Category: INDIA

  • গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে

    গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৬ এপ্রিল ২০২৩    ০০ঃ০৫

    https://wp.me/p1sCvy-4nv

     

    US-China Split Could Hinder Foreign Investment, Lower Global GDP, IMF Warns - BloombergUS-China Split 

     

    গ্লোবাল নেতা মানে গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতা হিশাবে, দুনিয়ায় আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ১৯৪৫ সাল থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এর পরিণতি বা ফলাফলে। যদিও অনেকের ধারণা এই অবস্থান যেন অফুরান বা অনন্তকাল ধরে চলবে। কিন্তু যার শুরু কিভাবে, কবে ও কী পরিস্থিতিতে আর যদি তা তা জানা-বুঝা যায় সেক্ষেত্রে তার শেষও আমাদের জানা থাকবে ও যাবে। এর মানে তাহলে বুঝতে হবে যে  সেটা আসলে আর অনন্তকালের কোন ঘটনা-ফেনোমেনা নয়। এছাড়া অনেকের আরও একটা ভুল ধারণা করেন যে গ্লোবাল নেতা ধারণাটা যেন সামরিক শক্তির, মানে সামরিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের। ফলে যেন কোন দেশ  পরাশক্তির [Superpower] দিক দিয়ে কতবড়  এর দ্বারাই বোধহয় নির্ধারিত হয়েছে কে গ্লোবাল নেতা বা কে নেতা নয়। না, সরি; এই ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বরং এককথায় বললে, কোন দেশকে গ্লোবাল নেতা বলতে যে সক্ষমতা বা যোগ্যতা কথা বলা হয় এটা মৌলিকভাবে  মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দুনিয়াতে একেকটা দেশ একেক সময়কালে নানান কারণে নিজ অর্থনীতিতে বাড়তি সঞ্চয়ে তা উদ্বৃতের (সারপ্লাস) পাহাড় হয়ে হাজির হতে দেখা যায়। এটাই ঐ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিকসহ সব ধরণের সক্ষমতার আদি উৎস। অর্থাৎ মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই ঐদেশের বাকিসব সক্ষমতার উৎস হয়ে হাজির হয়।  আর উত্থিত অর্থনীতির দেশ তা থেকেই অন্যদেশ বা বাকি দুনিয়ার উপর (ইতি বা নেতি আধিপত্য) এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে হাজির হয়। তাই অর্থনৈতিক বিপুল উত্থান থেকে  তা সবদিকে বিকশিত হয়ে উঠলে তা থেকেই ক্রমশ একটা দেশ গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে উঠে।  তাই বটম লাইনটা হল, গ্লোবাল নেতা মানে আসলে প্রাথমিকভাবে অথবা ওর প্রাথমিক রূপ হল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠা। একারণে চীনের অর্থনীতি কবে আমেরিকার ছাড়িয়ে আরো বড় অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে সেদিকে দুনিয়ার অভিমুখ বুঝতে চাওয়া লোকেদের, এমন সব এনালিস্টেরা আগ্রহের ফোকাস।

    তবে সাবধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠার ফেনোমেনাটা সাবজেকটিভ বা কোন কর্তা-মানুষের সিদ্ধান্তমূলক নয়। বরং তুলনা করে বললে,  যেমন সাবজেকটিভের বিপরীত শব্দ হল অবজেকটিভ। সেদিক থেকে  বলা যায়  ‘বিপ্লব’ [Revolution] ধারণাটাই  সাবজেকটিভ বা কর্তাবাচক। সক্রিয় মানুষ চাইলে বা করার চেষ্টা করলে তবেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে পারে; নইলে নয়। বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে কোন ‘বিপ্লব’ ঘটে না অথবা বলা যায় যা প্রাকৃতিক বা নেচারাল তা বিপ্লবী ঘটনা নয়। প্রাকৃতিকভাবেও অবশ্যই দুনিয়াতে হাজারো পরিবর্তন ঘটে থাকে এখনও ঘটে চলেছে তবে সেগুলো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক ঘটনাবলী নয়, মনে করা হয় না। তাই প্রাকৃতিক মানে অবজেকটিভ।  আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ইংরাজিতে তাই বলে ইভোলিউশন [Evolution]। মানে সেটা রি-ইভোলিউশন [Re-evolution বা Revolution (বিপ্লব)] জাতীয় কিছু  নয়। এই পরিবর্তনগুলোকে তাই ‘অবজেকটিভ’ ঘটনা বলা হয়। এখানে কোন কর্তা থাকেনা, এটা প্রাকৃতিক।
    অর্থাৎ আমাদের এখানকার আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই, কোনদেশের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা তাই ঠিক কোন সাবজেকটিভ ঘটনা নয়; যে তা  ঐ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাপ্রসুত এমন। বরং অবজেকটিভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত; মানে মানুষের ইচ্ছায় যেমন কোন জলোচ্ছাস বা ভুমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আসে না, তেমনই।

    আবার অনেককে আরেক মিথ্যা অনুমান পুষে নিয়ে থাকতে দেখা যায় যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই যেনবা সে দেশ গ্লোবাল নেতা হবেই; এমন মনে করে থাকে। এমন ধারণা ভুল। তাদেরকে বরং মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনসংখ্যা কখনও চীন বা ভারতের মত ১৪০ কোটির আশেপাশেও ছিল না, এখনও নয়। আমেরিকা এখনও কেবল আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার, যা প্রায় ৩৩ কোটি মাত্র।  আর এই জনসংখ্যা দিয়েই  আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল এবং এখনও আছে বা শেষ যুগ পাড় করছে বলা যায়। তবে গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ হতে গেলে জনসংখ্যার অধিক্য একটা পজিটিভ ফ্যাক্টর বা উপাদান অবশ্যই। তবু, সাবধান বড় জনসংখ্যা মানেই তা গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ; তা এমনটা নাও হতে পারে। নির্ভর করে নিজ ঐ বড় জনসংখ্যাকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ম্যানেজ করে কাজে লাগিয়ে বড় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তারা কতটা সক্ষম আর কপালও ভাল কিনা – এর উপর। যেমন, ভারত ও চীনের জনসংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি, এখন ভারত বরং একটু বেশি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলারের যেখানে চী্না অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়নের আর আমেরিকা এখনও ২৩ ট্রিলিয়নের, মানে চীনের চেয়ে বড়। তবে এখনকার  আরেক অনুমান হল আগামি ২০৩০ সালের দিকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে,  এনিয়ে হাতের কাছের ভোয়ার [VOA] এক রিপোর্ট  দেখে নেয়া যেতে পারে।
    এসব সত্বেও ভারত ব্যাপারটাকে নিজ উগ্র জাতিশ্রেষ্ঠত্বের [হিন্দুত্ববাদের] ধারণা দিয়ে দেখে থাকে। মনে করে সে চীনের চেয়ে কম কিসে, সেও চীনের সাথে এব্যাপারে সমতুলনীয়; এমন ধারণার প্রাবল্য অবশ্য ২০১৩-১৪ সালের ফেনোমেনা। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ শানিয়ে মোদি যখন ২০১৪ সালের পর থেকে নিজ-প্রচার শুরু করেছিল যে ভারত নাকি একটা ‘পরাশক্তি’ হয়ে গেছে!  এই ব্যাপারে অন্তত একটা ফ্যাক্টস বা ঘটনা মনে রাখলেই এর কারণ অনেকটাই বুঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

    বিদেশি পুঁজি নিয়ে কমিউনিস্ট ও জাতিবাদি চিন্তায় বেশি-বুঝের মিথঃ
    এককথায়, বিদেশি পুঁজি নেয়া না-নেয়া প্রসঙ্গে ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা আসলে একেবারেই উগ্র জাতিবাদিদের অনুসারী।  যেমন বিদেশি পুঁজি নেওয়া বা দেশে আসতে দেয়া দেশের জন্য কী হারাম না হালাল? এনিয়ে উগ্র-জাতিবাদি একরোখা ধারণাটাই কমিউনিস্টদেরও ধারণা। এরা উভয়েই মনে করে বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজি দেশে আসতে দেয়া হারাম, তাই তা দেশে আনাই যাবে না।  আর এপ্রসঙ্গে বাস্তবতার আমল-মুল্যায়নহীন জাতিবাদিদের একচেটিয়া হারাম ধারণাটাই আরও পোক্ত করেছে কমিউনিস্টেরা; তাদের ‘শোষণ’ ধারণা দিয়ে।

    যদিও এটা তো বলাই বাহুল্য আইডিয়ালি বললে যে বিদেশি পুঁজি এনে শিল্প-ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বরং নিজ দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতায় এগুলো করা তো নিঃসন্দেহে ভাল; এনিয়ে কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু বাস্তবতা তো এখানে না অন্যখানে! মানে তর্কটা এখানে না।
    তাই আরেকটু আগিয়ে এর পক্ষে বলি। দুনিয়ার যেকোন দেশের অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমে, যদি বাইরের হস্তক্ষেপ করতে না দেয়া যায় তবে, ঐদেশের অর্থনীতি বিকশিত হতে যত যা বিনিয়োগ লাগে তার সবটাই ঐ দেশীয় অর্থনীতি নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে, এবং তা সম্ভব; ইতিহাসে এটা প্রমাণিত সত্য। যেমন সারা ইউরোপে একেবারে শুরুর দিকে  মানে ১৬০০ সালের পর থেকে যখন তাদের কলোনি দখল ব্যবসা শুরু হয়েছিল এর আগের কালে, তাদেরকে কোন বাইরে থেকে পুঁজি বা সম্পদ লুটে  আনতে হয় নাই। নিজ অর্থনীতিতেই নিজ সঞ্চয় উদ্বৃত্ব ব্যবহার করেই নিজে বিকশিত হতে পেরেছিল; সম্ভব করেছিল। আমাদের মত দেশের যেমন বিনিয়োগ আনার জন্য “পশ্চিম আছে”,  সে তুলনায় সেকালে পশ্চিমের জন্য ১৬০০ সালের আগে তাদের জন্য কোন “পশ্চিম” বা বিনিয়োগদাতা বলে কেউ ছিল না।
    ১৬০০ সালের আগে-পরে বলে কথা টানছি এজন্য যে ১৬০৭ সালে ইউরোপ প্রথম কলোনিদখলে বেরিয়েছিল।   আর যাদেরকে কলোনিদখল করতে বেরিয়েছিল প্রথমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশ এর কোনটাই নয়।  সেটা ছিল উত্তর আমেরিকা যা এখন ইউএসএ বা আমেরিকা নামে পরিচিত। গত ১৬০৭ সালে প্রথম কলোনিদখল করা ভুখন্ড বা দেশ হল আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia] সর্বপ্রথম কলোনিদখল হয়ে যায়।  যারা দখল করেছিল তাদেরকে বৃটিশ বা ইংলিশ সেটেলার বলা হয়েছে। এর রেফারেন্স দেখতে এখানে[Colonial America (1492-1763)] আমেরিকান সরকারি লাইব্রেরিতে যেতে পারেন। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকাকে কলোনিদখল করা হয়েছিল এরও পরে নানা সময়ে।

    কিন্তু সর্বশেষ আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় যারা ইউরোপের কলোনি হয়ে থেকেছিলাম পরের অন্তত টানা দুশ বছর তারা ১৯৪৫ সালের পরে স্বাধীন মুক্ত দেশ হয়ে গেলেও এরপরে আমাদের নিজ অর্থনীতির বেলায় একই ফর্মুলা কাজ করে নাই যে আমাদের অর্থনীতিও নিজ বিনিয়োগ পুঁজি বা অর্থনৈতিক উদ্বৃত দিয়ে নিজের অর্থনীতির বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারবই। তা হয় নাই আর এটা করবেও না। আমরা পুষ্টির অভাবে ভুগা শিশুর মত বিনিয়োগ পুঁজির অভাবে ভুগবোই। কারণ অন্তত টানা দুশ বছর ধরে লাগাতর ইউরোপের কলোনিদখলদারেরা আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে সেকালের আগে থেকে যাকিছু  সারপ্লাস জমা হয়েছে তা উঠিয়ে দখলদারেরা নিজ নিজ দেশে লুট করে নিয়ে গেছিল। এতে তৈরি হওয়া গভীর স্থায়ী ক্ষত বা বিনিয়োগ পুঁজির ঘাটতি সেটা ১৯৪৫ সালের পরে আমরা স্বাধীন মুক্ত দেশ হলেও তা আপনাতেই নিজ নিজ অর্থনীতিতে পূরণীয় করা যায়নি কারণে এত অধিক লুট আর পূরণীয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ছিল আমাদের জন্য সেই নয়া বাস্তবতা যে আমাদের বিনিয়োগ পুঁজি লুট হয়ে গেছে অথচ আমরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অন্তত কাগজে কলমে ।

    অতএব ঐ খারাপ সময়ে  বিদেশি পুঁজি নেওয়া হারাম এই ফতোয়া যা এখনও তাদের মুখে বর্তমান, এসব কথা ছিল একেবারেই চরম অবিবেচক ও আত্মঘাতি। কার্যত এটা ছিল একদিকে চিন্তার মারাত্মক এক অক্ষমতা অন্যদিকে তা বাস্তবতাবিমুখ ভরপুর এক  বিশুদ্ধবাদিতা। ‘খাঁটি’ থাকতে চাওয়ার স্টুপিডিটি! যেন সাময়িক বিদেশি পুঁজি গ্রহণ করলে আমরা অশুদ্ধ হয়ে যাব!! আমাদের এদিকে এমন এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ভারতের জওয়াহরলাল নেহেরুর চিন্তা ও তাঁর অর্থনীতি। তিনি মারা গেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু তার কমিউনিস্ট অরিয়েন্টেড ইকোনমির চিন্তা বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ প্রসঙ্গ এটা চালু থেকেই গেছিল ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত।   যেটা ১৯৯০ সালে এসে ঐ নেহেরু-ইজমের অর্থনীতি তা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল।  সেকালে চন্দ্রশেখরের কোয়ালিশন সরকার অর্থের অভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে যা মূলত  balance of payments বা বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম ও ব্যয় বেশিতে ঘাটতিতে পরা থেকে সৃষ্ট – এই কারণে তিনি বাজেট পেশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন।  আর  balance of payments এর নিয়মিত ঘাটতি হলে একটাই এর ওষুধ, আইএমএফ-এর কাছে ঘাটতি পুরণে ঋণে বৈদেশিক মুদ্রা পেতে হাত পাতা। আর এর পুর্বশর্ত হচ্ছে এতদিনের আয়েসি আন্দাজি বিশুদ্ধবাদিতা ছেড়ে এবার বাস্তবতায় ফিরে আসতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর সংস্কার করতে বাধ্য হওয়া।  ঠিক কী ঘটেছিল এনিয়ে আইএমএফ-এর একটা ভাষ্য এখানে অন্য আরও ভাষ্য এখানে পাওয়া যেতে পারে।  সে সময়ে সব ব্যর্থতায় দায়ভার চন্দ্রশেখরেরর উপর যদিও এসেছিল কিন্তু নেহেরুসহ সকল পুর্ব-সরকারগুলোই এজন্য দায়ী ছিল। চন্দ্রশেখর সে যাত্রায় পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের নভেম্বরে যা থেকে কংগ্রেসের নরসীমা রাও ক্ষমতায় আসেন। আর তাঁর নয়া অর্থমন্ত্রী হন  মনমোহন সিং, যিনি আইএমএফ-এর সাথে মিলে অর্থনৈতিক সংস্কারটা সম্পন্ন করেছিলেন।  তবে মনে রাখতে হবে এঘটনার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ার সাথে (যা ভেঙ্গে গেছিল ১৯৯১ ডিসেম্বরে ) ভারতের এই অর্থনৈতিক পতন ও সংস্কারে বাধ্য হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই।   কারণ ভারতে তা ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগেই ১৯৯০ সালেই।

    ভারত ছেড়ে এবার বিদেশি পুঁজিতে চীন প্রসঙ্গেঃ
    কম কথায় সেরে ফেলতে এভাবে বলি, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি বা আমেরিকান পুঁজি দেশে আসতে অনুমতি দান শুরু করেছিল। যদিও এর আগে ১৯৫৮ সাল থেকেই মাও সেতুং আর সোভিয়েত বা স্তালিনীয় পথ বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিদেশি পুঁজি গ্রহণ প্রসঙ্গে ভিন্ন পথ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন মাও। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে যদিও এটা চীনের “সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ১৯৫৮” বলে পরিচিত। এসব রাখডাক বা ভিন্ন শব্দে নাম দেয়া খুব সম্ভবত ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য। কারণ,  আদতে এটা ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  আজকের দিনেও যারা কমিউনিস্ট সমালোচক তারা মাওকে তাদের হিরো বলে আপন করে রেখে দিয়েও সব দায় ও এর ভিলেন হিশাবে দেখাতে চায় দেং জিয়াও পিং-কে। তা যাক সে তর্ক অন্যখানে, করেছিও। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, মাও-এর অর্থনৈতিক সংস্কার,  কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাত্রা ইত্যাদি এসব নিয়ে কমিউনিস্টেরাসহ যেকারও  স্তালিনীয় সমাজতন্ত্র বুঝের দিক থেকে যত সমালোচনাই থাক এক জায়গায় গিয়ে সেসবের সবকিছু বেকার হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, চীন এই সংস্কারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ অনুমতি দিয়ে একে আপন করে নিয়েছে; মানে  নিজ অর্থনীতিতে আমেরিকার ওয়াল স্টিটের জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিয়েছে। শুধু তাই না পরে শুরুর দিকে এসব বিনিয়োগ চীন সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা শিল্প-বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগে তারা এখন তাদের পার্টনার। আর এ সবকিছুই ঘটেছে উল্লেখযোগ্য কোন সংঘাত বা ফ্রিকশন ছাড়াই। সেটাও না মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে চীন আজকে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ – চীন নিজেই আজ গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবার পথে। এদিকটার তাতপর্য সেটাও কোন দিক দিয়েই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই গ্রহিতা  চীন নিজেই এখন দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা প্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের এখানে সারা বছরের ঋণদানের বাজেটের চেয়েও এক চীনের বাজেট অনেক বড়। সারকথায় চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব।

     সারকথায়, চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব। 

    চীন ১৯৭৮ সালেএর জানুয়ারি থেকে আমেরিকার সাথে  আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও এমবেশি খোলা দিয়ে শুরু করেছিল।  পরে আমেরিকান বিনিয়োগের আসা বা প্রবেশ শুরু হয়েছিল। আর চীনের বড় অর্থনৈতিক উল্লফন ঘটেছিল (ডাবল ডিজিট জিডিপি) (১৯৯০-২০১০) মোটামুটি এই বিশবছরের সময়কালে।  তুলনায় ভারত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদেশি পুঁজি আসতে দেয়া হালাল কিনা তখনও সেই সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নাই। তাই ১৯৯১ সালকে মানা হয় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার বছর, যখন ভারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে মিটাতে ব্যর্থ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতিতে) হয়ে আইএমএফের সাহায্য পেতে দ্বারস্ত হয়েছিল। ফলাফলে সেই প্রথম নেহেরু কথিত ও প্রচলিত কমিউনিস্ট ইকোনমি ১৯৯১ সালেই খোলনলচে বদলায় বাধ্য হয়ে মনমোহন সিং এর অর্থনৈতিক সংস্কারে ঢেলে সাজানো শুরু হয়েছিল – যা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি।

    তবে এসব নিয়ে কথা বলাও বিপদের। আপনার কোন পছন্দের রাজনীতি বা আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাবধান। বাস্তব ঘটনা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও পেতে গিয়ে একাজে নিজ রাজনীতি-আদর্শকে শ্রেষ্ঠ মানতে হবে বা দেখাতেই হবে এই জিদ সবার আগে ত্যাগ করেন।  কারণ আপনি তখন আসলে তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গেছেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা বুঝাবুঝি আপনার অস্তিত্বের মত জরুরি। আর এটাই প্রধান ও আপনার আসল কাজ। কাজেই আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ দিয়েই কেবল তা পারতেই হবে এই জিদ ও চিন্তা ভুল। যেখানে আপনার দরকার বাস্তবতাকে বুঝবার জন্য একটা চিন্তা বা পদ্ধতিতে তা করতে সক্ষম হওয়া। যে চিন্তা বা পদ্ধতি এটা করতে সক্ষম তাই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে, আপন করতে হবে। এরপরে বা বাইরে প্রেমিকার মত আপনার পছন্দ বা বিশেষ নেকের একটা রাজনীতি বা আদর্শ আছে থাক না। কাজ না পারলেও জোর করে  আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ এর পক্ষে  ঢোল পিটানো তো সহি হতে পারে না! এরপর এবং সেই সাথে এবার কেন আপনার রাজনীতি-আদর্শ ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপযুক্ত টুলস হতে পারে নাই সেটা খুজে বের করেন। সংশোধন করে নেন।
    অনেকবার বলেছি চলতি শতক শুরুই হচ্ছে গ্লোবাল নেতা বদলের পালাবদলের সময়কাল হিশাবে যেটা আমরা পছন্দ করি নাই। বরং ঘটনা-ফেনমেনাই আমাদেরকে এটা দেখতে বাধ্য করেছে। এখন এতে আমেরিকান প্রভাবের ক্রমপতন আর চীনের প্রবল উত্থান যদি বাস্তবতা হয় – অবজেকটিভ বাস্তবতা হয় তা হলে এনিয়ে আমার কথা বলা মানে তো এটা নয় যে আমি চীনের দালাল। অথবা আমি চীনকে পছন্দ করি তাই এটা করছি। অথবা চীন কমিউনিস্ট তাই চীন আমার পছন্দ এটা  ধরে নিতেই হবে!!! অথচ আমেরিকা কী করে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভুমিতে সেই ব্যাপক ইতিবাচক ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণ আমার চেয়ে বেশি এবং ভাল করে কেউ করে নাই। একাজের সময় আমাকে কেউ আমেরিকান দালাল বলে না কেন?
    বাস্তবতা হল, নিজ পছন্দের আদর্শ দিয়ে ঘটনা না মিললেও জোর করে তেমন ব্যাখ্যা দেওয়াটা বোকামি; কারণ জরবরদস্তি পাঠক পছন্দ করবে কেন! কাজেই নিজ পছন্দের আদর্শের ভিত্তিতে কথা বলার দিন শেষ।  আর শেষ কথা হল আমি কোন কমিউনিস্টই নই। এছাড়া চীন    কমিউনিস্ট কিনা সেটাও কমিউনিস্টদের মধ্যেই অর্ক সাপেক্ষ, যা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই। গ্লোবাল পরিবর্তনগুলোকে কতটা উপযুক্তভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছি সেটাই মুখ্য দিক!  সেদিকটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হচ্ছি কিনা সেটার পরীক্ষায় উতড়ানো বা সফলতাই একালের মাপকাঠি।

    এখানে আমাদের পাঠকের সমস্যা হল, তারাও সময়ে বিভ্রান্ত হয়ে সময়য়ে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা এমন কোল্ডওয়ার এর তর্কের ফাদে আটকে যান। অথচ সেই কোল্ডওয়ার এর যুগ এখন অতীত, সেসব ভাবনা এখন অকেজো। তবুও কেউ কমিউনিস্ট না আমেরিকা-বাদী এমন কথিত একটা ধারণার আগে চালু করে পরে  পাঠক কোন মানুষ ও তার ব্যাখ্যাকে আমল করা শুরু করে থাকে। এটা খুবই ভুল পদ্ধতি।  আশা করব পাটঘক কমিউনিস্ট লুপ-হোল এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হবে ও বাঁচিয়ে চলা শিখে যাবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

    [উপরের এই লেখা আসলে দুদিনের মধ্যেই পরবর্তি যে লেখা দিব তার আগাম অংশ। তাই বুঝাই যাচ্ছে পরের লেখাটা চলতি এই রচনার উপরে দাড়িয়েই লেখা হবে। পরের রচনাকে তাই এলেখারই দ্বিতীয় অংশও বলা যেতে পারে।]

  • ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!

    ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!
    গৌতম দাস
    ২০ এপ্রিল ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4mT

    ‘The next few months are a crucial test of our democracy’   ‘The next few months are a crucial test of our democracy’ | Photo Credit: AP

    রাজনৈতিকভাবে গ্লোবাল ইস্যুতে  এশিয়া উত্তাল হয়ে উঠছে।  বিশেষ করে সাউথ-ইস্ট এশিয়া সামনের দুবছরে আরও বড় করে উত্তাল হবে। লঙ্খণগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে।   ঘটনার মূল ফেনোমেনাটা হল অর্থনৈতিকভাবে  রাইজিং চীনের দুনিয়া জুড়ে প্রবল  গ্লোবাল প্রভাবের প্ক্ষেটভুমিতে  ব্যাপারটা উঠতি চীন আর নামতি আমেরিকা এরই উত্থান-পতনের ঘটনাবলী ও প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে । যেটাকে অনেক সময় আমি “গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল” বলে ব্যাখ্যা করেছি। চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা আর তা থেকে জেগে উঠা কোন হবু সংঘাত – এই ঘটল বলে, লাগল বলে ধরণের পরিস্থিতিতে যা গত অন্তত দশবছর ধরে ক্রমশ বাড়ছে বা অস্থির হয়ে উঠছে – এটা হল সেই দৃশ্যপট।

    এর আগে আমরা দেখেছি ওবামা আমলের সেকেন্ড টার্ম (২০১৩-১৬) থেকে এই পালাবদলের ফেনোমেনা সাধারণ চোখে মোটামুটি  দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। তাতে তা বড়জোড় শ্রীলঙ্কা, বা মালদ্বীপ বা নেপালের নির্বাচনে ওসব দেশের দলগুলো একেকটা হয় ভারত বা চীনের সমর্থক হয়ে এমন ‘পালাপদলের’ প্রক্সি খেলে  চলছিল – এতটুকুই দেখা যেত। এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও  তখনকার ভারত মানে? সেকালের ভারত ছিল মূলত এশিয়ায় – এঅঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থের প্রতিনিধি ফলে ভারতের উপস্থিতি যেন এক বরকন্দাজি “যৌথ” উপস্থিতি। আমেরিকা তখন ব্যাপারটাকে আমাদের বুঝাতে এক বয়ান ভাষ্যে বলত – ভারত হল “এশিয়ায় আমেরিকার চীন ঠেকানো এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্ট”। তাই এশিয়ায় ভারতকে আমেরিকার এই চাঙ্গে তোলা!

    কিন্তু এখন এশিয়া উত্তাল হবার কথা যেটা বলছি, তাতে কথিত সেই যৌথ উপস্থিতি জিনিষটাই নাই, উধাও! তা একেবারে বদলে গিয়েছে। এককথায় বললে – যৌথ উপস্থিতি দূরে থাক বরং এশিয়ার ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যেকোন স্ট্রেটেজিক ইস্যুতে আলাদা; যার যার তার তার। তবে এমন আলাদা অবস্থান যত গভীরে ততই আরো বেশি করে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে; তবে ততদুর তা প্রকাশিত করা হয় না; তবে সেটা দুপক্ষেরই নিজ নিজ স্বার্থের আলাদা কারণে।

    যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান একবারেই আমেরিকার চেয়ে আলাদা। ভারত এখন রাশিয়ান তেল রপ্তানির  প্রধান পার্টনার। কিভাবে  নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া সরাসরি তেল রপ্তানি করতে পারে না। তাই ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি করে এরপর, রিফাইন করে পরে আবার বিদেশে বিক্রির সবচেয়ে বড় দেশ। ভারত তার আট-নয়টা রিফাইনারির সবগুলাই এখন কেবল একাজেই ব্যস্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেলের সেকেন্ডারি উতস হিশাবে ভারত ঐ তেল আবার বিভিন্ন পশ্চিমা দেশেই  রপ্তানি করছে।
    কাজেই সরকথাটা হল ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত রাশিয়ার পক্ষে আর বিপরীতে আমেরিকা রাশিয়ার বিপক্ষে তা সবাই জানেন।

    আমেরিকার বার্মায় রেজিম চেঞ্জে আগ্রহঃ
    তবে ভারত আর আমেরিকা  স্ব স্ব স্ট্রাটেজিক স্বার্থে কত দূরদুরান্তে আলাদা এর মোক্ষম উদাহরণ হল আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” [Regime Change] বা সরকার বদলের আগ্রহ – এই ইস্যু। এই ইস্যুতে বরং ভারত-চীন-রাশিয়া এই তিন দেশ যৌথভাবে আমেরিকার বিরোধী অবস্থানে।  ভারতে আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিডিয়া এনালাইসিসে রিক [RIC] বলে একটা শব্দ ব্যবহার শুরু হয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। [আগ্রহীরা এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন।] যেটা আসলে যথাক্রমে রাশিয়া, ভারত ও চীন এই তিনদেশের ইংরাজি নামে  প্রথম অক্ষর  নিয়ে তৈরি।  তবে আবার সাবধান এজন্য যে  এটা আর ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ (১৯৫৩-৯২) নয়। দুনিয়াতে কোথাও আর কোল্ড-ওয়ার এর নীতি ও অভ্যাস নাই। মানে হল, কোল্ড-ওয়ারের কালে কোন দুই দেশ স্ট্রাটেজিক বন্ধু হলে তারা এতে বাকি অন্য সব ইস্যুতে আপনাতেই ‘বন্ধু’ হয়ে যেতই। কিন্তু একালে সব উলটা। একালে দুই রাষ্ট্রের যেকোন শত্রুতা বা বন্ধুত্ব হল মূলত ইস্যু ভিত্তিক। তাই একালে দুইটা রাষ্ট্র এক ইস্যুতে চরম শত্রু হলেও অন্য ইস্যুতে কিছুটা ‘বন্ধু’ থাকতে দেখতে পাওয়া সম্ভব। চীন-ভারত এখনও বিভিন্ন স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ইস্যুতে যথেষ্ট শত্রুতা বজায় রাখে, আর ভারতের মিডিয়া এখনও এন্টি-চায়না টোনে যেকোন কিছু বয়ান করে থাকে। কিন্তু  আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” ইস্যুতে  ভারত-চীন একসাথে আমেরিকা বিরোধিতায় ও অবস্থানে;  আর তা রাশিয়াকে সাথে নিয়ে। আর একথাও সত্য যে এই ইস্যু খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশাল বলেই অন্য অনেক ইস্যুর উপরে  – তা খুবই নির্ধারক। যেমন “বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ” ইস্যু ভারতের কাছে খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশালী ইস্যু বলতে বুঝতে হবে এই ইস্যু ভারতের অন্যান্য ইস্যুতেও যা প্রভাব রাখবেই। যেমন, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে নোঙর করে উপস্থিত থাকুক এটা আমেরিকার বহুদিনের খায়েস। আর ঠিক এর উলটা অবস্থানটাই ভারতের। মরে গেলেও আমেরিকান এই খায়েসে একমত হবে না ভারত।
    ‘বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ’ ইস্যু বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান নৌ-উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। যদিও এর চেয়েও বড় কথা বার্মা আর ভারতের বিস্তির্ণ সীমান্ত আছে যা বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেলে এর ব্যাপক প্রভাব ভারতের উপর পড়তে বাধ্য। শুধু তাই নয়, এঘটনা ভারতের আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট অঞ্চল এর উপরেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। যদিও  এতদিন ভারত ভেবে এসেছে তার আসামসহ নর্থ-ইস্ট অঞ্চল রক্ষার স্বার্থ  এর প্রধান বাধা ও বিরোধি হল নর্থ-ইস্ট সীমান্তেরওপারে চীনের উপস্থিতি বা চীনের তিব্বত সীমান্ত। আর এটাকে বিক্রি করেই ভারত এতদিন বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর আদায়, বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ আর ফেনী-অঞ্চলকে যত রকমভাবে সম্ভব কব্জা করে নেয়া ও রাখা তা করে গিয়েছে। কিন্তু এখন টের পাচ্ছে আমেরিকা ভারতের জন্য প্রকৃতপক্ষে কে ও কী???

