Category: MODI

  • মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    গৌতম দাস

    ০৪ মে ২০২১, ০০:০৩ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3we

     

    ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল যার মধ্যে আবার দুই রাজ্য হল আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ, যারা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব আর পশ্চিম সীমানাজুড়ে। এর মানে হল গত পুরা মে মাসে আমাদের হিন্দুত্বের প্রবল প্রপাগান্ডার ভেতরে বসবাস করতে হয়েছিল। তবে এই নির্বাচন শেষে গণনা ও সব ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, পাঁচ রাজ্যের একই সাথে ২ মে সকাল থেকে। যা এখন প্রায় সব রাজ্যে রাজ্যের পুর্ণফল প্রকাশিত।
    আর  গতকাল ২মে দুপুর তিনটা নাগাদ পরিস্কার হয়ে যায় যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতাসীন তৃণমুল কংগ্রেস দল মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে এককভাবে দুশ-এর বেশি আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরতেছে।  সর্বশেষ সোমবার রাত সাড়ে সাতটায়, তৃণমূল ২১৩ আর বিজেপি ৭৭ আসন এভাবে আনন্দবাজার ফলাফল দেখাচ্ছে। এদিকে মমতার নিজের নন্দীগ্রাম আসনে তিনি হেরেছেন বলা হচ্ছে। যা তিনি আপাতত মেনে নিয়েছেন তবে আপত্তিসহ এবং তিনি সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত যাবেন সে হুশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে মমতা আজ সন্ধ্যায়  বলছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আগামি বুধবার শপথ নেবেন। রাজ্যের প্রাদেশিক সংসদ মানে বিধানসভায় বিজয়ী সদস্য না হলেও ছয় মাস পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা যায় অস্থায়ীভিত্তিতে। আর যেখানে ঐ ছয়মাসের মধ্যে কোন আসন খালি হলে (মানে  দলের কাউকে পদত্যাগ করিয়ে খালি করে নিয়ে) সেই উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এলেই স্থায়ী ও রেগুলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়।
    ওদিকে ৩মে বিকাল পাঁচটায় খবর ছিল, মমতা সাংবাদিক বক্তৃতায় জানিয়েছেন মোট বিজয়ী আসন হতে যাচ্ছে সম্ভবত ২২১। মানে এমন আসন সংখ্যা বা এর কাছাকাছি দেখতে চাওয়া মমতার অনুমান।

    এই ফলাফলের তাতপর্যঃ
    আমাদের সাধারণ মন্তব্য এককথায় বললে সেটা হবেঃ  সারা ভারত না হোক, এটা হল – অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় এবং আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্বকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাবলিক প্রত্যাখ্যান।  কিন্তু কেন এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেছে, যা হওয়াই স্বাভাবিক। কলকাতার আনন্দবাজার এমনই একটা ভারতীয় বিশ্লেষণ তুলে এনেছে দেখা যাচ্ছে  যা ঠিক তার নিজের নয় তবে সংগৃহীত। নিচে সেটাই এখানে হবহু তুলে  দিচ্ছিঃ
    তৃণমুল দলের “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের [এখন পর্যন্ত যা প্রায় ৪৮%] হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে। বিজেপি যখন রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচার চালাচ্ছে, মমতা তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করে ফেলেছেন বলেই বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তা না হলে এই জয় এবং ভোট শতাংশ তৃণমূলের ঝুলিতে আসা সম্ভব নয় বলেই তাঁদের ধারণা। কারণ, তৃণমূলের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট শতাংশপ্রাপ্তি এ বারই”।

    এখানে বিশ্লেষক বলতে যারা বুথফেরত ভোটারদের সাথে কথা বলে একটা জরিপকাজ সমাপ্ত করে থাকেন আর সেই ফলাফলের বিশ্লেষণ হাজির করেন – এনিয়ে তারা পেশাদার কাজ করেন। উপরে তাদের সারকথা হল, মমতার দল কেবল তার রেগুলার সমর্থক ভোটারদেরই ভোট পান নাই। সেটা ছাপিয়েও তিনি অবশ্যই যারা বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের ভোটার এদের অনেকেরও ভোট পেয়েছেন।  কেন পেলেন আর কেন তারা এমন কথা বলছেন কিসের ভিত্তিতে? কারণ তাদের ভিত্তি হল, এমনটা হয়েছে বলেই মমতার দল  এত ভোট (এখনই এটা প্রায় ৪৮% যা গণনার শেষপর্যন্ত ৫০% এর কাছে যাবে বলে অনুমান ) ও আসন পেয়েছেন।

    অনেকে জানেন শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই  মোট মুসলমান ভোটার প্রায় ২৭-২৮% হয়ে থাকে। আর এর মধ্যের আবার  বড় অংশটাই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে তৃণমুল একাই পেয়ে আসছে। তাহলে  মমতার দলের বাক্সে এখনকার সম্ভাব্য  মোট ৫০% ভোটপ্রাপ্তি হতে যাচ্ছে একথার  মানে হল –  মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের ভোট ছাড়াও প্রায় সব ধর্মের সমান সংখ্যক সমর্থক ভোটারদের ভোটও মমতার দল যোগাড় করতে এবার সক্ষম হয়েছে।  আর এতেই  মমতা ও তার দল হল পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম নির্বিশেষে সেই প্রতীক যারা একটা কমন ধারা, তৃণমুল দলে ভিতর “যাদের ইচ্ছা” সমবেত হয়ে – এমন একটা “মেজরিটি ম্যান্ডেট” তৈরি করেছে। আর মমতা হলেন যে ম্যান্ডেটের বাহক নেতা। তাহলে কী কারণে মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের বাইরের ভোটারদেরও টানতে পারলেন?

    অন্যদিকে আরও প্রশ্ন, তাহলে তৃণমুলের নিজে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঠিক কাদেরকে  প্রত্যাখান করলেন? আর কীইবা এই বিজয়ের তাতপর্য?

    ঠিক অখন্ড ভারত না,  আজকের রাজনৈতিক ইন্ডিয়া, এই রাষ্ট্র ২৮ রাজ্যের সমাহার।  কালচারাল দিক থেকে বললে ভারতের মেজরিটি বা ৮০ ভাগ নাগরিক সনাতন ধর্ম অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু তবুও কোন একক “দেবতার” (মানে সবাই একই দেবতার) অনুসারি-পুজারি তারা নয়। বরং রাজ্য-ভিত্তিতে দেখা যায় তাদের  একেক আঞ্চলের আলাদা ‘প্রধান দেবতার পুজার” প্রচলন আছে। এমনকি সেই দেবতার পুজা উতসবকে ঘিরেই আলাদা আলাদা বার্ষিক প্রধান ধর্মীয় উতসব ঐ রাজ্যে পালিত হয়।  অর্থাৎ কলকাতার মত সব রাজ্যে বা সবার প্রধান উতসব ‘দুর্গাপুজা” নয়। কিন্তু এটার সুবিধা-অসুবিধা কী? এটা নিয়ে কথা বলছি কেন?
    কারণ আর কারোই তেমন কোন অসুবিধা না হলেও,  আরএসএস- বিজেপির এতে বিরাট অসুবিধা। কেন? কারণ এরা  যারা রাজনৈতিক এক “হিন্দুত্ব নির্মাণ” করতে চায়, এজেন্ডা নিয়েছে  এবং “হিন্দুত্বের এক জাতিরাষ্ট্র” খাড়া করা ইমাজিন করে; এই নামে ভারতীয়দের সকলকে বাধতে চায় তাদের এমন ২৭ রকম রাজ্য বা  হিন্দুত্ব হলে চলে না।

    তাদের দরকার একটাই রকমের হিন্দুত্ব, প্রাকটিস। তাই আরএসএস- বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি ও ব্যাখ্যা হল, ভারতের উত্তরের ওপারে (কথিত আছে ইউরোপ বা জার্মান এরিয়ান থেকে আসা ধারা) সেখান থেকে এসেছে সেই এরিয়ান রেস যা ভারতের আর্য প্রজাতি বলে দাবি করে তারা। আর এমন দাবি করলে সুবিধা হল তাতে সবাই একই উৎসের বলে এই অজুহাতে সকলকে এক সুতায় বাধা যায়, সহজেই। যদিও এই ভারতেই আবার মোট তেত্রিশ কোটি দেবতার বয়ানও বিদ্যমান। আর বড় কঠিন বাস্তবতা হল,  আলাদা আলাদা রাজ্যে প্রধান উতসবের ভিন্নতা – এসবই  আরএসএস- বিজেপি র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পক্ষে মানে কোন একক হিন্দুত্ব তৈরির পক্ষে সায় দেয় না।  যেখানে এমনকি কালচারালি ভাষার ভিন্নতায় প্রত্যেক রাজ্য ভিন্ন। সেটা তো বটেই এছাড়া আবার যেমন কালচারাল  গান-নাচের বৈশিষ্ঠে তা  মৌলিকভাবেই আলাদা আলাদা ঘরানার। একেবারে বাদ্যযন্ত্রগুলোই আলাদা, রাগ আলাদা স্ব স্ব বৈশিষ্ঠের মহিমায় মহিমান্বিত। যা স্বভাবতই  কোন রাজ্য পরশি কারও তারা অস্বীকার বা অভারল্যাপ হওয়া বা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সেনসেটিভ।  এককথায় তারা আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ঠে ভরপুর এবং সেদিক থেকেই আলাদা। আর তাতে অন্তত কম করে হলেও মূল তিনটা ভাগে যা ভাগ করা যায়।

    কিন্তু  অন্যদের উপরে উত্তরভারত কেন্দ্রিক আর্য চিন্তাচর্চার জীবন ধারার প্রভাব  প্রাচীনকালে অখন্ড ভারতের আমল থেকে এই উত্তরের  অগ্রযাত্রা ছেয়ে বসলেও ভারতেরই   দুঅঞ্চলে বা জায়গায় প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। যে প্রতিরোধ সে আর পাড় হতে পারে নাই। এক হল দাক্ষিণার্তে [Decan] “দ্রাবিড়ীয়” [Dravidian] প্রতিরোধ আর এদিকে তাদেরই আরেক ধারার মারাঠা-বিহার পেরিয়ে আরো পুবে “বাংলার” প্রবেশমুখে প্রতিরোধ। এি প্রতিরোধ টিকে যাওয়া তাদের আগে থেকে চলে আসা  ভিন্নতার রূপবৈশিষ্ঠের ছাপটাই তাই প্রবল্ভাবে এখনও গান-নাচের ক্লাসিকাল চর্চাতেও স্পষ্ট। ভাষা তো আছেই। কিন্তু এসব ন্যাচারাল হিস্টোরিক্যাল অমিল-বেমিলগুলোকেই আরএসএস- বিজেপি  জবরদস্তিতে অস্বীকার করে এক দাবি করতে চায়, এক বলে দেখাতে চায়। আসলে চায় কথিত এক আর্য-চিন্তা (যা আসলে আরএসএস- বিজেপি এর) এরই আধিপত্য।

    দুনিয়ার সব (ভিতরে ভিতরে বা বাইরেও) জাতিবাদী বা জাতি-রাষ্ট্রবাদীরাই এই একই ভুল করে। এমন পথেই যায়। তারা সবাইকে এক ভাষায় কথা বলাতে চায়, নয়ত একই কালচারে বা একই ধর্মে বা একই দেবতায়। তাদের একেবারেই ভিত্তিহীন কিন্তু তবু দৃঢ় বিশ্বাস এভাবেই মানুষকে নাকি কেবল এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায় – এক জাতি-রাষ্ট্রে। অথচ দেখা যায় এর বিপরীতে আমেরিকার বয়স আড়াইশ বছর আর সে জাতি-রাষ্টর  নয়।  বরং এটাই এক প্রথম ও সবল এক ফেডারল রাষ্ট্র। যা পঞ্চাশটা বড় বড় সাইজের রাষ্ট্রের ভিন্নতার সমাহার। কাজেই আগের সব জাতি-রাষ্ট্র পরিশেষে যেমন ফেল করেছে ভেঙ্গে গিয়েছে ; আরএসএস- বিজেপি র একই আর্য-হিন্দুত্বে (রামকে প্রতীক করে) এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এটাও প্রত্যাখ্যাত হবে। প্রায় কাছাকাছি সমস্যা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের। যখন ১৯৯২ সালে ভেঙ্গে ১৫ টুকরা হল তাতে বুঝা গেল কী জবরদস্তি না চলেছিল। যেমন একটা জবরদস্তি হল, সবাইকে রুশ ভাষা শিখানো।

    এমনিতেই বেশীরভাগ  দেশি-বিদেশি মানুষ আরএসএস- বিজেপির  এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এমন প্রজেক্টের কথা জানে না, ধরতেই পারে না।  বিজেপি তাদের চোখে এক আম রাজনৈতিক দলই মনে হয় তাদের কাছে। কলকাতায় কংগ্রেস বা নানা ধরণের বাম যখন একে একে ভেসে গেছে আর একই সাথে আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনায় প্রবল অর্থ ও রিসোর্স খরচ করে হিন্দুত্বের রাজনীতি সব ছেয়ে ফেলতে সে যখন মরিয়া – এমন সব রাজনীতিকেই এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিনে রুখে দিয়েছেন একা মমতা।  কেন একা মমতা বলছি? কারণ মমতার বিশ্বস্ত কমরেডদেরকে যখন বিজেপি প্রলোভন দেখিয়ে কেড়ে নিয়ে গেছে ফলে তৃণমুল – সেই দল মানে আক্ষরিক অর্থেই একা মমতা হয়ে গেছে।  একটা তথ্য দেখেন অনেক অর্থ তাতপর্য বুঝা যাবে তাতে। এই নির্বাচনে এবার একা মোদী এক মাসেই ২২ বার এসে জনসভা করেছেন।  মানে প্রায় প্রতিদিন একটার কিছু কম। এথেকে বুঝা যায় কলকাতার এই নির্বাচন মোদী ওতার দলের কাছে কী! সেই নির্বাচনে মমতা এদের সবাইকে পরাজিত করে দিয়েছেন।
    কিন্তু প্রশ্ন হল, মমতা তাহলে তিনি হারালেন কাকে? তিনি হারিয়েছেন উতখাত ও প্রত্যাখান করেছেন – মূলত আরএসএস- বিজেপিকে সাথে তাদের যে হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা আছে সেটাকেও। যেটা গত সাত বছরে ক্রমশ ধেয়ে আসছিল, ছেয়ে বসছিল। কোথাও তেমন কোন শক্ত প্রতিরোধ কেউ তৈরি করতে পারে নাই।  এমনকি দ্রাবিড়িয় এলাকায় অন্তত কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি থাকার চেষ্টা করে গেছিল। এজন্যই এটা শ্রেফ একটা তৃণমুল দলের না, একজন মমতার বিজয় নয়। এটা ভারত রাষ্ট্রকে হিন্দুত্বের নামে হিটলারের মত এক তান্ডবের হাত থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করা।

    যারা মমতার তিন তারিখে বিকেলের কালিঘাটে তার বাড়ির পাশের সাংবাদিক সম্মেলন দেখেছেন (ফেসবুকে ক্লিপে দেখেছি আমি) তারা খেয়াল করবেন মমতাও এবিষয়ে সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই বিজয় ভারতের জনগণকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কী থেকে? এক উদগ্র হিন্দুত্ব, এক হিন্দুত্বের রাষ্ট্র, সবাই একই এক  টাইট  ইউনিফর্ম-এ – এমনই কিন্তু নতুন করে আরেক নীলচোখের আরিয়ান উগ্র জাতিবাদ, আরেক জার্মান হিটলারের উত্থান হতে চাচ্ছে যেন ! – এসব কিছু থেকে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, মমতা তাই এই জনগণকে বারবার সালাম আর থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলেন। বিপরীতে মমতা বলতে চাচ্ছিলেন সবাইকে একই রকম হিন্দু [আরএসএস- বিজেপির হিন্দু] হতে হবে কেন?

    অথচ ভিন্নতার ঐক্যের হিন্দু হলে অসুবিধা কী? সবাইকে ইউনিফর্ম হিন্দু হতে হবে কেন?  আর জবরদস্তি কেন? এছাড়া হিন্দু ছাড়াও তো অন্যধর্মের নাগরিক আছে, অনেক হিন্দু আরএসএস- বিজেপির হিন্দু নাও হতে চাইতে পারেন, এমনকি কোন রাজনৈতিক হিন্দু হতেই নাও চাইতে পারেন! তারা কোথায় যাবে? অথচ সকলকে নিয়েই এক রাজনৈতিক সাম্যে –  এমন বৈচিত্রগুলোর ঐক্যের এক ভারতীয় নাগরিক হলে হতে চাইলে পারবে না কেন?

    রাজনৈতিক সাম্য মানে নাগরিক হিসাবে সবাই সমান, সম অধিকারে সমান। ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, গায়ের রং, সমতলি-পাহাড়ি সব ধরণের পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিক্কারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে হবে রাষ্ট্রকে। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের বিপরীতে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। সব ভিন্নতাগুলোর ঐক্য গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি।

    এদিকে কোভিড সমস্যা মোকাবিলা করতে গয়ে মোদী প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা, এই পটভুমিতে ভারতকে নতুন দিশা আর ঐক্যের পথ দেখানোর সুযোগ ……

    এসব দিকগুলাই হল, তৃণমুলের টানা তৃতীয় বা এবারের বিজয়ের গভীর তাতপর্য।

    গৌতম দাস
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ০৪ মে ২০২১

  • লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভুখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদীর আপোষ
    গৌতম দাস
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    “India has no military capability to alter the situation”

    – Indian Gen. Panag

    [সার-সংক্ষেপঃ লাদাখ, ভারতের উত্তর-পুর্বে চীন-ভারত সীমান্তের নাম। গত ২০২০, মে মাস থেকে এই সীমান্তে চীন ও ভারত মুখোমুখি সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে বসেছিল। আর  ১৯৯১-৯৪ সালের সময়গুলোতে ভারত-চীন সীমান্ত আলোচনায় আপোষে চীন যেসব ভুখন্ড ভারতের অনুকূলে ছেড়ে দিয়েছিল, যা ভারতের (LAC) এলএসিতে পাওয়া ভুখন্ড মনে করা হয়, সেসব ভূখন্ড চীন মে মাসের ঐ সময়ে ফিরে দখল করে নিয়ে বসে গিয়েছিল।

    এই নিয়ে এক সামরিক সংঘাতে ১৫ জুন ২০২০ তারিখে ২০জন ভারতীয় সেনা নিহতও হয়েছিল। কিন্তু তা সত্বেও মোদি সেসময় সংসদে ও রেডিও বক্তৃতায় বলেছিলেন, “... neither has anyone entered Indian territory, nor is anyone present in Indian territory currently, and nor is any Indian post captured”। আসলে চীন গতবছর মে মাসের শুরু থেকেই ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া ভুখন্ডগুলোই পুনর্দখল করে বসেছিল। কিন্তু একথা সত্যি হওয়া সত্বেও ২০জন ভারতীয় সেনা হত্যা হওয়ার পরও মোদি অমন বিবৃতি দিয়েছিলেন। কেন?

    এর জবাব এখন পরিস্কার জানা যাচ্ছে। আসলে ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া LAC-এ পাওয়া ভূখন্ডগুলোই পুনরায় দখল কথার মানে হল এর আগের ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখা। এখন ভারত-চীন আলোচনায় ভারত ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখাকেই ভারতও তাঁদের স্থায়ী সীমান্তরেখা বলে মেনে নিয়েছে। উভয়পক্ষ এই ভিত্তিতেই সীমান্তে সেনা সমাবেশ ভেঙ্গে দিতে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে এর দুই পাড়ে নতুন সীমান্ত বরাবর সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে এবং ধাপে ধাপে সেটির বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    সে অনুযায়ী, প্রথম পর্ব ছিল ‘প্যাংগং সো (Pangong Tso) লেকের দুই পাড় থেকে সেনা ও স্থাপনা প্রত্যাহার। গত ১১-১৯ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত মতই এই প্রত্যাহার কোনো ব্যত্যয় ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আর ভারতের এই সীমান্তেরই এক সাবেক জিওসি লে জে পরাগ; এই ব্যাপারটাকে দেখে বলেছেন, … the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation….it is “good for the long term peace” ।

    সোজা বাংলায়, আমাদের সামরিক মুরোদ নাই তাই চীনের দাবি মোতাবেক ১৯৫৯ সালের সীমান্ত আমরা মেনে নিয়েছি। এটা দীর্ঘস্থায়ী শাস্তির জন্য ভালই হয়েছে”। কিন্তু কেন ভারতকে এমন পাওয়া-ভুখন্ড ফিরে ত্যাগ করতে বা হারাতে হচ্ছে?]

    Ladakh Stand-Off: India & China, Pangong Tso withdrawal done

    একদম বেড়াছেড়া!

    পথ চলতে চলতে পথিক কখন কোথায় নিজের জামাকাপড় খুইয়ে এসেছে সে হুশই নাই! যখন খেয়াল হল তখন এক বেড়াছেড়া অবস্থা! কেন? কারণ এখন লজ্জা ঢাকে কী দিয়ে সে এক কঠিন সমস্যা। আরেকদিকে, কৌতূহলী আশেপাশের মানুষকে কিভাবে কেন এসব হল তার ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না। কাজেই, এ এক বেড়াছেড়া অবস্থা বটে!

    বেড়াছেড়া শব্দটা কথ্য ভাষায় প্রচলিত শব্দ; তাই অনেকে একে ইনফরমাল শব্দ বলবেন হয়ত। তবু ‘বেড়াছেড়া’ শব্দটা আসলে খুবই এক্সপ্রেসিভ মানে, যা ঘটেছে তাকে এক শব্দে ফুটিয়ে তুলতে এক উপযুক্ত-প্রকাশক শব্দ। ইন্ডিয়া, মানে ভারতের মোদি সরকারের আজ এমনই বেড়াছেড়া দশা।

    কেন? কী হয়েছে??

    এবারে মোদির কাপড় খুলে নেয়ার অবস্থার শুরু বলা যায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে। লাদাখ – ভারতের ভাষায় তার উত্তরপূর্ব কোণের ভারত-চীন সীমান্ত যেখানে দুই দেশের সৈন্য মুখোমুখি হয়ে বসে আছে গত ২০২০ সালের মে মাস থেকে। ভারত (মিডিয়াও) এটাকে এক ‘অচলাবস্থা’ (standoff) বলে বর্ণনা করে এলেও চীনের কাছে ব্যাপারটা এমন অচল নয়। কারণ পরিস্থিতি ক্রমশ তার পক্ষেই এগিয়ে চলেছে। যেন – এবার ঘুঘু ধরা পড়েছে, অপেক্ষা কেবল তাকে কাচিয়ে উপরে তুলে পাকড়াও করার অবস্থা। এবং তাই হতে যাচ্ছে আসলে।

    কারণ অবশেষে মোদি চীনের কাছে ‘ভূখণ্ড হারিয়েছে’ স্বীকার করে নেয়ার পর উভয়পক্ষই যার যার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত শুধু না, তা বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ও শেষ করে ফেলেছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি। কথাটার মানে হল, চীন-ভারতের সীমান্তের যত জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করা হয়ে আছে/ছিল তার একেকটা এলাকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এরই প্রথম এলাকা ‘প্যাংগং সো’ নামে লেকের দুই পাড় থেকে প্রত্যাহার, যা গত দশ দিনে শেষ হয়ে গেছে। এখন পরের পর্বের প্রত্যাহার নিয়ে ফোর্স পর্যায়ে কথা বলা ও বাস্তবায়ন শুরু হবে।

    সেনা প্রত্যাহার কোথায় গিয়ে থামবে, নতুন কোন সীমান্তেঃ
    কিন্তু মূল প্রশ্ন : উভয়পক্ষ সৈন্য প্রত্যাহার করবে না হয় বোঝা গেল কিন্তু প্রত্যাহার করে কোথায় গিয়ে থামবে? অর্থাৎ কোনটাকে এখন নতুন সীমান্ত বলে উভয়পক্ষ মেনে চলবে? কারণ সব ফাটাফাটি সংঘাত বা মূল বিতর্কের উৎসই তো ছিল সেটাই!

    না, নতুন সীমান্তরেখাও এখন আর অমীমাংসিত নয়। লক্ষ করা যায়, চীন পা-ফেলে থাকে সাধারণত অনেক ক্যালকুলেশন করে। আসলে গত বছরের ৫ মে এর শুরু থেকেই চীন নিজের সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছিল ১৯৫৯ সালের এলএসি [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা মেনে।

    যদিও কী মেনে চীন একাজ করছে তা কখনো প্রকাশ্যে বলেনি। কিন্তু “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায়” ফিরে যেতে বলে চলেছিল ভারতের সাথে সব মিটিংয়েই। আর এখনকার সমঝোতাও হচ্ছে সেই ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মোদির ভারতের মেনে নিতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে। কাজেই উভয়পক্ষের সৈন্য ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখার’ দুই পাড়ে যার যার দেশের সংলগ্ন অংশে গিয়ে বসবে। আর সেটাই হবে নতুন সীমান্তরেখা।

    এটাই সৈন্য প্রত্যাহারের ভিত্তি বলে মেনে নিতে মোদি রাজি হয়েছেন। যদিও মোদীর জন্য এখন এটাই বিরাট সমস্যা আর ইজ্জতের ব্যাপার যে পাবলিকের কাছে তিনি এই ‘ভূমি হারানোর আপস ও বিনিময়ের কথা কিভাবে বলবেন!

    পাঠক যারা কম সময় দিতে চান, কম বিস্তারে পড়তে তারা নিচের ছোট প্যারার অংশটুকু বাদ দিয়ে সরাসরি পরের প্যারায় চলে যেতে পারেন।

    ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কী?
    একটা বড় তথ্য দিয়ে রাখি। ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কথাটা মূলত চীনের প্রস্তাবিত একটা সীমান্ত ধারণা। কিন্তু তা উভয়পক্ষের সম্মতিতে আঁকা কোনো ম্যাপ – ঠিক তা নয়। এটা ১৯৫৯ সালে চৌ এনলাই ও নেহেরুর এ’দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার চিঠি চালাচালির ঘটনা যেখানে চৌ নেহেরুকে “ম্যাকমোহন লাইন” [McMahon line] মেনে সীমান্ত টানার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

    “ম্যাকমোহন লাইন” প্রসঙ্গে বেশি বিস্তারে যাব না। কমকথায় বললে,  এই লাইন টেনে ঝগড়া মিটাবার চেষ্টাটা ১৯১৪ সালের, তিব্বতকে নিয়ে। হ্যাঁ, তিব্বতকে নিয়ে।  কিন্তু তিব্বতের দুর্ভাগ্য হল, তিব্বত স্বাধীন নাকি চীনের অধীনে স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ এই নিয়ে বিতর্ক মাও-এর আগের চীনা-জাতিবাদী শাসক চিয়াং কাইশেকের আমলের। যদিও ভারতের দিক থেকে অনেকে সময় ধারণা দিবার চেষ্টা করা হয় যে কমিউনিস্ট মাও খারাপ ও এগ্রেসিভ বলে তিব্বত নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন তিনি, ফলে দালাই লামাকে নিয়েও।

    অথচ ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ম্যাকমোহন লাইন এর প্রমাণ। এটা ১৯১৪ সালের জুলাইয়ে ঘটনা যখন তিব্বত প্রদেশের সাথে এর সীমান্ত সংলগ্ন বৃটিশ-ইন্ডিয়ার কমন সীমান্ত ম্যাপ কী হলে উভয় পক্ষ তা মেনে নিবে সে আলোচনা চলছিল, এটাই সেকালের দশ মাস ধরে চলা সিমলা কনফারেন্স চুক্তি [Simla Accord] নামেও পরিচিত।

    ম্যাকমোহন ছিলেন বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সেনা অফিসার ও পরে বৃটিশ-ইন্ডিয়া সরকারের বিদেশমন্ত্রী এবং সে হিসেবে তিনি ঐ সীমান্ত আলোচনার প্রধান নেগোশিয়েটর। তাই তার নামেই ম্যাকমোহন লাইন বলে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ঠিক হয়েছিল। তিব্বত প্রদেশের প্রতিনিধিসহ কেন্দ্রের চিয়াং কাইশেক সরকারের প্রতিনিধিও উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু শেষে কাইশেক সরকারের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে তাঁদের চোখে তিব্বত তো মূলচীনের-ই প্রদেশ। কাজেই তিব্বত কিভাবে স্বাক্ষরদাতা পার্টি হয় এই ছিল তাঁদের আপত্তি।

    অর্থাৎ তাঁদের আপত্তি ঠিক বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে নয়। তিব্বত স্বাধীন দেশ/ প্রদেশ কিনা সেই বিতর্ক। তাই পরবর্তিতে চীন মাওয়ের বিপ্লবের অধীনে কমিউনিস্ট চীন হয়ে গেলে কমিউনিস্ট চীনের অফিসিয়াল অবস্থান হয়ে যায় এটি যে, তিব্বত চীনের প্রদেশ আর ম্যাকমোহন লাইনই ভারতের সাথে সীমান্তরেখা। কিন্তু ততদিনে আবার নেহেরুর ইন্ডিয়া সেটা গ্রহণ করতে চায়নি। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে চীন আরও ভুখন্ড দখল করেছিল। যেটা পরে অবশ্য ছেড়েও দেয়। এরপর থেকেই [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা কথাটার উৎপত্তি হয়।

    ঐ চিঠি চালাচালিতে বর্ণনামূলক অর্থে কথা বলার সময় কারও দখলে থাকা ভুমি বুঝাতে চীন এই [LAC] ব্যবহার করেছিল। যেটা অবশ্যই উভয়পক্ষের সম্মতিতে গৃহিত কোনো কমন ম্যাপের স্টাটাস নয়।  তাই টেকনিক্যালি ভারত কখনই ১৯৫৯ সালের কোনো সীমান্ত বুঝাতে [LAC] শব্দটা ব্যবহার করতে চায় না। তবে চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল সুসময় বলা যায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল।

    ১৯৯১ সালে নরসীমা রাও-এর প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি পেং ভারত সফরে এসেছিলেন। আর তাতে উভয়পক্ষের সম্মতিতে [LAC] কোনটা হবে এনিয়ে বিস্তর আলোচনা ও রফার শুরু হয়েছিল। এতে নরসীমার ফিরতি চীন সফর ঘটেছিল ১৯৯৩ সালে এবং  সেই সফরকালে উভয়পক্ষ [LAC] এর দুই পাড়ে শান্তি বজায় রাখার লক্ষে এক সীমান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আর তখন থেকেই ভারতও অফিসিয়ালি [LAC] কথাটা মেনে নিয়েছিল ও ব্যবহার শুরু করেছিল। আর সেই থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বহুবার তাঁদের বিভিন্ন সীমান্তে  নতুন করে সম্মতিতে সীমান্তরেখা টানা হয়েছিল যেগুলো ঐ বছরের [LAC] যেমন, [LAC 1994] এভাবে বলার চল শুরু হয়েছিল।

    সারকথায়, ১৯৯১ সাল থেকে এবারের বলা [LAC] এর বাড়তি অর্থ হল তখন থেকে [LAC] মানে উভয়পক্ষের সম্মতি নিয়ে আঁকা সীমান্তরেখা। কিন্তু এত সম্মতির পরেও আবার ২০২০ সালে কেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ?

