Tag: ভারত

  • দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…

    দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…
    গৌতম দাস
    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Zu

     

     

                         President Biden Holds a Press Conference

     

     

    শিরোনামটাই কত সুন্দর! “দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ……!”
    মানে ভারত ছেড়ে ভিয়েতনামে পালিয়ে -এরপর বাইডেন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন! সেখানে হোটেলে পৌচ্ছে যেন দশ মিনিট ভাল করে শ্বাস নিয়ে এরপরে সাংবাদিক ডেকে নিয়ে আসা হয় বাইডেনের সামনে! তাইতেই বাইডেন জানান ভারতে মোদি তাঁকে কথা বলতে দেন নাই। [কনফারেন্সের ভিডিও ক্লিপ এখানে – 4:04 থেকে মোদির প্রসঙ্গ] মানে  যেন একদম যাকে বলে চোকিং [choking] – একেবারে টুঁটি চেপে শ্বাসকষ্ট উঠিয়ে দিয়ে ছেড়েছেন!  হয়ত এতে প্রমাণ হয়েছে বাইডেন না, একেবারেই না! বরং, মোদি-ই বাইডেনের চেয়ে  বেশি পাওয়ার ফুল অন্ততঃঃ নিজ দেশে!!! ব্যাপারটা এরকমই কিছু একটা হয়ে মিডিয়ায় হাজির হয়েছে।

    আসলে হয়ত, মোদি যার নাম তামাসা না করে তিনি কী কোন কাজ করতে পারেন না? বোধহয় না! হলোও তাই!  এটা এখন পরিস্কার যে মোদি তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে জি২০ সম্মেলন চলার ফাঁকে সাইড লাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। যেটা খুবই স্বাভাবিক! কিন্তু যেটা মারাত্মক অস্বাভাবিক তা হল যে ঐ দ্বিপাক্ষিক সভার পরে – না যৌথভাবে, না মোদি নিজে একা অথবা বাইডেনকে – কোন সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেন নাই। আর এটাকে, মোদি তাঁর সাফল্য মনে করতে পারেন! তবে এটাই পারফেক্ট স্বৈরশাসকের আচরণ! কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বা এর শাসকের আচরণ না!  যারা পাবলিক শব্দের অর্থ বুঝে নাই তারাই প্রধানমন্ত্রী; এরই চিহ্ন এসব! অথচ পাবলিক শব্দ না বুঝলে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের অর্থ তিনি কী বুঝেন? বুঝতে পারবেন?

    কোন দুই সরকার প্রধান নিজেদের মধ্যে কোন বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলন করেন, করতে হয়। এই রেওয়াজ তাঁরা মানেন এজন্য যে তাঁরা কী আলাপ করেছেন এর একটা সারাংশ অন্তত – নিজ নিজ ‘পাবলিক’ বা জনগণকে জানানো তাদের দায়িত্ব আর এটা জনগণের দিক থেকেও সেটা জানা তাদের মৌলিক অধিকার! আর সেই ‘পাবলিক বা জন-অধিকার’ পূরণ করতেই বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়ে থাকে। কারণ, একমাত্র সাংবাদিকেরাই পেশাদারি ভাবে ঐ বক্তব্য জনগণের কাছে নিয়ে যাবেন। এই অর্থে এখানে সাংবাদিক মানেই জন আকাঙ্খার এক ধরণের প্রতিনিধি। কাজেই মিডিয়া মানে কেবল মিডিয়ার মালিক আর মিডিয়ার শান-সৈকতের সাথে মিডিয়ার আয়ের হিসাবের বড়াই মাত্র নয়!  পাবলিক ধারণাটাকে সার্ভ করা বা সেবা দেওয়াটাই মিডিয়ার প্রধান কাজ!  তবে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য না জানলে এসবের কিছুই বুঝা যাবে না। আর তখনই মনে হবে সাংবাদিক সম্মেলন করা না -করা প্রধানমন্ত্রীর বাপের ইচ্ছা অথবা এসবই প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল ও তাঁরই একক এক্তিয়ারের এলাকা যেন! কিন্তু কে কাকে বুঝাবে যে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য কী??? 

    তবে ঘটনা্টা মোদিকে বাইডেনের ভারত ত্যাগ করার ২৪ ঘন্টার  মধ্যে ভীষণ বিপদ আর বিব্রতকর অবস্থায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কারণ, ভিয়েতনামে পৌছেই বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলন করার কারণে সবকিছুই দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।  প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা লিখছেন, 

    “বাইডেনের সফরে সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল মোদি-বাইডেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর সে দেশের প্রথা অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে। যেকোনো দেশের নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করা যুক্তরাষ্ট্রের রীতি। সেই রীতি মেনেই গত জুন মাসে মোদির সফরের সময় হোয়াইট হাউস কাভার করা সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও সংক্ষিপ্ত, তবু সেই সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভারতীয় গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু সমাজের অবস্থান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়েছিল। গত ৯ বছরে মোদির শাসনামলে সেটাই ছিল প্রথম ঘটনা। দেশে-বিদেশে কোথাও তাঁকে প্রশ্ন করার যে অধিকার কাউকে দেননি, সেই প্রথম তা দিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সেটাই ছিল সফরের শর্ত।
    সেই শর্তের কথাই এবার যুক্তরাষ্ট্র মনে করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর কোনো রকম প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখোমুখি হতে মোদি রাজি হননি। ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রশ্নোত্তর পর্ব বা সংবাদ সম্মেলন—কোনোটাই করা হবে না। এমনকি প্রেসিডেন্ট বাইডেন আলাদাভাবেও কোনো সংবাদ সম্মেলন করতে পারবেন না। সিএনএন তা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রচার করেছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে না হলেও বাইডেন ভিয়েতনাম গিয়ে সফররত সাংবাদিকদের সেই অধিকার দেবেন”।

    আসলে বেচারা মোদি! তারও যে কী কষ্ট আর ঝামেলায় দিন কাটছে সেট মোদি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না!!!  তিনি গত একমাস ধরে হরিয়ানায় মুসলমান কোপানোর এক জরুরী কাজে, এসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত আছেন, সামনে নির্বাচন। হরিয়ানার গুরগাঁও এর নুহ [Haryana’s Nuh] এলাকাটা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী যোগী সেখান থেকে মুসলমান নিশ্চিন্ন করার “বুলডোজার পলিসি” নিয়েছেন বলা হচ্ছে। তা যেন কম কম দেখা যায় এজন্য এখানে প্রগতির পত্রিকাত দিক থেকে থেকে দেখেন, হরিয়ানায় মুসলমান অঞ্চলে এবার উচ্ছেদের হুমকি। এখন আপনারাই বলেন যে, অন্তত এই অবস্থায় সাংবাদিক কেউ যদি মোদিকে জিজ্ঞাসা করে বসে যে হরিয়ানার নুহ এলাকায় কী হচ্ছে? তখন মোদি কী বলতেন?? তখন হিন্দুত্ববাদকে এমন দেশি-বিদেশির সামনে পরা ইজ্জত কে বাঁচাতো? কাজেই এটা তো ‘হিন্দুত্ববাদের জাতীয় স্বার্থ’, প্রগতিবাদের স্বার্থ; তাই না? কাজেই কীসের সাংবাদিকতা আর পাবলিক? ফেলায় রাখেন সব!

    আর বাইডেন হাতের কাছে বা পাশে মোদিকে – সাংবাদিকের সামনে পেলে কী করতেন এর এক সহজ ভাষ্য বা চিত্রকল্প আমরা পাই ভিয়েতনাম থেকে। সেখানে মানে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পৌছে বাইডেন বলেছেন, “‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব আরও জোরদার কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যা আমি সব সময় করে থাকি, এবারও তা–ই করেছি। শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তুলতে মানবাধিকারকে সম্মান করা, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকা যে গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরেছি”। অর্থাৎ খুবই ভদ্রভাবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মোদি কেমন “দায়ীত্ববান জনপ্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রী”!
    কথাগুলো যত মোলায়েমভাবে বলা তাতে এর প্রতিটা শব্দ দিয়েই বাইডেন আসলে মোদিকে ছিড়ে ফালা-ফালা করে দিয়েছেন! মানে বাইডেনের পলিসি তো এখন আসলে সবার জন্যই এক।  আর সংক্ষেপে তা হল – মানবাধিকার রক্ষা করে চলেন, নাগরিক বৈষম্য করা ত্যাগ করেন নাহলে উনি স্যাংশন দিবেন।  বাইডেনের এই ওষুধ হাসিনার জন্য যা  তা এখন শক্তিমান ভারতের মোদির জন্যও তাই! এতে হাসিনা-মোদি সাক্ষাত হলে তারা একই নিঃস্পেষক বাইডেনকে বদ-দোয়া দিতে পারেন কিংবা নিজেরা পারস্পরিক সহমর্মিতায় গলা জড়াজড়ি করে কাঁদতে পারেন! কিন্তু বাইডেনের হাত থেকে তাঁরা কেউই ছাড় পাচ্ছেন না; কারণ, তাঁরা দুজনই বাইডেনের বন্দী যেন!

    ঘটনা হল অনেক কিন্তু তা্মাসা তবু আমাদের পিছু ছাড়ছে না! তাহলে হাসিনা-মোদি এরা দুজনেই যদি এভাবে একই বাইডেনের বন্দিশালার বন্দি হয়ে থাকেন তাহলে হাসিনার বন্দীমুক্তির সুপারিশ মোদী বয়ে নিয়ে বাইডেনের কাছে যাবেন – এই যে গল্প গত কমপক্ষে দুমাস ধরে এই সৌম বন্দোপাধ্যায়,  প্রথম আলো আর ওদিকে অগ্নি রায় আর ডয়েচ ভেলে, ডেইলি স্টার চালিয়ে গেল, তার কী হবে???? যেমন গত ১৮ জুন মোদির আমেরিকা সফরের চারদিন আগে সৌম্য প্রথম আলোতে লিখেছিলেন বাইডেন-মোদি বৈঠক, মোদির আলোচনায় থাকছে বাংলাদেশ । আর এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ডাহা মিথ্যাগুলো প্রথম আলোর সাথে মিলে প্রপাগান্ডা করা।  মানে এতদিন মোদির গোয়েন্দা বিভাগের ফান্ডের অধীনে থেকে এসব প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এবার সৌম্য লিখে গেছেন আর প্রথম আলো তা ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু এবার? এবার আর মোদির খিদমতের ফান্ড এর অধীনে না। এবার বাইডেন-রাহুলের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে মোদির আকাম ফাঁস করে দেয়া। তাই এবারে সৌম্যের লেখা ও প্রথম আলোর ছাপা বক্তব্যের শিরোনামঃ দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ভারত নিয়ে যা বললেন বাইডেন। মানে মোদিকে কবর দিয়ে সৌম্য আর প্রথম আলো এখন বাইডেন-রাহুল গান্ধী ক্যাম্পে গিয়ে উঠলেন! এতে ওদিকে, মাঝখান থেকে মোদি-হাসিনা দুজনেই ক্ষতিগ্রস্থ – তাতে কেউ কারও হয়ে একই বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবে বা মিথ্যা আশ্বাস পরস্পরকে দিবে সে মূরোদ আর কারো নাই!! কারণ, মোদির সুপারিশের ভান্ড ফুটা হয়ে, সব মিথ্যা উদাম হয়ে পড়েছে!!! এটাই তো হওয়ার কথা,  আর কত? আর তাই হয়েছে!!

    এনিয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্টই ভারতের মিডিয়ায় যা ছাপা হয়েছে, তা। যেমন ইন্ডিয়া  টুডে যেটা মূলত প্রো-মোদি সেটাও কংগ্রেসের জয়রাম রমেশের এক টুইট বা এক্স বার্তাকে উদ্ধৃত করে রিপোর্ট করেছেঃ “Na karunga, na karne dunga…’: Congress mocks PM over Biden’s speech in Vietnam”। মানে  মোদির হয়ে যেন জয়্রাম রমেশ বলছেন যে,  “মোদি নিজেও প্রেসের সাথে কথা বলবেন , না বাইডেনকেও বলতে দিবেন”।
    এই রিপোর্টাই বাংলা করে আমাদের TBS ছেপেছে। শিরোনামঃ ভিয়েতনাম গিয়ে বাইডেন জানালেন, নরেন্দ্র মোদিকে মানবাধিকার ও মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলেছেন। এক কথায় বললে, প্রায় পনেরো বছর ধরে প্রেস এড়িয়ে চলা মোদি এবার একেবারে বাইডেনের হাতে ধরা খেয়ে গেলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রেসের সাথে সম্পর্ক-মুলাকাত-বাতচিত থাকবে না এটা ছোট-বড় যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ইমেজের জন্য, তিনি কেমন শাসক তা বুঝবার জন্য – একটা সবচেয়ে কালো দাগ অবশ্যই! সেটাই মোদির গায়ে লেগে গেছে!

    একইভাবে কলকাতা থেকে কলকাতা টিভি-ও মোদির বিরুদ্ধে কড়া এক রিপোর্ট লিখে বলেছেঃ “……ভিয়েতনামে গিয়ে বৈঠকের বিষয় নিয়ে হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট”, যে লেখার শিরোনাম হলঃ মোদিকে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেছি: বাইডেন। এই রিপোর্টটা আসলে সাজানো হয়েছে – যত কড়াভাবে সম্পাদক মোদিকে বধ করতে পারবেন ততই পাবলিকের দৃষ্টি আকর্ষণ তথা কাভারেজ ভাল হবে মিডিয়ার – এই সুত্রে!

    তাহলে, মোদির শাসনের সমস্ত সঞ্চয় ইতি-ইমেজ সব কালো কালিতে ঢেকে গেছে – যেটার দেশের ভিতরে প্রভাব হয়ত ইজ্জত একটু ‘কম ডুবে যাবে’ ধরণের কিন্তু দেশের বাইরে মোদির ইজ্জত একেবারেই ম্লান হয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা মুল্যবোধের নুন্যতম চর্চা আছে এমন যেকোন দেশে। আর আমাদের দেশে মোদি ও হাসিনার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হল, মোদি হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ করে দিবে এই বকোয়াজ সেটা আর এখন লীগের কর্মি বাহিনীও বিশ্বাস করবে না। তারা শকড হয়ে যাবে! – সেটাই এখন এতই উদাম হয়ে গেল!

    বাইডেনের কাছে যে মোদির নিজের বেইল নাই সে করবে হাসিনার জন্য সুপারিশ? কিভাবে?

     

    আপডেটঃ   ২০২৩;

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    ।

     

     

     

     

     

     

     

     

  • মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা

    মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা;
    আবার জি২০-ও তাই যদিও ভিন্ন কারণে

    গৌতম দাস
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩   সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Yr

     

                         G20 summit ends with India, Brazil and Russia boasting success

     

    মোদি এখন আর বিতর্কিত ভুখন্ড নিয়ে, উগ্র হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোশে ‘লড়কে লেঙ্গে’ বলে জবর দখলকারি হতে চান না। তাই তিনি এখন আর যুদ্ধ না। যেন,  ডায়লগে বিশ্বাসী। আপোষ আলোচনার ডিপ্লোমেসিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিতর্ক-বিবাদ সমাধানের পক্ষের এক গভীর বিশ্বাসী লোক হতে চান তিনি! এমনকি এব্যাপারে আন্তর্জাতিক রুল ও আইনের সহায়তাতেও এবং এসবের অধীনে যেতেও ইচ্ছুক!

    তাহলে মোদিকে একটু মনে করিয়ে দেয়া যাক, গত ২০১৯ সালে মানে মোদি ভারতে দ্বিতীয় সরকার গঠনের পরের প্রথম সংসদে ৫ আগষ্ট, মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে সারা কাশ্মীরই ভারতের, তা বলেছিলেন কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন কেন? যেখানে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত বলে যে দাবি তা অবৈধ, অগ্রহনযোগ্য বলে বাতিল  করে জাতিসংঘ রেকমন্ড করেছিল – কোন রাজা কী বলেন সেটা না, কাশ্মীরের বাসিন্দাদের সম্মতিই একমাত্র নির্ধারক মানে এক রেফারেন্ডাম বা গণভোট করে নিতে হবে; আর এটাই হবে ব্যাপারটা ফয়সালার ভিত্তি।  কিন্তু নেহেরু তা অমান্য করে সেই জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। আর এই অবৈধ কাজ করে আবার সম্ভবত মনের অস্বস্তি মিটাতে সান্ত্বণা হিশাবে  নেহেরু ভারতের কনষ্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা এনেছিলেন। যার সারকথা হল, কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদার রাজ্য করা কিন্তু সেটা আবার ভারতেরই যেন থাকে – এই ইচ্ছামত সংযোজনী আনা। যেটা বিবদমান কোন পক্ষের কেউ চায় নাই।  এমনকি ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায় হল, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।  অথচ এসবই অমান্য করে  মোদি-অমিত জোর করে সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন; এবার দাবি করছেন পুরা কাশ্মীর ভুখন্ডই ভারতের। এই হল ২০১৯ সালের মোদি-শাহের সংযোজন। যদিও আবার এখানে কেন কাশ্মীর ভারতের হবে এনিয়ে কোন কারণ-যুক্তি বা দলিল কোন কিছুরই উল্লেখ করেন নাই!!  যা অনেকটা –  আমি বলেছি তাই ওটা আমার ধরণের গোয়ার্তুমি!!! অথচ সেই মোদি এখন ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি এর অনুসারী হতে চাইছেন??? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি এক আন্তর্জাতিক সভার বন্তৃতায় এসব নয়া খায়েস নয়া ভান-ভনিতার কথা বলেছেন!!!

    তাহলে এই যে কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকেই এক বিতর্কিত ভুখন্ডই থেকে যাওয়া, আর একে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট থেকে মোদি-শাহ এর জবরদস্তিতে পুরা কাশ্মীরই ভারতের অংশ-ভুখন্ড বলে দাবি করা এটা কোন বা কার সাথে ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি করার পরে অথবা কোন “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলে  বিতর্ক মিটানো হয়েছিল????

    “Speaking at the East Asia Summit in the Indonesian capital Jakarta, Modi reiterated that “today’s era is not of war” and “dialogue and diplomacy” form “the only path to resolution” – a theme he has advocated for an end to the war in Ukraine ever since its invasion by Russia in February 2022.” – Indian Express September 8, 2023 

    উপরের এই উধৃতিটা নিয়েছি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এক সম্মেলনে ভারতের মোদির বক্তৃতা নিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। দুদিন আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সেখানে “ইস্ট এশিয়া সামিট” এর সম্মেলন ২০২৩’ [18th East Asia Summit (EAS)] এর ১৮তম অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।  “ইস্ট এশিয়া সামিট” বলতে বুঝতে হবে মূলত আশিয়ান দশ রাষ্ট্র আর এরপরেও আরো প্রায় আট রাষ্ট্রের এই সম্মেলন। সেই আট রাষ্ট্র হল – চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান।  এই সামিটে গিয়ে মোদি যে বক্তব্য রেখেছেন – সেটাতে চীনকে উদ্দেশ্য করে কিন্তু নাম না নিয়ে দেয়া মোদির এই স্ববিরোধী বক্তব্য। এখন ভিজা বিড়াল সাজা প্রধানমন্ত্রী মোদি বলতে চেয়েছেন – যে সে হল দুনিয়ায় আইনের শাসন দেখতে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী’ আর চীন হল যে আইনের শাসন মানে না এমন রাষ্ট্র। আর যে বিতর্কিত ভুমি যা ভারতের চোখে অরুনাচল আর চীনের চেখে তা ঝাঙনান ‘Zangnan’ সেই বিতর্কিত ভুমি নিয়ে  চীনকে খোঁচা মারতেই মাদি এমন [ সরাসরি না এমন ফ্রি কিক] বক্তৃতা মেরেছেন।

    আর এভাবে ভাব ধরেছেন যেন সন্ন্যাসী ভারতের এটা খুবই পবিত্র এক সাধু অবস্থান যে কারো ভুমির দিকে তাকায় না পর্যন্ত এমনই যোগী এই মোদি!!! অতএব এটাই ইউক্রেন ইস্যুতেও মোদির অবস্থান যেন তিনি পুতিন-জেলেনেস্কিকে বলছেন – ভায়েরা আমার তোমরা ডায়লগের মাধ্যমে সব মিটসাট করে নেও”।  তবে ভুলে যাওয়া যাবে না যে এই বক্তব্য হল মোদির সাইনবোর্ড – যা লটকানো থাকে কেবল দেখানোর জন্য। আর কার্যত মোদি বলতে চেয়েছেন,  ভাই পুতিন তুমি আমাকে ৬০ ডলারেরও নিচে [বাজারের গড় দাম যেখানে ৮০ ডলার বা উপরে] সস্তায় তেল পাঠাতেই থাকো যাতে আমার আটটা রিফাইনারিতেই দিন রাত আমি তেল শোধনাগার চালিয়ে সেই তেল রফতানির পবিত্র সুবিধা খেয়ে যেতে পারি! ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসির খেদমতগার আমি মোদি তো – আছিই তোমাদের সাথে!!!

    সারকথায়, মোদির হিন্দুত্ববাদের ভারত যদি মনে করে সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড আর এব্যাপারটা হল ভারত রাষ্ট্র কী মনে করে একান্ত তার ব্যাপার – তাই এনিয়ে অন্যের কিছুই বলার নাই। েখন একই ফর্মুলা মেনে, চীন যদি বলে ঝাঙনান ‘Zangnan’ চীনা রাষ্ট্রের ভুখন্ড – তাহলে তো আর এখানে মোদির এটা “যুদ্ধের যুগ নয়” অথবা এটা “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন যুগ” অথবা  এটা “ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসিতে সমাধান” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলার আর তো কোন সুযোগ নাই; খোদ মোদিরও না।  মানে মোদি নিজেই নিজের অবস্থানকে ব্লক করছেন – অবস্থা! মোদির সব কথাই তাই অর্থহীন প্রলাপ মাত্র হয়ে গেছে!

    ওদিকে, আনন্দবাজার মোদির এই বক্তৃতাটাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদি জোশ আর দেশপ্রেমের উথলায়ে উঠেছে বলে ব্যবহার করেছে; তাই তারা জোশ তোলা এক শিরোনাম করেছেঃ জি২০ বৈঠকের আগে জকার্তায় চিনকে কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – এভাবে। আর তাতে পাঠককুল যেন বলে উঠেছিল জিতে রহ মোদি!!!
    এছাড়াও আনন্দবাজার জানাচ্ছে মোদি সেখানে আরো বলেছেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ কিছুই উল্লেখ করতে বাদ রাখেন নাই।

    “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ,
    মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
    এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

    এর মানে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি যাই তার কাছে তার শত্রু মনে হয়েছে এমন কিছুকেউ উল্লেখ রাখতে পিছুপা হন নাই। কিন্তু তিনি কী জানেন এসবের উদ্গাতা আসলে তিনি নিজেই??? কারণ, তিনি  যতবার তাঁর হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আমাদের তাড়া করেন, আক্রমণ করেন ততবারই আমরা বাংলাদেশ থেকে যারা এটা প্রতিরোধ করি, রেজিস্ট [resistance] করি  এসব কিছুকেই ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা নামকরণ করে মৌলবাদ হিশাবে। আমাদের প্রতিরোধ বা resistance – এটাই হিন্দুত্ববাদি চোখে মৌলবাদ!!!  বাংলাদেশে আমাদের অস্তিস্ত রক্ষার জন্য আমাদেরকে হিন্দুত্ববাদি সকল ততপরতাকে প্রতিরোধ করতেই হয় ও হবেই!! 

     

    জি২০ সম্মেলনের আজ শেষ দিনঃ
    তবে আগে সেলফির দিন নিয়ে অল্প কথাঃ

    ইতোমধ্যে এবারের জি২০ সম্মেলন ২০২৩ আয়োজন করা হয়েছিল ভারতে, ৯-১০ সেপ্টেম্বর। আজ তার শেষ দিন। গতকাল প্রথমদিনের বিকালে ছিল শো-অফ বা রাষ্ট্রপ্রধান নেতাদের ব্যক্তি ইমেজ বাড়ানো যেটাকে বলে “পাবলিক ইমেজ” ক্রিয়েট বা তৈরি করে নেওয়ার এক শান্ত বিকেল। যেটা বাংলাদেশে বসেও আমরা টের পেয়েছিলাম এক সেলফি-ময় হয়ে উঠা সর্বত্র!!  বাইডেনের লক্ষ্য ছিল এক উদার মনের প্রেসিডেন্টের ইমেজ তৈরি করা।  বিশেষ যে প্রধানমন্ত্রী তাকে উঠতে বসতে গালাগালি, তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী, আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপকারি অথবা ২০ ঘন্টার লম্বা জার্নি করে দেখতে যাওয়ার মত আরও মহাদেশ আছে (মানে আমেরিকা আর যাবেন না বা পড়োয়া করেন না) ইত্যাদি এতসব বক্তব্য দেয়ার পরে তাঁকেই বাইডেনের সময় দেওয়ার দিক থেকে। ফলে এই বিচারে বাইডেন বাংলাদেশের সরকার নিয়ে যা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অবস্থান ও অসন্তোষ-ই থাক না কেন তিনি সেকারণে, মানবিক-সামাজিক সৌজন্য ভদ্রতা দেখানো আর নিজ উদার মনের পরিচয় অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি-ই আগিয়েছেন এটাই তিনি প্রমাণ করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বিপরীতে হাসিনা এই বিচারে তিনি ততটাই ইমেজ হারিয়েছেন।  যা বলেছেন তা তিনি মিন করেন এমনটা তিনি প্রমাণ রাখতে পারেন নাই। তিনি এজায়গায় শোচণীয় হেরেছেন।  যদিও এনিয়ে সাধারণ সম্পাদক ও. কাদের তার এক সেলফিতে বিএনপি নেতাদের ঘুম হারাম: ওবায়দুল কাদের বক্তব্যে এতে আওয়ামি দলীয় নেতা-কর্মির মনোবল চাঙ্গা করতে হয়ত কাজ করেছে কিন্তু এটা ততটাই হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়েছে যে তাহলে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ-কে আনার অর্থ কী দাড়ালো??? গতকাল বিকেলে লক্ষ্য করেছি প্রগতিশীল মানে  [প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ] চিন্তার ব্যক্তি বা লেখকেরা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে যে তাহলে কী তাদের হাসিনাই টিকে গেল – বাইডেনের সাথে রফা হয়ে গেল!!! এই খুশি তারা আর লুকাতে পারেন নাই বা লুকিয়ে রাখার টেনশন সহ্য করতে চান নাই যে তারা ভারতপন্থি বা র-পন্থি!! তারা সরাসরি বা পরোক্ষে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাহলে তো হাসিনা টিকেই গেল, তাই না!!!
    আমি অবশ্য তাদেরকে আর মানসিক যাতনা দিতে চাই নাই!  কারও অসুস্থতা কখনও কাম্য হতে পারে না! তবে অবাক হয়েছি তাদের চিন্তা করবার অক্ষ্মতাস দেখে যে তারা একটা সৌজন্য-ইমেজের স্বার্থ আর একই লোকের রাজনৈতিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ  এদুটার ফারাক করতে শিখেন নাই। আপনার এনিমি-কে তার মেয়ের সামনেই খুন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা (essential-ness) কী আছে বা থাকতে পারে??? নাকি এমন চিন্তা এটাকেই তো গাধামি, এক মফস্বলি চিন্তা বলে!  কারণ, সেকাজটা অন্ততপক্ষে বাচ্চাটাকে চকলেট দিয়ে দূরে পাঠিয়ে করতে হবে  – আর এটাই স্বাভাবিক!  আর বাইডেন এক্ষেত্রে চকলেট-ই এস্তেমাল করেছেন!!!   আর তাতে শত্রুতা তো ভোতা হয়ে যায় নাই। শত্রুতা শত্রুতার জায়গাতেই বহাল আছে!!!

    সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা প্রসঙ্গেঃ
    যেকোন দুই রাষ্ট্র অথবা বহুরাষ্ট্রীয় মোলাকাত বা সম্মেলন থেকে কোন যৌথ ঘোষণা আসাটা নুন্যতম তাদের মধ্যে কিছু ঐক্যমত্য আছে তা প্রকাশ করে। সেজন্য এটা খুবই কাম্য – সে কোন সামিট  মানে শীর্ষ দুই বা ততোধিক সরকারপ্রধান এর সাক্ষাত যাকে আমরা Summit বলে বুঝি; এমন সামিট মানেই এর সফলতার নুন্যতম মাপকাঠি হল যৌথ ঘোষণা – মনে করা হয় কূটনীতি চর্চায়! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গতবছর জি২০ সামিট থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুতে রাশিয়াকে টার্গেট করে, দায়ী করে সমস্ত বক্তব্য সাজানো হয়েছিল। লন্ডন গার্ডিয়ানের ভাষায়  “.…..All references to Russia, Russian aggression and Russia’s withdrawal in relation to the war in Ukraine that featured in last year’s joint statement at the G20 summit in Bali” । 

    কিন্তু এবার আক্কেল হয়েছে। ঐ সমস্ত লিখে কী কী অর্জন হয়েছে তা তো আজ এক বছরের মধ্যে সব পক্ষই পরিস্কার বুঝতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় কথা সারা পশ্চিম – মানে বাইডেন্সহ ইউরপের সব কুতুব রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের নিজ নিজ ইলেকশব ফেস করতে হবে। আর তাতে এরা কেউই নিজ নিজ জনগণের কাছে যুদ্ধের পক্ষে তাদের সাফাই অনুমোদন করিয়ে নেয়া মানে তাদের স্ব স্ব রাষ্ট্রের জনজীবন যুদ্ধের ফলে ভাল আছে আরামে বা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে তা একেবারেই নয়। কাজেই অন্তত বাইডেনের কথা যদি বলি আহামি ২০২৪ নভেম্বর তাকে আমেরিকান নির্বাচনের মুখোমুখি দাড়াতে হবে।  অনেকবার যুদ্ধ চালানোর প্রার্থী জিতেছে যেমন বুশের দ্বিতীয় বা সেকেন্ড টার্মের জয়। কিন্তু আবার ওবামার দুবারের জয়  যুদ্ধ থেকে ফেরত আনবার প্রার্থী ছিলেন বলে! অনুমান করা হচ্ছে এবার যুদ্ধ থেকে ফেরত আনার প্রার্থির পক্ষে রায় যাব। তাই আগামি বছরের শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাতে হবে বা বন্ধ দেখব বলে অনেকের অনুমান। ইত্যাদি এসব জল্পনা-কল্পনার ফলাফল হল এবার জ২০ এর যোথ ঘোষণায় আপোষের ভাষা চলে এসেছে।

    তাই গত বারের বালি সম্মেলন সেসব-ই বাদ রাখা হয়েছে এবার। রাশিয়াকে এবার দায়ী করা আর নয়।   সেটা তাদেরবি বিভক্তি আরো বাড়াবে আর এবার ভয় কাজ করছিল এ ঐ যুদ্তেধ তাদের যে কোন আসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে […alleviating fears that disagreements over the Russia-Ukraine war would prevent a consensus for the first time.]। আর একারণের এর বদলে নতুন যেসব শব্দাবলির উপর জোর দিয়ে ঐক্যমত্য আনা হয়েছে তা হলো …।Instead, the declaration emphasised that states must “refrain from the threat or use of force to seek territorial acquisition” and that “the use or threat of use of nuclear weapons is inadmissible”.
    অর্থাৎ এমন প্রধান দুইটা ভাষ্য যা বাংলা করে লিখলে হবে – ১। কোন ভুখন্ড বিতর্কে কোন হুমকি দেয়া বা শক্তি ব্যবহার না করার আহবান জানানো হয়েছে। 
    এছাড়াও  ২। কোন পক্ষের কোন পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহার করার হুমকি অনুমোদন-অযোগ্য বলা হয়েছে ঐ যৌথ সর্বসম্মতির ঘোষণায়।

    এককথায় বললে, কাউকে হেয় করার উপরে এটা ইতিবাচকতার জয় – এই লাইনে কথা বলার ধারার জয়লাভ!

