Category: MODI

  • আফগানিস্তান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা উদ্যোগ

    আফগানিস্তান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা উদ্যোগ

    গৌতম দাস

    ১৫ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3NQ

     

    A Taliban fighter stands guard as women wait in line during a World Food Programme food distribution in Kabul on November 6, 2021. (Photo by Hector RETAMAL / AFP)

    Afghans attempting to withdraw money from a bank in Kabul, Afghanistan, where lost income and cash shortages are worsening severe food insecurity, September 21, 2021. © 2021 Haroon Sabawoon/Anadolu Agency via Getty Images

    সবার আগের প্রসঙ্গঃ
    আফগানিস্তানে এক দুর্ভিক্ষ আসন্ন আর সেইসাথে সেখানকার পাহাড়ি-শীত জেঁকে বসল বলে। এর চেয়েও বড় কথা আফগান অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। এমনিতেই আফগানিস্তানে ২০ বছরের দখলি শাসন অবসানের পরে একটা নিজ রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। এর উপর তাতে কার্যকর একটা অর্থনৈতিক সিস্টেম আবার খাড়া ও চালু রাখা খুবই কঠিন কাজ। বিশেষত যখন ঐ দেশের অর্থনীতিতে  বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থাটাই অকার্যকর হয়ে আছে। বলা যায় আফগানিস্তান এখনো ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার’ সাথে একই বোঝাবুঝিতে নেই, ন্যূনতম কার্যকর রাজনৈতিক সহমত তৈরি নাই বা হচ্ছে না। ফলে বাস্তবত আফগানিস্তান বাইরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম ও গ্লোবাল মুদ্রাব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত নয়, বিচ্ছিন্ন। ফলে আফগান অর্থনৈতিক কাঠামোটাই নড়বড়ে, নিজে নিজে কোনো মতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। দুর্ভিক্ষাবস্থার মূল সঙ্কট এখানেই।

    এদিকে পাকিস্তানের ‘ডন’ একটি খুবই খারাপ খবর ছেপেছে। জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হকের বরাতে পত্রিকাটি লিখেছে, তা অনুবাদ করে লিখছি : ফারহান বলছেন, “মানবিক সাহায্য বিতরণ নিয়ে কাজ করা আমাদের সহকর্মীরা সতর্ক করে জানাচ্ছে যে, আফগানিস্তানের প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ লোক যারা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি (৫৫ শতাংশ), তারা অতি জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসঙ্কট ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে চলতি নভেম্বর ২০২১ থেকে মার্চ ২০২২ এই সময়কালটায়” [“Our humanitarian colleagues warn that nearly 23 million people — or 55 per cent of the Afghan population — are estimated to be in crisis or experiencing emergency levels of food insecurity between November 2021 and March 2022,” Mr. Haq said.]।

    বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে, ১৯৭৪ সালের দিকে যাদের বয়স তখনই ১০ বছর বা এর বেশি ছিল তাদের স্মৃতিতে আবছা বা স্পষ্ট থাকার কথা যে, দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পরে খাদ্যসঙ্কট, দুর্ভিক্ষ আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অকার্যকর হয়ে পড়া বা থাকা ওদেশের মানুষের জন্য কেমন অসহায় অবস্থায় এক চরম সঙ্কট-বিপর্যয় তৈরি করেছে! আজ বাংলাদেশে নিজেরা জীবনমানের দিক থেকে যে উঁচু জায়গাতেই থাকি পুরনো সেই স্মৃতি আমাদের জানান দেয় আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ এখন কী অমানবিক দুর্দশায়! চার দিকে খাদ্যের জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা – মিডিয়ায় শুধু পুরুষ লাইন না, নারীদের লাইনও বলে দেয় তাদের অসহায় অবস্থার কথা!

    এদিকে আমেরিকান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মূলত মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করে। গত ১১ নভেম্বর তার রিপোর্টের শিরোনাম ‘আফগানিস্তান দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি’ [Afghanistan Facing Famine]। মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ফেলা ও রাখা চেয়ে বড় মানবাধিকার ও মর্যাদার সঙ্কট আর কি-ই-বা হতে পারে? তাদের রিপোর্টের সারাংশ করে লিখেছে, ‘জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, আমেরিকার উচিত যা কিছু বাধানিষেধ বা অর্থনীতিক অবরোধ বা পলিসি তারা আফগানিস্তানে আরোপ করতে চায়, তা অবশ্যই যেন বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে শিথিল করে নেয়” [UN, World Bank, US Should Adjust Sanctions, Economic Policies]।’
    পরের প্রথম বাক্যেই লিখছে, ‘দাতা দেশ, জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আফগানিস্তানের ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তা গড়িয়ে সর্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ অবস্থা না তৈরি করে – আজ (১১ নভেম্বর) হিউম্যান রাইট ওয়াচ এ কথা বলেছে।”।
    Donor countries, the United Nations, and international financial institutions should urgently address Afghanistan’s collapsed economy and broken banking system to prevent widespread famine, Human Rights Watch said today.

     

    Pakistan hosts US, China, Russia to discuss Afghanistan

    আফগানিস্তান নিয়ে দুটা গ্লোবাল উদ্যোগঃ
    এ’সপ্তাহে আফগানিস্তান নিয়ে দুটো উদ্যোগ থেকে মিটিং ডাকা হয়েছে। একটার আয়োজক ভারত, অন্যটার পাকিস্তান। এর মধ্যে ভারতেরটাকে বলা যায় ভারত কিভাবে আফগানিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে আর পাকিস্তানেরটা হল, আফগানিস্তান কিভাবে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে স্বীকৃতি যোগাড় করে এক সাথে লেনদেন বিনিময় সম্পর্কে  যুক্ত হতে পারে তা নিয়ে। এটাই প্রকাশ পেয়েছে  কে কোথায় আমন্ত্রিত হয়েছে সেই তালিকায়। যেমন ভারত আফগানিস্তানকে আমন্ত্রণই জানায় নাই, কিন্তু পাকিস্তানের আয়োজনে আফগানিস্তান আমন্ত্রিত।

    এছাড়াও ভারতের তালেবানদের আফগানিস্তান নিয়ে সভা ডাকাতে  এনিয়ে অনেক পাঠক কৌতুহলি হতে পারেন ঠিক প্রথমত যে আমি ঠিক ভারতই বুঝাতে চেয়েছি কি না। কারণ আমরা জানতাম আমেরিকার বসানো পুতুল – গনি সরকারকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া ভারত অন্য কোনো কিছুতে আস্থা রাখে না, এমন ভারতকেই আমরা চিনতাম। হ্যাঁ, তা বটে। কিন্তু ইদানীং তাতে ছোট্ট কিছু মোচড় দেখছি আমরা। তা হলো ভারত হঠাৎ করে জানাল তারা (নাকি আফগানিস্তানকেই দাওয়াত না করে তবে) আফগানিস্তান ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের নিয়ে এক সভা করতে চায়। এমন ইচ্ছা করাটাই অবশ্য ভারতের ‘গনি সরকার’ ছেড়ে অন্য কিছুর তালাশ করার স্পষ্ট লক্ষণ।। তাই ভারতের দিক থেকে এটা বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া যে, ‘গনি সরকারকে’ ফিরিয়ে আনতে আবদার এটি বাস্তবের মাটিতে পা রেখে দাঁড়ানো কোনো পক্ষের জন্য কোনো অপশনই নয়। তাই বলা যায়, ভারত যে আফগান ইস্যুতে এক দিকভ্রান্ত মুসাফির হয়ে গেছে; যে আবার দিশা খুঁজতে এবার পথে নেমে পড়েছে তা আর লুকানো থাকল না।

    Uzbekistan’s Security Council Secretary Victor Makhmudov, Turkmenistan’s Security Council Secretary Charymyrat Amanov, Tajikistan’s Security Council Secretary Nasrullo Rahmatjon Mahmudzoda, Russia’s Security Council Secretary Nikolai Patrushev, India’s National Security Advisor Ajit Doval, Secretary of Iran’s Supreme National Security Council Ali Shamkhani, Kazakhstan’s Chairman of the National Security Committee Karim Massimov, Kyrgyzstan’s Security Council Secretary Marat Imankulov pose before attending the “Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan” in New Delhi, India, November 10, 2021. India’s Ministry of External Affairs/Handout via REUTERS

    আবার আফগানিস্তান ইস্যুতে কিছু করতে বা পেতে চাইলে চীন ও পাকিস্তান যে গুরুত্বপুর্ণ অংশীদার সে কথা আর ভারত অস্বীকার না করে স্বীকার করে নেওয়ার প্রমাণও হাজির রাখল। ভারত পাকিস্তান ও চীনকে তাদের সভায় যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই আমন্ত্রণে সব চেয়ে বেমানান ঘটনাটা হল, কোন জিনিষ হঠাত করে শুরু হয় না। প্রথমত গত আগষ্টে তালেবানেরা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এটা যে ভারত মানে না সেটা ভারত সবসময় প্রকাশ করে গেছে। যদিও ব্যাপারটা এমন না যে সারা দুনিয়াতেই তালেবানদের ব্যাপারে সব রাষ্ট্রশক্তি একে গ্রহণ করে নিয়েছে। তবে কোন আপত্তি তোলার চেয়ে কি করে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় সকলেই এই এপ্রোচ নিয়েই আগিয়ে এসেছে। তালেবানেরা কিভাবে সবার স্বীকৃত আফগান শাসক হয়ে উঠতে পারে এটাই ছিল মুখ্য দিক। তাই ভারতের জন্য এই সভা ডাকা নিয়ে সবচেয়ে যা বেমানান তা হল কেউ উজানে বাইতে বাইতে হঠাত যদি ভাটিতে নেমে যায় তেমন অবস্থা।  ভারত প্রতিটা ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের জন্য পাকিস্তানকে উঠতে বসতে দায়ী ও খারাপ ভাষা প্রয়োগ করে এসেছে।  কথা একটাই বলে এসেছে “পাকিস্তান সব সন্ত্রাসবাদ ঘটাচ্ছে”। এ’অবস্থায় হঠাত করে সেই তালেবানের আফগানিস্তান নিয়ে সম্মেলন ডাকা আর তাতে পাকিস্তানকেই দাওয়াত দেয়া – এটা কেন?  সবচেয়ে বড় কথা এটা কেন ভারত কী মূল্যায়ন বদলিয়েছে? তাই ভিন্নভাবে বাস্তবতা দেখছে? এর জবাব হল, না ভারত তা  মুখে স্বীকার করে কিছু বলছেনা।  তাহলে পাকিস্তান আসবে কেন?  এর জবাব ভারতের আছে নাই। ফলে তাই হয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টার দাওয়াত প্রত্যাখান নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মঈদ ইউসুফ-এর ভারতের আহুত সভায় না যাওয়া এবং সাথে ক্ষুবশ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, কোন শান্তি ভন্ডুলকারি আবার নিজেই শান্তিসভার আহবায়ক হতে পারে না ‘A spoiler can’t be a peacemaker’। শুধু তাই না তিনি ভারতের আহুত সভাকে খামোখা [moot] সভা বলে বলেন তিনি কোন খামোখা সভায় যাচ্ছেন না [not attend an upcoming moot]।  অন্যদিকে চীনেরও ভারতের সভার যোগদান প্রত্যাখানটা তুলনামূলক নরম বা ঠান্ডা ভাষায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিফিংয়ে জানান তারা ঐ সময়ের ব্যস্ততার মধ্যে সময় মিলাতে না পারায় [“scheduling reasons”……”inconvenient” ] যেতে পারছে না তা ভারতকে জানিয়েছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া এত খারাপ হত না হয়ত যদি ভারত আমেরিকা অথবা খোদ রাশিয়াকে দিয়েই পাকিস্তানকে লবি করাতো।  অর্থাৎ বলা যায় ভারত ঐ পর্যায়ের সিরিয়াস ছিল না।  আবার এমন সিরিয়াস না থাকার পিছনের বড় কারণ খোদ মোদি ও তার হিন্দুত্ববাদ।  কারণ ,মোদি তার শাসনের গত প্রায় আট বছর ধরে নিয়মিত পাকিস্তানকে ব্যবহার করে এসেছে তার নির্বাচনে তার বাক্সে হিন্দুভোট যোগাড়ের অপব্যবহারে। সেই পুরাণ ফর্মুলা যে, পাকিস্তান মানে মুসলমান । তাই পাকিস্তান বা মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াকু হিন্দু-বীর হলেন মোদি অতএব সমস্ত হিন্দুভোট মোদির দলের প্রাপ্য। কিন্তু এতে ভারত তো একটা রাষ্ট্র যার অনেক স্বার্থ আছে পাকিস্তানের সাথে একসাথে একমতে কাজ করার।  কিন্তু না, সেটা সেকেন্ডারি। হিন্দুত্ববাদের ভোট যোগাড়ই মোদীর প্রধান স্বার্থ হয়ে থেকে গেছে। এবং আগামি অন্তত ২০২৪ মে নির্বাচন পর্যন্ত এটাই থাকবে।

    শুধু কি তাই? ভারত কি মনে করে  আফগান ইস্যুতে এই সভা-সম্মেলন করে এবার পথে পেয়ে যাবে? এক কথায় উত্তর, একেবারেই না। কিভাবে তা জানা গেল? ভারতের মিডিয়ারই ভারতের এই  আফগান ইস্যুতে উদ্যোগ থেকে কোনো ফলাফল আসা নিয়ে আস্থায় নেই। যেমন ধরা যাক, দৈনিক প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি লিখছেন এভাবেঃ “পাকিস্তান বেঁকে বসেছে। মুখ ফিরিয়েছে চীনও। এখন আফগানিস্তান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভারতের উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে। তবু ভারত চেষ্টা ছাড়তে রাজি নয়”।  [দেখেন চীন-পাকিস্তানকে ছাড়াই উদ্যোগী ভারত] অর্থাৎ স্পষ্ট করেই   নয়াদিল্লি প্রতিনিধি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ভারতীয় উদ্যোগের উপর তার কোনো আস্থাই নেই।

    কেন ভারতও এমন সম্মেলন করতে গেলঃ
    ভারতের এ উদ্যোগে রয়টার্স বলছে দাওয়াত পেয়েছিল ইরান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান [India, Iran, Russia, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, Turkmenistan and Uzbekistan]। তবে আসলে এখানে ভারতসহ  আট রাষ্ট্রকে দেখা গেলেও এতে মূল গুরুত্ব ইরান ও রাশিয়ার। এ দুটোর মধ্যে আবারও মূল ওজনটা একমাত্র রাশিয়ার; যদিও ভারত এই সম্মেলনের শিরোনাম দিয়েছে এভাবে : ‘দ্যা দিল্লি রিজিওনাল সিকিউরিটি ডায়লগ অন আফগানিস্তান…’ [Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan…… ]।

    কিছু কথা এখানে খুলে বলাই ভাল, বুঝতে সুবিধা হবে তাতে। যেমন গত আগস্ট থেকে আফগানিস্তান ইস্যু ভারতের কেন ‘ঘুম হারাম’ হয়েছে সে কথা কাউকে সে খুলে বলতে পারছে না। প্রধানত ঘুম হারাম ঘটনাটা হল কাশ্মিরকে নিয়ে; অর্থাৎ কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ বা তা হাত ছাড়া হয়ে যায় কি না! কেন?

    কারণ মোদি-অমিত খুবই ভীত এ জন্য যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তারা একেবারেই গায়ের জোরে কাশ্মির (পুরোটাই মানে, শুধু ভারতের দখলে থাকা অংশ না – পাকিস্তান ও চীনের দখলে থাকা অংশসহ) ভারতের স্বাভাবিক অঙ্গ-ভূখণ্ড বলে সংসদে ঘোষণা করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এখানে “গায়ের জোরে” বললাম অনেক কারণে। প্রথমত, নেহরু জানতেন কাশ্মির ভারতের নয়; তাই তো জাতিসঙ্ঘের কাছে তিনি চিঠি লিখে মতামত চাইলে জাতিসঙ্ঘ গণভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত নিতে ফয়সালা দিয়েছিল। এটাই “নেহরু জানতেন” একথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।  কিন্তু ভারত জাতিসংঘের রায় কখনোই অনুসরণ করেনি। তবে একেবারেই কোনো পদক্ষেপ না নেয়াটা সরাসরি জাতিসংঘ অমান্য করা হয় – সম্ভবত এমন অনুমানে তিনি কিছু “বিশেষ শর্তে” (যেমন  ভারতের মূল ভূখণ্ডের কেউ কাশ্মিরে জমি কিনতে পারবে না ইত্যাদি) কাশ্মিরকে ভারতভুক্ত করে নেন। আর সেসব “বিশেষ শর্ত” সেটাই হল –  ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা। আর গত ২০১৮ সালেও ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিজেপি সমর্থক এক ব্যক্তি মামলা করেছিলেন ৩৭০ ধারা বাতিল করে রায় দিতে; তা এই যুক্তিতে যে সেসময় “ভারতের মূল কনস্টিটিউশন প্রণয়ন কমিটি” ৩৭০ ধারা যুক্ত করেছিলেন একে ‘অস্থায়ী’ বলে উল্লেখ করে। কিন্তু পরবর্তিতে এ নিয়ে আর কোনো কাজ না করেই ওই প্রণয়ন কমিটি তার আয়ু শেষ, তাই ‘বিলীন’ (ডিসল্ভ) বলে ঘোষণা করে দেয়া হয়। অতএব কোর্ট এখন ৩৭০ ধারাকে বাতিল ঘোষণা করুক – এই ছিল আর্জি। কিন্তু কোর্ট রায় দেন, এমন করা যাবে না। কারণ এমনটা করা হলে আইনিভাবে কাশ্মির আর ভারতের অংশ থাকবে না। তাই আদালত ওই রিট আবেদন বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন।
    এর অর্থ ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এক অবৈধ কাজ। কিন্তু যেহেতু কেউ এখনো এ ব্যাপারটা আদালতের দৃষ্টিতে আনেনি, তাই এটা অটুট থেকে যাচ্ছে।
    আবার সুপ্রিম কোর্টের ওই রিট মামলার রায়ে দেখা যাচ্ছে সেখানেও আসলে পরোক্ষে ধরে নিয়ে রায় দেয়া হয়েছে যে, কাশ্মির ভারতের নিজ মূল ভূখণ্ড নয়। তা হলে অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এবং কাশ্মিরকে সরাসরি ভারতের নিজভূমি বলে দখল করে নেয়া – এটাও তো অবৈধ। কিন্তু এটাও আদালতের দৃষ্টিতে কেউ আনেনি, তাই এটাও কোন চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে টিকে আছে। এ ছাড়া মোদির জমানায় আদালতের ট্রেন্ড হল, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করতে হয় এমন ইস্যু হলে আদালতের ঐ মামলা এড়িয়ে চলা বা বছরের পর বছর ফেলে রাখা অথবা কোনো একবারের প্রধান বিচারপতি আন্ডারহ্যান্ড ডিলের অভিযোগ মাথায় নিয়েও সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে দেয়ার ঘটনা অনেক। এসবই মামলা না হওয়া অথবা আদালতের দ্বারস্ত না হওয়া বা জনস্বার্থের মামলাগুলো করার মত লোক গরহাজিরা পিছনের কারণ মনে করা হয়।
    এভাবেই মোদি-অমিত তাদের রামরাজত্বের হিন্দুত্বের শাসন চালিয়ে যেতে পারবেন মনে করা হয়েছি। কিন্তু না!  উপরে উল্লেখিত এসব ‘গায়ের জোরের’ মতো হঠকারি কাজ – আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পরে থমকে যায় আর মোদি-অমিতও চমকে ওঠেন। কারণ এর সরাসরি প্রভাব  কাশ্মিরে জমানো রামরাজত্বের উপর পড়বেই। এর প্রভাবে আজকের কাশ্মিরে (যেখানে মানুষের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই,  প্এরতিনিধিত্টিবশীল শাসন নাই, এখন রাজ্যের মর্যাদায় নেই,  রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের কোনোই আইনি ব্যবস্থা বা কাঠামোই, [ রাজ্য সরকার] নাই)। একারণে এবার  যদি আবার সশস্ত্র আন্দোলন চাঙ্গা হয়, কি তুঙ্গে ওঠে আর যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মত  পরিস্থিতি এসে যায়; তবে সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাই ফিরে মোদি-অমিতের চরম বিরুদ্ধে চলে যাবে এই বলে যে, “গায়ের জোরে কাশ্মির ভারতের বলে দখল, ৩৭০ ধারা বাতিল’ করতে যাওয়াতেই এই বিপর্যয়! অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদ ব্যাকফায়ার শুরু করবে!
    মূলত একারণেই মোদি-অমিত এখন চান যেই আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসুক সে যেন প্রতিশ্রুতি দেয় যে কাশ্মিরে স্বাধীনতাকামী  কাউকে  আফগান-সহযোগিতা দেওয়া হবে না। মজার কথা হল, মোদি-অমিতের কাছে এই ঘোরতর মাথাব্যথার ইস্যু কাশ্মির অথচ, এনিয়ে বাইডেন প্রশাসন অন্তত কোনো সমর্থনের অবস্থানে নেই; বরং উল্টো ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু আমেরিকার অভিযোগের তালিকায় আছে। কিছু কংগ্রেস সদস্যও এ নিয়ে সোচ্চার।

    রাশিয়া কেনঃ
    তাহলে দেখা যাচ্ছে এখন সব মিলিয়ে ভারতের কাছে একমাত্র ভরসা মুরুব্বি রাশিয়া! কিন্তু সে কেন ভারতকে এই কোল দিতে গেল যাতে ভারত একটি সম্মেলন ডাকতে পারে?
    তালেবানরা এবার গত আগষ্টে  ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাশিয়া মূলত খুবই খুশি। তার অনুমান, এবার দিন তার পক্ষে এসেছে ও যাবে; আর আমেরিকার বিপক্ষে। কিন্তু একই রাশিয়ারই আবার এক প্রবল শঙ্কা; কারণ সে আবার সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয় রাষ্ট্রের  কাছে (এরই চার রাষ্ট্র ভারতের সম্মেলনে যোগ দিয়েছে) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা তাদের হবু আক্রমণ থেকে এই রাষ্ট্রদেরকে সুরক্ষিত রাখবে। আর     একাজে আবার রাশিয়া তালেবানদের ওপর নির্ভর করতে হবে, বিকল্প নাই। ফলে টেনশন আছে।
    এসব কিছু অবশ্যই রাশিয়ার বড় স্বার্থ। কিন্তু এসব ছাড়াও রাশিয়ার আরেক বড় স্বার্থ আছে। যেমন সেটি হল, রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইলের হবু ক্রেতা ভারত; যার একটার দামই আধা বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আরও কাহিনী হল – ভারত এটা কিনলে আমেরিকা ক্ষেপে গিয়ে ভারতের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ বহু ধরনের বাধা আরোপ করবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে আগেই জানানো হয়ে আছে, বাইডেন ক্ষমতা নিবার পরের মাসেও বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরে তা ভারতকে জানানো হয়ে আছে। তাই ভারত চেষ্টা-তালাশ করছে কোনো ছাড় পাওয়া যায় কি না। কিন্তু ইতোমধ্যেই উদাহরণ হল, একই পথে তুরস্কের বেলায় সে ব্যর্থ হয়ে আছে। এসব কারণে, রাশিয়ার আগ্রহ হল, ভারতকে কিনাতে পারলে তা আমেরিকার উপর একটা বড় চাপ তৈরি হবে।
    তাই এসব মিলিয়ে অনুমান করা যায় রাশিয়ার হবু ক্রেতা ও আগে অন্য অনেক সমরাস্ত্রের এরই মধ্যে ভালো ক্রেতা এই ভারতের ‘মন রক্ষা’ করতে রাশিয়া সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র সাথে নিয়ে ভারতের সম্মেলনে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। তবে সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র – এদের দিক থেকে দেখলে তাদের নিজস্ব বড় স্বার্থও এটা যে, তারা তালেবানদের ভরসা করেই যেকোনো রেডিক্যাল ইসলাম থেকে সুরক্ষিত থাকতে চায়। এটি তাদের ভাইটাল স্বার্থ!

    তা হলে ইরান কেন?
    ইরান ভারতের সম্মেলনে কেন – এটাও এক মজার প্রশ্ন। তবে জবাবটা সহজেই এভাবে বলা যায় যে, সম্প্রতি আফগানিস্তানে শিয়া মসজিদে হামলা পরপর সম্ভবত তিনবার বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। আর প্রতিবারই দেড় শতাধিকের উপর লোক মারা গেছে। এটা শুধু শিয়া মসজিদে হামলা – এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থেকে দেখাভুল হবে, এটা তা না; এরা ছিল মূলত আফগানি হাজারা শিয়া এথনিক গোষ্ঠি – তাদের উপর হামলা।
    ওরা শিয়া এই সেন্টিমেন্টের ওপর ভর করে এ হামলা করা ও তাতানো হয়েছে। কিন্তু এরা মূলত আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম এথনিক জনগোষ্ঠী। আমাদের মত দেশগুলোর ভূখণ্ডের সীমানা টেনেছে কলোনিয়াল শক্তিগুলো তাদের নিজের একান্ত স্বার্থে। আর এতে একই এথনিক জনগোষ্ঠী কাটা পড়ে সীমানা দুই দেশে বিভক্ত করা হয়ে গেছে।  যেমন আমাদের বেলায় একই বাঙালি অথবা পাঞ্জাবি এথনিক জনগোষ্ঠী যেমন ভারতে থেকে গেছে; যাদের আরেক অংশ বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে আলাদা কাটা পরে আছে। তেমনি আফগান হাজারা জনগোষ্ঠী আরেক বড় অংশ আছে ইরানে। ফলে আফগানিস্তানের অংশ হামলায় বিপদগ্রস্ত হলে ইরানের বড় দুটো সমস্যা। স্বাভাবিকভাবে  ইরানে সেন্টিমেন্ট তৈরি হয় হাজেরা আফগানদেরকে উদ্ধার ও রক্ষার। আবার আরেক বিপদ হলো, ইরান না চাইলেও তারা রিফুজি হিসেবে ইরানে ভিড় করে, করবেই – এটাই স্বাভাবিক। আর ইরান সেই দায় ঠেলে ফেলেও দিতে পারে না।
    কাজেই তালেবানরা যদি হাজারা, এরা শিয়া (ওরা কম মুসলমান বা সহি মুসলমান না ইত্যাদি ধরনের যেসব এথনিক ঘৃণা আফগান পশতুন ডমিনেটেড সমাজে প্রচলিত আছে) এই ধর্মীয়-সামাজিক মনোভাবের আলোকে উপেক্ষায় আইএসের হাতে হামলায় মারা যেতে দেয়, নাগরিক নিরাপত্তা না দিতে পারে তা হলে গত আগস্টে তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইরান সরকারের যে সমর্থন ও ইতিবাচক মনোভাব তালেবানদের প্রতি বজায় আছে তা ইরান চাইলেও আর বজায় রাখতে পারবে না। যেমন আফগানিস্তানের প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ এখনো ইরান করছে; যেখানে এর অর্থ পরিশোধের কী ব্যবস্থা হবে, সেটা এখনো অনিশ্চিত, তা সত্বেও। কারণ, তালেবানদের হাতে কোন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ নাই, ব্যবস্থা নাই।

    অতএব ইরানের ভারতের সম্মেলনে যোগ দেয়া বলতে গেলে তালেবানদের ওপর অপ্রকাশ্য অসন্তুষ্টির পরোক্ষ প্রকাশ বা বলা যায় তা প্রকাশ করার সুযোগ নেয়াঃ যেন তালেবানদেরকে বলা যে, তুমি আফগান হাজেরাদের উপর  আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামিস্টদের যদি আফগানিস্তান থেকে দূরে রাখতে না পারো, তবে ইরানের তোমার বিপরীতে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।’

    তাহলে এখন উলটা করে বলা যাকঃ  এর মানে কি যারা আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামীদের থেকে মুক্ত এক আফগানিস্তান দেখতে চায়; তাদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? ভাবটার একটা আবছা শেড থাকলেও সেটা কখনও নয়, সত্যিকারভাবে নয়। যেমন আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপ – এই হলো অ্যালার্জি বা অগ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি যদি ধরি, তা হলে কি বলা যাবে এমন গ্রুপের বিরোধীদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? এটি বলা যাবে না। কেন?
    কারণ বাইরে থেকে মনে হতে পারে, হিন্দুত্ববাদী ভারত নিশ্চয় এমন রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপদের বিরোধিতা পছন্দ করবে। কিন্তু না, করবে না। কেন? আর প্রমাণ কী?
    ইদানীং পাকিস্তানের ইমরান খান কী নিয়ে পেরেশান সেটা লক্ষ্য করতে হবে। দুটা ইসলামী গ্রুপ নিয়ে তিনি পেরেশান – TTP (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) আর TLP  (তেহরিক-ই-লাব্বায়েক পাকিস্তান)। আধা সশস্ত্র এরা আবার রাজধানীতে প্রকাশ্যে রেডিক্যাল মিছিল সমাবেশ করে থাকে।  টিএলপির  প্রধান আবার এখন গ্রেফতার হয়ে আছেন। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সমন জারি করে ডেকে অসন্তুষ্ট জানিয়েছেন। কারণ, ২০১৪ সালে পেশোয়ারের এক আর্মি স্কুলে টিটিপির অস্ত্রধারী জঙ্গিরা হামলা চালালে ১৩২ শিশুসহ মোট ১৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এরই বিচার এখনও চলছে।  তাই আদালত প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সরাসরি আদালতে দেকে নিয়ে এসে ভর্ৎসনা করেছেন।  তাই এবারের ইস্যুতে এদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী আভ্যন্তরীণভাবে অবস্থান জানিয়েছিলেন। কিন্তু  সেনাবাহিনীর ভিন্নমত হল তারা মনে করে এতে জীবন ও সম্পদ ক্ষয় হবে মাত্রাতিরিক্ত। তাই কৌশল হিসেবে এখনই সামরিক পদক্ষেপ বাতিল করা হয়েছে, আর সুযোগের অপেক্ষায়।

    মজার কথা, এ খবর আরো বিস্তারিত ছাপা হয়েছে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা। আর যা খুবই কম ঘটে থাকে – আমাদের অবাক করে প্রথম আলো এসব খবর ছেপে দিয়েছে ডন-এর রেফারেন্সে, বিনা দ্বিধায়।

    কিন্তু কেন ‘মজার খবর’ বলছি? ডন-এর খবরে লেখা হয়েছে, সশস্ত্র গ্রুপগুলো ভারতের সাথে সম্পর্কিত।  প্রথম আলোর এই রিপোর্টের শিরোনাম টিএলপির সঙ্গে চুক্তি প্রকাশ হচ্ছে, শক্তি প্রয়োগ চেয়েছিলেন ইমরান, নারাজ সেনাবাহিনী। প্রথম আলো ডন-এর রিপোর্ট থেকে অনুবাদ করে লিখেছে, ”

    প্রথম আলো লিখেছে  “পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি”। 

    “পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত।  পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি।’ এ ধরনের পাকিস্তান সরকারের পুরো মনোভাব ও পরিকল্পনাই ওই রিপোর্টে আছে। কিন্তু আমাদের এখানকার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, মোদি-অমিতের কাশ্মির বাঁচাতে তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তর অস্থিতিশীল করতে সশস্ত্র ইসলামী গ্রুপের ওপর নির্ভর করতেও রাজি; অর্থাৎ যে অভিযোগ আগে কেবল বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত অথবা একালে উইঘুর সশস্ত্র গোষ্ঠী (ETIM)-এর কথা উঠছে; এখন তা অনেক দূরে বিস্তৃত। এখানে উল্লেখ্য যে, হাজারাদের ওপর আইএসের যে তিন হামলা, তাতে সর্বশেষটাতে হামলাকারী হিসেবে ধৃত ব্যক্তি উইঘুর জনগোষ্ঠীর লোক। কেন এমন হচ্ছে? কারণ তালেবানরা এই ETIM গ্রুপকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেবে না বলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর থেকে এই উইঘুর গ্রুপ আইএস এর সাথে হাত মিলিয়ে যোগ দিয়েছে, তাই এ ঘটনা।

    বিপরীতে পাকিস্তানের আয়োজিত সম্মেলন কী ও কাদের নিয়েঃ
    এক কথায় জবাব, যদিও এ সম্মেলনের হোস্ট বা আয়োজক হল  পাকিস্তান কিন্তু এটা আসলে ‘ট্রয়কা প্লাস’ [TROIKA+] -এর বৈঠক। [এনিয়ে আমার পুরান লেখা রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে] কোন ‘ট্রয়কা প্লাস’? গত ১৫ আগস্ট তালেবানরা ক্ষমতা নেয়ার আগে রাশিয়ার উদ্যোগে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীনকে এই শক্তিধর তিন দেশীয় গঠন করা হয়েছিল তালেবান-আফগান ইস্যুতে তাদের কমন অবস্থান প্রকাশের জোট, সেটাই ট্রয়কা বা ত্রিদেশীয় জোট। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তালেবানদেরকে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের অধীনে আসতে সাহায্য করা যাতে তারা নয়া আফগানিস্তানকে নিয়ে গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে সহজেই প্রবেশ করতে পারে।
    আসলে নিরাপত্তা পরিষদের আফগান ইস্যুতে পাস হওয়া এক সর্বসম্মত প্রস্তাবকে তাদের গঠনভিত্তি হিসেবে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। পরে পাকিস্তানকে ওই ট্রয়কাতে কোঅপ্ট করে নেয়া হয়; কারণ আফগানিস্তানে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে পাকিস্তানের মাধ্যমে তা করা অর্থপূর্ণ ও সহজ। অন্তত দুটো কারণে – এক. পাকিস্তান এই প্রথম ২০ বছরের আমেরিকার স্বার্থের যুদ্ধের দায় থেকে মুক্ত হয়েছে। তারপরও এখনো আফগানিস্তানে যেকোন অস্থিতিশীলতা ঘটলে তাতে সবচেয়ে বেশি পুরনো দায় ফিরে আসবে পাকিস্তানের উপর, নিজে সেই অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত হবে ও সামরিক-অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হবে পাকিস্তানের। তাই পাকিস্তান না চাইলেও ‘স্থিতিশীল এক আফগান দেখার পক্ষে অবস্থান’ সে নিতে বাধ্য। দুই. আফগানিস্তান কিন্তু এক ল্যান্ডলকড ভূখণ্ড। ফলে পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম একটি তাল মিলিয়ে চলতে আফগানিস্তানও বাধ্য। এবং বাইরের কোন রাষ্ট্রও আফগানিস্তানে কিছু করতে চাইলে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে করলে তা বাস্তবায়ন সহজ ও সম্ভবত সম্ভব।

    অতএব পাকিস্তানকে গ্রুপে নেয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতে ভারতের জন্য তা এটা ততোধিক বিব্রতকর হয়ে যায়; কারণ এতে ভারতের অভ্যন্তরীণ পাবলিকের কাছে হিন্দুত্ববাদীরা যে প্রপাগান্ডা চালাত এই বলে যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ লালনকারী, তা এখানে উল্টে যায়। কারণ, এখানে পাকিস্তান হইয়ে যায় বাস্তবত – জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সন্ত্রাসবিরোধী সবচেয়ে নির্ভরশীল মিত্র, বিশেষ করে এখনকার সময়ের সবচেয়ে শক্তিধর তিন দেশ ও তাদের জোটের নির্ভরশীল মিত্র।

    এবার সবচেয়ে কঠিন সত্যটা আগে বলে রাখি। তা হলো আফগানিস্তানে তালেবানরা ফেল করলে এর বিকল্প বা অন্য শক্তিটা হল এককথায় আইএস।  মূলত আইএস আর সাথে ওর সমমনা আরো ছোট ছোট নানা, মূলত ‘পড়শিদেশীয়’ গ্রুপ। সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর বাস্তবতা হল, যেকোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তি তো বটেই, এমনকি এশিয়া অমুসলিম রাষ্ট্রগুলো তো বটেই,  এদের কেউই বা অন্য ইসলামী ধারা কেউই আইএসের সাথে পাশাপাশি পরস্পরকে স্বীকার করে টিকতে বা চলতে পারবে না, তা আইএস তো বটেই কেউই মনে করে না।  অর্থাৎ একা আইএস-এর রাজত্ব কায়েম হব।  ফলে তালেবানরা ফেল করার মানে সবার কাছেই পরিষ্কার।

    তাই তালেবানকেন্দ্রিক এখনকার বাস্তবতা হল, সংশ্লিষ্ট অন্য দেশের এক কমন আকাঙ্ক্ষা যে, তালেবানরা ফেল করা নয় বা আইএস আসা একেবারেই নয়। তাই তালেবানদের ফেল করতে দেয়া যাবে না। এতে সবার ক্ষতি। কিন্তু জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে, তার ভিত্তিতে তালেবানরা আফগানিস্তান শাসক হিসেবে নিজেদের গড়ে নিক। আর সেই আফগানিস্তান যেন পড়শি যেকোনো দেশে সশস্ত্র হামলাকারী কোনো গোষ্ঠীকে আশ্রয়দানকারী ভূখণ্ড না হয়, এটি নিশ্চিত করতে হবে।

     

    এটি বাস্তবায়নে তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
    অনেকে মনে করেন, তালেবানরা ভাবছে যেহেতু আফগানিস্তান যেন রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা আক্রমণকারীদের আশ্রয়ভূমি না হয় এটা নিশ্চিত করা প্রায় সারা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রস্বার্থ। কাজেই তালেবানরা রাজনৈতিকভাবে কেমন শক্তি (আরেকটি আইএস কি না বা রাজতন্ত্র যেমন এক সালতানাত বা আমিরের দেশ কি না) তা দেখাদেখি ট্রয়কাকে বিবেচনা বন্ধ করতে হবে বা ছাড় দিতে হবে।
    অথবা আফগানিস্তানেও দুর্ভিক্ষ লেগে যেতে পারে এই ভয়ে ট্রয়কাসহ সবাই তালেবানরা যেমন আছে এভাবেই মেনে নিতে বাধ্য হতে হবে।

    তালেবানদের নিজের সম্পর্কে এই অতি-অনুমান যে তারাই হলো দুনিয়াকে স্থিতিশীল রাখার একমাত্র শক্তি – এটিই তালেবানদের সব কিছুকে স্থবির করে রেখেছে।

    ট্রয়কা উদ্যোগ ফেল করলে এর প্রথম শিকার হয়ে যাবে আফগানিস্তানের খাদ্যসঙ্কটে থাকা ৫৫ শতাংশ জনগণ।

    দ্বিতীয়  সত্য হল, ট্রয়কার তালেবানের সাথে কোনো ছাড় দেয়া যদি ঘটেও সেই তালেবান শক্তির শাসনও ফেল করবেই। ফলাফল হবে আইএস ও সমমনাদের উত্থান। সেই আফগানিস্তান হবে আফ্রিকার সোমালিয়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো ভূখণ্ড। সারা দুনিয়ার জন্য এক নো গো [no go] এরিয়া!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৩ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান : ভারত ও পাকিস্তানের উদ্যোগ “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • এক মফস্বলী জেনারেল

    এক মফস্বলী জেনারেল

    গৌতম দাস

    ০৮ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Nt

     

    –China Attempting To Reduce India’s Influence In Myanmar, Sea: Bipin Rawat

     

    ভারতের জেনারেল বিপিন রাওয়াত [General Bipin Rawat], তার পদবি হল চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ, সিডিএস বা CDS; যা ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদেরও উপরের এক পদ ও পদবি। এই পদটি সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে। জেনারেল রাওয়াত ভারতের যখন (২০১৭-১৯) আর্মি চীফ ছিলেন তখন এটা মোদির হাতে তৈরি হচ্ছিল।  বলা যায় আর্মিকে হিন্দুত্ববাদ ও আরএসএসের আলোতে ছাপ দিয়ে সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ এটা।  তাই এই পদ সৃষ্টি হলে এর প্রথম পদাধিকারী হয়েছেন ততদিনে অবসর নেয়া ভারতের আর্মি চিফ এই জেনারেল বিপিন রাওয়াত। আর ওর শুরু, গত ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

    তিনি সম্প্রতি আসাম সফরে গিয়েছিলেন; গত ২০ অক্টোবর এক অভ্যন্তরীণ সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিতে। ঘটনা হল – আসাম পুলিশের এক অনুষ্ঠান ছিল সেটা। সভাটা হল – “প্রথম রবিকান্ত সিং মেমোরিয়াল লেকচার সিরিজ” যা আয়োজিত হয়েছিল ভারতের আইপিএস অফিসার ও পুলিশের এসপি রবিকান্ত সিং স্মরণে। তিনি আসামে তাঁর কাজের জেলা তিনসুকিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবিরোধী তৎপরতা দমনের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দল ‘উলফা’র হাতে তিনি খুন হয়ে যান। এসবই তাই আসামের আভ্যন্তরীণ ঘটনা।

    জেনারেল রাওয়াত ছিলেন সেই স্মরণসভার প্রধান বক্তা। পুরো অনুষ্ঠানে এক তিনি ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন সিভিলিয়ান। আর সাথে বক্তৃতার স্টেজে দেখা যাচ্ছে পেছনের টাঙানো ব্যানারে বাংলাদেশে বর্তমান ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দোরাইস্বামীর নাম, মানে তিনিও সেখানে বক্তা ছিলেন।

    যে উদ্দেশ্যে এই অনুষ্ঠান, তার সাথে ওর দুই প্রধান বক্তা এবং প্রধান বক্তার বক্তব্যের বিষয় ইত্যাদি এসবগুলোর সাথে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। বরং দেখা গেছে, খামোখা কোথা থেকে বাংলাদেশ সেখানে আলোচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউ না হয়েও। কেন?

