Category: MODI

  • মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?

    মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?
    গৌতম দাস
    ০৩ মার্চ ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৭
    https://wp.me/p1sCvy-5sa

     

     

     

    একটা অন্যায়-অপরাধের প্রতিকার বলতে আরেকটা অন্যায় করা নয়! কিন্তু মানুষের জিঘাংসা এতই তীব্র, সে প্রতিহিংসার আগুনে এতই সাইকো যে মানুষ সে পথেই যায়!
    আর নিজের করা বর্তমানের অন্যায়-অপরাধের সাফাই হিসাবে সে আগে তার উপরে ঘটা অন্যায়-অপরাধকে হাজির করে!  তাতে কিছুই মুছে না, দুটাই অন্যায়-ই হয়ে জ্বল জ্বলে থেকে যায়!

    গত সপ্তাহে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত ঢাকার এক অনুষ্ঠানে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়-কে [CJI  D. Y. CHANDRACHUD]  দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল। অফিসিয়াল দাওয়াত কার্ডের লেখা অনুসারে ব্যাপারটা ছিল – “The supreme Court of Bangladesh is going to organize an international conference on “South Asian Constitutional Court in The Twenty-First Century: Lessons from Bangladesh and India” on 23 & 24 February 2024. The valedictory scession of the conference will be held on 24 February 2024, at 10:00AM at the Bangabandhu International Conference center (BICC). – এরকম।
    মানে হল এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে; যদিও এতে অংশগ্রহণকারী কেবল ভারত ও বাংলাদেশ। আবার বলা হয়েছে, এটা দক্ষিণ এশিয়ার কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপ; যেখানে আবার কেবল ভারত আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা-পাঠ [lessions] নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু ঘটনা হল, দক্ষিণ-এশিয়া বলতে কেবল ভারত-বাংলাদেশই বুঝায় না। এভাবে ভারত কখনই তার দক্ষিণ-এশিয়ার ধারণা বাস্তবের সাথে মিলাতে না পারলেও একই কান্ড করে থাকে! আসলে ঘটেছে যেটা ভারতের মিথ্যা আধিপত্যের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশ! আর সেটা ঢাকতেই এটা “দক্ষিণ-এশিয়ার ব্যাপার” বলে নোংরামি ঢেকে রাখার ভারতের এই অক্ষম প্রচেষ্টা!

     

    অনুষ্ঠানের আরো দৃষ্টিকটু দিকঃ
    ঘটনার আরো সব মারাত্মক দিক আছে। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হল, একটা জুডিশিয়ারি ক্ষমতা তা যেন এক্সিকিউটিভ (বা প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতার অধীনে আছে ও থাকতে হবে এই অনুমানে দাঁড়িয়ে সবকিছু আয়োজন করা হয়েছে। কোন রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকে না। রাখা যায় না। বিচার বিভাগ জনপ্রশাসন বিভাগের মত নির্বাহি-প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন প্রতিষ্ঠান নয়, পুলিশ বা সামরিক বিভাগের মতও নয় যে এসব অফিস বা বিভাগের মত বিচার বিভাগও প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন সরকারি অফিস-প্রতিষ্ঠান নয়। তাহলে এটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না! জনগণই ঐ প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার উতস  তা আর কার্যত থাকে না!
    সেপারেশন অব পাওয়ার” বা বিচার বিভাগকে প্রধানমন্ত্রী (বা রাজার) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করার কনসেপ্ট এটা ইউরোপে রাজতন্ত্রের আমল থেকেই চালু এক পজিটিভ ধারণা। অর্থাৎ পরবর্তিতে জনগণই সব শাসন ক্ষমতার উতস – যেটাকে ঐ শাসন ক্ষমতার উতস কোন রাজা-বাদশা নয়; তাদের ডায়নেস্টির বংশ-পরম্পরা বা রাজার ছেলে রাজাও আর নয় এমন নয়া এই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মুলকথা চালু হয়েছিল। বলা হয় যা রাজতন্ত্র ব্যবস্থাকে নির্মুল করে ক্ষমতা নিয়েছিল – সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা আসার আগেই এটা চালু হয়েছিল যে বিচার বিভাগকে রাজার (বা পরে সমতুল্য নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে  আলাদা বা সেপারেট করতেই হবে। নইলে বিচার করা অর্থহীন। নির্বাহী ক্ষমতার শাসকের মুখ চেয়ে যে রায় দেয়া হয় ওটা বিচার নয়!

    তাই একালে রিপাবলিক নামে এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা জনগণের শাসনের নামে কিছু একটা চালু আছে আমরা দেখছি  অথচ কিছু লোক মনে করছে যেন বিচার বিভাগও সর্বময় ক্ষমতার প্রধানমন্ত্রীর বাইরে থাকে কী করে?? অধীনেই তো থাকা উচিত! বিএনপি-জামাত জঙ্গীবাদ ঠেকাতে নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই বিচার বিভাগ গড়তে হবে যারা সহি মনে করছেন এটা তাঁরা গড়ে তুললে সেটা প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়ে বিচার ও রায় দিবার এক বিচার বিভাগই হবে! এর বাইরে কিছু হবার সুযোগ নাই! এমনিতেই যেটা নিয়ে সরকার-বিরোধী যেকোন নাগরিকের ইতোমধ্যেও অভিযোগ করে আসছে। আমাদের বিচার বিভাগকেই ঢেলে সাজাতে হবে বলে মনে করে এমন অভিযোগকারিরা! সেখানে সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত এই কনফারেন্স আসলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগকেই পুষ্ট করল!

    এই আয়োজনে দৃষ্টিকটু ঘটনার শেষ নাই। যেমন প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা মূলত দুদেশের সুপ্রীম কোর্টের এক অনুষ্ঠান মাত্র।  কোর্ট যেকোন নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে দুরে বা আলাদা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক হত। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে তারা এনেছে হয়ত সেটা বড় সমস্যা হত না যদি নিজ পরিমিতবোধে প্রেসিডেন্ট – তিনিও কোন রাজনৈতিক বক্তব্য আনছেন না বা এড়িয়ে গেছেন। এরপর থেমে যাওয়া উচিত ছিল।  কারণ, কোন চীফ জাস্টিস প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক আসরে হাজির থাকেন না – খুবই সীমিত ও নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতার আসর ছাড়া!  প্রধানমন্ত্রী আর বিচার বিভাগের ক্ষমতা আলাদা – এটা সব জায়গাতেই প্রতিষ্ঠিত রাখতেই হয়!

    পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [prejudes]
    সেপারেশনের ইস্যুটা ছাড়াও আরেকটা বিরাট বিবেচনা নিয়ে বিচারকদের চলতেই হয়, মানতেই হয়। সেটা হল – পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [pre-judes]। বিচারক সকালে উঠে বাসায় নাস্তার টেবিলে এক ঘনিষ্ট আত্মীয়,বন্ধু বা হয়ত নিজ স্ত্রীর মুখে মন্তব্য শুনলেন যে আজ এজলাসে যে কেসের শুনানী তিনি শুনবেন সেই আসামীই আসল বা মূল খুনী অপরাধী – এধরণের একটা মন্তব্য!  কিন্তু বিচারকের কাজ হচ্ছে কোন কারও কানকথা না শুনা, কানেই না আসে সে ব্যবস্থা করা! আর এজলাসে বসে কেস ডকুমেন্ট আর শুনানীতে বাদী-বিবাদির উকিল কী তথ্য আর যুক্তি তুলছেন কেবল সেসবের ভিত্তিতে আসামী সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা। যেটা একমাত্র এজলাসেই তৈরি হয়, শুনতে শুনতে জন্মায়। কাজের সকালে বাসায় যদি কিছু শুনেছেন আর এতে তার মন যেভাবে প্রভাবিত হয়েছে – এটাই প্রিযুডিস বা পুর্ব-সংস্কার বলা হবে। এককথায় সেটা আসলে এজলাসে-বিচারে বসার আগেই প্রভাবিত হয়ে বিচার করে ফেলার অবস্থায় নিতে পারে বিচারককে!  একজন বিচারকের জন্য প্রিযুডিস তাই সবচেয়ে বড় অপরাধের কাজ মনে করা হয়!
    বিচারকেরা তাই নিজ জীবন সাজান যেন প্রিযুডিস এড়ানো জীবনাচার হয় নিজের! এজন্য সামাজিক-পারিবারিক নিজ জীবন তিনি নিয়ন্ত্রিত করেন। সবার দাওয়াতে তিনি যান না, সব সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন না; খুবই ঘনিষ্টজনেরটা ছাড়া! যাতে আবার কোন ব্যক্তিগত আলাপে তিনি জেনে বা না-জেনে যেন কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যান! এভাবে সতর্কতা নিতে হয় তাঁকে! কাজেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা-সাক্ষাত সেটা তো অনেক দুরের যেখানে নিজ সব আত্মীয়স্বজন বন্ধুর সাথেও কোন বিচারকের ততটা মেলামিশার কথাই না!

    অথচ এখানে হয়েছে উলটা প্রধানমন্ত্রীকেই এখানে চীফ গেষ্ট করা হয়েছিল। আর প্রধানমন্ত্রী প্রায় ত্রিশ মিনিটের বক্তৃতার পুরাটাই ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য! আমাদের বিটিভির রেকর্ডেড এই বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। এটা পুরা অনুষ্ঠানেরই ভিডিও প্রায় দুই ঘন্টার বেশি; এর মধ্যে ১ঃ৪৪ মানে একঘন্টা ৪৪ মি এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুরু হয়েছে।
    ওদিকে আরেক বড় অস্বস্তিকর ব্যাপার হল, এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে বলা হয়েছে সমাপনী বক্তা অতিথি [valedictory scession]। এটা সকাল দশটায় শুরু হলেও এটাই সমাপনি অনুষ্ঠান নয়। কারন, ঐদিনই বিকালে তিনটা থেকে ২৪ তারিখেওর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে।

    এই অনুষ্ঠানের আয়োজন কেন? মূল উদ্দেশ্য কী?
    এর জবাবটা হাসিনার দিক থেকে দেখে বললে মানে, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলে যা পাওয়া যায় তা হল, এদিনটা আসলে ছিল হাসিনার ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর থেকে এপর্যন্ত তিনি কী কী অর্জন করেছে এর একটা তালিকা হাজির করা আর এসবের জন্য ভারতের সরকার সেনাবাহিনী সহ ভারতের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান প্রায় সবাইকেই ধন্যবাদ জানানো। এর ভিতরে আবার ভারতের হাসিনাকে ছয় বছর আশ্রয় দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। এর সাথে হাসিনার ভাষায় বিচার বিভাগ যেভাবে   নিয়ন্ত্রিত ভাবে আচরণ করে ১৯৭৫ সালের আগষ্টের পর থেকে বখে গেছিল একে তিনি এবার শুদ্ধ করে নিজের মত করে সাজিয়েছেন – এই অর্জনকে ভারতের সামনে তুলে ধরতে চেয়েই যেন এই কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে!
    এই হল, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার সারকথা!
    কিন্তু প্রধান বিচারপতি  চন্দ্রচূড় এর কিছু মন্তব্য সব আউলায়ে দিয়েছে।  কিন্তু এরও আগে, চন্দ্রচুড়  আবার এই কনফারেন্স সম্পর্কে হাসিনার নিজ ভাষ্যকে পাশ কাটিয়ে নিজ ভাষ্য খাড়া করেছেন।

    কনফারেন্সের দাওয়াতপত্রের ভাষ্য ভারতেরঃ
    কেন ভারতের পুরা বিচার বিভাগ না হলেও এর মাথা সুপ্রীম কোর্ট এমন কনফারেন্সে যোগ দিল – এনিয়ে তাদের মনেও অস্বস্তি ছিল তা বুঝা যাচ্ছিল। যেমন, হাসিনার সাথে ভারতের বিচার বিভাগের লেনা-দেনা কী? আমাদের বিচার বিভাগের যেকারণে আমাদের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ট হওয়া অস্বস্তিকর কারণ তাদেরকে নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সেপারেশনে দূরে থাকাটাই একমাত্র স্বাভাবিক! বাকিটা অস্বাভাবিক!! তাহলে ঠিক একই যুক্তিতে ভারতের সুপ্রীম কোর্টও তাই অস্বাভাবিক কিছু করেছে???  তাদেরও কোন লেনা-দেখা থাকতেই পারে না। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশ এদুই সুপ্রীম কোর্ট কী একাদেমিক-টেকনিক্যাল বৈশিষ্ঠের কোন কনফারেন্সে মত্ত হয়েছিল? জবাব হল যে একেবারেই না। কারণ তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাদের কোন কাজ থাকার কথা না ??

    তাই এই অস্বাভাবিক দিক, এদিকটা সাফাই দিতেই চন্দ্রচুড় এন্ড গং বিচারপতিরা তার সঙ্গি হয়ে এসেছেন – অনুমান করা যায় তারা অনুষ্ঠান সুচির পাতার শুরুতেই ১০-১২ লাইনের কিছু বক্তব্য ঢুকানো দেখে। নিচে তেমনই পাতাটা দেখেন।

    এককথায় বললে এটা ভারতের জুড়িশিয়াল পেশাদারদের কিছু অপ্রয়োজনীয় আতলামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের ভারত যেন এশিয়ায় না হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বিচারীয় বিষয়ের বিরাট কুতুব এক অথরিটি!  এমন আগাম অনুমান ধরে নিয়ে তারা কথা বলেছে! যেমন বাক্যের প্রথমেই একটা শব্দ ব্যবহার করেছে পোস্ট-কলোনিয়াল। অনেকে আবার  পোস্ট-কলোনিয়াল শব্দটা কাউকে ব্যবহার করতে দেখলে এটা যেন বক্তার বিরাট এক জ্ঞানের বহরের প্রকাশ ভেবে মাথা নিচা করে সালাম-আনুগত্য জানাতে-বুঝাতে চায়।  অথচ এই ভাষ্যের সারকথা হল, ১৯৪৫ সালের আগের পশ্চিমাবিশ্বের অভিজ্ঞতা পরের কলোনিমুক্ত দেশে যেন আর অত কাজের না। তাই লিখেছে  – where constitutional borrowing has occured in the region rather than from europe & America. -মানে হল  পোস্ট কলোনিয়াল সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার চেয়ে আমাদের এই রিজিয়নে [মানে যার একছত্র নেতা হল ভারত বলে বক্তার ভুয়া অনুমান] আমাদের নিজেদের মধ্যকার অভিজ্ঞতা ধার নেয়া বেশী ঘটেছে। ফলে ভারত হল বাংলাদেশের জুডিশিয়াল বা বিচারীয় জ্ঞানের জগতে এক একছত্র নেতা ওস্তাদ। অতএব মোদি-চন্দ্রচূড় এন্ড গং-দের কথা শুনে বাংলাদেশ তুমি অনুগত হয়ে চল!!!!  আর আমাদের সুপ্রীম কোর্ট ভারতের সুপ্রীম কোর্টকে বড়ভাই মেনে আনুগত্য করুক!  কিন্তু আসলেই কী ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এর অর্জন এতই গৌরবেই? আসেন একটু চেক করে দেখি!

    প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা তাঁর বিরুদ্ধে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় মানতে রাজি হন নাইঃ 
    ভারত রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। আর এতে ভারত এরপর থেকে নিজে আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছিল। কেন?
    গত ১৯৭২ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে ইন্দিরার আসনে তিনি কারচুপি করেছেন আর এভাবেই তিনি এমপি আর শেষে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এমন মামলা করে তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী! এই মামলার হাইকোর্টের রায় বের হয় ১৯৭৫ সালে। বিচারক তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ ত্যাগ করার সময় দিয়ে সাজা ভোগ করতে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই রায় অমান্য করতে পালটা দেশে জরুরি আইন জারি করে পরিস্থিতি নিজের হাতে এনে নিয়ন্ত্রণে নেন; যাতে সাজা ভোগের প্রসঙ্গ চাপা পড়ে। সারকথা একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ আর নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী – এরা যদি কেউ কাউকে কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যবাধ্যকতা মান্য করতে  বা কাজ করতে দিতে না চায় – এটা ছিল সেই কেস। যার সার-অর্থ হল, রাষ্ট্রটা নাই হয়ে গেছে!! ঠিক তাই হয়েছিল ভারতে।  যদিও পরে ইন্দিরা সরকারের পতন ঘটে – নির্বাচনে বিরোধী মোরারজি দেশাই এরা ক্ষমতায় আসে। আমি আর সে  সব ফারদার বিস্তারে যাচ্ছি না এখন।

    [অনেকে ভাবতে পারেন কেবল ভারত রাষ্ট্রই ইন্দিরার হাতে এমন সংকটে পরেছিল। না, একেবারেই সত্য না। শেখ মুজিবের বাংলাদেশ রাষ্ট্রও ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের হাতেই এমন নাই হয়ে গেছিল। আমার পুরানা  ২০১০ সালের লেখা পড়েন এখানে।]

    কিন্তু এরপর থেকে ভারতের আইন পেশার একাদেমিক, উকিল বা বিচারক কমিউনিটি দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যাদের মধ্যে ডমিনেটিং ভাষ্য হল, বিচার বিভাগের প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা উচিত ছিল! বিচারকদেরও প্রধানমন্ত্রী জিন্দাবাদ বলতে হত!  শহরের এলিটদের বিরুদ্ধে যেভাবে গরীবেরা দাড়াতেই পারে না আগের মানসিকভাবে হেরে গিয়ে থাকে বলে – এটা ছিল অনেকটা সেরকম!
    আর সেই থেকে ভারতে এই “দেশের স্বার্থে” বলে আপোষি জাতিবাদিদের আপোষ ধারাটাই চলে আসছে এখনও। নানান বাঁক পেরিয়ে। এমনকি এখনও এই চন্দ্রচূড়েরা একই কাজ করে চলছেন! মুসলমান নিধন অত্যাচার নিগৃহ বৈষম্য চন্দ্রচুড়েরা দেখতেই পান না!  এমনকি চন্দ্রচূড় ঢাকায় এসেছেন মোদি-হাসিনার রাজনৈতিক আলোচনার ফলশ্রুতিতে। কিন্তু চন্দ্রচুড় কেন এই আলোচনায় অংশ নিবেন? মোদি বা হাসিনার সাথে এই প্যাচ-আপে তিনি কেন অংশ নিবেন? তিনি কী মোদির অধীনে কোন মন্ত্রণালয়ের সচিব?? এর উপর আবার মোদি  যে বাংলাদেশে নিজ কলোনি শাসন – আধিপত্য কায়েম করতে চলেছেন। আর চন্দ্রচূড় “পোষ্ট-কলোনিয়াল” বলে হুঙ্কার তুলে মোদির কলোনিদখলের নৌকায় উঠে বাংলাদেশে এসেছেন!  প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা প্রধান বিচারপতির চন্দ্রচূড়ের তো পরিণতি এমনই হবার কথা; নয় কী!!!

    চন্দ্রচূড় ভাব ধরতে চান কলোনিয়াল পশ্চিমারা খুব খারাপ। একমাত্র তিনিই বীর! তো রিপাবলিক ধারণাটা কোথায় পাইছেন, মহাশয়?  ব্যক্তি-বোধ, নাগরিক, রাষ্ট্র রাজনীতি ইত্যাদি সহ ভারতে রিপাবলিক ধারণা কিভাবে এলো? মোগল আমলে ছিল?? কাজেই বকোয়াজ বন্ধ করেন। ইউরোপের আমাদের মত দেশকে কলোনি করা অন্যায় নিঃসন্দেহে! কিন্তু কলোনিদখলদারদের দেশে শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে এই হিসাবে রিপাবলিক – জনগণ ক্ষমতার উতস – রাজনীতি নাগরিক ইত্যাদি সব ধারণাওগুলো আমরা বৃটিশদের থেকেই পেয়েছি। এটা পজিটিভ পাওনা! আর বৃটিশেরাও আবার সে ধারণার গোড়াটা পেয়েছে রোমান-দের কাছে থেকে। এটা শুরুতে প্রাচীন রোম থেকে পরে হোলি রোমান এম্পায়ার সমাজ থেকে!
    এখনও আমাদের হাইকোর্টের বিচারকেরা রায় লেখার সময় দুচারটা এক্সিওম [AXIOM] বা স্বতসিদ্ধ সত্য বলে কিছু বাণীর উল্লেখ করতে খুবই ভালবাসেন। এর মাহাত্ম হল, তিনি যে রোমান এক্সিওমগুলো মুখস্ত করেছেন সেটাই যাহির করে দেখানো! এখন চন্দ্রচূড়েরা কী বৃটিশ-রোমানদেরকে কলোনি শাসক বলে তুচ্ছ বা অস্বীকার করবেন? পশ্চিমা কলোনি শাসকদের গালি দিয়ে আবার, এখন ভারতকেই  কলোনিদখলদার (বাংলাদেশকে দখল) করে গড়তে চাইবেন? মোদির হাতধরে বাংলাদেশে আসবেন???

    বৃটিশদের কাছ থেকে রাজা রামমোহন রায় বৃটিশ রিপাবলিক ধারণাটা প্রথম বুঝেছিলেন। তিনিই প্রথম এটা বুঝে তা কাজে লাগাতে গেছিলেন। কিন্তু বুঝেছিলেন উলটা। ভেবেছিলেন, রিপাবলিক জাতি-রাষ্ট্র মানে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণা। সেটা অর্জন করতেই তিনি অসংখ্য জাতে বিভক্ত হিন্দুদেরকে সহ সকলেই আগে এক নয়া এক ব্রাহ্ম ধর্মে নিতেচেয়েছিলেন। আর এরই শেষ আজ পরিণতি বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ! 
    একটু পড়ালেখা করেন বুঝা কঠিন না। কিন্তু হুদাই পশ্চিমাবিরোধী সাইজেন না! এর পরিণতিতেই তো বাংলাদেশকেই একালে ভারতের কোলোনি সম্পর্কে বেধে ফেলার কাজে মোদির সঙ্গি হয়ে এসেছেন!

    চন্দ্রচুড়ের হাত ধুয়ে ফেলার কোশেশঃ
    কিন্তু এসব সত্বেও চন্দ্রচুড় নিজের হাত ধুয়ে রাখতে চেয়েছেন। হাসিনার উপস্থিতিতে ঐ অনুষ্ঠানের সবটা বিটিভি সংগ্রহ ও রেকর্ডিং করেছে। কিন্তু ভারতের ইন্ডিয়া টুডে আবার সেখান থেকে নিয়ে নিজেই ইউটিউব ভিডিও করে ছেড়েছে, বিশেষ করে চন্দ্রচূড়ের আধাঘন্টা কথা। কিন্তু তাতেই এরা সনুষ্ট হয় নাই। এ’বাদেও ঐ আধাঘন্টা থেকে আবার বিশেষ আড়াই মিনিটের একটা বক্যব্যের ভিডিও-ও তারা ছেড়েছে। মনে রাখতে হবে ইন্ডিয়া টুডে মোদি সরকারেরই বা র-এর আরেক হাতিয়ার। যখন বাংলাদেশে বিরোধী বা বাংলাদেশকে টার্গেট করে কিছু তাদের প্রপাগান্ডা করার থাকে তখন তারা এই মিডিয়া ব্যবহার করে থাকে। সেই আড়াই মিনিটের লিঙ্ক এখানে। চন্দ্রচূড়ের এই অংশের বয়ানটুকুকে  তাই এন্ডিয়া টুডে নিচে লিখিত টেলপ দিয়ে এক মলিয়া পড়ে শুনিয়ে দিয়েছেন  যাতে কেউ মোদির দোষে অসৎ কাজের সঙ্গী বলে চন্দ্রচুড়কে অভিযুক্ত না করেন। চন্দ্রচুড় খারাপ ও অনিশ্চিত সময়ের কথা বলছেন যে এসব সময়ে সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের মত প্রতিষ্ঠানগুলো কনষ্টিটিউশনের উপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখার পক্ষে এগিয়ে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকমত সচল থাকাটা সেজন্য গুরুত্বপুর্ন।

    In a time of uncertainty and ambiguity, the pillar of democracy are put to the test. CJ DYC speaking at the south asian constitutional court conference in Bangladesh emphasis the crucial role of institution like supreme court and election commission in upholding the trust of the people in the constitution.
    Speaking at the conference, CJ DYC said, the constitution is not like the income tax act. The legitimacy of our Governance institutions hinges on their functionality.
    He stressed that the confidence of the people in the constitution solidify when these institutions rise to the occasion.

    সারকথায় তিনি বলছেন  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ। মানে তিনি রেকর্ড রাখতে চান যে এদুটা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তিনি আমাদের বুঝাইছিলেন! কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় গত পনেরো বছরে এটা হাসিনা সরকারের অধীনে একটা প্রতিষ্ঠানেরও এমন যোগ্য হয় নাই এটা কে না জানে! আর নির্বাচন কমিশন??? নিশ্চয় এবার ৭ জানুয়ারী ভোট দিয়ে জনগণ খুবই খুশি!!!! কারণ, হাসিনা বলেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে এটাই নাকি বেস্ট নির্বাচন!  অর্থাৎ চন্দ্রচুড় হুদাই কীছু বকোয়াজ করে গেলেন আরকি!
    অবশ্য ভারতের অনেকের মনে হতে পারে সব হল আমরা মুসলমানদের স্মস্যা। আমরা পশ্চাদপদ আমরা তাই কিছু পারি না!।    তাহলে আচ্ছা ভারতের সুপ্রীম কোর্ট কী খুব একটিভ আর নির্বাচন কমিশন খুবই সুনামের?
    একই কথা বার বার লেখার চেয়ে আমার নিজেরই এক পুরানা লিখার লিঙ্ক এখানে, কী ভয়াবহ অবস্থা দেখেন এখানে। লেখাটার শিরোনাম ছিল ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা । চন্দ্রচুড়ের নিজের সুপ্রীম কোর্টের অবস্থা বুঝবার জন্য। এবং এই আবেদনে নির্বাচন কমিশন ভাল হয়ে যায় নাই।
     আর ভারতের খোদ নির্বাচন কমিশন??? সে আরেক ভয়াবহ অবস্থা!!!  ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের; প্রধান ছাড়া আরো দুজন কমিশনার। কম কথায় বললে মামলা টা ২০১৯ সালে ভাএরতের নির্বাচনের। মোদিসহ আরো অনেক প্রার্থীই নির্বাচনি আইন ভেঙ্গে সাজা পেয়েছেন বা  ফাইন দিয়েছেন। কিন্তু একমাত্র নরেন্দ্র মোদি ছাড়া। তার নামে যৎগুলো অভিযোগ দায়ের হয়েছিল কমিশন তার একটাতেও কোনই পদক্ষেপ নিতেই যান নাই। এনিয়ে কমিশন প্রধান এক সদস্যকে পাশে পেয়ে দু-এক ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে কোন একশনে যান নাই। আর তৃতীয়জন অশোক লাভাসা তার নাম – তিনি এরপর সরকারি নিগ্রহের শিকার হতে থাকেন – আর তা উনার স্ত্রীসহ যিনি উচ্চপদস্ত ব্যাংকার। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতিটা সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রাখা ব্যক্তি ছিলেন। কয়েকবছর পরে আর চাপ সহ্য করতে না পেরে অশোক লাভাসা আপোষ করতে বাধ্য হন। রফাটা হল এখন তিনি নির্বাচন কমিশন ছেড়ে দিয়েছেন; [ADB] এডিবিতে ভারত সরকার পক্ষের আমলা প্রতিনিধি হিসাবে আছেন!

    অর্থাৎ সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ বলে বিরাট জ্ঞানের কথা ছাড়লেও প্রধান বিচারপতি হিসাবে তিনি সরাসরি এর জন্য দায়ী!  অথচ বাংলাদেশে এসে জ্ঞানের কথা ছাড়ছেন???

    আমি এখনও পরিস্কার না বুঝি নাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী চান? কেন চন্দ্রচুড় ঢাকায় এসেছিলেন?  আমাদের কাছে এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সিনহা তার ঘটনাবলী এখনও জলজ্যান্ত আছে। তিনি গুজরাটে গেছিলেন এক বেসরকারি ল কলেজের অডিটরিয়াম উদ্বোধন – এই আমন্ত্রণে। গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য কত কী ভাল করেছেন এর ফিরিস্তি দিয়ে বক্তৃতা করে গেছিলেন। ভুলে গেছিলেন তিনি বিচার বিভাগের লোক যা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নয়। আর তিনি কোন সচিবও নন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসব জয়গাথা ছড়ানো তার কাজ দায়ীত্বের সাথে অসামন্বস্যপুর্ণ!  কিন্তু তিনি ফাঁদে পড়লেন যে তিনি কার কথা কে বেশী গুরুত্ব দিবেন! হিন্দু মনে ভাবলেন কাকা-বাবু এখানে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রেফারেন্সিয়াল! ফলাফল আমরা সবাই জানি! এর মানে  আমাদের সব অভিজ্ঞতাই বলছে এসবের একটাও কাজ করে নাই! এরপরেও ঠিক কী জানতে বাকী আছে???? আমার বুঝাবুঝি-নাগালের বাইরে!

    একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয় “আরবিট্রেশন” – এটা ভুলে গেছিলাম, এখন যোগ করে দিচ্ছিঃ
    ধনঞ্জয় চন্দ্রচুড় তাঁর বক্তৃতায় বিচার ব্যবস্থার ভিতরেই সালিশ ব্যবস্থাও [arbitration] যোগ করার প্রস্তাব করেছিলেন।  সালিশি মানে বুঝতে হবে – যেখানে কেউ অপরাধী বলে রায় দেয়া হয় না, কাউকে সাজা দেয়া হয় না। এটা এক আপোষ-মীমাংসার পথ। ফলে স্বভাবতই কোন ক্রিমিনাল কেসে এর ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু চন্দ্রচুড় এই সালিশ-ব্যবস্থার কথাও আসলে বলেনই নাই। তাহলে?
     