    তবে একটা মন্তব্য এখানে করাই যায়ঃ
    সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে ইউক্রেন ইস্যুতে সব দায় রাশিয়ার উপর চাপানোর যে কূটনীতি সেটাই কিন্তু আসলে জি২০ এর যৌথ ঘোষণা লিখতে গিয়ে পিছু হঠেছে বা আপোষী হতে বাধ্য হয়েছে। আর তা হয়েছে এবারের ব্রিকস সম্মেলন (২২-২৩ আগষ্টে) আগে হওয়া আর এবার তারা নিজেরা ডালপালা বিস্তার করে বড় প্রভাব ও বড় আশা নিয়ে হাজির হয়েছে – বলে সেই জোটবদ্ধ প্রভাব জি২০ তে পিছন থেকে  ক্রিয়াশীল ছিল। আর তাদের চাপেই মূলত এই আপোষী যৌথ ঘোষণা ২০২৩। যেখানে রাশিয়াকে আগের বছরের মত অভিযুক্ত করা দূরে থাক – এবার যৌথ ঘোষণায় রাশিয়া শব্দটাই নাই, অনুপস্থিত!
    মজার কথা হল, এই পিছনের ঘটনাটা আমেরিকা প্রভাবিত মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয় নাই। হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী এএফপি-ফ্রান্স২৪ তে মানে, AFP এই গ্লোবাল মিডিয়া এজেন্সিতে আর তা প্রকাশিত হয়েছে FRANCE24  এই টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকায়। এরা নাম প্রকাশ না করে লিখেছে,   ” আমরা পুরা জি২০ সম্মেলনকে ইউক্রেনাইজড করে ফেলার পশ্চিমা  প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সম্মেলন সফল করেছি।

    “We were able to prevent the West’s attempts
    to ‘Ukrainize’ the summit agenda,” the veteran
    diplomat said, dubbing the two-day gathering a “success”.

     এদিকে এই সুযোগে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভও সুযোগ নিয়েছেন – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানাচ্ছে তিনি বলেছেন, এক ইউক্রেন ইস্যু দিয়ে যেন যাতে এবার জি২০ সম্মেলনকে ঢেকে ফেলা না যায় সেব্যাপারে মূল কাজটা করেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ গ্রুপ [Global South helped avoid Ukraine issue overshadowing G20 agenda: Russia]।  গ্লোবাল সাউথ বলতে ব্রিকস-কে বুঝানো হয়ে থাকে।  আর এই সুযোগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা আর সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা ভোকাল হয়ে উঠতে শুরু করেন।
    লুলা বলেন, জি২০ এর এজেন্ডাকে কোন বাইরের ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভক্তি ঘটায় তা হতে দিতে পারি না। বাইরের ঘটনা বলতে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যু বুঝিয়েছেন। আরো বলেছেন, জি২০ কে বিভক্ত করার কোন শখ নাই আমাদের। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বদলে আমাদের দরকার শান্তি ও সহযোগিতা!

    “We cannot let geopolitical issues sequester the G20 agenda
    of discussions,” Lula said, an implicit reference to wrangling over the Ukraine war.
    “We have no interest in a divided G20. We need peace and cooperation instead of conflict.”

     এদিকে আগামি বছরের জি২০ এর সভাপতি হচ্ছেন ব্রাজিলের লুলা। তাই তিনি এখনই ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি যদি আগামি বছরও প্রেসিডেন্ট থাকেন (যদিও না থাকার কোন কারণ নাই) পুতিন ঐ সম্মেলনে আসবেন কারণ তিনি (পুতিনকে) গ্রেফতার হওয়ার কোন সুযোগ রাখবেন না [ If I’m the president of Brazil and if he comes to Brazil, there‘s no way that he will be arrested,” he told Indian news network Firstpost on Saturday.]। 

    আর এই সুযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভারভ এক মন্তব্য করে নিয়েছেন – এবারের জি২০ সম্মেলন এক “বাঁধভাঙ্গা সম্মেলন” – …  Calling it a “breakthrough summit”, Lavrov said 

    এই ছিল মোটাদাগে সম্মেলনে পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য বা মনের কথাগুলো!! এথেকে অন্তত একটা জিনিষ পরিস্কার যে দুনিয়ার নেতৃত্ব অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব প্রবলভাবে পরিবর্তিত, বদলে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে।  এবছরের ব্রিকস আর জি২০ সম্মেলন এর দুই ঐতিহাসিক চিহ্ন হয়ে থাকল। 

    শেষ কিছু কথাঃ
    কিন্তু জি২০ জিনিষটা কী? কারা এমন সম্মেলনের চাহিদা দাতা? কারণ, এই টপ জিডিপি-ওয়ালা দুনিয়ার ২০ রাষ্ট্র  এরা তো বিশেষ আমেরিকা-চীনা বলে মূল দুই পক্ষ-বিপক্ষে পরস্পরের চরম বিরোধী! তাহলে দুনিয়ায় এমন আ

    র কে আছে যে এমন ২০ দেশকে এই সম্মেলন প্রতি বছর জড়ো হতে বাধ্য করছে??? সেসব জানলে হয়তো এবারের সম্মেলনের ঘটনাগুলো আরো পরিস্কার বুঝতে তা সহায়ক হত!!

    হ্যা ঠিক তাই!  সেজন্য আগামিতে জি২০ গ্রুপ এরা কে কারা কী এদের উদ্দেশ্যে আর কে এর পরিচালক সে নিয়ে আগামিতে লেখা আনব; সেকথা বলে শেষ করছি!

     

    আপডেটেডঃ   আপডেট ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩  রাত ০৯ঃ ৪৮

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী

    ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী
    গৌতম দাস
    ২৭ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SM

     

                  BRICS new six Members

    ব্রিকস সম্মেলনের শেষদিনের সিদ্ধান্ত হল, নয়া ছয় দেশকে [সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও আর্জেন্টিনা], তারা এই প্রথম তাদের জোটকে সম্প্রসারিত করে নয়া সদস্য করতে চাইলো। কিন্তু বাংলাদেশ? এত ঢাকঢোল পিটানো বাংলাদেশ যে এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব হাজির রেখেছিল সেই-ই  বাদ হয়ে গেছে; সে এই ছয় রাষ্ট্রের মধ্যে জায়গা পায় নাই! কিন্তু ঠিক কেন? ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত! আমার আগের লেখায় শিরোনাম ছিল “মোদির আনা শর্ত ও পরিণতিতে বাংলাদেশ ব্রিকসে নাই’। কিন্তু ঠিক কীভাবে তা কার্যকর হয়েছিল তা বুঝতে একটু গভীরে যেয়ে এবার কথা বলব।
    ইতোমধ্যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা সুবীর ভৌমিক, সেও গতকাল (২৫ আগষ্ট) আবার বাংলাদেশকে নিয়ে এক লেখা দিয়েছে; যার শিরোনাম India, US narrow differences over Bangladesh ahead of elections]। । কিন্তু সুবীরের এই অবস্থান চারদিন আগের আনন্দবাজারের অগ্নি রায় বা দেবদীপ এদের অবস্থান থেকে একেবারে উলটা দিকে। তা একেবারে ভুতের মুখে রামনামের মত!  সুবীর লিখেছে,  বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ইস্যুতে “সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে” দেখা আমেরিকান অবস্থান যে এদেশে একটা অবাধ ও সুস্থ নির্বাচনই হতে হবে – এই বিষয়ে অনেক আলাপ আলোচনার পরে ভারত আমেরিকার অবস্থানের পক্ষে সায় দিয়েছে […India has agreed to the US stand of putting “absolute priority” on a free and fair parliamentary election due in January 2024.] সত্যিকরে বললে, এটা আবার অগ্নি রায় বা দেবদীপ পুরোহিত-দের প্রপাগান্ডার উলটা আরেক প্রপাগান্ডা নিঃসন্দেহে। কিন্তু অগ্নিদের মতই সুবীরও কোন প্রমাণ বা কোন সোর্স উল্লেখ করা ছাড়াই আরেক চাপাবাজি বক্তব্য। ফলে এ’বক্তব্যের কোনই মুল্য নাই। তবে এটা নিঃসন্দেহে সত্যিকথা যে ভারতীয় কারও – সে মোদি-ই হোক বা যেই কেউ  – এদের কারও আর বাংলাদেশে কোন বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নাই।  আমরা এখন বড় জোড় তাদের কথা শুনব – আর পাশে আবর্জনার ড্রামে তা ফেলে রাখব; কারণ আমরা তাদের কাউকেই বিশ্বাস করি না।

    আমার আগের লেখায় বলেছিলাম রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে যে ভারতের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাদ পড়েছে।  গত ২৩ আগষ্ট রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ব্রিকসের সম্প্রসারণ শেষ মুহুর্ত এসে ব্রিকসের আভ্যন্তরীণ বিভক্তির মুখে আটকে গেছে; BRICS expansion faces eleventh hour hurdle as divisions persist। এটা হল,  ব্রিকসের ভিতরের খবর বের করে এনে তাদের লিখা। বলেছে ভারতের মোদি-ই  নিজেই শেষ মুহুর্তে নয়া দুই শর্ত  শেষে হাজির করেছে ।

    ঐ রিপোর্ট বলেছে ইলেভেন্থ আওয়ারে মানে শেষ মুহুর্তে ভারত নয়া সদস্য নেয়া হবে কী ভিত্তিতে মানে কী শর্তে এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য পেশ করেছিল। শুধু তাই না একথাগুলো লেখা হয়েছিল “LAST-MINUTE SPOILER” এই নামের রয়টার্সের লেখার এক উপ-শিরোনামের নিচে। যার  অর্থ হল, শেষ মুহুর্তে যিনি সব ভন্ডুল [SPOILER] করে দেন। আর বলাই বাহুল্য সেই SPOILER হলেন ভারতে প্রধানমন্ত্রী মোদি।

    ঐ রিপোর্ট লিখেছিলঃ
    “but the source said it had been delayed after
    Indian Prime Minister Narendra Modi
    introduced new admission criteria.”

    কিন্তু কী ছিল সেই নয়া দুই শর্ত?
    “The BRICS country official said that admission criteria
    India’s Modi proposed included requiring members
    not be the target of international sanctions,
    ruling out potential candidates Iran and Venezuela.
    Modi was also pushing for a minimum per capital GDP requirement”

    কথাগুলো সোজা করে বাংলায় বললে, হবু ব্রিকস সদস্য হতে হলে – এরা কেউ আমেরিকান স্যাংশনের খাওয়া দেশ হতে পারবে না। তিনি অবশ্য আমেরিকা শব্দটা লুকিয়ে সে জায়গায় আন্তর্জাতিক লিখেছিলেন। আর দ্বিতীয় শর্তটা হল, ঐ হবু সদস্য দেশের অর্থনীতিতে  ওর নুন্যতম অর্জিত জিডিপি থাকতে হবে।

    এখন আমরা দেখব ব্রিকসের সদস্যপদ লাভে মোদির প্রথম শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    মোদির একথার কোন মানেই হয় না যে হবু সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ হতে পারবে না। কারণ, স্যাংশন বা আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ মানে কী? মানে আমেরিকার যথেচ্ছারে স্যাংশন চাপানো যেটা ঐ দেশের ডলারে বাণিজ্য এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। কিন্তু আমেরিকা এমন স্যাংশন দেয়ার কে? কী তার অথরিটি? এটা লুকাছাপার কিছু নাই যে এবারের বাইডেন প্রশাসন ইচ্ছামত যার উপরে আরোপের ইচ্ছা এভাবে স্যাংশন আরোপ করে গিয়েছেন। কারণ, আমেরিকান ডলার আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা হওয়াতে যে পড়ে পাওয়া সুবিধা আমেরিকার হাতে তাতে যেকোন দেশ যেন ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কেনা-বেচা না করতে পারে এই বাধা দিবার সুযোগ আমেরিকার হাতে আছে। আর আমেরিকা তার এই সুযোগ এর অপব্যবহার করবে না – এটাই আশা করা হয়েছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম-সভায়।  কিন্তু তা ছিল ভদ্রলোকি চুক্তির মত ঠিক আইনি বাধা নয়; আর সে অনুমানটাকেই আমেরিকা অমান্য করে চলেছে।  “পরে পাওয়া” সুবিধাটাই খেয়ে চলেছে।
    আর ওদিকে, ব্রিকস তৈরি হয়েছে যেসব রাষ্ট্র নিয়ে বা হবু সদস্যদের নিয়ে হতে চাচ্ছে তারা আমেরিকার এই অত্যাচার, যথেচ্ছাচারে অতিষ্ট হয়েছে বলেই তো নয়া ব্রিকস এর সদস্য হতে এসেছে। কাজেই আমেরিকান স্যাংশন কারো উপর  আরোপিত হলে সেই দেশকে আবার সদস্যপদ না দেয়ার মানে হল যেন, আমেরিকান ইচ্ছায় ব্রিকসের সদস্যপদ দেয়া। মানে ব্রিকস চালাবে যেন আমেরিকা – এমন অবস্থা তৈরি করা!  মানে কার্যত ব্রিকস-কে আমেরিকার খামখেয়ালি ইচ্ছার অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান করে ফেলা।  আর এভাবেই ভারত যদি ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত করতে চায় তাহলে আর এদের ব্রিকস গড়ার দরকার কী?
    অথবা আরেকটা দিক আছে! তাহলে, চীনের মুদ্রা ইউয়ান ভিত্তিতে যদি ব্রিকস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তাহলে চীনও কী আমেরিকার মতই যেকোন ব্রিকস সদস্য দেশের উপর চীনা খামখেয়ালি রুস্তমি শুরু করতে পারবে?   আর ভারত সেটা মান্য করে চলবে? মোদি তার মানে এটাই চাইছেন???? তাই কি??? মোদি সাব কী বলেন!!! 

    আর তামাসার কথা যে, ভারত কী নিশ্চিত যে ইউয়ান-ভিত্তিক ব্রিকস এরপর ভারতের উপরেই চীন সেই প্রথম  (ইউয়ান) স্যাংশনটা আরোপ করবে না? কাজেই “স্যাংশন খাওয়া দেশ সদস্যপদ পাবে না” এই শর্ত তো ভারতের জন্যই সবচেয়ে বড় আত্মঘাতি হয়ে উঠতে পারে!!!  তাহলে ভারতের এই  গদগদ হওয়া “আমেরিকা তোষণ” এর মানে কী? এমন আত্মভোলা ছাগলামির মানে কী?

    আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভারত  ” আমেরিকান স্যাংশন খাওয়া দেশকে” – সদস্যপদ দিয়ে ঐ দেশের সাথে আমেরিকান  ক্যাচাল-সংঘাতের দায়গুলো ব্রিকসে আনতে চাচ্ছে না, এড়াতে চাইছে মানে এই প্রশ্নে আমেরিকার বিরাগভাজন হতে চাচ্ছে না। কিন্তু সেটা হলেও এভাবে আমেরিকার খামখেয়ালিপনা আমল করে এর ভিত্তিতে একটা  ব্রিকস খাড়া করা কী সম্ভব, নাকি এটা বাস্তব? বা এর কোন দরকার আছে? যেমন ধরেন এখনই সবচেয়ে বড় স্যাংশন খাওয়া দেশ হল খোদ পুতিনের রাশিয়া। তাহলে মোদির প্রস্তাবিত শর্ত অনুসারে তো রাশিয়াকেই ব্রিকসের সদস্যপদ থেকে বাদ দিতে হয়! অথবা ধরা যাক, কোন কারণে ভারতের উপরেই কোন আমেরিকান স্যংশন যদি আরোপিত হয় তাহলে কী ভারত সরল বালকের মত নিজেই ব্রিকসের বাইরে গিয়ে বসবে? তাতে রাজি থাকবে তো??? একথার মানে হল, যে আপনার বাসায়  আপনি নিজে ঢুকতে পারবেন কিনা সেটা আর কেউ না একেবারে কোন বাইরের লোক বা পড়শি তার খামখেয়ালি ইচ্ছার কথা আপনি মেনে চলবেন? আর তা মেনেই আপনি আপনার নিজের বাসায় ঢুকবেন, ঢুকতে হবে? অথচ সেটাই মোদির ভারত প্রস্তাব করছে? এটা এবসার্ড[absurd] অর্থহীন; আজীব ও অবাস্তব ঘটনা! ভারতের এটা এক আজীব আমেরিকা প্রীতি! যেটার কারণে ভারত খোদ নিজেই আমেরিকার কাছে নিজের অস্তিত্ব নিজেই বিলীন করতে হতে পারে তা জেনেও ভারত তা করতে এক পায়ে খাড়া!!!!  তাই কী?  এটা মানে হয় না এমনই এবসার্ড অবিশ্বাস্য ঘটনা!  যা বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারত নিজেই অমান্য করবে!

    মূল কথাটা খেয়াল রাখতে হবে। ব্রিকসের সকল রাষ্ট্র যদি নাও চায়, তাহলেও ডলারের পাশাপাশি ডলারের বিকল্প কারেন্সি-ভিত্তিক (ধরা যাক চীনা ইউয়ান) ব্রিকস নামের আরেক অর্থনৈতিক  গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করার চেষ্টা করার অর্থ হল ডলারের একছত্র অধীপতি থাকাকে টেনে নিচে নামানো। তাই ব্রিকস খাড়া করব এই মজা লুটতে এলাম  অথচ আমেরিকা বা তার ডলারের সাথে প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না, এড়ায় চলতে পারব, চ্যালেঞ্জ করব না এই অনুমান ভিত্তিহীন এবং তা অর্থহীনও!! বোকার স্বর্গে বসবাস! মানে হল, মোদির ভারতের দশা হয়েছে সে  আমেরিকা ডাকলেই যদি তার বাসায় গিয়া ভারতকে পাশে  শুইতেই হয়, সঙ্গ দিতেই হয় –  তাহলে আর ঐ ভারতের আবার ব্রিকস নামের নয়া বিয়ে করতে যুক্ত হতে এসেছে কেন, দরকার কী?

    আসলেই মোদি এক আজব লোক!!!  সত্যি মোদি সাব পারেও বটে!!!
    [একটা ঘোষণাঃ উপরে যে গ্লোবাল অর্ডার কথা বা ধারণাটা  উল্লেখ করেছি – এটা খুবই ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্ট।  তাই এনিয়ে আলাদা করে একটা লেখা প্রায় রেডি আছে, ‘ফাইনাল টাচ’ দিয়ে একদিন পরেই পোস্ট করব।]

    মোদির দ্বিতীয় শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    এছাড়া  দ্বিতীয় শর্তও প্রায় একই রকমের অর্থহীন! মূল কারণ হল, ব্রিকস যদি পুরানা আইএমএফের বিকল্প প্রতিষ্ঠান হয়ে গড়ে উঠতেই চায় তাহলে হবু সদস্যদেশের নুন্যতম জিডিপি থাকতে হবে এমন শর্ত এর অর্থ কী? আমার দেশের নুন্যতম জিডিপি কেন উল্লেখযোগ্য কোন জিডিপি নাই বলেই তো আমি সদস্য হতে এসেছি, নাকি তামসা করতে? আর মূলকথায়, আইএমএফের জন্মের সময় কী সে এমন শর্ত দিয়ে নয়া সদস্য নিয়েছিল? দেয় নাই তো? তাহলে এখনই বা কেন এটা মোদির প্রস্তাব??  মোদির কনসালটেন্টেরা কি তাহলে গাধা-গরু, পড়াশুনায় ফাঁকি দেয়া ছাত্র যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্টাডি করে নাই? নাকি মাদী ব্রিকস-কে বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব বানাতে চাইছে? কিন্তু তেমন ক্লাব হিশাবে জি৭ – গ্রুপ  প্রথম বড়লোক রাষ্ট্রের ক্লাব তো আছেই – মোদি সেখানে না গিয়ে ব্রিকসে এসেছে কেন?

    ন্যায্যতার প্রশ্ন ফান্ডামেন্টাল, তাই সবার আগে এই প্রশ্ন তুলতেই হবেঃ
    অর্থনীতিতে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোকে অন্তত সুযোগের দিক থেকে সাম্য – সবাই সমান সুযোগ পেয়েছে – এতটুকুই যদি না করতে পারে তাহলে নয়া ব্রিকস খাড়া করার দরকার কী? এর সাফাই ন্যায্যতা কী? আমেরিকা্র খামখেয়ালি মত একালে আর কাকে কোন কোন দেশকে এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে দুনিয়া?  এমন সুবিধা ব্রিকসের চীন বা চীনের মত অন্য কোন ব্রিকস সদস্যের হাতে যেন না থাকে, না উঠে সেজন্যই তো ব্রিকস এর প্রয়োজনীয়তা! নাকি??  ব্রিকস তখনই তো কেবল নুন্যতম ইনসাফের প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করতে পারবে; নাকি? আর আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি মোদির ভারতের মত যারাই বে-ইনসাফিতে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে সে অনেক সুবিধা খেতে পারবে মনে করছে – এরা নিজেরাই আগামিতে সেই গর্তে পড়বেই! এটাই ইনসাফের মহিমা! 

    তাহলে কী দাঁড়ালো, এটাই কী আগামি ব্রিকসের মাতবর সদস্য হিশাবে মোদির ভারতেরআমেরিকার মত এক খামখেয়ালি ক্ষমতার হাতা হয়ে উঠার খায়েসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?  ্মানে বগলে ইট নিয়ে মুখে শেখ ফরিদ!!! আসলে এটাই তো বৃটিশ কলোলিদখলদারেরা চলে গেলে বা এর অবসান হলেও সেই বৃটিশ দখলদারের স্বভাব নিজে পেতে চাওয়া “নেহেরুর ভারত” হওয়ার পুরানা খায়েস!!!

    বাহা রে নন্দ! বাহ রে মোদি! তোর খায়েসের বলিহারি!! মোদি আসলেই পারে! এই দুনিয়ায় অসাম্যের নিয়ম-আইন কানুন যেখানে সমান থেকে উন্মুক্ত করার দাবি উঠছে, এই মোদি সেখানে যে নিজেকে অবলীলায় এর ভায়োলেটর (violator) অমান্যকারি এক দানব হিসাবেই পরিচিত করতে চাচ্ছে!

    যাহোক উপরে আমরা মোদির  হবু সদস্যদের সদস্যপদ লাভের শর্ত নিয়ে মোদির প্রস্তাবের পর্যালোচনা করলাম, দেখলাম। কিন্তু ফাইনালি ব্রিকস কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  মানে কলোনিদখলদারি মনের মোদির ভারত নয়া শর্ত  জুড়ার যে প্রস্তাবই আনুক না কেন, শেষে ব্রিকসের এই সম্মেলন এবিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  নয়া সদস্যপদ লাভের কীশর্ত ঠিক করেছিল?

    ব্রিকসে নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত কী ঠিক হয়েছেঃ
    সেটা ব্রিকস ঠিক খোলাখুলি আমাদের জানায় নাই। বলা ভাল ব্রিকস আসলে  তা খোলাখুলি না বলার পরোক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বে-ইজ্জতি হতে যায় না, তাই এতে বুঝা গেছে !

    কিন্তু নয়া ছয় সদস্য কারা হবে আর তাতে বাংলাদেশ নাই – এই সিদ্ধান্তের তাতপর্য কী?
    এই তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে পারলেই বুঝা সহজ যে ব্রিকস এর সদস্য হবার ফাইনাল ক্রাইটেরিয়া বা শর্ত এখন কী দাঁড়িয়েছে।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাঁড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন ইরানঃ
    ব্রিকসের  সদস্যপদ লাভের শর্ত কী তা তারা প্রকাশ্যে জানায় নাই। কিন্তু তাদের কার্যকলাপ দেখে বুঝা সম্ভব যে তারা ঠিক কী চেয়েছে এবং হয়েছে বা হচ্ছে।  যেমন কারা এই ছয় রাষ্ট্র এর প্যাটার্ন যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখি ইরান এই রাষ্ট্র সদস্যপদ লাভ করেছে; যেটা একটা বিশেষ প্যাটার্ণ নির্দেশ করে। কী সেটা?  ইরানের অর্থনীতি সেই জন্মের সময় ১৯৭৯ সাল থেকেই আমেরিকার নিয়মিত ও অসংখ্য স্যাংশনে জর্জরিত। মানে ইমাম খোমিনীর বিপ্লবে স্বাধীন ইরান জন্ম থেকেই সে আমেরিকান খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে আছে। কিন্তু সেই ইরান এবার ব্রিকস এর সদস্যপদ পেয়েছে। যার সোজা মানে হল, এতদিন কেবল চীন বুক ফুলিয়ে ইরানের তেল কিনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছিল। আজ ব্রিকস জানিয়ে দিল তারা ইরানের মুখের উপর যে অন্যায় লাগাম টেনে ধরার আমেরিকান খায়েস ছিল যা ইরানের অর্থনৈতিক সব সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করতে রেখেছিল – তা ব্রিকস অন্যায় মনে করছে।  ব্রিকস অন্তত (আমেরিকান স্যাংশন) যে মানতে চাচ্ছে না এটাই পরিস্কার হয়ে গেছে ব্রিকসের এই সিদ্ধান্ত থেকে। মনে রাখতে হবে  এক, খোদ ভারত ট্রাম্পের সময় থেকে ইরানের তেল যেন কেউ না কিনে তা বাস্তবায়নের বাধা হিশাবে যে স্যাংশন-শর্ত দিয়েছিল সেবারই প্রথম- মোদির ভারত তা মেনে নিয়েছিল। ট্রাম্পের জাতিসংঘ প্রতিনিধি Nikki Haley এর সেসময়ের এমন মন্তব্য নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট দেখতে পারেন এখানে।  এমন অন্যায়-বেইনসাফি ভাবে সেকালে ভারতের বিক্রি হয়ে যাওয়াতে  ট্রাম্পের কাছ থেকে ভারত কী গোপন সুবিধা পেয়েছিল আমরা জানি না। তবে এরপর থেকে ভারত আর ইরানি তেল কিনে নাই, সস্তায় দিলে এমনকি নিরাপদে তেল ইরান নিজেই পৌছে দিলেও না করেছিল ভারত। আর মনে রাখতে হবে, এখনও  ব্রিকসের কোন সিদ্ধান্ত নিবার পদ্ধতি হল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেদিকে তা নয়, বরং সর্বসম্মতিতে। এর মানে এবার মোদি সজ্ঞানে মেনে নিলেন যে ভারতও এবার ব্রিকস-এ ইরানের নয়া সদস্যপদ অনুমোদন করছে ভারত। অর্থাৎ ব্রিকসের সদস্যপদ লাভের নয়া শর্ত  যা মোদি আরোপ বা হাজির করতে প্রস্তাব করেছিল তা হাওয়া হয়ে গেছে। মোদি নিজেই  সেকথা আর আঁকড়ে ধরে বসে নাই; বরং নিজেই ফাইনালি আর কার্যকর করতে চায় নাই। কিন্তু কেন? আর তাহলে এসব ভুয়া শর্ত প্রস্তাব করেছিল কেন?

    কারণ, এককথায় মোদির আনা শর্ত ছিল ভুয়া ওজনহীন!  এই শর্ত সে প্রয়োগ হোক তা চায় নাই বরং অন্য কোন উদ্দেশ্য এর ছিল। সেকথায় পরে আসবো।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসরঃ
    নয়া ছয় সদস্য এরা আর কে কে এর অর্থ তাতপর্য খুঁজলে পাই সেখানে আরেকটা প্যাটার্ণ। সেটা হল, আরও তিন রাষ্ট্র – সৌদি আরব, ইউএই আর এমনকি সাথে মিসর। [এখানে UAE বলতে যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ফলে বড় প্রভাবশালী হল দুবাই; তবে রাজধানী হল আবুধাবি]।  এছাড়া  মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন রাষ্ট্রের সাথে ইরানও আছে (উপরের অর্থে নয় আরও অন্য অর্থে) – এটা যদি মনে রাখি তবে এর আরও অন্যান্য অর্থ-তাতপর্য আছে সে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখানে আবার ইরানের উল্লেখ সেটা প্রথম তাতপর্য হিশাবে উপরে যা লিখেছি এরও বাইরের ইরান। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিপ্লবের পর থেকে এতদিন কেউ কাউকে সহ্য করে না এমন প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল ইরান বনাম সৌদি। আর এই দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখার বড় ফ্যাক্টর এই প্রধান শক্তি ও সমর্থক এবং সুবিধাভোগী হয়ে  সুবিধা খেয়ে গেছিল আমেরিকা।  কাজেই এখানে ইরান-সৌদি একসাথে ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ – এই আলাদা বৈশিষ্ঠকে আমল করা চোখে তা দেখতে হবে।  এর পিছনের ঘটনা হল, সম্প্রতি  ইরান-সৌদির পুরানা সেসব বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে এদুই শক্তির হাত মিলিয়েছে; আর এভাবে চলার উদ্যোক্তা-মধ্যস্থতাকারি হল চীন। এতে প্রকাশিত চীনের এই সক্ষমতার কথা পশ্চিমের কেউ অস্বীকার করছে না। বরং চোখ বড় বড় করে ভীত ঈর্ষান্বিত চোখে হলেও তাদেরকেও ইরান-সৌদি ঐক্য, হাত মিলানোকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ-কে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ও বিদ্রোহকে সৌদি দমন থেকে যা এতদিন এক মহা মানবিক সমস্যা তৈরি হয়ে ছিল তা মিটমাটের রাস্তা খুলে দিয়েছে। হুতি ইস্যু ও এর বিবাদ থেকে বের হবার – এই ইস্যু অবসান হতে যাবার সুযোগ আসাতে প্রবল প্রশংসা করতেই হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকলকে।  কারণ কেউই নিজেকে বিবাদ পছন্দ করা মানুষ বলে হাজির করতে পারে না।    আর  ইউএই (UAE) যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ও প্রভাবশালী হল দুবাই – ওর আমীর ও তার বড় সন্তান হল বর্তমানে সৌদি আরবের MBA [প্রিন্স সালমান যিনি কার্যত সৌদি শাসক] এর সবচেয়ে কাছের বড় সমর্থক ও চিন্তা শেয়ার করা বন্ধু। অর্থনৈতিক অর্থে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা দেশগুলোতে আধুনিকতার সংস্কার আনার জন্য এদুই প্রিন্স নিজ উদ্যোগ ও কাজের জন্য যারা গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছেন।  একসাথে করতে একাজে এমনকি সৌদি যেসব কাজ করতে চায় কিন্তু নিজ নামে করতে চায় না তা করে দেয় দুবাই প্রিন্স – এমনটাও দেখা গেছে। বিশেষ করে বর্তমানে সৌদিতে যে অর্থনৈতিক সংস্কার বা ঢেলে সাজানো চলছে তাতে এদুই প্রিন্সের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

    তাহলে সৌদি-দুবাই আর ইরান – এ তিনের মাঝে আবার চীন, এর এক আলাদা বিশেষ তাতপর্য আছে। কী সেটা?
    এটাই নব উত্থিত ব্রিকস  এই বিকল্প ব্যবস্থা কায়েমের পথে চীন প্রথম অর্থপুর্ণ পদক্ষেপ। আগে অনেকবার বলেছি ১৯৪৫ সালে আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল । ইতোমধ্যে প্রায় আশি বছর এটা চলতে পেরেছে, আজও চলছে কিন্তু এখন আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত কমছে এর চেয়ে বহু গুণে চীনের সক্ষমতা বেড়ে সে আমেরিকাকে জিডিপিতে  ছাড়িয়ে এক নম্বর অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে।  দুনিয়ার সবদেশকেই একেবারেই কম বা না সুদে অবকাঠামো বিনিয়োগ যোগানোর সক্ষমতা – এটাই কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়ার একেবারে প্রাথমিক যোগ্যতা। কারণ এমন বিনিয়োগ দানের সক্ষমতা যখন কোন দেশের অর্থনীতির হয়, এটাই দুনিয়ায় বেশির ভাগ দেশের উপর ঐ সক্ষম দেশের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দাড়ায়, দাঁড়াবেই। আমেরিকার বদলে ওর এতদিনের গ্লোবাল নেতৃত্বের জায়গায় চীন উঠে আসতেছে, দখল করতেছে – এভাবেই দিন কে দিন দৃশ্যমান হাজির হয়ে উঠছে।ঙ্কারণ,  গরীব তো বটেই এমনকি মধ্যম আয়ের দেশগুলোও (যেমন আশিয়ান জোটের দেশগুলো) যারা অবকাঠামো ঋণ পেতে ৩% পর্যন্ত সুদ দিতে প্রস্তুত (কারণ, আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা ব্যবস্থাটা মানে বিশ্বব্যাংক এমন সরকারগুলোকে অবকাঠামো ঋণ আর দেয়ই না তবে এসবদেশের প্রাইভেট কোম্পানিকে হলে দিতে রাজি। এই নীতি ফলো করে বিশ্বব্যাংক।) তাই, এদের কাছে চীনা অবকাঠামো ঋণ খুবই কাম্য। ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য চীনের AIIB -এই ব্যাংক তাই মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাছে খুবই আদরণীয়!   আর মনে রাখতে হবে, এখনকার চীনের মত একটা দেশ যখন একবার অর্থনৈতিক সক্ষমতার চরম বৃদ্ধির স্তরে পৌছে [মানে নিজ অর্থনীতি বিপুল সারপ্লাস জমা করতে থাকে বা উদ্বৃত্ব সম্পদে ভরে উঠে ] এমন হয়ে যাবার অর্থ হল এরপরের দশ বছরের মধ্যেই ঐ দেশ সামরিক শক্তি হিশাবে সে হাজির হতে, দৃশ্যমান হতে শুরু করতে পারে।  আর এসব সম্ভাবনা ও সুবিধার কারণে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গায় বসে যাবার সুযোগ পেতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, আর তা কমবেশি খোদ আমেরিকাই মেনে নেওয়া বা রেফার করে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে।
    এটাকে আমি বারবার গ্লোবাল পালাবদল বলছি। আর এটা নিয়ে একদল আছে যাতা এটাকে কথিত ভুরাজনীতিক ঘটনা বলে পরিচয় করাতে চাচ্ছে। এভাবে নিজের অজ্ঞতা ঢাকার কিছু নাই, এটা অপ্রয়োজনীয়। ভূরাজনীতি বা জিও-পলিটিক্স  এই শব্দের মধ্যে যে ভূ [geo- জিও] শব্দটাই তো সঠিক নয়। কারণ এটা গ্লোবাল অর্ডার এরই নেতৃত্বের মধ্যে পালাবদলের ঘটনা।  যেখানে রূট শব্দ ও ধারণাটা হল গ্লোবাল [Global]। যা ভূ [geo- জিও] একেবারেই না। কারণ,  গ্লোবাল আর জিও- একই শব্দ না, এক অর্থও না। তবে গ্লোবাল না বলে অনেক বাংলায় “বিশ্বব্যবস্থা” লিখে; সেটা চলতে পারে।  এটা বোকা বোকা অবুঝ শব্দ  ভূ [geo- জিও]  বলার চেয়ে ভাল!

    নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠছে চীন – এই লক্ষ্যেই চীন পুরানা  গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট করে কেবল গ্লোবাল মুদ্রা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক আইএমএফ আর অবকাঠামো ঋণ দেবার বিশ্বব্যাংক – এই দুই গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের পাল্টা ও বিকল্প সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগ নিতেই এমন এক জোট খাড়া করেছে যাকে আমরা ব্রিকস বলে চিনছি।
    তবে আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য (কিন্তু চীনা নেতৃত্বে) এমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়া সহজ কাজ নয়। এছাড়া গড়ার কাজটা চীনের বেলায় শুরুতে সে কিছু দেশকে সাথে নিয়ে বসে কথা শুরু করেছে।  বৈঠকে বসে শুরু করলেই তা খাড়া হয়ে বা কার্যকর হয়ে যাবে না।  সে পথের প্রধান বাধাথল – এখনকার ব্যবস্থায় আমেরিকান ডলারেই বেশির ভাগ আন্তঃরাষ্টীয় লেনদেনবিনিময় বাণিজ্য  (আমদানি-রপ্তানি) সম্পন্ন হওয়া। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা একেবারেই কমে গেলেও এ’জায়গায় ডলারের উপর ব্যবহার কারি দেশ ও মানুষের পুরানা আস্থা অভ্যাস সহসা বদলে দেয়া যায় না একারণে। ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসন  স্যাংশন দেয়ার অতিব্যবহারের কারণে একটা বড় সংখ্যাক দেশ চাইছে ডলার নির্ভরতার বিকল্প – এমন দেশগুলোর শীর্ষে আছে রাশিয়া। হাসিনার বাংলাদেশও অতি আগ্রহী। কিন্তু আগেই বলেছি এটা ঘরে বসে বিকল্প খাড়া করে দিবার বিষয় নয়। তাতে রাশিয়া বা বাংলাদেশ এর মত দেশগুলো যতই ছটপট করুক! তাহলে ডলার মুদ্রা ভিত্তিক বাণিজ্যের আধিপত্য একে পিছনে ফেলে মানে ডলারে ব্যবসাকে সেকেন্ড অবস্থানে নামিয়ে দিয়ে, পরের সবচেয়ে চালু মুদ্রা ইউয়ান, একে সামনে আনার উপায় কী?

    গত ২০১৫ সালে চীনা ইউয়ান মুদ্রাকে আইএমএফ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিশাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তার আগে এমন আইএমএফ অনুমোদন দেয়া মুদ্রাগুলো হল (শুরুতে মার্কিন ডলার ছাড়াও) বৃটিশ পাউন্ড, জাপানিজ ইয়েন, ইইউ এর ইউরো। আর এসবের সাথে সেবার পঞ্চম কারেন্সি তখন হয়েছিল ইউয়ান[Yuan]। কিন্তু ইউয়ান ইতোমধ্যেই লেনদেনের মুদ্রা হিশাবে ডলার বাদে বাকি মুদ্রাগুলোকে ছাড়িয়েছে।  তাই এব্যাপারে চীনা গবেষণা অনুমান যা পরোক্ষে প্রকাশিত – এর ভাষ্য অনুযায়ী এমন চাবিকাঠিটা হল চীন প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ হিশাবে। তাই সুস্থির চীন আর সাথে অস্থির রাশিয়া উভয়েই মনে করে যে এসব জ্বালানি ক্রয়ের পেমেন্ট যদি ডলারের বদলে ইউয়ানে বদলে দেয়া যায় তাহলে মার্কিন ডলার ডমিনেন্সের উপর এক বড় ধাক্কা দেয়া সম্ভব। আর তাতেই ইউয়ান হয়ে যেতে পারে গ্লোবাল বাণিজ্য-লেনদেনের প্রধান মুদ্রা । মানে গ্লোবাল বাণিজ্য ঘটবার প্রধান মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে ইউয়ান।  যেটা গ্লোবাল বাণিজ্যে  মোটামুটি ৬০% এর বেশি হয়ে কোন মুদ্রা পৌছাতে পারলে তবে এরপর তা ক্রমশ বাড়তে থাকে  – আর তাকে সহসাই নামানো যায় না।  যে পথে এখন ডলার উত্থিত হয়ে আছে! চীনা ইউয়ান উত্থানে এক নম্বর মুদ্রা হয়ে উঠতে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিকল্পিত পথ এটাকেই মনে করা হয় – তাত্বিক ও অর্থনীতিবিদ পর্যায়ের ধারণায়। আর, এপথেই চীন আগাচ্ছে বলে মনে করা হয়। এনিয়ে গত ২০১৫ সালে আমারই অনেক লেখা আছে।

    কাজেই এটা এখন বলাই বাহুল্য যে এই পথে গ্লোবাল বাণিজ্যকে ঠেলে দেবার ক্ষেত্রে সৌদি আরব কেন চীনের কাছে গুরুত্বপুর্ণ ও অন্যতম এক নির্ধারক শক্তি।  ইউএই(UAE) এর তেলবিক্রির সক্ষমতা খুবকিছু না থাকলেও সে সৌদির যেকোন কাজ-উদ্যোগের এক নম্বর সহযোগী-সমর্থক। আর এবার এদের সাথে ইরান,  যে ১৯৭৯ সাল থেকেই জ্বালানি বিক্রি সক্ষমতা থাকা সত্বেও গরীব দেশ হয়ে আছে, ইরানি অসুস্থ বাচ্চার জন্য ওষুধ কিনে দিতে অর্থনীতি অক্ষম হয়ে পড়ে ছিল – সেই ইরান গত ৪৪ বছরে খুব কম সময়েই সে নিজের তেল বিক্রি করতে পেরেছে। এই ইরানও এবার যুক্ত হয়ে গেছে যেটা এর আগে সৌদি-ইরান বিরোধ লাগিয়ে রাখার জন্য ইরান আরো অসহায় হয়ে ছিল। এখন হবে উলটা। এবার ঠিক তেল বিক্রি না তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গ্লোবাল ভুমিকার নায়ক হয়ে উঠবে এই তিন দেশ।  আমরা মনে রাখতে পারি ইরান-চীন ২৫ বছরের বাণিজ্য-বিনিয়োগ চুক্তির কথা। যার সার কথা ইরানের তেলের বিনিময়ে চীনা ঋণ, বিনিয়োগ টেকনোলজি আর চীনা বাজার সবই উন্মুক্ত হবে ইরানের কাছে।   এছাড়া এর আরো সম্ভাবনা – মানে কোন দিকে সম্ভাব্য কী হতে পারে সেদিকে তাকালে পাই তুরস্কের এরদোয়ান-কে। যদিও তিনি শুরুতেই যোগ দিতে অপারগ হবেন। তা হলেও এটা বলাই যায় যে ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য এখন চীনের পক্ষে ও হাতে চলে গেছে।  তাই সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসর কে ব্রিকসের সদস্য করে নেয়া এটা ছিল চীনের  কাছে বিরাট প্রায়োরিটি; অন্তত বাংলাদেশের তুলনায়। যদিও বাংলাদেশ চীনের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ – এখানে ভারতের চেয়েও চীনকে প্রভাবশালী হয়ে উঠতেই হবে! কিন্তু বর্তমান অস্থিরতায় সে হাসিনার টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে দেখে – আর তা বুঝা যায় কেন সে বাংলাদেশের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায়োরিটীতে উপরে রাখলো

     এতদিন মিসর ছিল আমেরিকান সক্ষমতার এক প্রধান হাতা, এক নির্ভরশীল ফ্যাক্টর। এখন কী হবেঃ
    মূলকারণ, ১৯৭৮ সালে আমেরিকান মধ্যস্থতায় ইসরায়েলকে মিসরের সাথে ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল আমেরিকা। আর এর মাধ্যমেই কিসিঞ্জারের মধ্যপ্রাচ্য পলিসির (তেলের উপর খবরদারি সহ) [Kissinger ME policy] এতদিন প্রধান পশ্চিমা-নীতি মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর হয়ে ছিল। আর এর সুযোগেই আমেরিকা ইসরায়েলকে দিয়ে বারবার ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ হাতে পেয়েছে, ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকার হাতের মুঠোয় হয়ে যাওয়ার  চাবি কাঠি হয়ে ছিল এতদিন। আমেরিকার এই বিশেষ প্রভাব ও সক্ষমতাটাই এখন দুর্বল হয়ে শুরু করবে; চীনা প্রভাব এর উপরে জায়গা নিবে। এটাই গ্লোবাল অর্থনৈতিক পালাবদল বা এর আরেকটা প্রকাশের দিক!
    কিন্তু এবার চীনা মধ্যস্ততায়  সৌদি, ইউএই (UAE) এবং ইরানের সাথে মিসরও এসে যাওয়াতে ইসরায়েল – সেও এখন আমেরিকার চেয়েও সরাসরি চীনের সাথে যোগাযোগ করে নিজ নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা খুঁজে নিতে বাধ্য হবে। ইরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমাণাত্মক অবস্থান যদি কমাতে চায় তবে চীনের কাছে যেতে হবে। চীনের মাধ্যমে ইরানের কথা শুনতে হবে।  ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্য মানেই  চীনই সেখানকার একমাত্র কার্যকর শক্তি ও জায়গা  – এমন বলে মেনে নিতে হবে  – যারই মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থ আছে এমন সকলকেই  – ঘটনা ফেনোমেনোর অভিমুখ এখন সেদিকে আগিয়ে গেল। আমেরিকার চেয়ে চীন এখন ইসরায়েলের কাছে নিজ নিরাপত্তার নিশ্চিত করার স্বার্থে অনেক বেশি ওজনদার প্রভাবের দেশ হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এককথায় ইসরায়েল-মিসর সহ সারা মধ্যপ্রাচ্যে চীন এখন আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী ও বড় প্রভাব নিয়ে হাজির হতে থাকবে। আর এসব ততপরতা পিছনের এক  নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক ভিত্তির যোগানদার হয়ে হাজির হবে ব্রিকস ও চীনা নেতৃত্ব।

    তাহলে মোদির দেয়া সদস্যপদ লাভের শর্তের কী পরিণতি হলঃ 
    এক বা্ক্যে  সারকথাটা বললে, মোদির ভারত চেয়েছে হাসিনার বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয়ে যায়। আর সেটাই মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে। এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা! আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো।

    বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয় এটা মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে।
    এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে।
    কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে
    বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি
    যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা!
    আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো। 

     

    কিন্তু আপাতত বাংলাদেশের হাত ছাড়তে কেন চীন এতে রাজি হলঃ
    এর উত্তরটা, প্রশ্নটাকে আরেক ভাবে বুঝে বা পেশ করে দেয়া যাক। ছয়টা দেশ এবার সদস্যপদ লাভ করলো – এর সোজা অর্থ তাহলে এর স্বপক্ষে মোদির ভারতও সমর্থন দিয়েছে নইলে তা সর্বসম্মত হত না – তা পাশও হত না।  আর মোদি এই সমর্থন দিয়েছে – অবশ্যইচীনের সাথে একটা কিছুর বিনিময়ে। আর এটাই বাংলাদেশে সদস্যপদ সওদা [bounty] হয়ে যাওয়া!
    আসলে, চীন বাংলাদেশ বাদে যাদেরকে সদস্যপদ এবার দিতে চায় তাতে মোদির সম্মতি কিনে নিয়েছে। আর এই কেনা-বেচার সওদা হয়েছে বাংলাদেশের সদস্যপদ না পাওয়া। বাংলাদেশ যেন সদস্যপদ না পায় এতে চীনকে রাজি করিয়ে বিনিময়ে মোদি ঐ ছয় রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভে নিজ অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছে। বলা যায় এই হল, চীনের সাথে মোদির ডিল বা গিভ এন্ড টেক!  কাজেই এখানে মোদি এখানে ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত যাই পেশ করুক প্রকৃতপক্ষে সবই ছিল ভুয়া, দেখাইন্না এক বাহানা মাত্র। আর ওদিকে সবকিছু শেষ হয়েছে এই ডিলের মাধ্যমে! কিন্তু মোদি কেন এমন চরম হাসিনাবিরোধি অবস্থান নিল?
    এটা কমবেশি অনেকের  কাছেই পরিস্কার যে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি চীনের সাথে কমিটেড। ২০১৮ এর নির্বাচন যেমনই হোক, কথিত ঐ নির্বাচনের ব্যয় চীন যোগানোর মাধ্যমে এই সম্পর্ক যাত্রা শুরু করেছিল। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর বা চীনা তিস্তা প্রকল্প ইত্যাদি চীনের আগ্রহ যেগুলোতে বিশেষ করে যেগুলো ভারতের আপত্তি বা হাসিনাকে ফুসলিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে এতদিন যেসব প্রজেক্ট ভারত হাসিনাকে নিতেই দেয় নাই। নাকচ বা বন্ধ করে দিয়েছে মূলত সেগুলোতেও তখন থেকেই চীন চেয়েছে হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করানো – এটাই ছিল চীনেরর মূল লক্ষ্য।  আর এগুলো সবকিছুর উপর যেকোন উপায়ে বাধা দেয়া – এটাই গত সাড়ে চার বছর মোদির ভারত চেষ্টা করে গেছে। যেমন, চীনা তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দিকে ১৬ কিমি পর্যন্ত চীনারা কোন কাজ করতে পারবে না বলে ভারত আপত্তি  তুলে রেখেছে।  তিস্তার মত প্রকল্পগুলোতে চীনকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না দেয়ার পিছনে এমন ভারতীয় আপত্তিকে উপেক্ষা করে হাসিনা কাজ করতে পারে নাই। তবে সব প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন এগিয়ে যেতে পারে নাই আর বাধা সৃষ্টি করে রাখার বেশি কিছু ভারত করতে পারে নাই – এই হল এক খামোখা ব্যলেন্সিং পয়েন্ট এমন হয়ে থেকেছে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পনা হল আগামিতে হাসিনা যদি নিজেকে আবার বিজয়ী বলে যেভাবেই হোক ঘোষণা করতে পারে তাহলে এরপরেই ভারতের আপত্তিগুলো পায়ে মারিয়ে চীনের সাথে হাসিনা এগিয়ে যাবে এই ছিল চীনের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি – অনুমিত ধারণাটা এরকম। পশ্চিমা গোয়েন্দা ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট গুলোও এরকম ধারণা দিচ্ছে। অথচ অন্য কোন কিছু দিয়ে হাসিনাকে ফিরাতে মোদি ব্যর্থ হয়ে থাকছিল।  এতে হাসিনার যুক্তি ছিল সে চীনের সাথে এমন ডিল না করলে ক্ষতায় ফিরতে পারবে না – আমেরিকান চাপ ফেরানো অসম্ভব। আর মোদির যুক্তি হাসিনা-চীনের এই ঘনিষ্ঠতা মোদির ভারতের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।  এই ত্রিভুজ সংকট পরিস্থিতিতে না পেরে মোদি হাসিনাকে থামাতে গিয়ে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করেছে – মোদি খোদ চীনের সাথেই ডিল করে বসেছে।
    তাহলে চীনের দিক থেকে – সেই-ইবা কেন মোদির প্রস্তাবে রাজি হল?

    চীনকে দেয়া  মোদির ডিল-প্রস্তাব যে হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে হবে – এতে চীন কেন রাজি হল?
    এখন এটা তো সবাই জানে দেখাই যাচ্ছে যে বাস্তবতা হল,  চীন ও মোদি উভয়েই  বা এরা দুপক্ষই  হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছে। বা বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্যপদ না দিতে তারা এক ঐক্যমত্য কায়েম করেছে।  এর মানে মোদির ডিল-প্রস্তাবে চীন হ্যা দিয়েছে। তাহলে চীন এমন করল কেন? বাস্তবত  চীনের এতে রাজি হয়ে যাওয়া এটাই সব বলে দিচ্ছে যে খুব সম্ভবত চীনের  ক্যালকুলেশন-অনুমান হল, হাসিনা আর আগামিতে ক্ষমতায় থাকতে বা ফিরতে পারছে না। তাই, মোদির ডিল-প্রস্তাব চীনের মেনে নিয়ে হাসিনাকে ছেড়ে দেয়া আর বিনিময়ে বাজি ছয় রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দেওয়া প্রশ্নে মোদির ভারতকে দিয়ে সমর্থন দেওয়ানো – এই ডিল গ্রহণই চীনের জন্য সহি বেটার ডিল এবং সবচেয়ে লাভজনক!

    অর্থাৎ মোদি যা চেয়েছিল তা পেয়ে নিয়ে বাসায় গেছে। চীনও যেটা বেশি লাভজনক তাই পেয়ে নিয়ে ফিরে গেছে। মাঝখানে হাসিনা এদুইয়ের বেচা-বিক্রির ডিলের মধ্যে পরে সবই হারিয়েছে।
    এছাড়া চীনের দিক থেকে দেখলে  তার ইউয়ানকে ডলারের স্থান নেওয়ার  পক্ষে  কাজ শুরু করার  স্বার্থ মানে এর পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যকে কাজে লাগানো এটা অনেক বেশি অর্থপুর্ণ। ও বড় প্রায়োরিটি। সেটাই সে পেয়ে গেছে।

    শেষ করব তাহলে ইথিওপিয়া আর আর্জেন্টিনা কেন সদস্যপদ পেলো এর তাতপর্যঃ
    ইথিওপিয়া সম্পর্কে  বাইরের বিশেষ করে এশিয়ার মানুষের ধারণা খুবই কম। সৌভাগ্যবশত আমার প্রায় তিন বছর ওর রাজধানী আদ্দিস আবাবা-তে বসবাসের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই কিছু কথা বলব।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট একঃ
    বাইরের দুনিয়া থেকে বা অন্য মহাদেশ থেকে আফ্রিকার প্রবেশের গেটওয়ে মূলত তিনটা। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বিমানের রূটগুলো লক্ষ করলে বুঝা যায়। আপনাকে সবার আগে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়াতে ঢুকতে হবে।  এসব ফ্লাইট নিতে হবে। পরে যে আফ্রিকান দেশে যেতে চান  সেদেশের ফ্লাইট বদলে নিতে হবে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়া থেকে। মানে এই তিন দেশই হয়ে উঠেছে আফ্রিকার যেখানে যেতে চান এরই হাব বা প্রথম মোকাম দেশ।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট দুইঃ
    আফ্রিকা থেকে কলোনি দখল উঠে গেছে এশিয়ার পরেপরেই – ১৯৬০-৮০ এই সময়ের মধ্যে  ব্যাতিক্রম কেবল সাউথ আফ্রিকা ১৯৯৪।  আর একেবারেই ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া যে কখনও কলোনিদখলও হয় নাই। শুধু তাই না, পুরা দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় ইথিওপিয়া রাজা হাইলে সেলাসি শাসিত দেশ ছিল। রাজা ক্ষমতায় ছিল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। যতক্ষণ তা এক সোভিয়েত কমিউনিস্ট সমথিত  সামরিক ক্যু ঘটেছিল হাইলে মেঙ্গাস্তু [Mengistu Haile Mariam] -র হাতে। আরও পরে ১৯৯১ সালে চীনাস্ইটালে গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার মত আরেক কমিউনিস্ট গ্রুপ এখন ক্ষমতায়। আর সেনাবাহিনী হল ঐ গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা।
    সারা আফ্রিকার আর বড় পিছনে পড়ে অক্ষমতা হল, নুন্যতম পুজি বিকশিত বা শহরায়ন ঘটবার আগেই কলোনিদখল হয়ে যাওয়া। কথাটা অন্যভাবে বললে, সারা আফ্রিকার মানুষ আগে শহর কী জিনিষ তা দেখেনি। কলোনি মাস্টারেরা দখলের পর তারাই শহর গড়েছিল – মানে এসব মাস্টারের হাত ধরেই আফ্রিকার মানুষ শহর কী তা চিনেছিল। তুলনায় ভারতে বৃটিশেরা দখল নিবার আগেই আমাদের অন্তত তিনটা বড় বড় সমৃদ্ধ শহর (লক্ষ্ণৌ, হায়দ্রাবাদ আর দিল্লি) গড়ে উঠে গিয়েছিল।  আর এসব শহরের শহুরে পোষাক-ই হলো পাঞ্জাবি, এজন্য এটা কোন ধর্মের পোষাক নয়। শহরের প্রতীকী পোষাক বলে তা এখনও ভারতের সামাজিক অনুষ্ঠানে বা বিয়ের মুখ্য পোষাক!
    আফ্রিকার এই মারাত্ম পিছনে পড়ে থাকা এটা এতই মারাত্মক যে কলোনি শাসকেরা ফিরে গেলে সাধারণ ট্রেডিং  মুদিখানা বা পষাকের মত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ট্রেডিং – এটা শুরু করার মত মধ্যবিত্ত আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই গড়ে উঠে নাই। আর এজায়গাটাই দখল করে আছে বৃটিশদের হাত ধরে আফ্রিকার মাইগ্রটেড ভারতীয় শ্রমিক পরিবারেরা। অথচ এই কমন চিত্রের একমাত্র ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া।
    একালে অবকাঠামো পুঁজি ও সাথে FDI বা বিদেশি কারখানা পুঁজিও চীনের চীনের কারণে পাওয়া সহজ হয়েছে বলে এমন পুঁজি কাজে লাগানোর সক্ষমতা ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বেশি। একারণের চীনের চোখে এক গুরুত্বপুর্ন গন্তব্য হল ইথিওপিয়া! মানে এটাও আফ্রিকায় চীনেরই বড় স্বার্থের দেশ যাকে চীন ব্রিকস এর সদস্য করে নিল!

    সবশেষে আর্জেন্টিনাঃ
    গত কমপক্ষে সাত বছর ধরে লাগাতর আর্জেন্টিনা অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। যার মুদ্রাস্ফীতি ১০০% এর বেশি আর ৪০% এর বেশি লোক দারিদ্র সীমার নিচে চলে গেছে। এঅবস্থায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা  আর্জেন্টিনার কেস ব্রিকসে নিয়ে আসে, বিশেষ করে চীনের নজর ও বিবেচনায়।  ভেনেজুয়েলা যেমন সেবার চীনের কাছে কিউবান সুপারিশ  পেয়েছিল।  তেমনই আর্জেন্টিনাওপক্ষে পাওয়া শক্ত সুপারিশের কারণে চীনের নজরে আসায় এর পরিণতিতে র্আজেন্টিনাও এবার ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করে যায়। আর এতে চীনের আরেক বড় লাভ হয় নিজের পক্ষে ব্রাজিলের সমর্থন ও আস্থা আরো পোক্ত হল।

    তাহলে এককথায় বললে ছয় নয়া সদস্যই অনুমোদন পেয়েছে মূলত চীনের আগ্রহ ও সমর্থনের কারণে।  কারণ,  মোদি যতই ভাব দেখাক ব্রিকস বলতে এর মূল সক্ষমতা তো চীনের।  একমাত্র চীনেরই আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বা অন্যধরণের পুঁজি ঋণ দিবার সামর্থ আছে। তাতে ব্রিকস এর উদ্যোক্তা সদস্য আরো চার রাষ্ট্র হলেও এরা হল ডেকোরেশন!  বাস্তবত কার্যত চীনই মূল চালিকাশক্তি। তাতে ভারতের মোদি যতই ভাব দেখাক! বাংলাদেশকে ব্রিকসের বাইরে রাখুক!
    এরই রিফ্লেকশন ঘটতে বা ছাপ পড়তে দেখেছি আমরা এবারের নয়া সদস্যপদ বিতরণে!

    আপডেটেডঃ  ২৮  আগষ্ট  ২০২৩; রাত ২ঃ ১৩
    সর্বশেষ  আপডেটেডঃ  ২৯ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ১১ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিএনপির আত্মহননের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’

    বিএনপির নিজেকে খতমের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’
    গৌতম দাস
    ২২ আগষ্ট ২০২৩  মধ্যরাত  ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Q3

     

     

                                     Fundamentalism

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায় এর “দাগী অপরাধী” ততপরতা শেষ হচ্ছে না বা থামছেই না। বরং  সেটা এতই ক্ষমতাধর যে একদিনের মধ্যে বিএনপি সেক্রেটারি মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর-কে একেবারে মৌলবাদবিরোধি করে ছেড়েছে! যত্তবড় মৌলবাদবিরোধি সিপিবি কেন কোন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল কেউ এতদিন হতে পারে নাই!  নিশ্চয় এতে প্রগতিশীল ও সাহিত্য-সাংস্কৃতি জগতের যারা এতদিন আওয়ামি লীগ ওবস্থা ভাল না বুঝে ছুড়ে ফেলে বিএনপিকে প্রগতিশীল বানানোর কাজে লেগে পড়েছিল তারা তাদের পড়ে পাওয়া সাফল্য দেখে ব্যাপক খুশি হয়ে উঠেছেন!
    দেখা যাচ্ছে, এতে সর্বশেষ যোগ দিয়েছে দক্ষিণ-ভারতের দ্যা হিন্দু মিডিয়া গ্রুপের এক নয়া প্রপাগান্ডা-ময় ফ্রি পত্রিকা যার নাম “ফ্রটলাইন” [Frontline]।  মূল মিথ্যা কথাটা ছিল, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নাকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমেরিকার কাছে এক ‘কূটনৈতিক নোট’ বা “বার্তা” পাঠানো হয়েছে। যেটা পুরাটাই মিথ্যা।  কোন প্রমাণ ছাড়াই এধরণের মিথ্যা প্রপাগান্ডার দাবি প্রথমে ভারতের একটা বা দেড়-টা মিডিয়া থেকে ছড়ানো হয়েছে। মূল অপরাধী আনন্দবাজার-অগ্নি রায়দের আর, সেই কথিত মিথ্যা বার্তা-কে একটু ঘুড়িয়ে-ফিরিয়ে কিন্তু একইভাবে কোন প্রমাণ বা খবরের উৎস কে তা না জানিয়ে পরে তা প্রচার করেছে ডয়েচ ভেলে। তবে এটা নয়াদিল্লির ডয়েচ ভেলে। আর পরে প্রথম আলো-স্টার এই ডয়েচ ভেলের মিথ্যা রিপোর্টের বরাতে সেই চোথা-কপিটাই ছেপেছিল। একাজটাও সমান অপরাধের এজন্য যে  এরা তো দেখতেই পাচ্ছিলেন ডয়েচ ভেলের লেখাটা কোন “নিউজ” না। এটা এক “দাগী [despotic] ততপরতা” কারণ এতে তথ্যের কোন উৎস জানানো হয় নাই। তাই এটা কোন  “নিউজ” হয় নাই বরং একথা গুলো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালইয়ের কে ও কবে বলেছে এর কোন প্রমাণ সাথে না দিয়েই উলটে  আনা হয়েছে – এক গায়েবী “কূটনৈতিক নোট” এর দাবি। এই অপরাধী কাজ তো জার্নালিজমের লোক ও চোখ হিশাবে প্রথম আলো-স্টারের বুঝতে না পারার কোনই কারণ নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই অপরাধী কাজে তারাও সামিল হয়েছে।

    তবে ফ্রন্টলাইন অথবা ডয়েচ ভেলে বা প্রথম আলো-স্টার  এরা সকলেওই ভেসে গিয়ে এক লোভে। লোভটা হল, বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা যে রাজনৈতিক গুমোট অবস্থা তাতে সবচেয়ে “পাবলিক নজরদারিতে আছে ইন্ডিয়ান সরকার; মানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়া। এখন মিডিয়া বাণিজ্যিক চোখে দেখলে, এটাই বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান মিডিয়ার চোখে এটা সবচেয়ে লোভনীয় – নিজ নিজ মিডিয়া রিচ [media reach] বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ। যার সোজা মানে যত বেশি ভিউ ততই অর্থলাভ। এছাড়াও এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার রাজনৈতিক লাভালাভ উঠবে ভারত ও বাংলাদেশের চলতি সরকারের ঘরে। তাই তাদের থেকেই আরেক অঙ্কের অর্থ পাবার সম্ভাবনা। আর বলাই বাহুল্য এতে বড় ফান্ডটা হওয়ার কথা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মিডিয়া ফান্ড। এসব চিন্তা থেকেই মনি-কাঞ্চনের চকচকে লোভে এসব মিডিয়ার চোখে; তাতে এই কথিত “ভারতীয় বার্তা” অসত্য বা বাপ-মার হদিস হলেই বা কী? চকচকে লোভের কাছে এই হদিস-হীনতা মামুলি!!!
    এর একটা প্রমাণ দেয়া যাক।

    “দ্যা হিন্দু” মিডিয়া গ্রুপের আরেক সাবসিডিয়ারি বা সহায়ক কোম্পানি তবে, প্রপাগান্ডা পত্রিকা হল ফ্রন্টলাইন। কেন এমন বিশেষণ লাগিয়ে বলছি? কারণ, মূল ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা এই ইংলিশ ডেইলি এখন আগে অর্থ পরিশোধ পে [pay] করলে তবেই পড়তে দিবে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া তাদেরই আরেক ব্যবসা বিষয়ক বা শেয়ার মার্কেট মুখ্য করা আরেক পত্রিকা বিজনেস লাইন আরো আগেই পে [pay] পত্রিকা করা হয়েছে। তাতে বলাই বাহুল্য পাঠক কমে গেছে। তাই সমান্তরালে “ফ্রটলাইন” কে সামনে আনা হয়েছে যেটা ওপেন মানে পয়সা লাগবে না। ফ্রন্টলাইন পত্রিকা থেকে উপরের ছবিটা নেয়া হয়েছে বাংলাদেশের ২১ আগষ্ট সকাল পোনে আটটায়।  আর এতে তখনও দেখা যাচ্ছে “ফ্রটলাইন”  খবরের প্রধান হেড লাইন হল আগের দিনের মানে, ২০ আগষ্ট সকাল নয়টায় ছাপানো বা হোস্ট করা বাসি ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা স্টোরিটা। অথচ আজকাল নেট বা ওয়েব পত্রিকার যুগের কোন মিডিয়ায়  মুখ্য হেড লাইন নিউজের জায়গায় কোন খবরকে কী ২৪ ঘন্টা লটকায়ে থাকে? না রাখা উচিত, না বাস্তব সম্মত?? প্রশ্নই আসে না। তাহলে ফ্রন্টলাইন কেন রেখেছে? কারণ, এই প্রপাগান্ডা মিছা খবরটা “পয়সার মাল”। এটা এখনও পত্রিকার রিচ বাড়াবে বা বাড়ছে বলে ম্যানেজমেন্টের বুঝ! পাঠক টানবে, আনাগোনা হবে সেটাই তাদের অন্যসব আজকের টাটকা নিউজের চেয়েও সর্বোচ্চ হিট দিবে! সেই বিবেচনায় এই ২৪ ঘন্টা পুরানা চোথা-কপিটা টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। এ’থেকে অবশ্য এটা কেমন মান ও পাঠক আদরের পত্রিকা তা ঠাহর করা যাচ্ছে, সেটাই উদাম হয়েছে। যদিও সারকথাটা হল, এখানে মিডিয়া বা জার্নালিজম বলে কিছু নাই, সবটাই ব্যবসা আর অর্থের লোভই মুখ্য!!!

