Category: MODI

  • লীগ বা তার সরকার, আরএসএস-এর পাশে বসতে পারে না

    লীগ বা তার সরকার, আরএসএস-এর পাশে বসতে পারে না

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২২, ০৫:৩০ ভোর

    https://wp.me/p1sCvy-3XW

     

    Tenth round of the Indo-Bangladesh friendship dialogue

     

    ‘কানেক্টিভিটি’ [connectivity] শব্দটার অর্থ করা যায় সংযোগ বা সংযোগ-প্রাপ্যতা। ভারতের কারণে বাংলাদেশের কাছে এই শব্দটার অর্থই বদলে গেছে। এখন এর অর্থ হয়ে গেছে, বিনা পয়সায় বিনা ক্ষতিপোষণে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারত করিডোর নেবে। এমনকি রাস্তাঘাট এমনকি পোর্ট সুবিধা নিবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে। ভারতের দুই অংশকে আরামে কানেক্ট করে নিবে। বাংলাদেশের বাজার নষ্ট করবে। তাই এটা হয়ে গেছে  প্রায় জবরদস্তিতে এবং একপক্ষীয় (ওয়ানওয়ে) এককস্বার্থ আদায়ের এক শব্দ। ফলে এর সঙ্গে মিলে আবার কোথাও এটাকে  ‘বাংলাদেশ-ভারত ডায়ালগ’ জাতীয় কথার আড়ালে রেখে ততপরতা জারি রাখতেও দেখা গেছে। তাই “বাংলাদেশ-ভারত ডায়ালগ’ জাতীয় কথা কানে আসলেই মন সতর্ক হয়ে যায়!

    বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে তাই ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ডায়ালগ বা কানেক্টিভিটি ধরনের শব্দগুলো পাক্কা ছলচাতুরির শব্দই। বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়ে চাপ দিয়ে বিনা পয়সায় ভারতের একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায়ই এর লক্ষ্য।

    পররাষ্ট্রনীতি মানেই যেন যা কলোনি সম্পর্কের দাঁড়ানোঃ
    এমনিতে নেহেরু আমল মানে ভারতের জন্ম থেকেই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হল বৈদেশিক সম্পর্ক বলতে তা ‘কলোনি সম্পর্ক’, এই বুঝের উপর এটা কাজ করা। যেন পররাষ্ট্রনীতিতে দুই দেশের মধ্যে  রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক বা অন্য যে কোন সম্পর্ক মানেই তা কলোনি সম্পর্ক। বিশেষ করে ছোট দেশ হলেই তাকে ভারতের অধস্তন করে নিয়ে বা ধরে নিয়ে এই ভিত্তিতে সম্পর্ক করা। মানে এসবের বিপরীতে উভয়ের জন্য লাভজনক হয় এমন স্বার্থের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বলে যেন কিছু নাই, হতেই পারে না। অর্থাৎ কে কত চালাক ও অপরের  উপর প্রতারণায় দক্ষ, পররাষ্ট্রনীতি যেন এরই কারবার।

    আসলে কলোনি আমলে অধীনতা বা অধস্তন সম্পর্ক বলতে যা বুঝাত, তাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বুঝ। একই ধারণা অনুসারে, একালেও ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হতে পারে যেন একটাই- সেটা হল পুরনো স্টাইলের এক কলোনিদখল সম্পর্ক; আর যেখানে ভারত হবে কলোনি মাস্টার। আর যাকে দখল করা সে হবে স্লেভ [slave] বা দাস।

    এর সবচেয়ে ভাল বা আদর্শ উদাহরণ হল, নেপালের সঙ্গে ভারতের ১৯৫০ সালে করা চুক্তি,এখনও তা সংশোধন না করেই চালাতে চাওয়া ভারতের গড়িমসিরও শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি একালে ভুটানের সঙ্গে ভারতের পুনঃলিখিত নতুন চুক্তিটাও কমবেশি তাই। যেমন নেপালের সঙ্গে ১৯৫০ সালের চুক্তির একটি বৈশিষ্ট্য হল, পাহাড়ি বলে নেপালে হাইড্রোপাওয়ার বা জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা অনেক; কিন্তু সেই নিজ-উৎপাদিত বিদ্যুৎ নেপাল ভারত বাদে তৃতীয় দেশকে (সরাসরি) বিক্রি করতে পারবে না। নেপাল এক ল্যান্ডলকড দেশ; তাই সেটাকে চাপ দিবার হাতিয়ার করে এমন কথাই ঐ চুক্তির অংশ। তাহলে নেপালকে কী করতে বাধ্য?  নেপাল বরং ভারতেরই কোনো কোম্পানিকে এজেন্সি দিতে হবে আগে, এরপর সে নেপালের বিদ্যুৎ (ধরা যাক বাংলাদেশকে) বিক্রি করে কমিশন খাবে। পুরানা রাজতান্ত্রিক নেপালে, সশস্ত্র ও গণবিক্ষোভের রাজনৈতিক আন্দোলনের শেষে পরিণতিতে ২০১৫ সালে রাজতন্ত্র ভেঙে জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে রিপাবলিক রাষ্ট্র ও কনষ্টিটিউশনে রূপান্তরের পেছনের প্রধান কারণ ছিল এমন চুক্তির বিরোধিতা ও নাগপাশ ভেঙ্গে বের হওয়া।

    সেকালের (১৯৫০) নেপালকে এমন কলোনি চুক্তি করাতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে নেহেরুর অবস্থান ছিল আরও কড়া। ব্রিটিশ ভাইসরয় ভারত ত্যাগের আগে কলোনিদখলদার ব্রিটিশদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা যেন নেহেরুকেই হস্তান্তর করে গেছিলেন; ১৯৪৭ সালের পর থেকেই নেহেরু এই ভাব দেখাতেন। এই ভাব ও ভিত্তিহীন অনুমানের উপরে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি দাঁড় করিয়েছিলেন। আর নেপালকে অধীনস্ত বানিয়ে ভারতকে এজেন্সি না দিলে নেপাল কোনো উৎপাদন বা বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যকর করতে পারবে না-  এমন শর্ত ঐ চুক্তিতে আরোপ করেছিলেন। আর ঠিক এমন অজস্র অসম সুবিধা গায়ের জোরে বড়ভাই ভাব ধরে সেখানে ঢুকিয়ে রাখা হয়ে আছে।

    এখন একটা মজার তামসার কথা তুলে ধরা যায়!  যেমন, ভারত বলতে চায় নেপাল ল্যান্ডলকড দেশ। চারদিকের ভারতবেষ্টিত বলে ভারত পেরিয়ে তবেই নেপাল বহিঃবাণিজ্যের জন্য কোন নৌবন্দরের দেখা পেতে পারে। কাজেই নেপালকে এজন্য কাফফারা তো দিতেই হবে। ভারতকে কমিশন অথবা অগ্রাধিকার মানে মাখন অংশটা দিয়ে দিতেই হবে নেপালকে।  এই হল ভারতের সাফাই। এখন আসি  তাহলে একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরনের করিডোর দিতে আমরা বাংলাদেশ বাধ্য হব কেন? আমরা কেন একই যুক্তিতে আসামের উপরে  আমাদের কমিশন অথবা অগ্রাধিকার পাওয়া ন্যায্য হবেনা??  বিশেষত যেখানে আবার নর্থ-ইস্ট কিন্তু ঠিক  নেপালের মত একই অর্থে ল্যান্ডলকড ভূখণ্ড নয়। বাংলাদেশের বাইরে দিয়েই, মানে নিজ শিলিগুড়ি করিডোর দিয়েও কলকাতার সঙ্গে নর্থ-ইস্ট সংযুক্ত। তবু ভারতকে আমাদের নিজ রাজস্বের পয়সায় অবকাঠামো রাস্তা গড়ে সেটা আবার বিনা পয়সায় ভারতকেই দিতে হবে কেন ও কীভাবে?।এই হল ভারতের আবদার; আর এরই নাম তারা দিয়েছে ‘কানেক্টিভিটি’ আর সঙ্গে ‘বাংলাদেশ-ভারত ডায়লগ’ জাতীয় প্রতারণামূলক শব্দ তো আছেই!

    সিমলায় ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগঃ
    এমন প্রতারণামূলক ডায়লগ আবার এবছর শুরু হয়ে গেল ভারতের সিমলায় ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি । আর এটার নাকি ফরমাল নাম ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগ’। নাম যাই থাক মুল উদ্দেশ্য, বিনা পয়সায় করিডোর নেয়াসহ বাংলাদেশের বাজারে অবাধ প্রবেশ ও আরো কী কী নেয়া যায় এরই ফাঁক ফোকর বের করে ডিল করা।

    তবে এখানেও কিছুটা অলক্ষ্যে এক তামাসা আছে! সবার আগে সেকথায়; এবছর বাংলাদেশের দিক থেকে এই কথিত ‘ডায়লগ’ করতে রাজি হওয়া ভারতকে আমাদের বাঁ হাতে ফুল দেবার মত ঘটনা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কেন? বাংলাদেশ থেকে প্রতিমন্ত্রী পাঠানো হয়েছে এবার। এর পক্ষে কাভারেজ সাফাই যাই দেয়া হোক এমন হবার সম্ভাব্য অনুমিত কারণ মনে করা হচ্ছে, একালে আমাদের পিরিতি-সম্পর্কে গোলমাল শুরু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের টিকা বিপর্যয়ে ফেলে দেয়া থেকে। এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পেতেই আর অবকাঠামো বিনিয়োগের আরো অর্থ পেতে চীনের সঙ্গে গভীর কমিটমেন্টে জড়িয়ে যাওয়া ছাড়া সরকার পথ ছিল না। কাজেই সরকার এখন ভারতের দিকে ন্যূনতম তাকানো বা আমল করার অবস্থাতেই নাই। এরপরেও পূর্ণমন্ত্রীর বদলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠাতে রাজি হয়েছে এ জন্য ভারতেরই শুকরিয়া আদায় করা উচিত। কিন্তু ভারত এতে আবার পালটা মোচড় দিয়েছে যে দুই ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিও এখানে পাঠানো হবে। আর এসব তুচ্ছ বিষয় মনে করে বাংলাদেশ সরকার আর সম্ভবত আপত্তি চালিয়ে যেতে চায় নাই।  কিন্তু ভারতের চাতুরিটা হল, এখানে দল বলতে বিজেপির বদলে তারা খোদ আরএসএস-কে ঢুকিয়ে দিয়েছে। দুদেশের ক্ষমতাসীন দল বলতে আওয়ামি লীগ আর বিজেপি বুঝার কথা, স্বাভাবিকভাবেই। এই প্রটোকল-টাই মানা হয় নাই এখানে। ভঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু তারা বিজেপির বদলে আরএসএস-কে টেনে এনেছে।   ইসলাম বিদ্বেষ আর ঘৃণা যে দলের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা, যা বেচে মোদির ভোট জোগাড়- সেই আরএসএস এভাবে নিজেকে এই সুযোগে জাতে তুলে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের পাসে বসার জায়গা করে নিয়েছে। এজায়গায় ছাড় দেয়া একেবারেই অনুচিত ও বিরাট ভুল হয়েছে। ভবিষ্যতে এজন্য আমাদের খেসারত দিতে হতে পারে।

    এটা খুবই খারাপ ইঙ্গিত তৈরি করে দিয়েছে। প্রথম কথা দল হিসাবে আওয়ামী লীগ চাইলেই অন্তত নিজেকে আরএসএসের সঙ্গে এক কাতারে বসাতেই পারে না। মূলত এক সভায় বসতে পারে না। আওয়ামী লীগ যত খারাপই হোক, আরএসএস এর তুল্য দল নয়।  ভারতের সমাজ থেকে যে দল ইসলাম ও মুসলমানদের অবলীলায় এথনিক ক্লিনজিং করতে চায়, বা অনুমোদন দেয় আওয়ামী লীগ সে দলের কাতারে নিজেকে বসাতে পারে না। এথনিক ক্লিনজিং আর আধুনিক রাষ্ট্র একসঙ্গে চলতে বা কাজ করতে পারে না। তাতে বাংলাদেশের মানুষের চোখে আওয়ামী লীগের যত দোষ-ত্রুটি বা খামতিই থাকুক না কেন!

    দ্বিতীয় অপরাধ হল, সিমলা সভার আগে থেকেই হুমকি দেয়া হয়েছিল গত বছর অক্টোবরে কুমিল্লায় দুর্গাপূজার ঘটনাকে তারা আলোচনার বিষয়বস্ত বানাবে; যেন জবাবদিহিতা! মানে যেন বাংলাদেশের হিন্দুদের গার্ডিয়ান হলো ভারত! আবার মজার কথা হলো এনিয়ে ভারতীয় প্রতিনিধিদের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। এমজি আকবর এটাকে ‘এও হয় ও-ও’ হয় বলে পাশ কাটাতে চেয়েছেন।

    বিবিসিকে তিনি ঢাকার দুর্গাপুজা ইস্যুতে  সিমলায় কথা হবে কিনা এনিয়ে বলেছেন,
    ”ওটা তো, ওটা তো … আসলে যে কোনও ইভেন্ট বা ঘটনাই তো কন্ডিশনস বা শর্ত তৈরি করে। আমাদের দেশেও একই ব্যাপার হয়, কেউ একটা কিছু ভাষণ দিল বা কিছু বলল – অন্য পারে তার অভিঘাত হয়, বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। “আর তাছাড়া আমরা দুটো কাছাকাছি ও ঘনিষ্ঠ দেশ – দুটোই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ – ফলে কিছু-না-কিছু (আলোচনা) হওয়াই তো স্বাভাবিক।”

    এছাড়া আরএসএস-এর মুখপাত্র পত্রিকা ‘দ্য অর্গানাইজার’ এর প্রধান সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিবিসি লিখছে, ” কুমিল্লা বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে গত বছর তীব্র প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল আরএসএসের মুখপত্র ‘দ্য অর্গানাইজার’।  আর ক্ষুব্ধ অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

    “আরএসএস-এর থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণঃ”
    আবার ওদিকে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি শক্তের মত শ্রীরাধা দত্ত, যিনি বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন” -যেট আরএসএস-এর নিজের সাথে যুক্ত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক; আর শ্রীরাধা এরই সিনিয়র ফেলো। তিনি বিবিসিকে বলেন, সংলাপে “আরএসএসের থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ”, বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কিছু ঘটনার পটভূমিতে। তাঁর কথায়, ”এই তো দেখলাম গতকালও বোধহয় বরিশালে একটি মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিচ্ছিন্নভাবে এদিক-ওদিক এরকম ঘটেই চলেছে – যদিও আমাদের সবারই ধারণা বাইরে থেকে সরকার-বিরোধী শক্তিরাই এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করাচ্ছে”।

         শ্রীরাধা দত্ত, বিবিসি বাংলা থেকে নেয়া

    এই নারী সম্ভবত এক চোখে দেখেন, অপর চোখে দেখেন না। দেখলে উনি পরিস্কার দেখতেন, উত্তর প্রদেশে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কিভাবে প্রকাশ্যে মুসলমান গণহত্যার আহবান জানিয়ে  আরএসএস-সংশ্লিষ্ট কথিত সাধুরা হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হুঙ্কার দিচ্ছেন। এখন শ্রীরাধা দত্তরা যেভাবে বাংলাদেশের হিন্দুদের গার্জিয়ান সাজতে চাইছেন তাহলে তো আমাদেরকেও ভারতের মুসলমানদের ত্রাতা সাজতে হয়। আর সাথে ঐ সিমলা ডায়লগ অনুষ্ঠানে  ভারতের মুসলমানদের দুরবস্থা নিয়ে কথা বলতে ওরকম কিছু বাংলাদেশি দলকে পাঠাতে হত – শ্রীরাধা দত্তের দু’চোখ কাজ করলে নিশ্চয় ইনি  আমাদেরকে ওরকম কিছু বাংলাদেশি দলকে পাঠাতে নিজেই বলতেন!

    কিন্তু হায়? শ্রীরাধা দত্ত খেয়াল করেন নাই যে সেরের উপর সবসময় একটা ‘সোয়া সেরের’ বাটখারা সেখানে থাকে। ওখানেও তাই ঘটেছিল।  তাদের সকলের উপর ওজনের দিক থেকে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব ছিলেন রাম মাধব।  যিনি আরএসএস এর কোন এক কমিটির নেতা ও জাতীয় কর্মসমিতির (ওয়ার্কিং কমিটি) সদস্য। এই কিছুদিন আগেও তিনি আরএসএস থেকে ডেপুটেশনে গিয়ে  বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি পদে ছিলেন। তিনি পুরা আলোচনায় পানি ঢেলে দেন দলের মূল অবস্থান ব্যক্ত করে। তিনি সেখানে বিবিসিকে বলেছেন, “এই প্ল্যাটফর্মে দুই দেশের একান্ত নিজস্ব বা অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় না। কাজেই কুমিল্লার ঘটনা সিমলাতে কোনো ছায়াপাত করবে বলে তিনি মনে করেন না”।

    অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতীয়দের মধ্যেও কোনো ‘সমন্বয়ই’ নাই। আর এই সুযোগে শ্রীরাধা ওভার-এক্ট বা আলগা-মাতবরির সুযোগ নিয়েছিলেন। সবাই জানে বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন থিঙ্কট্যাঙ্ক খোদ আসএসএসেরই প্রতিষ্ঠান; আর মোদির বর্তমান সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এই প্রতিষ্ঠানেরই মূল কর্তা ও নেতা।

    তাহলে ভারত যদি সিমলাতে কুমিল্লা ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে পারে তাহলে আমরা ভারতের হিজাব ইস্যু নিয়ে ওই একই আসরে কথা বলতে পারব না কেন? এসব দিকে বাংলাদেশ সরকারের কড়া দৃষ্টি থাকা উচিত ছিল। আমাদের নিজেকে অপমানিত হতে দেওয়ার তো কিছু নাই। আর আওয়ামি লীগ যতদিন ক্ষমতায় আছে এসব এমন মিটিংয়ে এমন গা-ছেড়ে দিবার কিছুই হয় নাই।

    তবে একটা বড় লক্ষ্যণীয় দিক হল আমাদের কোন মিডিয়াই এই ডায়লগ অনুষ্ঠান মানে ১৮ ফেব্রুয়ারির আগে এনিয়ে তেমন রিপোর্ট দেখা যায় নাই, কেবল একা বিবিসি বাংলাতেই যা সব মাত করেছিল। বুঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা একটা দায় ঠেলা ধরণের হয়ে গেছিল। কিন্তু তবু উচিত ছিল বিবিসির রিপোর্টের পরে হলেও বাংলাদেশের মিডিয়ার জন্য মেটেরিয়াল সরবরাহ করা। অন্তত কাউন্টার ইনফরমেশনগুলো যেন তারা হয়ত বাসসের অথবা কয়েকটা দেশি মিডিয়াকে কাছে ডেকে নিয়ে দেয়া ব্রিফিং সরবরাহ করা।

    আর বলাই বাহুল্য এই কথিত ডায়লগও বিবিসি কানেকক্টিভিটি দিয়েই শেষ করেছিল। তাই বিবিসির রিপোর্টও শেষ হয়েছিল “বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি আলোচনা” এই উপ-শিরোনামে।

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  সাপ্তাহিক  “সাম্প্রতিক দেশকাল” পত্রিকার  ০৮ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর  ০৩ মার্চ প্রিন্টে   “ক্ষমতার লিগ্যাসিতেও আরএসএসের পাশে বসা নয়“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    গৌতম দাস

    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Vn

     

     

          MEA spokesperson Arindam Bagchi. | Photo Credit: twitter/@abagchimea

    ইংরেজি কমিউনাইজ [communize] শব্দটি খুবই ইতিবাচক এক শব্দ। যার রুট শব্দ কমিউন [commune]। ল্যাটিন অরিজিন কমিউনিস [communis] সেখান থেকে ইংরাজিতে যার অর্থ কমন [common] বা সাধারণ। সেখান থেকে সম্ভবত ফ্রেঞ্চ comuner (মানে ভাগাভাগি শেয়ার করা), হয়েও অরিজিনাল কমিউনাল [communal] (জোর করে দেয়া হিন্দু-ভারতীয় নেতি অর্থটা না) খুবই ইতিবাচক শব্দ যার অর্থ যে কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করে, আর কমিউনিটির কষ্ট-আরামসহ সবই যে শেয়ার করে; এবং এক সম্প্রদায় হিসেবে মিলেমিশে থাকে। এছাড়া, অনেক সময় প্রকৃতির সাথে স্পিরিচুয়ালি সম্পর্কিত করে দেখা অর্থে ‘কমিউনাইজ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দেখা যাচ্ছে রুট কমিউন এর যতগুলা অর্থ হয় সবই ইতিবাচক। কোন নিচা মানে যেটাকে ইংরাজিতে নেতিবাচক বা derogatory অর্থে ব্যবহার হয় এমন কোন ডেরিভেটিভ শব্দ বা অর্থই নাই।

    অথচ বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সমাজের জমিদার-হিন্দুরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য খাটাতে গিয়ে  সেই দরকারে অরিজিনাল  কমিউনাল শব্দের অর্থ-বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তাই ডিকসনারিতে না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী ধারণা ও ঘৃণায় হিন্দুত্ব-জাতির জোশে তারা সব ঢেকে ফেলতে চেয়েছিল। আর তাতে সবচেয়ে ইতিবাচক কমিউন শব্দটাকেও জবরদস্তিতে নেতিবাচক অর্থ দিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু শব্দটা ইংরাজি, ফলে ইংলিস ডিকসনারি তাদের এই নেতি অর্থ গ্রহণ করে নাই। একারণে বলা যায় জমিদার-হিন্দুরা  কমিউন শব্দের বাংলা – ‘সম্প্রদায়’ শব্দটাকে করেছে ‘সাম্প্রদায়িক’ যা খুবই নেতিবাচক অর্থ। তাই ভারতে ছেপে নেওয়া ছাড়া অন্য কো্ন ইংরেজি ডিকশনারিতে নেতি ‘কমিউনাল’ শব্দটাই পাওয়া যাবে না। কমিউন বা কমিউনিটি অথবা ইতিবাচক-কমিউনাল শব্দ পাওয়া যাবে। যার সবগুলোও অবশ্যই ইতিবাচক শব্দ।

    এখন জমিদার-হিন্দুর দেয়া এই কমিউনাল শব্দের অর্থ কী? তারা কী বোঝাতে চান?
    প্রথমত তারা বলতে চান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানেরা বাঙালি না। আর জমিদার-হিন্দুর রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল আধিপত্য অবিভক্ত বাংলার সবাইকে মানতেই হবে। আর সেই জবরদস্তি ক্ষমতার জমিদার-হিন্দুর দাবি  – বাঙালি মানেই কেবল হিন্দু; মুসলমানেরা এথনিক পরিচয়ে বাঙালিই নয়। মানে যেন কারও এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্য কারও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যায়।
    সারা মোগল আমলের নিয়ম  খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমিতে যেই চাষাবাদ করে জমি ভোগ-দখলের অধিকার তাঁর। বৃটিশ কলোনি-দখলদার শাসকেরা প্রথম এই জমি মালিকানা ভিত্তি ভেঙ্গে দেন। তারা জোর করে জমির আগের টাইটেল এবার অর্থের বিনিময়ে ‘জমিদার নামে নয়া গোষ্ঠির কাছে সেই জমির টাইটেল হস্তান্তর বা লিখে দিয়েছিল। অথচ তখনও জমি ভোগ-দখলের অধিকার পুরানা জমির চাষাবাদ-কারিদেরই ছিল।

    তাই এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণী নিজ ক্ষমতা আধিপত্য দেখাতে  মুসলমানদের এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ চালু করেন। দাবি করেন মুসলমানেরা বাঙালি না। এরই বিপরীতে দুবার জবাব দিয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রধান সংখ্যা-শক্তি হয়ে দেখিয়েছে তারা অবশ্যই মুসলমান। আর পরে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ করে দেখিয়েছে – তারা বাঙালিও।  জমিদার কলকাতা তাদের বাঙালিত্ব কেড়ে নিতে পারে নাই, পারবে না। ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথায় নিষ্পেসিত অন্তজ কিন্তু লড়াকু বাঙালির যে অংশটা ভালভাবে বাঁচতে ও লড়াবার সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এরা বাঙালি মুসলমান অবশ্যই। কিন্তু একারণে তার এথনিক-জাতি পরিচয়, যে ভাষায় সে মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক করে তা বদলে যাবে কেন? মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কোন জমিদার-হিন্দু মাতবর কেড়ে নিতে পারে না। মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কেড়ে নিবার ক্ষমতা জমিদার-হিন্দুর নাই,  জমির মালিকানা টাইটেলের মত এই বাঙালি পরিচয় কেড়ে নেয়া যায় না সম্ভব নয়। মানুষের এথনিক পরিচয় প্রায় অর্গানিক; ফলে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা যে ঘরে জন্ম নেই সে ভিত্তিতে এই পরিচয় সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এজন্য  এথনিক-সাংস্কৃতিক অর্থে জাতি বা জাতিবোধ কথাটা আগে বুঝতে হবে। এটা জবরদস্তির বিষয় না। মুসলমান বাঙালি তাই বাংলা ভাষা ছাড়ে নাই ছাড়তে পারে না, বাঙালি খাদ্যাভাস ইত্যাদিও ছাড়বে না আর সর্বোপরি মুসলমানিত্বও ছাড়ে নাই। তাতে শরতচন্দ্র হয়ে যতই আপনি “বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা” দেখানোর উপন্যাস লেখেন না কেন!

    কিন্তু বৃটিশ-ভারতের কলকাতার জমিদার হিন্দু সেই জবরদস্তিটাই করেছিল। বিশেষত মুসলমানেরা তাদের মানতে না চাইলে অথবা পাল্টা তাদেরকে ভিন্ন কোন নিজ ধর্মীয় সামাজিক চিহ্ন দেখানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে “সাম্প্রদায়িক ডাকা হবে” – এটা ছিল জমিদারশ-হিন্দুর সিদ্ধান্ত। তাদের আধিপত্যের সমাজে থাকতে গেলে তাদের সংজ্ঞায়িত করা ধারণা মানতে বাধ্য করার কায়দা হল এটা। মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া তাদের কথিত সব শিষ্টাচার ও কোড ফলো করলেই কেবল তারা স্কুল-কলেজ বা চাকরিতে তাদের সমাজে প্রবেশাধিকার দেবে, পাশে বসতেও দিতে পারে। আর যে তাদের কোড মানে না, ডমিনেন্স মানে না তাকে জমিদারেরা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলত।  একারণেই আজও সাম্প্রদায়িক শব্দটাই জমিদার-হিন্দুর সেই অত্যাচারেরই স্মারক চিহ্ন। কাজেই  এই সাম্প্রদায়িক শব্দটা ব্যবহারে আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন! প্রয়োজন ব্যবহার বাদ দেয়া।
    মনে রাখতে হবে  মুসলমানের বিরুদ্ধে জমিদার-হিন্দুর  বুকভরা বিদ্বেষ আর ঘৃণার ঝড় তোলা শব্দটাই হল ‘সাম্প্রদায়িক’।

    ভারতের বিদেশ বিভাগ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি একজন বাঙালি হিন্দু; উনার ‘বাগচি’ টাইটেল তাই নির্দেশ করে। এদিকে হিজাব ইস্যুতে স্বভাবতই ওআইসি বা ইসলামি ঐক্য সংস্থা [Organisation of Islamic Cooperation (OIC)]  ভারতের মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানোর নীতির নিন্দা করে অন্যান্যদের মতই বিবৃতি দিয়েছিল। এটা সহ্য হয় নাই ভারতের বিদেশ বিভাগের। ব্যাপারটাকে তারা দেখেছে যেন পুরানা জমিদার-হিন্দুর চোখে, তাদের আধিপত্য অস্বীকারের চেষ্টা হচ্ছে যেন। তাই পুরা জমিদার-হিন্দুর ঘৃণার হুঙ্কার দিয়েছেন অরিন্দম বাগচি। বলেছেন এটা নাকি ওআইসির সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট। এছাড়া অরিন্দম দাবি করছেন ভারতে নাকি একটা “কনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ও মেকানিজম” কার্যকর আছে আর ওর সাথে নাকি  আছে – “ডেমোক্রাটিক ইথোস (মুল্যবোধ) ও পলিটি (রাজনৈতিকতা)” ।

    ……constitutional framework and mechanisms, as well as democratic ethos and polity. The communal mindset of the OIC Secretariat does not allow for a proper appreciation of these realities

    কিন্তু সরি,  অরিন্দম! ভারতে এগুলোর কোনটাই নাই, ভারতের জন্ম থেকেই নাই। আছে কেবল দগদগে ঘা, এক হিন্দুত্ব। পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই।  এমনকি কান পেতে শুনেন আরএসএস প্রধানের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা দিবার পরিকল্পনা শুনতে পাবেন। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজ্যকে মুসলমান-শুণ্য করতে হবে, শেখানে তারা থাকতে পারবে না – এই ডাক ও পরিকল্পনাও শুনতে পাবেন।  আর চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে সব হারিয়ে মোদির ভোট যোগাড়ের এতে একমাত্র উপায় মুসলমান গণহত্যার হুমকি, মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো আর বিজেপি প্রার্থী না জিতলে মুসলমান মারবেন, বুলডোজার চালাবেন এই হুমকি দিচ্ছে। এগুলো কী কনষ্টিটিউশনাল আচরণ ?? ভারতে কী সুপ্রীম কোর্ট অথবা কোন নির্বাচন কমিশন বলে কিছু আর আদৌ আছে??? যাদের প্রত্যক্ষ কনষ্টিটিউশনাল দায়িত্ব ছিল মুসলমান ভোটারদের উপর এত চরম হুমকির বিরুদ্ধে তাতক্ষণিক সকল ব্যবস্থা নেয়া। অথচ এমন কোন কিছুই করা হয় নাই। মানে  ভারতের দুর্বল যে কনষ্টিটিউশন যে কনষ্টিটিউশনালিজম তাই তো  আজ একেবারেই নিস্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা প্রমাণিত। সে কারণে এসবের বিরুদ্ধে ওআইসি তো কোন ইসলামি আলেম ডেকে আনার কথা বলে নাই, পরামর্শ দিতে যায় নাই।  বরং আহবান রেখেছে [……OIC called upon the U.N. and the Human Rights Council to take “necessary measures”] জাতিসংঘ ও এর হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের কাছে তাদেরকে “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে বলেছে। অথচ দেখা যাচ্ছে এটাও মুখপাত্র অরিন্দমের সহ্য হয় নাই।   তাহলে?

    … ভারতে আছে কেবল দগদগে ঘা – যার নাম হিন্দুত্ব। যেখানে পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই, পারে না।

    অর্থাৎ  মুখপাত্র অরিন্দম এখনও জানেনই নাই যে ও আইসি-কে সাম্প্রদায়িক বলা – এটা একটা এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর কাজ। কারণ এই “সাম্প্রদায়িক” শব্দ ও ধারণাটাই জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষী ধারণা ও সেকালে তাদের হাতেই যার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল।  অন্যের এথনিক পরিচয় অরিন্দম আপনি পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু আপনি অন্য এক জনগোষ্ঠিকে তার এথনিক পরিচয় ও ইতিহাস তুলে কথা বলতে পারেন না; জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষের ইতিহাসের পক্ষে সাফাই দিতে পারেন না। বিশেষ করে আপনি যখন একটা দেশের বিদেশবিভাগের মুখপাত্র!! খেয়াল করেন, হিজাব নিয়ে বিবৃতি, আপত্তি তো আমেরিকাও তুলেছে। ওখানে অরিন্দম বাগচির মুরোদ হয় নাই  “সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট” শব্দ ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে  কথা বলার!
    এদিকে বর্তমান চালু নির্বাচনে মরিয়া মোদিকে জিতাতে,  খুঁচিয়ে ঘা করা এক পদক্ষেপ হল ভারতের স্কুল-কলেজে হিজাব ইস্যু খাড়া করা। এতে চরম এক মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণায় বৈষম্যমূলক আচরণে সমাজ তোলপাড় করা ফেলা, এটাই চলছে এখন। এতে আমেরিকা, ইউরোপ আর এদিকে পাকিস্তান বা ওআইসির নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে;  আর আসলে এতে ভারত কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। কারণ, কূটনৈতিক রেওয়াজে এ’বিষয়টা হল,  আপনি আপনার দেশের সব চিহ্ন-পরিচয় নির্বিশেষে আপনার নাগরিকের প্রতি অ-বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সাম্যের চোখে দেখতে বাধ্য থাকবেন ও দেখবেন – এটাই “আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল অর্ডার” আশা করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এবার  ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  আর তাতেই কূটনৈতিক ভাষা ও ভাষ্য হারিয়ে বেহাল দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে যায় ভারত।  এমন বে-দিশায় পড়ে, ওআইসি-কেই ঐ পুরানা জমিদার-হিন্দুর বয়ানের সাহায্যে “সাম্প্রদায়িক” বলে গালি দেয়া হয়েছে। আর এতে যেন সারা দুনিয়াটা জমিদার-হিন্দুর রাজত্ব – এটাই ধরে নেয়া হয়ে গেছে!  আবার তাদের হিসাব টনটনে, একইভাবে তারা আমেরিকাকে তাদের নিন্দার জবাব দিতে যায় নাই! অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই তারা যেনবা জমিদার-হিন্দুর প্রজা এই অনুমান শেখানে খাটাতে যায় নাই!
    তাই, এরপরে আমাদের আশা থাকবে যে “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার অর্থ-ইতিহাস-তাতপর্য বুঝে এটাকে কিভাবে আমল ও সুলুক করতে হবে তা আমরা নিজেরাই বুঝে নিতে পারব। কারণ জমিদার-হিন্দুর এমন মুসলমান-বিদ্বেষে ভরপুর শব্দের ইতিহাসের পক্ষে আমরা দাড়াতে বা প্রমোট করতে পারি না।

    মুসলমান কোপাতে হবে ও ইসলামবিদ্বেষ একমাত্র ভরসা মোদিরঃ
    প্রায় তিন সপ্তাহ আগের এক লেখায় পরিষ্কার করে লিখেছিলাম যে, একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত ২০২১ সালে। সেবারের মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয় আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রীর রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা তিনি দেশে  না দেখিয়েও পারছেন না আবার দেখালে মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো ‘নিচা’; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? তাই তিনি ঐ ট্যাংকারের উপর রঙ লাগিয়ে সৌদি সব চিহ্ন ঢেকে ঐ অক্সিজেনই ব্যবহার করেছেন, ক্রেডিট নিয়েছেন!  আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দু দৈনিকের কূটনীতিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাদের ভারত আসলে, মোদি তাকে যা বুঝায়ছিলেন, এমন কোনো পরাশক্তি নয়! যা নিয়ে মৌদির বয়ানে এতদিন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।  কেবল তখন সেটা তাস্র কাছে পরিস্কার হয়েছে যে ভারত কোন পরাশক্তি নয়। বলেছেন, ভারত নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন? এ’এক অদ্ভুত ভারতের মিথ্যাবলা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তার সাংবাদিক যার নিজস্ব বুঝাবুঝির মেকানিজমই বিকশিত হয় নাই!

