Tag: ভারত

  • চীন ভাইসাবের সমস্যা

    চীন ভাইসাবের সমস্যা
    গৌতম দাস
    ১৬ জুন ২৩  মধ্যরাত  ০০: ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4CP

           আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত: চীন। [চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন]

    চীনা এমবেশির ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল মিডিয়ার কিছু খোরাক এসেছিল [মুল ইংরাজিটা এখানে]। এরপর সবাই নিজ নিজ মত করে ফোকাস সাজিয়ে সে খবর মিডিয়ায় এনেছে। এর মধ্যে সবাইকে ছাড়ানো ফোকাসে প্রথম আলোও তা হাজির করেছে। তাতে মনে হইয়েছে চীন এবার বোধহয় যেন  হাসিনার বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে। দুনিয়াকে সব অনাচার থেকে মুক্ত করবে ইত্যাদি এমনই বোধহয় এর শপথ!
    না বাস্তবতা একেবারেই তা নয়। আমরা একসাথে কাজ করব এতটুকু তো বলাই যাই। কিন্তু পরের শব্দটা যখন নীতিগতভাবে, মানে মূলত কমন পলিসিতে তহ্ন একথার একরকম মানে হবে। আর যখন সরাসরি বা আকার ইঙ্গিতে বলা হবে যুদ্ধের বা বলপ্রয়োগের কথা তাহলে সেটা অন্যরকম! অনেকেই চীনাদের কথাটা –  “We stand ready to work together with Bangladesh and other countries to oppose all forms of hegemonism and power politics,…।” কথাটাকে নীতিগত সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নাই। বাইরে নিতে চেয়ে ইঙ্গিত রেখে মানে করেছেন। তাতেই এটা সাংঘাতিক শুনাচ্ছে। খুব সম্ভবত এটাই ভারতের ইচ্ছা যেকারণে প্রথম আলো এসব কথার এক্সট্রিম অর্থের ইঙ্গিত এনেছে।

    কিন্তু কোর ফ্যাক্টস-টা মানে মর্মশাসটা হল, আমেরিকা হাসিনাকে সরাতে পারলে, মোদিকেও সরাতে পারলে এতে লাভের গুড়ের এক বড় অংশ যাবে চীনের পক্ষে আর তা কিছুই না করেই!

    আমাদের উচিত হবে, “একসাথে কাজ” বলতে এইটারে নীতিগত পর্যায়ে রাখা ও বুঝা পর্যন্তই; তা ছাড়িয়ে ফিজিক্যাল যুদ্ধ, বা পাশে দাড়ায় যুদ্ধ এসবের ইঙ্গিত দেয়াটা হল উস্কানি তোলার চেষ্টা – এটা যেন মনে রাখি।

    এখন তাহলে চীন ভাইসাবের সমস্যাটা কীঃ
    চীনের মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, যে আমেরিকা “hegemonism and power politics”করে।
    আচ্ছা, চীনই কী প্রথম বা এবারই প্রথম যে আমেরিকার “hegemonism and power politics” এর নিন্দা করে কথা বলছে বা তুলছে?

    মোটেও না, একেবারেই না। এমনকি ১৯৫৩ সাল থেকে একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকা একাজ করে চলেছে। সেবারই প্রথম সিআইএ বাহিনী পাঠিয়ে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিল আমেরিকা। এটা দুনিয়া সকলেই জানে শুধু তাই নয়, এটা একালে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করে নিয়েছে। পরে একালে ২০১৩ সালে এই স্বীকারোক্তি নিয়ে নিউজ রিপোর্ট এখানে CIA admits role in 1953 Iranian coup

    । 
    কিতু তামাশা হল আমেরিকার এসব বিশেষ স্বভাব পরিচয় জানার পরও আজকের চীন [১৯৫৮ সাল থেকে মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে ঢেলে সাজানো যে চীন]  সেও কী সেই আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠতম সুসম্পর্ক করে নাই; আর সেটা অন্তত ২০১০ সাল পর্যন্ত????
    শুধু তাই না এই চীন-আমেরিকা হানিমুন এমনই হানি-ময় ছিল হবু বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়ে আমেরিকা-চীন এর সখ্যতা কী তখন ঘোষণা দিয়ে  এরা একসাথে সেসময়ের (১৯৭১) পাকিস্তানের আয়ুব-ইয়াহিয়ার পক্ষ নেয় নাই?
    আর তখন কী আমেরিকা  hegemonism and power politics নীতিতে ছিল না??? আমি নিশ্চিত কোনপক্ষই এটা অস্বীকার করবে না।  এমনকি ২০১০ সালের পর থেকে আজকের আবার আমেরিকা-চীন প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্রমশ এটা মুখোমুখি সংঘাতের সম্ভাবনা হাজর করার দিকে যাচ্ছে – এটাই তো বাস্তবতা!

    কাজেই আজকে হঠাত আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর কর্তা বলে আবিস্কার কেন? এটা পরিস্কার করে বলা উচিত ছিল চীনা মুখপাত্রের। এটাই সেই ফ্যাক্টস যে আজ আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর জন্য দায়ী করে কথা তোলা এটা চীনের এখনকার বাংলাদেশ নীতি! আবার এটাই সত্য কাল যদি আর কোন দৈব দুর্বিপাকে হাসিনা ক্ষমতা হারায় ফেলেন তাহলে আবার তখনও চীনা অবস্থান আবার বদলে যাবে, আর সেটাও স্বাভাবিকই হবে!
    সারকথায় তাহলে মূল বিষয়টা হল চীনা স্বার্থ। এটাই সবক্ষেত্রেই সবকিছুর নির্ণায়ক আর তাই এর মধ্যে আমেরিকা ভাল কী খারাপ কিংবা hegemonism and power politics কিনা সেটা খোজা অর্থহীন।কাজেই বাংলাদেশেও তো রাজনৈতিক ধারাগুলোর স্বার্থ – এর অন্তত দুইটা পক্ষ তো আছে আমরা ধরে নিতে পারি যে তারা হল – “প্রো  আর এন্টি” – হাসিনা। চীন যেমন তার যখন যেমন স্বার্থ সে ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তেমনই  তারাও তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ মোতাবেক অবস্থান নিবে, কোনটাকে সঠিক বা কোনটাকে বেঠিক বলবে! তাই না? এটাই তো স্বাভাবিক!

    কথা আরও আছে খানিকটাঃ
    এই যে চীন আজ হাসিনার পক্ষে দাঁড়িয়ে আমেরিকার hegemonism and power politics বলে খারাচ্ছে [নীতিগতভাবে] – তাতে, চীন নিশ্চয় জানে এটা কোন ক্ষমতার হাসিনা!

    ওয়ান-ইলেভেন বা ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে নয়া (অ্যামেরিকান) ক্ষমতার উদয় হয়েছিল এর সরাসরি সুবিধাভোগী এবং সরাসরি সেই ততপরতার গন্তব্য ও পরিণতিই তো হাসিনা ক্ষমতাসীন হয়ে উঠে যেটা আজ পনেরো বছর ধরে বহাল। এটা কী চীনের অজানা? তা তো নয়। তাহলে সেটাও তো এই আমেরিকারই hegemonism and power politics এর এক সদম্ভ প্রকাশই ছিল। অথচ চীন কী তখন এই আমেরিকারই অথবা আমেরিকার কোলে উঠে ক্ষমতা নেওয়ার জন্য কী হাসিনা সরকারের কোন সমালোচনা করেছিলেন? কোন অ্যামেরিকান hegemonism and power politics তখন চীন দেখতে পায় নাই কেন????

    বরং চীন কী করেছিল?
    ২০১০ সাল থেকেই চীন শুধু হাসিনা সরকারই নয়, পার্টি টু পার্টির কথা বলে আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষ সম্পর্ক শুরু করেছিল। ঐ বছরের ঈদের ছুটিতে ততকালীন লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম চীন সফরে গেছিলেন। আর চীন সরকার তক্কে তক্কে ছিল কীভাবে বিশ্বব্যাংকের পাশ দিয়ে হলেও অবকাঠামো ঋণদাতা হিশাবে বাংলাদেশে ঢুকা যায় কিভাবে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তা পেতে চীনের (বিশেষত ভারতীয় বাধা পেরিয়ে) ২০১৬ সাল লেগে যায়। কিন্তু কখনই চীন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান হেজিমনির (hegemonism and power politics) সমালোচনা করেই নাই। কেন? হোপ চীন এই সত্যের সাথে একমত হবে।
    তাহলে এখানেও সারকথা হল চীন যেটাকে তখন স্বার্থ মনে করেছিল সেটাই ছিল নির্ণায়ক! তাতে আমেরিকা hegemonism and power politics এর শক্তিধর – সেটা হ্যা কিংবা না তাতে কিছু আসে যায় নাই।

    তাহলে এখন শেষ কথাটা চীনকে শুনতে হবেঃ।
    তাহলে এখন সেই আমেরিকারই একই হাসিনা সরকারের উপর স্যাংশন দেয়া – এটা আসলে কী?

    সম্ভবত বাংলাদেশের মেজরিটি মানুষ বলবে এটা কাফফারা! আমেরিকার ২০০৭ সালে আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত! তবে স্বভাবতই এগুলো আমজনতার ভাষা যারা থিওলজি বা ম্যাটোফোরে [matafor] কথা বলে থাকে তাই! – ঠিক রাজনৈতিক ভাষা বা ভাষ্য হয়ত নয় তা বলতে পারেন!

    তাহলে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা পরিভাষাটা কী?
    সেটা হল, এখন অ্যামেরিকান স্বার্থ হল এশিয়ায় একটা ওলটপাল্ট বা ঢেলে সাজানো। গত ২৩ বছর ধরে অনুসৃত অ্যামেরিকান এশিয়া নীতি ঢেলে সাজানো। আর এই নয়ানীতিতে বাইডেন প্রশাসন  এখন আর হাসিনাকে আর দেখতে চাইছে না। কেন?

    কম করে বললেও এতে একটা সংযোগ হল ভারত মানে মোদির ভারতের! সেখানেও বাইডেন মোদিকে দেখতে চাইছে না। খাড়া ভাবে (ব্যক্তি বাদ দিয়ে) বললে, গত ২৩ বছর আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল, চীন ঠেকানোতে ভারতকে ব্যবহার করবে বলে। আর এরই মজুরি ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।
    কিন্তু এখন সময়টা হল অ্যামেরিকান বদল যাওয়ার –  মানে গত ২০০১ সালে ওয়ার অন টেরর বা এর কিছু আগে যার শুরু হয়েছিল সেই নীতি-পলিসির পল্টে যাওয়া বা পল্টানি শুরু হয়েছে এখন। যখন প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত এনপিটি [NPT] এর সদস্য না হওয়া সত্বেও তাকে পরমানুর কাচামাল পাওয়া, পরমানু এনরিচমেন্ট ইত্যাদিয়ে সাহায্য করে ভারতের মন জয় করে বুশের আমেরিকা ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছিলেন। কাশ্মীর নির্বাচনি ব্যবস্থা রাজীব থেকে বাজপেয়ি সকলেই ভেঙ্গে দিয়ে কাশ্মীরকে সশস্ত্র আন্দোলনের ভুমি এই নতুন দিকে ঠেলে দিলেন অথচ বুশ এটাকে মুসলমানদেরই দোষ, সশস্ত্রতা – কথিত “জঙ্গীবাদই” সমস্যা বলে সুর মিলিয়েছিলেন সেই সময়ে।

    ঘটনা হল আমেরিকা এখন হায় হায় করছে পুরানা সেই নীতি নেওয়াটা ভুল মনে করছে, সেটা মুখে না বললেও এক্ষণকার পদক্ষেপগুলো তা বলছে। তারা মনে করে ভারতের পিঠে হার রাখার জন্যই ভারত যেন ‘বেয়াদব’ হয়ে গেছে ভুয়া পরাশক্তির দাবিদার হয়ে গেছে। তুলনায় আমেরিকার খুব একটা কোন লাভ হয় নাই। এটাই পরোক্ষে সেসময়ের নীতি-পলিসিটা ভুল বলা হয়ে যাচ্ছে – কারণ তা বলেই না তা এখন বদলে দিতে চাচ্ছে।   তাই এখনকার অ্যামেরিকান লক্ষ্যকে ভারতের শব্দে বললে এটা যেন আমেরিকার “ভারতকে আওকাত শিখানোর” সময় এটা। কথাটা জামা পড়িয়ে বললে এককথায়, এক সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত ভারত দেখতে চায় আমেরিকা। যেটা সারকথায় কোন চীন-রাশিয়া-ভারত জোট এর হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাড়াবার হুমকি দিবে না। যদিও আপাতদৃষ্টিতে চীনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভারতের প্রপাগান্ডা যাতে ভারত মানে করে থাকে চীনই তার প্রধান শত্রু – এধরণের কথাই আমরা এখনও দেখছি। কিন্তু অ্যামেরিকান চাপ যত বাড়বে তাতে ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠবে এটাই সবার স্থির অনুমান!

    মোদি বাইডেনের দাওয়াতেঃ
    মজার কথা হল এমাসেই ২১-২৪ জুন  মোদি বাইডেনের আমন্ত্রণে আমেরিকা যাচ্ছেন। সেখানে বাইডেন ভারতকে নিয়ে যেন তোলায় তোলার সুযোগ নিবে; দরদামে নিবদ্ধ হবে।  সারকথায় বাইডেন সম্ভবত মোদিকেই বলবেন, সাব-অর্ডিনেট হয়ে ভারতকে তেমন সাইজে ছোট হয়ে যেতে। না হলে তিনি রাহুলের পক্ষ হয়েই  নিশ্চিত দাঁড়াবেন।
    বিপরীতে মোদি চাইবেন তাকে জিততে দিতে আর জিতবার পর ভারত-আমেরিকা এক কমন স্টাটেজিক দোস্ত হবেই এই ওয়াদা করতে চাইবেন তা যত গভীরে সম্ভব এমনটাই হতে পারবেন তিনি। এমনকি, এটা বলাও বিচিত্র নয় যে মোদি বলবেন বাকি সবদেশের সাথে সম্পর্কের উপর আমেরিকার সাথে সম্পর্ককে তিনি জায়গা দিতে চান ইত্যাদি।
    স্বভাবতই মোদি একবার নির্বাচন করে ফেললে আর মোদিকে আটকানোর কোন সুযোগ আমেরিকার হাতে থাকবে না, তাই বলাই বাহুল্য  যা করার আমেরিকাকে আগেই করতে হবে। কাজেই এই আলাপ থেকে কোন ডিলে বা রফায় এবারে পৌছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রায় তা  যাবে না।
    তবে বাইডেনের দিক থেকে এটা মোদিকে একবার শেষ বাজিয়ে দেখা বা নেওয়া যে মোদির দিকে গেলে বাইডেনের জন্য কোন ভাল ডিল ছিল না –  এখন ২৪ জুনের পরে এব্যাপারে বাইডেন নিশ্চিত হয়ে যাবেন হয়ত। এবং দেখা যাচ্ছে বাইডেনের গন্তব্য ক্রমশ  মোদিবিরোধীদের দিকে, মানে  রাহুলের দিকে! এদিকে শেষে যাবে হয়ত!
    তাহলে সেক্ষেত্রে এই পুরা প্রক্রিয়ায় শেষে ভারতের আসল সাইজ সক্ষমতাটা কী সেটাই উদোম হওয়ার দিকেই যাচ্ছে। এভাবে ভারতের সক্ষমতাটা প্রকাশ্য হয়ে যাওয়াটা এতে তো তা চীনের জন্যও কম লাভজনক হচ্ছে না- তাই নয় কী???
    তবে আমার কথা হল, ঘটনাটাক যেদিকেই যাক মোদি বা রাহুল বা মোদিবিরোধী জোট যাদের হাতেই ক্ষমতা গিয়ে শেষে ঠেকুক – ভারতরাষ্ট্র এতে এক্ষণকার চেয়ে মারাত্মকভাবে সক্ষমতায় এক দুর্বল ভারত হিশাবে পরিণত হবেই। ভাই পিঠে হাত রেখেছিল বলে এত দিনকার সব রোয়াবি পরাশক্তির ভাব সব চুপসে যাবে! আর এথেকে পরে পাওয়া চার আনা আসবে বাংলাদেশের পকেটে! এছাড়াও এতে সেই নয়া ভারতও কী চীনের দিক থেকে এক কাম্য-ভারত নয়, হবে না!! অবশ্যই!
    তার মানে আমেরিকার নীতি-অবস্থান চীনের জন্যও লাভজনক হতে পারে!

    তাহলে বাংলাদেশে আমেরিকা যদি কোন প্রায়শ্চিত্য করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তাতে চীনের বিরোধী অবস্থান অপ্রয়োজনীয়; বাংলাদেশের কেউ কেউ এরমধ্যে এটা তার পক্ষের মনে করে দাঁড়িয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক, তাই না! সময় দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘুর্ণিঝড় ভুমিকম্প ইত্যাদির মত করে অবজেকটিভলি দেখাও খারাপ হয় না!

    শেষকথাঃ
     এবিষয়ে আমার নিজের রিডিং নিয়ে দুটা কথা বলব।
    এক. আমি মনে করি এই মন্তব্য বাংলাদেশ বা হাসিনার নাম ধরে চীন বললেও এর টার্গেট বাংলাদেশ নয়। এর টার্গেট হল গ্লোবাল শ্রোতা এই অর্থে যে যেন বলা যে, চীন নয় আমেরিকাই এশিয়াকে আউলা ঝাউলা [প্লানডার বা plunder] করছে।  তোমরা অযথাই সবকিছুতে চীনকে দোষী করছো [বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির কথা যদি মনে রাখি।]। চ্চীন এটা বলবারই মওকা নিয়েছে – বাংলাদেশ ইস্যু বা এই ইস্যুর মাথায় দাঁড়াবার সুযোগ নিয়ে। কাজেই এসব চীনা কথা বার্তায় বাংলাদেশ ঠিক কোন প্রসঙ্গই না।

    দুইঃ দুনিয়াতে হিউম্যান রাইট ইস্যুটা ইস্যু হতে পেরেছে এই সেদিন, জাতিসংঘের জন্মেরও পরে ১৯৪৮ সালে। তাও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো এখনও জাতিসংঘ এর হিউম্যান রাইট বিষয়ক কোন কথায় মানে না আমল করে না; তা মানে না। মূল কারণ কমিউনিস্ট চিন্তায় রাজনীতিতে হিউম্যান রাইট বলে কিছু নাই।  বিপরীতে জাতিসংঘের ভিতরের যেকোন ফোরামে কোনটাই ইস্যু হিশাবে উঠাবে হবে কোনটা হবে না, এসবের চেয়েও বড় কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে কোন ইস্যুকে উঠানো হবে এসব ব্যাপারে আমেরিকা এখনও একলাই রাজা।  সে আগ্রহ দেখালে হবে না হলে কিছুই হবে অথবা দাফনায় দেয়া হবে – এই হল বাস্তবতা! এসবই আমেরিকাকে নির্ণায়কের এক বশাল ভুমিকা দিয়ে রেখেছে। কাজেই যখন আমেরিকা কোন হিউম্যান রাইট ইস্যু তুললে তাতেআমেরিকা যদি নিজের কোন স্বার্থ দেখে কেবল  তখনই সে উঠবে; নইলে দাফন হয়ে যাবে। যেমন দেখেন হাসিনার গুম খুন তো প্রথম পর্বে সবচেয়ে একচেটিয়া ছিল ২০১৬ সাল পর্যন্ত। অথচ সবকিছু আমেরিকার জানা সত্বেও তা কোথাও এক চিলতেও ইস্যু হয় নাই। কারণ আমেরিকা আগ্রহী ছিল না, ইস্যু মনে করে নাই যা তার কাজে লাগবে!  আজ মনে করছে বলেই তো এটা বিরাট ইস্যু! এসব দিক দিয়েই ইস্যুটা বুঝতে হবে।
    আবার উল্টা কথাটা হল, এবারর বাইডেনের আমলে এসে ইইউ শেষ বেলায় বাইডেনের নীতির মধ্যে মিশে গেল। এটা যদি না হত তাহলে কী দেখতাম?
    আমরা দেখতাম ইইউ এর পাঠশালায় চীন হিউম্যান রাইট এর  ক্লাস করছে। এবিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে আমার ২০১৯ সালের পুরানা লেখা এখানে দেখতে পারেন আগ্রহীরা।   এব্যাপারটা দুদুবারের চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণাতেও উল্লেখ আছে। কাজেই হিউম্যান রাইট যদি কোন ইস্যুই নয় বা বাজে কথা হয় – তা নিশ্চয় নয়; তাহলে তো চীন ইইউ এর পরামর্শ নিত না। সমস্যাটা হিউম্যান রাইট ইস্যু কী গুরুত্বপুর্ণ ইস্যু নয় না বা তা নিয়ে অন্যদেয়াশ কথা বলতে পারবে সেটাই বরং বাজে কথা। সবাইওই বলতে পারবে। কিন্তু ইস্যু হল বলবে কিনা। আর কোন রাষ্ট্র তখনই বলবে পক্ষে অথবা বিপক্ষে যেদিকে নিজের স্বার্থ দেখব। এই হল বটম লাইন!

    আপডেটঃ ১৬ জুন ২০২৩  ভোর রাত ০১ঃ ৩৭
    আপডেটঃ ১৭ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৩৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বেচারা আবদি

    বেচারা আবদি
    গৌতম দাস

    ৮ জুন ২০২৩    ০০ঃ ০১ মধ্য রাত
    https://wp.me/p1sCvy-4AX

     

    India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election

     

    এমন আবদি সাব-রে লইয়া আমরা কী করিবঃ
    এসএনএম আবদি [SNM ABDI]
    ভারতের প্রিন্ট মিডিয়া জগতে একজন সম্পাদক। এখন অবশ্য কোন মিডিয়ায় নাই, তবে ‘র’-এর সাথে সম্পর্কিত। তার এক দুঃখ-কাহিনী ভরা লেখা প্রকাশিত হয়েছে গতকাল ৬ জুন, ভারতের কুইন্ট [The QUINT] পত্রিকায়। সেখানে লেখার শেষে আবদির পরিচয় দেয়া হয়েছে  আউটলুক পত্রিকার সাবেক ডেপুটে এডিটর হিশাবে। আউটলুক-কে ভারতের মাপে “প্রগতিবাদী” মিডিয়া গণ্য করা হয়। আর কথিত মোদির-সেকুলার ভারতে কোন মুসলমান এডিটরের জন্য “প্রগতিশীলতাই” সবচেয়ে ভাল সার্টিফিকেট হয়ত!
    কিন্তু আবদি সাব এখন দেখি লেখাটা লিখেছেন য়াগের মতই ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের জন্য বা হয়ে। আজকাল তাঁর মত লেখকেরা এতই বেপরোয়া হয়েছেন যে সরাসরিই ‘র’-এর নাম লিখতেও  আর এদের ডর-লজ্জা করে না। ভদ্র ড্রয়িইং রুমে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা অসভ্যতা, বেয়াদবি মানা হবে এজন্য যে র [RAW] এই সংগঠন ভিনদেশে অন্তর্ঘাতমূলক বা subversive কাজ করে, অবলীলায় নিজ স্বার্থে সেদেশের নিরীহ মানুষও মেরে ফেলতে পারে, কেবল  এই হত্যাকে নিজদেশের স্বার্থ মনে করলে। যেটা বলাই বাহুল্য, মানুষ জগতের কাছে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য আদব-স্বভাব নয়; যদিও তা কোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থ হতেই পারে। একারণে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্য উচ্চারণ এড়িয়ে চলা ভদ্রতার রেওয়াজ!  যেমন আপনি কখনই বলতে পারেন না বা বলবেন না যে ওমুকের বাসা থেকে আপনি এটা চুরি করে এনেছেন! এটা হয় না!  কিন্তু  একালে আবদি বা সুবীর ভৌমিক দেখা যাচ্ছে এসব পরোয়া করা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের কাছে  ভদ্র-অভদ্র হলে কিছুই যায় আসে না।  বরং ‘র’-এর ক্ষমতা বা সাফল্য দেখানোই যেন গর্বের কাজ!

    আবদির এলেখার মুলকথাটা হল – লিখেছেন, বাংলাদেশে আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা এতে “ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, বিদেশে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা চালানো গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’, ন্যাশনাল সিকিউরিটি সমন্বয়ক সেক্রেটারিয়েট এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অফিস সকলেই বিরাট এক ঝাঁকি [jolted ] খেয়েছে”। মানে আবদি সাব বেচারা দুঃখ পেয়েছেন এমনভাবে ভারতের গুরুত্বপুর্ণ সকলকে ঝাঁকি দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়াতে! দেখেন নিচের ইংরাজিটা……

    It has jolted the Ministry of External, Affairs,
    the Research and Analysis Wing,
    the National Security Coordination Secretariat, and even the Prime Minister’s Office.

    দুবছর আগেও এমনই গোয়েন্দা বিভাগের এক ফরমায়েসি লেখা লিখছিলেন আবদি। আর এসবেরও আগে ২০১১ সালে তিনি বাংলাদেশে  প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সফরসঙ্গী হিশাবে এসেছিলেন। তখন অবশ্য তিনি দ্যা ফাস্ট পোস্ট -এই নামের ইংরাজি দৈনিকের সম্পাদক ছিলেন। মানে এখন [কংগ্রেস-ভার্সানে] গোয়েন্দাবিভাগের সাথে সম্পর্কিত তিনি। আর মনমোহনের যেই সফরটা ছিল এক প্রতারণার সফর – তিস্তার পানির বিনিময়ে করিডোর নেওয়ার কথা থাকলেও আজও সেই প্রতিশ্রুতি ভারত পূরণ করেনি, অথচ করিডোর ভোগ করে চলেছে সমানে ও অবলীলায়। এটাকেই ভারতের সাফল্যও মনে করছেন এরা।

    এবার যে পত্রিকায় আবদির লেখা ছাপা হয়েছে তার সম্পর্কেও দুকথা বলা দরকার। একালে নাগরিক অধিকারের উপর আক্রমাণাত্মক মোদি সরকারের ভারতে, এখনও সবার চেয়ে মাথা উচু করা সাহসী ভারতীয় মিডিয়াটা হলে ওয়াইর [WIRE] । বাকিরা  টিকতে পারে নাই। আর ওয়াইর-এর পরে যে এখনও মোদির টাকার লোভ আর চাপ সামলিয়ে এখনও  কিছু করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে সেই পত্রিকা হল কুইন্ট [the QUINT]।   যদিও আবদির লেখার কোন দায়িত্ব তারা নিতে চায় না তা জানিয়ে রেখেছে।

    আবদির গতকালের লেখা প্রসঙ্গেঃ
    এলেখার  শিরোনামেই বাংলাদেশে ভারতের হার ও ভারতের স্বার্থ বিপদে আছে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে আর এরপর ছটপটানি-তে বাঁচার চেষ্টা করছেন যেন, এভাবে লেখা। যার শিরোনাম লিখেছে এভাবে, India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election মানে “বাংলাদেশের নির্বাচন ইসুতে আমেরিকার হাত-মুচড়ানো থেরাপির প্রয়োগে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধরা”।
    শুরুর প্যারায় লিখছেন, বাংলাদেশে “আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞার চাপ এটা ভারতের জন্য সত্যিই এক খারাপ সংবাদ” [is really bad news for India]। কিন্তু তিনি কেন বাংলাদেশের উপর আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এক ভিন্ন দেশ ভারত এতে নিজের বিপদ দেখছে?? তা জানা যায় না!

    তবে তাঁর পরের প্যারাটা সবচেয়ে মজার। এবার এখানে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে হাসিনা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে হাসিনা অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইন-বহির্ভুত কায়দায় জিতেছিলেন। তাই লিখেছেন, “ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য পরিস্কার। এটা হাসিনা সরকারকে এমন এক শক্ত-ঘেরটোপের ভিতরে ফেলেছে তাতে হাসিনা যেন আর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মত করে অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইনবহির্ভুত উপায়ে ভোটে কারচুপি করতে না পারে। কিন্তু বিপরীতে দিল্লি যেকোন উপায়ে হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়” । দেখেন দেখি আবদির আবদার!!!

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means”.

    আবদির এই প্যারাটা একদিকে সততার সাথে মন খুলে বলা তার মনের কথা (মানে চোরের মনে কথার মত) আর বলাই বাহুল্য তা চোরামির গল্প সবাইকে খুলে বলার মতই এক গাধামি অবশ্যই!  আবার অন্যদিকে যেকোন সাফাই-বক্তব্যে অন্যতম দিক হলে সেটাকে একটা ন্যায়-ইনসাফের উপর দাঁড়ানো কথা হতেই হয়। অথচ আবদি আমলই করছেন না যে তার খায়েস-আকাঙ্খা যেটা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বা মোদি সরকারের খায়েস-আকাঙ্খা  – সেটার পিছনে কোন ন্যায়-ইনসাফের লেশ মাত্র নাই!
    যেমন আবাদির শেষ বাক্যটা দেখেন  New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means” – আমেরিকার ইচ্ছার বিপরীতে ভারত চায় যেকোন উপায়ে নির্বাচনে জিতানো ।
    আচ্ছা আবদি সাব, বলেন তো দেখি  তার মানে যেটা হাসিনাকে যেকোন উপায়ে জিতানোর ভারতীয় খায়েস সেটা কী আর কোন “নির্বাচন” থাকে?? না কারচুপি হয় সেটা??? এছাড়া এভাবে ভারত অন্যায়-বেইনসাফিতে যদি হাসিনা জিতাতে চায় তাহলে বিপরীতে আমেরিকার বাংলাদেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপকে হস্তক্ষেপ বলার সুযোগ বা নৈতিকতা কী আর ভারতের থাকে??? আবদি ‘র’-এর খেদমতে এতই মশগুল যে এই বেইনসাফি দিকটার দিকে তাঁর কোন চোখ নাই, আমল নাই!!!

    ভারতীয় লেখকেরা বিশেষ করে যারা মোদির কোলে বসে লেখেন তারা এত উচ্চমাত্রার উগ্রজাতিবাদে ভুগেন যে তাদের কাছে ন্যশনাল ইন্টারেস্ট বলে এক  আজিব ধারণা তাদের লালন করতে দেখা যায় যা অনুসারে ভারতের স্বার্থ-রক্ষার্থে তারা যাই করুক তা জায়েজ ও বৈধ হয়ে যাবে – বলে এক আজিব ধারনা তারা লালন করে থাকে। আবদিও এমনই এক লোক।
    আবদি লিখছেন, “একদিকে আমেরিকা হাসিনার প্রতি অবিশ্বাসে মাত্রা তুঙ্গে নিয়ে গেছে যে সে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, অন্যদিকে ভারতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে যেকোন উপায়ে হাসিনাকে ২০২৪ এর নির্বাচনে চতুর্থবারের মত জিতিয়ে আনা; আর এটাই
    তার বিদেশনীতি-কাম নিরাপত্তা স্বার্থ”।
    নিচে মূল ইংরাজিটা।

    “On the one hand, the US has such grave misgivings about Hasina that it wants to evict her from power. And on the other hand, the biggest priority of India’s foreign policy-cum-security establishment is to get Hasina re-elected in January 2024 for a fourth successive term at any cost.”

    তাঁর মানে যেটাকে ভারতের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” মনে করা হবে সেটা ভারত চাইলেই পাবে আর তা পাওয়ার জন্য ভারত সবকিছু করতে পারবে; তাতে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ বা নিজ রাষ্ট্রীয় এক্তিয়ারের বাইরে তা চলে গেলেও অথবা  অন্যদেশের সার্বভৌমত্ব এক্তিয়ার ভঙ্গ করলেও যেন কিছু এসে যায় না। অর্থাৎ সারকথাটা হল, ভারত সেটাকে তার জাতীয় স্বার্থ মনে করছে কিনা – এই হবে মাপকাঠি। এই মাপকাঠি ধরে সব জায়েজ মনে করতে হবে!! যদি খালি  ভারত মনে করে তাহলেই ভারত তা আদায় করতে পারবে!!!!
    তবে এই কথা শুনে তো আমাদের হাততালি দিয়ে উঠা উচিত। কারণ তাহলে, মোদি দেখতে খুবই খারাপ তুলনায় রাহুল অনেক হ্যান্ডসাম ছোকড়া। ফলে বাংলাদেশ যদি মনে করে মোদিকে উপড়ায়ে ফেলায় দিয়ে রাহুল কেন  বরং মমতাদিদিকে যদি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় নিয়ে আসি আর খালি সেটা যদি বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট বলে ঘোষণা করে দেই তাহলে তো আমরাও  ইচ্ছামত ভারতের সরকার বদলাতে পারব, তাই না??? কী মজাই না হবে!!! সত্যি! আবদি নিশ্চয় এতে খুশি হয়েছেন?

    এরপরে এসে এই বার আবদি সাবের হুশ এসেছে যে তাহলে বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকা-ভারতের কাড়াকাড়িতে তাহলে ভারত কী সবসময় মার খেয়েই যাবে? পরিস্থিতি সবসময় আমেরিকার পক্ষে ছেড়ে দিয়ে ভারত কী স্যাক্রিফাইস করেই যাবে নাকি উলটা আমেরিকাকে অমান্য করবে অথবা এমন অমান্য করা কী ঠিক হবে?  এই ধরণের লোমছোম কথাবার্তা  লিখে চলেছেন আবদি……The gaping chasm underlines the India-US conflict over Bangladesh and raises valid questions about India’s capabilities to pursue its goal defying the US – and whether it is wise to do so. It also flags gross US insensitivity to India’s interests even in India’s own backyard and how the US always expects India to quietly sacrifice its interests for America if they happen to clash!

