Tag: ভারত

  • যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    গৌতম দাস
    ০১ মে ২০২২, ০০:০৮  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-444

    –

         If China’s Economy Falls, Ours Will Too

           Dependence on China shrinks the US economy in Q1

    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ কথাটার মানে হল, এমন এক অবস্থা ও সিস্টেমের মধ্যে বসবাস যখন, মূলত আন্তঃরাষ্ট্রীয়ভাবে সব রাষ্ট্রের সাথে সবার এক ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলাই সেই গ্লোবাল সমাজের বৈশিষ্ঠ। দুনিয়াতে বাণিজ্য নতুন না অবশ্যই। তাই অনেকের মনে হতে পারে এই গ্লোবাল বাণিজ্য তো দুনিয়াতে সব সময়ের মতই এখনও আছে। কিন্তু সরি, তবু এ’কথাটা সত্যি না। বাণিজ্য বলতে আসলে দুটো মেজর ভাগ আছেঃ এক. কোন রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বাণিজ্য, অপরটা বা দুই. রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য। কেন এই ভাগের কথা বলছি? বাণিজ্য বলতে একটা আগাম-দরকারি [pre-requisite] শর্ত হল, বাণিজ্য ঘটতে হলে আগাম যার উপস্থিতি দরকার সেটা হল মুদ্রা [currency]। তাই বাণিজ্য ও মুদ্রা কার্যত সমনামীয় শব্দ। এখন মুদ্রা যে প্রচলন করত সেই অথরিটি হল সেকালের রাজা আর একালের ভাষায় রাষ্ট্র। আর কোনো দেশের মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা কেবল ঐ রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটাকেই তাই প্রথম ধরনের বাণিজ্য বলছি।

    এখন দ্বিতীয় ধরন মানে আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য যেটাকে বলে, এটা পরিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে মাত্র এই তো সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন ও ১৯৪৫ সালে এদের কার্যক্রম চালুর পর থেকে। মানে মাত্র ৭৭ বছর আগে থেকে। আর এখানে একই মানে কোন কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রা একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনেরও মুদ্রা হিশাবে ব্যবহৃত হয় তবে সেক্ষেত্রে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দ্বারা অনুমোদিত থাকতে হয়।  তাহলে কি এর আগে (১৯৪৫ সালের আগে) গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কিছু ছিল না? ‘ছিল না’ বলার মতই। মানে ছিল তবে খুবই সীমিত পর্যায়ে আর সেটাও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া থেকেই এই সীমিত বাণিজ্য ব্যবস্থাটাও চিরদিনের মত অকার্যকর হয়ে যায়। এছাড়া ঐ সীমিত বাণিজ্য মানে যা হারিয়ে যাওয়া সেকালের অর্থনীতির মূল তৎপরতারও ছিল খুবই তুচ্ছ এক অংশ। মূল প্রধান ধারার অর্থনীতি তা ছিল না। এছাড়া তা ছিল এক পরিবারের প্রাইভেট ব্যাংকের উদ্যোগ। রথশিল্ড ব্যাংক (Rothschild) যাকে ফ্যামিলি ব্যাঙ্কিং ডায়নেস্টি বলা হয়,  তা ইউরোপে ১৭৪৪ সাল থেকে ১৯১৪, এই সময়কালে ততপর ছিল। যদিও এনিয়ে কমিউনিস্ট প্রপাগান্ডামূলক ষড়যন্ত্রতত্বে লেখা প্রচুর ‘রহস্য’ ছড়ানো মুখরোচক আর্টিকেল অনলাইনে পাওয়া যায়। যেগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি খুব জরুরি কিছু না।  তবু এক পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে হলেও এই সীমিত বাণিজ্যও বা  কেন এমনভাবে তা চালু ছিল? অথবা অন্যভাবে বললে সেকালের ইউরোপে ব্যাপক কোন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় ছিল না কেন?

    কলোনিদখল ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিঃ
    এর মূল কারণ, সেকালে মানে ১৬০৭-১৯৪৫ সাল এই প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে চালু দুনিয়াটা ছিল কলোনি দখলদারদের যুগ। অর্থাৎ  আমাদের মত দেশকে কলোনিদখল করা – এই ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিক ততপরতা ছিল। যদিও এটাকে এই প্রথম ইতিহাসের রাজতন্ত্র ছেড়ে “রিপাবলিক” [republic] বা জন-রাষ্ট্র গড়ার যুগ বলে প্রশংসিত। তবুও এর সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল ওমন নব-রাষ্ট্রগুলোর প্রধান অর্থনীতি বলতে তা ছিল জাহাজে বিনিয়োগ আর সেই জাহাজ বেয়ে কলোনিদখল করে বেড়ানো। সোজা ভাষায় অন্যের দেশ দখল ও তার সম্পদ লুটে নিজ দেশে আনা। মানে সে সময়কালে  স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে ছিল ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি দখলদার দেশ (বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, পর্তুগীজ ও স্পানিজ) আর বেশির ভাগই এদের কারো না কারো কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ। আর এর ব্যতিক্রম হিসাবে ছিল রাশিয়ান জার বা অটোমান সাম্রাজ্য ধরনের কিছু সাম্রাজ্য অথবা আমেরিকা (১৭৭৬ সালের  আগে পর্যন্ত ছিল কলোনি) পরে স্বাধীন দেশ। ফলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য বলতে বড় কিছুই ছিল না; মূল অর্থনীতিও তা ছিল না। তবে একটা বিশেষ ধরনের লেনদেন ছিল যে, দখল হয়ে থাকা কলোনি (যেমন বৃটিশ-ইন্ডিয়া) থেকে একপক্ষীয় সম্পদ পাচার  ধরণের ততপরতা; মানে বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে তাদের মূল ভূখণ্ড ইংল্যান্ডে সম্পদ লুটে নিয়ে যাওয়া ধরনের। এভাবে “ওয়ান ওয়ে” সম্পদ পাচারের ততপরতা, একে ঠিক বাণিজ্য বলা মুশকিল এবং তা অর্থহীনও!! আবার যেমন বরফ আবিষ্কারের পরে বৃটিশ আমলেই, আমেরিকা থেকে জাহাজ ভরে কলকাতার এলিটদের জন্য বরফের জাহাজ আসত। এটা বৃটিশ-ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা ছিল না বলে একে কলোনি ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা মনে করা মুশকিল। তবে কলোনি সম্পর্কের কারণেই বা কোন স্বাধীন রাষ্ট্র না থাকার কারণেই মূলত সেকালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে কিছু গড়ে উঠেনি।

    তাই ১৯৪৪ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও পরের বছর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল নয়া কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো ও পুরানা রাষ্ট্র, সবার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করার জন্য; একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। একদিক থেকে এটা ছিল এক বিশাল তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা যে দুনিয়াব্যাপী এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এবং এমন এক দুনিয়াতে যেখানে আইনিভাবেই আর কোন দেশকে আর কলোনি করে রাখা যায় না। জাতিসংঘের আইনে ও দৃষ্টিতে তা বেআইনি ও অন্যায়।  তবু নয়া এই গড়ে উঠা বাণিজ্য ব্যবস্থা এর পণ্য বিনিময়ের সিস্টেমটা বড়লোক দেশগুলোর দিকে কান্নি মারা ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। তাই এই বিনিময় ব্যবস্থায় বৈষম্য আছে।  তবে এটা অস্বীকার-উপেক্ষা করা ভুল হবে যে ১৯৪৫ সালের আগের কোন বাণিজ্য ব্যবস্থাই না থাকার চেয়ে এবং ইউরোপের হাতে কলোনি দখল হয়ে  না থাকার চেয়ে এমন স্বাধীন রাষ্ট্র অবশ্যই ভাল!
    কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরও কিছু রাষ্ট্র যারা জাতিসঙ্ঘের সদস্য হলেও তবু তারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি বা তাদের করা হয়নি। অন্য ভাষায় বললে, এরা মূলত তখনকার কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো, এরাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি। তাই এই অপারগতার জন্য তারা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় যোগ দিবার যোগ্য হয়নি। তবে এনিয়ে আরেকটু বিস্তারে বলা দরকার।

    বাণিজ্য ও কমিউনিজমঃ
    কমিউনিজমে কী বাণিজ্য থাকে? মানে কমিউনিস্ট দেশের অর্থনীতিতে কী বাণিজ্য থাকে? মানে অনুমোদিত?? এই হল, আদি কনফিউশন! আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যও না থাকলে আভ্যন্তরীণভাবে যেকোন উতপাদিত পণ্য  বিতরণ মানে ভোক্তা পর্যন্ত তা পৌছে দিবার বিতরণ ব্যবস্থা (এটাই ট্রেড বা বাণিজ্য) বলে কী ওদেশে কিছুই নাই? আর থাকলেই বা তা কেমন?
    তবুও স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন-এই মোড়ল কমিউনিস্ট দেশ, এর প্রতিনিধি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের সময় উপস্থিত ছিলেন। বিখ্যাত ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে টানা ২২ দিনের সেই সম্মেলনে কিছু সোভিয়েত প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম নিয়ে আলোচনা ও দলিলপত্র খসড়া তৈরি শেষে, পরে দলিল স্বাক্ষরের সময় এবং তারও পরবর্তী সময়ে সদস্যপদের চাঁদা জমা দিয়ে সদস্য হওয়ার সময় সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও পরে স্টালিন বেঁচে ছিলেন ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি তা কাউকে জানানো হয়নি। অথবা এই নিয়ে স্টালিন কোন কারণ তুলে ধরেছেন বা লেখাও লিখেছেন বলে জানা যায় না। আবার  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবার পরে যদিও কমিউনিস্ট দেশগুলো আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হবে না – এমন একজোট হয়ে কোন দিন এধরনের কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও সত্য নয়।
    তবে এখান থেকেই একদিকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু আর অন্যদিকে এসবের বাইরে থেকে গেছিল ২০-২৫ রাষ্ট্র যারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নেয় নাই। যার অর্থ এই ২০-২৫ রাষ্ট্র এদের নিজেদের মধ্যেও কোন বাণিজ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না। প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিক অস্তিত্ব হয়ে টিকে ছিল। যদিও এমন দেশগুলোকে “সোভিয়েত ব্লক” বা “কমিউনিস্ট ব্লকের” রাষ্ট্র বলার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। আর তা টিকে ছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে না যাওয়া পর্যন্ত।
    তবে কেবল পোল্যান্ডের কথা কিছু জানা যায়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে কার্যক্রম শুরু করলে পোল্যান্ড কমিউনিস্ট ব্লকের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকও রাজি ছিল, অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল একদিন না একদিন সবদেশকেই একই গ্লোবাল অর্থনীতির সম্পর্কের মধ্যে  আনা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেট। কাজেই তাঁরা পোল্যান্ডকে সদস্যপদ দিবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাড়া ও সমর্থন না পাওয়াতে ব্যাপারটা ওখানেই থেমে যায়। অর্থাৎ পরে সদস্যপদ না নেয়া বা পাওয়ার সিদ্ধান্তটা আর একা সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর সমস্যা থাকেনি। আমেরিকার না চাওয়াও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

    কিন্তু অন্য দিক থেকে বললে, কমিউনিস্ট  দেশের ব্যবহারিক চিন্তায়, বাইরের অন্যদেশের সাথে কোনো আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য – এই আইডিয়াটা নিয়ে কমিউনিস্টদের মধ্যেই মূলত অস্বস্তি ও অস্পষ্টতা ছিল গভীর এবং যা এখনো কমিউনিস্ট চিন্তায় আছে- এ কথাও আরেক কড়া সত্য। এটা অনেকটা যেন ‘কমিউনিস্ট হারাম-হালাল’-এর সমস্যা। যেমন কমিউনিস্ট চোখে খোদ বাণিজ্য জিনিসটা কি হালাল? উৎপাদন একমাত্র সরকারি মালিকানায় হতে হবে এই ছিল সেকালের কমিউনিস্ট রাস্তা। ফলে এর সাথে আবার বাণিজ্যের দরকারটা কী? এমনই ছিল মনোভাবটা। যার সারকথা হল, এসব চিন্তার মুল জায়গাটা হল কমিউনিস্ট অর্থনীতিক চিন্তায় তাদের অর্থনীতিতে “পণ্য আমদানি” বলে কোন ধারনা নাই।
    তবে এসব অস্পষ্ট কথা হয়ত সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নে নিজে অনেক বড় দেশ বলে চিন্তা করা যেত যে, দেশের প্রয়োজনীয় সব ভোগ্যপণ্যই সে নিজ দেশে উৎপাদন করে নিবে। তাই, পণ্য আমদানি হীনতার অর্থনীতি এটাই কমিউনিস্টদের বাস্তব অর্থনীতি বলে খারা করা সম্ভব হয়েছিল।   কিন্তু তুলনায় ধরা যাক বাংলাদেশের মত ছোট কোনো কমিউনিস্ট দেশ হলে তার বেলায় কী হবে?? সব প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য অথবা এমনকি কোন কাঁচামাল আমদানি তার জন্য অত্যাবশিকীয়। কারণ তার পক্ষে এসব কিছুই নিজ দেশে উতপাদন করা অথবা কম শ্রমমুল্যে তৈরি করাই অসম্ভব হবে। এছাড়াও আরেক বড় সমস্যা! তার ব্যাপক প্রয়োজনীয় হবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ পাওয়ার। এবং সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কারখানা নির্মাণে সরাসরি  বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) – এদুটাই ঐ কমিউনিস্ট দেশ কোনভাবেই যোগাড় করতে পারবে না। তত্সব হিশাবে দুনিয়ার প্রত্যেকটা দেশ বা অর্থনীতি নিজের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিজেই জেনারেট ও সঞ্চয় করে থাকে। ফলে বিদেশ থেকে ঋণ আনা প্রয়োজনীয় হবার কথা না। কিন্তু শতভাগ বাস্তবতা হল, আমাদের মত সবদেশই নিজ প্রয়োজনীয়  যে থাকবে এটাও স্বাভাবিক; তার পক্ষে আমদানি বাণিজ্য ছাড়া গতি কী? এ ছাড়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য ছিল না বলে কমিউনিস্ট দেশগুলো বাণিজ্যে জড়িত হতে সুযোগ না পেয়ে ধুঁকে মরেছে। যদিও আধাখেঁচড়াভাবে কথিত বার্টার সিস্টেমের কথা বলে বছরে একবার হয়তো কোনো পণ্য ‘আমদানি’ করতে তাদের দেখা গিয়েছে। কেবল অবাস্তব জিদটাই থেকে গিয়েছে!!

    সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মেঃ
    অথচ পুরা কমিউনিজমেই বাণিজ্য করা যাবে কি না, সহি বা তা সঙ্গত কি না এই অস্পষ্টতা কখনো কাটেনি। সারপ্লাস ভ্যলু বা শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিবে এমন নয়া এক অর্থনীতির তাঁরা প্রচলন করবেই। বাস্তবে এই চরমপণ এর প্রতিরুপ হল কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” যেটা কার্যত –  “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়লেই নাকি সেই কাম্য সমাধান পাওয়া যাবে – কিন্তু নানান কারণে এই কল্পিত অর্থনৈতিক সিস্টেমটাই  কার্যত যেন টিকে থাকে তা কায়েম করাই যায় নাই।  ফলে কল্পিত সেই “শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিতে পারব – এমন অর্থনীতিটাই অধরা থেকে গেছে, এই হল কড়া বাস্তবতা। এতে সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও তবু “সেই কল্পনাটা মানে সমাজতন্ত্র – সেটাই ভাল ছিল” – এই জিদটাই কেবল এখনও টিকে আছে।  কিন্তু জিদ – এটা না কল্পনায় না বাস্তবে – এর কোনই মুল্য নাই, অর্থহীন।
    এটা তো গেল সেই সমাজতন্ত্র ভাবনা যার সারকথাটা এখন হতে পারে যে “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়াটাই টিকানো যায় নাই বলে এই পদ্ধতিতেও শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত আনার প্রতিশ্রুতিও ব্যার্থ হয়ে গেছে। তাই এখন আবার নতুন কোন অর্থব্যবস্থা – একটা সাসটেইনেবল কিছু কি করা যায় তা নিয়ে নয়া খোজ শুরু করতে হবে। কিন্তু এতে আমাদের আলোচ্য ইস্যু যে কমিউনিস্টদের জন্য বাণিজ্য হালাল কিনা – এই অনুমান-বিশ্বাসও জড়িয়ে আছে বলে – এই প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে গেছে ফলে বাণিজ্য ও কমিউনিজম – এদের পারস্পরিক সম্পর্কও কমিউনিজমে অমীমাংসিত। তবে এটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলেও কার্যত সকলেই বাস্তবে তা মেনে নিয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট নিজেই ব্যবসা করছে, ব্যবসাদারদের বিল্ডিং ভাড়া দিয়ে সে পয়সায় দল চালাচ্ছে।   যেখানে সারা বাংলাদেশের অর্থনীতিটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ  মানে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের  অংশ এখন। তখন আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন বা রাস্তায় ভিখারি কিংবা উন্নয়ন কনসালটেন্ট বা গবেষক কিংবা বসে বসে বই লিখছেন – ইত্যাদি যাই করেন কোন ফারাক নাই। আপনি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থের ভাগীদার। এই ক্যাপিটালিজম আপনার মুখের ভাতের প্রতিটা গ্রাস এর যোগানদাতা। আমাদের রক্তের কণায় কণায় ক্যাপিটালিজম। তাহলে আপনি কমিউনিস্ট হন আর না হন  কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মে???

    গ্লোবাল বাণিজ্যের পণ্য কেনাবেচায় অংশ নিতে গেলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে থাকতেই হবে এটা একটা আবশ্যিক পূর্বশর্ত। তা মূলত এজন্য যে, প্রত্যেক দেশের নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশের কোনো পণ্য কেনাবেচায় অংশ নেয়া সম্ভব নয়। কারণ নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশী পণ্যের মূল্য নিজ মুদ্রায় কত, তা জানা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের মুদ্রার নাম এসডিআর [SDR] যার মান প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠান, এক মার্কিন ডলার সমান কত এসডিআর তা প্রকাশ করে থাকে। সাধারণত তা, এক ডলার মানে ০.৭৪৩ এসডিআর – বিনিময় হার এর ‘আশপাশে’ হয়ে থাকে। আর এখান থেকেই প্রত্যেক সদস্য দেশ তার মুদ্রার মান বা তুল্য বিনিময় হার সম্পর্কে জেনে নিতে পারে। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে সেটাও জানা সম্ভব নয়। তাই এমন কমিউনিস্ট দেশের পক্ষে অন্যদেশের সাথে কোন বাণিজ্য করা অসম্ভব।

    কবে কার্যত কমিউনিস্ট দেশগুলোর “বাণিজ্য করা পাপ” ধারণা থেকে আপাত মুক্তি মিলেঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। ভেঙে রাশিয়াসহ মোট ১৫টা আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে। আর এরপর এসব রাষ্ট্র সবাই নতুন রাষ্ট্র হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করেছিল। ১৯৯২ সালের মধ্যে তারা সবাই সদস্যপদ লাভ করে, গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেবার যোগ্য হয়ে যায়। কমিউনিজম মাথায় থাক কিন্তু পাপ-মুক্তি মিলে যায় সকল কমিউনিস্ট দেশে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম চীন। মাও-এর চীন  সকল কমিউনিস্ট দেশের আগে অগ্রগামি যে ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। কখন ও কিভাবে সেই সময় সেকথা আপাতত এখানে না বলি; অন্য কখনও বলব বা বলাই আছে!!
    ফলে বলতে গেলে, সোভিয়েত ভেঙ্গে গেলে পরে সেই প্রথম সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্রই একই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে যায় মানে, গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চালু করার কার্যক্রমও যা পারে নাই তা সেই প্রথম সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে, দুনিয়াতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীনস্থ গ্লোবাল অর্থনৈতিক এক মহাগোষ্ঠীর বাইরে ‘সোভিয়েত অর্থনৈতিক ব্লক’ বলে আর কোনো দেশ থাকার অবসান ঘটেছিল।

    আগের এই ব্লক রাজনীতিতে দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা রাজনীতির আরেক প্রকাশ ছিল কোল্ড ওয়ার। মানে হল আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন (গত পঞ্চাশের দশক থেকে) এদুই পরাশক্তির রেষারেষি থেকে তারা যেন সবসময় কোনো যুদ্ধাবস্থায়, এমন টেনশন দেখা যেত; অথচ বাস্তবে তারা কোনো যুদ্ধে জড়িত নয় এমন থাকলেও এই টেনশন কাজ করত। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ায় এই কোল্ড ওয়ারের অবসান ঘটেছে।

    আমেরিকার নয়া অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনঃ
    কিন্তু একালে আমেরিকার নয়া প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, যার অর্থনীতি ২০২৮-৩০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে নানান স্বাধীন পরিসংখ্যানগত অনুমান বলছে। যেহেতু এখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তাও অভ্যাসবশত অনেক অধ্যাপকেও  প্রায়ই মন্তব্য প্রকাশ করতে দেখা যায় যে, আবার কি কোল্ড ওয়ার তাহলে ফিরে আসবে? ফ্যাক্টস হল, কোল্ড ওয়ার দুনিয়াতে সত্যিকারার্থে আর ফিরে আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই। এর একেবারেই মৌলিক কারণটা হল, এখন দুনিয়ার প্রায় সব দেশ একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ (আমরা অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তা পছন্দ করি বা না করি) হয়ে গেছে যে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। আর পুরনো কোল্ড ওয়ার যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে কিছু রাষ্ট্র ছিল যারা গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়নি বা সম্পর্কিত ছিল না। সেটাও এখন আর নাই। আর কোল্ড ওয়ার রেষারেষি সেকালে (১৯৫০-৯১) এর বাস্তবতায় দেখতে পাবার একটা বড় কারণ ছিল এমন ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে আলাদা অর্থনৈতিক ব্লক হিসাবে কিছু দেশের অস্তিত্ব থাকার সুযোগ তখন ছিল, তাই। একালে এই বাস্তবতাটাই আর নাই, সব লোপ পেয়ে গেছে। এখন সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। তাই চাইলেও কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আবহ আবার তৈরি করা সম্ভব নয়।

    তাহলে একালে এই ব্যাপারটা আমরা এখন কী বা কেমন হবে-থাকবে, নতুন করে কী দেখতে পাবো?
    উপরে এতক্ষণ ধরে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থাটা নিয়ে পাঠকের ধৈর্য চুরি করে কথাগুলো বলে গিয়েছি – এখন সিদ্ধান্ত টানতে পারব বলে।

    “এশিয়া টাইমস” [Asia Times] হংকং থেকে প্রকাশিত এক প্রভাবশালী পলিটিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ওয়েব পত্রিকা। বলা যায় যেন এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল“।  এর গত ২৮ এপ্রিল এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আমেরিকান অর্থনীতি প্রথম কোয়ার্টারে জিডিপি নেমে গেছে” [Dependence on China shrinks the US economy in Q1]।’ এর ভিতরের রিপোর্ট বলতে চাইছে, আমেরিকান অর্থনীতি চীনা পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কারণে আমেরিকার জিডিপি চীনের সাথেই ওঠানামা করা শুরু করেছে। এ কারণে রিপোর্টারের মন্তব্যঃ  দুনিয়াতে আগের কোনো রেকর্ড নেই এমন এক ঘটনা এটা- দুনিয়ার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বা রাইভাল [rival] অর্থনীতি তারা এমনই আজব রাইভাল যে, তারা একে অপর দেশটা থেকে আমদানিতে পণ্য আনাতে নির্ভরশীল হয়ে গেছে, অথচ তারা স্ট্র্যাটেজিকভাবে রাইভ্যাল দুই দেশ যে, পারলে অপরকে মেরে ফেলে! সারকথায় এতে চীন-আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি আমেরিকার বিরুদ্ধে, চীনের পক্ষে গেছে। চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি এখন প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার আর এটাই আমেরিকার জিডিপি-কে নামিয়ে দিয়েছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে ক্রমশ এই ঘটনাটা ঘটে গেছে। ট্রাম্প আমলের সাথে তুলনায় চীনাপণ্য আমদানি এখন ৬০% বেড়ে গেছে।

    তাহলে, এখানে প্রাসঙ্গিক মূল কথাটা হল, একালে কোল্ড ওয়ার উত্তর যুগে, কেউ কারও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বলে তার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নাই বা করা যাবে না – বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না। একালে বরং রাইভালের সাথেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক হতে দেখা যাবে; তা অবশ্যই হবে। এমনকি তা সবচেয়ে গভীর নির্ভরশীলতার অর্থনৈতিক সম্পর্কে ডুবে থাকছে ও থাকবে। এখানেই একাল পুরোপুরি আলাদা!  আর এখান থেকেই জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝা একেবারে ফেল করে, অচল হয়ে যায়। জাতবাদি বুঝের উল্টাটাই বাস্তবে দেখা যায়।  অতএব কোল্ড ওয়ারের যুগ আবার দুনিয়াতে ফিরে আসবে বলে কেউ যেন গল্প না ফাঁদে। আর সাথে জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝ যেন আর কেউ প্রাকটিশ না করে নিজেকে যেন শাসন করে রাখে!!

    আর এটাই কমবেশি একই অবস্থা ভারত-চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যেও। প্রথমত তারা উভয় দেশ এখন ঘোরতর এক বাণিজ্য সম্পর্কে লেপটে জড়িয়ে আছে। অথচ তারা প্রবল ও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক রাইভ্যাল দুই দেশ। ভারত পারলে চীনকে ছিড়ে খায়!! ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখছে, ‘২০২১ সালের পরিসংখ্যান বলছে গত এক বছরে ভারতের চীনা পণ্য আমদানি বেড়েছে ৪৩%।’ এই খবরের শিরোনামটা হল, [Amid bilateral chill, India-China trade marks record surge in 2021]  অথচ চীন-ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন শীতলতম, ঠাণ্ডা। গত  ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে নরেন্দ্র মোদি গত কয়েক বছর ধরে চীনা আমদানি কমাবেন বলে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলেন – স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ [Swadeshi Jagran Manch] নামে আগে থেকে এক সংগঠন গড়া ছিল সেটা দিয়ে। কিন্তু ফলাফল উল্টা এবং নিজের এই দুরবস্থা দেখে মোদিও নিশ্চুপ!

    এটাই কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী যুগের ফেনোমেনো। কারো সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক থাকলেও সে দেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক, আমদানি নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আরো জোরদার হতে পারে, একালে। সোজা কথায় জাতিবাদী অর্থনীতি বলে কোনো ধারণা এখানে ব্যর্থ শুধু নয়; জাদুঘর আর্কাইভে ফেলে রেখে দিবার বিষয় হয়ে গেছে। বাস্তবে বরং প্রায় উল্টারূপে তা  এখন হাজির হচ্ছে! তাই মোদি এ নিয়ে এখন একেবারেই চুপ!

    কিন্তু ব্রহ্ম চেলানি ততই ভোকাল!
    ব্রহ্ম চেলানি [Brahma Chellaney] – ছোট হলেও দিল্লিতে তার একটা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান আছে; নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ। প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক বলা যায়। কিন্তু এই বাইডেনের আমলে তিনি বারে বারে বাইডেনের ওপর ক্ষেপে উঠছেন। আবার প্রচণ্ড চীনবিরোধী তিনি, আর তা কখনও একেবারে আনলাইক একাদেমিক স্বভাবে!!!  সময়ে মোদির চেয়েও বেশি ন্যাশনালিস্ট হয়ে উঠতে দেখা যায় তাকে! চীনকে তিনি ‘আগ্রাসনবাদী চীন’ [aggressor]- সবসময় তিনি এভাবে লিখেন। মানে সময়ে তিনি আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে চীনবিরোধি হয়ে যান। এমনকি খোদ তিনিই আমেরিকার-বিরোধি হয়ে উঠেছিলেন একসময়।  তাকে প্রথম এমন ক্ষেপে উঠতে দেখা গিয়েছিল গত ২০২১ আগষ্টে বাইডেন যখন আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসেন; সব সেনা ফিরিয়ে আনেন। চেলানি পরাশক্তির এই শিয়াল ভূমিকা দেখে এটা মেনে নিতে পারেননি। তাই  বাইডেনেরই কঠোর সমালোচনা করেছিলেন আর সেটা এমনই পর্যায়ে যে  প্রায় ফিরে যেন তিনি আবার বুশের কোলে গিয়ে উঠতে চাইছেন দশা!

    সেই ব্রহ্ম চেলানি, তিনি ইদানীং আবার ক্ষুব্ধ! প্রধানত কোয়াডকে [QUAD] নিয়ে। কোয়াড-এর  চার দেশের প্রধানদের এবার সাক্ষাতে (অন লাইন বা ভার্চুয়াল নয়) সম্মেলন হচ্ছে আগামী ২৪ মে ২০২২। আর তাতে এখনই চেলানির হইচই শুনে মনে হচ্ছে যেন এবার ভারতের বদলে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম নতুন অন্তর্ভুক্ত হবার কথা উঠেছে, তা হয়েই যাবে। সেটা হোক আর না হোক, চেলানির এবারের কলামের (প্রথম আলো যার অনুবাদ ছেপেছে – কোয়াড কি চীনকে ঠেকানোর লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছে? – এই নামে) শিরোনাম। বুঝা যাচ্ছে এখানেও খুবই এগ্রেসিভ তিনি! যেমন-  আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে ঠেকানো যেন কোয়াডের লক্ষ্য এটা ধরে নিয়ে তিনি লিখছেন। অথচ, এটা বোধহয় কোথাও পাওয়া যাবে না।
    যা হোক, তিনি কোয়াডের চার দেশের উপরই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। কেন? তিনি দেখতে চান যে, এ’চার দেশের কারো সাথে চীন থেকে চীনা পণ্য-আমদানির বা বাণিজ্য সম্পর্ক বলতে কিছু নাই। অর্থাৎ মনে মনে তিনি যেন একটা কোল্ড ওয়ার আমলের সোভিয়েত-আমেরিকা সম্পর্ক দেখতে চাইছেন। এ কারণে তিনি মোদির উপরেও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত!

    কিন্তু তাকে কে বুঝাবে, একালের গ্লোবাল পরিস্থিতিতে তিনি যেমনই একে দেখতে চান না কেন সেটা আর দেখার সুযোগই নাই; সব বদলে গেছে। অর্থাৎ উপরে লেখার শুরুতে গ্লোবাল বাণিজ্য ও এর গতিপ্রকৃতিকে প্রসঙ্গ করে অর্ধেরই বেশি পাতা খরচ করেছি – এজন্য যে এই ধারণাটা সকল পাঠকেরই খুব কাজে লাগবে। অসংখ্য  ব্রহ্ম চেলানি-রা ছড়িয়ে আছে এবং আরো গজাবে। কিন্তু তাঁরা কী বলতে চাইছেন এবং কেন এসব কথাগুলোর এখন আর বাস্তবতা নাই – সেটা সম্পর্কে পাঠকে সচেতন ও প্রস্তুত করতেই এই লেখা।  ফলে কোল্ড ওয়ার যুগের মত চেহারা-বৈশিষ্ট্য একালে আর দেখা যাবে না বা তা আর ফিরবে না। জাতিবাদী অর্থনীতিই তো লোপ পেয়ে গেছে – সেই ১৯৮০ সালের শুরু থেকেই গ্লোবাল বাণিজ্যই দুনিয়ার মুখ্য অভিমুখ হতে চেয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গেছে। অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন জীবিত থাকতেই এই পরিবর্তন যাত্রা শুরু করেছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর থেকেই বাণিজ্য গ্লোবাল হয়ে  উঠা আর এর প্রভাব টের পাওয়া প্রবলভাবে শুরু হয়েছে। তাই একালের বৈশিষ্ট্য হল, যেকোনো দেশের স্ট্র্যাটেজিক রাইভালের সাথেও তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক একালে অবশ্যই থাকবে। সেটা চীন হলেও তাতেও ব্যত্যয় ঘটবে না;  বরং যেন আরও ভালোভাবে থাকবে। কারণ যেসব চীনাপণ্য সবচেয়ে সস্তা তা আপনি না কিনে (আমদানি করে) তো আপনার রেহাই নেই। বরং চীনাপণ্য কিনতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবানই মনে করবেন।
    যেমন এই উদাহরণটা ভালো করে লক্ষ করেন!!!  তবে সাবধান এটা চীনের প্রশংসার ইস্যু নয় বা চীনের প্রশংসা করার জন্য লিখা মনে করলে ভুল হবে। বরং আজকের বাস্তবতাটা খেয়াল করতে ও বুঝতে হবে। ভারতে বেশির ভাগই জাপানি প্রাইভেট কার – এই গাড়ির জয়েন্ট ভেঞ্চারে গড়ে ওঠা কারখানা ভারতে আছে। কিন্তু সেই জাপানই মোদি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে যেন চীনা স্পেয়ার্সের (যন্ত্রাংশ) ওপর বাড়তি ট্যাক্স বসানো না হয়। মানে, প্রত্যাহার করা হয়। কেন? কারণ, গাড়ির অরিজিন জাপানি আর এসেম্বল ভারতে হলেও এর স্পেয়ার্সগুলো ভারতে বসে ওর যন্ত্রাংশগুলো চীনাপণ্য আমদানি করে এনে লাগানো। কারণ চীনা স্পেয়ার্স-এর দাম আকাশপাতাল কম। সে কারণেই জাপান সরকারের নিজেরই অনুরোধ এটা মোদির কাছে। [ভারতের বোকার “জাতিবাদি অর্থনীতি বুঝ” যে অচল ও অকেজো সেটা দেখাতে ২০২০ সালের আমারই এক পুরান লেখা এখানে দেখা যেতে পারে। ]

    অর্থাৎ ব্রহ্ম চেলানির চিন্তাটা পুরনো যা ১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত কোনোমতে চলতে পারা “জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ” দিয়ে তৈরি। অথচ এই “মফস্বলি বুঝ” নিয়ে তিনি এখন দুনিয়াকে এবং কোয়াড-দেশের অর্থনীতিকেও ব্যাখ্যা করতে গেছেন। এর মানে, তিনি খোয়াবে আছেন যে, তিনি যেন ১৯৮০ সালের আগেই এখনো আছেন।

    এমনকি তিনি চীনা আরসিইপি [RCEP] জোট মানে যেটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশন শেয়ার্ড প্রোডাক্ট’ উৎপাদনের এক নয়া জোট যেটা আসলেই এক বিরাট আগামী সম্ভাবনার জোট – এর প্রবল বিরোধিতাও করেছেন। জাতিবাদি বুঝের ভারত এতে যোগ দিতে চায়না, আঙুর ফল টক মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশ সাহস করে এত যোগ দিবার আবেদন করেছে সঠিক ভাবেই। বহু আগে থেকেই বলে আসছি যে, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক গ্রাজুয়েট-বিশ্ববিদ্যালয় লেভেল থেকেই সিলেবাসে অর্থনীতিকেও অন্তত একটা সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে একালে রাখতেই হবে। কারণ যে কেউ অর্থনীতির কিছু না পড়লেও নিজেকে জাতিবাদী অর্থনীতির ওস্তাদ বলে হাজির করতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখন জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ থেকে বহু দূরে চলে গেছে। কাজেই নতুন বাস্তবতা বুঝতে অন্তত কিছু অর্থনৈতিক নতুন ধারণা জানতেই লাগবে। অনেক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক প্রফেসরের মধ্যেও এই (জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ দিয়ে সব ব্যাখ্যার) ঝোঁক দেখা দিতে পারে বা এখনও থেকে যেতে পারে।

    তাই অন্তত জাতিবাদী অর্থনীতির বাস্তবতা যে আর নাই এটুকু রিয়ালাইজ করাই হবে তাদের প্রথম পাঠ! মোদির “স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ’ তাই এখন চীনের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ। আবার সাবধান, ব্যাপারটা চীন বলে নয়; যেকোনো দেশের সাথে হতে পারে। বিদেশী পণ্য আমদানি এখন সাধারণ ব্যাপার যখন আপনিও রফতানিকারক। এটা গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ!

