Category: INDIA

  • বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    গৌতম দাস
    ২৯ আগষ্ট ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4dT

     

    এক কাল্পনিক আড্ডার আলাপঃ বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা বাক পরিবর্তন নিয়ে যেখানে কথা উঠেছিল।   বক্তা নিজেই প্রশ্নটা জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন ভারতমুখি হয়ে থাকে? মানে তিনি এই প্রশ্নের একটা সাফাই নিজেই দিতে চান তাই নিজেই কথাটা তুলেছেন। আর ভারতমুখি বলতে কেউ বাংলাদেশে থেকে আবার ভারতের স্বার্থকেই নিরন্তর নিজের স্বার্থজ্ঞান করে কথা বলে,এভাবে যে নিজেকে তুলে ধরতে চায় এমন কাল্পনিক একজনকে এখানে ধরে নেয়া হয়েছে।
    সব রাষ্ট্রেরই নিজ একান্ত কিছু স্বার্থ থাকে যা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা হবেই আর এনিয়ে  প্রশ্ন তোলার কিছু নাই। তবে এটা আবার যখন সীমা ক্রশ করে বাড়তে চায় মানে নাগরিক একদেশের কিন্তু আনুগত্য করে বসে অন্যদেশের এবং ভিন্ন দেশস্বার্থের তখন এটা বারবার বাকি সকলের কাছেই খুবই অস্বস্তিকর মনে হবে; এজন্য যে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিক-আনুগত্যের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে।  এটা অমান্য করতে চায় বলেই এই সীমাছাড়ানির কথাটা আসে। যেমন, কোন দুই ব্যক্তি একবার স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাবার পর স্ত্রীর স্বামীর প্রতি বা স্বামীর স্ত্রীর প্রতি এক লয়াল বা আনুগত্যের সম্পর্কের থাকতে বাধ্য। এই বস্তুগত আনুগত্য কোন কারণে যদি কখনও অনুপস্থিত হয়ে যায়, না থাকতে দেখা যায় তবে বুঝতে হবে ঐ সম্পর্ক কার্যত এরা আর স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কিত নয়; বা ভান করছে।  আর বাস্তবে এথেকেই পরকিয়ার মত কঠিন অমীমাংসিত জটিলতাগুলো তৈরি হয়।
    আবার এই ভারতমুখিতার ধরণের ভিতরেও গত বিশবছরে একটা কোয়ালিটিটিভ মানে গুনগত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। যেমন আগে, পাকিস্তান আমলে বা বাংলাদেশের আমলে কিন্তু ১৯৯২ সালের আগে দেখা যেত বাংলাদেশি হিন্দুদের বড় অংশই নিজেদেরকে কমিউনিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিশীল বলে পরিচয় তুলে ধরত। আর এই সাথে সেকালের ভারতের হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ বা যাদের একালের নতুন নাম বিজেপি-আরএসএস – এদের থেকে দূরে থাকত।  অথচ একালে মোদির আমলে বাংলাদেশের হিন্দুরা বিশেষত তরুণেরা মোদিকে তাদের নেতা ও ত্রাতা মনে করে থাকে। এটা এক তাতপর্যপুর্ণ পরিবর্তন সন্দেহ নাই।

    কিন্তু এই পটভুমিতে বক্তা চেষ্টা করছিলেন কেন এমন আনুগত্য সমস্যা তা নিয়ে এর স্বপক্ষে কিছু সাফাই তুলে ধরার। তিনি জানাচ্ছিলেন যে, একটা দেশের কোন কোন জনগোষ্ঠি তো অনেক রকম ভিন্নতায় অনেক কিছু চাইতেই পারে। সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই। তারা তো পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকতে চেয়েছিল। কথা বাস্তব সত্য এবং কথা তাদের মনের কথা সন্দেহ নাই। কিন্তু এই চাওয়া কী সঠিক ছিল? তাদের স্বার্থের পক্ষে ছিল?

    এককথায় বললে, আপাত দৃষ্টিতে সঠিক ও নির্দোষ এবং ইনোসেন্ট  মনে হলেও এটাই ছিল তার আত্মঘাতি চাওয়া। আজপর্যন্ত বাংলাদেশের হিন্দুদের সমস্ত দুর্দশার মুল ও ভুল এই চাওয়া। সবভুলের উতস এটা। যদিও ১৯৪৭ সালের আশেপাশের প্রেক্ষিতের দিক থেকে বললে, ততদিনে এটা বড় ধরণের ভুল অবস্থান।

    কিন্তু কিভাবে এটা বুঝব? তা কী দিয়ে বিচার করব?
    সবশেষে এই হলো এই তর্কের মূল প্রসঙ্গ!

    একঃ এটা যেকোন রাষ্ট্রগঠনের দিক থেকে এক মৌলিক সমস্যা যে সব নাগরিককে একমত হয়ে চাইতে হয় যে তারা কেমন রাষ্ট্র চায়। মানে কিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চায় এনিয়ে একমত থাকতে হয় বা হতেই হয়। তবেই এক মৌলিক বিষয়ের সমাধান পাওয়া যেতে পারে।  আর সেজন্য কেমন কী  ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে চাচ্ছি তা প্রস্তাবের সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন তা সবার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয় – কেবল এমন কিছুই যেন প্রস্তাব করা হয়। আর এতে ব্যর্থ হলে আগামিতে সব বিরোধে ও ব্যর্থতার শুরু হবে এখান থেকে।  ের কিছু সুত্র নির্দেশ করা যেতে পারেঃ –
    ১। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বা দাবিতে কোন কিছু চাওয়া জায়েজ  – এমন মনে করা সবার আগে ত্যাগ করতে হবে।

    ২। এরই আরেক ভার্সান বা মূলসুত্র হল, সমাজের কেউ অন্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ – সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে – এটাই যেকোন রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া বা কার্যকর না থাকার মূল কারণ হয়।
    ৩। তাই এরই উলটা পিঠের মানে ইতিবাচকভাবে বলা কথাটা হল – রাষ্ট্রে হতে হবে বৈষম্যহীন নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র এমন ভিত্তিতে।  মানে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে বেশি ক্ষমতা ও আধিপত্যের অথবা কেউ সংখ্যালঘিষ্ঠের কারণে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের, কেউ পাহাড়ি বলে বা সাঁওতাল বলে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের আইনি এবং সামাজিক চর্চার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতেই হবে ইত্যাদি এগুলো বন্ধ করতেই হবে। তাই মুল কথা, নাগরিক অধিকারেরর দিক থেকে নাগরিক সকলেই সমান – এই ভিত্তিতে। এই সাম্য-নীতি সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান করতে হবে।

    এটাই সংক্ষেপে “নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি” রাষ্ট্র বলা হয়। আরো সংক্ষেপ করতে ‘নাগরিক সাম্য নীতিও’ বলা যেতে পারে।

     

    এখন তাহলে বিচার করা যাক – সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই – এই বক্তব্যকে যারা বাংলাদেশের হিন্দুদের পক্ষের সাফাই মনে করছিল সেটা কী ঠিক ছিল? বাংলাদেশের হিন্দুরা কী নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি মেনে তাদের প্রস্তাব বা চাওয়া তুলে ধরে ছিল? অবশ্যই না। তাই হিন্দুদের সাফাই সঠিক না, তাদের পক্ষে গেছে বা কাজের হয়েছে তাও না, তাদের কাজে লেগেছে তাও না।
    এককথায় বললে, এর মানে, বাংলাদেশের হিন্দুদের পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকার দাবি বা যে বাসনা সেটা আসলে মুসলিম লীগের আত্মরক্ষামূলকভাবে “পাকিস্তান” নামে আলাদা রাষ্ট্র কায়েম করার যে দাবি -তারই হিন্দু ভার্সান।
    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় ঐক্যমত।

    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে যথেষ্ট প্রয়োজনীয় ঐক্যমত। 

    একথা শুনে হিন্দুদের পক্ষের সাফাই যারা দিতে এসেছিল তারা প্রসঙ্গটা কিছুটা বদলে এবার বলে বসল – এজন্যই তো ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বাংলাদেশের (পুর্ববঙ্গের) হিন্দুরা করেছিল।  এতে ঐ আসরে তারা ভেবেছিল নিশ্চয়  এবার বেশ শক্ত পয়েন্ট তুলতে পেরেছে! তাদের পয়েন্টকে আরো শক্ত-পোক্ত করতে তারা এবার  আরো কিছু কথা সাথে জুড়ে দিয়ে বলল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করার চিন্তা তো খুবই বিভেদমূলক ও পশ্চাতপদ চিন্তা! এই বক্তব্য অবশ্য আমাদের তি্নদেশে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা হিসাবে পরিচিত। কিন্তু তা আসলেই কী???  না বাংলাদেশের হিন্দুদের আসলেই  কপালই খারাপ!  কেন?

    এতদিন মনে করা হত, ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ার কাজটা সব খারাপ কাজের গোড়ার খারাপ কাজটা। এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করে থাকেন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা এমন এক মোক্ষম কথা তুলে মুসলিম লীগের মুখ বন্ধ করে দিতে পেরেছিল। আর এদের চোখে একাজটা ভারতের কংগ্রেসের চেয়েও ভাল ভাবে করেছিল  কমিউনিস্ট পার্টি।  কিন্তু ঘটনা আসলে উলটা যা উল্টেপাল্টে  বিচার করে দেখাই হয় নাই। কিভাবে?

    ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা যদি ধরে নেই খুবই খারাপ কাজ এমনকি জঘন্য কাজ তবে মুসলিম লীগ বা পাকিস্তান কায়েম করাই এধরণের প্রথম কাজ নয়।  ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা অখন্ড ভারতে সবার আগে করেছে, সবার আগে তুলেছে এবং এই ভিত্তিতে  নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্র সাজিয়েছে মুসলিম লীগ নয় – কংগ্রেস – যার পুরা নাম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল। কিভাবে?

    ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌল্লাকে পরাজিত করতে পারলেও নানা সমস্যার কারণে ১৭৬২-৬৪ সাল লেগে যায় ক্লাইভের বৃটিশ ইস্ট -ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে দেওয়ানি লাভ করতে বা প্রশাসন নিজের হাতে উঠিয়ে নিতে। পরে ঐ কোম্পানি আবার একই সময়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়াতে আর বৃটিশ রাণীর সহায়তায় কিছুটা উঠে দাড়ানোর পরে কোম্পানির প্রধান কাজ হয়েছিল যেভাবেই হোক তাতক্ষণিক রাজস্ব আদায় বা সংগ্রহ। একারণেই বাংলায় ব্যতিক্রমি জমিদার প্রথা (আগাম নগদ রাজস্ব জমা দিয়ে জমিদারি কেনা আর পরে প্রজার কাজ থেকে বছরান্তে খাজনা আদায় করে নেয়া) চালু হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির সেই প্রধান রাজস্ব আয়ের উতস জমিদারি ব্যবস্থাটা থিতু করতেই ১৮০০ সাল লেগে যায়। আর দেখা গেল, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জমিদারি কিনেছিল হিন্দু জমিদারেরা।  ফলে এরপরেই এই হিন্দু জমিদারদের মাথায় আসে হিন্দু আধিপত্য কায়েম করার।

    মনে রাখতে হবে সেকালে প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বলতে কৃষি তাও আবার সেটা জমিদারি মালিকানায় জমিদার-প্রজা ভিত্তিক সম্পর্কের কৃষি অর্থনীতি। ফলে সবার উপরে বৃটিশ কোম্পানি আর এর নীচে জমিদার হিন্দুর আধিপত্য কায়েমের সমাজ প্রতিষ্ঠা এটাই  বাস্তবে কায়েম হয়েছিল। যদিও পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কলকাতা সারা ভারতের বৃটিশ রাজধানী বলে অন্তত সারা বঙ্গে জমিদার হিন্দুর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম সহজ হয়েছিল।
    কিন্তু তবু এসবই ছিল অর্থনৈতিক বা মাঠের নয়া শ্রেণীর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম। কেন এভাবে বলছি?
    বলতে চাচ্ছি রাজনৈতিক অংশ এটা নয় তা বুঝাতে। নয়া শ্রেণীর  রাজনৈতিক অংশটা তৈরি হয়েছিল আলাদাকরে। তবে অবশ্যই এটা তৈরি হয়েছিল সমকালীন ভাবে। বা বলা যায় অল্প কিছুটা আগে। আর তা ঘটেছিল রাজা রামমোহন রায়ের হাতে তার আত্মীয়সভার আসর থেকে।  রামমোহন এর পরিচয় লম্বা না করে এখানে কমিউনিস্ট ইতিহাসে যেভাবে তাঁকে পরিচয় করানো হয়েছে কেবল সেটুকুই তুলে আনছি।

    আসলে রামমোহন রায়ের হাতে এক নয়া ধর্মের প্রবর্তন ঘটেছিল ১৮১৫ সালে, এটাই ব্রাহ্ম (ব্রাহ্মণ শব্দ বা ধারণার সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই) ধর্ম । ফলে সেই থেকে এখনও যারাই  ব্রাহ্ম ধর্ম বা সমাজ এর অনুসারি এরা সকলেই সেসময় থেকেই পারিবারিকভাবে রামমোহন প্রবর্তিত ব্রাহ্ম অনুসারি। সেটা রবীন্দ্রনাথের দাদামশায় (গ্রান্ডফাদার) দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে এখনও পুরা ঠাকুর পরিবার। আবার এদিকে ১৯৩৫ সালে পুনগঠিত প্রথম ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যপক সুশোভন সরকার তার সারা পরিবারও ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি হয়েছিলেন। আর এই সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে পরিচয় করানো হয়েছে।

    কিন্তু তাঁর এভাবে বলার মধ্যে সমস্যা কী হয়েছে তা হয়ত অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয় নাই। এছাড়া রামমোহন রায়ের কথা কেন তুললাম তা নিয়ে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। আর এর সাথে ধর্মের ভিত্তিতে দল গড়ার প্রসঙ্গে কে প্রথম এটা করেছিল সেকথাই এখন স্ইপষ্ট করে বলব।

    আমাদের এদিকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানে (এই তিনদেশে) কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের কাছে রেনেসাঁ বেশ আদরণীয় শব্দ ও ধারণা। রেনেসাঁ অনেকটা বড় মৌল ধারণা বা উতস ধারণার মত বলে  ধারণাটাকে মনে করেন তাঁরা। যদিও খোদ কার্ল মার্কস রেনেসাঁ  ধারণা দূরে থাক, আধুনিক রাষ্ট্র বা মর্ডার্ন স্টেট (তার ভাষায় ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্র’ ) নিয়েও  তিনি কোন আগ্রহই দেখান নাই। ভাল-মন্দ বড় কিছুই লেখেন নাই।  তাহলে কেন আদরণীয় হল? এর মূল কারণ প্রগতিশীলেরা মনে করেন, রেনেসাঁ ধারণার জপতে থাকলে মানে রেনেসাঁর আড়ালে থাকলে তাতেই অনেক উপকার হবে। তাদের প্রকল্প ধর্ম মানে, ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে খুবই ভাল সাফাই আনা যায় এখান থেকে।

    আর এধারণার নগদ খদ্দের হল জমিদার হিন্দু যারা যেন এই ধারণা কিনে নিবার জন্য অপেক্ষা করছিল।

    এখন প্রথম প্রশ্নে আসা যাক। শব্দাবলীতে বাক্যটাই লক্ষ্য করা যাক, লিখেছি “সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে দেখানো হয়েছে। আবার রামমোহন হচ্ছেন ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক এবং সুশোভনের নিজ ও পরিবার ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি। তাহলে “রেনেসাঁ আর ব্রাহ্ম” এখানে একসাথে উচ্চারিত হচ্ছে কেমন করে? তাহলে জানা যাচ্ছে একমাত্র কমিউনিস্ট সার্টিফায়েড ধর্ম হচ্ছে তাহলে ব্রাহ্ম। যেটা সত্যিই এক আজীব ব্যতিক্রম বটে!

    এনিয়ে সরাসরি কথা বললে, আসলে রামমোহন রায়ই বৃটিশ ভারতে প্রথম জাতিরাষ্ট্র বা মর্ডান রাষ্ট্র ধারণা আনেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে এই কল্পনাটা ছিল-  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র। অর্থাৎ ভারতের সবাইকে আগে আগে ব্রাহ্ম অনুসারি করে নিয়ে এবার –  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র – এমন ভারত ছিল রামমোহনের প্রজেক্ট। সারকথায়, ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের (নেশন স্টেটের) প্রথম ইমাজিনেশনটা আনেন রামমোহন। পরে তার মৃত্যু (১৮৩৩) আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অনুসারিরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে অচল অথর্ব হয়ে পড়লে এবার সেই প্রকল্পটাকে এবার ব্রাহ্মধর্মের বদলে ‘হিন্দুধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র’ – এভাবে বদলে নেয়া হয়। আর এটাই ১৮৮৫ সালে এটাই কংগ্রেস দল নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
    কাজেই দল হিসাবে প্রথম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হল কংগ্রেস।  আর এভাবেই প্রকল্প সুনির্দিষ্ট করে হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে এর বিশবছর পরে ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান ধর্ম-ভিত্তিক আরেক জাতিরাষ্ট্র’ পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য নয়া দল হয় মুসলিম লীগ।
    কাজেই মুসলিম লীগের পাকিস্তান কায়েমের বিরুদ্ধে কথা বলে   বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থান নেয়া কিন্তু আবার নিজেরা হিন্দু ধর্ম-ভিত্তিক ভারতে যুক্ত হওয়ার বাসনা  -এটাই তো আসলে কংগ্রেসি অবস্থান~!!!! ফলে এনিয়ে কোন সাফাই দিতে বা করতে তারা পারে না। এর মানে হয় না।

    তাহলে মূল সমস্যা ও সমাধান ছিল, ধর্মভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা সমূলে ত্যাগ করা। সকলকে নিয়ে “অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রের” প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা প্রস্তাব এর কথা বিবেচনা করা এবং সেভাবে আগানো।
    স্বভাবতই, নইলে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে সারাজীবন ইসকনের মাধ্যমে ‘মোদির দলের ভাড়াটে বাংলাদেশি’ উইংয়ের সদস্য হয়েই কাটাতে হবে।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    গৌতম দাস

    ২২ আগষ্ট  ২০২২   ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4dq

     

        EAM Jaishankar

    কেন শিরোনামটা এমন? ভেটো মানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) ১৫ সদস্যের যার ১০ আসন অস্থায়ী এবং বিভিন্ন মহাদেশের কোটা থেকে দুবছরের জন্য নির্বাচিত করে নেয়া হয়। আর পাঁচ টা আসন এগুলো স্থায়ী-আসন বলা হয় শুধু তাই না এই পরিষদে আলোচনার  জন্য হাজির করা যেকোন প্রস্তাবের উপর আলোচনার আগেই এই পাঁচ সদস্যের যেকোন একজন ভেটো বা আপত্তি দিতে পারে। আর তা দিলে ঐ প্রস্তাব পাশ হওয়া দূরে থাকে ঐ প্রস্তাবই বাতিল বলে গণ্য হবে।  এই পাঁচ ভেটোধারী ও স্থায়ী সদস্য হল আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া আর চীন।  গত ২০ বছরে ভারত অনেকবার এমন ভেটোধারী সদস্য হবার চেষ্টা করেছে, আমেরিকার দ্বারা সমর্থিত হবে বলে আশ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু বারবার সে আলোচনা চাপা পরে হারিয়ে গেছে। এবার জয়শঙ্কর যিনি এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী – তার মুখ দিয়ে আবার প্রসঙ্গটা আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তাঁর এক বক্তৃতার ইউটিউব ক্লিপ ভারতের মিডিয়ায় অনেক ছড়িয়েছে।

    জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (এরপর থেকে এ’লেখায় শুধু পরিষদ লিখব) ভারতের স্থায়ী আসন বা ভেটো ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন বহুদিনের। কিন্তু স্বপ্ন দেখনেওয়ালাদেরও দুইটা ধরণ দেখা যায়। এক হল যারা স্বপ্ন দেখতেই থাকে, পেলে কী করবে সেই হিংসাতেও তাদের বুক জ্বলে কিন্তু যোগ্যতার অভাবে স্বপ্ন বাস্তব করতে পারে না।  ফলে ধান্দাবাজ লোক ধরে যাদের মিথ্যা প্রলোভনের পিছনে তারা বছরের পর বছর ঘুরেই চলে, বেখবরে। কিছু আগালো কিনা সে মুল্যায়নও করে না।
    আরেক দল আছে যারা স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবায়িত করা যাবে এজন্য বাস্তবিক সমস্যা, বাধাগুলোকে স্টাডি করে আর একটা করে বাধা অপসারণ করে করে আগায়। তবে এরা অবশ্যই সবার আগে দেখে নেয় সেটা বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন কিনা। যদি হয় তবেই সে আগায়। এজন্য এদেরকে বলে রিয়েলিস্ট; মানে, যারা বাস্তবের চোখে দেখে স্বপ্ন বিচার করে।  কেবল স্বপ্নেই পোলাও খেয়ে চলে না!  এদুই ক্যাটাগরির বিচারে ভারত হল প্রথম ধরণের। তাই, আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাসের পিছনের সে ঘুরতেই আছে এই ভরসায় যে আমেরিকা তাকে ভেটোক্ষমতা এনে দিবে।
    অথচ একটা সহজ ভাবনা-কল্পনায় যদি দেখি জাতিসংঘের বর্তমান ওরিয়েন্টেশন মানে যেভাবে এটা সাজানো আছে এভাবেই যদি তাকাই তাহলে দেখব একা আমেরিকা নতুন কারও কোন ভেটোক্ষমতা পাইয়ে দিবার ক্ষমতা নাই বা রাখে না। কারণ, একা আমেরিকা না, পাঁচ ভেটোসদস্যই যদি ভারতকে ভেটোক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয় তবেই তা হতে পারে। চীনসহ যেকোন এক ভেটোসদস্য আপত্তি করলেই সব শেষ। তাহলে একা আমেরিকার আশ্বাসের উপর ভারতের অপেক্ষা তো অর্থহীন!! অথচ  গত বিশ বছর ধরে এটাই ভারতের আশ্বাসের  ভিত্তি হয়ে আছে, খামোখা।

    একালের হিসাবে যদি বলি তবে প্রণব মুখার্জির আমল এই আশ্বাসের ভরসা শুরু হয়েছে। মোটামুটিভাবে ২০০৭ এর পরে মানে যখন থেকে আমেরিকা বিশেষ করে বুশের আমল শেষে ওবামা চীন ঠেকানো বা China Containment এর ঠিকাদারি ভারতকে দিতে এসেছিল।

    তাই ওবামা যখন বুশের চেয়েও বড় করে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল (যে ভারতের স্থায়ী আসনের দাবিকে আমেরিকা সমর্থন দিবে) প্রণবের সরকার তা বেশ জোশের ঠেলায় বাস্তবতার দিকে তাকানোর বদলে স্বপ্নে ভাসতে শুরু করে দিয়েছিল। ভারত কতদুর নিজেকে নিচে নেমেছিল, বোকা চিন্তাশুন্য বানিয়েছিল তা বুঝা যায় যখন,  ২০০৯ সালে থেকে শুরু হওয়া হাসিনা সরকার পরে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিল এক বছরের মধ্যে ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি। সে সফরে প্রণব মুখার্জি লিখায়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশও (যে ঘরকা মুরগি ফলে যত খুশি জবেহ দেয়া যায়) ভারতের স্থায়ী আসনের দাবি সমর্থন করবে! সফরের শেষে যে ‘যৌথ ঘোষণা’ বের হয় তাতে একথা লেখা আছে। অথচ বাংলাদেশের সমর্থন তো কোন রিকয়ারমেন্ট নয়!

    জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতিঃ
    সবকিছুর গোড়ায় আছে আসলে জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতি – এই বিষয়টা। জাতিসংঘ এক আজিব জিনিষ; সেটা এই অর্থে যে এটা ঠিকঠাক বুঝলে তো বুঝছেনই। আর না বুঝলে তেজপাতা; মানে সারাজীবন আমি-আপনি সব বুঝিছি ভান করেই কাটিয়ে যেতে পারব। তাতে আপনি প্রণব মুখার্জি বা জয়শঙ্কর যাই হোন না কেন!! আপনার পদ-পদবি অনেক উচুঁতে হতে পারে কিন্তু তাতেও কোন নিশ্চয়তা নাই যে আপনি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানটা বুঝেছেন বা বুঝবেনই! যেমন বেশির ভাগ মানুষের ধারণা এটা একটা ‘গণতন্ত্রী’ প্রতিঠান; অথচ এরা খেয়াল করেন না যে পাড়ার ক্লাবের ক্ষেত্রেও এর মেম্বারেরা সবাই-ই দেখতে সমান মনে হলেও সবাই সমান ক্ষমতার হয় না।

    প্রথমত জাতিসংঘ অবশ্যই এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একটা দেশের পার্লামেন্টের মত সব সদস্যের সমান অধিকার, বা এক ভোট –  না জাতিসংঘ এমনটা নয়। বরং অসম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আবার বড় ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর কেউ যেন বেশির ভাগকেই নিজ দলে নিয়ে জোট পাকিয়ে অন্য আরেক বড় ক্ষমতার উপর চড়াও না হয়; এটাই জাতিসংঘ গড়ার সময়ের মুখ্য বিবেচনা ছিল। যেমন আমেরিকা যেন কমিউনিস্ট স্তালিনের সোভিয়েন ইউনিয়নের উপর কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোন কিছু চাপিয়ে না দিতে পারে তা নিশ্চিত করা এমন প্রতিষ্ঠানই হল ভেটোক্ষমতার জাতিসংঘ। এটাই নিশ্চিত করার উপায়ের নামই ভেটো পদ্ধতি। যাদের “এভিন্ন” অন্যভাবে বুঝ থেকে ভুল ধারণা আছে তারা এখনই তা কারেক্ট করে নিতে পারেন। সোজাকথা জাতিসংঘ কোন সাম্যের প্রতিষ্ঠান নয়। ্তাই এর সব সদস্যের ভোটের ক্ষমতা একরকম নয়। যেমন এমন ক্ষেত্রে মানে কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে কোন সিদ্ধান্ত এই পাঁচ ভেটোসদস্যের উপর চাপিয়ে দেয়া অসম্ভব।  যেমন, এমন হলে একা সোভিয়েত-ইউনিয়ন নিজের ভেটোটা প্রয়োগ করতে পারবে।  যার মানে হল, স্টালিন যা চায় না তেমন প্রস্তাব নিয়ে পরিষদে কোন আলোচনাই হবে না। সেক্ষেত্রে, আমেরিকা তখন আনা আগের প্রস্তাব চাইলে আবার তা সংশোধন করে হাজির করতে পারবে। তবে কীভাবে প্রস্তাব লিখলে পরে সোভিয়েতরা আর ভেটো দিবে না সেভাবে জেনে প্রস্তাব সংশোধন করে আবার তা উপস্থাপন করতে পারে। এভাবেই ভেটোক্ষমতা কার্যকর আছে।

    মুখ্য বুঝাবুঝির জায়গাটা হল জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, সেখানে ফোকাস করাঃ
    তাহলে জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কি ছিল? উপরের কথা থেকে পরিস্কার এটা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোন ‘সাম্যের’ পার্লামেন্ট ধরনের কিছু নয়ই। এর উদ্দেশ্য ছিল ‘নেতা’ রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা ও নানাবিধ চিন্তায় বিভিন্নতা থাকা সত্বেও তারা একটা ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ কায়েম করতে পারে কিনা সেই চেষ্টা। এবং কোনমতে তারা সেতা পেরেছিল। আর এরই উদ্যোগ ও মুখ্য আইডিয়াটা ছিল মূলত আমেরিকার মানে ততকালীন টানা চারবারের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর।

    তাঁর মূলকথাগুলো খুব সিম্পল। সেকালে (১৬০৭-১৯৪৫) দুনিয়া মানে চার-পাঁচটা রাষ্ট্র তারা দুনিয়ার বাকি দেশ-ভুখন্ডকে কলোনি করে রেখেছিল – আর জবরদস্তিতে শাসন ও লুট করে সম্পদ নিজ দেশে নিয়ে চলছিল। আমেরিকা এই স্টাইলে চলা দুনিয়াটার অবসান চেয়েছিল তবে নিজ স্বার্থে; মানে “দুনিয়ার ভাল হবে” ঠিক এমন কোন কারণে না। তাই এনিয়ে আমেরিকার মূল ভাষ্যটা হচ্ছে – দেশভুখন্ড ও তার বাসিন্দা কেন্দ্রিক; যেখানে আবার বাসিন্দারাই মূল ফ্যাক্টর ও নির্ণায়ক। বলা হয়েছে, “কোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবেন যে তাদের বসবাসের ভুখন্ড কার হাতে শাসিত হবে” 

    Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them;

    স্বভাবতই বাসিন্দারা কেউ বিদেশি কলোনি শাসক বা লুটেরা শাসক চাইবে না। অর্থাৎ এই মূল বাক্যটাই দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসন উতখাত করার রাস্তা খুলে দিয়েছিল। আর এই মূল বাক্য বা শর্ত মানলে তবেই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পক্ষ ও অংশগ্রহণ করবে; এই ছিল আমেরিকান অবস্থান। কবে থেকে কতদিন?  এখানে বলে রাখা ভাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সালে শুরু হলেও ১৯৪২ সালের জানুয়ারির আগে আমেরিকা তাতে কোন অংশ বা পক্ষ নেয় নাই। এনিয়ে যদিও কমিউনিস্টদের না-জানা এক প্রপাগান্ডা ব্যাখ্যা আছে। সেই অনুমিত প্রপাগান্ডাটা হল, আমেরিকা ব্যবসা করার লোভে যুদ্ধে কোন পক্ষ নেই নাই। এটা শতভাগ মিথ্যা অনুমান তা জানা যাবে যখন  পরে ১৯৪১ সালের আগষ্ট থেকে আমেরিকা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সাথে চুক্তি (আটল্যান্টিক চার্টার চুক্তি) করেছিল। এই চুক্তি থেকেই পরিস্কার রুজভেল্ট কেন যুদ্ধে যোগ দিতে দেরি করছিল্বেন। আর এই চুক্তি থেকেই বিশ্বযুদ্ধে জোটবদ্ধ দুই পক্ষ-বিপক্ষ স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। আবার আমেরিকার অর্থনীতিক সক্ষমতা দিকটা যদি দেখি, এর প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই ততদিনে সবচেয়ে বড় অর্থনীতির বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যকে আমেরিকা ছাড়িয়েছে । ফলে সঞ্চিত সারপ্লাস সম্পদের কারণে যেকোনদিকে বিনিয়োগ সক্ষমতায় সে আনপ্যারালাল। তাই ঐ যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণে অনেক আগে থেকেই আমেরিকা ছিল নির্ধারক; অথচ ১৯৪২ সালের ১জানুয়ারির আগে সে কোনদিকের হয়ে যুদ্ধে নামে নাই।

    তাই প্রথমে ১৯৪১ সালের আগষ্টে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে তিনি তাঁর শর্তে দাসখত দিতে [আটল্যান্টা চার্টার চুক্তির মাধ্যমে] বাধ্য করেন। আর আটল্যান্টা চার্টার চুক্তিই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান মিত্রপক্ষ জয়লাভ করলে পরের সেই  দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ও শাসন চির উচ্ছেদের প্রথম দলিল। একারণেই হিটলারবিরোধী যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানোও আসলে সম্পন্ন করা হয় ঐ একই শর্তে। এরই ফলাফল হল, সাড়ে চারমাস পরে ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি, ঐ একই দলিলের ড্রাফটে কিন্তু এবার রুজভেল্ট ও চার্চিল ছাড়াও আরো দুই দেশের প্রধানকর্তা এতে স্বাক্ষর দিচ্ছেন। এরা হলে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টালিন আর চীনের প্রেসিডেন্ট চিয়াং কাইসেক (নতুন দুজন, ব্যক্তি হিসাবে নয় তারা প্রতিনিধি পাঠিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন)।  আর এই চারদেশের স্বাক্ষরের দলিলটাই হল জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার দলিল বা ডিক্লারেশন [Declaration by the United Nations, January 1, 1942] । যদিও পরে অন্যান্য প্রায় ২১টা দেশ এতে প্রতিস্বাক্ষর করেছিল।
    এদিনে রুজভেল্ট যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষের কথা পরিস্কার করেন। তাঁর পক্ষের দেশগুলোর নাম দেন “মিত্র-শক্তি” যা্দেরকে পরবর্তিতে তিনি “ইউনাইটেড নেশন্স” (UNITED NATIONS বাংলায় জাতিসংঘ) বলে চিহ্নিত করেছেন। আর বিপক্ষ অক্ষশক্তি বলতে হিটলারের জর্মানি সাথে ইটালি ও জাপান এভাবে।

    কিন্তু তখন থেকেই জাতিসংঘ কী কেন – মানে কী ভিত্তিতে এটা গড়ে উঠেছিল সেসব কথা ক্রমশ পিছনে চাপা পড়ে থেকেছে আর প্রধান হয়েছে হিটলারের বিরুদ্ধে জোট হয়েছে এই খবর। এতে জাতিসংঘের জন্মের খবর যতটুকু পড়ালেখা জানা লোকেরা জেনেছে তাও আবার তারা বুঝেছে একটা বিজনেস এসোসিয়েশন বা সমিতি যেমন [যেন একটা FBCCI] হয় তেমন কিছু এক তবে এটা যেন “রাষ্ট্র  সমিতি” বলে মনে করা হয়েছে। অথচ এর জন্ম ঘোষণা ভিত্তি সবসদস্যই মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই কিন্তু এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি সব সদস্যের সমান একভোট এই ভিত্তিতে নয়; বরং ভেটো পদ্ধতি।
    সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ঘটনাটা হল, এই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি হল দুনিয়া থেকে কলোনি উচ্ছেদ।  আর সেই সাথে তা এই অর্থে ও শর্তে তা লেখা হয়েছে যার আরেকটা মানে হয়ে গেছে এতে রাজতন্ত্রের কোন সুযোগ নাই। সদস্য রাষ্ট্রকে রিপাবলিক হতেই হবে। কারণ দেশ-ভুখন্ড এর বাসিন্দা যারা তারা নিজেরাই কথা বলবেন, সবকিছু নির্ধারণ করবেন। ফলে কলোনি দখলদার শাসকের সাথে রাজার ভুমিকাও বাদ হয়ে গেছে। এরা কেউ না হয়ে গেছে।

    কিন্তু এত সমস্যার আরেক দিকটা খুবই জটিল হয়েছিল। তা হল সঠিক বুঝাবুঝি। এটা এমনকি জওয়াহরলাল নেহেরু যিনি স্বাধীন  ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী –  তিনিও জাতিসংঘ জন্মানোর ভিত্তিমূলক দিকটা বুঝেন নাই।  না, তাঁকে ছোট করার জন্য এটা বলা হচ্ছে না। যেমন দেখেন, এরই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল, কাশ্মির ইস্যু। তিনি ভেবেছিলেন কাশ্মির কার – এই প্রশ্নে যেহেতু কাশ্মিরের রাজা হরি সিং নেহেরুর সাথে –ভারতভুক্তির- চুক্তি করেছেন অতএব কাশ্মির নিশ্চয় ভারতের অংশ হয়ে গেছে। এটা মনে করে তিনি এর স্বপক্ষে এই দাবির উপর  জাতিসংঘের সম্মতির সিল-ছাপ্পড় নিশ্চয় পেয়ে যাবেন মনে করে ঐ ভারতভুক্তি-পত্র জাতিসঙ্ঘের মতামত চেয়ে পাঠিয়েছেন। অথচ তিনি জাতিসংঘের জন্মভিত্তিই জানেন না যে সেখানে একটা দেশের হকদার-নির্ধারক কোন রাজা নয় বাসিন্দারা, তাদের গণ-সম্মতিকেই ভিত্তি মানা হয়েছে। ফলে নেহেরুকে ফেরত পাঠানো জাতিসংঘের রায় ছিল “কাশ্মিরে গনভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত” নেওয়ার।  যা পরে তিনি কখনই এটা করেন নাই। আর সেই নেহেরু থেকে একালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পর্যন্ত কারও জাতিসংঘ প্রতিষ্টানটা কী বৈশিষ্ঠের, কী উদ্দেশ্যের তা কখনই তাদের পড়ালেখা করা হয়ে উঠে নাই।

    সম্প্রতিকালে জয়শঙ্করের বক্তৃতার এক ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়েছে। সম্ভবত তা ভারতের কোন এক একাদেমিক প্রতিষ্ঠানের যেখানে তিনি স্টুডেন্টদের –  ভারত কবে জাতিসঘের স্থায়ী বা ভেটোধারী সদস্যপদ পাবেন – এই প্রশ্নে কথা বলছিলেন। জয়শঙ্কর আমাদের বিসিএস-ক্যাডার দেয়ার মতই ভারতের সমতুল্য ফরেন ক্যাডারের লোক; সেখান থেকে পেশাদার কূটনীতিক জীবনের অবসরে, এখন মন্ত্রী হয়েছেন।  তিনি সম্ভবত নিজেকে স্মার্টভাবে হাজির করতে চেয়েছেন। তিনি এক কড়া শব্দ প্রয়োগ করেছেন সেখানে সমালোচনায়। শব্দটা হল জাতিসংঘের “ক্রেডিবিলিটি” [Credibility] কী আছে, ইত্যাদি। এখানে ক্রেডিবিলিটি বলতে এর বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা কী, এটা বলতে চেয়েছেন। তার মূল অভিযোগ জাতিসংঘ প্রতিনিধিত্বশীল নয়। শব্দটা অনেক কর্কশ এবং একই সাথে তার প্রতিষ্ঠানটার গঠন, উদ্দেশ্য ও ভিত্তি সম্পর্কে যে কোন ধারণা নাই সেটাও প্রকাশ করে দিয়েছে।

    প্রথমত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানের যে অঙ্গের কথা বলা হচ্ছে সেটা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সিকিউরিটি কাউন্সিল [UNSC] যেটা মূলত রাজনৈতিক বিষয়াদি দেখাশুনা করে।  শুরুতে বলেছি এটা মূলত ১৫ সদস্যের প্রতিষ্ঠান যার পাঁচটা ভেটোধারী সদস্যপদ আর বাকি দশটা অস্থায়ী (দুবছর) রোটেশনাল সদস্যপদ যা মহাদেশভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বশীল করে বেছে পূরণ করে নেয়া হয়ে থাকে। কাজেই এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে সদস্যপদ গড়া হয় নাই এই অভিযোগ ভিত্তিহীন।