    সেখানে আরো বলেছিলাম, চলতি এই নির্বাচনে “মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই হবে মোদির একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফেরানোর একমাত্র উপায়। আর তাই ঘটছে। এ’কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন, মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই মোদির রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় ঠাউরানো যার সোজা মানে, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!”

    নির্বাচন শুরু হয়েছে, খবর ভালো নাঃ
    শিডিউল মোতাবেক গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কিছু রাজ্য বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। আর এর সাথে  মোদির পক্ষে পরিকল্পিতভাবে দুটো চরম ঘৃণা ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করে নেয়া হয়েছে। প্রথমটি ঘটানো হয়েছে, গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ১৭-১৯ লাগাতার এই তিন দিন। দুই কথিত ‘সাধু’ নরসিংহআনন্দ ও প্রবোধানন্দ গিরি, তারা এর আয়োজক ও বক্তা। এরা আবার বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন নামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতা। তারা শেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক হিন্দুকে ‘সাফাই অভিযান’ পরিচালনার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই”। [every Hindu must pick up weapons and we will have to conduct this cleanliness drive (safai abhiyan). There is no solution apart from this.”] আর প্রথমজন বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ায় যদি মানুষকে টিকে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে জিহাদিদের উপর সাফাই অভিযান চালাতে হবে” [“In the entire world, if we want humanity to last, we will need to clean it of jihadis. ]। এর পরও কারো বুঝতে অস্পষ্টতা যাতে না থাকে তাই বলে দেই, এখানে এই সাফাই অভিযান মানে হল জাতিগতভাবে (মুসলমানদের) সবাইকে নির্মূল করা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে বোঝায়। দুনিয়াতে প্রথম হিটলার ও তার সহযোগীদের এই এথনিক ক্লিনজিং’ এর অভিযোগে বিচার হয়েছিল। সেই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের চোখে এটা সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। যার বেলায় শাস্তি হল সর্বোচ্চ দন্ড। সেই থেকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এটাই একাডেমিক বইপত্রে ও আইন-আদালতের ভাষাও সবচেয়ে বড় গোত্রের এক অপরাধ মানা হয় বটে।  এটাই এখন মোদি ও তাঁর গোষ্ঠির প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়। অথচ মোদি সরকারের বিদেশ বিভাগের মুখপাত্র সমালোচকদেরই উলটা “সাম্প্রদায়িক” বলছেন!

    গত ডিসেম্বরে কথিত সাধুদের ঘৃণা-সভার পরে প্রায় এক মাস ধরে চলে এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দেয়ার-নেয়ার পুলিশি প্রচেষ্টা; এছাড়া কোনো বাদি-অভিযোগকারী পাওয়া যাচ্ছে না, এ অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ জানুয়ারি কেবল নরসিংহ-আনন্দকে গ্রেফতার করা হয়। তবুও এমন সব আইনে গ্রেফতার দেখানো যাতেসে সহজেই জামিন পেতে পারে। অথচ ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ’ বা ‘জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’ – শুধু এ’অভিযোগে কাশ্মির বা নর্থ-ইস্টে অনবরত এমন আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতার করে কয়েক বছরের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে; এমন অন্তত চারটি আইন আছে। এসব আইন প্রয়োগ করে তারা, জঙ্গি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বলে থাকে। অথচ নরসিংহআনন্দের উপর একটা পুরা কমিউনিটিরর উপর এথনিক ক্লিনজিং,  গণহত্যা বা হত্যার হুমকি এসবের কোনটাই অভিযোগ আনা হয় নাই। কেবল ৫০৯ দারার একটা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল যে নারী ও সাংবাদিকদের উপর আপত্তির ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে [under section 509 of the Indian Penal Code (IPC) for making objectionable remarks against women and abusing a journalist.]। ফলে স্বভাবতই   ইতোমধ্যে তাঁর জামিনে মুক্তিও  হয়ে গেছে।

    এখন এমন গণহত্যার হুমকির ঘটনার পর এক মাস কেন বিভিন্ন অজুহাতে কোনো গ্রেফতার বা মামলা না করে অপেক্ষা করা হল? মূল কারণ এবছরের পাঁচ রাজ্য নির্বাচন শুরু হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক মাস ধরে কয়েক পর্বে। তাই ১৭-১৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে ঐ এথনিক ক্লিনজিং আর চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য দেয়ার পরও কোনো পুলিশ অ্যাকশন না ঘটানোতে – হিন্দু ভোটারদের মনে উসকানির ঝড় তুলে মানসিকভাবে তাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেয়া হয়। এভাবে এক মাস কাটিয়ে দেয়ার পরে নরসিংহআনন্দ এরপরে গ্রেফতার হয়েছে কি না বা জামিন হয়েছে কি না তা এসব আমজনতা হয়ত ব্যাপারটা আর খেয়াল রাখবে না; বেশির ভাগই মনে রাখবে না – এই ভরসায়। কিন্তু এদিকে হিন্দু ভোটারদের উসকানি দিয়ে এর নগদ ফলাফলে মোদির ভোটের বাক্স পর্যন্ত আনার লক্ষ্যে তাদের মনের ওপর ছাপ ফেলার ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়া তো হয়েই গেছে। এই ছিল পরিকল্পনাটা।

    এবার দ্বিতীয় ঘটনা – স্কুল-কলেজে হিজাবঃ
    নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে সেসব রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা মান্য করা সব-বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সে কারণে হিজাবের ইস্যুটা উঠানো হয়েছে এমন এক বিজেপিশাসিত রাজ্যে যেখানে এবছর নির্বাচন নাই। ফলে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু বলার নাই। কিন্তু আবার ইস্যুটা হাজির করা হয়েছে এমনভাবে যার এফেক্ট ভারতব্যাপী বিস্তৃত হয়। স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ ইস্যু যে কারণে এটা কেবল কর্নাটক রাজ্যের ঘটনা। এর ওপর আবার এটা এক-দু’টা স্কুল-কলেজের স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। সারা  রাজ্যে বা কর্নাটক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও নয়। একটা জেলার দু-একটা স্কুল-কলেজে। কিন্তু পাশের আরো দুটো জেলায় জবরদস্তিতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই শুরু করে দেয়া, আন্দোলন, এসব শুরু হয়েছে মোদির ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে; অথচ  সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি নিশ্চুপ।

    এতে কার্যত হিজাদ নিষিদ্ধ ইস্যুটা সারা কর্নাটক তো বটেই, সারা ভারতের সব রাজ্য ছাপিয়ে ভারতের বাইরে আমেরিকার নিন্দা প্রস্তাব, ওআইসি নিন্দা প্রস্তাব ঘটিয়ে এটা এখন ভারতের জন্য এক গ্লোবাল কূটনীতিক ইস্যু হয়ে গেছে। এতে বলাবাহুল্য এর এফেক্ট নির্বাচন চলছে এমন পাঁচ রাজ্যের উপরই পরিপূর্ণভাবে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। আর এবার তা সেখানকার প্রতিটি ব্যালট বাক্সে গিয়ে আছড়ে পড়বে, বিজেপির ভোটের বাক্সগুলো এখন নিশ্চয় উপচে পড়বে আর মোদি-বিজেপি এরই অপেক্ষায়! এ হল পরিকল্পনা!

    কথিত নিরপেক্ষ হিন্দুত্বের আদালতঃ
    এছাড়া এবার ঘটনাকে আরো পোক্ত করতে কোনো উপায়ই ছাড়া হয়নি; তাই আদালতও।  এদিকে আদালত মানেই ভীষণ বিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষে তা ভরপুর থাকে। তাদের সামাজিক সম্মানও অনেক উঁচুতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকেও এ’ইস্যুতে বলা হল, তারা এখন হস্তক্ষেপ করবে না; কখন করবে তা তারাই ঠিক করবে বলে রায় দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে স্থানীয় রাজ্য হাইকোর্ট বিরাট নিরপেক্ষতার ভান নিয়ে হাজির। তারা এক সাময়িক রায় দিয়ে দিয়েছে। সেটা হল, “স্টাটাস কো”;  যার আইনি মানে হল বিবদমান পক্ষগুলো বিবাদ শুরুর আগে যে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে গিয়ে স্থিতাবস্থায় থাকবে, যত দিন আদালত ইস্যুটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে কোনো ফাইনাল রায় না দেয়। এটাই ইউজুয়াল প্র্যাকটিস হয়ে থাকে।

    কিন্তু এখানে বাড়তি একটি টুইস্ট দেয়া হয়েছে। বলছে ‘স্ট্যাটাস কো’; কিন্তু সাথে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে যে, এর মানে হল, এই অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সময়ে কেউ কোনো ধর্মীয় পোশাকে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না। অথচ এ বলাটাই বেআইনি। এটা নিজেই এক বিরাট বৈষম্য – একেবারে এক সূক্ষ্ম কারচুপি করা যাকে বলে।

    কারণ হিজাব ইস্যু হওয়ার আগে যে যেমন খুশি হিজাব, পাগড়ি, ঘোমটা প্রভৃতি পরে স্কুল-কলেজে যেতে পারত ও আসতও। কাজেই ‘পূর্বাবস্থা’ বলতে এটাকেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাখ্যায় তা না বলে উল্টো ধর্মীয় পোশাক পড়া যাবে না [we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing]  এ কথা বলে আসলে কথিত এই সাময়িক সময়ের রায়ের কথা বলে যারা হিজাববিরোধী মোদি-বিজেপির লোক এদের দাবিকেই মেনে নেয়া ও এদের পক্ষেই রায় দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ দুপক্ষের কথা শুনে বিচার বিবেচনা করে ফাইনালি রায় হবার আগেই we restrain বলে হিজাবকেই বাদ দেওয়ার কর্তৃত্ব কোন বিচারকেরই নাই। কিসের ভিত্তিতে আপনারা we restrain বললেন???  কারণ, এই সাময়িক রায়টাও তো কোন শুনানির শেষে দেয়া নয়,  করা হয়নি। অথচ, আদালত যেন খুবই একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সিদ্ধান্ত দিয়েছে এই ভাব করে তাদের হিন্দুত্বের খেয়াল এটাই চাপিয়ে দিয়েছে।

    “Pending consideration of all these petitions, we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing saffron shawls (Bhagwa), scarfs, hijab, religious flags or the like within the classroom, until further orders.”

    এখন পরে কী ফাইনাল রায় হবে তা আগেই বলে দেয়া যায়। এ’বছরের নির্বাচন কেবল এই পাঁচ রাজ্যে আর তা কেবল ১০ মার্চ পর্যন্ত। এর মানে হল ১০ মার্চের পরে আদালত ফাইনাল রায় দিলে আর সেখানে আবার হিজাব পরে স্কুল-কলেজে আসার পক্ষেও যদি আদালত রায় দেয় তো বিজেপির আপত্তি হবে না; কারণ পরের বছরের আগে আর নির্বাচন নাই। অর্থাৎ এখনকার এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাটা যেঁ বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়ে আদালত বিজেপির হিন্দুত্ব ও ভোট জোগাড়কে সাহায্য করল। আবার ফাইনাল রায় হিজাব পড়ার পক্ষে  দিবার পথ খুলে রেখে বিচারক বিরাট উদার সাজবার পথ পরিষ্কার রেখে দিলেন, এবং তেমন রায়ও দিতে পারবেন।

    ভারতের উচ্চ আদালতগুলোর ভেঙে পড়ার ইতিহাসঃ
    এমনিতে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের চোখে আমাদের দেশের অনেকে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। কিন্তু বটম অব দ্য ফ্যাক্টস হল, ভারতের আদালতগুলো রাজনীতি বা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় নিজেদের সব ক্ষমতা সমর্পণ করার পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কেন ও কখন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির জাজমেন্টে তাকে দোষীকরে রায় দেয়া হয়ে যায়। এরপর বাকি ছিল তিনি কিভাবে শাস্তি হিসাবে জেলে যাবেন তার ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেয়া কেননা তিনি সিটিং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এরপর ইন্দিরার উপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ত্যাগ করে নিয়ে এরপর শাস্তিভোগের জন্য তৈরি হয়ে আসতে আদালতের সিদ্ধান্ত-রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা আদালতের সেই নির্দেশ পালন না করে, রায় উপেক্ষা করে –  ক্ষমতায় থেকেই উল্টো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। এভাবে তিনি এই শাস্তি গ্রহণ  জীবনেও আর করেন নাই।

    আর সেই থেকে আইন পেশার সব লোক, রাজনীতিবিদ মিলে মূল্যায়নে গিয়েছিলেন যে, জাজদের অমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাথে সংঘাতে যাওয়াতে তাতে কোন লাভই হয়নাই  উলটা ভারত-রাষ্ট্রই নাকি  দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তাদের আপস করা উচিত ছিল।’ এমন সঙ্ঘাতের এই নাকি মহিমা। অর্থাৎ আদর করে যেন বলা যে “রাজনীতিবিদেরা খুব দুষ্ট”।  অতএব মন্দের ভাল হিসেবে ক্ষমতার সাথে আপস করাই নাকি ভাল – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কেন?

    কারণ না হলে জরুরি অবস্থা দিলে তো তা রাষ্ট্রই না থাকার সমান, এই ক্ষতি হয়। ফলাফলে জরুরি অবস্থা পাওয়ার চেয়ে তাই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস করা অথবা এড়িয়ে চলা হলো -এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এটাই নাকি আদালতের পথ। যদিও এর কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে না, তবে এটাই সেই থেকে তাদের অলিখিত চর্চা ও বুদ্ধিজীবিতা!  আর এ সুযোগে দেখা যাচ্ছে এখন যেটা হয়েছে, একদল বিচারক হয়েছেন যারা এ সুযোগে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে নানা পার্সোনাল সুবিধা আদায় করে নেয়ার সূক্ষ্ম তৎপরতা চালিয়ে, কে কত বুদ্ধিমানের মত মোদির সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছেন সেই ক্রেডিটের গর্ব ও এর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। তাতে  ভারতের পরপর গত দুই প্রধান বিচারপতি যে এই দোষ দুষ্ট আছে তা আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বিশেষ মটর সাইকেল চড়ার খায়েস মিটালেন। অপরজন আসাম জাতিবাদের পক্ষে জাতির-সৈনিক হয়ে গেলেন!
    এতে প্রায়ই ভারত-রাষ্ট্রের বড় বড় দুর্বলতা বা ‘ফুটাফাটা’ এসবের কারণে, এটি ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে বলা হয় – সে পথের সবচেয়ে বড় এক গর্ত হল, এই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস, এড়িয়ে যাওয়া তথা হবু জরুরি অবস্থা এড়ানোর বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ-কথা!

    মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর সাথে ভোটের সম্পর্কঃ
    অনেকের মনে হতে পারে মোদির মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর নীতি-পদক্ষেপের সাথে ভোটের সম্পর্ক কী? আমরা বোধহয় বাড়িয়ে দেখছি ব্যাপারটাকে। তা অবশ্যই না। ভারতে এখন রাজ্য নির্বাচন চলছে পাঁচ রাজ্যে যেখানে সবচেয়ে বড় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যও আছে। কত বড়? ভারতে কেন্দ্র সরকার গড়তে মোট ন্যূনতম ২৭২ আসনে জিততে হয়। এই ২৭২টার ৮০ আসন সংগ্রহ করা সম্ভব একা এই উত্তরপ্রদেশ থেকেই, যার মানে ২৭২ এর প্রায় তিনের এক ভাগ আসন পেয়ে যাওয়া। একারণে বলা হয়, কেউ কেন্দ্রে সরকার গড়তে চাইলে উত্তরপ্রদেশে জেতা গুরুত্বপূর্ণ’ যদিও এখন যা চলছে তা কেন্দ্রের নির্বাচন না; রাজ্য নির্বাচন। কিন্তু এখন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচনে জিতলে তবেই না ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্বাচনেও  উত্জেতরপ্তারদেশের আশি আসনের বেশির ভাগ পাওয়া সম্ভব! একারণে এবারের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মোদি মুসলমান কোপায়ে যেকোনোভাবে জিততে মরিয়া!

    ঘটনার কেন্দ্র কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলনঃ
    এই প্রথম এটা রেকর্ড যে, একটা কৃষক আন্দোলন ১৫ মাস ধরে লাগাতার ভারতের হাইওয়ে রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করে শেষে জয়ী হয়েছে। দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের সংযোগ হাইওয়ে সড়কের মুখ্য শহর গাজিপুর। এটাই ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। হিন্দু জাতিবাদী আনন্দবাজার পত্রিকাও একে ‘ধাত্রীভূমি’ [ইতিহাসের ধাত্রীভূমিতে কি ক্ষতির আশঙ্কায় বিজেপি? ] বলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। এঅঞ্চলটাকে ‘পশ্চিম উত্তরপ্রদেশও’ বলা হয়। এটাই মোদির জন্য কাঁটা বিছানো ভূমি। এখানে মোদি হাঁটলে পায়ে কাঁটা বিঁধবে খালি। অথচ বিরোধী অন্যদের বেলায় হবে উল্টোটা। দিল্লিসহ এ অঞ্চলের আবহাওয়া হল – গ্রীষ্মে যত তপ্ত গরম, শীতকালে ততই শীত। অথচ এখানেই ১৫ মাস ধরে অনেকেই বউ-সংসার সাথে নিয়ে রাস্তায় বসে-শুয়ে কষ্ট করে গেছেন। শেষে মোদি তাদের সবার কাছে হার স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন, চালু করা তার তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার বা বাতিল করেছেন। কেন?
    এ অঞ্চলটা আশপাশের হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের বাকি যারা বাণিজিক কৃষিকাজ করে থাকেন, তাদের সবার চেয়েও সমৃদ্ধ এবং আসলে অগ্রগামী স্বার্থের বড় কৃষক লোকেদের বসবাসের স্থল। এদের জাট বা জাঠ, ইংরেজিতে জাঠল্যান্ডার বলা হয়; এমন এদের বৈশিষ্ট্য হল – মিনিমাম পাঁচ একর বা বেশি ও উর্বর জমিকে ঘিরে এদের কারবার এবং পাইকারি কৃষিপণ্যের বাজারের  (মান্ডির) বড় সাপ্লায়ার এমন কৃষক এরা। পাকিস্তানের করাচিতে বা কাশ্মিরেও এমন ‘জাঠদের’ দেখা মিলবে। আর তত্ত্বটা হল, যত আরবাইনাইজেশন বা শহুরেকরণ ঘটবে, ততই জাঠ কালচার বড় হবে, তাদের প্রভাব বাড়বে। এরাই ছিল ঐ কৃষক আন্দোলনের মূল আপসহীন অংশ। কিন্তু এমন জাঠ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান জাঠের টেনশন প্রায়ই ঘটে থাকে, হয়েছেও স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা আবার জাঠ ও মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে বুঝে।

    মোদির ২০১৪ সালের প্রথম কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্বাচনের আগের প্রায় এক বছর অমিত শাহ, ‘দা মাস্টারমাইন্ড অব দাঙ্গা’ – তিনি এসে এই উত্তরপ্রদেশে কাটিয়েছেন। তারই পদক্ষেপে মুজাফফরনগরে তিনি পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন, যার নগদ পরিণতি হল জাঠ-মুসলমান শত্রুতাকে চরমে তোলা, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। আর সেটারই ব্যালট ফলাফল ছিলল, ২০১৪ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট কেন্দ্রিয় ৮০ আসনের ৭২ আসন মোদির ব্যাগে। এমনকি অমিত শাহের এই ‘শত্রুতা’ বিক্রি করেই বিজেপি পরে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বা ইউপি রাজ্য নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছিলেন।  এবং পরে ২০১৯ সালে মোদির দ্বিতীয়বার সরকারের আসার জয়ও সম্পন্ন করেছিলেন, একই জাঠ-মুসলমান বিভক্তির কাধে চড়ে। কিন্তু এবার আর নয়। কেন?

    এরই মধ্যে এবার এই জাঠ ও মুসলমান একযোগে মোদির বিরুদ্ধে রাস্তায় কৃষি আন্দোলন করে ফেলেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। আর এতেই মোদি মাফ চেয়েও যে এই বিরোধী ঐক্যের পাথর সরাতে পারবেন না, তা জেনেও যতটা যা করা যায় মনে করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে মাফ চেয়েছেন। আর তার একমাত্র করণীয় করেছেন যে মুসলমান কোপানো আর বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো তুঙ্গে তোলা প্রবলতরভাবে তা সম্পন্ন করতে গেছেন, আর এখান থেকেই বাড়তি হিজাব বিতর্ক। স্কুলের ছোট বা টিন-এজ মেয়েগুলোকে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে অপমানের অভিজ্ঞতায় অবলীলায় ডুবিয়ে দেয়ার এই নিষ্ঠুরতা।

    ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫৮ ও ৫৫ আসনের এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে; বিশেষ করে প্রথম ৫৮ আসন – এই-ই সেই জাঠ অঞ্চলের। মোদির ভাগ্য এখানেই নির্ধারিত হবে। তবে এর ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১০ মার্চ। যদিও এরই মধ্যে আগাম মিডিয়া পূর্বাভাস মোদির বিরুদ্ধেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ওআইসিকে বলে সাম্প্রদায়িক!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    গৌতম দাস

    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3UR

     

                                            Lata Mangeskar (1929-2022)

    _

    সমাজ কোনো ব্যক্তির গুণাবলিকে তুলে ধরতে সহায়তা করে থাকে, তার ভাল গুণ থাকলে তা ফুটিয়ে তোলার কাজটা করে থাকে। উল্টা করে বললে, সমাজের ওপর ভর করেই ব্যক্তি ফুটে ওঠে, ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে। এমনকি তার গুণের উচ্চতা যদি অনেক উপরের হয় তাতে অনেক সময় তার বড় কিছু ত্রুটি যদিও ওই গুণের উচ্চতার নিচে-আড়ালে চলে যায়, তবু এসব অর্থে আমরা বলি, ব্যক্তিত্ব সমাজের সৃষ্টি।

    আবার কোন কোন ব্যক্তিত্ব তার ভাল-মন্দ যাবতীয় গুণ ও ত্রুটিসহই কখনও সমাজের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তেমনি এক ব্যক্তিত্ব সম্ভবত গত আট যুগের বিখ্যাত গায়িকা লতা মঙ্গেশকর। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার কেরিয়ার বা পেশাদার গায়িকা জীবনই অনেক লম্বা, প্রায় ৭২ বছর। এক মারাঠি পরিবারে জন্ম নেয়া লতার পেশাদার গানের জগতে প্রবেশ বা প্রথম তাঁর গলায় সিনেমার গান  রেকর্ডিং বলা হয় ১৯৪৮ সালের আশপাশের সময়ে। ব্রিটিশ-ভারত মানে অখণ্ড ভারত থাকার সময় থেকেই ভারতে সিনেমা – এই নয়া মিডিয়ার জন্ম হয়েছিল। তাতে নির্বাক-সবাক হয়ে চলচিত্রের উত্থানের শুরুর কালেই লতার আগমন। তবে এই সিনেমা নির্মাণ যখন নিজের জন্যই একদিকে নিজের বোদ্ধা দর্শক ও প্রশংসাকারী জড়ো করছে আর অন্য দিকে টেকনিশিয়ানগোষ্ঠী তৈরি করে সাজিয়ে বসতে শুরু করেছিল ততদিনে দেশ ভাগ হয়ে যায়। তবু ভাগ হওয়া আজকের তিন দেশে ভারতীয় সিনেমার প্রতি আগ্রহ ভাগ হয়ে যায়নি বা কমে যায়নি।

    সম্ভবত এর মূল কারণ  কমন অরিজিনের এক সাংস্কৃতিক বন্ধন; এ’তিন দেশের সংস্কৃতির মৌল উৎসগুলো একই জায়গার। এথনিক অর্থে মানুষ মাত্রই তার জাতিগত পরিচয় থাকে। আবার আমরা কোনো না কোনো সিভিলাইজেশনের অন্তর্গত থেকে বড় হই। এই বিচারে আমরা সবাই সিন্ধু সভ্যতার অংশ। তাই সিভিলাইজেশন অর্থে এর একই এথনিক জাতি পরিচয় আমরা তিন দেশেরই কমন বৈশিষ্ট্য। সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রাচীন ভারতের যত প্রকাশ দেখা যায় বা এ সম্পর্কে জানা যায় এর এক বড় চিহ্ন হল সংস্কৃতিতে গানের ধারা এবং ধরনগুলোর স্টাইল ও বৈশিষ্ট্য। যেমন আমাদের এই গানের ধারা পশ্চিমের সভ্যতার কোন ধারা অথবা আরব বা মেসোপটেমিয়ার ধারাও হওয়ার কথা নয়। প্রাচীন ভারত বলতে গেলে এর দাবিদার আমরাও কারণ এর বহু চিহ্নবৈশিষ্ট্য আমরা এখনো বহন করি। যেমন একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এর কেন্দ্রে আছে; এমন এক চিহ্ন সম্ভবত রাগসঙ্গীত ও এর ঘরানা মানে স্কুলগুলোতে যার প্রকাশ। তাই সভ্যতার চিহ্ন হিসেবে ক্লাসিক মিউজিক একটা খুবই শক্ত চিহ্ন হয়ে আছে। তবে এখন পলিটিক্যালি ডিভাইডেড দেশ তিনটাতে সভ্যতার রূপ-পরিণতিতে কী কী রূপ নিয়ে প্রকাশিত আছে, সেখানে অর্জনগুলো কেমন কী, আর তা কে কত অবিকশিত অর্থে ছোট বা বড় এসবের বিচারের ক্ষেত্রে তুলনায় ফারাক যতই যা নজরে আসুক, ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সংস্কৃতিতে গানের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন একই।

    কোক স্টুডিও-এর যুগেঃ
    গত ১৯৪৭ সাল থেকে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের গানের ভিত্তি এক হওয়া সত্ত্বেও আমরা কে কেমন কতদূর বিকশিত হয়েছি, অর্জন করেছি তা এক সহজ তুলনা করে বুঝার উপায় হতে পারে এমন কিছু সম্ভবত এখন এসে গেছে। সেটা হল কোক স্টুডিও।
    এখানে স্টুডিও বলতে মূলত গানের রেকর্ডিং স্টুডিও। অর্থাৎ রসুইখানা যেখানে ফাইনাল প্রডাকশনটা তৈরি হয়েছে। আর কোক বলতে বহুজাতিক পানীয় প্রস্তুত কোম্পানি ‘কোক’ এর কথাই বলা হচ্ছে, অবশ্যই। তবে এখানে এর ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করা সূত্রে যতটুকু; যাতে জোগানো তাদের অর্থের বিনিময়ে এই গানের তৎপরতা ও প্রচারের সাথে জুড়ে থাকার সুবিধায় কোক কোম্পানিও প্রচার ও প্রসার পায়। এ’থেকেই নামের ব্রান্ডিং  আর সেই ব্রান্ড নাম ও শব্দটা হয়ে দাঁড়ায় কোক স্টুডিও।

    এর শুরু ২০০৮ সালে পাকিস্তান থেকে। সাধারণত এমন গানের আয়োজন মানে, সংস্কৃতিতে গান এই শিল্পকলা সৃষ্টির আয়োজনে এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব লাগে। আর তাঁকে  অর্গানাইজার বা সংগঠক হতে হয়; আর তাঁকে গানের ও সমাজের এমন দুই অর্থেই সংগঠক হতে হয়। অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, কোক স্টুডিওতে এমন সংগঠক যারা হচ্ছেন  তাদের টেকনিক্যাল গুণ হল তারা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড বা মিস্কিং ইত্যাদি এসব অন্তত বুঝেন ভাল; আর সাথে সেন্স অব মিউজিক। স্বভাবতই তা নিশ্চয় পশ্চিমা-কালচারাল গানের বোধ বুঝাচ্ছি না। সেটা থাকলে তা বাড়তি ভাল, তুলনা করে তাঁরা নিজের বোধগম্যতা বাড়াতে পারবেন। কিন্তু মূল জিনিস হল, নিজের এথনিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও ইতিহাস সম্পর্কে একটা ভালো রকমের বোধ থাকতে হবে।

    পাকিস্তানে গত ২০০৮ সালে পাকিস্তান-কোক-স্টুডিও শুরু হয়েছিল এমন যে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বের হাত ধরে তার নাম রোহেইল হায়াত [Rohail Hyatt]। গত ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানে গানের কম্পোজার হিসাবে  তাঁর আগমন; এসে পাঁচবছরের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করেছিলেন, বলা হয়। এরপর নানা এলবামে কাজ করার পর তার উল্লেখযোগ্য  সব ছাপিয়ে গুরুত্বের কাজটা হল কোক স্টুডিও, এই প্রডাকশন।  এখানে পাকিস্তান সমাজের কাদের কাদেরকে বেছে তুলে এনে রোহেইল তাঁর গানের ধরন ও বৈচিত্র্য বা কম্বিনেশনের ডালি সাজাচ্ছেন তা লক্ষণীয়। সে দিকটা খেয়াল করলে তার ওজন বুঝা যাবে। পাকিস্তান কোক স্টুডিও-এর সফলতার তিন বছর পরে ভারতে একই আইডিয়াতে ইন্ডিয়ান কোক স্টুডিও শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে; দক্ষিণী কম্পোজার বা সুরকার লেসলি লুইসের [Leslee Lewis] হাত ধরে। আরেক দক্ষিণী গায়ক হরিহরণকে সাথে নিয়ে ১৯৯৬ সালে তার বহুল আদর পাওয়া অ্যালবামের নাম “কলোনিয়াল কাজিন”। তরুণদের টিভি এমটিভি এর কল্যাণে,  এ’নামেই লুইসকে বেশি মানুষ চেনে।

    দুই কোক স্টুডিও-এর তুলনা আমাদেরকে আমাদের একই প্রাচীন উৎস এবং একই সাথে আমাদের ভিন্নতা সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারে, পরিচয়  করাতে পারে। আগেই বলেছি অবিভক্ত ইন্ডিয়ান ধারার সংস্কৃতিতে এক বড় কমন চিহ্ন হল ক্লাসিক মিউজিক যা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় আমাদের কালচারাল উৎস একখানে। ক্লাসিক গান বা রাগ-প্রধান গান শুনে সচেতনরা ছাড়া অন্যদের বোঝা মুশকিল হতে পারে যে, সেটা ভারত না পাকিস্তানের উপস্থাপন।

    কিন্তু এরপর যদি ভারত-পাকিস্তান কোক স্টুডিওর মধ্যে ফারাক – মানে কে কোন দিকে গেছে বিকশিত হচ্ছে অভিমুখ কী তা তুলনা করে বুঝতে চাই তা হলে, ভারতের কোক স্টুডিও দেখে বোঝা যাবে ভারতের গানের জগত বাণিজ্যিক ভিত্তি খুঁজে নিতে পেরেছে। বাণিজ্যিক ভিত্তি বলতে “মডার্ন ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি” জগতের ভারত যার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হল ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমা। অর্থাৎ ভারতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ইন্ডিপেনডেন্ট অর্থে স্বাধীন নয় বরং তা  এক সিনেমা জগতকেন্দ্রিক। ফলে ভারতীয় কোক স্টুডিওতে এর গান, অর্জন ও পারফরমেন্সে এটা মডার্ন এবং সিনেমাকেন্দ্রিকতার ছাপে ভরপুর।

