Category: MODI

  • জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!

    জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!
    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Gw

     

     

     

    সময়ে কারও কাছে আঙুর ফল খুবই টক মনে হয় কারণ আঙুর হাতের নাগালে না আসা বা লাভ করা দুষ্প্রাপ্য বা নিজ অযোগ্যতা; তাই এমন কথা বলে চালিয়ে দেওয়া। ঠিক যেমন  ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’ হয়ে গেছে ।
    তিনি দাবি করেছেন, “নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে “প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে“। প্রতিবেশীদের কাছে এখন ভারতের পরিচয় স্থিতিশীলতার স্থায়ী প্রতীক হিসেবে”। মানে জয়শঙ্কর এখন আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন যে মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে মানে গত নয় বছরে  অন্তত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোদি ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে!!!!! আচ্ছা, এ তো বড় আজিব বাত! 

    তাহলে মোদির সাম্প্রতিক আমেরিকা সফর যা ছিল ২১-২৪ জুন – এই সময়কালের সপ্তাহেরও বেশি আগে থেকেই, ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট ভারতে যারা ছাপে (মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী) আর বাংলাদেশের প্রথম আলোও – এরা সকলে মিলে অন্তত তিনবার ঝলক উঠিয়ে কেন প্রপাগান্ডা করল যে বাংলাদেশের হাসিনার ভাগ্য নাকি মোদির আমেরিকা সফরে মোদি-বাইডেনের এর আলাপের মধ্যেই নির্ধারিত হবে????

    এখন প্রশ্ন হল কে মিথ্যা বলছে?
    দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী লিখেছিল, “ভারতের দুই প্রতিবেশি দেশ বছর শেষে নির্বাচনে যাচ্ছে। ভারত চায়, আমেরিকা এমন কোন উদ্যোগ যেন না নেয় যাতে ভারতের নিজস্বার্থ তাতে ক্ষুন্ন হয়ে যায়”। ভারতের নিজস্বার্থ মানে – আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হাসিনাকে আরেকবার জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার উপর বাধা সৃষ্টি – এটা বুঝতে হবে। কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এই অবস্থান নিয়েই খোলাখুলি লেখা ছেপে চলেছে। আর আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি উপদেষ্টা (NSA) জ্যাক সুলিভান [Jake Sullivan] ভারতে এসে ভারতের NSA অজিত দোভালের সাথেকার আলোচনায় নাকি এমন আলোচনা হয়েছে বলে দীপাঞ্জন দাবি করেছেন।

    “Two of India’s neighbours –Maldives and Bangladesh will go to polls later this year and early next year respectively. India is of the opinion that no initiatives should be launched in its neighbourhood that impacts its national interests adversely.”

    হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর লিখেছেন, “বাংলাদেশ-আমেরিকার সম্পর্ক একটা চাপের মধ্যে ঝাকুনিতে পড়েছে। রাষ্ট্রদুত পিটার হাস বারবার করে আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় এর আহবান জানাচ্ছে।”  [“…Peter Haas, repeatedly calling for the holding of a free and transparent general election”] যখন ইতোমধ্যেই আমেরিকা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যে নিজেকে এই অঞ্চলের এক পরাশক্তি বলে মিথ্যা করে হলেও ফুটানি করে ভাব দেখাতে চায় – সেই ভারতের কাছে নাকি হাসিনার সাহায্য চেয়েছে। [“Bangladesh has sought India’s assistance to tide over a rough patch in its relations with the US, especially over the conduct of elections in the neighbouring country, people familiar with the matter said on Tuesday.”]

    প্রথম আলোর প্রচেষ্টাঃ
    আর  রেজাউল লস্করের এই রিপোর্টারই উধৃতি দিয়েই আমাদের প্রথম আলো এক রিপোর্ট ছেপেছিল। যেন বাংলাদেশের সরকার ও তার সমর্থক এবং যারা ভারতের স্বার্থের ভিতরেই নিজস্বার্থ দেখে অথচ থাকে বাংলাদেশে – এমন গোষ্ঠিগুলোকে মিথ্যা করেই আস্থার কথা শোনাতে চেয়েছিল – এই অপ্রমাণিত কেবল জল্পনা-কল্পনার খবর (?) ছেপে উত্তেজনা সৃষ্টি করার মাধ্যমে!
    তবে এখানে ভারতের জ্ঞোয়েন্দা বিভাগ ও প্রথম আলোকে দেয়া তাদের এসাইনমেন্ট এর উদ্দেশ্য খুবই পরিস্কার। যেমন প্রথম আলো লিখছে, “…হিন্দুস্তান টাইমসের সূত্র বলছে, নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় একটি মুক্ত ও সমৃদ্ধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনার ওপরও আলোকপাত করেছে তারা“।
    অর্থাৎ ভারত আমেরিকাকে  চীনা জুজুর ভয় দেখাচ্ছে যে, যদি আমেরিকা তোমরা বাংলাদেশের আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় – এই উদ্দেশ্যে হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা-সহ নানান উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতেই থাকো তাহলে নাকি হাসিনা চীনের কোলে গিয়ে উঠে পড়তে পারে!  মানে আরেকবার রাতের নির্মাবাচন করতে দাও – এই হলো ভারতের অদ্ভুত আবদার!!!  ভারত এই কথিত চীনা-জুজুর মিথ্যা ভয়ের কথা ছড়িয়ে হাসিনাকেই আরেকবার ক্ষমতায় রেখে দিবার পক্ষে কথা তুলতে চাচ্ছে।
    আচ্ছা তাহলে এটাই কী জয়শঙ্করের কথিত  ” প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়ানো – কী তামাসা! আমরা কী প্রথম আলোর পারফরমেন্সে অভিভুত – এটা বলে উঠব!!!

    আরো আছেঃ
    প্রথম আলোর নয়াদিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সৌম্যের লেখা প্রথম আলোতে কখন কী পরিচয়ে ছাপা হবে এর তাল-ঠিকানা পাওয়া মুশকিল। যেমন কখনও তাঁর লেখা ছাপা হচ্ছে মতামত হিশাবে, কখনও নাম ছাড়াই শ্রেফ ‘নয়াদিল্লির প্রতিনিধি’ এভাবে পরিচয় লিখে; নয়ত প্রকাশ্যে নিজের নাম উল্লেখ করেই!!  গত ১৮ জুন সৌম্যের একটা লেখা ছাপা হয়েছিল; মানে মোদি-বাইডেন সরাসরি বা সামিট বৈঠক হয়েছিল ২৩ জুন – এর পাঁচদিন আগের ঘটনা সেটা। অর্থাৎ মোদির আমেরিকা রওয়ানা দিবার আগেই। সে লেখার সারকথা ছিল মোদি-বাইডেন বৈঠকে নাকি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ উঠছেই। এমনকি এভাবে লেখা হয়েছিল যে, “……সন্দেহ নেই, মোদি-বাইডেন বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের মন বোঝার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বাংলাদেশের নির্বাচনী গতিপ্রকৃতি”। অর্থাৎ সোজাকথায়, বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে!!!!!

    সৌমের ১৮ জুনের লেখায় আরো বলা হয়েছিলঃ

    এক.
    “দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তির দিকে দুই দেশের নজর যতটা নিবদ্ধ, ততটাই আগ্রহে এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। সে দেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন যে ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এই মুহূর্তে সরগরম, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি”।

    দুই.
    “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর চাপ, নতুন ভিসা নীতির মধ্য দিয়ে যা প্রতিফলিত, বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতকেও তা খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। ওই নীতির রূপায়ণ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভারতের অস্বস্তি ও চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই নয়া ফরমান নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল পরস্পরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। বাংলাদেশকে এই বিষয়ে আশ্বস্তও করা হয়েছে যে আসন্ন সফরে এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্যই মতবিনিময় করবেন”।

    তাহলে আজ ৫ জুলাই মানে মোদির সফর শেষে ১১/১২ দিন পরের।  তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… অথবা কেউই না; সবাই চুপ হয়ে আছে আর মুখে কুলুপ! না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!

     

    তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব
    নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… না সবার মুখে কুলুপ; না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!
    আগের দুসপ্তাহ ধরে মিথ্যা চাপাবাজির সব রিপোর্ট ছাপিয়ে ২৪ জুন থেকে আজও সবাই লুকিয়ে পড়ে আছে!!! আহা! কী সুবিধা!!!

     

    এখানেই শেষ নয়ঃ
    এরপর আবার সেই সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি হাজির! কিন্তু নতুন বেশভুষায়!
    আর এবার একই প্রথম আলোতে গত ২ জুলাই তার লেখার শিরোনাম কিন্তু এবার একেবারে উলটা কথায় –  “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে, বললেন জয়শঙ্কর”। আর সবচেয়ে বড় কথা এটাও ঘরে বসে এক বানানো খবর! আচ্ছা কন তো সৌম্য এটা একটা কথা হইল? নিজের মান-সম্মান বিশ্বাসযোগ্যতা এগুলো কিছুই না??? টাকাই সব!
    আপনি সৌম্য এতদিন কইলেন বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে! – মানে ২৩ জুনের বৈঠকে, মানে প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি বাংলাদেশের বা হাসিনার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবেন!! আর এখন এখানে কইতেছেন,জয়শঙ্কর বলেছেন – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে…।

    তাইলে সৌম বা প্রথম আলো আপনারা বলেন আপনাদের কোন কথাটা সঠিক????
    আপনাদের দুইটা কথার একটা তো অবশ্যই মিথ্যা কথা, এটা নিশ্চিত!

    কোনটা নিশ্চিত মিথ্যাঃ
     প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া সৌমের লেখাটার শিরোনাম – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে  – গুগল সার্চে দেখা গিয়েছে এটা ভারতে কোথাও ছাপা হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।  আর এই বানানো খবরটা বাংলাদেশে কেবল যুগান্তর, কালবেলা আর মানবজমিনে মাত্র; মানে বাংলাদেশেও আর কোন মিডিয়ায় ছাপা  হয় নয়। আর এরচেয়েও তাজ্জব ব্যাপারটা হল, এটা প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি হিশাবে সৌমের নিজস্ব রিপোর্ট হিশাবে। মানে সৌম নিজেই সোর্স!  তাহলে সে একই লেখা যুগান্তর, কালবেলা [পরে আবিস্কার হল যে সে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে তার খবরটা প্রথম আলোরটাই মানে ওটার কপি] আর মানবজমিনে ছাপা হয় কী করে???  খবর ছাপলে যে সোর্স বলতে হয় যেন তারা এটা জানেই না। তাই যেন এরা এই দুই মিডিয়া কেউই তাদের খবরের সোর্স কী তা লেখেই নাই।  বাংলাদেশের জার্নালিজমে সবচেয়ে বিপদজনক এক ধারা শুরু হয়েছে সোর্স-রেফারেন্স ছাড়া রিপোর্ট ছাপা অথবা আরো বিপদজনক এক শব্দ তারা লিখে  – “ডেস্ক রিপোর্ট”! অথচ  জার্নালিজমে ডেস্ক রিপোর্ট(!) বলে কিছু  কী আছে? হতে পারে না। তবে বাংলাদেশে এর মানে হল, অন্য মিডিয়া থেকে কপি করে এনেছে কিন্তু অসততা করে দেশি-বিদেশি সেই মিডিয়ার নামটাও বলতে চায় না। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটা হল – ডেস্ক রিপোর্ট মানে খবরের সোর্স বলে কিছু নাই (মানে পুরাটাই মিথ্যা বা গুরুত্বপুর্ণ কোন শব্দ বা বাক্য বদলে দেয়া টুইস্ট নিউজও তা হতে পারে) অথচ একে মিডিয়া রিপোর্ট আর জার্নালিজম বলে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে!! আর প্রথম আলো এই নষ্ট-সাংবাদিকতার নেতা উদ্গাতা!

    আরো গভীরে যাইঃ
    সৌমের প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া লেখা এটা কী এর আগের দিন বা আগের এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন প্রেস ব্রিফিং বা কোথায় দেয়া বক্তব্য???
    জবাব হল – না একেবারেই না। সৌম্য রিপোর্টে কেবল লিখেছেন, “……রাজধানী দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে নরেন্দ্র মোদির শাসনের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের ‘সাফল্য’ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। কিন্তু কোথাও কবে  জয়শঙ্কর একথা বলেছেন সে প্রসঙ্গে সৌম লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত শুক্রবার এ মন্তব্য করেন।  কিন্তু গুগল সার্চে এই রিপোর্টটা এক প্রথম আলোতে সৌম্যের লেখা  ছাড়া আর কেউ লিখে নাই বা কোন পত্রিকা নিজে রিপোর্ট লিখে ছাপে নাই। আর আগেই বলেছি বাংলাদেশের যেদুই একটা মিডিয়া এটা ছেপেছে তা তারা প্রথম আলোর নাম উল্লেখ করে বা না করে মানে সোর্স উল্লেখ না করেই ছেপে দিয়েছে। আর কোন “এরেঞ্জমেন্ট” থাকলে সেটা গোপন রেখে দিয়েছে।

    কেন আর কোথাও (ভারতে বা বাংলাদেশে) সৌম্যের লেখা এই রিপোর্ট এর বিষয়ে রিপোর্ট নাইঃ
    ভারতের কেন্দ্র সরকার বা সংসদের নির্বাচন আর সাত-আট মাস বাকি; মোটামুটি বললে আগামি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর শুরু হতে পারে।  ফলে জয়শঙ্কর-মোদি সহ সরকারের সকলের সব কাজকর্ম এখন নির্বাচন-মুখি বা মোদির ইমেজ বাড়ানোকে লক্ষ্য করেই আগাচ্ছে।  তাই গত নয় বছরে দেশে-বিদেশে মোদির সাফল্য কী – দেশের মুখ-উজ্জ্বল কী করেছেন এনিয়ে প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন জয়শঙ্কর! তাই তিনি এক বক্তৃতা আয়োজন করেছিলেন। আর সেখানেই দিয়েছিলেন এমন কিছু বক্তব্য। কিন্তু প্রথম কথা সেটার তারিখ কবে??? ওর তারিখ ছিল ৮ জুন। কীভাবে বের করলাম?
    অনেক খুজাখুজির পরে দেখা গেল মোদির নয় বছরের সাফল্য  আর জয়শঙ্করের বক্তব্য এদুই শব্দে মিল আছে এমন একটাই ইংরাজি রিপোর্ট আছে – যা ভারতের প্রায় সবাই ছেপেছে। যদিও স্বভাবসিদ্ধ ভাবে মোদি-বিজেপি এই প্রপাগান্ডা খবরটাকে টুইস্ট করেছে কুখ্যাত ANI কে দিয়েও। অনেকে সেটাই ছেপেছে। যেমন দ্যাপ্রিন্ট এর লেখা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস্র লেখা। ইত্যাদি। আর এর বাইরে এক মিডিয়া যা আমার নজরে এসেছে তা হলো “লাইভ-মিন্ট” – এই কম চলা পত্রিকার রিপোর্টটা ভাল- এটা সরকারি এজেন্সি পিটিআই এর নিউজ।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ হল এসব খবরই ভারতে প্রকাশিত হয়েছে  ৮ জুন তারিখের; মানে যেদিন জয়শঙ্কর তা বলেছেন।
    তাহলে কী ৮ জুন তারিখে প্রকাশিত জয়শঙ্কর এর বক্তব্য প্রসঙ্গে কী জয়শঙ্কর আবার পরবর্তিতে পয়লা জুলাই তারিখে এসে তিনি একই বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলেছেন??? কারণ সৌম্যের রিপোর্টের দাবি এই তারিখ ১ জুলাইয়ের!!!! এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য!!!  কারণ, যে প্রশ্নের উত্তর নাই তা হল,  সেক্ষেত্রে কেন ভারতের আর কোন মিডিয়ায় জয়শঙ্করের এই কথিত ১ জুলাইয়ের মিডিয়ার সাথে কথা বলা নিয়ে ভারতে কোন রিপোর্ট কেউ ছাপে নাই কেন??? এটা বেশ অস্বাভাবিক, বিশ্বাস অযোগ্য!!!

    তাহলে সৌম্য বন্দোপাধ্যায়  ১ জুলাই জয়শঙ্কর এমন সব কথা বলেছেন বলে দাবি করে রিপোর্ট লিখলেন কেন??? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।
    তবে, খুব সম্ভবত একাজ করার কারণ হল কংগ্রেস দল।  আসলে জয়শঙ্কর খুব সম্ভবত আবার একই প্রসঙ্গে – ফিরে নতুন করে কিছুই বলেন নাই। কিন্তু কংগ্রেস দল চায় জয়শঙ্করের বক্তব্যকেই একটু সমালোচনা করতে যা বাংলাদেশে প্রকাশিত হবে। আর তাই সৌম্যের ঐ ভুয়া রিপোর্টে  যার মধ্যে (বাড়তি হিশাবে) কলকাতার বাঙালি এক সাবেক কূটনীতিক দেব মুখোপাধ্যায়  এর বরাতে কিছু সমালোচনা ছাপা হয়েছে। যেখানে তিনি “তিস্তা চুক্তি না হওয়া” আর “অখণ্ড ভারতের মানচিত্র” মোদি প্রকাশ করেছে বলে –  এনিয়ে অসন্তোষ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। যদিও ফ্যাক্টস হল, ভারত বাংলাদেশ থেকে করিডোর নিয়েছে কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েও তিস্তা পানি আজও  দেয় নাই – এর প্রথম ভায়লেটর (২০১১ সালে বাংলাদেশে সফর) বা লঙ্ঘনকারী সেসময়ে কংগ্রেসেরই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর ক্ষমতাকালের ও ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরকালে এটা উন্মোচিত হয়েছিল যে ভারত তিস্তা পানিচুক্তি ভঙ্গ করছে। দেখুন সেসময়ের বিবিসি রিপোর্ট।    আর সেই একই ভায়োলেটর পরের প্রধানমন্ত্রী মোদি – এই ফ্যাক্ট তো লুকানো যাবে না। সে যাই হোক তাহলে, সৌমের এই রিপোর্ট কী মোদির নয়, কংগ্রেসের অর্থে লেখানো??? প্রথম আলো অর্থের লোভে এই জুয়াচুরি-সাংবাদিকতা করেছে???

    শেষ কথাঃ প্রথম আলোতে ছাপা সৌম বন্দোপাধ্যায়ের ২ জুলাইয়ের এই রিপোর্ট  অস্পষ্ট রহস্যময়ই থেকে গেল!

    আপডেটঃ ৭ জুলাই ২০২৩; দুপুর ১২ঃ ৩৪

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন

    মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন
    গৌতম দাস

    ২২ জুন ২০২৩      সকাল ০৯ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4E8

     

                   Biden hosts Indian Prime Minister Modi at White House

     

    মোদির বাইডেন সাক্ষাত হবে আজকে। কিন্তু এর আগেই ভারত একটা হাইপ [HYPE] তুলেছে মানে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ‘ওভার-পাবলিসিটি’ শুরু করেছে গত কমপক্ষে প্রায় দশদিন ধরে।
    এর উদ্দেশ্য দুইটা। এক.  আভ্যন্তরীণভাবে ভারতের ভোটারদের দেখানো যে মোদি এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব পরাশক্তি নেতা হয়ে গেছে। আর দুই. বাংলাদেশে হাসিনা সরকার টিকবে কিনা সেই নির্ধারক ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি, সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক এই ইমেজ তিনি গড়তে চান।
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২১-২৪ জুন তার আমেরিকা সফরে ইতোমধ্যেই আমেরিকায় পৌছেছেন। আজ ২২ তারিখ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে তার সাক্ষাতের কথা।
    এদিকে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য অ্যামেরিকান নয়া ভিসা পলিসিতে দেয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে, বাংলাদেশে ভিতর সরকার বা বিরোধী দলগুলোর যেখানে আমেরিকান এই নীতির বিরুদ্ধে কোন আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য প্রায় নাই বললেই চলে; বরং এর চেয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অপর দলের জন্য কত খারাপ হয়েছে  আর তাতে অন্যদলটা কত বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এনিয়ে সরকারি  প্রপাগান্ডাটাই মুল আসর দখল করেছে; যদিও এতে ব্যাপারটা মানুষ তামাসা হিশাবে দেখেছে। অন্তত ফেসবুক কে যদি আমার সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানার (সোশাল মিডিয়া) উৎস বলে  ধরি তাহলে  এমনটাই সোশাল মিডিয়ার ডমিনেটিং মুড।  আর মানুষের কাছে যে ওয়েলকামিং মেসেজ গেছে তা হল, অ্যামেরিকান ভিসা পলিসি এবার মানুষকে একটা ভাল কিছু দিবে কারণ, এটা হাসিনা সরকারের উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে!
    ওদিকে আবার ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়েছে উলটা। ভারতের মিডিয়া, কলাম লেখক, একাদেমিক বা থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইত্যাদিতে যুক্ত যারা তাদের সবার একই ভাষ্য আমেরিকা “কত্ত-ই না খারাপ দেশ” – যে তারা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে! আর এতে বাংলাদেশের উপর ভারতের আলগা খবরদারি মানে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” সেটা আর কিছুই এখন উসুল করা যাবে না; আগের সাজানো বাগান থেকে কত সহজেই না লুট ততপরতা চালানো যে অবারিত সুযোগ ছিল যেন সেটা এখন বন্ধ বা ক্ষুন্ন হতে যাচ্ছে আর এই ম্যাসেজ তারা পাঠ করে ফেলেচ্ছে। আর একারণে তারা রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।
    এতে সবচেয়ে অসুবিধা যেটা তা হল তাদের স্বার্থের পক্ষে ন্যায্যতা কী? সাফাই বয়ান কী? এমন কিছু তো একটা থাকতেই হবে। নইলে “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” হারিয়ে যাচ্ছে বললেই এর অর্থ হবে সেটা অবৈধ স্বার্থ নয়, ন্যায্য স্বার্থ অথবা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে নেয়া কোন অসম চুক্তি বা ঘুষের চুক্তি নয় এমন একটা নুন্যতম বয়ান অবশ্যই হতেই হবে। আর এখানেই অসাঞ্জস্যতা এক বিরাট ঘাটতি ভারতের সব বক্তব্য বা দাবিকে দুর্বল করে রেখেছে।

    পেড মিডিয়া প্রপাগান্ডাঃ
    এই সুযোগে প্রথম আলোর মত পত্রিকাগুলো যারা ভারতের গোয়েন্দাবিভাগের মিথ্যা সাজানো প্রপাগান্ডা খবর নিজেরা একে সত্যি বলে নিজ পত্রিকায় খবর ছাপে; তাদের এই দালালি ততপরতারর রেট মনে হচ্ছে বেড়ে গেছে। অথবা গোয়েন্দাবিভাগ নিজেরাই যেচে রেট বাড়িয়ে দিয়েছে হয়ত যাতে  মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছাপতে এরা আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠে, লোভনীয় পরিমাণ অর্থের লোভে অস্থির, ডেসপারেট। বেচাইন হয়ে যায় যেন!
    সম্ভবত সেকারণেই আমরা  নিউজ দেখছি প্রথম আলোতে যেখানে মরিয়া হয়ে বিপদে পড়বে জেনেও এসব প্রপাগান্ডার আবর্জনা  তারা খবর বলে ছাপছে। ধরা পড়লে শিরোনাম বদলে লঘু করার চেষ্টা করছে তবু প্রপাগান্ডা কাজ চালিয়েই যাচ্ছে। এসব মিথ্যা খবর তৈরির ভঙ্গিটা হল এমন দাবি করা যেন ভারতের মোদিই হচ্ছে বাংলাদেশে বাপ! তাই যেন বাংলাদেশে কী ঘটবে এর একমাত্র নির্ধারক ও ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি! মোদি যেন বাংলাদেশকে তাঁর কোন বাপের তালুক হিশাবে পেয়েছেন। তাই মোদিই একমাত্র হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির অ্যামেরিকান চাপ থেকে বাঁচাবেন, উদ্ধার করবেন। এই হল এসবের সারকথা!

    যেমন, গতকাল ২১ জুন সকাল থেকে দেখা গেল আরেক প্রপাগান্ডা যে বাংলাদেশ মানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন নাকি জয়শঙ্কর বা ভারতকে অনুরোধ করেছে যেন মোদি তার আমেরিকার সফরে বাইডেনের কাছে হাসিনার জন্য কিছু সুপারিশ করে। যার সার ইঙ্গিতটা হল, লেম্যানের ভাষায় বললে মোদি যেন হাসিনা সরকারকে আরেকবার রেখে দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়, আমেরিকাকে বলে!

    ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বারানসিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ ভুক্ত
    দেশগুলোর
    মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে গত ১২ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে
    বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
    এ কে আব্দুল মোমেনের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। সূত্র বলছে, বিভিন্ন
    পর্যায়ে ভারতের কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিষয়টি তুলেছেন।

    যদিও ভারতের মিডিয়ার এই দাবি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও সেতুমন্ত্রী কাদের অস্বীকার করেছেন। তার মানে ভারতের দাবি একপক্ষীয়, সকলেই বিনা তর্কে গ্রহণ করে এমন দাবি নয়।
    আর এটাই ছিল ২১ জুন সকাল থেকে প্রথম আলোর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট। অথচ প্রথম আলোর এই কাজটা এক মারাত্মক জার্নালিস্টিক অসততা। কেন?

    বর্তমান বাংলাদেশ প্রশ্নে, আমাদের মোমেন অথবা আমেরিকা সফররত মোদির ভারত এদের যে কেউ নানা প্রপাগান্ডা করতেই পারে যার সোজা অর্থ ফ্যাক্টস লুকাইতে পারে। তাহলে এক্ষেত্রে প্রথম আলোর অবস্থান হওয়া উচিত অন্তত নিজে ফ্যাক্টস না লুকানো বা কাউকে লুকাতে না দেওয়া বা সাহায্য না করা। এই সাপেক্ষে মানে এটা করার পরেই কেবল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অর্থের ভান্ডে প্রথম আলো একটু-আধটু মুখ দিতে পারে; যতটুকু যা পায়। কিন্তু প্রথম আলো – খোদ জার্নালিজম – এই কাজটাই ত্যাগ করে চলে গিয়েছে।

                                                                TIMES

    যেমন, ভারতের কিছুপক্ষের নানান দাবি বা মোমেনের দাবিতে তা সব তোলপাড় করে ফেলতে পারে, এমনকি মোদির অ্যামেরিকান সফরকে কেন্দ্র করে মিথ্যা আশা বা প্রপাগান্ডা যে হাসিনা আবার টিকে যাচ্ছে বলে হৈচৈও শুরু করতে পারে। আর এক্ষেত্রে মোদি ও বিজেপির প্রধান লাভের লক্ষ্যটা হল মিথ্যা হলেও এটা দিয়েই মোদির ইমেজ গড়া; মানে মোদিকে এক পরাশক্তি নেতা হিশাবে তুলে ধরা যে বাংলাদেশে সরকারকে বাঁচায় – এই ইমেজ গড়াটাই বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। তাতে এটা পুরাটাই মিথ্যা  হয় যে বাইডেন মোদির কথা শুনবেই না অথবা আদৌও এনিয়ে মোদি-বাইডেন হয়ত আলাপই হবে না – এমন হলেও ক্ষতি নাই। কারণ মোদির এই পরাশক্তি বা মিথ্যা গ্লোবাল নেতার ইমেজ – এটাই আগামি ভারতের নির্বাচনে বিজেপি ব্যবহার করবে আর দাবি করবে মোদির নেতৃত্বে ভারত কত উঁচুতে উঠেছে। আর এতে হাসিনা মিথ্যা আশা আকাঙ্খা তৈরি করে এর ছলনায় আরো হতাশ হয়ে যাবে কিনা সেটা তো মোদির বিবেচনাই নয়!
    অতএব এই ভুয়া উচ্ছাস তুলে হলেও ভারত মরিয়া হয়ে হাসিনার -জান যাওয়া অবস্থায়- এই মিথ্যা পরাশক্তি নেতার ইমেজ কামাতে নেমেছে। এমনকি পরোক্ষে তিনি হাসিনাকেও ট্রাপে ফেলেছেন, তা হলেও।
    আর এই পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম আলো যেপথ নিল, তা হল এর মধ্যে ফ্যাক্টস বা সত্যটা কী? সেটা বের করতে না যাওয়া।  মোদি কী আসলেই বাইডেনকে বলে হাসিনার সব বালা-মুসিবত মানে আরেকবার ক্ষমতায় থেকে যাবার বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন? নাকি এর কোন আদৌ সুযোগই নাই?
    না, প্রথম আলো এবিষয়ে ফ্যাক্টস উদ্ধার সেদিকে গেল না – বরং সে গেল মোদির মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে হাইপ বা উচ্ছাস তোলা বা যোগানো – যেটা সরাসরি একটা প্রতারণা???
    অথচ জার্নালিজমে সৎ থাকলে প্রথম আলোর ন্যায্য কাজ হত ফ্যাক্টসের সন্ধানে যাওয়া; যে অন্তত মোদির আদৌ কিছু করার সুযোগ আছে কিনা! সেটা যাচাই করে আসা!

    অনেকের মনে সন্দেহ হতে পারে সেটা কী খুবই সহজ হবে? এমন ভেবে! হা এটা এখানে একেবারেই সহজ এবং তৈরিই ছিল। যেমন, মোমেন বা মোদির ভারতের অনেকের দাবির প্রসঙ্গ হল বাইডেন বা অ্যামেরিকান অবস্থা নিয়ে – মানে বাইডেন-মোদি সামিটে (বাংলাদেশ প্রসঙ্গে) বাইডেন কী অবস্থানে থেকে কথা বলবেন? তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসুক বা না আসুক – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাইডেনের অবস্থান আগে থেকেই কী জানা যায় না, সেই তালাসে যেতে হত।

    এই প্রসঙ্গে অথেনটিক নিউজ পাবার এক বেস্ট জায়গা ও এক ব্যক্তি হল জন কিরবি [John Kirby ]। যিনি হোয়াইট হাউসে বসেন কারণ তিনি হলেন হোয়াইট হাউসের ন্যশনাল সিকিউরিটির স্ট্রাটেজিক কমিউনিকেশনের কো-অরডিনেটর কাম মুখপাত্র [National Security Council coordinator]। যিনি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং দিয়ে থাকেন। মোদির এই সফরটা দুই রাষ্ট্রের দুই এক্সিকিউটিভ হেড এর মধ্যে। মানে অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে। তাই কোন অথেনটিক নিউজ পেতে হলে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এখান key personality বিবেচ্য হবে। আর জার্নালিস্ট তো বটেই এমনকি  যারা এডভান্স পাঠক  এটা এদের কারোরই অজানা নয়। আর বাংলাদেশে বসে তাঁর [কিরবি-র] যেকোন ব্রিফিং পাবার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হল অ্যামেরিকান সরকারি ওয়েব সাইটে [সাধারণত যেটা https://www.state.gov] যাওয়া যেখানে সব বিস্তারিত থাকে। যেমন মোদি-বাইডেন হবু সাক্ষাত উপলক্ষ্যে আগাম যে ব্রিফিং সেটা ছিল ২০ পৃষ্ঠারো বেশি তাহলেও পুরাটাই ঐ ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। এখন জার্নালিজম করতে চাইলে এসব খবর জানা ও সংগ্রহ করা ছিল প্রথম আলোর সরাসরি দায়ীত্ব!

    এখন দেখা যাক প্রথম আলো হিন্দুস্থান টাইমস এর যে প্রপাগান্ডা রিপোর্ট ২১ তারিখ ভোর থেকে লোড করেছে সেটার সময় হল আমাদের ভোর পাঁচটায়। অথচ জন কিরবি এর ব্রিফিং হয়ে গেছে অ্যামেরিকান ২০ তারিখ সকাল ১১টায়। মানে এর ব্রিফিং আমরা বাংলাদেশে বসে রিপোর্টটা সংগ্রহের যোগ্য হয়ে গেছিল  ঐদিনই (২০ জুন) তবে আমাদের মোটামুটি রাত বারোটার পর থেকেই।
    অর্থাৎ প্রথম আলো জন কিরবি এর ব্রিফিং বক্তব্য আমলেই নেয় নাই; নেওয়ার দরকারও মনে করে নাই। বলতে গেলে উপেক্ষা করে লুকিয়েছে আর বরং এরই পালটা প্রপাগান্ডা রিপোর্টটাই পরের (২১ জুন) ভোরবেলা থেকে প্রচারণায় এনেছে।

    জন কিরবি – তিনি কী বলেছিলেনঃ
    জন করবি এর ব্রিফিং সাধারণত অনেক লম্বা হয়, সারা দুনিয়ার নানান দেশ প্রসঙ্গ হিশাবে থাকে তাই! তাই এটা ছিল জন কিরবির বিশ পৃষ্টা জুড়ে দুনিয়ার প্রসঙ্গ এর ব্রিফিং এখানে পাবেন ;  তা হলেও ওর ভিতর বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা আছে ওর চতুর্থ পৃষ্টায়। পুরাটা ডাউনলোড করে চতুর্থ পৃষ্টায় খুজেন। 

                         NSC Coordinator John Kirby


    জনকিরবি বলছেনঃ

    বাইডেন-মোদি হবু আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠুক বা নাই উঠুক; অথবা এমনকি মোদি সেখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যাই বলেন না কেন –  বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারিত। আর তা হচ্ছেঃ আমরা ইতোমধ্যেই পরিস্কার করে বলেছি যে আমরা চাইব বাংলাদেশে একটা ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন হবে। আর আমরা ভিসা পলিসিতে ট্রাভেল নিষেধাজ্ঞা তো এজন্যই দিয়েছি যাতে কেউ এই ইলেকশনে যা ইচ্ছা তাই না করতে পারে। অতএব এপ্রসঙ্গে এভাবে আমি কেবল আমাদের অবস্থান থেকেই কথাগুলো বলে দিলাম। আর আপনারারো বুঝলেন আমাদের স্পষ্ট অবস্থানটা কী। আর আমরা এব্যাপারে একেবারের পাবলিক সামনে খোলাখুলিও তবে একই সাথে আমরা ভারতীয় সরকারকে তাদের বাংলাদেশ সরকারের সাথে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সেটা যাই থাক সেনিয়ে চাইলে তাদের কথা বলতেই দিব বা আমাদের শুনাতেও পারবে।

    We have already made clear our desire to free and fair elections in Bangladesh, and you’re right, we adapted our visa policy to restrict travel to individuals who undermine Bangladeshi elections.  So I can only speak for ourselves.  You know where we are.  We’ve been pretty public about that, but we would let the Indian Government talk about their bilateral relations.

    মূল বিষয়টা হচ্ছে আগে বলেছি অ্যামেরিকান ভিসানীতি প্রকাশের পরে ভারত নিশ্চিত হয়ে যায় যে গত ১৫ বছর ধরে হাসিনাকে ক্ষমতায় সমর্থন জুগিয়ে বাংলাদেশ উপর যে জুলুম লুটপাটের রাজত্ব গড়ে যে সমস্ত অসম সুবিধা খেয়ে এসেছিল সেসবের ইতি হতে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই লিখছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের কথিত নির্বাচনে যেসব কান্ডকীর্তির ভোট করে বারবার নিজের ক্ষমতাকে হাসিনা বাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন তা আর এবার আগামিতে হচ্ছে না। এটাই অ্যামেরিকান ভিসানীতির সবচেয়ে বড় ইম্পিকেশন বা খাঁড়া অর্থ। যেটা ভারত ও হাসিনার উপর ও বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ হতে যাচ্ছে।
    ভারতীয় মিডিয়ায় সকলেই কমবেশি একথা ছাপছেঃ

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means.    

    তাহলে, এই হলো দুধ আর পানির আলাদা হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রথম আলোর এই এভেলএবেল ফ্যাক্টস টা তুলে আনে নাই। বরং এর উলটা মিথ্যা প্রপাগান্ডাকেই গতকাল সকাল থেকে প্রচার করে গেছে।

    এখন এই প্রথম আলো; এই জার্নালিজম কী টিকে থাকতে পারবে? না পারে?

