Tag: ভারত

  • ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!

    ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!
    গৌতম দাস
    ২০ এপ্রিল ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4mT

    ‘The next few months are a crucial test of our democracy’   ‘The next few months are a crucial test of our democracy’ | Photo Credit: AP

    রাজনৈতিকভাবে গ্লোবাল ইস্যুতে  এশিয়া উত্তাল হয়ে উঠছে।  বিশেষ করে সাউথ-ইস্ট এশিয়া সামনের দুবছরে আরও বড় করে উত্তাল হবে। লঙ্খণগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে।   ঘটনার মূল ফেনোমেনাটা হল অর্থনৈতিকভাবে  রাইজিং চীনের দুনিয়া জুড়ে প্রবল  গ্লোবাল প্রভাবের প্ক্ষেটভুমিতে  ব্যাপারটা উঠতি চীন আর নামতি আমেরিকা এরই উত্থান-পতনের ঘটনাবলী ও প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে । যেটাকে অনেক সময় আমি “গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল” বলে ব্যাখ্যা করেছি। চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা আর তা থেকে জেগে উঠা কোন হবু সংঘাত – এই ঘটল বলে, লাগল বলে ধরণের পরিস্থিতিতে যা গত অন্তত দশবছর ধরে ক্রমশ বাড়ছে বা অস্থির হয়ে উঠছে – এটা হল সেই দৃশ্যপট।

    এর আগে আমরা দেখেছি ওবামা আমলের সেকেন্ড টার্ম (২০১৩-১৬) থেকে এই পালাবদলের ফেনোমেনা সাধারণ চোখে মোটামুটি  দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। তাতে তা বড়জোড় শ্রীলঙ্কা, বা মালদ্বীপ বা নেপালের নির্বাচনে ওসব দেশের দলগুলো একেকটা হয় ভারত বা চীনের সমর্থক হয়ে এমন ‘পালাপদলের’ প্রক্সি খেলে  চলছিল – এতটুকুই দেখা যেত। এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও  তখনকার ভারত মানে? সেকালের ভারত ছিল মূলত এশিয়ায় – এঅঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থের প্রতিনিধি ফলে ভারতের উপস্থিতি যেন এক বরকন্দাজি “যৌথ” উপস্থিতি। আমেরিকা তখন ব্যাপারটাকে আমাদের বুঝাতে এক বয়ান ভাষ্যে বলত – ভারত হল “এশিয়ায় আমেরিকার চীন ঠেকানো এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্ট”। তাই এশিয়ায় ভারতকে আমেরিকার এই চাঙ্গে তোলা!

    কিন্তু এখন এশিয়া উত্তাল হবার কথা যেটা বলছি, তাতে কথিত সেই যৌথ উপস্থিতি জিনিষটাই নাই, উধাও! তা একেবারে বদলে গিয়েছে। এককথায় বললে – যৌথ উপস্থিতি দূরে থাক বরং এশিয়ার ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যেকোন স্ট্রেটেজিক ইস্যুতে আলাদা; যার যার তার তার। তবে এমন আলাদা অবস্থান যত গভীরে ততই আরো বেশি করে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে; তবে ততদুর তা প্রকাশিত করা হয় না; তবে সেটা দুপক্ষেরই নিজ নিজ স্বার্থের আলাদা কারণে।

    যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান একবারেই আমেরিকার চেয়ে আলাদা। ভারত এখন রাশিয়ান তেল রপ্তানির  প্রধান পার্টনার। কিভাবে  নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া সরাসরি তেল রপ্তানি করতে পারে না। তাই ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি করে এরপর, রিফাইন করে পরে আবার বিদেশে বিক্রির সবচেয়ে বড় দেশ। ভারত তার আট-নয়টা রিফাইনারির সবগুলাই এখন কেবল একাজেই ব্যস্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেলের সেকেন্ডারি উতস হিশাবে ভারত ঐ তেল আবার বিভিন্ন পশ্চিমা দেশেই  রপ্তানি করছে।
    কাজেই সরকথাটা হল ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত রাশিয়ার পক্ষে আর বিপরীতে আমেরিকা রাশিয়ার বিপক্ষে তা সবাই জানেন।

    আমেরিকার বার্মায় রেজিম চেঞ্জে আগ্রহঃ
    তবে ভারত আর আমেরিকা  স্ব স্ব স্ট্রাটেজিক স্বার্থে কত দূরদুরান্তে আলাদা এর মোক্ষম উদাহরণ হল আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” [Regime Change] বা সরকার বদলের আগ্রহ – এই ইস্যু। এই ইস্যুতে বরং ভারত-চীন-রাশিয়া এই তিন দেশ যৌথভাবে আমেরিকার বিরোধী অবস্থানে।  ভারতে আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিডিয়া এনালাইসিসে রিক [RIC] বলে একটা শব্দ ব্যবহার শুরু হয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। [আগ্রহীরা এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন।] যেটা আসলে যথাক্রমে রাশিয়া, ভারত ও চীন এই তিনদেশের ইংরাজি নামে  প্রথম অক্ষর  নিয়ে তৈরি।  তবে আবার সাবধান এজন্য যে  এটা আর ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ (১৯৫৩-৯২) নয়। দুনিয়াতে কোথাও আর কোল্ড-ওয়ার এর নীতি ও অভ্যাস নাই। মানে হল, কোল্ড-ওয়ারের কালে কোন দুই দেশ স্ট্রাটেজিক বন্ধু হলে তারা এতে বাকি অন্য সব ইস্যুতে আপনাতেই ‘বন্ধু’ হয়ে যেতই। কিন্তু একালে সব উলটা। একালে দুই রাষ্ট্রের যেকোন শত্রুতা বা বন্ধুত্ব হল মূলত ইস্যু ভিত্তিক। তাই একালে দুইটা রাষ্ট্র এক ইস্যুতে চরম শত্রু হলেও অন্য ইস্যুতে কিছুটা ‘বন্ধু’ থাকতে দেখতে পাওয়া সম্ভব। চীন-ভারত এখনও বিভিন্ন স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ইস্যুতে যথেষ্ট শত্রুতা বজায় রাখে, আর ভারতের মিডিয়া এখনও এন্টি-চায়না টোনে যেকোন কিছু বয়ান করে থাকে। কিন্তু  আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” ইস্যুতে  ভারত-চীন একসাথে আমেরিকা বিরোধিতায় ও অবস্থানে;  আর তা রাশিয়াকে সাথে নিয়ে। আর একথাও সত্য যে এই ইস্যু খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশাল বলেই অন্য অনেক ইস্যুর উপরে  – তা খুবই নির্ধারক। যেমন “বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ” ইস্যু ভারতের কাছে খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশালী ইস্যু বলতে বুঝতে হবে এই ইস্যু ভারতের অন্যান্য ইস্যুতেও যা প্রভাব রাখবেই। যেমন, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে নোঙর করে উপস্থিত থাকুক এটা আমেরিকার বহুদিনের খায়েস। আর ঠিক এর উলটা অবস্থানটাই ভারতের। মরে গেলেও আমেরিকান এই খায়েসে একমত হবে না ভারত।
    ‘বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ’ ইস্যু বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান নৌ-উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। যদিও এর চেয়েও বড় কথা বার্মা আর ভারতের বিস্তির্ণ সীমান্ত আছে যা বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেলে এর ব্যাপক প্রভাব ভারতের উপর পড়তে বাধ্য। শুধু তাই নয়, এঘটনা ভারতের আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট অঞ্চল এর উপরেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। যদিও  এতদিন ভারত ভেবে এসেছে তার আসামসহ নর্থ-ইস্ট অঞ্চল রক্ষার স্বার্থ  এর প্রধান বাধা ও বিরোধি হল নর্থ-ইস্ট সীমান্তেরওপারে চীনের উপস্থিতি বা চীনের তিব্বত সীমান্ত। আর এটাকে বিক্রি করেই ভারত এতদিন বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর আদায়, বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ আর ফেনী-অঞ্চলকে যত রকমভাবে সম্ভব কব্জা করে নেয়া ও রাখা তা করে গিয়েছে। কিন্তু এখন টের পাচ্ছে আমেরিকা ভারতের জন্য প্রকৃতপক্ষে কে ও কী???

    কিন্তু কাকে ঘিরে এশিয়া উত্তাল হচ্ছেঃ
    এলেখায় কথা শুরু করেছিলাম ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলে। কিন্তু কাকে ঘিরে তা হবে? মানে এর কেন্দ্র বা ফোকাস হতে যাচ্ছে কোন ভুগোল? সোজা জবাব হল,  সেই মূল ফোকাস হতে যাচ্ছে সম্ভবত বার্মা। তবে এটা সেখানেই একমাত্র বা ঘনীভুত থাকবে তা না। এর সরাসরি ভৌগলিক কেন্দ্র হবে চীনের তিব্বত-কুনমিং সীমান্তের নীচের অংশ থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট ও সংলগ্ন সব অংশ আর বলাই বাহুল্য বাংলাদেশও; ইত্যাদি সব ভূখন্ডই। তবে এসব কথা ভুগোল হিশাবে বলা, রাজনৈতিক প্রভাব বা বলয়ের দিক থেকে নয়, সেটা আরও বড় ও ব্যাপক।

    তাই  ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলতে এসবের বাইরেও নানান জায়গায় ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থে পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠছে ও উঠবে। যেমন উপরে ভারতের কিছু ভৌগলিক অঞ্চলের কথা বললেও রাজনৈতিক দিক থেকে সারা ভারতের উপরেই ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠতে পারে। আর ভারতে এসব কিছুই ইতোমধ্যে নড়াচড়া করা শুরু করে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। যদিও তা বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে তা বোধহয় আগামি “২০২৪ সালের আসন্ন কেন্দ্রিয় নির্বাচনকে” কেন্দ্র করেই।  আসলে, কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর কাছে  ২০২৪ সালের নির্বাচনে   মোদি ও বিজেপির ভরাডুবি ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে এই আমেরিকান পরিকল্পনা আগাচ্ছে।
    যেমন একটা ঘটনার কথা বলি।
    রাহুলের কংগ্রেসের সাথে মমতার তৃণমূলের সম্পর্ক খুবই খারাপ, বিশেষেত মোদিবিরোধি জোটের নেতা হিশাবে কংগ্রেস অথবা রাহুল গান্ধী কোনটাকে মানতে তৃণমূল রাজী নয় বলে। আবার, কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস  বিজেপিকে শত্রু মনে করে না বরং গোপনে বা প্রকাশ্যে বিজেপির সাথে মমতাবিরোধী এলায়েন্স করে।  একারণে গত ২ মার্চ ২০২৩ মমতা জানিয়ে দেন যে আগামি  “২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিরোধী জোটে যাচ্ছে না তৃণমূল, লড়বে একলাই, জানিয়ে দিলেন মমতা“। কোন জোটে যাবেন না।  কিনতু বেশি না ঐ মাসের তিন সপ্তাহের মাথায় একেবারে বিরোধি জোটের নেতা হিশাবে রাহুলের পক্ষে নিজে টুইট করলেন খোদ মমতাই। তিনি সব “তিক্ততা ভুলে কার্যত রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে … “রাহুলের পক্ষে মমতার টুইট: আমাদের গণতন্ত্র আজ নতুন নীচতায় পৌঁছাল। কেন?
    কারণ, ততদিনে মমতা জেনে গেছেন এই বিরোধি জোট নেতা রাহুল আগের জন নন। এটা সর্বাত্মক! তার মানে আমেরিকা ভারতে মোদির বিরোধিদের একাত্ম করতে পেরেছে এই মাঝের সময়ের মধ্যে।

    এখন এতে কী হতে পারে? সারা ভারতরাষ্ট্র মূলত এতে শেষে এমন এক যুগে প্রবেশ করতে পারে তাতে তা এই প্রথম হিন্দুত্ববাদ-সহ  মোদির বিজেপি-আরএসএস সমূলে উপড়ে পড়তে পারে। পুরানা গান্ধী-নেহরুর সফট বা লুকানো হিন্দুত্ববাদ ( মানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদ) যা একালে (২০১৪) মোদির প্রধানমন্ত্রী হবার আগে ঢলে পড়ে বিলীন হবার যুগে হাজির হবার পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনি বিজয় থেকে মোদির বিজেপি-আরএসএস একে আরো উগ্রভাবে  আর নরমের বদলে উগ্র-হিন্দুত্ব হয়ে হাজির হয়েছিল। তাতে ভারত চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও  চরম মুসলমান নিপীড়নমূলক এক চরম বৈষম্যমূলক  রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল, এবার এই পর্যায়ের একটা অবসান ঘটতে পারে।

     

    ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার সম্পর্কঃ
    কিন্তু ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার কী সম্পর্ক? বিশেষ করে যেখানে গতবার মানে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে তো আমরা তেমন কিছু দেখি নাই!
    হা সেকথা সত্যি; তবে সেবার আর এবার এক নয়; আর তেমন থাকছে না। মানে কী?
    আমাদের দেশেও আজকাল রাজনীতিক দল ক্ষমতায় বা বাইরে যেখানেই থাকুক এরা বলা শুরু করেছে “আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে, করার ক্ষমতা রাখে ইত্যাদি. যেমন এখানে দেখেন,  ….. যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোনও দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে।

    তবে এটা বলতে তামাসার মত শোনাচ্ছে যদিও তবু কথাটা হল – আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে বলতে মনে করা হয় এটা কেবল বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের বেলায় সত্যি। তবে, যেখানে ভারত অবশ্যই একালে আর যেন তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলে বুঝানো যাবে না। কেন?
    কারণ, মোদির প্রপাগান্ডায় ভারতের সারা মিডিয়া এক উগ্র-হিন্দুজাতি-বোধ থেকে সময়য়ে নিজ পত্রিকায় লিখেছে ও বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে ভারত তৃতীয় বিশের দেশ থেকে একলাফে কবে যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে। দ্যা-হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দারও একথা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু মোহভঙ্গের পরে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন।
    মোদির সেই ‘পরাশক্তি ভারতকে’ বাইডেনের আমেরিকা এখন মোদি রেজিম চেঞ্জের জন্য উঠে-পড়ে লেগে গিয়েছে – যদিও পুরা ঘটনাটা দেখে আগামি ২০২৪ সামের মে মাসের ফলাফলে জনগন দেখবে মোদি সেই নির্বাচনেই হেরে গেছে – এমনই মনে হবে হয়ত।
    তাই এশিয়া উত্তাল হচ্ছে বলতে যদি ভারতের দিকে তাকিয়ে বলি তবে, বলতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে আগামি বছর ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এই নির্বাচন শুরু হতে এখন থেকে এক বছরেরও কম সময় আর বাকি আছে বুঝতে হবে। কারণ গতবারের (২০১৯ সালের নির্বাচন) কথা মনে রেখে বললে ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন শুরু হয়ে যাবার কথা। আর আমেরিকা ও রাহুলের নেতৃত্বের বিরোধী দলের টার্গেট হল ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি ( ফলে সাথে তার হিন্দুত্ববাদও) উপড়ে উঠিয়ে ফেলে দেওয়া। আর আমেরিকান টার্গেট হল, এভাবে ভারত থেকে প্রো-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক নীতি-পলিসির এক ভারতকে পাওয়া।

    মোদি-উপড়ানোতে উতসাহিদের বয়ান দাবি করে যে ভারতে ধারাবাহিক একশন শুরু হয়ে গেছে। যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, শেয়ার বাজারে মোদির দোস্ত আদানির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুলের ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ] বলে মোদির অভিযোগ, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে যুক্ত।

    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্টঃ
    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট মানে হল আমাদের ভাষায় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় এর মুখপাত্র ছাড়াও আরেকজন উপ-মুখপাত্র আছেন যার নাম বেদান্ত প্যাটেল। তাকে আগে আমরা খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু তিনি এখন খুব এক্টিভ। ভারতের কেন্দ্রিয় সংসদের স্পিকার কংগ্রেসের রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করে দিয়েছেন।  আর এর অজুহাত হল গুজরাতের এক মেজিষ্টেট কোর্টে দুবছর আগের মামলা যে রাহুল মোদির মানহানি করেছেন, তার তাকে দুবছরের সাজা দিয়েছেন। তবে কোর্ট নিজেই তাকে আগাম জামিন দিয়েছেন উচ্চ আদালতে যাবার জন্য, এর আগে সাজা বলবত স্থগিত রেখেছেন ইত্যাদি। এমনিতেই বহু আইনি ত্রুটিতে ভরা এক সাজা আদেশ আর এছাড়া ঐ আইনেই বলা আছে চলতি সংসদ সদস্যের বেলায় আপিলের আগে এই সাজা বলবত করা যাবে না তবু স্পিকার  রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করেছেন। এরপর ঐ বেদান্ত প্যাটেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন আমেরিকা রাহুলকে নিয়ে আদালতের ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখছেন। ‘Importance of freedom of expression’: US says it’s watching Rahul Gandhi’s case – এই শিরোনাম দেখুন।
    অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে এখানে এসে ভারত আর বাংলাদেশ যেন একাকার – এক তৃতীয় বিশ্বের দেশ নিয়ে আমেরিকান বিবৃতি যেমন হয়ে থাকে।

    হিউম্যান রাইট নিয়ে আমেরিকাঃ
    আমাদের মত দেশে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ কী কাম্য? স্বাগত জানানোর মত? নাকি আমাদের আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপের উসিলা?
    এককথায় বলা যায়, কমিউনিস্টেরা মনে করে এটা হস্তক্ষেপ। কোন দেশ উত্তর কোরিয়া হয়ে গেলেও ভিন্ন কোনদেশের তা একেবারেই আমল করা উচিত না। কারণ, এটা তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়।

    এ সম্পর্কে একটা কথা বলাই যথেষ্ট যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক বলে কোন ধারণা নাই, অনুপস্থিত। অতএব সে অবস্থায় আবার নাগরিক অধিকার বা অধিকার [Citizen’s right] বলে কোন ধারণা সেরখানে থাকার আশা করা অর্থহীন। তবে রাষ্ট্রে শ্রেণী [Class] বলে ধারণার প্রাবল্য আছে। কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে বাসিন্দারা সকলে নাগরিক এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলে সমান নাগরিক অধিকারের নাগরিক। কমিউনিজমের রাষ্ট্র চিন্তায় নাগরিক বলে ধারণাটাই নাই, তাই সমান অসমানের বালাই নাই। তবে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা শ্রেণী ধারণা আছে।  আর তাদের ওই রাষ্ট্র কেবল প্রলেতারিয়েটের পক্ষের রাষ্ট্র, এর পক্ষে সগর্ব ঘোষণা আছে। সুতরাই এখানে সমান নাগরিক, সমান অধিকারের মানুষ বা নাগরিক বলে কিছু নাই। বরং মারাত্মক অসম ক্ষমতার বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা ও অসম শ্রেণী ধারণা আছে।
    অতএব কমিউনিস্টেরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা বলে, আভ্যন্তরীণ ইস্যুর কথা তুলে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকবে বা লুকাবে স্বাভাবিক!

    কিন্তু তাই বলে কী  হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে কথা তুলে আমরা আমেরিকাকে ডেকে আনবো? হস্তক্ষেপের উসিলা করে দিব?
    সেটাও অবশ্যই না।  এককথায় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘণ বা হস্তক্ষেপ না করতে দিয়েও অধিকার দিয়ে কথা বলতে দেয়া সম্ভব ও তা যায়।  এছাড়া মনে রাখতে হবে হিউম্যান রাইট তো জাতিসংঘের ঘোষিত ম্যান্ডেট এবং ইস্যু তাই এনিয়ে জাতিসংঘের ফোরামে তো কথা উঠবেই।  আর এখানেও কোন কথা না তোলার মানে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিতরে  সরকারবিরোধী সবাইকে গুম-খুন অপহরণ বা পিটায়ে মেরে ফেললেও তা নিয়ে বাইরের কাউকে কথা বলতে না দেয়া হবে।
    আসলে মূল তর্কটা অন্যখানে, সেখানে সরাসরি যাওয়া যাক।
    আমেরিকান সরকারি ফরেন পলিসিতে, আমেরিকান সরকার যদি কোন দেশ ও সরকারের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন এর বিরুদ্ধে কথা বললে আমেরিকারর নিজের স্বার্থ আছে বলে না দেখে তবে আমেরিকা সেক্ষেত্রে নিঃশ্চুপ থাকবে। অর্থাৎ ভায়োলেশন হলেই তা নিয়ে আমেরিকা মুখ খুলবে না। যদি তাতে আমেরিকান স্বার্থও না থাকে বা আমেরিকান সরকার না দেখে।

    তাহলে কনক্লুশন কীঃ
    ওয়ান-এলেভেনের হস্তক্ষেপ এর সুবিধা  যাদের পক্ষে গেছিল স্বভাবতই তারা এই হস্তক্ষেপকে ভাল বলবে। অন্যেরা সমালোচক হবে। বর্তমানে বা আগামিতেও এই নিয়মে সব হিসাব মিলবে দেখা যাবে। এর বাইরে আপাতত কোন কমন সুত্র বা সমাধান দেখছি না।

    সবশেষে ভারত প্রসঙ্গে আরেকটা তথ্যা দেই। সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও রাহুলের মা। দলের এক শীর্ষ বা প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি মোদির দুটার্মের প্রায় দশ বছরে রাজনৈতিক অপরাধ ও অন্যায়গুলোর একটা তালিকা করেছেন। অন্যভাবে বলা যায় মোদির নাগরিক অধিকার লঙ্ঘণ-গুলোর এক গ্রহ্নিত তালিকা এটা।  সিরিয়াস ও ভাল তালিকা সন্দেহ নাই। শিরোনাম করেছেন,  “An enforced silence cannot solve India’s problems.” জবরদস্তিতে চুপ করিয়ে দেয়া ভারতের সমস্যার কোন সমাধান নয়।  কিন্তু একটা অসুবিধা হল তিনি এটা কেবল দ্যা হিন্দু পত্রিকাকে দিয়েছেন আর তারা পাঠক এটা পুরাটা পড়তে চাইলে পয়সা চাচ্ছেন। যা খুবই অন্যায়। কংগ্রেসের দিক থেকেও বড় অন্যায়।  তবে অর্ধেকটা বিনা পয়সাতে পড়া যায়।
    একটা ভিন্ন বিকল্প আছে। আরো কয়েকটা পত্রিকা এনিয়ে পর্যালোচনার ছলে প্রায় অনেকটাই ছাপিয়ে দিয়েছে, যাদের একটা হল ইন্ডিয়া টুডে – সেটা এখানে দেখা যেতে পারে।  এমন করে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা এর টা এখানে।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    গৌতম দাস

    ২৬ জানুয়ারি ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4mg

     

     

    Fact Sheet: Indo-Pacific Strategy of the United States – U.S. Embassy in the Philippines

    বাইডেনের আমেরিকা সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। বেচারা হয়ে গেছে! তাঁর কোন নীতি-পলিসিই কাজের না, ফলে আনতে পারছে না। তাতে সেটা হোক ইউক্রেন ইস্যু অথবা বাংলাদেশের মত ছোটদেশের উপর আমেরিকান প্রভাবের ক্ষেত্রে; সব অকার্যকর। ফলে শেষে কেবল বকোয়াজ আর বোলচালে ভরপুর এক আড়াল তুলে দাঁড়িয়ে থাকছে তাঁর প্রশাসন। ব্যাপারটা হল কেবল ফাঁকা দাবি না,  ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় তিনি ভাল বিকল্প – সেটা নিজ আমেরিকান জনগণের কাছে তো  অন্তত প্রমাণ করতে হত; এখন এশিয়ায় বা বাংলাদেশের মত দেশের ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে  মূলত যেন এক ‘খামোখা’ বলেই পরিচিতি তুলে ধরছেন। বাংলাদেশের যারা হাসিনার শাসন এই ফ্যাসিজম থেকে মুক্ত হবার স্বপ্ন দেখছিলেন যেখানে আমেরিকার একটা ভুমিকা থাকার সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে, তারাও সমুলে হতাশ হয়েছেন।

    যেমন ধরা যাক, বাইডেন তাঁর শাসনের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘হিউম্যান রাইট’ বা মানবাধিকার নাকি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গ। যারা পোড় খাওয়া ‘আমেরিকা অবজারভার’ তারা বিশ্বাস করেন নাই; কিন্তু এটাই পরিণতি তা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন। যেমন বাইডেনের শাসনকে বলা যায় “স্যাংশনের রেজিম’ বলা যায়। যা কিছুই বাইডেনের অপছন্দের বা আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে তিনি মনে করেছেন তাতে সেখানেই তিনি যেন এক স্যাংশন আরোপের রাজা বনে গিয়ে অবিরাম সেসবের উপর স্যাংশন আরোপ করে গেছেন। এসবের মধ্যে কোথাও সত্যিই হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ঘটনাবলীও মাখামাখি করে আছে, অবশ্যই। যেমন বাংলাদেশের গুম, খুন হত্যা, অপহরণ, গায়েব, ‘ক্রশফায়ারের’ নামে হত্যা ইত্যাদি যতধরণের অপরাধ আছে তা গত পনেরো বছরে ঘটে চলেছে। নিঃসন্দেহে এগুলো হিউম্যান রাইট চরম ভায়োলেশনের ঘটনা। যেসবের উপর আমেরিকা স্যাংশন আরোপ করেছে। আবার একই নিঃশ্বাসে যেমন, রাশিয়া তার জ্বালানি তেল বিদেশে বেচতে পারবে না – এজন্য সে একই স্যাংশনও যথেচ্ছাচারে আরোপ করে চলেছে। যা মানবাধিকারের ইস্যুওই নয়; বরং খাসা একান্তই আমেরিকান ব্যবসা-বাণিজ্যিক স্বার্থ বৈ আর কিছু না – এমনটাও আছে।

    ঠিক যেমনি বাংলাদেশে হাসিনা রেজিমের তার রাজনৈতিকবিরোধীদের নির্বিচার দমনকে জঙ্গীবাদ দমনের নামে চালিয়ে দেয়াতে –  এর বিরুদ্ধে হাসিনার র‍্যাবসহ নানা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের উপর স্যাংশন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইতিবাচক বলে দেখে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু না – পরিশেষে আমেরিকা সবকিছুকেই তার চীনবিরোধী বাণিজ্যিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বলে যে মনে করে সেকথা আর লুকায়ে রাখল না বা পারল না!

    এককথায় বললে, ঢাকার শাহীনবাগে গুন-খুনের ভিকটিমদের সাথে দেখা করতে রাষ্ট্রদুত পিটারহাস উপস্থিতের সাথে সাথে হাসিনা যে মৃদ্যু পরোক্ষ বাধার পালটা অবস্থান দেখিয়েছিল তাতেই আমেরিকার নিজের আগানোর পথ নিয়ে রিভিউ-এ বসেছিল। এই আদ্যোপ্রান্ত পর্যালোচনা থেকেই আমেরিকার পথ চলায় গিয়ার বদল! মানে যেটারই পরিণতি আমরা দেখলাম ডোনাল্ড ল্যু এর বাংলাদেশ সফর। আর সেখান থেকে বাইডেনের মতিগতির ল্যাংটা হয়ে পড়া! কেমন সেটা?
    সেটা হল ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এসব বাইডেন প্রশাসনের কাছে কিছু না! তারা এসবের আসল ভক্ত না। সিনসিয়ার বা সিরিয়াস কোনটাই না! বকোয়াজ মাত্র!! বাইডেনের আসল স্বার্থ সারা দুনিয়ায় যেমন, তেমন এশিয়াতেও তার প্রতিযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বি নয়া উত্থিত হতে থাকা চীন; এই চীনবিরোধীতায় নিজ স্বার্থ উদ্ধার এটাই বাইডেনের মুখ্য নীতি-পলিসি। আর সেকাজ তার বাকি সব ততপরতা বিক্রিযোগ্য! যেমন এসময়ের এশিয়ায় বাইডেনের স্বার্থ সোজা  ভাষায় যা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) নামে পরিচিত।

    একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাঃ
    এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, এই আইপিএস (IPS) বা আগের কোয়াড (QUAD) গঠন – এদুইয়ের সম্পর্কই বা কী? প্রথম সমস্যা আমাদের মিডিয়া রিপোর্টার লেবেলেই ব্যাপারটা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। এর উপর আবার ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF) বলে আরেক ফেকড়া বা বাড়তি দিক (এক্সটেনশন) বা নয়া খাতা আছে।
    খুবই অল্প কথায় বললে, কোয়াড [QUAD] বা চারদেশীয় জোট (আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া)  যেটা ছিল তা কার্যত অকেজো। হাত লাগলেই ভেঙ্গে যাবে, সম্ভবত ভারত বেরিয়ে যাবে; এরকম! মূলত, একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাকে না বুঝা থেকে এই সমস্যা। আমেরিকা বরাবর এব্যাপারে ফেল করছে এজন্য যে তাদের মাথায় জোট বলতে সবসময় কোল্ডওয়ার কালের (১৯৫৩-৯১) সোভিয়েত (ব্লক) বনাম আমেরিকা (পশ্চিমা জোট) এর স্বপ্ন মাথায় ঘুরে থাকে। এই স্বপ্নকল্পনার কারণে আমেরিকার মনে ইচ্ছা করে আগের সোভিয়েতের মত যদি একালে চীনবিরোধী এক পশ্চিমাজোট (মূলত আমেরিকা ও ইইউ এর সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট) গড়তে পারা যায়।
    অথচ এই স্বপ্নটা একেবারেই অবাস্তব, অথচ সেটা আমেরিকার ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদলের কোন প্রেসিডেন্ট যারা হয়ে আসছেন তাদের  নীতি-পলিসিতে এটা প্রতিফলিত নাই। কিন্তু কেন অবাস্তব বলছি? সেকথা বললেই বাকি সব কথা পরিস্কার হয়ে যাবে। যাকে সোভিয়েত ব্লক বলছি এদের মূল ও কমন পরিচয় এটা না যে তারা কমিউনিস্ট অর্থনীতির চক্করে আটকে থাকা দেশ ছিল তাই। তাদের মুল পরিচয় আসলে তারা কেউই আইএমএফের [IMF] সদস্য ছিল না; তবে সেটা দু’এক রাষ্ট্র হতে চেয়েও সদস্যপদ পায় নাই বলে, আর বাদ বাকিরা, বেশির ভাগই রাশিয়ার স্টালিনের  অবস্থানের কারণে নিজেরাও সদস্য হতেও চায় নাই, একারণে। কিন্তু সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো আইএমএফের সদস্য ছিল না তাতে কী?

    এর এককথায় উত্তর হল, আইএমএফের সদসদ্য নয় একথার ব্যবহারিক মানে হল এসব রাষ্ট্র অন্যকোন রাষ্ট্রের সাথে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে পারবে না বা পারত না। এই কারণে তখনকার মানে কোল্ডওয়ারের  [Cold War]আমলে যেকোন জোট মানে কার্যত তা সামরিক-স্ট্রাটেজি অথবা রাজনীতিক আদর্শ কেন্দ্রিক জোট হত।  এর চেয়েও বড় কথা সেকালের ‘জোট ধারণা’ একালের ‘জোট ধারণা’ একেবারেই এক নয়। মানে কী?

    মানে হল একালের জোটে যার সাথে সামরিক-স্ট্রাটেজিক অথবা এমনকি অর্থনৈতিক স্বার্থের গভীর বিরোধ আছে তারই সাথে আবার একালে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘটে আছে। ফলে সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ গভীরবিরোধ থাকলেও তারই সাথে আবার গভীর বাণিজ্যিক লেনদেন ও পরস্পর গভীর নির্ভরতা তা শুধু সম্ভবই নয় একেবারে প্রধান বাস্তবতা। চীনের সাথে আমেরিকা, চীনের সাথে ভারত, চীনের সাথে জাপান, চীনের সাথে অষ্ট্রেলিয়া এমন প্রায় সকলের সাথেই চীনের যে  গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং এতে পণ্য-পুঁজির গভীরতম বিনিময় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা – এটাই বাস্তবতা। এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক এতই প্রধান যে একই সাথে চীনবিরোধী কোন সামরিক-স্ট্রটেজিক বা রাজনৈতিক জোট গড়া তা প্রায় অসম্ভব হয়ে আছে; এতে হয়ত তা গড়া হয়েছে ঠিকই, কার্যত যা অকেজো! যেমন সর্বশেষটা হল, অষ্ট্রেলিয়া বা জাপান। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় স্কট মরিসনকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন অ্যান্থনি আলবানিজ। স্কট মরিসনের দল লিবারেল পার্টি। আর নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন লেবার পার্টির অ্যান্থনি আলবানিজ। অষ্ট্রলিয়া-চীন বিরোধে চীনে অষ্ট্রেলিয়ার সব রপ্তানি সুবিধা  প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল।  অষ্ট্রেলিয়ায় নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী এখন আগের দলের উপর দোষচাপিয়ে আগের মতই চীনে রপ্তানির সুযোগ কতটা পুনরুদ্ধার করা যায়, চীনের সাথে সেসব সম্পর্ক ও চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গভীরভাবে ব্যস্ত।  আবার ওদিকে জাপান; চীনে কোভিডের কারণে চীনের অর্থনীতির অনেক খাত ঝুলে পড়াতে জাপানের র্অথনীতি সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ও এর ধাক্কার শিকার দেশ হয়ে উঠেছে। আবার কোয়াডকে আমেরিকা সামরিক অভিমুখী করে ঘুড়িয়ে দিতে চাইলে সবার আগে পিছটান দিয়েছে ভারত; ভারত কারও সাথে সামরিক জোট করতে চায় না, তাই। তাই বাইডেন আর কোয়াড নিয়ে সমস্ত নাড়াচাড়া স্তব্দ করে রেখেছেন।

    আর তাতেই আইপিএস (IPS) নামে আমেরিকা নয়া এক খাতা খুলেছেন বা এদিকে জোর দিয়েছেন। কিন্তু আইপিএস কী কেন? বলা হচ্ছে এটা কোয়াড থেকে আলাদা। জিজ্ঞাসা করলে বলে এটা কোন রাষ্ট্রজোট নয়, ডোনাল্ড ল্যু এবারের বাংলাদেশ সফরে যেমন পাবলিকলি বলেছেন। তাহলে এটা কী? বলছেন এতে নাকি সবদেশই ইন্দো-প্যাসেজিক জোন প্রসঙ্গে নিজের নিজের স্ট্রাটেজি জানাবে। কিন্তু কেন বা কী উদ্দদেশ্য? এখানেই কবি একটু নিরব! মানে প্রথমত এটা কী কোন একটা দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য স্ট্রাটেজি বা কৌশল? নাকি যুদ্ধ কৌশল, না সামরিক স্বার্থের কৌশল, নাকি রাজনৈতিক, না অর্থনৈতিক – এসব এই প্রশ্ন আছে। তা কেউই প্রকাশ্যে পরিস্কার করছে না। দ্বিতীয়ত, এখানে শত্রুদেশটা কে? এটা সবচেয়ে নির্ধারক প্রশ্ন! এটা লিখিত ভাষায় বা রেকর্ডে না বলে চর্চায় তারা বলে থাকে; ফলে মনে মনে ধরে নেয়া সেই শত্রুদেশ হল চীন!

    তাহলে কী দাড়ালো এটা?  যেখানে আমেরিকাসহ সকল দেশই চীনের সাথে বাণিজ্য- অর্থনীতিতে পুঁজি-পণ্য বিনিময়ে গভীরভাবে সম্পর্কিত সেখানে একই সাথে চীনবিরোধী আইপিএস (!) এটা কেমন স্ট্রাটেজিক জোটের কল্পনা???  আমেরিকা ঠিক চাইছেটা কী???  এর বাস্তব দিকটা তো খোদ আমেরিকার কাছেই অপরিস্কার!! তবু আমেরিকা চাইছে এশিয়ার সবদেশ তো বটেই কানাডাকেও কার্ড দেখাতে হবে! বা কানাডার কাম্য ইন্দো-প্যাসেজিক স্ট্রাটেজি কী তা লিখে জানাতে হবে। মানে হল কতটা সে চীনবিরোধী তা দেখাতে বলতে হবে! আর ঠিক এর মতই হাসিনার বাংলাদেশেকেও মূলত সেকথা বলতেই এসেছিলেন ডোনাল্ড ল্যু। তিনমাস মানে মার্চ মাসের মধ্যেই তা আমেরিকাকে জানাতে হবে। এদিকে আরও প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

     

    ওদিকে আইপিএস, এর আরেক বাড়তি ঝালড় আছে – সেটা হল, ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF)। মানে এটাই আসল অর্থনৈতিক জোটের কল্পনা। কিন্তু সমস্যা হল, এটা টু লেট (too late)!! কেন?

    কারণ ইতোমধ্যেই চীনা আগ্রহের আরেক এবং আরো গুছানো এক অর্থনৈতিক জোটের জন্ম ও ততপরতা গত ২০২০ সাল থেকে শুরু হয়েই আছে যার নাম RCEP। বাংলা লিখলে, রিজিওনাল কম্প্রিহেন্সশীপ ইকোনমিক পার্টনারশীপ [RCEP]। যেটা আসলে কালজয়ী; কারণ এটা জোটদেশগুলোর যেকোন উতপাদিত পণ্যে সদস্য সবদেশেরই শ্রম যুক্ত করার সুযোগ (shared value addition) রাখা হয় ও তাতে সকলেই এই পণ্যের ভোক্তা-ক্রেতা। যেমন জাপান, অষ্ট্রেলিয়া দুই কোয়াড সদস্য এমনকি আমেরিকা প্রভাবিত দক্ষিণ কোরিয়াও এই জোটের সদস্য হতে মিস করে নাই। জন্ম থেকে এরা সবাই সদস্য, তাতে কোয়াড বা IPS বলে কিছু গঠিত থাকুক আর নাই থাকুক!

    তাহলে এতদিনে  IPEF খাড়া করার আমেরিকান নয়া বাসনা কেন আর কতটুকু এটা নতুন কিছু করতে পারবে? যদিও এটা RCEP এর নকল করে তার চার বৈশিষ্টের একটা হিশাবে supply chains বলে একটা ধারণা রেখেছে যেটা shared value addition ধারণার ধারেকাছের নয় বলেই অনুমান। কারণ, shared value addition এটা আমেরিকান কনসেপ্ট নয়। বরং উঠতি অর্থনীতি বা ‘প্রাক্তন কমিউনিস্ট’ দেশ হলে এনিয়ে তাদের নিরীক্ষায় আগ্রহী দেশ হতে দেখা যায়। কারণ এখানে লেবার মানে ভ্যালু এডিশন“ভাগাভাগির” প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
    কিন্তু সেটাই মূল ইস্যু বা প্রধান বাধার দিক নয়। প্রধান বাধার দিক হল, আমরা যদি IPEF-এ যোগ দেই তবে আমাদের  কারখানা পুঁজি (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ) এবং  অবকাঠামো পুঁজির উতস কে হবে?