    কেন বাংলাদেশঃ
    “Assam at crossroads: Geopolitical events its Geographical events in its neighbourhood impacting North East India” – এই ছিল সভায় আলোচ্য বিষয়। বাংলা করলে হয়, নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়ার পড়শি দেশের জিও-পলিটিক্যাল ঘটনায় আসাম বড় বিপদে আছে, এরকম।

    সেখান থেকে  বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট মূল কথাগুলো তুলে আনলে, জেনারেল রাওয়াত বলছেন, ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে (আর নট ইন ইন্ডিয়াস ইন্টারেস্ট’)। আরো বলছেন, “আমাদের সাউথইস্ট এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে চীন ঢুকে পড়ছে তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে। সম্প্রতি আমরা দেখছি একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।

    এখানে বক্তব্যগুলো নেয়া হয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস, আসামের নিউজ-লাইফটিভি ও স্ক্রল (Scroll)ওয়েব ভারতীয় পত্রিকা থেকে। এছাড়া এখানে আলাদা করে বাংলাদেশের বণিকবার্তা পত্রিকার নাম ও রিপোর্টের কথা উল্লেখ করতেই হয়। বিশেষত ভারতীয়  নিউজ বাংলাদেশে স্থানীয় বাংলা পত্রিকায় কী করে রিপোর্টিং করতে হয় এর অনুকরণীয় উদাহরণ হিসাবে। বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া যেখানে বিপরীতে এটাকে ভারতীয় প্রপাগান্ডা করে অর্থ আয়ের উপায় হিসাবে নিয়েছে। তারা  “পছন্দের” ভারতীয় পত্রিকা বা ‘র’ এসাইন্ড নিউজের বাংলায় অনুবাদ করে বা অনুবাদের নামে যা খুশি লিখে ছাপিয়ে থাকে।  ঢাকার এমন অন্য বাংলা সব মিডিয়ার জন্য বণিকবার্তা এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত; যদি কেউ ভাল হতে চায় অনুসরণ করতে পারে।

    উপরে তুলে আনা জেনারেল রাওয়াতের কথায় ফিরে যাই, তার প্রথম বাক্য  ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে” – এই  বাক্যতেই তার কথা মিললো না।  যেমন চীন বাংলাদেশে ‘হানা’ দিচ্ছে, এই হানা দেওয়ার মানে কী?  চীন বাংলাদেশের কীভাবে হামলা দিয়েছে? কোন সামরিক হামলা করেছে নাকি? তা অবশ্যই না।  এছাড়া চীন বাংলাদেশে হানা দিলে বাংলাদেশ কি তাতে আপত্তি জানিয়েছে কারও কাছে নাকি? তা তো না।  এমনকি সে কথা কিন্তু রাওয়াতও আমাদের জানাচ্ছেন না। তাহলে?

    অথচ – এক. রাওয়াত নিজেই বলছেন, চীন অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। তার মানে ব্যাপারটা বাণিজ্যিক। তাহলে এটাকে রাওয়াত হানা দেওয়া [foray] বলছেন কেন?  মানে সাথে একটা সামরিক  ভাব-ইঙ্গিত তুলছেন কেন? এটা একে বাণিজ্যিক জিনিস তার ওপর ‘অবকাঠামো বিনিয়োগ’ কোনো বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয় – ফলে গ্রহিতা দেশের জন্য খুবই কাম্য; যা  বাংলাদেশকে  দেওয়ার ভারতের  মুরোদ নেই, এখনো হয়নি। বরং পারলে এই বিনিয়োগ ভারত-ই চীনের কাছ থেকে নেয়। তাহলে রাওয়াত এটাকে চীনের বাংলাদেশে ‘হানা দেয়া’ বলছেন কেন? অবকাঠামো বিনিয়োগ দেয়া কী করে ‘হানা’ দেয়া হয়? সেটাও কি ঈর্ষায় বলা কথা? সে জন্য?  নাকি সম্ভবত  রাওয়াত কি সামরিক তৎপরতা আর অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে আসা – এ দুয়ের ফারাকই বুঝেন না? একটা বাণিজ্যিক তৎপরতাকে যদি তিনি সামরিক হানা দেয়া বলেন, বুঝেন, তাহলে বলতেই হয় চার স্টার জেনারেল হলে হবে কী তিনি এখনো এক “মফস্বলের লোকই’ রয়ে গেছেন।  মানসিক বৃদ্ধি-বিকাশ কিছুই ঘটেনাই।  মফস্বলিয়া মানে শহরায়ন হয় নাই। জ্ঞানবুদ্ধি, মুল্যাবোধে অপুষ্ট থেকে গেছে যার।  ভারতের মডার্নাইজেশন, এডুকেশন ধারা যথেষ্ট বিকশিত ফলে ওর সামরিক মান তো খারাপ মনে করার কিছু নাই। তাহলে জেনারেল রাওয়াতের বেলায় এমন কেন সে এক প্রশ্ন বটে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায় – এটা কোন সামরিক জেনারেলের নুন্যতম স্ট্যান্ডার্ড নয়।

    আর এর মানে দাঁড়ালো জেনারেল বিপিন তো চীনের বিরুদ্ধে তার অভিযোগটা কী তাই তো প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না। চীনের বাংলাদেশে বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ানোর মুরোদ যদি থাকে ও প্রয়োগ হয় তা নিয়ে ভারতের কিছুর বলার নাই। আর যেকোন দেশ তা করবেই এবং তা বৈধ। তবে বড় জোর রাওয়াতের এনিয়ে ঈর্ষা হওয়া জায়েজ। কিন্তু তবু এই ঈর্ষা হতে হবে গোপনে বা মনে মনে অথবা আভ্যন্তরীণ গোপন নন-পাবলিক দলিলে।  কারণ, প্রকাশ্যে ঈর্ষা দেখানো  ভাল আদব ও রুচির পরিচয় নয়। তবে সবচেয়ে ভাল হবে চীনের যোগ্য প্রতিযোগী হয়ে আরো বড় বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের দরজা খটখটানো।আর এই মুরোদ না থাকলে ভারতের চেপে যাওয়াই ভাল! নয় কী? দেখা যাচ্ছে জেনারেল বিপিন যেন জিদ করেছেন  যে তাঁর এই বোকা ব্যবহার আমাদের সামনে বের করবেনই!

    এমন মন্তব্য করেও কেন জেনারেল বিপিন রাওয়াত এমন বোকা বোকা ব্যবহার করতে পারেন আর সেটা কেন কেমন হল এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে গিয়ে মনে হল, এটা এমনি এমনি সম্ভবত বুঝা যাবে না। তার ‘ভারতীয় মনগঠনে’ প্রবেশ করতে হবে।  একাজে আগে কিছু কথা আগাম ধরে নিতে হবে যেটা সম্ভবত তাঁর মনে ধরে নেয়া আছে। বছর কয়েক আগে ভারতের এক মিডিয়ায় দেখেছিলাম এক অনুমান যে, সারা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই ফলে বাংলাদেশের উপরেও, মানে যেন বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারির অধীনে আছে। নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া এই অনুমানের উপর তারা লিখছিলেন। অনেক ভারতীয় মিডিয়ায় সেকালে দেখেছিলাম লেখা হয়েছে একইভাবে ও অভিযোগে যে, চীন সাউথ এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়া নাকি ভারতের বাগানবাড়ি – এটা আগাম ধরে নিতেই হবে। আর বাগানবাড়ি মানে মূল বাড়ির পেছনের যেমন বাড়ির মালিকের বাগানবাড়ি থাকে, বাংলাদেশ হলো ভারতের সেই বাগানবাড়ির অংশ। বাংলাদেশে মানে ভারতের সেই কথিত বাগানবাড়িতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে এসে ঢুকে গিয়েছে।

    কেন ধারণাটা আমদানি করতে হল?
    কারণ এই উটকো ধারণাটা ছাড়া চীনের সাউথইস্ট এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এটাকে নেগেটিভ বা খারাপ কাজ বলা যাচ্ছে না।  এটা ভারতের স্বার্থের বিরোধী কাজ তাও বলা যাচ্ছে না। অথচ এতে বেকুবিটা হল –  বাংলাদেশ কী করে ভারতকে বাগানবাড়ি হল? কে দিয়েছে, ও কীভাবে? এর সাফাই কে দিবে সে খবর নেই। কিন্তু এটা আগাম ধরে নেওয়া আছে।
    এখন বাংলাদেশ যদি ভারতের বাগানবাড়ির অংশ হয় তাহলে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ( রাওয়াত নিজেই বলছেন, ……a tremendous influx of Chinese investments to build community projects and infrastructure.) নিয়ে বাংলাদেশে আসা মানে চীনের ভারতের বাগানবাড়িতে আসাই হয় – আর সেই সুত্রে, তা তো চীনের বাংলাদেশে হানা দিয়ে আসাই হয় – তাতে বিপিন রাওয়াত বলতেই পারেন! নাকি?
    এ ছাড়া দুই নম্বর পয়েন্ট হল – রাওয়াত বলেছেন, “বাংলাদেশ অনেক চীনা অস্ত্র কেনে”। (…… countries have been the largest recipients of military-grade weapons from the Chinese)।
    হ্যা, তো কিনে! কিন্তু তাতে কী হয়েছে? বাংলাদেশের অস্ত্র কেনা কী বেআইনি? না কি?  ভারতও কী আমেরিকা, রাশিয়া বা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড থেকে ‘মিলিটারি গ্রেড’ অস্ত্র কিনে না? আর এমন ক্রয়ের আগে কি ভারত প্রতিবেশী বাংলাদেশের অনুমতি নেয়? না। তাহলে  রাওয়াতের মনে এতে কী সন্দেহ জাগে তাতে আমাদের কী? আর অনেককে নিয়ে অনেকেরই নানা সন্দেহ থাকতেই পারে যা নিজ নিজ বাহিনীর অভ্যন্তরে কৌশলপত্রে থাকে ও এর অংশ হয়। তো  থাক  সেসব কথা। কিন্তু আসামের ঐ প্রকাশ্য সভায় তা উগরানোকেন? এটা কী কোন বুদ্ধিমানের কাজ? মানে এসব কী তাহলে বাংলাদেশকে শুনানো, ভয় দেখানোর জন্য?

    দিন সব একই রকম থাকেনা, বদলায়। তাই একালে বিপিন রাওয়াতের এসব ছেড়ে দেয়া উচিত। আগের এক লেখায় বলেছিলাম বোকা মানুষ জেনে না জেনে নিজেই নিজের শত্রু জন্ম দেয়, শত্রু খাড়া করে এবং শত্রুর মধ্যে বিশেষ সব আকার-বৈশিষ্ট্য তাতে এঁকে দেয়। আবার পরে এই মানুষই কান্নাকাটি করে যে, আমার শত্রু এমন কেন হলো! কাজেই রাওয়াতের বুদ্ধিমান হওয়া উচিত, এসব ‘কইরেন না।’ বাংলাদেশকে ভারতের শত্রুর আকার-বৈশিষ্ট দিয়েন না, নিজের খাতিরে।  ভারত চাইলে অবশ্যই এসব কাল্পনিক শত্রু কল্পনায় এঁকে চলতে পারে। এতে এক পর্যায়ে ভারত বাংলাদেশকে চীনের কোলে আশ্রয় নিতে ঠেলে দিতেও পারে। কেননা, অকারণে ও অত্যধিক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হলে যে কেউই নিরাপত্তার জন্য ছোটাছুটি করবেই। তাতে উপায়ন্তর না পেলে সে চীনকে বা যে কাউকে শক্তিশালী ও ভারতবিরোধী পাবে তাকেই ডেকে আনবে। এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই বলছিলাম ঠেলেন না!  কাজেই বাংলাদেশ ভারতের  কেমন শত্রু হবে সেটা নির্ধারণ বা নির্বাচনও ভারতের হাতেই আছে, রয়েই গেছে – এটা খেয়াল রেখেন।

    ভারতের আরো করণীয় কী?
    করণীয় হল – ১. আমরাও ব্রিটিশদের কলোনি ছিলাম যা থেকে ১৯৪৭ সালে মুক্তি পেয়েছি। কাজেই এরপর আমরা কোনোভাবেই ভারতের বাগানবাড়ি নই। সারা সাউথ এশিয়াও নয়। কথাগুলো ভারতের লিখে মনে রাখা উচিত। এছাড়াও লাস্ট ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কখনোই নেহরুকে পরবর্তী ভাইসরয় করে দিয়ে যাননি। কারণ মাউন্টব্যাটেনই সর্বশেষ। কাজেই নেহেরুর মত  মিথ্যা কল্পনায় স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেন। রাওয়াতের মত সবাই বন্ধ করেন যে, বাংলাদেশ ভারতের বাগানবাড়ি আর চীন সেখানে ‘হানা দিতে’ এসেছে।

    বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারি নয়। ইঙ্গিতেও এটা সত্যি না, ভুল। তাই, প্রথমে মিথ্যা স্বপ্নের গল্প বা মিথ থেকে বের হয়ে আসেন। আর জেনে রাখেন, আপনারা আমাদের চাপাচাপিতে ভয় না দেখালে, পুশ না করলে, বাধ্য না করলে (আমরা জানি চীন-ভারত সামরিক সমস্যা বিতর্ক-বিরোধ আছে; তবে) আমরা সেই সামরিক বিরোধে কখনো কোনো পক্ষ নিব না। কারণ ওতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া কোনো স্বার্থ নেই। এটা চীন বা কারো কোনো হবু প্ররোচনা বাংলাদেশের ওপর আসার আগে থেকেই আমরা নিশ্চিত, আমাদের স্বার্থ নেই। আর সস্তা বলে চীনের থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি আমরা, সেটা এক জিনিস। কিন্তু এর মানে কোনো বিরোধে চীনের পক্ষে দাঁড়াতে হবে এমন মুচলেকা কোথাও দেইনি আমরা। এখন বাকিটা হলো বুদ্ধিমান ভারতের হাতে ও উপরে।

    কাজেই “আসাম নাকি ক্রসরোডে পড়েছে” – এটা আমাদের জানার কথা নয়। আমাদের কনসার্ণ না।  তাই যদি পড়েও থাকে এর মধ্যে বাংলাদেশ কেউ না এবং নেই। সবটাই আপনারা ভাইসরয় বা বাংলাদেশ আপনাদের তালুক এই- জাতের অসার কল্পনাপ্রসূত চিন্তার সমস্যা। আর নয়তো তা ভারত-চীনের কোনো সামরিক, ভৌগোলিক বা স্ট্র্যাটেজিক বিরোধ যার কোনোটার অংশ আমরা নই। তবে এই অজুহাতে আবার ২০০৮ সালের মত বাংলাদেশের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে চান? কে বসবে ঠিক করে দিতে চান? পরের ১২ বছরের জন্য কাউকে বসাতে চান? আসেন চেষ্টা করে দেখেন! তবে মনে রেখেন, কোনো ঘটনা দুনিয়ায় একই রকমভাবে দু’বার ঘটে না! কেবল আবার বলব, নিজের শত্রু কেমন হবে মানুষ নিজেই এর আকার-বৈশিষ্ট্যদাতা!

    সত্যি কথা সরাসরি বললে, বিপিন রাওয়াতের কথার আসলে মানে হয় না। প্রথমত বাণিজ্যিক আর সামরিক তৎপরতা বা স্বার্থের ফারাক তিনি পরিষ্কার বুঝেন ও মনে রাখেন বলে আর মনে হয় না।। যেমন ধরেন – আমরা কি বলতে পারি যে, আমার ছেলে কেবল ম্যাট্রিক দিলো তাই পড়শির ছেলে  বুয়েটের পরীক্ষায় টিকে চান্স পাওয়াতে এটা আমার পরিবারের স্বার্থবিরোধী কাজ ও ঘটনা হয়েছে? পড়শির কোন সমৃদ্ধি মানে কী তা আমার স্বার্থবিরোধী? এভাবে বলা যায়? সেক্ষেত্রে, এটা বড়জোর হিংসার কথা, তাও আবার বেকুবি হিংসা কথা হবে!

    অথচ রাওয়াতই বলছেন, “চীন তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে সাউথ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে ঢুকে পড়ছে” সম্প্রতি আমরা দেখছি “একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।  মানে  রাওয়াতের কথাতেই এটা পরিষ্কার যে, এর পুরোটাই বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো বিনিয়োগ, সামরিক নয়। কাজেই এটা ভারতের স্বার্থ কি না, এতে ভারতের স্বার্থ আছে কি না ইত্যাদি প্রশ্ন তোলারই তো মানে হয় না, বোকামি। পড়শির ঘরে মেলা বাজার-সওদা আসলে এটা আমার স্বার্থে না, একথা বললে কী মানে হয়? তখন রাওয়াতকে বলতেই হয় যে, হ্যাঁ, অবশ্যই এসব বাজার-সওদা আপনাদের জন্য নয়, কাজেই এটি ভারতের স্বার্থ নয়। কিন্তু সে জন্য কান্নাকাটি করা যায় না, অভিযোগ করা যায় না, কেবল এ ঘটনা আপনাদের স্বার্থবিরোধী বলে চিৎকার করলে আপনাদের পাগলাগারদে পাঠানোই বাকি থাকে!

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত, আপনাকে আবার মনে করিয়ে দেই। ভারতের নীতি আসলে – ‘আমরা ভালো প্রতিশ্রুতিশীল পার্টনার হতে পারব না’- এটাই যেন হয়ে আছে। বরং কে কত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারে, ঠকাতে পারে এরই দক্ষতা দেখানোকেই আপনারা যোগ্যতা মনে করে আসছেন। ভারত বড় দেশ, ১৩৫ কোটির দেশ, তাই ভারতের এসব ‘জুয়াচুরি’ পড়শিরা যেন মানতে বাধ্যই থেকে যাবে। আর এই পরিস্থিতিতে এখন আপনাদের পড়শি দেশে আপনাদের কথিত বাগানবাড়িতে চীন কেন আসবে – আপনারা সেই দুশ্চিন্তায় থাকলে আমাদের কী করার আছে? এটি আপনাদেরই সম্ভবত মানসিক সমস্যা।

    বৃহত্তর দিকটা দেখিঃ
    ব্যাপার হল, ভারত বাংলাদেশের আইনিভাবে প্রাপ্য ৫৪ নদীর পানিতে আমাদের ভাগ লুটে খাচ্ছে – এটা কি এভাবেই চলতে পারে মনে করেন? কখনোই নয়। ভারত নাকি দক্ষিণ চীন সাগরে সবার অবাধ চলাচলের নেভিগেশনের রাইট চায়? সে জন্য চীনবিরোধী কোয়াড জোট বেঁধেছে। তাহলে আমাদের পানির রাইট দিতে চায় না, জন্ম থেকে পানি আটকে রেখেছেন কেন? যদি বলেন আপনাদের গায়ে বল আছে তাই দিবেন না। এর মানে বুঝেন?  আসলে বলছেন, আমাদেরকে ঠেলছেন যে, ভারতের চেয়ে বড় বা বেশি গায়ের বল নিয়ে আসো। তাহলে এসে নিয়ে যেও। অর্থাৎ বলশালী ভারতবিরোধী দেশের কাছে যেতে বলছেন? বুঝে বলেন কিন্তু!

    বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার সময় আগে থেকেই ভারতের দুই শর্ত হল যে, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় আসামের জন্য সব ধরনের করিডোর নিবেন। দিতে হবে। এমনকি রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। আর সেটা আড়াল করতে শর্ত হল, বিনিময়ে ভারত ছিটমহল লেনদেন সম্পন্ন করবে, যেটা শেখ মুজিবকে আনুষ্ঠানিক কথা দিয়ে বাংলাদেশের দিক থেকে বেরুবাড়ি হস্তান্তরের পরও ভারত আমাদেরটা তখনো দেয়নি। সেটাই এবার দেয়ার কথা। এটা কিন্তু দয়া নয়, আমাদের পাওনা। পাওনাটা আটকে রেখেছিলেন। কাজেই এটা তো করিডোর দেয়ার বিনিময়যোগ্য কিছু নয়। তাই আসলে এটাও ছেলেভুলানি!

    আর দ্বিতীয় শর্তটা ছিল তিস্তা নদীর পানি। যা ভারত আজও দেয়নি, কখনো দিবে না বলে বুঝা  হয়ে গেছে। ভারতেরই কেউ নাকি বাংলাদেশকে পানি দিতে দেয়নি – এ কথা যদি ভারত বলে তার মানে হবে ভারতেরই কথিত ‘কেন্দ্র’- এর সার্বভৌম মুরোদ নেই। এমন যদি ‘মাজাভাঙা’ হয় তাহলে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ভারত করে কেন, কী করেই বা করে যা পালন করার মুরোদ নেই? নাকি অজুহাত খাড়া করতে এমন চুক্তি করে?

    তাহলে এখন কেন বাংলাদেশ আপনাকে যোগ্য পার্টনার মনে করবে? আবার দেখুন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে এমন বড়ভাইয়ের ভয় দেখিয়ে ভারত চলে আসছে। তাহলে এখন, চীন কেন পড়শিদের দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসে, এ নিয়ে আপনাদের জ্বলুনি দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, ভারতের হাত ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে সব নিয়ন্ত্রণ? তাহলে আপনাদের কথিত প্রভাব এখন কোথায়? কাজেই সাবধান হওয়া উচিত! কী চাচ্ছেন, মানে কিভাবে আপনার হবু শত্রুর আকার আমাদেরকে দিচ্ছেন – এ দুটি বুঝেই  কথা আগাবেন আশা করি। এটা মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।

    বিপিন রাওয়াত কে?
    ২০১৭ সালের শুরু থেকে জেনারেল বিপিন রাওয়াত ভারতের আর্মি চিফের দায়িত্বে এসেছিলেন। সেই থেকে জেনারেল রাওয়াত সম্পর্কে বাংলাদেশের মনোভাব কেমন তার এক সারসংক্ষেপে জানা যেতে পারে।

    ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত তিন বছর রাওয়াত ছিলেন ভারতের সেনাপ্রধান। তিনি তিন বছরের আর্মি চিফের পোস্টে আসীন ছিলেন রুটিনভাবেই। তবে সে সময়ই নতুন পদ সিডিএস সৃষ্টি করা হয় এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। এই পদ ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের পদ হলেও এটা শুরু থেকেই পোশাকী মানে উর্দি বা সামরিক পদ ছিল। কিন্তু এটা ঠিক, তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের আগের যে যারা যেখানে সরকারি পদ যা একেবারে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত যার যা দায়িত্ব কর্তব্য ও কমান্ড যা ছিল সিডিএস [CDS] পদ সৃষ্টির পরেও, আগের সে কাঠামোতে কোনো বদল আনা হয়নি।
    আনুষ্ঠানিকভাবে তাই যা আগে বলা হয়েছিল, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বা সিডিএস পদ তৈরির পরও তাতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর সোজা মানে, সিডিএস তিন বাহিনী প্রধান আবার বাইরের কাউকেও কমান্ড করতে পারবেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে সিডিএসের কাজ হল তিন বাহিনী প্রধানের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা। আর সাথে কোথাও কোথাও আকার-ইঙ্গিতে বলা হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথেও সমন্বয় করা।

    একারণে, এটাই অনুমান আকারে ভারতে প্রচলিত আছে যে, আরএসএস-মোদি ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও হিন্দুত্বের ছাপ দিতে চায়। একারণেই এই নতুন পদ তৈরি করা হয়েছে। বাইরের চোখে যা একটা কথিত কো-অর্ডিনেশন।

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত আর্মি চিফ থাকার সময় থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে যেন তিনি বিজেপি কর্মী এমন আচরণ ও তাল দেয়া শুরু করেছিলেন; যার প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্ট বলে মনে করা হয় ২০১৯ মার্চ-মে মাসের নির্বাচনের ঠিক আগেই পাকিস্তান হামলার ভনিতা সাজানো। বিজেপি ও মোদি চেয়েছিলেন পাকিস্তানে সাজানো হামলা ও এভাবে প্রতিশোধ নেয়ার জোশ তোলা। তাতে যেন মোদির নেতৃত্বে বীরত্বের সাথে প্রতিশোধ নিয়ে আসা হয়েছে- এই জোশ তুলে হিন্দু ভোটার পোলারাইজেশন ঘটানো ও তা বিজেপির বাক্সে জড়ো করা। অর্থাৎ মেসেজটা হলো, অ্যান্টি পাকিস্তান মানে অ্যান্টি মুসলমান মানে এবার হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে একমাত্র মোদির দলকে ভোট দাও এই ছিল ২০১৯ নির্বাচনের স্লোগান সূত্র। এখন বিজেপির ওই ভোট রাজনৈতিক প্রোগ্রামে আর্মি কেন আসতে বা সায় দিতে রাজি হবে, এটাই নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল এই রাওয়াতের।

    এ কারণে, পাকিস্তানি বিরাট ঘাঁটিতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে বলে ভারতীয়রা সাফল্য দাবি করলে পরে ইমরান খান কূটনীতিকদের স্বচক্ষে সেই হামলাস্থলে নিয়ে গিয়ে দেখান, একটা মরা পাখি ছাড়া সেখানে কোনো প্রাণী আহত-নিহত কিছু নেই। তবে মাটিতে বোমা ফেলায় গর্ত হয়েছে অনেক, এর সচিত্র বর্ণনা তারা দেখিয়েছিল। কিন্তু তত দিনে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হয়ে যায়। ফলে এর কোনো প্রভাব সেখানে ছিল না।

    এর অনেক আগে অবশ্য বিপিন রাওয়াত যে আনুগত্য প্রদর্শনে সম্মতি জানিয়েছেন তাও পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। অনেকের মনে থাকতে পারে ঘটনাটা। কাশ্মিরের এক তরুণ কথিত সন্দেহভাজন জঙ্গি। তাকে ভারতীয় আর্মি তাদের এক জিপ গাড়ির বনেটের উপরে সামনে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধেছে। এরপর সেই গাড়ি নিয়ে সারা শহর ঘুরানো হয়েছে। এই নৃশংস অমানবিক কায়দায় এবং আইনবহির্ভূত অবস্থায় তাকে বসিয়ে সারা শহরে ফুল স্পিডে গাড়ি চালানো হয়েছিল। এটা মিডিয়ায় রিপোর্ট হওয়ার পর হইচই উঠেছিল। আর সামরিক কর্তারা সাফাই দিয়েছিলেন, বন্দীর বন্ধুদের ভয় দেখাতেই নাকি এমন করা হয়েছিল। অথচ বন্দীর সাথে এই আচরণ বেআইনি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর্মি চিফ বিপিন রাওয়াত সে সময় এর স্বপক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন। এর আগে ভারতের কোন আর্মি চীফ এমন দলবাজ হতে দেখা যায় নাই। নিজের পেশার প্রতিওই অনুরক্ত থেকে কাজ করেছেন। অনুমান করা হয়, মোদি এভাবেই তাকে পরীক্ষা করে নিয়েছিলেন। মনে করা হয়, এটাই তার হিন্দুত্ববাদী-রাজনীতির পক্ষে প্রথম অ্যাক্ট ও অফার, ফলে তা এক অন্তর্ভুক্তি ও সম্মতি। কারণ, একই সময় মুম্বাইয়ের কিছু অভিনেতাও বিজেপিতে রিক্রুট করা হয়েছিল। সাধারণভাবে অভিনেতাদের কাছে ব্যাপারটা টাকা নিয়ে অভিনয়ের মতোই রাজনৈতিক অভিনয় করে দেয়া। এমন অভিনেতাদের অনেকের মধ্যে ছিলেন সস্ত্রীক অনুপম খের, পরেশ রাওয়াল, কঙ্গনা রানাউত ইত্যাদি। পরেশ রাওয়ালসহ অনেকেই জিপে বেঁধে ঘুরানোর ওই ঘটনায় বিপিন রাওয়াতদের পক্ষে প্রপাগান্ডামূলক পাবলিক আর্গুমেন্ট দিয়েছিলেন।

    তাই জেনারেল বিপিন রাওয়াত এখনো যা করছেন তা এক আরএসএস ক্যাডারেরই তৎপরতা যেন। আর এতে আমরা দেখলাম, আরেক ক্যাডার বিপিন রাওয়াত  আসামে কী করলেন!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “এক জেনারেল “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

      ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

    গৌতম দাস

    ০১ নভেম্ববর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3MV

     

    আ.লীগ কি আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাচ্ছে— প্রশ্ন রানা দাশগুপ্তের

    গত বৃহস্পতিবার ২৮ অক্টোবর   চট্টগ্রামে ইসকনের এক জনসমাবেশ হয়েছে। পরদিনের প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে এ সমাবেশের আয়োজকদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে- “বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের নন্দনকানন চত্বরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি আয়োজিত এক সমাবেশ হয়েছে”।

    ‘ইসকন’ [ISCKON] ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড এক হিন্দুধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যা ‘কৃষ্ণনাম চর্চার এক বিশেষ ব্যাখ্যা’ প্রচারের সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তা সত্বেও চলতি শতকে এসে আমেরিকান সংসদে ও সিনেটে ভারত সরকারের পক্ষে আমেরিকান নীতি পলিসিকে প্রভাবিত বা লবি[lobby] করতে ভারত আমেরিকায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির মিলিত এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, ক্রমেই ইসকনও তার অংশ হয়ে যায়। এর নিট ফলাফল হল ইসকন আর নেহায়েতই ধর্মপ্রচারের সংগঠন থাকেনি। এর ফোকাস বদলে রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে যায়।