    তিনি আসলে  মিন করেছেন – মানে আরবিট্রেশনের কথা বলে এই আড়ালে (হিন্দুত্ববাদী) সরকারের চাওয়ার পক্ষে রায় দেয়া। এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেটাই আমরা এখন নিচে দেখব।
    বাবরি মসজিদ ধবংস করা হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। যদিও মানুষে নানানভাবে এঘটনাকে ব্যাখ্যা করে কেবল নিজের পক্ষে সাফাই টেনে থাকে। আর আমার ধারণা হল এটা ছিল মুসলমানবিরোধী ঘৃণা সাজিয়ে  সেই উস্কানিতে আরএসএস-বিজেপি যে ভোটের রাজনীতি ক্ষমতাদখল ব্যবস্থা আনতে যাচ্ছে এরই আগমনী সিগনাল- বার্তা ছিল।  তাদের হিসাবে এটা ছিল এভাবে হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতা আনবার জন্য পারফেক্ট টাইমিং; হয়েছিলোও তাই। এরই পরিণতি-প্রমাণ হল গত দশবছরের নরেন্দ্র মোদীর শাসন! ও বিচারকদের আছে তাঁর নানান চাওয়া – এর জন্য চাপ সৃষ্টি! আর এর পুর্ণতা দিবার পিছনের অন্যতম এক বিচারক হলেন ভারতের বর্তমান প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়! তারঁ বাবা যশোবন্ত বিষ্ণু চন্দ্রচূড় [YBC]ও এর আগে প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ধনঞ্জয় [DYC] হার্ভার্ড ল স্কুল গ্রাজুয়েট ও পিএইচডি হোল্ডার।  কিন্তু হায়!
    ১৯৯২ সালের মসজিদ ধবংস মামলায়  সুপ্রীম কোর্টের ফাইনাল রায় ঘোষণা হয় ২০১৯ সালে।  ধনঞ্জয় সেখানে রায় দাতা পাঁচ  বিচারকের একজন বিচারক! যেখানে বিচারকদের রায়ের সারকথা হল, মসজিদের স্থানে মন্দির করতে দেয়া হোক আর মসজিদের জন্য সরকার আলাদা জায়গা দেক! এই হল, ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়দের বিচারের রায়ের নামে সরকারের দালালি আর ইঙ্গিত দেয়া এটাই তাদের সালিশি ব্যবস্থা????
    তার মানে ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড় কী আমাদের বিচার বিভাগকে সালিশের চর্চার কথা বলে  বিভিন্ন মামলায় সরকারের পক্ষে রায় দিবার কথা বলে গেলেন? মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর চাওয়ার পক্ষেই বিচার বিভাগকে থাকতে হবে রায় দিতে হবে – এই অভ্যাস সেই যে ১৯৭৫ সাল থেকে ইন্দিরার হাতে শুরু হয়েছিল ভারতের বিচার বিভাগ এথেকে বের হতে পারে নাই। বরং এই চামচামির ধারা বজায় রেখে নিজের আখের গুছানো বিচারক প্রধান বিচারক হওয়াটাই ভারতের বিচার বিভাগের অনুসৃত নীতি হয়ে গেছে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৭ঃ ১৯   সন্ধ্যা
    আপডেটঃ ০৪ মার্চ ২০২৪ ০৮ঃ ১০   রাত

     

     

     

     

     

  • টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ
    বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    গৌতম দাস
    ২৬ নভেম্বর ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-59d

     

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian…”

    বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অন্তত একটা মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া,  গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ এক উলটা হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। এটা হল, কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির আমল বা একালের বিজেপির মোদির আমল মিলিয়ে গত সতেরো বছর ধরে অনুসরণ করে চলা ভারতের মিডিয়াগুলোর নীতির বিরুদ্ধ বা বিপরীত অবস্থান। বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতায় যেই আসুক ভারতের মিডিয়া এর কোন ভালমন্দ দেখতে পাবে না। তবে কেবল যে ঘটনায় ভারতের স্বার্থ আছে সেটাই সহি – এই হল বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মিডিয়াগুলোর অবস্থান!
    আবার যেমন,  কোন পত্রিকায় অনেক রকমের লেখাই ছাপা হয় – নিউজ রিপোর্ট, ভিউজ-মতামত, সত্য-মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা ফিচার  অথবা এমনকি উপ-সম্পাদকীয় ইত্যাদি সবই ছাপা হয়। কিন্তু পত্রিকায় যেটা সম্পাদকীয় বা এডিটরিয়াল [editorial] লেখা ছাপা হয় সেটাই একমাত্র পত্রিকার মালিক, সম্পাদক বা সম্পাদকীয় গ্রুপ বা বোর্ডের সকলের স্পষ্ট নিজস্ব  অবস্থান বা রাজনৈতিক বক্তব্য। এটা পত্রিকার পরিচালনাকারীদের নিজস্ব অবস্থান এবং নিজ দায় নিয়ে বলা কথা!  তা হলেও বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতা কেমন কী চলছে সেখানে এনিয়ে ভারতের প্রিন্ট- মিডিয়াগুলোর কোন সম্পাদকীয় মন্তব্য কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না! তবে বাংলাদেশে যেটা ভারতের স্বার্থ সেটাই সহি ধরে নিয়ে প্রিন্ট-মিডিয়ার অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়!

    এদিকটাই আরেক ভাষায় বললে, গত পনেরো বছরের বেশি হবে কোন ভারতীয় পত্রিকা বাংলাদেশের মানুষের হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে কথা বলেছে – এমন রেকর্ড নাই। এমনিতেই,  যদিও ১৯৪৭ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন তবে বিভক্ত ভারতের জন্মের আগে থেকে এখনও পর্যন্ত “হিউম্যান রাইট ও নাগরিক মৌলিক অধিকার” কখনই ভারতীয় রাজনীতিতে ইস্যু ছিল না। উচ্চারিত হয় নাই; এমনকি তা ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও উচ্চারিত নয়। কারণ, সেই ১৮১৫ সাল থেকেই ভারতে রাষ্ট্র-রাজনীতি বলতে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বুঝা হয়ে এসেছে। আর এতে বলাই বাহুল্য এখানে জাতি মানে একমাত্র সেটা উগ্র হিন্দু-বোধের এক হিন্দুত্ববাদ। অধিকার বা নাগরিক ধারণার যেখানে বালাই নাই! সারকথায়, ভারতে রাজনীতি বলতেই সেটা হল – জাতিবাদ এবং তা এক উগ্র-জাতিবাদ; যা এর বাইরের সব এথনিক-জাতিকে অস্বীকার, তাঁদের উপর চাপায় দেয়া মার্জিনালাইজ বা কোনঠাসা করে রেখে অ-হিন্দু বিশেষ করে মুসলমান নাগরিক এর উপর সামাজিক, কালচারাল ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করে রাখার রাজনীতি।
    হিন্দুত্ববাদ মানে যেখানে অধিকার বা নাগরিক ধারণা নাই; কাজ করে না। হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদের এক হিন্দুত্ববাদ ও বোধ সেখানে সব। আর এর বাইরে সবাই কে তারা মেরে, পিটিয়ে অবাধে নির্মুল করবে; এক আধিপত্যের জগত কায়েম করবে করতে হবে এই হল যার সারকথা। এমনকি পড়শি বা অন্যরাষ্ট্র তাঁদেরও যেন নিজ স্বার্থ বলে কিছু নাই। পড়শিসহ অন্য সকল (ছোট) রাষ্ট্রকেই যেন ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থকেই  নিজস্বার্থের উপর জায়গা দিতে হবে, তুলে রাখতে হবে। এমনকি খেলাধুলাতেও ভারতের কোন হেরে যাবার দুঃখে ভিন-রাষ্ট্রকেও দুখী হতে হবে, দুঃখবোধ দেখাতে বা প্রকাশ করতে হবে! এটা হিটলারকেও ছাড়িয়ে যাওয়া এমনই এক চরম উগ্র-জাতিবাদ!

    ফলে এসব কারণে, ভারতের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে যা কিছুই জানি না দেখি তা দেখলেও সেখানে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকার ধরণের কোন ধারণাই ভারতের রাজনীতিতে বা সামাজিক কালচারে নাই।

    ভারত ভিন-রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠার বিরোধীঃ
    কিন্তু এই প্রথম ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের অবস্থান জানিয়ে সম্পাদকীয়তে বলছে, “হাসিনাকে থামাতে হবে। কারণ তিনি কর্তৃত্ববাদী; বিরোধীশুন্য করতে-দেখতে চান। আর এটা নাকি ভারতেরও স্বার্থবিরোধী ও উদ্বিগ্ন হওয়ার মত হাসিনার এমন এই কর্তৃত্ববাদী স্বভাব!”। এই কথাগুলো তুলে এনেছি,  টাইমস অব ইন্ডিয়া-তে তাঁদের  নয়া অবস্থান জানিয়ে যে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে তার শিরোনাম থেকে। সেটা হল, ” Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” । আমাদের মানবজমিন এর অনুবাদ রিপোর্ট ছেপেছে।

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian
    streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” –

    সবচেয়ে মজার কথা শুরুতেই বুকফুলিয়ে টাইমস বলছে, “টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল টিম যা সিনিয়র জার্নালিস্টদের নিয়ে গঠিত তারা নিজেদের মধ্যে নাকি বিস্তর তর্ক-বিতর্ক শেষে একালের খবরাদি সম্পর্কে নিজেদের মতামত-অবস্থান নিয়ে থাকে [Times of India’s Edit Page team comprises senior journalists with wide-ranging interests who debate and opine on the news and issues of the day] । তাহলে, মানে কী দাঁড়ালো?

    গত ১৯৪৭ সালের আগের কথা বাদই রাখলাম। একালে মানে ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধীর আততায়ীর হাতে মৃত্যু হয়েছে ১৯৯১ সালে। অনেকের মনে হতে পারে একালে ভারত উগ্র হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠেছে বোধহয় বিজেপির মোদীর হাতে। না এটা মিথ্যা। বরং এর আগেই রাজীব গান্ধীর হাত ধরেই একালে মুসলমান এথনিক ক্লিঞ্জিং যেটাকে বলে বা “মুসলমান-নির্মুল” নীতি- এর শুরুটা হয়েছে ১৯৮৯ সালে। সেসময়ে এটা হয়েছিল কাশ্মীরে। সেখানে ১৯৪৭ থেকে যতই অস্থিতিশীলতা বা বিরোধ-সমস্যা থাকলেও রাজনীতিতে কোন সশস্ত্রতার ধারা নয় বরং  সেখানকার রাজনীতি ছিল চলে আসা নির্বাচনকেন্দ্রীক এক রাজনীতি। প্রকাশ্য এক গণ বা মাঠের রাজনীতি! রাজীব গান্ধী ১৯৮৯ সালের রাজ্য নির্বাচনে   কারচুপির করে জিতবার সিদ্ধান্ত  ও নীতি নিয়েছিলেন। সেটা এই অজুহাতে যে সেবার ১৯৮৯ এর নির্বাচনে ওমন কারচুপি না করলে নাকি বেশিরভাগ আসনে অ-কংগ্রেসি কাশ্মীরি মুসলমান সেখানে জিতে যাবেন। আর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফারুক আবদুল্লাহর পরামর্শে ও তাঁকে সাথে নিয়ে। ফারুক আবদুল্লাহও ঠিক কংগ্রেসি নন তবে তাঁর বাপের আমল থেকে তাঁদের দল প্রো-কংগ্রেসী!

    আর এরপরে বাবরি মসজিদ আক্রমণ থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সালে ভারতে বাজপেয়ীর বিজেপির কোয়ালিশন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ বিজেপি-আরএসএসের উত্থান ঘটে। ইতোমধ্যে নাইন-ইলেভেন মানে (২০০১ সালের ওয়ার অন টেরর) মানে আমেরিকা-ইন্ডিয়ার “জঙ্গী-মারার নামে” এলায়েন্স মানে এশিয়ায় হিন্দুত্ববাদের এক রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল প্য়রথমে। কিন্তু  অচিরেই সেখান থেকেও আবার সরে গিয়ে সেটা আমেরিকার হয়ে ভারতে চীন ঠেকানোর অজুহাতে ভারতকে ঠিকা দেওয়া; মানে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – যেটা এভাবে এখন বাংলাদেশ ১৭ বছর পার করেছে। স্বভাবতই এর স্বপক্ষে পুরা সময় জুড়েই ভারতের সমগ্র মিডিয়া ইসলাম কোপানোর বয়ান তুলে মশগুল থেকেছে।
    আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় মিডিয়ার এটিচ্যুড  সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছে মোদির গত দশ বছরে। এমনিতেই কোভিডের কারণ ভারতের মিডিয়া নিজে চলতে পারে নাই, ঠিকমত বেতন দিতে পারে না। অতএব পত্রিকা চালানোর খরচ মিটাতে মোদির হয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডার হাতিয়ার হয়ে উঠো – সব জায়েজ! আর তাতে ভারতের ‘র’-এর বা গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট – ভারতে যারা ছাপে তাঁদের শিখন্ডি মিডিয়া হয়ে উঠো! এই ছিল সেসময়ের মূলনীতি! তাঁদের সে এক মহা কসরত, কার উপর দিয়ে কে যাবে! যার ফলশ্রুতিতে ফাইনালি দাড়ায় মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী – এরা হয়ে উঠেন ‘র’-এর হয়ে শ্রেষ্ঠ প্রপাগান্ডিস্ট! যারা র-এর চাহিদা মত রিপোর্ট লিখতে ওস্তাদ! আগ্রহিরা এবিষয়ে আমার পুরানো লেখা পড়ে নিতে পারেন।  আমরা ভারত টাইমস অব ইন্ডিয়াকে এভাবেই চিনতাম!

     

    কিন্তু এখন এটা কী হলঃ
    কিন্তু হায়!! এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলছে? মোদিকে হাসিনা থেকে সাবধান করে ইডিটরিয়াল লিখছে??? গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল কম করে বললেও গত পন্বরো বছরের একেবারে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত! কেন?
    এটা বুঝা কঠিন না যে ২০০৬-৭ সাল থেকে আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া অবাস্থান ছিল যে – যেভাবে পারো বাংলাদেশকে ভারতের পক্ষে লুটে নেও! সব জায়েজ আছে!  বাংলাদেশের উপর দিয়ে আসামের করিডোর থেকে শুরু করে সবকিছু বিনা পয়সায় খাবলে তুলে নিয়ে খাওয়া, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার কিংবা সব নদীর পানি, বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করা, সীমান্তে সমানে বাংলাদেশি হত্যা ইত্যাদি যাকিছু ভারতের স্বার্থের পক্ষে যায় বলে তারা মনে করেছে তাই ভারতের মিডিয়া সঠিক ও জায়েজ মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট লিখে গেছে! সাথে ছিল জঙ্গী আবিস্কার আর জামায়াত কোপানোর নামে ইসলাম কোপানো মুসলমানবিদ্বেষে ভরপুর এক মহোৎসব চালিয়ে গেছে ভারতের মিডিয়া। বাংলাদেশের  প্রতিটা নির্বাচনে ভোটবিহীন তামাসা চলেছে – অথচ ভারতের একটা মিডিয়া এগিয়ে আসে নাই, টু শব্দটাও করে নাই! তখন তারা কোথাও হাসিনার কর্তৃত্ববাদ দেখে নাই; রাতের ভোট হয়েছে তারা জানে নাই! সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের সফর। বিএনপি ও জামায়াত-কে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে; আর এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধি দল বানাতে হবে। এই ব্যববস্থাপনার কারিগর ছিলেন সুজাতা সিং যা এরশাদের সাথে মিটিয়ের পরেই খোদ এরশাদ-ই তা মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মজার কথা কোন ভারতীয় মিডিয়া এনিয়ে কোন রিপোর্ট করে নাই। কারণ তাঁদের নীতি ছিল দুনিয়াতে ন্যায়-অন্যায়, সাংবাদিকতা-অসাংবাদিকতা, সঠিক-মিথ্যা বলে কিছু নাই। যাই ভারতের স্বার্থে তাই জায়েজ এই ছিল তাঁদের নীতি; তাই পুরাটাই মিথ্যা ও অন্যায় হলেও সেই অন্যায়ের পক্ষেই ভারতের মিডিয়াকে থাকতে হবে…!  এই ছিল গত পনেরো বছরের (দু-একটা ব্যতিক্রম বাদে) ভারতীয় সাংবাদিকতা! যা এখনও বর্তমান!!!
    কিন্তু তাহলে এর ভিতরে – এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলে বুঝছে???

    কথা আরও আছেঃ
    টাইমসের রিপোর্টের ছন্দ-মিলানো প্রথম বাক্যটাই রীতিমত শায়েরি! বলছে, বাংলাদেশ ৭ জানুয়ারি যাচ্ছে নির্বাচনে [POLL]; কিন্তু বিরোধীরা যাচ্ছে সাজাপ্রাপ্ত আসামী হিশাবে জেলে[JAIL] । ইংরাজিতে পোল আর জেলের অলংকার মিলিয়েছে। আর এর চেয়েও মারাত্মক হল কোন ভারতীয় মিডিয়ার সম্ভবত এই প্রথম জামা‍য়াতে ইসলামী এই রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ। লিখছে, [one big party stays banned.]; মানে জামায়াত নিষিদ্ধ করে দেয়া রায় বলবত রাখাকে এক ভারতীয় মিডিয়া ইউজুয়াল বদ-দোয়া দেওয়ার বদলে সহমর্মিতা জানিয়ে রিপোর্ট করছে!  যার ইঙ্গিতটা হল, এটা মতপ্রকাশের অধিকার, কনষ্টিটিউশনের সীমার মধ্যে থেকে রাজনৈতিক  দল খুলার ও জমায়েতের অধিকারকে জবরদস্তিতে কেড়ে নেওয়া, কোনঠাসা করা – মানে এককথায় রাজনীতিক ও দৈহিক নিপীড়ন করা হয়েছে এই রাজনৈতিক দলকে। তাই রিপোর্টটা একারণে জামায়াত-কে এই প্রথম ভিকটিম হিশাবে দেখছে ও দেখাচ্ছে!!! তাহলে এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া!!!  অথচ একালের এই ভারতই অন্তত গত ১৭ বছর ধরে লাগাতরভাবে জামায়াতের একাত্তর সালের ভুমিকার বিরোধিতার আড়ালে ইসলাম-মুসলমান রিলেটেড সবকিছুর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ চালিয়ে গেছে; শত্রুতা চালিয়ে গেছে। জামায়াত জঙ্গী-সংগঠন বলে প্রচার চালিয়ে নিজেদের সব অনৈতিক ততপরতাকে জায়েজ করতে গিয়েছে!
    একইভাবে বিএনপির পক্ষেও সহানুভুতিশীল হয়ে রিপোর্ট করেছে; যা অবিশ্বাস্য! বলেছে বিএনপির ১৩৯ জন নেতাকে সাজা শুনিয়ে দিয়েছে; তারা যেন নির্বাচন থেকে দূরে থাকে এর ব্যবস্থা করেছে!  এমনকি হাসিনার নিজে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন মানে কোন কেয়ার-টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যে আইনটা ছিল সেটা হাসিনারই বাতিলের জন্যও এই প্রথম হাসিনাকেই দায়ী করলো এক ইন্ডিয়ান মিডিয়া!! মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া, বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত এই দাবির প্রতি (তবে পরোক্ষে) সমর্থন জানিয়ে দিল!!!  আর এভাবে বিএনপির রাস্তার আন্দোলনকে জায়েজ করে দিয়ে এই মিডিয়া লিখেছে BNP is just doing street theatre when demanding restoration of the caretaker system.। যা নিয়ে একটা ভারতীয় মিডিয়াকে আমাদের বলার আছে একটাই – এটা আন-ইউজুয়াল! আমরা ভারতের মিডিয়ায় এটা দেখতে অনভ্যস্ত ছিলাম!

    “one big party stays banned.
    The top court upheld a previous ban
    on Jamaat-e-Islami – Bangladesh’s
    largest Islamist party – from contesting elections.”

    এতদুর পর্যন্ত যা দেখলাম তাতে এটা পরিস্কার ভাবে বুঝা গেছে যে টাইমসের এটা এক বড় ধরণের অবস্থানের পরিবর্তন। এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান সেই টাইমস অব ইন্ডিয়া এখন বাংলাদেশের শাসক শক্তি অথরিটিটিয়ান – মানে বাংলাদেশের শাসক কত খারাপ তা দাবি করে দেখানোর প্রতিষ্ঠান – হয়ে উঠতে চাইছে! তাহলে এই পরিবর্তনের কারণ কী? আবার যেখানে এটা ভারতের অন্য আর কোন মিডিয়ার মধ্যে এমন পরিবর্তন এখনও দেখা যায় নাই!
    এককথায় বললে, ভারতের মিডিয়া এখনও একালেও এমন নুন্যতম পলিটিক্যাল এথিক্স মেনে কেনে চলার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে নাই। যেমন আগে এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান; বুঝাই যেত সেটারও মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থ; কোন আদর্শিক অবস্থান তা ছিল না! তাহলে এখনকার এই পরিবর্তনও  অনুমান করি কোন আদর্শিক অবস্থান নয়! যার সোজা মানে বিক্রেতা-মিডিয়ার ক্রেতা-গ্রাহক সম্ভবত এখন বদলে গিয়েছে! আগে ছিল ক্রেতা ভারত সরকারের এক প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে  সার্ভিস দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। আর তাহলে এখন?

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার সার্ভিস ক্রেতা এখন কেঃ
    তাহলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  এখন এই অবস্থান বদল হওয়াতে এখনও কী মোদি সরকারই আছে? তা মনে হচ্ছে না। যদিও এটা সত্য যে জয়শঙ্করের অফিস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসুক কিংবা না – সেব্যাপারে তার খুব কিছু করণীয় আছে তা মনে করা না। যদিও তাই বলে কিছু লিপ-সার্ভিস বা কিছু রুটিন সম্পর্ক অবশ্যই আগের মত ভালই বহাল আছে।  তবুও বাংলাদেশের সরকার কর্তৃত্ববাদী কী না সেটা  টাইমসের এই দ্দেখে ফেলার সাথে কখনই মোদির রাজনীতির কোন সম্পর্ক নাই। কাজেই টাইমস অব ইন্ডিয়ার নয়া অবস্থানের পৃষ্টপোষক-অর্থদাতা অন্তত বিজেপি-মোদি নন। তাহলে কে হতে পারে?

    এর তালাশে আমরা এখন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই সম্পাদকীয়ের বাকি অংশে ফোকাস করব। যদিও কোন সম্পাদকীয় ছোট লেখাই হয় আর টাইমসের এই সম্পাদকীয়ও ছোট পাঁচশ- অক্ষরের নিচে। তাহলে এই শেষের অংশে কী আছে?

    সম্পাদকীয়ের শেষ অংশ ‘মারাত্মক’ কী আছেঃ
    সংক্ষিপ্তভাবে মারাত্মক সেই কথা হলঃ উপরে আমরা দেখেছি, টাইমস অভিযোগ হাসিনা সরকার অথরিটি-টেরিয়ান যে নিজেকে বিরোধিশুন্য দেখতে চায় মানে তার রাজনৈতিক সকল বিরোধী শক্তিকে সমাজ থেকে নির্মুল করতে ও দেখতে চায় ক্ষমতাসীনেরা। এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন বিরোধীশুন্য কথা টার অর্থ-তাতপর্য কী? কারণ, যেকোন ক্ষমতাসীনরা দাবি করতেই পারে যে বিরোধী দল আমাদের চাপ সহ্য করে মাঠের রাজনীতিতে টিকে থাকতে না পারলে আমরা কী করতে পারি – এমন বয়ান দিতেই পারে। কিন্তু এমন বয়ান কী জায়েজ? নাকি এটা ইনোসেন্ট বা নিঃস্পাপ বয়ান যে ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না?

    না অবশ্যই না। এই বয়ান জায়েজ নয়! এর সোজা সহজ উদাহরণ হল, ক্ষমতাসীন যদি নির্বাচনে কৌশলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বিরোধীদলের জন্য সুবিধাজনক নয় – এভাবে করে সাজায়? মানে হল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দল নিরেপেক্ষ করে না সাজায়? মানে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কান্নি মেরে থাকা পুলিশ ও প্রশাসন হয়ে হাজির হয়?
    এখন এই ব্যাপারটাই হয়েছে কীনা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – ক্ষমতাসীনদের কিছু বয়ান এর দিকে তাকাতে হবে। যেমন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকারের এক প্রিয় শ্লোগান হচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আর অন্যদিকে জামাত-বিএনপি এর বিপক্ষের! এতদুর শুনে কেউ মনে করতে পারে এর মধ্যে খারাপ কী আছে?  অথচ এটাই হল, সরকারের দিক থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া ম্যাসেজ যে তোমরা এখন বিরোধীদের সাথে সবকিছুতে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পার, এটা জায়েজ আছে! কারণ তারা সবাই তো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি! আমি সরকার সেটা বলে দিয়েছি! সুতরাং এটাই তোমাদের প্রটেকশন ভাষ্য! যেমন খেয়াল করে দেখেন বাংলাদেশের একজন অভিনেতা সম্প্রতি ক্রিকেটে ভারতীয়দের হারে খুশি হওয়া যাবে না – যারা খুশি হয় তারা  মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বলে ব্যাখ্যা খাড়া করছে! আর এমন বয়ান এটারই চরমতম রূপ হল, আমাদের রাষ্ট্রটাকে গুম-খুনের  রাষ্ট্র হিশাবে হাজির করা – এটাই হয়ে যাবে আর যার সাফাই হবে যারা “মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি!” বলে সরকার প্রচার করবে তাঁদের কোনই রাজনৈতিক নাগরিক অধিকার তো নাই-ই!  তাই তাদেরকে গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সব তো করাই যায়! এবং যাবে!!!

    তাহলে সারকথাটা হল, আমি ক্ষমতায় আর আমার রাজনৈতিক-বিরোধিদের যদি আমি আমার মতই সমান রাজনৈতিক, নাগরিক অধিকার না দিয়ে (নানা উসিলায়)  দাবায় রাখতে পারি তাহলে সেটাই পরিণতিতে ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের মত নির্বাচনই হবে! শুধু তাই না, সেটা এবার এই রাজনীতিক মাঠশুন্যতা – এটাই কাশ্মীরের মত রাজনীতি আর তখন নির্বাচন-কেন্দ্রিক থাকবে না। সশস্ত্রতার রাজনীতির পথে পা বাড়াতে চাইবে!

    ঠিক এদিকটা খেয়াল রেখে তাই টাইমস তার সম্পাদকীয়ের শেষের দিকে বলছেঃ “But what raises eyebrows and concerns is the vacuum previously occupied by the opposition. Marginalising mainstream opposition parties is an invitation to radical elements in Bangladeshi politics”।
    মানে হল, বিরোধীদলদেরকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশ ইত্যাদি সবকিছু থেকে তাঁদের বঞ্চিত করে দেওয়া – মানে এক শুন্যতা বা ভ্যাকুয়াম তৈরি করা – এর সোজা মানে হল, সশস্ত্র রেডিক্যাল রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা হয়ে উঠতে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া বা ঠেলে দেওয়া।

    এরপরে আরো দুইটা প্যারা আছে। এর প্রথমটায় বলছেঃ
    “Then there is the US factor. Washington is clearly concerned about charges of authoritarianism against Hasina and is viewing Bangladesh as part of its larger strategic tussle with China.”
    মানে হল বলছেঃ “এর সাথে আছে আমেরিকা ফ্যাক্টর। যারা তাই হাসিনার এভাবে কর্তৃত্ববাদী উত্থানে উদ্বিগ্ন বিশেষ করে এর সাথে চীন-আমেরিকার যে কৌশলগত টানা-হেচড়া আছে সেদিক থেকে দেখলে”।  অর্থাৎ টাইমস ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা অনুমান করি যে এর অর্থ হবেঃ কর্তৃত্ববাদী হাসিনার থেকে যাওয়া মানে তাতে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়বে!


    আর টাইমস অন ইন্ডিয়ার লেখার শেষ বা সিদ্ধান্ত বাক্য টা হল এভাবেঃ

    “Unless the opposition is given the space it should have, radical elements will create space they don’t currently have. That’s terrible news for India. A radicalised Bangladeshi establishment can bring Pakistan back into play. New Delhi should tell Hasina to change tack, in its, and her, interest.”