    একাজে আমেরিকা বুড়া সিংহ, আর বিপরীতে চীনকে উঠতি বাঘ বলা যায়। উদাহরণ, এই বুড়া বয়সে বাইডেনের আমেরিকা উঠে দাড়ানোর সখ করেছিলেন। বর্তমানের চীন দুনিয়ার আমাদের মত সবদেশের জন্যই অবকাঠামো পুঁজির ঋণদাতা ভুমিকায় একছত্র হয়ে উঠে আছে। এমন এক অর্থনীতিকে আমেরিকার বাইডেন এই বুড়া বয়সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। দেখা গেলে এতে তারা সবাই মিলে মাত্র ৬০০ বিলিয়ন ডলারের কমিটমেন্টের জোগাড় করতেই তাদের হিসশিম। এছাড়া এখনও এই সংগ্রহ হাতে আসা ও কাজে নেমে পড়ার ততপরতার কোন কিছুই শুরু করতে পারেন নাই। তাই খুব সম্ভবত ২০২৪ সালে বাইডেন ক্ষমতা ত্যাগের পরে এই উদ্যোগ্রটারও মৃত্য সংবাদ আমরা পাব!!!  তাহলে IPEF-এ যোগদানে আমাদের কী হবে????

    আসলে, কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক এসব শব্দ দিয়ে এপর্যন্ত আমেরিকান পেসিডেন্টেরা পিসমিল একমুঠো করে যা কিছু করে যাচ্ছেন এসবের কিছুই টিকবে না, শুরুতে কার্যকরই হতে পারবে না। তবুও  RCEP এর সমান্তরাল আরেকটা IPEF বলে জোট অবশ্যই খাড়াতে পারে তবে এর অন্যতম শর্ত হতে হবে যে এসব কোন অর্থনৈতিক জোটই বিশেষে দেশের (যেমন চীন অথবা আমেরিকা্র বিরোধী হতে পারবে না। ফলে একই দেশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সাপেক্ষে ইচ্ছা মত একই সাথে দুইটা জোটের মধ্যেই থাকতে ও সদস্য হতে পারবে, এমন জট হতে হবে। একটা জোটের মধ্যে সবাই থাকবে তাও হতে পারবে। কিন্তু কোন ভাবেই প্রকাশ্যে বা গোপনে আমরা চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক জোট করতে চাই, এমন করা যাবে না – এসব চিন্তা অবাস্তব, অকেজো। ঘৃণা ছড়াতে পারবে কিন্তু নিজে কার্যকর কিছুই হতে পারবে না। মুল কারণ আমরা সবাই একই [IMF] আইএমএফের সদস্য। মানে আমরা সকল রাষ্ট্র একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ ফলত আমরা মূলত একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ।  ক্যাপিটালিজমে “কোটারি” হয় না; সব ক্যাপিটালিজমই পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে  যাবেই; এভাবেই সে টিকে থাকে যা এর মৌল স্বভাব!

    চীন একারণের এটাকে নিন্দা করতে বলে, বাইডেনের ‘কোল্ডওয়ার মানসিকতা’।  এমনকি বাংলাদেশের চীনা নয়া রাষ্ট্রদুতই এসব ধারণা আড়াল নিয়ে বলেছেন “কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে: চীনের রাষ্ট্রদূত”। ওথবা “কোনো দেশকে বাদ দিয়ে গড়া জোটে যোগদানে সতর্ক থাকতে হবে”।

    এখনও তিনটা কথাঃ
    প্রথমত, আমেরিকা ল্যু এর সফরে মার্চের মধ্যে হাসিনা সরকারকে নিজদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরি করে তাদের জানাতে বলে গেছে বলে জানা যায়। কিন্তু এটা কেন?
    ল্যু যেটা বলতে চাইছেন এর সারকথা হল, বাংলাদেশ যেন চীনের সাথে সম্পর্ক বিশেষত অর্থনৈতিক যেটা যেমন প্রধানত, চীনা অবকাঠামো ঋণ ও চীনের উপর নির্ভরশীলতা না করে চলা। এছাড়া চীনা অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামও মানে করে থাকতে পারে। এছাড়া সাউথ চায়না সি নিয়ে আমেরিকা যে গায়ে পড়া ঝগড়া-বিরোধ বানিয়ে রেখেছে তাতে আমেরিকার পক্ষ নেয়। বাংলাদেশ যেন এমন অবস্থান নেয়!

    আমরা উপরে দেখেছি, আমেরিকান এই আকাঙ্খাটা আনরিয়েলিস্টিক; বাস্তবে তা সংঘটন বা করে দেখানোর কারও কোন সম্ভাবনা নাই বা সম্ভাবনাচ্যুত! তাহল এটা নিয়ে এই জিদ ধরার অর্থ কী?

    দ্বিতীয়ত, আমেরিকা বা এমনকি সে বগলে জাপানকে নিয়েও যে আমেরিকা সে আমাদের অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটানোর যোগ্য কোন দেশ নয়। যদিও এটা ঠিক ওয়ার্ল্ডব্যাংকের যেকোন ঋণপ্রকল্পে ওপেন টেন্ডার হতেই হয়।  যমুনা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের তরফে সিংহভাগ লোন দিয়েছিল জাপান। অথচ ১৯৯৭ সালে এই সেতু নির্মানে জাপান কোন অংশের কাজই পায় নাই। আর একালে, বাংলাদেশে চীনাঋণের প্রকল্পের কমিশন সরাসরি সিঙ্গাপুরে জমা হয়ে যায়, এটা এক বিরাট সমস্যা হয়ে আছে। কাজেই তরুণ উঠতি আকাঙ্খার ঋণ আকাঙ্খার বাংলাদেশকে আমেরিকা নিজ বাহুডোরে আটকে রাখার খায়েস; অর্থহীন!  তবে বাংলাদেশে নয়া এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ভিত্তিক নুন্যতম কিছু সংস্কার করতে পারলে এর অনুষঙ্গ হিশাবে চীনাঋণের কমিশন সমস্যার সমাধান সম্ভব। কারণ, চীনা সরকার আমাদের মত দেশে নুন্যতম সাধু বা সীমাহীন চরম চোর নির্বিশেষে সব ধরণের সরকারের সাথে কাজ করে থাকে।

    তৃতীয়ত,
    আমেরিকা কেন ডোনাল্ড ল্যু পাঠিয়ে এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) যোগদানের জন্য হাসিনা সরকারকে জোরাজুড়ি করছে?
    প্রায় ছয় মাস আগে থেকে বিএনপির এবারের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এবারের আন্দোলন শুরুর পিছনে গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১০ তারিখে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর আমেরিকান স্যাংশন আরোপের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে।  কারণ এবারের আন্দোলন শুরুর প্রথম দিকে সরকার আগের মত অভ্যাসে গুম-খুনের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারে যে এতে আগে থেকেই দেয়া স্যাংশনের চাপ আরো বাড়ছে ও বাড়বে। আর সরকারের এমন ততপরতা সব মনিটরিংয়ের অধীনে। তাই বলা যায় আমেরিকান অপ্রত্যক্ষ ইঙ্গিত ছিল এই আন্দোলন শুরু করার। শুধু তাই না, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ঢাকায় গোলাপবাগে বিএনপির লাখো সমাবেশের পরে প্রথম দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়  যে হাসিনা সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে এবার সত্যিই গণভিত্তি পেয়ে এক আন্দোলন উঠে দাড়িয়েছে। এরপর আসে পিটার হাসের আরেক স্টেপ আগানো। তিনি হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ভিমটিমদের ভিজিট করতে শুরু করে সরকারের দিক থেকে কিছু পরোক্ষ বাধার সম্মুখীন হন। আর এরপরেই আমরা দেখি পরিস্থিতি ক্রমশ আমেরিকার সাথে সরকারের “বাতচিত, ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর” ইত্যাদির দিকে যাচ্ছে। স্যাংশন আরোপের দিক থেকে বললে এটা নিঃসন্দেহে আমেরিকার পিছনে হাটা। কারণ, হাসিনা সরকারের সাথে যা যা ডায়লগ প্রয়োজন আমেরিকা মনে করে সেরকম  “বাতচিত ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর ইত্যাদি শেষ হবার পরই তা থেকে আমেরিকার প্তেরাপ্তি মনে করা যায় এমন  “কোন রফা” বা ভদ্র ভাষায় কোন অগ্রগতি না হলে এরপরই তো আমেরিকার স্যাংশন আরোপের দিকে যাবার কথা! এটাই অনুমান করা যায়!
    তার মানে আমেরিকা এই উলটাপালটা করে আগে-পিছে মানে এক-পা আগে পরে দুই-পা পিছের কূটনীতি করতে গিয়েছে! কেন? অনুমান করা যায় তাদের ধারণা এতে হাসিনার উপর  চাপের প্রভাবটা বেশি হবে!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা আমেরিকাকে বেশি চাপের সুবিধা দিবেঃ
    প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সেকথায় যাবার আগে অন্য কিছু কথা।
    তাহলো এর মানে বাইডেনের মানবাধিকার ও স্যাংশন তার পররাষ্ট্রনীতির কোন পলিসি তা একেবারেই নয়। বাইডেন মূলত মানবাধিকার ব্যবসায়ী হিশাবে নিজেকে হাজির করেছেন।
    এর মূল কারণ,  হাসিনা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি পেশ করবেন কিনা বা আমেরিকার নেতৃত্বে চীনবিরোধী কোন এক কমন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির অংশ হবেন কিনা অথবা ক্রমশ  ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক(IPEF) এ যোগ দিবেন কিনা অথবা চীনের সাথে অবকাঠামো ঋণসহ অন্যান্য প্রকল্প সুবিধা ও সম্পর্ক করা সব গুটিয়ে নিবেন কিনা ইত্যাদি এসবের সাথে  সমান্তরালে হাসিনার মানবাধিকার ভায়োলেশনের রেকর্ডের কী সম্পর্ক??? মানে হাসিনা চীনের থেকে সরে আসলে তার সব মানবাধিকার অপরাধ আর অপরাধ মনে করা হবে না???? তাই কী?
    ধরা যাক হাসিনা-সরকারের কাছে আমেরিকার যা কিছু খায়েস এর প্রায় সবকিছুতেই হাসিনা একমত হলেন। তাহলে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের  অভিযোগ এর রেকর্ড কী সব তখন থেকে ইতিবাচক বলে বিবেচিত হবে??? আমাদের জানা মতে, ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি হতে পারে একমাত্র উপযুক্ত আদালতে এর বিচারের পরে। এরপরেই কেবল অভিযোগ বা স্যাংশন উঠিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন!  তাহলে???

    তাহলে এই পরিস্থিতিতে এখন সরকারের সাথে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি ইস্যুতে আমেরিকার কথা বলা, সময় দেয়া কেন? আবার আমেরিকান সব প্রস্তাবে যদি সরকার একমত হয় তবে তাতে দেশে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সেই সাথে সেই নির্বাচনে এই সরকারকে পুনরায় জিতবার নুন্যতম নিশ্চয়তাও তাতে ব্যবস্থা কী থাকবে?? আমেরিকা কীভাবে হাজির করবে তা? নাকি তা সম্ভব? আর এসব নিশ্চয়তা না থাকলে সরকার কেন আমেরিকার এত কথা শুনবে, বা মান্য করবে? এমনিতেই হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ঘটানো – এমন সমীকরণ অসম্ভব। এর উপর হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কোন নির্বাচনে বিএনপিকে সামিল করা আরেক  অসম্ভব।

    অর্থাৎ বাংলাদেশের এক্ষণকার বাস্তবতা হল আগামি নির্বাচন পার হবে কীকরে আর  সাথে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি এদুইয়ের কোনটাকে বগলে নিয়ে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি-তে বাংলাদেশের এলাইনমেন্ট করে নেয়া নিয়ে কথা তোলা – এটা একদিকে আন-এথিক্যাল অন্যদিকে এমনটা ঘটবার কোন বাস্তবতাই নাই। আর সবার উপরে এসব ডিল বা সমঝোতা-অযোগ্য আইটেম। সেটা আমেরিকা বা হাসিনা সরকার দুদিক থেকে এটা ডিল অযোগ্য ইস্যু।
    যেমন গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার ভায়োলেশন চরমে উঠে আছে।  আর ওদিকে এই লম্বা সময়কালগুলোতে অভিযোগ সবকিছু জানা সত্বেও আমেরিকা এনিয়ে নিঃশ্চুপই ছিল। তাই বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিবার পরেও যদি এনিয়ে ধারাবাহিক নিশ্চুপ থাকত তাহলে একরকমের পরিস্থিতি হত। কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিজের পররাষ্ট্রনীতির নীতি-পলিসি বানানোর ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্য আচরনের পথে আর বাইডেন প্রশাসন যে নাই তাই তো উন্মোচিত!!  এককথায় “মানবাধিকার ও স্যাংশন”  এর পলিসি ঘোষণা ও স্যাংশন আরোপের পরে এটা  ডিল অযোগ্য ইস্যু হয়ে গেছে।
    আবার একটা মজার তথ্য হল, এখন ভারতও চায় না যে হাসিনা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তে সামিল হয়। প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদুত একথা বলেছেন বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে!

    আবার হাসিনার দিক থেকে যদি দেখি, কোন কিছু পাবার বিনিময়েও হাসিনার চীনের হাত ছেড়ে দেওয়ার যোগ্য থাকবে না। কারণ, সরকারের উন্নয়নের ঢোল পিটানোর সঙ্গে সামনজস্যপুর্ণ কাজ হল এই ধরণের ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা ও তা থেকে চুরির অব্যবস্থাপনা জারি রাখতে হবে। কারণ নাহলে দলের যারা এর বেনিফিসিয়ারী এরা কেউ আর দলের সাথে থাকবে না। অথচ সরকার চীনের হাত ছেড়ে দিলে  আমেরিকা-জাপানের পক্ষে হাসিনা সরকারকে ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা একই লেভেলে জারি রাখা অসম্ভব।
    মূলত এই প্রধান কারণেই আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে হাসিনা সরকারের চীনবিরোধী কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরির ততপরতায় সামিল হওয়ার বাস্তবতা নাই। এছাড়া আবার এটাই ছিল ২০২১ সালে হাসিনা সরকারের চীনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি; আর সেই সৌজন্যেই আমরা সে সময় বিনা পয়সায় আমাদের সমস্ত চীনা টিকা প্রাপ্তি ঘটেছিল!

    কাজেই সব ব্যাপারেই অবজেক্টিভিটি বা কঠিন বাস্তবতাই হয়ে উঠেছে একমাত্র নির্ধারক! আমেরিকা বা হাসিনা সরকার ডিল অযোগ্য বা সমঝোতায় আসা অযোগ্য এসব বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে আছে!
    তাই, আইপিএস (ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি) বা এর সংশ্লিষ্ট কোনও ততপরতায় হাসিনা সরকারের যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ! এছাড়া, বাংলাদেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছে; এতে একমাত্র রাস্তার আন্দোলনের দিকেই এই পরিস্থিতি থেকে বের হবার অভিমুখ রাস্তা!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ 
    ০০ঃ০২  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4l1

     

                  What is Enlightenment and Perpetual Peace by Immanuel Kant – Book Review

     

    এই লেখা শুরুতে এর শিরোনাম সম্পর্কে আগাম পরিচয় করিয়ে দিতে এই শিরোনাম কেন ও কী ধরণের এনিয়ে কিছু বাক্য দিয়ে শুরু করব।
    এই লেখার মূল বিষয়বস্তু “এনলাইটেনমেন্ট” (enlightenment)। আর শব্দটা দেখাই যাচ্ছে এক ইংরাজি শব্দ। “এনলাইটেনমেন্ট” শব্দটা ও এই ধারণার খুবই ইতিবাচক অনুসারি এমন অনেকে সম্ভবত এর বাংলা করবেন যে “এনলাইটেনমেন্ট” মানে, মানুষ বা জনগোষ্ঠিকে “অজ্ঞতামুক্ত” করা বা  “আলোকপ্রাপ্ত” করা। তবে পরিস্কার থাকার দরকার যে এই অর্থ আমার করা নয় বরং “এনলাইটেনমেন্ট” এর অনুসারিদের করা; মানে বলতে চাচ্ছি যে,  আমি এনলাইটেনমেন্ট-এর অনুসারি নই। বরং বলা যায় আমি ক্রিটিক্যাল বা পর্যালোচক অবস্থানের। আমি  বরং এই শব্দটার যা অর্থ নয় অথচ অনুসারিরা দাবি করে এদিকটা সামনে তুলে ধরতে চাইব এখানে।  সরাসরি বললে, এই শব্দের অর্থ-সীমা কোথায় সেদিক থেকে শব্দটাকে বরং সবাইকে পুরাপুরি ও খুটিয়ে জেনে ও চিনে নিতে আহবান জানাবো।

    এনলাইটেনমেন্ট শব্দটার প্রায় সমার্থক [synonymous] বা সহ-শব্দ হিসাবে উঠে আসে – বিজ্ঞান (science) বা র‍্যাশনালিটি (rationality) – এসব শব্দ। যে শব্দগুলোর অর্থ যদি সম্যক জানি তবে এসব শব্দের অর্থের সীমা জানা থাকবে। শব্দের অর্থসীমা জানা মানে কোন শব্দ কতদুর কী শব্দার্থ বহন করে ও কার পরে আর করে না সে সম্পর্কে সচেতন থাকা। এই অর্থে এই লেখার একটা উদ্দেশ্য বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দের অর্থের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করা, পাঠককে সচেতন করা।  বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দগুলো আমরা মূলত ব্যবহৃত হতে দেখি যে  ধর্ম-কে (বিশেষ করে ইসলাম) কোপানো বা ধর্মকে তুচ্ছ, নাকচ ইত্যাদি করার কাজে।

    যেমন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কথিত “বিজ্ঞান চর্চাবাদিদের” কার্যত মুল উদ্দেশ্য হল ধর্ম বা মূলত ইসলাম সম্পর্কে ঘৃণা বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিচা ধারণা প্রচার করা। অথচ বিজ্ঞান ও ধর্ম ধারণা দুটো একে অপরের সমতুল্য ক্যাটাগরি বা প্রসঙ্গই নয়। এছাড়া এরা মুখে বলে থাকে তারা সমাজে ইসলাম ধর্মের প্রভাব কমাতেই বিজ্ঞানচর্চা করতে বা বাড়াতে চায়; এতে যা কার্যত এক গভীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোই হয়ে দাড়ায়। শেষে ব্যাপারটা দাড়ায় সুনির্দিষ্টভাবে একটা ধর্ম ইসলাম – ইসলাম কোপাতে চাওয়া এর উদ্দেশ্য। এই রাজনৈতিক লক্ষ্যটা আসলে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বা বিজেপি-আরএসএসের মত এক উগ্র হিন্দু জাতিরাষ্ট্রীয় ধারণা। এটাই ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই চলে আসা হিন্দুত্ববাদ – উগ্র বা নরম “হিন্দু জাতিবাদই শ্রেষ্ঠ” এমন ধারণা।  অর্থাৎ কার্যত বাংলাদেশের কথিত বিজ্ঞানচর্চাগুলো আসলে হয়ে দাড়ায় হিন্দুত্ববাদের সমর্থক ও হিন্দুত্ববাদের প্রচার-প্রসার ঘটানো;  বা বাংলাদেশে প্রগতিবাদের নামে হিন্দুত্ববাদকে সহনশীল করে হাজির করার ততপরতা। এটাই ফলাফলে বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য জন্মানোর সাফাই বয়ান তৈরি করে। সারকথায় এনিয়ে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী বয়ানটা হল, মুসলমান মানেই যেহেতু জঙ্গী তাই, যেন জঙ্গীবাদকে দুর্বল করতে চাওয়ার কর্মী তারা? তাই যেন বাংলাদেশকে কথিত জঙ্গীবাদের কবল থেকে মুক্ত থাকতে আমাদেরকে ভারতীয় আধিপত্যের আড়াল আশ্রয়ে যেতেই হবে – এই হল তাদের প্রচ্ছন্ন সাজেশন……!

    জাত বা জাতি ধারণায় পরিচয়-আইডেনটিটি খাড়া করতে চেয়ে যেকোন ধর্ম বা বর্ণ, কালচারাল ভিন্নতা অথবা  সাধারণভাবে যেকোন এথনিসিটি [ethnicity] বা জাতপরিচয় এর পক্ষে দাঁড়িয়ে – “এটাই শ্রেষ্ঠ ” – ধরণের প্রচার করতে আমরা সকল ধারাকেই করতে দেখি যা খুবই কমন ফেনোমেনা; এটাই যেকোন রাষ্ট্র বা সমাজের কোন-না-কোন জাতির পরিচয় আঁকড়ে দাঁড়ানো – এটাই দেশের অস্থিতিশীলতার উতস হয়ে দাড়ায় আছে যা প্রকারন্তরে সমাজের জন্য গভীর ক্ষত ও বড় ক্ষতিকর ততপরতাতা। এটা মূলত যা আমার জাত-পরিচয়ের প্রেক্ষিতে “অপর” [others] এমন সকল এথনিক চিহ্ন-পরিচয়ের জনগোষ্ঠিকে জাত-নির্মুলের আকাঙ্খা রূপেই শেষে হাজির হয়ে যায়। যাকে আমরা “সব অপরকে” নির্মুলের এক এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর আকাঙ্খা বা পোড়ামাটির নীতি বলেও চিনি! কারণ,  শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা মাত্রই এর মৌলিক স্বভাব হল নিজের সকল “অপরকে” এই উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা; যার সবচেয়ে বড় ও এক প্রভাবশালী প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইউরোপ-জুড়ে হিটলার বা হিটলারিজমে। আবার ঐসময়ের হিটলারের হাতে নির্মুলের শিকার হওয়া জর্মান ইহুদি জনগোষ্ঠি, তারাও এখন পালটা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল নামে এক “হিটলারী”  রাষ্ট্র বানিয়ে নিজেই হয়ে গেছে মোদী-আরএসএসের মতই আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদী – ইহুদিবাদ যার নাম। অর্থাৎ মনে সেই একই শ্রেষ্ঠত্ববোধ আর ‘অপর’ সকল এথনিক জনগোষ্ঠিকে উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা মনে পুষে রেখে এরাও বড় হচ্ছে, এগিয়ে চলেছে। অথচ কারো শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে – নিজে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাড়া করা এটা কোন প্রতিকার নয় – কারও শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা  নিজেও আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাঁড়া করার মানে হয় না; হতে পারে না।
    দুনিয়ার কোন রাষ্ট্র বা সমাজ এককাট্টা শতভাগ একই এথনিক আইডেনটিটির হয়না। নুন্যতম এক থেকে দশভাগ ভিন্ন এথনিক আইডেনটিটির জনগোষ্ঠি সে সমাজে থেকে যায়। ফলে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার উদ্ভব ও অত্যাচার শুরু হতে দেখা যায়।  অথবা কখনও হয়ত দেখা যায় মোটামুটি একই আইডেনটিটির জনগোষ্ঠির কিন্তু একদল চায় ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব, তো অন্যদল চায় ধর্মভিত্তিক আরেক জাতিবাদী শ্রেষ্ঠত্ব। এরাই নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ববাদের সবচেয়ে বড় সংকট ও স্থায়ী তৈরি করে। অথচ একই সমাজে থাকতে হলে সবার আগে নির্মুল আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হবে; “আমার অপর” যাকে মনে করছি তাকেও পাশাপাশি সমান অধিকার ও মর্যাদায় স্বীকার করে নিতে হবে। তবে সবার আগের প্রধান কাজ হতে হবে যেকোন ধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধ ত্যাগ করতেহবে। ধর্ম-নির্বিশেষে জনগোষ্ঠির সকলকে বাইরে  জুতা খুলে ঘরে প্রবেশের মত করে নিজ নিজ সবধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধকে সমাজ-ঘরে প্রবেশের আগে বাইরে খুলে রেখে আসতে হবে। আমরা নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান রাজনৈতিক অধিকারের – এই নীতিতে দাঁড়ালে শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তির এক রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব।
    যদিও আরেক মুলকথায়, বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটি শব্দগুলো ব্যবহার করে আজীব এক কথিত সেকুলার নামের প্রগতিবাদ এই আড়ালে তারা এথনিক ঘৃণায় তারা “ইসলাম কোপাতে” চাইছে। ইসলাম ঘৃণায় সব ছেয়ে ফেলতে চাচ্ছে; কার্যত যা হিন্দুত্ববাদ। এবং ভারতীয় আধিপত্যের বিস্তারের সহায়ক। ‘জঙ্গীবাদের’ কথা তুলে ভয় দেখিয়ে এরাও হিন্দুত্ববাদের শ্রেষ্ঠত্ব – যা আরেকভাবে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধের ধারক, তাই কায়েম করতে চায়। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য কায়েম ও বাংলাদেশকে তার বাজারে পরিণত করার আরেক কলোনি-চিন্তা!!। বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটির নামে প্রগতিবাদের এভাবে শব্দ ব্যবহার বা এমন মানে করা যে মারাত্মক ভুল ও অন্যায় সেদিকটাই তুলে ধরা এলেখার উদ্দেশ্য।

    র‍্যাশনাল[rational] বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তাঃ
    এখানে এখন প্রাথমিকভাবে র‍্যাশনাল [rational] শব্দের অর্থ কিছুটা বলে রাখা যাক। এই শব্দটাও ইংরাজি দেখাই যাচ্ছে। এর খাস বা সার অর্থ হল – “বুদ্ধি”। মানে বুদ্ধি বলতে বা এমন ধারণাকে কেন্দ্র করে যা বুঝি, তাই!  যেমন রেশনাল শব্দের একটা অর্থ করা হয় – বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন বিচার বা বিচারকারি মানুষ। অর্থাৎ দুটাতেই “বুদ্ধি” ব্যবহার করে যে “বিচারটা” করা হয় তাই বলা হয়েছে। সেই সুত্রে তাহলে এখানে এতে ‘কী’ বলা হয় নাই? বা বাদ রাখা হয়েছে??  সেদিকে যাওয়া যাক, তাহলে র‍্যাশনাল শব্দের অর্থ আরেকটু খুলবে!
    যেমন বললাম, মন আর মগজের লড়াই চলছে!  এখানে মগজ মানে আসলে বুঝানো হয়েছে বুদ্ধি। মগজের ব্যবহার মানে বুদ্ধির ব্যবহার। আর বুদ্ধির বিপরীতে তাহলে কী ধারণা থেকে গেল? বা কী সংশ্লিষ্ট নয়, বাদ পড়ল?? সে প্রশ্নের দিকে আগানো  যাক! এখানে, বুদ্ধির বিপরীতে যা বাদ পড়ে থাকে তা হল মন বা মানুষের আবেগ অনুভুতি।  মানে মানুষের অন্য মানুষের সাথে অথবা মানুষে-মানুষের মধ্যে সম্পর্ক – এই মৌলিক দিক যাকে অনেক সময় বলি আমাদের মানবিক সম্পর্ক। মানুষের রিলেশনাল দিক বা বোধের দিক এটা। এটা বাদ বা বুদ্ধির বাইরে থেকে গেল। এদিকটা আর রেশনাল শব্দটা কাভার করে না বা অন্তর্ভুক্ত নয়। মানুষের আবেগ অনুভুতি বা “সম্পর্কিত বোধ” যেকারণে বুদ্ধির আমলই করে না; করতে পারে না। মানে এটা বুদ্ধি দিয়ে বুঝার বাইরে!

    তাই, শুধুই লজিক, যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে মানবিক সম্পর্ক [human relation] বা মন-কে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে।  আর বাস্তবে আমরা তা করিও না। তাহলে সারকথায়,  র‍্যাশনাল মানে যা কেবল লজিক [logic], রিজন [reason], যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে চলে। মন বা মনের ফিলিং [Feeling] অনুভব ইত্যাদি এসব একদিকে সরিয়ে রেখে এই বিচার করা হয়। [Reason বা রিজন বলতে form judgements logically বুঝতে হবে। মানে “যুক্তিবুদ্ধিতে ভর করে পৌছানো রায়” বুঝলেই আপাতত চলবে।] একারণেই যা লজিক্যাল মানে র‍্যাশনাল তা  রিলেশনাল (মন বা মানবিক সম্পর্ক) দিককে সাথে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে করা কোন বিচার নয়। মানে হিউম্যান বা রিলেশনাল দিক এখানে বাদ থেকে যায়। যেমন যদি বলি, সাধারণত এটাই মানুষের স্পিরিচুয়াল [spiritual] দিক আমলে না নেয়া বা বাদ রেখে চিন্তা করা।  স্পিরিচুয়াল মানে মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে; বস্তগত নানা কিছু ভোগের চাহিদার মত এবং বস্তুগত ভোগের চাহিদা থাকা সত্বেও।  অন্যভাবেও বলা যায়, মানুষের অন্য সকল মানুষ ও প্রকৃতির (কসমিক বা গ্রহ-নক্ষত্র সহ) সবকিছুর সাথে কিভাবে সম্পর্কিত সেই সম্পর্ককে জানা ও অনুভব করার আকাঙ্খাও আছে যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা! কারণ মানুষ দুনিয়ার তাঁর আগমন-আবির্ভাবেই কারণ উদ্দেশ্য কী আর এরপরে তাঁর জীবনের করণীয় কর্তব্য কী তাও এখান থেকেই সে সংগ্রহ (derive) করে বুঝে নিতে  চায়! এভাবে নিজ জীবনকে সামঞ্জস্যপুর্ণ করে সাজিয়ে নিতে চায়। আর এখান থেকেই এই আকাঙ্খা, যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা!!  অর্থাৎ এটা বৈষয়িক বা বস্তুগত আকাঙ্খা নয় বরং বস্তগতগুলোকে ছাড়িয়ে বা transcend করে গেলে তবেই এই আকাঙ্খার হদিস জানা যায়।  এর কারণ সে লক্ষ্য করেছে সম্ভবত এভাবে জীবন না সাজিয়ে নিলে এক গভীর “একাকিত্ববোধ” বা উদ্দেশ্যহীনতাবোধ জীবনকে গ্রাস করে থাকে। এসরের সমাধান পাওয়া থেকেই স্পিরিচুয়াল চাহিদা্কের উদ্ভব ও তা জাগিয়ে রাখা। এথেকেই মানুষের উপলব্দি যে মানুষ মাত্রই রিলেশনাল [relational] বা অজস্র আরো প্রাণ-অপ্রাণ ও প্রকৃতির সাথে সে রিলেশনে আছে সে বা গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছে – এই বোধ তাকে এমন ইঙ্গিত দেয়। এটাকেই আমি বলছি মানুষ “রিলেশনাল” বা relational element। মানুষ মাত্রই সম্পর্কিত বোধে [relational] এর মানুষ।   কিন্তু লজিক বা রেশনালিটি এই রিলেশনাল দিকটা ধরতে পারে না, ছুতে পারে না।
    অন্যভাষায়, তাই আমাদেরকে লজিক বা র‍্যাশনালিটির বিচার ছাড়িয়ে ছাপিয়ে বা ইংরাজিতে ট্রানসেন্ড [transcend] করতে পারলে তবেই মানুষের রিলেশনাল দিক সম্পর্কে জানা যায়, চর্চা করা সম্ভব।

    কিন্তু ষোল শতকে নতুন কী ঘটেছিলঃ
    আবার যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝতে বসে সেখানে মন বা মনের ফিলিং বা অনুভব-কেও খাটাতে চাওয়া তা কোন কাজে আসে না। মানে রিলেশনাল দিকটা সংযুক্ত রাখা বা না-রেখে গতিসুত্রকে বুঝতে গেলে দুই ফলাফলে কোন ভিন্নতা আসে না।  তাতে রেজাল্ট ভিন্ন হবে না। তবে এটা কেবল বস্তগত ফেনোমেনাকে বুঝার ক্ষেত্রে খাটবে। তাই কথা ছিল যে কেবল  বস্তগত ফেনোমেনাকে ব্যাখ্যা বা বুঝবার ক্ষেত্রেই কেবল র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানবুদ্ধিতা, এই চিন্তা পদ্ধতি সীমাবদ্ধ থাকবে। যদিও তা তারা থাকে নাই। কাজেই সংক্ষেপে বললে, র‍্যাশনাল [rational] মানে হল, মগজ বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার। রিলেশনাল দিক থেকেও বিচার নয় এটা।  যার সবকিছু “বুদ্ধি” এই কেন্দ্রিয় ধারণার উপর দাঁড়ানো! এই অর্থে যা র‍্যাশনাল তা আসলে কেবল বুদ্ধি দিয়ে বুঝাবুঝির পথ ও প্রসঙ্গ!