    কিন্তু কাকে ঘিরে এশিয়া উত্তাল হচ্ছেঃ
    এলেখায় কথা শুরু করেছিলাম ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলে। কিন্তু কাকে ঘিরে তা হবে? মানে এর কেন্দ্র বা ফোকাস হতে যাচ্ছে কোন ভুগোল? সোজা জবাব হল,  সেই মূল ফোকাস হতে যাচ্ছে সম্ভবত বার্মা। তবে এটা সেখানেই একমাত্র বা ঘনীভুত থাকবে তা না। এর সরাসরি ভৌগলিক কেন্দ্র হবে চীনের তিব্বত-কুনমিং সীমান্তের নীচের অংশ থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট ও সংলগ্ন সব অংশ আর বলাই বাহুল্য বাংলাদেশও; ইত্যাদি সব ভূখন্ডই। তবে এসব কথা ভুগোল হিশাবে বলা, রাজনৈতিক প্রভাব বা বলয়ের দিক থেকে নয়, সেটা আরও বড় ও ব্যাপক।

    তাই  ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলতে এসবের বাইরেও নানান জায়গায় ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থে পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠছে ও উঠবে। যেমন উপরে ভারতের কিছু ভৌগলিক অঞ্চলের কথা বললেও রাজনৈতিক দিক থেকে সারা ভারতের উপরেই ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠতে পারে। আর ভারতে এসব কিছুই ইতোমধ্যে নড়াচড়া করা শুরু করে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। যদিও তা বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে তা বোধহয় আগামি “২০২৪ সালের আসন্ন কেন্দ্রিয় নির্বাচনকে” কেন্দ্র করেই।  আসলে, কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর কাছে  ২০২৪ সালের নির্বাচনে   মোদি ও বিজেপির ভরাডুবি ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে এই আমেরিকান পরিকল্পনা আগাচ্ছে।
    যেমন একটা ঘটনার কথা বলি।
    রাহুলের কংগ্রেসের সাথে মমতার তৃণমূলের সম্পর্ক খুবই খারাপ, বিশেষেত মোদিবিরোধি জোটের নেতা হিশাবে কংগ্রেস অথবা রাহুল গান্ধী কোনটাকে মানতে তৃণমূল রাজী নয় বলে। আবার, কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস  বিজেপিকে শত্রু মনে করে না বরং গোপনে বা প্রকাশ্যে বিজেপির সাথে মমতাবিরোধী এলায়েন্স করে।  একারণে গত ২ মার্চ ২০২৩ মমতা জানিয়ে দেন যে আগামি  “২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিরোধী জোটে যাচ্ছে না তৃণমূল, লড়বে একলাই, জানিয়ে দিলেন মমতা“। কোন জোটে যাবেন না।  কিনতু বেশি না ঐ মাসের তিন সপ্তাহের মাথায় একেবারে বিরোধি জোটের নেতা হিশাবে রাহুলের পক্ষে নিজে টুইট করলেন খোদ মমতাই। তিনি সব “তিক্ততা ভুলে কার্যত রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে … “রাহুলের পক্ষে মমতার টুইট: আমাদের গণতন্ত্র আজ নতুন নীচতায় পৌঁছাল। কেন?
    কারণ, ততদিনে মমতা জেনে গেছেন এই বিরোধি জোট নেতা রাহুল আগের জন নন। এটা সর্বাত্মক! তার মানে আমেরিকা ভারতে মোদির বিরোধিদের একাত্ম করতে পেরেছে এই মাঝের সময়ের মধ্যে।

    এখন এতে কী হতে পারে? সারা ভারতরাষ্ট্র মূলত এতে শেষে এমন এক যুগে প্রবেশ করতে পারে তাতে তা এই প্রথম হিন্দুত্ববাদ-সহ  মোদির বিজেপি-আরএসএস সমূলে উপড়ে পড়তে পারে। পুরানা গান্ধী-নেহরুর সফট বা লুকানো হিন্দুত্ববাদ ( মানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদ) যা একালে (২০১৪) মোদির প্রধানমন্ত্রী হবার আগে ঢলে পড়ে বিলীন হবার যুগে হাজির হবার পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনি বিজয় থেকে মোদির বিজেপি-আরএসএস একে আরো উগ্রভাবে  আর নরমের বদলে উগ্র-হিন্দুত্ব হয়ে হাজির হয়েছিল। তাতে ভারত চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও  চরম মুসলমান নিপীড়নমূলক এক চরম বৈষম্যমূলক  রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল, এবার এই পর্যায়ের একটা অবসান ঘটতে পারে।

     

    ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার সম্পর্কঃ
    কিন্তু ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার কী সম্পর্ক? বিশেষ করে যেখানে গতবার মানে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে তো আমরা তেমন কিছু দেখি নাই!
    হা সেকথা সত্যি; তবে সেবার আর এবার এক নয়; আর তেমন থাকছে না। মানে কী?
    আমাদের দেশেও আজকাল রাজনীতিক দল ক্ষমতায় বা বাইরে যেখানেই থাকুক এরা বলা শুরু করেছে “আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে, করার ক্ষমতা রাখে ইত্যাদি. যেমন এখানে দেখেন,  ….. যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোনও দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে।

    তবে এটা বলতে তামাসার মত শোনাচ্ছে যদিও তবু কথাটা হল – আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে বলতে মনে করা হয় এটা কেবল বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের বেলায় সত্যি। তবে, যেখানে ভারত অবশ্যই একালে আর যেন তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলে বুঝানো যাবে না। কেন?
    কারণ, মোদির প্রপাগান্ডায় ভারতের সারা মিডিয়া এক উগ্র-হিন্দুজাতি-বোধ থেকে সময়য়ে নিজ পত্রিকায় লিখেছে ও বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে ভারত তৃতীয় বিশের দেশ থেকে একলাফে কবে যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে। দ্যা-হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দারও একথা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু মোহভঙ্গের পরে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন।
    মোদির সেই ‘পরাশক্তি ভারতকে’ বাইডেনের আমেরিকা এখন মোদি রেজিম চেঞ্জের জন্য উঠে-পড়ে লেগে গিয়েছে – যদিও পুরা ঘটনাটা দেখে আগামি ২০২৪ সামের মে মাসের ফলাফলে জনগন দেখবে মোদি সেই নির্বাচনেই হেরে গেছে – এমনই মনে হবে হয়ত।
    তাই এশিয়া উত্তাল হচ্ছে বলতে যদি ভারতের দিকে তাকিয়ে বলি তবে, বলতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে আগামি বছর ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এই নির্বাচন শুরু হতে এখন থেকে এক বছরেরও কম সময় আর বাকি আছে বুঝতে হবে। কারণ গতবারের (২০১৯ সালের নির্বাচন) কথা মনে রেখে বললে ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন শুরু হয়ে যাবার কথা। আর আমেরিকা ও রাহুলের নেতৃত্বের বিরোধী দলের টার্গেট হল ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি ( ফলে সাথে তার হিন্দুত্ববাদও) উপড়ে উঠিয়ে ফেলে দেওয়া। আর আমেরিকান টার্গেট হল, এভাবে ভারত থেকে প্রো-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক নীতি-পলিসির এক ভারতকে পাওয়া।

    মোদি-উপড়ানোতে উতসাহিদের বয়ান দাবি করে যে ভারতে ধারাবাহিক একশন শুরু হয়ে গেছে। যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, শেয়ার বাজারে মোদির দোস্ত আদানির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুলের ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ] বলে মোদির অভিযোগ, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে যুক্ত।

    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্টঃ
    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট মানে হল আমাদের ভাষায় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় এর মুখপাত্র ছাড়াও আরেকজন উপ-মুখপাত্র আছেন যার নাম বেদান্ত প্যাটেল। তাকে আগে আমরা খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু তিনি এখন খুব এক্টিভ। ভারতের কেন্দ্রিয় সংসদের স্পিকার কংগ্রেসের রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করে দিয়েছেন।  আর এর অজুহাত হল গুজরাতের এক মেজিষ্টেট কোর্টে দুবছর আগের মামলা যে রাহুল মোদির মানহানি করেছেন, তার তাকে দুবছরের সাজা দিয়েছেন। তবে কোর্ট নিজেই তাকে আগাম জামিন দিয়েছেন উচ্চ আদালতে যাবার জন্য, এর আগে সাজা বলবত স্থগিত রেখেছেন ইত্যাদি। এমনিতেই বহু আইনি ত্রুটিতে ভরা এক সাজা আদেশ আর এছাড়া ঐ আইনেই বলা আছে চলতি সংসদ সদস্যের বেলায় আপিলের আগে এই সাজা বলবত করা যাবে না তবু স্পিকার  রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করেছেন। এরপর ঐ বেদান্ত প্যাটেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন আমেরিকা রাহুলকে নিয়ে আদালতের ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখছেন। ‘Importance of freedom of expression’: US says it’s watching Rahul Gandhi’s case – এই শিরোনাম দেখুন।
    অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে এখানে এসে ভারত আর বাংলাদেশ যেন একাকার – এক তৃতীয় বিশ্বের দেশ নিয়ে আমেরিকান বিবৃতি যেমন হয়ে থাকে।

    হিউম্যান রাইট নিয়ে আমেরিকাঃ
    আমাদের মত দেশে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ কী কাম্য? স্বাগত জানানোর মত? নাকি আমাদের আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপের উসিলা?
    এককথায় বলা যায়, কমিউনিস্টেরা মনে করে এটা হস্তক্ষেপ। কোন দেশ উত্তর কোরিয়া হয়ে গেলেও ভিন্ন কোনদেশের তা একেবারেই আমল করা উচিত না। কারণ, এটা তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়।

    এ সম্পর্কে একটা কথা বলাই যথেষ্ট যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক বলে কোন ধারণা নাই, অনুপস্থিত। অতএব সে অবস্থায় আবার নাগরিক অধিকার বা অধিকার [Citizen’s right] বলে কোন ধারণা সেরখানে থাকার আশা করা অর্থহীন। তবে রাষ্ট্রে শ্রেণী [Class] বলে ধারণার প্রাবল্য আছে। কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে বাসিন্দারা সকলে নাগরিক এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলে সমান নাগরিক অধিকারের নাগরিক। কমিউনিজমের রাষ্ট্র চিন্তায় নাগরিক বলে ধারণাটাই নাই, তাই সমান অসমানের বালাই নাই। তবে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা শ্রেণী ধারণা আছে।  আর তাদের ওই রাষ্ট্র কেবল প্রলেতারিয়েটের পক্ষের রাষ্ট্র, এর পক্ষে সগর্ব ঘোষণা আছে। সুতরাই এখানে সমান নাগরিক, সমান অধিকারের মানুষ বা নাগরিক বলে কিছু নাই। বরং মারাত্মক অসম ক্ষমতার বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা ও অসম শ্রেণী ধারণা আছে।
    অতএব কমিউনিস্টেরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা বলে, আভ্যন্তরীণ ইস্যুর কথা তুলে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকবে বা লুকাবে স্বাভাবিক!

    কিন্তু তাই বলে কী  হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে কথা তুলে আমরা আমেরিকাকে ডেকে আনবো? হস্তক্ষেপের উসিলা করে দিব?
    সেটাও অবশ্যই না।  এককথায় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘণ বা হস্তক্ষেপ না করতে দিয়েও অধিকার দিয়ে কথা বলতে দেয়া সম্ভব ও তা যায়।  এছাড়া মনে রাখতে হবে হিউম্যান রাইট তো জাতিসংঘের ঘোষিত ম্যান্ডেট এবং ইস্যু তাই এনিয়ে জাতিসংঘের ফোরামে তো কথা উঠবেই।  আর এখানেও কোন কথা না তোলার মানে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিতরে  সরকারবিরোধী সবাইকে গুম-খুন অপহরণ বা পিটায়ে মেরে ফেললেও তা নিয়ে বাইরের কাউকে কথা বলতে না দেয়া হবে।
    আসলে মূল তর্কটা অন্যখানে, সেখানে সরাসরি যাওয়া যাক।
    আমেরিকান সরকারি ফরেন পলিসিতে, আমেরিকান সরকার যদি কোন দেশ ও সরকারের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন এর বিরুদ্ধে কথা বললে আমেরিকারর নিজের স্বার্থ আছে বলে না দেখে তবে আমেরিকা সেক্ষেত্রে নিঃশ্চুপ থাকবে। অর্থাৎ ভায়োলেশন হলেই তা নিয়ে আমেরিকা মুখ খুলবে না। যদি তাতে আমেরিকান স্বার্থও না থাকে বা আমেরিকান সরকার না দেখে।

    তাহলে কনক্লুশন কীঃ
    ওয়ান-এলেভেনের হস্তক্ষেপ এর সুবিধা  যাদের পক্ষে গেছিল স্বভাবতই তারা এই হস্তক্ষেপকে ভাল বলবে। অন্যেরা সমালোচক হবে। বর্তমানে বা আগামিতেও এই নিয়মে সব হিসাব মিলবে দেখা যাবে। এর বাইরে আপাতত কোন কমন সুত্র বা সমাধান দেখছি না।

    সবশেষে ভারত প্রসঙ্গে আরেকটা তথ্যা দেই। সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও রাহুলের মা। দলের এক শীর্ষ বা প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি মোদির দুটার্মের প্রায় দশ বছরে রাজনৈতিক অপরাধ ও অন্যায়গুলোর একটা তালিকা করেছেন। অন্যভাবে বলা যায় মোদির নাগরিক অধিকার লঙ্ঘণ-গুলোর এক গ্রহ্নিত তালিকা এটা।  সিরিয়াস ও ভাল তালিকা সন্দেহ নাই। শিরোনাম করেছেন,  “An enforced silence cannot solve India’s problems.” জবরদস্তিতে চুপ করিয়ে দেয়া ভারতের সমস্যার কোন সমাধান নয়।  কিন্তু একটা অসুবিধা হল তিনি এটা কেবল দ্যা হিন্দু পত্রিকাকে দিয়েছেন আর তারা পাঠক এটা পুরাটা পড়তে চাইলে পয়সা চাচ্ছেন। যা খুবই অন্যায়। কংগ্রেসের দিক থেকেও বড় অন্যায়।  তবে অর্ধেকটা বিনা পয়সাতে পড়া যায়।
    একটা ভিন্ন বিকল্প আছে। আরো কয়েকটা পত্রিকা এনিয়ে পর্যালোচনার ছলে প্রায় অনেকটাই ছাপিয়ে দিয়েছে, যাদের একটা হল ইন্ডিয়া টুডে – সেটা এখানে দেখা যেতে পারে।  এমন করে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা এর টা এখানে।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

     

    ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

    গৌতম দাস

    ১৮ জানুয়ারী  ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4m2

     

        What is the message Donald Lu left for Bangladesh? Daily Star

    ডোনাল্ড ল্যু ঢাকা সফর শেষে চলে যাবার পরে আমাদের সমাজের প্রায় সব কোণে বিস্তর আলাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা শুরু হয়েছে এই বলে যে হলো-টা কী বা ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়ালো – এধরণের!
    তবুও এটা এখন কমবেশি পরিস্কার – যেটা সোজাসাপ্টা বললে, ডোনাল্ড ল্যু কিছুটা  পিছু হটাছেন অথবা এক দিশা হারানো বাইডেন প্রশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এবং সেই অনুসারে তাদের এখনকার অবস্থানই যেন জানাতে এসেছিলেন।  তারা যে তাদের আগের অবস্থান থেকে অন্তত কিছুটা সরে গেছেন সেই পিছু হটা অবস্থান অনুসারে বাকি সবকিছু এডজাস্ট করে নিতে বা সে অনুযায়ী একটু ঢেলে সাজিয়ে নিতে এসেছিলেন তিনি।  যদিও মনে রাখতে হবে এই “পিছু হটা’ – এটা সাময়িক হতে বাধ্য! আমার বিচারে এটা স্থায়ী অবস্থা হবে না, বরং সাময়িক হতে বাধ্য।  মানে বলতে চাচ্ছি ল্যু ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা তাদের এই পিছু হটা অবস্থানও ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে; ফলে আবার আগের জায়গায় যেতে তাদের চেষ্টা করতে হবে! এজন্যই এটাকে ‘সাময়িক’ বলছি। কিন্তু এখন অবশ্যই এটা কিছুটা হলেও পিছু হটা !

    কথাটা সম্ভবত আরেকভাবে বলা যায়। যদি অনুমান করে নেয়া যায়, বাইডেন প্রশাসনের ভিতরে দুটা ধারা আছে বা হয়ে গেছে।  যার একটা ধারা যেটাকে আমরা এতদিন একমাত্র জ্ঞান করেই এসেছি সেটা হলঃ বাইডেন প্রশাসন ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এই অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে আর এভাবেই এশিয়ায় চীনবিরোধি আমেরিকান স্বার্থগুলো ভাল আদায় হবে বলে এতদিন মনে করে এসেছে এরা। এই ধারারই বাংলাদেশে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের গুম-খুন-অপহরণ-গায়েবের যেসব ভিকটিম আছে তাদের সাথে দেখা করার প্রোগ্রামে শাহীনবাগে যাওয়া। আর তা থেকেই হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সরাসরি কিছুটা সংঘাতময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

    অন্যদিকে, প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারাকে চিনাতে বলা যায়, এরা মনে করে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে হাসিনা সরকারের উতখাতের ঝামেলায় যাবার দরকার নাই। অন্যভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে…।

    সেক্ষেত্রে তাহলে জানতে হবে বা শুরু করতে হবে যে তাহলে বাইডেনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখান থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এমন চিন্তা করা বা পিছু হটার কথা সহজেই  বলতে পারছে কেন? আর কীইবা সেই উদ্দদেশ্য??
    বাইডেন প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে “মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা’ একেবারেই নয়। বরং সে জায়গায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘বার্মা দখল’! কিন্তু  সেক্ষেত্রে  ‘বার্মা দখল’ করতে চাইলে হাসিনা উতখাতের দায় সাথে নিয়ে আগানো কেন? সেকথায় পরে আসছি।

    আসলে প্রথম ধারার পথে চলতে গিয়ে এটা এখন অনুমানে বলাই যায় যে বাইডেনের আমেরিকার নিজ ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজি” ধরে আগাতে গিয়ে এমনভাবে হাসিনা সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে যাবে এটা তাদের কল্পনায় ছিল না। আগের দিনের মত সবই চুপচাপ পাড়িয়ে যেতে পারবে! কারণ, বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হবার পর থেকে প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল – সেই অভ্যাস মতে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকান প্রভাবে তারা যা করতে চেয়েছে মোটামুটি তাই হয়েছে ও পেয়েছে।

    কিন্তু বারে বারে বলেছি এটা “পালা-বদলের কাল” যখন আমেরিকাকে চীনা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতায় মোকাবিলা করতে হবেই ও হচ্ছে। পালা-বদল” মানে যেটা গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব বদলের এটা সময়কাল। যেটাকে অনেকেই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারে না অক্ষম বলে তারা তাদের চিন্তার অসক্ষমতা, দুর্বলতা ঢাকতে “ভূরাজনীতিক” বলে একটা আবছা অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে নিজের অস্পষ্ট চিন্তার প্রকাশ ঘটায়ে থাকে। এই পালাবদলে “ভূ-” বা কোন দেশের বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” জন্য এসব ঘটছে তা একেবারেই নয়; তা ভাবার কোন সুযোগও নাই। ভুরাজনীতি শব্দটার ব্যবহার ও আবির্ভাব প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে তবে এর শেষের দিকে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল ১৯৪৪-৫ সালে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও উত্থান ঘটে যাবার পরে  মানে এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও উদিত প্রভাবের পরে  ‘ভুরাজনীতি’ শব্দটা সেবার হারিয়েই যায়। এর মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কেন আমেরিকা এর একছত্র নেতা হিশাবে উঠে আসবে আর এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়া এক গ্লোবাল অর্ডার [new Global Order] বা বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা চালু হবে সেটা কোন দেশেরই বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” কারণে-পরিণতিতে এমনটা  ঘটে নাই। সে জন্য যারাই এই তিন প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও এদের সেকাল থেকে নয়া ভুমিকা ও তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে অপারগ তারাই geo- বা ভ্যু- বলে একটা পরাজিত ধারণাকে ধুয়ে মুছে আবার একালে খাড়া করে নিজেদের অকর্মণ্যতা আড়াল করে থাকে।

    তবে এখন যেটাকে পালাবদল  বলছি এতেও এমন অনুমান ভুল হবে যে, এতে আমেরিকা যেভাবে সেকালে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল চীনও একইভাবে একই ধরণের নেতা হবে। এই অনুমান অতি সরলিকরণও হবে। তাই সাবধান থাকতে হবে। তবে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক যে বিশ্ব ব্যবস্থা তখন জন্ম নিয়েছিল ও এখনও ধুকে হলেও চলছে – এখন পালাবদলে যেটা কেবল আমেরিকার জায়গায় চীনা নেতৃত্ব হয়ে যাবে এমনটা হল এক কপি-পেস্ট ধারণা। দুনিয়ায় কোন ঘটনাই একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ঘটে না। যদিও জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত আবার পুনর্গঠিত হবেই।

    আবার, এসব পালাবদল প্রসঙ্গে খোদ আমেরিকানদের কোন স্টাডি নাই বা ফেনোমেনাটা জানা নাই তা একেবারেই নয়। তবু তারা যেন নানার আমলে খাঁটি ঘি খাবার অভ্যাসে এখনও সহজেই আগের মতই তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করে ও ফেল মারতে থাকবে। কারণ পরিস্থিতি যে আর আগের মত একই রকম নাই তাই তারা সময়ে ভুলে যায়। আর বার বার পরাজিত হয়। এধরণের উদাহরণের অভাব নাই। যেমন ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটা ঘটনা। সে সময় আমেরিকা-বিশ্বব্যাংকের আগ্রহে তারা হাসিনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা। এই দুর্নীতির মামলা সত্যি হোক বা না হোক, এটা মনে করা ভুল হবে না যে এমন মামলা করার পিছনের তাদের অপর উদ্দেশ্যের দিক ছিল। সম্ভবত তা হল, যাতে আরো ভাল করে আমেরিকার অধীনস্ততায় আনা যায় যাতে হাসিনা আরো অনুগত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আমেরিকান বেকুবিটা হল দুর্নীতি মামলাটা যখন আনলই তখন কয়েক বছর পরেই আবার শেষে আদালত থেকে ঐ মামলাটাই বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কেন? অথচ তাতে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নয়া এক হারুপার্টিতে পরিণতি পেল!  সেটা কিভাবে?

    বিশ্বব্যাংক মানে হল নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে কম সুদে যে ঋণদাতা – তা ছোট বড় সব প্রকল্পে সে এমন ঋণ দিয়ে থাকে। আর এথেকেই “পড়ে পাওয়া বাড়তি চার আনার মত ঘটনাটা হল – আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বেড়ে যাওয়া।
    তাহলে দুর্নীতির মামলা এনে পরে পিছু হটে যাওয়ার আমেরিকানদের পরিণতি কী হয়েছিল? হয়েছিল এই যে নয়া ঋণদাতা উতস হিশাবে ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণদাতা’ হতে অপেক্ষা করছিল চীন বা প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চেয়ে অপেক্ষা করা চীন এই ফাঁকে সে বাংলাদেশে প্রবেশ ও নিজের হাজিরা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। যেটা এরপর হাসিনার চীন-সফর আর পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট  সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর শেষে ২০ বিলিয়ন ডলারের অধিক (যেটা পরে ঠেকেছিল ২৬ বিলিয়নে) প্রকল্পের বন্যা বাংলাদেশে বয়ে গেছিল।

    তাহলে চীনকে অবকাঠামো ঋণদাতা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে রাস্তা করে দিয়েছিল কে??? এটাই আমেরিকান বেকুবি!!   অথচ ঋণদাতা মানেই ওর ঋণগ্রহিতা দেশের উপর দাতার প্রভাব হাজির হওয়া বা বেড়ে যাওয়া। অনেকে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বলতে পরাশক্তির ‘সামরিক ক্ষমতা’ বলে বুঝে থাকে। এটা ভুল মিথ্যা। গ্লোবাল নেতা দেশের প্রভাব-আধিপত্য বলতে সেটা প্রধাণত নেতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানে যেমন তার ব্যাপক ‘ঋণদানের সক্ষমতা’ একেই বুঝায়।  তাহলে দাড়ালো যে আমেরিকা সেই বার নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল আর তাতে চীন উত্থান বা চীনা প্রভাব কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এবারও দ্বিতীয়বারও এমন কিছু একটা ঘটতে পারে সে ইঙ্গিত ফুটে উঠছে!!

    এবার বাইডেন প্রশাসন শপথ নিবার পর থেকে আমরা দেখছি তিনি আরেক “বাংলাদেশ প্রকল্প” খুলতে চাচ্ছেন – যেটাকে আমরা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প বলে চিনাতে পারি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ অবস্থায় উঠেছে এব্যাপারে সন্দেহ নাই।  কিন্তু প্রশ্ন হল বাইডেন কী আসলেই বাংলাদেশের মানবাধিকার চরম লঙ্ঘণ নিয়ে উদ্বিঘ্ন? মিন করেন? ঠিক তাই বুঝাতে চান???

    না একেবারেই না। তা সরাসরিই বলা যায়। যেমন এবার বাংলাদেশের বা হাসিনার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার পিছনে আমেরিকার দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি উদ্দেশ্যটা কী সেদিকে মনোযোগ দেই।  বাইডেনের আরেক উদ্দেশ্য বা মুল উদ্দেশ্য ছিল ও এখনও আছে – তা হল ‘বার্মা দখল”। এটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এটাকে পরোক্ষে বা পিছনে লুকিয়ে রেখে বাইরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্যটা বাইডেন মিথ্যা করে জানিয়ে চলছিলেন যে বাংলাদেশের হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য। আবার হাসিনার গুম-খুন-অপহরণ উঠায়ে নেয়া- ক্রসফায়ার ইত্যাদিতে মহামারি লাগিয়ে দেয়া এগুলোও বাস্তব ও সত্য। অর্থাৎ বাইডেনের “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প তো বাস্তবতার উপরেই দাঁড়ানো। হা অবশ্যই তাও সত্য । কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন গত পনেরো বছরের যেগুলো হাসিনা গুম-খুনের মহামারি হয়ে চলছিল তা তো আমেরিকা অজানা ছিল না। তবুও তখন কোন আমেরিকান প্রশাসন এদিকে মনোযোগ দেয় নাই – আসে নাই বা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিয়ে তাদের কোন কথা ছিল না কেন? যেটা আসলে অন্ধ ও নিশ্চুপ হয়ে পরোক্ষে হাসিনাকে সমর্থন দেয়া – তা করে গেছিল কেন? এর জবাব মিলে না!  কবি নীরব এখানে!
    এর জবাব হল, ডোনাল্ড ল্যু যতই বলুক যে আমেরিকার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্টে [1st amendment of US constitution, 1791] যে পাঁচ মৌলিক অধিকারের কথা দেয়া বা বলা আছে এনিয়ে আমেরিকা দেশে দেশে কথা বলবেই – সেকথা সবটা সত্যি না। সত্যিটা হল, ঐ পাঁচ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ হলেই হবে না সাথে ঐ লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে তখনই প্রশাসন কিছু বলবার পক্ষ নিবে যখন আমেরিকান রাষ্ট্র নিজের গভীর স্বার্থ ওর মধ্যে দেখবে বা থাকতে হবে তবেই আমেরিকা আগাবে এবং “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আগাবে।  আর আমেরিকান রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থগুলোকে আড়ালে ও পরোক্ষে রেখে দিবে। তাহল বাংলাদেশেও  হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড নিয়ে এগিয়ে আসার পিছনের আমেরিকান গভীর স্বার্থটা কী?

    গোড়ার স্বার্থ আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতেঃ
    হা, আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতে আর এটাই তার গোড়ার গভীর স্বার্থ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশকে জড়ানো কেন? বা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা পর্যন্ত উঁকি মারা কেন? কী দরকারে?

    আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো।

    কিন্তু বার্মা দখল মানে তো নুন্যতম একটা সেনা সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপার। হা তাই। তবে দখল কাজটা কম পয়সা খরচে, নিজ সেনা কম করে জড়িয়ে ও আয়েসে এই দখল ঘটাতে গেলে আমেরিকান স্টাইলটা হল, নিজ দেশের “এরিয়াল সাপোর্ট”[aerial support] দেয়া আর এই ছায়ায় সম্ভাব্য কোন দেশের (বাংলাদেশের!) একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল নেয়া।  তাই হাসিনাকে সরানো দরকার – এইছিল এতদিনের বাইডেনের গৃহিত লাইন এবং মূল স্বার্থ। কারণ তাহলে  সহজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সময়ের পদাতিক বাহিনীকে দিয়ে বার্মা দখল সহজ!  যেটা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে বাইডেন সেরে ফেলতে চেয়েছিল।

    এরিয়াল সাপোর্ট মানে কী?
    আরেক ভাষায় বললে এর অর্থ বার্মার নিজের আকাশ সীমানার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সেটা এই বলে যে, বার্মিজ বিমান বাহিনী যেন কোন উড়া-নড়াচড়া না করতে পারে এই মর্মে বার্মিজ বিমান বাহিনীর উপর এক  ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে দেয়া। সেটা আবার কী? মানে হল, বার্মার আকাশ-সীমার উপর আমেরিকার ‘নো ফ্লাই জোন’ঘোষণা বা দাবি জানিয়ে দেয়া।  আর তাতে এরপরে বার্মীজ কোন আকাশযান মানে কোন সামরিক-এয়ারফোর্স সক্ষমতা যাই থাক – বার্মার কোন হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান বার্মার নিজ আকাশের উপর দিয়ে উড়তে চাইলেও সেই বিমানের উপর আমেরিকান কোন জেট সেটার উপর বোমা ফেলে  গুড়িয়ে দিবে এই হুশিয়ারি আগাম দিয়ে রাখা।

    এতে সুবিধা হল, যেহেতু বিমান সক্ষমতা বার্মার থাকলেও সে ব্যবহার করতে পারবে না বা করলে তা মোকাবিলা করবে কোন আমেরিকান জেট ফলে সেই আড়ালে একেবারে সহজেই কেবল একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল করে নেয়া সহজ। এই কারণে “বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনীই” বাইডেনের আকাঙ্খা ও মূল কাম্য এবং টার্গেট। আর সে প্রয়োজনেই মূলত হাসিনার অপসারণ বা না-অপসারণের ‘এদুই লাইনের’ মাঝে দোল খাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

    আর বরং হাসিনাই যদি বাইডেনের বার্মা দখল আকাঙ্খায় পদাতিক বাহিনী সরবরাহকারি হিশাবে সামিল হতে রাজি হয়ে যায়??? এরাই হল সেকেন্ড অপিনিয়নধারী!!!! বা দ্বিতীয় ধারা!
    কিন্তু “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এর আড়ালে তো বাইডেন ভালই আগাচ্ছিল, এখন নয়া এপথের উত্থান হল কেন? দুইটা কারণে।

    কী সেই দুই কারণঃ
    এক. মূলত বার্মা দখলের আমেরিকার এই আকাঙ্খাটাই অবাস্তব। মনে হচ্ছে এনিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক আগে করে নেওয়ার দিক থেকে আমেরিকার ঘাটতি আছে!  যেমন যেটা আমেরিকার প্রাথমিক অনুমান যে সরাসরি “বার্মা দখল” এই ভাষায় না বলে ‘আরাকান ভুখন্ড’ দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া – এমন মানে জুড়ে দিয়ে কথাটা তারা বাংলাদেশকে বলতে চেয়েছিল। মনে করেছিল – এভাবে বললে নিশ্চয় বাংলাদেশ খুব খুশি হয়ে সামিল হতে চাইবে! বা পদাতিক বাহিনী নিয়ে সামিল হবে!!!  সেই কূটচাল এই হাসিনাই বহু আগেই (২০১৯ সালেই) প্রত্যাখান করে দিয়েছিলেন খুবই সঠিক ও কঠোর ভাষায়।
    কারণ কোন দেশের ভুখন্ড আমেরিকা অপর দেশের সাথে জুড়ে দিবার ক্ষেত্রে কে??  কেউই নয়! আমেরিকার কোন এক্তিয়ারই নাই। কোন দেশই একাজ করতে পারে না, ক্ষমতা রাখে না। জাতিসংঘের চোখে এটা গর্হিত ও অপরাধ্মূলক কাজ।

    একারণেই বার্মার ক্ষমতাসীন জেনারেলদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আড়ালে আমেরিকা আমাদেরকে বলতে চায় এতে আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা মিটিবে বলে আমেরিকার ধারণা আমরা খুশি হব এতে। অথচ এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও ২০১৯ সালে হাসিনার এই আমেরিকান প্রস্তাব প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে  মুল চালিকা ছিল চীনের এব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া; শুধু তাই না ভারতও আমেরিকার এই খায়েশের বিরুদ্ধে ছিল। ওদিকে আমেরিকানদের ধারনা তারা বার্মার দখল নিয়ে কোন এক পছন্দের জেনারেলকে বা সুচি-কে বসিয়ে নয়া বার্মা সরকার চালু করতে পারলে সেটা এক প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকারই হবে! কিন্তু বলাই বাহুল্য ঠিক এই দিকটার কারণের ভারত ও চীন ঘোরতরভাবেই এই ইস্যুতে আমেরিকার চরমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। বার্মাদেশের সাথে চীন ও ভারতের লম্বা সীমান্ত আছে তাই এদুই দেশ কিছুতেই বার্মায় এক  প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকার দেখতে চাইতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক!