    মজার কথা হল, এরপরেও আবদি মনে করেন, বাংলাদেশ হল নাকি ভারতের বাগানবাড়ি বা শখের মামাবাড়ি  ফলে সেখানে কেন আমেরিকান মাতব্বরি চলবে [India’s interests even in India’s own backyard] এনিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের কোন বাপের বাগানবাড়ি সেটা অবশ্য আমরা বাংলাদেশিরা জানি না বা মানিও না…।

    তিনি এরপরেও আবার ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের কথা তুলেছেন। বলছেন ভারতের কাছে পরীক্ষিত বন্ধু হল নাকি হাসিনা! আর ওদিকে আমেরিকা সে না হাসিনার পক্ষে না আওয়ামি লীগের পক্ষে – আমেরিকা কেবল সরকার বদল বা শাসক বদলে দিবার পক্ষে!!! For India, there is no alternative to Hasina – New Delhi’s tried and tested ally. But the US is neither in Hasina’s nor Awami League’s favour – it is in favour of an outright regime change, no less.
    মানে হল আবদি বলছেন ভারত নামের এই বাচ্চাটার মুড়ির মোয়া ভালো লেগেছে এখন তাকে তার হাতে সেটা না  দিয়ে অন্যকিছু দিলে কী তার ভাল লাগবে? আসলে আমেরিকা কতই না নিষ্ঠুর আর কী বলব!!! মাসুম বাচ্চা ভারতের কথা একবারো ভাববে না?????

    এরপর তিনি হাসিনাকে এক মারাত্মক সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে তা ভেবে সাবধান করেছেন। বলছেন, সাবধান “…… There is a very high probability of visas of Hasina’s immediate family members……” কথাটার বাংলা করলে,  হাসিনার আপন পরিবারের সদস্যদের উপরও আমেরিকা ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ [মানে তারাও যেন আমেরিকায় প্রবেশাসধিকার না পায় বা থাকলে বের করে দেয় ] এমন ব্যবস্থা জারি হতে পারে……।।

    তবে আসলে,  আবদি লোকটার চিন্তা ভাবনা খুবই ভোঁতা আর বোকা-বোকা কিসিমের, সন্দেহ নাই। যেমন বলতেছেন, হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ নাকি চীন আর পাকিস্তানিতে ভরে যাবে। মানে সেই আশির দশকের সব অচল চিন্তাভাবনা – হিন্দু-মুসলমান রেষারেষিতে ফেলে পেটি-মধ্যবিত্ত যেভাবে চিন্তা করে বা করত!  এর মানে  উনি জানেনই না যে হাসিনার সাথে একালে খুবই ও সবচেয়ে ভাল সম্পর্ক হল পাকিস্তানের; বাংলাদেশ পাকিস্তানি হাই-কমিশনারেরও। এছাড়া, চীন ২০১৬ সাল থেকে চীনের হাত খুলে অবকাঠামো ঋণ দেয়া যা একচোটে প্রায় ২৬ বিলিয়ন যা বাংলাদেশের জীবনে মোট বাকি সবার দেওয়া ঋণের চেয়েও বেশি। আর এটাই হাসিনার উন্নয়নের গল্পের পিছনের মূল রসদ। তাদের দলের চোরদের খাই মিটানোর উপায়!! একই অবস্থা ভারতের। চীন-ভারতের বাণিজ্য এখন বছর ১১৫ বিলিয়নের (যার মধ্যে চীন থেকে ভারতে আমদানি ৯৮.৫বিলিয়ন বাকিটা চীনে রপ্তানি) কাছাকাছি তাতে লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারতের যতই লড়াই ঝগড়া থাক। আবাদি-কে এসব দিকে চোখ তুলে তাকাতে শিখতেই হবে – আশির দশকের পরে এখনও পুরাণা চিন্তা বা পুরাতন গল্প ইত্যাদি এসবের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেই চলার এটা হল বেকুবের সাহস!

    এককথায় বললে আবদি আসলে হারু পার্টি। তিনি আগাম ধরে নিয়েই লিখতে বসেছেন যে [যেটা উনি ঠিকই বুঝেছেন] যে গত পনেরো বছর ধরে ভারত হাসিনার বাংলাদেশকে  যে চুসা চুসে গিয়েছে সেসব দিন এখন ফুরিয়ে আসছে। তাই প্রতিটা বাক্যে আবদি তিনি আপসোস ঝড়িয়ে কথা বলেছেন। এমনকি আরেক বাঙালি পেটি কর্মকর্তা – ঢাকায় ভারতের সাবেক এক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী – তাঁর কথিত এক বাণী স্মরণ করেছেন আবদি। আবদি বলছেন ২০১৮ সালের দিকে পিনাক রঞ্জন লিখেছিলেন – “হাসিনার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া এই অসৎ উদ্দেশ্যে করা একটা কাজ …the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”. ” –  যেটা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার উপর হস্তক্ষেপ করতে চেয়ে করা কাজ…”।

    In a rare criticism of Hasina by an Indian official, Pinak Ranjan Chakraborty who served as India’s Ambassador in Dhaka from 2007 to 2009, wrote in 2018 post-retirement that the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”.

    শেষ কথাটা হল, আবদি দেখতে পেয়েছেন, “বাংলাদেশ এখন আমেরিকার পরামর্শের পক্ষেই ক্রমশ ঝুকে যাকচ্ছে এবং যাবেই; আর এতে সবকিছুই বিএনপির পক্ষে চলে যাচ্ছে…”

    আমাদের শেষের বাক্যে মাত্র দুইটা শব্দ – বেচারা আবদি!  

    >>>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

    ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
    গৌতম দাস

    ০৪ জুন ২০২৩   ০০ঃ ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4yT

     

         দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে – প্রথম আলো

    অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভারত হাসিনা-বিরুদ্ধ-ততপরতায় নেমে পড়েছে, অবস্থান নিয়েছে। কিছু জায়গায় তো একেবারে প্রকাশ্যে, দেখিয়েই তা করতে শুরু করেছে।
    ভারতের মোদি সরকার বিশেষত তার গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশে হাসিনা সরকার আর টিকছে না যেন তা ধরে নিয়ে কাজকাম শুরু করে দিয়েছে। তাদের সকল ততপরতা এখন এমন হাসিনাবিরোধীতাকে টার্গেট করে যে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের জন্য তারা এখন ঝেঁড়ে কেশে হাসিনাকেই দায়ী করে বাইডেনের কাছে নালিশ দিয়েছে ও একশন দাবি করেছে। সেই চিঠির ইংরাজি পিডিএফ কপি এখানে। আর এর এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ অংশ বাংলা করে দিচ্ছি নিচে।


    ” যখন থেকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় তখন থেকে আজ অবদি বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে। বাড়িঘর পুড়ানো, লুট করা, মন্দির ধবংস করা ও প্রতিমা ভাঙচুর, খুন রেপ আর বাধ্য করে ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদিতে সবকিছুরই পরিণতি হয়েছে যে হিন্দুরা ভারতে পালায়ে গেছে।  শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের খৃশ্চান জনগোষ্ঠিকেই নিপীড়ন-নির্যাতন করেছে; তাদের তাদের উপাসনালয় জ্বালিয়ে দেয়া লুট করা, পাস্টার-পাদ্রীকে জেলে নেওয়া আর ধর্মান্তকরণ এর সময় পরিবার তছনছ করে দেয়া ইত্যাদি সবই ঘটেছে”।
    চিঠির যে অংশটার বাংলা অনুবাদ এটা নিচে সেটারই ইংরাজিটা, 

    “Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs”.

    আসলে ভারতীয় প্ররোচনায় ড্রাফট করা আর কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে সে অভিযোগ তোলার সময়ে হাসিনার বিরুদ্ধে বিরোধীদলের কর্মীদেরকে যতগুলো গুম, খুন, অপহরণ, বিনাবিচারে হত্যা বা বেআইনি আটকে রাখার অভিযোগ দায়ের কাছে ভারতের কৌশল সেসব অভিযোগই আসলে যেন কেবল হিন্দুদের কিছু খৃশ্চানের উপর করা হয়েছে – এইভাবে তুলে এনে সাজানো হয়েছে ঐ চিঠিতে। আরেক দিক থেকে দেখলে মোদি যেভাবে সবকিছুতে ভারতের মুসলমানেরা হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ [কেরালা স্টোরি সিনেমা]  করছে বলে ভুত দেখে থাকে সব জায়গায় সেভাবেই হাসিনাকেও ঐ একই ধর্মান্তকরণের কর্তা-নায়িকা বলে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাপারটায় বেশ আমোদ হয়েছে আমাদের! এই আর কী!
    আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাইলে নিশ্চয় এখন আপসোস করতে পারেন যে গত ২০২১ সালের কুমিল্লায় দুর্গাপুজার  হামলার ঘটনায় জড়িত সকলের খবর ম্যাপ এঁকে বের করলেও কেন তিনি এদের পিছনের ভারতীয় হাত ও লিঙ্ক উন্মোচন বা-প্রকাশ করেন নাই কেন একথা ভেবে!!! স্বামীর সুখের কথা ভেবে স্ত্রীরা এভাবে আর কতদিন……।

    অর্থাৎ হাসিনা সরকার আর টিকবে না মনে হচ্ছে ভারত যেন এমন সিদ্ধান্ত-অবস্থান পৌছে গিয়েছে। এনিয়ে সুবীর ভৌমিক গেল একসপ্তাহে দুবার লেখা দিয়েছে। প্রথমটাই হাসিনাকে বিরোধিতা দেখালেও আবার দ্বিতীয়টাতে ভান করেছে যে যেন ভারত সরকার ও গোয়েন্দা বিভাগ হাসিনা সরকারের টিকানোর জন্য কাজ করেছে। নিচে দেখেন সুবীরের লেখা থেকে সেই দাবির অংশটুকুছিল এরকমঃ

    “Indian diplomats and national security officials have flown back
    and forth in a week of intense parleys
    (foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka, to cite a few)”

     মানে হল, বাস্তবে ভারত হাসিনাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেও সুবীর এখনও একটু নাটক করতে চাইছেন। অথচ এনিয়ে ভারত সরকার ভারতের মিডিয়াকেও হাসিনা (বাংলাদেশ)বিরোধি সরকারি গাইড লাইন দেয়া হয়েছে। যেমন দেখুন “ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পালটা কূটনৈতিক বার্তা? চিনের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকা” ।  অথবা দ্যাহিন্দু পত্রিকার বিরাট আঁতলামো রিপোর্ট যার শিরোনাম  – Explained | How has Dhaka reacted to the U.S. threat on visas? – অথচ ভিতরে শিরোনামে দাবির কথা নিয়ে কিছুই নাই কেবল খামোখা চীনকে দোষারোপ ছাড়া।   মানে হল হাসিনা যেন চীনের পক্ষে নতুন করে যাচ্ছে অথচ এর কোনটাই সত্যি না।  আর ভারত এই উসিলা তুলছে  যেন বাইডেনের কোলে উঠে হাসিনাবিরোধি সাজতে পারে সে। ফ্যাক্টস হল, হাসিনা নতুন করে কোন চীন-ঘনিষ্ঠতা করে নাই। কারণ সেই সুযোগই নাই। এই ভোলাটাইল [volatile] বা অস্পষ্ট মুহুর্তে চীন নিজেই কোনদিকে ঝুঁকতে আগ্রহি নয়, কেবল রুটিন ততপরতা ছাড়া।

    কিন্তু কেন এখন ভারত হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে সময় হয়েছে মনে করলোঃ
    ভারতীয় র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন – একথা সুবীর ভৌমিক তার নিজের লেখাতেই “ভারতের বীরত্ব হিশাবে দেখাতে গিয়ে” স্বীকার করেছেন। যদিও গোয়েল সাব এসেছিলেন এনিয়ে হাসিনাবিরোধী শক্তির সাথে একসাথে কাজ করতে চাওয়ার অফার দিতে। কিন্তু বাংলাদেশের তেমন বা অমন কোন শক্তিই সামন্ত গোয়েলের সাথে কাজ করতে আগ্রহ দেখায় নাই। গোয়েল সাব ভেবেছিলেন হাসিনাবিরোধি কোন একশনে যৌথকাজ কারবারের অফার দিলে বাংলাদেশের যে কেউ ঝাপায় পড়ে গোয়েল সাব রে কোলে তুলে নিবে। আর এর ভিতর দিয়ে আগামি হাসিনা-উত্তর  নয়া সরকারের মধ্যেও হাসিনা আমলের মতই গোয়েল সাবেরা ঢুকে বসে থাকার সুযোগ নিবেন, ধারাবাহিকতা বা কন্টিনিউটি বহাল থাকবে! কিন্তু হায়! গোয়েল সাব হতাশ হয়েছেন!
    এই খবর নিয়ে যদিও আরেকটা সুত্র একটু কারেকশন দিয়েছে। তাদের মতে সামন্ত গোয়েলের সাথে বাংলাদেশের হাসিনাবিরোধী শক্তির দেখা হয়েছে সেকথা সত্য তবে সেটা বাংলাদেশে নয়, বিদেশে দেখা হয়েছে। মানে গোয়েল সাহেব বাংলাদেশে আসেই নাই। সে যাই হোক, এখানকার মূল কথাটা হল, ভারত হাসিনার হাত ছাড়ার সময় হয়েছে মনে করেছে।

    আসলে সারকথাটা হল, সামন্ত গোয়েল বা ভারত সরকার প্রচন্ড অধৈর্য ও অস্থির হয়ে উঠেছে। মূল কারণ, হাসিনা সরকারের টিকে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে অবস্থা তেমন ভাল না এমন ভয় অনেকের মধ্যেই ঢুকেছে; অন্তত ভারতের মত বিদেশিস্বার্থের মধ্যে “এক অনিশ্চয়তা” শুরু হয়েছে। সেখান থেকেই এমন অনুমান যে  হাসিনা যদি টিকতে নাই পারেন সেক্ষেত্রে হাসিনার সরকারের ক্ষমতা-উত্তর বাংলাদেশে কোন অন্তর্বর্তি সরকার বা পরের নির্বাচিত সরকার ইত্যাদিতে সম্ভব্য যারাই ক্ষমতায় আসবেন অনুমিত সেসবের কারোর সাথেই এখনও ভারতের কোন ঘনিষ্ঠতা দূরে থাক কোন নুন্যতম সম্পর্কের কিছুই তৈরি হয় নাই। কাজেই এই সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতেই এখন থেকেই ভারত বেপরোয়া অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু কী থেকে শুরু করবে তার কিছুই খুজে পাচ্ছে না।  যেখানে বিএনপি সেই প্রণয় ভার্মার বাসায় কথিত ডিনারের দাওয়াতের পরে যেন হ্যালো বলা থেকেও আরো দূরে চলে গেছে। মূল কারণ, ভারতের নিজ সম্পর্কে হুদাই খুবই উচ্চ ধারণা! ভারত ধরে নিয়ে আছে যে সেই-ই এতই ক্ষমতাবান যে বিএনপির নেতা কে হবে অথবা কী রাজনীতি করবে তা ভারত ঠিক করে দিতে পারে! যেখানে বাইডেনের হাত থেকে মোদি বাঁচে কিনা, কিভাবে তাই এখন নিলামে উঠেছে বড় বাজি হয়ে! অথচ এটা তো বুঝাই যাচ্ছে,  সরকার বদল না হলে বিএনপি কারোও সাথেই কথা বলবে না। এমনকি ভারতের বেলায় সরকার বদলের পরও কী হবে বিএনপি ভারতকে নিয়ে কী করবে এর পুরাটাই এখনও অনিশ্চিত।  সম্ভবত সঠিক শব্দ হবে যে  – সেটা এখনও বিএনপির কাছে  “এজেন্ডাই হতে পারে নাই”।  যেকারণে, সবমিলিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই বিএনপিবিরোধী প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে। অনেকের ভারত-ইসরায়েলি কালেকশনের সোয়েব চৌধুরীর কথা মনে আছে হয়ত। সেই সোয়েব একাজ শুরু করে দিয়েছে। যদিও এসব কাজ এখন মানুষ আর খায় না। কারণ সব গুমোর উদাম হয়ে গেছে তাই এসব ছেচড়ামির আর কোন দাম নাই!

    কিন্তু ভারত কেন এত মরিয়া হয়ে আগেই হাসিনার হাত ছাড়তে চায়?
    এর পিছনের সবচেয়ে বড় কারণ, গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশকে চুষে চুষে খেতে, একপক্ষীয় সুবিধা নিতে যত দীর্ঘ তার অফুরন্ত স্বার্থের লিস্ট ভারত তৈরি করেছে, হাসিনা-উত্তরকালে সেসবের কী হবে? সেই একই ধারাবাহিকতা-সুবিধা তখনও  থাকার তো কোন কারণ নাই। এছাড়া চুষে-লুটে যেসব একতরফা কর্মকান্ডে বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে আর এসবের উপর নির্ভরশীল হয়ে যে নিজস্বার্থ ব্যবস্থা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছে তা তো আর বজায় থাকবে না – সব অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক।  সুবীর ভৌমিক সরাসরি এসব  ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে বিএনপির নাম ধরেই লিখেছে যে আগামি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে কখনও যদি ভারতকে হাসিনার দেয়া বিভিন্ন একপক্ষীর চুক্তির সুবিধা সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করে দেয় তাহলে কী হবে [what with khateda Zia’s threart to review all agreements Hasina has signed with India]!!  সকলেই জানে এবিষয়ে ভারতের স্বার্থের স্টেক বা স্বার্থ-বহর অনেক লম্বা। তাই এখান থেকেই  ভারতের সব দুঃশ্চিন্তার শুরু। তাই বাংলাদেশে এমন যেকোন একটা রাজনৈতিক গ্রুপ বা শক্তিকে পেতে মরিয়া যারা আগামিতে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন হবেন – ফলে ভারতের বাংলাদেশ লুটার স্বার্থের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে! ভারতের দুর্ভাগ্য যে এখনও এমন কোন বাংলাদেশি শক্তির হদিস তারা পায় নাই। আর বিএনপি সে তো আরো দূরে। আর ততই গোয়েল সাহেবেরা ডেসপারেট হয়ে বলতে চাচ্ছেন হাসিনার বিরুদ্ধে কাজ করা বা তাঁকে বেচে দিয়ে হলেও ভারতকে বাংলাদেশের একটা আগামি রাজনৈতিক শক্তির নাগাল পেতেই হবে।
    ভারতের হাসিনার হাত ছাড়ার প্রথম উদ্যোগের হদিস  আমরা কিছু এখান থেকেই পাচ্ছি। তবে এটার প্রকাশ্য রূপ-ততপরতা নাগাল পাওয়া বা জানা যথেষ্ট কম-ই বলতে হবে। কারণ সেনা বা গোয়েন্দা বিষয়ক তথ্য যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর পেলেও সেনসেটিভ বলে অত খুলে আলোচনা করা যায় না। সেটা সঠিকও না, হিতে বিপরীত হতে পারে।  তাই ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটার দিকে তাকানো যাক। এটা তুলনায় অনেক স্পষ্ট  আর উন্মুক্ত।

    ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগঃ
    ভারতের এই উদ্যোগ অনেক প্রকাশ্য এবং অনেক দূর ইতোমধ্যে আগিয়ে গেছে।  আর সুবীর যেমন ক্রেডিট নিতে বলেছিল যে, ভারতের foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka ) যারা হাসিনারর পক্ষে কাজ করতে ভীষণ দৌড়াদৌড়ি করছে – সেটা দৌড়াদৌড়ি ছিল অবশ্যই কিন্তু তা ছিল হাসিনার বিপক্ষে, তাঁকে বেচে হলেও হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও ভারতের আগামি স্বার্থ উদ্ধার বা যা ছিল বাংলাদেশের আগামি রাজনৈতিক শক্তি যারা হবে তাদেরকে তালাশ বা অন্তত তাদের একটা লিঙ্ক যোগাড় -এই ছিল ভারতের ওসব দৌড়াদৌড়ির উদ্দেশ্য।

    কংগ্রেসম্যান বা কংগ্রেস প্রতিনিধি সম্পর্কে কিছু কথাঃ
    সরাসরি হিন্দুইজমের সমর্থক এক অ্যামেরিকান কংগ্রেস প্রতিনিধি ছিলেন তুলসী গাব্বার্ড।  [Tulsi Gabbard] এই নামে দেখুন এখানে যিনি সর্বশেষ ২০২০ সালেও কংগ্রেস সদস্য ছিলেন। তাকেঁ ঘিরে এছাড়া  হিন্দু অ্যামেরিকান ফাউন্ডেশন [Hindu American Foundation (HAF)], ইসকন এমন আরো অনেক কিছু মিলে ভারত কিছু কংগ্রেসম্যান যোগাড় করেছিলেন যাদেরকে ভারত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ব্যবসা দিয়ে নিজরাষ্ট্র স্বার্থে  ভারত ওসব কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে লবি করাত। আমেরিকার মোট কংগ্রেসম্যান হল ৪৩৫ জন। এদের মধ্যে নুন্যতম দশজনকে ভারত তার স্বার্থের পক্ষে লবি-কারি বানাতে পারবে সেটা নিশ্চয় অসম্ভব কিছু নয়। সেসবের একালের ততপরতা হিশাবে মনে করা যায় যখন একালে ছয় রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠান এক চিঠি।

    তাই একালে  হাসিনা-উত্তরকালে  ভারতের কী হবে এর সন্ধানে থাকা ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটা হল এই ছয় অ্যামেরিকান রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান (আমাদের ভাষায় যারা অ্যামেরিকান সংসদ সদস্য) প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে চিঠি পাঠানো থেকে। গত ১৭ মে এমন ছয় জন কংগ্রেসম্যান একটা চিঠিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠিয়েছিল। এই চিঠির বিষয়বস্তুই হল, বাংলাদেশে হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণ ও এর প্রতিকার!  এই চিঠির কপি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে অনেকে দেখে থাকবেন, আর এর একটা কপি ঢাকার নিউ এজ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আবার অনেকের কাছে আমেরিকান ইউনুস সেন্টারের কপিটাও আছে দেখেছি। শুরুতে বা উপরে আমি দিয়েছে অরিজিনাল কপির লিঙ্ক।

    সবচেয়ে বড় কথা এতে শেখ হাসিনাকে চরমতম ভিলেন – হিউম্যান রাইট ভায়োলেটর, র‍্যাবের নামে ডেথ স্ক্যায়াড [death squard] বা ভাড়াতে খুনি বাহিনী চালানো, বিরোধীদেরকে নির্যাতন, ঘুম, খুন, অপহরণ ইত্যাদি সব ধরণের অভিযোগে অভিযুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড়কথা এটা হাসিনা ক্ষমতাসীন হবার সেই ২০০৯ সাল থেকেই হাসিনার অপততপরতা বলে দাবি করা হয়েছে।
    এমনকি এর মধ্যে  তাই হাসিনার সহযোগী বাহিনী হিশাবে বাংলাদেশের সেনাসহ এসব বাহিনী থেকে (স্বল্প কিছু যা) জাতিসংঘ বাহিনীতে যুক্ত হয় এদের সকল বাহিনীকেই জাতিসংঘ শান্তিবাহিনীর কাজে নিষিদ্ধের করার জন্য বাইডেনের কাছে এবার সুপারিশ করা হয়েছে।

    সেনাবাহিনী বা জাতিসংঘ সম্পর্কিত চিঠিতে এই বাড়তি অনুচ্ছেদ – এটা বেশ নতুন তা মানতেই হবে। কারণ, এর ভিতর অন্তর্নিহিত বক্তব্য-অর্থ বা ইমল্পিকেশন [implication] অনেক গভীর ও মারাত্মক। এটা সৈনিকদেরকে অফিসারদের বিরুদ্ধে খেপানোর শয়তানি কাজ, অবশ্যই। অনুমান করা হচ্ছে যে এর ভিতরের যে অন্তর্নিহিত বক্তব্য তা নিয়েই কাজ করতে  এটা সুবীর ভৌমিক কথিত সামন্ত গোয়েলের ঢাকা আগমন ঘটিয়েছিল। অর্থাৎ ভারতীয় পক্ষ থেকে তাদের এই ততপরতা ফলাও করে হাসিনার পক্ষের কাজ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ ভারত করেছে উলটা কারণে, ভারতের হাসিনার হাত ছাড়তে বলা – এটাই সে ফেরি শুরু করেছে।

    কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ এবং চমক লাগানো দিক হল এই চিঠির আরেকটা অংশ, সেদিকটা। আর সেখান থেকে এটা পরিস্কার যে – এই ছয় কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষরে চিঠি পাঠানো – এটা ভারতেরই কাজ। তারাই কংগ্রেসম্যান জুটিয়ে এই চিঠি লেখার ঘটনাটা ঘটিয়েছে। কিন্তু  কেন?
    কংগ্রেসম্যানদের চিঠিতে কী আছে  সে সম্পর্কে আগে বলেছি। যেমন হাসিনাকে সেখানে হিউম্যান রাইট দলনকারী হিশাবে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে  উপরে বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু কীভাবে সেই বর্ণনা থেকে পরের প্রসঙ্গ যাওয়া হয়েছে তাপাঠককে সরাসরি জানানো দরকার।
    প্রথমত এই চিঠিতে  এক দীর্ঘ অভিযোগে দাবি করা হয়েছে  হাসিনা  হিন্দু-খৃশ্চানদের দলনকারী, জুলুমকারী [……persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh.] !!!!!  মানে হাসিনা তাদের ভাষায় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনকারী – যেকথা রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইবেন কিনা সন্দেহ!  কিন্তু সরি। এটা এখন সত্য  যে একথা এখন রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইছেন; আসছি সেখানে। এটাই ভারতের ম্যাসেজ বা ভারতের এখন দানের পাশা ঊল্টানো আচরণ!

    কংগ্রেসম্যানদের চিঠি হাসিনার অপরাধ সম্পর্কে লিখেছে …...The well-documented abuses by the Hasina government are not confined to her political opponents; the government also has persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh. মানে হাসিনার মানবাধিকার দলন এটা আর কেবল বিরোধীদলের উপরেই নাকি সীমাবদ্ধ নাই। এটা ধর্ম ও জাতিগতভাবে যারা সংখ্যালঘু [ মানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ভারত স্বঘোষিতভাবে যাদের কাস্টডিয়ান] দের উপরেও নির্যাতন জুলুমবাজি করছে হাসিনা!

    Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs.

    কী তামসা দেখেন! দাবি করে বলা হচ্ছে হাসিনার এবারের ক্ষমতা নিবার পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা নাকি অর্ধেক হয়ে গেছে [Hindu population has been halved]।  আর যে অভিযোগ এই সেদিনও সেতুমন্ত্রী বিরোধীদলের উপর আবার একালে গত কয়েক সপ্তাহ আগে আরোপ করতে চাচ্ছিলেন যে বিএনপি নাকি  সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর কাজ করছে! আর আজ সে অভিযোগ ভারতের মুখ দিয়ে উঠে আসছে খোদ হাসিনার বিরুদ্ধেই। তাই এটা এক কঠিন তামাসাই বটে! তবে এখনও আমরা আসল জায়গায় যাই নাই, এখন যাব।

    ‘দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক’ হয়েছেঃ
    এই প্রসঙ্গটা হল বাংলাদেশে ঘটা একটা ঘটনা যেটা ভারতীয় উদ্যোগে ঐ ছয় কংগ্রেসম্যানের চিঠিতে হাজির করা আর হাসিনাকে হিন্দু নির্যাতনকারি হিশাবে তুলে ধরার-ই বাংলাদেশ ভার্সান ও সংশ্লিষ্ট ততপরতা। এনিয়ে  প্রথম আলো লিখছে, “দেশের বিশিষ্টজনেরা  বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। সেটা ছিল   ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৪: ধর্মীয়–জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার’ শীর্ষক এক সভা যা বুধবার বিকেলে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয়। মজার কথা হল সেখানে প্রথম আলো প্রতিষ্ঠান হিশাবে নিজেও এক অংশগ্রহণকারী দাওয়াত গ্রহিতা হিশাবে উপস্থিত ছিল। তাদের যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান এতে প্রতিনিধি হিশাবে বক্তৃতা করেন।

    আসলে এখানে অংশগ্রহণ করেছেন যারা তারা হলেন  – যারাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভারতীয় অর্থে বা অর্থের প্রতিপত্তিতে তৈরি হওয়া ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তাদের আয়-জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই,  ভারত এই সভায় তাদের সকলকে যোগ দিতে সহজেই বাধ্য করতে পেরেছে। কথিত এই মতবিনিময় সভায় প্রথম আলতে ছাপা হওয়া রিপোর্টটাকে খুটিয়ে দেখলে এমন অনেক কিছুই পরিস্কার হওয়া সম্ভব। এককথায় এটা হল, ভারত এতদিন বাংলাদেশের যাদেরকেই (কথিত হিন্দু সংগঠন ও এর নেতারা সহ) পেলেপুষে  নিজের প্রভাবে রেখেছে তাদের সর্বোচ্চ সমাবেশ ছিল এটা। এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল হাসিনাকে ত্যাগ করা [disown] বা হাত ছেড়ে অস্বীকার করা যে তিনি আর তাদের কেউ নন।  শুধু তাই নয় গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা ‘সংখ্যালঘু’ নিপীড়ন-জুলুমবাজি করেছেন বলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করে দেওয়া। এটাই সবচেয়ে কঠিন কঠোর পদক্ষেপ ছিল ভারতের।  এর মানে ঐ কথিত সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা যে ভারতের পাপেট বা হাতের পুতুল ছিলেন সেটা যেন তারাই হাজির করেছেন। কেন?
    কারণ, বাংলাদেশের ভারতের কোরস্বার্থ সহ সবকিছুই এখন কঠিন বিপদের মুখে। তাই এসকল মুখ এক্ত্রে ঐ সভায় উপস্থিত হয়ে  হাসিনার মুন্ডু-নিপাত করছেন অবলীলায়!!!  সত্যি তামাশা চলছেই!!! কারণ বাংলাদেশে হাসিনা তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদের উপর যে নিপীড়ন জুলুম করেছে সেসব কিছুকে এক ঘটকার এই শয়তানেরা একে হিন্দু নিপীড়ন বলে নামিয়ে ছোট করে নিজের পক্ষে নিয়ে গেল!

    ঐ সভায় উপস্থিত এক মুখ্য চরিত্র দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যঃ
    দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সিপিডির মূল উদ্যোক্তা-মালিক রেহমান সোবহান এর পরের ব্যক্তি তিনি। সেই ওয়ান-ইলেভেনের সময় থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট কে করিডোর দিতেই হবে; দিলে সেই আয়ে আমরা নাকি সিঙ্গাপুর হয়ে যাব – এরপক্ষে ভারতীয় দালালি দিয়েই প্রতিষ্ঠানটার বড় ততপরতা শুরু।  তাই ভারতীয় স্বার্থরক্ষার কনসালটেন্সির অর্থ তাদের এক বড় আয়ের উৎস আমরা বুঝতে পারি।  কিন্তু তাই বলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য – তিনি বাংলাদেশের কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হয়ে যাবেন?? দেবপ্রিয়ের এই ভুমিকার এত চিপ …… একথা আমাদের জানা ছিল না। খুব সম্ভবত সিপিডি “ঠিকঠাক” চালাতে গেলে এখন দেবপ্রিয়কে কথিত সংখ্যালঘু  হিন্দু নেতার ভুমিকায় নামতেই হবে, হয়েছে দেখা যাচ্ছে।  তাহলে মানুষের আত্মমর্যাদা বলতে কী  আসলে কিছু নাই?
    প্রথম আলো সুনির্দিষ্ট করে বলছে,   ” মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে” – এই কথাটা বলেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য!  আর তা পুনরায় সমর্থন ও উচ্চারণ করেছেন রামেন্দ্র মজুমদার, শাহরিয়ার কবির প্রমুখ। সত্যিই দেবপ্রিয়-র বিল এইবার ম্যাচিউরড আর সবাইকে ছাড়িয়ে তা বড় পরিমানের হবে।

    সাম্প্রদায়িক জিনিষটা কী তা একটু পরে আসছি। তার আগে এখন ওবায়দুল কাদের – সেতুমন্ত্রী ওকার মুখটা মনে পড়ে করুণা লাগছে।  বেচারা কত না এতদিন প্রমাণ করলেন যে “বিএনপি মানে সাম্প্রদায়িক” একথা বলে; এভাবে মনে সুখ নিচ্ছিলেন তিনি। আর এখন বাংলাদেশের হিন্দু-সব বড় বড়কর্তাদের সভায় যেটা আবার ভারতের আশীর্বাদে সমবেত এক সভা; সেখান থেকে তার মানে ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কাউকেই ছাড়লো না ভারতীয় স্বার্থ? তারা ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কেই সাম্প্রদায়িক বলে রায় দিল????