    তুলনায় পাকিস্তান কোক স্টুডিওর বৈশিষ্ট্য হল, সে দেখিয়েছে সে পাকিস্তান এলিট ঘরের কিন্তু গভীর মিউজিক সেন্সের তরুণ যারা পপ বা রক ধরনের মিউজিক থেকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লাসিকে এসে গেছে; তাদেরকে রোহেইল তুলে এনেছেন। কিন্তু সেই সাথে রোহেইল শেষে একেবারে ক্লাসিক কাওয়ালি বা বুল্লেহ শাহকে পর্যন্ত একাকার করে  পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের।  এমনকি বিস্ময়কর এক ব্যক্তিত্ব হলেন সাইন জহুর  যিনি আমাদের মত অক্ষরের-শিক্ষায় জীবন যাপন করেন না। তাঁর ফোনেটিক্যাল মানে শব্দ উচ্চারণের দুনিয়ায় এই মাধ্যমে তাঁর চলাচল। অক্ষর না চিনে নিজের গলার স্বর বা শব্দের উচ্চারণ দিয়ে নিজের জগত গড়েছেন; গানের লিরিক যিনি অক্ষরে দিয়ে না আঁকিবুঁকিতে নোট নেন; তাঁকেও রোহেইল আবিস্কার করে আমাদেরকে পরিচয় করে দিয়েছেন।  পাকিস্তান কোক স্টুডিও আমাদের দেখাচ্ছে পাকিস্তানেরও গানের শক্তিমত্তা কত সমৃদ্ধ কত বিস্তৃত। বুল্লেহ শাহদের আখড়া এখনও কত সক্রিয়, নুসরত ফলে আলীদের ঘরানা এখনও কেমন দাপটের সাথে টিকে আছে। তাঁরা এখনও পাকিস্তানে হারিয়ে যান নাই, নিজের মত সারভাইবালের স্ট্রাগল করে হাজির থাকার চেষ্টা অরে যাচ্ছেন।
    তবে একই ক্লাসিক কালচারাল অরিজিনের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গানের শক্তিমত্তার দিক থেকে পাকিস্তান সম্ভবত এগিয়ে কিন্তু আবার এই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ক্ষেত্রে, বাণিজ্যিক ভিত্তি দেয়ার ক্ষেত্রে ভারত অতুলনীয় উঁচুতে উঠে গিয়েছে। যে ভারতে শিল্পকলার মুখ্য বা ফোকাস ইন্সটিটিউশন যদিও ঠিক গান অথবা নাটক থিয়েটার নয়, সিনেমা। ফলে কাউকে বা কারও অর্জন ফেলে দিবার নয়! স্বভাবতই এ কারণে দেশগুলো যার যার বাড়তি সুবিধার বা অর্জনের দিক অথবা অসুবিধা বা অবিকশিত নেতিদিকও অবশ্যই আছে ও তৈরি হয়েছে।

    কেন লতার আলাপের মধ্যে এদিকে এত দূরে এলামঃ
    মানুষের আবেগ-অনুভূতির ওপর দাঁড়ানো মানুষের শিল্পকলা বা ক্রিয়েটিভিটি [creativity] চর্চার দিক – সাধারণভাবে দেখলে মানুষের জীবনে একটা পেশা খুঁজে পাওয়া বা নেয়া যতটা কঠিন, ক্রিয়েটিভিটির জগতে এটা তার চেয়েও কঠিন।  মানুষের শিল্পকলা-বোধের জন্ম থেকেই এটা এমনই কঠিনতর।  তাই, জন্ম থেকেই শিল্পকলা-বোধের আদি লড়াই হল খোদ নিজ নিজ বিষয়-আশয়ের জীবনের সাথে। সোজা বাংলায়, পেটের সাথে। কেউ যে শিল্পকলা চর্চায় লিপ্ত হবে তো খাবে কী অথবা কে তাকে খাওয়াবে এই হল সেই মুখ্য প্রশ্ন। এটাকেই আরেক শব্দে প্রকাশ করতে বলা হয়”পৃষ্ঠপোষকতা” কে দিবে? মানে কার অর্থে ‘পেটের চিন্তা’ না করেও নিশ্চিন্তে শিল্পকলা চর্চায় ব্যস্ত হওয়া যায়? কোন যুগ-কালেই এই প্রশ্নের কোন জবাব কেউ দিতে পারে নাই। কারণ এর সমাধান নাই। তাই পায় নাই সেকালেরও শিল্পকলা-বোধের মানুষেরা……।

    অতএব, এই প্রশ্নে শিল্পকলা সব সময় একটা আপস করেই এপর্যন্ত চলে এসেছে বা টিকে গেছে, আছে। যেমন সেটা হল, যদি সেটা রাজ-রাজড়ার আমল হয় তো রাজাদের স্তুতিমূলক গানের  তৎপরতা কেটেছে। যেমন রাজ-বন্দনামূলক গান।  আর এটাকে বলেছি রাজ- পৃষ্ঠপোষকতা। অথবা অন্যদিকে ফিরলে আমরা পাই মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটানোর গান, ভক্তিসঙ্গীত, ভজন, কাওয়ালির ধরনে চলে যাওয়া। আর এখান থেকে গণমানুষের দান, ভালোবেসে দান, এমন সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতায় বেঁচে থাকা। কিন্তু এখানের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল – এই ধারা আরো খুবই সিরিয়াস ক্লাসিক্যাল ধারা।  যেন শ্রেফ ভাল পৃষ্ঠপোষকতা নয়। সে সবকে ছাড়িয়ে মোক্ষলাভের জন্য সে মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটাতে হাজির হয়েছে। নিজ আত্ম-ক্ষুধায় গানের ভিতর দিয়ে সে কোন একক স্পিরিটে পৌছানোর কসরত করছে!! এমনকি জমিদারির কালে, বাঈজি জীবনের মধ্য দিয়ে ক্লাসিক গানকে টিকে থাকতে হয়েছে। সেকালে এমন আরেক রূপ করাচিতে দেখা যেত ‘মুজরা’ বসানো…।  শিল্পকলায় স্ট্রাগল-এর কোন শেষ নাই…।

    বলা হয়, আসলে যা “মনের থেকে” ভাল লাগে তার “দাম” [beyound value] হয় না। আবার উল্টা দিকটা হল যে ব্যক্তি এটা শিল্পকলা-বোধে  ‘সৃষ্টি’ করে আপনার সামনে হাজির করেছে তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন কী করে, সে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকবে কী করে? তাই একটা বিনিময় মূল্য তাঁর অবশ্যই লাগবে। এই প্রশ্নও কম জরুরী নয় বরং  আরেক ভাইটাল প্রশ্ন! যার জবাব দিতে হবে বা পেতে হবে!

    আর বাণিজ্যিক সম্পর্কের যুগে এরই এক ধরণের আপাত সমাধান হল, পেশা হিসেবে শিল্পকলার যেকোনো এক শাখায় এতে পেশাদার পারফরমার হিসেবে একদিকে শিল্পকলার চর্চা, অন্যদিকে পেটের চিন্তার সমাধান পেতে হবে বা ব্যবস্থা করতে হবে ও হয়েছে। তবে বলাই বাহুল্য, এই বাণিজ্যিক সমাধান – এটাও এক বড় কম্প্রোমাইজ। জন্ম থেকেই কোন আপোষ করা ছাড়া কোনো শিল্পকলা চর্চা নাই, ঘটে নাই। মানে, মানুষের শিল্প-চিন্তার প্রকাশ সেটাকে “বেচাবিক্রির বস্তু” করতেই হয়েছে। আর বেচাবিক্রির বস্তু  না করে কেমনে নিজের ভরণ-পোষণ হবে – সেই প্রশ্ন  এড়িয়েই শিল্পকলাকে এই আপস করেই  নিজেকে বাস্তব করে চলতে হয়েছে। তাই একেই শিল্পকলা আছে – বলা যাচ্ছে!

    এ ব্যাপারে ভারতে যে বিকাশিত রূপটা হাজির হয়েছে সে দিকে তাকিয়ে বললে ভারতে শুধু বা মূলত গানকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা দাঁড় করানোতে যায়নি। বরং আরেকটা আরো বড় মাধ্যম তৈরি করে নিয়েছে; আর এটাই হল সিনেমা জগত। আর সিনেমারই এক গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ হতে পেরেছে বলেই গান এই শিল্পচর্চাটা টিকে গেছে ও আছে, সিনেমার আরেক শিল্পকলা রূপ হিসেবে  গান সাথে জুড়ে গিয়েছে। তাই এখন এভাবে বলা যায়, বাণিজ্যিক সিনেমার ভেতর দিয়ে টিকে আছে ক্লাসিক মিউজিক। তবে ঠিক ক্লাসিক রূপে না, মডার্ন মিউজিক হিসেবে।
    এখন অলক্ষ্যে এ দুইয়ের সম্পর্কটা বলে রাখা যাক। সেটা হল ক্লাসিক মানে ব্যাকরণসম্মত দিক এবং যা ভিত্তিমূলক দিক – শুধু তাই না। যেকোন ক্লাসিক দিকের মর্ম উপলব্ধি করতে গেলে “বোদ্ধা ট্রেনিং” থাকা লাগবে। এপ্রিশিয়েশন [appriciation] বোধ হুশ-জ্ঞান লাগবে। সেটা না জানলে প্রশংসা বা মূল্যায়ন করা যায় না – এই হল সুত্র।  কিন্তু আবার আরেক সমস্যা হল কাজটা ক্লাসিক হলেও তা হাজির করতে হবে সাধারণ্যে এবং তা জন-সাধারণের বোধের সীমায় পৌছে দিয়ে। অন্যভাবে বললে তত্ব নয় ব্যবহারিক রূপ লাগবে। আর সেটাই ব্যবহার দক্ষতায় ব্যবহৃত ও সৃষ্ট নতুন রূপটা আম আদমির সামনে পেশ-প্রদর্শন করে তাদের কোনো না কোনো বোধগম্যতায় তা আনা; আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে আনন্দ-মজা দেয়া; সাধারণের জীবন অসংখ্য টেনশনের জীবন – সেটাকে রিল্যাক্স করার বা স্ফুর্তি জাগানো যার লক্ষ্য  – এই রূপটাই আধুনিক গান। সেকারণের যার গানের ক্লাসিক দিক নিয়ে নুন্যতম বোধ অভিজ্ঞতা আছে সেই  ফিরে আধুনিক গানে ভালকিছু করতে পারবে ও দীর্ঘযাত্রায় টিকে যাবে।

    তাহলে লতা মঙ্গেশকর আমাদের কে?
    সাধারণভাবে বললে, এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতায় অরিজিনে মিল অর্থে এখনকার ভারত আসলে আমাদের এক কাজিন যেন; চাচাত-মামাত ভাই-বোন যেমন। যদিও একই ব্লাড, ডিএনএ ইত্যাদি আমাদের। তবুও আপনার কাজিন আপনার চেয়ে বহু ও বেশি গুণে গুণান্বিত হতেই পারে। আবার আপনার থেকে খারাপ এবং কদর্যও হতে পারে। কিন্তু ‘কাজিন’ বলছি কেন? মূল কারণ এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতাগত মিল ও একই হবার কারণে।

    এখন ভারতেই কেবল শিল্পকলা প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পেরেছে – মুম্বাইভিত্তিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বা বাণিজ্যিক সিনেমা রূপে। আরই এরই বগলে লেগে ঝুলে হাটছে গানের চর্চা। আর লতা মঙ্গেশকর হলেন ওই গানের জগতে টানা এক ৭২ বছরের পেশাদার। ব্রিটিশ-পিরিয়ড থেকে একাল পর্যন্ত কালদর্শী একজন পেশাদার।

    কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও লতার সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? এনিয়ে আগেই বলেছি শিল্পকলার প্রধান শত্রু হল শিল্পীর ব্যক্তি-বৈষয়িক জীবনের চাহিদা। জীবনে বৈষয়িক চাহিদার মিটানোর উপায় কী হবে তা না খাড়া করে শিল্পকলা চলতে পারে না। ফলে একদিক থেকে বললে এটা  এটাকে পেশা হিসাবে নেয়া মানে তা শিল্পকলার আপোষ, আবার অন্যদিক থেকে বললে এটাই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা ও সুযোগ এবং সম্ভবত একমাত্র সম্ভাবনা। আমাদের এই তিন দেশের মধ্যে ভারতই বাণিজ্যিক সিনেমা এই মিডিয়াকে সফলভাবে শিল্পকলা-সংশ্লিষ্ট মানুষদের পেশা হিসেবে নেয়ার এক স্থিতিশীল ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করতে পেরেছে। আর এই এক্সপেরিমেন্ট যখন শুরু হয় সেটাকে বলা যায় ১৯১৩ সালের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র যা পরে আরো বিকশিত হয়ে হয় ১৯৩১ সালের সবাক চলচ্চিত্র হয়েছে।

    আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হল, এক সময়ে আমরা সবাই অবিভক্ত ভারতের অংশীদার ছিলাম বলে ওর সব অর্জন ও ব্যর্থতারও ভাগিদার ছিলাম। ফলে সিনেমার এই শিল্পকলার বিকাশে মুখ্য ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অবিভক্ত সবার সাথে সে সময়ের পূর্ববঙ্গের বুঝমানেরাও প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিল। নিজের শিল্পকলার ভবিষ্যত খুঁজে ফিরেছিল।

    সে আগ্রহ দেশভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে পরেও থেমে যায়নি। কারণ আগ্রহটা আমাদের কালচারাল ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা পাকিস্তান-বাংলাদেশ (পূর্ববঙ্গ) হয়ে গেলেও রাজনৈতিক বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে যতটা সম্ভব পরস্পর কালচারালি কানেকটেড থাকার চেষ্টা করেছিলাম আমরা, যা স্বাভাবিক। ফলে সেই ঐতিহ্যের স্মরণ থেকেই একালে লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান পর্যন্ত; তাঁর  শোকবার্তা প্রেরণ খুবই ভ্যালিড ও স্বাভাবিক এক তৎপরতা। অবশ্য এর আরো একটা বড় কারণ ‘স্মৃতি’।

    স্মৃতি মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়ঃ
    বড় কারণ ‘স্মৃতি’, যা আমাদের তাড়া করে অনেকেই লক্ষ্য করেছেন হয়ত, ছোটবেলায় শোনা অনেক গান দু-একটা যা তখনই খুব অপছন্দ লাগত ফলে কম বা না শুনতাম আমরা হয়ত ব্যক্তিগতভাবে। অথচ আজ বড় হয়ে ধরা যাক সাবিনা ইয়াসমিনের সেই গান যা আমার অপছন্দের গান সেটাই খুব ভালো লাগছে! কেন, এর কারণ কী? এর কারণটা অদ্ভুত!! মানুষ পরিণত বয়স হলে তখন আমরা আর শুধু গান শুনি না। কোন ভেসে আসা গানশুনার সাথে সাথে আমরা তরুণ বা ছোটবেলার সেসব সময়ের টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতি মনে ভেসে উঠতে থাকে। আর এতে গান ছাড়িয়ে ওই স্মৃতিতে ডুবে যাই আমরা। অসংখ্য খারাপ বা ভালোর সুখবোধ আর ওদিকে হয়ত লজ্জা কিংবা অপরাধবোধ, মিলবার আকুতি ইত্যাদি জেগে ওঠে। নস্টালজিক ক্ষোভ হতাশা ফ্যান্টাসি ইত্যাদি সব এসে মাথায় ভিড় করে। আর ভালো লাগাটা মূলত ওখান থেকে। ফলে সাবিনার সেটা ধীর-লয়ের গান ছিল বলেই হয়ত টগবগে তরুণ বয়সে যেটা ভাল লাগেনি, সরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু পরিণত বয়সে স্মৃতির গুণে  সেটাই এখন মহার্ঘ্য হয়ে উঠতে পারে। অতএব গানের আরেক নাম এখানে গভীর স্মৃতি! লতা আমাদের স্মৃতির আরেক নাম!

    তাহলে একালে লতার গান কথার আসল মানে হল আমাদের পুরনো সেসব দিনের ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখের খুটিনাটি স্মৃতি। আমরা ভাগ হয়ে ছিটকে তিন দেশে পড়েছি কিন্তু লতার গান হল আমাদের পুরান সেসব স্মৃতির গ্রন্থি-কার। বুনে বুনে যে আবার তা জোড়া দেয়!!! মোটামুটিভাবে বললে, পঞ্চাশ তো বটেই ষাটের দশক পর্যন্ত আমরা ভারতের  সিনেমাকেন্দ্রিক পেশাদার শিল্পকলার যে উত্থান তার খবর নিতে পেরেছিলাম। এরপর থেকে রাজনৈতিক বিবাদ অনেক ভারী হয়ে যায়, প্রজন্মও বদলে যায়। স্মৃতি ফিকে হয়ে আসতে থাকে। তবু যাদের বয়স এখন ষাট বা এর বেশি তাদের স্মৃতিতে এখনও ভারতীয় সিনেমা বা লতা বাস করে, এটা কম কথা নয়!

    তবু ঠিক কেন লতা মঙ্গেশকর আজ এখানে প্রসঙ্গঃ
    লতা আজ এখানে লেখার প্রসঙ্গ হলেও এনিয়ে আরো কিছু কথা আছে। তবে সেসব অন্যদিকের কথায় এখন যাব…।
    এটা এখন সবাই স্বীকার করে নিয়েছে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক তৎপরতায় বাকি মহাদেশকে ছাড়িয়ে এশিয়াই প্রধান গ্লোবাল কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই কথাটা মাথায় খেয়াল রেখে  আরো অনেক কিছু দিয়ে আমাদের প্রভাবিত করতে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক ফেলো মাইকেল কুগেলমানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে; যিনি আমেরিকান ফরেন পলিসি নামের ম্যাগাজিনে এশিয়ার ঘটনাবলি প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক নিজের এক কলাম লিখে থাকেন। কুগেলমানের এবারের প্রসঙ্গে দেখি, লতা মঙ্গেশকর উঠে এসেছে  [Lata Mangeshkar Was a South Asian Icon]। তবু গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু তাঁর একটা শুরুর বাক্য ছিল এমন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার কাছে কমন কিছু ব্যক্তিত্ব হয়ে হাজির হওয়া সহজ নয়। কিন্তু লতা হয়েছেন, এধরণের সেই বাক্যটা। তবু তার ব্যাখ্যাটা পূর্ণ মনে হয়নি। কুগেলম্যান লিখেছিলেন…  “Her music united a region that has few shared heroes and often struggles to come together around common causes.”  অর্থাৎ লতা নাকি এই অঞ্চলকে (তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন আমাদের তিন দেশ) ঐক্যবদ্ধ করেছেন যেখানে আমাদের কমন হিরোর সংখ্যা খুবই কম আর একই কারণে একমতে ও একসাথে হবার উদাহরণ অনেক কম।

    কুগেলম্যান  কথাগুলো আনাড়ির মত বলেছেন, আর জোর করে মিলিয়ে বলেছেন। ফ্যাক্টস হল, ঠিক লতা মঙ্গেসকর আমাদের তিন দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেন নাই। উপরে এতক্ষণ সেকথাগুলোকেই খুঁড়ে বিভিন্ন দিক থেকে তুলে এনে বলার চেষ্টা করেছি। যার সারকথা হল, আমরা তিনদেশ লতার পেশাজীবন শুরুর পরে একটা বড় সময় পর্যন্ত একদেশ হিসাবেই ছিলাম। এবং এখনও সাংস্কৃতিক অরিজিন হিসাবে আমরা একই রূট শেয়ার করি। শত রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও লতা  অবশ্যই আমাদের শেয়ারড লাইফের এক প্রতীক। কিন্তু কোথায় আমরা ঐক্যবদ্ধ? এটা তো না থাকলেও জোর করে কাউকে খুশি করার জন্য বলার বিষয় নয়। বাস্তবতার কথাটা বললে অসুবিধা কী? এদিকটা তিনি না জেনে উলটা ব্যাখ্যা করতে গেছেন। তাই এখন নিচে আমরা দেখব আমাদের রাজনৈতিক ভিন্নতার শুরু কোথা থেকে, যেটা কুগেলম্যানের বুঝাবুঝিরই বাইরে…।

    কুগেলম্যান আমাদের তিন দেশে ভাগ হয়ে যাওয়া এবং এখনো তা নিয়েই আমাদের মধ্যে বড় রাজনৈতিক মতবিরোধে জড়িয়ে থাকাকে ইঙ্গিত করছেন?  অথচ তিনি লতার হিন্দু মহাসভা, আরএসএস বা বিজেপির মোদির প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য অনুভব করার দিক নিয়ে বেখবর।  আর স্বভাবতই এ নিয়ে লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তি রাজনৈতিক মতামত বা পছন্দের প্রশ্নে তাঁর হিন্দু-মহাসভা থেকে উঠে আসা আরএসএস-বিজেপি মোদির প্রতি ভালোবাসা আবেগ দেখানো; ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে  মোদি যেন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন সেই দোয়া-কামনা পাবলিকলি প্রকাশ করা থেকে শুরু করে, অবলীলায় বাবরি মসজিদ ভাঙার পক্ষে গান গেয়ে দিয়ে অংশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আমার মনে পড়া থেকেই তো এটা সবদিক থেকে লিখতে তাগিদ অনুভব করেছি।

    আমি আগেও অনেকবার বলেছি, রাজনৈতিক চিন্তায় একটা খামতি কত যুগ ধরে আমাদের তিন দেশকে গর্তে ফেলেছে এর আদর্শ উদাহরণ, এমন ব্যক্তিত্ব হলেন রাম মোহন রায়। গত ১৮১৫ সালে তার ‘আত্মীয় সভা’ নামে পাঠচক্র(?) থেকে (ব্রাহ্মণ নয়)  ব্রাহ্মধর্ম প্রচলনের প্রস্তাব করেন তিনি। সেখান থেকে ব্রাহ্মসমাজ গড়া শুরু করা এটাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। তিনি ভুল অনুমানে বুঝেছিলেন, ব্রিটিশরা একাট্টা অ্যাঙ্গলিকান বা ইংলিশ-ক্যাথলিকভিত্তিক এক ‘জাতি’ বলেই নাকি তারা মডার্ন ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র হতে পেরেছে। কাজেই ভারতকেও জাতি-রাষ্ট্র হতে হলে আগে একেও এক জাতি হতে হবে। তাই এক ‘ব্রাহ্ম-জাতি’ হয়ে নিতে হবে আগে। কারণ তাঁর অনুমান আমাদের অবিভক্ত ভারতে সনাতন ছাড়াও মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মও আছে। এর চেয়েও বড় বিষয়, হিন্দুধর্মেই অগুনতি জাতিভেদ বর্ণপ্রথা আছে। কাজেই আগে সবাইকে এক ধর্মে এনে নিতে হবে। নাহলে জাতি-রাষ্ট্র গঠন করা যাবে না। এই হলো তাঁর বোঝাবুঝিতে প্রধান ও পরিপুর্ণ ভুল অনুমান। আর এই ভুলের উপর দাঁড়িয়ে তিনি ব্রাহ্মধর্ম প্রচলন করে নিতে হবে বলে এক পূর্বশর্ত আরোপের কারণ। তবে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটা আমাদের মনে রাখতেই হবে, ভারতীয় কমিউনিস্ট ইতিহাসের চোখে, তাদের লিখিত ইতিহাস অনুসরণের ব্যাখ্যায় রামমোহনই নাকি কমিউনিস্টদের কথিত “বেঙ্গল রেনেসাঁ’র আদিগুরু”।

    পরবর্তিতে এর আঠারো বছরের মধ্যে রামমোহনের মৃত্যু হয়, আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্মসমাজ তিন টুকরা হয়ে ওই ব্রাহ্ম প্রকল্প অকেজো হয়ে যায় যদিও তা পরে উনিশ শতকেও কেবল টিকেই ছিল। কিন্তু অকেজো হয়ে যাওয়ার পর থেকে বা বলা যায় এ সুযোগে নতুন তত্বকার বা অভিমুখ দাতা হয়ে আসেন কপালকুন্ডলার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনিই যুক্তি সাজান যেহেতু ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে, তাই বিকল্প হিসেবে হিন্দু-জাতির ভিত্তিতে ভারত জাতি-রাষ্ট্রের সংশোধিত প্রকল্প নেয়া হোক। আর এর ভিত্তিতেই পরে কংগ্রেস দলের জন্ম দেয়া হয় ১৮৮৫ সালে। পরিণতিতে ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগের জন্ম। আর ওদিকে কংগ্রেসের চেয়েও আরো কট্টর উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী দল হিসাবে তৈরি হয় হিন্দু মহাসভা যেটা আরএসএস-বিজেপির আদি বা পুর্ব সাংগঠনিক রূপ।

    এখন লতার পছন্দ এই আরএসএস-বিজেপির মোদির রাজনীতি। কিন্তু সাবধান, এটা সাধারণভাবে যেমন বলা হয়, যার যা রাজনৈতিক দল পছন্দ সে তা করবে – এটা এমন ব্যাপার নয়। আপনি দেশের আরেক জনগোষ্ঠী-অংশকে কোপাবেন কাটবেন হত্যা করবেন, নির্মুল করে দিবেন – এটা কোনো রাজনীতি?? এই চিন্তা দিয়ে এক ভারতে সবাইকে ধরে রাখবেন কী করে?? এটা তো কারো পছন্দের রাজনীতি হতে পারে না, ফলে এটা সবার পছন্দের গায়িকা হতে চাওয়া কারও পছন্দের রাজনৈতিক মতামত হতেই পারে না। আবার যিনি সমাজের জন্য গান গাইবেন তিনি এমন রাজনীতি ভালোবেসে একই সাথে সুকুমারবৃত্তির চর্চাও করবেন কিভাবে? এটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন, বোধশক্তিহীন চিন্তা ও কাজ।

    ফলে এক দিক থেকে আমরা লতাকে  রাজনৈতিক দিক বাদ বা পাশে সরিয়ে রেখে কেবল আমাদের স্মৃতিগুলোকে রক্ষা করতে তাঁর গান মানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই; আমাদের দায়িত্ব পরিপালন করেছি। আমরা আমাদের স্মৃতির হত্যাকারী তো হতে পারি না, তাই। কিন্তু একই সাথে একই নিঃশ্বাসে লতার চিন্তার অন্ধত্ব, রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রতি বেহুঁশ ভালোবাসা থাকা এটা আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য; সেটাও জানিয়ে রাখতে চাই!

    তবে এটাও সত্য, গানের জগতের বহু বিখ্যাত লোক কিন্তু যারা বুদ্ধিমান তারা তাদের রাজনৈতিক পছন্দ  বাইরে আনেন না। ব্যক্তিগত জগতেই রেখে দেন। মূল কারণ তাদের গান পছন্দকারিরা নানান রাজনৈতিক মতের হতেই পারে্ন। এখন তিনি নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশ্যে দেখিয়ে ওসব পছন্দকারিদের মধ্যে বিভক্তি আনতে পারেন না।   বুদ্ধিমানদের এতটুকু সচেতনতার আছে বলে এজন্য আমরা তাদের নিয়ে ঘাটাতে চাই না।

    কিন্তু লতা মঙ্গেশকর এতই বোধশক্তিহীন যে, তিনি প্রকাশ্যেই তার ব্যক্তিগত দিক পাবলিক করে দেন। এবং বেপরোয়াভাবে হিন্দুত্ববাদে লিপ্ত হয়ে যান। ফলে মানুষের সুবৃত্তি আমল করার অযোগ্য ব্যক্তিত্ব তিনি যা শিল্পকলার সাথে আনফিট! অবশ্য অনেক সময় পেটের দায়ে মানুষ শিল্পকলার জগতে এসে পড়ে, সেটাও ঠিক!

    জুনিয়রদের উঠতে না দেয়াঃ
    আবার ভারতেই লতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের আরেক বড় ও গভীর অভিযোগ হল তিনি নবাগতেরা যেন তাদের কোন প্রতিভায় যেন তারা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠতে না হতে পারেন, এজন্য নিম্নশ্রেণীর আচরণ পদক্ষেপ বারবার তিনি নিয়েছেন।  এপ্রসঙ্গে ভারতের কিছু গায়িকা যেমন সুমন কল্যাণপুর বা অনুরাধা পরোয়াল [Suman Kalyanpur, Anuradha Paudwal] এদের কথা জানা যায়। এসব গায়িকারা যেন গানের গায়িকা বাজারে কাজ না পায় এমন এক একচেটিয়া অবস্থা সৃষ্টি অভিযোগ লতার বিরুদ্ধে বহু পুরানা। এমন শর্ত তিনি প্রযোজক-পরিচালকদের দিয়ে থাকে। অন্যভাবে বললে একটা একচেটিয়ার ব্যবস্থা কায়েম করে সবস্ময় টিকতে চেয়েছেন তিনি। অথচ তার নিজ প্রতিভা তো কম ছিল না! তাহলে তিনি কী নিজের উপর আস্থা রাখতে পারেন নাই? ইন-সিকিউরিটিতে ভুগতেন কেন??
    যেমন  খুব সম্ভবত সত্তর দশের শেষের দিকে্র ঘটনা যতটুকু মনে পড়ে, আমাদের রুনা লায়লাও এর শিকার হয়েছিলেন। একটা সিনেমায় গড়ে পাচটার মত গান থাকতে দেখা যায়। ঐ প্রযোজক পরিচালক রুনাকে দিয়ে তার সিনেমার দুটা গান রেকর্ডিং করিয়েছিলেন। এমনকি সেই গান সিনেমায় ছাড়ার আগেই বাজারেও ছাড়া হয়ে গেছিল। কিন্তু এবার লতা বললেন তিনি বাকি গানগুলো আর গেয়ে দিবেন না। যদি গাওয়াতে হয় তবে সবগানগুলোই (মানে যেদুটা রুনা গেয়ে ফেলেছে  সে দুটা সহ) আবার তাঁকে দিয়েই গাওয়াতে ও রেকর্ডিং করাতে হবে।  প্রযোজক বাধ্য হয়ে সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ফলাফল হল এই যে লতার একচেটিয়ার হাতে গান জিনিষটাই জিম্মি হয়ে থেকে গেছিল।

    এমনকি পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাট রেল স্টেশনে বসে গায়ে গেয়ে  পয়সা তুলে পেটের ভাত যোগাড় করা রানু মন্ডল কিভাবে যেন ঐ গান গেয়েই আধুনিক জগতের টিভি-রেকর্ডিং স্টুডিও পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তাকেও সহ্য করতে পারেন নাই লতা। বলেছেন রানুরা যেন আগে তাঁর গাওয়া বা রেকর্ডেড হওয়া গান কোন না করেন। কেন? তাঁর গাওয়া সব গানের সব ক্রেডিট কী তাঁর একার? সুরকার, লিরিসিস্ট, এরেঞ্জার, বাদকেরা ইত্যাদি আর কারও কোন অবদান নাই?? শেষ বয়সে এসেও এত উদ্ধত কেন? আচ্ছা তিনি যেটা “শ্রদ্ধাঞ্জলি” নামের প্রায় ৪৫ মিনিটের যে এলবামটা বের করেছেন স্টেজে গেয়েছেন সেটা তো চল্লিশের দশকয়ের গান থেকে শুরু করা হয়েছে যেগুলোর বেশির ভাগই তো অন্যের গাওয়া। তাহলে সেগুলো তিনি ফিরে গেয়েছেন কেন? আবার তারই গাওয়া গান অন্যেরা একালে গাইতে গিয়ে কোন নতুন নোট লাগানো এবং উপযুক্ত কারিশমায় গায়কিতে তা উপস্থাপন কী করা যায় না – এমনকি নয়া কোন এক্সপেরিমেন্ট নি্রীক্ষা করতেও কী তিনি দিবেন না!!!  শুনেছি রানু এখন সবছেড়ে  ফিরে গেছে তার পুরান রেল স্টেশনে…।
    এই একচেটিয়াত্ব ও ঈর্ষার শিকার হওয়া থেকে লতারই ছোট বোন আশা ভোঁশলেও বাদ যায় নাই। এসব দিক নিয়ে আরও জানতে আগ্রহিরা ভারতেরই দুটা আর্টিকেল এখানে ও এখানে পাবেন।

    [ফুট নোটঃ আসলে ইন্ডিয়ান ক্যাপিটালিজমের বিকাশ এই  ইতিহাস পাঠের এক বড় অংশ হতে পারে। আর তা ভালভাবে পাঠ করতে চাইলে এর এক ভাল  উপায় হতে পারে  – ভারতীয় সিনেমার বিকাশ  ও এটা একচেটিয়া পথ কেন সে অনুসরণ করল – সেটা স্টাডি  করা।  আর এখান থেকেই নেহেরুর তথাকথিত কমিউনিস্ট ইকোনমির মুখ থুবড়ে পরা পরিণতি এসবকিছুর স্টাডি  করতে হবে সেক্ষেত্রে। এসবই পরিণতিতে ইন্ডিয়ার প্রথম “ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এর ক্রাইসিস ১৯৯১” তৈরি করেছিল। যেটাকে  বলা যায় আধা-বুঝের  নেহেরুর কথিত কমিউনিস্ট ইকোনমি কিভাবে আইএমএফের কাছে মুখ থুবড়ে সারেন্ডার করেছিল আর পরে  ব্যাপক সংস্কার করে নিজের ইজ্জত রক্ষা করেছিল এরই ইতিহাস!  ভারতীয় সিনেমা একচেটিয়া ভাবেই বিকশিত হয়েছে, মূলত এমন নেহেরুয়ান অর্থনীতির কারণে। এটাই লতার একচেটিয়া বা নিজে ‘শ্রেষ্ট’ হয়ে থাকার খায়েস – এসবকে কতটা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে তা নিয়ে কোন এক আগামিতে দেখা হতে পারে… ]

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১২ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “আমাদের স্মৃতি ও অসংবেদী লতা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা সাথেও কাজের সম্পর্ক হবে! তাই কী??

    চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বে,
    আমেরিকা সাথেও কাজের সম্পর্ক হবে! তাই কী??

    গৌতম দাস

    ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Up

     

    At a time when hostality between China and USA has intensified

     

    সেটা ছিল আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে আমাদের ভাষায় আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইস [Ned Price] এর এক রেগুলার রুটিন প্রেস ব্রিফিং। কিন্তু ব্যাপারটা আর রুটিন থাকেনি। মনে হয়েছে তা “বিশেষ” হয়ে গেছে। প্রাইস অন্য এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলে বসেন, পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার – “Pakistan is a strategic partner of the United States.”’।

    পাকিস্তান অবশ্যই আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার – কিন্তু একালে কোন কথা প্রসঙ্গে সে কথা উঠে গেলেও সাথে বলে দেয়া হয় ওটা পাস্ট টেনস; যেন বলা মানে ওটা এককালে সত্যি ছিল। মানে চলতি একুশ শতকের শুরুতে ২০০১ সালে আমেরিকার আফগানিস্তান দখল শুরু থেকে ঐ দখল বাস্তবায়নের প্রয়োজনে সেই থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ‘স্ট্রাটেজিক পার্টনার’ করে রেখেছিল, সেটা জোর জবরদস্তি করে হলেও!

    আর সেটা টিকে ছিল এবং অত্যন্ত সরবভাবে অন্তত ওবামা আমল মানে, ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত। যা এরপর থেকে ট্রাম্পের আমলে এসে অনুচ্চারিত হতে হতে “নাই” হয়ে যায়। আর ট্রাম্পের আমলের আমেরিকার ব্যবহারিক আচরণ ও তৎপরতা দেখেই সবাই বুঝে গিয়েছিল “দিন বদলে গেছে”। কারণ আমেরিকা ততদিনে আফগানিস্তানে যুদ্ধের খরচ বইবার মুরোদহীন হতে হতে ভারে কাত হওয়া শুরু করেছে। কারণ তখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার আমেরিকার ব্যয় হাসিঠাট্টার ইস্যু নয় নিশ্চয়। আমেরিকার এই আচরণ যে আমেরিকার – ‘আফগানিস্তানকে ফেলে পালাতে পারলে বাঁচি’, এমন জায়গায় পৌঁছেছে তা তখন সবাই বুঝে গিয়েছিল। ফলে ‘পাকিস্তান আর আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার’ তখনো কি না, সেটা অনুচ্চারিত থাকাকেই সবার কাছে স্বাভাবিক ঠেকেছিল বা সয়ে গেছিল।

    কিন্তু এখন মানে, প্রায় পাঁচ বছর পরে ২০২২ সালের শুরুতে আবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র যিনি সাধারণত তা^র বিভাগের স্থায়ী কিছু অবস্থান-সিদ্ধান্তগুলোর উপরে দাঁড়িয়ে প্রেসের সাথে কথা বলে থাকেন, তিনি যখন আবার সে কথা ফিরে উচ্চারণ করে বলেন যে “পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার”, তখন তা আমাদের জন্য একটা নড়েচড়ে বসে নজর করার মত ঘটনা তো বটেই। শুধু তা-ই নয়, মানে এটা বিচ্ছিন্ন একটা বাক্য নয়। কারণ তিনি শুধু ঐ বাক্যটাই নয়। এর পরে তিনি ওই বাক্যকে ফিরে আরো শক্তপোক্ত করতে আরো কয়েকটি বাক্যও যোগ করেছেন।

    ঘটনার শুরু যদিও ইন্ডিয়া থেকেঃ
    ঘটনার শুরু ইন্ডিয়া থেকে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দায়ী করে বলেছিলেন, ‘তার ভুল ও অবিবেচক কূটনীতির কারণে , ‘‘পাকিস্তান ও চীনকে একত্র হতে সাহায্য করেছেন মোদি৷’’ অর্থাৎ চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক আগের চেয়ে এত বেশি ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে গেছে। এদিকে ভারতে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে উত্তরপ্রদেশসহ পাঁচ রাজ্যে প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে পাঁচ-সাত পর্বের এই নির্বাচন মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে চলবে, পরে্র মাসে ১০ মার্চ একসাথে সব ফল প্রকাশ করা হবে। এই নির্বাচনের ফলাফল ভারতের রাজনীতি এলোমেলো করে দেয়ার মত এক মুখ্য ঘটনাও হয়ে যেতে পারে। কারণ বিজেপি নিজেই প্রকাশ্যে নিজের মনের কথা বলেছে যে, এবারের উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে যদি বিজেপি হেরে যায় সেটা ২০২৪ সালের মোদির কেন্দ্রীয় নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা ও প্রভাব ফেলবে; মানে সে নির্বাচনে জেতা কঠিন হয়ে যাবে।

    তবু এখনো এ’ঘটনা ভারতের জন্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিতে তা এখনো এক স্থানীয় ঘটনাই। বিরোধী রাহুল গান্ধী মোদি ও বিজেপিকে ঘায়েল করতে এমন মন্তব্য করেছেন – যেমনটা ইলেকশনের আগে এমন কিছু কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েই থাকে। কিন্তু মোদির পক্ষের লোক সেই ইস্যুটাকে আমেরিকান প্রেস ব্রিফিংয়ে পর্যন্ত তুলে সেখান থেকে জবাব এনে রাহুলের  উপর আপার-হ্যান্ড নিতে চেয়েছিলেন সম্ভবত; আর তা থেকেই ঘটনা শুরু..।

    আমেরিকান মুখপাত্র নেড প্রাইস ব্যাপারটাকে ভারতের এক স্থানীয় ঘটনাই করে রেখে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতেন। কিছুটা করেও ছিলেন। বলেছিলেন তিনি চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ককে তাদের উপরই ছেড়ে দিয়ে রাখতে চান, এতে নিজে ঢুকতে চান না। তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তাই বলে রাহুলের বক্তব্যকে অনুমোদন দিয়ে তিনি এর পক্ষেও দাঁড়াচ্ছেন না।
    কিন্তু তা থেকেই আরো উসকানিমূলক প্রশ্ন করার সুযোগ করে নেন প্রশ্নকর্তা; যেটাকে অনেকে ‘অ্যারেঞ্জড’[arranged] মানে আগে থেকে আগাম-আঁতাত-বোঝাবুঝিতে থাকা উভয়ের এক সওয়াল-জবাব পরিস্থিতি তৈরি করে কথাবলা বলে অনেকে মনে করতে পারেন। এটা খুব আন-কমন ব্যাপার নয়; যদিও তা মূলত খুবই সীমিত পর্যায়ে  রেখে এমনটা অনেক সময় হয়েই থাকে। তবে সেটা আবার আমাদের  সাংবাদিকের একেবারে “তেলের ভাণ্ড” নিয়ে তেল মেরে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন (নাকি তোয়াজ) করতে বসার মতও নয় অবশ্যই। তেমন মনে করা মারাত্মক ভুল হবে।
    যা হোক সে প্রশ্নটা ছিল, পাকিস্তানের এমন আমেরিকা থেকে দূরে চলে যাওয়া অথবা খুবই চীন-ঘনিষ্ঠ হয়ে যাওয়া কেন? এটা কী  আমেরিকার তাদেরকে (বিশেষত পাকিস্তানকে) পরিত্যাগ করে ফেলে পালানোর জন্য ঘটছে কি না – এ প্রশ্ন তুলে বসেন [do you think they’re – they feel abandoned by the U.S.?]।
    আর এমন প্রশ্নের জবাব দেয়ার সুযোগ নিয়ে এবার যেন নেড প্রাইস তার নয়া বিস্তারিত মেসেজ হাজির করার সুযোগ নিলেন। আর তাতে তিনি মূলত আরো দু’টি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।

    এক. প্রাইস বলছেন, আমরা অনেক দিন থেকেই বলছি, ‘যেকোনো একটা দেশের জন্য তারা আমেরিকা না হলে চীনকে বেছে নিতে হবে, ব্যাপারটা একেবারেই এমন প্রয়োজনীয় নয়” [We’ve made the point all along that it is not a requirement for any country around the world to choose between the United States and China. ] ।’ তবে এরপরই প্রাইস চীনের চেয়ে আমেরিকা কেন অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ভালো এবং তাদের অনেক বাড়তি সুবিধা ও সে দেশকে মুক্ত থাকতে দেয় – এসব দিক নিয়ে নিজের কিছু বিজ্ঞাপনও প্রচার করে নেন।

    দুই. এরপর প্রাইসের সেই উক্তি যে “পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার”। আর এ’কথা বলার পরে তাঁর আরো দুই বাক্য হল, “ইসলামাবাদের সাথে আমাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পর্ক আছে। আর আমরা এই সম্পর্ককে বিভিন্ন পরিসরে খুবই মূল্য দিয়ে থাকি” [We have an important relationship with the government in Islamabad, and it’s a relationship that we value across a number of fronts.]। অর্থাৎ তিনি যেন বলতে চাইছেন আমরা যেন এগুলোকে কথার কথা হিসেবে না, সিরিয়াস কথা বলে দেখি।

    “We’ve made the point all along that it is not a requirement for any country around the world to choose between the United States and China. It is our intention to provide choices to countries when it comes to what the relationship with the United States looks like. And we think partnership with the United States conveys a series of advantages that countries typically would not find when it comes to the sorts of partnerships that – “partnerships” may be the wrong term; the sorts of relationships that the PRC has seeked to – has sought to have around the world.”

    নেড প্রাইস কেন এখন এ কথাগুলো বলছেনঃ
    এখানে একটা ব্যাকগ্রাউন্ড বা যে পটভুমিতে এ কথাগুলো উঠেছে তা পাঠককে মনে করিয়ে দেই। সেই পটভুমিটা হল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান এখন ইতোমধ্যেই চার দিনের (৩-৬ ফেব্রুয়ারি) চীন সফরে আছেন। যদিও সফরের মুখ্য কারণ চীনে আয়োজিত এবারের অলিম্পিক, এই গ্লোবাল স্পোর্টসে অন্যান্য সরকারপ্রধানের সাথে ইমরান খানের যোগ দিতেই চীন সফর। আবার বিশেষত এই অলিম্পিককে বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কটের ডাক দিয়েছেন […White House confirmed reports that it was instituting a diplomatic boycott on the Beijing 2022 Winter Olympics.]। আর কারণ দেখিয়েছে সেই পুরনো উইঘুর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তিনিও জানেন যে, এমন বারবার একই কারণ দেখানোটা মানুষ ভালো মনে করছে না আর তিনি নিজেও এতে সিরিয়াস নন ও মন শক্ত না করে অস্পষ্টভাবে উইঘুরের কথা তুলছেন। তাই এমন মনে করার কারণ আছে। যার কারণ হল, উইঘুর সশস্ত্র গ্রুপ [ইস্টার্ন টার্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM) ] এখন আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধবাদী আইএস-খোরশান এর সাথে মিলে সশস্ত্র তৎপরতায় জড়িত হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানে এরা যে বোমা হামলায় জড়িত হয়েছে তাতে ভারত-আমেরিকার সাহায্য সমর্থনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে উইঘুর কি নিজে ভিকটিম না আইএসের সহযোগী সন্ত্রাসী – এ প্রশ্ন এখন বাইডেনের সামনে ঝুলছে। কেন ট্রাম্প এই সংগঠনকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে নাম উঠিয়ে নিয়েছে আর বাইডেন প্রশাসন তাদেরকে বোমা হামলার কাজে ব্যবহারে সম্মতি দিচ্ছে?  এসব প্রশ্ন যেখানে উঠে আছে শেখানে বাইডেনের “উইঘুর মানবাধিকার লঙ্ঘন” এর জন্য চীনা অলিম্পিক বয়কটের ডাক – এটা একটা “দাগী” আচরণ। আর স্বভাবতই এটা দায়ীত্বশীল রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ হয় নাই!

    আমরা ইমরান খানের চীন সফরে ফিরে আসি। ইমরানের এবারের চীন সফরের মুখ্য দিক অলিম্পিক অবশ্যই নয়। এটা বরং রথ দেখার সাথে কলা বেচার অংশ। সেই মূল কাজে, তিনি এবার চীনা সরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে নয়, বরং এবার বিপুল চীনা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই বা FDI) মানে ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে ফিরবেন। সে কারণে পাকিস্তানের মিডিয়াগুলোতে একটাই নিউজ, ‘চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক এতে আরেক উচ্চতায় যাচ্ছে [….most likely take the Sino-Pakistan relations to new levels.]। আমাদের মত অর্থনীতির দেশে এফডিআইকে বাড়তি আকর্ষণীয় সুবিধা হিসেবে দেখা হয় এ’জন্য যে, অবকাঠামো নির্মাণে কোনো দেশের সরকার মূলত বিদেশী সরকারি ঋণ নেয়। কিন্তু এই এফডিআই বিনিয়োগ নেয়া – এটাও এক ঋণ নেয়া হলেও সরকার তা নেয় না। ফলে  তা সরকারের উপর ঋণের বোঝা বাড়ায় না তো বটেই, উল্টো ঋণের বোঝা কমাতে বা পরিশোধে এই বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে সাহায্য করে। কারণ ওই বিনিয়োগ বিদেশী মুদ্রায় বলে এই অর্থ ছাড় করতে সরকারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে তা হতে গিয়ে সেই বিদেশী মুদ্রা সরকারি কোষাগারে চলে যায় আর বিনিয়োগ আনা প্রাইভেট কোম্পানি বিনিময়ে স্থানীয় মুদ্রা হাতে পায়।

    আসলে  ক’দিন আগেই খুব কড়া শর্ত চাপিয়ে আইএমএফ পাকিস্তানকে এক বিলিয়ন ডলার লোন ছাড় করেছে। আইএমএফ জানত তাদের দেয়া এই ঋণের খবর পাকিস্তানকে  গ্লোবাল পুঁজি বাজারে আস্থার আসনে নিয়ে যাবে। তাই সুযোগ বুঝে এই কড়া শর্ত। আর তা করতে গিয়ে ইমরানকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে [SBI] বিশেষ অনুমতি দিতে নয়া আইন পাশ করাতে হয়েছে। যেটাকে ইমরানের বিরোধিরা এতে দেশের সার্বভৌমত্বের উপরে আঘাত বলে প্রচার করেছে।  তাই ভাল ইমেজের আসনে বসা এই পাকিস্তান তাই এখন অনুমান করা হচ্ছে চীন সেই ঋণ কিস্তি নিয়মিত যেন পরিশোধে পাকিস্তানকে এফডিআই জোগাড় করে দিয়ে সাহায্য করতে যাচ্ছে। সারকথায় পাকিস্তান তাহলে ইমরানের এ সফরের মাধ্যমে আরো গভীর সম্পর্কে চীনের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর এটাই ভারত ও আমেরিকার জন্য আরো অস্বস্তিকর ঘটনা হয়ে হাজির হয়েছে। এই ইস্যুতে তাদের স্ব স্ব মিডিয়া রিপোর্টিংয়ে সেটাই প্রতিফলিত হয়েছে।

    অতএব সে জন্যই কি নেড প্রাইস ঐ প্রেস ব্রিফিং থেকে নতুন সম্পর্ক সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

    কেন আমেরিকার পাকিস্তানকে এখনও খুবই দরকারঃ
    গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ রয়টার্সের এনিয়ে এক নিউজ
    [Blinken says U.S. will assess Pakistan ties over Afghanistan’s future] বলছে, আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিঙ্কেন তাদের সংসদ বা কংগ্রেসের শুনানিতে কেন আমেরিকার পাকিস্তানকে জরুরি দরকার তা ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তিনি পরিষ্কার করে রাখেন যে, আফগানিস্তানে “পাকিস্তানের বহুবিধ স্বার্থ আছে যেগুলোর অনেকটাই আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থের সাথে মিলে [Pakistan has a “multiplicity of interests some that are in conflict with ours.”]। যেমন আমেরিকা চাইবে অন্তত তালেবানদের গাইড করা এবং তালেবানের প্রতিদ্বন্দ্বি যেসব আরো রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপ আছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদিতে পাকিস্তান তাদের সহায়তা করুক। এ কারণে পাকিস্তান আমেরিকার কাছে খুবই প্রয়োজনীয় এবং তাই পাকিস্তান আমেরিকার চোখে পার্টনার হতে পারে।
    কিন্তু ব্যবহারিক জায়গায় আপাত যে সমস্যা দেখা যাচ্ছে যে পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক থমকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই অক্টোবর ২০২১ সালে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সফরের পর থেকে কিছুই যেন নড়েনি। সেটা কয়েক মাস ধরে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত না থাকা মানে, সে কাজ এক অস্থায়ী রাষ্ট্রদূত দিয়ে চালানোতেই প্রকাশ পায় [Islamabad has been without a full-time ambassador since Richard Olson left. ] – এমন মনোভাব প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের এক থিংকট্যাংক গবেষক। তিনি আরো ঘটনা তুলে ধরে বলছেন, গত ৯-১০ ডিসেম্বর বাইডেনের অবরোধ আরোপের সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে যার নাম ডেমোক্রাসি সামিট – সেখানে এক অগুরুত্বপুর্ণ গ্রুপে ইমরানকে মাত্র তিন মিনিটের এক রেকর্ডেড অনলাইন বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল। ফলে ইমরান খুব বিনয়ের সাথে ঐ সম্মেলনে যোগ দিতে বাইডেনকে অপারগতা জানিয়ে দেন। খুব সম্ভবত তখন ইন্ডিয়াকে তোয়াজ করতে বাইডেন পাকিস্তানকে তারা ভারতের সমান মনে করছে না, বা তাদের মধ্যে দুরত্ব আছে এটা প্রদর্শন করা মুখ্য বিবেচনা করেছিল। কিনতি ফাইনালি আমরা দেখলাম উলটা ভারতই বাইডেনকে ছেড়ে রাশিয়ার সাথে তাল দেয়া শো করেছে। এসব দিক যেমনই হোক, মূলকথা হল – আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক আসলে একটা খাদে পড়ে আছে। আমেরিকা সম্ভবত সেখান থেকে নিজেদের তুলতে চায় – সেকারণেই কী নেড প্রাইস???

    আসলে সোজাসাপ্টা বললে এখন, বাইডেন প্রশাসন সম্ভবত ইমরানের এই লম্বা চীন সফর নিয়ে খুবই অস্বস্তি ও বিরূপ অবস্থায় পড়েছেন। যেমন যদি পাকিস্তানকে তাদের এত দরকারি মনেই হয় তবে গত অক্টোবরের পর থেকে আমেরিকার আগ্রহ অগ্রগতিতে এর প্রকাশ নাই কেন? আসলে এ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা নাই বাইডেন প্রশাসনের হাতে। তাই খুব সম্ভবত কিছু শুভ-ইঙ্গিত বা বন্ধুত্বের ইঙ্গিত পাঠিয়ে সুচনা করতে চাইছে আমেরিকা!! আর সেটা করতেই হয়ত নেড প্রাইসের এই “আমরা এখনো স্ট্রাটেজিক পার্টনার” বক্তব্য! তবে প্রাইসের আচরণের এই ব্যাখ্যা কী তানিয়ে আমাদের আরো নিশ্চিত হতে হবে। মানে, এখনো নিশ্চিত বলে ধরে নেয়া ঠিক হবে না এবং তাই আরো মনিটর করতে হবে।

    কিন্তু যেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ তা হল, নেড প্রাইস একটা ইঙ্গিতে যেন বলে ফেলেছেন যে, আমাদের মতো দেশ চীনের সাথে বিনিয়োগ পাওয়ার সূত্রে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার পরও সমান্তরালে আমেরিকার সাথেও আমরা একসাথে কাজের সম্পর্ক করতে পারি। আর বলা বাহুল্য তা হতে অন্য ইস্যুতে তবে উভয়ের অভিন্ন স্বার্থের ইস্যুতে!!!

    এমন অনুমানের ভিত্তি হল, আফগানিস্তান বা অন্য কোনো ইস্যুতে আমেরিকার কাছে এখনো যদি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক জরুরি হয়ে থাকে তবে আমেরিকা সেই স্বার্থ হাসিল করার একমাত্র খোলা থাকা উপায় হল , চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হলেও সমান্তরালে পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক যতটুকু এগিয়ে নেয়ার বা করে নেয়ার সুযোগ আছে তা কাজে লাগানো।
    তা না হলে   – ইসলামাবাদের আমেরিকার সাথেও সম্পর্ক করতে চীনের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে টান টান উত্তেজনা ও চাপ অনুভব করার কিছু নেই। নেড প্রাইসের এই নতুন তথ্য পেশ করার কোন মানে হয় না [For the first time in years, the United States emphasised its strategic partnership with Pakistan, clarifying that Islamabad does not need to strain its relations with China to maintain ties with Washington.]।  প্রাইসের এমন  রাস্তা ধরে আগানোর কোন কারণ খুজে মেলেনা।

    “State Department’s spokesperson says
    Islamabad does not need to strain its
    ties with Beijing”

    তাহলে আমরা কি আসলে পাকিস্তান-আমেরিকার সম্পর্ক বুঝার জন্য এতক্ষণ এত কথা বলছি? না, মোটেও তা নয়। বাংলাদেশের আমেরিকার সাথেও সম্পর্কিত হতে হলে আগে থেকেই চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক থাকা নিয়ে টান টান উত্তেজনা ও চাপ অনুভব করার কিছুই নেই – সেটা কী আমাদের বেলাতেও সত্যি হবে??? সেটা বুঝা দরকার!
    ব্যাপারটা এমন কি না বা কতটুকু- সেটা জানাই আমাদের মূল আগ্রহ এবং এত কথা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৫ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বে আমেরিকা!!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    গৌতম দাস  ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3TZ

     

    [সার-সংক্ষেপঃ রাজনৈতিক আন্দোলনে সশস্ত্র ধারায় অথবা নিরস্ত্র গণ-আন্দোলনের ধারা হতে পারে।  কিন্তু সশস্ত্র ধারা হলেই সেটাকে উচ্চমার্গের আন্দোলন মনে করা অর্থহীন ও ভুল মাপকাঠির জ্ঞান। এর উপর যদি সে সশস্ত্রতা আবার হিটলারের ধারার যুদ্ধের ক্যাম্পের সাথে যুক্ত হয়ে করার চেষ্টা হয় অর্থাৎ যার অর্থ হল স্বাধীনতা বা ‘ফ্রিডম’ নিয়ে কথা বলা অথচ রাজনীতির ঠিক নাই। কী রাষ্ট্র তারা গড়বে সেটাও শেখানে বেখবর-ই থাকে! ভারতের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ঠিক এরই প্রতীক।  তিনি জাপানের সামরিক সহায়তায় বৃটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে মন-কামনা করেছিলেন যা ব্যর্থ হয়।  ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এদেরও হিটলারের আদর্শী ও অনুসারী। আরএসএস লেবেলে হিটলারের কাজ-ততপরতা নিয়ে তাদের উচ্ছাসমূলক অবস্থান দেখা যায়। কারণ তারা চরম জাতিবাদি – এথনিক ক্লিনজিং বা এথনিক জাতিকে নির্মুল করা জায়েজ মনে করার রাজনীতি করে। যদিও এখানে আমরা দেখব, ভারতের মোদি ও মমতা দুই রাজনীতি করলেও একই ‘নেতাজীকে’ দখল নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে তারা লড়ছে।]

              Taiwan offers to open national archive to ‘rediscover legacy’ of Netaji Subhas Chandra Bose

    সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫) [Subhas Chandra Bose], বৃটিশ আমলে কলকাতার বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং একসময়ে কংগ্রেসের সভাপতি;  যাকে কথিত পাবলিকের দেয়া খেতাব-নাম হল ‘নেতাজী’।  এখনকার কলকাতায় তাকে মূলত নেতাজী নামেই সবাই ডাকে ও পরিচিত।
    এই নেতাজী কিভাবে তিনি মারা গেছেন তা অবিশ্বাস করে এনিয়ে তাঁর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য” বলে আলোচনা সেই পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায়ই উঠেছে। কিন্তু একালে তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা মমতা ব্যানার্জি এই নেতাজী ইস্যুকে মোদির বিরুদ্ধে মানে আরএসএস-বিজেপির হিন্দি-বলয়ের আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছেন। আর  কলকাতা বিজেপিকে কোণঠাসা করতে এটাকে হাতিয়ার করেছেন। কলকাতা বলতে এখানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রতীক হিসাবে দেখে বলা হচ্ছে এবং এই কলকাতা যা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানীও বটে।
    যদিও মমতার মূল তর্ক এখানে আসলে  – কলকাতা কী আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের হিন্দু-বাঙালি অংশ? নাকি কলকাতার নেতা নেতাজীর বাঙালি, এই বাঙালি-হিন্দু এরা আলাদা এথনিক জাতি এবং এরা রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের কোন অংশই নয়? এই তর্ক সামনে এনেই হিন্দুত্ব পরিচয়ের বাইরে হিন্দিবিরোধী বাঙালি-হিন্দু জাতিবাদের জোয়ার পশ্চিমবঙ্গে সফলভাবে তুলতে পেরেছিলেন তৃণমুল দলের সভাপতি মমতা বন্দোপাধ্যায়। আর তা পেরেছিলেন বলেই গত ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি-মোদিকে ঠেকিয়ে দিয়ে বিপুল বিজয়ী হয় তৃণমুল এবং তা থেকে তৃণমূলের মমতা এখন ক্রমেই মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ফিগার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সম্প্রতি এক জনমত জরিপ সমীক্ষাতে মমতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর চেয়েও পপুলার রেটিংয়ে এগিয়ে থাকা নেতা এবং মোদির প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদ। ওই রিপোর্ট লিখেছে– “১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে দেখছেন ১১ শতাংশ”। কাজেই নেতাজী হলেন কলকাতার বাঙালি-হিন্দুর নেতা, আর হিন্দি-বলয়ের যারা এই নেতাজীকে নেতা মানে না তারাই বিজেপি – এই হল মমতার ডিফারেন্সিয়াল পয়েন্ট। আর মমতার এই “ভাগ দেখানো” বয়ানের সামনে কলকাতা বিজেপি পুরাপুরি অপ্রস্তুত ও বোকা! মূলত নেতাজী সুভাষকে নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত; ছুড়ে ফেলবেন নাকি কোলে তুলে নিবেন তা জানেন না! কারণ এনিয়ে তাদের কেন্দ্রীয় বিজেপির থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা কখনো পায়নি, সে রকম কোন ইঙ্গিত অবস্থানই নাই।

    ইন্ডিয়া টুডের জানুয়ারি সংখ্যার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ সমীক্ষায় এই চিত্র ফুটে উঠেছে। সমীক্ষায় যোগ দেওয়া ১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধিকে দেখছেন ১১ শতাংশ মানুষ।

    এখন বিজেপি তার হিন্দুত্বের চোখে দেখা ভারতের নেতাজীকে কোনো নেতা মানবে কী? এর উত্তর দেয়া ছাড়া কলকাতা বিজেপিকে কলকাতার-বাংলায় “বাইরের লোক” হিসেবেই থাকতে হবে। মমতার এই ইঙ্গিতপূর্ণ বয়ান এজন্য মোদির জন্যও কণ্টকময়!

    গত তিন বছরে এনিয়ে বহু ধাক্কা খাবার পরে মোদি তাই এবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। তিনি মমতার চ্যালেঞ্জের মুখে নিজে বাঁচতে নেতাজীকে ‘আপন” করে নেয়ার সিদ্ধান্ত-পরিকল্পনা এঁটে নিয়েছেন। গত ২৩ জানুয়ারি ছিল নেতাজী সুভাষের জন্মদিন। মোদি  ঐদিন দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে নেতাজীর হলোগ্রাম মূর্তির উদ্বোধন করেছেন। অর্থাৎ মোদিও এবার প্রতিযোগিতায় নেমে  মমতার কাছে নেতাজীর শেয়ার নিতে চাইছেন! কিন্তু এই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কে; কী তাঁর রাজনীতি?

    নেতাজী সুভাষের রাজনৈতিক জীবনঃ
    জওয়াহেরলাল নেহরু নেতাজীর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও নেহরুর আগেই নেতাজী কংগ্রেস দলের সভাপতি হয়েছিলেন ১৯৩৮-৩৯ সালের সময়কালে। নেতাজী পড়াশোনা শেষে লন্ডন থেকে ফিরে ১৯২১ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে গান্ধীর কংগ্রেস দলে যোগ দিয়েছিলেন। যখন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর বয়স ৫১ বছর। আর তখন নেতাজীর রাজনৈতিক গুরু বা মেন্টর [mentor] ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। এই চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন কলকাতার মেয়র, নামকরা ব্যারিস্টার আর এছাড়া কিছুটা আগ্রাসী জাতিবাদী। কিন্তু পরবর্তীতে গান্ধী আর নেতাজীর মধ্যে প্রায় প্রতিনিয়ত বড় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিতে শুরু করেছিল। তাদের মূল মতপার্থক্যকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবে যে, গান্ধী রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন, কিন্তু অহিংসভাবে। আর এর বিপরীতে সুভাষও রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন কিন্তু রাজনৈতিক বলপ্রয়োগে, যতটা পরিস্থিতি অনুমোদন করে এবং সময় সুযোগ হলে সশস্ত্রভাবেও। গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার চেয়ে সুভাষের রাজনীতি অনেক রেডিক্যাল এভাবেও সম্ভবত বলা যায়।
    এথেকে দীর্ঘ সময় দলের অভ্যন্তরীণ লড়াই সঙ্ঘাতে গান্ধী নেতাজীকে কোণায় বা আড়ালে ফেলে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আর এসবের পরিণতিতে নেতাজী দ্বিতীয়বার কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৩৯ সালে ঠিকই কিন্তু গান্ধীর প্রবল বিরোধিতায় গ্রুপিংয়ের চাপে বেশি দিন টিকতে পারেননি; একপর্যায়ে সভাপতির পদ তিনি ত্যাগ করেন। এরই  আরেক পর্যায়ে ইনি কংগ্রেস দলও ত্যাগ করেন। পরে ঐ ১৯৩৯ সালেই তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক” নামে নতুন দল গড়েন। কিন্তু ওই বছরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বৃটিশদের বিরোধী জোটপক্ষ হিটলারের জার্মানি-জাপান জোটের সাথে বিশেষ করে জাপানের সহযোগিতায় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র যুদ্ধের লড়াইয়ে নামেন। যদিও খুব বড় কোনো সফলতার ঘটনা সেটা ছিল না। এদিকে বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের কালে ১৯৪৫ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে বিধ্বস্থ বিমান থেকে তার শরীর আগুনে ঝলসে যায়। পরে এখনকার তাইওয়ান যার এক অংশ সেকালে জাপান কলোনি ছিল, সেখানকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার সমর্থকরা তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে “রহস্যজনক” বিমান হামলায় নিখোঁজ হয়ে যান ধরনের এক ফ্যান্টাসির বর্ণনায় বিশ্বাস করেন। এটাই তাদের চোখে নেতাজীর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য”!  এই হল একেবারে সারাংশে সুভাষের জীবনী।

    কলকাতার বীর নেতাজীঃ
    কিন্তু সেই থেকে কলকাতায় ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসন প্রত্যাহার ও কলোনি প্রশাসন গুটিয়ে চলে যাবার পরে বিশেষত কংগ্রেসবিরোধী মহলে নেতাজীকে এক বীর বানানোর তৎপরতা দেখা যায়। তারা নতুন করে গান্ধীর কংগ্রেসবিরোধী হয়ে নয়া বয়ান খাড়া করতে তৎপর হন। মূলত তরুণ ও পেটি মধ্যবিত্ত মহলে যা কথিত ‘অন্তর্ধান রহস্য’ এমন ‘রহস্যময়’; তাই নিশ্চয় আরো অনেক কিছু অজানা এ’ধরনের প্রপাগান্ডা যেটা সারবত্তায় এক গভীর কিন্তু ফাঁপা আবেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও গান্ধী-নেহেরুরা বাংলার নেতাজীকে জায়গা দেয় নাই, মুল্যায়ন করে নাই ধরণের বঞ্চিতবোধ থেকে অভিমান গোসসা কলকাতায় সেই থেকে সবকালেই বেশ  সরব। বিশেষত তরুণদের আক্ষেপ হল, তাদের ভারত ‘স্বাধীন’ হয়েছে তারা জানছে; ‘স্বরাজ’ বা কথিত ব্রিটিশবিরোধী “স্বাধীনতার আন্দোলন” হয়েছে তাদের জানানো হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে এটা তো টেবিলে বসে আপস আলোচনায় স্বাধীনতা পাওয়া বলেই তারা দেখছে। তাই এতে জোশ নাই!!!