           চট্টগ্রামে সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার সমাবেশ

    আমেরিকা হল এমন সমাজ যেখানে বহু বছর আগে থেকেই মানুষের জীবনে থিওলজি [theology] মানে ধর্ম বা ধর্মতত্বের আর প্রয়োজন নেই; মানুষের থিওলজিক্যাল নিড বা ধর্ম-বিষয়ক কোন চাহিদা আর নেই – এমন মনে করা, রটিয়ে বা  ঘোষণা করে দেয়া এক সমাজ। এই অনুমান-ধারণাটা যে ভিত্তিহীন এবং যথেষ্ট ভেবেচিন্তা বলা ভাষ্য নয় এরই প্রমাণ হল সেকালের জন্মের শুরুতে ইসকনের টিকে যাওয়া। যেকোন থিওলজির সারকথাটা  হল এটা এক আন্তঃসম্পর্ক বোধ, যা আমাদের ভেতরে এক ‘সম্পর্কিত’ বা  কানেকটেড বোধ জাগিয়ে দেয় বা রাখে। আমার যায় আসে আমাকে টানে, এমন একটা টান-বোধ করা কাজ করে টের পাই। সে আন্তঃসম্পর্ক বলতে তা হতে পারে মানুষে-মানুষে অথবা প্রকৃতির (মানুষ বাদে) সব কিছুর সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্ক বোধ। আর এসব যেকোনো দুইয়ের সম্পর্কের মাঝে থাকে ‘আল্লাহ’ ধরনের এক ধারণা যার মাধ্যমে মধ্যস্থতায় আসলে আমরা সবাই সব কিছুর সাথে কানেকটেড বা সম্পর্কিত বোধ করতে থাকি। এতে মানুষের বেঁচে থাকাটা মিনিংফুল এবং উদ্দেশ্যসম্মত মনে হতে থাকে। কিন্তু মডার্নিটির সস্তা বা দায়দায়িত্বহীন ব্যাখ্যার কারণে নিজেরা থিওলজিক্যাল নিড শূন্য ঘোষণা করে দেয়াতে পশ্চিম নিজের ক্ষতি করে ফেলেছে; অথচ বাস্তবে মানুষমাত্রই কম-বেশি একটি থিওলজিক্যাল চাহিদা থেকেই যায়। আমেরিকান সমাজের থিওলজিক্যাল নিড নাই, দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা এই ধারণা  এতে তৈরি হওয়া যে শুণ্যতা বা গ্যাপটা পূরণ করতেই এশিয়ান থিওলজিগুলোর অনেকেই পশ্চিমে এসে পপুলারিটি পেয়ে যায়। কারণ মানুষ মাত্রই তার থিওলজিক্যাল নিড থাকে থাকবেই। কম অথবা বেশি; জীবনের শুরু থেকেই নয়ত শেষের দিকে, তরুণ জোঁসে নয়ত অবসর জীবনে – এসব খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া বুঝা যায় আরো বহু যূগ থিওলজিক্যাল নিড থাকবে। ফর্ম বা আকারে হয়ত বদল আসবে।  বহুবার দেখা গিয়েছে মানুষ মারাত্মক আত্মঘাতি ভুল করেছে, তাঁর জানা জ্ঞান কোনটাই তাকে সতর্ক বা সাহায্য করে নাই।  পরে আবার থিওলজি থেকে, পড়তে গিয়ে বুঝছে তাকে সাবধান করা হয়েছিল কিন্তু সে বুঝে নাই, মোল্লাদের কারবার বলে তুচ্ছ করে গেছিল। আবার সাথে বলে রাখা ভাল যে তাই বলে জীবনের বস্তুগত দিকটাও উদাসিন, নজর আন্দাজ বা বেখেয়ালি হওয়া বা থাকাটাও সমান বিপদের হবে।
    যা হোক আমেরিকার সমাজের থিওলজিক্যাল গ্যাপ আছে-ছিল বলেই  ইসকন আমেরিকায় হবার  প্রথম দিকে এ সূত্রেই ‘জায়গা’ করে নিতে না পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে ভারতের লবি প্রতিষ্ঠানগুলোর জোটের অংশ হয়ে যাওয়াতে ইসকনের ফোকাস সরে গেছে। এমনকি নেতৃত্বও বদলে যায়, পরিচালন ক্ষমতায় এমন এক ক্যু হয়ে গিয়েছিল। যারা ভারত সরকারের পক্ষে সরাসরি কাজ করতে চায় ইসকন সংগঠনের এই ধারা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। এতে আগের ধর্মপ্রচারের উছিলায় আমেরিকায় জন্মানো এশিয়ান থিওলজির প্রতিষ্ঠানটা এবার হয় ঘোরতর এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষত ভারত সরকারের বর্ধিত হাতের ভুমিকায় তার গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজ করার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ইসকন হল বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে ও কাছে ভারত সরকার ও তার গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়ার বা পৌঁছানোর হাতিয়ার। ইসকন এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিরোধী এক সংগঠন; যদিও পরিকল্পিতভাবেই ইসকনের আগের ধর্মীয় ভাব ও এর বাইরের আদল সবই বজায় রেখে দেয়া হয়েছে। আর ওদিকে এই নয়া ইসকন এখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশে নাশকতা ও অপতৎপরতার সংগঠন ‘র’-এর বর্ধিত হাত হয়ে নিজেকে সাজিয়ে হাজির করতে থাকে।

    শুধু তা-ই নয়, এতে অবস্থা এখন এমনই যে, একালের আরএসএস-মোদির যুগে বাংলাদেশের ইসকনের তৎপরতায় বাংলাদেশের হিন্দুরা যেন কালচারালি আর বাঙালি হিন্দু নয়; তারা যেন আরএসএসের যে উত্তর প্রদেশের হিন্দু ব্যাখ্যা আছে – তার অনুসারী করে নেয়ার এক প্রোগ্রাম। এটাই ইসকনের প্রধান কর্মসূচি এবং তা নিশ্চিত করাই এর কাজ। যেমন বাঙালি হিন্দুকে উত্তর প্রদেশের হিন্দুর স্টাইলে নিরামিশাষী হতে শেখাচ্ছে তারা, ইসকন মার্কা কৃষ্ণভক্ত হওয়ার নামে। অথচ এথনোলজিক্যাল [ethnological] জাতির বিচারে এটা  প্রতিষ্ঠিত যে  বাঙালির খাদ্যাভ্যাস হল সে আমিষ-ভোজী। আর সেখান থেকেই প্রবাদ তারা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সেও হিন্দু অবশ্যই কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত এথনিক প্রজাতি্তে এক নয়। মানে এরা নিরামিষের লোক নয়। সোজা কথায় এথনোলজির বিচারে আমরা বাঙালি হিন্দু, উত্তর প্রদেশের আর্য অনুসারী হিন্দু নই। এই পুরান কাহিনী হিসাবে আর্যদের ভারত দখল অভিযানে দুটো অংশে গিয়ে তাদের অভিযান আর আগে বাড়তে পারে নাও, মূলত প্রাকৃতিক গাহাড় বা নদীর কারণে। এক হল ভারতের দক্ষিণে যেখান থেকে ভারতের দাক্ষিণার্ত-এর শুরু ধরা হয় – অন্ধ্র-হায়দ্রাবাদের কিছু অংশ থেকে দক্ষিণের পুরাটাই। আর এদিকে ভারতের পুবদিকে মারাঠা-বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্তবেশের পরে পরেই। ভাষার স্টাইল, খাদ্যাভাস, দেবদেবীর ভিন্নতা এমন কী আর্টকালচার গানের সুর-রাগ, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি অনেক কিছুতেই এথনিক ভিন্নতাগুলো বেঁচে যায় টিকে যায়।
    অথচ বাংলাদেশে ইসকন এসেছে পুরো উল্টা-পাল্টা হয়ে, আরএসএস-হিন্দুর প্রতিনিধি হয়ে।  তারা বাংলাদেশে এসেছে হিন্দু বাঙালি  সবাইকে আরএসএস বর্ণিত হিন্দু সাজাতে। পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে মমতা (হিন্দু-মুসলমান) বাঙালি বনাম আরএসএসের হিন্দু এই প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের জয় নিজের পক্ষে এনে মোদিকে ঠেকিয়েছিল।
    আর এসব কারণের বাংলাদেশে ইসকন আবার এদিকে, হিন্দু বাঙালিকে বাইরে থেকে দেখে চেনার উপায় চিহ্ন হিসেবে গলায় ‘কাঠের মালা’ পরাচ্ছে। অথচ ফ্যাক্টস হল, গলায় কাঠের মালা মূলত যারা নদীয়ার গৌড় বা বৈষ্ণব অনুসারী তাদের রেওয়াজ; এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাঙালি হিন্দু মাত্রই সবাই নদীয়ার শ্রীচৈতন্যের অনুসারী বা বৈষ্ণব নয়। অর্থাৎ বাঙালি হিন্দু মাত্রই গলায় কাঠের মালা পরা তাদের রেওয়াজ নয়। অথচ ইসকনের আরএসএসের হিন্দু হল, তারা এটিকে এক ইউনিফর্ম ধারণায় (গলায় কাঠের মালা) সাজিয়ে নিতে চায়। তাই হিন্দু বাঙালি মাত্রই ইউনিফর্মের মতো সবাইকে কাঠের মালা পরার রেওয়াজে নিতে চায়; অর্থাৎ পুরোটাই রাজনৈতিক ও ভিন দেশের অসৎ রাজনৈতিক স্বার্থ তারা চাপিয়ে রাজত্ব করতে চায়। মূলত এর মূল উদ্দেশ্য হল আরএসএসের উত্তর প্রদেশকেন্দ্রিক যে হিন্দুত্ববাদী ব্যাখ্যা আছে, বাংলাদেশের হিন্দুদেরও বলপ্রয়োগ করে হলেও এর অংশ করে নেয়া – তাও খাঁটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

    কাজেই আরেক অর্থে বাংলাদেশে ইসকন হয়ে উঠেছে ‘র’-এর “ফুট সোলজার”; মোদি সরকারের ‘বাংলাদেশ দখল নীতি’ বাস্তবায়নের ভয়ঙ্কর হাতিয়ার। স্বাধীন দেশে এটা বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের কাছ থেকে ‘আশা’ করা যায় না। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক মোদির নীতির বাস্তবায়ক হতে পারেন না। কারো প্রভাবহীন নয় ও স্বাধীন থাকতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারও এসব দিকে কোন নাগরিককে কোন ছাড় দিতে পারে না; উলটা সরকারকে এসব দমন করতেই হবে। এটা তার কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়ীত্ব ও মুখ্য কাজ।  এটা রাষ্ট্রস্বার্থের গুরুতর প্রশ্ন।

    এসবের পটভুমিতে এটা হতবাক করার বিষয় যে, গত ২৮ অক্টোবর সেই ইসকন চট্টগ্রামে জনসমাবেশ ডেকেছে আর তাতে যোগ দিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে লেগেছে প্রতিযোগিতা যে, কে বেশি ইসকনের সুনজর ও অনুগ্রহ লাভ করবে! এর প্রতীকী অর্থও খুবই বিপদের ও লজ্জাজনক! অর্থাৎ কে বেশি ভারতের অনুগ্রহ লাভ করবে? আর তাতে আওয়ামী লীগ যদি ১৩ বছরের শাসন চালাতে পারে তবে বিএনপির ভাগ্যেও নিশ্চয় এর কাছাকাছিই কিছু একটা হবে! এমন অনুমান, তাই কি? ওদিকে মিডিয়া রিপোর্টের এনিয়ে ইঙ্গিতে উপস্থাপনটাই মারাত্মক। লিখেছে, ‘সমাবেশে চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ, নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি নগর বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন”। কিন্তু মজার কথা হল, ওখানে বিএনপির কেবল একটি নেতার নাম আছে। অথচ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ছোট নেতাটার নামও সেখানে দেয়া আছে। আর ভোরের কাগজ লিখেছে, “নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা: শাহাদাত হোসেন” সেখানে বক্তৃতা করেন।

    ‘সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, এটা ষড়যন্ত্র’
    গুগল সার্চে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে দেখা যায় “সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: “ এমন বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি রেফারড হয়েছেন আইনমন্ত্রী। আর ভারতের কিছু মিডিয়ায় দেখা গেছে একই বক্তব্য দিয়েছেন বলে কোট করা হয়েছে খোদ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এমনকি গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৃত্যু ও ধর্ষণের নানা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।’ অর্থাৎ সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা মানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে দাবি। অথচ এরপরও চট্টগ্রামের সমাবেশের নাম হল – ‘সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে’ এই সমাবেশ। কেউ সরছেনা; প্রচলিত শব্দ ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ কথাটা দিয়েই সব জায়গায় কুমিল্লার ঘটনাকে বর্ণনা করা হচ্ছে। অথচ ইকবাল হোসেন গং তারা এখনো রিমান্ডে আর তাদের পেছনে কে আছে? নিয়োগ বা অ্যাসাইনমেন্ট দাতা কারা? ‘র’ না ‘ইসকন’ না থার্ড কেউ? এখনো তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এই অংশটা ঢেকে দেয়ার প্রপাগান্ডা চলছেই! ইকবাল হোসেনেই যেন সবশেষ খোঁজাখুজি শেষ ধরা হয়, এর পিছনে আর কেউ নাই; ভারতীয় মিডিয়ায় এমন  আকাঙ্খাই প্রবল!

    এদিকে চট্টগ্রামে ইসকনের সমাবেশে প্রধান গুরুত্ব পায় দু’জন হিন্দু-ব্যক্তিত্বের বক্তব্য। এর প্রথমজন রানা দাসগুপ্ত, তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তাদের দেয়া ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দের বর্ণনা অনুযায়ী কি খোদ রানা দাসগুপ্তের সংগঠনের নামটাই তাদের কথিত ‘সাম্প্রদায়িক’ নয় কি? আর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের নাম ডঃ অনুপম সেন।

    আবার লক্ষণীয়, ওই সমাবেশে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ। সময়ে মনে হয়েছে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিকল্প এবার পেয়ে গেছে। যেন এবার তারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে। রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। কেউ কেউ এই দ্বিতীয় বাক্যটাকেই মিডিয়ায় শিরোনাম করেছে। কিন্তু রানা দাসগুপ্তের বক্তব্য স্ববিরোধী।
    রানা দাসগুপ্তই কড়া অভিযোগগুলো তুলেছেন। এমনকি এটাও বলেছেন, ভোরের কাগজ লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগ ক্রমেই ১৯৪৮ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে চলে যাচ্ছে”।  এর জবাব আওয়ামি লীগ কী দেয় আমরা দেখব।  তবে এটা বহু পুরনো দিন থেকেই মুসলিম লীগ নিয়ে হিন্দু নেতাদের অভিযোগের শেষ নেই। এসব অভিযোগ, রাগ বা ক্ষোভের আদি উৎস হল – ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কেন করা হল।  কারণ এতে পুর্ববঙ্গেও   হিন্দু জমিদারদের যে পলিটিক্যাল, কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য ছিল তা এক নিমিষেই নাই হয়ে  গিয়েছিল। তাই একালে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় তারা এখন কী চায় আর যদি তারা মনে্র কথা খুলে বলতে রাজি হয় তাহলে সম্ভবত এর জবাব আসবে তারা সেই পুরানা আধিপত্যটাই ফেরত চায়। এমনকি একালের প্রজন্ম যারা তারাও ঘুরেফিরে একালের ভারত না হলেও কলকাতাকে যেভাবে দেখে জানে তেমন একটা পলিটিক্যাল যদি নাও হয় তবে অন্তত একই কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য দেখতে চাইবে। কিন্তু খুবই দুঃখিত এটা এবসার্ড, এক অবাস্তব কল্পনা!   আবার আমরা খেয়াল করলে জানব  যদিও খোদ শেখ মুজিবও এর নিন্দা করেননি বা নিজে মুসলিম লীগার ছিলেন বলে কখনো অস্বীকার করেননি। এমনকি হাসিনা শেখ মুজিবের আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন তাকে মুসলিম লীগার হিসেবেই বর্ণনা বজায় রেখে এবং কোনো রাখঢাক না করেই। কিন্তু “মুসলীম লীগ” শব্দটা হিন্দু নেতাদের কাছে একটা গভীর পাপের নাম।

    অথচ ভারতের কংগ্রেস যেমন এক হিন্দু-জাতিবাদী দল; সমতুল্যভাবে (পূর্ব) পাকিস্তানে মুসলিম লীগ মুসলমান-জাতিবাদী দল।  বাংলাদেশের হিন্দু নেতারা কংগ্রেসের চোখ দিয়ে কংগ্রেস যেমন মুসলিম লীগকে তার মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বি-শত্রু  দল হিসেবে দেখে, সেভাবে ঐ চোখেই তারা দেখে গেছে। অথচ কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি কোনো সর্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড নয়, কারণ এটা তো হিন্দু-জাতিবাদী চোখ। বরং কোন সর্বজনীন, কোন সুনিদ্দিষ্ট পরিচয়হীন দৃষ্টিভঙ্গীর এক অবিভক্ত ভারতের কল্পনা করতে না পারার অযোগ্যতা আর ব্যর্থতা থেকেই তো তিনদেশে বিভক্ত হয়েও তো আমরা আজও মূল প্রশ্ন সমাধান করতে পারি নাই, হাতড়ে মরতেছি। য়ার এমনিতেই  পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ভারতের ওই দৃষ্টিভঙ্গি কখনো গ্রহণ করেনি, করার কথাও না। কারণ মূল ত্রুটি ওটা হিন্দু-জাতিবাদী বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী।  অথচ রানা দাসগুপ্তরা অযথা এই পণ্ডশ্রম করে গেছেন। এখানেও করেছেন। কংগ্রেস বা একালের বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদীর চোখ দিয়ে তারা আগের পূর্ব পাকিস্তান বা এখনকার বাংলাদেশকে দেখতে হবে এবং সাজানোর দাবি করতে হবে এই অদ্ভুত কল্পনা তারা করে গেছেন।  হিন্দু-জাতিবাদী ভারত বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী  ভারত এটাই এখনও তাদের চোখে সেকুলার রাষ্ট্রের মডেল। তাদের কল্পনা শুধু না দাবিও যে বাংলাদেশকে তাদের কল্পনা মত হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী “কথিত সেকুলার রাষ্ট্র” করে গড়ে দিতে হবে।  নইলে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেবে।
    অবশ্য এখানে আরেক  সূক্ষ্ম দিক আছে। লক্ষণীয়, আসলে রানা দাসগুপ্ত কিন্তু “মুসলিম লীগ” বলেনইনি। বলেছেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। দুটার অর্থ একেবারেই উলটা। অর্থাৎ যেটা আওয়ামী লীগেরই আগের নাম বা প্রথম জন্মকালীন নাম সেটাসি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মানে আজকের হাসিনা আওয়ামি লীগের  আগে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামেই জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন। সবচেয়ে বড় কথা তারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ ত্যাগ করে বেড়িয়ে এসেই নতুন এইদল খুলেছিলেন।  তা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাওয়া বলতে তিনি আজকের হাসিনা আওয়ামী লীগের জন্ম হওয়াটাই দোষ বলছেন যেন। এককথায় মুসলিম লীগের উলটা এবং শত্রুদল হল আওয়ামী মুসলিম লীগ। তাহলে রানা দাসগুপ্ত এতে আপত্তির দেখছেন কী বা তার বিশেষ অভিযোগটা কী? আসলে  পুরোটাই ভুয়া।  রানা দাসগুপ্ত কি তাহলে ভাসানী-শামসুল হকের ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের গায়ে হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের চোখে তাকিয়ে দাগ লাগিয়ে দিতে চাইছেন? নাকি কিছু ভেবেচিন্তে বলেননি?

    আসলে ব্যাপারটা হলো, কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের প্রবক্তা ও কায়েমকারী হয় তা হলে এই দলের বা সমর্থকের কি আর মুসলিম লীগকে বিরোধিতা বা নিন্দা করার সুযোগ থাকে?  কেন? কারণ কংগ্রেসই কি মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের জনক নয়? সেটা আবার কীভাবে? তাদের হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়তে বেপরোয়া হওয়াটাই কি অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়তে ঠেলে দেওয়া, বাধ্য করা ও উৎসাহ দেয়া নয়? অর্থাৎ হিন্দু-জাতিবাদী দল খাড়া করে একটা  কংগ্রেস দলের জন্মই কী সমস্ত বিপর্যয় ডেকে আনার মূল প্রতিষ্ঠান ছিল না বা ঘটনা নয়? ভারতকে কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র করে আকার দিতে চায়, তবে এটাই কি প্রকারান্তরে মুসলমানদের ঠেলে দেয়া নয় যে, মুসলমানেরা তোমরা শুনে রাখ – ভারত বা কংগ্রেসে তোমাদের জায়গা নেই তাই তোমরা একটি পাল্টা মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়ে নাও? নইলে আমাদের তৈরি ভারত বা কংগ্রেসে আমাদের আধিপত্য ও অধীনতা মেনে চেপে গিয়ে কোনার চিপায় পড়ে থাকতে পারো। কাজেই এই অবস্থায় অতএব – হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রধারী কংগ্রেসের মুসলিম লীগকে কোনো সমালোচনা বা আপত্তির জায়গা কই? করলে সেটা তো তাদের নিজেরই সমালোচনা হবে!

    আবার দেখেন,  মনে হচ্ছে সূর্য সেনদের রাজনীতি রানা দাসগুপ্ত এখনো করে যাচ্ছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা ১৯০০ সালের পরেও আগের শতবছরের (১৮০০-১৯০০) রামরাজত্ব  তাদের পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রভাব কলকাতাকে কেন্দ্র করে ধরে রাখতে চান। আবার এ-ও আবদার যে, ততদিনে ব্রিটিশদের প্রায় দেড়শ বছরের সব অবকাঠামোগত ব্যয় সব কলকাতাতেই হোক, থেকে যাক। কিন্তু ব্রিটিশরা তা মানেনি, সম্ভব ছিল না। তারা বাংলাকে ভাগ করে ঢাকাকে রাজধানী করে আলাদা নতুন অবকাঠামো গড়তে ব্যয় করতে চেয়েছিল। কেন? মূল কারণ ততদিনে আসাম চা উৎপাদন যোগ্যতার জন্য তৈরি ও সম্পন্ন হয়ে গেছিল। অথচ চা বিক্রি, বিতরণের জন্য সেই চা চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যেতে ঢাকা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে ছোট জাহাজে তুলে তা চট্টগ্রাম বন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিবার কোনো অবকাঠামোই ছিল না। না আসাম থেকে ঢাকা হয়ে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত। এ’কারণে ঢাকাকে রাজধানী করে আসাম ও পূর্ববঙ্গকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ করা হয়েছিল ১৯০৫ সালে। এটাই ‘বঙ্গভঙ্গ’।  মানে  ঢাকাকে কেন্দ্র করে আরেক বাংলা প্রদেশ বানানো।  আর এটাই সহ্য হয়নি কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের, চ্যালেঞ্জ বোধ করেছিলেন যে, ঢাকা তো তাহলে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে যাবে তাতে। সক্ষমতাতেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ এখানে বাণিজ্যিক দিক এখানে ভারী – চায়ের সাথে পাটও আছে; আর বিস্তীর্ণ ধানের জমিতো আছেই। যার উপর আসামের লোভ ছিল। কারণ পুর্ববঙ্গ এব্যাপারে আসামের চেয়ে এগিয়ে ও দক্ষ। এসব ছাড়াও আরো দিক আছে। পূর্ববঙ্গে জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা বেশি, সংখ্যাগরিষ্ট; ফলে কলকাতার ম একচেটিয়া কুক্ষিগত প্রভাব  হিন্দু জমিদারেরা ঢাকায় সামাজিক সাপোর্ট সমর্থনে  জমাতে নাও পারতে পারেন। এসবই ছিল হিন্দু জমিদারদের মূল ভীতি। আর এসব স্বার্থে তারা নতুন প্রদেশ করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। এবং এনিয়ে তারা এত মরণপণ সিরিয়াস হন যে যে জমিদারেরা একশ বছরে বৃটিশদের সমর্থন ও ঔরসে  জমিদারি কামাইলেন অবিভক্ত বাংলার একছত্র নেতা হলেন যেই বৃটিশদের বদৌলতে সেই বৃটিশদের তারা অস্ত্র হাতে বিরোধীতার করতে লোক নিয়োগ ও সন্ত্রাসী দল গড়ে  শাসকদের বিরোধিতা করেছিলেন। তা হলে সূর্য সেনরা ছিল মূলত হিন্দু জমিদারদের স্বার্থে কাজ করেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামের লোক হয়েও সূর্য সেনরা নিজ পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধী। কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের লেঠেল। আর তারা জমিদার স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো লোক হলেন। পূর্ববঙ্গের বা, বাংলাদেশের কেউ হতে পারেন না। বরং সরাসরি কলকাতার হিন্দু জমিদারের পক্ষের লোক। কাজেই পূর্ববঙ্গের চোখে তারা কোনো বীর নন,  না হতেই পারেন না।  বরং পূর্ববঙ্গের বা ঢাকার স্বার্থের বিরোধী।  মানে চট্টগ্রামের লোক হয়ে ঢাকার কথা ভুলে মাড়িয়ে কলকাতার পক্ষে অস্ত্র হাতে মাকালীর নাম নিয়ে দাড়িয়ে গেলেন। কাজেই আপনারা নাকি কথিত স্বদেশী এটা কাদের আন্দোলন? কোন স্বদেশ? কলকাতার এবং হিন্দু জমিদারদের জন্য স্বদেশী!  কিন্তু দেখা যাচ্ছে এটা তো পূর্ববঙ্গের কোন স্বার্থই নয়। অথচ জবরদস্তিতে কলকাতা বা কংগ্রেসের স্বার্থটা বারবার আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এখনও।

    দেখা যাচ্ছে, এখনো কংগ্রেসের স্বার্থ ও অবস্থানের চিন্তাটাই রানাদের মাথায় সবসময় ভর ও ডমিনেট করে এবং গাইড করে থাকে। ফলাফলে হিন্দু জমিদার স্বার্থ তাদের চোখে হয়ে যায় কথিত অসাম্প্রদায়িক আর কেউ এর বিরোধিতা করলেই হয় ‘সাম্প্রদায়িকতা’। এই মুখস্থ কথা আর কত দিন?

    একালে কিছু হলেই আরেক বক্তব্য হল রাষ্ট্রধর্ম বলে ইসলামের বিরোধিতা। আচ্ছা,  আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালতে কোনো হিন্দু নাগরিক কী মামলায় হেরে গেছে এজন্য যে, আদালত তাকে এক মুসলমান নাগরিকের মতই সমতুল্য ও  সমান অধিকারের সাথে সমান অধিকারের ট্রিটেড হননি বলে এবং শুধু তাই না  সেটা ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়ার কারণে এবং এমনটা চালু হবার পর থেকে? এমন রেকর্ড কোথাও আছে কি?

    অর্থাৎ আদালত  অধিকার ও ট্রিটমেন্টে এর দিক থেকে কখনও নাগরিক বৈষম্য করে নাই, কোনো অসাম্য হয়নি। তবে ডেকোরেটেড পিস হিসেবে  রাষ্ট্রধর্ম শব্দগুলো অবশ্যই আছে। যা না থাকলে ভাল হত। অর্থাৎ এটা একটি জেদ-ক্ষোভের  সিম্বল। ফলে একটু ভেদের সিম্বলও অবশ্যই। কিন্তু তা-ই-বা কেন থাকবে? কারণ ইন্দিরা গান্ধী প্রগতিশীলতার নামে, অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত এক অর্থহীন ‘সেকুলার’ শব্দ ও ধারণা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এবং বুঝা যাচ্ছিল কারণ তখন তিনি  একাত্তরের শেষের দিকে সম্ভবত অক্টোবরে পাঁচবার আমাদেরকে স্বীকৃতির অনুরোধের ফাইল ঘুরাচ্ছিলেন।  পরে আমাদেরকে পরোক্ষে জানানো হয় এটা না মানলে আমাদের অনেক ভোগান্তি হবে।  ফলে এতে আবার সেই ইসলামবিদ্বেষ ফোবিয়া হিন্দু-জাতিবোধের চিন্তা ও  ডোমিনেন্স যা ভারতে গড়ে উঠেছে তাই আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এটাই তো ইসলামবিদ্বেষ। যেন তাজউদ্দিন সাহেব যত নিজেকে ইন্দিরা গান্ধীর সামনে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় করান না কেন, ইন্দিরা ভুলতেই পারছিলেন না যে তাজুদ্দিন তো আসলে মুসলমান!  তাই তিনি যেন “সেকুলার” সাবধানতার জোরাজুরি্তে তাজুদ্দিনকে বলতে চাচ্ছিলেন তাজউদ্দিন তুমি মুসলমান নও, তুমি সেকুলার……।
    আবার সেকুলার মানে কী তা তো তিনি ইন্দিরা বা আজকের রাজনৈতিক ভারত জানে  এর প্রমাণ তাদের রচিত কনষ্টিটিউশনে আজও নাই। তাদের ধারণা একটা হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তা ভিত্তিক রাষ্ট্রে কোন সমস্যাই নাই। কেবল “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” একথা ঢুকিয়ে দিলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়!
    অথচ বাংলাদেশে আমরা তো সবাই হিন্দুও নই। আমরা সেসময় ছিলাম রাজনৈতিকভাবে “বাঙালি জাতিবাদী”। ফলে ফেলে আসা জমিদার আধিপত্যের ইমেজ আমাদের ক্ষুব্ধ আশংকিত করবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের নতুন বাংলাদেশ বলে কী হচ্ছে এনিয়ে সন্দেহ করবে। জনমনের মনে আবার  সাতচল্ভেলিশের আগের জমিদারি অত্যাচারের ছবি ভেসে  উঠবে  চালু হবে।  এসব ভেবেও   আমাদেরকে সব মেনে নিতে হয়েছিল। (এনিয়ে বিস্তারিত আরো অন্য অনেক বইয়ে আছে। এখানে সেদিক আর টানছিনা।
    আবার মজার গোলমেলে ফ্যাক্টস হল, ১৯৪৭ সালে ভারতকে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র (নেশন-স্টেট) বানালেও নেহরু-গান্ধী কখনোই ভারতের কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলার’ শব্দটা রাখেননি; বরং আমাদের ওপর ১৯৭১ সালে জবরদস্তি করার বহু পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৬ সালে এবার ভারতের কনস্টিটিউশনের ৪২তম সংশোধনী হিসেবে ‘সেকুলার’ শব্দটা অন্তর্ভুক্ত করেন। [ সংশোধনীর প্রথম পাতাতেই  STATEMENT OF OBJECTS AND REASONS এই শিরোনামের অধীনে তৃতীয় পয়েন্টে]। এই লিঙ্কে গিয়ে দেখুন। আর সেই থেকে অনেকের ভুল অনুমান হল, যেকোন রাষ্ট্রে এমনকি তা  হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত রাষ্ট্র হলেও এতে  আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল  ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দ থাকলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়। ফলে এভাবেই ইন্দিরা গান্ধী আগে আমাদের দেশে এমন নীতি ঘোষণা করতে বাধ্য করেওছেন ১৯৭১ সালে পরে ১৯৭৬ সালের ভারতেও তাই করেছেন। এসব এমনই রাষ্ট্রচিন্তায় নাজুক  অবস্থা, দুরবস্তা। আসলে  নিশ্চয় আমাদের কনস্টিটিউশনেও  এই সকুলারিজম এই শব্দ থাকতে পারলেই এদিয়ে তারা মুসলমানদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন আর তারা তাদের হিন্দুত্ববোধ বুদ্ধিকে সেকুলার বলে চালাতে পারবেন, রাষ্ট্রে ছেয়ে রাখতে পারবেন এতটুকুই তাদের লক্ষ্য।  অথচ যারা সেকুলার শব্দ কোথাও না লিখে কায়েম করা যায়। মূলকথা সবাই নাগরিক আর নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র হতে হয়ে যেখানে সবাই একমাত্র পরিচয় নাগরিক হতে হয় ও সমান অধিকারের নাগরিক  – এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে হয়।  এতে কে কী হিন্দু না মুসলমান না পাহাড়ি এটা এখন যা আছে তাই থাকি কিন্তু কনষ্টিটিউশন এই পরিচয় সামনে অধিকারে কোন কমবেশি বা ভাগাভাগি করে না। সবাই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে মুসলমানের দেশে সেকুলার লিখে রেখে ইসলামবিদ্বেষ জারি রাখার যে সন্দেহ আমাদের দেশের মুসলমান নাগরিকদের মনে ভাসে, সন্দেহ জাগে তা তো অমূলক নয়।
    এভাবেই আরেক সন্দেহযুক্ত শব্দ হল “অসাম্প্রদায়িক”। এটা ডিকশোনারিতেই নাই। হিন্দু জাতিবাদের সৃষ্টি এই অদ্ভুত শব্দ।  এটাও হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের বোধবুদ্ধিতে খাড়া করা শব্দ যা দিয়ে যেকোন অ-হিন্দুর উপর চাপ সৃষ্টি বা তাকে, কোনঠাসা করার হাতিয়ার হয়। য়ার তারা আরামে অসাম্প্রদায়িক এই শব্দের আড়ালে হিন্দু-জাতিবাদিতা বা হিন্দুত্ববাদ এর আধিপত্য কায়েম করে নিতে পারে। আবার এই আকামকে তারা সেকুলার বলেও সার্টিফাই বা সাফাই দিতে পারে। অথচ  নতুন বাংলাদেশ তো অন্তত ইন্দিরাদের হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই নয়। এ্টা ছিল মুজিবের “বাঙালি নেশন স্টেট”; ভারতের মতো ‘হিন্দু নেশন স্টেট’ও কোনোভাবেই নয়। ফলে ভারতকে কপি করতে হবে কেন আর তা ফিট করবে কেন? ফলে সেই থেকে রানা দাসগুপ্তরা তাদের ‘কল্পিত দুঃখে’ আমাদেরও মাথা খাচ্ছেন।
    ওদিকে ১৯৭১-৭২ সালের এই সেকুলারিজম চাপিয়ে দেয়ার বিরোধিতা সহজ বা সময়ের সাথে মানানসই ছিল না বা হতো না। এজন্য এমনকি শেখ মুজিবও দেশে ফেরত আসার পর পরিস্থিতি বুঝে তখনই তা বিরোধিতা করতে যাননি। তাই পঞ্চম সংশোধনী লেখার সময় সেই প্রথম আর পরে অষ্টম সংশোধনী লেখার সময় আমাদের হাতে সুযোগ এসেছিল। ফলে সেকুলারিজম উঠিয়ে ফেলে দিলেও ঐ জায়গা ফাকা ফেলে রাখতে চায় নাই। এছাড়া রাগ-জিদও ছিল। তাই সেই জিদ উসুল করা হয়েছিল।  যদিও ‘সেকুলারিজম’ বা ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ইত্যাদি যে অসৎ শব্দ, খারাপ উদ্দেশ্যের শব্দ সেটা চিনতে আমাদের আমজনতার কোন অসুবিধা হয় নাই।
    যেমন এই রাগ-জেদের দিকটা ভালো বোঝা যায় যখন পঞ্চম সংশোধনীতে সেকুলারিজম ফেলে দিয়ে লেখা হয়েছিল “আল্লার উপর অগাধ বিশ্বাস”। এটা তো লিখে কায়েমের কিছু না। কিন্তু দেয়া হয়েছিল অনেকটা হুশিয়ারি বা পাল্টাপাল্টি হিসাবে। অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে, ভারতের এক হিন্দু নেশন স্টেট রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত ‘সেকুলার’ শব্দটা বাংলাদেশে তোমরা চালু করতে চেয়েছো অযথাই, খারাপ উদ্দেশ্যে। কারণ বাংলাদেশ তো হিন্দু নেশন স্টেট কখনোই নয়। কাজেই ইসলাম বা মুসলমানদের কন্ট্রোল করা আবদ্ধ রাখা জাতীয় কোনো শব্দ ইসলামবিদ্বেষ ও ফোবিয়া থেকে জন্ম নেয়া বুদ্ধি। আর এর প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দিতেই ১৯৮৮ সালে আরো পোক্ত হবে ভেবে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করে দেয়া – এমন মনে করা যায়। অথচ এর কোনো ব্যবহারিক বা লিগ্যাল ইমপ্লিকেশন নেই, কারো কারো জন্য হয়ত কিছুটা অস্বস্তি ছাড়া। আর এটাই মুসলমান হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড গংদের ওপর শাস্তির মত বা প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দেয়া।

    তবে আমার ধারণা একদিন পুর্ণ ও স্বাধীন জনগোষ্ঠির ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে নতুন কনষ্ঠিটিউশনে আমরা কোন বিভেদ চিহ্ন রাখব না।  জেদাজেদি করারও কিছু থাকবে না। সব মাফ করে দিয়ে পুরানা ভুলে জনগোষ্ঠি হিসাবে আমরা হয়ে দাড়াতে পারব। বৈষম্যহীন এক  সম-নাগরিক অধিকারের সমাজে আমরা জীবন গড়ব।

    উপরেও রানা দাসগুপ্ত বা অনুপম সেনদের চিন্তায় যে ফোবিয়ার কথা বলেছি এসব কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো সম্ভবত তারা এখন কী বলছেন তা যদি দেখি। ইসকনের ওই সভায় সারকথায় তারা বলছেন, তাঁরা বাহাত্তরে ফিরে যেতে চান। অথচ খোদ শেখ হাসিনাই তো ১৫তম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম আর সেকুলারিজম দুটোই রেখে  দিয়েছেন। যা এখনও লেটেস্ট ভাষ্য।  অথচ কায়দা করে রানা দাসগুপ্ত বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। অর্থাৎ কথার কোন তাল-ঠিকানা নাই।

    আসলে এসব কায়দা করে লাভ নেই। কিন্তু তারা এখন এসব কথা তুলছেন কেন? আমাদের দুই রাজনৈতিক দলই এখন ভারতের আনুগত্য লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এবং দেখা যাচ্ছে তা আবার সরাসরি ভারতের কাছেও না, তার ‘র’-এর কাছেও না। একেবারে ‘র’-এর হ্যান্ডলার ইসকনের কাছে হাত পেতেছে আর তা দেখে রানা দাসগুপ্তদের নিজেকে অনেক পাওয়ারফুল মনে হচ্ছে? তাই তো?  কিন্তু আর কত? ২০০ বছর হয়ে গেল এই মুসলমানদের দাবড়ে রাখতে হবে নাইলে নাকি মাথা চাড়া দিবে – এমন এই দাবড়ানোর চিন্তা এটাই তো ফ্যাসিজম, হিটলারি চিন্তা।  আপনার এই দাবড়ানির চিন্তার জন্যই তো আপনাকে বিশ্বাস করবে না কেউ, কোন আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে না। এটা এমনই ক্ষতিকর চিন্তা তা একবারও ভেবে দেখেন নাই। এজন্য হিন্দুত্ববাদি বা হিন্দুজাতিবাদ চিন্তাকে আমাদের এদিকের হিটলারিজম বলা হয়! এমন চিন্তার জন্যই আজ আমরা তিন দেশই বিচ্ছিন্ন, ধুঁকছি। হাতড়াচ্ছি।  খারাপ চিন্তাই প্রতিহিংসায় অন্য খারাপ চিন্তাকে ডেকে আনে। মানুষ নিজেই নিজের শত্রুর স্বভাব বৈশিষ্ট তৈরি করে।

    আসুন হিংসা পাশে ফেলে রাখি। আর আপনাদের চোখে ধর্মই যদি সব সমস্যার উৎস হয়ে থাকে তবে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজের কথা তো শুনেছেন। অবিভক্ত ভারতে রাষ্ট্র ধারণার গোড়া যেখান থেকে, সেই ১৮১৫ সালের রামমোহন রায় তাঁর আত্মীয় সভা আর যিনি আবার বেঙ্গল রেনেসাঁর নাকি আদিগুরু কমিউনিস্টরা দাবি করে, তা হলে তিনি রেঁনেসার আদিগুরু হয়ে নতুন করে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ চালু করেছিলেন কেন? করেন কী করে? রেনেসাঁর আদিগুরুর সাথে ধর্ম? কেমন মিলাবেন? এতো দুধ আর লেবুর চেয়েও খারাপ মিশ্রণ! হবে? তাই নয় কী এবং কেন?  আপনাদের উচিত হবে এর কারণ খুঁজে দেখা। ব্রাহ্মসমাজ জন্মের কারণ ধরতে পারলে বুঝে যাবেন, ধর্ম (আসলে ইসলাম ধর্ম) নিয়ে আপনাদের অনুমান কতটা ভিত্তিহীন, অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা!