     

    আপডেটঃ ২৩ জুন ২০২৩ ০১ঃ ৫৪ am

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে

    কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে
    গৌতম দাস
    ২০ জুন  ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Dk

     

                     MODI & MUNTASHIR

    ইংরাজিতে জাতি শব্দটা বুঝাতে মূলত দুইটা শব্দ হয় – Race ও Ethnicity। অর্থাৎ ইংরাজির Race ও Ethnicity এই দুটা শব্দকেই আমরা বাংলা করি জাতি বলে। খুবই সংক্ষেপে বললে এরমধ্যে Race অর্থে জাতি মানে যেটা  মানুষ প্রজাতির দুনিয়ায় আগমন বা উদ্ভব ঘটেছিল কয়েক মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা যেটা; এই অর্থে তা মানুষ জাতি [Human Race]। এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের রেস অর্থে বা রেসিয়াল বা জাতিগত ভিন্নতা – তা আবার বুঝা সম্ভব তার রক্তের ডিএনএ এর ভিন্নতা থেকে।

    বিপরীতে বাংলায় লেখা আরেক জাতি এই শব্দ ও  ধারণা হল যেটা Ethnicity অর্থে জাতি। যেটা একাল থেকে মাত্র মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরানা – এথনিক জাতি। মানুষ কালচারাল যা কিছু আছে তাতে ভাষা, ধর্মীয়, সামাজিক, প্রধান খাদ্য, রান্নার প্রক্রিয়া, বিশ্বাস মিথ ইত্যাদি সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত – এটাই এথনিক জাতি পরিচয়।  যেটাকে আমরা সভ্যতা বলি অথবা, অন্যভাষায় বললে দুনিয়ায় মানুষ যবে থেকে আগের যাযাবর জীবন ছেড়ে প্রথম কৃষিকাজ এর জীবন শুরু করেছিল। দুনিয়ার কোন এক ভুগোলে থিতু হয়ে বসে গিয়েছিল। আর তাতেই একেকটা সিভিলাইজেশন এর সুত্রপাত ঘটেছিল। এই অর্থে আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ। এটাকেই বলে এথনিক জাতি পরিচয়।  আর পরে সিন্ধু সভ্যতারই উপবিভাগ মানে এরও আবার সাব-এথনিক জাতি পরিচয় হিশাবে আমরা বাঙালি।
    উপরের কথাগুলো হল জাতি ধারনাটার সবচেয়ে ইতিবাচক উপস্থাপন। আর এর বাইরে জাতি পরিচয়ের বা জাতি বা জাত পরিচয় নিয়ে কথাবার্তার সবটাই মূলত নেতিবাচক। কারণ সেসবগুলোতে জাত পরিচয় নিয়ে আলাপ মানেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্য সকলকে ঘৃণা করা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো। যেখানে মূল কথাটা হল আমার জাতই শ্রেষ্ঠ  – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ।
    এই ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিপদজনক দিকটা হল – নিজেকে জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধে বলে উপলব্দি ও হাজির করা মানেই অন্য সকল জাত-পরিচয়ের মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, নিচা দেখানো ইত্যাদি আর এখান থেকেই যেহেতু আমি শ্রেষ্ঠ কাজেই আমি অন্য সকল জাত (বা ধর্ম)-পরিচয়ের মানুষকে নির্মুল করতে পারব সেটা জায়েজ হবে মনে করা শুরু হয়। আর এই নির্মুল বলতে অন্য জাত-ধর্ম পরিচয়ের মানুষকে হত্যা, দখল করা নইজের পায়ের নিচে রাখা অধীনস্ত করে রাখা এমনকি কলোনিদখল করা ইত্যাদি এসব কাজকরার স্বপক্ষে নিজ জাতশ্রেষ্ঠত্ব বোধকে সাফাই হিশাবে তুলে ধরা শুরু হয়। এটাই, এই প্রেজেন্টশন এভাবে বয়ান হাজির করা এটাই  মোদির হিন্দুত্ববাদ। এটাই হিটলারিজম – জর্মান জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ।

    তত্বকথা শেষ। এবার ব্যবহারিক কথাবার্তা। আর এর এক নয়া নমুনা হল ভারতের ‘আদিপুরুষ’ সিনেমা। যেটা গত ১২ জুন রিলিজ হয়েছে।  পাঠক সকলকে চিনে রাখতে বলব মনোজ শুক্লা নামের এই ব্যক্তিকে। যার ছবি উপরে দিয়েছি। অনেক স্ময় তাকে মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা নামেও চিনবেন।
    ইনিই হচ্ছেন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় পেমেন্ট পান এমন  -সিনেমা, নাটক বা টিভি অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডায়লগ লেখক। বিশেষ করে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ নামে পৌরাণিক বা মিথিক্যাল ঘটনাবলী যদি আপনার কাহিনীর চাহিদা হয়ে থাকে। এছাড়াও ভারতের জাতীয় দিবসগুলোতে সেদিনের টিভি প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট লিখার কাজে। আর বলাই বাহুল্য এসব দিন মানেই ভারতের সেনাবাহিনীর বর্ণনা আর এখান থেকে সবচেয়ে সহজে এবং অবশ্যই থাকবে মানে এতে ভিলেন হয়ে যে জিনিষ থাকবে তা হল পাকিস্তান; মানে মুসলমান-ইসলাম। এবার হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান যেটা সেখানে হাজির থাকবে এরই পপুলার কঠিন সুরসুরি দেয়া আবেগের স্ক্রিপ্ট লেখক হিশাবে পাবেন এই মনোজ মুন্তাশীর-কে!

                                                                                 MANOJ MUNTASHIR SHUKLA

    এমনিতেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান জিনিষটাই থকথকে আবেগের; যা স্থির মনে মানুষকে চিন্তা করতে দেয়না বরং ক্রমাগত আবেগে ভেসে যেতে উস্কানি তুলে চলে। কোন র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিও মানুষের মধ্যে কাজ শুরু করার আগেই ভোক্তা মানুষ বা ক্লায়েন্টকে মনোজ মুন্তাশীর তাঁর আবেগের সুরসুরি তুলে দখল নিতে হবে – এটা মনোজ খুবই ভাল বুঝেন এবং দক্ষ তিনি। ফলে এরপরে আবার মানুষের র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিতে চিন্তা পেরিয়ে স্পিরিট বা স্পিরিচুয়াল স্তরে যেতে মানুষকে মনোজ কোন সুযোগই দেন না।এই হল  মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা। একালের হিটলার মোদি বা হিন্দুত্ববাদ এর মূলত সাফাই বয়ান লেখক। অথচ বাইরে যার পরিচয় পান্ডুলিপি – অভিনয়ের পান্ডুলিপি লেখক বা প্রণেতা।

    মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা তিনিই আদিপুরুষ সিনেমার ডায়লগের লেখক। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “…এদিকে ‘আদিপুরুষ’ সিনেমার সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাশীর শুক্লা সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, যেসব সংলাপ দর্শকদের আঘাত করেছে, সেগুলো সংশোধন করা হবে”।
    আর প্রথম আলোও খুবই ইনোসেন্টলি ছেপেছে, “……এদিকে ‘আদিপুরুষ’ ছবির সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাসির শুক্লা টুইট করে জানিয়েছিলেন যে এই ছবির বিতর্কিত সব সংলাপ বদল করা হবে। মনোজ এক বড়সড় পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমি এবং ছবির নির্মাতা আর পরিচালক মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এই ছবির যেসব সংলাপ আপনাদের আঘাত করেছে, আমরা তা সব সংশোধন করব।’ আর এই সপ্তাহে তা ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হবে”।

     

    সবাই নিস্পাপ, ইনোসেন্টঃ
    মনোজ মুন্তাশীর থেকে প্রথম আলো অথবা চাই কী দর্শকেরা যাদের ভিতর হিন্দুত্ব জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের জোশ-চেতনা জাগরিত হয়েছে এরা সকলেই নিজেকে নিস্পাপ হিসাবেই দেখছেন। যাদের সবার কম কথাটা যেন এরকম – আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা দেখেছি কেবল – অথবা আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা খবরাখবর নিয়ে পত্রিকার বিনোদন পাতা চালিয়েছি যাতে ভারতীয় সেনিমাতার প্রচার প্রসার হয় এতটুকুই। এটা তো বিনোদনমূলক কাজ মাত্র। এভাবে ম্নোজও হয়ত বলবেন আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা যেন চলে প্রযোজক আমাকে টাকা দিয়েছে – তার সিনামাটা চালিয়ে টাকা উঠিয়ে দেয়াটাই আমার দেখার বিষয়। অর্থাৎ কেউ জানেই না যে তিনি একটা মারাত্মক অপরাধ ক্করছেন। নিজের জন্যও ক্ষতিকর একটা কাজ করেছেন।

    যদিও পুরা ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তাতে অনেক মোচড় বা টুইস্টও আছেঃ
    সিনেমাটা মূলত তেলেগু (বৃহত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ) ডমিনেটিং অভিনেতা-প্রযোজকদের এক হিন্দি সিনেমা যার অন্য সব দক্ষিণী ভাষাতেই (তামিল, তেলেগু, কন্নড় ও মালায়লাম ভাষায় ) রিলিজ দেয়া হয়েছে। রিলিজের প্রথম দিনেই নাকি ১৪০ কোটি টাকার টিকেট বিক্রি হয়েছে।  আবার এককথায় বললে এটা হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর প্রচার ভিত্তিক এক সিনেমা ততপরতা যেটা একটা হিটলারিজম! কিন্তু এতে মজার টুইস্ট হল, আরএসএস-এর কিছু অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এতে খুশি না। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “মুক্তির আগে এবং পরেও এই সিনেমাকে ঘিরে অভিযোগ একটাই ‘হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে আদিপুরুষের কাহিনি’। এমনকি সিনেমা থেকে কিছু দৃশ্য বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে আর্জি জানায় হিন্দু সেনার দল।
    আবার আরএক রিপোর্টে লিখেছে, আদিপুরুষ: রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’! – এই শিরোনামে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, “…… সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতের জাতীয় সভাপতি পিটি সুরেশ মিশ্রের পক্ষে কমলেশ শর্মা এই উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন পরিচালককে”। তাহলে কাহিনী কী এখানে?
    কাহিনী হল এটাও আসলে হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর উপর দাঁড়িয়ে আরেক ততপরতা; কিন্তু তা হলেও যেটা দেখে মনে হবে এটা তো সিনেমাটার বিরোধিতা করছে! সেটা কেমন করে?  এটা “হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে” বলে অভিযোগটাই তো  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর দাঁড়ানো।  তারা বলতে চাচ্ছে এটা মুসলমানেরা করেছে বা মুসলমানদের চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে করা কাজ অথবা মুসলমান সংশ্লিষ্টতা বা তাদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে করা কাজ। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বা অভিযোগ হল এখানে রামায়নের রাবনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাইফ আলী খান যিনি পতৌদির (এখন হরিয়ানা-দিল্লির এক অংশ হয়ে গেছে, সেকালে এক ছোট করদ রাজা ছিল) নবাবের বংশধর মুসলমান, ক্রিকেটার মনসুর আলো খান পতৌদির সন্তান। মূল ইঙ্গিত-বক্তব্যটা হল যেন এটা বলা যে – মুসলমানেরা হিন্দুদের সব ভাল ঐতিহ্য নষ্ট করে দিচ্ছে।
    পরের অভিযোগটা সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতদের। সেটা তো আরো সরাসুরি এটাক  বলছে এটা ” রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’ করা হয়েছে।  তাই এখানে হনুমানের দাড়ি-গোফ রাখা হয় নাই।

    কোনো হিন্দু গোঁফ ছাড়া দাড়ি রাখে না, যেভাবে ভগবান হনুমানজিকে দেখানো হয়েছে।
    চলচ্চিত্রটি রামায়ণ এবং ভগবান রাম,
    মা সীতা, ভগবান হনুমানের সম্পূর্ণ ইসলামীকরণ হয়েছে।
    এমনকি আদিপুরুষে রাবণের ভূমিকায় অভিনয় করা
    সাইফ আলি খানও তৈমুর কিংবা আলাউদ্দিন খিলজির মতো দেখতে।”

    অথচ কেউ টেরই পাইলেন না যে এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে ‘হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ দেখানোর’ এর যত ততপরতা – এটা একটা এতই উগ্র জাতি বা জাতিবাদি চিন্তা যে এটাই ভারতকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য যথেষ্ট। হিটলার হয়ত আপসোস করে বলবেন যে তিনি ও কেন এত উগ্র হতে পারেন নাই।
    আবার ওদিকে নেপাল তার দেশের সব সিনেমা থেকে  আদিপুরুষ সহ সব সিনেমাকে নামিয়ে দিয়েছে। দেখুন নেপালে হিন্দি ছবি প্রদর্শন বন্ধ ঘোষণা, নিষিদ্ধ ‘আদিপুরুষ’।

    আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আর আট মাসের মধ্যে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন। মানে মোদিকে এবার জততেই হবে; নইলে বাইডেনের আমেরিকা বসে আছে ঘাড়ের উপর। তাই ইতোমধ্যেই যা শুরু হয়েছে – মুসলমান কোপাও, জোরদার করো  – যাতে হিন্দু ভোট সব হিন্দুত্বের বড়াই ভ্যানিটিতে কেবল  মোদির বাক্সে ঢুকে, এরই নানান ততপরতা। এবারও মিথ্যা মিথ্য অভিনয়ে ভারেতের পাকিস্তান আক্রমণের নাটক হতে পারে। জয়শঙ্কর ও উঠতে বসতে কুটনৈতিক নর্মস রেওয়াজ ভেঙ্গে পাকিস্তানকে গালাগালি করছে, সোজন্যেবোধের হ্যান্ডশেক করবেন না জানাচ্ছেন। কারণ যত পাকিস্তানবিরোধীতা প্রদর্শন ততই মোদি নিজেকে হিন্দু-বীর হিশাবে হাজির দেখাতে পারবে – এই হল ভিতরের সাজেশন বয়ান। এছাড়া এসব হিন্দু সেনারা মামলা করলে সিনেমা প্রযোজকেরা অর্থের বিনিময়ে আপোষ করতেও চাইতে পারে। যা এসব লোকাল সংগঠনের আক আয়ের উৎস হতে পারে! কাজেই এগুলা টুইস্ট ঘটনা হিশাবে দেখা যাচ্ছে খারাপ নয়!

    কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়ঃ
    একালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হল যে, এখন আমরা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র একই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত হয়ে গেছি বলে এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় সকল জনগোষ্ঠিই অপর (Others) জনগোষ্ঠির সাথে কানেকটেড। আর তা জীবনের সকল অর্থেই জীবনের সাথে আরেক জীবনযাত্রার ক্রমশ গভীর হয়ে উঠছে এই বিনিময়; যা কেবল পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ  নয়।  কাজেই অন্য অপর জাতি জনগোষ্ঠির তুলনায় আপনি শ্রেষ্ঠ  এমন এক  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা একালে অচল শুধু নয়; এটা আত্মঘাতি। কারণ, এতে ভারত উল্টা একঘরে হয়ে যাবে অন্য যেকোন রাষ্ট্র এই ঘৃণা-বিদ্বেষ অপছন্দই শুধু না – এই ভারতের সঙ্গে পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যঅও করতে চাইবে না। কিছুদিন আগে কাতার লিড নিয়েছিল ওআইসির [OIC] হয়ে কঠর সমালোচনা করেছিল। জবাবে ভারতে বিদেশ মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি মুখরক্ষার একটাই শব্দ পেয়েছিল যে  OIC নাকি সাম্প্রদায়িক!!!!!!  এখানে দেখুন, জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    তাহলে এর সারকথাটা হল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে ছেয়ে উঠার একালে, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এই বয়ান এই উগ্র জাতিবাদি রাজনীতি দিয়ে কোন রাষ্ট্র খাড়া করা আত্মঘাতি, অচল। এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ! হিতে-বিপরীত কাজ! আর এরই অনুসঙ্গ আরেক চিহ্ন হল যে, আপনার রাষ্ট্রে বা কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়। কারণ, উগ্র জাতিবাদি রাজনীতিক ভিত্তি থলে তো ভিতরে নাগরিক অসাম্যই চর্চা হবে, মুসলমান কোপায়েই ভোট নিতে চাইবেন। এটাই হবে একমাত্র ততপরতা ও ভিত্তি! আর এঘটনায় আপনার পণ্যের ক্রেতা ভয় পাবে -অপছন্দ করা শুরু করবেই! এজন্যই বলছে একালে উগ্র জাতিবাদ –হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এক অচল আত্মফঘাতি রাজনোইতিক চিন্তা।  হিন্দুত্ববাদের ভারত তাই ক্রমশ ভেঙ্গে পড়বেই, একঘরে হয়ে যেতে বাধ্য
    একালে ধর্ম প্রচার, নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এজন্য অন্যের দেশ দখলে (ধর্ম প্রচার বা কলোনিদখলের জন্য) বেরিয়ে পড়বেন কিংবা এসব কাজকে  পুরানা দিনের রেফারেন্স দিয়ে জায়েজ বলে সাফাই বয়ান খাড়া করবেন – তা হবে না ! এটা কাজ করবে না। আর এরচেয়েও বড় কথা এটা আত্মঘাতি অচল ততপরতা! আপনিই একঘ্রে হয়ে যাবেন। সেটা সবার আগে বুঝবার চেষ্টা করেন!

    সবার আগে দুনিয়ায় বিশেষ করে চলতি নয়া শতকে কী কী  ও কেন বদলে গেছে সেসব কিছুকে আমল করেন।  নিজের ভাল চাইলে এর বাইরে কিছুই নাই!
    তাই একটা সিনেমা শুধু সিনেমা নয়, বহুকিছুই……।

    অথচ ভারত রাষ্ট্রের যেখানে দরকার একটা ফেডারেলিজম বা ফেডারল রাষ্ট্র কায়েম যাতে কেন্দ্র-রাজ্য বৈষম্য দূর হয়ে যায়, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্বের বোধের রাষ্ট্র না হয়।
    তাই এ’রাষ্ট্র নিজেও ভুগবে পড়শি রাষ্ট্রদেরকেও ভুগাবে  আর সাথে সংঘাত হত্যা, ক্লিনজিং ডেকে আনবে সেই শঙ্কা প্রবল হচ্ছে!

    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  মধ্যরাত ০১ঃ ১৯
    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  ভোর ০৫ঃ ০৪
    আপডেটঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৪

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    গুরুত্বপুর্ণ হওয়াতে একটা পাঠক-প্রশ্ন নিচে তুলে আনলাম সাথে আমার জবাবঃ
    Anil Iftakher
    বিশ্বে যতো জাতি আছে,তাদের মধ্যে অনেকেই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছে।যারা এগিয়ে আছে তাদের গর্ব করাটা কি অন্যায়? আমরা যে অনেক দিক দিয়ে পিছিয়ে আছি এটা নিয়ে কেউ খোচা দিলে কি তা অন্যা

    লেখকের জবাবঃ
    Anil Iftakher গর্বটা যখন করবেন “আমিই শ্রেষ্ঠ জাত” বলে দাবি করে তখন অন্যেরা বুঝবে যে এটা তার জন্য বিপদের কথা।
    তবে  এটা অন্যায় হবে মূলত এজন্য যে এরপরে আপনি আমার ঘাড়ে চড়বেন, আপনার পা টিপে দিতে বলবেন, আমার সম্পদ কেড়ে নিবেন, আমাকে উঠায় নিতে চাইবেন ইত্যাদি। আর এসবই করবেন যেহেতু – আপনিই শ্রেষ্ঠ – সেটা আগেই বলে নিছিলেন, তাই। অর্থাৎ আপনি যে জাত-শ্রেষ্ঠ এই বক্তব্যের দাম চাইবেন আপনি, আর আমাকে এর দাম চুকাতে বলবেন………।
    আর এখান থেকেই, অন্যের উপর আধিপত্য করা বা অন্যদেশকে কলোনিদখল করে নিবার পক্ষে যে সাফাই বয়ান, ন্যায্যতার বয়ান বা Justification  সেটা সাধারণত তৈরি হয়, হবে ঐকথার উপর দাঁড়িয়ে যে উনিই “শ্রেষ্ঠ জাত” তাই!
    – বৃটিশেরা আমাদের কলোনিদখল করে নিয়ে দাবি করত আমরা তো অসভ্য তাই সভ্যতা শিখাতে বৃটিশেরা আমাদের দখল করেছ।
    – বাংলায় জমিদার হিন্দুর আধিপত্যও এভাবে শুরু হয়েছিল যেহেতু তারা আগেই বলে নিয়েছিল যে ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’ – তাই মুসলমানেরা বাঙালি হিন্দুর সমান নয়, নিচা ও অধস্তন। অতএব মুসলমানদের উপর জমিদার হিন্দু বাঙ্গালির আধিপত্য, দাপট দেখানো অথবা অসমান জ্ঞান করে মুসলমানদেরকে তাদের পায়ের নিচে রাখাটা জায়েজ! অথবা কী অর্থে তারা বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রবেশাধিকার পেতে পারে সেই শর্ত তারা তাই হাজির করেছিল সেটা হল “অসাম্প্রদায়িকতা”। মানে মুসলমান-ইসলামিক চিহ্ন, অভ্যাস বা বৈশিষ্ঠ ত্যাগ করে বা লুকিয়ে রেখে, প্রকাশ্যে না দেখিয়ে তবেই হিন্দু সমাজে পিছনের বেঞ্চে বসার সুযোগ পেতে হবে!
    – হিটলারেরো জাত শ্রেষ্ঠত্ব বোধ থেকে সাফাই হচ্ছে তাই – জর্মান জাতি নীল চোখের এরিয়ান (Aryan referred to a racial category, বাংলায় আর্য) রক্তের তাই তারা শ্রেষ্ঠ। তাই ইউরোপের বাকি সবাইকে তাদের অধীনস্ততা করতে হবে। আর এথেকেই হিটলারের  ইহুদিদেরকে  গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা জায়েজ ইত্যাদি।

    –  মোদি ভারতে মুসলমানদের নিচা দেখানো আর মোদির হিন্দু জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর বড়াই দেখানোও একই কারণে। যেমন করোনাকালে মাঝে তারা বলেছিল তাবলীগ-মারকাজ এরা কালচারের দিক থেকে খুবই নিচু।  কারণ মুসলমানেরা নাকি আঙুল দিয়ে চেটে চেটে খাবার তুলে খায়। অথচ যেখানে ঘটনা হল, সারা অখন্ড ভারতই  এথনিক-জাত বৈশিষ্ঠ হিশাবে তারা সকলেরই খাদ্য গ্রহণ বা  খাওয়ার স্টাইল হল তারা চামচ দিয়ে তুলে খায় না। বরং হাতের পাঁচ আঙুল ব্যবহার করে, আঙুলে ধরে খাবার তুলে খায়। আবার খেয়ে বলতে চায় যে যে খাবারটা আমার শরীরের বাইরের – প্রকৃতির – কিন্তু তা আমার নিজ শরীর প্রবেশ করার পরে এক ‘প্রক্রিয়ায়’ সেটা আমার নিজ-শরীর হয়ে যাবে তাকে আগে থেকেই নিজ হাতে ছুঁয়ে ছেনে অনুভব করে আদরে আপন করে নিব না কেন! আমি আমার ঐ হবু খাদ্য বা শরীরকে আগেই তাকে স্পর্শে ফিল করতে চাই, এই অনুভুতি আমার জন্য খুবই জরুরি; অতএব হাত দিয়েই খেতে হবে!

    এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – তাই এক ভয়ঙ্কর ফেনোমেনা, ভয়ঙ্কর অসুখ, অসুস্থতা। আপনার যেকোন (অপর) বা আপনার পড়শিকে আপনি এটা ব্যবহার করেই তাকে সহজেই ‘নির্মুল” করার পক্ষে যুক্তি তুলবেন।  আর এটাকেই এথনিক ক্লিনজিং “Ethnic Cleansing” বলে।
    তাহলে আপনার কাছে যেটাকে খুবই সাধারণ – নিজেকে নিয়ে একটু গর্ব করা – বলে বুঝেছিলেন সেটা গত গভীর হিংস্র, নৃশংস এন্টি-হিউম্যান, এক কালো চিন্তা, despotic বা দাগী চিন্তা এখন তা বুঝতে চেষ্টা করেন। জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই  চিন্তার আসল রূপকে বুঝেন, চিনে নেন।
    একালের বাইডেন আর ট্রাম্প এদুই শাসকেরও দুই ব্যাখ্যার কিন্তু একই – হোয়াইট সুপ্রীজম বা White Supremacy – চিন্তা তারা ধারণ করে এসেছে। এনিয়ে আমার লেখাতে পাবেন। আর এখানে হোয়াইট বলতে পুর্ব ইউরোপীয় “সাদা ককেশীয়” [White CAUCASUS] এথনিক জাতের মানুষ বুঝানো হয়। মূল দিক গুলো তুলেছি এখন এবার বাকি অংশ বা আরো গভীরে যেতে গুগল সার্চ করে পড়াশুনা করে নেন।

     

     

     

     

     

  • বেচারা আবদি

    বেচারা আবদি
    গৌতম দাস

    ৮ জুন ২০২৩    ০০ঃ ০১ মধ্য রাত
    https://wp.me/p1sCvy-4AX

     

    India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election

     

    এমন আবদি সাব-রে লইয়া আমরা কী করিবঃ
    এসএনএম আবদি [SNM ABDI]
    ভারতের প্রিন্ট মিডিয়া জগতে একজন সম্পাদক। এখন অবশ্য কোন মিডিয়ায় নাই, তবে ‘র’-এর সাথে সম্পর্কিত। তার এক দুঃখ-কাহিনী ভরা লেখা প্রকাশিত হয়েছে গতকাল ৬ জুন, ভারতের কুইন্ট [The QUINT] পত্রিকায়। সেখানে লেখার শেষে আবদির পরিচয় দেয়া হয়েছে  আউটলুক পত্রিকার সাবেক ডেপুটে এডিটর হিশাবে। আউটলুক-কে ভারতের মাপে “প্রগতিবাদী” মিডিয়া গণ্য করা হয়। আর কথিত মোদির-সেকুলার ভারতে কোন মুসলমান এডিটরের জন্য “প্রগতিশীলতাই” সবচেয়ে ভাল সার্টিফিকেট হয়ত!
    কিন্তু আবদি সাব এখন দেখি লেখাটা লিখেছেন য়াগের মতই ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের জন্য বা হয়ে। আজকাল তাঁর মত লেখকেরা এতই বেপরোয়া হয়েছেন যে সরাসরিই ‘র’-এর নাম লিখতেও  আর এদের ডর-লজ্জা করে না। ভদ্র ড্রয়িইং রুমে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা অসভ্যতা, বেয়াদবি মানা হবে এজন্য যে র [RAW] এই সংগঠন ভিনদেশে অন্তর্ঘাতমূলক বা subversive কাজ করে, অবলীলায় নিজ স্বার্থে সেদেশের নিরীহ মানুষও মেরে ফেলতে পারে, কেবল  এই হত্যাকে নিজদেশের স্বার্থ মনে করলে। যেটা বলাই বাহুল্য, মানুষ জগতের কাছে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য আদব-স্বভাব নয়; যদিও তা কোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থ হতেই পারে। একারণে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্য উচ্চারণ এড়িয়ে চলা ভদ্রতার রেওয়াজ!  যেমন আপনি কখনই বলতে পারেন না বা বলবেন না যে ওমুকের বাসা থেকে আপনি এটা চুরি করে এনেছেন! এটা হয় না!  কিন্তু  একালে আবদি বা সুবীর ভৌমিক দেখা যাচ্ছে এসব পরোয়া করা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের কাছে  ভদ্র-অভদ্র হলে কিছুই যায় আসে না।  বরং ‘র’-এর ক্ষমতা বা সাফল্য দেখানোই যেন গর্বের কাজ!

    আবদির এলেখার মুলকথাটা হল – লিখেছেন, বাংলাদেশে আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা এতে “ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, বিদেশে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা চালানো গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’, ন্যাশনাল সিকিউরিটি সমন্বয়ক সেক্রেটারিয়েট এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অফিস সকলেই বিরাট এক ঝাঁকি [jolted ] খেয়েছে”। মানে আবদি সাব বেচারা দুঃখ পেয়েছেন এমনভাবে ভারতের গুরুত্বপুর্ণ সকলকে ঝাঁকি দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়াতে! দেখেন নিচের ইংরাজিটা……

    It has jolted the Ministry of External, Affairs,
    the Research and Analysis Wing,
    the National Security Coordination Secretariat, and even the Prime Minister’s Office.

    দুবছর আগেও এমনই গোয়েন্দা বিভাগের এক ফরমায়েসি লেখা লিখছিলেন আবদি। আর এসবেরও আগে ২০১১ সালে তিনি বাংলাদেশে  প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সফরসঙ্গী হিশাবে এসেছিলেন। তখন অবশ্য তিনি দ্যা ফাস্ট পোস্ট -এই নামের ইংরাজি দৈনিকের সম্পাদক ছিলেন। মানে এখন [কংগ্রেস-ভার্সানে] গোয়েন্দাবিভাগের সাথে সম্পর্কিত তিনি। আর মনমোহনের যেই সফরটা ছিল এক প্রতারণার সফর – তিস্তার পানির বিনিময়ে করিডোর নেওয়ার কথা থাকলেও আজও সেই প্রতিশ্রুতি ভারত পূরণ করেনি, অথচ করিডোর ভোগ করে চলেছে সমানে ও অবলীলায়। এটাকেই ভারতের সাফল্যও মনে করছেন এরা।

    এবার যে পত্রিকায় আবদির লেখা ছাপা হয়েছে তার সম্পর্কেও দুকথা বলা দরকার। একালে নাগরিক অধিকারের উপর আক্রমাণাত্মক মোদি সরকারের ভারতে, এখনও সবার চেয়ে মাথা উচু করা সাহসী ভারতীয় মিডিয়াটা হলে ওয়াইর [WIRE] । বাকিরা  টিকতে পারে নাই। আর ওয়াইর-এর পরে যে এখনও মোদির টাকার লোভ আর চাপ সামলিয়ে এখনও  কিছু করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে সেই পত্রিকা হল কুইন্ট [the QUINT]।   যদিও আবদির লেখার কোন দায়িত্ব তারা নিতে চায় না তা জানিয়ে রেখেছে।

    আবদির গতকালের লেখা প্রসঙ্গেঃ
    এলেখার  শিরোনামেই বাংলাদেশে ভারতের হার ও ভারতের স্বার্থ বিপদে আছে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে আর এরপর ছটপটানি-তে বাঁচার চেষ্টা করছেন যেন, এভাবে লেখা। যার শিরোনাম লিখেছে এভাবে, India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election মানে “বাংলাদেশের নির্বাচন ইসুতে আমেরিকার হাত-মুচড়ানো থেরাপির প্রয়োগে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধরা”।
    শুরুর প্যারায় লিখছেন, বাংলাদেশে “আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞার চাপ এটা ভারতের জন্য সত্যিই এক খারাপ সংবাদ” [is really bad news for India]। কিন্তু তিনি কেন বাংলাদেশের উপর আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এক ভিন্ন দেশ ভারত এতে নিজের বিপদ দেখছে?? তা জানা যায় না!

    তবে তাঁর পরের প্যারাটা সবচেয়ে মজার। এবার এখানে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে হাসিনা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে হাসিনা অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইন-বহির্ভুত কায়দায় জিতেছিলেন। তাই লিখেছেন, “ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য পরিস্কার। এটা হাসিনা সরকারকে এমন এক শক্ত-ঘেরটোপের ভিতরে ফেলেছে তাতে হাসিনা যেন আর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মত করে অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইনবহির্ভুত উপায়ে ভোটে কারচুপি করতে না পারে। কিন্তু বিপরীতে দিল্লি যেকোন উপায়ে হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়” । দেখেন দেখি আবদির আবদার!!!

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means”.

    আবদির এই প্যারাটা একদিকে সততার সাথে মন খুলে বলা তার মনের কথা (মানে চোরের মনে কথার মত) আর বলাই বাহুল্য তা চোরামির গল্প সবাইকে খুলে বলার মতই এক গাধামি অবশ্যই!  আবার অন্যদিকে যেকোন সাফাই-বক্তব্যে অন্যতম দিক হলে সেটাকে একটা ন্যায়-ইনসাফের উপর দাঁড়ানো কথা হতেই হয়। অথচ আবদি আমলই করছেন না যে তার খায়েস-আকাঙ্খা যেটা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বা মোদি সরকারের খায়েস-আকাঙ্খা  – সেটার পিছনে কোন ন্যায়-ইনসাফের লেশ মাত্র নাই!
    যেমন আবাদির শেষ বাক্যটা দেখেন  New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means” – আমেরিকার ইচ্ছার বিপরীতে ভারত চায় যেকোন উপায়ে নির্বাচনে জিতানো ।
    আচ্ছা আবদি সাব, বলেন তো দেখি  তার মানে যেটা হাসিনাকে যেকোন উপায়ে জিতানোর ভারতীয় খায়েস সেটা কী আর কোন “নির্বাচন” থাকে?? না কারচুপি হয় সেটা??? এছাড়া এভাবে ভারত অন্যায়-বেইনসাফিতে যদি হাসিনা জিতাতে চায় তাহলে বিপরীতে আমেরিকার বাংলাদেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপকে হস্তক্ষেপ বলার সুযোগ বা নৈতিকতা কী আর ভারতের থাকে??? আবদি ‘র’-এর খেদমতে এতই মশগুল যে এই বেইনসাফি দিকটার দিকে তাঁর কোন চোখ নাই, আমল নাই!!!

    ভারতীয় লেখকেরা বিশেষ করে যারা মোদির কোলে বসে লেখেন তারা এত উচ্চমাত্রার উগ্রজাতিবাদে ভুগেন যে তাদের কাছে ন্যশনাল ইন্টারেস্ট বলে এক  আজিব ধারণা তাদের লালন করতে দেখা যায় যা অনুসারে ভারতের স্বার্থ-রক্ষার্থে তারা যাই করুক তা জায়েজ ও বৈধ হয়ে যাবে – বলে এক আজিব ধারনা তারা লালন করে থাকে। আবদিও এমনই এক লোক।
    আবদি লিখছেন, “একদিকে আমেরিকা হাসিনার প্রতি অবিশ্বাসে মাত্রা তুঙ্গে নিয়ে গেছে যে সে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, অন্যদিকে ভারতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে যেকোন উপায়ে হাসিনাকে ২০২৪ এর নির্বাচনে চতুর্থবারের মত জিতিয়ে আনা; আর এটাই
    তার বিদেশনীতি-কাম নিরাপত্তা স্বার্থ”।
    নিচে মূল ইংরাজিটা।

    “On the one hand, the US has such grave misgivings about Hasina that it wants to evict her from power. And on the other hand, the biggest priority of India’s foreign policy-cum-security establishment is to get Hasina re-elected in January 2024 for a fourth successive term at any cost.”

    তাঁর মানে যেটাকে ভারতের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” মনে করা হবে সেটা ভারত চাইলেই পাবে আর তা পাওয়ার জন্য ভারত সবকিছু করতে পারবে; তাতে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ বা নিজ রাষ্ট্রীয় এক্তিয়ারের বাইরে তা চলে গেলেও অথবা  অন্যদেশের সার্বভৌমত্ব এক্তিয়ার ভঙ্গ করলেও যেন কিছু এসে যায় না। অর্থাৎ সারকথাটা হল, ভারত সেটাকে তার জাতীয় স্বার্থ মনে করছে কিনা – এই হবে মাপকাঠি। এই মাপকাঠি ধরে সব জায়েজ মনে করতে হবে!! যদি খালি  ভারত মনে করে তাহলেই ভারত তা আদায় করতে পারবে!!!!
    তবে এই কথা শুনে তো আমাদের হাততালি দিয়ে উঠা উচিত। কারণ তাহলে, মোদি দেখতে খুবই খারাপ তুলনায় রাহুল অনেক হ্যান্ডসাম ছোকড়া। ফলে বাংলাদেশ যদি মনে করে মোদিকে উপড়ায়ে ফেলায় দিয়ে রাহুল কেন  বরং মমতাদিদিকে যদি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় নিয়ে আসি আর খালি সেটা যদি বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট বলে ঘোষণা করে দেই তাহলে তো আমরাও  ইচ্ছামত ভারতের সরকার বদলাতে পারব, তাই না??? কী মজাই না হবে!!! সত্যি! আবদি নিশ্চয় এতে খুশি হয়েছেন?

    এরপরে এসে এই বার আবদি সাবের হুশ এসেছে যে তাহলে বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকা-ভারতের কাড়াকাড়িতে তাহলে ভারত কী সবসময় মার খেয়েই যাবে? পরিস্থিতি সবসময় আমেরিকার পক্ষে ছেড়ে দিয়ে ভারত কী স্যাক্রিফাইস করেই যাবে নাকি উলটা আমেরিকাকে অমান্য করবে অথবা এমন অমান্য করা কী ঠিক হবে?  এই ধরণের লোমছোম কথাবার্তা  লিখে চলেছেন আবদি……The gaping chasm underlines the India-US conflict over Bangladesh and raises valid questions about India’s capabilities to pursue its goal defying the US – and whether it is wise to do so. It also flags gross US insensitivity to India’s interests even in India’s own backyard and how the US always expects India to quietly sacrifice its interests for America if they happen to clash!

    মজার কথা হল, এরপরেও আবদি মনে করেন, বাংলাদেশ হল নাকি ভারতের বাগানবাড়ি বা শখের মামাবাড়ি  ফলে সেখানে কেন আমেরিকান মাতব্বরি চলবে [India’s interests even in India’s own backyard] এনিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের কোন বাপের বাগানবাড়ি সেটা অবশ্য আমরা বাংলাদেশিরা জানি না বা মানিও না…।

    তিনি এরপরেও আবার ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের কথা তুলেছেন। বলছেন ভারতের কাছে পরীক্ষিত বন্ধু হল নাকি হাসিনা! আর ওদিকে আমেরিকা সে না হাসিনার পক্ষে না আওয়ামি লীগের পক্ষে – আমেরিকা কেবল সরকার বদল বা শাসক বদলে দিবার পক্ষে!!! For India, there is no alternative to Hasina – New Delhi’s tried and tested ally. But the US is neither in Hasina’s nor Awami League’s favour – it is in favour of an outright regime change, no less.
    মানে হল আবদি বলছেন ভারত নামের এই বাচ্চাটার মুড়ির মোয়া ভালো লেগেছে এখন তাকে তার হাতে সেটা না  দিয়ে অন্যকিছু দিলে কী তার ভাল লাগবে? আসলে আমেরিকা কতই না নিষ্ঠুর আর কী বলব!!! মাসুম বাচ্চা ভারতের কথা একবারো ভাববে না?????