    আর তাই  উত্তেজনাহীন স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘটনা-বর্ণনার বিপরীতে এর বিরুদ্ধে তাদের সুভাষ বা নেতাজী (কলকাতায় তার সমর্থকদের দেয়া নাম) হলেন তাদের আসল সশস্ত্র যোদ্ধা – এই হল সেই বয়ান। আর যেহেতু হিন্দু-বলয়ে ভারতের প্রথম প্রতিভূ হল কংগ্রেস আর এর নেতা নেহেরু-গান্ধী যারা কলকাতার নেতাজীকে কোণঠাসা করেছিলেন, কাজেই কলকাতা বাঙালি-জাতিবাদের নেতা হিসেবে মমতা মোদিকেও দায়ী ও বিজেপিও  বাংলায়  বহিরাগত – এই ইঙ্গিত খাড়া করে চলছিলেন। আর সেটাই এবার মোদি সংশোধিত করে নিলেন।

    নেতাজীকে আমরা কী চোখে দেখবঃ
    প্রথমত কলকাতা শুরু (১৭৮৯) থেকেই আমাদেরকে গোনায় না ধরা আলাদা ভেবে এসেছে। বিশেষত পুর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠি মুসলমান এরা আদৌ বাঙালি কিনা  বা বাঙালির অংশ কিনা এসব প্রশ্ন তুলেছে। তবে আমরা অবশ্যই সেকালের হিসেবে পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের লোক। আমরা আমাদের মতই অবশ্যই বাঙালি, রক্ত দিয়ে স্বাধীন করে বাংলাদেশ পেয়েছি। তাহলে এখন আমরা কলকাতার ‘নেতাজী’কে কিভাবে দেখব? তৃণমূলের মমতার চোখে? নাকি কোনো প্রগতিবাদী চোখে?  এর জবাব হল – বস্তুতঃ  দুটোর কোনোটাই না। আসলে আমাদের চোখ মানে দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ আলাদা হয়ে গেছে বহু আগে থেকেই।

    সে স্বার্থ দিয়ে চিনতে চাইলে – বাংলাদেশের মূল স্বার্থ হল, জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ, তাই বরাবর সেকালের জমিদারি ব্যবস্থা ও শাসনের বিরোধিতা ছিলাম এবং তা করে গেছি আমরা। ফলে এই সূত্রে জমিদার হিন্দুরা যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আধিপত্য কায়েম করে নিয়েছিল; আর মুসলমানরা বাঙালি নয় বা বাঙালি স্বীকার করত না, আজও সেসবের কালচারাল প্রভাব ও জের অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান দেখা যায়। সেই থেকে মুসলমানবিদ্বেষের প্রচলন শুরু হয়েছিল; যে কারণে আজও প্রগতিবাদ ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রায় সমার্থক!
    তাই আমরা দেখেছিলাম, আমাদের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালে একমাত্র বাংলার ভাগ হওয়াই ছিল আমাদের স্বার্থ। কারণ বাংলা ভাগ ছাড়া জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ সম্ভব ছিল না। তাই বাংলা ভাগ মানেই হয়ে যায়, সেকালের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের স্বার্থ।

    এর বাইরে আমাদের জন্য অন্য কোন অপশন খোলা ছিল না। তাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে দু’বারই যারাই বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে দেখা গেছে তারা জমিদার হিন্দুস্বার্থের লোক; প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ তাদের স্বার্থের লোক। এজন্য আমাদের স্বার্থ কী তা বুঝবার সোজা ফর্মুলা হল, যারাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে এরাই আমাদের বিরোধী জমিদার-হিন্দু স্বার্থের লোক, আর এরাই প্রগতিশীল। আর প্রগতিশীলতাই তো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ নিয়ে আন্দোলন পর্যন্ত আমাদের বিরক্ত করে চলেছে, পিছু ছাড়েনি। যেমন দেখেন, ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন; অতএব বাস্তব ভিসির মুখে দাড়ি থাক আর না থাক ভিসি-ব্যঙ্গ করা ছবিতে ভিসির মুখে মুসলমানি দাড়ি লাগিয়ে তারা দিবেই! আর ভিসি অবশ্যই এবার ‘তালেবান’ হয়ে যাবেন! কারণ তাদের ভিসি তো কথিত ‘প্রগতিশীলতা’র বিরোধিতা করেছেন!
    তা হলে এত কথার সাথে এখানকার প্রসঙ্গ নেতাজী সুভাষের সম্পর্ক কী? প্রথমত, একটা রেফারেন্স জানিয়ে রাখি। গত ২০১৯ সালের আমার একটা লেখার শিরোনাম ছিল- “কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না“। অর্থাৎ আমাদের অবস্থানটা কী, এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এখন দরকার এর একটা আপডেট জানা।

    পুর্ববঙ্গের স্বার্থে নেতাজী কখনও অবস্থান দেখান নাইঃ
    এটা ঠিক নেতাজীকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থের পক্ষে কখনও অবস্থান দেখাতে হয় নাই। একটা সুবিধা তিনি পেয়েছিলেন।  আসলে নেতাজী রাজনীতিতে এসেছিলেন ১৯২১ সালে, অর্থাৎ ১৯০৫ সালে তিনি রাজনীতিতে কেউ নন, মাত্র আট বছর বয়সী তিনি। আবার কার্যত ১৯৩৯ থেকেই তিনি মূলধারা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা দূরে। আর ১৯৪৭ সালের দেশ বা বাংলাভাগের আগেই মানে ১৯৪৫ সালেই তিনি মৃত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গের কোনো সময়ে কোনো ইস্যুতে পক্ষ-বিপক্ষে  কোনো অবস্থান তার ছিল কী, জানা যায় না। তা হলে কী দিয়ে তাকে সুনির্দিষ্টভাবে বিচার মূল্যায়ন করতে পারি?
    তার জাপানের সহায়তা নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ের তাৎপর্য কী? প্রথমত ব্রিটিশবিরোধী তার সশস্ত্র তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা ছিল না, হয়ে উঠতে পারে নাই। প্রশ্নটা আর একটু এগিয়ে স্বচ্ছ করে করতে পারি এভাবে যে, ব্রিটিশ শাসকরা কলোনি ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পেছনে নেতাজীর গঠিত সেনাবাহিনী ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর তেমন কোনো অবদানই নেই, ছিল না।

    মূলত ঘটনা হিসেবে জাপানের সহায়তায় নেতাজীর ব্রিটিশ-ভারতের সশস্ত্র বিরোধিতা ছিল খুবই সীমিত। সেই আক্রমণ ছিল ভারতের নর্থ-ইস্টের এখনকার রাজ্য নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায়; ব্রিটিশ-ভারতের কোহিমা সীমান্তে এক-দুইটা বর্ডার-পোস্টে আক্রমণ মাত্র। যা ঘটনা হিসেবে খুবই নগণ্য, যেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমি দখলের কথাও জানা যায় না। তাহলে?

    বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা কখনও কলোনির নিয়ন্ত্রণ হারান নাইঃ
    এবার সাধারণভাবে বলা যাক। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ছিল মোট প্রায় ২০০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭)। এসময়ের মধ্যে কখনই কলোনি শাসকরা নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। তাদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জড হয়ে যায়নি। তবু তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হামলা আক্রমণের ঘটনা হল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, সেটাও নিয়ন্ত্রণ হারানোর মত কোন ঘটনা হয়ে উঠতে পারে নাই। এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল আমরা এই ঘটনাকে ডাকি সিপাই বিদ্রোহ বলে – সিপাই বিপ্লব বলি না।
    বিদ্রোহ মানে হল উপস্থিত শাসন অসহ্য হয়ে গেছে তাই মানছি না বলে উত্থান। কিন্তু এর পরে কোথায় যাব সেই পরিনতি পরিকল্পনা নিয়ে কোন ভাবনা নাই, এখনও দানা বাধে নাই। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক হুশ-জ্জান বোধ তখনও নাই। একারণে ওটা বিদ্রোহ অবশ্যই  কিন্তু পরে ক করব এই রাজনীতিক প্রস্তুতি নাই বলে তা আর কোন বিপ্লব নয়। 

    আর তাই শেষে বৃটিশ শাসক ঐ বিদ্রোহকে “ওভার-পাওয়ার” করে বিদ্রোহ দমন করে ফেলতে সক্ষম হয়। পরে বিদ্রোহীদের ওপর ভয়ার্ত নৃশংসতা ঘটিয়ে এর শেষ হয়েছিল। ফলে তাদের শাসন ফিরে নিজেকে সংহত করে নেয় যদিও সেই থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলোনি দখল শাসনের বদলে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হই আমরা।
    অন্যদিকে, এছাড়া ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে ১৯০০ সালের পর থেকে কলোনি ত্যাগের আগে পর্যন্ত সময়ে।  যেখানে ১৯০০ সালের আগে অনেক বিদ্রোহই হয়েছে – ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই ব্রিটিশ শাসকের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো তো নয়ই; বেগ পেতে হয় এমন কোনো উচ্চতার আন্দোলন সেগুলোর কোনোটাই ছিল না। কাজেই নেটিভ বা ভারতীয়দের কোনো আন্দোলনের কারণে কলোনি শাসকরা অখণ্ড ভারত ছেড়ে যায়নি।  আর অখন্ড ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের জন্মই যেখানে ১৮৮৫ সালে। তাই কথাটাকে আরো বড় প্রেক্ষিত থেকে বললে, এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশের কোনো কলোনি হয়ে থাকা দেশের স্থানীয়দের আন্দোলনের ঠেলায় কলোনি শাসকরা তাদের মুক্ত করে দিয়ে পলায়ে যায় নাই। এমন উদাহরণ জানা নাই।
    বরং আমরা চোখ আরো বড় করে তাকাতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরে কেবল ব্রিটিশ কলোনি দখলদার নয়; এর সাথে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসসহ সব কলোনি দখলদারেরাই দখলদারি ছেড়ে সব দেশকেই কলোনিমুক্ত করে দিয়ে গিয়েছিল স্বেচ্ছায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো, কোনো দখলী দেশের স্থানীয় আন্দোলন-সংগ্রামের কারণেই তারা সেই কলোনি ত্যাগ করে যায়নি। কলোনি মুক্তি ঘটেছিল কার্যত স্বেচ্ছায়। অর্থাৎ মামলাটা কেবল বৃটিশদের বেলায় নয়, সকল কলোনিদখলদারেরাই স্বেচ্ছায় ছেড়ে চলে গেছিল। কিন্তু কেন?

    হ্যাঁ, একটা ‘তবে’ অবশ্যই ছিল। সেটা হলো আটলান্টিক চার্টার চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্টে। ওই চুক্তিকে একটা দাসখত বলা যায় যেখানে চার্চিল রুজভেল্টকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হিটলারের পরাজয়ের ওই বিশ্বযুদ্ধে বিজয় ঘটলে দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসনের সমাপ্তি টানা হবে। যুদ্ধ-পরবর্তী দুনিয়াতে আর কোন কলোনি শাসন থাকবে না। আর এই শর্তেই আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, নেতৃত্বে বড় ভূমিকা নেয়া যুদ্ধের খরচের বেশির ভাগ একা বয়েছিল ইত্যাদি। আর এখান থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব শুরু হয়েছিল।

    কাজেই নেতাজী সুভাষও অখণ্ড ভারত বা কলকাতার বিরাট ভূমিকা রাখা কোন রাজনীতিক হতেই পারেননি, ছিলেন না।

    তবে দ্বিতীয় আরেক প্রসঙ্গঃ
    নেতাজী সুভাষ আরেক বিরাট অবিবেচক কাজ করেছিলেন। তাঁর রাজনীতির বোধ-বুদ্ধির খামতি এখানে ধরা পড়ে। তিনি আসলে প্রথমে গিয়েছিলেন জার্মানিতে, সরাসরি হিটলারের সাথে দেখা করতে। কিন্তু হিটলার এশিয়ায় তাঁর সামর্থ্য নিয়ে আসতে ছড়িয়ে পরতে চাননি। ফলে অপারগতা প্রকাশ করে তিনিই  এশিয়ায় হিটলারের র্জামানির বন্ধু ও পক্ষশক্তি  জাপানের কাছে যেতে বলেন। আর সেখান থেকেই নেতাজীর জাপানের সাথে সম্পর্কের শুরু। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই ফর্মুলা অনুসারে এটা হয়ত জায়েজ বা  অন্যায় মনে হচ্ছে না। কিন্তু আসলে এটা অন্যায় এবং বিরাট ভুল-ও। কেন?

    প্রথমত ১৯৪২ সালের পয়সা জানুয়ারি থেকেই বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ একদম স্বচ্ছ হয়ে যায়। এমনকি মনে রাখতে হবে ঐ পয়লা জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করার দিন।  যারা ঘোষণা করে দিয়েছিল যুদ্ধে জিতলে সেই নতুন দুনিয়াতে সব কলোনি শাসন নিষিদ্ধ থাকবে। অথচ নেতাজী নামে কথিত নেতা সেটার খবর রাখেন নাই। তার রিডিং বা ইতিহাস-পাঠই ভুল, ডাহা মিথ্যার উপর দাঁড়ানো। তাই তিনি অবলীলায় যাচ্ছেন হিটলারের কাছে??????? যারা এর বিপরীত পক্ষ!!!

    আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান বিজয়ী হলে, নেতাজীও হয়ত বিজয়ী হতেন! কিন্তু সেই ভারত অথবা বেঙ্গলের এই বিজয়ী নেতাজী আমাদের জন্য নিজেই এক হিটলার হতেন! রোহিঙ্গাদের শাসক বার্মিজ শাসক জেনারেলরা যেমন, ঠিক সেরকম!। কেন এমন কথা বলছি? জাপানিরা ১৯৪২ সালেই বার্মাকে ব্রিটিশ কলোনি শাসন থেকে বের করে নিজের অধীনে নিয়েছিল। এই অর্থে স্বাধীন করে দিয়েছিল। অং সান সু চির বাবাসহ ত্রিশজন বার্মিজকে জাপানিজ আর্মি বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল। পরে তাদের নেতৃত্বেই এক সেনাবাহিনী গড়ে দিয়েছিল জাপানিরা যারা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে ‘মুক্ত’ করেছিল।
    আবার লক্ষ্য করা যাক,  ভারতের এত জায়গা থাকতে নেতাজী কোহিমায় গেছিলেন কেন? সেটা এজন্য যে, কোহিমা সীমান্তের ওপারেই ছিল জাপান সমর্থিত ঐ বার্মিজ বাহিনী। তাদের সাহায্যেই নেতাজী দুই একটা বর্ডারপোস্ট সাময়িক দখল নিতে পেরেছিলেন, যা টেকেনি।

    এখন আসেন কেন এখনকার বার্মার কথা তুললাম?
    আমার একটা লেখার শিরোনাম হল, মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব। সেখানে দেখিয়েছি বার্মা কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়। এর মূল তাতপর্য হল যেহেতু বার্মাকে ব্রিটিশমুক্ত করে দিচ্ছে জাপানিজ আর্মি। খুবই ভালো কথা হয়ত! মনে হতে পারে। কিন্তু ঐ জাপানের নিজের রাজনীতিক ব্যবস্থা কী ধরনের? জাপান তখন সরাসরি একটা রাজতন্ত্র। তাও আবার কিছু নৃশংস জেনারেলের এক সেনাবাহিনী সহায়তায় ওটা একটা সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ; এবং এক এশিয়ান কলোনি শাসক। পুরা কোরিয়া (তখন দুই কোরিয়া এক অখন্ড) এবং চীনের প্রায় ২৫% তখন জাপান কলোনিদখল করে রেখেছে। অর্থাৎ সোজাসাপ্টা বললে, জাপান তখন বৃটিশের মতই কলোনিদখলদার কিন্তু রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্য। মানে  কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়; কোনো জন-রাষ্ট্র বা রিপাবলিক নয়। আর যা রিপাবলিক নয়, তা কোন রাষ্ট্রই নয় এবং রাজনৈতিকও নয়। জনগণ বা পাবলিক বলে কোন শব্দ বা ধারণা প্রচলিত নাই। আছে রাজা-আমির আর এর বিপরীতে সবাই প্রজা।

    রাজনৈতিক রাষ্ট্র হওয়ার পূর্বশর্ত হল, দেশ-রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস সেখানে থাকে জনগণ। জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে বলে স্বীকার করার প্রশ্ন তখন আসে। রাজা-শাসক বলে শেখানে কেউ থাকে না। আগে জনপ্রতিনিধি হতে হয়, তবেই সে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি।

    এমনকি এখনো জাপান কোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। জাপানের ফর্মাল নাম ইউনিয়ন অব জাপান। নামের সাথে কোথাও ‘রিপাবলিক’ শব্দটা নেই যদিও সেখানে নির্বাচন হয়, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকে।অর্থাৎ তারা “গণতন্ত্রী” হয়ত কিন্তু কোন জনরাষ্ট্র, জনপ্রতিনিধিশীল রিপাবলিক রাষ্ট্র সেটা এখনও নয়।  আর এ কারণে সেকালে জাপানিজদের দেয়া সব ট্রেনিংয়ে বলাই বাহুল্য কোন রাজনীতি, পাবলিক, জনস্বার্থ, পিপলস রাইট ধারণাগুলো থাকে নাই; কাজ করে নাই। এ কারণে বলেছি, সেকালের বার্মা বা কলকাতার নেতাজী এরা রাজনীতি কী তাই জানতেন না, গুরুত্ব দেন নাই। অথচ স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন! একারণে  বর্তমানেও বার্মা বা মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব যারা ওর ক্ষমতায় আছে, শাসন করছে মাত্র।

    সারকথাঃ যে নিজেই এক সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ, সেই শাসক আমাকে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার ট্রেনিং দিতে পারেই না।

    আর  একারণেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কোন রিপাবলিক জনরাষ্ট্র গড়ার সৈনিক ছিলেন না। “রাজনীতি” বা পাবলিক শব্দের অর্থ না বুঝা নেতাজী কেবল সশস্ত্রতা আর সাথে স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন। দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার কথা বলে আবেগী করে তুলতেন। অতএব তার জাপানের বিজয়ের পরিণতিতে এশিয়ার দেশগুলো হত একেকটা বার্মা – নেতাজীর  সেই পরিণতি হত একটা ‘গর্ভস্রাব’।  কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণা নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণাই নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কিন্তু তবু সাবধান! তৃণমূলের মমতাকে মোদির সাথে তার নেতাজী নিয়ে লড়াই করতে দিতে হবে; এটা আমরা নাকচ করব না। কারণ এটা ঠিক ‘নেতাজীকে’ নিয়ে কোনো লড়াই নয়। নেতাজীর আড়ালে এটা মোদির হিন্দুত্বে ভারতের অধীনের কলকাতা নাকি বাঙালি হিন্দুর কলকাতা থাকবে, এর লড়াই এটা।  এটাই কলকাতা বা মমতার নিজস্ব লড়াই – নিজি মামলা – যেখানে আমরা কেবল কামনা করতে পারি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বিজয়ী হোক! টিকে থাকুক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৯ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “মোদি-মমতার ‘নেতাজী’ বিবাদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Tp

    Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress

     

    ঘটনা এখানে দু’টা কিন্তু কারণ একই। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূর থেকে দূর-অস্তে চলে যাচ্ছে। সেই সুত্রে, কোন ভারত-ঘনিষ্ট ও নির্ভরশীল কোন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্র্ককের সুযোগ ও সম্ভাবনাঢ় বাস্তবতা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা-বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় চলে যাবে কেন?

    যদিও এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ঘটছে  ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। তবে, সম্পর্কিত। কিভাবে? যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা সেটা কেবল বাংলাদেশের উপর না আরো অনেক দেশসহ সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল  এই মার্কিন অবরোধের মূল কারণ – “মানবাধিকার লঙ্ঘন”। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে… [to infuse human rights into its foreign policy,] । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়া – এ’দুই ঘটনার পেছনের কারণ একটাই আর তা হল – (আমেরিকার ভাষ্যমতে) মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র‌্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা সেটাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টার ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।

    ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া [Human Rights and US Foreign Policy: Implications for India and China]। যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ছিল ভারত প্রসঙ্গেঃ বলাই বাহুল্য তা ভারতের জন্য ছিল খুবই হতাশার। এমনকি সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসিঃ পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ [Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress]।

    ‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে কংগ্রেস সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক “স্টেট অব দা ইউনিয়নের” ভাষণও দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উদ্যোগে। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারে যেতে আগ্রহিরা দেখতে পারেন – Table 2: Comparison of tabled resolutions on India’s abrogation of Article 370 in Kashmir]।  আর সেখান থেকেই এই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে। যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এমনকি এটাও লিখেছে যে, আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

    কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনার অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কাশ্মির ইস্যু যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা “জঙ্গি-টেরর” , ফলে তারা খারাপ লোক! অথচ এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, একেবারে ফ্যাক্টস লুকানো বা উল্টেদেয়া কথা। অথচ মূল ঘটনা গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্য নির্বাচনে পরিকল্পিত ব্যাপক কারচুপি। ঐ নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ফারুক আব্দুল্লাহ (মানে তখনকার কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কারচুপির পক্ষে গোপন ভাষ্যে সাফাই কী ছিল?
    তাদের খোড়াযুক্তি আর কানে-কানে প্রচার করা সাফাইটা ছিল যেহেতু ঐবছর মুফতি মোহম্মদ সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ইসলামি দলের একটা জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং তারা পপুলার ও জিতে যাবার প্রবল সম্ভাবনা; অতএব এদেরকে যেকোন উপায়ে ঠেকানো জায়েজ।  এককথায় বললে রাজীব-আব্দুল্লাহর অন্যায় জোট কাশ্মিরে আইনি রাজনীতি, প্রকাশ্য ও কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতি আর থাকবে কিনা সে পরোয়া করলেন না। এনিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখা এখানে আগ্রহিরা পড়তে পারেন।  তারা আইনি রাজনীতিক ব্যবস্থায় কবর দিয়ে হলেও কারচুপি করে মুফতি সাঈদের জোটকে পরাজিত দেখানোর জিদে ডুবে গেলেন।  আর তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে – এই রাজনৈতিক ধারা কাশ্মিরে মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে এর বিপরীতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে তিনিই প্রথম মিথ্যা বয়ান চালু করলেন। তিনি দাবি করতে থাকলেন, ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তানই এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভাররের কাশ্মিরকে অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে তথাকথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ানে গ্লোবাল জোট বেঁধে ছিল।

    সেই ১৯৮৭ সালের পর থেকে হিসাব করলে, গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার ভাটা বা নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়েই ওআরএফ-এর এই রিপোর্ট। মজার কথা হল – এই বাজপেয়িকেই তিনি  নাকি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলে ভারতের অনেকে প্রচার করে থাকেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনাও করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই যোগানদার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।

    বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই মারাত্মক অসৎতার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে থাকা নয়, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে বা ভাটায়’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন – ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে – সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল বা  উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখছে।

    অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, ভারতের নিজেকে ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারতও তৈরি হচ্ছিল। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বা এক মাসেরও আগে থেকে ঐ সামিটের দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল প্রথমতঃ, আমরা এখন খুজলে দেখব মোদি ওই আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তখন তা খেয়াল করিনি। যার মূল কারণ হল,  মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ ফ্যাক্টস হল মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!

    এসব অস্বস্তিকর সময় ও সভা মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এসব কিছুটা হাল্কা করতে ওর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) এক ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক  রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়। কিন্তু যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। নয়নিমারা হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিটের সেসব সাংবাদিক যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করিয়েছে যে “ভারত একটা পরাশক্তি” হয়ে গেছে। আর তারা কোন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকুক বা না তারা এটা বিশ্বাস করা সাংবাদিক। তেমনই আরেকজন হল, দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার। সে যাই হোক, গত ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত ছিল সেটা – তা আজো কেউ বলল না বা জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে “চীনকে মেসেজ দিচ্ছে_ বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে – সেটা! তাহলে চীন এলো কোথা থেকে ও কেন?

    আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারতই হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ফোকাস” বা সব কিছু ইত্যাদি বলে  বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার একেবারে  সমাপ্তি ঘোষণা না হইয়ে গেলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এখনভারতের পাশে আমেরিকা আর নাই – ফলে  এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায় – মূলত এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া। মালহোত্রার লেখার শিরোনাম খেয়াল করেন, [Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China]।

    এরপরেও এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, বুঝা যাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
    অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে – যেমনঃ ভারতের কাশ্মিরের মানবাধিকার লঙ্ঘন অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে আরো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?

    এর জবাব হলো – না, এর অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হল, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!

    আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
    একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মত উৎখাত হয়ে যাবার মত অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার  প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত আসলে  নিশ্চয় কোন পরাশক্তি নয়!!! নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন???

    জীবিত মানুষ আর মৃত-লাশের গভীর সম্পর্কঃ
    মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? আসলে এসব প্রশ্ন ছেয়ে ফেলেছিল সে সময়ের মোদির হিন্দুত্বের ভারতে!   মূল কারণ, মানুষ মূলত যেকোন মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা – ব্রিজের উপর থেকে তাঁর লাশও নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! বা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা, নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না; অথবা যা পরে ভাসেতে ভাসতে গঙ্গা নদী ধরে আরেক রাজ্যে পঁচা-গলা লাশ হিসাবে উঠবে কীনা …… ইত্যাদি। সারা ভারতের মানুষ এসব দেখে মানে নিজের সম্ভাব্য পরিণতি দেখে আঁতকে উঠেছিল!!! ভারতের মানুষেরা নিজের এই পরিণতি এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছিল। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা কী দরকার; এটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
    মোদি এসব জানতেন যে তার সম্পর্কে মানুষের গভীর মনে অন্তঃস্থলে তিনি কী পরিচয়ে আছেন?? তিনি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন!

    সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর শেষে (২০১৯ সালের মে মাস থেকে তিনি সেকেন্ড টার্মের প্রধানমন্ত্রী)। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এদের সবার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় – ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!

    কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে যেখানে এসে ঠেকে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!
    অবস্থা এখন এমন যে ইমরান খানের পাকিস্তান এই প্রথম এক নিজ ‘জাতীয় নিরাপত্তা পলিসি” [NSP] প্রণয়ন করেছে। যেটা আগের মত গতানুগতিক কেবল ভারতবিরোধিতার উপর দাঁড়ানো নয়। আর কেবল সরাসরি সরাসরি সামরিক নয় বরং সামগ্রিক। এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়াও পাকিস্তানের সহবস্থানের মনোভাবে লেখা এই নীতির প্রশংসা করেছে। এছাড়া প্রফেসর আয়েশা সিদ্দিকা যিনি পাকিস্তান অরিজিন লন্ডন  SOAS এর শিক্ষক কিন্তু  যিনি তার সেনা-ঘৃণা ম্যানিয়াকের জন্য কুখ্যাত, তিনিও অংশত এই পলিসিকে খারাপ বলতে পারেন নাই। পরোক্ষে প্রসংসা করেছেন বলা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদি বা তার সরকার এর সুযোগে ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার দিকে আগাবেন সেই সুযোগ মোদির নাই। কারণ ইমরান কেন যেকোন পাকিস্তানই তার কাছে এখন একমাত্র একটাই প্রয়োজনীয় – পাকিস্তান কোপানো মানে মুসলমান কোপানো আর তাতে ততই হিন্দুভোট নিজ বাক্সে — এই চিন্তার বাইরে যাবার অবস্থায় নাই মোদি। বরং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আরেকবার ফেক একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে এই রচনা আর মোদি তাতে বিজয়ী এটা দেখানো যায় কী করে এটাই মোদির লক্ষ্য আর তিনি তা খুজছেন!!

    এই একই সুত্রে, কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাময় নয়। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, হাসিনার ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতই পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে।  অর্থাৎ আগে ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধুত্ব জোরদার ছিল বলেই হাসিনা সরাসরি আমেরিকাকে এড়িয়ে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে পারত। আর এতে ভারত সরকার এবং এমনকি ‘র’-এর বহু অন্যায় আবদার হাসিনাকে সহ্য করতে হত। সেসব পরিস্থিতি গত ১৬ ডিসেম্বরের পরে একেবারেই লক-আপ হয়ে গেছে। যা আর ফিরবে না। মূল কারণ, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক দূর অস্তে চলে গেছে। এটা কোনভাবেই আর আগের সময়কালে একেবারেই নাই। আর এটা যে নাই তা সবগুলো পক্ষের কাছেই উদাম।  উপায়ন্ত না পেয়ে  ওআরএফ-এর আরেক ফেলো, সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর লেখায় তার ছাপ পড়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি ওআরএফ-এর সাইটে যে লেখা দিয়েছেন তাতে চীনার পাকিস্তানকেই কোপানোর চেষ্টা করে গেছেন। সাথে যেমন বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের “অনন্য সম্পর্কটা” চীনের কারণে “উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা” হয়ে দাড়িয়েছে। ঐ লেখার লম্বা শিরোনামটা  হলঃ “এক অনন্য সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন: উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ভারত এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব” – এর মূল  অর্থ এটাই। আরো সোজা করে বললে পিনাক সবকিছুকে নামিয়ে এনেছেন ভারতের অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের আপত্তিতে।
    ঠিক যেমন ও যে কারণে ভারত কোন চীনা অস্ত্র কিনে না, কিনবেও না; সস্তা ও মাঙনা হলেও নিবে না – ঠিক একই কারণে বাংলাদেশ ভারতের অস্ত্রের গুনাগুণ নুন্যতম ভাল কোয়ালিটির হলেও অথবা তা বাংলাদেশকে মাঙনা দিলেও বাংলাদেশ নিবে না।  এটা পানির মত সরল সত্য! এটা না বুঝার কিছু নাই। কিন্তু না বুঝার ভান ধরে পিনাক রঞ্জন এখন চীনের বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন ঐ লেখায়। আবার এনিয়ে একটা মিথ্যা বা শব্দ বদল করে নেয়া ক্যাম্পেইনও করছে অনেকে। শিরোনাম লিখেছে,   “চীনের ওপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে: পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী! – এভাবে। যেটা করেছে ক্যাম্পেইন পত্রিকা আমাদের সময়। অথচ পিনাক রঞ্জনের মূল বক্তব্যে ছিল,  “চিন থেকে আমদানি করা সামরিক সরঞ্জামের উপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে”। মূল লেখা ওআরএফ-এর বাংলায় সাইট থেকে দেখতে পারেন এখানে।  অর্থাৎ সাধারণভাবে সব ব্যাপারে বাংলাদেশে চীন-নির্ভরতা নাকি কেবল অস্ত্র কিনাতে এই নির্ভরতা – এই দুটাকে এক করে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। পিনাক রঞ্জন এখানে কেবল “অস্ত্র কেনার” ক্ষেত্রের কথা তুলেছেন।

    তবে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে পড়া ভা ভাটায় চলে যাওয়া নিয়ে  ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংকের লেখা বা রিপোর্টে। আমেরিকা ভারত থেকে অনেক দূরের কেউ – এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমনঃ “আমেরিকা কি অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সঠিক ভাবে পা ফেলছে?” – এটা ওআরএফ-এর আরেক ফেলোর লেখা, এখান এমন সুর দেখা যাবে। যা অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউ/স্বামী এর সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে।
    সব মিলিয়ে  নতুন করে এক ‘গ্লোবাল পোলারাইজেশন’ সাজিয়ে উঠা আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে!
    আর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা – এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও আরও হবে ভারতের। বাংলাদেশ তী ভারতেরই – যেন তার গ্রামের বাগানবাড়ি – এই অতি আহ্লাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকের অনুমান এটা শেষ হবে  ২০০৬ সালের আগের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যায়গায় –  “ব্যাক টু দ্যা প্যাভেলিয়ানে”!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২২ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদি মুসলমান ‘নির্মূলের’ উস্কানি তুলছেন

    মোদি মুসলমান ‘নির্মূলের’ উস্কানি তুলছেন

    গৌতম দাস

    ০৩ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3S5

     

    সাধুবেশে মুসলমান গণহত্যা-নির্মুলের প্রধান উস্কানিদাতা

    Is India Headed for an Anti-Muslim Genocide?