    তবে উনি সম্ভবত বলতে চাইছেন পাঁচ ভেটোসদস্যপদ এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে গড়া নয় বা বিতরণ হয় না। হ্যা সে কথা সত্য এবং এটা গ্লোবাল জনসংখ্যার ভিত্তিতে বা কোন প্রতিনিধিত্বশীল ভিত্তিতে বেছে পাঁচসদস্যকে দেয়া হয় নাই। আসলে তা হতেই হবে এই অনুমানই ঠিক না, এটা ভিত্তিহীন। যেমন এই পাঁচ স্থায়ীসদস্যের মধ্যে আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার কখনই কেউ নাই। [এই প্রতিনিধিত্বশীল করার দিকটা সম্পন্ন ও নিশ্চিত করা হয়েছে অস্থায়ী সদস্যপদ নেয়া বা বিতরণের বেলায়। ] আবার চীনকে নেয়া হয়েছে এর জনসংখ্যা ভারতের চেয়েও অনেক বেশি একারণেও না। কাজেই জাতিসংঘের জন্ম ইতিহাস না জেনে এমন অনেক কথাই বলা যায়।
    মূলত ভেটোসদস্যপদ দেয়া হয়েছে কারা ততকালীন সময়ে সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে বড় বা পরাশক্তি এদের কথা ভেবে (তাও চীনের বেলায় সেটাও নয়)। সামরিক বা পরাশক্তি বলে বিবেচনা করতে হয়েছিল রুজভেল্ট-কে। সেটা এজন্য যে পুরা জাতিসংঘের আইডিয়াটা রুজভেল্টের। তার এই আইডিয়াটা বাস্তবায়নে এরা যাতে বাধাগ্রস্থ না করে সেকথা ভেবেই।

    সাধারণভাবে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে খরচ (সোভিয়েন ইউনিয়ন-সহ সকল পক্ষশক্তিকে) এককভাবে যোগানো এমনকি যুদ্ধপরবর্তি পুনর্বাসনের শিল্প ও অবকাঠামোতে অর্থবিনিয়োগ এবং তা যুদ্ধের হেরে যাওয়া পক্ষের দেশগুলোকেও সহায়তা দেয়া সহ – দিয়েছিল আমেরিকা। সেকালের আমেরিকার একক সামর্থ ছিল বলেই তা থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য সব বিবেচনার উপরে উঠে যায় যা একটা কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল।

    আরও আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তো বটেই দুই বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই আমেরিকা দুনিয়াকে যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাওয়া মানে, – যুদ্ধ এড়িয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধগুলো মীমাংসার কোন উপায়, কোন রাজনৈতিক মৌলিক বক্তব্য অবস্থানের ভিত্তিতে – এক প্রতিষ্ঠান – গড়ে তুলে তা করা যায় কীভাবে এটা আমেরিকার মাথায় সবার আগে এসেছিল। তখনকার আমেরিকান সমাজ এধারণা প্রচলিত হয়ে উঠেছিল যে কোন যুদ্ধই মূলত দেশের পুঁজি বা সঞ্চিত সম্পদ ধংস করে দেয়; তাই এটা এড়ানোর উপায় খুঁজতে হবে। মনে করা হয় যে আমেরিকানরাও মূলত সাদা ককেশীয় হলেও তাঁরাও এশিয়ায় আমাদের মত এক শ্রেণীর বৃটিশ কলোনি শাসকের অধীনে শাসিত নিষ্পেষিত। আমেরিকান ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা বলতে বৃটিশসহ অন্যান্য ইউরোপীয় কলোনি শাসকের থেকে সামরিকভাবে লড়াই করে মুক্ত হওয়া ছিল।  ফলে অন্য কাউকে কলোনি করার বিরুদ্ধে এক শক্ত অভ্যন্তরীণ জনমত পরবর্তিতে আমেরিকান-সমাজে কাজ করত, সক্রিয় ছিল। তাই ল্যাটিন আমেরিকান অনেক ছোট দেশ দুতিন বছরের বেশি পরবর্তিতে আমেরিকা সেখানে কলোনি দখল চালিয়ে রাখে নাই, বা পারে নাই। এমন ব্যাকগ্রাউন্ডের আমেরিকাি আবার  প্রচুর সঞ্চিত সারপ্লাস (আজকের চীনও যেদিকে আগাচ্ছে) ছিল বলে এটাই বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকাকে নেতৃত্বের আসনে বা কমান্ডের পজিশন সহজেই পেতে সাহায্য করেছিল।

    তা সত্বেও যে জাতিসংঘ আমেরিকা প্রস্তাব করছিল তা না মানতে চাওয়ার সামর্থ তো কেবল তখনকার বিচারে তখনও যারা সামরিকভাবে সক্ষম এমন রাষ্ট্রগুলোকেই বুঝতে হবে। এই বিচারে এদের জন্য ভেটোসদস্য পদ রাখার প্রস্তাব করেছিলেন রুজভেল্ট। যাতে সামরিকভাবে সক্ষম বা পরাশক্তি দেশগুলো প্রস্তাবিত জাতিসংঘের ভিতরেই ধরে রাখা থাকে। নইলে জাতিসংঘ আইডিয়া কখনই কার্যকর হতে পারত না।
    মানে রাখতে হবে স্তালিন ছিলেন রজভে্লটের জাতিসংঘ আইডিয়ার প্রথম বিরোধিতাকারি। তাকে ঠান্ডা করতে বা তার ভয় দূর করতেই রুজভেল্ট ভেটো আইডিয়াটা আনেন। যার মূলকথাটা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আমেরিকা যেন পরাশক্তি অন্য দেশগুলোর উপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার মতলবে জাতিসংঘ গড়ার কথা বলছেন না, সেটা স্পষ্ট রাখা যায়; তাদের আস্থা আসে। এই বিচারে এই পাঁচ সদস্যপদ কোন বিজনেস এসোসিয়েশন সমিতি বা এফবিসিসিআই এর মত নয়; সাম্যও নয়। বরং একেবারেই বিশেষ। এদিকটা না বুঝলে জাতিসংঘ কেন বা কীরকম তা জানা যাবে না।

    এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের সংস্কার বা পুনর্জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক না; বিশেষ করে গ্লোবাল নেতৃত্ব (শুধু গ্লোবাল অর্থনৈতিক না রাজনৈতিকও) বদল এলে সেটাই একমাত্র জাতিসংঘের অন্তত ওরিয়েন্টেশনে তো বটেই আরো বহু খোলনলচেও বদল আসাটা অসম্ভব নয়।  তবে ভারত সবসময় যে কল্পনাটা করে এসেছে তাতে ধরে নেয়া থাকে যে আমেরিকা আজীবন যেন নেতা আছে থাকবে। ফলে জাতিসংঘের (কোন সংস্কারেও) আসন বন্টনের ক্ষমতা যেন আমেরিকার একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে!!! যেটা এখনও না, আগামিতেও হবে না।
    সে যাই হোক, জাতিসংঘের কোন নিয়মটা কেন ওরকম বা সেরকম তা বুঝতে চাইলে জাতিসংঘ জন্মকালীন পটভুমিতে রূজভেল্ট কী কী ব্যবহারিক সমস্যার মোকাবিলা করে আগাতে হয়েছে তা বুঝতেই হবে। নইলে কোনকিছুই বুঝা প্রায় অসম্ভব! এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের কোন পরিবর্তনে কী কী হতে পারে সে তা ইমাজিন করা সহজ হবে!!
    আবার পুরানা কথায় ফিরে যাই।  মুলকথা, সেকালে রুজভেল্ট ভেটোসদস্যপদ দিয়েই রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্সকে রাজি করিয়েছিলেন। ফলে আগামি দিনেও এমন কতকিছু দিয়ে হয়ত চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বি বা সহযোগীদেরকে সামলাতে হতে পারে।
    আবার লক্ষ্য করতে হবে সেকালে আমেরিকাকে মানে রুজভেল্টকে  চীনের ব্যাপারটা  আলাদা করে বিশেষ সুবিধা দিতে চেয়ে আলাদাভাবে চেয়ে নিতে হয়েছিল। সেক্ষেত্রে রুজভেল্টের যুক্তি ছিল তিনি এশিয়ায় হিটলারের একমাত্র বন্ধু  জাপান যে পরাজিত করেছেন বটে তা হয়ে গেলেও এর পুনরুত্থান ঘটতে পারে বলে আমেরিকা ভীত ছিলেন। আর কলোনি দখলদার জাপান ছিল উভয় কোরিয়া আর চীনের (কিছু অংশের) দখলদার। তাই বিশ্বযুদ্ধ পরের পরিস্থিতিতে জাপানের বিপরীতে চীনকে এক বিশেষ শক্তি হিসাবে উঠিয়ে আনতে রুজভেল্ট  এশিয়ার একমাত্র চীনকে ভেটোসদস্যপদ দিতে বাকিদের রাজি করিয়েছিলেন। যদিও কাজটা কঠিন ছিল না কারণ –  রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স এরা নিজেরা নিজেদের ভেটোসদস্যপদ পাবার পরে আর কোনদিকে আপত্তি তুলতে আর আগ্রহি ছিল না।

    তাই জন্মগঠন ইতিহাস সে সময়ের পরিস্থতি ও বিবেচনার ফ্যাক্টরগুলো কী কী ছিল তা না জেনে একালে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে তো অনেক কথা বলাই যায়। তাতে জয়শঙ্করের মত দেশের ভিতরের  অনেক হাততালিও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এগুলো আসলে নিজেরই অজ্ঞতা আর ইতিহাসবোধের অভাবই নির্দেশ করে এমন হয়ে যেতে পারে।

    তবে, এককথায় বললে, আমেরিকা বা রুজভেল্টের সঞ্চিত সম্পদ ব্যয় করার সক্ষমতা মূলত এটাই আমেরিকার হাতে দুনিয়া নতুন করে উঠে দাড়াতে ও আমেরিকান বক্তব্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

    তাই আজকের মোদির ভারতের জয়শঙ্করের জন্য একটাই বিকল্প হল, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেখানো। এটাই একমাত্র তাদের ভারতের ইচ্ছামত এক নয়া জাতিসংঘ তারা গড়ে নিতে পারলে হয়ত পারতেও পারে। আবার তখনকার “বাকিরা” তাতে রাজি হবে কিনা তাদেরকে রাজি করাতে ভারতকে কী কী নয়া প্রস্তাব দিতে হবে সেজন্যও ভারতকে বা জয়শঙ্কদেরকে রেডি থাকতে হবে। এরপরে তখন হয়ত তারা বুঝতে পারবেন কেন স্থায়ী ভেটোসদস্যপদগুলো দেশের ‘জনসংখ্যা আনুপাতিক’ ভাবে বেছে নেওয়া হয় নাই।

    আবার ধরেন,  না-বুঝা লোকেদের নিয়ে চলতে সমস্যা অনেক। জয়শঙ্কর অনেকবার ঐ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন ভারত তৃতীয় বড় অর্থনীতির দেশ। একবার বলেছেন “এমন একদিন আসবে”। সেটা আসুক আগে, তাই না!!! এপর্যন্ত ইকোনমিক বা স্টাটিস্টিক্যাল ডাটা নিয়ে স্টাডির ফোরকাস্ট হল সেটা ২০৫০ সাল নাগাদ হলেও হতে পারে। তাহলে এর ত্রিশবছর আগেই এজন্য হুড়োহুড়ি কেন?

    আবার মোদির বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সর্বনিম্ন। এটা ভারতের মুসলমান কুপিয়ে কতটা কী ঢেকে রাখা যাবে? ভারতের “হিন্দুত্ববাদ” এই রাজনীতিই এটা চলতে থাকলে তা ভারতকে যতটুক্তু সম্ভাবনা আছে সেতাও হতে দিবে না।  বারবার এমন কোন অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হতে দিবে না।

    আবার এটাকে তামাসাই বলতে হবে যে, জয়শঙ্করেরও ধারণা আমেরিকার সমর্থনে তিনি ভেটোক্ষমতা পেতে চান বা পাবার উপায় দেখেন। এটাও জাতিসংঘ না বুঝার আরেক প্রমাণ। কারোণ বর্তমান এই জাতিসংঘের মধ্যে চীনের হাতে ভেটোক্ষমতা আছে ফলে আমেরিকার যেকোন সমর্থনের বিরুদ্ধে চীনা এক ভেটো ভোটই সব আশা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটা তো জয়শঙ্করের না বুঝার কিছু নাই?? যার মানে  ভারতকে কেবল আমেরিকাই না অন্তত চীনের কাছেও প্রিয়পাত্র হতে হবে। কিন্তু ভারত তো মনে করে নিজেকে নিজে নিজেই “পরাশক্তি” ঘোষণা দিয়েই সব সমস্যা মোদি মোকাবুলা করতে পারবেন।

    অতএব জয়শঙ্করের ভারতের প্রথম কাজ হল, জাতিসংঘের জন্ম উত্থান নিয়ে স্টাডি করা। সাথে অন্তত ১৯৩৩-৪৫ এই সময়কালে পাশ হওয়া আমেরিকান আইন যেগুলো গ্লোবাল প্রভাবের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে স্টাডি করা। এর আগে চাপাবাজির মুখ খুললে বারবার বেইজ্জতি হতে হবে!!

    গ্লোবাল নাকি জিওঃ
    এটা আসলে হল, গ্লোবাল ফেনোমেনাকে না বুঝতে পেরে একে জিও বলে ডাকাডাকি!!
    এলেখায় অনেকবার “গ্লোবাল” শব্দটা ব্যবহার করেছি। এর অর্থ-তাতপর্য বুঝতে হবে। এই শব্দের উত্থান হয়েছে ১৯৪৫ সালের পরে।  আর ব্যতিক্রম কিছু ছাড়া প্রায় সবাই গ্লোবাল শব্দটার (যেমন গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদির) বদলে ব্যবহার করে জিও (geo) যেমন জিও পলিটিক্স  শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। আবার বুঝা যায় তারাও এই ব্যবহারে সন্তুষ্ট না, এক অস্বস্তি আছে তাদের মধ্যে।
    এক। উতপত্তি কাল হিসাবে দেখলে জিও-এই ধারণার উদ্ভব ও চর্চার শুরু (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে। এটাই ব্রিটানিকার ধারণা অনুসারে।
    আর এর বিপরীতে আইএমএফের জন্মের (১৯৪৪) পরেই কেবল সম্ভব হয়েছে গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদি ধরণের ধারণাওগুলোর।

    জিও দিয়ে যেকোন ধারণা (যেমন জিও-স্ট্রাটেজি বা জিও-পলিটিক্স) এদের মুল বক্তব্য জিও মানে কোনদেশের ভৌগলিক অবস্থান যখন ফ্যাক্টর, নির্ধারক উপাদান। এজন্যই জিও [Geo-, জিওগ্রাফি থেকে]। এসবই হল জিও+ ।
    আর আইএমএফ এর জন্ম মানে হল গ্লোবাল বা দুনিয়াব্যাপী যখন বাণিজ্য সম্ভব হয়েছে – ফলে গ্লোবাল অর্থনীতি বলে কোন ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। শুধু তাই না। যখন গ্লোবাল অর্থনীতির কারণে সবকিছুর গ্লোবাল ভার্সান দেখতে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

    কাজেই গ্লোবাল ধারণার বিকল্প কখনই জিও+ (জিও-পলিটিক্স)  হতেই পারে না।

    আর সবশেষে আসল সত্যি কথাটা বলে ফেলা যাক। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আমেরিকান নেতৃত্বের কারণে সবকিছু গ্লোবাল হয়ে উঠতে চাচ্ছে। ততদিন এর বাধা ছিল দুনিয়াজুড়ে থাকা কলোনি দখল-শাসন সম্পর্ক। যেটাকে একমাত্র আমেরকাই উচ্ছেদ করে দিয়েছে; বাধ্য করেছে। আসলে (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে – এটাই ছিল আসলে দুনিয়া গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবালি সম্পর্কিত হয়ে উঠার (গ্লোবাল বাণিজ্যের মাধ্যমে) আগমন বার্তা দেওয়ার কাল। আর সেটাকেই না বুঝতে পেরে ভুল করে জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে মনে করা হয়েছিল। এককথায় তাই,  জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে অনুমান এটা এক ভুল ধারণা। “গ্লোবাল” ফেনোমেনাকে বুঝতে না পারার খামতি। ভবিষ্যতে বিষয়টা নিয়ে আরো বিস্তার করে লিখার আগ্রহ রেখে আপাতত শেষ করছি।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৫ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-49S

     

    Ignoring BRICS is ignoring turn of history

     

    শশী থারুর [SHASHI THAROOR] একজন ভারতীয়, কংগ্রেস দলীয় রাজনীতিবিদ। মূলত, তিনি রাজনীতিকের চেয়ে বরং একজন কেরিয়ারিস্ট; তিনি প্রফেশনাল কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি এবং গ্রাজুয়েশন করেছেন আমেরিকার স্বনামধন্য ফ্লেশ্চার স্কুল [The Fletcher School of Law and Diplomacy] থেকে। এই অর্থে তাঁর এক নামী একাডেমিক ইনস্টিটিউশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদিও তিনি ততটুকুই রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন বা চেয়েছেন যতটুকু  কেরিয়ার বাড়াতে তাঁর দরকার মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এতে তিনি যতটা যোগ্য হয়েছেন তার চেয়ে বেশি  নিজ একাডেমিক (ফ্লেশ্চার) বড়াই বা গর্ব করে থাকেন এবং তা বাড়াবাড়ি রকম। তার সমসাময়িক বা এল্যুমনিদের [alumni] মধ্যে যারা এমনকি বাংলাদেশী (ফ্লেশ্চার) তাদেরকেও এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।

    মোদির ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার আগের টানা দুই টার্ম (২০০৪-১৪) কংগ্রেসের মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় ছিল; সেই সময়কালে থারুরের কেরিয়ার ও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল। সে সময়টা ছিল কংগ্রেস সরকারের – তাই তিনি কংগ্রেস দলের (কেরালা থেকে) এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন। মানে সে সময় অন্য দলের সরকার হলে তিনি সেই দল করতেন হয়ত, এ রকম কেরিয়ারিস্ট তিনি। কেন এমন বলছি?

    বলছি, সেকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই যেমন এতদিন তিনি ছিলেন এক মোদিবিরোধী কংগ্রেসী। কিন্তু গত ৭ জুলাই ২০২২ তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate] এক আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে – অবস্থান বদলে নিতে চাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি  বাইডেনের মহাউদ্যোগে নবগঠিত বা চলতি যে ‘পশ্চিমা জোট’ শক্তি তৈরি হচ্ছে (সাম্প্রতিকালে জি-৭ আর মাদ্রিদে ন্যাটোর সম্মেলন ডেকে বাইডেন হইচই ফেলতে চেয়েছেন, ইউরোপের সাথে আমেরিকার জোটকে তিনি  ‘পশ্চিমা ব্লক জোট’  [Western bloc’s] বলে পরিচয় করিয়েছেন সেখানেই) শশী থারুর বাইডেনের এই উন্মাদনা দেখে  আর বসে থাকতে পারেননি। একেবারে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকালতি শুরু করেছেন। যেখানে এতদিন তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকার ভারত পলিসির ক্রিটিক।

    শশী থারুর নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।  সেখানে তার ব্যক্তি অবস্থান হিসেবে যে লাইন তিনি পারসু করতেন বা পক্ষে কথা বলে থাকেন তা হল যেমন – কেন আমেরিকা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেনমেন্টের [China Containment] এ’কাজের ঠিকা দিয়েছে; এর সমালোচক ছিলেন তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই চীন ঠেকানোর পুরস্কার বা মজুরি হিসেবেই ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল।

    এই ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ প্রশ্নেই থারুর  মোদির প্রো-আমেরিকান হয়ে লেপ্টে থাকার নীতির সমালোচক ছিলেন। ফলে যেন কংগ্রেসি হিসেবেই মোদির সমালোচক তিনি, এ’পরিচয় লটকে চলতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি পাশ ফিরছেন; মোদির সমালোচক হয়ে বাইডেনকে অতি আপন করে নিতে চাইছেন। যেটা অনেকে পাল্টিমারাও বলতে পারেন। কিন্তু কী প্রসঙ্গে ছিল থারুরের সেই লেখা?

    আলোচ্য সেই লেখার শিরোনাম হল  – ‘ব্রিকস থেকে ভারত কি বেরিয়ে যাবে?’ এটা বাংলাদেশে অনেকে এভাবে বাংলা করে ছেপেছে – যেটা ভালো বাংলা হয়নি। কারণ, মূল ইংরাজি ভাষ্যটা ছিল Are the BRICS Breaking Up?  বা – ‘ব্রিকস কী ভেঙে পড়বে’-এরকম।

    প্রতি বছর ব্রিকস জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার গতমাসে ২৩-২৪ জুন তা হয়েছিল চীনে। একইসাথে তা বিশেষ গুরুত্বে ‘বেইজিং ঘোষণা’ [XIV BRICS Summit Beijing Declaration] বলে এক ঐক্যমতের দলিলে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। আর এবার ব্রিকস সম্মেলন হয়েছে এমন পটভূমিতে যখন বাইডেনের ‘পশ্চিমা-শক্তি’ আগেই ঘোষণা দিয়ে যা যা বলেছে এর অর্থ হয় যে, মূলত চীন ও সাথে রাশিয়া এবং এদের সহযোগী সব রাষ্ট্রকে তারা একঘরে করবে, কোনো অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কও রাখবে না; ভিন্ন করে দিবে; যেন অ-জাত বা নিচা-জাত তারা। সেটা অনেকটা ১৯৯২ সালের আগে সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই-ব্লকে দুনিয়া ভাগ হয়ে থাকার সময়কালে দুনিয়া যেমন ছিল তেমনি।
    সেখানে আবার দুনিয়াটাকে ফিরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাইডেনের এটা এক অবাস্তব খায়েস-কল্পনা মাত্র। যেটাকে ‘কোল্ড ওয়্যার’ [cold war]-এর সেকাল বলে অনেকে চিনে থাকে যার মূল অমন বৈশিষ্ঠ যে ব্লকে ভাগ হতে পেরেছিল যে, তাতে সোভিয়েত-আমেরিকা বলে এ দুই ব্লকের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্য-পুঁজিবিনিয়োগ বিষয়ক (ফলে  জ্ঞান বা স্বাভাবিক বাতচিত-সহ সবকিছুও) মানে ভাব বা ব্যবসা কোনোকিছুরই বিনিময় সম্পর্ক ছিল না।

    ঐ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ, খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের কোনো দেশ কেউই – ১৯৪৪ সালে আইএমএফ প্রথম  জন্ম ও গঠন হওয়ার পর থেকেই – এরা কেউ  সদস্যপদ নেয়নি। আর যে সুযোগে পরে আমেরিকাও সদস্যপদ না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাইডেনের নয়া-কল্পনার খায়েস অনেকটা সেকালের মতই যা একালে আবার সেখানে পৌঁছানো যায় কি না; এই তাঁর আকাঙ্খা বা মনোবাঞ্ছা। যদিও একালে সে বাস্তবতাটাই নাই ভেঙে গেছে, মানে বাস্তবে তা আর উপস্থিতিও নেই। তবু এ জায়গায় বাইডেন নির্বিকার। কিন্তু জিদ ধরেছেন সেকালেই ফিরতে চান! বাইডেনের ভাষায় বললে, তার নেতৃত্ব গড়ে তোলা ‘পশ্চিমা শক্তির’ সাথে চীন ও এর বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নাকি ‘মূল্যবোধে’ [Beijing…. challenges the Western bloc’s ‘interests, security and values’] এক বিশাল ফারাক আছে; তাই তিনি যেন অবাস্তব জেনেও এমন জিদ ধরেছেন।

    এ ছাড়া এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেক তাৎপর্য ছিল, এতদিন এতে পাঁচসদস্য রাষ্ট্র শুধু অংশ নিয়েএসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম অতিথি হিসেবে আরো ১৩টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। যে দেশগুলো হল – আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, সেনেগাল, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আমরা বলতে পারি, এর মানে, এদের কাছে বাইডেনের উদ্যোগে নবগঠিত যে ‘পশ্চিমা ব্লক’ করেছে, চীনকে একঘরে করবে বলে হুমকি দিয়েছে- সেসব দিকগুলো এসব দেশের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। কেন এভাবে বলছি?

    গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস (BRICS) আসলে কীঃ
    এক কথায় বললে, এখনো আমেরিকা গ্লোবাল ইকোনমির নেতা হয়ে থাকলেও এর অবস্থা পড়তি শেষ পর্যায়ে। বিপরীতে চীনের নেতৃত্ব উত্থিত হয়ে তা সেই জায়গা নিতে চাইছে। আ্মাদের অর্থ-বাণিজ্যের দুনিয়া এখন এরই জংশনে আছি। আর এতে গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; যেটা নিজে আছে আবার আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণে।
    কারণ, নিয়ন্ত্রক আইএমএফ এর বড় শেয়ার মালিকানা একা আমেরিকার নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। এমনকি চীন উঠে এলেও তার সাথে শেয়ার শেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। আর তা থেকেই ওয়াল স্টিটের পরামর্শে ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম! তাহলে ব্রিকস হল সেই আগামী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান; যখন গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল ঘটবে তখন যা কার্যকরি হবে। কিন্তু তা সক্রিয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে যখন চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে তখন। কেন? এখন নয় কেন?

    ইকোনমিক-টেকনিক্যাল কারণে একই দুনিয়াতে দুইটা ‘আইএমএফ’ ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে একটা দেশে একই সাথে দুটা সরকার থাকতে পারে না। তাই ২০০৯ সাল থেকে ব্রিকসের জন্ম হলেও এখনই তা দুনিয়াজুড়ে ‘আইএমএফ’-এর সমান্তরালে সক্রিয় হয়নি, ইচ্ছা করেই।
    চীন, ভারত, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল – এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস গঠিত। যদি অনুমান করে নেই আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে কেবল এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে সমান্তরাল আরেকটা দুনিয়া যেন আছে; তবে এখন অস্থায়ীভাবে এই পাঁচ রাষ্ট্রের জন্যই শুধু ব্রিকস যেন, আর সেই দুনিয়ায় আরেক আইএমএফ হিসেবে তা আপাতত হাজির আছে।
    এভাবে মনে করা যেতে পারে। যেদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে চীন আসীন হবে সেদিন ব্রিকস আর আইএমএফ মিলিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। তবে তা আজকের আমেরিকান প্রভাবের (মানে লায়ন শেয়ার) আইএমএফ যেমন, সেই রকম তখন সেটা চীনের প্রভাবের একটা নয়া আইএমএফ প্রতিষ্ঠান হবে, তাতে নতুন নাম কিছু একটা হবে হয়ত বা পুরনোটাই থাকবে। কিন্তু নয়া মালিকানা শেয়ারে বড় ভাগটা চীনের পক্ষে পুনর্গঠিত হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। কাজেই চীনকে উপেক্ষা করে নয়া দুনিয়া সাজানো বাইডেনের আমেরিকার এক মরণ খায়েশ মাত্র। অথচ বাইডেনের এ’অবস্থানের পরোয়া না করে ১৩ রাষ্ট্রের এবার ব্রিকসের অতিথি হয়েছে – নিজেদের স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটা ঘটিয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাইডেন যেখানে চীনকে গ্লোবাল বাণিজ্য থেকে বের করে একঘরে করার জিদ ধরেছেন; সেখানে এই ১৩ রাষ্ট্র উল্টা বাইছে – এমন পদক্ষেপ নজর-আমল করার মতই বলতে হবে!

    তবে ওদিকে একই দুনিয়াতে বিশ্বব্যাংক টাইপের প্রতিষ্ঠান একাধিক হতে পারে। টেকনিক্যাল অসুবিধা নাই। যেমন ইতোমধ্যেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এডিবি ADB) অথবা ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি IDB) আসলে এরা বিশ্ব ব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছে। এছাড়া চীনা প্রভাবাধীন নয়া এআইআইবি [AIIB] অথবা ব্রিকসের ভেতরেই আরেকটা ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক [NDB]’ নামে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে আছে।

    সার কথায় এতক্ষণের কথাগুলো সারকরে বললে, ব্যাপারটি হল, শশী থারুরকে এতদিন ব্রিকস নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। বরং ভারত-আমেরিকার চীন ঠেকানো নিয়ে কথা বলতেন। সেই তিনি এখন “ব্রিকস ভেঙে যাবে কি না” তা নিয়ে কথা বলছেন!
    আসলে আগেও অনেকবার বলেছিলাম যে গ্লোবাল ইকোনমি বা আইএমএফ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় কূটনীতিকদের সাবধান হওয়াই ভাল; এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির ইস্যু বলে ঠাওরে নিয়ে কথা বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের বিদ্যের দৌড় প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে – তাই অসাবধানে এ ইস্যুর সাথে আচরণ না করা ভুল। আর ঠিক সেই ভুল ও ফাঁদে আটকে গেছেন শশী থারুর!
    আগে বলে নেয়া যাক – কেন এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ‘বেইজিং ঘোষণা’ জিনিসটা কী যার ওপরই মূলত শশী থারুর এত ক্ষোভ বা আপত্তি!

    পাকিস্তানি আবদুল রহমান মক্কিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা নিয়ে তিন পর্যায় :
    প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগের সপ্তাহে ১৭ জুন, একজন পাকিস্তানি কিন্তু আইএস সদস্য আবদুল রহমান মক্কির নাম জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকায় তোলা হবে কি না এ নিয়ে ভারত-আমেরিকার এক যৌথ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন এটা আরো ছয় মাস দেরি করার পক্ষে নিজ ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে, পরের সপ্তাহে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের ভারতের মোদি নিজ বক্তৃতায় সরাসরি এ প্রসঙ্গটা উচ্চারণ না করে তবে প্রসঙ্গটা মাথায় রেখে বলেন, ‘আমাদের (ব্রিকসের সদস্যরা) একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝা উচিত, সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা দেয়া উচিত; যাতে এমন ইস্যুর রাজনীতিকরণ না হয়ে যায়।’

    Modi has said that the BRICS member nations should understand each other’s security concerns and provide mutual support in the designation of terrorists, asserting that this sensitive issue should not be “politicised”.

    আর এতে তৃতীয় ঘটনাটা হল, ব্রিকস সম্মেলন শেষে ‘বেইজিং ঘোষণা’ নামে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আর এই প্রস্তাবের  বিষয়টা সারকথায় বললে – আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যুতে ব্রিকস সদস্যরা  যখনই একসাথে জাতিসঙ্ঘে অবস্থান  নিতে পেরেছে তাতে কত ভাল কিছু ফলাফল এসেছে -সেসবের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখন থেকে আবার পরস্পরের সহযোগী হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

    কেন এসব বলেও বারবার চীন-ভারত একসাথে থাকতে পারেনি :
    এর মুলকথা হিসাবে বলা যায়, গ্লোবাল নেতৃত্বের পরিবর্তনের একালে গত ২০ বছর ধরে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে তাতে মৌলিক বোঝাবুঝিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেছে বা রাখা হয়েছে বলে এর উল্টো ফলই ভারত বারবার পেয়েছে। যেমন- ভারত মনে করে এসেছে, এযুগে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভারত এদের দুজনের মাথার উপরে উঠে যেতে পারবে। নিজ ভাগ্য গুছিয়ে নিতে পারবে, কারণ ভারতের কূটনীতি খুবই চতুর!!  কিন্তু এটা এতটাই উচ্চাশা যে, এ নিয়ে কথা বলাই সময় নষ্ট। কারণ, এখানে মূল বিষয়টা – কূটনীতিক দক্ষতা দেখানোর নয়- বরং ‘নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ও তা দেখানোর’। নিজেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করে দেখানোর।
    এতে মোদি ভাল নেতা কি না, বা দেশপ্রেমিক জাতিবাদী কি না কেবল তা দিয়ে বা এই কর্তাসত্তা দেখিয়ে দাবি করা অর্থহীন যে- ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’ অর্জন হয়ে গেছে। ফলে এখন চীন-আমেরিকাকে কূটনীতিক চাতুরি দিয়ে টেক্কা মেরে দিলেই সব অর্জন হয়ে যাবে?  না, তা হওয়ার কারণ নাই। বরং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে দেখাতে হয়। তার আগেই নিজেকে পরাশক্তি দাবি করা অর্থহীন। বাগাড়ম্বর! আর কিছু হওয়ার আগেই আমি বিরাট কিছু এই বাগড়ম্বরতাই ভারতের কিছু না হতে পারার কারণ। সর্বোপরি আছে হিন্দুত্ববাদ, এই ভুল শুধু না বিরাট ক্ষতিকর রাজনীতি।
    যেমন ধরেন, সম্প্রতি ভারতের জনসংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়েছে। বিবিসি বাংলা খবরটা ছেপেছে যেন এটা নিজেই এক অর্জনের ঘটনা।   গ্লোবাল অর্থনীতির প্রধান কেউ হতে হলে বড় জনসংখ্যা এর অর্জনের জন্য অবশ্য একটা ইতিবাচক উপায় (ফ্যাক্টর) ও সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বড় জনসংখ্যার কোনো দেশ হয়ে যাওয়া মানেই সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কারণ, ওই বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতিতে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বানাতে রূপান্তর করতে সক্ষম হতে হবে আগে – তবেই বড় জনসংখ্যা ইতিবাচক; না হলে ওই বিপুল জনসংখ্যাই হবে তখন বড় বোঝা বা ভার।

    আর এই ভারতীয় ভুল মনোভাবকেই ফুসলিয়ে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে দিল্লিকে নিয়ে গেছে, ঠিকা দিয়েছে; মানে উল্টা ভারতকে ব্যবহার করেছে। চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়েছে। অথচ আমেরিকা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘পতিত শক্তি’। অর্থাৎ ভারতসহ উদীয়মান যেকোন অর্থনীতির জন্য বিপরীত শক্তি। কাজেই আমেরিকা ভারতের দোস্ত বা এলাই হতে পারে না!!

    এবার সুনির্দিষ্ট করে জঙ্গি ইস্যু :
    চীনের উইঘুর ইস্যু। আপনি উইঘুর বাসিন্দাদের পক্ষে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন এবং যাওয়া উচিতও। কিন্তু এক শর্তে! তা হল – উইঘুররা আবার আফগানিস্তানে আইএসের সহযোগী হয়ে সশস্ত্র তৎপরতা করে বেড়াতে পারবে না। আসলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানেরাও উইঘুর [ETIM]  এদের এমন তৎপরতা করতে আপত্তি ও বাধা জানিয়েছে। এইখানে দেখেন এনিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট।
    কিন্তু তারা তবু ভারত ও আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কাজে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচরাও থাকছে।

    পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা ইনস্টিটিউটে হামলা বা পাকিস্তানে গোয়াদর ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী মারতে বেলুচদের সাথে মিলে উইঘুরের বাসিন্দারা যদি তৎপরতা চালায় তবে এরপর আপনি আর একই সাথে তাদের প্রতি চীনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরেক বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, গত ২০০১ সাল থেকে উইঘুররা আমেরিকা সরকারের “সন্ত্রাসী দলের তালিকায়” অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগ-দিয়ে  ট্রাম্প প্রশাসন এই [ETIM] গ্রুপকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে মুক্ত করে দেয়। আর পরে বাইডেন উইঘুর বাসিন্দাদের উপর চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেইজিংয়ের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। রফতানিতে চীনা তুলা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে বাইডেন আসলে কী চায়?

    সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবান গ্রুপ টিটিপির [Tehrik-i-Taliban Pakistan] সাথে এদের মিলিত তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্রয় অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তাদের তৎপরতা স্তিমিত করেছে। আসলে বটমলাইন হল – আপনি আরেক দেশে সন্ত্রাস উসকে দিয়ে নিজ দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারবেন না। আমেরিকার সাথে মিলে ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস উসকে তোলার নীতিতে চলে তারা স্ব স্ব নিজ দেশ সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে পারবে না। ভারত-আমেরিকা মিলে পাকিস্তানে [চীনা স্থাপনা বা প্রকল্পে] সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দিয়ে নিজেরা ভাল থাকতে পারবে না। সন্ত্রাস প্রসঙ্গে সবখানেই সব ফোরামেই একই নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। এটাই একমাত্র এথেকে মুক্তির উপায়। পিস-মিল করে একেক সন্ত্রাসের ঘটনায় একেক অবস্থান নিবেন কোনটা কাছে টেনে কোল দিবেন আবার কোনটাকে জাতিসংঘের তালিকায় তুলবেন – এগুলো কোনটাই কাজ করবে না। শেষ বিচারে এসব কোন কাজের অবস্থান হবে না।  কেবল নুইসেন্স সৃষ্টি করা যাবে।

    যেমন যদি প্রশ্ন করি, ভারত মুক্কি ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে আমেরিকার সাথে মিলে ভারত জাতিসঙ্ঘে যৌথ প্রস্তাব উত্থাপনে গেল কেন? একই সাথে এ ইস্যুতে চীনের সাথে কথা বলা ও একই নীতি তৈরি করে উভয়েই তাতে চলতে চাইল না কেন? সমস্যা তো এখানেই! ভারত তো আসলে মুক্কি ইস্যুতে মানে সন্ত্রাস ইস্যুতে চীনের সাথেও এক অবস্থানে যেতে চায় না। চাইলে এই পথ ধরত। ভারত চেয়েছিল আমেরিকার সাথে গলা মিলিয়ে চীনকে জাতিসঙ্ঘের আসরে বিব্রত করতে। ভারত সমাধান চাইলে আগেই চীনের সাথেও একই অবস্থান নিয়ে কথা বলত। যেটা মোদি ব্রিকসের সভায় নিজ বক্তৃতায় বলেছেন যে, “ব্রিকসের পাঁচ সদস্যের সবাই অন্যের সন্ত্রাস নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আমল করা উচিত”। কিন্তু ভারত নিজেই তো তা অনুসরণ না করার নীতিতে চলেছে। না হলে পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে মিলে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, উইঘুর বা আইএস সশস্ত্র তৎপরতাকে ক্রমাগত সাহায্য সমর্থন না করে তা থেকে দূরে সরে আসত! কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়ে কোন সশস্ত্র হামলা হয় নাই। কিন্তু সেজন্য ইমরানের সাথে মোদি সরকারের কোন ঘনিষ্ঠতা, কাজের আলাপ বা সম্পর্কের উন্নতিতে কোন পরিবর্তন আসে নাই। বরং পাকিস্তান-মুসলমান বলে বিদ্বেষ-ঘৃণা আরো বেড়েছে। মুসলমান কোপানো এখন আরো প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটা ভারতীয় নির্বাচনি প্রধান ইস্যু। এরই শেষপ্রান্তে আমরা নুপুর শর্মা-কে দেখতে পাচ্ছি!!!