    এরপর তিনি হাসিনাকে এক মারাত্মক সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে তা ভেবে সাবধান করেছেন। বলছেন, সাবধান “…… There is a very high probability of visas of Hasina’s immediate family members……” কথাটার বাংলা করলে,  হাসিনার আপন পরিবারের সদস্যদের উপরও আমেরিকা ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ [মানে তারাও যেন আমেরিকায় প্রবেশাসধিকার না পায় বা থাকলে বের করে দেয় ] এমন ব্যবস্থা জারি হতে পারে……।।

    তবে আসলে,  আবদি লোকটার চিন্তা ভাবনা খুবই ভোঁতা আর বোকা-বোকা কিসিমের, সন্দেহ নাই। যেমন বলতেছেন, হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ নাকি চীন আর পাকিস্তানিতে ভরে যাবে। মানে সেই আশির দশকের সব অচল চিন্তাভাবনা – হিন্দু-মুসলমান রেষারেষিতে ফেলে পেটি-মধ্যবিত্ত যেভাবে চিন্তা করে বা করত!  এর মানে  উনি জানেনই না যে হাসিনার সাথে একালে খুবই ও সবচেয়ে ভাল সম্পর্ক হল পাকিস্তানের; বাংলাদেশ পাকিস্তানি হাই-কমিশনারেরও। এছাড়া, চীন ২০১৬ সাল থেকে চীনের হাত খুলে অবকাঠামো ঋণ দেয়া যা একচোটে প্রায় ২৬ বিলিয়ন যা বাংলাদেশের জীবনে মোট বাকি সবার দেওয়া ঋণের চেয়েও বেশি। আর এটাই হাসিনার উন্নয়নের গল্পের পিছনের মূল রসদ। তাদের দলের চোরদের খাই মিটানোর উপায়!! একই অবস্থা ভারতের। চীন-ভারতের বাণিজ্য এখন বছর ১১৫ বিলিয়নের (যার মধ্যে চীন থেকে ভারতে আমদানি ৯৮.৫বিলিয়ন বাকিটা চীনে রপ্তানি) কাছাকাছি তাতে লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারতের যতই লড়াই ঝগড়া থাক। আবাদি-কে এসব দিকে চোখ তুলে তাকাতে শিখতেই হবে – আশির দশকের পরে এখনও পুরাণা চিন্তা বা পুরাতন গল্প ইত্যাদি এসবের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেই চলার এটা হল বেকুবের সাহস!

    এককথায় বললে আবদি আসলে হারু পার্টি। তিনি আগাম ধরে নিয়েই লিখতে বসেছেন যে [যেটা উনি ঠিকই বুঝেছেন] যে গত পনেরো বছর ধরে ভারত হাসিনার বাংলাদেশকে  যে চুসা চুসে গিয়েছে সেসব দিন এখন ফুরিয়ে আসছে। তাই প্রতিটা বাক্যে আবদি তিনি আপসোস ঝড়িয়ে কথা বলেছেন। এমনকি আরেক বাঙালি পেটি কর্মকর্তা – ঢাকায় ভারতের সাবেক এক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী – তাঁর কথিত এক বাণী স্মরণ করেছেন আবদি। আবদি বলছেন ২০১৮ সালের দিকে পিনাক রঞ্জন লিখেছিলেন – “হাসিনার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া এই অসৎ উদ্দেশ্যে করা একটা কাজ …the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”. ” –  যেটা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার উপর হস্তক্ষেপ করতে চেয়ে করা কাজ…”।

    In a rare criticism of Hasina by an Indian official, Pinak Ranjan Chakraborty who served as India’s Ambassador in Dhaka from 2007 to 2009, wrote in 2018 post-retirement that the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”.

    শেষ কথাটা হল, আবদি দেখতে পেয়েছেন, “বাংলাদেশ এখন আমেরিকার পরামর্শের পক্ষেই ক্রমশ ঝুকে যাকচ্ছে এবং যাবেই; আর এতে সবকিছুই বিএনপির পক্ষে চলে যাচ্ছে…”

    আমাদের শেষের বাক্যে মাত্র দুইটা শব্দ – বেচারা আবদি!  

    >>>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

    ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
    গৌতম দাস

    ০৪ জুন ২০২৩   ০০ঃ ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4yT

     

         দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে – প্রথম আলো

    অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভারত হাসিনা-বিরুদ্ধ-ততপরতায় নেমে পড়েছে, অবস্থান নিয়েছে। কিছু জায়গায় তো একেবারে প্রকাশ্যে, দেখিয়েই তা করতে শুরু করেছে।
    ভারতের মোদি সরকার বিশেষত তার গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশে হাসিনা সরকার আর টিকছে না যেন তা ধরে নিয়ে কাজকাম শুরু করে দিয়েছে। তাদের সকল ততপরতা এখন এমন হাসিনাবিরোধীতাকে টার্গেট করে যে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের জন্য তারা এখন ঝেঁড়ে কেশে হাসিনাকেই দায়ী করে বাইডেনের কাছে নালিশ দিয়েছে ও একশন দাবি করেছে। সেই চিঠির ইংরাজি পিডিএফ কপি এখানে। আর এর এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ অংশ বাংলা করে দিচ্ছি নিচে।


    ” যখন থেকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় তখন থেকে আজ অবদি বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে। বাড়িঘর পুড়ানো, লুট করা, মন্দির ধবংস করা ও প্রতিমা ভাঙচুর, খুন রেপ আর বাধ্য করে ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদিতে সবকিছুরই পরিণতি হয়েছে যে হিন্দুরা ভারতে পালায়ে গেছে।  শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের খৃশ্চান জনগোষ্ঠিকেই নিপীড়ন-নির্যাতন করেছে; তাদের তাদের উপাসনালয় জ্বালিয়ে দেয়া লুট করা, পাস্টার-পাদ্রীকে জেলে নেওয়া আর ধর্মান্তকরণ এর সময় পরিবার তছনছ করে দেয়া ইত্যাদি সবই ঘটেছে”।
    চিঠির যে অংশটার বাংলা অনুবাদ এটা নিচে সেটারই ইংরাজিটা, 

    “Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs”.

    আসলে ভারতীয় প্ররোচনায় ড্রাফট করা আর কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে সে অভিযোগ তোলার সময়ে হাসিনার বিরুদ্ধে বিরোধীদলের কর্মীদেরকে যতগুলো গুম, খুন, অপহরণ, বিনাবিচারে হত্যা বা বেআইনি আটকে রাখার অভিযোগ দায়ের কাছে ভারতের কৌশল সেসব অভিযোগই আসলে যেন কেবল হিন্দুদের কিছু খৃশ্চানের উপর করা হয়েছে – এইভাবে তুলে এনে সাজানো হয়েছে ঐ চিঠিতে। আরেক দিক থেকে দেখলে মোদি যেভাবে সবকিছুতে ভারতের মুসলমানেরা হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ [কেরালা স্টোরি সিনেমা]  করছে বলে ভুত দেখে থাকে সব জায়গায় সেভাবেই হাসিনাকেও ঐ একই ধর্মান্তকরণের কর্তা-নায়িকা বলে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাপারটায় বেশ আমোদ হয়েছে আমাদের! এই আর কী!
    আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাইলে নিশ্চয় এখন আপসোস করতে পারেন যে গত ২০২১ সালের কুমিল্লায় দুর্গাপুজার  হামলার ঘটনায় জড়িত সকলের খবর ম্যাপ এঁকে বের করলেও কেন তিনি এদের পিছনের ভারতীয় হাত ও লিঙ্ক উন্মোচন বা-প্রকাশ করেন নাই কেন একথা ভেবে!!! স্বামীর সুখের কথা ভেবে স্ত্রীরা এভাবে আর কতদিন……।

    অর্থাৎ হাসিনা সরকার আর টিকবে না মনে হচ্ছে ভারত যেন এমন সিদ্ধান্ত-অবস্থান পৌছে গিয়েছে। এনিয়ে সুবীর ভৌমিক গেল একসপ্তাহে দুবার লেখা দিয়েছে। প্রথমটাই হাসিনাকে বিরোধিতা দেখালেও আবার দ্বিতীয়টাতে ভান করেছে যে যেন ভারত সরকার ও গোয়েন্দা বিভাগ হাসিনা সরকারের টিকানোর জন্য কাজ করেছে। নিচে দেখেন সুবীরের লেখা থেকে সেই দাবির অংশটুকুছিল এরকমঃ

    “Indian diplomats and national security officials have flown back
    and forth in a week of intense parleys
    (foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka, to cite a few)”

     মানে হল, বাস্তবে ভারত হাসিনাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেও সুবীর এখনও একটু নাটক করতে চাইছেন। অথচ এনিয়ে ভারত সরকার ভারতের মিডিয়াকেও হাসিনা (বাংলাদেশ)বিরোধি সরকারি গাইড লাইন দেয়া হয়েছে। যেমন দেখুন “ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পালটা কূটনৈতিক বার্তা? চিনের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকা” ।  অথবা দ্যাহিন্দু পত্রিকার বিরাট আঁতলামো রিপোর্ট যার শিরোনাম  – Explained | How has Dhaka reacted to the U.S. threat on visas? – অথচ ভিতরে শিরোনামে দাবির কথা নিয়ে কিছুই নাই কেবল খামোখা চীনকে দোষারোপ ছাড়া।   মানে হল হাসিনা যেন চীনের পক্ষে নতুন করে যাচ্ছে অথচ এর কোনটাই সত্যি না।  আর ভারত এই উসিলা তুলছে  যেন বাইডেনের কোলে উঠে হাসিনাবিরোধি সাজতে পারে সে। ফ্যাক্টস হল, হাসিনা নতুন করে কোন চীন-ঘনিষ্ঠতা করে নাই। কারণ সেই সুযোগই নাই। এই ভোলাটাইল [volatile] বা অস্পষ্ট মুহুর্তে চীন নিজেই কোনদিকে ঝুঁকতে আগ্রহি নয়, কেবল রুটিন ততপরতা ছাড়া।

    কিন্তু কেন এখন ভারত হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে সময় হয়েছে মনে করলোঃ
    ভারতীয় র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন – একথা সুবীর ভৌমিক তার নিজের লেখাতেই “ভারতের বীরত্ব হিশাবে দেখাতে গিয়ে” স্বীকার করেছেন। যদিও গোয়েল সাব এসেছিলেন এনিয়ে হাসিনাবিরোধী শক্তির সাথে একসাথে কাজ করতে চাওয়ার অফার দিতে। কিন্তু বাংলাদেশের তেমন বা অমন কোন শক্তিই সামন্ত গোয়েলের সাথে কাজ করতে আগ্রহ দেখায় নাই। গোয়েল সাব ভেবেছিলেন হাসিনাবিরোধি কোন একশনে যৌথকাজ কারবারের অফার দিলে বাংলাদেশের যে কেউ ঝাপায় পড়ে গোয়েল সাব রে কোলে তুলে নিবে। আর এর ভিতর দিয়ে আগামি হাসিনা-উত্তর  নয়া সরকারের মধ্যেও হাসিনা আমলের মতই গোয়েল সাবেরা ঢুকে বসে থাকার সুযোগ নিবেন, ধারাবাহিকতা বা কন্টিনিউটি বহাল থাকবে! কিন্তু হায়! গোয়েল সাব হতাশ হয়েছেন!
    এই খবর নিয়ে যদিও আরেকটা সুত্র একটু কারেকশন দিয়েছে। তাদের মতে সামন্ত গোয়েলের সাথে বাংলাদেশের হাসিনাবিরোধী শক্তির দেখা হয়েছে সেকথা সত্য তবে সেটা বাংলাদেশে নয়, বিদেশে দেখা হয়েছে। মানে গোয়েল সাহেব বাংলাদেশে আসেই নাই। সে যাই হোক, এখানকার মূল কথাটা হল, ভারত হাসিনার হাত ছাড়ার সময় হয়েছে মনে করেছে।

    আসলে সারকথাটা হল, সামন্ত গোয়েল বা ভারত সরকার প্রচন্ড অধৈর্য ও অস্থির হয়ে উঠেছে। মূল কারণ, হাসিনা সরকারের টিকে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে অবস্থা তেমন ভাল না এমন ভয় অনেকের মধ্যেই ঢুকেছে; অন্তত ভারতের মত বিদেশিস্বার্থের মধ্যে “এক অনিশ্চয়তা” শুরু হয়েছে। সেখান থেকেই এমন অনুমান যে  হাসিনা যদি টিকতে নাই পারেন সেক্ষেত্রে হাসিনার সরকারের ক্ষমতা-উত্তর বাংলাদেশে কোন অন্তর্বর্তি সরকার বা পরের নির্বাচিত সরকার ইত্যাদিতে সম্ভব্য যারাই ক্ষমতায় আসবেন অনুমিত সেসবের কারোর সাথেই এখনও ভারতের কোন ঘনিষ্ঠতা দূরে থাক কোন নুন্যতম সম্পর্কের কিছুই তৈরি হয় নাই। কাজেই এই সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতেই এখন থেকেই ভারত বেপরোয়া অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু কী থেকে শুরু করবে তার কিছুই খুজে পাচ্ছে না।  যেখানে বিএনপি সেই প্রণয় ভার্মার বাসায় কথিত ডিনারের দাওয়াতের পরে যেন হ্যালো বলা থেকেও আরো দূরে চলে গেছে। মূল কারণ, ভারতের নিজ সম্পর্কে হুদাই খুবই উচ্চ ধারণা! ভারত ধরে নিয়ে আছে যে সেই-ই এতই ক্ষমতাবান যে বিএনপির নেতা কে হবে অথবা কী রাজনীতি করবে তা ভারত ঠিক করে দিতে পারে! যেখানে বাইডেনের হাত থেকে মোদি বাঁচে কিনা, কিভাবে তাই এখন নিলামে উঠেছে বড় বাজি হয়ে! অথচ এটা তো বুঝাই যাচ্ছে,  সরকার বদল না হলে বিএনপি কারোও সাথেই কথা বলবে না। এমনকি ভারতের বেলায় সরকার বদলের পরও কী হবে বিএনপি ভারতকে নিয়ে কী করবে এর পুরাটাই এখনও অনিশ্চিত।  সম্ভবত সঠিক শব্দ হবে যে  – সেটা এখনও বিএনপির কাছে  “এজেন্ডাই হতে পারে নাই”।  যেকারণে, সবমিলিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই বিএনপিবিরোধী প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে। অনেকের ভারত-ইসরায়েলি কালেকশনের সোয়েব চৌধুরীর কথা মনে আছে হয়ত। সেই সোয়েব একাজ শুরু করে দিয়েছে। যদিও এসব কাজ এখন মানুষ আর খায় না। কারণ সব গুমোর উদাম হয়ে গেছে তাই এসব ছেচড়ামির আর কোন দাম নাই!

    কিন্তু ভারত কেন এত মরিয়া হয়ে আগেই হাসিনার হাত ছাড়তে চায়?
    এর পিছনের সবচেয়ে বড় কারণ, গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশকে চুষে চুষে খেতে, একপক্ষীয় সুবিধা নিতে যত দীর্ঘ তার অফুরন্ত স্বার্থের লিস্ট ভারত তৈরি করেছে, হাসিনা-উত্তরকালে সেসবের কী হবে? সেই একই ধারাবাহিকতা-সুবিধা তখনও  থাকার তো কোন কারণ নাই। এছাড়া চুষে-লুটে যেসব একতরফা কর্মকান্ডে বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে আর এসবের উপর নির্ভরশীল হয়ে যে নিজস্বার্থ ব্যবস্থা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছে তা তো আর বজায় থাকবে না – সব অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক।  সুবীর ভৌমিক সরাসরি এসব  ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে বিএনপির নাম ধরেই লিখেছে যে আগামি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে কখনও যদি ভারতকে হাসিনার দেয়া বিভিন্ন একপক্ষীর চুক্তির সুবিধা সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করে দেয় তাহলে কী হবে [what with khateda Zia’s threart to review all agreements Hasina has signed with India]!!  সকলেই জানে এবিষয়ে ভারতের স্বার্থের স্টেক বা স্বার্থ-বহর অনেক লম্বা। তাই এখান থেকেই  ভারতের সব দুঃশ্চিন্তার শুরু। তাই বাংলাদেশে এমন যেকোন একটা রাজনৈতিক গ্রুপ বা শক্তিকে পেতে মরিয়া যারা আগামিতে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন হবেন – ফলে ভারতের বাংলাদেশ লুটার স্বার্থের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে! ভারতের দুর্ভাগ্য যে এখনও এমন কোন বাংলাদেশি শক্তির হদিস তারা পায় নাই। আর বিএনপি সে তো আরো দূরে। আর ততই গোয়েল সাহেবেরা ডেসপারেট হয়ে বলতে চাচ্ছেন হাসিনার বিরুদ্ধে কাজ করা বা তাঁকে বেচে দিয়ে হলেও ভারতকে বাংলাদেশের একটা আগামি রাজনৈতিক শক্তির নাগাল পেতেই হবে।
    ভারতের হাসিনার হাত ছাড়ার প্রথম উদ্যোগের হদিস  আমরা কিছু এখান থেকেই পাচ্ছি। তবে এটার প্রকাশ্য রূপ-ততপরতা নাগাল পাওয়া বা জানা যথেষ্ট কম-ই বলতে হবে। কারণ সেনা বা গোয়েন্দা বিষয়ক তথ্য যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর পেলেও সেনসেটিভ বলে অত খুলে আলোচনা করা যায় না। সেটা সঠিকও না, হিতে বিপরীত হতে পারে।  তাই ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটার দিকে তাকানো যাক। এটা তুলনায় অনেক স্পষ্ট  আর উন্মুক্ত।

    ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগঃ
    ভারতের এই উদ্যোগ অনেক প্রকাশ্য এবং অনেক দূর ইতোমধ্যে আগিয়ে গেছে।  আর সুবীর যেমন ক্রেডিট নিতে বলেছিল যে, ভারতের foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka ) যারা হাসিনারর পক্ষে কাজ করতে ভীষণ দৌড়াদৌড়ি করছে – সেটা দৌড়াদৌড়ি ছিল অবশ্যই কিন্তু তা ছিল হাসিনার বিপক্ষে, তাঁকে বেচে হলেও হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও ভারতের আগামি স্বার্থ উদ্ধার বা যা ছিল বাংলাদেশের আগামি রাজনৈতিক শক্তি যারা হবে তাদেরকে তালাশ বা অন্তত তাদের একটা লিঙ্ক যোগাড় -এই ছিল ভারতের ওসব দৌড়াদৌড়ির উদ্দেশ্য।

    কংগ্রেসম্যান বা কংগ্রেস প্রতিনিধি সম্পর্কে কিছু কথাঃ
    সরাসরি হিন্দুইজমের সমর্থক এক অ্যামেরিকান কংগ্রেস প্রতিনিধি ছিলেন তুলসী গাব্বার্ড।  [Tulsi Gabbard] এই নামে দেখুন এখানে যিনি সর্বশেষ ২০২০ সালেও কংগ্রেস সদস্য ছিলেন। তাকেঁ ঘিরে এছাড়া  হিন্দু অ্যামেরিকান ফাউন্ডেশন [Hindu American Foundation (HAF)], ইসকন এমন আরো অনেক কিছু মিলে ভারত কিছু কংগ্রেসম্যান যোগাড় করেছিলেন যাদেরকে ভারত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ব্যবসা দিয়ে নিজরাষ্ট্র স্বার্থে  ভারত ওসব কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে লবি করাত। আমেরিকার মোট কংগ্রেসম্যান হল ৪৩৫ জন। এদের মধ্যে নুন্যতম দশজনকে ভারত তার স্বার্থের পক্ষে লবি-কারি বানাতে পারবে সেটা নিশ্চয় অসম্ভব কিছু নয়। সেসবের একালের ততপরতা হিশাবে মনে করা যায় যখন একালে ছয় রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠান এক চিঠি।

    তাই একালে  হাসিনা-উত্তরকালে  ভারতের কী হবে এর সন্ধানে থাকা ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটা হল এই ছয় অ্যামেরিকান রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান (আমাদের ভাষায় যারা অ্যামেরিকান সংসদ সদস্য) প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে চিঠি পাঠানো থেকে। গত ১৭ মে এমন ছয় জন কংগ্রেসম্যান একটা চিঠিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠিয়েছিল। এই চিঠির বিষয়বস্তুই হল, বাংলাদেশে হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণ ও এর প্রতিকার!  এই চিঠির কপি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে অনেকে দেখে থাকবেন, আর এর একটা কপি ঢাকার নিউ এজ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আবার অনেকের কাছে আমেরিকান ইউনুস সেন্টারের কপিটাও আছে দেখেছি। শুরুতে বা উপরে আমি দিয়েছে অরিজিনাল কপির লিঙ্ক।

    সবচেয়ে বড় কথা এতে শেখ হাসিনাকে চরমতম ভিলেন – হিউম্যান রাইট ভায়োলেটর, র‍্যাবের নামে ডেথ স্ক্যায়াড [death squard] বা ভাড়াতে খুনি বাহিনী চালানো, বিরোধীদেরকে নির্যাতন, ঘুম, খুন, অপহরণ ইত্যাদি সব ধরণের অভিযোগে অভিযুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড়কথা এটা হাসিনা ক্ষমতাসীন হবার সেই ২০০৯ সাল থেকেই হাসিনার অপততপরতা বলে দাবি করা হয়েছে।
    এমনকি এর মধ্যে  তাই হাসিনার সহযোগী বাহিনী হিশাবে বাংলাদেশের সেনাসহ এসব বাহিনী থেকে (স্বল্প কিছু যা) জাতিসংঘ বাহিনীতে যুক্ত হয় এদের সকল বাহিনীকেই জাতিসংঘ শান্তিবাহিনীর কাজে নিষিদ্ধের করার জন্য বাইডেনের কাছে এবার সুপারিশ করা হয়েছে।

    সেনাবাহিনী বা জাতিসংঘ সম্পর্কিত চিঠিতে এই বাড়তি অনুচ্ছেদ – এটা বেশ নতুন তা মানতেই হবে। কারণ, এর ভিতর অন্তর্নিহিত বক্তব্য-অর্থ বা ইমল্পিকেশন [implication] অনেক গভীর ও মারাত্মক। এটা সৈনিকদেরকে অফিসারদের বিরুদ্ধে খেপানোর শয়তানি কাজ, অবশ্যই। অনুমান করা হচ্ছে যে এর ভিতরের যে অন্তর্নিহিত বক্তব্য তা নিয়েই কাজ করতে  এটা সুবীর ভৌমিক কথিত সামন্ত গোয়েলের ঢাকা আগমন ঘটিয়েছিল। অর্থাৎ ভারতীয় পক্ষ থেকে তাদের এই ততপরতা ফলাও করে হাসিনার পক্ষের কাজ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ ভারত করেছে উলটা কারণে, ভারতের হাসিনার হাত ছাড়তে বলা – এটাই সে ফেরি শুরু করেছে।

    কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ এবং চমক লাগানো দিক হল এই চিঠির আরেকটা অংশ, সেদিকটা। আর সেখান থেকে এটা পরিস্কার যে – এই ছয় কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষরে চিঠি পাঠানো – এটা ভারতেরই কাজ। তারাই কংগ্রেসম্যান জুটিয়ে এই চিঠি লেখার ঘটনাটা ঘটিয়েছে। কিন্তু  কেন?
    কংগ্রেসম্যানদের চিঠিতে কী আছে  সে সম্পর্কে আগে বলেছি। যেমন হাসিনাকে সেখানে হিউম্যান রাইট দলনকারী হিশাবে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে  উপরে বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু কীভাবে সেই বর্ণনা থেকে পরের প্রসঙ্গ যাওয়া হয়েছে তাপাঠককে সরাসরি জানানো দরকার।
    প্রথমত এই চিঠিতে  এক দীর্ঘ অভিযোগে দাবি করা হয়েছে  হাসিনা  হিন্দু-খৃশ্চানদের দলনকারী, জুলুমকারী [……persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh.] !!!!!  মানে হাসিনা তাদের ভাষায় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনকারী – যেকথা রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইবেন কিনা সন্দেহ!  কিন্তু সরি। এটা এখন সত্য  যে একথা এখন রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইছেন; আসছি সেখানে। এটাই ভারতের ম্যাসেজ বা ভারতের এখন দানের পাশা ঊল্টানো আচরণ!

    কংগ্রেসম্যানদের চিঠি হাসিনার অপরাধ সম্পর্কে লিখেছে …...The well-documented abuses by the Hasina government are not confined to her political opponents; the government also has persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh. মানে হাসিনার মানবাধিকার দলন এটা আর কেবল বিরোধীদলের উপরেই নাকি সীমাবদ্ধ নাই। এটা ধর্ম ও জাতিগতভাবে যারা সংখ্যালঘু [ মানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ভারত স্বঘোষিতভাবে যাদের কাস্টডিয়ান] দের উপরেও নির্যাতন জুলুমবাজি করছে হাসিনা!

    Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs.

    কী তামসা দেখেন! দাবি করে বলা হচ্ছে হাসিনার এবারের ক্ষমতা নিবার পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা নাকি অর্ধেক হয়ে গেছে [Hindu population has been halved]।  আর যে অভিযোগ এই সেদিনও সেতুমন্ত্রী বিরোধীদলের উপর আবার একালে গত কয়েক সপ্তাহ আগে আরোপ করতে চাচ্ছিলেন যে বিএনপি নাকি  সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর কাজ করছে! আর আজ সে অভিযোগ ভারতের মুখ দিয়ে উঠে আসছে খোদ হাসিনার বিরুদ্ধেই। তাই এটা এক কঠিন তামাসাই বটে! তবে এখনও আমরা আসল জায়গায় যাই নাই, এখন যাব।

    ‘দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক’ হয়েছেঃ
    এই প্রসঙ্গটা হল বাংলাদেশে ঘটা একটা ঘটনা যেটা ভারতীয় উদ্যোগে ঐ ছয় কংগ্রেসম্যানের চিঠিতে হাজির করা আর হাসিনাকে হিন্দু নির্যাতনকারি হিশাবে তুলে ধরার-ই বাংলাদেশ ভার্সান ও সংশ্লিষ্ট ততপরতা। এনিয়ে  প্রথম আলো লিখছে, “দেশের বিশিষ্টজনেরা  বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। সেটা ছিল   ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৪: ধর্মীয়–জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার’ শীর্ষক এক সভা যা বুধবার বিকেলে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয়। মজার কথা হল সেখানে প্রথম আলো প্রতিষ্ঠান হিশাবে নিজেও এক অংশগ্রহণকারী দাওয়াত গ্রহিতা হিশাবে উপস্থিত ছিল। তাদের যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান এতে প্রতিনিধি হিশাবে বক্তৃতা করেন।

    আসলে এখানে অংশগ্রহণ করেছেন যারা তারা হলেন  – যারাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভারতীয় অর্থে বা অর্থের প্রতিপত্তিতে তৈরি হওয়া ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তাদের আয়-জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই,  ভারত এই সভায় তাদের সকলকে যোগ দিতে সহজেই বাধ্য করতে পেরেছে। কথিত এই মতবিনিময় সভায় প্রথম আলতে ছাপা হওয়া রিপোর্টটাকে খুটিয়ে দেখলে এমন অনেক কিছুই পরিস্কার হওয়া সম্ভব। এককথায় এটা হল, ভারত এতদিন বাংলাদেশের যাদেরকেই (কথিত হিন্দু সংগঠন ও এর নেতারা সহ) পেলেপুষে  নিজের প্রভাবে রেখেছে তাদের সর্বোচ্চ সমাবেশ ছিল এটা। এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল হাসিনাকে ত্যাগ করা [disown] বা হাত ছেড়ে অস্বীকার করা যে তিনি আর তাদের কেউ নন।  শুধু তাই নয় গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা ‘সংখ্যালঘু’ নিপীড়ন-জুলুমবাজি করেছেন বলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করে দেওয়া। এটাই সবচেয়ে কঠিন কঠোর পদক্ষেপ ছিল ভারতের।  এর মানে ঐ কথিত সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা যে ভারতের পাপেট বা হাতের পুতুল ছিলেন সেটা যেন তারাই হাজির করেছেন। কেন?
    কারণ, বাংলাদেশের ভারতের কোরস্বার্থ সহ সবকিছুই এখন কঠিন বিপদের মুখে। তাই এসকল মুখ এক্ত্রে ঐ সভায় উপস্থিত হয়ে  হাসিনার মুন্ডু-নিপাত করছেন অবলীলায়!!!  সত্যি তামাশা চলছেই!!! কারণ বাংলাদেশে হাসিনা তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদের উপর যে নিপীড়ন জুলুম করেছে সেসব কিছুকে এক ঘটকার এই শয়তানেরা একে হিন্দু নিপীড়ন বলে নামিয়ে ছোট করে নিজের পক্ষে নিয়ে গেল!

    ঐ সভায় উপস্থিত এক মুখ্য চরিত্র দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যঃ
    দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সিপিডির মূল উদ্যোক্তা-মালিক রেহমান সোবহান এর পরের ব্যক্তি তিনি। সেই ওয়ান-ইলেভেনের সময় থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট কে করিডোর দিতেই হবে; দিলে সেই আয়ে আমরা নাকি সিঙ্গাপুর হয়ে যাব – এরপক্ষে ভারতীয় দালালি দিয়েই প্রতিষ্ঠানটার বড় ততপরতা শুরু।  তাই ভারতীয় স্বার্থরক্ষার কনসালটেন্সির অর্থ তাদের এক বড় আয়ের উৎস আমরা বুঝতে পারি।  কিন্তু তাই বলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য – তিনি বাংলাদেশের কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হয়ে যাবেন?? দেবপ্রিয়ের এই ভুমিকার এত চিপ …… একথা আমাদের জানা ছিল না। খুব সম্ভবত সিপিডি “ঠিকঠাক” চালাতে গেলে এখন দেবপ্রিয়কে কথিত সংখ্যালঘু  হিন্দু নেতার ভুমিকায় নামতেই হবে, হয়েছে দেখা যাচ্ছে।  তাহলে মানুষের আত্মমর্যাদা বলতে কী  আসলে কিছু নাই?
    প্রথম আলো সুনির্দিষ্ট করে বলছে,   ” মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে” – এই কথাটা বলেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য!  আর তা পুনরায় সমর্থন ও উচ্চারণ করেছেন রামেন্দ্র মজুমদার, শাহরিয়ার কবির প্রমুখ। সত্যিই দেবপ্রিয়-র বিল এইবার ম্যাচিউরড আর সবাইকে ছাড়িয়ে তা বড় পরিমানের হবে।

    সাম্প্রদায়িক জিনিষটা কী তা একটু পরে আসছি। তার আগে এখন ওবায়দুল কাদের – সেতুমন্ত্রী ওকার মুখটা মনে পড়ে করুণা লাগছে।  বেচারা কত না এতদিন প্রমাণ করলেন যে “বিএনপি মানে সাম্প্রদায়িক” একথা বলে; এভাবে মনে সুখ নিচ্ছিলেন তিনি। আর এখন বাংলাদেশের হিন্দু-সব বড় বড়কর্তাদের সভায় যেটা আবার ভারতের আশীর্বাদে সমবেত এক সভা; সেখান থেকে তার মানে ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কাউকেই ছাড়লো না ভারতীয় স্বার্থ? তারা ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কেই সাম্প্রদায়িক বলে রায় দিল????

    বাংলাদেশে যেখানে গত পনেরো বছর ধরে লাগাতর সেপাই, এসআই ওসি থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে হিন্দুদের সর্বোচ্চ পদায়ন ঘটে চলেছে, যেটা কারও কারও হিশাবে এটা ২৫% বা এরই বেশি। হাসিনার কথা শুনেছি অনেকের মাধ্যমে তিনি নাকি ধারণা করেন যে হিন্দুরাই নাকি তাঁর সবচেয়ে বিশ্বশ্ত, মুসলমান কর্মচারিরা যেটা নাও হতে পারেন! তাহলে?  এ কোন বাংলাদেশি হিন্দু ? ভারতের এক ইশারায় যারা তামাম-ই হাসিনা ছেড়ে শুধু না; সমস্ত দায়-অভিশাপ হাসিনার উপর চাপিয়ে দিয়ে ভারত-রাষ্ট্রস্বার্থ এর পক্ষে এলাইন হয়ে গেল? হাসিনাকে ছেড়েই চলে গেল? এরপরেও কী বাংলাদেশের সব হিন্দুরা না হোক  ঐ কথিত মত বিনিময় সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন? বলা যাবে, তাদের রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব পরিচয় বাংলাদেশী?
    ব্যক্তির রাষ্ট্র পরিচয় কেন একালে লাগে আর তা গুরুত্বপুর্ণ কেন সেটা  আগে বুঝার চেষ্টা করতে পারি আমরা।  রাষ্ট্র-পরিচয় না থাকায় বেওয়ারিশ লাশের মত কোন এয়ারপোর্টের মেঝেতে মাসের পর মাস শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়া মানুষের জীবনের দিকে একবার কিছুক্ষণ তাকান!! রাষ্ট্র স্পষ্ট না থাকা প্যালেসটাইনিদেরকে বুঝার চেষ্টা করেন অন্তত! মানুষের রাষ্ট্রীয় পরিচয় যেমন গুরুত্বপুর্ণ তেমন রাষ্ট্রটাকে টিকিয়ে রাখা  আর ওর দায় নেয়া বা রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষাও নাগরিক হিশাবে আপনার দায় – এদিকটাও বুঝতে হবে। কাজেই বাংলাদেশে আপনার যত দুঃখই থাক অভাব থাক তা মিটাতে সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই নতুন করে পুনঃগঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক লড়াই করেন, এটাই আপনার একমাত্র করণীয়। কিন্তু কোনভাবেই আপনার সুখ নিরাপত্তার জন্য মোদিকে আপনাকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে আহবান করতে পারেন না। কারণ, এতে আপনিও আর কার্যত বাংলাদেশের নাগরিক থাকেন না, রাষ্ট্রও আপনার থাকে না, নাই হয়ে যায়। মোদিও কী ভারতের কোন মুসলমান নাগরিককে পাকিস্তানকে ডেকে আনার পক্ষে থাকতে এলাও করবেন? সেটা একবার ভাবেন? সেটা মোদি হিন্দুত্ববাদি বলে নয় এটা কোন রাষ্ট্রই পারে না। তবে কিছুই করতে না পারলে একালে মাইগ্রেট করে জন্মরাষ্ট্র ফেলে মাইগ্রেটেড রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া যায় সেটা ট্রাই করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে বসে নিজ সুখ বা পেটিস্বার্থের জন্য  ভারতের ব্যাগ-বোঝা বইতে পারেন না।
    এটা খুবই অদ্ভুত একজন পিএইচডি হোলডার দেবপ্রিয়-কে নিয়ে এসব কথা বলতে হচ্ছে!! কথা আরও কত কী হয়ে গেছে দেখেন।  দেবপ্রিয় এখন কোনটা নিজের সামাজিক পরিচয় বলে দাবি করবেন? তিনি কী  বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থের নেতা? যেটা আসলে ভারতরাষ্ট্রের বাংলাদেশে যেসব স্বার্থ আছে এর কোন তল্পিবাহক সংগঠন বা এর নেতা ছাড়া আর কিছুই নয়!  নাকি দেবপ্রিয় সিপিডির এক বড়কর্তা প্রতিনিধি? দেখেন গতকাল সিপিডি বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে আবার সরকার সমালোচনার মুডে চলে গেছে। গতকাল কড়া সমালোচনা করেছে সিপিডির প্রতিনিধিরা। যদিও গতকাল দেবপ্রিয় সেখানে ছিলেন না,  সিপিডির অন্যেরা ছিল। এখন সপ্তাহ খানেক আগেও দেবপ্রিয় সরকারের পক্ষে দাঁড়ায়ে আইএমএফ রে দায়ী করে (বোকা বোকা দালালি) বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে আজকে হাসিনা ছেড়ে যাচ্ছেন কে?
    সোজা কথাটা হল, কাল যদি তিনি সিপিডির বাজেট সমালোচনায় উপস্থিত থাকতেন তাহলে তার মুখে বাজেট সমালোচনা কে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে নিত – আপনি বাংলাদেশের আম-মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে বাজেট সমালোচনা করছেন নাকি  হিন্দু নেতা হয়ে ভারতের স্বার্থের পক্ষে এটা কোন সমালোচনা?  আমাদেরকে এদুটার ফারাক বুঝবার তো কোন উপায় রাখেন নাই! যে কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হতে চায় (যা আসলে ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ) তিনি তো একই সাথে বাংলাদেশের আম-মানুষেরো প্রতিনিধি বা বক্তা হতে পারবেন না!  

    দেখেন হাসিনা ফ্যাসিস্ট – গুম, খুন ‘ডেথ স্ক্যায়াডের’ রানী হওয়াই তার পরিণতি। কিন্তু আপনি দেবপ্রিয় এতদিন হাসিনার মাখন খেয়ে চলেছিলেন আর এখন এই বিপদে পড়া হাসিনাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, কেবল ভারতের স্বার্থে? আপনি তো হাসিনার চেয়েও খারাপ! পনেরো বছর ধরে হাসিনার ‘ডেথ স্কয়াড’ চলেছে মুখ খুলেন নাই, আকার ইঙ্গিতেও না, কেন?  এমনকি এখনও হাসিনার সমালোচনা যেটা করছেন সেটাও ভারতের ইচ্ছায়! ঐ সভায় যারা উপস্থিত তারা সকলে এই অপরাধে অভিযুক্ত, নয় কি? 