    প্রশাসনিকভাবে ‘হরিদ্বার’ যদিও একটি জেলা শহর মাত্র, কিন্তু এটা ভারতে হিন্দুদের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান [pilgrimage]। বয়স্ক হিন্দু নারী-পুরুষের কাছে সাধারণত এক আগ্রহ ও আকাঙ্খার নাম হরিদ্বার যে, যদি তিনি একবার তীর্থের উদ্দেশ্যে হরিদ্বার ঘুরে আসতে পারতেন!  তীর্থ মানে হল পূণ্যসঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে কোন “পবিত্র স্থান”  ভ্রমণ। পবিত্র স্থান মানে সেসব জায়গাকে হিন্দু ধর্মীয় মিথিক্যাল ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান মানা হয়েছে। সাধারণত দেখা যায় বেশিরভাগ এমন তীর্থস্থানগুলো ভারতের উত্তরপ্রদেশেরও সর্ব-উত্তরে (ভারতের দিক থেকে উত্তর-পুর্ব কোণে) প্রায় নেপাল সীমান্তের কাছে।
    গত ২০০০ সালের আগে এই হরিদ্বার ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের অংশ। কিন্তু গত নভেম্বর ২০০০ সালে উত্তরপ্রদেশের সর্ব-উত্তর অংশকে প্রশাসনিকভাবে উত্তরাখন্ড [Uttarakhand] নামে আলাদা আরেক রাজ্য বলে এর জন্মের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। তাই হরিদ্বার এখন নবগঠিত উত্তরাখন্ড রাজ্যের ১৩ জেলার একটা। তবুও উত্তরাখন্ড ভারতের ছোট ছোট রাজ্যের কাতারেই রয়ে যায়। কারণ একটা তুলনা করলে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার (রাজ্য সরকার যে নির্বাচিত সংসদের হাতে গঠিত ও জবাবদিহিতা করে থেকে) ২৯৪ আসনের চেয়ে উত্তরাখন্ডে বিধানসভা মাত্র ৭০ আসনের , আবার কেন্দ্রীয় সংসদের আসন নিয়ে যদি তুলনা করি তবে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের তুলনায় উত্তরাখন্ডের আসন মাত্র পাঁচটা। তবে এটা একটা জনসংখ্যাগত ধারণা পাওয়ার জন্য তুলনা মাত্র।

    ওদিকে উত্তরপ্রদেশ মানে কুখ্যাত যোগী আদিত্যনাথ যার (বিজেপি) মুখ্যমন্ত্রী; যিনি জনপ্রতিনিধির পরিচয়ের চেয়ে কট্টর ধর্মীয় জবরদস্তির এক শাসক হিসেবে বেশি নাম কামিয়েছেন। পুরানা সেই উত্তরপ্রদেশের এক জেলা হরিদ্বার তীর্থক্ষেত্র হিসেবে নামডাকের আরেক কারণ, এটা হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত। ফলে দু’টি নদী যমুনা ও গঙ্গা নদীর প্রবাহের শুরু, হিমালয়ের গা-চুইয়ে আসা বরফগলা পানির উৎস, এখান থেকেই। এই নদীর পানিতে স্নান, এর স্বর্গীয় প্রভাব ফেলার ক্ষমতা আছে – এই মিথ [Myth, মুখে মুখে প্রচলিত বহুপুরানো কোন ধারণা] সেখানে প্রচলিত। এ’কারণে এখানে গঙ্গাকে শুধু গঙ্গা না বলে আগে পবিত্র শব্দ বসিয়ে মানে ‘পবিত্র গঙ্গা’ লেখা বা উচ্চারণ এর রেওয়াজ। যদিও বর্তমানে সারা হরিদ্বারের মানুষের বসবাসের প্রধান সঙ্কটের নাম পানি। খাবার পানি বা চাষাবাদের পানি দু’টিরই সঙ্কট এখানে। নদী দূষিত আর পানি প্রাপ্যতা কমে গিয়ে শহর এলাকাগুলোয় হাহাকার উঠেছে।

    উত্তরাখন্ডের ভেতরেই হরিদ্বার আর  এই হরিদ্বার থেকে মাত্র কুড়ি কিমির বাস-দূরত্বের মধ্যেই আবার আরেক তীর্থের শহর ঋষিকেশ। ঋষিকেশ যোগ [Yoga] (পপুলারলি যা এটা ‘যোগব্যায়াম’ বলে পরিচিত) ও ধ্যান বা মেডিটেশন – একে বুঝবার জানবার শহর।  এ’ছাড়া আরেক মিথিক্যাল গঙ্গাস্নানের ভুমিঘাট হল “কুম্ভমেলা” সেটাও এখানেই এই হরিদ্বারে। যা ১২ বছর পরপর আয়োজন করা রীতি আর এসময়ে গঙ্গাস্নানে খাস পুণ্য মিলবে- এ্মন বিশ্বাসে বা লোভে এবার (২০২১) সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর নিজের উদ্যোগে করোনার প্রকোপের মধ্যেও এ’মেলার আয়োজন চালু রেখেছিলেন। আর তাতে করোনাভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভে ভারতের প্রশাসন ও অর্থনীতি ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। না ভাইরাসে আক্রান্তদের ভাগ্যে  হাসপাতালের বেড অথবা শ্বাস সহজের অক্সিজেন মিলেছে কিংবা মারা যাবার পর সৎকার – কোনোটাই ঠিকমত কপালে জুটেনি কুম্ভমেলায় অংশগ্রহণকারীদের-সহ উত্তরপ্রদেশ ও ভারতের প্রায় সব শহরের বাসিন্দাদের। মোদি সরকারের সেকেন্ডম্যান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যন্ত দল বেঁধে গায়ে গা লাগিয়ে কথিত পুণ্যস্নানের লোভ সামলাতে পারেননি। এমন পুণ্যস্নানের পরে সৎকারবিহীন মৃত্যু যাদের হয়েছে তা নিয়ে খুব কিছু বলাও আসলে অস্বস্তিকর!

    অর্থাৎ সাধারণভাবে মূলত ধর্মীয় ভিজিটর বা ট্যুরিস্টের শহর হরিদ্বার আর এটাই এর অর্থনৈতিক ভিত্তি। আর কমবেশি সারা উত্তরাখন্ডই এমন। যার পিছনের অর্থ হল – বড়লোক ট্যুরিস্ট নয়, পুণ্য আদায়ের লোভে বা বলা যায় স্পিরিচুয়াল চাহিদা মিটাতে নিম্ন আয়ের যারা এরাই এই শহরের প্রধান ভিজিটর। আর এ’ফ্যাক্টরের কারণে উত্তরপ্রদেশের যেকোনো নতুন স্থাপনা বা অবকাঠামো বা কারখানা উতপাদন তা আর এই ঘিঞ্জি তীর্থস্থানগুলোতে নির্মাণ করা নয়; বরং এদেরকে পাশ কাটিয়ে অন্য শহরে স্থাপিত হতে শুরু করেছিল। আর ততই এসব তীর্থস্থানের শহুরগুলো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের নাম নিয়েছে। আর একপর্যায়ে নবগঠিত উত্তরাখন্ড হল আসলে তেমনই ওসব পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর সমাহার। মানে পিছিয়ে পড়া শহরহুলোকে নিয়ে গঠিত নতুন রাজ্য। এবার কড়া সত্যটা বলি, এরই পরিণতি হল, উত্তরাখন্ড তাই সাধু-সাধ্বীদের [সাধু শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ সাধ্বী] দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শহর। স্বভাবতই তাই বিজেপি-আরএসএসের বহু নামি-বেনামি অঙ্গসংগঠনের সক্রিয় তৎপরতার প্রধান শহর এটা। আর এসব ধর্মীয় নেতার প্রধান কাজ রাজনীতিবিদ ও রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকাশ্যে দায়-দায়িত্বহীন উস্কানি ও হুঙ্কার তুলে কথা বলা। আমাদের আজকের প্রসঙ্গ এটাই!

    দুই মাস আগে আমার এক লেখায় ত্রিপুরার মুসলমানদের উপর নিপীড়নে করুণ মার্জিনাল অবস্থা লক্ষ্য করে  বলেছিলাম, মোদি এখন সব হারানো মুসাফির, পাবলিক রেটিং যার তলানিতে। তাই সে এসব অপরাধমূলক নিপীড়নের রাস্তা ধরেছে। আর   এসব কিছু নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনাতেও খুব দূরে যাওয়া জরুরি নয়। কারণ যেসব রাজ্যে মোদির ভরাডুবির সম্ভাবনা বলে বিজেপি নিজেই  মনে করে তা বুঝার সবচেয়ে সহজ ফর্মুলা হল যে, যেসব রাজ্যে মুসলমান কোপানোর বিজেপি ততপরতা ও হুমকি যত বেশি বুঝতে হবে, বিজেপি মনে করে তাদের অবস্থা বা পাবলিক রেটিং ওখানে খুবই খারাপ। মোদির কাছে তাই, সমাজে মুসলমান হত্যার উন্মাদনা তোলাটাই ওসব কনষ্টিটুয়েন্সিতে হিন্দু-ভোটারদেরকে দলবেধে বিজেপি বাক্সে নিয়ে আসার শেষ ভরসা বা অবলম্বন। তাতে সরাসরি মুসলমান হত্যার উন্মাদনা আওড়ানো তা যতই মারাত্মকভাবে কনস্টিটিউশন বা নির্বাচন কমিশনের আইন লঙ্ঘন হোক না কেন, মোদি-অমিত তাতে পিছপা নন! বরং বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন!

    এসব বিচারে হরিদ্বার – এ তীর্থের শহর মানে পুণ্যলোভীদের খেদমত ও বিশ্বাস আরো শক্ত করা ও আশ্বাস দেয়ার উসিলায় সর্বজ্ঞানী, ধর্মজ্ঞানী ভাবধরে মিথিক্যাল গল্প ছড়িয়ে যারা পেটের ভাত জোগাড় করে এমন ‘পাণ্ডাদের’ শহর এটা। অরিজিনাল ‘পান্ডা’ শব্দের অর্থ,  ধর্মীয় টুরিস্টদের ধর্মীয় ক্রিয়া-কর্মাদি পালন ও সম্পন্ন করার কাজে যারা ভিজিটরদের থেকে নেয়া ফি-এর বিনিময়ে সহায়তা দেয়। এই বিশেষ মানসিক স্থিতি ও পরিবেশটা কেমন তা বুঝানোর জন্য এই লেখার শুরু থেকেই প্রায় ৩০০ অক্ষর ব্যয় করলাম। এ’ছাড়া নতুন বছর, এই ২০২২ সালে মোদির জন্য নির্ধারক উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজের নির্বাচন, তা অনুষ্ঠিত হবে এই ফেব্রুয়ারি-মার্চে।

    অতএব বলাবাহুল্য মোদির বিজেপির কাছে  তাই হরিদ্বারের কথিত সাধু-সাধ্বীর  কদর এখন তুঙ্গে। এদের ভাড়া করে নিয়ে হুঙ্কারের বক্তৃতা দেয়ানোর স্টাইলটা হল, তারা সরাসরি মুসলমানদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অপমান করে তাদের – মেরে ফেলবে, কেটে ফেলবে, পিষে ফেলবে – এথনিক ক্লিনজিং করে মুসলমান মুছে দেবে- এসব কথা বলবে তারা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে। আর এদের দিয়ে বলানোতে মোদি আশা করেন, বিরোধীরা যেন আপত্তি না তুলে এই ভেবে যে, ওরা ‘ধর্মীয় লোক’ কত কিছুই না বলে। অথবা এরা, আধুনিক রাষ্ট্র কনস্টিটিউশন না বুঝে বলেছে এই ভেবে বিরোধীরা এটা উপেক্ষা করুক। আবার বিরোধীরা এ নিয়ে আপত্তি তুললে সেটা থেকে পরে পাওয়া সামাজিক হৈচৈ বিজেপির নির্বাচনী ইচ্ছা- হিন্দুভোটের পোলারাইজেশন সেটা করে দিক, এটাই মোদি-বিজেপির প্রধান খায়েস। আর সর্বোপরি পুলিশ যেন কোনো অভিযোগ না নেয় বা মামলাকে নিরুৎসাহিত করে এটাই অমিত শাহের এবারের ‘পবিত্র’ নির্বাচনী দায়িত্ব। এরই মধ্যে এক পুলিশ অফিসার সেসব জ্ঞান পাবলিককে বিতরণ করে দিয়েছে মিডিয়ায়। অথচ কাহিনী হল, এবার ক্রিকেটে পাকিস্তানকে সমর্থন-উচ্ছ্বাস দেখানোতে এক ভারতীয় কাশ্মিরি তরুণের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসদমন আইনে চার্জ এনেছে পুলিশ।

    হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর আয়োজনঃ
    এবারের ঘটনার শুরু যেভাবে, গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে “ধর্মসংসদ” নামে সংগঠন এক আয়োজন করেছিল যার মূল আয়োজক ছিলেন এক বিতর্কিত কথিত ধর্মগুরু যতি নরসিংহানন্দ সরস্বতী। এদের নাম এমন বাহারিই হয়ে থাকে। “সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন হিন্দু রক্ষা সেনার প্রবোধানন্দ গিরি, বিজেপির মহিলা মোর্চার নেত্রী উদিতা ত্যাগী এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়। ভাইরাল একটি ক্লিপে দেখা যায়, প্রবোধানন্দ গিরি বলছেন, ‘মিয়ানমারের মতো আমাদের পুলিশ, সেনা, রাজনীতিবিদ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সব মানুষকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এবার ‘সাফাই [ক্লিনজিং] অভিযান’ চালাতে হবে।” এই ভাষ্যটা আনন্দবাজারের। এখানে সাফাই মানে ‘ক্লিনজিং বা ‘নির্মূল’ করা বুঝতে হবে। ভারতের দেয়া বাংলাভাষী বয়ান থেকে সরাসরি তা বুঝবার জন্য আনন্দবাজারের ভাষ্যটা এখানে এনেছি।
    তবে আম-পাঠকদের জন্য একটা সাবধান-বার্তা জানিয়ে রাখি। হরিদ্বারের ওসব ধর্মীয় নেতার সরাসরি সেসব বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। বলাহুল্য, তা লোমহর্ষক, একটা মানুষ কী করে গোষ্ঠী-ধরে অপর মানুষদের খুন করার আহ্বান জানাতে পারে? কিন্তু  তবু সাবধান আমরাও ওই ভিডিওর ব্যাপক প্রচার করে হিন্দুদের ‘অপর’ বলে তাদেরকেও খুন হতে  খুনাখুনির উসকানি দিতে পারি না। সেটা আইনি চোখেও পালটা আমাদের ‘অপরাধ’ হবে। তাদের মতোই দায়দায়িত্বহীন কাজ হবে। এমন প্রত্যেক ইউটিউব ভিডিওর শুরুতে সেকথা স্পষ্ট বলা আছে; পাবেন। পড়ে নিতে পারেন। তারা অপরাধী মানুষ ও দায়দায়িত্বহীন হলে আমরা যারা ধর্ম-নির্বিশেষে এমন মুসলমান হত্যার ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই, তারাও তাদের মতোই অপরাধী ও দায়দায়িত্বহীন হয়ে যেতে পারি না।

    এই অপরাধের শাস্তি কী?
    গত ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার এক মৌলিক ফারাক এখানেই। দুনিয়াতে কোনো দু’টা জনগোষ্ঠী স্বার্থ-সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়লে অন্যকে ‘অপরজ্ঞান’ করে তাদের ‘গুষ্ঠি-সহ নির্মূলের’ কথা, উগ্র ঘৃণা ছড়ানোর কথা আমরা শুনে থাকি। অপরকে কোনো একটা শব্দ দিয়ে ব্যঙ্গ বা তুচ্ছ করে কথা বলা যেমন, পাকিস্তানিদের”পাকি” বলা বা হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলা ইত্যাদি; ভদ্র বা আইনি ভাষায় এটাকে বলে ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর শুরুর প্রথমদিকের  উস্কানি তুলে কথা বলা। যেটা এরপর গণহত্যার পথে যাবার আগাম-ধ্বনি!

    এটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার গংয়ের প্রধান অপরাধ যিনি ঠিক এই কথিত সাধু-সাধ্বীদের মতই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর উসকানি, কিল দেম [kill them]– এই আহ্বানে প্রধানত ইহুদিদের আর সাথে অন্য যেকোনো বিরোধীদের হত্যা করেছিলেন। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াতে সেই প্রথম – আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসঙ্ঘ, মানবাধিকার সনদ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে নানান সংগঠন গড়ে উঠে এবং এখান থেকেই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর অপরাধে ‘সর্বোচ্চ শাস্তির’ সুপারিশ করা হয়। সেকালের জার্মানির ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে হিটলারের বন্ধুদের বিচার হয়েছিল। পরে এই আইনের আরো ভুলত্রুটি সংশোধন করে নতুন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট অ্যাক্ট ২০০১’ [ICC act 2001] গৃহীত হয়েছে। যেখানেও এই অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাগার। প্রতিটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশনে একইভাবে একাজকে এমন অপরাধ বলে গণ্য করে রাখার কথা।

    এথনিক ক্লিনজিং কথাটাঃ
    দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। তবে নামটা আইনি ও ভদ্রভাষায় হাজির করা হয়েছে বলে অনেকের কাছে অস্পষ্ট লাগতে পারে। এথনিক [ethnic] এই শব্দকে খাস বাংলায় এটাকে বলি আমরা ‘জাতি’।  তবে এটা ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে যাকে জাতি বা জনগোষ্ঠি  বলে বুঝানো হয় সেই অর্থে। আর ক্লিনজিং [cleansing], এটা বলে বুঝানো হয় কোন জনগোষ্ঠির প্রতিটা সদস্যকে খুন করার কল্পনা বা হুমকি-মূলক ততপরতা। গত ১৯৭১ সালের সময় এটাই আরেক শব্দে বর্ননা করা খুব চালু ছিল যেমন বলা হত “পোড়া মাটির” নীতি। সম্ভবত সেখানে ব্যাখ্যার কল্পনাটা হল, একটা জনগোষ্ঠির যেখানে বসবাস সেই ভুখন্ডের সবকিছুকে আগুন লাগিয়ে পুরিয়ে দেয়া, এভাবে নির্মুল করা। অর্থাৎ যেখানে অবশেষ কেবল যা বাচে [residue] তা হল পোড়ামাটি-টা এই কল্পনা। আর বাংলা ভাষায় ক্লিনজিং শব্দ বাংলায় সবচেয়ে পরিচিত শব্দ হল ‘নির্মুল’। যেমন খেয়াল করেন,  শাহরিয়ার কবিরে সংগঠন “ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিটি” – এই নামের মধ্যে নির্মুল শব্দটা্কে। এখানে মজার তামাসা হল, শাহবাগে বসে একদিকে তারা “ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের” মত জামায়াতের (কার্যত বুঝাতে চায় ইসলাম ধর্মের নিকুচি) বিচার চেয়েছে। অথচ এই বিচার যারা চাচ্ছে তেমন এক সংগঠনের নামই আবার নির্মুল কমিটি! মানে  ক্লিনজিং করতে চাওয়াদের কমিটি।
    সারা দুনিয়ায় এখন “গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমে” সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। মানে কোন জাতি বা জনগোষ্ঠিকে নির্মুল বা মুছে ফেলার চেষ্টা ও কাজ। এটাই বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ মানা হয়! তাই কাউকে “নির্মুল” করে দিবার অথবা মুছে ফেলে দিবার জন্য পাবলিকের মাঝে উস্কানি তোলা বা ক্লিনজিং – এক কঠিনতম অপরাধ। মোদী সেই অপরাধী এবং সেটা করতেও বেপরোয়া!

    কিন্তু ভারতে এনিয়ে এখনো আমরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে, সুয়োমোটো[Suo Moto] মানে  কোন অভিযোগকারীর অপেক্ষায় না থেকে বিচারক নিজেই ঘটনা আমলে নিয়ে মামলার প্রক্রিয়া শুরু করা্; এর  কোনো খবর নেই। এটা “জনস্বার্থ সমুন্নত রাখতে মামলাও” [Public Interest Litigation (PIL)] এর মতনও। তাও করা হয় নাই। আর ভারতীয় নির্বাচন  কমিশন? তাদের নাম নিলে আমাদেরকেই যেন উলটা তওবা পড়তে হবে !  চলতি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে উত্তরাখন্ড ও উত্তরপ্রদেশ এ’দুই রাজ্যেই বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনা করতে আসা এই কমিশনেরই দায়িত্ব। কাজেই সবচেয়ে সম্মুখসারির উপযুক্ত  অথরিটি হল এই কমিশন!  কিন্তু তারাও মনে হচ্ছে, তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আর মোদি সরকারের কথা আর কী বলব? প্রধান বেনিফিশিয়ারি হিসাবে বরং এঘটনায় ন্যায্যত মোদির সরকারের বিরুদ্ধেই মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু না, অমিত শাহ উল্টা নিশ্চিত করছেন কথিত ‘সাধুদের’ যেন কেউ স্পর্শ না করে।

    ‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন?
    সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল, হরিদ্বারে এই ‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন? কেন গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর এই আয়োজন! আমরা জানি না ঠিক কিসের প্রতিবাদে তাদের এই হুঙ্কার? কোথাও কি মুসলমানরা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনায় আপত্তি বা বাধা দিয়েছিল? না, এমন কোনো রেফারেন্স কথিত সাধুরাও দেয়নি। অর্থাৎ এ থেকে পরিষ্কার, এর উদ্দেশ্য একটাই – দুই মাস পরে নির্বাচন। আর তাতে সব হিন্দুভোট যেন বিজেপি বাক্সে যায় এই অনুমানে যতটা ব্যাপকভাবে পারা যায় এক মুসলমান ঘৃণা তীব্রতর করে হিন্দু-জোশ তোলা। আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছ হুমকি গালাগালি দিয়ে হিন্দু-জোশ তোলার সমতুল্য এফেক্ট আর কী কিছু হতে পারে?

    আবার এদের এই কথিত ‘ধর্ম-সংসদ’ শব্দটাই দেখুন। সংসদ শব্দটা দোজাহান-বাচক কোনো শব্দ নয়। শব্দটা কেবল বৈষয়িক দুনিয়া-কেন্দ্রিক। কারণ সংসদ মানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একত্রে শলাপরামর্শের জন্য বসার নির্দিষ্ট স্থান। আর জনপ্রতিনিধি শব্দটা আমাদের এই বস্তুগত দুনিয়ার, কেবল এই জাহানের শব্দ। আমরা আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তাকে আমাদের প্রতিনিধিরূপে নির্বাচন করি না। আমাদের সম্পর্ক তা নয় বলেই সব ধর্মতত্ত্ব সেই সাক্ষ্য দেয়। কাজেই এই ধর্ম-সংসদ কী জিনিস? সোনার পাথরের বাটি- এরকম? যদি আবার ভুল শব্দে তারা ‘ধর্মের ক্ষমতা’ বুঝাতে চেয়ে থাকেন তো তবে এভাবে বর্ণনা করার অথরিটি তাদের কে দিয়েছে? দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই তাদের এই অথরিটি দিতে পারে না।

    তা হলে এরা কারা? এরা হলো ধর্মীয় গুণ্ডা যাদের মোদির দল ভাড়া করেছেন এই আসন্ন নির্বাচনী মৌসুমে।

    তবে এতই ঘৃণ্য অপরাধীদের সম্পর্কে খুবই সীমিত দুই একটা ভারতীয় মিডিয়া রিপোর্ট করেছে। টিভি-মাধ্যমের মধ্যে করেছে এনডিটিভি, টেক্সট রিপোর্ট ও সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিস্তারিত ও ডিটেইল রিপোর্ট করেছে বরাবরের মতো ‘ওয়াইর’ (WIRE) এই ওয়েব পত্রিকাটা। এ ছাড়া সবার আগে রিপোর্ট করেছে কুয়িন্ট (QUINT), দা প্রিন্ট করেছে এদের সবার থেকে নিয়ে, তা হলেও করেছে। এছাড়া বিজেপি সমর্থক এসব আখড়াগুলো কেমন এর বর্ণনা দিয়েছে এরা।  অবশ্য যেসব মিডিয়া কিছুই বলে নাই, তাদের মুখ বন্ধ করতেও তো অর্থ লেগেছে!
    বাংলাদেশে আমরা কত গভীর বিপদে আছে এর ভাল প্রমাণ হল কোন প্রগতিবাদী টু শব্দ করছে না। কোন একটা ছোট বিবৃতিও নাই; যেন মোদি যেহেতু ভারতের নেতা অতএব তিনিই হলেন “প্রগতিবাদের নেতা”। যেখানে এমনকি পাকিস্তানের ইমরান সরকার এই ঘটনার সিরিয়াসনেস বুঝাতে পাকিস্তানের ভারতীয় হাইকমিশনকে ডেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা এটাকে “ফ্যাসিজমের জন্মদাতা বাবা হওয়া” [beget fascism] বলে চিহ্নিত করেছে।  কারণ আগেই প্রতিবাদী সচেতনতার লিড না নিলে আমরা তিনদেশের সাধারণ মানুষ এই ফ্যাসিজমের উন্মাদনায় এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যেতে পারি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ০১ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “মোদি নির্মূলের হুমকি দিয়ে হলেও জিততে চান”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    বাইডেনের অবরোধঃ
    অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২১   ১৭ঃ১৮ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3R1

       US President Joe Biden’s Summit for Democracy

     

    ঘোর ঘনঘটা। অন্ধকার ছেয়ে আসছে!
    যদিও এই অন্ধকার মানে এটা নয় যে এখন বাইডেন হাতে আলোর প্রদীপ আছে অথবা হাতে প্রদীপ নিয়ে তিনি মঞ্চে আসছেনই! না ব্যাপারটা একেবারেই এবার ২০০৭ সালের মত এত সরল নয়। বরং উল্টা-পালটা বহু কিছুরই সম্ভাবনা। সবচেয়ে বড় কথা এক প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা আর গভীর অনিশ্চয়তা ছেয়ে আসতে যাচ্ছে! সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সে “আমেরিকান অথরিটি” আর নাই। অথচ ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে একমত নাই। যেটুকু গত ৭৫ বছরে তোইরি হয়েছিল তা সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকা অপব্যবহার করাতে সবকিছু এখন অন্ধকারে। সারকথায় পুরান ওস্তাদের অথরিটি দুর্বল এমনকি চ্যালেঞ্জড হয়ে যাচ্ছে অথচ  ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে যেটুকু ঐক্যমত্য ছিল তাই ভেঙ্গে পড়তেছে। ইউক্রেন নিয়ে হুঙ্কার পালটা হুঙ্কার এর প্রমাণ। তবে আমাদের প্রসঙ্গ বাইডেনের অবরোধ আরোপ।

    বাইডেন বাংলাদেশের উপর অবরোধ আরোপ করেছেন। আর এটা ২০০৭ নয়, ২০২১ সাল। যখন আমেরিকার গ্লোবাল কর্তৃত্ব ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে; অর্থাৎ সিংহ এবার আরও বুড়া ও বেশি উত্থান-রহিত হয়ে গেছে। অথচ বাইডেন সেদিকটা আমল না করে উলটা বুড়া সিংহ আমেরিকাকে ওভার স্ট্রেস মানে আরও ভারের বোঝা চাপিয়ে দিলেন এই অবরোধ আরোপ করে। আর তাতে এটা মোটেই অসম্ভব নয় যে এতে বুড়া সিংহের ঘারে সবকিছু হুরমুর করে ভেঙ্গেচুড়ে পড়ল। ফলাফল  আরো এক গভীর নিম্নচাপ!
    উপরে এসব কথার অর্থ আবার কোনমতেই এটা নয় যে এখানে আমাদের সরকার সেফ থাকবে এমন কোন ইঙ্গিত দিচ্ছি। সেটা নয় তবে বহুকিছুই অনিশ্চিত বলছি ফলে স্বভাবতই এর মধ্যে সরকারের টিকে যাওয়াটাও অনিশ্চয়তা থেকে বাইরে থাকবে কী করে! মোট কথা যাদের হাতে যা কিছু নিয়ন্ত্রিত থাকতে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম সেসব সম্ভবত আর তেমন থাকছে না।  ফলে সবার আগে ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে পুরাতন ভারসাম্যটা।

    তবে একটা সারকথা একেবারে আঙুলে গুনে আমরা মনে রাখতে পারি যে, এবারের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” বা সেখান থেকে ঘোষিত অবরোধের নিষেধাজ্ঞার তালিকা প্রকাশের পর থেকে দুনিয়াটা আর আগের মত নাই, আগের জায়গায় তা আর স্থির নাই হয়ে গেছে। যদিও ক্রমশ ঘটনা গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ঘটনায় সেদিকেই যাচ্ছিল। তাতে বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা হল এসবের ‘ফাইনাল এলার্ম’ বাজানো।
    কিন্তু মজার কথাটা হল যদি প্রশ্ন জাগে বাইডেন কী জানতেন যে তিনি একটা “ফাইনাল এলার্ম” বাজিয়ে দিচ্ছেন! এর জবাবটা হবে খুব সম্ভবত না। তিনি বরং আমেরিকান সক্ষমতা আগের মত আছে মনে করে স্বাভাবিক মনে করেই একাজ করেছেন। হয়ত এখন ক্রমশ বুঝতেছেন বা বুঝবেন। এর একটা লক্ষণ হল থিঙ্কট্যাংক ফেলো কুগেলম্যান এর মন্তব্য যেটা প্রথম আলোতে অনুবাদে ছাপা হয়েছে। আর যার শিরোনাম “এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য খারাপও হতে পারে”। অর্থাৎ তিনি আমেরিকার জন্য খারাপ কথাগুলো সবটা উচ্চারণ করলেন না। কেবল কিছু ইঙ্গিত দিলেন।

    দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছেঃ
    আসলে আমাদের বেশির ভাগের অলক্ষ্যেই দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছে।  পোলারাইজেশন বা বাংলায় মেরুকরণ মানে কে কার দলে বা পক্ষে; সেই পক্ষা-পক্ষির ব্যাপারটা বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে যেভাবে সাজানো থেকে কাজ করত তা ভেঙ্গে গেছে। যেমন ভারতের কথাই যদি ধরি, বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগের দিনে,  ভারত আমেরিকার খুবই ঘনিষ্ট একথা মানতে কারও অসুবিধা হত না। এমনকি অকাসের না হোক অন্তত কোয়াডের প্রসঙ্গ উঠলে ভারত অবশ্যই চীনবিরোধী প্রথম সারির আমেরিকা ঘনিষ্ট, তা বলা যেত।  কিন্তু এখন এটা পুরাটাই আবছা অস্পষ্ট!  কিন্তু  এটাকে “বদলে গেছে” না বলে ভেঙ্গে গেছে বললাম কেন? বললাম এজন্য যে ভাঙ্গার পরে এটা এখন কোনদিকে যাবে থিতু হবে সেই নিশ্চয়তা এখানে এখনও নাই। এজন্যই বলছি পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত।

    যেমন এখন দশাটা এমন যে না চাইতেও একটা আপনাআপনি বা অবজেকটিভ পোলারাইজেশন এখানে তৈরি হয়ে আছে। তা হল, কে কে এখন বাইডেনের ‘ডেমোক্রেসি সামিট’ বা কথিত গণতন্ত্রের ছড়ি ঘুরানোর পক্ষে আর কে নয়।  তাতে একেবারেই একা বাইডেন একদিকে এমনকি ইউরোপও সেখানে বাইডেনের সাথে নয়, সম্ভবত এর মধ্যে বিপদ আঁচ করে দূরে থাকতে চাইছে। আর অন্যদিকে, শুধু চীন না, এখনকার গুরুত্বপুর্ণরা হল  রাশিয়া, চীন এবং ভারত ইত্যাদি। হা ভারত!  এবং এই নব সংযোজন ভারত এটা ১৩৫ কোটির দেশ তবে মোদির ভারত।  অথচ গত টানা বিশ বছর ধরে আগে কখনও দেখা যায় নাই এমনভাবে আমেরিকা-ভারত গাঁটছাড়া বেধে চলে আসছিল। সবাই এটাই জানত তারা ঘনিষ্ট বন্ধু – যেহেতু ভারত আমেরিকার চীন ঠেকানো [containment] এর বন্ধু অতএব এই সম্পর্ক এক লম্বা পথ হাটবে; অবশ্যই সহসা ভাঙবে না। এটাই ছিল সবার অনুমান!
    কিন্তু না। সবাইকে হতাশ করে দিয়ে এবার এক পুরান সত্যঃ রাষ্ট্র মানেই তা কেবল একান্তই নিজ নিজ স্বার্থ – সে কথাটাই ভেসে সামনে এলো। সেকথার ভাষ্যটা অনেকে এভাবে ঠাট্টা করে বলছেন, ভারত ‘বাবা’ বদলিয়েছে। আমেরিকার বদলে ভারতের বাবা এখন রাশিয়া। গত সপ্তাহে ৬ ডিসেম্বর রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত সফরে এসেছিলেন। আর সেটাকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রচন্ড হাইপ তুলে প্রপাগান্ডা করেছে [এটা নাকি ডিফাইনিং মোমেন্ট] যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের নজরে পরে এই এলান। স্বভাবতই এর প্রধান টার্গেট শ্রোতা হোক বাইডেনের আমেরিকা এই ছিল ভারতের আকাঙ্খা! আর এসব প্রচন্ড হাইপ তোলা এটাকেই অনেকে ভারতের বাবা বদল বলছেন!