    শুধু তাই না বাইডেন এমন এক সময়য়ে তার বার্মা দখলের খায়েশের পিছনে ছুটছে যখন আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে শুধু চীন-ভারতই না রাশিয়াও (ইউক্রেন যুদ্ধের পুটভুমিতে) খুবই সবল বিরোধীতা করতে আসবে। গত ২০১৯ সালের দিকে পরিস্থিতি ছিল একরকম কিন্তু এখনকার পটভুমিতে আমেরিকান নো ফ্লাই ছত্রছায়ায় যেকোন দেশের পদাতিক বাহিনী সীমানা অতিক্রম করে বার্মায় প্রবেশ মানে সেটা এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত যুদ্ধের ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হবে; বলে আমেরিকা এতই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
    মানে হল, আমেরিকার বার্মা দখলের উদ্দেশ্য হল চীনকে দুর্বল করা, চীনের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলা মত কাজ। অথচ এখন এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মাত্রই চীন দুর্বল হবার পরিবর্তে উলটা আমেরিকার তিন শত্রুদেশ (চীন-ভারত-রাশিয়া) একজোট হয়ে যাবে। একেবারে হিতে-বিপরীত অবস্থা। একারণের পিটার হাসের শাহীনবাগ ততপরতায় কিছুটা বাধা পেয়ে আমেরিকান প্রশাসন আভ্যন্তরীণ রিভিউয়ে বসলে সেই উসিলায় প্রশাসনের এসব দুর্বলতার দিক সামনে চলে এসেছিল বলে অনুমান করা যায়। আর তাতেই এই ডামাডোলে দ্বিতীয় ধারা যারা হাসিনাকে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অপসারণের পক্ষে কাজ করতে চায় না – এই ধারা উপরে উঠে বা সামনে চলে আসে।

    পরে তাদের প্রস্তাব হল, তাহলে বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো।  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে।

    আদর্শ উদাহরণ মাইকেল কুগেলম্যানঃ
    এই প্রসঙ্গে আগ্রহিরা কুগেলম্যানের লেখা ও আরেক সাক্ষাতকার পড়ে দেখতে পারেন।  মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] হচ্ছেন মূলত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের [WILSON Centre] ফেলো। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর। কিন্তু অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কের চেয়ে এই সেন্টারের ফারাক হল এই প্রতিষ্ঠানটা সেমি-গভর্মেন্ট। মানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফান্ড সরকারের দেয়া। এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের অনেক কথা বলার সুযোগ বা পছন্দ প্রকাশের সুযোগ আছে। ফলে কুগেলম্যান-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার পরে পরেই; আর তা এই চিন্তা করে যে কুগেলম্যান সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাইডেনের চোখের দেখে তাঁর অবজারভেশন ফরেন পলিসি [Foreign Policy] পত্রিকায় নিয়মিত লিখবেন। যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক ভাল ফিডব্যাক। এককথায় কুগেলম্যান অনেক বেশি বাইডেন প্রশাসন ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এখন আসল কথাটা হল যে কুগেলম্যান গত তিনমাসের বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নাখোস! বিএনপির জনসমাবেশকে তাই তিনি লাখে নয় হাজারে গুনে বলা উচিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আসলে প্রায় একজন – বাইডেনের ওবায়দুল কাদের। মানে হাসিনার জন্য একটা ওবায়দুল কাদের অবশ্যই সামঞ্জ্যপুর্ণ যেটা বাইডেনের জন্য বা এক্ষেত্রে একটা ভাঁড় অবশ্যই। তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are people who see reasons to support it. বাংলাদেশে এই লেখা ইংলিশ এবং বাংলায় ছাপা হয়েছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

    তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে,
    ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are

    people who see reasons to support it.।

    কুগেলম্যান এর এই অবস্থান এটাই বাইডেন প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারা। এটা প্রমাণ করে “মানবাধিকার” বাইডেনের ইস্যুই না; এটা কেবল  হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটাকে পুঁজি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা বাইডেনের লক্ষ্য।

     


    তাহলে  আইলিন লা বাকারকে পাঠিয়ে তাদের কী লাভ বা অগ্রগতি হলঃ

    মূলত তিনি এসেছিলেন দুটা সমর বিষয়ক চুক্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা যায় কিনা, তা দেখতে। নাম হিশাবে এরা হল General Security of Military Information Agreement (GSOMIA) and the Acquisition Cross-Servicing Agreement (ACSA)। তবে প্রথমটার ব্যাপারে আমেরিকা খুবই আগ্রহি, এটা সামরিক তথ্য সুরক্ষা ও শেয়ার বিষয়ক। যেটা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে এর আগেও বাংলাদেশের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। আর এবার এনিয়ে আলোচনার ফাঁকে হাসিনা সরকার বার্মায় পদাতিক বাহিনী পাঠানোতে আগ্রহি হতে পারে কিনা সে চেষ্টাও বাজিয়ে দেখা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    আবার অনুমান করা হয় যে এই একই অনুমানের কারণেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভোর রাতে এসে হাজির  হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় যে সরকার চীনের সাথে কোন প্রতিশ্রুতিতে যায় নাই। এতে বলা যায় অসন্তুষ্ট হয়েই চীনা মন্ত্রী মাত্র আধাঘন্টা মিটিং করে ঐ রাতেই চলে যান। কিন্তু এর মানে আবার আমাদের সরকার আইলিন লা বাকার-কেও কোনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা করেছেন তাও না। কিন্তু তাতে পুরা আসরের সব পক্ষগুলো পরস্পরের প্রতি পরস্পর সন্দেহ করে গেছেন, তা এড়ানো যায় নাই।
    বাংলাদেশের যেকোন রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ তাতে সে সরকার বা বিরোধী যাই হোক এদের সবার জন্য যেটা নো-গো এরিয়া [no-go area] তা হল, সামরিকভাবে কোন দেশের পক্ষে বা বিপক্ষের সাথেই না জড়ানো; এটা করাই যাবে না। এমন ভিমরতি যেন কাউকে না ধরে। আর একটা দিক হচ্ছে চীন ও আমেরিকা প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্যাচালে আমাদের (লীগ বা বিএনপি) কোন দলই যেন এদুই দেশের মধ্যে একেকটা দেশের পক্ষে একেকটা দল তাদের এজেন্ট এর ভুমিকা না নিয়ে বসে। যেমন লীগ যদি এই সীমারেখা না মেনে আমেরিকার এজেন্ট হয়ে বসে তবে সিওর বিএনপি তখন চীনের এজেন্ট হয়ে বসবে – অথবা ঠিক এর উলটা বা ভাইস-ভারসা! তাই সীমারেখা লঙ্ঘনের পরিণতি কী হবে তা সবার আগে থেকে জানা থাকতে হবে; কেউ যেন না বলে আমি আগে বুঝি নাই। এই সুযোগ নাই।  আজকের শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ক্ষমতায় থাকার লোভে তারা এই সীমারেখা ভেঙ্গে এখন পস্তাচ্ছে! এই সীমা ভাঙ্গার কাজ করা যাবে না।

    তাহলে ডোনাল্ড ল্যু এর ভারত সফরের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    আসলে পিটার হাসের শাহীনভাগ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর  পরে হোয়াইট হাউজের রিভিউ মিটিংয় থেকে সবাই বুঝে যায় বার্মা দখল বা হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ততপরতার কথা তাদের যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেভাবে আগায় নাই। মূল কারণ, বার্মা দখল এর চিন্তাটাই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে করা হয় নাই। তাই বার্মা দখলের খায়েসে তা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এক মোক্ষম জবাব হবার পরিবর্তে তা উলটা হয়ে গেছে; তা হয়ে গেছে আমেরিকার তিন শত্রু চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছাকাছি ঘনিষ্ঠতায় এনে দেওয়া। যা বার্মা দখল নিয়ে ফারদার চিন্তা পরিকল্পনাটাকে অসম্ভব, অকেজো করে তুলেছে।
    এই কারণে,  ডোনাল্ড ল্যু ভারত এসেছিলেন ভারতকে ঐ ‘ঘনিষ্ঠতা’ থেকে আলাদা করা যায় কিনা তা যাচাই করতে। ডোনাল্ড ল্যু এর সাথে NDTV এর এক সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে ল্যু ব্যাখ্যা করছিলেন তার সফরে আসার কারণ ও কী তিনি ভারতকে অফার করতে চান।
    বুশ ২০০৬ সালের মার্চে প্রথম ভারত সফরে এসেছিলেন। গত ২০০১ সাল থেকে ওয়ার অন টেররের প্রধান এলায়েন্স পার্টনার হিশাবে ভারতকে আরও কাছে টেনে চীনের উত্থান ঠেকানোর কাজে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চাওয়ার খায়েস থেকে। তখন থেকে বুশ অফার করেছিলেন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার জিএসপি এক্সপোর্ট সুবিধা ভারত পাবে তাতে। যে সুবিধাটা ট্রাম্পের আমলে ২০১৭ সাল থেকে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরই এক্সটেনডেড অংশ হল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকেও   ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  ল্যু বলছিলেন আগের দেয়া ঐ এক্সপোর্ট সুবিধা আবার ভাববার কথা। ল্যু এর কথাবলার স্টাইলও ছিল এপিজিং [appeasing] বা তেলানোর…। ওদিকে ল্যু এর সারকথা ছিল ভারত যদি আমেরিকার বার্মা দখলে আমেরিকার পক্ষে থাকে তাহলে সে কৃতার্থ হয়……।

    এনিয়ে সুবীর ভৌমিক কী বলেছেনঃ
    সেকথারই আরো বিস্তার পাওয়া গেছে সুবীর ভৌমিকের লেখায়। বলা যায় এই লেখায় সুবীর আমাদের অনুমানগুলোকেই যেন বাস্তবতা দিয়েছে।
    উপরে বার্মা দখল প্রশ্নে বাইডেনের যে এরিয়াল সাপোর্টের কথা বা নো ফ্লাই জোন বানানোর কথা বলেছিলাম,  সুবীরও সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সুবীরের লেখার শিরোনাম – “ আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারত সামিল হবে” [Will US do a Bosnia on Myanmar? No-fly-zone move may involve India]? ক্লিনটনের আমলে বসনিয়াকে রক্ষার জন্য তিনি বসনিয়ার আকাশের উপর এমন “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা করেছিলেন। বাবা অথবা সিনিয়র বুশ এবং ক্লিনটনও ততকালীন সাদ্দামের ইরাকের উপরে “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা দিয়ে সাদ্দামকে অকেজো করে দিয়েছিলেন।  তো বুঝা যাচ্ছে যে ল্যু এর ভারত সফরের উদ্দেশ্য হল, ভারতকে নো ফ্লাই জোন আরোপে আমেরিকার সাথে সামিল করে বার্মা দখল পরিকল্পনায় সম্ভাব্য জোটবদ্ধ করে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই। যাতে “চীন-রাশিয়া-ভারত” এই জোট থেকে ভারতকে আলাদা করার চেষ্টা করে দেখা যায়। যদিও দিনকে দিন এটা পরিস্কার হচ্ছে যে বার্মা দখল পরিকল্পনা নিয়ে দুর্বল হোমওয়ার্কের কারণে এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা পরিত্যক্ত হবার দিকে আগাচ্ছে!

    যদিও ভারতীয়দের মধ্যে এমন ধরণের একটা ভ্যানিটি ভেসে থাকতে দেখা যায় যেন লেখক (সুবীর) বলছে চান যে “দেখেছো চীন-আমেরিকার আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়িয়ে আমার দাম কত উপরে উঠেছে?” – সুবীরের আলোচ্য লেখাটাও আসলে এদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। আসলে ভারতের ইন্টেলেক্ট বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই বলে একটা ভাবনা কার্যকর থাকতে দেখা যায় যে সে আর চীন বা আমেরিকা কোন একটার পক্ষে সহসা ঝুকবে না। কেবল নিজের দাম বাড়িয়েই চলবে যাতে এক পর্যায়ে এই উত্থিত দামকে ব্যবহার করে সে চীন-আমেরিকারও উপরে উঠে যেতে পারে!! এমন ভাবনার বিষয়টা অবশ্যই আবেগে টইটম্বুর বা স্বপ্নে পোলাও খাওয়ার মত, বিশেষত যখন আমার জানাই নাই যে পোলাও কী করে পেতে হয়, রান্না করতে হয় ইত্যাদি। গত ২০১৩ সালে চীনা বেল্টরোড উদ্যোগ প্ররকল্পের প্রথম সম্মেলনের সময়ে ভারতকে চীনা দাওয়াত দেওয়ার পরে ভারত এভাবে বলেই তা প্রত্যাখান করেছিল।

    তবে সেসব যাই হোক ভারত এখন একালে বাইডেন আর পুতিনের তুলনায় অনেক বেশি পুতিনের দিকে থাকতে মন বেধে ফেলেছে। যদিও মুখে বলছে রাশিয়ার উপরে ভারতের গোলাবারুদে ৬০% নির্ভরশীলতার কারণে সে এই পথ সে নিয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার সস্তা তেলের সরবরাহ পাওয়া এর পিছনের কারণ। এমন কী তৃতীয় দেশে তা পাচার করার সুবিধাও ভারত পাচ্ছে। যেমন খোদ বৃটেনের ঋষি সুনাক তিনিও গোপনে রাশিয়ার তেল কিনছে ভারতের মাধ্যমে। আসলে খারাপ গ্লোবাল অর্থনীতি অ এতে ধস নামার সময়ে সস্তায় রাশিয়ান তেল পাওয়াকে সকলেই বিশাল রিলিফ বলে গণ্য করছে!! আর সাধারণভাবে ভারত আবার  আমেরিকার ঘনিষ্ট হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত ভারত তলে রেখেছে – ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের পরে, দেখে শুনে তখন তারা সিদ্ধান্ত নিবে!

    সবশেষে বলি, লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই সংক্ষেপে।
    তাহলে কী ল্যু এর পিছু হটা বা  বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকার হাসিনাকে টলাতে ফেল করার পর ল্যু যা প্রলেপ দিয়ে গেলেন যেটাকে অনেকেরই কল্পনায় ধরা আছে দেখা যাচ্ছে। যে কল্পিত  হাসিনা ও ল্যু এর মধ্যে কোন রফা হোক আর নাই হোক আর তাতে আমেরিকার সাথে বিএনপির সম্পর্কের মধ্যে এখন কোন দুরত্ব বোধ আমরা কেউ দেখতে পাই আর নাই পাই  – আগামিতে সম্ভবত মাস খানেকের মধ্যে ল্যু বা বাইডেন প্রশাসনে আবার পল্টি আসবে। প্রথম ধারা আবার জেগে উঠার সম্ভাবনাই বেশি নানান কারণে।  মানে মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে নিয়ে আগের মতই বাইডেন প্রশাসন আবার স্পষ্ট করে সোচ্চার হবে, এমন অনুমান করছেন অনেকেই!!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকালঃ ০৭ঃ৩০

     

  • মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    গৌতম দাস

    ২৪ অক্টোবর ২০২২  ০০ঃ০৬ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-4gr

     

          ..condemning hate speech unequivocally: U.N. Secretary-General António Guterres

    ‘ইউনাইটেড নেশনস’[United Nations] শব্দটার বাংলা হিসাবে ‘জাতিসংঘ’ শব্দটার ব্যবহার সম্ভবত বেশিরভাগ বাঙালি করে থাকেন। তবে কলকাতার আনন্দবাজার অনুবাদ করে ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ’ লিখে থাকে।  আনন্দবাজারের বেশির ভাগ ততপরতা অপছন্দের হলেও এই অনুবাদটা বেশি সঠিক ও অনেক অর্থপুর্ণ। কারণ ‘জাতি’ শব্দ ও ধারণা-টা মানে কোনভাবেই তা রাষ্ট্র নয়; যদিও না জেনে আমরা অনেকেই এই ভুল করে থাকি। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জ (বা জাতিসংঘ) – এই প্রতিষ্ঠানই জন্মের সময় থেকে নিজেকে ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আসছে। তবে এর স্বপক্ষে একটাই সাফাই-যুক্তি এবং তা খুবই দুর্বল সেই যুক্তিটা হল – সেসময় বেশির ভাগ রাষ্ট্র মানে মর্ডার্ণ রাষ্ট্র বলতে সেটা এক ‘জাতিরাষ্ট্র’ বা Nation State ধারণা বলে বুঝবার প্রাবল্য ছিল। যেটা পরের আট বছরের মধ্যে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের বেশির ভাগ রাষ্ট্র এই ভুল সংশোধন করে নিয়েছিল। যার পর থেকে ইউরোপের অন্তত ৪৬ টা রাষ্ট্র  আর নেশন স্টেট নয়, অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র হয়ে যায়। [ এনিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন কাউন্সিল অফ ইউরোপ [COE]।   রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল হলেন আন্তোনিও গুতেরেস (Antonio Guterres)। এই সেক্রেটারি জেনারেল-ই হলেন রাষ্ট্রপুঞ্জ-এর সর্বোচ্চ নির্বাহি প্রধান।

    এখন আজকের প্রসঙ্গে আসি। ঘটনা হল, ভারত বিশেষ করে এর প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্ভবত আর কোনদিন যাতে গুতেরেস ভারত সফরে না আসতে পারেন এর সব বন্দোবস্ত করবেন; তা অবশ্যই নিশ্চিত করবেন! কেন?
    গুতেরেস ভারত সফরে এসেছিলেন গত বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর সরকারি আমন্ত্রণে। গত ২০০৮ সালের ভারতের ভাষ্যমতে মুম্বাইয়ে “টেররিস্ট আক্রমণের বার্ষিকী” পালনের অনুষ্ঠানে, ঐ হামলার আহত-নিহতের প্রতিশ্রদ্ধা জানাতে। আর ঐ হামলা ছিল কাশ্মীর-কেন্দ্রিক কিছু সশস্ত্র প্রতিবাদী গ্রুপের যারা পাকিস্তান থেকে ভারতের মুম্বাইয়ে এসে ২০০৮ সালে “তাজমহল প্যালেস হোটেল” দখল করে ঐ হামলা চালিয়েছিল।

    তবে এবার, মোদি সম্ভবত চেয়েছিলেন গুতেরেসের এই সফর থেকে তিনি গ্লোবাল মিডিয়া মনোযোগ হাসিল করতে পারবেন যাতে তিনি ভারত সরকারের কাশ্মীর নির্যাতন নিপীড়ন দমনের অভিযোগ আড়াল করে এর উপরে বা বিরুদ্ধে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রসবাদী আক্রমণের কথা তুলে সেটা ঢেকে ফেলতে বা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিপীড়ন-কে জায়েজ করতে পারবেন।
    নেহেরুর আমল থেকে ভারত চেষ্টা করে যাচ্ছে এটা দেখাতে যে ভারতের কাশ্মীরের সমস্যা যেনবা কাশ্মীরীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে হাজির হয়েছে। এটা যেন এক “সন্ত্রাসবাদি” সমস্যা! এবং তা যেন সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছে! অথচ এটা শতভাগ মিথ্যা। ভারতের কাশ্মীরে সশস্ত্র ততপরতার শুরু ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের রাজ্য নির্বাচনে কেন্দ্রসরকারের ব্যাপক কারচুপির ঘটনা থেকে। কারণ ঐ কারচুপির পরে ক্ষুব্ধ ও হতাশায় পড়া কাশ্মীরীদের প্রতিক্রিয়া থেকে তারা সশস্ত্র ততপরতার দিকে ঝুঁকে যায়; আপন করে নেয়। অর্থাৎ (১৯৪৭ সালের পর থেকে) ১৯৮৭ সালের আগে পর্যন্ত এর আগে ভারতের কাশ্মীরে যত বিবাদ বা ক্ষোভই থাক না কেন; সেখানে একটা রাজ্য-নির্বাচনী ব্যবস্থাই চালু ছিল আর এই নিরস্ত্র ব্যবস্থাটাই ছিল ক্ষুব্ধ কাশ্মীরীদের প্রধান রাজনৈতিক ততপরতা। সারকথায়, ভারত সরকারই রাজ্য নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপি করে ফলাফল উলটে দিয়ে কাশ্মীরীদেরকে সশস্ত্রতার পথে ঠেলে দিয়েছিল।

    মোদি ভেবেছিলেন এবার গুতেরেসকে অতিথি করে এনে তিনি কথিত সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে জনমত যোগাড় করে নিজ আকামের পক্ষে মিডিয়া মাইলেজ যোগাড় করে নিবেন। কিন্তু এখন ফল হয়েছে উলটা। মোদি ও তাঁর সরকার আত্মঘাতি গোল খেয়ে গেছেন। কারণ,  গুতেরেস উলটা মোদি সরকারের হিউমান রাইট লঙ্ঘণ ও মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন বৈষম্যের কথা তুলে বক্তৃতা করেছেন আর  মোদি সরকারকে তা সংশোধনের আহবান রেখে গেছিল। তবে এই আহবান তিনি মূল অনুষ্ঠানে নয় বরং পরে, মুম্বাইয়েরই আরেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
    সেখানে, একাজে তিনি শব্দ হিসাবে ব্যবহার করেছেন ডাইভারসিটি [Diversity] ও প্লুরালিজম [Pluralism] । মানে গুতেরেস বলতে চাচ্ছেন, একটা রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ভিত্তিতে –  বহু ধর্ম ও বহু মত ও পথ কে পাশাপাশি কার্যকর থাকতে পারে এমন ভিত্তির একটা রাষ্ট্রগড়ে তুলতে পারলে একমাত্র তাতেই একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব হতে পারে। এভাবে বৈচিত্র ও ভিন্নতায় নাগরিকেরা সকলে পাশাপাশি কার্যকর থাকা ও পরস্পরকে জায়গা করে দেওয়া নিশ্চিত করতে পারলে সেটাই হবে রাষ্ট্রের শক্তি।
    ভারতের দ্যা হিন্দু লিখছে তিনি বলেছেন,   “রাষ্ট্রে জনবৈচিত্র থাকলে সেটাই সমৃদ্ধি আনবে যা একটা দেশকে শক্তিশালী করে। এই বোধ-অনুভবকে লালন ও শক্তিশালী করা এবং প্রতিদিনের চর্চায় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা উর্ধে তুলে ধরে তা শক্তিশালী ও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত যারা দুঃস্থ অবস্থায় আছে তাদেরকে সাথে নিতে বহু-সংস্কৃতি, বহু ধর্ম ও এথনিক জনগোষ্ঠির এক সমাজ গড়তে হবে; যেখানের সকলে একসাথে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তব্যকে একস্বরে নিন্দা জানাতে হবে”।
    আর এখান থেকেই মূল শব্দ উঠে এসেছে “হেট স্পিচ” [Hate Speech] বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তৃতা – এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহবান।

    “Diversity is a richness that makes your country stronger. That understanding…must be nurtured, strengthened and renewed every day by practising the values of Gandhi; by securing and upholding the rights and dignity of all people, especially the most vulnerable; by taking concrete action for inclusion, recognising the enormous value and contributions of multi-cultural, multi-religious and multi-ethnic societies; by condemning hate speech unequivocally,” Mr. Guterres said

    স্বভাবতই এতে পুরা ব্যাপারটাই মোদির হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে শক্ত সমালোচনা ও নিন্দা হয়ে উঠে এসেছে। ফলে তা হয়ে উঠেছে মোদির হিন্দুতেবাদেরই কঠোর সমালোচনা। কারণ, গত অন্তত তিন বছরে মোদি এই হেট স্পিচের উপরে ভর করে যাচ্ছেন; মোদি যেকোন নির্বাচনে জিতবার উপায় হিসাবে একে হিন্দু-ভোট মেরুকরণ ও ভোটবাক্স ভর্তি করার কৌশল ব্যবহার করে চলেছেন।

    তবে গুতেরেসের হেট স্পিচের কঠোর সমালোচনা দিয়েই প্রসঙ্গটা শেষ হয়ে যায় নাই। বরং বলা যায়, এতে সরকার প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ন্যাংটা করে ছেড়েছে। যদিও সেটা ছিল প্রথম পর্যায়। এবার এর দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে লিখছি।

    ঘৃণা-ভাষণের বিরুদ্ধে কঠোর না-হলে অবমাননার মামলা, প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

    হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলিঃ
    আসলে এখন শুরু হয়েছে এই হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলি! এখানে আসামি বা পার্টি আসলে তিনটা! কথাটা অন্যভাবে বললে,  একটা রাষ্ট্র ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যায় মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠানের নিস্ক্রিয়তায়। যার প্রথমটা হয়ে থাকে সরকার বা ক্ষমতার নির্বাহি বিভাগ’ অর্থাৎ এর বৈষম্যমূলক আচরণ ততপরতা থেকে। এদের নিজ বিশেষ দল ও শ্রেণীর নাগরিককে ফেবার করা ও অন্যান্যদেরকে নিগৃহিত করা থেকে এর শুরু হয়ে থাকে।
    এখন  নির্বাহি ক্ষমতার এই গর্হিত কাজকে যদি বিচার ব্যবস্থা আমল না করে এবং ক্ষতিগ্রস্থ নাগরিককে প্রতিকার না দেয় এখান থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়। এমনকি যেখানে বিচার ব্যবস্থার হাতে স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবার ক্ষমতা দিয়েই রাখা থাকে; তবুও দেশের বিচার বিভাগ সেই ক্ষমতাকে প্রয়োগ-ব্যবহার না করে পাশ কাটিয়ে  যাওয়া থেকেই সংকট শুরু হয়ে থাকে। আর তৃতীয় পর্যায়টা হল নির্বাচন কমিশনের, এদের অকেজো হয়ে বয়াসে থাকা থেকে। কারণ তাদেরকেও ক্ষমতা দেয়া থাকে যে ক্ষমতাসীন বা বিরোধি দল যখন নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করতে ডুবে যাচ্ছে অথচ কমিশন এনিয়ে কোন ব্যবস্থা না নেয়। অথচ কমিশন যেকোন রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে শুনানি শেষে অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রতিকার হিসাবে ঐ দলের রেজিষ্টেশন বাতিল করে দিতে পারে।

    সারকথায় বললে,  এখন শুরু হয়েছে এই তিন পর্যায়ের তিনটা প্রতিষ্ঠান যাদের দায় ছিল ক্ষমতাসীনদের হিন্দুত্ববাদের ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; অথচ এই তিন প্রতিষ্ঠানের কেউই তা করে নাই। অর্থাৎ  নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে থাকা প্রশাসন এর দায়ীত্ব ছিল মানে আমাদের ভাষায় ডিসি-এসপির দায়ীত্ব ছিল হেট স্পিচের বিরুদ্ধে একশনে যাওয়ার। কিন্তু তারা কেন্দ্র সরকার বা রাজ্যের হিন্দুত্ববাদি দলীয় আচরণের পক্ষে চুপ করে থেকে তাদের সহায়তা করে গেছে। যেমন,  পশ্চিম দিল্লির বিজেপি সাংসদ পারভেশ ভার্মা হিন্দু সভার একটি বৈঠকে মুসলিম সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে বয়কটের ডাক দেন। তিনি বলেন, “ওদের সবজি কিনবেন না। ওরা মাছ-মাংসের দোকান খুলে বসবে। ওদের সোজা করতে সামাজিক বয়কট করুন”। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন একশন হয় নাই। সবচেয়ে বেশি ঘটনা উদাহরণ ঘটেছে যোগীর উত্তর প্রদেশে। এছাড়া, ত্রিপুরা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ বা কর্ণাটক রাজ্যে হিজাব ইস্যুসহ নানান মুসলমান নিপীড়ন-মূলক সরকারি সিদ্ধান্ত বা একশন ঘটেছে।  দিল্লিতে পরিকল্পিত দাঙ্গায় সব তছনছ করে দেয়া হয়েছে।  দিল্লিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক সভায় বক্তা হিসেবে ছিলেন জগৎ গুরু যোগেশ্বর আচার্য। তিনি বলেন, ‘যদি দরকার হয়, হাত কেটে নাও। গলা নামিয়ে দাও। সবচেয়ে বেশি তোমার জেল হবে। কিন্তু এই সমস্ত লোককে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। বেছে বেছে মারো।’
    কিন্তু বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন এসব ঘটনা আমলই করে নাই; পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে।

     

    কিন্তু এখন ঘুম ভাঙ্গে নাই, বরং দায় অন্যের ঘাড়ে ঠেলে ফেলার দৌড়াদুড়ি শুরু হয়েছে। গুতেরেস বক্তব্য রেখেছিলেন ১৯ অক্টোবর ২০২২। আর ২১ তারখেই ভারতের সুপ্রিমকোটে প্রধান বিচারপতি যেন জেগে গেছেন। আনন্দবাজার লিখেছেঃ ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।

    ভারতে ঘৃণা-ভাষণের প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে দিন দুয়েক আগে সরব হয়েছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস। এবার সেই প্রসঙ্গেই কড়া মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।  …… শুক্রবার সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে। ঘৃণা-ভাষণ সংক্রান্ত ওই মামলায় বিচারপতিদের মন্তব্য, ‘‘আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ধর্মের নামে কোথায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা?’’

    তার মানে দেখা যাচ্ছে – ” ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে – সুপ্রীম কোর্টের এই ক্ষমতা তো আগেও ছিল কিন্তু তা এতদিন ব্য৭বহার করা হয় নাই কেন?
    সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশের সুপ্রীম কোর্ট কে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের সমালোচনার পরে জেগে উঠতে হয়, নিজ ক্ষমতা নিয়ে সে জেগে উঠে – সেদি রাষ্ট্র আসলে অনেক আগেই মৃত! আর এতে এখন আমরা যা দেখছে সেটা ব্যক্তির দায় নিয়ে ঠেলাঠেলি বৈ আর অন্য কিছু নয়!