    আগেই বলেছি, মূল কথা্টা হল – ভারত মনে করে চীন-মার্কিন বিরোধে ভারতকে আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকতে হবে, আর এরপর এ থেকে ফয়দা তোলার কূটনীতিতে চলতে হবে। চীন-আমেরিকার বিরোধ কাজে লাগিয়ে এভাবেই নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। যেন ভারতের কূটনীতিই খুবই বুদ্ধিমান তাই এটাই জিততে থাকবে সবস্ময়!!!  কিন্তু বাস্তবতা কী?? সময়ে তা ধরা যাক কিছুটা আদায় হলেও হতে পারে হয়ত, কিন্তু এথেকে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কীভাবে? অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সাথে কূটনীতিতে ওস্তাদ হওয়া বা না থাকার কী সম্পর্ক? চালাকি কূটনীতি আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী এক জিনিস? না কি এটা উলটা ক্ষতি করবে? করছে!! এখানে কবি নীরব! অথচ এসব নিয়ে  নুপুর শর্মা ইস্যুতে ডুবে যাওয়া দিনে শশী থারুর এ নিয়েই আমেরিকার পক্ষে তৎপর হতে উঠে দাঁড়ানোর সঠিক সময় ভাবলেন।

    ভারত কিসে ডুবে যাচ্ছে?
    মূলত মুসলমান নির্যাতন ও কোপানো। অথচ একমাত্র  মুসলমান নিধন করেই মোদি নির্বাচনে বাক্স ভরার নীতিতে তাকে চলতে হবে বলে মনে করেন। কারণ অর্থনীতির পারফরম্যান্স আগামিতে আর ভাল করার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সর্বশেষ ফরেন কারেন্সী্তে বিপর্যয়ের ধাক্কা আরো বিশাল। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাহার করে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার-  সবদেশের উপর প্রয়োগ করা ছাড়া তার অস্ত্র ভোঁতা – তাই বাইডেনের পক্ষে ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাওয়া আবার দিল্লির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রয়োগ না করা স্ববিরোধী।

    অথচ থারুর ভাবছেন মোদি তার মত বুদ্ধিমান নন। সেজন্যই নাকি সমস্যা!! তাই তিনি ভেবেছেন বাইডেনের এ নয়া উদ্যমে চীনের বিরোধিতা করার সময়গুলোতে একে ভারতের নিজের কাজে লাগাতে বাইডেনের বন্ধু হতে হবে ও আমেরিকার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ ভাব দেখাতে হবে। অথচ এসব অবস্থান মোদি-জয়শঙ্কর সব উল্টে-পাল্টে যতদুর ব্যবহার করা যায় করেছেন । এরপরেই সব অকেজো অবস্থায় তারা। ভারতের উপত লাগাতর তিনবছর ধরে  মুসলমানদের উপর আক্রমণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শুণ্যের কোঠায় আনার জন্য অবরোধ আরোপের সুপারিশ ঝুলছে। অথচ সেদিকে শশী থারুর খবর নাই। কেবল নিজেকে মোদির চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবা ছাড়া……!!!

    ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা- একথা দিয়ে শিরোনাম লেখা কেনঃ
    শশী থারুর তার লেখার শিরোনাম করেছেন ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে। কেন?
    এনিয়ে লেখায় একটাই কারণ জানা যায় যে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ঐক্যমত না দেখাতে পারা। প্রশ্ন হল, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে তা তো না। এনিয়ে ভিন্নতা ব্রিকসের জন্মের আগে ছিল। মাঝে ছিল এখনও আছে। তাহলে এখন সেকথা তুলে এই প্রশ্ন কেন? এটাই সন্দেহজনক। এমনকি মোদি  নিজে বা  সরকারের কেউ এমন “ভেঙ্গে যাওয়া” ধরণের মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন দেখা যায় নাই।  তাহলে “ভেঙ্গে যাওয়া” নিয়ে যেন আলোচনা উঠে এর কৃতিত্ব একা থারুরের। কেন? তিনি এই ইঙ্গিত তুলে মোদির আগে বা উপরে আমেরিকার প্রিয় হতে চান? আমেরিকার নয়া এজেন্সি নিতে মোদির সাথে টক্কর দিয়ে আগায় থাকতে চান? যদিও কংগ্রেস এখনও কোথাও চীন ফেলে প্রো- আমেরিকান অবস্থান নিবে এমন ইঙ্গিত এখনও কোথাও কোন ইস্যুতে দেখায় নাই। বরং একাদেমিক বা সোশাল পর্যায়ের ঘরোয়া আলোচনায়, মোদি জমানা শেষ হলে চীন-ভারত সম্পর্ক ভাল হবে এমন ইঙ্গিত নন-পার্টিজানদের দিয়ে অনেক সময় দেয়া হয়েছে।
    তো সেটা হতেই পারে। শশী থারুর তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি অবস্থান নেন, বদলান।
    কিন্তু ২০১৬ অক্টোবরের এক সংবাদ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শশী থারুর  ব্রিকস সম্পর্কে বলছেন, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ নেয়া উচিত, তাই ব্রিকস কে উপেক্ষা করলে এমন মোড় পরিবর্তন থেকে নিজেকে উপেক্ষিত করা হয়ে যেতে পারে [Ignoring BRICS is ignoring turn of history: Shashi Tharoor]। তাহলে, মিস্টার থারুর, কী দাড়ালো ব্যাপারটা?
    মনে হচ্ছে খোদ শশী থারুরেরই মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যাহোক, সেটা হতেও পারে। কিন্তু এনিয়ে তার একটা ব্যাখ্যা পেলে আমাদের জন্য সব বুঝাবুঝি সহজ হতে পারত।  তা শশী থারুর কী এখন অবলীলায় “ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকেও উপেক্ষার” পক্ষপাতি হতে বলছেন!!!! কোথায় গেল তার সে ইতিহাসবোধ!!  কেন?

    শশী থারুর গ্লোবাল অর্থনীতির ব্যবস্থাটাই বুঝেন না তা উদামঃ
    তাই শেষ কথাটা হল – শশী থারুর যে গ্লোবাল অর্থনীতি বুঝেন না সেটাই এতে উদাম হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন “ব্রিকসকে আরও চীনকেন্দ্রিক করা হোক, সেটা ভারত চায় না।’। আসলে এই হল হাজার কথার এক কথা। গোপেন এবার ধরা পড়েছে!!!! শশী থারুর যে ব্রিকস কী ধরনের প্রতিষ্ঠান এটাই বুঝেন না, তার এক শক্ত প্রমাণ এটা।

    প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে আইএমএফ কী এবং – এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ও গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ছাড়া দুনিয়াতে কোন দেশ আরেক দেশের সাথে পণ্য-বিনিময়, পুঁজিবিনিয়োগ বিনিময় ইত্যাদি চলতেই পারত না কেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা ও যুদ্ধের খরচ একক বহণকর্তা হিসাবে আমেরিকার উঠে আসা ও পরবর্তিতে আবার অর্থনীতির পুণর্বাসনে রিপেয়ারে অর্থ ঢেলেছে ঐ আমেরিকাই। এরসাথে সেই উদ্যোগ নিয়ে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  ব্যবস্থা জন্ম দিয়ে গিয়েছে বলে আজও দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা বলে একটা কিছু চলছে। তবে এটা মন্দের ভাল। আর এই ব্যবস্থা আমেরিকার দিকে কান্নিমারা ভাবেই তৈরি হয়েছে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে এই শতকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আর চীনের হাতে নয়া ও বিপুল সঞ্চিত সম্পদের কারণে একা চীনের হাতেই সবার চেয়ে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা পুঞ্জিভুত হচ্ছে। এটাই চীনের সব ধরণের ক্ষমতা বা সক্ষমতার উতস।  এই কারণেই মূলত চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সবখানে বেশি উঠছে। কিন্তু ঐ ১৯৪৫ সালের দিকে যদি আওয়াজ তোলা হত যে  (ঐকালের ব্রিকস মানে) আইএমএফ এই প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না, তাহলে কেমন হত?  এককথায় এর উত্তর হত তাহলে আজও দুনিয়ায় কোন বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুই হত না।

    উদ্বৃত সম্পদ  বা সারপ্লাস কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকাই ছিল সেকালে (মোটামুটি  ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া শতক জুড়ে)  একমাত্র রাষ্ট্র যার হাতে বা যার অর্থনীতি হচ্ছিল উদ্বৃত সম্পদে ভরপুর। সেকালের কলোনি সাম্রাজ্যের নেতা বৃটিশ বা ফরাসীদেরকে ছাড়িয়ে।  ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতাই ছিল সেকালের একমাত্র ভরসা যে যুদ্ধের পরেও এই আমেরিকার ভরসাতেই, সেই প্রথম দুনিয়াতে একটা গ্লোবাল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন গড়ে উঠে। এবং তাই হয়েছিল। তাই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। তাই আমেরিকা ছাড়া বা আমেরিকা-কেন্দ্রিক নয় এমন এক আইএমএফ গড়ার কথা কেউ যদি বলে তাহলে বুঝতে হবে তিনি আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা কী ও কেন এর দরকার সেটাই আসলে বুঝেন নাই।
    এখন সেকালে কী শশী থারুর মত টেরা কিন্তু বোকা চিন্তার কেউই ছিল না যে বলে নয়া আইএমএফ কে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না ???
    হা অবশ্যই ছিল।  আর সেটা হল ফ্রান্স।  ফ্রান্স আপত্তি তুলেছিল যে একমাত্র আমেরিকান ডলার-কেন্দ্রিক  এক আইএমএফ বাণিজ্য-অর্থনৈতিক  এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। ফ্রান্সের যুক্তি ছিল অনেকটা কথিত ‘গণতন্ত্রি’ বা রাষ্ট্রের সাম্য ধারণার মত যে একা আমেরিকা কেন সব খাবে? সব কর্তৃত্ব নিবে!!
    কিন্তু  বলাইবাহুল্য ফ্রান্সের আপত্তি সবাই নাদান বালকের আপত্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ সেকালে আমেরিকাই ছিল একমাত্র উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশ। আর উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশের মুদ্রা ছাড়া  (এটাই মূল টেকনিক্যাল যুক্তি বা কারণ) ঐ একই ন্যাশনাল মুদ্রাকে একই সাথে গ্লোবাল বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। তাই সদস্য সকল দেশই একমাত্র ডলারকেই পছন্দ না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।   

    এখন একালে, চীনকে নিয়েও প্রায় একই আচরণ দেখাচ্ছে বাইডেনের আমেরিকা। নাদান আচরণ করছে।  আওয়াজ তুলছে বাইডেন। যেমন একটা তুলনা চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পকে নিয়ে। বাইডেন এই প্রথম এই চীনা প্রকল্পকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বলে আওয়াজ উঠিয়েছে। যদিও সবাই জানে ও বুঝছে এটা অবুঝ বাচ্চার আকাশের চাঁদ পাবার জিদের মত!
    বাইডেন বহুকষ্ট পশ্চিমের সবদাতা মিলে কুথে-কাথে ছয়শ বিলিয়ন ডলার যোগাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেবল। যদিও এখনও সে অর্থ দিয়ে কাজে নামে নাই। এর ভিতর আমেরিকা দিয়েছে মাত্র দুইশ, সারা ইইউ মিলে দুইশ আর জাপান ও অন্যেরা মিলে বাকি দুইশ বিলিয়ন এভাবে। আর  এভাবে তারা সবাই মিলে বিনিয়োগ সক্ষমতা যোগাড় করেছে ছয়শ বিলিয়ন ডলার। ভাল, খুব ভাল!!

    কিন্তু চীনের বেল্ট-রোডে বিনিয়োগ কত?  
    চীন মনে করে, বেল্ট-রোড এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর স্বপ্ন। সে যা হয় হোক, এর যাত্রাশুরু মাত্র এই ২০১৩ সাল থেকে।   ইতোমধ্যেই এর বিনিয়োগ চার ট্রিলিয়ন (মানে চারহাজার বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে [China Belt And Road Projects Value Now Exceeds US$4 Trillion]।
    ব্যাপারটা সোজা। আমেরিকাও ওর অর্থনৈতিক উত্থানে যখন ওর যৌবনকালে ছিল তখন বেশির ভাগ এমন বিনিয়োগ প্রকল্প একা আমেরিকাই চালিয়েছে। সেটাই এখন শিফট করে গেছে, চীনের উত্থান ঘটছে একালে।

     তাহলে, এটা চীনা উদ্বৃত সম্পদে উত্থানের যুগঃ
    তাই সেকালে আমেরিকার নেতৃত্বে আইএমএফের বদলে একালে আমরা চীনের নেতৃত্বে হবু আইএমএফ এর ভ্রুণ হিসাবে যেন – ব্রিকসকে দেখছি। কাজেই একালে চীন ছাড়া তো ব্রিকস দাড়াবেই না। আর এতে বড় বিনিয়োগ-মালিকানাও চীনেরই হবে। যেমন এখনও আইএমএফের শেয়ার মালিকানা আমেরিকার সবার চেয়ে বেশি; তা আমেরিকা জবরদস্তিতে হলেও ধরে রেখেছে।

    তাহলে, বটম লাইন ফ্যাক্টস হল – চীন নাই এবং প্রধান ভূমিকায় নেই এটা যদি কল্পনা করি, তবে ব্রিকস বলে কোনো প্রতিষ্ঠানই হবে না, দাঁড়াবেই না। দাঁড়ানোর দরকারও হবে না।

    আসলে ব্রিকস প্রতিষ্ঠান দরকার কেন? এটা নিয়ে শশী থারুর নিজেই প্রশ্ন তুলে নিজেই যেসব জবাব দিয়েছেন তাতেই তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধির খামতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন- প্রথমত, ব্রিকস বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক নাকি ভূরাজনৈতিক জোট?

    এর জবাব হল – ব্রিকস না অর্থনৈতিক না ‘ভূরাজনৈতিক’ জোট। না বুঝে প্রশ্ন তুলতে গেলে এভাবেই ধরা খেতে হবে!!!! যেমন যদি প্রশ্ন তোলা হয় – আচ্ছা আইএমএফ কী কোন জোট? অর্থনৈতিক না ভূরাজনৈতিক জোট? এটা তেমনই এক বোকা প্রশ্ন হয়েছে।  আইএমএফ মূলত এক “গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম’ খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে  আর এই সিস্টেমের মুল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ, সাথে সহযোগী বিশ্বব্যাংক।

    আর নয়া ব্রিকস [BRICS],  এটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তবে পুর্ণ প্রস্ফুটিত নয় বা করা হয় নাই ইচ্ছা করেই। এক ঘরে দুই পীর থাকে না তাই।  এখন আইএমএফ কেমন প্রতিষ্ঠান এটা যখন শশী থারুর, আপনার ধারণায় নাই তখন ব্রিকসও আপনি বুঝবেন না। কেবল প্রশ্ন করবেন আর নিজের বোকামিটাই তুলে ধরবেন!

    কাজেই মুখ খোলার আগে শশী থারুরের উচিত হবে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটি কী – এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ফ্লেশ্চার স্কুল কিন্তু আইন আর কূটনীতি বিষয়ে জোর দেয় সত্ত্বেও এটা মান্টিশেডের সাবজেক্ট এমন প্রতিষ্ঠান। একথা বারবার বলা হয়েছে। তবে এর বাকি শেডগুলো স্টুডেন্টদেরকে নিজ যোগ্যতায় পূরণ করে নিতে হবে। থারুর সেদিকে মনোযোগ দেন নাই দেখা যাচ্ছে। অতএব তার এখন এসব ব্যাপারে দ্রুত মুখ খুলা এড়ায় চলা উচিত! এটা অপ্রয়োজনীয়! এজন্যই বারবার বলেছি এই যুগের কূটনীতিতে মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা আইআর [আন্তর্জাতিক রিলেশন] এবিষয়ে পড়ুয়াদের ক্লাসের পাঠ্য না হলেও নিজ উদ্যোগে অর্থনীতি পড়ে নিতেই হবে।

    একারণে শশী থারুর নিজে বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে, ভারত ব্রিকসের সদস্য ঠিকই হতে চান। কিন্তু তার দাবি, “চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না”। এর মানে কি?  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফে কী ভারতের জন্য কোন জায়গা আছে? আইএমএফে ভারতের উল্লেখ করার মত কোন মালিকানা নাই কেন? আর সেটা কী আমেরিকা একালে ভারতকে দেওয়ার জন্য বসে আছে? দিবে? আমেরিকার প্রিয়বান্দা হতে চাওয়া  শশী থারুর কাছে এর কী কোন জবাব আছে? অতএব তাঁর না বুঝে কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয় কী!!!

    তাহলে নবগঠিত বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান AIIB, আসেন এখানে দেখিঃ
    এটা চীনা উদ্যোগের একালের বিশ্বব্যাংক যেন। ব্রিকস (বা আইএমএফ) গড়তে গিয়ে আগেই নিজস্ব বিশ্বব্যাংকটা যেন গড়ে নিয়েছে।  ফলে চীনা প্রভাব ও সিদ্ধান্ত এখানে প্রধান ভুমিকায়। চীনের নিজের মালিকানা শেয়ার এখানে ৩০% এর মত। এটাই সবার চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হল, ভারত যার, শেয়ার মালিকানা ১০% এর মত। আমেরিকার নাই, ইউরোপের খুব কিছু উল্লেখ করার মত নয়। অর্থাৎ আর কাউকে তেমন নয়, তবে ভারতকে  চীন ঠিকই গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে পাশে রেখেছে। তাতে ভারতের সাথে চীনের যতই রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকুক।  এটা স্বাভাবিক!

    তাহলে শশী থারুর কীবুঝে বলছেন – চীনকেন্দ্রিক  ব্রিকস তিনি চাননা?? 

    ভারী কথাবার্তা থাক একটা গল্প বলে শেষ করব।
    শশী থারুর ব্রিকস চান কিন্তু চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না। আর বাস্তবতা হল, চীন না থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে উদ্বৃত্ব সম্পদ – বিনিয়োগ দিবে কে? বুঝা যাচ্ছে এদিকটা নিয়ে তিনি ভাবেনই নাই। তাহলে আইএমএফ অথবা ব্রিকস বলতে তিনি কী বুঝছেন? কেমন প্রতিষ্ঠান এর কিছুই বুঝেন নাই। আবার  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফ নিয়েও তার আপত্তি দেখি না। তাই সবমিলিয়ে, তাঁর এই অবস্থানেরই প্রতীক যেন নিচের এই গল্প!
    শ্রাদ্ধঃ  কোন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সৎকারের নানা অনুষ্ঠান হয়। এই  ক্রিয়াকর্মাদি যা কিছু করা হয় একে শ্রাদ্ধ বা শ্রাদ্ধাদির নানা অনুষ্ঠান বলে। আর কয়েকদিন ব্যাপী এমন অনুষ্ঠান শেষে সাধারণত একটা নিরামিষ ভোজ বা খাওয়াদাওয়া ভিতর দিয়ে এসবের সমাপ্তি ঘটে থাকে। এখন এক ব্যক্তি দাওয়াতে এমন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।  কিন্তু উপস্থিত হয়ে তিনি সৌজন্য আলাপ জমাতে গিয়ে  ঐ বাড়ির কর্তাগোছের এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আচ্ছা যার শ্রাদ্ধ খেতে এলাম তাঁকে দেখছিনা? তিনি কোথায়???” 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “শশী থারুরের ব্রিকস বুঝ!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও’নিল পাঠ


    যে নায়ক এখন ভিলেন হতে চায়?
    গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও
    ’নিল পাঠ

    গৌতম দাস

    ২৩ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46Y

     

          Brics ‘grew more than I thought’, says Jim O’Neill 2016

    The Big Issues for 2022

    জিম ও’নিল [Jim O’Neill] মূলত যুক্তরাজ্যের [UK] এক অর্থনীতিবিদ। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়াল স্ট্রিট পাড়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী এক বিনিয়োগ কোম্পানি ‘গোল্ডম্যান স্যাশে’[Goldman Sachs] আর এরই প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন তিনি; আর এর পুরা সেই সময়কালটা হল ১৯৯৫-২০১৩ সাল। তাঁর প্রসঙ্গে বৃটিশ সরকারের উপস্থাপিত এক বাইওগ্রাফিতে দেখা যাচ্ছে সেখানে লেখা আছে – Jim O’Neill worked for Goldman Sachs from 1995 until April 2013, spending most of his time there as Chief Economist.। পরে ২০১৫-১৬ সালে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’ [Project Syndicate] নামে বিভিন্ন নামি-লেখকের প্রবন্ধ সংগ্রহ ও মজুদের যে ওয়েবসাইটটা আছে সেখানে ২০০৮ সাল থেকেই তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন বলে তারা জানাচ্ছে।

    গোল্ডম্যানের সাথে থাকার সময়ের তার কিছু কাজ ছিল দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রভাব পড়া ঘটনার একটা যা, তাকে বিখ্যাত করেছিল বলে মনে করা হয়। সেই ২০০১ সালের এক নিবন্ধে তিনি প্রথম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান হিসাবে নয়া ব্রিকসের {BRICs} ধারণা (যা থেকে পরে ব্রিকস BRICS ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়) নিয়ে আসেন। কাজের অংশ হিসেবে তিনি তখন আসলে একটা নিবন্ধ বা পেপার লিখেছিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘বিল্ডিং বেটার গ্লোবাল ইকোনমিকস ব্রিকস’ [“Building Better Global Economic BRICs.”]। পরে সেই ধারণাটাই আরো সবিস্তার করেছিলেন ২০০৩ সালে সিরিজ আকারে লিখে। সেখানেই তিনি পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস-ফিগার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটা পূর্বাভাস বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘২০৪০ সালের মধ্যে চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে’ [China’s economy could become as large as the US economy (in nominal dollar terms) by 2040]।

    সেই ও’নিল গত বছর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর তাঁর সেই প্রথম রচনার ২০ বছর পূর্তিতে এ নিয়ে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটেই একটি কলাম লিখেছিলেন। “ব্রিকস কী আদৌ কখনও জাগবে? [Will the BRICS Ever Grow Up?] শিরোনামে।  যেখানে তার আরো কিছু আপডেট মূল্যায়ন যোগ করেছিলেন।

    যদিও তাঁর ২০০১ সালের প্রথম মুখ্য মন্তব্যটা ছিল, তিনি “রাইজিং ইকোনমিজ” [Rising Economy] দেশ বলে একটা নয়া শব্দ চালু করেছিলেন। সেকালেই দাঁড়িয়ে দেখে, শতকোটির উপরের জনসংখ্যার দুই দেশ চীন ও ভারতকে এদের অর্থনীতির গ্রোথ রেট দেখে তিনি ‘রাইজিং ইকোনমি’র দেশ বলে আলাদা এই ক্যাটাগরি চালু করেছিলেন। সার কথায় বলেছিলেন, চীনা অর্থনীতি সবাইকে ছাড়িয়ে এক নম্বর অবস্থানে যাবে। আর ভারত সেকালের এশিয়ার জাপানকেও ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া আমেরিকার পরে, মানে তৃতীয় স্থানে উঠে যাবে […… India could surpass Japan to become the third-largest economy soon thereafter; ]। শুধু তা-ই নয়, তৎকাল থেকেই এক বিবেচনায় সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির ব্লক বা গ্রুপের দেশ বলতে জি-৭ [G7 group] দেশগুলোকে বুঝানো হত; সেই জি-৭ ভুক্ত (কানাডা বাদে) দেশগুলোর মোট প্রবৃদ্ধির চেয়ে একত্রে এই নয়া রাইজিং ইকোনমিগুলোর দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগ করলে এটাই বেশি হবে – এই ছিল তার প্রধান দৃষ্টি-আকর্ষণী মন্তব্য!! অর্থাৎ তিনি তুলনা করছিলেন সেকালের অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারে শীর্ষ ইকোনমিক ব্লকের সদস্য এমন সাত দেশের সাথে রাইজিং ইকোনমিগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগফল – এটা তুলনায় ভালো ও বেশি সম্ভাবনাময় বলে দাবি উঠিয়ে!!

    স্বভাবতই জিম ও’নিল এর এই কাজ, এটা কোনো গণকের ভাগ্য গণনা ছিল না। ছিল বাস্তব পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্ট ও ফিগারের উপরে দাঁড়িয়ে করা বিশ্লেষণ। তাই ওই প্রবন্ধ সেকালে ওয়াল স্ট্রিট জগতে অর্থাৎ গ্লোবাল বিনিয়োগ পুঁজির পুঁজিবাজারের জগতে ব্যাপক আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এর মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে কখনো এতে কম হারে প্রবৃদ্ধি হলে তা গ্লোবাল বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জগতে খুবই নেতি চোখে ও ব্যবসা খারাপ যাওয়ার ইঙ্গিত বলে বিবেচিত হয়। তাদের হিসাবটা সোজা;  সেটা হল যে যত ভাল বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ততই তা আরো বড় বিনিয়োগ পুঁজির জন্য বড় চাহিদার বাজারের ইঙ্গিত আর ততই তাদের ব্যবসা  ভাল ও বাড়বার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে সেটা।
    আর এখানেই একপর্যায়ে জাতিবাদি অর্থনীতির ধারণা ব্যর্থ ও ভেঙে পড়া শুরু হয়ে যায়। কিভাবে, কেন?

    ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বলতে এখানে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে:
    আক্ষরিক অর্থে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street] বলতে  সেটা নিউ ইয়র্ক শহরের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই মাত্র। আমাদের মতিঝিলের মত! কিন্তু এখানে এখন থেকে সেটা আর কেবল নিউ ইয়র্কের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই নয়, বরং প্রতীকী অর্থে এটাই গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থ – এটাকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ধরণের কোম্পানির প্রধান অফিসগুলো বেশির ভাগই নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট পাড়াতেই অবস্থিত বা শুরু হয়েছিল। অনেকটা যেমন খুবই ক্ষুদ্র-অর্থে হলেও বাংলাদেশের পুঁজি ও শেয়ারবাজার বলতে ‘মতিঝিল’ পাড়া বুঝানো যায়। অবশ্য একালে “ওয়াল স্ট্রিট” ততপরতা আর কেবল ওয়াল স্ট্রিটেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছাড়িয়ে এর একটা দুবাইয়ে ও আরেকটা সিঙ্গাপুরে গড়ে উঠে ইতোমধ্যেই আসর জমিয়েছে; যদিও তা ওয়াল স্ট্রিটেরই ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বি না বরং সহযোগী হিসেবে নয়া কিছু অঞ্চলে, গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের নয়া কিছু তুলনায় ছোট কেন্দ্রভুমি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বললে এখন থেকে বুঝতে হবে এর ব্যাপকার্থে  – গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থের কথাই বলছি।

    নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের জন্ম বা যাত্রা শুরু ধরা হয় ১৭৯৪ সাল। তখনকার গভর্নর পিটার স্টাইভেসেন্টের [Then-Governor Peter Stuyvesant] এক নির্দেশে ওয়াল স্ট্রিট গড়ে উঠেছিল মূলত নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে [NYSE]। যেটার ঠিকানা ১১ নম্বর ওয়াল স্টিটে।  আর এর প্রায় শত বছর পরে ১৮৮০ এর দশকে আমেরিকান অর্থনীতি তখনকার বড় অর্থনীতি ব্রিটেনকে প্রথম ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যে ব্রিটিশ এম্পায়ার ছিল সবচেয়ে বড় কলোনি দখলদার যার সূর্য নাকি ‘কখনো অস্ত যায় না’ বলে গর্ব করা হত। আর এরও পরবর্তীতে আরেক বিরাট ঘটনাটা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫)। যে সময়ের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, যাকে বলা হয় আমেরিকাকে দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা বানানোর নায়ক; সেই রুজভেল্ট ছিলেন আসলে প্রধানত ওয়াল স্ট্রিটেরই স্বার্থ মাথায় রেখে চলা প্রেসিডেন্ট। আর এভাবে চলে তিনিই প্রথম আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার স্তরে উত্তীর্ণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের হাতে সঞ্চিত বিপুল উদ্বৃত্ত সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, মূলত ওয়াল স্ট্রিটের কোর [core] স্বার্থে, তিনি আমেরিকাকে এই স্তরে উঠিয়েছিলেন। আর তাই দেখা যায় এই প্রেসিডেন্টের চার টার্মের সময়কালে তাঁর আশপাশের  প্রায় সব উপদেষ্টা-মন্ত্রী-পরামর্শদাতা বা দফতর পরিচালকরা যারা ছিলেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড হল যারা এর আগে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো চালাতেন, মানে ওর (ঠিক মালিক না) পরিচালন-কর্তা বা এক্সিকিউটিভ হিসাবে কাজ করেছেন।

    এখন যে প্রশ্নটা তুলব, সেটা হল নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ কি সবসময় আমেরিকা রাষ্ট্রের স্বার্থ ছিল? হয়ে আছে বা থাকতে পেরেছে? এর জবাব খুঁজব এখন।

    জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ বলে নয়া টার্মে কথা বলা শুরু করেছিলেন তখনকার চীনা অর্থনৈতিক উত্থান মানে  সেটা ডাবল ডিজিট গ্রোথের (১০% বা এর উপরের জিডিপি) প্রথম দশকটা (১৯৯০-২০০০) পার হয়ে গেছে। ও’নিল মূলত চীনের এই উত্থান দেখেই ‘রাইজিং ইকোনমি’ টার্মটা আনছেন, কারণ ভারতের অর্থনীতিতে তখনও তেমন নড়াচড়া শুরু হয়নি। তবে ভারতেরও চীনের (এখন ১৪২ কোটি 2022) মতই বিপুল জনসংখ্যার দেশ শতকোটি (এখন ১৩৮ কোটি) ছাড়িয়েছে যা। যার সোজা মানে, একটা সঠিক নীতি-পলিসি বেছে নিতে পারলে এই জনশক্তিই হয়ে উঠতে পারে সম্পদ আর তাতে বিপুল উদ্বৃত্ত ও সঞ্চিত সম্পদের এক রাষ্ট্র হতে পারে ভারত। তাই চীনকে দেখেই ভারতও সেই থেকেই হতে পারে এমন সম্ভাবনাময় গোনায় ধরা দেশ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল।

    পরিস্কার করে রাখি, এখানে সেসময় বলতে তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-০৮) জুনিয়র বুশের শেষ আমল আর প্রেসিডেন্ট (২০০৯-১৬) ওবামা আমলের শুরু এদুই কালের এক মিলিত সময়কাল ছিল সেটা।
    সময়টা একই সাথে আরো অনেক কিছুর। যেমন আফগানিস্তানে বুশের ওয়ার অন টেররে পা আটকে গেছে তা টের পাবার সময় সেটা। মানে ২০০৫-০৬ সাল থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তখন আর দুনিয়াটা সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই মেরু দুনিয়া নয়। আর সেখান থেকেই এই দৃষ্টিভ্রম যে কাজেই একা আমেরিকা তখন দুনিয়াতে যা খুশি করতে পারে বাধাহীনভাবে একথায় তখন জুনিয়র বুশ এন্ড গংয়েরা ভেবেছিল – আর এটাই, তখন পরিস্কার হয়ে যায় যে এই বুঝাবুঝি ছিল ভিত্তিহীন। কারণ আমেরিকা তখন আফগানিস্তানে নিজেই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে যেখানে বিজয় দূরে থাক যুদ্ধ-ফেলে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশু সম্ভাবনাটুকুও নাই। মানে নিরন্তর খরচের এক অন্তহীন যুদ্ধে আটকে গেছে আমেরিকা যা থেকে কোন প্রাপ্তি বা সুফলও নাই। আর এতে খরচ জোগাতে ব্যর্থ আমেরিকান অর্থনীতি শেষে এথেকেই এক নয়া গ্লোবাল মহামন্দা্র (২০০৭-০৮) ডেকে এনেছিল বা গড়িয়ে যায়। অথচ তুলনায় তখনো চীনের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিট না হলেও ৭-৮ শতাংশ চালিয়ে যাচ্ছিল। মহামন্দার প্রভাব পশ্চিমা দেশগুলোতে ছিল সর্বোচ্চ অথচ যেটা চীন-কেন্দ্রিক এশিয়া দেশে ততটা অনুভুত নয়!  ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবেঃ এতদিনের পশ্চিমের হাতে উপেক্ষিত হয়ে থাকা এশিয়ার অর্থনীতি এবার উলটা উপেক্ষিত হয়ে থাকাটাই তো তাদের সুবিধা – মানে এশিয়ান অর্থনীতি পশ্চিমের সাথে ততটা সমন্বিত বা ইন্ট্রিগেটেড ছিল না, করা হয় নাই  বলেই পশ্চিমের মহামন্দার আঁচ এশিয়ায় কম দেখা যাচ্ছিল।

    আর এসব কিছু দেখে শেষে ওয়াল স্ট্রিট আর আমেরিকা-কেন্দ্রিক বা পশ্চিমাকেন্দ্রিক থাকতে পারেনি বা চায়নি। বিদেশে যেখানেই আয় করুক, আমেরিকাতেই তাকে উদ্বৃত্ত সম্পদ ফেরত নিতে হবে, এই বাধ্যবাধকতা এই প্রথম সে ভুলতে শুরু করেছিল। এশিয়াতেই নয়া বিনিয়োগ বাজার, তাই নয়া চাহিদার দেশ অঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে যায় সে!! এটাই জিম ও’নিলের পর্যবেক্ষণের মর্মার্থ বলে দাবি করা যায়!  আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে রিপোর্টগুলোতেও তা প্রতিফলিত হতে থাকে। সার কথায়, ওয়াল স্ট্রিট আর জাতিবাদি থাকেনি, পারে নাই। গ্লোবাল স্বার্থ হয়ে উঠেছিল। রুজভেল্টের আমেরিকায় এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিটের সাধারণ স্বার্থ আর আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হয়ে থাকতে পারে নাই। এক ব্যাপক বিচ্ছেদ ঘটে যায়। এটা মনে করা ভুল হবে না যে এই বিচ্ছেদের ঘটনাটাই জিম ও’নিল এর পর্যবেক্ষণে ধরা পরেছিল। আবার এখানেই জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ এই তত্ব আনলেন এটাই আসলে তখন ওয়ালস্টিটের আচরণের সাফাই হিসেবে ব্যবহৃত হতে থেকেছিল। এক কথায়, এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিট আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ ফেলে চীনা ‘রাইজিং ইকোনমি’র ভেতরে নিজের ‘কোর’ মানে, গ্লোবাল বিনিয়োগের বাজার এই মৌলিক স্বার্থ খুঁজে পেয়েছিল!

    ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সংস্কারঃ
    সাথে আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ছিল ২০০৯ সালের। যেমন একটা হল,  বিশ্বব্যাংকের ঢেলে সাজানোর ঘটনা। না, সবটা বোধহয় ঠিক বললাম না। আসলে এটা হল ঘটনার কেবল বাইরের দিকটা দেখে বললে। বিশ্বব্যাংক জন্ম থেকেই এর “অভ্যন্তরীণ তথ্য উন্মুক্ত নয়” – এভাবেই গড়ে উঠেছিল। এর সম্ভাব্য দুটো কারণ আছে মনে করা হয়। এক. বিশ্বব্যাংক কাজের ধরণ অনুসারে কোন সাধারণ আম পাবলিককে সার্ভিস দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। তবে পাবলিকের যে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান আছে মূলত এর সাথে তার কারবার ও ডিলিং [dealing]। আর সেটাকেই সুযোগ হিসেবে নিয়ে এর কান্ট্রি অফিসগুলো (যেমন বাংলাদেশের বিশ্বব্যাংক অফিস) পাবলিক থেকে দূরে পাবলিক ডিলিং না করেও চলতে পারত। সাধারণ তথ্য যেমন কোন দেশের মৌলিক তথ্যাবলী বা কান্ট্রি প্রোফাইল – এ’তথ্যও উন্মুক্ত ছিল না তখন। দুই. এরই সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়, কোল্ডওয়ার যুগ বলে তখন ছিল  কড়া কমিউনিস্ট ভীতি। এ’ভীতির কারণে নিজেকে ঢেকেঢুকে কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহির্বিভাগ (ERD বা এক্সটারনাল রিসোর্স ডিভিশন) আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন) সাথে যোগাযোগ রক্ষার মধ্য দিয়েই নিজ তৎপরতা চালিয়ে নিতে অসুবিধা হতো না। আগের এই ঢেকেঢুকে চলার সিদ্ধান্ত ভেঙে নিয়ে বিশ্বব্যাংক উন্মুক্ত হয়ে যায় ২০০৯ সাল থেকে। এমনকি এখন তো কান্ট্রি অফিসেরও ফেসবুক পেজ আছে যেখানে অনেক ইস্যুতে ওপেন আলোচনাও দেখতে পাওয়া যাবে। প্রশ্নোত্তর ও তথ্য সেখান থেকে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া প্রতিটি ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের কান্ট্রি অফিসগুলো বা হেড কোয়ার্টারের বহু কিছুই এখন নানা ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি যে কেউ আম-পাবলিক নিজেই জানতে পারে। একালে ‘ডিসকাশন ব্লগও’ [discussion blog] আছে যার বুলেটিন পাওয়া বা ওয়েবে সদস্য হওয়া যায়। কিন্তু কেন এই উন্মুক্ততা? সেটাও জিম ও’নিল-এর পরোক্ষ প্রভাব। কিভাবে সেটা?