    তাই যাকে পছন্দ করেন না তার সাথেই সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক; ফলে রাজনীতিক সম্পর্ক শীতল থাকলেও বাণিজ্যিক  ঘনিষ্ঠতাই এখান খুবই স্বাভাবিক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “যারে দেখতে পারি না তার আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই, কেন? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জয়শঙ্করের সফর

    জয়শঙ্করের সফর
    গৌতম দাস
    ২৮ এপ্রিল ২০২২

    সম্ভবত এই প্রথম জয়শঙ্করের সফরকে প্রথম আলো – এর পক্ষে থেকে দেখতে পারবে না!
    দুনিয়া আসলেই বড় অদ্ভুত যায়গা! অথচ যেটা গুণে গুণে চারদিন আগেও  হয়ত পারত।

     জয়শঙ্করের সফরের উদ্দেশ্য কী? হাসিনা-মোদি কী বাইডেনকে তাদের সম্মিলিত আবেদন দিয়ে উল্টা চাপ দিতে চাইছেন?? হাসিনা-মোদি কী বাইডেনকে তাদের সম্মিলিত আবেদন দিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন?? আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু ফলাফল হবে সম্ভবত তাঁরা দুজনেই ফেল করবেন!

    কিন্তু কেন চাপ দিবেন, কী নিয়ে?
    যদি সব ঠিকঠাক থাকে, দুই প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বলতে চাইবেন তাঁদের উপর বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার – এদুই খড়্গ এর প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। শুধু এতটুকুই না, প্রচ্ছন্ন বা অস্পষ্ট হুমকিও থাকতে পারে যে অন্যথায় তাঁরা রাশিয়ার কোলে গিয়ে উঠে বসতেও পারে। তবে ততদুর যাক না-যাক এমন হুমকি দিতে পারে!

    জয়শঙ্করের সফরে একান্ত বিষয়ক সব আলাপের কারণ, ব্যক্তিগত ভাবে (অন্যের মুখে) ভারত যা বলছে হাসিনা যা শুনেছে এটাই ‘মোদির ভারতের’ সব ঠিকঠাক অবস্থান কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া খুবই জরুরি; তাই!
    যেমন মোদির বুঝ হতে পারে তাঁরা একসাথে চাপ দিবে এতদুর ঠিক আছে। তবে শেষে ভারত সত্যিই আমেরিকার হাত ছেড়েই দিব – এখনই তা সিদ্ধান্ত নেয় নাই বা এতদুর যাবে না। বা হুমকি-ইঙ্গিতও দিবে না। এমন হতে পারে। তাই আগাম ভারতের মনের কথা বুঝে নেওয়াটা খুবই জরুরি হাসিনার জন্য। পথে নামার আগেই এসব বিষয় ব্যক্তিগতভাবে পরিস্কার হতেই হবে, বুদ্ধিমান হতে হলে!
    আর যদি হাসিনা অন-বোর্ড হয়েছে এজন্য যে মোদি তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেই যে আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা পর্যন্ত মোদি যেতে রাজি – এমনটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিক একান্ত আলাপে জয়শঙ্করকে নিশ্চিত করতে হবে যে হা, মোদির ভারত বাইডেনকে ছেড়ে আসা পর্যন্ত চিন্তা করেছে!
    আসলে উপরের পুরা ঘটনাটা একটা পশ্চাদ পটভুমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তা হল, মোদি-বাইডেন সম্পর্কের সর্বশেষ অবস্থা। ক্রমশ এটা এখন এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে বাইডেনের পক্ষে মোদির উপর নিজ দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার- এদুই খড়্গ ব্যবহার ত্যাগ করা একেবারেই সম্ভব না। অন্তত কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘণ – এটা তো বাইডেনের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। এছাড়া এখন ভারতের বেলায় এটা ছাড় দিলে বাইডেনের ইমান উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন এই সন্দেহ তৈরি হবে। কারণ এই একই অস্ত্র রাশিয়ার পুতিন সহ চীন ও সবার উপরেই প্রয়োগ ব্যবহার বাইডেনকে করে যেতে হবে। সেটা ইউনিফর্ম থাকবে না তাহলে! তাই ভারতের বেলায় বাইডেন যতটুকু খাতির করতে পারে তা হল এখনই তিনটা অবরোধ আরোপ করার সুপারিশ বাইডেনের অফিসে পেন্ডিং – তা আরো বড়জোর কয়েক মাস পেন্ডিং ফেলে রাখা। কিন্তু কোনভাবেই তা বাতিল বা ভারতকে বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দেয়া জাতীয় কথা উচ্চারণই বাইডেন করতে পারবেন না।
    ওদিকে মোদির সমস্যা হল, কমপক্ষে আগামি ২০২৪ সালে নিজের পুনঃনির্বাচন পর্যন্ত সব নির্বাচনে মোদিকে মুসলমান কোপানো-হত্যার কথা সরাসরি বলে চলতেই হবে – এই নীতিতে তাকে দল ও রাজনীতি পরিচালিত করতেই হবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ বলে ক্ষুব্ধ হিন্দু -ভোটারদের নিজের বাক্সে আনার জন্য এটাই মোদির হাতের শেষ অস্ত্র। কাজেই বাইডেনের মানবাধিকার বা অবরোধের ভয় আমল করার অবস্থায় নুন্যতম ভাবে বাইডেনকে ছাড় দিবার অবস্থায় মোদি নাই। বরং বাইডেনের এই মানবাধিকারের হুমকি উল্টা ভারতে দেশের ভিতরের – সুপ্রীম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনার বা আমলাদেরকে মোদির বিরুদ্ধে সাহসী করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে সাবেক শত আমলা-সচিব মোদির বিরুদ্ধে নাগরিক-বৈষম্য ও মুসলমান হত্যা ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছে [ঘৃণা আর বিদ্বেষের আবহে আমরা ভীত! মোদীকে খোলা চিঠি প্রাক্তন আমলাদের]। যেটা মোদির জন্য খুবই এলার্মিং!
    তাহলে সারকথা – মোদি আর বাইডেন কেউ কাউকে এতটুকু জায়গা ছাড় দিয়ে আপাতত বিবাদের সমাধান করবে সেই সুযোগ দুপক্ষের কারও হাতে নাই।
    এই অবস্থায় মোদি যদি (একা নয় সাথে হাসিনার প্রতিনিধি ও সুপারিশ সাথে নিয়ে ) বাইডেনের মুখোমুখি হয় তবে এখানেও ভারত-আমেরিকা যে কেউ কাউকে সম্পর্ক ছেড়ে যাবার চরম কথাটা উচ্চারণ এখনও করে নাই বা করছে না সেটাই প্রকাশ্য হয়ে গিয়ে বিপদ ডেকে আনতে পারে – কোন হাতছুট মুহুর্তে!

    বটম লাইন হল, কোন আগামি পরিস্থিতিতেই হাসিনার সংকট কাটছে না। বরং ভারত-বাংলাদেশের যৌথ মুভ সংকটকে আরো বাড়িয়ে তা “এখনই” ডেকে আনার অবস্থায় ফেলতে পারে! বাংলাদেশের ব্যাপারে বাইডেনের সিদ্ধান্তই ডমিনেট করার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। এছাড়া সেক্ষেত্রে, বাইডেনের বগলে ভারত না থাকার সম্ভাবনাও বেড়ে গেল!

    পুনশ্চঃ- আলী রীয়াজের আজকের লেখার শিরোনামটা বেশ অদ্ভুত! “বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবে ভারত?”।
    আচ্ছা আলী রিয়াজের কাছে তাঁর জাতীয় স্বার্থ কোনটা? আমেরিকার স্বার্থ না বাংলাদেশের স্বার্থ? আমি এনিয়ে পুরাই কনফিউজড বিভ্রান্ত! আমাদেরকে এভাবে বিপদে না ফেলে, এসব শব্দ তাই লেখকদের এড়িয়ে চলাই ভাল!!!

    অন্তত গত চৌদ্দ বছর ধরে যেখানে আমেরিকান স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ হয়ে আছে তখন তিনি “বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব” ভারত করলে কেন বিস্মিত হচ্ছেন? আমি বুঝি নাই!  কে যে কখন কার পক্ষে!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    গৌতম দাস

    ২৩ এপ্রিল ২০২২, ২০:৫৫

    https://wp.me/p1sCvy-439

     

    কেন শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বলে ভারতের আমলারা মোদিকে সাবধান করলেন?

    –
    প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর দুই ডজন সচিব নিয়ে চার ঘন্টা ধরে এক মিটিং করেছেন। বিষয় হল, ভারতের নাকি শ্রীলঙ্কার মত অর্থনৈতিক অবস্থা হতে পারে বলে তার সচিবেরা মোদিকে সাবধান করেছেন। খবরটা করেছে ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই [PTI]। যা ছাপিয়েছে অনেক মিডিয়াই। এমনই  এনডিটিভি-এর খবরটা এখানে দেয়া হল [States’ Freebies Flagged To PM With Lanka-Like Crisis Warning: Report]।
    কথা হল, একালে চীন নাকি খারাপ খারাপ ঋণ গছিয়ে সবার অর্থনীতিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে চলছে – একথা, এতদিন বলে প্রপাগান্ডার রাজা ভারত  চলছিল। সর্বশেষ এমনকি বাংলাদেশেও নাকি এর শিকার বলে কেউ কেউ নিউজ বা ইউটিউব ক্লিপ তৈরি করে প্রচার করছিল।। আজ, তাহলে এত সাবধানী খোদ সেই ভারতকেই আবার “ঋণের ফাঁদে” ফেলল কে? এটা তো একেবারে নিজের ফাঁদে নিজেই পড়া!   এতো দেখা যাচ্ছে এটা হল – মিথ্যা করে, বাঘ আসছে বাঘ আসছে বলে গ্রামবাসীকে উত্যক্ত করা রাখাল বালকের ঘটনা। আর এনিয়েই এবারের প্রসঙ্গ।

    শ্রীলঙ্কা গত কয়েক মাস ধরে হেডলাইনে, কারণ তার দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ প্রায় শূন্য, কোনো বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে প্রায় নাই। অবস্থা এতই করুণ যে, যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন স্কুল-কলেজের স্টুডেন্টদের লিখার কাগজ যা শ্রীলঙ্কা আমদানি করে চলে তা এখন কেনার মত বৈদেশিক মুদ্রাও তার হাতে নাই। ফলে স্কুল-কলেজে পড়াশুনা লাটে উঠেছে। এছাড়া আমদানি করা খাদ্যের বেলায় সমস্যা আরো ভয়াবহ। সব মিলিয়ে এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে।

    আর এই সুযোগেই কিছু প্রো-আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট মাঠে নেমে পড়েছে। তারা এটাকে চীনবিরোধী ক্যাম্পেইনের এক সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। এমনকি বাংলাদেশ নিয়েও – আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট যারা চীন বিরোধিতা করে থাকে তারাও কিছু আর্টিকেল বা ইউটিউব কনটেন্ট ছড়ানো শুরু করে দিয়েছে যেখানে কোনো ফ্যাক্টস ফিগারের বালাই ছাড়াই তারা বলছে যে বাংলাদেশেও নাকি শ্রীলঙ্কা হবে? আপনি হাসিনা সরকারের-বিরোধী তাতে তো কোণ সমস্যা নাই। কিন্তু তাই বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে  জিতবেন?? কতদুর যাবেন? এভাবে জেতা যাবে না। কিন্তু এটাই চলছে। যদিও এখানে এই লেখার গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এসব প্রপাগান্ডিস্টদের কবল থেকে প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা, যদিও তা ঠিক তাদের বিরোধিতা করে নয়। কারণ পক্ষ-বিপক্ষে প্রপাগান্ডা, যারা এ নিয়ে বাঁচতে চায়, কিছু কামাই করে চলতে চায় তারা তা করবেই। তাহলে ‘প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা’ বলতে ঠিক কী করতে চাই?

    গত কয়েক বছর ধরে যারা এই ক্যাম্পেইন ‘মাস্টার’, তারা যে ভাষ্যের ওপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করেছে তাদের একটা বড় অংশ হল বলা যায় যারা একেবারে  যেকোন ঋণ-গ্রহণের বিরোধি। এককথায় এরা নিজেদের প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশ এক ধারা বলে নিজেকে ভাবে। এরা মুল প্রপাগান্ডিস্ট নয়, তবে এদের ভাষ্য-অবস্থান চীনবিরোধী আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট্দেরকে সহায়তা যোগায় যেহেতু এদের বয়ান মুল প্রপাগান্ডিস্ট্দের সহায়তা করে।  এই মূল প্রপাগান্ডিস্টদের  মানে হল, কিছু প্রপাগান্ডা বক্তব্য যেমন, “চীন ফাঁদে ফেলে কোনো দেশকে অতিরিক্ত ঋণ গছিয়ে দিয়ে থাকে। তাই এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে”। তাই এই প্রপাগান্ডাকে তারা শিরোনামে বলে থাকে – ‘ডেট ট্রাপ’ [debt trap] বা ‘ঋণের ফাঁদ’ বলে। যেন চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে এক নম্বর বা সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এসব ছেচরামি করেই!!! এই হল এদের প্রপাগান্ডা বা চীনকে নিচা দেখানোর এক করুণ কায়দা!!  এতে ভাবনাটা অনেকটা ছেলে ধরার গল্পের মত যে, এশিয়ার দেশগুলো – এই তোরা আর বাইরে যাস না, চীনের ‘ঋণের ফাঁদ’-এ পড়বি!!!! তাই, তোরা ভারত-আমেরিকা ছুয়ে থাক!!
    আচ্ছা, কোন দেশকে অতিরিক্ত ঋণ দিয়ে ডুবিয়ে চীনের মত দেশের কী লাভ? এটা কী আসলেই কোন লাভ? শেষ বিচারে যখন কোন দেশ ঋণের সমস্যায় পরে যায় তাতে ক্ষমতাসীন সরকারের ইমেজ ক্ষুব্ধ পাবলিকের সামনে কোনভাবে কী আর কোন কাজে লাগে? পক্ষে যায় না যেতে পারে??

    গরীব অর্থনীতির দেশ “ঋণ না নিয়ে” চলে না কেনঃ
    আমরা পছন্দ করি বা না-করি ফ্যাক্টস হল, আমাদের মত দেশে নতুন কাজ সৃষ্টি করতে গেলে যে নয়া বিনিয়োগ লাগে তা যোগানোর মুরোদ আমাদের অর্থনীতির নাই। কাজ সৃষ্টির প্রয়োজনটা আমাদের না বুঝার কিছু নাই যে কোন নির্বাচিত সরকার অন্যতম কাজ হচ্ছে কর্মক্ষম জনগণের জন্য কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু তাই বলে কাজ সৃষ্টি করতে গেলে তো অর্থনীতিতে যে নয়া বিনিয়োগ লাগবেই তা দেশের অর্থনীতিতে থাকবে না কেন? বিনিয়োগ অন্য কোথাও থেকে আনতে হবে, অন্য দেশ দিবে ইত্যাদি  – এই ব্যাপারগুলো কী স্বাভাবিক? জবাব হল, না একেবারেই তা স্বাভাবিক নয়। বরং একেবারেই তা উল্টা। অর্থাৎ প্রত্যেক দেশের অর্থনীতিই তার দেশের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ যা আসলে “অর্থনীতিতে পুরানা সঞ্চিত সম্পদ” তা আসলে নিজেই উতপন্ন ও জমা-সঞ্চয় করতে সক্ষম থাকে। তাহলে প্রশ্ন হল আমাদের মত দেশের তা নাই কেন? কেন বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনতে হয়? এমনকি তা দুই ধরণের বিনিয়োগই – অবকাঠামোতে (infrastructure) বিনিয়োগ আর ব্যবসা-কারখানায় বিনিয়োগ (FDI) –  যা অন্যদেশ থেকে আনতে হয়। তা বিদেশ থেকেই আনতে হয়, কেন?

    প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশের মধ্যে এমন মনোভাব আছে যে ঋণ নেয়া হারাম!! কেন?
    এর জবাব আমরা সবাই জানি কিন্তু খেয়াল করি নাই। মূল কারণ ইউরোপের হাতে আমাদের কলোনি দখল হয়ে যাওয়া। আমরা বৃটিশদের হাতে কলোনি দখল হয়ে গেছিলাম বলে তাঁরা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ব সব সম্পদ লুটে তা পাচার করে তাঁরা নিজ দেশে নিয়ে গেছিল, দুশ বছর ধরে লাগাতর। আজও আমাদের দেশের বিনিয়োগের অর্থ সংকটের মুল কারণ এটাই।  এতে আমাদের দেশ পরবর্তিতে এক চরম বিনিয়োগ পুঁজি সংকটে পড়েছিল বিশেষত ১৯৪৭ সালে বৃটিশ কলোনি দখলের অবসান হয়ে যাওয়া সত্বেও। এখান থেকেই এরপর থেকে আমরা চাই বা না চাই বিদেশ থেকে বিনিয়োগ পুঁজি নিতে আমরা বাধ্য হয়ে যাই।
    কিন্তু তাতেও নতুন সমস্যা বাধে বা তৈরি করে আমাদেরই কিছু  (প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট) লোকের মাথায় “পুঁজি জিনিষটাই খারাপ” – এই ধারণা “মাথায় গেথে বসে” থাকায়। এদেরকেই আমরা প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট বলেই চিনি। পুঁজি নাড়াচাড়া করা, পুঁজির ততপরতায় জড়ানো, ব্যবসা করা ইত্যাদি কাজকে ধর্মে পাপের যে ধারণা সে চোখে যেন পাপ মনে করে বা পাপের চোখে দেখে থাকে।  অথচ ব্যবসা করা মানে তো পুঁজির ততপরতা তাই এটা পাপ ও হারাম ধরণের কাজ যেন!
    অথচ দেশে অর্থনৈতিক ততপরতা না চললে মানুষ খাবে কী? না কাজ পাবে না খাবার কিনতে পেতে পারে। যদিও এর একটাই জবাব তাদের কাছে আছে যে একমাত্র তাদের কথিত এক সমাজতন্ত্র চিন্তা যার সারার্থ তাদের কাছে – কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় উতপাদন চলতে দেয়া হবে!! এটাই একমাত্র “সহি’ অর্থনৈতিক ততপরতা। যেন এটাই তাদের ধর্ম অনুসারে একমাত্র সহি ততপরতা। এর উদাহরণ হাতের কাছেই পাবেন। বাংলাদেশের প্রথম সাড়ে তিন বছরের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিনের নেতৃত্বের অর্থনীতি অথবা ভারতে নেহেরু নেতৃত্বে কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যা ১৯৯০ সালে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে পর্যন্ত থামে নাই বা কোন সংস্কার-বদল ঘটে নাই। চরমতম “ব্যালেন্স অপব পেমেন্টের” ঘাটতিতে [মানে বৈদেশিক রিজার্ভের ঘাটতি থেকে ভাঁড়ার শুণ্যে করার দিকে যাত্রা] পরে শেষে এটা বিশ্বব্যাংকের চরণে হামলে পড়েছিল, ঐ ১৯৯০ সালে! বাংলাদেশেও তাই হয়েছিল। অন্যভাষায় এটাকে আমরা প্রচলিতভাবে বলি “চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ”। যার প্রধান এবং কমন ফেনোমেনা হচ্ছে – বৈদেশিক রিজার্ভ শুণ্য হয়ে পড়া। তাই কোন খাদ্য আমদানিরও মুরোদ না থাকা। আজকের শ্রীলঙ্কাতেও সেটাই ঘটেছে। আর তাতে আমাদের দেশে তখন হতাশ শেখ মুজিব তাজউদ্দিনকে ফেলে পাশে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি কিসিঞ্জারের সাথে কথা বলেন আর বিশ্বব্যাংকেও তদবীর করে আসেন ঐ চুয়াত্তরেই সেপ্টেম্বরের শেষে। কিন্তু সেই সাহায্য ও নীতিগত সংস্কারের সুবিধা বাংলাদেশে শুরু হবার আগেই তিনি পরের বছর (১৯৭৫) খুন হয়ে গেছিলেন। মোটামুটি ছিয়াত্তর সালের শুরু থেকেই প্রথম আমরা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও ফান্ড পাওয়া শুরু করেছিলাম।
    তাই মূলকথাটা হল, চোরে আপনার বাসার সব থালাবাসনও চুরি করে নিয়ে গিয়েছে বলে চোরের উপর রাগ করে বা “পাপমুক্ত থাকতে” কিংবা জিদ পুরা করতে আপনি আর মাটির সানকি থালাও না কিনে মাটিতে ভাত রেখে খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন না। এটা এথিকস পালন করার কোন কায়দাও না। বরং এটা সোজাসাপ্টা স্টুপিডিটি; অক্ষমের বাস্তববোধহীনতা!!!  তাহলে ঠিক কী বলতে চাচ্ছি?

    বলতে চাচ্ছি যে ইউরোপ বা পশ্চিম যারাই আমাদের সম্পদ লুটে চুরি করে নিয়ে গেছে তারাই একালে (১৯৪৫ সালের পর থেকে) যেন সেই সম্পদের কিয়দংশ  ফেরত দিতে চায়, যেটাকে তারা ঋণ বলছে! আর এরই অর্গানাইজেশনাল রূপ পদ্ধতির একটা সিস্টেমের নাম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক।  সোজা করে বললে এরা বিনা-সুদের অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে নামমাত্র সুদের (০.৭৫% বা, ১% পার্সেন্টের নিচে) ঋণ (যা আবার লম্বা ৪০ বছর ধরে পরিশোধযোগ্য)। আর এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অন্যদিকে প্রাইভেট কোম্পানির গ্লোবাল পুঁজি বাজার সর্বোচ্চ ৮% সুদে  বিভিন্ন ঋণ পাবার দিবার সুযোগ এসব প্রতিষ্ঠান করে থাকে।  তবে সাবধান প্রপাগান্ডায় পরা যাবে না। বিশ্বব্যাংকের কোন ঋণেই ৪% এর বেশি সুদ হয় না। আর প্রাইভেট কিন্তু গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সুদের হার সর্বোচ্চ ৮%  যা আমাদের মত দেশের জন্য দেখা গেছে ৬% এর বেশি নয়। তবে এটা একটা কাফফারা অবশ্যই। সেই সাথে আরো আছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্বভাবতই আমেরিকা বা পশ্চিমের স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে চলা সংগঠন; তা মিথ্যা নয়। তাই এর জ্বালা ও আমাদের স্বার্থহানি ঘটা বা সময়ে বড় প্রতিবাদ না করতে পারার মনকষ্ট আমাদের মত দেশের সেখানে আছে। যদিও সে কষ্টেরও একটা শেষ যেন আছে। যেমন এখনকার বাংলাদেশের ইচ্ছা (ক্ষমতাসীনদের)  অনুসারে কোন ঋণ কিভাবে নিবে অথবা একেবারেই নিবে না কিনা অথবা দেয়া শর্ত কবুল করবে বা না করবে ইত্যাদি আমরা বাছাই করার সামর্থে পৌছেছি। এছাড়া এমন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানও এখন একের অধিক হয়ে গেছে। কিন্তু কমিউনিস্ট গোয়ার্তুমি ছেড়ে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের কাছে এটা এথিক্যাল প্রশ্ন বা অবস্থানের ইস্যুই নয় যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ভাল না মন্দ। বরং এটা মন্দের ভাল, কিছুই না থাকার চেয়ে। আসলে এটা একটা খারাপ বাস্তবতাতে সেখান থেকে উঠে আসতে আমাদের বুদ্ধিমান কোন কম্প্রোমাইজ ও সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই আমাদেরকে বের  আজ হয়ে আসতে পারার অবস্থায় পৌছাতে হয়েছে।  তাই কোন পুঁজির ততপরতা খারাপ কিনা, ব্যবসা হারাম কিনা ইত্যাদি বিবেচনা করে – সারকথায় বিদেশি পুঁজি নেওয়া যাবে না এমন অলীক ভাবনা – এটা সবসময় আসলে অর্থহীন প্রলাপ। কিন্তু এই প্রলাপ বয়ানের উপর ভর করেই  আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্টেরা একালে রাজত্ব জমিয়েছে আর  চীনের তথাকথিত ঋণের ফাঁদের গল্প আমাদের শুনিয়েছে।  যেন কমিউনিস্টরা এবার বলতে চায় বলেছিলাম না বিদেশি ঋণ খারাপ জিনিষ!! আর ওদিকে প্রপাগান্ডিস্টেরা বলতে চায় যেন চীনা ঋণ হলে তা খারাপ আর আমেরিকান বা ইন্ডিয়ান ঋণ  আমাদেরকে দিলে অথবা  এ’দুই দেশ নিজের জন্য গ্লোবাল বাজার থেকে নিলে সেগুলো ভাল ও হালাল!!!  অবশ্য একটু পরেই আমরা দেখব খোদ আমেরিকা বা ভারত রাষ্ট্র নিজেরা নিজেদের বেলায় বৈদেশিক ঋণ কিভাবে নিয়েছে!

    চীনা ঋণের ফাঁদের প্রপাগান্ডা বয়ানের যুগেঃ
    বাস্তবে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর গড়া নিয়ে চীনের ঋণ নেয়ার এত কথা প্রথম প্রচারে এসেছিল। সেই বন্দর প্রকল্প পরে কার্যত শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে আর কোনো বোঝা হয়েই দাঁড়ায় নায়। কারণ, পরের প্রো-ইন্ডিয়ান সরকারের আমলেই  ঐ সরকার চীনের সাথে কথা বললে চীন এক সহজ সমাধান করেছিল। তা হল, পুরো প্রকল্পটাকে এক চীনা প্রাইভেট কোম্পানি কিনে নিয়েছিল, তাতে চীনের ঋণ পরিশোধের দায়ও ওই পোর্ট ক্রেতা নয়া কোম্পানির, তাতে শ্রীলঙ্কা সরকারকে কোনো ঋণের দায় আর বইতে হবে না, পরিশোধ করতে হবে না। চীনা সরকার এই ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিল। ফলে শ্রীলঙ্কা সরকারের কোন অর্থনৈতিক দায় আর ছিল না। ফলে এই পোর্ট প্রকল্প থেকে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে চাপ ফেলা জাতীয় কোনো প্রভাবের আর বালাই থাকেনি। অর্থাৎ পোর্ট প্রপার্টিটাই আর সরকারের থাকেনি। বরং যেকোন প্রকল্পের মোট মূল্যের প্রায় ২৫-৩০ ভাগ মালিকানা হোস্ট দেশের এমনিতেই পেয়ে যায় কোনো বিনিয়োগ করা ছাড়াই। কারণ প্রকল্পকে দেয়া জমি বা অবকাঠামো দেয়ারও একটা মূল্য ধরা থাকে বলে সরকার কোনো অর্থ খরচ না করেই তেমন প্রকল্পে ২৫-৩০ ভাগ মালিকানার ভাগ পেয়ে যায়। ফলে চীনা ওই প্রাইভেট কোম্পানি এখন হাম্বানটোটা পোর্টের বাকি অংশ, প্রায় ৭০ ভাগের মালিক। কিন্তু সেই থেকে তবু প্রপাগান্ডা আর কখনো বন্ধ হয়নি – আর তা থেকে ‘হাম্বানটোটা’ আর ‘চীনের ঋণের ফাঁদ’ এ দুই শব্দ থেকে যায় জব্বর প্রপাগান্ডা শব্দ হয়ে।

    তাহলে এই লেখা থেকে আমরা ঠিক কী করব? কী জানব?
    এসব প্রপাগান্ডার সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তিমূলক দিক যেটা তা হল, এই প্রপাগান্ডা বলতেই পারে না যে কোন দেশ কী পরিমাণ ঋণ নিলে তা ‘ঋণের ফাঁদ’ হয়ে যায়? (এক কথায় কোন দেশের জন্য কত দূর ঋণ নেয়া সেফ [safe]? তা কি আগাম জানা যায়? তা মাপার কি কোনো স্টান্ডার্ড আছে?) নাকি চীনা বা বিদেশী ঋণ মাত্রই ‘ঋণের ফাঁদ’? প্রপাগান্ডিস্টরা এটা কোনদিন পরিষ্কার করে বলে না, উহ্য রেখে পাশ কাটিয়ে থাকে? অর্থাৎ কোন দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান কী ও সেফ ঋণ নেওয়ার স্টান্ডার্ড কী তা হাজির না করেই এরা দাবি করতে থাকে চীনা ঋণ নেয়া একটা ফাঁদ! এই হলো এসব প্রপাগান্ডার কৌশল। এমনকি আমেরিকান প্রশাসন যে প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল এমন একটা রিপোর্ট হল এখানে।   এই রিপোর্টেও এ দুই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, পাশ কাটিয়েছে। তাদের ছাপানো কোনো প্রপাগান্ডা আর্টিকেলেও এ নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। বরং এটা আমেরিকান চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক অবস্থানের পক্ষে সাফাই বক্তব্য। যা ঠিক ঋণ নেয়া প্রসঙ্গে অর্থনীতি-নির্ভর ব্যাখ্যা নয়।
    এমনকি পরবর্তিতে এসব প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এক ডাচ কনসাল্টেন্টের রিপোর্ট ওই দাবি নাকচ করে আর্টিকেল ছেপেছিল যদিও সেখানেও ঋণ নেয়ার স্টান্ডার্ড কী, কত দূর ঋণ নেয়া সেফ আর আলোচ্য দেশের পরিসংখ্যান গত ফ্যাক্টস কী তা নিয়ে কোনো আলাপ করা হয়নি সেখানে। এতে সবার বক্তব্যই হয়ে গেছে শেষ বিচারে এক আন্দাজি কথাবার্তা বা সরাসরি প্রপাগান্ডা অথবা এসব প্রসঙ্গ থেকে দূরে অন্য প্রসঙ্গের বক্তব্য। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য ও প্রসঙ্গ হলঃ কোন দেশ নিজ অর্থনীতিতে কী পরিমাণের বেশি বিদেশী ঋণ নিয়ে ফেললে তা রিস্কি হওয়া শুরু হতে পারে, এ নিয়ে একটা গবেষণা স্টাডির ফলাফল পাঠকের সাথে সহজ ভাষায় আলাপ করা, শেয়ার করা।

    এনিয়ে বিশ্বব্যাংকের স্টাডি রিপোর্টের ফাইন্ডিংস কী বলেঃ
    সৌভাগ্যবশত এটা কোন খামখেয়ালি কথা নয়; গবেষণা, অবজারভেশন আর স্টাডি থেকে বাস্তবে পাওয়া রেজাল্ট। এই গবেষণাটা করেছিল বিশ্বব্যাংক এবং তা টানা ১৯৮০-২০০৮ এই ২৮ বছরের ডাটা নিয়ে। আর তা ১০১টা দেশের অর্থনৈতিক ডাটা নিয়ে যাদের মধ্যে গরিব ও ধনী উভয় ধরনের দেশই ছিল।
    কোন দেশের রাষ্ট্রীয় ঋণ পরিমাপ করার এক প্রচলিত পদ্ধতি হল তা ওই দেশের জিডিপির কত অংশ বা অনুপাতে কত তা জেনে নিয়ে প্রকাশ করা। অর্থাৎ ওই দেশের নেয়া মোট ঋণ, মোট জিডিপির কত অংশ সে অনুপাত সংখ্যা দিয়ে। যেমন যদি বলা হয় একটা দেশের ঋণ ৭৭%। তাহলে এ কথার মানে ওই দেশের জিডিপির ৭৭% – এই অঙ্কই হল ও দেশের নেয়া মোট বিদেশি ঋণ। আসলে এটাই ও দেশের ঋণ-বনাম-জিডিপির অনুপাত। যদিও বিভিন্ন দেশের মোট ঋণ সংক্রান্ত ডাটা পড়তে গিয়ে সাবধান! মোট ঋণ বললে রাষ্ট্র আভ্যন্তরীণ ভাবে নিজ কারেন্সিতে যে লোন নিয়েছে সেটাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে তাতে। তাই পরিস্কার করে বলতে ও বুঝতে হবে যে আমরা কোন দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রায় নেয়া ঋণ আমাদের আলোচ্য বিষয়।

    এই হিসাবে এই গবেষণায় পাওয়া ফাইন্ডিংস হল, কোনো দেশের নেয়া রাষ্ট্রীয় ঋণ ঐ দেশের জিডিপির ৭৭% বেশি হলে বা ছাড়িয়ে গেলে তা বিপদ জোনে প্রবেশ করেছে মনে করা হবে। তবে এই হিসাব সব্দেশের বেলার জন্য নয়। এতা কেবল অগ্রসর অর্থনীতির দেশের (যেমন জি৭ গ্রুপের দেশ [G7 countries]) বেলায় যারা পুরনো ও বড় অর্থনীতির দেশ বলে অনেক ঘাত সইবার সক্ষমতা থাকে।

    আর এর পরের ক্যাটাগরির মানে যাদেরকে উদীয়মান [Rising Economy] অর্থনীতি (যেমন জি২০ গ্রুপের দেশ) বলে, এদের ক্ষেত্রে টিপিং পয়েন্ট [Tipping point] বা বিপজ্জনক জোনে প্রবেশ ধরা হয় বা ঋণ-জিডিপি অনুপাত হল তাদের ৬৪% এর বেশি তা ছাড়িয়ে গেলে।

    এই হলো, বিশ্বব্যাংকের ওই গবেষণা ফলাফল থেকে পাওয়া ফলাফল। তাই তখন থেকে এটাই বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে মানা হয়। এই বক্তব্যগুলো পাওয়া গেছে ‘টিপিং পয়েন্ট খোঁজা কখন রাষ্ট্রের নেয়া ঋণ খারাপ ঋণে পরিণত হবে’[Finding The Tipping Point — When Sovereign Debt Turns Bad] এই শিরোনামে পাওয়া গবেষণা ফলাফল থেকে, যা বিশ্বব্যাংকের লাইব্রেরিতে রক্ষিত। আর ‘টিপিং পয়েন্ট’ বলতে সহ্য সীমা বা ভেঙে পড়ার আগের বিন্দু বুঝা যেতে পারে।

    তাহলে আমরা এখন আন্দাজে মন গড়া কথা বলে, যাকে দেখতে পারি না তার বিরুদ্ধে কথা বলা প্রপাগান্ডা থেকে চাইলেই বের হয়ে আসতে পারি। কারণ অন্তত বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে একটা কিছু আমাদের হাতে আছে। কোনো স্টান্ডার্ড মানে কোনো ধরনের মাপকাঠি যেটা ছাড়াই চীনবিরোধী প্রো-আমেরিকান বা প্রো-ইন্ডিয়ান হয়ে ইচ্ছামতো খামখেয়ালি প্রপাগান্ডা থেকে আমরা এখন চাইলে বের হয়ে আসতে পারি।

    সাথে অন্য একটা কথাঃ  যদিও বিশ্বব্যাংকের ঐ রিপোর্টে দুধরণের দেশের ক্যাটাগরির কথাই বলা আছে। তবু অনেক মিডিয়া রিপোর্টে আরেকটা বা গরিব দেশের ক্যাটাগরির কথা বলতে দেখা যায় যাদের বেলায় নেয়া বিদেশী ঋণ নিজ জিডিপির ৪০% এর বেশি হলে সেটাকে “টিপিং পয়েন্ট” বলে দাবি করা হয়েছে। এই হিসাবেও বাংলাদেশে (যতগুলো উৎস থেকে দেখা যায় এর সবটাই) এখনো ৩১% এর নিচে আছে ; কোন কোন দাবিতে এটা ১৫% বলে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করেছেন অনেক মিডিয়া রিপোর্টে।। আর বাংলাদেশের মোট ঋণের মাত্র ৬.৮১% হলো চীনের ঋণ আর সবচেয়ে বড় দাতাটা হলো বিশ্বব্যাংকের; সেটা ৩৮%।

    According to the World Bank and the International Monetary Fund (IMF), that a country will cross the danger mark if its external debts exceed 40 percent of GDP ensures that Bangladesh is in the “safe zone,” as its total foreign loan is less than 15 percent of its GDP.