    সাম্প্রদায়িকতা কী?
    খুবই সংক্ষেপে বলব। আর আমার আগে বলা লেখা পড়ে নিতে লিঙ্ক দিব।
    সেটা ১৮০০ সালের দিকের কথা যখন হিন্দু জমিদারের বৃটিশ শাসনের অধীনে নিচে নতুন শাসক শ্রেণী হিশাবে বাংলায় আসর জমিয়ে বসতেছেন।  তারা দুটা সিদ্ধান্তের উপর তাদের নয়া বাংলার মসনদ সাজিয়েছিলেন। সারকথায় এর এক হল, মুসলমানেরা বাঙালিই না। জমিদারদের এই চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত।  কেউ বাঙালি কিনা এই এথনিক পরিচয়াবলী ভা এথনিসিটি নির্ধারণ যেন কোন শাসকের ইচ্ছা দিয়ে নির্ধারণ সম্ভব!    দুইঃ বাংলা ভাষা সংস্কৃত থেকে এসেছে। যেটার বিপরীতে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লার উচ্চারণ বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা (কন্যা) নহে।

    এদুটা মূল সারকথার উচ্চারণে কী এমন ফারাক হয়ে গেল তা প্রগতিশীলেরা হয়ত বুঝবে না।  বলবেন হয়ত এটা হুদাই ভারতবিরোধিতা। এবিষয়ে প্রগতিশীলতা=হিন্দুত্ববাদ এই সমীকরণটা মনে রাখলেই আপাতত চলবে! এদিকে জমিদার হিন্দুর নেয়া সবচেয়ে আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা হল যে নয়া তাদের নে্তৃত্বে সমাজে মুসলমানদের উপর আধিপত্য (সম্পর্ক) কায়েম তাদের করতেই হবে। যেকোন জাতিবাদি চিন্তা মাত্রই তা অন্য সকল জাতির উপরে নিজ শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করতে চায় – এটাই তার  লক্ষ্য মনে করে থাকে। জাতিবাদ মানে তাই “জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ”। তাই জমিদারদের আধিপত্যের খায়েস মূলত হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদ কায়েমের খায়েস। এছাড়া, জমিদারির অর্থনৈতিক জবরদস্তি সে তো আছেই।

    সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। 
    এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’।

    মুসলমানেরা বাঙালি নয় এই ফতোয়া দিলে তা মুসলমান মাত্রই তারা অধস্তন, আর তা হিন্দু জাতভেদের হিশাবে হিন্দু-জাতের সবচেয়ে নিচা মুচি বা চন্ডালদের চেয়েও নিচে  – এখানে মুসলমানদের কোন অবস্থান হবে। এছাড়া পুর্ববঙ্গে আবার মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট। তাই এই নিচা অবস্থান দেখিয়ে দিলে জমিদারদের পক্ষে অখন্ড বাংলায় আধিপত্য করতে এটা সহায়ক হবে। কিন্তু আধিপত্য করতে হবে কেন এই প্রশ্ন কেউ করতে নিজেকে করতে চায় নাই!
    এরপরেও জমিদারদের দুঃখ ঘুচে নাই। মোটাদাগে যদি পশ্চিমবঙ্গে  মুসলমান জনসংখ্যা ২৫% ধরে নেই তবে সেটাও যথেষ্ট বড় সংখ্যা বলে এদেরকে  চাইলেও শুধু দাবিয়ে রাখা মুসকিল।  বৃটিশ ভারতে ১৮৩০ সালের দিকে আধুনিক শিক্ষা মানে স্কুল কলেজে শিক্ষা শুরু হয়েছিল।  অর্থাৎ সরকারি চাকরির জন্য জনসম্পদ [Human resource HR] তৈরি তা বৃটিশ-ইন্ডিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজ স্বার্থে। এই সিদ্ধান্তটাকে যদি একজামিন করি তাহলে দেখব শাসক জমিদার শ্রেণীর হাতে মুসলমানদেরকে এই সুবিধা নিতে ঠেকিয়ে দিবার মত তেমন অস্ত্র ছিল না। তাই তাদের সমাজ মানে তাদের হিন্দু আধিপত্যের সমাজে মুসলমানদের জন্যই অন্তত কিছু জায়গা ছেড়ে রাখাটাই সঠিক হবে বলে মনে করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই স্কুলে মুস্লমান ছেলেটাকে পাশ বসতে দিবে কিভাবে, কিংবা চাকরিস্থলে  বা এমনকি এই সুত্রে সমাজে পাশাপাশি চলতে দিবে কিনা ইত্যাদি মেলা প্রশ্ন ভর করে এসেছিল। তখন জমিদার শাসনের হিন্দু সমাজ যেসব শর্ত আরোপ করেছিল যে শর্ত পুরণ সাপেক্ষে এই “সর্ব অন্তজ-জাত” মুসলমানেরা তাদের সামনের হিন্দু ডমিনেটেড সমাজে একটি প্রবেশ ও কোনায় বসার অনুমতি পেয়েছিল সেটাই “অসাম্প্রদায়িক” হওয়া।  মুসলমান আদব কায়দা দেখানো যাবে না, ইসলামি চিহ্ন  প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা যাবে না মানে  হিন্দু সমাজের কমন প্লেসে দেখানো যাবে না। ব্যাপারটা দাড়ায় স্কুলে ব্যাকবেঞ্চে জায়গা হয় একটু কিন্তু কেউ পাশে বসে না।  নিজেরা টিকি আর চন্দনে মুখে বা কপালে ড্রয়িং এঁকে হিন্দুরা সাত জায়গা ঘুরে বেরাচ্ছে অথচ মাথার টুপি ভুলে মাথা থেকে না খুলে প্রকাশ্য রাস্তায় বের হওয়া যাবে না। মানে সবসময় মনে করিয়ে দেয়া You are not equal to us – এই লক্ষ্যেই এটা পরিচালিত হত, শাসন সহজ করার জন্য। তাহলে সাম্প্রদায়িকতা কী? এর মানে হল যে হিন্দু সমাজ যে অধীনতা শর্ত চাপিয়েছিল মুসলমানদের উপর সেটা ভঙ্গকারিকে সাম্প্রদায়িক বলা হত।  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে না চাইলে আপনি সাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ সেটা মেনে চললেই কেবল আপনি “অসাম্প্রদায়িক সার্টিফিকেট প্রাপ্ত” হয়ে শর্ত পূরণ করেছেন বলে কেবল ঐ সমাজে প্রবেশাধিকার লাভ করতে পারেন।
    কালক্রমে আবার একদল  হিন্দু একাদেমিক হিন্দুত্বের অসাম্প্রদায়িক হবার শর্ত  যেটা  সেটাই যেন আধুনিকতা, এই বলে প্রলেপ দেয়া এক নয়া সাফাই চালানোর চেষ্টা করেছিলেন।  কিন্তু  এরা জানেই না যে ‘অসাম্প্রদায়িকতার শর্ত’ যারা চাপাতে চায় তারা আধুনিকই নয়। তাদের আধুনিক হবার সুযোগ নাই। কারণ আধুনিকতা প্রথম শর্ত হচ্ছে সাম্য। অথচ আপনাদের চাওয়ার ভিত্তি তো আধিপত্য, জাত শ্রেষ্ঠত্ব। কাজেই মানুষকে সমান চোখে দেখতে শিখেন আগে। নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক সেটা শিখতে হবে আগে। এছাড়াও প্রত্যেকের মর্যাদা, স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা আছে সে কথা খেয়াল রাখতে হবে।  অথচ ওদিকে সাম্প্রদায়িক শর্ত দিবার উদ্দেশ্যই তো  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে অপর যেকাউকে বাধ্য করা। যেটা সাম্য ধারণার উলটা। বরং জাতভেদে বিভক্ত ও ছেড়াবেড়া হিন্দুত্বের ধারণাটাই এজন্য আধুনিক হবার অযোগ্য, এটা এক মৌলিক অযোগ্যতা।  আর তাদের কথিত রেনেসাঁর আদিপুরুষ রাম মোহন রায় এজন্যই তো সবার আগে  ১৮১৫ সালেই একটা নয়া ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ গড়ে নিতে চেয়েছিলেন। এসব কেন হয়েছে সেসবের ব্যাখ্যা করতে শিখেন আগে।  না বুঝে কথা বলা এসব অন্নদাশঙ্কর মার্কা  রেনেসাঁ-বুঝার ভাবসাব আর কতদিন দেখাবেন! বরং যেসব ধর্ম বা থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যায়  বাই ডিফল্ট সাম্য অনুসরণ যোগ্য হয়েই থাকে সেসব থিওলজি থেকে আধুনিকতায় যাওয়া আসা সহজ।   মর্ডানিটি বুঝবার আগেই কমিউনিস্ট- প্রগতিশীল হয়ে যাবার সমস্যা এগুলাই!  মূল কথাটা হল, সবার আগে সবাইকে সমানজ্ঞান করা ও মর্যাদা দিতে শিখতে হবে। আর এই হল কথিত অসাম্প্রদায়িকতার গুমোড় ফাঁক!

    “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও
    বাংলাদেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়ে যাওয়ার কথাটি
    বলেন বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।”

    এখন আসেন, দেবপ্রিয়ের ঐ কথিত মত বিনিময় সভার কথায়। তিনি হাসিনাকে দায়ী করে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে”। তাহলে তিনি আসলে কী বলেছেন যা শুনে ঐ আসরের আরও অনেক কর্তা-হিন্দুনেতা হাততালি দিয়েছেন?  এর মানে তারা পনেরো বছরের হাসিনার শাসনে একেবারেই সন্তুষ্ট নন। আমরা দেখছি তারা চাচ্ছেন অসাম্প্রদায়িকতা – একটা খুব সুন্দর অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ!  যা মুসলমান হাসিনা দিতে পারেন নাই, এই হলো অভিযোগ। কিন্তু সেটা কী জিনিষ! আচ্ছা থাক সেকথা বাদ দিলাম। বরং আসেন জিজ্ঞাসা করে জেনে নেওয়া যাক কখন হিন্দুরা অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ উপভোগ করেছিল? তাহলে একটা ধারণা পেয়ে যেতে পারি।
    আমি নিশ্চিত দেবপ্রিয় বা রামেন্দ্র মজুমদার তো বটেই এমনকি খুশি কবির আর সাথে শামসুল হুদাও বলে উঠবেন – কেন, ১৯৪৭ সালেরও আগের জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের সমাজে! 

    এবার কী বুঝা গেছে তাদের খাঁটি অসাম্প্রদায়িকতার মাপকাঠি কী? মানে আমাদেরকে  শুরু করতে হবে জমিদারদেরকে জমিদারি ফেরত দিয়ে। কারণ জমিদারি ফেরত না দিলে জমিদার-হিন্দু আধিপত্য আর তাদের রুস্তমির সমাজ ফিরে আসবে কোথা থেকে? আর সেটা না হলে জমিদারি-অসাম্প্রদায়িক সমাজ আসবে কোথা থেকে? আহ রে অসাম্প্রদায়িকতা, কোথায় রাখি তোরে!!!! My Foot!

    আচ্ছা তাহলে কলকাতায় কী অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ আছে? আছে তয় মমতা মাঝে মাঝে মুসলমানদের ভোট নিতে গিয়ে সব নষ্ট করে দেয়! অবশ্য ইদানিং আরএসএস উঠে আসছে। তারা হিন্দু জনবসতির মধ্যে হোটেলে মুসলমান স্কুল শিক্ষকদের ভাড়া দিয়ে  থাকতে এলে তাদেরকে থাকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিজেপি ফতোয়া দিয়েছে । ভালই হয়েছে, সব পরিস্কার হয়েছে। এটা খুবই  অসাম্প্রদায়িক কাজ হয়েছিল একটা!  অতএব শেখ হাসিনা যতই শেখের মেয়ে হোক, তিনি তো আসলে মুসলমান! মানেই বিল্ট-ইন সাম্প্রদায়িক! তাই না!

    তাহলে ভারত কেন এই মত বিনিময় সভা করে নিজের স্বার্থ জড়ো ও হাজির করছে?
    কারণ, হাসিনার অবস্থা ভাল না। যদি তিনি ক্ষমতা হারায়েই ফেলেন কোন কারণে তবে আগামির রাজনৈতিক শক্তির সাথে  ভারত যদি কোন সখ্যতাই না গড়তে পারে তবে এই হিন্দুস্বার্থে প্রতিনিধিত্বের নামে ভারত নিয়মিত ডিস্টার্বেন্স হিন্দু জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করা ছাড়া আর তো কোন লিভার [lever বা চারাকাঠি] ভারতের হাতে থাকবে না!

    +++
    আপডেটেডঃ ০৫ জুন ২০২৩ দুপুর  ০২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত

     

     

    বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত
    গৌতম দাস

    ৩০ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4xe

     

            মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর

     

     

    কোন নিউজ বা মিডিয়া গ্রুপ যখন কথিত “ফাইনান্সিশিয়াল সংকটে” পড়ে তখন যে সে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে তা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে সে দুনিয়াতে যদি মোদি আর তার গোয়েন্দাবিভাগ হাজির থাকে।  ভারতের ভিতরে অথবা বাইরে  অঘোষিতভাবে ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) মিডিয়া কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠান এর নাম হল এএনআই (ANI) যে নিজেই এক ‘বেসরকারি সংবাদ সংস্থা-ই’ যেন অন্য কিছু নয়, এই ভাব ধরে থাকে। অথচ এ’হলো ভারতে সরকারি প্রটেকশনে  ব্যক্তিমালিকানাধীন নিউজ এজেন্সী যে আমাদের বাসসের মত পর্যায়ের হয়ে উঠেছে কিন্তু কাজ করে সরকারি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের বাড়ানো হাত যেন! শুধু তাই নয়, ভারতের প্রধান সরকারি নিউজ এজেন্সি প্রতিষ্ঠান পিটিআই [PTI] এর চেয়েও ভারত সরকারের কাছে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত নিউজ এজেন্সি এটা;  অথচ লিগ্যাল স্টাটাসে সে বেসরকারি সংবাদ সংস্থা মাত্র। আর তা দিয়েই কথিত সংকটে পড়া মিডিয়া গ্রুপগুলো তাদের ফাইনান্সিল খারাপ সময়ে অভাবকে ব্বযবহার করে অর্থালোভি হয়ে উঠলে তাদেরকে শিকারে নেমে পড়ার প্রতিষ্ঠান হল এই এএনআই। কথিত অর্থ-সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর খুবই কাছের বন্ধু হয়ে উঠে এই এএনআই। এমনকি সে ঘটনা বাংলাদেশের বেলাতেও একই, সত্য! বাংলাদেশের প্রথম আলোর ক্ষেত্রে দেখেছি  তার বন্ধু হয়েছে এএনআই। এভাবে বন্ধু হয়ে জার্নালিজমের বেসিক নীতি ত্যাগ করে হলেও ভারতীয়দের আকাট পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে পড়েছিল ো পরে প্রায়ই এই প্রথম আলো,  স্রেফ কিছু নগদ অর্থ কামানোর জন্য।  এগুলো ২০২১ সালের শেষের দিকে সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল; এই উসিলায় যে করোনাকালে নাকি কর্মচারীদের ঠিকমত বেতন দিতে পারে নাই বা আয় কমে গেছে – মালিক বকা দিবে – এই ছিল সম্পাদকদের অজুহাতে।

    সম্প্রতিক বছরগুলোতে বিবিসিরও অর্থসংকট, ছাটাই ইত্যাদির কথা অনেকদিন ধরে কানে আসছে আমাদের। বিশেষ করে এসময়ে বিবিসি বাংলাকে প্রায়ই “এএনআই-এর এসাইমেন্ট ধরণের” নিউজ করতে দেখছি। একালের  বিবিসি বাংলার এই  ফেনোমেনাটা হল বিজেপি-আরএসএস এর আইটি চীফ অমিত মালব্যর অনুগত-রিপোর্ট করা; যেটা মালব্য-রা লাগাতর পয়সা খরচ করে মিডিয়া কিনে প্রপাগান্ডা  তৈরি করে – সেখান থেকে এটা এএনআই পর্যন্ত বিস্তৃত এই ততপরতা। এবিষয়ে এএনআইয়ের সিন্ডিকেটেড রিপোর্ট  – যা ছাপলে উলটা মিডিয়াগুলো পয়সা পায় – এমন কুখ্যাত ততপরতা এর ভাল প্রমাণ। রিপোর্টে কলমের একটা আচড়ও বসায় না অথচ সেটা নিউজ বা জার্নালিজম বলে ছেপে দেয় এরা নগদ পয়সা পাওয়ার লোভে।  যারা অমিত মালব্যকে চিনেন নাই তারা জেনে রাখতে পারেন, ভারত-বাংলাদেশ জুড়ে ফেসবুক যার নিয়ন্ত্রণে; প্রান্তীয় পর্যায়ে  যেকোন প্রোফাইল-একাউন্ট গায়েব করে দেয়া যার কাছে তুড়ি বাজানো…।  এছাড়াও ভারতীয় অরিজিন ফেসবুকে কাজ করা স্টাফদের সবার উপরের অলিখিত কর্তাব্যক্তিটার নাম হল যেন অমিত মালব্য।  তবে এসবের বাইরেও অনেক ঘটনা আছে যেমন পুরানা যারা কলকাতা অরিজিন বিবিসি বাংলার স্টাফ যেমন, শুভজ্যোতি ঘোষ আর সে আমলে কলকাতা আরএসএসের তথাগত রায় যখন বাংলার প্রধান ব্যক্তিত্ব – এরা ছিল দুজনে দুজনার।

    গত দুদিন ধরে তেমনই এক ততপরতা আমরা দেখছি বিবিসি -বাংলায়। সেটা হল ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) তরফে কিন্তু ফ্রন্টাল ফেস যেমন, ডঃ শ্রীরাধা দত্ত-কে সামনে এনে তাঁর বয়ানে ভারত ও মোদিকে বিরাট পরাশক্তিগত নেতা হিশাবে তুলে ধরার এক প্রপাগান্ডা চালিয়েছে বিবিসি।  এই নারীকে বাংলাদেশের ত্রাতা বা বাপ-মা হিসাবে তুলে ধরারও প্রকল্প এটা। কে এই শ্রীরাধা দত্ত?  ফরমালি তিনি বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন [VIF] নামের যেটা সরাসরি আরএসএস এর এক থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান, তার সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা।  এছাড়া ভারত আরএসএস প্রভাবিত নানান একাদেমিক / কমার্সিয়াল কিন্তু দলীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি জড়িত।  বাংলাদেশে প্রায়ই তিনি সিপিডি [CPD] ভিজিট করে থাকেন।
    সবমিলিয়ে মানে হল, তাঁর RSS  এর সাথে খোলাখুলি যুক্ত থাকা বা সংশ্লিষ্টতা আমাদেরকে তাঁর সম্পর্ক কিছু বিশেষ ধারণা দেয়।  সেখান থেকে অনেকে মনে করেন,  মোদি-আরএসএস এর দুনিয়াব্যাপী হিন্দুত্ববাদ ছড়ানোর যে স্বপ্ন-কল্পনা আছে তা বাস্তবায়নের কর্মী একজন তিনি।  তাই কার্যত ভিআইএফ (VIF), থিঙ্কট্যাঙ্কের নামে আরএসএস এর গ্লোবাল হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান হয়েছে মনে করা ভুল হবে না; যার কান্ডারি তিনি।  যেমন  এই প্রসঙ্গ বিবিসিসহ অনেক অনেক ইউটিউব ভিডিও-ও ছাড়া হয়েছে সব জায়গায় একই প্রপাগান্ডা তুলে ধরা হয়েছে; যার প্রধান কাজ হচ্ছে  শ্রীরাধার তুলে ধরছেন – বাংলাদেশে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরে যেন মোদি হলেন হাসিনার বাংলাদেশের ত্রাতা যে মোদি চাইলেই হাসিনা সরকারকে উদ্বার করে দিতে পারেন অথবা হাসিনা সরকারের এখনকার পরিত্রাণ যেন কথিত এক ক্ষমতাধর পরাশক্তি ভারত ও এটা মোদির ইচ্ছা বা ভাল মুডের উপর নির্ভরশীল।
    এটা ফুটিয়ে তোলা মত এক উপস্থাপক হচ্ছেন শ্রীরাধা দত্ত ও তাঁর কারিশমা; আর ওদিকে তা বাজারের ছড়িয়ে দিবার দায়ীত্ব-ঠিকাদারি পেয়েছে যেন বিবিসি বাংলা!

    বিবিসির রিপোর্টের নামে এক গারবেজের প্রসঙ্গঃ
    বিবিসির রিপোর্টের নামে এই গারবেজের শিরোনাম হল, “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর উপায় কী হাসিনা সরকারের”, যার রিপোর্টার হলেন শাকিল আনোয়ার।
    আচ্ছা এমন শিরোনাম কেন?  মানে রিপোর্টার এখানে এটাকে একটা ‘হুমকি’ বলে ধরে নিয়েছেন কেন? কী দেখে নিশ্চিত হয়েছেন? আর ধরে নিয়েছেন যে “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” এটা বাংলাদেশ সরকারের উপর এক “হুমকি”?   কিন্তু  এন্থনি ব্লিঙ্কেনের টুইট বা ডোনাল্ড লু এর বাংলাদেশি টিভিতে গিয়ে ব্যাখ্যাদানের পরে হাসিনা  সরকার ও সরকারি দলের প্রতিক্রিয়া কী ? নেগেটিভ ? তা তো নয়। এমনকি   আওয়ামি লীগ, বিএনপি এমনকি জাতীয় পার্টি – এর নেতারা কেউই একে নেতিবাচক ভাবে দেখে নাই, নেয় নাই। অন্তত তাদের অফিসিয়াল ভার্সানে এটা তাই। পরেরদিন রাষ্ট্রদুত পিটার হাস এই তিন দলের প্রতিনিধিদেরকে ডেকে কথা বললে তারা কেউই “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” নিয়ে কোন নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখান নাই।
    আবার ওবায়দুল কাদের এর প্রতিক্রিয়া দেখুন। সরকারি বাসস-এর রিপোর্ট লিখছে – “মার্কিন ভিসা নীতি নিয়ে বেকায়দায় বিএনপিঃ  ওবায়দুল কাদের”  অর্থাৎ আওয়ামি লীগ এর জন্য কোন বিপদ ঘটে নাই বরং বিএনপি এই নিষেধাজ্ঞায় বিপদে পড়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।  অথবা আবার দেখেন,  একই বাসস কিন্তু আরও এক রিপোর্টে লিখছে – “নতুন মার্কিন ভিসা নীতিতে অগ্নিসংযোগ বন্ধ হবেঃ মোমেনের আশাবাদ“। তাহলে কিসের ভিত্তিতে শাকিল আনোয়ার এটাকে হুমকি বলে চিহ্নিত ও  প্রচার করছেন? সেটা কী এই যে এটাকে হুমকি বলে  প্রচার না করলে শ্রীরাধা দত্ত বা তার মহাজন মোদিকে –  হাসিনা সরকারের এক ত্রাতা ও বীর হিশাবে তুলে ধরা যাবে না??? বাঃ বেশ ভাল কায়দা তো!  আর সেক্ষেত্রে  হয়ত বিবিসির ক্লায়েন্ট এসাইনমেন্টের বিল সেক্ষেত্রে পে করবে না, তাই কি? তার মানে বিবিসির এই এসাইমেন্টের ফোকাস হল, মোদিকে এক বিরাট ত্রাতা আর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা!! সেটা কতটা সত্যি – এই প্রশ্নটাকে মাথায় রেখে আমরা বিবিসির রিপোর্ট পড়ব।

    রিপোর্টের শুরুতেই বিবিসি এক গায়েবি কূটনীতিকের কথা এনেছে। নাম না আনা এই কূটনীতিক বলেছেন, “……এই রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে তলে তলে আমেরিকার সাথে দেন-দরবার দর-কষাকষির পথে যাবে সরকার“। আচ্ছা ভাইসাব,  কূটনীতিক ট্যাগ দিলেই কী কারো নামে যা খুশি লেখা বা চালানো যায়; জায়েজ?  আমেরিকার সাথে হাসিনার কোন ডিল বা রফা করতে গেলে একটা দেয়া-নেয়া লাগবে, এটা তো কোন গুঢ় জ্ঞান না, এটা সবাই জানে। এখন প্রশ্ন হল হাসিনার হাতে এমন কি আছে যেটা আমেরিকার কাছে লোভনীয় ফলে যা সে কামনা করে?  এমন কিছুই নাই, যেটুকু ছিল তা আগেই দেয়া হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয়ত, হাসিনার সাথে আমেরিকার কোন ডিলে জড়ানোর মানে হল হাসিনার প্রথম চয়েজ তাকে আরও এক টার্ম ক্ষমতায় রাখতে হবে – আর এর দায় আমেরিকাকে নিতে হবে। কিন্তু আমেরিকা ইতোমধ্যে প্রতিটা কথাতে জুড়ে দিয়ে বলেই যাচ্ছে যে একটা ফেয়ার ইলেকশন হতেই হবে। তাহলে এখানে বটম লাইনটা হল, একটা ফেয়ার ইলেকশন আর হাসিনাও আবার ক্ষমতায় – এদুটো একসাথে ঘটাতে হবে ; কিন্নোতু সরি এদুটো একসাথে সম্ভব নয়। কোন ম্যাজিকেও সম্ভব নয়! তাহলে এসব “তলে তলে বা দর কষাকষি টাইপের” বুকিস মুখস্ত কথা বিবিসি ঐ কথিত কূটনীতিকের মুখ দিয়ে বলাচ্ছে কেন?

    তাহলে,  রিপোর্ট-টাকে কী বিবিসি কোন রহস্য উপন্যাস বানাতে চেয়েছিল ?? অবশ্য না হলে মোদি ত্রাতা, মোদি পরাশক্তির মত ক্ষমতাধর এই গল্প কিভাবে আনা যাবে? ব্যাপারটা তো তাই, তাই না?

    দুইঃ
    দেখা গেল বিবিসি এভাবে প্রথম পর্ব জমাতে পারল না। এখন পরের পর্ব। এবার প্রকাশ্যে সাবেক কূটনীতিক তৌহিদ হোসেন বলছেন “বাংলাদেশে এক সামরিক ঘাটির” কথা। যদিও তিনি নিজেই তা শুরু করেছেন এটা একটা গুজব একথা বলে।
    প্রথমত এটা গুজব নয়, এটা আমেরিকানদের একটা খায়েস যে তারা তাদের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের জলসীমায় নোঙ্গর করতে পারলে তাদের শান্তি লাগত, এতে এশিয়ায় তাদের গায়ে বল বল ঠেকত। খায়েস তো মানুষের কত রকম থাকে! যেমন এই শতকের শুরুর আগে থেকেই অর্থহীন “ইসলাম কোপানিতে” লেগে পড়া ভারত-আমেরিকার দোস্তালির ইস্যুতে ভারতের  (তখন সেটা বাজপেয়ীর ভারত) সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অ্যামেরিকান প্রশাসন গ্রহণের পর থেকেই এই ঘাটি বানাবার খায়েস তারা লুকিয়ে ফেলেছিল, কোন ঘরের চালে গুজে রেখে চলছিল। কারণ, অ্যামেরিকান এই খায়েসের ইস্যুতে এর বিরুদ্ধে চীনের চেয়েও কোর আরও বড় বিরোধি হল ভারত। অর্থাৎ ভারত-ঘনিষ্ঠতা চাওয়ার আগেই আমেরিকাকে এই খায়েস ডেড করে তুলে রাখতে হত তাই করেছিল আমেরিকা। আর তাই সেটা সেই থেকে তোলাই আছে। অর্থাৎ খায়েস টা একেবারেই কোন গুজব নয়, তবে তুলে রাখা আছে, এক্টিভ নয় এই আরকি!
    কিন্তু আমেরিকান এই খায়েস নিয়ে আমাদের কী করার আছে?
    সেটা এবার এককথায় বললে, অ্যামেরিকান এই খায়েস ঠেকানো এটা আমাদের চেয়েও ভারত ও চীন এদুই শক্তির জন্য আরো বড় ইস্যু; সেটা এতই বড় যে এরা দুই রাষ্ট্রই তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা ঠেকাতে প্রস্তুত। কাজেই আমাদের ভুমিকা এখানে এতটুকু হলেই যথেষ্ট হবে যে বাংলাদেশকে ওদের লড়াইয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হওয়ানো যাবে না। বরং না হয়ে ওদের পায়ের পারার নিচে চাপা পড়ে মরতে না চাইলে আমাদের ভুমিকাটা খুবই ছোট্ট! তা হল, এই ইস্যুতে কোনপক্ষের সাথে না গিয়ে কোন খাতির জমানোর ইস্যু বলে বিবেচনাই না করা  – যেটাকে বলে – এটা আমাদের জন্য NO GO ইস্যু! যদি তা না মানি তাহলে এই ইস্যুর কারণে, আমেরিকা আসার আগেই ভারত ও চীনের দুদিক থেকে আক্রমণে আমরা শেষ হয়ে যাব।  মানে এটা হাসিনা বা কারও ক্ষমতায় আসা বা ক্ষমতার আয়ু বাড়ানোর কোন ইচ্ছার আইটেমই নয়! দরকষাকষির ইস্যু নয় বা এভাবে দেখা হারাম! এই কথাটা মনে রাখতেই হবে!।   কাজেই কূটনীতিক বলে নয় যেকারোই ভাব ধরে এনিয়ে কিছু বলা বা ভয় দেখানো অর্থহীন, অমূলক!

    আচ্ছা দুনিয়াতে আমেরিকার আর একটা সামরিক ঘাটি করা না করাতেই বা কী হয়েছে? কী হতে পারে? গত ২০১৬ সালে আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়াতে কোস্টাল এরিয়ায় একটা সামরিক ঘাটি চালু করেছে। তাতে কী হয়েছে? আমেরিকা চীনের উপর বিজয়লাভ করেছে নাকি কোন অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছে? কিছুই পায়নি। মনে রাখতে হবে কড়া ভাবে যে  একালে  আমেরিকা-চীনের প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এটা কোনভাবেই সামরিক চরিত্রের নয় সামরিকও নয়, এটা অর্থনৈতিক। আরো স্পষ্ট করে বললে, কার অর্থনীতি  এই মুহুর্তের দুনিয়ায় নিজ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস একুমুলেশন  বা অতিরিক্ত সম্পদ জমা করতে সক্ষম  হয়ে উঠেছে তারই প্রকাশের লড়াই । যদিও এটা তো প্রতিযোগিতার ইস্যু নয়, অবজেকটিভ ঘটনা। অর্থনীতিতে এই বাড়তি সম্পদ এটাই অন্যদেশের  উপর আমেরিকা বা চীনের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দেখা দিতে সক্ষম এবং হয়ও তাই।  যেখানে আমেরিকা দ্রুত তার পুরানা প্রভাব-বিস্তারের  সক্ষমতা হারাচ্ছে আর বিপরীতে চীন জাগছে। তাই আমেরিকা এটাকে সামরিক সক্ষমতা হিশাবে উলটে দিবার বা হাজির করে দেখানোর প্রাণপন চেষ্টা করছে। যে সামরিক ফিল্ডে আমেরিকা এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সক্ষম। কিন্তু আমেরিকা চাইলেই তা হচ্ছে না। কারণ, কোনদেশই সামরিক সংঘাত চাচ্ছে না, যদিও চীনের সাথে অনেক পড়শি দেশেরই সীমানা বিতর্ক  বিরোধ আছে। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার কোলে উঠে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে কেউ আগ্রহি নয়; এটা গাধামি এটুকু সকলেই বুঝে। তাই আমেরিকা বার বার ফেল করছে এখানেই।   আর তাতে কী হয়েছে?  হয়েছে এই যে অষ্টেলিয়ায় বানানো অ্যামেরিকান সামরিক ঘাঁটি কারই অন্তত এখনই কোন কাজে আসছে না। বিনিয়োগটা খামোখা হয়ে বসে আছে!

    ভারত পাশে দাঁড়াবে?- এর গল্পঃ
    ভারত পাশে দাঁড়াবে – একথা শুনলে আজকাল আর হাসিনাও খুশি হয় না। কারণ, মোদি ও ভারত মুরোদহীন, উত্থানরহিত এক ব্যক্তি বা শক্তি! আর এই মিথ্যা কথা কে বিশ্বাস করে!
    এরপরেও বিবিসি ও শাকিল আনোয়ার এসেছেন আসলে তাদের সাবজেক্ট বা এসাইনমেন্ট নিয়ে যে – ভারত পাশে দাঁড়াবে? ! আচ্ছা একালে ভারত কবে থেকে কারও পাশে দাড়ানোর মত পরাশক্তি হয়ে গেছে? আর কিভাবে সেটা? যখন একাল বলতে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে আমেরিকা-চীনের রেষারেষি, লড়াই বা প্রতিযোগিতা তুঙ্গে উঠার কাল বলে এটাকে বুঝতে হবে। একালে ভারত তাহলে কী কেউ?? অবশ্যই না।  তবে ভারত বড়জোর কখনও  আমেরিকা অথবা চীনের পক্ষে তাদের কারও থেকে আলগা খেপ-মারার মত কাজ বা এসাইনমেন্ট পেয়ে গেলে সীমিত অর্থে ভারত নিজেকে কিছু ক্ষেত্রে পাওয়ারফুল বোধ করতেও পারে। যা সে আগে করেছেও; বাংলাদেশকে ভারতের হাতে আমেরিকার তুলে দিবার পরে!

    আমাদের ওয়ান-ইলেভেন ছিল ২০০৭ সালের তেমনই একটা ঘটনা।  আমেরিকার চাওয়া ছিল এশিয়ায়  চীন-ঠেকানোর ঠিকাদারির কিছু কাজ ভারতকে দিয়ে করিয়ে নেয়।  আর তাতেই বিনিময়ে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই মাখন আমেরিকা কিছুই খেতে পারেনি বরং তার চেয়ে পিঠার আসল ভাগটা গিয়েছে ভারতের মুখে! আর তাতেই ২০১৪ সালের শুরু থেকেই আমেরিকাই সরাসরি বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ ও চাওয়া-পাওয়ার  সকল ক্ষমতা ও সুযোগ হারিয়ে ফেলেছিল। আর এতে  ভারত তখন বাংলাদেশকে একেবারে লুটে আর চুষে সব খেয়ে ফেলার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। এখন এটাকেই কী শাকিল বলছেন – এটাই কী ভারতের পাশে দাঁড়ানো?   বিবিসি বা শাকিলের উচিত শব্দের ওজন, অর্থ জেনে মেপে এরপর ব্যবহার করা! আর এটা আমার বলার বা মনে করিয়ে দিবার কথা না, তাদের নিজেদেরই জেনে আসারই কথা!

    আরএসএসের আছে একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্পঃ
    আরএসএসের একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্প আছে। যেটা হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে শুধু একটা অখন্ড ভারত কায়েম নয়; বরং সারা দুনিয়া জুড়ে হিন্দুত্ববাদ কায়েম করার স্বপ্ন। আর মোদি হলেন সেই স্বপ্ন-প্রকল্পের এখনকার প্রধান কান্ডারি। আমার একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ মিলবে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষত যেসব রাজ্যে প্রবাসী ভারতীয়দের সংখ্যা বলার মত একটা চাঙ্ক! সেসব রাজ্যের দেখা যাবে ক্যালেন্ডারে আরএসএস ঘোষিত হিন্দুত্বের চোখে পালনীয় দিন, মানে সরকারি ছুটির দিন নয় – যেমন একালের রামনমমী পালনের নামে অ-হিন্দুদের কোপানোর দিন হয়ে উঠেছে; এসব দিনে আমেরিকায় বসে এরা হিন্দুত্বের জয়গান গেয়ে মিছিল-সমাবেশ করছে। মনে রাখতে হবে অ্যামেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশন বলে তাদের সংগঠন আছে।
    কাজেই এমন লক্ষ্য ও ততপরতার অংশ হিশাবে – বাংলাদেশের উপর অ্যামেরিকান ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এই উসিলায় ত্রাতা ও বীর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা আর মোদি কী ত্রাতা হবেন –  এভাবে এমন মুরোদবিহীন কিন্তু উস্কানিমূলক প্রশ্ন তুলে  এরপর এরই জবাব দেওয়া বা নেওয়ার উসিলায় শ্রীরাধার কাছে গেছে বিবিসি। এটাই মোদি-আরএসএসের পক্ষে প্রোপাগান্ডা করার জন্য বিবিসিকে দেয়া এসাইমেন্ট!