    দুনিয়াতে মানুষের আগমন শুরু থেকেই সে ছিল যাযাবর, মানে দুনিয়ার কোথাও শুরু থেকে কোন ভুমিতে সে থিতু হয়ে বাস করেনি, করে নাই। আর মূলত, খাবার সংগ্রহ ও শিকারের তাগিদে যে এভাবে একেবারেই যাযাবর (Pastoral) ছিল।  আর  কয়েক দশ-লাখ বছরের সেই যাযাবর জীবন শেষে এক সময় মানুষের জীবন থিতু হয়ে এসেছিল। আরেক ভাষায় এটাকেই বলে মানুষের প্রথম কৃষিকাজের জীবনের শুরু বা বলা যায় মাটি কামড়ে কোন ভুমিতে থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক বসবাসের শুরু হয়েছিল যেখান থেকে। একারণেই যাযাবর আর কৃষিকাজ পরস্পর ভিন্ন বা বিপরীত ধারণা! আর শেষের এই থিতু হয়ে বসবাস – এটাকেই মোটামুটি গত ছয় হাজার বছরের মানুষের ইতিহাস বলা হয়। এটাকেই মানুষ এথনিক জীবন-যাপনের ইতিহাস বলে। জাত-পরিচয় বোধের শুরু এমনকি তাই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণার শুরুও একই – এই এথনিক জীবনের শেষের দিক থেকে। আমরা এখন যার বর্তমান প্রান্তে।
    এবার আসেন, এই ছয়হাজার বছরের মানুষ-জীবনের সফরে প্রায় পুরাটা পথই আমরা হেঁটেছি ধর্মতত্বের [theology] হাত ধরে।  অর্থাৎ আমাদের জীবনকে পুরাপুরি গাইড করে গেছে-হেঁটেছে নানা ধর্ম বা ধর্মবোধ থিওলজি। [ইংরাজি থি বা [ The] এর অর্থ হল দ্যা গড বা সমতুল্য আল্লাহ বা ঈশ্বর ধরণের ধারণা। তাই থিওলজি মানে গড বা আল্লাহ-বিষয়ক তত্ত্ব বা জ্ঞান।] তবে এই থিওলজিতে জীবন চলতে চলতে কেবল গত প্রায় পাঁচশ বছর আগের নয়া ঘটনা আসে; যখন নতুন করে এক বিজ্ঞান ও টেকনোলজির চর্চার রূপ দেখা গিয়েছিল – বিজ্ঞানের যুগ বলে! যে যুগে নয়া এক চিন্তার পদ্ধতির রূপ দেখেছিলাম আমরা। সারাংশে বললে সেটা একটা এজাম্পশন (assumption) এর উপর দাঁড়ানো বা আগাম ধরে নেয়া এক ভিত্তিতে যে কিছু ফেনোমেনা বা ঘটনা যা একেবারেই বস্তুগত বা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; আর এনিয়ে চিন্তা চর্চার পদ্ধতি ও এর ভিত্তি লজিক্যাল বা রেশনাল পদ্ধতিতে করা হবে। যেহেতু এগুলো ফিজিক্যাল ফেনোমেনা মানে নিউটনের গতির গতিসুত্র বুঝতে চাওয়ার মত ঘটনা তাই, মানুষের রিলেশনাল দিক বিচার এখানে স্থগিত বা বাদ দিয়ে আগানো যাক।   বা নিউটনের মোশন থিওরি (Laws of motion) বা গতিসুত্রের মত  ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; মানে যার উপর হিউম্যান ফেনোমেনার প্রভাব নাই (তা স্পিরিচুয়ালও নয়) বা এর প্রভাব প্রায় নাই বলে উপেক্ষাযোগ্য। অন্যভাষায় এটাই বিজ্ঞানের যুগ বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিন্তার যুগ। সেই থেকে রেশনাল পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হওয়া এই চিন্তা পদ্ধতিই সাইন্টিফিক, লজিক্যাল বা রেশনাল ইত্যাদি নানান নামে শনাক্ত হতে থাকে। কারণ পরবর্তিতে ইম্মানুয়াল কান্ট [Immanuel Kant] এই চিন্তা পদ্ধতি-কেই তত্বায়িত করেন। মানে আগে ব্যবহার শুরু হয়ে যাওয়া আর পরে কী হয়েছিল তাকে তত্বায়িত (Theorized) করে বলা। মানে এখানে চর্চা থেকে তত্ব এসেছিল, তত্ব থেকে চর্চা নয়। আর শেষে তার লেখা বিখ্যাত আর্টিকেল What is Enlightenment যা ১৭৮৪ সালে লেখা।

    Immanuel Kant: What is Enlightenment?,  1784

    যদিও অর্ধ-শিক্ষিত ও মুসলমান-কোপানিতে ও ঘৃণা ছড়াতে আগ্রহীদের মাঝে এটা বেশ গেথে বসা অনুমান এবং তা ভুল অনুমান যে এনলাইটেনমেন্ট এর ধারণা – এটা নাকি জোঁকের মুখে নুনের মত; যা ধর্ম-কে নাকচ করতে হাজির হয়েছে। তাই যেকোন ধর্ম বা ধর্মতত্বের সামনে এনলাইটেনমেন্ট অথবা  বিজ্ঞান-কে তুলে ধরলেই যেন ধর্ম নাকচ হয়ে যায় তাতে। একারণেই জাফর ইকবালেরা বিজ্ঞানবাদি। বলা বাহুল্য  বলাই বাহুল্য বিজ্ঞানবাদিতা একটা নেতি ধারণা। বুঝে-না-বুঝে ও সীমাবদ্ধতা না জেনে যারা অসৎ উদ্দেশ্যে যত্রতত্র “বিজ্ঞান” মারাতে যায় এরাই “বিজ্ঞানবাদি”। চিন্তার যে পদ্ধতি আছে; পদ্ধতি মেনে চিন্তা চর্চা করতে হয়। এরা তা জানে কখনও শুনেছে মনে হয় না।  বিজ্ঞান মূলত একটা চিন্তা পদ্ধতি; এটাকে র‍্যাশনাল চিন্তা পদ্ধতিও বলা হয়। আর গুরুত্বপুর্ণ কথা হল থিওলজির উপর র‍্যাশনাল চিন্তা-পদ্ধতি প্রযোজ্য নয়।  কারণ থিওলজি মূলত মানুষের সম্পর্ক (যাকে উপরে রিলেশনাল বলে বুঝিয়েছি) বিষয়ক জ্ঞানচর্চা। এই অনুমান ভিত্তিহীন হলেও এটা গভীরে  গেথে বসা সেই ভুল অনুমান। এসব নিয়েই এখানে কথা বলব।

    এই ভুল অনুমানের শুরু হয়েছিল রেনেঁসা আন্দোলন থেকে। এটা আজকের ইটালি তখন যা রোম-কেন্দ্রিক এবং প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের (-৭৫৮ খ্রীষ্টপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দ) লেজ ছাড়ার পরের ঘটনা এবং সেকালে ফ্লোরেন্স ও রোমে বিস্তৃত হওয়া ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী।  ততদিনে (৩১৩ খ্রীষ্টাব্দে) প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য এর সম্রাটসহ সকলেই  ক্যাথলিক খ্রীশ্চান হয়ে গিয়েছে। আর পরে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য ৪৭৬ সাল থেকে ধবংসও হয়ে গেছিল। তবে পরবর্তিতে, হলি রোমান এম্পায়ার (Holy Roman Empire) নামে তবে আজকের ফ্রান্স-জর্মানের মাঝের শার্মেগেলন [Charlemagne] এর সম্রাটের নেতৃত্বে ৮০০ সালের শেষ সপ্তাহে এই নয়া সাম্রাজ্যের শুরু বা পত্তন হয়। কালক্রমে সারা ইউরোপ যার অধীনস্ত হয়, টিকেছিল (কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে) ১৮০৬ সাল পর্যন্ত। যদিও প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সাসথে এর কোনই সম্পর্ক নাই। তবে  সেকালে রেনেসাঁ [Renaissance] আন্দোলন ফ্লোরেন্স ও রোম থেকে শুরু হওয়া হলেও তা ছিল আসলে হলি রোমান এম্পায়ারের আমলে; মানে যেটা কোনভাবেই প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের আমলে নয়। কিন্তু মানুষে দুটা সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভ্রান্ত সাধারণত হয়ে থাকে বলে পুরা ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত করলাম। সারকথায়, রেনেঁসা আন্দোলন যা ১৩০০ থেকে ১৬০০ সালের মাঝের ঘটনাবলী এবং যার সাথে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের কোন সম্পর্ক নাই। যে রোমের অধীনে ছিল স্রা ইউরোপ। কিন্তু রেনেঁসা আন্দোলন প্রাচীন  ফ্লোরেন্স ও রোম শহরে শুরু হলেও পরে ১৪৯৯ সাল থেকে ফ্রান্সের ভিতর দিয়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পরেছিল।  আর ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল সহ সব ধরণের পরিবর্তন আবর্তিত হয়েছিল এই আন্দোলনের কারনে। একারণে অনেকের মনে এটাকে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যেরই কোন ঘটনা মনে করে ভুল করে থাকে। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এর বহু আগেই ৪৭৬ সালেই  প্রাচীন রোম সাম্রাজ্য ধবংস হয়ে গেছিল।

    এখন রেনেঁসা আন্দোলন এর বিচারে ইউরোপে এক “ধর্মের যুগ” ছিল। যেটাকে মোটাদাগে ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ বলে তারা মনে করে আর এটাকেই তাদের কোন কোন ধারা কালো যুগ (Dark age) অথবা  মধ্যযুগ বলে (Middle Ages or medieval period) পরিচিত করায়, এটাকে তারা অতিউতসাহীরা  অন্ধকার যুগ  (dark age period) বলেও মানে করে থাকে। আমরা এই আলোচনায় দেখব কেন তাদের এই ভুল অনুমান; এছাড়া এই অনুমিত ভুল ধারণার কোন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো! যদিও ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল এটা সারা দুনিয়াব্যাপী কোন  অন্ধকারের সময়কাল ধারণা নয়; বরং পুরানা রোম-কেন্দ্রিক শাসিত (বা পরের হলি রোমান এম্পায়ার শাসিত) যে ইউরোপ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটা ধারণা। এবং এর চেয়েও বড় কথা এটা সব ধর্মের বেলায় নয় বরং কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের – মানে সেকালে রোম-শাসিত ইউরোপের ও যা কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের বেলায় এই অর্থে এটা ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল বুঝানো হয়েছে। তবু ইউরোপ পরে এটা সব ধর্মের বেলাতেই যেন প্রযোজ্য এমন অর্থ করে থাকে। এমনকি পুর্ব-ইউরোপ যার বেশিরভাগ অংশ শাসিত হয়েছিল রাশিয়ান জার (১৫৪৭-১৯১৭ সাল) এর অধীনে, এরা থেকে গেছিল অর্থডক্স ক্রিশ্চান। অন্ধকার যুগ-ওয়ালারা এদেরকেও গোনায় ধরে নাই। আমরা এশিয়ার মুসলমানেরা তো আরো দূরে…।

    আর  এই অন্ধকারের ধারণা – এরই বিপরীতে আলোর ধারণা এনে  মানে অন্ধকার কারও উপর “আলো ঢেলে” যেন কিছুকে আলোকিত করে তোলা – এই অর্থেই এর নামকরণ হয়েছে এনলাইটমেন্ট বা en-light-en-ment ।

    এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানোঃ  
    ওদিকে আবার এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানো। এমনকি বিজ্ঞান ধারণাটারও সারকথা হচ্ছে লজিক (logic) আর সেই অর্থে এর আরেক শব্দ হল র‍্যাশনাল (rational) বা বাংলা করে একে যুক্তিবুদ্ধি-সম্মত, এভাবেও বলা যায়। এনিয়ে আলাপ বিস্তারে নিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখা ভাল যে বিজ্ঞান নিজে কোন জ্ঞানের শাখা নয় বরং মানুষের এক চিন্তা পদ্ধতি বা ম্যাথডলজি (methodology)। আর এই চিন্তা পদ্ধতিটাইকেই (বৈশিষ্ট হিসাবে) বলে লজিক্যাল বা র‍্যাশনাল। তবে এই আলোচনার মূল ফোকাস হল বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি এই ধারণাগুলোর ব্যবহার সীমা কোথায় সে সম্পর্কে পাঠককে জানানো। কোথায় কতদুর যাবার পরে বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি ধারণা দিয়ে সেই প্রসঙ্গ আর ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে সেই সীমাকে বুঝা ও বুঝে নেওয়া।  যেমন বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটির জ্ঞান দিয়ে ধর্ম ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে।

    অষ্টাদশ শতকে যুক্তি (reason) ও বিজ্ঞানের বিকাশের সেকালে ইউরোপীয় ইতিহাস যে নয়া রূপ-পদ্ধতিতে হেঁটেছিল একেই এনলাইটেনমেন্ট (আলোকপ্রাপ্ত ) বলে চেনানো হয়েছিল। ইম্মানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant (1724-1804)) তিনি এক জর্মান দার্শনিক তিনিই এনলাইটেনমেন্ট ধারণাকে তত্বায়িত করে সামনে নিয়ে আনেন। এখান থেকেই কান্ট শব্দটা থেকে কানশিয়ান (Kantian মানে যেমন, ইম্মানুয়াল কান্টের লজিক অর্থে) কানশিয়ান লজিক (logic); বা র‍্যাশনালিটি (rationality) ধারণাগুলো প্রচলিত বা ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছিল। তবে এভাবে “তত্বায়িত করেন” বললাম এজন্য যে “থিওরি ও প্রাকটিস” এদুইয়ের সম্পর্ক মানে তত্ব ও তার চর্চা নিয়ে  এদুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটা কথা চালু আছে সেটা এরকম যে কোন তত্ব আগে না ওর ব্যবহার বা চর্চা আগে ঘটেছিল। এই তর্কের সমাধান হল, দার্শনিকেরা আগে তত্ব তৈরি করেন, এরপর ওর ব্যবহারিক রূপ তৈরি হয় ঠিকই। এরপরে আবার ঐ চর্চিত রূপ থেকে পুনরায় নয়া তত্ব-ও তৈরি হতে পারে। কান্টের ক্ষেত্রে তাঁর তত্বের আগেই এর ব্যবহার শুরু হয়েছিল। পরে কান্ট সেসব ব্যবহারিক ধারণা থেকে সেগুলোকে তত্বায়িত করে সাজিয়ে যা এনেছিলেন সেটাই কানশিয়ান লজিক ও  রাশন্যালিটি ধারণা।

    “বিজ্ঞান” কী কোন জ্ঞানের শাখাঃ
    এদিকে বিজ্ঞান ধারণাটা নিয়ে আমাদের মধ্যে আবার এটা সবরোগের ওষুধ যেন এমন ধারণা আছে।  বিশেষ করে আপনি যদি ধর্ম কোপানোর বা নাকচ করার হাতিয়ার বুঝা ও ফেরি করা লোক হয়ে থাকেন। তাদের ধারণা হয়ে থাকে বিজ্ঞান দিয়ে ধর্ম বা ধর্মতত্ব-কে (Theology) পরাস্ত করা সম্ভব। কিন্তু আসলেই কী তাই???

    দুঃখিত, তা অবশ্যই না।
    এমনিতেই থিওলজি ও বিজ্ঞান দুটা সমতুল্য ক্যাটাগরি নয়। থিওলজিকে যে অর্থে জ্ঞানের একটা ব্রাঞ্চ বা শাখা বলা যায়। তাহলে বিজ্ঞান কী কোন জ্ঞানের শাখা???  আমরা যেমন ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বাইলজি বা ইতিহাস, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন জ্ঞানের শাখা সম্পর্কে সম্পর্কে জানি; তাহলে বিজ্ঞানও কি তেমন আরেক জ্ঞানের শাখা? অবশ্যই না। আবার সাইন্স, আর্টিস, কমার্স সমাজ-বিজ্ঞান কিংবা শিল্পকলার কোন শাখায় পড়াশুনা করি তেমনই আর্টস বা শিল্পকলাতেও কী বিজ্ঞান থাকে? এর জবাব কি হবে??
    আপাতত দ্রুত জবাবে চলে যাব, কারণ কম কথা বা মূল কথায় এর জবাব হল – বিজ্ঞান নিজে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বা ইতিহাস এর মত কোন জ্ঞানের শাখা নয়। তাহলে বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞান হল জ্ঞানের পদ্ধতি বা  এক চিন্তা পদ্ধতি। আর সেকারণে শিল্পকলাতেও বিজ্ঞান থাকা সম্ভব আর তা সত্যিই আছে। মানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে।  সব জ্ঞানের শাখাই বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া বা জানা হয়ে থাকে।  মানুষ মাত্রই আবার রাশনাল এন্ড বিয়ন্ড (rational & beyond) । মানুষ রাশনাল অবশ্যই কিন্তু একই সাথে একে ছাড়িয়েও (Beyond) আরও অনেক কিছু। এই ছাপিয়ে যাওয়া বা ট্রান্সশিয়েন্ট (transient) – এটাও র‍্যাশনালিটির উপরে মানুষের আরেক স্বভাব বৈশিষ্ট।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    অসমাপ্ত, বাকিটা দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে দেখুন।
    দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4lO

    [এই লেখার একটা প্রথম ভার্সান আগে  একটা ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। পুরানা সেই লেখার লিঙ্ক দেখেন এখানে।   আর তা ছাপা হয়েছিল গতমাসে মানে গতবছর, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ও তা হয়েছিল ইসলামি ছাত্র আন্দোলন এর কেন্দ্রীয় সম্মেলনের স্মারকে প্রকাশিত প্রকাশনায়। স্বভাবতই সেটা প্রথম ভার্সান বলে তা এখানে এই সর্বশেষ ফাইনাল ভার্সান এর চেয়ে আকারে অনেক ছোট ছিল। আমার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত  বর্তমান এই রচনা ফাইনাল ভার্সান বলে বিবেচিত হবে। যদিও দু ভার্সানের লেখার নামে  অনেক ফারাক করে দিয়েছি, গুহুবহু একই নাম রাখি নাই। আশা করি লেখাটা উপভোগ্য হবে। এই ই-মেল ঠিকানায় প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।]

  • বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত

     

    বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত
    গৌতম দাস

    https://wp.me/p1sCvy-4eU

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০ঃ০১ রাত

    সীমান্তে মর্টারশেলের অবিস্ফোরিত গোলা

     

    চীনা নেতৃত্বে দল পাকানো বা জোট গঠন আর আমেরিকার নেতৃত্বে পুরানা ও নয়া জোট গঠন এদুই কাজ যেন সাম্প্রতিককালে ভীষণ দ্রুত আগানো শুরু হয়েছে। এরই এক প্রকাশ হল বার্মাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নড়াচড়া। দু-চারটা মর্টার বা গোলা বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে এসে পড়া বা এতে বাংলাদেশের দু-চারজন করে আহত-নিহত হওয়া – এসবই মূল ঘটনার খুবই ক্ষুদ্র কিছু বাইরের দিক।

    চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি ট্রাম্পের আমলে (২০১৭-২০) যেমন ছিল – একে যদি বলি আমেরিকার তার গ্লোবাল নেতৃত্বের ততপরতা বা দায়ভার ফেলে তা  ট্রাম্পের ঝেড়ে অস্বীকারের অবাস্তব পথ ধরে চীন ঠেকাতে আভ্যন্তরীণমুখি ও জাতিবাদি হয়ে উঠার চেষ্টা; তাহলে পরবর্তিতে মানে চলতি বাইডেনের আমলটা হল, প্রকাশ্যে চীনবিরোধী করে নানান গ্লোবাল জোট পাকানো ও তা দিয়ে আগ্রাসী হয়ে যুদ্ধ-সহ সব সক্রিয় ততপরতা করা্র যুগে তিনি দুনিয়ার সবাইকে টেনে নিতে চাইছেন।

    বিপরীতে চীনের দিক থেকে প্রতিক্রিয়ায় এসবের পালটা যেসব ততপরতা চীন ঘটিয়ে চলেছে সেসবের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বললে তা মূলত দুইটা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বা মাধ্যমেঃ এক. এসসিও [SCO] আর দুই.  ব্রিকস [BRICS] নামে ততপরতা।

    চীনা ততপরতাঃ
    এসসিও [SCO] – এটা এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-জোট যার নাম-সংক্ষেপ কে ভেঙ্গে বললে এর পুরা নাম ‘সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন’; তাই সংক্ষেপে SCO।  সাধারণত যেকোন আন্তর্জাতিক জোটকে মূল যে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; আর তা হল অর্থনৈতিক অথবা স্ট্রাটেজিক এভাবে। আর এই স্ট্রাটেজিক শব্দটাকে বাংলা করে বললে “কৌশলগত” এমন কোন জোট বলতে  বুঝতে হবে মূলত এটা সামরিক ও রাজনৈতিক (ছদ্ম-পলিটিক্যাল) বৈশিষ্ঠের জোট। এভাবেই তা হাজির হতে চেষ্টা করছে। যদিও বেশিরভাগ জোটই মূলত অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জোট হয়ে থাকে যেমন আসিয়ান, সার্ক ইত্যদি।

    নয়া ধারার জোটঃ
    কিন্তু যদি সুস্পষ্ট করে একালে বলি, ধরাধরি শুরু হয়ে গেছে মানে বলতে চাচ্ছি  কোন দেশ  – চীন না আমেরিকা – কার সাথে বিশেষ ঘনিষ্ট হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে গেছে এই অর্থে, আরেক ধরণের নয়া ধারার জোট হতে দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে চীনা না হয় আমেরিকান জোট।

    নয়া ধারার জোট, মানে কী বলতে চাচ্ছি। যেমন আগে মানে গত শতকের নব্বই দশক জুড়ে তখনও জোট হত মূলত অর্থনৈতিক। যা এরপর থেকে ক্রমশ মুল উদ্দেশ্য আড়ালে রেখে (চীনের দিক থেকে বললে) তা চীনের নেতৃত্বে নয়া ধারার জোট গঠন বা গঠনের ইঙ্গিত শুরু হয়েছিল। আর এতে ‘মুল উদ্দেশ্য আড়ালে’ বলতে বুঝিয়েছি তা যে আসলে আমেরিকাবিরোধী সেটা প্রকাশ্যে কোথাও উল্লেখ না রেখে ততপর হওয়া। তুলনায় যেমন – ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব জোট বা সব আন্তর্জাতিক ততপরতাই আসলে বাই ডিফল্ট হয়ে যেত কার্যত আমেরিকান উদ্যোগে বা আমেরিকান নেতৃত্বের জোট। আর ঠিক এর বিপরীতে সোভিয়েত যুগ শেষে একালে  নয়া ফেনোমেনা হিসাবে হাজির হয়ে চলছে চীনের উদ্যোগে বা নেতৃত্বে জোট গড়ে তোলা।
    তবে  চীনের দিক থেকে সেটাকে স্পষ্ট করে আমেরিকাবিরোধী সেটা উল্লেখ না করেই তা করা শুরু হয়েছিল যেমন এই এসসিও জোট গড়া থেকে। এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ২০০১ সালে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ২০০১ সালের হলেও তা ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা হামলার বেশ কয়েকমাস আগের ঘটনা। ফলে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এটা ছিল এক অঘোষিতভাবে আমেরিকাবিরোধী জোট।  যা মূলত চীন ও রাশিয়ার সেই প্রথম কাছাকাছি আসা।  আর এটা ছিল ১৯৫৮ সালের পরে সেই প্রথম চীন-রাশিয়ার কাছাকাছি আসা যখন ঐ ১৯৫৮ সালের আগে দুদেশই “স্টালিনবাদী কমিউনিস্ট” দেশ ছিল। আর এর চেয়েও বড় কথা ২০০১ সালে এসে তারা দুদেশের কেউই আর কমিউনিস্ট দেশ নয়।
    কেউ কোনদেশ আর কমিউনিস্ট কিনা এর একটা ভাল মাপকাঠি হতে পারে, সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য কিনা। সদস্য না হলে সে তখনও কমিউনিস্ট – এটা একটা ভাল মাপকাঠি। বিশেষ করে যদি আমরা এই ফ্যাক্টস মনে রাখি যে,  পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে ভেঙ্গে গেলে এরপরে রাশিয়াসহ মোট ১৫ রাষ্ট্রে তারা আলাদা বিভক্ত হয়ে যায়। আর এরপরেই রাশিয়াসহ ১৫ রাষ্ট্র সকলে এই প্রথম আবেদন করে আইএমএফের সদস্য হয়ে গেছিল। আর ওদিকে মাওয়ের নেতৃত্বের চীন (বা নয়া চীন) মানে চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনীতিক অস্বীকৃতির চীন ছিল সেটা – সেই চীনে  ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জারের প্রথম গোপন চীন সফরের পরে চীন-আমেরিকার ডিল শুরু করেছিল। আর পরে এথেকেই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনীতিক স্বীকৃতি ঘটে – ইত্যাদি এসব ঘটে যাবার পরে তখন ১৯৮০ সাল থেকেই নয়াচীনও প্রথম আইএমএফের সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    এসব কথাগুলো মনে রাখলে আমরা সহজেই মানব যে আইএমএফের সদস্যপদ নেওয়া মানে সে আর কমিউনিস্ট দেশ নয় হয়ে যাওয়া – এর একটা ভাল মাপকাঠি।
    এই বিচারে  চীন ও রাশিয়া প্রথম জোটবদ্ধ দেশ হচ্ছে এসসিও [SCO]-তে ২০০১ সালের শুরু থেকে আর যখন এদুই দেশ কিন্তু আর কমিউনিস্ট দেশ নয়। এরচেয়েও বড় কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে তারা কার্যত আমেরিকাবিরোধি হলেও এর কারণ তারা আগে ‘কমিউনিস্ট ছিল’  এমন কোনই কারণে নয়। মুলকথা এই শতকেও যারাই আমেরিকানবিরোধি ফলে  তারা নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট – এমন ভুল ধারণ অচল তাই এই ভুল অনুমানকে যেন আমরা জেনে-না জেনে আমাদের চিন্তার ভিত্তি না বানায় ফেলে থাকি, এই সতর্কতা দরকার।

    যদিও শুরুতে এসসিও এর জন্মানোর ভিত্তি ছিল যে – সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয়টা দেশকে নিরাপত্তার দিক থেকে পুরানা স্টাইলে রাশিয়া-নির্ভরই তারা যেন থেকে যায়, পশ্চিমা-প্রভাবে না চলে যায়। যেমনটা পোল্যান্ড, রুমানিয়া ইত্যাদি সোভিয়েতের বাইরের কিন্তু যারা কমিউনিস্ট দেশ – এদের বেলায় ঘটেছে এমন না হয়ে যায়।
    অন্যভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে পাঁচ দেশকে বুঝায় এর মধ্যে আবার যারা রাশিয়া অথবা চীন এদের কোন একটা দেশের সীমান্ত লাগোয়া দেশ এদেরকে নিয়েই এসসিও গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে চীন-রাশিয়া ছাড়া আরো তিন (কাজাখ, কিরঘিজ, তাজিক এই এথনিক-ভিত্তির দেশ) এভাবে পাঁচ দেশ; আর পরে  উজবেক এই এথনিক দেশ মিলে মোট ছয় দেশ নিয়ে এসসিও গঠিত হয়েছিল। যেটা থেকে রাশিয়া ক্রমশ একালে এসে ইউরোএশিয়া [euroasia] বলে একটা নয়া ধারণা চালু করেছে। অনেক পুরানা কমিউনিস্ট তাই ইউরোএশিয়া শব্দটা বেশি ব্যবহার করে কথা বলে। অথচ একালে পুতিনের রাশিয়ার কোন আমেরিকাবিরোধি পদক্ষেপকে কমিউনিস্ট বলে সহি মনে করে কথা বলা বা গর্ব করা অর্থহীন!

    তবে যেটা বলছিলাম, এই এসসিও জন্ম থেকেই তারা অনুল্লেখ রাখা আমেরিকাবিরোধী জোট অবশ্যই। তবে এরচেয়েও বড় কথা একালে মানে ধরা যাক গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের রাজধানী সমরখন্দে এবছরের এসসিও সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২; এই সম্মেলন বলছে তাদের সদস্য সংখ্যা ক্রমশ  বাড়ছে। যেমন শুরুতে ছয় দেশের এসসিও  ইতোমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান এদুই রাষ্ট্রকে একসাথে পুর্ণসদস্য করে নেয়া হয়ে গেছে। এবছর থেকে ইরানও পুর্ণসদস্য হওয়াতে মোট পুর্ণসদস্য নয় রাষ্ট্র। আর তুরস্কও সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করাতে ব্যাপারটা আর সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক অথবা যাদের চীন বা রাশিয়ার সাথে সীমান্ত আছে এমন কেন্দ্রিক বলে থাকছে না। কী হচ্ছে তাহলে?

    এটাই চীন-কেন্দ্রিক আমেরিকাবিরোধি প্রধান জোটের আকার নিচ্ছে। যেমন ইতোমধ্যেই এসসিও-এর দাওয়াতি বা অবজারভার সদস্যদেশ হয়েছে আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মঙ্গোলিয়া। আর ওদিকে এক নয়া এক ক্যাটাগরি ‘ডায়লগ মেম্বার’ হয়ে যুক্ত হয়েছে  – আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, ইজিপ্ট, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক – এমন এরা আরো নয় দেশ।

    আলাপ আবার একটু পিছন থেকে শুরু করছি। চীন-কেন্দ্রিক বা আগামি গ্লোবাল নেতা চীন এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জোট ততপরতা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা যদি খুঁজতে যাই তবে এর প্রকাশ্য শুরু হল ২০০৯ সাল থেকে। যদিও তখনও চীন-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট  মানে খুবই সচল ইতিবাচক ও সক্রিয় ছিল যা উভয় দেশেরই মুখ্য-স্বার্থ বলে বিবেচিত হয়ে চলছিল। এছাড়া মনে যাই থাক, কোন প্রকাশ্যবিরোধ বা কারো মৌলিক ভিন্নস্বার্থের উপস্থিতি তখনও উদয় হয় নাই।
    এই বিচারে ইতিহাসের ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বললে, ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একরকম গভীর সহযোগিতামূলক ছিল যা আগের ত্রিশ বছর মানে  ১৯৭৮- সাল থেকে যা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রথম তা তাল কেটে যায়, ২০০৯ সাল থেকে। সেটা ছিল আগের মতই সম্পর্ক সহযোগিতামূলকভাবে একসাথে বেড়ে উঠা সত্বেও এবার বাড়তি আরেক উলটা ফেনোমেনা ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠা শুরু করেছিল – যেটাকে আমরা স্বার্থ যার যার – এমন এক নয়া ফেনোমেনার যুগের শুরু বলতে পারি।

    ২০০৯ সালের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছিল যার প্রধান ও মুখ্য ঘটনাটা হল চীনের ব্রিকস [BRICS] ব্যাঙ্কের ধারণা নিয়ে সামনে আগিয়ে যাওয়া, যেটা কার্যত সরাসরি আমেরিকাবিরোধি। তবে এটা ঘটবার কারণ আমেরিকা নিজেই। বলা যায় আমেরিকা নিজেই চেয়েছিল এভাবেই বিষয়টা আগে বাড়ুক। নইলে আমেরিকার জন্য তার দিক থেকে অন্য অপশনগুলো হত আরো নিজ স্বার্থবিরোধি হত। মানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা শেয়ার চীনকে ছেড়ে দিতে হত।
    তাই ঘটনাবিরোধের শুরু, চীনের বিশ্বব্যাংকের নিজের মালিকানা শেয়ার বাড়ানোর আবেদন, এখান থেকে।  যা আগেই সে করেছিল আর আমেরিকা সেটা ২০০৯ সালে কার্যত প্রত্যাখান করেছিল। এর অর্থ, এথেকে গ্লোবাল পুঁজিবাজার বুঝেছিল যে এটা যেন চীনকে বলা যে পারলে তুমি চীন আমেরিকার মতই সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ারধারী হতে  আরেকটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিতে পারলে কর। অর্থাৎ বর্তমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এ আমেরিকান শেয়ার মালিকানা সর্বোচ্চ; যার সোজা অর্থ আমেরিকাই ইচ্ছাই শেষ কথা। এদুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-মালিকানার কাঠামোর মত করেই তৈরি। তাই চীনকে উপস্থিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মধ্যে মালিকানার ভাগ বাড়াতে না দিয়াটাই আমেরিকার জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে, চীনকে নতুন করে বিকল্প আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমেরিকা।

    আর এখান থেকেই আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়।   তাই ওয়াল স্ট্রীটের লিডিং এক কোম্পানির (গোল্ডম্যান স্যাসে goldmansachs.com ) এর চীফ ইকোনমিষ্টের পাবলিক পরামর্শ রেখেছিলেন যাতে চীন এগিয়ে আসে। আর চীন যেন সেই পরামর্শকেই মুল্য দিতে এগিয়ে আসে। আর গড়ে নেয়া নয়া এমন চীনা-বিকল্প  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানই হল ‘ব্রিকস ব্যাংক’ [BRICS Bank]। মূলকথায়, বিগত ১৯৯০ সাল থেকেই দুনিয়ার এমন নতুন দিকে মোচড়ের পিছনের মূল কারণ মনে করা হয়, চীনা অর্থনীতির ব্যাপক উত্থান – রাইজিং ইকোনমির ধারণা এখান থেকেই শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনের অর্থনীতিতে ক্রমশ বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি (accumulated surplus capital)। যা নিজেই তখন থেকেই অন্যান্য দেশে মানে সারা দুনিয়ার সবদেশেই – ‘অবকাঠামো’ ও ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ হিসাবে হাজির হবার যোগ্যতা-সক্ষমতা নিয়ে হাজির হবেই। ঠিক যেমনটা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াতে আমেরিকা ঘটিয়েছিল।  এটাকেই আমরা অন্যদেশের উপর  “প্রভাব বিস্তারের” মুল উপাদান হিসাবে এককালে আমেরিকার আর একালে চীনের সক্ষমতায় দেখি। তাই, প্রভাব বিস্তারি ক্ষমতার পুর্বশর্ত হল নিজ অর্থনীতি যদি বিপুল পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি – গড়ে তুলতে শুরু করা। এটাই আসল কারণ বলে বুঝতে পারি।

    আরেক অর্থে এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা অথবা পরাশক্তি হয়ে হাজির হওয়ার মূল শর্ত। অনেকে এই ব্যাপারটাকে সামরিক সক্ষমতা ভেবে ভুল করি। যদিও মূল ফ্যাক্টর বা উপাদান হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো হবেই আর সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানে এবার তা নিজদেশে সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়ানোরও সক্ষমতা হয়ে উঠা স্বাভাবিক যা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

    আর এটাই একালের দুনিয়ায় ঘটে গিয়েছে বলে গ্লোবাল পরিবর্তনের আরেক পর্যায়ের মুখে এখন আমরা সকলে।  যখন চীন ও আমেরিকার উভয়েই জোট পাকানো বা নিজ নিজ পক্ষে প্রকাশ্যেই নানান দেশকে সামিল করার প্রচেষ্টা যুগের শুরু হয়ে গিয়েছে বলতে পারি। তাই এটাকেই ঠাট্টা করে বলেছি “ধরাধরি শুরু” হয়ে গিয়েছে।

    তবে খুবই সাবধান, এই নয়া ফেনোমেনা সাবজেকটিক না। মানে আমি সাবজেকটিভ ভাবে আমাদের দেশে এটা ব্যাখ্যা করে বলেছি বলে এটা তাই হয়েছে তা একেবারেই নয়।  বরং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বা  পুঁজির সারপ্লাস সঞ্চয় ব্যাপক হবে কিনা, হয়েছে কিনা এটা বলার ক্ষেত্রে আমার ভুমিকা আসলে এক আবহাওয়াবিদের মত দর্শক-অবজারভার মাত্র; যে বিভিন্ন লক্ষণ ও দাটা মেপে ঘুর্ণিঝড় আসতেছে একথা আগাম বলে; কিন্তু কোনভাবেই যে নিজে ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টকর্তা নয়।

    আবার আমি কমিউনিস্ট কিনা অথবা রশিয়া-চীন কমিউনিস্ট বলে হয়ত  এদের পক্ষ টেনে আমি একথা বলছি – এমন ধারণা প্রসঙ্গেঃ

    প্রথমত আমি একেবারেই কোন কমিউনিস্ট নই। সবকিছু সরকারি মালিকানাভিত্তিক যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ধারণা আছে আমি এই চিন্তার অনুসারি একেবারেই নই। এছাড়া উপরে বলেছি, চীন-রাশিয়া কেউই আজ আর কেন কমিউনিস্ট নয়। চলতি কমিউনিজম আমার ইডিওলজি নয়। এছাড়া বর্তমান চীন-রাশিয়ার সখ্যতা যা আমরা দেখছি সেটা তারা কমিউনিস্ট ছিল বলে এখন এমন দেখা দিয়েছে একথা মিথ্যা। মূলত তাদের কমন প্রতিদ্বন্দ্বি বা বাধা এক্টাই সেটা আমেরিকা; এটাই তাদের সহমর্মিতা ও সখ্যতার মূল ভিত্তি। এটাই তাদের যেকোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বা ফোরামে পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন করার চেষ্টায় কমন অবস্থান নিবার আসল কারণ। মনে রাখা দরকার আজ যা চীন করছে ঠিক সে কাজটাই এককালে আমেরিকা করেছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে নিজ ক্ষমতায় করে সাজিয়ে নিবার ক্ষেত্রে।  আর  আমেরিকার সেদিনের উত্থানের বর্ণনার সময় আমি অকাতরে আমেরিকাকে পজিটিভ ভাবেই ব্যাখ্যা করে থাকি। কারণ দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নায়ক অবশ্যই আমেরিকা, তা সে যে কারণেই করে থাকুক। আমেরিকার সেই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত দুনিয়ার আগিয়ে যাবার জন্য এক লম্বা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।   আসলে সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট ধারণা ও চিন্তায় দুনিয়ার সেই পরিবর্তনকে  আজও তাদের উপলব্দিতে আসেনি, নিতে পারে নাই। এটা তাদের চিন্তা ও পদ্ধতির দুর্বলতা।

    তাহলে এখন আমরা কে কিভাবে ব্যাপারটাকে দেখব? যেমন একটা খুব কমন ও পপুলার পথ হল, আমরা কে কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাকে সহি মনে করি সেই ভিত্তিতে কেউ চীন আর কেউ আমেরিকার পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করা। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা একটাই যে আমরা কে চীনকে ভালবাসি আর কে আমেরিকাকে সেই ভিত্তিতে দুনিয়ায় পরিবর্তনের ঘটনাবলিকে দেখা ও ব্যাখ্যা করা এটা তো কোন চিন্তার মেথডলজি হতে পারে না।

    সারকথায়, আমার এই কথাগুলো বুঝতে সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়া কিভাবে নতুন করে সাজানো হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের মোটা মোটা ফ্যাক্টসগুলো যদি আগাম মনে রাখি বা সুযোগ পেলেই তা পড়ে রপ্ত করে আসি।  কারণ, এটা যার যত সম্যক বিস্তারিক স্টাডি থাকবে তার পক্ষে একালকের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যায় তিনি আগিয়ে থাকবেন।

    এবার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কেঃ
    উপরে চীন-রাশিয়ার অভিমুখ নিয়ে কথা বললাম; তাহলে এরার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কে। তবে লক্ষণীয় যে উভয় পক্ষই যে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জোট পাকাচ্ছে এর দুটোই বৃহত্তর এশিয়াতেই। মানে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্টাল এশিয়ায় যে এশিয়ার ব্যপ্তি।  এই বিচারে আমেরিকার সাজানো নাট্যমঞ্চের নাম ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ বা ‘কোয়াড’।  কথাগুলো তাই শেষের দিকের আমেরিকান ততপরতাকে মাথায় রেখে ইঙ্গিতে বলব।

    বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছেঃ
    গত কয়েকদিন ধরে বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছে আর সম্প্রতি আমেরিকান  সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান জেনারেল চার্লস এ ফ্লিন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ফেসবুকে বাংলাদেশ আর্মির যে পেজ আছে সেখানে দেয়া তথ্য এটা। জেনারেল ফ্লিন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছেন এমন অনেক ছবিও সেখানে দেয়া হয়েছে। আর পিছনে টাঙ্গানো ব্যানারে লেখা আছে “৪৬তম ইন্দো-প্যাসেফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার,  IPAMS 2022”।
    এতে অন্তত যেসব কৌতুহল সৃষ্ট হয়েছে সেগুলো একেবারেই আমাদের আর্মিকে নিয়ে নয়। মূলত তা ঐ ব্যানারে লেখা  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দটাকে কেন্দ্র করে। আর তা থেকে “বাংলাদেশ কী কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে জয়েন করে ফেলেছি”? কবে থেকে? এসব।
    এগুলো নিয়ে যারা যতটুকু জানেন তাদের কেউ কেউ বলছেন,  না – বাংলাদেশ জয়েন করে নাই। কিন্তু তাহলে ব্যানারের কথাগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই কৌতুহল অবশ্য  কেউ মিটাতে পারে নাই। এটাকে কৌতুহল বলছি বটে তবে এটা আসলে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার ভয় মিশানোও বটে!

    আবার একথাও সত্য যে বাংলাদেশ আর্মির সাথে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ওয়ার্কিং রিলেশন হল জাতিসংঘ মিশনকে কেন্দ্র করে। আর ঐ ফেসবুক পেজে তাই যেমনটা লেখা আছে –  “……বৈঠকে “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি” বিষয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্যগণ “বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা মিশন ও এর করণীয়” শীর্ষক ব্রেক আউট সেশন এবং জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।  এটা খুবই স্বাভাবিক।
    তবে তারা কক্সবাজার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিজিট ও কথাও বলেছে।  আর এর সাথে জুড়ে তাই উঠে আসছে রোহিঙ্গা বা বার্মা নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনার কথা।  আমেরিকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চিন্তার সারকথা হল, বার্মার আরাকান প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে সমাধান টানা। এতে বলাই বাহুল্য এটা একটা সামরিক পরিকল্পনা।
    আর তাতে ব্যাপারটা দাড়াচ্ছে এমন যেন,  এখন আমরা ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেই আর না দেই বাংলাদেশের এই ‘সামরিক পরিকল্পনায়’ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কী আসন্ন?
    আর সেজন্যই কী বার্মিজ গোলা এসে পড়ছে? আসলে এনিয়ে সরকারি ভাষ্য-অবস্থান নিয়ে কোন ব্রিফিং খুবই কম। তাই, সবকিছু প্রশ্ন কৌতুহল হয়ে আছে যার জবাব নাই। এটা যতই উহ্য থাকবে কৌতুহলের ডালপালা তত বাড়বে। মূল কারন বাংলাদেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে কীনা এটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যু। কারণ সবাই জানে বর্তমান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি ইনফ্লেশনের মধ্যে আবার একটা যুদ্ধ কল্পনার মানে কী!