    কাজেই এটা পরিষ্কার আমরা দেখছি যে, তবুও চীনবিরোধী একটা প্রপাগান্ডার নহর এখনও বয়ে যাচ্ছে।

    টিপিং পয়েন্ট নিয়ে কিছু মজার তথ্যঃ
    বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, জি৭ ভুক্ত বড় অর্থনীতির আমেরিকার বেলায় তার ঋণের টিপিং পয়েন্ট হয় ৭৭%। কিন্তু সেই ১৯৪৬ সালেই মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যখন আমেরিকা একচ্ছত্র গ্লোবাল নেতা হিসেবে উঠে এসেছিল তখনই খোদ আমেরিকার টিপিং পয়েন্ট ছিল ১০৬% যার সোজা মানে এটা ৭৭% চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তা সত্বেও আমেরিকা সেকালে গ্লোবাল নেতাই ছিল এবং অন্য সব দেশকে ঋণ দেয়ার মূল উৎস ছিল এবং তা সরাসরি দ্বিপক্ষীয়ভাবে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে গেছিল।
    তবে এছাড়া আরো বড় ঘটনাটা হল, পরে আমেরিকার এই ঋণ-বনাম-জিডিপি অনুপাত কমতে থাকে। শেষ ১৯৭৪ সালের মধ্যে এটা নেমে মাত্র ২৩% হয়ে যায়।

    তাহলে এখন কত?
    পরে ১৯৮০ সাল থেকে আমেরিকার এই অনুপাত বা রিয়েল টিপিং পয়েন্ট আবার বাড়তে থাকে; ২০০৭ সালের গ্লোবাল মহামন্দার সময় আরো বাড়ে। আর ২০০৯ সাল থেকে এটা ৭৭% এর বেশি ছাপিয়ে তা বাড়তে শুরু করেছিল যেটা এখনো বৃদ্ধির দিকে। ২০২০ সালের সেকেন্ড কোয়ার্টারে এটা সর্বোচ্চ ১৩৫.৯% ( যদিও সারা বছরের গড় ১৩৪%) হয়ে আছে।
    এর মানে সারকথাটা হল,  বিশ্বব্যাংকের টিপিং পয়েন্টই শেষ কথা নয়; একটা স্টান্ডার্ড মাত্র। ফলে এটা ছাপিয়ে গেলেই সব ভেঙে পড়বেই এমনটা সত্যি নয়, তবে হতে পারে। আর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বড় অর্থনীতি হয়ে থাকার কারণে এসব দেশের ঘাত সহ্য ক্ষমতা বেশি, অভিজ্ঞতায় তাই দেখা গেছে।

    কোন দেশ সর্বোচ্চ অনুপাতেঃ
    ২০২০ সালের হিসাবে এমন দেশ হল ভেনিজুয়েলা। তার অনুপাত ছিল ৩০৪%। আমরা সবাই কমবেশি ভেনিজুয়েলার অবস্থা জানি। তার উপর আমেরিকান তেল অবরোধ দেয়া আছে সুদীর্ঘ সময় ধরে। ফলে সুনির্দিষ্ট কিছু দেশেই সে একমাত্র তেল বিক্রি করতে পারে এবং তা ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রাতেই কেবল। আর তেল বিক্রি করে যেটুকু বিদেশী মুদ্রা আয় করতে পারে। সে কারণে ভেনিজুয়েলার অনুপাত বা টিপিং পয়েন্ট অমন উঁচু। তুলনায় সেকেন্ড সর্বোচ্চ অনুপাত ছিল জাপান ২০৪%। আর আমেরিকা ছিল ষষ্ঠ প্লেসে, ১৩৪%। তাহলে বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড ৭৭% এখানে কার্যত অকেজো! কিছুই ভেঙ্গে পড়েনি বা ট্রিপ করে যায় নাই!!

    তাহলে প্রপাগান্ডিস্ট মোড়ল ভারতের কী অবস্থাঃ
    এশিয়ার সব দেশই ‘চীনা ঋণের ফাঁদে’ পড়ে ডুবে গেল – এই হল ভারতের প্রবল প্রপাগান্ডার মুলকথা। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় আবার আমেরিকার থেকেও ভারতের গলা বেশি উঁচু। তাহলে এই প্রসঙ্গে ভারতের নিজের কী অবস্থা? সে খবর নিতে হয়। ব্লুমবার্গ [bloomberg] আমেরিকার ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ মিডিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম। সে ভারতের কুয়িন্ট [QUINT] নিউজের সাথে খবর শেয়ার করে ও ভারতে খবর ছাপে। তাদেরই এক রিপোর্ট বলছে, ভারতের ঋণ বনাম জিডিপি অনুপাত ২০২১ সালে ৮৭.৮%। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাজেট ২০২২ রাষ্ট্রের ঋণ নামিয়ে আনতে হলে একটি শক্ত অর্থনৈতিক উন্নতি দেখাতে হবে [Budget 2022: Bringing Public Debt Down Requires A Strong Groth Path]।’ আর তাহলেই নাকি আগামী বছর এই অনুপাত কমে ৮৭.৪% হতে পারে। অর্থাৎ ভারতকে যদি রাইজিং অর্থনীতির দেশ গণ্য করি, তাহলেও ওর বিশ্বব্যাংক স্টান্ডার্ড অনুপাত হয় ৬৪%। অথচ এই  আইডিয়াল টিপিং পয়েন্ট বা  স্টান্ডার্ড থেকে  রিয়েল টিপিং পয়েন্ট ৮৭% , তা অনেক দূরের ফিগার অবশ্যই। তাহলে কোন সুখে ভারত সব দেশের বিরুদ্ধে লেগে সেখানে ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ খুঁজে ফেরে?

    তাহলে ভারতের শেষ অবস্থাটা কীঃ
    গত ৪ এপ্রিল ভারতের অনেক পত্রিকাতেই একটা নিউজ ছাপা হয়েছে। তা হলো, অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে মোদি তার দু’ডজন সিনিয়র সচিব বা কর্কমর্তাদের নিয়ে লম্বা ৪ ঘণ্টার এক মিটিং করেছেন। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, ‘বুরোক্রাটেরা মোদিকে লাল পতাকা দেখিয়েছেন এই বলে যে, শ্রীলঙ্কার মতো ক্রাইসিস ভারতেও দেখা দিতে পারে।’ তারা আসলে বলতে চাইছেন ভারতেরঅনেক রাজ্যে যেভাবে নয়া প্রকল্প নেয়া হচ্ছে তা ভাল হচ্ছে না। এতে বৈদেশিক অর্থের সঙ্কটে পড়বে ভারত। হিন্দুস্থান টাইমস এ নিয়ে একটি ভিডিও ক্লিপও বানিয়েছে। আর এতে ভারতে হইচই পড়া অবস্থা যে, তাহলে কি খোদ ভারতই এখন শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে? এর সাথে এক অসমর্থিত খবরও আছে। তা বলছে, সম্প্রতি মোদিকে বাইডেন যে ফোন করেছিলেন, রাশিয়া থেকে ভারত যেন তেল আর না কিনে এই ইস্যুতে, সেখানে ভারত বাইডেনের কথায় আসলে রাজি হয়েছে। কারণ, বাইডেন মোদিকে শ্রীলঙ্কা ধরনের অর্থনৈতিক ক্রাইসিস সামলাতে ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট দিতে কবুল করেছেন। ভারতের ৬১৪ বিলিয়ন বৈদেশিক ঋণ শোধে কিস্তি দেরিতে ফেরত দিতে ও সুদ কমাবার আবেদন করেছেন মোদি। এখন একথা কতটা সত্য তা জানা যাবে যদি আমরা দেখি যে ভারত আর রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে না!!
    এবার তাহলে ভারতকেও কোন চায়না ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারল!! এটা সত্যি এক তামাসার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে!
    তাহলে দাঁড়াল এই যে কার প্রপাগান্ডা কখন যে কাকে খায়? এখন প্রধান প্রশ্ন হল, তাহলে, ভারতকে ঋণের ফাঁদে ফেলল কে সে চীন?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারতকেই ঋণের ফাঁদে ফেলল কে! “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    গৌতম দাস

    ১১ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-42k

     

        The Indian-American underachiever

    ইউক্রেন ইস্যুতে পরাজয়ের পরে বাইডেন প্রশাসনের শেষ কামড় যেন শুরু হয়েছে। সে্টা অনুমান করেই আগে লিখেছিলাম, বাইডেন এখন দক্ষিণ এশিয়ায় চাপ বাড়াবেন। তাকে ফল দেখাতে হবেই! বাংলাদেশ এই চাপের মধ্যে পড়বে। তা কেবল বাংলাদেশ নয়, আমাদের এই সারা অঞ্চলে প্রবলভাবে এই চাপের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আসন্ন আরেক প্রধান টার্গেট এখন ভারত। “ভারতকে পক্ষে আনতেই হবে”, এরই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে আমেরিকা। কিন্তু এই চাপ কি কাজ করবে, না ভারতই হাতছুট হয়ে যাবে?

    দুই সপ্তাহ আগে বাইডেনের ইউরোপ সফরের পর থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাইডেন হেরে গেছেন। ইউরোপ বাইডেনের কথা মেনে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারছে না। বাইডেন বিকল্প দিয়েছিলেন যে, আমেরিকা নাকি ইউরোপকে তেল-গ্যাস জ্বালানিদাতা হতে চায়। এতে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া আগেই বিপুল উচ্ছ্বাসে মেতে এটাকে কাভারেজ দিলেও ইউরোপ মানে জার্মান-ফান্স-নেদারল্যান্ডসের ইউরোপ আনমুভড [unmoved] থেকে যায়। মানে, নিজেদের পুরনো অবস্থান যে, রাশিয়ান গ্যাসই তাদের লাগবে, সে অবস্থান বহাল থেকে যায়। অন্তত ২০২৪ সাল পর্যন্ত নাকি তাদের এমন থাকতেই হবে; না হলে তারা বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়বে, এই ছিল তাদের বক্তব্য ও অবস্থান।
    তাহলে, ইউরোপ বাইডেনের কথায় আনমুভড বা “মাতে নাই” পরিস্থিতিতে থেকে যায়। এটাতেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইউক্রেন ইস্যুতে বাইডেন হেরে গেলেন। আর এতে প্রথম ধাক্কাটা হল বাইডেন ইউরোপকে সাথে ধরে রাখতে ফেল করলেন।

    অবরোধের স্ববিরোধঃ
    কেন এমন হল, বাইডেন ইউরোপে কেন হারলেন? এর সোজা জবাব হল, বাইডেনের আমেরিকা তার চাপ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াবাড়িভাবে ব্যবহার করেছেন। কী সেটা? বাইডেন-ই এই ইউক্রেনের যুদ্ধকে তাঁর আবিস্কার “অবরোধ আর মানবাধিকার” এদুই অস্ত্র দিয়ে লড়বার একক পরিকল্পক। তিনি নিজে রাশিয়ার ওপর এক গাদা সিরিজ অবরোধ আরোপ তো করেছেনই। সাথে ইউরোপকেও চাপ দিয়ে বাধ্য করেছেন একইভাবে অবরোধ দিতে। এটাই বাড়াবাড়ি। তাতে এবারই প্রথম ইউরোপ কোনো দেশের ওপর এমন বেপরোয়া হয়ে রেকর্ড পরিমাণ অগুণতি অবরোধ আরোপ করেছে। এ ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে অবিবেচক ও আত্মঘাতী কাজটাও তারা করে ফেলেছে, জাস্ট বাইডেনকে খুশি করতে হবে এই বিবেচনায়। যেন না জানি, তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে না আবার বাইডেন মহাশয় ইউরোপের ওপর অসন্তুষ্ট ও ‘সংহতিতে’ নেই মনে করে বসেন কি না যেন এই ছিল ইউরোপের ভয়। কিন্তু ইউরোপেরও কপাল খারাপ, যেখানে বাঘের ভয় ঠিক সেখানেই যেন গাড়ি খারাপ হওয়ার দশা!

    বাইডেনের চাপে তারা খেয়ালই করেননি যে, রাশিয়ার ওপর দিয়ে তাদের ইউরো মুদ্রার অবরোধে আরোপের অর্থ আসলে কার্যত ইউরোপের নিজের ওপরই অবরোধ দেয়া হয়েছে। কেন?
    এটা শুনতে অনেকের মজা লাগতে পারে যে, ইউরো মুদ্রা এখন মহা ক্ষমতাধর হয়ে গেছে যে, সে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে তাকে কুপোকাত করে দিতে পারে। তাহলে নিশ্চয় ইউরোপের অর্থনীতি অনেক ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে! তাই কি? একটু দাঁড়ান, ধীরে চলেন প্লিজ! কেন?

    ইউরো অবরোধের সোজা মানে হল, আপনি পুতিনের রাশিয়াকে বলছেন যে, এখন থেকে আর আমার ইউরো মুদ্রায় কোনো পণ্য আর বেচা এবং কেনা কোনোটাই করতে পারবেন না। অর্থাৎ ইউরো যাদের মুদ্রা এই ইউরো জোনের বাইরের রাশিয়াসহ সব দেশ তো বটেই এমনকি জোনের ভিতরের সদস্য যেমন জার্মানি সেও রাশিয়ার কাছ থেকে ইউরোতে গ্যাস কিনতে পারবে না। এটাই হয়ে গেছিল এর অর্থ।  যেখানে জার্মান অর্থনীতি্র (চাহিদা ওঠানামা আছে বলে), ৪০-৫৫% রাশিয়ান গ্যাসের ওপর  নির্ভরশীল। অথচ জার্মানিও রাশিয়ান গ্যাস আমদানি করতে পারবে না। অবরোধের মানে হয়ে গেছে তাই। কেন?

    অবরোধের শুরুতে একটা ফাঁকি দিয়েছিল জার্মানির মত ইইউ এর ইউরোপ। তারা বুদ্ধিমান হয়েছে মনে করে কার্যত রাশিয়ান গ্যাস কেনার ওপর অবরোধ অকার্যকর করে রেখেছিল। ভেবেছিল, এভাবে রাশিয়ার ওপর ইউরো অবরোধ দিয়েও রাশিয়ান গ্যাস তারা কিনে-চলতে পারবে। কিন্তু না!

    খোদ পুতিন এতে পানি ঢেলে দিয়েছেন। পুতিন ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যারা আর বন্ধুসুলভ দেশ নয় (মানে যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ দিয়েছে) তারা এখন থেকে রাশিয়ান কোনো কিছু কিনতে চাইলে রাশিয়ার নিজের মুদ্রা রুবলে [ruble] এর মূল্য পরিশোধ করবে। আর এতেই মহাবিপদে পড়ে গেছে ইউরোপ; বিশেষত যারা রাশিয়ান গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাৎক্ষণিক এদেরকে জ্বালানি রেশনিং শুরু করতে হয়েছে। কারণ ইউরোপে বসবাসে নিজ বাস করার ঘর গরম রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে সেই ইউরোপ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়। তাতে আপনি গরিব-ধনী যাই হন। আর এই সমস্যা মোকাবেলার তাদের সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হল, বিপুল জ্বালানি ব্যবহার করে মিউনিসিপালিটির গরম পানির প্রবাহ বাসিন্দাদের বাসগৃহে পৌছানো। এতে প্রত্যেকটা বাসার প্রত্যেক বসবাসের রুমের ভিতরের দেয়াল বেষ্টন করে থাকে এই গরম পানির লাইন। আর তাতেই রুম বসবাসযোগ্য থাকে। তাই গ্যাস ইউরোপের জীবনযাপনে খুবই এসেনশিয়াল। তাহলে এর মানে দাঁড়িয়েছে, যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে নিজেরা পরাশক্তির ভান ও সুখবোধ করছিল আজ সেই ইউরোপ নিজেরাই নিজেদের অস্ত্রের মুখে কাঁপছে!! নাকি হয়তো ঠাণ্ডায় কাঁপছে, আসলে সব একই কথা হয়ে গেছে! মানে নিজ অবরোধ নিজেরই বিরুদ্ধে চলে গেছে।

    এখন অনেকের মনে হতে পারে, রুবলে মূল্য পরিশোধের কথা বলে এটা পুতিনের প্রতিহিংসা। আমেরিকান ইউরোপে প্রপাগান্ডায় পুতিনের যে দানব ছবি এঁকে দিয়েছেন তাতে বেশির ভাগ মানুষ এটাই বিশ্বাস করবে হয়ত! কিন্তু না এটা ফ্যাক্টস নয়। কেন?

    ইউরোপ ভাবতে পারে যে,  তারা ইচ্ছা করলেই কেবল তাদের রাশিয়ান গ্যাস কেনার উপর তাদের অবরোধ অ-প্রযোজ্য করে রাখতে পারে। আর এমন এই ব্যতিক্রম বা বিশেষ ছাড় দিয়ে তারা তো পুতিনকেই ফেবার করছিল। যে পুতিনের গ্যাসটা অন্তত ইউরোপ কিনতেই থাকবে। ফলে বেচাবিক্রিহীন পুতিন-কে নিশ্চয় এটা ফেবার করাই হল!!  সরি,  এই অনুমানটা ডাহা ভুল। কারণ রাশিয়ান গ্যাসের বিনিময়ে ইউরোপ পুতিনের হাতে ইউরো ধরিয়ে যদি দেয়ও তবু এসব ইউরো আসলে অচল মুদ্রা। না, এটা অচল পয়সা বা ফেক নোট গছিয়ে দেয়া নয়। আসল ইউরো তারা দিলেও তা রাশিয়ার কাছে অচল নোটের মতোনই ঠেকেছিল। কেন? কারণ রাশিয়া ঐ ইউরোতে নিজের কোনো কিছু কেনার বেলায় দাম পরিশোধের মুদ্রা হিসাবে তা ব্যবহার করতে পারে না। কারণ, মূলত ইউরোপ তো রাশিয়ার ওপর ইউরো ব্যবহার করে কিছু কেনার ক্ষেত্রেও অবরোধ দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ যেন হাতে একশ টাকার নোট আছে ঠিকই কিন্তু দোকানদার ওই নোট নিতে চাচ্ছে না। সোজা কথায়, রাশিয়ার হাতে পড়লেই যেকোন ইউরো অচল নোট হয়ে যাবে। তাই ইউরো নিয়ে রাশিয়ার কাউকে গ্যাস বিক্রি করার মানে হল তাকে মাগনা গ্যাস দেয়া হয়েছে। কারণ রাশিয়ার হাতে থাকা ইউরো বাজারে কেউ নিবে না। এ কারণেই ইউরোপসহ সবাইকে রুবলে দাম শোধ করে রাশিয়ান পণ্য কিনতে বলা – এটা পুতিনের কোনো প্রতিহিংসাই নয়। এটা আসলে ইউরোপের ইউরো অবরোধ আরোপের-ই স্ববিরোধিতা। তারা খেয়ালই করেনি যে, রাশিয়ান গ্যাস বিক্রির উপর অবরোধ আরোপে তাদের বেলায় ছাড় থাকলেও তাতে রাশিয়ার কোনো লাভই নেই; কারণ তা রাশিয়ার নিজের কোন কেনাকাটাতে  হাতে পাওয়া অই ইউর মুদ্রা ব্যবহারের কোন সুযোগই নাই। তাই।রাশিয়ার দিক থেকে ইউরোতে যেকোনো কেনাবেচার উপরেও কোনো ছাড় বলে বিবেচিত হবে না। হওয়ার সুযোগই নেই।

    দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশঃ
    আর এখান থেকেই দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশের সুযোগ খুলে যায়। রাশিয়ার উপর অবরোধ এখন বহুবিধ। আরোপিত  অবরোধ এখন আমেরিকা, ইউরোপ ছাড়াও আমেরিকার ধন কোয়াড সদস্য (কেবল ভারত ছাড়া) সবারই অবরোধ আরোপিত আছে। এমনিতেই একালে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক বড় উপায় হল তার মাটির নিচের সম্পদ বিক্রি করা। কাজেই এই সম্মিলিত অবরোধ রাশিয়ার উপরে যথেষ্ট ভারী প্রভাব এনেছে। আবার লক্ষণীয় ভারতের জনসংখ্যা ১৩৫ কোটি যার কাছাকাছি হল একমাত্র চীন। ফলে এমন বিশাল জনসংখ্যার ভারতে বিশাল জ্বালানি চাহিদা অনুমেয়। তাই পুতিনও ব্যারেল-প্রতি ৩৫ ডলার সমতুল্য ছাড় দেয়াতে [India Will Continue to Buy Oil From Russia, Sitharaman Says] এই সুযোগে সম্প্রতি ভারত ১৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনে নিয়েছে, রাশিয়া থেকে রুবলে। আর এতে স্বভাবতই এটা আরোপিত সব অবরোধকেই ফাঁকি দেয়া। অতএব আমেরিকার চোখে ভারত “বেয়াড়া এক দুষ্ট ছেলে’ হয়ে উঠেছে। তাই আমেরিকা ভারতকে প্রথমে বুঝিয়ে বলা, পরে কড়া কথা আর হালকা হুমকি দিতে দিতে গত এক মাস পার করে ফেলেছে। এখন এরপর আগামী পরশু ওয়াশিংটনে বসছে দু’পক্ষের এক ক্রুশিয়াল বৈঠকে। এই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক নাম “U.S.-India 2+2 Ministerial meeting: গত চার বছর ধরে এদুই দেশ এমন বৈঠক করে আসছে। তাই এটা চতুর্থ বৈঠক।

     

    কিন্তু কেন ভারতের রাশিয়ান তেল কিনাতে আমেরিকা এতে এত বিপদ গুনছেঃ
    ভারত সস্তা পেয়ে কিছু রাশিয়ান তেল কিনে নেওয়াতে য়ামেরিকার কাছে কেন ব্যাপারটা সিরিয়াস আর তা ঠিক কতটা সিরিয়াস? এর উত্তর পাওয়া খুবই সহজ। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার দেশ হল চীন ১৪০ কোটির বেশি। আর এর পরের বড় জনসংখ্যার দেশ হল ভারত ১৪০ কোটির কম, প্রায় ১৩৮ কোটি। আর এরা দুই রাষ্ট্র যদি একসাথে রাশিয়ান তেল কিনে এবং রুবলে তাহলে এর অর্থ হবে দুনিয়ার মোত জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ ভাগ জনসংখ্যায় রাশিয়ান তেন কিনতে ফিরে গেল। অর্থাৎ এদের মিলিত জনসংখ্যা বা রাশিয়ান তেলের ভোক্তা হয়ে যাওয়া খুবই তাতপর্যপুর্ণ। রাশিয়ান মোট কাস্টমারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আমেরিকান অবরোধের প্রভাব অকার্যকর হয়ে যাবেই। সবচেয়ে বড় কথা এতা কিন্তু চীন-ভারতের কোন আঁতাত নয়। বরং ২০১৪ সালে যখ প্রথম আমেরিকা রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ করেছিল এরই প্রতিক্রিয়ার চীন-রাশিয়া তেল কিনার চুক্তি হয়েছিল। চীনা ইউয়ান মুদ্রায় রাশিয়ান তেলের বিনিময়ে চীনা পণ্যের রাশিয়ার কিনে নেওয়া চালু তখন থেকে।   আর ভারত এখন রাশিয়ান তেল সস্তায় পেয়ে ছারতে চাচ্ছে না এমন কাস্টমার। কাজেই  এদুই বড় রাশিয়ান তেলের ক্রেতা বাইডেনের জন্য বিরাট হুমকি অবশ্যই!! এথেকে অনুমান করা যায় ভারতকে আমেরিকার কোলে ফের পেতে বাইডেন অনেক দূর যেতে রাজি হবেন, সম্ভবত  চাপ প্রয়োগ সর্বোচ্চ করবেন!

    এমনিতে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকারের – কথা যদি বলি তবে শুরু থেকেই বাইডেনের “মানবাধিকার” –  এই অস্ত্র তাক করা ছিল মূলত ভারতের দিকে। না ভারতকে ঠিক কোন বিশেষভাবে ঘায়েল করার জন্য নয়। বরং বাইডেনের দেখানো দরকার এই অস্ত্র তিনি সবার উপরে সমান প্রয়োগ করছেন কোনো বৈষম্য বা কাউকে খাতির ছাড়া। এ ছাড়া এটা বাইডেনের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। বরং ভারতের পাওনা তিনটা অবরোধের সিদ্ধান্ত তৈরি আছে; কিন্তু তিনি কার্যকর না করে ফেলে রেখেছেন। অর্থাৎ বাইডেনের ক্ষমতা নেয়ার পর থেকেই মুলত বাইডেন-ভারত আর এক লাইনে অ্যালাইন করা অবস্থানে নাই, চলছে না এবং এটাই তাদের ফান্ডামেন্টাল বিরোধ। মানে কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে চলতে পারবেন না। কেন?

    যে শাসক নরেন্দ্র মোদি নিজেরই  জনগোষ্ঠীর এক অংশ, মুসলমানদের খুন করার প্রকাশ্যে হিন্দুদেরকে আহবান জানানোর ব্যবস্থা করে দিতে দ্বিধাগ্রস্ত নন – এই মোদিকে চিনতে হবে। কেন মোদি এমন ডেস্পারেট? তার খোঁজ নিলে দেখব, এটাই আসলে তাঁর নির্বাচনে জিতে আসার খুবই কাজের এক কৌশল। সব পথ হারিয়ে এটাই এখন মোদির একমাত্র অবলম্বন। কাজেই মুসলমান নিগৃহীত করা তার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তবেই এই জোশে হিন্দু ভোট তার বাক্সে আসবে। অতএব, এ জায়গায় মোদি বাইডেনের মানবাধিকারের কথায় কোনো ছাড় দিতে পারবেন না। আবার বাইডেনও ভারতকে মানবাধিকারে এমন জলজ্যান্ত লঙ্ঘন উপেক্ষা করতে পারবেন না। কারণ অবরোধ ও মানবাধিকার এদুই এখন তার প্রধান অস্ত্র। তিনি ভারতের উপর এই অস্ত্র প্রয়োগ বাতিল না করে বড়জোর পিছিয়ে যত দিন দেরি করা যায় তা করতে পারেন, এটাই কেবল বাইডেনের হাতে আছে। এভাবেই তিনি এখন পর্যন্ত ভারতকে ধরে রেখেছেন চুড়ান্ত ফাটাফাটিতে যান নাই। যদিও এটাই হয়ে আছে – বাইডেন-ভারত সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা না হওয়ার পথে প্রধান এক বাধা হয়ে থেকে আছে।

    বাধা দুইঃ
    রাশিয়ার ওপরে ভারতের সমরাস্ত্রে নির্ভরশীলতা, সেটা কমপক্ষে ৭০ শতাংশ। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক রিপোর্ট এটাকে ৮৫%  […as high as 85 per cent.] বলেছে। তাই আমেরিকার রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপের পরে সবচেয়ে বড় বিপদ গুনেছে ভারত। প্রধান কারণ সত্যিই ভারতের সাথে কোথাও কারও সাত দিন যুদ্ধ চললে সাপ্লাই ফুরিয়ে যাওয়াতে এরপর ভারত রাশিয়ান সাপ্লাই বিশেষত ছোট-বড় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও স্পেয়ার্স পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যাবে।  ভারত কেন এমন রাশিয়া নির্ভরশীল হল এর অবস্থার পেছনের কারণ দু’টা। এক. রাশিয়ান অস্ত্র তুলনায় আমেরিকান যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে সত্যিই দশগুণ সস্তা। একটা হেলিকপ্টার, এমন ন্যূনতম ভারী অস্ত্রের বেলাতেই এটা সত্য। দুই. রাশিয়া তো আসলে ভারতের কোল্ডওয়ার-কালের মিত্র। ফলে সেকাল থেকে রাশিয়ান অস্ত্রনির্ভর হয়েই ভারত নিজের প্রতিরক্ষা সাজিয়েছিল। সুবিধা ছিল প্রধান ভারতের তখনকার প্রধানশত্রু পাকিস্তান যেমন আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাঁধা। ফলে ভারতেরও রাশিয়ার সাথে বাধা পড়লে এটা দীর্ঘ দিন একই সাপ্লায়ার হয়ে টিকে থাকার বা কাজ করার সম্ভাবনা ভাল মনে করা হয়েছিল। তাই এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক জেনেশুনেই তৈরি। তবে এটাতে প্রথম নড়াচড়া পড়েছিল ২০০১ সালে বুশের আমলে ওয়ার অন টেরর ইস্যুতে ভারত বুশের মিত্র হওয়ার পর থেকে। অর্থাৎ কোল্ডওয়ার উত্তরকালে সেই প্রথম বুশ ভারতকে নিষিদ্ধ পারমাণবিক কাঁচামাল ও টেকনোলজি সরবরাহের লোভ দেখানোতে। সেখান থেকেই ক্রমেই এটা ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর হয়ে পরে চীন ঠেকানোর নাম করে ভারত-আমেরিকা সখ্যের গভীরতা শুরু। আর এতেই আমেরিকা-ঘনিষ্ট ভারতই এখন সবচেয়ে করুণ দশায়। বলা হচ্ছে ‘বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সবচেয়ে চিকন এক দড়ির উপর দিয়ে হাঁটছেন” [Why India is walking a diplomatic tightrope… ]।’ কেন এমন মনে করা?

    তাই ভারতের একেবারে প্রধান শঙ্কা হল, রাশিয়ান অস্ত্রের সাপ্লাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কারণ রাশিয়ার উপর বলতে গেলে আমেরিকার সব বন্ধু অবরোধ আরোপ করেছে। তাই এক কড়া অবরোধের চাপে তাহলে ভারত রাশিয়ান স্পেয়ার্সের সাপ্লাই পাবে কী করে? অর্থ পরিশোধ করবে কী উপায়ে? আর এখান থেকেই আমেরিকান অবরোধ বাইপাস করে রুবলে রাশিয়ার সাথে পণ্য লেনদেনের ব্যবস্থা প্রথম চালু করে ভারত। স্বভাবতই এটাই বাইডেনের সবচেয়ে বড় না-পছন্দ ও ক্ষুব্ধ তিনি। অতএব আমেরিকা হুঙ্কার দিচ্ছে, “রাশিয়ার তেল কেনা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন নয়, তবে ইতিহাস নয়া দিল্লিকে ভুল স্থানে নিয়ে যাবে: হোয়াইট হাউজ”।

    এই অবস্থায় আমেরিকার ডেপুটি নাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার দালিপ সিং, যিনি আসলে বাইডেনের রাশিয়া অবরোধের টেকনিক্যাল প্রণেতা, তিনি ভারত সফরে এসেছিলেন। তিনি উপস্থাপন নরম কিন্তু কড়া ভাষায় ভারতকে সাবধান করেন ভারতকে, রাশিয়ান তেল কিনার বিরুদ্ধে। সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়া সংগে সম্পর্ক গভীর না করতে [urged the country not to enhance ties with Moscow.] র তাতেই মিডিয়া মন্তব্যে এটাকে বিতর্কিত মন্তব্য [created controversy ] বলে ট্যাগ দেয়া হয়েছে। এমনকি শিরোনামে আর কড়া করে বলা হয়েছে NSA who warned India on Russia ties…।

    এমনিতেই আমেরিকার শখের ধন কোয়াডের [QUAD] এটা নিয়ে গর্ব বা হুমকির শেষ নাই এরই ভিতর ভারত বাকি কয়াড সদস্যদের মত রাশিয়ার উপর কোন অবরোধ আরোপ দূরে থাক উলটা পক্ষে যায় এমনভাবে ভোট দিয়েছে।তাই   বাইডেন একবার বলে বসেন কোয়াডের মধ্য একমাত্র ভারতই কাপাকাপি [shaky] বা অগোছাল [The Quad is — with the possible exception of India being somewhat shaky] . আর এতে আরএসএস এর এম নেতা উলটা বলেন আমেরিকাই কাপাকাপি [shaky]। আমেরিকা চীন থেকে শুরু করে আফগান্সতান পর্যন্ত শেকি [It’s Biden’s US that’s shaky, not India — from China to Afghanistan]। শুধু তাই না তিনি আরও আগিয়ে বলেন, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক একটা শেকি ফেজে প্রবেশ করেছে [India-US relations seem to be entering a ‘shaky’ phase]।

    অর্থাত এসব রিপোর্ট নিয়ে  ভারতের মিডিয়া তোলপাড়। যদিও ইউক্রেন ইস্যু হাজির হবার আগে থেকেই ভারত বাইডেনের বিকল্প বা বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করে আসছিল, যাতে মুসলমান দলনের কারণে মোদির ওপর আমেরিকান মানবাধিকার চাপ ভারত এড়াতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার ‘কোলে চলে যাওয়া’র সময় তখন যে ভানটা ভারত তৈরি করেছিল সেটাই এখন একেবারেই সিরিয়াস হয়ে গেছে।

    অবস্থা দেখে মনে হয় ভারতের মনের গহিনের অনুভব সম্ভবত এটাই যে, ভারত আমেরিকার সাথে সখ্য চাইলেও শেষে ভারত তা রক্ষা করে চলতে পারবে না। রাশিয়ার কাছেই ভারতকে যেতেই হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার চীনের সাথে সম্পর্কটা কেমন হবে – এই হল আরেক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আর এটাই   ভারতের বড় দ্বিধা অস্পষ্টতার জায়গা। ফলে আমেরিকা চাপ দিলেই ভারত আরও দিশেহারা বোধ করে। আর নিজ বিপুল জনসংখ্যার বাজারের লোভ দেখিয়ে ক্ষুব্ধ আমেরিকাকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু এবার স্টেক সম্ভবত অনেক উঁচু! তাই কী হবে এই আশঙ্কা জয়শঙ্করেরও! তিনি আবেদনের স্বরে বলছেন, রাশিয়ায় অবরোধের কারণে আমাদের নিরাপত্তার দিকটা (মানে তাদের অস্ত্র পাবার দিকটা)  অস্পষ্ট হয়ে গেল। এদিকটা তাদের বিবেচনা করা দরকার।

    এসবের মধ্যেই ব্যাপক কুটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে। অথচ ভারতের এই “রুবলে দেনদেন” চালুর ব্যাপারে এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর হতে চান বাইডেন। সর্বশেষ এটা নিয়েই মূলত ওয়াশিংটনে ১১ এপ্রিল থেকে ভারত-আমেরিকান বৈঠক, যার গালভরা নাম ‘২+২’। আর এখানেই রাশিয়ান এস-৪০০  ভারতের কিনবার শাস্তি হিসাবেও এক অবরোধ আরোপ পেন্ডিং পড়ে আছে। আর এখানে ২+২-এর মানে হলো, দু’দেশেরই দুই পররাষ্ট্র ও দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একসাথে চারজনের বৈঠক। এর আগে চীনকে দেখাতে যে, ভারত যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে তা ভেবে এমন ২+২ বৈঠক নিয়ে মিডিয়ায় গর্ব ভরে উপচে উঠত আমরা দেখেছি। কিন্তু আজ সেসব ম্লান, সবাই রিয়েল প্রবলেমের সামনে পড়েছে। তাই যেন ভ্যানিটি উপাদানগুলো অনাদরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর এই মিটিংতা আসলে যদিও মূলত আমেরিকান সামরিক অস্ত্র ভারতের কিনা সংক্রান্ত কিন্তু নেপথ্যে ভারত-আমেরিকান সম্পর্কের টানাটানি অসন্তোষটাই সারফেসে বারবার ছাপিয়ে উঠতে চাইবে।

    তবে এটাও ভুলে যাওয়া ভুল হবে যে, জয়শঙ্করের “খুব চিন্তায় আছি” টাইপের যে ইমেজটা তৈরি করেছেন এর আরেক অর্থ ও উদ্দেশ্য আছে। তা হল, ভারতের কেনাকাটার উপর এসব আমেরিকান অবরোধে যেন  আমেরিকা ছাড় পায় সে জন্য আমেরিকার সামনে এক করুণ ইমেজ তৈরি করে রাখা। যদিও ভারত জানে, বাইডেনের এখানে ছাড় দেয়ার সুযোগ বা ইচ্ছার মধ্যে নাই। তবে জয়শঙ্করের মুল বা খাস উদ্দেশ্য হল, ভারতে মোদির মুসলমান কোপানোতে এজন্য এর উপর কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবরোধ যেন আরোপিত না হয়। সে ব্যাপারে বাইডেনকে ঠান্ডা রাখা। কারণ, রাশিয়ান অস্ত্র কিনার শাস্তি হিশাবে অবরোধ খাওয়া যতটা জাতিবাদি গর্বের, মুসলমান কোপানোর জন্য অবরোধ খাওয়া ততটাই বেইজ্জতির হবে!