    অর্থ হলঃ “হাসিনা যদি তার রাজনৈতিক বিরোধীদেরকে রাজনীতিক-বিরোধীতা করার জায়গা না দেন (অর্থাৎ জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশের অধিকার ইত্যাদি সবকিছু থেকে বঞ্চিত করে দেয়) তবে রেডিক্যাল বা সশস্ত্র রাজনীতিক ধারা ঐ স্থানটা দখল করবে যাদের জায়গা এখনও বাংলাদেশে তেমন নাই! আর এটাই ভারতের জন্য খুবই ভয়ঙ্কর সংবাদ হবে!”।

    এরপরের বাক্যের অর্থ এটা একেবারেই কোন ভারতীয় লেখকের হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা। এছাড়া তারা কখনই কোন রেফারেন্সে-ছাড়াই পাকিস্তানকে না জড়িয়ে বা গালি না দিয়ে থাকতে পারে না। সেই পটভুমিতে পরের বাক্যটা হলঃ একটা রেডিক্যাল (সশস্ত্র) বাংলাদেশ এটা পাকিস্তানকে মাঠে ফিরে ডেকে আনতে পারে! (অর্থাৎ এরমধ্যে পাকিস্তান কোথা থেকে এল কেউ জানে না) “তাই নয়াদিল্লির উচিত হবে হাসিনাকে সামলানো তাকে স্বার্থ-অভিমুখ বদলাতে বাধ্য করা!”।

    এই শেষের বাক্যটাও একই মিথ্যা হামবড়া তবে মুরোদহীন ভারতকে জাগানোর বা এর এখনও হাসিনাকে নিয়ন্ত্রণের যেন ক্ষমতা আছে এই ভাব নিয়ে বলা কথা! কারণ, ভারত যেন একটা বিরাট ক্ষমতাবান কুতুব  এই ভাব না ধরলে ভারতীয় সাংবাদিকের কলমের আগায় যেন কালি আসে না !  অথচ এতদিন হাসিনা যতটুকু চীনের সাথে সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা কায়েম করেছে তা কী ভারত ঠেকাতে পেরেছে? কাজেই হাসিনার যা সক্ষমতা সেটার সবই যেন ভারতের দেয়া এমন ভুয়া দাবির দরকার কী??? আর ভারত যা চায় এর বাইরেও হাসিনার নিজস্ব স্বার্থ বলে অনেক কিছু আছে এবং তা থাকাই স্বাভাবিক! তাতে হাসিনার স্বার্থের কোন ন্যায্যতা থাকুক আর নাই থাকুক!


    তাহলে টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ঘটলঃ

    টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ও এর তাতপর্য কী, এনিয়ে কিছুটা উপরে দাবি করে বলেছি যে, এই বদল বিজেপির মোদির আগ্রহে ঘটে নাই। কারণ টাইমসের বদলি অবস্থান কোনভাবেই সেটা মোদির রাজনীতি নয় যে মোদি হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকারের পক্ষে কথা বলবেন বা টাইমস-কে বলতে বলবেন বা অর্থ দিবেন!
    আর টাইমস মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া কোন অর্থপ্রাপ্তি ছাড়াই এমন সম্পাদকীয় লিখার কারণ নাই! তাহলে?

    খুব সম্ভবত এটা কোন আমেরিকান উদ্যোগ! এমন অনুমান করাটা আশা করি ভুল হবে না!  যা সাধারণত কোন থিঙ্ক-ট্যাংক বা এনজিও এর মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর এটা বাইডেনের মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার বা স্যাংশনের পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ, মানে সাথে যায়!
    তবে মূলকথাটা হল, হাসিনা যদি এবারও ২০১৪, ২০১৮ এর মত একই পথে বিজয়ী হতে পারে তবে টাইমস অব ইন্ডিয়ার মুখ দিয়ে প্রকাশিত এই আশঙ্কা সত্যি হবার সম্ভাবনা!

     

    আপডেটঃ  ২৬ নভেম্বর  ২০২৩,  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৪০
    সর্বশেষ আপডেটঃ ২৭ নভেম্বর  ২০২৩,  রাত ১২ঃ ৪৭

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • চন্দন নন্দী-রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!

    ওরা ইসলামি দল খুঁজেছে!
    চন্দন নন্দী, রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!
    গৌতম দাস

    ১৫ অক্টোবর ২০২৩    বিকেল ১৭ঃ ২৩

    https://wp.me/p1sCvy-55l

              কুমিল্লায় হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে অবস্থান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের

     

    এবার ২০২৩ সালের দুর্গাপুজা আগামি সাতদিনের মধ্যেই শুরু হবে। মানে পুজা শুরু বা সপ্তমী হবে সম্ভবত ২১ অক্টোবর শনিবার। কিন্তু ইতোমধ্যেই সেই চন্দন নন্দী বা “কংগ্রেসি ‘র’” কানেকটেড লেখক – তিনি এবার ‘র’ এর হয়ে, গত ২০২১ সালের দুর্গাপুজার সময়ে ঘটা ঘটনার (বসা মুর্তির কোলের উপর কোরান শরীফ রেখে আসা) মত করে আবার খুব সম্ভবত সেই কুমিল্লা থেকেই দাঙ্গা ও উত্তেজনা তৈরি করে এর দায় বিএনপি বা কোন ইসলামি দলের উপর চাপানোর প্রচেষ্টা নিয়েছে।  গত পরশু ১৩ অক্টোবর তিনি লিখেছেন, “কুমিল্লা শহরে নাকি হেফাজতে ইসলামিরা শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পরে কুমিল্লার হিন্দু মাইনরিটির আক্রমণ করেছে ও ধাওয়া দিয়েছে”।

    …another crowd of Islamists belong to the Hefazat-e-Islam,
    after offering Friday prayers, chased and attacked members
    of the minority Hindu community in Comilla district…

    অথচ বাংলাদেশের যেসব মিডিয়া ঘটনাটা কাভার করেছে তাতে উল্লেখিত বর্ণনায় ফ্যাক্টস হল,  এটা কুমিল্লা আওয়ামি লীগ বনাম রানা দাসগুপ্তের সংগঠন (হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ, HBCUC) – এদুই সংগঠনের মধ্যকার গত কয়েকদিনের ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক; আর তা থেকে কুমিল্লা শহরে গত শুক্রবার তাঁদের দুই মিছিল মুখোমুখি হয়ে গেলে শ্লোগান-পাল্টা শ্লোগানের পরে হাতাহাতিতে ‘ঐক্য পরিষদের’ চারজনের মাথা ফেটে যাবার মত আহত হয়েছে। অর্থাৎ সারকথায় ঘটনা আসলে আপন ঘরে ঘরের বিবাদ! মানে কোন ইসলামি সংশ্লিষ্টতা দূরে থাক কোন ইসলামি গন্ধও নাই! বরং এতা হল, আওয়ামি লীগের সাথে ভারতের তল্পীবাহক এক বাংলাদেশী হিন্দু সংগঠনের ‘ঐক্য পরিষদের’ বিবাদ। অথচ চন্দন নন্দী ঘটনাটার মধ্যে হেফাজতে ইসলামকে আবিস্কার করেছেন। বাংলাদেশের আজকের পত্রিকা, প্রথম আলো, সমকাল, যুগান্তর,  মানবজমিন, ডেইলি স্টার ইত্যাদি মিডিয়ায় এমনকি চন্দন নন্দীর প্রিয়  বিডিনিউজ২৪ অথবা ‘অসাম্প্রদায়িক’ দেশ রূপান্তর, প্রো-ইন্ডিয়ান কালের কন্ঠ এমন প্রত্যেকটা পত্রিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে বিবাদটা  আওয়ামী যুবলীগ ও রানা দাসগুপ্তের ঐক্য পরিষদের মধ্যে।  মানে হেফাজত-সহ কোন ইসলামি সংগঠন এর সাথে -পাঁচেই নাই। কোন ছায়াও নাই!  অথচ চন্দন নন্দী চারদিকে একাই কেবল ইসলামি দল দেখতে পেয়েছেন। কারণ, খোদ রানা দাসগুপ্তও কোন ইসলামি দলকে নয়, খোদ সরকারকে দায়ী করে শাহবাগে বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছেন, “কুমিল্লায় স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারীরা এই হামলা চালিয়েছেন” ।  প্রথম আলোর সোহরাব হাসানও এবার ছাত্রলীগ-যুবলীগের টার্গেট সংখ্যালঘুরা শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয় লিখেছে।
    অথচ, চন্দন নন্দীর লেখায় দাবি, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু মেরেছে। মানে হল, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু দেখলেই যেন খাবলিয়ে ছিঁড়ে খেতে তেড়ে আসছে নরেন্দ্র মোদির বজরং দলের গুন্ডাদের মত – এমন কাল্পনিক এক ছবি এঁকে নিজ গল্পগাথার কথা বলে গেছেন চন্দন নন্দী। লিখেছেন, …after offering Friday prayers, chased and attacked members of the minority Hindu community in Comilla district। মানে মিথ্যা কাল্পনিক বয়ানেরও একটা সীমা থাকে নন্দী সেটাও মানতে চান নাই। এখন এটা কী ‘র’ এর মরিয়া কোন  পুজা-এজেন্ডা নাকি অর্থের পাহাড় প্রমাণ চাপের কারণে ঘটেছে – তা জানা যায় নাই!
    আবার তিনি বাংলাদেশের সকল মিডিয়ায় প্রকাশিত বয়ান যেখানে বলা হয়েছে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের – সেটাও তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন আর আবার বলছেন আমাদের মিডিয়া নাকি ঢাকাঢাকি করে ভিন্ন লেবেল লাগিয়ে রিপোর্ট লিখেছে –  The Bangladeshi media labelled the attackers as men belonging to the Juba League and the Chhatra League.”। মানে হল নন্দীর দাবি,  বাংলাদেশের সকল মিডিয়াই নাকি মিথ্যা করে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের বলেছে বা চিহ্নিত (labelled) করা হয়েছে। অর্থাৎ চন্দন নন্দী-ই হলেন একমাত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির!  তিনি কোন এক গায়েবী চোখে দেখেছেন???

    চন্দন নন্দী ও ‘র’ এর এই ডেসপারেট বা মরিয়া হয়ে মিথ্যা বলা – এটাই
    আমাদের শঙ্কিত করে যে তারা এবারের দুর্গাপুজার সময়ে এরা আমাদেরকে
    শান্তিতে থাকতে দিবে না, এমন কোন পরিকল্পনা করেছে কিনা!
    তাই ইতোমধ্যেই কোন একটা ইসলামি সংগঠনের নাম হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে!

    চন্দন নন্দীর এমন ভয়ংকর দানব  হয়ে উঠার পিছনে আমাদের প্রগতিশীলদের দায় আছেঃ
    চন্দন নন্দী; ভেবেছিলাম একে নিয়ে আর লিখব না, বোধহয় লিখতে হবে না! কিন্তু না। যে এবার একবারে ভারতের গোয়েন্দা-অন্তর্ঘাতমূলক কাজ ও এমন সংস্থা [RAW] এর সাথে সরাসরি জড়িয়েছে। আসলে  যে জীবনে কখনও এমন জড়িয়েছে সে তা আর জীবনেও ছাড়তে পারে না। এই কথাটাই এখন আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে ভারতের চন্দন নন্দীর বাবা – তিনি ছিলেন মানে তিনি সাবেক ‘র’ এর কর্মকর্তা এজেন্ট। কিন্তু সেসব মোদি ২০১৪ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগের ঘটনা। তাই তিনি ‘কংগ্রেসি র’। পরে মোদির জমানায় এসে এরাই হয়ে গেছিলেন মোদির ‘র’ এর  ঢেলে সাজানো নয়া কর্তাদের সহকারী!  কাজেই সেই সুত্রে বাবার ‘র’ কলিগ, জুনিয়র বা কলিগের ছেলে ইত্যাদিদের সুত্রে চন্দন নন্দীও ‘কংগ্রেসি র’। আর এরাই এখন তার গুজব বা আধাসত্য বয়ান বা খবরের উৎস। আর একারণে, অনেক আগে লিখেছিলাম চন্দন নন্দী ‘কংগ্রেসি র’। এমনিতেই ১৯৬৮-৭০ সালের দিকে জন্ম নেয়া ‘র’  এর উত্থান, বিকাশ সবই কংগ্রেসের হাতে আর সেই সুত্রে, ‘কংগ্রেসি র’ মানে প্রায় ঘরের ছেলের অবস্থা ইত্যাদি । যা প্রায় ২০১৩ সালের শেষ পর্যন্ত কমবেশি প্রবল বহাল ছিল।  এছাড়া ‘কংগ্রেসি র’ এই নামকরণ আবার লক্ষ্য করেছি  চন্দনের মত কিন্তু ঢাকার বাসিন্দা এমন ‘কংগ্রেসি র’ যারা আছেন; যারা, বলাই বাহুল্য আওয়ামি জমানায় বহাল তবিয়তে থাকছেন, তারাই নিজেরা নিজেদের পরিচয় দেয় এভাবেই – ‘কংগ্রেসি র’ বলে, তা শুনেছি। এছাড়াও এমনকি এসব সুত্রে ঢাকার অনেক সরকারি অফিসও চন্দনের আধাসত্য বক্তব্যের স্কুপ সোর্স হওয়া বিচিত্র নয়, বরং স্বাভাবিক হয়ে গেছে!

    এবছর চন্দন নন্দীকে নিয়ে লিখেছিলাম আমিই প্রথম যখন তিনি বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় একটা লেখা ছাপেন  গত ২ সেপ্টেম্বর, যা হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই বিব্রত করেছিল। ফলে বিডিনিউজ২৪ ওয়েব পত্রিকাটা বন্ধ হয়ে গেছিল, যা সম্প্রতি আবার খুলেছে। এরপরে লক্ষ্যণীয় যে চন্দন তাঁর লেখার প্রসঙ্গ / বিষয় বদল করে মানে কার দিক থেকে লিখবে সেই এটিচ্যুডে বদল ঘটিয়েছেন। চন্দনের সাধারণ ঝোঁক হল, ‘র’ এর ঘরের তথ্য বাইরে প্রকাশ করে দিয়ে ক্রেডিট নেয়া। আর নন্দীর এমন করার পিছনের সাইকোলজিটা হল – চন্দনের বাবার সাথে চন্দনের বনিবনার অভাব। আবার এর পিছনে ঘটনা হল, চন্দন পশ্চিমে উচ্চশিক্ষা শেষ না করে ভারতে ফেরত আসা, টাইমস অব ইন্ডিয়ায় চাকরিরও সমাপ্তি ইত্যাদি এসব নিয়ে সম্ভবত ‘র’ এর এজেন্ট বাবার সাথে তার ব্যাপক ও গভীর মনোমালিন্য।  বর্তমানে সে কোথাও কোন চাকরিতে নাই। কিন্তু খেপ মারতে হয় ফ্রি-ল্যান্সার নামে আর পুরানা ‘র’ এর যোগাযোগ-গুলো ব্যবহার করে…।
    তাই এবার প্রথম বিডিনিউজে সে লেখা ছাপিয়েছিল  হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই জন্য বিব্রতকর হবে এমন বয়ান ছাপিয়ে। চিন্তা না করে কাজে ওস্তাদ চন্দন নন্দী এখানেও ভেবে দেখে কাজ করেব নাই যে এর পরিণতি কী হবে! তাই ঘরের ভিতর খারাপ প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক! সম্ভবত সেকারণে, আমরা দেখলাম পরের লেখা থেকে নন্দী এটিচ্যুড বদলে ফেলেছেন। তিনি হয়ে উঠেন আর হাসিনা-মোদি নয় এবার কেবলমাত্র হাসিনার বিরুদ্ধের সত্য-আধাসত্য প্রপাগান্ডা করা। যেগুলো অবশ্যই জার্নালিজমের বিচারে অপ-জার্নালিজম!
    সেই থেকে  চন্দন হয়ে যায় হাসিনা বা তাঁর ছেলে বা সরকার সম্পর্কে আধাসত্য বা কোন বিশ্বাসযোগ্য সোর্স ছাড়া গায়েবি সোর্সের নামে ছড়ানো্র এক প্রপাগান্ডা লেখক। এছাড়া তিনি তার লেখার জন্য ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চলের এক ইংরাজি ওয়েব সাইট NorthEast News কে আপাত স্থায়ীভাবে বেছে নি্য়েতে দেখেছিলাম আমরা। কেন এমন?
    ভারতের নর্থ-ইস্ট মানে আসাম-সহ  সাথে ছোট ছোট পাহাড়ি গোত্রভিত্তিক (ট্রাইবাল) মোট সাত রাজ্য। কিন্তু এগুলো ভারতের অবিরাম মাথাব্যাথ্যা যে এরা কে কখন না জানি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করে বসে। এই ভয় থেকেই এই এলাকায় ভারতের গোয়েন্দা ও ‘র’ ততপরতা ব্যাপক, অনেক বেশি। অনুমান করা হয় সেই সুত্রে সারা নর্থ-ইস্টের প্রায় সব ইংলিশ-ওয়েব পত্রিকা যা আছে তা  প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে ‘র’ এর ততপরতায় নিয়ন্ত্রিত। মূলকারণ, এসব মিডিয়া নিজে চলার আয় নিজে করতে পারে না। আর সেই সুত্রে ‘র’ এর অর্থ বা ভর্তুকিই তাঁদের একমাত্র সহায়! একারণে, সারা নর্থ-ইস্ট থেকে নাগাল্যান্ড হয়ে বার্মা – মানে একেবারে থাইল্যান্ড সীমান্ত পর্যন্ত সব ইংরাজি ওয়েব সাইটগুলো এই একই দশায়!  ফলে নন্দীর এবং সময়ে এমন একেকটা ওয়েব পত্রিকায় সুবীর ভৌমিকের আবির্ভাব একারণেই ঘটতে দেখেছি আমরা। আর  এমনই এক NorthEast News এ এবার নন্দীর আবির্ভাব ঘটেছিল।
    এদিকে উপরে বলেছি, হাসিনা বিরোধী এবারের প্রপাগান্ডা হাজির করাতে এখনকার বাংলাদেশে মাস-লেবেলে এমনকি বিদেশের বাংলাদেশিদের কাছেও নন্দী ক্রমশঃ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল। আমি ২০১৫ সাল থেকে নন্দীকে ফলো করি। আমার পুরানা লেখায় সেকারণে “নন্দী কে” তা লিখতে সহজ করে ধারাবাহিক বর্ণনা দিয়েছিলাম।  আর এই লেখা এখনও আমার সাইটে  প্রতিদিন কমপক্ষে পঞ্চাশজন বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নক করে থাকে, দেখতে পাই! অনুমান করি তাঁদের মূল বিষয় আসলে চন্দন নন্দী কে? এই কৌতুহল!

    সবচেয়ে খারাপ কাজ করেছে আমাদের প্রগতিশীল মহল! ফ্যাক্ট চেকিং-এর নামে একজন চন্দন নন্দীকে নাকচ করতে গেছেন। তাও সেটাও আবার (ইসরায়েল-ইন্ডিয়া কানেকটেড) সোয়েব চৌধুরীর আরেক প্রপাগান্ডা পত্রিকা দ্যা ব্লিটজ [The BLITZ] এর রেফারেন্স দিয়ে; মানে ভর করে!! মানে ব্লিটজ যেন এক নুন্যতম বিশ্বাসযোগ্য পত্রিকা এটা ধরে নেয়া হয়েছে সেখানে। মানে, গত শতকে বাংলাদেশের ইনকিলাব পত্রিকা থেকে উত্থিত সোয়েব চৌধুরি সম্পর্কে একালে যাদের কোন ধারণা নাই্‌ তাদেরই এক ছেলেখেলা হয়ে গেছে কাজটা! এককথায় বলা যায় যে ব্লিটজের কোন  পাঠক বিশ্বাসযোগ্যতা নাই, অথচ তার কাঁধে মাথা রেখে আরেক বিশ্বাসযোগ্যতা-হীন চন্দন নন্দীকে নাকচ করার কিছু কী আছে? না থাকতে পারে? এমন চন্দন নন্দীর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলা – দুটাই বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে!
    এদিকে অন্যান্য প্রগতিশীলদেরকে দেখা গেছে এই ফ্যাক্ট চেককে আপহোল্ড বা আপন করে  নিয়ে দেখেছেন কেউ!  আবার চন্দন নন্দী সম্প্রতিকালে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন আমেরিকা থেকে প্রচারিত কনক সারোয়ার এর ভিডিও ক্লিপে। এই সাক্ষাতকারকেও একই সাথে প্রগতিশীলদের অনেকেই প্রশংসা করেছেন, আপন করেছেন। এই সাক্ষাতকারের শুরুতে [০২ঃ ২৪ মিনিটে] চন্দন নন্দীর উপস্থিতিতে কনক চন্দনকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে চন্দনের বাবা  যে ‘র’ এর কর্মকর্তা অফিসার ছিলেন ও বাংলাদেশে পোস্টেড ছিলেন, তা কনক আমাদের জানিয়েছেন!  ]
    এদিকে প্রগতিশীলতার কাহিনীর শেষ নাই! সিপিডি এর মালিক  ডঃ রেহমান সোবহান আর সাথে ডঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মিলে এরা গত ২০০৭ সালে ভারতের আসামকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর দেওয়ার পক্ষে প্রপাগান্ডা করবেন, এই ঠিকা পেয়েছিলেন। এমনকি যারা তাঁর বিরোধিতা করছেন তাদেরকে তিনি অশিক্ষিতও বলেছিলেন। সেই রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের এবারের ঠিকা সম্ভবত রানা দাসগুপ্তের সংগঠন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ এর পরামর্শক হওয়া যাতে এই সংগঠন আওয়ামি লীগকে ছদ্ম তুলাধুনা করে আবহাওয়া তৈরি করে বিএনপির কাঁধে রানা দাসগুপ্তকে সওয়ার করানী! এরা গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা সরকার হিন্দুদের জন্য কিছু করেন নাই, অবস্থা নাকি আরো খারাপ হয়েছে বলে হাসিনাকে উঠতে বসতে গালাগালি শুরু করেছেন – উদ্দেশ্য বিএনপির কোলে উঠা বা রানা দাসগুপ্তকে তুলে দেওয়া!
    এই সকল প্রগতিশীল মহল এখন কুমিল্লার ঘটনায় কী করবেন? এটা তো প্রকাশ্য যে সেখানকার আওয়ামি এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনের বাহার “মদবিহীন পুজা” করতে আহবান করেছেন। আর সেটার বিরোধিতা করার উসিলায় রানা দাসগুপ্ত মাঠে নেমেছেন। সকল রিয়েল উত্তেজনার শুরু সেখান থেকে। আর কথা তো সত্য যে কলকাতায় পুজার সময় মদের বার বা বেচাবিক্রি বন্ধ রাখা হয়, কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা ঠিক রাখার সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে তাই। বাহার এমপি সেটার রেফারেন্স টেনেছেন!  অথচ চন্দন নন্দী এবার ‘র’ এর এজেন্ডা নিয়ে নেমে রানা দাসগুপ্ত দেরকে নাকি হেফাজত ইসলামি বা মুসলমানেরা আক্রমণ করেছে বলে মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছেন!। ইতোমধ্যেই প্রগতিশীলদের আদরণীয় হয়ে উঠে চন্দন নন্দীর ধারণা তিনি এবার সেই প্রগতির ইমেজ বিক্রি আর এর ক্যাশ ছিটিয়ে  – মুসলমানেরা হিন্দুদের আক্রমণ করেছে –  বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ফ্রেমে আওয়ামি বনাম রানা দাসগুপ্তের ঝগড়াকে লুকিয়ে তা ঢেলে সাজিয়ে- এটা হিন্দুদের উপর মুসলমানদের হামলা বলে চালিয়ে দিবেন! সেটা আবার এখন কিছু কাজের অগ্রগতি দেখাতে শুরু করেছে।

    যেমন ডেইলি স্টার ইতোমধ্যেই রানা দাসগুপ্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পাঠককেও নিতে উস্কানি তুলেছে। তাই এনিয়ে তাঁদের রিপোর্টে এমপি বাহারের   ‘এটা শুধু আমার কথা নয়, দিল্লি থেকেও এটা বলেছে।’ বলে উপ-শিরোনাম করেছে। সম্পাদক মাহফুজ আনাম এতদিন নিজে ‘র’ বা ভারতের দালালির লোক বলে পরিচিত হয়ে যাওয়াকে অসুবিধা নাই মনে করলেও তাঁর নিজের আওয়ামি লীগের সাথে সম্পর্ক নাই – সেতা প্রমাণ করে রাখতে নিজ আওয়ামি বিরোধিতাকে খুব সিরিয়াসলি নিতে দেখছি আমরা। তাই এর আগে ওবায়দুল কাদেরের আমরাও আছি দিল্লি­ও আছে, বক্তব্যের সমালোচনা করে উল্টা নিজেই এক কলাম লিখে ফেলেছেন। আর মাহফুজ সাহেব এখন কুমিল্লার আওয়ামি এমপি বাহারের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছেন। মানে এই এমপিকে নিচা করেছেন বা ভিলেন করে এঁক্কে দিয়েছে! এতে সার মানে দাঁড়িয়েছে যে রানা দাসগুপ্তকে সাপোর্ট করা মানেই তো চন্দন নন্দীকে সাপোর্ট করা! অর্থাৎ এখানে পরোক্ষে কায়দা করে ‘র’ এর পক্ষে দাঁড়িয়েছে ডেইলি স্টার।

    তাহলে রানা দাসগুপ্ত গত পনেরো বছর ধরে আওয়ামি মাখন লুটে এখন আওয়ামি-বিরোধী ঝান্ডা দেখানো কেনঃ
    হা এটাই ঘটনা কেন্দ্র! অল্পকথায় বললে, হাসিনার আওয়ামি লীগের ক্ষমতার অবস্থা ভাল নয়! কখন কী হয়ে যায় ঠিক নাই। এই হল এদের মূল উপলব্দি! সবচেয়ে সাড়ে সর্বনাশ হল, সেই আওয়ামি লীগ ছাড়া মোদির ভারত বাংলাদেশে বিএনপি বা আর অন্য কোন দলের দিকে এতদিন ফিরেও তাকায়ও নাই! তাই এ’বস্থায় বিএনপির কোলে উঠতে রানা দাসগুপ্তসহ মোদির ভারতের আগ্রহটাই মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে! আর তা থেকেই – সেটারই মরিয়া দশা দেখছি আমরা! রানা দাসগুপ্ত  চরম বেচাইন হয়ে উঠেছেন!  এরই গ্রাউন্ড সাজাতে সম্ভবত রানা দাসগুপ্ত মোদির ভারতের হয়ে প্রক্সি-যোদ্ধা বা এডভান্স পার্টি হয়ে উঠতে চাইছেন! যাতে বিএনপি এখন মোদির এডভান্স পার্টি রানা দাসগুপ্তের দিকে একট কোল দেয়! সেকারণেই রানা চরম আওয়ামি-বিরোধীতা শো করছে্ন – যা জরুরত সে জাদা – সেটা তো অবশ্যই!
    এটাই আমরা দেখছি।  আর এটা দেখে ততধিক জ্বলে উঠছে আওয়ামি লীগ মানে যুবলীগ-ছাত্রলীগ! আর মহড়াস্থল কুমিল্লা কারণ ২০২১ সালে ভারত এখানে সফল হয়েছিল! কোরান শরীফ রাখা ইকবাল কে?  সেটা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ভিডিও ক্লিপের প্রমাণ দাখিল করার পরও ইকবালের পিছনে কে তা আর হাজির না করে আওয়ামি লীগ বরং উলটা ভারতকে বাঁচিয়ে  দিয়ে সেই সুবিধায় নিজ ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে ভারত সহায়তা দিয়ে যাক – এভাবে ক্যাশ করতে কাজ করে গেছিল! এনিয়ে এখন হয়ত আপশোষ করছে! আর ইকবাল?
    ১৬ মাসের সাজা দেয়া ইকবাল এখন বেকসুর খালাসের পরে লাপাত্তা করে দিয়েছে সরকার!  আর ওদিকে রানা দাসগুপ্ত এখন বিরাট বিপ্লবী – এক বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে এখন ইকবাল খুঁজে ফিরছেন, তাঁর আরো শাস্তি দিতে চেয়ে উলটা সরকারের বিরুদ্ধেই তিনি সোচ্চার! বেচারা হাসিনা সরকার!!!
    আবার ওদিকে খেয়াল করেন, মোদির এডভান্স পার্টি বলতে সেটা কিন্তু ঠিক রানা দাসগুপ্ত নন। বরং মোদি-আরএসএস বেটার প্রতিনিধিত্বের পার্টি হল গোবিন্দ প্রামানিক এরটা। তাহলে রানা কেন এখন গুরুত্বপাবে? এনিয়ে প্রামানিককে রানাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তবু রানা দাসগুপ্তই এখন মোদির এক নম্বর আদরের দল কারণ, যেমন ধরেন রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের মত লোকদের পক্ষে সরাসরি আরএসএস এর গোবিন্দ প্রামানিক হল একটু অস্বস্তিকর, এর চেয়ে রানা দাসগুপ্ত এই গংদেরকে একটু আড়াল দেয়! তাই এই আয়োজন! নিঃসন্দেহে পরিকল্পিত আয়োজনই চলছে!

    নন্দী আর দাসগুপ্ত গং ওরা এখন হন্যে হয়ে যুতসই  ইসলামি দল খুজছে। যাতে সবমিলিয়ে হেফাজত-সহ ইসলামি দলগুলোর অন্তত কাউকে তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাদেরকে বলির বখড়া বানাতে রানা-নন্দীরা উঠেপড়ে লেগেছে! কিন্তু এবারের পরিকল্পনা আমরা বাস্তব হওয়া ঠেকাতে পারি এবং অবশ্যই ঠেকাতে হবে। সেজন্য আমাদেরকে সচেতন ও সাবধান হতে হবে। কারো সাজানী ফাঁদে বা উস্কানিতে পড়া যাবে না। আর এভাবে তাঁদের অসৎ পরিকল্পনা উন্মোচিত করে দিয়েই একমাত্র আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পারি! রানা-নন্দীদের পরিকল্পনাসহ সব ততপরতার নিন্দা জানাই!