    আসলে বড় পিকচারের দিক থেকে বললে,  এখনকার সব  আলোচনায় প্রধান যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন ডোনাল্ড ল্যু [U.S. Assistant Secretary of State Donald Lu] যিনি  আমাদের অঞ্চলে বাইডেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। যিনি সম্প্রতি ‘বিক্ষুব্ধ’ ভারত সফরে এসেছিলেন। এর চেয়েও বড় হল, পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ফেলানোর মূল নায়ক বা এক্সিকিউটর তিনি বলে মনে করা হয়। সাথে আরো কথা হল, আমেরিকা পাকিস্তানকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করছে যার মধ্যে এফ-১৬ এর যন্ত্রপাতিও সংশ্লিষ্ট আছে। এবিষয়ে ভারতের মিডিয়ার খবর এখানে দেখা যেতে পারে।  তাই ঐ সফরে ভারত খুবই কড়াভাবে এতে “আপত্তি” জানিয়েছে।

    সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুমান হল, চীনের এসসিও-এর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত দুদেশই আছে। তাই আমেরিকার পরিকল্পনা হল, এফ-১৬ ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত এর দুরত্ব বা কথার যুদ্ধ অন্তত শুরু করে দেয়া যাক। আর এভাবে তাহলে পাকিস্তান ইস্যুতে ইঙ্গিত হল, ইমরানকে জেলে যেতে হচ্ছে, তা সম্ভবত আসন্ন! আর এভাবেই শাহবাজ সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিতভাবে ভারসাম্যহীন এক প্রো-আমেরিকান  করে সাজানোর পরিকল্পনা এই ডোনাল্ড ল্যু এর।
    এই সুযোগে  কিছু কথা বলে রাখার সুযোগ নেয়া যাক।  সাম্প্রতিককালে আমাদের মত দেশের নিজে বাঁচার পথ হচ্ছে চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত) কারও দিকে এককভাবে আমরা যেন কোনভাবেই না ঝুকে গিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো দাঁড়ানো। একটা ভারসাম্য তৈরি করা  – আর এর মূল সুত্র হচ্ছে একেবারে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে মেপে পথ চলা। যদিও তা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন নিজেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নিজের জনগণের সমর্থনের উপর শাসক দাড়ানোর মুরোদে থাকে। এটা একেবারে প্রাইমারি। যে-ই ক্ষমতায় থাকতে  চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত)ীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে সে নিজের তো বটেই বাংলাদেশকেও গর্তে ডুবাতে নিয়ে যাবে।
    তাই ফ্যাসিবাদ হটাতে চাইলে কি আমাদেরকে কারো যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ও সমর্থক হতেই হবে – সকল ভয় ও কৌতুহলি প্রশ্নের কেন্দ্র এটা!!!!

  • কেন ভারত সফর

    কেন ভারত সফর
    গৌতম দাস

    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২  0৮ঃ৫৫ সকাল

    https://wp.me/p1sCvy-4eE

     

    Bangladesh PM Sheikh Hasina Arrives In Delhi For 4-day Visit

    হাসিনার সদ্য সমাপ্ত ভারত-সফর নিয়ে সফরের আগে থেকেই দেশে হাইপ [hype] বা মিথ্যা উচ্ছ্বাস তোলার চেষ্টায় কমতি ছিল না। মনে করা হয় আওয়ামি যুগ্ম বা সহ-সম্পাদক এর নিচের নেতাকর্মিমহলে ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ট এটা দেখাতে পারলে, এরা বিরোধিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে  নির্দয় মারপিট করতে জোশ পায়, চাঙ্গা হয়ে উঠে। অনেকে তাই হাইপ তোলাটাকে এখান থেকে দেখেছে।  তবে এর আগে বাংলাদেশের কোন প্রধানমন্ত্রীর কোন সফর নিয়ে এমন হাইপ তোলার চেষ্টা আমরা দেখিনি। সেদিক থেকে একটা বাড়াবাড়ি ত অবশ্যই ছিল।

    অন্যদিকে, এই সফর কেন, কী এর মুখ্য উদ্দেশ্য এর একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সরকার বা দল হাজির করার ক্ষেত্রে ব্যাপক খামতি দেখা গেছিল।  এরা কেউ বলতেই পারে নাই বা চায় নাই যে এই সফরের উদ্দেশ্য কী বা মুখ্য ইস্যু কী?  এটা ঢাকতেই যেন হাইপ তোলা হচ্ছে তা মনে হয়েছে। কিন্তু মুল বিষয়,  দেশের সরকার প্রধান কোন সফরে কেন যাচ্ছেন এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে অসুবিধা হবে কেন – এটাই তো আসলে অকল্পনীয় এবং অবিশ্বাস্য! কিন্তু তাই হয়েছে।

    ভারত-বাংলাদেশের বর্তমান বা চলমান সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গত ১৪ বছরে ব্যাপক অস্বচ্ছতা ও নিরুত্তর সব প্রশ্ন ক্রমেই তৈরি করে ফেলা হয়েছে।  সরকার এদিকটা কোনই আমল করে নাই অথবা আমল করা অবস্থায় ছিল না। যেমন, “ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে” – পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন একথা বলে ১২ ঘন্টাও টিকতে পারে নাই। এই উদাহরণটা আমরা মনে রাখতে পারি। এছাড়া দিনকে দিন ভারতের সাথে আমাদের নানান পাওনা নিয়ে গত ১৪ বছরে (যেকালে ভারত আমাদের চরম বন্ধু সরকার বলে দাবি জারি আছে) অমীমাংসিত ইস্যুর সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমে নাই। আর পানির মত ন্যায্য পাওনার ইস্যুগুলোর সমাধান ভারত আরো জোর জবরদস্তিতে করে তা না দিয়ে চলতে চেয়েছে। আর আমাদের সরকার বরং সেগুলো পাশ কাটিয়ে সবসময় চেষ্টা করেছে উলটা ভারতের খাতিরদারি আর তোয়াজ করে চলতে।  তাই এটা আশা করা অস্বাভাবিক ছিল না যে যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ইন্ডিয়া সফর তাই এই সফরের অন্তত প্রধান ফোকাস ইস্যুটা কী এনিয়ে সরকার স্পষ্ট করে বলে রাখবে। কিন্তু তাও এবার সরকার করে নাই।

    তুলনায় এর আগে যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জটিলতা বা অস্বাভাবিকতা যাই থাক তা সত্বেও তো উভয় দেশ থেকেই  উভয় দিক থেকে সরকার প্রধানের সফর ঘটেছে। কিন্তু কখনই এবারের মত এই সফরে ইস্যু কী – তা উহ্য রাখা হয় নাই। অথচ এবার নুন্যতম ফোকাস ইস্যুটা কী তা কেউ জানে না। সরকার স্পষ্ট করে বলতে পারে নাই – এমনটা হয় নাই।

    তাই উপায় না পেয়ে এমনকি প্রো-সরকারি মিডিয়াগুলোও পাবলিককে সন্তুষ্ট করতে যাকে পেয়েছে তাকেই ধরে নিয়ে এসেছে কিছু বলার জন্য। আর তাতেও দেখা গিয়েছে বিশেষত সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা হিমশিম খেয়েছেন। প্রশ্নের জবাবের চেয়ে আরো নতুন নিরুত্তর প্রশ্নগুলো সামনে এসে হাজির হয়েছে।  আর এতে সব আলোচনাতেই মুখ্য প্রসঙ্গ হয়ে ছেয়ে গেছে যে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা একপক্ষীয় – বাংলাদেশের দিক থেকে কেবল দিয়ে যাওয়া অথচ বাংলাদেশের প্রতিটা ন্যায্য পাওনার যেখানে হদিস নাই। এক্ষেত্রে অবশ্য আমরা ২০১৮ সালের ৩০ মে হাসিনার নিজের মুখের আক্ষেপের কথা মনে রাখতে পারি যে তিনি বলেছিলেন,  “ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা সারাজীবন মনে রাখবে” – শেখ হাসিনা।

    ‘ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের’ উপরই নির্ভরশীলঃ
    এবার সফরে মূল ইস্যু না জানা থাকাতে দীর্ঘ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়েই আমাদের সমাজে আলোচনার চেয়ে সমালোচনা হয়েছে বেশি।  তাই শেষে এর একটাই ব্যাখ্যা আপনাতেই  সামনে হাজির গেছে যেন আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল তাই তার পক্ষে বাংলাদেশের পাওনা বা স্বার্থের দিকটা নিয়ে কথা বলার, তুলে ধরার সুযোগ ও সক্ষমতা তার নাই, সে হারিয়েছে।
    এছাড়া এমন আপনা হাজির ব্যাখ্যার পক্ষে আরো উস্কানি তোলা আগুন ধরিয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য। হাসিনার ভারত সফরের দু-সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে স্থানীয় হিন্দুদের এক জমায়েতে দেয়া , “বাংলাদেশের সরকারকে টিকানোর জন্য ভারতকে বলেছি” – এই বক্তব্য। মোমেনের বক্তব্যের কারণেই ‘ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল” আছে এই সরকার এরপক্ষে সরকারি অনুমোদন পোক্ত হয়েছে বলে সমাজ দেখেছে। যদিও ঐদিন সন্ধ্যা হতেই খারাপ প্রতিক্রিয়া টের পেয়ে সাধারণ সম্পাদক কাদেরকে দিয়ে ঐ বক্তব্য “দল বা সরকারের নয়” বলে অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু দলনেত্রীর হুকুমছাড়া  – মোমেন, কাদের বা পরবর্তিতে আব্দুর রহমান এর মত নেতারা কেউ কথা বলেছেন এটা বিশ্বাস করা কঠিন!!
    আর এথেকেই আগামি বছর নির্বাচনের কথা খেয়াল রেখে সাধারণ মানুষের অনুমান যে আসলেই আগামি নির্বাচনেও সরকার ভারতের সক্রিয় সমর্থন কামনা করছে। যেন ভারতের অবস্থান  হাসিনা সরকারের পক্ষেই থাকে, অন্যদলের দিকে না যায় – এটা নিশ্চয় এবারের হাসিনার ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য!!

    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা, কেনঃ
    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। অথচ এবার সরকার না চাইতেও তিস্তা নদীর না-পাওয়া পানি ইস্যু এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের গায়ের জোরের নীতি-পলিসি  আরো উন্মোচিত হয়েছে।  তাই, সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা এনিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পরেছে।  আর তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। কেন?
    গত ২০০৯ থেকে চলে আসা টানা ১৪ বছরের সরকার মূলত ভারতের নর্থ-ইস্ট বা আসামের সব চাহিদার ইস্যু বা দুঃখ ঘুচিয়ে দিবে যেন এই প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিল। এককথায় বললে, সারা নর্থ-ইস্ট বা আসাম, ত্রিপুরা ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরণের অবাধ করিডোর সুবিধা নিবে এর বিনিময়েই যেন তখন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। মনে হয়েছে যেন আমরা এখনও “অখন্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়ায় ১৯৪৭ সালের আগেই আছি”। এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাই ভারতের একক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অবাধে বাংলাদেশের ভুখন্ডের উপর দিয়ে সব করিডোর সুবিধা নেওয়া হয়েছে। আর তা যোগানোই যেন আমাদের সরকারের কর্তব্য!!

    এখন ২০০৭ সালের পরিকল্পনা মতে,  ভারত এভাবে একপক্ষীয় ভাবে সকল সুবিধা নিবে এটা দেখতে খারাপ লাগে তাই, ভারতের দিক থেকে দুইটা অমীমাংসিত ইস্যু তারা বাংলাদেশকে সমাধান করে দিবে বা ছাড় দিবে – এমন একটা ধারণা আমরা কার্যকর থাকতে দেখেছিলাম। এর একটা হল “ছিটমহল বিনিময়” যা সেই শেখ মুজিবের আমল থেকে চুক্তি করেও ফেলে রাখা ছিল।  যেটা সেই আমল থেকে আমরা আমাদের ভুমি ভারতকে ছেড়ে বসে আছি কিন্তু ভারতের খবর নাই – অবস্থায় ছিল; এই ছিটমহল প্রশ্নের সমাপ্তি টানবে। আর দ্বিতীয়টা ছিল, তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। এই কারণে বলা যায়, তিস্তা ইস্যু হল স্পেশাল যা ভারতের দিক থেকে নয়া হাসিনা সরকারকে আপোষে দেয়া প্রতিশ্রুতি।
    অথচ আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদি সশস্ত্র আন্দোলন সমস্যা মিটিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে আসামের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, আকাশ-স্থল-পানি ইত্যাদি সব মাধ্যমে করিডোর যোগাযোগ সুবিধা কী নয় – এমন সবকিছু ভারতকে দেওয়ার পরও আমাদের সরকারের হাত শুন্য – আশ্বাস ছাড়া সেখানে কিছুই নাই!!
    আর এখন এসব সত্বেও আমাদের বেচারা সাংবাদিক, কূটনীতিক বা অধ্যাপকেরা তবু আশার বাণী শুনাচ্ছেন যে এই সফরে তিস্তা ইস্যু নাকি আলোচনার বিষয় হবে – অথচ এনিয়ে কোথায় কোন আলাপ নাই।
    এমনকি কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে মোদি সরকার তো পানি দিতেই চায় কিন্তু মমতা চায় না তাইতেই  নাকি সব সমস্যা হয়েছে। আচ্ছা যদি সমস্যাটা তাই হয় এসব বক্তারা কী একবার ভেবে দেখেছেন এর অর্থ কী? এর অর্থ হল, তাদের মোদি-জী আসলে একটা খামোখা!!! মুরোদ নাই, অক্ষম; তাই তিনি কেউ নন। তাহলে ভারতের সরকার কাঠামো অনুসারে এখানে  মোদি সরকারের যদি মুখ্যমন্ত্রীর উপরে মুরোদ নাই হয়ে থাকেন মানে পানি দেওয়ার ক্ষমতা যদি মোদির না মমতার হাতে থাকে তাহলে আমরা মোদির সাথে কেন ডিল করতে বা চুক্তি করতে চাচ্ছি বা গিয়েছি কেন??? মোদি তাহলে কে আমাদের কাছে??? জয়শঙ্করের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা কথা বলছি বা বলব কেন??? কোন মুরোধীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের যাওয়ার দরকারই বা কী??

    একারণেই বাংলাদেশে একথার প্রতি বিশ্বাস বাড়ছে যে আমাদের সরকার ভাবছে তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের সমর্থন জরুরি আর একারণেই বলাই বাহুল্য ভারত তাই যেচে আমাদের কোন ন্যায্য পাওনা দিতে মনোযোগ দিবে কেন?

    ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা ছেড়ে, প্রসঙ্গে আসতে হবে – কেন ভারত সফরঃ
    উপরে এতক্ষণ ঘুরায় ফিরায় আমরা অনেক কথায় গেলাম। কিন্তু মূল বিষয় যে ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী তা জানা হল না। এককথায় বাংলাদেশে বা দেশের বাইরের মিডিয়ায় যাকিছু প্রকাশিত আলোচনা তারা কেউই সফরের উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট জানাতে পারে নাই। শেষে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়ে লিখেছে এই সফরের উদ্দেশ্য নাকি “রাজনৈতিক”। ‘রাজনৈতিক’ মানে?? সেটা আবার কী??  আসলে সেটা হল  মানুষ যখন বুঝে যায় তার কথার কোন মানে হচ্ছে না তখন কিছু অর্থহীন অবুঝ শব্দে (vague) মানে আন্দাজে অস্পষ্ট শব্দ নিয়ে আসে। এখানে ‘রাজনৈতিক’ শব্দের অর্থ তাই। ঠিক যেমন অনেকে নিজ বুদ্ধিতে না কলিয়ে দুনিয়ার নানান ফেনোমেনো ব্যাখ্যা না করতে পারলে বলে – এটা ‘ভূরাজনীতি’ বা ‘ভূরাজনৈতিক প্রভাব’। এই “রাজনৈতিক” শব্দের আমদানিও সেরকম। অর্থাৎ যেটা নিজেই বুঝে নাই, সেটা অন্যকে বুঝাতে লজ্জা ঢাকতে গিয়ে যে শব্দ তুলে আনা হয়।

    তাহলে আবার পুরানা প্রশ্ন, এই ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী? এবার আর রহস্য না করে বললে সোজা জবাবটা হল – ভারত সফরের উদ্দেশ্য ‘চীন’! সেটা আবার কী? যেখানে সফরে যাচ্ছে ভারতে তাহলে সেখানে উদ্দেশ্য চীন – একথার মানে কী?

    মানে হল, গত দুমাস ধরে বাংলাদেশের মিডিয়ায় লাগাতর যে প্রধান খবরে ডুবে ছিল ও আছে তা হল, রিজার্ভ সংকট। মানে সরকারের কোষাগারে দেশচালানোর মত  যথেষ্ট ডলার নাই। গড়ে প্রতি মাসে আমদানি আয় ও রপ্তানিতে ব্যয়ের ঘাটতিতে একে রেমিটেন্স ও ইত্যাদি আয় দিয়ে পূরণ করার পরও ব্যালেন্সে ঘাটতি গড়ে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। আর সামাজিক বাস্তবতার দিক দিয়ে যদি ব্যাপারটাকে বর্ণনা করি তা হল,  আমাদের নিয়মিত কমপক্ষে দুঘন্টা লোডশেডিং হয় আর সারা দেশের মানুষের সরকারি-বেসরকারি  ওয়ার্কিং আওয়ার  ৩ ঘন্টা কমানো হয়েছে, মূলত বিদ্যুতের চাহিদা কম রাখার জন্য। আর এদুটা হল আমাদের ডলার সঙ্কট কত তীব্র তা বুঝবার জন্য বাইরের মাত্র দুটা প্রকাশিত চিহ্ন। এছাড়া চারিদিকে মুদ্রাস্ফীতি যা মূলত উদ্ভুত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এতে বাজারে ডলার কেনাবেচার রেট ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এসবই হল মারাত্মক গভীর সব সংকটের বাইরের দুচারটা লক্ষণ। আবার সেই থেকে আইএমএফের কাছে বিশেষ ঋণের আবেদন করা হয়েছে, সে খবরের উদ্ভব। তবে আপাতত দেখা যাচ্ছে ডলার সংকট নিয়ে উদাম খবরগুলো আর বাইরে আসছে না। নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিছু লাগামও টানা হয়েছে। কিন্তু সংকট যে আগের মতই আছে সেটাও পরিস্কার!
    এসবের সারকথা হল, আমরা গভীরভাবে ডলার বা রিজার্ভের সংকটে আছি।

    আমাদের দেখা উদাহরণ বলছে, এমন ডলার সংকটে আইএমএফ সংকটের সুরাহা দেয় কিন্তু  তা প্রথমত, অন্তত ৪-৫ মাস লেগে যায় তাতে। আর, তবে এর আগেই বাছবিচারহীনভাবে খামোখা সব ভর্তুকি তুলে নেওয়ার দাবি করে আইএমএফ মুদ্রাস্ফীতি চরমে তুলে দেয়। (তবে আমাদের সরকার কেউ না বলতে আগাম নিজেই তেলের দাম দেড়্গুণ বাড়িয়ে সমস্যাকে ঘোলাটে করেছে।) দ্বিতীয়তঃ  সব চেয়ে বড় কথা আইএমএফ এক্ষেত্রে চলতি সরকারের সাথে চুক্তিই করে না। যদিও হবু নয়া ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা ও শর্তাবলি কী হবে তা নিয়ে আলোচনার সবই করে। কিন্তু শেষে চুক্তি করার আগে বলে থাকে চলতি সরকারের সাথে না, পরবর্তি সরকারের সাথে সে চুক্তি করবে। এর মানে যে যা বুঝার বুঝে নিতে পারেন। আর শ্রীলঙ্কায় ঠিক এই জিনিষটাই সম্প্রতি ঘটেছে।

    তাহলে এর থেকে সরকারের নুন্যতম বিকল্প বা পরিত্রাণ কি?  তা হল, চীনের মত দেশ থেকে বড় নগদ ঋণ নেয়া। চীনের নাম নেয়া এজন্য যে বাকি যারা দেশ তাদের সামর্থের প্রশ্ন আছে আর এরচেয়েও বড় হল, কোন ‘ক্যাম্পের’ তারা ইত্যাদি এসবের প্রশ্ন আছে। তবে আইডিয়ালি বললে, আইএমএফের লোন পাওয়া নিশ্চিতের বা পাওয়ার পরেও একই সাথে সাথে চীনা ঋণও পাওয়ার দরকার থাকে। আমাদেরও আছে। মূল কারণ, আইএমএফ লোনের পরিমাণ কম হলেও এর উদ্দেশ্য বা আমাদের লাভ ও দরকার হল দেশি-বিদেশি পুঁজি বাজার ও ব্যাংক ব্যাবসাকে আশ্বস্ত করা যে আইএমএফ (সে বাজারের চোখে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ) নিজে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চেক করেছে। আর চীনের ঋণ দরকার রিজার্ভের ঘাটতি পূরণে। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে সম্ভবত সরকার বেছে নেয়া লাইনটা হল, আইএমএফের  ঋণ পাওয়া যা হবে হোক, আগে চীনা লোন নিশ্চিত করা যাক!

    কিন্তু তাতে আবার সমস্যা কীঃ
    তাতে সমস্যা কী? নয়া চীনা লোন নিলেই তো হয়। আর এর সাথে আবার হাসিনার ভারত সফরে যাওয়ার কী সম্পর্ক?

    বিরাট সম্পর্ক। আর সেটা দশহাত শাড়ি পড়ার মত, যে ডানদিকটা ভালমত ঢাকলে তাতে বাদিকটা উদাম হয়ে যায়। সেটা আবার কী? এখন চীনেরও সদ্য পুরান  কিছু ক্ষোভ আছে। আর চীনের স্বভাব হল ক্ষুব্ধ হলে সে ঐ দেশ ছেড়ে চলে যায় না। বরং বিপদে পড়া দেশটাকে আরও সাহায্য করে ঠিকই কিন্তু এবার আরো কড়া সব শর্ত আরোপ করে।

    এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি গত ২০২১ সালে আমাদের করোনা টিকা পাওয়ার কাহিনী। আজ বাংলাদেশে দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার মধ্যে সবার চেয়ে আগিয়ে ৭৩.৭% সফল তিন ডোজ টিকাদান করা দেশ। কিন্তু এই মিরাকল কেমনে সম্ভব হল কেউ খবর নেই নাই। ভারত আমাদের সাথে শর্তভঙ্গ করে আমাদেরকে টিকা না দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পাপনের প্রকাশ্যে ভারতকে গালাগালি করা আমরা দেখেছি। এরপরও, এখন এই অর্জন সম্ভব করা গিয়েছে। কারণ, এখন আমাদের টিকা পাওয়ার মূল চালান চীনের দেয়া আর সেটা প্রায় বিনা পয়সায়। ঢাকা শহরের মধ্যে বিতরণ করা  (জাতিসংঘের হু এর দানে দেয়া কিছু টিকা) বাদে এর বাইরের সব টিকাই চীনা টিকা। কিন্তু কিসের বিনিময়ে সরকারকে এই টিকা পেতে হয়েছে আমরা সাধারণ্যে খবর নেই নাই।

    খুব সম্ভবত আজকের ডলার সংকটের ক্ষেত্রেও ক্ষুব্ধ চীনের শর্ত মেনে আমাদের লোন পেতে হবে। গত ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট এর ঢাকা সফরের পর থেকে আমরা প্রথম চীনা অবকাঠামো ঋণ পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই ছয়বছরে নিতে চাওয়া বহু অবকাঠামো প্রকল্প শেষে আমরা নিতে পারি নাই। কারণ, চলতি ১৪ বছরের টানা সরকারকে ভারতের সমর্থনের (ভারতের সমর্থনে সরকার বিষয়ক মন্তব্য করে মোমেন যেকারণে নিন্দিত) ব্যাপারটাকে সবার উপরে সবসময় আমল ও মনোযোগ দিতে হয়েছে। খুব সম্ভবত এবার চীনা নগদ ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আপত্তিতে আগে যেসব চীনা-প্রকল্প বাদ দিতে হয়েছে এর সিঙ্ঘভাগে এবার ফিরে গ্রহণ করতে বাংলাদেশকে রাজি হতে হবে।

    আর এতে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুমান করে আগেই ভারতের সাথে কথা বলে অন্তত যথাসম্ভব তা জানিয়েই কাজ করতে মনস্থ করেছে সরকার। অতএব সেখান থেকেই এই ভারত সফর। এনিয়ে একমাত্র সমকাল পত্রিকায় সঠিকভাবে সম্প্রতি কিছু রিপোর্ট এসেছে। স্বভাবতই খবরের সোর্সের নাম আড়াল করে ছাপানো  “তাসনিম মহসিন” এর লেখা সমকালের কিছু রিপোর্টে তা এসেছে। এর মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর   ‘ঢাকার মধ্যপন্থায় আশ্বস্ত দিল্লি’ শিরোনামে লেখাটা সবচেয়ে (তবে যতটা সম্ভব ইঙ্গিতে বলা) বিস্তারিত।  যদিও আসলেই কী ভারত এতে আশ্বস্ত হবে? এর জবাবটা ঘুরিয়ে দিতে হবে! বলতে হবে, কেউ আশ্বস্ত হবে কিনা সেটাই তো ওর নিজ যোগ্যতার উপর নির্ভর করে! তাই না!!

    যেমন ধরেন টিকা প্রসঙ্গে মানে, দিব বলে চুক্তি করে না দেওয়া এটা ভারতের ছেঁচরামো – এর পরিণতি কী হয়েছে? পরিণতি হল কক্সবাজারের কিছু স্থাপনা বাংলাদেশ চীনকে করতে দিয়েছে। মানে যেমন বিমানবন্দর-রানওয়ে ও ‘ইত্যাদি’ নির্মাণের কাজ দেয়া। এখন এতে ভারত অস্বস্তিবোধ করে তো লাভ নাই। এটাই তো টিকা না দেওয়ার  কাফফারা!! নয় কি? ভারতের নাই মুরোদ বা যোগ্যতা তবু তাকে চীন-বাংলাদেশ প্রথম টিকা-চুক্তিতে বা-হাত ঢুকাতেই হবে। চীনা টিকার  গবেষণায় থার্ড ফেজে বাংলাদেশ অংশ নেওয়ার বিনিময়ে  চীনা টিকা পাওয়া বন্ধ করে দিতে হবেই!!! এই ছিল অক্ষম মুরোদধীন ভারতের কূটনীতি! এতে পরিণতি কী হয়েছে সেটাই দেখব!

    অর্থাৎ সেই ভারত যোগ্য হয় নাই এখনও।  অন্যকে অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ হয় নাই। ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উন্নিত নয়। আর পছন্দের দেশকে ‘অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ” যখন হয়, এটাই কোন দেশের গ্লোবাল নেতা হবার বা কার্যত দাবি করার বা উঠে দাড়ানোর মুল লক্ষণ চাবিকাঠি।  এভাবেই  দাপটের সাথে গত পচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা এভাবেই মুরোদ দেখিয়ে এসেছে। যেটা এখন শীর্ণ প্রায়, বুড়া সিংহের মত।  এটাই অন্যদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের আসল  সক্ষমতা ও যোগ্যতা।  যা এখন আমেরিকার জায়গায় দেখাচ্ছে চীন। আর ভারতের সে মুরোদ হতে এখনো ধারে কাছেও নাই; তবে হয়ত হবে। অথচ এখনই বিরাট হা-করা আশার জিহবা বের করে ভারত বসে গিয়েছে। যেন কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ জেগেছে!!

    যেমন উপরে উল্লেখিত সমকালের তাসলিম মোহসিনের ঐ লেখার একটা অংশ হল এরকমঃ “…সাবমেরিন বিষয়ক সামরিক প্রশিক্ষণে বঙ্গোপসাগরে চীনা উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমুদ্রে নিরাপত্তা নজরদারি জোরদারের জন্য রাডার সিস্টেম দেবে ভারত।  এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে”।  এটাই হল, – কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ – এর পারফেক্ট উদাহরণ। ভারত যেন বলতে চাইছে – মাংস খেতে না পারলাম একটু ঝোল তো পেতে পারি।  আসলে যে মাংস পাবার যোগ্য নয়, হয়নি সে ঝোলও কেন পাবে???  আগে নিজের অবকাঠামো নির্মাণের সব প্রয়োজন পুর্ণ কর – এরপরেই না অন্যদেশে অবকাঠামো ঋণ দিতে শুরু করা!  মানে গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করতে, ছড়িয়ে দিতে শুরু করা এসব কাজের যোগ্য হওয়া আর এজন্য  ছেঁচরামো শুরু করা কি এককথা?? আর এসব করে শেষে লাভটা কী হয়?

    কাজেই এখন ভারতের মুরোদহীন আপত্তি উপেক্ষা করে চীন-বাংলাদেশের পুরানা বাদ-পড়া চীনা প্রকল্পগুলো আবার চালু করতে হাসিনার সামনের ভারতীয় বাধা কাটাতেই, মানে অন্তত মুখরক্ষা করতেই হাসিনার এবারের ভারত সফর ঘটেছে। এটাই মূল কারণ। আর লাভের লাভ যে ভারতীয় কোন আপত্তি যে হাসিনা আমল বা শোনার অবস্থায় নাই সেটা বলে দিয়ে এসে সব বাধা কাটিয়ে আনতে তিনি সফল – এই অর্থে তার সফর সফল বলে সরকার দাবি করছে। আর তা যাওয়ারই কথা। আর এর সাথে পাশাপাশি চীনা  কিছু নগদ ঋণের সংস্থানও হাসিনা করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে অবশ্যই যাতে তাঁর চেপে বসা ডলার সংকটের কিছু সুরাহা হয়।

    কিন্তু হাসিনার ভারত সফর সফল “হবারই কথা” বলছি কেন?
    বলছি কারণ ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে গেছে তা একেবারে ভেঙ্গে না গেলেও। ফলে ভারত যেন হাসিনার জন্য আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ নিয়ে যাক, এমন উদ্দেশ্য হাসিনার এই সফরে ছিল না।  কারণ, এখন আর আমেরিকার কাছে  ভারতের সেই মুল্য বা গুরুত্ব নাই।  একারণেই রাশিয়ান তেল বা জ্বালানি নিয়ে সেসব বকোয়াজি এটা শাহরিয়ার আলমের নিজের কল্পনা। যতদুর জানা যায় এটা আপার ফরমাইস ছিল না।

    কিন্তু  এখন কী দাড়ামো? এর মানে কী এই যে সরকারের ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাচ্ছে? না, এখনো অনেক সবুর করতে হবে। এছাড়া সবটা  না হলেও সরকার কিছু আলো দেখতে পাবে অবশ্যই। তাও যদি এখন চীনের সাথে নয়া কিছু চুক্তি সম্পন্ন-সহ সেসব কাজকে বাস্তবে করে দেখাতে পারে তা পরিকল্পনা-মত সফল হতে হবে আগে।

    পুরা ডলার সংকট সমাধান কী হবেঃ
    কিন্তু কেন পুরা ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা জাগাতে পারা যাচ্ছে না? মূল কারণ সংকটটা কৃত্রিম। মানে হল, গত ১৪ বছর যে পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ লোপাট হয়েছে এরা সবাই চাচ্ছে তাদের টাকা ডলারে রুপান্তর করে নিতে। এটা বাস্তবত অসম্ভব। কারণ, এই চাহিদা অস্বাভাবিক। এটা বাংলাদেশের স্বাভাবিক অর্থনীতি থেকে উঠে আসা কোন চাহিদা নয়। এটা আলটপকা এবং লুটেরাদের চাহিদা। যা স্বাভাবিক অর্থনীতিক চাহিদার বাইরের ঘটনা আর বাইরের লোকেদের। আমাদের স্বাভাবিক অর্থনীতি কখনও আমাদের অর্থনীতিতে সচল সব স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে ডলারে রুপান্তরিত করার কোনই চাহিদা তৈরি করে না।  কাজেই এখন দেখা দেওয়া সব চুরির টাকার ডলারে রুপান্তরের চাহিদা এটা স্বাভাবিক ও আমাদের অর্থনীতির পক্ষে তাদের চাহিদা মিটানো এবসার্ড! ফলে সোজা কথা,  চোরদের তৈরি করা “ডলার চাহিদার” উপর রাষ্ট্রের একশন লাগবে – সক্ষমতা লাগবে, একে কঠোর দমন করা লাগবে, যদি  সে মুরোদ থাকে!

    এই পরিস্থিতিতে জীবন নাভিস্বাসে উঠে যাওয়া মানুষের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সাথে এখন থেকে অর্থনীতি ক্রমশ স্থবির হতে চাইবে – এমন দশা স্পষ্ট হইয়ে উঠবে। যা ব্যাপক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে ঠিকমত কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনীতির সামনে চলে আসা, প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠা  – এটা এক খুবই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে তাদের আমেরিকান সমর্থনও পাওয়ার কথা।  বাকিটা আগামিতে…।

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    গৌতম দাস
    ২৯ আগষ্ট ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4dT

     

    এক কাল্পনিক আড্ডার আলাপঃ বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা বাক পরিবর্তন নিয়ে যেখানে কথা উঠেছিল।   বক্তা নিজেই প্রশ্নটা জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন ভারতমুখি হয়ে থাকে? মানে তিনি এই প্রশ্নের একটা সাফাই নিজেই দিতে চান তাই নিজেই কথাটা তুলেছেন। আর ভারতমুখি বলতে কেউ বাংলাদেশে থেকে আবার ভারতের স্বার্থকেই নিরন্তর নিজের স্বার্থজ্ঞান করে কথা বলে,এভাবে যে নিজেকে তুলে ধরতে চায় এমন কাল্পনিক একজনকে এখানে ধরে নেয়া হয়েছে।
    সব রাষ্ট্রেরই নিজ একান্ত কিছু স্বার্থ থাকে যা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা হবেই আর এনিয়ে  প্রশ্ন তোলার কিছু নাই। তবে এটা আবার যখন সীমা ক্রশ করে বাড়তে চায় মানে নাগরিক একদেশের কিন্তু আনুগত্য করে বসে অন্যদেশের এবং ভিন্ন দেশস্বার্থের তখন এটা বারবার বাকি সকলের কাছেই খুবই অস্বস্তিকর মনে হবে; এজন্য যে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিক-আনুগত্যের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে।  এটা অমান্য করতে চায় বলেই এই সীমাছাড়ানির কথাটা আসে। যেমন, কোন দুই ব্যক্তি একবার স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাবার পর স্ত্রীর স্বামীর প্রতি বা স্বামীর স্ত্রীর প্রতি এক লয়াল বা আনুগত্যের সম্পর্কের থাকতে বাধ্য। এই বস্তুগত আনুগত্য কোন কারণে যদি কখনও অনুপস্থিত হয়ে যায়, না থাকতে দেখা যায় তবে বুঝতে হবে ঐ সম্পর্ক কার্যত এরা আর স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কিত নয়; বা ভান করছে।  আর বাস্তবে এথেকেই পরকিয়ার মত কঠিন অমীমাংসিত জটিলতাগুলো তৈরি হয়।
    আবার এই ভারতমুখিতার ধরণের ভিতরেও গত বিশবছরে একটা কোয়ালিটিটিভ মানে গুনগত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। যেমন আগে, পাকিস্তান আমলে বা বাংলাদেশের আমলে কিন্তু ১৯৯২ সালের আগে দেখা যেত বাংলাদেশি হিন্দুদের বড় অংশই নিজেদেরকে কমিউনিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিশীল বলে পরিচয় তুলে ধরত। আর এই সাথে সেকালের ভারতের হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ বা যাদের একালের নতুন নাম বিজেপি-আরএসএস – এদের থেকে দূরে থাকত।  অথচ একালে মোদির আমলে বাংলাদেশের হিন্দুরা বিশেষত তরুণেরা মোদিকে তাদের নেতা ও ত্রাতা মনে করে থাকে। এটা এক তাতপর্যপুর্ণ পরিবর্তন সন্দেহ নাই।

    কিন্তু এই পটভুমিতে বক্তা চেষ্টা করছিলেন কেন এমন আনুগত্য সমস্যা তা নিয়ে এর স্বপক্ষে কিছু সাফাই তুলে ধরার। তিনি জানাচ্ছিলেন যে, একটা দেশের কোন কোন জনগোষ্ঠি তো অনেক রকম ভিন্নতায় অনেক কিছু চাইতেই পারে। সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই। তারা তো পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকতে চেয়েছিল। কথা বাস্তব সত্য এবং কথা তাদের মনের কথা সন্দেহ নাই। কিন্তু এই চাওয়া কী সঠিক ছিল? তাদের স্বার্থের পক্ষে ছিল?

    এককথায় বললে, আপাত দৃষ্টিতে সঠিক ও নির্দোষ এবং ইনোসেন্ট  মনে হলেও এটাই ছিল তার আত্মঘাতি চাওয়া। আজপর্যন্ত বাংলাদেশের হিন্দুদের সমস্ত দুর্দশার মুল ও ভুল এই চাওয়া। সবভুলের উতস এটা। যদিও ১৯৪৭ সালের আশেপাশের প্রেক্ষিতের দিক থেকে বললে, ততদিনে এটা বড় ধরণের ভুল অবস্থান।

    কিন্তু কিভাবে এটা বুঝব? তা কী দিয়ে বিচার করব?
    সবশেষে এই হলো এই তর্কের মূল প্রসঙ্গ!