    তবে ভারতের দিক থেকে আরেক রিয়েল থ্রেটও আছে যেটা ভারতের ভাষায় চীনের সাথে তার সীমান্তবিরোধ। যেটা আর কিছুই না, কলোনি আমল থেকেই অচিহ্নিত হয়ে থাকা সীমানা। যদিও একথা মনে করার কারণ আছে, এটা মূলত উগ্র হিন্দুত্ব এমন জাতিবাদী কল্পনার শাসক মোদি হওয়ার কারণে। যে কারণে এই যে দেখার বা উপস্থাপনের চেষ্টা যে, মোদির হিন্দুত্ব জাতিবাদ সীমান্ত রক্ষায় সবচেয়ে দেশপ্রেমিক! কিন্তু আসলেই কি এই প্রদর্শন খুবই মূল্যবান? সীমান্ত দুই ইঞ্চি জায়গা ছাড় বা দখল পাওয়াটাকে হিন্দুত্বের জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে ভোটের বাক্সে এর ফল ক্যাশ করার চেষ্টা এটা ত ফালতু জাতিবাদেরই থাকে। যেটা প্রাকটিক্যাল নয়, কাজের লাভালাভ নাই।

    বরং ভারতের লম্বা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে কথা বললে এই কথিত সীমান্তবিরোধ তুলনায় তুচ্ছ। আর আমেরিকা তো ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া গ্লোবাল নেতা যার বিপরিতে চীন  সে জায়গা নিতে ক্রমেই উত্থিত নেতা তাহলে বুড়া সিংহ আমেরিকার যে ন্যাচারালি মরণ হবে এটা না বুঝার কিছু নাই। কারণ এর আর ভারতকেও ন্যূনতম বিনিয়োগ বা ঋণ দেয়ার মুরোদও নেই। তাই প্রতীকী অর্থে ক’দিন পরে মরবে যে শক্তি এর সাথে ভারতের গাঁটছড়া বাঁধার অর্থ কী? ভারতের বন্ধু তো হওয়ার কথা ভারতের আগামীদের, তার অতীত নয়। এটা মানতে না পারার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা আসলে মোদির উগ্র হিন্দুত্ব, এই চোখ দিয়ে দেখার সমস্যা।

    ভারত-আমেরিকান নড়বড়ে সম্পর্কঃ
    ইউক্রেনে হার হচ্ছে টের পাওয়ার পরে বাইডেন দক্ষিণ এশিয়ায় জোর দিয়েছেন, মনোযোগ ফোকাস করেছেন। এটা ভারতও সেন্স করেছে। যেমন এক মিডিয়া রিপোর্ট তাই লিখছে, ‘পাকিস্তানের অস্থিরতা, কলম্বোর অর্থনৈতিক ক্রাইসিস, মালদ্বীপে ভারতবিরোধী ক্যাম্পেইন, তালেবানদের ভারতবিরোধিতা ও চীনের প্রভাব বাড়ানোতে ভারতের প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা ভারতের জন্য লংটার্ম রিস্কের ইঙ্গিত।’ [Colombo to Male to Islamabad, India has new headaches as neighbourhood erupts in trouble] অথচ আগে হলে মানে, ভারত আমেরিকার শক্ত কোয়াড বন্ধু হয়ে থাকার কালে এসব অস্থিরতাকে ভারত ইতিবাচকভাবে দেখত, নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নিত। অথচ এখন শঙ্কিত হচ্ছে। আসলে ভারত যদি নিজেকে চীনের সাথে তুলনীয়ই শুধু না, এক পরাশক্তি ভাবতে থাকে তাহলে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক আর ঘনিষ্ঠ না থাকলে চীনের সামনে সেই ভারতের কী হবে এ নিয়ে হাত পা কাঁপাকাঁপি করা থেকেই এমন রিপোর্টই তো লেখা হবে এবং হয়েছেও।

    যা হোক, ভারতের মন এখন আশঙ্কায় পূর্ণ যে আমেরিকা-ভারত সম্পর্কটা কি একেবারে ভেঙে না গেলেও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? নাকি ভেঙ্গেই যাবে? যেমন, রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকান আপত্তি যদি ভারত না শুনে তবে চরম পরিস্থিতিতে খোদ ভারতের উপরই একটা অবরোধ আরোপ হতে পারে আর সেটা খুব দূরের কিছু নয়। আর এটা নিয়েই আসলে ভারতের মূল দুশ্চিন্তা। আর সে ক্ষেত্রে তাহলে এশিয়ায় সুনির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশে কী হবে?

    বাংলাদেশে কোনো হবু আমেরিকান তৎপরতা বা হস্তক্ষেপে ভারত কোথায় কোন দিকে অবস্থান নেবে, থাকবে, তাহলে সে ক্ষেত্রে? একটা সম্ভাবনা ধরা যাক যদি আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক খুবই নিচে চলে গেল; তবু সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেলায় ব্যতিক্রমভাবে তারা একসাথে লিপ্ত আছে, এমন দেখতে পাওয়া অসম্ভব নয়। যদিও এমনটা দেখতে পাবার সম্ভাবনা কম। আবার অন্য একটা কথাও আছে।

    বাংলাদেশে কোনো তৎপরতায় আমরা যদি আমেরিকাকে দেখি, যার বগলে ভারত বাঁধা আছে তবে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বা যেমন ধরা যাক যাদেরকে অনেকে ‘ইসলামিস্ট’ বলে, এদের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক খারাপ। এদের কাছে আমেরিকার কোনো গ্রহণযোগ্যতা দূরে থাক সেক্ষেত্রে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে। তাতে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক যেমন অবস্থাতেই থাকুক না কেন। বলা যায়, এটাই গত ১৪-১৫ বছরে বাংলাদেশে ভারতের অর্জন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোথায়? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ

    “দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ

    গৌতম দাস

    ০৪ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৮ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-40v

     

    –        ‘The Kashmir Files’ Makers

    দ্য কাশ্মির ফাইলস – একটা ভারতীয় সিনেমার নাম। আসলে বলা উচিত, মুসলমানের প্রতি ঘৃণাবিদ্বেষের বিষ উগড়ে দিয়ে বিজেপির পক্ষে নিজ বাক্সে হিন্দুভোট জোগাড়ের নতুন এক উপায় হল, এই কথিত সিনেমা। ‘কথিত’ বললাম এ জন্য যে, কোন নির্বাচনী প্রপাগান্ডা বা প্রচারমূলক কাজে প্যারোডি গান লিখে গেয়ে তা ক্যাম্পেইনের যেমন রেওয়াজ দেখা যায় এটাও তেমনি যেন; তবে এটা অনেক বড় ধরনের বাজেটের প্রপাগান্ডা। তাই পয়সা খরচ করে গানের বদলে একেবারে সিনেমা বানিয়ে এক বড় প্রপাগান্ডার কাজ। প্রপাগান্ডা মানে যেখানে সত্য-মিথ্যা ভুলে, কেয়ার না করে তা কেবল প্রচার আর প্রচার! তাই এটা সিনেমা নয়; না সৌন্দর্যগুণ বিচারে না বিনোদনের বিচারে। এটা একটা প্রপাগান্ডার বস্তু মাত্র।

    আর খরচের বিচারে শোনা যায়, এটা প্রায় সাত কোটি রুপিতে বানানো, যেটা ইতোমধ্যে ৩০০ কোটির বেশি অর্থ আয় করেছে। সত্যি হিন্দুত্ববাদ কী না পারে যার মূল কারণ বলা যায়, বিজেপি শাসিত রাজ্যে এর টিকিট করমুক্ত করা হয়েছে, এভাবে হাইপ-জোশ তোলার কারণে আর দলীয় প্রপাগান্ডা যেমন সারা ভারতে নাকি মুসলমানরা হিন্দুদের ওপর হত্যা ও অত্যাচার করছে -ফলে হিন্দুরাই ভিকটিম, তাই ত্রাতা মোদিকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান, এটাই এই ছবির মাহাত্ম্য!

    কাশ্মির ফাইলস-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ধরতে ফ্যাক্ট চেকঃ 
    ‘কাশ্মির ফাইলস’-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ও অপততপরতাগুলোকে উন্মোচন করতে বিভিন্ন “ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট” প্রকাশ হতে শুরু করেছে।
    আবার ইতোমধ্যে ভারতেই এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে আরো যেসব প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছে এর বিরুদ্ধে পাল্টা ‘ফ্যাক্ট চেক’ (অর্থাৎ বর্ণিত কোন ঘটনার পিছনের আসল ঘটনাটা কী তা পরীক্ষা ও প্রমাণসহ সেই ফ্যাক্টস তুলে ধরা) রিপোর্টও মিডিয়ায় প্রকাশ করা শুরু হয়েছে। এরই একটা রিপোর্ট দেখা গেল, গত পয়লা এপ্রিলের দক্ষিণী পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’তে [Fact Check: ‘The Kashmir Files’ and the disinformation surrounding it]।

    A girl walks past a poster of the Bollywood movie “ The Kashmir Files” inside a cinema in Mumbai, on March 17, 2022. Credit: Reuters

    ওখানে পাঁচটা বিভিন্ন প্রপাগান্ডার ঘটনা তুলে আনা হয়েছে, যার পাঁচটাই ভুয়া বা মিথ্যা বলে প্রমাণ দেখানো হয়েছে। এখানে ওর একটা তুলে আনছি। যেমন, কাশ্মিরে কতজন হিন্দু কাশ্মিরি পণ্ডিত এ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে? এতে কোনো এক কথিত আরটিআই (RTI বা, রাইট টু ইনফরমেশন) তথ্যে বলা হয়েছে, তা ১৬৩৫ জন। কিন্তু এই ফ্যাক্ট চেক মোতাবেক, তা মাত্র ৮৯ জন আর বাকিরা ‘অন্য কেউ’। এই রিপোর্টের সিদ্ধান্ত হল, এই তথ্যা মিসলিডিং। মানে এটা শ্রোতা-দর্শককে ইচ্ছা করে ভুল ধারণা দিয়ে বিপথে নেয়া।

    ছবির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রা, তিনিই আসলে মোদির মুল পুতুল! যেমন তিনি ২০১৭ সালেও মোদির হয়ে ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের মেম্বার ছিলেন এবং  কাশ্মির নিয়ে অন্যান্যদের ফিল্ম রিলিজে বাধা দিয়েছেন। তিনিই এখন আবার কাশ্মিরি প্রপাগান্ডা সিনেমা বানানোর পরে আনুষ্ঠানিকভাবে মোদির সাথে দেখা করতে গেছেন যেন তারা এক মহত-কাজ করেছেন। আর ঐ দেখা করার অনুষ্ঠানে মোদি বলেছেন মুক্ত ভারতে সবাই ছবি বানাতে পারে।

              সৎ যুধিষ্ঠির নরেন্দ্র মোদির “দেশের স্বার্থে” হিন্দুত্ববাদের সৎ ও সত্য কথা তুলে ধরার প্রজেক্ট এই সিনেমা; “….to portay the truth correctly”। বলেছেন                    সত্যের অনেক  রূপ আছে, যে চায় অন্য একটা ফিল্ম বানাক”। আগ্রহিরা দেখতে পারেন এখানে ।

    সার কথায় সব ফ্যাক্ট চেক রিপোর্টই পাল্টা কথায় বলছে যে, এটা একটা বিজেপি দলীয় প্রপাগান্ডা সিনেমা; ফলে নানান উসকানিমূলক তথ্য, ভুয়া তথ্য (অনেক মিডিয়ায় এই সিনেমাটাকে ধান্ধাবাজি বা ম্যানিপুলেটেড তথ্য বলতেও দ্বিধা করা হয়নি) সাথে দিয়ে দলীয় প্রপাগান্ডায় সবটা অসৎ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

     

    সিনেমা তৈরি পরে পরিচালক অগ্নিহোত্রী ও অভিনেত্রী পল্লবী জোশি  যেন এক মহৎ কিছু অর্জন করেছেন – যেখানে প্রপাগান্ডার গ্লানিটুকুও নাই –  এই মনে করে মোদি ও অমিতের সাথে দেখা করে এসে এরপর সেই মধুর সাক্ষাতের উচ্ছসিত বর্ণনা পাবেন – এই লিঙ্কে এখানে।  

    হিন্দুত্ববাদের প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও, দ্য ডেইলি স্টারঃ
    এই প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও লেগেছে মানে লাগিয়েছে ইংরাজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। বাংলাদেশে অনেক ব্যক্তি বা তাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, যেমন কোনো ইংরাজি পত্রিকা এদের মধ্যে তারা সেকুলার হয়ে থাকবে ও দেখাবেই এমন ব্রত নিয়ে থাকতে দেখা যায়। কারো মধ্যে কোন কিছু ব্রত বা প্রতিজ্ঞা হিসেবে থাকা তা হয়ত খারাপ নয়; কিন্তু যখন ফলাফল দেখা যায় উল্টা!! কারণ এতে মূল সমস্যা আমরা যখন দেখি, ঠিক কী করলে তাদের আকাঙ্খার সেকুলার অবস্থান সেটা কী বা কী হতে পারে এটা নিয়ে তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণাই নাই। যেমন অনেককেই ভেবে বসতে দেখা যায় যে, ধর্ম বিশেষত ইসলামকে যদি কষে গালাগাল  কেউ করে দিতে পারে বা ইসলামের নিকুচি করে দিতে পারে তাহলে সে বা ঐ আচরণ নিশ্চয় সেকুলার; অর্থাৎ এটা একটা তাদের কাছে এক অদ্ভুত মাপকাঠি!!!  এমন উদ্ভট সব ফ্যান্টাসী ধারণা বা গোপন খায়েশ আমাদের অনেকের মধ্যেই থাকতে দেখা যায়। এতে পরিণতি দেখা দেয় যে, কখন কথিত প্রগতিবাদ আর হিন্দুত্ববাদ এক হয়ে গেছে এরা কেউ তারা টের পায়নি বা খেয়ালই করেনি! তেমনই অবস্থা হয়েছে ডেইলি স্টারের!

    ফেসবুকে ডেইলি স্টারের এক সিনেমা রিভিউ পেজ আছে যার নাম “স্টার মুভি রিভিউ”। সেখানে দেখা গেল, দ্য কাশ্মির ফাইলস এই সিনেমা নিয়ে প্রায়  দশ মিনিটের এক সিনেমা রিভিউ বা পর্যালোচনার ভিডিও বক্তব্য [যে সিনেমা নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত ভারত] সাঁটা আছে। অনুষ্ঠান সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব। তিনি কথা শুরু করেছেন ওই সিনেমার পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীকে সাধুবাদ দিয়ে। কী কারণে? তিনি নাকি “এমন একটা ঘটনাকে এই প্রথমবারের মত বিগ স্ক্রিনে তুলে এনেছেন যা এপর্যন্ত কেউ তুলে আনেনি; গত ত্রিশ বছর ধরে ঘটনাটা নিয়ে কেউ কথাবার্তা বলেনি। অথচ এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”।

    আসলে এই কথা বলেই সঞ্চালক যে হিন্দুত্ববাদের কবলে পড়ে গেলেন তাই-ই তার হুঁশে নাই।
    ওদিকে ঐ হত্যা-অত্যাচারের ঘটার আগে-পরের সময়কালে  কংগ্রেস তো বটেই খোদ বিজেপি ও বাজপেয়িও এই ঘটনা ঢেকে রাখার ক্ষেত্রে সহযোগী ভুমিকা ছিল অর্থাৎ ঢেকে রাখা কর্তাদের দলে তারাও ছিলেন তাহলে তারা কেন ও কিভাবে এ ঘটনা নিয়ে কথা তুলবেন?  ফলে এটা তো ঢাকাই থাকবে, নাকি? এটাই ঢাকা থাকার মূল কারণ। তো পরিচালক অথবা  এখনকার সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব ইত্যাদি এদের উচিত হবে কেন তারা ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন সে দিকে যাওয়া। কেবল কংগ্রেস খারাপ অথবা যেন কাশ্মীরের মুসলমানেরাই এটা প্রকাশ হতে না দিবার জন্য দায়ী এমন ইঙ্গিত তোলা অসততা  হবে।

    আসলে প্রথমত, এটা মুম্বাইয়ের কোনো বাণিজ্যিক সিনেমা বলতে যা বুঝায় তা নয়। এটা হিন্দুত্ববাদের পক্ষে দলীয় ভোট জোগাড়ের এক প্রপাগান্ডামূলক সিনেমা। অথচ এটাতে ভান করা হয়েছে যেন এটা একটা সাধারণ বাণিজ্যিক সিনেমাই। আবার এটা হিন্দুত্বের রাজনীতি এর স্বার্থে করা সিনেমা; অতএব এটা নিশ্চয় ভারতীয় উগ্র চরম জাতিবাদের স্বার্থের সিনেমা। কাজেই বিজেপি সরকার এ ছবির প্রদর্শন ট্যাক্স ফ্রি করে দিয়ে  কথিত দেশপ্রেমী জাতি-বোধের জজবা ও জোয়ার তুলুক,  তবু আমাদের একে প্রশংসা করতে হবে? এখন লক্ষণীয় কথিত হিন্দুস্বার্থ কিভাবে কোন ফাঁকে ভারতীয় জাতিবাদের স্বার্থ হয়ে গেছে কেউ তা খেয়াল করছে না। হিন্দুস্বার্থ মানেই তা ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ না-ও হতে পারে, এটাই হলো বটম লাইন। মুসলমান কোপানোকে যদি কেউ হিন্দুস্বার্থ বলে মনে করে তাহলে এটাও কী ভারতের স্বার্থ হবেই?

    দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় ঘটনা বা সঞ্চালকের চাতুরী এবং বোকামিটা হল, তিনি সাধুবাদ দিয়ে যাচ্ছেন পরিচালককে। কেন? তিনি মনে করছেন এর আগে কেউ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগ মানে, তাদের ভারতের অন্য শহরে চলে যাওয়া – এই চাপা পড়ে থাকা ঘটনার দিকটা সামনে নিয়ে আসেনি। অতএব পরিচালক অগ্নিহোত্রী নিশ্চয় অনেক মহান মানুষ। তাই কি?

    এথেকে দর্শক ভুল ধারণা পেতে পারে যে, তাহলে কাশ্মির সমস্যা মানে হল, মুসলমানদের হাতে হিন্দু দলন ও নিপীড়নের ঘটনা। বিজেপির ভাষায় ‘জাস্টিস’- দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের জাস্টিস দেয়ার কথা কেউ বলেনি। যেন সে জন্যই এটা এক সিনেমা! নাজমুস সাকিব জেনে না জেনে এই অসত্য ধারণা তৈরি করছেন।

    ধরা যাক যদি আপনি আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিকে প্রথমে আগ বাড়িয়ে খুবই নির্দয়ভাবে পিটিয়েছেন। পরে ওই প্রতিদ্বন্দ্বি আপনার চেয়ে দল ভারী করে আপনাকে আরো নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আরো বেশি সংখ্যায় আহত-নিহত করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি খুবই বুদ্ধিমান বলে আগে আপনার ওদেরকে পেটানোর অংশ আড়ালে বা বাদ রেখে কেবল আপনাকে কিভাবে কত খারাপভাবে পিটিয়েছে এনিয়ে এক লোমহর্ষক সিনেমা বানিয়ে ছেড়ে দিলেন, যাতে কেউ এটা দেখলে আপনাকেই খুবই ও একমাত্র ভিকটিম মনে হতে থাকে। আর এর ফলে তা দেখে এক নাজমুস সাকিব বলা শুরু করেন, পরিচালককে ধন্যবাদ যে, তিনি ভিকটিমকে জাস্টিস দেয়ার পথ খুলেছেন, কেউ যা নিয়ে কখনো কথা বলেনি, সে চাপা পড়া বিষয়টাই তিনি সামনে এনেছেন। ব্যাপারটা অনেক সুইট আর প্রগতিবাদী হবে তাহলে তাই না? আর এতে আমরা নিশ্চয় আপনাকে ‘খুবই বুদ্ধিমান’ বলব, কী বলেন?

    কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতাঃ
    দ্য কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতা এটাই। কারণ এর উদ্দেশ্য হিন্দু-মুসলমানকে প্রথমে বিভক্ত ও মেরুকরণ করা। পরে হিন্দুরা ভালো, মুসলমানরা খারাপ এভাবে এক তৈরি বয়ানে ঘটনাকে তুলে ধরা, যাতে এবার বিজেপি বা মোদিকে ত্রাণকর্তা মনে হয়। আর তাতে সব হিন্দু ভোট বিজেপির বাক্সে ঢোকে। এ জন্য সে কাশ্মিরের ঘটনা ইতিহাসের আগে-পিছে দেখাবেই না। যেন কাশ্মীর মানেই মুসলমানের হাতে হিন্দু নিপীড়ন অত্যাচারিত হওয়া, এটাই তুলে ধরবে…।
    অথচ এই শঠতাকারিরা কাশ্মিরের ঘটনা মানেই তা ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্ম অথবা ১৯৫০ সালে রচিত ভারতের কনস্টিটিউশন থেকেও শুরু করবে না। তাঁরা এর শুরু ধরবে জানুয়ারি ১৯৯০ সালে  হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগের ঘটনা থেকে। আবার এর শেষও তাঁরা টেনে দিবে ১৯৯০ সালের দু-এক বছর পরেই। আর প্রচার চালাবেন, এখনো কাশ্মিরের একমাত্র সমস্যা হলো ইনজাস্টিস; দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের প্রতি ইনজাস্টিস। আর এতে নিশ্চয় আপনার প্রাপ্য হবে সাধুবাদ! তাই কি?

    কাশ্মির ফাইলস-এর শঠতাকে বিচার বা ওর শঠতাকে উদাম করতে চাইলে দুটা প্রশ্ন করেন আর তা বুঝার চেষ্টা করেন। এক, কাশীরে সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল কবে থেকে এবং কেন?  আর দুই, কাশ্মীর শুরু থেকে মানে ১৯৪৭ সাল থেকে কখনই এটা হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত দাঙ্গার ইস্যু ছিল না। ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে কাশ্মীরের সংঘাত; ভারতের সাথে থাকা  ও না-থাকার সংঘাত। তাহলে কাশ্মিরে হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল কবে থাকে এবং কেন?

    সংক্ষেপে বললে, কাশ্মীরে সশস্ত্র রাজনীতি বা তরুণদের হাতে আস্ত্র তুলে নেওয়া এটা ১৯৪৭ সালের ঘটনা নয়। বরং ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কাশ্মীরের রাজনীতি মানেই সেটা নির্বাচনি রাজনীতি ছিল। ঐ ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পরে ১৯৮৮ সাল থেকে কাশ্মীর সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করে।  আত তা থেকে প্রথমে বছরে দুএকজন পরে ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ঐ বড় করে  হিন্দু পণ্ডিতদের হত্যা নিপীড়ন ও দেশত্যাগের ঘটনাটা ঘটেছিল।  তাহলে এই পুরা ঘটনা থেকে কেবল ১৯৯০ সালের হিন্দু পন্ডিত নিপীড়নের ঘটনাকেই আলাদা করে এই সিনেমা উঠিয়ে আনছে কেন? কেবল ১৯৯০ সালের এই ঘটনাকেই ইনজাস্টিস বলে তুলে আনছে কেন? যে এই প্রশ্ন করতে পারবে না সেই-ই এই সিনেমার মাধ্যমে মোদির হিন্দুত্ববাদের শিকার হবে।

    কাশ্মীর বিরোধের ফান্ডামেন্টাল দিকঃ
    কাশ্মিরের সব অশান্তির শুরু ১৯৪৭ সাল থেকেই।  ভারতের প্রায় সব রাজনীতিবিদ এখনও কাশ্মিরের প্রাক্তন রাজা হরি সিং ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হয়ে যাওয়ার কাগজে সই করার উপযুক্ত অথরিটি বলে মনে করেন।  এমনকি রাজনীতিবিদদের এমন মনে করার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিকরা এনিয়ে ভিন্ন আর কিছু জানেন তা মনে হয় না।
    বরং সারা ভারতকে এক মিথ্যা জাতিবাদী জোশে ভুগতে দেখা যায় যে, ব্রিটিশ কলোনি দখলদাররা নাকি স্বদেশী আন্দোলনের নামে জমিদার হিন্দুর সন্ত্রাসবাদ বা কংগ্রেসের আন্দোলনে মুখে টিকতে না পেরেই যেন ভারত ত্যাগ করেছিল। অথচ একথা শতভাগ মিথ্যা। ফ্যাক্টস হল, কেবল ব্রিটিশরা নয়, সারা দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসকই ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ থামার পরে স্ব স্ব কলোনি ছেড়ে স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফিরে চলে গিয়েছিল। আর তারা ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল যে কারণে ঠিক সেই একই কারণে, রাজা হরি সিং-সহ তার মত কোন রাজারই ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হওয়ার কোনো কাগজ-দলিলে স্বাক্ষর করার অথরিটিই ছিল না, অথরিটি হারিয়েছিল। আর এসব কিছুর পেছনে মূল কারণ হল ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি [Atlantic Charter Aug14, 1941]। এটাকে বলা যায়, আমেরিকার সাথে কলোনি দখলদার ইউরোপের একেবারে মুখ্য এক চুক্তি। এই চুক্তিতে বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশেরা বিনা শর্তে দখলদারি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আর এই শর্তেই আমেরিকা হিটলারের বদলে ব্রিটিশ-ফরাসি ইত্যাদি মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে বিশ্বযুদ্ধে সেই প্রথম অংশ নিতে সম্মত হয়েছিল। আর এর সাথে এতে ফেলে যাওয়া কলোনির কোন রাজার আর কোনো অথরিটিই নেই, থাকবে না যে, সে ওই দেশকে নিয়ে নিজ খেয়ালে অন্য কোনো দেশের ভেতর যোগ দেওয়াতে পারব। কারণ ঐ চুক্তিতে বলা আছে ওই দেশ কার দ্বারা শাসিত হবে, এর একমাত্র নির্ধারক হবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ বা পাবলিক। ফলে ঐদেশের নিজ ভাগ্য তা নিজ পাবলিকের ভোটের সম্মতিতে ঠিক হবে। ফলে তা সহজেই এক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র হতে পারবে। ব্রিটিশরা চলে গেলে কাশ্মিরেরও এমন হওয়ার কথা।

    নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, পড়েছেন জানা যায় নাঃ
    কিন্তু নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, এর চিহ্ন-প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি এই চুক্তি-ই যে, জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি -দলিল বলে জাতিসংঘ মনে করে এবং সেটাও নেহরু জানতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং উল্টা প্রমাণ আছে। এসবেরই ফলাফলে নেহরু কাশ্মিরকে জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে রাখার পক্ষে জোড়াতালি (৩৭০ বা ৩৫এ ধারা) কিছু কাজ করে যান। কাশ্মিরের সব সমস্যার শুরু এখান থেকে। এবং কোন মতেই এটা কাশ্মীরের হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ-সংঘাত একেবারেই নয়।
    আর কড়া কথাটা হল, দুনিয়ার সব ইতিহাস পাঠক বা স্টুডেন্টদের মুখস্ত থাকা উচিত আটলান্টিক চার্টার চুক্তির। কারণ এটা উপস্থিত মর্ডান ও গ্লোবাল  রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দলিল। যারা পড়বে না তাঁরা বকোয়াজ করবে।

    দ্বিতীয় বড় ফ্যাক্টস হল, জম্মু-কাশ্মির মিলে ২০১১ সালের হিসাবে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১.৩ কোটি যার ৬৮.৩% হলো মুসলমান আর হিন্দুরা ২৮.৪; বাকিটা অন্যান্য। আর ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই যে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা যেটা সেটাই কাশ্মিরের ওপরেও ভর করেছিল কিন্তু অনেক ধীরে ধীরে  যদিও তা অনেক পরে ১৯৮৭ সালের আগে নয়। কেবল সেই সমসাময়িক সময়ে। তাতে কী হয়েছিল?