    অথচ খুবই সহজ এসবের সমাধান। আমাদের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। বদলে তা অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র হতে হবে যেখানে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে হিন্দু বা মুসলমান (বা জুম্ম জাতি) জাতি পরিচয় নিয়ে লড়ার কিছু থাকবে না। তখন দেখবেন, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক ধরনের শব্দের আড়াল আর দরকার নেই, লাগছে না।

    শেষ কথা
    এত সেকুলারপ্রিয় আপনারা যারা সেকুলার ভারতের কনস্টিটিউশনকে আদর্শ মনে করেন,  তাহলে ভারতের এই কনস্টিটিউশনই আরএসএসের মোদিকে রাজত্ব করতে জায়গা করে দেয় কেমন করে? সেই প্রশ্ন করুন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনও বিজেপি দলকে অনুমোদন রেজিষ্ট্রেশন দিয়েছে কী করে? সহ্য করে কী করে? এতে কোনো সেকুলারিজমের সমস্যা দেখে না! কী অদ্ভুত? সহ-বাস! হিন্দুত্ববাদ আর সেকুলারিজম সহ-বাস করে কেমন করে? তাহলে কেবল মুসলমান-বাদ দেখলেই এবার ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ হাতে দৌড়ে আসেন কেন?

    এছাড়া  বাংলাদেশের হিন্দুনেতাকেই দেখি এই মোদির সাথে দেখা করে এসে বলশালী অনুভব করেন। আবার দেশে ফিরেই সেকুলার বাংলাদেশ নাই, কিংবা রাষ্ট্রধর্ম আছে বলে কান্নাকাটি করেন। কিভাবে করেন এগুলো? তা হলে আপনারা ঠিক কী চান? বাহাত্তরের কনস্টিটিউশন নামের আড়ালে মোদির ভারতের আধিপত্য ও অধীনস্থতা কায়েম? এসবের জন্য আপনারা বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার হতে পারেন না। পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা না বাড়ালে স্বল্প কিছু পরিবর্তনও কাজ করার কোন কারণ নাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩০ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ইসকনের মন পেতে প্রতিযোগিতা “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ

     

    মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ 

    গৌতম দাস

    ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    [সার-সংক্ষেপঃ  আরএসএস প্রধান এই মোহন ভাগবত, ইনার দাবি মুসলমানেরা নাকি বেশি পয়দা করে। এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে ধর্মীয় জনসংখ্যায়  ভারসাম্যহীনতা মানে কী? একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? দেশে হিন্দু-মুসলমান কী সমান থাকতেই হবে? কেন? ইহা কি বস্তু? যে না থাকলে কী ক্ষতি? যদি নাগরিক মাত্রই সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয় তো উনার সমস্যা কী?
    আর এই মোহন ভাগবত তিনি কে?  কোন নবাব বা দেশের কোন মালকিন উনি? তার অনুমতি নিয়ে কী মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে নাকি? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন?
    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে – এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? উনি কী দিয়ে বুঝেছেন, মেপেছেন যে কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন জনসংখ্যা বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার ভারসাম্য বলে কোন বস্তু পরিমাপ করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন? ইউজলেস লুজার সব!]

     

    There has been attempt to increase Muslim population and turn India into Pakistan: Mohan Bhagwat

     

     

    প্রধানমন্ত্রী মোদী কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন? ভারতের আগামী নির্বাচন মানে প্রধানমন্ত্রিত্ব নির্ধারণের নির্বাচন বা চলতি ভাষায় অনেকে একে ‘কেন্দ্রের’ নির্বাচন বলে। আর আনুষ্ঠানিক ভাষায় তা ১৮তম “লোকসভার” নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের শেষে ফলাফল হয়ে যাওয়ার কথা ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে, এই হলো শিডিউল।

    অনেকের মনে হতে পারে এখনো সে তো প্রায় আড়াই বছর মানে অনেক দূরে। না, ঠিক দূরে না। ভারতের ভোটের হিসাবে আগামী মার্চ মাস – সেটা হল অনেকটা আমেরিকার মিড-টার্মের মত। আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের চার বছর টার্মের মধ্যে মাঝামাঝি, ঠিক দুই বছরের সময় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংসদের সব আসনেরই নতুন নির্বাচন হয়। আর সাথে সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনেও নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ্টাই মিড-টার্ম নির্বাচন। এর ফলাফল যাই আসুক প্রেসিডেন্ট স্বপদেই থেকে যাবেন, কিছুই হবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে মানুষের মনোভাব বোঝা যাবে, যেটা পরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট বা তার দলের ভবিষ্যত কেমন এর ইঙ্গিত দিবে।

    ভারতের (এখনকার) ছোটবড় মিলিয়ে মোট ২৮ রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় হল উত্তরপ্রদেশ। এরাজ্য একাই কেন্দ্রের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৮০ আসনের; যেখানে এর পরের বড় বড় পাঁচ রাজ্যের আসন হল – ৪৮, ৪২, ৪০, ৩৯, ২৮ এরকম। মানে উত্তরপ্রদেশের পরে অন্য রাজ্যগুলো সবাই অনেক ছোট, প্রায় সবাই এর অর্ধেক আসনের নিচে। তাই উত্তরপ্রদেশের নিজ রাজ্য-নির্বাচন (যা প্রাদেশিক বা লেজিসলেটিভ) ভারতের মিড-টার্ম নির্বাচনের মত বলে মনে করা হয়।

    উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন আগামী বছর ২০২২ সালের মার্চে, ৪০৩ আসনের রাজ্য নির্বাচন হবে এটা। মনে করা হয় এ রাজ্যে মোদীর দল আগামী মার্চে এবারো জিতলে তা মোদীকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরতে সহায়তা করবে। এ ছাড়াও মনে করা হয়, ভারতের তথাকথিত কেন্দ্রের শাসন মানে হিন্দিভাষীর শাসন, উত্তরপ্রদেশের শাসন বা কালচারালি আর্য আধিপত্যের শাসন ইত্যাদি সব উত্তরপ্রদেশের সাথে যুক্ত।
    এখন উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ও শাসন বা আসলে নির্বাচন মানে হল যোগী আদিত্যনাথের দানবীয় নিপীড়নের মুখে দাঁড়ানো। তবুও উত্তরপ্রদেশে আগামী মার্চে কে জিতবে সেটা আজকের এলেখার কোনো ইস্যু নয়। এখানে আজ ইস্যু বা লেখার প্রসঙ্গ হল এখন থেকে সারা ভারতে আরএসএস-বিজেপির নির্বাচনী ইস্যু কী হতে যাচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা। কারণ সম্প্রতি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত “ভাস্ট ডিফারেন্স” বলে ফেটে পড়েছেন। তিনি গত শুক্রবার নাগপুরে (মহারাষ্ট্রে) বার্ষিক বিজয়াদশমী পালন উপলক্ষে বক্তৃতা রাখছিলেন।

    কিন্তু ‘ভাস্ট ডিফারেন্স’ মানে কী?
    ভাস্ট ডিফারেন্স বা ব্যাপক ফারাক বলতে কী কিসের ফারাক বুঝানো হয়েছে?  মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। এটা অনেক দিনের পুরানা এক  ইতরোচিত রেসিস্ট [racist] বা হিটলারি অভিযোগ; বিশেষত যখন আরএসএস-বিজেপির মনে হয় যুতসই অভিযোগের অভাব ঘটেছে, তখন এটা তারা আবার উঠায় আনে। স্বাধীন হওয়ার পর ভারতে এ’অভিযোগ প্রথম তুলেছিল ১৯৫১ সালে আসাম রাজ্য। সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে। তবে সারা অসমীয়া বা আসামিজ [Assamese] জনগোষ্ঠী করেছিল। সেই সময় থেকে (পূর্ব পাকিস্তান) বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষ বাঙালিরা মূলত তারা বুঝাত মুসলমানরা, আসামে অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ প্রথম জোরেশোরে ফোকাস উঠতে থাকে। পরে ট্রাইবাল বা পাহাড়িসহ সব অসমীয়া-জনগোষ্ঠী এক দিকে আর বাকিরা সবাই ‘বিদেশী’, এভাবে এক যুক্তিতে ভাগ করে সর্বাত্মক বিভেদ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা আর এদের কারো হাতে থাকেনি; অসমীয়া-জাতিবাদীদের চরম-উগ্র আন্দোলন হয়ে উঠেছিল। শেষে ১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক আপস-চুক্তি করেছিলেন এই শর্তে যে, তিনি “আসামে বিশেষ জনগণনা” ও প্রত্যেকের “নাগরিকত্ব চেক বা যাচাই” করে কথিত বিদেশী বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করে বের করার বন্দোবস্ত নেবেন। রাজীব গান্ধীর ভাষায় তিনি এই আপস না করলে আসাম ভারত থেকে আলাদা হয়ে যেত। তাই তিনি এমন আপস করেছিলেন। কিন্তু তিনি পরে এ নিয়ে কোনো বাস্তবায়নে যাননি। ফলে অসমীয়-জাতিবাদ আরো চরম উগ্র হয়ে উঠতে থাকে। আর তাদের এই উগ্রতার জোরে তারা একেবারেই নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আসামের “সব দুঃখের কারণ” হল বাংলাদেশের বাঙালি। (অথচ নেহেরুর  আসল ভয় হল আসাম ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চীনের অংশ হয়ে যেতে পারে অথবা অন্তত চীন আসামের উপর দিয়ে করিডোর নিতে পারলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এরপর বঙ্গোপসাগরকে বন্দর হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে যেতে পারে – এই ভয়ে তারা আসামকে সবসময়  যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল করে ফেলে রাখতে চেয়ে এসেছে। আর এটাই আসামের পিছিয়ে পড়া রাজ্য হয়ে থাকার মূল কারণ। ) তাই তাদের অসমীয়-জাতির জন্য জীবন দিয়ে ফেলতে পারে এমন চাওয়া অসমিজ ইন্টেলেকচুয়ালরা আদালতের মাধ্যমে ওই দাবি বাস্তবায়নে আগানোর বা বলা যায় এক সেমি-ষড়যন্ত্রের পথ ধরেন। এর এক কুতুব নেতা বলতে পারি আমরা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক রঞ্জন গোগই [Ranjan Gogoi], এই অসমিজের নাম করতে পারি। এক বেআইনি কাজকে তারা আইনি রূপ দিয়ে হালাল করেছেন বলা যায়।  বিচার বিভাগ গায়ের জোরে নির্বাহি বিভাগের কাজ হাতে তুলে নিয়েছিল। আসামের মাঠের নাগরিকত্ব যাচাই আদালতের কাজ ছিল না।  তবু তারা তাদের মুসলমান-ঘৃণা ও অনুপ্রবেশকারি তত্ব সত্য প্রমাণ করতে একাজ করেছিল। এবং তাতেও ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশীদের কথিত অনুপ্রবেশ তাদের সব দুঃখ ও সম্পদ হারানোর কারণ’ একথা তারা মাঠের গণনা ও শতভাগ নাগরিকত্ব পরীক্ষা করেও দেখেছেন – কথা সত্য নয়, প্রমাণ করতে পারেন নাই।
    বাস্তবে এই গণনা পরিচালিত হয়েছিল পুরোটাই আসামের কোনো প্রশাসন নয়, খোদ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। আর অন্য প্রদেশ (মধ্যপ্রদেশ) থেকে ক্যাডার অফিসার এনে আর মূলত বিচারক রঞ্জন গোগইয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং যখন এর শেষ ১৩ মাস তিনি  ভারতের চিফ জাস্টিস সেসময়ে। কিন্তু সব চেষ্টার পরও শোচনীয়ভাবে অসমীয়া-জাতিবাদীরা তাদের দাবির বাস্তবতা প্রমাণ করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতি ও ফলাফলে তারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বিজেপি (তখন রাজ্য সরকারে) প্রস্তাব করে মুখরক্ষার্থে আবার ১০-২০ শতাংশ বাংলাদেশসংলগ্ন আসাম সীমান্ত অংশে আবার গণনা করতে বিচারক রঞ্জন গোগই যেন এক আদালতের নির্দেশ জারি করে দেন। উদ্দেশ্য ছিল এবারের পুণঃগণনায় কারচুপি করে মুসলমানদের ‘অনাগরিক’ বলে বেছে বের করে দেয়া হবে। কিন্তু রঞ্জন গোগই  আর নোংরা  একাজে নিজেকে জড়াতে রাজি হননি। তিনি ওই প্রাপ্ত গণনাকেই ফাইনাল বলে রায় দেন। তাতে কিন্তু অসমীয় নেতা-পাবলিকেরাও এবার বিজেপি থেকে আলাদা হয়ে আন্দোলন শুরু করার চেষ্টা করে; কারণ তাদের বিভেদের পয়েন্ট হল, বিজেপি চাইছিল বাংলাদেশী সাধারণভাবে নয়, কেবল বাংলাদেশের কথিত মুসলমানদের বের করে দিতে নতুন কিছু করে। আর অসমিজরা বলছিল, তারা হিন্দু-মুসলমান সব বাংলাদেশীকে বের করতে চান, যা তাদের অরিজিনাল দাবি ছিল।

    এদিকে গত ২০১৯ সালে আসামে আবার রাজ্য নির্বাচন হয় এবং বিজেপি আবার ‘কোন জাদুমন্ত্রে’ ক্ষমতায় আসে। কারণ এই নির্বাচনের আগে অসমীয় ন্যাশলালিজম এত উগ্র হয়ে উঠেছিল খোদ বিজেপির বিরুদ্ধে যে মোদী পাঁচবার এসেও মিটিং করতে পারেন নাই, ফিরে গেছিলেন।  আর এবার নতুন চালে নতুন করে এবারের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। আর এসেই  এরই মধ্যে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, “মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। তাই ওই কথায় গত জুলাই মাসে আনন্দবাজার লিখেছিল, “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ বিধান সভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এমনকি আনন্দবাজারও ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যে লিখেছে, ‘তবে মুসলিম জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে বলে দাবি করলেও, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে দেখা যায়নি হিমন্তকে।’

    “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী অসম সরকারও। তার জন্য ১ হাজার ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ সোমবার বিধানসভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।”  – আনন্দবাজার ২০ জুলাই ২০২১।

    আর ওদিকে অসমীয়া দেশপ্রেমী ভাইয়েরা, তাদের কী খবর? তারা ক্রমেই এখনো ‘অসমীয়া জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Assamese culture superior to RSS ideology] – এই জাতিবাদের ঝাণ্ডা সবখানে উঁচিয়ে চলেছেন। কিন্তু বিজেপির বয়ান ও বাক্সে ঢুকে গেছেন সেটা এখন ভুলে আছেন। গত মাসে আসামের বৈধ-মুসলমান নাগরিককে প্রায় ছয় হাজার একরেরও বেশি বৈধ নিজ জমি থেকে মুখ্যমন্ত্রী তাদের উৎখাত করে দিয়েছেন। প্রথমে বলা হল শিবমন্দির বানাতে মুসলমানদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে দেখেন বিবিসির রিপোর্ট  আসাম: শিবমন্দির বানাতে মুসলিম উচ্ছেদ, বিক্ষোভে পুলিশের গুলি। পরে বলা হল যে না একটা কৃষি খামার করবে হাজার একরের।

    “বেশ কয়েক মাস ধরেই আলোচনা হচ্ছিল এই উচ্ছেদ আর তার পরের পুনর্বাসন নিয়ে। সরকারের দাবি এই জমি তাদের। গ্রামবাসীরা দখলকারী। তাই তাদের সরে যেতে হবে। “কেন এটা সরকারি জমি হবে? আমাদের পূর্বপুরুষরা উচিত দাম দিয়ে এই জমি কিনেছিল। সেই দলিলও আমাদের কাছে আছে,” বলছিলেন আজিরুন্নেসা নামের এক নারী।

    সরাসরি সেই হত্যার ক্লিপ আর বিবিসির সরেজমিন রিপোর্ট আপনারা দেখেছেন, যেখানে নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর বক্তব্য যেটা শিরোনাম করা হয়েছে যে, আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: ‘আমাদের দোষ একটাই – আমরা মুসলমান’ বলছিলেন ধলপুরের এক গ্রামবাসী।

    এই হলো হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যার ‘ভাস্ট ডিফারেন্সের’ মানে, ব্যাপক ফারাকের গল্প। এত দিন ভাবা হয়েছিল, বিজেপি এমন করে আসামে বা বিক্ষিপ্তভাবে উত্তরপ্রদেশে যোগীর রাজ্যে জোর করে ভ্যাসেকটমি করা বা ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামানো হতে পারে।

    কিন্তু না। এটা আর শুধু বিজেপির না, এটা এখন একেবারে আরএসএসের কেন্দ্রীয় প্রোগ্রাম, মানে এটাই আরএসএস-বিজেপির প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির মূল কর্মসূচি। সে কথাই ঘোষণা করেছেন মোহন ভাগবত গত শুক্রবার।

    ‘Vast differences’ in growth rate of religions
    ভাস্ট ডিফারেন্স থিওরি।  ভাগবত গত ২০১৫ সালের তাদেরই এক পুরনো প্রস্তাব বের করে এনেছেন, বলেছেন এটি নাকি তাদের ‘পপুলেশন পলিসি’। তবে তিনি মোদি সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি’ বানাতে বলছেন। আর দাবি করছেন, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ জনগোষ্ঠীর জন্মহার বৃদ্ধির ব্যাপক ফারাক, অনুপ্রবেশ ও ধর্মান্তকরণের ফলে আমাদের ধর্মীয় জনসংখ্যার অনুপাত ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। বিশেষত সীমান্ত এলাকাগুলোতে, যা আমাদের দেশের ঐক্য, সংহতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে ‘অনুপ্রবেশ ও উচ্চ জন্মহার এমন দুভাবেই মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ভারতের ঐক্যের জন্য বিরাট হুমকি’। 

    Friday called for a National Register of Citizens (NRC) and a review of the population policy, pointing out “demographic imbalance” due to “vast differences” in the growth rate of different religions and infiltration in border areas.

    “আমাদের জনসংখ্যার মধ্যে ভারতীয় ধর্মীয় অরিজিন যারা এরা ছিল ৮৮ শতাংশ, যা ১৯৫১-২০১১ এ সময়ের মধ্যে নেমে এসেছে ৮৩.৮ শতাংশে। অথচ এর বিপরীতে মুসলিম জনসংখ্যা যা আগে ছিল ৯.৮ শতাংশ বেড়ে হয়ে গেছে ১৪.২৩ শতাংশ” । এ ছাড়াও শেষে মোহন ভাগবত যা বলেছেন, তাতে তারই মানসিক স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। তিনি বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনের পরে সে সহিংসতা শুরু হয়েছে এবং আর তাতে রাজ্য সরকার যে বর্বরতা ও জনসংখ্যার (হিন্দু-মুসলমান) ভারসাম্যহীনতাকে তোয়াজ করেছে, তাতে হিন্দুদের দুস্থ অবস্থা উঠেছে চরমে।’ এখানে উদ্ধৃতিগুলো নিতে হয়েছে শনিবারের ভারতের ওয়েব ম্যাগাজিন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে।

    This resolution says the share of religions of “Bharatiya origin” — including Hinduism, Buddhism, Jainism and Sikhism and excluding Islam and Christianity — came down to 83.8 per cent in 2011 census from 88 per cent in 1951 while the Muslim population increased to 14.23 per cent from 9.8 per cent during that period.

    বাংলাদেশে পুজাঃ
    এদিকে বাংলাদেশের  দুর্গাপূজার শেষ দুই দিন স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে পারেনি। আবার আমাদের মুসলমান জনগোষ্ঠীও প্রচণ্ড অস্বস্তিতে, তারাও ক্ষুব্ধ; তাদের জন্যও ধর্মীয় অবমাননাকর ঘটনার জন্য। আবার সরকারও খাচ্ছে হিমশিম; আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে তাদের নাজেহাল অবস্থা হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কোনোপক্ষই সন্তুষ্ট নয় একেবারেই। এক কথায় বললে, কোথাও একটা স্যাবোটাজ হয়েছে,আমাদের আন্তঃজনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা ছিটানো হয়েছে, যা সরকারের অনুমানের নিয়ন্ত্রণসীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই একটি লজ্জায় পড়ে গেছি। আমাদের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক সমসাময়িককালে এমন খারাপ হয়নি এবং দুর্দশায় কখনো পড়েনি। এরই মধ্যে আমরা দেখলাম বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারী একটা স্পষ্ট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি লিখিতভাবে (যে চিঠি বিবিসিতে প্রকাশিত) প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে বাংলাদেশে ‘হস্তক্ষেপ করতে’ আহ্বান রেখেছেন!  অর্থাৎ সকালে মন্দিরে কোরান শরীফ রেখে আসার ঘটনা আর সন্ধ্যায় মোদীকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের জন্য ডাক দেয়া?
    তার নিশ্চয় অজানা নয় যে, আরেকটা দেশে হস্তক্ষেপ করতে প্রকাশ্যে আহ্বান জানানোর অর্থ-তাৎপর্য ও এর দায়-দায়িত্ব কী? দেখা যাচ্ছে তিনি আগে থেকেই যেন সব জানতেন। তবে বিবিসি তার প্রপাগান্ডা করতে রাজি হয়নি না হলেও তাকে দুরেও ফেলে নাই। তার আহবানের চিঠি ঠিকই প্রচার করে দিয়েছে! তা হলে বাংলাদেশের সহিংসতায় তার সংশ্লিষ্টতা কী সেটি পুরাটা এখন খুলে বলার দায় বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারীর। আর বাংলাদেশের উচিত হবে এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করা।

    যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, মোদির আগামী নির্বাচনে জয় না পাওয়া নিয়ে তিনি কি নিশ্চিত? না হলে মুসলমানরা নাকি ‘বেশি বাচ্চা পয়দা’ করে অথবা জনসংখ্যা ‘ভারসাম্যহীন’- এসব কথা যে রেসিজম বর্ণবাদিতা, তা জেনেও এমন কথাগুলো তাদের র‌্যাংক অ্যান্ড ফাইল- আরএসএস থেকে বিজেপি সব নেতাকর্মী মুখ্যমন্ত্রী মরিয়া হয়ে উচ্চারণ করতে শুরু করেছে কেন? সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ এমন কথা বলতে পারে না।

    এই মোহন ভাগবত, এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা মানে কী? মানে একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? এটা কি বস্তু?

    মোহন ভাগবত তিনি কে? তার অনুমতি নিয়ে মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন? ইউজলেস লুজার সব!

    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে- এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? ইনি কী দিয়ে বুঝেছেন, কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার পরিমাপক করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন?

    ভারতের কনস্টিটিউশনে বা কোন আইন অনুযায়ী, মুসলমানরা কথিত কোন ভারসাম্য ভেঙেছে? আর সেটি তিনি ডিকটেট করার কে? তিনি কোন মহারাজা?
    মোহন ভাগবত কি জানেন ভারতের সরকারি ভাষ্য হলো, মুসলমানদের জনসংখ্যা বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক?

    আবার এসমস্ত বক্তব্যই তো এক রেসিস্ট বক্তব্য। তিনি নিজেই মনেও হচ্ছে, জলাতঙ্ক রোগীর মতো মুসলমান-আতঙ্কে ভুগছেন! এত ভয়াবহ অসুস্থতা! এটি তো হিটলারের অন্য জাতি-ঘৃণা বা অন্য জাতি-আতঙ্ক এসবেরই কপি। ভারতের কনস্টিটিউশনাল কোর্টের উচিত হবে এই দাঙ্গাবাজ অসুস্থ উসকানিদাতাকে থামানো, স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্তত কিছু পদক্ষেপ নেয়া। নইলে এসব অসুস্থ লোক এ অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেবে, নিজেরাও পুড়ে মরবে। াশা করি ভারতে কিছু সুস্থ লোক এখনো বেঁচে আছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৬ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বেশি পয়দার বিরুদ্ধে মোদির সংগ্রাম“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতকে আমেরিকান ছেঁকা; অভিমান! না ডিভোর্স!

    ভারতকে আমেরিকান ছেঁকা; অভিমান! না ডিভোর্স!

    গৌতম দাস

     ০৪ অক্টোবর ২০২১, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3K4

     

     

    “U.S.-India Relationship Is the Quad’s Litmus Test”

     

    কেবল আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের ক্ষেত্রেই নয় “ঘটনার ২০ বছর” কথাটা ভারত-আমেরিকার “বিশেষ সম্পর্কের” ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হচ্ছে। সেও বিশেষ সম্পর্কের একটা বড় অংশ জুড়ে দাড়িয়েছিল কোয়াড [QUAD]; যা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত এই চার দেশীয় এক জোট। আমেরিকা-ভারতের গত ২০ বছরের সেই “বিশেষ সম্পর্ক” এবার হেলে পড়েছে মনে হচ্ছে। তাই আপাতত আমেরিকার উপরে ভারতের ক্ষোভ, অভিযোগ আর অভিমানের প্রকাশ দিয়ে বুঝাচ্ছে। বিশেষ করে গত ২৪ সেপ্টেম্বরের পরের ঘটনাবলীতে। কেন?
    আসলে ভারতের খুবই গর্বের ‘কোয়াড’ নিয়ে কথা বলছি। এত দিন কোয়াড এর উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বললে মানে হত যেন আপনি দুনিয়ার কথিত ‘বেস্ট ডেমোক্র্যাটিক” রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আর তাতে আমরা ভাবতাম তারা তারা মিলেই বেষ্ট হয়ে থাকুক আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিয়ে প্রশ্ন জানিয়েছে সেটা আমরা অনেকেই জানি। আর নতুন ঘটনা হল, ভারতের এক প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব উলটা আমেরিকার দিকে আঙুল তুলে বলছে, আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে […there are serious questions about the strength and performance of democracy in the US, highlighted by what happened in January 2021]
    তবে খুব সাবধান! কারণ এটা এতদিনে কেন? কারণ, আমেরিকা কোয়াডকে কেন্দ্র করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ভারত আমেরিকার কাছে (মানে খোদ কোয়াড-ই) এত গুরুত্বের কিছু না। তাই সে ভারতকে ছেড়ে অষ্ট্রেলিয়াকে কাছে টেনে কোয়াডের বদলে নতুন এবং সামরিক এক জোট খুলেছে। আমেরিকার এই “অবজ্ঞা” ও “তুচ্ছজ্ঞান” ভারতের ভিতরে মূল আলোচ্য বিষয়। ভারতের ভিতরের যারা এতদিন আমেরিকান পয়সায় থিঙ্কট্যাংক খুলে আঁতলামি করত আর গল্পে রাজা-উজির মারত তারা এখন ভারতেই কোনঠাসা  আর নাইলে  উলটা গান ধরেছে।  এককথায় এটাকেই বলে প্রেমে ছেঁকা খাওয়া – ভারতকে দেয়া “আমেরিকান ডিচ” (ditch)।  তাতেও শেষ না। ওদিকে,  এখন খোদ লন্ডন ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনে তার আর্টিকেলের শিরোনাম “কোয়াডের কাজটা কী” [What is the point of the Quad]?

    গত ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল হোয়াইট হাউজে কোয়াডের চার নেতার এই প্রথম মুখোমুখি কোন মিটিং করতে বসার দিন। আগের লেখায় বলেছিলাম, এটাই প্রথম মুখোমুখি মিটিং; তবে এটাই শেষ মিটিংও হতে পারে। আর এখন ওই মিটিং শেষে যত দিন যাচ্ছে তাতে  আমেরিকার উপর ভারতের গোসসা আর চেপে রাখা থাকছে না; বরং নানান ক্ষোভ ও অভিমান ততই সামনে আসছে। তবে সম্পর্কটা আপাতত কেউই ভেঙে দিচ্ছে না। যদিও অকার্যকর ফেলে রাখার ঝোঁকটাই বেশি। কেন?

    ছোট্ট জবাব হল, স্বামী সতীন নিয়ে এলে যা হয়! মানে হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু চালিত সাবমেরিনে সজ্জিত করতে ইংল্যান্ডকে সাথে নিয়ে “অকাস” (AUKUS) [ভিন্ন উচ্চারণে অনেকে “আউকাস” বলছে] নামে এক ত্রিদেশীয় নয়া জোট ঘোষণা করেছে; অর্থাৎ  মোট চার সদস্যের কোয়াড অথচ এর দুই সদস্য মিলে আবার বাড়তি যুক্তরাজ্যকে সাথে নিয়ে নতুন আরেক জোট গড়ার ঘোষণা করেছে। আর এবার আগেভাগেই ঘোষণা করে দিয়েছে এটা ‘সামরিক জোট’। এতে যেন আমেরিকার এক প্রকাশ্য ইঙ্গিত যে, আমরা সামরিক সম্পর্কে আসতে ভারতের জন্য অনেক  অপেক্ষা করেছি, আর না। অথবা এটা যেন বাইডেন বলছেন, “এখন তোমরা ভেবে দেখো, এই সামরিক জোটে যুক্ত হবে কি না, না হলে রাস্তা মাপো! আর এ নিয়ে কার্ড শো করো, তোমাদের মনে কী আছে ঝেড়ে কাশো। সেটি দেখতেই তো ২৪ তারিখে মিটিং ডেকেছি- এখানে মুখোমুখি হও!”
    এখানে এই ভাষ্যটা নিঃসন্দেহে  অনুমান-কল্পনা করে লেখা। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটা প্রায় এমনই ঘটেছে। নরেন্দ্র মোদীর হোয়াইট হাউজ রওনা হওয়ার দুই দিন আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা যে প্রেস ব্রিফিং করেন, সেখানেই সুনির্দিষ্ট করে তিনি বলেছিলেন, কোয়াড অথবা মোদির কোয়াড মিটিংয়ে যোগ দিতে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার সাথে ত্রিদেশীয় নয়া জোট অকাসের কোনো সম্পর্ক নেই; [No link between AUKUS and Quad, says India]।  এটা ছিল  ‘দ্য হিন্দু’ এর এনিয়ে ২১ সেপ্টেম্বরে বিস্তারিত এক রিপোর্টের শিরোনাম। লিখেছে, ভারতের পররাষ্ট্র  সচিব বলেছেন, ‘আমরা এই নয়া জোটের কেউ নই। আমাদের চোখে কোয়াডের সাথে এই নয়া জোটের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। অথবা কোয়াডের তৎপরতার উপর এর কোনো প্রভাব বা সম্পর্ক নাই।’

    “We are not party to this alliance. From our perspective, this is neither relevant to the Quad, nor will it have any impact on its functioning,”  – Mr. Shringla told journalists at a briefing on the Prime Minister’s visit.

    কিন্তু শ্রীংলার এসব কথাতে মিডিয়ার কৌতুহল মিটেনি। তাই তারা আরো প্রশ্ন করেন তাহলে মোদীর এই হোয়াইট হাউজ সফর কি নয়া জোটের প্রভাবের নিচে গুরুত্ব হারিয়ে চাপা পড়ে যাবে? অন্য এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, কোয়াড কি এখন থেকে তা হলে ‘নরম-সরম’ ধরনের ইস্যুতে নিজেকে নামিয়ে নেবে? শ্রীংলাকে তাই আবার এ নিয়ে মুখ খুলতেই হয় যদিও তাতে বিপদ আরো বেড়ে যায়, কমেনি।

    if the Mr Modi’s meetings and the Quad summit would be impacted or overshadowed by the big U.S.-Australian defence partnership, Mr. Shringla said the two events were not linked and also denied that the new partnership would mean that the Quad would only deal with “softer issues”

    তিনি বলেন, “নয়াজোট একটি সামরিক জোট। আর কোয়াড আলাদা লক্ষ্য নিয়ে আলাদা কিছু দেশের গ্রুপ। তবে কোয়াডের চার সদস্য দেশ আবার মালাবার এক্সারসাইজ নামে আরেক সমমনাদের কাজের জোট, যারা প্রায়ই মূলত একসাথে যৌথ নৌমহড়ার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু  ‘মালাবার নৌমহড়া গ্রুপের’ সাথে কোয়াডের কোনো সম্পর্ক নেই”- শ্রীংলা বলেন।

    And in the same sentiment Malabar exercises (maritime exercises involving Australia, India, Japan, U.S.) are those that are done between different nations but has nothing to do with Quad,” Mr. Shringla said.