    কেন কথাগুলো এত কঠোরভাবে বলছিঃ
    লেটেস্ট বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। সেটা হল বাইডেন এখন ভারতকে কিভাবে দেখছে তা বুঝতে হবে।  অন্তত এই ২০২৩ সালের শুরু থেকেই পুরানা – ভারত-আমেরিকা যতটুকু যা এলায়েন্স খাতির অথবা চীন-ঠেকানোর চুক্তি এবং হাতে হাত ধরে ওয়ার্কিং রিলেশন যা আগে তৈরি ছিল – এর সবটাই ফুল স্টপ হয়ে যায়। এর বহু আগেই অবশ্য ট্রাম্পের আমলেই ২০১৭ সালে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকায় এক্সপোর্ট  এর বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়েছিল। আবার একালে কোয়াড [] শুকিয়ে অকেজো হয়ে গেলে অথবা  ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ান তেল, কয়লা ইত্যাদি পুণঃরপ্তানি শুরু সহ নানাবিধ প্রকাশ বলছে যে দুপক্ষই অঘোষিতভাবে স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক সমাপ্তি টেনেছে। ভারতের সাবেক কূটনীতিকেরা আমাদের জানাচ্ছে যে ভারত এখনও স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সটা ফিরে চায়। মানে হল আমেরিকা চায় না। এসবের কারণে, আমরা বুঝতে পারি যে চীনের সামনে ভারতের অসহায়বোধ  আরও বেড়েছে। আর সর্বোপরি – আমেরিকা বড় ভাই তার পিঠে হাত রেখেছে – এতে ভারতের গা-গরম ভাবভঙ্গি ভারত সেটা গত ২৩ বছর ধরে দুনিয়ার বাজারে বিক্রি করে চলেছিল তা বন্ধ হয়ে আছে। – আর এখান থেকেই মিথ্যা আর ফাঁপা হলেও মোদির যে পরাশক্তি ভাবদেখানো এর উৎস হিশাবে আবার আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নাই কিন্তু আছে দেখাতে মোদি-রা এখনও উদগ্রীব যদিও সেসব দেখানোটা এখন একেবারেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে!
    তবু স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স টা যে নাই তা  বাস্তবে দেখা ঘটনা, সিম্পটম বা ইঙ্গিত দেখে বলা ঘটনা-ই, কারণ সরকারি বা ঘোষিতভাবে দুপক্ষের কেউ তা বলে নাই।  তাই এবার কিছু সরাসরি ইঙ্গিত-প্রমাণ নিয়ে কথা বলব।

    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্সঃ
    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্স মানে আসলে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – মানে স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সে যে দীর্ঘ কমপক্ষে ২২ বছরের সমপর্ক ছিল এর অবসান ঘটা। এর প্রমাণ হিশাবে একালে আমেরিকার বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ এর ইচ্ছা নিয়ে যতটুকু যা প্রকাশিত তা যথেষ্ট ভাল প্রমাণ অবশ্যই। কারণ এটাই অ্যামেরিকার নয়া এশিয়ান স্ট্রাটেজির বেজ বা মূল অংশ, অবশ্যই আর তা ভারতবিরোধী বা ভারতের স্বার্থকে আমল বা কেয়ার না করে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু আমি এর কথা  এখানে এখন টানবো না। কারণ আরও বড় প্রমাণ-লক্ষণও হাজির হয়ে আছে তাই। কী সেটা?

    এককথায় এটা হল, ভারতকে সাইজ করে ছোট করা বা আসল সাইজে আনা –  বলতে পারি। মানে হল আমেরিকা যেন বলতে চাইছে গত তেইশ বছর আমার প্রভাবে থেকে ফুলে উঠা ভাব করেছো -পরাশক্তি মারাও? তাই এখন তোমাকে সাইজ করবে আমি। তোমার আসল সাইজে তোমারে ফিরিয়ে আনব।  এসব ভাব-ইঙ্গিতের বক্তব্যেরই বাইরের মানে হল –  ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর আমেরিকা-বাইডেন প্রশাসন আর মোদির শাসন দেখতে চায় না। তবে এক্ষেত্রে পরোক্ষে এবং আইন মানা সব ততপরতায় আমেরিকা ভারতের বিরোধীদলদের সুবিধা হয় সুবিধা পায় এমন সব পদক্ষেপ নিবে। এটা ইতোমধ্যেই আমেরিকা শুরু করে দিয়েছে। বলা যায় গুজরাত-ফাইল বা গুজরাতে মুসলমান নিধন এর ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রচার দিয়ে এর শুরু। পরে আদানিকে ডুবিয়ে দেয়া যেটা মোদির সব ততপরতার অর্থনৈতিক উৎস ও সাপোর্ট যেখান থেকে পেত সেটাকে ধবংস করে দেয়া; রাহুল গান্ধীকে বিকল্প হিশাবে প্রমোট করা ইত্যাদি। এভাবে বিরোধী সকল দলকে ম্যাসেজ দেয়া যে রাহুলের পিছনে তারা যেন দাঁড়ায় আর নিজেদের নানান স্বার্থগুলো এলাইন করা এক রাস্তা ধরে সহযোগিতা করে সাজিয়ে নেয় যাতে তাদের সকলেরই আমেরিকার সহায়তা পেতে সুবিধা হয়, আমেরিকারও কাজগুলো সবার জন্য এফেকটিভ হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের ছোট্ট একটা কথা – যা এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল যখন বলেন ‘আমরা সব মনিটর করছি” –  তা অনেক কথারই স্বল্পকথা আসলে।
    আবার লক্ষ্য করেন সম্প্রতি ফেসবুকে ভারতীয় স্টাফদেরকে যে সমুলে ছাটাই করা হয়েছে সেটাও বাইফ+ডেনের দিক থেকে মোদিবিরোধিদেরকে দেয়া উপহার। এটা যে মোদির ঘরে আঁচ ও আগুন লেগেছে এর কিছু নমুনা দেখতে পারেন এখানে। এই পত্রিকাটা আরএসএসের স্বরাজ -উইংয়ের পত্রিকা।

    মজার কথা হল, বাইডেন যতই এক্টিভ বা এগ্রেসিভ হচ্ছেন যা জন্মের পর থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই উপস্থিত ছিল না ততই যেন মোদি পিছু হটছেন; মানে হয়ে গেছে যেন তাই করছেন বাইডেন। আমেরিকার হেফাজতে থাকা ভারতের আভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গে যত গোয়েন্দা রিপোর্ট ডকু আছে [যেমন পুলোওয়ামায় পাকিস্তানের সাথে কোন বোমাবাজি ঘটেই নাই, সেতাই আমেরিকা মোদির পছন্দের লোক কাশ্মীরে মীদি যাকে প্রতিনিধি বা গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন সেই সত্য মালিক তা ফাঁস করে দিয়েছেন।] এর সবগুলো যেন বাইডেন ভারতের বিরোধীদলের সামনে খুলে দিয়েছে, এক্সেস দিয়ে দিয়েছেন।  অথচ প্রতিক্রিয়ায় মোদি ততই কুকড়ে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, সরে যাচ্ছেন – সর্বপরি এড়িয়ে প্রতিরোধ অবস্থান ত্যাগ করে চলে যাচ্ছেন। যেন মোদি বুঝে গেছেন যে  প্রতিরোধ অবস্থানে গেলে তাঁর আরো বেশি ক্ষতি হবে, ন্যাংটা হয়ে যাবে্ন!
    এটা এক অদ্ভুত খেলা যেন! ওদিকে সর্বশেষ অনেক বাধা পেরিয়ে রাহুল তার নিজের জন্য একটা সাধারণ পাশপোর্ট ইস্যু করাতে পেরেছেন তাও সেটা আবার মাত্র তিন বছরের জন্য – বাকি আগের সব পাশপোর্ট সারেন্ডার বা বাতিল করেছে মোদি সরকার। আর এই পাশপোর্ট নিয়েই আগামি মাসে রাহুল আমেরিকা যাচ্ছেন। বাজারের অনুমান এটাই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে তার ফাইনাল ডিল মানে – কাজের লক্ষ্য কী হবে, কে কী করার দায়ীত্ব নিবে ইত্যাদি এসবেরই ফাইনাল হবে সেখানে।   বাস্তবে কী হবে না হবে সে আমরা আগামিতে দেখতেই পাবো অবশ্যই।
    কিন্তু আসল কথাটা হল,  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক যে এখন ডিভোর্সির  – স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স থেকে পতিত হয়ে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – এর একথা তো অন্তত বিবিসির কাছে কোন কিছুতে অজানা নয়! ছিল না। কারণ গুজরাত ডকু তো তারাই প্রচার করেছে! তাহলে???

    একালে ভারতের নিজের সক্ষমতায় বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো, কিংবা আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের জন্য  সুপারিশ করা ইত্যাদি কোন কিছুই হচ্ছে না, কারণ মোদির তা করার মুরোদ নাই, শেষ। তা নাই এবং ছিলও না যতটুকু যা ভারত দেখিয়েছিল আগে সেটুকুও  মোদি ফুলিয়ে ফাপিয়ে নিজেকে পরাশক্তি কল্পনায় দেখিয়েছে – এসবের পিছনের কারণ ভারতের পিঠে কিছুটা সময় হাত রেখেছিল আমেরিকা – সে কারণে। অর্থাৎ অ্যামেরিকান স্বার্থে সে ভারতকে যতটুকু মাতবর বলে দাবি করার সুযোগ দিয়েছিল সেটাই। সবচেয়ে বড় কথা সেটা আর এখন একেবারেই নাই। অথচ এটাকেই মোদি ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে বলে চালাবার দেখাবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছে। যার সর্বশেষ প্রচেষ্টার নাম হল বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত এদের ক্যারিকেচার!  তাহলে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো বা না দাঁড়াতে চাওয়া নিয়ে জল্পনাওকল্পনা ছড়ানো এর সবকিছুই ডাহা মিথ্যা। মোদির ইমেজ তৈরির প্রপাগান্ডা মাত্র!

    আসল কথাটা হল, যে মোদির ভারতের এখন বাইডেনের আমেরিকার কাছে নিজেদেরই বেইল নাই  – না ভারতের না মোদির – সেই মোদি কিভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারে? হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ নিয়ে যেতে পারে, কে তিনি?????

    অথচ এ পুরা ব্যাপারটাই ডিটেইল অন্তত বিবিসির নিজের জানা থাকার পরও   দিল্লি কি তাদের সেই কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে – হাসিনাকে উদ্ধার টাইপের রিপোর্ট তাহলে কী করে করতে পারল??
    এটাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে নেয়া বিবিসির এসাইনমেন্ট!

    বিবিসি একালে অনেক এক্টিভ একাজে। বিবিসি যদি এমন চালাতেই থাকে তবে আগামিতে হাসিনার যুগ শেষে তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।  বাংলাদেশে  গণধিকৃত মিডিয়া হিশাবে পরিচিত হবে! নিজের ভাগ্য নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার তো অবশ্যই বিবিসি বা শাকিল আনোয়ারের!   মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য গড়ে থাকে!

    আপডেটেডঃ ৩১ মে ২০২৩, দুপুরঃ ১০ঃ৩৯


    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা
    গৌতম দাস

    ২২ মে, ২০২৩   ০০ঃ০৩
    https://wp.me/p1sCvy-4ul

           Wary Delhi watching Dhaka 

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক আবার একটা লেখা ছাপিয়েছেন – ‘দ্যা ফেডারল’ [The Federal], এই নামের দক্ষিণ-ভারতীয় পত্রিকায়। বাংলাদেশের পাঠককুল সাধারণত  সুবীরকে ধরে নেন যে তিনি ভারত সরকারের (গোয়েন্দাবিভাগ) এক অঘোষিত মুখপাত্র। বা উলটা করে বললে শুরুর দিকে সুবীরও যেন এটাই চেয়েছিলেন যার নতিজা এটা। তবে যেকোন সরকারের নানান মুখপাত্র থাকে; আর মুখপাত্র ব্যাপারটা হল,  কোন ঘটনায় সরকারের মানে সরকারি ভাষ্যটা কী তা জানাতেই এই পদের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো সরকারি প্রতিনিধি বা কর্মচারির মধ্যে  কার কথাটা সরকারের অবস্থান বলে সরকার মনে করে সেটার নির্ধারক হল কাকে মুখপাত্র বলে সরকার আগেই পরিচয় করিয়েছে।  যেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও এক মুখপাত্র থাকে; সম্প্রতি বাংলাদেশেও এই প্রথম এমন পদে একজন মুখপাত্র নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু মুখপাত্র দরকার হয় যারা সরকারের অফিসিয়াল বা ঘোষিত মুখপাত্র নয় বা থাকেন না; অথচ তাদের মুখ দিয়ে সরকার নিজ অবস্থানও জানায় রাখতে চান। অর্থাৎ অফিসিয়ালি তাঁকে মুখপাত্র বলে স্বীকার না করেও সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ অবস্থান জানানোর এক ব্যবস্থা করে থাকে, যেখানে পাঠক আর সরকার – এরা উভয় পক্ষই এই অঘোষিত ব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন। অর্থাৎ ইনফরমালি এক ফরমাল ব্যবস্থা যেন! সুবীরকে তেমনই এক মুখপাত্র মনে করা হয়!
    আবার এমন ব্যবস্থা চীনেরও আছে, যদিও তা আরেকটু গোছানো। চীনের বেশিরভাগ খবর প্রকাশিত হয় জিনহুয়া  [Xinhua] নিউজ এজেন্সি থেকে তবে তা চীনে সারা দেশের নানান নামের পত্রিকায়। কিন্তু চীনা গ্লোবাল টাইমস [Global Times] হল সরকারি অবস্থান প্রকাশ করার আলাদা এক পত্রিকা তবে সে কথাটাও অঘোষিতই থাকে। মানে কোথাও তা উল্লেখ নাই; তবুও পাঠক অনুমান করে নেয় বা ধরে নেয় যে এটাই চীনের অফিসিয়াল ভার্সান।

    সুবীরদের এই লেখার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন ঢাকার উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে” [As Hasina faces heat in Dhaka ahead of polls, Delhi finds itself in a corner too]। মানে সারকথায় সুবীর যেন বলতে চাইছেন,  বাংলাদেশের হাসিনা যেমন  আমেরিকান চাপ থেকে বের হবার পথ না পেয়ে মোদির সহায় হয়েছিলেন; মোদিও তাতে ব্যর্থতা অসহায়ত্ব দেখিয়ে ফেলে পালাতে বা কেটে পড়তে চাইছেন!

    এতদিনের ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বা মোদি-হাসিনার সম্পর্কের কথা পাশে সরিয়ে রেখে যদি কেবল এবারেরটা মানে গত মাসে ২৫ এপ্রিল হাসিনা সরকারের জাপান সফর থেকেই আমলনামা শুরু করি – তাহলে বলতে হয় জাপান সফরটা মূলত ছিল মোদির ভারতের জন্য কিছু করে দিবার সফর। যাতে আমাদের সরকার মোদির জন্য কিছু করে দিলে  মোদি সরকারও আমাদের সরকারের জন্য গুরুত্বপুর্ণ কিছু করে দিবেন!  যেমন এক, বাংলাদেশ জাপানি লোনের ভার নিজ কাঁধে নিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে শুধু সমুদ্র বন্দর না একেবারে একটা (মাতারবাড়িতে) গভীর সমুদ্র বন্দরের ব্যবস্থা পাইয়ে দিতে জাপান সফরে গেছেন।  আর দুইঃ যদিও  মোদির ভারত ক্রমান্বয়ে নিজেকে এক পরাশক্তি বলে এক শতভাগ মিথ্যা দাবি বা আচরণ করে চলে –  যেন কোন মানুষ যখন অলীক সব স্বপ্ন-কল্পনাকে বাস্তবে তা আছে বলে মনে করে বিশ্বাস করা শুরু করে আর সেসবকে তাঁর স্মৃতি বলে চালিয়ে দিতে চায়, এটা সেরকম। যা বাস্তবে নাই ঘটেই নাই তা কারো স্মৃতি হয় কেমনে?  যেখানে বাস্তবের ভারত হল এমন এক অর্থনীতির নাম যার প্রচুর অবকাঠামো ঋণ আর এফডিআই- এদুই ধরণের বিনিয়োগ ঋণের ঘাটতিতে আছে বা থাকছে; মানে একটা বিদেশি ঋণচাহিদায় থাকা দেশ। উদ্বৃত্বের অর্থনৈতিক দেশ ভারত নয়। ফলে তার ঋণ প্রয়োজন যেটা সে সবাইকে জানিয়ে চীনের (যে এখন ঋণদাতা হিশাবে শীর্ষে) কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারে না। তার অহঙ্কার-ভ্যানিটিতে লাগবেই যদি সে নিজ পুর্ণ ক্ষমতায় বিকশিত হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু মোদির ভারতের আবার চীন-এলার্জি আছে বলে – মানে হলে হুদাই মোদি হল এক কঠোর জাতিবাদি স্বরাজ্য-জ্ঞানসম্পন্ন শক্তি হিশাবে দেখিয়ে পাবলিকের কাছে ভোট চেয়ে ফেলেছে; ফলে যেখান থেকে সে আর এখন বের হতে পারবে না –  অতএব চীন তার বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারলেও মোদিকে এখন চীনের একটা বিকল্প খুঁজতে নেমে পড়তে হয়েছে। ভারত সেই বিকল্প হিশাবে সে পেতে চায় জাপানকে। যদিও ভারত জানে এটা তেমন জুতের না; কারণ এটা আবার পায়ে জুতার কাটার মত খচখচ করে লাগে। কারণ জাপানি ঋণের খরচ তুলনায় বেশি; এছাড়া জাপানি শিল্প ভারতকে সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত করার ঝোঁক প্রবল বেশি। তবে মাঙনা যদি কিছু জাপান থেকে আসে তো খারাপ কী! এটাও ঠিক! হাসিনার সফরকে আমরা এখান থেকে দেখতে পারি!

    সমস্যা হল মোদির ভারতের অর্থনীতিবিষয়ক স্বপ্ন আসলে এক অলীক স্বপ্ন। কারণ, মোদি বা আরএসএস এর রাজনীতি এক উগ্র জাতিবাদী ধারণা বলে, তাদের অর্থনীতি জ্ঞান ও ধারনাও উগ্র জাতিবাদ প্রসুত! কিন্তু এর মানে কী? মানে হল এই চিন্তা্র শাসকেরা বাস্তবে কখনও আরেক দেশের সাথে শেষবিচারে লেনদেন বা বাণিজ্য-অর্থনীতিতে লিপ্ত হয়ে পারে না, পারবে না। কেননা এমন উগ্র জাতিবাদ মনে করে আমার দেশের মানুষ যাকিছু উতপণ্য ভোগ-ব্যবহার করব তা কেবল নিজ-দেশের উতপাদনই হতে হবে। আমিও রপ্তানি করব অন্যদেশেও আমার দেশে রপ্তানি করবে – না এমন নীতিতে উগ্র জাতিবাদ বিশ্বাস করে না। এটা কার্যত ওয়ানওয়ে  মানে কেবল একদিকে আমিই কেবল রপ্তানি করব এমন হতে হবে। এমনকি তা যদি তা সোজা আঙ্গুলে না হয় (বাস্তবে তা না হওয়ারই কথা) তবে শঠতা, প্রতারণা করে হয়েও আগাতে হবে। ভুয়াভাবে এমন বিশ্বাস আছে তা দেখাতে হবে আর এই দেখানোটা জায়েজ মনে করতে হবে। যেটা অনেকটা ছলনাময় ও চতুর কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী বৃটিশদের মত, তাদের পররাষ্ট্রনীতির মত;  আর এটাই উগ্র জাতিবাদিদের অর্থনৈতিক মডেল।  একারণে গত একদশকেরও বেশি এই জাপান-ভারতের সম্পর্ক এক স্বপ্ন-কল্পনাই হয়ে চলছে যার তেমন কোন বাস্তবায়ন অগ্রগতি নাই। যদিও তাতে উচ্ছ্বাসে কমতি নাই। যেকারণে,  যাকিছুর নামে সাথে স্বরাজ অথবা জাগরণ ধরণের শব্দ আছে বুঝতে হবে সেসবগুলো আসলে আরএসএস এর প্রকল্প। তাই স্বরাজ্য-মাগ ম্যাগাজিনে জাপানকে নিয়ে উচ্ছাস দেখা যাবে যারা বলতে চাইবে এই তো চীনের বিকল্প এক বিড়াল হিশাবে জাপানকে পেয়ে গেছি আর চিন্তা নাই। কিন্তু এটা যে মাঙনায় পাওয়া হাসিনা সরকারের দেয়া জাপান থেকে হবু সুবিধা তা উগ্র জাতিবাদিরা পরিস্কার করে বলবে না।

    কিন্তু হাসিনা সরকার তাহলে এর বিনিময়ে নিজে কী পাবে ভেবেছিল? সেটা অনেকটা –  “দেখেন তো ভাইজান কিছু করতে পারেন কিনা – আমেরিকার ঘেরাও এর ভিতর থেকে আমাকে উদ্ধারে কিছু করতে পারেন কিনা” – ধরণের কিছু।
    এমনকি গত সপ্তাহে বাংলাদেশের হোস্ট করা (১২-১৩ মে) ভারত মহাসাগর কনফারেন্স নামে যেটা হল সেটাও ছিল আরেক রাজভেট – ভারতকে দেয়া আমাদের উপহার। সেটা আবার কী? এছাড়া এই সম্মেলনের তাতপর্যই বা কী?

    সেটা বুঝাতে একটু পিছন থেকে বলি। আগেও  অনেকবার বলেছি যে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের একালের সকল প্রতিযোগিতার  ফোকাস-ভুখন্ড হবে (আসলে হয়ে গেছে) এশিয়া; আর যা  নুন্যতম আগামি তিনদশকের জন্য। অর্থাৎ একথাটাই আবার ভুখন্ডের দিক থেকে না বলে এর বদলে, মহাসাগর এর দিক থেকে বললে তা হল, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে সমুদ্র-অঞ্চল হল এর ফোকাস এরিয়া ।  আমেরিকা নিজের সেই সমুদ্র-কেন্দ্রিক ততপরতার ফোকাস করেছে  – সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ যেটা – সাউথ চায়না সি বলে ইতোমধ্যেই পরিচিত; তাকে কেন্দ্র করে তবে তা, অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়ে হৈ চৈ করে শুরু করে দিয়েছে।  চীনও কমবেশি তা করেছে তবে প্রোফাইল লো রেখে এবং সেও অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়েই সেটা শুরু করেছে। যেমন, আমাদের কক্সবাজর কেন্দ্রিক চীনের উপস্থিতি ও সব ততপরতা হল সেগুলোই।

    কিন্তু ‘পরাশক্তি’ নামের ভাঁড় ভারত, তার খায়েসের কী হবে? তারও একটা কিছু দেখানো যে লাগবেই! যাতে মনে হয় নকল হলেও সেও একটা পরাশক্তি! তাই এ যেন -পোলাও মনে করে গরীবের চালভাজা- খাওয়ার সুখ! আর সেটাই হাসিনার কান্ধে চড়ে এবারের ভারত মহাসাগর কনফারেন্স এর হোস্ট ভারত করে নিয়েছে বাংলাদেশকে। এটা করে, ভারত দেখাতে চাইলো সেও কম যায় না। এদিকে,  কূটনৈতিক রেওয়াজ হল কোন কনফারেন্সের গুরুত্বের মাত্রা বুঝার একটা তরিকা হল তাতে আগত বিভিন্ন দেশের কারা প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছে তা দিয়ে। মানে এরই একটা মাপকাঠি মানা হয় হল  – রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন সেখানে এসেছেন। তাতে ভারতকে দেখা গেল তবু একজন রাষ্ট্রপতিকে আনতে পেরেছেন। কিন্তু কে তিনি? তিনি হচ্ছেন মরিশাসের রাষ্ট্রপতি! মহাদেশ-হিসাবে যা আফ্রিকায়; মানে আফ্রিকার পাদদেশে যে মাদাগাস্কার দ্বীপ আছে তারও আরও পুবে খুবই  ছোট্ট একদ্বীপ। মোট জনসংখ্যা যার মাত্র ১২ লাখ, মানে আমাদের মাঝারি মানের একটা উপজেলার জনসংখ্যা যেমন। আর মরিশাসের ৬৭% জনসংখ্যা আবার ভারতীয় অরিজিন। কেন এমন? কারণ,  যাদেরকে সস্তা শ্রমিক হিশাবে বৃটিশ কলোনিদখলদারেরা সেকালের বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে মাইগ্রেট করে নিয়ে গেছিল, তারাই। যেমন অনেকেই লক্ষ্য করেছেন বাংলাদেশে এসে এই মরিশাস প্রেসিডেন্ট – নাম পৃথ্বীরাজসিং রূপম – তিনি  সস্ত্রীক আমাদের ঢাকেশ্বরী মন্দির দর্শন করতে গেছিলেন। সারকথায়, এজন্য এটা এক ভারত-নির্ভরশীল দ্বীপ-রাষ্ট্র। এই হল সেই একমাত্র প্রেসিডেন্টের নমুনা! দাবি করা হয়েছে পঁচিশটা দেশের প্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিল যার প্রায় সবই ভারতের আমন্ত্রণে বা ভারতের কূটনৈতিক জোরে।  আর বাংলাদেশ কেবল হোস্ট মাত্র যার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে সদ-ব্যবহার করে দেখাতে পারে সে বাংলাদেশে অনেক প্রভাবশালী! ভারতের ‘এরিয়া অফ ইনফ্লুয়েন্সেই’,  “আমার তালুকেই”যেন বাংলাদেশ অবস্থিত!

    বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেলঃ
    কিন্তু এসব করার বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেল? হা; সেকথাটাই যেন আমাদেরকে জানাতে মোদি সরকার সুবীর ভৌমিকের আর্টিকেল্টা প্রকাশিত কররার ব্ছেযবস্থা করেছে। যেমন শিরোনাম থেকেই শুরু হয়েছে এটা বলে যে “বাংলাদেশ সরকার (অ্যামেরিকান) “চাপের” তাপ বুঝতেছে আর তাতে দিল্লিও কোণার চিপায় পড়ে গিয়েছে”। কিন্তু এতে তো ভারতকেও বিপদে পড়া দেখানো হয়ে গেল, তা কেন? কারণ এখন ভারতের খাই-দাই শেষ; মানে আমাদের সরকার ভারতের জন্য যা যোগাড় করে দিয়েছিল! ফলে এখন ভারতও নিজেকে অসহায় কোণার চিপায় পড়া দেখালেই তো দায়িত্ব শেষ – যেন বলতে চাচ্ছে, “অনেক চেষ্টা করলাম, আর পারি নাই ভাই!”  এমন বলে হলেও তো খালাস পেতে হবে!!!

    সাথে আবার সুবীরের আরও অজুহাতও আছে। এমনকি এতে খোদ ভারতই বিপদে আছে বলে সে আড়াল নিতেও চেয়েছে। একাজে, ভারতকে অসহায় দেখানোটাও জরুরি মনে করেছেন সুবীর! যেমন সাব-হেডিং দিয়েছেন, “খোদ ভারতই এক শক্ত-ঠেলার মধ্যে” [India in a tight spot] পড়েছে। এরপর বলছেন, এবারের পরিস্থতিতে দুইটা জিনিষ নাকি ভারতের বিপক্ষে, নাহলে ভারত হাসিনার জন্য কতকিছু করে দেখায় দিত!
    সে দুটা অসুবিধা কী? সুবীর বলছেন এক হল, জাতিসংঘে ভারতের হাতে চীনের মত ভেটোক্ষমতা নাই যে যেকোন অ্যামেরিকান প্রস্তাবে বিরুদ্ধে সে ভেটো মেরে দিতে পারত। আচ্ছা সুবীর সাব, আমেরিকা কী হাসিনার বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কোন প্রস্তাব এনে হাসিনাকে চাপে রেখেছে? তা তো বাস্তবতা নয়! তাহলে এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা কেন বলেন? বাস্তবতা হল,  আমেরিকা  নিজ-রাষ্ট্র-ক্ষমতাবলেই নানান স্যাংশন দিয়ে রেখেছে? শুধু তাই না। এখনও জাতিসংঘের যেকোন ফোরামে অ্যামেরিকান প্রভাব সবার চেয়ে বেশি। এই প্রভাবের অর্থ হল অন্যান্য ভেটো হোল্ডার সদস্যদের (চীন বা রাশিয়ার) এতে তেমন কিছুই করার নাই।  আজ জাতিসংঘ গঠন প্রায় আশি বছর হয়ে গেল তবুও গ্লোবাল নেতা আমেরিকা ঢলে পড়ার যুগে  আজ প্রবেশ করলেও  আমেরিয়ান প্রভাব এখনও একক; আমেরিকা চাইলেই কেবল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট [OHCHR] এজেন্সি সংগঠনে যেকোন প্রস্তাব সহজে নড়েচড়ে উঠতে পারে।  ফলে ভারতের অযোগ্যতা, অসহায়ত্ব তো নতুন নয়। এমনকি আজ ভারত ভেটো ক্ষমতা পেলেও তাতে কিছুই হবে না। কারণ, এখনই আমেরিকা ছাড়াও আরও চার ভেটোক্ষমতা-ওয়ালা দেশ আছে। যার মধ্যে দুজন হল বৃটিশ ও ফরাসিরা। কই জাতিসংঘে তাদের উদ্যোগে বা চাপ কী হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু আছে??? কাজেই ভারতের আলগা মাতবরি দেখানোর ত এখানের কিছু নাই!!! সোজা কথাটা হল, ভারতের হাতে ভেটোক্ষমতা থাকলেও সেটা হাসিনা সরকারের উপর আমেরিকান চাপের  বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারত না। কাজেই ভারতের আলগা ভাব নিবার কী আছে এখানে???
    সুবীর ভৌমিক দ্বিতীয় আরেক ওজুহাত সুনিয়েছেন হাসিনা-কে। তিনি বলছেন ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা। সেসময় নির্বাচনের আগের ডিসেম্বরে (২০১৩) ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ভারত পাঠিয়েছিল। প্রকাশ্যেই তিনি বলে গেছিলেন, বিএনপি ছাড়াই (কারচুপির) নির্বাচন হবে কোন সমস্যা হবে না কারণ এরশাদ না চাইলেও জাতীয় পার্টিকেই গৃহপালিত বিরোধী দল করে নেয়া হবে – যেটা সুজাতার সঙ্গে এরশাদ মিটিং শেষে বেড়িয়েই মিডিয়ার সামনে সব উদাম করে দিয়েছিলেন এরশাদ। মজাটা হল,  সে ঘটনাটা সুবীর ভৌমিক এখন স্মরণ করছেন আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের বিরাট কৃতিত্ব বলে দাবি করে।
    অথচ ফ্যাক্টস হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা ও এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের ক্ষমতা সবই তখনও এককভাবে সবই আমেরিকার দখলে ছিল। আর আজকের চেয়ে তা আরও ভাল ভাবে। যার কাছে ভারত তুচ্ছাতিতুচ্ছই ছিল। কিন্তু ঐ ভারতকে আমেরিকা এশিয়ায় চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি বরকন্দাজ বানিয়ে রেখেছিল বলে তাতে ভারতের কিছু “ভয়েস অর্থে ক্ষমতা” তৈরি হয়েছিল যা আমেরিকা সদয় হলে ভারতকে সময়ে আমল করত। [মনে রাখতে হবে সেই ক্ষমতাটুকুও এখন ভারতের নাই]  কারণ আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতেই তুলে দিয়েছিল বলেই সুজাতা সিং অ্যামেরিকান ক্ষমতার উপর ভর করেই ওসব মাতব্বরি কথা সেকালে বলে যেতে পেরেছিল।  সুবীরের ধারণা এগুলো কেউ জানে না,  বা তার চাপাবাজি কেউ ধরতে বা বুঝতে পারবে না। পুওর সুবীর!! সুবীর তাই এবার লিখছে সুজাতার এই খেল এসবই নাকি ভানুমতির খেল  আর সেই আসলে ভানুমতি ছিলেন প্রণব মুখার্জি। যিনি এখন মারা গেছেন বলেই নাকি এবার আর হাসিনাকে অ্যামেরিকান চাপ থেকে উদ্ধারে মোদি কিছু করতে পারল না।!!!!
    মিঃ সুবীর, মিথ্যা কথা বলতে গেলেও তো কিছু নিয়ম মানতে হয়, নাকি?? সুবীর সেটাও বুঝে না। অথচ এবারের লেখাতেই সুবীর স্বীকার করে নিয়েছেন যে সুজাতার সেসময়ের ক্ষমতার অপ-ব্যবহারের ও অবৈধ হস্তক্ষেপের ক্ষমতাটাই ছিল আমেরিকারর ক্ষমতাই। সুবীর সেসব কথা স্বীকার করছে এভাবে আর লিখেছে,    its (India’s) strategic alliance with the US to take on China – মানে  চীন ঠেকানোর বরকন্দাজি সুত্রে আমেরিকার সাথে ভারতের যে স্ট্রাটেজিক এলায়্যেন্স ছিল সেটাই সেসময়ের ভারতের সুজাতার ক্ষমতার উৎস। মানে এটা ব্যক্তি প্রণব মুখার্জির কোন ক্যারিসমা বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু তবুও সুবীর এই লেখায় দাবি করেছে [India now also lacks someone like Pranab Mukherjee……… ] – আজ প্রণব বেঁচে থাকলে ভারত আমেরিকাকে দেখায় দিতে পারত, হাসিনার বিরুদ্ধে অ্যামেরিকান চাপ থেকে হাসিনাকে উদ্ধার করে দিতে পারত!
    সুবীর এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নাই। প্রণব মুখার্জির ক্ষমতা সম্পর্কে আরো লিখে দাবি করে বসেছেন যে ….. [প্রণব].who battled it out with the US to ask the military-backed caretaker to stand down.  মানে প্রণব এতই ক্ষমতাবান যে তিনি খোদ আমেরিকার সাথে লড়ে বাংলাদেশের  সেনাবাহিনীকে সরে দাঁড়িয়ে হাসিনাকে ক্ষমতা দিবার ব্যবস্থা করে দিতে আমেরিকাকে বাধ্য করতে পেরেছিলেন।  আর এটাই এখন মোদি সরকার হাসিনার জন্য কিছু করতে পারছেন না; কারণ প্রণব মুখার্জি এই একটাই রত্ন ছিল ভারতের, তিনি তো মরে গেছেন!!

    তার মানে দাড়ালো যে প্রণব মরার পর ভারত আর হাসিনার সরকারের জন্য কিছুই করতে পারবে না। তাহলে তো ভারতের সবকথা এখানেই শেষ হয়ে যাবার কথা, নাকি?
    না, সুবীর মিথ্যা বলতেছেন।  তাই এসব বলার পরেই তিনি এবার ভারতের এখনকার মনের শঙ্কা হাজির করছেন। সেই আশঙ্কা নিচে ছবি আকারে দিয়েছি।  কথাগুলো সুবীরের লেখা থেকে নেয়া। যা বাংলা করলে হয় যে, কী হবে যদি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে এতদিন যাকিছু হাসিনা সরকারকে দিয়ে চুক্তি করে ভারত পেয়ে নিয়েছে তার সবকিছু পুণর্মুল্যায়ন করে খালেদা যদি ওসব চুক্তি বাতিল করে দেন – এই হুমকির কী হবে???

    কিন্তু এই আশঙ্কা কেন? হাসিনা সরকার আর ভারতের মধ্যে কী কোন আন্ডারহ্যান্ড অসম বা আনফেয়ার ডিল করা হয়েছে? সুবীর সেতাই কী পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন না!  এই বাক্যটা লিখে সুবীর ভৌমিক সেই আশঙ্কা তার বাংলাদেশি পাঠকের মনে নিজেই স্বগোক্তিতে প্রবেশ করিয়ে দিলেন!  যখন বাংলাদেশের বিগ মেজরিটি মানুষ বিশেষ করে তরুণদের মনে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” এখন সর্বোচ্চ!  বাংলাদেশে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” ও নেতি লুটেরা ধারণা এর আগে কখনও এমন তুঙ্গে উঠে নাই! এই বাস্তবতায় এটাই কী তাহলে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ ডিলিং এর নতিজা নয় কী?  – প্রণবের এসব শঠতা এটা কী আসলেই ভারতের জন্য খুবই ভাল কিছু হয়েছে? ইতোমধ্যেই যা কিছু প্রকাশিত হয়ে গেছে তা আসলেই ভারতের বিপক্ষে চলে যায় নাই, যাবার কারণ নয়? মানে আমরা যেটাকে – লাভের গুড় পিপড়াতে খেয়ে গেছে অবস্থার কথা বলি ! এটা কী তাই নয়?   সুবীর ভৌমিক সহ ভারতের নীতি নির্ধারকদের জন্য ব্যাপারটা তাদের জন্য রিভিউয়ের খোরাক হতে পারে- যদি সতভাবে চিন্তা করতে পারে তবে এই ভিউ পয়েন্ট তাদেরকে আগ্রহি করতেও পারে!

    কিন্তু এর পরেও ইতোমধ্যে আরো কিছু খারাপ ডেভেলবমেন্ট তৈরি হয়ে গেছে। আগামিতে কী হতে পারে তা নিয়ে সুবীর এক সার্ভে রিপোর্টের বরাতে অনেক কিছুই বলেছেন। আর এর সাথে  সুবীর ভৌমিকের মুখ দিয়ে আরও কিছু ভারতের নয়া খায়েস-ফরমায়েস হাজির হয়ে গেছে। সুবীর  হাসিনা সরকারের কাজে নয়া আরও চাহিদা হাজির করতে দ্বিধা করেন নাই। একাজে সুবীরের  নয়া উপশিরোনাম হল, হাসিনাকে যা করতে হবে [What Hasina needs to do]। মানে হল, ভারত যা করল তাতে হাসিনা এখন শেষ হয়ে যাচ্ছেন; অথচ সেদিকে সুবীরের কোন দৃষ্টি নাই। বরং ভারত এখনও আছে কেবল নিজ সংকীর্ণস্বার্থ নিয়ে। তাই বলতে চেয়েছেন,  নিজ স্বার্থ ভুলে হাসিনা সরকারকে এখনও এরপরেও যা করতে হবে তার  এক তালিকা দিয়েছেন সুবীর।

    এটা বেশ ইন্টারেস্টিং যে সুবিরের বরাতে আমরা জানছি যে ভারতের অবস্থান হল, বটম লাইনটা হল, “হাসিনাকে চীনের সংস্পর্শ ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু এর সাথে যেটা বলা নাই তা হল, কেন হাসিনাকে তা করতে হবে? হাসিনার স্বার্থ বা লাভ কী এতে? এর কোন হদিস রাখেন নাই। যেন এটা ভারতের একক স্বার্থের নির্দেশ!!! ভারতের প্রেজেন্টেশন এমন সবসময় সবকিছুতে ভীষণ স্বার্থপর ও সংকীর্ণ – যেখানে সেটা হল ও মডেলটা হল কলোনিদখলদারের মডেল। যেটাপ্রথম কপি ও চালু করেছিলেন জওয়াহরলাল নেহেরু, আর তা এখনও চর্চায় ভারতের প্রধান ধারা। ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক এবং করুণার… কেন?