    আসলে রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর মোট প্রভাব তখন ক্রমশ জি-৭ উন্নত অর্থনীতিগুলোকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে এ’কথার গুরুত্ব তখন কেউ অস্বীকার বা ছোট করে আর দেখতে পারছিল না। এ’ছাড়া ওয়াল স্ট্রিট আপন স্বার্থেই এসব ঘটনা ও তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছে। মূল কথা, এর আরো কিছু প্রভাব ছিল মারাত্মক।

    যেমন, বিশ্বব্যাংকের প্রাকটিস বা নিয়ম হল, নিজ অর্থনীতির সাইজ-প্রভাব অনুসারে সদস্য দেশকে কম বা বেশি চাঁদা দিয়ে শুরুতে বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিতে হয়। আর পরে যাদের অর্থনীতির সাইজ ব্যাপক বড় কিছু হয়ে যায় ততই বাড়তি চাঁদা দিতে হয়। এখন এই চাঁদা মানে কী আবার? চাঁদা মানে, বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা আসলে এক শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানির মত আর সদস্য দেশগুলোর চাঁদা দেওয়াটাই আসলে সদস্য দেশের বিশ্বব্যাংকের শেয়ার কেনা হিসেবে দেখা হয়। কাজেই সদস্যদেশের অর্থনীতি যত বড় হয়ে যাবে ততই বড় শেয়ার কিনতে হবে। কিন্তু ব্যতিক্রম হল, একেবারে বড় মালিকানাগুলোর বেলায়। যেমন এখন সবচেয়ে বড় মালিকানা আমেরিকার; তা ১৬.৫৭% [অবশ্য গত ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এটা ১৬-১৮% এর মধ্যে নড়াচড়া করেছে]। পরে জাপান ৮.৩২%। আর এরপর ইউরোপের বড় অর্থনীতির চারটা দেশ ৪-৫ শতাংশের বেশি কেউ নয়। তুলনায় বাংলাদেশ ১ শতাংশের শতভাগের এক অংশের মত, এরকম। নিচের এই ডাটা পেয়েছি  সরাসরি বিশ্বব্যাংকের সাইট থেকে, তবে একটু পুরানা। যা কম্পাইল করা হয়েছে ২০১৯ পর্যন্ত আর প্রকাশিত ২০২০ সালে। [নিচের এই তথ্য যথেষ্ট আপডেটেড না, তবে এর চেয়ে আপডেট সংগ্রহ আমার নাগালে আসে নাই।]

    Who are the World Bank’s shareholders and
    how much capital do they own?
    • 189 member countries have subscribed to US$280
    billion of subscribed capital (paid in capital + callable
    capital)
    • The largest shareholders include the United States
    (16.57% of total subscribed capital), Japan (8.32%),
    China (4.59%), Germany (4.16%), and France and
    the United Kingdom (with 3.90% each
    source: WORLD BANK 2020

    কিন্তু বিরোধ বাধে চীন নিজের শেয়ার বাড়াতে চাইলে। চীন তার নয়া অর্থনীতির সাইজে শেয়ার মালিকানা বাড়াতে চাইলে তাতে আমেরিকা মানে তার সিনেট সেই ফাইলে অনুমোদন দেয়নি। মানে অভ্যন্তরীণভাবে বিশ্বব্যাংক টেকনিক্যালি চীনের প্রস্তাবের পক্ষে সায় দিলেও তা পাস করতে আমেরিকান মতামত চেয়ে পাঠালে সেই ফাইল আর (মূলত আমেরিকান সিনেট থেকে) ফিরে যায়নি। ফলে চীনের শেয়ার (২০১৯ পর্যন্ত) ৪.৫৯% এর নিচেই থেকে যায়। তুলনায় ভারতের শেয়ার হল ২.৯১%, এটা ভারতের সরকারি তথ্য।  

    আসলে বিশ্বব্যাংকে চীনের মালিকানা বাড়ানোর আবেদনে সাড়া না দেয়া  এটা ছিল চীনের প্রতি আমেরিকার এক অব্যক্ত মেসেজ। মানে কিছু না বলে যেটা ইঙ্গিতে বলা হয়ে যায় তা হল যে, আমি আমেরিকা বিশ্বব্যাংকের মালিকানায় চীনের শেয়ার বাড়াতে দিব না। একে নিজ নিয়ন্ত্রণেই রাখব। আমেরিকা জানত [জিম ও’নিলের ততপরতার কারণে অনুমানে] যে, চীন তাহলে নিজেই আলাদা করে বিশ্বব্যাংক খুলবে। আর সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য সেটাই তুলনায় আমেরিকার স্বার্থের জন্য ভাল বলে আমেরিকার কাছে মনে হয়েছিল।

    আসলে ততদিনে, মানে সেই ২০০৩ সাল থেকে জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমির’ তত্ব দিচ্ছেন, সম্ভবত পরোক্ষে তিনি চীনের রাইজিং অবস্থা দেখে আগে থেকেই চীনকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন যে, চীন যেন নিজ প্রভাবাধীন (আমেরিকান প্রভাবের বিপরীতে) নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান দুটোই গড়ে নেয়।

    পাঠককে মনে করিয়ে দেই, জিম ও’নিল-এর কথাগুলো কিন্তু আদতে ছিল ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলা কথা। অর্থাৎ যে কথা এখন সহজ করে বলতে পারি যে, আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট স্বার্থ সে রাইজিং চীনা সরকারকে পরামর্শে দিয়ে বলে চলছিল যে, নিজ প্রভাবাধীন নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান খাড়া করে নাও। অর্থাৎ সেই থেকে ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আর জাতিবাদ আমেরিকান সীমায় থাকেনি, থাকতে চায়নি বা থাকলে নিজ অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যেত।

    অতএব সেই থেকে ও’নিলের BRIC বা ব্রিক ধারণাটা সবল হচ্ছিল। আর ২০০৯ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সংস্কার এবং উন্মুক্ত করা আর সেই সাথে চীনকে প্রত্যাখ্যানের সেই বছরই ব্রিকস ব্যাংক [BRICS Bank] নামে চীনা প্রভাবাধীন নয়া প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে যায়। এখানে একটু তথ্যের কারেকশন আছে। জিম ও’নিলের প্রথম আইডিয়াটা ছিল চীন, ভারত আর সাথে রাশিয়া ও ব্রাজিলকে নিয়ে মানে তাদের দেশের নামের প্রথম অক্ষরত নিয়ে BRIC বা ব্রিক এভাবে। ২০০৯ সালে এই চার দেশ নিয়েই ব্রিক নামে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও সাথে জুড়ে নিলে এবার নয়া নাম হয়ে যায় ব্রিকস [BRICS]।

    এখন একটা প্রশ্ন, তাহলে ব্রিকস ব্যাংক যদি এর নাম হয়  তো সেক্ষেত্রে এটা একটাই প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তো প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলাদা দুটো; যদিও তাদের সমন্বয় আছে। এমনকি কোনো দেশের বিশ্বব্যাংকের সদস্য হতে হলে সেই দেশকে আগে আইএমএফের সদস্য হতেই হয়। সেটা হয়ে থাকলে এবার বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার সে যোগ্য হয়। তা হলে ব্রিকস ব্যাংক কার সমতুল্য, আইএমএফ না  বিশ্বব্যাংক এর? এর উত্তর হল, আসলে ব্রিকস ব্যাংকটাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মিলিত ধারণা। আর এর ভেতরে ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ [NDB] বলে বিশ্বব্যাংক সমতুল্য আরেকটা নয়া প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে।

    কিন্তু জিম ও’নিল এখন অন্য কিছু বলছেনঃ
    গত ১৭ মে ২০২২ ও’নিল আরেক কলাম লিখেছেন সেই প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ওয়েবেই। যার শিরোনাম হলো ‘ফের গ্লোবাল মহামন্দা কী আসন্ন?’ [Another Global Recession?]  আর আমাদের প্রথম আলোও এ’লেখার একটা অনুবাদ ছাপিয়েছে।   এখানে পাঠককে আবার একটু মনে করিয়ে দেই। এখানে “এখন” মানে সুনির্দিষ্ট করে যখন বাইডেন তার নয়া ও শেষ অস্ত্র [স্যাংশন ও মানবাধিকার] নিয়ে হাজির যেটাতে জিদ আছে কিন্তু সাফাই নাই। মনের গহীনের জিদটা হল যে, দুনিয়াতে সাদা চামড়ার (সাদা ককেশীয় এথনিসিটি) শাসন চলে আসছে, যা প্রায় ৫০০ বছর [মোটামুটিভাবে ১৬০৭ সালে আমেরিকাকে (আজকের ভার্জিনিয়া রাজ্য) বৃটিশ কলোনি করা দিয়ে শুরু থেকে আজও] ধরে টিকে আছে। এটা যেভাবেই হোক বাইডেন আরো টিকিয়ে রাখবেন। চীনা অবজেকটিভ উত্থানের বিরুদ্ধে  জিদ-জবরদস্তিতে যা করা যায় এমন সবকিছু করে হলেও টিকে থাকবেন! তাতে অবজেক্টিভ বাস্তবতা ভিন্ন কিছু বললেও তিনি জিদ ধরে আড়াআড়ি বসে থাকবেন। একবার বলবেন অবরোধ আর মানবাধিকার  নামে নতুন দুটো অস্ত্র এনেছেন। এতে আর অর্থ-অস্ত্র কোনটাই আর লাগবেই না। আমেরিকা এমনিতেই ইউক্রেনসহ সবকিছুতেই জিতে যাবে। আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় শেষ বা আপস হতে যাওয়া অবস্থায় পৌছে গেলে এবার নয়া ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ-অস্ত্র ঢেলে সেই মরা যুদ্ধকে তিনি আবার চাঙ্গা করছেন। এমনকি এতে ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই মিলে আপোষের অর্থের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই যে আসলে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব” জাতিবাদ বা সাদা চামড়ার শাসনের ঘোর সমর্থক তা এখানে উদাম হয়ে প্রকাশিত। কিন্তু এতে স্বভাবতই আমেরিকান জন্য বড় যুদ্ধের খরচ বাইডেন ডেকে নিয়ে আসছেন, যা বইবার অর্থনৈতিক অবস্থা আমেরিকারই নাই, এই দুইদল তা জানা সত্বেও একাজ করছে অবলীলায়!! অর্থাৎ আবার আরেক ভয়াবহ হিটলারিজম মানে এক এথিনিসিটির শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম কিন্তু তফাত এই যে এবার জর্মান শ্রেষ্ঠত্বের বদলে সাদা ককেশীল শ্রেষ্ঠত্ব – করে হলেও তারা দুনিয়ার নেতা থেকে যাবেই। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব যেন গায়ের জোর জবরদস্তি বা সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করার বিষয়???

    তাই এ অবস্থায় ও’নিল নিজের এ লেখার সারাংশ শুরুতেই লিখছেন এভাবেঃ
    এককথায় ও’নিলের এই লেখা পড়লে অনুমান হবে ও’নিল তিনিও সম্ভবত দুনিয়া থেকে সাদা শাসন উঠে যাওয়ার শকুনি শোকের ফাঁদে পড়েছেন!!!
    যদিও তিনি এলেখার শুরুতেই নিজ লেখার সারাংশ করে বলছেন, “উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে আসল আয় ক্রমেই কমছে, ওদিকে চীনের দুর্বল বাইরের চেহারা আর সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে লতিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা এসব কিছুর মধ্যে করোনা মহামারীর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বদলে নিচে চলে যাওয়া দেখে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্তে¡ও নীতিনির্ধারকদের এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, যাতে ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠা যায়!

    Between falling real incomes in advanced economies, China’s weakening outlook, and the uncertainties stemming from Russia’s war in Ukraine, there is more than enough reason to worry that the post-pandemic recovery is giving way to a downturn. But there is still much that policymakers could do to mitigate the blow.

    এ বক্তব্যের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, ও’নিল গ্লোবাল অর্থনীতি করোনা মহামারী ক্ষতি কাটিয়ে উঠার বদলে নিচের দিকে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু তাতে বাইডেনের বর্তমান অনুসৃত নীতি-পলিসিই যে এটা তৈরি করছে সেদিকে জিম ও’নিলের ভ্রুক্ষেপ নাই। তিনি বাইডেনের নীতিতে খারাপ ভুমিকা বা আপত্তির কিছু দেখছেন না। একেবারে বাইডেনের নামই তিউনি উচ্চারণ করেন নাই। কেন? ভাসুরের নাম? পতিত বৃটিশ অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাইদেনকে দরকার? তাই এখন কিছু বিপক্ষে বলা যাবে না??   আসলে সবমিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে হয়েছে এই পশ্চিমা বায়াসড অবস্থানটাই তিনি গ্রহণ করেছেন। সাধারণত পলিটিক্সের চেয়ে যার আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি হয় তিনি যেকোনো উপায়ে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে খাড়া অবস্থান নেন। কিন্তু এখানে তিনি ব্যতিক্রম, তা করেননি।
    আবার ধরা যাক পুতিন সবকিছুর জন্য দায়ী তবু সেক্ষেত্রে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ানোর দিকে আরো ঠেলে দেওয়া কী বাইডেনের নীতি-পলিসি হতে পারে? করোনা উত্তরকালে অর্থনীতির রিকভারি গুরুত্বপুর্ণ, খাদ্যের মূল্য নিচে নামানো গুরুত্বপুর্ণ নাকি পুতিনকে শায়েস্তা?

    আবার ও’নিল রাজনীতির প্রসঙ্গেই যদি ঢুকলেন তা হলে বাইডেন কেন বিনা অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের কথা বলে শেষে প্রায় আপস হয়ে যাওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে টেনে অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের মধ্যে ঢুকালেন এটাও ও’নিলের চোখে আমল পায়নি। তা হলে তিনিও কী এখানে চীনা উত্থানে সাদা শাসন হারানোর আশঙ্কার দ্বারা প্রভাবিত? অথচ তিনিই না অবলীলায় ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে মানে, পরোক্ষে রাইজিং চীনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ফোরকাস্ট করেছিলেন এবং তার ফোরকাস্ট ২০৪০ সালে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে, যা এখন ‘২০২৮ সাল’ বলছে ইন্ডিপেনডেন্ট পরিসংখ্যান স্টাডির লোকেরা। তিনি এখন তা হলে পিছাচ্ছেন কেন? পালাচ্ছেন কেন? এখানে তিনি নিজ পুরনো অবস্থানের বদল সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ছোঁয়ায় প্রভাবিত হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে!!!

    আবার চীনের বর্তমান লকডাউন প্রসঙ্গে দুই রকম কথা বলছেন। এক দিকে বলছেন, ‘সেই দিক থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক থাকার ব্যাপারে চীনের সমালোচনা খুব কমই করা যেতে পারে” [China can hardly be criticized for being generally cautious. ]।’ আবার বলছেন, চীন “কোভিডের বিরুদ্ধে এত কড়া অবস্থান নিবার বদলে শিথিল করলে চীনা অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; এটা চীনের জন্য ভাল, গ্লোবালিও ভাল”!  আসলেই জিম ও’নিল কী বলছেন এগুলা????

    শেষে বলছেন তিনটা ফ্যাক্টরের কথা, আমেরিকান ফেডারল রিজার্ভসের সিদ্ধান্ত, চীনা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর পুতিনের কথা। প্রথমত তিনি বাইডেনের নীতি-পলিসির উপর দুনিয়ার যেন কিছুই নির্ভর করে না, এই মিথ্যা অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। অর্থাৎ দুনিয়া উলটে গেলেও এমন অবস্থানে থেকেই তিনি কথা বলবেন বলে আগেই ঠিক করেছেন।  কারণ এই তিন ফ্যাক্ট্রের মধ্যে বাইডেনের সিদ্ধান্ত-করণীয় কোনোই ফ্যাক্টর নয়, তিনি ধরে নিয়েছেন। তাই এই তিনের একটাতেও বাইডেন ফ্যাক্টর নয়।  অথচ বাইডেন ৪০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ নিয়েছেন যেন তিনি ইউক্রেনকে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে এই যুদ্ধ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত চালাতে পারেন। আর মরা যুদ্ধকে জাগিয়ে আরো কমপক্ষে ছয়মাস জীবিত-যুদ্ধ করে দেয়া মানেই সরাসরি অন্তত জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম বা খাদ্যের দাম কমার বদলে আরো বেড়ে যাবার সব লক্ষণ নিশ্চিত করেছেন বাইডেন। অথচ ও’নিল এখানে এসে বাইডেনের নাম উচ্চারণই করছেন না।  সোজা কথায় ও’নিল দেখা যাচ্ছে তাঁর নিজ কথা আর কাজের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। তিনি কেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা বাইডেনের নীতির সমর্থক হচ্ছেন এর কোন কারণও বলছেন না। এমনকি তিনি যে সমর্থক তা পাঠক যেন বুঝবে না বলে ধরে নিয়েছেন!

    সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, বাইডেনের হাতে এখন আরো ছয় মাস আরামে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ আছে। মানে, যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যাবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অথচ ও’নিল এটাকে কোনো ফ্যাক্টর মনে করছেন না!! তার এ অবস্থানের মধ্যে ওয়াল স্ট্রিটের কোনো স্বার্থ কিভাবে লুকিয়ে আছে? তিনি নিশ্চুপ!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২১ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জিম ও’নিল : যে নায়ক এখন ভিলেন!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন বন্ড’

    শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’

    গৌতম দাস

    ১৬ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46k

    Sri Lanka To Default on Dollar Bonds.  GOTA GOTA YOU FAILED!  GOTA GOTA YOU FAILED!

     

    উপরের প্রথম ছবিটা বিবিসির এক ভিডিওও ক্লিপ রিপোর্ট থেকে নেয়া। যেখানে নারী বিক্ষোভকারিরা শ্লোগান তুলছে GOTA মানে “প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া – তুমি ব্যর্থ!”   শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া, তাঁর সরকার পরিচালনা বা ম্যানেজমেন্ট চরমভাবে ফেল করেছে। এক কথায় বললে তা মূলত ‘ইকোনমিক মিসম্যানেজমেন্ট’-এর কারণে। বাংলায় বলা যায়, অর্থনীতি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক দ্রুটি ও ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে এখানে। আর এতে এর ইমপ্যাক্ট মানে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এর যা প্রভাব সেটা কড়া মানসিক আঘাতের পর্যায়ের! কিন্তু কেন মানসিক অবস্থার দিকটা এত গুরুত্ব দিচ্ছি?

    সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন মানেই সবসময় তা একটি স্ট্রাগল; এক নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্যে থাকে এমন জীবন। সমাজের যত নিচের বর্গে মানুষে লড়াই ততই যেন নির্মম সে লড়াই! কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে এটাই এক প্রধান ও মারাত্মক প্রসঙ্গ! কেন?

    মানুষ তার জীবন-সংগ্রামের লড়াইগুলো কী হাসিমুখেই লড়তে পারে?? এটাই হচ্ছে মূখ্য প্রশ্ন! মানুষ অবশ্যই হাসিমুখেই তা লড়তের পারে কিন্তু কেবল এক শর্তে; সেটা হল এই যে, তাঁর এই লড়াকু জীবনের একটি শেষ আছে, এর অবসান আছে এবং তাহতে পারে এমন আশা আছে, ভবিষ্যৎ আছে – এই ইঙ্গিত চলতি লড়াকু জীবনে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। অর্থাৎ কষ্টকর জীবন-সংগ্রামে আশা আছে কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা? নাকি কোন শেষ নাই ফলে ভবিষ্যতই নাই – এমন নয় তো!!! একদিন এই কষ্টকর জীবন শেষ হবে এক নয়া ভোর আসবে – এটুকু দেখতে পেলেও কেবল মানুষ সব কষ্টের জীবন বাইতে রাজি থেকে যায় – না থাকলে অবশ্যই আত্মহত্যার কথা ভাববে! এমনকি চরম কষ্টের জীবন যার আরেক বটম লাইন হল, নিজ প্রজন্ম তো গেছেই – লড়তে লড়তেই এটা শেষ হয়ে যাবে দেখা যাচ্ছে; মানুষ নিজের সেই জীবন ও প্রজন্মও বাজি ধরে লড়তে লড়তেই শেষ করে ফেলতেও রাজি হয় – কিন্তু কেবল এক শর্তে। সেটা হল, এই নিজ প্রজন্ম বিলিয়ে দেয়ার বিনিময়ে হলেও যেন তার পরের প্রজন্ম থেকে, মানে নিজ সন্তানদের প্রজন্ম থেকে তাদের যেন আর অন্তত আর না খেয়ে থাকতে হয়। এই হলো সেই ন্যূনতম আশা; আর এটাকেই সে নিজ লড়াকু জীবনের ভবিষ্যৎ আছে বলে মানে। ইংরেজিতে এটাকে সাবসিস্টেন্স লেভেল [subsistence level] মানে কেবল বেঁচে থাকা ও অস্তিত্ব ধরে রাখার লড়াই হিসেবে দেখা হয়; অর্থাৎ ন্যূনতম অস্তিত্ব ধরে থাকতে পারবে, এ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আর অন্তত এটা ক্রমশ ভালর দিকে পরিবর্তিত হতেই হবে – এটাই সেই প্রণোদনা বা এই বোঝাবুঝির মৌলিক-বুঝ। নিম্নবর্গের মানুষকে এ নিশ্চয়তাটুকু দিতে হয়, এই আশার বাতিটুকু যেন না নিভিয়ে দেয়া হয় সে দিকে রাজনীতি ও সরকারকে খেয়াল রাখতে হয় – এটাই সাধারণ মানুষের এজীবন সমাপ্ত করে এথেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ। সেটাই  একটা ন্যূনতম বুদ্ধিমান সরকারের লক্ষণ যে এদিকটা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল এবং বাস্তব বোধবুদ্ধিসম্পন্ন! তাই নিচের ছবিতে আমরা দেখব এই মেয়েতা বলছে আজ আমার জীবনের আর কোন কোন ভবিষ্যত নাই [……at this point I don’t see any future]। অর্থাৎ যেন আত্মহত্যার পুর্বাবস্থায় পৌছে গিয়েছে তরুণী মেয়েটা! তাঁর পুরা বক্তব্য হল,

    “As a young person may be about seven months ago, I would have said I have a future here but at this point I don’t see any future here” – নিচের ছবির তরুণী মেয়েটার বক্তব্য এটা। যারা ভিডিওও লিঙ্ক চান, এখানে খুলে দেখতে পারেন। 


    দুঃখের বিষয়, শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার সরকার এই ন্যূনতম যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। তাই নিজেই হেরে গেছেন। আর এতে স্বভাবতই ফলাফলে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষকেও তাদের নিজ নিজ জীবন সম্পর্কে পুরোপুরি হতাশ করে দিয়েছে। বেঁচে থেকে জীবন সংগ্রামের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। এ নিয়ে বিবিসির এই শিরোনাম এক টিনএজ তরুণী বলছে, ‘আমি অল্পবয়সী তবু এখন এখানে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখি না।’ অথবা রান্নার গ্যাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো মানুষ হঠাৎ আর্তনাদ করে বলছে, ‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের চাইলে বাঁচাতে পারে।’ এসবই হল – জীবনের আশার বাতি নিভিয়ে দেয়ায়  কঠিন সব খেদোক্তি!!

    এই হলো এখনকার শ্রীলঙ্কান জীবনের সাধারণ ও কঠোর বাস্তবতা! গত সোমবার ৯ মে এর সারা দিনে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত গণসন্তোষ-বিক্ষোভে এক সিটিং সরকারি এমপিসহ মোট আটজন নিহত হলেন। সিএনএনের ভাষ্যমতে, ৩৮ জন রাজনীতিবিদের বাড়ি তারা পুড়িয়ে দিয়েছে। আর স্থানীয় লাইভ টেলিভিশনে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে যে, ‘সরকারি দলের সংগঠিত গুণ্ডারা লাঠিসোটা আর বুলেটের অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাজধানীর কয়েকটি স্থানে প্রথমে চড়াও হয়েছিল। সরকারের অনুমান ছিল, এসব বিক্ষোভ শক্তহাতে দমন না করে সামলালে তাদের জন্য বিপদ হবে। কিন্তু এতেই ঘটনা ঘটে উল্টা অর্থাৎ সরকার যে মানুষের জীবনের সব আশা কেড়ে নিয়েছে, এসব দিকে সরকারের খেয়াল ছিল না। আর এতেই আরো বিক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষেরা প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি নেতাদের বাসায় বাসায় গিয়ে হামলা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসা ছেড়ে এক নৌঘাঁটিতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। আর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের করার চেষ্টা করেন।

    তামিল-সিংহলি দ্বন্দ্বঃ
    শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক বড় দীর্ঘ দিনের অসন্তোষের ইস্যু হল, দেশের প্রধান এথনিক জনগোষ্ঠী সিংহলিদের সাথে জনসংখ্যার প্রায় ১৮%  [২০১২ সালের সরকারি গণনার হিসাবে, যা বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে তবে ১৯৮১ সালের হিসাবে যা ১৫% ছিল]। এই তামিল এথনিক জনগোষ্ঠী যাদের প্রায় ১১% শ্রীলঙ্কার স্থানিয় আর বাকিরা ভারত থেকে মাইগ্রেটেড তামিল।   স্থানীয়ভাবে তামিলেরা  মূলত শ্রীলঙ্কার উত্তরে ও পুবে বসবাস করে। মনে করা হয়, যারা মাইগ্রেটেড ব্রিটিশ আমলে এরা চাবাগান ইত্যাদিতে অগ্রসর ও দক্ষ শ্রমিক বলে তাদের ভারতের তামিলনাড় (পুরানা মাদ্রাজ) – থেকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলেও  তামিলনাড়–র থেকে আসা তামিলরা স্থায়ী হয়ে শ্রীলঙ্কায় থেকে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সিংহলিদের সাথে চেয়ে তামিলদের সাথে নাগরিকবৈষম্য বেড়ে গেলে সশস্ত্র রাজনীতির এলটিটিই [LTTE] গোষ্ঠীর জন্ম হয়। কিন্তু লম্বা ২৬ বছরেও কোনো আপস-সমাধান না আসায় বা অনেকের চোখে এ আন্দোলন সশস্ত্রতাতেই থেকে যাওয়ার আগ্রহ সীমাহীন ছিল বলে এটা কোনো সমাধানের চেয়ে যেন আজীবন সঙ্ঘাত চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত তৈরি করেছিল। ফলাফলে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনী সশস্ত্র বলপ্রয়োগে আক্রমণ শুরু করলে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছারখার হয়ে যায়। আর সেটা ছিল মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারের আমল। তাই অনেক মনে করেন, সেই থেকে জাতিবাদী বীরের অহং তৈরি হয়েছিল মহেন্দ্র রাজাপাকসের পরিবারকে কেন্দ্র করে। যেমন এখন যিনি শ্রীলঙ্কা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে তিনি পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র-এর আপন ছোট ভাই। এই পরিবারের মহেন্দ্র-ই প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ২০০৯ সালে, যার বাবা কেবল একজন এমপি ছিলেন।   আর পরে এভাবে ২০১৯ সাল থেকে  নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন মাহিন্দার ছোটভাই গোটাবায়া। আর এরপর থেকে আস্তে আস্তে তাঁর সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের অন্তত ২০ জন সদস্য মন্ত্রী বা এমপি হয়ে নানা পদে জড়িয়ে ছিলেন। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কান রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি, তা অনুমান করা কঠিন নয়; যদিও এদিকটা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবিসির এক রিপোর্টের শিরোনাম হলঃ  শ্রীলঙ্কার সঙ্কট : যুদ্ধবিজয়ী বীরেরা কী করে ভিলেন হয়ে গেলেন [Sri Lanka crisis: How war heroes became villains]??

    এখান থেকে আরেকটু অনুসিদ্ধান্ত টানা যাক। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা গণ-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করার পরে আগেই উঠা প্রেসিডেন্ট ও ছোট ভাই গোটাবায়ার পদত্যাগের পাবলিক ডিম্যান্ড বা দাবি এখন আরো জোরদার হয়েছে। এরই মধ্যে গোটাবায়া তাদের দলীয়, আগে পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। যদিও তিনি বিরোধী দলীয়  এখন এক এমপি মাত্র ছিলেন কিন্তু তাকে রাজাপক্ষে পরিবারের ঘনিষ্ট মনে করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হয়েই বিবিসিকে তিনি বলেছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে গেছে [……PM described the Sri Lankan economy as “broken]। তাই তিনি পাবলিকের কাছে আহবান রেখেছেন “ধৈর্য ধরতে, তিনি সব কিছু ভালো জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন” [“be patient, I will bring things back”.]”। কিন্তু তিনি কি সেই সুযোগ পাবেন?

    ওই সাক্ষাৎকারে তিনি কোনো আশা জাগাতে পারেননি। নিজেই এমন শঙ্কা ব্যক্তও করেছেন। বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক অবস্থা আবার ভালো হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই না আরো বেশি খারাপ হয়ে যায়” […… misery and unrest is “going to get worse before it gets better”.]”। এরই প্রতিধ্বনি যেন পাবলিক ডিম্যান্ডে যে গোটাবায়াকেও পদত্যাগ করতে হবে।

    শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বাস্তব অবস্থাটা কীঃ
    এক কথায় এর জবাব, এই অর্থনীতির এক ব্যাপক সংস্কার করতে হবে এবং কমবেশি সবাই মানেন যে, আইএমএফের [IMF] হাতেই এই সংস্কার হলেই ভাল। অনেক এটাকে নয়া ঋণ গ্রহণের সাথে পরিশোধেরও কাঠামোতে বদল আনা বলছেন। এক পেছনে মূল কারণ হল, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (প্রধান পণ্য উৎপাদন চা-সহ) কোম্পানিগুলোর বড় একটা অংশ বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানায়। মানে পুরানা দিন থেকেই স্থানীয় ব্যবসায় বিদেশী নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। সোজা কথায় এতে অর্থনীতির বৈশিষ্ঠ হবে – শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে প্রডাকটিভ ক্যাপিটালের (উতপাদক পুঁজি) চেয়ে বিনিয়োগ ক্যাপিটালের ()ইনভেস্টমেন্ট বা সুদী পুঁজির) ভুমিকা ও এর প্রভাব অনেক বেশি ও তা ডমিনেটিং হয়ে আছে। এছাড়া এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক বড় ফ্যাক্টর – সভরেন বন্ড [Sovereign Bond] !!

    সভরেন বন্ড কীঃ
    ইংরেজি সভরেন [sovereign] শব্দের আক্ষরিক অর্থ সার্বভৌম। কিন্তু অর্থনীতিতে সভরেন শব্দ ব্যবহার হয় একটু ভিন্ন অর্থে। এখানে সভরেন মানে ‘রাষ্ট্র নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছে’ এ ধরনের। কিন্তু ঠিক কিসের গ্যারান্টি? সে প্রসঙ্গে যাবো।

    সাধারণত ‘বন্ড’ বলতে তা সরকারি সিল-ছাপ্পড় মারা এবং যা এক কাগুজে “নোট” [note] লিখে দেয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর এই শব্দের মূল অর্থ একটা নোট লিখে দিয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়া।  কিন্তু সভরেন বন্ড, একসাথে শব্দদুটা কথার মানে হল, কেউ নিজ অর্থ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের সভরেন বন্ড কিনতে পারে। এর বিশেষত্ব হলো এর ম্যাচুরিটি মানে পাঁচ বছরের বন্ড হলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া শেষে এর সুদসহ আসল অর্থটা ঐ রাষ্ট্র বন্ড ক্রেতাকে ফেরত দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আর স্বভাবতই এই সভরেন বন্ডের বেলায়, এটা কোনো ব্যক্তি বা প্রাইভেট কোম্পানির ইস্যুকৃত ও বিক্রি করা কোন বন্ডে দেয়া গ্যারান্টির চেয়ে খোদ রাষ্ট্রের নিজের দেয়া গ্যারান্টির ওজন ও আস্থা পাবলিকের কাছে অনেক বেশিই হবে।

    এই বিচারে কোনো সরকারের ইস্যু করা ‘ডলার সভরেন বন্ড’ (International Sovereign Bond – ISB) মানে, বৈধ আমেরিকান ডলার খরচ করে যে বন্ড কিনতে হবে – এমন বন্ড (ইস্যু করে) ছেড়ে সরকার নিজ প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড়ের এক সহজ উপায় বলে একালে মনে করা হয়। যদিও এটা অনেক রিস্কি একটা পদক্ষেপ। তবে এটা আমেরিকার মত বড় ও প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির দেশের বেলায় গ্লোবাল পুঁজিবাজারে আমেরিকান সভরেন বন্ড যথেষ্ট আস্থাবাচক – এক বন্ড কেনা ও বেচার ব্যবস্থা – তা বুঝা যায়। যেমন জাপান ও চীন এদের একেক দেশ, এখন আমেরিকার এমন এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সভরেন বন্ড এখনো কিনে রেখেছে। কিন্তু বলাবাহুল্য বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সরকার যদি অমন সভরেন বন্ড ইস্যু করে থাকে তবে তা একই মাত্রার আস্থাবাচক  বা ওজনদার হবে না।

    তবে বাস্তবে বাংলাদেশ কখনোই এমন সভরেন বন্ড ইস্যু বা চালু করেছে বলে জানা নেই যদিও চলতি সরকারের আমলেই সময়ে এমন কিছু বিক্ষিপ্ত আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর প্রতিশ্রুত সুদাসল  পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকারের অপারগতা। বলে, অনেক ইন্ডিপেনডেন্ট রিপোর্ট অথবা সিএনএন, বিবিসিসহ শ্রীলঙ্কার স্থানীয় মিডিয়াতেই মানা হয় যে, শ্রীলঙ্কান সভরেন বন্ডের সর্বশেষ সুদ ফেরত দেয়ার তারিখ ছিল গত ১২ এপ্রিল ২০২২।

    কিন্তু  শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর দেয়া প্রতিশ্রুত সুদাসল পরিশোধে শ্রীলঙ্কান অর্থনীতির  অপারগতা!

    সরকার নিজেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে তারা এই অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে; পারছে না – রেডি নয় বলে অপারগতা জানায়। আর তখন থেকে গ্লোবাল পুঁজি বাজারে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ও সরকার ডুবে যাচ্ছে এখবর আর লুকানো না থেকে চাউর হয়ে যায়। তবে এসব কথা কেবল গত এপ্রিল ২০২২ এর নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসেও একইভাবে (ISB) এর পাওনা পরিশোধ করতে শ্রীলঙ্কা সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও তখন শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি যে সংকটের কথা স্বীকার করা হয় নাই।এনিয়ে তখনকার আলজাজিরার রিপোর্ট এখানে।

    The government is due to make a $36 million interest payment on a 2023 dollar bond April 18, as well as $42.2 million on a 2028 note, Bloomberg-compiled data show. A $1 billion sovereign bond was maturing July 25.

    এটা ছিল ভারতের এক মিডিয়া  বিজনেস স্টান্ডার্ড এর রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু অংশ।
    আর সেবার এপ্রিলের ব্যর্থতায় আরো বলা হয়েছিল জরুরি খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ ইত্যাদি আমদানির অর্থ না থাকাতে তারা তখনই আর নিজ বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার খালি করতে চাইছেন না। কিন্তু কার্যত এটা দাঁড়িয়ে যায় যে, সরকার একদিকে আইএসবি বন্ডের পাওনা শোধ করেনি আবার প্রয়োজনীয় জরুরি দ্রব্যাদিও সব আমদানি করতে পারেনি। ফলে জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও খাদ্যশস্য এমনকি স্কুলের পড়ালেখার কাগজ ও ওষুধও পর্যাপ্ত আমদানি করতে পারেনি বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে। মুল কারণ চাহিদার তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রা ছিল অনেক কম।  আর একবার এমন সাপ্লাইয়ের অভাবের কথা বাজারে রটে গেলে আমদানি-সাপ্লাই দ্বিগুণ করেও বাজার থিতুতে আনা যায় না। কালোবাজারি-মজুতদারি হয়ে যায় বাজারের মূল ফেনোমেনা। আর এথেকেই সেটাই শ্রীলঙ্কার সমাজ ও অর্থনীতিতে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠার অবস্থা সৃষ্টি করেছিল।

    বৈদেশিক বন্ড বা ISB প্রসঙ্গে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমাদের মত দেশে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক বা চীনা বা অন্য কোনো দেশের ঋণ নেয়ার চেয়ে ISB  ইস্যু করে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ডলার জোগাড় করা – এদুটার মধ্যে কোনটা ভাল? অথবা দুটোর ভালো-মন্দ কী? বিশেষজ্ঞরা আমাদের মত দেশের বেলায় বন্ড বা ISB ইস্যু করাকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, তুলনায় অবকাঠামো (বিশ্বব্যাংক বা চীনের মতো দেশ থেকে) ঋণ নেয়াকে ভাল মনে করে। এর পিছনের কারণ বলা হয়, অবকাঠামো প্রকল্প বাজেটে বরাদ্দ (ডলার মুল্যে) যেসব অর্থ অন্তত স্থানীয়ভাবে কিনতে বা ব্যয় করতে হবে; যেমন, স্থানীয় শ্রম কিনতে হবে হয়ত অথবা সিমেন্ট বা রড ধরনের কাঁচামাল ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য বা প্রকল্পের জন্য একোয়ার [acquire] করা জমির মূল্য পরিশোধ – এসবের তুল্য সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যা বাজেটে বরাদ্দ থাকে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রাপ্ত  স্থানীয় মুদ্রা ওই প্রকল্প নিজ অ্যাকাউন্টে তা জমা করে নেয়। এরপর সেখান থেকে ঐ টাকা স্থনীয় ক্রয়ে ব্যয় করা হয়। এতে ব্যয়িত ঐ বৈদেশিক মুদ্রাকে রাষ্ট্রের অর্থনীতি রাষ্ট্রের  বৈদেশিক মুদ্আরা আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকে। আর তুলনায় বন্ড- ISB ইস্যু করে বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করলে তা সুদসহ আসল এর সবটাই আবার ডলারে ফিরে পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে বন্ড- ISB ইস্যুর চেয়ে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে প্রকল্প উৎসাহের বিষয় বলে গণ্য করা হয়। দেখা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কা এসব বাছবিচার বিবেচনাকে আমল না করে এগিয়ে চলতে গিয়ে বন্ড- ISB ইস্যু করা অনেক সহজ কাজ মনে করতে গিয়ে আজ বিপদে পড়েছে! এটা অবশ্যই বেপরোয়া আচরণ!