    কিন্তু আমাদের কাছে এটি কৌতুকের যে, এখন ভারত কোনো সামরিক তৎপরতা বা সামরিক জোটের সাথে নেই বলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাচ্ছে; অথচ যতবারই ওসব নৌমহড়া হয়েছে মিডিয়া রিপোর্টে সবসময় তা কোয়াডের নামে হচ্ছে বলেই রিপোর্টেড হয়েছে। কিন্তু ভারতসহ কেউ এর বিরুদ্ধে কোনো সংশোধনী বা আপত্তি করেনি। তাই আগের লেখায় বলেছিলাম এটাই ভারতের “মাংস না খাওয়া নিরামিশাসী থাকতেই চান কিন্তু মাংসের ঝোল খাবার লোভ-শখ ষোল আনা!”।  আর তাই যেন এবার বাইডেন এবার কোয়াডের মিটিং দিয়েছেন একেবারে হোয়াইট হাউজে যেন ভারত প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকার সাথে সামরিক জোট করতে রাজি কিনা তা এবারই খোলাখুলি জানাতে বাধ্য হয়। যেটা এবার ভারত জানাতে বাধ্য হয়েছে যে সে নাই। অর্থাৎ আর আমেরিকার সাথে খাতিরের ভাব, ভান ও ভনিতার দিন নাই, শেষ। তাই, হোয়াইট হাউস এই কোয়াড সভা উপলক্ষ্যে এক ফ্যাক্টশীট প্রকাশ করেছে [Fact Sheet: Quad Leaders’ Summit] স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে, যা তাদের থিঙ্কট্যাংক ব্যক্তিত্বরাই সমালোচনা করে বলছেন, এতে এক কোভিডের টিকা প্রোগ্রাম নিয়েই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা হয়েছে। যা আসলে ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ভারত জাপানের বিনিয়োগ নিয়ে অন্যকে টিকা সরবরাই করবে কী যেখানে ভারতের নিজ জনগোষ্ঠির জন্য প্রয়োজনীয় যা টিকা তা উতপাদনের ক্যাপাসিটিই নাই। আর নাই বলেই শেষে বাস্তবত ভারতকে বিদেশে থেক্লে টিকা আমদানি করে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। তার মানে নতুন করে কোয়াড বেচে আছে দেখাতে চেয়েই কোয়াডের কেবল কোভিড প্রোগ্রামের কথা বলা হয়েছে পুরা সাত পৃষ্ঠা ধরে। যা ইতোমধ্যেই কোয়াডের ব্যর্থ এরিয়া।
    অর্থাৎ কোয়াড যে নাই হয়ে গেছে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে এটাই চারদেশ মিলে পরোক্ষে স্বীকার করে নিয়েছে। আর ঠিক একথাটাই নিউইয়র্ক সিটি কলেজের এক প্রফেসর আমেরিকারই “ফরেন পলিসি’ পত্রিকায় গত জুন মাসে আর্টিকেল লিখে বলেছিলেন। লেখার শিরোনাম ছিল কোয়াড এক মিথ্যা-মায়ার নাম’ [The Quad Is a Delusion]। বলেছিলেন এই জোট “আমেরিকাকে চীনের বিপরীতে কোন বাড়তি সুবিধা এনে দিবে না”।

    ভারতের রাজনীতিকেরা কী জানতেন না, কোয়াড বা আমেরিকা তাদেরকে রক্ষা করবে নাঃ
    অভ্যন্তরীণভাবে ভারতের শাসক-নেতাদের মনে এটা পরিষ্কার না থাকার কারণ নেই যে, কোনো যুদ্ধে জড়ানোর মূল বিপদ হল যে, এটা যুদ্ধের খরচের বোঝা চাপিয়ে নিজ খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো খারাপ করে ফেলা। ফলে পাকিস্তানের ইস্যু ছাড়া কোনো যুদ্ধে না জড়ানোই অন্য সব দেশের মতো ভারতীয় মনের সাধারণ অবস্থান। কিন্তু এ দেশের নাম ভারত যার আরেক নাম হওয়া উচিত ‘ভান ও ভণিতা’র দেশ। ভান-ভনিতা করে চলে এদের জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্ঠের আকার ধারণ করে বসে গেছে। এরা জীবিনের কঠিন বাস্তবতাগুলোকে কখনো প্রকাশ পেতে দেবে না; বরং যা সে নয় তাই সে ‘শো’ করবে, যেটাকে আমরা শো-আপ করা বলি।
    ভারত শো-আপ করা ছাড়া কিছুই করতে পারে না, চলতে পারে না। এটা নেহরু কংগ্রেসের ভারতের প্রথম প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা তথাকথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির (বিদেশের বিনিয়োগ নেয়া যাবে না) পরিণতি; এমন  এক কালচারাল বৈশিষ্ঠ হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ উন্মুখ হয়ে কাজের খোঁজে শহরে-রাজধানীতে এসে থাকে  এটা দুনিয়াতে খুবই কমন ফেনোমেনা। কিন্তু নেহরুর ভারতের ক্ষেত্রে  কাজে নয়া পেশা, কাজের আশায় শহরে ভীড় করেছিল এমন  চার প্রজন্ম পার হয়ে গেলেও নেহেরুর কমিউনিস্ট অর্থনীতি তাদের বস্তিবাস অথবা জীবনমানের নিম্ন ও স্থবির দশায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারে নাই। খারাপ অর্থনীতিতে কাজের অভাবে পড়ে চরম দুঃখ-দুর্দশাগুলোর প্রকাশ মাপক অনেক ধরনের হয়ে থাকে। এর একটি হলো মধ্যবিত্তের উত্থান-পরিবর্তনগুলোকে স্টাডি করে সেটা বোঝার চেষ্টা অনেক পুরনো হলেও ভারতের এই মাপকে ভারতের চার প্রজন্মের খবর এখানে খুবই করুণ। বাংলাদেশের সাথে যদি তুলনা করা হয়,  আমাদের বেলায় আমাদেরকে শুরুই করতে হয়েছিল অনেক দেরিতে অন্যদের (দেশভাগের আগের ভারত আর পরের পশ্চিম পাকিস্তান) পেট ভরার পরে, স্থায়ী সম্পদগুলো সবই তাদের পকেতে থেকে গেছিল, আমাদের শুরু একাত্তরের পরে। তবু এখানে দেখব আমাদের মধ্যবিত্তের ফর্মেশন সবার চেয়ে আলাদা। ভারেতের চেয়ে তো বটেই, একেবারেই আলাদা। আমাদের বেলায়, কোনো প্রথম প্রজন্ম যদি ঢাকায় এসে বাসের হেলপার হয়, তবে পরের প্রজন্মের কর্তা বাস ড্রাইভার হয়ে হাজির হতে দেখা যেতে পারে। আর এখানে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত ও তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, একালে বাস ড্রাইভারের মেয়ে কলেজে পড়ে!  আমাদের এখানে কোন মানুষ বা তার পরিবার যারা গ্রাম থেকে শহরে ধাবমান এরা চার প্রজন্ম ধরে একই স্তরের জীবনমানে আছে দেখা যাবে না – ট্রেন্ড টা এরকম।

    এখন ভারতের বেলায় যেটা ঘটে আসছে তা হল এক লম্বা সময় ধরে একই নিম্নআয়ের জীবনমান ধরে ওর মধ্যেই আটকে থাকতে বাধ্য হলে তখন একটা সময়ে এর কালচারাল প্রভাব হয় মারাত্মক। যেমন – স্বল্প আয়ের পরিবার বলে, এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার রান্নার তেল কিনে একেকবার আধাছটাক করে। তবে তা নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। কিন্তু সে সেটা কী করতে কিনে এটা গুরুত্বপুর্ণ। সে কিনবে পকেটে করে শিশি নিয়ে গিয়ে। কেন? কেউ যখন তা কিনে বাসায় ফিরবে, তা যেন পড়শি পরিবারের কেউ দেখে না ফেলে যে এত অল্প করে তেল কিনে। যার মানে তার অর্থনৈতিক অবস্থার আসল লেভেল কোনটা। কেন এমন হয়?
    কিন্তু  তাঁর পড়শিও কি তার মত একই লেবেলের অর্থনৈতিক জীবনমানের মানুষ নয়? অবশ্যই। আসলে তারা নানা সামাজিক আসরে ওসব পড়শিরা পরস্পর পরস্পরের কাছে ভান-ভণিতায় শো করে গেছে ও যায়। তারা সবাই ভনিতা করে দেখাতে চায় যে তাদের জীবনমান অনেক ভালো বা উঁচু। আর এমন করে দেখানোতে সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘শো-আপ’ হল যখন তারা পরস্পরকে শো-আপ করে এই বলে যে, তাদের জীবন নিয়ে তারা খুবই খুশি, খুব ভালো, সুখে আছে তারা। সে কারণে এই মিথ্যা শো-আপটার সাথে আধাছটাক তেল কিনে আনাটা যায় না, মিলে না বলেই সে পকেটে শিশি ঢুকায়! সব ঢেকেঢুকে ভণিতা করতে চায়। অথচ যেটা সবাই জানে আর যেটা পড়শি সবারই কমন অবস্থা সে্টা নিয়ে আবার একে অপরের কাছ থেকে লুকানোর চেষ্টার কী আছে? কিন্তু এথেকে সম্ভবত গভীর ক্ষতের দিকটা হল, এখন এই যে শো-আপ এটি সম্ভবত মধ্যবিত্তের একটি ‘জাতীয় কালচারে’ পরিণত হয়ে গেছে। ফরমাল স্টাডি করলে আর এরকম অনেক লক্ষণও নিশ্চিয় পাওয়া যাবে! তাই, যেন এই হল ভান-ভনিতার ভারত!  এটাই সম্ভবত ভারতেরই আরেকটা দিক-বৈশিষ্ঠ;  – নেহেরু-ইয়ান ভারতের কমিউনিস্ট ইকোনমির স্থায়ী ছাপ বৈশিষ্ঠ।

    এর কী কোনই পরিবর্তন নাই?
    অবশ্যই হয়েছে খানিক আর্ধেক, তবে যা একবার কালচারে ঢুকে যায় তা সহসা বের হয় না। ভারতের ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর গান্ধী পরিবারের বাইরে নরসীমা রাও প্রথম ও নতুন প্রধানমন্ত্রী হন। আর তারই অর্থমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। কিন্তু ততদিনে আগের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী  (শ্রীলংকার এলটিটি ইস্যুতে তাদের হাতে খুন হয়েছিলেন তিনি) মৃত্যুর অনেক আগে তিনি জেনে গিয়েছিলেন, দাদামশাই নেহরু গ্রেটেস্ট কমিউনিস্ট আকামটা কী করেছিলেন; কারণ এর আগেই মনমোহন অনেক দিন সেন্ট্রাল  ব্যাংকের গভর্নরসহ ভারত সরকারের নানা অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সব পজিশনের দায়িত্বে তিনি ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীবকে সমস্যার গোড়া বুঝানোর সুযোগ নিয়েছিলেন। যাতে, নেহরুর কথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির কাঠামোটা ফেলে এর সংস্কারই একমাত্র সমাধান এতে তিনি রাজি হন। এরই মধ্যে ১৯৯০ সালে ভারত “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতির মুখে পড়ে যায়। ফলে আইএমএফ লোনের দ্বারস্থ হয়ে মুক্তেতি খুজতে নামতেই হয়। কমিউনিস্ট অর্থনীতির বেকুবিপনা আর অচলতা উদোম হয়ে যায়। এ কারণে পরের বছর নতুন সরকারে  ড. মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হয়ে সংস্কার শুরু করেছিলেন সহজেই, প্রায় বিনা বিতর্কে।
    এদিকে পরবর্তীতে নতুন শতকে, তত দিনে চীনেরও অর্থনীতি ভালভাবেই ডাবল ডিজিট গ্রোথে প্রবেশ করেছে। ফলে “ডেভেলপড” অর্থনীতির উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে “রাইজিং ইকোনমির’ দেশ বলে নয়া টার্ম চালু হয়। দুনিয়ার বড় জনসংখ্যার দেশ হিসেবে চীন (১৩৯ কোটি) সবার উপরে আর তার পেছনে ভারত (১৩৫ কোটি)। এমন জনসংখ্যা বেশির দেশে অর্থনীতি খারাপ থাকলে ওদেশের লোক কম ভোগ করলেও অর্থনীতিটা সাইজে বড় গ্রুপে গিয়ে পড়ে। চীনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটাও  তাই-ই। তবে ততদিনে চীন শুধু জনসংখ্যাতেই বড় নয়; আবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল [যেটা চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস]। চীনের সাথে ভারতের কেবল ফারাকটা ছিল যে, জনসংখ্যাতেও ভারত বড় অবশ্যই তবে চীনের মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ ভারত তখনো নয়। তখনো নয়। এটাই আবার বিশাল ফারাক টেনে দিয়েছে কারণ চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে বলে সেই-ই গ্লোবাল নেতা হতে পারবে। ভারত নয়। সুতরাং বড় জনসংখ্যাই সবকিছু না। কিন্তু পটেনশিয়াল দেশ মাত্র। কিন্তু ওদেশের সরকারের কোনো লোভী বা ওভার-এস্টিমেটেড সিদ্ধান্ত দেশের সব সম্ভাবনা শেষ করে দিতে পারে। তবে সে যাই হোক  ঐ সময়ই এই “রাইজিং ইকোনমি” টার্মটা চালু হলে ব্যাপারটা আমেরিকার নজরে আসে।

    এমনিতেই নাইন-ইলেভেনের হামলার পাল্টা, আফগানিস্তানে আমেরিকার হামলার পক্ষে বিভিন্ন দেশের সমর্থন নিতে গিয়ে ২০০২ সালের মধ্যে কথিত “সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে” ভারত ও আমেরিকা, তাদের মধ্যে আঁতাত হয়ে যায়। ইসলামবিদ্বেষীভাবে কাদের ও কিভাবে সন্ত্রাসী বলবে, তা ঠিক হয়। আর সাথে “রাইজিং ইকোনমি” বিষয়ে ভারতের সাথে কাজ করার গ্রাউন্ড তৈরি করাও শুরু হয়েছিল। এখান থেকেই এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতির দু’টা দেশ চীন ও ভারতকে একসাথে মোকাবেলা করতে না গিয়ে, বরং একটাকে আরেকটার বিরুদ্ধে খাড়া করতে ভারতকে প্রলোভন ও প্রশ্রয়ের পিঠে হাত রাখার পরিকল্পনা করেছিল আমেরিকা। এখান থেকেই ভারতের পিঠে হাত রেখে ‘চীন ঠেকানোর’ পরিকল্পনা ও তৎপরতার শুরু। আর তাতেই তারা লোভী করে তুলেছিল ভারতকে, য়ার এতে ভারতের মাথা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে যায়।

    সাধারণভাবে বললে, একাজটাকে বলে ভারতের ইন্টেলেজেনশিয়ার (একাদেমিক প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা, চিন্তাচর্চায় জড়িত যে জনসংখ্যার অংশ) উপরে চিন্তায় প্রভাব-দখল নেয়া।   একাজটা আমেরিকা করেছিল কিছু আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে, কিন্তু কয়েকভাবে। ভারতে  আমেরিকান ওসব থিংকট্যাংকের এক্সটেন্ডেড শাখা খুলে অথবা প্রতিষ্ঠান বা এনজিও খুলতে ফান্ড দিয়ে এবং এক চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন দিয়ে একাদেমিক পেশায় জড়িত এমন এবং এছাড়াও হায়ার স্টাডিতে আগ্রহীদের তাদের প্রলুব্ধ করে। আর দ্বিতীয়টি হল, স্কলারশিপ বিতরণ। হায়ার স্টাডিজে আকাঙ্খীদের (মাস্টার্স বা পিএইচডি) স্টুডেন্টদের স্কলারশিপ দিয়ে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের অংশ করে নেয়াটা এর লক্ষ্য; যাতে তারা বিশ্বাস করতে ও প্রচারণা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। ( এবারের  হোয়াইট হাউজ কোয়াড মিটিংয়ে বাইডেন আবার এমন এক স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।) এ বিষয়ে প্রথম কথাবার্তা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সাল থেকেই, মনমোহন সিং প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হলে। আর পরে চুক্তি হয়েছিল ২০০৬ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফরকালে।  ভারতে সেই প্রথম থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল। তবে করুণ ব্যাপারটা হল,   সে সময় ভারতের নীতি নির্ধারকেরা ব্যাপারটাকে দেখেছিল এভাবে যে নিজেকে আর থিংকট্যাংক খুলতে পয়সা খরচ করতে হলো না, এমনই সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে। এছাড়া আরও দিকটা হল, আমেরিকার কাছে গুরুত্ব পাওয়ায় নিজে বিরাট কিছু দামি হয়ে গেছে বলে ওভার-এস্টিমেশন;  অর্থাৎ ফিরে  সম্ভবত সেই ভান-ভনিতার দিন এতে আরো জেঁকে বসেছিল মনে করা যেতে পারে।

    আসলে সেকালের ভারতে থিংকট্যাংক বলতে সামরিক বাহিনীই নিজ বাজেট থেকে অর্থ নিয়ে আর সেনা এক্সটেনডেড প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমিতভাবে চালানো কিছু স্টাফ দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান খাড়া করে রেখেছিল। বাজেট স্বল্পতা থাকলে  একটা প্রতিষ্ঠান যেমন হয় তাই। আমেরিকান বয়ান ভারতে প্রবেশ করেছিল এভাবেই এর  সুযোগ নিয়ে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, একটা বয়ানে এসবের সমন্বয়ের নিয়ম স্ট্রাকচার তারা চালু করেছিল তখন থেকে। সেটা সম্ভব হয়েছিল যেসব কারণে যেমন, এরপর থেকে ভারতে থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় কারণ সেটাই ছিল  নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান; কারণ থিংকট্যাংকগুলোর প্রতিটি প্রোগ্রাম এই মন্ত্রণালয়েরই অনুমোদন ও পূর্বানুমতিপ্রাপ্ত। ফলে সমন্বিত। আর থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে তখন দেখা যেওত যেমন সরাসরি সরকারি,  অথবা একমাত্র (ব্যবসায়ীদের দেয়া দাতব্য অনুদানে চলা) ওআরএফ [ORF] আর এবার এসবের সাথে আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা বা ফান্ডে চলে এরা এবং ভারতীয় ব্যক্তিত্ব যারা আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো [fellow] হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এমন যারা আমেরিকায় বা ভারতেই থাকেন। এতে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয় ও আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট (আমেরিকান থিংকট্যাংকসহ) যেটা সমন্বিত অবস্থান একেক সময়ে নেয়, সেটাই সংশ্লিষ্ট সবার উপর কার্যকর হয়, তাই সবার কমন অবস্থানের গাইড লাইন হয়। তবে ট্রাম্প আমলে এসে তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে এসব স্কলারশিপ এবং এনজিও ফান্ড সব বন্ধ বা খুবই সীমিত হয়ে যায়। তবুও আমেরিকা্নর নিজের থিংকট্যাংকঅগুলোর তৎপরতা খুবই সক্রিয় থেকেই গেছিল মূলত মন্ত্রী জয়শঙ্করের কারণে, যাকে আড়ালে ভারতের সবচেয়ে বড় আমেরিকান থিংকট্যাংকের এজেন্ট বলেন অনেকে। ওদিকে আমেরিকান স্বার্থে স্কলারশিপের ভারতে বসে মূল অনুমোদনদাতা ভারতীয় যে মূলত আমেরিকানদের প্রধান লোক সে তখন থেকে ভারত ছেড়ে সিঙ্গাপুরে গিয়ে চাকরি নিয়ে আছেন। তখন থেকে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক তৎপরতা কিছুটা ঝিমিয়ে ছিল। বাইডেন সম্ভবত চাচ্ছেন সেটিকে সবার আগে আবার চালু রাখতে। এই ব্যাপারটা এমন বিস্তৃত বলার পিছনের কারণ এটাই। কোয়াড নাই ঠিক তা হবে না সম্ভবত তবে, গুটিয়ে যাচ্ছে এর সব লক্ষণ এভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু বাইডেনের এখনও দরকার ভারতের চিন্তাশীল কর্তাদের চিন্তার উপর প্রভাব। তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারার সক্ষমতা যাতে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের নিচে তারা চাপা থাকে।

    এই অংশটা এত বিস্তারিত বললাম আর এক এজন্য যে, এবারের মোদীর হোয়াইট হাউজ সফর শেষে অথবা বলা যায়  – এবার কোয়াড-এরই এক সতীন প্রতিষ্ঠান অকাস [AUKUS] খাড়া হওয়াতে, উপেক্ষিত বোধ করা ভারতের ক্ষোভ-অভিমান যা ক্রমেই বের হয়েই চলেছে তাতে মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম আমেরিকান বয়ান ভারতের আবার নীরবে খেতে, মেনে চলতে ভারত কেউ কেউ আপত্তি তুলবে; যেটা আবার হয়ত আর্থিক সুযোগ সুবিধা পেলে চুপ করে যাবে।  অর্থাৎ সেটা যেভাবেই নতুন রূপ নেক না কেন – এটাই হবে আফগানিস্তানে তালেবানে উত্থানের বাইরে আরেক প্রায় ২০ বছরের ঘটনার পরিসমাপ্তি। এর পুরনো ‘সেটিংসের’ এবার ভেঙে পড়ার ঘটনা হবে এটা। এককথায় এটাই ভারত-আমেরিকার এত দিনের থিংকট্যাংক সম্পর্কে  বদল। তা একেবারে ভেঙ্গে যদি নাও পড়ে এতে মোচড় আসার মত তা বদলে যেতে বাধ্য।

    এমন কোথায় কোথায় এখন ভারতের আঘাত লাগবে এর একটি তালিকা (না আমার করা নয়)  পাওয়া যায় – হর্ষ ভি পন্থ [Harsh V. Pant] -এর লেখা থেকে। পন্থ মূলত লন্ডন কিংস কলেজের অধ্যাপক। কিন্তু  ভারতে সক্রিয় সবচেয়ে বড় থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তিনি ডিরেক্টরও।  আর তিনি এবার তাঁর লেখাটা ছাপতে দিয়েছেন আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’-তে।

    ফরেন পলিসি (আমেরিকান এলিটদের পত্রিকা ফরেন অ্যাফেয়ার্স নয়। দু’টিই কাছাকাছি নামের বলে ভুল বোঝা থেকে সতর্ক করতে একথা বলছি। এই পত্রিকার পজিশন আগে যাই থাক না কেন, বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এই পত্রিকাটা এখন বিশেষভাবে বাইডেন-অ্যাসাইন্ড এক পত্রিকা। সাধারণভাবে পত্রিকাটা বাইডেনের অঘোষিত এক পাবলিক মুখপাত্রের মত তার সব পলিসির পক্ষে প্রচার করতে তো দেখাই যায়, এটাই এর অবস্থান। এছাড়াও  বিশেষত আরেকটা দিক হল,  আমেরিকান প্রফেসর কুগেলম্যান [Michael Kugelman]; তিনি আসলে  Deputy Director of the Asia Program  at the Wilson Center] এটা একটা প্রভাবশালী আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক। তাঁকে এখানে হায়ার বা নিয়োগ করা হয়েছে। আর তাঁকে কেন্দ্র করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাইডেনের নীতি-পলিসির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহে [ এশিয়ার দেশগুলোতে বাইডেনের স্বার্ত্থ সংশ্লিষ্ট] চার-পাঁচটি দেশে কী ঘটছে বা বাইডেন কী ঘটাতে যাচ্ছেন তা নিয়ে সরাসরি কুগেলম্যানের (চার-পাঁচ পাতা, ২০০০ অক্ষরের) মন্তব্য এ পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। যার শিরোনাম weekly South Asia Brief। উল্টো করে বললে এতে – কুগেলম্যানের মন্তব্য থেকে বাইডেনের মনোভাবের কিছু হদিস মিলা সম্ভব।
    এই ফরেন পলিসি পত্রিকাতেই হর্ষ পন্থের ভারতের ক্ষোভের তালিকাসমৃদ্ধ লেখাটার [শিরোনামঃ- The U.S.-India Relationship Is the Quad’s Litmus Test ] ছাপা হয়েছে। এই আক্রমণাত্মক শিরোনামের ভাবানুবাদ টা হবে এমন – “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের টিকে যাওয়া এই কোয়াড টিকে কি না তার ভাগ্য পরীক্ষা”। এছাড়া এলেখায় তিনি এশিয়ায় আমেরিকা তার বিদেশনীতি বদলে ফেলেছে বলে আমেরিকাকে অভিযুক্ত করেছেন [……as the United States makes a foreign-policy shift in Asia. ]। এমনকি খুবই কড়াভাবে ভারত-আমেরিকা বিরোধের কথা উল্লেখ করে আবার- এটিকে ‘কনফ্লিক্টিং অব প্রায়োরিটি’ ক্যাটাগরিতে ফেলেছেন। ব্যাপারটা অনেকটা একবার ছেড়ে দিয়েছেন বলে হুমকি ও ভাব করে আবার ধরে রাখছেন – এমন।

    India has a vital role to play in each area, but it also has many unresolved differences with the United States, such as their vaccine supply chain issues, approaches to climate policy, and conflicting priorities regarding Taiwan and Pakistan.

    অর্থাৎ নাম ধরেই বলেছেন, “ভারতের প্রায়োরিটি পাকিস্তান”। প্রথমত তিনি স্বীকার করছেন ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে।  কিন্তু এটা তো  কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – যেখানে আগে পড়ে বলে কিছু নাই।  মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার  পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না।  ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে  “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

    হর্ষ পন্থ স্বীকার করছেন, কোয়াডে ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে।  কিন্তু এটা তো  কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – আগে পড়ে বলে কিছু নাই।  মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার  পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না।  ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে  “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

    পন্থের কথাটি জমেনি বা অর্থ হয়নি। অনেকটা জোর করে মিলিয়ে বলা। আগে-পড়ে বলে কিছু না থাকলেও সেটা দাবি করা। পন্থ কামনা করছেন, আসলে পাকিস্তানের কথা, ঠিক যেভাবে গত প্রায় বিশ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের  অসৎ বয়ান ঠিক রাখার স্বার্থে  ভারতকে তোষামোদ আর পাকিস্তানকে চাপের মধ্যে রেখে গেছে – সেটাই, সেই সুখের দিন ভারত ফেরত চাইতেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল  তালেবান ইস্যু কি কেবল ভারত-পাকিস্তান ইস্যু? তা তো কখনো নয়, কারণ এতে খোদ বাইডেনের আমেরিকার স্বার্থই (এবং সক্ষমতাও) তো সবার চেয়ে বড়। আর বাইডেনকে অন্তত  সেনা ফিরিয়ে নিয়ে আমেরিকার প্রতিদিনের ৩০০ মিলিয়ন ডলার বাঁচাতেই হত। সেটা পরোয়া না করে বাইডেন কেবল ভারতের ইচ্ছার পক্ষে কাজ করবে  এটা আশা করাটাই যে করে তারই সমস্যা! এটা না বুঝার তো কিছু নেই। কিন্তু পন্কেথ বা ভারত এভাবে ভাবে কেন? কেন এমন করছে? এটাই, এই যে সবসময় এই ওভার-এস্টিমেশন, বড় মনে করে — মুই কী হনু রে — যে আমি অনেক দামী এই ফুটা দেমাগ ইত্যাদি – এটাকেই তো ভান-ভনিতার ভারত বলেছি! অতএব, ভারত এখন যত দাম মানে অহেতুক যতই দাম দেখাবে ততই এই দুরত্ব বাড়তে থাকবে যা শেষ পর্যন্ত খুবই খারাপ জায়গায় – উইঘুরের মত, এই আমেরিকাই ঘুরে গিয়ে ভারতের কাশ্মীর ইস্যুতে আচরণ, মানবাধিকার নিয়ে ভীষণ চাপে ফেলতে পারে!  এসব দিক নিয়ে ভারতের ভিতরেই বুদ্ধিমানেরা ইনার আলোচনা শুরু করেছে!

    ক্ষুব্ধ ভারতের চেয়েও বাইডেনের এখনকার বড়  মাথাব্যথা হল চীনের সাথে আপোষে বসাঃ
    এদিকে আমেরিকার চিন্তার জন্য কেবল ভারতের ক্ষোভই ‘একমাত্র’ নয়। এর থেকেও নিঃসন্দেহে  এখনকার বড় বাইডেনের মাথাব্যথা হল চীন। না নতুন করে আমেরিকা-চীনের কোন বিরোধ এটা নয়; বরং তা থেকে ছুটবার আলো এটা। আসলে এটা চীনের সাথে আমেরিকার ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ যেটা ট্রাম্প শুরু করে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তা থেকে সব ধরনের যুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম বা সম্ভাবনা। আর ক্ষমতা ত্যাগের আগে ট্রাম্প বড়াই করে বলে গিয়েছিলেন যে, তার দেখানো পথই বাইডেনকে অনুসরণ করে যেতে হবে। কারণ এমন ‘শক্ত বাঁধন’ তিনি দিয়ে যাচ্ছেন।

    আমরা (অন্তত আমি নিজে) অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, বাইডেনের শপথের পরে বোকা হয়ে এই ইস্যুতে ট্রাম্পকেই অনুসরণের নীতি অনুসরণ করতে গেলেন। আর তাতে চীনের সাথে আলোচনার ‘আলাস্কা বৈঠকে’ই সব শেষে, এমনকি মারামারি লাগার অবস্থা। সেই থেকে বাণিজ্য যুদ্ধ বা আলোচনা একেবারেই বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু বন্ধ থাকলে যা হয়, চীন-আমেরিকা যত ধরনের শত্রুতা সম্ভব তা ক্রমশ ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল।

    গত মাস থেকেই পরিস্কার বাইডেনের অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির চাপের মুখে। এনিয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  আর তিন ডজন ব্যবসায়ী ফেডারেশন কর্তৃক বাইডেনকে লিখিত অনুরোধ যে, চীনের সাথে বাণিজ্য আলাপে চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক সরাতে যেন দ্রুত  চীনের সাথে আলোচনা শুরু করা হয়।এছাড়াও,   মিডটার্ম নির্বাচনে নিজ ডেমোক্র্যাট দল হারবে এই পূর্বাভাস দেখে [এই সব প্রসঙ্গ আমার আগের লেখার বিস্তারিত আছে] বাইডেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ফোনে কথা বলেন। অনেকে বলছেন এতে শি জিনপিং শর্ত দিয়েছেন; অনেকে বলছেন, তিনি আবার বাণিজ্য আলোচনা করতেই চাননি।

    আর বাস্তবে আমরা দেখছি আলোচনা ফের শুরু করার পরিবেশ সৃষ্টির নামে বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে- উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বয়ান ঘুরে যাওয়ার ইঙ্গিত, হংকং বা তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ ঢিলা করা,  হুয়াওয়ে ফোনের সিএফওকে ‘মেঙ’ -কে তিন বছর ধরে কানাডায় আটকে রাখার পরে বন্দিবিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়াসহ  আপোষনামার বা পরিবেশ সৃষ্টির তালিকাটা অনেক লম্বা মনে হচ্ছে।  সব কিছু শুরু হয়েছে। তা হলে হুয়াওয়ের ফাইভ-জি টেকনোলজিতে অবরোধও কি তুলে নেয়া হবে; চীনে পশ্চিমা মাইক্রোচিপস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞাও কি? এটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে? মনে হচ্ছে ন্যাংটা করে ফেলবে বাইডেনকে। কারণ, তার বিপদটা ঘরেই। বাইডেন খারাপ অবস্থা হল  মিডটার্ম  নির্বাচনে ও অর্থনীতিতে!

    মূল্কথাটা হল, প্রেসিডেন্ট শি, আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমেরিকার  দিক থেকে  যা কমানো সম্ভব এমন বাহ্যিক টেনশনগুলো কমানোর মত পদক্ষেপগুলো নিতে বলেছে। বাইডেনও এই সারকথাটাই মিডিয়ায় জানিয়েছে। তাই বলে এর লিস্ট কত বড় বা তাতে কী থাকবে তাকিছু বাইডেন বলেন নাই।

    তবে বাইডেন-শি এর আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির নামে এখনই এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লিস্ট যত লম্বা হবে ততই আমেরিকার উপর ভারতের ক্ষোভ  আরো বাড়বে বলেই অনুমান! কারণ বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই ভীত মোদীর কামনা ছিল চীন-আমেরিকা সম্পর্ক যত তিতা হবে, তা মোদীর জন্য ভালো। কারণ যাতে সেই তিতা সম্পর্কের আড়ালে কমলা হ্যারিসের মুখ দিয়ে তোলা বাইডেনের ভারতের বিরুদ্ধেও মানবাধিকারের খারাপ রেকর্ডটা (কাশ্মিরের স্ট্যাটাস, ভারতজুড়ে মুসলমান নিপীড়ন ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রভৃতি) চাপা পড়ে যায়।

    দুনিয়া আসলেই আর আগের মতো সব সম্পর্কে থাকছে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০২ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কোয়াডে ভারত-আমেরিকা অভিমান!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলো কী নিজেই নিজেকে মৃত ঘোষণা করতে চাইছে?

    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১০.৫৬ সকাল
    প্রথম আলো চরমতম বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমাদের জানামতে এর অফিস কাওরানবাজারেই ছিল। কিন্তু গত দুমাসের রিপোর্টিং মান, ধরণ ও ততপরতায় তাতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মনে হচ্ছে এটা বোধহয় কোন ভারতীয় পত্রিকা। যার অফিস ভারতের কোন শহরে!
    এমনিতেই ভারতীয় পত্রিকায় জার্নালিজম থাকে না। থাকে জাতিবাদ-দেশপ্রেমিকতা। মানে খবর যেভাবে পেশ করলে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি দেশপ্রেম প্রকাশ পাবে সেটাই করতে হবে। তাতে নিউজ মিথ্যা হলেও অসুবিধা নাই। অর্থাৎ জার্নালিজমের নীতি ও সততা এর গাইডলাইন নয়, বড়জোর সেকেন্ডারি। অর্থাৎ দেশপ্রেমের নামে খাড়া মিথ্যা প্রপাগান্ডাও জায়েজ। আর কথিত এই দেশপ্রেমের নিচে যদি কিছু জায়গা ত্থাকে তো সেখানে জার্নালিজমকে ফেলে রাখা যেতে পারে। এককথায় কথিত তাদের ‘ন্যাশনাল ইন্টারে্স্টটের’ সাংবাদিকতা। ফলে এরপর আর খবরের সত্য-মিথ্যা জাহান্নামে!
    কথা এখানেই শেষ না। দল বিজেপি যেহেতু এখন ক্ষমতায়। তাই মোদীর
    আরএসএস –বিজেপির রাজনীতি এবং স্বার্থটাই ভারত দেশপ্রেমের মাপকাঠি এবং তাদের কথা-ই ভারতের ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’। তাই শেষে এটাই প্রথম আলোরও খবর প্রকাশের গাইড লাইন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ প্রথম আলোর খবরের সোর্স বলা হচ্ছে ভারতে প্রকাশিত কোন পত্রিকার খবর।
    আগেও বলেছিলাম “ডেস্ক নিউজের” নামে প্রথম আলোতে আরেক চাতুরি চলে। তা হল, খবরের উতস-এর পরোয়া না করে অনুবাদের নামে যা ইচ্ছা তাই রিপোর্ট করা। যেন ‘অনুবাদক’ বলে আরেক ক্যাটাগরির কর্মী প্রথম আলো নিয়োগ দিয়েছে বা দেখতে পাওয়া যাবে। যারা সাংবাদিকতার সব দায় কর্তব্যের উর্ধে। খবরের উৎসে কোন কথা বা শব্দ থাক আর নাই থাক তিনি যেকোন শব্দ খবরের মধ্যে ঢুকাতে পারেন, বেপরোয়া। কারণ ওটা নাকি ‘ডেস্ক নিউজ’। ফলে যেন খবরের সত্যতার দায় প্রথম আলোর নাই।
    এর উপর আবার গতমাস থেকে এখন শুরু হয়েছে ‘বান-তালে’ (শব্দ উলটে নিয়ে পড়তে হবে) জার্নালিজম’। মানে যারা কা=বু=লে ক্ষমতা দখল করেছে। তাদের নিয়ে ভারতের জার্নালিজম। খবরের সোর্স না থাকলেও বানিয়ে এই নতুন শাসকদের বিরুদ্ধে লিখতে হবে ও সেটাই জার্নালিজম বলে মানতে হবে। নয়া শাসক আসাতে ভারতের স্বার্থের ক্ষতি হয়েছে। তাই এই ইস্যুতে ভারতের জার্নানিজম বাপ-মা হারা বেপরোয়া হয়ে গেছে। বেঁচে আছে কেবল কথিত ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের সাংবাদিকতা, তাই দেশপ্রেমের ভারে, উৎস না থাকলেও যা খুশি লিখে দিবার স্বাধীনতা।
    আর এতে প্রথম আলো হয়েছে আরো স্বাধীন বেপরোয়া। ভারতের যেকোন মিডিয়ায় প্রকাশিত এসব প্রপাগান্ডা গারবেজকে প্রথম আলো তার প্রকাশিত নিজ খবরের সোর্স বলে দাবি করছে। পেগাসাস এই ইসরায়েলি আড়িপাতা সফটওয়ার মোদী কিনেছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে, আর বিরোধী রাজনীতিক এমনকি নিজ সরকারের সচিব ইত্যাদির উপর তিনি তা ব্যবহার করে আসছেন। এটা নিয়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে মামলা চলছে। সংসদে হৈ চৈ চলছে। অথচ এখনও না সরকার বা সফটওয়ার কোম্পানী (এনএসও) স্বীকার করেছে যে মোদী এই সফটওয়ার কিনেছে। আদালতে দেওয়া সরকারের এফিডেফিট ইতোমধ্যে দুবার বদলিয়েছে। এমনকি কিনে নাই সেটাও বলছে না। পিছলে বেড়াচ্ছে। অথচ এনিয়ে যে রিপোর্ট প্রথম আলো ২৪ জুলাই ছেপেছে তা আসলে কোম্পানী এনএসও এর পক্ষের এক সাফাই। সেজন্য শিরোনাম হল এই আড়িপাতা সফটওয়ারের কারণে নাকি “লাখ লাখ মানুষ রাতে ভালো ঘুমাতে পারে”।
    এএনআই – এটা নিজেকে ভারতের এক প্রাইভেট নিউজ এজেন্সী বলে দাবি করে। বস্তুত এটা ফেক নিউজের একটা আড়ত। ইইউ এর এক গবেষণাালব্দ ফল থেকে পাওয়া অভিযোগ এটা। (EU DisinfoLab report) গুগল সার্চ দিয়ে আগ্রহিরা খুজে নিতে পারেন। আর এই কথিত এজেন্সীর উপরে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের হয়ে যেসব ফেক নিউজ করার দরকার হয় তা করে দেওয়ার বা হালাল করে দেওয়াই এই এজেন্সীর কাজ। অথচ এই এএনআই এর নিউজকেই উৎস মেনে পিআলো তা ছেপে চলেছে।
    যেটা গত পরশু একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে সেটা হল, একটা কথিত নিউজ;
    এতে উল্লেখিত খবরের সোর্সগুলো এরকমঃ
    ১। ……বলে সরকারি সংস্থাগুলো মনে করছে
    ২।…… বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে।
    ৩……… বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
    ৪।……… বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,
    ৫। ……… পাকিস্তানের নাম জড়িয়ে পড়ার কথা শোনা যায়।
    ৬।………… পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রচার রয়েছে।