    এর একমাত্র কারণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট সংসদে অমিত শাহের সারা কাশ্মীরই (পাকিস্তান ও চীনা অধিকৃত অংশসহ) ভারতের অংশ দাবি করা। অর্থাৎ এখানে আসলে মোদি-অমিতের সরকার দাবি করে ফেললেন যে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত যত কিছু সীমান্ত সমঝোতা ও চুক্তি হয়েছিল তা তারা মানেন না। এবং এই না মানা একপক্ষীয় ভাবে। আর একপক্ষীয়ভাবে কোনো চুক্তি বাতিল করে দেয়া মানে উভয়পক্ষ বসে কোনো আলোচনায় থেকে নয় – যেটি কূটনীতিতে খুবই অশিষ্ট [rogue] আচরণ গণ্য করা হয়, তাই ঘটানো হয়েছিল।]

    কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের ভাল সম্পর্কের সময়ে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে সীমান্ত নিয়ে আপস আলোচনায় ফলাফলের ভিত্তিতে সে সময়ে প্রতি বছরই উভয়ের সম্মতিতে চীন নিজের দাবিকৃত অংশ থেকে বেশ কিছু ভূখণ্ড ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। এ থেকেই এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর জন্ম। তাহলে এখন ১৯৫৯ সালকেই আবার ফিরে নতুন করে সব সীমানার ভিত্তি মেনে নিয়ে এখনকার মোদির আপসনামার অর্থ কী?

    অর্থ হচ্ছে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে আপোস আলোচনায় যা কিছু ভূখণ্ড ভারত পেয়েছিল তা আর ভারতের হাতে থাকল না। ভারত এই ভূখণ্ডের দাবিই যেন ছেড়ে দিল। সেটা ভারতের অনিচ্ছাকৃত হলেও মোদি-অমিতের “পুরা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড”, সংসদে এই দাবি করাতে এমন অর্থই তৈরি হয়ে গেছিল।

    এর সোজা মানে হল মোদীর এখন ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মেনে আপোস করাতে ভারত চীনের কাছে বড় ভূখণ্ড হারাচ্ছে সেটা স্বীকার করে নিল। শুধু তাই না, এর আরেক বিশেষত্ব আছে।

    আগে মীমাংসিত ছিল এমন ভূখণ্ড এবার আবার চীনকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে গেল। কিন্তু কেন? এমন তো আগে কখনো হয়নি! মোদি কি যেকোনোভাবে একটা সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে আসার স্বার্থে পাগল হয়ে এমনটি করছে? একেবারেই যে তা নয় সেটা বলা মুশকিল। কারণ এই করোনাকালের আগে থেকেই মোদির ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। তাই এই সময় সেনা প্রত্যাহার, খরচ কমানো এবং সাথে টেনশনও কমানো ইত্যাদি মোদীর জন্য এক বিরাট চাহিদা তো বটেই। সেকারণে এই আপোস মীমাংসা মানে সেনা প্রত্যাহার বা [disengagement] এটির মূল শর্ত হলে মোদি তাতেও রাজি।

    পাঠকের কাছে ব্যাপারটা আমাদের ভাষ্যে না বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের মিডিয়ায় ছাপা হওয়া এক সাবেক কমান্ডার লে. জেনারেল পানাগের [Lt Gen HS Panag (Retd)] বয়ানে তুলে ধরব। তিনি পরপর দু’বার রাষ্ট্রীয় মেডেলপ্রাপ্ত সেনা অফিসার।

    লে. জে. পানাগ বলছেন, ‘… এই সৈন্য প্রত্যাহার ঘটছে একেবারে ঠিক চীনের দাবিকৃত ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে। কারণ এ পরিস্থিতিকে ভিন্ন কোনো বিকল্প আকার দেয়ার মতো সামরিক যোগ্যতা ভারতের নাই।’

    তিনি আরো বলেন, তবুও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য এটাই ভালো  [……” that the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation. However, he said, it is “good for the long term peace”………”The plan, he presumed, will include acceptance of McMohan Line in Northeast with some give and take between New Delhi and Beijing, as per the 1959 proposal.”]।

    কিন্তু এই জেনারেল যে কথা কোনো রাখঢাক না করে গড়গড়ে বলে গেলেন মোদির সে সক্ষমতা নাই। কারণ লাদাখ বা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মোদির নেয়া সব পদক্ষেপেই সততার অভাব ছিল। মোদীর অসততা হল, তিনি নিজ ভোটবাক্স ভরাতে সীমান্তে তিনি বীর, বীরত্ব দেখাচ্ছেন তিনি, হিন্দুত্বের বিজয় আনছেন তিনি ইত্যাদি ভুয়া বয়ানের সুরসুরি তুলতে এসব করেছেন।

    তিনি কাশ্মীর দখল করেছেন। পুরা কাশ্মীর ভারতের মধ্যে এনেছেন তাই তিনি ও তার দল হিন্দুত্বের বীর। এসব জাতশ্রেষ্ঠত্বের জজবা উন্মত্ত জোশ, আধা সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি এনেছেন যেকোনো অ-হিন্দুর বিরুদ্ধে। যার সবকিছুর উদ্দেশ্য ভোটবাক্সকে হিন্দুর-ভোটবাক্স এই জোয়ার তুলে।

    আবার এই মিথ্যা বীরত্বের দাবি করতে গিয়ে যেমন – ভারত-চীন প্রত্যক্ষ সেনা সংঘাতে ভারত যখন ২০ জন সৈন্য হারিয়েছিল তার পরে মোদি সর্বদলীয় বৈঠকে দাঁড়িয়ে এবং ‘মন কি বাত’ নামের রেডিও প্রোগ্রামে বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, ‘চীন ভারতের কোনো ভূখণ্ড দখল করে নাই, কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেনি’ ইত্যাদি। তার সোজা অর্থ হলো, ভারতের সৈন্যরাই চীনে অনুপ্রবেশ করে মার খেয়ে মরেছে। অথচ আসলে মোদীর ওই বিবৃতিতে স্বীকার করে নেয়া হয় যে, চীনা দাবিকৃত ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখাই’ তাদের উভয়ের প্রকৃত সীমান্ত। যদিও মোদি কখনোই তার ওই কথার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সংসদে আলোচনাও তুলতে দেননি।

    কাজেই  এখনকার ‘সেনা প্রত্যাহার’ নিয়ে মোদির বড় সমস্যা হল, তার সংসদ বা নাগরিকের কাছে তিনি কিভাবে খুলে বলবেন যে তার উগ্র জাতিবাদী হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতি আর হুঙ্কার আসলে সব অচল আর ভুয়া! ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ার বিনিময়ে তিনি চীনা সৈন্যদের ঠাণ্ডা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু সেজন্য তিনি বাৎচিত শুরু করছেন আরেক শঠতার আশ্রয়ে।

    এক. তিনি যে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে বিনিময়-সওদা করছেন- এ কথা একেবারে লুকিয়ে ফেলেছেন।

    দুই. এই বিষয়ে পাবলিকের সামনে কথা শুরু করছেন চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে – এখান থেকে। যেন এটা দু’পক্ষেরই সেনা প্রত্যাহার নয়, যেন শুধুই চীনা সৈন্য প্রত্যাহার হচ্ছে। অর্থাৎ যেন চীনা সেনারা ভারতে এসেছিল, এখন পালিয়ে গেল। এটাই যেন এক বিরাট সুখবর আর মোদী সরকারের বিজয়- এমন ভাব দেখাচ্ছেন। অন্তত দুটো মিডিয়া দ্যা হিন্দু আর দ্যা প্রিন্ট এ কাজে মোদির ইজ্জত বাচানোর মত করে এমন ভাষ্য লাগাতার তৈরি করে যাচ্ছে।

    অথচ সত্যিকার ব্যাপারটা হল, ভারতীয় সেনারা ‘পিছিয়ে’ ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায় ফিরে গেল আর চীনা সৈন্য প্রত্যাহার নয় বরং ওই ছেড়ে যাওয়া ভূখণ্ডের দখল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

    মোদীর ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টায় আরেক মন্ত্রী ভিকে সিংঃ
    মোদি তাই ‘চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে’ এমনই কাছাকাছি কিছু একটা ব্যাখ্যায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথকে দিয়ে সংসদে বিবৃতি পড়ে শোনান, ঐ ১১ জানুয়ারি যেদিন ভারতীয় সেনা ইতোমধ্যেই মাঠে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে দিয়েছিল সেদিন। তবু এতকিছুর পরেও আগেই আরেক বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছিল। সে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল মোদীর আরেক মন্ত্রী ভিকে সিং।

    তিনি আসলে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান, এক ফোর-স্টার জেনারেল। সম্ভবত মোদি তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিথ্যা অ্যাডভ্যান্স ঢোল পিটানোর – ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে মোদি আপোস করছেন এদিকটা লুকিয়ে কথা শুরু করার জন্য। তিনিই প্রথম বলতে নামেন যে এই সেনা প্রত্যাহার এটাই নাকি মোদীর বিজয়। কিভাবে?

    তিনি গত ৭ জানুয়ারি ভারতের দক্ষিণে তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে সফরে গিয়ে জনগণকে ব্যাপারটা ‘সহজ করে বুঝিয়ে বলার’ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এতে তিনি হিতে বিপরীত করে ফেলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কগুলো কত সহজ ফলে অন্যের দেশে অনুপ্রবেশ ঘটানো -এগুলো কোনো ব্যাপার না। এই ধারণা তৈরি করতে গিয়ে বলে বসেন যে ভারত কতবার যে চীনা ভূখণ্ডে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে এর শেষ নেই।

    আরো এক কাঠি ওপরে গিয়ে বলেছেন, “চীনারাও অনুপ্রবেশ করেছে তবে আমাদের চেয়ে কম। চীনারা ১০ বার করলে আমরা ৫০ বার করেছি”   [“Let me assure you, if China has transgressed 10 times, we must have done it at least 50 times,”।

    বলাই বাহুল্য, এরপর এটাই সমালোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এমনকি এ নিয়ে চীনে চীনা সরকারি মুখপাত্রকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কয়েক শব্দে এক মন্তব্য করেন যে, “সত্যি কথা সবসময় অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়ে।”

    আসলে ভিকে সিং সেখানে আরেক ভুয়া দাবি করে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়াকে আড়াল করতে গিয়েছিলেন। তিনি তাই মনে করায় দিয়ে বলার ছলে বলেন, চীনা পণ্য বর্জন প্রোগ্রাম নিয়েছিল বিজেপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। আর সরকার চীনা বিভিন্ন অ্যাপ-প্রোগ্রাম ভারতে নিষিদ্ধ করেছিল, ভারতে বাণিজ্যে বা টেন্ডারে অংশ নেয়া বন্ধ করেছিল। আর তাতেই নাকি চীনারা চাপে পড়েছিল তাই তারা সেনা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে।

    কিন্তু তার এই দাবিও আসলে ভুয়া। কারণ পরিসংখ্যান বলছে যে, বরং চীন থেকে কাঁচামাল বা তৈরি পণ্যের আমদানি বেড়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ এক দাবি ভিকে সিং শুরুতেই করেছিলেন সেখানে। তিনি বলে বসেন, চীনের সাথে অফিসিয়াল সীমান্তরেখা বলে কোনোকিছু কখনও আঁকাই হয় নাই; [……”  official border with China has never been demarcated.“।

    তার মানে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি পেং ১৯৯১ সালে ভারতে আসেন নাই, নরসীমা রাও-ও ১৯৯৩ সালে পাল্টা চীন সফরে যান নাই। অতএব ১৯৯১-১৯৯৩ এই সময়কালের মধ্যে [LAC] নিয়ে চীন-ভারত উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথমবারের মত কোনো সমঝোতা হয় নাই?

    আসলে এটা তিনি বলছেন কারণ মোদি নিজেই এই “অস্বীকারের” [১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে] ফাঁদে পড়েছেন। তাই ইতিহাস উল্টাতে ভিকে সিং সারা ভারতকে সেই ফাঁদে ফেলতে চাইছেন। ওদিকে, কংগ্রেস গত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে এন্থনী অভিযোগ করে বলেন, লাদাখের এই সেনা প্রত্যাহার আসলে চীনের কাছে সারেন্ডার “Disengagement in Ladakh is surrender to China,” ছাড়া কিছুই না।

    যা হোক, এই সেনা প্রত্যাহার মনে হচ্ছে সফলতার দিকেই যাবে, তাতে ভারতকে যে শর্তই পালন করতে হোক না কেন। তবে ঘটনা আরো কিছু আছে।

    আসলে এখন মোদির এত দ্রুত আপোস করে ফেলার পেছনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মোদি আশা করতেন, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য বিরোধটা যদি সামরিক দিকে গড়ায় তাহলে তিনিও এর আড়ালে, ভারতের চীনের সাথে বিরোধকে সামরিক দিকে ঠেলে দেয়ার সুযোগ নিতে পারবেন। কিন্তু তা হয়নি, মোদির কপাল খারাপ!

    কিন্তু রেকর্ড বলছে, ট্রাম্প তার চার বছরে পরিস্থিতি কখনোই সামরিক দিকে যেতে দেননি। যদিও অনেক গরম কথা, হুঙ্কার দিয়েছেন। আর ওই চার বছরে তিনি মোদিকেও বাকচাতুরি ছাড়া কোনো ফেভারই দেননি। কিন্তু উল্টা ভারতে অস্ত্রবিক্রির সুবিধা নিয়েছেন। সেটা যাই হোক শেষে বাইডেন এসে যাওয়াতে এসব দিকে মোদির সরকার এখন একেবারেই হতাশ। কেবল অপেক্ষা করছেন বাইডেনের সাথে প্রথম মোলাকাতে কী আলামত দেখেন তা জানতে। পছন্দ না হলে এবং বিশেষ করে মানবাধিকারের চাপ খেলে জয়শঙ্করের তৈরি আরেকটা অবস্থান আছে সে দিকে যাবেন। সেটা হলো তিনি বলবেন, এখন থেকে চীন-আমেরিকার বিরোধে ভারত আর কোনো দিকে নেই, গ্যালারির দর্শকমাত্র হয়ে থাকবে। যেন অনেকটা ঘরে খাবার নাই বলে উপোস রাখছি এমন বলে বেড়ানো হবে সেটা আর কী।

    সবশেষে, চীন গত বছর সীমান্তে সেনা সমাবেশের শুরু থেকেই আগে ভারতকে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ানো মানে, এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর মাধ্যমে যেসব ভূমি ফেরত দিয়েছিল তা আবার কেড়ে নিতে এগিয়েছিল কেন?

    স্বল্পকথায় বললে, ব্যাপারটা ২০১৯ সালে মোদির “পুরা কাশ্মিরই ভারতের”- সংসদে এই দাবি করার খেসারত। সংসদে ৩৭০ ধারা বাতিল করার পরে অমিত শাহ একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কাশ্মিরের তিন অংশ- ভারত ও পাকিস্তানের দখলের অংশ এবং চীনের দখলে থাকা অংশ- এই পুরো কাশ্মিরই ভারতের ভূখণ্ড। এই ঘোষণাতেই সবকিছুর ট্রিগার টিপে দেয়া হয়েছিল।

    আজ মোদি সরকার “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা” মেনে নিতে বাধ্য হলেন। দুনিয়ার সব উগ্র জাতিবাদীর পতনের মত এই হিন্দুত্ব জাতিবাদ এখানেও হেরে গেল।

    চীন বলতে চাইল, ভারত আপোস আলোচনায় সীমান্তবিরোধ মিটানোর মত কোনো পার্টনারই নয়, যোগ্য নয় তাই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “সেনা প্রত্যাহারে গিয়ে মোদির যে দশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    গৌতম দাস

    ০৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3cY

    প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বরের আগে-পরের দিনগুলোতে সাধারণত দেখা যায় সরকার প্রধানেরা নিউইয়র্কমুখী হচ্ছেন। তখন তারা জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের [UNGA, UN General assembly] সভায় যোগ দিতে ব্যস্ত দিন কাটান। সাধারণ পরিষদের সভা মানে, বছরে এই একটাই গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠান যা সব সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্র এখন প্রায় ১৯৩ টি। এখানে সবার হাজিরা বাধ্যতামূলক না হলেও জাতিসঙ্ঘের এই জমায়েতেকে যেন এক ‘বিশ্বসভা’। মানে যা দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠীর হাজির থাকার এক প্রতিনিধিত্বমূলক বিশ্বফোরাম বা বিশ্বদরবার ধরনের ধারণা – সেটা কোথাও ঘোষণা করা না থাকলেও, ক্রিয়াশীল থাকে বলে মনে করা যায়, এখানেই এর গুরুত্ব। এ’বছরও সেপ্টেম্বরে এর ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও ফারাক এতটুকুই ছিল যে এবার কোন সরকারপ্রধানই কোভিডের কারণে জাতিসংঘে নিজ সশরীরে হাজির হননি, আগাম রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদীও বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন।

    জাতিসঙ্ঘ কেমন ধরনের প্রতিষ্ঠান আর কী তার ক্ষমতার এখতিয়ার ও সীমা? এটা কী পারে বা পারে না? এ নিয়ে সাধারণ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি আছে, এমনকি সরকারপ্রধান বা অনেক দেশের একাডেমিক পর্যায়েও।

    সাধারণত কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান আর সাম্য ধারণাটা প্রায় হাত ধরাধরি করে চলে। এজন্য সংগঠন বা সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান মানেই তা মাস (ইংরেজি mass বা বাংলায় গণ) অর্গানেইজেশন বলে ধরে নেয়া হয়। আর কোন গণসংগঠন মানেই সেখানে সদস্যরা সবাই সমান; এমন সাম্যতাই সেখানে ভিত্তি বলে সবাই মেনে নিয়ে থাকে। তবে গণপ্রতিষ্ঠান মানেই সবাই সেখানে সমান – এটা আধুনিক কালের ধারণা। কিন্তু এটারইবা আসল মানে কী?

    তা হল, যখন রাজা বা সম্রাটের শাসন বা রাজবংশের দিন ফুরিয়েছে আর এর বিপরীতে পাবলিক বা জনগণের শাসন বলে ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। কোনো ব্যক্তি বা রাজা নয়, সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস পাবলিক বা জনগণ।  প্রতিটা নাগরিক তবে সম্মিলিতভাব ক্ষমতার উৎস, একথা থেকে যেখানে সবকিছুর শুরু। আর ঐ সমাজে ও সংগঠনে ‘রাজকীয় মর্যাদার’ কোন বিশেষ বলে কেউ থাকে না। বরং পাবলিকের রাষ্ট্রটাই হল সমাজের সবচেয়ে বড় বা প্রধান গণপ্রতিষ্ঠান। তাই কোন ব্যক্তি বা রাজার খামখেয়ালি না, পাবলিক আর পাবলিকের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব মাধ্যমে এখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অন্তত হওয়ার কথা।
    এই সূত্রে পাবলিকের রাষ্ট্র বা ‘রিপাবলিক’ [republic] কথাটা এসে গেছে সেখানে রাষ্ট্রসহ যেকোনো গণপ্রতিষ্ঠান মানেই ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক সবাই সমান, এমন বৈষম্যহীনতার এক সাম্য ধারণা ও নীতি বজায় থাকতে হবে।

    এখন এই বিচারে তাহলে ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট লিখে যখন জন্ম হয়েছিল সেকালে এর সব সদস্য রাষ্ট্রই সমান এমন ধারণার ভিত্তিতেই একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও ব্যতিক্রম আছে। যেমন- সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সদস্যরা সবাই সমান আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘেরই আরেকটা ফোরাম আছে নিরাপত্তা পরিষদ [UNSC, UN Security Council] যা এক অর্থে সাম্যনীতির ফোরাম নয়। তাহলে কী এটা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের নীতি ভঙ্গ করে গড়া হয়েছে? জবাব হবে, না। ঠিক তা নয়; আর সেটা জরুরিও নয়। তাহলে? ব্যাপারটা কী, কিভাবে এটা ব্যাখ্যা করব?

    আমরা এ বিষয়ে অনেক ফতোয়া পাবো, এমনকি অনেক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানেও; যেখানে হয়ত স্টুডেন্টরা শিখছে – জাতিসঙ্ঘ ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক শব্দটা এখানে আনলাম অনেকে ব্যবহার করে বলে।  প্রথমত ‘গণতন্ত্র’ খুব ভালো শব্দ নয়, বরং চাতুরীর শব্দ।
    পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বিকল্প বা সমতুল্য ধারণা ‘গণতন্ত্র’ নয়। যেমন এতে অনেকে কোন একটা দেশের বেলায় হয়ত বলবে,  “সেদেশে নির্বাচন হয়, চাইকি সেটা নিশীথভোট হয়ত, অতএব গণতন্ত্র আছে” – টাইপের কথা বলে রিপাবলিক ধারণাকে অর্থ তাৎপর্যহীন করে ফেলতে পারে। তাই এখানে দুটি পয়েন্টে কথা বলব।

    প্রথম পয়েন্টঃ আমরা জাতিসংঘের প্রসঙ্গে কথা বলছি মানে প্রসঙ্গটা এখানে ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রবিষয়ক; আর আমরা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে একাকার করে দেখছি। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এক করে দেখলেও কোনো ভুল হয় না, এ কথাও সত্যি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল হয় ও হবেই। লক্ষ্যণীয়, এছাড়াও আমরা নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে কথা বলছি মানে এটা একটা রাষ্ট্রের ভিতরের বা অভ্যন্তরীণ দিক নিয়ে কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় নিয়ে। রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় মানে এখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা খেয়াল রেখে তা লঙ্ঘন যাতে না হয় এভাবে কথা বলতে হবে। সোজা কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা এসোসিয়েশন এমনটা বুঝে নিয়ে,এরপর প্রশ্ন হল,  জাতিসঙ্গে বসে নেয়া সবার সিদ্ধান্ত কী কোনও একটা সদস্য রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ করা যাবে? কারণ তা করতে গেলে তো ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে? এজন্য, যেকোনো রাষ্ট্রের ওপর আরেক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত যেমন কার্যকর মনে করা যায় না, তেমন জাতিসঙ্ঘেরও। অর্থাৎ সার্বভৌম বাংলাদেশের উপর জাতিসংঘ কোন সুপার-স্টেট হতে পারে না; কিংবা আরেক বড়ভাই রাষ্ট্র বলে কিছু থাকতেই পারে না। (তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে করা যায়।) কাজেই ব্যক্তিদের নিয়ে একটা সমিতি বা ক্লাব ব্যক্তির উপর ক্লাব বা দলের সিদ্ধান্ত দিতে পারলেও এই ব্যাপারটা রাষ্ট্রের বেলায় খাটতে পারে না। রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা কোন জাতিসংঘ তার কোন সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে না। রাষ্ট্রই শেষ কথা এর উপর আর কেউ কর্তা থাকতে পারে না। তাই, এখানে এসে যা ব্যক্তির বেলায় সত্য ও প্রযোজ্য মনে করা যায় তা রাষ্ট্রের বেলাতেও সত্য ও প্রযোজ্য বলে একাকার করে দেখা যাবে না, ভুল হবে।

    তাহলে কী জাতিসঙ্ঘের কোন সিদ্ধান্ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সদস্য রাষ্ট্রের  উপর প্রযোজ্য নয় বা করা যাবে না? তাহলে হয়ে আছে কী করে? সেটা বুঝার জন্য সার্বভৌমত্ব কথাটা খেয়াল রেখে – একটা কায়দা করা হয়েছে – সেদিকে তাকাতে হবে। যেমন ধরা যাক, সব রাষ্ট্র বসে কোন নতুন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন তৈরি করতে লাগলো। বাংলাদেশের প্রতিনিধি ধরা যাক তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দলিল প্রস্তুত শেষে ওই দলিলে স্বাক্ষর দিয়ে এলেন। এখন ঐ আইন মানতে বাংলাদেশকে বাধ্য করানো কী যাবে? কারণ সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে। আমাদের সংসদের বাইরের কোন আইন আমাদের কেন মানতে হবে? তাই এই জটিলতা এড়িয়ে যেতে বা এথেকে বিরত থাকতে যা করা হয় তা হল, জাতিসংঘের ঐ মিটিংয়ে পাশ হওয়া ওই আইন বা কনভেনশনটাই এবার দেশে নিয়ে এসে সরাসরি আমাদের সংসদে পেশ করা হয়। যেন আমরা আমাদের সংসদে কোনো প্রস্তাব পেশ করছি এভাবে। এইবার সেই প্রস্তাব আমাদের সংসদে পাস হওয়ার পর সেটা আর জাতিসঙ্ঘের আইন বা কনভেনশন বলে বাংলাদেশ মেনে চলছে এমন নয়। সেটা আমাদের সংসদে পাস হয়ে যায় যদি তবে তা আমাদের সংসদে গৃহীত আইন বলে মানতে কোন আর অসুবিধা নাই। এই প্রক্রিয়াটাকেই র‌্যাটিফিকেশন [ratification] বা অনুসমর্থন করে নেয়া বলে।  আর এই হল সার্বভৌমত্ব বাঁচিয়ে আর জাতিসঙ্ঘের সাথে দেশের সম্পর্ক রক্ষার সমাধান।

    দ্বিতীয় পয়েন্টঃ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৩৩-১৯৪৫ সালের এ সময়ে একনাগাড়ে চারবারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসঙ্ঘের আইডিয়া বা ইমাজিনেশনের উদ্গাতা মূলত তিনি। এর পেছনের কারণ, তিনি হলেন সেকালের কলোনি শাসন উচ্ছেদ করে দেয়ার পক্ষের লোক। যাতে এরপর স্বাধীন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো নিজ অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আমেরিকান পুঁজিবাজারের ঋণখাতক হতে চাইলে হতে পারে। মানে নিজ প্রয়োজনীয় ঋণের গ্রহীতা অর্থে পুঁজিবাজারের ক্রেতা হয়ে উঠে। যাতে দুনিয়ায় কলোনি দখল শাসনের চেয়ে তুলনামূলক অনেক ভাল স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের এক আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। একাজে তিনি আবার যুদ্ধের বিপক্ষের লোক। এজন্য সবাইকে নিয়ে আগে আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থ বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষের লোক। কারণ তাঁর অনুমান যুদ্ধে পুঁজি-সম্পদ বিনষ্ট হয় মারাত্মক, তাই এমন বাস্তবতা থেকে তিনি সরতে চাচ্ছিলেন। [যদিও তার স্বপ্ন বা আইডিয়া আর পরবর্তিতে বাস্তবের আমেরিকা ১৯৫৩ সাল থেকেই আর এক থাকে নাই। তবে তা নিয়ে কথা আজকের প্রসঙ্গ নয়।] যদিও সেকালে তার প্রস্তাব ইউরোপের নেতারা সহজেই মেনে নিয়েছিল কারণ হিটলারের আক্রমণের মুখে  তাদের তখন  আমেরিকার অধস্তন হয়ে পড়া এবং পুরা মুখাপেক্ষি হয়ে থাকার দশা তাই। কিন্তু তখনকার  সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন তা মানতে চাননি। স্তালিনের সোজা আপত্তির দিকটা ছিল, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় ও  চলে এমন এক জাতিসঙ্ঘ গড়ার পর ঐ প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কলকাঠির প্রভাবে কোন সময় সেই জাতিসঙ্ঘ তার কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত যদি সংখ্যালঘু বলে সোভিয়েত ইয়নিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তখন কী হবে?
    আবার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত রাষ্ট্র ওর ঊর্ধ্বে বা বাইরের জাতিসঙ্ঘ বলে কারো সিদ্ধান্ত কেন বাধ্য হয়ে মানবে? অতএব স্তালিন তা একেবারেই মানতে নারাজ।

    ভেটো ধারণার আবির্ভাবঃ
    এই জটিলতা সমাধান করতেই আসে ‘ভেটো’ সিস্টেমের আইডিয়া। এর সোজা ব্যবহারিক মানে হল, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই ভেটোওয়ালা সদস্য রাষ্ট্রের একটাও যদি আপত্তি করে, না ভোট দেয় (না-ভোটটাই ভেটো) তবে সেটা আর সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। সেজন্য এটা আলাদা করে নিরাপত্তা পরিষদ এই ফোরাম, এখানে পাঁচ রাষ্ট্রের একটাও যদি কোন ইস্যুতে আপত্তি করে তাতে আলোচনার প্রস্তাব ভোটাভুটির আগেই বাতিল হয়ে যাবে। তবে এটা গেল ভেটো ব্যবস্থার নেগেটিভ দিক থেকে ব্যাখ্যা। এটাকে উল্টা ইতিবাচক করে বলা যায়, উপস্থিত দুনিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পাঁচটা পরাশক্তি বা বিশেষ রাষ্ট্র একমত না হলে সেটা নিয়ে এরপর আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। দুনিয়ার ক্ষমতা-ভারসাম্যের জন্য সবার আগে পাঁচটা বিশেষ রাষ্ট্রের একমত হয়ে থাকা জরুরি একথাটা সবার মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই আসলে জাতিসংঘের জন্ম। এই আইডিয়া হাজির করেই রুজভেল্ট স্তালিনকে নিজের নৌকায় তুলতে পেরেছিলেন, জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত হয়েছিল।

    মফস্বলি মোদীর এবারের জাতিসংঘঃ
    এবারের সেপ্টেম্বরে মোদি নাকি খুবই সফল এক প্রধানমন্ত্রীর মত জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা রেখেছেন। অন্তত কলকাতার আনন্দবাজারের চোখে তাই। উগ্র হিন্দুজাতিবাদী অবস্থানের আনন্দবাজার এবার প্রকাশ্যেই হিন্দুত্ব জাতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  ভারতের “সীমান্ত সঙ্ঘাতের” এই “মোক্ষম সময়ে” প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি ভারতের “নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো ভাবে তুললেন”- এভাবে লিখেছে আনন্দবাজার। মানে আনন্দবাজারের কথা শুনে মনে হচ্ছে রুজভেল্টসহ সবাই নিজের নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো তুলেছিল” বলেই যেন জাতিসঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল! মফস্বলি আর কাকে বলে! আনন্দবাজার আর, নেহেরু থেকে প্রণব মোদী এভাবে সকলেই যদি মফস্বলি হয়ে যায় তো ভারতের ভবিষ্যত কী? একটু পড়াশুনা ও তথ্য সংগ্রহ আর বুঝাবুঝি ভারতকে কে করাবে? কঠিন এক পরিস্থিতি! আনন্দবাজারসহ এসব উগ্র হিন্দুজাতিবাদের ধারণা হল যে ঐ নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা এক উদগ্র হিন্দুজাতি হয়ে মোদীর মত যুদ্ধবাজ-দেশপ্রেমিক [jingoist] নেতার নেতৃত্বে জোরালো করে তোলা – এটাই হল চাবিকাঠি! যেটা একেবারেই হিটলারের জর্মানির নীলচোখের জর্মান জাতশ্রেষ্ঠত্ব চিন্তা। সে ভিত্তিতেই এবারের মোদীর বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট [Full text of PM Modi] লিখেছেন সম্ভবত হিটলারকে গুরু মানা কোন আরএসএস নেতা!

