Category: INDIA

  • “দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ

    “দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ

    গৌতম দাস

    ০৪ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৮ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-40v

     

    –        ‘The Kashmir Files’ Makers

    দ্য কাশ্মির ফাইলস – একটা ভারতীয় সিনেমার নাম। আসলে বলা উচিত, মুসলমানের প্রতি ঘৃণাবিদ্বেষের বিষ উগড়ে দিয়ে বিজেপির পক্ষে নিজ বাক্সে হিন্দুভোট জোগাড়ের নতুন এক উপায় হল, এই কথিত সিনেমা। ‘কথিত’ বললাম এ জন্য যে, কোন নির্বাচনী প্রপাগান্ডা বা প্রচারমূলক কাজে প্যারোডি গান লিখে গেয়ে তা ক্যাম্পেইনের যেমন রেওয়াজ দেখা যায় এটাও তেমনি যেন; তবে এটা অনেক বড় ধরনের বাজেটের প্রপাগান্ডা। তাই পয়সা খরচ করে গানের বদলে একেবারে সিনেমা বানিয়ে এক বড় প্রপাগান্ডার কাজ। প্রপাগান্ডা মানে যেখানে সত্য-মিথ্যা ভুলে, কেয়ার না করে তা কেবল প্রচার আর প্রচার! তাই এটা সিনেমা নয়; না সৌন্দর্যগুণ বিচারে না বিনোদনের বিচারে। এটা একটা প্রপাগান্ডার বস্তু মাত্র।

    আর খরচের বিচারে শোনা যায়, এটা প্রায় সাত কোটি রুপিতে বানানো, যেটা ইতোমধ্যে ৩০০ কোটির বেশি অর্থ আয় করেছে। সত্যি হিন্দুত্ববাদ কী না পারে যার মূল কারণ বলা যায়, বিজেপি শাসিত রাজ্যে এর টিকিট করমুক্ত করা হয়েছে, এভাবে হাইপ-জোশ তোলার কারণে আর দলীয় প্রপাগান্ডা যেমন সারা ভারতে নাকি মুসলমানরা হিন্দুদের ওপর হত্যা ও অত্যাচার করছে -ফলে হিন্দুরাই ভিকটিম, তাই ত্রাতা মোদিকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান, এটাই এই ছবির মাহাত্ম্য!

    কাশ্মির ফাইলস-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ধরতে ফ্যাক্ট চেকঃ 
    ‘কাশ্মির ফাইলস’-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ও অপততপরতাগুলোকে উন্মোচন করতে বিভিন্ন “ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট” প্রকাশ হতে শুরু করেছে।
    আবার ইতোমধ্যে ভারতেই এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে আরো যেসব প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছে এর বিরুদ্ধে পাল্টা ‘ফ্যাক্ট চেক’ (অর্থাৎ বর্ণিত কোন ঘটনার পিছনের আসল ঘটনাটা কী তা পরীক্ষা ও প্রমাণসহ সেই ফ্যাক্টস তুলে ধরা) রিপোর্টও মিডিয়ায় প্রকাশ করা শুরু হয়েছে। এরই একটা রিপোর্ট দেখা গেল, গত পয়লা এপ্রিলের দক্ষিণী পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’তে [Fact Check: ‘The Kashmir Files’ and the disinformation surrounding it]।

    A girl walks past a poster of the Bollywood movie “ The Kashmir Files” inside a cinema in Mumbai, on March 17, 2022. Credit: Reuters

    ওখানে পাঁচটা বিভিন্ন প্রপাগান্ডার ঘটনা তুলে আনা হয়েছে, যার পাঁচটাই ভুয়া বা মিথ্যা বলে প্রমাণ দেখানো হয়েছে। এখানে ওর একটা তুলে আনছি। যেমন, কাশ্মিরে কতজন হিন্দু কাশ্মিরি পণ্ডিত এ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে? এতে কোনো এক কথিত আরটিআই (RTI বা, রাইট টু ইনফরমেশন) তথ্যে বলা হয়েছে, তা ১৬৩৫ জন। কিন্তু এই ফ্যাক্ট চেক মোতাবেক, তা মাত্র ৮৯ জন আর বাকিরা ‘অন্য কেউ’। এই রিপোর্টের সিদ্ধান্ত হল, এই তথ্যা মিসলিডিং। মানে এটা শ্রোতা-দর্শককে ইচ্ছা করে ভুল ধারণা দিয়ে বিপথে নেয়া।

    ছবির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রা, তিনিই আসলে মোদির মুল পুতুল! যেমন তিনি ২০১৭ সালেও মোদির হয়ে ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের মেম্বার ছিলেন এবং  কাশ্মির নিয়ে অন্যান্যদের ফিল্ম রিলিজে বাধা দিয়েছেন। তিনিই এখন আবার কাশ্মিরি প্রপাগান্ডা সিনেমা বানানোর পরে আনুষ্ঠানিকভাবে মোদির সাথে দেখা করতে গেছেন যেন তারা এক মহত-কাজ করেছেন। আর ঐ দেখা করার অনুষ্ঠানে মোদি বলেছেন মুক্ত ভারতে সবাই ছবি বানাতে পারে।

              সৎ যুধিষ্ঠির নরেন্দ্র মোদির “দেশের স্বার্থে” হিন্দুত্ববাদের সৎ ও সত্য কথা তুলে ধরার প্রজেক্ট এই সিনেমা; “….to portay the truth correctly”। বলেছেন                    সত্যের অনেক  রূপ আছে, যে চায় অন্য একটা ফিল্ম বানাক”। আগ্রহিরা দেখতে পারেন এখানে ।

    সার কথায় সব ফ্যাক্ট চেক রিপোর্টই পাল্টা কথায় বলছে যে, এটা একটা বিজেপি দলীয় প্রপাগান্ডা সিনেমা; ফলে নানান উসকানিমূলক তথ্য, ভুয়া তথ্য (অনেক মিডিয়ায় এই সিনেমাটাকে ধান্ধাবাজি বা ম্যানিপুলেটেড তথ্য বলতেও দ্বিধা করা হয়নি) সাথে দিয়ে দলীয় প্রপাগান্ডায় সবটা অসৎ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

     

    সিনেমা তৈরি পরে পরিচালক অগ্নিহোত্রী ও অভিনেত্রী পল্লবী জোশি  যেন এক মহৎ কিছু অর্জন করেছেন – যেখানে প্রপাগান্ডার গ্লানিটুকুও নাই –  এই মনে করে মোদি ও অমিতের সাথে দেখা করে এসে এরপর সেই মধুর সাক্ষাতের উচ্ছসিত বর্ণনা পাবেন – এই লিঙ্কে এখানে।  

    হিন্দুত্ববাদের প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও, দ্য ডেইলি স্টারঃ
    এই প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও লেগেছে মানে লাগিয়েছে ইংরাজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। বাংলাদেশে অনেক ব্যক্তি বা তাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, যেমন কোনো ইংরাজি পত্রিকা এদের মধ্যে তারা সেকুলার হয়ে থাকবে ও দেখাবেই এমন ব্রত নিয়ে থাকতে দেখা যায়। কারো মধ্যে কোন কিছু ব্রত বা প্রতিজ্ঞা হিসেবে থাকা তা হয়ত খারাপ নয়; কিন্তু যখন ফলাফল দেখা যায় উল্টা!! কারণ এতে মূল সমস্যা আমরা যখন দেখি, ঠিক কী করলে তাদের আকাঙ্খার সেকুলার অবস্থান সেটা কী বা কী হতে পারে এটা নিয়ে তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণাই নাই। যেমন অনেককেই ভেবে বসতে দেখা যায় যে, ধর্ম বিশেষত ইসলামকে যদি কষে গালাগাল  কেউ করে দিতে পারে বা ইসলামের নিকুচি করে দিতে পারে তাহলে সে বা ঐ আচরণ নিশ্চয় সেকুলার; অর্থাৎ এটা একটা তাদের কাছে এক অদ্ভুত মাপকাঠি!!!  এমন উদ্ভট সব ফ্যান্টাসী ধারণা বা গোপন খায়েশ আমাদের অনেকের মধ্যেই থাকতে দেখা যায়। এতে পরিণতি দেখা দেয় যে, কখন কথিত প্রগতিবাদ আর হিন্দুত্ববাদ এক হয়ে গেছে এরা কেউ তারা টের পায়নি বা খেয়ালই করেনি! তেমনই অবস্থা হয়েছে ডেইলি স্টারের!