    আসলে যারা বন্ড- ISB কিনেছিলেন তাদেরকে প্রদেয় এপ্রিল ২০২২ এর কিস্তির অর্থ দিতে ব্যর্থতা ছিল সবচেয়ে বড় ঘন্টা বেজে যাওয়া যে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি বিশাল সংকটে পড়ে গেছে। অথচ এথেকে দেশকে বের করার মত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে গোটাবায়া সরকার ছিল ততোধিক উদাসীন। যেন সরকার আরামে অপেক্ষা করছিল যেন এক মিরাকল ঘটবে আর অর্থনীতির এই মারাত্মক সংকট মুহুর্তেই সমাধান হয়ে যাবে। অথচ ব্যাপারটা মোটেই তা ছিল না। ফলে সরকার এসব সংকটকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে নাই বা সংকটটারই গুরুত্ব আমল করতে সক্ষম ও যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। আর এটাই মূল ব্যর্থতা।

    সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে এথেকে উদ্ধার পেতে গেলে সেই সমাধানের ব্যাপারে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর গ্লোবাল বাজারের আস্থা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি মনে করা হয়। যেমন গত ফেব্রুয়ারি থেকেই শ্রীলঙ্কান অর্থনৈতিক রেটিংয়ের ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এমন অন্তত দু’টি প্রতিষ্ঠান শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে খারাপ রেটিং দেয় বা রেটিং নামিয়ে দিয়েছিল। এর সোজা ফলাফল হল, বিদেশীরা এই রেটিং দেখেই কিন্তু বন্ড-ISB  বা কোনো দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে আসে। এসব কারণে, যখন গ্লোবাল বাজার দেখে যে, একটা দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটে ফাইনালি আইএমএফ এসে ঐ দেশকে উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করছে কীনা??? এটাই গ্লোবাল পুঁজি বাজারে সবার কাছে এক আস্থার চিহ্ন ছড়িয়ে দেয়। অতএব, সে কারণেই সবাই এখন তাকিয়ে আছে আইএমএফের সাথে শ্রীলঙ্কা সরকারের যে কথা-নেগোশিয়েশন চলছে গত ফেব্রুয়ারি থেকে, তা কবে এথেকে তা একটা চুক্তিতে তা পরিণতি ও সম্পন্ন হতে সমর্থ হয়!!  যার ব্যবহারিক অর্থ, শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি উদ্ধারে আইএমএফ তার কাজ শুরু করে!

    উপরে যে সভরেন বন্ডের কথা বললাম, যা পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকার এখন বিনিয়োগকারিদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারি [defaulter] হয়ে আছে – এই অর্থ পরিশোধ করবে কী করে? কার থেকে আবার অর্থ ঋণ করে এনে? এই বাস্তবতাটা এতই কঠিন যে একমাত্র আইএমএফ-ই [IMF] হতে পারে সেই সম্ভাব্য উতস।  এক রিপোর্ট ধারণা দিচ্ছে যে শ্রীলঙ্কাকে এক্ষণি পরিশোধ করতে হবে এমন অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার [……Sri Lanka’s external debt servicing obligations were thought to be over USD 6 billion.]।  আর এত বিশাল পরিমাণ অর্থ একমাত্র  আইএমএফ-ই যোগাতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা বাজারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে!

    যদিও এসবের মধ্যে আরেক বড় জটিলতা হল, ঐ দেশের চলতি রাজনৈতিক অবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া, তাঁরও পদত্যাগ বিনা কোন নুন্যতম রাজনৈতিক স্থিরতা আসছে না। যার অর্থ আইএমএফ তা হলে কি পরবর্তি নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে? সোজা কথা, গোতাবায়া যতই নিজের পদত্যাগে দেরি করবেন ততই আইএমএফ সংস্কার কাজে নামতেই দেরি করবে! বলাবাহুল্য এর মানে শ্রীলঙ্কা আরো দীর্ঘসময় ধরে চলবে চরম বিশৃঙ্খলা!! অথচ ঘটনা সে দিকেই যাচ্ছে। একদিকে বাজারে খবর হল, নতুন শপথ নেয়া প্রধানমন্ত্রী রনিলকে গোতাবায়ার লোক মনে করা হয়। অর্থাৎ তাই দেশের মানুষেরই আস্থা নাই। ফলে এদের সবার পদত্যাগ না দেখলে নয়া রাজনৈতিক ঐক্য আনা ও সংস্কার কার্যকর করতে এগিয়ে আসা সব পিছিয়ে অনিশ্চিত হয়ে যেতে থাকবে!!!।

    চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার কী খবরঃ
    শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থা নিয়ে যেসব সিরিয়াস মিডিয়া রিপোর্ট করছে এদের মধ্যে যেমন ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা বিজনেস স্টান্ডার্ড ইত্যাদি আছে – সব মিলিয়ে এরা কেউই এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্য শ্রীলঙ্কা ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ পড়েছে বলে কোন কারণ দেখায় নাই। মানে এসব মিথ্যা তথ্যের প্রপাগান্ডা করেনি। বরং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা ব্যাখ্যামূলক [Explained] রিপোর্ট করেছে। এখানে দেখেন,……Explained: What led to Sri Lanka’s economic crisis, and who’s is helping?। তাতে স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণের (সেটা নাকি ৫১ বিলিয়ন ডলার বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে – Sri Lanka announces default on all of its $51 billion external debt )। কিন্তু এই কথাটা সবটা সত্য না। ৫১ বিলিয়ন ডলার – এটা সবটাই প্রতিশ্রুতি ফেল করা ঋণ যেটাক্বে ডিফল্টার (default) বলে টঝিক তা না। একটা দেশের নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণ আর  সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডলার যোগাড় একই জিনিষ নয়। মূলত সভরেন বন্ড জিনিষটা ঋণ নেয়াই নয়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বা চীন জাপান থেকে নেয়া ঋণের বেলায় সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে পারার পরিণতি হল – পুনরায় পরিশোধের সময় দেয়া [রিসিডিউল বা reshedule] তবে সাথে আরো কিছু কড়া শর্তে। কিন্তু ডিফল্টার করে বাজারে খবর রটিয়ে ঐদেশের রেটিং বা অর্থনীতির মান ফেলে দিয়ে নয়।  আর সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি ফেল করা অন্য জিনিষ। এখানে রিসিডিউলের কিছু নাই। যতদ্রুত সম্ভব সব পাওনা দেরির সুদ-সহ পরিশোধ করা। নইলে গ্লোবাল পুঁজি বাজারের বদনামে রেটিং আরো নিচে নেমে না দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়।
    কিন্তু এই ৫১ বিলিয়ন ঋণ দেখানো এটা সবটাই সভরেন বন্ডের ডিফল্টার বা প্রতিশ্রুতির অর্থ নয়। এটা শ্রীলঙ্কার পরিশোধযোগ্য মোট বৈদেশিক দায়। দায় মানেই তা ঋণ নয়। আর এই মোট ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের হল সভরেন বন্ড-ISB ইস্যু করে নেয়া বৈদেশিক দায়। তাই টাইমস অব ইন্ডিয়া পরোক্ষে এমন মানে করে রেখেছে (যেটা আসলে একটা প্রপাগান্ডা) যেন এই ৫১ বিলিয়ন ডলারের পুরোটার ওপর ডিফল্টার হওয়াতেই যেন শ্রীলঙ্কার ক্রাইসিস। এ কথা সত্য নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, বন্ডের ক্রেতার দায় মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের আর এসব বন্ড যারা কিনেছে এরা হলো প্রধানত জাপান, চীন ও এডিবি সাথে কিছু খুচরা বিনিয়োগকারী [ISBs make up the largest share of Sri Lanka’s foreign debt at $12.55 billion, with the Asian Development Bank, Japan and China among the other major lenders.]।

    এর সোজা মানে হল, চীনের কোনো ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদে পড়ার গল্প এটি নয়। এটা সোজাসাপ্টা বন্ড-আইএসবি ইস্যু করার বাজার থেকে অর্থ তুলে আনার বোকামি, এটাই মিস-ম্যানেজমেন্ট এবং বন্ড ক্রেতাদের কিস্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতায় বাজারে খারাপ ইমেজ আর খারাপ অর্থনীতি আর তা মিস-ম্যানেজ বা ভুল পরিচালনাজনিত সমস্যা।

    কিন্তু তবুও ভারতেরই আরেক দল মিডিয়া (যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম আলো বা নিউএজ যারা হয়ত না বুঝে প্রপাগান্ডার শিকার) – এরা শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকটকে চীনের ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদ বলে পুরোনা স্টাইলের প্রপাগান্ডার মধ্যে এখনো আছে ও চালিয়ে যাচ্ছে। আর এদের মিথ্যা প্রপাগান্ডার ভিত্তি এএফপির নামে চালানো এক রিপোর্ট। যে একই রিপোর্ট টাইমস অব ইন্ডিয়া,  ভারতের   এনডিটিভি,     আমাদের প্রথম আলোর অনুবাদ আর নিউ এজ সহ আরো অনেকে তুলে এনেছে। মজার কথা হল শিরোনাম এবং খবরের একই সোর্স হলেও তাতে ভিতরে বডিতে কনটেন্ট সবার এক না।   আর এদের সবার মধ্যে কেবল এনডিটিভি একটা ডিসক্লেমার জুড়ে দিয়ে শেষে জানিয়েছে (This story has not been edited by NDTV staff and is auto-generated from a syndicated feed.)।অর্থাৎ তারা কোন শব্দও এতে ঢুকায় নাই।

    এ ছাড়া একই প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে ভারতের আইপি টিভি (প্রথম কলকাতা) বা সোশ্যাল মিডিয়া টিভি অথবা ফেসবুক ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি, এসব জায়গায় গেঁথে বসা প্রপাগান্ডা ধারণাটা হল, সেই পুরানা গল্প – চীনা ঋণের কারণেই শ্রীলঙ্কা অর্থনীতির আজ এ দুর্গতি। অথচ এটা ভিত্তিহীন।
    আর সবচেয়ে বড় কথা, ওই হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরের মালিকই এখন আর শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। তাই ওটা নির্মাণের ব্যয় পরিশোধের কোনো দায় বা ঋণের বোঝা শ্রীলঙ্কান সরকারের নয় ও নাই। সোজা কথায়,  এখন বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। ওর মালিক এখন চীনের এক প্রাইভেট কোম্পানি যারা বন্দর চালিয়ে নিজের আয় থেকে দায় তুলে নেবে ও নিচ্ছে। ফলে ওই বন্দর নির্মাণ খাতের কোনো ঋণ শ্রীলঙ্কা সরকারকে বইতে হচ্ছে না ও নাই; ওই বালাই-ই নেই এই হলো বাস্তবতা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৪ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জীবনের ভবিষ্যৎ আছে, এ আশা কেড়ে নিতে নেই“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

    –

     

  • বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    ইউক্রেন-যুদ্ধকে ‘নয়া পর্যায়ে’ ঠেলে দিলেন !
    বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    গৌতম দাস

    ০৯ মে ২০২২, ০০:০৭  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-451

       Biden   seeks $33 billion war chest to support Ukraine

    ইউক্রেনের যুদ্ধ তৃতীয় মাসে পড়েছে, আর এরই মধ্যে এই যুদ্ধ এক নব ও বৃহৎ পর্যায়ে প্রবেশের মুখে মানে, এই যুদ্ধ বাইডেন এখন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বা কমপক্ষে আরো ছয় মাস গড়িয়ে নিতে যাচ্ছেন, তা বুঝা যাচ্ছে। অন্তত বাইডেনের নয়া পরিকল্পনা এটাই। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ-ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে দুটা মিডিয়া রিপোর্টে। মূলত গত এপ্রিলের শুরু থেকেই এই নয়া পরিকল্পনার উদ্ভব যার প্রকাশ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। তবে দুটো মিডিয়া রিপোর্টের শেষেরটা নিয়েই আগে কথা বলা যাক।

    আমেরিকান অভ্যন্তরীণ এক নিউজ নেটওয়ার্ক সিএনবিসি [CNBC] ২৮ এপ্রিল জানাচ্ছে, আমেরিকান কংগ্রেসের কাছে বাইডেন ইউক্রেনে সামরিক (অস্ত্র ইত্যাদি) ও মানবিক সাহায্যের জন্য মোট আরো ৩৩ বিলিয়ন ডলার পেতে অনুমোদন চেয়েছেন [Biden to ask Congress for $33 billion to support Ukraine through September] অর্থাৎ এই রিপোর্টে এটাও পরিষ্কার করে লেখা যে, এই অর্থ দিয়ে তিনি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে চান! আর এর মাত্র তিন বিলিয়ন খরচ হতে পারে মানবিক সাহায্য খাতে। কিন্তু মোট অনুমোদিত অর্থের প্রায় দু-তৃতীয়াংশই মানে, প্রায় ২১ বিলিয়নই আমেরিকা খরচ করবে ইউক্রেনকে সামরিক অস্ত্র সাহায্য জোগাতে। এ ছাড়া আরো প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার বাইডেন খরচ করবেন ইউক্রেনের ভাঙা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে।

    অন্য দিকে এবার আসি মিডিয়া রিপোর্টের প্রথমটায়। এই ইঙ্গিত-প্রমাণটা হল, গত মাসে ২৪ এপ্রিল বাইডেনের দুই মন্ত্রী- প্রতিরক্ষামন্ত্রী (আসলে তারা উপদেষ্টা আমাদের মন্ত্রীর সমতুল্য) লয়েড অস্টিন [Lloyd Austin ] আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken]- এরা দু’জন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে হাজির হয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাথে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। আর তাঁদের কিয়েভে হাজির হওয়াটাও গল্প-উপন্যাসের মত বেশ থ্রিলিং। তুরস্কের মধ্যস্থতার উদ্যোগে  রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে গত মার্চের শেষ সপ্তাহে  দ্বিতীয় ডায়ালগে বসার সময়ে তারা রুশ সৈন্য সমাবেশ কিয়েভ অভিমুখ থেকে ডনবাস অঞ্চলে সরিয়ে নিয়েছিল।  আর এই সুযোগে দিনে পোল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া কূটনীতিকরা  দিনে কিয়েভ এসে দিনেই ফেরত যাওয়া এভাবে  কিয়েভে হাজির হওয়া শুরু করেছিলেন। আর এরই উসিলায় লয়েড অস্টিন আর অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন প্রথমে পাশের দেশ পোল্যান্ডে (পোল্যান্ড ন্যাটো মেম্বার ও এই যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে) সফরে আসেন। আর সেখান থেকে নীরবে অজ্ঞাত সফরে বের হয়ে, ট্রেনে করে কিয়েভে পৌঁছে জেলেনস্কির সাথে দেখা করেন। তবে কিয়েভে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার কিছুটা আমরা বুঝতে পারি এনিয়ে প্রকাশিত ২৫ এপ্রিলের রয়টার্সের রিপোর্ট থেকে যার শিরোনাম ‘ইউক্রেন সফরঃ ব্লিঙ্কেন ও অস্টিন আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসার আর সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি [On Ukraine visit, Blinken, Austin pledge return of U.S. diplomats, more security aid]’। যদিও ওই রিপোর্টে সামরিক সাহায্যের কথা যতটুকু ছিল তার সবগুলোই খুবই কম, কয়েক মিলিয়ন ডলারের মাত্র। আর আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসা বলতে বুঝানো হয়েছে যে গত তিন বছর ধরে কিয়েভে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ছিল না আর অন্যান্য আমেরিকান কূটনীতিকদের যুদ্ধেশুরুর ১৫ দিন আগে পাশের পোল্যান্ডে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট। তাই এখন এই ইস্যুতে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ও কূটনীতিকদের ইউক্রেনে ফিরে আসার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আর সেকথাই ও’দুই  সফররত মন্ত্রী বলছিলেন।

    আসলে বাইডেনের এই ‘নয়া পর্যায়ের’ ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিকল্পনা অনেক বড় আর গভীরের। সিএনবিসির ঐ রিপোর্টে স্পষ্ট করেই লিখছে, ‘আমেরিকান সামরিক নেতারা বলছেন, ইউক্রেনে আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য দুটো। প্রথমটি হলো, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে সজ্জিত করা যাতে তারা ইউক্রেন থেকে রাশিয়ান সেনাদের পুরো বের করে দিয়ে সরাসরি বিজয় আনতে পারে। আর আমেরিকার দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, রাশিয়ার সমগ্র সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়া আর সাথে বাণিজ্যে ও অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওর অর্থনীতিকেও একেবারে ধসিয়ে দেয়া।’

    “U.S. military leaders say their strategic objectives in Ukraine are now two-fold.  The first is to arm Ukrainian forces so that they can secure an outright victory in the war by expelling Russia from Ukraine entirely.  The second is to weaken Russia’s entire power structure over the long-term by tying up its troops in a war of attrition while crippling its economy with sanctions and trade embargoes.”

    তবু আরো সহজে তা বুঝার আরেক উপায় হল অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন – বিশেষত অস্টিনের এই পর্যায়ের এপ্রিল মাসের সব সফরগুলোকে যদি এক সাথে মিলিয়ে দেখি। আমরা শুরু করতে পারি ৮ এপ্রিল অস্টিনের অফিস পেন্টাগনের থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতি থেকে। ওখানে বলা হয়েছে, অস্টিন ১০ এপ্রিল থেকে ইসরাইল, জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার এবং যুক্তরাজ্য সফরে বের হচ্ছেন। কিন্তু এগুলো ছিল সবই কেবল ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সফর তালিকা যার মধ্যে জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার ও যুক্তরাজ্য সফর সবই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার – এগুলো ছিল আসলে প্রথমবারের মত সফর! আর এরপর? এরপর শুরু হয়েছিল নয়া পর্যায়। তারা দু’জন এবার ২৩ এপ্রিল থেকে সফর শুরু করেছিলেন যেখানে ২৩ এপ্রিল তারা এই নয়া সফরে পোল্যান্ড পৌঁছে গেছিলেন। আর সেখান থেকেই পরদিন কিন্তু ট্রেনে অজ্ঞাতযাত্রা হিসাবে ইউক্রেনের কিয়েভে চলে গেছিলেন, যার কথা উপরে বলেছি।

    এর পরই শুরু হয়েছিল আসল সফর। ইউক্রেন সফর শেষে অষ্টিন এবার একা ২৬ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয়বার জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার সফর শুরু করেছিলেন। আর অস্টিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সফর ও উপস্থিতি ছিল মুখ্যত ২৬ এপ্রিল ন্যাটো-ইইউ [NATO-EU Talk] বৈঠকে। সেটা ছিল ৪০ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ইউক্রেন ইস্যুতে এক সভা। আসলে এটাই ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাইডেনের সর্বাত্মক যুদ্ধের ডাক- এরই সভা!

    বাইডেনের এই নয়া পরিকল্পনার চাপ সংশ্লিষ্ট ওই ৪০ দেশে কত প্রচণ্ড হতে পারে তা এখান থেকে সহজেই অনুমেয়।

    খুব সম্ভবত সে কারণেই নতুন করে ইইউর দেশগুলো যেন কোনোভাবেই রাশিয়ার তেল-গ্যাস না কিনতে পারে এজন্য কমিটমেন্ট দেয়ার প্রসঙ্গ এর পরই আবার উঠে আসে; যদিও ওই যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের এক সপ্তাহ পরই এই প্রতিশ্রুতি চাওয়া নিয়ে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে আরো আলাপের আগে গত ২৬ এপ্রিল অস্টিনের উপস্থিতিতে ৪০ দেশের ন্যাটো-ইইউ বৈঠক নিয়ে আরো কিছু কথা বলে নেয়া যাক।

    যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের নিউজের প্রায় সব রিপোর্টের হেড লাইন করা হয়েছে যার ভাষ্য এভাবে যে, “ইউক্রেন বিশ্বাস করে, সে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিততে পারবে”। যেমন- ইইউ জুড়ে উপস্থিত থাকা মিডিয়া ‘পলিটিকো [POLITICO]’ এর শিরোনাম হল – “অস্টিন : আমেরিকা বিশ্বাস করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন ‘যুদ্ধে জিততে পারে” [Austin: U.S. believes Ukraine ‘can win’ war against Russia]।” আবার ‘ইউরোনিউজ [EURONEWS]’ এর হেডলাইন হল, “সবাই বিশ্বাস করে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধে জিততে পারে’ বলেছেন আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে” [‘Everyone believes Ukraine can win the war,’ says US defence secretary at NATO-EU talks ]। অর্থাৎ “সবাই বিশ্বাস করে” অথবা “আমেরিকা বিশ্বাস করে” এই দুটো ভাষ্যই অস্টিন ওই বৈঠকে উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু কেন তিনি এই ‘বিশ্বাসের’ ওপর জোর দিলেন? এটাই মুখ্য!

    কারণ রাশিয়া যে, আমেরিকার সাথে টক্কর দেয়া পরাশক্তি ছিল বা আছে আর ইউক্রেন যে ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টা খণ্ডের এখন একটা খণ্ড-দেশ; আর সেই দেশ ইউক্রেন এখন রাশিয়াকে যুদ্ধে হারিয়ে দিবে – কথাটা না হাসির বিষয় হয়ে যায় তা আগাম ভেবেই মনে হচ্ছে, এখানে বিশ্বাসের উপর  জোর দেয়া হয়েছে। তবে মুখ্য বিষয়টা এখান থেকেই অনুমেয় যে, ইউক্রেনের রাশিয়াকে যুদ্ধে হারাতে গেলে আমেরিকা ও ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করে প্রায় ঢেকে ফেলতে হবে – এমন অবস্থায় যেতে হবে যা আদৌ কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন তো আছেই!

    তার মানে আমরা এখন অন্তত ৪০টা দেশ সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকবে – এমন এক “যুদ্ধ” প্রসঙ্গে কথা বলছি। এমন যুদ্ধের কথা শুনলেও  এদিকে অনেকে ভাবতে পারেন, আমার দেশ তো এই যুদ্ধের কেউ নয়, ফলে আমরা দূরে বসে খেলা দেখার মত যুদ্ধ উপভোগ করব। কিন্তু না; এই অনুমান দুনিয়ার সব দেশের বেলাতেই মিথ্যা হয়ে যাবে। মূল কারণ আমাদের বড় যুদ্ধের সবচেয়ে কমন ধারণা বলতে আমাদের মনে আসবে (১৯৩৯-৪৫) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ত। তাও আবার বয়স্ক লোকদেরই এনিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। সমস্যা হল, সে সময়কালের জমানায় গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে; যেটা এখন উল্টা। মানে এখন সব দেশই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে এক গ্লোবাল বাণিজ্যে পরস্পরের অর্থনীতি সরাসরি, সবার সাথে সবার অর্থনীতিই সংযুক্ত হয়ে গেছে। তাই এযুগে কোন ঘটনাই আর লোকাল বা এমনকি আঞ্চলিক বলে আর কিছু অবশিষ্ট নাই। ফলে এক দেশে কোনো পণ্যের অভাব হলে দুনিয়াতে ওই পণ্যের প্রধান উৎস দেশগুলোতে প্রথমে আর পরে দুনিয়ার সব দেশেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পরতে দেখা যায়। তাই পুরনো কোনো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়েই এবারের যুদ্ধের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। যেমন, কেবল তিনটি পণ্যকে যদি আলোচনায় আনি –  জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম – যা উৎপাদনের  একালে বড়  উৎস হল রাশিয়া ও ইউক্রেন (কেবল গম আর ভোজ্যতেলের বেলায়) উভয়েই। এ তিনটি পণ্যের মূল্যে গ্লোবালি ইতোমধ্যে আগুন লেগেছে; এরই মধ্যে যার মূল্য দ্বিগুণ বা এরও বেশি হওয়ার পথে। ফলে যারা চাল না, গম তাদের প্রধান খাদ্য যেমন পাকিস্তান বা ভারতের উত্তর অংশ, এরা বিশাল সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। শুধু খাদ্যের দ্বিগুণ মুল্যবৃদ্ধির কারণেই দুনিয়াব্যাপী এক বিপর্যয় আমাদের সকলের দিকে নব পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হবার আগেই ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। এথেকে আন্দাজ করা যেতে পারে গ্লোবাল অর্থনীতির হাল কী হবে অথবা কী পরিমাণ লোক অনাহারে বা খাদ্য কিনতে না পেরে মারা যাবে।
    এখন বাইডেন কি এসব সম্ভাব্য গ্লোবাল মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাগুলোকে আমল করেছেন? সম্ভাব্য জবাব হল, তিনি এসব আমল করলে এই নয়া যুদ্ধের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা – তারা সারা পশ্চিমের সবাই এখন ইউক্রেনের ঘাড়ে চড়ে নিজেদের স্বার্থের যুদ্ধটা সেরে ফেলতে চাইছেন! কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই যুদ্ধে কি কোন একটা পক্ষ নিজেকে বিজয়ী বলে দাবি করতে পারবে? সবচেয়ে বড় কথা – বাইডেন কী  মাত্র “৩৩ বিলিয়ন ডলারের’ মধ্যে এই নয়া যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন? এটা কি  আদৌও পারা সম্ভব?  আমেরিকা পরাশক্তির ইজ্জত হারিয়ে সদ্য – বহু কষ্টে ২০ বছরের আফগানিস্তান যুদ্ধ যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হত মানে, সেই অর্থ সব ড্রেনেজ হত –  কোনমতে ইজ্জত ভুলে হলেও তা শেষ করতে পেরেছিল, সেটা কি এই বাইডেনের হাতেই ঘটে নাই? সেই বাইডেন কী করে আবার এবার ইউক্রেনের কাঁধে সওয়ার হয়ে যুদ্ধে নামতে সবাইকে উত্তেজিত করতে নামেন কী করে!!!! এটা আক্ষরিক অর্থেই ‘ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন’ বটে!

    এই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিজ ব্যক্তি ইমেজ বাঁচাতে অথবা দলের ইমেজ বাঁচাতে বহুবার নিজ দেশকে যুদ্ধে নিয়ে গেছেন এমন রেকর্ড আছে। এমনকি বাইডেনের মত ডেমোক্রাট, কথিত “লিবারেল ভদ্রলোক ইমেজের” ক্লিনটনেরও মনিকা লিউনেস্কি কেলেঙ্কারি মামলা থেকে মনোযোগ সরাতে ইরাকের সাদ্দামের উপর বিমান হামলা – বোমা মেরেছিলেন তিনি। তাহলে এখন বাইডেনও কি আগামি নভেম্বর মিড-টার্ম নির্বাচন যেটাতে তার দল প্রেসিডেন্টের পারফরমেন্সের জন্য শোচনীয়ভাবে হারবে বলেই সার্ভে রিপোর্ট এরই মধ্যে প্রকাশিত, সেই নির্বাচনে বিজ খারাপ ইমেজ কমাতে বা ঢাকতে মানে প্রভাব ফেলতেই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ জোগাড় করতে গেছেন??  মানে ঐ অর্থ খরচ করতে তা আগামী নভেম্বর কেন, আরো অনেক নভেম্বর পেরিয়ে যেতে পারে – ঘটনা কি এভাবে আমেরিকার হাতছুট হয়ে যাওয়ার দিকে আরেকবার যাচ্ছে?

    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখিঃ
    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখি, বাইডেনের এ’যুদ্ধকে নয়া পর্যায়ে নেয়ার পরিকল্পনা বোঝা যাচ্ছে এপ্রিলের শুরু থেকেই। অথচ তুরস্কের উদ্যোগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির লক্ষ্যে ডায়লগ অনেক দূর এগিয়ে গেছিল। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ডায়লগ ঘটে যাওয়া মানে  এই যুদ্ধ একটা সমাপ্তির কাছাকাছি চলে যাওয়া এমন আশা দু’পক্ষের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল। যেমন প্রথম আলোর এক অনুবাদ রিপোর্টে যা ৩০ মার্চ প্রকাশিত, এর শিরোনাম ছিল, “ইস্তাম্বুল সংলাপ কি ইউক্রেন যুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।” মানে বলতে চেয়েছে এই যুদ্ধ কী সমাপ্তির দিকে চলে যাচ্ছে!!  আবার ২৯ মে বিবিসির রিপোর্ট থেকে নেয়া অনুবাদ রিপোর্টের শিরোনাম, “ইউক্রেনের যে প্রস্তাবে নমনীয় হলো রাশিয়া”। ভিতরের একটা বাক্য ছিল এরকমঃ এক মাসের বেশি সময় ধরা চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের দিকে এটাই সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। মস্কোর এই নমনীয় অবস্থানের পেছনে রয়েছে ইউক্রেনের প্রস্তাব”। অর্থাৎ যুদ্ধ যে সমাপ্তির দিকে তা এখানে একেবারে স্পষ্ট। এমনকি ৫ এপ্রিল রুশ বার্তা সংস্থা তাসের খবর অনুবাদ করে প্রথম আলো লিখছে, “লিখিত সমঝোতা হলেই পুতিন-জেলেনস্কি আলোচনা সম্ভবঃ পেসকভ”।

    অথচ বাইডেন প্রায় সমাপ্তি ও আপোষের দিকে চলে যাওয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে ঐ ৫ এপ্রিলের মধ্যেই নব পর্যায়ের আরেক বৃহৎ পরিসরে ৪০টা দেশের যুদ্ধের হিসাবে ঠেলে দিলেন। সোজা কথায় যা আগে কখনও করেন নাই এবার তাই করলেন – তাঁর পরিকল্পনা এবার একেবারে এর উল্টো। তিনি এপ্রিলের শুরু থেকে নয়া উদ্যোগে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছেন। তাই ১০ এপ্রিল থেকেই সেই বার্তা নিয়ে অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন ইউরোপ যুদ্ধের ডঙ্কা বাজিয়ে নেমে পড়েছেন! আর ২৬ এপ্রিলের মধ্যে ৪০ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সবাইকে ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে শামিল করে ফেলেছেন। চাপের মুখে ইউরোপ রাজিও হয়েছে।

    কিছু কথা মনে করিয়ে দেইঃ
    গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করেছিল। এর একদিন পরে জেলেনেস্কির হতাশা যে তারা একাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তেছেন পাশে আমেরিকাসহ ইউরোপের কোন দেশ নাই। অর্থাৎ তিনি প্রতারিত হয়েছেন তাই বলতে চেয়েছিলেন। এর পরোক্ষ জবাবে বাইডেন বলেছিলেন আমেরিকা রাশিয়া বিরুদ্ধে ইউক্রেন বা অন্য কোন দেশের মাটিতে যুদ্ধে লড়বে না। কারণ তার যুদ্ধের অস্ত্র ছিল আসলে রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে তুলে বিনা-অস্ত্রের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া।  একই যুক্তিতে এপর্যন্ত তিনি ন্যাটোর মাধ্যমে ইয়ক্রেনে কোন অস্ত্র সরবরাহ করেন নাই। যেটা সম্প্রতিকালে শুরু হয়েছে।
    তাহলে এখন ইউক্রেনে বা ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনকে অস্ত্র করতে চলে তিনি আগের সব প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে ফেললেন!!! আর তাতে এবারের সকল ততপরতাড় জন্য দায় তিনি নিজের মাথায় নিতেও বেপরোয়া হয়ে গেছেন। একারণের বলছি বাইডেন নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে নিজ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলেন। সারা দুনিয়াকে একটা অনন্ত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিলেন!!  আর ভাবছেন ৩৩ বিলিয়ন ডলারে তিনি ইউক্রেন-কে দিয়ে রাশিয়া জয় করাবেনই……। এই বাইডেন এখন সারা দুনিয়ার জন্য বিপদজনক ও দায়ীত্বজ্ঞানহীন হওয়ার পথে চলে গেছেন। তাই বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে চলেছেন!!

    ‘কিন্তু’ বিরাট বিরাট সব কিন্তুঃ
    ২৬ এপ্রিলের ন্যাটো-ইইউ এর ৪০ দেশের সভায় রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানি একেবারে বন্ধ অথবা ইইউ দেশের নিজ জ্বালানির সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনাই তোলা হয়নি। কিন্তু এরপর থেকে কানাঘুষা অথবা “চরম বিদ্রোহী” বা অসহ্য মনে করা দেশগুলো প্রকাশ্যে রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারবে না বলে প্রেসকে জানিয়ে দেয়। যেমন ইতালি, হাঙ্গেরি বা অস্ট্রিয়া এসব দেশের এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আর জার্মানি যে সবচেয়ে বেশি রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানিতে নির্ভরশীল (প্রায় ৪২ শতাংশ); যদি সে আজ এক কথা বললে পরের দিনই নিশ্চিত থাকা যায়, সে একটা উল্টো কথা বলবে। হয়তো বলে ফেলল, আমদানি বন্ধসহ অনেক কিছু করবে, কিন্তু পরের দিন বলবে ‘যদি সব দেশ রাজি থাকে তবেঅই জর্মানি সেটা করবে। আমরা যদি এসব স্ববিরোধী রিপোর্টের একটা সারাংশ করি তবে দেখব ৩ মে এর দুটো রিপোর্টই যথেষ্ট – পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি আঁচ করার জন্য। যেমন ৩মে এর  বিবিসির রিপোর্ট লিখেছে,  ইইউর মধ্যে এই প্রশ্নে বিভক্তি দেখা দিয়েছে [EU divided over how to step away from Russian energy]। ইংরেজি শিরোনামের অনুবাদ, ‘রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সরে আসা হবে কবে এই প্রশ্নে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত।’ সার কথায় এর জবাবে একদল বলছে, ২০২৭ সালের পর থেকে। প্রো-আমেরিকান অন্য গ্রুপ বলছে, চলতি বছর শেষ থেকে। আবার জার্মানি বলছে এখনই তো একেবারেই সম্ভব না। এদিকে প্রথম আলোরও ঐদিনের বাংলা  শিরোনাম – “রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিভক্তি”।

    কিন্তু একই দিন মানে ৩ মে এর নিউ ইয়র্ক টাইমস একেবারে সরাসরি ভাণ্ড ফুটা করে দিয়েছে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন লাগিয়ে এর শিরোনাম – ‘ইউরোপ কি রাশিয়ান তেল আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেয়ার পথেঃ এরপরে কী?’ [Europe Is About to Ban Russian Oil: What’s Next?]। আসলে ভেতরে খবর এর একেবারে উল্টা; অর্থাৎ কোন প্রশ্ন নয়, একেবারে জবাব!!! কী সেটা?

    এক্সপার্টদের জবানে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে- ১. এক্সপার্টরা বলেছেন রাশিয়ার সাথে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করা সম্ভব। ২. কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন; এ ছাড়া এ উদ্যোগ নিতে গেলে সরবরাহের অভাব ও বাড়তি মূল্যের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। ৩. আর তাতে আমরা এমন একটি অবস্থার মুখোমুখি হতে পারি যে, যেখানে ভোক্তারা এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়ছে সেই তাদেরই আমরা নয়া বাড়তি বোঝার শাস্তির মধ্যেই ফেলে দিতে পারি। আর এতে শেষ ফলাফল হবে, মানুষ করোনার দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়া অর্থনীতির সঙ্কোচন থেকে উত্তরণের যে লড়াই চালাচ্ছিল, তা শেষে লাইনচ্যুত হয়ে সব মাথায় ভেঙে পড়তে পারে।’

    “Analysts say it will be possible to sever Europe’s oil ties to Russia, but the effort will take time and may lead to shortages and higher prices for gasoline, diesel, jet fuel and other products — a situation that could penalize consumers already struggling with inflation and, ultimately, derail the economic recovery from the pandemic.”

    আর এই তিন পয়েন্টের সারাংশ কথাটা হল, আমরা বাইডেনের বাঁশির পেছনে হেঁটে একটা সম্মিলিত ধ্বংসের পথে যাচ্ছি!!! কেন?