     

     

    আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ১৭
    সর্বশেষ আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ৫০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    কানাডায় ‘র’-এর খুনঃ
    মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    গৌতম দাস
    ২৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৯
    https://wp.me/p1sCvy-52J

     

            …Canada row wake-up call on rival India

    কানাডায় নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাসকারি এক শিখ নেতাকে খুন করতে মোদির ভারত রাষ্ট্রের এক অন্তর্ঘাতমুলক খুনাখুনির প্রতিষ্ঠান ‘র’ [RAW] কানাডায় গিয়ে একাজ করে এসেছে। কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ, যিনি নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে মিথ্যা ‘তিনি যেন কূটনীতিক’ এই ছুপা পরিচয় নিয়ে কানাডায় ছিলেন। তিনি এই খুনের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে ইন্টেলিজেন্স তথ্য থেকে ধারণা করা  ও অভিযোগ উঠেছে। তাই তাকে, কানাডা সরকার ‘বহিস্কার’ [‘অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি ঘোষণা’ বা persona non grata] করে দিয়েছে।
    এই ঘটনা নিয়ে খোদ  আমেরিকা থেকেই বহু মিডিয়া রিপোর্ট  প্রকাশিত হয়েই চলেছে। এখনও আসছে। বিশেষ করে শুরুর দিকে রয়টার্সের খবরগুলো আর পরে  নিউ ইর্য়ক টাইমসে এই রিপোর্টটা সারা ফেলেছে। এতে প্রকাশিত ভাষ্য থেকে এর স্টোরির সারাংশটা এরকম যে, আমেরিকা প্রতিদিনই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অসংখ্য বিদেশি দুব্যক্তির কথোপকথনের মধ্যে বা-হাত-ঢুকিয়ে [intercept]  তা শুনে থাকে। কিন্তু এত তথ্যের ভিড়ে এক কথোপকথন (যেটার এক প্রান্তে ছিলেন এখন বহিস্কৃত কানাডায় কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ বলে অনুমান করা হচ্ছে) আমেরিকার হাতে এসে যায়। সেই তথ্যসহ আরো অনেক কিছুই আমেরিকা কানাডা সরকারের সাথে শেয়ার করেছিল। এমনিতেই সাধারণভাবে এদুই রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অনেক কিছুই তারা শেয়ার করে, পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে, যেন একই রাষ্ট্র এর দুই অংশ তারা।
    খুনের ঘটনাটায় ভুক্তভোগীর নাম [Hardeep Singh Nijjar] হরদীপ সিং নির্জ্জার,  যিনি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন এক শিখ রাষ্ট্র কায়েমের  – মানে খালিস্তান আন্দোলনের কর্মী; এই অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের রাজনীতির অনুসারী।
    অনেকের ধারণা হতে পারে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মানেই তা টেররিজম বা একালে জঙ্গীবাদের ক্যাটাগরিতে ফেলে একে নিন্দা করা যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আপনি যদি দাবি তুলেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য আমি রেফারেন্ডাম চাই – আর এটাই আমার দাবী সেক্ষেত্রে নেতিভাবে দেখিয়ে কোন শাসকেরই এথেকে  সুবিধা খাবার সুযোগ থাকে না। কানাডায় বসে শিখ কমিউনিটি এভাবে তাদের দাবি পরিচালিত করছে। যা সম্পুর্ণ আইনিভাবেও বৈধ আন্দোলন!
    হরদীপ সিং তিনি কানাডায় খুন হন চলতি বছরের গত জুন মাসে। এরপর পরেই ব্যাপারটা ভারত-কানাডার মধ্যে সরকারি পর্যায়েই আলোচনা হয়েছিল, তবে তা মিডিয়া থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি সদ্য সমাপ্ত গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত জি২০ এর সম্মেলন চলার কালেই কূটনৈতিক চক্রে কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রের মধ্যে একসাথে এবং সাথে মোদিকে নিয়েও কিন্তু গোপনে আলোচনাও হয়েছিল। (যেটা এখন জানা যাচ্ছে এমন সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তা মিডিয়ায় স্বীকার করছে)। বিশেষ করে ইন্টেলিজেন্স তথ্য শেয়ার করার  আরেক অপ্রকাশ্য গ্রুপ ‘৫ আই’ [5 EYE] – এই গ্রুপ যার নাম বাংলা করলে হয় পাঁচ চোখের গ্রুপ। আর এর সদস্যরা হল, আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। সোভিয়েতের সাথে কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আমলে এটা আমেরিকা, ইউকে এর মধ্যে এক গোপন চুক্তিতে প্রথম এর জন্ম হয়েছিল যার সাথে কালক্রমে অন্য তিন দেশ যুক্ত হয়েছিল। কেবল ২০১০ সালে এমন জোটের তথ্য প্রকাশ্যে এনে উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার জি২০ সম্মেলনে এই জোটও তা গোপনে বিস্তর আলোচনা করলেও  এ’থেকে কোন অগ্রগতি, দিশা বা পরের পদক্ষেপ কী তা বের না হওয়াতে এখন খোলাখুলি একে-অপরের  কূটনীতিক বহিস্কার-সহ, এখন আমেরিকা খোলাখুলি ভারতকে – খুনী কে তা বের করতে – কানাডিয়ান তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য প্রকাশ্যে শক্ত আহবানে এসে ঠেকেছে। যার মানে হল, ভারতকেই এখন ‘র’ এর দিক থেকে যারা যারাই এই খুনের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের জন্য কানাডার হাতে তুলে দিতে হতে হবে – এই হল সারা পশ্চিমের হয়ে ভারতকে আমেরিকান পরামর্শ ও অনুরোধ।  আর আমেরিকান অনুরোধ মানে এখন এটা ক্রমশ ভারতের জন্য বাধ্যবাধকতা হতে থাকবে!  আর বলাই বাহুল্য যে এটা হল আপোষে ব্যাপারটা সবচেয়ে কম আন্দোলিত করে সমাপ্তি টানার প্রস্তাব। এখন মোদি এতে একমত না হলে ক্রমশ ভারতের উপর চাপ বাড়বে এবং অবশ্যই এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদেশের সাথে ভারতের শত্রুতার চরমে যেতে থাকবে – এতে কোনই সন্দেহ নাই।
    আপনি একটা রাষ্ট্র মানে একটা রাষ্ট্রস্বার্থ হলেও অপর এক রাষ্ট্রের ভিতরে ঢুকে গোপনে সেদেশের নাগরিক কাউকে খুন করে আসতে পারেন না। এটা আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনেও ক্রিমিনাল অপরাধ। তাতে ঐ খুন হওয়া ব্যক্তি আপনার কাছে আপনার রাষ্ট্রের যতবড়ই শত্রু বিবেচিত থাক না কেন! এই যে অপর দেশ-ভুমিতে ঢুকে ঐ দেশের নাগরিককে হত্যা এটা সেই অন্যদেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!  এতে আইনি পথ ছিল মানে হতে পারত যে ভারত কানাডা সরকারের কাছে হরদীপ সিং এর নামে ভারতে মামলা আছে তাই তাঁকে ভারত সরকারের হাতে হস্তান্তরের দাবি করা। কিন্তু এখন যা হয়েছে তা হল কানাডার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলার মত এক্ট করে ফেলার কুটনীতিক-সামরিক দিক তো আছেই এছাড়াও হরদীপ সিং কে নিয়ে ভারত কোন বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণের আগেই  মানে ভারতে চোখেও তো  বিচার-প্রমাণ প্রক্রিয়া শেষে প্রমাণিত কোন  অপরাধী নয় তাহলে তাকে আগেই খুন করা হল কেন? মানে ভারত হরদীপ সিং কে কোন বিচার প্রক্রিয়ায় আনতেই চায় না যুদ্ধের এনিমি যেন এমন বিবেচনায় খুন করেছে!!!  অর্থাৎ বলা যায় মোদি সরকার তাঁকে নিয়েই বিচারের পথে না গিয়ে আইন বহির্ভুত [extra judicial] খুন বা কিলিং ঘটিয়েছে !! এটা তো ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি নির্দেশে এক কিলিং!!!! আর না হলে যুদ্ধের এনিমি হিশাবে ট্রিট করেছে – এর দুটোতেই মোদির ভারত অপরাধী!

    অন্তর্ঘাতমুলক [subversive] মানে কীঃ
    ভারতের বিদেশে গোয়েন্দাগিরি ও অপততপরতার সংগঠন হল ‘র’ [RAW]। এসব অপততপরতাকে বাংলায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা বলাই সঠিক! যদিও অনেকে এটাকে স্যাবোটাজ [sabotage] শব্দে ব্যাপারটাকে ধরতে চেষ্টা করেন।
    অন্তর্ঘাত শব্দটা ডিকশনারী মানে দেখলেই বুঝা যায় এটা কত ভয়ঙ্কর। এর ডিকশনারি মানে হল, ভিতরে থেকে বসবাস করেও গোপনে কারো ক্ষতি করা। এখানে ভিতরে বলতে যাকে খুন করবে বা ক্ষতি করবে তার দেশে কিংবা খোদ তাঁর বাড়িতেই মেহমান হয়েও এবং বন্ধু সেজে এমন খুন বা ক্ষতি করবে। অর্থাৎ শব্দটা নিজ থেকেই এক ক্ষতিকর শব্দ। এর উপর আছে এর বিশ্বাসঘাতক দিকটা।  এখানেই শেষ না, আরো আছে। সব মিলিয়ে সেটা মানে, মানুষের এমন কাজ হল চরম অনৈতিক ও অসৎ[immoral] কাজ। তাহলে  এটা তো এমনিতেই অধঃপতিত এক ধারণা  তবু, মানুষের সমাজেই তো এমন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের প্রতিষ্ঠান যেমন ‘র’-কে লুকিয়ে থাকতে/আছে পাওয়া যায়!!! হ্যা একথা সত্য তবে কেবল একটা জায়গায় অন্তর্ঘাত ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকও পাওয়া যায়। সেখানে আসছি পরে, এর আগে…।

    এর মূল ইংরাজি  শব্দটা হল সাবভারসিভ [subversive] যারই সংস্কৃত ঘেঁষা এক বাংলা করা হয় অন্তর্ঘাতমুলক; বা এমন কাজ বা ততপরতা। সাবভারসিভ এর আক্ষরিক মানে হল ‘উপড়ে ফেলা’ [overthrow something]।  আর এই উপড়ে ফেলার অর্থ সরকার উপড়ে ফেলা, ব্যক্তিকে উপড়ে ফেলা মানে খুন করা এবং তার বাসায় গিয়ে খুন করা সহ কোন সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠানকেই দমন করা, দাবড়ে দেয়া ইত্যাদি। ভারতের ‘র’ হল তেমনই এক সাবভারসিভ প্রতিষ্ঠান।
    সবচেয়ে বড়কথা যে কোন রাষ্ট্রের আইনের বিচারে ও চোখে সাবভারসিভ কাজটা সবসময়ই ‘অবৈধ’। তাতে এটাও সম্ভব যে, সাবভারসিভ কাজ মানেই প্রো-একটিভ মানে নিজেই আগাম “আইন নিজের হাতে তুলে” নিয়ে – উপড়ে ফেলার খুন জখম বলতে যা যা বুঝায় এর সবই করে আসা। আর মনে রাখতে হবে,  ‘র’ ভারতের হলেও সেই  ভারতেরই আইনেও ভিনদেশের কোন  ‘র’  সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ও এর ততপরতাও চলে তবে সেটাও অবৈধ। শুধু তাই না, ভিনদেশে গিয়ে ‘র’ এর মত প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা সে দেশের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!!  একারণে, ধরা যাক বাংলাদেশে কোন ‘র’ এর এজেন্ট এসে প্রকাশ্যে বলতেই পারবে না যে সে ‘র’ এর এজেন্ট। কারণ, ‘র’ সাবভারসিভ কাজের প্রতিষ্ঠান বলেই তা এক অবৈধ প্রতিষ্ঠান।  আপনি ‘র’ – এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এই পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের (বা যেকোন দেশের) ভিসা পাবার প্রশ্নই আসে না!  আর এই অনৈতিক ও অসৎ সংগঠন বলেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে আপনার অফিস বা বাসার ড্রয়িং রুমে প্রবেশ-বসবাস অনুমতি পাবে না!

    কোথায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকঃ
    উপরের পুরা প্যারাগ্রাফটাই অন্তর্ঘাত শব্দটার নেতি ও বিশ্বাসঘাতক দিকটা উন্মোচন করা হয়েছে এর প্রতিটা বাক্যে। তাহলে অন্তর্ঘাত কাজের এর পক্ষে এর সমর্থক কারা? কারা হয় এমন সমর্থক?

    এককথায় এর জবাব উগ্র জাতিবাদি চিন্তার লোকেরা!
    লক্ষ্য করলে দেখা যাবে উগ্র জাতিবাদি চিন্তা বা রাজনীতির যেখানে রমরমা বা ইতিহাসের যেসব যুগে তা রমারমা ছিল সেসব কালে উগ্র জাতিবাদি চিন্তার পাশে বসে থাকতে আমরা পেয়েছিলাম সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ও প্রতিষ্ঠানকে। ১৯৫০ সালের আগের সাড়ে তিনশ বছর ছিল পশ্চিমাদেশে বিশেষত ইউরোপ ছিল জাতিরাষ্ট্র বা উগ্র জাতিবাদি চিন্তার যুগ। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নানান কারণে এর অনেক কিছুই একেবারেই বদলে যায়। সবচেয়ে বড় কারণ, খোদ ইউরোপই জাতিরাষ্ট্র ধারণার রাষ্ট্র চর্চা বন্ধ করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়েছিল। এছাড়া আরও  পরে কোল্ড ওয়ারের আমলে তা কিছুটা দেখা দিলেও তা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতই থেকে যায়। এককথায় এর মূলকারণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু ও এর বিস্তার। কারণ, রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সাথে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতাও চালাবে আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও চালাবে এটা কঠিন। মানে এদুটো একসাথে চালানো খুবই মুশকিল। যেমন ইতোমধ্যেই কানাডা-ভারত আবার কানাডা-ইউকে যে বাণিজ্য আলোচনা চলছিল তা এখন পিছনে পরে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।    তাই যেমন,  সোভিয়েত ব্লক আর পশ্চিমাদেশ এদের মধ্যে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ছিল না, সম্ভবও ছিল। একারণে এদের – পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পর অন্তর্ঘাত্মূলক ততপরতা  চলতে পেরেছিল কোল্ড ওয়ার আমলে। তাই পশ্চিমাদেশে এটা কমে গেলেও এশিয়ায় বিশেষত ভারতে তা ব্যতিক্রম। দুটা কারণে। এক .  ভারতে এটা হিন্দুত্ববাদ এই উগ্রজাতিবাদে আচ্ছন্ন এক জাতিরাষ্ট্র। আর দ্বিতীয় কারণ, জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তান রেষারেষি সম্পর্ক। যদিও সাধারণভাবে সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত প্রতিষ্ঠান অনেক রাষ্ট্রই সক্ষম থাকে। কিন্তু  তা করে না, কেবল গোয়েন্দা ততপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ সে সক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখে। আর ভারত-পাকিস্তান এদের মধ্যেই এর ব্যাপক ব্যবহার – এটাই গুরুত্বপুর্ণ জায়গা। এর উপর এসব প্রতিষ্ঠানের অন্য দেশে গিয়ে অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ঘটানোর পরে দেখা যাবে কেবলমাত্র উগ্র জাতিবাদি দেশেই দেখা যাবে যে শাসক একাজকে গৌরবের বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বা ওদেশের মিডিয়া প্রকাশ্যে এটা গৌরবের কাজ বলছে।

    তাই উগ্র জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদ- হিন্দুত্ববাদী ভারত আর এই ভারতের প্রতিষ্ঠান র-এর কোন ততপরতা পাকিস্তানে ঘটিয়ে এলে তা ভারতের মিডিয়া প্রকাশ্যে তাতে উতযাপনের বিষয় হিশাবে তুলে ধরে থাকে।
    কানাডায় হরদীপ সিং-কে খুন করা আসার প্রেক্ষিতে কলকাতার আনন্দবাজার ঠিক একাজটাই করেছে।

    কলকাতার আনন্দবাজারের র-এর অন্তর্ঘাতি ততপরতার পক্ষে প্রকাশ্য উতযাপনঃ
    উপরে বলেছি, অনেক রাষ্ট্রেরই  সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত সক্ষম প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন ততপরতায় তারা যায় না বা এনিয়ে কথিত দেশপ্রেমি উতযাপন তারা করে না। সম্ভবত কাজটার মধ্যে অনৈতিক, অসততার দিক আছে তা খেয়াল রাখে বলে। কিন্তু মফস্বলী কলকাতার কাছে এই খারাপ দিকটার কথা খেয়াল রেখে বা ভেবে এথেকে দূরে থাকার মত কোন ক্রিটিক্যাল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে নাই। এর উপর ক্ষমতায় যখন মোদি তখন সে আরেক হিন্দুত্ববাদী রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলের র-এরও আবার বিশেষ অন্তর্ঘাত-বাহিনী (‘টিম জে’) বানিয়ে কী করে পাকিস্তানে অপ-ততপরতা চালিয়ে এসেছিল সেই কথিত গর্বের কাহিনী এখন ছেপেছে আনন্দবাজার। অন্তর্ঘাত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজটা যেন খুবই গর্বের তা একালেও এই পত্রিকা পাঠকের মনে এখন হরদীপ হত্যার সময় যাতে জনমত কানাডার হত্যাকে গৌরবের মনে করে সে উস্কানি তুলতেই আনন্দবাজারের এই উদ্যোগ। এর শিরোনামেই ব্যাপারটা খুবই গৌরবের এমন উস্কানি তুলতে লেখা হয়েছে – “পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে শত্রু নিধন, খলিস্তানিদের ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর গোপন তাস ছিল ‘টিম জে’ “। এই ‘টিম জে’ হল র-এর ভিতরেই আরেক বিশেষ বাহিনী যা রাজীব গান্ধী তৈরি করিয়েছিলেন। মনে রাখতে পারি ইন্দিরা গান্ধী খুন হয়েছিলেন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে শিখদের কাছে পবিত্র “স্বর্ণমন্দিরে হামলা ও তছনছ করে সেখানে আশ্রয় নেয়া সকল আন্দোলনকারীদেরকে হয় হত্যা করেছিল বা বের করে গ্রেফতার করেছিলেন। আর স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশনের বদলা নিতেই ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর তারা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। রাজীব গান্ধীও প্রায় একইভাবে শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে খুন হয়ে গেছিলেন। এমনকি খোদ দিল্লিতেই ইন্দিরার হত্যা হয়ে যাবার কয়েকদিন পরে শিখ-জাতির বাসিন্দা পেলেই তাদের উপর কংগ্রেসিরা এথনিক ক্লিনজিং করেছিল!

    সাধারণভাবে বললে, ভারতে বারবার বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যা হাজির হচ্ছে জন্মের সময়ে ভারত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রগঠনে কিছু মারাত্মক ত্রুটির কারণে। নেহেরুর রাজনৈতিক চিন্তার বৈশিষ্ট হল ১। এটা কলোনিশাসক মডেল। জবরদস্তিতে ঘাড়ে চড়তে হবে আর শুষে নিতে থাকতে হবে  তাতে সেটা আভ্যন্তরীণভাবে কেন্দ্রিভুত ক্ষমতার নামে অথবা পড়শির উপরে চড়াও ধরণের হলেও একই ফর্মুলা। ২। ভারতের রাজ্যগুলোর উপরে একমাত্র তথাকথিত কেন্দ্রের কড়া নিয়ন্ত্রণেই ভারতকে এক রাখা সম্ভব। এটা নেহেরু বিশ্বাস করতেন। আর এরই প্রতিফলন তিনি ঘটিয়ে রেখেছেন যা এখনও বর্তমান ভারত রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে।   আর একারণেই পালটা প্রতিক্রিয়ায় সব সময় কোন না কোন রাজ্যে ভারত ভেঙ্গে রাজ্যগুলোর আলাদা হবার উপক্রম!! উল্টোদিক থেকে পড়লে অন্যভাষায় বললে, এটাই বিচ্ছিন্নতাবাদ। আর তা ঠেকাতে উগ্র জাতিবাদী প্রপাগান্ডা যে বিচ্ছিন্নতাবাদ মানেই অপরাধ! সোজা ভাষায় বললে, নেহেরুর কাছে শাসন বলতে কলোনিশাসক যেভাবে ভারতকে অধীনস্ত রেখে শাসন করেছিল, সেটাই মডেল। এর বাইরে ১৭৭৬ সাল থেকে স্বাধীন আমেরিকা যে ফেডারল বলে আরেক রাষ্ট্র ধারনার হাজির ও সবচেয়ে স্টেবল-থিতু ধারণা বলে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে এটা তিনি বেখবর। বরং বৃটিশেরা চলে গেলেও তিনি নেহেরুই যেন তখনও বৃটিশ রানীর ভাইসরয় এই মনে করে তিনি ভারত রাষ্ট্র কাঠামো ও শাসন সাজিয়েছেন।
    আবার এর সাথে ছিল উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী ও এর কথিত অর্থহীন দেশপ্রেম!!! আর সেটাই তবে আরো উগ্র উপস্থাপনায় একালে মোদির আমলে তা হয়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদী শাসনের প্রধান হাতিয়ার। আর তা থেকেই কথিত হিন্দুত্বের দেশপ্রেম এর আবেগ তুলে ভোটের বাক্স ভরা। তাই শিখ কমিউনিটির উপর যে নিরবিচ্ছিন্ন নিপীড়ন এটাকেই মিথ্যা করে ইতিবাচকভাবে হাজির করতে উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেম ছড়িয়ে দেয়া উস্কে তোলা – একাজটাই করেছে আনন্দবাজার। তাতে আরেক দেশে গিয়ে গোপন ও গুপ্ত হত্যা করে আসা যে আন্তর্জাতিক অপরাধ এমন কোন বোধ তাদের নাই। অথচ ভারতে  ২০০৮ সালে পাকিস্তানের ২৬/১১ মুম্বাই হামলা সেই একই ঘটনার উলটা পিঠ। মানে একই জিনিষ ভারত করলে তা দেশপ্রেম ও বীরত্ব; কিন্তু পাকিস্তান করলে সেটা অন্যায় আর মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ দিয়ে একে প্রতিবাদ ও বিচার করে দেখাতে হবে!!! এই হলো উগ্র জাতিবাদের মূলনীতি।  সেটা অনুসরণ করেই আনন্দবাজার বলতে চাচ্ছে কানাডায় গিয়ে হরদীপ সিং-কে হত্যা এই অন্তর্ঘাতি ততপরতা এটা ভারতীয় দেশপ্রেম এবং এটা যেন বৈধ এবং ভারতীয় দেশপ্রেম ও বীরত্বের নজির! জনমনে এই উগ্র হিন্দুত্বের জাতিবাদ এবং এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেছে আনন্দবাজার যাতে তারা কানাডায় গিয়ে হত্যা করাটাকে অন্যায়-অবৈধ না একেবারে উলটা দেশপ্রেমের বীরত্ব হিশাবে দেখে!

    মফস্বলি আনন্দবাজারের বেকুবিটা হল, তারা ভেবেছে সারা দুনিয়াটাই যেন মুসলমানের পাকিস্তান তাই মুসলমানদেরকে তো যা খুশি শাস্তি দেয়া যায় এই হলো অনুমান! তাই পাকিস্তানে ভারতের র-এর ‘টিম জে’ যেটা করতে পেরেছে সেটা যেন সে কানাডাতেও করতে পারবে!! এটা যেন কোন ব্যাপারই না!!! এই হলো তাদের হিন্দুত্ববাদের গাধামি! তারা বুঝেই নাই যে কানাডার গায়ে হাত মানে এটা অলিখিতভাবে আমেরিকার [সাদা ককেশীয়] গায়ে হাত তোলার সামিল! এর উপর কানাডা আমেরিকার সাথে জি৭ জোটের সদস্য! শুধু তাই নয় কানাডা ন্যাটোর সদস্য এবং ইন্টেলিজেন্স শেয়ার গ্রুপ ফাইব আই [Five EYE]  এর সদস্যও বটে! তাই মোদি যদি আমেরিকান “সহযোগিতার প্রস্তাবে” রাজি না হন তবে এই বিরোধ ক্রমশ চরমে না উঠে উপায় থাকবে না।

    ওদিকে মোদি হরদীপ সিং হত্যার পথে পা বাড়িয়েছেন আরেক কারণে! শুধু ভারত দেশের বাইরের হিসাবের কথাটা হল, পশ্চিমাদের চীন-ঠেকানোর কাজে ভারত গুরুত্বপুর্ণ পিলার ও বন্ধু তাই সেই ভারত এক্ষেত্রে কানাডায় গিয়ে খুন করেও পার পেয়ে যাবে; এছাড়া এতটুকুই না। মোদি আসন্ন আগামি নির্বাচনে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে শায়েস্তার পদক্ষেপ নিয়ে বীরত্ব আর গর্ব প্রকাশ করে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জজবা উঠাবে -ভোটারদের আবেগী করেও তুলবে যাতে এর প্রভাব মোদি-বিজেপির ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়!  কাজেই আমেরিকার দাবি যে “কানাডার সাথে  তদন্তে ভারতকে সহযোগিতা” এই আহবান – মোদির এতে সায় দেয়া এটা প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব একটা ঘটনা হয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি! আর সেক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিমের কাছে ভারত যতই চীন-ঠেকানোর দেয়াল- এই গুরুত্বের দেশ হোক না কেন মোদির ভারতকে পশ্চিম এক্ষেত্রে তারা পাচ্ছে না!!! সে সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি!

    আবার অন্যদিকে; আগামি বছরের শুরুতেই এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন, তাতে কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম; যা কানাডায় খুনের ঘটনার বহু আগে থেকেই একটিভ হয়ে ছিল। মোদির হিন্দুত্ববাদের এক ব্যবহারিক রূপ হল মুসলমানের উপর চরমতম বৈষম্য ও পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখার নানান বেআইনি পদক্ষেপ নেয়া – অন্যদিকে ভয় আর প্রলোভন দেখিয়ে  বিচার বিভাগকেই নিস্ক্রিয় রাখা, বদলি বা ডিপার্টমেন্ট বদল পর্যন্ত ঘটিয়ে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনকে স্থবির রাখা -সহ সবকিছু করে মোদি এক রামরাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন। আর এসব করেই আবার বাড়তি হিশাবে মুসলমান ঘৃণা বা শিখদের প্রতি ঘৃণা উস্কে তা বিক্রি মানে, এভাবে ভোটের বাক্স ভরার নীতিতেই মোদি গত দশবছর ধরে ক্ষমতায় টিকে আছে।
    কিন্তু এখন মোদির সেসব পরিকল্পনা ও ছকের কী হবে, কী প্রভাব পড়বে সেসবও দেখার বিষয়!  আসন্ন নির্বাচনের সময়ে, কানাডায় অন্তর্ঘাত কাজ যে যুদ্ধ ঘোষণার সমান কাজ তা হলেও – সেটা করা মোদির ঠিক আছে এমন জোশ তুলে আনা  – এটামোদির বিজেপি করতে যাবে আর টিকাতে পারবে?  আবার মোদি যদি পেরে যায় তাহলে এই মোদিকে বাইডেনের নেতৃত্বের পশ্চিম কী বোকার মত দাঁড়িয়ে দেখবে??? এসবই হয়ে উঠবেই আগামির ঘটনাবলীতে মুখ্য নির্ধারক সব প্রশ্ন!!!

    সর্বশেষঃ একটু আগে প্রথম আলো জানাচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পালটা কানাডাকে অপরাধীদের আশ্রয় দিবার অভিযোগ করেছেন। এর অর্থ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমের সাথে কোন আপোষের পথ বের করার পথে মোদির ভারত হাটবে না, যাচ্ছে না।

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; দুপুর ০১ঃ ৪৫
    সর্বশেষ আপডেটঃ  

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা

    মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা;
    আবার জি২০-ও তাই যদিও ভিন্ন কারণে

    গৌতম দাস
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩   সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Yr

     

                         G20 summit ends with India, Brazil and Russia boasting success

     

    মোদি এখন আর বিতর্কিত ভুখন্ড নিয়ে, উগ্র হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোশে ‘লড়কে লেঙ্গে’ বলে জবর দখলকারি হতে চান না। তাই তিনি এখন আর যুদ্ধ না। যেন,  ডায়লগে বিশ্বাসী। আপোষ আলোচনার ডিপ্লোমেসিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিতর্ক-বিবাদ সমাধানের পক্ষের এক গভীর বিশ্বাসী লোক হতে চান তিনি! এমনকি এব্যাপারে আন্তর্জাতিক রুল ও আইনের সহায়তাতেও এবং এসবের অধীনে যেতেও ইচ্ছুক!