    ফেসবুকে ডেইলি স্টারের এক সিনেমা রিভিউ পেজ আছে যার নাম “স্টার মুভি রিভিউ”। সেখানে দেখা গেল, দ্য কাশ্মির ফাইলস এই সিনেমা নিয়ে প্রায়  দশ মিনিটের এক সিনেমা রিভিউ বা পর্যালোচনার ভিডিও বক্তব্য [যে সিনেমা নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত ভারত] সাঁটা আছে। অনুষ্ঠান সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব। তিনি কথা শুরু করেছেন ওই সিনেমার পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীকে সাধুবাদ দিয়ে। কী কারণে? তিনি নাকি “এমন একটা ঘটনাকে এই প্রথমবারের মত বিগ স্ক্রিনে তুলে এনেছেন যা এপর্যন্ত কেউ তুলে আনেনি; গত ত্রিশ বছর ধরে ঘটনাটা নিয়ে কেউ কথাবার্তা বলেনি। অথচ এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”।

    আসলে এই কথা বলেই সঞ্চালক যে হিন্দুত্ববাদের কবলে পড়ে গেলেন তাই-ই তার হুঁশে নাই।
    ওদিকে ঐ হত্যা-অত্যাচারের ঘটার আগে-পরের সময়কালে  কংগ্রেস তো বটেই খোদ বিজেপি ও বাজপেয়িও এই ঘটনা ঢেকে রাখার ক্ষেত্রে সহযোগী ভুমিকা ছিল অর্থাৎ ঢেকে রাখা কর্তাদের দলে তারাও ছিলেন তাহলে তারা কেন ও কিভাবে এ ঘটনা নিয়ে কথা তুলবেন?  ফলে এটা তো ঢাকাই থাকবে, নাকি? এটাই ঢাকা থাকার মূল কারণ। তো পরিচালক অথবা  এখনকার সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব ইত্যাদি এদের উচিত হবে কেন তারা ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন সে দিকে যাওয়া। কেবল কংগ্রেস খারাপ অথবা যেন কাশ্মীরের মুসলমানেরাই এটা প্রকাশ হতে না দিবার জন্য দায়ী এমন ইঙ্গিত তোলা অসততা  হবে।

    আসলে প্রথমত, এটা মুম্বাইয়ের কোনো বাণিজ্যিক সিনেমা বলতে যা বুঝায় তা নয়। এটা হিন্দুত্ববাদের পক্ষে দলীয় ভোট জোগাড়ের এক প্রপাগান্ডামূলক সিনেমা। অথচ এটাতে ভান করা হয়েছে যেন এটা একটা সাধারণ বাণিজ্যিক সিনেমাই। আবার এটা হিন্দুত্বের রাজনীতি এর স্বার্থে করা সিনেমা; অতএব এটা নিশ্চয় ভারতীয় উগ্র চরম জাতিবাদের স্বার্থের সিনেমা। কাজেই বিজেপি সরকার এ ছবির প্রদর্শন ট্যাক্স ফ্রি করে দিয়ে  কথিত দেশপ্রেমী জাতি-বোধের জজবা ও জোয়ার তুলুক,  তবু আমাদের একে প্রশংসা করতে হবে? এখন লক্ষণীয় কথিত হিন্দুস্বার্থ কিভাবে কোন ফাঁকে ভারতীয় জাতিবাদের স্বার্থ হয়ে গেছে কেউ তা খেয়াল করছে না। হিন্দুস্বার্থ মানেই তা ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ না-ও হতে পারে, এটাই হলো বটম লাইন। মুসলমান কোপানোকে যদি কেউ হিন্দুস্বার্থ বলে মনে করে তাহলে এটাও কী ভারতের স্বার্থ হবেই?

    দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় ঘটনা বা সঞ্চালকের চাতুরী এবং বোকামিটা হল, তিনি সাধুবাদ দিয়ে যাচ্ছেন পরিচালককে। কেন? তিনি মনে করছেন এর আগে কেউ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগ মানে, তাদের ভারতের অন্য শহরে চলে যাওয়া – এই চাপা পড়ে থাকা ঘটনার দিকটা সামনে নিয়ে আসেনি। অতএব পরিচালক অগ্নিহোত্রী নিশ্চয় অনেক মহান মানুষ। তাই কি?

    এথেকে দর্শক ভুল ধারণা পেতে পারে যে, তাহলে কাশ্মির সমস্যা মানে হল, মুসলমানদের হাতে হিন্দু দলন ও নিপীড়নের ঘটনা। বিজেপির ভাষায় ‘জাস্টিস’- দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের জাস্টিস দেয়ার কথা কেউ বলেনি। যেন সে জন্যই এটা এক সিনেমা! নাজমুস সাকিব জেনে না জেনে এই অসত্য ধারণা তৈরি করছেন।

    ধরা যাক যদি আপনি আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিকে প্রথমে আগ বাড়িয়ে খুবই নির্দয়ভাবে পিটিয়েছেন। পরে ওই প্রতিদ্বন্দ্বি আপনার চেয়ে দল ভারী করে আপনাকে আরো নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আরো বেশি সংখ্যায় আহত-নিহত করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি খুবই বুদ্ধিমান বলে আগে আপনার ওদেরকে পেটানোর অংশ আড়ালে বা বাদ রেখে কেবল আপনাকে কিভাবে কত খারাপভাবে পিটিয়েছে এনিয়ে এক লোমহর্ষক সিনেমা বানিয়ে ছেড়ে দিলেন, যাতে কেউ এটা দেখলে আপনাকেই খুবই ও একমাত্র ভিকটিম মনে হতে থাকে। আর এর ফলে তা দেখে এক নাজমুস সাকিব বলা শুরু করেন, পরিচালককে ধন্যবাদ যে, তিনি ভিকটিমকে জাস্টিস দেয়ার পথ খুলেছেন, কেউ যা নিয়ে কখনো কথা বলেনি, সে চাপা পড়া বিষয়টাই তিনি সামনে এনেছেন। ব্যাপারটা অনেক সুইট আর প্রগতিবাদী হবে তাহলে তাই না? আর এতে আমরা নিশ্চয় আপনাকে ‘খুবই বুদ্ধিমান’ বলব, কী বলেন?

    কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতাঃ
    দ্য কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতা এটাই। কারণ এর উদ্দেশ্য হিন্দু-মুসলমানকে প্রথমে বিভক্ত ও মেরুকরণ করা। পরে হিন্দুরা ভালো, মুসলমানরা খারাপ এভাবে এক তৈরি বয়ানে ঘটনাকে তুলে ধরা, যাতে এবার বিজেপি বা মোদিকে ত্রাণকর্তা মনে হয়। আর তাতে সব হিন্দু ভোট বিজেপির বাক্সে ঢোকে। এ জন্য সে কাশ্মিরের ঘটনা ইতিহাসের আগে-পিছে দেখাবেই না। যেন কাশ্মীর মানেই মুসলমানের হাতে হিন্দু নিপীড়ন অত্যাচারিত হওয়া, এটাই তুলে ধরবে…।
    অথচ এই শঠতাকারিরা কাশ্মিরের ঘটনা মানেই তা ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্ম অথবা ১৯৫০ সালে রচিত ভারতের কনস্টিটিউশন থেকেও শুরু করবে না। তাঁরা এর শুরু ধরবে জানুয়ারি ১৯৯০ সালে  হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগের ঘটনা থেকে। আবার এর শেষও তাঁরা টেনে দিবে ১৯৯০ সালের দু-এক বছর পরেই। আর প্রচার চালাবেন, এখনো কাশ্মিরের একমাত্র সমস্যা হলো ইনজাস্টিস; দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের প্রতি ইনজাস্টিস। আর এতে নিশ্চয় আপনার প্রাপ্য হবে সাধুবাদ! তাই কি?

    কাশ্মির ফাইলস-এর শঠতাকে বিচার বা ওর শঠতাকে উদাম করতে চাইলে দুটা প্রশ্ন করেন আর তা বুঝার চেষ্টা করেন। এক, কাশীরে সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল কবে থেকে এবং কেন?  আর দুই, কাশ্মীর শুরু থেকে মানে ১৯৪৭ সাল থেকে কখনই এটা হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত দাঙ্গার ইস্যু ছিল না। ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে কাশ্মীরের সংঘাত; ভারতের সাথে থাকা  ও না-থাকার সংঘাত। তাহলে কাশ্মিরে হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল কবে থাকে এবং কেন?