    ভারতের ‘আদি পাপ’ হল, সব নাগরিকদের সমান অধিকারের রাষ্ট্র হবে, সেটা তাঁরা করবে না। মানে অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র তা হবে না; তাঁরা গড়বে না। বরং তাঁরা সাম্য নয়, হিন্দু আধিপত্যের এক রাষ্ট্র গড়বে। যা এক হিন্দু ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র হতে হবে। আর যে ধর্মের লোক সংখ্যায় বেশি মানে হিন্দুরা এ রাষ্ট্রে আধিপত্য নেবে। এভাবেই ১৮৮৫ সাল থেকে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এই লাইনে আগিয়েছে আর ১৯৪৭ সালের ভারত কায়েম করেছে।
    আমার এই অসাম্যের রাষ্ট্র হিন্দু আধিপত্যের রাষ্ট্র কথাটা বুঝে নিতে এদিকে আসেন। যেমন, সাম্প্রদায়িক শব্দটাকে ভাঙেন, যে শব্দটা দুনিয়ার আর কোনো রাষ্ট্রে নাই। আর এ শব্দের আসল অর্থ হল, হিন্দু আধিপত্যের স্বার্থে ডিফাইন করা সীমার মধ্যে মুসলমানদের বসবাস, জীবন যাপন করতে হবে। তাই মুসলমানেরা ধর্মীয় চিহ্ন প্রদর্শন করে স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপনও করে চলতে পারবে না। যদি তা অনুসরণ না করে তবে ওসব মুসলমানকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ দিয়ে নিন্দা করা হবে। বিপরীতে যেসব মুসলমান তা মানবে, মানে হিন্দু আধিপত্য কর্তৃত্ব মেনে নেবে তাদের মানার শর্তেই তারা হিন্দুদের পাশে সমাজে মানে যেমন স্কুলে অফিসে পাশে বসতে দেয়া হবে। আর তাতে এসব মুসলমানরা ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে গণ্য হবে। তাই সাম্প্রদায়িক বা অসাম্প্রদায়িক শব্দের আসল কাজ ও রূপ হল “হিন্দু আধিপত্য” নিশ্চিত করা।
    যেমন দেখেন মোগল আমলে “সাম্প্রদায়িক” বলে কোন ধারণা বা শব্দটা নাই। তখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কথাও জানা যায় না। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বেশির ভাগ জমিদারি হিন্দুরা নেয়াতে (যে জমিদারি মানে, ব্রিটিশ শাসকের নিচে ওই সমাজের কর্তা এক নিয়ামক শক্তি ) এবার তারা তাদের আধিপত্য (ধর্মীয় পরিচয়ে আধিপত্য) চালু করেছিল। আসলে হিন্দু জাতিবাদের ভিত্তিতে হবু ভারত গড়তে হবে – কংগ্রেসের এই নীতির ভিত্তিতে ভারতের জন্ম – এটা ক্রমেই ওই জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের পক্ষে সাফাই হিসাবে হাজির হয়েছিল।

    এখন ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের কনষ্টুটিউশনে  কাশ্মিরকে ভিত্তিহীনভাবে ভারতের অঙ্গীভুত করে নিবার পরেও নেহরু শান্তিতে থাকতে পারেননি। সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ১৫% তবে কোথাও কোথাও মানে, কোন রাজ্যে বা শহরে তা বড়জোর ২৫-৩০%। ফলে সহজেই হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম রাখা সহজ ছিল যদিও তা সমাজে সবধরনের নাগরিক অসাম্যের প্রধান উৎস হয়েই থেকে গেছিল।

    কিন্তু ভারতের এই হিন্দু-আধিপত্য পছন্দের শাসকরা তাদেরই আধিপত্যের তত্ত্ব মুসলমানরা কেমন অস্বস্তি অনুভব করে তা কাশ্মিরে টের পেয়েছিল। কারণ ওই একই আধিপত্য তত্ব কাশ্মিরে তাদের বিপক্ষে কাজ করেছিল। কারণ কাশ্মিরে মুসলমানরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ (৬৮%)।  আর এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে কোন হাতছুট ঘটনা ক্রমন হতে পারে এর প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৮৭ সালের কাশ্মীর (প্রাদেশিক বা অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনে। কারণ তত দিনে কাশ্মিরের অতিষ্ঠ মুসলমানরা, তাদের ব্যক্তি বা সামাজিক-রাজনৈতিক দল বা গ্রুপগুলো একজোট হয়ে মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট (এমইউএফ MUF) গড়ে ওই নির্বাচনে লড়ে ক্ষমতা নিতে তৈরি হয়েছিল। এই এমইউএফ ছিল ১৯৮৪ সালে গড়ে তোলা প্রথম ভ্রুণ এক ছাত্রসংগঠন, যার নাম ছিল ইসলামী স্টুডেন্ট লীগ। এটাই প্রথম কাশ্মীরের রাজনীতিতে  “সবকিছু ইসলামি হতে হবে” এই আইডিয়ার রাজনীতির আবির্ভাব ঘটেছিল।   আসলে ভারতের আধিপত্য তত্ত্ব অনুসারে, কাশ্মিরে হবু মুসলমান আধিপত্য দেখে তারা প্রমাদ গুনে বিপদ বুঝতে পারে আর এটাই তারা মেনে নিতে পারেনি।
    কেন কাশ্মির এমন বদলে গেল, মূল কারণ নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হলে সেখানে ধর্মীয় বা সব ধরনের পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান নাগরিক হয়ে থাকতে পারে আর নাগরিকের যদি সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয়, তাহলে কারো কারো আধিপত্যের আলাপ সেখানে থাকে না। কিন্তু বাস্তবের ভারত ছিল এর বিপরীত। হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের হাতে পড়ে সেটা হিন্দু আধিপত্যের ভারত হয়ে উঠেছিল। আর তা একইভাবে কাশ্মিরের মুসলমানরা অনুসরণ করতে গেলে হিন্দুদের জন্য সব বিপদ ঘনিয়ে ওঠে।আর এতেই সবচেয়ে বড় স্টুপিডিটির বা দেশলাই মারার কাজটা করেছিলেন ফারুক আবদুল্লাহ।

    দেশলাই জ্বালানোর ভুমিকায় ফারুক আবদুল্লাহঃ
    এই “মুসলিম উত্থান” বার্তাটা কাশ্মির জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ নজর করেন। কারণ তিনি এমইউএফ-এর ভেতরের কোন নেতা ও দল ছিলেন না। তিনি ততকালের বিষয়টাকে দিল্লি গিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কানে তোলেন; সাথে আলাপ করেন এই এমইউএফ-এর উত্থান ঠেকানো নিয়ে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ব্যাপক হলেও সরাসরি নির্বাচনী কারচুপি করেই তারা এই উত্থান ঠেকাবেন। তাই ঐ নির্বাচনের ভোটদানের পরেই এমইউএফের ছোট-বড় প্রায় সব নেতাকর্মীকে (যতদুর সম্ভব) তারা গ্রেফতার করেন আর পরে প্রতিটা কেন্দ্রের ফলাফল ওই দিন দূরে থাক সপ্তাহ-দশ দিন পরে ইচ্ছামত ঘোষণা করেছিলেন। আর এখান থেকে কাশ্মিরের রাজনীতি মানে মিছিল মিটিংয়ের প্রকাশ্য রাজনীতি ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরের বছর ১৯৮৮ সাল থেকে সারা কাশ্মির সশস্ত্র রাজনীতি পথে চলে যায়। অস্ত্র আর খুনাখুনি এটাই প্রধান ধারা হয়ে যায়। তারপর থেকে কাশ্মিরে নির্বাচনের আর কোনো গুরুত্ব থাকেনি, থাকার আর কোন সুযোগও থাকে নাই। কংগ্রেস-বিজেপির ভাষায় যা ‘জঙ্গিবাদ’ হয়ে যায়। আর বিজেপির বাজপেয়ি তার নতুন ডমিনেটং বয়ানে হাজির হলেন। তিনি কাশ্মিরে কংগ্রেসের হাতে ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপি করাতে রাজনীতিকে সশস্ত্রতার দিকে ঠেলে দেয়া্কে ভুলে গেলেন, অস্বীকার করলেন। আর এক নয়া বয়ান হাজির করলেন যে, কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস ‘সীমা পার কী আতঙ্কবাদ’ -মানে কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস নাকি পাকিস্তান থেকে আসা টেরোরিজম! কেন্দ্র ভারতের কোন ভুমিকা যেন নাই!
    যারা  ১৯৮৭ সালের এই টার্নিং পয়েন্ট বিস্তারিত আরো পড়তে চান তাঁরা দেখতে পারেন ১। এখানে,   ২।  এখানে The 23rd March 1987, the day that changed Kashmir as never before, ৩।  এখানে, ৪। এছাড়াও আমার এক পুরানা লেখা এখানে।

    আর ওদিকে কাশ্মিরের সশস্ত্র রাজনীতির শুরুতে এই প্রথম প্রথম প্রতিহিংসাবশত দু-একজন হিন্দু পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে যেটার সবচেয়ে বড় আর ব্যাপক হত্যার ঘটনাটা ছিল ১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি। আর এবারও কংগ্রেস, বিজেপি, ফারুক আবদুল্লাহ আর মুফতি সাঈদ সবাই কমবেশি যার যার অবদান-দায় রেখে পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন। ভেবেছিলেন পন্ডিতেরা দেশত্যাগ করলে সেটা সশস্ত্রতার বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ান তৈরিতে একটা চাপ হবে। কাশ্মিরের গভর্নর জগমোহন বা কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি সাঈদ বা বিজেপি সমর্থিত কোয়ালিশনে ভিপি সিং-এর সরকারের আমলে এই জম্মুত্যাগের ঘটনাটা ঘটানো হয়েছিল। তাই সকলের দায় ছিল। যদিও কেউ এথেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। কিন্তু শিক্ষাটা হলো, কেউ কোনো একটা নিজধর্মীয় আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র গড়বেন নাকি অধিকারভিত্তিক সাম্যের নাগরিক রাষ্ট্র? যেমন গড়বেন তেমন ফল পাবেন। ফলে সেটা সারা ভারতে কায়েম করবেন অথবা কেবল কাশ্মিরে কোনো একটি ধর্মীয় আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়বেন – যেখানেই গড়েন, এই কাজ কোথাও কারো জন্য ফলদায়ক হয়নি। আর আপনি যদি হিন্দু আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র চান তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনি তার মানে সে দেশে মুসলমান আধিপত্যের আরেক জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার জন্ম হতে দাওয়াত দিচ্ছেন!!!
    ঠিক যেমন এখন ভারতে শুরু হয়েছে হিন্দু-জাতিবাদের আরও ভয়াবহ সেকেন্ড ফেজ। এবার হিন্দুত্ববাদের আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়ার খায়েশ। এতে আরেকবার মুসলিম লীগের মতোই মুসলিম জাতিরাষ্ট্র চিন্তার জন্মকে (এবার তা সম্ভবত গ্লোবাল) দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। যেমন গুড় ঢালবেন তেমনই মিস্টি হবে!

    তাহলে কাশ্মির ফাইল কী দাঁড়াল? সেটা হচ্ছে কাশ্মিরের সব ইতিহাস ফেলে কেবল ১৯৯০ সালে কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যাওয়াটা – কেবল এই অংশটা ইতিহাস থেকে তুলে এনে একে সামনে এনে বিজেপির পক্ষে সহানুভ‚তি জোগাড়, এই হিন্দুত্ব উত্থানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার ১৯৪৭ সাল থেকে কত কাশ্মিরি মরেছে – কত ইনজাস্টিস সেটা নয়; কেবল ১৯৯০ সালে্র মধ্যে সব বুঝাবুঝি সীমাবদ্ধ করতে রাখতে চাইছেন। সঞ্চালক নাজমুস সাকিবের মত বলতে থাকেন কাশ্মির ফাইল সিনেমা  “এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”। আর সাথে মুখরোচক দাবি – জাস্টিস।  তবে কেবল “১৯৯০ সালকে” জাস্টিস দিতে চাইছেন!

    কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে পরে প্রতিবাদঃ 
    ডেইলি স্টারের ওই সঞ্চালক তার অনুষ্ঠানের শেষের দিকে বারবার অনুরোধ করছিলেন কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে যেন তাঁর কথার প্রতিবাদ বা ভিন্নমত নিয়ে কেউ আসেন। অথচ তিনি নিজেই আসলে কাশ্মিরের ইতিহাস কতটুকু জানেন? কাশ্মির মানে কী কেবল ১৯৯০ সাল??? না। অবু তার কাছে কাশ্মিরের ইতিহাস মানেই কেবল ওই ১৯৯০ সাল ও কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু-ত্যাগ এটুকুই মাত্র। তামাশার আসলে কোনো শেষ নেই।
    তিনি টেরই পেলেন না যে, তিনি পরিচালক অগ্নিহোত্রীর হিন্দুত্ববাদের পাল্লায় পড়ে অন্ধ হয়ে গেছেন বা হতে চেয়ে হয়েছেন। অথচ তিনি মনে করছেন, নির্যাতিত হিন্দুদের পক্ষ নিয়েছেন; তাহলে এটা নিশ্চয় প্রগতিবাদী অবস্থান।  কিন্তু কে তাকে বুঝাবে ঠিক এখানেই প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ এরা এমন এক হয়ে গেছে! তাই তিনি হিন্দুত্ববাদকেই প্রগতিবাদ ঠাওরাচ্ছেন!! বেচারা ডেইলি স্টার!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ ‘দ্য কাশ্মির ফাইলস’; যেখানে হিন্দুত্ববাদই প্রগতিবাদ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!

    পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!
    গৌতম দাস

    ১ এপ্রিল ২০২২   সময় ০০ঃ০৬ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ZZ

     

     

    দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্বে থাকা এক আমেরিকা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের এক রাষ্ট্রদুতকে হুমকি দেয়া এক চিঠিতে লিখেছে যে ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব পাশ না হলে পাকিস্তানকে নাকি চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে [ …wherein Pakistan was warned of “grave consequences” if the no-trust motion failed.]। এই চিঠিকে কেন্দ্র করে এটা পাকিস্তানের রাজনীতি ও ক্ষমতায় আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগে তোলপাড়। এবং এখন খুব সম্ভবত আগামি ৩ এপ্রিলে পাকিস্তানে সংসদে অনাস্থা ভোটে ইমরানকে পরাজিতই হতে দেখব আমরা।
    আসলে এটা কেবল পাকিস্তান নয়। আমাদের ধারণা সবাই পাকিস্তানের জায়গায় নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রকে বসিয়ে ব্যাপারটা ভাবতেছে। তাই এই পাকিস্তান ইস্যু গুরুত্বপুর্ণ।

    এনিয়ে আমার এক ফেসবুক স্টাটাসে আলোচনায় এক পাঠক একটা প্রশ্ন রাখেন। নিচে সেই প্রশ্নটা তুলে ধরা হল। আর এরপরে এনিয়ে আমার জবাবও সাথে দেয়া হল।

     

    প্রশ্নঃ  চীন কেনো হাত গুটিয়ে বসে থাকে বিভিন্ন দেশে এরকম অবস্থায়? চীনের তো বিশাল বিনিয়োগ ও কৌশলগত স্বার্থ আছে। চীন তাহলে কিভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার সঙ্গে পেরে উঠবে? এছাড়া কোন দেশের সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে এরকম বিপদে পরলে, চীনের পক্ষ থেকে যদি যথাযথ সাহায্য না পায় তাহলে কে যাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে।

     

    আমার উদাহরণসহ একটু বড় জবাবঃ 
    সব স্বার্থ-সংঘাতকেই সামরিক সংঘাত মনে করা খুবই বড় ভুল বিচার। অথবা একে সামরিক দিক থেকে দেখা-নেওয়া বা ঠেলে দেওয়া ঠিক না; বুদ্ধিমানের কাজও না। কারণ এর চেয়েও সহজ পথ আছে।
    এছাড়া সবার আগে চীন-আমেরিকার স্বার্থ-সংঘাতটাকে বুঝতে হবে। মূলত এর ধরণটাকে বুঝতে হবে। এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে থাকে আমেরিকা, এর নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে।  চীনা উত্থান আমেরিকাকে তাড়া করে ফিরছে।  তাই এর নানা ধরণের ছাপ ও প্রকাশ ঘটছে চারদিকে বিশেষত এশিয়াতেই যা বেশি এবং সবদেশেই কমবেশি।  ফলে আমাদের মত দেশে একেকজন ইমরান – প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান এই টানাটানি চাপের মধ্যে পড়বেই। তাতে আপনি ইমরান অথবা হাসিনা  প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান যেই হন!
    এখন আপনি প্রশ্নকর্তা  আশা করছেন আমেরিকান ন্যায় অথবা অন্যায় চাপের মুখে চীন কেন পাকিস্তানের ইমরাঙ্কে  রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে না – এই হল আপনার প্রশ্ন!
    এনিয়ে আগে বাংলাদেশেরই একটা উদাহরণ দিব। পরে আবার কিছু তত্ব কথায় আসব।

    ঘটনাটা বাংলাদেশের টিকা প্রাপ্তি নিয়েঃ
    তখনও  দুনিয়াতে  চীনা উতপাদিত কোন টিকাই বাজারে আসে নাই।  এমনকি পশ্চিমা ফাইজার বা মর্ডানাও নয়। বরং চীনা টিকারই (Sinovac) তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হবে যা সফল হলে পরে টিকার বাণিজ্যিক উতপাদন শুরু হবে। চীন বাংলাদেশকে এই থার্ড ফেজে ঐ প্রক্রিয়াতে যুক্ত হতে অফার দিয়েছিল। থার্ড ফেজ মানে আগের মূল দুই গুরুত্বপুর্ণ ফেজ-এর পরীক্ষানিরীক্ষা সফল হয়ে গেছে। তাই এবার বাজারে ছাড়ার আগে একটু দেখে নেয়া যে (বাংলাদেশেও) এই টিকা পুশ করলে ব্যবহারিক পর্যায়ে ছোটখাট হলেও খারাপ প্রতিক্রিয়া হয় কিনা বা হলে আগেই তা এড়ানো যায় কীনা ইত্যাদি এসব ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই এই থার্ড ফেজ। যার অর্থ চীন এই পরীক্ষামূলক টিকা বাংলাদেশ কেবল নির্বাচিত কিছু হেলথ-স্টাফদেরকে দেয়া হবে আর তাদেরকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। যেহেতু এটা তখনও পরীক্ষামূলক তাই। আর বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল চীনা টিকার এক শেষ ফেজে টেকনিক্যাল সহায়তা করার।  বাংলাদেশকে দেয়া ঐ অফারে বলা হয়েছিল এই পরীক্ষা সফল হলে কয়েক লাখ ফাইনালি উতপাদিত টিকা  আমাদের দেয়া হবে বিনা খরচায় আর সাথে  লাইসেন্স ও সহায়তা দেয়া হবে যাতে নিজেরাই আমরা দেশে প্রডাকশনে যেতে পারি  একটা বড় খরচ ও সামর্থ ছাড়াই।
    কিন্তু ভারত পুরা ব্যাপারটা ভন্ডুল করতে নগদ “কমিশনের” লোভ দেখিয়ে সরকারকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশই ভারতে আগাম অর্থ দিয়ে ওদের ফ্যাক্টরির উতপাদন
    ক্ষমতা বাড়িয়ে দিবে আর তাতে উতপাদিত টিকা আর কমিশন দুটাই ভোগ করবে। আর তা করতে মাঝখানে সরকার-প্রিয় বাংলাদেশের প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে ভারতের সাথে চুক্তি করা হয়।  আর এতে মন্ত্রণালয় অতি খুশিতে থাকায় চীনের সাথে টিকার (থার্ড ফেজ) ফর্মাল চুক্তির সম্মতি স্বাক্ষরের সময়সীমা মিস করে যায়। পরে দেরিতে হলেও সেসব পত্র দিতে যোগাযোগ করলে চীনের দিক থেকে জানানো হয় যে যে তাদের টিকা উতপাদন কোম্পানি (ওটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানির টিকা পরীক্ষা ছিল) আমাদের সময়সীমা মিস করাতে ঐ অফার অন্য দেশকে দিয়ে দিয়েছে (সম্ভবত ইন্দোনেশিয়া)। ফলে এখন আর কী করা যায় এনিয়ে এক প্রাথমিক আলাপে বলা হয় ফান্ডই প্রধান সমস্যা।  এখন নতুন করে ফান্ড যোগাড় করতে সময় লাগবে। আপনারাও দেখেন আমরাও দেখি ফান্ড কোথা থেকে যোগাড় করা যায়। এককথায় ব্যাপারটা অনিশ্চিত হয়ে যায়।
    এখন এনিয়ে বাংলাদেশ খবর ছড়িয়ে পড়লে এটা বিব্রতকর হবে কারণ তখনও আমাদের টিকা কোথা থেকে আসবে তা একেবারেই অনিশ্চিত ছিল। তাই অনুমান করা হয় এথেকে রক্ষা পেতে ভারতের সাথে মিলে একটা গল্প সাজানো হয়। ভারতের রয়টার্সের রুমা পাল আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন চীনারা অর্থ চেয়েছে এজন্যই বাংলাদেশ-চীন টিকা ডিল ভেঙ্গে গেছে?
    আমাদের মন্ত্রী সায় দিয়ে বলে হা সেজন্যই। এরপর তারা আইসিডিডিআরবি-কেও জিজ্ঞাসা করে কেন টিকা-সম্পর্ক কাজ করছে না? কিন্তু এনিয়ে আইসিডিডিআরবি কোন মন্তব্য করতে রাজি হয় নাই। এরপর ঢাকার চীনা এমব্যাশি কেও একই প্রশ্ন করেছিল কিন্তু তাদেরও জবাব ‘নো কমান্টস’।
    আমাদের অঞ্চলে  আমেরিকান ফান্ডেড ও নিয়ন্ত্রিত আরেক মিডিয়া আছে “বেনার নিউজ” নামে। তারাও এনিয়ে রিপোর্টের ফাইন্ডিংসও প্রায় একই রকম।

    অর্থাৎ এসব প্রশ্নের জবাবে চীন চাইলে প্রতিবাদ করে আসল ঘটনা ফাঁস করে দিলে আমাদের সরকার বিব্রত হয়ে যেত। কিন্তু চীনা অবস্থান ছিল মিডিয়া এড়িয়ে যাওয়া। কেবল সবুর করা ধৈর্য ধরা আর এতে মেওয়া মিলবে তা বিশ্বাস করা। ঘটেছিলও তাই।

    ভারতীয় টিকা আমরা নিতে শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে করোনা সেকেন্ডে ভ্যারিয়েন্ট বা ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত হয়ে যায়। দাবি উঠে বাংলাদেশকে টিকা বন্ধ করার যদিও আমরা আগাম বিনিয়োগ করে কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়ে টিকা পাবার চুক্তি করেছিলাম। কিন্তু ভারত সরকার আর টিকা দিতে পারে নাই, বন্ধ করে দিয়েছিল। ততদিনে দুনিয়ায় টিকা পুর্ণ আবিস্কৃত আর প্রত্যেক দেশই কোথা থেকে নিজের প্রয়োজনীয় টিকা পাবে তা চুক্তিবদ্ধ হয়ে রয়েছিল। কেবল আমরা বাদে। ফলে সরকারের এতা বলার সুযোগ ছিল না যে টিকা আবিস্কৃত-ই হয় নাই।  তাই উপায়ন্ত না পেয়ে সরকার চীনের হাত-পায়ে ধরা শুরু করেছিল।
    সংক্ষেপে বললে এতে ফলাফল হল, চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে অনেক ছাড় আমাদের দিতে হয়েছে যদিও বিনিময়ে আমরা এখন প্রয়োজনীয় টিকা যতটা পুশ করতে সক্ষম এর সবটা পাচ্ছি চীন থেকে আর তা সম্ভবত এখন ফ্রি। সাথে আমাদের একটা প্রাইভেট ওষুধ কোম্পানিকে টিকা উতপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে চীনা সহায়তায়।

    তাহলে কী দাড়ালো?
    কুটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোমালিন্য হলেই লাঠি-বন্ধুক বের করা চলে না। এর সবচেয়ে বড় কারণ, সব সম্পর্কই সামরিকভাবে কে কত বড় বা সক্ষম তা দিয়ে সাব্যস্ত হয় না, তা নয়ও তাই।
    বিশেষ করে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব টা সামরিক নয়। আমেরিকার অর্থনৈতিক হাল চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, একেবারেই তুলনীয় নয়। কিন্তু সামরিক দিক দিয়ে আমেরিকা এখনও ছয়গুণ বেশি সক্ষম। আমেরিকার গ্লোবাল প্রভাব এখনও কম নয়। যদিও দ্রুতই তা কমছে।

    কাজেই আমেরিকার উদ্বৃত্ব সম্পদ না থাকার সমস্যাটা, অন্যদেশকে অর্থ-বিনিয়োগ-অনুদান দিবার অযোগ্যতাটা  এসবগুলো আমেরিকার বাড়তি সামরিক সক্ষমতা দিয়ে পূরণীয় নয়। কাজেই মূল সামর্থটা উদ্বৃত্ব সম্পদ কার কেমন আছে!

  • বিচারক বা কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    দেশপ্রেম নয়, মানুষ ন্যায়বিচার দেখতে চায়!
    বিচারক-কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    গৌতম দাস
    ২১ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3YT

    –

    Former Chief Election Commissioner OP Rawat along with Chief Election Commissioner Sunil Arora (L) and Election Commissioner Ashok Lavasa (R) | PTI–

    গত ১০ মার্চ ছিল ভারতের পাঁচ রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন। এক পাঞ্জাব ছাড়া নির্বাচন কমিশন বাকি চার রাজ্যে  বিজেপিকে বিপুল বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছিল সেদিন। অর্থাৎ বিজেপি এখন ওসব রাজ্যে সরকার গড়বে। উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, গোয়া ও মনিপুর এই পাঁচ রাজ্যে এবার নির্বাচন হল। যদিও এই পাঁচ রাজ্য রাজ্যের মর্যাদার দিক থেকে এরা সবাই-ই সমান। কিন্তু এরা সবাই সমান রাজ্যের মর্যাদার হলেও জনসংখ্যা বা রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে তারা সমান নয়। এভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলো কোনোভাবেই অন্য রাজ্যের সমান নয়। কেন সমান নয়?
    এটা বুঝবার একটা দিক-পদ্ধতি হতে পারে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পার্লামেন্ট (বা যেটাকে ওরা লোকসভা বলে) তাতে কোন রাজ্যের কার কতটা আসন তা দিয়ে। কেন্দ্রে কম আসনের রাজ্য মানে সেটা ছোট রাজ্য; মানে কম জনসংখ্যার মানেই তা ভৌগলিকভাবেও ছোটরাজ্য। এই হিসাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট নির্বাচন যেটাকে তারা লোকসভা বলে তাতে মোট ৫৪৩ আসন। আর তাতে উত্তরপ্রদেশ (৮০), উত্তরাখণ্ড (৫), পাঞ্জাব (১৩), গোয়া (২) ও মনিপুর (২) – এভাবে পাশের ব্রাকেটে তাদের লোকসভার আসন বা কনষ্টিটুয়েন্সি কয়টা তা দেখানো হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন হয়ে গেছে গত বছর ২০২১ সালে; তবু কৌতুহল মিটানো আর তুলনা করে বুঝবার জন্য এখানে জানানো হচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ লোকসভা আসন ৪২টা আর এর মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা কম করে ধরলেও ১৬ কোটি।
    তাহলে ফর্মুলাটা হল, ভারতের কোন রাজ্য কত বড় বা গুরুত্বের তা বুঝবার সোজা তরিকা হল ঐ রাজ্যের জন্য বরাদ্দ লোকসভায় আসন সংখ্যা জেনে নেয়া। এই গুরুত্বের বিচারে যেখানে ভারতে কেন্দ্রে সরকার গড়তে লাগে লোকসভায় ন্যূনতম ২৭২ আসন, সেখানে একা উত্তরপ্রদেশ যা একমাত্র বড় রাজ্য তা দিতে পারে একাই ৮০ আসন। ফলে উত্তরপ্রদেশ গুরুত্বে এখানেই সবার চেয়ে বড়। এ ছাড়া সারা ভারতের উপর যেটাকে বলে হিন্দি বলয়ের শাসন- আধিপত্য, এর কেন্দ্র বুঝাতে উত্তরপ্রদেশকে দেখানো হয় । আবার এটাই ‘আর্য’ বা ব্রাহ্মণ আধিপত্যের কেন্দ্র, এই হিসেবে উত্তরপ্রদেশ। আবার এর বিপরীতটা হল দ্রাবিড়ীয় বা ডেকান [Deccan বা দাক্ষিণার্ত] দক্ষিণী চার রাজ্য আর এ দিকে আংশিকভাবে বাংলা প্রদেশ। এ ছাড়া শেষে একটা ‘নোক্তা’ হিসেবে বলা যায়, ভারতের নেহেরু-গান্ধী ডায়নেস্টি বা বংশের শাসন সেটাও এই উত্তরপ্রদেশ কেন্দ্রিক; সুনির্দিষ্ট করে বললে এলাহাবাদ শহরে যেটা আসলে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য হাইকোর্টের শহর। আর এখানেই নেহেরুর বাবা মতিলাল নেহেরু বৃটিশ আমলে এলাহাবাদে ওকালতি প্র্যাকটিস করবেন বলে পাশের কাশ্মির থেকে এক কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ – তিনিও উত্তরপ্রদেশেই এককালে খুঁটি গেড়েছিলেন।
    দরকার যেখানে ফেডারল রাষ্ট্র অথচ হয়ে আছে উগ্র হিন্দুত্বের জাত শ্রেষ্ঠত্বের এর ভারত জাতিরাষ্ট্র! যার বিচার বিভাগ আবার ন্যায়দন্ড ফেলে ন্যায়বিচারের বদলে এর উপরে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ভুয়া দেশপ্রেমিকতাকে!

    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতির পাঠঃ
    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানে নির্বাচনের প্রসঙ্গে আসি। এবার এই পাঁচ রাজ্য নির্বাচন চলেছিল কয়েকপর্বে প্রায় এক মাস ধরে, ৭ মার্চ পর্যন্ত; যার গণনা, ফলাফল এক সাথে ১০ মার্চ প্রকাশিত হয়েছে। উপরে দেখানো উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বের কারণে পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হলেও ভারতের রাজনীতির সবাই আসলে তাকিয়েছিল এক উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের দিকে। যেকোন নির্বাচনে কিসের ভিত্তিতে ভোট বিভিন্ন প্রাথীর বাক্সে যাবে, ভাগ হবে, এমন নানা নির্বাচনী ইস্যু তাতে হাজির হতে দেখা যায়। সেই বিচারে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় গত এক মাস ধরে যেসব নির্বাচনী ইস্যুর কথা বলা ও আলোচনা করে হয়েছিল সেগুলো হল – এক. কৃষক আন্দোলন। মানে আগের টানা ১৫ মাস ধরে চলা এক কৃষক আন্দোলনে শেষে মোদি হার স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট তিন আইন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। দুই. ভারতে কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সামলাতে মোদির ব্যর্থতা।  অর্থাৎ  মোদির সরকার – সৎকার, হাসপাতাল বেড, অক্সিজেন ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সব সিস্টেমটাই ভেঙে পড়েছিল যেখানে। আর তাতে নাগরিক হিশাবে মানুষের মর্যাদা এই সামাজিক মুল্যবোধে ধুলায় লুটিয়ে পড়েছিল। তিন. অর্থনীতি; অর্থাৎ ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি ও কাজ সৃষ্টিতে অভাব মানে পুরানা অর্থনৈতিক ততপরতাই সীমিত বা বন্ধ হয়ে আসা – কোভিডের আগে যা ছিল তা একেবারেই ভেঙে পড়া, ইত্যাদি।
    এসব ইস্যুগুলোতে এক বিজেপির দলীয় বা সমর্থক মিডিয়া ছাড়া বাকি সব মিডিয়ায় এসব ইস্যুতে বিজেপির পক্ষ থেকে জবাব-সাফাই নাই, তারা এসব ইস্যুতে নেতি-ছাপ পড়বে প্রাপ্ত-ভোটে তাই এই ভিত্তিতে বিজেপি ভোট হারাবে এই ছিল তাদের সবারই রিপোর্টিংয়ের লাইন। যেমন “উত্তর প্রদেশের ভোটে বিজেপিকে শায়েস্তায় ‘মিশন ইউপি’’ অথবা “উত্তর প্রদেশের ভোট যে কারণে মোদির জন্য জনপ্রিয়তার পরীক্ষা”- এমন ছিল সেসব রিপোর্টের শিরোনাম।
    এছাড়া “গোরক্ষা ইস্যু” যেটা গরুকে দেবতা মান্য করার হিন্দুত্বের রাজনীতি হাজির করা; উদ্দেশ্য যে এতে ভোটাররা এই হিন্দুত্ত্বের ইস্যুতে ডুবে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিদের ফেলে বিজেপিকেই ভোটটা দিবে এই অনুমান। এই কথিত “গোরক্ষা ইস্যু” বুমেরাং হয়ে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মানে কৃষকের গরু বুড়া হলে তা মাংসের বাজারে বেচার নিষেধাজ্ঞার কারণ গরুকে বসিয়ে খাওয়াতে না পেরে মালিক সে গরুর মালিকানা ত্যাগ করে ছেড়ে দিয়েছে। আর সেই ছাড়া গরু এবার গৃহস্থের জন্য ফসল নষ্টের সমস্যা, তাতে রাতজেগে পাহারা বসানোর সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে।  [নদীতে গরু-মহিষের মৃতদেহ, উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে উত্তাপ]।  এককথায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে গরুর আক্রমণ কেন বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে এটা তুলে ধরেছিল বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়া।
    এমনকি আমেরিকান ক্ষমতাসীনদের থিংকট্যাংক “আটলান্টিক কাউন্সিল”, তারাও মোদির জন্য ‘ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ বলে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে রিপোর্ট করেছিল [Modi faces a critical test in India’s most populous state]। অথবা বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর ভাগ্য নিয়ে ফ্রান্সের মিডিয়ায় উদ্বিগ্ন রিপোর্ট [Turbulent priest: India’s anti-Muslim firebrand and possible future PM]। অন্য দিকে বিশেষ করে ইংরাজি দ্য-প্রিন্ট এ নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করে গেছে [The BJP and the SP are neck-to-neck in Uttar Pradesh ]  অথবা [CM says UP will be largest economy if BJP wins. Data shows unlikely ...]। আর কলকাতার আনন্দবাজার ছিল আরো সরেস। সে অনিন্দ্য জানা নামে এক রিপোর্টারকে সারা মাস উত্তরপ্রদেশে রেখেই নিয়মিত – “উত্তরপ্রদেশের ভোট-বুক” সিরিজ রিপোর্ট ছাপিয়ে গেছে; ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৩ পর্বে তের শহরের সিরিজ রিপোর্ট। প্রতিটা খণ্ড ছিল উত্তরপ্রদেশে বিজেপির দুঃসহ শাসনের বিভিন্ন নজির। যেমন ‘হাতরাস’ এর কাহিনী যেটা আসলে এক দলিত কিশোরীকে রেপ করে, হত্যা করে উঁচুজাতের লোকেদের কাহিনী। এরপর পুলিশ-বিজেপি মিলে ওই কিশোরীর সৎকারের নামে মা-বাবার অনুমতি বা তাদের উপস্থিতি ছাড়াই সেই লাশ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর সেই কিশোরীর বাড়ি এখন আদালতের নির্দেশে আর্মি ক্যাম্প বানিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

    কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির জিতবার আশা জাগানোর ছিল নাঃ
    অর্থাৎ সমর্থকের বাইরে কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির পক্ষে জিতবার আশা জাগানোর মত রিপোর্ট ছিল না। এর মধ্যে আরেক সংযোজন হল – দুই কথিত সাধুর (যারা বিজেপি-আরএসএস অ্যাফিলিয়েটেড) প্রকাশ্য সভা থেকে মুসলমান গণহত্যা শুরুর আহবান, হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার আহ্বানের বক্তৃতা দেয়া হয়। [ধর্মীয় বিভাজন ভারতকে তলেতলে ভেঙে দিচ্ছে] অথবা [As UP Polls Continue, BJP MLAs Dial Up Anti-Muslim Hate Speeches]।

    অথচ পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন অথবা সুপ্রিম কোর্ট নির্বিকার। সবার সময় ক্ষেপণ চলতেই থাকে। প্রায় এক মাস পরে কথিত সাধুর একজনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু মামলা দেয়া হয় মেয়েদের প্রতি অশালীন উক্তির  অথবা Haridwar ‘Dharam Sansad’ shows Modi is facing an internal threat from Sangh Parivar। এমন মামলা জামিনযোগ্য বলে ক’দিনের মধ্যেই তার জামিনও হয়ে যায়।
    এছাড়া ক’দিনের মধ্যেই হিজাব নিয়ে প্রায় জোর করে ব্যাপক এক সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। উদ্দেশ্য হলো, যত বেশি ধর্মীয় মেরুকরণ ততই বেশি বিজেপি ভোট বাড়বে, এই অনুমান। এখানে যে বয়ান তৈরির দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে তা হলো, যেন মুসলমানদের অত্যাচারেই হিন্দু জনগোষ্ঠী অতিষ্ঠ। এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়। আর এই ‘নিপীড়িত’ হিন্দুদেরই ত্রাতা হিসেবে এবার হাজির হয় মোদি ও দল বিজেপি। অতএব বয়ান শেষে হিন্দুরা একজোট হয়ে বিজেপিকে ভোট দাও!!