    কিন্তু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কী? কোন বক্তব্য? আর সেটা ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ, কী মিডিয়া ঠিক কী বুঝেছে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে কেবল আনন্দবাজারও বুঝেনি তাও নয়। আসলে এযুগে এখনো যারা “জাতিরাষ্ট্র চিন্তার” রাজনীতিতে আছেন কোন জাতিসংঘ বা এর চেয়েও কোন উন্নত প্রতিষ্ঠান বা দুনিয়া গড়া তাদের বুঝের বাইরেই থেকে যাবে, আমরা ধরে নিতে পারি। এছাড়াও উলটা এরা যদি হিটলারের মত আরো উগ্র-জাতি চিন্তার কেঊ হন তাহলে তো কথাই নেই। যেমন ছিল জাতিসঙ্ঘে মোদীর এই বক্তব্য। বাস্তবত জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘ কী তা বুঝে উঠতে পারে নাই। অন্তত নিচের কয়েকটা পয়েন্ট থেকে তা বুঝে নেয়া যায়।

    এক. জাতিসঙ্ঘের জন্ম হল সেই পথচিহ্ন-মার্ক যখন “জাতিরাষ্ট্র” [nation state] ধারণার নিকৃষ্ট পরিণতি হিসেবে হিটলারের জার্মানির উত্থান ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যা সারা ইউরোপ দেখেছিল। দেখার পরে জাতিসঙ্ঘের জন্ম ততপরতার সমান্তরালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে (১৯৫০ সালে স্বাক্ষর নেয়া শুরু আর ১৯৫৩ সালে কার্যকর) জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ত্যাগ করে অধিকারভিত্তিক ও নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতিতে নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ভারতের কোনো রাজনীতির ধারাই বা রাজনীতিবিদ তা টেরও পায়নি। একাডেমিকরাও এর খবর এখনো পেয়েছেন এমন জানা যায় না। বরং উলটা ভারতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটা রীতিমত দানব হয়ে উঠেছে। এই শব্দ দিয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী বা সম্পাদক যেকোনো ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারেন। কেবল জাতীয় স্বার্থের খাতিরে এটা বলছেন এই সাফাই দিলেই সব জায়েজ থাকবে। এমনকি মুসলমান বা দলিতের ওপর সব জুলুম অত্যাচার হত্যা সব করতে পারবেন। এই হলো বর্ণহিন্দুর চরম রেসিজমের একালের ভারত। হতে পারে এই ‘জাতীয়স্বার্থ’ ভঙ্গের ভয়ে একাডেমিকেরাও ভারত জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চান না।

    দুই. জাতিসঙ্ঘ জাতিরাষ্ট্র ধারণার ওপর কখনোই দাঁড়ানো নয়। এজন্য জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের সমাধান করতে বলেছিল রাজার ইচ্ছা নয়, কোন কথিত জাতির ভিত্তিতেও নয়। কাশ্মির ভূখন্ডের বাসিন্দা নির্বিশেষে তাদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য, রায় দিয়েছিল। নেহেরু তা করেন নাই, মোদি পর্যন্তও তা কেউ করেন নাই। সারা ভারতের রাজনীতি মনে করে হিন্দুত্ব ও জাতিরাষ্ট্র ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাদের রাজনীতি ও মহান ভারত রাষ্ট্র খাড়ায় আছ। রাম মোহন রায় থেকে শুরু করে (হিন্দুত্বের) জাতিরাষ্ট্র এখনও তাদের রাজনীতির মূলভিত্তি। তাতে কেউ হিন্দুত্বের ভিত্তি কথাটা গলা নামিয়ে বলে বা মুখে উচ্চারণ না করেও ধরে নিয়ে কথা শুরু করে। আর মোদীর মত যারা এরা সবাই গলা চড়ায় প্রকাশ্যে বলে, এই যা ফারাক। নেহেরুও তাই কাশ্মীরের রাজা খুজে বের করেছে। অথচ কাজটা সহজ ছিল কাশ্মীরের ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরণের জনগণের কাছে এপ্রোচ করতে পারতেন, তাদের সমর্থন চাইতেন যেই রাজনীতিতে নেহেরু যেতেই পারেন নাই, বা করতেন না।
    আর এছাড়া সুযোগ পেলেই অন্য বা পড়শি রাষ্ট্রকে অধস্থন কলোনিকৃতের মত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। কলোনি করে নেয়া ছাড়াও যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য করে লাভবান হওয়া যায় এটা ভারতের বুঝে দেখা হয় নাই। কলোনিচিন্তাই তার কাছে পথ থেকে গেছে। ভারতের ধারণা এটাই নিজরাষ্ট্র পরিচালনার খাসনীতি (নেপাল-ভারত চুক্তি এর খাস উদাহরণ)। অথচ এর উলটা কলোনিদখল হারাম – এই ধারণার উপর জাতিসংঘ দাঁড়ানো।

    তিন. একালের জাতিসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার লোভ জেগেছে ভারতের। আর মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে তা জাগিয়েছে আমেরিকা। চীন ঠেকানোর খেপ মারতে ভারতকে নিয়োগ করার জন্য এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তামাসা হলো ভারত সেটা বিশ্বাস করেছে। কারণ ভারত খবরই রাখে নাই যে আমেরিকার সেই মুরোদ এখন আর রাখে না। যা ছিল জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগে। যা এখন আর কিছুই নাই। এখন কেউ কাউকে সদস্যপদ পাইয়ে দিতেই পারে না।
    তাই আমেরিকান ঝুলানী মুলা খেয়ে বিশ্বাস করেছিল প্রণব মুখার্জি। গত ২০১০ সালে হাসিনার প্রথম ভারত সফরের যৌথ ঘোষণায় প্রণব তাই লেখিয়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশ ভারতে ভেটো সদস্যপদ পায় যেন তা সমর্থন করে। প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ এমনই যে তিনি বুঝেছিলেন হাসিনার মত অনেক দেশের সমর্থন বাগানো যেন জাতিসংঘে ভারতের ভেটোসদস্যপদ হাসিলের উপায়।
    ব্যাপার হল, ভেটো সদস্যপদ দেয় কে? ব্যাপারটা ভারতের আর জানাই হলো না। একালে মোদীও তাই বিশ্বাস করে বলছেন, “আর কত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে ভারত?”। মোদী পুরাই বেকুবি আরো ধারণাটা হল, এই কথাটা জোর দিয়ে উদগ্রভাবে বললে বোধহয় কেউ শুনবে বা কাজ হবে। মোদী বক্তৃতায় এবার সেটাই করেছেন। আর আনন্দবাজার আরেক বেকুব হয়ে এটারই প্রশংসা করে ছেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কথা হল, মোদী এটা কার কাছে চাচ্ছেন? জাতিসঙ্ঘ না আমেরিকা নাকি চীন? নাকি কারও কাছে এটা চাওয়ার জিনিষ কিনা সেটা মোদী বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চিত হয়েছেন? উগ্র জাতিবাদীর কাছে আসলে সব কিছুই জোর দাবি করে নেওয়ার জিনিষ! এর বাইরে কোন ভাবনা তাদের কাজ করে না!

    প্রথম কথা, এটা এককালের মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগের সময়ের কোন রাষ্ট্রের মুরোদের প্রশ্ন  ছিল যে কে কাকে সদস্যপদ দিতে পারে। যা সেকালে একমাত্র আমেরিকারই ছিল। এমনকি সেকালের স্টালিনেরও ছিল না। ইউরোপেরও কারোই না; তারা হিটলারের মার খেয়ে ১৯৪১ সালের আগষ্টের পর থেকে একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। ফলে এরা নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক মত হাসিল হয়েছে কিনা কেবল এতেই সন্তুষ্ট ছিল। যেমন পঞ্চম দেশ চীন এর মধ্যে ঢুকে নিজ ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিল কী করে?

    [যারা পড়তে কম সময় দিতে চান তারা নিচের প্যারাটাই বাদ দিয়ে পড়তে পারেন।]

    চীন কিভাবে ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিলঃ
    এর জবাবটা একালে যে জানে সে-ই সেকালের পুরা ব্যাপারটা বলতে পারবে। চীন আসলে ছিল সেকালের পুরা সময়জুড়েই  জাপানের কলোনি, পুরাটা না হলেও চীনের অন্তত ২৫% এর মত ভুমি সমসময়ই জাপানের দখলে ছিল।  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জর্মান ইতালি ও জাপানের বিরোধী যে মিত্রশক্তিজোট গড়ে উঠেছিল আমেরিকার রুজভেল্ট তার মূলনেতা হিসাবে নিজ স্বপ্নের আগামি দুনিয়া যার হবু গ্লোবাল নেতা হবে আমেরিকা, সেই দুনিয়ায় এশিয়ান কলোনিশক্তি হিসাবে জাপানকে ধবংস করে চীনকে এশিয়ার হবু নেতা ও আমেরিকার পক্ষের দেশ হিসাবে দেখতেন তিনি। মূলত রুজভেল্টের সে স্বপ্ন-কল্পনার কারণে চীন ভেটো সদস্যপদ পেয়ে গেছিল। এমনকি এটা চীনও তা চেয়েছিল বা কল্পনা করেছিল কখনও তা জানা যায় না।
    কিন্তু একটা আসল কথা এখনও এখানে বলা হয় নাই। আমাদের জেনে নিতে হবে। আমরা এতক্ষণ  যে চীনের কথা বলছি সেটা মাওয়ের চীন নয়। মাওয়ের চীন তখন উদয় হয় নাই, হয়েছিল আরও চারবছর পরে ১৯৪৯ সালে। তাই এতক্ষণ চীন বলতে বুঝিয়েছি – চীনা ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির নেতা চিয়াং কাইসেকের চীনের কথা। কিন্তু রুজভেল্ট ও কাইসেকের কপাল পোড়া দুঃখটা হল, ১৯৪৫ সালে কলোনিশক্তি জাপানের পতন হলে এর মাত্র চারবছর পরেই ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব চীনে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর চিয়াং কাইসেক পালিয়ে সেকালেও চীনেরই ভুখন্ড কিন্তু আলাদা দ্বীপ তাইওয়ানে, আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর একদিকে মাওয়ের বিল্পবীদের লংমার্চের ক্লান্তি অন্যদিকে সেকালের হবু বিশ্বশক্তির দুই নেতা স্তালিন ও প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান (১৯৪৫ সালে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট এই ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হন) এদের চাপাচাপিতে “যুদ্ধের বদলে শান্তির” কথায় মাও আর ফিরে তাইওয়ান দখলে যান নাই, পরে দেখবেন বলে ছেড়ে দেন। এতে পরবর্তিতে চিয়াং কাইসেক তাইওয়ানেই ঘাটি গেড়ে বসে যায়। যেটা এখনও আছে। এটা পরে আরও পোক্ত হয়ে যায় আমেরিকার কারণে। কারণ মাওয়ের চীনই আগের জাতিসংঘে রেজিষ্টার করা ভেটো সদস্যপদের চীন হিসাবে নিজের প্রতিনিধিত্ব চাইলে আমেরিকা এতে সমর্থন দিতে এবার গড়িমসি শুরু করেছিল। স্তালিনও কিছুই করতে পারে নাই। মাওয়ের চীন নিচু স্বরে মনে করে স্তালিন চায় নাই তাই হয় নাই। তবে সেসময় মাও চাইলে হয়ত আলাদা নতুন চীন হিসাবে সদস্যপদ পেতে পারত কিন্তু সেক্ষেত্রে আগের ভেটো সদস্যপদ চিরদিনের মত হাতছাড়া হয়ে তাইওয়ানে হাতে থেকে যেত। তাই মাওয়ের  চীন এরপর জাতিসংঘের সদস্যপদ নাই এভাবে এমন চীন হয়েও রয়ে গেছিল। কিন্তু কতদিন?
    একনাগাড়ে (১৯৪৯-১৯৭১) এই সময়টা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যখন আমরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রিত, খাওয়া না খাওয়া হয়ে আছি আর নির্যাতন, হত্যায় নিত্যসঙ্গি হয়ে দিন যাচ্ছে; ১৯৭১ মার্চের পরের সেই ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরের  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ঘটেছিল প্রকাশ্যে অনেক কিছু। সেখানে এক প্রস্তাবে উপর ভোটের সময় সংখ্যাগরিষ্টতার ভোটে “এতদিনের তাইওয়ানের ভোগ করা ভেটো সদস্যপদ” এর আসল হকদার মাওয়ের চীন বলে ঐ সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। আর এর চেয়েও বড় কথা এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ ঐ ভোটাভুটির সময়ে আমেরিকা ছিল আধারাজি কিন্তু আবার বাধাও দেয় নাই, এমন অবস্থান নিয়েছিল সেকারণে। কেন? এর পিছনের লম্বা কারণ হল, এটাই ছিল বিগত ১৯৬৮ সাল থেকে চলে আসা গোপনে চীন-আমেরিকান আলোচনা-বুঝাবুঝি-আলাপের প্রথম প্রকাশ। যেটা সেসময়ে ঘটেছিল পুর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিনিময়ে, আয়ুব-ইয়াহিয়ার শাসন কাল জুড়ে তাদের মধ্যস্ততায়। আর সাথে আরও সবচেয়ে নির্ধারক ঘটনাটা ছিল – ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন একথা বলে মাঝের দুদিন গোপনে কিসিঞ্জার সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন। সেসময়েরই একমত হওয়া ডিলের প্রথম সাক্ষাত আলাপ ও আতাঁত ছিল সেটা। মূলত মাওয়ের চীন আমেরিকান পুঁজি ও ব্যবসা বাণিজ্য চীনে প্রবেশ করতে দিবে যদি নিক্সনের আমেরিকা বিনিময়ে  চীন নামের ভেটো সদস্যপদ তাইওয়ানের বদলে এটা তখন মাওয়ের চীনের হাতে এনে দিবে তাতে রাজি হয়। এই ছিল ডিল। এভাবেই মাওয়ের চীন জাতিসংঘের ভেটো সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর মাঝের সময়ে লম্বা আলোচনা ও বুঝাবুঝি করে নেওয়ার পর ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় দেশে এমবেসি খুলে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক শুরু করেছিল।

    গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা আর কাউকে এখন ভেটো সদস্যপদ পাইয়ে দিবার বা এমন কোন নেতাগিরি মাতব্বরি করারই মুরোদ রাখে না; সব এখন প্রায় শুকিয়ে আসছে। এটা বুঝা কী খুব কঠিন? দ্বিতীয়ত আগামিতেও  জাতিসংঘের কোন সংস্কার হওয়া অথবা এমনকি ভেটো সদস্যের পাঁচ দেশের তালিকাও বদলাবে না,  যতক্ষণ না নতুন গ্লোবাল নেতা কেউ এসে বসছে। সেটা এখনই বলে দেয়া যায়। কারণ, এটা হবে সেই হবু নেতার নতুন করে জেগে উঠা প্রভাব ইচ্ছা বা এখতিয়ার। অন্যভাবে বলা যায়, তার সাথে অন্যরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আর কোন রাষ্ট্র নতুন করে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা পাবে, নাকি কেউই পাবে না অথবা বাদ যাবে। এখন যদি হবু সে নেতা চীন হয়, তবে তাই! সমস্যা হচ্ছে জাতিসংঘের উত্থানের সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে আপনার স্টাডি বা পরিস্কার বুঝাবুঝি না থাকলে আপনি মফস্বলি চিন্তাই তো করবেন, আমেরিকার টাউটারি মিথ্যা আশ্বাসই আপনার  কাছে সত্যি মনে হবে। আর এই বেপুথে যেতে আপনাকে আরও টানবে আপনার জাতিরাষ্ট্র চিন্তা। অথচ ১৯৪৫ সালের পর থেকে এই কলোনিচিন্তাটাই, এই জাতিরাষ্ট্র চিন্তা যে  মৃত সে খগবর আপনি রাখেন নাই।

    আজকের ভারত মানে এই হিটলার-অনুসারি হিন্দুত্ববাদী ভারত, একে  চীন আগামিতে নতুন নেতা হলে  কেন একে ভেটো সদস্যপদ দিতে যাবে, না অন্য কেউ দিবে? আর এমন সদস্যপদ পাওয়ার প্রাথমিক যোগ্য হবার জন্য তবু অন্তত কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও কমিটমেন্ট তো ভারতের লাগবে! কেবল হিন্দুত্বের জন্য যে ভারত নিজ দেশের অন্যান্য অ-হিন্দু সকল নাগরিকের প্রতি চরম বৈষম্য করে, কোন সাম্য আচরণের কথা চিন্তাও করতে পারে না সেই ভারতকে কে এবং কেন ভেটো সদস্যপদে টেনে তুলবে?

    আবার মোদীর ধারণা দেখেন, তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ এবং ভারতের মূল আদর্শ নাকি এক।’ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্বই আত্মীয়) এই মন্ত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সভায় বার বার’ নাকি জাতিসঙ্ঘে উচ্চারিত হয়ে থাকে। অথচ মোদীর ভারত হল এমন, যে হিন্দু নয় বা যার হিন্দুত্ব নাই এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারে না। সেই মোদী এমন ফাঁপা আওয়াজ দিচ্ছে!
    দেখা যাচ্ছে এটাই এখনও ভারতের জাতিসঙ্ঘ রিডিং!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৩ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “মোদি-প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

    হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

    গৌতম দাস

    ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Co

     

    Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

    নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

    মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

    গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

    মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

    এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

    আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

    তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

    একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

    নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

    ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

    তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

    এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

    পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

    এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

    আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

    অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

    ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

    এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

    মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
    এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

    শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
    তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

    অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

    অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

    এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

    এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
    প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

    সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

    একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

    সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

    এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

    হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

    গৌতম দাস

    ২৭ মে ২০১৯, ০০:০৬,  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2AB

     

    ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। তাতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং গত ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনের চেয়েও এবার আরও বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance (NDA)]। গত এমন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা মোট ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ২৮২ ও ৩৩৬।

    এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’ [Hindutto]- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচনটা হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হল ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

    এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচনে সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এক প্রধান প্রশ্ন ছিল যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? অর্থাৎ বৃটিশ-ভারত নামেই বাইরে থেকে একে এককাট্টা ভারত মনে হয়। কিন্তু আসলে তা অসংখ্য রেসিয়াল বৈশিষ্ঠের জনগোষ্ঠির ভারত। এছাড়া বৃটিশ্বরা এই ভারতকে শাসন করে গেছে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে। ফলে ভারত বলতে বিভিন্ন ধরণের জনগোষ্ঠির ভিন্নতাগুলো আবার যেমন তেমন না। যেমন ভারতে এখনও ২৯টা রাজ্য। মানে অন্তত ২৯ রকমের বড় বড় বিভক্তি এখানে আছে। এরকম আর কত কত ধরণের আইডেনটিটিতে এখনও বিভক্ত হয়ে আছে ভারতের নাগরিকেরা।  এই ভিন্নতাগুলো সত্বেও তাদের একটা রাষ্ট্রে ধরে রাখার উপায় কী? এই ছিল নেহেরুর কাছে মুখ্য প্রশ্ন। সে  কোন বন্ধন, যা দিয়ে তাদের আটকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায়?

    এই কঠিন জটিলতার সবচেয়ে সহজ জবাব নেহেরু খুজে নিয়েছিলেন যেটা তা হল “হিন্দুত্ব”। মানে হিন্দুত্ব হল সেই আঠা বা গ্লু [glue] যার ভিত্তিতে নাগরিকেরা জোটে বেধে একতায় তাদের এক থাকার উপায়। সেই থেকে নব গঠিত ভারত হিন্দুত্ব হল নাগরিক ঐক্যে এভাবে গড়ে উঠেছে।বলাই বাহুল্য এটাই ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে একক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, the biggest disasterous decision.

    প্রশ্নটা আসলে অরিজিনালি ছিল মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বুঝাবুঝির বা বলা যায় বুঝাবুঝিতে ঘাটতি থাকলে সেই অভাব থেকে উত্থিত এবং বিপথগামী প্রশ্ন। যেমন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে বা করার কালে আদৌ এমন ভিত্তি খুজে ফেরা  জরুরি কিনা? সরাসরি উত্তর হল যে – একেবারেই না। কিন্তু তবু নেহেরুর এই বিপথগামী পথই ধরেছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে এটা ১৯৪৭ সালের আগষ্টের পরে উদয় হওয়া প্রশ্ন নয়। এটা এর আগের পুরা উনিশ শতক (১৮১৫-১৮৯৯) এই সারাটা সময় চিন্তার বিপথগামী গমণ বজায় ছিল।  সেদিকে একটু পরে আবার আসছি।

    নেহেরুর কাছে ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না – এটাই ছিল তাঁর চোখে সদুত্তর। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অ-হিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে, মারজিনাল করে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানের দিকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। তা হল, হিন্দুত্ব একটা কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়। এরই প্রতিভূ বা সব বৈশিষ্ট-চিহ্ন নিজেই হাজির হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’।

    কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যেই সরাসরি হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে আরএসএসের নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে। দক্ষিণ ভারতের কমল হাসানকে অনেকে চিনে থাকতে পারেন যারা ভারতীয় সিনেমার খবর রাখেন। তিনি সিনেমার খ্যত নায়ক। তিনি সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু নাথুরাম সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি মামলা খেয়েছেন। পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জামিন চেয়ে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন,  “Godse himself, in his book Why I killed Gandhi, had categorically stated that Mahatma Gandhi had acted against the interest of Hindus, and had blamed him for partition, Mr. Haasan said.”। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস-বিজপি দুপক্ষই ইস্যুটা কার্পেটের নিচে ফেলে চেপে যেতে চান। আরএসএস তাদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্ট বা কর্মিসভায় নাথুরামকে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাদের হিরো বলে তুলে ধরে। যদিও বাইরে খুব বেশি এই ভাবনা প্রচারে আনতে চায় না। আর যে মোদী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নাথুরাম তর্কে ঢুকতেই চান না।

    যে যাই হোক, ১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ গড়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা একালের নেতা এলকে আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে [… providing a fresh ideological narrative to the people,” ] বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

    কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদী নির্বাচনে নেমেছিলেন?  ছোট্ট করে এনিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যাক। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে আমরা তুলনা করলে বুঝব, ২০১৪ সালে মোদীর মুখ্য (catchy) ইস্যু ছিল মূলত “অর্থনৈতিক”। অথচ এবার অর্থনৈতিক শব্দটাই তিনি কোথাও উচ্চারণই করেন নাই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চলতি শতকের প্রথম দশক (২০০১-০৯) থেকে। যেখান থেকে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংকের ধারণা উঠে এসেছে। তো “রাইজিং অর্থনীতির” ইন্ডিয়া এর একটা। মোদীর আগের কংগ্রেস (২০০৪-১৪) সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে এর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশাআকাঙ্খাও চরমভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। সেদিকটা খেয়াল করে মোদী ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ঐ অর্থনৈতিক ইস্যু সেটাকেই আবার উস্কে চাঙ্গা করে তুলে ধরে দাবি করেছিলেন তিনি এটা আবার তুলে সচল করতে পারবেন, কারণ গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখমন্ত্রী তিনি। তিনি তখনও থার্ড টার্মের মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই খাতিরে যেন তাঁকে ২০১৪ নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল কিন্তু তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তাঁর নাই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি [demonitization & GST]  ইস্যুতে তার কপাল খুলে নাই, তা যতই ভাল প্রোগ্রাম হোক বা না হোক। ডিমনিটাইজেশন মানে নোট বাতিল আর জিএসটি মানে ভারতের এক রাজ্যের পণ্য আর রাজ্যে ঢুকলে টাক্স আরোপ করা হয়, এসব পাল্টাপাল্টি ট্যাক্সকে উঠিয়ে নেয়া, সরল নিয়ম করা আর আদায়কৃত ট্যাক্স শেয়ার করার ফর্মুলা চালু – এককথায় বিশেষ করে পরেরটা খুবই ভাল কাজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন, প্রথম তিন বছরের সাফারিং এর কারণে নগদ অর্থনীতিক পারফরমেন্সের বিচারে তিনি ফেল করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি একেবারেই ফেল করেছেন।

    কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, মোদীই ভারতের এক ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে তিনি নিজের দল এবং বিশেষ করে নিজ সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যেটা যে, দলীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে একটা দল -অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বা প্রশাসন বিষয়ক একাদেমিক যারা দলের খাতায় নাম লেখানো – এমন  এদেরকে নিয়ে গঠিত কোন টিমের পরামর্শের দিয়ে সরকার চলছে। না মোদী এসব এমেচার করতে রাজী না।  বরং তিনি তা করে থাকেন ও ভরসা করেন তা হল প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানী নিয়োগ দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদী-অমিতের বিশেষ “রাজনৈতিক ব্রান্ড” এটাই। এজন্য তারা বিজেপির মত দল করলেও খুবই স্মার্ট। এমনকি নির্বাচনও তিনি করেন এমন কোম্পানীকে পরামর্শক রেখে। এই জায়গায় মোদীর বিজেপিকে ধর্মতাত্বিক নেতা বা মফস্বলী কোন নেতা জ্ঞান করা খুবই ভুল হবে ও খাটো করে দেখা হবে।

    আর সেই কন্সাল্টেন্টদের পরামর্শেই এবার তিনি একক – কেবল “হিন্দুত্ব” ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। তবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ যেটা উপরে বলেছি যে, এটা সম্ভব হল কারণ ভিত্তি হিসাবে ভারত-রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠিত। কিন্তু যে উত্তর এখনও অমীমাংসিত তা হল – বিভিন্ন আত্ম-পরিচয় বা বৈশিষ্টের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কেন কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে – আটকে ধরে রাখার কোন আঠা বা গ্লু যেমন একটা হিন্দুত্ব – এর প্রয়োজন আদৌও কী অনিবার্য, এসেনসিয়াল? না কী অপ্রয়োজনীয় এবং বিকল্প আছে?  এছাড়া কবে থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টাকে “এসেনশিয়াল” মানে হিন্দুত্বকে এসেনশিয়াল বলে বুঝে এসেছেন, সেটাও খুজে দেখা ও লক্ষ্য করা খুবই জরুরি।

    এই প্রশ্নটা ভারতে তো বটেই,উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, তাই স্পষ্ট উত্তর নাই। এবং এক ভারতের কারণেই উপমহাদেশের সবখানেই এটা অমীমাংসিত ও সব অসন্তোষের উতস এটা।

    আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক রূপ বৈশিষ্ট হল “রেনেসাঁ” [Renaissance] চিন্তা। ইউরোপের এই রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বৃটিশ-ভারতের রাজধানী, বাংলায় নিয়ে এসেছিল বৃটিশ-শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে থাকেন সকল রেনেসাঁবাদীরা। তার সক্রিয়তার প্রধান সময়কালটা হল (১৮১৫-৩৩)। তিনিই প্রথম এবং তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পিছনে পুরা ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, একটা “হিন্দুত্ব” থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাক্ষ্ম ধর্ম-এর প্রবর্তক যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই – এক হিন্দু নাশনালিজম। তবে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়গুলোতে এটার কার্যকারিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে পরবর্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দের ইত্যাদি্র মত কিছু ব্যক্তিত্বের হাত ঘুরে আরও রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের জন্মের সময় (১৮৮৫) থেকেই এর  হাতে পৌছাতে শুরু করেছিল। আরও পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদ করা ও পরবর্তিতে তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলন – এসবের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। আর সবশেষে দেশভাগের পরে নেহেরুর হাতে সেই একই “হিন্দুত্ব” কিন্তু এবার নতুন প্রয়োজনে – এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। আর  সেই থেকে আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই পুরা সময়ে  হিন্দুত্ব চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সমস্ত বিভক্তির উতস এখানেই। এটাকে একটা অন্ধের হাতড়ানোও বলতে পারি! কারণ লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ভারত যদি একটা মর্ডান রিপাবলিকই হতে চেয়েছিল বা চেয়ে থেকে থাকে তবে তার আবার “হিন্দুত্ব” এর, হিন্দু নাশনালিজমের দরকার কেন? কিভাবে তা হয়? এর জবাব কংগ্রেস বা আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি কখনো দেয় নাই, দিবে না – খুঁজবে না। অথচ অনিবার্য এসেনশিয়াল মনে করে রাখবে।  এতেই তারা এর সাহায্যে অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠির উপরে আধিপত্য কায়েম করতে পারার সুবিধার দিকটা মুখ্য – এই সুবিধার দিকটাই তাদের জন্য সব চেয়ে লোভণীয় ছিল বলে। যদিও মর্ডান রিপাবলিক বলতে একে ধর্মীয় নাশনালিজম বলে মানে করা – এই সুবিধাবাদি ভুল বুঝার ঝোঁক ইউরোপেও ছিল।

    সবচেয়ে বড় তামাশার দিকটা হল, হবু  “মর্ডান রিপাবলিক” ভারত বলতে একে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম বলে বুঝা ও মানে দেওয়া কিন্তু একে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ” বা “স্বদেশি আন্দোলন” বলে নাম দেয়া আর ওদিকে এভাবে এর আসল পরিচয় হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম লুকিয়ে রাখা ফেলা হয়েছে। শুধু তাই না। এর প্রভাব এখানেই শেষ না। এভাবে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম এর রাজনীতি করা এটাই মুসলমানদের জবরদস্তি ঠেলে দেয়া হয়েছে যেন তাঁরাও ইসলামি নাশনালিজমই করে – মুসলিম লীগ করে আবির্ভুত হয়। আর এইবার সেই কঠিন তামাশাটা! এই মুসলমান আর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ লটকে দেয় যে এরা ধর্মীয় রাজনীতি করে, এরা সাম্প্রদায়িক, এরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চায় ইত্যাদি। ফ্যাক্টস হল, হিন্দুরা যদি হিন্দু নাশনালিজমের রাস্তা ধরে  তাহলে এরপর মুসলমানেরা যাই করবে তা এক ইসলামি নাশনালিজমই তো হবেই!