    সংক্ষেপে বললে, কাশ্মীরে সশস্ত্র রাজনীতি বা তরুণদের হাতে আস্ত্র তুলে নেওয়া এটা ১৯৪৭ সালের ঘটনা নয়। বরং ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কাশ্মীরের রাজনীতি মানেই সেটা নির্বাচনি রাজনীতি ছিল। ঐ ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পরে ১৯৮৮ সাল থেকে কাশ্মীর সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করে।  আত তা থেকে প্রথমে বছরে দুএকজন পরে ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ঐ বড় করে  হিন্দু পণ্ডিতদের হত্যা নিপীড়ন ও দেশত্যাগের ঘটনাটা ঘটেছিল।  তাহলে এই পুরা ঘটনা থেকে কেবল ১৯৯০ সালের হিন্দু পন্ডিত নিপীড়নের ঘটনাকেই আলাদা করে এই সিনেমা উঠিয়ে আনছে কেন? কেবল ১৯৯০ সালের এই ঘটনাকেই ইনজাস্টিস বলে তুলে আনছে কেন? যে এই প্রশ্ন করতে পারবে না সেই-ই এই সিনেমার মাধ্যমে মোদির হিন্দুত্ববাদের শিকার হবে।

    কাশ্মীর বিরোধের ফান্ডামেন্টাল দিকঃ
    কাশ্মিরের সব অশান্তির শুরু ১৯৪৭ সাল থেকেই।  ভারতের প্রায় সব রাজনীতিবিদ এখনও কাশ্মিরের প্রাক্তন রাজা হরি সিং ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হয়ে যাওয়ার কাগজে সই করার উপযুক্ত অথরিটি বলে মনে করেন।  এমনকি রাজনীতিবিদদের এমন মনে করার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিকরা এনিয়ে ভিন্ন আর কিছু জানেন তা মনে হয় না।
    বরং সারা ভারতকে এক মিথ্যা জাতিবাদী জোশে ভুগতে দেখা যায় যে, ব্রিটিশ কলোনি দখলদাররা নাকি স্বদেশী আন্দোলনের নামে জমিদার হিন্দুর সন্ত্রাসবাদ বা কংগ্রেসের আন্দোলনে মুখে টিকতে না পেরেই যেন ভারত ত্যাগ করেছিল। অথচ একথা শতভাগ মিথ্যা। ফ্যাক্টস হল, কেবল ব্রিটিশরা নয়, সারা দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসকই ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ থামার পরে স্ব স্ব কলোনি ছেড়ে স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফিরে চলে গিয়েছিল। আর তারা ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল যে কারণে ঠিক সেই একই কারণে, রাজা হরি সিং-সহ তার মত কোন রাজারই ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হওয়ার কোনো কাগজ-দলিলে স্বাক্ষর করার অথরিটিই ছিল না, অথরিটি হারিয়েছিল। আর এসব কিছুর পেছনে মূল কারণ হল ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি [Atlantic Charter Aug14, 1941]। এটাকে বলা যায়, আমেরিকার সাথে কলোনি দখলদার ইউরোপের একেবারে মুখ্য এক চুক্তি। এই চুক্তিতে বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশেরা বিনা শর্তে দখলদারি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আর এই শর্তেই আমেরিকা হিটলারের বদলে ব্রিটিশ-ফরাসি ইত্যাদি মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে বিশ্বযুদ্ধে সেই প্রথম অংশ নিতে সম্মত হয়েছিল। আর এর সাথে এতে ফেলে যাওয়া কলোনির কোন রাজার আর কোনো অথরিটিই নেই, থাকবে না যে, সে ওই দেশকে নিয়ে নিজ খেয়ালে অন্য কোনো দেশের ভেতর যোগ দেওয়াতে পারব। কারণ ঐ চুক্তিতে বলা আছে ওই দেশ কার দ্বারা শাসিত হবে, এর একমাত্র নির্ধারক হবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ বা পাবলিক। ফলে ঐদেশের নিজ ভাগ্য তা নিজ পাবলিকের ভোটের সম্মতিতে ঠিক হবে। ফলে তা সহজেই এক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র হতে পারবে। ব্রিটিশরা চলে গেলে কাশ্মিরেরও এমন হওয়ার কথা।

    নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, পড়েছেন জানা যায় নাঃ
    কিন্তু নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, এর চিহ্ন-প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি এই চুক্তি-ই যে, জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি -দলিল বলে জাতিসংঘ মনে করে এবং সেটাও নেহরু জানতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং উল্টা প্রমাণ আছে। এসবেরই ফলাফলে নেহরু কাশ্মিরকে জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে রাখার পক্ষে জোড়াতালি (৩৭০ বা ৩৫এ ধারা) কিছু কাজ করে যান। কাশ্মিরের সব সমস্যার শুরু এখান থেকে। এবং কোন মতেই এটা কাশ্মীরের হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ-সংঘাত একেবারেই নয়।
    আর কড়া কথাটা হল, দুনিয়ার সব ইতিহাস পাঠক বা স্টুডেন্টদের মুখস্ত থাকা উচিত আটলান্টিক চার্টার চুক্তির। কারণ এটা উপস্থিত মর্ডান ও গ্লোবাল  রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দলিল। যারা পড়বে না তাঁরা বকোয়াজ করবে।

    দ্বিতীয় বড় ফ্যাক্টস হল, জম্মু-কাশ্মির মিলে ২০১১ সালের হিসাবে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১.৩ কোটি যার ৬৮.৩% হলো মুসলমান আর হিন্দুরা ২৮.৪; বাকিটা অন্যান্য। আর ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই যে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা যেটা সেটাই কাশ্মিরের ওপরেও ভর করেছিল কিন্তু অনেক ধীরে ধীরে  যদিও তা অনেক পরে ১৯৮৭ সালের আগে নয়। কেবল সেই সমসাময়িক সময়ে। তাতে কী হয়েছিল?

    ভারতের ‘আদি পাপ’ হল, সব নাগরিকদের সমান অধিকারের রাষ্ট্র হবে, সেটা তাঁরা করবে না। মানে অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র তা হবে না; তাঁরা গড়বে না। বরং তাঁরা সাম্য নয়, হিন্দু আধিপত্যের এক রাষ্ট্র গড়বে। যা এক হিন্দু ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র হতে হবে। আর যে ধর্মের লোক সংখ্যায় বেশি মানে হিন্দুরা এ রাষ্ট্রে আধিপত্য নেবে। এভাবেই ১৮৮৫ সাল থেকে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এই লাইনে আগিয়েছে আর ১৯৪৭ সালের ভারত কায়েম করেছে।
    আমার এই অসাম্যের রাষ্ট্র হিন্দু আধিপত্যের রাষ্ট্র কথাটা বুঝে নিতে এদিকে আসেন। যেমন, সাম্প্রদায়িক শব্দটাকে ভাঙেন, যে শব্দটা দুনিয়ার আর কোনো রাষ্ট্রে নাই। আর এ শব্দের আসল অর্থ হল, হিন্দু আধিপত্যের স্বার্থে ডিফাইন করা সীমার মধ্যে মুসলমানদের বসবাস, জীবন যাপন করতে হবে। তাই মুসলমানেরা ধর্মীয় চিহ্ন প্রদর্শন করে স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপনও করে চলতে পারবে না। যদি তা অনুসরণ না করে তবে ওসব মুসলমানকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ দিয়ে নিন্দা করা হবে। বিপরীতে যেসব মুসলমান তা মানবে, মানে হিন্দু আধিপত্য কর্তৃত্ব মেনে নেবে তাদের মানার শর্তেই তারা হিন্দুদের পাশে সমাজে মানে যেমন স্কুলে অফিসে পাশে বসতে দেয়া হবে। আর তাতে এসব মুসলমানরা ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে গণ্য হবে। তাই সাম্প্রদায়িক বা অসাম্প্রদায়িক শব্দের আসল কাজ ও রূপ হল “হিন্দু আধিপত্য” নিশ্চিত করা।
    যেমন দেখেন মোগল আমলে “সাম্প্রদায়িক” বলে কোন ধারণা বা শব্দটা নাই। তখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কথাও জানা যায় না। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বেশির ভাগ জমিদারি হিন্দুরা নেয়াতে (যে জমিদারি মানে, ব্রিটিশ শাসকের নিচে ওই সমাজের কর্তা এক নিয়ামক শক্তি ) এবার তারা তাদের আধিপত্য (ধর্মীয় পরিচয়ে আধিপত্য) চালু করেছিল। আসলে হিন্দু জাতিবাদের ভিত্তিতে হবু ভারত গড়তে হবে – কংগ্রেসের এই নীতির ভিত্তিতে ভারতের জন্ম – এটা ক্রমেই ওই জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের পক্ষে সাফাই হিসাবে হাজির হয়েছিল।

    এখন ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের কনষ্টুটিউশনে  কাশ্মিরকে ভিত্তিহীনভাবে ভারতের অঙ্গীভুত করে নিবার পরেও নেহরু শান্তিতে থাকতে পারেননি। সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ১৫% তবে কোথাও কোথাও মানে, কোন রাজ্যে বা শহরে তা বড়জোর ২৫-৩০%। ফলে সহজেই হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম রাখা সহজ ছিল যদিও তা সমাজে সবধরনের নাগরিক অসাম্যের প্রধান উৎস হয়েই থেকে গেছিল।