    মোদির এই তৎপরতা এবার প্রমাণ করেছিল যে, মোদিও নির্বাচনের ভোট তার বিরুদ্ধে যাবে এটা তার ও দলেরও অনুমান ছিল। তাই এত মরিয়া হয়ে সুনির্দিষ্ট করে এথনিক-ধর্মীয় কোনো জনগোষ্ঠী-বিরোধী প্রপাগান্ডা, সরাসরি খুন করতে বলা, ঘৃণা করতে বলার উদ্বীপ্তকরণ; এসব অ্যান্টি-মুসলমান প্রচারণা, ইসলামবিদ্বেষের [Hijab Row Can Hurt Indian Diplomacy] কোনো কিছুই তিনি বাদ রাখেন নাই।

    আরেক শেষ অস্ত্র প্রপাগান্ডায় বিজয় ঘোষণাঃ
    এরপরেই ছিল বিজেপির আরেক শেষ অস্ত্র। সারা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এসব প্রপাগান্ডার পরে পয়লা মার্চ থেকে মোদি-অমিত একেবারে ড্রাইভিং সিট নিয়ে সরাসরি বসে যান। অমিতশাহ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় পয়লা মার্চ এক লম্বা সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করে দেন, নির্বাচনে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হচ্ছে। এই ঘোষণায় একটা মিলের দিক হল, গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের সময়ও তিনি একইভাবে শেষ সপ্তাহে বিজেপি কেন্দ্রের কত আসনে জিতে যাবে, তা ঘোষণা করেছিলেন। এবারও তাই দেখা গেছে। তিনি খুব করে রিপোর্টারকে বুঝিয়ে দেন যে, দিল্লির ক্ষমতায় মানে কেন্দ্রে সরকার গড়তে গেলে উত্তরপ্রদেশ হয়ে তবেই দিল্লিতে যেতে হয়। তাই তারা উত্তর প্রদেশে জিতে যাচ্ছেন। মানে ২০২৪ সালে কেন্দের নির্বাচনেও জিতে যাচ্ছেন [“If anyone wants to form a government with full majority at the Centre, it cannot be without Uttar Pradesh’s mandate,” ]।

    কিন্তু প্রশ্ন যেখানে উত্তরপ্রদেশের এই নির্বাচনে বিজেপির জন্য এত নেগেটিভ ইস্যু আর অসংখ্য জনদুর্ভোগ থাকার পরেও কেন বিজেপি জিতবে- এ নিয়ে কোনো প্রসঙ্গ কোনো কথার জবাব অমিত শাহ দেন নাই। বারবার বলেছেন এবার (২০২২) তারা উত্তরপ্রদেশে জিতে যাচ্ছেন, তাই ২০২৪ সালেও কেন্দ্রে জিতবেন। এ ছাড়া কিসের ভিত্তিতে এ কথা বলছেন এ ব্যাপারে তিনি নিরুত্তর থেকেছেন।

    পরে ১০ মার্চ ফলাফল ঘোষণার দিনও অমিত শাহের বর্ণনা মত ফলাফল আসতে থাকে। আর তাতে নিজেদের বিজয় ঘোষিত হয়েছে বলে মোদি প্রথমেই পার্টির অফিসে বিজয় সভার আয়োজন করেন। পরে আরো বিজয় মিছিল বের করেন গুজরাট সফরে। সেখান থেকেও তার একইকথা তারা ২০২৪ সালের নির্বাচনে কেন্দ্রে জিতে যাচ্ছেন।

    এখানে তামাশা দিকটা হল, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে কোনো মিডিয়ার মনে প্রশ্ন নাই যে, কেন তাদের গত এক মাস ধরে যা কিছু রিপোর্ট – বিজেপির দিক থেকে খারাপ বা নেতি ফলাফল বা জিতিতে বাধা পাবার রিপোর্ট এর কোনো প্রতিফলন ফলাফলের মধ্যে নাই, কেন? এর ব্যাখ্যা কী? এটা আসলেই খুবই মজার যে, অনেক সময় মিডিয়া নিজের আলোচনা-রিপোর্টের প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে না-ও থাকতে পারে। কিন্তু কেন থাকল না এর ব্যাখ্যা কী? সেটা নিয়ে কথা বলা, তালাশ করা কী তাদের কাজ নয়? কিন্তু এখানেই সব ‘কবি’ নীরব দর্শক মাত্র!! আসলে, মোদির হাতে এমন কী আছে যে মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে যত নেগেটিভ দিক তার অযোগ্যতা প্রকাশিত বা প্রমাণিত থাক না কেন, ভোটাররা ক্ষুব্ধ ও সাফারার হোকনা কেন – এসবের কোনোটারই প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে থাকে না কেন? এর উপর এটা নিয়ে ঐ মিডিয়াগুলোই আর কথা বলে না কেন??

    মিডিয়া এদিকে তাকানোকে যেন নিষিদ্ধ মনে করেঃ
    ব্যাপারটা এমন যেন ভোটের প্রকাশিত কমিশনের ফলাফল মিডিয়া আলোচনার বিরুদ্ধে গেলেও তারা এনিয়ে আর আলোচনা করে না। যেন এদিকে তাকানোকে তারা নিষিদ্ধ মনে করে!!  বরং সেদিক থেকে মনোযোগ সরাতে এখন তারা অনেকে রিপোর্ট করেছে যে, কংগ্রেস কেন এত খারাপ ফল করল? যেন কংগ্রেস ক্রমেই সব হারানো দলে পরিণত হচ্ছিল না! যেন সবাই আশা করছিল কংগ্রেস এবার বিরাট কিছু ফলাফল দেখাবে!

    প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য নয়ঃ
    নীতিটা ভারী সুন্দর(!)। দেখা যাচ্ছে ভারতের লিগ্যাল প্রফেশনের (বিচারক, উকিল-ব্যারিস্টার বা লিগাল একাদেমিক ইত্যাদি) কেউ অথবা মিডিয়া যেন প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করা দেশের বিরুদ্ধে কাজ মনে করা শুরু করেছে। যেমন ধরা যাক বর্তমানে সাবেক এক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা যিনি নিয়মিত মোদির নির্বাচনী আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে একাই সোচ্চার থাকতেন; আর অন্য কমিশনারেরা নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়া [EC Rejects by 2-1 Vote Lavasa’s Demand to Record Dissent Note in Orders] বা আইনি-নিরপেক্ষ জায়গায় দাঁড়িয়ে যেকোনো বেআইনি কাজের প্রশ্ন তোলাকে দেশ-বিরোধী কাজ মনে করেছেন। এমনকি কমিশনার অশোক লাভাসা ঐ নো-অফ-ডিসেন্ট বা আপত্তি-নোটে ঠিক কী বলেছিলেন সেকথা রাইট টু ইনফরমেশন আইনেও (যে আইনে যেকোন নাগরিক কোন “পাবলিক তথ্য” জানতে চাইলে সরকার সেই তথ্য দিতে বাধ্য) নির্বাচন কমিশন তা প্রকাশ করে নাই। মোদি এবং এসব বিচারক-কমিশনারদের স্বার্থ কত গভীরে যে এরা পরস্পরকে আঁতাতে সাহায্য করে বলে থাকে, তা এখানে প্রকাশিত।  তাই তারা সবাই নির্বাহী ক্ষমতার পক্ষের লোক হয়ে থাকাই তাদের ভূমিকা মনে করছেন। কিন্তু কেন? ভারত এমন হয়ে গেল কেন?? কবে থেকে??

    Ashok Lavasa, the only member of the 3-man Election Commission to rule that Prime Minister Narendra Modi had violated the Model Code of Conduct while campaigning for the 2019 general election, was selected as a potential candidate for surveillance just weeks after his dissent, according to leaked records of phone numbers that The Wire has seen.

    সেই যে এককালে ১৯৭৫ সালে জুনে জরুরি আইনের শাসন দেখেছিল ভারত, সেই থেকে এনিয়ে এক স্মৃতি তারা কাঁধে নিয়ে ফিরছে। তারা আজও বিভ্রান্ত যে, সেসময়ে ঐ হাইকোর্ট মামলার বিচারক [Justice Jagmohanlal Sinha]  সিটিং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে আইনত শাস্তির রায় দিয়ে কি তারা ঠিক করেছিল? তারা মনে করা শুরু করেছিলেন সারকথায় বললে, তা হল প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতা যদি ট্যারা হয় – আগ্রাসী আচরণের হয়, আইন মানতে, চলতে না চায়, বাড়তি সুবিধা চায়, বিরোধীদের বিরুদ্ধে আদালতকে ব্যবহার করতে চায়- তবে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের কাজ-ভূমিকা যেন হল নির্বাহী বিভাগের পক্ষে দাঁড়ানো বা নির্বাহী বিভাগের জন্য পথ ছেড়ে দেয়া। এককথায় যত আগ্রাসী এক্সিকিউটিভ প্রধানমন্ত্রী, নিয়ম-আইন ভাঙতে চাওয়া নির্বাহীর মুখোমুখি তারা হবেন ততই তাদেরকে যেন আপসে প্রধানমন্ত্রীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। এই হলো সেই নীতি! কেন?

    এটাই তারা সেসময় উলটা ভুল শিক্ষা নিয়েছিলেন; আদালতের দেয়া সাজা ও সিদ্ধান্ত মানতে না চাওয়া প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষেত্রে! যেন আদালত ইন্দিরাকে সাজা দিয়েছিল বলেই ভারতে জরুরি আইন এসেছিল। মানে পরোক্ষে জরুরী আইন আনার দায় বিচারকদের!!! অতএব, লিগ্যাল প্রফেশনের মানুষের কাজ ও ভূমিকাই হচ্ছে অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাপ খাইয়ে চলা। এতে দেশ ভালো থাকে – তাই এটাই দেশপ্রেমিকতা!!!! বিচারকের হাতে ন্যায়দণ্ড নয়; কথিত দেশপ্রেমিকতা দেখিয়ে দোষী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাকে মাফ বা তাঁর দোষ মাফ করা বা এড়িয়ে চলাই বিচারকের কাজ!!

    লক্ষ্য করা যায়, সেই থেকে আইন প্রফেশন, বিচারকেরা হয়ে গেছেন – ন্যায়দণ্ডের বাহকের চেয়েও সবার আগে ‘দেশপ্রেমিক”। যেন দেশপ্রেমিকতা আগে দেখানো শেষ হলে এরপর বিচার-আচারে বসা যেতে পারে। এ জন্যই কি ভারতের নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসাকে কমিশনের চাকরি ছেড়ে যেতে হলো? অথচ কোনো মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা নাই!

    অথচ অশোক লাভাসা নিজে তো বটেই তার স্ত্রীও তাঁর প্রফেশনে সরকারের হাতে  নিগৃহিত ও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন।  শেষে যেটা কার্যত ক্যাডার বদল করা, এভাবেই অশোক লাভাসা এখন নির্বাচন কমিশন আগাম ছেড়ে দিয়েছেন। আর তিনি এখন মোদি প্রশাসনের তরফে সরকারিভাবে এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) ম্যানিলাতে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে থাকলে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকতেন। মানে এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন তার অধীনে হত।

    তাহলে অবস্থা দাঁড়াল এই যে এখন থেকে আইন না মানতে না চাওয়া অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীকে জায়গা করে দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। এভাবেই ভারতের আদালত আর কমিশন চলবে – ভোট কারচুপি, বাক্সের প্রোগ্রাম বদলে দিলেও এভাবেই সব চলবে। আগ্রাসি মোদিকে কিছু বলা যাবে না। আর এমন দুর্দমনীয় ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী মোদি এরপরে মুসলমান গণহত্যার হুমকি দিয়ে হিন্দু ভোট নিজ বাক্সে নিতেই থাকবেন! আর এভাবেই আগামী ২০২৪ সাল তো বটেই, আগামী ভারতে সব নির্বাচন জিতে চলবেন! আর নিশ্চয় এতে দেশপ্রেমিক ভারত অনেক উন্নতি করে এগিয়ে যাবে!!!!

    [আরেক ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করা নিয়ে আমার আগের আগের আরেক লেখা – “ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা” – সেটা পাবেন এখানে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বিচারক বা কমিশনাররা যখন সবাই দেশপ্রেমিক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোমেন এটা কী করলেন?

    মোমেন এটা কী করলেন?

    গৌতম দাস

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২

    গত দু-একদিন ধরে একটা ভিডিও ক্লিপ ফেসবুক মাতিয়ে বেড়াচ্ছে, সেখানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন কিছু বক্তব্য রাখছেন। এই ধরণের ছবি বা ক্লিপে মোমেনকে দেখে আমাদের কারই ভাল লাগে নাই। আভ্যন্তরীণ ভাবে সরকার বিতর্কিত হতে পারে কিন্তু মোমেন বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজের -প্রতিরূপই থাকেন! ফলে আমাদের সবার জন্যই এটা ম্যাটার করে! এঘটনায় সরকারের মানে বাংলাদেশের ইমেজ আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
    বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটা মোটেই সুখকর চিত্র নয় যে তাদেরকে প্রতিনিধিত্বের নামে কেউ বিদেশিদের একাংশের কাছে কাকুতি-মিনতি করছে…!! তাও আবার সেটা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে – যেখানে বডি ল্যাঙুয়েজ আর ঘটনা ল্যাঙ্গুয়েজ আর পুরা সেটের সেটিংটা হল যে জয়শঙ্কর স্টেজে ডায়াসে আর মোমেন আমজনতা স্তরে নিচে……। আর জয়সঙ্কর আমাদেরকে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে …… বাহ বাহ কি দৃশ্য!
    আসলে ওটা ছিল মোমেনের মুরোদ দেখানোর বেস্ট সুযোগ। জয়শঙ্করের আপত্তি হল চীনা বিনিয়োগ আমরা কেন নিয়েছি। আর চীনা বিনিয়োগ নেয়া মানেই –  তার চোখে, এমন এয়ারপোর্ট বানানো যেখানে কোন বিমান ল্যান্ড করে নাই ইত্যাদি।
    আর এখানেই মোমেনের জিজ্ঞাসা করা দরকার ছিল ভারত আমাদের বিআরটিসি-কে লোন (কথিত লাইন অব ক্রেডিট)  দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে কেন? গত তের বছর ধরে বিআরটিসি এক অলাভজনক গলার কাটা, সরকারি রাজস্ব থেকে উলটা ভর্তুকি দিয়ে এটা টিকিয়ে রাখত্বে হয়েছে। কারণ সর্বশেষ ভারতের লিল্যান্ড-সহ নিজ  অচল গাড়ি কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভারত সরকার প্রায় দুশ কোটি টাকা ওসব কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করে দেয়। আর এখন ঐ কোম্পানিগুলোর অবিক্রিত গাড়িগুলো কোন দাম যাচাই ছাড়া ইচ্ছামত দামে আমাদেরকে কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। আর ঐ দুশকোটির টাকার (এর আগেও দফায় দফায় এই) ঋণ ও এর সুদ বইতে দায় চাপিয়েছে আমাদের উপর, এটাই লাইন অন ক্রেডিট কথার মানে।
    তাহলে অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের মত আমাদের অলাভজনক বিআরটিসি কোম্পানিকে ডুবিয়ে দেওয়ার কাজটা কী জয়শঙ্কর সাহেব করেন নাই???
    মোমেনের উচিত ছিল এই জবাবদিহিতা জয়শঙ্করের কাছে চাওয়া…। এটা হতে পারত স্মার্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মত কাজ।এছাড়া একই রকম যেসব চীনা বিনিয়োগ ভারত নিয়েছে মোদির প্রথম পাঁচ বছরে সেসব প্রকল্পের তথ্য ভারত ওয়েব সাইট থেকে সরিয়ে রেখেছে কেন? ভারতে চীনা বিনিয়োগের তথ্য আগে জয়শঙ্করের উচিত পাবলিক করে দেয়া। এরপর অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের গল্প আমরা শুনতে রাজি হব। এটাই সমান সমান হতে পারে তাই না!!!!
    মোমেন কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে আপনাকে সাধারণ্যে বসতে হতেই পারে, এড়ানো যায়না এমন স্তরে বা পরিস্থিতিতে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাই বলে সেটাকে আরও কোন রাজ-সভাসদের অর্থ তৈরি করতে পারেন না – যেখানে আপনাকে অনুগ্রহপ্রার্থি প্রজা মনে হয় এমন পরিস্থিতি নিজেকে নিচা দেখানোর বা নিচে ফেলার তো দরকার নাই! নাকি???
    ওখানে ভুলে যাওয়া হয়েছে যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন আপনি ওখানে ব্যক্তি মোমেন নন। আপনি সেখানে অবশ্যই সব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে সমান মর্যাদার আরেক ও নিজ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। কিন্তু মোমেনের বক্তব্য দেয়া আর প্রশ্ন করার মধ্যে সেটাই অনুপস্থিত ছিল। যেন ব্যক্তি মোমেন কিছু বাকা প্রশ্ন করতে চাইছেন, মান-অপমানের কথা ভুলে।
    ঘটনা হল বাংলাদেশ চীনের সাথে গভীর সম্পর্ক গিয়ে নিজেকে জড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট এখনকার বাংলাদেশ সরকার সঠিক বা বেঠিক যেভাবেই হোক তা করেছে। কিন্তু সেজন্য আমরা কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে যাব কেন?? আমরা তা করতে যেতে পারি না! সেজন্য মোমেন ইন্ডিয়ার মাধ্যমে প্রায় সত্তরটা দেশের কোন সভায় গিয়ে জবাবদিহিতা করতে যাবেে কেন? তাও কার্যত ভারতের জয়শঙ্করের মাধ্যমে???
    মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স বা এমএসসি [MSC], ১৯৬৩ সালে জন্ম নেয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সিকিউরিটি প্রসঙ্গে ডায়লগের একটা জোট। ওর নিজ ভাষ্য অনুসারে তা ট্রান্স-আটলান্টিক মানে আটল্যান্টিকের দুইপাড়ে মানে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ-কে নিয়ে করা এক জোট।
    এখন কোন যুক্তিতেই আমরা ট্রান্স-আটলান্টিক ভূগোলের কেউ নই। অথবা কোন বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ বা অর্থনীতির কেউ হই নাই। তাহলে আমরা এমএসসি তে গেছি কেন?? কোন সুখে?? আমাদের কোন স্বার্থই এখনও নাই, হয় নাই যে ওমন সভায় যাওয়া যখন প্রয়োজনীয় হয়েছে!! একমাত্র যদি আমাদের অপমানিত হবার সাধ না হয়ে থাকে! অথচ কার সামনে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে ক্ষমতা রক্ষার বন্দোবস্ত কখনও দুনিয়াতে কেউ অর্জন করতে পারে নাই।
    এই হল সরকারের প্রথম মারাত্মক অসংগত আচরণ!
    ফলে যেন নিচা হবার জন্য ওখানে মোমেন গিয়েছেন!
    ঘটনা হল, ঐ এমএসসি সংগঠন জন্ম থেকেই কোল্ড ওয়ার যুগে এন্টি-সোভিয়েত এক ডায়লগের জোট। কিন্তু একালে সেসব হারিয়ে তা এখন কার্যত এক চীন-বিরোধী টান্স-আটল্যান্টিক জোট হয়েছে। তাও আবার এখন এমন এক সময়ে যখন ইইউ বাইডেনের সাথে আর এক সুরে নাচবে না, স্টেপ মিলাবে না – সেটাই এখন সবখানে একেবারেই স্পষ্ট। যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ বাইডেনের সাথে হাত ধরে হাটছে না, পা ফেলছে না…।
    তাহলে সেরকম একটা জোটের সভায় গিয়েই হাসিনাকে তার চীনের সাথে সম্পর্কের গভীরে যাওয়াটা উচিত-অনুচিত যাই হোক, কেন তাকে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে ঐ সভায় যেতে হবে?? আর জয়শঙ্করের কাছে কেন? সে কে??
    কোয়াড জোট – তা অবকাঠামোর জন্য স্বল্পসুদের ঋণ দিবার সংগঠন নয় – এর সে মুরোদও নাই এটা তেমন জোটও নয়। সারা দুনিয়া এটা জানে। তাহলে কোয়াড এমন ঋণ দিতে পারলে তবেই আমরা কোয়াডে যাব অথবা চীন এমন ঋণ দিতে পারে কেবল এজন্যই আমরা চীনের কাছে গিয়েছি – এসব বয়ান তুলে ধরতে মিউনিখ যাওয়া কেন? আর অপমানিত হওয়া কেন? দুনিয়া সম্পর্কে আমরা কী এতই বেখবর??
    প্রথমত ভুল অথবা সঠিক দিদ্ধান্ত আমরা যেটাই নেই না কেন কারও কাছে জবাবদিহিতার সম্পর্ক আমাদের হতেই পারে না। এর মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার মত কোন কাজ কোন ঘটনাই থাকতে পারে না। অপমানিত হওয়া ছাড়া। আর সেটাই মোমেন করেছেন, যেকোন সম্ভবত কোন উপদেষ্টা, কারও বোকামি নির্দেশে।
    কোয়াডের কথাই যদি এসময় মাথায় থাকে তাহলে এর বাস্তবতাটা হল এখন ইউরোপ-আমেরিকা একই চোখে ঘটনা দেখছে না। এমনকি কোয়াডের চার দেশই একই তালে নাই। অকাস সামরিক জোট গঠনই এর প্রমাণ। আবার পরিণতিতে অকাস (AUKUS) বা কোয়াড (QUAD) দুটাই স্থবির। বরং আমেরিকার বাংলাদেশে অবরোধ দেওয়ার গ্লোবাল পলিটিক্যাল সোজা মানেটা হল বাইডেনের কাছে অকাস বা কোয়াড কোনটাই আর ফোকাসে নাই। তার ফোকাস এখন বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট ইত্যাদি এসব। আর বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট মানেই ভারতের সাথে আমেরিকার জন্মের সর্ববৃহত স্বার্থ-সংঘাত হবে সেটা।
    আবার খোদ ভারত-ই কী এখন কোন জোটে কারও সাথে আছে?? আজ বাইডেন তো কাল পুতিন – এই অবস্থায় চলে গেছে ভারত; পা কাঁপছে। ওদিকে পুতিনও ভারতের উপর ভরসা করে বসে নাই। তাহলে পুতিনের পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ঘনিষ্ঠতার নয়া যুগ শুরু করত না। ইমরানের সাম্প্রতিক রাশিয়া সফর ইঙ্গিত করে যে পাকিস্তানের জন্মের পরে এই প্রথম সে মেরু বদল করছে। যার মানে পুতিনের কাছে ভারতের চেয়ে পাকিস্তান বেশি গুরুত্বপুর্ণ এখন। তাহলে এই পরিস্থিতিতে ভারতকেই পুতিনের কাছে যেতে হবে নিজ তাগিদেই, সব অপমান বা তুচ্ছ হবার কথা জেনেই।
    তাহলে মোমেন কোন ভারতের কাছে যাচ্ছে, নিজ চীনের সাথে সম্পর্ক এর সাফাই দিতে যাচ্ছে কেন? হাসিনার সরকারের ভারতের কাছে ঠেকা টা কোথায়? কে ভারত? কোন ভারতের কাছে সে যাচ্ছে??
    এক হতে পারে যদি সরকার পরে যায় তো কর্মিদের আশ্রয়স্থল হতে পারে এমন কাজে লাগা ছাড়া এই “একাকী” হয়ে পড়া ভারত হাসিনার কেউ না। কোন কাজে লাগবে না। এটা হতেই পারে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকা চলতি সরকারকে এককালে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কি সেই কৃত্যজ্ঞতা তো ২০১৪ সাল থেকে মিটে গেছে।
    কেউ কার কাছে সাফাই দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যায়নি, যাবে না।
    আর মোমেন সাহেব কোন মিটিংয়ে যাবার আগে ঐ হবু মিটিংয়ের ফরমাট আগে জেনে নিয়ে তবেই তার যাওয়া উচিত। আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনাকে মাটিতে রেখে ডায়াসেে বসবে ভারতের জয়শঙ্কর – এই ফরমাট কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোন ধরণের বাংলাদেশের সরকারের জন্যই এটা ইজ্জতের প্রশ্ন।
    প্রটোকল প্রটোকল বলে চেচিয়ে লাভ নাই, প্রটোকল আগে বুঝতে হবে। কোন প্রটোকল চিন্তায় মোমেন সাহেব মিউনেখ গেছিলেন?? এখানে হাসিনার লাভালাভের চিন্তায় তিনি কিছুই হাসিল করতে পারেন নাই, উলটা তিনি বাংলাদেশের মান-সম্মান ডুবিয়ে দিয়ে এসেচেন।

    সবশেষ হাসিনা সরকারের কী হবে এটা এখন অবজেক্টিভ বাস্তবতায় নির্ধারিত হবে। সাবজেক্টিভ কর্তা হিসাবে হাসিনা তাতে হাত ঢুকায়ে কিছুই আগাবে না – এমন শত মিউনিখ মিটিং সরকারকে রক্ষা করতে পারবে না! লাভের লাভ হবে অপমানিত হয়ে ফিরে আসা…! আর সেটাও সরকারের বিরুদ্ধেই যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com[লেখাটার প্রথম ভার্সান আজ (২২ফেব্রু ২০২২) সকালের সরাসরি আমার ফেসবুকে দেয়া হয়েছিল।
    পরে তা আরও আপডেট করে, আমার এই ওয়েব সাইটে দেয়া হয়েছে। আর সেই ভার্সান টাই ফিরে লোড করা হল  আজই আমার ফেসবুকে এখনই সকাল ১১ঃ৩৪ এ।
    এই আপডেটে অনেক নতুন তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।]
  • জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    গৌতম দাস

    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Vn

     

     

          MEA spokesperson Arindam Bagchi. | Photo Credit: twitter/@abagchimea

    ইংরেজি কমিউনাইজ [communize] শব্দটি খুবই ইতিবাচক এক শব্দ। যার রুট শব্দ কমিউন [commune]। ল্যাটিন অরিজিন কমিউনিস [communis] সেখান থেকে ইংরাজিতে যার অর্থ কমন [common] বা সাধারণ। সেখান থেকে সম্ভবত ফ্রেঞ্চ comuner (মানে ভাগাভাগি শেয়ার করা), হয়েও অরিজিনাল কমিউনাল [communal] (জোর করে দেয়া হিন্দু-ভারতীয় নেতি অর্থটা না) খুবই ইতিবাচক শব্দ যার অর্থ যে কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করে, আর কমিউনিটির কষ্ট-আরামসহ সবই যে শেয়ার করে; এবং এক সম্প্রদায় হিসেবে মিলেমিশে থাকে। এছাড়া, অনেক সময় প্রকৃতির সাথে স্পিরিচুয়ালি সম্পর্কিত করে দেখা অর্থে ‘কমিউনাইজ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দেখা যাচ্ছে রুট কমিউন এর যতগুলা অর্থ হয় সবই ইতিবাচক। কোন নিচা মানে যেটাকে ইংরাজিতে নেতিবাচক বা derogatory অর্থে ব্যবহার হয় এমন কোন ডেরিভেটিভ শব্দ বা অর্থই নাই।

    অথচ বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সমাজের জমিদার-হিন্দুরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য খাটাতে গিয়ে  সেই দরকারে অরিজিনাল  কমিউনাল শব্দের অর্থ-বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তাই ডিকসনারিতে না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী ধারণা ও ঘৃণায় হিন্দুত্ব-জাতির জোশে তারা সব ঢেকে ফেলতে চেয়েছিল। আর তাতে সবচেয়ে ইতিবাচক কমিউন শব্দটাকেও জবরদস্তিতে নেতিবাচক অর্থ দিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু শব্দটা ইংরাজি, ফলে ইংলিস ডিকসনারি তাদের এই নেতি অর্থ গ্রহণ করে নাই। একারণে বলা যায় জমিদার-হিন্দুরা  কমিউন শব্দের বাংলা – ‘সম্প্রদায়’ শব্দটাকে করেছে ‘সাম্প্রদায়িক’ যা খুবই নেতিবাচক অর্থ। তাই ভারতে ছেপে নেওয়া ছাড়া অন্য কো্ন ইংরেজি ডিকশনারিতে নেতি ‘কমিউনাল’ শব্দটাই পাওয়া যাবে না। কমিউন বা কমিউনিটি অথবা ইতিবাচক-কমিউনাল শব্দ পাওয়া যাবে। যার সবগুলোও অবশ্যই ইতিবাচক শব্দ।

    এখন জমিদার-হিন্দুর দেয়া এই কমিউনাল শব্দের অর্থ কী? তারা কী বোঝাতে চান?
    প্রথমত তারা বলতে চান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানেরা বাঙালি না। আর জমিদার-হিন্দুর রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল আধিপত্য অবিভক্ত বাংলার সবাইকে মানতেই হবে। আর সেই জবরদস্তি ক্ষমতার জমিদার-হিন্দুর দাবি  – বাঙালি মানেই কেবল হিন্দু; মুসলমানেরা এথনিক পরিচয়ে বাঙালিই নয়। মানে যেন কারও এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্য কারও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যায়।
    সারা মোগল আমলের নিয়ম  খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমিতে যেই চাষাবাদ করে জমি ভোগ-দখলের অধিকার তাঁর। বৃটিশ কলোনি-দখলদার শাসকেরা প্রথম এই জমি মালিকানা ভিত্তি ভেঙ্গে দেন। তারা জোর করে জমির আগের টাইটেল এবার অর্থের বিনিময়ে ‘জমিদার নামে নয়া গোষ্ঠির কাছে সেই জমির টাইটেল হস্তান্তর বা লিখে দিয়েছিল। অথচ তখনও জমি ভোগ-দখলের অধিকার পুরানা জমির চাষাবাদ-কারিদেরই ছিল।

    তাই এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণী নিজ ক্ষমতা আধিপত্য দেখাতে  মুসলমানদের এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ চালু করেন। দাবি করেন মুসলমানেরা বাঙালি না। এরই বিপরীতে দুবার জবাব দিয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রধান সংখ্যা-শক্তি হয়ে দেখিয়েছে তারা অবশ্যই মুসলমান। আর পরে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ করে দেখিয়েছে – তারা বাঙালিও।  জমিদার কলকাতা তাদের বাঙালিত্ব কেড়ে নিতে পারে নাই, পারবে না। ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথায় নিষ্পেসিত অন্তজ কিন্তু লড়াকু বাঙালির যে অংশটা ভালভাবে বাঁচতে ও লড়াবার সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এরা বাঙালি মুসলমান অবশ্যই। কিন্তু একারণে তার এথনিক-জাতি পরিচয়, যে ভাষায় সে মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক করে তা বদলে যাবে কেন? মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কোন জমিদার-হিন্দু মাতবর কেড়ে নিতে পারে না। মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কেড়ে নিবার ক্ষমতা জমিদার-হিন্দুর নাই,  জমির মালিকানা টাইটেলের মত এই বাঙালি পরিচয় কেড়ে নেয়া যায় না সম্ভব নয়। মানুষের এথনিক পরিচয় প্রায় অর্গানিক; ফলে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা যে ঘরে জন্ম নেই সে ভিত্তিতে এই পরিচয় সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এজন্য  এথনিক-সাংস্কৃতিক অর্থে জাতি বা জাতিবোধ কথাটা আগে বুঝতে হবে। এটা জবরদস্তির বিষয় না। মুসলমান বাঙালি তাই বাংলা ভাষা ছাড়ে নাই ছাড়তে পারে না, বাঙালি খাদ্যাভাস ইত্যাদিও ছাড়বে না আর সর্বোপরি মুসলমানিত্বও ছাড়ে নাই। তাতে শরতচন্দ্র হয়ে যতই আপনি “বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা” দেখানোর উপন্যাস লেখেন না কেন!

    কিন্তু বৃটিশ-ভারতের কলকাতার জমিদার হিন্দু সেই জবরদস্তিটাই করেছিল। বিশেষত মুসলমানেরা তাদের মানতে না চাইলে অথবা পাল্টা তাদেরকে ভিন্ন কোন নিজ ধর্মীয় সামাজিক চিহ্ন দেখানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে “সাম্প্রদায়িক ডাকা হবে” – এটা ছিল জমিদারশ-হিন্দুর সিদ্ধান্ত। তাদের আধিপত্যের সমাজে থাকতে গেলে তাদের সংজ্ঞায়িত করা ধারণা মানতে বাধ্য করার কায়দা হল এটা। মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া তাদের কথিত সব শিষ্টাচার ও কোড ফলো করলেই কেবল তারা স্কুল-কলেজ বা চাকরিতে তাদের সমাজে প্রবেশাধিকার দেবে, পাশে বসতেও দিতে পারে। আর যে তাদের কোড মানে না, ডমিনেন্স মানে না তাকে জমিদারেরা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলত।  একারণেই আজও সাম্প্রদায়িক শব্দটাই জমিদার-হিন্দুর সেই অত্যাচারেরই স্মারক চিহ্ন। কাজেই  এই সাম্প্রদায়িক শব্দটা ব্যবহারে আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন! প্রয়োজন ব্যবহার বাদ দেয়া।
    মনে রাখতে হবে  মুসলমানের বিরুদ্ধে জমিদার-হিন্দুর  বুকভরা বিদ্বেষ আর ঘৃণার ঝড় তোলা শব্দটাই হল ‘সাম্প্রদায়িক’।

    ভারতের বিদেশ বিভাগ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি একজন বাঙালি হিন্দু; উনার ‘বাগচি’ টাইটেল তাই নির্দেশ করে। এদিকে হিজাব ইস্যুতে স্বভাবতই ওআইসি বা ইসলামি ঐক্য সংস্থা [Organisation of Islamic Cooperation (OIC)]  ভারতের মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানোর নীতির নিন্দা করে অন্যান্যদের মতই বিবৃতি দিয়েছিল। এটা সহ্য হয় নাই ভারতের বিদেশ বিভাগের। ব্যাপারটাকে তারা দেখেছে যেন পুরানা জমিদার-হিন্দুর চোখে, তাদের আধিপত্য অস্বীকারের চেষ্টা হচ্ছে যেন। তাই পুরা জমিদার-হিন্দুর ঘৃণার হুঙ্কার দিয়েছেন অরিন্দম বাগচি। বলেছেন এটা নাকি ওআইসির সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট। এছাড়া অরিন্দম দাবি করছেন ভারতে নাকি একটা “কনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ও মেকানিজম” কার্যকর আছে আর ওর সাথে নাকি  আছে – “ডেমোক্রাটিক ইথোস (মুল্যবোধ) ও পলিটি (রাজনৈতিকতা)” ।

    ……constitutional framework and mechanisms, as well as democratic ethos and polity. The communal mindset of the OIC Secretariat does not allow for a proper appreciation of these realities

    কিন্তু সরি,  অরিন্দম! ভারতে এগুলোর কোনটাই নাই, ভারতের জন্ম থেকেই নাই। আছে কেবল দগদগে ঘা, এক হিন্দুত্ব। পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই।  এমনকি কান পেতে শুনেন আরএসএস প্রধানের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা দিবার পরিকল্পনা শুনতে পাবেন। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজ্যকে মুসলমান-শুণ্য করতে হবে, শেখানে তারা থাকতে পারবে না – এই ডাক ও পরিকল্পনাও শুনতে পাবেন।  আর চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে সব হারিয়ে মোদির ভোট যোগাড়ের এতে একমাত্র উপায় মুসলমান গণহত্যার হুমকি, মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো আর বিজেপি প্রার্থী না জিতলে মুসলমান মারবেন, বুলডোজার চালাবেন এই হুমকি দিচ্ছে। এগুলো কী কনষ্টিটিউশনাল আচরণ ?? ভারতে কী সুপ্রীম কোর্ট অথবা কোন নির্বাচন কমিশন বলে কিছু আর আদৌ আছে??? যাদের প্রত্যক্ষ কনষ্টিটিউশনাল দায়িত্ব ছিল মুসলমান ভোটারদের উপর এত চরম হুমকির বিরুদ্ধে তাতক্ষণিক সকল ব্যবস্থা নেয়া। অথচ এমন কোন কিছুই করা হয় নাই। মানে  ভারতের দুর্বল যে কনষ্টিটিউশন যে কনষ্টিটিউশনালিজম তাই তো  আজ একেবারেই নিস্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা প্রমাণিত। সে কারণে এসবের বিরুদ্ধে ওআইসি তো কোন ইসলামি আলেম ডেকে আনার কথা বলে নাই, পরামর্শ দিতে যায় নাই।  বরং আহবান রেখেছে [……OIC called upon the U.N. and the Human Rights Council to take “necessary measures”] জাতিসংঘ ও এর হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের কাছে তাদেরকে “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে বলেছে। অথচ দেখা যাচ্ছে এটাও মুখপাত্র অরিন্দমের সহ্য হয় নাই।   তাহলে?