    ৭।………… ঢাকার বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী

    ৭৫০ অক্ষরের এই কথিত নিউজে খবরের সোর্স এই সাতভাবে বলা আছে। এটা কী জার্নালিজম? তাও প্রথম আলোর?
    প্রথম আলো এভাবে নিজেকে নিচা করে নামিয়ে কথিত খবর ছাপছে কেন?
    অর্থ সংকট? পাকিস্তান আমাদের কারও অপছন্দের দেশ হতেও পারে। কিন্তু সেজন্য এর বিরুদ্ধে এমন প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে নিজের অর্থ সংকট মিটাতে হবে? ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ বা নয়াদিল্লির অর্থ নিয়ে? তাই কী?
    এমন গারবেজ অসততার জিনিষগুলো প্রথম আলোতে ছাপার আগে এই পত্রিকার সম্পাদকের আত্মহত্যা করাই অনেক সম্মানের হত!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  •  “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

     “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

    গৌতম দাস

    ০২ আগষ্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    FP.COM   A security officer walks past a mural showing U.S. Special Representative for Afghanistan Reconciliation Zalmay Khalilzad and Taliban co-founder Mullah Abdul Ghani Baradar in Kabul on July 31, 2020. WAKIL KOHSAR/AFP VIA GETTY IMAGES

     

    [সার-স্ংক্ষেপঃ   লেখার শিরোনাম “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে” – এটা মূলত এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুতের দেয়া শিরোনাম, সেখান থেকে নেওয়া।  তিনি আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদুত,  বিবেক কাতজু [Vivek Katju]। হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হওয়া তাঁর লেখা  এক কলামের শিরোনাম ছিল – India is losing out in Afghanistan ।  অর্থাৎ এই সাবেক কূটনীতিক মোদী-জয়শঙ্করের ভারতের এক করুণ পরিণতি দেখছেন।  তাঁর পুরা লেখাটাই মোদী-জয়শঙ্করের কঠোর সমালোচনা করে লেখা।
    ঠিক তেমনই আরেকজন হলেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলো তাকে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি বলে পরিচয় করায়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি মোদী-জয়শঙ্কর থেকে নিজেকে দুরত্ব তৈরি করে তাদের দায় না নিয়ে এক রচনা লিখে বলেছেন –  “আফগানিস্তান হতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কূটনৈতিক দক্ষতার কষ্টিপাথর”। অথচ প্রথম আলো তার এই দায় না নেয়া লেখাটা ছেপেছে সৌম্যর ‘মতামত কলাম” হিসাবে।  অর্থাৎ সৌম্য প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি সে হিসাবে নয়।
    মুলকথাটা হল, তালেবান ইস্যুতে মোদীর নীতি-পলিসিতে বড় গলদ দেখছেন ভারতের কূটনীতিক, একাদেমিক বা মিডিয়াকর্মিরা – তাঁরা মোদী-জয়শঙ্করদের থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করে কথা বলা শুরু করেছেন। তবুও মোদী-জয়শঙ্কর হুশিয়ারি দিচ্ছেন।  জয়শঙ্কর ২৯ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় বলেছেন, আফগানিস্তানে বলপ্রয়োগের সরকার ক্ষমতা দখল করলে (মানে তালেবানেরা ক্ষমতা দখল করলে) ভারত তা মেনে নিবে না [We would never accept any outcome which is decided by force”]। মানে স্বীকৃতি দিবে না। যদিও ভারতের স্বীকৃতির অপেক্ষায় তালিবানরা রয়েছে এমন কথা জানা যায় না। তবে ভারত সফরে আসা আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তার কথাও ভারতের কাছাকাছি মনে হলেও, কিন্তু এক বড় ফারাকের। তিনি বলছেন সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তালেবানদের অসুবিধা হবে। তিনি একটা শব্দ ব্যবহার করেছে “pariah” [Afghanistan to become ‘pariah state’ if Taliban seizes power: US] যার সমতুল্য বাংলা মানে হল অছ্যুত বা একঘরে হয়ে থাকা।  দেখা যাচ্ছে আমেরিকা যেখানে হুমকি নয়, অবজেকটিভলি তালেবান্দের উদ্দেশ্যে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছেন  মুরোদহীন ভারত সেখানে হুঙ্কার দিয়ে বলছে – ভারত মেনে নিবে না। ]

     

    এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়িঃ
    আফগানিস্তানকে ঘিরে এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি চরমে উঠেছে। গ্লোবাল পাওয়ারগুলোর সবাই তো বটেই,  এমনকি মুরোদ না থাকলেও যারা আকাঙ্খী, তারাও এতে শামিল হতে চাইছে। কারণ একটাই তালেবান ইস্যু গরম হয়ে উঠছে। মানে আমেরিকার বন্ধুরা যারা গত বিশ বছর ধরে আমেরিকার পক্ষে থেকে কাবুলের পুতুল সরকারের থেকে নানান “প্রজেক্ট” বাগিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের জন্য এখন দুঃখের দিন, হাহাকারদের দিন। বিশেষ করে ভারত তার তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আটকে গেছে সেই দুঃখে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দিয়ে যাচ্ছে – যে তালেবান সরকার টিকবে না।  এতো গেল একটা দিক। অন্যদিকটা  আরেকটু ভেঙে বললে, গত ২০ বছর হিতাহিত ভুলে আমেরিকার এই আফগানিস্তানে চালানো আক্রমণ ও দখলদারির দিন এবারের মত শেষ হবে। কিন্তু শেষ ‘কাফফারা’ দিতে হবে আরো অনেক; এবার সে ‘কাফফারা’ দেওয়ার  এক নয়া জমানায় সম্ভবত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

    SPUTNIKNEWS

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা যা আজকাল অস্বীকার-কারীরাও পরোক্ষে স্বীকার না করে পারছে না যে, আমেরিকার বদলে এর জায়গায় চীনের উঠে বসার কথা বা লক্ষণ-ইঙ্গিতও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আমেরিকার জন্য এই শাস্তি ডেকে নেওয়ার কারণও মূলত আফগানিস্তান। কারণ আসলে এই যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়েই, এতদিন সামলে চলা আমেরিকার অর্থনীতি, ২০০৭ সাল থেকেই বেসামাল হয়ে যায়। এই খরচ বেহিসাবি কারণ এই যুদ্ধ অন্তহীন এবং  এতে লোভ ও চরম অপরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখানে খরচের কোনো রিটার্ন আপাতত আর আসার সম্ভাবনা নাই, এর কিছুই ফেরত আসবে না। সেটা ক্রমান্বয়ে নিশ্চিত হয়ে যাওয়াতে ২০০৮ সাল থেকেই গ্লোবাল মহামন্দা নেমে এসেছিল। আর তাতেই প্রথম সুবিধাটা যায় চীনের ঘরে যে তখন নিজ অর্থনীতির কেবল ডাবল ডিজিট জিডিপির ২০ বছরে পৌঁছাতে যাচ্ছিল। তাই আমেরিকার বদলে সে জায়গায় চীন – এই সুবিধা চীনের জন্য প্রথম উন্মুক্ত হয়েছে আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার পরের পিছু হটা থেকে।

    তাই ২০১৪ সালেই আমেরিকাকে প্রথম বড় সেনা প্রত্যাহার ঘটাতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান  অর্থমন্ত্রী বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের  খরচ জোগানোর অপারগতায় শেষ টাইমলাইন ছিল সেটা। তাই প্রথম সেই প্রধান সেনা প্রত্যাহার (আমেরিকাসহ ‘ন্যাটো’ ও তার বন্ধুদের সেনা) যা শুরু হয়েছিল তা এবার ২০২১ সালে বাদবাকি সমূলে প্রত্যাহার শেষ হতে প্রতিশ্রুত হয়েছে, যার টার্গেট আগস্টের শেষে। অর্থাৎ এ মাসের মধ্যেই।

    এতে  আফগানিস্তানে এতদিন আমেরিকার যা অর্থসম্পদ ক্ষতি হয়েছে তা তো হয়েছেই; কিন্তু সেটাই শেষ নয়। বরং আরেক  বিরাট সম্ভাব্য ওলটপালট সামনে অপেক্ষায়। আর তাতে আমেরিকার এর চেয়েও বড় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকছে। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলে যে নতুন  ভারসাম্য আসন্ন, অন্তত এশিয়ার ভারসাম্য এখান থেকেই পুনর্লিখিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

    ওদিকে এনিয়ে ভারতের অবস্থান আরও নাজুক, একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। তাই যদিও আপাতত মোদীর ভারত আমেরিকাকে জাপটে ধরেই থাকছে বটে; তবে পারলে বাইডেনের চেয়ে – ভারতের হিউম্যান রাইট নিয়ে প্রশ্ন না তোলা – ট্রাম্পের মত প্রেসিডেন্টই মোদীর ভারতের কাম্য।  কিন্তু এসব কিছুই ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। এরপরে সেই নির্বাচনে বিজেপি ফিরে জিততে না পারলে সেই ভারত পথ বদলে চীনের বন্ধু হয়ে যাবার পথে যাওয়াটাও অসম্ভব নয়। বিশেষত ইতোমধ্যেই ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন আওয়াজ ইতোমধ্যেই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং তাতে তালেবানদের ক্ষমতায় ফিরে চলে আসার সম্ভবনা ভারতকে একেবারে অস্থির বেচাইন করে দিয়েছে।
    কারণ মূল সে ঘটনা হল তালেবান  – মানে ১৯৯৬ থেকে আমেরিকার ২০০১ সালে দখলের আগে পর্যন্ত যারা কাবুলের সরকারের ক্ষমতায় ছিল, সেই তালেবানরা। নিঃসন্দেহে সেই আর এই – তালেবানের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা এবার আকাশ-পাতাল ফারাক দেখব বলে আশা করতে পারি।  তবুও তালেবানরা এবার “আগের মত একই তালেবান কি না” (ভারত যেমনটা আগেই প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে) – তবু সেটা বড় ফ্যাক্টর নয়।
    কারণ মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালে আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের হামলার পর পাল্টা আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করেছিল পরের মাসে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। আর এরপরই  জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটোক্ষমতাসহ মোট ১৫ আসনের  সকলে সর্বসম্মতিক্রমে ১৪ নভেম্বর ২০০১, তালেবান শাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা প্রস্তাব ও ভোট দিয়েছিল।  মানে গ্লোবাল রাজনীতিতে রুলিং শাসকেরা সেসময় একেবারেই সদলে  তালেবানের বিরুদ্ধে চলে গেছিল।  অথচ  তুলনায় আজকের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন।  এখন একই পরিষদে আমেরিকান কোনো প্রস্তাব নিয়ে যদি ভোটাভুটি হয় তবে এর বিপক্ষে  অন্তত দু’টা (চীন ও রাশিয়া) ভেটো পড়বে আর বিভক্তি ভোট তো হয়ে যাবেই। অর্থাৎ কোন প্রস্তাব পাসই হবে না। এটাই অনেক বড় ফ্যাক্টর।

    উপরে যে গ্লোবাল পালাবদলের কথা তুলেছি, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুর উপর এরই মধ্যে ছাপ পরে গেছে পুরোদস্তুর। যেমন – গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে ইতোমধ্যেই “আমেরিকা বনাম চীন” এমন দুটো পক্ষের মধ্যে অন্য দেশগুলো কে কোন দিকে সেই পক্ষ-বিপক্ষ প্রতিদিনই আমরা আরো চোখা হয়ে উঠতে দেখছি। গ্লোবাল পালাবদলে ‘আমেরিকা বনাম চীন’ এই পক্ষ-বিপক্ষের ছাপটাই আফগানিস্তানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই মেরুকরণে পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে পেছনে কাজ করছে। যেমন- কে কে আমেরিকার ফেলে যাওয়া পুতুল সরকারের পক্ষে আর কে কে তালেবানের (শর্ত সাপেক্ষে) প্রতি সহানুভূতিশীল – এই দুই ভাগেই প্রতিফলিত হচ্ছে প্রথমটা আমেরিকার পক্ষে আর পরেরটা ‘চীনের পক্ষ’। এদিকটাই এখন প্রধান ফ্যাক্টর।

    তবে আফগানিস্তানের এখনকার সব ঘটনার শুরু যে ২০০১ সালের আমেরিকান হামলা থেকে সেই আমেরিকার এখন প্রধান টার্গেট ও স্বার্থ হল – আফগানিস্তানে আমেরিকার সব অর্থব্যয় এবার বন্ধের ব্যবস্থা করা যা ড্রেনে পড়ছে; আর, এরপর আমেরিকান টার্গেট সেই আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে যাওয়া। তাই, এরপরে তালেবান আক্রমণের মুখে কাবুলের সরকার টিকে থাকতে পারবে কি না সেটা আমেরিকার কাছে সেকেন্ডারি, তার পারলে ভালো  – এরকম। যদিও আমেরিকা তা মুখে স্বীকার করছে না, ভাবে বলছে। ওদিকে আমেরিকার আরেক কোর-স্বার্থ হল, সেনা প্রত্যাহারের পরে, আল-কায়েদার মত গ্লোবাল সশস্ত্র ইসলামি গ্রুপগুলো যেন আফগানিস্তানে্র আশ্রয়ে থেকে অপারেট না করে। আর এটাই তালেবানদের সাথে ট্রাম্প ও বাইডেনের মুখ্য ডিলিং পয়েন্ট, যা অপ্রকাশ্য রাখা আছে। যদিও তালেবানেরা সেই আশ্বাসও দিয়েছে [The Taliban has also assured the US that it would not allow global terrorist groups to operate from Afghanistan.] বলে জানা যাচ্ছে।

    তিনটা আলাদা মিটিং কিন্তু প্রায় সমান্তরালেঃ
    আমেরিকান সেনা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের সময় তেমন আর বেশি নাই, মাত্র আগস্ট মাসটাই। তাই আমরা অস্থির কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেখছি যার মধ্য থেকে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের তিনটা মিটিংয়ের কথা এখানে তুলে ধরব।

    এক.
    সময়ের হিসাবে ধরলে তিন মিটিংয়ের সবশেষেরটা হল ২৮ জুলাইয়ে, ৯ সদস্যের তালেবান প্রতিনিধিদের চীন সফর ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ওয়াং ই-এর [Wang Yi] সাথে বৈঠক।

    আফগান তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার [Mullah Abdul Ghani Baradar] বুধবার চীন সফরে গেছেন, আর সেখানে পৌঁছেই উত্তরাঞ্চলীয় তিয়ানজিং শহরে তিনি বৈঠক করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে।

    বলা যায় ভারত ও সমমনা যারা এতদিন আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের হাতে গত বিশ বছর মাখন খেয়ে গেছে, তাদের জন্য চীন-তালেবান এই বৈঠক এক মহাজুলুনি তৈরি করেছে। সেই ঈর্ষা আর জলুনি কত তীব্র তা দেখা যাচ্ছে বিবিসি বাংলার নিচের এই রিপোর্টে।

    চীন-আফগানিস্তান: ঘনিষ্ঠ হচ্ছে কমিউনিস্ট চীন ও সুন্নী তালেবান, তৈরি হচ্ছে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

    এতে তালেবানদের দিক থেকে এই প্রথম আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের ‘কাউন্টার ওজন’ প্রকাশ করা মানে পাল্টা-পাল্লায় বাটখারার ভার দেখানো হল। আর তাতে চীনের পেছনে রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলো আর (হবু ছয় দেশীয় জোট দেখানোর কারণে) সম্ভবত বাংলাদেশও – তাদের সবাই যে আছে সেই অনুমান ছড়িয়ে দেয়া হল। এরই পাল্টা হিসেবে আমেরিকার বগলে এক ভারত ছাড়া আর কেউ আপাতত দৃশ্যমান নয়। আমেরিকা-ভারতের বিপরীতে তালেবানের এই বাটখারার ভার দেখানো তাৎপর্যময় অবশ্যই। এটা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু মন্তব্যে। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং বলেছেন, তালেবানরা ‘এখন আফগানিস্তানে এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি” [“Wang Yi pointed out, the Afghan Taliban is a crucial military and political force in Afghanistan,” ]।’ আবার রয়টার্স রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীন বলছে, তালেবানদের কাছে চাওয়ার আছে যে, তারা আফগানিস্তানের শান্তি প্রতিষ্ঠায় মিলমিশ ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক!’ [China told a visiting Taliban delegation on Wednesday it expected the insurgent group to play an important role in ending Afghanistan’s war and rebuilding the country,] এই কথায় ভারতসহ সমমনাদের জলুনি উঠলেও বলার কিছু নাই। কারণ চীনের একথা সবচেয়ে ইতিবাচক এক স্টেমমেন্ট।
    এছাড়া আরেক তাতপর্যপুর্ণ দিক আছে। চীনের উইঘুরে (মানে জিনজিয়াং প্রদেশ যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা) ‘পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামী আন্দোলন’ [East Turkestan Islamic Movement বা সংক্ষেপে ETIM] নামে সশস্ত্র সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে বা রুখতে তালেবানরা চীনকে সাহায্য করবে – চীন এই আশাবাদ রেখেছে। ঐ মিটিং শেষে তালেবান মুখপাত্র মোহাম্মদ নাঈম জানিয়েছেন, ‘তারা চীনকে আশ্বস্ত করেছেন, আফগান-ভূমি চীনের বিরুদ্ধে কাউকে ব্যবহার করতে তারা দেবেন না [“(The) delegation assured China that they will not allow anyone to use Afghan soil against China,” Naeem said. ]।’ তালেবানদের আরেক মিডিয়া মুখপাত্র সুহেল শাহীন অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, চীন আফগানিস্তানের অবকাঠামো পুনর্গঠনের ‘welcome friend’  বা ‘স্বাগত-বন্ধু’;  [Taliban spokesman Suhail Shaheen says the group welcomes Chinese investments in reconstruction and would guarantee the safety of investors and workers]।
    সার কথায়, তালেবানেরা সশস্ত্র এবং অ-দায়িত্বশীল এক রাজনৈতিক শক্তি বলে পশ্চিমে ও বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে যে প্রচার আছে বা খারাপ ইমেজ করে রাখা আছে, একালে সেসব কাটানো ও লঘু করার দিক থেকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এই বৈঠক তালেবানদের অনেক সুবিধা দেবে, ইমেজ বাড়াবে।

    দুই.
    আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony J Blinken] ২৭-২৮ জুলাই ভারত সফর করে গেলেন। এক কথায় বললে এটা ছিল আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যু পরিস্থিতিতে বেদিশা ও একা হয়ে পড়া ভারতকে আশ্বাস দিয়ে পিঠ-চাপড়ে দেয়ার সফর।
    প্রথমত, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদী তাঁর অভ্যন্তরীণ জনগণ, কূটনীতিক, একাডেমিশিয়ান ও মিডিয়াকর্মীদের কাছেই আস্থা একেবারে হারিয়েছেন। তারা লেখা শুরু করে দিয়েছেন, “আফগান প্রশ্নে দিল্লি বন্ধুহীন“। অথবা এখানে দেখেন,  Indian experts are wondering why New Delhi has been sidelined in Afghanistan. ।  আর উল্টা পাকিস্তানের ভেতরে আমেরিকা ও রাশিয়া নিজ নিজ স্বার্থের আশ্রয় খুঁজছে। ওদিকে পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার চীন তো আছেই। জয়েন্ট স্টেটমেন্ট দেখেন এখানে  [Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan]।    মনে করা হচ্ছে, ভারতকে বাইরে রেখে মূলত এই ফ্যাক্টসগুলো মিডিয়ায় প্রচার হয়ে পড়াতে মোদি ভীত হয়ে যান। বিজেপির ধারণা, মোদীর ভারতকে ছাড়িয়ে  পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আগামী যেকোনো ভোটে মোদীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। আর সেটা কাউন্টার করতেই ব্লিঙ্কেনকে এনে যেন দেখিয়ে মোদী সবাইকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন। তবে এর ফল তেমন সুখকর হয়নি।

    এর অনেক কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হল, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার স্বার্থের অনেক মিল থাকলেও কিন্তু অমিল-ভিন্নমতও কম নয়। যেমন – ব্লিঙ্কেনের ফিরে যাওয়ার আগে ভারতে মিডিয়ায় সামনে এসেছিলেন তিনি। ততক্ষণে চীন-তালেবান মিটিংয়ের রিপোর্ট মিডিয়ায় এসে গেছে। তাই, তালেবানের চীন সফরের সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে এর জবাব দিতে গিয়ে ব্লিঙ্কেন প্রকারান্তরে চীনের প্রশংসা করে বসেন।

    Asked about the Taliban visit, U.S. Secretary of State Antony Blinken said in New Delhi that it was a “positive thing” if Beijing was promoting a peaceful resolution to the war and “some kind of (Afghan) government … that’s truly representative and inclusive.”

    বলেন, এই ‘সফরটা ইতিবাচক’। চীন যদি যুদ্ধাবস্থায় এক শান্তিপূর্ণ প্রস্তাব ও আফগানিস্তানে কোনো ধরনের সরকারের কথা বলে যা সত্যিই সবাইকে নিয়ে এবং প্রতিনিধিত্বমূলক তবে তা তো ইতিবাচক”। এখন ব্লিঙ্কেনের পক্ষ থেকে চীনের এই পরোক্ষ প্রশংসা তো মোদীর জন্য হজম করা খুবই মুশকিল। এই হল, আমেরিকা ও ভারতের স্বার্থের বেমিল। ওদিকে ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীর সবচেয়ে বড় অনাস্থা হলো – আফগানিস্তানে যার যার স্বার্থ আছে সে মোতাবেক সংশ্লিষ্ট এমন সবাই ইতোমধ্যে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তালেবানদের সাথে কয়েকবার বৈঠক এবং আলোচনা, বুঝাবুঝি বা সমঝোতা করে নিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইরান মূলত কেউ বাকি নেই এদিক দিয়ে। অথচ ভারত এই পথেই নেই। এটাতে মূলত ভারতের আভ্যন্তরীণ ইন্টেলেজেন্সিয়া  তারা অসন্তুষ্ট ও হতাশ। ভারত কেবল গোপনে একবার তালেবানদের সাথে দেখা করেছে যা আবার প্রকাশ্যে অস্বীকার করে থাকে। আর পাকিস্তান তালেবানদের নাকি ভারতের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করছে বা উসকাচ্ছে বলে ডাহা মিথ্যা এমন প্রপাগান্ডায় ভারত লিপ্ত হয়ে গেছে। অতীতে তালেবানরা কী কী খারাপ কাজ করেছে এর বর্ণনা দিয়ে ভারত এখন প্রচার শুরু করেছে। অথচ ভারতের এক মিডিয়া-মুঘল দা-প্রিন্ট পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্তা লিখেছেন ……

    “Like them or not, Taliban are a reality. India can deal with them if BJP resets its politics…”

    অর্থাৎ তিনি উলটা বিজেপি-আরএসএস কে তালেবান-বাস্তবতা মানতে বলেই থামেন নাই। উলটা পরামর্শ রেখে বলেছেন, মোদীর খোদ নিজেদের রাজনীতিই বদলে নিতে। আসলে একেবারেই কোন সঠিক পলিসিতে মোদীর ভারত নাই বলেই ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীদের প্রধান অনাস্থা। এছাড়া আরো ভেতরের খবর হল, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মুডে আছে।  খবরটা দিয়েছেন আফগানিস্তানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদুত বিবেক কাতজু। লিখেছেন,

    Indian policymakers had looked at the Afghan scene dispassionately especially after the US began talking to the Taliban in Doha in 2018. What is strange is that even after the US-Taliban deal in February 2020, Indian strategists, instead of making up for lost time, continued to ignore emerging realities.
    Stranger still, Kabul-based senior political personalities, who have recently interacted with the Indian leadership, say that India continues to have a “wait and watch” approach. What they are leaving unsaid is that India has become a bystander in Afghanistan, not knowing which way to turn.
    Some analysts are railing against countries which are engaging the Taliban. They believe that these countries will pay a price for not understanding the true nature of the group.

    অর্থাৎ ভারত কোন প্রস্তুতিই নেয়নি তাই নয়। শেষের বাক্যটা বলছে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে।  তাই আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত কোনোই প্রস্তুতি নেয়নি। কারণ ভারতের ধারণা- তালেবানরা পরাজিত হবে, হারিয়ে যাবে। আর বর্তমান সরকারই থাকবে যা আসলে অনিশ্চিত জেনেও ভারত আমেরিকার ভরসায় বসে থাকতেই চায়। কিন্তু সে দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরেই সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে আমেরিকার চাওয়া আর ভারতের চাওয়াও তো এক নয়।

    তবে ব্লিঙ্কেনের এবারের সফর শেষের পর থেকে, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া হুমকি ও আক্রমণ শুরু করেছে। দিল্লি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নতুন মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে বলিয়েছে, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে জানাচ্ছে যে, সারা কাশ্মিরই ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মির ভারতেরই ভূমি – যেটা নাকি পাকিস্তানের দখল করে থাকা। তাই পাকিস্তান-কাশ্মিরের কিছু অংশের ওপর দিয়ে চীন-পাকিস্তানের করিডোর [CPEC] নির্মাণ করা হয়েছে সেটা ‘তথাকথিত’  করিড়োর সহ সব অবৈধ দখল ছেড়ে যেন পাকিস্তান চলে যায় সেই কড়া আহ্বান রেখেছে ভারত [“We call upon Pakistan to vacate all Indian areas under its illegal occupation,” ]।

    একই সাথে তালেবানদের চীনে গিয়ে মিটিং করার বিরুদ্ধে ভারত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে [India Thursday also reacted against Taliban leaders visiting China and meeting the country’s leaders there]। আর সবশেষে, ‘আফগানিস্তানে গায়ের জোরে কোনো সরকার কায়েমের বিরুদ্ধে’ মানে, তালেবানদের কাবুলের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে [“Unilateral imposition of will by any party will not be democratic…..] ভারতের আপত্তির কথা জানিয়েছে। তবে এসব হুঙ্কার মোদীর ভারত মূলত তার অভ্যন্তরীণ জনমত যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনুমান, তাকে ফিরানোর লক্ষ্যের বলা হয়েছে বলে দেখেছেন অনেকে। কিন্তু আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিবেক কাটজু; তিনি খুবই কড়াভাবে মোদি-জয়শঙ্করের নীতি পলিসিকে তুলোধোনা করে হিন্দুস্তান টাইমসে কলাম লিখেছেন।

    তিন.
    এটা হল – গত ২৫ জুলাইয়ে চীন-আমেরিকার নিজস্ব সম্পর্ক প্রসঙ্গে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক। বাইডেন জানুয়ারিতে মার্কিন ক্ষমতায় শপথ নেয়ার পরে মার্চের ১৮-১৯ তারিখে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দু’পক্ষের প্রতিনিধির বৈঠক হয়েছিল যা খুবই তিক্ততা দিয়ে শেষ হয়েছিল। এবারের মিটিংটাকে এক দিক থেকে এরই পরবর্তি ও পাল্টা সফর বলে মনে করছেন অনেকে [Why Tianjin? And what’s in store in China for US envoy Wendy Sherman?]। বিশেষত আগের মিটিংটা হয়েছিল আমেরিকার রাজধানীর বাইরে দেশের উত্তরের আলাস্কা শহরে। আর এবারের আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সাথে বৈঠকটা দেয়া হয়েছিল বেজিংয়ের বাইরে তিয়ানজিং শহরে যেটা আসলে চীনা-আফগান সীমান্তের এক শহর।
    এবারের এই মিটিংয়ের সার কথা ছিল, নিজেদের মধ্যে যত মনোমালিন্যই থাকুক যুদ্ধ তারা কেউ চায় না- এ কথাটা প্রকাশ করে রাখা। যেমন- এই মিটিংয়ের পরে আমেরিকা মিডিয়াকে জানিয়েছে, তাদের সম্পর্ক খুবই ‘টাফ কম্পিটিশনের’[stiff competition]। তবে একই নিঃশ্বাসে তারা জানিয়েছে যে, ‘আমেরিকা চীনের সাথে যুদ্ধ-সঙ্ঘাত চায় না’ [Price said that in her meeting with Wang, Sherman vowed “stiff competition” with China but also stressed that the US “[did] not seek conflict” with Beijing.] এবং আমেরিকা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতেই থাকবে। এর পাল্টা চীন বলেছে, ‘তিনটা জিনিস দেখতে চাই আমরা।’ [three demands with the second-ranking US diplomat: the United States must not challenge or seek to subvert China’s model of governance; it must not interfere in China’s development; and it must not violate China’s sovereignty or harm its territorial integrity.] আমেরিকা আমাদের মডেলের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা বলবে না; চীনা পথের উন্নতি নিয়ে তারা কোনো কথা বলবে না। আর হংকং ও তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। ফলে আমেরিকা যেন চীনের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে, এ নিয়ে মন্তব্য করতে না আসে। তবে উভয়পক্ষই পারস্পরিক ডায়ালগ চালিয়ে যেতে চায় বলে জানায়। এক কথায়, না চাইতে কোনো যুদ্ধের শঙ্কা যেন কোনো পক্ষের মনে কাজ না করে তা আগেই মিটিয়ে রাখার মেসেজ তারা আদান-প্রদান করে রাখল।

                                        ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের  মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি

    কেন এমনটা হল?
    এর কিছুটা হদিস আমরা পাই ভারতের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মনের চরম ক্ষোভ উপচিয়ে প্রকাশ করা বিবৃতি থেকে। এরপর এ নিয়ে ভারতের সামরিক ইন্টেলিজেন্সিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকে। যেমন পারভিন শাওনি [@PravinSawhney] নামে এক সাবেক মেজর যিনি একটা ‘ডিফেন্স ম্যাগাজিন’ চালান ও এর সম্পাদক। তিনি টুইট করে লিখেছেন ‘মোদি একেকটা অর্থহীন মন্তব্য করে  যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার দিকে ভারতকে নিয়ে যাচছে – যা তিনি কখনো জিততেই পারবেন না, আর এই যুদ্ধ তো এড়ানোযোগ্য!’ [With each mindless remark, India is heading towards war – which it cannot win & is avoidable. ] এ ছাড়াও লিখছেন, এটা ‘মোদির দুর্ভাগ্য যে, তার টপ সামরিক জেনারেল রাওয়াত; অগ্রসর সামরিক ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই!’ [Modi’s misfortune is have Rawat as the top military officer who knows nothing about advances in warfare!]

    শেষ দুটা পয়েন্টঃ
    আর একমাস পরে আফগানিস্তানে তালেবানদেরকে আমরা কোন ভুমিকায় দেখব? এর সম্ভাব্য দুটা অবস্থান হতে পারে। গত ২০ বছর ধরে তালিবানেরা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে যা থেকে কী করা যাবে আর কীনা – এসম্পর্কে তারা অনেক ওয়াকেবহাল অবস্থায় এখন তা আমরা অনুমান করতে পারি।।

    আমরা পছন্দ করি আর নাই করি এপর্যন্ত দুনিয়া যে জায়গা পর্যন্ত পথ-পরিক্রম করে এসেছে তাতে গ্লোবাল রাজনীতির কিছু ভ্যালুজ তারা তৈরি ও প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা বলছি না সেগুলা সব আদর্শ অথবা দুনিয়ার সকল জনগোষ্ঠিরই স্বার্থ ও কালচারকে তা প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তালেবানেরা যদি আউট-রাইট সেগুলোর বিরোধিতা করে নিজেদের সব ভ্যালুজ নিয়ে চলতে চায় বা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে এটা আগের মতই ব্যর্থ হবে তা বলাই বাহুল্য। এটা হল কো খেলার নিয়ম বদলানোর মত সমস্যা। আপনি গ্যালারিতে বসে থেকে খেলার নিয়ম বদলাতে পারবেন না। বরং প্রথমত তাদের নিয়মেই খেলতে নামতেই হবে। এরপর খেলতে খেলতে খেলার নিয়ম বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে।

    কাজেই একটা পথ হল তালিবানেরা দুনিয়ায় উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতির নিয়ম – পুরান খেলার নিয়ম মেনেই খেলতে নেমে পড়া। এতে সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হবে দায়ীত্বশীল রাষ্ট্রের আচরণ করা। বড়জোর এর সাথে নিজেদের যেসব ভ্যালুজ আছে কোথাও কোথাও এর প্রদর্শনে নেমে পড়া। তবে  আগে ইমেজ তৈরি এদিকটা খেয়াল রাখতে হবে।
    আর যেকথা মনে রাখতেই হবে তা হল,  যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের সরকারি নানান বাহিনীই কেবল থাকবে। কিন্তু  একই সাথে ঐ দেশ আবার পাশাপাশি কোন সশস্ত্র গ্রুপকেও অপারেট করতে দিতে পারে না।  এক ঘরে দুই পীর হয় না। অথরিটি একজনই বা একটাই হয়।  তবে সাবধান এসব কিছু শুরু হতে পারে আগে দেশে একটা বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল করে নিবার পরেই। কারণ ক্ষমতা দখলের পরেই কেবল একটা কনষ্টিটিউশন আর ওর নানান নিয়ম, আইন-কানুন  তৈরি হতে পারে। এটাই হতে পারে দায়ীত্বশীল পথ। এবার এই পথের সফলতার সম্ভাবনা প্রচুর। প্রধান কারণ  এবার গ্লোবাল রাজনৈতিক শক্তির একটা সফল অংশ তালিবানের পক্ষে আছে।

    অন্যদিকে আরেকটা পথ হল, আগের (১৯৯৬-২০০১) বারের মত করে মাঠে নেমে পড়া। যারা গ্লোবাল ইসলামি রাজনীতির সমর্থক তাদের দৃষ্টিতে  হয়ত এটাই সম্ভবত সঠিক পথ। হতে পারে।  তবে এই পথটা আগের বারের মত আপাতত ব্যর্থ হবে, ছিটকে পড়বে। টিকতে পারবে না। এখন যে যেটা পথ পছন্দ করে সে তো সেই দিকটাকেই সহি পথ বলবে!
    তবু মুলকথাটা হল, আসলে আমরা যে যেই রাজনীতিই কোন দেশে করতে চাই না কেন –  একেবারেই নতুন বা পুরানা ধারা – এসব কিছুর বাইরে  মূল ফ্যাক্টর হল উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতিতে ও শক্তিতে যারা ক্ষমতাবান থাকে তারা আপনাকে কী চোখে দেখবে! আমরা এটা উপেক্ষা করতে পারি না!
    তবু, তালিবানেরা শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নিবে সেটা দেখার অপেক্ষা করতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩১ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “তালেবান ইস্যু ও তিন মিটিং“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে

    কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে
    মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২১, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Ca

    Imageমোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    [সারকথাঃ  “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”
    গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন।  তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে  এই ফাঁপা ডায়লগ চালু  করেছিলেন   “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ  লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত   “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!  
    বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও  নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।
    বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর  এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল।  এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!
    কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।
    কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত।  হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে  – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন  কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।
    আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে।  সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে।  মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে। কেন?
    লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি।  বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!]

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    শুরুর কথাঃ
    আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

    দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

    কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

    আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

    আমেরিকায়  নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

    সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল।  ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল –  কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি  ক্ষুব্ধ  জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে  এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায়  রওনা দিয়েছিল।  কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় –    ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এপ্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর  একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

    কাশ্মির প্রসঙ্গে  শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো  কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

    ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে  [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir]  – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

    ‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন  কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

    আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে,  উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক  কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি  ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী]  বিরাট এক   আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

    আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার  লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট  মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

    আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে!  মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন!  সেরকম? কেন এমন বলছি?

    সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা- এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

    Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

    এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড  ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

    বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না।  পাকিস্তান বা তালেবানদের  আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

    এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

    ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে  ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে  এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল।  নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই।  সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই –  এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

    অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ]  এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস।  এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

    এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে।  অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

    তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার  মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে,  ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

    অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ 
    অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন।  যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন?  কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন।  আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক।      কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

    কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

    অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

    ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

    সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “হিন্দুত্ববাদই কি মোদির প্রধান শত্রু হবে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    গৌতম দাস

    ০৭ জুন ২০২১, ২০:০৭, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3zY

    Modi Vs Mamota in the light of Center Vs State conflict

    নেহরুভিয়ান বা নেহেরু স্টাইলের ভারত গড়তে গিয়ে এটা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন করে ভারত-রাষ্ট্রের এসব গুপ্ত-হস্তক্ষেপ ব্যবস্থাদি এখন আবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কলকাতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২ মে, মানে এক মাসেরও আগে এবং তাতে তৃণমূল কংগ্রেস দলের মমতা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছেন। মানে আবার মমতা ব্যানার্জি সরকার গড়বেন এবং গড়েছেনও। অথচ এই নির্বাচনে প্রচণ্ড মিথ্যা আশ্বাস জড়ো করে ফেলা হয়েছিল যে, মোদীর বিজেপি বিজয়ী হচ্ছেই; এই প্রপাগান্ডা এখন আত্মঘাতী অবস্থায়। তাই বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মানসিক জোর ধরে রাখার জন্য, মিথ্যা উচ্ছ্বাস জীবিত রাখতে গিয়ে প্রতি পদে পদে এখন “কেন্দ্র বনাম রাজ্য” – এভাবে মোদী-মমতা মুখোমুখি সংঘাত জোরদার করে তুলতে চাইছেন মোদী।

    ভারতের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতঃ
    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ভারতের জন্মের সমান বয়সী এক মারাত্মক ক্ষত। এটা মূলত নেহেরু-স্টাইলে চিন্তার পরিণতি।  এই চিন্তার মূল বৈশিষ্ট হল, কলোনিদখলদার বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও (তাদের শাসনের প্রধান রাজ/রানীর প্রতিনিধিকে ভাইসরয় বলা হত)  নেহেরু নিজেকে এক “ভাইসরয়-ই” মনে করতেন।  যা তাঁর কাজ ও ততপরতার মধ্যে বিশেষত খোদ ভারত-রাষ্ট্র কাঠামোটাই এর সবচেয়ে বড় স্পষ্ট প্রমাণ।  অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পরের ভারতের জনগণের সাথে নেহেরু নিজের সম্পর্কটা কী এই প্রশ্নে নিজেকে এক কলোনিদখলদারের মত করেই ভবেবে নিয়ে দেখেছেন।  অর্থাৎ “জনপ্রতিনিধি” শব্দ ও এই মৌলিক ধারণাটাই তিনি আমল করতে চান নাই। ফলে একটা “রিপাবলিক” রাষ্ট্রের মূলকথাটাই তাঁর কখনই জানা হয়ে উঠে নাই। বিপরীতে তার ত্রুটিপুর্ণ চিন্তার মৌলিক দিকটা হল, হবু ভারত-রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা কথিত এক কেন্দ্রের নামে ও এর হাতে কুক্ষিগত করা যায় কী করে সেদিকে সচেষ্ট থেকেই কলোনি-উত্তর ভারতের জন্ম দিয়েছেন; কনষ্টিটিউশন লিখিয়েছেন। এটাকেই আমরা নেহেরুভিয়ান চিন্তা বা নেহেরু-স্টাইলে চিন্তা বলছি। যাকে প্রতীকীভাবে সময়ে নেহেরুর “ভাইসরয়”-চিন্তাও বলেছি।
    কাজেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত – এটা আসলে ভারতের রাষ্ট্রগঠনের জন্মগত এক মারাত্মক ত্রুটি। ফলে এককথায় (ফেডারল এক ভারত করে)  এর পুনর্জন্ম বা ভেঙ্গে-গড়া যার একমাত্র সমাধান।  কিন্তু ভারত-রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলে সেটা আবার পুনঃর্গঠনের মুরোদ যদি ভারতের রাজনীতিবিদ-ইন্টেলেজেন্সিয়ার থাকে (যার আলামত এখন পর্যন্ত নাই) তবেই এ’থেকে ভারত মুক্ত হতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। নইলে আস্তে আস্তে এটা ব্ল্যাক-হোলের গর্তে হারিয়ে যাবার মত এক ঘটনা হবে। মানে এককালের যুগশ্লোভিয়া, চেকোশ্লোভিয়া অথবা খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন বলে রাষ্ট্র থাকলেও তাদের ভেঙ্গে যাওয়া বা আজ নাই হয়ে যাবার মত আরেক ঘটনা হবে এটা। কথিত একটা কেন্দ্রের নামে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইলে পরিণতি এটাই তো হবার কথা!

    এ অবস্থায় আরেকটু ভেঙ্গে বললে ভারত-রাষ্ট্রে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ, এই জিনিসটা কী আসলে? যদিও এই প্রশ্নটাই এখন মোদীর কারণে সর্বত্র সরব হয়ে উঠেছে। এখন যেটা মোদী-মমতা বলা হচ্ছে এটাই কয়েক বছর আগে উঠেছিল রাজ্য-দিল্লিতে, মোদী-কেজরিলাল নামে।  আর তা এবার কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও ক্রমে ছড়াচ্ছে। সবাই কান-খাড়া করে উঠতে চাইছে।

    ফেডারেল মানে কী বুঝবঃ
    ফেডারেল [Federal] শব্দটা ইংরেজি। এর একটা বাংলা অনেকে করে থাকেন ‘যুক্তরাষ্ট্রীয়’ বলে। যেমন অনেকে লিখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইংরাজি United States of America (USA) এর বাংলা হিসাবে।  ফেডারেল রাষ্ট্র ধারণাটা যদি রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমিত থাকে তাহলে হয়ত এমন বাংলা দিয়ে চলতে পারে হয়ত। যদিও এটা ভাল বাংলা নয়। কারণ ফেডারেল শব্দের সাধারণ অর্থ হল, স্বাধীন ও সমতুল্যদের মধ্যে এবং তাদের নিয়ে গড়া এক  এসোসিয়েশন। যেমন স্বাধীন ফুটবল ক্লাবগুলোকে নিয়ে গড়া এক ফুটবলের ফেডারেল এসোসিয়েশন বা ফেডারেশন। অথবা স্বাধীন গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক ফেডারেশন। অথবা সবধরনের স্বাধীন ট্রেডের  এসোসিয়েশনগুলোরও আবার এক ফেডারেশন। লক্ষ্য করেন, এখানে কিন্তু ফেডারেশন বা ফেডারেল ধারণার ব্যবহার কোনো রাষ্ট্র-বিষয়ক ব্যাপারে নয়। তাই ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় শব্দটা এখানে কোনোভাবেই যুতসই তো নয়ই; সোজা কথা তা খাটবে না, অচল। তাই এ লেখায় ফেডারেল শব্দের কোনো বাংলা না করেই তা সরাসরি ব্যবহার করব।

    আর ফেডারল শব্দটা আমাদের মানুষের কাছে তাদের নজর ও নাগালে এসেছিল অন্তত দুবার। প্রথমবার ১৯২৮ সালে যখন মুসলিম লীর নেতা জিন্নাহ নেহেরুকে আগামি ভারত (যেটা এখন ভারত ও পাকিস্তান হয়ে গেছে)  স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যগুলোর একটা ফেডারল ভারত করা হোক বলে প্রস্তাব করেছিলেন। আর স্বভাবতই আমরা উপরে দেখেছি নেহেরু-স্টাইল ছিল ঠিক এর উলটা, তাই তা প্রত্যাখ্যাত বা পত্রপাঠ বিদায় হয়েছিল। আর দ্বিতীয়বার আমরা শুনেছিলাম ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বদলে খন্দকার মোস্তাক পাকিস্তানের সঙ্গে এক কন-ফেডারেশন গড়তে চেয়েছিলেন বা সে লক্ষ্যে কিছু চেষ্টা করেছিলেন।

    তাহলে এখন কেবল রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো ধারণা হিসেবে যদি বলি, এটা একটা ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ বলতে যেমন বললাম, আমেরিকা একটা ফেডারেল রাষ্ট্র, তাহলে কী বুঝব?

    সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, এটা ৫০টা স্বাধীন ও সমতুল্য স্টেটের সমর্থনে গঠিত একটা ফেডারেল রাষ্ট্র অবশ্যই; তবে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগেই সেগুলো স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং আছে বলে তাদের নিয়ে গঠিত এই বিশেষ ধরনের এসোসিয়েশন বা রাষ্ট্রটাকে ফেডারেল রাষ্ট্র বলা হচ্ছে।

    তাহলে এখন এক সম্পূরক প্রশ্ন তোলা যাক। তাই, ভারতও কী একটা ফেডারেল রাষ্ট্র? কারণ ভারতেও তো বর্তমানে ২৮টা ছোট-বড় রাজ্য আছে বা নিয়ে গঠিত?

    না, একেবারেই তা নয়। ভারত কোনো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; যদিও কেন নয় তা যথেষ্ট না জেনে বুঝেই অনেকে পত্রিকা রিপোর্টে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের বিরোধের ইস্যু হলেই তাকে ‘ফেডারেল’ সমস্যা বলে যেচে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি জাহির করতে চায় অনেক রিপোর্টার। মানে শব্দটা তারা শুনেছে যেন সেটা বুঝাতে চায়। কিন্তু কথাটা সবচেয়ে বেখেয়ালে বলে ফেললেও ভারত কোনোভাবেই ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ নয়। আর মূলকথাটা হল, একটা রাষ্ট্রের ভিতরে  অনেকগুলো প্রদেশ বা রাজ্য থাকা মানেই সেটা একটা ফেডারল রাষ্ট্র – এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন ও বাজে কথা।

    কিন্তু কেন? ফেডারল বুঝতে এত কঠোর সীমারেখা টানছি কেন?
    ফেডারল কথাটা আমরা বুঝতে পারি আমেরিকার জন্মের ইতিহাস দিয়ে এবং সম্ভবত তাতে সবটা সহজে বোঝা যাবে। খুব অল্প কথায় বললে আজকের “ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র” এটা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্ম নিয়েছিল। আজ পর্যন্ত এটাই দুনিয়াতে ফেডারল রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ।  আর এর আগের (১৭৭৬ সালের আগের) কলোনিয়াল আমেরিকা [American colonies] বলতে তা ব্রিটিশসহ ইউরোপের বহু রাষ্ট্রেরই  কলোনিদখল ব্যবসায়ী কোম্পানির মালিকানাধীন ছোট ছোট কলোনি বা দখলকৃত ভূমি হিসেবে ছিল। আর ঐ দখলকৃত ভূমিগুলো আবার ব্রিটিশসহ নানান ইউরোপীয় দখলদাররা নিজ নিজ দেশ থেকে ‘বিনা পয়সায় জমি দেয়া হবে, শুরুর বিনিয়োগ দেয়া হবে’ ইত্যাদি নানা প্রলোভনের কথা বলে গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দাদের মাইগ্রেট করে জাহাজে ভরে ভরে এককালে আমেরিকায় এনেছিল।

    এসব গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দারাই জমি পাওয়ার লোভে মাইগ্রেট করে আমেরিকায় এসেছিল।  এরপর এরাই স্থানীয় আদি বা নেটিভ বাসিন্দাদেরকে (‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলে এরা ডাকত যাদের) খেদিয়ে দিয়েছিল, কখনো মেরে ফেলা হয়েছিল অথবা আরো গহিন বন জঙ্গলে পালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এভাবেই সাদা চামড়ার কলোনি মালিকরা সাদা ইউরোপীয় গরীব মাইগ্রেন্টদের এনে বসতি স্থাপনে বিভিন্ন ছোট শহর বা রাজের আমেরিকা কলোনি স্থাপন সম্পন্ন করেছিল। এই প্রথম পর্বের পরে মালিকরা এরপর সেখানে নিয়ে আসে আফ্রিকানদেরকে ‘কালো দাস’ নামে, একইভাবে মাইগ্রেট করিয়ে। তফাত খালি এরা পায়ে শিকল পরানো দাস হিসেবে এসেছিল এবং তা আফ্রিকা থেকে। আর এই দাসদেরকেই পরিচালনা করত সাদা মাইগ্রেন্টরা তবে সাদা মালিকদের পক্ষ থেকে। আর রাশিয়ান সোভিয়েত শ্রমশিবিরের চেয়েও ভয়াবহভাবে শিকলে বাঁধা দাসশ্রমিক হিসেবে। তবু যতই দিন গেছে, আর কালো মানুষেরা যত “পোষ” মেনেছে, ততই শিকল আলগা করে দিয়েছে শাসকেরা।

    ওদিকে ব্রিটিশরা ভারতে কলোনি দখল ও শাসন শুরু করেছিল – আমেরিকার কলোনিমুক্ত বা স্বাধীন হওয়ার মাত্র কুড়ি বছর আগেই। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের পায়ে শিকল না দিলেও কলোনির হুকুম ও বাধ্যবাধকতার ভেতরে রেখেছিল যা আমাদের প্রায়ই অসহ্য হয়ে উঠলে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটত। কিন্তু আমেরিকার বেলায় নানান শহর ও রাজ্যের সাদা মাইগ্রেন্টরাই এক সময় তাদেরই মাস্টার বা সাদা মালিকদের শাসনের বিরুদ্ধে শুধু বিদ্রোহ নয় একবারে বিপ্লব – মানে পাল্টা ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এটাই আমেরিকান কলোনিতে ‘নয়া আমেরিকান বিপ্লব’ [American Revolution] নামে পরিচিত, যার সময়কাল ১৭৭৬ সালের আশপাশের সময়। সোজা কথা, ব্রিটেনে বসে কলোনি ব্যবসায়ী মালিকরা আমেরিকায় তাদের নানা শহর বা রাজ্যের কলোনিগুলো সাদা ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের দিয়ে পরিচালনা করবে, এই সুযোগেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে। এরপর স্বাধীন সেসব শহর ও কোথাও পুরা রাজ্যটাই স্বাধীন হয়ে যায়। এবং এবার তারা একত্রে হওয়ার জন্য সম্মিলিত হয়ে বসেছিল; যেটাকে তারা আমেরিকা মহাদেশীয় সম্মেলন (আমেরিকান কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস ১৭৭৫) নামে ডাকে। Continental-Congress  বসা ছিল খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। এরপর পরের বছর ১৭৭৬ সালে এক ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্রে তারা সম্মিলিতভাবে গঠিত হয় ও এর স্বাধীনতার ঘোষণা [Declaration of Independence (1776)] দেয়।

    ফেডারল ধারণা বুঝবার জন্য এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও লক্ষণীয় যে, এখানে শহর বা রাজ্যগুলো আগে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত হয়েছিল। এরপরে  এই স্বাধীন রাজ্যগুলো একটা রাষ্ট্রে ফেডারেটেড [Federated] ভাবে একত্র হতে এসেছিল। এটাই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্মের ঘোষণা দেয়া আজকের ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র ও এর বৈশিষ্ট্য। তবে আজকের ৫০ রাজ্যের আমেরিকা যা আমরা দেখছি তা অবশ্য শুরুতে এমন ছিল না। শুরুতে মাত্র ১৩টা স্বাধীন রাজ্য কনফেডারেশনে এ ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে সম্মতি দিয়েছিল। কেন? কারণ সদ্য স্বাধীন কলোনিমুক্ত রাজ্যগুলোর  সবার মনে ভয় ছিল নতুন এই ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে গিয়ে আবার আগের মত কোনো রাজ্য আরেক রাজ্যের ওপর কলোনির মতো আচরণ শুরু করে কি না – সেটাই সবাই আগে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। তাই দ্বিধা ও দেরি। যেমন শুরুতে ফেডারল আমেরিকার কোন একক কারেন্সি বা ডলার মুদ্রা ছিল না। এমনকি এক রাজ্যের মুদ্রা আরেক রাজ্যে চলত না। প্রত্যেক রাজ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের আলাদা আলাদা ছাপানো কারেন্সি ছিল। প্রথম স রাজ্যীর সব ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা কো-অর্ডিনেশনের জন্য ফেডারল রিজার্ভ ব্যাংক (একালের তুলনীয় আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক ) গঠন করা হয়েছিল এই ১৯১৩ সালে।  এরপর ১৯১৫ সালে প্রথম ফেড-এর ইস্যুকৃত বাজারে আসে। তাই তা কেবল ৫,১০ আর ২০ ডলারের। তাই ধীরে ধীরে যত আস্থা এসেছে ততই ফেডারল আইনকানুন কী তৈরি হচ্ছে সেগুলো এবং গঠনতন্ত্র কী রাখা হচ্ছে, কাঠামো কী ইত্যাদি দেখে আর কিছুটা প্র্যাকটিসে নিশ্চিত হওয়ার পরে ১৩ রাজ্য থেকে সেটা আজ ৫০ রাজ্যের আমেরিকা উঠে এসেছে। কাজেই ফেডারল ধারণার গোড়ার ধারণা হল, আগে নিজে স্বাধীন থাকা পরে ফেডারল বা এক ফেডারেশনের ছাতার নিচে আসা। নইলে বের হয়ে যেন যেতে পারে – এমন সুযোগ ও বের হয়ে যাবার রাস্তা খুলে রাখা থাকা চাই।

    নেহেরুর কেন্দ্র-রাজ্যের ভারতঃ
    তাহলে এখন আসেন ১৯৪৭ সালে, নেহরুর গঠিত ভারত সেও তো এমন ২৮-২৯টা রাজ্যে এবং এরা কি প্রত্যেকে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত রাজ্য ছিল? না, একেবারেই নয়। বরং কথিত ভারত বলে একটা বিরাট ভূখণ্ড ছিল বলে ধরে নেয়া হয়েছিল আর যেটাই ব্রিটিশ শেষ ভাইসরয় (রানীর প্রতিনিধি) মাউন্টব্যাটেন নেহরুর হাতে ১৫ আগষ্ট তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো কোন কোন ভূখণ্ড? এক কথায় বললে, কেবল যেগুলোর প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে তৈরি ও পরিচালিত হত। অর্থাৎ তিন প্রেসিডেন্সি (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বাই) ও প্রায় ১৮টা প্রদেশ। আর এর বাইরে ছোটবড় মিলিয়ে ৫৫০ এরও বেশি করদ রাজার রাজ্য ছিল। কিন্তু এগুলো নেহরুকে হস্তান্তরের প্রশ্নই ছিল না।

    কারণ এগুলো ছিল ব্রিটিশ শাসনক্ষমতার অধীনস্থ এবং শর্ত সাপেক্ষ মানে, রাজারা বৃটিশ শাসনক্ষমতার সাথে তাদের আদায়কৃত রাজস্বের একাংশ শেয়ার করতেন। কাজেই ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেলে ওসব করদ রাজ্য তখন থেকে আবার ফিরে স্বাধীন রাজার রাজ্য হয়ে যায়। আর তাতে, নেহরুর কাছে করদ রাজ্যগুলোকে আর হস্তান্তরের কোনো আইনি অধিকার ব্রিটিশ শাসকের ছিল না।

    কাজেই নেহরু যে দুশ্চিন্তায় ‘পাগল’ ছিলেন তা হল, প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ ও পুরানা করদ রাজ – এদের সবগুলোকে পিটিয়ে জবরদস্তি করে হলেও, সেনাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও – কথিত এক ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া যায় কী করে! এই হলো জন্মের সময়কালের নেহরুর ভারত। সে কারণে নেহরুর নিজের ভারতের রাজ্যগুলোর জনগণের প্রতি অ্যাটিচ্যুড যেন ভারত কলোনিমুক্ত হলেও তিনি তখনও এক কলোনি ভাইসরয়! যেন নিজেই রাজা বা রানী অথবা প্রধান রাজ-প্রতিনিধি।

    অর্থাৎ উল্টা করে বললে ২৮-২৯ টা রাজ্যে এরা যতই স্বাধীন ততই তা নেহরুর মাথা ব্যথার কারণ। সার কথায়, আমেরিকার মত স্বাধীন রাজ্যগুলো স্বেচ্ছায় যুক্ত হচ্ছে, এমন কোনো ভারত-রাষ্ট্রে তারা সংযুক্ত হয়নি। আর আসলে যে কনসেপ্টটা কাজ করেছে সেখানে যে, মাউন্টব্যাটেন নেহরুকে ভারত বলে কিছু একটা দিয়ে গেছেন; অতএব সে কারণেই ভারতের রাজ্যগুলো স্বাধীন নয়, এমনকি পুরানা করদ রাজ্যগুলোও স্বাধীন নয়  – জবরদস্তিতে করার এই অনুমানটাই বাস্তবায়ন করেছেন নেহরু। আর সেকালে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে এভাবে। এই রাষ্ট্র তাই নিজেই নিজেকে কখনো অন্তত কনষ্টিটিউশনে  “ফেডারেল” বলে ব্যাখ্যা করতে বা তুলে ধরতে যায় নাই। তাহলে ভারত কী? এই হলো ভুতুড়ে ভারত ও তার জন্ম!

    এখন এই ভূতুড়ে ভারতটা কে? অনেক সময় মনে হবে এটা বোধহয় ‘উত্তর প্রদেশ’ রাজ্য। কেন? কারণ এর এলাহাবাদ শহরে নেহরুরা বাস করতেন। তার বাবা মতিলাল নেহেরু ওকালতি প্র্যাকটিস করতে কাছের বড় শহর হিসেবে (কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ তিনি) এলাহাবাদে এসেছিলেন।

    [ইলাহাবাদের শহরের সব পুরানা চিহ্ন শেষ করে দিলেও এখনও এটা বড় শহর। যদিও এর নাম বদলে “প্রয়াগরাজ” [Prayagraj] রাখা হয়েছে মোদীর দলের হাতে ২০১৮ সালে।  কিন্তু এখনও উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সর্বোচ্চ কোর্ট, হাইকোর্টটা  “এলাহাবাদ হাইকোর্ট” নামেই ইলাহাবাদ শহরে থেকেই গেছে।]

    এখন তাহলে এই উত্তর প্রদেশ নামক এই রাজ্য কী ভারতের বাকি সব রাজ্যের ওপর শাসনকর্তৃত্বের কর্তা? কিন্তু সে ক্ষেত্রেও এই শাসনের ভিত্তি কী, ক্ষমতার উৎস কী,  সে প্রশ্ন থাকবে। যার উত্তর কেউ জানে না। তাই এটা ভূতুড়ে! তাহলে কি এটা সেই ইঙ্গিত যে, উত্তরপ্রদেশ মানে এক আর্য-শাসন বুঝতে হবে? তাহলে আর সেটা সবাই মানলেও বাংলা বা দ্রাবিড়ীয়রা তা মানতে বাধ্য কেন?

    এসব প্রশ্নের কোনো দিনই কোনো সমাধান হয়নি। উল্টা উত্তর প্রদেশ বা হিন্দিবেল্ট কেন্দ্রিক ভূতুড়ে এক ক্ষমতা, এরই নাম হয়ে গেছে “কেন্দ্র”। কনস্টিটিউশনেই আবার কখনো একে ‘ইউনিয়ন’ বলা হয়েছে বটে বিশেষত জুডিশিয়ারি অংশে। কিন্তু এটা কাদের ইউনিয়ন? ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার আগে কি তারা স্বাধীন ছিল?  নাকি ভারত বলে এক ভাববাচক আগাম ভুতুড়ে ধারণাই ছিল মাত্র? তাহলে কারা এক জায়গায় জড়ো বা ইউনিয়নে যুক্ত হচ্ছে? এসবের কোনো জবাব কোথাও নেই। বরং আগেই বলেছি সারা ভূখণ্ডকে ভারত নামের মধ্যে ধরে রাখবেন কী করে, কিসের আঠা লাগিয়ে, এটা ছিল বরং নেহরুর দুশ্চিন্তা। এই ‘আঠা’টারই হল হিন্দুত্ব। যদিও নেহরু ও গান্ধী বুদ্ধিমান, তাই তারা এ কথাটা প্রকাশ্যে কোথায় লিখে বলতে চাননি। আর সে কারণেই সম্ভবত এই কথিত কেন্দ্র এই ভারত, সেটা কথিত ‘সেকুলার’ কি না তাও নেহরু ও গান্ধী রা কোথাও লিখে রাখেননি। ইন্দিরা গান্ধী কেবল ১৯৭৬ সালে এসে “বাংলাদেশের কারণে” তা লিখিয়েছিলেন।

    তবে ভারত মানে উত্তর প্রদেশ কিংবা আর্য-শাসন এসব চিন্তা যে নেহেরুর মাথায় কাজ করত এটা অমূলক নয়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৬২ সালের কিছু ঘটনা। সেটা হল, সারা ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা ও অফিসিয়াল ভাষা করতে হবে বলে এক সিদ্ধান্ত নেহেরুর সরকার বাস্তবায়ন করতে গেছিলেন।  নেহেরুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রথম প্রতিবাদ বিক্ষোভ বলা হয় এটাকে যা দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য থেকে শুরু হয়েছিল। এবং প্রধানত তামিলনারু থেকে। দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য বলা হয়, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গনা, কর্ণাটক, তামিলনারু, কেরালা – এদেরকে। এর দুবছর পরেই নেহেরু মারা যান। আর তিনি বেচে থাকতেই এবং পরের প্রধানমন্ত্রী এই ইস্যুতে আপোষ করে মিটিয়ে নেন।   আর সেই থেকে ভারতে রাষ্ট্রভাষা বলেই কিছু নাই (এটাই সুপ্রীমকোর্টেরও রায়) তবে অফিসিয়াল ভাষা আছে যদিও সেখানে হিন্দির পাশাপাশি ইংরাজিও যুক্ত করে নেয়া হয়। আসলে এটাই ছিল কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা।  কিন্তু এখান থেকে এটা পরিস্কার যে কেন্দ্র মানে “আর্য-শাসন” (যেখান থেকে হিন্দি-প্রীতি) ধরণের ধারণায় নেহেরু ভুগতেন।  অনেকে মনে করেন নেহেরুর জীবনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা  ও চ্যালেঞ্জ ঘটেছিল প্রায় একই সময়ে ১৯৬২ সালে।  প্রথমটা আর্যশাসন সংক্রান্ত সারাভারত হিন্দিভাষা চালু করতে গিয়ে ধাক্কা খাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ।  আর এই দুই ঘটনার শোকেই তিনি ব্রেনস্ট্রোক করেছিলেন বলে অনেকের বিশ্বাস আর এই ধারণা যে এতে তিনি এই প্রথম নিজের উপর আস্থা হারিয়েছিলেন। আর এর দুবছরের মধ্যে তিনি মারা যান।

    আমরা তাহলে এখন আরো ফোকাসে আসি। সেটা হলো, নেহরুর ভারত তাহলে ফেডারেল দূরে থাক, এটা বরং “কেন্দ্র” নামে ভূতুড়ে ক্ষমতার অধীনস্থতায় থাকা সব রাজ্যগুলোতে, যেখানে মূলকথাটা হল, বহুবিধ জায়গা ও সুযোগ রেখে দেয়া যাতে কেন্দ্র রাজ্যের ওপর চাইলেই হস্তক্ষেপ করতেই পারে। রাজ্যের  সর্ববিধ শাসন প্রশাসনকে ওভাররুল করে  “কেন্দ্র” নামে এক কর্তৃত্বের অধীনে সব তুলে নিতে পারে।

    যেমন গভর্নর ব্যবস্থা, এটা করাই হয়েছে যেন যেকোনো সময় “কেন্দ্র” রাজ্যসরকারকে বাতিল করে এর পরিচালনা নিজের হাতে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতি খারাপ – এই বলে গভর্নর রিপোর্ট দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই আসলে গভর্নর মূলত কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপের হাতিয়ার। একইভাবে বাজেট বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতিরোধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রের একক নিয়ন্ত্রণে, মানে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় রাখা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার-অপব্যবহার করে [যেমন মমতার] রাজ্য সরকারের উপর প্রধানমন্ত্রীর [মোদীর] হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। আসলে এভাবেই হস্তক্ষেপের মেকানিজম যেন তথাকথিত ভূতুড়ে কেন্দ্রের হাতে থাকে এমন সুযোগ রেখেই সেকালে কনস্টিটিউশন লেখা হয়েছিল; যাতে নেহরু নিজ হাতে সব নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারেন।

    আবার এ হস্তক্ষেপগুলো আগাম কোন লিখে রাখা ‘রুল বুক’ (বা চাইলে তা সংসদে পাশ করে নিয়ে রাখা) মেনে চলা হোক, তা সেভাবে রাখাই হয়নি। বরং রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তি বা সাবজেকটিভ ইচ্ছার উপর। কাজেই রাজ্যকে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিইচ্ছার অধীন হতে হবে রাজ্যকে, সোজা কথায় ‘তেল মারতে হবে’। এমনিতেই রুল বুক বা প্রশাসনের বিজনেস রুল বুকের অধীনে না থাকা কোনো ক্ষমতা মানেই তা ভয়াবহ  এক দানবীয় হতে বাধ্য। কারণ কোন “রুলবুকের” অধীনে লিখিত এই না থাকার মানেই হলো চরম অরাজকতা। কারণ  কেউ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেই তার ক্ষমতার প্রয়োগের  ব্যাপারটাকে  তার ব্যক্তিখেয়ালের হাতে কোনোভাবেই ছেড়ে দেয়াই যায় না। রুল বুকের স্ট্যান্ডিং গাইডলাইন অবশ্যই থাকতে হবে। অথচ তা নেই, রাখা হয়েছে সাবজেক্টটিভলি বা অবাধ ব্যক্তি খেয়ালে।

    মোদী-মমতা বা কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদঃ
    এবারের রাজ্য নির্বাচনে দলের হারার পর মোদীর আচরণ ও তৎপরতা বলছে তিনি মমতার সাথে সঙ্ঘাতেই থাকতে চান। অনেকটা যেন তিনি বলতে চান, নেহেরু মহাশয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে এসব অবাধ হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুবিধা দিয়ে গেছেন।  ফলে কংগ্রেস তাকে কিছু বলতে পারবে না। কাজেই তিনি সেসব সুবিধা বিজেপি দলের স্বার্থে ব্যবহার করবেন না কেন?   যেমন সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় পরবর্তি পরিস্থতিকে তদারকির উছিলা করে মোদী মমতার সাথে এক মিটিংয়ে বসতে চান বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু মোদীর ইচ্ছা সেখানে তিনি রাজ্য বিরোধীদলের নেতা হিসেবে তার দলের লোককেও উপস্থিত রাখবেন এবং এতে সম্ভবত দলীয় কর্মীদের দেখাবেন যে কলকাতার বিরোধী নেতাও অনেক ক্ষমতা রাখেন। এখন এই প্রসঙ্গে মমতার দাবি, মোদী এই ব্যাপারটা একা ঠিক করতে পারেন না যে, রাজ্য থেকে সচিব ও প্রশাসনিক স্টাফসহ সাথে আর কোন কোন জনপ্রতিনিধি তাদের দুজনের সভায় উপস্থিত থাকবেন। আর এসব বিধি বা কনস্টিটিউশনে নেই বলে দাবি করেছেন মমতা।

    এমনিতেই এটা দৃষ্টিকটু যে প্রধানমন্ত্রী ব্যুরোক্র্যাট আর মুখ্যমন্ত্রীর মতো জনপ্রতিনিধিকে একই প্রটোকলে ট্রিট করছেন। এর উপর সবখানেই মোদীর এটা প্রদর্শনের ইচ্ছা যে, মুখ্যমন্ত্রী যেন প্রধানমন্ত্রীর এক অধীনস্থ প্রশাসনিক স্টাফ! এমনিতেই নেহরু কথিত কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুযোগ রেখে দিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক সাজিয়ে গেছেন। কারণ তার অযথা ভয় থেকে অযাচিত ক্ষমতার চর্চা যে রাজ্য যদি কেন্দ্রের কথা না শুনে; তাই সবসময় রাজ্যকে দাবড়ে রাখার সব মেকানিজম, দ্বৈত ক্ষমতাকর্তৃত্ব-ব্যবস্থা- এসবই হবে এর হাতিয়ার। এর উপর মোদী নিজেই মমতাকে একটা শিক্ষা দিয়ে অধীনস্থতায় আসতে বাধ্য করতে চাচ্ছেন। তাই সব মিলিয়ে এটা ভয়াবহ।

    এখন মমতা ওই সভায় রাজ্যের প্রধান সচিবকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছা করেই সম্ভবত কেবল মোদীর সাথে সাক্ষাৎ করেই, কোনো মিটিং না করেই ফিরে চলে আসেন। শুধু তাই নয়, নিজ রাজ্যের মুখ্যসচিবকেও সাথে নিয়ে  মোদীর মিটিং বর্জন করে চলে আসেন।

    স্বভাবতই এটা মোদির জন্য অপমানবোধের। তিনি মুখ্যসচিবকে শোকজ করেন এবং দিল্লিতে এসে রিপোর্ট করতে বলেন। কিন্তু মুখ্যসচিব এর জবাবে লিখেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে মানে কথা শুনেই মোদীর ওই সভায় থাকতে পারেন নাই। অর্থাৎ তিনি যেন বলছেন, আমিও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী অবশ্যই। কিন্তু আমার বর্তমান রিপোর্টিং জনপ্রতিনিধি হলেন মুখ্যমন্ত্রী; প্রধানমন্ত্রী নন। কাজেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকেই তাকে ফলো করতে হয়েছে। অর্থাৎ এটাও আসলে এক দ্বৈত ক্ষমতা ব্যবস্থার পরিণতি এবং তা ব্যুরোক্র্যাসিতে।

    এতে যে নতুন জিনিষটা সামনে এসেছে তা হল, এতদিন মনে করা হত কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদের ইস্যুটা বোধহয় কেবল রাজনৈতিক। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের কেবল এতে সংশ্লিষ্ট হবেন বা সাফার করবেন। কিন্তু না। এবার প্রমাণ হল যে বুরোক্রাসির সব অফিসারেরাও (ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের ) এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট হবেনই এবং তাদেরকে পক্ষও নিতে হবেই। আসলে এভাবে একসময় সারা ভারতই অনুভব করবে যে সকলের সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে আছে এই ইস্যুতে। দেখা যাচ্ছে বুরোক্রাসিও এখন এই তর্কে পক্ষ নিচ্ছেন। যদিও এখনও অনেকেই রাষ্ট্রগঠন ব্যাপারটা বুঝেন না বলে ভেবেছেন ভারতের এই দুঃখ বোধহয় বুরোক্রাসির সীমাবদ্ধতা। শ্যাম সরণ একজন অবসরে যাওয়া ক্যাডার কূটনীতিক ও সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তাঁর ভাবনায় এই সংঘাতের পলিটিক্যাল ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাটা দেখতে চান নাই  বা তার চোখেই পরে নাই হয়ত। তাই তিনি এটাকে বুরোক্রাসির রিফর্ম করেই রাজনৈতিক চিন্তা বা রাষ্ট্রগঠন-বিষয়ক রাজনীতিবিদদের চিন্তার ঘাটতির  সমাধান করে ফেলবেন ভেবেছেন। যা একটা ফলস অনুমান।

    এমনিতেই সবখানে জাতিবাদ বিশেষ করে জাতিগত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের তোড়ে ভারত ডুবছে। এর ওপর তাদের আরেক ভ্যানিটি হল, ভারতের ব্যুরোক্র্যাসি নাকি ‘স্টিলের তৈরি’, [Anarchy, dents Sardar Patel’s IAS steel frame’ ] তাই এটা এতই শক্ত। আর এর ক্রেডিট হল নাকি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের যিনি এর প্রণেতা, মন্ত্রী। প্যাটেল, তিনি মহাত্মা গান্ধীর মতই এক গুজরাটি লোক ও বাসিন্দা। তাই মোদী গুজরাটে তার রেকর্ড উঁচু (৫৯৭ ফুট) এক স্ট্যাচু বানিয়ে নিজেই আরো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর সেই প্যাটেল হলেন আবার নেহরুর সব আকাম বা জবরদস্তি ঘটানো যে কোনো কাজের ডানহাত। যেমন ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে করদ রাজাদের ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করার নেতা তিনি ছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে।

    এখন বাস্তবে এই স্টিলের ব্যুরোক্র্যাসির যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা চর্চার দিক থেকে মূলত এক দ্বৈত শাসনব্যবস্থা আর সেটাই ভেঙে পড়তে যাচ্ছে তা বুঝতে পারা বা বিপদ অনুভব করার কেউ আছেন এমন দেখা যাচ্ছে না।

    কাজেই এভাবে চললে মোদীর টার্ম শেষ হতে হতে ২০২৪ সাল নাগাদ নেহরুর ছাপ মারা এই ভারত মানে, এই নেহরুভিয়ান ভারতরাষ্ট্র তার জন্মদুর্বলতায় ক্রমেই আরো কয়েক ধাপ ভাঙনের দিকেই এগিয়ে যাবে। এর সোজা প্রকাশ আমরা দেখতে পাবো পরবর্তীতে কথিত কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে। আমরা হয়ত দেখব, কোনো সর্বভারতীয় দল যেমন কংগ্রেস বা বিজেপি – এরা আর কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারছে না।  আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশনই একমাত্র ভরসা হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনাই বড় হবে।

    এটাই রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস। এমনিতে রাষ্ট্র ভেঙে পড়া মানেই তা খারাপ, তা কিন্তু নয়। কারণ গড়তে গেলে তো আগে তা ভাঙতেই হবে। কিন্তু এটাই বিরাট বিপদের হবে যখন ভাঙার পরে গড়বেন কিভাবে, কী গড়তে চান, এ নিয়ে আপনি একেবারেই অপ্রস্তুত ও পরিকল্পনাহীন! সারা ভারতের দশা আবার এটাই বলে মনে হয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ৫ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “নেহরুভিয়ান এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    গৌতম দাস

    ১০ মে ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3wM

     

     

    India not really a Superpower

    গত ২ মে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। বিজেপির ৭৭ আসনের বিপরীতে তৃণমূল ২১৩ আসন পেয়ে বিধানসভায় জিতেছে। কিন্তু আরএসএস-বিজেপি ব্যাপারটাকে যেন ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ও সরকারের নির্বাচনের মত পর্যায়ের  বিশাল গুরুত্বের বানিয়ে ছেড়েছিল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় থাকায় বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারি প্রশাসনকে দুমড়ে মুচড়ে কিভাবে সেই ক্ষমতাকে এক রাজ্যের নির্বাচনে চরম অপব্যবহার করতে গিয়ে হারতে পারে এরই নজির হয়ে থাকবে এই নির্বাচন!

    মোদীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেন গুরুত্বেরঃ
    আরএসএস-বিজেপি এই রাজ্য নির্বাচনকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং এতে সম্ভবত সর্বোচ্চ অর্থকড়ি ও সময় ঢালার পেছনের কারণ কী?  যেমন একমাসেরও বেশি সময় ধরে  আটপর্ব এইনির্বাচনের শ্লট বানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর কোথাও আট পর্বে তা হয় নাই। আবার আটপর্ব যে অপ্রয়োজনীয় ছিল এর প্রমাণ কমিশন অজান্তে নিজেই তুলে ধরেছে। পাঁচপর্ব নির্বাচনের পর কোভিড ভাইরাসের প্রভাব বেড়ে যাওয়াতে কমিশন সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিল। সেখানে বাকি সবভোট একদিনে নিয়ে সব শেষ করার জন্য মমতা প্রস্তাব দিলে  কমিশন টেকনিক্যাল আপত্তির কথা তুলে তা নাকচ করেছিল।  তা হল, একদিনে ভোট নিতে গেলে মোট যে পরিমাণ ফোর্স লাগবে তা এখন সংগ্রহ করার সময় নাই। তাদের এই কথায় প্রমাণিত যে এত মাস জুড়ে নির্বাচন আয়োজনের দরকার ছিল না। কেবল সময় থাকতে ফোর্স সংগ্রহ করলেই হত। তাহলে  নির্বাচনের মাঝের দিনের গ্যাপ এত বেশি রাখা হয়েছিল ইচ্ছা করেই। আর এই “খেয়ালি” ইচ্ছাটা কার খেয়ালে?  এটাই এখন স্পষ্ট এক রাজ্যের নির্বাচনে  মোদী  নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে রেকর্ড গড়েছেন। যাতে তিনি একমাসের মধ্যে মোট ১৮ দিন কলকাতায় সভা করতে পারেন এবং তা করেছেন। এটাই ক্ষমতার অপব্যবহার আর পশ্চিমবঙ্গের  এবারের  নির্বাচনকে আরএসএস-বিজেপি  কী মাত্রার গুরুত্ব দিয়েছে তার প্রমাণ। তাহলে কথা সোজা, দেখা গেল এবার ‘কলকাতা দখলকে’ আরএসএস-বিজেপি মাত্রারিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেটাই বা কেন?

    সবাই রাম-পুজারী হিন্দু না, বিজেপির দরকার একই হিন্দুঃ
    ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক দিক থেকে বললে ভারত মানে বৃহত্তর উত্তরপ্রদেশের হিন্দু ভারত- এমন ভাবনার আধিপত্য চলে আসছে।  ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার উপর ভারতের জন্ম থেকেই এই আধিপত্য সবসময় ক্রিয়াশীল থেকে আসছে।  আর তাই এর সাথে দক্ষিণ ভারতের বিরোধের কথা আমরা অনেকে কম-বেশি শুনেছি। দক্ষিণ ভারত হিন্দি জানলে বুঝলেও হিন্দি ব্যবহার করে না চল নাই – একথাও আমরা শুনেছি।
    হায়দরাবাদের (বা অন্ধ্রের) পরে তেলেঙ্গানা থেকে কর্নাটক, তামিলনাড়ু হয়ে কেরালা পর্যন্ত এই দক্ষিণী অঞ্চল একে ভারতের ভাষায় দাক্ষিণাত্য (ডেকান বা Deccan) বলা হয়।  দক্ষিণদিক কথার সংস্কৃত উচ্চারণ ‘দাক্ষিণাত্য’ আর এই খটমটে শব্দ বৃটিশেরা ইংরেজিতে সহজে উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘ডেকান’ বানিয়ে ফেলেছে। ভাষার দিক থেকে এই অঞ্চলের চারটা ভাষাকে একসাথে একে দ্রাবিড়ীয় ভাষার অঞ্চল বলে। এটাই হিন্দিবিরোধী ও আর্যবিরোধী দ্রাবিড় সমাজ অঞ্চল। আসলে দাক্ষিণাত্য বলতে বুঝায়, ভারতের দক্ষিণের পুর্ব ও পশ্চিম উপকুল এবং এক বিস্তৃর্ণ উচু মালভুমি ও পর্বতমালা (plateau and mountain ranges) যার সর্বোচ্চটা আনাইমুদি (২৬৯৫ মিটার), এভাবে এই পুরা অঞ্চলকে।  আর এই বিস্তৃর্ণ মালভুমি ও পর্বতমালা এলাকা টপকাতে পারে নাই বলেই উত্তরের আর্য আক্রমণ ও সম্ভাব্যদখল থেকে দক্ষিণ বেঁচে যায়। প্রাচীনকালের সেই লড়াই প্রতিরোধ এবং এর ফলাফল এখনও সক্রিয় ও কার্যকর ফলে ঐতিহাসিক গুরুত্বের। ফলে দক্ষিণ-ভারতের হিন্দি না-বলা এটা শ্রেফ শখ বা কারও খেয়াল মোটেও নয়।
    এছাড়া আরও আছে।  যেমন, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনের পর থেকেই এই দ্রাবিড় সমাজ “ব্রাহ্মণ তাদের সমাজে অপ্রয়োজনীয়” বলে এক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন করেছিল। ব্রাহ্মণ ছাড়াও বিয়ে করা যাবে বলে আইনও তৈরি করেছিল, যা এখনো চালু আছে। এরই উত্তরসুরি আঞ্চলিক ডিএমকে ও আন্না-ডিএমকে দল। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার আন্দোলনও করেছিল এই রাজ্যগুলো যার কেন্দ্র ছিল তামিলনারু। [আগ্রহিরা  E V Ramaswami (EVR or “Periyar”) এই ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্ট যেকোন ইতিহাস পড়তে পারেন।] এছাড়াও ১৯৬২ সালে হিন্দিভাষা চাপানোবিরোধী আন্দোলনে জীবন দিয়ে রুখে দেয়ার কারণে আজও ভারতের সুপ্রীম কোর্টের ব্যাখ্যায় ভারতের কনষ্টিটিউশনে উল্লেখিত কোনো “রাষ্ট্রভাষা” নেই – এমন করে রাখা হয়েছে। তবে সরকারি দাপ্তরিক ভাষা আছে আর তা হিন্দি (ঠিক হিন্দি নয় হিন্দুস্থানি) এবং ইংরাজি।  আর্য-হিন্দির আগ্রাসন দক্ষিণে এমন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। আর একইভাবে  একই রকম আর্য-হিন্দির আগ্রাসন  প্রতিরোধ পেয়েছিল বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্রবেশমুখে। তাই বাংলাভাষা টিকে যায়, যদিও প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের সেই প্রতিরোধ ভারতের দক্ষিণের মত পর্যায়ের প্রবল ছিল না বলে এর প্রচারও কম হয়েছে। এসব প্রতিরোধের চিহ্ন হয়েই এবং সে কারণে এখনও ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বৈশিষ্ট বলতে মেজর তিনটা ধারা দেখতে পাওয়া যাবেই – উওর, দক্ষিণ ও পুর্ব  ধারা বা ঘরানার সঙ্গীত ও নৃত্যধারায়।  অবশ্যই এগুলো এথনোলজি  অর্থে [ethnological] ভারতীয় জাতিবৈশিষ্ঠের ভিতরের মৌলিক ভিন্নতা।  এই ভিন্নতা বলতে আলাদা আলাদা ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে এথনিক-ধরণের ভিন্নতাগুলো তো  বটেই এছাড়া আরও ভালভাবে  এই ভিন্নতা  সাংস্কৃতিকভাবেও ধরা যায় যেমন নাচ-গানে, বাদ্যযন্ত্রে, ঘরানায় স্পষ্ট সাংস্কৃতিক ট্রেডিশনের ভিন্নতায়।  তাই এককথায় বললে, তামিলনারুর মত কলকাতাও আর্য-হিন্দিবিরোধী আরেক হাব। এজন্য পশ্চিমবাংলা আরএসএস-বিজেপির আরেক মাথা ব্যাথা।  মূল কারণ আগেও বলেছি বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা হল ভারতের রাজ্যগুলোতে এথনোলজি-সাংস্কৃতিক অর্থে তারা ভিন্ন ভিন্ন হিন্দু। বিজেপি সেগুলোর উপর এক রাম-পুজারী হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিয়ে সবাইকে বেধে এক হিন্দুত্বের জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চায়।  হিন্দুত্ববাদের আরএসএস-বিজেপি এবার কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে সেই ‘বাংলা’কে বিজয় মানে, জবরদস্তিতে উপর থেকে এক ইউনিফর্ম হিন্দুত্ব চাপানোর খেয়ালে কলকাতায় এসেছিল। এবং পরাজিত হয়ে গেল। বিজেপির যে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের জাতিবাদ – এটা তারা সারা ভারতে কায়েম করতে চায়। অর্থাৎ এখনকার ভারতের ২৮ রাজ্যের মোট ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী সনাতন ধর্মাবলম্বী বলা হলেও এরা সাংস্কৃতিক-এথিনিক অর্থে সবাই একই ধরনের হিন্দু নয়। কিন্তু বিজেপির ভাষায় বললে, তারা ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে “রামের অনুসারী” হিন্দু বানাতে চায়, এমন এক পরিচয়ে বাঁধতে চায়। যাতে এর ফলে ভারত এক হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের জাতিরাষ্ট্র হয়।

    Supremacist বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতাঃ
    সারা দুনিয়ায় আমিই সুপ্রীম বা শ্রেষ্ঠ এমন শ্রেষ্ঠত্ববাদি [Supremacist] – এই চিন্তার প্রাবল্য জেগে উঠা দেখেছিলাম আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে জর্মান, ইটালি ও জাপানের মধ্যে যার প্রধান ভোকাল নেতা ছিলেন হিটলার।  আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ এই জাতগর্ব বা রেসিজম [Racism] – এই হল সমস্যা ও সংঘাতের শুরুর ভাষ্য বা মিথ্যা সাফাই।  কারণ এরপরেই বলা হবে যে আমিই শ্রেষ্ঠ অতএব তাই আমার কথা তোমাকে শুনে চলতে হবে, আমার অধীনতা মানতে হবে, আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব, গ্যাস চেম্বার করব, তোমাকে কলোনিদখল করব ইত্যাদি। অনেক সময় আবার এই জাত বলতে নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব যেটা হিন্দু বা মুসলমান বা অন্যকোনটা হতে পারে অথবা ‘গায়ের রং’ যেমন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার – ইত্যাদি হয়ে পারে। এগুলো আমরা কমবেশি দেখেছি বা পরিচিত।
    কিন্তু সাবধান – কেউ হিন্দু মানেই সে রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদি (হিন্দুত্ববাদী) হবেই এমন নিশ্চিত ধরে নেয়াটা খুবই ভুল হবে। কারণ নাও হতে পারে। েকইভাবে, কেউ মুসলমান মানেই সে রেসিস্ট নাও হতে পারে। পাকিস্তানি পাঞ্জাবী মানেই সেও ব্যক্তি হিসাবে রেসিস্ট নাও হতে পারে। উলটা আমি বাঙালি জাতিবাদি এই ভাব ধরে যখন পাকিস্তানিদের “পাকি” বলে ডাকব – এটাই রেসিজম হবে। তাহলে মূল কথাটা হল কেউ কী করে নিজেকে  প্রেজেন্ট বা হাজির করছি, কী দাবি করছি;  বিশেষ করে দলবদ্ধ হয়ে বা রাজনৈতিক দিক থেকে  – এর উপরই নির্ভর করবে  কেউ  শ্রেষ্ঠত্ববাদি বা রেসিস্ট কিনা।  এই বিচারে  আরএসএস-বিজেপির হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমের দল যারা এখন ভারতে ক্ষমতায়।  আর লক্ষ্য করেন, চেক করে দেখেন সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব – আমিই শ্রেষ্ঠ, আমারটাই শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি ধরণের ভাব বা ধারণা আছে কি না? যদি থাকে তবে অন্যকে নিন্দা করার আগে নিজেকে সংশোধন করে নেন। অনেক সময় আমরা না-বুঝে, না খেয়াল করে অসচেতনে অনেক কিছু করে বসি।

    আবার আরেক চিহ্ন হল,  রেসিজমের মধ্যে –  শ্রেষ্ঠত্ব, মহান বা বেস্ট এসব শব্দ বা ধারণা থাকবেই। ফলে এখান থেকে বের হতে হবে বা এড়িয়ে থাকতে হবে আমাদের।  বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতিসংঘের জন্মের ভিতর দিয়ে এই প্রথম আইডিয়া বা  বয়ান হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমকে ক্রিমিনাল অপরাধ মনে করা হইয়েছে আর তা বলা বাহুল্যই  নিন্দনীয় করা হয়েছে। কিন্তু তবু ব্যবহারিক চর্চায় মনের কোণায় ছোট রূপে হলেও তা এখনও থেকে গেছে শুধু না, তা আরো  প্রকাশ্য হবার চেষ্টা অনেক প্রবল হয়েছে। যার পিছনের মূল কারণ মনে করা হয় যে সময়টা এখন  -“গ্লোবাল সিস্টেমে নেতৃত্বে পালাবদলের”।  সারা দুনিয়া এতদিন বেশিরভাগ সময়েই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবেই জনবসতি বা সিভিলাইজেশনগুলো শাসিত ও পরিচালিত হয়ে এসেছে। কেবল শেষ প্রায় পাঁচশ বছর বলা যায় কলোনিদখল সুত্রে দুনিয়া পশ্চিমের সিভিলাইজেশনের অধীনে সংগঠিতভাবে অধীনস্ততা চলে গেছিল।  এরই ভিতর আবার য়ারও শেষের ইমিডিয়েট ৭৫ বছর তা দুনিয়ার আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বে কেটেছে। আর এটাতেই পালাবদল আসন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এতে  বদল অনিবার্য জেনেও পুরানা শাসনের সুখ যাদের ছাড়তে ও নতুনকে মেনে নিতে ইচ্ছা করছে না এদেরই একটা অংশ এক সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ আকড়ে উঠে দাড়াতে চাইছে। পুরানা গল্পের উস্কানি  – যে আমাদের কতকিছুতে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল – এই কথিত অতীত মহান, গ্রেট, বেস্ট এসব শব্দ দিয়ে – এক শ্রেষ্ঠত্ববাদ খাড়া করার জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও তারা জানে কারণ আমেরিকান সরকারি গবেষণার সবগুলো ফাইন্ডিংসই (২০০৮ থেকে সর্বশেষ ২০২১ সালেরটা) তাদের জানিয়েছে এই পালাবদল অনিবার্য অবশ্যই কিছুই তারা ঠেকাতে পারবে না কারণ এই পরিবর্তন অবজেকটিভলি নির্ধারিত। সাবজেক্ট বা মানুষের নিয়ন্ত্রণে আর নয়।  কিন্তু তবু মরিয়া হয়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে কেউ কেউ এগিয়ে আসা বন্ধ করে নাই।

    কেন বিজেপির হিন্দুত্ব বা এক হিন্দু-ভারতের কথিত এক জাতিরাষ্ট্র গড়তে ব্যর্থ হবে?
    এর মূল ব্যবহারিক সমস্যাটা হল,  ভারতের সব রাজ্যের বাসিন্দারা শ্রীরামকে তাদের প্রধান দেবতা মানে না বা তাকে ঘিরে প্রধান দেবতাপূজা বা প্রধান উৎসব উদযাপন করে না। যদিও আবার শ্রীরামকে তারা অমান্য করে ঠিক তাও নয়। অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যেই তাদের নিজস্ব ‘প্রধান দেবতা’ ও সে অনুযায়ী এক প্রধান বার্ষিক উৎসবও আছে। ফলে বাংলায় দুর্গা বনাম রামের একটা প্রধান ভিন্নতা আছে এবং এটা প্রধান বাস্তবতা। শুধু তাই নয়, মনে রাখতে হবে, এটা অন্য কারো দেবতাকে অমান্য করা এর মূল বিষয় নয়। কিন্তু নিজ ভাষা, নিজ শিল্পকলা, নিজ গাথাগল্প সাংস্কৃতিক এ ট্র্যাডিশনে অন্য কোনো রাজ্যের, ন্যূনতম অন্যের হস্তক্ষেপ বা আধিপত্য অথবা ডিকটেট, সামান্য চুল পর্যন্ত কোনো বদল আনা এরা একে অন্যের বেলায় বরদাশত করতেই পারবে না। কারণ এভাবেই তো ভারতে একেকটা রাজ্য স্ব স্ব ভিন্নতা নিয়ে হাজির ও ঐক্য হয়ে হাজির আছে। এভাবেই এরা একেকটা  ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ অর্থে ভিন্ন ভিন্ন জাতি। যেমন, বাঙালি, উড়িয়া, গুজরাতি, মারাঠি রাজস্থানী  ইত্যাদি এরা ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ জাতি। ঠিক যেমন কলকাতার বাঙালি ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’  জাতিবোধ নিয়ে তারা সবসময় নিজের মতো হয়ে থাকতে ও উঠতে চাইবে। অথচ সবাই মূলত হিন্দু হলেও এই কালচারাল গভীর ভিন্নতা এটাই বার বার বলছে   আরএসএস-বিজেপির রাজনীতি ভুল ও অকেজো অবাস্তব বলে তা ব্যর্থ হবেই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা অপ্রয়োজনীয়।
    কিন্তু  তবু আরএসএস-বিজেপি  হিন্দুত্বভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভারত গড়ার জিদে আটকে থাকা দল, তারা এমন ভারত গড়ে নিজ একক রাজনীতি ও নিয়ন্ত্রণে ভারতকে আনবেই এই জিদের প্রচেষ্টার দল। তাই আরএসএস-বিজেপি বলা যায়, এই রাজ্য নির্বাচনকে এই প্রথম নিয়েছিল দুর্গার ওপর রামের আধিপত্য কায়েম করা যায় কি না এর উদ্যোগ হিসেবে। সেক্ষেত্রে মমতার দলের বিজয়ের তাৎপর্য হল, বাংলা তার দুর্গা আঁকড়ে ধরে বিজেপির হিন্দুত্ব এবং তার রাজনৈতিক ‘রামকে’ পরাজিত করল। এই অর্থে পুরনো আর্য-বাংলা ঐতিহাসিক লড়াইটা আবার বাংলা জিতে রিনিউ করে নিলো।

    এ জন্যই এই নির্বাচন নিয়ে কলকাতার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনে কেবল তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাই তৃণমূলকে ভোট দেননি। অর্থাৎ তৃণমুলের  হিন্দু-মুসলমান সমর্থকেরা  মিলেই কেবল তৃণমূলকে ভোট দেননি। এর সাথে আরো আছে বাঙালি অর্থে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট; এমনকি বিজেপির সমর্থকদের একটা বড় অংশ যারা নিজ দল ছেড়ে মমতাকে মানে ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ বাঙালির পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই বিশ্লেষকদের দাবি এটা হয়েছে বলেই মমতার পক্ষে মোট প্রায় ৪৮.৫% ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। যেমন আনন্দবাজার লিখেছে, “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে”।
    এবারের নির্বাচন তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিজেপির হিন্দুত্বের আধিপত্যের কাছে নত না হওয়া বরং, হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র গড়ার প্রপাগান্ডায় কলকাতার বাঙালিদের সেই পাল্লায় না পড়া। তারা নিজ বাংলা এথনিসিটির অর্থে জাতি রক্ষার লড়াইয়ে রাজনৈতিক শ্রীরামকে পরাজিত করতে এগিয়ে এসেছিল। এই অর্থে বাংলার সাথে লেপ্টে লেগে থেকেছে, তাকে ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। অথচ ব্যাপারটা হলো, বিজেপির ভাষ্যের এক আর্য-হিন্দির রাজনৈতিক ‘রাম’-এর ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র; এ নিয়ে জোরাজুরি করাতেই মমতার জন্য অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক ‘রাম’কে হারানো।

    কিন্তু একারণেই আবার অনেকেই আশঙ্কা করছেন এখন; অনেকে বলছেন এটাই বিজেপির হামলার শেষ নয়। আরএসএস-বিজেপির স্টাইল এভাবে হার স্বীকার করে নেয় না। প্রতিশোধ নিতে তারা ফিরে আসে। সাধারণত এরপর আসে মুসলমান হত্যা-নিপীড়নের হুজুগ নিয়ে। মুসলমান নির্যাতন, দাঙ্গা হত্যা নিপীড়ন করা খুবই সহজ – এই সুযোগ নিয়ে তারা কৌশল সাজিয়ে আসে। কারণ দেখা যায়, আরএসএস-বিজেপির একটা স্থির ধারণা হল যে, ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় এক চরম মার-হত্যা-নিপীড়ন দাঙ্গা ঘটানো- এই ‘ভয়ের রাজনীতি’ কায়েম করা তাদের হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জিগির তোলার উস্কানি ও সাংগঠনিক শ্রীবৃদ্ধির প্রধান অস্ত্র ও উপায়। এটা তারা বিশ্বাস করে থাকে। তাই যখনই ভোটে পরাজয় হয় তখনই তারা এ কৌশলের কথা চিন্তা করে। কারণ নিজেদের পরাজয়ের হতাশাকে তারা প্রতিহিংসা দিয়ে পূরণ করে এগোনোকেই সঠিক কৌশল মনে করে।

    ঠিক যেমন সর্বশেষ দিল্লির রাজ্য নির্বাচনে সেটাই আমরা দেখেছিলাম। সে সময় নাগরিকত্ব ইস্যুতে দিল্লির নির্বাচনে মুসলমানরা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে এরপরে দিল্লিতে মুসলমান পাড়াগুলোতে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা ও হত্যা, তথা ম্যাসাকার হয়েছিল। দিল্লির কোর্ট-হাইকোর্ট আজো সেসব মামলায় কোনো প্রতিকার করতে পারেনি। অথচ মূল নেতা ‘মিশ্র’ সব ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। বাংলায় মমতার বিজয়ের পরে এ হামলা হবেই এমন বলার কোন মানে নাই; তবে এটা হবেই না – তা বলাও অবশ্যই ভুল। বরং সব দিকে সচেতন ও সোচ্চার থাকাই সঠিক কাজ।
    কিন্তু বাংলাদেশে একটি ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে ‘কেন্দ্রীয় শাসনের হস্তক্ষেপ’ চেয়ে চার-পাঁচজনের একটা গ্রুপকে মানববন্ধন নামে দাড়াতে দেখছি আমরা। অনেকটা ‘হিন্দুদের জন্য হিন্দুরা’- টাইপের যুক্তিতে এসব আজব দাবি; যেখানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশের কেউ কোনো পক্ষের নয়। তাই কলকাতার আরএসএস-বিজেপি ঢাকায় এসে ব্যানার নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দাঁড়ানো – এগুলো অবশ্যই কোনো ভালো লক্ষণ নয়। ফলে অবিলম্বে সরকারের এ বিষয়ে সতর্কতা, পদক্ষেপ নেয়া ও নজর দেয়া উচিত। কারণ সবশেষে এরা সবাই সংখ্যালঘু অজুহাতে ভিকটিম সেজে নিজেদের সব আকাম কাজের দায় চাপাবে আমাদের সরকারের উপরেই!

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দনঃ
    এদিকে আমাদের প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর দলনেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দন বার্তা যথেষ্ট আগ্রহ সঞ্চার করেছে। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মোমেনের ওই চিঠি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধেও এক প্রচ্ছন্ন বার্তা”। কিন্তু তিনি লিখেছেন এই প্রথম নাকি ভারতে “রাজ্যের নির্বাচনকে ‘ধর্মীয় আধারে’ করার চেষ্টা হয়েছিল। বিজেপি নেতারা ভোট প্রচারে নাকি সরাসরি ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দিয়েছেন”।
    সরি, আপনার দাবি গ্রহণ করতে পারলাম না। প্রথমত, ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দেয়া অথবা ‘ধর্মীয় আধারে’ ভারতের রাজ্য নির্বাচন বিজেপির এটিই প্রথম নয়। কলকাতা তো বটেই এমনকি রাজস্থানের নির্বাচনেও বাংলাদেশের মুসলমানদের ভারতে অনুপ্রবেশের ভুয়া অভিযোগ তুলে ‘তেলাপোকা’ বলা হয়েছে। আজ হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাওয়ার মত অনুভব হতে পারে কারও; তবু এসব একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। বিজেপি কখনো কি লুকিয়েছে যে, সে প্রায়ই মুসলমানদের জন্য দাঙ্গা ও হত্যার আজাব হয়ে আসে না? তার দলের রাজনীতিই তো হল , হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব বা হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ভারতের রাজ্যগুলোর সবাই প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে সনাতন হিন্দু বলে পরিচিত হলেও বিজেপিসহ যেকোনো শ্রেষ্ঠত্ববাদী দলের এই কমন ফিচার হয় যে, তারা এক একক পরিচয়ে সবাইকে বাঁধতে চাইবেই – এক জাতশ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করার চেষ্টা করবেই। যা এক পন্ডশ্রম যদিও! বিজেপি তো এগুলো লুকায় না! কিন্তু যাদের এসব নজরদারি করার কথা সেই নির্বাচন কমিশন বা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এখানে নজর দিতে রাজি নয়। অথচ ধর্মীয় আধারে বা বিভাজনের নীতিতে ভোট চাওয়া – এটা বিজেপির জন্য দল নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মত কৃত অপরাধ, তবু  তা তারা করেই চলছে, অবলীলায়। এখন এসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা খোদ নিজেদেরই যদি নিজেদের ভারতের নাগরিক নয়, হিন্দু হিসেবে আবিষ্কার ও গর্ব করে থাকেন ও চলেন তবে ভারতের কনস্টিটিউশনে কী লেখা থাকল তাতে কিছুই আসবে যাবে না। উল্লিখিত ব্যক্তিদের মত সাংবাদিকের চোখেও এগুলো কোনো বড় সমস্যা হিসেবে ধরা পড়বেও না।

    উনি আরো লিখেছেন, কলকাতার “ভোটে বিজেপির বিপর্যয় ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় সেই স্বস্তির ছোঁয়া স্পষ্টতই পরিলক্ষিত। সেটাই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে আগ্রহ জাগিয়েছে”।
    তাঁর এ’কথাতে বলা যায়, সেটা কলকাতায় যা হয় হোক কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এ ছাড়া আর কী বলতে পারতেন? তবে তার অবশ্যই ভারতের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করার মত বোকামি করার কিছু নেই! আবার এতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রটোকলের যে ব্যত্যয় নেই তা তো কূটিল কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেছেন আর নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে, ‘মোমেনের অভিনন্দন বার্তা কূটনৈতিক প্রটোকলের দিক থেকে নিখুঁত”। কাজেই এনিয়ে আমাদের কী আর বলার আছে!

    মোদির বিজেপি ভারতে ক্ষমতাসীন আছে ও নির্বাচন করে যাচ্ছে সাত বছরের বেশি ধরে। তিনি যে ‘এক শ্রীরামের নামে’ [শুধু হিন্দু হলে হবে না] এমন এক পরিচয়ে ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে নিয়ে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চান সেই মেরুকরণের চেষ্টা তিনি সবসময় করে চলেছেন। কিন্তু সাত বছর ধরে, দেব মুখার্জির মত অনেকেই ব্যাপারটাকে প্রশ্রয়ের চোখেই দেখে এসেছেন।

    বরং এমন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের বিরাট কুল – তাদের চোখে  মোদী এখন ‘বিরাট সফল নেতা’। কারণ এদের চোখে তিনি নাকি ভারতকে এক “পরাশক্তির প্রায় কাছাকাছি’ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। তাই সেই মোদী বাঙালির দুর্গার উপর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদী’ চাপালেন কি না বা কোনো ‘ধর্মীয় বিভাজন’ টেনে ভোটের জোশ তৈরি করলেন কি না তাতে তাদের কী আসে যায়! বরং মোদী বলতে চেয়েছেন – ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ বোধ এসব কোনো ভিত্তি নয়। বরং অন্যায়কারী হিন্দু হলেই সে আপনার ভাই, তার পাশে দাঁড়াতে হবে। এই হলো মোদীর আরএসএস-বিজেপির রাজনীতির ভিত্তি।
    এতে মোদীর এই রাজনীতিতে যদি কলকাতায় একটি দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করে ফেলতে পারে , তাতে বাংলাদেশের হিন্দুদের কোন স্বার্থটা উদ্ধার পাবে? নিজেকে রক্ষা পারবে কেন? কার দয়ায়? না, এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। চিন্তা করতেই রাজি না। এছাড়া কোনো কেন্দ্র থেকে কোনো মোদি কি তাদের বাঁচাতে আসবেন? আর আমাদের সরকার এ-কোন মোদীর ভারতকে করিডোরসহ অসংখ্য সুযোগ সুবিধা খুলে দিবে যে কলকাতায় একটা দাঙ্গা ও হত্যার আয়োজন করতে চায়?

    অতএব যেখানে বসে যে যা বলছেন তা চিন্তা করে দায়-দায়িত্ব নিয়েই মুখ খুলবেন – এটাই আমরা সকলকেই আগাম সতর্ক করতে পারি!

    বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো এবং বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক শ্রীরাধা দত্ত। যতটুকু শুনেছি এটা  আরএসএস-বিজেপির দল ও চিন্তা প্রভাবিত একটি থিংকট্যাংক। সেখানকার শ্রীরাধা বলছেন, ‘ভারতের অঙ্গরাজ্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিই প্রধান বিবেচ্য।”
    এসব মুখস্থ আপ্তবাক্য বা কথার কথা ভারতে অনেক লেখা হয়েছে। তাই এসব শুনলে আমাদের অস্বস্তি লাগে। পারলে বিজেপির ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ অথবা ‘ধর্মীয় বিভাজন’ রাজনীতি- এর বিরুদ্ধে লিখে দেখান। পারলে পক্ষেও লিখতে পারেন। কিন্তু চুপ থাকবেন না। এ সময় লিপ সার্ভিস দিয়ে পরিবর্তন আসবে না যদিও বাংলাদেশে আমরা আপনাদের উপর আশা রাখি না। আপনাদের মোদীর ভারতরাষ্ট্র ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’-এর রাজনীতি করে যাবে আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব আশা জিইয়ে রাখবেন এটা আর কত চলবে? বা চলতে পারে?  না, চলতে পারে না। এসব বুঝা কী খুব কঠিন!

    ‘পরাশক্তি’ ভারতঃ
    এখন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের এক বিরাট দল সব প্রসঙ্গ ছেড়ে এমন প্রচন্ড মোদীভক্ত হয়ে উঠেছেন যে দেখার মত! কেন? তারা কিভাবে মোদীভক্ত হয়েছেন? তাতেই বাকি সবাই নিজে নিজেই বুঝে যাবেন।
    ভারতের এখন বিভিন্ন রাজ্যে করোনা মহামারীতে রোগীদের অক্সিজেনের অভাবে বহু লোকের প্রাণ যাচ্ছে। এছাড়া সরঞ্জাম বেড এমনকি মৃত সতকারে শ্বশানেও পর্যাপ্ত  জায়গা পাওয়ায়ো কঠিন হয়েছে। অর্থাৎ মোদী যে ‘সরকার চালাতে’ গিয়ে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেছেন – এখানে এসে তা আর কারো থেকে তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। এ ব্যাপারটাকে ‘সরকার চালাতে’ না বলে ফরমাল ভাষায় বলা হয় ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর; যার চেয়ে দুনিয়ায় আর বড় ফেল বা পরাজয় নেই।

    ভারতে গত ১৬ বছরের এক ভ্যানিটি বা অহমিকা ভারতের আমলা-রাজনীতিবিদরা চালু করে রেখেছিলেন যে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্যও নেয়া যাবে না। কিন্তু কেন কংগ্রেস-বিজেপিসহ সব আমলা-রাজনীতিবিদ সাহায্য না নেয়ার এমন জিদ করেছিলেন? মিলিয়ে দেখুন, ১৬ বছর মানে হলো ২০০৫ সাল থেকে। তার সোজা মানে হলো, বুশের আমলে ভারত যখন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার থেকে ‘চীন ঠেকানোর’ ঠিকা পেয়েছিল, সে সময়ের সিদ্ধান্ত এটা। বাংলাদেশকে অ্যামেরিকার ভারতের হাতে  তুলে দিবার সিদ্ধান্তও এর একটু পরে ঘটেছিল। কিন্তু ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, এ সুযোগে নিজেকে এক ‘পরাশক্তি’ হিসেবে অসত্য হলেও তুলে ধরবে, দেখাবে। তাই তারা ১৬ বছর আগে মুরোদে না কুলালেও দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্য নেয়া নিষিদ্ধ করেছিল।
    তা হলে এখন সে কথা কেন তুলছি?

    কারণ অক্সিজেন সঙ্কটের শুরুতেই মোদি আর (সাহায্য না নেয়ার) ‘ফুটানিকা ডিব্বা’টা বহন করতে রাজি হননি কিংবা বলা ভালো এটাই তা ত্যাগের মোক্ষম সময় যে এই সুযোগে তিনি ভ্যানিটি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নিয়ে ফেলেন। সে কারণের যেন মোদী এবার মোট ২০টি দেশের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করেন, যার মধ্যে চীন আছে। এমনকি ক্ষুদ্র ভুটানও।

    আর এতেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সাংবাদিক-ইন্টেলেকচুয়ালরা। এ নিয়ে তাদের মনোভাব সবচেয়ে ভালো পাঠ করা যায় দ্যা প্রিন্টে ছাপা এক আর্টিকেলে। ওর শিরোনামটাই তাদের চিন্তা পাঠ করার জন্য যথেষ্ট। ওই আর্টিকেলের শিরোনাম হল, ‘ভারত কি তৃতীয় বিশ্ব হয়ে ফেরত গেল? মশকরাটা হল, আমাদের পরাশক্তির আকাঙ্খাটা এভাবে কোভিডের হাতে পড়ে ন্যাংটা হয়ে গেল”  [Is India back to being ‘Third World’? Irony of an aspiring superpower exposed by Covid crisis]।

    একই মনোভাব ‘দ্যাহিন্দু’র সুহাসিনী হায়দারের। তিনি প্রায় চ্যালেঞ্জের মত মোদিকে লিখেছেন তিনি কেন বিদেশী সাহায্য নিতে গেলেন? [Why has India accepted foreign aid after 17 years?]  এভাবে লিডিং সাংবাদিককুলের মধ্যে হতাশার ছায়া নেমে আসতে দেখছি আমরা।

    মূল কথাটা হলো, মোদীর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’- এসব দিকের জন্য তারা মোদীকে কাঁধে বসিয়ে তুলে ধরতে কোনোই শরম বোধ করেন না। কারণ এই হিন্দুত্বের মোদী তাদের মিথ্যা হলেও পরাশক্তির স্বাদ চাটিয়েছে বলে মনে করে তাঁরা। এখন মোদী সেই মিথ্যা গর্ব বা ভ্যানিটিটা কেড়ে ফেলে দেয়ায়ই তাদের এত হইচই।

    কাজেই হিন্দুত্ব কলকাতায় মার খেয়ে গেল কি না আর তাতে দিল্লির মত কলকাতার মুসলমান মারার উৎসব আসন্ন কি না!  না, এগুলো তাদের অ্যান্টেনার নজরে আসার যোগ্য হয়নি। এই জয় শ্রীরামের জয়জয়কার থেকে ভারতকে কে বাঁচাবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ভারত এখন তৃতীয় বিশ্ব ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]