    কিন্তু ভারতের এই হিন্দু-আধিপত্য পছন্দের শাসকরা তাদেরই আধিপত্যের তত্ত্ব মুসলমানরা কেমন অস্বস্তি অনুভব করে তা কাশ্মিরে টের পেয়েছিল। কারণ ওই একই আধিপত্য তত্ব কাশ্মিরে তাদের বিপক্ষে কাজ করেছিল। কারণ কাশ্মিরে মুসলমানরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ (৬৮%)।  আর এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে কোন হাতছুট ঘটনা ক্রমন হতে পারে এর প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৮৭ সালের কাশ্মীর (প্রাদেশিক বা অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনে। কারণ তত দিনে কাশ্মিরের অতিষ্ঠ মুসলমানরা, তাদের ব্যক্তি বা সামাজিক-রাজনৈতিক দল বা গ্রুপগুলো একজোট হয়ে মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট (এমইউএফ MUF) গড়ে ওই নির্বাচনে লড়ে ক্ষমতা নিতে তৈরি হয়েছিল। এই এমইউএফ ছিল ১৯৮৪ সালে গড়ে তোলা প্রথম ভ্রুণ এক ছাত্রসংগঠন, যার নাম ছিল ইসলামী স্টুডেন্ট লীগ। এটাই প্রথম কাশ্মীরের রাজনীতিতে  “সবকিছু ইসলামি হতে হবে” এই আইডিয়ার রাজনীতির আবির্ভাব ঘটেছিল।   আসলে ভারতের আধিপত্য তত্ত্ব অনুসারে, কাশ্মিরে হবু মুসলমান আধিপত্য দেখে তারা প্রমাদ গুনে বিপদ বুঝতে পারে আর এটাই তারা মেনে নিতে পারেনি।
    কেন কাশ্মির এমন বদলে গেল, মূল কারণ নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হলে সেখানে ধর্মীয় বা সব ধরনের পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান নাগরিক হয়ে থাকতে পারে আর নাগরিকের যদি সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয়, তাহলে কারো কারো আধিপত্যের আলাপ সেখানে থাকে না। কিন্তু বাস্তবের ভারত ছিল এর বিপরীত। হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের হাতে পড়ে সেটা হিন্দু আধিপত্যের ভারত হয়ে উঠেছিল। আর তা একইভাবে কাশ্মিরের মুসলমানরা অনুসরণ করতে গেলে হিন্দুদের জন্য সব বিপদ ঘনিয়ে ওঠে।আর এতেই সবচেয়ে বড় স্টুপিডিটির বা দেশলাই মারার কাজটা করেছিলেন ফারুক আবদুল্লাহ।

    দেশলাই জ্বালানোর ভুমিকায় ফারুক আবদুল্লাহঃ
    এই “মুসলিম উত্থান” বার্তাটা কাশ্মির জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ নজর করেন। কারণ তিনি এমইউএফ-এর ভেতরের কোন নেতা ও দল ছিলেন না। তিনি ততকালের বিষয়টাকে দিল্লি গিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কানে তোলেন; সাথে আলাপ করেন এই এমইউএফ-এর উত্থান ঠেকানো নিয়ে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ব্যাপক হলেও সরাসরি নির্বাচনী কারচুপি করেই তারা এই উত্থান ঠেকাবেন। তাই ঐ নির্বাচনের ভোটদানের পরেই এমইউএফের ছোট-বড় প্রায় সব নেতাকর্মীকে (যতদুর সম্ভব) তারা গ্রেফতার করেন আর পরে প্রতিটা কেন্দ্রের ফলাফল ওই দিন দূরে থাক সপ্তাহ-দশ দিন পরে ইচ্ছামত ঘোষণা করেছিলেন। আর এখান থেকে কাশ্মিরের রাজনীতি মানে মিছিল মিটিংয়ের প্রকাশ্য রাজনীতি ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরের বছর ১৯৮৮ সাল থেকে সারা কাশ্মির সশস্ত্র রাজনীতি পথে চলে যায়। অস্ত্র আর খুনাখুনি এটাই প্রধান ধারা হয়ে যায়। তারপর থেকে কাশ্মিরে নির্বাচনের আর কোনো গুরুত্ব থাকেনি, থাকার আর কোন সুযোগও থাকে নাই। কংগ্রেস-বিজেপির ভাষায় যা ‘জঙ্গিবাদ’ হয়ে যায়। আর বিজেপির বাজপেয়ি তার নতুন ডমিনেটং বয়ানে হাজির হলেন। তিনি কাশ্মিরে কংগ্রেসের হাতে ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপি করাতে রাজনীতিকে সশস্ত্রতার দিকে ঠেলে দেয়া্কে ভুলে গেলেন, অস্বীকার করলেন। আর এক নয়া বয়ান হাজির করলেন যে, কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস ‘সীমা পার কী আতঙ্কবাদ’ -মানে কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস নাকি পাকিস্তান থেকে আসা টেরোরিজম! কেন্দ্র ভারতের কোন ভুমিকা যেন নাই!
    যারা  ১৯৮৭ সালের এই টার্নিং পয়েন্ট বিস্তারিত আরো পড়তে চান তাঁরা দেখতে পারেন ১। এখানে,   ২।  এখানে The 23rd March 1987, the day that changed Kashmir as never before, ৩।  এখানে, ৪। এছাড়াও আমার এক পুরানা লেখা এখানে।

    আর ওদিকে কাশ্মিরের সশস্ত্র রাজনীতির শুরুতে এই প্রথম প্রথম প্রতিহিংসাবশত দু-একজন হিন্দু পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে যেটার সবচেয়ে বড় আর ব্যাপক হত্যার ঘটনাটা ছিল ১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি। আর এবারও কংগ্রেস, বিজেপি, ফারুক আবদুল্লাহ আর মুফতি সাঈদ সবাই কমবেশি যার যার অবদান-দায় রেখে পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন। ভেবেছিলেন পন্ডিতেরা দেশত্যাগ করলে সেটা সশস্ত্রতার বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ান তৈরিতে একটা চাপ হবে। কাশ্মিরের গভর্নর জগমোহন বা কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি সাঈদ বা বিজেপি সমর্থিত কোয়ালিশনে ভিপি সিং-এর সরকারের আমলে এই জম্মুত্যাগের ঘটনাটা ঘটানো হয়েছিল। তাই সকলের দায় ছিল। যদিও কেউ এথেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। কিন্তু শিক্ষাটা হলো, কেউ কোনো একটা নিজধর্মীয় আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র গড়বেন নাকি অধিকারভিত্তিক সাম্যের নাগরিক রাষ্ট্র? যেমন গড়বেন তেমন ফল পাবেন। ফলে সেটা সারা ভারতে কায়েম করবেন অথবা কেবল কাশ্মিরে কোনো একটি ধর্মীয় আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়বেন – যেখানেই গড়েন, এই কাজ কোথাও কারো জন্য ফলদায়ক হয়নি। আর আপনি যদি হিন্দু আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র চান তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনি তার মানে সে দেশে মুসলমান আধিপত্যের আরেক জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার জন্ম হতে দাওয়াত দিচ্ছেন!!!
    ঠিক যেমন এখন ভারতে শুরু হয়েছে হিন্দু-জাতিবাদের আরও ভয়াবহ সেকেন্ড ফেজ। এবার হিন্দুত্ববাদের আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়ার খায়েশ। এতে আরেকবার মুসলিম লীগের মতোই মুসলিম জাতিরাষ্ট্র চিন্তার জন্মকে (এবার তা সম্ভবত গ্লোবাল) দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। যেমন গুড় ঢালবেন তেমনই মিস্টি হবে!

    তাহলে কাশ্মির ফাইল কী দাঁড়াল? সেটা হচ্ছে কাশ্মিরের সব ইতিহাস ফেলে কেবল ১৯৯০ সালে কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যাওয়াটা – কেবল এই অংশটা ইতিহাস থেকে তুলে এনে একে সামনে এনে বিজেপির পক্ষে সহানুভ‚তি জোগাড়, এই হিন্দুত্ব উত্থানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার ১৯৪৭ সাল থেকে কত কাশ্মিরি মরেছে – কত ইনজাস্টিস সেটা নয়; কেবল ১৯৯০ সালে্র মধ্যে সব বুঝাবুঝি সীমাবদ্ধ করতে রাখতে চাইছেন। সঞ্চালক নাজমুস সাকিবের মত বলতে থাকেন কাশ্মির ফাইল সিনেমা  “এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”। আর সাথে মুখরোচক দাবি – জাস্টিস।  তবে কেবল “১৯৯০ সালকে” জাস্টিস দিতে চাইছেন!

    কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে পরে প্রতিবাদঃ 
    ডেইলি স্টারের ওই সঞ্চালক তার অনুষ্ঠানের শেষের দিকে বারবার অনুরোধ করছিলেন কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে যেন তাঁর কথার প্রতিবাদ বা ভিন্নমত নিয়ে কেউ আসেন। অথচ তিনি নিজেই আসলে কাশ্মিরের ইতিহাস কতটুকু জানেন? কাশ্মির মানে কী কেবল ১৯৯০ সাল??? না। অবু তার কাছে কাশ্মিরের ইতিহাস মানেই কেবল ওই ১৯৯০ সাল ও কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু-ত্যাগ এটুকুই মাত্র। তামাশার আসলে কোনো শেষ নেই।
    তিনি টেরই পেলেন না যে, তিনি পরিচালক অগ্নিহোত্রীর হিন্দুত্ববাদের পাল্লায় পড়ে অন্ধ হয়ে গেছেন বা হতে চেয়ে হয়েছেন। অথচ তিনি মনে করছেন, নির্যাতিত হিন্দুদের পক্ষ নিয়েছেন; তাহলে এটা নিশ্চয় প্রগতিবাদী অবস্থান।  কিন্তু কে তাকে বুঝাবে ঠিক এখানেই প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ এরা এমন এক হয়ে গেছে! তাই তিনি হিন্দুত্ববাদকেই প্রগতিবাদ ঠাওরাচ্ছেন!! বেচারা ডেইলি স্টার!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ ‘দ্য কাশ্মির ফাইলস’; যেখানে হিন্দুত্ববাদই প্রগতিবাদ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!

    পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!
    গৌতম দাস

    ১ এপ্রিল ২০২২   সময় ০০ঃ০৬ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ZZ

     

     

    দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্বে থাকা এক আমেরিকা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের এক রাষ্ট্রদুতকে হুমকি দেয়া এক চিঠিতে লিখেছে যে ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব পাশ না হলে পাকিস্তানকে নাকি চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে [ …wherein Pakistan was warned of “grave consequences” if the no-trust motion failed.]। এই চিঠিকে কেন্দ্র করে এটা পাকিস্তানের রাজনীতি ও ক্ষমতায় আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগে তোলপাড়। এবং এখন খুব সম্ভবত আগামি ৩ এপ্রিলে পাকিস্তানে সংসদে অনাস্থা ভোটে ইমরানকে পরাজিতই হতে দেখব আমরা।
    আসলে এটা কেবল পাকিস্তান নয়। আমাদের ধারণা সবাই পাকিস্তানের জায়গায় নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রকে বসিয়ে ব্যাপারটা ভাবতেছে। তাই এই পাকিস্তান ইস্যু গুরুত্বপুর্ণ।

    এনিয়ে আমার এক ফেসবুক স্টাটাসে আলোচনায় এক পাঠক একটা প্রশ্ন রাখেন। নিচে সেই প্রশ্নটা তুলে ধরা হল। আর এরপরে এনিয়ে আমার জবাবও সাথে দেয়া হল।

     

    প্রশ্নঃ  চীন কেনো হাত গুটিয়ে বসে থাকে বিভিন্ন দেশে এরকম অবস্থায়? চীনের তো বিশাল বিনিয়োগ ও কৌশলগত স্বার্থ আছে। চীন তাহলে কিভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার সঙ্গে পেরে উঠবে? এছাড়া কোন দেশের সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে এরকম বিপদে পরলে, চীনের পক্ষ থেকে যদি যথাযথ সাহায্য না পায় তাহলে কে যাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে।

     

    আমার উদাহরণসহ একটু বড় জবাবঃ 
    সব স্বার্থ-সংঘাতকেই সামরিক সংঘাত মনে করা খুবই বড় ভুল বিচার। অথবা একে সামরিক দিক থেকে দেখা-নেওয়া বা ঠেলে দেওয়া ঠিক না; বুদ্ধিমানের কাজও না। কারণ এর চেয়েও সহজ পথ আছে।
    এছাড়া সবার আগে চীন-আমেরিকার স্বার্থ-সংঘাতটাকে বুঝতে হবে। মূলত এর ধরণটাকে বুঝতে হবে। এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে থাকে আমেরিকা, এর নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে।  চীনা উত্থান আমেরিকাকে তাড়া করে ফিরছে।  তাই এর নানা ধরণের ছাপ ও প্রকাশ ঘটছে চারদিকে বিশেষত এশিয়াতেই যা বেশি এবং সবদেশেই কমবেশি।  ফলে আমাদের মত দেশে একেকজন ইমরান – প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান এই টানাটানি চাপের মধ্যে পড়বেই। তাতে আপনি ইমরান অথবা হাসিনা  প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান যেই হন!
    এখন আপনি প্রশ্নকর্তা  আশা করছেন আমেরিকান ন্যায় অথবা অন্যায় চাপের মুখে চীন কেন পাকিস্তানের ইমরাঙ্কে  রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে না – এই হল আপনার প্রশ্ন!
    এনিয়ে আগে বাংলাদেশেরই একটা উদাহরণ দিব। পরে আবার কিছু তত্ব কথায় আসব।

    ঘটনাটা বাংলাদেশের টিকা প্রাপ্তি নিয়েঃ
    তখনও  দুনিয়াতে  চীনা উতপাদিত কোন টিকাই বাজারে আসে নাই।  এমনকি পশ্চিমা ফাইজার বা মর্ডানাও নয়। বরং চীনা টিকারই (Sinovac) তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হবে যা সফল হলে পরে টিকার বাণিজ্যিক উতপাদন শুরু হবে। চীন বাংলাদেশকে এই থার্ড ফেজে ঐ প্রক্রিয়াতে যুক্ত হতে অফার দিয়েছিল। থার্ড ফেজ মানে আগের মূল দুই গুরুত্বপুর্ণ ফেজ-এর পরীক্ষানিরীক্ষা সফল হয়ে গেছে। তাই এবার বাজারে ছাড়ার আগে একটু দেখে নেয়া যে (বাংলাদেশেও) এই টিকা পুশ করলে ব্যবহারিক পর্যায়ে ছোটখাট হলেও খারাপ প্রতিক্রিয়া হয় কিনা বা হলে আগেই তা এড়ানো যায় কীনা ইত্যাদি এসব ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই এই থার্ড ফেজ। যার অর্থ চীন এই পরীক্ষামূলক টিকা বাংলাদেশ কেবল নির্বাচিত কিছু হেলথ-স্টাফদেরকে দেয়া হবে আর তাদেরকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। যেহেতু এটা তখনও পরীক্ষামূলক তাই। আর বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল চীনা টিকার এক শেষ ফেজে টেকনিক্যাল সহায়তা করার।  বাংলাদেশকে দেয়া ঐ অফারে বলা হয়েছিল এই পরীক্ষা সফল হলে কয়েক লাখ ফাইনালি উতপাদিত টিকা  আমাদের দেয়া হবে বিনা খরচায় আর সাথে  লাইসেন্স ও সহায়তা দেয়া হবে যাতে নিজেরাই আমরা দেশে প্রডাকশনে যেতে পারি  একটা বড় খরচ ও সামর্থ ছাড়াই।
    কিন্তু ভারত পুরা ব্যাপারটা ভন্ডুল করতে নগদ “কমিশনের” লোভ দেখিয়ে সরকারকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশই ভারতে আগাম অর্থ দিয়ে ওদের ফ্যাক্টরির উতপাদন
    ক্ষমতা বাড়িয়ে দিবে আর তাতে উতপাদিত টিকা আর কমিশন দুটাই ভোগ করবে। আর তা করতে মাঝখানে সরকার-প্রিয় বাংলাদেশের প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে ভারতের সাথে চুক্তি করা হয়।  আর এতে মন্ত্রণালয় অতি খুশিতে থাকায় চীনের সাথে টিকার (থার্ড ফেজ) ফর্মাল চুক্তির সম্মতি স্বাক্ষরের সময়সীমা মিস করে যায়। পরে দেরিতে হলেও সেসব পত্র দিতে যোগাযোগ করলে চীনের দিক থেকে জানানো হয় যে যে তাদের টিকা উতপাদন কোম্পানি (ওটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানির টিকা পরীক্ষা ছিল) আমাদের সময়সীমা মিস করাতে ঐ অফার অন্য দেশকে দিয়ে দিয়েছে (সম্ভবত ইন্দোনেশিয়া)। ফলে এখন আর কী করা যায় এনিয়ে এক প্রাথমিক আলাপে বলা হয় ফান্ডই প্রধান সমস্যা।  এখন নতুন করে ফান্ড যোগাড় করতে সময় লাগবে। আপনারাও দেখেন আমরাও দেখি ফান্ড কোথা থেকে যোগাড় করা যায়। এককথায় ব্যাপারটা অনিশ্চিত হয়ে যায়।
    এখন এনিয়ে বাংলাদেশ খবর ছড়িয়ে পড়লে এটা বিব্রতকর হবে কারণ তখনও আমাদের টিকা কোথা থেকে আসবে তা একেবারেই অনিশ্চিত ছিল। তাই অনুমান করা হয় এথেকে রক্ষা পেতে ভারতের সাথে মিলে একটা গল্প সাজানো হয়। ভারতের রয়টার্সের রুমা পাল আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন চীনারা অর্থ চেয়েছে এজন্যই বাংলাদেশ-চীন টিকা ডিল ভেঙ্গে গেছে?
    আমাদের মন্ত্রী সায় দিয়ে বলে হা সেজন্যই। এরপর তারা আইসিডিডিআরবি-কেও জিজ্ঞাসা করে কেন টিকা-সম্পর্ক কাজ করছে না? কিন্তু এনিয়ে আইসিডিডিআরবি কোন মন্তব্য করতে রাজি হয় নাই। এরপর ঢাকার চীনা এমব্যাশি কেও একই প্রশ্ন করেছিল কিন্তু তাদেরও জবাব ‘নো কমান্টস’।
    আমাদের অঞ্চলে  আমেরিকান ফান্ডেড ও নিয়ন্ত্রিত আরেক মিডিয়া আছে “বেনার নিউজ” নামে। তারাও এনিয়ে রিপোর্টের ফাইন্ডিংসও প্রায় একই রকম।