    বাংলাদেশে যেখানে গত পনেরো বছর ধরে লাগাতর সেপাই, এসআই ওসি থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে হিন্দুদের সর্বোচ্চ পদায়ন ঘটে চলেছে, যেটা কারও কারও হিশাবে এটা ২৫% বা এরই বেশি। হাসিনার কথা শুনেছি অনেকের মাধ্যমে তিনি নাকি ধারণা করেন যে হিন্দুরাই নাকি তাঁর সবচেয়ে বিশ্বশ্ত, মুসলমান কর্মচারিরা যেটা নাও হতে পারেন! তাহলে?  এ কোন বাংলাদেশি হিন্দু ? ভারতের এক ইশারায় যারা তামাম-ই হাসিনা ছেড়ে শুধু না; সমস্ত দায়-অভিশাপ হাসিনার উপর চাপিয়ে দিয়ে ভারত-রাষ্ট্রস্বার্থ এর পক্ষে এলাইন হয়ে গেল? হাসিনাকে ছেড়েই চলে গেল? এরপরেও কী বাংলাদেশের সব হিন্দুরা না হোক  ঐ কথিত মত বিনিময় সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন? বলা যাবে, তাদের রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব পরিচয় বাংলাদেশী?
    ব্যক্তির রাষ্ট্র পরিচয় কেন একালে লাগে আর তা গুরুত্বপুর্ণ কেন সেটা  আগে বুঝার চেষ্টা করতে পারি আমরা।  রাষ্ট্র-পরিচয় না থাকায় বেওয়ারিশ লাশের মত কোন এয়ারপোর্টের মেঝেতে মাসের পর মাস শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়া মানুষের জীবনের দিকে একবার কিছুক্ষণ তাকান!! রাষ্ট্র স্পষ্ট না থাকা প্যালেসটাইনিদেরকে বুঝার চেষ্টা করেন অন্তত! মানুষের রাষ্ট্রীয় পরিচয় যেমন গুরুত্বপুর্ণ তেমন রাষ্ট্রটাকে টিকিয়ে রাখা  আর ওর দায় নেয়া বা রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষাও নাগরিক হিশাবে আপনার দায় – এদিকটাও বুঝতে হবে। কাজেই বাংলাদেশে আপনার যত দুঃখই থাক অভাব থাক তা মিটাতে সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই নতুন করে পুনঃগঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক লড়াই করেন, এটাই আপনার একমাত্র করণীয়। কিন্তু কোনভাবেই আপনার সুখ নিরাপত্তার জন্য মোদিকে আপনাকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে আহবান করতে পারেন না। কারণ, এতে আপনিও আর কার্যত বাংলাদেশের নাগরিক থাকেন না, রাষ্ট্রও আপনার থাকে না, নাই হয়ে যায়। মোদিও কী ভারতের কোন মুসলমান নাগরিককে পাকিস্তানকে ডেকে আনার পক্ষে থাকতে এলাও করবেন? সেটা একবার ভাবেন? সেটা মোদি হিন্দুত্ববাদি বলে নয় এটা কোন রাষ্ট্রই পারে না। তবে কিছুই করতে না পারলে একালে মাইগ্রেট করে জন্মরাষ্ট্র ফেলে মাইগ্রেটেড রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া যায় সেটা ট্রাই করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে বসে নিজ সুখ বা পেটিস্বার্থের জন্য  ভারতের ব্যাগ-বোঝা বইতে পারেন না।
    এটা খুবই অদ্ভুত একজন পিএইচডি হোলডার দেবপ্রিয়-কে নিয়ে এসব কথা বলতে হচ্ছে!! কথা আরও কত কী হয়ে গেছে দেখেন।  দেবপ্রিয় এখন কোনটা নিজের সামাজিক পরিচয় বলে দাবি করবেন? তিনি কী  বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থের নেতা? যেটা আসলে ভারতরাষ্ট্রের বাংলাদেশে যেসব স্বার্থ আছে এর কোন তল্পিবাহক সংগঠন বা এর নেতা ছাড়া আর কিছুই নয়!  নাকি দেবপ্রিয় সিপিডির এক বড়কর্তা প্রতিনিধি? দেখেন গতকাল সিপিডি বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে আবার সরকার সমালোচনার মুডে চলে গেছে। গতকাল কড়া সমালোচনা করেছে সিপিডির প্রতিনিধিরা। যদিও গতকাল দেবপ্রিয় সেখানে ছিলেন না,  সিপিডির অন্যেরা ছিল। এখন সপ্তাহ খানেক আগেও দেবপ্রিয় সরকারের পক্ষে দাঁড়ায়ে আইএমএফ রে দায়ী করে (বোকা বোকা দালালি) বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে আজকে হাসিনা ছেড়ে যাচ্ছেন কে?
    সোজা কথাটা হল, কাল যদি তিনি সিপিডির বাজেট সমালোচনায় উপস্থিত থাকতেন তাহলে তার মুখে বাজেট সমালোচনা কে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে নিত – আপনি বাংলাদেশের আম-মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে বাজেট সমালোচনা করছেন নাকি  হিন্দু নেতা হয়ে ভারতের স্বার্থের পক্ষে এটা কোন সমালোচনা?  আমাদেরকে এদুটার ফারাক বুঝবার তো কোন উপায় রাখেন নাই! যে কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হতে চায় (যা আসলে ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ) তিনি তো একই সাথে বাংলাদেশের আম-মানুষেরো প্রতিনিধি বা বক্তা হতে পারবেন না!  

    দেখেন হাসিনা ফ্যাসিস্ট – গুম, খুন ‘ডেথ স্ক্যায়াডের’ রানী হওয়াই তার পরিণতি। কিন্তু আপনি দেবপ্রিয় এতদিন হাসিনার মাখন খেয়ে চলেছিলেন আর এখন এই বিপদে পড়া হাসিনাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, কেবল ভারতের স্বার্থে? আপনি তো হাসিনার চেয়েও খারাপ! পনেরো বছর ধরে হাসিনার ‘ডেথ স্কয়াড’ চলেছে মুখ খুলেন নাই, আকার ইঙ্গিতেও না, কেন?  এমনকি এখনও হাসিনার সমালোচনা যেটা করছেন সেটাও ভারতের ইচ্ছায়! ঐ সভায় যারা উপস্থিত তারা সকলে এই অপরাধে অভিযুক্ত, নয় কি? 

    সাম্প্রদায়িকতা কী?
    খুবই সংক্ষেপে বলব। আর আমার আগে বলা লেখা পড়ে নিতে লিঙ্ক দিব।
    সেটা ১৮০০ সালের দিকের কথা যখন হিন্দু জমিদারের বৃটিশ শাসনের অধীনে নিচে নতুন শাসক শ্রেণী হিশাবে বাংলায় আসর জমিয়ে বসতেছেন।  তারা দুটা সিদ্ধান্তের উপর তাদের নয়া বাংলার মসনদ সাজিয়েছিলেন। সারকথায় এর এক হল, মুসলমানেরা বাঙালিই না। জমিদারদের এই চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত।  কেউ বাঙালি কিনা এই এথনিক পরিচয়াবলী ভা এথনিসিটি নির্ধারণ যেন কোন শাসকের ইচ্ছা দিয়ে নির্ধারণ সম্ভব!    দুইঃ বাংলা ভাষা সংস্কৃত থেকে এসেছে। যেটার বিপরীতে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লার উচ্চারণ বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা (কন্যা) নহে।

    এদুটা মূল সারকথার উচ্চারণে কী এমন ফারাক হয়ে গেল তা প্রগতিশীলেরা হয়ত বুঝবে না।  বলবেন হয়ত এটা হুদাই ভারতবিরোধিতা। এবিষয়ে প্রগতিশীলতা=হিন্দুত্ববাদ এই সমীকরণটা মনে রাখলেই আপাতত চলবে! এদিকে জমিদার হিন্দুর নেয়া সবচেয়ে আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা হল যে নয়া তাদের নে্তৃত্বে সমাজে মুসলমানদের উপর আধিপত্য (সম্পর্ক) কায়েম তাদের করতেই হবে। যেকোন জাতিবাদি চিন্তা মাত্রই তা অন্য সকল জাতির উপরে নিজ শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করতে চায় – এটাই তার  লক্ষ্য মনে করে থাকে। জাতিবাদ মানে তাই “জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ”। তাই জমিদারদের আধিপত্যের খায়েস মূলত হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদ কায়েমের খায়েস। এছাড়া, জমিদারির অর্থনৈতিক জবরদস্তি সে তো আছেই।

    সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। 
    এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’।

    মুসলমানেরা বাঙালি নয় এই ফতোয়া দিলে তা মুসলমান মাত্রই তারা অধস্তন, আর তা হিন্দু জাতভেদের হিশাবে হিন্দু-জাতের সবচেয়ে নিচা মুচি বা চন্ডালদের চেয়েও নিচে  – এখানে মুসলমানদের কোন অবস্থান হবে। এছাড়া পুর্ববঙ্গে আবার মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট। তাই এই নিচা অবস্থান দেখিয়ে দিলে জমিদারদের পক্ষে অখন্ড বাংলায় আধিপত্য করতে এটা সহায়ক হবে। কিন্তু আধিপত্য করতে হবে কেন এই প্রশ্ন কেউ করতে নিজেকে করতে চায় নাই!
    এরপরেও জমিদারদের দুঃখ ঘুচে নাই। মোটাদাগে যদি পশ্চিমবঙ্গে  মুসলমান জনসংখ্যা ২৫% ধরে নেই তবে সেটাও যথেষ্ট বড় সংখ্যা বলে এদেরকে  চাইলেও শুধু দাবিয়ে রাখা মুসকিল।  বৃটিশ ভারতে ১৮৩০ সালের দিকে আধুনিক শিক্ষা মানে স্কুল কলেজে শিক্ষা শুরু হয়েছিল।  অর্থাৎ সরকারি চাকরির জন্য জনসম্পদ [Human resource HR] তৈরি তা বৃটিশ-ইন্ডিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজ স্বার্থে। এই সিদ্ধান্তটাকে যদি একজামিন করি তাহলে দেখব শাসক জমিদার শ্রেণীর হাতে মুসলমানদেরকে এই সুবিধা নিতে ঠেকিয়ে দিবার মত তেমন অস্ত্র ছিল না। তাই তাদের সমাজ মানে তাদের হিন্দু আধিপত্যের সমাজে মুসলমানদের জন্যই অন্তত কিছু জায়গা ছেড়ে রাখাটাই সঠিক হবে বলে মনে করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই স্কুলে মুস্লমান ছেলেটাকে পাশ বসতে দিবে কিভাবে, কিংবা চাকরিস্থলে  বা এমনকি এই সুত্রে সমাজে পাশাপাশি চলতে দিবে কিনা ইত্যাদি মেলা প্রশ্ন ভর করে এসেছিল। তখন জমিদার শাসনের হিন্দু সমাজ যেসব শর্ত আরোপ করেছিল যে শর্ত পুরণ সাপেক্ষে এই “সর্ব অন্তজ-জাত” মুসলমানেরা তাদের সামনের হিন্দু ডমিনেটেড সমাজে একটি প্রবেশ ও কোনায় বসার অনুমতি পেয়েছিল সেটাই “অসাম্প্রদায়িক” হওয়া।  মুসলমান আদব কায়দা দেখানো যাবে না, ইসলামি চিহ্ন  প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা যাবে না মানে  হিন্দু সমাজের কমন প্লেসে দেখানো যাবে না। ব্যাপারটা দাড়ায় স্কুলে ব্যাকবেঞ্চে জায়গা হয় একটু কিন্তু কেউ পাশে বসে না।  নিজেরা টিকি আর চন্দনে মুখে বা কপালে ড্রয়িং এঁকে হিন্দুরা সাত জায়গা ঘুরে বেরাচ্ছে অথচ মাথার টুপি ভুলে মাথা থেকে না খুলে প্রকাশ্য রাস্তায় বের হওয়া যাবে না। মানে সবসময় মনে করিয়ে দেয়া You are not equal to us – এই লক্ষ্যেই এটা পরিচালিত হত, শাসন সহজ করার জন্য। তাহলে সাম্প্রদায়িকতা কী? এর মানে হল যে হিন্দু সমাজ যে অধীনতা শর্ত চাপিয়েছিল মুসলমানদের উপর সেটা ভঙ্গকারিকে সাম্প্রদায়িক বলা হত।  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে না চাইলে আপনি সাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ সেটা মেনে চললেই কেবল আপনি “অসাম্প্রদায়িক সার্টিফিকেট প্রাপ্ত” হয়ে শর্ত পূরণ করেছেন বলে কেবল ঐ সমাজে প্রবেশাধিকার লাভ করতে পারেন।
    কালক্রমে আবার একদল  হিন্দু একাদেমিক হিন্দুত্বের অসাম্প্রদায়িক হবার শর্ত  যেটা  সেটাই যেন আধুনিকতা, এই বলে প্রলেপ দেয়া এক নয়া সাফাই চালানোর চেষ্টা করেছিলেন।  কিন্তু  এরা জানেই না যে ‘অসাম্প্রদায়িকতার শর্ত’ যারা চাপাতে চায় তারা আধুনিকই নয়। তাদের আধুনিক হবার সুযোগ নাই। কারণ আধুনিকতা প্রথম শর্ত হচ্ছে সাম্য। অথচ আপনাদের চাওয়ার ভিত্তি তো আধিপত্য, জাত শ্রেষ্ঠত্ব। কাজেই মানুষকে সমান চোখে দেখতে শিখেন আগে। নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক সেটা শিখতে হবে আগে। এছাড়াও প্রত্যেকের মর্যাদা, স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা আছে সে কথা খেয়াল রাখতে হবে।  অথচ ওদিকে সাম্প্রদায়িক শর্ত দিবার উদ্দেশ্যই তো  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে অপর যেকাউকে বাধ্য করা। যেটা সাম্য ধারণার উলটা। বরং জাতভেদে বিভক্ত ও ছেড়াবেড়া হিন্দুত্বের ধারণাটাই এজন্য আধুনিক হবার অযোগ্য, এটা এক মৌলিক অযোগ্যতা।  আর তাদের কথিত রেনেসাঁর আদিপুরুষ রাম মোহন রায় এজন্যই তো সবার আগে  ১৮১৫ সালেই একটা নয়া ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ গড়ে নিতে চেয়েছিলেন। এসব কেন হয়েছে সেসবের ব্যাখ্যা করতে শিখেন আগে।  না বুঝে কথা বলা এসব অন্নদাশঙ্কর মার্কা  রেনেসাঁ-বুঝার ভাবসাব আর কতদিন দেখাবেন! বরং যেসব ধর্ম বা থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যায়  বাই ডিফল্ট সাম্য অনুসরণ যোগ্য হয়েই থাকে সেসব থিওলজি থেকে আধুনিকতায় যাওয়া আসা সহজ।   মর্ডানিটি বুঝবার আগেই কমিউনিস্ট- প্রগতিশীল হয়ে যাবার সমস্যা এগুলাই!  মূল কথাটা হল, সবার আগে সবাইকে সমানজ্ঞান করা ও মর্যাদা দিতে শিখতে হবে। আর এই হল কথিত অসাম্প্রদায়িকতার গুমোড় ফাঁক!

    “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও
    বাংলাদেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়ে যাওয়ার কথাটি
    বলেন বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।”

    এখন আসেন, দেবপ্রিয়ের ঐ কথিত মত বিনিময় সভার কথায়। তিনি হাসিনাকে দায়ী করে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে”। তাহলে তিনি আসলে কী বলেছেন যা শুনে ঐ আসরের আরও অনেক কর্তা-হিন্দুনেতা হাততালি দিয়েছেন?  এর মানে তারা পনেরো বছরের হাসিনার শাসনে একেবারেই সন্তুষ্ট নন। আমরা দেখছি তারা চাচ্ছেন অসাম্প্রদায়িকতা – একটা খুব সুন্দর অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ!  যা মুসলমান হাসিনা দিতে পারেন নাই, এই হলো অভিযোগ। কিন্তু সেটা কী জিনিষ! আচ্ছা থাক সেকথা বাদ দিলাম। বরং আসেন জিজ্ঞাসা করে জেনে নেওয়া যাক কখন হিন্দুরা অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ উপভোগ করেছিল? তাহলে একটা ধারণা পেয়ে যেতে পারি।
    আমি নিশ্চিত দেবপ্রিয় বা রামেন্দ্র মজুমদার তো বটেই এমনকি খুশি কবির আর সাথে শামসুল হুদাও বলে উঠবেন – কেন, ১৯৪৭ সালেরও আগের জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের সমাজে! 

    এবার কী বুঝা গেছে তাদের খাঁটি অসাম্প্রদায়িকতার মাপকাঠি কী? মানে আমাদেরকে  শুরু করতে হবে জমিদারদেরকে জমিদারি ফেরত দিয়ে। কারণ জমিদারি ফেরত না দিলে জমিদার-হিন্দু আধিপত্য আর তাদের রুস্তমির সমাজ ফিরে আসবে কোথা থেকে? আর সেটা না হলে জমিদারি-অসাম্প্রদায়িক সমাজ আসবে কোথা থেকে? আহ রে অসাম্প্রদায়িকতা, কোথায় রাখি তোরে!!!! My Foot!

    আচ্ছা তাহলে কলকাতায় কী অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ আছে? আছে তয় মমতা মাঝে মাঝে মুসলমানদের ভোট নিতে গিয়ে সব নষ্ট করে দেয়! অবশ্য ইদানিং আরএসএস উঠে আসছে। তারা হিন্দু জনবসতির মধ্যে হোটেলে মুসলমান স্কুল শিক্ষকদের ভাড়া দিয়ে  থাকতে এলে তাদেরকে থাকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিজেপি ফতোয়া দিয়েছে । ভালই হয়েছে, সব পরিস্কার হয়েছে। এটা খুবই  অসাম্প্রদায়িক কাজ হয়েছিল একটা!  অতএব শেখ হাসিনা যতই শেখের মেয়ে হোক, তিনি তো আসলে মুসলমান! মানেই বিল্ট-ইন সাম্প্রদায়িক! তাই না!

    তাহলে ভারত কেন এই মত বিনিময় সভা করে নিজের স্বার্থ জড়ো ও হাজির করছে?
    কারণ, হাসিনার অবস্থা ভাল না। যদি তিনি ক্ষমতা হারায়েই ফেলেন কোন কারণে তবে আগামির রাজনৈতিক শক্তির সাথে  ভারত যদি কোন সখ্যতাই না গড়তে পারে তবে এই হিন্দুস্বার্থে প্রতিনিধিত্বের নামে ভারত নিয়মিত ডিস্টার্বেন্স হিন্দু জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করা ছাড়া আর তো কোন লিভার [lever বা চারাকাঠি] ভারতের হাতে থাকবে না!

    +++
    আপডেটেডঃ ০৫ জুন ২০২৩ দুপুর  ০২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • আবার সুবীর ভৌমিক!

    আবার সুবীর ভৌমিক!
    গৌতম দাস

    ২ জুন ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4yv

             Why Did the United States Just Sanction Bangladesh – FP

     

    আবার সুবীর ভৌমিক! তিনি আবার একটা লেখা পয়দা করেছেন, একই ফেডারেল পত্রিকায়। তবে এবার সম্ভবত শ্রীরাধা দত্তের দ্বারা সুবীর উদ্বুদ্ধ হয়েছেন যে – “ভারত এক পরাশক্তি”, এমন ভাব দেখানিতে সামিল হয়ে।  স্বপ্নে পোলাও খাবার মত এই ভাব ধরে কল্পিত ধারণার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নিয়ে আরো কত কী তো লেখা সম্ভব!! অসম্ভবএর কী আছে? আর এতে মোদির ভারতের ইমেজ অনেকটাই ফাও ফাও বাড়িয়ে নিবার অনেক সুযোগ আছে। তাই সুবীর মনে হচ্ছে এবার সে লাইনে আবার একটা লেখা পয়দা করেছেন।

    লেখার শিরোনামঃ “India intervenes to douse tempers in US-Bangladesh spat” মানে হল – “আমেরিকা-বাংলাদেশের মধ্যে গরম হয়ে যাওয়া কথাবার্তায় ভারতীয় হস্তক্ষেপ, উত্তেজনার পারদ নামাতে”।

    তার মানে সারকথা হল, ভারত এক বিরাট পরাশক্তি আর মোদি তার বিরাট নেতা – এই প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সুবীরও। এতে তিনি মোদিকে এতই বিরাট নেতা বানাচ্ছেন যে তিনি যেন দুপক্ষকে শান্ত করেছেন [নিচে মূল ইংরাজিটা দেখতে পারেন।]। এই অভিনয়ের উপর দাঁড়িয়ে সুবীর কথা সাজিয়েছেন। আবার সুবীর নিজেই এক সাফাইও হাজির করেছেন যে কেন ভারত গুরুত্বপুর্ণ হল। সুবীর বলছেন, ভারত নাকি “উভয় পক্ষকে সহনশীল সংযত [advising moderation] হতে পরামর্শ দিয়েছে”। কিন্তু কেন দিতে গেল আর কেন আর কী সুত্রে ওরা উভয়পক্ষ ভারতের কথিত পরামর্শ গ্রহণ করল বা ভারতকে পরামর্শ দিবার জায়গা করে দিল? এনিয়ে সুবীর নিজেই ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, কারণ আমেরিকা নাকি ভারতের কৌশলগত পার্টনার আর বাংলাদেশের কাছে ভারত হল সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু , তাই।

    “India has played a vital role by advising moderation
    on both sides since it is close to both the US(its strategic partner)
    and Bangladesh (its most trusted friend in South Asia).”

    সমস্যা হল, বাংলাদেশের মানুষ জানে যে এটা একটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ, স্বামী প্রাক্তন হয়ে গেলে তাকে কী আর স্বামী বলে চালায় দেয়া যায়? আমেরিকার সাথে ভারতের স্ট্রেটেজিক মিল অবস্থানের যে সম্পর্ক ছিল সেটা আর কার্যত নাই। বাইডেন মোদি-বিহীন ভারত চাওয়া শুরু করলে কী আর পুরানা এসব সম্পর্ক এখনও জিন্দা আছে বলে চালিয়ে দেয়া সম্ভব?? আবার  অন্যটা, মানে হাসিনা সরকার? ভারত যে সুযোগ পেলে হাসিনা সরকারকে বেঁচে দিয়ে হলেও পরবর্তি সরকারের সাথে সম্পর্ক বা খাতির জমানো করতে পিছপা হবে না সেটা তো কারও অজানা থাকার কোন কারণ নাই! তাহলে কেন সুবোর এদিকটা আড়াল করতে চাইছেন?

    আর ইতোমধ্যেই ভারত যে এমন বেচাবিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে এর প্রমাণ সুবীর তার এই লেখাতেই রেখেচেন। সেখানে যাচ্ছি একটু বাদে। তার আগে, সবচেয়ে আজিব বাত হল, সুবীর নিজেই জানাচ্ছেন “……  R&AW chief Samant Goel to Dhaka,” – মানে র-এর চীফ নিজেই ঢাকা-ইন্ডিয়া দৌড়াদৌড়ি করতেছেন। প্রথমত সুবীর কেন সামন্ত গোয়েলের এই গোপন ততপরতা পাবলিক করে দিচ্ছেন? সুবীরের হয়ত ধারণা এতে হাসিনা সরকার খুশি হবে? অথবা র-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবছায় থাকবে! তাই কী? না হলে, গোয়েলের এই গোপন ততপরতা পাবলিক করে দিবার কোন লাভজনক কারণ তো দেখা যাচ্ছে না!
    তবে অন্যদিকে,  সুবীর কী জানেন না যে এই কথাটা বাংলাদেশের আম-মানুষ সবচেয়ে অপছন্দ করবে????? যেখানে বাংলাদেশের  আম-মানুষের ভারতীয় ততপরতা নিয়ে সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকে; অবিশ্বাস করে!  অন্যভাবে বললে, R&AW অথবা এর chief এর প্রতি বাংলাদেশের আম মানুষের নুন্যতম সহানুভুতি নাই, থাকার কোনও কারণও নাই! কারণ, গত ১৫ বছর ভারত বাংলাদেশিদের স্বার্থের এদিকটায় কোন আমলই করে নাই! তাহলে সুবীরের এই বেপরোয়া ভাবটা কেন?  সামন্ত গোয়েল বা প্রণয় ভার্মা-রা বিরাট দৌড়াদৌড়ি করছেন এই তথ্য কী হাসিনা সরকারের পক্ষে যাবে, তার জন্য ভাল হবে? প্রশ্নই আসে না, পাবলিকের চোখে ভাল হবে না বরং নেগেটিভ হবেই! তাহলে সুবীরের এসব পাকামো কেন? এর একটাই কারণ হতে পারে যে মোদি ও তার ভারত যে বিরাট পরাশক্তি হয়ে গেছে – সেই ফাঁপা আর শতভাগ মিথ্যা হলেও সেই কথাটাকেই ফুটানি দেখানোর জন্য ব্যবহার করা!!

    এটাই আসলে হাসিনা সরকার মরুক আর বাচুক জাহান্নামে যাক এই সরকারকে এখন বেচা দিয়ে হলেও সামন্ত গোয়েল বা মোদির স্বার্থ উদ্ধার মনে হচ্ছে তাদের প্রধান লক্ষ্য!

    আবার লেখার শুরুর প্যারাতেই সুবীর হাসিনা সরকার সম্পর্কে লিখছেন Bangladesh has promised ………who are linked to electoral fraud.
    মানে সুবীর বলছেন, – অ্যামেরিকা বলেছে যারা নির্বাচনী প্রতারণা বা কারচুপিতে সংশ্লিষ্ট তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে, এজন্য সরকার সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।  আবার পরে সুবীর আরো বলেছেন, ২০১৪ আর ২০১৮ এর নির্বাচনে যারা ভোটচুরিতে দুবারই ব্যাপারটাকে আবর্জনা বানিয়ে ফেলেছিল তাদের উপর আমেরিকা খুবই ক্ষুব্ধ। [it feels, has marred two successive national elections in 2014 and 2018.]
    আবার সুবীর সাথে জুড়ে দিয়েছেন হাসিনা সরকার এসব কারচুপির কথা ঝেড়ে অস্বীকার করেছে……। তাই কী করার কথা না? সরকার স্বীকার করার পরে কী আর সরকার থাকে?

    আচ্ছা সুবীর সাব এত পিছলা-পিছলি করতাছেন কেন? যেমন,  ২০১৪ সালের কথাই ধরেন, ভারত সরকার বা তার গোয়েন্দা বিভাগের কাছে ফাস্ট-হ্যান্ড ইনফরমেশনই আছে?  নাই কী? ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং-কে দিয়ে ভারত সরকার যে এসাইনমেন্টে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল তা কী তামাম ভারতীয় সরকারি পক্ষের কাছে অজানা? সেখানে বিএনপি বাদ আর এরশাদকে বিরোধী দল সাজিয়ে নির্বাচন পার হতে হবে – এই ছিল সুজাতার এসাইনমেন্ট তা তো সেই সময়ই এরশাদ ঐ সময়ের সুজাতার সাথে এরশাদ তাঁর মিটিং থেকে বের হয়েই ভারতের এই সিদ্ধান্তের কথা সরাসরি সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। একালেও চলতি বছরে সংসদে জাতীয় পার্টিও সেসব পুরানা ভারতীয় প্রতারণার কথা তারা নিজেরাই স্বীকার করে আবার আমাদের জানিয়েছে, এখানে দেখুন।  কাজেই এসব তো সুবীর সাবের কিছুই অজানা নয়। তাহলে এখন এমন ঢং করে নিঃস্পাপ সাজা – এটা তো বাংলাদেশের আজ-জনতার জন্য বিরক্তিকর নেকামোই ঠেকবে! নাকি?

    আবার র‍্যাবের উপর অ্যামেরিকান স্যাংশনের জন্য হাসিনার যেসব দুর্বল সাফাই – যে র‍্যাব কথিত জঙ্গিবাদ দমন করেছে – বলেছেন সেগুলোকেই সুবীর আঁকড়ে ধরে আবার হাজির করেছেন এখানে। কিন্তু কথা হল সুবীরের টার্গেট শ্রোতা কে? আমেরিকা? বাংলাদেশের আম-জনতা? এদের কারও কাছেই তো এই সাফাই গ্রহণীয় নয়। তাহলে কে টার্গেট শ্রোতা? ভারতের সরকার অথবা হাসিনা সরকার? সেটা তো ঘরে ডেকে নিয়ে বললেও হত! এর প্রয়োজন কী? কার ভোগে লাগবে এই প্রকাশ্য চামচামি?

    সোজা কথায় আমরা দেখছি এবার সুবোর ভৌমিক খুবই অস্থির বেচাইন; কথার তালমিল রাখতে পাচ্ছেন না।
    তবে সুবীরকে যা মনে রাখতে হবে তা হল এটা ২০১৩-১৪ সাল নয়। এটা ২০২৩ সাল। ফলে নানার আমলে ঘি খাইছিলেন সেই গল্প হাজির করে এখন তুড়ি বাজাতে চাইলে তো আর বাজবে না। এখন আমেরিকান অবস্থান আর ভারতের অবস্থান এক নয়, স্ট্রাটেজিক মিলের গল্প সে তো বহু দূর, যা বহু আগেই ছিঁড়ে গেছে; এশিয়ায় ভারত-আমেরিকা এখন যার যার তার তার আর সর্বপরি খোদ মোদিকেই ক্ষমতাচ্যুতি বা অপসারণ এখন অন্তত বাইডেনের কামনা!  কাজেই পরাশক্তি ভাবধরা মোদির চেয়ে এক অধীনস্ত ইন্ডিয়া –  এটাই  বাইডেনের এশিয়া নীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ।  সেটাকে অধীনস্ত বা বাইডেন-রাহুল ডিল যাই বলি না কেন!   আদতে সবকিছুই মোউলিক জায়গায় আসলে বদলে গেছে। কাজেই খামোখা মোদিকে পরাশক্তি বা বাংলাদেশের ত্রাতা ভাব ধরে লাভ নাই। আমেরিকা ভারতের এখনও স্ট্রাটেজিক বন্ধু বলে মিথ্যা ভাব ধরেও লাভ নাই! এতে মোদির গুরুত্ব বাড়ারও কোন কারণ নাই! এমনকি তা হাসিনা সরকারের কাছেও না!

    কে মিথ্যা বলছেন সুবীর না শ্রীরাধাঃ
    আবার সবচেয়ে বড় কথা শ্রীরাধা দত্ত [যাকে নিয়ে গত সপ্তাহেই লিখেছি এখানে দেখেন] অফিসিয়ালি আরএসএস এর সাথে যুক্ত মানে আরএসএস এর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিআইএফ [VIF] এর এক কর্ণাধর। বিপরীতে সুবীর ভৌমিক আপনি যা কিছুই হন না কেন অফিসিয়ালি ভারত সরকারের কেউ না।
    এখন  শ্রীরাধা দত্ত বিবিসি-কে বলে গেছেন ভারত সরকার হাসিনার জন্য কিছু করবে না। আর সুবীর আপনি বলছেন উল্টাটা। কী হল তাহলে?
    আবার হাসিনা সরকার টিকানোর পক্ষেই নাকি র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েলের ঢাকা সফর ছিল বলে গল্প দিচ্ছেন! মানে এসেছিলেন এটা আপনিই সাক্ষ্য দিয়ে বলছেন তাই এটা আমাদের অস্বীকারের কিছু নাই। কিন্তু সরকার টিকানোর জন্য কী এসেছিলেন? না উল্টাটা, আমরা বিভ্রান্ত! তাহলে আসলটা কী?  ঠিক কোনটা আসল তা নিয়ে আপনার উপর আস্থা রাখা যাচ্ছে না! তাই,  খুব সম্ভবত শ্রীরাধা নয়,  সুবীর আপনি একদম ডাহা মিথ্যা বলছেন।

    কথা বেশি বললে চাপাবাজি সব বের হয়ে পড়ে!!! এত বারবার একেক কথা দিয়ে আপনার হাজিরাটাই সব অস্থিরতারই ইঙ্গিত!
    আর স্বভাবতই এতে, বাংলাদেশে ভারত সরকার বা মোদি বা সুবীর ভৌমিক ইত্যাদি এদের সকলেরই বিশ্বাসযোগ্যতা শুণ্যের কোঠায় ডুবে যাচ্ছে! অসৎ লোকে দুনিয়াটা ভারি হয়ে উঠছে!