    একঃ এটা যেকোন রাষ্ট্রগঠনের দিক থেকে এক মৌলিক সমস্যা যে সব নাগরিককে একমত হয়ে চাইতে হয় যে তারা কেমন রাষ্ট্র চায়। মানে কিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চায় এনিয়ে একমত থাকতে হয় বা হতেই হয়। তবেই এক মৌলিক বিষয়ের সমাধান পাওয়া যেতে পারে।  আর সেজন্য কেমন কী  ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে চাচ্ছি তা প্রস্তাবের সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন তা সবার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয় – কেবল এমন কিছুই যেন প্রস্তাব করা হয়। আর এতে ব্যর্থ হলে আগামিতে সব বিরোধে ও ব্যর্থতার শুরু হবে এখান থেকে।  ের কিছু সুত্র নির্দেশ করা যেতে পারেঃ –
    ১। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বা দাবিতে কোন কিছু চাওয়া জায়েজ  – এমন মনে করা সবার আগে ত্যাগ করতে হবে।

    ২। এরই আরেক ভার্সান বা মূলসুত্র হল, সমাজের কেউ অন্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ – সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে – এটাই যেকোন রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া বা কার্যকর না থাকার মূল কারণ হয়।
    ৩। তাই এরই উলটা পিঠের মানে ইতিবাচকভাবে বলা কথাটা হল – রাষ্ট্রে হতে হবে বৈষম্যহীন নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র এমন ভিত্তিতে।  মানে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে বেশি ক্ষমতা ও আধিপত্যের অথবা কেউ সংখ্যালঘিষ্ঠের কারণে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের, কেউ পাহাড়ি বলে বা সাঁওতাল বলে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের আইনি এবং সামাজিক চর্চার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতেই হবে ইত্যাদি এগুলো বন্ধ করতেই হবে। তাই মুল কথা, নাগরিক অধিকারেরর দিক থেকে নাগরিক সকলেই সমান – এই ভিত্তিতে। এই সাম্য-নীতি সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান করতে হবে।

    এটাই সংক্ষেপে “নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি” রাষ্ট্র বলা হয়। আরো সংক্ষেপ করতে ‘নাগরিক সাম্য নীতিও’ বলা যেতে পারে।

     

    এখন তাহলে বিচার করা যাক – সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই – এই বক্তব্যকে যারা বাংলাদেশের হিন্দুদের পক্ষের সাফাই মনে করছিল সেটা কী ঠিক ছিল? বাংলাদেশের হিন্দুরা কী নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি মেনে তাদের প্রস্তাব বা চাওয়া তুলে ধরে ছিল? অবশ্যই না। তাই হিন্দুদের সাফাই সঠিক না, তাদের পক্ষে গেছে বা কাজের হয়েছে তাও না, তাদের কাজে লেগেছে তাও না।
    এককথায় বললে, এর মানে, বাংলাদেশের হিন্দুদের পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকার দাবি বা যে বাসনা সেটা আসলে মুসলিম লীগের আত্মরক্ষামূলকভাবে “পাকিস্তান” নামে আলাদা রাষ্ট্র কায়েম করার যে দাবি -তারই হিন্দু ভার্সান।
    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় ঐক্যমত।

    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে যথেষ্ট প্রয়োজনীয় ঐক্যমত। 

    একথা শুনে হিন্দুদের পক্ষের সাফাই যারা দিতে এসেছিল তারা প্রসঙ্গটা কিছুটা বদলে এবার বলে বসল – এজন্যই তো ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বাংলাদেশের (পুর্ববঙ্গের) হিন্দুরা করেছিল।  এতে ঐ আসরে তারা ভেবেছিল নিশ্চয়  এবার বেশ শক্ত পয়েন্ট তুলতে পেরেছে! তাদের পয়েন্টকে আরো শক্ত-পোক্ত করতে তারা এবার  আরো কিছু কথা সাথে জুড়ে দিয়ে বলল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করার চিন্তা তো খুবই বিভেদমূলক ও পশ্চাতপদ চিন্তা! এই বক্তব্য অবশ্য আমাদের তি্নদেশে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা হিসাবে পরিচিত। কিন্তু তা আসলেই কী???  না বাংলাদেশের হিন্দুদের আসলেই  কপালই খারাপ!  কেন?

    এতদিন মনে করা হত, ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ার কাজটা সব খারাপ কাজের গোড়ার খারাপ কাজটা। এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করে থাকেন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা এমন এক মোক্ষম কথা তুলে মুসলিম লীগের মুখ বন্ধ করে দিতে পেরেছিল। আর এদের চোখে একাজটা ভারতের কংগ্রেসের চেয়েও ভাল ভাবে করেছিল  কমিউনিস্ট পার্টি।  কিন্তু ঘটনা আসলে উলটা যা উল্টেপাল্টে  বিচার করে দেখাই হয় নাই। কিভাবে?

    ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা যদি ধরে নেই খুবই খারাপ কাজ এমনকি জঘন্য কাজ তবে মুসলিম লীগ বা পাকিস্তান কায়েম করাই এধরণের প্রথম কাজ নয়।  ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা অখন্ড ভারতে সবার আগে করেছে, সবার আগে তুলেছে এবং এই ভিত্তিতে  নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্র সাজিয়েছে মুসলিম লীগ নয় – কংগ্রেস – যার পুরা নাম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল। কিভাবে?

    ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌল্লাকে পরাজিত করতে পারলেও নানা সমস্যার কারণে ১৭৬২-৬৪ সাল লেগে যায় ক্লাইভের বৃটিশ ইস্ট -ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে দেওয়ানি লাভ করতে বা প্রশাসন নিজের হাতে উঠিয়ে নিতে। পরে ঐ কোম্পানি আবার একই সময়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়াতে আর বৃটিশ রাণীর সহায়তায় কিছুটা উঠে দাড়ানোর পরে কোম্পানির প্রধান কাজ হয়েছিল যেভাবেই হোক তাতক্ষণিক রাজস্ব আদায় বা সংগ্রহ। একারণেই বাংলায় ব্যতিক্রমি জমিদার প্রথা (আগাম নগদ রাজস্ব জমা দিয়ে জমিদারি কেনা আর পরে প্রজার কাজ থেকে বছরান্তে খাজনা আদায় করে নেয়া) চালু হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির সেই প্রধান রাজস্ব আয়ের উতস জমিদারি ব্যবস্থাটা থিতু করতেই ১৮০০ সাল লেগে যায়। আর দেখা গেল, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জমিদারি কিনেছিল হিন্দু জমিদারেরা।  ফলে এরপরেই এই হিন্দু জমিদারদের মাথায় আসে হিন্দু আধিপত্য কায়েম করার।

    মনে রাখতে হবে সেকালে প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বলতে কৃষি তাও আবার সেটা জমিদারি মালিকানায় জমিদার-প্রজা ভিত্তিক সম্পর্কের কৃষি অর্থনীতি। ফলে সবার উপরে বৃটিশ কোম্পানি আর এর নীচে জমিদার হিন্দুর আধিপত্য কায়েমের সমাজ প্রতিষ্ঠা এটাই  বাস্তবে কায়েম হয়েছিল। যদিও পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কলকাতা সারা ভারতের বৃটিশ রাজধানী বলে অন্তত সারা বঙ্গে জমিদার হিন্দুর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম সহজ হয়েছিল।
    কিন্তু তবু এসবই ছিল অর্থনৈতিক বা মাঠের নয়া শ্রেণীর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম। কেন এভাবে বলছি?
    বলতে চাচ্ছি রাজনৈতিক অংশ এটা নয় তা বুঝাতে। নয়া শ্রেণীর  রাজনৈতিক অংশটা তৈরি হয়েছিল আলাদাকরে। তবে অবশ্যই এটা তৈরি হয়েছিল সমকালীন ভাবে। বা বলা যায় অল্প কিছুটা আগে। আর তা ঘটেছিল রাজা রামমোহন রায়ের হাতে তার আত্মীয়সভার আসর থেকে।  রামমোহন এর পরিচয় লম্বা না করে এখানে কমিউনিস্ট ইতিহাসে যেভাবে তাঁকে পরিচয় করানো হয়েছে কেবল সেটুকুই তুলে আনছি।

    আসলে রামমোহন রায়ের হাতে এক নয়া ধর্মের প্রবর্তন ঘটেছিল ১৮১৫ সালে, এটাই ব্রাহ্ম (ব্রাহ্মণ শব্দ বা ধারণার সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই) ধর্ম । ফলে সেই থেকে এখনও যারাই  ব্রাহ্ম ধর্ম বা সমাজ এর অনুসারি এরা সকলেই সেসময় থেকেই পারিবারিকভাবে রামমোহন প্রবর্তিত ব্রাহ্ম অনুসারি। সেটা রবীন্দ্রনাথের দাদামশায় (গ্রান্ডফাদার) দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে এখনও পুরা ঠাকুর পরিবার। আবার এদিকে ১৯৩৫ সালে পুনগঠিত প্রথম ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যপক সুশোভন সরকার তার সারা পরিবারও ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি হয়েছিলেন। আর এই সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে পরিচয় করানো হয়েছে।

    কিন্তু তাঁর এভাবে বলার মধ্যে সমস্যা কী হয়েছে তা হয়ত অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয় নাই। এছাড়া রামমোহন রায়ের কথা কেন তুললাম তা নিয়ে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। আর এর সাথে ধর্মের ভিত্তিতে দল গড়ার প্রসঙ্গে কে প্রথম এটা করেছিল সেকথাই এখন স্ইপষ্ট করে বলব।

    আমাদের এদিকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানে (এই তিনদেশে) কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের কাছে রেনেসাঁ বেশ আদরণীয় শব্দ ও ধারণা। রেনেসাঁ অনেকটা বড় মৌল ধারণা বা উতস ধারণার মত বলে  ধারণাটাকে মনে করেন তাঁরা। যদিও খোদ কার্ল মার্কস রেনেসাঁ  ধারণা দূরে থাক, আধুনিক রাষ্ট্র বা মর্ডার্ন স্টেট (তার ভাষায় ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্র’ ) নিয়েও  তিনি কোন আগ্রহই দেখান নাই। ভাল-মন্দ বড় কিছুই লেখেন নাই।  তাহলে কেন আদরণীয় হল? এর মূল কারণ প্রগতিশীলেরা মনে করেন, রেনেসাঁ ধারণার জপতে থাকলে মানে রেনেসাঁর আড়ালে থাকলে তাতেই অনেক উপকার হবে। তাদের প্রকল্প ধর্ম মানে, ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে খুবই ভাল সাফাই আনা যায় এখান থেকে।

    আর এধারণার নগদ খদ্দের হল জমিদার হিন্দু যারা যেন এই ধারণা কিনে নিবার জন্য অপেক্ষা করছিল।

    এখন প্রথম প্রশ্নে আসা যাক। শব্দাবলীতে বাক্যটাই লক্ষ্য করা যাক, লিখেছি “সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে দেখানো হয়েছে। আবার রামমোহন হচ্ছেন ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক এবং সুশোভনের নিজ ও পরিবার ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি। তাহলে “রেনেসাঁ আর ব্রাহ্ম” এখানে একসাথে উচ্চারিত হচ্ছে কেমন করে? তাহলে জানা যাচ্ছে একমাত্র কমিউনিস্ট সার্টিফায়েড ধর্ম হচ্ছে তাহলে ব্রাহ্ম। যেটা সত্যিই এক আজীব ব্যতিক্রম বটে!

    এনিয়ে সরাসরি কথা বললে, আসলে রামমোহন রায়ই বৃটিশ ভারতে প্রথম জাতিরাষ্ট্র বা মর্ডান রাষ্ট্র ধারণা আনেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে এই কল্পনাটা ছিল-  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র। অর্থাৎ ভারতের সবাইকে আগে আগে ব্রাহ্ম অনুসারি করে নিয়ে এবার –  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র – এমন ভারত ছিল রামমোহনের প্রজেক্ট। সারকথায়, ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের (নেশন স্টেটের) প্রথম ইমাজিনেশনটা আনেন রামমোহন। পরে তার মৃত্যু (১৮৩৩) আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অনুসারিরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে অচল অথর্ব হয়ে পড়লে এবার সেই প্রকল্পটাকে এবার ব্রাহ্মধর্মের বদলে ‘হিন্দুধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র’ – এভাবে বদলে নেয়া হয়। আর এটাই ১৮৮৫ সালে এটাই কংগ্রেস দল নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
    কাজেই দল হিসাবে প্রথম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হল কংগ্রেস।  আর এভাবেই প্রকল্প সুনির্দিষ্ট করে হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে এর বিশবছর পরে ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান ধর্ম-ভিত্তিক আরেক জাতিরাষ্ট্র’ পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য নয়া দল হয় মুসলিম লীগ।
    কাজেই মুসলিম লীগের পাকিস্তান কায়েমের বিরুদ্ধে কথা বলে   বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থান নেয়া কিন্তু আবার নিজেরা হিন্দু ধর্ম-ভিত্তিক ভারতে যুক্ত হওয়ার বাসনা  -এটাই তো আসলে কংগ্রেসি অবস্থান~!!!! ফলে এনিয়ে কোন সাফাই দিতে বা করতে তারা পারে না। এর মানে হয় না।

    তাহলে মূল সমস্যা ও সমাধান ছিল, ধর্মভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা সমূলে ত্যাগ করা। সকলকে নিয়ে “অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রের” প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা প্রস্তাব এর কথা বিবেচনা করা এবং সেভাবে আগানো।
    স্বভাবতই, নইলে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে সারাজীবন ইসকনের মাধ্যমে ‘মোদির দলের ভাড়াটে বাংলাদেশি’ উইংয়ের সদস্য হয়েই কাটাতে হবে।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    গৌতম দাস

    ২২ আগষ্ট  ২০২২   ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4dq

     

        EAM Jaishankar

    কেন শিরোনামটা এমন? ভেটো মানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) ১৫ সদস্যের যার ১০ আসন অস্থায়ী এবং বিভিন্ন মহাদেশের কোটা থেকে দুবছরের জন্য নির্বাচিত করে নেয়া হয়। আর পাঁচ টা আসন এগুলো স্থায়ী-আসন বলা হয় শুধু তাই না এই পরিষদে আলোচনার  জন্য হাজির করা যেকোন প্রস্তাবের উপর আলোচনার আগেই এই পাঁচ সদস্যের যেকোন একজন ভেটো বা আপত্তি দিতে পারে। আর তা দিলে ঐ প্রস্তাব পাশ হওয়া দূরে থাকে ঐ প্রস্তাবই বাতিল বলে গণ্য হবে।  এই পাঁচ ভেটোধারী ও স্থায়ী সদস্য হল আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া আর চীন।  গত ২০ বছরে ভারত অনেকবার এমন ভেটোধারী সদস্য হবার চেষ্টা করেছে, আমেরিকার দ্বারা সমর্থিত হবে বলে আশ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু বারবার সে আলোচনা চাপা পরে হারিয়ে গেছে। এবার জয়শঙ্কর যিনি এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী – তার মুখ দিয়ে আবার প্রসঙ্গটা আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তাঁর এক বক্তৃতার ইউটিউব ক্লিপ ভারতের মিডিয়ায় অনেক ছড়িয়েছে।

    জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (এরপর থেকে এ’লেখায় শুধু পরিষদ লিখব) ভারতের স্থায়ী আসন বা ভেটো ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন বহুদিনের। কিন্তু স্বপ্ন দেখনেওয়ালাদেরও দুইটা ধরণ দেখা যায়। এক হল যারা স্বপ্ন দেখতেই থাকে, পেলে কী করবে সেই হিংসাতেও তাদের বুক জ্বলে কিন্তু যোগ্যতার অভাবে স্বপ্ন বাস্তব করতে পারে না।  ফলে ধান্দাবাজ লোক ধরে যাদের মিথ্যা প্রলোভনের পিছনে তারা বছরের পর বছর ঘুরেই চলে, বেখবরে। কিছু আগালো কিনা সে মুল্যায়নও করে না।
    আরেক দল আছে যারা স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবায়িত করা যাবে এজন্য বাস্তবিক সমস্যা, বাধাগুলোকে স্টাডি করে আর একটা করে বাধা অপসারণ করে করে আগায়। তবে এরা অবশ্যই সবার আগে দেখে নেয় সেটা বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন কিনা। যদি হয় তবেই সে আগায়। এজন্য এদেরকে বলে রিয়েলিস্ট; মানে, যারা বাস্তবের চোখে দেখে স্বপ্ন বিচার করে।  কেবল স্বপ্নেই পোলাও খেয়ে চলে না!  এদুই ক্যাটাগরির বিচারে ভারত হল প্রথম ধরণের। তাই, আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাসের পিছনের সে ঘুরতেই আছে এই ভরসায় যে আমেরিকা তাকে ভেটোক্ষমতা এনে দিবে।
    অথচ একটা সহজ ভাবনা-কল্পনায় যদি দেখি জাতিসংঘের বর্তমান ওরিয়েন্টেশন মানে যেভাবে এটা সাজানো আছে এভাবেই যদি তাকাই তাহলে দেখব একা আমেরিকা নতুন কারও কোন ভেটোক্ষমতা পাইয়ে দিবার ক্ষমতা নাই বা রাখে না। কারণ, একা আমেরিকা না, পাঁচ ভেটোসদস্যই যদি ভারতকে ভেটোক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয় তবেই তা হতে পারে। চীনসহ যেকোন এক ভেটোসদস্য আপত্তি করলেই সব শেষ। তাহলে একা আমেরিকার আশ্বাসের উপর ভারতের অপেক্ষা তো অর্থহীন!! অথচ  গত বিশ বছর ধরে এটাই ভারতের আশ্বাসের  ভিত্তি হয়ে আছে, খামোখা।

    একালের হিসাবে যদি বলি তবে প্রণব মুখার্জির আমল এই আশ্বাসের ভরসা শুরু হয়েছে। মোটামুটিভাবে ২০০৭ এর পরে মানে যখন থেকে আমেরিকা বিশেষ করে বুশের আমল শেষে ওবামা চীন ঠেকানো বা China Containment এর ঠিকাদারি ভারতকে দিতে এসেছিল।

    তাই ওবামা যখন বুশের চেয়েও বড় করে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল (যে ভারতের স্থায়ী আসনের দাবিকে আমেরিকা সমর্থন দিবে) প্রণবের সরকার তা বেশ জোশের ঠেলায় বাস্তবতার দিকে তাকানোর বদলে স্বপ্নে ভাসতে শুরু করে দিয়েছিল। ভারত কতদুর নিজেকে নিচে নেমেছিল, বোকা চিন্তাশুন্য বানিয়েছিল তা বুঝা যায় যখন,  ২০০৯ সালে থেকে শুরু হওয়া হাসিনা সরকার পরে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিল এক বছরের মধ্যে ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি। সে সফরে প্রণব মুখার্জি লিখায়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশও (যে ঘরকা মুরগি ফলে যত খুশি জবেহ দেয়া যায়) ভারতের স্থায়ী আসনের দাবি সমর্থন করবে! সফরের শেষে যে ‘যৌথ ঘোষণা’ বের হয় তাতে একথা লেখা আছে। অথচ বাংলাদেশের সমর্থন তো কোন রিকয়ারমেন্ট নয়!

    জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতিঃ
    সবকিছুর গোড়ায় আছে আসলে জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতি – এই বিষয়টা। জাতিসংঘ এক আজিব জিনিষ; সেটা এই অর্থে যে এটা ঠিকঠাক বুঝলে তো বুঝছেনই। আর না বুঝলে তেজপাতা; মানে সারাজীবন আমি-আপনি সব বুঝিছি ভান করেই কাটিয়ে যেতে পারব। তাতে আপনি প্রণব মুখার্জি বা জয়শঙ্কর যাই হোন না কেন!! আপনার পদ-পদবি অনেক উচুঁতে হতে পারে কিন্তু তাতেও কোন নিশ্চয়তা নাই যে আপনি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানটা বুঝেছেন বা বুঝবেনই! যেমন বেশির ভাগ মানুষের ধারণা এটা একটা ‘গণতন্ত্রী’ প্রতিঠান; অথচ এরা খেয়াল করেন না যে পাড়ার ক্লাবের ক্ষেত্রেও এর মেম্বারেরা সবাই-ই দেখতে সমান মনে হলেও সবাই সমান ক্ষমতার হয় না।

    প্রথমত জাতিসংঘ অবশ্যই এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একটা দেশের পার্লামেন্টের মত সব সদস্যের সমান অধিকার, বা এক ভোট –  না জাতিসংঘ এমনটা নয়। বরং অসম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আবার বড় ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর কেউ যেন বেশির ভাগকেই নিজ দলে নিয়ে জোট পাকিয়ে অন্য আরেক বড় ক্ষমতার উপর চড়াও না হয়; এটাই জাতিসংঘ গড়ার সময়ের মুখ্য বিবেচনা ছিল। যেমন আমেরিকা যেন কমিউনিস্ট স্তালিনের সোভিয়েন ইউনিয়নের উপর কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোন কিছু চাপিয়ে না দিতে পারে তা নিশ্চিত করা এমন প্রতিষ্ঠানই হল ভেটোক্ষমতার জাতিসংঘ। এটাই নিশ্চিত করার উপায়ের নামই ভেটো পদ্ধতি। যাদের “এভিন্ন” অন্যভাবে বুঝ থেকে ভুল ধারণা আছে তারা এখনই তা কারেক্ট করে নিতে পারেন। সোজাকথা জাতিসংঘ কোন সাম্যের প্রতিষ্ঠান নয়। ্তাই এর সব সদস্যের ভোটের ক্ষমতা একরকম নয়। যেমন এমন ক্ষেত্রে মানে কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে কোন সিদ্ধান্ত এই পাঁচ ভেটোসদস্যের উপর চাপিয়ে দেয়া অসম্ভব।  যেমন, এমন হলে একা সোভিয়েত-ইউনিয়ন নিজের ভেটোটা প্রয়োগ করতে পারবে।  যার মানে হল, স্টালিন যা চায় না তেমন প্রস্তাব নিয়ে পরিষদে কোন আলোচনাই হবে না। সেক্ষেত্রে, আমেরিকা তখন আনা আগের প্রস্তাব চাইলে আবার তা সংশোধন করে হাজির করতে পারবে। তবে কীভাবে প্রস্তাব লিখলে পরে সোভিয়েতরা আর ভেটো দিবে না সেভাবে জেনে প্রস্তাব সংশোধন করে আবার তা উপস্থাপন করতে পারে। এভাবেই ভেটোক্ষমতা কার্যকর আছে।

    মুখ্য বুঝাবুঝির জায়গাটা হল জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, সেখানে ফোকাস করাঃ
    তাহলে জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কি ছিল? উপরের কথা থেকে পরিস্কার এটা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোন ‘সাম্যের’ পার্লামেন্ট ধরনের কিছু নয়ই। এর উদ্দেশ্য ছিল ‘নেতা’ রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা ও নানাবিধ চিন্তায় বিভিন্নতা থাকা সত্বেও তারা একটা ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ কায়েম করতে পারে কিনা সেই চেষ্টা। এবং কোনমতে তারা সেতা পেরেছিল। আর এরই উদ্যোগ ও মুখ্য আইডিয়াটা ছিল মূলত আমেরিকার মানে ততকালীন টানা চারবারের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর।

    তাঁর মূলকথাগুলো খুব সিম্পল। সেকালে (১৬০৭-১৯৪৫) দুনিয়া মানে চার-পাঁচটা রাষ্ট্র তারা দুনিয়ার বাকি দেশ-ভুখন্ডকে কলোনি করে রেখেছিল – আর জবরদস্তিতে শাসন ও লুট করে সম্পদ নিজ দেশে নিয়ে চলছিল। আমেরিকা এই স্টাইলে চলা দুনিয়াটার অবসান চেয়েছিল তবে নিজ স্বার্থে; মানে “দুনিয়ার ভাল হবে” ঠিক এমন কোন কারণে না। তাই এনিয়ে আমেরিকার মূল ভাষ্যটা হচ্ছে – দেশভুখন্ড ও তার বাসিন্দা কেন্দ্রিক; যেখানে আবার বাসিন্দারাই মূল ফ্যাক্টর ও নির্ণায়ক। বলা হয়েছে, “কোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবেন যে তাদের বসবাসের ভুখন্ড কার হাতে শাসিত হবে” 

    Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them;

    স্বভাবতই বাসিন্দারা কেউ বিদেশি কলোনি শাসক বা লুটেরা শাসক চাইবে না। অর্থাৎ এই মূল বাক্যটাই দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসন উতখাত করার রাস্তা খুলে দিয়েছিল। আর এই মূল বাক্য বা শর্ত মানলে তবেই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পক্ষ ও অংশগ্রহণ করবে; এই ছিল আমেরিকান অবস্থান। কবে থেকে কতদিন?  এখানে বলে রাখা ভাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সালে শুরু হলেও ১৯৪২ সালের জানুয়ারির আগে আমেরিকা তাতে কোন অংশ বা পক্ষ নেয় নাই। এনিয়ে যদিও কমিউনিস্টদের না-জানা এক প্রপাগান্ডা ব্যাখ্যা আছে। সেই অনুমিত প্রপাগান্ডাটা হল, আমেরিকা ব্যবসা করার লোভে যুদ্ধে কোন পক্ষ নেই নাই। এটা শতভাগ মিথ্যা অনুমান তা জানা যাবে যখন  পরে ১৯৪১ সালের আগষ্ট থেকে আমেরিকা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সাথে চুক্তি (আটল্যান্টিক চার্টার চুক্তি) করেছিল। এই চুক্তি থেকেই পরিস্কার রুজভেল্ট কেন যুদ্ধে যোগ দিতে দেরি করছিল্বেন। আর এই চুক্তি থেকেই বিশ্বযুদ্ধে জোটবদ্ধ দুই পক্ষ-বিপক্ষ স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। আবার আমেরিকার অর্থনীতিক সক্ষমতা দিকটা যদি দেখি, এর প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই ততদিনে সবচেয়ে বড় অর্থনীতির বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যকে আমেরিকা ছাড়িয়েছে । ফলে সঞ্চিত সারপ্লাস সম্পদের কারণে যেকোনদিকে বিনিয়োগ সক্ষমতায় সে আনপ্যারালাল। তাই ঐ যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণে অনেক আগে থেকেই আমেরিকা ছিল নির্ধারক; অথচ ১৯৪২ সালের ১জানুয়ারির আগে সে কোনদিকের হয়ে যুদ্ধে নামে নাই।

    তাই প্রথমে ১৯৪১ সালের আগষ্টে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে তিনি তাঁর শর্তে দাসখত দিতে [আটল্যান্টা চার্টার চুক্তির মাধ্যমে] বাধ্য করেন। আর আটল্যান্টা চার্টার চুক্তিই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান মিত্রপক্ষ জয়লাভ করলে পরের সেই  দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ও শাসন চির উচ্ছেদের প্রথম দলিল। একারণেই হিটলারবিরোধী যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানোও আসলে সম্পন্ন করা হয় ঐ একই শর্তে। এরই ফলাফল হল, সাড়ে চারমাস পরে ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি, ঐ একই দলিলের ড্রাফটে কিন্তু এবার রুজভেল্ট ও চার্চিল ছাড়াও আরো দুই দেশের প্রধানকর্তা এতে স্বাক্ষর দিচ্ছেন। এরা হলে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টালিন আর চীনের প্রেসিডেন্ট চিয়াং কাইসেক (নতুন দুজন, ব্যক্তি হিসাবে নয় তারা প্রতিনিধি পাঠিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন)।  আর এই চারদেশের স্বাক্ষরের দলিলটাই হল জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার দলিল বা ডিক্লারেশন [Declaration by the United Nations, January 1, 1942] । যদিও পরে অন্যান্য প্রায় ২১টা দেশ এতে প্রতিস্বাক্ষর করেছিল।
    এদিনে রুজভেল্ট যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষের কথা পরিস্কার করেন। তাঁর পক্ষের দেশগুলোর নাম দেন “মিত্র-শক্তি” যা্দেরকে পরবর্তিতে তিনি “ইউনাইটেড নেশন্স” (UNITED NATIONS বাংলায় জাতিসংঘ) বলে চিহ্নিত করেছেন। আর বিপক্ষ অক্ষশক্তি বলতে হিটলারের জর্মানি সাথে ইটালি ও জাপান এভাবে।

    কিন্তু তখন থেকেই জাতিসংঘ কী কেন – মানে কী ভিত্তিতে এটা গড়ে উঠেছিল সেসব কথা ক্রমশ পিছনে চাপা পড়ে থেকেছে আর প্রধান হয়েছে হিটলারের বিরুদ্ধে জোট হয়েছে এই খবর। এতে জাতিসংঘের জন্মের খবর যতটুকু পড়ালেখা জানা লোকেরা জেনেছে তাও আবার তারা বুঝেছে একটা বিজনেস এসোসিয়েশন বা সমিতি যেমন [যেন একটা FBCCI] হয় তেমন কিছু এক তবে এটা যেন “রাষ্ট্র  সমিতি” বলে মনে করা হয়েছে। অথচ এর জন্ম ঘোষণা ভিত্তি সবসদস্যই মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই কিন্তু এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি সব সদস্যের সমান একভোট এই ভিত্তিতে নয়; বরং ভেটো পদ্ধতি।
    সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ঘটনাটা হল, এই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি হল দুনিয়া থেকে কলোনি উচ্ছেদ।  আর সেই সাথে তা এই অর্থে ও শর্তে তা লেখা হয়েছে যার আরেকটা মানে হয়ে গেছে এতে রাজতন্ত্রের কোন সুযোগ নাই। সদস্য রাষ্ট্রকে রিপাবলিক হতেই হবে। কারণ দেশ-ভুখন্ড এর বাসিন্দা যারা তারা নিজেরাই কথা বলবেন, সবকিছু নির্ধারণ করবেন। ফলে কলোনি দখলদার শাসকের সাথে রাজার ভুমিকাও বাদ হয়ে গেছে। এরা কেউ না হয়ে গেছে।

    কিন্তু এত সমস্যার আরেক দিকটা খুবই জটিল হয়েছিল। তা হল সঠিক বুঝাবুঝি। এটা এমনকি জওয়াহরলাল নেহেরু যিনি স্বাধীন  ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী –  তিনিও জাতিসংঘ জন্মানোর ভিত্তিমূলক দিকটা বুঝেন নাই।  না, তাঁকে ছোট করার জন্য এটা বলা হচ্ছে না। যেমন দেখেন, এরই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল, কাশ্মির ইস্যু। তিনি ভেবেছিলেন কাশ্মির কার – এই প্রশ্নে যেহেতু কাশ্মিরের রাজা হরি সিং নেহেরুর সাথে –ভারতভুক্তির- চুক্তি করেছেন অতএব কাশ্মির নিশ্চয় ভারতের অংশ হয়ে গেছে। এটা মনে করে তিনি এর স্বপক্ষে এই দাবির উপর  জাতিসংঘের সম্মতির সিল-ছাপ্পড় নিশ্চয় পেয়ে যাবেন মনে করে ঐ ভারতভুক্তি-পত্র জাতিসঙ্ঘের মতামত চেয়ে পাঠিয়েছেন। অথচ তিনি জাতিসংঘের জন্মভিত্তিই জানেন না যে সেখানে একটা দেশের হকদার-নির্ধারক কোন রাজা নয় বাসিন্দারা, তাদের গণ-সম্মতিকেই ভিত্তি মানা হয়েছে। ফলে নেহেরুকে ফেরত পাঠানো জাতিসংঘের রায় ছিল “কাশ্মিরে গনভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত” নেওয়ার।  যা পরে তিনি কখনই এটা করেন নাই। আর সেই নেহেরু থেকে একালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পর্যন্ত কারও জাতিসংঘ প্রতিষ্টানটা কী বৈশিষ্ঠের, কী উদ্দেশ্যের তা কখনই তাদের পড়ালেখা করা হয়ে উঠে নাই।

    সম্প্রতিকালে জয়শঙ্করের বক্তৃতার এক ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়েছে। সম্ভবত তা ভারতের কোন এক একাদেমিক প্রতিষ্ঠানের যেখানে তিনি স্টুডেন্টদের –  ভারত কবে জাতিসঘের স্থায়ী বা ভেটোধারী সদস্যপদ পাবেন – এই প্রশ্নে কথা বলছিলেন। জয়শঙ্কর আমাদের বিসিএস-ক্যাডার দেয়ার মতই ভারতের সমতুল্য ফরেন ক্যাডারের লোক; সেখান থেকে পেশাদার কূটনীতিক জীবনের অবসরে, এখন মন্ত্রী হয়েছেন।  তিনি সম্ভবত নিজেকে স্মার্টভাবে হাজির করতে চেয়েছেন। তিনি এক কড়া শব্দ প্রয়োগ করেছেন সেখানে সমালোচনায়। শব্দটা হল জাতিসংঘের “ক্রেডিবিলিটি” [Credibility] কী আছে, ইত্যাদি। এখানে ক্রেডিবিলিটি বলতে এর বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা কী, এটা বলতে চেয়েছেন। তার মূল অভিযোগ জাতিসংঘ প্রতিনিধিত্বশীল নয়। শব্দটা অনেক কর্কশ এবং একই সাথে তার প্রতিষ্ঠানটার গঠন, উদ্দেশ্য ও ভিত্তি সম্পর্কে যে কোন ধারণা নাই সেটাও প্রকাশ করে দিয়েছে।

    প্রথমত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানের যে অঙ্গের কথা বলা হচ্ছে সেটা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সিকিউরিটি কাউন্সিল [UNSC] যেটা মূলত রাজনৈতিক বিষয়াদি দেখাশুনা করে।  শুরুতে বলেছি এটা মূলত ১৫ সদস্যের প্রতিষ্ঠান যার পাঁচটা ভেটোধারী সদস্যপদ আর বাকি দশটা অস্থায়ী (দুবছর) রোটেশনাল সদস্যপদ যা মহাদেশভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বশীল করে বেছে পূরণ করে নেয়া হয়ে থাকে। কাজেই এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে সদস্যপদ গড়া হয় নাই এই অভিযোগ ভিত্তিহীন।

    তবে উনি সম্ভবত বলতে চাইছেন পাঁচ ভেটোসদস্যপদ এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে গড়া নয় বা বিতরণ হয় না। হ্যা সে কথা সত্য এবং এটা গ্লোবাল জনসংখ্যার ভিত্তিতে বা কোন প্রতিনিধিত্বশীল ভিত্তিতে বেছে পাঁচসদস্যকে দেয়া হয় নাই। আসলে তা হতেই হবে এই অনুমানই ঠিক না, এটা ভিত্তিহীন। যেমন এই পাঁচ স্থায়ীসদস্যের মধ্যে আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার কখনই কেউ নাই। [এই প্রতিনিধিত্বশীল করার দিকটা সম্পন্ন ও নিশ্চিত করা হয়েছে অস্থায়ী সদস্যপদ নেয়া বা বিতরণের বেলায়। ] আবার চীনকে নেয়া হয়েছে এর জনসংখ্যা ভারতের চেয়েও অনেক বেশি একারণেও না। কাজেই জাতিসংঘের জন্ম ইতিহাস না জেনে এমন অনেক কথাই বলা যায়।
    মূলত ভেটোসদস্যপদ দেয়া হয়েছে কারা ততকালীন সময়ে সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে বড় বা পরাশক্তি এদের কথা ভেবে (তাও চীনের বেলায় সেটাও নয়)। সামরিক বা পরাশক্তি বলে বিবেচনা করতে হয়েছিল রুজভেল্ট-কে। সেটা এজন্য যে পুরা জাতিসংঘের আইডিয়াটা রুজভেল্টের। তার এই আইডিয়াটা বাস্তবায়নে এরা যাতে বাধাগ্রস্থ না করে সেকথা ভেবেই।

    সাধারণভাবে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে খরচ (সোভিয়েন ইউনিয়ন-সহ সকল পক্ষশক্তিকে) এককভাবে যোগানো এমনকি যুদ্ধপরবর্তি পুনর্বাসনের শিল্প ও অবকাঠামোতে অর্থবিনিয়োগ এবং তা যুদ্ধের হেরে যাওয়া পক্ষের দেশগুলোকেও সহায়তা দেয়া সহ – দিয়েছিল আমেরিকা। সেকালের আমেরিকার একক সামর্থ ছিল বলেই তা থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য সব বিবেচনার উপরে উঠে যায় যা একটা কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল।

    আরও আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তো বটেই দুই বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই আমেরিকা দুনিয়াকে যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাওয়া মানে, – যুদ্ধ এড়িয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধগুলো মীমাংসার কোন উপায়, কোন রাজনৈতিক মৌলিক বক্তব্য অবস্থানের ভিত্তিতে – এক প্রতিষ্ঠান – গড়ে তুলে তা করা যায় কীভাবে এটা আমেরিকার মাথায় সবার আগে এসেছিল। তখনকার আমেরিকান সমাজ এধারণা প্রচলিত হয়ে উঠেছিল যে কোন যুদ্ধই মূলত দেশের পুঁজি বা সঞ্চিত সম্পদ ধংস করে দেয়; তাই এটা এড়ানোর উপায় খুঁজতে হবে। মনে করা হয় যে আমেরিকানরাও মূলত সাদা ককেশীয় হলেও তাঁরাও এশিয়ায় আমাদের মত এক শ্রেণীর বৃটিশ কলোনি শাসকের অধীনে শাসিত নিষ্পেষিত। আমেরিকান ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা বলতে বৃটিশসহ অন্যান্য ইউরোপীয় কলোনি শাসকের থেকে সামরিকভাবে লড়াই করে মুক্ত হওয়া ছিল।  ফলে অন্য কাউকে কলোনি করার বিরুদ্ধে এক শক্ত অভ্যন্তরীণ জনমত পরবর্তিতে আমেরিকান-সমাজে কাজ করত, সক্রিয় ছিল। তাই ল্যাটিন আমেরিকান অনেক ছোট দেশ দুতিন বছরের বেশি পরবর্তিতে আমেরিকা সেখানে কলোনি দখল চালিয়ে রাখে নাই, বা পারে নাই। এমন ব্যাকগ্রাউন্ডের আমেরিকাি আবার  প্রচুর সঞ্চিত সারপ্লাস (আজকের চীনও যেদিকে আগাচ্ছে) ছিল বলে এটাই বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকাকে নেতৃত্বের আসনে বা কমান্ডের পজিশন সহজেই পেতে সাহায্য করেছিল।

    তা সত্বেও যে জাতিসংঘ আমেরিকা প্রস্তাব করছিল তা না মানতে চাওয়ার সামর্থ তো কেবল তখনকার বিচারে তখনও যারা সামরিকভাবে সক্ষম এমন রাষ্ট্রগুলোকেই বুঝতে হবে। এই বিচারে এদের জন্য ভেটোসদস্য পদ রাখার প্রস্তাব করেছিলেন রুজভেল্ট। যাতে সামরিকভাবে সক্ষম বা পরাশক্তি দেশগুলো প্রস্তাবিত জাতিসংঘের ভিতরেই ধরে রাখা থাকে। নইলে জাতিসংঘ আইডিয়া কখনই কার্যকর হতে পারত না।
    মানে রাখতে হবে স্তালিন ছিলেন রজভে্লটের জাতিসংঘ আইডিয়ার প্রথম বিরোধিতাকারি। তাকে ঠান্ডা করতে বা তার ভয় দূর করতেই রুজভেল্ট ভেটো আইডিয়াটা আনেন। যার মূলকথাটা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আমেরিকা যেন পরাশক্তি অন্য দেশগুলোর উপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার মতলবে জাতিসংঘ গড়ার কথা বলছেন না, সেটা স্পষ্ট রাখা যায়; তাদের আস্থা আসে। এই বিচারে এই পাঁচ সদস্যপদ কোন বিজনেস এসোসিয়েশন সমিতি বা এফবিসিসিআই এর মত নয়; সাম্যও নয়। বরং একেবারেই বিশেষ। এদিকটা না বুঝলে জাতিসংঘ কেন বা কীরকম তা জানা যাবে না।

    এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের সংস্কার বা পুনর্জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক না; বিশেষ করে গ্লোবাল নেতৃত্ব (শুধু গ্লোবাল অর্থনৈতিক না রাজনৈতিকও) বদল এলে সেটাই একমাত্র জাতিসংঘের অন্তত ওরিয়েন্টেশনে তো বটেই আরো বহু খোলনলচেও বদল আসাটা অসম্ভব নয়।  তবে ভারত সবসময় যে কল্পনাটা করে এসেছে তাতে ধরে নেয়া থাকে যে আমেরিকা আজীবন যেন নেতা আছে থাকবে। ফলে জাতিসংঘের (কোন সংস্কারেও) আসন বন্টনের ক্ষমতা যেন আমেরিকার একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে!!! যেটা এখনও না, আগামিতেও হবে না।
    সে যাই হোক, জাতিসংঘের কোন নিয়মটা কেন ওরকম বা সেরকম তা বুঝতে চাইলে জাতিসংঘ জন্মকালীন পটভুমিতে রূজভেল্ট কী কী ব্যবহারিক সমস্যার মোকাবিলা করে আগাতে হয়েছে তা বুঝতেই হবে। নইলে কোনকিছুই বুঝা প্রায় অসম্ভব! এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের কোন পরিবর্তনে কী কী হতে পারে সে তা ইমাজিন করা সহজ হবে!!
    আবার পুরানা কথায় ফিরে যাই।  মুলকথা, সেকালে রুজভেল্ট ভেটোসদস্যপদ দিয়েই রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্সকে রাজি করিয়েছিলেন। ফলে আগামি দিনেও এমন কতকিছু দিয়ে হয়ত চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বি বা সহযোগীদেরকে সামলাতে হতে পারে।
    আবার লক্ষ্য করতে হবে সেকালে আমেরিকাকে মানে রুজভেল্টকে  চীনের ব্যাপারটা  আলাদা করে বিশেষ সুবিধা দিতে চেয়ে আলাদাভাবে চেয়ে নিতে হয়েছিল। সেক্ষেত্রে রুজভেল্টের যুক্তি ছিল তিনি এশিয়ায় হিটলারের একমাত্র বন্ধু  জাপান যে পরাজিত করেছেন বটে তা হয়ে গেলেও এর পুনরুত্থান ঘটতে পারে বলে আমেরিকা ভীত ছিলেন। আর কলোনি দখলদার জাপান ছিল উভয় কোরিয়া আর চীনের (কিছু অংশের) দখলদার। তাই বিশ্বযুদ্ধ পরের পরিস্থিতিতে জাপানের বিপরীতে চীনকে এক বিশেষ শক্তি হিসাবে উঠিয়ে আনতে রুজভেল্ট  এশিয়ার একমাত্র চীনকে ভেটোসদস্যপদ দিতে বাকিদের রাজি করিয়েছিলেন। যদিও কাজটা কঠিন ছিল না কারণ –  রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স এরা নিজেরা নিজেদের ভেটোসদস্যপদ পাবার পরে আর কোনদিকে আপত্তি তুলতে আর আগ্রহি ছিল না।

    তাই জন্মগঠন ইতিহাস সে সময়ের পরিস্থতি ও বিবেচনার ফ্যাক্টরগুলো কী কী ছিল তা না জেনে একালে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে তো অনেক কথা বলাই যায়। তাতে জয়শঙ্করের মত দেশের ভিতরের  অনেক হাততালিও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এগুলো আসলে নিজেরই অজ্ঞতা আর ইতিহাসবোধের অভাবই নির্দেশ করে এমন হয়ে যেতে পারে।

    তবে, এককথায় বললে, আমেরিকা বা রুজভেল্টের সঞ্চিত সম্পদ ব্যয় করার সক্ষমতা মূলত এটাই আমেরিকার হাতে দুনিয়া নতুন করে উঠে দাড়াতে ও আমেরিকান বক্তব্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

    তাই আজকের মোদির ভারতের জয়শঙ্করের জন্য একটাই বিকল্প হল, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেখানো। এটাই একমাত্র তাদের ভারতের ইচ্ছামত এক নয়া জাতিসংঘ তারা গড়ে নিতে পারলে হয়ত পারতেও পারে। আবার তখনকার “বাকিরা” তাতে রাজি হবে কিনা তাদেরকে রাজি করাতে ভারতকে কী কী নয়া প্রস্তাব দিতে হবে সেজন্যও ভারতকে বা জয়শঙ্কদেরকে রেডি থাকতে হবে। এরপরে তখন হয়ত তারা বুঝতে পারবেন কেন স্থায়ী ভেটোসদস্যপদগুলো দেশের ‘জনসংখ্যা আনুপাতিক’ ভাবে বেছে নেওয়া হয় নাই।

    আবার ধরেন,  না-বুঝা লোকেদের নিয়ে চলতে সমস্যা অনেক। জয়শঙ্কর অনেকবার ঐ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন ভারত তৃতীয় বড় অর্থনীতির দেশ। একবার বলেছেন “এমন একদিন আসবে”। সেটা আসুক আগে, তাই না!!! এপর্যন্ত ইকোনমিক বা স্টাটিস্টিক্যাল ডাটা নিয়ে স্টাডির ফোরকাস্ট হল সেটা ২০৫০ সাল নাগাদ হলেও হতে পারে। তাহলে এর ত্রিশবছর আগেই এজন্য হুড়োহুড়ি কেন?