    কারণ, সুবীর এক আজিব ও অবিশ্বাস্য কথা বলেছেন, যেন ভুতের মুখে রামনামঃ

    Delhi wants to see the Awami League return to power but through a fair election
    that can shut up the Western nitpickers and prevent Bangladesh’s slide
    into a one-party rule that will augment Chinese influence.

    সোজা ভাষায় বলছেন,  ভারত দেখতে চায় হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরুক কিন্তু একটা ফেয়ার নির্বাচনের মাধ্যমে। যদিও এই ফেয়ার নির্বাচনের মানে কী  সেটা সুবীর পরিস্কেকার করেন নাই। আবার গত কোন নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে কিনা সেটা নিয়ে ভারত কখনও কিছুই বলতে চায় নাই, পাশ কাটিয়ে গেছে, তাই এনিয়ে ভারতের কোন উদ্বেগ ছিল না। একমাত্র উদ্বেগ ছিল নিজ স্বার্থ হাসিল, তা যেভাবেই হোক। তাহলে আজ  ফেয়ার নির্বাচনের কথা কেন?  আগে (সুজাতা সিংয়ের কেসের আমলে) ফেয়ার নির্বাচন না করার ফর্মুলা দিয়ে যাওয়া –  মানে সেটা কী তাহলে ভুল হয়েছিল? বলে এখন স্বীকার করছে? যদি তাই হয় তো  ভারত কী এর দায় নিবে?
    ঐ সার্ভে রেজাল্টের বরাতে সুবীর অনেক চেষ্টা করেও হাসিনার দলকে জিতবে বা সে সুযোগ আসবে তা দেখাতে পারে নাই। শুরু করেছিলেন যে হাসিনার লীগ দল 32 to 47 seats পাবে বলে।  পরে নানান শর্তে সেটা  83–117 seats হতে পারে বলেছেন। আর সবশেষে ১৪০ আসনের উপরে আর তুলতে পারেন নাই।  
    কিন্তু তবু, যে ফর্মুলা দিয়েছে এর সোজা মানে, আ লীগের ভিতরে যুদ্ধ শুরু করতে হবে। অপর গ্রুপকে চীনাপন্থি নামে লেভেল লাগিয়ে তাদেরকে দলছাড়া করতে হবে। এমনকি বেচারা মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে ভারতকে স্বামী মেনেও নিজে আজ চীনাপন্থি তকমা পেয়েছেন। ভারত তার উতখাত চায়। এমন মন্ত্রণালয়ের নামও দিয়ে দিয়েছেন সুবীর এরা হল -” home, finance, foreign, information, industry, commerce, and water resources” ইত্যাদি।
    এই ব্যাপারটা বা ভারতের কামনার পার্জিং [purging]; বাংলায় বললে তা দলে বিভক্তি আনতে সুপারিশ করা। অর্থাৎ ভারত এখন লীগকেই চীনাপন্থি নামে লেভেল  আরেক ভাগ করতে চায়। মানে ভারতীয় হস্তক্ষেপ কত গভীরে চলে গেছে এর চিহ্ন।  সম্ভবত এর আরো বড় চিহ্ন হল, কালবেলা পত্রিকায় আরেক প্রপাগান্ডা লেখা; যার শিরোনাম আরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসছে, প্রস্তুত সরকার এই মিথ্যা জল্পনা-কল্পনা ওয়ালা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে।  সেই রিপোটটা আওয়ামি লীগ দলে বিভক্তি আনার আরও বিস্তারিত ভারতীয় উদ্যোগ বলে মনে করছেন অনেকে।  কারণ, আমেরিকার আরও স্যাংশন দেওয়ার আর কোন কারণই নাই। কারণ সেক্ষেত্রে স্যাংশন খেয়ে হলেও হাসিনা সরকারের জন্য তো ভালই। আর সেটা এই অর্থে যে এটা হাসিনা সরকার থেকে যেতে পারে, সে সম্ভাবনা বাড়াবে!

    এখন ফিরে আবার সুবীর ভৌমিকের লেখার শিরোনাম টা মনে করা যাক  – নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে।
    হাসিনা সরকার একা নয়, বাংলাদেশ ইস্যুতে সাথে ভারতও চরম বিপদে পড়েছে।  সুবীর সেই দুর্দশার একাউন্টগুলো আমাদের সামনে খুলে ফেলেছেন!

    +++++
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!

    কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!
    গৌতম দাস

    ১৮ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4t2

     

             India: Congress victory strong message against majoritarian politics

     

    দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্য সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১০ মে যার, ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ১৩ মে এবং  এই ফলাফল হয়েছে মোদির জন্য একালের খুবই বিপর্যয়কর এক আঘাত। অনেকটা যেন ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভাগ্যে নেমে এসেছিল এক কঠিন নেতি ফলাফল বিপর্যয় হিশাবে যখন, বিজেপি ঐ নির্বাচনে বিরাট মার্জিনে জিতে আসতেছেই বলে ব্যাপক প্রপাগান্ডা  আওয়াজ তোলার পরে বাস্তব ফলাফল দেখা গিয়েছিল একেবারে উলটা; বিজেপি সেবার তার গত ২০১৯ সালের সফলতাটাই ধরে রাখতে পারে নাই; বরং আরও নিচে নেমে গেছিল। এবার কর্ণাটকের ফলাফল বিজেপির জন্য অনেকটা সেরকম তো বটেই তবে এর চেয়েও বেশি নেতি প্রভাব ফেলেছে। এর বড় কারণ হল প্রথমত, আগামি কেন্দ্রীয় নির্বাচন আসন্ন। মানে হল, আগামি বছর মে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন ততদিনে শেষ হয়ে ফলাফলও প্রকাশিত হয়ে যাবে।

    এছাড়াও, অন্যান্য বড় ফ্যাক্টরগুলো হলঃ এতদিন গত ২৩ বছরেরও বেশি যে ভারত ছিল এশিয়ায় অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজিক পার্টনারই শুধু না, ভারত ছিল আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর বরকন্দাজ। আর এর বিনিময়ে মানে বরকন্দাজির নামে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার চলতি বছর থেকে বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা অনুসৃত নীতি থেকে সরে এসেছে। যদিও সরকারি আনুষ্ঠানিকভাবে   আমেরিকা বা ভারত দুই সরকারের কোন পক্ষ থেকেই কোন ঘোষণা  দেওয়া হয় নাই কৌশলগত কারণে কিন্তু, দুপক্ষই নিজ নিজ সরকারের পথচলা ও আচার আচরণে এমনকি ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রকাশিত করে ফেলছে যে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। তবুও যেটা অনেকটা একটা বিয়ে ভেঙ্গে গেছে কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স হয় নাই – এর মত। তাই আচার-আচরণ বসবাসে তা প্রতিফলিত হবেই, সেরকম। সেই নয়া  গতি-প্রকৃতি কেমন এনিয়ে ভারতের মনোভাব যেভাবে প্রকাশিত তা নিয়ে একটা লেখা আসবে আগামিতে।

    এতদিন বাইডেন সরকার বিভিন্নদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে   মানবাধিকার লঙ্ঘণের এর অভিযোগ আনা আর স্যাংশন আরোপ – অন্তত এই দুই নীতি নিয়ে সামনে আগিয়েছে। তাসত্বেও এর কোনটাই এতদিন মোদি সরকারের উপর প্রয়োগ করে নাই। ছাড় দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলেছিল। কিন্তু এবার সবকিছুই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর সংসদ সদস্যপদ খারিজ ও সাজা দান ইস্যুতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট(পররাষ্ট্র বিভাগ) এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল জানিয়েছিল তারা সব লক্ষ্য করছে [we r Watching], নোট নিচ্ছে। তাই, আমার আগেরই এক লেখায় কিছু বিস্তারিত বাক্যে লিখেছিলাম। সেই গত লেখায় এখানে, যার সারকথাটা হলঃ
    “যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, মোদির দোস্ত আদানির শেয়ার বাজারে করা কারসাজির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার পরোক্ষ আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ]  যেটাকে প্রত্যক্ষ আহবান বলে দাবি করে মোদির অভিযোগ, আদালতে মোদির কারসাজি করে রাহুলকে শাস্তির রায় ঘোষণা ও প্রভাব বিস্তার; এছাড়া, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে গাথা ও যুক্ত।”
    অর্থাৎ মোদির ভারত থেকে অ্যামেরিকার আলাদা হয়ে যাওয়া রাস্তাটা হল এই যে, বাইডেন এখন দেখতে চান ২০২৪ সালে্র নির্বাচনে মোদি সরকার যেন ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়; আর এর স্বপক্ষে “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে”  আইন বাঁচিয়ে যতটা সহায়তা করা যায় এর সবটা করতে নেমে পড়েছে আমেরিকা। তাই কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির গোহারা হার “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নতুন উতসাহে আগিয়ে যেতে উতসাহিত করবে আর ঠিক ততটাই যেন তা বিজেপি-কে হতাশ ও নিরুতসাহিত করবে! এটাই হল কর্ণাটক নির্বাচনের একতা বড় তাতপর্য, যা একেবারেই ভারতের একটা আঞ্চলিক হিশাবেও যায় না কর্ণাটক এমন এক রাজ্য নির্বাচন মাত্র হওয়া সত্বেও, এর মধ্য দিয়ে এক  গ্লোবাল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দিক ফুটে উঠেছে! এনিয়ে সবচেয়ে বড় করে ভোটের হার-জিত দুপক্ষই পরস্পরকে টিটকারি করেছে টুইটারে।  যেমন তেমনই একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক মোটা ভাই কর্ণাটক নির্বাচনের ফলাফল আসতেই ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে অমিত শাহ প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করেছেন আর সকল প্রার্থীই ভোট ছেয়েছেন মোদির নামে। তাই ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক “মোটা ভাই” পালাচ্ছে। আর গুজরাতি ভাষায় মোটা ভাই মানে বড় ভাই যার মাথায় আবার প্রতীকিভাবে অমিত শাহের মত বিশাল টাক আছে।

    ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটক কোথায়, কেন আর এর গুরুত্বই বা কীঃ
    শুরুতে একবাক্যে কর্ণাটকের এই নির্বাচনের ফলাফল একটু বলে নেই। এই নির্বাচনে মোট আসন ছিল ২২৪ যার মধ্যে এবার কংগ্রেস একাই জিতেছে ১৩৯ আসনে, যেখানে সরকার গঠনের জন্য নুন্যতম প্রয়োজনীয় হল ১১৩ আসন। এখানে গত রাজ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে আর সেবারই প্রথম বিজেপি দল ১০৪ আসন পেয়েছিল যা এককভাবে সরকার  গঠন করার মত যথেষ্ট আসন নয়। কিন্তু এদিয়েই বিজেপি ষড়যন্ত্র এঁটে বাকি আসন সেবার বিরোধীদের থেকে ভাগিয়ে এনে গত পাঁচ বছর রাজ্য সরকার গঠন করতে সক্ষম ও তা চালিয়ে এসেছিল। কারা সেই ভাগিয়ে আনা লোক তা নিয়ে এলেখার শেষে কথা বলব।

    এবার, ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটকের পরিচিতি প্রসঙ্গে। উত্তর-ভারতের আর্য-প্রভাবিত সব রাজ্যগুলোর বিপরীতে ভারতের দক্ষিণের চারটা প্রদেশকে   ‘দ্রাবিড়ীয়ান’ রাজ্য বলা হয়। অনেক সময় এই রাজ্যগুলোকে ‘দাক্ষিণার্ত’ [DECCAN] অঞ্চলও  বলতে দেখা হয়। আসলে ভূ-গঠনশৈলী হিশাবে এই পুরা অঞ্চলটাকেই (সংস্কৃতঘেঁষা বাংলায়) বলে মালভুমি, ইংরাজিতে যা  Plateau বলে পরিচিত। আর গ্রামের সাধারণ বাংলায় যেটা পাহাড়ের উপরের এক ব্যাপক বিস্তীর্ণ সমতলভুমি – এমন ভুখন্ডকে বুঝায়।  যার নাম বাংলা উচ্চারণে লিখলে হবে  ডেকান প্লাটো [DECCAN Plateau]। 

    মিথিওলজি বা প্রচলিত ধারণায়ঃ
    মিথিওলজি [mythology] মানে বলা যায় কিংবদন্তি ধারণা; বহু পুরানা প্রচলিত থাকা ধারণায় যা আছে বা থাকে কিন্তু যার প্রমাণ নিয়ে কেউ আগ্রহ করে না বা মাথা ঘামায় না।  সব এথনলজি [ethnology] বা জাতির ধারণার মধ্যেই এমন নানান মিথ [myth] থাকতে দেখা যায়। সেকথা একটু পরে আসছি।   ভারতের উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে ধর্মীয় ও কালচারাল ঝগড়ার মূল ইস্যুটা প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একারণে যে ভারতের বাইরে থেকে এসে আর্যরা যেখানে প্রথম খুঁটি গেড়ে বসেছিল সেটা সারা ভারত না বরং,  কেবল উত্তর ভারত মাত্র। পরে সেখান থেকে এর আশেপাশের প্রদেশ যেমন মহারাষ্ট্র (মারাঠি) এর উপর অংশ, মধ্যপ্রদেশ আর পুবে বিহার পর্যন্ত সহজেই প্রভাব বিস্তার ও ভাষার দিক থেকে এসব রাজ্যের উপর সংস্কৃত ভাষার প্রভাব-আধিপত্য ছড়াতে পেরেছিল। কিন্তু কখনই দাক্ষিণার্থে প্রবেশ করতে পারে নাই। আর প্রায় একইভাবে ওদিকে পুবে বিহারে – ভোজপুরি ভাষার বিহার পেরিয়ে বাংলায় পুরাটা দখল নিতে পারে নাই আর্যরা।  আর্যরা মহারাষ্ট্র পেরিয়ে আরও দক্ষিণে দাক্ষিণার্থের কোথায় প্রবেশ না করতে পারার মূল কারণ মনে করা হয় এই ডেকান প্লাটো মানে পাহাড়ের উপরের সমতলভুমি, এটাকে তারা সদলে পার হতে পারে নাই।
    এমনকি মিথিওলজিতে [এথনিক মিথের ধারণায়] দেখা যায় আর্যদের দেবতা ও তাদের আবাস স্বর্গের ধারণায় – সেখানে সুরালোক বলতে স্বর্গ বুঝানো হয়ে থাকে অর্থাৎ স্বর্গ মানে সুর বা দেবতা-দের আবাস যেখানে।  আর বিপরীতে যারা দেবতাদেরকেই স্বর্গচ্যুত করতে চায় এরাই হল তাদের চোখে অসুর। যেন দেবতাদের দিক থেকে দেখলে সুর হল তারা নিজেরা; তারা নায়ক সেখানে আর অসুর হল ভিলেন বা বিপরীত।  দুর্গাপুজার মুর্তিতে দেখা যাবে ওটা হল, দুর্গা লড়ছেন এক অসুরের সাথে। আর কেমনে চিনব যে এটা অসুর? দেখা যাবে মহিষের পেট চিড়ে যে বেরিয়ে এসেছে আর দেখতে কুচকুচে কালো – এই হল আর্যদের ভিলেন-বোধ। আর তাতে এটাই মহিষাসুর!
    সারকথায় মিথিক্যাল বর্ণনাগুলোতে সেটা কার দিক থেকে দেখা বর্ণনা – এটাই খুবই নির্ধারক। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই একদল সাঁওতাল ট্রাইব আছে যারা দুর্গাকেই উলটা ভিলেন মনে করে থাকে; আর মেনে বিপরীতে মহিষাসুর এরই পুজা করে থাকে। এনিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক নিউজ এখানে। আবার মহিষাসুর নিয়ে কলকাতার বাঙালির আলাদা ভার্সান এখানে দেখা যেতে পারে।

    দাক্ষিণার্ত – ভারতের এই অঞ্চলটা হল এই উচু পাহাড়-মালভুমি তা আগেই বলেছি; কিন্তু যার আবার দুই দিকেই দুই সাগর। মানে বামে বা পশ্চিমে হল আরব সাগর আর ডানে বা পুবে হল বঙ্গোপসাগর। ভূ-প্রাকৃতিক এসব কারণে এই অঞ্চলের মানুষেরা প্রচন্ড খাঁড়া রোদের মধ্যে বসবাস করতে হয় আর তাতে রোদে পোড়া বলে তাদের গায়ের রঙ খুবই কালো হয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা যত বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকুলে ও মাছধরা পেশায় তারা ততই কালো। কাজেই এই কালো রং-ই হয়েছে আর্যদের চোখে নিচা মানুষ; মানে,  যাদের আর্যরা ঘৃণা ছিটিয়ে নিচা দেখাতে চায় যাদের সেই আম জনগণ – এরাই নাকি  আর্যদের চোখে অসুর! এরা অসুরের জাত! কেউ কেউ তাদের দ্রাবিড়ীয়-ও [DraviDian] বলে থাকে।  তামিলনাড়ূর সবচেয়ে বড় দলের নাম ডিএমকে [DMK -Dravida Munnetra Kazhagam ] যেখানে ডি [D] মানে দ্রাবিড়। [ভারতের নামগুলোর মধ্যে তাই কখনও ইংরাজিতে ‘ডি’ অক্ষর দেখা গেলে এর উচ্চারণ বাংলায় “ড়” করতে হবে]।
    আর একটা কথা বলার সুযোগ নেই। কর্ণাটক এর ভাষার নাম কানাড়া যা দ্রাবিড়ীয় চারটা ভাষার একটা।  কর্ণাটকিরা নিজেদের কন্নড় জাতির লোক মনে করে থাকে, তাই তাদের ভাষার নাম কানাড়া। কর্ণাটকের কন্নড় ভাষা পাশের মানে উপরের সীমান্ত সংলগ্ন মহারাষ্ট্র (মুম্বাই) এর দক্ষিণ সীমান্ত বা পুবে বা ডানপাশে অন্ধ্রপ্রদেশ ও নিচের তামিলনাড়ুতেও কন্নড় ভাষা বলার চল আছে।

    দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্যের কর্ণাটকঃ
    দ্রাবিড় শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঘন কালো চামড়ার মানুষ যাদের দক্ষিণ ভারতে দেখা যায় [a member of an ancient dark-skinned people of southern India.]  । এদিকে ১৯১৬ সাল থেকেই তামিল বা দ্রাবিড়ীয়রা তাদের দলীয় প্রতীক ছিল এক দাড়িপাল্লার ছবি যা হিন্দুধর্মীয়  জাত-বিভাজন ও বৈষম্যের বিপরীতে সাম্যের প্রতীক। আর এদের সাথে ছিল একটা ফ্লাগ – যা ছিল একটা পুরাটাই কালো ফ্লাগ; আর এর কেন্দ্রে কেবল একটা লাল সার্কেল চিহ্ন থাকত। যেখানে এই কালো হল তাদের নিচা করে রাখা মর্যাদার ও নিপীড়নের প্রতীকি বিরুদ্ধতা যার বিরুদ্ধে উঠে দাড়ানোর  প্রতীক হল লালচক্র চিহ্ন।

    The party at its inception retained the flag of the South Indian Liberal Federation, which had a picture of a traditional type of balance signifying the idea of equality.[26] Its central theme was to remove the degraded status imposed on Dravidians. 

    ভারতে দ্রাবিড়ীয়ান বলতে এরা পুরানা হিশাবে চার রাজ্য ছড়িয়ে আছে – কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু আর কেরালা।
    কর্ণাটকঃ কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর (নতুন নাম ব্যাঙ্গালুরু)। আর এই ব্যাঙ্গালোর রাজধানী থেকে ১২০ কিমির ভিতরে পশ্চিম দিকে টিপু সুলতানের মহীসুর বা ইংরাজিতে মাইসোর [Mysore] অবস্থিত। আর মাইসোর শব্দটা আবার অনেকে দাবি করেন যে মহিষাসুর শব্দের নাকি অপভ্রংশ যেখানে এর অর্থ  ‘মহিষের মত তুচ্ছ প্রাণীর গর্ভে জন্মানো অসুর’।
    আর অন্ধ্রপ্রদেশ – এই নয়া রাজ্য গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবার পরে এবং এই অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী করা হয়েছিল বৃটিশ আমলের নিজামের হায়দ্রাবাদকে। এছাড়া মোগল আমল থেকেই বিকশিত লক্ষ্ণৌ এর পরের দ্বিতীয় বড় শহর ছিল হায়দ্রাবাদ – এই সেই হায়দ্রাবাদ। অর্থাৎ পুরানা হায়দ্রাবাদ রাজ-রাজ্যকে এর রাজধানী করে নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠিত হয়েছিল।
    তেলেঙ্গনা  – এটা বাড়তি; মানে হল আগের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের এক অংশ এখন তেলেঙ্গনা হয়েছে। ভেঙ্গে গেলেও  বাকি অন্ধ্রপ্রদেশ এখন আগের নামেই তবে আলাদা রাজ্য।
    তামিলনাড়ু – এই নামেই বুঝা যাচ্ছে এটা দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী তামিল এথনিক জাতি-রাজ্য, আগের নাম মাদ্রাজ।
    আর সর্বদক্ষিণে হল কেরালা রাজ্য। এভাবেই পুরানা হিশাবে ভারতের দক্ষিণী চার রাজ্য (নতুন হিশাবে পাঁচ রাজ্য) মিলিয়ে দাক্ষিণার্ত। সমুদ্র সংযোগের দিক থেকে ভারতের নিচের দিকের বা দক্ষিণী অংশ এটা। যার আবার পশ্চিম দিকে আরব সাগর কিন্তু দক্ষিণ দিকটা তখনও বঙ্গোপসাগর বা এর সর্ব-পশ্চিম প্রান্ত – এভাবে বিভক্ত। আর দক্ষিণের আরব সাগরের সংযোগ দিয়েই আরব দেশ থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে ধর্মপ্রচারকেরা আরবদেশ থেকে ১০০০-১১০০ সালের দিকে প্রধানত এই কেরালা দিয়েই প্রবেশ করেছিল। এভাবে প্রথম ব্যাপক মুসলমান সংযোগ ও ভারতে ইসলামের প্রসার শুরু হয়েছিল।  এমনকি খ্রীশ্চানিটিও বিশেষত পর্তুগীজেরাও এই দাক্ষিণার্ত দিয়েই ভারতে এসেছিল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে।

    মোদির হিন্দুত্ববাদের এযুগে এসেও আর্যদের অসমাপ্ত কাজ করার খায়েসঃ 
    এখন,  একালে মোদির হিন্দুত্ব হিন্দিভাষাভাষি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব-আধিপত্য ছড়িয়ে বসেছে। তাই এক অর্থে হিন্দুত্ববাদ যেন আর্যদেরই নয়া অনুসারি এবং ব্রাক্ষ্মণ-ইজম এর ধারা হয়েই থাকতে চায়। যদিও আবার সাধারণভাবে সব হিন্দুভোট তাকে পেতে ও নিতেই হবে। তাই আর্য-ভাব ও ব্রাক্ষ্মণ-ভাব সে প্রকাশ্যে আনে না; অন্তরে চর্চা করে।  আবার জায়গামত জাত-পাত ভেদের বা উচ্চ-বংশের ঠাকুর এর সুবিধাও পেলে উঠিয়ে নিবে। তাই মোদির হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হল তার মানে – এটা পুরানা আর্য-শ্রেষ্ঠত্ব ধারণারই যেন আর এর একালের রূপ  হল আরএসএস-বিজেপি;  পুরানা আর্য কারবারিদেরই যেন একালের এক নয়া উত্থান!  তাই উত্তর ভারতের দিক থেকে দেখলে কর্ণাটক হচ্ছে দাক্ষিণার্তে প্রবেশের এক প্রবেশদ্বার যেন!
    তবে মোদির বিজেপি-আরএসএস এদের খায়েসস হল আর্যদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা। মানে হল দাক্ষিণার্তকেও হিন্দি বলয়ের অধীনে ও প্রভাব প্রতিপত্যিতে নিয়ে আসা। এজন্য গত ২০১৮ সালের সরকার গঠন করার পর থেকে  বিজেপি-আরএসএস এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করতে থাকে যে তারা দাক্ষিণার্ত প্রায় দখল কর্বে ফেলেছে! যদিও বাস্তবে ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়!

    মোদির বিজেপি-আরএসএসের এমন যত স্বপ্ন বা খায়েসই থাক এনিয়ে দুটা বড় ঘটনার কথা বলব।
    এক হলঃ সরাসরি এন্টি-ব্রাহ্মণ আন্দোলন যা প্রথমে সংগঠিতভাবে শুরু হয়েছিল  ১৯১৬ সালে তামিলনাড়ুতে। পরে ১৯৩৭, ১৯৪০ সহ অনেক বারই।  সেবার জাস্টিস পার্টি নামে দল গঠন করে তা শুরু হয়েছিল। পরবর্তিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতে আবার সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল তামিলনাড়ুতে পেরিয়ার রামস্বামী [ E. V. Ramasamy (Periyar)] নামে নেতার হাতে। সেসময় দ্রাবিড়ীয় সমাজে বিয়ে করতে গেলে যেন ব্রাহ্মণ-কে ডাকতে বা নির্ভরশীল হতে না হয় তাই এই আন্দোলন। তারা স্বাধীন ভারতের তামিল রাজ্য সরকারের হাত দিয়ে সংসদে এক সিভিল ম্যারেজের আইন পাশ করিয়ে নেন। যেহেতু রাজ্য সরকারের আইন ফলে ব্রাহ্মণ ডেকে এনে বিয়ে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা এতে নাই হয়ে যায়।  পরবর্তিকালে রামস্বামীর এই আন্দোলনই ১৬৬৪-৬৫ সালের দিকে [এর আগে ১৯৬৩ সালে নেহরু  Official Languages Act in 1963 চালু করেছিলেন – এর বিরুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ও বাধা হিশাবে উঠে এসেছিল। হিন্দি চাপানোর প্রতিবাদে সারা দাক্ষিণার্তে জুড়ে তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। তামিলনাড়ুতে কিছু মানুষ গায়ে আগুন ধরিয়েও প্রতিবাদ করেছিল। এই আইনে সারা ভারতের সব রাজ্যের স্কুলে হিন্দি ভাষা শিখা বাধ্যতামূলক করা হয়। যা দ্রাবিড়ীয় অঞ্চলে কোথাও গ্রহণযোগ্য হয়  নাই।

    আবার ওদিকে, অনেকে মনে করেন এরপরেই নেহরু মারা যান ১৯৬৪ সালে হার্ট এটাকে। তাই অনেকের ধারণা সেসময়ের দুটা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের শক নেহরু শারীরিক-মানসিক ভাবে অসহ্য হয়ে যায় বলে অনেকে মনে করেন।  সে দুই রাজনৈতিক ঘটনার এক হল, নেহেরুর হিন্দি-ভাষার ভারত-সাম্রাজ্য বা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে ভারত গড়ার খায়েস মার খেয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ এবং আসাম দখলসহ (সাথে লাদাখের অনেক অংশ-ভুখন্ড ও জম্মুকাশ্মীরের বর্তমান আকসাই চীন) এর ঘটনা; যেটা  ২১ নভেম্বর ১৯৬২ তে চীন একমাস একদিন পরে স্বেচ্ছায় সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে গেছিল।
    আর নেহেরুর হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার জোড়জবরদস্তির প্রতিক্রিয়ায়, এতে দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্য আরও বেশি করে এন্টি-হিন্দি রাজ্য হয়ে উঠেছিল এবং এখনও সেই সেন্টিমেন্ট বর্তমান যা সবচেয়ে বেশি তামিলনাড়ুতে। সেখানকার ডিএমকে পার্টি এরপর থেকে তামিলনাড়ুতে প্রধান দল হয়ে উঠে আছে। পরবর্তিতে অবশ্য কেবল ডিএমকে দলটাকে ছেড়ে বেরিয়ে আরেকটা আন্না-ডিএমকে দল হয়েছে। যারা দুই দল অদলবদল করে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসে – অন্য কোন দল নাই। ওদিকে নেহেরুর মৃত্যুর পরের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী কম্প্রোমাইজ হিশাবে হিন্দি-কে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারটা কনষ্টিটিউশনে উহ্য করে রাখেন। যেটা পরবর্তিকালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এক অবজারভেশন-রায়ে ঘোষণা করে যে ভারতে রাষ্ট্র-ভাষা বলতে কিছু নাই, ভাষার বাধ্যবাধকতাও নাই। তবে অফিসিয়াল ভাষা বলে অনেক কিছু আছে যা সব মিলিয়ে এখন ইংরাজি ও হিন্দিসহ মোট ২২টার মত।

    গত ১৯১৮ সালের মানে আগের বারের কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল ঘাটতিতে থাকা নয়্টা আসন কিনে নিয়ে। আর তা জুগিয়েছিল কর্ণাটকের আরেক ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী সামাজিক-ধর্মীয় গোষ্ঠি যাদেরকে লিঙ্গায়েত [Lingayat or  Lingayatism] নামে ডাকা হয়।   যারা লিঙ্গায়েত নিয়ে আর একটু পড়াশুনা করতে চান তারা এখানে লেখাটা পড়তে পারেন।  এরা বলাই বাহুল্য হিন্দুত্ববাদের বিরোধী।  এছাড়া  ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব লিঙ্গায়েত রাজ্য-সংসদ সদস্য বিজেপিতে বা কংগ্রেসেই সবাই এমন ছিল না। অর্থাৎ দুদলের মধ্যেই লিঙ্গায়েত সদস্য ছিল। লিঙ্গায়েত-রা কর্ণাটক ভোটারদের মধ্যে ১৭% জনগোষ্ঠি। তা হলেও তারা দুই দলের মধ্ইযে নির্বাচিত সদস্য হয়ে ছিল। কিন্তু মোদি সেবার লিঙ্গায়েতদের জজবা তুলে তাদের সব রাজ্য-সংসদ সদস্যকে দলছুট করে নিজ দলে ভিড়ান। এভাবেই তার নয় আসনের খামতি তিনি পূরণ করে সেবার সরকার গঠনে সফল হয়েছিল।  কিন্তু এবার নির্বাচনের আগে লিঙ্গায়েত হবু রাজ্য-সংসদ সদস্যদের কংগ্রেসে যোগ দিবার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু পরে ফলাফল প্রকাশের পরে একটা রিপোর্ট এমন ফলাফলের ব্যাখ্যা করে বলেছে যে এতে কংগ্রেসের পক্ষ্যে সব লিঙ্গায়েত সদস্যের আসন যায় নাই সত্য। তবুও তা এমন হয় নাই যে কংগ্রেস এতে তেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ শেষ বিচারে ভোট ব্যালেন্স হয়ে গেছে।

    ওদিকে ভোটারদের আরেক বড় চাঙ্ক হল মুসলিম ভোট। কর্ণাটকে মুসলমান ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটারের ১২% এর মত।  আর এতে মোদির সেই পুরানা কৌশল -ইসলামোফোবিয়া আর ঘৃণা ছড়ানী চালু করেছিল। আপনাদের অনেকেরই গত ২০২২ ফেব্রুয়ারিতে মুসকান নামের এক কলেজ তরুণীর সাহসী প্রতিবাদের ভিডিওদেখেছেন; এখানে টুইটারে দেখেন, মনে আছে নিশ্চয়। হা সেটাই ছিল মোদির নোংরা পুরানা কৌশল যে তরুণদের মাঝে হিজাব তর্ক তুললে তাতে ইসলাম-ঘৃণা জোরদার হবে আর হিন্দু-ভোটারদের মুসলমান-বিদ্বেষী করতে পারলে তাতে বেশির ভাগ হিন্দুভোট বিজেপির পক্ষে আসবে – এই ছিল মোদির অনুমান। কিন্তু ভাগ্যের ফের মুসলমান-বিদ্বেষী জজবা তেমন করে কর্ণাটকে উঠে নাই।  মোদি মুসলমান ঘৃণা এতই তুঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন যে তার ২২৪ আসলে প্রার্থীদের মধ্যে একটা আসনেও মুসলমান প্রার্থীকেই রাখেন নাই।  তাই ফলাফল দেখে এখন মনে করা হচ্ছে মুসলমানেরা হিজাব মামলায় আদালতে তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হলেও নির্বাচনের আগে তারা সংগঠিত হয়ে কংগ্রেসের পক্ষে একযোগে ভোট দিতে পেরেছেন।

    এব্যাপারে এটা মনে করা অমুলক হবে না যে  এক্ষেত্রে আমেরিকার সমর্থন মানে মোদিবিরোধী  “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নৈতিক সমর্থন দিয়ে যতটা সম্ভব সহায়তা দেয়া – এটা যথেষ্ট কাজ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিরোধীদলের সবাইকে আস্থা দিয়েছে যে তারা চাইলে মোদির বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে পারে, মোদিকে হারাতেও পারে।  আসলে বিরোধী জোটের পক্ষে অ্যামেরিকান সংসর্গ সম্পর্কে আগেই বলেছি এটা সাবধানী ও পরোক্ষ পদক্ষেপ হলেও গ্লোবাল মহলে মোদি সরকারের আভ্যন্তরীণ পরিচালনায় কতটা সে স্বৈরাচারী আর মূলত মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা প্রচারক – মোদির এই পরিচয়কে বাইরের দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা এক বড় সহায়ক।
    যদিও ভারতের রাজনীতি এপর্যন্ত ভিতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কখনই বিরোধীদলকে বাইরে নিতে দেয়া হয় নাই। এটা সম্ভব হয়ে এসেছে কারণ বেশির ভাগ দ্বন্দ্ব পাকিস্তান বা কাশ্মীর-কেন্দ্রিক। অথবা কখনও পাঞ্জাব বা আসামের মত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমস্যাকে দেশের স্বার্থ বলে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করা হয়ে এসেছে।  এছাড়া জন্ম থেকেই ভারত এত উগ্র জাতিবাদ (যা মূলত হিন্দু-জাতিবাদ) দিয়ে শাসিত- পরিচালিত হয়ে এসেছে যে এটা মূলত শেষবিচারে এক “এন্টি-পাকিস্তানি জাতি” ধারণা; তাই এটা সহজেই এক উগ্র-হিন্দুজাতিবাদ ধারণা হতে পেরেছে। [অনেকে অবশ্য  পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর উল্টাটাও বলবেন।]
    ভারতে কখনই  রাজনৈতিক অধিকারের ইস্যুকে অথবা জনগণের নাগরিক অধিকারের অথবা বাক ও ব্যক্তির অধিকারের ইস্যুকে  যেকোন রাষ্ট্রের গঠনে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখতে দেয়া হয় নাই। এবং সবচেয়ে বড়কথা রাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে সেই রাজনীতিক চিন্তার অভ্যাস বা চর্চাই হতে দেয়া হয় নাই। প্রতিটা উগ্র-জাতিবাদী জাতিরাষ্ট্রে এমনটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক; আর বিপরীতে শাসকের প্রথম পছন্দও [নেহেরু সহ সকল ভারতীয় শাসক] তাই একটাই –উগ্র জাতিরাষ্ট্র– যেখানে জাতিবাদ, দেশপ্রেম, দেশ মাতৃকা ইত্যাদি এসব শব্দের আবেগ-সুরসুরি তৈরি করে জনগণকে দাবায় রাখাটাই শাসকদের কমন কৌশল হয়ে থাকে।
    তৃতীয় বিশ্বের দেশে এমন হওয়ার পিছনে আরেক দায়ী ফ্যাক্টর হচ্ছে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট। আসলে এদের রাষ্ট্র- সম্পর্কিত অস্পষ্ট ও অপুষ্ট ধারণাই  [শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণাই] এজন্য দায়ী।  যেটা অন্যভাষায় মনে করিয়ে দিলে কমিউনিস্ট চিন্তায় অধিকারের ধারণা নাই শুধু না এটা হারাম – এমন হওয়াটাই সেই দায়ী ফ্যাক্টর। নয়া চলতি শতকের শুরু থেকে আবার সেটা জঙ্গীবাদ দমনের নামে বিরোধী রাজনীতিকের নির্মুলকরণ কর্মসুচি হয়ে দাড়িয়েছে।  যদিও আমেরিকা আজ মোদির চাপে দাবিয়ে রাখা ভারতের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে বের করে  মুক্ত  করে আনার পক্ষে কাজ করছে কিন্তু এই  জঙ্গীবাদ দমনের নামে জনগণের অধিকার ও বিরোধী রাজনীতিকে কোনঠাসা করে রাখার পক্ষে শাসকের এই নয়া চর্চার জন্য খোদ আমেরিকার ওয়ার অন টেরর নীতিও কম দায়ী নয়!  আবার, মোদির ক্যাশিয়ার আদানির শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি ও তাতে ধস নামানোর পিছনে এতে পরিবেশ তৈরি করে দিতে অ্যামেরিকার কিছু সহায়ক ভুমিকা থাকায় এর সুবিধা ভারতের বিরোধী দলেরা পেয়েছে। যেমন আদানির পতনের পরে গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটের উতসাহীদের সাথে নিয়ে আরেক শেঠ শেয়ার ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস, তিনি এক আসরে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে আদানিকে সমালোচনা করে শুইয়ে দেয়া – এটা শেষবিচারে ভারতের বিরোধিদের পক্ষে গিয়েছে।  যদিও ভারতের বিরোধী রাজনীতিকদের  আজকে আমেরিকার এই সমর্থন নেওয়ার কিছু নেগেটিভ এফেক্টও আছে যা কার্যকর হতে পারে। তবুও বর্তমানে সতর্কভাবে অ্যামেরিকান এই সমর্থন নেয়াটা খুবই সঠিক ও হালাল কাজ-ই হবে।

     Temple run: Hard lessons for Rahul Gandhi’s ‘soft Hindutva’

    এর পিছনের মূল কারণ হল ভারতের এক বাস্তবতা। সেটা হল আমেরিকা আজ আছে বলেই “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দল” বলে কোন কিছুই ভারতে সম্ভব হচ্ছে যা এতদিন সম্ভব ছিল না। কংগ্রেস বা রাহুল গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক চিন্তায় বড় খামতি এজন্য দায়ী।
    যেমন ২০১৮ সালে থেকেই মোদী বিরোধী রাজনীতি বিশেষত মোদির হিন্দুত্ববাদ বিরোধীরা কিভাবে মোকাবিলা করবেন – এনিয়ে রাহুল ও কংগ্রেস চরম অযোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল মোদির তখন প্রায় পাঁচবছরের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি ছেয়ে ফেলাতে পেরেছিলেন। আর এতে কংগ্রেস ধরেই নিয়েছিল  যে এরপর থেকে ভারতে বোধহয় আর কংগ্রেস নিজের রাজনীতিও হিন্দুত্ববাদকে আপন ও অনুসরণ করে গড়ে নেয়া দিক এসে গেছে। তাই ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের আগে্র বছর গত কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচনে রাহুল নিজে এক মন্দিরে পুজা দিয়ে কংগ্রেসের সফট হিন্দুত্ববাদ চালু করেছিলেন উপরের ছবি ও লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন কংগ্রেসও হিন্দুত্ববাদের নামে ভোট না চাইলে ভারতের হিন্দুরা তাদেরকে আর ভোট দিবে না! এই মিথ্যা অনুমানের পিছনে ছূটতে যাওয়া কংগ্রেস এটাই ইঙ্গিত করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এটা তো হিন্দু জাতিরাষ্ট্র এর ভারত কায়েমেরই প্রথম রাজনৈতিক দল হয়েই গড়ে উঠেছিল।

    অথচ এর বেকুবিপনার পাল্টা উদাহরণ কিন্তু তখনও রাহুলের সামনে ছিল।
    কলকাতার রাজনীতিতে তৃণমূল সেই ২০১১ সাল থেকে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসছে। আর সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় হল যে তৃণমূলের মমতা কখনই কোন ব্রান্ডের কোন হিন্দুত্ব এর নামে হিন্দুদের কাছে ভোট চাইতে হয় নাই, তবু যথেষ্ট হিন্দুভোট তার দল পেয়েছে।   কোন হিন্দুত্ব বয়ান ছাড়াই তিনি লাগাতর তিন তিনবার হিন্দুদের ভোট পেয়ে রাজ্যে সরকার গড়ে চলেছেন। কোন সমস্যা হয় নাই! কেন? তার মানে একবারও এদিকে রাহুল বা কংগ্রেস একবারও চোখ মেলে তাকায়নি! এটাই কংগ্রেস দলের ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাবার পিছনের অন্যতম মূল কারণ, যেন এটা কংগ্রেসের নিজেই নিজেকে যেন বলা যে এই দলের আয়ূ শেষ!!! আজকে রাহুল “ভারত জোড়ো” [ মুসলমান ঘৃনাবিদ্বেষে জনগণ বিভক্ত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে জনগণের একত্র হওয়া বা জোড়া লাগানো পক্ষে এক প্রচারণা] নামে পদযাত্রা কর্মসুচিতে এসেছে।  এটা তখনই কংগ্রেস শুরু করেছে যখন পিছনে অ্যামেরিকান ফ্যাক্টর উপস্থিত হয়ে কংগ্রেস রাজনীতিকে নয়া সাহস ও দিশা দিয়েছে!  অর্থাৎ মোদি যুগের ভারতে সবাইকেই একমাত্র হিন্দুত্ববাদের নামেই ভোট চাইতে হবে – এই মিথ্যা অনুমান থেকে রাহুল ও কংগ্রেস এখন বের হয়ে এসেছে। যেটা না করে স্ফট হিন্দুত্বের পক্ষে দাড়ানোটা শুধু আত্মঘাতিই তা না; কংগ্রেস দল যে মূলত জন্ম থেকেই হিন্দু-ইজমের [গান্ধীর Hinduism -তাও বলা চলে] দল হিশাবে গড়ে তোলা হয়েছিল এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ!