    এমনিতেই বাইডেনের প্রেসিডেন্ট জিতে যাওয়া মোদির জন্য কাম্য ছিল না। তা অপ্রকাশ্য ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন নিজ নির্বাচনের এক ক্যাম্পেইন-করণীয় বানিয়েছিলেন কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুকে। বলেছিলেন তিনি এই ইস্যুতে প্রশ্ন  তুলবেন। তাই মোদির দিক থেকে তার অপছন্দের কিছুই লুকানো ছিল না বা ক্ষমতায় এলে পরে দেখা যাবে – এমন ইস্যু ছিল না। তাই মোদি নিজ অবস্থান ভেবে রেখেছিলেন যে বাইডেনের কাছাকাছি মুখোমুখি না হবার বা এড়িয়ে চলার। আর কামনা করতেন, চীন-আমেরিকার ট্রেড সংঘাত তীব্র হোক যাতে কাস্মীর ইস্যু নিয়ে তিনি এর আড়ালে প্রথম দুয়েক বছর কাটাতে পারেন। কিন্তু এমন কামনা পূরণ করনে-ওয়ালার কাছে ভিত্তি পায় নাই।

    অন্যদিকে আরও জটিল সমস্যা। বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হলে তা বিস্তারে নোট  করা আর তা নিয়ে মামলা সাজানোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক স্বাধীন কমিশন আছে। যারা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে বার্ষিক রিপোর্ট পাঠায়। এর নাম USCIRF (United States Commission on International Religious Freedom)।

    ভারত সম্পর্কে এই প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট খুবই খারাপ। এমন খারাপদেরকে তারা সিপিসি ক্যাটাগরিতে ফেলে চিহ্নিত করে থাকে। “কান্টি অফ পার্টিকুলার কনগার্ণ (CPC) বা “বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ এই ক্যাটাগরিতে। ভারতে মুসলমানদের উপরে নিপীড়ন প্রশ্নে ভারত এখন সিপিসি তালিকার দেশ। গত কয়েকমাসে মোদির সরকারের উপর এবার যুক্ত হয়েছে চার্চেও হামলার অভিযোগ।

    অতএব এ’দুই উদ্বেগের বিচারে বাইডেনের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” এর দিন যত ঘনায়ে আসছিল তাতে বাইডেন এবার ভারতের উপর কোন অবরোধ আরোপ দিতে পারে এই ছিল মোদি সরকারের অনুমান। কারণ ২০২১ সালের সিপিসি রিপোর্টে এটাই সুপারিশ করা ছিল। যেটা ট্রাম্পের আমল থেকেই এমন রিপোর্টগুলো উপেক্ষা করে চলছিল।  আবার মোদির দিক থেকে দেখলে এই ধর্মীয় নিপীড়নই তার শেষ ভরসা। মোদির ধারণা আগামি বছর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে পাবলিক রেটিং খারাপ অবস্থাতেও তার জিতে আসবার একমাত্র উপায়। ফর্মুলা সেই পুরানা; গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীত্বের আমল থেকে গত আট বছরের মোদির প্রধানমন্ত্রীত্ব পর্যন্ত যে – যত মুসলমান নিপীড়ন ততই ভোটার পোলারাইজেশন এবং ততই বেশির ভাগ হিন্দুভোটার মোদির দলের বাক্সে। এই অনুমানে যে মোদি হল বাঘের বাচ্চা যে অন্য ধর্মের লোকেদের দাবড়িয়ে বেড়াতে সক্ষম; “হিন্দুধর্মই শ্রেষ্ঠ যা ধরে রাখার নায়ক মোদি”! কাজেই মোদির পক্ষে মুসলমান কোপানো একটু আপাতত কমানোও অসম্ভব! কাজেই মোদির পক্ষে বাইডেনের অবরোধ নিয়ে ভাববার সুযোগ নাই।

    আবার অবরোধের ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আরো আছে। অন্যের (আমেরিকান) বোমারু বিমান ঠেকানোর মিসাইল রাশিয়ার তৈরি S-400 । কিন্তু এই মিসাইল ক্রয়কারি রাষ্ট্রকে ঠেকাতে বা এক ধরণের অপরাধী বলে চিহ্নিত করার আইন আমেরিকা সাজিয়েছে যার নাম (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act,  CAATSA) ।  অর্থাৎ যে রাশিয়ান এই মিশাইল কিনবে সে আমেরিকার ঘোষিত শত্রু হবে তাই তার উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ করা হবে। ভারতের এমন ক্রয়াদেশের পাবার পরে রাশিয়ান মিসাইল পাঠানো রাশিয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এখনও বাইডেন অবরোধ দিবেন নাকি ভারতকে এই আইন থেকে ছাড় দিবেন এসবের কোনটাই এখনও ঘোষণা করেন নাই। অর্থাৎ সব এখনও বকেয়া বা পেন্ডিং হয়ে পড়ে আছে।

    এবার বাস্তবে কী ঘটেছে? এরই মধ্যে এবার বাইডেনের ডেমোক্রেসি সামিটে ভারত গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় দাওয়াত প্রাপ্ত দল ছিল। কিন্তু ঐ সামিট থেকে যেসব দেশের উপর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে সে তালিকায় ভারত নাই। এককথায় ভারতের উপরে আমেরিকার কোন অবরোধই আরোপ করা হয় নাই।

    আসলে এর মানে, উলটা বাইডেনই মোদির ভারতের হাতে বাঘবন্দি হয়ে গেছেন যেন। কেন এমন হল?

    কারণ মোদির উলটা চাল, তিনি পুতিনকে ভারতে ডেকে এনেছেন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক নানা কথা আর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জয়েন্ট ভেনচার নিয়ে আলাপ করেছেন। আর তাতেই বাইডেনের যেন বলতি বন্ধ!  ভারত এরপরে আর বাইডেনের চীন ঠেকানোর কাজে নাই লাগুক তবু ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার ভারতীয় বাজার যার লোভ দেখিয়ে ভারত সবসময় তার অপনেন্টকে এভাবেই শায়েস্তা করেছে। এটাই আরেকবার প্রমাণ করেছে যে পচাত্তর বছর আগের যে আমেরিকা ছিল, বাইডেনের আমেরিকা সেটা আর নয়। বাইডেনের আমেরিকাই উলটা ভারতের কাছে কেঁচো হয়েছে – নত হয়েছে, অকেজো হয়ে গেছে। অন্তত এখন আমরা এটাই দেখছি!

    তাই বাইডেন ভারতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্টিফিকেট দিয়ে দাওয়াত করেছেন আর যত পেন্ডিং অবরোধ-করার কথা ছিল এর একটাও প্রকাশ করতে পারেন নাই উলটা সবগুলোকে নিজের মুখের মধ্যে আটকে রেখে তা নিজেকেই  গিলে খেতে হয়েছে – এটা কোন আমেরিকা???

    ফলাফল কী? এর নেতি ফলাফলও আছে। আগে হলে আমেরিকান চাপে মোদির ভারত ইসলামবিদ্বেষ কিছুটা আড়াল করে হয়ত সরাসরি ইসলাম কোপানো অন্তত কিছুদিন বন্ধ রাখত।  যেমন বেশিদিন আগের কথা নয়। মোদির ক্ষমতায় আসার পরের বছর (২০১৫) ওবামা ভারত সফরে এসে (সেসময় মুসলমান ও খ্রীশ্চান নিপীড়ন, চার্চে হামলা শুরু হয়েছিল) মোদিকে চাপ দেওয়াতে শেষে মোদি বিজেপির নীতি-রাজনীতি আর তার সরকারের নীতি আলাদা বলে ঘোষণা করেছিলেন। সরকারের নীতি হিসাবে সব ধর্মাবলম্বির ধর্মপালনের স্বাধীনতাকে মোদি স্বীকার করে প্রটেক করার দায় কবুল নিয়েছিলেন। দিল্লির এক চার্চের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়ে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। [আগ্রহিরা এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত জানতে আমার পুরামা ২০১৫ সালের মে মাসের এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন। ওখানে সেকালে চার্চের অনুষ্ঠানে দেয়া মোদির ভাষণটাও সংযোজিত আছে।]  অথচ এবার উলটা, ভারতই বাইডেনকে চ্যালেঞ্জ করে গেল! আমেরিকা কিভাবে ক্রমশ কর্তৃত্ব হারাচ্ছে এর এক জলজ্যান্ত প্রমাণ এটা।

    রাজনাথের কারিগরিঃ
    এদিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের ৫০ বছর স্মরণে এক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে ছিলেন। এতদিন এধরণের অনুষ্ঠানে ভারত বড়জোর দাবি করত যে তারা বাংলাদেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। কিন্তু এবার তিনি দাবি করেন ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে।  আবার দেখা যাচ্ছে, ভারতের এক নামী সম্পাদক- কলামিস্ট লিখেছেন বাংলাদেশে আমেরিকান অবরোধে ভারতের নিশ্চুপ থাকার বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে অনেকেরই অনুমান-কল্পনা হল আবার কী তাহলে  আমেরিকার হাত থেকে প্রটেকশন পেতে বা হুজুর ধরতে মোদী-হাসিনা গভীর সম্পর্ক হতে যাচ্ছে, তাই কী ?
    দিন সবসময় একরকম থাকে না। না, এটা এখন বাস্তবতাতেই অসম্ভব। ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের কথা অবশ্যই আমরা কেউ বলছি না। ফলে কথাটা হচ্ছে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যের। এমন রুটিন সম্পর্কের (আমরা ১৯৭১ সালে এটা সেটা ছিলাম টাইপের) বাইরে অন্য কোনদিকে এখন আর আগাবার সম্ভাবনা নাই। আর এদিকে হাসিনা সরকার কখনও যদি ফেল না করে তাহলে চীনের সাথে তার সম্পর্ক একটুও ঢিলা হবার কোন সম্ভাবনা নাই।
    তবে সরকারের জন্য এখনকার চ্যালেঞ্জ হল – অবরোধ আরোপের ফলে আমলা আর দলীয় কর্মি-নেতাদের যাদের সক্রিয়তা সরকার টিকাতে ম্যাটার করে এদের মনোবল নিঃসন্দেহে চাপ খাবে – সেটা কতদুর সামলাতে পারে তা দেখতে হবে।  অবরোধের পাল্লায় পড়া যাবে না যা “অর্জন” তা সামলাতে হবে – তাদের এই পালাই পালাই মনোভাব ডমিনেট করবে।  সরকারের পাবলিক রেটিং থাকলেই একমাত্র যা দিয়ে এমন চাপ মোকাবিলা সহজেই সম্ভব হত হয়ত।
    আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে!

  • মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা, সাথে পিকের কৌশল

    মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা, সাথে পিকের কৌশল

    গৌতম দাস

    ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    –

    For India’s opposition to recover, the Gandhis should quit

    [সার-সংক্ষেপঃ উপরের বা সাথে দেয়া ছবিটা লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকার চলতি সংখ্যায় এক আর্টিকেলের প্রচ্ছদ। যদিও আমার এলেখার প্রসঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ও তার দল। ইকোনমিস্টের  ঐ আর্টিকেলের সারকথা হল, ভারতের বিরোধী দলকে জোটবদ্ধ হতে পিছিয়ে দিয়েছে  ও দিচ্ছে এই গান্ধী পরিবার।  আর ঠিক এজায়গায় প্রত্যক্ষ না হওয়া সত্বেও বিপরীতে মমতা নিজেকে উত্থিত করার যে চেষ্টা করছেন তা সম্পর্কিত।  ইকোনমিস্ট সরাসরি বলেছে গান্ধী পরিবারের ভারতের রাজনীতিকে এভাবে স্থবির করে রাখা “ত্যাগ করা উচিত” । শিরোনামেই সেকথা বলেছে যে “গান্ধীদের ত্যাগ করা উচিত” [Gandhis should quit]।
    কিন্তু ততদিন কী তাহলে মমতা অপেক্ষা করবেন? গান্ধী পরিবার কী করে তা দেখার জন্য? একেবারেই না। ভারতের মিডিয়া এনিয়ে অনেক কথা লিখেছে। যেমন যা লেখা শুরু করেছে তা হল,  “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমশই নিজেকে মোদী-বিরোধী শিবিরের ‘মুখ’ করে তুলছেন”।  এমন নেতা  হিসাবে নিজেকে হাজির করার কাজে মমতা অনেক দূর আগিয়ে গেছেন।  আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দল হচ্ছে গান্ধীদের কংগ্রেস।
    আরেক পত্রিকা লিখছে, “আঞ্চলিক দলের তকমা ঝেড়ে তৃণমূল এখন সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পথে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে মোদিবিরোধী জোটে সোনিয়া, রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কা নন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন মুখ”।
    কেন?  কারণ, মমতার নিজেকে এই প্রধান মুখ হিসাবে উপস্থাপনে বিভিন্ন দল ভেঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গ্রুপ দল বেধে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করেছে। অনেকে সরাসরি যোগদান করছে।  চলতি নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে মমতার দিল্লি সফরে একটা অন্যতম কর্মসুচি ছিল এমন যোগদানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটিয়ে তা দেখানো।  আর এবার মিডিয়া লিখছে এভাবেঃ “একের পর এক উইকেট পড়ছে কংগ্রেসে। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে”। অর্থাৎ অনেক দল থেকে লোক আসছে তৃণমূলে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে দল ভেঙ্গে লোক মমতার দলে যোগ দিচ্ছে সেদলটা হল গান্ধী পরিবারের কংগ্রেস।
    কোন কোন পত্রিকা তাদের রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা শুরু করেছে কেন আভ্যন্তরীণভাবে কংগ্রেস স্থবির ও অগোছালো। যার মূলকথাটা হল, গান্ধী পারিবারিক নেতৃত্বটাই এর মুল কারণ। এই পরিবার এটা কংগ্রেসের তরুণ নেতাদের আকাঙ্খা দাবায় রাখার প্রতীক হয়ে গেছে। আবার কংগ্রেসের বয়স্ক বা পরীক্ষিত নেতারাও মনে করছে তাদের পোটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাবনা সব এই পরিবারের জন্যই স্বীকৃতি পাচ্ছে না। মিডিয়ায় লেখা হয়েছে, রাহুল গান্ধীকে দলে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।  আর এতেই ফলাফলে সবকিছুই স্থবির হয়ে বসে থাকা। আর ঠিক এ’জিনিষটার দিকে নজর ঢেলেছেন পিকে মানে প্রশান্ত কিশোর । যিনি আসলে মমতার পক্ষে ও মমতার নিয়োগকৃত  রাজনৈতিক দলের জন্য  পেশাদার এক  “ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট”; ভারতের আনন্দবাজারি ভাষায় “ভোটকুশলী”।  যদিও শব্দটা হবে সম্ভবত ভোটকৌশলী এক্সপার্ট। বাংলায় প্রকৌশলী শব্দের “কৌশলী” শব্দটা যেখান থেকে।

    এছাড়া ওদিকে ঠিক বিজেপি না, আরএসএসে আভ্যন্তরীণ বিরোধের টেনশনে্র কথা শুনা যাচ্ছে মোদিকে তৃতীয়বার প্রার্থী না করার ব্যাপারে ফলে আরএসএসের মমতার প্রতি তাদের কিছু আগ্রহের খবরও বাজারে এসেছে দেখা যাচ্ছে। ]

     

    মমতার তৃণমূল কংগ্রেস রাইজিংঃ
    অসময়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও এর নেতা মমতা ব্যানার্জি নিয়ে আজকের প্রসঙ্গ। অসময়ে এজন্য যে, এটা পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনের আগের অথবা অব্যবহিত পরের সময় অবশ্যই একেবারেই নয়। আবার যদিও একটা পৌরসভা  (ওদের ভাষায় পুরভোট)  বা মেয়র নির্বাচন আসন্ন। তবে  এর রাজনৈতিক গুরুত্ব তেমন নেই। সাধারণত যতটুকু একটি পৌর নির্বাচনের থাকে, এবার তাও নেই। এর মূল কারণ গত   ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিলে মমতা শুধু নিজে ও দলকে টানা তৃতীয়বার রাজ্যের ক্ষমতায় বিজয়ী হয়ে নিয়ে এসেছেন সে জন্য নয়। আসলে এই নির্বাচন ছিল হেভিওয়েট বিজেপি পুরা দলকেই কলকাতা থেকে পুরো উৎখাত করে ফেলা। অথবা বলা যায়, সারা ভারতের বিরোধীরা যখন মোদির সামনে শিশু বা বামন হয়ে যায়, কেবল সেখানে একা মমতা নিজ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দিয়ে লড়ে প্রমাণ করে দিলেন, এক প্রধানমন্ত্রী মোদির ইমেজের ওপর দাঁড়ানো চালু এদলটিও তার সামনে কিছুই না। ফলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে যে ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার ঝড় বিজেপি তুলেছিল, সেটাসহ মোদি বা বিজেপি কোনো কিছুকেই মমতা আস্ত রাখেননি। উপড়ে ফেলেছেন। এরপর যারা নির্বাচনের আগ দিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের এবার বিজেপি ছেড়ে আবার একমাত্র দল মমতার তৃণমূলেই ফেরতের হিড়িক পড়ে যায়; যেন সবাইকেই ফিরে যেতে হবে, বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।  এছাড়া “দ্রুত অনুগ্রহ যোগাড় করে” কার আগে কে ফিরে জায়গা নেবে যেন এর প্রতিযোগিতাও শুরু করাতে পেরেছিলেন মমতা।

    তবে বছরের শুরুতে মার্চ-এপ্রিল ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পরেও আবার ওরই  উপনির্বাচনও ইতোমধ্যে হয়ে গেছে অনেক আসনে; কারণ করোনার জন্য আটকে থাকা, শিডিউলে থাকা অনেক উপনির্বাচন দীর্ঘ দিন হতে পারেনি।  আর সেই উপ-নির্বাচনেও বিজেপি আরেক দফা আরো তুচ্ছ হয়ে যায়।
    এসব কারণে এখন পৌর নির্বাচনের গুরুত্ব এবার আরো কম বা নাই; কারণ গত ৩০ সেপ্টেম্বরে, ছয় মাসের মধ্যে ঐ উপ-নির্বাচন হয়েছিল। আর এবার সুযোগ পেয়ে একসাথে সারা ভারতেও অনেক উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর তা ছিল ভারতের ১৩টি রাজ্যের লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা মিলিয়ে মোট ২৮টি আসনে উপনির্বাচন। এতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন ছিল চারটি। আর ওদিন আরো তিন রাজ্যের তিন লোকসভা আসনে উপনির্বাচন হয়। রাজ্য তিনটি হলো – হিমাচল, মধ্যপ্রদেশ ও কেন্দ্রশাসিত রাজ্য দাদরা ও নগর হাভেলি; যার  মধ্যে বিজেপি জিতেছিল কেবল মধ্যপ্রদেশে; আর বাকি দুই রাজ্যে বিজেপি হেরে যায়। এ বছরের কলকাতায় মমতার রাজ্য নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর থেকে সেই জোয়ার এতই তীব্র  উঠেছিল যে, এই উপনির্বাচনে ছয় মাসের ব্যবধানে এক লাখেরও বেশি ভোটে উল্টো বিজেপি প্রার্থীরা এবার হেরে যান। আর বিজেপি প্রার্থী প্রায় সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

    পশ্চিমবঙ্গে মোদির এই ব্যাপক হার গত প্রায় আট বছরের মোদির শাসনামলে এই প্রথম, যা তার বিজেপি দলসহ তাকে এই প্রথম সমূলে এত বড় আঘাত হেনেছে মনে করা হচ্ছে। একটা পত্রিকা লিখেছিল,

    উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিজেপি শিবিরে প্রচণ্ড উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে বিজেপিবিরোধী তৃণমূলের পালে হাওয়া লেগেছে, তাতে মনে করা হচ্ছে, সেই হাওয়ায় সত্যিই এবার বিজেপির বাগান তছনছ হয়ে যেতে পারে?

    এ ছাড়াও প্রথমে মনে করা হয়েছিল, মোদির ওপর এ আঘাত বোধহয় কেবল পশ্চিমবঙ্গেই। কিন্তু এখন একেবারেই পরিষ্কার, এটা ভারতজুড়েই বিরাট ছাপ ফেলেছে।
    আসলে এটা এক ‘আন্ডার কারেন্ট’ যেখানে সেটা নদীর যত তলদেশে ততই সেখানে স্রোতের বেগ তত বেশি। অথচ পুরো ব্যাপারটা বাইরে থেকে তেমন বোঝাই যায়নি। কিন্তু কী সেটা?
    বিজেপি বা মোদিবিরোধী সব বিরোধী দলের অভ্যন্তরেই প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত ও ক্ষোভ বর্তমান। এসব ক্ষুব্ধ ভগ্নাংশ বা গ্রুপগুলোতে অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত এতই তীব্র কিন্তু তারা দল ছাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সেদিকে ফায়সালার পথ বেছে নেবে, তা ঘটছিল না। সম্ভবত তাদের দ্বিধার মূল কারণ, এসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ ভেঙে বেরিয়ে যেতে চাইলেও তারা কোথায় যাবে কোন দিকে বা গন্তব্যে? এটা স্পষ্ট খুঁজে না পাওয়ায়ই তারা উদ্দেশ্যহীন হয়ে পুরনো নিজ দলের সাথে লেপ্টে থেকে গিয়েছিল।

    কিন্তু দেখা যাচ্ছে আজ এটা প্রমাণিত যে, তৃণমূলের মমতা হলেন সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক যার বাঁশির পেছনে ওসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ একেবারে সদলে এসে একের পর এক যোগদান শুরু করেছে এখন। আর তাতে রাতারাতি মমতার তৃণমূল দল এক আঞ্চলিক দলের পরিচয় থেকে বেরিয়ে সর্বভারতীয় দলের পরিচয় ধারণ করতে যাচ্ছে।

    ‘সর্বভারতীয় দল’ মানে কীঃ
    ভারতে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে মোট রাজ্যের সংখ্যা ২৮টা। কোনো একটা রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকটা রাজ্যেই বা বেশির ভাগ রাজ্যেই উপস্থিতি মানে কমিটি থাকলে সাধারণত চলতি অভ্যাসে তাকে “সর্বভারতীয়” দল বলে বুঝানো হয়ে থাকে। তবে স্বভাবতই এটা আইনি বা নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত সংজ্ঞা নয়। কমিশনের মতে, তাদের কতগুলোর শর্তের একটা পূরণ করলেই সেটা ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদা লাভ করে থাকে। এছাড়াও সময়ে সময়ে নির্বাচন কমিশন এই মর্যাদা কোন দলের জন্য সে দল “প্রাপ্ত বা কেড়ে নেয়া” হল বলে ঘোষণা দিয়ে থাকে।

    যেমন এমন কিছু শর্তগুলো হল, দলটাকে ভারতের যেকোনো তিন রাজ্য থেকে লোকসভার (কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে যেটা) নির্বাচনে মোট ভোটারের কমপক্ষে ২ শতাংশ পেতে হবে। অথবা দলটিকে লোকসভা বা বিধানসভা (রাজ্য সরকার গঠনের লক্ষ্যে) নির্বাচনে যেকোনো চার বা ততোধিক রাজ্য থেকে মোট ভোটের ৬ শতাংশ পেতে হবে। আর সাথে আরো চারটি লোকসভা আসন জিততে হবে। অথবা দলটাকে চার রাজ্যের যেকোনো একটাতে ‘রাজ্য দল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হবে।

    যেমন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে কমিশন ঘোষিতভাবে ভারতে আটটা ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল আছে যদিও সম্প্রতি এদের চারটির অবস্থা খারাপ যে, সম্ভবত তারা নয়া রিভিউয়ে বাদ পড়বে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস কখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল নয়; যদিও গত ২০০১ সালের রাজ্য নির্বাচনের সময় থেকে তৃণমূল খুবই কঠোর চেষ্টা শুরু করেছে। আর আগামী বছর মানে সারা ২০২২ সালে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এগুলো হল – গোয়া, মনিপুর, উত্তরখণ্ড, পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশ। এতে একমাত্র উত্তর প্রদেশের নির্বাচন হবে মে মাসে আর বাকি চারটি নির্বাচনই হবে মার্চ মাসের বিভিন্ন সময়ে। বাংলা ভাষায় এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিধানসভার নির্বাচন’ বলে পরিচিত। ইংরেজিতে যা ‘লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’ বা সংক্ষেপে শুধু “অ্যাসেম্বলি” নির্বাচন বলার চল আছে।
    আর সার কথাটা হল, তৃণমূল কংগ্রেস এখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত নয়। তৃণমূল মূলত আঞ্চলিক দল মানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যভিত্তিক দল।

    তাহলে ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিলের নির্বাচনের পর এবার তৃণমূলকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও হইচই ওঠার কারণ কী?
    এক কথায় বললে, পশ্চিমবঙ্গের গত এপ্রিল নির্বাচন হয়েছিল মোদির নামে, মোদির সুনাম বা ক্রেডিটকে দেখিয়ে, তাঁকে সামনে রেখে। এমনকি বিজেপি দলের চেয়েও মোদির নাম এগিয়ে রাখা হয়ে থাকে সবসময় ঠিক যেমন গত সাত বছর ধরে বিজেপি একা মোদির নাম ও ক্রেডিটের উপরে নির্বাচন করে যাচ্ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এতে কলকাতায় এমন প্রপাগান্ডা ঝড় তারা তুলেছিল যেন নির্বাচনের পরে সারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ছাড়া “আর কোনো দল থাকছে না”। ফলে অন্যান্য দল থেকে সুযোগসন্ধানীদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায় যে, নিজ নিজ দল ছেড়ে কার আগে কে বিজেপিতে যোগ দেবে। অথচ ফলাফল প্রকাশের পরে পেলে দেখা গেল, কিছুই বাস্তব-সত্য নয়, সব প্রপাগান্ডা। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টিতে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি পায় ৭৭টি আসন। অথচ মোদি-অমিত আওয়াজ দিয়েছিলেন বিজেপি নাকি ২০০ এর বেশি আসন পাবে। বাস্তবে  তাও আবার সেই ৭৭ এখন ৭২ হয়ে গেছে। অর্থাৎ  ঐ পাঁচজন তৃণমূলে আবার ফেরত গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোটের সাথে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ‘সেক্যুলার ফ্রন্ট’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল  জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পীরজাদার দলের একটা আসন পাওয়া ছাড়া এই পুরো দল বা জোট এবার আর কোনো আসন পায়নি। অনেকে এটাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, এটা গত ২০১৯ সালের কেন্দ্র নির্বাচনে সিপিএমের নিজ কর্মের শাস্তি বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। কেন?
    সিপিএমের বামফ্রন্ট ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেসের সাথে জোট করে নির্বাচন লড়ে আসছে। কিন্তু যেহেতু মমতাই তাদের ৩০ বছরের সাজানো দুর্গ ২০১১ ভেঙে দিয়ে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন, তাই মমতার দলই তাদের প্রধান শত্রু ও বিরোধী তা আজও এরা মনে করে থাকে। তাতে ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতায় যে দলই থাক। কিন্তু এখানে ফাঁকিটা হল, এতে ক্ষমতাসীন মোদি কমিউনিস্টদের ভাবধারার অলক্ষ্যে এবং একথা তারা মুখে না বললেও পরোক্ষে  সিপিএমের দোস্ত হয়ে উঠেছে। এরই চরম অবস্থাটা আমরা দেখে ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনে। তারা বিজেপির সাহায্য নিয়ে মমতা উৎখাতের পরিকল্পনা করে ভোটকেন্দ্রে বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়েছিল। এই কৌশল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মত বয়স্ক নেতারা পছন্দ না করলেও সেবার তারা পাত্তা পাননি। তাদের আপত্তি দলের কেউ শুনে নাই।  আর তাতে হঠাৎ বিজেপি তিন আসন থেকে এক লাফে ১৮ আসন লাভ করেছিল যেখানে মোট পশ্চিমবঙ্গের ভাগে মোট আসন ৪২টা আর তৃণমূল একাই প্রায় সবটা পেয়ে থাকে। এ কারণেই ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে একটা সিটও না পাওয়াকে সিপিএমের কর্মের শাস্তি বলা হচ্ছে। এ ছাড়া তারা পীরজাদাকে জোটের সাথে নিয়ে মূসলমান ভোট ভাগ করতে চেয়েছেন, যাতে বিজেপির সুবিধা হয়। কিন্তু মুসলমান ভোটাররাই সব রুখে দেন, তারা ভোট ভাগ হতে দেননি। মমতার এত আসন পাওয়া বা বাম-কংগ্রেস সাথে পীরজাদার জোট মাত্র একটিই আসন পাওয়ার ঘটনাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।

    এ তো গেল শুধু পশ্চিমবঙ্গের হিসাব, সাথে এখন তৃণমূলের বিস্তৃতি বাইরের রাজ্যেও। সর্বভারতীয় দল হিসেবে তৃণমূল নিজের নতুন কেন্দ্রিয় কমিটি সাজিয়ে নিয়েছে। আর এতে একেক করে অন্যান্য রাজ্যের দলের নেতাকর্মীরা যোগ দেয়া শুরু করেছেন; যার মধ্যে গোয়া আর ত্রিপুরা সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে।

    এবার গত সপ্তাহে (২৫ নভেম্বর) মমতা দিল্লি সরকারি সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে এর ফাঁকে নিজ দলের শুভযাত্রার অনেক কাজ করে এসেছেন তিনি, যাতে অন্তত তৃণমূলকে এখন এক সর্বভারতীয় দল মনে হয়। আসলে বিভিন্ন দল থেকে মমতার দলে যোগদান করতে আসছেন; এরই এক অনুষ্ঠান ছিল এবারের মুখ্য আকর্ষণ। যেসব রাজ্য থেকে পুরনো দল ছেড়ে নেতারা (সাবেক বা বর্তমান) এমপিরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন এদের মধ্যে আছেন উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে; বলা হচ্ছে হিন্দি বলয়ের তিন সাবেক সাংসদ কীর্তি আজাদ, অশোক তনওয়ার ও পবন বর্মা যোগ দিয়েছেন। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখছে, “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমেই নিজেকে মোদিবিরোধী শিবিরের ‘মুখ’ করে তুলছেন।”

    আসলে বলা যায়, এটাই হল মমতার মুখ্য মেসেজ। অর্থাৎ মোদিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট গড়তে গেলে এর সম্ভাব্য নেতা কে কে হতে পারেন – এই বিচারে মমতা নিজেকে সর্বভারতীয় নেতার ইমেজ দিয়ে রাখলেন। কিন্তু কেন এটা?

    প্রশান্ত কিশোর বা পিকেঃ
    রাজনীতিতে কনসালটেন্সি বা ভারতে একালের ভোটযুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে প্রফেশনাল এক্সপার্ট নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনে পরিকল্পনা করে ভোটে নামা শুরু হয়েছে। ভারতের রাজনীতি ষোলোআনাই নির্বাচননির্ভর। তাই “ভারতে রাজ্যের বা কেন্দ্রের নির্বাচনের আগেই কেবল রাজনীতি করো। বাকি সময় দলের বাতি ধরে রাখলেই হবে”। এই হলো ভারতের রাজনীতি। ফলে দলের হয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা, লড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে যেহেতু এটা ‘পরিচালনা’ মানে ডিরেকশন বা নির্দেশনা দেয়া; কাজেই ব্যাপারটা আসলে একটা ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক কাজ যার এক বাংলা করতে পারি পরিচালনা বা ম্যানেজ করা বা সামলানো। কাজেই এজন্যই তো “ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট” নিয়োগ। তাই না?