    অর্থাৎ এসব প্রশ্নের জবাবে চীন চাইলে প্রতিবাদ করে আসল ঘটনা ফাঁস করে দিলে আমাদের সরকার বিব্রত হয়ে যেত। কিন্তু চীনা অবস্থান ছিল মিডিয়া এড়িয়ে যাওয়া। কেবল সবুর করা ধৈর্য ধরা আর এতে মেওয়া মিলবে তা বিশ্বাস করা। ঘটেছিলও তাই।

    ভারতীয় টিকা আমরা নিতে শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে করোনা সেকেন্ডে ভ্যারিয়েন্ট বা ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত হয়ে যায়। দাবি উঠে বাংলাদেশকে টিকা বন্ধ করার যদিও আমরা আগাম বিনিয়োগ করে কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়ে টিকা পাবার চুক্তি করেছিলাম। কিন্তু ভারত সরকার আর টিকা দিতে পারে নাই, বন্ধ করে দিয়েছিল। ততদিনে দুনিয়ায় টিকা পুর্ণ আবিস্কৃত আর প্রত্যেক দেশই কোথা থেকে নিজের প্রয়োজনীয় টিকা পাবে তা চুক্তিবদ্ধ হয়ে রয়েছিল। কেবল আমরা বাদে। ফলে সরকারের এতা বলার সুযোগ ছিল না যে টিকা আবিস্কৃত-ই হয় নাই।  তাই উপায়ন্ত না পেয়ে সরকার চীনের হাত-পায়ে ধরা শুরু করেছিল।
    সংক্ষেপে বললে এতে ফলাফল হল, চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে অনেক ছাড় আমাদের দিতে হয়েছে যদিও বিনিময়ে আমরা এখন প্রয়োজনীয় টিকা যতটা পুশ করতে সক্ষম এর সবটা পাচ্ছি চীন থেকে আর তা সম্ভবত এখন ফ্রি। সাথে আমাদের একটা প্রাইভেট ওষুধ কোম্পানিকে টিকা উতপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে চীনা সহায়তায়।

    তাহলে কী দাড়ালো?
    কুটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোমালিন্য হলেই লাঠি-বন্ধুক বের করা চলে না। এর সবচেয়ে বড় কারণ, সব সম্পর্কই সামরিকভাবে কে কত বড় বা সক্ষম তা দিয়ে সাব্যস্ত হয় না, তা নয়ও তাই।
    বিশেষ করে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব টা সামরিক নয়। আমেরিকার অর্থনৈতিক হাল চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, একেবারেই তুলনীয় নয়। কিন্তু সামরিক দিক দিয়ে আমেরিকা এখনও ছয়গুণ বেশি সক্ষম। আমেরিকার গ্লোবাল প্রভাব এখনও কম নয়। যদিও দ্রুতই তা কমছে।

    কাজেই আমেরিকার উদ্বৃত্ব সম্পদ না থাকার সমস্যাটা, অন্যদেশকে অর্থ-বিনিয়োগ-অনুদান দিবার অযোগ্যতাটা  এসবগুলো আমেরিকার বাড়তি সামরিক সক্ষমতা দিয়ে পূরণীয় নয়। কাজেই মূল সামর্থটা উদ্বৃত্ব সম্পদ কার কেমন আছে!

  • বিচারক বা কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    দেশপ্রেম নয়, মানুষ ন্যায়বিচার দেখতে চায়!
    বিচারক-কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    গৌতম দাস
    ২১ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3YT

    –

    Former Chief Election Commissioner OP Rawat along with Chief Election Commissioner Sunil Arora (L) and Election Commissioner Ashok Lavasa (R) | PTI–

    গত ১০ মার্চ ছিল ভারতের পাঁচ রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন। এক পাঞ্জাব ছাড়া নির্বাচন কমিশন বাকি চার রাজ্যে  বিজেপিকে বিপুল বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছিল সেদিন। অর্থাৎ বিজেপি এখন ওসব রাজ্যে সরকার গড়বে। উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, গোয়া ও মনিপুর এই পাঁচ রাজ্যে এবার নির্বাচন হল। যদিও এই পাঁচ রাজ্য রাজ্যের মর্যাদার দিক থেকে এরা সবাই-ই সমান। কিন্তু এরা সবাই সমান রাজ্যের মর্যাদার হলেও জনসংখ্যা বা রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে তারা সমান নয়। এভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলো কোনোভাবেই অন্য রাজ্যের সমান নয়। কেন সমান নয়?
    এটা বুঝবার একটা দিক-পদ্ধতি হতে পারে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পার্লামেন্ট (বা যেটাকে ওরা লোকসভা বলে) তাতে কোন রাজ্যের কার কতটা আসন তা দিয়ে। কেন্দ্রে কম আসনের রাজ্য মানে সেটা ছোট রাজ্য; মানে কম জনসংখ্যার মানেই তা ভৌগলিকভাবেও ছোটরাজ্য। এই হিসাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট নির্বাচন যেটাকে তারা লোকসভা বলে তাতে মোট ৫৪৩ আসন। আর তাতে উত্তরপ্রদেশ (৮০), উত্তরাখণ্ড (৫), পাঞ্জাব (১৩), গোয়া (২) ও মনিপুর (২) – এভাবে পাশের ব্রাকেটে তাদের লোকসভার আসন বা কনষ্টিটুয়েন্সি কয়টা তা দেখানো হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন হয়ে গেছে গত বছর ২০২১ সালে; তবু কৌতুহল মিটানো আর তুলনা করে বুঝবার জন্য এখানে জানানো হচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ লোকসভা আসন ৪২টা আর এর মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা কম করে ধরলেও ১৬ কোটি।
    তাহলে ফর্মুলাটা হল, ভারতের কোন রাজ্য কত বড় বা গুরুত্বের তা বুঝবার সোজা তরিকা হল ঐ রাজ্যের জন্য বরাদ্দ লোকসভায় আসন সংখ্যা জেনে নেয়া। এই গুরুত্বের বিচারে যেখানে ভারতে কেন্দ্রে সরকার গড়তে লাগে লোকসভায় ন্যূনতম ২৭২ আসন, সেখানে একা উত্তরপ্রদেশ যা একমাত্র বড় রাজ্য তা দিতে পারে একাই ৮০ আসন। ফলে উত্তরপ্রদেশ গুরুত্বে এখানেই সবার চেয়ে বড়। এ ছাড়া সারা ভারতের উপর যেটাকে বলে হিন্দি বলয়ের শাসন- আধিপত্য, এর কেন্দ্র বুঝাতে উত্তরপ্রদেশকে দেখানো হয় । আবার এটাই ‘আর্য’ বা ব্রাহ্মণ আধিপত্যের কেন্দ্র, এই হিসেবে উত্তরপ্রদেশ। আবার এর বিপরীতটা হল দ্রাবিড়ীয় বা ডেকান [Deccan বা দাক্ষিণার্ত] দক্ষিণী চার রাজ্য আর এ দিকে আংশিকভাবে বাংলা প্রদেশ। এ ছাড়া শেষে একটা ‘নোক্তা’ হিসেবে বলা যায়, ভারতের নেহেরু-গান্ধী ডায়নেস্টি বা বংশের শাসন সেটাও এই উত্তরপ্রদেশ কেন্দ্রিক; সুনির্দিষ্ট করে বললে এলাহাবাদ শহরে যেটা আসলে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য হাইকোর্টের শহর। আর এখানেই নেহেরুর বাবা মতিলাল নেহেরু বৃটিশ আমলে এলাহাবাদে ওকালতি প্র্যাকটিস করবেন বলে পাশের কাশ্মির থেকে এক কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ – তিনিও উত্তরপ্রদেশেই এককালে খুঁটি গেড়েছিলেন।
    দরকার যেখানে ফেডারল রাষ্ট্র অথচ হয়ে আছে উগ্র হিন্দুত্বের জাত শ্রেষ্ঠত্বের এর ভারত জাতিরাষ্ট্র! যার বিচার বিভাগ আবার ন্যায়দন্ড ফেলে ন্যায়বিচারের বদলে এর উপরে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ভুয়া দেশপ্রেমিকতাকে!