    … ভারতে আছে কেবল দগদগে ঘা – যার নাম হিন্দুত্ব। যেখানে পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই, পারে না।

    অর্থাৎ  মুখপাত্র অরিন্দম এখনও জানেনই নাই যে ও আইসি-কে সাম্প্রদায়িক বলা – এটা একটা এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর কাজ। কারণ এই “সাম্প্রদায়িক” শব্দ ও ধারণাটাই জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষী ধারণা ও সেকালে তাদের হাতেই যার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল।  অন্যের এথনিক পরিচয় অরিন্দম আপনি পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু আপনি অন্য এক জনগোষ্ঠিকে তার এথনিক পরিচয় ও ইতিহাস তুলে কথা বলতে পারেন না; জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষের ইতিহাসের পক্ষে সাফাই দিতে পারেন না। বিশেষ করে আপনি যখন একটা দেশের বিদেশবিভাগের মুখপাত্র!! খেয়াল করেন, হিজাব নিয়ে বিবৃতি, আপত্তি তো আমেরিকাও তুলেছে। ওখানে অরিন্দম বাগচির মুরোদ হয় নাই  “সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট” শব্দ ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে  কথা বলার!
    এদিকে বর্তমান চালু নির্বাচনে মরিয়া মোদিকে জিতাতে,  খুঁচিয়ে ঘা করা এক পদক্ষেপ হল ভারতের স্কুল-কলেজে হিজাব ইস্যু খাড়া করা। এতে চরম এক মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণায় বৈষম্যমূলক আচরণে সমাজ তোলপাড় করা ফেলা, এটাই চলছে এখন। এতে আমেরিকা, ইউরোপ আর এদিকে পাকিস্তান বা ওআইসির নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে;  আর আসলে এতে ভারত কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। কারণ, কূটনৈতিক রেওয়াজে এ’বিষয়টা হল,  আপনি আপনার দেশের সব চিহ্ন-পরিচয় নির্বিশেষে আপনার নাগরিকের প্রতি অ-বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সাম্যের চোখে দেখতে বাধ্য থাকবেন ও দেখবেন – এটাই “আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল অর্ডার” আশা করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এবার  ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  আর তাতেই কূটনৈতিক ভাষা ও ভাষ্য হারিয়ে বেহাল দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে যায় ভারত।  এমন বে-দিশায় পড়ে, ওআইসি-কেই ঐ পুরানা জমিদার-হিন্দুর বয়ানের সাহায্যে “সাম্প্রদায়িক” বলে গালি দেয়া হয়েছে। আর এতে যেন সারা দুনিয়াটা জমিদার-হিন্দুর রাজত্ব – এটাই ধরে নেয়া হয়ে গেছে!  আবার তাদের হিসাব টনটনে, একইভাবে তারা আমেরিকাকে তাদের নিন্দার জবাব দিতে যায় নাই! অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই তারা যেনবা জমিদার-হিন্দুর প্রজা এই অনুমান শেখানে খাটাতে যায় নাই!
    তাই, এরপরে আমাদের আশা থাকবে যে “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার অর্থ-ইতিহাস-তাতপর্য বুঝে এটাকে কিভাবে আমল ও সুলুক করতে হবে তা আমরা নিজেরাই বুঝে নিতে পারব। কারণ জমিদার-হিন্দুর এমন মুসলমান-বিদ্বেষে ভরপুর শব্দের ইতিহাসের পক্ষে আমরা দাড়াতে বা প্রমোট করতে পারি না।

    মুসলমান কোপাতে হবে ও ইসলামবিদ্বেষ একমাত্র ভরসা মোদিরঃ
    প্রায় তিন সপ্তাহ আগের এক লেখায় পরিষ্কার করে লিখেছিলাম যে, একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত ২০২১ সালে। সেবারের মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয় আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রীর রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা তিনি দেশে  না দেখিয়েও পারছেন না আবার দেখালে মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো ‘নিচা’; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? তাই তিনি ঐ ট্যাংকারের উপর রঙ লাগিয়ে সৌদি সব চিহ্ন ঢেকে ঐ অক্সিজেনই ব্যবহার করেছেন, ক্রেডিট নিয়েছেন!  আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দু দৈনিকের কূটনীতিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাদের ভারত আসলে, মোদি তাকে যা বুঝায়ছিলেন, এমন কোনো পরাশক্তি নয়! যা নিয়ে মৌদির বয়ানে এতদিন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।  কেবল তখন সেটা তাস্র কাছে পরিস্কার হয়েছে যে ভারত কোন পরাশক্তি নয়। বলেছেন, ভারত নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন? এ’এক অদ্ভুত ভারতের মিথ্যাবলা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তার সাংবাদিক যার নিজস্ব বুঝাবুঝির মেকানিজমই বিকশিত হয় নাই!

    সেখানে আরো বলেছিলাম, চলতি এই নির্বাচনে “মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই হবে মোদির একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফেরানোর একমাত্র উপায়। আর তাই ঘটছে। এ’কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন, মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই মোদির রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় ঠাউরানো যার সোজা মানে, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!”

    নির্বাচন শুরু হয়েছে, খবর ভালো নাঃ
    শিডিউল মোতাবেক গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কিছু রাজ্য বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। আর এর সাথে  মোদির পক্ষে পরিকল্পিতভাবে দুটো চরম ঘৃণা ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করে নেয়া হয়েছে। প্রথমটি ঘটানো হয়েছে, গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ১৭-১৯ লাগাতার এই তিন দিন। দুই কথিত ‘সাধু’ নরসিংহআনন্দ ও প্রবোধানন্দ গিরি, তারা এর আয়োজক ও বক্তা। এরা আবার বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন নামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতা। তারা শেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক হিন্দুকে ‘সাফাই অভিযান’ পরিচালনার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই”। [every Hindu must pick up weapons and we will have to conduct this cleanliness drive (safai abhiyan). There is no solution apart from this.”] আর প্রথমজন বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ায় যদি মানুষকে টিকে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে জিহাদিদের উপর সাফাই অভিযান চালাতে হবে” [“In the entire world, if we want humanity to last, we will need to clean it of jihadis. ]। এর পরও কারো বুঝতে অস্পষ্টতা যাতে না থাকে তাই বলে দেই, এখানে এই সাফাই অভিযান মানে হল জাতিগতভাবে (মুসলমানদের) সবাইকে নির্মূল করা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে বোঝায়। দুনিয়াতে প্রথম হিটলার ও তার সহযোগীদের এই এথনিক ক্লিনজিং’ এর অভিযোগে বিচার হয়েছিল। সেই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের চোখে এটা সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। যার বেলায় শাস্তি হল সর্বোচ্চ দন্ড। সেই থেকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এটাই একাডেমিক বইপত্রে ও আইন-আদালতের ভাষাও সবচেয়ে বড় গোত্রের এক অপরাধ মানা হয় বটে।  এটাই এখন মোদি ও তাঁর গোষ্ঠির প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়। অথচ মোদি সরকারের বিদেশ বিভাগের মুখপাত্র সমালোচকদেরই উলটা “সাম্প্রদায়িক” বলছেন!

    গত ডিসেম্বরে কথিত সাধুদের ঘৃণা-সভার পরে প্রায় এক মাস ধরে চলে এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দেয়ার-নেয়ার পুলিশি প্রচেষ্টা; এছাড়া কোনো বাদি-অভিযোগকারী পাওয়া যাচ্ছে না, এ অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ জানুয়ারি কেবল নরসিংহ-আনন্দকে গ্রেফতার করা হয়। তবুও এমন সব আইনে গ্রেফতার দেখানো যাতেসে সহজেই জামিন পেতে পারে। অথচ ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ’ বা ‘জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’ – শুধু এ’অভিযোগে কাশ্মির বা নর্থ-ইস্টে অনবরত এমন আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতার করে কয়েক বছরের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে; এমন অন্তত চারটি আইন আছে। এসব আইন প্রয়োগ করে তারা, জঙ্গি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বলে থাকে। অথচ নরসিংহআনন্দের উপর একটা পুরা কমিউনিটিরর উপর এথনিক ক্লিনজিং,  গণহত্যা বা হত্যার হুমকি এসবের কোনটাই অভিযোগ আনা হয় নাই। কেবল ৫০৯ দারার একটা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল যে নারী ও সাংবাদিকদের উপর আপত্তির ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে [under section 509 of the Indian Penal Code (IPC) for making objectionable remarks against women and abusing a journalist.]। ফলে স্বভাবতই   ইতোমধ্যে তাঁর জামিনে মুক্তিও  হয়ে গেছে।

    এখন এমন গণহত্যার হুমকির ঘটনার পর এক মাস কেন বিভিন্ন অজুহাতে কোনো গ্রেফতার বা মামলা না করে অপেক্ষা করা হল? মূল কারণ এবছরের পাঁচ রাজ্য নির্বাচন শুরু হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক মাস ধরে কয়েক পর্বে। তাই ১৭-১৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে ঐ এথনিক ক্লিনজিং আর চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য দেয়ার পরও কোনো পুলিশ অ্যাকশন না ঘটানোতে – হিন্দু ভোটারদের মনে উসকানির ঝড় তুলে মানসিকভাবে তাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেয়া হয়। এভাবে এক মাস কাটিয়ে দেয়ার পরে নরসিংহআনন্দ এরপরে গ্রেফতার হয়েছে কি না বা জামিন হয়েছে কি না তা এসব আমজনতা হয়ত ব্যাপারটা আর খেয়াল রাখবে না; বেশির ভাগই মনে রাখবে না – এই ভরসায়। কিন্তু এদিকে হিন্দু ভোটারদের উসকানি দিয়ে এর নগদ ফলাফলে মোদির ভোটের বাক্স পর্যন্ত আনার লক্ষ্যে তাদের মনের ওপর ছাপ ফেলার ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়া তো হয়েই গেছে। এই ছিল পরিকল্পনাটা।

    এবার দ্বিতীয় ঘটনা – স্কুল-কলেজে হিজাবঃ
    নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে সেসব রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা মান্য করা সব-বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সে কারণে হিজাবের ইস্যুটা উঠানো হয়েছে এমন এক বিজেপিশাসিত রাজ্যে যেখানে এবছর নির্বাচন নাই। ফলে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু বলার নাই। কিন্তু আবার ইস্যুটা হাজির করা হয়েছে এমনভাবে যার এফেক্ট ভারতব্যাপী বিস্তৃত হয়। স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ ইস্যু যে কারণে এটা কেবল কর্নাটক রাজ্যের ঘটনা। এর ওপর আবার এটা এক-দু’টা স্কুল-কলেজের স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। সারা  রাজ্যে বা কর্নাটক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও নয়। একটা জেলার দু-একটা স্কুল-কলেজে। কিন্তু পাশের আরো দুটো জেলায় জবরদস্তিতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই শুরু করে দেয়া, আন্দোলন, এসব শুরু হয়েছে মোদির ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে; অথচ  সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি নিশ্চুপ।

    এতে কার্যত হিজাদ নিষিদ্ধ ইস্যুটা সারা কর্নাটক তো বটেই, সারা ভারতের সব রাজ্য ছাপিয়ে ভারতের বাইরে আমেরিকার নিন্দা প্রস্তাব, ওআইসি নিন্দা প্রস্তাব ঘটিয়ে এটা এখন ভারতের জন্য এক গ্লোবাল কূটনীতিক ইস্যু হয়ে গেছে। এতে বলাবাহুল্য এর এফেক্ট নির্বাচন চলছে এমন পাঁচ রাজ্যের উপরই পরিপূর্ণভাবে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। আর এবার তা সেখানকার প্রতিটি ব্যালট বাক্সে গিয়ে আছড়ে পড়বে, বিজেপির ভোটের বাক্সগুলো এখন নিশ্চয় উপচে পড়বে আর মোদি-বিজেপি এরই অপেক্ষায়! এ হল পরিকল্পনা!

    কথিত নিরপেক্ষ হিন্দুত্বের আদালতঃ
    এছাড়া এবার ঘটনাকে আরো পোক্ত করতে কোনো উপায়ই ছাড়া হয়নি; তাই আদালতও।  এদিকে আদালত মানেই ভীষণ বিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষে তা ভরপুর থাকে। তাদের সামাজিক সম্মানও অনেক উঁচুতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকেও এ’ইস্যুতে বলা হল, তারা এখন হস্তক্ষেপ করবে না; কখন করবে তা তারাই ঠিক করবে বলে রায় দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে স্থানীয় রাজ্য হাইকোর্ট বিরাট নিরপেক্ষতার ভান নিয়ে হাজির। তারা এক সাময়িক রায় দিয়ে দিয়েছে। সেটা হল, “স্টাটাস কো”;  যার আইনি মানে হল বিবদমান পক্ষগুলো বিবাদ শুরুর আগে যে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে গিয়ে স্থিতাবস্থায় থাকবে, যত দিন আদালত ইস্যুটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে কোনো ফাইনাল রায় না দেয়। এটাই ইউজুয়াল প্র্যাকটিস হয়ে থাকে।

    কিন্তু এখানে বাড়তি একটি টুইস্ট দেয়া হয়েছে। বলছে ‘স্ট্যাটাস কো’; কিন্তু সাথে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে যে, এর মানে হল, এই অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সময়ে কেউ কোনো ধর্মীয় পোশাকে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না। অথচ এ বলাটাই বেআইনি। এটা নিজেই এক বিরাট বৈষম্য – একেবারে এক সূক্ষ্ম কারচুপি করা যাকে বলে।

    কারণ হিজাব ইস্যু হওয়ার আগে যে যেমন খুশি হিজাব, পাগড়ি, ঘোমটা প্রভৃতি পরে স্কুল-কলেজে যেতে পারত ও আসতও। কাজেই ‘পূর্বাবস্থা’ বলতে এটাকেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাখ্যায় তা না বলে উল্টো ধর্মীয় পোশাক পড়া যাবে না [we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing]  এ কথা বলে আসলে কথিত এই সাময়িক সময়ের রায়ের কথা বলে যারা হিজাববিরোধী মোদি-বিজেপির লোক এদের দাবিকেই মেনে নেয়া ও এদের পক্ষেই রায় দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ দুপক্ষের কথা শুনে বিচার বিবেচনা করে ফাইনালি রায় হবার আগেই we restrain বলে হিজাবকেই বাদ দেওয়ার কর্তৃত্ব কোন বিচারকেরই নাই। কিসের ভিত্তিতে আপনারা we restrain বললেন???  কারণ, এই সাময়িক রায়টাও তো কোন শুনানির শেষে দেয়া নয়,  করা হয়নি। অথচ, আদালত যেন খুবই একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সিদ্ধান্ত দিয়েছে এই ভাব করে তাদের হিন্দুত্বের খেয়াল এটাই চাপিয়ে দিয়েছে।

    “Pending consideration of all these petitions, we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing saffron shawls (Bhagwa), scarfs, hijab, religious flags or the like within the classroom, until further orders.”

    এখন পরে কী ফাইনাল রায় হবে তা আগেই বলে দেয়া যায়। এ’বছরের নির্বাচন কেবল এই পাঁচ রাজ্যে আর তা কেবল ১০ মার্চ পর্যন্ত। এর মানে হল ১০ মার্চের পরে আদালত ফাইনাল রায় দিলে আর সেখানে আবার হিজাব পরে স্কুল-কলেজে আসার পক্ষেও যদি আদালত রায় দেয় তো বিজেপির আপত্তি হবে না; কারণ পরের বছরের আগে আর নির্বাচন নাই। অর্থাৎ এখনকার এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাটা যেঁ বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়ে আদালত বিজেপির হিন্দুত্ব ও ভোট জোগাড়কে সাহায্য করল। আবার ফাইনাল রায় হিজাব পড়ার পক্ষে  দিবার পথ খুলে রেখে বিচারক বিরাট উদার সাজবার পথ পরিষ্কার রেখে দিলেন, এবং তেমন রায়ও দিতে পারবেন।

    ভারতের উচ্চ আদালতগুলোর ভেঙে পড়ার ইতিহাসঃ
    এমনিতে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের চোখে আমাদের দেশের অনেকে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। কিন্তু বটম অব দ্য ফ্যাক্টস হল, ভারতের আদালতগুলো রাজনীতি বা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় নিজেদের সব ক্ষমতা সমর্পণ করার পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কেন ও কখন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির জাজমেন্টে তাকে দোষীকরে রায় দেয়া হয়ে যায়। এরপর বাকি ছিল তিনি কিভাবে শাস্তি হিসাবে জেলে যাবেন তার ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেয়া কেননা তিনি সিটিং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এরপর ইন্দিরার উপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ত্যাগ করে নিয়ে এরপর শাস্তিভোগের জন্য তৈরি হয়ে আসতে আদালতের সিদ্ধান্ত-রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা আদালতের সেই নির্দেশ পালন না করে, রায় উপেক্ষা করে –  ক্ষমতায় থেকেই উল্টো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। এভাবে তিনি এই শাস্তি গ্রহণ  জীবনেও আর করেন নাই।

    আর সেই থেকে আইন পেশার সব লোক, রাজনীতিবিদ মিলে মূল্যায়নে গিয়েছিলেন যে, জাজদের অমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাথে সংঘাতে যাওয়াতে তাতে কোন লাভই হয়নাই  উলটা ভারত-রাষ্ট্রই নাকি  দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তাদের আপস করা উচিত ছিল।’ এমন সঙ্ঘাতের এই নাকি মহিমা। অর্থাৎ আদর করে যেন বলা যে “রাজনীতিবিদেরা খুব দুষ্ট”।  অতএব মন্দের ভাল হিসেবে ক্ষমতার সাথে আপস করাই নাকি ভাল – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কেন?

    কারণ না হলে জরুরি অবস্থা দিলে তো তা রাষ্ট্রই না থাকার সমান, এই ক্ষতি হয়। ফলাফলে জরুরি অবস্থা পাওয়ার চেয়ে তাই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস করা অথবা এড়িয়ে চলা হলো -এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এটাই নাকি আদালতের পথ। যদিও এর কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে না, তবে এটাই সেই থেকে তাদের অলিখিত চর্চা ও বুদ্ধিজীবিতা!  আর এ সুযোগে দেখা যাচ্ছে এখন যেটা হয়েছে, একদল বিচারক হয়েছেন যারা এ সুযোগে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে নানা পার্সোনাল সুবিধা আদায় করে নেয়ার সূক্ষ্ম তৎপরতা চালিয়ে, কে কত বুদ্ধিমানের মত মোদির সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছেন সেই ক্রেডিটের গর্ব ও এর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। তাতে  ভারতের পরপর গত দুই প্রধান বিচারপতি যে এই দোষ দুষ্ট আছে তা আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বিশেষ মটর সাইকেল চড়ার খায়েস মিটালেন। অপরজন আসাম জাতিবাদের পক্ষে জাতির-সৈনিক হয়ে গেলেন!
    এতে প্রায়ই ভারত-রাষ্ট্রের বড় বড় দুর্বলতা বা ‘ফুটাফাটা’ এসবের কারণে, এটি ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে বলা হয় – সে পথের সবচেয়ে বড় এক গর্ত হল, এই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস, এড়িয়ে যাওয়া তথা হবু জরুরি অবস্থা এড়ানোর বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ-কথা!

    মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর সাথে ভোটের সম্পর্কঃ
    অনেকের মনে হতে পারে মোদির মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর নীতি-পদক্ষেপের সাথে ভোটের সম্পর্ক কী? আমরা বোধহয় বাড়িয়ে দেখছি ব্যাপারটাকে। তা অবশ্যই না। ভারতে এখন রাজ্য নির্বাচন চলছে পাঁচ রাজ্যে যেখানে সবচেয়ে বড় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যও আছে। কত বড়? ভারতে কেন্দ্র সরকার গড়তে মোট ন্যূনতম ২৭২ আসনে জিততে হয়। এই ২৭২টার ৮০ আসন সংগ্রহ করা সম্ভব একা এই উত্তরপ্রদেশ থেকেই, যার মানে ২৭২ এর প্রায় তিনের এক ভাগ আসন পেয়ে যাওয়া। একারণে বলা হয়, কেউ কেন্দ্রে সরকার গড়তে চাইলে উত্তরপ্রদেশে জেতা গুরুত্বপূর্ণ’ যদিও এখন যা চলছে তা কেন্দ্রের নির্বাচন না; রাজ্য নির্বাচন। কিন্তু এখন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচনে জিতলে তবেই না ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্বাচনেও  উত্জেতরপ্তারদেশের আশি আসনের বেশির ভাগ পাওয়া সম্ভব! একারণে এবারের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মোদি মুসলমান কোপায়ে যেকোনোভাবে জিততে মরিয়া!

    ঘটনার কেন্দ্র কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলনঃ
    এই প্রথম এটা রেকর্ড যে, একটা কৃষক আন্দোলন ১৫ মাস ধরে লাগাতার ভারতের হাইওয়ে রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করে শেষে জয়ী হয়েছে। দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের সংযোগ হাইওয়ে সড়কের মুখ্য শহর গাজিপুর। এটাই ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। হিন্দু জাতিবাদী আনন্দবাজার পত্রিকাও একে ‘ধাত্রীভূমি’ [ইতিহাসের ধাত্রীভূমিতে কি ক্ষতির আশঙ্কায় বিজেপি? ] বলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। এঅঞ্চলটাকে ‘পশ্চিম উত্তরপ্রদেশও’ বলা হয়। এটাই মোদির জন্য কাঁটা বিছানো ভূমি। এখানে মোদি হাঁটলে পায়ে কাঁটা বিঁধবে খালি। অথচ বিরোধী অন্যদের বেলায় হবে উল্টোটা। দিল্লিসহ এ অঞ্চলের আবহাওয়া হল – গ্রীষ্মে যত তপ্ত গরম, শীতকালে ততই শীত। অথচ এখানেই ১৫ মাস ধরে অনেকেই বউ-সংসার সাথে নিয়ে রাস্তায় বসে-শুয়ে কষ্ট করে গেছেন। শেষে মোদি তাদের সবার কাছে হার স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন, চালু করা তার তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার বা বাতিল করেছেন। কেন?
    এ অঞ্চলটা আশপাশের হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের বাকি যারা বাণিজিক কৃষিকাজ করে থাকেন, তাদের সবার চেয়েও সমৃদ্ধ এবং আসলে অগ্রগামী স্বার্থের বড় কৃষক লোকেদের বসবাসের স্থল। এদের জাট বা জাঠ, ইংরেজিতে জাঠল্যান্ডার বলা হয়; এমন এদের বৈশিষ্ট্য হল – মিনিমাম পাঁচ একর বা বেশি ও উর্বর জমিকে ঘিরে এদের কারবার এবং পাইকারি কৃষিপণ্যের বাজারের  (মান্ডির) বড় সাপ্লায়ার এমন কৃষক এরা। পাকিস্তানের করাচিতে বা কাশ্মিরেও এমন ‘জাঠদের’ দেখা মিলবে। আর তত্ত্বটা হল, যত আরবাইনাইজেশন বা শহুরেকরণ ঘটবে, ততই জাঠ কালচার বড় হবে, তাদের প্রভাব বাড়বে। এরাই ছিল ঐ কৃষক আন্দোলনের মূল আপসহীন অংশ। কিন্তু এমন জাঠ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান জাঠের টেনশন প্রায়ই ঘটে থাকে, হয়েছেও স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা আবার জাঠ ও মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে বুঝে।

    মোদির ২০১৪ সালের প্রথম কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্বাচনের আগের প্রায় এক বছর অমিত শাহ, ‘দা মাস্টারমাইন্ড অব দাঙ্গা’ – তিনি এসে এই উত্তরপ্রদেশে কাটিয়েছেন। তারই পদক্ষেপে মুজাফফরনগরে তিনি পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন, যার নগদ পরিণতি হল জাঠ-মুসলমান শত্রুতাকে চরমে তোলা, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। আর সেটারই ব্যালট ফলাফল ছিলল, ২০১৪ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট কেন্দ্রিয় ৮০ আসনের ৭২ আসন মোদির ব্যাগে। এমনকি অমিত শাহের এই ‘শত্রুতা’ বিক্রি করেই বিজেপি পরে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বা ইউপি রাজ্য নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছিলেন।  এবং পরে ২০১৯ সালে মোদির দ্বিতীয়বার সরকারের আসার জয়ও সম্পন্ন করেছিলেন, একই জাঠ-মুসলমান বিভক্তির কাধে চড়ে। কিন্তু এবার আর নয়। কেন?

    এরই মধ্যে এবার এই জাঠ ও মুসলমান একযোগে মোদির বিরুদ্ধে রাস্তায় কৃষি আন্দোলন করে ফেলেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। আর এতেই মোদি মাফ চেয়েও যে এই বিরোধী ঐক্যের পাথর সরাতে পারবেন না, তা জেনেও যতটা যা করা যায় মনে করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে মাফ চেয়েছেন। আর তার একমাত্র করণীয় করেছেন যে মুসলমান কোপানো আর বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো তুঙ্গে তোলা প্রবলতরভাবে তা সম্পন্ন করতে গেছেন, আর এখান থেকেই বাড়তি হিজাব বিতর্ক। স্কুলের ছোট বা টিন-এজ মেয়েগুলোকে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে অপমানের অভিজ্ঞতায় অবলীলায় ডুবিয়ে দেয়ার এই নিষ্ঠুরতা।

    ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫৮ ও ৫৫ আসনের এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে; বিশেষ করে প্রথম ৫৮ আসন – এই-ই সেই জাঠ অঞ্চলের। মোদির ভাগ্য এখানেই নির্ধারিত হবে। তবে এর ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১০ মার্চ। যদিও এরই মধ্যে আগাম মিডিয়া পূর্বাভাস মোদির বিরুদ্ধেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ওআইসিকে বলে সাম্প্রদায়িক!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    গৌতম দাস

    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3UR

     

                                            Lata Mangeskar (1929-2022)

    _

    সমাজ কোনো ব্যক্তির গুণাবলিকে তুলে ধরতে সহায়তা করে থাকে, তার ভাল গুণ থাকলে তা ফুটিয়ে তোলার কাজটা করে থাকে। উল্টা করে বললে, সমাজের ওপর ভর করেই ব্যক্তি ফুটে ওঠে, ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে। এমনকি তার গুণের উচ্চতা যদি অনেক উপরের হয় তাতে অনেক সময় তার বড় কিছু ত্রুটি যদিও ওই গুণের উচ্চতার নিচে-আড়ালে চলে যায়, তবু এসব অর্থে আমরা বলি, ব্যক্তিত্ব সমাজের সৃষ্টি।

    আবার কোন কোন ব্যক্তিত্ব তার ভাল-মন্দ যাবতীয় গুণ ও ত্রুটিসহই কখনও সমাজের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তেমনি এক ব্যক্তিত্ব সম্ভবত গত আট যুগের বিখ্যাত গায়িকা লতা মঙ্গেশকর। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার কেরিয়ার বা পেশাদার গায়িকা জীবনই অনেক লম্বা, প্রায় ৭২ বছর। এক মারাঠি পরিবারে জন্ম নেয়া লতার পেশাদার গানের জগতে প্রবেশ বা প্রথম তাঁর গলায় সিনেমার গান  রেকর্ডিং বলা হয় ১৯৪৮ সালের আশপাশের সময়ে। ব্রিটিশ-ভারত মানে অখণ্ড ভারত থাকার সময় থেকেই ভারতে সিনেমা – এই নয়া মিডিয়ার জন্ম হয়েছিল। তাতে নির্বাক-সবাক হয়ে চলচিত্রের উত্থানের শুরুর কালেই লতার আগমন। তবে এই সিনেমা নির্মাণ যখন নিজের জন্যই একদিকে নিজের বোদ্ধা দর্শক ও প্রশংসাকারী জড়ো করছে আর অন্য দিকে টেকনিশিয়ানগোষ্ঠী তৈরি করে সাজিয়ে বসতে শুরু করেছিল ততদিনে দেশ ভাগ হয়ে যায়। তবু ভাগ হওয়া আজকের তিন দেশে ভারতীয় সিনেমার প্রতি আগ্রহ ভাগ হয়ে যায়নি বা কমে যায়নি।

    সম্ভবত এর মূল কারণ  কমন অরিজিনের এক সাংস্কৃতিক বন্ধন; এ’তিন দেশের সংস্কৃতির মৌল উৎসগুলো একই জায়গার। এথনিক অর্থে মানুষ মাত্রই তার জাতিগত পরিচয় থাকে। আবার আমরা কোনো না কোনো সিভিলাইজেশনের অন্তর্গত থেকে বড় হই। এই বিচারে আমরা সবাই সিন্ধু সভ্যতার অংশ। তাই সিভিলাইজেশন অর্থে এর একই এথনিক জাতি পরিচয় আমরা তিন দেশেরই কমন বৈশিষ্ট্য। সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রাচীন ভারতের যত প্রকাশ দেখা যায় বা এ সম্পর্কে জানা যায় এর এক বড় চিহ্ন হল সংস্কৃতিতে গানের ধারা এবং ধরনগুলোর স্টাইল ও বৈশিষ্ট্য। যেমন আমাদের এই গানের ধারা পশ্চিমের সভ্যতার কোন ধারা অথবা আরব বা মেসোপটেমিয়ার ধারাও হওয়ার কথা নয়। প্রাচীন ভারত বলতে গেলে এর দাবিদার আমরাও কারণ এর বহু চিহ্নবৈশিষ্ট্য আমরা এখনো বহন করি। যেমন একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এর কেন্দ্রে আছে; এমন এক চিহ্ন সম্ভবত রাগসঙ্গীত ও এর ঘরানা মানে স্কুলগুলোতে যার প্রকাশ। তাই সভ্যতার চিহ্ন হিসেবে ক্লাসিক মিউজিক একটা খুবই শক্ত চিহ্ন হয়ে আছে। তবে এখন পলিটিক্যালি ডিভাইডেড দেশ তিনটাতে সভ্যতার রূপ-পরিণতিতে কী কী রূপ নিয়ে প্রকাশিত আছে, সেখানে অর্জনগুলো কেমন কী, আর তা কে কত অবিকশিত অর্থে ছোট বা বড় এসবের বিচারের ক্ষেত্রে তুলনায় ফারাক যতই যা নজরে আসুক, ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সংস্কৃতিতে গানের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন একই।

    কোক স্টুডিও-এর যুগেঃ
    গত ১৯৪৭ সাল থেকে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের গানের ভিত্তি এক হওয়া সত্ত্বেও আমরা কে কেমন কতদূর বিকশিত হয়েছি, অর্জন করেছি তা এক সহজ তুলনা করে বুঝার উপায় হতে পারে এমন কিছু সম্ভবত এখন এসে গেছে। সেটা হল কোক স্টুডিও।
    এখানে স্টুডিও বলতে মূলত গানের রেকর্ডিং স্টুডিও। অর্থাৎ রসুইখানা যেখানে ফাইনাল প্রডাকশনটা তৈরি হয়েছে। আর কোক বলতে বহুজাতিক পানীয় প্রস্তুত কোম্পানি ‘কোক’ এর কথাই বলা হচ্ছে, অবশ্যই। তবে এখানে এর ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করা সূত্রে যতটুকু; যাতে জোগানো তাদের অর্থের বিনিময়ে এই গানের তৎপরতা ও প্রচারের সাথে জুড়ে থাকার সুবিধায় কোক কোম্পানিও প্রচার ও প্রসার পায়। এ’থেকেই নামের ব্রান্ডিং  আর সেই ব্রান্ড নাম ও শব্দটা হয়ে দাঁড়ায় কোক স্টুডিও।

    এর শুরু ২০০৮ সালে পাকিস্তান থেকে। সাধারণত এমন গানের আয়োজন মানে, সংস্কৃতিতে গান এই শিল্পকলা সৃষ্টির আয়োজনে এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব লাগে। আর তাঁকে  অর্গানাইজার বা সংগঠক হতে হয়; আর তাঁকে গানের ও সমাজের এমন দুই অর্থেই সংগঠক হতে হয়। অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, কোক স্টুডিওতে এমন সংগঠক যারা হচ্ছেন  তাদের টেকনিক্যাল গুণ হল তারা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড বা মিস্কিং ইত্যাদি এসব অন্তত বুঝেন ভাল; আর সাথে সেন্স অব মিউজিক। স্বভাবতই তা নিশ্চয় পশ্চিমা-কালচারাল গানের বোধ বুঝাচ্ছি না। সেটা থাকলে তা বাড়তি ভাল, তুলনা করে তাঁরা নিজের বোধগম্যতা বাড়াতে পারবেন। কিন্তু মূল জিনিস হল, নিজের এথনিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও ইতিহাস সম্পর্কে একটা ভালো রকমের বোধ থাকতে হবে।

    পাকিস্তানে গত ২০০৮ সালে পাকিস্তান-কোক-স্টুডিও শুরু হয়েছিল এমন যে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বের হাত ধরে তার নাম রোহেইল হায়াত [Rohail Hyatt]। গত ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানে গানের কম্পোজার হিসাবে  তাঁর আগমন; এসে পাঁচবছরের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করেছিলেন, বলা হয়। এরপর নানা এলবামে কাজ করার পর তার উল্লেখযোগ্য  সব ছাপিয়ে গুরুত্বের কাজটা হল কোক স্টুডিও, এই প্রডাকশন।  এখানে পাকিস্তান সমাজের কাদের কাদেরকে বেছে তুলে এনে রোহেইল তাঁর গানের ধরন ও বৈচিত্র্য বা কম্বিনেশনের ডালি সাজাচ্ছেন তা লক্ষণীয়। সে দিকটা খেয়াল করলে তার ওজন বুঝা যাবে। পাকিস্তান কোক স্টুডিও-এর সফলতার তিন বছর পরে ভারতে একই আইডিয়াতে ইন্ডিয়ান কোক স্টুডিও শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে; দক্ষিণী কম্পোজার বা সুরকার লেসলি লুইসের [Leslee Lewis] হাত ধরে। আরেক দক্ষিণী গায়ক হরিহরণকে সাথে নিয়ে ১৯৯৬ সালে তার বহুল আদর পাওয়া অ্যালবামের নাম “কলোনিয়াল কাজিন”। তরুণদের টিভি এমটিভি এর কল্যাণে,  এ’নামেই লুইসকে বেশি মানুষ চেনে।