    সবশেষে একটা কথাঃ যদিও কর্ণাটকের নির্বাচনে মোদিবিরোধীরা বিরাট জয় পেয়েছে এরপরেও খুবই শক্তভাবে পাঠক সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এই নির্বাচনের দুটা কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান যারা আইনীভাবে দায়ীত্বপ্রাপ্ত ছিল এই নির্বাচনকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার – এমন দুই প্রতিষ্ঠান হল সুপ্রীম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন।  যাতে এমনকী সরকার বা সরকারি দলের বিরুদ্ধেও নির্বাচনি আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেন। কিন্তু আগের নির্বাচনেওর মতই এখানে এওদুই প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধি দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অপব্যবহার ও হয়রানি করে যাচ্ছে। এমন প্রতিষ্ঠান গুলো যেমন সিবিআই [CBI – Central Investigation boreau), ইডি ED [Enforcement Directorate, For Economic Law], আয়কর অধিদপ্তর ইত্যাদি এগুলো প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিরোধীদের হয়্রানি করা হচ্ছে যাতে চাপে ফেলে বিরোধীদলের নেতাদেরকে সরকারের সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করা যায়। মোদির চাপের কাছে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান নত হয়েছে, মোদির খাম খেয়ালির অধীনস্ত হয়েছে।
    এরকম দশটা ফ্যাক্টর মোদি বিরোধিদলের বিরুদ্ধে এখনও খাড়া করে রেখেছে। The WIRE পত্রিকা এমন দশটা ফ্যাক্টরের কথা উল্লেখ করে রিপোর্ছেট করেছে যার শিরোনাম Ten Factors to Remember Amidst the Congress’s Win and BJP’s Defeat in Karnataka। পাঠকের উচিত হবে এই দশ বাধার কথাও যেন তারা জেনে রাখে।

    কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচন ভারতের সকল বিরোধিকেই সাহস যোগাক যে তাদের একত্রে উঠে দাঁড়াতেই হবে। যদিও সামনে অনেক পথ আর তাতে অনেক যদি-কিন্তু আছে! আপাতত তাদের জন্য শুভ কামনার বেশি আগানোটা আমার জন্য প্রয়োজনীয় নয়!  তাই শুভ কামনা জানিয়ে শেষ করছি!

    +++++++
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!

    ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!
    গৌতম দাস
    ২০ এপ্রিল ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4mT

    ‘The next few months are a crucial test of our democracy’   ‘The next few months are a crucial test of our democracy’ | Photo Credit: AP

    রাজনৈতিকভাবে গ্লোবাল ইস্যুতে  এশিয়া উত্তাল হয়ে উঠছে।  বিশেষ করে সাউথ-ইস্ট এশিয়া সামনের দুবছরে আরও বড় করে উত্তাল হবে। লঙ্খণগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে।   ঘটনার মূল ফেনোমেনাটা হল অর্থনৈতিকভাবে  রাইজিং চীনের দুনিয়া জুড়ে প্রবল  গ্লোবাল প্রভাবের প্ক্ষেটভুমিতে  ব্যাপারটা উঠতি চীন আর নামতি আমেরিকা এরই উত্থান-পতনের ঘটনাবলী ও প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে । যেটাকে অনেক সময় আমি “গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল” বলে ব্যাখ্যা করেছি। চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা আর তা থেকে জেগে উঠা কোন হবু সংঘাত – এই ঘটল বলে, লাগল বলে ধরণের পরিস্থিতিতে যা গত অন্তত দশবছর ধরে ক্রমশ বাড়ছে বা অস্থির হয়ে উঠছে – এটা হল সেই দৃশ্যপট।

    এর আগে আমরা দেখেছি ওবামা আমলের সেকেন্ড টার্ম (২০১৩-১৬) থেকে এই পালাবদলের ফেনোমেনা সাধারণ চোখে মোটামুটি  দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। তাতে তা বড়জোড় শ্রীলঙ্কা, বা মালদ্বীপ বা নেপালের নির্বাচনে ওসব দেশের দলগুলো একেকটা হয় ভারত বা চীনের সমর্থক হয়ে এমন ‘পালাপদলের’ প্রক্সি খেলে  চলছিল – এতটুকুই দেখা যেত। এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও  তখনকার ভারত মানে? সেকালের ভারত ছিল মূলত এশিয়ায় – এঅঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থের প্রতিনিধি ফলে ভারতের উপস্থিতি যেন এক বরকন্দাজি “যৌথ” উপস্থিতি। আমেরিকা তখন ব্যাপারটাকে আমাদের বুঝাতে এক বয়ান ভাষ্যে বলত – ভারত হল “এশিয়ায় আমেরিকার চীন ঠেকানো এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্ট”। তাই এশিয়ায় ভারতকে আমেরিকার এই চাঙ্গে তোলা!

    কিন্তু এখন এশিয়া উত্তাল হবার কথা যেটা বলছি, তাতে কথিত সেই যৌথ উপস্থিতি জিনিষটাই নাই, উধাও! তা একেবারে বদলে গিয়েছে। এককথায় বললে – যৌথ উপস্থিতি দূরে থাক বরং এশিয়ার ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যেকোন স্ট্রেটেজিক ইস্যুতে আলাদা; যার যার তার তার। তবে এমন আলাদা অবস্থান যত গভীরে ততই আরো বেশি করে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে; তবে ততদুর তা প্রকাশিত করা হয় না; তবে সেটা দুপক্ষেরই নিজ নিজ স্বার্থের আলাদা কারণে।

    যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান একবারেই আমেরিকার চেয়ে আলাদা। ভারত এখন রাশিয়ান তেল রপ্তানির  প্রধান পার্টনার। কিভাবে  নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া সরাসরি তেল রপ্তানি করতে পারে না। তাই ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি করে এরপর, রিফাইন করে পরে আবার বিদেশে বিক্রির সবচেয়ে বড় দেশ। ভারত তার আট-নয়টা রিফাইনারির সবগুলাই এখন কেবল একাজেই ব্যস্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেলের সেকেন্ডারি উতস হিশাবে ভারত ঐ তেল আবার বিভিন্ন পশ্চিমা দেশেই  রপ্তানি করছে।
    কাজেই সরকথাটা হল ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত রাশিয়ার পক্ষে আর বিপরীতে আমেরিকা রাশিয়ার বিপক্ষে তা সবাই জানেন।

    আমেরিকার বার্মায় রেজিম চেঞ্জে আগ্রহঃ
    তবে ভারত আর আমেরিকা  স্ব স্ব স্ট্রাটেজিক স্বার্থে কত দূরদুরান্তে আলাদা এর মোক্ষম উদাহরণ হল আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” [Regime Change] বা সরকার বদলের আগ্রহ – এই ইস্যু। এই ইস্যুতে বরং ভারত-চীন-রাশিয়া এই তিন দেশ যৌথভাবে আমেরিকার বিরোধী অবস্থানে।  ভারতে আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিডিয়া এনালাইসিসে রিক [RIC] বলে একটা শব্দ ব্যবহার শুরু হয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। [আগ্রহীরা এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন।] যেটা আসলে যথাক্রমে রাশিয়া, ভারত ও চীন এই তিনদেশের ইংরাজি নামে  প্রথম অক্ষর  নিয়ে তৈরি।  তবে আবার সাবধান এজন্য যে  এটা আর ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ (১৯৫৩-৯২) নয়। দুনিয়াতে কোথাও আর কোল্ড-ওয়ার এর নীতি ও অভ্যাস নাই। মানে হল, কোল্ড-ওয়ারের কালে কোন দুই দেশ স্ট্রাটেজিক বন্ধু হলে তারা এতে বাকি অন্য সব ইস্যুতে আপনাতেই ‘বন্ধু’ হয়ে যেতই। কিন্তু একালে সব উলটা। একালে দুই রাষ্ট্রের যেকোন শত্রুতা বা বন্ধুত্ব হল মূলত ইস্যু ভিত্তিক। তাই একালে দুইটা রাষ্ট্র এক ইস্যুতে চরম শত্রু হলেও অন্য ইস্যুতে কিছুটা ‘বন্ধু’ থাকতে দেখতে পাওয়া সম্ভব। চীন-ভারত এখনও বিভিন্ন স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ইস্যুতে যথেষ্ট শত্রুতা বজায় রাখে, আর ভারতের মিডিয়া এখনও এন্টি-চায়না টোনে যেকোন কিছু বয়ান করে থাকে। কিন্তু  আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” ইস্যুতে  ভারত-চীন একসাথে আমেরিকা বিরোধিতায় ও অবস্থানে;  আর তা রাশিয়াকে সাথে নিয়ে। আর একথাও সত্য যে এই ইস্যু খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশাল বলেই অন্য অনেক ইস্যুর উপরে  – তা খুবই নির্ধারক। যেমন “বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ” ইস্যু ভারতের কাছে খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশালী ইস্যু বলতে বুঝতে হবে এই ইস্যু ভারতের অন্যান্য ইস্যুতেও যা প্রভাব রাখবেই। যেমন, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে নোঙর করে উপস্থিত থাকুক এটা আমেরিকার বহুদিনের খায়েস। আর ঠিক এর উলটা অবস্থানটাই ভারতের। মরে গেলেও আমেরিকান এই খায়েসে একমত হবে না ভারত।
    ‘বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ’ ইস্যু বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান নৌ-উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। যদিও এর চেয়েও বড় কথা বার্মা আর ভারতের বিস্তির্ণ সীমান্ত আছে যা বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেলে এর ব্যাপক প্রভাব ভারতের উপর পড়তে বাধ্য। শুধু তাই নয়, এঘটনা ভারতের আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট অঞ্চল এর উপরেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। যদিও  এতদিন ভারত ভেবে এসেছে তার আসামসহ নর্থ-ইস্ট অঞ্চল রক্ষার স্বার্থ  এর প্রধান বাধা ও বিরোধি হল নর্থ-ইস্ট সীমান্তেরওপারে চীনের উপস্থিতি বা চীনের তিব্বত সীমান্ত। আর এটাকে বিক্রি করেই ভারত এতদিন বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর আদায়, বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ আর ফেনী-অঞ্চলকে যত রকমভাবে সম্ভব কব্জা করে নেয়া ও রাখা তা করে গিয়েছে। কিন্তু এখন টের পাচ্ছে আমেরিকা ভারতের জন্য প্রকৃতপক্ষে কে ও কী???

    কিন্তু কাকে ঘিরে এশিয়া উত্তাল হচ্ছেঃ
    এলেখায় কথা শুরু করেছিলাম ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলে। কিন্তু কাকে ঘিরে তা হবে? মানে এর কেন্দ্র বা ফোকাস হতে যাচ্ছে কোন ভুগোল? সোজা জবাব হল,  সেই মূল ফোকাস হতে যাচ্ছে সম্ভবত বার্মা। তবে এটা সেখানেই একমাত্র বা ঘনীভুত থাকবে তা না। এর সরাসরি ভৌগলিক কেন্দ্র হবে চীনের তিব্বত-কুনমিং সীমান্তের নীচের অংশ থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট ও সংলগ্ন সব অংশ আর বলাই বাহুল্য বাংলাদেশও; ইত্যাদি সব ভূখন্ডই। তবে এসব কথা ভুগোল হিশাবে বলা, রাজনৈতিক প্রভাব বা বলয়ের দিক থেকে নয়, সেটা আরও বড় ও ব্যাপক।

    তাই  ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলতে এসবের বাইরেও নানান জায়গায় ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থে পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠছে ও উঠবে। যেমন উপরে ভারতের কিছু ভৌগলিক অঞ্চলের কথা বললেও রাজনৈতিক দিক থেকে সারা ভারতের উপরেই ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠতে পারে। আর ভারতে এসব কিছুই ইতোমধ্যে নড়াচড়া করা শুরু করে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। যদিও তা বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে তা বোধহয় আগামি “২০২৪ সালের আসন্ন কেন্দ্রিয় নির্বাচনকে” কেন্দ্র করেই।  আসলে, কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর কাছে  ২০২৪ সালের নির্বাচনে   মোদি ও বিজেপির ভরাডুবি ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে এই আমেরিকান পরিকল্পনা আগাচ্ছে।
    যেমন একটা ঘটনার কথা বলি।
    রাহুলের কংগ্রেসের সাথে মমতার তৃণমূলের সম্পর্ক খুবই খারাপ, বিশেষেত মোদিবিরোধি জোটের নেতা হিশাবে কংগ্রেস অথবা রাহুল গান্ধী কোনটাকে মানতে তৃণমূল রাজী নয় বলে। আবার, কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস  বিজেপিকে শত্রু মনে করে না বরং গোপনে বা প্রকাশ্যে বিজেপির সাথে মমতাবিরোধী এলায়েন্স করে।  একারণে গত ২ মার্চ ২০২৩ মমতা জানিয়ে দেন যে আগামি  “২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিরোধী জোটে যাচ্ছে না তৃণমূল, লড়বে একলাই, জানিয়ে দিলেন মমতা“। কোন জোটে যাবেন না।  কিনতু বেশি না ঐ মাসের তিন সপ্তাহের মাথায় একেবারে বিরোধি জোটের নেতা হিশাবে রাহুলের পক্ষে নিজে টুইট করলেন খোদ মমতাই। তিনি সব “তিক্ততা ভুলে কার্যত রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে … “রাহুলের পক্ষে মমতার টুইট: আমাদের গণতন্ত্র আজ নতুন নীচতায় পৌঁছাল। কেন?
    কারণ, ততদিনে মমতা জেনে গেছেন এই বিরোধি জোট নেতা রাহুল আগের জন নন। এটা সর্বাত্মক! তার মানে আমেরিকা ভারতে মোদির বিরোধিদের একাত্ম করতে পেরেছে এই মাঝের সময়ের মধ্যে।

    এখন এতে কী হতে পারে? সারা ভারতরাষ্ট্র মূলত এতে শেষে এমন এক যুগে প্রবেশ করতে পারে তাতে তা এই প্রথম হিন্দুত্ববাদ-সহ  মোদির বিজেপি-আরএসএস সমূলে উপড়ে পড়তে পারে। পুরানা গান্ধী-নেহরুর সফট বা লুকানো হিন্দুত্ববাদ ( মানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদ) যা একালে (২০১৪) মোদির প্রধানমন্ত্রী হবার আগে ঢলে পড়ে বিলীন হবার যুগে হাজির হবার পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনি বিজয় থেকে মোদির বিজেপি-আরএসএস একে আরো উগ্রভাবে  আর নরমের বদলে উগ্র-হিন্দুত্ব হয়ে হাজির হয়েছিল। তাতে ভারত চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও  চরম মুসলমান নিপীড়নমূলক এক চরম বৈষম্যমূলক  রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল, এবার এই পর্যায়ের একটা অবসান ঘটতে পারে।

     

    ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার সম্পর্কঃ
    কিন্তু ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার কী সম্পর্ক? বিশেষ করে যেখানে গতবার মানে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে তো আমরা তেমন কিছু দেখি নাই!
    হা সেকথা সত্যি; তবে সেবার আর এবার এক নয়; আর তেমন থাকছে না। মানে কী?
    আমাদের দেশেও আজকাল রাজনীতিক দল ক্ষমতায় বা বাইরে যেখানেই থাকুক এরা বলা শুরু করেছে “আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে, করার ক্ষমতা রাখে ইত্যাদি. যেমন এখানে দেখেন,  ….. যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোনও দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে।

    তবে এটা বলতে তামাসার মত শোনাচ্ছে যদিও তবু কথাটা হল – আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে বলতে মনে করা হয় এটা কেবল বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের বেলায় সত্যি। তবে, যেখানে ভারত অবশ্যই একালে আর যেন তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলে বুঝানো যাবে না। কেন?
    কারণ, মোদির প্রপাগান্ডায় ভারতের সারা মিডিয়া এক উগ্র-হিন্দুজাতি-বোধ থেকে সময়য়ে নিজ পত্রিকায় লিখেছে ও বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে ভারত তৃতীয় বিশের দেশ থেকে একলাফে কবে যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে। দ্যা-হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দারও একথা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু মোহভঙ্গের পরে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন।
    মোদির সেই ‘পরাশক্তি ভারতকে’ বাইডেনের আমেরিকা এখন মোদি রেজিম চেঞ্জের জন্য উঠে-পড়ে লেগে গিয়েছে – যদিও পুরা ঘটনাটা দেখে আগামি ২০২৪ সামের মে মাসের ফলাফলে জনগন দেখবে মোদি সেই নির্বাচনেই হেরে গেছে – এমনই মনে হবে হয়ত।
    তাই এশিয়া উত্তাল হচ্ছে বলতে যদি ভারতের দিকে তাকিয়ে বলি তবে, বলতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে আগামি বছর ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এই নির্বাচন শুরু হতে এখন থেকে এক বছরেরও কম সময় আর বাকি আছে বুঝতে হবে। কারণ গতবারের (২০১৯ সালের নির্বাচন) কথা মনে রেখে বললে ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন শুরু হয়ে যাবার কথা। আর আমেরিকা ও রাহুলের নেতৃত্বের বিরোধী দলের টার্গেট হল ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি ( ফলে সাথে তার হিন্দুত্ববাদও) উপড়ে উঠিয়ে ফেলে দেওয়া। আর আমেরিকান টার্গেট হল, এভাবে ভারত থেকে প্রো-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক নীতি-পলিসির এক ভারতকে পাওয়া।

    মোদি-উপড়ানোতে উতসাহিদের বয়ান দাবি করে যে ভারতে ধারাবাহিক একশন শুরু হয়ে গেছে। যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, শেয়ার বাজারে মোদির দোস্ত আদানির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুলের ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ] বলে মোদির অভিযোগ, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে যুক্ত।

    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্টঃ
    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট মানে হল আমাদের ভাষায় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় এর মুখপাত্র ছাড়াও আরেকজন উপ-মুখপাত্র আছেন যার নাম বেদান্ত প্যাটেল। তাকে আগে আমরা খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু তিনি এখন খুব এক্টিভ। ভারতের কেন্দ্রিয় সংসদের স্পিকার কংগ্রেসের রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করে দিয়েছেন।  আর এর অজুহাত হল গুজরাতের এক মেজিষ্টেট কোর্টে দুবছর আগের মামলা যে রাহুল মোদির মানহানি করেছেন, তার তাকে দুবছরের সাজা দিয়েছেন। তবে কোর্ট নিজেই তাকে আগাম জামিন দিয়েছেন উচ্চ আদালতে যাবার জন্য, এর আগে সাজা বলবত স্থগিত রেখেছেন ইত্যাদি। এমনিতেই বহু আইনি ত্রুটিতে ভরা এক সাজা আদেশ আর এছাড়া ঐ আইনেই বলা আছে চলতি সংসদ সদস্যের বেলায় আপিলের আগে এই সাজা বলবত করা যাবে না তবু স্পিকার  রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করেছেন। এরপর ঐ বেদান্ত প্যাটেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন আমেরিকা রাহুলকে নিয়ে আদালতের ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখছেন। ‘Importance of freedom of expression’: US says it’s watching Rahul Gandhi’s case – এই শিরোনাম দেখুন।
    অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে এখানে এসে ভারত আর বাংলাদেশ যেন একাকার – এক তৃতীয় বিশ্বের দেশ নিয়ে আমেরিকান বিবৃতি যেমন হয়ে থাকে।

    হিউম্যান রাইট নিয়ে আমেরিকাঃ
    আমাদের মত দেশে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ কী কাম্য? স্বাগত জানানোর মত? নাকি আমাদের আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপের উসিলা?
    এককথায় বলা যায়, কমিউনিস্টেরা মনে করে এটা হস্তক্ষেপ। কোন দেশ উত্তর কোরিয়া হয়ে গেলেও ভিন্ন কোনদেশের তা একেবারেই আমল করা উচিত না। কারণ, এটা তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়।

    এ সম্পর্কে একটা কথা বলাই যথেষ্ট যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক বলে কোন ধারণা নাই, অনুপস্থিত। অতএব সে অবস্থায় আবার নাগরিক অধিকার বা অধিকার [Citizen’s right] বলে কোন ধারণা সেরখানে থাকার আশা করা অর্থহীন। তবে রাষ্ট্রে শ্রেণী [Class] বলে ধারণার প্রাবল্য আছে। কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে বাসিন্দারা সকলে নাগরিক এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলে সমান নাগরিক অধিকারের নাগরিক। কমিউনিজমের রাষ্ট্র চিন্তায় নাগরিক বলে ধারণাটাই নাই, তাই সমান অসমানের বালাই নাই। তবে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা শ্রেণী ধারণা আছে।  আর তাদের ওই রাষ্ট্র কেবল প্রলেতারিয়েটের পক্ষের রাষ্ট্র, এর পক্ষে সগর্ব ঘোষণা আছে। সুতরাই এখানে সমান নাগরিক, সমান অধিকারের মানুষ বা নাগরিক বলে কিছু নাই। বরং মারাত্মক অসম ক্ষমতার বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা ও অসম শ্রেণী ধারণা আছে।
    অতএব কমিউনিস্টেরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা বলে, আভ্যন্তরীণ ইস্যুর কথা তুলে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকবে বা লুকাবে স্বাভাবিক!

    কিন্তু তাই বলে কী  হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে কথা তুলে আমরা আমেরিকাকে ডেকে আনবো? হস্তক্ষেপের উসিলা করে দিব?
    সেটাও অবশ্যই না।  এককথায় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘণ বা হস্তক্ষেপ না করতে দিয়েও অধিকার দিয়ে কথা বলতে দেয়া সম্ভব ও তা যায়।  এছাড়া মনে রাখতে হবে হিউম্যান রাইট তো জাতিসংঘের ঘোষিত ম্যান্ডেট এবং ইস্যু তাই এনিয়ে জাতিসংঘের ফোরামে তো কথা উঠবেই।  আর এখানেও কোন কথা না তোলার মানে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিতরে  সরকারবিরোধী সবাইকে গুম-খুন অপহরণ বা পিটায়ে মেরে ফেললেও তা নিয়ে বাইরের কাউকে কথা বলতে না দেয়া হবে।
    আসলে মূল তর্কটা অন্যখানে, সেখানে সরাসরি যাওয়া যাক।
    আমেরিকান সরকারি ফরেন পলিসিতে, আমেরিকান সরকার যদি কোন দেশ ও সরকারের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন এর বিরুদ্ধে কথা বললে আমেরিকারর নিজের স্বার্থ আছে বলে না দেখে তবে আমেরিকা সেক্ষেত্রে নিঃশ্চুপ থাকবে। অর্থাৎ ভায়োলেশন হলেই তা নিয়ে আমেরিকা মুখ খুলবে না। যদি তাতে আমেরিকান স্বার্থও না থাকে বা আমেরিকান সরকার না দেখে।

    তাহলে কনক্লুশন কীঃ
    ওয়ান-এলেভেনের হস্তক্ষেপ এর সুবিধা  যাদের পক্ষে গেছিল স্বভাবতই তারা এই হস্তক্ষেপকে ভাল বলবে। অন্যেরা সমালোচক হবে। বর্তমানে বা আগামিতেও এই নিয়মে সব হিসাব মিলবে দেখা যাবে। এর বাইরে আপাতত কোন কমন সুত্র বা সমাধান দেখছি না।

    সবশেষে ভারত প্রসঙ্গে আরেকটা তথ্যা দেই। সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও রাহুলের মা। দলের এক শীর্ষ বা প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি মোদির দুটার্মের প্রায় দশ বছরে রাজনৈতিক অপরাধ ও অন্যায়গুলোর একটা তালিকা করেছেন। অন্যভাবে বলা যায় মোদির নাগরিক অধিকার লঙ্ঘণ-গুলোর এক গ্রহ্নিত তালিকা এটা।  সিরিয়াস ও ভাল তালিকা সন্দেহ নাই। শিরোনাম করেছেন,  “An enforced silence cannot solve India’s problems.” জবরদস্তিতে চুপ করিয়ে দেয়া ভারতের সমস্যার কোন সমাধান নয়।  কিন্তু একটা অসুবিধা হল তিনি এটা কেবল দ্যা হিন্দু পত্রিকাকে দিয়েছেন আর তারা পাঠক এটা পুরাটা পড়তে চাইলে পয়সা চাচ্ছেন। যা খুবই অন্যায়। কংগ্রেসের দিক থেকেও বড় অন্যায়।  তবে অর্ধেকটা বিনা পয়সাতে পড়া যায়।
    একটা ভিন্ন বিকল্প আছে। আরো কয়েকটা পত্রিকা এনিয়ে পর্যালোচনার ছলে প্রায় অনেকটাই ছাপিয়ে দিয়েছে, যাদের একটা হল ইন্ডিয়া টুডে – সেটা এখানে দেখা যেতে পারে।  এমন করে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা এর টা এখানে।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়? (২য় ও শেষ পর্ব)

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?
    (২য় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩  ০০ঃ২২ রবিবার

    https://wp.me/p1sCvy-4lO

     

    প্রথম পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4l1
    দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব এখান থেকে শুরু। continued………

    যেমন মানুষের সম্পর্কগুলো কোন ধরণের?
    মূলকথায় এটা ‘রিলেশনাল’ (relational) মানুষে মানুষের সম্পর্কিয় দিকটা সে লালন করে থাকে। সে কেবল লজিক্যাল সম্পর্ক করে না।  সেটা কেমন?
    দোকানদারের সাথে ক্রেতার সম্পর্ক এটা লজিক্যাল। (যদিও এটা মানুষে মানুষেরই এক সম্পর্ক, তবুও)।  এখানে দোকানদারকে দশ টাকা দিলে দোকানদার ঠিক দশটাকার পণ্যই বিনিময়ে তুলে দেয়।  কিন্তু পিতার সাথে সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অথবা আমাদের যে কারো পিতামাতার সাথে সম্পর্ক এটা রিলেশনাল, মানুষে মানুষের সাথে সম্পর্কিত বোধ করা এক সম্পর্ক। যদি হয় এমন যে কোন পুত্র বা কন্যা  পিতার রাশনাল আকাঙ্খা মানছে না। পড়ালেখা করছে না, ঠিকমত খাওয়া যা নিজ যত্ন নেয়া করছে না, পারিবারিক বা সামাজিক ডিসিপ্লিন অনুসরণ করছে না। এখন ব্যাপারটা রাশন্যালি দেখলে পুত্র-কন্যার পিতার অনুগত হবার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। এজন্য পিতা ক্রমশ চাপসৃষ্টি জন্য শাস্তি দেওয়ার দিকে যেতে পারে। বকাঝকা থেকে খাওয়া পরা বন্ধ চাইকি বাসা থেকে বের করে দেয়া বা খোদ সন্তানই বের হয়ে যাওয়াও ঘটতে পারে। রাশনালি এটাই হবার কথা!
    কিন্তু তা ঘটছে না। কারণ, পিতা ব্যাপারটাকে দেখছে রিলেশনাল জায়গায় বসে। পিতা একই সাথে ভাবছে সন্তান তো তার নিজেরই, যাকে সে প্রচন্ড ভালবাসে। তাই এমন পথে সমাধান করতে গেলে পিতার নিজেরই তা আরো কষ্ট পাবার কারণ হবে সেটা। তাই, এটা কোন সমাধান নয়। তাই পিতা হয়ে গেলেন হেদায়েতি লাইনে। বা পারসুয়েশিভ (persuasive) মানে  তিনি কোন ভাল ফল পাক আর নাই পাক পিতা হয়ে গেল নিয়মিত ‘বুঝানোর’ লাইনে। কন্যার হয়ত এক দুর্বল জায়গা হল ওর নানী অথবা বড় ভাই অথবা এক বড় বোন। তাই তাদেরকে দিয়ে পিতা নিয়মিত বুঝানোর লাইনে গেলেন। এটাকে আমরা হেদায়েতি লাইনও বলতে পারি। হয়ত দেখা গেল ২৫-৩০ বছর বয়সের আশেপাশের কালে কন্যার ভিতর হঠাত পরিবর্তন দেখা গেল। নিজে নিজেই তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল এমন হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা রিলেশনাল; মানে বিয়ন্ড লজিক্যাল – বা যুক্তিবুদ্ধির সম্পর্ক ছাড়িয়ে চলে যাওয়া এক দশা।

    আবার আরেকটা উদাহরণ স্বামী-স্ত্রী নিয়ে। দুজনেই চাকরি করে। কিন্তু স্ত্রী দাবি প্রতিদিন অফিস শেষে বাসায় এসে আমাকেই চা বানাতে হয়। কেন? স্ত্রী বলছে তুমি কিছুই না করে আরামে কেবল আমার দেয়া সেসব সেবা উপভোগ কর! এটা তো সাম্যের সম্পর্ক নয়। তাই তারা সমাধান ঠিক করল যে এরপর গুনে গুনে একেকজন পনেরোদিন করে চা বানাবে। কিন্তু তাতে দেখা গেল স্ত্রীর এক (কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল) বান্ধবী ব্যাপারটা শুনে ব্যাপারটাতে বান্ধবিকে একটা র‍্যাশনাল বোকা বলে সাব্যস্ত করল।  স্ত্রী ব্যাপারটা কীভাবে তা বুঝতে চাইলে তার বান্ধবী বলল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা শুধুই রাশনাল নয়, এটা র‍্যাশনাল এন্ড বিয়ন্ড। এভাবে দেখতে হয়! কিভাবে সেটা?

    বান্ধবি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলল, নিজেদের দম্পতি সম্পর্কের বেলায় সে লক্ষ্য করেছে প্রতিদিনই সে নিজেই চা-নাস্তা সব বানায়। আর সে সময়ে সে যখন উপাচার সাজিয়ে স্বামীর সাথে বসে কথা বলে গল্প করে সেসময়ই তার স্বামী সবচেয়ে উতফুল্ল থাকে, সবচেয়ে কেয়ারিং স্বামী হয়ে উঠে যা স্বামীর প্রতিটা কথায় আচরণে প্রকাশ পেতে থাকে। এটা তাকে ভীষণ সুখ দেয়। এথেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা সে ভাবতেই পারে না! আর এটা তাঁর বেচে থাকার জন্য খুবই প্রশান্তিময় এক উপাদান হয়ে আছে জীবনে।  তাই এই সুখের লোভে কোন বোকা চা-নাস্তা বানানোর কাজ ভাগের কথা তুলবে আর এভাবে ‘সাম্য’ খুজতে যাবে? এখানে সাম্য অবশ্যই রেশনাল কিন্তু তুলনায় অকেজো; কাজেই রিলেশনাল পথ ধরাই উত্তম!! এই হল বান্ধবীর সিদ্ধান্ত!

    তাহলে দাড়ালো যা – সব জানা বুঝাবুঝিই কী কেবল  বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে পাওয়া??? মানুষ কী কেবল লজিক, রিজন বা র‍্যাশনালিটি দিয়েই চিন্তা করে? এর জবাব হবে মানুষ শুধুই কেবল লজিক্যাল বা র‍্যাশন্যাল হয় না। সে একই সাথে রিলেশনাল হয়েও চিন্তা করে থাকে।

    আরেকটা কথা বলে এই প্রসঙ্গটা এখানে শেষ করব তবে সেটা আবার আসবে পরে।
    ১৪৫০-১৫৫০ সাল এসময়টা এজ অব সাইন্স [Age of Science] বা বিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট অর্জনের যুগ মনে করা হয়। যেটা পরবর্তিতেো ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
    আর ঠিক এরপরেই বা পাশাপাশি যে রেনেসাঁ নামে আরেক আন্দোলনের কথা বলেছি তা ইউরোপীয় ইতিহাসে ছড়িয়ে পড়েছিল, ব্যাপক নাড়া দিয়েছিল। সারকথার দিক থেকে বললে এই রেনেসাঁ  ছিল আসলে পরবর্তিতে যাকে এনলাইনটেনমেন্ট বলে বা র‍্যাশনালিটি আবির্ভাবের যুগ বলে এরই প্রাথমিক দিক বা শুরুর রূপ। রেনেসাঁ থেকে  এনলাইনটেনমেন্ট-এ পৌছাতে মোটাদাগে প্রায় চারশ বছর লেগেছিল। তাই রেনেসাঁ বলে ভাল-মন্দে যা শুরু এরই পরিণত রূপ এনলাইটেনমেন্ট। যেখান থেকে আবার মর্ডানিটির ধারণা; রাজনৈতিকভাবে যেখান থেকে মর্ডান স্টেট (আধুনিক রাষ্ট্র) ও ব্যবস্থার ধারণা। তবে এগুলো র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানের যুগ অবশ্যই তবে অচিরেই যা থেকে নেতি অর্থে অতি-বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানবাদিতার তা শুরুও বটে।
    তাহলে বিজ্ঞান ও থিওলজির লড়াইটা কী রূপ নিয়েছিল ও কেন?
    বিজ্ঞান কেন ঐ সময়ে মানে রেনেসাঁ একটু আগে আগে বিকশিত হয়েছিল? এই প্রশ্নটা গুরুত্বপুর্ণ।

    এরিস্টোটলের কথা শুনেছি কমবেশি  আমরা, একটা প্রাথমিক ধারণাও আছে। তাঁর সময়কাল ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২)। মানে পুরাটাই যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা। তিনি দার্শনিক না রাজনীতিবিদ নাকি আবার বিজ্ঞানী বা জোর্তিবিদ এককথায় বলা মুশকিল তাই সেকালে এমন গুণীদের বলা হত বহুবিদ্যাগুণী; (polymath) বলা হত। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ লক্ষ্যনীয় হল, তাহলে তখন বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বা থিওলজিস্ট  এভাবে সবকিছু আলাদ আলাদা মানুষের কাজ হয়ে যায় নাই।  একই লোক একই সাথে বিজ্ঞানী ও  থিওলজিস্ট  হতে পারত। আর তা অবলীলায়!
    কিন্তু পরবর্তিতে রেনেসাঁ আন্দোলনের একটু আগে বা প্রায় সমসাময়িক ঘটনা হয়েছিল বিজ্ঞান বিকাশের শতবর্ষ। কিন্তু এবার  সেই বিজ্ঞান কিন্তু এরিস্টোটল যুগের বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক আলাদা। কারণ সে তখন যে মূলত রাশনালিস্ট, রিজন (reason) তার মন্ত্র বা চিন্তা পদ্ধতি্র।
    তাহলে এবার এই বিজ্ঞান আসলে কী, কোথায় সে আগের চেয়ে আলাদা হয়ে গেল? এতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন!