    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতির পাঠঃ
    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানে নির্বাচনের প্রসঙ্গে আসি। এবার এই পাঁচ রাজ্য নির্বাচন চলেছিল কয়েকপর্বে প্রায় এক মাস ধরে, ৭ মার্চ পর্যন্ত; যার গণনা, ফলাফল এক সাথে ১০ মার্চ প্রকাশিত হয়েছে। উপরে দেখানো উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বের কারণে পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হলেও ভারতের রাজনীতির সবাই আসলে তাকিয়েছিল এক উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের দিকে। যেকোন নির্বাচনে কিসের ভিত্তিতে ভোট বিভিন্ন প্রাথীর বাক্সে যাবে, ভাগ হবে, এমন নানা নির্বাচনী ইস্যু তাতে হাজির হতে দেখা যায়। সেই বিচারে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় গত এক মাস ধরে যেসব নির্বাচনী ইস্যুর কথা বলা ও আলোচনা করে হয়েছিল সেগুলো হল – এক. কৃষক আন্দোলন। মানে আগের টানা ১৫ মাস ধরে চলা এক কৃষক আন্দোলনে শেষে মোদি হার স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট তিন আইন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। দুই. ভারতে কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সামলাতে মোদির ব্যর্থতা।  অর্থাৎ  মোদির সরকার – সৎকার, হাসপাতাল বেড, অক্সিজেন ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সব সিস্টেমটাই ভেঙে পড়েছিল যেখানে। আর তাতে নাগরিক হিশাবে মানুষের মর্যাদা এই সামাজিক মুল্যবোধে ধুলায় লুটিয়ে পড়েছিল। তিন. অর্থনীতি; অর্থাৎ ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি ও কাজ সৃষ্টিতে অভাব মানে পুরানা অর্থনৈতিক ততপরতাই সীমিত বা বন্ধ হয়ে আসা – কোভিডের আগে যা ছিল তা একেবারেই ভেঙে পড়া, ইত্যাদি।
    এসব ইস্যুগুলোতে এক বিজেপির দলীয় বা সমর্থক মিডিয়া ছাড়া বাকি সব মিডিয়ায় এসব ইস্যুতে বিজেপির পক্ষ থেকে জবাব-সাফাই নাই, তারা এসব ইস্যুতে নেতি-ছাপ পড়বে প্রাপ্ত-ভোটে তাই এই ভিত্তিতে বিজেপি ভোট হারাবে এই ছিল তাদের সবারই রিপোর্টিংয়ের লাইন। যেমন “উত্তর প্রদেশের ভোটে বিজেপিকে শায়েস্তায় ‘মিশন ইউপি’’ অথবা “উত্তর প্রদেশের ভোট যে কারণে মোদির জন্য জনপ্রিয়তার পরীক্ষা”- এমন ছিল সেসব রিপোর্টের শিরোনাম।
    এছাড়া “গোরক্ষা ইস্যু” যেটা গরুকে দেবতা মান্য করার হিন্দুত্বের রাজনীতি হাজির করা; উদ্দেশ্য যে এতে ভোটাররা এই হিন্দুত্ত্বের ইস্যুতে ডুবে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিদের ফেলে বিজেপিকেই ভোটটা দিবে এই অনুমান। এই কথিত “গোরক্ষা ইস্যু” বুমেরাং হয়ে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মানে কৃষকের গরু বুড়া হলে তা মাংসের বাজারে বেচার নিষেধাজ্ঞার কারণ গরুকে বসিয়ে খাওয়াতে না পেরে মালিক সে গরুর মালিকানা ত্যাগ করে ছেড়ে দিয়েছে। আর সেই ছাড়া গরু এবার গৃহস্থের জন্য ফসল নষ্টের সমস্যা, তাতে রাতজেগে পাহারা বসানোর সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে।  [নদীতে গরু-মহিষের মৃতদেহ, উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে উত্তাপ]।  এককথায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে গরুর আক্রমণ কেন বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে এটা তুলে ধরেছিল বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়া।
    এমনকি আমেরিকান ক্ষমতাসীনদের থিংকট্যাংক “আটলান্টিক কাউন্সিল”, তারাও মোদির জন্য ‘ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ বলে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে রিপোর্ট করেছিল [Modi faces a critical test in India’s most populous state]। অথবা বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর ভাগ্য নিয়ে ফ্রান্সের মিডিয়ায় উদ্বিগ্ন রিপোর্ট [Turbulent priest: India’s anti-Muslim firebrand and possible future PM]। অন্য দিকে বিশেষ করে ইংরাজি দ্য-প্রিন্ট এ নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করে গেছে [The BJP and the SP are neck-to-neck in Uttar Pradesh ]  অথবা [CM says UP will be largest economy if BJP wins. Data shows unlikely ...]। আর কলকাতার আনন্দবাজার ছিল আরো সরেস। সে অনিন্দ্য জানা নামে এক রিপোর্টারকে সারা মাস উত্তরপ্রদেশে রেখেই নিয়মিত – “উত্তরপ্রদেশের ভোট-বুক” সিরিজ রিপোর্ট ছাপিয়ে গেছে; ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৩ পর্বে তের শহরের সিরিজ রিপোর্ট। প্রতিটা খণ্ড ছিল উত্তরপ্রদেশে বিজেপির দুঃসহ শাসনের বিভিন্ন নজির। যেমন ‘হাতরাস’ এর কাহিনী যেটা আসলে এক দলিত কিশোরীকে রেপ করে, হত্যা করে উঁচুজাতের লোকেদের কাহিনী। এরপর পুলিশ-বিজেপি মিলে ওই কিশোরীর সৎকারের নামে মা-বাবার অনুমতি বা তাদের উপস্থিতি ছাড়াই সেই লাশ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর সেই কিশোরীর বাড়ি এখন আদালতের নির্দেশে আর্মি ক্যাম্প বানিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

    কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির জিতবার আশা জাগানোর ছিল নাঃ
    অর্থাৎ সমর্থকের বাইরে কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির পক্ষে জিতবার আশা জাগানোর মত রিপোর্ট ছিল না। এর মধ্যে আরেক সংযোজন হল – দুই কথিত সাধুর (যারা বিজেপি-আরএসএস অ্যাফিলিয়েটেড) প্রকাশ্য সভা থেকে মুসলমান গণহত্যা শুরুর আহবান, হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার আহ্বানের বক্তৃতা দেয়া হয়। [ধর্মীয় বিভাজন ভারতকে তলেতলে ভেঙে দিচ্ছে] অথবা [As UP Polls Continue, BJP MLAs Dial Up Anti-Muslim Hate Speeches]।

    অথচ পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন অথবা সুপ্রিম কোর্ট নির্বিকার। সবার সময় ক্ষেপণ চলতেই থাকে। প্রায় এক মাস পরে কথিত সাধুর একজনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু মামলা দেয়া হয় মেয়েদের প্রতি অশালীন উক্তির  অথবা Haridwar ‘Dharam Sansad’ shows Modi is facing an internal threat from Sangh Parivar। এমন মামলা জামিনযোগ্য বলে ক’দিনের মধ্যেই তার জামিনও হয়ে যায়।
    এছাড়া ক’দিনের মধ্যেই হিজাব নিয়ে প্রায় জোর করে ব্যাপক এক সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। উদ্দেশ্য হলো, যত বেশি ধর্মীয় মেরুকরণ ততই বেশি বিজেপি ভোট বাড়বে, এই অনুমান। এখানে যে বয়ান তৈরির দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে তা হলো, যেন মুসলমানদের অত্যাচারেই হিন্দু জনগোষ্ঠী অতিষ্ঠ। এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়। আর এই ‘নিপীড়িত’ হিন্দুদেরই ত্রাতা হিসেবে এবার হাজির হয় মোদি ও দল বিজেপি। অতএব বয়ান শেষে হিন্দুরা একজোট হয়ে বিজেপিকে ভোট দাও!!