    আবার মোদির বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সর্বনিম্ন। এটা ভারতের মুসলমান কুপিয়ে কতটা কী ঢেকে রাখা যাবে? ভারতের “হিন্দুত্ববাদ” এই রাজনীতিই এটা চলতে থাকলে তা ভারতকে যতটুক্তু সম্ভাবনা আছে সেতাও হতে দিবে না।  বারবার এমন কোন অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হতে দিবে না।

    আবার এটাকে তামাসাই বলতে হবে যে, জয়শঙ্করেরও ধারণা আমেরিকার সমর্থনে তিনি ভেটোক্ষমতা পেতে চান বা পাবার উপায় দেখেন। এটাও জাতিসংঘ না বুঝার আরেক প্রমাণ। কারোণ বর্তমান এই জাতিসংঘের মধ্যে চীনের হাতে ভেটোক্ষমতা আছে ফলে আমেরিকার যেকোন সমর্থনের বিরুদ্ধে চীনা এক ভেটো ভোটই সব আশা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটা তো জয়শঙ্করের না বুঝার কিছু নাই?? যার মানে  ভারতকে কেবল আমেরিকাই না অন্তত চীনের কাছেও প্রিয়পাত্র হতে হবে। কিন্তু ভারত তো মনে করে নিজেকে নিজে নিজেই “পরাশক্তি” ঘোষণা দিয়েই সব সমস্যা মোদি মোকাবুলা করতে পারবেন।

    অতএব জয়শঙ্করের ভারতের প্রথম কাজ হল, জাতিসংঘের জন্ম উত্থান নিয়ে স্টাডি করা। সাথে অন্তত ১৯৩৩-৪৫ এই সময়কালে পাশ হওয়া আমেরিকান আইন যেগুলো গ্লোবাল প্রভাবের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে স্টাডি করা। এর আগে চাপাবাজির মুখ খুললে বারবার বেইজ্জতি হতে হবে!!

    গ্লোবাল নাকি জিওঃ
    এটা আসলে হল, গ্লোবাল ফেনোমেনাকে না বুঝতে পেরে একে জিও বলে ডাকাডাকি!!
    এলেখায় অনেকবার “গ্লোবাল” শব্দটা ব্যবহার করেছি। এর অর্থ-তাতপর্য বুঝতে হবে। এই শব্দের উত্থান হয়েছে ১৯৪৫ সালের পরে।  আর ব্যতিক্রম কিছু ছাড়া প্রায় সবাই গ্লোবাল শব্দটার (যেমন গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদির) বদলে ব্যবহার করে জিও (geo) যেমন জিও পলিটিক্স  শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। আবার বুঝা যায় তারাও এই ব্যবহারে সন্তুষ্ট না, এক অস্বস্তি আছে তাদের মধ্যে।
    এক। উতপত্তি কাল হিসাবে দেখলে জিও-এই ধারণার উদ্ভব ও চর্চার শুরু (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে। এটাই ব্রিটানিকার ধারণা অনুসারে।
    আর এর বিপরীতে আইএমএফের জন্মের (১৯৪৪) পরেই কেবল সম্ভব হয়েছে গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদি ধরণের ধারণাওগুলোর।

    জিও দিয়ে যেকোন ধারণা (যেমন জিও-স্ট্রাটেজি বা জিও-পলিটিক্স) এদের মুল বক্তব্য জিও মানে কোনদেশের ভৌগলিক অবস্থান যখন ফ্যাক্টর, নির্ধারক উপাদান। এজন্যই জিও [Geo-, জিওগ্রাফি থেকে]। এসবই হল জিও+ ।
    আর আইএমএফ এর জন্ম মানে হল গ্লোবাল বা দুনিয়াব্যাপী যখন বাণিজ্য সম্ভব হয়েছে – ফলে গ্লোবাল অর্থনীতি বলে কোন ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। শুধু তাই না। যখন গ্লোবাল অর্থনীতির কারণে সবকিছুর গ্লোবাল ভার্সান দেখতে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

    কাজেই গ্লোবাল ধারণার বিকল্প কখনই জিও+ (জিও-পলিটিক্স)  হতেই পারে না।

    আর সবশেষে আসল সত্যি কথাটা বলে ফেলা যাক। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আমেরিকান নেতৃত্বের কারণে সবকিছু গ্লোবাল হয়ে উঠতে চাচ্ছে। ততদিন এর বাধা ছিল দুনিয়াজুড়ে থাকা কলোনি দখল-শাসন সম্পর্ক। যেটাকে একমাত্র আমেরকাই উচ্ছেদ করে দিয়েছে; বাধ্য করেছে। আসলে (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে – এটাই ছিল আসলে দুনিয়া গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবালি সম্পর্কিত হয়ে উঠার (গ্লোবাল বাণিজ্যের মাধ্যমে) আগমন বার্তা দেওয়ার কাল। আর সেটাকেই না বুঝতে পেরে ভুল করে জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে মনে করা হয়েছিল। এককথায় তাই,  জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে অনুমান এটা এক ভুল ধারণা। “গ্লোবাল” ফেনোমেনাকে বুঝতে না পারার খামতি। ভবিষ্যতে বিষয়টা নিয়ে আরো বিস্তার করে লিখার আগ্রহ রেখে আপাতত শেষ করছি।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    গৌতম দাস

    ১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4cM

     

         Chinese loans: Developing countries must ‘think twice’

    গ্রামদেশে একটা শব্দ চালু আছে “ভাঙরি” দেয়া; মানে বিয়ে ভাঙরি দেয়া বা বিয়ে ভেঙে দেয়া। এর মানে, গ্রামের কোনো দুই পরিবারে হয়ত বিয়ে ঠিক হয়েছে; প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সব গ্রামে কিছু লোক থাকে যাদের কাজ হল, বিয়ে ভাঙরি দেওয়া। হতে পারে, তাদের বেশির ভাগ নিজের জীবন নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ। হতে পারে তারা অবিবাহিত বা চিরকুমার ধরনের যাদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, তাই জীবনের আশা দুর্বল। এরা ছেলের পরিবারে গিয়ে রটায় মেয়ের চরিত্র খারাপ অথবা মেয়ের পরিবারে গিয়ে বলে, ছেলের আগে একবার বিয়ে হতে গিয়েছিল বা হয়েছিল – এ ধরনের গল্প-গুজব ছড়ানো এদের কাজ!

    ভারতের এখনকার অবস্থা এই হতাশ ভাঙরি দেয়া মানুষের মত। উঠেপড়ে লেগেছে ‘চীন কত খারাপ’- সত্য-মিথ্যা যেভাবে পারে, তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কান ভারী করতে। আর ভারতীয় মিডিয়া এই প্রপাগান্ডার উপর ভর করেই দেশ এক দেশপ্রেম-জাগরণের জোশ রচনায় অস্থির হয়ে উঠেছে।  আবার আমাদের সরকারও সময়ে প্রলোভনে পড়ে ভারতের প্রপাগান্ডা শুনতে চাওয়ার ভান করতে গেছে – “যদি কিছু লাইগা যায়” ভেবে। মূলত চুরির অর্থ ডলারে পাচার করতে গিয়েই এই ডলার সঙ্কট যা থেকে এক চরম অস্থির-অনিশ্চয়তা আমাদের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে। আর তাতে অসহায় বোধ করে সরকার কোথায় কী পাওয়া যায় যেন সব উলটা দেখতে চাইছে; অথচ আগেই জানে ওখানে কিছু পাওয়া যাবে না।

    ঘটনা হল, আমাদের সরকারের অর্থমন্ত্রী এ এইচ এম মুস্তফা কামাল কথিত এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ফাইনান্সিয়াল টাইমস [Financial Times, (FT)] পত্রিকাকে। সেখানে তিনি চীনা ঋণ কত খারাপ ও কেন বিপজ্জনক, তা বর্ণনা করেছেন বলে দাবি করেছে পত্রিকাটা। FT বা এফটি-এর গত ৯ আগস্ট প্রকাশিত ওই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী চীনা বেল্ট ও রোড ঋণ নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন’ [Bangladesh’s Finance minister warns on Belt and Road loans from China]। এটা মনে করার ‘যথেষ্ট’ কারণ আছে যে, এই কথিত রিপোর্টের সাথে ভারতের ইন্টেলিজেন্সের সংশ্লিষ্টতা আছে। কারণ পরের দু’দিন ধরে ভারত এই কথিত রিপোর্ট-কে দিয়ে দিনরাত তার চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। যেটা একটা দেশের পরিচালকদের যারা মানসিকভাবে সুস্থ তাদের পরিচালিত কোন কাজ ও তার নীতি-পলিসি হতে পারে না।

    ভারতে অন্তত দশটা পত্রিকায় [ economic Times India ,  AsiaFinancial ,   Swarajyamag , Hindustantimes ,  market.businessinsider , Newsonair , Theweek , Wionews ,  Sentinelassam , NewsBharati , Statecraft , News18 , OWSA , ANI  ……….. আরও আছে] ছেপে মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাতম তুলে ফেলেছে।

    সবগুলো নিউজই একই Financial Times  এর বরাতে ছাপা হয়েছে যদিও সেসবের ভাষ্য, নতুন আরো শব্দ ঢুকানো বা লেখার ভলিউম ছোটবড় করা অথবা শিরোনাম আলাদা করা বা নয়া শব্দ ঢুকানো ইত্যাদি করা হয়েছে; যার মূলকথা হল, রিপোর্টটা স্পষ্ট করে চীন কত খারাপ, চীন বিভিন্ন দেশকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলে আয় করে চলা একটা দেশ যেন এই টাউটারি-ই চীনের প্রধান আয়ের উতস আর এছাড়া , শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে চীন দায়ী – এসব অর্থ করে এভাবে সাজিয়ে লেখা।
    এভাবে পরবর্তীতে ভাষ্যগুলোর লিড আসে হিন্দুস্তান টাইমস থেকে [Bangladesh minister warns against China’s BRI lending, cites Sri Lanka’s example]। যেখানে শিরোনামের সাথে এবার বাড়তি শব্দ যোগ করা হয়, ‘শ্রীলঙ্কার উদাহরণের পরিপ্রক্ষিতে’ বা cites Sri Lanka’s example – এ বাড়তি শব্দগুলো। আর দশ তারিখ বিকালে বাংলাদেশের ‘মানবজমিন’ পত্রিকাও হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার বাংলা অনুবাদ করে ছাপে। মানে যেন ঘর পোড়ায় আলু পোড়া দিয়ে কিছু পয়সা কামানোর সুযোগ কেউ ছাড়ে নাই।

    এফটি [FT]-এর রিপোর্ট ছাপা হওয়ার পরে, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পরে অর্থমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয় এবার এক রিজয়েন্ডার [rejoinder] বা প্রতিবাদলিপি পাঠান; যা এমরা ১১ আগস্ট সন্ধ্যার পরে একমাত্র টের পাই। কিন্তু মন্ত্রীর প্রতিবাদলিপির ঠিক-ভাষ্যটা কী তা তখনও জানা যায় নাই। কেবল বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস পত্রিকা একটা সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পাওয়া গেছিল। ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস ওই রিপোর্টে জানায়, মন্ত্রী এক প্রতিবাদ দিয়েছেন যা তারা জেনেছে, “এক অফিস-কর্তার (অনুমান করছি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউকে বুঝিয়েছে) কাছ থেকে যে বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল [‘the official aware of the rejoinder told the FE.’]“। অর্থাৎ এর সোর্স তখনও খুবই দুর্বল।

    তবে এর পরের দিন ১২ আগস্ট ভোরবেলা বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টার একটু আগে, FT এবার অর্থমন্ত্রীর ওই প্রতিবাদলিপির মূল ভাষ্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ আরো প্রায় ১২ ঘন্টা পরে, এর আগে পাবলিকলি কেউ জানতে পারে নাই যে প্রতিবাদলিপিতে কী ছিল। ্কিন্তু এতেই ভারতীয় সকল মিডিয়া আন-মুভড থাকে। মানে কেউই তাদের মিথ্যা প্রপাগান্ডা বন্ধ করে নাই। মানে  ১২ আগস্ট সারা দিন ভারতীয় পত্রিকাগুলো যারা এফটি-এর বরাতের নামে খবর ছেপেছিল এই প্রতিবাদলিপির কথা তারা সবাই চেপে গিয়েছে। এমনকি প্রভাবশালী দ্য প্রিন্ট; যার প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত যিনি নিজে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন আর সাথে ঐ লেখার এক ভিডিও ক্লিপ-ভাষ্য তিনি নিজে তৈরি করে ইউটিউবে প্রচার করে থাকেন। তিনিও এফটি বরাতে কিন্তু হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার ওপর ভিত্তি করে তার ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছেন। সেটা চালিয়ে গেলেন প্রতিবাদ আসার পরেও; যা একটি খাসা চীনবিরোধী “দেশপ্রেমিক” ভারতের প্রপাগান্ডা হয়েছে অবশ্য। অর্থমন্ত্রীর প্রতিবাদলিপিটা ছাপানোর বদলে শেখর গুপ্ত বরং তার প্রপাগান্ডা ক্লিপটাই ১২ আগস্ট সারা দিন প্রচার করে গিয়েছেন, এমনই দেশপ্রেমিক তিনি!!!

    কী ছিল মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতেঃ
    সার কথায় তিনি লিখেছেন, এরিপোর্টে “মন্ত্রীর প্রকৃত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেনি” [does not properly reflect the minister’s actual position.]। কিন্তু মন্ত্রীর ‘প্রকৃত’ অবস্থানটা কী ছিল তাহলে? পরের প্যারায় মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতে লিখছেন, ‘The report mentioned Sri Lanka’। মানে যেন তিনি না রিপোর্টটা শ্রীলঙ্কার কথা এনেছে!! তাই কী? এমরা নিশ্চিত নই। যদিও এরপর মন্ত্রী শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ উল্লেখ করেছেন।    উল্লেখ করে বলেছেন – যে (মূলত) “সভরেন লোন নেয়ার কারণে গত মে মাসে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে গেছে এবং পরে আইএমএফ এর সাথে চুক্তিতে গিয়েছে”। মন্ত্রীর এই দাবিটা সত্য। আর মন্ত্রী তাই এখন দাবি করেছেন এই রিপোর্ট লিখেছে, বিআরআই (চীনা বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ লোন) লোনের কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম খারাপ হয়ে গেছে’- এটা তিনি বলেন নাই। অর্থাৎ চীনা লোনের কারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়েছে এটা বলেন নাই; বরং আসলে ‘সভরেন ঋণের কারণে সমস্যা হয়েছে’।

    পরের প্যারায় মন্ত্রী বলছেন, ‘ চীনা লোন নেওয়ার ব্যাপারে (কাউকে) তিনি সতর্ক করেন নাই”। এ ছাড়া সবশেষে তিনি একটা তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘২০২১ সালের হিসেবে আমাদের মোট বিদেশী ঋণ ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ৪ বিলিয়ন হচ্ছে চীনা লোন।’

    অর্থাৎ মন্ত্রী বলতে চাইছেন, বাংলাদেশের কোনো অর্থনৈতিক ক্রাইসিস চীনা লোনের কারণে নয়।
    তবে বাংলাদেশের টিবিএস পত্রিকা তারাও মনে করে মন্ত্রীর বক্তব্য  বদলানো (ডিস্টোর্ট distort) করা হয়েছে। তারা লিখেছে, “London-based daily Financial Times (FT) published a report recently distorting statements made by Finance Minster“। তাদের রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল এটা। 

    মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপিতে আমাদের প্রাথমিক মন্তব্যঃ
    দেখা যাচ্ছে এফটির রিপোর্টার হেরেও হার মানতে রাজি নয়। তিনি প্রতিবাদলিপিটা ছাপবার সময় একটা নয়া শিরোনাম দিয়েছেন, Letter: Why Bangladesh minister is phlegmatic on BRI loans , যেখানে একটা বাঁকা শব্দ তিনি ঢুকিয়েছেন – phlegmatic। অক্সফোর্ড যে শব্দের অর্থ করে আবেগশুন্য unemotional, মানে এক উচ্ছ্বাসশুন্য অবস্থা।  মানে বিআরআই ঋণ নিয়ে মন্ত্রী আবেগশুন্য কেন? এধরণের একটা ভাব বা বক্তব্য এর লেখক বেঞ্জামিন পারকিন দিচ্ছেন। এটা অন্যায় ও অসততা। কারণ প্রথমত একজন মন্ত্রী বলছেন তার কথা বিকৃত বা ডিস্টোর্ট করা হয়েছে। যেটা Financial Times (FT) ও এর রিপোর্টারের জন্য খুবই অসম্মানজনক অভিযোগ। যেটা আসলে বলা হচ্ছে এই পত্রিকা ও এর রিপোর্টার অসৎ ও বিশ্বাস করা যায় না- ইন্টিগ্রিটির অভাব আছে। যেটা একটা মারাত্মক অভিযোগ। অথচ রিপোর্টার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফাজলামো করছেন। কেন? এইক রিপোর্ট-টা ইংল্যান্ডের এই অর্থনৈতিক দুর্দিনে কেউ পয়সা দিয়ে করিয়েছে??? তাই মন্ত্রীর এত মারাত্মক অভিযোগ শুনেও এক ইউরোপীয় মন অনড়, প্রতিক্রিয়াশুন্য??? তিনি তো অন্তত বলবেন যে মন্ত্রীর অভিযোগ সত্য না!!! নাকি??? সত্যি এটা এক অদ্ভুত সাংবাদিকতা!!!

    কিন্তু মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপি-ও যেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেঃ
    ১। প্রথমত এ প্রতিবাদলিপিতে এটা এখন সন্দেহতীতভাবে পরিষ্কার যে, মন্ত্রী এফটি-এর সাথে কথা বলেছেন যেটাকে তারা ইন্টারভিউ বলছে।

    ২. কিন্তু কোন দেশের মন্ত্রী সাক্ষাৎকারে বা সাংবাদিকের সাথে আলাপে কোনো একাডেমিক বা ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ কথোপকথনে লিপ্ত হন না, হওয়ার কথা না। এটা তার করণীয় কাজ বা সাবজেক্ট না, এখতিয়ারও না। ফলে শ্রীলঙ্কা কেন সঙ্কটে ডুবেছে এ প্রসঙ্গে তিনি কথা বলবেন কেন? শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের মন্ত্রীর এক্তিয়ারের বাইরে – এটাও কী মন্ত্রী জানা নাই? শ্রীলঙ্কা এনিয়ে কোন আপত্তি বা ব্যাখ্যা চেয়ে বসলে তো আমাদের সরকার কঠিন বিব্রত হবে, মাফ চাইতে হবে??   মন্ত্রী বড়জোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কথা বলবেন। এটাই তার এখতিয়ার। বাংলাদেশে চীনা লোন নিয়েও কথা বলবেন যতটুকু একটা বিদেশি মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় মন্ত্রী হিসেবে তাঁর এখতিয়ার। তবুও সাবধান যে সেটাও – শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণ নিয়ে ডুবেছে কিনা – এ বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে, এড়িয়ে যাওয়া বক্তব্য হতে হবে। শ্রীলঙ্কায় তাদের সমস্যা কার জন্য কী হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দেয়ার কাজ আমাদের মন্ত্রীর কোনভাবেই নয়। কোন বিদেশী সাংবাদিক তাকে তবু যদি উস্কানিতে শ্রীলঙ্কা চীনের লোনে ডুবেছে কিনা – এনিয়ে মন্তব্য জানতে চায় তাহলে, অর্থমন্ত্রীর উচিত হবে, ঠাণ্ডা মাথায় ভদ্রভাবে ঐ সাংবাদিককে বিদায় করে দেয়া। আর সাংবাদিককে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, তিনি অর্থমন্ত্রী –  বাংলাদেশের কোনো পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল না; তাই রিপোর্টার যদি আরও  প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করতে পারেন বা প্রশ্ন না থাকলে তিনি কথোপকথন শেষ করবেন। কিন্তু জানা যাচ্ছে, মন্ত্রী সেটা করেননি, সাংবাদিকের সাথে মেতেছিলেন। আর রিপোর্টার নির্লজ্জের মত তাঁকে বিক্রি করে দিয়েছে!!

    ৩। বাংলাদেশের চলতি সরকারের একটি নিয়মিত সমস্যা দেখা গিয়েছে যে, কেন সে চীনের সাথেও সম্পর্ক রাখছে তা ভারতকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া। তবু এই কান্ড যদি সরকার টু সরকার পর্যায়ে হয় যেখানে ফরমাল-ইনফরমাল বহু দিকেই আলাপ হয়ে থাকে যা স্বাভাবিক, সেখানে এমন কিছু হতে পারে। কিন্তু পাবলিকলি বা প্রকাশ্যে মিডিয়া-সাংবাদিকতায় এ্টা একেবারেই কাম্য নয়। কেননা তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতকে ট্যাক্স দিয়ে আমাদের যেন চলতে হচ্ছে!!!

    ভারতও প্রায়ই এমন দাবি করে থাকে যে, তার পড়শি দেশগুলো যেন ভারতের নিজ বাসার পিছনের বাগানবাড়ি সে দেশগুলো যেখানে ভারত ইচ্ছামতো হাত ঢুকাতে পারে, ফুল তুলে আনতে পারে ইত্যাদি। [এনিয়ে আমার পুরানা কয়েকটা লেখা আছে যার একটা লেখা “এক মফস্বলী জেনারেল” দেখা যেতে পারে।] এই ধারণার আদিগুরু হলেন জওয়াহের লাল নেহরু। তিনি মনে করতেন মানে ভাব করতেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে ফিরে গেলেও ওর বদলে তখন থেকে নেহরু হলেন রানীর নয়া ‘ভাইসরয়’ বা প্রতিনিধি। ফলে ভারতের পড়শি দেশ যারাও ভারতের সাথে বা অংশ হয়ে ব্রিটিশ কলোনির অংশ ছিল, কিন্তু এখন এসব স্বাধীন দেশ হলেও সেই সূত্রে নেহরুর নয়া “কলোনি-অধীনস্থতা” তাদের মানতে হবে।

    ভারত এ কথাগুলোই রিপিট করা শুরু করেছিল যখন চলতি শতকে চীনা অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়ে যাওয়াতে এশিয়া-আফ্রিকা সবখানেই এর চীনা প্রভাব বাড়ছিল। ফলে  ভারতের পড়শি দেশগুলোর উপরও চীনা প্রভাব স্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল। কিন্তু ভারত চীনের মতই পালটা নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে না, যে মুরোদ তার এখনো হয় নাই তাই, বরং নেহরুর সামন্ত-কলোনি স্টাইল দিয়ে কিছু করার খামোখা চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর আমাদের সরকারের নিজ দুর্বলতার কারণে বিদেশী সাংবাদিক বা ভারতীয় সাংবাদিক পেলেই তাকে তোষামোদ করতে চেষ্টা করা থেকে এসব সমস্যা তৈরি হয় বলে অনেকে অনুমান করে। খুব সম্ভবত এমন কিছুর ফ্যারে পড়েই মন্ত্রীর এই বিপর্যয়!

    ৪।  তবে কোন সূত্রে (FT)এফটির প্রতিনিধি অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে অ্যাকসেস বা প্রবেশ-অনুমতি পায় ও কথা বলতে পেরেছিল সেটা এক বিরাট কৌতুহল ও রহস্য। অবশ্যই। কারণ মন্ত্রী এই সাংবাদিকের সাথেই চীন কেমন, শ্রীলঙ্কার সঙ্কটে চীনা ঋণের স্বভাব খাসলত কেমন ইত্যাদি যেন এটা তাদের খোশগল্প-আলাপের সাবজেক্ট ছিল, মন্ত্রী সে আলাপ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে করেছেন! আর এমন বিশেষ আগ্রহ বিচার করলে এটা তো ভারতের পলিসি যে চীনকে এক দানব বলে তুলে ধরতে চায়। এছাড়া যেন এই চীন এমন যে, যার বাসার ভাত চড়ে অন্যদেশকে ‘ঋণের ফাঁদে ফেলে – বিভিন্ন দেশ থেকে লুটে আনা পয়সায়’!
    কাজেই Financial Times (FT) সাথে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ দেয়ার পেছনের ঘটনার সাথে ভারত আছে, তার ইন্টেলিজেন্স আছে এমন অনুমান প্রবল। বিশেষ করে, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর মুখ দিয়ে চীনা ঋণের বিরুদ্ধে বলানো, আর এরপর সেটাকে আরেক দফায় ভারতের আরো দশটা পত্রিকায় আরো কঠোর চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ভাষ্য হিসাবে দ্রুত উপস্থাপন যেখানে আবার সেন্ট্রাল রোলে হিন্দুস্তান টাইমসকে রাখা- এ এক বিরাট খবর ম্যানিপুলেশন, প্রপাগান্ডা-হিন্দুত্বের জাতিবাদী চীনবিরোধী জোশ তৈরি করে ভারতের এক মহা-প্রপাগান্ডা তৎপরতা অবশ্যই!  সেটা ভারত করলে করুক যা ভারত আর চীনের ব্যাপার; কিন্তু ভারত এই প্রপাগান্ডা করেছে আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাঁধে বন্ধুক রেখে। যেটা অবশ্যই আমাদের সবার জন্য বদারিং পয়েন্ট! এটা ইনসাল্টিং; বিব্রতকর! তাতে এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, তিনি চীনা ঋণের নিন্দা করেন আর নাই করেন তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, তিনি ভারতের হাতে ব্যবহৃত হয়ে গেছেন। এবং সেটা জেনে বা না-জেনে!

    ৫। এফটির রিপোর্টের শিরোনামে একটি শব্দ হল, ‘বিআরআই’ [BRI] লোন মানে বেল্ট-রোড প্রকল্পের লোন। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে চীনা লোন মানেই যেন তা বিআরআই!  না, তা একেবারেই না। এটা ভারতীয় অনুমান এবং এটা মিথ্যা অনুমান। এর কারণ যখন বেল্ট-রোড প্রকল্প যার শুরুতে ২০১৩ সালে নাম ছিল ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড; আগে কয়েক বছর তা চলার পরে ২০১৭ সালে বিআরআই [Belt road Initiative] নাম দিয়ে সম্মেলন ডাকা হয়েছিল কেবল তখনি ভারত বিআরআই প্রকল্পের প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছিল। ভারতকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছিল আর তাতে অপারগতা প্রকাশ করতে গিয়ে ভারত প্রথম তার বিরোধিতা প্রকাশ্যে এনেছিল। কাজেই সবকিছুকে  ‘বিআরআই’ বলে হাজির করা নিজের ঘৃণা-বিরোধিতা প্রকাশ এটাই তো ভারতের অবস্থান!
    আরেক মজার দিক হল, মোদির ভারতে কি চীনা অবকাঠামো ঋণ নেই? মোদি মূলত ২০১৪ সালের আগে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই চীনা সখ্যতা, চীনা অবকাঠামো ঋণের পথ খুলেছিলেন। আর সেটাই তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার পরে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। কাজেই চীনা অবকাঠামো ঋণ  অবশ্যই আছে; মোদির প্রথম পাঁচ বছরে এ সখ্যতা ছিল ঘোরতর। ভারতের রেলওয়ে আধুনিকায়ন (স্টাফ ট্রেনিংসহ), এছাড়া ভারতের অন্তত পাঁচটা শহর আধুনিক অবকাঠামো নতুন করে গড়ে দেয়াসহ আরো অনেক অবকাঠামো প্রকল্প সেখানে নেয়া ছিল। কিন্তু বিআরআই বিরোধিতার পর থেকে ভারতে চীনা ঋণ বিষয়ে সব পাবলিক ইনফরমেশন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এখানের জন্য সার কথা হল, চীনা ঋণ মানে বিআরআই নয়। যেমন বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোন বরং নন-বিআরআই।  যদিও কোনো নন-বিআরআই লোন পরে বিআরআই হিসেবে উভয়পক্ষ মেনে নিয়েছে এমনও হয়েছে। আবার পদ্মা সেতুকে বিআরআই বলে দেখাতে রাজি হননি হাসিনা।
    আবার যদি আরেকটু আগাই তবে  চার দেশীয় চীনের কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা-কলকাতা [BCIM] যে রেলপথ পরিকল্পনা ছিল সেটা এখন সেভাবে নাই, পরিত্যক্ত। এর বদলে সেটা এখন কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা বলে কাজ চলছে। তাতে ভারত সরে গেছে মানে ঢাকা-কলকাতা পদ্মার রেলপথ হলে সেটা দিয়ে কানেক্ট করার কথা ছিল; তা আবার আলাদাভাবে শুধু ঢাকা-কলকাতা হয়ে আছে। ফলে চার দেশীয় ঐ প্রকল্প ছিল সত্যিকার বিআরআই। কারণ কোন প্রকল্পকে BRI বলার প্রধান নির্ণায়ক হল যে মূল বিআরআই এর সাথে তা যুক্ত হবে কীনা!!  যেকোনো অবকাঠামো যা ইউরোপ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে চীন হয়ে (সাথে অবশ্য সমুদ্রপথে আফ্রিকা যুক্ত) এরপর এশিয়ায় ছড়িয়ে বিভিন্ন দেশে – এটা হল সেই মূল বিআরআই। এমন মূল বিআরআইয়ে যুক্ত নয় তেমন চীনা প্রকল্পও বাংলাদেশে অনেক আছে। কাজেই সাধারণভাবে চীনা ঋণ না বলে সব ঋণ কে বিআরআই বলার মানে হল যেটা  একমাত্র ভারতই যার সুনির্দিষ্ট করে বিরোধিতা করে!

    কেন এসময়ে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডাঃ
    আগে যেমনই হোক, গত প্রায় দুই মাস ধরে ভারত বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা  বাড়িয়েছে। এর প্রধান দুটা কারণ মনে করা হয়। প্রথমটা হল, গত এক দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি; এটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ডাটা থেকে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই ফিগার নিয়ে ভারতে মোদিবিরোধীরা মোদির অর্থনীতি খারাপ চলছে, ফেল করেছে এর প্রমাণ বলে পাবলিক পর্যায়ের সমালোচনা তুলে ধরে এসেছে। সেটা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বা আরো ফেলবে বলে মোদির আশঙ্কা। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ডলার সঙ্কটে বা আইএমএফের কাছে হাত পেতেছে – এ তথ্য ব্যবহার করে ও ব্যাপক প্রচার করে মোদি তার অভ্যন্তরীণ ভোট-কাটা বিরোধীদের সোজা বা শায়েস্তা করতে চান, এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে ভারত ব্যাপক প্রপাগান্ডা করে তুলে ধরছে।

    দ্বিতীয় কারণটাও ভারত এর সাথে যুক্ত করেছে। সেটা হল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ হল চীনা ঋণ – এই কথাটা মিথ্যা হলেও ভারতের খায়েস – মিথ্যা প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ছেয়ে ফেলা যাতে ভারত তার চীনবিরোধী প্রচারের সব কাজ সেরে ফেলতে পারে।

                                   Chinese naval Hi-tech Tracking Ship Yuan Wang 5 docking at Sri Lanka’s Hambantota Port

    এদিকে আমাদের সরকারের এখনকার চাওয়া হল, আমেরিকান অবরোধের চাপের সাথে সে এখন ডলার-অর্থনীতির সঙ্কটে পড়েছে, এখানে ভারত তাকে সহায়তা করুক। চাইছে গত ২০১৩-১৪ সালের মত, বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান চাপ ভারত সামলে দিক। কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারত আর আমেরিকা বা বাইডেনের সম্পর্ক আর সেখানেই নাই; ভারত আর সেই প্রিয়পাত্র নাই। আসলে আমেরিকা আর ভারত, এদের উভয়ের স্বার্থ উভয়ের মৌলিক বিরোধী হয়ে দেখা দেয়া শুরু হয়ে গেছে। যদিও তাই বলে এখনই সম্পর্কচ্যুতির ঘোষণা দিলে তা আরো ক্ষতিকর হবে, তাই এটা রুটিন সম্পর্ক করে ফেলে রাখা হয়েছে; যদিও এখনকার পরিস্থিতিটা এমন যেমন,  মূল ফ্যাক্টর ভারত যতই রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে যাবে তত দ্রুত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক সব ভেঙে পড়বে। যেমন সর্বশেষ উদাহরণটাই দেয়া যাক। গতকাল রয়টার্সের নিউজ হল – ভারত রাশিয়ার অশোধিত তেল গোপনে এনে শোধন করে অন্যদেশকে সরবরাহ করছে – U.S. says India hid Russian origin of fuel shipped to U.S.,] এতে স্বভাবতই বাইডেন ক্ষুব্ধ।
    কাজেই এঅবস্থায় আমাদের সরকারের আকাঙ্খা মোতাবেক ২০১৩-১৪ সালের সুখস্মৃতিতে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সব জেনেও এবাস্তবতা মানতে সরকারের মন সায় দেয় না। বিশেষ করে তার ভয়, সে একেবারে একা হয়ে যাচ্ছে। তাই বারবার হাত বাড়ায় আর একটা করে ভারতের ঝাপ্টা খাচ্ছে।
    বাংলাদেশ সরকারের এ’আকাঙ্খা ন্যূনতম কোন বাস্তব রূপ দিতে ভারত অক্ষম বটে কিন্তু তাতে কী বাংলাদেশকে লুটে খাওয়া, অপব্যবহার করা এটা এখন ভারতের একটা বড় সুযোগ ও কাজে দাঁড়িয়ে গেছে।

    তাহলে অপর কাজটা কী?
    পুরানা কাহিনী হল,  চীন-আমেরিকার সম্পর্ক ২০১০ সালের পর থেকে প্রথম তিতা হতে শুরু করেছিল। অন্যভাবে বললে, প্রেসিডেন্ট ওবামা যতই এটা টের পাচ্ছিলেন, ততই বেশি করে চীনকে – বাণিজ্যিক সুবিধায় ছাড় দিতে হবে – ওবামার এদাবিকে জায়গা করে দিয়ে চীন আমেরিকাকে ম্যানেজ করছিল। কিন্তু এটাও অকার্যকর হতে শুরু করে পরে স্পষ্টত ট্রাম্পের দ্বিতীয় বছর থেকে। তবু চীন যেটা মেইন্টেন করে গেছে তা হল – সে দ্বিপাক্ষিক ডায়লগের রাস্তা শক্ত মনোযোগে খোলা রেখে চলতে পেরেছিল। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্পীকার পেলোসির তাইওয়ান উত্তেজনা সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। তাতে চীন এখন বাইডেনের ওপর এত ক্ষুব্ধ যে, পাবলিকের ভাষায় বললে, চীন আমেরিকার ফোন ধরছে না। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকাও, সেকালে কখনো দু’পক্ষ এমন ফোনের নাগালের বাইরে থাকেনি। কারণ এমন বাইরে থাকা মানে তাতে অনিচ্ছাতে বড় সামরিক সঙ্ঘাত যেকোনো সময় টার্ন নিতে পারে, যখন দু’পক্ষের হাতেই কঠিন মারণাস্ত্র মজুদ!