    +++

    আপডেটেডঃ ০২ জুন ২০২৩ দুপুর  ১০ঃ ৫৮ ১১

    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত

     

     

    বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত
    গৌতম দাস

    ৩০ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4xe

     

            মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর

     

     

    কোন নিউজ বা মিডিয়া গ্রুপ যখন কথিত “ফাইনান্সিশিয়াল সংকটে” পড়ে তখন যে সে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে তা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে সে দুনিয়াতে যদি মোদি আর তার গোয়েন্দাবিভাগ হাজির থাকে।  ভারতের ভিতরে অথবা বাইরে  অঘোষিতভাবে ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) মিডিয়া কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠান এর নাম হল এএনআই (ANI) যে নিজেই এক ‘বেসরকারি সংবাদ সংস্থা-ই’ যেন অন্য কিছু নয়, এই ভাব ধরে থাকে। অথচ এ’হলো ভারতে সরকারি প্রটেকশনে  ব্যক্তিমালিকানাধীন নিউজ এজেন্সী যে আমাদের বাসসের মত পর্যায়ের হয়ে উঠেছে কিন্তু কাজ করে সরকারি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের বাড়ানো হাত যেন! শুধু তাই নয়, ভারতের প্রধান সরকারি নিউজ এজেন্সি প্রতিষ্ঠান পিটিআই [PTI] এর চেয়েও ভারত সরকারের কাছে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত নিউজ এজেন্সি এটা;  অথচ লিগ্যাল স্টাটাসে সে বেসরকারি সংবাদ সংস্থা মাত্র। আর তা দিয়েই কথিত সংকটে পড়া মিডিয়া গ্রুপগুলো তাদের ফাইনান্সিল খারাপ সময়ে অভাবকে ব্বযবহার করে অর্থালোভি হয়ে উঠলে তাদেরকে শিকারে নেমে পড়ার প্রতিষ্ঠান হল এই এএনআই। কথিত অর্থ-সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর খুবই কাছের বন্ধু হয়ে উঠে এই এএনআই। এমনকি সে ঘটনা বাংলাদেশের বেলাতেও একই, সত্য! বাংলাদেশের প্রথম আলোর ক্ষেত্রে দেখেছি  তার বন্ধু হয়েছে এএনআই। এভাবে বন্ধু হয়ে জার্নালিজমের বেসিক নীতি ত্যাগ করে হলেও ভারতীয়দের আকাট পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে পড়েছিল ো পরে প্রায়ই এই প্রথম আলো,  স্রেফ কিছু নগদ অর্থ কামানোর জন্য।  এগুলো ২০২১ সালের শেষের দিকে সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল; এই উসিলায় যে করোনাকালে নাকি কর্মচারীদের ঠিকমত বেতন দিতে পারে নাই বা আয় কমে গেছে – মালিক বকা দিবে – এই ছিল সম্পাদকদের অজুহাতে।

    সম্প্রতিক বছরগুলোতে বিবিসিরও অর্থসংকট, ছাটাই ইত্যাদির কথা অনেকদিন ধরে কানে আসছে আমাদের। বিশেষ করে এসময়ে বিবিসি বাংলাকে প্রায়ই “এএনআই-এর এসাইমেন্ট ধরণের” নিউজ করতে দেখছি। একালের  বিবিসি বাংলার এই  ফেনোমেনাটা হল বিজেপি-আরএসএস এর আইটি চীফ অমিত মালব্যর অনুগত-রিপোর্ট করা; যেটা মালব্য-রা লাগাতর পয়সা খরচ করে মিডিয়া কিনে প্রপাগান্ডা  তৈরি করে – সেখান থেকে এটা এএনআই পর্যন্ত বিস্তৃত এই ততপরতা। এবিষয়ে এএনআইয়ের সিন্ডিকেটেড রিপোর্ট  – যা ছাপলে উলটা মিডিয়াগুলো পয়সা পায় – এমন কুখ্যাত ততপরতা এর ভাল প্রমাণ। রিপোর্টে কলমের একটা আচড়ও বসায় না অথচ সেটা নিউজ বা জার্নালিজম বলে ছেপে দেয় এরা নগদ পয়সা পাওয়ার লোভে।  যারা অমিত মালব্যকে চিনেন নাই তারা জেনে রাখতে পারেন, ভারত-বাংলাদেশ জুড়ে ফেসবুক যার নিয়ন্ত্রণে; প্রান্তীয় পর্যায়ে  যেকোন প্রোফাইল-একাউন্ট গায়েব করে দেয়া যার কাছে তুড়ি বাজানো…।  এছাড়াও ভারতীয় অরিজিন ফেসবুকে কাজ করা স্টাফদের সবার উপরের অলিখিত কর্তাব্যক্তিটার নাম হল যেন অমিত মালব্য।  তবে এসবের বাইরেও অনেক ঘটনা আছে যেমন পুরানা যারা কলকাতা অরিজিন বিবিসি বাংলার স্টাফ যেমন, শুভজ্যোতি ঘোষ আর সে আমলে কলকাতা আরএসএসের তথাগত রায় যখন বাংলার প্রধান ব্যক্তিত্ব – এরা ছিল দুজনে দুজনার।

    গত দুদিন ধরে তেমনই এক ততপরতা আমরা দেখছি বিবিসি -বাংলায়। সেটা হল ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) তরফে কিন্তু ফ্রন্টাল ফেস যেমন, ডঃ শ্রীরাধা দত্ত-কে সামনে এনে তাঁর বয়ানে ভারত ও মোদিকে বিরাট পরাশক্তিগত নেতা হিশাবে তুলে ধরার এক প্রপাগান্ডা চালিয়েছে বিবিসি।  এই নারীকে বাংলাদেশের ত্রাতা বা বাপ-মা হিসাবে তুলে ধরারও প্রকল্প এটা। কে এই শ্রীরাধা দত্ত?  ফরমালি তিনি বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন [VIF] নামের যেটা সরাসরি আরএসএস এর এক থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান, তার সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা।  এছাড়া ভারত আরএসএস প্রভাবিত নানান একাদেমিক / কমার্সিয়াল কিন্তু দলীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি জড়িত।  বাংলাদেশে প্রায়ই তিনি সিপিডি [CPD] ভিজিট করে থাকেন।
    সবমিলিয়ে মানে হল, তাঁর RSS  এর সাথে খোলাখুলি যুক্ত থাকা বা সংশ্লিষ্টতা আমাদেরকে তাঁর সম্পর্ক কিছু বিশেষ ধারণা দেয়।  সেখান থেকে অনেকে মনে করেন,  মোদি-আরএসএস এর দুনিয়াব্যাপী হিন্দুত্ববাদ ছড়ানোর যে স্বপ্ন-কল্পনা আছে তা বাস্তবায়নের কর্মী একজন তিনি।  তাই কার্যত ভিআইএফ (VIF), থিঙ্কট্যাঙ্কের নামে আরএসএস এর গ্লোবাল হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান হয়েছে মনে করা ভুল হবে না; যার কান্ডারি তিনি।  যেমন  এই প্রসঙ্গ বিবিসিসহ অনেক অনেক ইউটিউব ভিডিও-ও ছাড়া হয়েছে সব জায়গায় একই প্রপাগান্ডা তুলে ধরা হয়েছে; যার প্রধান কাজ হচ্ছে  শ্রীরাধার তুলে ধরছেন – বাংলাদেশে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরে যেন মোদি হলেন হাসিনার বাংলাদেশের ত্রাতা যে মোদি চাইলেই হাসিনা সরকারকে উদ্বার করে দিতে পারেন অথবা হাসিনা সরকারের এখনকার পরিত্রাণ যেন কথিত এক ক্ষমতাধর পরাশক্তি ভারত ও এটা মোদির ইচ্ছা বা ভাল মুডের উপর নির্ভরশীল।
    এটা ফুটিয়ে তোলা মত এক উপস্থাপক হচ্ছেন শ্রীরাধা দত্ত ও তাঁর কারিশমা; আর ওদিকে তা বাজারের ছড়িয়ে দিবার দায়ীত্ব-ঠিকাদারি পেয়েছে যেন বিবিসি বাংলা!

    বিবিসির রিপোর্টের নামে এক গারবেজের প্রসঙ্গঃ
    বিবিসির রিপোর্টের নামে এই গারবেজের শিরোনাম হল, “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর উপায় কী হাসিনা সরকারের”, যার রিপোর্টার হলেন শাকিল আনোয়ার।
    আচ্ছা এমন শিরোনাম কেন?  মানে রিপোর্টার এখানে এটাকে একটা ‘হুমকি’ বলে ধরে নিয়েছেন কেন? কী দেখে নিশ্চিত হয়েছেন? আর ধরে নিয়েছেন যে “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” এটা বাংলাদেশ সরকারের উপর এক “হুমকি”?   কিন্তু  এন্থনি ব্লিঙ্কেনের টুইট বা ডোনাল্ড লু এর বাংলাদেশি টিভিতে গিয়ে ব্যাখ্যাদানের পরে হাসিনা  সরকার ও সরকারি দলের প্রতিক্রিয়া কী ? নেগেটিভ ? তা তো নয়। এমনকি   আওয়ামি লীগ, বিএনপি এমনকি জাতীয় পার্টি – এর নেতারা কেউই একে নেতিবাচক ভাবে দেখে নাই, নেয় নাই। অন্তত তাদের অফিসিয়াল ভার্সানে এটা তাই। পরেরদিন রাষ্ট্রদুত পিটার হাস এই তিন দলের প্রতিনিধিদেরকে ডেকে কথা বললে তারা কেউই “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” নিয়ে কোন নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখান নাই।
    আবার ওবায়দুল কাদের এর প্রতিক্রিয়া দেখুন। সরকারি বাসস-এর রিপোর্ট লিখছে – “মার্কিন ভিসা নীতি নিয়ে বেকায়দায় বিএনপিঃ  ওবায়দুল কাদের”  অর্থাৎ আওয়ামি লীগ এর জন্য কোন বিপদ ঘটে নাই বরং বিএনপি এই নিষেধাজ্ঞায় বিপদে পড়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।  অথবা আবার দেখেন,  একই বাসস কিন্তু আরও এক রিপোর্টে লিখছে – “নতুন মার্কিন ভিসা নীতিতে অগ্নিসংযোগ বন্ধ হবেঃ মোমেনের আশাবাদ“। তাহলে কিসের ভিত্তিতে শাকিল আনোয়ার এটাকে হুমকি বলে চিহ্নিত ও  প্রচার করছেন? সেটা কী এই যে এটাকে হুমকি বলে  প্রচার না করলে শ্রীরাধা দত্ত বা তার মহাজন মোদিকে –  হাসিনা সরকারের এক ত্রাতা ও বীর হিশাবে তুলে ধরা যাবে না??? বাঃ বেশ ভাল কায়দা তো!  আর সেক্ষেত্রে  হয়ত বিবিসির ক্লায়েন্ট এসাইনমেন্টের বিল সেক্ষেত্রে পে করবে না, তাই কি? তার মানে বিবিসির এই এসাইমেন্টের ফোকাস হল, মোদিকে এক বিরাট ত্রাতা আর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা!! সেটা কতটা সত্যি – এই প্রশ্নটাকে মাথায় রেখে আমরা বিবিসির রিপোর্ট পড়ব।

    রিপোর্টের শুরুতেই বিবিসি এক গায়েবি কূটনীতিকের কথা এনেছে। নাম না আনা এই কূটনীতিক বলেছেন, “……এই রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে তলে তলে আমেরিকার সাথে দেন-দরবার দর-কষাকষির পথে যাবে সরকার“। আচ্ছা ভাইসাব,  কূটনীতিক ট্যাগ দিলেই কী কারো নামে যা খুশি লেখা বা চালানো যায়; জায়েজ?  আমেরিকার সাথে হাসিনার কোন ডিল বা রফা করতে গেলে একটা দেয়া-নেয়া লাগবে, এটা তো কোন গুঢ় জ্ঞান না, এটা সবাই জানে। এখন প্রশ্ন হল হাসিনার হাতে এমন কি আছে যেটা আমেরিকার কাছে লোভনীয় ফলে যা সে কামনা করে?  এমন কিছুই নাই, যেটুকু ছিল তা আগেই দেয়া হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয়ত, হাসিনার সাথে আমেরিকার কোন ডিলে জড়ানোর মানে হল হাসিনার প্রথম চয়েজ তাকে আরও এক টার্ম ক্ষমতায় রাখতে হবে – আর এর দায় আমেরিকাকে নিতে হবে। কিন্তু আমেরিকা ইতোমধ্যে প্রতিটা কথাতে জুড়ে দিয়ে বলেই যাচ্ছে যে একটা ফেয়ার ইলেকশন হতেই হবে। তাহলে এখানে বটম লাইনটা হল, একটা ফেয়ার ইলেকশন আর হাসিনাও আবার ক্ষমতায় – এদুটো একসাথে ঘটাতে হবে ; কিন্নোতু সরি এদুটো একসাথে সম্ভব নয়। কোন ম্যাজিকেও সম্ভব নয়! তাহলে এসব “তলে তলে বা দর কষাকষি টাইপের” বুকিস মুখস্ত কথা বিবিসি ঐ কথিত কূটনীতিকের মুখ দিয়ে বলাচ্ছে কেন?

    তাহলে,  রিপোর্ট-টাকে কী বিবিসি কোন রহস্য উপন্যাস বানাতে চেয়েছিল ?? অবশ্য না হলে মোদি ত্রাতা, মোদি পরাশক্তির মত ক্ষমতাধর এই গল্প কিভাবে আনা যাবে? ব্যাপারটা তো তাই, তাই না?

    দুইঃ
    দেখা গেল বিবিসি এভাবে প্রথম পর্ব জমাতে পারল না। এখন পরের পর্ব। এবার প্রকাশ্যে সাবেক কূটনীতিক তৌহিদ হোসেন বলছেন “বাংলাদেশে এক সামরিক ঘাটির” কথা। যদিও তিনি নিজেই তা শুরু করেছেন এটা একটা গুজব একথা বলে।
    প্রথমত এটা গুজব নয়, এটা আমেরিকানদের একটা খায়েস যে তারা তাদের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের জলসীমায় নোঙ্গর করতে পারলে তাদের শান্তি লাগত, এতে এশিয়ায় তাদের গায়ে বল বল ঠেকত। খায়েস তো মানুষের কত রকম থাকে! যেমন এই শতকের শুরুর আগে থেকেই অর্থহীন “ইসলাম কোপানিতে” লেগে পড়া ভারত-আমেরিকার দোস্তালির ইস্যুতে ভারতের  (তখন সেটা বাজপেয়ীর ভারত) সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অ্যামেরিকান প্রশাসন গ্রহণের পর থেকেই এই ঘাটি বানাবার খায়েস তারা লুকিয়ে ফেলেছিল, কোন ঘরের চালে গুজে রেখে চলছিল। কারণ, অ্যামেরিকান এই খায়েসের ইস্যুতে এর বিরুদ্ধে চীনের চেয়েও কোর আরও বড় বিরোধি হল ভারত। অর্থাৎ ভারত-ঘনিষ্ঠতা চাওয়ার আগেই আমেরিকাকে এই খায়েস ডেড করে তুলে রাখতে হত তাই করেছিল আমেরিকা। আর তাই সেটা সেই থেকে তোলাই আছে। অর্থাৎ খায়েস টা একেবারেই কোন গুজব নয়, তবে তুলে রাখা আছে, এক্টিভ নয় এই আরকি!
    কিন্তু আমেরিকান এই খায়েস নিয়ে আমাদের কী করার আছে?
    সেটা এবার এককথায় বললে, অ্যামেরিকান এই খায়েস ঠেকানো এটা আমাদের চেয়েও ভারত ও চীন এদুই শক্তির জন্য আরো বড় ইস্যু; সেটা এতই বড় যে এরা দুই রাষ্ট্রই তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা ঠেকাতে প্রস্তুত। কাজেই আমাদের ভুমিকা এখানে এতটুকু হলেই যথেষ্ট হবে যে বাংলাদেশকে ওদের লড়াইয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হওয়ানো যাবে না। বরং না হয়ে ওদের পায়ের পারার নিচে চাপা পড়ে মরতে না চাইলে আমাদের ভুমিকাটা খুবই ছোট্ট! তা হল, এই ইস্যুতে কোনপক্ষের সাথে না গিয়ে কোন খাতির জমানোর ইস্যু বলে বিবেচনাই না করা  – যেটাকে বলে – এটা আমাদের জন্য NO GO ইস্যু! যদি তা না মানি তাহলে এই ইস্যুর কারণে, আমেরিকা আসার আগেই ভারত ও চীনের দুদিক থেকে আক্রমণে আমরা শেষ হয়ে যাব।  মানে এটা হাসিনা বা কারও ক্ষমতায় আসা বা ক্ষমতার আয়ু বাড়ানোর কোন ইচ্ছার আইটেমই নয়! দরকষাকষির ইস্যু নয় বা এভাবে দেখা হারাম! এই কথাটা মনে রাখতেই হবে!।   কাজেই কূটনীতিক বলে নয় যেকারোই ভাব ধরে এনিয়ে কিছু বলা বা ভয় দেখানো অর্থহীন, অমূলক!

    আচ্ছা দুনিয়াতে আমেরিকার আর একটা সামরিক ঘাটি করা না করাতেই বা কী হয়েছে? কী হতে পারে? গত ২০১৬ সালে আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়াতে কোস্টাল এরিয়ায় একটা সামরিক ঘাটি চালু করেছে। তাতে কী হয়েছে? আমেরিকা চীনের উপর বিজয়লাভ করেছে নাকি কোন অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছে? কিছুই পায়নি। মনে রাখতে হবে কড়া ভাবে যে  একালে  আমেরিকা-চীনের প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এটা কোনভাবেই সামরিক চরিত্রের নয় সামরিকও নয়, এটা অর্থনৈতিক। আরো স্পষ্ট করে বললে, কার অর্থনীতি  এই মুহুর্তের দুনিয়ায় নিজ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস একুমুলেশন  বা অতিরিক্ত সম্পদ জমা করতে সক্ষম  হয়ে উঠেছে তারই প্রকাশের লড়াই । যদিও এটা তো প্রতিযোগিতার ইস্যু নয়, অবজেকটিভ ঘটনা। অর্থনীতিতে এই বাড়তি সম্পদ এটাই অন্যদেশের  উপর আমেরিকা বা চীনের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দেখা দিতে সক্ষম এবং হয়ও তাই।  যেখানে আমেরিকা দ্রুত তার পুরানা প্রভাব-বিস্তারের  সক্ষমতা হারাচ্ছে আর বিপরীতে চীন জাগছে। তাই আমেরিকা এটাকে সামরিক সক্ষমতা হিশাবে উলটে দিবার বা হাজির করে দেখানোর প্রাণপন চেষ্টা করছে। যে সামরিক ফিল্ডে আমেরিকা এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সক্ষম। কিন্তু আমেরিকা চাইলেই তা হচ্ছে না। কারণ, কোনদেশই সামরিক সংঘাত চাচ্ছে না, যদিও চীনের সাথে অনেক পড়শি দেশেরই সীমানা বিতর্ক  বিরোধ আছে। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার কোলে উঠে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে কেউ আগ্রহি নয়; এটা গাধামি এটুকু সকলেই বুঝে। তাই আমেরিকা বার বার ফেল করছে এখানেই।   আর তাতে কী হয়েছে?  হয়েছে এই যে অষ্টেলিয়ায় বানানো অ্যামেরিকান সামরিক ঘাঁটি কারই অন্তত এখনই কোন কাজে আসছে না। বিনিয়োগটা খামোখা হয়ে বসে আছে!

    ভারত পাশে দাঁড়াবে?- এর গল্পঃ
    ভারত পাশে দাঁড়াবে – একথা শুনলে আজকাল আর হাসিনাও খুশি হয় না। কারণ, মোদি ও ভারত মুরোদহীন, উত্থানরহিত এক ব্যক্তি বা শক্তি! আর এই মিথ্যা কথা কে বিশ্বাস করে!
    এরপরেও বিবিসি ও শাকিল আনোয়ার এসেছেন আসলে তাদের সাবজেক্ট বা এসাইনমেন্ট নিয়ে যে – ভারত পাশে দাঁড়াবে? ! আচ্ছা একালে ভারত কবে থেকে কারও পাশে দাড়ানোর মত পরাশক্তি হয়ে গেছে? আর কিভাবে সেটা? যখন একাল বলতে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে আমেরিকা-চীনের রেষারেষি, লড়াই বা প্রতিযোগিতা তুঙ্গে উঠার কাল বলে এটাকে বুঝতে হবে। একালে ভারত তাহলে কী কেউ?? অবশ্যই না।  তবে ভারত বড়জোর কখনও  আমেরিকা অথবা চীনের পক্ষে তাদের কারও থেকে আলগা খেপ-মারার মত কাজ বা এসাইনমেন্ট পেয়ে গেলে সীমিত অর্থে ভারত নিজেকে কিছু ক্ষেত্রে পাওয়ারফুল বোধ করতেও পারে। যা সে আগে করেছেও; বাংলাদেশকে ভারতের হাতে আমেরিকার তুলে দিবার পরে!

    আমাদের ওয়ান-ইলেভেন ছিল ২০০৭ সালের তেমনই একটা ঘটনা।  আমেরিকার চাওয়া ছিল এশিয়ায়  চীন-ঠেকানোর ঠিকাদারির কিছু কাজ ভারতকে দিয়ে করিয়ে নেয়।  আর তাতেই বিনিময়ে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই মাখন আমেরিকা কিছুই খেতে পারেনি বরং তার চেয়ে পিঠার আসল ভাগটা গিয়েছে ভারতের মুখে! আর তাতেই ২০১৪ সালের শুরু থেকেই আমেরিকাই সরাসরি বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ ও চাওয়া-পাওয়ার  সকল ক্ষমতা ও সুযোগ হারিয়ে ফেলেছিল। আর এতে  ভারত তখন বাংলাদেশকে একেবারে লুটে আর চুষে সব খেয়ে ফেলার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। এখন এটাকেই কী শাকিল বলছেন – এটাই কী ভারতের পাশে দাঁড়ানো?   বিবিসি বা শাকিলের উচিত শব্দের ওজন, অর্থ জেনে মেপে এরপর ব্যবহার করা! আর এটা আমার বলার বা মনে করিয়ে দিবার কথা না, তাদের নিজেদেরই জেনে আসারই কথা!

    আরএসএসের আছে একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্পঃ
    আরএসএসের একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্প আছে। যেটা হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে শুধু একটা অখন্ড ভারত কায়েম নয়; বরং সারা দুনিয়া জুড়ে হিন্দুত্ববাদ কায়েম করার স্বপ্ন। আর মোদি হলেন সেই স্বপ্ন-প্রকল্পের এখনকার প্রধান কান্ডারি। আমার একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ মিলবে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষত যেসব রাজ্যে প্রবাসী ভারতীয়দের সংখ্যা বলার মত একটা চাঙ্ক! সেসব রাজ্যের দেখা যাবে ক্যালেন্ডারে আরএসএস ঘোষিত হিন্দুত্বের চোখে পালনীয় দিন, মানে সরকারি ছুটির দিন নয় – যেমন একালের রামনমমী পালনের নামে অ-হিন্দুদের কোপানোর দিন হয়ে উঠেছে; এসব দিনে আমেরিকায় বসে এরা হিন্দুত্বের জয়গান গেয়ে মিছিল-সমাবেশ করছে। মনে রাখতে হবে অ্যামেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশন বলে তাদের সংগঠন আছে।
    কাজেই এমন লক্ষ্য ও ততপরতার অংশ হিশাবে – বাংলাদেশের উপর অ্যামেরিকান ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এই উসিলায় ত্রাতা ও বীর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা আর মোদি কী ত্রাতা হবেন –  এভাবে এমন মুরোদবিহীন কিন্তু উস্কানিমূলক প্রশ্ন তুলে  এরপর এরই জবাব দেওয়া বা নেওয়ার উসিলায় শ্রীরাধার কাছে গেছে বিবিসি। এটাই মোদি-আরএসএসের পক্ষে প্রোপাগান্ডা করার জন্য বিবিসিকে দেয়া এসাইমেন্ট!

    কেন কথাগুলো এত কঠোরভাবে বলছিঃ
    লেটেস্ট বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। সেটা হল বাইডেন এখন ভারতকে কিভাবে দেখছে তা বুঝতে হবে।  অন্তত এই ২০২৩ সালের শুরু থেকেই পুরানা – ভারত-আমেরিকা যতটুকু যা এলায়েন্স খাতির অথবা চীন-ঠেকানোর চুক্তি এবং হাতে হাত ধরে ওয়ার্কিং রিলেশন যা আগে তৈরি ছিল – এর সবটাই ফুল স্টপ হয়ে যায়। এর বহু আগেই অবশ্য ট্রাম্পের আমলেই ২০১৭ সালে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকায় এক্সপোর্ট  এর বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়েছিল। আবার একালে কোয়াড [] শুকিয়ে অকেজো হয়ে গেলে অথবা  ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ান তেল, কয়লা ইত্যাদি পুণঃরপ্তানি শুরু সহ নানাবিধ প্রকাশ বলছে যে দুপক্ষই অঘোষিতভাবে স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক সমাপ্তি টেনেছে। ভারতের সাবেক কূটনীতিকেরা আমাদের জানাচ্ছে যে ভারত এখনও স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সটা ফিরে চায়। মানে হল আমেরিকা চায় না। এসবের কারণে, আমরা বুঝতে পারি যে চীনের সামনে ভারতের অসহায়বোধ  আরও বেড়েছে। আর সর্বোপরি – আমেরিকা বড় ভাই তার পিঠে হাত রেখেছে – এতে ভারতের গা-গরম ভাবভঙ্গি ভারত সেটা গত ২৩ বছর ধরে দুনিয়ার বাজারে বিক্রি করে চলেছিল তা বন্ধ হয়ে আছে। – আর এখান থেকেই মিথ্যা আর ফাঁপা হলেও মোদির যে পরাশক্তি ভাবদেখানো এর উৎস হিশাবে আবার আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নাই কিন্তু আছে দেখাতে মোদি-রা এখনও উদগ্রীব যদিও সেসব দেখানোটা এখন একেবারেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে!
    তবু স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স টা যে নাই তা  বাস্তবে দেখা ঘটনা, সিম্পটম বা ইঙ্গিত দেখে বলা ঘটনা-ই, কারণ সরকারি বা ঘোষিতভাবে দুপক্ষের কেউ তা বলে নাই।  তাই এবার কিছু সরাসরি ইঙ্গিত-প্রমাণ নিয়ে কথা বলব।

    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্সঃ
    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্স মানে আসলে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – মানে স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সে যে দীর্ঘ কমপক্ষে ২২ বছরের সমপর্ক ছিল এর অবসান ঘটা। এর প্রমাণ হিশাবে একালে আমেরিকার বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ এর ইচ্ছা নিয়ে যতটুকু যা প্রকাশিত তা যথেষ্ট ভাল প্রমাণ অবশ্যই। কারণ এটাই অ্যামেরিকার নয়া এশিয়ান স্ট্রাটেজির বেজ বা মূল অংশ, অবশ্যই আর তা ভারতবিরোধী বা ভারতের স্বার্থকে আমল বা কেয়ার না করে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু আমি এর কথা  এখানে এখন টানবো না। কারণ আরও বড় প্রমাণ-লক্ষণও হাজির হয়ে আছে তাই। কী সেটা?

    এককথায় এটা হল, ভারতকে সাইজ করে ছোট করা বা আসল সাইজে আনা –  বলতে পারি। মানে হল আমেরিকা যেন বলতে চাইছে গত তেইশ বছর আমার প্রভাবে থেকে ফুলে উঠা ভাব করেছো -পরাশক্তি মারাও? তাই এখন তোমাকে সাইজ করবে আমি। তোমার আসল সাইজে তোমারে ফিরিয়ে আনব।  এসব ভাব-ইঙ্গিতের বক্তব্যেরই বাইরের মানে হল –  ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর আমেরিকা-বাইডেন প্রশাসন আর মোদির শাসন দেখতে চায় না। তবে এক্ষেত্রে পরোক্ষে এবং আইন মানা সব ততপরতায় আমেরিকা ভারতের বিরোধীদলদের সুবিধা হয় সুবিধা পায় এমন সব পদক্ষেপ নিবে। এটা ইতোমধ্যেই আমেরিকা শুরু করে দিয়েছে। বলা যায় গুজরাত-ফাইল বা গুজরাতে মুসলমান নিধন এর ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রচার দিয়ে এর শুরু। পরে আদানিকে ডুবিয়ে দেয়া যেটা মোদির সব ততপরতার অর্থনৈতিক উৎস ও সাপোর্ট যেখান থেকে পেত সেটাকে ধবংস করে দেয়া; রাহুল গান্ধীকে বিকল্প হিশাবে প্রমোট করা ইত্যাদি। এভাবে বিরোধী সকল দলকে ম্যাসেজ দেয়া যে রাহুলের পিছনে তারা যেন দাঁড়ায় আর নিজেদের নানান স্বার্থগুলো এলাইন করা এক রাস্তা ধরে সহযোগিতা করে সাজিয়ে নেয় যাতে তাদের সকলেরই আমেরিকার সহায়তা পেতে সুবিধা হয়, আমেরিকারও কাজগুলো সবার জন্য এফেকটিভ হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের ছোট্ট একটা কথা – যা এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল যখন বলেন ‘আমরা সব মনিটর করছি” –  তা অনেক কথারই স্বল্পকথা আসলে।
    আবার লক্ষ্য করেন সম্প্রতি ফেসবুকে ভারতীয় স্টাফদেরকে যে সমুলে ছাটাই করা হয়েছে সেটাও বাইফ+ডেনের দিক থেকে মোদিবিরোধিদেরকে দেয়া উপহার। এটা যে মোদির ঘরে আঁচ ও আগুন লেগেছে এর কিছু নমুনা দেখতে পারেন এখানে। এই পত্রিকাটা আরএসএসের স্বরাজ -উইংয়ের পত্রিকা।

    মজার কথা হল, বাইডেন যতই এক্টিভ বা এগ্রেসিভ হচ্ছেন যা জন্মের পর থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই উপস্থিত ছিল না ততই যেন মোদি পিছু হটছেন; মানে হয়ে গেছে যেন তাই করছেন বাইডেন। আমেরিকার হেফাজতে থাকা ভারতের আভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গে যত গোয়েন্দা রিপোর্ট ডকু আছে [যেমন পুলোওয়ামায় পাকিস্তানের সাথে কোন বোমাবাজি ঘটেই নাই, সেতাই আমেরিকা মোদির পছন্দের লোক কাশ্মীরে মীদি যাকে প্রতিনিধি বা গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন সেই সত্য মালিক তা ফাঁস করে দিয়েছেন।] এর সবগুলো যেন বাইডেন ভারতের বিরোধীদলের সামনে খুলে দিয়েছে, এক্সেস দিয়ে দিয়েছেন।  অথচ প্রতিক্রিয়ায় মোদি ততই কুকড়ে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, সরে যাচ্ছেন – সর্বপরি এড়িয়ে প্রতিরোধ অবস্থান ত্যাগ করে চলে যাচ্ছেন। যেন মোদি বুঝে গেছেন যে  প্রতিরোধ অবস্থানে গেলে তাঁর আরো বেশি ক্ষতি হবে, ন্যাংটা হয়ে যাবে্ন!
    এটা এক অদ্ভুত খেলা যেন! ওদিকে সর্বশেষ অনেক বাধা পেরিয়ে রাহুল তার নিজের জন্য একটা সাধারণ পাশপোর্ট ইস্যু করাতে পেরেছেন তাও সেটা আবার মাত্র তিন বছরের জন্য – বাকি আগের সব পাশপোর্ট সারেন্ডার বা বাতিল করেছে মোদি সরকার। আর এই পাশপোর্ট নিয়েই আগামি মাসে রাহুল আমেরিকা যাচ্ছেন। বাজারের অনুমান এটাই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে তার ফাইনাল ডিল মানে – কাজের লক্ষ্য কী হবে, কে কী করার দায়ীত্ব নিবে ইত্যাদি এসবেরই ফাইনাল হবে সেখানে।   বাস্তবে কী হবে না হবে সে আমরা আগামিতে দেখতেই পাবো অবশ্যই।
    কিন্তু আসল কথাটা হল,  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক যে এখন ডিভোর্সির  – স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স থেকে পতিত হয়ে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – এর একথা তো অন্তত বিবিসির কাছে কোন কিছুতে অজানা নয়! ছিল না। কারণ গুজরাত ডকু তো তারাই প্রচার করেছে! তাহলে???

    একালে ভারতের নিজের সক্ষমতায় বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো, কিংবা আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের জন্য  সুপারিশ করা ইত্যাদি কোন কিছুই হচ্ছে না, কারণ মোদির তা করার মুরোদ নাই, শেষ। তা নাই এবং ছিলও না যতটুকু যা ভারত দেখিয়েছিল আগে সেটুকুও  মোদি ফুলিয়ে ফাপিয়ে নিজেকে পরাশক্তি কল্পনায় দেখিয়েছে – এসবের পিছনের কারণ ভারতের পিঠে কিছুটা সময় হাত রেখেছিল আমেরিকা – সে কারণে। অর্থাৎ অ্যামেরিকান স্বার্থে সে ভারতকে যতটুকু মাতবর বলে দাবি করার সুযোগ দিয়েছিল সেটাই। সবচেয়ে বড় কথা সেটা আর এখন একেবারেই নাই। অথচ এটাকেই মোদি ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে বলে চালাবার দেখাবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছে। যার সর্বশেষ প্রচেষ্টার নাম হল বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত এদের ক্যারিকেচার!  তাহলে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো বা না দাঁড়াতে চাওয়া নিয়ে জল্পনাওকল্পনা ছড়ানো এর সবকিছুই ডাহা মিথ্যা। মোদির ইমেজ তৈরির প্রপাগান্ডা মাত্র!

    আসল কথাটা হল, যে মোদির ভারতের এখন বাইডেনের আমেরিকার কাছে নিজেদেরই বেইল নাই  – না ভারতের না মোদির – সেই মোদি কিভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারে? হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ নিয়ে যেতে পারে, কে তিনি?????

    অথচ এ পুরা ব্যাপারটাই ডিটেইল অন্তত বিবিসির নিজের জানা থাকার পরও   দিল্লি কি তাদের সেই কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে – হাসিনাকে উদ্ধার টাইপের রিপোর্ট তাহলে কী করে করতে পারল??
    এটাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে নেয়া বিবিসির এসাইনমেন্ট!

    বিবিসি একালে অনেক এক্টিভ একাজে। বিবিসি যদি এমন চালাতেই থাকে তবে আগামিতে হাসিনার যুগ শেষে তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।  বাংলাদেশে  গণধিকৃত মিডিয়া হিশাবে পরিচিত হবে! নিজের ভাগ্য নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার তো অবশ্যই বিবিসি বা শাকিল আনোয়ারের!   মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য গড়ে থাকে!

    আপডেটেডঃ ৩১ মে ২০২৩, দুপুরঃ ১০ঃ৩৯


    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা
    গৌতম দাস

    ২২ মে, ২০২৩   ০০ঃ০৩
    https://wp.me/p1sCvy-4ul

           Wary Delhi watching Dhaka 

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক আবার একটা লেখা ছাপিয়েছেন – ‘দ্যা ফেডারল’ [The Federal], এই নামের দক্ষিণ-ভারতীয় পত্রিকায়। বাংলাদেশের পাঠককুল সাধারণত  সুবীরকে ধরে নেন যে তিনি ভারত সরকারের (গোয়েন্দাবিভাগ) এক অঘোষিত মুখপাত্র। বা উলটা করে বললে শুরুর দিকে সুবীরও যেন এটাই চেয়েছিলেন যার নতিজা এটা। তবে যেকোন সরকারের নানান মুখপাত্র থাকে; আর মুখপাত্র ব্যাপারটা হল,  কোন ঘটনায় সরকারের মানে সরকারি ভাষ্যটা কী তা জানাতেই এই পদের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো সরকারি প্রতিনিধি বা কর্মচারির মধ্যে  কার কথাটা সরকারের অবস্থান বলে সরকার মনে করে সেটার নির্ধারক হল কাকে মুখপাত্র বলে সরকার আগেই পরিচয় করিয়েছে।  যেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও এক মুখপাত্র থাকে; সম্প্রতি বাংলাদেশেও এই প্রথম এমন পদে একজন মুখপাত্র নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু মুখপাত্র দরকার হয় যারা সরকারের অফিসিয়াল বা ঘোষিত মুখপাত্র নয় বা থাকেন না; অথচ তাদের মুখ দিয়ে সরকার নিজ অবস্থানও জানায় রাখতে চান। অর্থাৎ অফিসিয়ালি তাঁকে মুখপাত্র বলে স্বীকার না করেও সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ অবস্থান জানানোর এক ব্যবস্থা করে থাকে, যেখানে পাঠক আর সরকার – এরা উভয় পক্ষই এই অঘোষিত ব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন। অর্থাৎ ইনফরমালি এক ফরমাল ব্যবস্থা যেন! সুবীরকে তেমনই এক মুখপাত্র মনে করা হয়!
    আবার এমন ব্যবস্থা চীনেরও আছে, যদিও তা আরেকটু গোছানো। চীনের বেশিরভাগ খবর প্রকাশিত হয় জিনহুয়া  [Xinhua] নিউজ এজেন্সি থেকে তবে তা চীনে সারা দেশের নানান নামের পত্রিকায়। কিন্তু চীনা গ্লোবাল টাইমস [Global Times] হল সরকারি অবস্থান প্রকাশ করার আলাদা এক পত্রিকা তবে সে কথাটাও অঘোষিতই থাকে। মানে কোথাও তা উল্লেখ নাই; তবুও পাঠক অনুমান করে নেয় বা ধরে নেয় যে এটাই চীনের অফিসিয়াল ভার্সান।

    সুবীরদের এই লেখার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন ঢাকার উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে” [As Hasina faces heat in Dhaka ahead of polls, Delhi finds itself in a corner too]। মানে সারকথায় সুবীর যেন বলতে চাইছেন,  বাংলাদেশের হাসিনা যেমন  আমেরিকান চাপ থেকে বের হবার পথ না পেয়ে মোদির সহায় হয়েছিলেন; মোদিও তাতে ব্যর্থতা অসহায়ত্ব দেখিয়ে ফেলে পালাতে বা কেটে পড়তে চাইছেন!