    বিহারের প্রশান্ত কিশোর (পিকে) হচ্ছেন আপাতত ভারতের একমাত্র এমন পলিটিক্যাল কনসাল্ট্যান্ট। এটা আসলে জনমত যাচাই, পাবলিক মনোভাব আগাম বুঝা, নির্বাচনে ভোটারদের মুখ্য আশা-আকাঙ্খা কী, কী হলে তারা খুবই খুশি হবে, দলের সবচেয়ে খারাপ দিক কোনটা, দলের পজিটিভ-নেগেটিভ সব জেনে নেয়া ইত্যাদি সবকিছুই এর কাজের মধ্যে পড়ে। এসব কাজের জন্য একেবারে স্যাম্পল ডাটা সংগ্রহ করে গবেষণা স্টাডিতে নেমে পড়া; আর সে স্টাডির ফলাফল অনুসারে দলকে পরিচালিত হতে, নড়াচড়া করতে নির্দেশ দেয়া, এটাই কনসালটেন্টের কাজ। পিকে এর আগে পুরান পেশা হিসাবে পেশাদার কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে জাতিসঙ্ঘে এমন স্টাডি গবেষণার কাজ করতেন। এরপর কী খেয়ালে সেসব ছেড়ে এখনকার কাজে নেমে এসেছেন। এ’পর্যন্ত কোনো দলের সাথে (ও পক্ষে) পরামর্শদানের চুক্তি করে সে দল কখন ঐ নির্বাচনে হারেনি। ফলে এটা তার এক ভালো রেকর্ড। এককালে বিজেপিকেও এমন পরামর্শ দিয়েছেন। কংগ্রেসকেও। বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষমতাসীন রাজ্য সরকারকেও। আবার পাঞ্জাবসহ এমন অনেক রাজ্যকেই। মমতার সাথে  তাঁর  সম্পর্কের শুরু ঐ ২০১৯ সালে; সেবারের কেন্দ্র নির্বাচনে খারাপ ফলাফলের প্রেক্ষিতে এরপর থেকেই মমতা পিকে-কে নিয়োগদান করেছিলেন; যার ফলাফল পরেরবার মমতার ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে মোদি হারানোর জয়জয়কার লাভ করেন। কিন্তু এরপর থেকেই কেন্দ্রের নির্বাচনে মমতার দলের পক্ষে নেমে পড়া, নতুন চুক্তি হাতে নেন পিকে। আনন্দবাজারের ভাষায় এটাই ‘ভোট-কুশলীর কাজ’। শব্দটা ইংরেজি স্ট্রাটেজিস্ট শব্দটার বাংলা কৌশলী আর সেখান থেকে ব্যক্তি কুশলী। এটা কুশল বিনিময়ের কুশল নয়। আসলে, এটা প্রকৌশলী লিখতে যে কৌশল শব্দ ব্যবহার করি সেই কৌশল শব্দ থেকে কৌশলী হবে।

    পিকে তার কাজের শুরুতেঃ
    গত মে মাস থেকে কাজে নেমেই পিকে ‘বিরোধী জোটের ঐক্য’ গড়া দিয়ে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। ঘোষণাও করেছিলেন, কংগ্রেসকে সাথে নেয়া ছাড়া এ কাজ শুরু করার মানে নেই; এ ধরনের বক্তব্যও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মাথাতেই অগ্রগতি না দেখে এবার আবিষ্কার করেন যে, খোদ কংগ্রেস দল ও এর অভ্যন্তরীণ বর্তমান দশাই সব সমস্যার উৎস। আর এরপর থেকেই তিনি প্রকাশ্যেই কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো কী তা বিভিন্ন ঘটনার সময় প্রকাশ্যেই তুলে ধরতে শুরু করেন। ইঙ্গিত দিতে থাকেন কংগ্রেস যোগ্য দল নয়; তাই সে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। এর পরই তিনি মমতাকে নেতা হিসেবে ‘প্রজেক্ট’ করা শুরু করে দেন। খুব সম্ভবত তারই পরিকল্পনায় মমতার এবারের দিল্লি সফর।

    ঘটনা যতটুকুই যা, তা সঠিক হোক বা না; বাস্তবতা হলো পিকের কৌশলে মোদিবিরোধী জোট গড়তে এখনো অগ্রসর হতে পারেন আর না পারেন, মমতাই যে কিছু করার ক্ষমতা রাখেন, এই ইমেজ তিনি (পিকের মাধ্যমে) চার দিকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন, সন্দেহ নেই। এরই সোজা মানে হল, পিকে সঠিকই ধরেছেন, মোদিবিরোধী দল বা কর্মীরা কোন নেতা, কোন পরিকল্পনা, কোন দল ও জোট ইত্যাদি, এমন সব কিছু আছে এমন একটা জায়গা যে খুঁজে ফিরছে – তা পিকে ধরে ফেলেছেন। আর সেজায়গাটাই হতে যাচ্ছে মমতার তৃণমূল।  বিভিন্ন দল ও গ্রুপে তারা যে এখন পুরান দল ছেড়ে বের হয়ে আসবে, সাহস করবে, মমতাকে দেখে তারা পথ খুঁজে পেয়েছে মনে করবে –  তা ফল দেয়া শুরু করেছে। আর এ কাজটা করতেই রাহুল বা সোনিয়ার নেতৃত্বের কংগ্রেস আনফিট, সেটিই সম্ভবত প্রমাণ হতে যাচ্ছে। ইকোনমিস্ট সেকথাটাই বলেছে।

    বাংলাদেশের বাংলা ট্রিবিউনে তাদের কলকাতা প্রতিনিধি লিখেছেন শিরোনাম দিল্লি দখলের পথে মমতা!। বলছেন, ‘একের পর এক উইকেট পড়ছে কংগ্রেসে। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। অন্য দিকে বাংলার বুকে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া তৃণমূল আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে দেশে বিজেপিবিরোধী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে। আঞ্চলিক দলের তকমা ঝেড়ে তৃণমূল এখন সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পথে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে মোদিবিরোধী জোটে সোনিয়া, রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কা নন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন মুখ্য। এমনটিই বলছে রাজনৈতিক মহল। তবে কী ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর ‘মহামিশন ২০২৪’-এর গেমপ্ল্যানকে লক্ষ্য করে এখন দিল্লি দখলের পথে মমতা!”।
    কথা সঠিক; এখন পর্যন্ত যে দলটা সবচেয়ে বেশি ভেঙে দলে দলে নেতাকর্মী বের হয়ে তৃণমূলে যোগ দিচ্ছে এদের বেশির ভাগই পুরনো কংগ্রেস দলের।

    তবে আমাদের অতি উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। আপাতত মনোযোগে পর্যবেক্ষণই আমাদের কাজ বোধ করি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২৭ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা ও পিকে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    গৌতম দাস

    ২২ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    –

    Nehru was way ahead of his time. Seeing him through a 20/20 lens is wrong

    ভারতের শ্যাম সরণ [Shyam Saran], একজন কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাট। গত ১৯৭০ সাল থেকে ভারতের ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে তিনি ২০০৪-০৬ সালে এই সময়কালে মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদ ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন। পরে সে পদ থেকে ফরমাল অবসর নিলেও এরপর সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভারত সরকারের বা সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও নানান দায়িত্বে কাজ করে গেছেন। বহু ধরনের কাজে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বা বেসরকারি ও বিদেশে অনেক কিছুর সাথে এখনো সক্রিয় তিনি। দেশী-বিদেশী থিংকট্যাংকের কাজের সাথেও তিনি জড়িত। একেবারে সক্রিয় এখন সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ [CPR] এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে। এছাড়া প্রায়ই তাঁর লেখা কলাম বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত।

    সম্প্রতি তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু সম্পর্কে উঁচু মূল্যায়নমূলক এক কলাম লিখেছেন। ভারত সরকারের ফরেন সার্ভিস ক্যাডারে যারা যোগ দেন তাদের সবারই এক স্বপ্ন-খায়েশ থাকতে দেখা যায় যে, তিনি ফরেন সচিব হওয়ার পরেই অবসর নেবেন। যদিও টেকনিক্যাল ঝামেলায় সচিব পদটা খালি নেই এমন হয়ে দাড়াতে পারে কারো বেলায়; অবসরে যাওয়ার সময় এসে গেলে অনেকের ভাগ্যে তা হয় না। এমনকি আরেকটু এগিয়ে অনেকের জ্বলজ্বলে খায়েশ মনে পুষে রাখে যে, সার্ভিস লাইফে যদি ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সাথে লাইন-ঘাট, সম্পর্ক, পারফরম্যান্স দেখিয়ে মন পাওয়া ইত্যাদি ঘটে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কারণ তাহলে তিনি চাকরি থেকে অবসরের পরে কপালও খুলে গেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন।

    যেমন কংগ্রেসের সালমান খুরশিদ এমন এক কূটনীতিক ছিলেন যিনি এখন কংগ্রেস দলের সাবেক মন্ত্রী এবং এখন কংগ্রেস দলের এক রাজনৈতিক নেতা হিসাবেও পরিচিত। আর বিজেপির মোদির ক্ষেত্রেও তাঁর বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করও তেমনদের একজন। তখন মোদি কেবল প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ২০১৪ সালে। কোন আমেরিকান সরকার-প্রশাসনকে ছুঁতে বা পৌঁছাতে গেলে সবচেয়ে ভাল উপায়টা কী? তারাই বা ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করে থাকেন? বিষয়গুলো ব্যক্তিগত মত করে জানা জরুরি। মোদির সেসব প্রয়োজন মিটাবার মত করে ২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসার পর থেকে এরই প্রধান হাতিয়ার হয়ে আছেন জয়শঙ্কর, ঘটনা চক্রে যিনি তখন আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।  ঘটনাচক্রে  মোদির তাঁকেই পছন্দ হয়েছিল।  আবার মোদিও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু নিশ্চিত নন যে, আমেরিকার কাছে কী চাইতে হয়, কী পাওয়া যায়; কিভাবে তা চাইতে হয় আবার কী চাওয়া ঠিক নয়, ইত্যাদি। আবার যেখানে মোদি আমেরিকার খাতায় ওসময়ের  কিছু দিন আগে পর্যন্ত গুজরাটে দাঙ্গা লাগিয়ে মুসলমান হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ তালিকায় থাকলেও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। আবার আমেরিকারও মোদির সাথে বিশেষ সম্পর্ক করা দরকার। কাজেই জয়শঙ্কর হয়ে যান মোদি আর আমেরিকা এ’দু’পক্ষের মনোভাব আগাম বুঝাবার ব্যক্তি ও দু’জনা দু’জনের বিশেষ দুত।  তাই সেসময় জয়শঙ্কর অবসরে চলে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে হঠাৎ মোদি সেসময়ের উপস্থিত ফরেন সচিব সুজাতা সিংকে  সরিয়ে দিয়ে জয়শঙ্করকেই সচিব পদে নিয়ে নেন। আর এরপরে ২০১৯ সালে মোদি দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জিতে এলে ততদিনে জয়শঙ্করেরও  সচিব থেকেও অবসরে যাবার সময় তখন। কিন্তু আবার ভাগ্যের শিকা ছিড়েছিল।  তখন হঠাৎ মোদির আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মারা যাওয়াতে মোদি এবার জয়শঙ্করকে  মন্ত্রীও করে নিয়েছিলেন।

    কিন্তু সচিব হওয়ার এসব লালিত স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে একটা মূল ফ্যাক্টর থেকে যায় তা হল ‘বহনকারী’; মানে একটা রাজনৈতিক দল লাগে। কারণ তিনি তো আমলা ফলে একটা  রাজনৈতিক দলই কেবল তাকে রাজনৈতিক পদ দিতে পারে ও বসাতে পারে। শ্যাম সরণের ক্ষেত্রে এই দলটার নাম হল কংগ্রেস। অর্থাৎ ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ শেষের দিকে যত সামান্যই হোক পক্ষে একটা রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেতেই হয়। সচিব বা বিশেষ করে মন্ত্রী পর্যায়ে পৌঁছাতে গেলে রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট পাওয়া নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে যায়।

    এই বিচারে শ্যাম সরণকে দিনশেষে কেউ কংগ্রেসের লোক বলে ফেলবে অবশ্যই। তবে এর বাইরেও ভারতে আরেকটা রেওয়াজ আছে যা এখন হয়ে উঠেছে আরেকটা বিষয়ের প্রশ্ন। তা হল  – জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ। এটাও প্রায় ফরেন মিনিস্টারের মতোই আরেক পদ। কারণ উপদেষ্টা ঠিক মন্ত্রী না হলেও মন্ত্রীর সম-মর্যাদার পদ। কোনো সাবেক ফরেন সচিব অবসর নেয়ার পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নিযুক্তি পেয়েছেন এমন হতে পারে ও হয়েছে। তাই এটাকেও এসব সাবেক আমলারা জীবনের বিরাজ ক্রেডিট ও অর্জন গণ্য করে। তা করুক কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এই উপদেষ্টা পদে সাবেক গোয়েন্দা বিভাগের আমলারাও নিয়োগ পেতে পারেন এবং পেয়ে থাকেন। যেমন বর্তমান মোদির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সাবেক “ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর” (আইবি) সর্বোচ্চপদ ডিরেক্টর ছিলেন। কিন্তু সমস্যা হল – ফরেন সার্ভিস আর ইন্টেলিজেন্স বুরো এরা উভয় উভয়কে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে বসার জন্য অনুপযুক্ত বা কম যোগ্য মনে করে রেষারেষির কারণে। তাই কনুই-গুঁতা মারামারি চলে নিরন্তর। যেমনটা এখন জয়শঙ্কর আর দোভালের মধ্যে চলে আর মোদিকে সবসময় তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তা সামাল দিতে হয়।

    এখানে একটা বাড়তি তথ্য দিয়ে রাখি, আশাকরি অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিনিষটা কী? আবার এটার সর্বোচ্চ উপরে কোন মন্ত্রী নয়, তবে এক উপদেষ্টা কেন? প্রশ্নদুটার জবাব একই। এটাই আসলে ‘র’ [RAW] এর আসল মন্ত্রণালয়-ঘটিত ডিপার্টমেন্ট এর নাম।  অন্যভাবে বললে ‘র’ – এটা ভারতের বাইরে ভিন্নদেশে গিয়ে নাশকতার কাজ করে বেড়ানোর প্রতিষ্ঠান; এটাকে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হবে – এই প্রশ্নের সমাধান হিসাবে এটা  জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার অধীনে; যেখানে আবার তিনি উপদেষ্টা, ঠিক মন্ত্রী নন। কেন?
    কারণ ‘র’ এর পরিচালনার জন্য দরকার ছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাইরেক্ট একসেস, রাত-বিরাতেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি পৌছে যাওয়ার সুবিধা। বিদেশে কাউকে খুন করার সিদ্ধান্ত দেয়া ও এর দায় নেয়া কোন ছোট সিদ্ধান্ত নয়।  অথচ অন্য সবের মত এই প্রতিষ্ঠানকেও আর পাঁচটা কোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অধীনে রাখলে ডাইরেক্ট একসেস বন্ধ হয়ে যাবে। আর ঐ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরই আগে সবকিছু বিবেচনা করে দেখা একটা এক্তিয়ার ও তাতে সময়ব্যয় করতে দিতেই হবে। এরপরে দরকার হলে প্রধানমন্ত্রী।  এই কালক্ষেপণ বন্ধ করতেই ‘র’ মূলত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনেই একটা বিভাগ করে রাখা হয়েছে। আর ওর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়মিত পরামর্শদান ও তথ্যে আপডেট রাখার কাজটা করেন ঐ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বাইরে থেকে বুঝবার সুযোগ নাই যে  এই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা – উনার কাজকর্ম  ‘র’ কে নিয়ে যারা, কাকে মারবে ধরবে, খুনোখুনি ধবংস বিনাশ কাকে করবে ইত্যাদি এসব নিয়ে। এবং ভারতের নিয়ম অনুযায়ী, এই পদে সাবেক ফরেন সচিব অথবা সাবেক ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো চীফ এমন দুদিক থেকেই আসতে পারে। [এই ব্যাপারগুলো পাবলিকলি আরো  জানার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে ২০০৭ সালে ভারতে প্রকাশিত “কাও বয়েস” বা [The Kaoboys of R&AW] এই বই থেকে।]  যেমন  শিবশঙ্কর মেনন তিনি সাবেক ফরেন সচিব থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আর এপর্যন্ত  কেবল পাঁচজন মানে পাঁচবার নয়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগে বদল এসেছে।  এ’হল, ভারতের আমলা থেকে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হবার গল্প।

    যেটা বলতে চাচ্ছি তা হল – ফরেন সার্ভিসের ব্যক্তিত্বরা সার্ভিসের শেষের দিকে পছন্দের দলের দিকে লীন হয়ে যেতে থাকেন আর অবসরের পরে তো ওই দলের লোকই হয়ে যান। সেই বিচারে শ্যাম সরণের ভাগ্যে জুটেছিল কংগ্রেস দল। সে কারণেই বা সেই থেকে কি নেহরু সম্পর্কে তার এত উচ্ছ্বাসের মূল্যায়ন? আমরা তা খেয়াল করে দেখব, বিচার করব।

    নেহেরুকে নিয়ে শ্যাম সরণের লেখাঃ
    গত ১৭ নভেম্বরে ভারতের দ্যা প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় শ্যাম সরণের প্রায় ১২০০ অক্ষরের কলামের দ্বিতীয় প্যারাতেই তিনি এক সমালোচনামূলক মন্তব্য লিখে বলছেন, “নেহরুর নেতৃত্বে ভুলত্রুটি ছিল, যার কিছু আবার দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক পরিণতি রেখে গেছে। তার কাশ্মির ইস্যু নাড়াচাড়ার মধ্যে ত্রুটি দেখি, ঠিক যেমন আমি তার ১৯৬২ সাল চীনের ভারতে অনুপ্রবেশকে ভুলপাঠ করার দোষ দেখি” [“There were flaws in his leadership, some of which left enduring and negative consequences. I would fault his handling of the Kashmir issue, just as I would his misreading of Chinese intentions in 1962.” ]।

    সারা জীবন আমলা হিসাবে কাটানো কাউকে শেষে কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক ব্যক্তিত্ব বলে অনুমান করে নেয়াটা ভুল হবে। তা সত্ত্বেও নেহরুর মত ‘পরম’ নেতার ভুলত্রুটি  আছে সেটা বলা – সেটা সম্ভবত এই প্রথম আমরা উচ্চারিত হতে দেখলাম। তা সু-রেওয়াজের ধারা হতে উঠতেও পারে হয়ত আগামিতে; যেটা ভারতে এখন নেই বা আমরা দেখি না। তবে শ্যাম সরণ সম্ভবত আদর্শ বা খাঁটি কোন চোখে নয়, প্র্যাকটিক্যাল চোখে দেখে বিচার করতে অনুরোধ রেখেছেন।

    কিন্তু এরপরেও আবার শ্যাম সরণ ডিপ্লোম্যাটের মত এখানে এসে পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন। এছাড়া আবার এই সুযোগে না বলার সুযোগ নিয়েছেন যে, কাশ্মির ইস্যু অথবা ১৯৬২ সালের চীনের আসাম দখল ইস্যুতে নেহরুর ত্রুটিটা ঠিক কী ও কোথায়? বরং এবার তিনি নেহরুকে প্রশংসায় ছেয়ে ফেলেছেন, আগের যে কারো চেয়ে এগিয়ে। আর তা করতে গিয়ে তিনি আর পাঁচটা ‘হিন্দু জাতিবাদীই’ হয়ে থাকার মধ্যে আটকে গেছেন। কোন ধরনের ব্যতিক্রম হতেও চেষ্টা করেননি। সবচেয়ে মজার কথা, তিনি নিজে “হিন্দু জাতিবাদী” অবস্থান নিচ্ছেন আর ‘জাতিবাদের’ পক্ষে কথা বলছেন সেদিকে খেয়াল নাই অথচ একই সাথে অভিযোগ করছেন সাতচল্লিশ সালে “ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ” হয়েছে [The country had been partitioned on the basis of religion…… ]। নেহেরু-গান্ধি যদি এক ‘হিন্দু জাতিবাদের ভারত’ বানাতে লেগে পড়েন এই এক্টটাই তো দেশভাগের পক্ষে তাদের শুরু করা প্রথম কাজ!  তাই নয় কী? এর মানে হল – নিজের অবস্থান যে, একটা ‘হিন্দু জাতিবাদের’ সেটা খেয়াল করার পরিপক্কতা তার এখনও হয়নি অথচ ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ’ কেন হল তা নিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। আসলে ব্যাপারটা হল – নেহরু-গান্ধী যদি ভারতকে একটা হিন্দু জাতিবাদী ভারত হিসাবেই গড়তে শুরু করে দেন (যা তারা বাস্তবে করেও ছিলেন) তাহলে এর সোজা মানে হল – তারাই তো তাহলে মুসলমানদেরও একটা মুসলমান জাতিবাদী পাকিস্তান গড়ে নিতে ঠেলে দিয়েছেন – তাই নয় কি? এটা বুঝতে কারো কষ্ট হলে বুঝতে হবে, সেটা হচ্ছে তাঁর হিন্দুত্বের  প্রতি গভীর ভালোবাসার আর মুসলমান বা ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও ফোবিয়ার কারণে। এসবই পুরা এর পেছনের কারণ।

    এরপর তিনি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার সময় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৫০ করদ রাজ্যের কথা তুলেছেন। মানে  যাদেরকে হবু ভারতে কেমনে জোর করে ঢুকিয়ে নিতে সেকাজে নেহরুর প্রশংসা করে নিতে চান এই সুযোগে। সরি এটা কোন প্রশংসনীয় কাজ ছিল না যে তাদেরকে নেহরু সামরিক শক্তি দেখিয়ে নেহরুর ভারতে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিলেন। অথচ তিনি এটাকে নেহরুর সাফল্য হিসেবে দেখছেন। অথচ এটাই ছিল ব্যর্থতা; কারণ, তিনি গায়ের জোরে কাজটা করেছেন; যা না করেও হয়ত এটা করা যেত।

    যেমন কোন স্বাধীন মানুষকে যদি চয়েজ দেয়া হয় যে, তিনি এক রাজার শাসনাধীনে থাকতে চাইবেন নাকি পাবলিকের প্রতিনিধিত্বের শাসনের অধীনে যেটা রিপাবলিক না জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র, এমন চান? করদ রাজ্যের সমাধান আসলে ছিল এ দুই চয়েজের প্রশ্ন। কাজেই নেহরুকে ওই সব করদ রাজ্যের বাসিন্দাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হত যে, তারা কী চায়। কিন্তু নেহরু তা করেননি। তিনি গিয়েছেন করদ রাজ্যের রাজার কাছে। আসলে নেহরু বাসিন্দা নাগরিকদের কাছে নয়, তিনি গেছেন রাজার হুকুমের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে। আর এটাকেই তিনি সহজে কাম সারা ভেবেছিলেন।  এটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এর মানে, তিনি তো রিপাবলিক ধারণাই বুঝেননি। তাই এর শক্তিও বুঝেননি। স্বাধীন মানুষ নিজের স্বাধীন চয়েজ প্রকাশের সুযোগ পেলে জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র-এর পক্ষে থাকবে। কিন্তু নেহেরুর ভিতরে এসব বোধ কাজ করে নাই। কেবল এক হিন্দু জাতিবাদ বুঝের অন্ধকারে তিনি সব হারিয়ে ফেলিয়েছেন।

    আর সবচেয়ে বড় কথা, কাশ্মির সমস্যার মূল কথা বা মূল সমস্যাটাই তো এটাই। কারণ, প্রথমত কাশ্মিরও একটা বড় করদ রাজ্য অথচ এর সমাধানে তিনি কিছুই করতে পারেননি। করতে গেছেন হিন্দু রাজাকে পক্ষে টেনে সহজ সমাধান, যেহেতু বাসিন্দারা বড় সংখ্যায় মুসলমান তাই। একারণে, বাসিন্দাদের মতামতের কাছে যাননি। তাই এতে উল্টা তা এমন জটিল করেছেন যে, আজো ভারত-পাকিস্তান সব সঙ্ঘাতের প্রধান ইস্যু এটাই। অর্থাৎ শ্যাম  সরণের করদ রাজ্য ইস্যুর সমাধান নিয়ে নেহরু প্রশংসা করতে গেছেন যা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা ‘খামোখা’ আর স্রেফ চাটুকারিতা! এই বয়সে (৭৫) এটা তাকে মানায় নাই বলাই বাহুল্য।

    শ্যাম সরণের জন্ম ১৯৪৬ সালে। পরের ২৪ বছরের মধ্যে  তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ১৯৭০ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে ফেলেছেন। মানে, মোটামুটি ১৯৬৬ সাল থেকেই ধরা যায় তিনি যথেষ্ট ‘ডাগর’ হয়ে গিয়েছিলেন। লক্ষণীয় ওটাই ছিল সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের দুনিয়া। অথচ আর পাঁচজন সেকালের গ্র্যাজুয়েট বা রাজনীতিকের মত তিনিও খবর রাখেননি যে, দুনিয়ার জন্য “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের” মুখ্য অর্থ ও তাৎপর্যটা কী? আর ১৯৪৫ সাল মানে, বিশ্বযুদ্ধ শেষের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে প্রধান ফারাকটা কী ও কেন?

    কিন্তু সে কথা আমরা কী দেখে বুঝলাম? কারণ, তিনি লিখছেন, “যুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শান্তি স্থাপনের কিন্তু তা না হয়ে দুনিয়া দুই ইডিওলজির দুই সামরিক ব্লকে ভাগ হয়ে গিয়েছিল [The post-war world was already moving from the promise of enduring peace to a prolonged confrontation between two powerful ideological and military blocs, with the constant threat of a nuclear holocaust.]। তিনি আসলে সোভিয়েত ও আমেরিকা এভাবে দুই ব্লকে ভাগের কথা বলছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন বা কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ব্লকে ভাগাভাগি এসেছিল একমাত্র ১৯৫৩ সালের পরের ঘটনা হিসেবে। এমনকি তাও ইমিডিয়েট পরে নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার শপথ নিয়েছিলেন ২০ জানুয়ারি ১৯৫৩। আর এরপর প্রেসিডেন্ট তাঁর নীতি বিশেষ করে সামরিকনীতি যেখানে আসলে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়াদি এসেছিল; আর তা বাইরে প্রকাশ্যে আসতে আসতে দুই বছর লেগেছিল। য়ার সবচেয়ে বড় কথা এগুলো তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাৎপর্য নয় বরং যুদ্ধ শেষের দশবছর পরের ঘটনা। যা প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার (১৯৫৩-৬১)-এর দুনিয়াকে একেবারেই উলটা এক নতুন গতিপথ যার সাথে বিশ্বযুদ্ধের নেতা রুজভেল্টের (১৯৩৩-৪৫) কাজ ও তৎপরতার কোনোই সম্পর্ক নেই বরং উলটা ততপরতা এগুলা। যার মানে শ্যাম সরণও নেহরুর মতই রুজভেল্ট বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই স্টাডি অথবা ন্যূনপক্ষে আমেরিকান ইতিহাস পাঠ ইত্যাদি ঘটনার দিকে যানই-নি। কাজেই তিনি নেহরুর মূল্যায়নকারী হবেন কিভাবে? আর ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে ফারাকটা কী ও কেন তা কিভাবে বুঝবেন?

    অতএব তিনিও যে মুখস্থ কথার এক গতানুগতিক চাপাবাজ তাও প্রমাণ করছেন এখানে। আবার যেমন লেখার শেষের দিকে তিনি  “সেকুলারিজমে” নিষ্ঠাবান এক  মহাভক্ত হিসেবে নিজেকে হাজির করেছেন।

    ভারত সম্পর্কে লিখছেন, “একটা বহু ধর্মীয়, বহু কালচারের রাষ্ট্র ভারত সেকুলার রাষ্ট্র না হলে আর কী হতে পারে [A multi-cultural and multi-religious country could not be anything but a secular State ……]?  অথচ  ঘটনা হল, শ্যাম সরণ সেকুলার শব্দটা জানছেন, শিখেছেন কবে থেকে? তিনি কি জানেন ১৯৭৬ সালের আগে সেকুলার শব্দটা ভারতের কনস্টিটিউশনে কখনো ছিল না! আসলে ১৯৭৬ সালেই প্রথম সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনের আরেকটা নীতি হিসেবে নয়া সংশোধনী জারি করে তা ঢুকানো হয়েছে এবং তা খামোখাই এবং নিজেদের হিন্দুজাতি চিন্তা লুকাবার জন্য। আর তাতে তাই কেবল একটাই লাভ হয়েছিল যে, এটা দিয়ে নিজেদের হিন্দুত্ব প্রীতি ও হিন্দু-জাতিবাদ প্রীতিকে লুকিয়ে এর উপরে সেকুলার জামা টাঙানো গিয়েছিল তখন থেকেই। এই আর কী! আর সেকুলারিজমকে যারা নীতি হিসেবে দেখতে ও বুঝতে চায় তারা অবশ্যই ভণ্ড ও মুসলমানবিদ্বেষী। আমার রাষ্ট্রনীতি সেকুলারিজম এমন কথা লিখে কনুষ্ষ্টিউশনে সেটে দিয়ে বাস্তবায়ন করার বিষয়ই নয়। এমনকি কোথাও না লিখে রেখেও সৎভাবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব।  তাই  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এরা এসবের কোনো পাঠ-পড়াশোনা ও ফ্যাক্টস যাচাইসহ কোনো হোমওয়ার্কই করেননি।

    করণীয় সেকুলারিজম নয়; মূল করণীয় মানুষ জাতি নয় নাগরিক এই বোধে এবার  নাগরিক অধিকারে সাম্য মানে বৈষম্যহীন করা – এর বাস্তবায়ন – এটাই সব কাজের কাজ।  অথচ তারা কোন একটা জাতির কথা মানে “ধর্মীয় জাতির” কথা আনবেই আর এরপর জাতি-রাষ্ট্রের গড়ার দিকে হাটা দিবে।  অথচ সকলেই জানে এই জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট মাত্রই তা নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করবেই।  ফলে সে আবার কিসের সেকুলার নীতি করবে?  আর নেশন স্টেট মাত্রয়ই সেখানে আর না নাগরিক ধারণা  না নাগরিক অধিকার ধারণা কোনটাই থাকে না। সব আবছা করে ফেলা যায় সহজেই জাতি আর দেশপ্রেমের জোশে।
    কথা আরও আছে। নেশন-স্টেট যারা আদি চর্চাকারী (১৬৫০-১৯৫০) তারা সবাই ইউরোপের কলোনি দখলদার রাষ্ট্র ছিল। সারা দুনিয়ায় কলোনি দখল করে বেড়ানো তাদের প্রধান ব্যবসা, প্রধান পেশা এবং প্রধান রাষ্ট্রনীতি ছিল, এই টানা ৫০০ বছর ধরে।  ফলে তারা নাগরিক অধিকার বা মূল নাগরিক ধারণা কী বুঝবেবা বুঝেছিল? ফলে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতার কী আর বাস্তবায়ন করবে? অথচ আমরা তা পড়িনি, খোঁজ খেয়াল  রাখিনি।

    এজন্যই এসবের বিপরীতে মূল প্রশ্নটা আসলে ‘নাগরিক সাম্য’ কায়েম। মানে, সবার সমান নাগরিক অধিকার থাকতেই হবে। সেকুলার বলে দুনিয়াতে কিছু থাকলে এর একটাই ইতিবাচক অর্থ, সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ এটা কোনো জাতিরাষ্ট্র মানে নেশন-স্টেটে অর্জন একেবারেই সম্ভব নয়। যেমন বাঙালি জাতিবাদ পাহাড়িদের সমান নাগরিক গণ্য করবে না। করেনি। এমনকি পাহাড়িদের জুম্ম-জাতিবাদ সেটাও তাদের বাইরের কাউকে তার সমান গণ্য করবে না। হিন্দু নেশন-স্টেট মুসলমানকে সমান নাগরিক অধিকারের গণ্য করবে না, প্র্যাকটিস করবে না। একই অবস্থা হবে মুসলমান নেশন-স্টেটে হিন্দু নাগরিকের।
    এসবই একেবারে গোড়ার মূল সমস্যা; এগুলোই চিন্তার গভীর ত্রুটি । হিন্দুত্ববাদ আড়াল করা যার লক্ষ্য সেই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধি দিয়ে এসব কোনো সমাধান নয় বা কিছুই আড়াল কেমন করে করবে!  বরং মুসলমানবিদ্বেষের উৎস লুকানো হয়ে আছে এটাই!

    শ্যাম সরণ বলছেন, একালের ভারত নাকি “ভারত রাষ্ট্রের সেকুলার থেকে দূরে চলে যাওয়ার কুৎসিত পরিণতি” [We see the ugly consequences of the State departing from the secular norm.]।  মানে হল, তবু এসব লোকগুলো পড়াশুনা না করে, বাস্তবে কি হচ্ছে তা না দেখে কথা বলবে।   খুব ভালো কথা। তাহলে গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেস ও তার একালের প্রতিনিধি ও নেতা রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ‘সফট হিন্দুত্ব’ চাচ্ছে কেন আর মোদির সাথে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে কেন? তাহলে আসলে সারা ভারতজুড়ে  প্রধান রাজনৈতিক ধারা এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ। হিন্দুত্ব মানে এই হিন্দু-জাতিবাদ এটাই কি নেহরু-গান্ধীর ভারত নয়? এর আরও  সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – মোদি বা বিজেপি কি ঘোষণা দিয়ে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ চর্চা করতে গিয়ে কোন সমস্যা হচ্ছে?  কোনো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা কোনো নির্বাচন কমিশনের আইনে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, হচ্ছে? কোথাও হয়নি। কারণ এটাই তো নেহরু-গান্ধীর ভারত ও ভারতের কনস্টিটিউশন, তাই নয় কি? মোদি তো তাদের কনস্টিটিউশন বা ভারতকে কোনো বদল করে নেননি! কাজেই আর কী প্রমাণ লাগবে? ফলে,  এনিয়ে একে তাকে দায়ী বা অভিযোগ করার সুযোগ কই?

    তাহলে এভাবে নিজের সাথে প্রতারণার দরকার কী? শ্যামসরণ এভাবেই মোদির আগের কংগ্রেসের প্রতারণাপূর্ণ হিন্দু-জাতিবাদ করে যেতে চান, এটাই ফারাক দেখাতে চান, তাই কী?  এতে কী ফারাক হবে? অথচ পরে অপর অংশ মানে মোদিকে তিনি বলছেন, ওরা ধর্মান্ধ বা বাইগট-ধারা [small-minded, vulgar and bigoted version]।  অর্থাৎ নিজেকে আড়াল করার নখরা এরা তবু করবেই! অথচ মোদি-আরএসএস এরা বরং তুলনায় ‘ভালো’; কারণ তারা খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদী। তারা কংগ্রেস, নেহরু বা শ্যাম সরণের মত নিজের হিন্দুত্ববাদ লুকায় না, অর্থহীন সেকুলার জামা গায়ে দেয় না! শ্যাম সরণের চোখ এই নেহরুই তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব!! এটাকে এক বোকা চাটুকারিতা ছাড়া আর কী বলা যায়?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২০ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “শ্যাম সরণের নেহরুপ্রীতি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]