    ওদিকে কথিত ‘কূটনৈতিক “বার্তার” কারণে অবস্থা এমন হয়েছে যে এই গল্পের কোন সত্যতা নাই সেই গল্প নিয়ে লীগ-বিএনপি রাজনৈতিক নেতারা বিবৃতি দেয়া শুরু করেছে। বলছে, “যদি ভারত এমন বক্তব্য” দিয়ে থাকে অথবা “যদি এমন ভারতীয় বার্তা” মানে কূটনীতিক নোট বলে কিছুর অস্বিত্ব থেকে থাকে – এভাবে “যদির কথা” তুলে যার যার মনের খায়েস বা বাকযুদ্ধ চালানো হয়েছিল গতকাল সারাদিন।
    এভাবে যদির উপর দাঁড়িয়ে কথা বলাটা চরম বোকামি শুধু না বরং বেইজ্জতি হবার সম্ভাবনা!  কারণ, এখন যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবার  সোজা বিবৃতি দিয়ে বা সাংবাদিক ডেকে জানায় যে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত আমেরিকাকে কথিত কোন বার্তাই পাঠায় নাই – তখন কী হবে!!!  সেটা হবে অনেকটা এরকম যে সমাজে কেউ কাউকে যদি বলে [যেটা বাস্তবে কেউ করে না] আপনি আমাকে যদি গালি দিয়ে থাকেন তবে আমি আপনাকে জুতা দিয়ে মারব। আরে বাবা আমি গালি দিয়েছি কিনা সেটা তো আগে নিশ্চিত হবে আপনাকে, নাকি? যদি গালি না দিয়ে থাকেন তখন তো নিজেকেই লজ্জা পেতে হবে!  এছাড়া এসবের মধ্যে কূটনীতিক রীতিনীতি শিষ্টাচার এর ব্যাপার আছে। তাই সেটা হবে কোন ঘটনা বাস্তবে ঘটার আগেই “যদি তা ঘটত” এমন কাল্পনিক ধরে নিয়ে মারামারি শুরু করে দেয়া।  স্বভাবতই এতে মানুষ সবার আগে “যদি দিয়ে কথা বলা” লোকটাই মূল উস্কানিদাতা বলে সাব্যস্ত করবে!  কারণ,  “যদি দিয়ে কথা বলা” মানে পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া শুরু করা।  অথচ সেটাই ঘটেছে।
    এব্যাপারে অন্তত কিছু শোভন এবং কূটনীতিক (কোন বাংলাদেশি) এক খসড়া বক্তব্য হতে পারত যদি বলত – “এ দেশের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বিদেশি শক্তি কথা বলতে পারে না, অশ্রদ্ধা করতে পারে না – এটা সবার মনে রাখা উচিত”।  “জনগণের ইচ্ছা” এটাই আমাদের সার্বভৌমত্ব,  জনপ্রতিনিধিদেরকে দেয়া ম্যান্ডেট। কাজেই, কোন বিদেশি  শক্তির আমাদের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার নুন্যতম সুযোগ নাই। এমন যে কোন ততপরতাকে আমারা প্রতিরোধ করতে বাধ্য। তাই কোন বিদেশি শক্তির এমন ততপরতা হবে খুবই দুঃখজনক ঘটনা।  আমরা আশা করব সকলেই এব্যাপারে নিজেকে সংযত করে নিবেন!

    কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপি আরো এক ধাপঃ
    যেমন বিএনপি “যদি দিয়ে কথা বলে” থেমে গেল তাও একটা মানে হত। কিন্তু মির্জা ফকরুল এরপর যেন একেবারে যেন  নিজে নিজেকেই বিব্রত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আরও আগ বাড়িয়ে বলেছেন,  ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”।


    মির্জা ফকরুল এর এই বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    তাহলে মির্জা এত দ্রুত এমন “মৌলবাদ-বিরোধী” বক্তব্য কেনঃ
    মূল কথাটা হল, মির্জা নিজেই আল-টপকা  “মৌলবাদ-বিরোধী”বা পক্ষ বলে তর্কটা নিয়ে গেছে।  অথচ কোন মৌলবাদ-তর্ক তো হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে ইস্যু ছিল না!
    যদিও গত ২০১৫ সাল থেকেই বিএনপির মধ্যকার এক বেহুশ আর পোলাপানি চিন্তা দেখা দিয়েছিল যে,  প্রগতিবাদিদের মত মৌলবাদ-বিরোধি বক্তব্য দিতে পারলে দল ভারত ও পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে – যেন আওয়ামি সমতুল্য হবে দল!  মানে এরা সেই থেকে বেমালুম অসতর্কতায়  নিজ “মুসলমান জাতিবাদি” কোর সমর্থক গোষ্ঠিরই বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়ে চলেছে। কিন্তু কেন? কারণ, বিএনপির অস্থির কথিত তরুণ নেতাদের অপুষ্ট বুঝের বোকা-অনুমান হল ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। আওয়ামি লীগকে দেখেই তাদের এই সর্টকাট অনুমান!  অথচ মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের উপর ভারতের কর্ত্ত্বত্ব ও প্রভাব ভারতের নিজ মুরোদে সৃষ্ট হয় নাই। আসে নাই। এটা এককালে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল তাই। কিন্তু এখন বাইডেন প্রশাসন ভারতের সাথে সেই বিশেষ [চীন ঠেকানোর ঠিকাদারির দায় থেকে ভারতকে মুক্ত করে দিয়েছে]। শুধু তাই না, এরপর বাংলাদেশের উপর পুরানা ভারতীয় প্রভাব ভেঙ্গে দিয়ে বাইডেন নয়া সম্পর্ক গড়তে নয়া পলিসি-অবস্থান নিয়েছে। যেটা শুধু বাংলাদেশের উপর ভারতের মাতব্বরি উপড়ে ফেলাই নয়,  ভারত-আমেরিকার পুরানা সম্পর্কে-কেও বদলে নিবে!  এবার গত জুনে ২২-২৪ মোদির বাইডেন সফর তাই  সেই সফর ছিল মূলত সামরিক ক্রেতা-বিক্রেতার সাক্ষাত-সফর। যা মূলত ভারতে (যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন বানানোর কারখানা বসানোতে) আমেরিকার বিনিয়োগ সংক্রান্ত…। এর সাথে রাজনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক কোন ইস্যু নাই, আলোচনার এজেন্ডা বা তালিকায় তা ছিল না।

    কিন্তু লেটেস্ট ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়টা – এসব পরিস্কার জানা সত্বেও মোদি-হাসিনা ভান করতে চায় যে যেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আগের মতই আছে। ফলে মোদিও যেন আমেরিকার কাছে হাসিনার সুপারিশকারিই এখনও আছে। এই ভান এর উপর ভিত্তি করে গত দুদিনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা চলছে, আওয়ামি কর্মিদের মনোবল বাড়াতে! আর তাতেই এক সিপিবি কর্মি যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে বসে গেছে অবস্থা!! রাজনীতির খোঁজ-খবর বা অভিমুখ না জেনে না রেখে রাজনীতি করা যায় না। মির্জা ফকরুল-সহ তাদের নীতিনির্ধারকদের ভুল-অনুমান হল, এভাবে মৌলবাদের কথা তুললে নিশ্চয় আমেরিকা বা পিটার হাস খুব সন্তুষ্ট হবে আবার ওদিকে মৌলবাদবিরোধি গলা চড়ালে মোদির হিন্দুত্ববাদও বেজায় খুশি হবে। অথচ ওরা খবর নেয় নাই সেকালে নব্বইয়ের দশকে মৌলবাদ বলতে এর প্রধান পৃষ্টপোষক বলতে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আমেরিকাকেই বুঝাত – এতে তাদের সেই বয়ান হল,  “মৌলবাদ উত্থান” ঘটার জন্য প্রধান অভিযুক্ত আমেরিকা!
    মির্জা ফকরুলের মুখ দিয়ে বের হওয়া যে বয়ান হাজির হয়েছে এটা চলতে থাকলে ক্রমশ এটা এমন নয়া বাস্তবতায় পৌছাবে সেটা হল  বাংলাদেশের “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার সমর্থকদের দল হিশাবে বিএনপি তার স্থান হারাবে।  আর তাতে ভিন্ন এক নয়া দল গঠিত হয়ে এর উপর ভর করে নয়া এক ‘মুসলিম জাতিবাদি’ কনষ্টিটুয়েন্সির দল হাজির হতেও পারে। যা বলাই বাহুল্য বর্তমান বিএনপিকে শুকিয়ে ফেলবে।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    তবে ভারত যে মিথ্যা “কূটনীতিক বার্তার” কথা তুলে আওয়ামী কর্মিদের হতাশা ভেঙ্গে মন চাঙ্গা করতে চেষ্টা করেছে সেটা এখন কমবেশি পরিস্কারঃ
    আর এতে ভারতীয়  “সাফাই ভাষ্য” চরমভাবে দুর্বল।  তারা বলছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে হাসিনা ফিরে ক্ষমতায় না থাকলে ভারতের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে – এটাই কথিত সেই ভারতীয় বার্তা। এখন একবার ভেবে দেখেন, দুনিয়ার কোন নির্বাচন কমিশন অথবা আদালতের কাছে এটা তো বলাই যায় না যে আমি ওমুককে বিজয়ী দেখতে চাই। অথবা (আদালতের কাছে) ওমুকের ফাঁসির রায় চাই। একথা বলার মানে হয় না। কারণ এটাই তো নিশিভোট! কোন নির্বাচন ফলাফল কেমন হতে হবে তা আগাম দাবি করে বলার মানে হল সেটা আর নির্বাচনই নয়। অথবা শাহবাগের মত দাবি – আগাম ফাঁসির রায়ই হতে হবে বয়ে রায় চাই একথা বলার মানে হল সেটা আর বিচার নয় বা আদালতের রায় নয়। এছাড়া ভিন্ন একটা দেশ, বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনাকেই বিজয়ী দেখতে চাই এটা কী বলা যায়? মানে হয়? নাকি এসব কথা  জনসমক্ষে প্রচার হয়ে যাবার পর আমেরিকার পক্ষে ইচ্ছা থাকলেই কী এসবের বাস্তবায়ন বা মেনে নিতে পারবে???

    সারকথায় এটা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা দিবার মত কোন “ভারতীয় বার্তাই” হয় নাই – কোন কূটনীতিক বার্তা হওয়া দূরে থাক!   এটা “শাহবাগী ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই” – এর চেয়েও ন্যাংটা উলঙ্গ এক বর্বর ভাষ্য! যেমন, আমরা কী বলতে পারি যে আমরা ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চাই; এটাই বাংলাদেশের স্বার্থ!!!!!
    এধরনের বাচালদের কাজ কামে আমেরিকার জড়িত হবার নুন্যতম সম্ভাবনা নাই। বাইডেনের আমেরিকা অন্য নানান ইস্যু পদক্ষেপে ভুল করতে পারে, অন্যায় করতে পারে। কিন্তু তারা বোকা নয়।  তাহলে এসব কথিত ভারতীয় বার্তার একমাত্র লক্ষ্য হল, ভেঙ্গে পড়া আওয়ামি কর্মিদের চাঙ্গা করারই এক অকেজো চেষ্টা মাত্র!

    আপডেটেডঃ    ২২ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৭ঃ ৩৫
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  ২৩ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ২৫

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা 

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা
    গৌতম দাস
    ২০ আগষ্ট ২০২৩   মধ্যরাত ১২ঃ ৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-4Ox

     

            হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে

     

    ঘটনা বড়ই অদ্ভুত! ভারত বাংলাদেশ বা হাসিনা সরকারকে নিয়ে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের বার্তা”  এমন কোন বার্তার অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা এর কোন খবর নাই। আনন্দবাজার, ডয়েচ ভেলে, প্রথম আলো অথবা  ওবায়দুল কাদের (সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী) এমন কারো কাছেই এমন খবরের নিশ্চয়তা নাই; কেউই নিশ্চিত করেন নাই বা এমন খবরের রেফারেন্স কী তা বলেন নাই। অথচ গতকাল থেকে এখনও কথিত এই ভারতীয় বার্তা নিয়ে প্রায় সব পক্ষই কথা বলে চলেছে। “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছুর অস্বিত্ব কী? তা না বলে  যারা এনিয়ে কথা বলছেন তারা অন্যায় করছেন।  এভাবে “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছু থাকলে তার কথা এই…... এভাবে শর্ত সাপেক্ষে নিজের কথা বলছেন। অথচ এভাবে কথা চলতে পারে না, মানে হয় না। খুব সম্ভব কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের এক সরকারী ভাষ্য এখন আসন্ন যেখানে তারা বলবেন –  না তো এমন কোন ভাষ্য তো আমরা দেই নাই!!!!!
    অথচ এবার আনন্দবাজারের সাথে একইভাবে খবরের উৎস কী সেটা উল্লেখ না করে গায়েবী লিউজ ছেপেছে ডয়েজ ভেলে।  আর এই মিথ্যা গায়েবী খবর প্রথম আলো ডয়েচ ভেলের বরাতে ছেপেছে।  দাবি করেছে “কূটনৈতিক নোটে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তা ভারত এবং অ্যামেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না”। কিন্তু কোথায় ভারত এমন  কূটনৈতিক নোটে জানিয়েছে এর কোন হদিস নাই। মানে এরাও প্রথম আলো, স্টার, আনন্দবাজার এর মত একই দলে যোগ দিল। এতে বলাই বাহুল্য ডয়েচ ভেলে কেও মূল্য চুকাতে হতে পারে।   যেন সকলে এরা হাই স্টেকে জুয়ারি জুয়া খেলতে নেমেছে সাংবাদিকতা নামে!!!!

    আনন্দবাজারের অগ্নি রায় যা শুরু করেছিলেনঃ
    প্রথম কথা হল আজকের আনন্দবাজারে অগ্নি রায়ের লেখাটা এটা কোন সাংবাদিকতা-ই নয়। এটা আসলেই এক বাজারি লেখা যার পায়ে কেবল ঘুঙ্ঘুরটাই নাই!  একটা মনগড়া  আর কোন রেফারেন্স ছাড়া কিছু  রচিত বাক্যের গল্প বলা যায় একে বড় জোর। যেমন এই বানানো গল্পটা মোট ৪৪৪ শব্দের। কিন্তু তাতেই এর ভিতর অগ্নি রায় চার বার  “সুত্র বলছে” ব্যবহার করেছেন। মানে সোজাসাপ্টা এটা গায়েবী কথাবার্তা যার বাপ-মা নাই।  আর এধরণের চাপাবাজি শব্দ আর মিথ্যা কথাই সেখানে আছে। তবে আনন্দবাজারি লেখায় “সুত্র” মানে তা ইংরাজি সোর্স [source] এর বাংলা করেছে তারা এভাবে। আর এভাবে কথিত “সুত্র” এর কথা বলে আনন্দবাজার সাংবাদিকতায় খবরের সোর্স বলার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে চায়। এটাই অসৎ জার্নালিজম!   জার্নালিজমে নুন্যতম ফেয়ার [fair] বা সৎ জার্নালিজমের প্রধান ও নুন্যতম শর্ত হল খবরের সোর্স উল্লেখ করতেই হয়; পাঠক-কে জানাতেই হয়। অথচ এই ৪৪৪ অক্ষরের গল্পটার মধ্যে কোন উপযুক্ত সোর্সের কথা উল্লেখ নাই। অথচ সমানে যা খুশি তাই দাবি করে চলা হয়েছে। অথচ আনন্দবাজার প্রবর্তিত সেই অস্তিত্বহীন কথিত “ভারতীয় বার্তা” প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আর মির্জা ফকরুল পর্যন্ত কথা বলে ফেলেছেন!!
    তবে আরো সব প্রসঙ্গে ঢুকবার আগেই পাঠককে মনে করিয়ে দেই। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের এবার এখন একেবারে ঘুম নাই অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেকথা ভারতের ভাষাতেই বললে, ভিসানীতি ধরণের স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হলে সেটাতে নাকি ভারতের স্বার্থ খুন্ন হবে। এটা আবদি বা সুবীর ভৌমিক আমাদেরকে খোলাখুলিই জানিয়েছে।  যার মানে হল, হাসিনাকে ভোট কারচুপি বা রাতের ভোট করতে দিলেই একমাত্র ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হবে।  যার সারকথাটা হল, নির্বাচন এর নামে যা হবে হোক কিন্তু শেষে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে নাহলে নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। এমনকি তাদের বিদেশ মন্ত্রণালোয়ের মুখপাত্রও অরিন্দম বাগচি আমাদেরকে কনষ্টিটিউশন মাফিক মানে হাসিনার মাপে চলতে হেদায়েত করেছে।

    এখন এসবের সারকথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভারতের মিডিয়ায় লেখা হচ্ছে। এবং খুব সম্ভবত এটা চলতি বছরের দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস এর চেষ্টা।  যার প্রথমটা তোলা হয়েছিল মোদির আমেরিকা বা বাইডেন সফরের কালে (২১-২৪ জুন ২০২৩), আগে ও পরের সময়ে। কিন্তু এসব মিথ্যা হাইপ তোলার দায় দায়িত্ব না নিয়ে ও অস্বীকার করে ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ২ জুলাই জানায়ছিলেন একেবারে উলটা কথা – যে ভারত নাকি “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে”।  [এপ্রসঙ্গে আমার সেসময়ের লেখা – “জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!” – লেখাটার লিঙ্ক এখানে]।  তার মানে অগ্নি রায়দের মত মিথ্যা প্রপাগান্ডা লেখকদের পরিণতি মাত্র গত মাসেই আমরা দেখেছি; যখন জয়শঙ্কর এসবের কোন দায়দায়িত্বই নেন নাই। অথচ তাসত্বেও  আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে।

    তবে খুব সম্ভবত এবারের পটভুমি হল আগামি মাসে [৯-১০ সেপ্টেম্বর] অনুষ্ঠিতব্য ভারতে G20 নেতাদের সম্মেলন। নিচে সংক্ষেপে G20 জিনিষটা কী তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যাদের হাতে সময় কম তারা এটা পার হয়ে এরপরের প্যারাতেও চলে গিয়ে সেখান থেকে পড়া শুরু করতে পারেন। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের চেয়েও বেশি। ফলে সে পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য বিনিয়োগ গ্রহিতা। তাই এবারের সম্মেলন সেখানে।

    G20 নেতাদের সম্মেলন কীঃ
    দুনিয়াতে যেসব রাষ্ট্রের জিডিপি সবার চেয়ে উপরের দিকে এমন টপ ২০টারাষ্ট্রের  কমন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এক জোট হল এই G20। প্রতিবছর নানান দেশে এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটা গড়ে উঠার ইতিহাস হল, এক কথায়, এটা মূলত ওয়াল স্ট্রিট [wall Street]  নিউইয়র্ক,  এর আগ্রহ ও আবেদনে গঠিত ও সৃষ্ট।  ওয়াল স্ট্রিট এক প্রতীকী নাম বা শব্দ যার অর্থ এটা বিরাট বিরাট পুঁজি (ঋণ দেয়া) বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান। এর এতই বড় প্রতিষ্ঠান যা কমিউনিস্টদের কল্পনাতেই নাই। নাই কারণ, এবিষয়ে তাদের প্রধান গুরু জোসেফ স্তালিনেরও কোন ধারনা ছিল না। কিন্তু তামাসাটা হল,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান যুদ্ধের খরচ যোগানদার ও নেতা ছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। রুজভেল্টের অর্থনৈতিক-সহ সবধরণের সহযোগিতাতেই স্তালিন তার সোভিয়েত ইউনিয়নকে হিটলারের জার্মানির হাতে আক্রান্ত ও পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে আসল কথাটা হল, রুজভেল্টের পিছনে ছিল এই ওয়াল স্ট্রিট -ই। ওয়াল স্ট্রিট এর বৃহত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে করিতকর্মা ও দক্ষ কর্মিরাই ছিল রুজভেল্টের মন্ত্রী, প্রশাসক, পরামর্শদাতা, বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রধান ইত্যাদি সবকিছুতে...। আর স্তালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে, মারা যাবার আগে তিনি জানতেন যে ওয়াল স্ট্রিট  কী জিনিষ এমন প্রমাণ কেউ দেখে নাই।  সম্ভবত একারণেই, পরবর্তিতে স্তালিনের অনুসারি কমিউনিস্টদের কল্পনায় সবচেয়ে বড় পুঁজির কারবারী  হল, বহুজাতিক কোম্পানি [MNC: Multi National Corp.] বা কর্পোরেট হাউজগুলো। আর আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা অনুসরণ করে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের। যেখানে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের চোখেও ওয়াল স্ট্রিট বলেই কিছু নাই। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের তো খবরই নাই।
    এই MNC দেরই বাপ হল ওয়াল স্ট্রিট। সেটা এই অর্থে যে MNC গুলোকেই  বড় বড় পরিমাণ পুঁজি ঋণ বা বিনিয়োগ হিশাবে দেয় ওয়াল স্ট্রিট; মানে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো।  তাই ওয়াল স্ট্রিট শব্দের আলোচ্য প্রসঙ্গে মানে হল যাদেরকে বিনিয়োগ পুঁজির বাজারকে বাড়াতে সব সময় নয়া বাজারের খোঁজে বেরাতে হয়। এজন্য এরা প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা অর্থনীতিগুলোকে তারা চাপ দিয়ে বেড়াতে হয়।  ওয়াল স্ট্রিট এর আবেদন ও দাবি হল, তোমরা  G20 দেশগুলো বছরে একবার করে নিজেদের মধ্যে বসে সমন্বয় বাড়াও, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী তা নিয়ে আলাপ করে বড় ২০ দেশ কোঅর্ডিনেটশন বাড়াও। কারণ, একমাত্র তাহলেই ওয়াল স্ট্রিট এর বাজার বাড়বে; মানে এতে তোমাদের অর্থনীতিও বাড়বে দ্রুত।  এই হল সংক্ষেপে G20।

    কিন্তু মোদির ছেঁচড়ামো গেল না। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের বেশি হয়ে গেছে বলে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থনীতি যেন হয়ে গেছে  তা একেবারেই নয়। তবে ওয়াল স্টিটের চোখে ভারত পটেনশিয়াল রাইজিং বলে সে  বড় জোর সম্ভাব্য পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ ঋণ গ্রহিতা। এতটুকুই। আর মোদিকে এই সম্ভাবনাটাকেই বাস্তব করে দেখাতে পারতে হবে, ভারতের অর্থনীতিকে  বাস্তব গতি দিতে পারতে হবে। মানে ভারত জি-২০ সম্মেলন করেছে বলেই ভারতের অর্থনীতি তেমন উচা হয়ে গেছে তা একেবারেই নয়। কিন্তু মোদির ছেচরামি হল, তাকে ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উচা করার আগেই এর ফায়দা নিতে হবে – এই লাইনে রওনা দিয়েছে। আর সেই সাথে ভাব করতে হবে ভারত যেন পরাশক্তি। তবে এই ভাব-ভাষ্যটাই মোদি আভ্যন্তরীণ ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করে ভোট তুলতে চায়।  আর এরই সাথে হাসিনার বাংলাদেশ জি-২০ দেশগুলোর ধারেকাছেরও কেউ না হওয়া সত্বেও মোদি হাসিনার বাংলাদেশ তার অধস্থন  হাতা-ল্যাসপেন্সার এই অপমান করার বিনিময়ে হাসিনাকে  জি-২০ এর দাওয়াত করে এনে দেখাতে চায়। তার নিজ দেশে দেখাতে চায় যে মোদির ভারতেরও অধস্থন এক  হাতা-ল্যাসপেন্সার দেশ-সরকার আছে!!! এটাই মোদির ছেচরামি!!! অথচ কার্যত অনাহুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমরা ঐ সভায় কী সম্মান পাবো সেখানে??  বড়লোক বন্ধুর বিয়েতে যেতে পেরেছি তা অনেক গরীর বন্ধু এক বিরাট অর্জন বা জাতে উঠা বলে মনে করতে পারে, এটা সেরকমই কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি!!!

    সেটা কী দাঁড়াবে তা দেখা যাবে। এর আগে অনেক কিছুই ঘটবে। তবে এনিয়ে আপাতত আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ফলস এক ঢেউ তুলতে চাইছে।   যেমন শিরোনাম থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করা যাক। অগ্নি রায় বলছে “হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে”। এখানে সবারটা কে কে? একা মোদির ভারত ছাড়া তো কেউ নাই। আমেরিকাই তো ভারতের সাথেই নাই। অগ্ন রায় যেটা এককালে ছিল যেন সেটা এখনও আছে এই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে একথা বলছেন। মানে ২০০৭ সালের যে আমেরিকা বাংলাদেশে হাসিনাকে বসিয়ে সেই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল – সেই আমেরিকা তো এখনকার আমেরিকা নয়। দেখাই যাচ্ছে হাসিনা সরকারই বলতেছে, আমেরিকা তাকে উতখাত করতে চায়। সর্বশেষ ১৬ আগষ্ট সরকার বলছে, আমাকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী, লিঙ্ক দেখেন। অথচ অগ্নি রায় গল্প ফেঁদেছে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে নাকি সেটা আমেরিকারও ক্ষতি?? মানে সোজাসাপ্টা একটা আরেকটার বিপরীত কথা!
    এরপরে স্টোরির শুরুতে অগ্নি রায়ের প্রথম বাক্য “বাংলাদেশে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে তা ভারত এবং আমেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না বলে মনে করে নয়াদিল্লি”। যেটা নিয়ে আমরা উপরে দেখলাম এটা এক ভারতের ছাড়া আর কোন দেশের স্বার্থ নয়।  এরপর পরের বাক্যঃ

    “কূটনৈতিক সূত্রের খবর, একাধিক স্তরের বৈঠকে নয়াদিল্লি
    এ কথা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসনকে।
    সূত্রের খবর— বাংলাদেশের
    আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ভারত যে খুশি নয়,
    ওয়াশিংটনকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তাও”।

    এটা অগ্নি রায়ের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী মন্তব্য।  গত জুনেই মোদির আমেরিকা সফরে এটা ফকফকা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাইডেনের সাথে মোদির, বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথাই হয় নাই। এছাড়া পরে জয়শঙ্কর উলটা ক্রেডিট নিয়েছে এই বলে যে প্রতিবেশি দেশে ভারত কম জড়াচ্ছে। তাহলে এসব সুত্রের খবর বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা কেন??  ফ্যাক্টস হল, ত এনিয়ে ওয়াশিংটনকে ভারত কিছুই জানায় নাই। কারণ বাংলাদেশকে নিয়ে একই স্বার্থের পাটাতনে ভারত-আমেরিকা আর নাই।   ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার এশিয়াকে দেখার দিন শেষ হয়েছে। বাইডেনের আমেরিকা এখন এশিয়াকে দেখতে চায় ভারতকে ছাড়াই। বরং ভারতের স্বার্থবিরোধি অবস্থান নিয়ে।  আর তা শুধু আগামিতে মোদিকে হারিয়ে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোটকেই ২০২৪ সালের ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া  এতটুকুই নয়। আরো আছে!  কী সেটা?

    বাইডেনের আমেরিকার নয়া এশিয়া নীতি-পলিসি সেখানে কেবল রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর ভারত নয়, সেই ভারত এমন হবে যে হবে যে হবে সম্ভাব্য সারা দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার পদচারণা করতে চাইছে সেই আমেরিকাকেই সমর্থন করবে, এমন এক অধস্তন অনুসারী ভারতকেই আমেরিকা দেখবার আকাঙ্খা করছে। আরো আছে – আর তা শুরু বাইডেনের বার্মা পলিসি-ই নয়; মানে বাইডেন যেমন আগামি বার্মা দেখতে চায় সেটাকেই ভারত সমর্থ করবে মানে, ওর বিরোধিতার বদলে বরং অ্যামেরিকান স্বার্থের ভিতরেই ভারত নিজের স্বার্থ খুজে নিচ্ছে বা খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এমন হতে হবে – শুধু তাও নয়।  এটা হল, সপ্তম নৌবহর কেবল বঙ্গোপসাগরে নয় আন্দামানেও হাজির থাকতে চায়।

    ঠিক যেমন বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, 
    ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে নানা খেলা চলছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই এলাকাটাকে
    নিয়ে নানা ধরনের খেলার একটা চক্রান্ত। যেহেতু আমি জানি
    , আমি বুঝি যে কীভাবে আমাকে ক্ষমতা থেকে
    সরাবে। তাদের কিছু কেনা গোলাম আছে
    , পদলেহনকারী আছে, তাদের বসিয়ে এই জায়গাটাকে নিয়ে খেলবে।
    সেটাই হচ্ছে প্রচেষ্টা। সেটা আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি”।

    কিন্তু হাসিনার এসব বক্তব্যের কারণে কিছুই বদলাবে না। যেমন, ২০০৬ সালের শেষে যদি ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে,  আজ সরকার যেমন বক্তব্য রাখছে, তখনকার  বিএনপি যদি একই রকম বক্তব্য দিত তাতে ওয়ান-ইলেভেন ঘটা বা কিছুই ঘটা আটকাতো না। তখনও ভারত মহাসয়াগরের কথার মত অন্য কথাও তো ছিল। যেমন যদি বিএনপির দিক থেকে  বলা হত এভাবে  যে,  আমাদের বদলে আমেরিকা আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবে ……ইত্যাদি! তাতে কী কিছু ওয়ান-ইলেভেন ঘটা আটকাতো? মোটেও না।
    এসরের মূল ইস্যুটা হল জনপ্রতিনিধিদের গণবিচ্ছিন্নতা।   এমনকি আজ গণ বিচ্ছিন্নতার দিক থেকে আজকের  হাসিনা সরকারের সেকালের বিএনপির চেয়ে বেশি গণবিচ্ছিন্ন। সেটা এই অর্থে যদি অন্তত একটা ফ্যক্টর বিবেচনা করি যে আমাদের মত দেশে জনপ্রতিনিধিদের অন্তত কিছুটা ভয় বা লজ্জা থাকে যে দিন শেষে আমাকে আবার জনগণের কাছেই ভোট চাইতে যেতে হবে। কিন্তু সেটা এখন থাকত হয়ে গেছে।  গত ১৫ বছর ধরে  সরকার প্রশাসন আমলা পুলিশ এমনকি যেকোন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি তা একেবারে আওয়ামি মাঠকর্মীটারও আর সেসবের পরোয়া করা বালাই নাই। কারণ, সেটাও ম্যানেজ করার মেকানিজম মাঠকর্মী-নেতাদের হাতে পর্যন্ত এসে গেছে। জনপ্রতিনিধিদেরকে ভোট চাইতে আর পাবলিকের কাছে যেতে হয় না – এটাই সে মেকানিজম।  কাজেই  এখন ক্ষমতাসীনদে্রা এখন আম-জনতাকে সব ধরণের পরোয়ার বাইরে বা উর্ধে উঠে গেছেন। এরই উলটা দিকটার নামই হল এক  “জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা” যা জন্ম দিয়েছে এক গণবিচ্ছিন্নতার দল ও সরকার ব্যবস্থার রাজনীতি।  তাই আগেই বলা যায় এসব “ভারত মহাসাগরের গল্প” বলে এবারও আরো কিছুই ফিরানো যাবে না।

    সারাংশটা হল্‌  এখন কেন আমাদের মত দেশে কেন কিছু “ফিরানো” যায় না – এর আসল কারণ পাওয়া যাবে একজন জনপ্রতিনিধির আবার গণবিচ্ছিন্নতা কী? এটা তো স্ববিরোধি কথা!!! হা এই স্ববিরোধের আরেক নাম নিশিভোট!  এথেকে সে কেন গণবিচ্ছিন্ন এর অর্থ  কিছুটা হলেও বুঝা যাবে।  আবার, মূলত  এখনকার বাংলাদেশের রাজনীতির এই – গণবিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট – এর কারণেই এখন গণ-অভ্যুত্থানের কথা বকোয়াজ, ফাকা-আওয়াজে উলটা বরং তা জুতসই “ভারতের দালালি” করার বক্তব্য হয়ে থাকবে।  যেটা অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানের কথার আড়ালে তা করছেন।  আর এতেই কার্যত তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ জাতীয় কথা ও শব্দাবলী এসবই মুখ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়,  দাঁড়াবেই! সেটা আমরা পছন্দ করি বা নাই করি!