    অতএব সেই হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম – এটাই একালে মোদীর হাতে স্বরূপে হাজির হতে চাইছে।
    এমন কী মোদীর গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে সামাজিক বিভাজন তো বটেই যেভাবে সংগঠিতভাবে  সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল,  “মুসলমানকে ধরে জয় শ্রীরাম বলাতে হবে” এর নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে, [এই মাত্র দ্য হিন্দু পত্রিকার খবর এটা এবারও শুরু হয়র গেছে – মুসলমান তরুণ দর্জি বাসায় ফিরছিল, তাঁকে ঘিরে ধরে বলা হয়েছে, মাথার টুপি খুলে ফেলতে, এরপর জবরদস্তিতে জয় শ্রীরাম বলতে বলে পিটানো হয়েছে।] গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে তারা নাজেহাল “সামাজিক ন্যুইসেন্স” তৈরি করতে নেমে পড়েছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে একইভাবে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা ঐ মুসলমান গৃহস্থকে খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ এরপরেও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে? কেঁউ মাথা ঘামায় নাই। কংগ্রেসের নেতাকর্মি অথবা কোন কমিউনিস্ট এনিয়ে প্রশ্ন করার মুরোদ আছে দেখি নাই আমরা।  মর্ডান রিপাবলিকের অর্থ তাতপর্য তারা নুন্যতম কিছু বুঝে অথবা চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ হচ্ছে এটা – এই বুঝ থেকে তারা কখনও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারে নাই। এটাই একটা বিরাট প্রমাণ যে ভারত আসলেই এবং বরাবরই একটা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র। এর বাইরে রাষ্ট্র কী, অন্য কোন রাষ্ট্রের রূপ কী – এনিয়ে ভারতের কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা কোন প্রগতিবাদীদের কোন বুঝ, কোন স্টাডি কোন বুঝাপড়া কিচ্চু নাই।

    এই কথার আরও প্রমাণ পেতে চাইলে  আরও লক্ষ্যণীয় হল, যেমন এখনকার কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী – এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত। মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও কংগ্রেস নুন্যতম অন্তত প্রতীকী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। কংগ্রেসে তা না হয়ে, আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই তথাকথিত সেকুলারিজমের জামাখুলে প্রকাশ্যেই নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে এটা নাকি মোদীর মত হার্ড হিন্দুত্ববাদ না,”সফট হিন্দুত্ববাদ”। এই দাড়িয়েছে এখন কংগ্রেসের ‘সেকুলারিজম’। অর্থাৎ  তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস এখন আর হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদীর হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। ওদিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে তারাও সব আসন হারিয়েছে শুধু তাই না, নিজেদের ভাগের ২২% ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদের নির্বাচনে, মোদীর দলকে। তাতে ব্যাপারটা এখন দাড়িয়েছে এই যে, হিন্দুত্ববাদ ঠেকানোর বোলচালের দলগুলাকে মোদী এবার তাদেরকে আসল চেহারায় এনে ছেড়েছে, এটাই আসলের মোদীর ক্ষমতার আসল সাফল্য!

    আবার লক্ষ্য করা যাক, এই নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হয়ে হলে, পরদিন (২০ মে) মোদী হিন্দু তীর্থস্থান উত্তরপ্রদেশের পাহাড়ে প্রাচীন কেদারনাথের মন্দির গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে বসে গেলে তা দেখে কংগ্রেসীদের জবাব হল আমাদের রাহুল তো সেখানে কেদারনাথের মন্দিরে পায়ে হেঁটে গেছিলেন আর মোদী গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে, কাজেই আমরা শ্রেষ্ট।  আসলে এইখানেই মোদীর হিন্দুত্ব অনেক আগেই বিজয় লাভ করে গেছে। তাই ভোটের ফলাফলে না, মোদী আসলে এখানেই বহু আগেই কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন।

    হিন্দুত্ব কত ভারী এর লক্ষ্যণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন। মোদীর হিন্দুত্ব কত পাওয়ারফুল,বাকি সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে, পিছনে ফেলে নিজে সবার উপরে উঠে যেতে পারে এরই প্রাণ এগুলো।

    যেমন, সবপর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদী-অমিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তাদের জোট ৩০০ এর আশেপাশের আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তব ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও ভালমত ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ শুরু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেছে তা নয়, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করে নাই, এটা এমনই ফলাফল।

    আবার, সাধারণত রাজ্য সরকারে (যেমন রাজস্থানে কংগ্রেস ) কোন দল সরকারে আছে এটা লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল  সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথায় এমন ফ্যক্টর এবার কাজ করে নাই। এমনকি যেখানে গত মাত্র পাঁচ মাসে আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা কোন বিজেপি বিরোধী দল জিতেছে সেখানেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই এবার বিজেপি আবার ফিরে ঐ রাজ্যের প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এই অবস্থা দেখা গিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় বা কর্ণাটক এমন রাজ্যে। এসব রাজ্যের ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। খুব ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এমন দেখা যায় না। অথচ বিজেপি এবার এমন হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই জিতেছে।

    আবার,নর্থ-ইষ্ট মানে আসাম-ত্রিপুরাসহ ছোট ছোট ট্রাইবাল সাত রাজ্য। আসামে এনআরসি [National Register of Citizens (NRC) ] অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর সর্বশেষ চল্লিশ লাখ হিন্দু-মুসলমান লোক নানান কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ জোগাড় করতে ফেল করেছে। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। গতবছর জুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। কারণ নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছিল। মিজোরামে “বাই বাই ইন্ডিয়া” বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর চলতি হিন্দুত্বের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এজাতীয় সব “কথিত নাগরিক আপত্তি” হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি সাত রাজ্যেই বেশিরভাগ আসন নিয়েছে, কোন রাজ্যে সবগুলোই।

    আবার, কলকাতার মানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রচন্ড রকমভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তাঁর তৃণমুল দলের লোকসভার ৩৪ আসন এবার নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি দুইটা থেকে এক লাফে ১৮ আসন  পেয়ে গেছে। তৃণমুল বা মমতা রাজনীতি ও তাঁর সরকারের অনেক দোষ বা অভিযোগ থাকতে পারে, অনেকের অপছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রধান বাধা এখনো এই মমতাই। বিশেষ করে বিজেপির এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে আরও সফল হতে গেলে মোদীর প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানোর ব্যবস্থা করা – তা বলাই বাহুল্য।

    ফলাফল প্রকাশের দিন, নিজের বিজয় নিশ্চিতের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছেন। এখনও করছেন। কিন্তু এসব জায়গায় সেখানে তিনি আগে নির্বাচনি প্রচারের সময়ে কত কী বলেছেন ঘৃণা ছড়িয়েছেন সব ভুলে এমনকি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে নির্বাচনের পরে এখন “তিনি সবার নেতা” বলে দাবি করেছেন। তিনি নিজেই  গত ২০১৪ নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – সেই শ্লোগান ওদিন তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হবার পরে প্রথম এবার উচ্চারণ করলেন। এবার নির্বাচনের পর ভোল পাল্টায়ে তিনি নিজেই “সংখ্যালঘুদের” সহানুভুতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, বলছেন”He said if his first term was about “Sabka sath, sabka vikas (Alongside all, development for all)”, his second would stand for “Sabka sath, sabka vikas, sabka vishwas (Alongside all, development for all, trust of all)”।  এই নির্বাচনি বিজয়ে পুরা সময় তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলার সাফল্য গাথা দিয়ে। “পাকিস্তান” = “মুসলমানের” বিরুদ্ধে তিনিই একমাত্র “ভারত-রক্ষক” – এই ছিল তার বয়ানের পাঞ্চ লাইন। আর দ্যা হিন্দু পত্রিকা তাদের নির্বাচন উত্তর গবেষণার ভিত্তিতে বলছে এই বক্তব্যের প্রভাব এমন ছিল যে এক্সিট পোলে অংশ নেয়া মানুষ  বলেছে অর্থনীতি মোদীর ঘাটতি আছে, সাফল্য নাই কিন্তু তবুও তারা মনে করে বালাকোট ইস্যুটাও গুরুত্বপুর্ণ – তাই মোদীকে ভোট দিয়েছেন। দা হিন্দু Balakot plank বলে উপশিরোনামে বলছে, বালাকোটকে ইস্যু করে মোদী রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ আর উত্তরাখন্ডের সব আসনের দখল পেয়েছে [all seats in Rajasthan, Gujarat, Madhya Pradesh, Haryana, Himachal Pradesh and Uttarakhand.]

    আমাদের মনে রাখতে হবে, একথাটাও সঠিক যে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির মুখ্য টার্গেট – প্রধান উদ্দেশ্য পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে শেয়ার না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে এখন সুশীল হয়ে বলছে  নির্বাচনের সময় “মোদী একটু হিন্দুত্বের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু এখন সে এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল হয়ে যাবে” ভাবতে পারেন, একথা বলেছেনও। ইতোমধ্যে অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। যেমন কলকাতার টেলিগ্রাফ লিখছে Narendra Modi tried to shake off his divisive image and reach out to the minorities on Saturday। এছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি, একথাও ঠিক। কিন্তু একটা জিনিষ এখনই সবাই নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারে। তা হল – হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদীর পক্ষে আর সামনে আগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজনীতিতে – এটা আর সম্ভব নয়।

    অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির “আগানোর” প্রধান কর্মসুচী হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মত “নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি” করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এনিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কিন্তু তাতে কী হতে পারে?

    কলকাতায় যদি আসামের মত এনআরসি-ততপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোন হিন্দু নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে মোদী সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দিবার ব্যবস্থা নিবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহালে শেষ করা হবে। মুসলমানদের বেলায় কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয় অন্তত ক্যাম্পে নিয়ে ফেলে রাখবে। কপাল ভাল থাকলে তাকে আগের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন কোন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে! এতদিন এককথায় গরীবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল সেসব ছিনে এখন  সকলের জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করবে।

    ওদিকে লক্ষ্যণীয় আর এক বিষয় হল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের বাংলায় নতুন করে এনআরসি-ততপরতা বা বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে ডেকে আনার রাজনীতিটা ঠিক পছন্দ করছে, তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হতে পারে এটা কাজ বেড়ে যাবে অনেক, অথবা অজানা বহু অভিমুখ গতিমুখ তৈরি হয়ে যাবে তা কোথায় গিয়ে না ঠেকে সে আশঙ্কায়, হতে পারে। অথবা হতে পারে ভান করা। যাতে এর প্রতিক্রিয়া কোথায় কোন পর্যায়ে হচ্ছে আগামিও হতে পারে তা জেনেবুঝে নেওয়ার সুযোগ নেয়ার কারণ। সারকথা তারা স্বস্তিদায়ক ঘটনা হিসাবে দেখছে না।

    (ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫ টা। এখানে মোদীর টার্গেট হবে [উত্তর প্রদেশের মত এটা আশিটা না হলেও] এই ৬৫ আসন এটার গুরুত্ব কম হবে না – এগুলো বিজেপির পক্ষে হাসিল করা। এক এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসন গুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদীর আশু লক্ষ্য।

    মতুয়াঃ
    বাংলাদেশে ট্রাইবাল বলতে পাহাড়ি বা সাঁওতালদের মত বিক্ষিপ্ত নানান পকেট আছে এগুলাই। এছাড়া সমতলিদের মধ্যে কোন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠি  এখনও টিকে বা বজায় থাকার কথা এখন আর জানা যায় না। বুঝা যায় তারা বিভিন্ন মানুষ মিলেমিশে এখন একই সমা্জে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা গড়ে পুরান ট্রাইবাল পরিচয়্টা ঘুটা দিয়ে গুলিয়ে দিয়েছে। তবু আমাদের গোপালগঞ্জের জেলার “মতুয়া” বলে এক হিন্দু জনগোষ্ঠির কথা জানা যায়। বাংলাপিডিয়া “মতুয়া”দের কথা বলছে। বলেছে, “গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারা” বলে এদের চিনিয়েছে। বলেছে ,“গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত”। এই জনগোষ্ঠিরই প্রধান বা বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বণগাঁও মহুকমাতে সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে।

    গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠি বর্তমানে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘদিনের এমপি ছিল মমতা ঠাকুর। সে তৃণমুল দলের এমপি ছিল, কিন্তু সে এবার হেরে গেছে। আর সে জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন [তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাল মতুয়া, বনগাঁয় জয়ী শান্তনু]। এই দুই প্রার্থীই যদিও মুল গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। কিন্তু কেন মুখ ফেরাল? আনন্দবাজার লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে এখানে সভা করে গেছেন। “মোদীজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে”। আর সেই থেকে এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাতাল শুরু হয়েছে। পুরা ব্যাপারটাই ইঙ্গিত দেয় যে মোদী এনআরসি আন্দোলন নিয়ে কিভাবে আগাতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও একারণেই এবার দুহাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মতুয়াদের নড়াচড়াটা হিন্দুদের অবস্থা বুঝার জন্য প্রতীকী।

    আসামের এনআরসি ততপরতা শুরু করার সময় মোদী সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা “ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” হয়ে থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষ্য দিয়ে সেকথার অনুরণন করে বিবিসিকে বলছেন, “নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন মি: মোমেন”। কিন্তু তাঁর পরচুলার মতই একথাও আসলে নকল, কোন ভরসা নাই। অন্তত নির্বাচন পরবর্তি নড়াচড়াগুলা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর হল তার কথায়, “বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোন কারণ নেই” । আচ্ছা মোদীর মুখপাত্র হয়ে তাঁর এই সাফাই দেয়াটা কেন প্রয়োজনীয়? কিছু না বলে “দেখছি” বলে থাকা যেত না?  সত্যি অদ্ভুত!

    কিন্তু আর একটা দিক যখন আগে ভারত “আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” বলেছিল তখন “বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে” এমন কোন আইন বা ইস্যু ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা এই আইন এখন আছে। যা এখন নড়াচড়া করে উঠবে, সচল হবে অনুমান করা যায়। এটা নিয়ে বাংলাদেশেও একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। তবে দুই তরফে। এক, একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ততপরতা শুরু হলে সেখানে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার এই ততপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোন খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হলে এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, তা বলাই বাহুল্য। তারা খুবই ক্ষুব্ধ হবে অনুমান করতে পারি। তাই পুরা বিষয়টা নিয়ে মোদী সরকার ঠিক কী কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে এর একটা এসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কোথায় এবং কী কী তা নিয়ে কথা বলা, সম্ভাব্য স্বার্থবিঘ্ন কী হতে পারে তা নিয়ে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও ততপর হওয়া জরুরি। আমাদের সকলেরই সুস্থ শরীর ব্যস্ত হয়ে উঠার, অস্থির হয়ে উঠার দিন কী সামনে! সত্যি কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য কে জানে! আমরা সবাই কী বলি হয়ে যাব এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত  ২৫ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি!“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

    মোদীর শরীরী ভাষা তা ছিল না

    গৌতম দাস

    ২০ মে ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Ap

     

     

    ভারতের লোকসভা নির্বাচন প্রায় শেষ। এটা ভারতের ১৭তম লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন।  নির্বাচনের ছয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছিল আগেই। আজ ১৯ মে রোববার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এরপর ২৩ মে সকাল থেকে একযোগে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। ঐদিনই দুপুর ১২টা নাগাদ কোন প্রার্থী কে কোথায় এগিয়ে থাকছেন তা আঁচ পাওয়া শুরু হয়ে যাবে। কোন দল সরকার গড়তে যাচ্ছে এর অভিমুখ আন্দাজ করাও ঐদিনই সন্ধ্যার পর থেকে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কে কোন আসনে জিততে যাচ্ছে; কোন দলের প্রাপ্ত মোট আসন সংখ্যা কেমন হবে ইত্যাদিও। আর প্রাপ্ত সে ফলাফলের ভিত্তিতে পরেরদিন ২৪ মে থেকে প্রত্যেক দলের জোট গড়ার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যাবে। ফলাফল কী হতে পারে এপ্রসঙ্গে প্রায় সবারই অনুমান ভারতে একটা কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

    আসলে ভারতে কোয়ালিশন সরকার এবারই নতুন না। বরং গত ১৯৮৯ সালের নবম লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সব সরকারই ছিল আসলে কোয়ালিশন সরকার। এমনকি মোদীর চলতি সরকারে বিজেপির মারজিনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এটাও ছিল এক কোয়ালিশন সরকার। তবে এ পর্যন্ত এসব কোয়ালিশন সরকারগুলো গঠিত হয়েছিল হয় কংগ্রেস না হয় বিজেপির নেতৃত্বে। সেকালে এ’দুই পার্টির কোন একটা কোয়ালিশনের নেতা না থাকলে সরকার টিকে নাই। যেমন, ১৯৯৬ সালে দেবগৌড়া-জ্যোতি বসুর কোয়ালিশন ছিল এমন এক ব্যতিক্রম যা ১৮ মাসের বেশি টিকে নাই। তবে এবারই কংগ্রেস অথবা বিজেপিকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার সম্ভাবনা আবার উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও এরকম আরও কয়েকজন যেমন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেতা মায়াবতী বা অন্ধ্রপ্রদেশের সিটিং মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুও আছেন যারা এমন সরকারের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী বা সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। আর মমতাই এমন ভিন্ন ধরণের কোয়ালিশন সরকারের বিশেষত্বকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে একে আলাদা নাম, ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’-এর সরকার বলে ডাকছেন।

    দুনিয়াতে  রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিপরীত ধারণা হিসেবে ইতিহাসের একপর্যায়ে উঠে আসে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা। যার মূল বৈশিষ্টগত ফারাক ও নতুনদিকটা হল,  রিপাবলিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সরকার বলতে এটা পাবলিকের গণসম্মতির রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রে এর ক্ষমতার উতস – নাগরিক লোকক্ষমতা।  এছাড়াও এমন রাষ্ট্রের আবার আরও একটা রূপ আছে। বিশেষত কাঠামোর দিক থেকে বিচারে দুনিয়ায় সেই রাষ্ট্র-রূপটার নাম – ফেডারেল রিপাবলিক রাষ্ট্র। একে ফেডারেল বলার কারণ হল, এখানে রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রদেশ নিয়ে গঠিত বা বলা যায় রাষ্ট্র অনেকগুলো প্রাদেশিক ইউনিট বা রাজ্যে বিভক্ত থাকে। তবে ফেডারল রাষ্ট্রের  বৈশিষ্টের মূল জায়গাটা হল, এখানে রাষ্ট্রের  কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও সম্পদ ইত্যাদি কী ভিত্তিতে রাজ্যগুলোও এসব উতস ব্যবহারের সমান সুযোগ [access] পাবে তা আগেই বিস্তারিত এর লিখিত নিয়ম বলা থাকে, একটা ন্যায্যতার ভিত্তিও যেন সেখানে প্রতিষ্ঠিত থাকে। রাজ্য বা রাজ্য-সরকারকে দেয়া বরাদ্দ যেন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতার প্রধানের পছন্দের বা অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে, এভাবে এখানে রাজস্বসহ সব বরাদ্দ হতে হয়। রাজস্ব, সম্পদ বা রাজনৈতিক ক্ষমতা ইত্যাদিতে কোনো কোনো রাজ্য যেন কোন বৈষম্যের শিকার না হয়- এমন কাঠামোগত প্রটেকশন ব্যবস্থা থাকাই ফেডারেল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। ভারত আমেরিকার মতো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। তবে ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় দলগুলোর সমন্বয়ে একটা কেন্দ্রীয় সরকার গড়া অর্থে মমতা এটাকে ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ [Fedaral Front]- এর সরকার বলছেন।

    গত ১৭ মে ছিল শেষপর্বের এবং পুরা নির্বাচনের প্রচারণার সর্বশেষ দিন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী ততপরতা ও কার্যক্রমের সমাপ্তি হিসেবে দলের প্রধান অমিত শাহকে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসেছিলেন। অমিত শাহ মুখস্থ কথার মত সেখানে বিজেপির জোট তিন শতাধিক আসন পাবে বলে দাবি করে আসছিলেন। মজার কথা হল, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক পাশে বসা মোদীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বলছিল না। ঐ সাংবাদিক সম্মেলনের পুরা সভা পরিচালনা ও শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর সবই অমিত একাই করছিলেন, মাঝে মোদী কেবল একবার তার প্রশাসনের পাঁচ বছর সমাপ্ত হল বলে নিজের কিছু অনুভূতি প্রকাশ ও শেয়ার করেছিলেন। তবে কোনো কারণে তিনি এদিন সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি, সব অমিত একাই সামলেছেন। দ্যা হিন্দু পত্রিকা বলছে, এটা গত পাঁচ বছরের শেষে এক বড় ব্যতিক্রম [At his first press conference in 5 years, Modi says Amit Shah will take questions]। তবে মোদীর বক্তব্যের শরীরী-ভাষ্য ছিল ভিন্নররকম। যেন তিনি বলতে চাইছিলেন, গত পাঁচ বছরের শাসন আর এই নির্বাচনী প্রচারণা মিলিয়ে যা কিছু পেরেছি সব করলাম। যেন তিনি এখন ভগবান ভরসায় আছেন যদি তিনি আবার তাঁকে ক্ষমতায় আনেন। অর্থাৎ ক্ষমতায় তিনি আবার ফিরে আসছেনই এমন কনফিডেন্স, গত ২০১৪ সালের মত, মোদির নিজের ওপর আস্থা বা মোদি-জ্বর ইত্যাদি কোনটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিবিসি (১৮ মে দিবাগত) রাত দশটায় এক খবর ছেপেছে যেখানে বলা হয়েছে মোদী উত্তরপ্রদেশেরও আরও উত্তরে প্রাচীন কেদারনাথ মন্দিরে ধ্যানে বসেছেন। বিবিসি শিরোনামে বলেছে এটা মোদীর “স্পিরিচুয়াল ব্রেক” [spiritual break]। ঘটনা হল তিনি নিজেই বা তাঁর দল টুইটারে ছবিসহ এই খবর দিয়েছে। একই ছবি দিয়ে তবে বিবিসির একটু আগে মধ্যপ্রাচ্যের এক ইংরাজি দৈনিক গালফ টুডে রিপোর্ট করেছে যে এই  ছবি সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে। টুইটারেও অনেকে  মন্তব্য লিখেছে। একজন বলছে তিনি গতদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের সময় থেকেই তিনি ধ্যানে [@Bhai_saheb: Yesterday modiji was meditating in press conference and today at kedarnath]। সে যাই হোক মোদীর “মন অশান্ত” এটা স্বপ্রকাশিতভাবে বুঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ আগেরদিনের সাংবাদিক সভায় মোদীর শরীরী ভাষায় যে তিনি নিজেকে “হবু বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী” হিসাবে কনফিডেন্ট মনে করতে পারছিলেন মনের সেই অস্থিরতার কথাই আজকের টুইটারের ম্যাসেজ থেকেও প্রতিষ্ঠিত হল। এমনিতেই মোদী চরম মিথ্যাবাদী বলে মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করেছিল দুদিন আগে যে – ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট তিনি অনেক আগেই ব্যবহার জানতেন বলে এমন আগের সময়ে তিনি দাবি করেছেন সেটা ভারতে বাণিজ্যিকভাবে  ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট চালু হবার বছর পাঁচেক আগের ঘটনা হয়ে যায়।

       ______________________

    সর্বশেষঃ  আজ ১৯ মে সন্ধ্যা থেকে এই প্রথম এক্সিট পোলের মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য আসতে শুরু করেছিল। এক্সিট পোল মানে ভোটের বুথ ফেরত কিছু সংখ্যক লোকের সাথে কথা বলা – এমন নমুনার ভিত্তিতে সংগৃহিত তথ্যের বিশ্লেষণ মন্তব্য। এমন আটটা  কোম্পানি থেকে প্রকাশিত আট এক্সিট পোলের ফলাফল  মানে অনুমান-মন্তব্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ছয়টাই বলেছে মোদীর জোট  আবার ক্ষমতায় ফিরবে। মানে ২৭২ এর বেশি আসন পাবেন। কেবল দুটা এক্সিট পোলের ফলাফল-অনুমান-মন্তব্যে একটা বলছে ২৪২, অন্যটা বলছে ২৬৭ আসন পাবে। বলাই বাহুল্য এগুলো খাটি অনুমান মাত্র, সত্যি ফলাফল নয়। আর ভারতের নির্বাচনে এর আগে এক্সিট পোলের অনুমানের পুরা উলটা ফলাফল বাস্তবে হয়েছে এমন রেকর্ডও আছে। তাই  আসল ফলাফল পেতে ২৩ মে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
    আমরা সতর্কতা হিসাবে ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি
    (প্রাক্তন বিজেপি নেতা) ভেঙ্কায় নাইডু বলছেন, “Exit polls do not mean exact polls...Since 1999, most of the exit polls have gone wrong”- উনার এই কথাটা মনে রাখতে পারি।______________________

    ওদিকে  কেবল নন-কনফিডেন্ট মোদী কেবল চেহারাতেই নয়, মোদী সম্ভবত যে ফিরে ক্ষমতায় আসতে পারছেন না সে ব্যাপারটা চার দিকে সেভাবেই খবর ফুটে উঠতে শুরু করেছে। অন্তত নির্বাচন শুরুর পর থেকে। প্রায় পাঁচ জোড়া নির্বাচনী-বিশ্লেষক গ্রুপ কেউই নির্বাচন শুরুর (১১ এপ্রিলের) পর থেকে আর ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে, মোদী আবার ক্ষমতায় আসছেন। শুধু তাই না, এবার মিডিয়াগুলোও তাদের মূল্যায়নে বলা শুরু করেছে, মোদির বিজেপি ও তাঁর জোট এনডিএ-কে সাথে নিলেও সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসন ) বিজেপি পাচ্ছে না। এর ফলে আঞ্চলিক দলগুলোকে ভাগিয়ে নিজ নিজ জোটে ঢুকিয়ে নিতে ফলাফল ঘোষণা হবার পরে হর্সেস ট্রেডিং বা  এমপি কেনা-বেচার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠল। আর কংগ্রেসের বেলায় বলা হচ্ছে, ফলাফলে যদি তার মোট প্রাপ্ত আসন এক শ’র নিচে হয়, তবে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি ছেড়ে দেবেন আগেই; আর সেই সাথে জোটের অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেবেন [কুর্সিতে অনড় নয় কংগ্রেস,বার্তা আঞ্চলিক দলগুলিকে]। আর যদি দেড় শ’র বেশি আসন পান, সে ক্ষেত্রেই কেবল জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল দরকষাকষিতে নামবেন। অর্থাৎ কংগ্রেস যদি এক শ’র নিচে আসন পায় তবে আর কংগ্রেসের পক্ষের জোট ইউপিএ-এর পক্ষের কাউকে ভাগিয়ে মোদী তার এনডিএ জোটকে মোট ২৭২ এর উপরে নিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেরাই ফেডারেল ফ্রন্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন করার সম্ভাবনা হাজির হয়ে যাবে।

    নির্বাচন কেমন হলো?
    এবারের নির্বাচন কেমন হলো? এক কথায় জবাব, খুবই খারাপ। ভারত-রাষ্ট্র আরেকবার আরেক ধাপ দুর্বল হয়ে গেল। এটা বলাই বাহুল্য যে কোন নির্বাচন কমিশন যখন নিরপেক্ষতা সততা স্বচ্ছতায় একটা সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাতে সবচেয়ে সবল হয়ে উঠে খোদ রাষ্ট্রটাই। ওর প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যত দৃঢ় হয়।  কিন্তু এবারের ভারতের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনই এসব ক্ষেত্রেই অসফল; ফলে এই কমিশনই  ভারত-রাষ্ট্রকে পরাজিত করে দিল। রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে গেল।