    কেন ইইউ বাইডেনের আঁচল ধরে হাটছেঃ
    সবশেষে একটা অনুমিত ধারণার কথা বলে বিদায় নিব। নতুন করে ইউক্রেন যুদ্ধে হাওয়া দেয়া, অস্ত্র পাঠানোর ঘটনায় বাইডেনের স্বার্থ না হয়  উপরে ব্যাখ্যা করলাম কিন্তু ইউরোপ মানে সারা ইইউ কেন বাইডেনের পিছনে??? ইইউ-এর নেতা দেশগুলোই বলছে রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই তারা চলতে পারবে না, অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত এমন থাকতেই হবে এই কথা তারা নিজেরাই বলছে। তাহলে  আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অষ্টিন যখন ২৬ এপ্রিল, ৪০ রাষ্ট্রের ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে বসেন তখন সেখানে ইইউ চুপ করে থাকল কেন??? অথচ আবার মিটিং শেষে বাইরে এসে এবার আবার তারা সোচ্চার তারা রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই চলতে পারবে না – বলা হচ্ছে এনিয়ে তারা বিভক্ত?? কেন এমন??
    এরই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা একটাই দেখতে পাই, সেকথাটাই বলব এখন!
    ইউক্রেনের যুদ্ধ আসলে এক হিসাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব আসন্ন পালাবদলে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রক্সি যুদ্ধ।  গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনা উত্থান এই অনিবার্য এবং অবজেকটিভ ঘটনাটাকে জবরদস্তিতে তবু বাইডেন যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টায় নেমেছে। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু যে ঘটনাটা পর্দার পিছনে সেদিকে একটু আলো ফেলি।
    গত প্রায় পাঁচশ বছর এভাবে অথবা সেভাবে দুনিয়া শাসন-আধিপত্য করে আসছে সাদা ককেশিয়ান এথনিক জনগোষ্ঠি –  এবং একারণে তাদের কালচারাল আধিপত্যও শাসন করছে আমাদের সভ্যতা শিখানো সরকার বদল সবই করছে। মূলত কলোনি দখল করে তারা টিকেছিল, এই সময়কালের বেশিরভাগ সময়টা। আজ তা চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ এই প্রথম এশিয়ার চীন গ্লোবাল ম্নেতা হবার পথে। যার সোজা অর্থ এই প্রথম এটা সাদা শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে।  আমাদের চেয়ে এই এথনিক সাদা গোষ্ঠি এদিকটা অনেক বেশি খেয়াল রেখেছে। এই সাদা শ্রেষ্ঠতত্ববাদ – যেটার রাজনৈতিক উপস্থিতির একালের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ডোনাল্ড ট্রাম্প; এটা যতটা না তার রিপাবলিক দল তার চেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষক তিনি নিজে। এরা তাই চীনা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসায় আপত্তি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার। আসলে সারা পশ্চিম জুড়ে চীনা উত্থান ইউরোপ-সহ সারা পশ্চিমা দেশ ও কালচারের মধ্যে একটা আতঙ্ক হিসাবে ছড়িয়ে গেছে, হাজির হয়েছে।
    বাইডেন কী সেই চীনা ভয় আতঙ্ক মনে করিয়ে দিয়ে বার বার ইইউ-কে নিজের নেতৃত্বের অধীনে  নিচ্ছে??
    কিন্তু সারা পশ্চিম চাইলেও তো চীনা উত্থান ঠেকাতে সক্ষম হবে না। কারণ, – যা অবজেকটিভ যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত ঘটনা – তা ঠেকানো সাবজেকটিভ কাজ নয়; কর্তা মানুষের সেখানে কোন ভুমিকা থাকে না। মানুষ চাইলেই ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্প ঠেকায় দিতে পারে না।  যেমন বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সাম্রাজ্য আমেরিকান উত্থান ঠেকাতে পারে নাই, নিজেই ডুবে গেছে! আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা হয়েছে ১৯৪৫ সাল থেকে। অবজেকটিভ ঘটনা  যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত – এটা কোন দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ইস্যুও না। তাই কারও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তা ঠেকানোও যাবে না। এটা অবজেকটিভ সক্ষমতা অর্থাৎ, এক অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইস্যু। ঠিক যে সক্ষমতার জোরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হয়েছিল আমেরিকা!! প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর  তাঁর পিছনে ছিল সেকালেই  –  সারা ওয়াল স্ট্রিট, এই অর্থনীতিক পাওয়ার সেন্টার!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৭ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    গৌতম দাস
    ০১ মে ২০২২, ০০:০৮  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-444

    –

         If China’s Economy Falls, Ours Will Too

           Dependence on China shrinks the US economy in Q1

    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ কথাটার মানে হল, এমন এক অবস্থা ও সিস্টেমের মধ্যে বসবাস যখন, মূলত আন্তঃরাষ্ট্রীয়ভাবে সব রাষ্ট্রের সাথে সবার এক ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলাই সেই গ্লোবাল সমাজের বৈশিষ্ঠ। দুনিয়াতে বাণিজ্য নতুন না অবশ্যই। তাই অনেকের মনে হতে পারে এই গ্লোবাল বাণিজ্য তো দুনিয়াতে সব সময়ের মতই এখনও আছে। কিন্তু সরি, তবু এ’কথাটা সত্যি না। বাণিজ্য বলতে আসলে দুটো মেজর ভাগ আছেঃ এক. কোন রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বাণিজ্য, অপরটা বা দুই. রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য। কেন এই ভাগের কথা বলছি? বাণিজ্য বলতে একটা আগাম-দরকারি [pre-requisite] শর্ত হল, বাণিজ্য ঘটতে হলে আগাম যার উপস্থিতি দরকার সেটা হল মুদ্রা [currency]। তাই বাণিজ্য ও মুদ্রা কার্যত সমনামীয় শব্দ। এখন মুদ্রা যে প্রচলন করত সেই অথরিটি হল সেকালের রাজা আর একালের ভাষায় রাষ্ট্র। আর কোনো দেশের মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা কেবল ঐ রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটাকেই তাই প্রথম ধরনের বাণিজ্য বলছি।

    এখন দ্বিতীয় ধরন মানে আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য যেটাকে বলে, এটা পরিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে মাত্র এই তো সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন ও ১৯৪৫ সালে এদের কার্যক্রম চালুর পর থেকে। মানে মাত্র ৭৭ বছর আগে থেকে। আর এখানে একই মানে কোন কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রা একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনেরও মুদ্রা হিশাবে ব্যবহৃত হয় তবে সেক্ষেত্রে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দ্বারা অনুমোদিত থাকতে হয়।  তাহলে কি এর আগে (১৯৪৫ সালের আগে) গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কিছু ছিল না? ‘ছিল না’ বলার মতই। মানে ছিল তবে খুবই সীমিত পর্যায়ে আর সেটাও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া থেকেই এই সীমিত বাণিজ্য ব্যবস্থাটাও চিরদিনের মত অকার্যকর হয়ে যায়। এছাড়া ঐ সীমিত বাণিজ্য মানে যা হারিয়ে যাওয়া সেকালের অর্থনীতির মূল তৎপরতারও ছিল খুবই তুচ্ছ এক অংশ। মূল প্রধান ধারার অর্থনীতি তা ছিল না। এছাড়া তা ছিল এক পরিবারের প্রাইভেট ব্যাংকের উদ্যোগ। রথশিল্ড ব্যাংক (Rothschild) যাকে ফ্যামিলি ব্যাঙ্কিং ডায়নেস্টি বলা হয়,  তা ইউরোপে ১৭৪৪ সাল থেকে ১৯১৪, এই সময়কালে ততপর ছিল। যদিও এনিয়ে কমিউনিস্ট প্রপাগান্ডামূলক ষড়যন্ত্রতত্বে লেখা প্রচুর ‘রহস্য’ ছড়ানো মুখরোচক আর্টিকেল অনলাইনে পাওয়া যায়। যেগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি খুব জরুরি কিছু না।  তবু এক পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে হলেও এই সীমিত বাণিজ্যও বা  কেন এমনভাবে তা চালু ছিল? অথবা অন্যভাবে বললে সেকালের ইউরোপে ব্যাপক কোন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় ছিল না কেন?

    কলোনিদখল ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিঃ
    এর মূল কারণ, সেকালে মানে ১৬০৭-১৯৪৫ সাল এই প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে চালু দুনিয়াটা ছিল কলোনি দখলদারদের যুগ। অর্থাৎ  আমাদের মত দেশকে কলোনিদখল করা – এই ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিক ততপরতা ছিল। যদিও এটাকে এই প্রথম ইতিহাসের রাজতন্ত্র ছেড়ে “রিপাবলিক” [republic] বা জন-রাষ্ট্র গড়ার যুগ বলে প্রশংসিত। তবুও এর সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল ওমন নব-রাষ্ট্রগুলোর প্রধান অর্থনীতি বলতে তা ছিল জাহাজে বিনিয়োগ আর সেই জাহাজ বেয়ে কলোনিদখল করে বেড়ানো। সোজা ভাষায় অন্যের দেশ দখল ও তার সম্পদ লুটে নিজ দেশে আনা। মানে সে সময়কালে  স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে ছিল ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি দখলদার দেশ (বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, পর্তুগীজ ও স্পানিজ) আর বেশির ভাগই এদের কারো না কারো কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ। আর এর ব্যতিক্রম হিসাবে ছিল রাশিয়ান জার বা অটোমান সাম্রাজ্য ধরনের কিছু সাম্রাজ্য অথবা আমেরিকা (১৭৭৬ সালের  আগে পর্যন্ত ছিল কলোনি) পরে স্বাধীন দেশ। ফলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য বলতে বড় কিছুই ছিল না; মূল অর্থনীতিও তা ছিল না। তবে একটা বিশেষ ধরনের লেনদেন ছিল যে, দখল হয়ে থাকা কলোনি (যেমন বৃটিশ-ইন্ডিয়া) থেকে একপক্ষীয় সম্পদ পাচার  ধরণের ততপরতা; মানে বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে তাদের মূল ভূখণ্ড ইংল্যান্ডে সম্পদ লুটে নিয়ে যাওয়া ধরনের। এভাবে “ওয়ান ওয়ে” সম্পদ পাচারের ততপরতা, একে ঠিক বাণিজ্য বলা মুশকিল এবং তা অর্থহীনও!! আবার যেমন বরফ আবিষ্কারের পরে বৃটিশ আমলেই, আমেরিকা থেকে জাহাজ ভরে কলকাতার এলিটদের জন্য বরফের জাহাজ আসত। এটা বৃটিশ-ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা ছিল না বলে একে কলোনি ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা মনে করা মুশকিল। তবে কলোনি সম্পর্কের কারণেই বা কোন স্বাধীন রাষ্ট্র না থাকার কারণেই মূলত সেকালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে কিছু গড়ে উঠেনি।

    তাই ১৯৪৪ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও পরের বছর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল নয়া কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো ও পুরানা রাষ্ট্র, সবার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করার জন্য; একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। একদিক থেকে এটা ছিল এক বিশাল তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা যে দুনিয়াব্যাপী এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এবং এমন এক দুনিয়াতে যেখানে আইনিভাবেই আর কোন দেশকে আর কলোনি করে রাখা যায় না। জাতিসংঘের আইনে ও দৃষ্টিতে তা বেআইনি ও অন্যায়।  তবু নয়া এই গড়ে উঠা বাণিজ্য ব্যবস্থা এর পণ্য বিনিময়ের সিস্টেমটা বড়লোক দেশগুলোর দিকে কান্নি মারা ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। তাই এই বিনিময় ব্যবস্থায় বৈষম্য আছে।  তবে এটা অস্বীকার-উপেক্ষা করা ভুল হবে যে ১৯৪৫ সালের আগের কোন বাণিজ্য ব্যবস্থাই না থাকার চেয়ে এবং ইউরোপের হাতে কলোনি দখল হয়ে  না থাকার চেয়ে এমন স্বাধীন রাষ্ট্র অবশ্যই ভাল!
    কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরও কিছু রাষ্ট্র যারা জাতিসঙ্ঘের সদস্য হলেও তবু তারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি বা তাদের করা হয়নি। অন্য ভাষায় বললে, এরা মূলত তখনকার কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো, এরাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি। তাই এই অপারগতার জন্য তারা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় যোগ দিবার যোগ্য হয়নি। তবে এনিয়ে আরেকটু বিস্তারে বলা দরকার।

    বাণিজ্য ও কমিউনিজমঃ
    কমিউনিজমে কী বাণিজ্য থাকে? মানে কমিউনিস্ট দেশের অর্থনীতিতে কী বাণিজ্য থাকে? মানে অনুমোদিত?? এই হল, আদি কনফিউশন! আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যও না থাকলে আভ্যন্তরীণভাবে যেকোন উতপাদিত পণ্য  বিতরণ মানে ভোক্তা পর্যন্ত তা পৌছে দিবার বিতরণ ব্যবস্থা (এটাই ট্রেড বা বাণিজ্য) বলে কী ওদেশে কিছুই নাই? আর থাকলেই বা তা কেমন?
    তবুও স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন-এই মোড়ল কমিউনিস্ট দেশ, এর প্রতিনিধি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের সময় উপস্থিত ছিলেন। বিখ্যাত ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে টানা ২২ দিনের সেই সম্মেলনে কিছু সোভিয়েত প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম নিয়ে আলোচনা ও দলিলপত্র খসড়া তৈরি শেষে, পরে দলিল স্বাক্ষরের সময় এবং তারও পরবর্তী সময়ে সদস্যপদের চাঁদা জমা দিয়ে সদস্য হওয়ার সময় সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও পরে স্টালিন বেঁচে ছিলেন ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি তা কাউকে জানানো হয়নি। অথবা এই নিয়ে স্টালিন কোন কারণ তুলে ধরেছেন বা লেখাও লিখেছেন বলে জানা যায় না। আবার  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবার পরে যদিও কমিউনিস্ট দেশগুলো আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হবে না – এমন একজোট হয়ে কোন দিন এধরনের কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও সত্য নয়।
    তবে এখান থেকেই একদিকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু আর অন্যদিকে এসবের বাইরে থেকে গেছিল ২০-২৫ রাষ্ট্র যারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নেয় নাই। যার অর্থ এই ২০-২৫ রাষ্ট্র এদের নিজেদের মধ্যেও কোন বাণিজ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না। প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিক অস্তিত্ব হয়ে টিকে ছিল। যদিও এমন দেশগুলোকে “সোভিয়েত ব্লক” বা “কমিউনিস্ট ব্লকের” রাষ্ট্র বলার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। আর তা টিকে ছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে না যাওয়া পর্যন্ত।
    তবে কেবল পোল্যান্ডের কথা কিছু জানা যায়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে কার্যক্রম শুরু করলে পোল্যান্ড কমিউনিস্ট ব্লকের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকও রাজি ছিল, অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল একদিন না একদিন সবদেশকেই একই গ্লোবাল অর্থনীতির সম্পর্কের মধ্যে  আনা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেট। কাজেই তাঁরা পোল্যান্ডকে সদস্যপদ দিবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাড়া ও সমর্থন না পাওয়াতে ব্যাপারটা ওখানেই থেমে যায়। অর্থাৎ পরে সদস্যপদ না নেয়া বা পাওয়ার সিদ্ধান্তটা আর একা সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর সমস্যা থাকেনি। আমেরিকার না চাওয়াও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

    কিন্তু অন্য দিক থেকে বললে, কমিউনিস্ট  দেশের ব্যবহারিক চিন্তায়, বাইরের অন্যদেশের সাথে কোনো আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য – এই আইডিয়াটা নিয়ে কমিউনিস্টদের মধ্যেই মূলত অস্বস্তি ও অস্পষ্টতা ছিল গভীর এবং যা এখনো কমিউনিস্ট চিন্তায় আছে- এ কথাও আরেক কড়া সত্য। এটা অনেকটা যেন ‘কমিউনিস্ট হারাম-হালাল’-এর সমস্যা। যেমন কমিউনিস্ট চোখে খোদ বাণিজ্য জিনিসটা কি হালাল? উৎপাদন একমাত্র সরকারি মালিকানায় হতে হবে এই ছিল সেকালের কমিউনিস্ট রাস্তা। ফলে এর সাথে আবার বাণিজ্যের দরকারটা কী? এমনই ছিল মনোভাবটা। যার সারকথা হল, এসব চিন্তার মুল জায়গাটা হল কমিউনিস্ট অর্থনীতিক চিন্তায় তাদের অর্থনীতিতে “পণ্য আমদানি” বলে কোন ধারনা নাই।
    তবে এসব অস্পষ্ট কথা হয়ত সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নে নিজে অনেক বড় দেশ বলে চিন্তা করা যেত যে, দেশের প্রয়োজনীয় সব ভোগ্যপণ্যই সে নিজ দেশে উৎপাদন করে নিবে। তাই, পণ্য আমদানি হীনতার অর্থনীতি এটাই কমিউনিস্টদের বাস্তব অর্থনীতি বলে খারা করা সম্ভব হয়েছিল।   কিন্তু তুলনায় ধরা যাক বাংলাদেশের মত ছোট কোনো কমিউনিস্ট দেশ হলে তার বেলায় কী হবে?? সব প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য অথবা এমনকি কোন কাঁচামাল আমদানি তার জন্য অত্যাবশিকীয়। কারণ তার পক্ষে এসব কিছুই নিজ দেশে উতপাদন করা অথবা কম শ্রমমুল্যে তৈরি করাই অসম্ভব হবে। এছাড়াও আরেক বড় সমস্যা! তার ব্যাপক প্রয়োজনীয় হবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ পাওয়ার। এবং সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কারখানা নির্মাণে সরাসরি  বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) – এদুটাই ঐ কমিউনিস্ট দেশ কোনভাবেই যোগাড় করতে পারবে না। তত্সব হিশাবে দুনিয়ার প্রত্যেকটা দেশ বা অর্থনীতি নিজের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিজেই জেনারেট ও সঞ্চয় করে থাকে। ফলে বিদেশ থেকে ঋণ আনা প্রয়োজনীয় হবার কথা না। কিন্তু শতভাগ বাস্তবতা হল, আমাদের মত সবদেশই নিজ প্রয়োজনীয়  যে থাকবে এটাও স্বাভাবিক; তার পক্ষে আমদানি বাণিজ্য ছাড়া গতি কী? এ ছাড়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য ছিল না বলে কমিউনিস্ট দেশগুলো বাণিজ্যে জড়িত হতে সুযোগ না পেয়ে ধুঁকে মরেছে। যদিও আধাখেঁচড়াভাবে কথিত বার্টার সিস্টেমের কথা বলে বছরে একবার হয়তো কোনো পণ্য ‘আমদানি’ করতে তাদের দেখা গিয়েছে। কেবল অবাস্তব জিদটাই থেকে গিয়েছে!!

    সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মেঃ
    অথচ পুরা কমিউনিজমেই বাণিজ্য করা যাবে কি না, সহি বা তা সঙ্গত কি না এই অস্পষ্টতা কখনো কাটেনি। সারপ্লাস ভ্যলু বা শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিবে এমন নয়া এক অর্থনীতির তাঁরা প্রচলন করবেই। বাস্তবে এই চরমপণ এর প্রতিরুপ হল কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” যেটা কার্যত –  “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়লেই নাকি সেই কাম্য সমাধান পাওয়া যাবে – কিন্তু নানান কারণে এই কল্পিত অর্থনৈতিক সিস্টেমটাই  কার্যত যেন টিকে থাকে তা কায়েম করাই যায় নাই।  ফলে কল্পিত সেই “শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিতে পারব – এমন অর্থনীতিটাই অধরা থেকে গেছে, এই হল কড়া বাস্তবতা। এতে সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও তবু “সেই কল্পনাটা মানে সমাজতন্ত্র – সেটাই ভাল ছিল” – এই জিদটাই কেবল এখনও টিকে আছে।  কিন্তু জিদ – এটা না কল্পনায় না বাস্তবে – এর কোনই মুল্য নাই, অর্থহীন।
    এটা তো গেল সেই সমাজতন্ত্র ভাবনা যার সারকথাটা এখন হতে পারে যে “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়াটাই টিকানো যায় নাই বলে এই পদ্ধতিতেও শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত আনার প্রতিশ্রুতিও ব্যার্থ হয়ে গেছে। তাই এখন আবার নতুন কোন অর্থব্যবস্থা – একটা সাসটেইনেবল কিছু কি করা যায় তা নিয়ে নয়া খোজ শুরু করতে হবে। কিন্তু এতে আমাদের আলোচ্য ইস্যু যে কমিউনিস্টদের জন্য বাণিজ্য হালাল কিনা – এই অনুমান-বিশ্বাসও জড়িয়ে আছে বলে – এই প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে গেছে ফলে বাণিজ্য ও কমিউনিজম – এদের পারস্পরিক সম্পর্কও কমিউনিজমে অমীমাংসিত। তবে এটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলেও কার্যত সকলেই বাস্তবে তা মেনে নিয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট নিজেই ব্যবসা করছে, ব্যবসাদারদের বিল্ডিং ভাড়া দিয়ে সে পয়সায় দল চালাচ্ছে।   যেখানে সারা বাংলাদেশের অর্থনীতিটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ  মানে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের  অংশ এখন। তখন আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন বা রাস্তায় ভিখারি কিংবা উন্নয়ন কনসালটেন্ট বা গবেষক কিংবা বসে বসে বই লিখছেন – ইত্যাদি যাই করেন কোন ফারাক নাই। আপনি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থের ভাগীদার। এই ক্যাপিটালিজম আপনার মুখের ভাতের প্রতিটা গ্রাস এর যোগানদাতা। আমাদের রক্তের কণায় কণায় ক্যাপিটালিজম। তাহলে আপনি কমিউনিস্ট হন আর না হন  কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মে???

    গ্লোবাল বাণিজ্যের পণ্য কেনাবেচায় অংশ নিতে গেলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে থাকতেই হবে এটা একটা আবশ্যিক পূর্বশর্ত। তা মূলত এজন্য যে, প্রত্যেক দেশের নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশের কোনো পণ্য কেনাবেচায় অংশ নেয়া সম্ভব নয়। কারণ নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশী পণ্যের মূল্য নিজ মুদ্রায় কত, তা জানা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের মুদ্রার নাম এসডিআর [SDR] যার মান প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠান, এক মার্কিন ডলার সমান কত এসডিআর তা প্রকাশ করে থাকে। সাধারণত তা, এক ডলার মানে ০.৭৪৩ এসডিআর – বিনিময় হার এর ‘আশপাশে’ হয়ে থাকে। আর এখান থেকেই প্রত্যেক সদস্য দেশ তার মুদ্রার মান বা তুল্য বিনিময় হার সম্পর্কে জেনে নিতে পারে। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে সেটাও জানা সম্ভব নয়। তাই এমন কমিউনিস্ট দেশের পক্ষে অন্যদেশের সাথে কোন বাণিজ্য করা অসম্ভব।

    কবে কার্যত কমিউনিস্ট দেশগুলোর “বাণিজ্য করা পাপ” ধারণা থেকে আপাত মুক্তি মিলেঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। ভেঙে রাশিয়াসহ মোট ১৫টা আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে। আর এরপর এসব রাষ্ট্র সবাই নতুন রাষ্ট্র হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করেছিল। ১৯৯২ সালের মধ্যে তারা সবাই সদস্যপদ লাভ করে, গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেবার যোগ্য হয়ে যায়। কমিউনিজম মাথায় থাক কিন্তু পাপ-মুক্তি মিলে যায় সকল কমিউনিস্ট দেশে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম চীন। মাও-এর চীন  সকল কমিউনিস্ট দেশের আগে অগ্রগামি যে ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। কখন ও কিভাবে সেই সময় সেকথা আপাতত এখানে না বলি; অন্য কখনও বলব বা বলাই আছে!!
    ফলে বলতে গেলে, সোভিয়েত ভেঙ্গে গেলে পরে সেই প্রথম সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্রই একই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে যায় মানে, গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চালু করার কার্যক্রমও যা পারে নাই তা সেই প্রথম সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে, দুনিয়াতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীনস্থ গ্লোবাল অর্থনৈতিক এক মহাগোষ্ঠীর বাইরে ‘সোভিয়েত অর্থনৈতিক ব্লক’ বলে আর কোনো দেশ থাকার অবসান ঘটেছিল।

    আগের এই ব্লক রাজনীতিতে দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা রাজনীতির আরেক প্রকাশ ছিল কোল্ড ওয়ার। মানে হল আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন (গত পঞ্চাশের দশক থেকে) এদুই পরাশক্তির রেষারেষি থেকে তারা যেন সবসময় কোনো যুদ্ধাবস্থায়, এমন টেনশন দেখা যেত; অথচ বাস্তবে তারা কোনো যুদ্ধে জড়িত নয় এমন থাকলেও এই টেনশন কাজ করত। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ায় এই কোল্ড ওয়ারের অবসান ঘটেছে।

    আমেরিকার নয়া অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনঃ
    কিন্তু একালে আমেরিকার নয়া প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, যার অর্থনীতি ২০২৮-৩০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে নানান স্বাধীন পরিসংখ্যানগত অনুমান বলছে। যেহেতু এখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তাও অভ্যাসবশত অনেক অধ্যাপকেও  প্রায়ই মন্তব্য প্রকাশ করতে দেখা যায় যে, আবার কি কোল্ড ওয়ার তাহলে ফিরে আসবে? ফ্যাক্টস হল, কোল্ড ওয়ার দুনিয়াতে সত্যিকারার্থে আর ফিরে আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই। এর একেবারেই মৌলিক কারণটা হল, এখন দুনিয়ার প্রায় সব দেশ একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ (আমরা অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তা পছন্দ করি বা না করি) হয়ে গেছে যে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। আর পুরনো কোল্ড ওয়ার যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে কিছু রাষ্ট্র ছিল যারা গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়নি বা সম্পর্কিত ছিল না। সেটাও এখন আর নাই। আর কোল্ড ওয়ার রেষারেষি সেকালে (১৯৫০-৯১) এর বাস্তবতায় দেখতে পাবার একটা বড় কারণ ছিল এমন ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে আলাদা অর্থনৈতিক ব্লক হিসাবে কিছু দেশের অস্তিত্ব থাকার সুযোগ তখন ছিল, তাই। একালে এই বাস্তবতাটাই আর নাই, সব লোপ পেয়ে গেছে। এখন সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। তাই চাইলেও কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আবহ আবার তৈরি করা সম্ভব নয়।

    তাহলে একালে এই ব্যাপারটা আমরা এখন কী বা কেমন হবে-থাকবে, নতুন করে কী দেখতে পাবো?
    উপরে এতক্ষণ ধরে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থাটা নিয়ে পাঠকের ধৈর্য চুরি করে কথাগুলো বলে গিয়েছি – এখন সিদ্ধান্ত টানতে পারব বলে।

    “এশিয়া টাইমস” [Asia Times] হংকং থেকে প্রকাশিত এক প্রভাবশালী পলিটিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ওয়েব পত্রিকা। বলা যায় যেন এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল“।  এর গত ২৮ এপ্রিল এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আমেরিকান অর্থনীতি প্রথম কোয়ার্টারে জিডিপি নেমে গেছে” [Dependence on China shrinks the US economy in Q1]।’ এর ভিতরের রিপোর্ট বলতে চাইছে, আমেরিকান অর্থনীতি চীনা পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কারণে আমেরিকার জিডিপি চীনের সাথেই ওঠানামা করা শুরু করেছে। এ কারণে রিপোর্টারের মন্তব্যঃ  দুনিয়াতে আগের কোনো রেকর্ড নেই এমন এক ঘটনা এটা- দুনিয়ার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বা রাইভাল [rival] অর্থনীতি তারা এমনই আজব রাইভাল যে, তারা একে অপর দেশটা থেকে আমদানিতে পণ্য আনাতে নির্ভরশীল হয়ে গেছে, অথচ তারা স্ট্র্যাটেজিকভাবে রাইভ্যাল দুই দেশ যে, পারলে অপরকে মেরে ফেলে! সারকথায় এতে চীন-আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি আমেরিকার বিরুদ্ধে, চীনের পক্ষে গেছে। চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি এখন প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার আর এটাই আমেরিকার জিডিপি-কে নামিয়ে দিয়েছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে ক্রমশ এই ঘটনাটা ঘটে গেছে। ট্রাম্প আমলের সাথে তুলনায় চীনাপণ্য আমদানি এখন ৬০% বেড়ে গেছে।

    তাহলে, এখানে প্রাসঙ্গিক মূল কথাটা হল, একালে কোল্ড ওয়ার উত্তর যুগে, কেউ কারও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বলে তার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নাই বা করা যাবে না – বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না। একালে বরং রাইভালের সাথেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক হতে দেখা যাবে; তা অবশ্যই হবে। এমনকি তা সবচেয়ে গভীর নির্ভরশীলতার অর্থনৈতিক সম্পর্কে ডুবে থাকছে ও থাকবে। এখানেই একাল পুরোপুরি আলাদা!  আর এখান থেকেই জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝা একেবারে ফেল করে, অচল হয়ে যায়। জাতবাদি বুঝের উল্টাটাই বাস্তবে দেখা যায়।  অতএব কোল্ড ওয়ারের যুগ আবার দুনিয়াতে ফিরে আসবে বলে কেউ যেন গল্প না ফাঁদে। আর সাথে জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝ যেন আর কেউ প্রাকটিশ না করে নিজেকে যেন শাসন করে রাখে!!

    আর এটাই কমবেশি একই অবস্থা ভারত-চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যেও। প্রথমত তারা উভয় দেশ এখন ঘোরতর এক বাণিজ্য সম্পর্কে লেপটে জড়িয়ে আছে। অথচ তারা প্রবল ও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক রাইভ্যাল দুই দেশ। ভারত পারলে চীনকে ছিড়ে খায়!! ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখছে, ‘২০২১ সালের পরিসংখ্যান বলছে গত এক বছরে ভারতের চীনা পণ্য আমদানি বেড়েছে ৪৩%।’ এই খবরের শিরোনামটা হল, [Amid bilateral chill, India-China trade marks record surge in 2021]  অথচ চীন-ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন শীতলতম, ঠাণ্ডা। গত  ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে নরেন্দ্র মোদি গত কয়েক বছর ধরে চীনা আমদানি কমাবেন বলে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলেন – স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ [Swadeshi Jagran Manch] নামে আগে থেকে এক সংগঠন গড়া ছিল সেটা দিয়ে। কিন্তু ফলাফল উল্টা এবং নিজের এই দুরবস্থা দেখে মোদিও নিশ্চুপ!

    এটাই কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী যুগের ফেনোমেনো। কারো সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক থাকলেও সে দেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক, আমদানি নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আরো জোরদার হতে পারে, একালে। সোজা কথায় জাতিবাদী অর্থনীতি বলে কোনো ধারণা এখানে ব্যর্থ শুধু নয়; জাদুঘর আর্কাইভে ফেলে রেখে দিবার বিষয় হয়ে গেছে। বাস্তবে বরং প্রায় উল্টারূপে তা  এখন হাজির হচ্ছে! তাই মোদি এ নিয়ে এখন একেবারেই চুপ!

    কিন্তু ব্রহ্ম চেলানি ততই ভোকাল!
    ব্রহ্ম চেলানি [Brahma Chellaney] – ছোট হলেও দিল্লিতে তার একটা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান আছে; নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ। প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক বলা যায়। কিন্তু এই বাইডেনের আমলে তিনি বারে বারে বাইডেনের ওপর ক্ষেপে উঠছেন। আবার প্রচণ্ড চীনবিরোধী তিনি, আর তা কখনও একেবারে আনলাইক একাদেমিক স্বভাবে!!!  সময়ে মোদির চেয়েও বেশি ন্যাশনালিস্ট হয়ে উঠতে দেখা যায় তাকে! চীনকে তিনি ‘আগ্রাসনবাদী চীন’ [aggressor]- সবসময় তিনি এভাবে লিখেন। মানে সময়ে তিনি আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে চীনবিরোধি হয়ে যান। এমনকি খোদ তিনিই আমেরিকার-বিরোধি হয়ে উঠেছিলেন একসময়।  তাকে প্রথম এমন ক্ষেপে উঠতে দেখা গিয়েছিল গত ২০২১ আগষ্টে বাইডেন যখন আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসেন; সব সেনা ফিরিয়ে আনেন। চেলানি পরাশক্তির এই শিয়াল ভূমিকা দেখে এটা মেনে নিতে পারেননি। তাই  বাইডেনেরই কঠোর সমালোচনা করেছিলেন আর সেটা এমনই পর্যায়ে যে  প্রায় ফিরে যেন তিনি আবার বুশের কোলে গিয়ে উঠতে চাইছেন দশা!

    সেই ব্রহ্ম চেলানি, তিনি ইদানীং আবার ক্ষুব্ধ! প্রধানত কোয়াডকে [QUAD] নিয়ে। কোয়াড-এর  চার দেশের প্রধানদের এবার সাক্ষাতে (অন লাইন বা ভার্চুয়াল নয়) সম্মেলন হচ্ছে আগামী ২৪ মে ২০২২। আর তাতে এখনই চেলানির হইচই শুনে মনে হচ্ছে যেন এবার ভারতের বদলে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম নতুন অন্তর্ভুক্ত হবার কথা উঠেছে, তা হয়েই যাবে। সেটা হোক আর না হোক, চেলানির এবারের কলামের (প্রথম আলো যার অনুবাদ ছেপেছে – কোয়াড কি চীনকে ঠেকানোর লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছে? – এই নামে) শিরোনাম। বুঝা যাচ্ছে এখানেও খুবই এগ্রেসিভ তিনি! যেমন-  আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে ঠেকানো যেন কোয়াডের লক্ষ্য এটা ধরে নিয়ে তিনি লিখছেন। অথচ, এটা বোধহয় কোথাও পাওয়া যাবে না।
    যা হোক, তিনি কোয়াডের চার দেশের উপরই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। কেন? তিনি দেখতে চান যে, এ’চার দেশের কারো সাথে চীন থেকে চীনা পণ্য-আমদানির বা বাণিজ্য সম্পর্ক বলতে কিছু নাই। অর্থাৎ মনে মনে তিনি যেন একটা কোল্ড ওয়ার আমলের সোভিয়েত-আমেরিকা সম্পর্ক দেখতে চাইছেন। এ কারণে তিনি মোদির উপরেও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত!

    কিন্তু তাকে কে বুঝাবে, একালের গ্লোবাল পরিস্থিতিতে তিনি যেমনই একে দেখতে চান না কেন সেটা আর দেখার সুযোগই নাই; সব বদলে গেছে। অর্থাৎ উপরে লেখার শুরুতে গ্লোবাল বাণিজ্য ও এর গতিপ্রকৃতিকে প্রসঙ্গ করে অর্ধেরই বেশি পাতা খরচ করেছি – এজন্য যে এই ধারণাটা সকল পাঠকেরই খুব কাজে লাগবে। অসংখ্য  ব্রহ্ম চেলানি-রা ছড়িয়ে আছে এবং আরো গজাবে। কিন্তু তাঁরা কী বলতে চাইছেন এবং কেন এসব কথাগুলোর এখন আর বাস্তবতা নাই – সেটা সম্পর্কে পাঠকে সচেতন ও প্রস্তুত করতেই এই লেখা।  ফলে কোল্ড ওয়ার যুগের মত চেহারা-বৈশিষ্ট্য একালে আর দেখা যাবে না বা তা আর ফিরবে না। জাতিবাদী অর্থনীতিই তো লোপ পেয়ে গেছে – সেই ১৯৮০ সালের শুরু থেকেই গ্লোবাল বাণিজ্যই দুনিয়ার মুখ্য অভিমুখ হতে চেয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গেছে। অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন জীবিত থাকতেই এই পরিবর্তন যাত্রা শুরু করেছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর থেকেই বাণিজ্য গ্লোবাল হয়ে  উঠা আর এর প্রভাব টের পাওয়া প্রবলভাবে শুরু হয়েছে। তাই একালের বৈশিষ্ট্য হল, যেকোনো দেশের স্ট্র্যাটেজিক রাইভালের সাথেও তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক একালে অবশ্যই থাকবে। সেটা চীন হলেও তাতেও ব্যত্যয় ঘটবে না;  বরং যেন আরও ভালোভাবে থাকবে। কারণ যেসব চীনাপণ্য সবচেয়ে সস্তা তা আপনি না কিনে (আমদানি করে) তো আপনার রেহাই নেই। বরং চীনাপণ্য কিনতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবানই মনে করবেন।
    যেমন এই উদাহরণটা ভালো করে লক্ষ করেন!!!  তবে সাবধান এটা চীনের প্রশংসার ইস্যু নয় বা চীনের প্রশংসা করার জন্য লিখা মনে করলে ভুল হবে। বরং আজকের বাস্তবতাটা খেয়াল করতে ও বুঝতে হবে। ভারতে বেশির ভাগই জাপানি প্রাইভেট কার – এই গাড়ির জয়েন্ট ভেঞ্চারে গড়ে ওঠা কারখানা ভারতে আছে। কিন্তু সেই জাপানই মোদি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে যেন চীনা স্পেয়ার্সের (যন্ত্রাংশ) ওপর বাড়তি ট্যাক্স বসানো না হয়। মানে, প্রত্যাহার করা হয়। কেন? কারণ, গাড়ির অরিজিন জাপানি আর এসেম্বল ভারতে হলেও এর স্পেয়ার্সগুলো ভারতে বসে ওর যন্ত্রাংশগুলো চীনাপণ্য আমদানি করে এনে লাগানো। কারণ চীনা স্পেয়ার্স-এর দাম আকাশপাতাল কম। সে কারণেই জাপান সরকারের নিজেরই অনুরোধ এটা মোদির কাছে। [ভারতের বোকার “জাতিবাদি অর্থনীতি বুঝ” যে অচল ও অকেজো সেটা দেখাতে ২০২০ সালের আমারই এক পুরান লেখা এখানে দেখা যেতে পারে। ]

    অর্থাৎ ব্রহ্ম চেলানির চিন্তাটা পুরনো যা ১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত কোনোমতে চলতে পারা “জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ” দিয়ে তৈরি। অথচ এই “মফস্বলি বুঝ” নিয়ে তিনি এখন দুনিয়াকে এবং কোয়াড-দেশের অর্থনীতিকেও ব্যাখ্যা করতে গেছেন। এর মানে, তিনি খোয়াবে আছেন যে, তিনি যেন ১৯৮০ সালের আগেই এখনো আছেন।

    এমনকি তিনি চীনা আরসিইপি [RCEP] জোট মানে যেটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশন শেয়ার্ড প্রোডাক্ট’ উৎপাদনের এক নয়া জোট যেটা আসলেই এক বিরাট আগামী সম্ভাবনার জোট – এর প্রবল বিরোধিতাও করেছেন। জাতিবাদি বুঝের ভারত এতে যোগ দিতে চায়না, আঙুর ফল টক মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশ সাহস করে এত যোগ দিবার আবেদন করেছে সঠিক ভাবেই। বহু আগে থেকেই বলে আসছি যে, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক গ্রাজুয়েট-বিশ্ববিদ্যালয় লেভেল থেকেই সিলেবাসে অর্থনীতিকেও অন্তত একটা সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে একালে রাখতেই হবে। কারণ যে কেউ অর্থনীতির কিছু না পড়লেও নিজেকে জাতিবাদী অর্থনীতির ওস্তাদ বলে হাজির করতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখন জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ থেকে বহু দূরে চলে গেছে। কাজেই নতুন বাস্তবতা বুঝতে অন্তত কিছু অর্থনৈতিক নতুন ধারণা জানতেই লাগবে। অনেক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক প্রফেসরের মধ্যেও এই (জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ দিয়ে সব ব্যাখ্যার) ঝোঁক দেখা দিতে পারে বা এখনও থেকে যেতে পারে।

    তাই অন্তত জাতিবাদী অর্থনীতির বাস্তবতা যে আর নাই এটুকু রিয়ালাইজ করাই হবে তাদের প্রথম পাঠ! মোদির “স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ’ তাই এখন চীনের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ। আবার সাবধান, ব্যাপারটা চীন বলে নয়; যেকোনো দেশের সাথে হতে পারে। বিদেশী পণ্য আমদানি এখন সাধারণ ব্যাপার যখন আপনিও রফতানিকারক। এটা গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ!

    তাই যাকে পছন্দ করেন না তার সাথেই সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক; ফলে রাজনীতিক সম্পর্ক শীতল থাকলেও বাণিজ্যিক  ঘনিষ্ঠতাই এখান খুবই স্বাভাবিক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “যারে দেখতে পারি না তার আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই, কেন? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জয়শঙ্করের সফর

    জয়শঙ্করের সফর
    গৌতম দাস
    ২৮ এপ্রিল ২০২২

    সম্ভবত এই প্রথম জয়শঙ্করের সফরকে প্রথম আলো – এর পক্ষে থেকে দেখতে পারবে না!
    দুনিয়া আসলেই বড় অদ্ভুত যায়গা! অথচ যেটা গুণে গুণে চারদিন আগেও  হয়ত পারত।

     জয়শঙ্করের সফরের উদ্দেশ্য কী? হাসিনা-মোদি কী বাইডেনকে তাদের সম্মিলিত আবেদন দিয়ে উল্টা চাপ দিতে চাইছেন?? হাসিনা-মোদি কী বাইডেনকে তাদের সম্মিলিত আবেদন দিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন?? আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু ফলাফল হবে সম্ভবত তাঁরা দুজনেই ফেল করবেন!