    বরং সুপ্রীম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করে যে ভারতের এই বিচার বিভাগ আসলে মৃত! হিন্দুত্ববাদ পুরা রাষ্ট্র আর তার আসব অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সবকিছুকে আসলে খেয়ে ফেলেছে…। 

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    গৌতম দাস

    ১৭ অক্টোবর ২০২২  রাত ০১ঃ১৮

    https://wp.me/p1sCvy-4gb

     

           Pakistan’s Foreign Minister Bilawal Bhutto-Zardari speaks following his meeting with U.S. Secretary of State…..

     

    একটা দৃশ্যমান স্ববিরোধ বা পরস্পরবিরোধী ঘটনা আজকের লেখার বিষয়। কোথায় ঘটেছে এটা? বাইডেনের আমেরিকার বিদেশ নীতি-পলিসিতে বা তাঁর সাম্প্রতিক কিছু ততপরতায়।  কী সেই পরস্পরবিরোধী দুই ঘটনা?
    এক. মূল বিরোধের স্থান হল,  গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের যুগে চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের পটভুমি। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটনা গড়াতে গড়াতে এখন চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে আমেরিকাবিরোধী এক মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলেছে। বিশেষত সর্বশেষ গতমাসে ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর চীনের সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও বা SCO) এর বার্ষিক সভা থেকে এই মেরুকরণ আরো দৃশ্যমান করে দেখানোর সুযোগ হিসাবে চীন-রাশিয়া-ভারত নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ভারত ও পাকিস্তান এর জন্মবিরো্‌ধ – এই প্রাচীনবিরোধকে উস্কে দিয়ে যেন আমেরিকা সেখান থেকে কোন নিজ সুবিধা বের করতে না পারে তাই ২০০১ সালে জন্ম নেয়া চীন-রাশিয়ার জোট এসসিও-তে ভারত-পাকিস্তান এদুইদেশকে একসাথে ২০১৫ সালে এসে একই দিনে SCO এর সদস্য করে নেয়া হয়েছিল। তা সত্বেও, বাইডেন ঐ মেরুকরণের পালটা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের উপর সওয়ার হয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ উস্কে তুলে দিল।
    সারকথায় বললে,  আমেরিকাবিরোধী চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে তাদের নয়া মেরুকরণ-কে দুর্বল করতে সাম্প্রতিককালে আমেরিকা ভারত-পাকিস্তানের বিভেদ উস্কে তোলার কৌশল নিয়েছে। যেমন এর শুরুটা হল, পাকিস্তানকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য প্রায় আধা বিলিয়ন ডলারের সহায়তার জন্য বাইডেনের হাত বাড়ানো। স্বভাবতই এটা ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষি উস্কে তুলতে যথেষ্ট। যদিও জয়শঙ্কর চেষ্টা করেছেন বিরোধটাকে ঠিক পাকিস্তান-ভারত নয় বরং  ভারত-আমেরিকার বিরোধ হিসাবে কেন্দ্রীভুত রাখতে। তিনি ভারতে বসে বা আমেরিকা সফরে গিয়ে এনিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে  খুবই কড়া মন্তব্য বা অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন। [এখানে বিস্তারিত ] যদিও তাতে পাকিস্তানে ইমরানকে হটিয়ে আমেরিকার বর্তমান ক্ষমতাসীন শাহবাজ সরকারকে ক্ষমতায় আনা-কেন্দ্রিক ততপরতা অথবা তাতে যে আমেরিকা-ঘনিষ্টতা শুরু হয়েছিল তা এখন আপত্তিকর ‘অতি ঘনিষ্ঠতা’ হয়ে গেছে, যা আন-এথিক্যাল। কারণ এটা আর এখন পাকিস্তানের স্বার্থে যতটা নয়, তার চেয়ে আমেরিকার স্বার্থে শাহবাজ সরকারকে জবেহ দেওয়ার সামিল হয়ে গেছে। ভারতের সাথে পাকিস্তানের অমীমাংসিত বিরোধ আছে এটা সত্য। কিন্তু তাই বলে সেটাকে অপব্যবহার ঘটানো আর তাকেই আমেরিকা যেন একমাত্র, মুখ্য ও চোখা করে উঠিয়েছে এবং নিজ বাজে স্বার্থে!

    কিন্তু আসলেই কী আমরা বাইডেনের পদক্ষেপ-গুলো বুঝেছিলামঃ
    বাইরের আমরাও ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় ঘটনা, মেরুকরণ ইত্যাদির গতিপ্রকৃতি বুঝেতেছি। কিন্তু না আবার কিছু নতুন ঘটনা হাজির হয়েছে যাতে আমাদের ঘটনা বুঝতে এখনো অনেক বাকি – এটাই সবার উপরে ভেসে উঠেছে।
    কিন্তু কী সেটা? সে ঘটনা আবার দুইটা। এক, শাহবাজের পাকিস্তান তো এখন থেকে বাইডেনকে ভালই সার্ভিস দিতে থাকবে, এটাই ধরে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু না। আমরা দেখলাম, বাইডেন হঠাৎ গত পরশু (১৪ অক্টোবর) পাকিস্তান সম্পর্কে খুবই কঠোর, কটু ও অমর্যাদাকর মন্তব্য করেছে। যার ফলে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদুতকে শাহবাজ সরকার ডেকে এনে তাঁর হাতে পাকিস্তানের কড়া আপত্তি ধরিয়ে দিয়েছে। তাহলে কী দাঁড়ালো এটা?  পাকিস্তান সম্পর্কে বাইডেন বলেছেন, “পাকিস্তান হচ্ছে সম্ভবত দুনিয়ার সেসব মারাত্মক ক্ষতিকর বিপদজনক রাষ্ট্রগুলোর একটা যার হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে কিন্তু দায়ীত্ববান নিয়ন্ত্রণ নাই”। “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”. …।।

    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে তাইঃ
    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে – একথার মানে কী বা বলতে কী বুঝব? অথবা কতটুকুর বেশি বুঝলে ভুল হবে?
    একালের বিচারে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বলতে বুঝতে হবে, কোন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও রুটিন কিছু সম্পর্ক তবুও থেকেও যাওয়া।  অর্থাৎ  ভেঙ্গে যাওয়ার আগে যে  সম্পর্কে ‘বিশেষ ঘনিষ্ঠতার’ জায়গাগুলো ছিল কেবল সেসব ক্ষেত্রগুলোর তাতে পরিসমাপ্তি ঘটা। কিন্তু এরপরেও কূটনৈতিক সম্পর্কসহ রুটিন যেসব সম্পর্কে ঐ দুই দেশের মধ্যে আগেও ছিল যেমন, এসবের মধ্যে পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেগুলো ছিল সেগুলো সবই তা চলতে থাকবে। এটাকে বলছি ‘একালের বিচারের’ ঘটনা। কেন? কারণ,  এর আগে মানে ১৯৯২ সালের আগে আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ক এর কথাই যদি ধরি – এটাই মুখ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা ধরণ এবং এতাই স্টান্ডার্ড বলে মনে করা হত। আর এর মূল বৈশিষ্ট ছিল আমেরিকা-সোভিয়েত এ’দুই ব্লক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন – পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ই ছিল না –  এমনকি ভাষা, কালচার বা শিল্পকলার বিনিময় বলতেও তেমন কিছুই ছিল না। যার সারকথাটা হল – ‘নো এক্সচেঞ্জ’। এটাই ছিল সেকালের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের স্টান্ডার্ড রূপ। আর এর ঠিক উলটা হল একালের বিচারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যেখানে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বললেও বুঝতে হবে তবু একধরণের রুটিন সম্পর্ক যেমন সাধারণ বাণিজ্য সম্পর্ক তবু থেকে যাবে। বিস্তারে যাব না কেবল সংক্ষেপে বলব, একালের সম্পর্ক মানে সকলেই একই আইওএমএফের সদস্য তাই বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে যাবেই। আর তাছাড়া একবার বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি ও শুরু করে ফেললে কিছু কিছু পণ্যে পারাস্পরিক ও আন্তঃনির্ভরতা তৈরি হয়ে যাবেই। এটাই মনে রেখে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া ধারণাকে একালে বুঝতে হবে।
    তাহলে একালের বিচারে  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে বলতে কি বুঝায়, এর অন্তত কিছু বুঝলাম। আর তাতে ভারত যেসব সুবিধা হারিয়েছে সেগুলো হল যেমনঃ ১। আমেরিকার-ভারত একসাথে হয়ে আগে পাকিস্তান কোপাতে পারত। মানে আমেরিকার-ভারতের ইসলাম-বিদ্বেষকে তারা পাকিস্তানেরই দোষ বলে উলটা চাপিয়ে দিতে পারত। তাতে দাবি করত, পাকিস্তান একটা ‘নিচা’ দেশ – এরা পশ্চাদপদ, এরা জঙ্গী, আনকালচার্ড কিংবা এদের ধর্মটাই অপুষ্ট বা দুষ্ট ধরণের ঘৃণামূলক অবুঝ বা না-বুঝের কথাবার্তা  ইত্যাদি; এই ভাষ্যের উপর দাঁড়িয়ে এরা পাকিস্তানকে ডিকটেট করতেও সেকালে চাইতে পারত। বাস্তবত  আমেরিকার-ভারতই যে মূলত স্ব স্ব দেশে মুসলমানদের সাথে সীমাহীন বৈষম্য করে চলেছে, বৈষম্যের জাল ফেলে রেখেছে সেটাকে আড়ালে রেখে তাদের সব যৌথ ততপরতাই হল জঙ্গি, ইসলামি রাডিক্যালিজম নামে চালানো সব ঘটনার আদি উতস!
    সেটা যাক হোক,  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে আর এতেই ভারত আর যে পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ‘বয়ানের জায়গা নাই হয়ে গেছে  পাচ্ছে না, চালু থাকতে পারছে না। এর এক সরাসরি ক্ষতি হয়েছে মোদি সরকারের। তিনি ভারত “পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ” এই  ভুয়া বয়ানের উপর দাড়িয়েই ভারতের মুসলমানেরাই খারাপ বা যেন এজন্যই  এরা নিপীড়িত হবার যোগ্য এই সাফাই তৈরি করেই হিন্দুত্ববাদের জজবা তুলে সেই জোশগুলোকে ভোটের বাক্সে জড়ো করে নিজ ক্ষমতা টিকায় রাখতে ব্যবহার করে চলতে পারত। এটা মোদির এক সরাসরি ক্ষতি।

    তেমনই ভারতের আরেক ক্ষতি হল বাংলাদেশেঃ
    আমেরিকা আর বাংলাদেশ – এরা সরাসরি নিজেরা দুই দেশের স্বার্থের ভাল-মন্দ বা পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে নিজেরাই ডিল করুক – এভাবেই আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে উঠুক?? তাতে ভালবাসা বা শত্রুতা করুক এটা ভারতের কাম্য নয়! না তা নয়। ভারতের ইচ্ছা বাংলাদেশ আমেরিকা-বাংলাদেশ এর সম্পর্কটাকে সরাসরি নিজেরা নয়; বরং ভারতের মাধ্যমে ডিল করুক। মানে আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক – এর লেনদেন, সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি সবটা ভারতের মাধ্যমে ঘটুক। আর এভাবে ভারতকে একটা আলগা মাতবরি বা কুতুবি করতে দেক। যেটা আদতে বাংলাদেশের উপর ভারত একটা আলগা দালালি ও খামখা অভিভাবকগিরি হয়ে উঠুক। বিনিময়ে যেটা বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বলে যেন ভারত দাবি ও উপভোগ করতে পারে!! গত ২০০৭ সাল থেকে এটাই কায়েম হয়ে ভারতের রুস্তমি রাজত্বের ভিত্তি হয়ে থাকা শুরু হয়েছিল। হাসিনা নিজ ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে এটা মেনে নিয়েছিল বলেই এটা চালু হতে পেরেছিল।

    কিন্তু  আমেরিকার ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে যাওয়াতে এসব কিছুই একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। এতে বাস্তবতা হল খুব সহসাই আবার  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক নুন্যতম জেগে উঠুক বা উঠবে এর কোন সম্ভাবনাই নাই, বরং আরো শত্রুতামূলক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। তাই এই পরিস্থিতিতে ভারত নতুন কিছু করে বাংলাদেশের সরকারের উপর প্রভাব সামান্যও যদি ফেরত পায় এমন সব চেষ্টা জারি রেখেছে। এরই একটা রিপোর্ট হল, “বাংলাদেশের ১৯৭১ সালে ঘটা নৃশংসতাগুলোকে আমেরিকান কংগ্রেসে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করে প্রস্তাব পাশ”  ‘Resolution in US house to recognise 1971 atrocities in Bangladesh as genocide’ ।

    ঘটনা পুরানা একাত্তর সালের কিন্তু এটা এখন শাহবাগী রাজনীতি।  সংক্ষেপে বললে বিষয়টা হল, কোন রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার ঘটনাকে জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ও সীমানায় জেনোসাইড বা ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করানো ও স্বীকৃতির ইন্টারন্যাশনাল লিগাল মুল্য অনেক। এছারা এতে ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার অনেক কাছে চলে যাওয়াও হয়। কিন্তু নানান টেকনিক্যাল কারণে, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ঘটনা জাতিসংঘের চোখে গণহত্যা বলে স্বীকৃত নয়। এখন এই আলোকে আমেরিকান কংগ্রেস যদি  এমন গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দেয় তবু সেটা অবশ্যই সমতুল্য কোন ঘটনাই নয়। তবুও এর কেবল কিছুটা ক্যাম্পেইন, প্রপাগান্ডা মুল্য মাত্র এতে থাকবে। এছাড়া এটা লিগাল রায় নয়। পক্ষ-বিপক্ষেরের রাজনৈতিক জোটের মতামত মাত্র।

    কিন্তু তা হলেও এমন মতামত আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস থেকে উদিত হতে পারল কেন?  এটা তো সত্তরের দশকেও হয় নাই। তাহলে এখন কেন?

    আমেরিকা লবির দেশ, লবি করা বৈধঃ
    বহু দেশের নাগরিকই পরবর্তিতে মাইগ্রেটেড হয়ে আমেরিকার নাগরিক হয়। আমেরিকান নাগরিক মানে এটাই। এটাই আমেরিকান নাগরিক হওয়াদের প্রধান ধারা। ফলে কেউ পুর্ণ নাগরিক হয়ে গেলেও তারা স্ব স্ব অরিজিন দেশের স্বার্থের প্রেশার গ্রুপের ভুমিকার ভোটার-নাগরিক হয়ে যেতে পারে। তবে সেটা একমাত্র একই অরিজিন দেশের আমেরিকানেরা সংগঠিত হতে পারলে তবেই এরা সম্মিলিতভাবে ফেলে আসা দেশের পক্ষে বিশাল লবি গ্রুপ হয়ে উঠতে পারে।  বাংলাদেশেরও বহু মানুষ একালে আমেরিকার নাগরিক হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এখনো বাংলাদেশ লবি গ্রুপ হবার পরিবর্তে  বরং দেশের মতই দ্বিদলীয় ভাগ হয়ে দলদাস হতেই আগ্রহি।

    কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে, তারা অনেক জনসংখ্যার বলে, সরকারের দিক থেকে আমেরিকায় এমবেশি থেকে পরিচালিত এটা সংগঠিত করে নেয়া বলে এটা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের হয়ে তবে বিশাল লবি গ্রুপ – এক র‍্যাকেট হয়ে ততপরতা করে থাকে। কংগ্রেস সদস্যও নির্বাচন করে থাকে। কোন সিনেটরের পিছনের সাপোর্ট গ্রুপ হয়েও কাজ করে থাকে সময়ে। তবে কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর এসব জনপ্রতিনিধি সবসময় সরাসরি ভারতীয় অরিজিনের এমন ব্যক্তি নাও হতে পারেন। তবে অবশ্যই তাদের কনষ্টিটুয়েন্সি ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান ভোটাররাই হয়ে থাকেন। এছাড়া আরেক ধরণের জনপ্রতিনিধিকে দেখা যায় যারা আমেরিকায় ভারতের স্বার্থের পক্ষে কাজ করে থাকেন। এরা হল, আসলে কোন এক বা একদল হোয়াইট আমেরিকান ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি যাদেরকে ভারত তাদের দেশের ব্যবসা পাইয়ে দিয়েছে, সহজ করে দিয়েছে। আর বিনিময়ে তারা ভারতের পক্ষে ও স্বার্থে কাজ করবে এমন এক বা একাধিক জনপ্রতিনিধি জুটিয়ে দিয়েছে হয়ত।

    আলোচ্য ক্ষেত্রেও আমেরিকান কংগ্রেসে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে,  দুই কংগ্রেসম্যান এই প্রস্তাবটা তুলে এসে পাশ করিয়েছেন –  স্টিভ শ্যাবট [Steve Chabot ] ও আরও খান্না [Ro Khanna ] নামের দুই আমেরিকান কংগ্রেসম্যান। স্বভাবতই খান্না  এই পাঞ্জাবি টাইটেল এর  মানে তিনি ভারতীয় অরিজিন।

    তাহলে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট “এই প্রস্তাব” তাদের এত আগ্রহ করে আনার কারণ কী? কারণ এটাই মোদি সরকারের আগ্রহ। কিন্তু সরকারের আগ্রহ কেন? কারণ, এই প্রস্তাব মানে হল,  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক সরাসরি না হয়ে সেটা ভারতের মাধ্যমে  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক করার বা হবার লাইনের প্রস্তাব – এরই আকুতি। আর এটাই এতদিন হাসিনা সরকারের স্বার্থ ছিল। বা স্বার্থের গৃহিত লাইন ছিল। যেটা এখন অকার্যকর। হাসিনা মনে করে ভারত এব্যাপারে এখন মুরোদহীন; যার নিজেরই আমেরিকার কাছে বেইল নাই। আর খোদ আমেরিকাই এখন হাসিনা সরকারের উপর বিলা! কিন্তু তবু ভারত নাছোড়বান্দা। যেন দেখাতে চায় এখনো আমার কিছু আমেরিকান জনপ্রতিনিধির উপর প্রভাব আছে আর সেটা আমরাই বাংলাদেশে বেচতে চাই!!

    তাহলে এখন এই লেখার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেটা হল, বাইডেন কেন চীন-আমেরিকার বিরোধ প্রসঙ্গে এখন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার কাজে লাগানো সম্পন্ন করেও আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই পারমানবিক বোমার অধিকারি দেশ প্রশ্নে অযোগ্য [without any cohesion] রাষ্ট্র বললো?

    Biden in a speech said Pakistan “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”.

    আসলে এর মূল কারণ, দুটা দুই কনটেকস্ট (context) বা পটভুমিতে। প্রথমটা ভারতের চীন-রাশিয়ার পক্ষে চলে যাওয়ার শাস্তি হিসাবে যেটা আগেই অনেক বলেছি। আর দ্বিতীয়টার হল, আমেরিকায় নির্বাচন আগামি ৮ নভেম্বর ২০২২, সেই প্রসঙ্গে ও পটভুমিতে। নির্বাচন মানে?

    বাইডেনের চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার দুইবছর বা অর্ধ-আয়ু পার হবার দিন হল আগামি ৮ নভেম্বর। আর ঐদিনই আবার আমেরিকান সিস্টেম অনুসারে এক-তৃতীয়াংশ সিনেট ও পুরা কংগ্রেসের সদস্যদের আসনে মেয়াদ শেষ ও নয়া-নির্বাচনের দিন। আরেকটু ভেঙ্গে বললে, আমেরিকার কংগ্রেসে (আমাদের ভাষায় সংসদে) সদস্যরা মাত্র দুবছরের জন্য নির্বাচিত হন। তাই প্রতিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ও ওর সাথে একবার আর আরেকবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দুবছর পার হলে পরে (যেটাকে মিড-টার্ম বলে) – এভাবে দুই সময়ে দুবছর পরপর আমেরিকান কংগ্রেস সব সদস্যদের (মোট ৪৩৫+২ ) আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

    আর আমেরিকান কংগ্রেসের নির্বাচনের সাথে একই সময়ে এভাবে সিনেটরদেরও নির্বাচন হইয়ে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে এক জায়গায় শুধু একটু ফারাক আছে।   তা হল, সিনেটরেরা কংগ্রেসের মত দুবছরের মেয়াদে নয়, বরং টানা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তবে প্রতি দুই বছর পরপর মোট আসনে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

    তাহলে সারকথায় মিড টার্ম নির্বাচন মানে কী দাড়ালো? তা হল, একঃ  সব কংগ্রেসের আসনেই (৪৩৫+২) নয়া নির্বাচন এর দিন সেটা। দুইঃ  সিনেটের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচনের দিন সেটা। আর তিনঃ প্রতি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মেয়াদের অর্ধ-মেয়াদ বা দুবছর পার করার দিন সেটা। যদিও এই মিড-টার্মের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের (বাইডেনের ডেমক্রাট) দলের জনপ্রতিনিধিরা কংগ্রেস ও সিনেটের যেকোন এক জায়গায় বা দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তাতে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা হারাতে হবে না। মানে ডেমক্রাটেরা আগামি এই মিড টার্মে কংগ্রেস ও সিনেটের সবজায়গায় হেরে গেলেও বাইডেনই প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন। চারবছর পুর্ণ প্রেসিডেন্টই থেকে যাবেন।

    এবার আমাদের প্রাসঙ্গিক কথা হল, আসন্ন মিড-টার্মের নির্বাচনে ডেমোক্রাট কংগ্রেসম্যান যারা ভারত-প্রভাবিত তাদেরকে জিতাবার জন্যই বাইডেন পাকিস্তান-বিরোধী অমন কথা বলেছেন। অর্থাৎ এর সাথে ভারতের আমেরিকাকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার সাথে তাদের জোটে চলে যাবার কোন সম্পর্ক নাই।
    আমার একথা সবচেয়ে ভাল বুঝা যাবে বাইডেন কোথায় গিয়ে এইকথাগুলো বলছেন সেদিকে যদি খেয়াল করেন। লেখা আছে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচন উপলক্ষ্যে ডেমোক্রাট কংগ্রেস প্রার্থীদের পক্ষে ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে [……Biden made the comments during a reception of the Democratic Congressional Campaign Committee on Thursday ]। ঐ ক্যাম্পেইন শুরুর আগে ক্যাম্পেইন কমিটির সভায় তাদেরকে উতসাহ দিতে  বাইডেন সেখানে গিয়েছিলেন।  ঐ বক্তৃতাতেই তিনি পাকিস্তানকে ক্ষেপিয়ে ঐকথা বলেছেন।
    এককথায় বললে, যেমন  ডেমোক্রাট Ro Khanna [ROHIT KHANNA] এর মত ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান কংগ্রেসম্যানদেরকে মিডটার্মে আবার জিতাবার জন্য বাইডেন পাকিস্তানকে ঠেস দেয়া বা নিচা দেখানো ঐ বক্তব্য দিয়েছেন। আবার যেমন Ro Khanna কে জিতাবার জন্য বাইডেন কাজ করছেন বলে এর মানে এমন নয় যে বাইডেন আমেরিকা-ভারতের ঘনিষ্ট আগেকার সম্পর্কটাই আবার ফিরিয়ে আনার পক্ষে কাজ করছেন। এমন বুঝা ভুল হবে!

    এই হল মূল কথা। আর এখন একটু বাড়তি কথা বলে নেই এই সুযোগে। এই মিড-টার্মে বাইডেনের দল ডেমোক্রাটেরা গোহারা হারবে বলে পুর্বাভাস বলছে। কারণ প্রায় ৯% মুদ্রাস্ফীতি আর এতে মিডল-ক্লাস ও নিম্ন মধ্যবিত্ত এরা প্রচন্ড ক্ষেপে ক্ষুব্ধ। এছারা প্রায় দেড় বছর ধরেই তাদের পছন্দের ও নাগালের মধ্যে মুল্যের চীনের তৈরি গৃহস্থলিতে ব্যবহার হয় এমন ওয়াসিং মেসিন বা এসি ইত্যাদি আমদানি পণ্যের উপর ২৫% বা এর উপরে কোথাও ৬৬% পর্যন্ত অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানোতে ক্ষুব্ধ ছিল তারা। যদিও এই বাড়তি ট্যাক্স বসিয়েছিলেন ট্রাম্প তাঁর ক্ষতা ছাড়ার আগে কিন্তু এর এফেক্ট শুরু হয় বাইডেনের আমলে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ট ভোটারেরা বাইদেনের দলের বিরুদ্ধে যাবে বলে অনুমান। এতে যদিও বাইডেন ক্ষমতাচ্যুত হবেন না। তবে, যেগুলো অর্থ-বিল মানে যেখানে প্রেসিডেন্ট কোথাও কোন দেশে অর্থ বরাদ্দ দিতে চান এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চান সেগুলো আগে তাকে সংসদ-সিনেটে অনুমোদন নিতে হবে। আর এই অনুমোদন নিতে গিয়েই তিনি বাধার সম্মুখীন হবেন।

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

     

  • বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    গৌতম দাস
    ০৪ অক্টোবর ২০২২;  Published on: Oct 4, 2022 at 00:03

    https://wp.me/p1sCvy-4fr

     

      External Affairs Minister S Jaishankar with United States Secretary of State Antony Blinken in Washington DC on Tuesday | ANI

    সরাসরি বললে, এতদিন এশিয়ায় এক মুখ্য (পুরানা) মেরুকরণ বিরাজ করছিল যেটার শুরু মোটাদাগে বললে চলতি শতকের শুরু থেকে। কিন্তু চিনব কী করে?  বাংলাদেশের গত ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু হওয়া আর পরিণতিতে ভারত-আমেরিকার বসিয়ে দেয়া হাসিনা সরকারকে আমরা অনেকে যেভাবে চিনি আর এটাই হল সেই মেরুকরণের ফলাফল বা ফসল। তাই পুরানা সেই মেরুকরণ বলতে বুঝিয়েছি বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকারকে। অর্থাৎ এই মেরুকরণে মূল বৈশিষ্ট ছিল যে পরিণতিতে এতে ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা জায়গা নিয়েছিল একই মেরুতে।  আজ সেই মেরুকরণ এখন ভেঙ্গে পড়ার মুখে; অন্তত আজ ৩ অক্টোবরের সকালের খবর পর্যন্ত; তা খুবই দ্রুত আগিয়ে যাচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষগুলোরই ভাষা ও ভাষ্যও ক্রমশ বদলে যাচ্ছে!  তবে অবশ্যই এটা তা ভেঙ্গে-গড়া ধরণের। তাই আবার গড়তে বড় আরেক নয়া মেরুকরণ ঘটা শুরু হয়েছে; সেটা ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। যদিও এর বড় ও স্পষ্ট প্রকাশটা ঘটতে আরেকটু সময় নিচ্ছে।

    মুখ্য তবে পুরানা মেরুকরণ এর বৈশিষ্ট কী ছিলঃ
    ঘটনার পিছনের দিক থেকে তাকিয়ে বললে, এর জন্ম জর্জ ডব্লিউ বুশ [George Walker Bush] বা জুনিয়র বুশের হাতে যার দুই টার্মের প্রেসিডেন্সি হল ২০০১-২০০৯, এই সময়কালে। তাতে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের নয়া যুগের সুচনা করেছিল। দু-এক বাক্যে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার (১৯৫৩-৬১) [Dwight D. Eisenhower] এর আমলে (১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে তাঁর প্রথম ভারত সফর), ততদিনে যিনি “সিআইও পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশে সরকার ফেলানো” কুখ্যাত অভ্যাস চালুর নায়ক; এভাবে প্রথম “ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক” শুরু হয়েছিল সেই ১৯৫৯ সাল থেকে। যদিও ১৯৬২ সালের পর থেকে তা আর ভারতের জন্য সুখকর থাকে নাই। মুল কারণ দুটা।  একদিকে আমেরিকার হয়ে নেহেরুর ভারতের চীনে (তীব্বতের দালাইলামার দেশছেড়ে পলায়ন ও ভারতে আশ্রয় ইস্যুতে) ততপরতা ও আমেরিকার খেদমত করতে গিয়েছিলেন বলে (মনে করা হয় এটাই আইসেনহাওয়ার-নেহেরুর ১৯৫৯ সালের গোপন চুক্তি ); আর তাতে ক্ষুব্ধ চীনের হাতে ১৯৬২ সালে আসাম বেদখল ও মার খাওয়া ছিল ভারতের জন্য খুবই খারাপ অভিজ্ঞতা।
    আর এছাড়া অন্যদিকে পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে  মূলত, ভারত-পাকিস্তানসহ ছোট দেশগুলো যাতে নিজেরাই পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ বা তৈরিতে না আগাতে পারে তাই, আমেরিকা-সোভিয়েত এই ইস্যুতে এক এলায়েন্স করেছিল; আর তাতে যৌথভাবে নানান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল (যা শেষে NPT বা নন প্রিলিফারেশন চুক্তি পর্যন্ত হয়েছিল। এই NPT  চুক্তি ছিল আসলে, UN এর অধীনে এই চুক্তি সদস্যদের স্বাক্ষরের জন্য ওপেন করা হয় ১৯৬৮ সালে আর কার্যকর হয়েছিল ১৯৭০ সাল থেকে।) – আর এদুই ঘটনা থেকে পরবর্তিতে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই ঝুলে যায়, প্রায় ভেঙ্গে পড়ে। যা আর সতেজ থাকে নাই।
    তাই এর প্রায় ত্রিশবছর পরে  আর ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতোমধ্যে (১৯৯১ সালে) ভেঙ্গে যাবার সুবিধা নিতে, একমাত্র গত শতকের নব্বইয়ের দশকেরও শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার চালু করতে এবার দুপক্ষ আগ্রহি হয়েছিল। যদিও তা ২০০০ সালের জানুয়ারিতে বিল ক্লিনটনের ভারত সফরে ও তাঁর হাতে তবে ‘সুশীলভাবে’ ঘটেছিল;  আর ক্লিনটনের বিপরীতে তখন ভারতের বিজেপির বাজপেয়ীর প্রথম পুর্ণ প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৯-২০০৪) জমানা ছিল সেটা।

    তবে ভারত-আমেরিকার সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল  পরস্পরের পিঠচুলকানোঃ
    আর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ২০০১ সেপ্টেম্বর নাইন-ইলেভেনের পরে তা মূলত উভয়ের  “মুসলমান কোপানো” সুবিধা নিতে তারা ‘জঙ্গী’ বয়ান খাড়া করে এরই মারামারি যুদ্ধের সম্পর্ক হিসাবে। আর তা প্রথম রূপান্তরিত হয়েছিল বুশের হাতে ওয়ার অন টেরর এর পলিসির অধীনে।  অর্থাত নয়া চলতি শতকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এর মুখ্য দিক বা ফোকাস ছিল আসলে এক ‘মুসলমান কোপানো্র’ এলায়েন্স। যেটা তাদের উভয়ের জন্য দরকারি ছিল এজন্য যে ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে ভোটে কারচুপি করে এথেকে সৃষ্ঠ ক্ষোভে কাশ্মিরের মুসলমান জনগোষ্ঠিকে প্রথমে কংগ্রেস পরে বিজেপির বাজপেয়ী আরও সুচারুভাবে সেই প্রথম সশস্ত্রতার দিকে ঠেকে দেওয়াতে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলা। আর ওদিকে আমেরিকার দিক থেকে দরকার তাদের “ওয়ার অন টেররের পলিসির” পক্ষে ভারতের সম্মতি আদায় – এদুই স্বার্থের এলায়েন্স ছিল সেটা। পরবর্তিতে, আরো এগিয়ে ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফরের ফলে, তা হয়ে দাঁড়ায় এমন যেটাকে বলা যায়,  ভারত আমেরিকার হয়ে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ বা ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেওয়া সম্পর্ক। এটাই ভারত-আমেরিকার প্রথম ঘোরতর চীনবিরোধি এক স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স ছিল। যা এবার সম্পুর্ণ উলটা দিকে টার্ণ নিতে শুরু করেছে আর এবার এই ২০২২ সালের শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার ভাঙ্গাচুড়ে, এক নয়া মেরুকরণ হতে যাচ্ছে। কোন কোন ইস্যু বা ক্ষেত্রে তা ইতোমধ্যেই  প্রবলভাবে শুরু হয়ে গেছে।