    কিন্তু “আরেকবার” কেন? আর দুর্বল হওয়া মানেইবা কী?
    সাধারণভাবে বললে, ভারত-রাষ্ট্র মূলত চালায়, চালিয়ে আসছে এর ব্যুরোক্র্যাটেরা। সেটাই হবার কথা এবং একমাত্র বিকল্প। কারণ ১৪০ কোটির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর এক রাষ্ট্র, একে দক্ষ ব্যুরোক্র্যাটরাই একমাত্র চালাতে পারবে – এটাই স্বাভাবিক। অনেকে ভাবতে পারেন যে, কেন এভাবে বলা হচ্ছে যেখানে বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা তো সমাজে নেতিবাচক ধারণার বলে মনে করা হয়। হা তা থাকলেও মনে রাখতে হবে  বুর‍্যোক্রাসি বা আমলাতন্ত্র শব্দটা আসলে ইতিবাচক পজিটিভ এবং প্রয়োজনীয় শব্দ। প্রথমে এর সেই ইতিবাচক অর্থ বুঝতে হবে বুর‍্যোক্রাসির আসল মানে কী? আমাদের পরিবারগুলোর প্রধান ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা আমাদের মায়েরা। মা সন্তান, স্বামীসহ সব মেম্বারদের নিয়ে সবাইকে ভাত বেরে খাওয়ায় এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু ধরা যাক পরিবার বড় হয়ে যাবার কোন কারণে মা সন্তানদের মাথার কাছে নিয়ে হাত বুলিয়ে ভাল বেড়ে আর ভাত খাওয়াতে পারছেন না। তাই ম্যানেজ করার সুবিধার্থে মা নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছেন। এতে খাবার সবার পাতে পাতে আর তুলে না দিয়ে বাটিতে বাটিতে তরকারি বেড়ে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যেখানে কোনটা কার বাটি তা বুঝতে বাটির নিচে চিরকুটে নাম লিখে রাখা হয়ছে। এতে মার পক্ষে বড় সংসারটা ম্যানেজ করা তুলনামূলক সহজ হয়েছে, স্বাশ ফেলার সময় পাচ্ছেন। আর এখানেও মায়ের স্নেহ-মমতা প্রকাশ আছে অবশ্যই, তা টের পাওয়া যায় কিন্তু একটু পরোক্ষে। এটাই বুর‍্যোক্রেসি, এক বুর‍্যোক্রেটিক ম্যানেজমেন্ট।  বড় হয়ে যাওয়া যে কোন কাজ একমাত্র এভাবেই ম্যানেজ করা সম্ভব। এক লিখিত নির্দেশিকা বইয়ের মাধ্যমে বড় কাজ পরিচালনা।
    এখন মা যাকে ম্যানেজার বা কেয়ারটেকার রেখে এই নতুন ব্যবস্থাপনা চালু রেখেছেন সেই ম্যানেজার এবার নিজের অসৎ কোন স্বার্থে মায়ের নির্দেশের উলটা মানে করল বা প্রয়োগ করল, আর মাও আবার তদারকি মনিটরিং করা ঢিলা দিল বা ভুলে গেল। অথবা মায়ের এক দুষ্ট সন্তান যে জানে, ডাক্তারের নির্দেশে তার এক বোনের বিশেষ যত্ন নিতে সেই  ভাগের বাটিতে বেশি মাংস থাকছে আজকাল  তাই  সেই দুষ্টু সন্তান এবার ম্যানেজারের সঙ্গে খাতির জমিয়ে বাটি অদলবদল করে নিয়েছে ইত্যাদি  – এই যে পরিস্থিতি এখানে এসে এবার বুর‍্যোক্রাসির অর্থ হয়ে দাড়াবে নেগেটিভ। বুর‍্যোক্রাসির মানে হয়ে যাবে এবার অবহেলা, হ্যারাসমেন্ট দুর্নীতি ইত্যাদির এক ব্যবস্থা। তাহলে সারকথায় কোন কাজ ততপরতা যখ্ন বড় হয়ে যায় তা ম্যানেজ করতে বুর‍্যোক্রাসির বিকল্প কোন উপায় নাই। তাই আবার তদারকি মনিটারিং এর ভাল ব্যবস্থাপনা দিয়েই একে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বুর‍্যোক্রাসির অর্থ ইতিবাচক করাই একমাত্র পথ।

    কাজেই যেখান থেকে কথা উঠেছিল,.১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতকে পরিচালনা করতে পারে কেবলমাত্র এক দক্ষ ও করিৎকর্মা এক বুর‍্যোক্রাসিই।  তবে এদের উপরে বসে রাজনৈতিক নির্দেশ দিতে, ভালো রাজনীতি ও রাজনীতিবিদও অবশ্যই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র চালানো শুধু ব্যুরোক্র্যাটদের কাজ নয়। এ ছাড়া শক্ত এক বিচার বিভাগও আরেকটা খুবই প্রয়োজনীয় অঙ্গ। ওদিকে নির্বাচন কমিশনও আছে – এরাও মূলত ব্যুরোক্র্যাটেরই অংশ। তাই তাদেরও শক্ত ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বলা হয়ে থাকে, সাবেক ক্যাবিনেট সচিব ও দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (১৯৯০-৯৬) টিএন সেশন – তিনি তার আমলে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক ও কঠোর সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে, আর সেটাই নির্বাচন কমিশনের আজকের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রধান উৎস। কিন্তু তবু এবারের নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশন ‘পরাজিত’।  অনুমান করা হচ্ছে রাজনীতিবিদের কারণে প্রভাবিত হয়ে দ্বিতীয়বার ভারত-রাষ্ট্রের পরাজয় ও দুর্বল হওয়ার ঘটনা ঘটল। চলতি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনাস্থা জমেছে পাহাড় প্রমাণ।

    এবারের নির্বাচন ছিল পরিচালনের দিক থেকে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এক নির্বাচন। যার মূল কারণ হল, মোদীর অর্থনৈতিক ব্যর্থতা। আর তা থেকে পালাতে আড়ালে যেতে তিনি নির্বাচনকে সাজিয়েছেন “হিন্দুত্বকে” মুখ্য বা কেন্দ্র করে। হিন্দুত্বই শ্রেষ্ট এবং সবকিছু – এই বক্তব্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান হিসাবে মোদী তাঁর সব সংজ্ঞায়িত বা অসংজ্ঞায়িত ক্ষমতাকে অপব্যাবহারে কাজে লাগাতে নেমে গেছেন যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের ভোটের স্বার্থে মুচড়ে ব্যবহার করা যায়। এতে তাঁর সৃষ্ট এই অযাচিত চাপ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা দ্বিধাগ্রস্থতা থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই বিশেষত মোদীর বিরুদ্ধে একশন নেবার ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে গেছে।  দ্বিতীয় সদস্য তাঁকে কোনঠাসা ও উপেক্ষা করে রেখেছে প্রধানসহ অন্য জন – মিডিয়াতেই এই অভিযোগ এসে গেছে।
    এককথায় বললে, রাষ্ট্রের নির্বাহীপ্রধান যখন আইন মানতে চান না বা তাঁর বিরুদ্ধে যখন আইন প্রয়োগ করা যায় না বা প্রয়োগ কর্তা ভীত হয়ে এড়িয়ে চলতে চায় – এটা হল সেই অবস্থা। মূলত এটা রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া, অকেজো নন-ফাইশনাল হয়ে পড়ার পুর্বলক্ষণ। এমন অসহায় অবস্থার প্রকৃত  মানে বা ইঙ্গিতটা হল, রাষ্ট্রকে আবার ঢেলে সাজানো, নতুন করে প্রজাতন্ত্র গড়বার মুরোদ দেখানোর জন্য রাষ্ট্র আহবান জানাচ্ছে।

    এমনই, প্রথম ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি আসন থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী রাজ নারায়ণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ‘কারচুপি করে’ জিতেছিলেন – এই অভিযোগে ১৯৭১ সালেই মামলা হয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্টে। এরই রায় এসেছিল ১২ জুন ১৯৭৫ সালে। সেবার আদালত প্রধানমন্ত্রীকে আদালতে সশরীরে এসে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছিলেন, এমনকি আদালত পুলিশের নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর আদালতে প্রবেশ অনুমোদন করে নাই। বরং আইন সংশ্লিষ্ট সব পেশার লোক যারা আদালতে আসেন তাদের নিয়ে গড়া এক হিউম্যান চেইন – এর ভিতরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে রেখে আদালতের এমন নিজস্ব নিরাপত্তায় ইন্দিরা গান্ধী এজলাসে উঠে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু  রায় ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে যায়, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাতে ইন্দিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। আপিল কোর্ট তাৎক্ষণিকভাবে সাজা স্থগিত করেছিল আর কয়েকমাস পরে, ৭ নভেম্বর বিস্তারিত শুনানিতে সব শাস্তি রদ করে দেন। কিন্তু এর অনেক আগেই ঘটনা অন্য দিকে গড়ায় ও গতিমুখ বদলে যায় ।

    হাইকোর্ট তার মূল রায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনে জিতবার দায়ে ইন্দিরা গান্ধীর ওই কারচুপির নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে দেন। এছাড়া ইন্দিরার প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এর আগেই অন্য কাউকে বিকল্প প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়ার সংসদীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী ২০ দিন সময় দিয়ে ঐ নির্দেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু এখানেই নির্বাহীপ্রধান ইন্দিরা আইনের উর্ধে উঠে যেতে চাইলেন।

    ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে যেন ক্ষমতা ছাড়তে বা সাজা খাটতে না হয়, সে উদ্দেশ্যে পরবর্তি ২০ দিন শেষ হওয়ার আগেই ২৫ জুন ১৯৭৫ সারা দেশে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে বসেন। এতে তিনি নাগরিক মৌলিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার, মিডিয়ায় সেন্সরশিপ আরোপ ইত্যাদি প্রায় সবকিছু করার সুযোগ নেন, সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। কনস্টিটিউশনাল জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে তিনি পাল্টা দাবি করেছিলেন যে, ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং তা ঠেকাতে’ এই ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। এভাবে স্রেফ নিজেকে বাঁচাতে তিনি রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশনকে অকার্যকর ও দুর্বল করে ফেলেন, খরচের খাতায় ঠেলে  দেন।
    প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতাকে বা ক্ষমতাকেন্দ্র একক রাখতে হয় বিভাজ্য করা যায় না। একে বিভক্ত বা কোনো শরিকানা করার ভুল করা যায় না। একথা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে এই ক্ষমতাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা ভারসাম্য ও স্বচ্ছতার মধ্যে আনার জন্যও কিছু পদক্ষেপ থাকতে হয়। যেমন কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাও নির্বাহী প্রধানের বৃহত্তর অধীনেই রেখে; তবে ব্যক্তি না বরং নন-পারসনাল, অবজেকটিভভাবে ওর ক্ষমতা স্ট্যাটুটরি বিধানে বর্ণিত করে রেখে দেয়া হয়। যেমন দুর্নীতি তদন্তের প্রতিষ্ঠান, সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর এবং কম্প্রোটোলার জেনারেল নিয়োগ ইত্যাদির বেলায়। অথবা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে (তুলনামূলক অর্থে) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে স্বাধীন করে রেখে দেয়া খুবই দরকার হয়; যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন।

    কিন্তু এত কিছুর পরেও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া বা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় এবং যাবেই। কারণ শত আইন করে, লিখে রেখে এমন বিপর্যয়গুলোকে বন্ধ করা যাবে না। কারণ নির্বাহীপ্রধানই যদি আইনের উর্ধে উঠে যেতে চান তখন কী হবে! এর জবাবে বলা হয়, যাদের দিয়ে ক্ষমতার এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানো হবে, ক্ষমতার চর্চা হবে তারা নিজেরা প্রজ্ঞাবান হবেন – এটাই এর একমাত্র প্রতিকার। বিশেষ করে নির্বাহী প্রধানের হাতে এবং যার যার এখতিয়ার পেরিয়ে অন্যের সীমানায় ঢুকে পড়া, কোনো সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যাবে না। আর সর্বোপরি, কেন রাষ্ট্রক্ষমতাকে এমন করে রাখা হয়েছে, এর সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

    কিন্তু না হলে?  অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন (যেটা সাধারণত নির্বাহী প্রধানের হাতে ঘটে থাকে, সেই ইংল্যান্ডের রাজার আমল থেকেই) ঘটলে তাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা ও ভূমিকা দুর্বল করে ফেলার কারণে রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়বে। তাই ঘটেছিল।

    ভারতের জরুরি আইন জারির প্রায় দুবছর পরে ইন্দিরা গান্ধী (২১ মাসের) জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে, ১৯৭৭ সালে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিলেন এবং গোহারা হেরেছিলেন। তিনি নিজে এবং বড় সন্তান সঞ্জয় গান্ধী এতে পরাজিত হন অর্থাৎ পরোক্ষে শাস্তি পেয়েছিলেন বলা হয়। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্রের সেই দুর্বলতার দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। খুব সম্ভবত এরই একটা দাগ হল এবারের নির্বাচনে এই দুরবস্থা।

    কারণ ইন্দিরার ঐ ঘটনা এরপর থেকে ভারতের বিচার বিভাগ বা প্রশাসনে জড়িয়ে থাকা পেশাদার ব্যক্তিরা একটা শিক্ষা নিয়ে থাকবেন সম্ভবত – সেটা হলঃ  তারা কোনো দুর্দমনীয় নির্বাহী প্রধান মানে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে যাবেন না। বরং পরোক্ষে (কমন বন্ধুকে পাঠিয়ে) তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে থাকবেন; আর বাস্তবে মুখোমুখি কোনো সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লেও তা এড়িয়ে যাওয়ার সব চেষ্টা করবেন। খুব সম্ভবত ইন্দিরার ঐ ঘটনা সম্পর্কে তাদের মুল্যায়ন হল আদালতের ঐ একশন শেষ বিচারে কাউন্টার প্রডাকটিভ। তাই মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে মুখ বাঁচাতে হবে, সেটাই বেটার।  যেমন ওই মামলাতেই লক্ষণীয় হল, সুপ্রিম কোর্ট পরে ওই সাজার রায় উল্টে দিয়েছিলেন। যদিও জরুরি আইন জারি থাকায় সে আমলে এটা করা তত জরুরি ছিল না। কিন্তু আসলেই কী এটা “বেটার”!

    নরেন্দ্র মোদীর এই পাঁচ বছরে নির্বাহী ক্ষমতার এমন অপব্যবহার অনেকবার তিনি ঘটিয়েছেন।  রিজার্ভ ব্যাংকের গর্ভনরের উপর চাপ সৃষ্টি অথবা নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা সিবিআই এর প্রধানকে অপসারণ করা নিয়ে বেপরোয়া হয়ে অনেক জল ঘোলা করেছেন। সেসব রেখে কেবল এবারের নির্বাচনের কথায় আসি। অন্যান্য বারের মত এবারের নির্বাচনের আগেও ভারতের নির্বাচন কমিশন হালনাগাদ এক আচরণবিধি জারি করেছিল। সেখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রেফারেন্স হিসেবে টেনে কোনো নির্বাচনী বক্তব্য দেয়া যাবে না, কাশ্মিরে পুলওয়ামায় প্যারামিলিটারি গাড়িবহরে হামলা বা এরপরে পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত ভারতের বিমান হামলা – এগুলোকে নির্বাচনী বক্তব্য বা পোস্টারে আনা যাবে না। বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ছিল। কিন্তু মোদী নিজেই  এসবগুলো আচরণবিধির সবই ভঙ্গ করেছেন। যেমন তিনি “তাঁর সেনাবাহিনীর” সাফল্য, যারা বালাকোটে সন্ত্রাসীদের বোমা মেরে ধ্বংস করে এসেছে “তাদের সম্মানে দেশপ্রেমে” এবারই প্রথম ভোটার’ যারা সে তরুণেরা যেন মোদীকে ভোট দেয়- এরকম প্রচারণার সব অভিযোগ মোদীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল।

    কমপক্ষে পাঁচটা এমন সিরিয়াস আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এসেছিল মোদীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক গড়িমসির পরে সব অভিযোগ থেকেই নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রীকে খালাস দিয়ে দেয় [EC’s clean chit to PM came amid dissent]। এটা দ্যা হিন্দু পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ঐ খালাস দেয়াটাই শেষ কথা নয়। কোনায় একতা শব্দ আছে “amid dissent”। যার মানে হল, Ashok Lavasa নামে এক নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে।

    এছাড়া প্রথম দু-তিনটা অভিযোগ বা মামলার ক্ষেত্রে সে অভিযোগ প্রায় মাসখানেক ফেলে রাখা হয়েছিল। এমনকি প্রায় কাছাকাছি অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে ৪৮ ঘণ্টা, আর এক বিরোধী নেতা মায়াবতীকে ৩৬ ঘন্টা নির্বাচনি প্রচার ততপরতা চালানো থেকে বিরত থাকার শাস্তি দেয়া হয়েছিল। যোগী আদিত্যনাথও ঐ একই “মোদি কা আর্মি” বলে সম্বোধন করে মোদীর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। এছাড়া আবার অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ যেখানে রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন কমিশন শাস্তি দিয়েছিল, সেখানে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে কমিশনের কেন্দ্র দিল্লির অফিসে।

    ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও খোদ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল তাদের পদক্ষেপ-হীন অভিযোগ ফেলে রাখার  নানান উদাহরণ দিয়ে। কিন্তু তবু আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শাস্তিমূলক রায় শুনাতে যায় নাই। এর স্বপক্ষে অবশ্য আদালতের শক্ত যুক্তি আছে যা ভ্যালিড। তাই আদালত রায়ে বলেছে,  ‘কমিশন স্বাধীনভাবে এসব ব্যাপার নিজেই বিবেচনা করে যেকোনো শাস্তি দিতে পারে’  – এভাবে বলে এক উৎসাহিত করার রায় দিয়েছে। এর পেছনের সুপ্রিম কোর্টের শক্ত অবস্থান আছে বলে  আমরা নিজেরাই অনুমান করতে পারি। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের মতোই নির্বাচন কমিশনের নিজেরও বিচারিক ক্ষমতা আছে। ফলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব হল, আগেই নিজে হস্তক্ষেপ না করা, বরং কমিশনের নিজের বিচারিক ক্ষমতা ও ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালনের জন্য যে ক্ষমতা আছে, তা ব্যবহার প্রয়োগ করতে পর্যাপ্ত সময় সুযোগ করে দেয়া, যাতে কমিশন তা ব্যবহার করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট আগেই হস্তক্ষেপ করতে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠত। ফলে এটা এড়ানো সুপ্রীম কোর্টের সঠিক পদক্ষেপ।

    কিন্তু আমরা দেখছি, নির্বাচন কমিশন মোদীর নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাত করতে চায় নাই, এড়িয়ে যাবার পথ ধরেছে গেছে। এটা এখন দগদগেভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কয়েকটা মিডিয়াও প্রসঙ্গটা তুলেছে।

    ভারতের নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে  যথেষ্ট সক্ষম ও দক্ষ এতে সন্দেহ করার কিছু নেই। যদিও বাংলাদেশের গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি দল হয়ে এসে কী ভূমিকা নিয়েছিল আমরা জানতেই পারি নাই। বলাই বাহুল্য তাদের সফর কূটনীতির বুদ্ধিতেই পরিচালিত হয়েছিল, কমিশন পর্যায়ের বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ হয়নি।

    সাম্প্রতিককালে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা অপব্যবহার করে কিছু স্টাটুটারি প্রতিষ্ঠান যেমন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অথবা তদন্ত প্রতিষ্ঠান সিবিআইর প্রধানসহ অনেকের সাথে, তাদের তুলনামূলক স্বাধীন থাকার ক্ষমতা ক্ষুন্ন করতে গিয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছিলেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হয়তো বিজেপি দলের; কিন্তু স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও ক্ষতযুক্ত করে ফেলার দীর্ঘস্থায়ী দাগ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় এর ‘কাফফারা’ দিতে হতে পারে।

    খুব সম্ভবত মোদীর আগের এসব তৎপরতা দেখেই এর প্রতিক্রিয়ায় এবার নির্বাচন কমিশন এমন আচরণ করেছে। কিন্তু তাতে কী? ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল করে ফেলার দুর্ঘটনা কী এড়াতে পেরেছে – সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে! এটা ভারত-রাষ্ট্রকে অনবরত তাড়া করতেই থাকবে; সম্ভবত কখন কোন কাফফারা আদায় করে নিবে, কে জানে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা এর আগে গত  ১৮ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদির শরীরী ভাষা তা নয়“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

    ভারতের নির্বাচনঃ কোন অভিমুখে হাঁটছে

    গৌতম দাস

    ২২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৫

    https://wp.me/p1sCvy-2zq

     

    নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী ও সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তি – ছবি : TOI

    ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন, যা ভারতের ভাষায় “লোকসভার নির্বাচন” [General Election To Lok Sabha, 2019], তা অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় পর্ব গত ১৮ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। এভাবে বলতে হচ্ছে, কারণ ভারতের ভোটপ্রদান  এবারও মোট সাত পর্বে এক মাসেরও বেশি দিন ধরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটা করে পর্বের নির্বাচনের সমাপ্ত হবে। এভাবে নির্বাচন শেষ হবে সপ্তম পর্বটা আগামী মাসে, ১৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে। এরপর বাক্সবন্দী করে সব যার যার কেন্দ্রেই রাখা ভোট, ২৩ মে সকাল থেকে একসাথে গণনা শুরু হবে। এতে আশা করা যায়, ঐদিন বেলা ১১টার পর থেকে কে কোন আসনে এগিয়ে আছে, সেই অভিমুখ স্পষ্ট হতে শুরু করবে, আর সেখান থেকে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে, সেই অভিমুখ বা ইঙ্গিতও জানা শুরু হয়ে যাবে। এভাবে দিন শেষে সন্ধ্যার পরে সব ফলাফল না এলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে কোন দল বা কারা ক্ষমতায় আসছে।

    এটা ভারতজুড়ে ৫৪৩ আসনের লোকসভা নির্বাচন; অর্থাৎ ভারতে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় যেতে হলে কোন দল বা জোটকে মোট ২৭২ ছাড়িয়ে (২৭২+) এরও বেশি আসন পেতে হয়। কারণ, প্রেসিডেন্টের মনোনীত আরো দু’টি আসনও আছে তা যোগ হলে মোট আসন ৫৪৫ হবে।

    ভারতের টিভি মিডিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন ড. প্রণয় রায়। তাঁর মিডিয়া প্রফেশনাল স্ত্রী রাধিকা রায় এনডিটিভি গ্রুপ কোম্পানি খোলার প্রথম উদ্যোক্তা। এর একমাস পরে প্রণয় রায় তাতে সহ-উদ্যোক্তা হিসাবে যোগ দেন। এভাবে দুজনে মিলে ১৯৮৮ সালে ‘এনডিটিভি’ মিডিয়া গ্রুপ চালু করেছিলেন। দু’জনে মিলে তাঁরা এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের শেয়ার মালিক। এই প্রণয় রায় ব্যতিক্রম অনেক অর্থে। তিনি অন্য মিডিয়া মালিক বা সম্পাদনার নির্বাহীদের সবার থেকে আলাদা এ জন্য যে, তিনি একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, অর্থনীতির ডক্টরেট সেই সাথে ব্রিটেনে পড়ালেখা করা পেশাদার চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট।

    এ ছাড়া যখন টিভি বলতে একমাত্র সরকারি টিভি বুঝত মানুষ, সেই যুগে তিনি ভারতীয় “দূরদর্শনে” অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করতেন। আরও সেই সাথে ভারতের নির্বাচনের সময় প্রাপ্ত নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য এবং অভিমুখ বিশ্লেষণ – এটা তখ থেকেই তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।ইংরাজিতে psephologist (উচ্চারণ “সিফোলজিস্ট”) বলে একটা শব্দ আছে। যার অর্থ নির্বাচনতাত্বিক; অর্থাৎ যিনি দক্ষতার সাথে  নির্বাচনে ভোটারেরা কোনদিকে ও কেন ভোট দিল সে তাতপর্য ও প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ভারতের মিডিয়া একমাত্র তাকেই নামের আগে ‘সিফোলজিস্ট’ বিশেষণ লাগিয়ে বলে পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে দেখা যায়।  যেমন  তামিলনারু ভিত্তিক দক্ষিণী ১৪০ বছরের প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক “দ্যা হিন্দু” লিখেছে, প্রণয় রায় সম্পর্কে –  “১৯৮০ সাল থেকে প্রণয় আর ভারতের নির্বাচন প্রায় সমার্থক কথা হয়ে গেছে। তাকে দিয়েই ভারতে “নির্বাচনতাত্বিক” শব্দটার ব্যবহার শুরু”। [“Prannoy Roy has been synonymous with elections since 1980. He pioneered opinion polls in India and introduced psephology to the country.”]।

    পরবর্তীকালে ১৯৮৮ সালে নিজের “এনডিটিভি” চালু হলে ‘নির্বাচনী ডাটার অর্থ- তাৎপর্য ও অভিমুখ বিশ্লেষণ” করার ভারতের বাজারে তিনি আরও বিস্তারে পাইওনিয়ার বা অগ্রগামী বলে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান। ইনি চলতি নির্বাচনের আগে এপ্রসঙ্গ নিয়ে তার বই [দ্যা ভারডিক্ট : ডিকোডিং ইন্ডিয়ান ইলেকশন… (The Verdict: Decoding India’s Elections. প্রকাশ করেছেন। বইটি হল, ভারতের নির্বাচনে ভোট প্রদানের অর্থ-তাতপর্য কী করে বের করতে হয়, তা নিয়ে। এরই এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

    প্রণয়ের সেই বিচারে ১৯৫২ সাল  ভারতের লোকসভা নির্বাচনে শুরু হওয়ার পর থেকে, ভারতের ভোটারদের ভোট দেয়ার প্যাটার্নকে তিন আলাদা যুগে (একেকটা প্রায় ২৫ বছরে) তিনি ভাগ করতে চান। প্রথম ২৫ বছর ধরে (১৯৫২-১৯৭৭) ভোটারেরা একনাগাড়ে, স্বাধীন ভারত পাওয়ার আবেগ ও জোশে কংগ্রেসকেই মানে সরকারের পারফরম্যান্স যেমন হোক তাদেরকেই আবার জেতাতে হবে- এই ছিল তখনকার আবেগ বা ফর্মুলা। তাই ৮০% ক্ষেত্রে আগের সরকারই আবার ক্ষমতায় এসেছিল। এটার নাম তিনি দিয়েছেন পুরান “ক্ষমতাসীন-মুখি ভোট”। একবার জিতে যাবার পর সারা পাঁচবছর এলাকায় চেহারা না দেখালেও পরের বার আবার তিনি নির্বাচিত হতে পারতেন। কারণ সেটা ছিল বিশ্বস্ত ভোটারদের যুগ। ভোটারদের নেতাদের উপর অগাধ বিশ্বাস কাজ করত। প্রণয় বলছেন, এটাকে আপনারা “বোকা ভোটার” বা “গভীর আশাবাদী” ভোটারও বলতে পারেন।

    প্রণয় বলছেন এরপর ১৯৭৭ সালের নির্বাচন থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব – যার নাম তিনি দিয়েছেন – “ক্রুদ্ধ ভোটারদের [angry voter] যুগ”, ১৯৭৭-২০০২ সাল পর্যন্ত। এটা শুরু হয়েছিল  ১৯৭৭ সালের মার্চের ষষ্ঠ লোকসভা নির্বাচন থেকে। এই নির্বাচন ছিল আগের ২১ মাসের (১৯৭৫-৭৭) ধরে ইন্দিরার “জরুরি আইন জারি” করে বিরোধী দমন নির্যাতন চালানোর সমাপ্তিতে। তাই সেটাই ছিল প্রথম  কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে পুনরায় বিজয়ী না করে শুরু হয় দ্বিতীয় যুগ পর্ব। অর্থাৎ এই ক্রদ্ধ ভোটার যুগের বৈশিষ্ঠ ছিল, যার পারফরম্যান্স খারাপ তাকে পরের নির্বাচনে নির্বিচারে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়া। প্রণয় বলছেন এই দ্বিতীয় যুগে যেকোন ক্ষমতাসীন সরকার [incumbency] পরের বার নির্বাচনে ৭০% ক্ষেত্রে উতখাত হয়ে গেছে। প্রণয়ের ব্যাখ্যা হল পাবলিক এতই ক্রুদ্ধ থাকত যে একট ভাল অথবা একটু খারাপ বলেও কাউকে মাফ করে নাই, নির্বিচারে পুরান হলেই তাকে বাদ – এই ছিল ফর্মুলা বা নীতি।

    আর সর্বশেষ এখনকার যুগপর্ব, নতুন শতকের শুরুতে ২০০২ সাল থেকে যার উত্থান। তখন থেকে শুরু হয় আর একেবারে নির্বিচার নয়, এবার বিচার করে দেখেশুনে পুরান কোনো সরকারকে রেখে দেয়াও শুরু হয়েছে, যদিও কাউকে কাউকে শাস্তি বা বাদ দিয়ে দেয়াও, সে তো আছেই। প্রণয়ের রায়ের ভাষায়, এরা অনেক “বিবেচক ভোটার”। এখানে এপর্যন্ত ৫০% ক্ষেত্রে দেখা গেছে  ভোটাররা নেতাকে পুণর্নিবাচিত আর ৫০% ক্ষেত্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।   অর্থাৎ একথার সুত্র ধরে বললে, প্রণয় রায় মোদীর আবার বিজয় সম্ভাবনাকে তিনি একেবারে অসম্ভব বলে ঠিক ফেলে দেননি। ভারতের মিডিয়া জগতে প্রণয় ও তার টিভির চলতি বা সাবেক কলিগরা সবাই যারা এখন ভারতের মিডিয়া জগতের প্রভাবশালী ও মাথা পরিচালক। আর সম্ভবত একজন বাদে (অর্ণব গোস্বামি যে প্রকাশ্যেই বিজেপির পক্ষে) বাকিরা সবাই মোদি-বিরোধী বা কঠোর সমালোচক বলে মনে করা হয়।
    তবে তিনি এই তৃতীয় পর্বে আর এক নতুন উপাদানের কথা বলেছেন; জানাচ্ছেন, এই পর্বে বিপুলভাবে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ঘটেছে। তাই তাদের সংখ্যার কারণে তারা এখন ভোটের ফলাফলে অন্তত এটাও আর একটা নির্ধারক উপাদান।

    প্রণয় রায়ের বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হল, ভারতে সরকার গঠন এখন সরাসরি ঠিক ভোটারের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সেটা ভোটারের ভোটের চেয়েও “জোট” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কেমন করে আপনি জোট করছেন, কাকে জোটসঙ্গি বেছে নিচ্ছেন, কেন, কী বুঝে – এভাবে জোটবন্ধু বেছে নেয়া – এটাই এখন মুখ্য নির্ধারক যে, শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে।

    উল্টা করে বললে প্রণয় আসলে বলতে চাইছেন, ভারতে কোনো একক দলের একা নিজের সামর্থ্যে সরকার গঠনের দিন শেষ। সারা ভারতের ভোটারদের আস্থা আছে এমন কোন দল বলতে আর কেউ বাকি নাই। আর একটু এগিয়ে বললে তাহলে এখন কিসের দিন? অর্থাৎ কিসের ভিত্তিত্ব সরকার গঠন হয় বা হবে? এর জবাব হবে, এখনকার ভোট দেয়া ও সরকার গঠনে সমর্থ হওয়ার অভিমুখ হল সঠিক “জোট” টা গড়া। কিন্তু কার সাথে কার জোট? ভারতে সর্বভারতীয় বা ভারত-জুড়ে আছে এমন দল আছে মাত্র দুটা, আর তারা পরস্পর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি – বিজেপি ও কংগ্রেস। কাজেই এদের দুইয়ের মধ্যে জোট হবার প্রশ্নই আসে না, তা বলা হচ্ছে না। তাহলে জোট কাদের সাথে?