    তাহলে মোদিকে একটু মনে করিয়ে দেয়া যাক, গত ২০১৯ সালে মানে মোদি ভারতে দ্বিতীয় সরকার গঠনের পরের প্রথম সংসদে ৫ আগষ্ট, মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে সারা কাশ্মীরই ভারতের, তা বলেছিলেন কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন কেন? যেখানে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত বলে যে দাবি তা অবৈধ, অগ্রহনযোগ্য বলে বাতিল  করে জাতিসংঘ রেকমন্ড করেছিল – কোন রাজা কী বলেন সেটা না, কাশ্মীরের বাসিন্দাদের সম্মতিই একমাত্র নির্ধারক মানে এক রেফারেন্ডাম বা গণভোট করে নিতে হবে; আর এটাই হবে ব্যাপারটা ফয়সালার ভিত্তি।  কিন্তু নেহেরু তা অমান্য করে সেই জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। আর এই অবৈধ কাজ করে আবার সম্ভবত মনের অস্বস্তি মিটাতে সান্ত্বণা হিশাবে  নেহেরু ভারতের কনষ্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা এনেছিলেন। যার সারকথা হল, কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদার রাজ্য করা কিন্তু সেটা আবার ভারতেরই যেন থাকে – এই ইচ্ছামত সংযোজনী আনা। যেটা বিবদমান কোন পক্ষের কেউ চায় নাই।  এমনকি ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায় হল, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।  অথচ এসবই অমান্য করে  মোদি-অমিত জোর করে সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন; এবার দাবি করছেন পুরা কাশ্মীর ভুখন্ডই ভারতের। এই হল ২০১৯ সালের মোদি-শাহের সংযোজন। যদিও আবার এখানে কেন কাশ্মীর ভারতের হবে এনিয়ে কোন কারণ-যুক্তি বা দলিল কোন কিছুরই উল্লেখ করেন নাই!!  যা অনেকটা –  আমি বলেছি তাই ওটা আমার ধরণের গোয়ার্তুমি!!! অথচ সেই মোদি এখন ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি এর অনুসারী হতে চাইছেন??? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি এক আন্তর্জাতিক সভার বন্তৃতায় এসব নয়া খায়েস নয়া ভান-ভনিতার কথা বলেছেন!!!

    তাহলে এই যে কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকেই এক বিতর্কিত ভুখন্ডই থেকে যাওয়া, আর একে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট থেকে মোদি-শাহ এর জবরদস্তিতে পুরা কাশ্মীরই ভারতের অংশ-ভুখন্ড বলে দাবি করা এটা কোন বা কার সাথে ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি করার পরে অথবা কোন “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলে  বিতর্ক মিটানো হয়েছিল????

    “Speaking at the East Asia Summit in the Indonesian capital Jakarta, Modi reiterated that “today’s era is not of war” and “dialogue and diplomacy” form “the only path to resolution” – a theme he has advocated for an end to the war in Ukraine ever since its invasion by Russia in February 2022.” – Indian Express September 8, 2023 

    উপরের এই উধৃতিটা নিয়েছি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এক সম্মেলনে ভারতের মোদির বক্তৃতা নিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। দুদিন আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সেখানে “ইস্ট এশিয়া সামিট” এর সম্মেলন ২০২৩’ [18th East Asia Summit (EAS)] এর ১৮তম অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।  “ইস্ট এশিয়া সামিট” বলতে বুঝতে হবে মূলত আশিয়ান দশ রাষ্ট্র আর এরপরেও আরো প্রায় আট রাষ্ট্রের এই সম্মেলন। সেই আট রাষ্ট্র হল – চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান।  এই সামিটে গিয়ে মোদি যে বক্তব্য রেখেছেন – সেটাতে চীনকে উদ্দেশ্য করে কিন্তু নাম না নিয়ে দেয়া মোদির এই স্ববিরোধী বক্তব্য। এখন ভিজা বিড়াল সাজা প্রধানমন্ত্রী মোদি বলতে চেয়েছেন – যে সে হল দুনিয়ায় আইনের শাসন দেখতে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী’ আর চীন হল যে আইনের শাসন মানে না এমন রাষ্ট্র। আর যে বিতর্কিত ভুমি যা ভারতের চোখে অরুনাচল আর চীনের চেখে তা ঝাঙনান ‘Zangnan’ সেই বিতর্কিত ভুমি নিয়ে  চীনকে খোঁচা মারতেই মাদি এমন [ সরাসরি না এমন ফ্রি কিক] বক্তৃতা মেরেছেন।

    আর এভাবে ভাব ধরেছেন যেন সন্ন্যাসী ভারতের এটা খুবই পবিত্র এক সাধু অবস্থান যে কারো ভুমির দিকে তাকায় না পর্যন্ত এমনই যোগী এই মোদি!!! অতএব এটাই ইউক্রেন ইস্যুতেও মোদির অবস্থান যেন তিনি পুতিন-জেলেনেস্কিকে বলছেন – ভায়েরা আমার তোমরা ডায়লগের মাধ্যমে সব মিটসাট করে নেও”।  তবে ভুলে যাওয়া যাবে না যে এই বক্তব্য হল মোদির সাইনবোর্ড – যা লটকানো থাকে কেবল দেখানোর জন্য। আর কার্যত মোদি বলতে চেয়েছেন,  ভাই পুতিন তুমি আমাকে ৬০ ডলারেরও নিচে [বাজারের গড় দাম যেখানে ৮০ ডলার বা উপরে] সস্তায় তেল পাঠাতেই থাকো যাতে আমার আটটা রিফাইনারিতেই দিন রাত আমি তেল শোধনাগার চালিয়ে সেই তেল রফতানির পবিত্র সুবিধা খেয়ে যেতে পারি! ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসির খেদমতগার আমি মোদি তো – আছিই তোমাদের সাথে!!!

    সারকথায়, মোদির হিন্দুত্ববাদের ভারত যদি মনে করে সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড আর এব্যাপারটা হল ভারত রাষ্ট্র কী মনে করে একান্ত তার ব্যাপার – তাই এনিয়ে অন্যের কিছুই বলার নাই। েখন একই ফর্মুলা মেনে, চীন যদি বলে ঝাঙনান ‘Zangnan’ চীনা রাষ্ট্রের ভুখন্ড – তাহলে তো আর এখানে মোদির এটা “যুদ্ধের যুগ নয়” অথবা এটা “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন যুগ” অথবা  এটা “ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসিতে সমাধান” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলার আর তো কোন সুযোগ নাই; খোদ মোদিরও না।  মানে মোদি নিজেই নিজের অবস্থানকে ব্লক করছেন – অবস্থা! মোদির সব কথাই তাই অর্থহীন প্রলাপ মাত্র হয়ে গেছে!

    ওদিকে, আনন্দবাজার মোদির এই বক্তৃতাটাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদি জোশ আর দেশপ্রেমের উথলায়ে উঠেছে বলে ব্যবহার করেছে; তাই তারা জোশ তোলা এক শিরোনাম করেছেঃ জি২০ বৈঠকের আগে জকার্তায় চিনকে কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – এভাবে। আর তাতে পাঠককুল যেন বলে উঠেছিল জিতে রহ মোদি!!!
    এছাড়াও আনন্দবাজার জানাচ্ছে মোদি সেখানে আরো বলেছেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ কিছুই উল্লেখ করতে বাদ রাখেন নাই।

    “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ,
    মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
    এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

    এর মানে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি যাই তার কাছে তার শত্রু মনে হয়েছে এমন কিছুকেউ উল্লেখ রাখতে পিছুপা হন নাই। কিন্তু তিনি কী জানেন এসবের উদ্গাতা আসলে তিনি নিজেই??? কারণ, তিনি  যতবার তাঁর হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আমাদের তাড়া করেন, আক্রমণ করেন ততবারই আমরা বাংলাদেশ থেকে যারা এটা প্রতিরোধ করি, রেজিস্ট [resistance] করি  এসব কিছুকেই ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা নামকরণ করে মৌলবাদ হিশাবে। আমাদের প্রতিরোধ বা resistance – এটাই হিন্দুত্ববাদি চোখে মৌলবাদ!!!  বাংলাদেশে আমাদের অস্তিস্ত রক্ষার জন্য আমাদেরকে হিন্দুত্ববাদি সকল ততপরতাকে প্রতিরোধ করতেই হয় ও হবেই!! 

     

    জি২০ সম্মেলনের আজ শেষ দিনঃ
    তবে আগে সেলফির দিন নিয়ে অল্প কথাঃ

    ইতোমধ্যে এবারের জি২০ সম্মেলন ২০২৩ আয়োজন করা হয়েছিল ভারতে, ৯-১০ সেপ্টেম্বর। আজ তার শেষ দিন। গতকাল প্রথমদিনের বিকালে ছিল শো-অফ বা রাষ্ট্রপ্রধান নেতাদের ব্যক্তি ইমেজ বাড়ানো যেটাকে বলে “পাবলিক ইমেজ” ক্রিয়েট বা তৈরি করে নেওয়ার এক শান্ত বিকেল। যেটা বাংলাদেশে বসেও আমরা টের পেয়েছিলাম এক সেলফি-ময় হয়ে উঠা সর্বত্র!!  বাইডেনের লক্ষ্য ছিল এক উদার মনের প্রেসিডেন্টের ইমেজ তৈরি করা।  বিশেষ যে প্রধানমন্ত্রী তাকে উঠতে বসতে গালাগালি, তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী, আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপকারি অথবা ২০ ঘন্টার লম্বা জার্নি করে দেখতে যাওয়ার মত আরও মহাদেশ আছে (মানে আমেরিকা আর যাবেন না বা পড়োয়া করেন না) ইত্যাদি এতসব বক্তব্য দেয়ার পরে তাঁকেই বাইডেনের সময় দেওয়ার দিক থেকে। ফলে এই বিচারে বাইডেন বাংলাদেশের সরকার নিয়ে যা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অবস্থান ও অসন্তোষ-ই থাক না কেন তিনি সেকারণে, মানবিক-সামাজিক সৌজন্য ভদ্রতা দেখানো আর নিজ উদার মনের পরিচয় অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি-ই আগিয়েছেন এটাই তিনি প্রমাণ করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বিপরীতে হাসিনা এই বিচারে তিনি ততটাই ইমেজ হারিয়েছেন।  যা বলেছেন তা তিনি মিন করেন এমনটা তিনি প্রমাণ রাখতে পারেন নাই। তিনি এজায়গায় শোচণীয় হেরেছেন।  যদিও এনিয়ে সাধারণ সম্পাদক ও. কাদের তার এক সেলফিতে বিএনপি নেতাদের ঘুম হারাম: ওবায়দুল কাদের বক্তব্যে এতে আওয়ামি দলীয় নেতা-কর্মির মনোবল চাঙ্গা করতে হয়ত কাজ করেছে কিন্তু এটা ততটাই হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়েছে যে তাহলে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ-কে আনার অর্থ কী দাড়ালো??? গতকাল বিকেলে লক্ষ্য করেছি প্রগতিশীল মানে  [প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ] চিন্তার ব্যক্তি বা লেখকেরা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে যে তাহলে কী তাদের হাসিনাই টিকে গেল – বাইডেনের সাথে রফা হয়ে গেল!!! এই খুশি তারা আর লুকাতে পারেন নাই বা লুকিয়ে রাখার টেনশন সহ্য করতে চান নাই যে তারা ভারতপন্থি বা র-পন্থি!! তারা সরাসরি বা পরোক্ষে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাহলে তো হাসিনা টিকেই গেল, তাই না!!!
    আমি অবশ্য তাদেরকে আর মানসিক যাতনা দিতে চাই নাই!  কারও অসুস্থতা কখনও কাম্য হতে পারে না! তবে অবাক হয়েছি তাদের চিন্তা করবার অক্ষ্মতাস দেখে যে তারা একটা সৌজন্য-ইমেজের স্বার্থ আর একই লোকের রাজনৈতিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ  এদুটার ফারাক করতে শিখেন নাই। আপনার এনিমি-কে তার মেয়ের সামনেই খুন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা (essential-ness) কী আছে বা থাকতে পারে??? নাকি এমন চিন্তা এটাকেই তো গাধামি, এক মফস্বলি চিন্তা বলে!  কারণ, সেকাজটা অন্ততপক্ষে বাচ্চাটাকে চকলেট দিয়ে দূরে পাঠিয়ে করতে হবে  – আর এটাই স্বাভাবিক!  আর বাইডেন এক্ষেত্রে চকলেট-ই এস্তেমাল করেছেন!!!   আর তাতে শত্রুতা তো ভোতা হয়ে যায় নাই। শত্রুতা শত্রুতার জায়গাতেই বহাল আছে!!!

    সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা প্রসঙ্গেঃ
    যেকোন দুই রাষ্ট্র অথবা বহুরাষ্ট্রীয় মোলাকাত বা সম্মেলন থেকে কোন যৌথ ঘোষণা আসাটা নুন্যতম তাদের মধ্যে কিছু ঐক্যমত্য আছে তা প্রকাশ করে। সেজন্য এটা খুবই কাম্য – সে কোন সামিট  মানে শীর্ষ দুই বা ততোধিক সরকারপ্রধান এর সাক্ষাত যাকে আমরা Summit বলে বুঝি; এমন সামিট মানেই এর সফলতার নুন্যতম মাপকাঠি হল যৌথ ঘোষণা – মনে করা হয় কূটনীতি চর্চায়! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গতবছর জি২০ সামিট থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুতে রাশিয়াকে টার্গেট করে, দায়ী করে সমস্ত বক্তব্য সাজানো হয়েছিল। লন্ডন গার্ডিয়ানের ভাষায়  “.…..All references to Russia, Russian aggression and Russia’s withdrawal in relation to the war in Ukraine that featured in last year’s joint statement at the G20 summit in Bali” । 

    কিন্তু এবার আক্কেল হয়েছে। ঐ সমস্ত লিখে কী কী অর্জন হয়েছে তা তো আজ এক বছরের মধ্যে সব পক্ষই পরিস্কার বুঝতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় কথা সারা পশ্চিম – মানে বাইডেন্সহ ইউরপের সব কুতুব রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের নিজ নিজ ইলেকশব ফেস করতে হবে। আর তাতে এরা কেউই নিজ নিজ জনগণের কাছে যুদ্ধের পক্ষে তাদের সাফাই অনুমোদন করিয়ে নেয়া মানে তাদের স্ব স্ব রাষ্ট্রের জনজীবন যুদ্ধের ফলে ভাল আছে আরামে বা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে তা একেবারেই নয়। কাজেই অন্তত বাইডেনের কথা যদি বলি আহামি ২০২৪ নভেম্বর তাকে আমেরিকান নির্বাচনের মুখোমুখি দাড়াতে হবে।  অনেকবার যুদ্ধ চালানোর প্রার্থী জিতেছে যেমন বুশের দ্বিতীয় বা সেকেন্ড টার্মের জয়। কিন্তু আবার ওবামার দুবারের জয়  যুদ্ধ থেকে ফেরত আনবার প্রার্থী ছিলেন বলে! অনুমান করা হচ্ছে এবার যুদ্ধ থেকে ফেরত আনার প্রার্থির পক্ষে রায় যাব। তাই আগামি বছরের শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাতে হবে বা বন্ধ দেখব বলে অনেকের অনুমান। ইত্যাদি এসব জল্পনা-কল্পনার ফলাফল হল এবার জ২০ এর যোথ ঘোষণায় আপোষের ভাষা চলে এসেছে।

    তাই গত বারের বালি সম্মেলন সেসব-ই বাদ রাখা হয়েছে এবার। রাশিয়াকে এবার দায়ী করা আর নয়।   সেটা তাদেরবি বিভক্তি আরো বাড়াবে আর এবার ভয় কাজ করছিল এ ঐ যুদ্তেধ তাদের যে কোন আসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে […alleviating fears that disagreements over the Russia-Ukraine war would prevent a consensus for the first time.]। আর একারণের এর বদলে নতুন যেসব শব্দাবলির উপর জোর দিয়ে ঐক্যমত্য আনা হয়েছে তা হলো …।Instead, the declaration emphasised that states must “refrain from the threat or use of force to seek territorial acquisition” and that “the use or threat of use of nuclear weapons is inadmissible”.
    অর্থাৎ এমন প্রধান দুইটা ভাষ্য যা বাংলা করে লিখলে হবে – ১। কোন ভুখন্ড বিতর্কে কোন হুমকি দেয়া বা শক্তি ব্যবহার না করার আহবান জানানো হয়েছে। 
    এছাড়াও  ২। কোন পক্ষের কোন পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহার করার হুমকি অনুমোদন-অযোগ্য বলা হয়েছে ঐ যৌথ সর্বসম্মতির ঘোষণায়।

    এককথায় বললে, কাউকে হেয় করার উপরে এটা ইতিবাচকতার জয় – এই লাইনে কথা বলার ধারার জয়লাভ!

    তবে একটা মন্তব্য এখানে করাই যায়ঃ
    সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে ইউক্রেন ইস্যুতে সব দায় রাশিয়ার উপর চাপানোর যে কূটনীতি সেটাই কিন্তু আসলে জি২০ এর যৌথ ঘোষণা লিখতে গিয়ে পিছু হঠেছে বা আপোষী হতে বাধ্য হয়েছে। আর তা হয়েছে এবারের ব্রিকস সম্মেলন (২২-২৩ আগষ্টে) আগে হওয়া আর এবার তারা নিজেরা ডালপালা বিস্তার করে বড় প্রভাব ও বড় আশা নিয়ে হাজির হয়েছে – বলে সেই জোটবদ্ধ প্রভাব জি২০ তে পিছন থেকে  ক্রিয়াশীল ছিল। আর তাদের চাপেই মূলত এই আপোষী যৌথ ঘোষণা ২০২৩। যেখানে রাশিয়াকে আগের বছরের মত অভিযুক্ত করা দূরে থাক – এবার যৌথ ঘোষণায় রাশিয়া শব্দটাই নাই, অনুপস্থিত!
    মজার কথা হল, এই পিছনের ঘটনাটা আমেরিকা প্রভাবিত মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয় নাই। হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী এএফপি-ফ্রান্স২৪ তে মানে, AFP এই গ্লোবাল মিডিয়া এজেন্সিতে আর তা প্রকাশিত হয়েছে FRANCE24  এই টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকায়। এরা নাম প্রকাশ না করে লিখেছে,   ” আমরা পুরা জি২০ সম্মেলনকে ইউক্রেনাইজড করে ফেলার পশ্চিমা  প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সম্মেলন সফল করেছি।

    “We were able to prevent the West’s attempts
    to ‘Ukrainize’ the summit agenda,” the veteran
    diplomat said, dubbing the two-day gathering a “success”.

     এদিকে এই সুযোগে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভও সুযোগ নিয়েছেন – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানাচ্ছে তিনি বলেছেন, এক ইউক্রেন ইস্যু দিয়ে যেন যাতে এবার জি২০ সম্মেলনকে ঢেকে ফেলা না যায় সেব্যাপারে মূল কাজটা করেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ গ্রুপ [Global South helped avoid Ukraine issue overshadowing G20 agenda: Russia]।  গ্লোবাল সাউথ বলতে ব্রিকস-কে বুঝানো হয়ে থাকে।  আর এই সুযোগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা আর সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা ভোকাল হয়ে উঠতে শুরু করেন।
    লুলা বলেন, জি২০ এর এজেন্ডাকে কোন বাইরের ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভক্তি ঘটায় তা হতে দিতে পারি না। বাইরের ঘটনা বলতে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যু বুঝিয়েছেন। আরো বলেছেন, জি২০ কে বিভক্ত করার কোন শখ নাই আমাদের। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বদলে আমাদের দরকার শান্তি ও সহযোগিতা!

    “We cannot let geopolitical issues sequester the G20 agenda
    of discussions,” Lula said, an implicit reference to wrangling over the Ukraine war.
    “We have no interest in a divided G20. We need peace and cooperation instead of conflict.”

     এদিকে আগামি বছরের জি২০ এর সভাপতি হচ্ছেন ব্রাজিলের লুলা। তাই তিনি এখনই ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি যদি আগামি বছরও প্রেসিডেন্ট থাকেন (যদিও না থাকার কোন কারণ নাই) পুতিন ঐ সম্মেলনে আসবেন কারণ তিনি (পুতিনকে) গ্রেফতার হওয়ার কোন সুযোগ রাখবেন না [ If I’m the president of Brazil and if he comes to Brazil, there‘s no way that he will be arrested,” he told Indian news network Firstpost on Saturday.]। 

    আর এই সুযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভারভ এক মন্তব্য করে নিয়েছেন – এবারের জি২০ সম্মেলন এক “বাঁধভাঙ্গা সম্মেলন” – …  Calling it a “breakthrough summit”, Lavrov said 

    এই ছিল মোটাদাগে সম্মেলনে পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য বা মনের কথাগুলো!! এথেকে অন্তত একটা জিনিষ পরিস্কার যে দুনিয়ার নেতৃত্ব অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব প্রবলভাবে পরিবর্তিত, বদলে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে।  এবছরের ব্রিকস আর জি২০ সম্মেলন এর দুই ঐতিহাসিক চিহ্ন হয়ে থাকল। 

    শেষ কিছু কথাঃ
    কিন্তু জি২০ জিনিষটা কী? কারা এমন সম্মেলনের চাহিদা দাতা? কারণ, এই টপ জিডিপি-ওয়ালা দুনিয়ার ২০ রাষ্ট্র  এরা তো বিশেষ আমেরিকা-চীনা বলে মূল দুই পক্ষ-বিপক্ষে পরস্পরের চরম বিরোধী! তাহলে দুনিয়ায় এমন আ

    র কে আছে যে এমন ২০ দেশকে এই সম্মেলন প্রতি বছর জড়ো হতে বাধ্য করছে??? সেসব জানলে হয়তো এবারের সম্মেলনের ঘটনাগুলো আরো পরিস্কার বুঝতে তা সহায়ক হত!!

    হ্যা ঠিক তাই!  সেজন্য আগামিতে জি২০ গ্রুপ এরা কে কারা কী এদের উদ্দেশ্যে আর কে এর পরিচালক সে নিয়ে আগামিতে লেখা আনব; সেকথা বলে শেষ করছি!

     

    আপডেটেডঃ   আপডেট ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩  রাত ০৯ঃ ৪৮

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি

    ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি
    গৌতম দাস
    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩   ১৯ঃ ৪৭ সন্ধ্যা
    https://wp.me/p1sCvy-4XV

     

           ‘চীনের উত্থান : উদ্বিগ্ন প্রতিবেশী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

    শাহরিয়ার কবীর এবার একেবারে ধরা খেয়ে গেছেন। এটা টু মাচ[too much] হয়ে গেছে; তিনি সীমা ছাড়িয়েছেন। এছাড়া, আরেকটু বারাবাড়ি করলে এবার হয়ত দেখব তাকে উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।হয়ত দেখব তিনি নিজেই লিখে দাবি করছেন যে তিনি বোবা হয়ে গেছেন!!! হা ব্যাপারটা আসলেই এতই সিরিয়াস!!
    বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন কী করে পার হবে, হাসিনা সরকার টিকে যেতে পারবেন কীনা এটা একটা অনিশ্চয়তা যা কেউই কী দাঁড়াবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারে; তাতে আপনি যে-পক্ষেরই লোক হন। তবে আপনি আত্মবি্শ্বাস দেখাতে পারেন, প্রপাগান্ডা করতে পারেন বা এমন পক্ষ-বিপক্ষ অনেক কিছুই! কিন্তু অন্তত পরবর্তি ছয়-সাত মাসের পরেই একমাত্র নিশ্চিত জানা যাবে যে ঠিক কী ঘটল। এর আগে দুপক্ষই প্রাণপণ নিজের পক্ষে চেষ্টা করে যাবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতি্তের কোন আন্দাজ ছাড়াই এমন সময়ে শাহরিয়ার ভারতের এক দালালির ঠিকাদারি নিয়ে এসেছেন। সেটা হল হাসিনা যেন চীন-ঘনিষ্ট না হন – ভারতকে ফেলে চীনা ঘোরতর সহযোগিতা নিতে না যান ইত্যাদি এমন সেসব প্রপাগান্ডা!
    এটা কে না জানে যে হাসিনা এই সংকটে নিজে যেকোনভাবে ক্ষমতায় টিকে যাবার চেষ্টা করবেন।  তাতে চীনের কোলে না কার কোলে উঠে এটা পার হবেন সেটা তো সেকেন্ডারি বিবেচনা!  প্রাইমারি বিবেচনা হল, সংকট পার হওয়া!  অথচ মামার বাড়ীর আবদারের মত ভারত বলছে  যে না তুমি চীনের কোলে উঠতে পারবা না!!!  আর শাহরিয়ারকে লাগিয়েছে ঠিকা দিয়ে এনিয়ে প্রপাগান্দা করতে! সব বিচারেই এটা অর্থহীন!  কারণ হাসিনার এক নম্বর বিবেচনা হল, ক্ষমতায় টিকে যাওয়া। আগেও তাকে টিকতে হবে। টিকে গেলে এরপরে যে হয়ত ভারতের জন্য কিছু করতেও পারে। অথচ ভারতের পোলাপানি আবদার হল যে না, হাসিনাকে সবার আগে ভারতের স্বার্থ মানতে হবে, বুঝতে হবে??? কোন সুস্থ মানুষ এভাবে চিন্তা করে না! আর এই অসুস্থ আর অবাস্তব চিন্তাটাকে বাংলাদেশে ফেরি করার ঠিকা নিয়ে এসেছে শাহরিয়ার কবীর! যেন ভারতের এই ঠিকা টা না পেলে বা নিলে আগামি বছর সে না খেয়ে থাকবে যেন এমন মরণপণ অবস্থ দশা তার!  যেন এক রেলওয়ে কুলি যে লাগেজটা বহন অযোগ্য কিনা তা বুঝবার অবস্থা নাই; বাসায় অভাব এত বেশি!!

    বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ানদের এক প্রকাশ্যে মহড়া হয়েছে গতকাল। এরা সরকারের ঘরে উঠে বসে থাকা লোকজন এবং এরা সরকারের ঘরে বসেই সরকারের বিরোধীতা করতে চাইছেন।
    এরা সরকারের ঘরেই বসে থাকা লোক এবং বাংলাদেশিই; কিন্তু প্রো-ইন্ডিয়ান এলিমেন্ট। ভারতের বাংলাদেশ নীতি দেখভাল করার ঠিকাদার বলা যায় সম্ভবত এদেরকে!
    গতকাল, এক পুস্তক প্রকাশনী বা “মোড়ক উন্মোচন” অনুষ্ঠান হয়েছে – পত্রিকার ভাষায় বললে, “মঙ্গলবার বিকালে প্রেস ক্লাবে “চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি” শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান” হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর (মানিক) রচিত এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় মূখ্য আলোচকের বক্তব্য দেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির”।

    বইয়ের নাম এর মধ্যে “উদ্বিগ্ন” শব্দটা আছে – আর সেই উদ্বিগ্ন প্রতিবেশিটা হচ্ছে বাংলাদেশ নয়, সেটা আসলে ভারত। কিন্তু সে তার সেই উদ্বিগ্নতা – এটা সে চালিয়ে দিতে চায় বাংলাদেশের নামে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বর্তমান হাসিনা সরকারের নামে।

    শাহরিয়ারের সারকথা হল – চীন খারাপঃ
    কিন্তু কেন খারাপ?
    ১। শাহরিয়ার বলেছেন,  … “এই বইয়ে  (চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি) প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে কীভাবে চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান রেখেছে। তখন স্লোগান ছিলো হিন্দি-চীনি ভাই ভাই। সেই সৌহার্দ্য থেকে কীভাবে সংঘাতে পৌঁছল…”।

    উপরে কথিত, চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান – এই তথ্য ভুল।  অন্তত গত ২০২২ ডিসেম্বরে কলকাতার প্রাক্তন সাংবাদিক ও গোয়েন্দার সংস্থার লোক সুখরঞ্জন দাসগুপ্তের এক লেখা ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় শিরোনামঃ চীন-ভারত সম্পর্ক কোন পথে। সেই লেখার ভাষ্য শাহরিয়ারের এই তথ্য সাপোর্ট করে না।

    আর খুবই অল্পকথায় বলতে ঘটনাটা আসলে, ১৯৬০ সালে  চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ট করতে নেহেরু চৌএনলাইকে কলকাতায় এনেছিলেন। আর সেখানকার শ্লোগান ছিল হিন্দি-চীনি ভাই ভাই অথবা নেহেরুর পঞ্চশীলা নীতি ইত্যাদি। তাই এটা না চীন (১৯৪৯) না ভারত (১৯৪৭) এমন কারো স্বাধীনতায় কারো অবদানের ঘটনাই নয়।   আর সেটা আবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (1953 to 1961) আইসেনহাওয়ারের আমল। যিনি বিখ্যাত বা কুখ্যাত – সিআইএ পাঠিয়ে দেশ দখল- এর কারণে। তিনি নেহেরুকে পটিয়ে তিব্বতের দালাইলামাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদেরকে মাও-বিরোধী ততপরতায় সহায়তা দিতে সি আইএ পাঠিয়েছিলেন ভারতের মাধ্যমে – যারা ভারতে থেকে এই ততপরতা করবে। কিন্তু মাও এর সরকার এসব টের পেয়ে যখন সামরিকভাবে ধাওয়া দেন তখন সিআইএ দালাইলামাকে সাথে নিয়ে তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে পর্যন্ত তুলে দিয়ে গেছিল। কিন্তু  তাদের ভারতে প্রবেশ,  সেটা ভারতের হিমাচল প্রদেশ দিয়ে নয় যেখানে এখন দালাইলামা আশ্রিত। সিআইএ অনেক ঘুর পথে আসামের দিশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল। আর চীনারা সেই ধাওয়া করতে এসেই তারা পুরা আসাম দখল করেছিল আর একমাস একদিন পরে নিজেরাই তা ছেড়ে দিয়ে চীনে ফিরে যায়।
    কাজেই শাহরিয়ারের উচিত একটু কষ্ট করা নেট ঘেটে দেখা সস্তা ভারতীয় যা মনে চায় লিখাগুলোর ফাঁদে না পরা!