    ভারত জামাতে ইসলামি বলে কী বুঝাতে চায়ঃ
    আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় তাদের এই ৪৪৪ শব্দের লেখায় প্রথম ১১৫ শব্দের পরের ১৮০ শব্দ কেবল ব্যয় করেছে জামাতে ইসলাম বলে এক শব্দ আর ধারণা নিয়ে। এনিয়ে সবার আগে পাঠককে একটা সাবধান করে দেই। ঐ লেখায় “জামাতে ইসলাম” লেখা হলেও এশব্দ শুধু রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম  বুঝান হয় নাই। এটা একটা দলের নাম করার আড়ালে একটা প্রতীকী শব্দ হিশাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এশব্দ দিয়ে বুঝতে হবে বাংলাদেশে ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – এর কথা বুঝানো হয়েছে।   এভাবে জামাতে ইসলাম বলে সব জিঘাংসা বিদ্বেষ উগড়ে দেওয়ার শুরু ২০০৮ সাল থেকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে যারাই গেছেন সকলেই  জামাতে ইসলাম এদুটো শব্দ দিয়ে গত ১৫ বছর ধরে  জিঘাংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে কথা বলে গেছেন।  ভারতও সেটাই রপ্ত করে কথা বলছে। এটা হল ভারতের কাছে অনেকটা ১৯৪৭ সালের আগের জমিদারি শাসনে শাসিত পুর্ববঙ্গে ফিরে যাবার (মৃত) আকাঙ্খার মত। এটাই জামাতে ইসলাম শব্দে এর বিরুদ্ধাচারণ।
    কথাটা স্পষ্ট হবে, যদি উত্তর খুঁজি যে ভারত বা  আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় এরা জামাতে ইসলাম শব্দগুলো বলে কীসের বিরোধিতা করছে? অথবা আরো স্পষ্ট করে তারা এর বদলে কী দেখতে চাইছে?

    এরা সকলেই [এবং এমনকি খুব সম্ভবত বাংলাদেশের এখনকার বেশির ভাগ হিন্দু-সহ প্রগতিশীলেরা ] এদের কাছে যে আদর্শ বাংলাদেশ কাম্য সেটা হল ১৯৪৭ সালের আগের জমিদার হিন্দুর আধিপত্যের যে পুর্ববঙ্গ – সেটাই, সেখানে যদি ফেরত যাওয়া যেত। ভেঙ্গে বললে সেটা হল কোন নাগরিক সাম্য নয়, আইনের চোখের ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য নয় বরং জমিদার হিন্দু আধিপত্য করবে আর ইসলাম-মুসলমানের কোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – সেটাকে অবশ্যই দমানো হবে শুধু না এদের সকলকে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স মেনে নিতে হবে।
    এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে কী কী মেনে নিতে হবে? সেই তালিকার নাম সেটা অন্য শব্দে বললে তা হল – মুসলমানদেরকে অসাম্প্রদায়িক-  হয়ে থাকতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের বেলায় নয়, এখনকার সারা ভারতের – মানে কেবল মোদির ভারতের না বা হিন্দুত্ববাদের ভারতের নয় – সারা ভারতের বেশীর ভাগ হিন্দু নাগরিকের আকাঙ্খা। এমন এক ভারত রাষ্ট্রই এদের কল্পনা।  আসলে যেকোন থিওলজি-তে দাঁড়িয়ে কল্পনায় যে কোন মর্ডার্ণ রাষ্ট্রের অনুমান এমন হয় ও হবেই।  আসলে যেকোন এথনিক বৈশিষ্ট ভিত্তিক আধিপত্যের কল্পনা এটা দিয়ে জাতিরাষ্ট্র কায়েম হবে হয়ত কিন্তু তা রিপাবলিক রাষ্ট্র হবে না যেটা ‘নাগরিক সাম্য’ অথবা “ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য” এটা হবে না।
    এককথায় বললে, ভারতের হিন্দুত্ববাদ (সাথে একালের ওয়ার অন টেরর) এটাই কিন্তু বাংলাদেশে  -ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ  জোরেসোরে ঘটিয়েছে।  এটা হল হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ।  অথচ তামাসাটা হল, হিন্দুত্ববাদের ভারত বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়ে যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ সেটাকেই “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী নামে বিরোধিতা করছে!
    আর ঐ যে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স এর চিহ্ন ও নমুনা হিশাবে মুসলমানদেরকে “অসাম্প্রদায়িক” হয়ে থাকতে বলার দাবি ও বয়ান এটাই সবচেয়ে বেশি করে বয়ে বাংলাদেশের নিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ ফেরত মুসলমানেরা
    ।  কারণ কলকাতায় থাকার সময়ে এসব মুসলমানেরা অসাম্প্রদায়িক থাকবে এই শর্তেই তো শিক্ষিত হতে সুযোগ পেয়েছিল।    অথচ বাংলাদেশে ফিরে এরাই প্রগতিবাদের নামে হয়ে গেল হিন্দুত্ববাদের (জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স ধারণার) ক্যারিয়ার।
    তবে এত শব্দ থাকতে বাংলাদেশের চেতনাবাদী বা “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি” কেন ইসলাম কোপাতে “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী শব্দটা বেছে নিল?  এর কারণ হল, “জামাতে ইসলাম” নামে ডেকে কাউকে কোপানো এর  পরে এমন নৃশংসতার পক্ষে কোন সাফাই হাজির করা ওদের জন্য খুবই জরুরি।  আর ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে সেই সাফাই বয়ানটা হল, যে এটা সাধারণ ভাবে “বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশকে” কোপানোর নৃশংসতা করা নয়; বরং এটা যেনবা  ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামের অপরাধের বিরোধিতা করা হচ্ছে। 

    কঠিন সত্যিটা হল,   বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক যেকোন প্রকাশকে কোপানোর নৃশংসতা করা – এটা তো রেসিজম। ঘোরতর এক Racism; এক নির্মুল আকাঙ্খা।  এক এথনিক[ethnic] জাত-ধর্ম বিদ্বেষ – ইসলামবিদ্বেষ! এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] বা অন্যের জাত-ধর্ম নির্মুলের ভয়াবহ আকাঙ্খা!!   অথচ এটাই প্রগতিশীলতা বলে চালানোর চেষ্টা  চলছে।

    তাহলে আনন্দবাজার কেন এখানে জামাতে ইসলাম শব্দ দিয়ে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ নিল?
    কারণ, সে আমেরিকাকে ভয় দেখাতে চায় যে হাসিনা আগামিতে ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে ইসলামিজম ছেয়ে যাবে। কাজেই হাসিনাই ক্ষমতায় থাক! এই হল তাদের ছদ্ম-পরিচয়ে থেকে বলা সাজেশন!

    কিন্তু এনিয়ে অ্যামেরিকান অবস্থান কীঃ
    এটা বলাই বাহুল্য যেকেউই  ক্ষমতাসীন যখন থাকে তখন সে কখনই  বিরোধি যেকোন “রেডিক্যালিজম” মানে ক্ষমতাসীনকে সশস্ত্রভাবে উতখাত করতে চাওয়া যেকোন শক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর বা নির্মমই হবে।  একারণের সবদেশের কনষ্টিটিউশনেই লেখা থাকে এসব “রেডিক্যালিজম”  করলে ওর শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। তাই  ইসলামি রেডিক্যালিজমের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান থাকা তা কোন নতুন জিনিষ নয় বরং অনস্বীকার্য বা obvious ঘটনা অবস্থান। এছাড়া ওয়ার অন টেরর এর টানা বিশ বছর এর বেশি হয়ে গেল; এখন   আমেরিকার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা-শিক্ষা তো হয়েছেই ধরে নিতে পারি। সম্ভবত সেকারণের আমাদের মত দেশে অ্যামেরিকান নীতি এখন ইসলামি রাজনীতি মানেই এর বিরোধী হতেই হবে ঠিক তা নয়। মানে কোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে ইসলামি রাজনীতি করা যাবে না ঠিক তা নয়। তবে মূল অবস্থানতা হল এই যে, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সব ধর্মের নাগরিকের অধিকার সমান বা সাম্য ধারণার মধ্যে থাকলে  ইসলামি রাজনীতি করতে কোন দলেরই সমস্যা নাই। তবে এর সাথে কথা আরো কিন্তু কথা বা ফারদার ব্যাখ্যা তারা সাথে দিয়ে বা করে থাকে। যেমন তারা সমাজে প্লুরালিজম [Pluralism]  থাকবে মানে হল,  ওদেশে বহু এবং বিরোধি মতামত-রাজনীতি থাকবে এটা মানতে রাজি থাকতে হবে। এছাড়া একথাটাই আরেকভাবে বলা ইনক্লুসিভ [Inclusive] বলে আরেক শব্দের কথা তারা বলে দেয়। যেমন যেকোন রাজনীতি-চিন্তাকে তার সকল বিরোধিতাকারীদেরকেও সাথে পাশাপাশি নিয়ে চল্তে পারতে হবে।  মানে কোন বিরোধি মতামত বক্তব্যকে চাপিয়ে কোনায় ফেলে দেয়া বা কোনঠাসা করে রাখা  – সেটা না করে বরং সবার বক্তব্যই বলতে দিতে হবে, তাতে শেষে কার বক্তব্য ও তা কতটুকু পাবলিক গ্রহণ করবে সেটাই হবে সবকিছুর নির্ধারক। এসবই মোটা দাগে অ্যামেরিকান অবস্থান। মানে সারাংশে বললে, ভারত বা আনন্দবাজারি গোষ্ঠি  ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামি জুজুর ভয় দেখালেই আমেরিকা ভয় পেয়ে পালাবে বা হাসিনাকে ফরে ক্ষমতায় রেখে দিবে আর  এই বাজারি গোষ্ঠি এতে সফল হয়ে যাবে – এগুলা বেকুরি সর্টকার্ট ও ধান্দালি চিন্তা।

    এগুলো আসলে কলকাতার কিছু মফস্বলি চিন্তা।  তাদের দুনিয়া বলতে তা কলকাতার মধ্যেই আবদ্ধ বলে মনে করে – এরা আমেরিকাকে আন্ডার এস্টিমেট করছে খামোখা। এসব তো এমনকি জয়শঙ্করই আমল করবে না,  করার কথা না। মোদি-জয়শঙ্কর বরং  ভারতে বাইডেনের পলিসিকে  কৌশলে পাশ কাটিয়ে কিভাবে মোদিকে আবার ক্ষমতাসীন করবে – এই চিন্তায় নির্ঘুম! নিজ মাথার ঘায়ে তারা নিজেরাই পাগল অবস্থায়! যদিও হাসিনাকে জি-২০ এর সভায় ডেকে আনতে পেরেছে বলে এটা মোদি সরকারের বিরাট কূটনৈতিক  সাফল্য বা মোদি আন্তর্জাতিক জগতে এক বিশাল নেতা এসব কথা ছড়িয়ে ভোটের বাক্সে এর ইতি প্রভাব যেন পড়ে ইত্যাদি এসব কান্ড তো মোদি অবশ্য করবেনই!!  এমনকি বাইডেনও জি২০ এর সভায় আসতেছেন; তাই বাংলাদেশের হাসিনার জন্য মোদিই যেন বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবেন বলে মোদি প্রপাগান্ডাও করবেন। সেটা নিজে বলবেন না অবশ্যই – তবে কয়েকটা মিডিয়ায় এমন জল্পনা-কল্পনা রিপোর্টও করাতে পারেন। যদিও তা অবশ্যই ওখানেই শেষ হবে; মানে সত্যিই মোদি কী বাইদেনের সাথে কথা বলেছিলেন তা নিয়ে আর কোন রিপোর্ট হবে না। ফুলস্টপ!

    হাসিনা জি-২০ মিটিংয়ে গেলেও বাইডেনের সাথে কোন সাইড-লাইন টকঃ
    আমরা এখনও কেউ জানিনা (এছাড়া এখনও সময় আছে) যে হাসিনা শেষে জি-২০ এর সভায় ভারত সফরে নিশ্চিত যাবেন কী না! ধরে নেয়া যাক তিনি যাবেন। যদি যানও তবু হাসিনার সরাসরি বাইডেনের সাথে বা মোদির মধ্যস্ততায় কোন কথা কী হবার সম্ভাবনা আছে? সাইড লাইনে? অনুমান হচ্ছে এর সম্ভাবনা খুবই কম। এর অন্তত একটা কারণ হল, আমেরিকার সাথে বসে কোন আর লাভ বা পরিস্থিতি হাসিনার পক্ষে আগাবে এমন বাস্তবতা সম্ভবত আর নাই। তা এখন ঢাকায় একেবারেই স্পষ্ট!  যেমন সর্বশেষ যে দুজন কংগ্রেস-ম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন তা সরকারের জন্য কোন সুখকর কিছু ছিল না। এই সফরে কংগ্রেস-ম্যানদের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব ছিল এর এক মাপকাঠি। কারণ, মোমেনের জবাব দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে কংগ্রেস-ম্যানদের প্রশ্নগুলো কাম্য বা ওয়েলকামিং  নয়! খাস বাংলায় বললে মোমেন -টেরা উত্তর- দিয়েছিলেন।  এছাড়া অতিথিরা ঢাকার পৌছানোর আগেই মোমেন অনেকবারই বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই আগমন ওয়েলকামিং নয়। তিনি বলে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সরকার আমেরিকার সাথে আর কোন চুক্তিতেই যাবেন না।  অথবা হাসিনার নিজেরই ভারত মহাসাগরে কী ঘটতে যাচ্ছে সংক্রান্ত বক্তব্য থেকে বুঝা যায় তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের কোন আশা আর সম্ভবত দেখেন না।
    কাজেই এই পরিস্থিতিতে তিনি জি-২০ এর সভায় বাইডেন বা অন্য কারও সাথে কথা বলার আগ্রহে আছে – এটা আমাদের জন্য কষ্ট কল্পিত!
    আর এসব খুটিনাটি দিক বা এর ডেভেলবমেন্ট বিবেচনায় রেখে কথা বলা – এটা আনন্দবাজার বা অগ্নি রায়ের মুরোদের মধ্যে তা আছে এমন মনে হয় না। তার আসলে একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো তাও আবার সেটা মফস্বলি বুঝাবুঝির উপর ভর করে করতে যাওয়া …… না এটাকে এখানেই ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমাদের!

    আপডেটেডঃ    ২০ আগষ্ট ২০২৩;  রাত ০১ঃ ৫৩
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

     

    বাংলাদেশ প্রসঙ্গেঃ
    ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

    ১৪ জুলাই ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০৫
    https://wp.me/p1sCvy-4In

     

                        VOA  –  MODI & BIDEN

     

    “বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা আর ভারতের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নিবে না!” – সেসব দিন শেষ হয়েছে। হ্যা কথা এটাই; যদিও কথাটা আমার নয়। কথাটা বলেছেন এসএনএম আবদি; ভারতীয় সাংবাদিক!  আবদি লিখেছেন “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” আক্ষরিক অর্থে বললে, আবদি বলছিলেন “ঘটনার মূলে হল – ভারত ও আমেরিকা আর একমতে বাংলাদেশের কোন কিছুকে দেখছে না”।

    হা বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি আর এক নয়ঃ
    আবার এসএনএম আবদি [SNM Abdi] ভারতীয় সাংবাদিক;  এক দৈনিকের সাবেক  সম্পাদক এসএনএম আবদি চলতি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আবার লিখেছেন। প্রায় একমাসের বেশি কিছুদিন আগে তাঁর লেখা নিয়ে আমার আলোচনা-মন্তব্যে তাঁর পরিচয় নিয়ে অনেক লিখেছি। তাই এবার আবার সেদিকে যাচ্ছি না। তবে দৃশ্যত আবদি আর সুবীর ভৌমিক (যিনি আবদির মত গত শতকের আরেক সাংবাদিক), এরা দুজনেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ও সম্ভবত এঁরা তাদের মিডিয়া উইংয়ে কাজ করেন বলে মনে করা হয়। অনেকে যারা ভারতের রাজনীতির উত্থান-পতন ও ট্রেন্ড-অভিমুখ মনিটর করেন, খেয়াল রাখেন এটা তাদের ধারণা বা মতামত। এদের দুজনেরই তাই একই সমস্যা যে তাঁরা পাবলিকলি বলতে পারেন না যে তাঁরা এখন কী করেন বা কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন বা কাজ করেন! কোন প্রতিষ্ঠানের বেতনের লিস্টে বা পে-রোলে তাদের নাম আছে! ইত্যাদি!

    আবদি আবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লিখেছেন গত ১০ জুলাইয়ে, ভারতের ফ্রি-প্রেস-জর্নাল নামে এক বহু পুরানা ইংরাজি পত্রিকাতে, যার শিরোনাম “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” । আমাদের মানবজমিনও আবার সে লেখা অনুবাদ করে চাপিয়েছে – “বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত থেকে আলাদা যুক্তরাষ্ট্র, নিতে চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” – এই শিরোনামে। ফলে পাঠক যারা বাংলা বা ইংরাজি যেটা থেকেই পড়তে চান পড়তে পারেন।

    আমার এলেখার বড় শিরোনাম,  “বাংলাদেশ-আমেরিকা প্রসঙ্গঃ ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!”। যেটা আবদির শিরোনামের কথাটাই তবে আমার ভাষায় লিখা বলা যায়।  আমরা বলে এসেছি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেনের ক্ষমতা দখলের পরে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা একথা বহুবার বলেছি।  ভারত কে দিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজের বিনিময়-মজুরি হিশাবে। কিন্তু তা কি চিরদিনের জন্য নাকি কতদিনের জন্য??

    এই প্রশ্নে বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী একাংশের ধারণা এটা যতদিন হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন। যদিও বাস্তবে ঘটনাটা এমন না। এভাবে ঘটে নাই। অপ্নতত এখন তো একেবারেই পরিস্কার যে দিন ফুরিয়েছে। তবুও যেমন এক. ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনে হাসিনা চেয়েছিল ভারত ২০১৪ সালের মত খোলাখুলি ন্যাংটা হয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানাক! কিন্তু মোদির ভারত বুদ্ধিমান হতে চেয়েছিল সম্ভবত! তাই এত দায় না নিয়ে দূরে দাঁড়ায় কেবল মাখনটা উঠিয়ে খেতে চাওয়া এক অবস্থান নিয়েছিল। আর এতে হাসিনা ক্ষেপে গিয়ে এক প্রকাশ্য হুঙ্কারে যে  বয়ান দিয়েছিলেন “ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে: শেখ হাসিনা” –  রিপোর্ট্ টা তখনকার বাংলা ট্রিবিউনের। কিন্তু তাতে কী এরপর ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কী নাই হয়ে গেছিল? না ঠিক তা নয়। তবে এই ভাষায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। যদি বলি এরপরে মানে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা-মোদি সম্পর্কে আর কোন নয়া চুক্তি হয়েছে কিনা – এই বিচারে বলা যায় হাসিনা-মোদি এরপর আর কোন চুক্তি হয় নাই অথবা নয়া চুক্তি করে কিছু দেয়া হয় নাই। তবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আগের করা চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন অর্থে ২০১৯ সালের পরেও অনেক কিছুই দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। আর সবসময়ই একটা রুটিন সম্পর্ক তো আছেই যেটা অবশ্যই বেশ ঘনিষ্ট। এমনকি যতটা ঘনিষ্ট সময়ে এর চেয়েও বেশি করে তা দেখানোও হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতিকালে যত অ্যামেরিকান চাপ বাড়ছে ততই ভারতের মুরোদ থাকুক আর নাই হাসিনা সরকার ততই ভারতের কোলে মুখ-গুজে – “দেখেন না কিছু করতে পারেন কিনা” টাইপের  চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এমন রিপোর্ট ভারতীয় পত্রিকায় বেশি দেখা যাচ্ছে; যা প্রথম আলো একেবারে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে হলেও তাদের বরাতের উপর চড়ে মিথ্যা করে ভারতীয় করিতকর্মের মিথ্যা বয়ান তৈরি করে চলেছে।   যদিও এর মানে এমনটা একেবারেই নয় যে ভারতের সাথে হাসিনার খাতিরের সম্পর্কটা অটুট আছে বা ধরে রাখা গেছে! সেটা একেবারেই নয়; বাস্তবতাই সেটা নয়। মূলকথা আমেরিকাকে সুপারিশ করে ভারতের সেই মুরোদই হারিয়ে গেছে!

    কিন্তু হাসিনার সাথে ভারতের সম্পর্কটা কী বা কেমন আর সবচেয়ে বড় কথা ভারত-বাংলাদেশের এই বিশেষ খাতিরদারি সম্পর্কটা ২০০৭ সালে কেন হতে পেরেছিল? তা নিয়ে আমাদের আম-জনতা লেবেলে জানা-বুঝা কম। বরং তর্ক হতে দেখা যায় এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার কীনা এনিয়ে; এবং বলাই বাহুল্য তর্কে দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ট অংশই মনে করে এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল কেন এটা হতে পারল? এককথায় এর জবাব হল, এটা আমেরিকার কারণে। অন্যভাবে বললে বড়ভাই আমেরিকা এশিয়ায় নিজস্বার্থে চীন-ঠেকাতে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতেই ভারতের ‘মুই কি হনু’ এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে সে নিজেকে অ্যামেরিকান বরকন্দাজ-প্রতিনিধি বা আমেরিকার লোকাল এজেন্ট ভাবা শুরু করেছিল। আর অন্তত টানা দশবছর এটা সে উপভোগ করেছিল যতক্ষণ না ট্রাম্প এসে  ২০১৭ সালে আমেরিকার আগের সরকার-প্রশাসন গুলোর দেয়া বিশেষ সুবিধা ট্রাম্প সেবার সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করেছিল। যদিও সেটা ছিল আসলে আগের দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নয়।

    আর এবার সব রাজনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার – এটাই ঘটেছে একালে বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরু থেকেই একট একটু করে। একমাত্র একালে যা সুনির্দিষ্ট আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে!  মূলত ভারতীয় মুসলমানদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন, বৈষম্য আর সাধারণভাবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ; যেটা প্রতিবছরের ধর্মীয় স্বাধীনতা [Freedom of religion or religious liberty – OHCHR] লঙ্ঘনের সুচকে প্রতিফলিত এবং এর  আমেরিকান কমিশনার প্রতিবছর প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করে গেছে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু এবার এসব কিছুকে ছাড়িয়ে বাইডেন মোদির বিরুদ্ধে কত সিরিয়াস আর কত আগিয়ে গেছে তা প্রকাশ হয়ে পরে যখন দেখা যায় মোদির বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন মোদিবিরোধী সকল গোষ্ঠির নেতা হিশাবে  কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে সহায়তা করছে। সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে,  গুজরাত হত্যার বিবিসিতে প্রচারিত ডকুমেন্টারি থেকে শুরু করে  আদানির শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ফাঁস ও ধ্বস নামিয়ে দেয়া, আদানিকে তুলাধোনা করে জর্জ সোরেস (গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটে হেজ ফান্ড বা hedge fund এর এক কুতুব শেঠ) এর পাবলিক বক্তৃতা ইত্যাদিতে প্রকাশিত। এরপরে রাহুল গান্ধীর প্রথমে লন্ডন ও পরে আমেরিকা সফর আর সেখানে গিয়ে সবখানেই থিঙ্কট্যাংক ও মানবাধিকার গ্রুপের সাথে দিনরাত বৈঠক – ইত্যাদি এঘটনা থেকেই প্রথম পরিস্কার হয়ে যায় যে ভারতের পিঠে হাত রাখার দিন এবার শেষ হয়েছে! ২০০৭ সালে  বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া নিয়ে আমেরিকা যেভাবে অভিযুক্ত যাই হোক না – মূল ভারত-আমেরিকান সম্পর্কই এখন আর সেই আগের জায়গায় নাই হয়ে গেছে। কারণ, বাইডেন এখন ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকে আর দেখতে চান না মর্মে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন আর বলা যায় তা প্রকাশ্যও হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় এটা এখন পরিস্কার যে সেজন্য আইন বাঁচিয়ে দুরত্বে থেকে বাইডেন যতটা সম্ভব সব ভাবেই মোদি বিরোধীদের জোটের রাহুলকে নেতা মেনে গড়ে উঠার পক্ষে আগিয়ে গিয়ে সহায়তা করেছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  তবে আমার আমেরিকা-ভারত দুরত্বের কথা লেখাতে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে, সম্প্রতিকালে মোদির আমেরিকা সফর এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব?

    স্বল্পে মূলকথায় বললে, এবারের মোদির সফর ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সফর। যেটাকে টেনেটুনে বড়জোড় সামরিক অস্ত্র কেনা-বেচা বা কিছু সামরিক ইকুইপমেন্ট ভারতে  উতপাদন করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও টেকনোলজির চুক্তি হয়েছে বলা যেতে পারে। এমনকি এই সফরে গ্লোবাল বা আঞ্চলিক কোন ভারত-আমেরিকা স্ট্রাটেজিক আলোচনা বা আমরা “কমন স্ট্রাটেজিক বন্ধু” জাতীয় কোন কথাবার্তাও হয় নাই।  তবে এশিয়ায় ভারত ও আমেরিকা উভয়েই চীনবিরোধি নিজ নিজ স্ট্রাটেজিক অবস্থানের রাষ্ট্র। যদিও তাদের মধ্যে কোন কমন জীবিত কোন প্লাটফর্মও [কোয়াডের মত যা এখন মৃত অকার্যকর অর্থে]  অবশিষ্ট নাই বা বেঁচে নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [নন অফিসিয়াল জোট ধরণের] উদ্যোগ বলে এতে ভারত-আমেরিকা চীনবিরোধী হয়ে আছে ধরে কিছু কথা হয়; তাও সেটা যৌথতায় নয়! এছাড়া ভারত কোন সামরিক জোট করতে চায় না – এই নীতির দেশ বলে এনিয়েভারতের নুন্যতম উচ্ছসিত হওয়ার বাস্তবতাই নাই। অর্থাৎ মোদির ঐ সফরটার একমাত্র ফোকাস বাণিজ্যিক। কোন রাজনৈতিক আলোচনায় সেখানে হয় নাই। বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা তো অনেক দুরের বাত!

    তাহলে হানিমুন শেষঃ
    হা শেষ! ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন ঘটিয়ে যেটা শুরু হয়েছিল – আমেরিকা বড় ভাই ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল বলে ভারত নিজেই ‘হাসিনার বাংলাদেশের’ মালিক হয়ে গেছে বলে যে ভাব নিয়ে চলছিল এর অবসান হয়েছে। এটাকে আবদি তার এবারের লেখায় বলেছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের প্রভাব বলয়ের দেশ [… Bangladesh is in India’s zone of influence, New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs. ] অথবা কখনও বলেছেন হাসিনা হলো ভারতমুখাপেক্ষী সরকার [pro-India Prime Minister Sheikh Hasina-led Awami League …।]।  এবং এভাবেই ভারত এতদিন নিজেকে ভুয়াবাজি মিথ্যা করে হলেও পরাশক্তি ভাব ধরে চলেছিল – এরই সমাপ্তিকাল!
    এর মূল কারণ, এখন বাইডেন প্রশাসন মোদি-যুগের অবসান দেখতে মনস্থ করেছে।  মোদির মুসলমান বিদ্বেষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কে ব্যবহার করে বাইডেন তাই এপ্রসঙ্গকে সামনে উঠিয়ে ফোকাসে এনেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই। এতে ইতোমধ্যেই মোদিবিরোধী জোট সবল হচ্ছে – নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভেদকে সেকেন্ডারি করে কার্পেটের নিচে তা চাপা দিতে পেরেছে – মিডিয়াও মোদিবিরোধীয় সরব হয়ে উঠছে। এমনকি এর ছাপ আদালত পাড়াতেও পড়েছে যে মোদির বিরুদ্ধে রায় দেয়া যেন এখন সহজ ও সম্ভব।   কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে থাকা প্রতিষ্ঠান সিবিআই, ইডি, রাজ্যপালের অফিস বা আয়কর বিভাগ লেলিয়ে দিয়ে  বিরোধীদের শাসিত রাজ্যে মোদি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার চরমে উঠেছে – আর এর অবসানে বিরোধীরা জোটবদ্ধ ও নিজেরা ভোকাল হওয়া সম্ভব বলে মনে করতে শুরু করেছে –  বাইডেনের একটু দুরবর্তি সহায়তাতেই!
    এসবের সারকথা হল, যদি ২০২৪ সালে মোদি যদি পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন তবে মোদিবিরোধী সেই ভারতের উপর অ্যামেরিকান প্রভাব অনেক বেশি হবে।  চাই কী সেই ভারত, আমেরিকার এশিয়া নীতি যেমন বার্মা নীতির সাথে এলাইন [align] বা সমপাতিত করে নিজেকে পুনর্গঠিত হতে পারে বলে আমেরিকার মনে আশা জাগতে পারে।  আর সেই আমেরিকা হবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা যেকথা বলবে সেটাই শেষ কথা! এনিয়ে ভারতের সাথে কোন আলোচনাই নয়।  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক সেই অভিমুখেই ইতোমধ্যে   রওনা দিয়ে দিয়েছে – এটাই আবদির এই নয়া লেখার প্রধান দাবি!!