    এদিকে এ’পরিস্থিতিতে চীনের একটা হাই-টেক ট্র্যাকিং জাহাজ হাম্বানটোটা বন্দরের দিকে আগাচ্ছিল বন্দর থেকে রিফুয়েলিং ইত্যাদি রুটিন সুবিধা গ্রহণের জন্য। এটা অসামরিক গবেষণা মনিটরিং-এর  এক হাইটেক জাহাজ নাম “ইউয়ান ওয়াং ৫“। রয়টার্স লিখেছে, ” Foreign security analysts describe the Yuan Wang 5 as one of China’s latest generation space-tracking ships, used to monitor satellite, rocket and intercontinental ballistic missile launches.”
    কিন্তু চীন নিয়ে মানসিকভাবে ম্যানিয়াক ভারত তবু এটা নিয়ে হাইপ বা হৈচৈ তুলবেই। তাই ভারত ততই আমেরিকার মনোযোগ আকর্ষণে যেন এনিয়ে তীব্র আপত্তি হইচই ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ায় তুলেছিল; যদিও ভারতের শেষ লক্ষ্য এসবের কোন কিছু নয়।  আসলে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভারত নিজের ক্ষুদ্র সক্ষমতার ব্যবহার করে (নগদ বৈদেশিক মুদ্রায় লোন দেয়া নয়); তবে ভারতের ভেতরের বাজার থেকে যা যা রুপিতে কেনা যায় এমন প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চাল-গম ধরনের খাদ্য আর তেল-গ্যাস জ্বালানি ইত্যাদি লোন হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে পাঠিয়েছিল। এখন শ্রীলঙ্কায় আপাতত ভারত বা ভারতের সাথে চীনের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিমূলক এন্ট্রি নেই; বরং আমেরিকা একা মাতবরি করছে আর সেই খুশিতে ভারত মেটেরিয়াল লোন-সহায়তা নিয়ে এগিয়েছিল। কিন্তু রনিল বিক্রমাসিং নয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে গেলে ভারতের ভাগে অন্তত সাহায্য-সমতুল্য কর্তৃত্ব-প্রভাব কোন কিছুই আসেনি। কিন্তু এ্টা ভারত আশা করছে। সেই  মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আমেরিকার চেয়েও উচ্চৈঃস্বরে চীনা জাহাজের এসফরের বিরোধিতা ও আপত্তি দায়ের করেছিল শ্রীলঙ্কার কাছে। কিন্তু আমেরিকা ভারতের সাথে মিলে শ্রীলঙ্কার সাথে দেনদরবার কিছু করতে যায় নাই। যা করেছে একাই।  ফলাফলে গতকাল সকালেও ভারতের মিডিয়া ভারত কত শক্তিশালী আর চীন কত দুর্বিনীত তার ঢাক পিটাচ্ছিল যেন, ভারত চীনকে ঠেকিয়ে দিয়েছে আর পারলে সে চীনা জাহাজ আর বন্দরের মাঝে ভারতীয়-নৌবাহিনী দাঁড় করিয়ে চীনকে ভাগিয়ে দেয়।
    আসলে এনিয়ে গত তিন দিন ধরে ভারতীয় মিডিয়ায় মোদি সরকারের চীনবিরোধী ‘দেশপ্রেম’ আর দেশের কত স্বার্থসচেতন তারা এরই মহিমা প্রদর্শিত হচ্ছিল। এজন্য এর সাথে মিলিয়ে, বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ব্যবহার করে “চীন কত খারাপ” এটা তুলে ধরাটা এক বিরাট প্রপাগান্ডা মিডিয়া উচ্ছাস ঘটিয়েছিল।

    কিন্তু হায়! ভারতের এক পত্রিকা WIRE গত ১২ আগষ্ট সন্ধ্যায় ভারতের সব উত্তেজনায় ঠান্ডা পানি ঢেলে লিখেছে, শ্রীলঙ্কা সরকার চীন জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে অনুমতি দিয়েছে। কারণ, চীন ও আমেরিকার এ বিরোধিতা কেন তারা করছে এর সপক্ষে  যুক্তিগ্রাহ্য যথেষ্ট কারণ তারা দেখাতে পারেনি। আসলে এই ঘটনায় শ্রীলঙ্কা দেখিয়ে দিল এখনও সে ভাত-আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম!!!

    সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক, কেবল একটাই বেছে নিতে হবেঃ
    এটা এক তত্বকথার ‘হেদায়েত’ বাণী! কী হতে চান, সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক? তার মানে হল যেকোন একটা নিতে হবে। দুটোই এক সাথে হওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ঠিক তাই। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রবাদী উগ্র দেশপ্রেমিকরা হিন্দুত্ববাদীদের মতই ব্যাপারটা বুঝতে নারাজ। আসুন,  তা নিয়ে আলাপ করি। সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হল, ফ্যাক্টস। এতা ফ্যাক্টস বেসজড হতে হবে! একেবারে অবিকৃত বা এদিক-সেদিক মানে করা নয় বা ইঙ্গিত করে বলিয়েছেন, ফেবার করেছেন ইত্যাদি, এমন করা যাবে না। ফ্যাক্টের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে হবে।

    এখন এভাবে চললে এর অনেক কিছু আপনার দেশের স্বার্থের বিপক্ষে যেতেও পারে। তবু, বাস্তব-সত্য তো সত্যই তা ময়ানতেই হবে। এখন তাহলে আপনি কী চান? যদি সাংবাদিকতা চান তাহলে দেশপ্রেম প্রদর্শন তা হোক না-হোক তা পাশে ফেলে রেখে আপনাকে সাংবাদিকতা বা সাংবাদিক স্বার্থকে উপরে তুলে ধরতে হবে। জার্নালিজমকে ফাংশন করতে দিতেই হবে।
    কিন্তু ভারতীয় বর্ষীয়ান সম্পাদক শেখর গুপ্তা সাংবাদিকের আগে দেশপ্রেমিক হতে চান। তাই বাংলাদেশের এই মন্ত্রী-উপাখ্যান নিয়ে ভারতের  তার নির্মিত ভিডিও ক্লিপে তিনি কড়া দেশপ্রেমিক সেজেছেন। অথচ ভারতের পাঁচজন সিনিয়র সাংবাদিকের নাম নিলে তিনি নিজে একজন হবেন। এই হল, ভারতের সাংবাদিক দুর্দশা! সাংবাদিকতাকে চিপায় ফেলে দেশপ্রেমিকের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় নেমেছেন তিনি! দেখুন তার ইউটিউব! 

    তিনি শেখর গুপ্তা এখানে দুইটা বড় মিথ্যা বলেছেনঃ
    এক। হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নিয়ে, এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে এখন শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর এই পয়সাও ঋণের বোঝা নাই। কারণ, চীনা সরকারি ঋণের অর্থে এটা নির্মাণের পরেই শ্রীলঙ্কায় এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার এসেছিল।  তারা দাবি করতে থাকে যে সরকারের পক্ষে এর ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। এটাই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সরকারকে জানায়। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়ায় এমন যেন চীনক্বে এখন শ্রীলঙ্কাকে দেয়া ঋণ ফেরত নিয়ে নিতে হবে। ফলে দুপক্ষের আলাপ-আলোচনায় এটা সাব্যস্ত হয় যে তাহলে চীনা সরকার এক প্রাইভেট চীনা কোম্পানী যোগাড় করে দিবে যে নির্মিত হাম্বানটোটা বন্দর কিনে নিবে আর এই বন্দরের আয় থেকে নিজের এই বিনিয়োগ ধীরে ধীরে তুলে নিবে। এটা সাব্যাস্তের পরে নতুন বিতর্ক উঠে বন্দরের কতভাগের মালিক হবে নয়া ক্রেতা। যেহেতু সব প্রকল্পেই অন্তত প্রকল্পের জায়গা-জমি দেয়া বা যাদেরকে সরিয়ে ঐ জায়গায় বন্দর নির্মাণ হয়েছে তাদের পুণর্বাসন ইত্যাদিতে সরকার খরচ করে বলে যেকোন বড় প্রকল্পের ৩০% এর শেয়ার মালিকানা সরকারের হয়-ই। তাই ঐ চীনা প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার মালিকানা এখন প্রকল্পমূল্যের ৭০%।  আর ঠিক একারণের শ্রীলঙ্কা সরকার  হাম্বানটোটা বন্দরের মালিকও নয়, এনিয়ে কোন চীনা ঋণপরিশোধের দায়ও সরকারের নাই। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা সরকার অর্থনীতি ফেল করার পিছনে হাম্বানটোটা বন্দরের কোন ভুমিকাই নাই। অথচ শেখরগুপ্তা হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়েই যাচ্ছে।
    দুইঃ অন্যান্য চীনা ঋণ শ্রীলঙ্কাকে গছিয়ে দেওয়ার ভারেই ওদেশের অর্থনীতি ঢুবে গেছে?
    এটাও শতভাগ মিথ্যা।  এনিয়ে আমার আগের  ১৬ মে ২০২২ তারিখে লেখা শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’ এখানে বিস্তারিত আছে। শেখর গুপ্তা দাবি করছেন চীনা ঋণই শ্রীলঙ্কার অর্থনঈতি ফেল করার কারণ। অথচ তিনি ফ্যাক্টস অনুসরণ করতে রাজি না। ্তিনি শ্রীলঙ্কা সরকারের দেয়া কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কত ঋণ এই ফ্যাক্টস শীট অনুসরণ করে কথা বলতে চান না। সেটাই নিচে আবার তুলে এনেছি।

    এখানে শ্রীলঙ্কার সরকারের দেয়া তথ্য মতে, দেখা যাচ্ছে তাদের নেয়া মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ১০% হল চীনা লোন। এজন্য যদি চীনকে দায়ী করা হয় তাহলে শ্রীলঙ্কায় জাপানের ঋণও ১০%, বিশ্বব্যাংকের আরেকটু কম ৯% এছাড়া এডিবিও আরেকটু বেশি ১৩% – এদের সকলকেও দায়ী করতে হয় সমানে!!!। কিন্তু তা না করে কেবল চীনকে দায়ী করা মিথ্যা ও খারাপ উদ্দেশ্যমূলক অবশ্যই, সেটাই শেখর গুপ্তা ও ভারত করে চলেছে।
    আর বাস্তবে শ্রীলঙ্কার দুর্দশা বা ডিফল্ট হবার মূল কারণ, নেয়া মোট ঋণের ৪৭%, এক বিশেষ ঋণ। যেটাকে বলে সভরেন ঋণ [Sovereign loan ] যার মানে হল শ্রীলঙ্কা সরকারের ডলার বন্ড বাজারে ছেড়ে বিদেশ (যারা মূলত ব্যক্তি বিনিয়োগকারি) থেকে ডলার সংগ্রহ করেছিল। [সভরেন লোন মানে সরাসরি রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে ডলার বন্ড ছেড়ে নেয়া লোন।] আমাদের মত দেশের কিছু অতিচালাক নেতা-মন্ত্রীর কাছে এভাবে ডলার বন্ড ছেড়ে ডলার সংগ্রহকে খুব লোভনীয় খুব আরাম ও মজার মনে হয়। কিন্তু তা সব সময়ই ভীষণ রিস্কি এদিকটা তারা ভুলে থাকতে চায়। কারণ এই ঋণ ফেরত দেওয়ার যে কিস্তি তা প্রায়ই সরকার সময়ে ফেরত দিতে পারে না ফলে ডিফল্টার হয়ে যায়। যা থেকে গ্লোবাল ঋণ-বাজারে বদনাম ছড়ায় ব্যাপকভাবে! আর এটাই হয়েছে শ্রীলঙ্কার বেলায়। আর শ্রীলঙ্কার সভরেন বন্ড ছেড়ে নেয়া ঋণ সবচেয়ে বেশি ৪৭%। আর একারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে আইএমএফের কাছে সারেন্ডার করে লোন চাইতে গেছে। যা বাংলাদেশের বেলায়, সে এখনও কোন ডিফল্টার নয় তবে আইএমএফের কাছে আগেই সারেন্ডার করে লোন চেয়েছে। মন্ত্রী নিজেও তাঁর প্রতিবাদলিপিতে ঠিক এদিকটায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এদিকটা  অর্থাৎ শেখর গুপ্তা একজন মিথ্যা প্রপাগান্ডার লোক যিনি নিজেকে কোন সম্পাদকের দাবি দূরে থাকে তিনি নিজেকে কোন সাংবাদিকই দাবি করতে পারেন না।

    সবশেষের কথা হল, বাংলাদেশের আইএমএফের কাছে চাওয়া ঋণ পেলেও আমাদের আরো ঋণ লাগবে যার সম্ভাব্য দাতা এক চীন ছাড়া সরকার কারো কথা ভাবতে পারছে না। এমনকি আইএমএফ দেরি করলেও এ ঋণ প্রয়োজনীয় বেশি। কিন্তু এ ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সম্ভবত চীনের শর্ত হতে যাচ্ছে, যেসব চীনা প্রকল্প আগে ভারতের আপত্তিতে বাদ পড়েছে বা ঠেকিয়ে রাখা আছে – সেসব এবার আমাদের সরকারকে অনুমোদন দিতে হবে। ভারত সম্ভবত সে জন্য এমন আগ্রাসী! কিন্তু অক্ষম ডেস্পারেট! তাহলে, অর্থমন্ত্রী কী বুঝে এফটি-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন? যা তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিতে হয়!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা দৈনিক “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার ১৩ আগষ্ট ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে “অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার“ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    গৌতম দাস

    ১৮ জুলাই ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4aK

     

     

    [ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন চলতি আমেরিকা নিয়ে কিছু আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছে। আর তা করতে গিয়ে আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কত গভীর এর আভাস দিয়ে ফেলেছে। আজকের প্রসঙ্গ এনিয়ে। ]

    অরিজিনালি এর পরিচয় ছিল “সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট” বলে। বিগত ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা একালে এসে তা আমেরিকাতেও নিজের বিস্তার ঘটিয়েছে – এমনকি ‘কোর এডিটরিয়াল অফিসটা’ এই আমেরিকা থেকেই পরিচালিত। আবার এখন এক ওয়েব ভার্সনও বের করেছে যাতে সে যেন এক দৈনিক পত্রিকাও হয়ে গেছে। কারণ, কী আর করা! শক্ত প্রতিযোগিতায় মিডিয়া বলতে একালে তাতে  “লোকাল” বলতে কিছু নাই কারণ সবই তা অনলাইনের দুনিয়া হয়ে গেছে। ফলে সাপ্তাহিক বলে কেউ এক সপ্তাহ হাতগুটিয়ে বসে থাকলে সেই মিডিয়ার বাজার তাতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দখলে চলে যেতে পারে। অতএব অনলাইনে হলেও দৈনিক উপস্থিতি বা হাজির নিশ্চিত করতে হয়েছে সকলকে।

    অবশ্য এর পিছনে অন্য আরেক বড় কারণ আছে। সেটা আমেরিকার এক সরকারি সার্ভে রিপোর্টের ভাষায় বললে, ‘গ্লোবাল পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ’ প্রসঙ্গে, যা দুনিয়ার বাকি সবকিছুর প্রবাহ – এদের অভিমুখ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।  ঐ রিপোর্ট বলেছিল, গ্লোবাল বিনিয়োগপুঁজির প্রবাহের অভিমুখ একালে পশ্চিম থেকে পুবে মানে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়; এই এশিয়ামুখী অভিমুখ আপাতত যেটা ফিক্সড বা এমন স্থিরতা লাভ করে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে যে তা আর আগামীতে আবার কখনোই তা উলটে পশ্চিমামুখী হবে না;  অর্থাৎ এটা ই-রিভার্সিভ্যাল [irreversible] হয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে লাগাতার গত ৪০০ বছর ধরে এটা পশ্চিমমুখী হয়ে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত হয়ে চলেছিল। সারা দুনিয়াকে কলোনি বানিয়ে লুট করে ইউরোপ নিজের হাতে দুনিয়ার সব অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত পশ্চিমমুখী করে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত করে নিয়েছিল। সেটাই এখন উল্টা, স্থায়ীভাবে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। আর এভাবেই উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের এক নয়া-কাল হতে শুরু করে দিয়েছে। এশিয়ান এক চীনা উত্থানে এসব উল্টে গেছে; যেটাকে অনেকে অবজেকটিভ বা প্রাকৃতিক প্রতিশোধের এক নয়াকাল বলতে শুরু করেছে।

    আমেরিকান ঐ সার্ভে রিপোর্টের মূল অর্থ-তাৎপর্যের আলোকে এখন গ্লোবাল মিডিয়াকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। প্রায় ২০০ বছর আগের প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা মিডিয়াগুলো একালের এই ‘অভিমুখ বদলের’ ব্যাপারটা তৎক্ষণাৎ বুঝে না ফেলার কোনো কারণ নাই, তারা বুঝে গেছিল। আর তারই প্রতিক্রিয়াজাত সিদ্ধান্তে পশ্চিমের প্রতিটা মিডিয়া হাউজ দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই টিকে যাবার জন্য, এশিয়ামুখী হয়ে নয়া অবস্থান সূচনা করে দিয়েছে। যেমন তাদের ফোকাস এখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালী পাঠক বা প্রতিষ্ঠান কারা [মানে কাদের পাঠ এশিয়ার সমাজগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে] – দ্রুত এমন তাঁদেরকে খুঁজে বের করা আর নিজ নিজ মিডিয়া প্রডাক্ট এসব ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের প্রভাবিত করতে না পারলে এশিয়া-কেন্দ্রিক নবউত্থিত গ্লোবাল-বাজার ওসব পশ্চিমা মিডিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাবে; আর,  তাতে প্রভাবশূন্য হয়ে যেতেও পারে, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক এটাই ঘটতে শুরু করেছে। এমনিতেই আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীটের বাইরে সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া গ্লোবাল পুঁজিবাজার এর এক্সটেনশন –  এই শিফটিং অনেক আগেই ঘটে গেছে। সেই সাথে গত ১৪ বছর ধরে এখন হংকং, সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া মিডিয়া হাউজগুলোরও দ্রুত উত্থান হচ্ছে।  যেমন এশিয়া টাইমস অথবা সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট ইত্যাদি সেন্ট্রাল ভুমিকা নিয়ে নিয়েছে।  অতএব, ইকোনমিস্টও এখন অনলাইনে হলেও দৈনিক ভার্সনে হাজির!

    ইকোনমিস্টের এমনই এক অনলাইন দৈনিকের ভার্সন, আমার মত অনেকের ই-মেল বক্সেও এসেছে এই সপ্তাহে। সেখানে গত ১৬ জুলাই সংখ্যা এর এক প্রধান আর্টিকেলের ছোট শিরোনাম হল – ‘ওয়েক আপ, ডেমোক্রাটস’ [Wake up, Democrats! (উপরের ছবিতে দেখেন)]! বাংলা করে বললে, “আমেরিকান ডেমোক্র্যাট দলের লোকেরা, এবার জেগে ওঠো!” নিচে যার আবার বড় আরেক শিরোনাম দেয়া আছে। সেটা হল এমন, “ডেমোক্র্যাটদের জেগে ওঠা দরকার আর তাদের অ্যাক্টিভিস্টদের চরমপন্থী খায়েশে সব তছনছ হয়ে যাওয়া বন্ধ করা উচিত” [The Democrats need to wake up and stop pandering to their extremes]।’ আবার একটা সারকথা শেষে লিখে দিয়ে বলেছে, ‘আমেরিকার ভালোর জন্য শাসক দলের জরুরিভাবে নিজ দলের অ্যাক্টিভিস্টদের নিয়ন্ত্রণ নেয়া উচিত” [For the good of America, the governing party urgently needs to take on its own activists] !’ বলাই বাহুল্য, কী সাংঘাতিক এসব কথা! কিন্তু ইকোনমিস্ট কেন এত গরম কথা বলছে? সেটা দেখা যাক।

    এরপর ঐ আর্টিকেলের প্রথম কয়েকটা বাক্য আমি এখানে তুলে আনছি। লিখছে, আমেরিকার “প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তিনি এক ঐতিহাসিক কালের প্রেসিডেন্ট হবেন। তবে সেটা যেন অবশ্যই জো বাইডেনের মত ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট নয়”। পরের বাক্যে লিখেছে, “এপর্যন্ত বাইডেনের প্রেসিডেন্টগিরিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর পাবলিক রেটিং বা গ্রহণযোগ্যতা ১৯৫০ সালের পরে সর্বনিম্ন”। ইকোনমিস্ট কেন এমন লিখল, কারণ রয়টার্সের ১৩ জুলাই প্রকাশিত এক সার্ভে বলছে – বাইডেনের গ্রণযোগ্যতা মাত্র ৩৯%। আর বাইডেন “সরাসরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রকাশিত মতের” পাবলিক হল ৫৫%।

    Every president yearns to be historic—but not historic like Joe Biden. At this point in his presidency Mr Biden’s singular achievement is to have the lowest approval rating of any incumbent since the 1950s. Even among Democrats, 67% think the economy is doing poorly, 78% think the country is heading in the wrong direction and 64% want another presidential candidate on the ticket in 2024.

    এরপরে আরেকটা তথ্য যোগ করেছে ইকোনমিস্ট, যেটা আরো মারাত্মক! লিখছে, ‘এমনকি ডেমোক্র্যাট দল মানে বাইডেনের নিজ দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতাবিষয়ক তথ্যে দেখা যাচ্ছে – ৬৭% দলীয় কর্মী মনে করেন বাইডেনের অর্থনীতির পারফরম্যান্স খুবই খারাপ। এমনকি “৭৮% পাবলিক মনে করেন দেশ ‘ভুল পথে’ চলছে আর সে কারণে, ৬৪% মনে করেন আগামি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাইডেন নয় ভিন্ন প্রার্থী খোঁজা দরকার”।

    গতবছর ক্ষমতাসীন হওয়ার সময়  মানে ‘১৮ মাস আগে বাইডেন জনগণকে একটু শান্তি দেবেন, ভালো দিন দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন”। কিন্তু ঘটেছে উল্টা। তাদের সব সুখ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। চরমতম মুদ্রাস্ফীতি, সব সদিচ্ছা সু-বোধ সব হারিয়ে গেছে। এক গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই যেন সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি এখন ৯.১%। যেখানে কোন দেশে্র  মুদ্রাস্ফীতি ৫-৬% এর উপরে দেখা দিলে – ব্যবসায়ী নয়, তবে চাকরি করেন বা ছোট ব্যবসায়ী যারা, এমন সব নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এমন মুদ্রাস্ফীতি খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ, এটা তাদের ছোট ছোট সঞ্চয়ের উপর তারা সাধারণত যে ব্যাংক ইন্টারেস্ট পান, মুদ্রাস্ফীতি তাকেই ছাপিয়ে যায়, নেগেটিভ করে দেয়। এতে এককথায় সঞ্চয়ের মূল্য নেগেটিভ হয়ে যায় মানে, যেন সঞ্চয় ক্ষয়ে যায়।

    কাজেই আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা গো-হারা হারবে তা নিয়ে তাদের নিজেদের আর কোনো সন্দেহ নেই। সার্ভে রিপোর্টগুলোও তা বলছে। এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচন মানে হল, তাদের চার বছরের প্রেসিডেন্ট টার্মের ঠিক প্রথম দু’বছর পূর্তিতে নয়া যে নির্বাচন। না, তাই বলে মিড-টার্ম এটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিছুই নয়। যেমন, এখানে এবারের মিড-টার্মে ডেমোক্র্যাটরা হেরে গেলে তাতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে পদত্যাগ করে বাসায় চলে যেতে হবে না। তিনি বরং ২০২৪ সাল পর্যন্ত আগের মতই প্রেসিডেন্ট থেকে যেতে পারবেন। আসলে এই নির্বাচন হল, কংগ্রেস (আমাদের তুলনীয় ভাষায় বললে সংসদ) ও সিনেট (বা দ্বিতীয় সংসদ) এই দুই জায়গাতেই হবু নির্বাচন। তবে সব আসনে নয়, মিড-টার্মে কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনেই নতুন নির্বাচন হবে। আর সার্ভে প্রেডিকশন বলছে, এবারের মিড-টার্ম নির্বাচনে বাইডেনের পাপে ডেমোক্র্যাট দল বেশির ভাগ আসনেই গো-হারা হেরে যাবে। আর এতে পরবর্তীতে ফল হবে এই যে, পরে বাইডেন সরকার চালাতে গিয়ে পদে পদে বাধা পাবে। কারণ, ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না বলে বাইডেন যাই করতে যাবেন তাতে আইনি সহায়তার দরকার হলে তাতে কংগ্রেস বা সিনেটের অনুমোদন না পেয়ে এর জ্বালায় প্রেসিডেন্টকে ভুগতে হবে।

    এরপর এক কড়া নেতিমানের মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে ইকোনমিস্ট। শব্দটা হলো জেরোন্টো-ক্রাটিক [Geronto-cratic]। একে খাস বাংলা করে বলতে হয় – ‘বুইড়াদের’ শাসন বা সরকার। কেন এমন কথা? মানে ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই বাইডেন যে এক অনেক বয়স্ক ব্যক্তি একথাটা এর মধ্যে অনেকবারই প্রকট হয়ে উঠতে দেখা গেছে। বিশেষত, এক অসুস্থতায় বাইডেনকে ল্যাবটেস্ট করাতে গিয়ে তাকে ‘আংশিক অচেতন’ হতে হত। তাই ল্যাবে যাওয়ার আগেই তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা দিয়ে এরপর ল্যাবটেস্টে গিয়েছিলেন।

    আর এই ব্যাপারটাতে “প্রেসিডেন্ট আসলে অনেক বুইড়া” অথবা “এর বেশিদিন আয়ূ নাই”  এ্ধরণের কথা যেন নগদে প্রমাণ হিসেবে পাবলিকলি হাজির হয়েছিল। আবার ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তিনিও যথেষ্ট বুড়া সেকথাটাও সত্যি বটে; আবার পাবলিক পারসেপশনেও তাই। একারণেই ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, যেন বুইড়া বাইডেন আগামী দু’বছর আরো খারাপ সরকার চালিয়ে শেষে সেই কারণেই না আবার আরেক বুইড়া ট্রাম্প – একেই না প্রেসিডেন্ট বানিয়ে নিয়ে হাজির করেন! অবশ্য মূল কথাটা এখানে আসলে আমেরিকান আম-মানুষের মধ্যে হতাশা, এক গণহতাশা এসে গেছে!  মানে সামনে আমেরিকানদের ভাগ্য বদলের কোনো আশা নেই – তাই খায়েশ হল একেই ঠীকঠাক করতে হবে; এটাই হল ইকোনমিস্টের মূল মেসেজ!

    আবার ইকোনমিস্ট আগেই ডিসক্লেমার করে বলে নিচ্ছে, ‘রাজনৈতিক দলকে পরামর্শ দেয়া এই পত্রিকার কাজ বা দায়িত্ব নয় [This newspaper does not usually hand out advice to political parties, but America’s sickly democracy requires urgent repair.]।’ এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে তাহলে যে ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেল ছাপানোর দরকার কী? তাই এর উত্তরে আগাম তারা বলে রাখছে, ‘আমেরিকার অসুস্থ গণতন্ত্র এর জরুরি মেরামত দরকার’ তাই এ বিশেষ ব্যবস্থা।

    তবে উপরে যে হতাশার কথা বলা হল সেটা অবশ্যই রেগুলার বা সাধারণ হতাশা একটা সমাজে যেমন দেখি তেমন বলে বুঝলে ভুল হবে। কেন?
    এর জবাব পাওয়া যাবে ইকোনমিস্টের কিছু আকার ইঙ্গিতে বলা পরের মন্তব্য থেকে।  যা আসলে বর্তমান আমেরিকান সমাজের অভ্যন্তরীণ গাঠনিক তন্তুতে দুর্বলতা ও নুন্যতম সামাজিক ঐক্যের অভাবে যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ছোট ছোট শিরোনাম আকারে ইকোনমিস্ট তা উল্লেখ বা একটা তালিকা করে বলেছে  যেমন – ১. “ডি-ফান্ড দ্যা পুলিশ” মুভমেন্ট [a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, ]; মানে হল পুলিশ যদি সমাজের ঐক্য ধরে রাখতে কাঙ্খিত ও প্রয়োজনীয় কর্তব্য পালন না করতে পারে তাহলে পুলিশ বাহিনীতে ফান্ড দেয়া বন্ধ করতে হবে – বলে গড়া এক সামাজিক আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে এখানে। এ ধরনের, অনেক আন্দোলনের কথা তুলেছে ইকোনমিস্ট। যেমন আরো আছে – ২। সীমান্তে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা কার্যকর না করে তুলে দেয়া বা ‘abolish immigration enforcement’; অথবা মেয়েদের জন্মদাত্রী মানুষ হিসেবে তুলে ধরার আন্দোলন [relabel women as birthing people]; অথবা ক্লাসরুম থেকেই ছাত্রদের অ্যান্টি-রেসিজম শেখানো (আসলে বলতে চাইছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তায় সমাজ ছেয়ে গেছে তাই এর বিরোধিতার কথা) ইত্যাদি। লক্ষ্য করার বিষয় এসব প্রতিটা দাবিই মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিরা তুলে থাকে এমন দাবি।

    “……a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, shun capitalism, relabel women as birthing people and inject “anti-racism” into the classroom……”

    আসলে সার কথায় অপ্রত্যক্ষভাবে ইকোনমিস্ট বলতে চাইছে, রিপাবলিকানরা একালে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারায় বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা তা থেকে ওঠা অসন্তোষকে উসকে দিচ্ছে। তাই ইকোনমিস্ট চাইছে ডেমোক্র্যাটদের এর বিরোধিতায় পাল্টা এথিকস, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কাজে উঠে আসতে হবে – এই হল ইকোনমিস্টের বাসনা। যদিও এমন আকাঙ্খা পূরণ হতে হলে এর  মূল  সমস্যা হল, বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?

    কারণ, খোদ বাইডেনই আরেক ধরনের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী [Colonial White Supremist Global Power হতে চায়] – যাকে হয়ত বলা যায় ‘গ্লোবাল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’। এই কায়দাতেই তিনি ইউরোপকে সাথে নিয়ে চীনবিরোধী এক আটল্যান্টিক জোট গড়তে নেমে পড়েছেন। বাইডেন তার “পশ্চিমা শক্তি” – ইউরোপ-আমেরিকা মিলে যে পশ্চিমা-মন, এই মনকে সুরসুরি দিচ্ছেন যে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে এসে গেলে গত পাঁচ-ছয়শ বছর ধরে দুনিয়ার উপর সাদা মানুষের শাসন যা এখন প্রান্তে এসে ঠেকেছে এই রামরাজত্ব উবে যাবে। একে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তাই যেন তারা চীনবিরোধী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট গড়ে লড়তে এগিয়ে আসে। এভাবেই পশ্চিমা-মনকে উস্কে সকলকেই তিনি এক বর্ণবাদি-রেসিজমের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি গ্লোবাল – এখানেই তিনি কেবল ট্রাম্প থেকে আলাদা। তাহলে  ডেমোক্কেরাট না রিপাবলিকান? কে কাকে নৈতিকতা শেখাবেন?

    তাছাড়া মূল সমস্যা তো এগুলোর একটাও নয়। আমেরিকান সমাজে অনৈক্য কেন?
    এর কারণ খুঁজবে কে?
    যেমন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে আছে। আর সেই থেকে নিজ সমাজে আমেরিকানরা যেসব আয়েসী জীবনের সুযোগ সুবিধার জীবনভর উপভোগ করে আর  সেই সাথে দুনিয়ার উপর মাতব্বরি করে এসেছে – এক চীনা অর্থনৈতিক উত্থানেই তা এখন এলোমেলো হয়ে গেছে। তবে এতে পুরনো আমেরিকান সমাজ যেন এর ধাক্কায় ধসে পড়বে তা তো হওয়ারও কথা ছিল না। যদি আমেরিকানরা বুদ্ধিমানের মত চীনের সাথে প্রয়োজনীয় পজিটিভ ডিল করে কিছু প্রয়োজনীয় রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট করে, মেনে নিয়ে এগিয়ে যেত। বৃটিশদের টপকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে যাওয়াতে তো সেই থেকে লন্ডন বসবাসের অযোগ্য শহর হয়ে যায় নাই!! তাই না!!  তাহলে?
    অথচ গত ছয় বছরে, না ট্রাম্প না বাইডেন কেউ চীনের সাথে সহবস্থান বা আপোষে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থান খোঁজার পথে যায় নাই, সেদিকে যাননি। বরং ঘুরেফিরে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের নেতা হয়ে উঠতে চেয়েছে। যেন এই বর্টাণবাদি রাস্তাটাই তাদের কেবল চোখে পড়েছে আর খুবই পছন্দ হয়েছে। এখন নিজ সমাজকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন। দুনিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারার ‘সীমাহীন লোভ’ তাদের চোখ-মুখে ঝিলিক দিয়ে গেছে, এখনো যাচ্ছে – বাস্তবে সব জায়গা থেকে নিজেরা হারিয়ে যাচ্ছেন এটা দেখার পরও।

    ফলে এখনকার আমেরিকান সমাজ হল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতি ‘সীমাহীন লোভ থেকে জাত’ এক  অনৈক্ক্যযের সমাজ; এটা অনৈক্য কে কাটাতে আসবে, কে পাড়বে? কারণ, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই রাজনৈতিক ধারাই এখন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের অনুসারি; কেবল, তাদের প্রকাশ ভিন্ন। এ অবস্থায় ইকোনমিস্ট প্রস্তাব করতে চাইছে ডেমোক্র্যাট দল কিছু এথিক্যাল দায়িত্ব পালন করুক।’ কিন্তু এটা কার্যত অসম্ভব! বরং আমেরিকান সমাজের খেয়াখেয়িই তাদের সমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সেই ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। যার মূল কারণ হচ্ছে আমেরিকান রাজনীতি এখন – ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – বলে বিভক্ত নয় বরং তা পিছনে ফেলে ক্রমশ  – কে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” আর কে এর বিপক্ষে – এই ভিত্তিতে দুইটা পক্ষ হয়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু তাতেও সংকটটা হল, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – দুইটা পার্টিই একে-অপরকে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপক্ষের দল বলে দেখাতে চাইছে। এটাকেই ইকোনমিস্ট “সামাজিক অনৈক্য” বলে দেখাচ্ছে।

    “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী” বাইডেনঃ
    সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন আসলে চীন ঠেকাতে  বেপরোয়াভাবে হলেও আরো বড় ধরনের এক ‘আমেরিকান যারা  “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী’ হতে রওনা দিয়েছেন। যেমন ধরেন,  বাইডেনের অপছন্দ যেকোন দেশের উপর খেয়াল-খুশিমত  “ডলার অবরোধ আরোপ” করা – এটা তো অপব্যবহার। আইএমএফ  জন্মের সময় (১৯৪৪) আমেরিকান ডলারভিত্তিক এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইএমএফ তো ছিল এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। ফলে আইডিয়ালি আইএমএফের পূর্ব-অনুমোদন সাপেক্ষে  একমাত্র কোন রাষ্ট্রের উপর আমেরিকার “ডলার অবরোধ আরোপ” করা সঠিক বা জায়েজ হত। কিন্তু বাইডেন ক্ষমতা অপব্যবহারকারি হতেই বেশি পছন্দ করেছে, বেপরোয়া হয়েছে! কিন্তু তাতে “অপব্যবহারকারিই হয়ে উঠেছে!

    আমেরিকান ডলার যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা, তা তো আসলে একই সাথে আমেরিকার-রাষ্ট্র এর ন্যাশনাল বা রাষ্ট্রীয় মুদ্রাও। জন্মের সময় নিরুপায় হয়ে এই টেকনিক্যাল ফাঁক থেকে গেছে বলে এর সুযোগ নিয়ে আমেরিকা যেকোন রাষ্ট্রের ওপর যা তার খেয়াল-ইচ্ছা, সে নিজ ডলারকে অবরোধ আরোপে হাতিয়ার বানিয়ে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। কাজেই আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, আগামীতে ডলারের বদলে অন্য যেকোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুল মুদ্রার জায়গা নিলে এর ‘কাফফারা’ তখন আমেরিকান ডলারকে দিতেই হবে।  আর আইএমএফ ভবিষ্যতে অবশ্যই পুনর্গঠিত করে নিতে হবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য তা করে নেয়া হবে নেয়া আইএমএফ অবশ্যই নতুন করে তখন গৃহীত যেকোন আন্তর্জাতিক মুদ্রার  উপর এই খেয়ালি অপব্যবহার বন্ধে শর্ত আরোপ করবেই। কাজেই বাইডেন এন্ড গং – এরা যতই অন্যান্য মুদ্রার রাষ্ট্রকে এখন অসন্তুষ্ট করবে ততই এখন থেকেই তারা ডলারকে এড়িয়ে এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাবেই। যার অর্থ বাইডেনের ডলার অবরোধ আসলে আমেরিকার স্থায়ী শত্রুর জন্ম দেয়াই হচ্ছে।

    বাইডেনেরই এমন আরেক অপব্যবহারের হাতিয়ারঃ
    আমাদের সরকার লুটপাটের সরকার করে, এতে জবাবদিহিতা নাই, জনপ্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা নাই; এগুলো সব ঠিক আছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে এটা এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে ক্রমেই ঝুঁকছে। ফলে প্রত্যেক দেশের অর্থনীতি টালমাটাল আর তাতে নিজ ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের অস্থিরতা ও সঙ্কটে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে সকলে –  আমরা আগেই ব্যবস্থা নিতে চাই বা বিপদে পড়ার পরে হলেও নিতে চাই – তাই আইএমএফের সাথে কথা বলতে চাই বলে ভাবতে শুরু করেছে। আসলে ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট হলে, আমাদের কেবল আইএমএফের তত্ত্বাবধান আর আইএমএফের ঋণের শরণাপন্ন হতেই হয়, এর বিকল্প নাই। বলা যায়, আমরা বাধ্য। কেন?