    সেকথাগুলো  বুঝাবার জন্য সহজ করে বললে, আগে জোতির্বিদ, দার্শনিক বা থিওলজিস্ট একই চিন্তা পদ্ধতি অনুসরণ করতে চলত ও পারত। অর্থাৎ দুনিয়াটা ফিজিক্যাল বা বস্তুগত এবং একই সঙ্গে স্পিরিচুয়াল; মানে ফেনোমেনা আকারে বললে এটা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা এবং একই সাথে তা স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা হিসাবে দেখা হত।  কিন্তু এখনকার মূল আগাম অনুমান (assumption) হল এই ধরে নিয়ে আগানো যে দুনিয়াটা কেবলই সব ফিজিক্যাল ফেনোমেনা।
    অর্থাৎ ইউরোপের রেনেসাঁ বা বিজ্ঞানের যুগের বিজ্ঞানচর্চায় মূল আগাম অনুমান বা সেই ভিত্তি হল সব ফেনোমেনাই কেবল ফিজিক্যাল বা বস্তুগত। কোন স্পিরিচুয়াল দিক নাই। এজন্যই এটা র‍্যাশনাল, রিজন-বেজ বা লজিক্যাল হয়ে উঠেছিল।
    একারণের তাদের মহা আবিস্কার হিউম্যানিজম (Humanism) – এই ধারণাটা স্পিরিচুয়াল ধারণার ছিটেফো্টাকেও এড়িয়ে তা কেবল এক “বস্তুগত মানুষের” ধারণা। মানে এর মধ্যে  মানুষের রিলেশনাল দিকের বুঝাবুঝি অনুপস্থিত। যা এখন এক হিউম্যান কোয়ালিটির কথা তুলে ধরা যা স্পিরিচুয়াল দিক নাই, রিলেশনাল দিক নাই। কানেকটেড বোধ নাই।  এই  হিউম্যানিজম (Humanism) কথার সোজা মানে হল, কথিত মানবতাবাদী। মানে যে ব্যক্তি – মানুষের সব হিউম্যান কোয়ালিটির কথা বুঝে ও মানে। কিন্তু তার চোখে এই মানুষের মধ্যে কোন স্পিরিচুয়ালিটির বোধ ধারণার বালাই নাই।
    সারকথায় এমন এক বৈষয়িক ভোগী মানুষ যার স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা বা আকাঙ্খা নাই। তাই, “রিলেশনাল” নয়, বোধ নাই।  তাই যেমন কেউ যদি বলে, নবী মানবতাবাদী ছিলেন? তাহলে কেমন হবে? এটা কথা হল না, মানে হয় না! কারণ এখানে এমন এক নবীর কথা কল্পনা করা হয়েছে যার মধ্যে স্পিরিচুয়ালিটির ক্ষুধা বা আকাঙ্খা অথবা বোধ ইত্যাদি এসবের কোনটাই নাই। মানে যেটা এক উদ্ভট, এব্সার্ড বা অলীক ধারণা। যার কোন নবী ধারণাই নাই!
    দুনিয়ার বস্ত-অবস্তু ও গ্রহ-নক্ষত্র সহ সকল কিছুর সাথে আমরা মানুষ কানেকটেড, যুক্ত বা সম্পর্কিত। আর এই সম্পর্ক তৈরি করেছে এমনভাবে যেখানে প্রতি দুই সত্বার (being) মাঝখানে আছে আল্লাহ, গড বা ঈশ্বর ধরণের কিছু ধারণা যে আমাদের যেকোন দুই সত্বাকে কানেক্ট বা সম্পর্কযুক্ত করে তুলে,  সম্পর্কিত করে এক বন্ধনের মধ্যে রেখেছে।  যেকোন থিওলজির কমন ভিত্তিমূলক ধারণা এটাই। এভাবে আমরা সবাই “আল্লাহ ধরণের ধারণা” যার মধ্যে দিয়ে সবাই সবকিছুর সাথে কানেকটেড – যেকোন থিওলজির মূলকথা এটাই। তবে  হয়ত কোন কোনটা থিওলজিতে ব্যাখ্যা বেশি স্পষ্ট করে সাজানো, এভাবে ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারে।
    সরাসরি বললে বিজ্ঞান বা রাশনালিটি এই কানেকটেড দিকটা উপেক্ষা করে চলে, আমল করে না। তবে যেমন নিউটনের গতিসুত্র এটার (ফিজিক্যাল ফেনমেনাকে ব্যাখ্যা করার বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি) উপর মানুষের স্পিরিচুয়াল দিকের তেমন প্রভাব নাই। কিন্তু সাবধান। যখনও আমাদের যাকে ব্যাখ্যা করছি তার ভিতর যদি “মানুষ” থাকে তবে  বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি সেখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ মানুষের উপর প্রয়োগ মানেই ধরে নিতে হত ওখানে স্পিরিচুয়াল দিক আছে,  মানুষ কানেকটেড বা সম্পর্কিত বিষয়াবলী আছে। তাই বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি বা লজিক্যাল বা রেশনাল দিক যথেষ্ট নয়। কিন্তু তবু বিজ্ঞানবাদিতা বিশ্বাস করে তারা সর্বগামি তারা হিউম্যান ফেনোমেনা (যা কেবলই ফিজিক্যাল নয়) গুলোকেও ব্যাখ্যা করতে সমর্থ; তাদের চিন্তা পদ্ধতি সমর্থ!! অথচ এই অনুমান ও দাবি অসত্য!!

    আবার পুরানা কথায় একটু ফিরে যাই।
    কথিত “প্রগতিশীলতার” যে মৌলিক বৈশিষ্ট – ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা, এর পক্ষে যে সাফাই বা তাদের মূল আড়াল যার পিছনে দাঁড়ায়ে তারা নিজের ডিফেন্স সাধারণত নিয়ে থাকে বলে বুঝি সেটা হল এই রেনেসাঁ (renaissance) ধারণা; যদিও রেনেসাঁ কী জিনিষ এটা জিজ্ঞাসা করা যায় তবে দেখা যাবে খুবই আবছা কিছু না-বুঝা মুখস্ত কথা তারা বলছে।
    তবে তাদের এক সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে, বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ বলে যে তর্ক তারা তুলে থাকে। ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে সেটা হল – বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দিয়েছে। অথচ ব্যাপারটা কী তাই? আর এতই সিম্পল?মোটেই তা নয়। তাহলে কী?
    প্রথম কথা হল বিজ্ঞান ও থিওলজি (ধর্মতত্ব) এদুইয়ের সাবজেক্ট ম্যাটার বা কথা বলার প্রসঙ্গই এক নয়। এরা একই বিষয় নিয়ে কাজ করে না।

    রেনেসাঁ জিনিসটা কীঃ
    রেনেসাঁ শব্দের প্রাথমিক ধারণা করতে, যদি এর আক্ষরিক বাংলা করি তবে এর অর্থ পুনঃজন্ম (re-birth) । তবে এটা যতটা না জন্ম এর চেয়ে বেশি আবার ফিরে পাওয়া (re-found) এমন অর্থ করলে তা এর আসল অর্থের বেশি কাছাকাছি হবে।
    এটা মূলত এখনকার ইটালির রাজধানী রোম এবং ফ্লোরেন্স শহরে বিকশিত হওয়া এক প্রগাঢ় আবেগ উচ্ছ্বাসের কাল (১৪ শতক থেকে ১৭ শতক জুড়ে মানে ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী। কী নিয়ে? এটা ছিল ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে শিল্পকলার নানা ধরণে এবং রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। তবে এই বয়ানের মধ্যে যেটা বাদ পরে গেল তা হল সাইন্স বা বিজ্ঞানের বিস্তারে মানে শতবর্ষ জুড়ে (১৪৫০-১৫৫০) নানা বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের যুগ। তবে পরে ১৪৯৯ সাল থেকে এই আন্দোলন এবার আর রোম বা ফ্লোরেন্সে আবদ্ধ থাকে নাই; বরং নর্থ ইউরোপ বা ফ্রান্স দিয়ে ঢুকে সারা ইউরোপকে আন্দোলিত করে ফেলেছিল।

    একাদেমিসিয়ানদের মধ্যে বলা হয়ে থাকে, প্রায় চারশ বছরের রেনেসাঁ আন্দোলন ধারাবাহিকতায় বিকশিত হলেও এর বিকাশের তিনটা আলাদা পর্ব বা স্তরে বলে চিহ্নিত করা যায় – শুরুর দিক, চরম বিকাশের দিক আর শেষের দিক এভাবে। বিস্তারে দেখতে দেখুন এখানে। তবে আমরা সেই বিস্তারের দিকে এখান থেকে আর এখন যাব না।

    The Renaissance was a fervent period of European cultural, artistic, political and economic “rebirth” following the Middle Ages.
    Generally described as taking place from the 14th century to the 17th century, the Renaissance promoted the rediscovery of classical philosophy, literature and art.
    Although the evolution of Italian Renaissance art was a continuous process, it is traditionally divided into three major phases: Early, High, and Late Renaissance.

    বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে যে বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দেয় – আমি এমন ধারণ-অনুমানের সমর্থক-খাদক নই। মূল কারণ এরা মূলত মানুষের চিন্তার ইতিহাস বিশেষ করে ‘চিন্তার পদ্ধতি’ সম্পর্কেই বেখবর। তবু তারা কেবল রেনেসাঁ বলতে বুঝেছে বা আগ্রহী যেন এজন্য যে তারা মনে করে রেনেসাঁ পাওয়া মানে ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম কোপানোর একটা অস্ত্র পাওয়া গেছে!

    রেনেসাঁ মানে পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদঃ
    রেনেসাঁ মানে  আগে বলেছি পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদ করতে হবে সবার আগে। তবেই প্রগতিবাদীদের ইসলাম কোপানোর আকাঙ্খা ও গোমড় ফাঁক হবে।  তাই সেকাজে সবার আগে ‘মধ্যযুগ’ (middle age) এই ধারণাটা নিয়ে কথা শুরু করা যাক। মধ্যযুগ বলতে মোটাদাগে ৫০০ থেকে ১৫০০ সাল; মাঝের এই হাজার বছরটাকে কী বুঝানো হয়ে থাকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, এটা প্রাচীন রোমের (ancient Rome) সাথে সংযুক্ত ঘটনা। বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য রোম নিয়ে স্বল্পে কিছু কথা এখানেই যোগ করে রাখি। প্রাচীন রোম বলতে একেবারে শুরুতে এক ছোট নগর রাষ্ট্র যা পরে রোমান রাজার রাজ্য (৭৫৩-৫০৯ খ্রীষ্ট্রপুর্ব) হয়ে যায়। আর পরে তা এক রোমান রিপাবলিকে পরিণত হয়েছিল (৫০৯-২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব)। এভাবে সবশেষে তা পরিণত হয়েছিল এক রোমান সাম্রাজ্যে (২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্ট্রাব্দ বা যিশুর জন্মের পরে)। আর এই ৪৭৬ সালে রোম সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। একালের ইউরোপের বড় অংশ জুড়েই তা এই রোম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।

    কিন্তু পরে ৮০০ সাল থেকে আরেক রোমান সাম্রাজ্য জন্ম নিয়েছিল। যদিও দুই রোমান সাম্রাজের মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই, একই সাম্রাজের পুনঃ-আবির্ভাবও নয়। তাই পরের রোমান সাম্রাজ্যের পুরা নাম ছিল হলি রোমান এম্পায়ার যা বাংলায় বললে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ হয়। তাই মধ্যযুগ বলতে আসলে রোমান সাম্রাজ্যের পতন (৪৭৬ সাল) বুঝা বা ধরা হয়। আর ওদিকে ১৫০০ সাল বলতে আসলে চোদ্দ শতকে রেনেসাঁর জন্মকে বুঝানো হয়। মধ্যযুগ মানে দাঁড়ালো প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের পতন আর রেনেসাঁর জন্ম এদুই এর মাঝের সময়কে। কিন্তু কেন?

    আসলে ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে রেনেসাঁ আন্দোলন শুরু হওয়ার পিছনে্র কারণ হিশাবে বলা হয় এ’শহর দুটা শিল্পকলা সংশ্লিষ্ট চিত্রকর, আর্কিটেক্ট, ভাস্কর্য-শিল্পী ইত্যাদিতে ও তাদের কাজে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ছিল। তারাই এরা টের পেতে শুরু করেছিল যে তখনও রোমের প্রাচীন যেসব শিল্পকলার নিদর্শন তখনও টিকে ছিল সেগুলো তাদের সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অগ্রসর ছিল। অর্থাৎ  সেকালে রেনেসাঁ শুরুর জমানা চোদ্দ শতকের চেয়ে প্রাচীন রোম অনেক অগ্রসর ছিল। তাই তাদের উচিত হবে প্রাচীন রোমের  শিল্পকলার নিদর্শনগুলোকে আবার খুঁজে নিয়ে সেগুলোর অনুসারি হয়ে সেসবের পুনজন্ম ও ব্যবহার ঘটিয়ে নিজের সময়কালকে আপডেট করে নেয়া। ক্রমশ একই জিনিষ দেখা যেতে লাগলে রাজনীতি বা অর্থনীতি বিষয়ক ধারনাগুলোতেও। কিন্তু এমন দেখা যাওয়ার পিছনের কারণ কী???
    এর কারণ হিসাবে অনেকে ধারণা করতে থাকে যে খ্রীষ্টধর্মের বন্ধন-ই এমন পিছিয়ে যাবার কারণ। এর মানে কী? আর  কী দেখে তাদের কেন এমন মনে হল?

    প্রাচীন রোম কী খ্রীশ্চান ধর্ম অনুসারি ছিলঃ
    উত্তর টা হ্যা। কিন্তু সাথে আরেক প্রশ্ন হল, প্রাচীন রোমের মোট সময়কাল মানে এর শুরুটা হল যিশুর জন্মেরও ৭৫৩ বছর আগে বা যেটাকে আমরা  খ্রীষ্টপুর্ব বলি, তখন। সে সময় থেকে শুরু করে এই সাম্রাজ্যের পতন হয়ে যায় যিশুর জন্ম পরবর্তি ৪৭৬ সাল পর্যন্ত। মোট কথা যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা হল রোম সাম্রাজ্যের জন্ম। তাহলে? কবে থেকে সেই রোম ক্যাথোলিক খ্রীশ্চান ধর্মকে গ্রহণ ও অনুসারি হয়েছিল?

    আসলে ৩১৩ খৃষ্টাব্দ বা সাল থেকে সম্রাট কনষ্টানটিন (Constantine) এর আমলে রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট-সহ প্রজারাও খ্রীশ্চান হয়ে যায়। তাই আরো সুনির্দিষ্ট করে মধ্যযুগ বলতে অনেকে বলে থাকেন আসলে ৪৭৬ সালে রোমের পতন থেকে নয় বরং আরও আগে এই ৩১৩ সালে পুরা সাম্রাজ্যের খ্রীশ্চান হবার পর থেকেই – রোমের শিল্পকলা-সহ  জ্ঞানবুদ্ধির সবকিছুতে তারা আগেকার সময় থেকে পিছিয়ে যাওয়ার শুরু মনে করে থাকে। সরাসরি বললে, খ্রীশ্চান হওয়ার কারণেই তাদের এরপরের জীবনে জ্ঞানবুদ্ধি কমতে শুরু করেছিল।  অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ ধর্মবিরোধী এক ধারণা হয়ে উঠার শুরু এখান থেকেই। কিন্তু আসলেই কী তাই?

    কেন এমন প্রশ্ন করছিঃ
    কারণ ৩১৩ সালে এসে রোমের সবাই খ্রীশ্চান হয়ে যাবার আগে কী তাহলে রোমের সমাজ ধর্মহীন ছিল??? রোমের বাসিন্দারা অন্যকোন ধর্মের অনুসারী  ছিল না?  এর জবাব হল ৩১৩ সালের আগে তারা অবশ্যই অন্যধর্মের অনুসারী ছিল। কোন ধর্মহীন ছিল না! কারণ এথেন্স বা গ্রীক সভ্যতার দেবতা বা বহুঈশ্বরবাদী ধারণা-বৈশিষ্টের গ্রীক থিওলজি-ই ছিল রোমের পুর্বপুরুষ-সকল। তাই গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবীই ছিল  ও রোমের বাসিন্দাদের উপাস্য ও অনুসৃত ধর্ম। অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ সাধারণভাবে সব ধর্মের বিরোধী এক ধারণা ছিল না। বরং ছিল ৩১৩ সাল থেকে প্রচরণ শুরু হওয়া ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের বিরোধী। এবং গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবী কেন্দ্রিক ধর্মচর্চার প্রতি সহানুভুতিশীল! একালের কমিউনিস্টদের আকাঙ্খায় যে নাস্তিকতা বা ধর্মহীনতা – তার সাথে রেনেসাঁ আন্দোলনের  গ্রীক ধর্মের প্রতি যে মনোভাব তা কোনভাবেই এক নয়।  এককথায় বললে, অন্তত শিল্পকলার বিচারে  রোমে গ্রীক থিওলজির প্রভাব ও অবদান ৩১৩ সাল থেকে অনুসৃত ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের  প্রভাব ও অবদান নেতিবাচক – তাদের ভাষায় পিছিয়ে থাকা।
    তবে আমাদের জন্য যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল,  ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে শুরু হওয়া রেনেসাঁ আন্দোলনের রেনেসাঁ-বাদীরা তারা ধর্মবিরোধী নয়। একালের কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীরা আকার-ইঙ্গিতে আমাদের যা বুঝিয়ে থাকে, সেটা একেবারেই মিথ্যা। – “ধর্ম মানেই কালো যুগ, অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ” এসব অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন!!
    তবুও যে প্রশ্নটা থেকে যায় যে গ্রীক থিওলজি আর ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের তুলনা – যে তুলনাতে ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের অবদান “পশ্চাদপদতা” সেই অনুমানও কতটা সঠিক? আর সবচেয়ে বড় কথা কেন এমন অনুমানের জন্ম??

    দুনিয়ায় মোটাদাগে দুই বৈশিষ্ঠের থিওলজিঃ 
    এসব প্রশ্নের জবাব খুজতে আমাদেরকে প্রসঙ্গের আরেকটু গভীরে যেতে হবে। দুনিয়াতে যত ধরণের ধর্মচর্চা (থিওলজি) আছে সেগুলো মোটা দুভাগে ভাগ করা যায়। যেমন আসমানি কিতাব বা কিতাবি ধর্ম – এর একটা ধরণ। যেখানে নাজেল হওয়া কিতাবি ধর্ম সেটা, বলে মনে করা হয়। আবার নন-কিতাবি ধর্মও আছে। যেমন ভারতের হিন্দু সভ্যতা থেকে বিজেপি-আরএসএস পর্যন্ত এসে তা হিন্দু-ধর্ম হয়ে উঠা। অথবা আরেক উদাহরণ হল, গ্রীক দেবদেবী ভিত্তিক অনুসৃত গ্রীকদের ধর্মচর্চা। ফলে এটাই গ্রীকদের রোমের আসার পরে তখনও তাদের অনুসৃত ধর্ম ছিল যাকে নন-কিতাবি থিওলজি বলা যায়।
    মোটা দাগে কিতাবি আর নন-কিতাবি ধর্মের বড় ফারাকটা হল, কিতাবি ধারার মধ্যে, স্ব স্ব মূল কিতাব একবারই আসে বা নাজেল হয় আর তাদের নবী-জন্মের পরে তাতে কিছু কালাম যোগ হয় বড়জোর। তুলনায় নন-কিতাবির বেলায় এখানে এক লম্বা সময় ধরে ইভলভিং (evolving) বা ক্রমশ প্রকাশিত এমন ধারায় উদ্ভব বা বিকশিত এভাবে নয়া দেবতা-সহ নয়া বাণী এখানে এসে থাকে। এখানে একাধিক দেব-দেবির ধারণাও দেখা যায়।  অবশ্যই এখানে এদুইয়ের মধ্যে কোনটা ভাল এজাতীয় কথা বলার মানে হয় না। সেটা অন্তত আমার কাজ না। এলেখার উদ্দেশ্যও না।  বরং যে যেটা অনুসরণ করে তার কাছে সেটাই সবচেয়ে ভাল – এমনটাই দেখতে পাওয়া যায়।  তবে আরেক ফারাক-বৈশিষ্ট হল, কিতাবি ধর্ম কম্প্রিহেন্সিভ (comprehensive) হয়ে থাকে। মানে সর্ব-বিষয়ে ব্যাপকভাবে বক্তব্য এড্রেস করা হয়ে থাকে যেন কোন প্রসঙ্গই স্পর্শ করতে বাদ রাখে নাই সাধারণত এমন হয়ে থাকে। এছাড়া কিতাবি ধর্ম যেটা সবচেয়ে পুরানা পরে নাজেল হওয়া সেটা তত বেশি ডিটেল হয়ে থাকতে দেখা যায়।
    এসব বিচারে বলা যায়, প্রাচীন রোম আসলে প্রায় হাজার বছর ধরে নন-কিতাবি গ্রীক দেবতাভিত্তিক ধর্ম অনুসরণ করে চলার পরে, ৩১৩ সাল থেকে কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্মের অনুসারি হয়ে উঠেছিল। আর কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্ম ইনক্লুসিভ ও কম্প্রিহেনসিভ হওয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের (মানে ফিজিক্যাল ফেনোমেনা গুলা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে) চর্চায় অনেক বেশি নয়া বিধিনিষেধ তখন থেকে তাদের মেনে চলতে হয়েছিল।
    এতদুর বলার পরও মৌলিক কথার আরো কিছু অংশ বাকি থেকে গেছে। এখন সেদিকে যাব।

    রেনেসাঁ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এর বিকাশের তিন পর্ব বা স্তরের দিক আছে তা বলেছি। কিন্তু এভাবে সতেরো শতকে (১৬০১-১৭০০) এসে রেনেসাঁ স্তব্দ হয়ে যায় বা থেকে যায়। একাদেমিকভাবে এর সাতটা কারণ বা সাতটা উপাদানের সম্মীলিত প্রভাবের কথা জানা যায়। যেমন পনেরো শতকের দিকে রোমের ভুমি দখলে মেতে উঠেছিল  স্পেন, ফ্রান্স ও জর্মানী। ফলে রোম বা ফ্লোরেন্স অস্থিতিশীল উঠতে শুরু করেছিল। আবার প্রতিযোগিতায় পড়ে যাবার কারণে ফ্লোরেন্স ও রোমে আসা-যাওয়ার নৌবাণিজ্যের রুট বদলে গিয়েছিল । ফলে আয় বিশেষত সমৃদ্ধ ফ্লোরেন্সের সম্পদ-ধারীরা আর আগের মত রেনেসাঁ আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা চালিয়ে যেতে পেরে উঠছিল না। ইত্যাদি কারণগুলো ছাড়াও আরেক নির্ধারক কারণও উঠে এসেছিল। এতদিন রেনেসাঁ আন্দোলন ক্রীশ্চানিটিকে কোনঠাসা করে চলে আসছিল। কিন্তু এই রেনেসাঁই এবার পালটা আক্রমণ ও চাপের মুখে পড়ে যায়। কারণ ততদিনে ততকালীন প্রশাসন নয়া আইনি বাধা তৈরি করতে সমর্থ হয়ে যায়। তাই সেকাজে নয়া আইনের নাম রোমান ইনকুইজেশন (Roman Inquisition) বলে  আইন চালু করেছিল তাদের কাউন্সিল অব ট্রেন্ট (Council of Trent) । সহজ ভাষায়, এই ট্রেন্ট মানে হল রোমান ক্যাথলিক অথরিটি যারা “ধর্ম-অবমাননার” শাস্তি আরোপ করার ক্ষমতাধারী কর্তাগোষ্ঠি। আসলে মূলকথাটা হল, রোমের ক্যাথলিক ক্রিশ্চান চার্চ মূলত প্রটেষ্টেন্ট (Protestent) খ্রীশ্চানিটি ধারার হাতে ক্রমান্বয়ে আগে থেকেই  চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছিল। যার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-কারী হয়ে উঠেছিল প্রটেস্ট্যান্টেরা।  হওয়াতে আর সাথে প্রকারন্তরে রেনেসাঁর অবস্থান প্রটেসটেন্ট দের পক্ষে যাওয়াতে সবমিলিয়ে ক্ষমতাসীন ক্যথলিকেরা “নিজ ধর্মীয় আইন লঙ্ঘন ও নিষিদ্ধ পুস্তক চর্চার বিরুদ্ধে  ও এই অজুহাতে  মৃত্যুদন্ডের শাস্তি চালু করেছিল।

    মিলিত ফলাফলে রেনেসাঁ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে যায় সতেরো শতকেই। আর এখান থেকেই পরের মানে আঠারো শতকে এরই পরিপূরক আরেক আন্দোলন এনলাইটেনমেন্ট (enlightenment) আন্দোলন বিকশিত হয়ে উঠেছিল।  তবে এখানে প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির ধারা সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক।
    এনলাইটেনমেন্ট  নিয়ে কথা  কথা আগানোর আগে রেনেসাঁ নিয়ে গুরুত্বপুর্ণ আরো কিছু কথা আগে শেষ করে নেয়া যাক।
    তবে বিদ্রোহি প্রটেস্টেন্ট খ্রীশ্চান ধারার সাথে রেনেসাঁবাদীদের সখ্যতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। খুবই সংক্ষেপে বললে,  প্রটেস্টেন্ট ধারার উত্থান তাদের মূল নেতা মার্টিন লুথারের হাতে। জর্মানিতে জন্ম লুথারের জীবনকাল (১৪৮৩-১৫৪৬); যার পরিচয় সম্পর্কে বলা হয় তিনি এক জর্মান থিওলজিষ্ট, প্রফেসর, যাজক ও চার্চ সংস্কারক ইত্যাদি।  আসলে তিনি ছিলেন ধর্মতত্বে একাদেমিক গ্রাজুয়েট। গত ১৫০০ সালের পরে রেনেসাঁ যখন নর্থ ইউরোপে হানা দিয়েছে ঘটনাচক্রে শহরের সিনিয়র পাদ্রীদের সাথে বাইবেলের ব্যাখ্যা নিয়ে গভীর ঝগড়ায় লিপ্ত। রেনেসাঁ আন্দোলনের অন্যতম এক ইতিবাচক অবদান হচ্ছে মানুষকে সবকিছু নিজে দেখেশুনে পড়ে বুঝাবুঝি করে নিতে আগ্রহী করে তোলার যুগের সুচনা করেছিল। যেমন এর আগে বাইবেলে কী আছে তা পাদ্রীরাই ব্যাখ্যা করার এক্তিয়ারধারী। এমন হবার পিছনের টেকনিক্যাল কারণ হল শুকানো চামড়ার উপর বাইবেল হাতে লেখা। ফলে তা জনে জনে বিতরণ বা সহজেই পাওয়া যায় এমন বস্তু ছিল না। বলা হয়ে থাকে রেনেসাঁ উদয় পিছনে তিনটা জিনিষ আর আগে আবিস্কৃত হতে হয়েছিল। তাহল গোলাবারুদ, কম্পাস আর প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানা। এর প্রথম দুটা হল বাকি ইউরোপ থেকে নৌপথে ফ্লোরেন্স বা রোম পৌছানো বাস্তব ও সহজেই সম্ভব করে তুলতে ভুমিকা রেখেছিল। এমনিতেই  ফ্লোরেন্স বা রোম থেকে রেনেসাঁ নর্থ ইউরোপ পৌছাতে লেগেছিল প্রায় একশ বছর।  কেবল ছাপাখানা আবিস্কৃত হয়েছিল বলেই এরপরে তা অসংখ্য কপি ছাপা হয়ে  ইউরোপে রেনেসাঁ ছড়িয়ে পড়তে তা সাহায্য করেছিল। বাইবেলও এরপরে জন-নজরে উন্মোচিত হতে সাহায্য করেছিল। যারা বাইবেলের ব্যাখ্যা নিজে কুক্ষিগত করে এতদিন রাখতে পেরেছিল  সেই পাদ্রিগোষ্ঠি  এরাই সেকালের ক্ষমতাসীন এলিট ক্লাসের সহযোগী ছিল। ঝগড়া শুরু হয়েছিল এক আন্ডার কনষ্ট্রাকশনে থাকা চার্চে নোটিশ টাঙানো ছিল যে এই দানবাক্সে অর্থে দিলে সহজেই বেহস্ত মিলব – ধরনের গ্যারান্টি।  লুথার এই বক্তব্য বাইবেল সমর্থিত নয় বলে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আর তা থেকে বড় রাজ-পাদ্রি পর্যন্ত সকলের সালে তার বিতর্ক – শেষে পালিয়ে থাকা, রাজ নীটিশ ইত্যাদি। আর ততই তিনি লুথার প্রতিদিন এসব সরকারি পাদ্রিদের বিরুদ্ধে তাঁর গরীব মানুষের স্বার্থের পক্ষে বাইবেলের ব্যাখ্যা দান। শেষে রাজ-পাদ্রিদের পশ্চাদ-অপসারণ। আর তা থেকেই প্রটেস্টটানিজম (Protestant Reformation) হাজির হয়েছিল। যেখান থেকে প্রটেস্টটানিজম (Protestantism, Reformation of Catholic) বা বলা যায় প্রটেস্টেন্ট নামে নয়া ফ্যাকড়ার খ্রীশ্চানিটির জন্ম। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হল, রেনেসাঁর আগমন প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির আগমন ও উদ্ভবকে সাহায্য করেছিল। ফলে আমাদের এদিকের ইসলাম কোপানি খায়েসের কথিত সেকুলার যারা নাকি  রেনেসাঁ পাঠ করে রায় দিয়ে থাকেন যে রেনেসাঁ ধর্মের প্রয়োজনীয়তা শে করেছে তারা আদৌ কোন রেনেসাঁ পাঠ করেছে কিনা তা সন্দেহজনক!

    কথা শুরু করেছিলাম মধ্যযুগ (medieval period) নিয়ে। এই শব্দটা উচ্চারণ করাই হয় একটা তুচ্ছতাতুচ্ছ অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে যে এটা নাকি ধর্মের যুগ তাই এটা পশ্চাদপদ। যদিও রেনেসাঁর উদ্গাতা প্রভাবশালী সামনের সারির দশজন কর্তার নাম নিলে দেখা যাবে ওর মধ্যে মাত্র একজন মধ্যযুগ-কে অন্ধকার যুগ (Dark Ages) বলে চিহ্নিত করেছেন [Francesco Petrarca (known as Petrarch) was the first person to coin the term ‘Dark Ages’. He was an Italian scholar of the 14th century.] ।

    তা ভাল! কিন্তু বিপরীতে তারা কী কামনা করতেন? সেটা এখন আমরা বিচার করে দেখব আর এভাবেই তাদের ‘অন্ধকারের ধারণা’ বুঝব।

    হিউম্যানিজম (Humanism) এই শব্দটার বাংলা অনেকে করেন। মানবতাবাদ। ইন্টারেস্টিং ঘটনা হল শব্দটাকে খুবই ইতিবাচক শব্দ বলে আমরা মনে করি। এমনকি কেউ কেউ বলে বসেন যে নবীও খুবই মানবতাবাদী ছিলেন।  কিন্তু দুঃখের কথা হল এই “মানবতাবাদ” হল রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট। আর এটা একটা এন্টি-রিলিজিয়াস শব্দ।   দুনিয়াতে যারা হিউম্যানিস্ট গ্রুপ আছে তারা নিজের সম্পর্ক মনে করে তাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হল, তারা হলেন রিজন (reason) যুক্তিবুদ্ধিতে চলা উচ্চমানের ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া তারা যেসব মুল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন যা আল্লাহ-ভগমানের মত কোন অতিপ্রাকৃত (super-natural) ধারণায় আস্থাবিশ্বাস রাখেন না। বরং যা মানুষের প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতালব্ধ ধারনায় কেবল এর উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন। [Humanism is an approach to life based on reason and our common humanity, recognizing that moral values are properly founded on human nature and experience alone.]।
    কথাগুলোকে আরো সরাসরি বললে তাদের ধারণা হল, আল্লাহ-খোদা বলে কিছু নাই। মানুষই সব। এভাবে বলাতে অনেকের মনে হতে পারে এটা আর এমন কি? এটা তো আল্লাহ বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীর মধ্যকার পুরানা বিবাদ বৈ আর কিছু না!  হা আপাত চোখে তা মনে হতে পারে কিন্তু তা নয়।  কেন?

    মানুষ কী কেবল কোন বস্তুগত সত্বা (physical being) মানে ফিজিক্যাল বিয়িং। নাকি এটা একই সাথে এক স্পিরিচুয়াল বিয়িং (spiritual being) -ও; এটাও বটে!  রক্ত-মাংসের মানুষের অসংখ্য বস্তুগত চাহিদা আছে; তাই মানুষ কেবলই এক বস্তুগত সত্বা বা ফিজিক্যাল বিয়িং নয়। তাই এতেই সে শেষ না, মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদাও সাথে আছে।
    হিউম্যানিজম  স্পিরিচুয়াল চাহিদাকে অস্বীকার করে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু এই স্পিরিচুয়াল জিনিষটা কী?
    সারকথায় মূল প্রশ্ন হল আমরা মানুষ কিভাবে দুনিয়াতে অন্যান্য বস্তু, অবস্তু, অন্যান্য প্রাণী- অপ্রাণী বা উদ্ভিদ এমনকি গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি অথবা আরেকটা মানুষ ও অন্যান্য অস্তিত্ব ইত্যাদি সবকিছুর সাথে কানেকটেড বা সংযুক্ত – এই বিষয় নিয়ে যে কথা বলে বা যার সাবজেক্ট ম্যাটার এটাই থিওলজি। কি করে মানুষ বাকি সবকিছু অন্যান্যের সাথে কানেকটেড এটাই  থিওলজি ব্যাখ্যা করে থাকে।  মানুষের কোন বিষয়ে একটা ধারণা যেমন যুগে যুগে বিকশিত হয়ে পরে পোক্ত হয় তেমনই এটাও। যত পরবর্তিকালের থিওলজি ততই আরেকটু স্পষ্ট তার ব্যাখ্যা। তবে ব্যাখ্যা সঠিক কিনা অথবা কোন থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যাটা ভাল এটা এখানকার আলোচনার বিষয় না। বরং বুঝাতে চেয়েছি কানেকশন, কি করে আমরা সম্পর্কিত সেদিকটা বুঝাবার চেষ্টা করছি। আর আমরা কী করে সকলে কানেকটেড এটা জানা-বুঝার যে আকুতি – সম্পর্কিত বোধ করার আকুতি এটাই স্পিরিচুয়াল চাহিদা। আমি দুনিয়াতে কেন, এর দরকার কী অথবা এর অর্থ তাতপর্য কী এগুলোকে জানা এটাই মানুষকে তাড়া করে। এছাড়া মানুষ তার পরিবারের সদস্য অথবা কোন কোন ঘনিষ্ঠজন এদের প্রতি একটা “টান” অনুভব করে কেন?
    মূল কথাটা হল, এই অনুভবগুলো আর মানুষের কেবল ‘ফিজিক্যাল বিয়িং’ ধারণার মধ্যে আটকে থাকতে দেয় না। মানে হল মানুষ কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা ও বাসস্তানের চাহিদা-ধারী নয়, তার স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে।

    এজন্যই আমরা লক্ষ্য করলে দেখল ১৪শতকের রেনেসাঁ থেকে শুরু করে ১৮ শতকের এনলাইটেনমেন্ট এই পুরা সময়কাল জুড়েই কেবল বিজ্ঞানবাদিতা আর সাথে রিজন, লজিক্যাল বা রেশনালিটি ধারণার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা।

    কাজেই রেনেসাঁ অথবা ওর চারশবছরের সফর শেষে এনলাইটমেন্ট পর্যায়ে আসা, এক পড়তে হবে ক্রিটিক্যালি। শুধু সবই ভাল বা সবই খারাপ এমন কোনটার করেও নয়। বিশেষ করে আমাদের এদিকের প্রপাগান্ডা ধারণা –  রেনেসাঁ নাকি এসেছে ধর্মের ইতি টানতে,  এমন ভিত্তিহীন অনুমানও এড়িয়ে চলতে হবে। আসলে মূলত বিজ্ঞান ও রেশনালিটি ধারণাকে এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধতা এর নো গো [No Go] এরিয়া সম্পর্কে জেনে তবেই এটা আমল করতে হবে।

    সমাপ্ত

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com