    এজন্যই আবদি বলছেন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হঠাত সক্রিয় ভুমিকার বিরুদ্ধে ভারত বোবা হয়ে গেছে ও আছে [… New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs]। বাংলাদেশের ভিতরেও যতটা শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে নিজস্বার্থ উপযোগী করে আকার দিয়ে, এজেন্সি দিয়ে দাঁড় করিয়ে এতদিন রাজত্ব করছিল এমন সবকিছু থেকে আপাতত গুটিয়ে প্রত্যাহার শুরু হয়েছে।  আর হয়ত তা সীমিত করে পুনর্গঠিত করার ইচ্ছায়ও হতে পারে। এসবেরই সোজা মানে হল,  যেই “বাবা আমেরিকা” ভারতকে পড়শিদের উপর কিছু মাতব্বরি করার ক্ষমতা দিয়েছিল  সেই বাবা এখন ভারতের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ভারতকে ফকির করে দিচ্ছে।

    যে রাশিয়ান জাহাজের মালামাল খালাসের মুরোদ ভারতের হয় নাইঃ
    আবদি তার লেখার শেষের দিকে বাংলাদেশের রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কিছু রাশিয়ান ইকুইপমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাওয়া এক রাশিয়ান জাহাজ-কে কিভাবে মাল খালাস না করে তা রাশিয়ায় ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছিল এর বর্ণনা দিয়েছেন – একটা বড় উদাহরণ হিশাবে।  ঘটনা হলো রাশিয়ান জাহাজটা ছিল আমেরিকার স্যাংশন খাওয়া তালিকায়।  তাই ঐ জাহাজে বাংলাদেশে ভীড়তে গেলে আমেরিকা তা রোধ করতে বাংলাদেশকে আগাম তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছিল। এতে প্রতিক্রিয়ায়  রাশিয়া ও বাংলাদেশের সাথে আলাপ করে ভারত লিড নিয়ে রাজি হয়েছিল যে ঐ নিষিদ্ধ জাহাজ সে কলকাতার হলদিয়ায় ভিড়িয়ে মালামাল নামিয়ে সহজেই সড়ক পথে সেসব মালামাল বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু বিধি বাম! কারণ সেদিন শেষ হয়েছে। তাই আমেরিকা ভারতকেও তার আপত্তির কথা জানিয়ে দেয় যাতে সে নিষিদ্ধ জাহাজ নোঙ্গর না করায় কলকাতা। আবদি লিখছে, আমেরিকা আপত্তির পদক্ষেপে এগিয়ে এলে ভারত পিছু হটে যায়!

    শুধু তাই নয় ঐ লেখার শেষে আপনি একটা মরাল লিখেছে এভাবেঃ
    এই গল্পের শেষে প্রকাশিত নৈতিক ভাষ্যটা হল, আমেরিকা এখন মনে করে তার কথাই শেষ কথা – এর উপর কোন কথা নাই। এবং পুরান দোস্ত ভারত অ্যামেরিকান এই নয়া অবস্থান পছন্দ বা অপছন্দ যাই হোক ভারতকে এমন অ্যামেরিকান ইচ্ছাকে মেনেই বেচে থাকা অভ্যাস করতেই হবে!  [“The moral of the story is that the US believes in having the last word, and even allies like India must learn to live with it whether they like it or not.”। মানে মোদিকে এমন অপমান হজম করতে শিখতে হবেই!

    কেন আবদি এমন সংবাদের বাহক হলেনঃ
    ব্যাপারটা হলো, এই নতুন অভিমুখ সম্পর্কে অনেকদিন ধরেই বলছি। কিন্তু ভারতের  কেউ এসব কথাকে সত্যি বলে বলে আমাদেরকে জানায় নাই। বরং উলটা প্রপাগান্ডা করতেই দেখেছি। তাহলে এই অসহায় ভারত – আমেরিকার সামনে গড়াগড়ি খাওয়া এই ভারতের ইমেজ আমাদের সামনে আনার দায়িত্ব আবদি কেন নিলেন? আগে উপরে লিখেছি বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের ততপরতা অন্তত আপাতত গুটিয়ে রাখার কথা কানে আসার কথা বলেছি। আবদির এই লেখা কানে আসা সেসব সংবাদ নিয়ে নিশ্চয়তা যোগালো বলা যায়।  তার মানে ভারত এই খবর নিশ্চয়তা দিয়েই ছড়িয়ে দিতে চাইছে?? মানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ বা গোষ্ঠিতে ভাঙ্গা-গড়া না হোক অন্তৎ ক্রমশ এদের ভাঙ্গার কথা নিয়মিত শুনব আমরা – তাই কি???

    যাকিছু আপোষে নিজ ইচ্ছায় আসতেই আছে ও থাকবে  তা সাদরে গ্রহণ কর জনগণ! জনগণ বুদ্ধিমান!

    সবশেষে আবদির কিছু সত্যবচনঃ
     আবদি এখানে যে অবস্থান নিয়ে লিখেছেন তা হল বাংলাদেশে হাসিনার ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি আর গুম খুন হত্যায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের যত অভিযোগ সেসবকেই তিনি সত্য বলে গ্রহণ করে নিয়ে কথা বলেছেন। এসব পাশ কাটিয়েও তিনি সদর্পে বলছেন হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় রাখতে হবে! কেন? তার একটাই সাফাই আর তা হল, বাংলাদেশে ভারতের গভীর স্বার্থ আছে যে হাসিনা-ই রক্ষা করে দিতে পারবে।  অর্থাৎ কোন ন্যায়-ইনসাফ বা আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায্যতা নয়। শ্রেফ ভারতের স্বার্থ – কাজেই আব্দি ভারতের সেই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন????? বড়ই অদ্ভুত না! মানে কোন মানুষ কী কোন ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তি ছাড়াই – আমার  ওইটা ভাল লাগে বা ওইটা আমি খাবো আমাকে এনে দেও ইত্যাদি এভাবে কথা বলতে পারে???

    তিনি এটাও পরিস্কার করেই বলছেন তাই এই চাওয়া – ভারতের স্বার্থ বলে তা পেতে চাওয়া এটা হাসিনারও (বেইনসাফি) উচ্চাঙ্খা বটে; এমনকি এর মানে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মই থেকে ছিটকে পিছলিয়ে পড়ে যাওয়া এমনকি যেটা বাংলাদেশকে এক দলের ও এক নেতার বাংলাদেশে পরিণত করবে…। [That would no doubt serve India’s national interests; and of course, fulfil Hasina’s ambitions; but would also mean ignoring the democratic backsliding that has reduced Bangladesh into a one-party, one-leader nation.]

    তবুও এটাই তাঁর আকাঙ্খা! কি তামসা!

     

     

    আপডেটেডঃ  ১৪  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

  • ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!
    গৌতম দাস

    ৯ জুলাই ২০২৩  ভোর ০৩ঃ  ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Hx

     

     

     

     

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কথাটা ভেঙ্গে সরাসরি উদোম করে দেখালে এর মানে হল, নাগরিক রাষ্ট্রে কোন ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা রাখাই যাবে না। বিশেষ করে ইসলামি বিয়ে। এর বদলে ধর্ম নির্বিশেষে সকলকের জন্য একই (তাই ইউনিফর্ম বা সার্বজনীন বলা) এবং একমাত্র ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইনেই’ বিয়ে করতে হবে। এই হোল সিভিল কোড বুঝনেওয়ালাদের দাবি।   তাদের সার্বজনীন ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ মানে হল, কোন  বিয়েকে ধর্মের সংশ্লিষ্টতাহীন করে সাজাতে হবে; যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এবং ধর্মীয় বিয়ে আর রাষ্ট্র আমল করবে না; এর বদলে নাগরিক হিশাবে দুই পুরুষ-নারী নাগরিকের মধ্যে বিয়ের আইন করা হবে।
    একথা শুনে অনেকের মনে হতে পারে বা ভালই তো!!! ধর্ম বা হিন্দু-মুসলমান নিয়ে ক্যাচালের চেয়ে এই ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ তো খুবই ভালো!!! এর মধ্যে বেশ প্রগতিশীলতা আর এডভ্যান্সমেন্টও দেখে ফেলতে পারে কেউ!!! ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশংসায় আমরা কাউকে খুশিতে উত্তেজিতও হয়ে উঠতে দেখতে পারি। আর পোগতিশিল=হিন্দুত্ববাদীরা খুশিতে নেচে উঠতে পারে এই বলে যে এবার ‘মুসলমান কোপানির’ একটা ভাল অস্ত্র পাওয়া গেছে!!
    হ্যা ঠিকই তাই। ‘ইউনিভার্সাল সিভিল কোড’ এর দাবিদারেরা অসৎ মনে ও উদ্দেশ্যে ইসলামের সাথে রাষ্ট্রের একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিরোধ খাড়া করতে, মুসলমান কোপাতেই এই দাবি করে থাকে। তাই এনিয়ে একটা মজার দিক বা মিলের দিক দেখিয়ে দেই তাহলে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে।
    বাংলাদেশে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর দাবি সবচেয়ে উচ্চকন্ঠে করে থাকে কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিবি। এর খাস প্রমাণ  পাওয়া যাবে এখানে  ২০২৩ সালে সমাপ্ত সিপিবি এর দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত ও প্রকাশিত প্রস্তাব যা সাপ্তাহিক একতা  পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সেখান থেকে। তাতে ১২ নম্বরে যার উপশিরোনাম [১২. নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে] এর অধীনে চার নম্বর দাবিতে লেখা আছে দেখেন  [৪.      ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।] ।    এবং বলাই বাহুল্য তার নারী (এনজিও) সংগঠন মহিলা পরিষদও এই দাবি করে থাকে। অন্যদিকে,  আগামি বছরে মানে ভারতের আবার কেন্দ্র সংসদ নির্বাচন আসন্ন। তাই মোদি বা বিজেপির এবারেরও মুসলমানদেরকে কোনঠাসা করে রাখার সফল নেতা হিশাবে মোদির  অন্যতম নির্বাচনী ইস্যুও হল এই ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কায়েম।

    তাহলে সিপিবি আর মোদির মধ্যে মিলটা কোথায় আর কেনইবা এই মিল দেখছি আমরা???   বলাই বাহুল্য এই মিল হল একই ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান কোপানির খায়েসজাত – এটাই তাদের মধ্যে কমন;  তাই এই লক্ষ্যের ঐক্য!!
    তবে যারা এখনও প্রগতিশীল আর সাথে বাড়তি হিশাবে যাদের কেউ কেউ হয়ত নারীবাদিও তাদের জন্য বলে রাখি যদি তারা সাদা মনে – শ্রেফ বুঝবার জন্য মানার জন্য না – যারা জানতে চান যে কেন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ দাবিটা ভুল তাহলে তা এলেখার শেষের দিকে “আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ”  – এই উপ-শিরোনামে লেখাটা পাবেন; পড়ে নিতে পারেন।

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ যখন হাতিয়ারঃ
    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই শব্দ কয়টা শুনলে অনেকের কাছে পবিত্র বা উচ্চমার্গীয় মনে হতে পারে, তাই অনেকের ক্ষেত্রে কিছুটা ভক্তিতে অজান্তে মাথা ঝুঁকেও যেতে পারে; সেটা এই বলে যে এটা একটা খুবই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ কোন পরম জ্ঞান হবে নিশ্চয় যা কোন প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় খুবই কাজের ও উপাদেয়!!!

    কিন্তু  আমি দুঃখিত পাঠক। এই অনুমান একেবারেই মিথ্যা শুধু না বরং উলটা। এটা আসলে মন ভর্তি যাদের ইসলাম বিদ্বেষ, যারা তক্কে তক্কে থাকে কিভাবে মুসলমানদেরকে সমাজে নিচা দেখাবে –  মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানি বা জাগানি কিছু প্রগতিশীল ভাব ধরাদের কারবার এটা; যারা আসলে হিন্দুত্ববাদী। তাদের কাছেই – মুসলমান কোপানির এক ভাল হাতিয়ার হল এই শব্দগুচ্ছে – ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’।

    শব্দগুলো ইংরাজিতে যার বাংলায় ইতিবাচক অর্থে সারকথা হল,  একটা রাষ্ট্রে ধর্মের বাইরে বিয়ে সংক্রান্ত আইনী ধারা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই কী তা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’এর পরিণত হবেঃ
    না একেবারেই না। তবে মুসলমানবিদ্বেষ যদি আপনার গোপন খায়েস হয় তবে এমন জাতিরাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে আপনি মুসলমান কোপানি বা বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে হাজির করবেনই। আর সেজন্য  ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই হাতিয়ার তুলবেনই। ফলে এই অসততার এমন আউটকামই আমরা হয়ত দেখব। তাই এককথায় বললে, রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই তা গড়ার মূল উদ্দেশ্যই তো হল নাগরিক বৈষম্য দূরে রাখা। ধর্মীয় বা যে কোন পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক অধিকারে সকলেই সমান – এই নীতির বাস্তবায়ন। কাজেই মুসলমান বা ধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অবস্থান নেয়া অপ্রয়োজনীয়; আর তাতে এতে  বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে যে কোন রাষ্ট্র গড়া বা রূপ দেয়া হবে যেটা অগ্রহণযোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য হ্যে দাঁড়াবে যা কাম্য নয়।   

    একথা সত্য যে, একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ধর্ম বা অন্যকোন পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন ভাবে তার সকল নাগরিকের সকল ‘মৌলিক নাগরিক অধিকার’ সুরক্ষা দিবার প্রতিশ্রুতিতেই কেবল জন্ম নিতে পারে বা হওয়ার কথা।
    কিন্তু বাংলাদেশ মানে যে পুরাতন অখন্ড ভারত ভেঙ্গে আজ যে তিন রাষ্ট্র হয়েছে  এর একটা রাষ্ট্র – এই বাংলাদেশে (সাথে হিন্দুত্ববাদি ভারতেও) কিছু পোগতিশিল কমিউনিস্টের এই ধারণা যে – না এভাবে চলবে না। রাষ্ট্রকে ইসলাম কোপাতেই হবে। মুসলমান বিদ্বেষী ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানি ইত্যাদি এমন বৈশিষ্ট তাদের “কল্পিত আধুনিক রাষ্ট্রের” থাকতেই হবে। নাইলে আর সেটা তাদের জাতিরাষ্ট্র হয় কী করে – এতে তো “মজা” নাই। অথচ এটা আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ বা এক্তিয়ারই নয়; বা উদ্দেশ্যই নয়। কারণ এমন রাষ্ট্রে মুসলমান নাগরিককে যদি চিন্তায় খাটো আর নিচা সংস্কৃতির বলে মিথ্যা হলেও তুলে ধরতে করে তবে তা এক চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই হবে!  তবে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই যদি তাদের মজা পাবার উপাদান হয় তো বলার কিছু নাই!  অতএব একারণেই ভারতে ১৯৪৭ সালের পরে সম-নাগরিক অধিকারের নয় বরং হিন্দু আধিপত্যের ভারতবর্ষ মানে হিন্দু জাতশ্রেষ্ঠত্বের এক ভারত জাতিরাষ্ট্র সেখানে গড়ে উঠেছে। আর তাই-ই হয়েছে আমাদের বাস্তবের ভারত! আর এর প্রভাবে অন্য দুই রাষ্ট্রও তাই একই!

    তবে বিশেষ করে পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাশ হবার পরে জমিদারি হারানো জমিদার হিন্দুরা প্রতিশোধ নিতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। এই ভেবে যে এই পার্টি ধর্মবিরোধী; কাজেই এদের ধর্মবিরোধী রাজনৈতিক ধারার আড়ালে বসে তারা মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণাছড়ানি বয়ান প্রগতির বয়ান বলে হাজির করতে পারবেন। প্রগতিবাদিতার আড়ালে এরা রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইসলামের সাথে সংঘাত বাধাতে আর রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপাতে বা এভাবে রাষ্ট্রকে সাজাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যদিও এতে কারও লাভ হয় নাই। কারণ, প্রতিশোধ নেয়া মানুষের করণীয় কাজ হতে পারে না। তবু এই ততপরতাকেই আমরা  এই অঞ্চলে চিনি পোগতিশিলতা-কমিউনিস্ট বলে। তারা আমাদেরকে ধর্মচিন্তা-মুক্ত বিশেষত ইসলাম-চিন্তা মুক্ত এক সমাজ-রাষ্ট্র হাজির করতে চায়; আর এভাবে তারা তাদের জমিদারি হারানির ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে তারা কায়েম করতে বদ্ধপরিকর! তাই তাদের এক নম্বর কৌশল হল আধুনিক রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় বা গায়ে পড়ে ভাবে হলেও ইসলামের বিরুদ্ধে খাড়া করে হাজির করা।

    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথাঃ
    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তেমনই এক ইস্যু যা দিয়ে পোগতিশিল-কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রকে মুসলমান কোপানোর কাজে ব্যবহার করতে চায়; আর তা পারবে বলে তারা মনে করে। তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা বিশেষত ইসলামি ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা ভেঙ্গে চুরমার করতে চায়।
    আর এটাকেই তারা ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ তাদের কথিত উচ্চমার্গীয় জ্ঞান জাত ততপরতা বলে আড়াল নিয়ে দাবি করে থাকে! কিন্তু আড়ালে কেন?
    কারণ, প্রগতিবাদীদের ৯৯.৯৯% এর ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট” জিনিষটা কী এসম্পর্কে পড়াশুনা-বুঝাবুঝি একেবারেই নাই। বেশির ভাগই এর নাম শুনে নাই।  তবে এর অন্তত একটা কারণ হল, মার্কসের কোন রচনায় রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট বা আধুনিকতা বা রিপাবলিক রাষ্ট্র ইত্যাদি সেখানে কোন প্রসঙ্গই নয়, হয় নাই। আবার এমনকি তাদের মধ্যে যারা অতি দিগগজ  মানে ধরেন যারা লন্ডনে গিয়ে ইংরাজী সাহিত্যে পিএইচডি করে এসেছেন – এরাও অন্তর্ভুক্ত মানে একই অবস্থা তাদের! তাই এরা কখনও ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে দুপাতা লিখেছেন জানা যায় না। ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ কে প্রগতিশীলতা-কমিউনিস্ট এর সাথে রিলেট করে কিছু ব্যাখ্যা করেছেন জানা যায় না।  অর্থাৎ কার্যত যেহেতু তাদের চিন্তার মুরোদ নাই – অক্ষম উত্থানরহিত; তাই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে তাদের হাউশ তাদের খায়েসের বাতচিত তারা কেবল তাদের মধ্যেই এক আড়ালের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। এবং অলিখিত আলোচনাতেই আটকে রাখেন!
    অথচ এরা প্রত্যেকে আধুনিক রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপানির অগ্রসেনানী সৈনিক! রাষ্ট্রকে তারা তাদের ইসলামবিদ্বেষ এর খায়েস পূরণের হাতিয়ার করে অপব্যবহার করতে চায়!

    ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও রিপাবলিক রাষ্ট্রঃ
    আপন ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে একটা নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিশাবে দেখা এটা ইউরোপের কোন দেশে নাই; কিন্তু একমাত্র কেবল আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে এটা পাওয়া যাবে। পিছনের অনেক কারণের মধ্যে মূল কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান বা ওসমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে এই সাম্রাজ্য-ভুখন্ডকে কার্যত বৃটিশ ও ফরাসীরা  নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া থেকে। এরপর এরা ওসব ভুখন্ডের মুসলমান বাসিন্দাদেরকে শাসন করতে গিয়ে – পুরানা ক্রুসেডে ইউরোপের হারের কথা না মনে পড়ে যায় – এটা একটা ভয়ের কথা ছিল। এজন্য যে নতুন শাসন-তত্ব শাসক বৃটিশ ও ফরাসীরা ১৯১৮ সালের পরে ওসমান সাম্রাজ্য ভুখন্ডে  চালু করেছিল তা হল, কথিত নয়া রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করা নামে এক অদ্ভুত বায়না সেখানে তারা হাজির করেছিল। গত ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফিলিয়া সম্মেলনের কখনও অথবা ক্লাসিক্যাল ইউরোপীয় রাষ্ট্র-চিন্তায় কখনও এমন কথা শুনা যায় নাই।  বরং উল্টা আমেরিকা নিজে ১৭৭৬ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশ হবার পরে পনেরো বছরের মধ্যে ১৭৯১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হলে সেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো কী কী তা বর্ণনা করতে গিয়ে সেখানে এই প্রথম কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার বলতে তাতে ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – এটাকেও এক নাগরিক অধিকারের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আর এথেকে এটা প্রমাণ করেছে যে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারনার সাথে ধর্ম পালনের কোন বিরোধ নাই। তাই রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করার কথা বুজরুকি ও শয়তানি!
    কিন্তু এই শয়তানিটাই আপন হয়ে দাড়ায় আমাদের এই অঞ্চলে হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের অনুসারি, হিন্দুত্ববাদিদের কাছে।   ফলে তা প্রগতিশীল ও কমিউনিস্টদের কাছেও।

    সব সিভিলাইজেশনই ধর্মতত্বের হাত ধরেই আগিয়েছেঃ
    কিছু কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। সারা দুনিয়াতে মানব সভ্যতার বয়স  ধরা হয় প্রায় ছয় হাজার বছরের বেশি। ইতিবাচক অর্থে মানব সভ্যতা (human Civilization) এর সোজাসাপ্টা মানে হল যখন থেকে মানুষ যাযাবর জীবন, ফলমূল খাবার টোকায়া খাওয়ার জীবন ছেড়ে এবার কৃষিকাজ শিখে চাষাবাদ শুরু করেছিল। আর চাষাবাদের জীবনের পুর্বশর্ত হল, থিতু হয়ে কোন এক নদীবিধৌত উর্বর ভুখন্ডে বসতি স্থাপন করে বসে যাওয়া  – আগের কোন যাযাবর জীবনের বিপরীতে।  যেটাকে আমরা একালে এমন একেক ভুখন্ডে গড়ে উঠা বসবাস যা থেকে আসলে নানান এথনিক [ethnic] বৈশিষ্টে ভিন্নতায় আমাদের নিজ সভ্যতায় বসবাস শুরু হয়েছিল – আর এটাকেই আমরা সিভিলাইজেশন অর্থে সভ্যতা বলছি।  যা আসলে মূলত এথনিক অর্থে জাত-সভ্যতা! আর  এই এথনিক পরিচয় বলতে যার ভিতরের এক প্রভাবশালী উপাদান হল ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়!  আর প্রগতিশীলতার নামে আমাদের অনেকের মনে বৈষম্যহীন অধিকারের রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চেয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এরা  ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এর সাথে সংঘাত বাধানোকে অনিবার্য মনে করে থাকে। আর এখান থেকেই সব বিরোধের উতপত্তি।
    এখন এই ছয় হাজার বছরের মধ্যে প্রায়  দুহাজার বছর আগে যীশুর জন্ম।  এর মধ্যে নবীর যুগও এসেছে। আর এই সময়কালে সবসময়ই আমরা অনেকগুলো মানে কোন না কোন একটা ধর্মতত্বের হাত ধরেই হেটেছি। আমাদের হাত খালি থাকে নাই। আর ইতিবাচক অর্থে দুনিয়ায় আমাদের সকল সভ্যতা ধর্মতত্বের হাত ধরেই এপর্যন্ত হেটে এসেছে। পরবর্তিতে ১৪৫০-১৫৫০ এই সময়কালকে বলা হয় বিজ্ঞানের যুগ শতবর্ষ – যখন একনাগাড়ে বিজ্ঞানের গুরুত্বপুর্ণ আবিস্কার গুলো ঘটেছিল। কিন্তু এরপরেও এসময়ে “বিজ্ঞান” এসে যাওয়াতে দুনিয়া থেকে কোন ধর্মতত্ব  তো নাই হয়ে যায় নাই! বরং বলা যায় বিজ্ঞানকে পাশে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ধর্মতত্ব তার জায়গাতেই আছে। মাঝে একটু কেবল সময় লেগেছে এডজাস্ট হতে পরস্পরকে জায়গা করে দিতে।  তাই শেষ বিচারে  মানুষের এখনকার চিন্তা-চর্চার রূপ যেখানে গিয়েই ঠেকুক চিন্তা-চর্চার শুরুর দিকে সবকিছুই ছিল ধর্মতাত্বিক বৈশিষ্ঠের। কাজেই ধর্মতত্ব জিনিষটা গায়ের জোরে ত্যাগ করার বিষয়ই নয়! আর কাকে ত্যাগ করব আমাদের সকলের আদি না হলেও পুরাতন সব প্রজন্মকে??? এটা কী সম্ভব?? কাজেই  ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিশাবে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রেখে দেওয়া একটা খুবই উপযুক্ত এপ্রোচ বা আগানোর উপায়। কিন্তু কাজ আরও আছে আর তা করতে হবে বুদ্ধিমান হয়ে!

     

    তাহলে আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ
    খুবই সহজ!
    ১। সবার আগে আমাদের মনের ভিতরের যেকোন ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি বাইরে বের করে ফেলে দিতে হবে; তাতে আমরা যার যার ধর্মপালনের লোক হই আর নাই হই না কেন! ধর্মপালন বা মানা না মানা আপনার নিজস্ব বিষয়। কিন্তু ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি ত্যাগ করতেই হবে! নাগরিক যার যার ইচ্ছা হবে তাকে তার ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে। আর আমরা তার ফেলো বা পাশের নাগরিকেরা আমাদের দায়িত্ব হবে আমরা নিজেরা যেই ধর্মই পালন করি অথবা কোন ধর্মই পালন না করলেও ফেলো নাগরিকের অধিকার রক্ষায় আমাদের সহযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে হবেই।
    ২।  আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা মানেই যেগুলো বহু পুরানা ট্রাডিশন হিশাবে কোন না কোন ধর্মতত্বের ঘরে বসে, হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। ধর্মীয়-কালচারাল ও সামাজিকতায় মাখামাখি হয়ে থাকা এই ট্রাডিশনে হস্তক্ষেপ বা ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়; আর এটা রাষ্ট্রের কোন কাজ বা এক্তিয়ারই নয়। বিশেষত এক হিশাবে দেখলে এসব ট্রাডিশন মানা না মানা তো পারসোনাল ইস্যু।  তবে রাষ্ট্রের দায় আছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষা দেওয়ার। তাই সেই কর্তব্য পালন করার প্রয়োজনে ট্রাডিশনাল বিয়ের প্রথায় কোন হাত না লাগিয়ে রাষ্ট্র বরং কিছু বাড়তি কাজ করণীয় বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে। যেমন বিয়ে ধর্মীয়-সামাজিক রীতিতেই ট্রাডিশন মেনেই চলবে। তবে এর আর বাড়তি দিকটা হতে পারে হলঃ ক. এই বিয়েটা সরকারি লাইসেন্স নেয়া কাজি বা রেজিষ্টার্ড কাজির কাছে লিপিবদ্ধ (রেজিষ্ট্রেশন) করাতেই হবে। যেই কাজিই আবার বিয়ের সাতদিন বা একমাসের মধ্যে (যেভাবে বলা থাকবে) সরকারি ডাটাবেজে এই বিয়ের সব তথ্য ফিড করা হয়েছে তা নিশ্চিত করবে – ঐ বিয়ের ডকুমেন্টে বা কাবিনে ডাটাবেজ সংরক্ষকের প্রতিস্বাক্ষর যুক্ত করে দিবে। এতাই মূলত রেজিস্টার্ড কাজির রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূল করণীয় কাজ হবে।
    একচুয়ালি, এটাই বাংলাদেশের বর্তমান কাজি অফিসের কাজের প্রচলিত নিয়ম; যেটা ইতোমধ্যেই চালু হয়ে আছে ১৯৮৮ সাল থেকে মানে, এরশাদের আমলে। এবং সেসময় আমাদের রাষ্ট্রের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তো ভেঙ্গে ফেলতে বা হস্তক্ষেপ করতে হয় নাই। বরং সেসময় মূল কনসার্ণ ছিল পুরুষেরা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আর যেকোন মনের দশা খেয়ালে থাকা অবস্থায় তাঁর নারীকে তালাক দিয়ে দিচ্ছিল। এই দায়িত্বহীন কাজগুলোকে শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে দেখা গেল ১৯৮৮ সালের আগে বিয়ে হত পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জিন কে ডেকে এনে দুজন দোস্তকে সাক্ষী রেখেই বিয়ে সম্পন্ন মনে করা হত। কিন্তু কোথাও এই বিয়ের তথ্য সংরক্ষণ করার কোন সিস্টেমই ছিল না।  আর তাই দায়িত্বহীন তালাক তখনই শৃঙ্খলে আনা সম্ভব হবে যখন বিয়েটা যে হয়েছিল এর ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে ও সার্টিফাই বা সার্টিফিকেট দেবার ব্যবস্থা থাকবে। এসব কারণেই ১৯৮৮ সাল থেকে বিয়ের ডাটাবেজ সংরক্ষণ ভিত্তিক কাজি-রেজিষ্টার্ড বিয়ে ব্যবস্থা চালু করা গেছিল। তবুওও এতে এখনও  যেটা অসম্পুর্ণ অংশ তা হল, মুসলমান বাদে অন্য নাগরিকদের  বেলায় এমন কোন রেজিষ্ট্রশনের সহজ ব্যবস্থাটা এখনও নাই।  অথচ রাষ্ট্রের দিক থেকে দরকারি হল, কোন ধর্মীয় ট্র্বেডিশনের বিয়ে সেটা হোক বা না হোক – সমান্তরালভাবে সকল নাগরিক মাত্রই সবার বিয়ে রেজিষ্টেশনেরে ব্যবস্থা থাকতেই হবে। কারণ, এটা না থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে নারী নাগরিকেরা। নিশ্চয় আমরা সকলে মানব যে বিয়ের পরে সামাজিক পারিবারিক দায়ীত্ব ফেলে পুরুষেরা সোজা হেটে চলে যেতে খুবই ওস্তাদ!

    অতএব, কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ ব্যবস্থা চালু একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। সকল নাগরককে একই খুড়ে মাথা কামিয়ে দিতে হবে কেন? মানে ধর্মবিহীন বিয়ের ব্যবস্থা কায়েমই একমাত্র রাষ্ট্রের করণীয় এটা ভিত্তিহীন কথাই শুধু নয়, এই বক্তব্য ধর্মবিদ্বেষী যা মূলত ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাজীবীদের অসৎ কাজ হবে। এককথায় ‘ইউনি্ফর্ম সিভিল কোড’ এর উদ্দেশ্য মুসলমান কোপানি আর ঘৃণাচর্চার দোকান খুলে বসার সামিল! আর  মূলত  ধর্মপালনের কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রের কাজ তাতে ধর্ম তার এক্তিয়ারের মধ্যে কাজ করবে আর রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে তার এক্তিয়ার ও দায়ীত্ব পালন করে যাবে। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসততায় ইসুলাম বা মূসলমান এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে খাড়া করা শুধু অন্যায় নয়, এটা অপরাধও!