    কিন্তু কেন চাপ দিবেন, কী নিয়ে?
    যদি সব ঠিকঠাক থাকে, দুই প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বলতে চাইবেন তাঁদের উপর বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার – এদুই খড়্গ এর প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। শুধু এতটুকুই না, প্রচ্ছন্ন বা অস্পষ্ট হুমকিও থাকতে পারে যে অন্যথায় তাঁরা রাশিয়ার কোলে গিয়ে উঠে বসতেও পারে। তবে ততদুর যাক না-যাক এমন হুমকি দিতে পারে!

    জয়শঙ্করের সফরে একান্ত বিষয়ক সব আলাপের কারণ, ব্যক্তিগত ভাবে (অন্যের মুখে) ভারত যা বলছে হাসিনা যা শুনেছে এটাই ‘মোদির ভারতের’ সব ঠিকঠাক অবস্থান কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া খুবই জরুরি; তাই!
    যেমন মোদির বুঝ হতে পারে তাঁরা একসাথে চাপ দিবে এতদুর ঠিক আছে। তবে শেষে ভারত সত্যিই আমেরিকার হাত ছেড়েই দিব – এখনই তা সিদ্ধান্ত নেয় নাই বা এতদুর যাবে না। বা হুমকি-ইঙ্গিতও দিবে না। এমন হতে পারে। তাই আগাম ভারতের মনের কথা বুঝে নেওয়াটা খুবই জরুরি হাসিনার জন্য। পথে নামার আগেই এসব বিষয় ব্যক্তিগতভাবে পরিস্কার হতেই হবে, বুদ্ধিমান হতে হলে!
    আর যদি হাসিনা অন-বোর্ড হয়েছে এজন্য যে মোদি তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেই যে আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা পর্যন্ত মোদি যেতে রাজি – এমনটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিক একান্ত আলাপে জয়শঙ্করকে নিশ্চিত করতে হবে যে হা, মোদির ভারত বাইডেনকে ছেড়ে আসা পর্যন্ত চিন্তা করেছে!
    আসলে উপরের পুরা ঘটনাটা একটা পশ্চাদ পটভুমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তা হল, মোদি-বাইডেন সম্পর্কের সর্বশেষ অবস্থা। ক্রমশ এটা এখন এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে বাইডেনের পক্ষে মোদির উপর নিজ দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার- এদুই খড়্গ ব্যবহার ত্যাগ করা একেবারেই সম্ভব না। অন্তত কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘণ – এটা তো বাইডেনের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। এছাড়া এখন ভারতের বেলায় এটা ছাড় দিলে বাইডেনের ইমান উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন এই সন্দেহ তৈরি হবে। কারণ এই একই অস্ত্র রাশিয়ার পুতিন সহ চীন ও সবার উপরেই প্রয়োগ ব্যবহার বাইডেনকে করে যেতে হবে। সেটা ইউনিফর্ম থাকবে না তাহলে! তাই ভারতের বেলায় বাইডেন যতটুকু খাতির করতে পারে তা হল এখনই তিনটা অবরোধ আরোপ করার সুপারিশ বাইডেনের অফিসে পেন্ডিং – তা আরো বড়জোর কয়েক মাস পেন্ডিং ফেলে রাখা। কিন্তু কোনভাবেই তা বাতিল বা ভারতকে বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দেয়া জাতীয় কথা উচ্চারণই বাইডেন করতে পারবেন না।
    ওদিকে মোদির সমস্যা হল, কমপক্ষে আগামি ২০২৪ সালে নিজের পুনঃনির্বাচন পর্যন্ত সব নির্বাচনে মোদিকে মুসলমান কোপানো-হত্যার কথা সরাসরি বলে চলতেই হবে – এই নীতিতে তাকে দল ও রাজনীতি পরিচালিত করতেই হবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ বলে ক্ষুব্ধ হিন্দু -ভোটারদের নিজের বাক্সে আনার জন্য এটাই মোদির হাতের শেষ অস্ত্র। কাজেই বাইডেনের মানবাধিকার বা অবরোধের ভয় আমল করার অবস্থায় নুন্যতম ভাবে বাইডেনকে ছাড় দিবার অবস্থায় মোদি নাই। বরং বাইডেনের এই মানবাধিকারের হুমকি উল্টা ভারতে দেশের ভিতরের – সুপ্রীম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনার বা আমলাদেরকে মোদির বিরুদ্ধে সাহসী করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে সাবেক শত আমলা-সচিব মোদির বিরুদ্ধে নাগরিক-বৈষম্য ও মুসলমান হত্যা ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছে [ঘৃণা আর বিদ্বেষের আবহে আমরা ভীত! মোদীকে খোলা চিঠি প্রাক্তন আমলাদের]। যেটা মোদির জন্য খুবই এলার্মিং!
    তাহলে সারকথা – মোদি আর বাইডেন কেউ কাউকে এতটুকু জায়গা ছাড় দিয়ে আপাতত বিবাদের সমাধান করবে সেই সুযোগ দুপক্ষের কারও হাতে নাই।
    এই অবস্থায় মোদি যদি (একা নয় সাথে হাসিনার প্রতিনিধি ও সুপারিশ সাথে নিয়ে ) বাইডেনের মুখোমুখি হয় তবে এখানেও ভারত-আমেরিকা যে কেউ কাউকে সম্পর্ক ছেড়ে যাবার চরম কথাটা উচ্চারণ এখনও করে নাই বা করছে না সেটাই প্রকাশ্য হয়ে গিয়ে বিপদ ডেকে আনতে পারে – কোন হাতছুট মুহুর্তে!

    বটম লাইন হল, কোন আগামি পরিস্থিতিতেই হাসিনার সংকট কাটছে না। বরং ভারত-বাংলাদেশের যৌথ মুভ সংকটকে আরো বাড়িয়ে তা “এখনই” ডেকে আনার অবস্থায় ফেলতে পারে! বাংলাদেশের ব্যাপারে বাইডেনের সিদ্ধান্তই ডমিনেট করার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। এছাড়া সেক্ষেত্রে, বাইডেনের বগলে ভারত না থাকার সম্ভাবনাও বেড়ে গেল!

    পুনশ্চঃ- আলী রীয়াজের আজকের লেখার শিরোনামটা বেশ অদ্ভুত! “বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবে ভারত?”।
    আচ্ছা আলী রিয়াজের কাছে তাঁর জাতীয় স্বার্থ কোনটা? আমেরিকার স্বার্থ না বাংলাদেশের স্বার্থ? আমি এনিয়ে পুরাই কনফিউজড বিভ্রান্ত! আমাদেরকে এভাবে বিপদে না ফেলে, এসব শব্দ তাই লেখকদের এড়িয়ে চলাই ভাল!!!

    অন্তত গত চৌদ্দ বছর ধরে যেখানে আমেরিকান স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ হয়ে আছে তখন তিনি “বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব” ভারত করলে কেন বিস্মিত হচ্ছেন? আমি বুঝি নাই!  কে যে কখন কার পক্ষে!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    গৌতম দাস

    ২৩ এপ্রিল ২০২২, ২০:৫৫

    https://wp.me/p1sCvy-439

     

    কেন শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বলে ভারতের আমলারা মোদিকে সাবধান করলেন?

    –
    প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর দুই ডজন সচিব নিয়ে চার ঘন্টা ধরে এক মিটিং করেছেন। বিষয় হল, ভারতের নাকি শ্রীলঙ্কার মত অর্থনৈতিক অবস্থা হতে পারে বলে তার সচিবেরা মোদিকে সাবধান করেছেন। খবরটা করেছে ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই [PTI]। যা ছাপিয়েছে অনেক মিডিয়াই। এমনই  এনডিটিভি-এর খবরটা এখানে দেয়া হল [States’ Freebies Flagged To PM With Lanka-Like Crisis Warning: Report]।
    কথা হল, একালে চীন নাকি খারাপ খারাপ ঋণ গছিয়ে সবার অর্থনীতিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে চলছে – একথা, এতদিন বলে প্রপাগান্ডার রাজা ভারত  চলছিল। সর্বশেষ এমনকি বাংলাদেশেও নাকি এর শিকার বলে কেউ কেউ নিউজ বা ইউটিউব ক্লিপ তৈরি করে প্রচার করছিল।। আজ, তাহলে এত সাবধানী খোদ সেই ভারতকেই আবার “ঋণের ফাঁদে” ফেলল কে? এটা তো একেবারে নিজের ফাঁদে নিজেই পড়া!   এতো দেখা যাচ্ছে এটা হল – মিথ্যা করে, বাঘ আসছে বাঘ আসছে বলে গ্রামবাসীকে উত্যক্ত করা রাখাল বালকের ঘটনা। আর এনিয়েই এবারের প্রসঙ্গ।

    শ্রীলঙ্কা গত কয়েক মাস ধরে হেডলাইনে, কারণ তার দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ প্রায় শূন্য, কোনো বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে প্রায় নাই। অবস্থা এতই করুণ যে, যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন স্কুল-কলেজের স্টুডেন্টদের লিখার কাগজ যা শ্রীলঙ্কা আমদানি করে চলে তা এখন কেনার মত বৈদেশিক মুদ্রাও তার হাতে নাই। ফলে স্কুল-কলেজে পড়াশুনা লাটে উঠেছে। এছাড়া আমদানি করা খাদ্যের বেলায় সমস্যা আরো ভয়াবহ। সব মিলিয়ে এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে।

    আর এই সুযোগেই কিছু প্রো-আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট মাঠে নেমে পড়েছে। তারা এটাকে চীনবিরোধী ক্যাম্পেইনের এক সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। এমনকি বাংলাদেশ নিয়েও – আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট যারা চীন বিরোধিতা করে থাকে তারাও কিছু আর্টিকেল বা ইউটিউব কনটেন্ট ছড়ানো শুরু করে দিয়েছে যেখানে কোনো ফ্যাক্টস ফিগারের বালাই ছাড়াই তারা বলছে যে বাংলাদেশেও নাকি শ্রীলঙ্কা হবে? আপনি হাসিনা সরকারের-বিরোধী তাতে তো কোণ সমস্যা নাই। কিন্তু তাই বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে  জিতবেন?? কতদুর যাবেন? এভাবে জেতা যাবে না। কিন্তু এটাই চলছে। যদিও এখানে এই লেখার গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এসব প্রপাগান্ডিস্টদের কবল থেকে প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা, যদিও তা ঠিক তাদের বিরোধিতা করে নয়। কারণ পক্ষ-বিপক্ষে প্রপাগান্ডা, যারা এ নিয়ে বাঁচতে চায়, কিছু কামাই করে চলতে চায় তারা তা করবেই। তাহলে ‘প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা’ বলতে ঠিক কী করতে চাই?

    গত কয়েক বছর ধরে যারা এই ক্যাম্পেইন ‘মাস্টার’, তারা যে ভাষ্যের ওপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করেছে তাদের একটা বড় অংশ হল বলা যায় যারা একেবারে  যেকোন ঋণ-গ্রহণের বিরোধি। এককথায় এরা নিজেদের প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশ এক ধারা বলে নিজেকে ভাবে। এরা মুল প্রপাগান্ডিস্ট নয়, তবে এদের ভাষ্য-অবস্থান চীনবিরোধী আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট্দেরকে সহায়তা যোগায় যেহেতু এদের বয়ান মুল প্রপাগান্ডিস্ট্দের সহায়তা করে।  এই মূল প্রপাগান্ডিস্টদের  মানে হল, কিছু প্রপাগান্ডা বক্তব্য যেমন, “চীন ফাঁদে ফেলে কোনো দেশকে অতিরিক্ত ঋণ গছিয়ে দিয়ে থাকে। তাই এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে”। তাই এই প্রপাগান্ডাকে তারা শিরোনামে বলে থাকে – ‘ডেট ট্রাপ’ [debt trap] বা ‘ঋণের ফাঁদ’ বলে। যেন চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে এক নম্বর বা সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এসব ছেচরামি করেই!!! এই হল এদের প্রপাগান্ডা বা চীনকে নিচা দেখানোর এক করুণ কায়দা!!  এতে ভাবনাটা অনেকটা ছেলে ধরার গল্পের মত যে, এশিয়ার দেশগুলো – এই তোরা আর বাইরে যাস না, চীনের ‘ঋণের ফাঁদ’-এ পড়বি!!!! তাই, তোরা ভারত-আমেরিকা ছুয়ে থাক!!
    আচ্ছা, কোন দেশকে অতিরিক্ত ঋণ দিয়ে ডুবিয়ে চীনের মত দেশের কী লাভ? এটা কী আসলেই কোন লাভ? শেষ বিচারে যখন কোন দেশ ঋণের সমস্যায় পরে যায় তাতে ক্ষমতাসীন সরকারের ইমেজ ক্ষুব্ধ পাবলিকের সামনে কোনভাবে কী আর কোন কাজে লাগে? পক্ষে যায় না যেতে পারে??

    গরীব অর্থনীতির দেশ “ঋণ না নিয়ে” চলে না কেনঃ
    আমরা পছন্দ করি বা না-করি ফ্যাক্টস হল, আমাদের মত দেশে নতুন কাজ সৃষ্টি করতে গেলে যে নয়া বিনিয়োগ লাগে তা যোগানোর মুরোদ আমাদের অর্থনীতির নাই। কাজ সৃষ্টির প্রয়োজনটা আমাদের না বুঝার কিছু নাই যে কোন নির্বাচিত সরকার অন্যতম কাজ হচ্ছে কর্মক্ষম জনগণের জন্য কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু তাই বলে কাজ সৃষ্টি করতে গেলে তো অর্থনীতিতে যে নয়া বিনিয়োগ লাগবেই তা দেশের অর্থনীতিতে থাকবে না কেন? বিনিয়োগ অন্য কোথাও থেকে আনতে হবে, অন্য দেশ দিবে ইত্যাদি  – এই ব্যাপারগুলো কী স্বাভাবিক? জবাব হল, না একেবারেই তা স্বাভাবিক নয়। বরং একেবারেই তা উল্টা। অর্থাৎ প্রত্যেক দেশের অর্থনীতিই তার দেশের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ যা আসলে “অর্থনীতিতে পুরানা সঞ্চিত সম্পদ” তা আসলে নিজেই উতপন্ন ও জমা-সঞ্চয় করতে সক্ষম থাকে। তাহলে প্রশ্ন হল আমাদের মত দেশের তা নাই কেন? কেন বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনতে হয়? এমনকি তা দুই ধরণের বিনিয়োগই – অবকাঠামোতে (infrastructure) বিনিয়োগ আর ব্যবসা-কারখানায় বিনিয়োগ (FDI) –  যা অন্যদেশ থেকে আনতে হয়। তা বিদেশ থেকেই আনতে হয়, কেন?

    প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশের মধ্যে এমন মনোভাব আছে যে ঋণ নেয়া হারাম!! কেন?
    এর জবাব আমরা সবাই জানি কিন্তু খেয়াল করি নাই। মূল কারণ ইউরোপের হাতে আমাদের কলোনি দখল হয়ে যাওয়া। আমরা বৃটিশদের হাতে কলোনি দখল হয়ে গেছিলাম বলে তাঁরা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ব সব সম্পদ লুটে তা পাচার করে তাঁরা নিজ দেশে নিয়ে গেছিল, দুশ বছর ধরে লাগাতর। আজও আমাদের দেশের বিনিয়োগের অর্থ সংকটের মুল কারণ এটাই।  এতে আমাদের দেশ পরবর্তিতে এক চরম বিনিয়োগ পুঁজি সংকটে পড়েছিল বিশেষত ১৯৪৭ সালে বৃটিশ কলোনি দখলের অবসান হয়ে যাওয়া সত্বেও। এখান থেকেই এরপর থেকে আমরা চাই বা না চাই বিদেশ থেকে বিনিয়োগ পুঁজি নিতে আমরা বাধ্য হয়ে যাই।
    কিন্তু তাতেও নতুন সমস্যা বাধে বা তৈরি করে আমাদেরই কিছু  (প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট) লোকের মাথায় “পুঁজি জিনিষটাই খারাপ” – এই ধারণা “মাথায় গেথে বসে” থাকায়। এদেরকেই আমরা প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট বলেই চিনি। পুঁজি নাড়াচাড়া করা, পুঁজির ততপরতায় জড়ানো, ব্যবসা করা ইত্যাদি কাজকে ধর্মে পাপের যে ধারণা সে চোখে যেন পাপ মনে করে বা পাপের চোখে দেখে থাকে।  অথচ ব্যবসা করা মানে তো পুঁজির ততপরতা তাই এটা পাপ ও হারাম ধরণের কাজ যেন!
    অথচ দেশে অর্থনৈতিক ততপরতা না চললে মানুষ খাবে কী? না কাজ পাবে না খাবার কিনতে পেতে পারে। যদিও এর একটাই জবাব তাদের কাছে আছে যে একমাত্র তাদের কথিত এক সমাজতন্ত্র চিন্তা যার সারার্থ তাদের কাছে – কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় উতপাদন চলতে দেয়া হবে!! এটাই একমাত্র “সহি’ অর্থনৈতিক ততপরতা। যেন এটাই তাদের ধর্ম অনুসারে একমাত্র সহি ততপরতা। এর উদাহরণ হাতের কাছেই পাবেন। বাংলাদেশের প্রথম সাড়ে তিন বছরের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিনের নেতৃত্বের অর্থনীতি অথবা ভারতে নেহেরু নেতৃত্বে কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যা ১৯৯০ সালে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে পর্যন্ত থামে নাই বা কোন সংস্কার-বদল ঘটে নাই। চরমতম “ব্যালেন্স অপব পেমেন্টের” ঘাটতিতে [মানে বৈদেশিক রিজার্ভের ঘাটতি থেকে ভাঁড়ার শুণ্যে করার দিকে যাত্রা] পরে শেষে এটা বিশ্বব্যাংকের চরণে হামলে পড়েছিল, ঐ ১৯৯০ সালে! বাংলাদেশেও তাই হয়েছিল। অন্যভাষায় এটাকে আমরা প্রচলিতভাবে বলি “চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ”। যার প্রধান এবং কমন ফেনোমেনা হচ্ছে – বৈদেশিক রিজার্ভ শুণ্য হয়ে পড়া। তাই কোন খাদ্য আমদানিরও মুরোদ না থাকা। আজকের শ্রীলঙ্কাতেও সেটাই ঘটেছে। আর তাতে আমাদের দেশে তখন হতাশ শেখ মুজিব তাজউদ্দিনকে ফেলে পাশে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি কিসিঞ্জারের সাথে কথা বলেন আর বিশ্বব্যাংকেও তদবীর করে আসেন ঐ চুয়াত্তরেই সেপ্টেম্বরের শেষে। কিন্তু সেই সাহায্য ও নীতিগত সংস্কারের সুবিধা বাংলাদেশে শুরু হবার আগেই তিনি পরের বছর (১৯৭৫) খুন হয়ে গেছিলেন। মোটামুটি ছিয়াত্তর সালের শুরু থেকেই প্রথম আমরা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও ফান্ড পাওয়া শুরু করেছিলাম।
    তাই মূলকথাটা হল, চোরে আপনার বাসার সব থালাবাসনও চুরি করে নিয়ে গিয়েছে বলে চোরের উপর রাগ করে বা “পাপমুক্ত থাকতে” কিংবা জিদ পুরা করতে আপনি আর মাটির সানকি থালাও না কিনে মাটিতে ভাত রেখে খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন না। এটা এথিকস পালন করার কোন কায়দাও না। বরং এটা সোজাসাপ্টা স্টুপিডিটি; অক্ষমের বাস্তববোধহীনতা!!!  তাহলে ঠিক কী বলতে চাচ্ছি?

    বলতে চাচ্ছি যে ইউরোপ বা পশ্চিম যারাই আমাদের সম্পদ লুটে চুরি করে নিয়ে গেছে তারাই একালে (১৯৪৫ সালের পর থেকে) যেন সেই সম্পদের কিয়দংশ  ফেরত দিতে চায়, যেটাকে তারা ঋণ বলছে! আর এরই অর্গানাইজেশনাল রূপ পদ্ধতির একটা সিস্টেমের নাম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক।  সোজা করে বললে এরা বিনা-সুদের অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে নামমাত্র সুদের (০.৭৫% বা, ১% পার্সেন্টের নিচে) ঋণ (যা আবার লম্বা ৪০ বছর ধরে পরিশোধযোগ্য)। আর এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অন্যদিকে প্রাইভেট কোম্পানির গ্লোবাল পুঁজি বাজার সর্বোচ্চ ৮% সুদে  বিভিন্ন ঋণ পাবার দিবার সুযোগ এসব প্রতিষ্ঠান করে থাকে।  তবে সাবধান প্রপাগান্ডায় পরা যাবে না। বিশ্বব্যাংকের কোন ঋণেই ৪% এর বেশি সুদ হয় না। আর প্রাইভেট কিন্তু গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সুদের হার সর্বোচ্চ ৮%  যা আমাদের মত দেশের জন্য দেখা গেছে ৬% এর বেশি নয়। তবে এটা একটা কাফফারা অবশ্যই। সেই সাথে আরো আছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্বভাবতই আমেরিকা বা পশ্চিমের স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে চলা সংগঠন; তা মিথ্যা নয়। তাই এর জ্বালা ও আমাদের স্বার্থহানি ঘটা বা সময়ে বড় প্রতিবাদ না করতে পারার মনকষ্ট আমাদের মত দেশের সেখানে আছে। যদিও সে কষ্টেরও একটা শেষ যেন আছে। যেমন এখনকার বাংলাদেশের ইচ্ছা (ক্ষমতাসীনদের)  অনুসারে কোন ঋণ কিভাবে নিবে অথবা একেবারেই নিবে না কিনা অথবা দেয়া শর্ত কবুল করবে বা না করবে ইত্যাদি আমরা বাছাই করার সামর্থে পৌছেছি। এছাড়া এমন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানও এখন একের অধিক হয়ে গেছে। কিন্তু কমিউনিস্ট গোয়ার্তুমি ছেড়ে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের কাছে এটা এথিক্যাল প্রশ্ন বা অবস্থানের ইস্যুই নয় যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ভাল না মন্দ। বরং এটা মন্দের ভাল, কিছুই না থাকার চেয়ে। আসলে এটা একটা খারাপ বাস্তবতাতে সেখান থেকে উঠে আসতে আমাদের বুদ্ধিমান কোন কম্প্রোমাইজ ও সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই আমাদেরকে বের  আজ হয়ে আসতে পারার অবস্থায় পৌছাতে হয়েছে।  তাই কোন পুঁজির ততপরতা খারাপ কিনা, ব্যবসা হারাম কিনা ইত্যাদি বিবেচনা করে – সারকথায় বিদেশি পুঁজি নেওয়া যাবে না এমন অলীক ভাবনা – এটা সবসময় আসলে অর্থহীন প্রলাপ। কিন্তু এই প্রলাপ বয়ানের উপর ভর করেই  আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্টেরা একালে রাজত্ব জমিয়েছে আর  চীনের তথাকথিত ঋণের ফাঁদের গল্প আমাদের শুনিয়েছে।  যেন কমিউনিস্টরা এবার বলতে চায় বলেছিলাম না বিদেশি ঋণ খারাপ জিনিষ!! আর ওদিকে প্রপাগান্ডিস্টেরা বলতে চায় যেন চীনা ঋণ হলে তা খারাপ আর আমেরিকান বা ইন্ডিয়ান ঋণ  আমাদেরকে দিলে অথবা  এ’দুই দেশ নিজের জন্য গ্লোবাল বাজার থেকে নিলে সেগুলো ভাল ও হালাল!!!  অবশ্য একটু পরেই আমরা দেখব খোদ আমেরিকা বা ভারত রাষ্ট্র নিজেরা নিজেদের বেলায় বৈদেশিক ঋণ কিভাবে নিয়েছে!

    চীনা ঋণের ফাঁদের প্রপাগান্ডা বয়ানের যুগেঃ
    বাস্তবে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর গড়া নিয়ে চীনের ঋণ নেয়ার এত কথা প্রথম প্রচারে এসেছিল। সেই বন্দর প্রকল্প পরে কার্যত শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে আর কোনো বোঝা হয়েই দাঁড়ায় নায়। কারণ, পরের প্রো-ইন্ডিয়ান সরকারের আমলেই  ঐ সরকার চীনের সাথে কথা বললে চীন এক সহজ সমাধান করেছিল। তা হল, পুরো প্রকল্পটাকে এক চীনা প্রাইভেট কোম্পানি কিনে নিয়েছিল, তাতে চীনের ঋণ পরিশোধের দায়ও ওই পোর্ট ক্রেতা নয়া কোম্পানির, তাতে শ্রীলঙ্কা সরকারকে কোনো ঋণের দায় আর বইতে হবে না, পরিশোধ করতে হবে না। চীনা সরকার এই ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিল। ফলে শ্রীলঙ্কা সরকারের কোন অর্থনৈতিক দায় আর ছিল না। ফলে এই পোর্ট প্রকল্প থেকে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে চাপ ফেলা জাতীয় কোনো প্রভাবের আর বালাই থাকেনি। অর্থাৎ পোর্ট প্রপার্টিটাই আর সরকারের থাকেনি। বরং যেকোন প্রকল্পের মোট মূল্যের প্রায় ২৫-৩০ ভাগ মালিকানা হোস্ট দেশের এমনিতেই পেয়ে যায় কোনো বিনিয়োগ করা ছাড়াই। কারণ প্রকল্পকে দেয়া জমি বা অবকাঠামো দেয়ারও একটা মূল্য ধরা থাকে বলে সরকার কোনো অর্থ খরচ না করেই তেমন প্রকল্পে ২৫-৩০ ভাগ মালিকানার ভাগ পেয়ে যায়। ফলে চীনা ওই প্রাইভেট কোম্পানি এখন হাম্বানটোটা পোর্টের বাকি অংশ, প্রায় ৭০ ভাগের মালিক। কিন্তু সেই থেকে তবু প্রপাগান্ডা আর কখনো বন্ধ হয়নি – আর তা থেকে ‘হাম্বানটোটা’ আর ‘চীনের ঋণের ফাঁদ’ এ দুই শব্দ থেকে যায় জব্বর প্রপাগান্ডা শব্দ হয়ে।

    তাহলে এই লেখা থেকে আমরা ঠিক কী করব? কী জানব?
    এসব প্রপাগান্ডার সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তিমূলক দিক যেটা তা হল, এই প্রপাগান্ডা বলতেই পারে না যে কোন দেশ কী পরিমাণ ঋণ নিলে তা ‘ঋণের ফাঁদ’ হয়ে যায়? (এক কথায় কোন দেশের জন্য কত দূর ঋণ নেয়া সেফ [safe]? তা কি আগাম জানা যায়? তা মাপার কি কোনো স্টান্ডার্ড আছে?) নাকি চীনা বা বিদেশী ঋণ মাত্রই ‘ঋণের ফাঁদ’? প্রপাগান্ডিস্টরা এটা কোনদিন পরিষ্কার করে বলে না, উহ্য রেখে পাশ কাটিয়ে থাকে? অর্থাৎ কোন দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান কী ও সেফ ঋণ নেওয়ার স্টান্ডার্ড কী তা হাজির না করেই এরা দাবি করতে থাকে চীনা ঋণ নেয়া একটা ফাঁদ! এই হলো এসব প্রপাগান্ডার কৌশল। এমনকি আমেরিকান প্রশাসন যে প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল এমন একটা রিপোর্ট হল এখানে।   এই রিপোর্টেও এ দুই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, পাশ কাটিয়েছে। তাদের ছাপানো কোনো প্রপাগান্ডা আর্টিকেলেও এ নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। বরং এটা আমেরিকান চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক অবস্থানের পক্ষে সাফাই বক্তব্য। যা ঠিক ঋণ নেয়া প্রসঙ্গে অর্থনীতি-নির্ভর ব্যাখ্যা নয়।
    এমনকি পরবর্তিতে এসব প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এক ডাচ কনসাল্টেন্টের রিপোর্ট ওই দাবি নাকচ করে আর্টিকেল ছেপেছিল যদিও সেখানেও ঋণ নেয়ার স্টান্ডার্ড কী, কত দূর ঋণ নেয়া সেফ আর আলোচ্য দেশের পরিসংখ্যান গত ফ্যাক্টস কী তা নিয়ে কোনো আলাপ করা হয়নি সেখানে। এতে সবার বক্তব্যই হয়ে গেছে শেষ বিচারে এক আন্দাজি কথাবার্তা বা সরাসরি প্রপাগান্ডা অথবা এসব প্রসঙ্গ থেকে দূরে অন্য প্রসঙ্গের বক্তব্য। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য ও প্রসঙ্গ হলঃ কোন দেশ নিজ অর্থনীতিতে কী পরিমাণের বেশি বিদেশী ঋণ নিয়ে ফেললে তা রিস্কি হওয়া শুরু হতে পারে, এ নিয়ে একটা গবেষণা স্টাডির ফলাফল পাঠকের সাথে সহজ ভাষায় আলাপ করা, শেয়ার করা।

    এনিয়ে বিশ্বব্যাংকের স্টাডি রিপোর্টের ফাইন্ডিংস কী বলেঃ
    সৌভাগ্যবশত এটা কোন খামখেয়ালি কথা নয়; গবেষণা, অবজারভেশন আর স্টাডি থেকে বাস্তবে পাওয়া রেজাল্ট। এই গবেষণাটা করেছিল বিশ্বব্যাংক এবং তা টানা ১৯৮০-২০০৮ এই ২৮ বছরের ডাটা নিয়ে। আর তা ১০১টা দেশের অর্থনৈতিক ডাটা নিয়ে যাদের মধ্যে গরিব ও ধনী উভয় ধরনের দেশই ছিল।
    কোন দেশের রাষ্ট্রীয় ঋণ পরিমাপ করার এক প্রচলিত পদ্ধতি হল তা ওই দেশের জিডিপির কত অংশ বা অনুপাতে কত তা জেনে নিয়ে প্রকাশ করা। অর্থাৎ ওই দেশের নেয়া মোট ঋণ, মোট জিডিপির কত অংশ সে অনুপাত সংখ্যা দিয়ে। যেমন যদি বলা হয় একটা দেশের ঋণ ৭৭%। তাহলে এ কথার মানে ওই দেশের জিডিপির ৭৭% – এই অঙ্কই হল ও দেশের নেয়া মোট বিদেশি ঋণ। আসলে এটাই ও দেশের ঋণ-বনাম-জিডিপির অনুপাত। যদিও বিভিন্ন দেশের মোট ঋণ সংক্রান্ত ডাটা পড়তে গিয়ে সাবধান! মোট ঋণ বললে রাষ্ট্র আভ্যন্তরীণ ভাবে নিজ কারেন্সিতে যে লোন নিয়েছে সেটাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে তাতে। তাই পরিস্কার করে বলতে ও বুঝতে হবে যে আমরা কোন দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রায় নেয়া ঋণ আমাদের আলোচ্য বিষয়।

    এই হিসাবে এই গবেষণায় পাওয়া ফাইন্ডিংস হল, কোনো দেশের নেয়া রাষ্ট্রীয় ঋণ ঐ দেশের জিডিপির ৭৭% বেশি হলে বা ছাড়িয়ে গেলে তা বিপদ জোনে প্রবেশ করেছে মনে করা হবে। তবে এই হিসাব সব্দেশের বেলার জন্য নয়। এতা কেবল অগ্রসর অর্থনীতির দেশের (যেমন জি৭ গ্রুপের দেশ [G7 countries]) বেলায় যারা পুরনো ও বড় অর্থনীতির দেশ বলে অনেক ঘাত সইবার সক্ষমতা থাকে।

    আর এর পরের ক্যাটাগরির মানে যাদেরকে উদীয়মান [Rising Economy] অর্থনীতি (যেমন জি২০ গ্রুপের দেশ) বলে, এদের ক্ষেত্রে টিপিং পয়েন্ট [Tipping point] বা বিপজ্জনক জোনে প্রবেশ ধরা হয় বা ঋণ-জিডিপি অনুপাত হল তাদের ৬৪% এর বেশি তা ছাড়িয়ে গেলে।

    এই হলো, বিশ্বব্যাংকের ওই গবেষণা ফলাফল থেকে পাওয়া ফলাফল। তাই তখন থেকে এটাই বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে মানা হয়। এই বক্তব্যগুলো পাওয়া গেছে ‘টিপিং পয়েন্ট খোঁজা কখন রাষ্ট্রের নেয়া ঋণ খারাপ ঋণে পরিণত হবে’[Finding The Tipping Point — When Sovereign Debt Turns Bad] এই শিরোনামে পাওয়া গবেষণা ফলাফল থেকে, যা বিশ্বব্যাংকের লাইব্রেরিতে রক্ষিত। আর ‘টিপিং পয়েন্ট’ বলতে সহ্য সীমা বা ভেঙে পড়ার আগের বিন্দু বুঝা যেতে পারে।

    তাহলে আমরা এখন আন্দাজে মন গড়া কথা বলে, যাকে দেখতে পারি না তার বিরুদ্ধে কথা বলা প্রপাগান্ডা থেকে চাইলেই বের হয়ে আসতে পারি। কারণ অন্তত বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে একটা কিছু আমাদের হাতে আছে। কোনো স্টান্ডার্ড মানে কোনো ধরনের মাপকাঠি যেটা ছাড়াই চীনবিরোধী প্রো-আমেরিকান বা প্রো-ইন্ডিয়ান হয়ে ইচ্ছামতো খামখেয়ালি প্রপাগান্ডা থেকে আমরা এখন চাইলে বের হয়ে আসতে পারি।

    সাথে অন্য একটা কথাঃ  যদিও বিশ্বব্যাংকের ঐ রিপোর্টে দুধরণের দেশের ক্যাটাগরির কথাই বলা আছে। তবু অনেক মিডিয়া রিপোর্টে আরেকটা বা গরিব দেশের ক্যাটাগরির কথা বলতে দেখা যায় যাদের বেলায় নেয়া বিদেশী ঋণ নিজ জিডিপির ৪০% এর বেশি হলে সেটাকে “টিপিং পয়েন্ট” বলে দাবি করা হয়েছে। এই হিসাবেও বাংলাদেশে (যতগুলো উৎস থেকে দেখা যায় এর সবটাই) এখনো ৩১% এর নিচে আছে ; কোন কোন দাবিতে এটা ১৫% বলে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করেছেন অনেক মিডিয়া রিপোর্টে।। আর বাংলাদেশের মোট ঋণের মাত্র ৬.৮১% হলো চীনের ঋণ আর সবচেয়ে বড় দাতাটা হলো বিশ্বব্যাংকের; সেটা ৩৮%।

    According to the World Bank and the International Monetary Fund (IMF), that a country will cross the danger mark if its external debts exceed 40 percent of GDP ensures that Bangladesh is in the “safe zone,” as its total foreign loan is less than 15 percent of its GDP.

    কাজেই এটা পরিষ্কার আমরা দেখছি যে, তবুও চীনবিরোধী একটা প্রপাগান্ডার নহর এখনও বয়ে যাচ্ছে।

    টিপিং পয়েন্ট নিয়ে কিছু মজার তথ্যঃ
    বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, জি৭ ভুক্ত বড় অর্থনীতির আমেরিকার বেলায় তার ঋণের টিপিং পয়েন্ট হয় ৭৭%। কিন্তু সেই ১৯৪৬ সালেই মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যখন আমেরিকা একচ্ছত্র গ্লোবাল নেতা হিসেবে উঠে এসেছিল তখনই খোদ আমেরিকার টিপিং পয়েন্ট ছিল ১০৬% যার সোজা মানে এটা ৭৭% চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তা সত্বেও আমেরিকা সেকালে গ্লোবাল নেতাই ছিল এবং অন্য সব দেশকে ঋণ দেয়ার মূল উৎস ছিল এবং তা সরাসরি দ্বিপক্ষীয়ভাবে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে গেছিল।
    তবে এছাড়া আরো বড় ঘটনাটা হল, পরে আমেরিকার এই ঋণ-বনাম-জিডিপি অনুপাত কমতে থাকে। শেষ ১৯৭৪ সালের মধ্যে এটা নেমে মাত্র ২৩% হয়ে যায়।

    তাহলে এখন কত?
    পরে ১৯৮০ সাল থেকে আমেরিকার এই অনুপাত বা রিয়েল টিপিং পয়েন্ট আবার বাড়তে থাকে; ২০০৭ সালের গ্লোবাল মহামন্দার সময় আরো বাড়ে। আর ২০০৯ সাল থেকে এটা ৭৭% এর বেশি ছাপিয়ে তা বাড়তে শুরু করেছিল যেটা এখনো বৃদ্ধির দিকে। ২০২০ সালের সেকেন্ড কোয়ার্টারে এটা সর্বোচ্চ ১৩৫.৯% ( যদিও সারা বছরের গড় ১৩৪%) হয়ে আছে।
    এর মানে সারকথাটা হল,  বিশ্বব্যাংকের টিপিং পয়েন্টই শেষ কথা নয়; একটা স্টান্ডার্ড মাত্র। ফলে এটা ছাপিয়ে গেলেই সব ভেঙে পড়বেই এমনটা সত্যি নয়, তবে হতে পারে। আর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বড় অর্থনীতি হয়ে থাকার কারণে এসব দেশের ঘাত সহ্য ক্ষমতা বেশি, অভিজ্ঞতায় তাই দেখা গেছে।

    কোন দেশ সর্বোচ্চ অনুপাতেঃ
    ২০২০ সালের হিসাবে এমন দেশ হল ভেনিজুয়েলা। তার অনুপাত ছিল ৩০৪%। আমরা সবাই কমবেশি ভেনিজুয়েলার অবস্থা জানি। তার উপর আমেরিকান তেল অবরোধ দেয়া আছে সুদীর্ঘ সময় ধরে। ফলে সুনির্দিষ্ট কিছু দেশেই সে একমাত্র তেল বিক্রি করতে পারে এবং তা ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রাতেই কেবল। আর তেল বিক্রি করে যেটুকু বিদেশী মুদ্রা আয় করতে পারে। সে কারণে ভেনিজুয়েলার অনুপাত বা টিপিং পয়েন্ট অমন উঁচু। তুলনায় সেকেন্ড সর্বোচ্চ অনুপাত ছিল জাপান ২০৪%। আর আমেরিকা ছিল ষষ্ঠ প্লেসে, ১৩৪%। তাহলে বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড ৭৭% এখানে কার্যত অকেজো! কিছুই ভেঙ্গে পড়েনি বা ট্রিপ করে যায় নাই!!