    এতদিনের ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বা মোদি-হাসিনার সম্পর্কের কথা পাশে সরিয়ে রেখে যদি কেবল এবারেরটা মানে গত মাসে ২৫ এপ্রিল হাসিনা সরকারের জাপান সফর থেকেই আমলনামা শুরু করি – তাহলে বলতে হয় জাপান সফরটা মূলত ছিল মোদির ভারতের জন্য কিছু করে দিবার সফর। যাতে আমাদের সরকার মোদির জন্য কিছু করে দিলে  মোদি সরকারও আমাদের সরকারের জন্য গুরুত্বপুর্ণ কিছু করে দিবেন!  যেমন এক, বাংলাদেশ জাপানি লোনের ভার নিজ কাঁধে নিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে শুধু সমুদ্র বন্দর না একেবারে একটা (মাতারবাড়িতে) গভীর সমুদ্র বন্দরের ব্যবস্থা পাইয়ে দিতে জাপান সফরে গেছেন।  আর দুইঃ যদিও  মোদির ভারত ক্রমান্বয়ে নিজেকে এক পরাশক্তি বলে এক শতভাগ মিথ্যা দাবি বা আচরণ করে চলে –  যেন কোন মানুষ যখন অলীক সব স্বপ্ন-কল্পনাকে বাস্তবে তা আছে বলে মনে করে বিশ্বাস করা শুরু করে আর সেসবকে তাঁর স্মৃতি বলে চালিয়ে দিতে চায়, এটা সেরকম। যা বাস্তবে নাই ঘটেই নাই তা কারো স্মৃতি হয় কেমনে?  যেখানে বাস্তবের ভারত হল এমন এক অর্থনীতির নাম যার প্রচুর অবকাঠামো ঋণ আর এফডিআই- এদুই ধরণের বিনিয়োগ ঋণের ঘাটতিতে আছে বা থাকছে; মানে একটা বিদেশি ঋণচাহিদায় থাকা দেশ। উদ্বৃত্বের অর্থনৈতিক দেশ ভারত নয়। ফলে তার ঋণ প্রয়োজন যেটা সে সবাইকে জানিয়ে চীনের (যে এখন ঋণদাতা হিশাবে শীর্ষে) কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারে না। তার অহঙ্কার-ভ্যানিটিতে লাগবেই যদি সে নিজ পুর্ণ ক্ষমতায় বিকশিত হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু মোদির ভারতের আবার চীন-এলার্জি আছে বলে – মানে হলে হুদাই মোদি হল এক কঠোর জাতিবাদি স্বরাজ্য-জ্ঞানসম্পন্ন শক্তি হিশাবে দেখিয়ে পাবলিকের কাছে ভোট চেয়ে ফেলেছে; ফলে যেখান থেকে সে আর এখন বের হতে পারবে না –  অতএব চীন তার বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারলেও মোদিকে এখন চীনের একটা বিকল্প খুঁজতে নেমে পড়তে হয়েছে। ভারত সেই বিকল্প হিশাবে সে পেতে চায় জাপানকে। যদিও ভারত জানে এটা তেমন জুতের না; কারণ এটা আবার পায়ে জুতার কাটার মত খচখচ করে লাগে। কারণ জাপানি ঋণের খরচ তুলনায় বেশি; এছাড়া জাপানি শিল্প ভারতকে সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত করার ঝোঁক প্রবল বেশি। তবে মাঙনা যদি কিছু জাপান থেকে আসে তো খারাপ কী! এটাও ঠিক! হাসিনার সফরকে আমরা এখান থেকে দেখতে পারি!

    সমস্যা হল মোদির ভারতের অর্থনীতিবিষয়ক স্বপ্ন আসলে এক অলীক স্বপ্ন। কারণ, মোদি বা আরএসএস এর রাজনীতি এক উগ্র জাতিবাদী ধারণা বলে, তাদের অর্থনীতি জ্ঞান ও ধারনাও উগ্র জাতিবাদ প্রসুত! কিন্তু এর মানে কী? মানে হল এই চিন্তা্র শাসকেরা বাস্তবে কখনও আরেক দেশের সাথে শেষবিচারে লেনদেন বা বাণিজ্য-অর্থনীতিতে লিপ্ত হয়ে পারে না, পারবে না। কেননা এমন উগ্র জাতিবাদ মনে করে আমার দেশের মানুষ যাকিছু উতপণ্য ভোগ-ব্যবহার করব তা কেবল নিজ-দেশের উতপাদনই হতে হবে। আমিও রপ্তানি করব অন্যদেশেও আমার দেশে রপ্তানি করবে – না এমন নীতিতে উগ্র জাতিবাদ বিশ্বাস করে না। এটা কার্যত ওয়ানওয়ে  মানে কেবল একদিকে আমিই কেবল রপ্তানি করব এমন হতে হবে। এমনকি তা যদি তা সোজা আঙ্গুলে না হয় (বাস্তবে তা না হওয়ারই কথা) তবে শঠতা, প্রতারণা করে হয়েও আগাতে হবে। ভুয়াভাবে এমন বিশ্বাস আছে তা দেখাতে হবে আর এই দেখানোটা জায়েজ মনে করতে হবে। যেটা অনেকটা ছলনাময় ও চতুর কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী বৃটিশদের মত, তাদের পররাষ্ট্রনীতির মত;  আর এটাই উগ্র জাতিবাদিদের অর্থনৈতিক মডেল।  একারণে গত একদশকেরও বেশি এই জাপান-ভারতের সম্পর্ক এক স্বপ্ন-কল্পনাই হয়ে চলছে যার তেমন কোন বাস্তবায়ন অগ্রগতি নাই। যদিও তাতে উচ্ছ্বাসে কমতি নাই। যেকারণে,  যাকিছুর নামে সাথে স্বরাজ অথবা জাগরণ ধরণের শব্দ আছে বুঝতে হবে সেসবগুলো আসলে আরএসএস এর প্রকল্প। তাই স্বরাজ্য-মাগ ম্যাগাজিনে জাপানকে নিয়ে উচ্ছাস দেখা যাবে যারা বলতে চাইবে এই তো চীনের বিকল্প এক বিড়াল হিশাবে জাপানকে পেয়ে গেছি আর চিন্তা নাই। কিন্তু এটা যে মাঙনায় পাওয়া হাসিনা সরকারের দেয়া জাপান থেকে হবু সুবিধা তা উগ্র জাতিবাদিরা পরিস্কার করে বলবে না।

    কিন্তু হাসিনা সরকার তাহলে এর বিনিময়ে নিজে কী পাবে ভেবেছিল? সেটা অনেকটা –  “দেখেন তো ভাইজান কিছু করতে পারেন কিনা – আমেরিকার ঘেরাও এর ভিতর থেকে আমাকে উদ্ধারে কিছু করতে পারেন কিনা” – ধরণের কিছু।
    এমনকি গত সপ্তাহে বাংলাদেশের হোস্ট করা (১২-১৩ মে) ভারত মহাসাগর কনফারেন্স নামে যেটা হল সেটাও ছিল আরেক রাজভেট – ভারতকে দেয়া আমাদের উপহার। সেটা আবার কী? এছাড়া এই সম্মেলনের তাতপর্যই বা কী?

    সেটা বুঝাতে একটু পিছন থেকে বলি। আগেও  অনেকবার বলেছি যে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের একালের সকল প্রতিযোগিতার  ফোকাস-ভুখন্ড হবে (আসলে হয়ে গেছে) এশিয়া; আর যা  নুন্যতম আগামি তিনদশকের জন্য। অর্থাৎ একথাটাই আবার ভুখন্ডের দিক থেকে না বলে এর বদলে, মহাসাগর এর দিক থেকে বললে তা হল, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে সমুদ্র-অঞ্চল হল এর ফোকাস এরিয়া ।  আমেরিকা নিজের সেই সমুদ্র-কেন্দ্রিক ততপরতার ফোকাস করেছে  – সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ যেটা – সাউথ চায়না সি বলে ইতোমধ্যেই পরিচিত; তাকে কেন্দ্র করে তবে তা, অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়ে হৈ চৈ করে শুরু করে দিয়েছে।  চীনও কমবেশি তা করেছে তবে প্রোফাইল লো রেখে এবং সেও অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়েই সেটা শুরু করেছে। যেমন, আমাদের কক্সবাজর কেন্দ্রিক চীনের উপস্থিতি ও সব ততপরতা হল সেগুলোই।

    কিন্তু ‘পরাশক্তি’ নামের ভাঁড় ভারত, তার খায়েসের কী হবে? তারও একটা কিছু দেখানো যে লাগবেই! যাতে মনে হয় নকল হলেও সেও একটা পরাশক্তি! তাই এ যেন -পোলাও মনে করে গরীবের চালভাজা- খাওয়ার সুখ! আর সেটাই হাসিনার কান্ধে চড়ে এবারের ভারত মহাসাগর কনফারেন্স এর হোস্ট ভারত করে নিয়েছে বাংলাদেশকে। এটা করে, ভারত দেখাতে চাইলো সেও কম যায় না। এদিকে,  কূটনৈতিক রেওয়াজ হল কোন কনফারেন্সের গুরুত্বের মাত্রা বুঝার একটা তরিকা হল তাতে আগত বিভিন্ন দেশের কারা প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছে তা দিয়ে। মানে এরই একটা মাপকাঠি মানা হয় হল  – রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন সেখানে এসেছেন। তাতে ভারতকে দেখা গেল তবু একজন রাষ্ট্রপতিকে আনতে পেরেছেন। কিন্তু কে তিনি? তিনি হচ্ছেন মরিশাসের রাষ্ট্রপতি! মহাদেশ-হিসাবে যা আফ্রিকায়; মানে আফ্রিকার পাদদেশে যে মাদাগাস্কার দ্বীপ আছে তারও আরও পুবে খুবই  ছোট্ট একদ্বীপ। মোট জনসংখ্যা যার মাত্র ১২ লাখ, মানে আমাদের মাঝারি মানের একটা উপজেলার জনসংখ্যা যেমন। আর মরিশাসের ৬৭% জনসংখ্যা আবার ভারতীয় অরিজিন। কেন এমন? কারণ,  যাদেরকে সস্তা শ্রমিক হিশাবে বৃটিশ কলোনিদখলদারেরা সেকালের বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে মাইগ্রেট করে নিয়ে গেছিল, তারাই। যেমন অনেকেই লক্ষ্য করেছেন বাংলাদেশে এসে এই মরিশাস প্রেসিডেন্ট – নাম পৃথ্বীরাজসিং রূপম – তিনি  সস্ত্রীক আমাদের ঢাকেশ্বরী মন্দির দর্শন করতে গেছিলেন। সারকথায়, এজন্য এটা এক ভারত-নির্ভরশীল দ্বীপ-রাষ্ট্র। এই হল সেই একমাত্র প্রেসিডেন্টের নমুনা! দাবি করা হয়েছে পঁচিশটা দেশের প্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিল যার প্রায় সবই ভারতের আমন্ত্রণে বা ভারতের কূটনৈতিক জোরে।  আর বাংলাদেশ কেবল হোস্ট মাত্র যার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে সদ-ব্যবহার করে দেখাতে পারে সে বাংলাদেশে অনেক প্রভাবশালী! ভারতের ‘এরিয়া অফ ইনফ্লুয়েন্সেই’,  “আমার তালুকেই”যেন বাংলাদেশ অবস্থিত!

    বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেলঃ
    কিন্তু এসব করার বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেল? হা; সেকথাটাই যেন আমাদেরকে জানাতে মোদি সরকার সুবীর ভৌমিকের আর্টিকেল্টা প্রকাশিত কররার ব্ছেযবস্থা করেছে। যেমন শিরোনাম থেকেই শুরু হয়েছে এটা বলে যে “বাংলাদেশ সরকার (অ্যামেরিকান) “চাপের” তাপ বুঝতেছে আর তাতে দিল্লিও কোণার চিপায় পড়ে গিয়েছে”। কিন্তু এতে তো ভারতকেও বিপদে পড়া দেখানো হয়ে গেল, তা কেন? কারণ এখন ভারতের খাই-দাই শেষ; মানে আমাদের সরকার ভারতের জন্য যা যোগাড় করে দিয়েছিল! ফলে এখন ভারতও নিজেকে অসহায় কোণার চিপায় পড়া দেখালেই তো দায়িত্ব শেষ – যেন বলতে চাচ্ছে, “অনেক চেষ্টা করলাম, আর পারি নাই ভাই!”  এমন বলে হলেও তো খালাস পেতে হবে!!!

    সাথে আবার সুবীরের আরও অজুহাতও আছে। এমনকি এতে খোদ ভারতই বিপদে আছে বলে সে আড়াল নিতেও চেয়েছে। একাজে, ভারতকে অসহায় দেখানোটাও জরুরি মনে করেছেন সুবীর! যেমন সাব-হেডিং দিয়েছেন, “খোদ ভারতই এক শক্ত-ঠেলার মধ্যে” [India in a tight spot] পড়েছে। এরপর বলছেন, এবারের পরিস্থতিতে দুইটা জিনিষ নাকি ভারতের বিপক্ষে, নাহলে ভারত হাসিনার জন্য কতকিছু করে দেখায় দিত!
    সে দুটা অসুবিধা কী? সুবীর বলছেন এক হল, জাতিসংঘে ভারতের হাতে চীনের মত ভেটোক্ষমতা নাই যে যেকোন অ্যামেরিকান প্রস্তাবে বিরুদ্ধে সে ভেটো মেরে দিতে পারত। আচ্ছা সুবীর সাব, আমেরিকা কী হাসিনার বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কোন প্রস্তাব এনে হাসিনাকে চাপে রেখেছে? তা তো বাস্তবতা নয়! তাহলে এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা কেন বলেন? বাস্তবতা হল,  আমেরিকা  নিজ-রাষ্ট্র-ক্ষমতাবলেই নানান স্যাংশন দিয়ে রেখেছে? শুধু তাই না। এখনও জাতিসংঘের যেকোন ফোরামে অ্যামেরিকান প্রভাব সবার চেয়ে বেশি। এই প্রভাবের অর্থ হল অন্যান্য ভেটো হোল্ডার সদস্যদের (চীন বা রাশিয়ার) এতে তেমন কিছুই করার নাই।  আজ জাতিসংঘ গঠন প্রায় আশি বছর হয়ে গেল তবুও গ্লোবাল নেতা আমেরিকা ঢলে পড়ার যুগে  আজ প্রবেশ করলেও  আমেরিয়ান প্রভাব এখনও একক; আমেরিকা চাইলেই কেবল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট [OHCHR] এজেন্সি সংগঠনে যেকোন প্রস্তাব সহজে নড়েচড়ে উঠতে পারে।  ফলে ভারতের অযোগ্যতা, অসহায়ত্ব তো নতুন নয়। এমনকি আজ ভারত ভেটো ক্ষমতা পেলেও তাতে কিছুই হবে না। কারণ, এখনই আমেরিকা ছাড়াও আরও চার ভেটোক্ষমতা-ওয়ালা দেশ আছে। যার মধ্যে দুজন হল বৃটিশ ও ফরাসিরা। কই জাতিসংঘে তাদের উদ্যোগে বা চাপ কী হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু আছে??? কাজেই ভারতের আলগা মাতবরি দেখানোর ত এখানের কিছু নাই!!! সোজা কথাটা হল, ভারতের হাতে ভেটোক্ষমতা থাকলেও সেটা হাসিনা সরকারের উপর আমেরিকান চাপের  বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারত না। কাজেই ভারতের আলগা ভাব নিবার কী আছে এখানে???
    সুবীর ভৌমিক দ্বিতীয় আরেক ওজুহাত সুনিয়েছেন হাসিনা-কে। তিনি বলছেন ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা। সেসময় নির্বাচনের আগের ডিসেম্বরে (২০১৩) ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ভারত পাঠিয়েছিল। প্রকাশ্যেই তিনি বলে গেছিলেন, বিএনপি ছাড়াই (কারচুপির) নির্বাচন হবে কোন সমস্যা হবে না কারণ এরশাদ না চাইলেও জাতীয় পার্টিকেই গৃহপালিত বিরোধী দল করে নেয়া হবে – যেটা সুজাতার সঙ্গে এরশাদ মিটিং শেষে বেড়িয়েই মিডিয়ার সামনে সব উদাম করে দিয়েছিলেন এরশাদ। মজাটা হল,  সে ঘটনাটা সুবীর ভৌমিক এখন স্মরণ করছেন আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের বিরাট কৃতিত্ব বলে দাবি করে।
    অথচ ফ্যাক্টস হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা ও এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের ক্ষমতা সবই তখনও এককভাবে সবই আমেরিকার দখলে ছিল। আর আজকের চেয়ে তা আরও ভাল ভাবে। যার কাছে ভারত তুচ্ছাতিতুচ্ছই ছিল। কিন্তু ঐ ভারতকে আমেরিকা এশিয়ায় চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি বরকন্দাজ বানিয়ে রেখেছিল বলে তাতে ভারতের কিছু “ভয়েস অর্থে ক্ষমতা” তৈরি হয়েছিল যা আমেরিকা সদয় হলে ভারতকে সময়ে আমল করত। [মনে রাখতে হবে সেই ক্ষমতাটুকুও এখন ভারতের নাই]  কারণ আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতেই তুলে দিয়েছিল বলেই সুজাতা সিং অ্যামেরিকান ক্ষমতার উপর ভর করেই ওসব মাতব্বরি কথা সেকালে বলে যেতে পেরেছিল।  সুবীরের ধারণা এগুলো কেউ জানে না,  বা তার চাপাবাজি কেউ ধরতে বা বুঝতে পারবে না। পুওর সুবীর!! সুবীর তাই এবার লিখছে সুজাতার এই খেল এসবই নাকি ভানুমতির খেল  আর সেই আসলে ভানুমতি ছিলেন প্রণব মুখার্জি। যিনি এখন মারা গেছেন বলেই নাকি এবার আর হাসিনাকে অ্যামেরিকান চাপ থেকে উদ্ধারে মোদি কিছু করতে পারল না।!!!!
    মিঃ সুবীর, মিথ্যা কথা বলতে গেলেও তো কিছু নিয়ম মানতে হয়, নাকি?? সুবীর সেটাও বুঝে না। অথচ এবারের লেখাতেই সুবীর স্বীকার করে নিয়েছেন যে সুজাতার সেসময়ের ক্ষমতার অপ-ব্যবহারের ও অবৈধ হস্তক্ষেপের ক্ষমতাটাই ছিল আমেরিকারর ক্ষমতাই। সুবীর সেসব কথা স্বীকার করছে এভাবে আর লিখেছে,    its (India’s) strategic alliance with the US to take on China – মানে  চীন ঠেকানোর বরকন্দাজি সুত্রে আমেরিকার সাথে ভারতের যে স্ট্রাটেজিক এলায়্যেন্স ছিল সেটাই সেসময়ের ভারতের সুজাতার ক্ষমতার উৎস। মানে এটা ব্যক্তি প্রণব মুখার্জির কোন ক্যারিসমা বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু তবুও সুবীর এই লেখায় দাবি করেছে [India now also lacks someone like Pranab Mukherjee……… ] – আজ প্রণব বেঁচে থাকলে ভারত আমেরিকাকে দেখায় দিতে পারত, হাসিনার বিরুদ্ধে অ্যামেরিকান চাপ থেকে হাসিনাকে উদ্ধার করে দিতে পারত!
    সুবীর এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নাই। প্রণব মুখার্জির ক্ষমতা সম্পর্কে আরো লিখে দাবি করে বসেছেন যে ….. [প্রণব].who battled it out with the US to ask the military-backed caretaker to stand down.  মানে প্রণব এতই ক্ষমতাবান যে তিনি খোদ আমেরিকার সাথে লড়ে বাংলাদেশের  সেনাবাহিনীকে সরে দাঁড়িয়ে হাসিনাকে ক্ষমতা দিবার ব্যবস্থা করে দিতে আমেরিকাকে বাধ্য করতে পেরেছিলেন।  আর এটাই এখন মোদি সরকার হাসিনার জন্য কিছু করতে পারছেন না; কারণ প্রণব মুখার্জি এই একটাই রত্ন ছিল ভারতের, তিনি তো মরে গেছেন!!

    তার মানে দাড়ালো যে প্রণব মরার পর ভারত আর হাসিনার সরকারের জন্য কিছুই করতে পারবে না। তাহলে তো ভারতের সবকথা এখানেই শেষ হয়ে যাবার কথা, নাকি?
    না, সুবীর মিথ্যা বলতেছেন।  তাই এসব বলার পরেই তিনি এবার ভারতের এখনকার মনের শঙ্কা হাজির করছেন। সেই আশঙ্কা নিচে ছবি আকারে দিয়েছি।  কথাগুলো সুবীরের লেখা থেকে নেয়া। যা বাংলা করলে হয় যে, কী হবে যদি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে এতদিন যাকিছু হাসিনা সরকারকে দিয়ে চুক্তি করে ভারত পেয়ে নিয়েছে তার সবকিছু পুণর্মুল্যায়ন করে খালেদা যদি ওসব চুক্তি বাতিল করে দেন – এই হুমকির কী হবে???

    কিন্তু এই আশঙ্কা কেন? হাসিনা সরকার আর ভারতের মধ্যে কী কোন আন্ডারহ্যান্ড অসম বা আনফেয়ার ডিল করা হয়েছে? সুবীর সেতাই কী পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন না!  এই বাক্যটা লিখে সুবীর ভৌমিক সেই আশঙ্কা তার বাংলাদেশি পাঠকের মনে নিজেই স্বগোক্তিতে প্রবেশ করিয়ে দিলেন!  যখন বাংলাদেশের বিগ মেজরিটি মানুষ বিশেষ করে তরুণদের মনে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” এখন সর্বোচ্চ!  বাংলাদেশে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” ও নেতি লুটেরা ধারণা এর আগে কখনও এমন তুঙ্গে উঠে নাই! এই বাস্তবতায় এটাই কী তাহলে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ ডিলিং এর নতিজা নয় কী?  – প্রণবের এসব শঠতা এটা কী আসলেই ভারতের জন্য খুবই ভাল কিছু হয়েছে? ইতোমধ্যেই যা কিছু প্রকাশিত হয়ে গেছে তা আসলেই ভারতের বিপক্ষে চলে যায় নাই, যাবার কারণ নয়? মানে আমরা যেটাকে – লাভের গুড় পিপড়াতে খেয়ে গেছে অবস্থার কথা বলি ! এটা কী তাই নয়?   সুবীর ভৌমিক সহ ভারতের নীতি নির্ধারকদের জন্য ব্যাপারটা তাদের জন্য রিভিউয়ের খোরাক হতে পারে- যদি সতভাবে চিন্তা করতে পারে তবে এই ভিউ পয়েন্ট তাদেরকে আগ্রহি করতেও পারে!

    কিন্তু এর পরেও ইতোমধ্যে আরো কিছু খারাপ ডেভেলবমেন্ট তৈরি হয়ে গেছে। আগামিতে কী হতে পারে তা নিয়ে সুবীর এক সার্ভে রিপোর্টের বরাতে অনেক কিছুই বলেছেন। আর এর সাথে  সুবীর ভৌমিকের মুখ দিয়ে আরও কিছু ভারতের নয়া খায়েস-ফরমায়েস হাজির হয়ে গেছে। সুবীর  হাসিনা সরকারের কাজে নয়া আরও চাহিদা হাজির করতে দ্বিধা করেন নাই। একাজে সুবীরের  নয়া উপশিরোনাম হল, হাসিনাকে যা করতে হবে [What Hasina needs to do]। মানে হল, ভারত যা করল তাতে হাসিনা এখন শেষ হয়ে যাচ্ছেন; অথচ সেদিকে সুবীরের কোন দৃষ্টি নাই। বরং ভারত এখনও আছে কেবল নিজ সংকীর্ণস্বার্থ নিয়ে। তাই বলতে চেয়েছেন,  নিজ স্বার্থ ভুলে হাসিনা সরকারকে এখনও এরপরেও যা করতে হবে তার  এক তালিকা দিয়েছেন সুবীর।

    এটা বেশ ইন্টারেস্টিং যে সুবিরের বরাতে আমরা জানছি যে ভারতের অবস্থান হল, বটম লাইনটা হল, “হাসিনাকে চীনের সংস্পর্শ ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু এর সাথে যেটা বলা নাই তা হল, কেন হাসিনাকে তা করতে হবে? হাসিনার স্বার্থ বা লাভ কী এতে? এর কোন হদিস রাখেন নাই। যেন এটা ভারতের একক স্বার্থের নির্দেশ!!! ভারতের প্রেজেন্টেশন এমন সবসময় সবকিছুতে ভীষণ স্বার্থপর ও সংকীর্ণ – যেখানে সেটা হল ও মডেলটা হল কলোনিদখলদারের মডেল। যেটাপ্রথম কপি ও চালু করেছিলেন জওয়াহরলাল নেহেরু, আর তা এখনও চর্চায় ভারতের প্রধান ধারা। ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক এবং করুণার… কেন?

    কারণ, সুবীর এক আজিব ও অবিশ্বাস্য কথা বলেছেন, যেন ভুতের মুখে রামনামঃ

    Delhi wants to see the Awami League return to power but through a fair election
    that can shut up the Western nitpickers and prevent Bangladesh’s slide
    into a one-party rule that will augment Chinese influence.

    সোজা ভাষায় বলছেন,  ভারত দেখতে চায় হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরুক কিন্তু একটা ফেয়ার নির্বাচনের মাধ্যমে। যদিও এই ফেয়ার নির্বাচনের মানে কী  সেটা সুবীর পরিস্কেকার করেন নাই। আবার গত কোন নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে কিনা সেটা নিয়ে ভারত কখনও কিছুই বলতে চায় নাই, পাশ কাটিয়ে গেছে, তাই এনিয়ে ভারতের কোন উদ্বেগ ছিল না। একমাত্র উদ্বেগ ছিল নিজ স্বার্থ হাসিল, তা যেভাবেই হোক। তাহলে আজ  ফেয়ার নির্বাচনের কথা কেন?  আগে (সুজাতা সিংয়ের কেসের আমলে) ফেয়ার নির্বাচন না করার ফর্মুলা দিয়ে যাওয়া –  মানে সেটা কী তাহলে ভুল হয়েছিল? বলে এখন স্বীকার করছে? যদি তাই হয় তো  ভারত কী এর দায় নিবে?
    ঐ সার্ভে রেজাল্টের বরাতে সুবীর অনেক চেষ্টা করেও হাসিনার দলকে জিতবে বা সে সুযোগ আসবে তা দেখাতে পারে নাই। শুরু করেছিলেন যে হাসিনার লীগ দল 32 to 47 seats পাবে বলে।  পরে নানান শর্তে সেটা  83–117 seats হতে পারে বলেছেন। আর সবশেষে ১৪০ আসনের উপরে আর তুলতে পারেন নাই।  
    কিন্তু তবু, যে ফর্মুলা দিয়েছে এর সোজা মানে, আ লীগের ভিতরে যুদ্ধ শুরু করতে হবে। অপর গ্রুপকে চীনাপন্থি নামে লেভেল লাগিয়ে তাদেরকে দলছাড়া করতে হবে। এমনকি বেচারা মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে ভারতকে স্বামী মেনেও নিজে আজ চীনাপন্থি তকমা পেয়েছেন। ভারত তার উতখাত চায়। এমন মন্ত্রণালয়ের নামও দিয়ে দিয়েছেন সুবীর এরা হল -” home, finance, foreign, information, industry, commerce, and water resources” ইত্যাদি।
    এই ব্যাপারটা বা ভারতের কামনার পার্জিং [purging]; বাংলায় বললে তা দলে বিভক্তি আনতে সুপারিশ করা। অর্থাৎ ভারত এখন লীগকেই চীনাপন্থি নামে লেভেল  আরেক ভাগ করতে চায়। মানে ভারতীয় হস্তক্ষেপ কত গভীরে চলে গেছে এর চিহ্ন।  সম্ভবত এর আরো বড় চিহ্ন হল, কালবেলা পত্রিকায় আরেক প্রপাগান্ডা লেখা; যার শিরোনাম আরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসছে, প্রস্তুত সরকার এই মিথ্যা জল্পনা-কল্পনা ওয়ালা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে।  সেই রিপোটটা আওয়ামি লীগ দলে বিভক্তি আনার আরও বিস্তারিত ভারতীয় উদ্যোগ বলে মনে করছেন অনেকে।  কারণ, আমেরিকার আরও স্যাংশন দেওয়ার আর কোন কারণই নাই। কারণ সেক্ষেত্রে স্যাংশন খেয়ে হলেও হাসিনা সরকারের জন্য তো ভালই। আর সেটা এই অর্থে যে এটা হাসিনা সরকার থেকে যেতে পারে, সে সম্ভাবনা বাড়াবে!

    এখন ফিরে আবার সুবীর ভৌমিকের লেখার শিরোনাম টা মনে করা যাক  – নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে।
    হাসিনা সরকার একা নয়, বাংলাদেশ ইস্যুতে সাথে ভারতও চরম বিপদে পড়েছে।  সুবীর সেই দুর্দশার একাউন্টগুলো আমাদের সামনে খুলে ফেলেছেন!

    +++++
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!

    কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!
    গৌতম দাস

    ১৮ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4t2

     

             India: Congress victory strong message against majoritarian politics

     

    দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্য সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১০ মে যার, ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ১৩ মে এবং  এই ফলাফল হয়েছে মোদির জন্য একালের খুবই বিপর্যয়কর এক আঘাত। অনেকটা যেন ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভাগ্যে নেমে এসেছিল এক কঠিন নেতি ফলাফল বিপর্যয় হিশাবে যখন, বিজেপি ঐ নির্বাচনে বিরাট মার্জিনে জিতে আসতেছেই বলে ব্যাপক প্রপাগান্ডা  আওয়াজ তোলার পরে বাস্তব ফলাফল দেখা গিয়েছিল একেবারে উলটা; বিজেপি সেবার তার গত ২০১৯ সালের সফলতাটাই ধরে রাখতে পারে নাই; বরং আরও নিচে নেমে গেছিল। এবার কর্ণাটকের ফলাফল বিজেপির জন্য অনেকটা সেরকম তো বটেই তবে এর চেয়েও বেশি নেতি প্রভাব ফেলেছে। এর বড় কারণ হল প্রথমত, আগামি কেন্দ্রীয় নির্বাচন আসন্ন। মানে হল, আগামি বছর মে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন ততদিনে শেষ হয়ে ফলাফলও প্রকাশিত হয়ে যাবে।

    এছাড়াও, অন্যান্য বড় ফ্যাক্টরগুলো হলঃ এতদিন গত ২৩ বছরেরও বেশি যে ভারত ছিল এশিয়ায় অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজিক পার্টনারই শুধু না, ভারত ছিল আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর বরকন্দাজ। আর এর বিনিময়ে মানে বরকন্দাজির নামে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার চলতি বছর থেকে বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা অনুসৃত নীতি থেকে সরে এসেছে। যদিও সরকারি আনুষ্ঠানিকভাবে   আমেরিকা বা ভারত দুই সরকারের কোন পক্ষ থেকেই কোন ঘোষণা  দেওয়া হয় নাই কৌশলগত কারণে কিন্তু, দুপক্ষই নিজ নিজ সরকারের পথচলা ও আচার আচরণে এমনকি ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রকাশিত করে ফেলছে যে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। তবুও যেটা অনেকটা একটা বিয়ে ভেঙ্গে গেছে কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স হয় নাই – এর মত। তাই আচার-আচরণ বসবাসে তা প্রতিফলিত হবেই, সেরকম। সেই নয়া  গতি-প্রকৃতি কেমন এনিয়ে ভারতের মনোভাব যেভাবে প্রকাশিত তা নিয়ে একটা লেখা আসবে আগামিতে।

    এতদিন বাইডেন সরকার বিভিন্নদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে   মানবাধিকার লঙ্ঘণের এর অভিযোগ আনা আর স্যাংশন আরোপ – অন্তত এই দুই নীতি নিয়ে সামনে আগিয়েছে। তাসত্বেও এর কোনটাই এতদিন মোদি সরকারের উপর প্রয়োগ করে নাই। ছাড় দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলেছিল। কিন্তু এবার সবকিছুই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর সংসদ সদস্যপদ খারিজ ও সাজা দান ইস্যুতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট(পররাষ্ট্র বিভাগ) এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল জানিয়েছিল তারা সব লক্ষ্য করছে [we r Watching], নোট নিচ্ছে। তাই, আমার আগেরই এক লেখায় কিছু বিস্তারিত বাক্যে লিখেছিলাম। সেই গত লেখায় এখানে, যার সারকথাটা হলঃ
    “যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, মোদির দোস্ত আদানির শেয়ার বাজারে করা কারসাজির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার পরোক্ষ আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ]  যেটাকে প্রত্যক্ষ আহবান বলে দাবি করে মোদির অভিযোগ, আদালতে মোদির কারসাজি করে রাহুলকে শাস্তির রায় ঘোষণা ও প্রভাব বিস্তার; এছাড়া, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে গাথা ও যুক্ত।”
    অর্থাৎ মোদির ভারত থেকে অ্যামেরিকার আলাদা হয়ে যাওয়া রাস্তাটা হল এই যে, বাইডেন এখন দেখতে চান ২০২৪ সালে্র নির্বাচনে মোদি সরকার যেন ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়; আর এর স্বপক্ষে “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে”  আইন বাঁচিয়ে যতটা সহায়তা করা যায় এর সবটা করতে নেমে পড়েছে আমেরিকা। তাই কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির গোহারা হার “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নতুন উতসাহে আগিয়ে যেতে উতসাহিত করবে আর ঠিক ততটাই যেন তা বিজেপি-কে হতাশ ও নিরুতসাহিত করবে! এটাই হল কর্ণাটক নির্বাচনের একতা বড় তাতপর্য, যা একেবারেই ভারতের একটা আঞ্চলিক হিশাবেও যায় না কর্ণাটক এমন এক রাজ্য নির্বাচন মাত্র হওয়া সত্বেও, এর মধ্য দিয়ে এক  গ্লোবাল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দিক ফুটে উঠেছে! এনিয়ে সবচেয়ে বড় করে ভোটের হার-জিত দুপক্ষই পরস্পরকে টিটকারি করেছে টুইটারে।  যেমন তেমনই একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক মোটা ভাই কর্ণাটক নির্বাচনের ফলাফল আসতেই ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে অমিত শাহ প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করেছেন আর সকল প্রার্থীই ভোট ছেয়েছেন মোদির নামে। তাই ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক “মোটা ভাই” পালাচ্ছে। আর গুজরাতি ভাষায় মোটা ভাই মানে বড় ভাই যার মাথায় আবার প্রতীকিভাবে অমিত শাহের মত বিশাল টাক আছে।

    ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটক কোথায়, কেন আর এর গুরুত্বই বা কীঃ
    শুরুতে একবাক্যে কর্ণাটকের এই নির্বাচনের ফলাফল একটু বলে নেই। এই নির্বাচনে মোট আসন ছিল ২২৪ যার মধ্যে এবার কংগ্রেস একাই জিতেছে ১৩৯ আসনে, যেখানে সরকার গঠনের জন্য নুন্যতম প্রয়োজনীয় হল ১১৩ আসন। এখানে গত রাজ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে আর সেবারই প্রথম বিজেপি দল ১০৪ আসন পেয়েছিল যা এককভাবে সরকার  গঠন করার মত যথেষ্ট আসন নয়। কিন্তু এদিয়েই বিজেপি ষড়যন্ত্র এঁটে বাকি আসন সেবার বিরোধীদের থেকে ভাগিয়ে এনে গত পাঁচ বছর রাজ্য সরকার গঠন করতে সক্ষম ও তা চালিয়ে এসেছিল। কারা সেই ভাগিয়ে আনা লোক তা নিয়ে এলেখার শেষে কথা বলব।

    এবার, ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটকের পরিচিতি প্রসঙ্গে। উত্তর-ভারতের আর্য-প্রভাবিত সব রাজ্যগুলোর বিপরীতে ভারতের দক্ষিণের চারটা প্রদেশকে   ‘দ্রাবিড়ীয়ান’ রাজ্য বলা হয়। অনেক সময় এই রাজ্যগুলোকে ‘দাক্ষিণার্ত’ [DECCAN] অঞ্চলও  বলতে দেখা হয়। আসলে ভূ-গঠনশৈলী হিশাবে এই পুরা অঞ্চলটাকেই (সংস্কৃতঘেঁষা বাংলায়) বলে মালভুমি, ইংরাজিতে যা  Plateau বলে পরিচিত। আর গ্রামের সাধারণ বাংলায় যেটা পাহাড়ের উপরের এক ব্যাপক বিস্তীর্ণ সমতলভুমি – এমন ভুখন্ডকে বুঝায়।  যার নাম বাংলা উচ্চারণে লিখলে হবে  ডেকান প্লাটো [DECCAN Plateau]। 

    মিথিওলজি বা প্রচলিত ধারণায়ঃ
    মিথিওলজি [mythology] মানে বলা যায় কিংবদন্তি ধারণা; বহু পুরানা প্রচলিত থাকা ধারণায় যা আছে বা থাকে কিন্তু যার প্রমাণ নিয়ে কেউ আগ্রহ করে না বা মাথা ঘামায় না।  সব এথনলজি [ethnology] বা জাতির ধারণার মধ্যেই এমন নানান মিথ [myth] থাকতে দেখা যায়। সেকথা একটু পরে আসছি।   ভারতের উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে ধর্মীয় ও কালচারাল ঝগড়ার মূল ইস্যুটা প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একারণে যে ভারতের বাইরে থেকে এসে আর্যরা যেখানে প্রথম খুঁটি গেড়ে বসেছিল সেটা সারা ভারত না বরং,  কেবল উত্তর ভারত মাত্র। পরে সেখান থেকে এর আশেপাশের প্রদেশ যেমন মহারাষ্ট্র (মারাঠি) এর উপর অংশ, মধ্যপ্রদেশ আর পুবে বিহার পর্যন্ত সহজেই প্রভাব বিস্তার ও ভাষার দিক থেকে এসব রাজ্যের উপর সংস্কৃত ভাষার প্রভাব-আধিপত্য ছড়াতে পেরেছিল। কিন্তু কখনই দাক্ষিণার্থে প্রবেশ করতে পারে নাই। আর প্রায় একইভাবে ওদিকে পুবে বিহারে – ভোজপুরি ভাষার বিহার পেরিয়ে বাংলায় পুরাটা দখল নিতে পারে নাই আর্যরা।  আর্যরা মহারাষ্ট্র পেরিয়ে আরও দক্ষিণে দাক্ষিণার্থের কোথায় প্রবেশ না করতে পারার মূল কারণ মনে করা হয় এই ডেকান প্লাটো মানে পাহাড়ের উপরের সমতলভুমি, এটাকে তারা সদলে পার হতে পারে নাই।
    এমনকি মিথিওলজিতে [এথনিক মিথের ধারণায়] দেখা যায় আর্যদের দেবতা ও তাদের আবাস স্বর্গের ধারণায় – সেখানে সুরালোক বলতে স্বর্গ বুঝানো হয়ে থাকে অর্থাৎ স্বর্গ মানে সুর বা দেবতা-দের আবাস যেখানে।  আর বিপরীতে যারা দেবতাদেরকেই স্বর্গচ্যুত করতে চায় এরাই হল তাদের চোখে অসুর। যেন দেবতাদের দিক থেকে দেখলে সুর হল তারা নিজেরা; তারা নায়ক সেখানে আর অসুর হল ভিলেন বা বিপরীত।  দুর্গাপুজার মুর্তিতে দেখা যাবে ওটা হল, দুর্গা লড়ছেন এক অসুরের সাথে। আর কেমনে চিনব যে এটা অসুর? দেখা যাবে মহিষের পেট চিড়ে যে বেরিয়ে এসেছে আর দেখতে কুচকুচে কালো – এই হল আর্যদের ভিলেন-বোধ। আর তাতে এটাই মহিষাসুর!
    সারকথায় মিথিক্যাল বর্ণনাগুলোতে সেটা কার দিক থেকে দেখা বর্ণনা – এটাই খুবই নির্ধারক। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই একদল সাঁওতাল ট্রাইব আছে যারা দুর্গাকেই উলটা ভিলেন মনে করে থাকে; আর মেনে বিপরীতে মহিষাসুর এরই পুজা করে থাকে। এনিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক নিউজ এখানে। আবার মহিষাসুর নিয়ে কলকাতার বাঙালির আলাদা ভার্সান এখানে দেখা যেতে পারে।

    দাক্ষিণার্ত – ভারতের এই অঞ্চলটা হল এই উচু পাহাড়-মালভুমি তা আগেই বলেছি; কিন্তু যার আবার দুই দিকেই দুই সাগর। মানে বামে বা পশ্চিমে হল আরব সাগর আর ডানে বা পুবে হল বঙ্গোপসাগর। ভূ-প্রাকৃতিক এসব কারণে এই অঞ্চলের মানুষেরা প্রচন্ড খাঁড়া রোদের মধ্যে বসবাস করতে হয় আর তাতে রোদে পোড়া বলে তাদের গায়ের রঙ খুবই কালো হয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা যত বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকুলে ও মাছধরা পেশায় তারা ততই কালো। কাজেই এই কালো রং-ই হয়েছে আর্যদের চোখে নিচা মানুষ; মানে,  যাদের আর্যরা ঘৃণা ছিটিয়ে নিচা দেখাতে চায় যাদের সেই আম জনগণ – এরাই নাকি  আর্যদের চোখে অসুর! এরা অসুরের জাত! কেউ কেউ তাদের দ্রাবিড়ীয়-ও [DraviDian] বলে থাকে।  তামিলনাড়ূর সবচেয়ে বড় দলের নাম ডিএমকে [DMK -Dravida Munnetra Kazhagam ] যেখানে ডি [D] মানে দ্রাবিড়। [ভারতের নামগুলোর মধ্যে তাই কখনও ইংরাজিতে ‘ডি’ অক্ষর দেখা গেলে এর উচ্চারণ বাংলায় “ড়” করতে হবে]।
    আর একটা কথা বলার সুযোগ নেই। কর্ণাটক এর ভাষার নাম কানাড়া যা দ্রাবিড়ীয় চারটা ভাষার একটা।  কর্ণাটকিরা নিজেদের কন্নড় জাতির লোক মনে করে থাকে, তাই তাদের ভাষার নাম কানাড়া। কর্ণাটকের কন্নড় ভাষা পাশের মানে উপরের সীমান্ত সংলগ্ন মহারাষ্ট্র (মুম্বাই) এর দক্ষিণ সীমান্ত বা পুবে বা ডানপাশে অন্ধ্রপ্রদেশ ও নিচের তামিলনাড়ুতেও কন্নড় ভাষা বলার চল আছে।

    দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্যের কর্ণাটকঃ
    দ্রাবিড় শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঘন কালো চামড়ার মানুষ যাদের দক্ষিণ ভারতে দেখা যায় [a member of an ancient dark-skinned people of southern India.]  । এদিকে ১৯১৬ সাল থেকেই তামিল বা দ্রাবিড়ীয়রা তাদের দলীয় প্রতীক ছিল এক দাড়িপাল্লার ছবি যা হিন্দুধর্মীয়  জাত-বিভাজন ও বৈষম্যের বিপরীতে সাম্যের প্রতীক। আর এদের সাথে ছিল একটা ফ্লাগ – যা ছিল একটা পুরাটাই কালো ফ্লাগ; আর এর কেন্দ্রে কেবল একটা লাল সার্কেল চিহ্ন থাকত। যেখানে এই কালো হল তাদের নিচা করে রাখা মর্যাদার ও নিপীড়নের প্রতীকি বিরুদ্ধতা যার বিরুদ্ধে উঠে দাড়ানোর  প্রতীক হল লালচক্র চিহ্ন।

    The party at its inception retained the flag of the South Indian Liberal Federation, which had a picture of a traditional type of balance signifying the idea of equality.[26] Its central theme was to remove the degraded status imposed on Dravidians. 

    ভারতে দ্রাবিড়ীয়ান বলতে এরা পুরানা হিশাবে চার রাজ্য ছড়িয়ে আছে – কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু আর কেরালা।
    কর্ণাটকঃ কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর (নতুন নাম ব্যাঙ্গালুরু)। আর এই ব্যাঙ্গালোর রাজধানী থেকে ১২০ কিমির ভিতরে পশ্চিম দিকে টিপু সুলতানের মহীসুর বা ইংরাজিতে মাইসোর [Mysore] অবস্থিত। আর মাইসোর শব্দটা আবার অনেকে দাবি করেন যে মহিষাসুর শব্দের নাকি অপভ্রংশ যেখানে এর অর্থ  ‘মহিষের মত তুচ্ছ প্রাণীর গর্ভে জন্মানো অসুর’।
    আর অন্ধ্রপ্রদেশ – এই নয়া রাজ্য গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবার পরে এবং এই অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী করা হয়েছিল বৃটিশ আমলের নিজামের হায়দ্রাবাদকে। এছাড়া মোগল আমল থেকেই বিকশিত লক্ষ্ণৌ এর পরের দ্বিতীয় বড় শহর ছিল হায়দ্রাবাদ – এই সেই হায়দ্রাবাদ। অর্থাৎ পুরানা হায়দ্রাবাদ রাজ-রাজ্যকে এর রাজধানী করে নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠিত হয়েছিল।
    তেলেঙ্গনা  – এটা বাড়তি; মানে হল আগের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের এক অংশ এখন তেলেঙ্গনা হয়েছে। ভেঙ্গে গেলেও  বাকি অন্ধ্রপ্রদেশ এখন আগের নামেই তবে আলাদা রাজ্য।
    তামিলনাড়ু – এই নামেই বুঝা যাচ্ছে এটা দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী তামিল এথনিক জাতি-রাজ্য, আগের নাম মাদ্রাজ।
    আর সর্বদক্ষিণে হল কেরালা রাজ্য। এভাবেই পুরানা হিশাবে ভারতের দক্ষিণী চার রাজ্য (নতুন হিশাবে পাঁচ রাজ্য) মিলিয়ে দাক্ষিণার্ত। সমুদ্র সংযোগের দিক থেকে ভারতের নিচের দিকের বা দক্ষিণী অংশ এটা। যার আবার পশ্চিম দিকে আরব সাগর কিন্তু দক্ষিণ দিকটা তখনও বঙ্গোপসাগর বা এর সর্ব-পশ্চিম প্রান্ত – এভাবে বিভক্ত। আর দক্ষিণের আরব সাগরের সংযোগ দিয়েই আরব দেশ থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে ধর্মপ্রচারকেরা আরবদেশ থেকে ১০০০-১১০০ সালের দিকে প্রধানত এই কেরালা দিয়েই প্রবেশ করেছিল। এভাবে প্রথম ব্যাপক মুসলমান সংযোগ ও ভারতে ইসলামের প্রসার শুরু হয়েছিল।  এমনকি খ্রীশ্চানিটিও বিশেষত পর্তুগীজেরাও এই দাক্ষিণার্ত দিয়েই ভারতে এসেছিল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে।

    মোদির হিন্দুত্ববাদের এযুগে এসেও আর্যদের অসমাপ্ত কাজ করার খায়েসঃ 
    এখন,  একালে মোদির হিন্দুত্ব হিন্দিভাষাভাষি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব-আধিপত্য ছড়িয়ে বসেছে। তাই এক অর্থে হিন্দুত্ববাদ যেন আর্যদেরই নয়া অনুসারি এবং ব্রাক্ষ্মণ-ইজম এর ধারা হয়েই থাকতে চায়। যদিও আবার সাধারণভাবে সব হিন্দুভোট তাকে পেতে ও নিতেই হবে। তাই আর্য-ভাব ও ব্রাক্ষ্মণ-ভাব সে প্রকাশ্যে আনে না; অন্তরে চর্চা করে।  আবার জায়গামত জাত-পাত ভেদের বা উচ্চ-বংশের ঠাকুর এর সুবিধাও পেলে উঠিয়ে নিবে। তাই মোদির হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হল তার মানে – এটা পুরানা আর্য-শ্রেষ্ঠত্ব ধারণারই যেন আর এর একালের রূপ  হল আরএসএস-বিজেপি;  পুরানা আর্য কারবারিদেরই যেন একালের এক নয়া উত্থান!  তাই উত্তর ভারতের দিক থেকে দেখলে কর্ণাটক হচ্ছে দাক্ষিণার্তে প্রবেশের এক প্রবেশদ্বার যেন!
    তবে মোদির বিজেপি-আরএসএস এদের খায়েসস হল আর্যদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা। মানে হল দাক্ষিণার্তকেও হিন্দি বলয়ের অধীনে ও প্রভাব প্রতিপত্যিতে নিয়ে আসা। এজন্য গত ২০১৮ সালের সরকার গঠন করার পর থেকে  বিজেপি-আরএসএস এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করতে থাকে যে তারা দাক্ষিণার্ত প্রায় দখল কর্বে ফেলেছে! যদিও বাস্তবে ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়!

    মোদির বিজেপি-আরএসএসের এমন যত স্বপ্ন বা খায়েসই থাক এনিয়ে দুটা বড় ঘটনার কথা বলব।
    এক হলঃ সরাসরি এন্টি-ব্রাহ্মণ আন্দোলন যা প্রথমে সংগঠিতভাবে শুরু হয়েছিল  ১৯১৬ সালে তামিলনাড়ুতে। পরে ১৯৩৭, ১৯৪০ সহ অনেক বারই।  সেবার জাস্টিস পার্টি নামে দল গঠন করে তা শুরু হয়েছিল। পরবর্তিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতে আবার সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল তামিলনাড়ুতে পেরিয়ার রামস্বামী [ E. V. Ramasamy (Periyar)] নামে নেতার হাতে। সেসময় দ্রাবিড়ীয় সমাজে বিয়ে করতে গেলে যেন ব্রাহ্মণ-কে ডাকতে বা নির্ভরশীল হতে না হয় তাই এই আন্দোলন। তারা স্বাধীন ভারতের তামিল রাজ্য সরকারের হাত দিয়ে সংসদে এক সিভিল ম্যারেজের আইন পাশ করিয়ে নেন। যেহেতু রাজ্য সরকারের আইন ফলে ব্রাহ্মণ ডেকে এনে বিয়ে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা এতে নাই হয়ে যায়।  পরবর্তিকালে রামস্বামীর এই আন্দোলনই ১৬৬৪-৬৫ সালের দিকে [এর আগে ১৯৬৩ সালে নেহরু  Official Languages Act in 1963 চালু করেছিলেন – এর বিরুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ও বাধা হিশাবে উঠে এসেছিল। হিন্দি চাপানোর প্রতিবাদে সারা দাক্ষিণার্তে জুড়ে তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। তামিলনাড়ুতে কিছু মানুষ গায়ে আগুন ধরিয়েও প্রতিবাদ করেছিল। এই আইনে সারা ভারতের সব রাজ্যের স্কুলে হিন্দি ভাষা শিখা বাধ্যতামূলক করা হয়। যা দ্রাবিড়ীয় অঞ্চলে কোথাও গ্রহণযোগ্য হয়  নাই।

    আবার ওদিকে, অনেকে মনে করেন এরপরেই নেহরু মারা যান ১৯৬৪ সালে হার্ট এটাকে। তাই অনেকের ধারণা সেসময়ের দুটা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের শক নেহরু শারীরিক-মানসিক ভাবে অসহ্য হয়ে যায় বলে অনেকে মনে করেন।  সে দুই রাজনৈতিক ঘটনার এক হল, নেহেরুর হিন্দি-ভাষার ভারত-সাম্রাজ্য বা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে ভারত গড়ার খায়েস মার খেয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ এবং আসাম দখলসহ (সাথে লাদাখের অনেক অংশ-ভুখন্ড ও জম্মুকাশ্মীরের বর্তমান আকসাই চীন) এর ঘটনা; যেটা  ২১ নভেম্বর ১৯৬২ তে চীন একমাস একদিন পরে স্বেচ্ছায় সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে গেছিল।
    আর নেহেরুর হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার জোড়জবরদস্তির প্রতিক্রিয়ায়, এতে দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্য আরও বেশি করে এন্টি-হিন্দি রাজ্য হয়ে উঠেছিল এবং এখনও সেই সেন্টিমেন্ট বর্তমান যা সবচেয়ে বেশি তামিলনাড়ুতে। সেখানকার ডিএমকে পার্টি এরপর থেকে তামিলনাড়ুতে প্রধান দল হয়ে উঠে আছে। পরবর্তিতে অবশ্য কেবল ডিএমকে দলটাকে ছেড়ে বেরিয়ে আরেকটা আন্না-ডিএমকে দল হয়েছে। যারা দুই দল অদলবদল করে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসে – অন্য কোন দল নাই। ওদিকে নেহেরুর মৃত্যুর পরের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী কম্প্রোমাইজ হিশাবে হিন্দি-কে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারটা কনষ্টিটিউশনে উহ্য করে রাখেন। যেটা পরবর্তিকালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এক অবজারভেশন-রায়ে ঘোষণা করে যে ভারতে রাষ্ট্র-ভাষা বলতে কিছু নাই, ভাষার বাধ্যবাধকতাও নাই। তবে অফিসিয়াল ভাষা বলে অনেক কিছু আছে যা সব মিলিয়ে এখন ইংরাজি ও হিন্দিসহ মোট ২২টার মত।

    গত ১৯১৮ সালের মানে আগের বারের কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল ঘাটতিতে থাকা নয়্টা আসন কিনে নিয়ে। আর তা জুগিয়েছিল কর্ণাটকের আরেক ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী সামাজিক-ধর্মীয় গোষ্ঠি যাদেরকে লিঙ্গায়েত [Lingayat or  Lingayatism] নামে ডাকা হয়।   যারা লিঙ্গায়েত নিয়ে আর একটু পড়াশুনা করতে চান তারা এখানে লেখাটা পড়তে পারেন।  এরা বলাই বাহুল্য হিন্দুত্ববাদের বিরোধী।  এছাড়া  ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব লিঙ্গায়েত রাজ্য-সংসদ সদস্য বিজেপিতে বা কংগ্রেসেই সবাই এমন ছিল না। অর্থাৎ দুদলের মধ্যেই লিঙ্গায়েত সদস্য ছিল। লিঙ্গায়েত-রা কর্ণাটক ভোটারদের মধ্যে ১৭% জনগোষ্ঠি। তা হলেও তারা দুই দলের মধ্ইযে নির্বাচিত সদস্য হয়ে ছিল। কিন্তু মোদি সেবার লিঙ্গায়েতদের জজবা তুলে তাদের সব রাজ্য-সংসদ সদস্যকে দলছুট করে নিজ দলে ভিড়ান। এভাবেই তার নয় আসনের খামতি তিনি পূরণ করে সেবার সরকার গঠনে সফল হয়েছিল।  কিন্তু এবার নির্বাচনের আগে লিঙ্গায়েত হবু রাজ্য-সংসদ সদস্যদের কংগ্রেসে যোগ দিবার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু পরে ফলাফল প্রকাশের পরে একটা রিপোর্ট এমন ফলাফলের ব্যাখ্যা করে বলেছে যে এতে কংগ্রেসের পক্ষ্যে সব লিঙ্গায়েত সদস্যের আসন যায় নাই সত্য। তবুও তা এমন হয় নাই যে কংগ্রেস এতে তেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ শেষ বিচারে ভোট ব্যালেন্স হয়ে গেছে।

    ওদিকে ভোটারদের আরেক বড় চাঙ্ক হল মুসলিম ভোট। কর্ণাটকে মুসলমান ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটারের ১২% এর মত।  আর এতে মোদির সেই পুরানা কৌশল -ইসলামোফোবিয়া আর ঘৃণা ছড়ানী চালু করেছিল। আপনাদের অনেকেরই গত ২০২২ ফেব্রুয়ারিতে মুসকান নামের এক কলেজ তরুণীর সাহসী প্রতিবাদের ভিডিওদেখেছেন; এখানে টুইটারে দেখেন, মনে আছে নিশ্চয়। হা সেটাই ছিল মোদির নোংরা পুরানা কৌশল যে তরুণদের মাঝে হিজাব তর্ক তুললে তাতে ইসলাম-ঘৃণা জোরদার হবে আর হিন্দু-ভোটারদের মুসলমান-বিদ্বেষী করতে পারলে তাতে বেশির ভাগ হিন্দুভোট বিজেপির পক্ষে আসবে – এই ছিল মোদির অনুমান। কিন্তু ভাগ্যের ফের মুসলমান-বিদ্বেষী জজবা তেমন করে কর্ণাটকে উঠে নাই।  মোদি মুসলমান ঘৃণা এতই তুঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন যে তার ২২৪ আসলে প্রার্থীদের মধ্যে একটা আসনেও মুসলমান প্রার্থীকেই রাখেন নাই।  তাই ফলাফল দেখে এখন মনে করা হচ্ছে মুসলমানেরা হিজাব মামলায় আদালতে তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হলেও নির্বাচনের আগে তারা সংগঠিত হয়ে কংগ্রেসের পক্ষে একযোগে ভোট দিতে পেরেছেন।

    এব্যাপারে এটা মনে করা অমুলক হবে না যে  এক্ষেত্রে আমেরিকার সমর্থন মানে মোদিবিরোধী  “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নৈতিক সমর্থন দিয়ে যতটা সম্ভব সহায়তা দেয়া – এটা যথেষ্ট কাজ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিরোধীদলের সবাইকে আস্থা দিয়েছে যে তারা চাইলে মোদির বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে পারে, মোদিকে হারাতেও পারে।  আসলে বিরোধী জোটের পক্ষে অ্যামেরিকান সংসর্গ সম্পর্কে আগেই বলেছি এটা সাবধানী ও পরোক্ষ পদক্ষেপ হলেও গ্লোবাল মহলে মোদি সরকারের আভ্যন্তরীণ পরিচালনায় কতটা সে স্বৈরাচারী আর মূলত মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা প্রচারক – মোদির এই পরিচয়কে বাইরের দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা এক বড় সহায়ক।
    যদিও ভারতের রাজনীতি এপর্যন্ত ভিতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কখনই বিরোধীদলকে বাইরে নিতে দেয়া হয় নাই। এটা সম্ভব হয়ে এসেছে কারণ বেশির ভাগ দ্বন্দ্ব পাকিস্তান বা কাশ্মীর-কেন্দ্রিক। অথবা কখনও পাঞ্জাব বা আসামের মত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমস্যাকে দেশের স্বার্থ বলে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করা হয়ে এসেছে।  এছাড়া জন্ম থেকেই ভারত এত উগ্র জাতিবাদ (যা মূলত হিন্দু-জাতিবাদ) দিয়ে শাসিত- পরিচালিত হয়ে এসেছে যে এটা মূলত শেষবিচারে এক “এন্টি-পাকিস্তানি জাতি” ধারণা; তাই এটা সহজেই এক উগ্র-হিন্দুজাতিবাদ ধারণা হতে পেরেছে। [অনেকে অবশ্য  পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর উল্টাটাও বলবেন।]
    ভারতে কখনই  রাজনৈতিক অধিকারের ইস্যুকে অথবা জনগণের নাগরিক অধিকারের অথবা বাক ও ব্যক্তির অধিকারের ইস্যুকে  যেকোন রাষ্ট্রের গঠনে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখতে দেয়া হয় নাই। এবং সবচেয়ে বড়কথা রাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে সেই রাজনীতিক চিন্তার অভ্যাস বা চর্চাই হতে দেয়া হয় নাই। প্রতিটা উগ্র-জাতিবাদী জাতিরাষ্ট্রে এমনটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক; আর বিপরীতে শাসকের প্রথম পছন্দও [নেহেরু সহ সকল ভারতীয় শাসক] তাই একটাই –উগ্র জাতিরাষ্ট্র– যেখানে জাতিবাদ, দেশপ্রেম, দেশ মাতৃকা ইত্যাদি এসব শব্দের আবেগ-সুরসুরি তৈরি করে জনগণকে দাবায় রাখাটাই শাসকদের কমন কৌশল হয়ে থাকে।
    তৃতীয় বিশ্বের দেশে এমন হওয়ার পিছনে আরেক দায়ী ফ্যাক্টর হচ্ছে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট। আসলে এদের রাষ্ট্র- সম্পর্কিত অস্পষ্ট ও অপুষ্ট ধারণাই  [শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণাই] এজন্য দায়ী।  যেটা অন্যভাষায় মনে করিয়ে দিলে কমিউনিস্ট চিন্তায় অধিকারের ধারণা নাই শুধু না এটা হারাম – এমন হওয়াটাই সেই দায়ী ফ্যাক্টর। নয়া চলতি শতকের শুরু থেকে আবার সেটা জঙ্গীবাদ দমনের নামে বিরোধী রাজনীতিকের নির্মুলকরণ কর্মসুচি হয়ে দাড়িয়েছে।  যদিও আমেরিকা আজ মোদির চাপে দাবিয়ে রাখা ভারতের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে বের করে  মুক্ত  করে আনার পক্ষে কাজ করছে কিন্তু এই  জঙ্গীবাদ দমনের নামে জনগণের অধিকার ও বিরোধী রাজনীতিকে কোনঠাসা করে রাখার পক্ষে শাসকের এই নয়া চর্চার জন্য খোদ আমেরিকার ওয়ার অন টেরর নীতিও কম দায়ী নয়!  আবার, মোদির ক্যাশিয়ার আদানির শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি ও তাতে ধস নামানোর পিছনে এতে পরিবেশ তৈরি করে দিতে অ্যামেরিকার কিছু সহায়ক ভুমিকা থাকায় এর সুবিধা ভারতের বিরোধী দলেরা পেয়েছে। যেমন আদানির পতনের পরে গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটের উতসাহীদের সাথে নিয়ে আরেক শেঠ শেয়ার ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস, তিনি এক আসরে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে আদানিকে সমালোচনা করে শুইয়ে দেয়া – এটা শেষবিচারে ভারতের বিরোধিদের পক্ষে গিয়েছে।  যদিও ভারতের বিরোধী রাজনীতিকদের  আজকে আমেরিকার এই সমর্থন নেওয়ার কিছু নেগেটিভ এফেক্টও আছে যা কার্যকর হতে পারে। তবুও বর্তমানে সতর্কভাবে অ্যামেরিকান এই সমর্থন নেয়াটা খুবই সঠিক ও হালাল কাজ-ই হবে।

     Temple run: Hard lessons for Rahul Gandhi’s ‘soft Hindutva’

    এর পিছনের মূল কারণ হল ভারতের এক বাস্তবতা। সেটা হল আমেরিকা আজ আছে বলেই “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দল” বলে কোন কিছুই ভারতে সম্ভব হচ্ছে যা এতদিন সম্ভব ছিল না। কংগ্রেস বা রাহুল গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক চিন্তায় বড় খামতি এজন্য দায়ী।
    যেমন ২০১৮ সালে থেকেই মোদী বিরোধী রাজনীতি বিশেষত মোদির হিন্দুত্ববাদ বিরোধীরা কিভাবে মোকাবিলা করবেন – এনিয়ে রাহুল ও কংগ্রেস চরম অযোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল মোদির তখন প্রায় পাঁচবছরের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি ছেয়ে ফেলাতে পেরেছিলেন। আর এতে কংগ্রেস ধরেই নিয়েছিল  যে এরপর থেকে ভারতে বোধহয় আর কংগ্রেস নিজের রাজনীতিও হিন্দুত্ববাদকে আপন ও অনুসরণ করে গড়ে নেয়া দিক এসে গেছে। তাই ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের আগে্র বছর গত কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচনে রাহুল নিজে এক মন্দিরে পুজা দিয়ে কংগ্রেসের সফট হিন্দুত্ববাদ চালু করেছিলেন উপরের ছবি ও লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন কংগ্রেসও হিন্দুত্ববাদের নামে ভোট না চাইলে ভারতের হিন্দুরা তাদেরকে আর ভোট দিবে না! এই মিথ্যা অনুমানের পিছনে ছূটতে যাওয়া কংগ্রেস এটাই ইঙ্গিত করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এটা তো হিন্দু জাতিরাষ্ট্র এর ভারত কায়েমেরই প্রথম রাজনৈতিক দল হয়েই গড়ে উঠেছিল।

    অথচ এর বেকুবিপনার পাল্টা উদাহরণ কিন্তু তখনও রাহুলের সামনে ছিল।
    কলকাতার রাজনীতিতে তৃণমূল সেই ২০১১ সাল থেকে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসছে। আর সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় হল যে তৃণমূলের মমতা কখনই কোন ব্রান্ডের কোন হিন্দুত্ব এর নামে হিন্দুদের কাছে ভোট চাইতে হয় নাই, তবু যথেষ্ট হিন্দুভোট তার দল পেয়েছে।   কোন হিন্দুত্ব বয়ান ছাড়াই তিনি লাগাতর তিন তিনবার হিন্দুদের ভোট পেয়ে রাজ্যে সরকার গড়ে চলেছেন। কোন সমস্যা হয় নাই! কেন? তার মানে একবারও এদিকে রাহুল বা কংগ্রেস একবারও চোখ মেলে তাকায়নি! এটাই কংগ্রেস দলের ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাবার পিছনের অন্যতম মূল কারণ, যেন এটা কংগ্রেসের নিজেই নিজেকে যেন বলা যে এই দলের আয়ূ শেষ!!! আজকে রাহুল “ভারত জোড়ো” [ মুসলমান ঘৃনাবিদ্বেষে জনগণ বিভক্ত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে জনগণের একত্র হওয়া বা জোড়া লাগানো পক্ষে এক প্রচারণা] নামে পদযাত্রা কর্মসুচিতে এসেছে।  এটা তখনই কংগ্রেস শুরু করেছে যখন পিছনে অ্যামেরিকান ফ্যাক্টর উপস্থিত হয়ে কংগ্রেস রাজনীতিকে নয়া সাহস ও দিশা দিয়েছে!  অর্থাৎ মোদি যুগের ভারতে সবাইকেই একমাত্র হিন্দুত্ববাদের নামেই ভোট চাইতে হবে – এই মিথ্যা অনুমান থেকে রাহুল ও কংগ্রেস এখন বের হয়ে এসেছে। যেটা না করে স্ফট হিন্দুত্বের পক্ষে দাড়ানোটা শুধু আত্মঘাতিই তা না; কংগ্রেস দল যে মূলত জন্ম থেকেই হিন্দু-ইজমের [গান্ধীর Hinduism -তাও বলা চলে] দল হিশাবে গড়ে তোলা হয়েছিল এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ!