    কথাটা এভাবে বলা যায়, ধরা যাক  যদি ১০ বিলিয়ন ডলার হলে আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট মোচন হয় আর সেই অর্থ যদি আইএমএফ নয়, একা চীন থেকেই এনে নেই, তাহলেও আমাদের সঙ্কটমুক্তি ঘটবে না। কেন?

    এর মূল কারণ গ্লোবাল বাণিজ্য ও পুঁজিবাজারের অনাস্থা তাতে আমাদের অথনীতির উপর থেকে যাবে, তাই। যেমন এমনিতে চীন এখনো কমিউনিস্ট চীন। তাই চীনের যেকোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর হস্তক্ষেপ ঘটাতে কেবল চীনা সরকারের একটু ইশারাই যথেষ্ট বলে, গ্লোবাল লেনদেন জগতের বাণিজ্য বা পুঁজিবাজারের ধারণা। তবে  চীন ছাড়া অন্য অকমিউনিস্ট কোনো রাষ্ট্র এসব সাহায্য দিলেও তাতে বাজারের আস্থা আসবে কিনা বলা মুশকিল। তাহলে আস্থা কিসে আসবে? গত পঁচাত্তর বছর ধরে গ্লোবাল বাজারে আইএমএফ নিজের সম্পর্কে এই আস্থাটাই গড়ে তুলেছে বা নিয়েছে।  আসলে বাজার-বিনিয়োগে নিয়োজিত অর্থটা যার, একমাত্র  কেবল তারই আস্থায় আসতে হবে বাজারকে – এর কোনো বিকল্পও নেই। আর আপাতত বাজারের আস্থার একমাত্র প্রতিষ্ঠান হয়ে আছে আইওএমএফ, অন্য যেকোন বিকল্প প্রতিষ্ঠানের চেয়ে। এই হল বাস্তবতা!

    এখন আবার আইএমএফের সবচেয়ে বড় মালিক শেয়ারহোল্ডার আমেরিকা বলে এর ওপর আমেরিকার কর্তৃত্ব  সবার চেয়ে বেশি। এছাড়াও যেমন এখনকার বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যান তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়োগ দেয়া, প্রায় তারই নিজ দোস্ত-জিগার তিনি। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি তিনি পেশাদার বুরোক্রাট নন, রাজনৈতিক বিচারে নিয়োগপ্রাপ্ত। যদিও কোনো দেশের রাজনীতিতে ন্যূনতম হস্তক্ষেপ ঘটানো আইএমএফের ম্যান্ডেট অনুসারে খুবই গর্হিত অপরাধ। কিন্তু এর পরেও বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যায় মেরে ফেলার পরিকল্পক আইএমএফ, এমন রেকর্ড এর অভাব নাই।

    আর একালে আমরা ট্রাম্প-বাইডেনের আমলে দেখছি তারা (তাদের ভাষায় চীনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে) আইএমএফকে দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে অ্যাবিউজ বা অপব্যবহার করছে। যেমন বর্তমানের কারেন্সি মজুদ সঙ্কটে – কোনো দেশে আইএমএফ পুরনো সরকারের সাথেই সব আলাপ শুরু করছে, চুক্তির শর্তও ঠিক করছে, ইত্যাদি সবকিছু। কিন্তু চুক্তি সম্পন্ন করছে না। বরং উপস্থিত সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে – এটা বলাচ্ছে বা নিজেই বলছে। এতে আভ্যন্তরীণ ও বাইরে থেকে যৌথ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে সরকার ফেলে দিয়ে এরপর  নয়া সরকার না এলে চুক্তি করা বা পরে অর্থ ট্রান্সফার, কোনোটাই আইএমএফ করছে না। এভাবেই বাইডেনের ইচ্ছার বরকন্দাজ সেজে চলেছে আইএমএফ।  পাকিস্তানের ইমরান ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এলে ট্রাম্প তার উপরও একইভাবে আইএমএফ-কে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় গোটাবায়ে-কে ক্ষমতা ছেড়ে যেতে হল একইভাবে বাইডেনের আইএমএফ-কে ব্যবহারের কারণে। বাংলাদেশও একই ফাঁদে পড়ে গেছে বলে অনুমিত হয়। যদিও আমাদের সরকার ভাবছে ভারতীয় অরিজিন এমন আইএমএফের শীর্ষ  স্টাফদের মাধ্যমে তার কথা আগাচ্ছে ফলে গোতাবায়ের মত ভয়ের কারণ নাই। সরকারের এই অনুমান ভুল প্রমাণ হবার সম্ভাবনাই প্রবল!  মুল কারণ, আমরা আমেরিকার আইএমএফের মুরুব্বি হওয়াকে বাইডেনের অপব্যবহার – এই যুগে প্রবেশ করে ফেলেছি।

    এদিকে এবিষয়ে পাবলিক পারসেপশন আবার হাসিনার বিরুদ্ধে। তারা মনে করে হাসিনা অসহ্য এক টেরর ক্ষমতার মানুষ। ফলে বাইডেন  আইএমএফ-কে অপব্যবহার করলেও তাদের এখন এটা অনুমোদন করা উচিত।  তাদের এখন হাসিনার হাত থেকে মুক্তি দরকার, পরেরটা পরে!!!  এদেশের মত সরকারগুলোর প্রতি জনগণ অতিষ্ঠ থাকার কারণে এ অপব্যবহার বা হস্তক্ষেপের সুযোগটা বাইডেনের পক্ষে যাচ্ছে। যদিও এটা নিরেট বাইডেনের ক্ষমতার অপব্যবহার। তাই আজ বাদে কাল এই হস্তক্ষেপের ‘কাফফারা’ আমেরিকাকে  চুকাতে হবেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৬ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ অপূর্ণ থাকবে“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন বন্ড’

    শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’

    গৌতম দাস

    ১৬ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46k

    Sri Lanka To Default on Dollar Bonds.  GOTA GOTA YOU FAILED!  GOTA GOTA YOU FAILED!

     

    উপরের প্রথম ছবিটা বিবিসির এক ভিডিওও ক্লিপ রিপোর্ট থেকে নেয়া। যেখানে নারী বিক্ষোভকারিরা শ্লোগান তুলছে GOTA মানে “প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া – তুমি ব্যর্থ!”   শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া, তাঁর সরকার পরিচালনা বা ম্যানেজমেন্ট চরমভাবে ফেল করেছে। এক কথায় বললে তা মূলত ‘ইকোনমিক মিসম্যানেজমেন্ট’-এর কারণে। বাংলায় বলা যায়, অর্থনীতি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক দ্রুটি ও ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে এখানে। আর এতে এর ইমপ্যাক্ট মানে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এর যা প্রভাব সেটা কড়া মানসিক আঘাতের পর্যায়ের! কিন্তু কেন মানসিক অবস্থার দিকটা এত গুরুত্ব দিচ্ছি?

    সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন মানেই সবসময় তা একটি স্ট্রাগল; এক নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্যে থাকে এমন জীবন। সমাজের যত নিচের বর্গে মানুষে লড়াই ততই যেন নির্মম সে লড়াই! কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে এটাই এক প্রধান ও মারাত্মক প্রসঙ্গ! কেন?

    মানুষ তার জীবন-সংগ্রামের লড়াইগুলো কী হাসিমুখেই লড়তে পারে?? এটাই হচ্ছে মূখ্য প্রশ্ন! মানুষ অবশ্যই হাসিমুখেই তা লড়তের পারে কিন্তু কেবল এক শর্তে; সেটা হল এই যে, তাঁর এই লড়াকু জীবনের একটি শেষ আছে, এর অবসান আছে এবং তাহতে পারে এমন আশা আছে, ভবিষ্যৎ আছে – এই ইঙ্গিত চলতি লড়াকু জীবনে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। অর্থাৎ কষ্টকর জীবন-সংগ্রামে আশা আছে কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা? নাকি কোন শেষ নাই ফলে ভবিষ্যতই নাই – এমন নয় তো!!! একদিন এই কষ্টকর জীবন শেষ হবে এক নয়া ভোর আসবে – এটুকু দেখতে পেলেও কেবল মানুষ সব কষ্টের জীবন বাইতে রাজি থেকে যায় – না থাকলে অবশ্যই আত্মহত্যার কথা ভাববে! এমনকি চরম কষ্টের জীবন যার আরেক বটম লাইন হল, নিজ প্রজন্ম তো গেছেই – লড়তে লড়তেই এটা শেষ হয়ে যাবে দেখা যাচ্ছে; মানুষ নিজের সেই জীবন ও প্রজন্মও বাজি ধরে লড়তে লড়তেই শেষ করে ফেলতেও রাজি হয় – কিন্তু কেবল এক শর্তে। সেটা হল, এই নিজ প্রজন্ম বিলিয়ে দেয়ার বিনিময়ে হলেও যেন তার পরের প্রজন্ম থেকে, মানে নিজ সন্তানদের প্রজন্ম থেকে তাদের যেন আর অন্তত আর না খেয়ে থাকতে হয়। এই হলো সেই ন্যূনতম আশা; আর এটাকেই সে নিজ লড়াকু জীবনের ভবিষ্যৎ আছে বলে মানে। ইংরেজিতে এটাকে সাবসিস্টেন্স লেভেল [subsistence level] মানে কেবল বেঁচে থাকা ও অস্তিত্ব ধরে রাখার লড়াই হিসেবে দেখা হয়; অর্থাৎ ন্যূনতম অস্তিত্ব ধরে থাকতে পারবে, এ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আর অন্তত এটা ক্রমশ ভালর দিকে পরিবর্তিত হতেই হবে – এটাই সেই প্রণোদনা বা এই বোঝাবুঝির মৌলিক-বুঝ। নিম্নবর্গের মানুষকে এ নিশ্চয়তাটুকু দিতে হয়, এই আশার বাতিটুকু যেন না নিভিয়ে দেয়া হয় সে দিকে রাজনীতি ও সরকারকে খেয়াল রাখতে হয় – এটাই সাধারণ মানুষের এজীবন সমাপ্ত করে এথেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ। সেটাই  একটা ন্যূনতম বুদ্ধিমান সরকারের লক্ষণ যে এদিকটা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল এবং বাস্তব বোধবুদ্ধিসম্পন্ন! তাই নিচের ছবিতে আমরা দেখব এই মেয়েতা বলছে আজ আমার জীবনের আর কোন কোন ভবিষ্যত নাই [……at this point I don’t see any future]। অর্থাৎ যেন আত্মহত্যার পুর্বাবস্থায় পৌছে গিয়েছে তরুণী মেয়েটা! তাঁর পুরা বক্তব্য হল,

    “As a young person may be about seven months ago, I would have said I have a future here but at this point I don’t see any future here” – নিচের ছবির তরুণী মেয়েটার বক্তব্য এটা। যারা ভিডিওও লিঙ্ক চান, এখানে খুলে দেখতে পারেন। 


    দুঃখের বিষয়, শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার সরকার এই ন্যূনতম যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। তাই নিজেই হেরে গেছেন। আর এতে স্বভাবতই ফলাফলে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষকেও তাদের নিজ নিজ জীবন সম্পর্কে পুরোপুরি হতাশ করে দিয়েছে। বেঁচে থেকে জীবন সংগ্রামের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। এ নিয়ে বিবিসির এই শিরোনাম এক টিনএজ তরুণী বলছে, ‘আমি অল্পবয়সী তবু এখন এখানে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখি না।’ অথবা রান্নার গ্যাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো মানুষ হঠাৎ আর্তনাদ করে বলছে, ‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের চাইলে বাঁচাতে পারে।’ এসবই হল – জীবনের আশার বাতি নিভিয়ে দেয়ায়  কঠিন সব খেদোক্তি!!

    এই হলো এখনকার শ্রীলঙ্কান জীবনের সাধারণ ও কঠোর বাস্তবতা! গত সোমবার ৯ মে এর সারা দিনে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত গণসন্তোষ-বিক্ষোভে এক সিটিং সরকারি এমপিসহ মোট আটজন নিহত হলেন। সিএনএনের ভাষ্যমতে, ৩৮ জন রাজনীতিবিদের বাড়ি তারা পুড়িয়ে দিয়েছে। আর স্থানীয় লাইভ টেলিভিশনে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে যে, ‘সরকারি দলের সংগঠিত গুণ্ডারা লাঠিসোটা আর বুলেটের অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাজধানীর কয়েকটি স্থানে প্রথমে চড়াও হয়েছিল। সরকারের অনুমান ছিল, এসব বিক্ষোভ শক্তহাতে দমন না করে সামলালে তাদের জন্য বিপদ হবে। কিন্তু এতেই ঘটনা ঘটে উল্টা অর্থাৎ সরকার যে মানুষের জীবনের সব আশা কেড়ে নিয়েছে, এসব দিকে সরকারের খেয়াল ছিল না। আর এতেই আরো বিক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষেরা প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি নেতাদের বাসায় বাসায় গিয়ে হামলা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসা ছেড়ে এক নৌঘাঁটিতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। আর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের করার চেষ্টা করেন।

    তামিল-সিংহলি দ্বন্দ্বঃ
    শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক বড় দীর্ঘ দিনের অসন্তোষের ইস্যু হল, দেশের প্রধান এথনিক জনগোষ্ঠী সিংহলিদের সাথে জনসংখ্যার প্রায় ১৮%  [২০১২ সালের সরকারি গণনার হিসাবে, যা বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে তবে ১৯৮১ সালের হিসাবে যা ১৫% ছিল]। এই তামিল এথনিক জনগোষ্ঠী যাদের প্রায় ১১% শ্রীলঙ্কার স্থানিয় আর বাকিরা ভারত থেকে মাইগ্রেটেড তামিল।   স্থানীয়ভাবে তামিলেরা  মূলত শ্রীলঙ্কার উত্তরে ও পুবে বসবাস করে। মনে করা হয়, যারা মাইগ্রেটেড ব্রিটিশ আমলে এরা চাবাগান ইত্যাদিতে অগ্রসর ও দক্ষ শ্রমিক বলে তাদের ভারতের তামিলনাড় (পুরানা মাদ্রাজ) – থেকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলেও  তামিলনাড়–র থেকে আসা তামিলরা স্থায়ী হয়ে শ্রীলঙ্কায় থেকে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সিংহলিদের সাথে চেয়ে তামিলদের সাথে নাগরিকবৈষম্য বেড়ে গেলে সশস্ত্র রাজনীতির এলটিটিই [LTTE] গোষ্ঠীর জন্ম হয়। কিন্তু লম্বা ২৬ বছরেও কোনো আপস-সমাধান না আসায় বা অনেকের চোখে এ আন্দোলন সশস্ত্রতাতেই থেকে যাওয়ার আগ্রহ সীমাহীন ছিল বলে এটা কোনো সমাধানের চেয়ে যেন আজীবন সঙ্ঘাত চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত তৈরি করেছিল। ফলাফলে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনী সশস্ত্র বলপ্রয়োগে আক্রমণ শুরু করলে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছারখার হয়ে যায়। আর সেটা ছিল মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারের আমল। তাই অনেক মনে করেন, সেই থেকে জাতিবাদী বীরের অহং তৈরি হয়েছিল মহেন্দ্র রাজাপাকসের পরিবারকে কেন্দ্র করে। যেমন এখন যিনি শ্রীলঙ্কা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে তিনি পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র-এর আপন ছোট ভাই। এই পরিবারের মহেন্দ্র-ই প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ২০০৯ সালে, যার বাবা কেবল একজন এমপি ছিলেন।   আর পরে এভাবে ২০১৯ সাল থেকে  নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন মাহিন্দার ছোটভাই গোটাবায়া। আর এরপর থেকে আস্তে আস্তে তাঁর সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের অন্তত ২০ জন সদস্য মন্ত্রী বা এমপি হয়ে নানা পদে জড়িয়ে ছিলেন। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কান রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি, তা অনুমান করা কঠিন নয়; যদিও এদিকটা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবিসির এক রিপোর্টের শিরোনাম হলঃ  শ্রীলঙ্কার সঙ্কট : যুদ্ধবিজয়ী বীরেরা কী করে ভিলেন হয়ে গেলেন [Sri Lanka crisis: How war heroes became villains]??

    এখান থেকে আরেকটু অনুসিদ্ধান্ত টানা যাক। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা গণ-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করার পরে আগেই উঠা প্রেসিডেন্ট ও ছোট ভাই গোটাবায়ার পদত্যাগের পাবলিক ডিম্যান্ড বা দাবি এখন আরো জোরদার হয়েছে। এরই মধ্যে গোটাবায়া তাদের দলীয়, আগে পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। যদিও তিনি বিরোধী দলীয়  এখন এক এমপি মাত্র ছিলেন কিন্তু তাকে রাজাপক্ষে পরিবারের ঘনিষ্ট মনে করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হয়েই বিবিসিকে তিনি বলেছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে গেছে [……PM described the Sri Lankan economy as “broken]। তাই তিনি পাবলিকের কাছে আহবান রেখেছেন “ধৈর্য ধরতে, তিনি সব কিছু ভালো জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন” [“be patient, I will bring things back”.]”। কিন্তু তিনি কি সেই সুযোগ পাবেন?

    ওই সাক্ষাৎকারে তিনি কোনো আশা জাগাতে পারেননি। নিজেই এমন শঙ্কা ব্যক্তও করেছেন। বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক অবস্থা আবার ভালো হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই না আরো বেশি খারাপ হয়ে যায়” […… misery and unrest is “going to get worse before it gets better”.]”। এরই প্রতিধ্বনি যেন পাবলিক ডিম্যান্ডে যে গোটাবায়াকেও পদত্যাগ করতে হবে।

    শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বাস্তব অবস্থাটা কীঃ
    এক কথায় এর জবাব, এই অর্থনীতির এক ব্যাপক সংস্কার করতে হবে এবং কমবেশি সবাই মানেন যে, আইএমএফের [IMF] হাতেই এই সংস্কার হলেই ভাল। অনেক এটাকে নয়া ঋণ গ্রহণের সাথে পরিশোধেরও কাঠামোতে বদল আনা বলছেন। এক পেছনে মূল কারণ হল, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (প্রধান পণ্য উৎপাদন চা-সহ) কোম্পানিগুলোর বড় একটা অংশ বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানায়। মানে পুরানা দিন থেকেই স্থানীয় ব্যবসায় বিদেশী নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। সোজা কথায় এতে অর্থনীতির বৈশিষ্ঠ হবে – শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে প্রডাকটিভ ক্যাপিটালের (উতপাদক পুঁজি) চেয়ে বিনিয়োগ ক্যাপিটালের ()ইনভেস্টমেন্ট বা সুদী পুঁজির) ভুমিকা ও এর প্রভাব অনেক বেশি ও তা ডমিনেটিং হয়ে আছে। এছাড়া এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক বড় ফ্যাক্টর – সভরেন বন্ড [Sovereign Bond] !!

    সভরেন বন্ড কীঃ
    ইংরেজি সভরেন [sovereign] শব্দের আক্ষরিক অর্থ সার্বভৌম। কিন্তু অর্থনীতিতে সভরেন শব্দ ব্যবহার হয় একটু ভিন্ন অর্থে। এখানে সভরেন মানে ‘রাষ্ট্র নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছে’ এ ধরনের। কিন্তু ঠিক কিসের গ্যারান্টি? সে প্রসঙ্গে যাবো।

    সাধারণত ‘বন্ড’ বলতে তা সরকারি সিল-ছাপ্পড় মারা এবং যা এক কাগুজে “নোট” [note] লিখে দেয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর এই শব্দের মূল অর্থ একটা নোট লিখে দিয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়া।  কিন্তু সভরেন বন্ড, একসাথে শব্দদুটা কথার মানে হল, কেউ নিজ অর্থ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের সভরেন বন্ড কিনতে পারে। এর বিশেষত্ব হলো এর ম্যাচুরিটি মানে পাঁচ বছরের বন্ড হলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া শেষে এর সুদসহ আসল অর্থটা ঐ রাষ্ট্র বন্ড ক্রেতাকে ফেরত দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আর স্বভাবতই এই সভরেন বন্ডের বেলায়, এটা কোনো ব্যক্তি বা প্রাইভেট কোম্পানির ইস্যুকৃত ও বিক্রি করা কোন বন্ডে দেয়া গ্যারান্টির চেয়ে খোদ রাষ্ট্রের নিজের দেয়া গ্যারান্টির ওজন ও আস্থা পাবলিকের কাছে অনেক বেশিই হবে।

    এই বিচারে কোনো সরকারের ইস্যু করা ‘ডলার সভরেন বন্ড’ (International Sovereign Bond – ISB) মানে, বৈধ আমেরিকান ডলার খরচ করে যে বন্ড কিনতে হবে – এমন বন্ড (ইস্যু করে) ছেড়ে সরকার নিজ প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড়ের এক সহজ উপায় বলে একালে মনে করা হয়। যদিও এটা অনেক রিস্কি একটা পদক্ষেপ। তবে এটা আমেরিকার মত বড় ও প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির দেশের বেলায় গ্লোবাল পুঁজিবাজারে আমেরিকান সভরেন বন্ড যথেষ্ট আস্থাবাচক – এক বন্ড কেনা ও বেচার ব্যবস্থা – তা বুঝা যায়। যেমন জাপান ও চীন এদের একেক দেশ, এখন আমেরিকার এমন এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সভরেন বন্ড এখনো কিনে রেখেছে। কিন্তু বলাবাহুল্য বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সরকার যদি অমন সভরেন বন্ড ইস্যু করে থাকে তবে তা একই মাত্রার আস্থাবাচক  বা ওজনদার হবে না।

    তবে বাস্তবে বাংলাদেশ কখনোই এমন সভরেন বন্ড ইস্যু বা চালু করেছে বলে জানা নেই যদিও চলতি সরকারের আমলেই সময়ে এমন কিছু বিক্ষিপ্ত আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর প্রতিশ্রুত সুদাসল  পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকারের অপারগতা। বলে, অনেক ইন্ডিপেনডেন্ট রিপোর্ট অথবা সিএনএন, বিবিসিসহ শ্রীলঙ্কার স্থানীয় মিডিয়াতেই মানা হয় যে, শ্রীলঙ্কান সভরেন বন্ডের সর্বশেষ সুদ ফেরত দেয়ার তারিখ ছিল গত ১২ এপ্রিল ২০২২।

    কিন্তু  শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর দেয়া প্রতিশ্রুত সুদাসল পরিশোধে শ্রীলঙ্কান অর্থনীতির  অপারগতা!

    সরকার নিজেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে তারা এই অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে; পারছে না – রেডি নয় বলে অপারগতা জানায়। আর তখন থেকে গ্লোবাল পুঁজি বাজারে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ও সরকার ডুবে যাচ্ছে এখবর আর লুকানো না থেকে চাউর হয়ে যায়। তবে এসব কথা কেবল গত এপ্রিল ২০২২ এর নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসেও একইভাবে (ISB) এর পাওনা পরিশোধ করতে শ্রীলঙ্কা সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও তখন শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি যে সংকটের কথা স্বীকার করা হয় নাই।এনিয়ে তখনকার আলজাজিরার রিপোর্ট এখানে।

    The government is due to make a $36 million interest payment on a 2023 dollar bond April 18, as well as $42.2 million on a 2028 note, Bloomberg-compiled data show. A $1 billion sovereign bond was maturing July 25.

    এটা ছিল ভারতের এক মিডিয়া  বিজনেস স্টান্ডার্ড এর রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু অংশ।
    আর সেবার এপ্রিলের ব্যর্থতায় আরো বলা হয়েছিল জরুরি খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ ইত্যাদি আমদানির অর্থ না থাকাতে তারা তখনই আর নিজ বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার খালি করতে চাইছেন না। কিন্তু কার্যত এটা দাঁড়িয়ে যায় যে, সরকার একদিকে আইএসবি বন্ডের পাওনা শোধ করেনি আবার প্রয়োজনীয় জরুরি দ্রব্যাদিও সব আমদানি করতে পারেনি। ফলে জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও খাদ্যশস্য এমনকি স্কুলের পড়ালেখার কাগজ ও ওষুধও পর্যাপ্ত আমদানি করতে পারেনি বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে। মুল কারণ চাহিদার তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রা ছিল অনেক কম।  আর একবার এমন সাপ্লাইয়ের অভাবের কথা বাজারে রটে গেলে আমদানি-সাপ্লাই দ্বিগুণ করেও বাজার থিতুতে আনা যায় না। কালোবাজারি-মজুতদারি হয়ে যায় বাজারের মূল ফেনোমেনা। আর এথেকেই সেটাই শ্রীলঙ্কার সমাজ ও অর্থনীতিতে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠার অবস্থা সৃষ্টি করেছিল।

    বৈদেশিক বন্ড বা ISB প্রসঙ্গে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমাদের মত দেশে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক বা চীনা বা অন্য কোনো দেশের ঋণ নেয়ার চেয়ে ISB  ইস্যু করে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ডলার জোগাড় করা – এদুটার মধ্যে কোনটা ভাল? অথবা দুটোর ভালো-মন্দ কী? বিশেষজ্ঞরা আমাদের মত দেশের বেলায় বন্ড বা ISB ইস্যু করাকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, তুলনায় অবকাঠামো (বিশ্বব্যাংক বা চীনের মতো দেশ থেকে) ঋণ নেয়াকে ভাল মনে করে। এর পিছনের কারণ বলা হয়, অবকাঠামো প্রকল্প বাজেটে বরাদ্দ (ডলার মুল্যে) যেসব অর্থ অন্তত স্থানীয়ভাবে কিনতে বা ব্যয় করতে হবে; যেমন, স্থানীয় শ্রম কিনতে হবে হয়ত অথবা সিমেন্ট বা রড ধরনের কাঁচামাল ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য বা প্রকল্পের জন্য একোয়ার [acquire] করা জমির মূল্য পরিশোধ – এসবের তুল্য সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যা বাজেটে বরাদ্দ থাকে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রাপ্ত  স্থানীয় মুদ্রা ওই প্রকল্প নিজ অ্যাকাউন্টে তা জমা করে নেয়। এরপর সেখান থেকে ঐ টাকা স্থনীয় ক্রয়ে ব্যয় করা হয়। এতে ব্যয়িত ঐ বৈদেশিক মুদ্রাকে রাষ্ট্রের অর্থনীতি রাষ্ট্রের  বৈদেশিক মুদ্আরা আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকে। আর তুলনায় বন্ড- ISB ইস্যু করে বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করলে তা সুদসহ আসল এর সবটাই আবার ডলারে ফিরে পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে বন্ড- ISB ইস্যুর চেয়ে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে প্রকল্প উৎসাহের বিষয় বলে গণ্য করা হয়। দেখা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কা এসব বাছবিচার বিবেচনাকে আমল না করে এগিয়ে চলতে গিয়ে বন্ড- ISB ইস্যু করা অনেক সহজ কাজ মনে করতে গিয়ে আজ বিপদে পড়েছে! এটা অবশ্যই বেপরোয়া আচরণ!

    আসলে যারা বন্ড- ISB কিনেছিলেন তাদেরকে প্রদেয় এপ্রিল ২০২২ এর কিস্তির অর্থ দিতে ব্যর্থতা ছিল সবচেয়ে বড় ঘন্টা বেজে যাওয়া যে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি বিশাল সংকটে পড়ে গেছে। অথচ এথেকে দেশকে বের করার মত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে গোটাবায়া সরকার ছিল ততোধিক উদাসীন। যেন সরকার আরামে অপেক্ষা করছিল যেন এক মিরাকল ঘটবে আর অর্থনীতির এই মারাত্মক সংকট মুহুর্তেই সমাধান হয়ে যাবে। অথচ ব্যাপারটা মোটেই তা ছিল না। ফলে সরকার এসব সংকটকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে নাই বা সংকটটারই গুরুত্ব আমল করতে সক্ষম ও যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। আর এটাই মূল ব্যর্থতা।

    সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে এথেকে উদ্ধার পেতে গেলে সেই সমাধানের ব্যাপারে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর গ্লোবাল বাজারের আস্থা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি মনে করা হয়। যেমন গত ফেব্রুয়ারি থেকেই শ্রীলঙ্কান অর্থনৈতিক রেটিংয়ের ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এমন অন্তত দু’টি প্রতিষ্ঠান শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে খারাপ রেটিং দেয় বা রেটিং নামিয়ে দিয়েছিল। এর সোজা ফলাফল হল, বিদেশীরা এই রেটিং দেখেই কিন্তু বন্ড-ISB  বা কোনো দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে আসে। এসব কারণে, যখন গ্লোবাল বাজার দেখে যে, একটা দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটে ফাইনালি আইএমএফ এসে ঐ দেশকে উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করছে কীনা??? এটাই গ্লোবাল পুঁজি বাজারে সবার কাছে এক আস্থার চিহ্ন ছড়িয়ে দেয়। অতএব, সে কারণেই সবাই এখন তাকিয়ে আছে আইএমএফের সাথে শ্রীলঙ্কা সরকারের যে কথা-নেগোশিয়েশন চলছে গত ফেব্রুয়ারি থেকে, তা কবে এথেকে তা একটা চুক্তিতে তা পরিণতি ও সম্পন্ন হতে সমর্থ হয়!!  যার ব্যবহারিক অর্থ, শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি উদ্ধারে আইএমএফ তার কাজ শুরু করে!

    উপরে যে সভরেন বন্ডের কথা বললাম, যা পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকার এখন বিনিয়োগকারিদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারি [defaulter] হয়ে আছে – এই অর্থ পরিশোধ করবে কী করে? কার থেকে আবার অর্থ ঋণ করে এনে? এই বাস্তবতাটা এতই কঠিন যে একমাত্র আইএমএফ-ই [IMF] হতে পারে সেই সম্ভাব্য উতস।  এক রিপোর্ট ধারণা দিচ্ছে যে শ্রীলঙ্কাকে এক্ষণি পরিশোধ করতে হবে এমন অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার [……Sri Lanka’s external debt servicing obligations were thought to be over USD 6 billion.]।  আর এত বিশাল পরিমাণ অর্থ একমাত্র  আইএমএফ-ই যোগাতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা বাজারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে!

    যদিও এসবের মধ্যে আরেক বড় জটিলতা হল, ঐ দেশের চলতি রাজনৈতিক অবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া, তাঁরও পদত্যাগ বিনা কোন নুন্যতম রাজনৈতিক স্থিরতা আসছে না। যার অর্থ আইএমএফ তা হলে কি পরবর্তি নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে? সোজা কথা, গোতাবায়া যতই নিজের পদত্যাগে দেরি করবেন ততই আইএমএফ সংস্কার কাজে নামতেই দেরি করবে! বলাবাহুল্য এর মানে শ্রীলঙ্কা আরো দীর্ঘসময় ধরে চলবে চরম বিশৃঙ্খলা!! অথচ ঘটনা সে দিকেই যাচ্ছে। একদিকে বাজারে খবর হল, নতুন শপথ নেয়া প্রধানমন্ত্রী রনিলকে গোতাবায়ার লোক মনে করা হয়। অর্থাৎ তাই দেশের মানুষেরই আস্থা নাই। ফলে এদের সবার পদত্যাগ না দেখলে নয়া রাজনৈতিক ঐক্য আনা ও সংস্কার কার্যকর করতে এগিয়ে আসা সব পিছিয়ে অনিশ্চিত হয়ে যেতে থাকবে!!!।

    চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার কী খবরঃ
    শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থা নিয়ে যেসব সিরিয়াস মিডিয়া রিপোর্ট করছে এদের মধ্যে যেমন ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা বিজনেস স্টান্ডার্ড ইত্যাদি আছে – সব মিলিয়ে এরা কেউই এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্য শ্রীলঙ্কা ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ পড়েছে বলে কোন কারণ দেখায় নাই। মানে এসব মিথ্যা তথ্যের প্রপাগান্ডা করেনি। বরং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা ব্যাখ্যামূলক [Explained] রিপোর্ট করেছে। এখানে দেখেন,……Explained: What led to Sri Lanka’s economic crisis, and who’s is helping?। তাতে স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণের (সেটা নাকি ৫১ বিলিয়ন ডলার বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে – Sri Lanka announces default on all of its $51 billion external debt )। কিন্তু এই কথাটা সবটা সত্য না। ৫১ বিলিয়ন ডলার – এটা সবটাই প্রতিশ্রুতি ফেল করা ঋণ যেটাক্বে ডিফল্টার (default) বলে টঝিক তা না। একটা দেশের নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণ আর  সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডলার যোগাড় একই জিনিষ নয়। মূলত সভরেন বন্ড জিনিষটা ঋণ নেয়াই নয়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বা চীন জাপান থেকে নেয়া ঋণের বেলায় সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে পারার পরিণতি হল – পুনরায় পরিশোধের সময় দেয়া [রিসিডিউল বা reshedule] তবে সাথে আরো কিছু কড়া শর্তে। কিন্তু ডিফল্টার করে বাজারে খবর রটিয়ে ঐদেশের রেটিং বা অর্থনীতির মান ফেলে দিয়ে নয়।  আর সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি ফেল করা অন্য জিনিষ। এখানে রিসিডিউলের কিছু নাই। যতদ্রুত সম্ভব সব পাওনা দেরির সুদ-সহ পরিশোধ করা। নইলে গ্লোবাল পুঁজি বাজারের বদনামে রেটিং আরো নিচে নেমে না দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়।
    কিন্তু এই ৫১ বিলিয়ন ঋণ দেখানো এটা সবটাই সভরেন বন্ডের ডিফল্টার বা প্রতিশ্রুতির অর্থ নয়। এটা শ্রীলঙ্কার পরিশোধযোগ্য মোট বৈদেশিক দায়। দায় মানেই তা ঋণ নয়। আর এই মোট ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের হল সভরেন বন্ড-ISB ইস্যু করে নেয়া বৈদেশিক দায়। তাই টাইমস অব ইন্ডিয়া পরোক্ষে এমন মানে করে রেখেছে (যেটা আসলে একটা প্রপাগান্ডা) যেন এই ৫১ বিলিয়ন ডলারের পুরোটার ওপর ডিফল্টার হওয়াতেই যেন শ্রীলঙ্কার ক্রাইসিস। এ কথা সত্য নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, বন্ডের ক্রেতার দায় মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের আর এসব বন্ড যারা কিনেছে এরা হলো প্রধানত জাপান, চীন ও এডিবি সাথে কিছু খুচরা বিনিয়োগকারী [ISBs make up the largest share of Sri Lanka’s foreign debt at $12.55 billion, with the Asian Development Bank, Japan and China among the other major lenders.]।

    এর সোজা মানে হল, চীনের কোনো ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদে পড়ার গল্প এটি নয়। এটা সোজাসাপ্টা বন্ড-আইএসবি ইস্যু করার বাজার থেকে অর্থ তুলে আনার বোকামি, এটাই মিস-ম্যানেজমেন্ট এবং বন্ড ক্রেতাদের কিস্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতায় বাজারে খারাপ ইমেজ আর খারাপ অর্থনীতি আর তা মিস-ম্যানেজ বা ভুল পরিচালনাজনিত সমস্যা।

    কিন্তু তবুও ভারতেরই আরেক দল মিডিয়া (যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম আলো বা নিউএজ যারা হয়ত না বুঝে প্রপাগান্ডার শিকার) – এরা শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকটকে চীনের ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদ বলে পুরোনা স্টাইলের প্রপাগান্ডার মধ্যে এখনো আছে ও চালিয়ে যাচ্ছে। আর এদের মিথ্যা প্রপাগান্ডার ভিত্তি এএফপির নামে চালানো এক রিপোর্ট। যে একই রিপোর্ট টাইমস অব ইন্ডিয়া,  ভারতের   এনডিটিভি,     আমাদের প্রথম আলোর অনুবাদ আর নিউ এজ সহ আরো অনেকে তুলে এনেছে। মজার কথা হল শিরোনাম এবং খবরের একই সোর্স হলেও তাতে ভিতরে বডিতে কনটেন্ট সবার এক না।   আর এদের সবার মধ্যে কেবল এনডিটিভি একটা ডিসক্লেমার জুড়ে দিয়ে শেষে জানিয়েছে (This story has not been edited by NDTV staff and is auto-generated from a syndicated feed.)।অর্থাৎ তারা কোন শব্দও এতে ঢুকায় নাই।

    এ ছাড়া একই প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে ভারতের আইপি টিভি (প্রথম কলকাতা) বা সোশ্যাল মিডিয়া টিভি অথবা ফেসবুক ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি, এসব জায়গায় গেঁথে বসা প্রপাগান্ডা ধারণাটা হল, সেই পুরানা গল্প – চীনা ঋণের কারণেই শ্রীলঙ্কা অর্থনীতির আজ এ দুর্গতি। অথচ এটা ভিত্তিহীন।
    আর সবচেয়ে বড় কথা, ওই হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরের মালিকই এখন আর শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। তাই ওটা নির্মাণের ব্যয় পরিশোধের কোনো দায় বা ঋণের বোঝা শ্রীলঙ্কান সরকারের নয় ও নাই। সোজা কথায়,  এখন বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। ওর মালিক এখন চীনের এক প্রাইভেট কোম্পানি যারা বন্দর চালিয়ে নিজের আয় থেকে দায় তুলে নেবে ও নিচ্ছে। ফলে ওই বন্দর নির্মাণ খাতের কোনো ঋণ শ্রীলঙ্কা সরকারকে বইতে হচ্ছে না ও নাই; ওই বালাই-ই নেই এই হলো বাস্তবতা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৪ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জীবনের ভবিষ্যৎ আছে, এ আশা কেড়ে নিতে নেই“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

    –