    ভারতে আঞ্চলিক বা রিজিওনাল দল কথাটার মানে হল ঠিক কোন অঞ্চল নয় আসলে সেগুলো একেকটা রাজ্যভিত্তিক (প্রাদেশিক) দল। যেমন মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এর ততপরতা নাই বললেই চলে, অন্তত প্রার্থী দিবার মত অবস্থা নাই। এভাবে  ২৯ রাজ্যের ভারতে, প্রায় প্রত্যেক রাজ্যেই অন্তত দুই বা এর বেশি সংখ্যক আঞ্চলিক দল আছে। এরা মূলত প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে থাকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনেও এরা দাঁড়িয়ে গিয়ে বিপর্যয় তৈরি করে ফেলতে পারে, ফেলে থাকে। বিশেষত এমন আঞ্চলিক দলগুলো যারা রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় থাকে। তাই তাদের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে বড় আসন পেয়ে যাবার সম্ভাবনাও তৈরি থাকে। যেমন তৃণমুল গত ২০১৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের বরাদ্দ মোট ৪২ আসনের মধ্যে ৩৪টাই পেয়েছিল। এ’কারণে আঞ্চলিক দলগুলোকে -কংগ্রেস না বিজেপি- কে আগে নিজের জোটে জুড়ে নিবে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কংগ্রেসের এমন জোটের নাম ইউপিএ [United Progressive Alliance, UPA] আর বিজেপির এমন জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance, NDA]। ভারতের নির্বাচনি রাজনীতির এই ঝোঁক একেই প্রণয় রায় বলছেন ভোটের চেয়েও সঠিক “জোট” গড়তে পারা – এটা বেশি নির্ধারক। ভারতে রাজনীতির এই নতুন ঝোঁক তৈরি ও তা স্থায়ী হয়ে গেছে সেই ১৯৮৫ সাল থেকে।

    এজন্য বলা হচ্ছে, ১৯৮৫ সালের পর থেকেই ভারতজুড়ে দল বলতে কংগ্রেস বা বিজেপির একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আসার দিন শেষ হয়েছে। আর শুরু হয়েছে, তাই “জোটের” সরকার গড়ে ক্ষমতায় আসার দিন।  কিন্তু এই নতুন ধারাবাহিকতাতেও গতবার  মানে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস আর এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল। ভোট পরিসংখ্যান বলছে, কংগ্রেস বা বিজেপি একা তো নয়ই, জোট হিসাবে ক্ষমতায় যেতে চাইলেও নিজ দলকে নুন্যতম কিছু আসন পেতেই হয়। এপর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে সেই সংখ্যাটা হল ১১৫। আর এই বিচারে ২০১৪ নির্বাচনে কংগ্রেস নিজে পেয়েছিল মাত্র ৩৮ আসন আর, জোট হিসেবে সর্বনিম্ন, মাত্র ৬০ আসন। অর্থাৎ কংগ্রেসের ঝোঁক এবার আরও পতনের দিকে। আর ওদিকে এবারের চলতি নির্বাচন থেকে একইভাবে বিজেপিরও পতন শুরু হয়ে যেতে পারে।

    তাই যদি এবারও কংগ্রেসের এই ট্রেন্ড অব্যাহত থাকে, তবে সেটা হবে জোট হিসাবেও কংগ্রেস আর লায়েক থাকবে না, এমন স্থায়ী পতন। অর্থাৎ আঞ্চলিক দলগুলোও আর কংগ্রেসের সাথে কোন জোট করতে চাইবে না। নতুন সেই অভিমুখের অর্থ হবে আঞ্চলিক দল বা বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দল – এমন ছোট দলগুলোই এবার উল্টা বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে না নিয়ে নিজেরা নিজেরাই জোট সরকার গঠন করার শুরুর দিন। কলকাতার মমতার ভাষায় এটাই, “ফেডারেল ফ্রন্ট” এর সরকার গড়া। এই রচনার শুরুতে যে ছবি ব্যবহৃত হয়েছে তাতে, তৃতীয় ফ্রন্ট বা থার্ড ফ্রন্ট বলতে এর কথাই বুঝানো হয়েছে। এদিকটাই আরেক ভাষায় আমলে নিয়ে প্রণব রায় বলছেন ভারতের এবার “এটা কোন জাতীয় নির্বাচন নয়”। বরং এটা হল রাজ্যগুলোর এক ফেডারেশনের নির্বাচন। [“2019 is not a national election at all, it’s a federation of states election,”]। মমতার “ফেডারল” শব্দের সাথে মিলের দিকটা লক্ষ্যণীয়।

    বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রণয় রায়ের তৃতীয় মন্তব্য ছিল সরাসরি কংগ্রেস সম্পর্কে; এবং বলা বাহুল্য তা খুবই করুণ! তিনি বলছেন, ‘কংগ্রেস সম্ভবত ২০৫০ সালের নির্বাচনের কথা চিন্তা করে এবারের নির্বাচন লড়ছে”। এ কথার সোজা মানে হল, কংগ্রেস দিশা হারিয়েছে। তাই কারো সাথে জোট করতে চাচ্ছে না, বুঝছে না অথবা পারছে না। এমনকি সম্ভবত অন্যরাও কংগ্রেসকে তাদের জোটে নিলে কোনো লাভ হবে না, কংগ্রেসকে এমন অযোগ্য দল মনে করছে। তবে প্রণয় সব কারণের জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করছেন। বলতে চাইছেন কংগ্রেসের নিজের ওজন সম্পর্কেই নিজেরই কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা ধারণা নেই। যেন রাহুল দলের সভাপতি হয়ে যাওয়ার পরে তার মনে একটা ভাব এসেছে যে, এবার বাপ-দাদার কংগ্রেসের যুগ ফিরে এসেছে বা আসবেই। অথচ নিজের পায়ের নিচে মাটিই নেই, বেখবর!

    ভারতের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে একা উত্তর প্রদেশ এই রাজ্যে সর্বোচ্চ আসন, একমাত্র রাজ্য যেখানে আসন সংখ্যা ৮০টি। এর পরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন অনেক নিচে; তা হলো মহারাষ্ট্র ৪৮, আর এর পরে তৃতীয় সর্বোচ্চ পশ্চিমবঙ্গ ৪২, এভাবে। অর্থাৎ উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে খুবই নির্ধারক, গত নির্বাচনে একা বিজেপিই এখানে পেয়েছিল ৭২টি। অর্থাৎ একা এখানে বেশি আসন পাওয়ার সাথে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারা সম্পর্কিত ফেনোমেনা। সেই উত্তর প্রদেশে এবার দুই প্রধান আঞ্চলিক দল [এসপি (সমাজবাদী পার্টি) আর বিএসপি (বহুজন সমাজবাদী পার্টি)] যারা মূলত গরিব, অন্তজ, দলিত ও মুসলমানদেরকে প্রতিনিধিত্ব করে, – ঠাকুরদের বিরুদ্ধে যাদব-  এমন দল। এরা সবার আগে এবার নিজেরাই বিজেপিকে ঠেকাতে প্রথম কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে জোট বাঁধে। প্রত্যেকে সমান ৩৮ আসন নিয়ে দুদলে মোট ৭৬। আর বাকি চারের কংগ্রেস নিতে চাইলে দু’টি গান্ধী পরিবারের মা-ছেলের জন্য। আর অন্য দু’টি আর এক ছোট আঞ্চলিক দলের (রাষ্ট্রীয় লোকদল) জন্য। এই জোট গড়তে সবচেয়ে নমনীয় হল সমাজবাদী পার্টি। তাই নিজের ভাগের ৩৮ সিট থেকে সে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার আগ্রহ যে দেখাতে পারছে।

    কিন্তু মূল কথা যেটা, বিজেপি বিরোধী সবাইকে নিয়ে সব রাজ্যেই এক “জোট” গড়তে না পারার জন্য আঞ্চলিক দলগুলো মূলত দায়ী করছে কংগ্রেসকে। কারও পাটাতনে না দাঁড়িয়ে উপর থেকে দেখলে, খুব সম্ভবত আসল জটিলতাটা হল – কংগ্রেসের স্বার্থের সাথে প্রতিটি আঞ্চলিক দলের স্বার্থই সঙ্ঘাতমূলক। অন্তত কংগ্রেস সেখান থেকেই দেখছে। এ ছাড়া সাথে আরও আছে কংগ্রেসের নিজের সম্পর্কে অতি-মূল্যায়ন। ফলে এ জন্য কোনো আঞ্চলিক দলের সাথেই এবার কংগ্রেসের কোনো রাজ্যে কোনো আসন সমঝোতা করতে সক্ষম হয়নি। যেমন এখন রাজ্য সরকারে ক্ষমতাসীন দিল্লিতে এমন আঞ্চলিক দল হল আম আদমি পার্টি, ওদিকে কলকাতা, কেরালা বা ত্রিপুরায়  এমন দল হল সিপিএম, পাঞ্জাবেও প্রভাব আছে এমন দল আম আদমি, এছাড়া আর উত্তর প্রদেশের অবস্থা তো জানলাম উপরে ইত্যাদি; এভাবে আঞ্চলিক দলগুলো সকলে কংগ্রেসের উপর ক্ষুব্ধ। কারণ কোথাও কংগ্রেসের সাথে কারো শেষ পর্যন্ত কোনো জোট, বা আসন ভাগাভাগি হয়নি। এমনকি উত্তর প্রদেশে এসপি আর বিএসপির জোট ঘোষিত হওয়ার পরে সেটাকেও উপেক্ষায় এরপরেও আবার কংগ্রেস ঘোষণা করেছিল যে, রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা এবার প্রথম নির্বাচন করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াল, তাতে কংগ্রেস সবখানেই এবার একা নির্বাচন করছে। আবার প্রিয়াঙ্কার নিজে নির্বাচন করাও অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে যার সোজা মানে হল, কংগ্রেসের একা চলার এমন ততপরতার কারণে  এবার সবখানেই বিজেপি-বিরোধী ভোটগুলো কংগ্রেসের কারণেই সবচেয়ে বেশি ভাগ হবে। যার পুরা সুফলটা ভোগ করবে বিজেপি। এজন্য অনেকে টিটকিরি দিয়ে বলছে প্রিয়াংকার আগমনটা মূলত মোদীকে সহায়তা করতে।

    অর্থাৎ কংগ্রেস যত আঞ্চলিক দলগুলোর ভোট কাটবে ঠিক তত ভোটই বিজেপির এগিয়ে যাবে। আর ততটাই বিজেপির জন্য তা সুবিধা বয়ে আনবে। এমনকি কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশ নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও মারাত্মক। এখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তর প্রদেশের ৩০টি আসনে কংগ্রেস একক ও শক্ত প্রার্থী দিবে, তাদের নাকি বিপুল সম্ভাবনা। মানে ওই ৩০ আসনে সে ‘শক্ত’ করে ভোট নষ্ট করবে আর বাকি ৫০টি আসনে ‘দুর্বল’ভাবে নষ্ট করবে। এ কারণে কংগ্রেসের এবারের ভোট কৌশলের কোনো তাল নেই বেতাল দশা; উদ্দেশ্যবিহীনের মতো আচরণ করছে কংগ্রেস। এ দিকটা খেয়াল করে প্রণয় রায় বলছেন সঠিকভাবে “জোট” করা যেখানে জেতার জন্য নির্ধারক বিষয়, কংগ্রেস সেখানে ততটাই যেন বেখবর, ভবঘুরে। তাই কংগ্রেসের লক্ষ্য চলতি ২০১৯ সাল না যেন সুদুর ২০৫০ সালের নির্বাচনের লক্ষ্যে এক অস্পষ্ট সময়ের দিকে তাকিয়ে কংগ্রেসের সব সিদ্ধান্ত।

    প্রণয় রায়ের তিন মন্তব্য নিয়ে কথা শেষ, এখন অন্যান্য প্রসঙ্গ। ভারতের নির্বাচন তাই স্বভাবতই আমরা অনেকেই আগ্রহ নিয়ে সময় দিব, জানতে চাইব। বিশেষ করে নানান কারণ যারা আবার নিয়মিত ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিক-অভিমুখ জানতে ততটা সময় দিতে পারিনি, তারাও এখন জানতে চাইব। সব নির্বাচনেই মূল দু’টি দল থাকে, অনেকটা আমাদের লীগ-বিএনপির মত। আর ভারতের এমন দুই দল হল বিজেপি ও কংগ্রেস। এটাই আমাদের বহু পুরনো সময় থেকে চেনা ধারণা। কিন্তু সরি! এবার এই অনুমান নিয়ে ভারতের নির্বাচন বুঝতে গেলে সব হিসাবে ভুল হবে। কেন?

    Source: Election Commission data | Shivam Vij/ThePrint

    গত প্রায় ৩০ বছরের (১৯৮৪-২০১৪) একটা ভোটের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ বলছে, যে আসন কখনো কংগ্রেস হারাচ্ছে তা বিজেপি বা আঞ্চলিক দল পাচ্ছে; বেশি সময়ে বিজেপি পাচ্ছে। কিন্তু বিজেপি যে সিট হারাচ্ছে তা কংগ্রেস ফিরে পাচ্ছেই না। বেশির ভাগই আঞ্চলিক দল পাচ্ছে। তাই আগ্রহিরা এই খবর অনুসরণ করতে পারেন যে বলছে – ২০১৯ সালের নির্বাচন থেকে “কংগ্রেসমুক্ত ভারত” – বিজেপির এই শ্লোগান বাস্তবে ত্বরান্বিত হয়ে উঠতে পারে।

    এর সোজা মানে হল, বিজেপির বিকল্প দল বলতে সেটা আর কংগ্রেস নয়, আঞ্চলিক দল। এক কথায় আঞ্চলিক দলের প্রভাব ক্রমশ বড় করে বেড়ে চলা – এটাই ভারতের রাজনীতির মূল অভিমুখ। আর এটাই কংগ্রেসের কথিত অনুমিত স্বার্থের সাথে প্রত্যেক আঞ্চলিক দলের অনুভূত স্বার্থবিরোধ অথবা বিজেপি-বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও কারো সাথেই কংগ্রেসের জোট না হওয়া। তাই এবার বিজেপি ফল খারাপ করলে এর অর্থ কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে তা নয়। এবারো তা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর মমতা ঠিক এই কারণের বেশির ভাগ আঞ্চলিক দলের কংগ্রেসবিরোধিতার ভোকাল মুখপাত্র। ভোট চাইতে গিয়ে তিনি পাবলিক মঞ্চে উঠে সরাসরি বলছেন, কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবেন না। প্রবল উত্তেজিত মমতার আরো একধাপ এগিয়ে দাবি এবার বিজেপি ১০০ আসনও পাবে না: মমতা।

    জনমত সমীক্ষা
    ভারতের নির্বাচনের ফল সম্পর্কে জনমতের সমীক্ষা (বা বুথ ফেরত ভোটার সমীক্ষা) চালিয়ে আগাম অনুমান করা সব সময় খুবই কঠিন একটা কাজ। এর মূল কারণ বিপুলসংখ্যক ভোটার (প্রায় ১০০ কোটি) যার তুলনায় স্যাম্পল সাইজ যত বড় আর ছড়ানো হওয়া উচিত তা না হওয়া বা নেয়া। তবুও এই নির্বাচনের ভারতের অন্তত পাঁচটা সমীক্ষা গ্রুপের কথা জানা যায়, যারা গত বছর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে (মোদির পক্ষে) সে অনুমান দিয়ে যাচ্ছে। আগে যাই থাক, গত ১৯ মার্চ এমনই এক অনুমিত গণনা রিপোর্ট বলে চলছিল বিজেপির-বন্ধু জোট আবার সরকার গঠন করে ফেলবে ২৮৩ আসন পেয়ে।

    এই জনমত সমীক্ষা চালিয়েছিল “টাইমস নাউ ও ভিএমআর”। যারা অবশ্য প্রো-বিজেপি সমীক্ষা গ্রুপ বলে প্রচার আছে। আমরা লক্ষ্য করছি এদের প্রচারটাই আমাদের প্রথম আলোতে বেশি আসছে। কিন্তু ১১ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে সবার হাতে আর অনুমিত ডাটা নয়, অন্তত মোট ভোট প্রদানের শতকরা হার কত সে ফ্যাক্টস এখন প্রকাশিত। এর ফলে দেখা গেছে অন্তত দু’টি সমীক্ষা গ্রুপ এখন পিছু হটছে। এমনই একটা গ্রুপ ‘সিএসডিএস’ তাদের প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হল, ‘প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর বিজেপি কী অসুবিধায় পড়ছে?’ [Is it disadvantage BJP post first phase polling?] তারা এবার বিশ্লেষণে বলছে, প্রথম পর্যায়ে উত্তর প্রদেশের আট আসনে নির্বাচন হয়েছে। যার দু’টি বাদে বাকি ছয়টাতে বিজেপির অবস্থা খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা, যেখানে গত ২০১৪-তে এই আট আসনই বিজেপির ছিল। এখানে এবার ভোট প্রদানের হার কম আর ওই ছয়টা আসনেই মুসলমান ভোটার সংখ্যায় আধিক্য বলে এই যুক্তি তুলে এরা এখন সরে এসে বলছে- এই আট আসনের ছয়টাতেই বিজেপি খারাপ করবে।……the BJP would be down six in UP in the first round.

    একইভাবে আরেক সমীক্ষা গ্রুপ ‘সি-ভোটার’- যারা মোদির ‘পাবলিক রেটিং’ কেমন যাচ্ছে তা নিয়ে কথা বলে এসেছে। আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি এরা দাবি করেছিল পাকিস্তানে কথিত ‘বিমান হামলা’ করে আসাতে মোদির রেটিং বেড়ে ৬২ শতাংশ হয়েছিল। এরপর এক মাসে তা অল্প করে কমলেও তা হয়েছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু প্রথম পর্যায়ের ভোট হয়ে যাওয়ার পর এবার তারা বলছে, সেটা আরো কমে এবার ৪৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মোদির গ্রহণযোগ্যতা এখন ১৯ শতাংশই কমে গেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটপ্রদান অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত ১৮ এপ্রিল। তাতেও দেখা গেছে ভোট প্রদানের হার ২০১৪ সালের চেয়ে বাড়েনি, তবে অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। [On 7 March, the Modi government’s approval rating was at 62.06 percent. Despite a minor decrease it remained in the 50s till 22 March. But on 12 April, a day after the first phase of polling, the Modi government’s approval rating had fallen to 43.25 percent, a fall of almost 19 percent in about five weeks.] মোটকথা সমীক্ষা গ্রুপগুলোই আর জোর দিয়ে মোদির সম্ভাব্য ভালো ফল করার কথা বলতে চাচ্ছে না। তাতে আসল ফলাফল আগামী মাসে যাই আসুক না কেন।

    এই নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য তার আশা কী? তার আশা হবে এই লেখার শুরুতে যে ছবি তৃতীয় শক্তি বা ফেডারল ফ্রন্টের কথা বলা হয়েছে এর সাফল্য ও বিজয়। এতে  নাগরিকদের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে ভারত রাষ্ট্র কোন কোটারি নয়, কোন ভুতুড়ে ক্ষমতার “কেন্দ্র” এর রাষ্ট্র নয় – এই বিচারে এখানকার চেয়ে তুলনায় ভাল গণপ্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র হবে। দানব ভারত, হিন্দুত্বের ভারতের বদলে এর তুলনামূলক গ্রহনযোগ্যতা বাড়বে।  তার তাতেই বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত  ২০ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের নির্বাচনে কী হচ্ছে “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

    মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

    গৌতম দাস
    ০৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2xY

     

    যুদ্ধ একই সাথে বয়ানের যুদ্ধ হয়ে উঠে, বিশেষ করে যেখানে এর একপক্ষে থাকে মোদীর মত যুদ্ধবাজ শিকারি নেতা। মোদীর কাছে  ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাটা হল আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আসন্ন নির্বাচনে জিতবার হাতিয়ার হিসাবে একে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা ও ইস্যু। সেই উত্তেজনা প্রসঙ্গে সর্বশেষ বড় খবরটা ছিল – পাকিস্তানে বিধ্বস্ত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের আটক পাইলট যার নাম – “অভিনন্দন বর্তমান” – তিনি গত ১ মার্চ রাত ১০টার দিকে ভারতের মাটিতে ফিরে গিয়েছেন; তাকে মুক্ত ও হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এর আগের দিন পাকিস্তানের সংসদে মানে ওদিনের উচ্চ ও নিম্ন সংসদের যৌথ অধিবেশনে তাঁর বক্তৃতায় নিজের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেন, “শুভেচ্ছা আর সৌজন্য দেখাতে আর উত্তেজনা নামিয়ে”[…as a gesture of goodwill to de-escalate tensions in the region.”], ডায়ালগের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের প্রতি আস্থা তৈরি করতে তিনি আটক পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

    কিন্তু এতে ব্যাপারটা মোদীর পক্ষে যায় নাই। বরং তাঁকে এবার এখানেও আরও উদাম করে ফেলেছে। মূল কারণ মোদী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এতদিন যে ঘৃণা তাতিয়ে ছিলেন, ভারতীয় মনকে যেভাবে উত্ত্যক্ত করে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন এই বলে যে, নিশ্চিতভাবে পাকিস্তান খুবই খারাপ স্বভাবের আর মানবিক চরিত্রহীন এক শত্রু এমন ছবি এঁকেছিলেন, তাতে খাড়া করা এমন বয়ানের ওপরে ইমরান খানের এই ঘোষণা শুধু পানি ঢেলে দেয়া নয়, একেবারে ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দিয়েছিল। এর ভালো চিহ্ন হল গত দুই সপ্তাহে মোদী পাকিস্তান বা ইমরানের যে কল্পিত দানব ছবি এঁকে ফেলেছিলেন – সেই ভারত থেকেই ইমরানের প্রতি অভিনন্দন জানানোর একটি লহর বয়ে গেছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে।

    যারা অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের এমন জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে এতে প্রকাশ্যে সবচেয়ে আগে আছেন সম্ভবত ভারতীয় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। তিনি ইমরানের এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম আলো এ বিষয়ে “যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ‘হিরো’ ইমরান!” শিরোনামে সবার প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। আরো লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী ইমরানের পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তের জন্য “সামাজিক মাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। এমনকি তাকে সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কও বলা হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদীর পরিকল্পনার একেবারে বিপরীত। ভারতে পাকিস্তানবিরোধী প্রবল উত্তেজনার মধ্যে পাইলটের জীবনে এরপর কী হবে এ নিয়ে জনমত যখন চরম উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময়ে উদ্বিগ্ন মানুষের কল্পনাকে ছাড়িয়ে ইমরান এক ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় জনমতের বড় অংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিয়ে গেছেন। আর এটাই ছিল মোদির সবচেয়ে বড় হার, এক দুর্বল পয়েন্ট হয়ে হাজির হয়েছে।

    কাশ্মীর প্রসঙ্গে একটা ফ্যাক্ট যা একটা কঠিন বাস্তবতা আর যা একালের খুব কম মানুষ ব্যাপারটা জানেন বা আমল করতে দেয়া হয় না এমন সে কথা তুলে ধরা যাক, যা কাশ্মির ইস্যুকে বুঝার জন্য ফাউন্ডেশনাল। গত ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ ও কলোনি মুক্তির কালে – বেঙ্গল বা পাঞ্জাব এ দুই প্রদেশ যেমন ভাগ হয়ে একেকটা করে টুকরা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে অংশ হয়ে যায়, আর সেই থেকে টুকরাগুলো এ দুই রাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেছে-  কাশ্মীর, কিন্তু সেই একই অর্থে বাংলা বা পাঞ্জাব মত নয়। এমনকি তুলনীয়ই নয়। যদিও ভারতীয় কাশ্মীর আর পাকিস্তানি কাশ্মীর বলে বিভক্ত অংশ আছে তবুও কাশ্মির কোনোভাবেই বাংলা বা পাঞ্জাব নয়। কেন?

    এর একেবারে গোড়ার কারণ হল, বেঙ্গল ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রেসিডেন্সি’ প্রশাসনে আর পাঞ্জাব ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রদেশ’ প্রশাসন। আর তুলনায় কাশ্মীর বরাবরই ছিল প্রিন্সলি স্টেট বা এক  রাজার করদ রাজ্য। আসলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বলে এক ব্রিটিশ কলোনি-রাষ্ট্রের কথা আমরা জানি আর শুনি বটে, কিন্তু এককাট্টা একই প্রশাসনের অধীনস্ত ভুখন্ড মানে কোন একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে আমরা সবাই এক ইন্ডিয়ান রাষ্ট্র ভূখণ্ড  – এমন কিছু কোনো দিনই ছিল না। তাহলে ছিল কী? ছিল আসলে একই শাসক “ফোর্ট উইলিয়াম” নামে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক দুর্গ বা হেডকোয়ার্টার। এতটুকুই এক। আর বাকি সবাই আলাদা আলাদা প্রশাসনিক ভুখন্ড।
    এই কোম্পানি শাসন শেষ হয় প্রথম শত বছর পরে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এরপর থেকে কোম্পানির জায়গায় সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হয়, কিন্তু তাতে আগের মতোই ব্রিটিশ-ভারত বলতে ওই একই ফোর্ট উইলিয়ামের অধীনের তিন ধরনের প্রশাসনিক পদ্ধতিতে তিন ধরনের ভূখণ্ডই বজায় রাখা হয়েছিল। বেঙ্গল, বোম্বাই আর মাদ্রাজ- এ তিনটাকে প্রেসিডেন্সি প্রশাসন বলা হত। আর এর পাশাপাশি ছিল প্রায় আট-নয়টা প্রদেশের (১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ছেড়ে যাবার সময় হয়েছিল ১৭ টা প্রদেশ) প্রশাসন। আর ওদিকে ভুখন্ডের তৃতীয় ধরণটা ছিল ছোট-বড় প্রায়.৫৬৫ প্রিন্সলি স্টেট [Princely State]। প্রিন্সলি স্টেটগুলোকে করদ রাজার রাজ্যও বলা হত – এজন্য যে এসব করদ রাজ্যের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা ইস্যুতে এরা সরাসরি ব্রিটিশদের ইচ্ছা ও স্বার্থই শেষ কথা – এমন অধীন। এছাড়া এটা মেনে নিয়েই আগের মত এর রাজারা খাজনা তুলে রাজত্ব করে যেতেন আর তোলা খাজনার একটা ভাগ ব্রিটিশদের শেয়ার করতেন। তবে এভাবে করদরাজ্য চালাতে রাজত্বের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে  রাজ্যগুলো পরিচালিত হত ঐ করদ রাজাদের আলাদা নিজস্ব প্রশাসনে। এগুলো ‘স্বাধীন’ বলে মনে করা হলেও আসলে তা ছিল বৃটিশদের পক্ষ হয়ে রাজার শাসন।

    বৃটিশ ইন্ডিয়ান মোট ভুখন্ডের ৪০% ভুমিই ছিল এমন প্রিন্সলি স্টেট। আর এসব স্টেট বা করদ রাজ্যে বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩%। এমনই এক প্রিন্সলি স্টেট ছিল কাশ্মীর। কাশ্মীর তাই কোন প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশ প্রশাসনের সাথে তুলনীয় ভুখন্ড নয়, কারণ এসব প্রশাসন পরিচালিত হত সরাসরি ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। বিপরীতে কাশ্মীর সরাসরি করদ রাজার অধীনস্ত প্রশাসন; যা প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশের প্রশাসনের মত সরাসরি ব্রিটিশদের পরিচালিত প্রশাসন নয়।
    একারণে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও কলোনিমুক্তির সময়, সাধারণভাবে প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশগুলো ভাগাভাগি হয়ে  যেমন তুলনামূলক সহজেই নতুন স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান বলে দুই রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পেরেছিল, প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে নাই। এর মূল কারণ করদ রাজ্যগুলো পরিচালিত হতো ফোর্ট উইলিয়ামের কোনো ধরনের প্রশাসনে নয়, বরং করদরাজার নিজের প্রশাসনে। আবার ব্রিটিশ শাসকেরা এসব রাজার সাথে ‘করদরাজ্য’ সম্পর্ক ও চুক্তিতে থাকার ফলেই  করদরাজ্যের কাউকেই আইনত ভারত অথবা পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দিতে পারার আইনি সুযোগ ছিল না, সে জটিলতা ছিল। আর এই আইনি সুযোগ নিয়েই বৃটিশ শাসকেরা, প্রিন্সলি স্টেট গুলোর কী হবে এই ইস্যু প্রসঙ্গ না তুলে বরং তা এড়িয়ে থেকেই নিজেরা ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