    ভারতের উপর আমেরিকার এবার প্রথম স্যাংশন জারি শুরু হয়েছেঃ
    ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এবারের প্রকাশ্যে  ঢলে পড়ার ঘটনাটা হল, এই প্রথম ভারতের উপর আমেরিকার স্যাংশন জারি। যেমন, ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া দ্যা প্রিন্ট এর এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে – লিখেছে  “জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরের পরেই, আমেরিকার প্রথম এক ভারতীয় কোম্পানির উপর, ইরানি তেল আমদানির সম্পর্ক করার জন্য, স্যাংশন আরোপ” [Days after Jaishankar visit, US imposes first-ever sanction on Indian firm for oil trade with Iran]।

    অর্থাৎ এর আগে ভারতকে দেয়া আমেরিকার বাণিজ্যিক সুবিধাসহ বিভিন্ন ফেবার পরে ছাটাই হতে হতে ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছিল সেই ট্রাম্পের আমল (২০১৭) থেকেই। তবু ভারতের কোর কিছু স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক  সে আমেরিকার সাথে বজায় রেখে চলছিল। এমনকি ট্রাম্প আমলের (২০১৯) শেষে যখন ইরান-আমেরিকান পারমানবিক চুক্তি সে [Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA)] ভেঙ্গে দিলে এরপরে ইরানের উপর নতুন করে স্যাংশন আরোপ করা হয়েছিল। আর তাতে ট্রাম্প ২০১৯ সালে ভারতকে ইরান থেকে সেবার তেল আমদানি বন্ধ করতে বাধ্যও করতে পেরেছিল। এছাড়াও একালে কোয়াডের ভিতর নানা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নিয়ে বাইডেন প্রকাশ্যেই সমালোচনা করে যাচ্ছিল। ভারতে মোদির “মুসলমান কুপিয়ে নির্বাচনে জিতার” কৌশল নিয়ে বাইডেনের ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন’ স্যাংশন আরোপের সুপারিশ করে চলছিল লাগাতর। বাইডেন সেটা নিয়ে সাবধান করেছেন এমনকি, কাশ্মীরে মোদির নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু স্যাংশন আরোপ করতে পারেন এমন ধারণা দিলেও বাইডেন এর আগে কখনও তা বাস্তবায়ন করেন নাই। অর্থাৎ প্রকাশ্য মুখে সমালোচনা করলেও বাইডেন প্রশাসন কখনও চরম পদক্ষেপ হিসাবে ভারতের উপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোন স্যংশন আরোপের মত ঘটনা ঘটান নাই।

    ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরও আমেরিকান স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা খাওয়া রাশিয়া থেকে এতদিন ভারত তেল ও অন্যান্ত পণ্য আমদানি করে চলেছিল। তাদের গরীব অর্থনীতির দোহাই দিয়ে। এসব নিয়ে প্রকাশ্যে আমেরিকা আপত্তি বা অসন্তোষ জানালেও কখনই আমেরিকান পদক্ষেপ স্যাংশন আরোপ পর্যন্ত  গড়ায় নাই। কিন্তু এবার একই কাজ মানে ইরানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এবং তা একটা ভারতীয় বেসরকারি কোম্পানি আমদানি করাতে আমেরিকা এবার সেই কোম্পানির উপর প্রথম আমেরিকা সরাসরি স্যাংশন আরোপ করেছে।

    আমেরিকার এই এক্টের মধ্যে দিয়ে একটা নিশ্চিত ম্যাসেজ হল, আমেরিকা তার আপত্তিসহ-ই রাশিয়া থেকে ভারতকে তেল আমদানি এলাও করলেও ইরান থেকে একই কাজ ভারত করতে চাইলে কঠোরভাবে তা দমন করবে তা বুঝিয়ে দিল।

    ওদিকে এনিয়ে মিডিয়া রিপোর্ট হল, এত পরেপরেই এবার জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরে গত সপ্তাহের ২৭ সেপ্টেম্বরে ব্লিঙ্কের সাথে তাঁর বৈঠকে এসব বিরোধ নিয়ে ঠিক কী আলাপ হয়েছিল এর বিস্তারিত সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে, ভারতীয় মুখপাত্র জানান নাই। তাঁর “জানা নাই”, অজুহাতে। অর্থাৎ অনুমান করা হচ্ছে ভারতের মোদি সরকারকে এখন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক নিয়ে” কিছু তিতা সিদ্ধান্ত আর না নিলেই নয় – এমন অবস্থায় পৌছেছে। আগামি দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে এর চিহ্ন-ইঙ্গিত আর অপ্রকাশ্য থাকবে না।  আসলে এবারের জয়শঙ্করের সফরের পরে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক যে আর  অপ্রকাশ্য-বিরোধ হয়ে হাজির না হয়ে থাকবে না, এরই প্রবল অনুমান করা হচ্ছে। কারণ, কোন সম্পর্ক আরো কিছুদিন ইতিবাচক থাকার সম্ভাবনা থাকলে সেটা এতদিন প্রকাশ্যে এসে পড়ত।

    সম্পর্কবিরোধটা শুধু তেল আমদানি, অনেক গভীরেরঃ
    আসলে সম্পর্কবিরোধটা তো শুধু তেল আমদানি নিয়ে নয়; বরং সর্বত্র ও সব ইস্যুতেই। যার আরেক বড় প্রকাশ হল, আমেরিকান বার্মা দখলের খায়েস-পরিকল্পনা। যেটা নিয়ে আগের সপ্তাহে লিখেছি। বলেছিলাম ভারতের কোরস্বার্থ হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনথ ফ্লিট নোঙর না করতে দেয়া আর এরই সাথে সর্বোতভাবে ” হবু “আমেরিকান বার্মা দখলের” বিরোধিতা করা। মানে কোন ‘বাইডেনের বার্মা’ দেখতে ভারতের না চাওয়া, এমনকি চীনের কোলে উঠে হলেও এর যতটা সম্ভব সরাসরি প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা।
    আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি, তিন সপ্তাহ আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর লাদাখ সিমান্তে চীন-ভারত ২০২০ সাল থেকে উভয় পক্ষ যে সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে রেখে ছিল এর অবসান ঘটিয়েছে উভয় পক্ষ। ভোজবাজির মত উভয়ের সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।  এমনকি চীন-ভারত কতটা কাছাকাছি চলে গিয়েছে আর তাতে ভারত কত মরিয়া হয়ে ছাড় দিচ্ছে এর এক প্রমাণও হাজির হয়েছে। এরপরেই গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ছিল এসসিও (SCO) বার্ষিক সভা; সেখানে চীন এক আলোচনায় বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে এমন এক ম্যাপ দেখিয়েছে যেখানে ভারতের দাবির খোদ লাদাখ ও অরুনাচল প্রদেশকে চীনের অংশ বলে দেখানো হয়েছে তবু মোদির ভারত কোন আপত্তি তুলে নাই – ভারতে বসে এনিয়ে অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। এনিয়ে ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনামঃ
    “ভারতের মানচিত্র থেকে বাদ অরুণাচল, লাদাখ! এসসিও-তে ‘চিনা–কীর্তি’ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে” [লিঙ্ক পেতে এখানে ক্লিক করেন]

    আসলে, এখন যেভাবে আমেরিকার এমন খায়েস-পরিকল্পনা প্রকাশিত হচ্ছে এসবই চলতি শতকের শুরুতেও আগে থেকেই আমেরিকার ছিল। কিন্তু শতকের শুরুতে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক কাজ করতে শুরু করাতে, বিশেষত – ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা’ কাজ করছিল বলে আমেরিকার সেইসব খায়েস লুকিয়ে বা তুলে রাখা হয়েছিল তখন।  কিন্তু বর্তমানে  আমেরিকান বার্মা দখলের পরিকল্পনা আমেরিকা আর লুকিয়ে রাখতে চাইছে না। আর ওদিকে এই পরিকল্পনার পালটা পদক্ষেপ হিসাবে রাশিয়া-চীন-ভারত এক অঘোষিত মেরুকরণে রাশিয়াকে সামনে রাখতে ভারত-চীন আগ্রহি বলে আর রাশিয়ার বার্মার শাসকদের সাথে এলায়েন্স গড়াতেই বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ছিল।

    আসলে কার্যত সবমিলিয়ে এতেই ‘নয়া মেরুকরণ’ আর অপ্রকাশ্যে রাখাতে সবপক্ষই অক্ষম হয়ে পড়ছে। আর এরই প্রথম বলি হয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক। সে কারণেই এসব আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে এসব আর আলামত হয়ে থাকবে না। প্রকাশ্য চিহ্ন-ইঙ্গিতেও নয়, বরং প্রকাশ্য নয়া মেরুকরণ, নয়া জোট হিসাবেই তা হাজির হতে যাচ্ছে।
    আর তা দেখার জন্য আমাদেরকে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। আসলে ইতোমধ্যেই মূল আমেরিকা-চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের পালা বদলের লড়াই – এরই অংশ হিসাবে চীনা পক্ষের সম্ভাব্য মেরুকরণের মহড়াটা হয়ে গেছে এসসিও (SCO) বা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন এর  গত-মাসের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন থেকেই।

    তা সত্বেও এর বিপরীতে বাইডেনের আমেরিকা আর কোন দেশকে নিজের পক্ষে পেতে যাচ্ছে – বিশেষত ইইউ বা ইউরোপ কী বাইডেনের পক্ষে থাকতে পারবে কিনা এবং খোদ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বাইডেনের কী নিয়ন্ত্রণ থাকছে না বাইডেনের হাত গলে তা বাইরে চলে যাচ্ছে – এসব কিছুই তা আগামি ডিসেম্বরেরই ফয়সালা হয়ে যাবে। খুব সম্ভবত নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তা ফুটে উটতে শুরু করবে।  আর তা অবশ্যই প্রকশ্যে; মানে গ্লোবাল মেরুকরণের আর কোন কিছুই অপ্রকাশ্য থাকবে না। যেমন,  ইউক্রেন যুদ্ধ এবার (নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে) শেষ হবে কিনা এবং তা, কোন মেরুকরণে তাও এবার নির্ধারিত হয়ে যাবে প্রকাশ্যেই, নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে।

    কিন্তু এতে বাংলাদেশে কীঃ
    বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনাটা হল, গ্লোবাল রাজনৈতিক এই ঘটনাগুলোর পরিণতি বা ফলাফলে, বিশেষ করে নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ তা বাংলাদেশে বড় প্রভাব ফেলবে। যদিও বাংলাদেশের চলতি ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠা রাজনৈতিক মোচড় ও গত পনেরা বছরের শাসন ঘটনাবলির একটা বড় অংশই মূলত লোকাল ঘটনা। তবু এই লোকাল ঘটনা্য়র মধ্যে এতদিন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ছিল এক বড় নির্ধারক উপাদান। তাই আমেরিকা-ভারত “সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” একেবারে ভেঙ্গে পড়া ও নয়া মেরুকরণের দিকে রওনা এর নিট ফলাফল হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের আলগা মাতবরি ও প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। এবং তা ইতোমধ্যেই সেদিকে রওনা দিয়েছে। সেটা সম্ভবত ২০০৭ সালের ১/১১ এর আগের বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের জায়গায় ফিরে যাবে। অনেকে তাই দোরাইস্বামীর গতমাসের বিদায় ভাষণ কে স্মরণ করছেন; যেখানে তিনি বলছেন, বাংলাদেশে “ভারত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পাশে নেই” বা সাথে ছিল না। এর গুমোর ‘অর্থ’ বের করার চেষ্টা করছেন অনেকে।  সারকথায় বললে, আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা শুন্য হয়ে গেলে আর বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বা গুরুত্বমূল্য আর কই থাকে?

    তবু শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারত চেষ্টা করবে পুরানা কায়দা বজায় রাখতেঃ
    কিন্তু সাবধান শেষদিন পর্যন্ত ভারতের চেষ্টা বজায় থাকবে। কিন্তু কি করে বুঝব সেটা বজায় থাকার চেষ্টা করছে? সর্বশেষ সুলতানা কামালের লেখা যা প্রথম আলো ছেপে দিয়েছে – এটাই ঢলে পড়া পুরাতন ভারতের শেষ উঠার চেষ্টা। আমেরিকার স্যাংশন আরোপ আগামি ১০ ডিসেম্বর ২০২২ একবছর হবে। আর আলামত হচ্ছে সম্প্রতিকালে হাসিনার ক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আর একাজে সম্মুখ সারির মিডিয়ার ভুমিকায় আগের মতই প্রথম আলো। এমনকি এই ততপরতা ইউক্রেন যুদ্ধের আমেরিকান প্রপাগান্ডা পর্যন্ত বিস্তৃত করে রেখেছে; অনেকে এটাকে প্রথম আলোর একেবারে উদাম হয়ে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া হয়ে উঠার লক্ষণ হিসাবে দেখছে।
    যদিও মিডিয়া হিসাবে নিজের বেছে নেওয়া প্রথম আলোর কোর-ভুমিকা হচ্ছে ইন্ডিয়ান স্বার্থরক্ষা যেটাকে, সে আবার প্রগতিশীলতা, সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা বা অসাম্প্রদায়িকতা এসব শব্দের আড়ালে করে থাকে। কিন্তু  এখন সে যেন প্রো-আমেরিকান ভুমিকাটাকে এর উপরে রেখে চলছিল। এসব কথাগুলো গোয়েন্দা-পরিভাষায় বলা হয়, এতবছর সিআইএ র-কে আপারহ্যান্ডে রেখে নিজের কাজ চালাচ্ছিল। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২১ স্যাংশন ঘোষণা দিয়ে সিআইএ নিজেই যেন নিজেকে আপারহ্যান্ডে উঠিয়ে নিয়েছিল। আর এখন? fall apart ! অর্থাৎ এক বছর না যেতেই এটা এখন ধর্ম ও স্বার্থ যার যার অবস্থায়!!  “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়া যেটা এতক্ষণ উপরে আলচনা করেছি তা যেন সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়ে পড়েছে “এখানে”।  আর এর ঢলে পড়া বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাব – এথেকেই পালটা আবার উঠে দারানোরই এক উদ্যোগ প্রচেষ্টা হল সুলতানা কামালের ততপরতা, আর প্রথম আলোর এর পক্ষে দাঁড়িয়ে মরিয়া হয়ে সহায়তা দেয়া।
    মূলত ইডেনের “সেক্স  স্লেভারির ঘটনা” হাসিনা ও লীগের মরাল ভিত্তিতে প্রবল আঘাত হেনেছে। যেটা ক্ষমতাচ্যুত হবার আগেই যেন লীগের মরালি-চ্যুত হয়ে পড়া। আর একাজে লীগকে সহায়তা দিয়ে বিনিময়ে ভারত নিজের ঢিলা হয়ে পড়া ক্ষমতা আবার খাড়া করতেই এই সুলতানার প্রচেষ্টা। তিনি প্রবল চেষ্টা করেছেন ঘটনার দায় বিওএনপির উপর যতটা সম্ভব চাপিয়ে দিতে। এমনকি সুলতানার কাছাখোলা  সর্বশেষ প্রচেষ্টাটা এবার আর প্রথম আলোর পক্ষ কাঁধ দেয়া সম্ভব হয় নাই। তাই ভারতের প্রো-মোদি এক মিডিয়া ইন্ডিয়া টুডে সে দায় নিয়েছে। যাতে আমেরিকার কাছে বাংলাদেশে হারানো ভারতের প্রভাবেই অন্তত কিছুটা ভারত ফিরে পায়! কিন্তু এর পরিণতি হল সুলতানাকে এখন থেকে বাকি জীবন পাবলিক লাইফে নেপথ্যে বা বাইরে কাটাতে হবে। আর তিনি হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কেউ না, আসলে ছিলেনও না এটাই এখন উদাম হয়ে গেল!! এত দ্রুত, অবিশ্বাস্য!!!
    তবে এই পতনের মূল জায়গাটা হল, “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়াকে পড়তে ব্যার্থ হওয়া। সুলতানা যে একজন ‘পুর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’ ছিলেন তা তাঁর জীবন সায়হ্নে এসে উদাম হয়ে গেল!

    মূল সমস্যা “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” পড়তে ব্যার্থতাঃ
    এমনই আরেক চরম ব্যর্থতার ঘটনা দেশের ভিতরেই ঘটেছে। দেশের ভিতরেই আমরা দেখছি হাসিনার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় যারা তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আর সেকথাটাকে প্রথম আলোর রিপোর্টের ভাষায় বললে, “বিএনপিকে থামানোর পথ খুঁজছে আ.লীগ”। এই হল বাস্তবতা। অথচ দেখা যাচ্ছে অনেক তুলনামূলক ছোট রাজনৈতিক দল এই ফেনোমেনাটা পড়তে জানে না।  বলে এখন  এই শেষ জীবনে এসে আবার এদের অনেকে ভারতের সহায়তা পেতে চেষ্টারত; লিঙ্ক যোগাড়ের চেষ্টায় রত। তাদের বোকা আকাঙ্খাটা হল, ভারত যদি তাদের দলীয় রেজিষ্টেশন ইত্যাদি কোন সরকারি ফেবার পেতে সহায়তা করে তাহলে এটাই তাদের নিজদলের স্বার্থ হবে।  আগামি হবু নির্বাচনে এভাবেই তারা নিজ স্বার্থটা  বলে বিশ্বাস করছে। এদেরকে নিয়ে কী বলা যায়??
    তার মানে লীগ যেখানে নিজ ক্ষমতা ধরে রাখার অন্তত চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে এই দলগুলো সেখানে তা দেখতেই পাচ্ছে না। শুধু তাই না, ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভাটাতে হওয়া সত্বেও এরা হাসিনার বাংলাদেশের উপর মোদির প্রভাব অটুট দেখতে পাচ্ছে!! তাদের প্রাণপণে ভারত লবি খুঁজার কথা জেনে-দেখে  বুঝা যাচ্ছে তাদের নাদানি কত গভীর!!! তারা শেষে এই ২০২২ সালে এসে প্রাণপণে ভারতের দালালি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তারা জানেই না যে কোন সম্পর্কই আর আগের জায়গায় নাই; তা না থাকারই কথা! না গ্লোবাল রাজনীতির মেরুকরণের দিক না এটা একান্তই এর স্থানীয় রাজনীতির দিক। সে কেবল ভাল লবি খুজে ভারতের সেবা করে নিজের স্বার্থ অর্জন করতে নেমেছে!!! অদ্ভুত তাদের বুঝাবুঝির ভিত্তি!!
    রাস্তার আন্দোলন বা উদ্যোগ কোথায় পরিণতি বা ফলাফলে পৌচাচ্ছে তা দেখতে একটু অপেক্ষা করতেও তারা রাজি না। আবার ভারতের কাছে যা চাইতে নেমেছে তা মিনিংফুলি ভারতের দেওয়ার ক্ষমতা আছে কিনা তা চেক করতেও তারা রাজি না!! এই হল বাংলাদেশের কিছু রাজনীতিক!

    তাহলে এখন শুরুর  কিছু কথা আবার মনে করিয়ে শেষ করব।  বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকার এর অর্থ হল এতে যে গ্লোবাল মেরুকরণের ইঙ্গিতটা ছিল তা হল – ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা একই মেরুতে জায়গা নিয়েছিল। এখন বাংলাদেশের রাজনীতিক যারা  “এই মেরুকরণ”কে একেবারে স্থায়ী বলে মনে করবে; তারা রাজনীতি করার অযোগ্য যারা ধরে নিবে যে শুধু তাই না,  যারা মনে করবে ভারতের সাথে লবি করলে তবেই আমাদের সরকারের থেকে কিছু সুবিধা পাবার পথ এবং এই পথ স্থায়ী!!!সবশেষে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কটা কত দ্রুত গতিতে ভেঙ্গে পড়ছে তা বুঝতে সহায়ক এই রিপোর্টটা আগ্রহিদের পড়ে দেখতে রেফার করব। এটা ভারতের দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখা। তিন অক্টোবর সকাল আটটায় তা প্রকাশিত, ফলে তা লেটেষ্ট। বাংলাদেশের ভাষায় বললে তিনি ফরেন বিটের সাংবাদিক। তবে আমি নয়নিমাকে গণ্য করি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যেন সেই অ-সরকারি মুখপাত্র যার মুখ দিয়ে মন্ত্রণালয় নিজের মনের খায়েসের কথাগুলো বলে থাকে, যা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিজমুখে প্রকাশ্যে নানা সীমাবদ্ধতায় বলা সম্ভব নয়। তবে, এখানে নয়নীমা যেন ধরে নিয়েছেন ভারত-আমেরিকার পুরান সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে!! এভাবেই লেখা!! আর এলেখা থেকে  পরিস্কার যে ভারত আর দুইনৌকায় পা-দিয়ে চলতে পারছে না। তাকে কোন একদিকে অবস্থান নিতেই হবে; মূলত আমেরিকা তাকে এঅবস্থায় দিকে ঠেলে দিয়েছে। এবং ইঙ্গিতে বলা অবস্থান হল চীন-রাশিয়ার দিকেই ভারতের সম্ভাব্য অবস্থান, যেমন এই রিপোর্ট লিখছে, এরকমঃ

    .…..well set the tone for the next meeting of Quad, but India — a neighbour of Beijing
    and a strategic partner of Moscow.….. 

    আমরা চীনকে ভারতের এই “পড়শি” বলে সম্বোধন এর আগে দেখেছি বলে মনে পরে না। এটাই কী এখন থেকে ভারতের চীন-ঘনিষ্ট হবার ইঙ্গিত!! কারণ, এতদিন তো চীনকে  ভারতের মিডিয়া ভারতের শত্রু বলেই আমাদের কাছে পরিচিত করিয়ে গেছে! যেকারনে, এখনো ভারতের পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে চীন তাদের শত্রু দেশ। চীনের যেকোন কিছুই তাই ভারতের পাবলিক মাইন্ডে এখনো ঠাট্টার বস্তুই। তাহলে দাড়াচ্ছে যা তা হল, এটা ভারতের জন্য – কে ফ্রেন্ড আর কে এনিমি – তা রি-ডিফাইন করার জটিল বা উভয় সঙ্কটের সময়!  আর এর সাথে যায় এমন নতুন সেসব কিছু নয়া বয়ান তৈরি সহজ কাজ না হলেও সম্ভব বটে!

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    গৌতম দাস

    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4fa

     

        আমেরিকান কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান – রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাবক

    সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত খুঁজছে বার্মা থেকে বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ার পিছনের ঘটনা কী? সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রধান দিকটা হল, এমনিতেই ডলার সংকট আর চরম মুদ্রাস্ফীতিতে ডুবে থাকা আমাদের অর্থনীতিতে তাদের নাভিশ্বাস উঠা জীবনে, বাংলাদেশ কী কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছে? আমরা কী এবার অন্যের যুদ্ধস্বার্থে বলি হতে যাচ্ছি? কারণ সাধারণভাবে বাংলাদেশের নুন্যতম অবস্থান হল যুদ্ধের বাইরে থাকা অর্থে যুদ্ধবিরোধিতা, শামিল না হওয়া। সেখানে বলাই বাহুল্য এসময়ের যেকোন যুদ্ধ যাতে জবরদস্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা হবে আত্মঘাতি বিশেষত তাতে যেখানে এখন অন্তত মারাত্মক খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষাবস্তা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা আছে!

    ঘটনাটা প্রথম প্রকাশ ছিল একটা পুরানা ঘটনা যার শুরু এক আমেরিকান উদ্যোগ থেকে। গত ২০১৯ সালের হাসিনা যেটাকে বলেছিলেন দুর্বৃত্বপনা; বা দুর্বৃত্বের প্রস্তাব [flagitious proposition]।  আমেরিকান বেনার নিউজের ভাষায়, আমেরিকার এক “গর্হিত কাজ”।


    সেই প্রস্তাবটা কী আর তা কোথা থেকে উদয় হয়েছিল?

    এটা উদয় হয়েছিল আকাবাকাঁ ভাবে; মানে প্রথম যুগে আমেরিকার বার্মার জেনারেলদের পক্ষ নিয়ে কথা বলা যেটা পরে জেনারেলদের নির্মুলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে।একালের বার্মার দিকে আমরা প্রথম খোঁজ নিতে আকৃষ্ট হই ২০১৭ সালে, রোহিঙ্গা উচ্ছেদ আর বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়প্রার্থিতা থেকে। কিন্তু একালের বার্মার পরিবর্তনের শুরু ২০০৭ সাল থেকে।
    ভারত সরকার যেন বার্মার জেনারেলদেরকে খুব সুবুদ্ধি দিচ্ছে এমন ভাব ধরে দেয়া উস্কানিতে জেনারেলেরা মুসলমান বলে বার্মার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে ২০১৭ সালে নিশৃংসভাবে হত্যা আর ভয়ের খেলা দেখিয়ে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মজার কথা হল রোহিঙ্গা খেদানোর পক্ষে জেনারেলেরা যে সাফাই ব্যাখ্যা দিয়েছিল তা আমেরিকা, ভারত, ও চীন কেউ বাদ যায় নাই, সকলের মেনে নিয়েছিল ও তাদেরও অবস্থানও সেটাই হয়ে দাড়িয়েছিল। সারকথায় সেই ভাষ্যটা হল, আরসা (ARSA, Arakan Rohingya Salvation Army) বলে এক ‘কল্পিত বাহিনীর’ কথা তুলেছিল। আরসা নাকি বার্মিজ নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে ৭০টা স্থানে হামলা করেছিল। আর তা প্রতিরোধ করতে ধাওয়া করতে গেলে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থলের বাসিন্দারা ভয়ে ডিসপ্লেসেড বা ঘর ছেড়ে আশ্রয়ে ভাগতে যাওয়াতেই নাকি বাংলাদেশ সীমান্তে রোগিঙ্গা ঢল উঠার কারণ। সারকথায়, দেখা যায় জেনারেলেরা তাদের যে সব দানবীয় আচরণের দায়স্বীকার করতে পারবে না তা এই “কল্পিত আরসার নামে” তারা হাজির করে থাকেন। পরিণতিতে এখন সংশ্লিষ্ট সবদেশেরই একটা করে আরসা আছে। আমেরিকান পাসপোর্টধারী আরসাও আছে বলে শুনতে পাই!!

    এককথায়, ২০০৭ সালের পর থেকে বার্মা গ্লোবাল লাইম লাইটের ইস্যু হয়ে আসার পিছনের মূল কারণ হল এর আগে মোটামুটি ১৯৮৯ সাল থেকেই ক্রমান্বয়ে বার্মা জাতিসংঘের অবরোধ আর পরে আমেরিকান বা পশ্চিমা অবরোধে পর্যদুস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মত চীন-বার্মা সীমান্ত এটাও শতছিদ্র [perforated] সীমান্ত বলা হয়। সেই সুযোগ এর ভিতর দিয়ে এটাই বার্মার বাহিরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের একমাত্র সীমান্ত বা উপায় হয়ে উঠে; কিন্তু এর সবটাই ইনফরমালি ফরমাল ধরণের বাণিজ্যের লেনদেন। ফলে অন্যভাবে দেখলে বার্মার উপর সব স্যাংশন বা অবরোধের ফলে পরিণতিতে এর মাখন গিয়ে উঠছিল একা চীনের ঘরে।

    এটা ভাঙতেই নেপথ্যে ভারত উদ্যোগ আহবানে সারা দিয়ে পশ্চিম সামিল হওয়াতে বার্মা  গ্লোবাল লাইম লাইটটে আস্সেতে শুরু করেছিল। এরই প্রকাশ্য চিহ্ন হল বা  এক রফার দলিল হল ২০০৮ সালের বার্মার কথিত নয়া কনষ্টিটিউশন ২০০৮। কিন্তু “কথিত” কারণ, বার্মা এরপরেও আসলে কোন রাষ্ট্র নয় – একটা আর্মি ক্লাবের মালিকানায় একটা ভুখন্ড মাত্র। এনিয়ে বিস্তারে দেখতে এখানে।   যা হোক এনিয়ে কথা আর বাড়াবো না কারণ, ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে জেনারেলেরা বুঝে যায় ও সিদ্ধান্ত নেয় যে এই পশ্চিমা-ফর্মুলায় বাইরের দুনিয়ায় আসাটা ভুল ও তা অকার্যকর,তাতে ব্যাপারটা ক্ষমতা জেনারেলদের হাতে রাখার দিক থেকে।

    কিন্তু ঘটনা এর আগেই দুনিয়ার অন্যান্য ঘটনায় অন্যদিকে রওনা দিয়েছে। আমেরিকা-চীনের গ্লোবাল পালাবদলের গোপন-প্রকাশ্যের লড়াইয়ে আমেরিকা আবিস্কার করেছিল যে বার্মার অবস্থান আসলে চীন-ভারতের দিকে ভারি ফলে বড় মাখন সব তাদের দিকে চলে যাচ্ছে। এমনকি সেটার মধ্যে আবার বার্মা না চাইলেও তার অতি চীন-নির্ভরতা যা সীমাহীন বলে আর লম্বা সময় ধরে তা চীনমুখি করে শুরু থেকেই দীর্ঘদিন সাজানো বলে সব মাখন এমনিতেই চীনের ঘরে উঠেই চলছে।

    তাই ২০১৯ সাল থেকেই এনিয়ে আমেরিকার বিকল্প ভিন্ন পরিকল্পনা উন্মোচিত হতে শুরু হয়েছিল। এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা সংক্ষিপ্ততম ভাষায় বললে তা হল,  ‘বার্মা দখল’। এটা হল, আমেরিকার ‘বার্মা দখল’ পরিকল্পনা।  কিন্তু এই ভাষায় নয়; বরং ভিন্নভাবে। তাহলে দখলের সেই সাফাই-ভাষ্যটা কী? সাফাইটা হল, আমেরিকা রোহিঙ্গা সমস্যা্র সমাধান করতে চায়, এই ছলে। সোজাসাপ্টা বললে, রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানের উছিলায় বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ( মোটা দাগে সম্ভাব্য আমেরিকান এয়ার কাভারে বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনী মুভ করিয়ে ধরণের কিছু করে) বার্মা দখল।

    কিন্তু এসব কথাগুলো আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছিল ভিন্নভাবে, ভিন্ন ভাষায়। কীভাবে এবং কোথায়?