    ২।  শাহরিয়ার ঐ সভায় বলেছেন, “…এদিকে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে চীন কাউকে সাহায্য করেনি। তাই চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে”।
    এখানে হঠাত করে চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব – এর কথা বললেন কেন? বললেন কারণ “শাহরিয়ার ভারতের স্বার্থপন্থী” হয়ে এবার উলটা হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছেন। আর তা বলছেন যেন ভারতের মুখপাত্র হয়ে যে, হাসিনা আপনি – “চীন ও ভারত দুদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন – এটা বাংলাদেশের জন্য বিপদ আনবে। তাই হাসিনা,  সেটা না করে আপনি কেবল ভারতের সাথে লেগে থাকেন”। ভারতের এমন খায়েসটা ভারত শাহরিয়ারকে দিয়ে অভিযোগের আকারে তুলিয়েছে।

    এতা বলাই বাহুল্য আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে হাসিনা ভীষণ আমেরিকান চাপে আছেন। কোনভাবে একটা নির্বাচন হয়েছে আর তিনি আবার জিতেছেন – এটা ঘোষণা দিতে পারলে এরপর বাকিটা মানে আমেরিকান পরের চাপ ডিঙিয়ে টিকে থাকার ব্যপারে চীন তাকে সাহায্য করবে – এমন একটা ঝাপসা বয়ান বাজারে চালু আছে।
    এটা আদৌ সত্য কিনা তেমন ডকুমেন্ট অর্থে তা কেউ দেখেছে জানা যায় না। কিন্তু মোদির ভারত এই ঝাপসা বয়ানের ভিত্তিতেই হাসিনা বিরোধিতা শুরু করেছে বা প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। আর এটাই এসব কথা ঢাকায় চালু হবার পিছনের কারণ।  আর এসব প্রপাগান্ডাই বাংলাদেশে চীন-হাসিনা বিশেষ সম্পর্কের রহস্য হয়ে ঝাপসা বয়ান হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।  শাহরিয়ারের এই বক্তৃতা সেই (ঝাপসা বয়ান ছড়ানোর) ততপরতারই একটা অংশ! তবে মোদি এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে এর কারণেই, বাংলাদেশকে ব্রিকসে উঠতে দেয় নাই – মনে করা সম্ভবত ভুল হবে না!। যদিও মুখে মুখে বা প্রকাশ্যে হাসিনা-মোদির মধ্যে এখনও অনেক ভাব – সেটাও জারি আছে। হাসিনা জি২০ এর সভায় যাচ্ছেন। অতএব সারকথায় ভারতের চোখে চীন খারাপ – একথাটাই এখানে শাহরিয়ার বলছেন। অথচ শাহরিয়ারের এই ততপরতাই বলে দিচ্ছে ঝাপসা বয়ান ভাষ্যটা ভারতের। যেটা শাহরিয়ার ফেরি করতে এনেছেন।

    ৩। শাহরিয়ার আরো বলছেন, চীনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে শ্রীলঙ্কা, এর আগে একইভাবে পাকিস্তানও ঋণের ফাঁদে পড়েছিল। অথবা আরও সার করে অন্য জায়গায় বলেছেন, “চীন ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার আগে ভাবতে হবে”।
    শাহরিয়ারের প্রথম মন্তব্য ঋণের ফাঁদে প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বেলায় সত্যি নয়। পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রশ্নে চীনের ঋণ তৃতীয় বড় ঋণ। তা এনিয়ে আর কথা বাড়াবো না। তবে পরের কথা যেটা বলেছেন এটাই সঠিক আর এটাই মুখ্য সুত্র যে “ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা” । তবে আমি কেবল ‘ভূরাজনৈতিক’ এই আধো-বোলের আন্দাজি শব্দটা ফেলে দিব। বদলে “গ্লোবাল ইকনমি” বলব।  আর পরের আধিপত্য শব্দটা ফেলতে বলব না তবে অর্থ আরো খুলবার জন্য সাথে প্রভাব বিস্তার শব্দটা লাগিয়ে নিতে বলব। আর কথাটাকে এবার সাজিয়ে বলব – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ঋণ দেয়া ঠিক তা নয় বরং, এটা সারা দুনিয়াকে ব্যাপক অবকাঠামো ঋণ দিবার মুরোদ – এটা এসে গেলে একটা দেশ এটা দিয়েই এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়ে উঠে – এভাবে বলব।
    যেমন ধরেন ভারত একই চীনের পথে হাটে না কেন? কারণ ভারতের অর্থনীতির সেই মুরোদ নাই, এখনও হয় নাই। আবার তাহলে এর আগে আমেরিকা কী করেছিল? হা ঠিক আজ চীন যা করে নেতা হতে চাইছে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকা ঠিক সেকাজ করেই গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। এমনকি মোদির ক্ষমতার প্রথম পাঁচ বছরে ভারতেও চীনা ঋণ কত অথবা এমনকি মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালিন গুজরাতে চীনা ঋণ কত ছিল – সেসব তথ্য মোদি লুকিয়ে রেখেছে কেন? পারলে তা বের করেন!!!!
    ভারত চীনা প্রভাবের বিরোধী হতেই পারে। কিন্তু তা বলে শাহরিয়ার চীনা ঋণ খারাপ বা অনৈতিক ধরণের বাজে কথা – এসব তার না করাই ভাল!
    মনে রাখবেন হাসিনা যে সর্বক্ষণ উন্নয়নের গল্প শুনাচ্ছে এই ‘উন্নয়ন’ আর (চীনের দেয়া) অবকাঠামো ‘ঋণ’ – এদুটা একই কথা – দুদিক থেকে দেখে বলা। হাসিনা চীনা-ঋণ না পেলে বা নিলে কী করত???  ভারতের ঋণ নিত? ভারতের সে মুরোদ আছে????? একারণে, শাহরিয়ারের এসব কথা ফালতু কথা!!! আজাইরা ভারতকে চীনের উপরে – যেন বিশাল মুরোদের এমন গল্প ছড়াতে এসেছেন। অথচ এসব অর্থহীন!!!

    ৪। শাহরিয়ার আরো বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের ব্যবহৃত সব বুলেট চীনের: শাহরিয়ার কবির”। শাহরিয়ারের  এসব শুরশুরি উস্কানে আবেগ আওয়ামি লীগারেরাও খাবে না; প্রগতিবাদীরাও না। শাহরিয়ারের এটা হয়েছে আসলে পোপের চেয়েও বেশি খ্রীশ্চান হতে চাওয়া যেন! অনেক দেশেরই স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রু-মিত্র অনেক রকম ছিল, থাকে। ছিল বলছে মানে হল সেটা ধরে আজীবন বসে থাকা অবাস্তব চিন্তা। যেমন ধরেন ভিয়েতনামের (স্বাধীনতার যুদ্ধে) চেয়ে বড় আমেরিকান নিষ্পেষণ খুব কম দেশের ইতিহাসে আছে। এজেন্ট অরেঞ্জ (Agent Orange) শব্দটা গুগলে যেকেউ সার্চ দেন দেখেন কী বের হয়, কী এটা! এই কেমিক্যাল উড়োজাহাজ থেকে ছিটিয়ে ভিয়েতনামের গভীর বনজঙ্গল সব সাফ করা হয়েছিল যাতে বিদ্রোহিরা বনে লুকাতে না পারে; কারণ এই কেমিক্যাল toxic, plant-killing chemical (herbicide)।
    কিন্তু মানুষের জীবনের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ, যেদিকটা সকলেই উপেক্ষা ক্করেছিল। ভিয়েতনামিজদেরকে আমেরিকা মানুষ মনে করে নাই! এতই তীব্র ছিল তাদের নিজ স্বার্থবোধ। কারণ এটা মানুষের জীবনে cancer, congenital (birth) disorders and life-threatening health complications. নিয়ে আসে। আজও ভিয়েতনামের কোন দম্পতি জানে না যে তাদের বাচ্চা জন্ম নিতে গেলে কেমন বিকলাঙ্গ হবে – হাত স্বাভাবিক কিন্তু হঠাত করে কবজি থেকে  বা কনুই এর পর থেকে তা আর নাই, একইভাবে পা নাই – সারকথায় ডিফেক্টিভ বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে এখনও যার কোন প্রতিকার নাই।  কিন্তু এই ভিয়েতনামেরই আজ সবচেয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক ভাল আমেরিকার সাথে; অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য!  এখন এর মানে কী ভিয়েৎনামিজরা খুব খারাপ!
    শাহরিয়ার  আপনি ভারতের স্বার্থে দালালির ঠিকাদারিতে বাংলাদেশের মানুষকে আবেগ-ইমোশনাল করে শুড়শুড়ি তুলার চেষ্টা করছেন? এখন বলেন কোনটা খারাপ? ভারতের কাছে আবার বেচবেন?  বাংলাদেশের  মানুষের আবেগ চটকাচ্ছেন কেন???

    ৫। শাহরিয়ারদের এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ফ্লপই হবে। ভারতের অর্থের অপচয়ই হবে। কারণ শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতার ঠিক নাই।
    এটা বলাই বাহুল্য যে যারা বাংলাদেশে এখন হাসিনাবিরোধী তারা শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ নয়। আর এমনিতেও বাংলাদেশের আম-মানুষ তারা খোদ শাহরিয়ার এন্ড গং এমন যেকারো বিরোধী সেই শাহবাগের দিন গুলো থেকেই। তাহলে শাহরিয়ারের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ কারা? যারা হাসিনার পক্ষের হাসিনার দলীয় লোক এরা? অথবা যারা ঠিক দলের নয় তবে লীগের সুবিধাভোগী? এরা?

    এরা শাহরিয়ারের কোন কথাতেই কান দিবে না তাতে তা যতই খোদ ভারতের স্বার্থকে প্রগতিবাদী জামা পড়িয়ে হাজির করলেও। এর মূল কারণ, এরা কেউই  ভারত ছেড়ে চীনের কোলে (হাসিনার) উঠাকে খারাপ ভাববে কেন? কোন কারণ নাই। এটা সারভাইবাল বা মরিয়া আত্মরক্ষার পর্যায়! এছাড়া এটা খারাপ ভাবার মধ্যে তো তাদের কোন স্বার্থই নাই!!! বরং হাসিনা টিকে গেলেই তাদের স্বার্থ!
    এছাড়া হাসিনার নেক নজরে যে আছে, পড়েছে একবার – সেই আবার এখন হাসিনাবিরোধীতা দেখাবে????? কেন? বরং হাসিনা এযাত্রায় টিকে গেলে তারা খুশি হবে। আর সেটা চীনের হাত ধরে কিনা তাতে তাদের কী এসে যায়? – সেটা কী তাদের জন্য কোন আপত্তি হবার কিছু????
    সারকথায় শাহরিয়ার গংদের পক্ষে এখন দাঁড়াবার কেউ নাই।তাদের বয়ান শুনবার মত কোন সামাজিক গ্রুপই এখন আমাদের সমাজে নাই।  এটা তো ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাইয়ের যুগ  একেবারেই নয়! যে প্রগতি-ওয়ালারা ঝাপিয়ে পড়বে!   আসলে শাহরিয়ার গংয়েরা সবাই   তারা এমন এক ভারতীয় ইচ্ছা-স্বার্থ ফেরি করার ঠিকা নিয়ে আসছেন যেটা এখন বাংলাদেশের কেউ খাবে না। আর বেশি বারাবাড়ি করলে হাসিনার উপর দিয়ে কথা বললে এরা নিজেরাই কেউ তাদেরকে ‘উপড়ে ফেলে দিবে’ – এমন রিস্ক নিচ্ছেন তারা।

    আর এটাই এক শাহরিয়ার কবীর আর ঐ বই লেখক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) ছাড়া ওখানে আর যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা কেউই  – হাসিনা চীনা-ঘনিষ্ট হয়েছেন বা আরো হতে পারেন – এনিয়ে কোন অভিযোগ করে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। বরং সকলেই ভারসাম্য রেখে কথা বলেছেন। সারকথায় হাসিনাকে চটাতে চাচ্ছেন না -চটে যাক এমন কথা কেউ বলছেন না – যার সোজা মানে তারা সবার আগে হাসিনাকেই ছুয়ে থাকতে চান, আনুগত্য ঠিক রাখতে চান – এটা পরিস্কার রেখেছেন!!!

    ওখানে আর যারা বক্তৃতা দিয়েছেন তারা হলেন, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার ইত্যাদি কেউই ভারসাম্য না রেখে কথা বলেন নাই।  যেমন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার। তিনি বলেন, চীন নিজের শক্তিতে উত্থান করেছে। চীনকে আমরা উপেক্ষা করতে পারবো না, তাই তাদের জানতে হবে। চীন যে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে- এতে সংঘাত অনিবার্য। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এই সংঘাত এড়াতে সচেষ্ট হতে হবে।

    এখন সবশেষে একটা কথা মনে করিয়ে দিব। কথিত হাসিনা-চীন আশ্বাস সেটা যদি সত্যিও ধরে নেই, তবুও এই সহায়তা পাওয়া তো শর্তযুক্ত। সে শর্ত বা বাস্তবতা বা যদির কথাটা হল,  যে হাসিনা সরকার চীনের সহায়তা পাবার পুর্বশর্ত  পুরণে নিজেকে কোনমতে করা একটা নির্বাচন দেখিয়ে নিজেকে বিজয়ী করতে পারতে হবে আগে। তবেই না এসব জল্পনা-কল্পনা!  কাজেই মোদির ভারত বা শাহরিয়ারের দালালির ঠিকাদারিতে  কি বললে এটা নিয়ে আমাদেরও এতে মনোযোগী হবার মত কিছুই নাই।  তবে এই লেখায় যা করা হল, তা হল, শাহরিয়ার গং যে মোদির ঝাপসা বয়ান টার উপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সেটাই খুলে দেখিয়ে দেয়া!! এতটুকুই!

    একটা কথা লিখতে চেয়েছিলাম বাদ পড়ে গেছে। আগামি এক বছরের মধ্যে এটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি-তে কেউ না, কোন ফ্যাক্টর না। এটা ২০০৭ সালের আগে বাংলাদেশের কাছে যেমন ভারত ছিল, এটা সেই ভারত হয়ে যাবে। এর মূল কারণ, এখনো আমেরিকা ঘোষণা না দিয়ে যেটা করে যাচ্ছে তা হল – চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিতে ভেট-উপহার হিশাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। বাইডেনের আমেরিকা সেই অবস্থানের ফাইনাল বদল বা সমাপ্তি টেনে দিলেও সেটা তিনি এখনও পাবলিক ঘোষণা দিয়ে করেন নাই।  অন্য আরেকটা ফ্যাক্টস হল, হাসিনা এখনও ক্ষমতায়। একারণে, মোদি  মিথ্যা ভাব ধরার সুযোগ নিতে পারছেন যেন ভারত এখনও আমেরিকার দেয়া খবরদারিটাই ব্যবহার করছে; সেটা তার যেন অটুট আছে। অথবা মোদির ভারত যা বাংলাদেশে করে মাতবরি দেখায় তা আমেরিকা অনুমোদিত অথবা মোদির ভারত চাইলেই সে আমেরিকার কাছে হাসিনার পক্ষ হয়ে সুপারিশ করতে পারে ইত্যাদি। অথচ  এসবই ভুয়া ভিত্তিহীন। আমেরিকা যা কিছু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে  ২০০৭ সালে ভারতকে দিয়েছিল  সেসবই প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু হাসিনা এখনও ক্ষমতায় আছে বলে মোদি এই মিথ্যা ভাব ও অভিনয়টা এখনও করে যেতে পারছে। একারণেই অগ্নি রায়েরা মিথ্যা কথা বলে করে খেয়ে যেতে পারছে।

    আগামি এক বছরের মধ্যে এই জিনিষটাই এই মিথ্যা ভাব ধরা – এটাই উন্মুক্ত হয়ে যাবে যে বাংলাদেশের উপরে ভারত কেউ না। আর আমেরিকাও এমন কোন কর্তৃত্ব বাংলাদেশের উপর খাটাতে ভারতকে দেয় নাই; ফিরিয়ে নিয়েছে। এসবই স্পষ্ট উদাম হয়ে যাবে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠান শেষ ফলাফলও প্রকাশ হয়ে যায় – এর পর থেকে।  ভারত কেউ না হয়ে যাবে। বাংলাদেশের উপর প্রভাব থাকবে কেবল আমেরিকা ও চীনের। একা ভারত, সে না আমেরিকা না চীনের ঘনিষ্ট থাকবে বা হবে। তবে ভারতের উপর আমেরিকান চাপ বাড়ার সম্ভাবনা (একেবারে বাংলাদেশের মত না হলেও ভারতের উপর আমেরিকার সাব-অর্ডিনেট হওয়ার চাপ বাড়বে) আর সে পরিস্থিতিতে ভারত হয়ত চীনের কোলে উঠতে চাইতে পারে।   ঘটনা যে দিকে গিয়েই থিতু হোক না কেন ভারত বাংলাদেশ কেউ না হয়ে যাবে ক্রমশ!! এই সম্ভাবনা এখন আমরা ক্রমশ উন্মুক্ত হতে দেখছি!

     

     

    আপডেটেডঃ   ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩;  রাত ০২ঃ ১৯ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বাংলাদেশে ‘মুসলিম জাতিবাদ’ মানে কী ও কেন

    বাংলাদেশে ‘মুসলিম জাতিবাদ’ মানে কী ও কেন
    গৌতম দাস
    ২৪ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Rc

     

    ভারত-বাংলাদেশের মিলে কিছু আওয়ামি সাংবাদিক একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছিল যে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন অ্যামেরিকান চাপে ফেয়ার নির্বাচন হতে গেলে হাসিনা বিজয়ী হবে না, আর সেটা ভারত-আমেরিকার জন্য অলাভজনক, ক্ষতিকর স্বার্থের হবে। তাই, মোদি সরকার এনিয়ে  নাকি আমেরিকাকে কূটনীতিক নোট পাঠিয়েছে!!! যার কোন সত্যতা পাওয়া যায় নাই। কিন্তু  এই প্রপাগান্ডার চাপের মধ্যে বক্তব্য দিয়ে গিয়ে এর মধ্যে জড়িয়ে বিএনপির সেক্রেটারী মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর আগ বাড়িয়ে বলেছিলেনঃ

    ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল
    এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের
    ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায়
    আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”
    ।

    সার সংক্ষেপঃ  [সেখান বর্ণনা করা এই মৌলবাদ মানে কী? এর অনুষঙ্গি অর্থ ও সাথে জড়ানো আরো অর্থ নিয়ে আলোচনা বিস্তার ঘটাতে গিয়ে অনুষঙ্গী হিশাবে মুসলিম জাতিবাদ ধারণাটা সেখানে এনেছিলাম। আমার সেই আগের বা পুরানা লেখাটা (এখানে লিঙ্ক) থেকে  মুসলিম জাতিবাদ  ধারণাটা আলাদা করে তুলে এনে তা আলাদা লেখা হিশাবে এখানে ছাপাচ্ছি। কারণ, মুল ধারণাটা প্রথমে অনেক সংক্ষেপিত ছিল। পরবর্তিতে, ওখানে দুদিন পরে ঐলেখার অনেক স্থানে স্থানে নয়া সংযোজনে বহু বিস্তার ঘটিয়েছি। যেটা হয়ত প্রথম দিনের পাঠকেরা পরে আর দেখেন নাই বা খেয়াল করেন নাই। তাই এখন সকলের চোখে পরার জন্য  কেবল “মুসলিম জাতিবাদ” অংশটাই এখানে আলাদা করে উঠিয়ে এনেছি।]


    মির্জা ফকরুল এর এই মৌলবাদ বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    আপডেটেডঃ
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিএনপির আত্মহননের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’

    বিএনপির নিজেকে খতমের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’
    গৌতম দাস
    ২২ আগষ্ট ২০২৩  মধ্যরাত  ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Q3

     

     

                                     Fundamentalism

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায় এর “দাগী অপরাধী” ততপরতা শেষ হচ্ছে না বা থামছেই না। বরং  সেটা এতই ক্ষমতাধর যে একদিনের মধ্যে বিএনপি সেক্রেটারি মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর-কে একেবারে মৌলবাদবিরোধি করে ছেড়েছে! যত্তবড় মৌলবাদবিরোধি সিপিবি কেন কোন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল কেউ এতদিন হতে পারে নাই!  নিশ্চয় এতে প্রগতিশীল ও সাহিত্য-সাংস্কৃতি জগতের যারা এতদিন আওয়ামি লীগ ওবস্থা ভাল না বুঝে ছুড়ে ফেলে বিএনপিকে প্রগতিশীল বানানোর কাজে লেগে পড়েছিল তারা তাদের পড়ে পাওয়া সাফল্য দেখে ব্যাপক খুশি হয়ে উঠেছেন!
    দেখা যাচ্ছে, এতে সর্বশেষ যোগ দিয়েছে দক্ষিণ-ভারতের দ্যা হিন্দু মিডিয়া গ্রুপের এক নয়া প্রপাগান্ডা-ময় ফ্রি পত্রিকা যার নাম “ফ্রটলাইন” [Frontline]।  মূল মিথ্যা কথাটা ছিল, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নাকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমেরিকার কাছে এক ‘কূটনৈতিক নোট’ বা “বার্তা” পাঠানো হয়েছে। যেটা পুরাটাই মিথ্যা।  কোন প্রমাণ ছাড়াই এধরণের মিথ্যা প্রপাগান্ডার দাবি প্রথমে ভারতের একটা বা দেড়-টা মিডিয়া থেকে ছড়ানো হয়েছে। মূল অপরাধী আনন্দবাজার-অগ্নি রায়দের আর, সেই কথিত মিথ্যা বার্তা-কে একটু ঘুড়িয়ে-ফিরিয়ে কিন্তু একইভাবে কোন প্রমাণ বা খবরের উৎস কে তা না জানিয়ে পরে তা প্রচার করেছে ডয়েচ ভেলে। তবে এটা নয়াদিল্লির ডয়েচ ভেলে। আর পরে প্রথম আলো-স্টার এই ডয়েচ ভেলের মিথ্যা রিপোর্টের বরাতে সেই চোথা-কপিটাই ছেপেছিল। একাজটাও সমান অপরাধের এজন্য যে  এরা তো দেখতেই পাচ্ছিলেন ডয়েচ ভেলের লেখাটা কোন “নিউজ” না। এটা এক “দাগী [despotic] ততপরতা” কারণ এতে তথ্যের কোন উৎস জানানো হয় নাই। তাই এটা কোন  “নিউজ” হয় নাই বরং একথা গুলো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালইয়ের কে ও কবে বলেছে এর কোন প্রমাণ সাথে না দিয়েই উলটে  আনা হয়েছে – এক গায়েবী “কূটনৈতিক নোট” এর দাবি। এই অপরাধী কাজ তো জার্নালিজমের লোক ও চোখ হিশাবে প্রথম আলো-স্টারের বুঝতে না পারার কোনই কারণ নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই অপরাধী কাজে তারাও সামিল হয়েছে।

    তবে ফ্রন্টলাইন অথবা ডয়েচ ভেলে বা প্রথম আলো-স্টার  এরা সকলেওই ভেসে গিয়ে এক লোভে। লোভটা হল, বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা যে রাজনৈতিক গুমোট অবস্থা তাতে সবচেয়ে “পাবলিক নজরদারিতে আছে ইন্ডিয়ান সরকার; মানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়া। এখন মিডিয়া বাণিজ্যিক চোখে দেখলে, এটাই বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান মিডিয়ার চোখে এটা সবচেয়ে লোভনীয় – নিজ নিজ মিডিয়া রিচ [media reach] বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ। যার সোজা মানে যত বেশি ভিউ ততই অর্থলাভ। এছাড়াও এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার রাজনৈতিক লাভালাভ উঠবে ভারত ও বাংলাদেশের চলতি সরকারের ঘরে। তাই তাদের থেকেই আরেক অঙ্কের অর্থ পাবার সম্ভাবনা। আর বলাই বাহুল্য এতে বড় ফান্ডটা হওয়ার কথা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মিডিয়া ফান্ড। এসব চিন্তা থেকেই মনি-কাঞ্চনের চকচকে লোভে এসব মিডিয়ার চোখে; তাতে এই কথিত “ভারতীয় বার্তা” অসত্য বা বাপ-মার হদিস হলেই বা কী? চকচকে লোভের কাছে এই হদিস-হীনতা মামুলি!!!
    এর একটা প্রমাণ দেয়া যাক।

    “দ্যা হিন্দু” মিডিয়া গ্রুপের আরেক সাবসিডিয়ারি বা সহায়ক কোম্পানি তবে, প্রপাগান্ডা পত্রিকা হল ফ্রন্টলাইন। কেন এমন বিশেষণ লাগিয়ে বলছি? কারণ, মূল ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা এই ইংলিশ ডেইলি এখন আগে অর্থ পরিশোধ পে [pay] করলে তবেই পড়তে দিবে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া তাদেরই আরেক ব্যবসা বিষয়ক বা শেয়ার মার্কেট মুখ্য করা আরেক পত্রিকা বিজনেস লাইন আরো আগেই পে [pay] পত্রিকা করা হয়েছে। তাতে বলাই বাহুল্য পাঠক কমে গেছে। তাই সমান্তরালে “ফ্রটলাইন” কে সামনে আনা হয়েছে যেটা ওপেন মানে পয়সা লাগবে না। ফ্রন্টলাইন পত্রিকা থেকে উপরের ছবিটা নেয়া হয়েছে বাংলাদেশের ২১ আগষ্ট সকাল পোনে আটটায়।  আর এতে তখনও দেখা যাচ্ছে “ফ্রটলাইন”  খবরের প্রধান হেড লাইন হল আগের দিনের মানে, ২০ আগষ্ট সকাল নয়টায় ছাপানো বা হোস্ট করা বাসি ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা স্টোরিটা। অথচ আজকাল নেট বা ওয়েব পত্রিকার যুগের কোন মিডিয়ায়  মুখ্য হেড লাইন নিউজের জায়গায় কোন খবরকে কী ২৪ ঘন্টা লটকায়ে থাকে? না রাখা উচিত, না বাস্তব সম্মত?? প্রশ্নই আসে না। তাহলে ফ্রন্টলাইন কেন রেখেছে? কারণ, এই প্রপাগান্ডা মিছা খবরটা “পয়সার মাল”। এটা এখনও পত্রিকার রিচ বাড়াবে বা বাড়ছে বলে ম্যানেজমেন্টের বুঝ! পাঠক টানবে, আনাগোনা হবে সেটাই তাদের অন্যসব আজকের টাটকা নিউজের চেয়েও সর্বোচ্চ হিট দিবে! সেই বিবেচনায় এই ২৪ ঘন্টা পুরানা চোথা-কপিটা টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। এ’থেকে অবশ্য এটা কেমন মান ও পাঠক আদরের পত্রিকা তা ঠাহর করা যাচ্ছে, সেটাই উদাম হয়েছে। যদিও সারকথাটা হল, এখানে মিডিয়া বা জার্নালিজম বলে কিছু নাই, সবটাই ব্যবসা আর অর্থের লোভই মুখ্য!!!

    ওদিকে কথিত ‘কূটনৈতিক “বার্তার” কারণে অবস্থা এমন হয়েছে যে এই গল্পের কোন সত্যতা নাই সেই গল্প নিয়ে লীগ-বিএনপি রাজনৈতিক নেতারা বিবৃতি দেয়া শুরু করেছে। বলছে, “যদি ভারত এমন বক্তব্য” দিয়ে থাকে অথবা “যদি এমন ভারতীয় বার্তা” মানে কূটনীতিক নোট বলে কিছুর অস্বিত্ব থেকে থাকে – এভাবে “যদির কথা” তুলে যার যার মনের খায়েস বা বাকযুদ্ধ চালানো হয়েছিল গতকাল সারাদিন।
    এভাবে যদির উপর দাঁড়িয়ে কথা বলাটা চরম বোকামি শুধু না বরং বেইজ্জতি হবার সম্ভাবনা!  কারণ, এখন যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবার  সোজা বিবৃতি দিয়ে বা সাংবাদিক ডেকে জানায় যে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত আমেরিকাকে কথিত কোন বার্তাই পাঠায় নাই – তখন কী হবে!!!  সেটা হবে অনেকটা এরকম যে সমাজে কেউ কাউকে যদি বলে [যেটা বাস্তবে কেউ করে না] আপনি আমাকে যদি গালি দিয়ে থাকেন তবে আমি আপনাকে জুতা দিয়ে মারব। আরে বাবা আমি গালি দিয়েছি কিনা সেটা তো আগে নিশ্চিত হবে আপনাকে, নাকি? যদি গালি না দিয়ে থাকেন তখন তো নিজেকেই লজ্জা পেতে হবে!  এছাড়া এসবের মধ্যে কূটনীতিক রীতিনীতি শিষ্টাচার এর ব্যাপার আছে। তাই সেটা হবে কোন ঘটনা বাস্তবে ঘটার আগেই “যদি তা ঘটত” এমন কাল্পনিক ধরে নিয়ে মারামারি শুরু করে দেয়া।  স্বভাবতই এতে মানুষ সবার আগে “যদি দিয়ে কথা বলা” লোকটাই মূল উস্কানিদাতা বলে সাব্যস্ত করবে!  কারণ,  “যদি দিয়ে কথা বলা” মানে পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া শুরু করা।  অথচ সেটাই ঘটেছে।
    এব্যাপারে অন্তত কিছু শোভন এবং কূটনীতিক (কোন বাংলাদেশি) এক খসড়া বক্তব্য হতে পারত যদি বলত – “এ দেশের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বিদেশি শক্তি কথা বলতে পারে না, অশ্রদ্ধা করতে পারে না – এটা সবার মনে রাখা উচিত”।  “জনগণের ইচ্ছা” এটাই আমাদের সার্বভৌমত্ব,  জনপ্রতিনিধিদেরকে দেয়া ম্যান্ডেট। কাজেই, কোন বিদেশি  শক্তির আমাদের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার নুন্যতম সুযোগ নাই। এমন যে কোন ততপরতাকে আমারা প্রতিরোধ করতে বাধ্য। তাই কোন বিদেশি শক্তির এমন ততপরতা হবে খুবই দুঃখজনক ঘটনা।  আমরা আশা করব সকলেই এব্যাপারে নিজেকে সংযত করে নিবেন!

    কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপি আরো এক ধাপঃ
    যেমন বিএনপি “যদি দিয়ে কথা বলে” থেমে গেল তাও একটা মানে হত। কিন্তু মির্জা ফকরুল এরপর যেন একেবারে যেন  নিজে নিজেকেই বিব্রত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আরও আগ বাড়িয়ে বলেছেন,  ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”।


    মির্জা ফকরুল এর এই বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    তাহলে মির্জা এত দ্রুত এমন “মৌলবাদ-বিরোধী” বক্তব্য কেনঃ
    মূল কথাটা হল, মির্জা নিজেই আল-টপকা  “মৌলবাদ-বিরোধী”বা পক্ষ বলে তর্কটা নিয়ে গেছে।  অথচ কোন মৌলবাদ-তর্ক তো হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে ইস্যু ছিল না!
    যদিও গত ২০১৫ সাল থেকেই বিএনপির মধ্যকার এক বেহুশ আর পোলাপানি চিন্তা দেখা দিয়েছিল যে,  প্রগতিবাদিদের মত মৌলবাদ-বিরোধি বক্তব্য দিতে পারলে দল ভারত ও পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে – যেন আওয়ামি সমতুল্য হবে দল!  মানে এরা সেই থেকে বেমালুম অসতর্কতায়  নিজ “মুসলমান জাতিবাদি” কোর সমর্থক গোষ্ঠিরই বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়ে চলেছে। কিন্তু কেন? কারণ, বিএনপির অস্থির কথিত তরুণ নেতাদের অপুষ্ট বুঝের বোকা-অনুমান হল ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। আওয়ামি লীগকে দেখেই তাদের এই সর্টকাট অনুমান!  অথচ মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের উপর ভারতের কর্ত্ত্বত্ব ও প্রভাব ভারতের নিজ মুরোদে সৃষ্ট হয় নাই। আসে নাই। এটা এককালে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল তাই। কিন্তু এখন বাইডেন প্রশাসন ভারতের সাথে সেই বিশেষ [চীন ঠেকানোর ঠিকাদারির দায় থেকে ভারতকে মুক্ত করে দিয়েছে]। শুধু তাই না, এরপর বাংলাদেশের উপর পুরানা ভারতীয় প্রভাব ভেঙ্গে দিয়ে বাইডেন নয়া সম্পর্ক গড়তে নয়া পলিসি-অবস্থান নিয়েছে। যেটা শুধু বাংলাদেশের উপর ভারতের মাতব্বরি উপড়ে ফেলাই নয়,  ভারত-আমেরিকার পুরানা সম্পর্কে-কেও বদলে নিবে!  এবার গত জুনে ২২-২৪ মোদির বাইডেন সফর তাই  সেই সফর ছিল মূলত সামরিক ক্রেতা-বিক্রেতার সাক্ষাত-সফর। যা মূলত ভারতে (যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন বানানোর কারখানা বসানোতে) আমেরিকার বিনিয়োগ সংক্রান্ত…। এর সাথে রাজনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক কোন ইস্যু নাই, আলোচনার এজেন্ডা বা তালিকায় তা ছিল না।

    কিন্তু লেটেস্ট ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়টা – এসব পরিস্কার জানা সত্বেও মোদি-হাসিনা ভান করতে চায় যে যেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আগের মতই আছে। ফলে মোদিও যেন আমেরিকার কাছে হাসিনার সুপারিশকারিই এখনও আছে। এই ভান এর উপর ভিত্তি করে গত দুদিনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা চলছে, আওয়ামি কর্মিদের মনোবল বাড়াতে! আর তাতেই এক সিপিবি কর্মি যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে বসে গেছে অবস্থা!! রাজনীতির খোঁজ-খবর বা অভিমুখ না জেনে না রেখে রাজনীতি করা যায় না। মির্জা ফকরুল-সহ তাদের নীতিনির্ধারকদের ভুল-অনুমান হল, এভাবে মৌলবাদের কথা তুললে নিশ্চয় আমেরিকা বা পিটার হাস খুব সন্তুষ্ট হবে আবার ওদিকে মৌলবাদবিরোধি গলা চড়ালে মোদির হিন্দুত্ববাদও বেজায় খুশি হবে। অথচ ওরা খবর নেয় নাই সেকালে নব্বইয়ের দশকে মৌলবাদ বলতে এর প্রধান পৃষ্টপোষক বলতে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আমেরিকাকেই বুঝাত – এতে তাদের সেই বয়ান হল,  “মৌলবাদ উত্থান” ঘটার জন্য প্রধান অভিযুক্ত আমেরিকা!
    মির্জা ফকরুলের মুখ দিয়ে বের হওয়া যে বয়ান হাজির হয়েছে এটা চলতে থাকলে ক্রমশ এটা এমন নয়া বাস্তবতায় পৌছাবে সেটা হল  বাংলাদেশের “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার সমর্থকদের দল হিশাবে বিএনপি তার স্থান হারাবে।  আর তাতে ভিন্ন এক নয়া দল গঠিত হয়ে এর উপর ভর করে নয়া এক ‘মুসলিম জাতিবাদি’ কনষ্টিটুয়েন্সির দল হাজির হতেও পারে। যা বলাই বাহুল্য বর্তমান বিএনপিকে শুকিয়ে ফেলবে।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    তবে ভারত যে মিথ্যা “কূটনীতিক বার্তার” কথা তুলে আওয়ামী কর্মিদের হতাশা ভেঙ্গে মন চাঙ্গা করতে চেষ্টা করেছে সেটা এখন কমবেশি পরিস্কারঃ
    আর এতে ভারতীয়  “সাফাই ভাষ্য” চরমভাবে দুর্বল।  তারা বলছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে হাসিনা ফিরে ক্ষমতায় না থাকলে ভারতের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে – এটাই কথিত সেই ভারতীয় বার্তা। এখন একবার ভেবে দেখেন, দুনিয়ার কোন নির্বাচন কমিশন অথবা আদালতের কাছে এটা তো বলাই যায় না যে আমি ওমুককে বিজয়ী দেখতে চাই। অথবা (আদালতের কাছে) ওমুকের ফাঁসির রায় চাই। একথা বলার মানে হয় না। কারণ এটাই তো নিশিভোট! কোন নির্বাচন ফলাফল কেমন হতে হবে তা আগাম দাবি করে বলার মানে হল সেটা আর নির্বাচনই নয়। অথবা শাহবাগের মত দাবি – আগাম ফাঁসির রায়ই হতে হবে বয়ে রায় চাই একথা বলার মানে হল সেটা আর বিচার নয় বা আদালতের রায় নয়। এছাড়া ভিন্ন একটা দেশ, বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনাকেই বিজয়ী দেখতে চাই এটা কী বলা যায়? মানে হয়? নাকি এসব কথা  জনসমক্ষে প্রচার হয়ে যাবার পর আমেরিকার পক্ষে ইচ্ছা থাকলেই কী এসবের বাস্তবায়ন বা মেনে নিতে পারবে???

    সারকথায় এটা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা দিবার মত কোন “ভারতীয় বার্তাই” হয় নাই – কোন কূটনীতিক বার্তা হওয়া দূরে থাক!   এটা “শাহবাগী ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই” – এর চেয়েও ন্যাংটা উলঙ্গ এক বর্বর ভাষ্য! যেমন, আমরা কী বলতে পারি যে আমরা ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চাই; এটাই বাংলাদেশের স্বার্থ!!!!!
    এধরনের বাচালদের কাজ কামে আমেরিকার জড়িত হবার নুন্যতম সম্ভাবনা নাই। বাইডেনের আমেরিকা অন্য নানান ইস্যু পদক্ষেপে ভুল করতে পারে, অন্যায় করতে পারে। কিন্তু তারা বোকা নয়।  তাহলে এসব কথিত ভারতীয় বার্তার একমাত্র লক্ষ্য হল, ভেঙ্গে পড়া আওয়ামি কর্মিদের চাঙ্গা করারই এক অকেজো চেষ্টা মাত্র!

    আপডেটেডঃ    ২২ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৭ঃ ৩৫
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  ২৩ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ২৫

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

     

    বাংলাদেশ প্রসঙ্গেঃ
    ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

    ১৪ জুলাই ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০৫
    https://wp.me/p1sCvy-4In

     

                        VOA  –  MODI & BIDEN

     

    “বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা আর ভারতের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নিবে না!” – সেসব দিন শেষ হয়েছে। হ্যা কথা এটাই; যদিও কথাটা আমার নয়। কথাটা বলেছেন এসএনএম আবদি; ভারতীয় সাংবাদিক!  আবদি লিখেছেন “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” আক্ষরিক অর্থে বললে, আবদি বলছিলেন “ঘটনার মূলে হল – ভারত ও আমেরিকা আর একমতে বাংলাদেশের কোন কিছুকে দেখছে না”।

    হা বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি আর এক নয়ঃ
    আবার এসএনএম আবদি [SNM Abdi] ভারতীয় সাংবাদিক;  এক দৈনিকের সাবেক  সম্পাদক এসএনএম আবদি চলতি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আবার লিখেছেন। প্রায় একমাসের বেশি কিছুদিন আগে তাঁর লেখা নিয়ে আমার আলোচনা-মন্তব্যে তাঁর পরিচয় নিয়ে অনেক লিখেছি। তাই এবার আবার সেদিকে যাচ্ছি না। তবে দৃশ্যত আবদি আর সুবীর ভৌমিক (যিনি আবদির মত গত শতকের আরেক সাংবাদিক), এরা দুজনেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ও সম্ভবত এঁরা তাদের মিডিয়া উইংয়ে কাজ করেন বলে মনে করা হয়। অনেকে যারা ভারতের রাজনীতির উত্থান-পতন ও ট্রেন্ড-অভিমুখ মনিটর করেন, খেয়াল রাখেন এটা তাদের ধারণা বা মতামত। এদের দুজনেরই তাই একই সমস্যা যে তাঁরা পাবলিকলি বলতে পারেন না যে তাঁরা এখন কী করেন বা কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন বা কাজ করেন! কোন প্রতিষ্ঠানের বেতনের লিস্টে বা পে-রোলে তাদের নাম আছে! ইত্যাদি!

    আবদি আবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লিখেছেন গত ১০ জুলাইয়ে, ভারতের ফ্রি-প্রেস-জর্নাল নামে এক বহু পুরানা ইংরাজি পত্রিকাতে, যার শিরোনাম “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” । আমাদের মানবজমিনও আবার সে লেখা অনুবাদ করে চাপিয়েছে – “বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত থেকে আলাদা যুক্তরাষ্ট্র, নিতে চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” – এই শিরোনামে। ফলে পাঠক যারা বাংলা বা ইংরাজি যেটা থেকেই পড়তে চান পড়তে পারেন।

    আমার এলেখার বড় শিরোনাম,  “বাংলাদেশ-আমেরিকা প্রসঙ্গঃ ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!”। যেটা আবদির শিরোনামের কথাটাই তবে আমার ভাষায় লিখা বলা যায়।  আমরা বলে এসেছি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেনের ক্ষমতা দখলের পরে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা একথা বহুবার বলেছি।  ভারত কে দিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজের বিনিময়-মজুরি হিশাবে। কিন্তু তা কি চিরদিনের জন্য নাকি কতদিনের জন্য??

    এই প্রশ্নে বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী একাংশের ধারণা এটা যতদিন হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন। যদিও বাস্তবে ঘটনাটা এমন না। এভাবে ঘটে নাই। অপ্নতত এখন তো একেবারেই পরিস্কার যে দিন ফুরিয়েছে। তবুও যেমন এক. ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনে হাসিনা চেয়েছিল ভারত ২০১৪ সালের মত খোলাখুলি ন্যাংটা হয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানাক! কিন্তু মোদির ভারত বুদ্ধিমান হতে চেয়েছিল সম্ভবত! তাই এত দায় না নিয়ে দূরে দাঁড়ায় কেবল মাখনটা উঠিয়ে খেতে চাওয়া এক অবস্থান নিয়েছিল। আর এতে হাসিনা ক্ষেপে গিয়ে এক প্রকাশ্য হুঙ্কারে যে  বয়ান দিয়েছিলেন “ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে: শেখ হাসিনা” –  রিপোর্ট্ টা তখনকার বাংলা ট্রিবিউনের। কিন্তু তাতে কী এরপর ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কী নাই হয়ে গেছিল? না ঠিক তা নয়। তবে এই ভাষায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। যদি বলি এরপরে মানে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা-মোদি সম্পর্কে আর কোন নয়া চুক্তি হয়েছে কিনা – এই বিচারে বলা যায় হাসিনা-মোদি এরপর আর কোন চুক্তি হয় নাই অথবা নয়া চুক্তি করে কিছু দেয়া হয় নাই। তবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আগের করা চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন অর্থে ২০১৯ সালের পরেও অনেক কিছুই দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। আর সবসময়ই একটা রুটিন সম্পর্ক তো আছেই যেটা অবশ্যই বেশ ঘনিষ্ট। এমনকি যতটা ঘনিষ্ট সময়ে এর চেয়েও বেশি করে তা দেখানোও হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতিকালে যত অ্যামেরিকান চাপ বাড়ছে ততই ভারতের মুরোদ থাকুক আর নাই হাসিনা সরকার ততই ভারতের কোলে মুখ-গুজে – “দেখেন না কিছু করতে পারেন কিনা” টাইপের  চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এমন রিপোর্ট ভারতীয় পত্রিকায় বেশি দেখা যাচ্ছে; যা প্রথম আলো একেবারে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে হলেও তাদের বরাতের উপর চড়ে মিথ্যা করে ভারতীয় করিতকর্মের মিথ্যা বয়ান তৈরি করে চলেছে।   যদিও এর মানে এমনটা একেবারেই নয় যে ভারতের সাথে হাসিনার খাতিরের সম্পর্কটা অটুট আছে বা ধরে রাখা গেছে! সেটা একেবারেই নয়; বাস্তবতাই সেটা নয়। মূলকথা আমেরিকাকে সুপারিশ করে ভারতের সেই মুরোদই হারিয়ে গেছে!

    কিন্তু হাসিনার সাথে ভারতের সম্পর্কটা কী বা কেমন আর সবচেয়ে বড় কথা ভারত-বাংলাদেশের এই বিশেষ খাতিরদারি সম্পর্কটা ২০০৭ সালে কেন হতে পেরেছিল? তা নিয়ে আমাদের আম-জনতা লেবেলে জানা-বুঝা কম। বরং তর্ক হতে দেখা যায় এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার কীনা এনিয়ে; এবং বলাই বাহুল্য তর্কে দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ট অংশই মনে করে এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল কেন এটা হতে পারল? এককথায় এর জবাব হল, এটা আমেরিকার কারণে। অন্যভাবে বললে বড়ভাই আমেরিকা এশিয়ায় নিজস্বার্থে চীন-ঠেকাতে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতেই ভারতের ‘মুই কি হনু’ এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে সে নিজেকে অ্যামেরিকান বরকন্দাজ-প্রতিনিধি বা আমেরিকার লোকাল এজেন্ট ভাবা শুরু করেছিল। আর অন্তত টানা দশবছর এটা সে উপভোগ করেছিল যতক্ষণ না ট্রাম্প এসে  ২০১৭ সালে আমেরিকার আগের সরকার-প্রশাসন গুলোর দেয়া বিশেষ সুবিধা ট্রাম্প সেবার সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করেছিল। যদিও সেটা ছিল আসলে আগের দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নয়।

    আর এবার সব রাজনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার – এটাই ঘটেছে একালে বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরু থেকেই একট একটু করে। একমাত্র একালে যা সুনির্দিষ্ট আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে!  মূলত ভারতীয় মুসলমানদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন, বৈষম্য আর সাধারণভাবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ; যেটা প্রতিবছরের ধর্মীয় স্বাধীনতা [Freedom of religion or religious liberty – OHCHR] লঙ্ঘনের সুচকে প্রতিফলিত এবং এর  আমেরিকান কমিশনার প্রতিবছর প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করে গেছে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু এবার এসব কিছুকে ছাড়িয়ে বাইডেন মোদির বিরুদ্ধে কত সিরিয়াস আর কত আগিয়ে গেছে তা প্রকাশ হয়ে পরে যখন দেখা যায় মোদির বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন মোদিবিরোধী সকল গোষ্ঠির নেতা হিশাবে  কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে সহায়তা করছে। সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে,  গুজরাত হত্যার বিবিসিতে প্রচারিত ডকুমেন্টারি থেকে শুরু করে  আদানির শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ফাঁস ও ধ্বস নামিয়ে দেয়া, আদানিকে তুলাধোনা করে জর্জ সোরেস (গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটে হেজ ফান্ড বা hedge fund এর এক কুতুব শেঠ) এর পাবলিক বক্তৃতা ইত্যাদিতে প্রকাশিত। এরপরে রাহুল গান্ধীর প্রথমে লন্ডন ও পরে আমেরিকা সফর আর সেখানে গিয়ে সবখানেই থিঙ্কট্যাংক ও মানবাধিকার গ্রুপের সাথে দিনরাত বৈঠক – ইত্যাদি এঘটনা থেকেই প্রথম পরিস্কার হয়ে যায় যে ভারতের পিঠে হাত রাখার দিন এবার শেষ হয়েছে! ২০০৭ সালে  বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া নিয়ে আমেরিকা যেভাবে অভিযুক্ত যাই হোক না – মূল ভারত-আমেরিকান সম্পর্কই এখন আর সেই আগের জায়গায় নাই হয়ে গেছে। কারণ, বাইডেন এখন ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকে আর দেখতে চান না মর্মে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন আর বলা যায় তা প্রকাশ্যও হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় এটা এখন পরিস্কার যে সেজন্য আইন বাঁচিয়ে দুরত্বে থেকে বাইডেন যতটা সম্ভব সব ভাবেই মোদি বিরোধীদের জোটের রাহুলকে নেতা মেনে গড়ে উঠার পক্ষে আগিয়ে গিয়ে সহায়তা করেছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  তবে আমার আমেরিকা-ভারত দুরত্বের কথা লেখাতে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে, সম্প্রতিকালে মোদির আমেরিকা সফর এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব?

    স্বল্পে মূলকথায় বললে, এবারের মোদির সফর ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সফর। যেটাকে টেনেটুনে বড়জোড় সামরিক অস্ত্র কেনা-বেচা বা কিছু সামরিক ইকুইপমেন্ট ভারতে  উতপাদন করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও টেকনোলজির চুক্তি হয়েছে বলা যেতে পারে। এমনকি এই সফরে গ্লোবাল বা আঞ্চলিক কোন ভারত-আমেরিকা স্ট্রাটেজিক আলোচনা বা আমরা “কমন স্ট্রাটেজিক বন্ধু” জাতীয় কোন কথাবার্তাও হয় নাই।  তবে এশিয়ায় ভারত ও আমেরিকা উভয়েই চীনবিরোধি নিজ নিজ স্ট্রাটেজিক অবস্থানের রাষ্ট্র। যদিও তাদের মধ্যে কোন কমন জীবিত কোন প্লাটফর্মও [কোয়াডের মত যা এখন মৃত অকার্যকর অর্থে]  অবশিষ্ট নাই বা বেঁচে নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [নন অফিসিয়াল জোট ধরণের] উদ্যোগ বলে এতে ভারত-আমেরিকা চীনবিরোধী হয়ে আছে ধরে কিছু কথা হয়; তাও সেটা যৌথতায় নয়! এছাড়া ভারত কোন সামরিক জোট করতে চায় না – এই নীতির দেশ বলে এনিয়েভারতের নুন্যতম উচ্ছসিত হওয়ার বাস্তবতাই নাই। অর্থাৎ মোদির ঐ সফরটার একমাত্র ফোকাস বাণিজ্যিক। কোন রাজনৈতিক আলোচনায় সেখানে হয় নাই। বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা তো অনেক দুরের বাত!

    তাহলে হানিমুন শেষঃ
    হা শেষ! ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন ঘটিয়ে যেটা শুরু হয়েছিল – আমেরিকা বড় ভাই ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল বলে ভারত নিজেই ‘হাসিনার বাংলাদেশের’ মালিক হয়ে গেছে বলে যে ভাব নিয়ে চলছিল এর অবসান হয়েছে। এটাকে আবদি তার এবারের লেখায় বলেছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের প্রভাব বলয়ের দেশ [… Bangladesh is in India’s zone of influence, New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs. ] অথবা কখনও বলেছেন হাসিনা হলো ভারতমুখাপেক্ষী সরকার [pro-India Prime Minister Sheikh Hasina-led Awami League …।]।  এবং এভাবেই ভারত এতদিন নিজেকে ভুয়াবাজি মিথ্যা করে হলেও পরাশক্তি ভাব ধরে চলেছিল – এরই সমাপ্তিকাল!
    এর মূল কারণ, এখন বাইডেন প্রশাসন মোদি-যুগের অবসান দেখতে মনস্থ করেছে।  মোদির মুসলমান বিদ্বেষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কে ব্যবহার করে বাইডেন তাই এপ্রসঙ্গকে সামনে উঠিয়ে ফোকাসে এনেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই। এতে ইতোমধ্যেই মোদিবিরোধী জোট সবল হচ্ছে – নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভেদকে সেকেন্ডারি করে কার্পেটের নিচে তা চাপা দিতে পেরেছে – মিডিয়াও মোদিবিরোধীয় সরব হয়ে উঠছে। এমনকি এর ছাপ আদালত পাড়াতেও পড়েছে যে মোদির বিরুদ্ধে রায় দেয়া যেন এখন সহজ ও সম্ভব।   কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে থাকা প্রতিষ্ঠান সিবিআই, ইডি, রাজ্যপালের অফিস বা আয়কর বিভাগ লেলিয়ে দিয়ে  বিরোধীদের শাসিত রাজ্যে মোদি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার চরমে উঠেছে – আর এর অবসানে বিরোধীরা জোটবদ্ধ ও নিজেরা ভোকাল হওয়া সম্ভব বলে মনে করতে শুরু করেছে –  বাইডেনের একটু দুরবর্তি সহায়তাতেই!
    এসবের সারকথা হল, যদি ২০২৪ সালে মোদি যদি পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন তবে মোদিবিরোধী সেই ভারতের উপর অ্যামেরিকান প্রভাব অনেক বেশি হবে।  চাই কী সেই ভারত, আমেরিকার এশিয়া নীতি যেমন বার্মা নীতির সাথে এলাইন [align] বা সমপাতিত করে নিজেকে পুনর্গঠিত হতে পারে বলে আমেরিকার মনে আশা জাগতে পারে।  আর সেই আমেরিকা হবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা যেকথা বলবে সেটাই শেষ কথা! এনিয়ে ভারতের সাথে কোন আলোচনাই নয়।  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক সেই অভিমুখেই ইতোমধ্যে   রওনা দিয়ে দিয়েছে – এটাই আবদির এই নয়া লেখার প্রধান দাবি!!

    এজন্যই আবদি বলছেন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হঠাত সক্রিয় ভুমিকার বিরুদ্ধে ভারত বোবা হয়ে গেছে ও আছে [… New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs]। বাংলাদেশের ভিতরেও যতটা শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে নিজস্বার্থ উপযোগী করে আকার দিয়ে, এজেন্সি দিয়ে দাঁড় করিয়ে এতদিন রাজত্ব করছিল এমন সবকিছু থেকে আপাতত গুটিয়ে প্রত্যাহার শুরু হয়েছে।  আর হয়ত তা সীমিত করে পুনর্গঠিত করার ইচ্ছায়ও হতে পারে। এসবেরই সোজা মানে হল,  যেই “বাবা আমেরিকা” ভারতকে পড়শিদের উপর কিছু মাতব্বরি করার ক্ষমতা দিয়েছিল  সেই বাবা এখন ভারতের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ভারতকে ফকির করে দিচ্ছে।

    যে রাশিয়ান জাহাজের মালামাল খালাসের মুরোদ ভারতের হয় নাইঃ
    আবদি তার লেখার শেষের দিকে বাংলাদেশের রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কিছু রাশিয়ান ইকুইপমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাওয়া এক রাশিয়ান জাহাজ-কে কিভাবে মাল খালাস না করে তা রাশিয়ায় ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছিল এর বর্ণনা দিয়েছেন – একটা বড় উদাহরণ হিশাবে।  ঘটনা হলো রাশিয়ান জাহাজটা ছিল আমেরিকার স্যাংশন খাওয়া তালিকায়।  তাই ঐ জাহাজে বাংলাদেশে ভীড়তে গেলে আমেরিকা তা রোধ করতে বাংলাদেশকে আগাম তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছিল। এতে প্রতিক্রিয়ায়  রাশিয়া ও বাংলাদেশের সাথে আলাপ করে ভারত লিড নিয়ে রাজি হয়েছিল যে ঐ নিষিদ্ধ জাহাজ সে কলকাতার হলদিয়ায় ভিড়িয়ে মালামাল নামিয়ে সহজেই সড়ক পথে সেসব মালামাল বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু বিধি বাম! কারণ সেদিন শেষ হয়েছে। তাই আমেরিকা ভারতকেও তার আপত্তির কথা জানিয়ে দেয় যাতে সে নিষিদ্ধ জাহাজ নোঙ্গর না করায় কলকাতা। আবদি লিখছে, আমেরিকা আপত্তির পদক্ষেপে এগিয়ে এলে ভারত পিছু হটে যায়!

    শুধু তাই নয় ঐ লেখার শেষে আপনি একটা মরাল লিখেছে এভাবেঃ
    এই গল্পের শেষে প্রকাশিত নৈতিক ভাষ্যটা হল, আমেরিকা এখন মনে করে তার কথাই শেষ কথা – এর উপর কোন কথা নাই। এবং পুরান দোস্ত ভারত অ্যামেরিকান এই নয়া অবস্থান পছন্দ বা অপছন্দ যাই হোক ভারতকে এমন অ্যামেরিকান ইচ্ছাকে মেনেই বেচে থাকা অভ্যাস করতেই হবে!  [“The moral of the story is that the US believes in having the last word, and even allies like India must learn to live with it whether they like it or not.”। মানে মোদিকে এমন অপমান হজম করতে শিখতে হবেই!

    কেন আবদি এমন সংবাদের বাহক হলেনঃ
    ব্যাপারটা হলো, এই নতুন অভিমুখ সম্পর্কে অনেকদিন ধরেই বলছি। কিন্তু ভারতের  কেউ এসব কথাকে সত্যি বলে বলে আমাদেরকে জানায় নাই। বরং উলটা প্রপাগান্ডা করতেই দেখেছি। তাহলে এই অসহায় ভারত – আমেরিকার সামনে গড়াগড়ি খাওয়া এই ভারতের ইমেজ আমাদের সামনে আনার দায়িত্ব আবদি কেন নিলেন? আগে উপরে লিখেছি বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের ততপরতা অন্তত আপাতত গুটিয়ে রাখার কথা কানে আসার কথা বলেছি। আবদির এই লেখা কানে আসা সেসব সংবাদ নিয়ে নিশ্চয়তা যোগালো বলা যায়।  তার মানে ভারত এই খবর নিশ্চয়তা দিয়েই ছড়িয়ে দিতে চাইছে?? মানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ বা গোষ্ঠিতে ভাঙ্গা-গড়া না হোক অন্তৎ ক্রমশ এদের ভাঙ্গার কথা নিয়মিত শুনব আমরা – তাই কি???

    যাকিছু আপোষে নিজ ইচ্ছায় আসতেই আছে ও থাকবে  তা সাদরে গ্রহণ কর জনগণ! জনগণ বুদ্ধিমান!

    সবশেষে আবদির কিছু সত্যবচনঃ
     আবদি এখানে যে অবস্থান নিয়ে লিখেছেন তা হল বাংলাদেশে হাসিনার ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি আর গুম খুন হত্যায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের যত অভিযোগ সেসবকেই তিনি সত্য বলে গ্রহণ করে নিয়ে কথা বলেছেন। এসব পাশ কাটিয়েও তিনি সদর্পে বলছেন হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় রাখতে হবে! কেন? তার একটাই সাফাই আর তা হল, বাংলাদেশে ভারতের গভীর স্বার্থ আছে যে হাসিনা-ই রক্ষা করে দিতে পারবে।  অর্থাৎ কোন ন্যায়-ইনসাফ বা আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায্যতা নয়। শ্রেফ ভারতের স্বার্থ – কাজেই আব্দি ভারতের সেই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন????? বড়ই অদ্ভুত না! মানে কোন মানুষ কী কোন ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তি ছাড়াই – আমার  ওইটা ভাল লাগে বা ওইটা আমি খাবো আমাকে এনে দেও ইত্যাদি এভাবে কথা বলতে পারে???

    তিনি এটাও পরিস্কার করেই বলছেন তাই এই চাওয়া – ভারতের স্বার্থ বলে তা পেতে চাওয়া এটা হাসিনারও (বেইনসাফি) উচ্চাঙ্খা বটে; এমনকি এর মানে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মই থেকে ছিটকে পিছলিয়ে পড়ে যাওয়া এমনকি যেটা বাংলাদেশকে এক দলের ও এক নেতার বাংলাদেশে পরিণত করবে…। [That would no doubt serve India’s national interests; and of course, fulfil Hasina’s ambitions; but would also mean ignoring the democratic backsliding that has reduced Bangladesh into a one-party, one-leader nation.]