    ওদিকে বিশেষ করে কাশ্মীর আবার সম্ভবত একমাত্র স্টেট, যা হবু ভারত-পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে মানে উভয়েরই সীমান্তে অবস্থিত। অর্থাৎ দুটোর সাথে সীমান্ত আছে। এবার অন্য আর একটা প্রিন্সলি স্টেটের সাথে তুলনা করা যাক। আরেক করদরাজ্য হল “নিজামের হায়দরাবাদ” [এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ], এর বেলায়, এর চার দিকে ভারত ভূখণ্ড বলে যেমন নেহরু সৈন্য পাঠিয়ে বলপ্রয়োগে সহজেই একে ভারতে ঢুকিয়ে নিতে পেরেছিলেন। কাশ্মিরের বেলায় তেমনটি ঘটেনি, বা বলা যায় এমন ঘটাতে গিয়েই বিপত্তি দেখা দেয়। করদরাজ্যের করদ রাজা ও শাসক হরি সিংয়ের অধীনে কাশ্মীরে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যালঘু আর তুলনায় মুসলমানেরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠই শুধু নয়, বড় অংশ ছিল ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী। এরাই নতুন পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে বসে বলে তা মোকাবেলায় হরি সিং চলে যান নেহরুর ভারতের কাছে। তবে কে প্রথম সঙ্ঘাত শুরু করেছিল, এ নিয়ে যার যার আলাদা ভাষ্য আছে। আবার কাশ্মীর কোন দিকে যাবে অংশ হবে – ভারত না পাকিস্তানে, ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তা ফেলে রেখে কাশ্মীরের রাজা স্বাধীন থাকার বোকা স্বপ্ন দেখত। অর্থাৎ দুনিয়া অভিমুখ কোনদিকে চলে গেছে এর কোন ধারণাই তাঁর ছিল না। দুনিয়া থেকেই কলোনি শাসন উতখাত হয়ে যাওয়া যেখানে বিশ্বযুদ্ধের দুনিয়ার অভিমুখ সেখানে তিনি মহারাজা থাকার স্বপ্ন দেখতেন। ফলে এমন স্বপ্ন রাখাই থেকেছিল যেন একটা বিস্ফোরককে পকেটে রাখা। তাই সারকথায় বললে, ১৯৪৮ সালে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় কাশ্মীরকে নিয়ে। যুদ্ধ শুরু হলে পরে নেহরুর অনুমান ছিল, বিরোধের ব্যাপারটা জাতিসঙ্ঘ তুলতে পারলে তিনি নিজের পক্ষে আনুকূল্য পাবেন। তাই তিনিই ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘে তোলেন।
    এখানে জাতিসংঘের জন্ম বৈশিষ্ট কিছুটা বলে রাখলে কাশ্মীর ইস্যু বুঝতে সুবিধা হবে। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া আর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এর গুছিয়ে বসা – বলা যায় এসময়টা জাতিসঙ্ঘ ছিল এক বহুল আদর্শময় ও আকাঙ্খিত মডেলের এক শান্তি স্থাপনের প্রতিষ্ঠান, হাই মরালের প্রতিষ্ঠান। দুনিয়াতে কেউ কাউকে কলোনি দখল করে রাখা এই দখলদারি ও কলোনি শাসন চালানো গ্রহণযোগ্য নয় – বলা যায় এই নীতিতে পরিচালিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এলায়েড পাওয়ার [Allied powers ] বা আমেরিকার নেতৃত্বের পক্ষ। ঐ যুদ্ধে হিটলার বিরোধী এলায়েড পাওয়ার বা মিত্র বাহিনী জয়লাভ করেছিল। জাতিসংঘের জন্মেরও ভিত্তি একই; ঐ একই “কলোনি শাসন অগ্রহণযোগ্য” – এই নীতিতে। এর মূল কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করার প্রধান শক্তি ছিল আমেরিকা আর এর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হল জাতিসঙ্ঘ। তিনি বাকি বিজয়ী শক্তিদের রাজি করিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়েন। তাই এটা আবার যুদ্ধবিরোধী নৈতিকতায় পরিচালিত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে, তা কোনো যুদ্ধে নয় বরং জাতিসংঘের করা ডায়ালগ ও মধ্যস্থতা মধ্যদিয়ে, আন্তর্জাতিক নানান আইন ও কনভেনশনের ভিত্তিতে – যেকোন বিরোধ মিটানো – এই ছিল জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য। তাই যুদ্ধ এড়ানোর আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেকালের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন রুজভেল্ট ও তারপরের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান।
    আমেরিকার ১৯৩৩-১৯৫৩ সাল, এই ২০ বছরের পাঁচ প্রেসিডেন্টের প্রশাসন থাকার কথা। এই ২০ বছরের প্রথম টানা চারবার প্রেসিডেন্ট জিতেছিলেন রুজভেল্ট, আর শেষবার হ্যারি ট্রুম্যান। প্রথম পর্বের টানা সাড়ে ১২ বছর প্রেসিডেন্ট ছিল রুজভেল্টের। আর শেষ সাড়ে সাত বছর (সাড়ে তিন ও চার মিলে) প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রুম্যান। কারণ, ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থবারও শপথ নেয়ার পর, মাত্র পরের তিন মাসের মধ্যে রুজভেল্ট মারা গেলে তার নীতি-পলিসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান দায়িত্ব নেন। এছাড়া, এভাবে ভাঙ্গা প্রায় সাড়ে তিন বছর প্রেসিডেন্টের দ্বায়িতে পালন শেষ করার পরের বার ১৯৪৮ সালে নির্বাচনেও ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি প্রার্থী ছিলেন ও বিজয়ী হন। তাই ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একই রুজভেল্টের নীতিটাই বজায় ছিল। আর এদিকে রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে দেখেছিলেন দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন একেবারে উতখাত করে বদলে দিয়ে স্বাধীন রিপাবলিক (রাজতন্ত্র নয়) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও যুদ্ধ এবং এরই সুযোগ ও নীতি হিসেবে। জাতিসংঘ তাই তাঁর উদ্যোক্তা-স্বপ্ন প্রতিষ্ঠান।

    আর এ’কারণেই সেকালের কাশ্মীর বিরোধে জাতিসংঘের চোখে – রাজা হরি সিং নেহরুর কাছে ভারতে এক্সেশন [accession] বা অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এক “রাজার ইচ্ছা” জানিয়েছিলেন কি না, সেটি কোনো ভিত্তি নয় বরং কাশ্মীরের জনগণ কোন দিকে যেতে চায়, এই ভিত্তিতেই কাশ্মীরের ভাগ্যের আপস সমাধানের পক্ষে রায় দেয় জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘের রেজুলেশন হয়, কাশ্মিরে গণভোট হতে হবে আর এর রায়ই হবে সমাধান যে, কাশ্মির ভারত-না-পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে কিছু বাড়তি বাক্য বলে রাখি। কমিউনিস্ট ভাষ্যে সাম্রাজ্যবাদ-আমেরিকা, অন্য দেশের তেল বা সম্পদ লুটেরা আমেরিকা, সিআইএ পাঠিয়ে গুপ্তহত্যা ঘটানোর আমেরিকা ইত্যাদি – যে পরিচয়ের আমেরিকা আমরা শুনি এর শুরু হয়েছিল রুজভেল্টের নীতির সমাপ্তিতে; মানে ১৯৫৩ সালে জানুয়ারিতে বিজয়ী রিপাবলিকান নতুন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার শপথ নেয়ার পর থেকে।
    যা হোক, জাতিসঙ্ঘের এই গণভোটের সিদ্ধান্ত আজও নেহেরু বা ভারতে বাস্তবায়ন করা হয়নি। উপেক্ষা করেই চলছে। আর সে কারণেই কাশ্মীর প্রসঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারী কারো সাহায্য নেয়া যাবে না, কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কারো সাথে কাশ্মিরবিরোধ ইস্যু শেয়ার বা সংযুক্ত করা যাবে না – এই হলো ভারতের স্থায়ী নীতি। যে কারণ ভারত সবসময় আউরাতে থেকে বলে, “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – যা বলার মানে হল কেউ ভারতকে “গণভোট না করার কথা” মনে করায় দিতে পারবে না। এটাকেই বলে ভারতের “বিগ-এম” (ইংরেজিতে ‘এম’ মানে এখানে Mediation বা মধ্যস্থতা) ভীতি। এর অর্থ হল যদি কোন মধ্যস্থতাকারী আবার জাতিসঙ্ঘের সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন চেয়ে বসে কিংবা মনে করিয়ে দেয়, তা আলোচনার ইস্যু হয়ে যায়। এ সপ্তাহে ভারতের এক মুরব্বি সাংবাদিক শেখর গুপ্তা লিখেছেন, কোনো শক্তিধর দেশের মধ্যস্থতা ছাড়া কাশ্মির সমস্যার সমাধান নেই। [Bilateralism has failed. India can make peace with Pakistan only with big-power guarantees]। বলা বাহুল্য এটা ভারতের – “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – গত ৭০ বছর আটকে থাকা কিন্তু অকার্যকর নীতির সরাসরি সমালোচনা।

    কেন?
    কারণ, যুদ্ধবাজ মোদী বাস্তবে এবারের কাশ্মীর সমস্যার ইতি টেনেছেন বিশেষত, আটকে পড়া পাইলটকে ফেরত এনেছেন, আপাতত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে মাটিচাপা দিয়েছেন “বাইরের” মধ্যস্থতাকারীদেরই সাহায্যে।

    প্রথমত, মোদীর তথাকথিত ‘প্রতিশোধের’ উন্মাদনা তৈরি করে ভারতীয় মনকে ক্ষেপানোর উদ্দেশ্য ছিল এটা দাবি করা যে, তিনিই একমাত্র নেতা ও দল যে “মুসলমান” পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে সক্ষম। মোদীই ৩৬ ইঞ্চি বুঝের ছাতি-ওয়ালা [বুকের ছাতির রেফারেন্স মোদীর নিজের দেয়া] সেই নেতা।  বিজেপির রাজনীতির বহু পুরনো অনুসরণ করা মূল লাইন হল, মুসলমানের বিরুদ্ধে  হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে এভাবে হিন্দুমনের মেরুকরণ ঘটিয়ে, সেই জনমতকে নিজের পক্ষে ভোটের বাক্সে আনা। এ কারণে মেরে ফেলব, ছিঁড়ে ফেলব, ছাল ছাড়িয়ে নেব, বুকের ছাতি দেখানো ইত্যাদি ভাষা এসব হল মোদীর দলের ও ব্যক্তিত্বদের “প্রতিশোধ” নিতে সক্ষমতার প্রমাণ। আর হিন্দু হলে ভাল আর মুসলমান হলেই খারাপ – এভাবে অতি সরলীকরণ করে নিজেদের ভয়ঙ্কর দাঙ্গার উন্মাদনা তৈরির চিন্তাকে আড়াল করা। অথচ রাজনীতি, রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন, নাগরিক অধিকার, নাগরিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এসব নিয়ে কাজ করা ইত্যাদি মোদীর দলের কাছে এজন্য কখনো কোনদিন কোন ইস্যু নয়, ইস্যু হয় নাই; বরং “প্রতিশোধের” রাজনীতি, দাঙ্গার উন্মাদনা তাদের প্রিয় জিনিস।

    এবার তাই পুলওয়ামায় আত্মঘাতি হামলার বিরুদ্ধে  “প্রতিশোধের” মাতম তুলেছিলেন মোদী, পরে তিনি বোমারুবিমান পাঠিয়ে বালাকোটে [বালাকোট পাকিস্তান কাশ্মীরের ভিতরে নয়, বাইরে পাখতুন প্রদেশে]  কথিত “টেরর ক্যাম্পের” ওপর বোমা ফেলে সব ধ্বংস করে এসেছেন, এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করা ছিল তাঁর পরিকল্পনা। প্রায় সবই ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাধে পাকিস্তানের হাতে হামলাকারি ভারতের পাইলট আটকা পড়ায়। অপর দিকে আরেক বড় বিপদ দেখা দেয়। মোদী দাবি করেছিলেন, বালাকোটের ক্যাম্পে ভারতের পাইলটের বোমা হামলায় নাকি “৩০০ টেররিস্ট” মেরে এসেছেন। যদিও ঠিক তিনশ’ই কেন, ২৯৯ বা ৩০১ নয় কেন তা জানা যায়নি। এদিকে সেসব নিয়ে পরের দিন থেকে শুরু হয়ে যায় বোমা ফেলার স্থানের সরেজমিন রিপোর্টিং। পাকিস্তানের জিও টিভির এই প্রজন্মের সাংবাদিক হামিদ মীর ঘটনাস্থল সফর করে ফেসবুকে ক্লিপ পাঠিয়ে বলছেন, এক মরা কাক ছাড়া [There was one casualty, a crow ] সেখানে কেউ মরেনি। আর ওই বনের ভেতর কুঁড়েঘরের এক গরিব মানুষ কিছুটা আহত হয়েছেন। তবে বাড়ি অক্ষত আছে। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর বিশাল এক গর্ত হয়ে গেছে। সেটি আবার রয়টার্সের এক সাংবাদিকের নিজস্ব সফরের ছবি ও রিপোর্ট। সেটা আবার ইতোমধ্যে  ছাপা হয়ে গিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

    তবে এসব মিডিয়া রিপোর্ট আসার আগেই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মোদিবিরোধী মমতা-রাহুলসহ ২১ দলের এক সভা হয়েছে। সেখানে বিরোধীরা দাবি তুলে ও নিন্দা জানায় যে, মোদি সেনাবাহিনীর রক্ত ও জওয়ানদের ত্যাগকে নিজের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন [Opposition leaders condemn Modi govt for politicising current situation with Pakistan]। কলকাতা ছেড়ে দিল্লির এই মিটিংয়ে রওনা হওয়ার আগে মমতার নিজ ভাষায় আঙুল তুলে বলেছেন, “জওয়ানদের রক্ত নিয়ে ভোটের রাজনীতি’ করাই কি আসল লক্ষ্য? আর ওই দিকে পরের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি ২১ দলের মিলিত অভিযোগ মোদী “জওয়ানদের আত্মত্যাগকে নিয়ে রাজনীতিকরণ করছেন”India’s Modi criticised for politicising Pakistan standoff]। আর কলকাতায় ফিরে ১ মার্চ, এবার মমতার সরাসরি চ্যালেঞ্জ বালাকোটে ” ‘‘প্রথমদিন থেকেই শুনছি, শত্রুপক্ষের ৩০০-৩৫০ লোক মারা গিয়েছেন। কত কী, আদৌ কেউ মারা গিয়েছেন কি না, আমরা জানতে চাই। আরও জানতে চাই, বোমা কোথায় ফেলা হয়েছিল, আদৌ বোমা ঠিক জায়গায় পৌঁছেছিল কি না”। এরপর বিভিন্ন বিদেশি সংবাদপত্রের নাম উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আরও বলেন, ‘‘তারা বলছে, এমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি। বোমাটা অন্য জায়গায় পড়েছে, মিস হয়েছে। মানুষ মারা যায়নি। কেউ বলছে, একজন মারা গেছেন। তো সত্যটি কী, এটা তো মানুষ জানতে চাইতেই পারে। আমরা বাহিনীর সাথে রয়েছি। কিন্তু বাহিনীকে সত্যি কথাটি বলার সুযোগ দেয়া উচিত। দেশের লোকেরও সত্যিটা জানা উচিত”।
    কিন্তু এখন মোদীর বিপদ এর চেয়েও বড়। তার ধারণা ছিল প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেছে, ফলে তিনিই একমাত্র ছাতিওয়ালা নেতা, সেসব দাবির পক্ষে রসদ এখন তাঁর হাতে এসে গেছে। সুতরাং এখন সীমান্ত উত্তেজনা শীতল [de-escalation] করাই মূল কাজ। কিন্তু পাইলট আটকে যাওয়ায় ব্যাপারটি পুরা ঘোলাটে জটিল হয়ে থাকে।

    তাই তিনি আসলে তিনটি বা অন্ততপক্ষে দু’টি ক্যাম্পকে মধ্যস্থতা করতে কুটনৈতিক ততপরতা করতে ডাকেন। প্রথম ক্যাম্পের মূল নেতা সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহম্মদ বিন সালমান বা এমবিএস (MBS)। এটি কারো অজানা নয় যে, অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সঙ্কটে থাকা পাকিস্তানে তিনি গত সপ্তাহে সফরে এসে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। এ ছাড়া আরো ৯ বিলিয়নের মধ্যে নগদ তিন বিলিয়ন ডলার ইমরান ক্ষমতায় আসার পরই দিয়েছেন। এক কথায় এই প্রিন্স হলেন এখন ইমরানের পাকিস্তানের কাছে প্রমাণিত ত্রাতা। আবার খাসোগি হত্যা মামলায় ইমেজ হারানো এই প্রিন্সের কাছে পাকিস্তান সফর হল ইমেজ আবার চাঙ্গা করার উপায়। কাজেই মোদীর দিক থেকে সেই ইমরানকে রাজি করাতে হলে এখন ইমরানের দুর্বলতা ও ব্যক্তি সম্পর্ক গড়ে তোলা ব্যক্তিত্ব প্রিন্সই হলেন সঠিক লোক, এটি বুঝতে মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কষ্ট হয়নি। এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রিন্স- MBS আর দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স, এরা হলেন মূল ক্ষমতাধর। দুবাইয়ের প্রিন্সও এমবিএসের আগেই পাকিস্তান সফরে এসে প্রায় ১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। কাজেই মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের আগ্রহে – ভারত ওআইসি’র কেউ নয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও দুবাইয়ের প্রিন্স ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওআইসি’র সভায় অতিথি হতে দাওয়াত করেন। এখানেই মোদীর কাম্য মধ্যস্থতাটা ঘটে। কারণ, এর শুরু শুধু প্রিন্স MBS এর নিজের প্রভাব নয় আর এক হাতে তিনি ট্রাম্পের জামাই ক্রুসনারের মাধ্যমে ট্রাম্পের আমেরিকা দিয়েও ইমরানকে প্রভাবিত করেন। ভিয়েতনাম সফরে থাকা ট্রাম্প তাই শুধু ইঙ্গিতে বলে্ন “সারপ্রাইজ আছে”। [Earlier, U.S. President Trump said he expected “reasonably decent news” regarding the conflict between India and Pakistan, adding that the United States was trying to mediate.] অতএব, এটাকে বলতে পারি আমেরিকা সমর্থিত মিডল ইস্ট ক্যাম্পের মধ্যস্থতা।
    দ্বিতীয় ক্যাম্পটি হল, এটা মূলত চীনের উদ্যোগ। অনেকটা অপসৃয়মাণ আমেরিকান প্রভাবের ভেতর উত্থিত দুনিয়ার নতুন নেতা চীনের। ভারত ও পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ ও বাজার স্বার্থ খুবই ভাইটাল। এনিয়ে দুবাইয়ের এক সেমিনারের জাতিসংঘ আর বিশ্বব্যাংকের মন্তব্যটা দেখা যেতে পারে [Don’t let border tensions hamper trade: UN & World Bank economists to India, Pakistan]।  যদিও চীনের গ্লোবাল স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এর ভেতর ভারত আবার একটু বেয়াড়া, সবসময় কথা শুনতে চায় না। দাম বাড়িয়ে চায়, নেয়। তাই চীন নিজের প্রভাব বাড়াতে রাশিয়াকে সাথে রাখে। তাই এখানে মিটিংটা হয়েছে চীনে। ভারত, রাশিয়া ও চীন এ তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে। এ ছাড়া সাংহাই করপোরেশন সংগঠনের সূত্রে গত ২০১৭ সালে ভারত-পাকিস্তানকে একত্রে সাংহাই জোটের সদস্য করে নেয়া হয়।
    কিন্তু সব পক্ষের “উত্তেজনা নামানোর” প্রস্তাব শুনে ইমরান উল্টো নিজের ইমেজ বাড়ানোর বুদ্ধিতে নিজেই এগিয়ে আসেন। তাই পরের দিনই বিনা শর্তে পাইলটকে ছেড়ে দেয়ার আগাম ঘোষণা তিনি দিয়ে বসেন।

    কিন্তু বালাকোটে নাকি বোমা ফেলে ৩০০ জন জঙ্গী মেরে ফেলা হয়েছে – সেসব কথিত মৃত জঙ্গীর লাশ মোদী এখন কোথা থেকে দেখাবেন? সমস্যা এখন এখানে ঠেকেছে। এ দিকে খবর বেরিয়েছে, হাজার কেজি বোমা ফেলে বনজঙ্গলের পরিবেশ নষ্টের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে মামলা করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। এতে ৩০০ মৃত জঙ্গির লাশ সংগ্রহ মোদীর জন্য আরো কঠিন করে দিয়ে তাকে বিব্রত করাই পাকিস্তানের উদ্দেশ্য, তাই মনে হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস আরও খারাপ মন্তব্য করে বলেছে, – “Pakistan released the Indian pilot it had captured, capping a humiliating episode for India and a surreal week for him”.

    তাহলে এখন ভারতের বিগ-এম ভীতি, মানে মধ্যস্থতাকারীর ভীতির কী হল, কোথায় গেল? আমরা দেখলাম, ঘটনা শক্তপোক্ত করতে মোদী দু’টি বৃহৎ ক্যাম্পকে নিয়োগ করে নিজে উদ্ধার পেলেন। সম্ভবত এই বাস্তবতায় শেখর গুপ্ত লিখছেন, কাশ্মির ইস্যুতে “দ্বিপাক্ষিকতার দিন শেষ, বিগ পাওয়ারের মধ্যস্থতা নেয়ার” দিন এসে গেছে।
    পাইলটকে ফেরত পেতে গিয়ে আর ওই দিকে মমতার চোখা প্রশ্নের কারণে মোদির সব প্রপাগান্ডা আর তৎপরতাই এখন উদোম। সবাই সব জেনে গেছে।

    সর্বশেষ আবার ওআইসিঃ
    আজ আবার ওআইসি ইস্যু হাজির, কিন্তু এবার তা ভারতের জন্য চরম নেতিবাচক। ভারত দুবাইয়ে সমাদরে ওআইসির দাওয়াত খেয়ে এসে এরপরের দিনটাই তাঁর জন্য ছিল উলটা, অন্যরকম। কেন? ওআইসির ঐ দুবাই-সম্মেলন থেকে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে তাতে ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  কাশ্মীরে ভারত সরকারের নাগরিক ট্রিটমেন্ট অর্থাৎ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। মানে দুবাই মিটিংয়ে কাশ্মীরের নির্যাতিত জনগণ প্রসঙ্গের গৃহিত প্রস্তাবগুলোতে স্বভাবতই ভারতের কঠোর সমালোচনা করতে হয়েছে। সেখানে যে দুটা শব্দ ভারতের জন্য খুবই বিব্রতকর সেটা হল – “Indian terrorism” “MASS BLINDING” এর নিন্দা। প্রথমটা সরকারি গুম, খুন নিপীড়ন এসবের সীমাছাড়ানি বলপ্রয়োগের তাই এটাকে সরকারি “সন্ত্রাস” বলা হয়েছে। আর পরেরটা  বিশেষ করে নাগরিক গ্রহণযোগ্যতা সীমার বাইরে গিয়ে ছররা গুলির প্রয়োগ[use of pellet guns by security forces ] যা মাথার খুলিতেও পর্যন্ত গিয়ে ঢুকে থাকে, তাই এর কড়া সমালোচনা।

    অতএব ভারত ঐ দাওয়াতে গিয়ে খাদ্য আর প্রশংসাসহ যা যা কিছু গ্রহণ করেছিল তা এবার বমি করে উগরে বের করতে হয়েছে।  ভারতকে এবার “প্রত্যাখ্যানের” বিবৃতি দিয়ে তা বলতে হয়েছে। দা হিন্দু পত্রিকার শিরোনাম, India rejects OIC resolution on “Indian terrorism” in Kashmir। আর ওদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও এর রিপোর্ট করেছে। মূলত এদুই পত্রিকাতেই এটা ভাল রিপোর্টেড হয়েছে। এক্সপ্রেসের শিরোনাম হল, “OIC condemns ‘atrocities’, India says J&K internal matter”। অর্থাৎ ওআইসি কাশ্মীরে ভারত সরকারের নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণের নিন্দা করেছে।  আর এর জবাবে ভারত বলেছে, জম্মু-কাশ্মীরে যা কিছু ঘটে তা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানে হল বাইরের কেউ এতে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু তাহলে ভারত মধ্যস্থতা নিতে গিয়েছিল কেন, সে জবাব ভারত আমাদের দিচ্ছে না!

    ওদিকে ওআইসির প্রস্তাবে, ভাঙ্গা বাবরি মসজিদের জায়গায় আবার তা নির্মাণ করে দেওয়ার আহবানও রাখা হয়েছে [… Indian government to rebuild the Babri Masjid in Ayodhya]। ফলে মোদী সরকারের জন্য এটা এক চরম বিপর্যয় অবস্থা।

    বাকী বেশির ভাগ মিডিয়া এটাকে মোদী সরকারের “কূটনৈতিক বিপর্যয়” এর ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেছে। কিন্তু মিডিয়ায় কেন তা এত জোড়ালো হল? কারণ সুষমা স্বরাজ ওআইসিতে দাওয়াত পাওয়াতে সেটাকে খুবই গর্বের সাথে ভারত তা প্রচারে নিয়েছিল যে এটা পাকিস্তানকে কোনঠাসা করতে পারার কুটনৈতিক সাফল্য। এছাড়া যখন সুষমা দাওয়াত করার কথা উঠেছিল ওআইসির মধ্যে আভ্যন্তরীণ ভাবে তখন থেকেই পাকিস্তানের পরিরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা নিয়ে পাকিস্তান সরকারের আপত্তির কথা সরাসরি মিডিয়ায় তুলেছিল। এরই প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের অন্য ডেলিগেট সদস্যরা পরে যখন দুবাই সম্মেলন যোগ দিলেন তখন দেখা গেল তাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাদ রাখা হয়েছে। সম্ভবত কোন বিব্রতকর কিছু ঘটার সুযোগ রাখতে চায় নাই কোন পক্ষ। আর তাতেই ভারত এটাকে তাদের বিরাট সাফল্য বলার সুযোগ নিতে গিয়েছিল। এছাড়া ওআইসির প্রস্তাবে ইমরানের পাইলট ফেরত দেবার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা হয়েছে। এটাও ভারতের দেখানো সাফল্য – এবার ফুটা হয়ে যাবার আর একটা কারণ। সারকথায় ভারতের মোদী সরকারের মিথ্যা বা যুদ্ধবাজ প্রপাগান্ডা – ধর্মের কল মানে ন্যায়ের কলের বাতাসে নড়ে – এর মত আপনাতেই যেন ভেঙ্গেচুড়ে পড়েছে।
    ফলে মোদীর উদাম ন্যাংটা হয়ে যেতে আর কিছুই যেন বাকি থাকে নাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০২ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদি আরো উদোম হয়ে গেছেন“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

    হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিলঃ আসাম ও বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

    গৌতম দাস

    ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2wW

     

    আবার হেডলাইনে আসাম। তবে এবার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নতুন “নাগরিকত্ব বিল”। যদিও সম্প্রতিকালে আসাম বলতে বাংলাদেশের মানুষ চিনে এনআরসি-এর আসাম। NRC বা এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস; অর্থাৎ আসামে এখন বসবাসকারী সবাইকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে এক নাগরিকত্বের তালিকায় নাম তুলতে হচ্ছে। যার মূল কথা – ‘পড়শি’ দেশ থেকে যারা আসামে ২৪ মার্চ ১৯৭১ এর পরে আসামে এসেছে তাদের চিহ্নিত করা, যারা আসামের নাগরিক গণ্য হবেন না। তাদের অনুমান ছিল যে ইতোমধ্যে এক ব্যাপক সংখ্যক লোক আসামে এসে ঢুকেছে। যদিও নানা কারণে অনেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ দিতে পারেনি; যেমন সন্তান পেরেছি কিন্তু পিতা কোন ডকুমেন্ট দেখাতে পারেন নাই এমনও হয়েছে। তবু এসব অপ্রমাণিত থেকে যাওয়া কিন্তু চিহ্নিত নাগরিকদের নিয়ে এরপর তাদের নিয়ে ঠিক কি করা হবে তা “আনুষ্ঠানিক” ভাবে কেউ বলছে না। রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিতে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত ভারতের সরকারি অবস্থান হল যে এটা ভারতের “অভ্যন্তরীণ বিষয়”  – এই বলে চালাতে চাইছে। ঠিক যেমন ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হচ্ছে বলে শুরু করলেও তা আর কখনই বন্ধ করা হয় নাই। এদিকে এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল। এই তালিকা তৈরির নির্দেশ কিন্তু ভারতের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী নয়, সুপ্রিম কোর্ট থেকে এসেছে। তা সত্ত্বেও সেই কোর্টও স্পষ্ট করে বলছে না যে, ‘নাগরিক প্রমাণ দিতে না পারলে’ সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে কী করা হবে। কারণ, কারও ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত না হওয়া মাত্রই এটা আপনাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে না যে, সে বাংলাদেশের নাগরিক। আর মূল কথা সে ক্ষেত্রে ঐ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ইস্যু নিয়ে কোন ততপরতার শুরুর আগে বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিকভাবে ফরমাল কথা বলতে হবে। বাংলাদেশকে রাজি করাতে হবে। বাংলাদেশ যদি রাজি হয় তবেই এরপরেই কেবল আসামে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারবে।

    তবে সে কথা এখন থাক। কারণ, ইস্যু এখন তার চেয়ে আলাদা এবং ভয়াবহ। হিন্দুত্বের মোদী এবার আবার আর এক নতুন দানবীয় ইস্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাকে আসামে নতুন করে আগুন লাগানোর লক্ষ্যে মোদীর ‘নাগরিকত্ব বিল’ বলা যায়। যার আঁচ বাংলাদেশেও টের পাওয়া যাবে এমনই ভয়ঙ্কর। এই বিলের আনুষ্ঠানিক শিরোনাম হল – সিটিজেনশিপ (সংশোধনী) বিল ২০১৬ (Citizenship (Amendment) Bill, 2016)। এই বিলটা বিজেপি ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভায় পেশ করেছিল ১৯ জুলাই ২০১৬ সালে। তাই বিলের নামের সাথে ২০১৬ শব্দটা লেগে আছে। এতদিন সেটা এক যাচাই কমিটিতে ইচ্ছা করে ফেলে রাখা হয়েছিল। আসলে মোদী এটা সময়-সুবিধামত বের করবেন তাই গত দু-আড়াই বছর এটা আটকা ছিল। এখন গত সপ্তাহে ৮ জানুয়ারি ২০১৯, ঐ শিরোনামের আইনটা ভারতের লোকসভায় শেষ অধিবেশনে পাস হয়েছে।