    বলা হল এটা যেন রুটিন আমেরিকান কংগ্রেসের (সংসদ) এক ততপরতা। যেখানে সংসদীয় কমিটি তো থাকবেই। তেমনই ওর পররাষ্ট্র উপকমিটির এশিয়া অংশের নেতা বা কংগ্রেসম্যান হলেন ব্রাড শেরম্যান। একথা সর্বজন বিদিত যে রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বার্মিজ জেনারেলদের এথনিক ক্লিনজিং ঘটে চলছে।  আর তারা কখনই বাধ্য না হলে রোহিঙ্গাদের  আগামিতে ফেরত নিতেই চান না। তাই এই পরিস্থিতিকে উছিলা করে এইবার শেরম্যান সামনে এসে তিনি নিজ উপকমিটির এশিয়ার বাজেট প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বলছেন, বার্মার রাখাইন প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে।

    এশিয়ায় আমেরিকান রণকৌশলগত স্বার্থ রক্ষার্থে ও প্রভাবিত করতে দুইটা মিডিয়া ও ওয়েব সাইট খুলেছে। এর একটা হল বেনার নিউজ [BENAR News]  আরেকটা ডিজিটাল লাইব্রেরি ধরণের যার নাম ‘রোর বাংলা’ [roar.media]। এগুলো ২০১৭ সালের শেষের দিকে চোখে পড়তে শুরু করেছিল। ব্যানার নিউজের ক্যারেকটার হল অনেকটা সোভিয়েত-আমেরিকা রেষারেষির যুগের মত তখন আমেরিকা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে কোন প্রতিষ্ঠান খাড়া করলেই সেখানে একটা শব্দ কমন থাকতে দেখা যেত –  ফ্রি [Free] এই শব্দটা; যেমন ফ্রি নিউজ বা ফ্রি মিডিয়া। বুঝাতে চাইত যে রাশিয়া ফ্রি স্পিচ বা ফ্রি মিডিয়া বলে কিছু নাই। এর উল্টাটা তাই আমেরিকায় যেটা আছে। তাই অনেক সময় বেনার নিউজেও ফ্রি শব্দটা দেখা যায়। [কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ওয়েব বাংলাদেশের ভিতর থেকে হলে এখন বিআরটিএ তা আটকে রেখেছে। ফলে ভিপিএন [VPN] দিয়ে ঢুকতে হবে। তবে বিদেশ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ঢুকা যাবে।]

    সেই ব্যানার নিউজে ব্রাড শেরম্যান এর ‘রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনা” এই খবরটা কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল? গত ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত এর হুবহু সে রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা তুলে আনছি … “রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ধরনের প্রস্তাবনা একটি ‘গর্হিত কাজ’  ”। পরেরদিন ৯ জুলাই ২০১৯ একই খবর আমেরিকান ভোয়াবাংলার [VOA] নিউজও ছিল এরকমঃ ……“রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের দেয়া প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা”।

    রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাবঃ
    তাহলে এবার আমরা ২০১৭ সালের জেনারেলদের কোলে বসে থাকা তিনদেশের আমেরিকা, ভারত ও চীন – এখানে একটা বদল হতে দেখছি। এদের মধ্যে আমেরিকা সরে এসে যেন পল্টি মারতে চাইছে। বলছে বার্মাকে ভাগ করে “রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনতে হবে”। এখানে আরো একটু আলো ফেলব। পটভুমিটা হল,  এটা বার্মিজ জেনারেলদের বৈশিষ্ট যে তারা গ্রহিতা দেশকে অনুগ্রহ লাভের ভুমিকায় রেখে দিয়ে তাদের উপর নিজ কমান্ড বজায় রাখার ক্ষমতা রাখে, নিজ দাতা অবস্থান তারা সহসা হারায় না; যেভাবেই হোক তা ধরে রাখতেই সক্ষম হতে দেখি আমরা। তাহলে, আমেরিকা কী এই জেনারেলদের কমান্ড থেকেই বের হতে চাচ্ছে? না, ঠিক একদম তা নয়।  সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

    কখন ও কোথায় এবং  কোন ভাষায় আমেরিকা এটা প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিল? এটাই ২০১৯ সালের জুনের শেষে-আগষ্টের প্রথম সপ্তাহের দিকে, আমেরিকান কংগ্রেসে (আমেরিকান সংসদে) তা আমরা দেখলাম। আর এর চেয়েও বড় কথাটা হল, আজকের বার্মিজ গোলা এসে বাংলাদেশে কেন এসে পড়ছে এর পিছনের পোলারাইজেশনে মানে আমেরিকা, চীন ও ভারত এবং একালে যুক্ত হওয়া রাশিয়ার মধ্যে এখন  কোনদেশ কে কোন দিকে এখন আছে তা আসলে সেকালে ২০১৯ সালেই স্পষ্ট ছিল। সেটা কীভাবে??

    ২০১৯ সালের রোহিঙ্গা বা বার্মা ইস্যুতে ভারত-চীন একসাথে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানেঃ
    ঐ ২০১৯ সালেই ব্রাড শেরম্যান এর কথিত আমেরিকান প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল ভারত ও চীন একসাথে। এরই একটা ঝলক দেখেছিলাম তখন। যদিও তা তখন যথেষ্ট খোলাখুলি ছিল না বলে তত আমল হয় নাই।  সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় কীভাবে এই খবর আমাদের কাছে তখন এসেছিল তা ফিরে অনুসরণ করলেই।

    যেমন ব্রাড শেরম্যান প্রথমবারের মত আমেরিকান কংগ্রেসে রাখাইন প্রদেশ কেটে আনার কথা বলেছেন ১৩ জুন ২০১৯।  আর তা আমরা প্রথম জানতে পারি একমাত্র ভারতীয় টাইমস অব ইন্ডিয়ায় (TOI-ET) প্রকাশিত এক রিপোর্টের কল্যাণ্যে; তাও আবার সেই রিপোর্ট শেরম্যানের বক্তব্যের প্রায় ১৭ দিন পরে, ১ জুলাইয়ে। এবং দ্বিতীয় আর কোন মিডিয়ায় এই খবর ছাপা হয়েছে জানা যায় না।

    This proposal was made on June 13 during a hearing on the State Department’s budget for the South Asia, according to a US media report.

    এমনকি TOI-ET নিজের খবরের সোর্স হিসাবে জানাচ্ছে সেটা আমেরিকার স্থানীয় রিপোর্ট (according to a US media report)। অর্থাৎ খুব অস্পষ্ট; সুনির্দিষ্ট  করে কোন সোর্স এর কথা বলা নাই। কিন্তু তাই বলে খবরটা কী দুর্বল বা ভুয়া? না; অবশ্যই তা একেবারেই নয়। কেন, কী প্রমাণ আছে এর?

    প্রথম প্রমাণ হল,  এই খবরের প্রতিক্রিয়ায় যেসব খবর তৈরি হয়েছে, আমেরিকান দুই মিডিয়া বেনার নিউজ আর ভোয়া,  তা অবলীলায় নিজেরাই ছেপেছে। এভাবে এরা পরোক্ষে TOI-ET এর খবরের সত্যতার সাক্ষ্য দিয়ে ফেলেছে। মানে আমেরিকান কংগ্রেসে এমন আলোচনা হয়েছে তা স্বীকার করে নিচ্ছে।

    আর দ্বিতীয় প্রমাণ আরও অনেক বেশি সাক্ষ্য -প্রমাণ। এর সবচেয়ে বড় প্রভাবটা হল, TOI-ET তে ছাপা হওয়া ঐ রিপোর্টের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা খুবই কড়াভাবে আমেরিকাকে ধোলাই করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। আর তা বাংলাদেশে তো বটেই, ভারতে ব্যাপকভাবে এবং এশিয়ায় অনেকদেশের মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছিল। ফলে TOI-ET তে ছাপা হওয়া খবরের সত্যতা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন থাকে নাই। তবে এসব সত্বেও ভারত-চীন যে এক অবস্থান নিয়ে আমেরিকার বিরোধিতা করেছিল সে অংশটা ভারত কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণে হাজির রাখতে চায় নাই; তাই যাকিছু প্রমাণ তা পরোক্ষে প্রমাণ, এখানে তা লুকায় নাই।

    এমনকি আরেকটা তথ্য খুব গুরুত্বপুর্ণ ছিল সে সময়ে। ১ জুলাই ২০১৯ TOI-ET প্রথম খবরটা চাউর করেছিল। আর এর প্রায় এক সপ্তাহ পরে ৯ জুলাই হাসিনা এক সাংবাদিক সম্মেলনে হাসিনা আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান  ব্রাড শেরম্যানকে খুবই কড়া ্সমালোচনা করেছিলেন।
    তবে, সবচেয়ে বড় কথা হল ঐ সাংবাদিক সম্মেলন ছিল আসলে হাসিনার ২০১৯ সালের ৩-৮ জুলাই এই পাঁচদিনের চীন সফর শেষে দেশে ফিরার পরের দিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিং। আমরা জানি সাধারণত হাসিনার চীন সফরের সময়কালে ভারত টেনশনে থাকে যে কোন কোন নয়া চীনা প্রকল্পে না হাসিনা একমত হয়ে এলেন!!! যা হোক, সেবার ঘটেছিল উলটা। ভারত-চীন মিলে একসাথে হাসিনার মাধ্যমে আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের জবাব দিয়েছিল। যেমন বেনার নিউজের এর শিরোনাম করে ছিল, “রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে বলা অন্যায়ঃ শেখ হাসিনা”। ভোয়ার শিরোনাম ছিল, “কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের কড়া সমালোচনা করলেন হাসিনা”।

    এখন ২০১৯ সালের ঠিক এই পুরান জিনিষটাই আবার নতুন করে এখন উঠে আসছে।  যদিও আগে কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাবটা এসেছিল ট্রাম্পের আমলে। কিন্তু এবার (২০২২) সেটাই আরো সংগঠিতভাবে বাইডেনের প্রোগ্রাম হয়ে এসেছে। আর এতে বাংলাদেশের নিজ রাষ্ট্র-রাজনীতি ও  সাধারণ মানুষের দিক থেকে যদি বলি, তবে এটা এখন আমাদের ১৪ বছরের ফ্যাসিবাদি-কর্তৃত্ববাদী সরকার উতখাতেই বিষয়, যেটার স্বপক্ষে আমাদের মানুষেরা আশা করে যে আমেরিকা এতে সমর্থন দিবে।  আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট ফোরামগুলোতে আমাদের পাশে নিঃশর্তে দাঁড়াবে এটাই আশা করে। কিন্তু ক্রমশ যে ইঙ্গিত আমরা দেখছি সেটা হল,  ব্রডম্যানের “রাখাইন প্রদেশ কেটে আনা” – সেই ব্যাগেজ এটাই যেন  বাইডেনের শর্ত হিসাবে আমাদের কাধেঁ লটকে বসে যেতে চাইছে।

    একদম খাড়াভাবে বললে, বার্মা একটা স্বাধীন সার্বভৌম জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র তাতে সে আমাদের জন্য যতই রোহিঙ্গা সমস্যা তৈরি বা মুসলমান ক্লিনজিং এর নায়ক হোক না কেন!  তাই, “রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার আমেরিকার প্রস্তাব – এটা একটা ক্রিমিনাল প্রস্তাব। এটা কোনদিনই কোনভাবেই জাতিসংঘ টপকিয়ে পাশ হতে পারবে না। যেমন,  ইরাকের সাদ্দামের স্বাধীন কুয়েত রাষ্ট্রকে দখলের পরিণতিতে জাতিসংঘ নিন্দা প্রস্তাব যেমন প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হয়েছিল, সবকিছু সাদ্দামের বিরুদ্ধে গেছিল। এটাই সাদ্দামের প্রথমত বিশাল নৈতিক পরাজয় ঘটিয়েছিল আর এর সুযোগ নিয়ে বুশের ইরাক দখল সহজকেই ঘটে গিয়েছিল।

    আসলে বাইডেন বার্মা দখল করতে চান যাতে আমেরিকা-চীন এদের যে গ্লোবাল নেতৃত্বের ঝগড়া আছে তাতে আমেরিকার নিজের বিজয় ও স্বার্থ তাতে মিটে। মূলত এশিয়ায় বার্মা, যতই জেনারেলদের ক্লাব সেটা হোক, সেই জেনারেলেরা পরাজিত হয়ে সেটা “বাইডেনের বার্মা” হয়ে যাবে এটা পড়শি ভারত ও চীনের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
    বলা যেতে পারে পরিস্থিতি এখন ভারত-আমেরিকার গত ২০ বছরের ঘনিষ্ট সম্পর্কের সবচেয়ে ভাটার সময়, দূরে সরে যাবার সময়!! আমেরিকা ইতোমধ্যেই পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছে!!

    আমরা সবাই জানি যে,   গত কমপক্ষে প্রায় ২০ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর দাড়োয়ান হতে চেয়ে ভুমিকা রেখে গেছে। তবুও ভারতের নিজ কোরস্বার্থ  হল বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনফ্লিট নোঙর করার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অথবা ভারতের যেকোন পড়শিদেশে আমেরিকার গেড়ে বসার বিরোধিতা করা যেটাতে সে আপোষ করে নাই।  চীন হল ভারতের ন্যাচারাল পড়শি (যা বদলানো যাবে না) যার তুলনায় আমেরিকার নতুন করে এশিয়ার কোথাও কোন পড়শি দেশে গেড়ে বসতে দেয়া ভারতের জন্য আপত্তির। এই হল ভারতের কোরস্বার্থের সারকথা।

    কাজেই বার্মা প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এটা চীনা অবস্থানের পক্ষে সমর্থন হয়ে উঠবে; ন্যাচারাল কারণে।

    ওদিকে রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধ সাত মাস শেষ করেছে যা আগামি নভেম্বরের আগে কোন মোড় বদল বা মোচড় নিবার সম্ভাবনা নাই বলেই মনে হয়। এঅবস্থায় রাশিয়া না চাইতেই আমেরিকা বিরোধী জোট বা ফ্রন্টের সামনের স্থানের রাষ্ট্র। তাই ভারত ও চীনের সমর্থনে রাশিয়া বাইডনের বার্মার দখলের স্বপ্নের বিপরীতে তবে এই উসিলায় সরাসরি এশিয়ায় পা-রাখতে চাওয়া আমেরিকার বিরোধিদের প্রধান ভুমিকায় হাজির হচ্ছে।

    কিন্তু বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে এসবই তো গ্লোবাল নানা দেশেরস্বার্থ ও পরিস্থিতি।  আর বাংলাদেশের নিজস্ব চাওয়া যেখানে হাসিনার পতনে একটা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও রাজনীতি কায়েম; এভাবে কর্তৃত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ হটানো। এই কাজে আমরা আমেরিকাসহ দুনিয়া সকল রাষ্ট্রের সমর্থন চাই; সকল ফোরামে সমর্থন চাই। কিন্তু তাই বলে আমরা না আমেরিকা না চীন বা ভারতের স্বার্থের কোন যুদ্ধে সামিল হতে পারব না। আমরা কারো ব্যাগেজ বইতে পারব না, কোন সামরিক সংশ্লিষ্ঠতায় সামিল হতে চাই না, পারব না। এটা বাংলাদেশের কোরস্বার্থের বিরোধি!

    আমরা হাসিনার ক্ষমতা আকড়ে থাকার প্রবল বিরোধী; সরকারের কাঠামো, জবাবদিহিতা  ভেঙ্গে ফেলা এর চরমবিরোধী;  বিচার বিভাগ তো বটেই খোদ কনষ্টিটিউশনই এখন নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে। এসবই অগ্রহণযোগ্য যার আমুল পরিবর্তন এখন আমাদের নুন্যতম কাম্য। তাতে হাসিনা ২০১৯ সালে যতই  সঠিকভাবে আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান শেরম্যানের সমালোচনা করে থাকেন না কেন!

    আমরা কী শেষে আমেরিকা না চীনের পক্ষ নিবঃ
    এখন বাংলাদেশ বলতে দুটা প্রতিনিধিত্ব হতে দেখা যাচ্ছে। একটা হাসিনা-মোমেনের।  যেমন হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন, বার্মার বাংলাদেশে বোমার গোলা ফেলা প্রসঙ্গে বলছেন এটা নাকি বার্মার ‘অনিচ্ছাকৃত’। অর্থাৎ একদিকে বার্মার গোলা পড়তেছে এটা বাস্তবতা। কিন্তু সেটাকে  কৌশলে নরম করে দেখিয়ে কসরত করে মোমেন অস্বীকারের চেষ্টা করছেন; এটাকে প্রলেপ দিয়ে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। এটা হল আসলে হাসিনার বাইডেনবিরোধি রাশিয়া-চীন-ভারতের জোট বা মেরুতে বাংলাদেশকে ঢুকাতে, অবস্থান নিতে চাইছেন।  আর এজায়গায় বাংলাদেশের কমন স্বার্থ ও আকাঙ্খাকে হাসিনা প্রতিনিধিত্ব করেন না। মানে তিনি সেই আকাঙ্খাকে নিজের সাথে রাখতে পারেন নাই বলেই আমার ধারণা।  আসলে হাসিনার স্বার্থ আর আমাদের কমন স্বার্থ এক নয়। এককথায় বাংলাদেশের স্বার্থ হল, কোন দেশ বা ব্লকে না সামিল হওয়া। সেটা বাইডেনের বার্মা দখলের পক্ষে বা বিপক্ষে  কোন যুদ্ধেই সামিল না হওয়া।

    বাংলাদেশ শেষে বাস্তবে কোন সিদ্ধান্তের দিকে যায় সেটা আগামি বাংলাদেশের জন্য খুবই নির্ধারক!!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত

     

    বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত
    গৌতম দাস

    https://wp.me/p1sCvy-4eU

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০ঃ০১ রাত

    সীমান্তে মর্টারশেলের অবিস্ফোরিত গোলা

     

    চীনা নেতৃত্বে দল পাকানো বা জোট গঠন আর আমেরিকার নেতৃত্বে পুরানা ও নয়া জোট গঠন এদুই কাজ যেন সাম্প্রতিককালে ভীষণ দ্রুত আগানো শুরু হয়েছে। এরই এক প্রকাশ হল বার্মাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নড়াচড়া। দু-চারটা মর্টার বা গোলা বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে এসে পড়া বা এতে বাংলাদেশের দু-চারজন করে আহত-নিহত হওয়া – এসবই মূল ঘটনার খুবই ক্ষুদ্র কিছু বাইরের দিক।

    চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি ট্রাম্পের আমলে (২০১৭-২০) যেমন ছিল – একে যদি বলি আমেরিকার তার গ্লোবাল নেতৃত্বের ততপরতা বা দায়ভার ফেলে তা  ট্রাম্পের ঝেড়ে অস্বীকারের অবাস্তব পথ ধরে চীন ঠেকাতে আভ্যন্তরীণমুখি ও জাতিবাদি হয়ে উঠার চেষ্টা; তাহলে পরবর্তিতে মানে চলতি বাইডেনের আমলটা হল, প্রকাশ্যে চীনবিরোধী করে নানান গ্লোবাল জোট পাকানো ও তা দিয়ে আগ্রাসী হয়ে যুদ্ধ-সহ সব সক্রিয় ততপরতা করা্র যুগে তিনি দুনিয়ার সবাইকে টেনে নিতে চাইছেন।

    বিপরীতে চীনের দিক থেকে প্রতিক্রিয়ায় এসবের পালটা যেসব ততপরতা চীন ঘটিয়ে চলেছে সেসবের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বললে তা মূলত দুইটা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বা মাধ্যমেঃ এক. এসসিও [SCO] আর দুই.  ব্রিকস [BRICS] নামে ততপরতা।

    চীনা ততপরতাঃ
    এসসিও [SCO] – এটা এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-জোট যার নাম-সংক্ষেপ কে ভেঙ্গে বললে এর পুরা নাম ‘সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন’; তাই সংক্ষেপে SCO।  সাধারণত যেকোন আন্তর্জাতিক জোটকে মূল যে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; আর তা হল অর্থনৈতিক অথবা স্ট্রাটেজিক এভাবে। আর এই স্ট্রাটেজিক শব্দটাকে বাংলা করে বললে “কৌশলগত” এমন কোন জোট বলতে  বুঝতে হবে মূলত এটা সামরিক ও রাজনৈতিক (ছদ্ম-পলিটিক্যাল) বৈশিষ্ঠের জোট। এভাবেই তা হাজির হতে চেষ্টা করছে। যদিও বেশিরভাগ জোটই মূলত অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জোট হয়ে থাকে যেমন আসিয়ান, সার্ক ইত্যদি।

    নয়া ধারার জোটঃ
    কিন্তু যদি সুস্পষ্ট করে একালে বলি, ধরাধরি শুরু হয়ে গেছে মানে বলতে চাচ্ছি  কোন দেশ  – চীন না আমেরিকা – কার সাথে বিশেষ ঘনিষ্ট হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে গেছে এই অর্থে, আরেক ধরণের নয়া ধারার জোট হতে দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে চীনা না হয় আমেরিকান জোট।

    নয়া ধারার জোট, মানে কী বলতে চাচ্ছি। যেমন আগে মানে গত শতকের নব্বই দশক জুড়ে তখনও জোট হত মূলত অর্থনৈতিক। যা এরপর থেকে ক্রমশ মুল উদ্দেশ্য আড়ালে রেখে (চীনের দিক থেকে বললে) তা চীনের নেতৃত্বে নয়া ধারার জোট গঠন বা গঠনের ইঙ্গিত শুরু হয়েছিল। আর এতে ‘মুল উদ্দেশ্য আড়ালে’ বলতে বুঝিয়েছি তা যে আসলে আমেরিকাবিরোধী সেটা প্রকাশ্যে কোথাও উল্লেখ না রেখে ততপর হওয়া। তুলনায় যেমন – ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব জোট বা সব আন্তর্জাতিক ততপরতাই আসলে বাই ডিফল্ট হয়ে যেত কার্যত আমেরিকান উদ্যোগে বা আমেরিকান নেতৃত্বের জোট। আর ঠিক এর বিপরীতে সোভিয়েত যুগ শেষে একালে  নয়া ফেনোমেনা হিসাবে হাজির হয়ে চলছে চীনের উদ্যোগে বা নেতৃত্বে জোট গড়ে তোলা।
    তবে  চীনের দিক থেকে সেটাকে স্পষ্ট করে আমেরিকাবিরোধী সেটা উল্লেখ না করেই তা করা শুরু হয়েছিল যেমন এই এসসিও জোট গড়া থেকে। এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ২০০১ সালে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ২০০১ সালের হলেও তা ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা হামলার বেশ কয়েকমাস আগের ঘটনা। ফলে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এটা ছিল এক অঘোষিতভাবে আমেরিকাবিরোধী জোট।  যা মূলত চীন ও রাশিয়ার সেই প্রথম কাছাকাছি আসা।  আর এটা ছিল ১৯৫৮ সালের পরে সেই প্রথম চীন-রাশিয়ার কাছাকাছি আসা যখন ঐ ১৯৫৮ সালের আগে দুদেশই “স্টালিনবাদী কমিউনিস্ট” দেশ ছিল। আর এর চেয়েও বড় কথা ২০০১ সালে এসে তারা দুদেশের কেউই আর কমিউনিস্ট দেশ নয়।
    কেউ কোনদেশ আর কমিউনিস্ট কিনা এর একটা ভাল মাপকাঠি হতে পারে, সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য কিনা। সদস্য না হলে সে তখনও কমিউনিস্ট – এটা একটা ভাল মাপকাঠি। বিশেষ করে যদি আমরা এই ফ্যাক্টস মনে রাখি যে,  পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে ভেঙ্গে গেলে এরপরে রাশিয়াসহ মোট ১৫ রাষ্ট্রে তারা আলাদা বিভক্ত হয়ে যায়। আর এরপরেই রাশিয়াসহ ১৫ রাষ্ট্র সকলে এই প্রথম আবেদন করে আইএমএফের সদস্য হয়ে গেছিল। আর ওদিকে মাওয়ের নেতৃত্বের চীন (বা নয়া চীন) মানে চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনীতিক অস্বীকৃতির চীন ছিল সেটা – সেই চীনে  ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জারের প্রথম গোপন চীন সফরের পরে চীন-আমেরিকার ডিল শুরু করেছিল। আর পরে এথেকেই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনীতিক স্বীকৃতি ঘটে – ইত্যাদি এসব ঘটে যাবার পরে তখন ১৯৮০ সাল থেকেই নয়াচীনও প্রথম আইএমএফের সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    এসব কথাগুলো মনে রাখলে আমরা সহজেই মানব যে আইএমএফের সদস্যপদ নেওয়া মানে সে আর কমিউনিস্ট দেশ নয় হয়ে যাওয়া – এর একটা ভাল মাপকাঠি।
    এই বিচারে  চীন ও রাশিয়া প্রথম জোটবদ্ধ দেশ হচ্ছে এসসিও [SCO]-তে ২০০১ সালের শুরু থেকে আর যখন এদুই দেশ কিন্তু আর কমিউনিস্ট দেশ নয়। এরচেয়েও বড় কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে তারা কার্যত আমেরিকাবিরোধি হলেও এর কারণ তারা আগে ‘কমিউনিস্ট ছিল’  এমন কোনই কারণে নয়। মুলকথা এই শতকেও যারাই আমেরিকানবিরোধি ফলে  তারা নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট – এমন ভুল ধারণ অচল তাই এই ভুল অনুমানকে যেন আমরা জেনে-না জেনে আমাদের চিন্তার ভিত্তি না বানায় ফেলে থাকি, এই সতর্কতা দরকার।

    যদিও শুরুতে এসসিও এর জন্মানোর ভিত্তি ছিল যে – সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয়টা দেশকে নিরাপত্তার দিক থেকে পুরানা স্টাইলে রাশিয়া-নির্ভরই তারা যেন থেকে যায়, পশ্চিমা-প্রভাবে না চলে যায়। যেমনটা পোল্যান্ড, রুমানিয়া ইত্যাদি সোভিয়েতের বাইরের কিন্তু যারা কমিউনিস্ট দেশ – এদের বেলায় ঘটেছে এমন না হয়ে যায়।
    অন্যভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে পাঁচ দেশকে বুঝায় এর মধ্যে আবার যারা রাশিয়া অথবা চীন এদের কোন একটা দেশের সীমান্ত লাগোয়া দেশ এদেরকে নিয়েই এসসিও গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে চীন-রাশিয়া ছাড়া আরো তিন (কাজাখ, কিরঘিজ, তাজিক এই এথনিক-ভিত্তির দেশ) এভাবে পাঁচ দেশ; আর পরে  উজবেক এই এথনিক দেশ মিলে মোট ছয় দেশ নিয়ে এসসিও গঠিত হয়েছিল। যেটা থেকে রাশিয়া ক্রমশ একালে এসে ইউরোএশিয়া [euroasia] বলে একটা নয়া ধারণা চালু করেছে। অনেক পুরানা কমিউনিস্ট তাই ইউরোএশিয়া শব্দটা বেশি ব্যবহার করে কথা বলে। অথচ একালে পুতিনের রাশিয়ার কোন আমেরিকাবিরোধি পদক্ষেপকে কমিউনিস্ট বলে সহি মনে করে কথা বলা বা গর্ব করা অর্থহীন!

    তবে যেটা বলছিলাম, এই এসসিও জন্ম থেকেই তারা অনুল্লেখ রাখা আমেরিকাবিরোধী জোট অবশ্যই। তবে এরচেয়েও বড় কথা একালে মানে ধরা যাক গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের রাজধানী সমরখন্দে এবছরের এসসিও সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২; এই সম্মেলন বলছে তাদের সদস্য সংখ্যা ক্রমশ  বাড়ছে। যেমন শুরুতে ছয় দেশের এসসিও  ইতোমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান এদুই রাষ্ট্রকে একসাথে পুর্ণসদস্য করে নেয়া হয়ে গেছে। এবছর থেকে ইরানও পুর্ণসদস্য হওয়াতে মোট পুর্ণসদস্য নয় রাষ্ট্র। আর তুরস্কও সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করাতে ব্যাপারটা আর সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক অথবা যাদের চীন বা রাশিয়ার সাথে সীমান্ত আছে এমন কেন্দ্রিক বলে থাকছে না। কী হচ্ছে তাহলে?