    সবশেষে একটা কথাঃ যদিও কর্ণাটকের নির্বাচনে মোদিবিরোধীরা বিরাট জয় পেয়েছে এরপরেও খুবই শক্তভাবে পাঠক সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এই নির্বাচনের দুটা কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান যারা আইনীভাবে দায়ীত্বপ্রাপ্ত ছিল এই নির্বাচনকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার – এমন দুই প্রতিষ্ঠান হল সুপ্রীম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন।  যাতে এমনকী সরকার বা সরকারি দলের বিরুদ্ধেও নির্বাচনি আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেন। কিন্তু আগের নির্বাচনেওর মতই এখানে এওদুই প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধি দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অপব্যবহার ও হয়রানি করে যাচ্ছে। এমন প্রতিষ্ঠান গুলো যেমন সিবিআই [CBI – Central Investigation boreau), ইডি ED [Enforcement Directorate, For Economic Law], আয়কর অধিদপ্তর ইত্যাদি এগুলো প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিরোধীদের হয়্রানি করা হচ্ছে যাতে চাপে ফেলে বিরোধীদলের নেতাদেরকে সরকারের সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করা যায়। মোদির চাপের কাছে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান নত হয়েছে, মোদির খাম খেয়ালির অধীনস্ত হয়েছে।
    এরকম দশটা ফ্যাক্টর মোদি বিরোধিদলের বিরুদ্ধে এখনও খাড়া করে রেখেছে। The WIRE পত্রিকা এমন দশটা ফ্যাক্টরের কথা উল্লেখ করে রিপোর্ছেট করেছে যার শিরোনাম Ten Factors to Remember Amidst the Congress’s Win and BJP’s Defeat in Karnataka। পাঠকের উচিত হবে এই দশ বাধার কথাও যেন তারা জেনে রাখে।

    কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচন ভারতের সকল বিরোধিকেই সাহস যোগাক যে তাদের একত্রে উঠে দাঁড়াতেই হবে। যদিও সামনে অনেক পথ আর তাতে অনেক যদি-কিন্তু আছে! আপাতত তাদের জন্য শুভ কামনার বেশি আগানোটা আমার জন্য প্রয়োজনীয় নয়!  তাই শুভ কামনা জানিয়ে শেষ করছি!

    +++++++
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • বিগ-বি তে আমেরিকাকে দেখা যাচ্ছে না, ফলাফল? 

    এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ঢুকে পড়ার পথ দুইটা
    কিন্তু জাপান-ভারত-বাংলাদেশের কথিত বিগ-বি তে আমেরিকাকে দেখা যাচ্ছে না, ফলাফল?

    ০৯ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4qz

     

                                          The Big-B Initiative: Alive or Dead? 

     

    এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ঢুকে পড়ার এপর্যন্ত দুইটা পথ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এশিয়ায় আমেরিকাকে প্রবেশের বিশেষ পথ খুঁজতে শুরু করতে হল কেন ও তা কবে থেকে?
    যদিও গত শতক পর্যন্ত এশিয়া তো গতানুপতিকতা ভাবেই অ্যামেরিকান নেতৃত্বে বয়ে গেছিল।  চীনা উত্থান ঘটনার উল্লেখ করার মত কিছু ঘটে নাই, কোন চিহ্নও ছিল না। কেবল, ডাবল ডিজিটে চীনা জিডিপি বাড়ছিল যেটা বিগত ১৯৯০ সাল থেকে সেটা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন লক্ষণ ছিল না। এমনকি ২০০৮ সালের যে গ্লোবাল মহামন্দা [বাড়তি পড়তে আগ্রহিরা দেখতে পারেন The Great Recession and Its Aftermath] ; এটাকে আমেরিকা সরকারি ভার্সানের এক বয়ান মনে করা যেতে পারে। তারাও জেনেছিল যে এই মহামন্দার কেন্দ্রভুমি মূলত পশ্চিমা জগতেই; মানে এশিয়ায় এর প্রভাব তেমন দৃশ্যমান নয়। একমাত্র চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সেটা ১৯৯০ সাল থেকে এক নাগাড়ে ১৭-১৮ বছর চলার পরে সেই প্রথম ৮-৯% এভাবে ক্রমশ সিঙ্গেল ডিজিটের দিকে নামতে শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ গ্লোবাল ইকনমি (যেটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম) বলতে যেটা আমরা বুঝি সেটাও মাত্রার দিক থেকে তখনও তত গ্লোবাল হয়ে উঠে নাই – পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার আর এশিয়ার বাজারগুলো ততটা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে নাই – গভীর বাণিজ্য লেনদেনের সম্পর্কই এই পারস্পরিক নির্ভরশীল এক গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে উঠে, তা তখনও ছিল না।  কিন্তু এখন সেটা অনেক ইন্টিগ্রেটেড বা পরস্পর সম্পর্কিত। বিশেষ করে সারা এশিয়া দেশগুলোর বাজারে চীনা উপস্থিতি ও চীনের যায়গা করে নিয়েছে অনেকখানিই।
    প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ত্রিদেশীয় সফর ছিল মূলত ইমেজ তৈরির সফর, দেশের অর্থনৈতিক সংকট বিশেষত বৈদেশিক রিজার্ভের দৃষ্টিকটু ঘাটতি যা সাধারণ মানুষ পর্যায়ে তাদের জীবনেও অনুভুত হয়ে গেছে ভালভাবেই। অথচ আসন্ন নির্বাচন যেমনই হোক বা না হোক – সরকারের ইমেজের প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তাই তিনি রাজনৈতিক নুন্যতম অধিকার দিতে পারেন আর নাই পারেন সরকার “উন্নয়নের চ্যাম্পিয়ান” এই ইমেজ তৈরিই মূলত এসফরের লক্ষ্য ছিল।  সরকারের প্রায় ১৫ বছরের আয়ুতে কেবল ২০১৬ সালের পরেই (চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর সফর) সরকার উন্নয়ন করছে বলে মনোযোগ টানা শুরু করতে পেরেছিল। এর একদম খাড়া কারণটা হল অবকাঠামো ঋণ [ যেটা ইংরাজিতে – Infrastructure Development Loan বা  ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলবমেন্ট লোন-  এথেকেই বাংলায় উন্নয়ন শব্দটা এসেছে] এর দাতা ছিল একচেটিয়া বিশ্বব্যাংক। এটা বলাই বাহুল্য বিশ্বব্যাংকের লোন নিয়ে কোন দেশ “উন্নয়নের চ্যাম্পিয়ান” দাবি করে নাই, করা যায় না। এর মূল কারণ, আমাদের মত দেশ যাদের সকলেরই এমন বিশাল ঋণ চাহিদায় ভুগছে যেটার খুবই অল্প অংশই কেবল বিশ্বব্যাংক (এর নিজস্ব ফান্ড ক্যাপাসিটি) পূরণ করতে সক্ষম।  তাই ২০১৬ সালের আগে আমরা ছিলাম উন্নয়নের ঋণ পাবার দিক থেকে সাপ্রেসড বা চাপিয়ে রাখা দেশ। আর আরেক সবচেয়ে বড় অ্যামেরিকান বোকামির খেসারত দিয়েছে আমেরিকা। তারা ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করেছিল। এই অভিযোগ কতটা সঠিক বা বেঠিক আমরা জানতেই পারি নাই। তবে আমেরিকা যে অবিবেচক আনপ্রফেশনাল এটা একেবারেই প্রমাণিত। তারা দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করেছে  ভাল কথা কিন্তু বছর দুই ঘুরতেই নিজেরাই সে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তাহলে প্রধান প্রশ্ন অভিযোগ দায়ের কেন করেছিল? যথেষ্ট চিন্তাভাবনা না করেই? যারা এত কম চিন্তা করে কাজ করে তারা কী প্রফেশনাল??  এরপরে আরও বড় প্রশ্ন আছে।  চীন যে এই শতকে বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে অবকাঠামো ঋণ দানের সুযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠে আসছে – সেটা কী সারা অ্যামেরিকান প্রশাসন বা বিশ্বব্যাংকের পরিচালকেরা কেউ খেয়াল করে নাই?? বাংলাদেশের সাথে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক ঝুলে গেলে এটাই যে চীনের বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার সুযোগ হিশাবে হাতে এসে যাবে – এটা যে আমেরিকা বুঝেই নাই সেই আমেরিকা তো ডুবে মরবেই…। নাকি!!!
    তাই এটা একটা ক্লাসিক উদাহরণ যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনা উত্থানের সক্ষমতায় সে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবেই এবং ছাড়িয়ে গেছিল এর হাতে নাতে প্রমাণ। তাই এভাবে বলা যায় পুরানা নেতা আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতায় চীন সক্ষমতায় এগিয়ে যাওয়া চীন আমেরিকাকে পরাজিত করে নিজ প্রভাব বাড়িয়ে নিয়েছিল; আর আগিয়ে যাওয়ার সেটাই ছিল শুরু। বিপরীতে আমেরিকা পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছে।

    আমেরিকা এশিয়ায় কতটুকু আগিয়েছেঃ
    বহু পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর একালে এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ইন্টারভেনশন বা হস্তক্ষেপ বা পদক্ষেপ নিয়ে ঢুকে পড়তে এখন শেষ পর্যন্ত দুটা পথ বা পাটাতন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও মনে রাখতে হবে এটা চীন-আমেরিকার মধ্যে এশিয়ায় কোন অবকাঠামো ঋণ দান করে নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়। চীন সেটাতেই নিজেকে আকড়ে ধরে থেকেছে  বটে কিন্এতু আমেরিকা  বহু আগেই এটাকে সামরিক ও স্ট্রাটেজিক দিক দিয়ে আগানোই তার পথ চুনেছে। যার সোজা মানে সে চীনের কাছে অবকাঠামো ঋণদানের প্রতিযোগিতার পথ ছেড়ে দিয়েছে – হার স্বীকার করে কেটে পড়েছে। তবে আমেরিকার অনুসৃত  সেই পথই এখন ফাইনালি ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি এই মুখ্য নামে আপাত থিতু হয়েছে। যদিও এটা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে ওবামা্র এশিয়া পিভোট নামে। সেটা অনেক আগেই ব্যর্থ হলে পরে ট্রাম্পের আমলে পুরানা কোয়াড নামে আবার তা চালু করা হয়েছিল।  পরে তা অ্যামেরিকান বন্ধুদের মধ্যে কে কার কাছে সাবমেরিন বেচবে এসব তর্কাতর্কিতে পরে আর ওদিকে মাঝখান থেকে ভারতের কার্যত কোয়াড থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। মূল কারণ ভারত কোন সামরিক জোটে যেতে চায় না; কেবল চীনবিরোধী পলিটিক্যাল জোটে থাকাতেই তার স্বার্থ বলে মনে করে।  আরও পরে বাইডেন এসে সব ঝিমিয়ে পড়া দশাকে আবার চাঙ্গা করতে চায় তবে এবার এরই নাম হল ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি। যার খাস অর্থ হল কে কে চীনকে একঘরে করতে চাও (ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জাতিসংঘের ফোরামেও), বলো।  এটাই লেটেস্ট হয়ে খাড়িয়ে আছে। এই গেল বাইডেনের একটা প্রথম পথ   বা এশিয়ায় পা রাখার পাটাতন বা সম্পভাব্থয উপায়।

    তাহলে অপর পথ বা পাটাতনটা  কী?
    শিরোনা্মে আমরা সেটাকে বলতে পারি আমেরিকার বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ। যার সবচেয়ে বড় সাফাই-অজুহাত হল এক মিলিয়ন এরও বেশি রাখাইন রোহিঙ্গা খেদিয়ে বাংলাদেশে তাদের মানবেতর জীবনে ফেলে দিয়েছে বার্মার জেনারেলেরা। কথা সত্য। নিঃসন্দেহে যা এক চরম মুসলমানবিদ্বেষী জাত-ঘৃণার প্রকাশ; এক হিটলারি এথনিক উদগ্র ঘৃণা ছড়ানির বেপরোয়া কাজ। আর এত নিচা পর্যায়ের কাজের নয়া-উস্কানি বার্মার জেনারেলেরা ভারত থেকে পেয়েছিল – সেকালে ২০০৭ সালের আগের একঘরে হয়ে থাকা বার্মাকে পশ্চিমের দুনিয়ার সাথে মুলাকাত – পশ্চিমের অবরোধ তুলে দেওয়া – একাজে পশ্চিমের এক এজেন্ট হিশাবে ভুমিকা রাখার সুযোগ নিয়ে ভারত এই পরামর্শ দিয়েছিল। ভারত আশ্বাস ও পরামর্শ দিয়েছিল জেনারেলদের যে এটাই ভাল সময়। ভারতের ক্যালকুলেশন সঠিক তবে তা বার্মার জন্য আত্মঘাতি ছিল। কারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়াতে এক নয়া বার্মা যেভাবে ২০০৮-১০ সাল থেকে উন্মেচিত হয়েছিল  ফলে বার্মার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য আর মাটির নিচের সম্পদ লুটে খাওয়ার এক নয়া বার্মা যেভাবে ২০০৮-১০ সাল থেকে উন্মেচিত হয়েছিল তা  চীন, ভারত আর আমেরিকাসহ পশ্চিমের কাছে তাতে কোনপক্ষই নিজের লোভ সামলাতে পারে নাই। তাই রোহিঙ্গা খেদানি কাজকে চীন, ভারত আর আমেরিকা সকলেই সমর্থন করেছিল। আর এর পক্ষে বার্মা বা আমেরিকাসহ সকলেরই  সাজানো বয়ান ছিল কথিত এক আরসা (ARSA) নাকি বার্মিজ সামরিক বাহিনীর উপরেই হামলা করেছিল আর তার পালটা হামলাতেই নাকি রোহিঙ্গাদের নির্মুল শুরু হয়েছিল। চীন, ভারত আর আমেরিকা এই সাফাই বয়ান সমর্থন করেছিল।
    এখন আমেরিকা গত কয়েক বছর হলো, সে অবস্থান বদলিয়েছে।  এখন সে রোহিঙ্গা খেদানোকেই প্রধান কারণ বানিয়ে এর প্রতিকার হিশাবে  বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ এর পরিকল্পনা করেছে।

    এমুহুর্তে আমেরিকার মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখছে কেনঃ
    এতক্ষণ পশ্চাত পটভুমি বর্ণনা করলাম। আর এতে আমরা দেখলাম আমেরিকার হাতে এখন দুটা খাতা  বা পথ খুলা আছে। তবে এদুইয়ের কোনটা নিয়ে আমেরিকা আগামিতে এশিয়ায় নিজ প্রভাব বিস্তারে আগাবে এহলো প্রশ্ন! যদিও এনিয়ে আমেরিকার মধ্যে কেউ কেউ দোনোমনো দেখছে কেন? যদিও এই পথের দ্বন্দ্ব বলতে এমন না যে বাইডেন দুই খাতার কোন একটাকে নিয়ে আগাবে!  বরং আগানোর পথ হিসাবে সে পথ দুটাকেই একসাথে ব্যবহার করতে পারে অবশ্যই। কিন্তু কোনটা ডমিনেটিং বা ফোকাসে আর কোনটা সেকান্ডারি হয়ে সহায়তার ভুমিকা নিবে – এনিয়ে বাইডেনের পরামর্শদাতাদের মধ্যে সাময়িক ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে এটাকে  দ্বিধাদ্বন্দ্ব বলে মনে করা ভুল হবে। আর এসব নিয়ে বাংলাদেশে যারা নিজেকে হাসিনাবিরোধি  মনে করে তাদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে একধরণের সাময়িক –  ঢাকার বাজার অন্তত কিছুটা হতাশা ও কৌতুহলে দেখছেন বলে দাবি করেছেন! জাপান সফর থেকে জাপান-বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে আর পরে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেলের কিছু বক্তব্যকে ভোয়া যেভাবে কায়দা করে হতাশব্যঞ্জকভাবে হাজির করেছে – তাতে এথেকে এসব তৈরি হতে পারে হয়ত।

    জাপানে দুই প্রধানমন্ত্রীর এক যৌথ ঘোষণার মূলকথা কীঃ
    যৌথ ঘোষণার মূলকথা কী – তা নিয়ে আমার বুঝ কী সেটাই সবার আগে বলে দিয়েই শুরু করা যাক। জাপান, (হাসিনার) বাংলাদেশ আর (মোদির) ভারত – এই তিনদেশ মিলে যদি একটা পথচলার জোট খাড়া করতে পারত তাহলে হয়ত সেই আলোকে এই যৌথ ঘোষণা কে একটা পারফেক্ট যৌথ ঘোষণা বলে মানা যেত। কিন্তু অসুবিধা হল যে এমন তিন নেতার তিনদেশীয় আকাঙ্খার সবচেয়ে বড় খামতিটা হল এদের এওই পরিকল্পনার আমেরিকাকে কোথাও দেখা যায় নাই। এশিয়ায় এমন যেকোন জোটের-কৌশল পরিকল্পনায় যদি আমেরিকা অনুপস্থিত থাকে তবে বুঝতে হবে এমন পর৮ইকল্পনার কোন ভবিষ্যতই নাই। তাতে যদি আমেরিকাকেও ভিতরে না রাখা যায় তবে অন্তত এনিমি হিশাবে বিপরীতে দেখাতেই হবে।  তবু আমেরিকাকে অনুপস্থিত বা উহ্য রেখে যেকোন পরিকল্পনা মাত্রই তা এক অলীক আকাশ-কুসুম বলেই আমাদের মানতে হবে। হতে বাধ্য।

    তাহলে জাপান ও বাংলাদেশের সাথে বিগ-ব [BIG-B] বলে প্ল্যান যেটা মোদি সাজাচ্ছে দেখেন এখানে [JAPAN AND THE BIG-B PLAN FOR BANGLADESH: AN ASSESSMENT] , এখানে বিগ-বি নিয়ে জাপানের জাইকার উদ্যোগ [The Initiative of BIG-B, JICA], অথবা এখানে চীন এবং  আমেরিকাকেও বাদ দিয়ে ভারতের এক “নয়া ওয়ার্ল্ড অর্ডার” এর স্বপ্ন-কল্পনা [“THE NEW WORLD ORDER” ]; অথবা এমনকি মোদির হিন্দুত্বের স্বরাজ্য ম্যাগাজিন যেভাবে এতে মোদির বিজয়  দেখছে –A Quiet Diplomatic Victory for India, Japan Against China in Bangladesh – এরকম যত কথা এখন উঠেছে এর সবই যেন নিশ্চিত বৃথা যাবার জন্যই অপেক্ষা করছে। বলা হচ্ছে BIG-B উদ্যোগটা নাকি ২০১৪ সালে শুরু হয়েছিল। তাহলে এতদিনেও এর কোন অগ্রগতি নাই কেন? কারণ, আমেরিকারকে উদ্যোক্তারা কী কোথায় রাখবে এর ভিতরে না বাইরে তা ঠিক করতে পারে নাই তাই??? আর আমেরিকা এতে রাজি হবে কেন এসব প্রসঙ্গ-গুলো নিয়ে কথা আগাতে ভারত ও জাপান উভয়েরই দ্বিধা অস্বস্তি আছে তা তো বলাই বাহুল্য! মোদি এখন একালে একেবারেই চাইবে না এতে আমেরিকা কোনভাবেই যুক্ত হোক বা তার ছায়া কোথাও থাকুক। আবার বিপরীতে বাইডেন এর অবস্থাও তাই!

    এছাড়া এখন এটা কে না জানে যে, বাইডেনের বার্মা দখল প্রকল্পে সে সরাসরি মোদির ভারত এবং চীনেরও বিরোধী। আর এমনিতেই আগামি ২০২৪ সালের ভারতের  আগামি নির্বাচনে বাইডেনের বাজি হল সে মোদিকে উতখাত আর রাহুলকে ক্ষমতাসীন দেখতে চায়। তাই আইন বাঁচিয়ে যতটুকু যা করা যায় এর সবটুকুই করতে শুরু করেছেন বাইডেন। তাহলে মোদির ভারত আর বাংলাদেশ-কে সাথে নিয়ে জাপানের ত্রিদেশীয় খায়েশ এর তো কোন ভবিষ্যতই নাই!!!!  আসলে এককথায়, যেখানে আমেরিকা নাই অথচ জাপান-মোদির ভারত আর হাসিনার বাংলাদেশ – এমন ত্রিদেশীয় কোন পরিকল্পনা আছে এখন তাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে জাপানি বিনিয়োগ হানতেন ইত্যাদি যাই দেখানো হোক না কেন এসবকিছুর ভবিষ্যত শুণ্য!!  এসব অবাস্তব ও অলীক সব কল্পনা হয়েই থাকবে – যেভাবে ২০১৪ সাল থেকে এই উদ্যোগটা কেবল টিকেই আছে!
    এছাড়া আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির এনিমি ও হেরে যাওয়া জাপানের কথা মনে রাখি তবে কিছু কথা আমরা হাতে গুনে মনে রাখতে পারি যে যুদ্ধের পর থেকে জাপানি পররাষ্ট্রনীতি অ্যামেরিকান পররাষ্ট্রনীতিরই অনুগত হয়ে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এই প্রতিশ্রুতির কারণ হল –  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পক্ষ নেয়া ও হেরে যাওয়া সত্বেও জাপানের পুণর্বাসনে ও পুনর্গঠনে সমস্ত বিনিয়োগ আমেরিকাই দিয়েছিল। কাজেই  Initiative of BIG-B   এটা যতই উচ্চে তুলে সম্ভাবনাময় হিশাবে দেখানো হোক না কেন  অ্যামেরিকান স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে বা বাইরে জাপান যেতে পারবে না; কিছুই করতে পারবে না।

    কেন Initiative of BIG-B এর ভবিষত নাই এর দ্বিতীয় আরেক কারণঃ
    এই উদ্যোগটা আসলে মূলত গভীরভাবে নিজেদের চীনবিরোধী মনে করে তাদের আগ্রহে তৈরি হওয়া উদ্যোগ। সে হিশাবে এটাক ভারত ও জাপানের উদ্যোগ; কিন্তু তাহলে এর ভিতর বাংলাদেশ কেন?  কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা এটা প্রথমে চীনা নেতৃত্ব আরেক উদ্যোগ আগে তৈরি হয়ে যাবার পরে এরই নকল এক উদ্যোগ মাত্র। চীনা সেই উদ্যোগের নাম RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership] । এটা আশিয়ান [ASEAN] জোটের গর্ভ থেকে প্রথম প্রস্তাবিত হয়েছিল ২০১১ সালে। মজার কথা হল চীনা নেতৃত্বের RCEP তৈরি হলেও  এখানে জাপানও সদস্য হয়ে আছে।  মূলত আশিয়ান দশটা দেশই ভারি এরা দশটা দেশ আর এদের সাথে  জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন – এভাবে এরা সবাই মিলে এটা একটা Free trade agreement (FTA) এর বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্ত। এটা গত বছর ২০২২ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে সক্রিয় ততপরতায় চলে গেছে; জার্কাতা এর হেড কোয়ার্টার। কিন্তু  এর চেয়েও বেশি ইম্পর্টেন্ট তথ্যটা হল এটা মূলত শেয়ার্ড ভ্যালু চেন [shared value Chain] – ভিত্তিতে এক উতপাদন ব্যবস্থায় সদস্যরা সকলে যুক্ত হবে – যেখানে যেকোন একটা পণ্য নির্মাণে সদস্য সকল দেশের শ্রম যুক্ত করে [শ্রম যোগ করা মানে ভ্যালু এড করা] নির্মিত হবে আর সদস্য সকলেই ঐ পণ্যের ক্রেতা ব্যবহারকারি-ভোক্তা হবে। এটাই দুনিয়ার লেটেস্ট অর্থনৈতিক জোটবদ্ধতার এক নয়া ধারা যা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে অবশ্যই ।  আর এর সদস্য হতে গেলে প্রধান শর্ত হল আপনার নিজ দেশে বিদেশি পণ্য আমদানিতে যে শুল্ক ব্যবস্থা বজায় আছে তাতে গড়ে শুল্ক হার  ৮-১০% এরও নিচে হতেই হবে। এটা আশিয়ান জোটের সদস্যপদ পাবার ক্ষেত্রেও শর্ত।

    কিন্তু তাতে কী?
    তাতেই এটা ভারতের পক্ষে এসব শর্তপূরণ একেবারেই অসম্ভব। কেন?

    আসলে কোন উগ্র জাতিবাদি বিশেষ করে যাদের জাতিবাদ এক অর্থনৈতিক জাতিবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত তেমন ধারায় বিরাজ করে ভারত। এমনিতেই ভারত জন্ম থেকেই এক উগ্র-জাতিবাদি অর্থনৈতিক দেশ। আর একালে মোদির উগ্রজাতি-বোধের হাতে পড়েছে এটা আরও মারাত্মক দিক। ঠিক এই অর্থনৈতিক উগ্র-জাতিবাদ অবশ্য ব্যবহারিক কমিউনিস্ট বা স্তালিনিস্টদের মধ্যেও  গেথে থাকা একই ধারণা।  এরা মনে করে দেশের মানুষ যা কিছুর ভোক্তা বা সেবা নিবে এমন সকল পণ্যই দেশে তৈরি হতে হবে। একারণের জাতিবাদি ও কমিউনিস্টেরা কার্যত বাণিজ্য-বিরোধী। এমনিতেই নেহেরুর হাতে গড়ে উঠা ভারত অন্যের পণ্য তো কিনবেই না – এমন কঠোর নীতিতে বিশ্বাসী; আর এর উপর আবার এক কলোনিদখল মানসিকতাও তারা ক্রেডিট হিশাবে দেখে থাকে। সেটা এমন যে পারলে ছলেবলে অন্য দেশের বাজার দখল করবে আর এজন্য চাপ দিয়ে বা বেকায়দায় ফেলে হলেও এটা তারা জায়েজ মনে করে। একারণেই নেহেরুর সেই নীতি একালে এখনও ধরে রেখে চলছে মোদি।
    আরেকটা তথ্য দেই তাহলে অনেক কিছু পরিস্কার হবে।
    RCEPএর জন্মের প্রস্তাব যখন তুঙ্গে তখন কথা উঠেছিল মোদির ভারত কেন তাতে যোগ দিবে না?  স্বভাবতই মোদি ও তার পররাষ্ট্র নেতা জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন এসব উদ্যোগ ভারতের জন্য নয়। আসলে ভারতকে ত অন্যের পণ্য ঠেকাতে ট্যাক্স বেশি ধরতে হবে বা ডাম্পিং করতে হবে। যেমন আমাদের পাটের উপর এখন এমন ট্যাক্স আরোপ করে, আমাদের রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছে। তাহলে আমরা ভারতের পণ্য আমদানি করব কেন? এই প্রশ্নের জবাব তারা দিবে না বুঝাতে চাইবে তারা বড় ভাই। এনিয়ে আমার পুরানা লেখা একটু পরে খোজ করে দিচ্ছি।
    এমন পুরানা লেখার শিরোনাম ও লিঙ্ক এখানেঃ
    ১।    আরসিইপিঃ দুনিয়ায় নতুন সম্পর্ক আনার সম্ভাবনা

    ২। যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    আর ঠিক একই প্রস্তাব বাংলাদেশকেও দেয়া হয়েছিল। কিছুদিন পরে বাংলাদেশ আশিয়ান সদস্য হবার জন্য আবেদনও করে রেখেছে।

    তাহলে এখন এটা সবার কাছেই পরিস্কার হয়ে যাবার কথা যে ভারত দুনিয়ার কোন দেশের সাথেই অর্থনৈতিক জোট গড়বার যোগ্য নয়। তাতে সেটা সার্ক বা যেকোন অর্থনীতিই হোক না কেন!
    অতএব, এত ঘটা করে তাহলে RCEP  এর বিকল্প হিশাবে  Initiative of BIG-B  নিয়ে এত গল্প আর এই জাপান-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণার কী আর কোন অর্থ আছে? এক নিজ নিজ দেশের পাবলিককে বোকা বানানোর প্রপাগান্ডা ছাড়া…।।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
     

     

     

  • আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!

    আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!
    গৌতম দাস

    ০৫ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4pZ

     

     

     

    সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে! আজ ৫ এর ২০১৩ এর দশম বার্ষিকী!
    অনেকে যেটাকে শাহবাগ বনাম শাপলা, অথবা শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলার সমাবেশ বলে।
    জমিদার হিন্দুর জমিদারি বন্দোবস্ত ব্যবস্থা ১৯৫১ সালে উচ্ছেদ হয়ে গেলে একারণে, জমিদার হিন্দুর রাজনৈতিক ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেলেও এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক [Cultural] প্রভাব থেকেই যায়।
    সেই কালচারাল প্রভাব – যা মূলত ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান ঘৃণা চর্চার এক ভরপুর আধার – প্রগতিশীলতার নামে গড়ে উঠা শাহবাগের ততপরতার বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধের দিন!

    বৃটিশ আমলে জমিদারি হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর জমিদারি আইনের পরে মোটামুটি ১৮০০ সাল থেকে ক্রমাগত রাজত্ব করতে উঠে চলেছিল। এর বিরুদ্ধেই প্রথম সবল ধাক্কা ও আমাদের বিজয় হল ১৯৪৭ সালের আগষ্টে্র ভারতভাগ নামে যা পরিচিত যার অপর নাম পাকিস্তান কায়েমে সফল হওয়া।  পাকিস্তান কায়েমের অনেক অর্থ তাতপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নেতি ব্যাখ্যাও আছে দেখা যায়। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থ তাতপর্য হল, পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল – মানে কোন আপোষ হয় নাই বলেই দেশ ভাগ হয়ে গেছিল। আর তা হয়েছিল বলেই এরপরে সহজেই জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ সম্ভব হয়েছিল।
    এই ধারাবাহিকতায় ১৬ মে ১৯৫১ সালে আইনগতভাবে জমিদারি আইন উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছিল। আইনি ভাষায় যা “পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০” নামে পরিচিত দেখুন বাংলাপিডিয়াতে । আইনটা ইংরাজিতে দেখতে এখানে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act 1950 ক্লিক করেন।  পাকিস্তান কায়েমের ফলে এভাবে সবচেয়ে বড় অর্জন হল পুর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে বসে এই জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস করতে সক্ষম হওয়া। তাতে কমিউনিস্টেরা যতই জোরগলায় মিথ্যা-ব্যাখ্যায় বলুক না কেন যে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম করেই নাকি পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল।
    অথচ তারা স্বীকার করতে চায় না যে এই একই পাপ করার রাস্তা তো কংগ্রেসই আমাদের দেখিয়েছিল; যেটা কমিউনিস্টেরা চেপে যায়।  কংগ্রেস কী আমাদেরও আগে একই কাজ করে নাই?  আর আমাদেরও একই পথে যেতে বাধ্য করে নাই? তাঁরাই কী ১৮৮৫ সালে ধর্মের ভিত্তিতেই এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ভারত কায়েম করতে – “কংগ্রেস” [যার ফর্মাল নাম “ইন্ডিয়ান জাতীয় কংগ্রেস”] নামে দলের জন্ম দেয় নাই!  আর আমাদেরকে সেই উপেক্ষা থেকেই কী ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয় নাই!!! তবে পাকিস্তান কায়েমে যতটুকু যা আমাদের ভুল [যেমন ধর্ম, ভাষা বা যেকোন ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভুল] ছিল তাতে কংগ্রেসের ভারত কায়েমেও ততধিক ভূল। আর সেক্ষেত্রে মোদির হিন্দুত্ববাদের বিজেপির ভারত? তাকে কী বলবেন? এক্ষেত্রে প্রগতিবাদীরা বাকশুণ্য, কেন?  এটাকেই তো নিরেট ইসলামবিদ্বেষ আর দগদগে মুসলমান ঘৃণা বলছি!  জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল গতবছর অক্টোবরে আন্তোনিও গুতেরেজ ভারতে  এসে কঠোর ভাষায় প্রকাশ্যে ভারতের মুসলমান-ঘৃণা চর্চার বিরুদ্ধে সমালোচনা আর সাবধান করে গেলেন। প্রতিক্রিয়ায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিল নিজেই এক মামলা ডেকে নিয়ে। অথচ এখন বিকার নাই।  কিন্তু এখন কোথায় সেই প্রতিশ্রুতি? দ্যা কেরালা স্টোরি নামে বিদ্বেষমূলক ও মনগড়া কাহিনীতে গড়া সিনেমা রিলিজের বিরুদ্ধে বাধা দিতে সুপ্রিম কোর্ট ও কেরালা হাইকোর্ট নিঃশ্চুপ। তারা এখন সিনেমা বানানোর খরচ  যেন ঠিক মত উঠে আসে তোলা হয় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।  কোর্ট আসলে বলছে সিনেমার বাজার ঠিক করবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে কিনা। ‘Market will decide’ — SC, Madras HC refuse to stay release of ‘The Kerala Story’ অথবা বলতে চাইছে,  নির্বাচনের আগে মুসলমানবিরোধী হিংসা বিদ্বেষ এর ঝড় তুললে কোনই অসুবিধা নাই!