    তবুও এটাই তাঁর আকাঙ্খা! কি তামসা!

     

     

    আপডেটেডঃ  ১৪  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

  • ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!
    গৌতম দাস

    ৯ জুলাই ২০২৩  ভোর ০৩ঃ  ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Hx

     

     

     

     

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কথাটা ভেঙ্গে সরাসরি উদোম করে দেখালে এর মানে হল, নাগরিক রাষ্ট্রে কোন ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা রাখাই যাবে না। বিশেষ করে ইসলামি বিয়ে। এর বদলে ধর্ম নির্বিশেষে সকলকের জন্য একই (তাই ইউনিফর্ম বা সার্বজনীন বলা) এবং একমাত্র ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইনেই’ বিয়ে করতে হবে। এই হোল সিভিল কোড বুঝনেওয়ালাদের দাবি।   তাদের সার্বজনীন ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ মানে হল, কোন  বিয়েকে ধর্মের সংশ্লিষ্টতাহীন করে সাজাতে হবে; যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এবং ধর্মীয় বিয়ে আর রাষ্ট্র আমল করবে না; এর বদলে নাগরিক হিশাবে দুই পুরুষ-নারী নাগরিকের মধ্যে বিয়ের আইন করা হবে।
    একথা শুনে অনেকের মনে হতে পারে বা ভালই তো!!! ধর্ম বা হিন্দু-মুসলমান নিয়ে ক্যাচালের চেয়ে এই ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ তো খুবই ভালো!!! এর মধ্যে বেশ প্রগতিশীলতা আর এডভ্যান্সমেন্টও দেখে ফেলতে পারে কেউ!!! ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশংসায় আমরা কাউকে খুশিতে উত্তেজিতও হয়ে উঠতে দেখতে পারি। আর পোগতিশিল=হিন্দুত্ববাদীরা খুশিতে নেচে উঠতে পারে এই বলে যে এবার ‘মুসলমান কোপানির’ একটা ভাল অস্ত্র পাওয়া গেছে!!
    হ্যা ঠিকই তাই। ‘ইউনিভার্সাল সিভিল কোড’ এর দাবিদারেরা অসৎ মনে ও উদ্দেশ্যে ইসলামের সাথে রাষ্ট্রের একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিরোধ খাড়া করতে, মুসলমান কোপাতেই এই দাবি করে থাকে। তাই এনিয়ে একটা মজার দিক বা মিলের দিক দেখিয়ে দেই তাহলে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে।
    বাংলাদেশে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর দাবি সবচেয়ে উচ্চকন্ঠে করে থাকে কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিবি। এর খাস প্রমাণ  পাওয়া যাবে এখানে  ২০২৩ সালে সমাপ্ত সিপিবি এর দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত ও প্রকাশিত প্রস্তাব যা সাপ্তাহিক একতা  পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সেখান থেকে। তাতে ১২ নম্বরে যার উপশিরোনাম [১২. নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে] এর অধীনে চার নম্বর দাবিতে লেখা আছে দেখেন  [৪.      ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।] ।    এবং বলাই বাহুল্য তার নারী (এনজিও) সংগঠন মহিলা পরিষদও এই দাবি করে থাকে। অন্যদিকে,  আগামি বছরে মানে ভারতের আবার কেন্দ্র সংসদ নির্বাচন আসন্ন। তাই মোদি বা বিজেপির এবারেরও মুসলমানদেরকে কোনঠাসা করে রাখার সফল নেতা হিশাবে মোদির  অন্যতম নির্বাচনী ইস্যুও হল এই ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কায়েম।

    তাহলে সিপিবি আর মোদির মধ্যে মিলটা কোথায় আর কেনইবা এই মিল দেখছি আমরা???   বলাই বাহুল্য এই মিল হল একই ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান কোপানির খায়েসজাত – এটাই তাদের মধ্যে কমন;  তাই এই লক্ষ্যের ঐক্য!!
    তবে যারা এখনও প্রগতিশীল আর সাথে বাড়তি হিশাবে যাদের কেউ কেউ হয়ত নারীবাদিও তাদের জন্য বলে রাখি যদি তারা সাদা মনে – শ্রেফ বুঝবার জন্য মানার জন্য না – যারা জানতে চান যে কেন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ দাবিটা ভুল তাহলে তা এলেখার শেষের দিকে “আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ”  – এই উপ-শিরোনামে লেখাটা পাবেন; পড়ে নিতে পারেন।

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ যখন হাতিয়ারঃ
    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই শব্দ কয়টা শুনলে অনেকের কাছে পবিত্র বা উচ্চমার্গীয় মনে হতে পারে, তাই অনেকের ক্ষেত্রে কিছুটা ভক্তিতে অজান্তে মাথা ঝুঁকেও যেতে পারে; সেটা এই বলে যে এটা একটা খুবই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ কোন পরম জ্ঞান হবে নিশ্চয় যা কোন প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় খুবই কাজের ও উপাদেয়!!!

    কিন্তু  আমি দুঃখিত পাঠক। এই অনুমান একেবারেই মিথ্যা শুধু না বরং উলটা। এটা আসলে মন ভর্তি যাদের ইসলাম বিদ্বেষ, যারা তক্কে তক্কে থাকে কিভাবে মুসলমানদেরকে সমাজে নিচা দেখাবে –  মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানি বা জাগানি কিছু প্রগতিশীল ভাব ধরাদের কারবার এটা; যারা আসলে হিন্দুত্ববাদী। তাদের কাছেই – মুসলমান কোপানির এক ভাল হাতিয়ার হল এই শব্দগুচ্ছে – ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’।

    শব্দগুলো ইংরাজিতে যার বাংলায় ইতিবাচক অর্থে সারকথা হল,  একটা রাষ্ট্রে ধর্মের বাইরে বিয়ে সংক্রান্ত আইনী ধারা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই কী তা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’এর পরিণত হবেঃ
    না একেবারেই না। তবে মুসলমানবিদ্বেষ যদি আপনার গোপন খায়েস হয় তবে এমন জাতিরাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে আপনি মুসলমান কোপানি বা বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে হাজির করবেনই। আর সেজন্য  ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই হাতিয়ার তুলবেনই। ফলে এই অসততার এমন আউটকামই আমরা হয়ত দেখব। তাই এককথায় বললে, রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই তা গড়ার মূল উদ্দেশ্যই তো হল নাগরিক বৈষম্য দূরে রাখা। ধর্মীয় বা যে কোন পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক অধিকারে সকলেই সমান – এই নীতির বাস্তবায়ন। কাজেই মুসলমান বা ধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অবস্থান নেয়া অপ্রয়োজনীয়; আর তাতে এতে  বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে যে কোন রাষ্ট্র গড়া বা রূপ দেয়া হবে যেটা অগ্রহণযোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য হ্যে দাঁড়াবে যা কাম্য নয়।   

    একথা সত্য যে, একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ধর্ম বা অন্যকোন পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন ভাবে তার সকল নাগরিকের সকল ‘মৌলিক নাগরিক অধিকার’ সুরক্ষা দিবার প্রতিশ্রুতিতেই কেবল জন্ম নিতে পারে বা হওয়ার কথা।
    কিন্তু বাংলাদেশ মানে যে পুরাতন অখন্ড ভারত ভেঙ্গে আজ যে তিন রাষ্ট্র হয়েছে  এর একটা রাষ্ট্র – এই বাংলাদেশে (সাথে হিন্দুত্ববাদি ভারতেও) কিছু পোগতিশিল কমিউনিস্টের এই ধারণা যে – না এভাবে চলবে না। রাষ্ট্রকে ইসলাম কোপাতেই হবে। মুসলমান বিদ্বেষী ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানি ইত্যাদি এমন বৈশিষ্ট তাদের “কল্পিত আধুনিক রাষ্ট্রের” থাকতেই হবে। নাইলে আর সেটা তাদের জাতিরাষ্ট্র হয় কী করে – এতে তো “মজা” নাই। অথচ এটা আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ বা এক্তিয়ারই নয়; বা উদ্দেশ্যই নয়। কারণ এমন রাষ্ট্রে মুসলমান নাগরিককে যদি চিন্তায় খাটো আর নিচা সংস্কৃতির বলে মিথ্যা হলেও তুলে ধরতে করে তবে তা এক চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই হবে!  তবে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই যদি তাদের মজা পাবার উপাদান হয় তো বলার কিছু নাই!  অতএব একারণেই ভারতে ১৯৪৭ সালের পরে সম-নাগরিক অধিকারের নয় বরং হিন্দু আধিপত্যের ভারতবর্ষ মানে হিন্দু জাতশ্রেষ্ঠত্বের এক ভারত জাতিরাষ্ট্র সেখানে গড়ে উঠেছে। আর তাই-ই হয়েছে আমাদের বাস্তবের ভারত! আর এর প্রভাবে অন্য দুই রাষ্ট্রও তাই একই!

    তবে বিশেষ করে পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাশ হবার পরে জমিদারি হারানো জমিদার হিন্দুরা প্রতিশোধ নিতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। এই ভেবে যে এই পার্টি ধর্মবিরোধী; কাজেই এদের ধর্মবিরোধী রাজনৈতিক ধারার আড়ালে বসে তারা মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণাছড়ানি বয়ান প্রগতির বয়ান বলে হাজির করতে পারবেন। প্রগতিবাদিতার আড়ালে এরা রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইসলামের সাথে সংঘাত বাধাতে আর রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপাতে বা এভাবে রাষ্ট্রকে সাজাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যদিও এতে কারও লাভ হয় নাই। কারণ, প্রতিশোধ নেয়া মানুষের করণীয় কাজ হতে পারে না। তবু এই ততপরতাকেই আমরা  এই অঞ্চলে চিনি পোগতিশিলতা-কমিউনিস্ট বলে। তারা আমাদেরকে ধর্মচিন্তা-মুক্ত বিশেষত ইসলাম-চিন্তা মুক্ত এক সমাজ-রাষ্ট্র হাজির করতে চায়; আর এভাবে তারা তাদের জমিদারি হারানির ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে তারা কায়েম করতে বদ্ধপরিকর! তাই তাদের এক নম্বর কৌশল হল আধুনিক রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় বা গায়ে পড়ে ভাবে হলেও ইসলামের বিরুদ্ধে খাড়া করে হাজির করা।

    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথাঃ
    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তেমনই এক ইস্যু যা দিয়ে পোগতিশিল-কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রকে মুসলমান কোপানোর কাজে ব্যবহার করতে চায়; আর তা পারবে বলে তারা মনে করে। তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা বিশেষত ইসলামি ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা ভেঙ্গে চুরমার করতে চায়।
    আর এটাকেই তারা ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ তাদের কথিত উচ্চমার্গীয় জ্ঞান জাত ততপরতা বলে আড়াল নিয়ে দাবি করে থাকে! কিন্তু আড়ালে কেন?
    কারণ, প্রগতিবাদীদের ৯৯.৯৯% এর ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট” জিনিষটা কী এসম্পর্কে পড়াশুনা-বুঝাবুঝি একেবারেই নাই। বেশির ভাগই এর নাম শুনে নাই।  তবে এর অন্তত একটা কারণ হল, মার্কসের কোন রচনায় রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট বা আধুনিকতা বা রিপাবলিক রাষ্ট্র ইত্যাদি সেখানে কোন প্রসঙ্গই নয়, হয় নাই। আবার এমনকি তাদের মধ্যে যারা অতি দিগগজ  মানে ধরেন যারা লন্ডনে গিয়ে ইংরাজী সাহিত্যে পিএইচডি করে এসেছেন – এরাও অন্তর্ভুক্ত মানে একই অবস্থা তাদের! তাই এরা কখনও ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে দুপাতা লিখেছেন জানা যায় না। ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ কে প্রগতিশীলতা-কমিউনিস্ট এর সাথে রিলেট করে কিছু ব্যাখ্যা করেছেন জানা যায় না।  অর্থাৎ কার্যত যেহেতু তাদের চিন্তার মুরোদ নাই – অক্ষম উত্থানরহিত; তাই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে তাদের হাউশ তাদের খায়েসের বাতচিত তারা কেবল তাদের মধ্যেই এক আড়ালের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। এবং অলিখিত আলোচনাতেই আটকে রাখেন!
    অথচ এরা প্রত্যেকে আধুনিক রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপানির অগ্রসেনানী সৈনিক! রাষ্ট্রকে তারা তাদের ইসলামবিদ্বেষ এর খায়েস পূরণের হাতিয়ার করে অপব্যবহার করতে চায়!

    ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও রিপাবলিক রাষ্ট্রঃ
    আপন ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে একটা নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিশাবে দেখা এটা ইউরোপের কোন দেশে নাই; কিন্তু একমাত্র কেবল আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে এটা পাওয়া যাবে। পিছনের অনেক কারণের মধ্যে মূল কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান বা ওসমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে এই সাম্রাজ্য-ভুখন্ডকে কার্যত বৃটিশ ও ফরাসীরা  নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া থেকে। এরপর এরা ওসব ভুখন্ডের মুসলমান বাসিন্দাদেরকে শাসন করতে গিয়ে – পুরানা ক্রুসেডে ইউরোপের হারের কথা না মনে পড়ে যায় – এটা একটা ভয়ের কথা ছিল। এজন্য যে নতুন শাসন-তত্ব শাসক বৃটিশ ও ফরাসীরা ১৯১৮ সালের পরে ওসমান সাম্রাজ্য ভুখন্ডে  চালু করেছিল তা হল, কথিত নয়া রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করা নামে এক অদ্ভুত বায়না সেখানে তারা হাজির করেছিল। গত ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফিলিয়া সম্মেলনের কখনও অথবা ক্লাসিক্যাল ইউরোপীয় রাষ্ট্র-চিন্তায় কখনও এমন কথা শুনা যায় নাই।  বরং উল্টা আমেরিকা নিজে ১৭৭৬ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশ হবার পরে পনেরো বছরের মধ্যে ১৭৯১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হলে সেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো কী কী তা বর্ণনা করতে গিয়ে সেখানে এই প্রথম কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার বলতে তাতে ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – এটাকেও এক নাগরিক অধিকারের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আর এথেকে এটা প্রমাণ করেছে যে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারনার সাথে ধর্ম পালনের কোন বিরোধ নাই। তাই রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করার কথা বুজরুকি ও শয়তানি!
    কিন্তু এই শয়তানিটাই আপন হয়ে দাড়ায় আমাদের এই অঞ্চলে হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের অনুসারি, হিন্দুত্ববাদিদের কাছে।   ফলে তা প্রগতিশীল ও কমিউনিস্টদের কাছেও।

    সব সিভিলাইজেশনই ধর্মতত্বের হাত ধরেই আগিয়েছেঃ
    কিছু কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। সারা দুনিয়াতে মানব সভ্যতার বয়স  ধরা হয় প্রায় ছয় হাজার বছরের বেশি। ইতিবাচক অর্থে মানব সভ্যতা (human Civilization) এর সোজাসাপ্টা মানে হল যখন থেকে মানুষ যাযাবর জীবন, ফলমূল খাবার টোকায়া খাওয়ার জীবন ছেড়ে এবার কৃষিকাজ শিখে চাষাবাদ শুরু করেছিল। আর চাষাবাদের জীবনের পুর্বশর্ত হল, থিতু হয়ে কোন এক নদীবিধৌত উর্বর ভুখন্ডে বসতি স্থাপন করে বসে যাওয়া  – আগের কোন যাযাবর জীবনের বিপরীতে।  যেটাকে আমরা একালে এমন একেক ভুখন্ডে গড়ে উঠা বসবাস যা থেকে আসলে নানান এথনিক [ethnic] বৈশিষ্টে ভিন্নতায় আমাদের নিজ সভ্যতায় বসবাস শুরু হয়েছিল – আর এটাকেই আমরা সিভিলাইজেশন অর্থে সভ্যতা বলছি।  যা আসলে মূলত এথনিক অর্থে জাত-সভ্যতা! আর  এই এথনিক পরিচয় বলতে যার ভিতরের এক প্রভাবশালী উপাদান হল ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়!  আর প্রগতিশীলতার নামে আমাদের অনেকের মনে বৈষম্যহীন অধিকারের রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চেয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এরা  ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এর সাথে সংঘাত বাধানোকে অনিবার্য মনে করে থাকে। আর এখান থেকেই সব বিরোধের উতপত্তি।
    এখন এই ছয় হাজার বছরের মধ্যে প্রায়  দুহাজার বছর আগে যীশুর জন্ম।  এর মধ্যে নবীর যুগও এসেছে। আর এই সময়কালে সবসময়ই আমরা অনেকগুলো মানে কোন না কোন একটা ধর্মতত্বের হাত ধরেই হেটেছি। আমাদের হাত খালি থাকে নাই। আর ইতিবাচক অর্থে দুনিয়ায় আমাদের সকল সভ্যতা ধর্মতত্বের হাত ধরেই এপর্যন্ত হেটে এসেছে। পরবর্তিতে ১৪৫০-১৫৫০ এই সময়কালকে বলা হয় বিজ্ঞানের যুগ শতবর্ষ – যখন একনাগাড়ে বিজ্ঞানের গুরুত্বপুর্ণ আবিস্কার গুলো ঘটেছিল। কিন্তু এরপরেও এসময়ে “বিজ্ঞান” এসে যাওয়াতে দুনিয়া থেকে কোন ধর্মতত্ব  তো নাই হয়ে যায় নাই! বরং বলা যায় বিজ্ঞানকে পাশে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ধর্মতত্ব তার জায়গাতেই আছে। মাঝে একটু কেবল সময় লেগেছে এডজাস্ট হতে পরস্পরকে জায়গা করে দিতে।  তাই শেষ বিচারে  মানুষের এখনকার চিন্তা-চর্চার রূপ যেখানে গিয়েই ঠেকুক চিন্তা-চর্চার শুরুর দিকে সবকিছুই ছিল ধর্মতাত্বিক বৈশিষ্ঠের। কাজেই ধর্মতত্ব জিনিষটা গায়ের জোরে ত্যাগ করার বিষয়ই নয়! আর কাকে ত্যাগ করব আমাদের সকলের আদি না হলেও পুরাতন সব প্রজন্মকে??? এটা কী সম্ভব?? কাজেই  ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিশাবে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রেখে দেওয়া একটা খুবই উপযুক্ত এপ্রোচ বা আগানোর উপায়। কিন্তু কাজ আরও আছে আর তা করতে হবে বুদ্ধিমান হয়ে!

     

    তাহলে আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ
    খুবই সহজ!
    ১। সবার আগে আমাদের মনের ভিতরের যেকোন ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি বাইরে বের করে ফেলে দিতে হবে; তাতে আমরা যার যার ধর্মপালনের লোক হই আর নাই হই না কেন! ধর্মপালন বা মানা না মানা আপনার নিজস্ব বিষয়। কিন্তু ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি ত্যাগ করতেই হবে! নাগরিক যার যার ইচ্ছা হবে তাকে তার ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে। আর আমরা তার ফেলো বা পাশের নাগরিকেরা আমাদের দায়িত্ব হবে আমরা নিজেরা যেই ধর্মই পালন করি অথবা কোন ধর্মই পালন না করলেও ফেলো নাগরিকের অধিকার রক্ষায় আমাদের সহযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে হবেই।
    ২।  আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা মানেই যেগুলো বহু পুরানা ট্রাডিশন হিশাবে কোন না কোন ধর্মতত্বের ঘরে বসে, হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। ধর্মীয়-কালচারাল ও সামাজিকতায় মাখামাখি হয়ে থাকা এই ট্রাডিশনে হস্তক্ষেপ বা ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়; আর এটা রাষ্ট্রের কোন কাজ বা এক্তিয়ারই নয়। বিশেষত এক হিশাবে দেখলে এসব ট্রাডিশন মানা না মানা তো পারসোনাল ইস্যু।  তবে রাষ্ট্রের দায় আছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষা দেওয়ার। তাই সেই কর্তব্য পালন করার প্রয়োজনে ট্রাডিশনাল বিয়ের প্রথায় কোন হাত না লাগিয়ে রাষ্ট্র বরং কিছু বাড়তি কাজ করণীয় বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে। যেমন বিয়ে ধর্মীয়-সামাজিক রীতিতেই ট্রাডিশন মেনেই চলবে। তবে এর আর বাড়তি দিকটা হতে পারে হলঃ ক. এই বিয়েটা সরকারি লাইসেন্স নেয়া কাজি বা রেজিষ্টার্ড কাজির কাছে লিপিবদ্ধ (রেজিষ্ট্রেশন) করাতেই হবে। যেই কাজিই আবার বিয়ের সাতদিন বা একমাসের মধ্যে (যেভাবে বলা থাকবে) সরকারি ডাটাবেজে এই বিয়ের সব তথ্য ফিড করা হয়েছে তা নিশ্চিত করবে – ঐ বিয়ের ডকুমেন্টে বা কাবিনে ডাটাবেজ সংরক্ষকের প্রতিস্বাক্ষর যুক্ত করে দিবে। এতাই মূলত রেজিস্টার্ড কাজির রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূল করণীয় কাজ হবে।
    একচুয়ালি, এটাই বাংলাদেশের বর্তমান কাজি অফিসের কাজের প্রচলিত নিয়ম; যেটা ইতোমধ্যেই চালু হয়ে আছে ১৯৮৮ সাল থেকে মানে, এরশাদের আমলে। এবং সেসময় আমাদের রাষ্ট্রের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তো ভেঙ্গে ফেলতে বা হস্তক্ষেপ করতে হয় নাই। বরং সেসময় মূল কনসার্ণ ছিল পুরুষেরা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আর যেকোন মনের দশা খেয়ালে থাকা অবস্থায় তাঁর নারীকে তালাক দিয়ে দিচ্ছিল। এই দায়িত্বহীন কাজগুলোকে শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে দেখা গেল ১৯৮৮ সালের আগে বিয়ে হত পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জিন কে ডেকে এনে দুজন দোস্তকে সাক্ষী রেখেই বিয়ে সম্পন্ন মনে করা হত। কিন্তু কোথাও এই বিয়ের তথ্য সংরক্ষণ করার কোন সিস্টেমই ছিল না।  আর তাই দায়িত্বহীন তালাক তখনই শৃঙ্খলে আনা সম্ভব হবে যখন বিয়েটা যে হয়েছিল এর ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে ও সার্টিফাই বা সার্টিফিকেট দেবার ব্যবস্থা থাকবে। এসব কারণেই ১৯৮৮ সাল থেকে বিয়ের ডাটাবেজ সংরক্ষণ ভিত্তিক কাজি-রেজিষ্টার্ড বিয়ে ব্যবস্থা চালু করা গেছিল। তবুওও এতে এখনও  যেটা অসম্পুর্ণ অংশ তা হল, মুসলমান বাদে অন্য নাগরিকদের  বেলায় এমন কোন রেজিষ্ট্রশনের সহজ ব্যবস্থাটা এখনও নাই।  অথচ রাষ্ট্রের দিক থেকে দরকারি হল, কোন ধর্মীয় ট্র্বেডিশনের বিয়ে সেটা হোক বা না হোক – সমান্তরালভাবে সকল নাগরিক মাত্রই সবার বিয়ে রেজিষ্টেশনেরে ব্যবস্থা থাকতেই হবে। কারণ, এটা না থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে নারী নাগরিকেরা। নিশ্চয় আমরা সকলে মানব যে বিয়ের পরে সামাজিক পারিবারিক দায়ীত্ব ফেলে পুরুষেরা সোজা হেটে চলে যেতে খুবই ওস্তাদ!

    অতএব, কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ ব্যবস্থা চালু একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। সকল নাগরককে একই খুড়ে মাথা কামিয়ে দিতে হবে কেন? মানে ধর্মবিহীন বিয়ের ব্যবস্থা কায়েমই একমাত্র রাষ্ট্রের করণীয় এটা ভিত্তিহীন কথাই শুধু নয়, এই বক্তব্য ধর্মবিদ্বেষী যা মূলত ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাজীবীদের অসৎ কাজ হবে। এককথায় ‘ইউনি্ফর্ম সিভিল কোড’ এর উদ্দেশ্য মুসলমান কোপানি আর ঘৃণাচর্চার দোকান খুলে বসার সামিল! আর  মূলত  ধর্মপালনের কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রের কাজ তাতে ধর্ম তার এক্তিয়ারের মধ্যে কাজ করবে আর রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে তার এক্তিয়ার ও দায়ীত্ব পালন করে যাবে। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসততায় ইসুলাম বা মূসলমান এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে খাড়া করা শুধু অন্যায় নয়, এটা অপরাধও!

    তাহলে মোদি এখন কী করছেনঃ
    মোদি গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরেক বৈষম্য চালু করতে পায়ে পারা দিয়ে হলেও জবরদস্তিতে  ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ চালু করার হুমকি দিয়ে চলেছেন। তাঁর এই ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করতে এখানে এসে তিনি মর্ডানিস্ট হবার ভান করছেন। যাতে মুসলমানেরা আরও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়।  কিন্তু ভারতের অনেক পুরানা রাষ্ট্র বলে এর কিছু সুবিধাও আছে।  তাই তাদের বিচার বিভাগের অংশ প্রতিষ্ঠান ‘আইন কমিশন’ এর মতামত যথেষ্ট শক্তিশালী।  এমনকি কোন আইন বদলাতে গেলে সেবিষয়ে আইন কমিশনের মতামত ভালই গুরুত্ব পায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

    কলকাতার আনন্দবাজার ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর বাংলা করেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। ইলেকশনের আগে আর পিছনে অ্যামেরিকান সমর্থনে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদল এখন একজোট হচ্ছে বলে  অনেক কিছুতেই আর মোদির টাকা খেয়ে মিডিয়া কাজ করছে না। তাই আনন্দবাজার নিজেই জানাচ্ছে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ নিয়ে ভারতের আইন কমিশনের মতামত কী? নিচের সেই পুরা প্যারাগ্রাফটাই আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা হয়েছে দেখেন।

    “কী বলেছিল ২১-তম আইন কমিশন?”
    সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলবীর সিংহ চৌহানের নেতৃত্বাধীন ২১-তম আইন কমিশনের মত ছিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকারের মতো পারিবারিক বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান, পার্সি, জৈন সকলের একই আইন চালু করার প্রয়োজন নেই। পারিবারিক আইনে সংস্কার নিয়ে কমিশনের বক্তব্য ছিল,“সংঘাতের সমাধান ফারাক মুছে ফেলা নয়। অধিকাংশ দেশ এখন ফারাককে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফারাক থাকাটাই মজবুত গণতন্ত্রের প্রতীক। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এখন কাঙ্ক্ষিত নয়, প্রয়োজনও নেই। তার বদলে যেখানে বৈষম্য রয়েছে, সেগুলো দূর করা উচিত।”

    অর্থাৎ এককথায় বললে আইন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সাথে নাই। তবু মোদি ডেসপারেট ভাবে আগাচ্ছেন। আর ওদিকে এতদিন কংগ্রেস-কমিউনিস্টেরা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কে মুসলমানেদেরকে প্রগতিশীলতায় শিক্ষিত করার আইন মনে করত। কিন্তু এখন?
    এখন এরা মোদিবিরোধী প্রায় সকলেই অবস্থান বদলে নিয়েছে। তারা এখন আইন কমিশনের বক্তব্যকেই নিজেদের বক্তব্য বলে প্রচার করতে নেমেছে। সিপিএম এর পরিবর্তিত অবস্থান পাওয়া গেছে তাদের গণশক্তি পত্রিকায়। নিচে সে অংশ তুলে আনা হয়েছেঃ

     সিপিএম এর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি 
    বিবৃতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে তৎপরতার বিরোধিতা করে পলিট ব্যুরো বলেছে, এই বিষয়ে ফের আলোচনা শুরু করেছে বর্তমান (২২তম) আইন কমিশন। অথচ এর আগের আইন কমিশন (২১তম) বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা করে ২০১৮ সালেই বলেছিল, ‘‘এখন অভিন্ন দেওয়ানি বিধির না প্রয়োজন আছে, না এই বিধি কাম্য।’’ সিপিআই(এম) এই অবস্থানকে সমর্থন করে। অভিন্নতা আর সমতা এক নয়। পার্টি সমস্ত সম্প্রদায়ের মহিলাদের সমানাধিকারের পক্ষে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত ও প্রথাগত আইনগুলিকে সংস্কারের মাধ্যমেই সেই লক্ষ্যে সব থেকে ভালভাবে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে, যে প্রক্রিয়ায় সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ থাকবে ওই সম্প্রদায়গুলির সমস্ত মহিলা ও পুরুষের।

    কংগ্রেসের অবস্থান এখানে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের অবস্থান আগে যাই থাক তাদের উচিত হবে ভেবে চিন্তে তাদের আপডেটেড অবস্থান দেখানো।
    আশা করব সমাজের সকল অংশ ইতিবাচকভাবে নিজ নিজ দায়-অবস্থান দায়ীত্বের সাথে তুলে ধরবেন; তাতে আগে আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন! ঘৃণা-বিদ্বেষ আমাদের কারও জন্যই কোন সমাধান-অবস্থান নয় হতে পারে না! এটুকু আমাদের না বুঝার কিছু নাই!

    আপডেটেডঃ ০৯ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ১২ঃ ৫৮
    আপডেটেডঃ ১০ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ০৩ঃ ৩৩

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com