    এটাই চীন-কেন্দ্রিক আমেরিকাবিরোধি প্রধান জোটের আকার নিচ্ছে। যেমন ইতোমধ্যেই এসসিও-এর দাওয়াতি বা অবজারভার সদস্যদেশ হয়েছে আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মঙ্গোলিয়া। আর ওদিকে এক নয়া এক ক্যাটাগরি ‘ডায়লগ মেম্বার’ হয়ে যুক্ত হয়েছে  – আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, ইজিপ্ট, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক – এমন এরা আরো নয় দেশ।

    আলাপ আবার একটু পিছন থেকে শুরু করছি। চীন-কেন্দ্রিক বা আগামি গ্লোবাল নেতা চীন এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জোট ততপরতা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা যদি খুঁজতে যাই তবে এর প্রকাশ্য শুরু হল ২০০৯ সাল থেকে। যদিও তখনও চীন-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট  মানে খুবই সচল ইতিবাচক ও সক্রিয় ছিল যা উভয় দেশেরই মুখ্য-স্বার্থ বলে বিবেচিত হয়ে চলছিল। এছাড়া মনে যাই থাক, কোন প্রকাশ্যবিরোধ বা কারো মৌলিক ভিন্নস্বার্থের উপস্থিতি তখনও উদয় হয় নাই।
    এই বিচারে ইতিহাসের ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বললে, ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একরকম গভীর সহযোগিতামূলক ছিল যা আগের ত্রিশ বছর মানে  ১৯৭৮- সাল থেকে যা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রথম তা তাল কেটে যায়, ২০০৯ সাল থেকে। সেটা ছিল আগের মতই সম্পর্ক সহযোগিতামূলকভাবে একসাথে বেড়ে উঠা সত্বেও এবার বাড়তি আরেক উলটা ফেনোমেনা ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠা শুরু করেছিল – যেটাকে আমরা স্বার্থ যার যার – এমন এক নয়া ফেনোমেনার যুগের শুরু বলতে পারি।

    ২০০৯ সালের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছিল যার প্রধান ও মুখ্য ঘটনাটা হল চীনের ব্রিকস [BRICS] ব্যাঙ্কের ধারণা নিয়ে সামনে আগিয়ে যাওয়া, যেটা কার্যত সরাসরি আমেরিকাবিরোধি। তবে এটা ঘটবার কারণ আমেরিকা নিজেই। বলা যায় আমেরিকা নিজেই চেয়েছিল এভাবেই বিষয়টা আগে বাড়ুক। নইলে আমেরিকার জন্য তার দিক থেকে অন্য অপশনগুলো হত আরো নিজ স্বার্থবিরোধি হত। মানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা শেয়ার চীনকে ছেড়ে দিতে হত।
    তাই ঘটনাবিরোধের শুরু, চীনের বিশ্বব্যাংকের নিজের মালিকানা শেয়ার বাড়ানোর আবেদন, এখান থেকে।  যা আগেই সে করেছিল আর আমেরিকা সেটা ২০০৯ সালে কার্যত প্রত্যাখান করেছিল। এর অর্থ, এথেকে গ্লোবাল পুঁজিবাজার বুঝেছিল যে এটা যেন চীনকে বলা যে পারলে তুমি চীন আমেরিকার মতই সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ারধারী হতে  আরেকটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিতে পারলে কর। অর্থাৎ বর্তমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এ আমেরিকান শেয়ার মালিকানা সর্বোচ্চ; যার সোজা অর্থ আমেরিকাই ইচ্ছাই শেষ কথা। এদুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-মালিকানার কাঠামোর মত করেই তৈরি। তাই চীনকে উপস্থিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মধ্যে মালিকানার ভাগ বাড়াতে না দিয়াটাই আমেরিকার জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে, চীনকে নতুন করে বিকল্প আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমেরিকা।

    আর এখান থেকেই আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়।   তাই ওয়াল স্ট্রীটের লিডিং এক কোম্পানির (গোল্ডম্যান স্যাসে goldmansachs.com ) এর চীফ ইকোনমিষ্টের পাবলিক পরামর্শ রেখেছিলেন যাতে চীন এগিয়ে আসে। আর চীন যেন সেই পরামর্শকেই মুল্য দিতে এগিয়ে আসে। আর গড়ে নেয়া নয়া এমন চীনা-বিকল্প  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানই হল ‘ব্রিকস ব্যাংক’ [BRICS Bank]। মূলকথায়, বিগত ১৯৯০ সাল থেকেই দুনিয়ার এমন নতুন দিকে মোচড়ের পিছনের মূল কারণ মনে করা হয়, চীনা অর্থনীতির ব্যাপক উত্থান – রাইজিং ইকোনমির ধারণা এখান থেকেই শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনের অর্থনীতিতে ক্রমশ বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি (accumulated surplus capital)। যা নিজেই তখন থেকেই অন্যান্য দেশে মানে সারা দুনিয়ার সবদেশেই – ‘অবকাঠামো’ ও ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ হিসাবে হাজির হবার যোগ্যতা-সক্ষমতা নিয়ে হাজির হবেই। ঠিক যেমনটা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াতে আমেরিকা ঘটিয়েছিল।  এটাকেই আমরা অন্যদেশের উপর  “প্রভাব বিস্তারের” মুল উপাদান হিসাবে এককালে আমেরিকার আর একালে চীনের সক্ষমতায় দেখি। তাই, প্রভাব বিস্তারি ক্ষমতার পুর্বশর্ত হল নিজ অর্থনীতি যদি বিপুল পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি – গড়ে তুলতে শুরু করা। এটাই আসল কারণ বলে বুঝতে পারি।

    আরেক অর্থে এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা অথবা পরাশক্তি হয়ে হাজির হওয়ার মূল শর্ত। অনেকে এই ব্যাপারটাকে সামরিক সক্ষমতা ভেবে ভুল করি। যদিও মূল ফ্যাক্টর বা উপাদান হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো হবেই আর সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানে এবার তা নিজদেশে সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়ানোরও সক্ষমতা হয়ে উঠা স্বাভাবিক যা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

    আর এটাই একালের দুনিয়ায় ঘটে গিয়েছে বলে গ্লোবাল পরিবর্তনের আরেক পর্যায়ের মুখে এখন আমরা সকলে।  যখন চীন ও আমেরিকার উভয়েই জোট পাকানো বা নিজ নিজ পক্ষে প্রকাশ্যেই নানান দেশকে সামিল করার প্রচেষ্টা যুগের শুরু হয়ে গিয়েছে বলতে পারি। তাই এটাকেই ঠাট্টা করে বলেছি “ধরাধরি শুরু” হয়ে গিয়েছে।

    তবে খুবই সাবধান, এই নয়া ফেনোমেনা সাবজেকটিক না। মানে আমি সাবজেকটিভ ভাবে আমাদের দেশে এটা ব্যাখ্যা করে বলেছি বলে এটা তাই হয়েছে তা একেবারেই নয়।  বরং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বা  পুঁজির সারপ্লাস সঞ্চয় ব্যাপক হবে কিনা, হয়েছে কিনা এটা বলার ক্ষেত্রে আমার ভুমিকা আসলে এক আবহাওয়াবিদের মত দর্শক-অবজারভার মাত্র; যে বিভিন্ন লক্ষণ ও দাটা মেপে ঘুর্ণিঝড় আসতেছে একথা আগাম বলে; কিন্তু কোনভাবেই যে নিজে ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টকর্তা নয়।

    আবার আমি কমিউনিস্ট কিনা অথবা রশিয়া-চীন কমিউনিস্ট বলে হয়ত  এদের পক্ষ টেনে আমি একথা বলছি – এমন ধারণা প্রসঙ্গেঃ

    প্রথমত আমি একেবারেই কোন কমিউনিস্ট নই। সবকিছু সরকারি মালিকানাভিত্তিক যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ধারণা আছে আমি এই চিন্তার অনুসারি একেবারেই নই। এছাড়া উপরে বলেছি, চীন-রাশিয়া কেউই আজ আর কেন কমিউনিস্ট নয়। চলতি কমিউনিজম আমার ইডিওলজি নয়। এছাড়া বর্তমান চীন-রাশিয়ার সখ্যতা যা আমরা দেখছি সেটা তারা কমিউনিস্ট ছিল বলে এখন এমন দেখা দিয়েছে একথা মিথ্যা। মূলত তাদের কমন প্রতিদ্বন্দ্বি বা বাধা এক্টাই সেটা আমেরিকা; এটাই তাদের সহমর্মিতা ও সখ্যতার মূল ভিত্তি। এটাই তাদের যেকোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বা ফোরামে পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন করার চেষ্টায় কমন অবস্থান নিবার আসল কারণ। মনে রাখা দরকার আজ যা চীন করছে ঠিক সে কাজটাই এককালে আমেরিকা করেছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে নিজ ক্ষমতায় করে সাজিয়ে নিবার ক্ষেত্রে।  আর  আমেরিকার সেদিনের উত্থানের বর্ণনার সময় আমি অকাতরে আমেরিকাকে পজিটিভ ভাবেই ব্যাখ্যা করে থাকি। কারণ দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নায়ক অবশ্যই আমেরিকা, তা সে যে কারণেই করে থাকুক। আমেরিকার সেই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত দুনিয়ার আগিয়ে যাবার জন্য এক লম্বা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।   আসলে সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট ধারণা ও চিন্তায় দুনিয়ার সেই পরিবর্তনকে  আজও তাদের উপলব্দিতে আসেনি, নিতে পারে নাই। এটা তাদের চিন্তা ও পদ্ধতির দুর্বলতা।

    তাহলে এখন আমরা কে কিভাবে ব্যাপারটাকে দেখব? যেমন একটা খুব কমন ও পপুলার পথ হল, আমরা কে কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাকে সহি মনে করি সেই ভিত্তিতে কেউ চীন আর কেউ আমেরিকার পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করা। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা একটাই যে আমরা কে চীনকে ভালবাসি আর কে আমেরিকাকে সেই ভিত্তিতে দুনিয়ায় পরিবর্তনের ঘটনাবলিকে দেখা ও ব্যাখ্যা করা এটা তো কোন চিন্তার মেথডলজি হতে পারে না।

    সারকথায়, আমার এই কথাগুলো বুঝতে সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়া কিভাবে নতুন করে সাজানো হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের মোটা মোটা ফ্যাক্টসগুলো যদি আগাম মনে রাখি বা সুযোগ পেলেই তা পড়ে রপ্ত করে আসি।  কারণ, এটা যার যত সম্যক বিস্তারিক স্টাডি থাকবে তার পক্ষে একালকের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যায় তিনি আগিয়ে থাকবেন।

    এবার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কেঃ
    উপরে চীন-রাশিয়ার অভিমুখ নিয়ে কথা বললাম; তাহলে এরার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কে। তবে লক্ষণীয় যে উভয় পক্ষই যে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জোট পাকাচ্ছে এর দুটোই বৃহত্তর এশিয়াতেই। মানে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্টাল এশিয়ায় যে এশিয়ার ব্যপ্তি।  এই বিচারে আমেরিকার সাজানো নাট্যমঞ্চের নাম ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ বা ‘কোয়াড’।  কথাগুলো তাই শেষের দিকের আমেরিকান ততপরতাকে মাথায় রেখে ইঙ্গিতে বলব।

    বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছেঃ
    গত কয়েকদিন ধরে বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছে আর সম্প্রতি আমেরিকান  সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান জেনারেল চার্লস এ ফ্লিন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ফেসবুকে বাংলাদেশ আর্মির যে পেজ আছে সেখানে দেয়া তথ্য এটা। জেনারেল ফ্লিন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছেন এমন অনেক ছবিও সেখানে দেয়া হয়েছে। আর পিছনে টাঙ্গানো ব্যানারে লেখা আছে “৪৬তম ইন্দো-প্যাসেফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার,  IPAMS 2022”।
    এতে অন্তত যেসব কৌতুহল সৃষ্ট হয়েছে সেগুলো একেবারেই আমাদের আর্মিকে নিয়ে নয়। মূলত তা ঐ ব্যানারে লেখা  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দটাকে কেন্দ্র করে। আর তা থেকে “বাংলাদেশ কী কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে জয়েন করে ফেলেছি”? কবে থেকে? এসব।
    এগুলো নিয়ে যারা যতটুকু জানেন তাদের কেউ কেউ বলছেন,  না – বাংলাদেশ জয়েন করে নাই। কিন্তু তাহলে ব্যানারের কথাগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই কৌতুহল অবশ্য  কেউ মিটাতে পারে নাই। এটাকে কৌতুহল বলছি বটে তবে এটা আসলে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার ভয় মিশানোও বটে!

    আবার একথাও সত্য যে বাংলাদেশ আর্মির সাথে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ওয়ার্কিং রিলেশন হল জাতিসংঘ মিশনকে কেন্দ্র করে। আর ঐ ফেসবুক পেজে তাই যেমনটা লেখা আছে –  “……বৈঠকে “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি” বিষয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্যগণ “বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা মিশন ও এর করণীয়” শীর্ষক ব্রেক আউট সেশন এবং জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।  এটা খুবই স্বাভাবিক।
    তবে তারা কক্সবাজার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিজিট ও কথাও বলেছে।  আর এর সাথে জুড়ে তাই উঠে আসছে রোহিঙ্গা বা বার্মা নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনার কথা।  আমেরিকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চিন্তার সারকথা হল, বার্মার আরাকান প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে সমাধান টানা। এতে বলাই বাহুল্য এটা একটা সামরিক পরিকল্পনা।
    আর তাতে ব্যাপারটা দাড়াচ্ছে এমন যেন,  এখন আমরা ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেই আর না দেই বাংলাদেশের এই ‘সামরিক পরিকল্পনায়’ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কী আসন্ন?
    আর সেজন্যই কী বার্মিজ গোলা এসে পড়ছে? আসলে এনিয়ে সরকারি ভাষ্য-অবস্থান নিয়ে কোন ব্রিফিং খুবই কম। তাই, সবকিছু প্রশ্ন কৌতুহল হয়ে আছে যার জবাব নাই। এটা যতই উহ্য থাকবে কৌতুহলের ডালপালা তত বাড়বে। মূল কারন বাংলাদেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে কীনা এটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যু। কারণ সবাই জানে বর্তমান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি ইনফ্লেশনের মধ্যে আবার একটা যুদ্ধ কল্পনার মানে কী!

    আসলে বড় পিকচারের দিক থেকে বললে,  এখনকার সব  আলোচনায় প্রধান যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন ডোনাল্ড ল্যু [U.S. Assistant Secretary of State Donald Lu] যিনি  আমাদের অঞ্চলে বাইডেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। যিনি সম্প্রতি ‘বিক্ষুব্ধ’ ভারত সফরে এসেছিলেন। এর চেয়েও বড় হল, পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ফেলানোর মূল নায়ক বা এক্সিকিউটর তিনি বলে মনে করা হয়। সাথে আরো কথা হল, আমেরিকা পাকিস্তানকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করছে যার মধ্যে এফ-১৬ এর যন্ত্রপাতিও সংশ্লিষ্ট আছে। এবিষয়ে ভারতের মিডিয়ার খবর এখানে দেখা যেতে পারে।  তাই ঐ সফরে ভারত খুবই কড়াভাবে এতে “আপত্তি” জানিয়েছে।

    সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুমান হল, চীনের এসসিও-এর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত দুদেশই আছে। তাই আমেরিকার পরিকল্পনা হল, এফ-১৬ ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত এর দুরত্ব বা কথার যুদ্ধ অন্তত শুরু করে দেয়া যাক। আর এভাবে তাহলে পাকিস্তান ইস্যুতে ইঙ্গিত হল, ইমরানকে জেলে যেতে হচ্ছে, তা সম্ভবত আসন্ন! আর এভাবেই শাহবাজ সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিতভাবে ভারসাম্যহীন এক প্রো-আমেরিকান  করে সাজানোর পরিকল্পনা এই ডোনাল্ড ল্যু এর।
    এই সুযোগে  কিছু কথা বলে রাখার সুযোগ নেয়া যাক।  সাম্প্রতিককালে আমাদের মত দেশের নিজে বাঁচার পথ হচ্ছে চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত) কারও দিকে এককভাবে আমরা যেন কোনভাবেই না ঝুকে গিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো দাঁড়ানো। একটা ভারসাম্য তৈরি করা  – আর এর মূল সুত্র হচ্ছে একেবারে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে মেপে পথ চলা। যদিও তা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন নিজেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নিজের জনগণের সমর্থনের উপর শাসক দাড়ানোর মুরোদে থাকে। এটা একেবারে প্রাইমারি। যে-ই ক্ষমতায় থাকতে  চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত)ীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে সে নিজের তো বটেই বাংলাদেশকেও গর্তে ডুবাতে নিয়ে যাবে।
    তাই ফ্যাসিবাদ হটাতে চাইলে কি আমাদেরকে কারো যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ও সমর্থক হতেই হবে – সকল ভয় ও কৌতুহলি প্রশ্নের কেন্দ্র এটা!!!!

  • কেন ভারত সফর

    কেন ভারত সফর
    গৌতম দাস

    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২  0৮ঃ৫৫ সকাল

    https://wp.me/p1sCvy-4eE

     

    Bangladesh PM Sheikh Hasina Arrives In Delhi For 4-day Visit

    হাসিনার সদ্য সমাপ্ত ভারত-সফর নিয়ে সফরের আগে থেকেই দেশে হাইপ [hype] বা মিথ্যা উচ্ছ্বাস তোলার চেষ্টায় কমতি ছিল না। মনে করা হয় আওয়ামি যুগ্ম বা সহ-সম্পাদক এর নিচের নেতাকর্মিমহলে ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ট এটা দেখাতে পারলে, এরা বিরোধিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে  নির্দয় মারপিট করতে জোশ পায়, চাঙ্গা হয়ে উঠে। অনেকে তাই হাইপ তোলাটাকে এখান থেকে দেখেছে।  তবে এর আগে বাংলাদেশের কোন প্রধানমন্ত্রীর কোন সফর নিয়ে এমন হাইপ তোলার চেষ্টা আমরা দেখিনি। সেদিক থেকে একটা বাড়াবাড়ি ত অবশ্যই ছিল।

    অন্যদিকে, এই সফর কেন, কী এর মুখ্য উদ্দেশ্য এর একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সরকার বা দল হাজির করার ক্ষেত্রে ব্যাপক খামতি দেখা গেছিল।  এরা কেউ বলতেই পারে নাই বা চায় নাই যে এই সফরের উদ্দেশ্য কী বা মুখ্য ইস্যু কী?  এটা ঢাকতেই যেন হাইপ তোলা হচ্ছে তা মনে হয়েছে। কিন্তু মুল বিষয়,  দেশের সরকার প্রধান কোন সফরে কেন যাচ্ছেন এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে অসুবিধা হবে কেন – এটাই তো আসলে অকল্পনীয় এবং অবিশ্বাস্য! কিন্তু তাই হয়েছে।

    ভারত-বাংলাদেশের বর্তমান বা চলমান সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গত ১৪ বছরে ব্যাপক অস্বচ্ছতা ও নিরুত্তর সব প্রশ্ন ক্রমেই তৈরি করে ফেলা হয়েছে।  সরকার এদিকটা কোনই আমল করে নাই অথবা আমল করা অবস্থায় ছিল না। যেমন, “ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে” – পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন একথা বলে ১২ ঘন্টাও টিকতে পারে নাই। এই উদাহরণটা আমরা মনে রাখতে পারি। এছাড়া দিনকে দিন ভারতের সাথে আমাদের নানান পাওনা নিয়ে গত ১৪ বছরে (যেকালে ভারত আমাদের চরম বন্ধু সরকার বলে দাবি জারি আছে) অমীমাংসিত ইস্যুর সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমে নাই। আর পানির মত ন্যায্য পাওনার ইস্যুগুলোর সমাধান ভারত আরো জোর জবরদস্তিতে করে তা না দিয়ে চলতে চেয়েছে। আর আমাদের সরকার বরং সেগুলো পাশ কাটিয়ে সবসময় চেষ্টা করেছে উলটা ভারতের খাতিরদারি আর তোয়াজ করে চলতে।  তাই এটা আশা করা অস্বাভাবিক ছিল না যে যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ইন্ডিয়া সফর তাই এই সফরের অন্তত প্রধান ফোকাস ইস্যুটা কী এনিয়ে সরকার স্পষ্ট করে বলে রাখবে। কিন্তু তাও এবার সরকার করে নাই।

    তুলনায় এর আগে যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জটিলতা বা অস্বাভাবিকতা যাই থাক তা সত্বেও তো উভয় দেশ থেকেই  উভয় দিক থেকে সরকার প্রধানের সফর ঘটেছে। কিন্তু কখনই এবারের মত এই সফরে ইস্যু কী – তা উহ্য রাখা হয় নাই। অথচ এবার নুন্যতম ফোকাস ইস্যুটা কী তা কেউ জানে না। সরকার স্পষ্ট করে বলতে পারে নাই – এমনটা হয় নাই।

    তাই উপায় না পেয়ে এমনকি প্রো-সরকারি মিডিয়াগুলোও পাবলিককে সন্তুষ্ট করতে যাকে পেয়েছে তাকেই ধরে নিয়ে এসেছে কিছু বলার জন্য। আর তাতেও দেখা গিয়েছে বিশেষত সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা হিমশিম খেয়েছেন। প্রশ্নের জবাবের চেয়ে আরো নতুন নিরুত্তর প্রশ্নগুলো সামনে এসে হাজির হয়েছে।  আর এতে সব আলোচনাতেই মুখ্য প্রসঙ্গ হয়ে ছেয়ে গেছে যে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা একপক্ষীয় – বাংলাদেশের দিক থেকে কেবল দিয়ে যাওয়া অথচ বাংলাদেশের প্রতিটা ন্যায্য পাওনার যেখানে হদিস নাই। এক্ষেত্রে অবশ্য আমরা ২০১৮ সালের ৩০ মে হাসিনার নিজের মুখের আক্ষেপের কথা মনে রাখতে পারি যে তিনি বলেছিলেন,  “ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা সারাজীবন মনে রাখবে” – শেখ হাসিনা।

    ‘ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের’ উপরই নির্ভরশীলঃ
    এবার সফরে মূল ইস্যু না জানা থাকাতে দীর্ঘ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়েই আমাদের সমাজে আলোচনার চেয়ে সমালোচনা হয়েছে বেশি।  তাই শেষে এর একটাই ব্যাখ্যা আপনাতেই  সামনে হাজির গেছে যেন আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল তাই তার পক্ষে বাংলাদেশের পাওনা বা স্বার্থের দিকটা নিয়ে কথা বলার, তুলে ধরার সুযোগ ও সক্ষমতা তার নাই, সে হারিয়েছে।
    এছাড়া এমন আপনা হাজির ব্যাখ্যার পক্ষে আরো উস্কানি তোলা আগুন ধরিয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য। হাসিনার ভারত সফরের দু-সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে স্থানীয় হিন্দুদের এক জমায়েতে দেয়া , “বাংলাদেশের সরকারকে টিকানোর জন্য ভারতকে বলেছি” – এই বক্তব্য। মোমেনের বক্তব্যের কারণেই ‘ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল” আছে এই সরকার এরপক্ষে সরকারি অনুমোদন পোক্ত হয়েছে বলে সমাজ দেখেছে। যদিও ঐদিন সন্ধ্যা হতেই খারাপ প্রতিক্রিয়া টের পেয়ে সাধারণ সম্পাদক কাদেরকে দিয়ে ঐ বক্তব্য “দল বা সরকারের নয়” বলে অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু দলনেত্রীর হুকুমছাড়া  – মোমেন, কাদের বা পরবর্তিতে আব্দুর রহমান এর মত নেতারা কেউ কথা বলেছেন এটা বিশ্বাস করা কঠিন!!
    আর এথেকেই আগামি বছর নির্বাচনের কথা খেয়াল রেখে সাধারণ মানুষের অনুমান যে আসলেই আগামি নির্বাচনেও সরকার ভারতের সক্রিয় সমর্থন কামনা করছে। যেন ভারতের অবস্থান  হাসিনা সরকারের পক্ষেই থাকে, অন্যদলের দিকে না যায় – এটা নিশ্চয় এবারের হাসিনার ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য!!

    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা, কেনঃ
    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। অথচ এবার সরকার না চাইতেও তিস্তা নদীর না-পাওয়া পানি ইস্যু এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের গায়ের জোরের নীতি-পলিসি  আরো উন্মোচিত হয়েছে।  তাই, সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা এনিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পরেছে।  আর তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। কেন?
    গত ২০০৯ থেকে চলে আসা টানা ১৪ বছরের সরকার মূলত ভারতের নর্থ-ইস্ট বা আসামের সব চাহিদার ইস্যু বা দুঃখ ঘুচিয়ে দিবে যেন এই প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিল। এককথায় বললে, সারা নর্থ-ইস্ট বা আসাম, ত্রিপুরা ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরণের অবাধ করিডোর সুবিধা নিবে এর বিনিময়েই যেন তখন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। মনে হয়েছে যেন আমরা এখনও “অখন্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়ায় ১৯৪৭ সালের আগেই আছি”। এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাই ভারতের একক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অবাধে বাংলাদেশের ভুখন্ডের উপর দিয়ে সব করিডোর সুবিধা নেওয়া হয়েছে। আর তা যোগানোই যেন আমাদের সরকারের কর্তব্য!!

    এখন ২০০৭ সালের পরিকল্পনা মতে,  ভারত এভাবে একপক্ষীয় ভাবে সকল সুবিধা নিবে এটা দেখতে খারাপ লাগে তাই, ভারতের দিক থেকে দুইটা অমীমাংসিত ইস্যু তারা বাংলাদেশকে সমাধান করে দিবে বা ছাড় দিবে – এমন একটা ধারণা আমরা কার্যকর থাকতে দেখেছিলাম। এর একটা হল “ছিটমহল বিনিময়” যা সেই শেখ মুজিবের আমল থেকে চুক্তি করেও ফেলে রাখা ছিল।  যেটা সেই আমল থেকে আমরা আমাদের ভুমি ভারতকে ছেড়ে বসে আছি কিন্তু ভারতের খবর নাই – অবস্থায় ছিল; এই ছিটমহল প্রশ্নের সমাপ্তি টানবে। আর দ্বিতীয়টা ছিল, তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। এই কারণে বলা যায়, তিস্তা ইস্যু হল স্পেশাল যা ভারতের দিক থেকে নয়া হাসিনা সরকারকে আপোষে দেয়া প্রতিশ্রুতি।
    অথচ আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদি সশস্ত্র আন্দোলন সমস্যা মিটিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে আসামের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, আকাশ-স্থল-পানি ইত্যাদি সব মাধ্যমে করিডোর যোগাযোগ সুবিধা কী নয় – এমন সবকিছু ভারতকে দেওয়ার পরও আমাদের সরকারের হাত শুন্য – আশ্বাস ছাড়া সেখানে কিছুই নাই!!
    আর এখন এসব সত্বেও আমাদের বেচারা সাংবাদিক, কূটনীতিক বা অধ্যাপকেরা তবু আশার বাণী শুনাচ্ছেন যে এই সফরে তিস্তা ইস্যু নাকি আলোচনার বিষয় হবে – অথচ এনিয়ে কোথায় কোন আলাপ নাই।
    এমনকি কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে মোদি সরকার তো পানি দিতেই চায় কিন্তু মমতা চায় না তাইতেই  নাকি সব সমস্যা হয়েছে। আচ্ছা যদি সমস্যাটা তাই হয় এসব বক্তারা কী একবার ভেবে দেখেছেন এর অর্থ কী? এর অর্থ হল, তাদের মোদি-জী আসলে একটা খামোখা!!! মুরোদ নাই, অক্ষম; তাই তিনি কেউ নন। তাহলে ভারতের সরকার কাঠামো অনুসারে এখানে  মোদি সরকারের যদি মুখ্যমন্ত্রীর উপরে মুরোদ নাই হয়ে থাকেন মানে পানি দেওয়ার ক্ষমতা যদি মোদির না মমতার হাতে থাকে তাহলে আমরা মোদির সাথে কেন ডিল করতে বা চুক্তি করতে চাচ্ছি বা গিয়েছি কেন??? মোদি তাহলে কে আমাদের কাছে??? জয়শঙ্করের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা কথা বলছি বা বলব কেন??? কোন মুরোধীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের যাওয়ার দরকারই বা কী??

    একারণেই বাংলাদেশে একথার প্রতি বিশ্বাস বাড়ছে যে আমাদের সরকার ভাবছে তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের সমর্থন জরুরি আর একারণেই বলাই বাহুল্য ভারত তাই যেচে আমাদের কোন ন্যায্য পাওনা দিতে মনোযোগ দিবে কেন?

    ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা ছেড়ে, প্রসঙ্গে আসতে হবে – কেন ভারত সফরঃ
    উপরে এতক্ষণ ঘুরায় ফিরায় আমরা অনেক কথায় গেলাম। কিন্তু মূল বিষয় যে ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী তা জানা হল না। এককথায় বাংলাদেশে বা দেশের বাইরের মিডিয়ায় যাকিছু প্রকাশিত আলোচনা তারা কেউই সফরের উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট জানাতে পারে নাই। শেষে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়ে লিখেছে এই সফরের উদ্দেশ্য নাকি “রাজনৈতিক”। ‘রাজনৈতিক’ মানে?? সেটা আবার কী??  আসলে সেটা হল  মানুষ যখন বুঝে যায় তার কথার কোন মানে হচ্ছে না তখন কিছু অর্থহীন অবুঝ শব্দে (vague) মানে আন্দাজে অস্পষ্ট শব্দ নিয়ে আসে। এখানে ‘রাজনৈতিক’ শব্দের অর্থ তাই। ঠিক যেমন অনেকে নিজ বুদ্ধিতে না কলিয়ে দুনিয়ার নানান ফেনোমেনো ব্যাখ্যা না করতে পারলে বলে – এটা ‘ভূরাজনীতি’ বা ‘ভূরাজনৈতিক প্রভাব’। এই “রাজনৈতিক” শব্দের আমদানিও সেরকম। অর্থাৎ যেটা নিজেই বুঝে নাই, সেটা অন্যকে বুঝাতে লজ্জা ঢাকতে গিয়ে যে শব্দ তুলে আনা হয়।

    তাহলে আবার পুরানা প্রশ্ন, এই ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী? এবার আর রহস্য না করে বললে সোজা জবাবটা হল – ভারত সফরের উদ্দেশ্য ‘চীন’! সেটা আবার কী? যেখানে সফরে যাচ্ছে ভারতে তাহলে সেখানে উদ্দেশ্য চীন – একথার মানে কী?

    মানে হল, গত দুমাস ধরে বাংলাদেশের মিডিয়ায় লাগাতর যে প্রধান খবরে ডুবে ছিল ও আছে তা হল, রিজার্ভ সংকট। মানে সরকারের কোষাগারে দেশচালানোর মত  যথেষ্ট ডলার নাই। গড়ে প্রতি মাসে আমদানি আয় ও রপ্তানিতে ব্যয়ের ঘাটতিতে একে রেমিটেন্স ও ইত্যাদি আয় দিয়ে পূরণ করার পরও ব্যালেন্সে ঘাটতি গড়ে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। আর সামাজিক বাস্তবতার দিক দিয়ে যদি ব্যাপারটাকে বর্ণনা করি তা হল,  আমাদের নিয়মিত কমপক্ষে দুঘন্টা লোডশেডিং হয় আর সারা দেশের মানুষের সরকারি-বেসরকারি  ওয়ার্কিং আওয়ার  ৩ ঘন্টা কমানো হয়েছে, মূলত বিদ্যুতের চাহিদা কম রাখার জন্য। আর এদুটা হল আমাদের ডলার সঙ্কট কত তীব্র তা বুঝবার জন্য বাইরের মাত্র দুটা প্রকাশিত চিহ্ন। এছাড়া চারিদিকে মুদ্রাস্ফীতি যা মূলত উদ্ভুত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এতে বাজারে ডলার কেনাবেচার রেট ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এসবই হল মারাত্মক গভীর সব সংকটের বাইরের দুচারটা লক্ষণ। আবার সেই থেকে আইএমএফের কাছে বিশেষ ঋণের আবেদন করা হয়েছে, সে খবরের উদ্ভব। তবে আপাতত দেখা যাচ্ছে ডলার সংকট নিয়ে উদাম খবরগুলো আর বাইরে আসছে না। নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিছু লাগামও টানা হয়েছে। কিন্তু সংকট যে আগের মতই আছে সেটাও পরিস্কার!
    এসবের সারকথা হল, আমরা গভীরভাবে ডলার বা রিজার্ভের সংকটে আছি।

    আমাদের দেখা উদাহরণ বলছে, এমন ডলার সংকটে আইএমএফ সংকটের সুরাহা দেয় কিন্তু  তা প্রথমত, অন্তত ৪-৫ মাস লেগে যায় তাতে। আর, তবে এর আগেই বাছবিচারহীনভাবে খামোখা সব ভর্তুকি তুলে নেওয়ার দাবি করে আইএমএফ মুদ্রাস্ফীতি চরমে তুলে দেয়। (তবে আমাদের সরকার কেউ না বলতে আগাম নিজেই তেলের দাম দেড়্গুণ বাড়িয়ে সমস্যাকে ঘোলাটে করেছে।) দ্বিতীয়তঃ  সব চেয়ে বড় কথা আইএমএফ এক্ষেত্রে চলতি সরকারের সাথে চুক্তিই করে না। যদিও হবু নয়া ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা ও শর্তাবলি কী হবে তা নিয়ে আলোচনার সবই করে। কিন্তু শেষে চুক্তি করার আগে বলে থাকে চলতি সরকারের সাথে না, পরবর্তি সরকারের সাথে সে চুক্তি করবে। এর মানে যে যা বুঝার বুঝে নিতে পারেন। আর শ্রীলঙ্কায় ঠিক এই জিনিষটাই সম্প্রতি ঘটেছে।

    তাহলে এর থেকে সরকারের নুন্যতম বিকল্প বা পরিত্রাণ কি?  তা হল, চীনের মত দেশ থেকে বড় নগদ ঋণ নেয়া। চীনের নাম নেয়া এজন্য যে বাকি যারা দেশ তাদের সামর্থের প্রশ্ন আছে আর এরচেয়েও বড় হল, কোন ‘ক্যাম্পের’ তারা ইত্যাদি এসবের প্রশ্ন আছে। তবে আইডিয়ালি বললে, আইএমএফের লোন পাওয়া নিশ্চিতের বা পাওয়ার পরেও একই সাথে সাথে চীনা ঋণও পাওয়ার দরকার থাকে। আমাদেরও আছে। মূল কারণ, আইএমএফ লোনের পরিমাণ কম হলেও এর উদ্দেশ্য বা আমাদের লাভ ও দরকার হল দেশি-বিদেশি পুঁজি বাজার ও ব্যাংক ব্যাবসাকে আশ্বস্ত করা যে আইএমএফ (সে বাজারের চোখে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ) নিজে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চেক করেছে। আর চীনের ঋণ দরকার রিজার্ভের ঘাটতি পূরণে। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে সম্ভবত সরকার বেছে নেয়া লাইনটা হল, আইএমএফের  ঋণ পাওয়া যা হবে হোক, আগে চীনা লোন নিশ্চিত করা যাক!

    কিন্তু তাতে আবার সমস্যা কীঃ
    তাতে সমস্যা কী? নয়া চীনা লোন নিলেই তো হয়। আর এর সাথে আবার হাসিনার ভারত সফরে যাওয়ার কী সম্পর্ক?