    দুই কোক স্টুডিও-এর তুলনা আমাদেরকে আমাদের একই প্রাচীন উৎস এবং একই সাথে আমাদের ভিন্নতা সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারে, পরিচয়  করাতে পারে। আগেই বলেছি অবিভক্ত ইন্ডিয়ান ধারার সংস্কৃতিতে এক বড় কমন চিহ্ন হল ক্লাসিক মিউজিক যা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় আমাদের কালচারাল উৎস একখানে। ক্লাসিক গান বা রাগ-প্রধান গান শুনে সচেতনরা ছাড়া অন্যদের বোঝা মুশকিল হতে পারে যে, সেটা ভারত না পাকিস্তানের উপস্থাপন।

    কিন্তু এরপর যদি ভারত-পাকিস্তান কোক স্টুডিওর মধ্যে ফারাক – মানে কে কোন দিকে গেছে বিকশিত হচ্ছে অভিমুখ কী তা তুলনা করে বুঝতে চাই তা হলে, ভারতের কোক স্টুডিও দেখে বোঝা যাবে ভারতের গানের জগত বাণিজ্যিক ভিত্তি খুঁজে নিতে পেরেছে। বাণিজ্যিক ভিত্তি বলতে “মডার্ন ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি” জগতের ভারত যার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হল ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমা। অর্থাৎ ভারতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ইন্ডিপেনডেন্ট অর্থে স্বাধীন নয় বরং তা  এক সিনেমা জগতকেন্দ্রিক। ফলে ভারতীয় কোক স্টুডিওতে এর গান, অর্জন ও পারফরমেন্সে এটা মডার্ন এবং সিনেমাকেন্দ্রিকতার ছাপে ভরপুর।

    তুলনায় পাকিস্তান কোক স্টুডিওর বৈশিষ্ট্য হল, সে দেখিয়েছে সে পাকিস্তান এলিট ঘরের কিন্তু গভীর মিউজিক সেন্সের তরুণ যারা পপ বা রক ধরনের মিউজিক থেকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লাসিকে এসে গেছে; তাদেরকে রোহেইল তুলে এনেছেন। কিন্তু সেই সাথে রোহেইল শেষে একেবারে ক্লাসিক কাওয়ালি বা বুল্লেহ শাহকে পর্যন্ত একাকার করে  পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের।  এমনকি বিস্ময়কর এক ব্যক্তিত্ব হলেন সাইন জহুর  যিনি আমাদের মত অক্ষরের-শিক্ষায় জীবন যাপন করেন না। তাঁর ফোনেটিক্যাল মানে শব্দ উচ্চারণের দুনিয়ায় এই মাধ্যমে তাঁর চলাচল। অক্ষর না চিনে নিজের গলার স্বর বা শব্দের উচ্চারণ দিয়ে নিজের জগত গড়েছেন; গানের লিরিক যিনি অক্ষরে দিয়ে না আঁকিবুঁকিতে নোট নেন; তাঁকেও রোহেইল আবিস্কার করে আমাদেরকে পরিচয় করে দিয়েছেন।  পাকিস্তান কোক স্টুডিও আমাদের দেখাচ্ছে পাকিস্তানেরও গানের শক্তিমত্তা কত সমৃদ্ধ কত বিস্তৃত। বুল্লেহ শাহদের আখড়া এখনও কত সক্রিয়, নুসরত ফলে আলীদের ঘরানা এখনও কেমন দাপটের সাথে টিকে আছে। তাঁরা এখনও পাকিস্তানে হারিয়ে যান নাই, নিজের মত সারভাইবালের স্ট্রাগল করে হাজির থাকার চেষ্টা অরে যাচ্ছেন।
    তবে একই ক্লাসিক কালচারাল অরিজিনের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গানের শক্তিমত্তার দিক থেকে পাকিস্তান সম্ভবত এগিয়ে কিন্তু আবার এই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ক্ষেত্রে, বাণিজ্যিক ভিত্তি দেয়ার ক্ষেত্রে ভারত অতুলনীয় উঁচুতে উঠে গিয়েছে। যে ভারতে শিল্পকলার মুখ্য বা ফোকাস ইন্সটিটিউশন যদিও ঠিক গান অথবা নাটক থিয়েটার নয়, সিনেমা। ফলে কাউকে বা কারও অর্জন ফেলে দিবার নয়! স্বভাবতই এ কারণে দেশগুলো যার যার বাড়তি সুবিধার বা অর্জনের দিক অথবা অসুবিধা বা অবিকশিত নেতিদিকও অবশ্যই আছে ও তৈরি হয়েছে।

    কেন লতার আলাপের মধ্যে এদিকে এত দূরে এলামঃ
    মানুষের আবেগ-অনুভূতির ওপর দাঁড়ানো মানুষের শিল্পকলা বা ক্রিয়েটিভিটি [creativity] চর্চার দিক – সাধারণভাবে দেখলে মানুষের জীবনে একটা পেশা খুঁজে পাওয়া বা নেয়া যতটা কঠিন, ক্রিয়েটিভিটির জগতে এটা তার চেয়েও কঠিন।  মানুষের শিল্পকলা-বোধের জন্ম থেকেই এটা এমনই কঠিনতর।  তাই, জন্ম থেকেই শিল্পকলা-বোধের আদি লড়াই হল খোদ নিজ নিজ বিষয়-আশয়ের জীবনের সাথে। সোজা বাংলায়, পেটের সাথে। কেউ যে শিল্পকলা চর্চায় লিপ্ত হবে তো খাবে কী অথবা কে তাকে খাওয়াবে এই হল সেই মুখ্য প্রশ্ন। এটাকেই আরেক শব্দে প্রকাশ করতে বলা হয়”পৃষ্ঠপোষকতা” কে দিবে? মানে কার অর্থে ‘পেটের চিন্তা’ না করেও নিশ্চিন্তে শিল্পকলা চর্চায় ব্যস্ত হওয়া যায়? কোন যুগ-কালেই এই প্রশ্নের কোন জবাব কেউ দিতে পারে নাই। কারণ এর সমাধান নাই। তাই পায় নাই সেকালেরও শিল্পকলা-বোধের মানুষেরা……।

    অতএব, এই প্রশ্নে শিল্পকলা সব সময় একটা আপস করেই এপর্যন্ত চলে এসেছে বা টিকে গেছে, আছে। যেমন সেটা হল, যদি সেটা রাজ-রাজড়ার আমল হয় তো রাজাদের স্তুতিমূলক গানের  তৎপরতা কেটেছে। যেমন রাজ-বন্দনামূলক গান।  আর এটাকে বলেছি রাজ- পৃষ্ঠপোষকতা। অথবা অন্যদিকে ফিরলে আমরা পাই মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটানোর গান, ভক্তিসঙ্গীত, ভজন, কাওয়ালির ধরনে চলে যাওয়া। আর এখান থেকে গণমানুষের দান, ভালোবেসে দান, এমন সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতায় বেঁচে থাকা। কিন্তু এখানের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল – এই ধারা আরো খুবই সিরিয়াস ক্লাসিক্যাল ধারা।  যেন শ্রেফ ভাল পৃষ্ঠপোষকতা নয়। সে সবকে ছাড়িয়ে মোক্ষলাভের জন্য সে মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটাতে হাজির হয়েছে। নিজ আত্ম-ক্ষুধায় গানের ভিতর দিয়ে সে কোন একক স্পিরিটে পৌছানোর কসরত করছে!! এমনকি জমিদারির কালে, বাঈজি জীবনের মধ্য দিয়ে ক্লাসিক গানকে টিকে থাকতে হয়েছে। সেকালে এমন আরেক রূপ করাচিতে দেখা যেত ‘মুজরা’ বসানো…।  শিল্পকলায় স্ট্রাগল-এর কোন শেষ নাই…।

    বলা হয়, আসলে যা “মনের থেকে” ভাল লাগে তার “দাম” [beyound value] হয় না। আবার উল্টা দিকটা হল যে ব্যক্তি এটা শিল্পকলা-বোধে  ‘সৃষ্টি’ করে আপনার সামনে হাজির করেছে তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন কী করে, সে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকবে কী করে? তাই একটা বিনিময় মূল্য তাঁর অবশ্যই লাগবে। এই প্রশ্নও কম জরুরী নয় বরং  আরেক ভাইটাল প্রশ্ন! যার জবাব দিতে হবে বা পেতে হবে!

    আর বাণিজ্যিক সম্পর্কের যুগে এরই এক ধরণের আপাত সমাধান হল, পেশা হিসেবে শিল্পকলার যেকোনো এক শাখায় এতে পেশাদার পারফরমার হিসেবে একদিকে শিল্পকলার চর্চা, অন্যদিকে পেটের চিন্তার সমাধান পেতে হবে বা ব্যবস্থা করতে হবে ও হয়েছে। তবে বলাই বাহুল্য, এই বাণিজ্যিক সমাধান – এটাও এক বড় কম্প্রোমাইজ। জন্ম থেকেই কোন আপোষ করা ছাড়া কোনো শিল্পকলা চর্চা নাই, ঘটে নাই। মানে, মানুষের শিল্প-চিন্তার প্রকাশ সেটাকে “বেচাবিক্রির বস্তু” করতেই হয়েছে। আর বেচাবিক্রির বস্তু  না করে কেমনে নিজের ভরণ-পোষণ হবে – সেই প্রশ্ন  এড়িয়েই শিল্পকলাকে এই আপস করেই  নিজেকে বাস্তব করে চলতে হয়েছে। তাই একেই শিল্পকলা আছে – বলা যাচ্ছে!

    এ ব্যাপারে ভারতে যে বিকাশিত রূপটা হাজির হয়েছে সে দিকে তাকিয়ে বললে ভারতে শুধু বা মূলত গানকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা দাঁড় করানোতে যায়নি। বরং আরেকটা আরো বড় মাধ্যম তৈরি করে নিয়েছে; আর এটাই হল সিনেমা জগত। আর সিনেমারই এক গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ হতে পেরেছে বলেই গান এই শিল্পচর্চাটা টিকে গেছে ও আছে, সিনেমার আরেক শিল্পকলা রূপ হিসেবে  গান সাথে জুড়ে গিয়েছে। তাই এখন এভাবে বলা যায়, বাণিজ্যিক সিনেমার ভেতর দিয়ে টিকে আছে ক্লাসিক মিউজিক। তবে ঠিক ক্লাসিক রূপে না, মডার্ন মিউজিক হিসেবে।
    এখন অলক্ষ্যে এ দুইয়ের সম্পর্কটা বলে রাখা যাক। সেটা হল ক্লাসিক মানে ব্যাকরণসম্মত দিক এবং যা ভিত্তিমূলক দিক – শুধু তাই না। যেকোন ক্লাসিক দিকের মর্ম উপলব্ধি করতে গেলে “বোদ্ধা ট্রেনিং” থাকা লাগবে। এপ্রিশিয়েশন [appriciation] বোধ হুশ-জ্ঞান লাগবে। সেটা না জানলে প্রশংসা বা মূল্যায়ন করা যায় না – এই হল সুত্র।  কিন্তু আবার আরেক সমস্যা হল কাজটা ক্লাসিক হলেও তা হাজির করতে হবে সাধারণ্যে এবং তা জন-সাধারণের বোধের সীমায় পৌছে দিয়ে। অন্যভাবে বললে তত্ব নয় ব্যবহারিক রূপ লাগবে। আর সেটাই ব্যবহার দক্ষতায় ব্যবহৃত ও সৃষ্ট নতুন রূপটা আম আদমির সামনে পেশ-প্রদর্শন করে তাদের কোনো না কোনো বোধগম্যতায় তা আনা; আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে আনন্দ-মজা দেয়া; সাধারণের জীবন অসংখ্য টেনশনের জীবন – সেটাকে রিল্যাক্স করার বা স্ফুর্তি জাগানো যার লক্ষ্য  – এই রূপটাই আধুনিক গান। সেকারণের যার গানের ক্লাসিক দিক নিয়ে নুন্যতম বোধ অভিজ্ঞতা আছে সেই  ফিরে আধুনিক গানে ভালকিছু করতে পারবে ও দীর্ঘযাত্রায় টিকে যাবে।

    তাহলে লতা মঙ্গেশকর আমাদের কে?
    সাধারণভাবে বললে, এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতায় অরিজিনে মিল অর্থে এখনকার ভারত আসলে আমাদের এক কাজিন যেন; চাচাত-মামাত ভাই-বোন যেমন। যদিও একই ব্লাড, ডিএনএ ইত্যাদি আমাদের। তবুও আপনার কাজিন আপনার চেয়ে বহু ও বেশি গুণে গুণান্বিত হতেই পারে। আবার আপনার থেকে খারাপ এবং কদর্যও হতে পারে। কিন্তু ‘কাজিন’ বলছি কেন? মূল কারণ এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতাগত মিল ও একই হবার কারণে।

    এখন ভারতেই কেবল শিল্পকলা প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পেরেছে – মুম্বাইভিত্তিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বা বাণিজ্যিক সিনেমা রূপে। আরই এরই বগলে লেগে ঝুলে হাটছে গানের চর্চা। আর লতা মঙ্গেশকর হলেন ওই গানের জগতে টানা এক ৭২ বছরের পেশাদার। ব্রিটিশ-পিরিয়ড থেকে একাল পর্যন্ত কালদর্শী একজন পেশাদার।

    কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও লতার সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? এনিয়ে আগেই বলেছি শিল্পকলার প্রধান শত্রু হল শিল্পীর ব্যক্তি-বৈষয়িক জীবনের চাহিদা। জীবনে বৈষয়িক চাহিদার মিটানোর উপায় কী হবে তা না খাড়া করে শিল্পকলা চলতে পারে না। ফলে একদিক থেকে বললে এটা  এটাকে পেশা হিসাবে নেয়া মানে তা শিল্পকলার আপোষ, আবার অন্যদিক থেকে বললে এটাই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা ও সুযোগ এবং সম্ভবত একমাত্র সম্ভাবনা। আমাদের এই তিন দেশের মধ্যে ভারতই বাণিজ্যিক সিনেমা এই মিডিয়াকে সফলভাবে শিল্পকলা-সংশ্লিষ্ট মানুষদের পেশা হিসেবে নেয়ার এক স্থিতিশীল ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করতে পেরেছে। আর এই এক্সপেরিমেন্ট যখন শুরু হয় সেটাকে বলা যায় ১৯১৩ সালের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র যা পরে আরো বিকশিত হয়ে হয় ১৯৩১ সালের সবাক চলচ্চিত্র হয়েছে।

    আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হল, এক সময়ে আমরা সবাই অবিভক্ত ভারতের অংশীদার ছিলাম বলে ওর সব অর্জন ও ব্যর্থতারও ভাগিদার ছিলাম। ফলে সিনেমার এই শিল্পকলার বিকাশে মুখ্য ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অবিভক্ত সবার সাথে সে সময়ের পূর্ববঙ্গের বুঝমানেরাও প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিল। নিজের শিল্পকলার ভবিষ্যত খুঁজে ফিরেছিল।

    সে আগ্রহ দেশভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে পরেও থেমে যায়নি। কারণ আগ্রহটা আমাদের কালচারাল ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা পাকিস্তান-বাংলাদেশ (পূর্ববঙ্গ) হয়ে গেলেও রাজনৈতিক বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে যতটা সম্ভব পরস্পর কালচারালি কানেকটেড থাকার চেষ্টা করেছিলাম আমরা, যা স্বাভাবিক। ফলে সেই ঐতিহ্যের স্মরণ থেকেই একালে লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান পর্যন্ত; তাঁর  শোকবার্তা প্রেরণ খুবই ভ্যালিড ও স্বাভাবিক এক তৎপরতা। অবশ্য এর আরো একটা বড় কারণ ‘স্মৃতি’।

    স্মৃতি মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়ঃ
    বড় কারণ ‘স্মৃতি’, যা আমাদের তাড়া করে অনেকেই লক্ষ্য করেছেন হয়ত, ছোটবেলায় শোনা অনেক গান দু-একটা যা তখনই খুব অপছন্দ লাগত ফলে কম বা না শুনতাম আমরা হয়ত ব্যক্তিগতভাবে। অথচ আজ বড় হয়ে ধরা যাক সাবিনা ইয়াসমিনের সেই গান যা আমার অপছন্দের গান সেটাই খুব ভালো লাগছে! কেন, এর কারণ কী? এর কারণটা অদ্ভুত!! মানুষ পরিণত বয়স হলে তখন আমরা আর শুধু গান শুনি না। কোন ভেসে আসা গানশুনার সাথে সাথে আমরা তরুণ বা ছোটবেলার সেসব সময়ের টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতি মনে ভেসে উঠতে থাকে। আর এতে গান ছাড়িয়ে ওই স্মৃতিতে ডুবে যাই আমরা। অসংখ্য খারাপ বা ভালোর সুখবোধ আর ওদিকে হয়ত লজ্জা কিংবা অপরাধবোধ, মিলবার আকুতি ইত্যাদি জেগে ওঠে। নস্টালজিক ক্ষোভ হতাশা ফ্যান্টাসি ইত্যাদি সব এসে মাথায় ভিড় করে। আর ভালো লাগাটা মূলত ওখান থেকে। ফলে সাবিনার সেটা ধীর-লয়ের গান ছিল বলেই হয়ত টগবগে তরুণ বয়সে যেটা ভাল লাগেনি, সরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু পরিণত বয়সে স্মৃতির গুণে  সেটাই এখন মহার্ঘ্য হয়ে উঠতে পারে। অতএব গানের আরেক নাম এখানে গভীর স্মৃতি! লতা আমাদের স্মৃতির আরেক নাম!

    তাহলে একালে লতার গান কথার আসল মানে হল আমাদের পুরনো সেসব দিনের ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখের খুটিনাটি স্মৃতি। আমরা ভাগ হয়ে ছিটকে তিন দেশে পড়েছি কিন্তু লতার গান হল আমাদের পুরান সেসব স্মৃতির গ্রন্থি-কার। বুনে বুনে যে আবার তা জোড়া দেয়!!! মোটামুটিভাবে বললে, পঞ্চাশ তো বটেই ষাটের দশক পর্যন্ত আমরা ভারতের  সিনেমাকেন্দ্রিক পেশাদার শিল্পকলার যে উত্থান তার খবর নিতে পেরেছিলাম। এরপর থেকে রাজনৈতিক বিবাদ অনেক ভারী হয়ে যায়, প্রজন্মও বদলে যায়। স্মৃতি ফিকে হয়ে আসতে থাকে। তবু যাদের বয়স এখন ষাট বা এর বেশি তাদের স্মৃতিতে এখনও ভারতীয় সিনেমা বা লতা বাস করে, এটা কম কথা নয়!

    তবু ঠিক কেন লতা মঙ্গেশকর আজ এখানে প্রসঙ্গঃ
    লতা আজ এখানে লেখার প্রসঙ্গ হলেও এনিয়ে আরো কিছু কথা আছে। তবে সেসব অন্যদিকের কথায় এখন যাব…।
    এটা এখন সবাই স্বীকার করে নিয়েছে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক তৎপরতায় বাকি মহাদেশকে ছাড়িয়ে এশিয়াই প্রধান গ্লোবাল কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই কথাটা মাথায় খেয়াল রেখে  আরো অনেক কিছু দিয়ে আমাদের প্রভাবিত করতে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক ফেলো মাইকেল কুগেলমানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে; যিনি আমেরিকান ফরেন পলিসি নামের ম্যাগাজিনে এশিয়ার ঘটনাবলি প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক নিজের এক কলাম লিখে থাকেন। কুগেলমানের এবারের প্রসঙ্গে দেখি, লতা মঙ্গেশকর উঠে এসেছে  [Lata Mangeshkar Was a South Asian Icon]। তবু গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু তাঁর একটা শুরুর বাক্য ছিল এমন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার কাছে কমন কিছু ব্যক্তিত্ব হয়ে হাজির হওয়া সহজ নয়। কিন্তু লতা হয়েছেন, এধরণের সেই বাক্যটা। তবু তার ব্যাখ্যাটা পূর্ণ মনে হয়নি। কুগেলম্যান লিখেছিলেন…  “Her music united a region that has few shared heroes and often struggles to come together around common causes.”  অর্থাৎ লতা নাকি এই অঞ্চলকে (তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন আমাদের তিন দেশ) ঐক্যবদ্ধ করেছেন যেখানে আমাদের কমন হিরোর সংখ্যা খুবই কম আর একই কারণে একমতে ও একসাথে হবার উদাহরণ অনেক কম।

    কুগেলম্যান  কথাগুলো আনাড়ির মত বলেছেন, আর জোর করে মিলিয়ে বলেছেন। ফ্যাক্টস হল, ঠিক লতা মঙ্গেসকর আমাদের তিন দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেন নাই। উপরে এতক্ষণ সেকথাগুলোকেই খুঁড়ে বিভিন্ন দিক থেকে তুলে এনে বলার চেষ্টা করেছি। যার সারকথা হল, আমরা তিনদেশ লতার পেশাজীবন শুরুর পরে একটা বড় সময় পর্যন্ত একদেশ হিসাবেই ছিলাম। এবং এখনও সাংস্কৃতিক অরিজিন হিসাবে আমরা একই রূট শেয়ার করি। শত রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও লতা  অবশ্যই আমাদের শেয়ারড লাইফের এক প্রতীক। কিন্তু কোথায় আমরা ঐক্যবদ্ধ? এটা তো না থাকলেও জোর করে কাউকে খুশি করার জন্য বলার বিষয় নয়। বাস্তবতার কথাটা বললে অসুবিধা কী? এদিকটা তিনি না জেনে উলটা ব্যাখ্যা করতে গেছেন। তাই এখন নিচে আমরা দেখব আমাদের রাজনৈতিক ভিন্নতার শুরু কোথা থেকে, যেটা কুগেলম্যানের বুঝাবুঝিরই বাইরে…।

    কুগেলম্যান আমাদের তিন দেশে ভাগ হয়ে যাওয়া এবং এখনো তা নিয়েই আমাদের মধ্যে বড় রাজনৈতিক মতবিরোধে জড়িয়ে থাকাকে ইঙ্গিত করছেন?  অথচ তিনি লতার হিন্দু মহাসভা, আরএসএস বা বিজেপির মোদির প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য অনুভব করার দিক নিয়ে বেখবর।  আর স্বভাবতই এ নিয়ে লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তি রাজনৈতিক মতামত বা পছন্দের প্রশ্নে তাঁর হিন্দু-মহাসভা থেকে উঠে আসা আরএসএস-বিজেপি মোদির প্রতি ভালোবাসা আবেগ দেখানো; ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে  মোদি যেন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন সেই দোয়া-কামনা পাবলিকলি প্রকাশ করা থেকে শুরু করে, অবলীলায় বাবরি মসজিদ ভাঙার পক্ষে গান গেয়ে দিয়ে অংশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আমার মনে পড়া থেকেই তো এটা সবদিক থেকে লিখতে তাগিদ অনুভব করেছি।

    আমি আগেও অনেকবার বলেছি, রাজনৈতিক চিন্তায় একটা খামতি কত যুগ ধরে আমাদের তিন দেশকে গর্তে ফেলেছে এর আদর্শ উদাহরণ, এমন ব্যক্তিত্ব হলেন রাম মোহন রায়। গত ১৮১৫ সালে তার ‘আত্মীয় সভা’ নামে পাঠচক্র(?) থেকে (ব্রাহ্মণ নয়)  ব্রাহ্মধর্ম প্রচলনের প্রস্তাব করেন তিনি। সেখান থেকে ব্রাহ্মসমাজ গড়া শুরু করা এটাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। তিনি ভুল অনুমানে বুঝেছিলেন, ব্রিটিশরা একাট্টা অ্যাঙ্গলিকান বা ইংলিশ-ক্যাথলিকভিত্তিক এক ‘জাতি’ বলেই নাকি তারা মডার্ন ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র হতে পেরেছে। কাজেই ভারতকেও জাতি-রাষ্ট্র হতে হলে আগে একেও এক জাতি হতে হবে। তাই এক ‘ব্রাহ্ম-জাতি’ হয়ে নিতে হবে আগে। কারণ তাঁর অনুমান আমাদের অবিভক্ত ভারতে সনাতন ছাড়াও মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মও আছে। এর চেয়েও বড় বিষয়, হিন্দুধর্মেই অগুনতি জাতিভেদ বর্ণপ্রথা আছে। কাজেই আগে সবাইকে এক ধর্মে এনে নিতে হবে। নাহলে জাতি-রাষ্ট্র গঠন করা যাবে না। এই হলো তাঁর বোঝাবুঝিতে প্রধান ও পরিপুর্ণ ভুল অনুমান। আর এই ভুলের উপর দাঁড়িয়ে তিনি ব্রাহ্মধর্ম প্রচলন করে নিতে হবে বলে এক পূর্বশর্ত আরোপের কারণ। তবে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটা আমাদের মনে রাখতেই হবে, ভারতীয় কমিউনিস্ট ইতিহাসের চোখে, তাদের লিখিত ইতিহাস অনুসরণের ব্যাখ্যায় রামমোহনই নাকি কমিউনিস্টদের কথিত “বেঙ্গল রেনেসাঁ’র আদিগুরু”।

    পরবর্তিতে এর আঠারো বছরের মধ্যে রামমোহনের মৃত্যু হয়, আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্মসমাজ তিন টুকরা হয়ে ওই ব্রাহ্ম প্রকল্প অকেজো হয়ে যায় যদিও তা পরে উনিশ শতকেও কেবল টিকেই ছিল। কিন্তু অকেজো হয়ে যাওয়ার পর থেকে বা বলা যায় এ সুযোগে নতুন তত্বকার বা অভিমুখ দাতা হয়ে আসেন কপালকুন্ডলার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনিই যুক্তি সাজান যেহেতু ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে, তাই বিকল্প হিসেবে হিন্দু-জাতির ভিত্তিতে ভারত জাতি-রাষ্ট্রের সংশোধিত প্রকল্প নেয়া হোক। আর এর ভিত্তিতেই পরে কংগ্রেস দলের জন্ম দেয়া হয় ১৮৮৫ সালে। পরিণতিতে ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগের জন্ম। আর ওদিকে কংগ্রেসের চেয়েও আরো কট্টর উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী দল হিসাবে তৈরি হয় হিন্দু মহাসভা যেটা আরএসএস-বিজেপির আদি বা পুর্ব সাংগঠনিক রূপ।

    এখন লতার পছন্দ এই আরএসএস-বিজেপির মোদির রাজনীতি। কিন্তু সাবধান, এটা সাধারণভাবে যেমন বলা হয়, যার যা রাজনৈতিক দল পছন্দ সে তা করবে – এটা এমন ব্যাপার নয়। আপনি দেশের আরেক জনগোষ্ঠী-অংশকে কোপাবেন কাটবেন হত্যা করবেন, নির্মুল করে দিবেন – এটা কোনো রাজনীতি?? এই চিন্তা দিয়ে এক ভারতে সবাইকে ধরে রাখবেন কী করে?? এটা তো কারো পছন্দের রাজনীতি হতে পারে না, ফলে এটা সবার পছন্দের গায়িকা হতে চাওয়া কারও পছন্দের রাজনৈতিক মতামত হতেই পারে না। আবার যিনি সমাজের জন্য গান গাইবেন তিনি এমন রাজনীতি ভালোবেসে একই সাথে সুকুমারবৃত্তির চর্চাও করবেন কিভাবে? এটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন, বোধশক্তিহীন চিন্তা ও কাজ।

    ফলে এক দিক থেকে আমরা লতাকে  রাজনৈতিক দিক বাদ বা পাশে সরিয়ে রেখে কেবল আমাদের স্মৃতিগুলোকে রক্ষা করতে তাঁর গান মানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই; আমাদের দায়িত্ব পরিপালন করেছি। আমরা আমাদের স্মৃতির হত্যাকারী তো হতে পারি না, তাই। কিন্তু একই সাথে একই নিঃশ্বাসে লতার চিন্তার অন্ধত্ব, রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রতি বেহুঁশ ভালোবাসা থাকা এটা আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য; সেটাও জানিয়ে রাখতে চাই!

    তবে এটাও সত্য, গানের জগতের বহু বিখ্যাত লোক কিন্তু যারা বুদ্ধিমান তারা তাদের রাজনৈতিক পছন্দ  বাইরে আনেন না। ব্যক্তিগত জগতেই রেখে দেন। মূল কারণ তাদের গান পছন্দকারিরা নানান রাজনৈতিক মতের হতেই পারে্ন। এখন তিনি নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশ্যে দেখিয়ে ওসব পছন্দকারিদের মধ্যে বিভক্তি আনতে পারেন না।   বুদ্ধিমানদের এতটুকু সচেতনতার আছে বলে এজন্য আমরা তাদের নিয়ে ঘাটাতে চাই না।

    কিন্তু লতা মঙ্গেশকর এতই বোধশক্তিহীন যে, তিনি প্রকাশ্যেই তার ব্যক্তিগত দিক পাবলিক করে দেন। এবং বেপরোয়াভাবে হিন্দুত্ববাদে লিপ্ত হয়ে যান। ফলে মানুষের সুবৃত্তি আমল করার অযোগ্য ব্যক্তিত্ব তিনি যা শিল্পকলার সাথে আনফিট! অবশ্য অনেক সময় পেটের দায়ে মানুষ শিল্পকলার জগতে এসে পড়ে, সেটাও ঠিক!

    জুনিয়রদের উঠতে না দেয়াঃ
    আবার ভারতেই লতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের আরেক বড় ও গভীর অভিযোগ হল তিনি নবাগতেরা যেন তাদের কোন প্রতিভায় যেন তারা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠতে না হতে পারেন, এজন্য নিম্নশ্রেণীর আচরণ পদক্ষেপ বারবার তিনি নিয়েছেন।  এপ্রসঙ্গে ভারতের কিছু গায়িকা যেমন সুমন কল্যাণপুর বা অনুরাধা পরোয়াল [Suman Kalyanpur, Anuradha Paudwal] এদের কথা জানা যায়। এসব গায়িকারা যেন গানের গায়িকা বাজারে কাজ না পায় এমন এক একচেটিয়া অবস্থা সৃষ্টি অভিযোগ লতার বিরুদ্ধে বহু পুরানা। এমন শর্ত তিনি প্রযোজক-পরিচালকদের দিয়ে থাকে। অন্যভাবে বললে একটা একচেটিয়ার ব্যবস্থা কায়েম করে সবস্ময় টিকতে চেয়েছেন তিনি। অথচ তার নিজ প্রতিভা তো কম ছিল না! তাহলে তিনি কী নিজের উপর আস্থা রাখতে পারেন নাই? ইন-সিকিউরিটিতে ভুগতেন কেন??
    যেমন  খুব সম্ভবত সত্তর দশের শেষের দিকে্র ঘটনা যতটুকু মনে পড়ে, আমাদের রুনা লায়লাও এর শিকার হয়েছিলেন। একটা সিনেমায় গড়ে পাচটার মত গান থাকতে দেখা যায়। ঐ প্রযোজক পরিচালক রুনাকে দিয়ে তার সিনেমার দুটা গান রেকর্ডিং করিয়েছিলেন। এমনকি সেই গান সিনেমায় ছাড়ার আগেই বাজারেও ছাড়া হয়ে গেছিল। কিন্তু এবার লতা বললেন তিনি বাকি গানগুলো আর গেয়ে দিবেন না। যদি গাওয়াতে হয় তবে সবগানগুলোই (মানে যেদুটা রুনা গেয়ে ফেলেছে  সে দুটা সহ) আবার তাঁকে দিয়েই গাওয়াতে ও রেকর্ডিং করাতে হবে।  প্রযোজক বাধ্য হয়ে সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ফলাফল হল এই যে লতার একচেটিয়ার হাতে গান জিনিষটাই জিম্মি হয়ে থেকে গেছিল।

    এমনকি পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাট রেল স্টেশনে বসে গায়ে গেয়ে  পয়সা তুলে পেটের ভাত যোগাড় করা রানু মন্ডল কিভাবে যেন ঐ গান গেয়েই আধুনিক জগতের টিভি-রেকর্ডিং স্টুডিও পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তাকেও সহ্য করতে পারেন নাই লতা। বলেছেন রানুরা যেন আগে তাঁর গাওয়া বা রেকর্ডেড হওয়া গান কোন না করেন। কেন? তাঁর গাওয়া সব গানের সব ক্রেডিট কী তাঁর একার? সুরকার, লিরিসিস্ট, এরেঞ্জার, বাদকেরা ইত্যাদি আর কারও কোন অবদান নাই?? শেষ বয়সে এসেও এত উদ্ধত কেন? আচ্ছা তিনি যেটা “শ্রদ্ধাঞ্জলি” নামের প্রায় ৪৫ মিনিটের যে এলবামটা বের করেছেন স্টেজে গেয়েছেন সেটা তো চল্লিশের দশকয়ের গান থেকে শুরু করা হয়েছে যেগুলোর বেশির ভাগই তো অন্যের গাওয়া। তাহলে সেগুলো তিনি ফিরে গেয়েছেন কেন? আবার তারই গাওয়া গান অন্যেরা একালে গাইতে গিয়ে কোন নতুন নোট লাগানো এবং উপযুক্ত কারিশমায় গায়কিতে তা উপস্থাপন কী করা যায় না – এমনকি নয়া কোন এক্সপেরিমেন্ট নি্রীক্ষা করতেও কী তিনি দিবেন না!!!  শুনেছি রানু এখন সবছেড়ে  ফিরে গেছে তার পুরান রেল স্টেশনে…।
    এই একচেটিয়াত্ব ও ঈর্ষার শিকার হওয়া থেকে লতারই ছোট বোন আশা ভোঁশলেও বাদ যায় নাই। এসব দিক নিয়ে আরও জানতে আগ্রহিরা ভারতেরই দুটা আর্টিকেল এখানে ও এখানে পাবেন।

    [ফুট নোটঃ আসলে ইন্ডিয়ান ক্যাপিটালিজমের বিকাশ এই  ইতিহাস পাঠের এক বড় অংশ হতে পারে। আর তা ভালভাবে পাঠ করতে চাইলে এর এক ভাল  উপায় হতে পারে  – ভারতীয় সিনেমার বিকাশ  ও এটা একচেটিয়া পথ কেন সে অনুসরণ করল – সেটা স্টাডি  করা।  আর এখান থেকেই নেহেরুর তথাকথিত কমিউনিস্ট ইকোনমির মুখ থুবড়ে পরা পরিণতি এসবকিছুর স্টাডি  করতে হবে সেক্ষেত্রে। এসবই পরিণতিতে ইন্ডিয়ার প্রথম “ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এর ক্রাইসিস ১৯৯১” তৈরি করেছিল। যেটাকে  বলা যায় আধা-বুঝের  নেহেরুর কথিত কমিউনিস্ট ইকোনমি কিভাবে আইএমএফের কাছে মুখ থুবড়ে সারেন্ডার করেছিল আর পরে  ব্যাপক সংস্কার করে নিজের ইজ্জত রক্ষা করেছিল এরই ইতিহাস!  ভারতীয় সিনেমা একচেটিয়া ভাবেই বিকশিত হয়েছে, মূলত এমন নেহেরুয়ান অর্থনীতির কারণে। এটাই লতার একচেটিয়া বা নিজে ‘শ্রেষ্ট’ হয়ে থাকার খায়েস – এসবকে কতটা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে তা নিয়ে কোন এক আগামিতে দেখা হতে পারে… ]

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১২ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “আমাদের স্মৃতি ও অসংবেদী লতা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]