    তাহলে মোদি এখন কী করছেনঃ
    মোদি গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরেক বৈষম্য চালু করতে পায়ে পারা দিয়ে হলেও জবরদস্তিতে  ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ চালু করার হুমকি দিয়ে চলেছেন। তাঁর এই ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করতে এখানে এসে তিনি মর্ডানিস্ট হবার ভান করছেন। যাতে মুসলমানেরা আরও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়।  কিন্তু ভারতের অনেক পুরানা রাষ্ট্র বলে এর কিছু সুবিধাও আছে।  তাই তাদের বিচার বিভাগের অংশ প্রতিষ্ঠান ‘আইন কমিশন’ এর মতামত যথেষ্ট শক্তিশালী।  এমনকি কোন আইন বদলাতে গেলে সেবিষয়ে আইন কমিশনের মতামত ভালই গুরুত্ব পায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

    কলকাতার আনন্দবাজার ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর বাংলা করেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। ইলেকশনের আগে আর পিছনে অ্যামেরিকান সমর্থনে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদল এখন একজোট হচ্ছে বলে  অনেক কিছুতেই আর মোদির টাকা খেয়ে মিডিয়া কাজ করছে না। তাই আনন্দবাজার নিজেই জানাচ্ছে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ নিয়ে ভারতের আইন কমিশনের মতামত কী? নিচের সেই পুরা প্যারাগ্রাফটাই আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা হয়েছে দেখেন।

    “কী বলেছিল ২১-তম আইন কমিশন?”
    সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলবীর সিংহ চৌহানের নেতৃত্বাধীন ২১-তম আইন কমিশনের মত ছিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকারের মতো পারিবারিক বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান, পার্সি, জৈন সকলের একই আইন চালু করার প্রয়োজন নেই। পারিবারিক আইনে সংস্কার নিয়ে কমিশনের বক্তব্য ছিল,“সংঘাতের সমাধান ফারাক মুছে ফেলা নয়। অধিকাংশ দেশ এখন ফারাককে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফারাক থাকাটাই মজবুত গণতন্ত্রের প্রতীক। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এখন কাঙ্ক্ষিত নয়, প্রয়োজনও নেই। তার বদলে যেখানে বৈষম্য রয়েছে, সেগুলো দূর করা উচিত।”

    অর্থাৎ এককথায় বললে আইন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সাথে নাই। তবু মোদি ডেসপারেট ভাবে আগাচ্ছেন। আর ওদিকে এতদিন কংগ্রেস-কমিউনিস্টেরা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কে মুসলমানেদেরকে প্রগতিশীলতায় শিক্ষিত করার আইন মনে করত। কিন্তু এখন?
    এখন এরা মোদিবিরোধী প্রায় সকলেই অবস্থান বদলে নিয়েছে। তারা এখন আইন কমিশনের বক্তব্যকেই নিজেদের বক্তব্য বলে প্রচার করতে নেমেছে। সিপিএম এর পরিবর্তিত অবস্থান পাওয়া গেছে তাদের গণশক্তি পত্রিকায়। নিচে সে অংশ তুলে আনা হয়েছেঃ

     সিপিএম এর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি 
    বিবৃতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে তৎপরতার বিরোধিতা করে পলিট ব্যুরো বলেছে, এই বিষয়ে ফের আলোচনা শুরু করেছে বর্তমান (২২তম) আইন কমিশন। অথচ এর আগের আইন কমিশন (২১তম) বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা করে ২০১৮ সালেই বলেছিল, ‘‘এখন অভিন্ন দেওয়ানি বিধির না প্রয়োজন আছে, না এই বিধি কাম্য।’’ সিপিআই(এম) এই অবস্থানকে সমর্থন করে। অভিন্নতা আর সমতা এক নয়। পার্টি সমস্ত সম্প্রদায়ের মহিলাদের সমানাধিকারের পক্ষে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত ও প্রথাগত আইনগুলিকে সংস্কারের মাধ্যমেই সেই লক্ষ্যে সব থেকে ভালভাবে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে, যে প্রক্রিয়ায় সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ থাকবে ওই সম্প্রদায়গুলির সমস্ত মহিলা ও পুরুষের।

    কংগ্রেসের অবস্থান এখানে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের অবস্থান আগে যাই থাক তাদের উচিত হবে ভেবে চিন্তে তাদের আপডেটেড অবস্থান দেখানো।
    আশা করব সমাজের সকল অংশ ইতিবাচকভাবে নিজ নিজ দায়-অবস্থান দায়ীত্বের সাথে তুলে ধরবেন; তাতে আগে আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন! ঘৃণা-বিদ্বেষ আমাদের কারও জন্যই কোন সমাধান-অবস্থান নয় হতে পারে না! এটুকু আমাদের না বুঝার কিছু নাই!

    আপডেটেডঃ ০৯ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ১২ঃ ৫৮
    আপডেটেডঃ ১০ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ০৩ঃ ৩৩

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!

    জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!
    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Gw

     

     

     

    সময়ে কারও কাছে আঙুর ফল খুবই টক মনে হয় কারণ আঙুর হাতের নাগালে না আসা বা লাভ করা দুষ্প্রাপ্য বা নিজ অযোগ্যতা; তাই এমন কথা বলে চালিয়ে দেওয়া। ঠিক যেমন  ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’ হয়ে গেছে ।
    তিনি দাবি করেছেন, “নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে “প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে“। প্রতিবেশীদের কাছে এখন ভারতের পরিচয় স্থিতিশীলতার স্থায়ী প্রতীক হিসেবে”। মানে জয়শঙ্কর এখন আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন যে মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে মানে গত নয় বছরে  অন্তত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোদি ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে!!!!! আচ্ছা, এ তো বড় আজিব বাত! 

    তাহলে মোদির সাম্প্রতিক আমেরিকা সফর যা ছিল ২১-২৪ জুন – এই সময়কালের সপ্তাহেরও বেশি আগে থেকেই, ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট ভারতে যারা ছাপে (মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী) আর বাংলাদেশের প্রথম আলোও – এরা সকলে মিলে অন্তত তিনবার ঝলক উঠিয়ে কেন প্রপাগান্ডা করল যে বাংলাদেশের হাসিনার ভাগ্য নাকি মোদির আমেরিকা সফরে মোদি-বাইডেনের এর আলাপের মধ্যেই নির্ধারিত হবে????

    এখন প্রশ্ন হল কে মিথ্যা বলছে?
    দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী লিখেছিল, “ভারতের দুই প্রতিবেশি দেশ বছর শেষে নির্বাচনে যাচ্ছে। ভারত চায়, আমেরিকা এমন কোন উদ্যোগ যেন না নেয় যাতে ভারতের নিজস্বার্থ তাতে ক্ষুন্ন হয়ে যায়”। ভারতের নিজস্বার্থ মানে – আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হাসিনাকে আরেকবার জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার উপর বাধা সৃষ্টি – এটা বুঝতে হবে। কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এই অবস্থান নিয়েই খোলাখুলি লেখা ছেপে চলেছে। আর আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি উপদেষ্টা (NSA) জ্যাক সুলিভান [Jake Sullivan] ভারতে এসে ভারতের NSA অজিত দোভালের সাথেকার আলোচনায় নাকি এমন আলোচনা হয়েছে বলে দীপাঞ্জন দাবি করেছেন।

    “Two of India’s neighbours –Maldives and Bangladesh will go to polls later this year and early next year respectively. India is of the opinion that no initiatives should be launched in its neighbourhood that impacts its national interests adversely.”

    হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর লিখেছেন, “বাংলাদেশ-আমেরিকার সম্পর্ক একটা চাপের মধ্যে ঝাকুনিতে পড়েছে। রাষ্ট্রদুত পিটার হাস বারবার করে আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় এর আহবান জানাচ্ছে।”  [“…Peter Haas, repeatedly calling for the holding of a free and transparent general election”] যখন ইতোমধ্যেই আমেরিকা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যে নিজেকে এই অঞ্চলের এক পরাশক্তি বলে মিথ্যা করে হলেও ফুটানি করে ভাব দেখাতে চায় – সেই ভারতের কাছে নাকি হাসিনার সাহায্য চেয়েছে। [“Bangladesh has sought India’s assistance to tide over a rough patch in its relations with the US, especially over the conduct of elections in the neighbouring country, people familiar with the matter said on Tuesday.”]

    প্রথম আলোর প্রচেষ্টাঃ
    আর  রেজাউল লস্করের এই রিপোর্টারই উধৃতি দিয়েই আমাদের প্রথম আলো এক রিপোর্ট ছেপেছিল। যেন বাংলাদেশের সরকার ও তার সমর্থক এবং যারা ভারতের স্বার্থের ভিতরেই নিজস্বার্থ দেখে অথচ থাকে বাংলাদেশে – এমন গোষ্ঠিগুলোকে মিথ্যা করেই আস্থার কথা শোনাতে চেয়েছিল – এই অপ্রমাণিত কেবল জল্পনা-কল্পনার খবর (?) ছেপে উত্তেজনা সৃষ্টি করার মাধ্যমে!
    তবে এখানে ভারতের জ্ঞোয়েন্দা বিভাগ ও প্রথম আলোকে দেয়া তাদের এসাইনমেন্ট এর উদ্দেশ্য খুবই পরিস্কার। যেমন প্রথম আলো লিখছে, “…হিন্দুস্তান টাইমসের সূত্র বলছে, নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় একটি মুক্ত ও সমৃদ্ধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনার ওপরও আলোকপাত করেছে তারা“।
    অর্থাৎ ভারত আমেরিকাকে  চীনা জুজুর ভয় দেখাচ্ছে যে, যদি আমেরিকা তোমরা বাংলাদেশের আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় – এই উদ্দেশ্যে হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা-সহ নানান উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতেই থাকো তাহলে নাকি হাসিনা চীনের কোলে গিয়ে উঠে পড়তে পারে!  মানে আরেকবার রাতের নির্মাবাচন করতে দাও – এই হলো ভারতের অদ্ভুত আবদার!!!  ভারত এই কথিত চীনা-জুজুর মিথ্যা ভয়ের কথা ছড়িয়ে হাসিনাকেই আরেকবার ক্ষমতায় রেখে দিবার পক্ষে কথা তুলতে চাচ্ছে।
    আচ্ছা তাহলে এটাই কী জয়শঙ্করের কথিত  ” প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়ানো – কী তামাসা! আমরা কী প্রথম আলোর পারফরমেন্সে অভিভুত – এটা বলে উঠব!!!

    আরো আছেঃ
    প্রথম আলোর নয়াদিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সৌম্যের লেখা প্রথম আলোতে কখন কী পরিচয়ে ছাপা হবে এর তাল-ঠিকানা পাওয়া মুশকিল। যেমন কখনও তাঁর লেখা ছাপা হচ্ছে মতামত হিশাবে, কখনও নাম ছাড়াই শ্রেফ ‘নয়াদিল্লির প্রতিনিধি’ এভাবে পরিচয় লিখে; নয়ত প্রকাশ্যে নিজের নাম উল্লেখ করেই!!  গত ১৮ জুন সৌম্যের একটা লেখা ছাপা হয়েছিল; মানে মোদি-বাইডেন সরাসরি বা সামিট বৈঠক হয়েছিল ২৩ জুন – এর পাঁচদিন আগের ঘটনা সেটা। অর্থাৎ মোদির আমেরিকা রওয়ানা দিবার আগেই। সে লেখার সারকথা ছিল মোদি-বাইডেন বৈঠকে নাকি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ উঠছেই। এমনকি এভাবে লেখা হয়েছিল যে, “……সন্দেহ নেই, মোদি-বাইডেন বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের মন বোঝার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বাংলাদেশের নির্বাচনী গতিপ্রকৃতি”। অর্থাৎ সোজাকথায়, বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে!!!!!

    সৌমের ১৮ জুনের লেখায় আরো বলা হয়েছিলঃ

    এক.
    “দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তির দিকে দুই দেশের নজর যতটা নিবদ্ধ, ততটাই আগ্রহে এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। সে দেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন যে ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এই মুহূর্তে সরগরম, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি”।

    দুই.
    “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর চাপ, নতুন ভিসা নীতির মধ্য দিয়ে যা প্রতিফলিত, বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতকেও তা খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। ওই নীতির রূপায়ণ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভারতের অস্বস্তি ও চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই নয়া ফরমান নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল পরস্পরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। বাংলাদেশকে এই বিষয়ে আশ্বস্তও করা হয়েছে যে আসন্ন সফরে এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্যই মতবিনিময় করবেন”।

    তাহলে আজ ৫ জুলাই মানে মোদির সফর শেষে ১১/১২ দিন পরের।  তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… অথবা কেউই না; সবাই চুপ হয়ে আছে আর মুখে কুলুপ! না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!

     

    তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব
    নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… না সবার মুখে কুলুপ; না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!
    আগের দুসপ্তাহ ধরে মিথ্যা চাপাবাজির সব রিপোর্ট ছাপিয়ে ২৪ জুন থেকে আজও সবাই লুকিয়ে পড়ে আছে!!! আহা! কী সুবিধা!!!

     

    এখানেই শেষ নয়ঃ
    এরপর আবার সেই সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি হাজির! কিন্তু নতুন বেশভুষায়!
    আর এবার একই প্রথম আলোতে গত ২ জুলাই তার লেখার শিরোনাম কিন্তু এবার একেবারে উলটা কথায় –  “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে, বললেন জয়শঙ্কর”। আর সবচেয়ে বড় কথা এটাও ঘরে বসে এক বানানো খবর! আচ্ছা কন তো সৌম্য এটা একটা কথা হইল? নিজের মান-সম্মান বিশ্বাসযোগ্যতা এগুলো কিছুই না??? টাকাই সব!
    আপনি সৌম্য এতদিন কইলেন বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে! – মানে ২৩ জুনের বৈঠকে, মানে প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি বাংলাদেশের বা হাসিনার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবেন!! আর এখন এখানে কইতেছেন,জয়শঙ্কর বলেছেন – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে…।

    তাইলে সৌম বা প্রথম আলো আপনারা বলেন আপনাদের কোন কথাটা সঠিক????
    আপনাদের দুইটা কথার একটা তো অবশ্যই মিথ্যা কথা, এটা নিশ্চিত!

    কোনটা নিশ্চিত মিথ্যাঃ
     প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া সৌমের লেখাটার শিরোনাম – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে  – গুগল সার্চে দেখা গিয়েছে এটা ভারতে কোথাও ছাপা হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।  আর এই বানানো খবরটা বাংলাদেশে কেবল যুগান্তর, কালবেলা আর মানবজমিনে মাত্র; মানে বাংলাদেশেও আর কোন মিডিয়ায় ছাপা  হয় নয়। আর এরচেয়েও তাজ্জব ব্যাপারটা হল, এটা প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি হিশাবে সৌমের নিজস্ব রিপোর্ট হিশাবে। মানে সৌম নিজেই সোর্স!  তাহলে সে একই লেখা যুগান্তর, কালবেলা [পরে আবিস্কার হল যে সে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে তার খবরটা প্রথম আলোরটাই মানে ওটার কপি] আর মানবজমিনে ছাপা হয় কী করে???  খবর ছাপলে যে সোর্স বলতে হয় যেন তারা এটা জানেই না। তাই যেন এরা এই দুই মিডিয়া কেউই তাদের খবরের সোর্স কী তা লেখেই নাই।  বাংলাদেশের জার্নালিজমে সবচেয়ে বিপদজনক এক ধারা শুরু হয়েছে সোর্স-রেফারেন্স ছাড়া রিপোর্ট ছাপা অথবা আরো বিপদজনক এক শব্দ তারা লিখে  – “ডেস্ক রিপোর্ট”! অথচ  জার্নালিজমে ডেস্ক রিপোর্ট(!) বলে কিছু  কী আছে? হতে পারে না। তবে বাংলাদেশে এর মানে হল, অন্য মিডিয়া থেকে কপি করে এনেছে কিন্তু অসততা করে দেশি-বিদেশি সেই মিডিয়ার নামটাও বলতে চায় না। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটা হল – ডেস্ক রিপোর্ট মানে খবরের সোর্স বলে কিছু নাই (মানে পুরাটাই মিথ্যা বা গুরুত্বপুর্ণ কোন শব্দ বা বাক্য বদলে দেয়া টুইস্ট নিউজও তা হতে পারে) অথচ একে মিডিয়া রিপোর্ট আর জার্নালিজম বলে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে!! আর প্রথম আলো এই নষ্ট-সাংবাদিকতার নেতা উদ্গাতা!

    আরো গভীরে যাইঃ
    সৌমের প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া লেখা এটা কী এর আগের দিন বা আগের এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন প্রেস ব্রিফিং বা কোথায় দেয়া বক্তব্য???
    জবাব হল – না একেবারেই না। সৌম্য রিপোর্টে কেবল লিখেছেন, “……রাজধানী দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে নরেন্দ্র মোদির শাসনের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের ‘সাফল্য’ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। কিন্তু কোথাও কবে  জয়শঙ্কর একথা বলেছেন সে প্রসঙ্গে সৌম লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত শুক্রবার এ মন্তব্য করেন।  কিন্তু গুগল সার্চে এই রিপোর্টটা এক প্রথম আলোতে সৌম্যের লেখা  ছাড়া আর কেউ লিখে নাই বা কোন পত্রিকা নিজে রিপোর্ট লিখে ছাপে নাই। আর আগেই বলেছি বাংলাদেশের যেদুই একটা মিডিয়া এটা ছেপেছে তা তারা প্রথম আলোর নাম উল্লেখ করে বা না করে মানে সোর্স উল্লেখ না করেই ছেপে দিয়েছে। আর কোন “এরেঞ্জমেন্ট” থাকলে সেটা গোপন রেখে দিয়েছে।

    কেন আর কোথাও (ভারতে বা বাংলাদেশে) সৌম্যের লেখা এই রিপোর্ট এর বিষয়ে রিপোর্ট নাইঃ
    ভারতের কেন্দ্র সরকার বা সংসদের নির্বাচন আর সাত-আট মাস বাকি; মোটামুটি বললে আগামি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর শুরু হতে পারে।  ফলে জয়শঙ্কর-মোদি সহ সরকারের সকলের সব কাজকর্ম এখন নির্বাচন-মুখি বা মোদির ইমেজ বাড়ানোকে লক্ষ্য করেই আগাচ্ছে।  তাই গত নয় বছরে দেশে-বিদেশে মোদির সাফল্য কী – দেশের মুখ-উজ্জ্বল কী করেছেন এনিয়ে প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন জয়শঙ্কর! তাই তিনি এক বক্তৃতা আয়োজন করেছিলেন। আর সেখানেই দিয়েছিলেন এমন কিছু বক্তব্য। কিন্তু প্রথম কথা সেটার তারিখ কবে??? ওর তারিখ ছিল ৮ জুন। কীভাবে বের করলাম?
    অনেক খুজাখুজির পরে দেখা গেল মোদির নয় বছরের সাফল্য  আর জয়শঙ্করের বক্তব্য এদুই শব্দে মিল আছে এমন একটাই ইংরাজি রিপোর্ট আছে – যা ভারতের প্রায় সবাই ছেপেছে। যদিও স্বভাবসিদ্ধ ভাবে মোদি-বিজেপি এই প্রপাগান্ডা খবরটাকে টুইস্ট করেছে কুখ্যাত ANI কে দিয়েও। অনেকে সেটাই ছেপেছে। যেমন দ্যাপ্রিন্ট এর লেখা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস্র লেখা। ইত্যাদি। আর এর বাইরে এক মিডিয়া যা আমার নজরে এসেছে তা হলো “লাইভ-মিন্ট” – এই কম চলা পত্রিকার রিপোর্টটা ভাল- এটা সরকারি এজেন্সি পিটিআই এর নিউজ।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ হল এসব খবরই ভারতে প্রকাশিত হয়েছে  ৮ জুন তারিখের; মানে যেদিন জয়শঙ্কর তা বলেছেন।
    তাহলে কী ৮ জুন তারিখে প্রকাশিত জয়শঙ্কর এর বক্তব্য প্রসঙ্গে কী জয়শঙ্কর আবার পরবর্তিতে পয়লা জুলাই তারিখে এসে তিনি একই বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলেছেন??? কারণ সৌম্যের রিপোর্টের দাবি এই তারিখ ১ জুলাইয়ের!!!! এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য!!!  কারণ, যে প্রশ্নের উত্তর নাই তা হল,  সেক্ষেত্রে কেন ভারতের আর কোন মিডিয়ায় জয়শঙ্করের এই কথিত ১ জুলাইয়ের মিডিয়ার সাথে কথা বলা নিয়ে ভারতে কোন রিপোর্ট কেউ ছাপে নাই কেন??? এটা বেশ অস্বাভাবিক, বিশ্বাস অযোগ্য!!!

    তাহলে সৌম্য বন্দোপাধ্যায়  ১ জুলাই জয়শঙ্কর এমন সব কথা বলেছেন বলে দাবি করে রিপোর্ট লিখলেন কেন??? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।
    তবে, খুব সম্ভবত একাজ করার কারণ হল কংগ্রেস দল।  আসলে জয়শঙ্কর খুব সম্ভবত আবার একই প্রসঙ্গে – ফিরে নতুন করে কিছুই বলেন নাই। কিন্তু কংগ্রেস দল চায় জয়শঙ্করের বক্তব্যকেই একটু সমালোচনা করতে যা বাংলাদেশে প্রকাশিত হবে। আর তাই সৌম্যের ঐ ভুয়া রিপোর্টে  যার মধ্যে (বাড়তি হিশাবে) কলকাতার বাঙালি এক সাবেক কূটনীতিক দেব মুখোপাধ্যায়  এর বরাতে কিছু সমালোচনা ছাপা হয়েছে। যেখানে তিনি “তিস্তা চুক্তি না হওয়া” আর “অখণ্ড ভারতের মানচিত্র” মোদি প্রকাশ করেছে বলে –  এনিয়ে অসন্তোষ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। যদিও ফ্যাক্টস হল, ভারত বাংলাদেশ থেকে করিডোর নিয়েছে কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েও তিস্তা পানি আজও  দেয় নাই – এর প্রথম ভায়লেটর (২০১১ সালে বাংলাদেশে সফর) বা লঙ্ঘনকারী সেসময়ে কংগ্রেসেরই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর ক্ষমতাকালের ও ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরকালে এটা উন্মোচিত হয়েছিল যে ভারত তিস্তা পানিচুক্তি ভঙ্গ করছে। দেখুন সেসময়ের বিবিসি রিপোর্ট।    আর সেই একই ভায়োলেটর পরের প্রধানমন্ত্রী মোদি – এই ফ্যাক্ট তো লুকানো যাবে না। সে যাই হোক তাহলে, সৌমের এই রিপোর্ট কী মোদির নয়, কংগ্রেসের অর্থে লেখানো??? প্রথম আলো অর্থের লোভে এই জুয়াচুরি-সাংবাদিকতা করেছে???

    শেষ কথাঃ প্রথম আলোতে ছাপা সৌম বন্দোপাধ্যায়ের ২ জুলাইয়ের এই রিপোর্ট  অস্পষ্ট রহস্যময়ই থেকে গেল!

    আপডেটঃ ৭ জুলাই ২০২৩; দুপুর ১২ঃ ৩৪

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন

    মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন
    গৌতম দাস

    ২২ জুন ২০২৩      সকাল ০৯ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4E8

     

                   Biden hosts Indian Prime Minister Modi at White House

     

    মোদির বাইডেন সাক্ষাত হবে আজকে। কিন্তু এর আগেই ভারত একটা হাইপ [HYPE] তুলেছে মানে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ‘ওভার-পাবলিসিটি’ শুরু করেছে গত কমপক্ষে প্রায় দশদিন ধরে।
    এর উদ্দেশ্য দুইটা। এক.  আভ্যন্তরীণভাবে ভারতের ভোটারদের দেখানো যে মোদি এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব পরাশক্তি নেতা হয়ে গেছে। আর দুই. বাংলাদেশে হাসিনা সরকার টিকবে কিনা সেই নির্ধারক ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি, সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক এই ইমেজ তিনি গড়তে চান।
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২১-২৪ জুন তার আমেরিকা সফরে ইতোমধ্যেই আমেরিকায় পৌছেছেন। আজ ২২ তারিখ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে তার সাক্ষাতের কথা।
    এদিকে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য অ্যামেরিকান নয়া ভিসা পলিসিতে দেয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে, বাংলাদেশে ভিতর সরকার বা বিরোধী দলগুলোর যেখানে আমেরিকান এই নীতির বিরুদ্ধে কোন আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য প্রায় নাই বললেই চলে; বরং এর চেয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অপর দলের জন্য কত খারাপ হয়েছে  আর তাতে অন্যদলটা কত বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এনিয়ে সরকারি  প্রপাগান্ডাটাই মুল আসর দখল করেছে; যদিও এতে ব্যাপারটা মানুষ তামাসা হিশাবে দেখেছে। অন্তত ফেসবুক কে যদি আমার সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানার (সোশাল মিডিয়া) উৎস বলে  ধরি তাহলে  এমনটাই সোশাল মিডিয়ার ডমিনেটিং মুড।  আর মানুষের কাছে যে ওয়েলকামিং মেসেজ গেছে তা হল, অ্যামেরিকান ভিসা পলিসি এবার মানুষকে একটা ভাল কিছু দিবে কারণ, এটা হাসিনা সরকারের উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে!
    ওদিকে আবার ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়েছে উলটা। ভারতের মিডিয়া, কলাম লেখক, একাদেমিক বা থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইত্যাদিতে যুক্ত যারা তাদের সবার একই ভাষ্য আমেরিকা “কত্ত-ই না খারাপ দেশ” – যে তারা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে! আর এতে বাংলাদেশের উপর ভারতের আলগা খবরদারি মানে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” সেটা আর কিছুই এখন উসুল করা যাবে না; আগের সাজানো বাগান থেকে কত সহজেই না লুট ততপরতা চালানো যে অবারিত সুযোগ ছিল যেন সেটা এখন বন্ধ বা ক্ষুন্ন হতে যাচ্ছে আর এই ম্যাসেজ তারা পাঠ করে ফেলেচ্ছে। আর একারণে তারা রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।
    এতে সবচেয়ে অসুবিধা যেটা তা হল তাদের স্বার্থের পক্ষে ন্যায্যতা কী? সাফাই বয়ান কী? এমন কিছু তো একটা থাকতেই হবে। নইলে “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” হারিয়ে যাচ্ছে বললেই এর অর্থ হবে সেটা অবৈধ স্বার্থ নয়, ন্যায্য স্বার্থ অথবা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে নেয়া কোন অসম চুক্তি বা ঘুষের চুক্তি নয় এমন একটা নুন্যতম বয়ান অবশ্যই হতেই হবে। আর এখানেই অসাঞ্জস্যতা এক বিরাট ঘাটতি ভারতের সব বক্তব্য বা দাবিকে দুর্বল করে রেখেছে।

    পেড মিডিয়া প্রপাগান্ডাঃ
    এই সুযোগে প্রথম আলোর মত পত্রিকাগুলো যারা ভারতের গোয়েন্দাবিভাগের মিথ্যা সাজানো প্রপাগান্ডা খবর নিজেরা একে সত্যি বলে নিজ পত্রিকায় খবর ছাপে; তাদের এই দালালি ততপরতারর রেট মনে হচ্ছে বেড়ে গেছে। অথবা গোয়েন্দাবিভাগ নিজেরাই যেচে রেট বাড়িয়ে দিয়েছে হয়ত যাতে  মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছাপতে এরা আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠে, লোভনীয় পরিমাণ অর্থের লোভে অস্থির, ডেসপারেট। বেচাইন হয়ে যায় যেন!
    সম্ভবত সেকারণেই আমরা  নিউজ দেখছি প্রথম আলোতে যেখানে মরিয়া হয়ে বিপদে পড়বে জেনেও এসব প্রপাগান্ডার আবর্জনা  তারা খবর বলে ছাপছে। ধরা পড়লে শিরোনাম বদলে লঘু করার চেষ্টা করছে তবু প্রপাগান্ডা কাজ চালিয়েই যাচ্ছে। এসব মিথ্যা খবর তৈরির ভঙ্গিটা হল এমন দাবি করা যেন ভারতের মোদিই হচ্ছে বাংলাদেশে বাপ! তাই যেন বাংলাদেশে কী ঘটবে এর একমাত্র নির্ধারক ও ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি! মোদি যেন বাংলাদেশকে তাঁর কোন বাপের তালুক হিশাবে পেয়েছেন। তাই মোদিই একমাত্র হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির অ্যামেরিকান চাপ থেকে বাঁচাবেন, উদ্ধার করবেন। এই হল এসবের সারকথা!

    যেমন, গতকাল ২১ জুন সকাল থেকে দেখা গেল আরেক প্রপাগান্ডা যে বাংলাদেশ মানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন নাকি জয়শঙ্কর বা ভারতকে অনুরোধ করেছে যেন মোদি তার আমেরিকার সফরে বাইডেনের কাছে হাসিনার জন্য কিছু সুপারিশ করে। যার সার ইঙ্গিতটা হল, লেম্যানের ভাষায় বললে মোদি যেন হাসিনা সরকারকে আরেকবার রেখে দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়, আমেরিকাকে বলে!

    ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বারানসিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ ভুক্ত
    দেশগুলোর
    মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে গত ১২ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে
    বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
    এ কে আব্দুল মোমেনের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। সূত্র বলছে, বিভিন্ন
    পর্যায়ে ভারতের কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিষয়টি তুলেছেন।

    যদিও ভারতের মিডিয়ার এই দাবি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও সেতুমন্ত্রী কাদের অস্বীকার করেছেন। তার মানে ভারতের দাবি একপক্ষীয়, সকলেই বিনা তর্কে গ্রহণ করে এমন দাবি নয়।
    আর এটাই ছিল ২১ জুন সকাল থেকে প্রথম আলোর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট। অথচ প্রথম আলোর এই কাজটা এক মারাত্মক জার্নালিস্টিক অসততা। কেন?

    বর্তমান বাংলাদেশ প্রশ্নে, আমাদের মোমেন অথবা আমেরিকা সফররত মোদির ভারত এদের যে কেউ নানা প্রপাগান্ডা করতেই পারে যার সোজা অর্থ ফ্যাক্টস লুকাইতে পারে। তাহলে এক্ষেত্রে প্রথম আলোর অবস্থান হওয়া উচিত অন্তত নিজে ফ্যাক্টস না লুকানো বা কাউকে লুকাতে না দেওয়া বা সাহায্য না করা। এই সাপেক্ষে মানে এটা করার পরেই কেবল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অর্থের ভান্ডে প্রথম আলো একটু-আধটু মুখ দিতে পারে; যতটুকু যা পায়। কিন্তু প্রথম আলো – খোদ জার্নালিজম – এই কাজটাই ত্যাগ করে চলে গিয়েছে।

                                                                TIMES

    যেমন, ভারতের কিছুপক্ষের নানান দাবি বা মোমেনের দাবিতে তা সব তোলপাড় করে ফেলতে পারে, এমনকি মোদির অ্যামেরিকান সফরকে কেন্দ্র করে মিথ্যা আশা বা প্রপাগান্ডা যে হাসিনা আবার টিকে যাচ্ছে বলে হৈচৈও শুরু করতে পারে। আর এক্ষেত্রে মোদি ও বিজেপির প্রধান লাভের লক্ষ্যটা হল মিথ্যা হলেও এটা দিয়েই মোদির ইমেজ গড়া; মানে মোদিকে এক পরাশক্তি নেতা হিশাবে তুলে ধরা যে বাংলাদেশে সরকারকে বাঁচায় – এই ইমেজ গড়াটাই বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। তাতে এটা পুরাটাই মিথ্যা  হয় যে বাইডেন মোদির কথা শুনবেই না অথবা আদৌও এনিয়ে মোদি-বাইডেন হয়ত আলাপই হবে না – এমন হলেও ক্ষতি নাই। কারণ মোদির এই পরাশক্তি বা মিথ্যা গ্লোবাল নেতার ইমেজ – এটাই আগামি ভারতের নির্বাচনে বিজেপি ব্যবহার করবে আর দাবি করবে মোদির নেতৃত্বে ভারত কত উঁচুতে উঠেছে। আর এতে হাসিনা মিথ্যা আশা আকাঙ্খা তৈরি করে এর ছলনায় আরো হতাশ হয়ে যাবে কিনা সেটা তো মোদির বিবেচনাই নয়!
    অতএব এই ভুয়া উচ্ছাস তুলে হলেও ভারত মরিয়া হয়ে হাসিনার -জান যাওয়া অবস্থায়- এই মিথ্যা পরাশক্তি নেতার ইমেজ কামাতে নেমেছে। এমনকি পরোক্ষে তিনি হাসিনাকেও ট্রাপে ফেলেছেন, তা হলেও।
    আর এই পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম আলো যেপথ নিল, তা হল এর মধ্যে ফ্যাক্টস বা সত্যটা কী? সেটা বের করতে না যাওয়া।  মোদি কী আসলেই বাইডেনকে বলে হাসিনার সব বালা-মুসিবত মানে আরেকবার ক্ষমতায় থেকে যাবার বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন? নাকি এর কোন আদৌ সুযোগই নাই?
    না, প্রথম আলো এবিষয়ে ফ্যাক্টস উদ্ধার সেদিকে গেল না – বরং সে গেল মোদির মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে হাইপ বা উচ্ছাস তোলা বা যোগানো – যেটা সরাসরি একটা প্রতারণা???
    অথচ জার্নালিজমে সৎ থাকলে প্রথম আলোর ন্যায্য কাজ হত ফ্যাক্টসের সন্ধানে যাওয়া; যে অন্তত মোদির আদৌ কিছু করার সুযোগ আছে কিনা! সেটা যাচাই করে আসা!