    নিজেকে কমিউনিস্ট বলে দাবি করতে এদের ভাল লাগে মানে, যেটা লতিফ সিদ্দিকীর ভাষায় “কমিউনিস্ট মাড়ানি” তা এদের হতে খুব ভাল লাগে; অথচ জমিদার শ্রেণীকে উচ্ছেদের বিরোধীতা করা এরা কোন কমিউনিস্ট???  বাংলাদেশে এরাই বা এটাই প্রগতিশীলতা!!! এনিয়ে আমার আগের দুপর্বে লেখা আগ্রহিরা পড়তে পারেন।

     নুন্যতম অর্থনীতি জ্ঞান থাকলে এরা বুঝত জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ ছাড়া কোন দেশের অর্থনীতি গড়া, ভিত্তি স্থাপন সম্ভব নয়।  এবং সেটা অবশ্যই ক্যাপিটালিজমের প্রথম পদক্ষেপ। তাতে এই ক্যাপিটালিজম বলতে যেকোন ধরণের ক্যাপিটালিজমই হোক না কেন! তাতে কমিউনিস্টদের পছন্দের রাষ্ট্রীয় ক্যাপিটালিজম [State Capitalism; যেটাকে তারা সমাজতন্ত্র নামে ডাকে] সেটা হোক অথবা মালিকানা ভিত্তিক স্বাভাবিক ক্যাপিটালিজম – যেটাই বুঝেন না কেন – বটম লাইন হল, যে পথেই যান  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ আপনাকে করতেই হবে এটাই হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশে নিজ অর্থনীতি সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ। সমাজের সবাইকে কাজের সংস্থান দিবার মত একটা অর্থনীতি চাইলে আপনাকে  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ থেকে শুরু করতে হবে। অথচ জমিদার হিন্দুর স্বার্থ হল ঠিক এরই বিরুদ্ধে; তারা এর ঘোরতর বিরোধী। আর এই জমিদার হিন্দুর কায়েমিস্বার্থ ও আধিপত্যের সমাজ ও চিন্তাকেই প্রগতিশীলতা বলে এক কমিউনিস্ট রাজনীতি বাংলায় যাত্রা শুরু করেছিল। কেন জমিদারি উচ্ছেদ বাংলাদেশের  অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি গড়ার জন্য জরুরি ছিল তা জানতে প্রিয়া সাহা ইস্যুতে আমার পুরানা দুপর্বে লেখা এখানে  দেখতে পারেন। এতে বুঝা যাবে কেন কোন কৃষি সংস্কার মানে জমিদার মালিকানা  এই মালিকানার ধরণ উচ্ছেদ না করলে কোন শিল্পায়ন গড়ে উঠবে না। সকলকে কাজ দিবার মত অর্থনীতি হবে না।

    অথচ কমিউনিস্টেরা নাকি মুখ্যত শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন। তাহলে জমিদার হিন্দুর জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার কাজ কিভাবে কমিউনিস্টদের প্রগতিশীলতা হয়??? এই জমিদার হিন্দু একই সাথে তাল দিয়ে প্রজা-হিন্দুদেরও কালচারালি তাদের স্বার্থপক্ষ হতে বুঝিয়ে নিজ জমিদারি স্বার্থের পক্ষে সামিল করেছিল। এর ফলাফলে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রাও জমিদার হিন্দুর  (যা কার্যত জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার) পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। জমিদারি মালিকানা নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধাচারণকে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রা হিন্দু-বিরোধিতা জ্ঞান করত।  এটা ছিল আসলে,  প্রজা-মুসলমানদের উপর প্রজা-হিন্দুদেরকে কালচারাল শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া ও এই জাত-শ্রেষ্ঠত্বের ভাবনা মাথায় ঢুকানোতে প্রজা-হিন্দুরাও কালচারালি  জমিদার হিন্দুর  জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার পক্ষে লাঠিয়াল হয়ে যায়। আগ্রহীরা আরো পড়ে দেখতে পারেন আমারই ২০১৬ সালে লেখা – হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ। 

    এরই পরিণতি হল, দেশভাগের পরে মূলত ১৯৫০ সালের পরে দেশত্যাগের কালে  প্রজা-হিন্দুরা পুর্ব-পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) থেকে যেতে পারে নাই। সামাজিক এনিমিটি আগেই তৈরি হয়ে গেছিল। কারণ বহু আগেই তারা প্রজা-মুসলমানেদের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন [alien] মানে এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতা রচনা করে ফেলেছিল।   জমিদার হিন্দুর স্বার্থ আর সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দুর স্বার্থ যেনবা এক এই হুদাই ভাবনায় এমন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো লাঠিয়াল-গিরিতে তারা দেখিয়ে ফেলেছিল তারা যেন জমিদার স্বার্থেরই লোক – এমন মনোভাব আগ থেকেই বলে ও ভেবে ফেলার জন্য বাংলাদেশে তারা থেকে যেতে পারে নাই।

    সবচেয়ে বড় কথা জমিদারি উচ্ছেদ আইনে তো  কেবল প্রজা-মুসলমানদেরকেই  নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমির মালিক করে দেওয়া হয় নাই। বা ঐ আইনে কেবল মুসলমানেরাই সুবিধা পাবে, হিন্দুরা নয় একথা বলে তো লেখা নাই। সকল প্রজাই এই সুবিধা পেয়েছে বা পাবার যোগ্য ছিল। কাজেই হিন্দু-প্রজারাও একই সুযোগে  ‘নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে’ জমির মালিক হয়েছে। তবু কালচারালি তারা জমিদার হিন্দুর সাথে সংযুক্ত বা এটাচড [Cultural attachment] – এই বোধের কারণে এটা ক্রমশ তাদের জন্য দেশত্যাগই একমাত্র সত্য ও পরিণতিতে নিয়ে গেছে। এরই কাফফারা বা খেসারত হিশাবে বাংলাদেশের হিন্দুরা এখন ভিকটিম-হুড বা সংখ্যালঘু ইত্যাদি যা পায় সে বয়ান আকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করে চলছে আজও।

    তবে এখানে আমাদের সকলেরই কিছু গুরুত্বপুর্ণ করণীয় আছে। পুরানা প্রজা-হিন্দু ভুল করেছে বলে আমরা এখন তাদের প্রতি কোন বিদ্বেষ বা বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারিনা। তাতে তাঁরা একালে হিন্দুত্ববাদে উতসাহিত হোক কিংবা মোদির কোলে উঠে তাঁকেই ত্রাতা মনে করুক না কেন; আমাদের কাজ কর্তব্য আমাদের করে রাখতে হবে। তা হল, ধর্ম-নির্বিশেষে বা এমনকি শাঁওতাল বা পাহাড়ি ট্রাইব বা উপজাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকই একই এবং সমান অধিকারের নাগরিক এই ভিত্তিতে ব্যবহারিক রাষ্ট্র তাড় আইন প্রয়োগ ও চর্চায় তা বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রতিফলিত করতে হবে। এমন একটা ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে যেতে হবে। এ’দায় আমাদের সকলের; তাতে পুরানা বিবাদে আমাদের অবস্থান ভিন্নতা যাই থাক। তবেই একটা নয়া বাংলাদেশের স্থিতিশীল সমাজ আমরা পাব।  পুরানা কোন বিবাদ-বৈষম্য জিইয়ে রাখলে এটাই আগামিতে নানা দিকে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে অস্থিতিশীলতার বড় কারণ হবে।  এটাই সম-সুযোগের [Equal Opportunity], সকলকে নিয়ে [inclusive] এক বাংলাদেশ গড়ার শেষ সুযোগ – যা আমরা যেকোন মূল্যেই হারাতে পারি না।

    তাহলে আজ ৫ মে এর তাতপর্য কী?
    এদিন থেকেই আমাদের বুঝতে আর বাকি থাকে নাই প্রগতিশীলতা ও তাদের কথিত সেকুলারিজম আর কমিউনিজম কী জিনিষ। শাহবাগ আমাদের চিনিয়েছে প্রগতিশীলতা আর কমিনিজম এর নামের আড়ালে এটা ইসলামবিদ্বেষ আর মূসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর পরিকল্পিত কাজ। যা আমরা হয়ত আগে তত খেয়াল করি নাই। এটাই জমিদার হিন্দুর অসমাপ্ত আধিপত্যকে কালচারাল মোড়কের আড়ালে আবার প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ। এটাই একালে ভারতের রাজনৈতিক ও কালচারাল আধিপত্য যেটাকে বাংলাদেশের উপর আবার জেঁকে বসানোর আমেরিকার সহায়তার নয়া উদ্যোগ। তাই ৫মে এর প্রতিরোধ ছিল এর সম্মিলিত বিরোধিতার দিন, একে সমূলে উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টা – এই আত্ম-সচেতনতার দিন!
    জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থকে বিশেষত এর রাজনৈতিক দিকটাকে আমরা উতখাত করতে পেরেছিলাম পাকিস্তান আমলে, বিশেষ করে ১৯৫১ সালে। কিন্তু প্রগতিশীলতার নামে কমিউনিজমের নামের আড়ালে এর সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ও আধিপত্য আমাদের সমাজের উচ্চ-অংশ ও শিক্ষিত অংশের মধ্যে কালচারালি টিকেই ছিল, এখনও আছে। আর এভাবেই জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থ সব বিনষ্ট হয়ে গেলেও এটা কালচারালি-সাংস্কৃতিকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছে।

    আর এর বিরুদ্ধে প্রথম সফল ও সদর্প প্রতিবাদ ছিল শাপলা সমাবেশ। শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলা সফল কালচারাল প্রতিবাদ। এখান থেকেই আমরা প্রথম টের পাই এখনও আমাদের অসম্পুর্ণ কাজ কী এবং আমাদের অর্জন কী কী ছিল।
    এখন এর মূলনীতিটাকে এভাবে হয়ত বলা যায়, বাঙালি মুসলমান স্বাধীন। ১৯৭১ সালেও সে বাংলাদেশি হিন্দুর সাথে মিলে নয়া রিপাবলিক গড়েছে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে। কিন্তু কোনভাবেই এর অর্থ এমন নয় যে এখন বাঙালি মুসলমানকে (এবং সেই অর্থে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিকেও)  কলকাতার বাঙালিকে অনুসরণ করে বাঙালি হতে হবে বা বাঙালিত্ব শিখতে হবে; ইসলামবিদ্বেষ বা মুসলমান-ঘৃণা করতে শিখতে হবে।

    বাঙালি মুসলমান কেউ চাইলে মর্ডান জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে চাইলে হতেই পারে। কিন্তু কলকাতা এখানে বাঙালির মুসলমানের (বা সেই অর্থে বাঙালি হিন্দুরও) মডেল (কথিত সেকুলার বা ইসলামবিদ্বেষী) হতে পারবে না। এখানে সচেতনতা লাগবে।  এই নয়া সচেতনতা নিয়ে সামনে আগালে নয়া রাষ্ট্র-রিপাবলিকে ইসলামি-ওরিয়েন্টেড মানুষ [যাদেরকে সাধারণভাবে অনেকে ইসলামিস্ট বলে থাকে ]  এরাও মর্ডান বাঙালি মুসলমানকেও জায়গা করে দিবে।   বলাই বাহুল্য শর্ত একটাই যে সে কলকাতা-অনুসারি বাংলাদেশি মুসলমান বা ঘৃণা-বিদ্বেষী বাঙালিয়ানার চর্চা করবে না। এককথায়, কলকাতায় গড়ে উঠা বাঙালি কালচারাল চোখ ও অভ্যাসকে আমাদের সীমানার বাইরে রেখে আসতে হবে। তাতে কলকাতার প্রতি আমাদের কোন বিদ্বেষ নাই, তারা তাদের কালচার নিয়ে ভাল থাকুক, যা হতে চায় হোক। মোদির হিন্দুত্ববাদকে নিয়ে যা করতে চায় করবে। আমাদের বলার নাই। কেবল মনে রাখতে হবে তারা আমাদের অনুসরণীয় বাতিঘর নয়! তাদের “বিদ্যাসাগরেরা” কেবল তাদেরই থাকুক!

    ৫মে এর আত্মত্যাগ যেন ভুলে না যাই!  এর তাতপর্য আমাদের মধ্যে জিন্দা থাকুক! আরও বিকশিত, উদ্ভাসিত হোক!

    last Edit – 06:35am 06 May 2023


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে

    গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৬ এপ্রিল ২০২৩    ০০ঃ০৫

    https://wp.me/p1sCvy-4nv

     

    US-China Split Could Hinder Foreign Investment, Lower Global GDP, IMF Warns - BloombergUS-China Split 

     

    গ্লোবাল নেতা মানে গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতা হিশাবে, দুনিয়ায় আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ১৯৪৫ সাল থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এর পরিণতি বা ফলাফলে। যদিও অনেকের ধারণা এই অবস্থান যেন অফুরান বা অনন্তকাল ধরে চলবে। কিন্তু যার শুরু কিভাবে, কবে ও কী পরিস্থিতিতে আর যদি তা তা জানা-বুঝা যায় সেক্ষেত্রে তার শেষও আমাদের জানা থাকবে ও যাবে। এর মানে তাহলে বুঝতে হবে যে  সেটা আসলে আর অনন্তকালের কোন ঘটনা-ফেনোমেনা নয়। এছাড়া অনেকের আরও একটা ভুল ধারণা করেন যে গ্লোবাল নেতা ধারণাটা যেন সামরিক শক্তির, মানে সামরিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের। ফলে যেন কোন দেশ  পরাশক্তির [Superpower] দিক দিয়ে কতবড়  এর দ্বারাই বোধহয় নির্ধারিত হয়েছে কে গ্লোবাল নেতা বা কে নেতা নয়। না, সরি; এই ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বরং এককথায় বললে, কোন দেশকে গ্লোবাল নেতা বলতে যে সক্ষমতা বা যোগ্যতা কথা বলা হয় এটা মৌলিকভাবে  মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দুনিয়াতে একেকটা দেশ একেক সময়কালে নানান কারণে নিজ অর্থনীতিতে বাড়তি সঞ্চয়ে তা উদ্বৃতের (সারপ্লাস) পাহাড় হয়ে হাজির হতে দেখা যায়। এটাই ঐ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিকসহ সব ধরণের সক্ষমতার আদি উৎস। অর্থাৎ মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই ঐদেশের বাকিসব সক্ষমতার উৎস হয়ে হাজির হয়।  আর উত্থিত অর্থনীতির দেশ তা থেকেই অন্যদেশ বা বাকি দুনিয়ার উপর (ইতি বা নেতি আধিপত্য) এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে হাজির হয়। তাই অর্থনৈতিক বিপুল উত্থান থেকে  তা সবদিকে বিকশিত হয়ে উঠলে তা থেকেই ক্রমশ একটা দেশ গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে উঠে।  তাই বটম লাইনটা হল, গ্লোবাল নেতা মানে আসলে প্রাথমিকভাবে অথবা ওর প্রাথমিক রূপ হল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠা। একারণে চীনের অর্থনীতি কবে আমেরিকার ছাড়িয়ে আরো বড় অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে সেদিকে দুনিয়ার অভিমুখ বুঝতে চাওয়া লোকেদের, এমন সব এনালিস্টেরা আগ্রহের ফোকাস।

    তবে সাবধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠার ফেনোমেনাটা সাবজেকটিভ বা কোন কর্তা-মানুষের সিদ্ধান্তমূলক নয়। বরং তুলনা করে বললে,  যেমন সাবজেকটিভের বিপরীত শব্দ হল অবজেকটিভ। সেদিক থেকে  বলা যায়  ‘বিপ্লব’ [Revolution] ধারণাটাই  সাবজেকটিভ বা কর্তাবাচক। সক্রিয় মানুষ চাইলে বা করার চেষ্টা করলে তবেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে পারে; নইলে নয়। বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে কোন ‘বিপ্লব’ ঘটে না অথবা বলা যায় যা প্রাকৃতিক বা নেচারাল তা বিপ্লবী ঘটনা নয়। প্রাকৃতিকভাবেও অবশ্যই দুনিয়াতে হাজারো পরিবর্তন ঘটে থাকে এখনও ঘটে চলেছে তবে সেগুলো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক ঘটনাবলী নয়, মনে করা হয় না। তাই প্রাকৃতিক মানে অবজেকটিভ।  আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ইংরাজিতে তাই বলে ইভোলিউশন [Evolution]। মানে সেটা রি-ইভোলিউশন [Re-evolution বা Revolution (বিপ্লব)] জাতীয় কিছু  নয়। এই পরিবর্তনগুলোকে তাই ‘অবজেকটিভ’ ঘটনা বলা হয়। এখানে কোন কর্তা থাকেনা, এটা প্রাকৃতিক।
    অর্থাৎ আমাদের এখানকার আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই, কোনদেশের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা তাই ঠিক কোন সাবজেকটিভ ঘটনা নয়; যে তা  ঐ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাপ্রসুত এমন। বরং অবজেকটিভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত; মানে মানুষের ইচ্ছায় যেমন কোন জলোচ্ছাস বা ভুমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আসে না, তেমনই।

    আবার অনেককে আরেক মিথ্যা অনুমান পুষে নিয়ে থাকতে দেখা যায় যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই যেনবা সে দেশ গ্লোবাল নেতা হবেই; এমন মনে করে থাকে। এমন ধারণা ভুল। তাদেরকে বরং মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনসংখ্যা কখনও চীন বা ভারতের মত ১৪০ কোটির আশেপাশেও ছিল না, এখনও নয়। আমেরিকা এখনও কেবল আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার, যা প্রায় ৩৩ কোটি মাত্র।  আর এই জনসংখ্যা দিয়েই  আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল এবং এখনও আছে বা শেষ যুগ পাড় করছে বলা যায়। তবে গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ হতে গেলে জনসংখ্যার অধিক্য একটা পজিটিভ ফ্যাক্টর বা উপাদান অবশ্যই। তবু, সাবধান বড় জনসংখ্যা মানেই তা গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ; তা এমনটা নাও হতে পারে। নির্ভর করে নিজ ঐ বড় জনসংখ্যাকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ম্যানেজ করে কাজে লাগিয়ে বড় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তারা কতটা সক্ষম আর কপালও ভাল কিনা – এর উপর। যেমন, ভারত ও চীনের জনসংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি, এখন ভারত বরং একটু বেশি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলারের যেখানে চী্না অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়নের আর আমেরিকা এখনও ২৩ ট্রিলিয়নের, মানে চীনের চেয়ে বড়। তবে এখনকার  আরেক অনুমান হল আগামি ২০৩০ সালের দিকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে,  এনিয়ে হাতের কাছের ভোয়ার [VOA] এক রিপোর্ট  দেখে নেয়া যেতে পারে।
    এসব সত্বেও ভারত ব্যাপারটাকে নিজ উগ্র জাতিশ্রেষ্ঠত্বের [হিন্দুত্ববাদের] ধারণা দিয়ে দেখে থাকে। মনে করে সে চীনের চেয়ে কম কিসে, সেও চীনের সাথে এব্যাপারে সমতুলনীয়; এমন ধারণার প্রাবল্য অবশ্য ২০১৩-১৪ সালের ফেনোমেনা। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ শানিয়ে মোদি যখন ২০১৪ সালের পর থেকে নিজ-প্রচার শুরু করেছিল যে ভারত নাকি একটা ‘পরাশক্তি’ হয়ে গেছে!  এই ব্যাপারে অন্তত একটা ফ্যাক্টস বা ঘটনা মনে রাখলেই এর কারণ অনেকটাই বুঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

    বিদেশি পুঁজি নিয়ে কমিউনিস্ট ও জাতিবাদি চিন্তায় বেশি-বুঝের মিথঃ
    এককথায়, বিদেশি পুঁজি নেয়া না-নেয়া প্রসঙ্গে ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা আসলে একেবারেই উগ্র জাতিবাদিদের অনুসারী।  যেমন বিদেশি পুঁজি নেওয়া বা দেশে আসতে দেয়া দেশের জন্য কী হারাম না হালাল? এনিয়ে উগ্র-জাতিবাদি একরোখা ধারণাটাই কমিউনিস্টদেরও ধারণা। এরা উভয়েই মনে করে বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজি দেশে আসতে দেয়া হারাম, তাই তা দেশে আনাই যাবে না।  আর এপ্রসঙ্গে বাস্তবতার আমল-মুল্যায়নহীন জাতিবাদিদের একচেটিয়া হারাম ধারণাটাই আরও পোক্ত করেছে কমিউনিস্টেরা; তাদের ‘শোষণ’ ধারণা দিয়ে।

    যদিও এটা তো বলাই বাহুল্য আইডিয়ালি বললে যে বিদেশি পুঁজি এনে শিল্প-ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বরং নিজ দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতায় এগুলো করা তো নিঃসন্দেহে ভাল; এনিয়ে কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু বাস্তবতা তো এখানে না অন্যখানে! মানে তর্কটা এখানে না।
    তাই আরেকটু আগিয়ে এর পক্ষে বলি। দুনিয়ার যেকোন দেশের অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমে, যদি বাইরের হস্তক্ষেপ করতে না দেয়া যায় তবে, ঐদেশের অর্থনীতি বিকশিত হতে যত যা বিনিয়োগ লাগে তার সবটাই ঐ দেশীয় অর্থনীতি নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে, এবং তা সম্ভব; ইতিহাসে এটা প্রমাণিত সত্য। যেমন সারা ইউরোপে একেবারে শুরুর দিকে  মানে ১৬০০ সালের পর থেকে যখন তাদের কলোনি দখল ব্যবসা শুরু হয়েছিল এর আগের কালে, তাদেরকে কোন বাইরে থেকে পুঁজি বা সম্পদ লুটে  আনতে হয় নাই। নিজ অর্থনীতিতেই নিজ সঞ্চয় উদ্বৃত্ব ব্যবহার করেই নিজে বিকশিত হতে পেরেছিল; সম্ভব করেছিল। আমাদের মত দেশের যেমন বিনিয়োগ আনার জন্য “পশ্চিম আছে”,  সে তুলনায় সেকালে পশ্চিমের জন্য ১৬০০ সালের আগে তাদের জন্য কোন “পশ্চিম” বা বিনিয়োগদাতা বলে কেউ ছিল না।
    ১৬০০ সালের আগে-পরে বলে কথা টানছি এজন্য যে ১৬০৭ সালে ইউরোপ প্রথম কলোনিদখলে বেরিয়েছিল।   আর যাদেরকে কলোনিদখল করতে বেরিয়েছিল প্রথমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশ এর কোনটাই নয়।  সেটা ছিল উত্তর আমেরিকা যা এখন ইউএসএ বা আমেরিকা নামে পরিচিত। গত ১৬০৭ সালে প্রথম কলোনিদখল করা ভুখন্ড বা দেশ হল আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia] সর্বপ্রথম কলোনিদখল হয়ে যায়।  যারা দখল করেছিল তাদেরকে বৃটিশ বা ইংলিশ সেটেলার বলা হয়েছে। এর রেফারেন্স দেখতে এখানে[Colonial America (1492-1763)] আমেরিকান সরকারি লাইব্রেরিতে যেতে পারেন। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকাকে কলোনিদখল করা হয়েছিল এরও পরে নানা সময়ে।

    কিন্তু সর্বশেষ আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় যারা ইউরোপের কলোনি হয়ে থেকেছিলাম পরের অন্তত টানা দুশ বছর তারা ১৯৪৫ সালের পরে স্বাধীন মুক্ত দেশ হয়ে গেলেও এরপরে আমাদের নিজ অর্থনীতির বেলায় একই ফর্মুলা কাজ করে নাই যে আমাদের অর্থনীতিও নিজ বিনিয়োগ পুঁজি বা অর্থনৈতিক উদ্বৃত দিয়ে নিজের অর্থনীতির বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারবই। তা হয় নাই আর এটা করবেও না। আমরা পুষ্টির অভাবে ভুগা শিশুর মত বিনিয়োগ পুঁজির অভাবে ভুগবোই। কারণ অন্তত টানা দুশ বছর ধরে লাগাতর ইউরোপের কলোনিদখলদারেরা আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে সেকালের আগে থেকে যাকিছু  সারপ্লাস জমা হয়েছে তা উঠিয়ে দখলদারেরা নিজ নিজ দেশে লুট করে নিয়ে গেছিল। এতে তৈরি হওয়া গভীর স্থায়ী ক্ষত বা বিনিয়োগ পুঁজির ঘাটতি সেটা ১৯৪৫ সালের পরে আমরা স্বাধীন মুক্ত দেশ হলেও তা আপনাতেই নিজ নিজ অর্থনীতিতে পূরণীয় করা যায়নি কারণে এত অধিক লুট আর পূরণীয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ছিল আমাদের জন্য সেই নয়া বাস্তবতা যে আমাদের বিনিয়োগ পুঁজি লুট হয়ে গেছে অথচ আমরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অন্তত কাগজে কলমে ।

    অতএব ঐ খারাপ সময়ে  বিদেশি পুঁজি নেওয়া হারাম এই ফতোয়া যা এখনও তাদের মুখে বর্তমান, এসব কথা ছিল একেবারেই চরম অবিবেচক ও আত্মঘাতি। কার্যত এটা ছিল একদিকে চিন্তার মারাত্মক এক অক্ষমতা অন্যদিকে তা বাস্তবতাবিমুখ ভরপুর এক  বিশুদ্ধবাদিতা। ‘খাঁটি’ থাকতে চাওয়ার স্টুপিডিটি! যেন সাময়িক বিদেশি পুঁজি গ্রহণ করলে আমরা অশুদ্ধ হয়ে যাব!! আমাদের এদিকে এমন এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ভারতের জওয়াহরলাল নেহেরুর চিন্তা ও তাঁর অর্থনীতি। তিনি মারা গেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু তার কমিউনিস্ট অরিয়েন্টেড ইকোনমির চিন্তা বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ প্রসঙ্গ এটা চালু থেকেই গেছিল ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত।   যেটা ১৯৯০ সালে এসে ঐ নেহেরু-ইজমের অর্থনীতি তা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল।  সেকালে চন্দ্রশেখরের কোয়ালিশন সরকার অর্থের অভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে যা মূলত  balance of payments বা বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম ও ব্যয় বেশিতে ঘাটতিতে পরা থেকে সৃষ্ট – এই কারণে তিনি বাজেট পেশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন।  আর  balance of payments এর নিয়মিত ঘাটতি হলে একটাই এর ওষুধ, আইএমএফ-এর কাছে ঘাটতি পুরণে ঋণে বৈদেশিক মুদ্রা পেতে হাত পাতা। আর এর পুর্বশর্ত হচ্ছে এতদিনের আয়েসি আন্দাজি বিশুদ্ধবাদিতা ছেড়ে এবার বাস্তবতায় ফিরে আসতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর সংস্কার করতে বাধ্য হওয়া।  ঠিক কী ঘটেছিল এনিয়ে আইএমএফ-এর একটা ভাষ্য এখানে অন্য আরও ভাষ্য এখানে পাওয়া যেতে পারে।  সে সময়ে সব ব্যর্থতায় দায়ভার চন্দ্রশেখরেরর উপর যদিও এসেছিল কিন্তু নেহেরুসহ সকল পুর্ব-সরকারগুলোই এজন্য দায়ী ছিল। চন্দ্রশেখর সে যাত্রায় পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের নভেম্বরে যা থেকে কংগ্রেসের নরসীমা রাও ক্ষমতায় আসেন। আর তাঁর নয়া অর্থমন্ত্রী হন  মনমোহন সিং, যিনি আইএমএফ-এর সাথে মিলে অর্থনৈতিক সংস্কারটা সম্পন্ন করেছিলেন।  তবে মনে রাখতে হবে এঘটনার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ার সাথে (যা ভেঙ্গে গেছিল ১৯৯১ ডিসেম্বরে ) ভারতের এই অর্থনৈতিক পতন ও সংস্কারে বাধ্য হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই।   কারণ ভারতে তা ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগেই ১৯৯০ সালেই।

    ভারত ছেড়ে এবার বিদেশি পুঁজিতে চীন প্রসঙ্গেঃ
    কম কথায় সেরে ফেলতে এভাবে বলি, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি বা আমেরিকান পুঁজি দেশে আসতে অনুমতি দান শুরু করেছিল। যদিও এর আগে ১৯৫৮ সাল থেকেই মাও সেতুং আর সোভিয়েত বা স্তালিনীয় পথ বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিদেশি পুঁজি গ্রহণ প্রসঙ্গে ভিন্ন পথ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন মাও। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে যদিও এটা চীনের “সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ১৯৫৮” বলে পরিচিত। এসব রাখডাক বা ভিন্ন শব্দে নাম দেয়া খুব সম্ভবত ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য। কারণ,  আদতে এটা ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  আজকের দিনেও যারা কমিউনিস্ট সমালোচক তারা মাওকে তাদের হিরো বলে আপন করে রেখে দিয়েও সব দায় ও এর ভিলেন হিশাবে দেখাতে চায় দেং জিয়াও পিং-কে। তা যাক সে তর্ক অন্যখানে, করেছিও। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, মাও-এর অর্থনৈতিক সংস্কার,  কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাত্রা ইত্যাদি এসব নিয়ে কমিউনিস্টেরাসহ যেকারও  স্তালিনীয় সমাজতন্ত্র বুঝের দিক থেকে যত সমালোচনাই থাক এক জায়গায় গিয়ে সেসবের সবকিছু বেকার হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, চীন এই সংস্কারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ অনুমতি দিয়ে একে আপন করে নিয়েছে; মানে  নিজ অর্থনীতিতে আমেরিকার ওয়াল স্টিটের জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিয়েছে। শুধু তাই না পরে শুরুর দিকে এসব বিনিয়োগ চীন সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা শিল্প-বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগে তারা এখন তাদের পার্টনার। আর এ সবকিছুই ঘটেছে উল্লেখযোগ্য কোন সংঘাত বা ফ্রিকশন ছাড়াই। সেটাও না মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে চীন আজকে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ – চীন নিজেই আজ গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবার পথে। এদিকটার তাতপর্য সেটাও কোন দিক দিয়েই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই গ্রহিতা  চীন নিজেই এখন দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা প্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের এখানে সারা বছরের ঋণদানের বাজেটের চেয়েও এক চীনের বাজেট অনেক বড়। সারকথায় চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব।

     সারকথায়, চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব। 

    চীন ১৯৭৮ সালেএর জানুয়ারি থেকে আমেরিকার সাথে  আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও এমবেশি খোলা দিয়ে শুরু করেছিল।  পরে আমেরিকান বিনিয়োগের আসা বা প্রবেশ শুরু হয়েছিল। আর চীনের বড় অর্থনৈতিক উল্লফন ঘটেছিল (ডাবল ডিজিট জিডিপি) (১৯৯০-২০১০) মোটামুটি এই বিশবছরের সময়কালে।  তুলনায় ভারত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদেশি পুঁজি আসতে দেয়া হালাল কিনা তখনও সেই সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নাই। তাই ১৯৯১ সালকে মানা হয় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার বছর, যখন ভারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে মিটাতে ব্যর্থ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতিতে) হয়ে আইএমএফের সাহায্য পেতে দ্বারস্ত হয়েছিল। ফলাফলে সেই প্রথম নেহেরু কথিত ও প্রচলিত কমিউনিস্ট ইকোনমি ১৯৯১ সালেই খোলনলচে বদলায় বাধ্য হয়ে মনমোহন সিং এর অর্থনৈতিক সংস্কারে ঢেলে সাজানো শুরু হয়েছিল – যা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি।

    তবে এসব নিয়ে কথা বলাও বিপদের। আপনার কোন পছন্দের রাজনীতি বা আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাবধান। বাস্তব ঘটনা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও পেতে গিয়ে একাজে নিজ রাজনীতি-আদর্শকে শ্রেষ্ঠ মানতে হবে বা দেখাতেই হবে এই জিদ সবার আগে ত্যাগ করেন।  কারণ আপনি তখন আসলে তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গেছেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা বুঝাবুঝি আপনার অস্তিত্বের মত জরুরি। আর এটাই প্রধান ও আপনার আসল কাজ। কাজেই আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ দিয়েই কেবল তা পারতেই হবে এই জিদ ও চিন্তা ভুল। যেখানে আপনার দরকার বাস্তবতাকে বুঝবার জন্য একটা চিন্তা বা পদ্ধতিতে তা করতে সক্ষম হওয়া। যে চিন্তা বা পদ্ধতি এটা করতে সক্ষম তাই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে, আপন করতে হবে। এরপরে বা বাইরে প্রেমিকার মত আপনার পছন্দ বা বিশেষ নেকের একটা রাজনীতি বা আদর্শ আছে থাক না। কাজ না পারলেও জোর করে  আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ এর পক্ষে  ঢোল পিটানো তো সহি হতে পারে না! এরপর এবং সেই সাথে এবার কেন আপনার রাজনীতি-আদর্শ ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপযুক্ত টুলস হতে পারে নাই সেটা খুজে বের করেন। সংশোধন করে নেন।
    অনেকবার বলেছি চলতি শতক শুরুই হচ্ছে গ্লোবাল নেতা বদলের পালাবদলের সময়কাল হিশাবে যেটা আমরা পছন্দ করি নাই। বরং ঘটনা-ফেনমেনাই আমাদেরকে এটা দেখতে বাধ্য করেছে। এখন এতে আমেরিকান প্রভাবের ক্রমপতন আর চীনের প্রবল উত্থান যদি বাস্তবতা হয় – অবজেকটিভ বাস্তবতা হয় তা হলে এনিয়ে আমার কথা বলা মানে তো এটা নয় যে আমি চীনের দালাল। অথবা আমি চীনকে পছন্দ করি তাই এটা করছি। অথবা চীন কমিউনিস্ট তাই চীন আমার পছন্দ এটা  ধরে নিতেই হবে!!! অথচ আমেরিকা কী করে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভুমিতে সেই ব্যাপক ইতিবাচক ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণ আমার চেয়ে বেশি এবং ভাল করে কেউ করে নাই। একাজের সময় আমাকে কেউ আমেরিকান দালাল বলে না কেন?
    বাস্তবতা হল, নিজ পছন্দের আদর্শ দিয়ে ঘটনা না মিললেও জোর করে তেমন ব্যাখ্যা দেওয়াটা বোকামি; কারণ জরবরদস্তি পাঠক পছন্দ করবে কেন! কাজেই নিজ পছন্দের আদর্শের ভিত্তিতে কথা বলার দিন শেষ।  আর শেষ কথা হল আমি কোন কমিউনিস্টই নই। এছাড়া চীন    কমিউনিস্ট কিনা সেটাও কমিউনিস্টদের মধ্যেই অর্ক সাপেক্ষ, যা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই। গ্লোবাল পরিবর্তনগুলোকে কতটা উপযুক্তভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছি সেটাই মুখ্য দিক!  সেদিকটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হচ্ছি কিনা সেটার পরীক্ষায় উতড়ানো বা সফলতাই একালের মাপকাঠি।

    এখানে আমাদের পাঠকের সমস্যা হল, তারাও সময়ে বিভ্রান্ত হয়ে সময়য়ে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা এমন কোল্ডওয়ার এর তর্কের ফাদে আটকে যান। অথচ সেই কোল্ডওয়ার এর যুগ এখন অতীত, সেসব ভাবনা এখন অকেজো। তবুও কেউ কমিউনিস্ট না আমেরিকা-বাদী এমন কথিত একটা ধারণার আগে চালু করে পরে  পাঠক কোন মানুষ ও তার ব্যাখ্যাকে আমল করা শুরু করে থাকে। এটা খুবই ভুল পদ্ধতি।  আশা করব পাটঘক কমিউনিস্ট লুপ-হোল এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হবে ও বাঁচিয়ে চলা শিখে যাবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

    [উপরের এই লেখা আসলে দুদিনের মধ্যেই পরবর্তি যে লেখা দিব তার আগাম অংশ। তাই বুঝাই যাচ্ছে পরের লেখাটা চলতি এই রচনার উপরে দাড়িয়েই লেখা হবে। পরের রচনাকে তাই এলেখারই দ্বিতীয় অংশও বলা যেতে পারে।]