    সার করে বললে, মূলত এটা এর আগে ভারতের “নাগরিকত্ব বিল ১৯৫৫” (Citizenship Act, 1955) এর কিছু ধারায় আনা সংশোধনের পরের নতুন রূপ। সংশোধিত হবার পর ঐ বিলের সারকথাটা হল – বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশ থেকে (মুসলমান বাদে) হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান এই ছয় ধর্মের লোক ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হলে – আর ভারতে আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে তাদের ছয় বছর বসবাস পূর্ণ হলে পরে এবার তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া যাবে। এই লক্ষ্যে এমন কেউ ভারতে প্রবেশ করলে যা আগের (১৯৫৫) সংজ্ঞা অনুসারে ‘অবৈধ ইমিগ্রান্ট’ (illegal immigrant) বলে বিবেচিত হতেন, এখন এই বিল পাশের পরে তারা “আশ্রয়প্রার্থী নাগরিক” বলে বিবেচিত হবেন। ফলে তারা ভারত থেকে বহিস্কৃত (deported) হবেন না, বা অবৈধ প্রবেশের দায়ে আদালতে পঁচে মরবেন না। বরং ভারতে থাকার পারমিট পাবেন। আর এভাবে টানা সাত বছর (আগের আইনে এটা ১২ বছর ছিল) থাকার পরে আবেদন করলে, ভারতের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন।

    যদিও (মুসলমান বাদে) শব্দগুলো সেখানে লেখা নেই, কিন্তু অর্থ তাই। আর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শব্দগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে, আর ছয় ধর্মের নামও পরিস্কার উল্লেখ করা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়া বারবার ছয় ধর্মের উল্লেখ করার ঝামেলা এড়াতে েদের বদলে একটা শব্দ লেখা শুরু করেছে – ‘অ-মুসলমান”। যেমন ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনাম হল, (Lok Sabha passes Citizenship Bill amid protests, seeks to give citizenship to non-Muslims from 3 countries)। অর্থাৎ মোদী সরকার আসলে যা বুঝাতে চেয়েছে, মিডিয়াগুলো তাই লেখা শুরু করেছে।

    কেন এই আইন আদালতে অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত
    যে লিগাল ত্রুটির কারণে এই বিল অবৈধ ও রদ (null & Void) হয়ে যাওয়া উচিত মূল সে যুক্তিটা হলঃ এটা বৈষম্যমূলক। অর্থাৎ এটা কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক “সাম্য নীতি” ভঙ্গ করেছে। ঐ বিলে বলা হয়েছে – ঐ তিন দেশে ‘ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হয়ে থাকারা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী যারা, তারা এ সুযোগ নিতে পারবে। কিন্তু তা সাধারণভাবে সব ধর্মের লোক না বরং ‘মুসলমান বাদে’ ভারতের ছয় ধর্মের কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে, যাদের বেলায়ই কেবল এটা প্রযোজ্য হবে। এটা স্পষ্টত এক বৈষম্যমূলক আইন। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা থাকা ও বাস্তবায়ন – এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের এক মৌলিক ভিত্তি।  এখানে সাম্য কথাটা ইতিবাচকভাবে বলা হয়। যেখানে মূল ভাবটা হল, বৈষম্য – নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না, কোন আইন করা যাবে না যার মাধ্যমে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। মানে রাষ্ট্রকে এক “নাগরিক বৈষম্যহীনতার” নীতি অনুসরণ করতেই হবে। বৈষম্যহীনতা মানেই ত সাম্য – তাই শব্দটাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে “সাম্যের” নীতি বলা হয়ে থাকে। এই কারণে, কোনও রিপাবলিক রাষ্ট্র কেউ মুসলমান বলে বা হিন্দু বলে যেকোন নাগরিক এমন কারও প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পারে না। এটাই নাগরিক সাম্য বা Equility এর মৌলিক নীতি, অথবা রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন থাকার প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। এই যুক্তিতে কোন সুপ্রীম কোর্ট এই বিলকে বাতিল ঘোষণা করতে পারে।

    এছাড়া, আর একটা কথা হল কখন কোন জিনিষ আইন বলে গণ্য হবে – এই প্রসঙ্গে আইনের ভিতমূলক প্রস্তাব বলে থাকে যে কোন বিষয় আইন বলে তখনই মানা হবে যদি তা নাগরিক-নির্বিশেষে সবার উপর প্রযোজ্য করা হয় তবেই। নইলে তা কোন আইনই নয়। সোজা কথা যা সবার উপর প্রযোজ্য করা যায় না তা কোন আইনই নয়। মোদীর নাগরিক বিল এই যুক্তিতে কোন আইনই নয়। ফলে ভারতের আদালতে রিট হলে আর  সৎ ও দুরদৃষ্টির যেকোন পেশাদার বিচারক এই আইনকে অবৈধ ও রদ (null & Void) করা হল – বলে রায় দিবেন।

    ওদিকে বিল পাশের আগের সপ্তাহে ০৪ জানুয়ারি আসামের শিলচর গিয়ে মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছিলেন। সেখানে আবেগী বক্তৃতায়  দিয়ে মোদী বলছেন, ভারত মাতার সন্তানদের প্রতি ভারতের দায় আছে (আগ্রহীরা ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন। 15:58 মিনিটের এই ক্লিপে 05:30 মিনেটের পর থেকে মোদীর “ভারতমাতার” সে কাহিনী শুনা যেতে পারে।)। সেই দায় থেকে ঐ তিন দেশের ঐ ছয় ধর্মের যারা ধর্মীয় কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদেরকে আশ্রয় দেয়া মোদীর দায়িত্ব – এটাই মোদীর সারকথা। কিন্তু এখন মোদীর এই যুক্তি অনুসারেই মুসলমানদের বাদ পড়ার কোন কারণ নাই। এটা এমনই উদাম এক মুসলমান-বিদ্বেষী আইন।  যেখানে এমনকি পারসি, খ্রীশ্চান ধর্মও মোদীর ধর্ম-তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।  যেমন, আরএসএস-বিজেপি তাদের উদাম বিদ্বেষ ঢাকতে প্রায়ই বলে থাকে, “ইসলাম বা মুসলমানেরা ভারতে বহিরাগত”। এখন এসব বিদ্বেষী-ভাষ্য যদি এটা মেনেও নেই তাহলে খোদ আর্যরা কী বহিরাগত নয়? তারা কোন ভারতের ঘরের লোক? এছাড়া প্রাক-ইসলামি যুগের পারস্য বা ইরানের পারসিক অথবা ইউরোপীয় খ্রীশ্চান এরা কীভাবে ভারতের ঘরের? আরএসএস-বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষ কত তীব্র তার প্রমাণ এগুলো। না তবে সাবধান। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে বলবার জন্য একথাগুলো বলা হচ্ছে অজান্তেও তা মনে করা যাবে না। সেটা আর এক বিরাট বে-ইনসাফি হবে। যেমন মোদী যদি বলতে পারতেন “যে কোন ধর্মের” আর “যে কোন দেশের” নাগরিক যারা ধর্মের কারণ নির্যাতিত তাদের জন্য এই আইন – তবে সেটাই হত সবচেয়ে মানবিক আর সবার জন্য কাম্য ও আদরের এক নাগরিকত্ব আইন।

    এখন তাই মোদির নাগরিক বিল পাস হওয়ার দিন, ৮ জানুয়ারি এক উল্লেখযোগ্য নতুন বৈষম্যের দিন হয়ে থাকল। কারণ, একে তো এমনিতেই আসামে আগের নাগরিক তালিকা তৈরির – এনআরসি তাতে, ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমানকে আসামের অপ্রমাণিত নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে আবার ১৮ লাখই হিন্দু। অর্থাৎ এনআরসি তৈরির উদ্যেশ্য বা পেছনের অনুমান ছিল যে প্রমাণ করতে না পারা অর্থে অবৈধ নাগরিকের বেশির ভাগ হবে মুসলমান। আর মুসলমান মানেই ধরে নিতে হবে, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অনুমানই ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে যায় যখন হাজির হয় যে এর মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাদের নিয়ে কী করা হবে সেই টেনশন বাড়ছিল। এর ভেতর নতুন করে আর এক দিকে উত্তেজনা ঘুরিয়ে বিজেপির দলীয়করণ করে নেয়া হল।

    ১৯৮৫ সালের চুক্তি বনাম মোদীর বিল
    অহমিয়াদের সাথে রাজীব গান্ধী সরকারের ১৯৮৫ সালের চুক্তিতে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন ভাগ ছিল না। বলা ছিল, যারাই ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের পরে আসামে প্রবেশ করেছে বলে জানা যাবে তাদেরকে আসামের নাগরিক মানা হবে না – এই ছিল চুক্তি মূল কথা।  এই কারণে, NRC এর ভিত্তিও একই। কিন্তু বিজেপি এই ৪০ লাখ  হিন্দু-মুসলমান, এমন অপ্রমাণিত-নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবার বাস্তবতায় হিন্দুদেরকে সুবিধা আর মুসলমানদেরকে বঞ্চনা দিয়ে এক বৈষম্য করে এতে মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের খাড়া করতে চাইছে।  এমনিতে বিজেপির সবখানের কমন রাজনৈতিক কৌশল হল – সাধারণভাবে “নাগরিক অধিকার” রক্ষা নয়, বরং একে পাশ কাটিয়ে হিন্দুত্বের আওয়াজ তুলে এর ভিত্তিতে সমাজে ভোটের মেরুকরণ তৈরি করা। আর এই সুযোগে হিন্দুত্বের নামে নিজদলের ভোটের বাক্স ভারি করা। ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে সেই কাজটাই করা হল; তাতে সমাজে খামোখা বিভক্তি রেষারেষি বৈষম্য বাড়ল কীনা, রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেল কিনা – এসব কিছু ফেলে এখন পাঁচ বছরের মোদীর শাসনের শেষে উল্লেখযোগ্য সবই হারানো বিজেপি এখন বেপরোয়া।

    এই বিলের প্রভাব ও পরিণতি
    প্রথমত, আমাদের সুস্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে যে, মোদির এই বিল আসামের এনআরসি বিতর্কের কোনো সুস্থ সুরাহা করার দিকে তাকিয়ে করা হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্য এ বিতর্ককে ব্যবহার করে বিজেপির নিজের বিভাজনের রাজনীতিকে বিস্তার ঘটান। তাই বেপরোয়া হয়ে অর্ধজ্ঞানের গোয়াঁর বিজেপি নেতারা [আসামের মন্ত্রী ও সারা নর্থ-ইস্টে বিজেপির মুল সংগঠক Himanta Biswa Sarma, আসামের মুখ্যমন্ত্রী Sarbananda Sonowal ] মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন করে তারা দাবি করছে এটা নাকি তাদের তথাকথিত “সভ্যতার লড়াই”। বলছে – ……They want us to be slaves of a particular civilisation. However in this civilisational fight we must win. যদিও নেপথ্যে তারা বলছেও তারা নিরুপায়। অন্য সব ইস্যু বা অর্জন হারানো বিজেপি এখন তাই আসন্ন নির্বাচনে মূল ফোকাস শ্লোগান করবে তথাকথিত হিন্দুস্বার্থ, হিন্দুত্ব বা কথিত সভ্যতার লড়াই……।

    এভাবে বিভাজন ঘটিয়ে তাদের শেষ আশা যে এভাবেই তারা আসন্ন নির্বাচন পার হবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে,  সাধারণভাবে ভারতীয় “নাগরিক” এমন পরিচয়ের রাজনীতি বিজেপি করে না বরং এক বিভক্ত পরিচয় হিন্দুত্ব – এমন হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিই বিজেপি করে। এই হিন্দুত্ব পরিচয়ে ভোটারদের জন্য সে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে কেবল তথাকথিত হিন্দু স্বার্থের আওয়াজ তুলে মেরুকরণ করা ও ভোট বাক্সে তা পৌঁছান- এই হলো বিজেপির রাজনীতির কৌশল। তাই মোদির নাগরিকত্ব বিল সাধারণভাবে ভারতের সব রাজ্যের দিকে তাকিয়ে করা বলে মনে হলেও তা আসলে আড়াল সৃষ্টি করা। আর এই আড়ালে তাঁর বিশেষ টার্গেট রাজ্য হল – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। যেমন এ বিলের মাধ্যমে আসলে বলা হয়ে গেছে যে, আসামের তাদের এনআরসি-ইস্যুতে অপ্রমাণিত নাগরিকদের মধ্যেকার ১৮ লাখ হিন্দুকে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব দেয়ার দায়িত্ব বিজেপি নিয়ে নিল। আর এভাবেই আসামকে এখন হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করল বিজেপি।

    অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে এতদিন বিজেপি অভিযোগ করত,  পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া হিন্দু বাঙালি [পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভাষায় যারা ‘বাঙাল’], কংগ্রেস আর সিপিএম, কেবল এদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে গেছে। ‘বাঙালদের’ রেশনকার্ড আর ভোটার বানিয়ে দিয়ে নিজের দল-ভারী করার সহজ রাজনীতি করে গেছে। এমন ধরণের পাল্টাপাল্টি বয়ান অনেক আছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল এমন অভিযোগ – কংগ্রেস, সিপিএম অথবা বিজেপি – এরা কেউই মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কখনো করে না। তাহলে কী উল্টা? মানে, মমতা “বাঙালদের” বিরুদ্ধের রাজনীতিটা করে? না, সেটাও না। এমন অভিযোগও দেখা যায়নি। তবে মজার ব্যাপারটা হল এখন এ বিলের মাধ্যমে এবার বিজেপি নিজেই “বাঙাল” মনোরঞ্জনে সবার ওপরে এগিয়ে থাকার রাজনীতিতে নামল। যে অভিযোগ সে এতদিন অন্যদের বিরুদ্ধে করত।

    সাধারণভাবে পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া ধর্ম-নির্বিশেষে যে কেউই হোক, তাকে ভারতে নাগরিক হিসাবে “ন্যাচারালাইজ” করে নেয়া – এটা কোনোই খারাপ বা অন্যায় কাজ নয়। আপত্তি করারও কিছু এখানে নাই। যদিও আগে আইন বানিয়ে আইনসম্মত ভাবে তা করলে সেটা তো আরও ভাল। কিন্তু ঘোরতর বে-ইনসাফি অন্যায় ও খারাপ কাজ হবে যদি বৈষম্য করা হয় যে, “কেবল অমুক ধর্ম” হলেই তাকে স্বাগত। মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে যখন “মুসলমান বাদে” বলে নীতি-পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিজেপি সেই ভয়ঙ্কর বীজ বপনের কাজ শুরু করল। আসামের ঐ ১৮ লাখ হিন্দুর কথা তুলে বিজেপি আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনি ফোকাসের বক্তব্য করতে চায়। যাতে সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু আর বিশেষ করে “বাঙাল” হিন্দুরা সহানুভূতিশীল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোটের বাক্সে আসে, প্রতিফলিত হয়। তাই মোদীর এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করা করা হয়েছে – অহমীয়াদের স্বার্থদের বিরুদ্ধে। এই হল নাগরিকত্ব বিল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি টার্গেট। মোদী তান্ডব আর ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর এই বিলের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মমতাই এখন প্রধান প্রতিরোধকারি ও ভরসা।

    তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এমনকি এর সাথে পশ্চিমবঙ্গেও আর এক  বিজেপি প্রপাগান্ডাও চলবে যে, আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বা “নাগরিক তালিকা” তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আবার অপপ্রচার শুরু করা হবে যে, তারা তুচ্ছ তেলাপোকা ও অনুপ্রবেশকারী মুসলমান এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নির্বাচনী অপপ্রচার এবং এই চরম ঘৃণা ছড়ান উন্মাদনা, এটাও বিজেপি পাশাপাশি চালাবেই। এটাই হবে, হিন্দুমনে জাগানো ঘৃণা-বিদ্বেষ কাজের মূল ফোকাস বয়ান। তার নির্বাচনি মুখ্য বয়ান।

    যদিও এখানে খেয়াল রাখতে হবে আসামের মূল এনআরসির দাবি বা চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে আইনত তারা ঠিক কেবল মুসলমান বুঝায় নাই। এটা তেমন ভিত্তির ওপর দাঁড়ান নয়। ফলে তারা কেবল মুসলমানদের বের করে দিতে এ কাজ করছে তা নয়, বরং স্পষ্ট করে বলছে – ২৪ মার্চের পরে ধর্ম-নির্বিশেষে যারাই আসামে এসেছে তাদের বিদেশি বা অ-নাগরিক বলতে হবে। কিন্তু বিজেপি বা মোদি এই সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। তাদের সোজা ভাষ্য ও অর্থ হল – এনআরসির কর্মকান্ড বলতে কেবল ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারী’ বুঝতে হবে।

    আসামে এই বিলের প্রতিক্রিয়া
    কেবল আসাম নয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আসাম ছাড়াও যেমন মনিপুরে, এমনকি ত্রিপুরায়ও। অনুমান করা যায় – তাদের মূল উদ্বেগের কারণ হল, এই সাত রাজ্যের মধ্যে যাদের সীমান্তের অপর পাড় বাংলাদেশ, তারা তো বটেই, এমনকি যারা নয়, তাদের এলাকাতেও বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা এবার নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়েই এসে গেড়ে বসে যাবে – এই হল তাদের মুল উদ্বেগ। সাধারণভাবে এখানে আগে থেকেই থাকা সবচেয়ে বড় টেনশনের ইস্যু হয়ে ছিল, সমতলি-পাহাড়ি। আসামেরও মূল দ্বন্দ্ব, টেনশনও এটা। [আমাদের দেশে যেটা পাহাড়ি সেটা নর্থ-ইস্টের ভাষায় জনজাতি বা ট্রাইব।]  কারণ এই অঞ্চলের বড় বৈশিষ্ট হল পাহাড়ি বাসিন্দা অথবা ‘জনজাতি’ বাসিন্দা। ফলে এই অঞ্চলের সমতলি-পাহাড়ির মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন আর তা থেকে উদ্ভুত উচ্চ বা নিম্নস্বরে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা সেখানে সবসময় কাজ করে থাকে। এরই মধ্যে আবার “বাঙালি-হিন্দুমুখি” করে তৈরি করা নাগরিকত্ব বিল এটাকে তারা দেখছে যে এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের (তারা বলতে চাচ্ছে এতে সমতলিদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে) নতুন করে আসার সম্ভাবনা প্রবল হবে আর স্বভাবতি তা ঘটলে তাতে আগের টেনশন আরও বড় নতুন মাত্রা পেতে পারে।

    তবে সুনির্দিষ্ট করে আসামের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক, তা অনুমান করা যায়। যেমন এমনিতেই আসামের এনআরসিতে যে ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকেছিল, তাদের মধ্যকার ১৮ লাখ হিন্দু নিজেদের ভাগ্য মোদী ফিরাবে একটা গতি হবে এই ভরসায় ইতোমধ্যেই তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব বিলের ও মোদীর ভক্ত হয়েছিলেন। সেটা কেবল ওই ১৮ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা আসামের বাঙালি হিন্দুমাত্রই তাঁরা ক্রমেই সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছিলেন। এককথায় বললে, মোদীর হিন্দুত্বের ভিত্তিতে পাবলিক মেরুকরণ এর রাজনীতি এখানই বিভক্তির প্রভাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছিল। আর তাই এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।এই বিলের বিরুদ্ধে অহমীয়দের প্রধান আপত্তি হল এই বিলটা আসলে মূলত “বাঙালি-হিন্দুমুখি”।

    কেন? এখন এই ১৮ লাখ হিন্দুই হবেন আসামের পাহাড়ি বা যারা নিজেদের অহমিয়া পরিচয় দাবি করেন তাদের হাতে আক্রান্ত হবার প্রধান টার্গেট। আসামের পাহাড়ি বা অহমিয়া পরিচয়ধারীদেরই মূল রাজনৈতিক দল হল – অহম গণ পরিষদ ও বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট। যারা বিজেপির সাথে মিলে বিজয়ে গত ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচন থেকে আসামের প্রাদেশিক জোট সরকারে ছিল। মোদীর নাগরিকত্ব বিল পাসের প্রতিবাদে এরাই এখন জোট-সরকার থেকে বের হয়ে গেছে। বিজেপির জোট শরিক অহম গণপরিষদের তিন মন্ত্রী রাজ্য মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে নয় জানুয়ারি সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরাই ১৯৮৫ সালের চুক্তির মুল দাবিদার পক্ষ যে চুক্তির মূলকথা হল, অ-অহমিয়দের আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এরা এর প্রধান প্রবক্তা ও রক্ষক। এর আগে বাঙালি-নিধনের বহু রেকর্ড এদের আছে, এবং সম্প্রতি আসামের তিনসুকিয়া জেলায় পাঁচ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, যা ওই ১৮ লাখ হিন্দু বাঙালির ভাগ্যে এখন কী হবে এর ইঙ্গিত বলেছেন অনেকেই।

    এ দিকে, আর এক অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যাচ্ছে। তা হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ মোদীর এই বিল পাসে খুশি হয়নি মনে হচ্ছে, অন্তত ভাল কাজ মনে করছে না। যদিও পেশাদার হিসেবে তাঁরা তাঁদের আপত্তি মনে মনে রেখেছে। তবে সেই সাথে আর একটা কাজ করেছে। তা হল, তাদের সাথে সম্পর্কিত বা এসাইনড লোকেদের হাতে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকে তাদের আপত্তি বা যুক্তিগুলো জানা গেছে। তাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হল, এই বিল পাসের ফলে এতে গত ছয় বছরে উলফার (ULFA, আসামে এটা উচ্চারিত হয় আলফা বলে) কমে আসা তৎপরতা যা এখন পরেশ বরুয়া অংশের নামে আছে কিন্তু স্তিমিত তাদের পুরনো সেসব তৎপরতা আবার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে তাঁরা। এমনিতেই জটিল পরিস্থিতি ও সমীকরণের আসামে আবার নতুন উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতের ফলে তাদের এতদিনের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যা কিছু অর্জন এত দিনে হয়েছিল তার উপর পানি ঢেলে দেয়া হবে বলে তারা মনে করে। তাই অশান্তি আর তাদের কাজ বাড়বে।

    বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া
    এবারের ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি ও মোদীর রাজনীতি হবে বাংলাদেশের জন্যও ভয়ঙ্কর। এমনিতেই বাংলাদেশের স্থানীয় হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই এখন আরএসএসের মুঠোয়। এই বিল “বাঙালি-হিন্দুমুখি” বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের “বাঙালদের” মনোরঞ্জন-মুখি এই অভিযোগ অনেকের।  ফলে মোদীর নাগরিকত্ব বিলের রাজনীতি হাজির করে বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির অনেকটাই আরএসএসের মুঠোয় ভরতে তাদের সাহায্য করেছে। যদিও নিকট আগামিতেই বাংলাদেশের হিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে আত্মঘাতি বলে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য যে ম্যাসেজ অপেক্ষা করছে তা হল, এই বিল এক বিশাল মরিচিকা।

    ওদিকে অর্থনীতিক ‘উন্নয়ন ও বিকাশে’ রাজনীতিতে মোদী ইতোমধ্যেই ফেল মেরেছে। আসলে সেকারণেই মোদীর এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতি এত সিরিয়াস-নেস। আর একেই বিকল্প ইস্যু ভাব ধরে হাজির করার উদ্যোগ। মানে তার এখন একমাত্র সম্ভাব্য ইস্যু হবে হিন্দুত্ব, যার বিশেষ ফোকাস হবে ‘নাগরিকত্ব বিল’। আমরা ইতোমধ্যে – মুসলমানেরা তুচ্ছ তেলাপোকা, পিসে মেরে ফেলা হবে, বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে উপড়ে ফেলা হবে, ইত্যাদি এসব বলে গত নভেম্বর পাঁচ রাজ্য নির্বাচন লড়েছে বিজেপি দেখেছি।

    সেই মহড়ার পর এবার আবার মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় নামতে হবে মোদীকে। আমাদের সরকার গতবার কেবল তথ্যমন্ত্রী ইনুকে দিয়ে এই ইস্যুতে ভারতের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু এবার নাগরিকত্বের বিল পাস করার পরে মুসলমান-বিদ্বেষ আর অনুপ্রবেশকারী বলে সরাসরি বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডা আরও তীব্র হবে বলে অনুমান করা যায়। কারণ এবার এটা আরও বড় স্টেক; মোদী নির্বাচনে জেতার মামলা যেখানে আবার নাগরিকত্ব বিল মুল ইস্যু।

    এছাড়া ওদিকে আবার বিশেষ করে আসামে যেখানে অহমিয়া-বাঙালি সঙ্ঘাত উসকে গেল সে পরিপ্রেক্ষিতঅও তৈরি হচ্ছে। হাসিনা সরকার তার প্রথম পাঁচ বছরেই উলফা দমনে যে ভূমিকা ও সহায়তা দিয়েছিল এর প্রশংসায় ভারতের গোয়েন্দা-আমলা থেকে রাজনীতিক সবাই পঞ্চমুখ। যদি তাই হয় তবে একদিকে এখন সেই অর্জন ভেঙে ফেলতে পরোয়া করছে না মোদীর নির্বাচনে জিতবার স্বার্থ। আর অন্যদিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের তেলাপোকা বলে ঘৃণা আর গালির জোয়ার তুলছে। এটা কতটুকু ফেয়ার? মোদীকেই জিতাবার স্বার্থে আমাদের সরকার কী মোদীর অত্যাচার, অনাচার জুলুমের দায়ীত্ব নিজের কাধে নিবে? আমাদের সরকারের নিজেকে আরও ভারতমুখি পরিচয়ে আর নিজেকে গণবিরোধী করার রিস্কের মধ্যে ফেলা ঠিক হবে? মনে হয় না।

    ভারতের হবু নির্বাচনে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের দুই দিকে দুই রাজ্যে থেকেই মোদীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ-বিরোধী প্রপাগান্ডায় (যা ইতোমধ্যে আমরা রাজস্থান, ছত্তিসগড় নির্বাচনে দেখেছি) দেখতে হবে আমাদেরকে। বলা বাহুল্য এতে বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে পাল্টা সরব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আর সম্ভাব্য সে পরিস্থিতির কথা আঁচ করে আগে থেকেই ভারতকে সাবধান করে নিজেদের স্বার্থ-প্রতিক্রিয়ার কথা তুলে না ধরা হবে আমাদের সরকারের আর এক বড় ভুল।

    গুরুতর প্রশ্ন, এ নাগরিকত্ব বিল পাসের পরে আসাম্র ‘নাগরিকত্ব অ-প্রমাণিত থেকে যাওয়া’ প্রায় ১৭ লাখ মুসলমানের কী হবে? রোহিঙ্গাদের মত তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হবে? অথবা মোদীর উসকানি ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের কারণে জীবনের ভয়ে তারা আসাম ছেড়ে বাংলাদেশের দিকে ঢল নামাবে, নাকি তাদের বাধ্য করা হবে?

    আমাদের উচিত হবে এমন যেকোনো কিছুর আগে এনিয়ে মোদীর সাথে ‘ডায়লগ ওপেন’ করা। মোদীকে আগে থেকেই সংযত করা, আমাদের উদ্বেগের কথা বলা এবং প্রতিশ্রুতি আদায় করা হবে আমাদের প্রাথমিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ। অন্যথায় আমাদের সরকারকে অজনপ্রিয় হওয়ার অপ্রয়োজনীয় ভারতমুখি পরিচয়ের রিস্ক নিতে হবে।

    শেষ কথাঃ
    শেষ কথাটা হল এই বিল পুরাপুরি আইনসিদ্ধ হবার প্রক্রিয়া এখনও বাকী। কারণ লোকসভায় পাশের পর এবার ভারতের উচ্চ-কক্ষ, রাজসভাতেও তা পাশ হতে হবে। তবেই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা পরিপুর্ণ আইন হবে। রাজ্যসভা বসবে আগামি ৩১ জানুয়ারি। সবচেয়ে বড় কথা কিন্তু এখানে বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই। এর অর্থ এই বিল এখানে পাশ হবার কোন সম্ভাবনা নাই। ২৪৫ সদস্যের রাজ্যসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর জোট এখনো ৮৮ জন সদস্য। বিপরীতে বিজেপি বিরোধী শিবিরের এই মুহূর্তে সদস্যসংখ্যা ১৫৬। তাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
    তাহলে এটা জানার পরেও মোদী এত উদ্যোগী কেন? কারণ, আপাতত তাঁর “বাঙালি-হিন্দুমুখি” প্রেমের প্রকাশ – আর কিছু পারুক না পারুক  মোদীর মূল উদ্যোগ হল – এটা দেখিয়েই সে কাজ সারতে চায়। এটাই তাঁর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম-ত্রিপুরাসহ পুরা নর্থ-ইস্টে (মোট ৬৬ আসনে) নির্বাচনে লড়বার লক্ষ্যে মেরুকরণে হিন্দুত্ব রাজনীতির একমাত্র কৌশল।  আর এই মেরুকরণে এই অঞ্চলের প্রাণ-বেড়িয়ে যাবার অবস্থা তৈরি হলেও সংকীর্ণ স্বার্থপর বিজেপি ও মোদী নির্বিকার; যেভাবেই হোক তাঁকে ক্ষমতা পেতে হবে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদির নতুন বিল: আসাম ও বাংলাদেশ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

    ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

    গৌতম দাস

    ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2we

     

     

    ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

    অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

    কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

    এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

    ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

    অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
    বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

    কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
    প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

    মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

    আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

    এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
    ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

    তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

    কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

    প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

    এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

    তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

    ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

    ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

    এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

    শেষ কথাঃ
    কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
    কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]