    তাহলে প্রপাগান্ডিস্ট মোড়ল ভারতের কী অবস্থাঃ
    এশিয়ার সব দেশই ‘চীনা ঋণের ফাঁদে’ পড়ে ডুবে গেল – এই হল ভারতের প্রবল প্রপাগান্ডার মুলকথা। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় আবার আমেরিকার থেকেও ভারতের গলা বেশি উঁচু। তাহলে এই প্রসঙ্গে ভারতের নিজের কী অবস্থা? সে খবর নিতে হয়। ব্লুমবার্গ [bloomberg] আমেরিকার ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ মিডিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম। সে ভারতের কুয়িন্ট [QUINT] নিউজের সাথে খবর শেয়ার করে ও ভারতে খবর ছাপে। তাদেরই এক রিপোর্ট বলছে, ভারতের ঋণ বনাম জিডিপি অনুপাত ২০২১ সালে ৮৭.৮%। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাজেট ২০২২ রাষ্ট্রের ঋণ নামিয়ে আনতে হলে একটি শক্ত অর্থনৈতিক উন্নতি দেখাতে হবে [Budget 2022: Bringing Public Debt Down Requires A Strong Groth Path]।’ আর তাহলেই নাকি আগামী বছর এই অনুপাত কমে ৮৭.৪% হতে পারে। অর্থাৎ ভারতকে যদি রাইজিং অর্থনীতির দেশ গণ্য করি, তাহলেও ওর বিশ্বব্যাংক স্টান্ডার্ড অনুপাত হয় ৬৪%। অথচ এই  আইডিয়াল টিপিং পয়েন্ট বা  স্টান্ডার্ড থেকে  রিয়েল টিপিং পয়েন্ট ৮৭% , তা অনেক দূরের ফিগার অবশ্যই। তাহলে কোন সুখে ভারত সব দেশের বিরুদ্ধে লেগে সেখানে ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ খুঁজে ফেরে?

    তাহলে ভারতের শেষ অবস্থাটা কীঃ
    গত ৪ এপ্রিল ভারতের অনেক পত্রিকাতেই একটা নিউজ ছাপা হয়েছে। তা হলো, অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে মোদি তার দু’ডজন সিনিয়র সচিব বা কর্কমর্তাদের নিয়ে লম্বা ৪ ঘণ্টার এক মিটিং করেছেন। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, ‘বুরোক্রাটেরা মোদিকে লাল পতাকা দেখিয়েছেন এই বলে যে, শ্রীলঙ্কার মতো ক্রাইসিস ভারতেও দেখা দিতে পারে।’ তারা আসলে বলতে চাইছেন ভারতেরঅনেক রাজ্যে যেভাবে নয়া প্রকল্প নেয়া হচ্ছে তা ভাল হচ্ছে না। এতে বৈদেশিক অর্থের সঙ্কটে পড়বে ভারত। হিন্দুস্থান টাইমস এ নিয়ে একটি ভিডিও ক্লিপও বানিয়েছে। আর এতে ভারতে হইচই পড়া অবস্থা যে, তাহলে কি খোদ ভারতই এখন শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে? এর সাথে এক অসমর্থিত খবরও আছে। তা বলছে, সম্প্রতি মোদিকে বাইডেন যে ফোন করেছিলেন, রাশিয়া থেকে ভারত যেন তেল আর না কিনে এই ইস্যুতে, সেখানে ভারত বাইডেনের কথায় আসলে রাজি হয়েছে। কারণ, বাইডেন মোদিকে শ্রীলঙ্কা ধরনের অর্থনৈতিক ক্রাইসিস সামলাতে ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট দিতে কবুল করেছেন। ভারতের ৬১৪ বিলিয়ন বৈদেশিক ঋণ শোধে কিস্তি দেরিতে ফেরত দিতে ও সুদ কমাবার আবেদন করেছেন মোদি। এখন একথা কতটা সত্য তা জানা যাবে যদি আমরা দেখি যে ভারত আর রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে না!!
    এবার তাহলে ভারতকেও কোন চায়না ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারল!! এটা সত্যি এক তামাসার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে!
    তাহলে দাঁড়াল এই যে কার প্রপাগান্ডা কখন যে কাকে খায়? এখন প্রধান প্রশ্ন হল, তাহলে, ভারতকে ঋণের ফাঁদে ফেলল কে সে চীন?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারতকেই ঋণের ফাঁদে ফেলল কে! “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    গৌতম দাস

    ১১ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-42k

     

        The Indian-American underachiever

    ইউক্রেন ইস্যুতে পরাজয়ের পরে বাইডেন প্রশাসনের শেষ কামড় যেন শুরু হয়েছে। সে্টা অনুমান করেই আগে লিখেছিলাম, বাইডেন এখন দক্ষিণ এশিয়ায় চাপ বাড়াবেন। তাকে ফল দেখাতে হবেই! বাংলাদেশ এই চাপের মধ্যে পড়বে। তা কেবল বাংলাদেশ নয়, আমাদের এই সারা অঞ্চলে প্রবলভাবে এই চাপের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আসন্ন আরেক প্রধান টার্গেট এখন ভারত। “ভারতকে পক্ষে আনতেই হবে”, এরই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে আমেরিকা। কিন্তু এই চাপ কি কাজ করবে, না ভারতই হাতছুট হয়ে যাবে?

    দুই সপ্তাহ আগে বাইডেনের ইউরোপ সফরের পর থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাইডেন হেরে গেছেন। ইউরোপ বাইডেনের কথা মেনে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারছে না। বাইডেন বিকল্প দিয়েছিলেন যে, আমেরিকা নাকি ইউরোপকে তেল-গ্যাস জ্বালানিদাতা হতে চায়। এতে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া আগেই বিপুল উচ্ছ্বাসে মেতে এটাকে কাভারেজ দিলেও ইউরোপ মানে জার্মান-ফান্স-নেদারল্যান্ডসের ইউরোপ আনমুভড [unmoved] থেকে যায়। মানে, নিজেদের পুরনো অবস্থান যে, রাশিয়ান গ্যাসই তাদের লাগবে, সে অবস্থান বহাল থেকে যায়। অন্তত ২০২৪ সাল পর্যন্ত নাকি তাদের এমন থাকতেই হবে; না হলে তারা বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়বে, এই ছিল তাদের বক্তব্য ও অবস্থান।
    তাহলে, ইউরোপ বাইডেনের কথায় আনমুভড বা “মাতে নাই” পরিস্থিতিতে থেকে যায়। এটাতেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইউক্রেন ইস্যুতে বাইডেন হেরে গেলেন। আর এতে প্রথম ধাক্কাটা হল বাইডেন ইউরোপকে সাথে ধরে রাখতে ফেল করলেন।

    অবরোধের স্ববিরোধঃ
    কেন এমন হল, বাইডেন ইউরোপে কেন হারলেন? এর সোজা জবাব হল, বাইডেনের আমেরিকা তার চাপ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াবাড়িভাবে ব্যবহার করেছেন। কী সেটা? বাইডেন-ই এই ইউক্রেনের যুদ্ধকে তাঁর আবিস্কার “অবরোধ আর মানবাধিকার” এদুই অস্ত্র দিয়ে লড়বার একক পরিকল্পক। তিনি নিজে রাশিয়ার ওপর এক গাদা সিরিজ অবরোধ আরোপ তো করেছেনই। সাথে ইউরোপকেও চাপ দিয়ে বাধ্য করেছেন একইভাবে অবরোধ দিতে। এটাই বাড়াবাড়ি। তাতে এবারই প্রথম ইউরোপ কোনো দেশের ওপর এমন বেপরোয়া হয়ে রেকর্ড পরিমাণ অগুণতি অবরোধ আরোপ করেছে। এ ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে অবিবেচক ও আত্মঘাতী কাজটাও তারা করে ফেলেছে, জাস্ট বাইডেনকে খুশি করতে হবে এই বিবেচনায়। যেন না জানি, তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে না আবার বাইডেন মহাশয় ইউরোপের ওপর অসন্তুষ্ট ও ‘সংহতিতে’ নেই মনে করে বসেন কি না যেন এই ছিল ইউরোপের ভয়। কিন্তু ইউরোপেরও কপাল খারাপ, যেখানে বাঘের ভয় ঠিক সেখানেই যেন গাড়ি খারাপ হওয়ার দশা!

    বাইডেনের চাপে তারা খেয়ালই করেননি যে, রাশিয়ার ওপর দিয়ে তাদের ইউরো মুদ্রার অবরোধে আরোপের অর্থ আসলে কার্যত ইউরোপের নিজের ওপরই অবরোধ দেয়া হয়েছে। কেন?
    এটা শুনতে অনেকের মজা লাগতে পারে যে, ইউরো মুদ্রা এখন মহা ক্ষমতাধর হয়ে গেছে যে, সে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে তাকে কুপোকাত করে দিতে পারে। তাহলে নিশ্চয় ইউরোপের অর্থনীতি অনেক ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে! তাই কি? একটু দাঁড়ান, ধীরে চলেন প্লিজ! কেন?

    ইউরো অবরোধের সোজা মানে হল, আপনি পুতিনের রাশিয়াকে বলছেন যে, এখন থেকে আর আমার ইউরো মুদ্রায় কোনো পণ্য আর বেচা এবং কেনা কোনোটাই করতে পারবেন না। অর্থাৎ ইউরো যাদের মুদ্রা এই ইউরো জোনের বাইরের রাশিয়াসহ সব দেশ তো বটেই এমনকি জোনের ভিতরের সদস্য যেমন জার্মানি সেও রাশিয়ার কাছ থেকে ইউরোতে গ্যাস কিনতে পারবে না। এটাই হয়ে গেছিল এর অর্থ।  যেখানে জার্মান অর্থনীতি্র (চাহিদা ওঠানামা আছে বলে), ৪০-৫৫% রাশিয়ান গ্যাসের ওপর  নির্ভরশীল। অথচ জার্মানিও রাশিয়ান গ্যাস আমদানি করতে পারবে না। অবরোধের মানে হয়ে গেছে তাই। কেন?

    অবরোধের শুরুতে একটা ফাঁকি দিয়েছিল জার্মানির মত ইইউ এর ইউরোপ। তারা বুদ্ধিমান হয়েছে মনে করে কার্যত রাশিয়ান গ্যাস কেনার ওপর অবরোধ অকার্যকর করে রেখেছিল। ভেবেছিল, এভাবে রাশিয়ার ওপর ইউরো অবরোধ দিয়েও রাশিয়ান গ্যাস তারা কিনে-চলতে পারবে। কিন্তু না!

    খোদ পুতিন এতে পানি ঢেলে দিয়েছেন। পুতিন ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যারা আর বন্ধুসুলভ দেশ নয় (মানে যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ দিয়েছে) তারা এখন থেকে রাশিয়ান কোনো কিছু কিনতে চাইলে রাশিয়ার নিজের মুদ্রা রুবলে [ruble] এর মূল্য পরিশোধ করবে। আর এতেই মহাবিপদে পড়ে গেছে ইউরোপ; বিশেষত যারা রাশিয়ান গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাৎক্ষণিক এদেরকে জ্বালানি রেশনিং শুরু করতে হয়েছে। কারণ ইউরোপে বসবাসে নিজ বাস করার ঘর গরম রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে সেই ইউরোপ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়। তাতে আপনি গরিব-ধনী যাই হন। আর এই সমস্যা মোকাবেলার তাদের সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হল, বিপুল জ্বালানি ব্যবহার করে মিউনিসিপালিটির গরম পানির প্রবাহ বাসিন্দাদের বাসগৃহে পৌছানো। এতে প্রত্যেকটা বাসার প্রত্যেক বসবাসের রুমের ভিতরের দেয়াল বেষ্টন করে থাকে এই গরম পানির লাইন। আর তাতেই রুম বসবাসযোগ্য থাকে। তাই গ্যাস ইউরোপের জীবনযাপনে খুবই এসেনশিয়াল। তাহলে এর মানে দাঁড়িয়েছে, যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে নিজেরা পরাশক্তির ভান ও সুখবোধ করছিল আজ সেই ইউরোপ নিজেরাই নিজেদের অস্ত্রের মুখে কাঁপছে!! নাকি হয়তো ঠাণ্ডায় কাঁপছে, আসলে সব একই কথা হয়ে গেছে! মানে নিজ অবরোধ নিজেরই বিরুদ্ধে চলে গেছে।

    এখন অনেকের মনে হতে পারে, রুবলে মূল্য পরিশোধের কথা বলে এটা পুতিনের প্রতিহিংসা। আমেরিকান ইউরোপে প্রপাগান্ডায় পুতিনের যে দানব ছবি এঁকে দিয়েছেন তাতে বেশির ভাগ মানুষ এটাই বিশ্বাস করবে হয়ত! কিন্তু না এটা ফ্যাক্টস নয়। কেন?

    ইউরোপ ভাবতে পারে যে,  তারা ইচ্ছা করলেই কেবল তাদের রাশিয়ান গ্যাস কেনার উপর তাদের অবরোধ অ-প্রযোজ্য করে রাখতে পারে। আর এমন এই ব্যতিক্রম বা বিশেষ ছাড় দিয়ে তারা তো পুতিনকেই ফেবার করছিল। যে পুতিনের গ্যাসটা অন্তত ইউরোপ কিনতেই থাকবে। ফলে বেচাবিক্রিহীন পুতিন-কে নিশ্চয় এটা ফেবার করাই হল!!  সরি,  এই অনুমানটা ডাহা ভুল। কারণ রাশিয়ান গ্যাসের বিনিময়ে ইউরোপ পুতিনের হাতে ইউরো ধরিয়ে যদি দেয়ও তবু এসব ইউরো আসলে অচল মুদ্রা। না, এটা অচল পয়সা বা ফেক নোট গছিয়ে দেয়া নয়। আসল ইউরো তারা দিলেও তা রাশিয়ার কাছে অচল নোটের মতোনই ঠেকেছিল। কেন? কারণ রাশিয়া ঐ ইউরোতে নিজের কোনো কিছু কেনার বেলায় দাম পরিশোধের মুদ্রা হিসাবে তা ব্যবহার করতে পারে না। কারণ, মূলত ইউরোপ তো রাশিয়ার ওপর ইউরো ব্যবহার করে কিছু কেনার ক্ষেত্রেও অবরোধ দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ যেন হাতে একশ টাকার নোট আছে ঠিকই কিন্তু দোকানদার ওই নোট নিতে চাচ্ছে না। সোজা কথায়, রাশিয়ার হাতে পড়লেই যেকোন ইউরো অচল নোট হয়ে যাবে। তাই ইউরো নিয়ে রাশিয়ার কাউকে গ্যাস বিক্রি করার মানে হল তাকে মাগনা গ্যাস দেয়া হয়েছে। কারণ রাশিয়ার হাতে থাকা ইউরো বাজারে কেউ নিবে না। এ কারণেই ইউরোপসহ সবাইকে রুবলে দাম শোধ করে রাশিয়ান পণ্য কিনতে বলা – এটা পুতিনের কোনো প্রতিহিংসাই নয়। এটা আসলে ইউরোপের ইউরো অবরোধ আরোপের-ই স্ববিরোধিতা। তারা খেয়ালই করেনি যে, রাশিয়ান গ্যাস বিক্রির উপর অবরোধ আরোপে তাদের বেলায় ছাড় থাকলেও তাতে রাশিয়ার কোনো লাভই নেই; কারণ তা রাশিয়ার নিজের কোন কেনাকাটাতে  হাতে পাওয়া অই ইউর মুদ্রা ব্যবহারের কোন সুযোগই নাই। তাই।রাশিয়ার দিক থেকে ইউরোতে যেকোনো কেনাবেচার উপরেও কোনো ছাড় বলে বিবেচিত হবে না। হওয়ার সুযোগই নেই।

    দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশঃ
    আর এখান থেকেই দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশের সুযোগ খুলে যায়। রাশিয়ার উপর অবরোধ এখন বহুবিধ। আরোপিত  অবরোধ এখন আমেরিকা, ইউরোপ ছাড়াও আমেরিকার ধন কোয়াড সদস্য (কেবল ভারত ছাড়া) সবারই অবরোধ আরোপিত আছে। এমনিতেই একালে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক বড় উপায় হল তার মাটির নিচের সম্পদ বিক্রি করা। কাজেই এই সম্মিলিত অবরোধ রাশিয়ার উপরে যথেষ্ট ভারী প্রভাব এনেছে। আবার লক্ষণীয় ভারতের জনসংখ্যা ১৩৫ কোটি যার কাছাকাছি হল একমাত্র চীন। ফলে এমন বিশাল জনসংখ্যার ভারতে বিশাল জ্বালানি চাহিদা অনুমেয়। তাই পুতিনও ব্যারেল-প্রতি ৩৫ ডলার সমতুল্য ছাড় দেয়াতে [India Will Continue to Buy Oil From Russia, Sitharaman Says] এই সুযোগে সম্প্রতি ভারত ১৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনে নিয়েছে, রাশিয়া থেকে রুবলে। আর এতে স্বভাবতই এটা আরোপিত সব অবরোধকেই ফাঁকি দেয়া। অতএব আমেরিকার চোখে ভারত “বেয়াড়া এক দুষ্ট ছেলে’ হয়ে উঠেছে। তাই আমেরিকা ভারতকে প্রথমে বুঝিয়ে বলা, পরে কড়া কথা আর হালকা হুমকি দিতে দিতে গত এক মাস পার করে ফেলেছে। এখন এরপর আগামী পরশু ওয়াশিংটনে বসছে দু’পক্ষের এক ক্রুশিয়াল বৈঠকে। এই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক নাম “U.S.-India 2+2 Ministerial meeting: গত চার বছর ধরে এদুই দেশ এমন বৈঠক করে আসছে। তাই এটা চতুর্থ বৈঠক।

     

    কিন্তু কেন ভারতের রাশিয়ান তেল কিনাতে আমেরিকা এতে এত বিপদ গুনছেঃ
    ভারত সস্তা পেয়ে কিছু রাশিয়ান তেল কিনে নেওয়াতে য়ামেরিকার কাছে কেন ব্যাপারটা সিরিয়াস আর তা ঠিক কতটা সিরিয়াস? এর উত্তর পাওয়া খুবই সহজ। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার দেশ হল চীন ১৪০ কোটির বেশি। আর এর পরের বড় জনসংখ্যার দেশ হল ভারত ১৪০ কোটির কম, প্রায় ১৩৮ কোটি। আর এরা দুই রাষ্ট্র যদি একসাথে রাশিয়ান তেল কিনে এবং রুবলে তাহলে এর অর্থ হবে দুনিয়ার মোত জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ ভাগ জনসংখ্যায় রাশিয়ান তেন কিনতে ফিরে গেল। অর্থাৎ এদের মিলিত জনসংখ্যা বা রাশিয়ান তেলের ভোক্তা হয়ে যাওয়া খুবই তাতপর্যপুর্ণ। রাশিয়ান মোট কাস্টমারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আমেরিকান অবরোধের প্রভাব অকার্যকর হয়ে যাবেই। সবচেয়ে বড় কথা এতা কিন্তু চীন-ভারতের কোন আঁতাত নয়। বরং ২০১৪ সালে যখ প্রথম আমেরিকা রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ করেছিল এরই প্রতিক্রিয়ার চীন-রাশিয়া তেল কিনার চুক্তি হয়েছিল। চীনা ইউয়ান মুদ্রায় রাশিয়ান তেলের বিনিময়ে চীনা পণ্যের রাশিয়ার কিনে নেওয়া চালু তখন থেকে।   আর ভারত এখন রাশিয়ান তেল সস্তায় পেয়ে ছারতে চাচ্ছে না এমন কাস্টমার। কাজেই  এদুই বড় রাশিয়ান তেলের ক্রেতা বাইডেনের জন্য বিরাট হুমকি অবশ্যই!! এথেকে অনুমান করা যায় ভারতকে আমেরিকার কোলে ফের পেতে বাইডেন অনেক দূর যেতে রাজি হবেন, সম্ভবত  চাপ প্রয়োগ সর্বোচ্চ করবেন!

    এমনিতে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকারের – কথা যদি বলি তবে শুরু থেকেই বাইডেনের “মানবাধিকার” –  এই অস্ত্র তাক করা ছিল মূলত ভারতের দিকে। না ভারতকে ঠিক কোন বিশেষভাবে ঘায়েল করার জন্য নয়। বরং বাইডেনের দেখানো দরকার এই অস্ত্র তিনি সবার উপরে সমান প্রয়োগ করছেন কোনো বৈষম্য বা কাউকে খাতির ছাড়া। এ ছাড়া এটা বাইডেনের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। বরং ভারতের পাওনা তিনটা অবরোধের সিদ্ধান্ত তৈরি আছে; কিন্তু তিনি কার্যকর না করে ফেলে রেখেছেন। অর্থাৎ বাইডেনের ক্ষমতা নেয়ার পর থেকেই মুলত বাইডেন-ভারত আর এক লাইনে অ্যালাইন করা অবস্থানে নাই, চলছে না এবং এটাই তাদের ফান্ডামেন্টাল বিরোধ। মানে কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে চলতে পারবেন না। কেন?

    যে শাসক নরেন্দ্র মোদি নিজেরই  জনগোষ্ঠীর এক অংশ, মুসলমানদের খুন করার প্রকাশ্যে হিন্দুদেরকে আহবান জানানোর ব্যবস্থা করে দিতে দ্বিধাগ্রস্ত নন – এই মোদিকে চিনতে হবে। কেন মোদি এমন ডেস্পারেট? তার খোঁজ নিলে দেখব, এটাই আসলে তাঁর নির্বাচনে জিতে আসার খুবই কাজের এক কৌশল। সব পথ হারিয়ে এটাই এখন মোদির একমাত্র অবলম্বন। কাজেই মুসলমান নিগৃহীত করা তার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তবেই এই জোশে হিন্দু ভোট তার বাক্সে আসবে। অতএব, এ জায়গায় মোদি বাইডেনের মানবাধিকারের কথায় কোনো ছাড় দিতে পারবেন না। আবার বাইডেনও ভারতকে মানবাধিকারে এমন জলজ্যান্ত লঙ্ঘন উপেক্ষা করতে পারবেন না। কারণ অবরোধ ও মানবাধিকার এদুই এখন তার প্রধান অস্ত্র। তিনি ভারতের উপর এই অস্ত্র প্রয়োগ বাতিল না করে বড়জোর পিছিয়ে যত দিন দেরি করা যায় তা করতে পারেন, এটাই কেবল বাইডেনের হাতে আছে। এভাবেই তিনি এখন পর্যন্ত ভারতকে ধরে রেখেছেন চুড়ান্ত ফাটাফাটিতে যান নাই। যদিও এটাই হয়ে আছে – বাইডেন-ভারত সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা না হওয়ার পথে প্রধান এক বাধা হয়ে থেকে আছে।

    বাধা দুইঃ
    রাশিয়ার ওপরে ভারতের সমরাস্ত্রে নির্ভরশীলতা, সেটা কমপক্ষে ৭০ শতাংশ। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক রিপোর্ট এটাকে ৮৫%  […as high as 85 per cent.] বলেছে। তাই আমেরিকার রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপের পরে সবচেয়ে বড় বিপদ গুনেছে ভারত। প্রধান কারণ সত্যিই ভারতের সাথে কোথাও কারও সাত দিন যুদ্ধ চললে সাপ্লাই ফুরিয়ে যাওয়াতে এরপর ভারত রাশিয়ান সাপ্লাই বিশেষত ছোট-বড় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও স্পেয়ার্স পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যাবে।  ভারত কেন এমন রাশিয়া নির্ভরশীল হল এর অবস্থার পেছনের কারণ দু’টা। এক. রাশিয়ান অস্ত্র তুলনায় আমেরিকান যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে সত্যিই দশগুণ সস্তা। একটা হেলিকপ্টার, এমন ন্যূনতম ভারী অস্ত্রের বেলাতেই এটা সত্য। দুই. রাশিয়া তো আসলে ভারতের কোল্ডওয়ার-কালের মিত্র। ফলে সেকাল থেকে রাশিয়ান অস্ত্রনির্ভর হয়েই ভারত নিজের প্রতিরক্ষা সাজিয়েছিল। সুবিধা ছিল প্রধান ভারতের তখনকার প্রধানশত্রু পাকিস্তান যেমন আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাঁধা। ফলে ভারতেরও রাশিয়ার সাথে বাধা পড়লে এটা দীর্ঘ দিন একই সাপ্লায়ার হয়ে টিকে থাকার বা কাজ করার সম্ভাবনা ভাল মনে করা হয়েছিল। তাই এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক জেনেশুনেই তৈরি। তবে এটাতে প্রথম নড়াচড়া পড়েছিল ২০০১ সালে বুশের আমলে ওয়ার অন টেরর ইস্যুতে ভারত বুশের মিত্র হওয়ার পর থেকে। অর্থাৎ কোল্ডওয়ার উত্তরকালে সেই প্রথম বুশ ভারতকে নিষিদ্ধ পারমাণবিক কাঁচামাল ও টেকনোলজি সরবরাহের লোভ দেখানোতে। সেখান থেকেই ক্রমেই এটা ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর হয়ে পরে চীন ঠেকানোর নাম করে ভারত-আমেরিকা সখ্যের গভীরতা শুরু। আর এতেই আমেরিকা-ঘনিষ্ট ভারতই এখন সবচেয়ে করুণ দশায়। বলা হচ্ছে ‘বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সবচেয়ে চিকন এক দড়ির উপর দিয়ে হাঁটছেন” [Why India is walking a diplomatic tightrope… ]।’ কেন এমন মনে করা?

    তাই ভারতের একেবারে প্রধান শঙ্কা হল, রাশিয়ান অস্ত্রের সাপ্লাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কারণ রাশিয়ার উপর বলতে গেলে আমেরিকার সব বন্ধু অবরোধ আরোপ করেছে। তাই এক কড়া অবরোধের চাপে তাহলে ভারত রাশিয়ান স্পেয়ার্সের সাপ্লাই পাবে কী করে? অর্থ পরিশোধ করবে কী উপায়ে? আর এখান থেকেই আমেরিকান অবরোধ বাইপাস করে রুবলে রাশিয়ার সাথে পণ্য লেনদেনের ব্যবস্থা প্রথম চালু করে ভারত। স্বভাবতই এটাই বাইডেনের সবচেয়ে বড় না-পছন্দ ও ক্ষুব্ধ তিনি। অতএব আমেরিকা হুঙ্কার দিচ্ছে, “রাশিয়ার তেল কেনা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন নয়, তবে ইতিহাস নয়া দিল্লিকে ভুল স্থানে নিয়ে যাবে: হোয়াইট হাউজ”।

    এই অবস্থায় আমেরিকার ডেপুটি নাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার দালিপ সিং, যিনি আসলে বাইডেনের রাশিয়া অবরোধের টেকনিক্যাল প্রণেতা, তিনি ভারত সফরে এসেছিলেন। তিনি উপস্থাপন নরম কিন্তু কড়া ভাষায় ভারতকে সাবধান করেন ভারতকে, রাশিয়ান তেল কিনার বিরুদ্ধে। সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়া সংগে সম্পর্ক গভীর না করতে [urged the country not to enhance ties with Moscow.] র তাতেই মিডিয়া মন্তব্যে এটাকে বিতর্কিত মন্তব্য [created controversy ] বলে ট্যাগ দেয়া হয়েছে। এমনকি শিরোনামে আর কড়া করে বলা হয়েছে NSA who warned India on Russia ties…।

    এমনিতেই আমেরিকার শখের ধন কোয়াডের [QUAD] এটা নিয়ে গর্ব বা হুমকির শেষ নাই এরই ভিতর ভারত বাকি কয়াড সদস্যদের মত রাশিয়ার উপর কোন অবরোধ আরোপ দূরে থাক উলটা পক্ষে যায় এমনভাবে ভোট দিয়েছে।তাই   বাইডেন একবার বলে বসেন কোয়াডের মধ্য একমাত্র ভারতই কাপাকাপি [shaky] বা অগোছাল [The Quad is — with the possible exception of India being somewhat shaky] . আর এতে আরএসএস এর এম নেতা উলটা বলেন আমেরিকাই কাপাকাপি [shaky]। আমেরিকা চীন থেকে শুরু করে আফগান্সতান পর্যন্ত শেকি [It’s Biden’s US that’s shaky, not India — from China to Afghanistan]। শুধু তাই না তিনি আরও আগিয়ে বলেন, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক একটা শেকি ফেজে প্রবেশ করেছে [India-US relations seem to be entering a ‘shaky’ phase]।

    অর্থাত এসব রিপোর্ট নিয়ে  ভারতের মিডিয়া তোলপাড়। যদিও ইউক্রেন ইস্যু হাজির হবার আগে থেকেই ভারত বাইডেনের বিকল্প বা বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করে আসছিল, যাতে মুসলমান দলনের কারণে মোদির ওপর আমেরিকান মানবাধিকার চাপ ভারত এড়াতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার ‘কোলে চলে যাওয়া’র সময় তখন যে ভানটা ভারত তৈরি করেছিল সেটাই এখন একেবারেই সিরিয়াস হয়ে গেছে।

    অবস্থা দেখে মনে হয় ভারতের মনের গহিনের অনুভব সম্ভবত এটাই যে, ভারত আমেরিকার সাথে সখ্য চাইলেও শেষে ভারত তা রক্ষা করে চলতে পারবে না। রাশিয়ার কাছেই ভারতকে যেতেই হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার চীনের সাথে সম্পর্কটা কেমন হবে – এই হল আরেক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আর এটাই   ভারতের বড় দ্বিধা অস্পষ্টতার জায়গা। ফলে আমেরিকা চাপ দিলেই ভারত আরও দিশেহারা বোধ করে। আর নিজ বিপুল জনসংখ্যার বাজারের লোভ দেখিয়ে ক্ষুব্ধ আমেরিকাকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু এবার স্টেক সম্ভবত অনেক উঁচু! তাই কী হবে এই আশঙ্কা জয়শঙ্করেরও! তিনি আবেদনের স্বরে বলছেন, রাশিয়ায় অবরোধের কারণে আমাদের নিরাপত্তার দিকটা (মানে তাদের অস্ত্র পাবার দিকটা)  অস্পষ্ট হয়ে গেল। এদিকটা তাদের বিবেচনা করা দরকার।

    এসবের মধ্যেই ব্যাপক কুটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে। অথচ ভারতের এই “রুবলে দেনদেন” চালুর ব্যাপারে এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর হতে চান বাইডেন। সর্বশেষ এটা নিয়েই মূলত ওয়াশিংটনে ১১ এপ্রিল থেকে ভারত-আমেরিকান বৈঠক, যার গালভরা নাম ‘২+২’। আর এখানেই রাশিয়ান এস-৪০০  ভারতের কিনবার শাস্তি হিসাবেও এক অবরোধ আরোপ পেন্ডিং পড়ে আছে। আর এখানে ২+২-এর মানে হলো, দু’দেশেরই দুই পররাষ্ট্র ও দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একসাথে চারজনের বৈঠক। এর আগে চীনকে দেখাতে যে, ভারত যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে তা ভেবে এমন ২+২ বৈঠক নিয়ে মিডিয়ায় গর্ব ভরে উপচে উঠত আমরা দেখেছি। কিন্তু আজ সেসব ম্লান, সবাই রিয়েল প্রবলেমের সামনে পড়েছে। তাই যেন ভ্যানিটি উপাদানগুলো অনাদরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর এই মিটিংতা আসলে যদিও মূলত আমেরিকান সামরিক অস্ত্র ভারতের কিনা সংক্রান্ত কিন্তু নেপথ্যে ভারত-আমেরিকান সম্পর্কের টানাটানি অসন্তোষটাই সারফেসে বারবার ছাপিয়ে উঠতে চাইবে।

    তবে এটাও ভুলে যাওয়া ভুল হবে যে, জয়শঙ্করের “খুব চিন্তায় আছি” টাইপের যে ইমেজটা তৈরি করেছেন এর আরেক অর্থ ও উদ্দেশ্য আছে। তা হল, ভারতের কেনাকাটার উপর এসব আমেরিকান অবরোধে যেন  আমেরিকা ছাড় পায় সে জন্য আমেরিকার সামনে এক করুণ ইমেজ তৈরি করে রাখা। যদিও ভারত জানে, বাইডেনের এখানে ছাড় দেয়ার সুযোগ বা ইচ্ছার মধ্যে নাই। তবে জয়শঙ্করের মুল বা খাস উদ্দেশ্য হল, ভারতে মোদির মুসলমান কোপানোতে এজন্য এর উপর কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবরোধ যেন আরোপিত না হয়। সে ব্যাপারে বাইডেনকে ঠান্ডা রাখা। কারণ, রাশিয়ান অস্ত্র কিনার শাস্তি হিশাবে অবরোধ খাওয়া যতটা জাতিবাদি গর্বের, মুসলমান কোপানোর জন্য অবরোধ খাওয়া ততটাই বেইজ্জতির হবে!

    তবে ভারতের দিক থেকে আরেক রিয়েল থ্রেটও আছে যেটা ভারতের ভাষায় চীনের সাথে তার সীমান্তবিরোধ। যেটা আর কিছুই না, কলোনি আমল থেকেই অচিহ্নিত হয়ে থাকা সীমানা। যদিও একথা মনে করার কারণ আছে, এটা মূলত উগ্র হিন্দুত্ব এমন জাতিবাদী কল্পনার শাসক মোদি হওয়ার কারণে। যে কারণে এই যে দেখার বা উপস্থাপনের চেষ্টা যে, মোদির হিন্দুত্ব জাতিবাদ সীমান্ত রক্ষায় সবচেয়ে দেশপ্রেমিক! কিন্তু আসলেই কি এই প্রদর্শন খুবই মূল্যবান? সীমান্ত দুই ইঞ্চি জায়গা ছাড় বা দখল পাওয়াটাকে হিন্দুত্বের জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে ভোটের বাক্সে এর ফল ক্যাশ করার চেষ্টা এটা ত ফালতু জাতিবাদেরই থাকে। যেটা প্রাকটিক্যাল নয়, কাজের লাভালাভ নাই।

    বরং ভারতের লম্বা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে কথা বললে এই কথিত সীমান্তবিরোধ তুলনায় তুচ্ছ। আর আমেরিকা তো ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া গ্লোবাল নেতা যার বিপরিতে চীন  সে জায়গা নিতে ক্রমেই উত্থিত নেতা তাহলে বুড়া সিংহ আমেরিকার যে ন্যাচারালি মরণ হবে এটা না বুঝার কিছু নাই। কারণ এর আর ভারতকেও ন্যূনতম বিনিয়োগ বা ঋণ দেয়ার মুরোদও নেই। তাই প্রতীকী অর্থে ক’দিন পরে মরবে যে শক্তি এর সাথে ভারতের গাঁটছড়া বাঁধার অর্থ কী? ভারতের বন্ধু তো হওয়ার কথা ভারতের আগামীদের, তার অতীত নয়। এটা মানতে না পারার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা আসলে মোদির উগ্র হিন্দুত্ব, এই চোখ দিয়ে দেখার সমস্যা।

    ভারত-আমেরিকান নড়বড়ে সম্পর্কঃ
    ইউক্রেনে হার হচ্ছে টের পাওয়ার পরে বাইডেন দক্ষিণ এশিয়ায় জোর দিয়েছেন, মনোযোগ ফোকাস করেছেন। এটা ভারতও সেন্স করেছে। যেমন এক মিডিয়া রিপোর্ট তাই লিখছে, ‘পাকিস্তানের অস্থিরতা, কলম্বোর অর্থনৈতিক ক্রাইসিস, মালদ্বীপে ভারতবিরোধী ক্যাম্পেইন, তালেবানদের ভারতবিরোধিতা ও চীনের প্রভাব বাড়ানোতে ভারতের প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা ভারতের জন্য লংটার্ম রিস্কের ইঙ্গিত।’ [Colombo to Male to Islamabad, India has new headaches as neighbourhood erupts in trouble] অথচ আগে হলে মানে, ভারত আমেরিকার শক্ত কোয়াড বন্ধু হয়ে থাকার কালে এসব অস্থিরতাকে ভারত ইতিবাচকভাবে দেখত, নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নিত। অথচ এখন শঙ্কিত হচ্ছে। আসলে ভারত যদি নিজেকে চীনের সাথে তুলনীয়ই শুধু না, এক পরাশক্তি ভাবতে থাকে তাহলে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক আর ঘনিষ্ঠ না থাকলে চীনের সামনে সেই ভারতের কী হবে এ নিয়ে হাত পা কাঁপাকাঁপি করা থেকেই এমন রিপোর্টই তো লেখা হবে এবং হয়েছেও।

    যা হোক, ভারতের মন এখন আশঙ্কায় পূর্ণ যে আমেরিকা-ভারত সম্পর্কটা কি একেবারে ভেঙে না গেলেও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? নাকি ভেঙ্গেই যাবে? যেমন, রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকান আপত্তি যদি ভারত না শুনে তবে চরম পরিস্থিতিতে খোদ ভারতের উপরই একটা অবরোধ আরোপ হতে পারে আর সেটা খুব দূরের কিছু নয়। আর এটা নিয়েই আসলে ভারতের মূল দুশ্চিন্তা। আর সে ক্ষেত্রে তাহলে এশিয়ায় সুনির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশে কী হবে?

    বাংলাদেশে কোনো হবু আমেরিকান তৎপরতা বা হস্তক্ষেপে ভারত কোথায় কোন দিকে অবস্থান নেবে, থাকবে, তাহলে সে ক্ষেত্রে? একটা সম্ভাবনা ধরা যাক যদি আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক খুবই নিচে চলে গেল; তবু সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেলায় ব্যতিক্রমভাবে তারা একসাথে লিপ্ত আছে, এমন দেখতে পাওয়া অসম্ভব নয়। যদিও এমনটা দেখতে পাবার সম্ভাবনা কম। আবার অন্য একটা কথাও আছে।

    বাংলাদেশে কোনো তৎপরতায় আমরা যদি আমেরিকাকে দেখি, যার বগলে ভারত বাঁধা আছে তবে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বা যেমন ধরা যাক যাদেরকে অনেকে ‘ইসলামিস্ট’ বলে, এদের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক খারাপ। এদের কাছে আমেরিকার কোনো গ্রহণযোগ্যতা দূরে থাক সেক্ষেত্রে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে। তাতে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক যেমন অবস্থাতেই থাকুক না কেন। বলা যায়, এটাই গত ১৪-১৫ বছরে বাংলাদেশে ভারতের অর্জন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোথায়? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]