    বিরাট সম্পর্ক। আর সেটা দশহাত শাড়ি পড়ার মত, যে ডানদিকটা ভালমত ঢাকলে তাতে বাদিকটা উদাম হয়ে যায়। সেটা আবার কী? এখন চীনেরও সদ্য পুরান  কিছু ক্ষোভ আছে। আর চীনের স্বভাব হল ক্ষুব্ধ হলে সে ঐ দেশ ছেড়ে চলে যায় না। বরং বিপদে পড়া দেশটাকে আরও সাহায্য করে ঠিকই কিন্তু এবার আরো কড়া সব শর্ত আরোপ করে।

    এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি গত ২০২১ সালে আমাদের করোনা টিকা পাওয়ার কাহিনী। আজ বাংলাদেশে দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার মধ্যে সবার চেয়ে আগিয়ে ৭৩.৭% সফল তিন ডোজ টিকাদান করা দেশ। কিন্তু এই মিরাকল কেমনে সম্ভব হল কেউ খবর নেই নাই। ভারত আমাদের সাথে শর্তভঙ্গ করে আমাদেরকে টিকা না দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পাপনের প্রকাশ্যে ভারতকে গালাগালি করা আমরা দেখেছি। এরপরও, এখন এই অর্জন সম্ভব করা গিয়েছে। কারণ, এখন আমাদের টিকা পাওয়ার মূল চালান চীনের দেয়া আর সেটা প্রায় বিনা পয়সায়। ঢাকা শহরের মধ্যে বিতরণ করা  (জাতিসংঘের হু এর দানে দেয়া কিছু টিকা) বাদে এর বাইরের সব টিকাই চীনা টিকা। কিন্তু কিসের বিনিময়ে সরকারকে এই টিকা পেতে হয়েছে আমরা সাধারণ্যে খবর নেই নাই।

    খুব সম্ভবত আজকের ডলার সংকটের ক্ষেত্রেও ক্ষুব্ধ চীনের শর্ত মেনে আমাদের লোন পেতে হবে। গত ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট এর ঢাকা সফরের পর থেকে আমরা প্রথম চীনা অবকাঠামো ঋণ পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই ছয়বছরে নিতে চাওয়া বহু অবকাঠামো প্রকল্প শেষে আমরা নিতে পারি নাই। কারণ, চলতি ১৪ বছরের টানা সরকারকে ভারতের সমর্থনের (ভারতের সমর্থনে সরকার বিষয়ক মন্তব্য করে মোমেন যেকারণে নিন্দিত) ব্যাপারটাকে সবার উপরে সবসময় আমল ও মনোযোগ দিতে হয়েছে। খুব সম্ভবত এবার চীনা নগদ ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আপত্তিতে আগে যেসব চীনা-প্রকল্প বাদ দিতে হয়েছে এর সিঙ্ঘভাগে এবার ফিরে গ্রহণ করতে বাংলাদেশকে রাজি হতে হবে।

    আর এতে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুমান করে আগেই ভারতের সাথে কথা বলে অন্তত যথাসম্ভব তা জানিয়েই কাজ করতে মনস্থ করেছে সরকার। অতএব সেখান থেকেই এই ভারত সফর। এনিয়ে একমাত্র সমকাল পত্রিকায় সঠিকভাবে সম্প্রতি কিছু রিপোর্ট এসেছে। স্বভাবতই খবরের সোর্সের নাম আড়াল করে ছাপানো  “তাসনিম মহসিন” এর লেখা সমকালের কিছু রিপোর্টে তা এসেছে। এর মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর   ‘ঢাকার মধ্যপন্থায় আশ্বস্ত দিল্লি’ শিরোনামে লেখাটা সবচেয়ে (তবে যতটা সম্ভব ইঙ্গিতে বলা) বিস্তারিত।  যদিও আসলেই কী ভারত এতে আশ্বস্ত হবে? এর জবাবটা ঘুরিয়ে দিতে হবে! বলতে হবে, কেউ আশ্বস্ত হবে কিনা সেটাই তো ওর নিজ যোগ্যতার উপর নির্ভর করে! তাই না!!

    যেমন ধরেন টিকা প্রসঙ্গে মানে, দিব বলে চুক্তি করে না দেওয়া এটা ভারতের ছেঁচরামো – এর পরিণতি কী হয়েছে? পরিণতি হল কক্সবাজারের কিছু স্থাপনা বাংলাদেশ চীনকে করতে দিয়েছে। মানে যেমন বিমানবন্দর-রানওয়ে ও ‘ইত্যাদি’ নির্মাণের কাজ দেয়া। এখন এতে ভারত অস্বস্তিবোধ করে তো লাভ নাই। এটাই তো টিকা না দেওয়ার  কাফফারা!! নয় কি? ভারতের নাই মুরোদ বা যোগ্যতা তবু তাকে চীন-বাংলাদেশ প্রথম টিকা-চুক্তিতে বা-হাত ঢুকাতেই হবে। চীনা টিকার  গবেষণায় থার্ড ফেজে বাংলাদেশ অংশ নেওয়ার বিনিময়ে  চীনা টিকা পাওয়া বন্ধ করে দিতে হবেই!!! এই ছিল অক্ষম মুরোদধীন ভারতের কূটনীতি! এতে পরিণতি কী হয়েছে সেটাই দেখব!

    অর্থাৎ সেই ভারত যোগ্য হয় নাই এখনও।  অন্যকে অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ হয় নাই। ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উন্নিত নয়। আর পছন্দের দেশকে ‘অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ” যখন হয়, এটাই কোন দেশের গ্লোবাল নেতা হবার বা কার্যত দাবি করার বা উঠে দাড়ানোর মুল লক্ষণ চাবিকাঠি।  এভাবেই  দাপটের সাথে গত পচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা এভাবেই মুরোদ দেখিয়ে এসেছে। যেটা এখন শীর্ণ প্রায়, বুড়া সিংহের মত।  এটাই অন্যদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের আসল  সক্ষমতা ও যোগ্যতা।  যা এখন আমেরিকার জায়গায় দেখাচ্ছে চীন। আর ভারতের সে মুরোদ হতে এখনো ধারে কাছেও নাই; তবে হয়ত হবে। অথচ এখনই বিরাট হা-করা আশার জিহবা বের করে ভারত বসে গিয়েছে। যেন কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ জেগেছে!!

    যেমন উপরে উল্লেখিত সমকালের তাসলিম মোহসিনের ঐ লেখার একটা অংশ হল এরকমঃ “…সাবমেরিন বিষয়ক সামরিক প্রশিক্ষণে বঙ্গোপসাগরে চীনা উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমুদ্রে নিরাপত্তা নজরদারি জোরদারের জন্য রাডার সিস্টেম দেবে ভারত।  এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে”।  এটাই হল, – কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ – এর পারফেক্ট উদাহরণ। ভারত যেন বলতে চাইছে – মাংস খেতে না পারলাম একটু ঝোল তো পেতে পারি।  আসলে যে মাংস পাবার যোগ্য নয়, হয়নি সে ঝোলও কেন পাবে???  আগে নিজের অবকাঠামো নির্মাণের সব প্রয়োজন পুর্ণ কর – এরপরেই না অন্যদেশে অবকাঠামো ঋণ দিতে শুরু করা!  মানে গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করতে, ছড়িয়ে দিতে শুরু করা এসব কাজের যোগ্য হওয়া আর এজন্য  ছেঁচরামো শুরু করা কি এককথা?? আর এসব করে শেষে লাভটা কী হয়?

    কাজেই এখন ভারতের মুরোদহীন আপত্তি উপেক্ষা করে চীন-বাংলাদেশের পুরানা বাদ-পড়া চীনা প্রকল্পগুলো আবার চালু করতে হাসিনার সামনের ভারতীয় বাধা কাটাতেই, মানে অন্তত মুখরক্ষা করতেই হাসিনার এবারের ভারত সফর ঘটেছে। এটাই মূল কারণ। আর লাভের লাভ যে ভারতীয় কোন আপত্তি যে হাসিনা আমল বা শোনার অবস্থায় নাই সেটা বলে দিয়ে এসে সব বাধা কাটিয়ে আনতে তিনি সফল – এই অর্থে তার সফর সফল বলে সরকার দাবি করছে। আর তা যাওয়ারই কথা। আর এর সাথে পাশাপাশি চীনা  কিছু নগদ ঋণের সংস্থানও হাসিনা করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে অবশ্যই যাতে তাঁর চেপে বসা ডলার সংকটের কিছু সুরাহা হয়।

    কিন্তু হাসিনার ভারত সফর সফল “হবারই কথা” বলছি কেন?
    বলছি কারণ ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে গেছে তা একেবারে ভেঙ্গে না গেলেও। ফলে ভারত যেন হাসিনার জন্য আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ নিয়ে যাক, এমন উদ্দেশ্য হাসিনার এই সফরে ছিল না।  কারণ, এখন আর আমেরিকার কাছে  ভারতের সেই মুল্য বা গুরুত্ব নাই।  একারণেই রাশিয়ান তেল বা জ্বালানি নিয়ে সেসব বকোয়াজি এটা শাহরিয়ার আলমের নিজের কল্পনা। যতদুর জানা যায় এটা আপার ফরমাইস ছিল না।

    কিন্তু  এখন কী দাড়ামো? এর মানে কী এই যে সরকারের ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাচ্ছে? না, এখনো অনেক সবুর করতে হবে। এছাড়া সবটা  না হলেও সরকার কিছু আলো দেখতে পাবে অবশ্যই। তাও যদি এখন চীনের সাথে নয়া কিছু চুক্তি সম্পন্ন-সহ সেসব কাজকে বাস্তবে করে দেখাতে পারে তা পরিকল্পনা-মত সফল হতে হবে আগে।

    পুরা ডলার সংকট সমাধান কী হবেঃ
    কিন্তু কেন পুরা ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা জাগাতে পারা যাচ্ছে না? মূল কারণ সংকটটা কৃত্রিম। মানে হল, গত ১৪ বছর যে পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ লোপাট হয়েছে এরা সবাই চাচ্ছে তাদের টাকা ডলারে রুপান্তর করে নিতে। এটা বাস্তবত অসম্ভব। কারণ, এই চাহিদা অস্বাভাবিক। এটা বাংলাদেশের স্বাভাবিক অর্থনীতি থেকে উঠে আসা কোন চাহিদা নয়। এটা আলটপকা এবং লুটেরাদের চাহিদা। যা স্বাভাবিক অর্থনীতিক চাহিদার বাইরের ঘটনা আর বাইরের লোকেদের। আমাদের স্বাভাবিক অর্থনীতি কখনও আমাদের অর্থনীতিতে সচল সব স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে ডলারে রুপান্তরিত করার কোনই চাহিদা তৈরি করে না।  কাজেই এখন দেখা দেওয়া সব চুরির টাকার ডলারে রুপান্তরের চাহিদা এটা স্বাভাবিক ও আমাদের অর্থনীতির পক্ষে তাদের চাহিদা মিটানো এবসার্ড! ফলে সোজা কথা,  চোরদের তৈরি করা “ডলার চাহিদার” উপর রাষ্ট্রের একশন লাগবে – সক্ষমতা লাগবে, একে কঠোর দমন করা লাগবে, যদি  সে মুরোদ থাকে!

    এই পরিস্থিতিতে জীবন নাভিস্বাসে উঠে যাওয়া মানুষের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সাথে এখন থেকে অর্থনীতি ক্রমশ স্থবির হতে চাইবে – এমন দশা স্পষ্ট হইয়ে উঠবে। যা ব্যাপক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে ঠিকমত কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনীতির সামনে চলে আসা, প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠা  – এটা এক খুবই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে তাদের আমেরিকান সমর্থনও পাওয়ার কথা।  বাকিটা আগামিতে…।

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • নাসিরুদ্দিন শাহরা ‘কথিত সেকুলার’ ভাঁড়ে পরিণত 

    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা “কথিত সেকুলার” ভাঁড়ে পরিণত 

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০৫ পিএম  

    https://wp.me/p1sCvy-3LG

     

    Had great faith when Modi ascended to power in 2014: Naseeruddin Shah

    [সার-সংক্ষেপঃ  ভারতের নাসিরুদ্দিন শাহরা অবুঝের মত কথা বলছেন। তারা ভারতের রাজনীতি নাকি নিজের ধর্ম – কোনটার সংস্কার চান, সেটাই পরিষ্কার নন বা পরিস্কার করছেন না। তিনি যে ধারণার উপর ফিরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন তা কংগ্রেসের কথিত-‘প্রগতিবাদী’ রাজনীতি; যা এখন নিজগুণেই পরাজিত ও মৃত।  আমরা তিন দেশ ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে এটাই জন্ম থেকেই আজও অশান্ত ও দুর্বল করে রেখেছে। এবং এখনও সমাধান করতে সক্ষম না হলে আগামিতেও আরও অশান্ত থাকতে বাধ্য হবে।  অথচ নাসিরুদ্দিন শাহরা তা বুঝতে পারছেন মনে হয় না।]

    কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের রাজনীতি ভারতেই আজ মৃত। কংগ্রেসের ক্রমে নিঃশেষ, মুছে যাওয়া আর বিজেপির দু’বার বিজয়ই এর প্রমাণ। হিন্দুত্ববাদের বিজেপি হয়ত আবার জিতবে বা জিতবে না, কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতি শেষ ও বিলুপ্ত, এটা আর ফিরে আসবে না, তা আমার কথা নয়। গত নির্বাচনে রাহুল গান্ধী নিজেই “সফট হিন্দুত্ববাদের” ভিত্তিতে ও পক্ষে ভোট চেয়ে তা প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ ভারতে প্রধান দুই দলের এখন একটাই রাজনীতি – হিন্দুত্ববাদ। সাথে এখানে বলে রাখা ভাল অনেকের হয়ত খেয়াল করে দেখাই হয় নাই যে “হিন্দুত্ববাদ” জিনিষটা কী!

    আগে বলে নেয়া যাক হিন্দুত্ববাদ কী নয়! এর মানে, কেউ হিন্দু (বা সনাতন) হলে সে হিন্দুত্ববাদী বা খারাপ তা এখানে বলা হচ্ছে না, হয় না। হিন্দু হওয়া খারাপ তাও না। এককথায়, হিন্দুত্ববাদ আর হিন্দু মানে একই কথা একেবারেই নয়। কেউ হিন্দু হয়েও হিন্দুত্ববাদি নাও হতে পারেন। তবে হিন্দুত্ববাদি সকলেই হিন্দুও।   ব্যাপারটা হল আজও কংগ্রেস এবং বিজেপি – প্রথমটা সফট [soft]  আর পরেরটা ভারি হিন্দুত্ববাদী হলেও এদুই দলের বাইরে এখনও অনেকেই হিন্দু থাকতে পারেন এবং তারা আছেনও।

    আবার, কেউ হিন্দুত্ববাদী হলে সেটা খারাপ এজন্য যে এটা উগ্র হিন্দু জাতিবাদ বা ন্যাশনালিজম। তবে উগ্র বা নরম যেটাই হোক এটা খারাপ। চিন্তা হিসাবে বিপদজনক। কারণ এগুলো “আমার জাতি শ্রেষ্ঠ” ফলে অন্যদের উপরে আমার স্থান – এধরণের জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর ধারণা; বলাই বাহুল্য সব জাত শ্রেষ্ঠত্ব ধারণাই বিপদজনক ও ক্ষতিকর। হিটলারের মত অন্য-সব জাতিগোষ্ঠিকে পুড়িয়ে মারার মত ধারণা –  এথনিক ক্লিনজিং ধারণা।  কোন ধর্ম বা কোন জনগোষ্ঠির মনের গহীনে “নিজ-জাত-শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা দুনিয়ার বাকি সব জাতিগোষ্ঠির জন্য বিপদজনক এবং পাশাপাশি অন্য কোন জাতিগোষ্ঠির সাথে বসবাস-অযোগ্য এক “জাতিবোধ।  তাতে এই জাত বলতে তা ইংরাজিতে race অথবা ethnic যাই বুঝাক বা যে অর্থেই জাত বা জাতি বুঝাক না কেন। সবার বেলাতেই সত্য। হিন্দুত্ববাদ একটা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারণা।

    আসলে, যেকোন  ধরণের জাতি-ধারণা মধ্যেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণা সুপ্ত বা লুকানো থাকেই।  আর তাই যেকোন সময় তা বের হয়ে এসে আমরাও একেকটা জাতি হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলারের মত “আমরা দেহে নীল চোখের এরিয়ান রক্ত বা ব্লাড, আমরা হলাম দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আমরা জাত-শ্রেষ্ঠ। এই ছিল হিটলারের মুখ্য বয়ান। আর এটাই সব রেসিস্ট (বর্ণবাদী racist) – এদের কমন ডায়লগ আর চরম ক্ষতিকর বয়ান। দুটা শব্দ দিয়ে এদের চিনা বা চিনানো সম্ভব। আমরা চেক করতে পারি তারা রক্ত  অথবা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলছে কিনা!  অথবা আমরা মহান বা  আমরা মহান জাতি; আমার ভারত মহান বা আমার জর্মানি মহান ইত্যাদি ধরণের বয়ান দেয় কিনা! আর এখানে  রক্ত মানে তাদের রক্ত নাকি সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ, এই তাদের দাবি।  একারণে কংগ্রেস বা বিজেপির “হিন্দুজাতি রাষ্ট্র” গড়তে চাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ গড়া একই কথা।  অনেক সময় আমরা অজানায় আরেকটা জনগোষ্ঠিকে  নিচা দেখানো যায় এভাবে শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে ফেলি – তাই এটা অবশ্যই রেসিজম এবং ক্ষতিকর । [যেমন পাকিস্তানিদের আমরা ‘পাকি’ বললাম।] আর এভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিক হল, এতে একটা রাষ্ট্রের ভিতরে আর সকলেই সম-নাগরিক অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ বা সম্ভাবনা থাকে না। নাই হয়ে যায়।  কাজেই মূলকথা কারও হিন্দু নাগরিক হওয়া (যেটা কোন সমস্যা নয়) আর হিন্দুত্ববাদী নাগরিক হওয়া এক কথা নয়।

    ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রভাব অর্থে বা ট্রেন্ড অর্থে বলতে পারি কংগ্রেসের রাজনীতির পতন হয়েছে।  অর্থাৎ উগ্র-হিন্দুবাদকে লুকানো রেখে আড়াল নেয়া হিন্দুত্ববাদ পরাজিত হয়েছে। আর এতে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দুজাতিবাদ উদাম হয়ে বিজেপি নামে ক্ষমতাসীন। অথচ নাসিরুদ্দিনরা যা নাই, যা মৃত, সেই কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের অলীক সেক্যুলার ভারতে ফেরার দাবি করছেন! গত বছর (২০২১) সেপ্টেম্বরে তার ফেসবুক ইউটিউবে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু বক্তব্য প্রচার করছেন সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    মনে রাখতে হবে, রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজেরই পরিণতি হল – এক হিন্দুজাতি রাষ্ট্র, হিন্দু নেশন স্টেটের ধারণা-কল্পনা। আর শেষে এরই বাস্তব রূপ হল ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া  ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া অনুমোদিত প্রথম রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ বা সংক্ষেপে কংগ্রেস। হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র কায়েম যার লক্ষ্য। বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে উস্কে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে পরিণতিতে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের আরেক রাষ্ট্র গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হবে। তাই হয়েছে …

    নাসিরউদ্দিন শাহ এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ
    নাসির উদ্দিন শাহ এর মূল পাবলিক পরিচয় তিনি দক্ষ শক্তিমান অভিনেতা ও পরিচালক তো বটেই; তিনি তিনবারের “ফিল্মফেয়ার” পুরস্কার প্রাপ্ত, তিনবার ভারতীয় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং একজন “পদ্মভূষণ” পুরস্কারপ্রাপ্ত। দিল্লির স্বনামে পরিচিত, “ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা” [NSD] এই ইন্সটিটিউটের ১৯৭৩ সালের গ্রাজুয়েট। আমার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতায় বললে, আমাদের তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়  জীবনে আশির দশকে আমরা তাঁর বিখ্যাত অভিনয় ও সিনেমাগুলো দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। নিঃসন্দেহে তিনি একজন ভাল পারফর্মার। হাতে গোনা কিছু সফল লোকেদের একজন একজন তিনি। যদিও সেকালের এক অর্থহীন আবেগী ভাষ্য অনুসারে বললে, আমরা “পুঁজিবাদবিরোধী সিনেমা” দেখতে চাই এমন ভাষ্যের কথা চালু হয়েছিল। এরই অধীন   কথিত “প্যারালাল সিনেমা” আন্দোলন এক ব্যর্থ অভিজ্ঞতা ছিল সেগুলা, তা অবশ্যই। কিন্তু এখানে আমাদের আলোচনার  বিষয় এসবের একেবারেই বাইরে। তাই এখন আর সেদিকে যাচ্ছি না।

    বলা যায় মোদির আমলের ভারত (২০১৪-এখনও) এইকালে চরম অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ নাসিরউদ্দিন শাহ এর ক্ষোভ আর তা থেকে তোলা হিন্দুত্ববাদী বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ে নাই। বিশেষ করে গত বছর থেকে। যার মূল কারণ হল, চরমতম মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন মোদি বিজেপি ও তার দলবল। যার পিছনে আছে ভারতের কোভিড দুরবস্থায় মোদি প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ফেল করা থেকে। সেখান থেকে অর্থনৈতিক সংকট, কাজ হারানো, চিকিতসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া ইত্যাদি। আর এত হারিয়ে ফেলা জনমত যা মোদিকে কোনঠাসা করে তুলেছে আর এই সংকট মোকাবিলায় মোদি নিয়মিত চলমান মুসলমানবিদ্বেষকে আরো চরমে তুলে এথেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হিসাবে একে হাজির করেছেন।
    যেমন, আফগানিস্থানে তালেবান-উত্থানে ভারতীয় মুসলমানদের উচ্ছাস প্রকাশ – এর বিরুদ্ধে নাসিরউদ্দিন শাহ  নিজের কথিত “সেকুলার অবস্থান” দিয়ে মোকাবিলা করতে গেছিলেন। আর এতে পরিণতিতে তিনি না ঘরের না ঘাটের অবস্থান পড়েছেন। এতে না ভারতীয় মুসলমানদের আম প্রধানধারা তাকে আপন করতে পেরেছে না এখনকার হিন্দুত্ববাদ প্রভাবিত ভারতের প্রধানধারা তাদেরঅও অন্তত এলিট বা সেলিব্রেটি বলে নাসিরউদ্দিনকে জায়গা করে দিয়ে পেরেছে। অথচ সবখানেই নাসিরউদ্দিন শাহ তার কাম্য তবে মৃত ও কথিত সেকুলারিজম খুজে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।
    কাশ্মীরের মুসলমান হত্যা-নিপীড়ন এর পক্ষে হিন্দুত্ববাদী সাফাই বয়ান তৈরির সিনেমা “কাশ্মীর ফাইলস নিয়েও নাসিরউদ্দিন শাহ কড়া প্রতিবাদ করেছেন। করেছেন তার কথিত সেকুলারিজম এর উপর দাঁড়িয়ে। অথচ এই কংগ্রেসি সেকুলারিজম (১৯৪৭-৯০ এর দশক) সেকালেও কিছুর সমাধান করতে পারে নাই। গান্ধী নিজেই খুন হয়ে গেছেন তাও না! আর নব্বই এর দশক থেকে ভারতে  কথিত সেকুলারিজম ক্রমেই শেষ প্রভাবটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। আর এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদের জমানা।
    মূলকথাটা হল, স্বাধীন ভারত জন্মের আগে থেকেই “কংগ্রেসি সেকুলারিজম” – এটা ছিল এক মিথ্যা অবলম্বন। অকেজো রাষ্ট্রনীতি। কারণ খোদ কংগ্রেসের জন্মই হয়েছে খোদ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়ার খায়েসে। যার সুপ্ত ও মৌলিক লক্ষ্য হল “হিন্দু আধিপত্য” কায়েম। এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র-সমাজ গড়তে হবে।
    অথচ কোন আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার চিন্তার মধ্যে যেকোন জনগোষ্ঠির যদি অন্যের উপর “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনা থেকে যায় তবে নিয়মিত সামাজিক সংঘাত তো চলারই কথা! এবং তাই ঘটে চলেছে। সারা কংগ্রেসি আমল এটা এভাবেই চলেছে। আর এই নোংরা চেহারা ঢাকতেই মিথ্যা-প্রলেপ হিসাবে আনা হয়েছিল কথিত ও অর্থহীন সেকুলারিজম ধারণা। অথচ সারা কংগ্রেসি আমলে হিন্দু “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনায় কোন বদল আনা হয় নাই। তাই, এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। তা সত্বেও নাসিরউদ্দিন শাহ এর মত ভারতীয় মুসলমানেরা নিজের সাথেই প্রতারণা করে নিজেকে বুঝ দিয়েছে যে না – কংগ্রেসি সেকুলারিজম ভাল ও তাদের কাম্য। তাদের সুরক্ষা দিবে!! এটা দিতে পারবে না। কারণ, হিন্দু “আধিপত্য” কায়েম কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য – তাই এটা জারি রেখে এরপর আর মুসলমানদের জন্য এটা আর রক্ষাকবজ হতে পারতে না।

    এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণাঃ
    অথচ এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল  এর সাথে আরেকটা শব্দ আছে “অসাম্প্রদায়িক”। মুল শব্দটা তারা বানিয়েছে – সাম্প্রদায়িক বা কমুনাল (communal)। এখন কমুনাল বা সাম্প্রদায়িক শব্দের মানে কী?
    সাম্প্রদায়িক শব্দটা আসলে “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের যে বাসনা তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এরই এক্সটেনশন বা বিস্তার করতে গিয়ে তৈরি এক ধারণা। যেমন এই প্রশ্নের জবাব কী যে, “হিন্দু আধিপত্যের সমাজ গড়ার যে বাসনা তাহলে মুসলমান বা অন্যধর্মের লোকেরা  সেখানে কীভাবে বসবাস করবে? এর জবাবে “হিন্দু আধিপত্য” আগ্রহিরা বলবে, আমার সমাজে তুমি মুসলমান থাকতে চাইলে আমি কিছু শর্ত দিব যা তোমাকে মেনে চলতে হবে বা সে অনুযায়ী তোমার নিজেকে সাজিয়ে নিতে হবে। আর সেসব শর্তগুলো মানলে তোমাকে আমি যে খেতাব দিব তার নামই হল “অসাম্প্রদায়য়িক”। মানে হল আমি হিন্দু আমি আমার আধিপত্যের সমাজ কায়েম করব, আমার ধর্মিয় আধিপত্য বা শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্নগুলো প্রদর্শন করব। কিন্তু তুমি মুসলমান তোমার চিহ্ন – টুপি বা পাঞ্জাবি ধরণের ইসলামি চিহ্ন প্রদর্শন করতে পারবা না। বরং আমার নির্দেশিত কালচারাল আইকন বা চিহ্নে নিজেকে সাজিয়ে নিবা। একমাত্র তাহলেই আমি তোমাকে আমার পাশে বসতে দিব। আমার স্কুল-কলেজে আমার পাশে বা একই সুবিধায় চাকরি-কাজের স্থলেও আমার পাশে তোমাকে বসতে দিব। যাতে তুমি যে আমার অধীনে তা জ্বলজ্বল করে প্রকাশ্য থাকে। সারকথায় বললে, অসাম্প্রদায়িক হলে মানে  নিজেকে ভুলে আমার শর্তে নিজেকে সাজালে কেবল তবেই আমি তোমাকে আমার সমাজে জায়গা দিব।
    এই কারণে বলা যায়, সাম্প্রদায়িক শব্দটার উপস্থিতি আর ধারণা থেকেই বুঝা যায়  “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের মুল  বাসনার বাস্তবায়ক শর্ত হল “অসাম্প্রদায়িকতা”।

    ভারতীয় মুসলমানদের উপর এই “অসাম্প্রদায়িকতার” শর্ত আজও চাপিয়ে রাখা আছে। আর নাসিরুদ্দিন শা বা কবি গীতিকার জাভেদ আখতার এর মত ভারতের কালচারাল জগতের লোকেরা  এই ভিত্তিতে নিজেদেরকে সেকুলার বলে পরিচয় দিয়ে বেদম খুশি ছিল। তারা মানতেই চায় নাই যে এট অধীনস্ততা!
    তারা এটাও মানতে চায় নাই যে কংগ্রেসের সেকুলারিজম আসলে ইসলাম কোপানোর আর ইসলামবিদ্বেষের সেকুলারিজম!

    যারা হিন্দুত্ববাদ বিরুদ্ধে লড়তে চান তাদের উচিত অসাম্প্রদায়িকতা বা কমুনাল শব্দগুলো একেবারে পরিত্যাগ করা।
    এগুলো হিন্দু আধিপত্য কায়েমের শব্দ ও চিহ্ন। আমাদের যেকোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন সেকুলারিজমই নয়। তাহলে এখন মুল সমস্যাটা কী? সেটা হল, না তারা হিন্দুত্ববাদের প্রতিবাদকারি না তারা অন্য মূসলমানদের সাথে একাত্ম। বরং তারা আজ একা! আর সর্বপরি তাদের পেয়ারের কংগ্রেস নিজেই আজ নিজেকে সফট হিন্দুত্ববাদী বলে নিজেদেরকে তুলে ধরছে।

    বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের দিকে ঠেলে দেয়া হবে। হয়েছেও তাই। কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগ বলে আলাদা দল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। যা পরে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল। পববর্তীতে কংগ্রেস তো বটেই বিশেষত কমিউনিস্টরা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার জন্য জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের ওপর সবদোষ চাপিয়ে প্রপাগান্ডা করে চলেছে। অথচ সবার আগে হিন্দুজাতি রাষ্ট্রের ভারতের কল্পনা ও এর ভিত্তিতে কংগ্রেসের জন্ম তারা দিয়েছে, এই খবর তারা লুকিয়ে রাখে।

    তাহলে একালে নাসিরুদ্দিনরা কী চাইছেন? তারা বলছেন তাদেরকে ওই হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেসের সরকার বা জমানাটা ফিরে এনে দিতে, যে হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেস চেহারা লুকাতে ‘সেক্যুলার’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ জামা গায়ে দিয়ে ঘুরত। আমরা নাসিরুদ্দিনদের খুশি করতে এখন চাইলেও সেই কংগ্রেসকে ফিরে আনতে পারব না। কারণ সে মৃত আর সে জায়গায় স্বরূপে আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদ কায়েম হয়েছে। কংগ্রেস আর জাগবে না। সে ইতিমধ্যে সফট হিন্দুত্ববাদে চলে গেছে।

    আসলে নাসিরুদ্দিনদের খেয়াল করলে দেখতেন তারা আসলে কংগ্রেসের হিন্দুজাতি ধারণার ভেতরে যে মার্জিনালাইজও চাপা পরে থাকা (কথিত সেক্যুলার) ‘মুসলমান’ ধারণা তৈরি হয়েছিল সেখানে ফেরত যেতে চাইছেন। কিন্তু সেটা তো নিজগুণেই এখন মৃত!

    নাসিরুদ্দিন শাহদের অনেক আগেই বুঝে নেওয়া দরকার ছিল যে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে টাইপের বৃটিশ শয়তানি ব্যাখ্যার সেকুলারিজম যা ভারতীয় কথিত সেকুলারিজম – এর সাথে ক্লাসিক সেকুলারিজমের কোন সম্পর্ক নাই। ক্লাসিক সেকুলারিজমের মুল বৈশিষ্ট ও তাতপর্য হল ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকই সম- অধিকারের নাগরিক।   ফলে এর ভিতরে “রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে বলাটাই শয়তানি”, হিন্দু আধিপত্য নিশ্চিত করার ছুপা খায়েস।
    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা এসব মৌলিক ধারণা থেকে বহুগুণ দূরে…।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা   গত  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “নাসিরুদ্দিন শাহরা ভাঁড়ে পরিণত হবেন“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]