    অনেকের মনে সন্দেহ হতে পারে সেটা কী খুবই সহজ হবে? এমন ভেবে! হা এটা এখানে একেবারেই সহজ এবং তৈরিই ছিল। যেমন, মোমেন বা মোদির ভারতের অনেকের দাবির প্রসঙ্গ হল বাইডেন বা অ্যামেরিকান অবস্থা নিয়ে – মানে বাইডেন-মোদি সামিটে (বাংলাদেশ প্রসঙ্গে) বাইডেন কী অবস্থানে থেকে কথা বলবেন? তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসুক বা না আসুক – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাইডেনের অবস্থান আগে থেকেই কী জানা যায় না, সেই তালাসে যেতে হত।

    এই প্রসঙ্গে অথেনটিক নিউজ পাবার এক বেস্ট জায়গা ও এক ব্যক্তি হল জন কিরবি [John Kirby ]। যিনি হোয়াইট হাউসে বসেন কারণ তিনি হলেন হোয়াইট হাউসের ন্যশনাল সিকিউরিটির স্ট্রাটেজিক কমিউনিকেশনের কো-অরডিনেটর কাম মুখপাত্র [National Security Council coordinator]। যিনি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং দিয়ে থাকেন। মোদির এই সফরটা দুই রাষ্ট্রের দুই এক্সিকিউটিভ হেড এর মধ্যে। মানে অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে। তাই কোন অথেনটিক নিউজ পেতে হলে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এখান key personality বিবেচ্য হবে। আর জার্নালিস্ট তো বটেই এমনকি  যারা এডভান্স পাঠক  এটা এদের কারোরই অজানা নয়। আর বাংলাদেশে বসে তাঁর [কিরবি-র] যেকোন ব্রিফিং পাবার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হল অ্যামেরিকান সরকারি ওয়েব সাইটে [সাধারণত যেটা https://www.state.gov] যাওয়া যেখানে সব বিস্তারিত থাকে। যেমন মোদি-বাইডেন হবু সাক্ষাত উপলক্ষ্যে আগাম যে ব্রিফিং সেটা ছিল ২০ পৃষ্ঠারো বেশি তাহলেও পুরাটাই ঐ ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। এখন জার্নালিজম করতে চাইলে এসব খবর জানা ও সংগ্রহ করা ছিল প্রথম আলোর সরাসরি দায়ীত্ব!

    এখন দেখা যাক প্রথম আলো হিন্দুস্থান টাইমস এর যে প্রপাগান্ডা রিপোর্ট ২১ তারিখ ভোর থেকে লোড করেছে সেটার সময় হল আমাদের ভোর পাঁচটায়। অথচ জন কিরবি এর ব্রিফিং হয়ে গেছে অ্যামেরিকান ২০ তারিখ সকাল ১১টায়। মানে এর ব্রিফিং আমরা বাংলাদেশে বসে রিপোর্টটা সংগ্রহের যোগ্য হয়ে গেছিল  ঐদিনই (২০ জুন) তবে আমাদের মোটামুটি রাত বারোটার পর থেকেই।
    অর্থাৎ প্রথম আলো জন কিরবি এর ব্রিফিং বক্তব্য আমলেই নেয় নাই; নেওয়ার দরকারও মনে করে নাই। বলতে গেলে উপেক্ষা করে লুকিয়েছে আর বরং এরই পালটা প্রপাগান্ডা রিপোর্টটাই পরের (২১ জুন) ভোরবেলা থেকে প্রচারণায় এনেছে।

    জন কিরবি – তিনি কী বলেছিলেনঃ
    জন করবি এর ব্রিফিং সাধারণত অনেক লম্বা হয়, সারা দুনিয়ার নানান দেশ প্রসঙ্গ হিশাবে থাকে তাই! তাই এটা ছিল জন কিরবির বিশ পৃষ্টা জুড়ে দুনিয়ার প্রসঙ্গ এর ব্রিফিং এখানে পাবেন ;  তা হলেও ওর ভিতর বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা আছে ওর চতুর্থ পৃষ্টায়। পুরাটা ডাউনলোড করে চতুর্থ পৃষ্টায় খুজেন। 

                         NSC Coordinator John Kirby


    জনকিরবি বলছেনঃ

    বাইডেন-মোদি হবু আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠুক বা নাই উঠুক; অথবা এমনকি মোদি সেখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যাই বলেন না কেন –  বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারিত। আর তা হচ্ছেঃ আমরা ইতোমধ্যেই পরিস্কার করে বলেছি যে আমরা চাইব বাংলাদেশে একটা ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন হবে। আর আমরা ভিসা পলিসিতে ট্রাভেল নিষেধাজ্ঞা তো এজন্যই দিয়েছি যাতে কেউ এই ইলেকশনে যা ইচ্ছা তাই না করতে পারে। অতএব এপ্রসঙ্গে এভাবে আমি কেবল আমাদের অবস্থান থেকেই কথাগুলো বলে দিলাম। আর আপনারারো বুঝলেন আমাদের স্পষ্ট অবস্থানটা কী। আর আমরা এব্যাপারে একেবারের পাবলিক সামনে খোলাখুলিও তবে একই সাথে আমরা ভারতীয় সরকারকে তাদের বাংলাদেশ সরকারের সাথে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সেটা যাই থাক সেনিয়ে চাইলে তাদের কথা বলতেই দিব বা আমাদের শুনাতেও পারবে।

    We have already made clear our desire to free and fair elections in Bangladesh, and you’re right, we adapted our visa policy to restrict travel to individuals who undermine Bangladeshi elections.  So I can only speak for ourselves.  You know where we are.  We’ve been pretty public about that, but we would let the Indian Government talk about their bilateral relations.

    মূল বিষয়টা হচ্ছে আগে বলেছি অ্যামেরিকান ভিসানীতি প্রকাশের পরে ভারত নিশ্চিত হয়ে যায় যে গত ১৫ বছর ধরে হাসিনাকে ক্ষমতায় সমর্থন জুগিয়ে বাংলাদেশ উপর যে জুলুম লুটপাটের রাজত্ব গড়ে যে সমস্ত অসম সুবিধা খেয়ে এসেছিল সেসবের ইতি হতে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই লিখছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের কথিত নির্বাচনে যেসব কান্ডকীর্তির ভোট করে বারবার নিজের ক্ষমতাকে হাসিনা বাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন তা আর এবার আগামিতে হচ্ছে না। এটাই অ্যামেরিকান ভিসানীতির সবচেয়ে বড় ইম্পিকেশন বা খাঁড়া অর্থ। যেটা ভারত ও হাসিনার উপর ও বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ হতে যাচ্ছে।
    ভারতীয় মিডিয়ায় সকলেই কমবেশি একথা ছাপছেঃ

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means.    

    তাহলে, এই হলো দুধ আর পানির আলাদা হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রথম আলোর এই এভেলএবেল ফ্যাক্টস টা তুলে আনে নাই। বরং এর উলটা মিথ্যা প্রপাগান্ডাকেই গতকাল সকাল থেকে প্রচার করে গেছে।

    এখন এই প্রথম আলো; এই জার্নালিজম কী টিকে থাকতে পারবে? না পারে?

     

    আপডেটঃ ২৩ জুন ২০২৩ ০১ঃ ৫৪ am

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে

    কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে
    গৌতম দাস
    ২০ জুন  ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Dk

     

                     MODI & MUNTASHIR

    ইংরাজিতে জাতি শব্দটা বুঝাতে মূলত দুইটা শব্দ হয় – Race ও Ethnicity। অর্থাৎ ইংরাজির Race ও Ethnicity এই দুটা শব্দকেই আমরা বাংলা করি জাতি বলে। খুবই সংক্ষেপে বললে এরমধ্যে Race অর্থে জাতি মানে যেটা  মানুষ প্রজাতির দুনিয়ায় আগমন বা উদ্ভব ঘটেছিল কয়েক মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা যেটা; এই অর্থে তা মানুষ জাতি [Human Race]। এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের রেস অর্থে বা রেসিয়াল বা জাতিগত ভিন্নতা – তা আবার বুঝা সম্ভব তার রক্তের ডিএনএ এর ভিন্নতা থেকে।

    বিপরীতে বাংলায় লেখা আরেক জাতি এই শব্দ ও  ধারণা হল যেটা Ethnicity অর্থে জাতি। যেটা একাল থেকে মাত্র মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরানা – এথনিক জাতি। মানুষ কালচারাল যা কিছু আছে তাতে ভাষা, ধর্মীয়, সামাজিক, প্রধান খাদ্য, রান্নার প্রক্রিয়া, বিশ্বাস মিথ ইত্যাদি সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত – এটাই এথনিক জাতি পরিচয়।  যেটাকে আমরা সভ্যতা বলি অথবা, অন্যভাষায় বললে দুনিয়ায় মানুষ যবে থেকে আগের যাযাবর জীবন ছেড়ে প্রথম কৃষিকাজ এর জীবন শুরু করেছিল। দুনিয়ার কোন এক ভুগোলে থিতু হয়ে বসে গিয়েছিল। আর তাতেই একেকটা সিভিলাইজেশন এর সুত্রপাত ঘটেছিল। এই অর্থে আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ। এটাকেই বলে এথনিক জাতি পরিচয়।  আর পরে সিন্ধু সভ্যতারই উপবিভাগ মানে এরও আবার সাব-এথনিক জাতি পরিচয় হিশাবে আমরা বাঙালি।
    উপরের কথাগুলো হল জাতি ধারনাটার সবচেয়ে ইতিবাচক উপস্থাপন। আর এর বাইরে জাতি পরিচয়ের বা জাতি বা জাত পরিচয় নিয়ে কথাবার্তার সবটাই মূলত নেতিবাচক। কারণ সেসবগুলোতে জাত পরিচয় নিয়ে আলাপ মানেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্য সকলকে ঘৃণা করা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো। যেখানে মূল কথাটা হল আমার জাতই শ্রেষ্ঠ  – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ।
    এই ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিপদজনক দিকটা হল – নিজেকে জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধে বলে উপলব্দি ও হাজির করা মানেই অন্য সকল জাত-পরিচয়ের মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, নিচা দেখানো ইত্যাদি আর এখান থেকেই যেহেতু আমি শ্রেষ্ঠ কাজেই আমি অন্য সকল জাত (বা ধর্ম)-পরিচয়ের মানুষকে নির্মুল করতে পারব সেটা জায়েজ হবে মনে করা শুরু হয়। আর এই নির্মুল বলতে অন্য জাত-ধর্ম পরিচয়ের মানুষকে হত্যা, দখল করা নইজের পায়ের নিচে রাখা অধীনস্ত করে রাখা এমনকি কলোনিদখল করা ইত্যাদি এসব কাজকরার স্বপক্ষে নিজ জাতশ্রেষ্ঠত্ব বোধকে সাফাই হিশাবে তুলে ধরা শুরু হয়। এটাই, এই প্রেজেন্টশন এভাবে বয়ান হাজির করা এটাই  মোদির হিন্দুত্ববাদ। এটাই হিটলারিজম – জর্মান জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ।

    তত্বকথা শেষ। এবার ব্যবহারিক কথাবার্তা। আর এর এক নয়া নমুনা হল ভারতের ‘আদিপুরুষ’ সিনেমা। যেটা গত ১২ জুন রিলিজ হয়েছে।  পাঠক সকলকে চিনে রাখতে বলব মনোজ শুক্লা নামের এই ব্যক্তিকে। যার ছবি উপরে দিয়েছি। অনেক স্ময় তাকে মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা নামেও চিনবেন।
    ইনিই হচ্ছেন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় পেমেন্ট পান এমন  -সিনেমা, নাটক বা টিভি অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডায়লগ লেখক। বিশেষ করে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ নামে পৌরাণিক বা মিথিক্যাল ঘটনাবলী যদি আপনার কাহিনীর চাহিদা হয়ে থাকে। এছাড়াও ভারতের জাতীয় দিবসগুলোতে সেদিনের টিভি প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট লিখার কাজে। আর বলাই বাহুল্য এসব দিন মানেই ভারতের সেনাবাহিনীর বর্ণনা আর এখান থেকে সবচেয়ে সহজে এবং অবশ্যই থাকবে মানে এতে ভিলেন হয়ে যে জিনিষ থাকবে তা হল পাকিস্তান; মানে মুসলমান-ইসলাম। এবার হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান যেটা সেখানে হাজির থাকবে এরই পপুলার কঠিন সুরসুরি দেয়া আবেগের স্ক্রিপ্ট লেখক হিশাবে পাবেন এই মনোজ মুন্তাশীর-কে!

                                                                                 MANOJ MUNTASHIR SHUKLA

    এমনিতেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান জিনিষটাই থকথকে আবেগের; যা স্থির মনে মানুষকে চিন্তা করতে দেয়না বরং ক্রমাগত আবেগে ভেসে যেতে উস্কানি তুলে চলে। কোন র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিও মানুষের মধ্যে কাজ শুরু করার আগেই ভোক্তা মানুষ বা ক্লায়েন্টকে মনোজ মুন্তাশীর তাঁর আবেগের সুরসুরি তুলে দখল নিতে হবে – এটা মনোজ খুবই ভাল বুঝেন এবং দক্ষ তিনি। ফলে এরপরে আবার মানুষের র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিতে চিন্তা পেরিয়ে স্পিরিট বা স্পিরিচুয়াল স্তরে যেতে মানুষকে মনোজ কোন সুযোগই দেন না।এই হল  মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা। একালের হিটলার মোদি বা হিন্দুত্ববাদ এর মূলত সাফাই বয়ান লেখক। অথচ বাইরে যার পরিচয় পান্ডুলিপি – অভিনয়ের পান্ডুলিপি লেখক বা প্রণেতা।

    মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা তিনিই আদিপুরুষ সিনেমার ডায়লগের লেখক। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “…এদিকে ‘আদিপুরুষ’ সিনেমার সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাশীর শুক্লা সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, যেসব সংলাপ দর্শকদের আঘাত করেছে, সেগুলো সংশোধন করা হবে”।
    আর প্রথম আলোও খুবই ইনোসেন্টলি ছেপেছে, “……এদিকে ‘আদিপুরুষ’ ছবির সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাসির শুক্লা টুইট করে জানিয়েছিলেন যে এই ছবির বিতর্কিত সব সংলাপ বদল করা হবে। মনোজ এক বড়সড় পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমি এবং ছবির নির্মাতা আর পরিচালক মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এই ছবির যেসব সংলাপ আপনাদের আঘাত করেছে, আমরা তা সব সংশোধন করব।’ আর এই সপ্তাহে তা ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হবে”।

     

    সবাই নিস্পাপ, ইনোসেন্টঃ
    মনোজ মুন্তাশীর থেকে প্রথম আলো অথবা চাই কী দর্শকেরা যাদের ভিতর হিন্দুত্ব জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের জোশ-চেতনা জাগরিত হয়েছে এরা সকলেই নিজেকে নিস্পাপ হিসাবেই দেখছেন। যাদের সবার কম কথাটা যেন এরকম – আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা দেখেছি কেবল – অথবা আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা খবরাখবর নিয়ে পত্রিকার বিনোদন পাতা চালিয়েছি যাতে ভারতীয় সেনিমাতার প্রচার প্রসার হয় এতটুকুই। এটা তো বিনোদনমূলক কাজ মাত্র। এভাবে ম্নোজও হয়ত বলবেন আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা যেন চলে প্রযোজক আমাকে টাকা দিয়েছে – তার সিনামাটা চালিয়ে টাকা উঠিয়ে দেয়াটাই আমার দেখার বিষয়। অর্থাৎ কেউ জানেই না যে তিনি একটা মারাত্মক অপরাধ ক্করছেন। নিজের জন্যও ক্ষতিকর একটা কাজ করেছেন।

    যদিও পুরা ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তাতে অনেক মোচড় বা টুইস্টও আছেঃ
    সিনেমাটা মূলত তেলেগু (বৃহত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ) ডমিনেটিং অভিনেতা-প্রযোজকদের এক হিন্দি সিনেমা যার অন্য সব দক্ষিণী ভাষাতেই (তামিল, তেলেগু, কন্নড় ও মালায়লাম ভাষায় ) রিলিজ দেয়া হয়েছে। রিলিজের প্রথম দিনেই নাকি ১৪০ কোটি টাকার টিকেট বিক্রি হয়েছে।  আবার এককথায় বললে এটা হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর প্রচার ভিত্তিক এক সিনেমা ততপরতা যেটা একটা হিটলারিজম! কিন্তু এতে মজার টুইস্ট হল, আরএসএস-এর কিছু অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এতে খুশি না। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “মুক্তির আগে এবং পরেও এই সিনেমাকে ঘিরে অভিযোগ একটাই ‘হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে আদিপুরুষের কাহিনি’। এমনকি সিনেমা থেকে কিছু দৃশ্য বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে আর্জি জানায় হিন্দু সেনার দল।
    আবার আরএক রিপোর্টে লিখেছে, আদিপুরুষ: রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’! – এই শিরোনামে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, “…… সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতের জাতীয় সভাপতি পিটি সুরেশ মিশ্রের পক্ষে কমলেশ শর্মা এই উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন পরিচালককে”। তাহলে কাহিনী কী এখানে?
    কাহিনী হল এটাও আসলে হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর উপর দাঁড়িয়ে আরেক ততপরতা; কিন্তু তা হলেও যেটা দেখে মনে হবে এটা তো সিনেমাটার বিরোধিতা করছে! সেটা কেমন করে?  এটা “হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে” বলে অভিযোগটাই তো  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর দাঁড়ানো।  তারা বলতে চাচ্ছে এটা মুসলমানেরা করেছে বা মুসলমানদের চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে করা কাজ অথবা মুসলমান সংশ্লিষ্টতা বা তাদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে করা কাজ। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বা অভিযোগ হল এখানে রামায়নের রাবনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাইফ আলী খান যিনি পতৌদির (এখন হরিয়ানা-দিল্লির এক অংশ হয়ে গেছে, সেকালে এক ছোট করদ রাজা ছিল) নবাবের বংশধর মুসলমান, ক্রিকেটার মনসুর আলো খান পতৌদির সন্তান। মূল ইঙ্গিত-বক্তব্যটা হল যেন এটা বলা যে – মুসলমানেরা হিন্দুদের সব ভাল ঐতিহ্য নষ্ট করে দিচ্ছে।
    পরের অভিযোগটা সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতদের। সেটা তো আরো সরাসুরি এটাক  বলছে এটা ” রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’ করা হয়েছে।  তাই এখানে হনুমানের দাড়ি-গোফ রাখা হয় নাই।

    কোনো হিন্দু গোঁফ ছাড়া দাড়ি রাখে না, যেভাবে ভগবান হনুমানজিকে দেখানো হয়েছে।
    চলচ্চিত্রটি রামায়ণ এবং ভগবান রাম,
    মা সীতা, ভগবান হনুমানের সম্পূর্ণ ইসলামীকরণ হয়েছে।
    এমনকি আদিপুরুষে রাবণের ভূমিকায় অভিনয় করা
    সাইফ আলি খানও তৈমুর কিংবা আলাউদ্দিন খিলজির মতো দেখতে।”

    অথচ কেউ টেরই পাইলেন না যে এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে ‘হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ দেখানোর’ এর যত ততপরতা – এটা একটা এতই উগ্র জাতি বা জাতিবাদি চিন্তা যে এটাই ভারতকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য যথেষ্ট। হিটলার হয়ত আপসোস করে বলবেন যে তিনি ও কেন এত উগ্র হতে পারেন নাই।
    আবার ওদিকে নেপাল তার দেশের সব সিনেমা থেকে  আদিপুরুষ সহ সব সিনেমাকে নামিয়ে দিয়েছে। দেখুন নেপালে হিন্দি ছবি প্রদর্শন বন্ধ ঘোষণা, নিষিদ্ধ ‘আদিপুরুষ’।

    আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আর আট মাসের মধ্যে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন। মানে মোদিকে এবার জততেই হবে; নইলে বাইডেনের আমেরিকা বসে আছে ঘাড়ের উপর। তাই ইতোমধ্যেই যা শুরু হয়েছে – মুসলমান কোপাও, জোরদার করো  – যাতে হিন্দু ভোট সব হিন্দুত্বের বড়াই ভ্যানিটিতে কেবল  মোদির বাক্সে ঢুকে, এরই নানান ততপরতা। এবারও মিথ্যা মিথ্য অভিনয়ে ভারেতের পাকিস্তান আক্রমণের নাটক হতে পারে। জয়শঙ্কর ও উঠতে বসতে কুটনৈতিক নর্মস রেওয়াজ ভেঙ্গে পাকিস্তানকে গালাগালি করছে, সোজন্যেবোধের হ্যান্ডশেক করবেন না জানাচ্ছেন। কারণ যত পাকিস্তানবিরোধীতা প্রদর্শন ততই মোদি নিজেকে হিন্দু-বীর হিশাবে হাজির দেখাতে পারবে – এই হল ভিতরের সাজেশন বয়ান। এছাড়া এসব হিন্দু সেনারা মামলা করলে সিনেমা প্রযোজকেরা অর্থের বিনিময়ে আপোষ করতেও চাইতে পারে। যা এসব লোকাল সংগঠনের আক আয়ের উৎস হতে পারে! কাজেই এগুলা টুইস্ট ঘটনা হিশাবে দেখা যাচ্ছে খারাপ নয়!

    কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়ঃ
    একালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হল যে, এখন আমরা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র একই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত হয়ে গেছি বলে এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় সকল জনগোষ্ঠিই অপর (Others) জনগোষ্ঠির সাথে কানেকটেড। আর তা জীবনের সকল অর্থেই জীবনের সাথে আরেক জীবনযাত্রার ক্রমশ গভীর হয়ে উঠছে এই বিনিময়; যা কেবল পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ  নয়।  কাজেই অন্য অপর জাতি জনগোষ্ঠির তুলনায় আপনি শ্রেষ্ঠ  এমন এক  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা একালে অচল শুধু নয়; এটা আত্মঘাতি। কারণ, এতে ভারত উল্টা একঘরে হয়ে যাবে অন্য যেকোন রাষ্ট্র এই ঘৃণা-বিদ্বেষ অপছন্দই শুধু না – এই ভারতের সঙ্গে পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যঅও করতে চাইবে না। কিছুদিন আগে কাতার লিড নিয়েছিল ওআইসির [OIC] হয়ে কঠর সমালোচনা করেছিল। জবাবে ভারতে বিদেশ মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি মুখরক্ষার একটাই শব্দ পেয়েছিল যে  OIC নাকি সাম্প্রদায়িক!!!!!!  এখানে দেখুন, জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    তাহলে এর সারকথাটা হল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে ছেয়ে উঠার একালে, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এই বয়ান এই উগ্র জাতিবাদি রাজনীতি দিয়ে কোন রাষ্ট্র খাড়া করা আত্মঘাতি, অচল। এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ! হিতে-বিপরীত কাজ! আর এরই অনুসঙ্গ আরেক চিহ্ন হল যে, আপনার রাষ্ট্রে বা কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়। কারণ, উগ্র জাতিবাদি রাজনীতিক ভিত্তি থলে তো ভিতরে নাগরিক অসাম্যই চর্চা হবে, মুসলমান কোপায়েই ভোট নিতে চাইবেন। এটাই হবে একমাত্র ততপরতা ও ভিত্তি! আর এঘটনায় আপনার পণ্যের ক্রেতা ভয় পাবে -অপছন্দ করা শুরু করবেই! এজন্যই বলছে একালে উগ্র জাতিবাদ –হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এক অচল আত্মফঘাতি রাজনোইতিক চিন্তা।  হিন্দুত্ববাদের ভারত তাই ক্রমশ ভেঙ্গে পড়বেই, একঘরে হয়ে যেতে বাধ্য
    একালে ধর্ম প্রচার, নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এজন্য অন্যের দেশ দখলে (ধর্ম প্রচার বা কলোনিদখলের জন্য) বেরিয়ে পড়বেন কিংবা এসব কাজকে  পুরানা দিনের রেফারেন্স দিয়ে জায়েজ বলে সাফাই বয়ান খাড়া করবেন – তা হবে না ! এটা কাজ করবে না। আর এরচেয়েও বড় কথা এটা আত্মঘাতি অচল ততপরতা! আপনিই একঘ্রে হয়ে যাবেন। সেটা সবার আগে বুঝবার চেষ্টা করেন!

    সবার আগে দুনিয়ায় বিশেষ করে চলতি নয়া শতকে কী কী  ও কেন বদলে গেছে সেসব কিছুকে আমল করেন।  নিজের ভাল চাইলে এর বাইরে কিছুই নাই!
    তাই একটা সিনেমা শুধু সিনেমা নয়, বহুকিছুই……।

    অথচ ভারত রাষ্ট্রের যেখানে দরকার একটা ফেডারেলিজম বা ফেডারল রাষ্ট্র কায়েম যাতে কেন্দ্র-রাজ্য বৈষম্য দূর হয়ে যায়, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্বের বোধের রাষ্ট্র না হয়।
    তাই এ’রাষ্ট্র নিজেও ভুগবে পড়শি রাষ্ট্রদেরকেও ভুগাবে  আর সাথে সংঘাত হত্যা, ক্লিনজিং ডেকে আনবে সেই শঙ্কা প্রবল হচ্ছে!

    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  মধ্যরাত ০১ঃ ১৯
    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  ভোর ০৫ঃ ০৪
    আপডেটঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৪

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    গুরুত্বপুর্ণ হওয়াতে একটা পাঠক-প্রশ্ন নিচে তুলে আনলাম সাথে আমার জবাবঃ
    Anil Iftakher
    বিশ্বে যতো জাতি আছে,তাদের মধ্যে অনেকেই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছে।যারা এগিয়ে আছে তাদের গর্ব করাটা কি অন্যায়? আমরা যে অনেক দিক দিয়ে পিছিয়ে আছি এটা নিয়ে কেউ খোচা দিলে কি তা অন্যা

    লেখকের জবাবঃ
    Anil Iftakher গর্বটা যখন করবেন “আমিই শ্রেষ্ঠ জাত” বলে দাবি করে তখন অন্যেরা বুঝবে যে এটা তার জন্য বিপদের কথা।
    তবে  এটা অন্যায় হবে মূলত এজন্য যে এরপরে আপনি আমার ঘাড়ে চড়বেন, আপনার পা টিপে দিতে বলবেন, আমার সম্পদ কেড়ে নিবেন, আমাকে উঠায় নিতে চাইবেন ইত্যাদি। আর এসবই করবেন যেহেতু – আপনিই শ্রেষ্ঠ – সেটা আগেই বলে নিছিলেন, তাই। অর্থাৎ আপনি যে জাত-শ্রেষ্ঠ এই বক্তব্যের দাম চাইবেন আপনি, আর আমাকে এর দাম চুকাতে বলবেন………।
    আর এখান থেকেই, অন্যের উপর আধিপত্য করা বা অন্যদেশকে কলোনিদখল করে নিবার পক্ষে যে সাফাই বয়ান, ন্যায্যতার বয়ান বা Justification  সেটা সাধারণত তৈরি হয়, হবে ঐকথার উপর দাঁড়িয়ে যে উনিই “শ্রেষ্ঠ জাত” তাই!
    – বৃটিশেরা আমাদের কলোনিদখল করে নিয়ে দাবি করত আমরা তো অসভ্য তাই সভ্যতা শিখাতে বৃটিশেরা আমাদের দখল করেছ।
    – বাংলায় জমিদার হিন্দুর আধিপত্যও এভাবে শুরু হয়েছিল যেহেতু তারা আগেই বলে নিয়েছিল যে ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’ – তাই মুসলমানেরা বাঙালি হিন্দুর সমান নয়, নিচা ও অধস্তন। অতএব মুসলমানদের উপর জমিদার হিন্দু বাঙ্গালির আধিপত্য, দাপট দেখানো অথবা অসমান জ্ঞান করে মুসলমানদেরকে তাদের পায়ের নিচে রাখাটা জায়েজ! অথবা কী অর্থে তারা বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রবেশাধিকার পেতে পারে সেই শর্ত তারা তাই হাজির করেছিল সেটা হল “অসাম্প্রদায়িকতা”। মানে মুসলমান-ইসলামিক চিহ্ন, অভ্যাস বা বৈশিষ্ঠ ত্যাগ করে বা লুকিয়ে রেখে, প্রকাশ্যে না দেখিয়ে তবেই হিন্দু সমাজে পিছনের বেঞ্চে বসার সুযোগ পেতে হবে!
    – হিটলারেরো জাত শ্রেষ্ঠত্ব বোধ থেকে সাফাই হচ্ছে তাই – জর্মান জাতি নীল চোখের এরিয়ান (Aryan referred to a racial category, বাংলায় আর্য) রক্তের তাই তারা শ্রেষ্ঠ। তাই ইউরোপের বাকি সবাইকে তাদের অধীনস্ততা করতে হবে। আর এথেকেই হিটলারের  ইহুদিদেরকে  গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা জায়েজ ইত্যাদি।

    –  মোদি ভারতে মুসলমানদের নিচা দেখানো আর মোদির হিন্দু জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর বড়াই দেখানোও একই কারণে। যেমন করোনাকালে মাঝে তারা বলেছিল তাবলীগ-মারকাজ এরা কালচারের দিক থেকে খুবই নিচু।  কারণ মুসলমানেরা নাকি আঙুল দিয়ে চেটে চেটে খাবার তুলে খায়। অথচ যেখানে ঘটনা হল, সারা অখন্ড ভারতই  এথনিক-জাত বৈশিষ্ঠ হিশাবে তারা সকলেরই খাদ্য গ্রহণ বা  খাওয়ার স্টাইল হল তারা চামচ দিয়ে তুলে খায় না। বরং হাতের পাঁচ আঙুল ব্যবহার করে, আঙুলে ধরে খাবার তুলে খায়। আবার খেয়ে বলতে চায় যে যে খাবারটা আমার শরীরের বাইরের – প্রকৃতির – কিন্তু তা আমার নিজ শরীর প্রবেশ করার পরে এক ‘প্রক্রিয়ায়’ সেটা আমার নিজ-শরীর হয়ে যাবে তাকে আগে থেকেই নিজ হাতে ছুঁয়ে ছেনে অনুভব করে আদরে আপন করে নিব না কেন! আমি আমার ঐ হবু খাদ্য বা শরীরকে আগেই তাকে স্পর্শে ফিল করতে চাই, এই অনুভুতি আমার জন্য খুবই জরুরি; অতএব হাত দিয়েই খেতে হবে!

    এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – তাই এক ভয়ঙ্কর ফেনোমেনা, ভয়ঙ্কর অসুখ, অসুস্থতা। আপনার যেকোন (অপর) বা আপনার পড়শিকে আপনি এটা ব্যবহার করেই তাকে সহজেই ‘নির্মুল” করার পক্ষে যুক্তি তুলবেন।  আর এটাকেই এথনিক ক্লিনজিং “Ethnic Cleansing” বলে।
    তাহলে আপনার কাছে যেটাকে খুবই সাধারণ – নিজেকে নিয়ে একটু গর্ব করা – বলে বুঝেছিলেন সেটা গত গভীর হিংস্র, নৃশংস এন্টি-হিউম্যান, এক কালো চিন্তা, despotic বা দাগী চিন্তা এখন তা বুঝতে চেষ্টা করেন। জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই  চিন্তার আসল রূপকে বুঝেন, চিনে নেন।
    একালের বাইডেন আর ট্রাম্প এদুই শাসকেরও দুই ব্যাখ্যার কিন্তু একই – হোয়াইট সুপ্রীজম বা White Supremacy – চিন্তা তারা ধারণ করে এসেছে। এনিয়ে আমার লেখাতে পাবেন। আর এখানে হোয়াইট বলতে পুর্ব ইউরোপীয় “সাদা ককেশীয়” [White CAUCASUS] এথনিক জাতের মানুষ বুঝানো হয়। মূল দিক গুলো তুলেছি এখন এবার বাকি অংশ বা আরো গভীরে যেতে গুগল সার্চ করে পড়াশুনা করে নেন।