    মোদির এই তৎপরতা এবার প্রমাণ করেছিল যে, মোদিও নির্বাচনের ভোট তার বিরুদ্ধে যাবে এটা তার ও দলেরও অনুমান ছিল। তাই এত মরিয়া হয়ে সুনির্দিষ্ট করে এথনিক-ধর্মীয় কোনো জনগোষ্ঠী-বিরোধী প্রপাগান্ডা, সরাসরি খুন করতে বলা, ঘৃণা করতে বলার উদ্বীপ্তকরণ; এসব অ্যান্টি-মুসলমান প্রচারণা, ইসলামবিদ্বেষের [Hijab Row Can Hurt Indian Diplomacy] কোনো কিছুই তিনি বাদ রাখেন নাই।

    আরেক শেষ অস্ত্র প্রপাগান্ডায় বিজয় ঘোষণাঃ
    এরপরেই ছিল বিজেপির আরেক শেষ অস্ত্র। সারা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এসব প্রপাগান্ডার পরে পয়লা মার্চ থেকে মোদি-অমিত একেবারে ড্রাইভিং সিট নিয়ে সরাসরি বসে যান। অমিতশাহ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় পয়লা মার্চ এক লম্বা সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করে দেন, নির্বাচনে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হচ্ছে। এই ঘোষণায় একটা মিলের দিক হল, গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের সময়ও তিনি একইভাবে শেষ সপ্তাহে বিজেপি কেন্দ্রের কত আসনে জিতে যাবে, তা ঘোষণা করেছিলেন। এবারও তাই দেখা গেছে। তিনি খুব করে রিপোর্টারকে বুঝিয়ে দেন যে, দিল্লির ক্ষমতায় মানে কেন্দ্রে সরকার গড়তে গেলে উত্তরপ্রদেশ হয়ে তবেই দিল্লিতে যেতে হয়। তাই তারা উত্তর প্রদেশে জিতে যাচ্ছেন। মানে ২০২৪ সালে কেন্দের নির্বাচনেও জিতে যাচ্ছেন [“If anyone wants to form a government with full majority at the Centre, it cannot be without Uttar Pradesh’s mandate,” ]।

    কিন্তু প্রশ্ন যেখানে উত্তরপ্রদেশের এই নির্বাচনে বিজেপির জন্য এত নেগেটিভ ইস্যু আর অসংখ্য জনদুর্ভোগ থাকার পরেও কেন বিজেপি জিতবে- এ নিয়ে কোনো প্রসঙ্গ কোনো কথার জবাব অমিত শাহ দেন নাই। বারবার বলেছেন এবার (২০২২) তারা উত্তরপ্রদেশে জিতে যাচ্ছেন, তাই ২০২৪ সালেও কেন্দ্রে জিতবেন। এ ছাড়া কিসের ভিত্তিতে এ কথা বলছেন এ ব্যাপারে তিনি নিরুত্তর থেকেছেন।

    পরে ১০ মার্চ ফলাফল ঘোষণার দিনও অমিত শাহের বর্ণনা মত ফলাফল আসতে থাকে। আর তাতে নিজেদের বিজয় ঘোষিত হয়েছে বলে মোদি প্রথমেই পার্টির অফিসে বিজয় সভার আয়োজন করেন। পরে আরো বিজয় মিছিল বের করেন গুজরাট সফরে। সেখান থেকেও তার একইকথা তারা ২০২৪ সালের নির্বাচনে কেন্দ্রে জিতে যাচ্ছেন।

    এখানে তামাশা দিকটা হল, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে কোনো মিডিয়ার মনে প্রশ্ন নাই যে, কেন তাদের গত এক মাস ধরে যা কিছু রিপোর্ট – বিজেপির দিক থেকে খারাপ বা নেতি ফলাফল বা জিতিতে বাধা পাবার রিপোর্ট এর কোনো প্রতিফলন ফলাফলের মধ্যে নাই, কেন? এর ব্যাখ্যা কী? এটা আসলেই খুবই মজার যে, অনেক সময় মিডিয়া নিজের আলোচনা-রিপোর্টের প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে না-ও থাকতে পারে। কিন্তু কেন থাকল না এর ব্যাখ্যা কী? সেটা নিয়ে কথা বলা, তালাশ করা কী তাদের কাজ নয়? কিন্তু এখানেই সব ‘কবি’ নীরব দর্শক মাত্র!! আসলে, মোদির হাতে এমন কী আছে যে মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে যত নেগেটিভ দিক তার অযোগ্যতা প্রকাশিত বা প্রমাণিত থাক না কেন, ভোটাররা ক্ষুব্ধ ও সাফারার হোকনা কেন – এসবের কোনোটারই প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে থাকে না কেন? এর উপর এটা নিয়ে ঐ মিডিয়াগুলোই আর কথা বলে না কেন??

    মিডিয়া এদিকে তাকানোকে যেন নিষিদ্ধ মনে করেঃ
    ব্যাপারটা এমন যেন ভোটের প্রকাশিত কমিশনের ফলাফল মিডিয়া আলোচনার বিরুদ্ধে গেলেও তারা এনিয়ে আর আলোচনা করে না। যেন এদিকে তাকানোকে তারা নিষিদ্ধ মনে করে!!  বরং সেদিক থেকে মনোযোগ সরাতে এখন তারা অনেকে রিপোর্ট করেছে যে, কংগ্রেস কেন এত খারাপ ফল করল? যেন কংগ্রেস ক্রমেই সব হারানো দলে পরিণত হচ্ছিল না! যেন সবাই আশা করছিল কংগ্রেস এবার বিরাট কিছু ফলাফল দেখাবে!

    প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য নয়ঃ
    নীতিটা ভারী সুন্দর(!)। দেখা যাচ্ছে ভারতের লিগ্যাল প্রফেশনের (বিচারক, উকিল-ব্যারিস্টার বা লিগাল একাদেমিক ইত্যাদি) কেউ অথবা মিডিয়া যেন প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করা দেশের বিরুদ্ধে কাজ মনে করা শুরু করেছে। যেমন ধরা যাক বর্তমানে সাবেক এক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা যিনি নিয়মিত মোদির নির্বাচনী আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে একাই সোচ্চার থাকতেন; আর অন্য কমিশনারেরা নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়া [EC Rejects by 2-1 Vote Lavasa’s Demand to Record Dissent Note in Orders] বা আইনি-নিরপেক্ষ জায়গায় দাঁড়িয়ে যেকোনো বেআইনি কাজের প্রশ্ন তোলাকে দেশ-বিরোধী কাজ মনে করেছেন। এমনকি কমিশনার অশোক লাভাসা ঐ নো-অফ-ডিসেন্ট বা আপত্তি-নোটে ঠিক কী বলেছিলেন সেকথা রাইট টু ইনফরমেশন আইনেও (যে আইনে যেকোন নাগরিক কোন “পাবলিক তথ্য” জানতে চাইলে সরকার সেই তথ্য দিতে বাধ্য) নির্বাচন কমিশন তা প্রকাশ করে নাই। মোদি এবং এসব বিচারক-কমিশনারদের স্বার্থ কত গভীরে যে এরা পরস্পরকে আঁতাতে সাহায্য করে বলে থাকে, তা এখানে প্রকাশিত।  তাই তারা সবাই নির্বাহী ক্ষমতার পক্ষের লোক হয়ে থাকাই তাদের ভূমিকা মনে করছেন। কিন্তু কেন? ভারত এমন হয়ে গেল কেন?? কবে থেকে??

    Ashok Lavasa, the only member of the 3-man Election Commission to rule that Prime Minister Narendra Modi had violated the Model Code of Conduct while campaigning for the 2019 general election, was selected as a potential candidate for surveillance just weeks after his dissent, according to leaked records of phone numbers that The Wire has seen.

    সেই যে এককালে ১৯৭৫ সালে জুনে জরুরি আইনের শাসন দেখেছিল ভারত, সেই থেকে এনিয়ে এক স্মৃতি তারা কাঁধে নিয়ে ফিরছে। তারা আজও বিভ্রান্ত যে, সেসময়ে ঐ হাইকোর্ট মামলার বিচারক [Justice Jagmohanlal Sinha]  সিটিং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে আইনত শাস্তির রায় দিয়ে কি তারা ঠিক করেছিল? তারা মনে করা শুরু করেছিলেন সারকথায় বললে, তা হল প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতা যদি ট্যারা হয় – আগ্রাসী আচরণের হয়, আইন মানতে, চলতে না চায়, বাড়তি সুবিধা চায়, বিরোধীদের বিরুদ্ধে আদালতকে ব্যবহার করতে চায়- তবে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের কাজ-ভূমিকা যেন হল নির্বাহী বিভাগের পক্ষে দাঁড়ানো বা নির্বাহী বিভাগের জন্য পথ ছেড়ে দেয়া। এককথায় যত আগ্রাসী এক্সিকিউটিভ প্রধানমন্ত্রী, নিয়ম-আইন ভাঙতে চাওয়া নির্বাহীর মুখোমুখি তারা হবেন ততই তাদেরকে যেন আপসে প্রধানমন্ত্রীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। এই হলো সেই নীতি! কেন?

    এটাই তারা সেসময় উলটা ভুল শিক্ষা নিয়েছিলেন; আদালতের দেয়া সাজা ও সিদ্ধান্ত মানতে না চাওয়া প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষেত্রে! যেন আদালত ইন্দিরাকে সাজা দিয়েছিল বলেই ভারতে জরুরি আইন এসেছিল। মানে পরোক্ষে জরুরী আইন আনার দায় বিচারকদের!!! অতএব, লিগ্যাল প্রফেশনের মানুষের কাজ ও ভূমিকাই হচ্ছে অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাপ খাইয়ে চলা। এতে দেশ ভালো থাকে – তাই এটাই দেশপ্রেমিকতা!!!! বিচারকের হাতে ন্যায়দণ্ড নয়; কথিত দেশপ্রেমিকতা দেখিয়ে দোষী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাকে মাফ বা তাঁর দোষ মাফ করা বা এড়িয়ে চলাই বিচারকের কাজ!!

    লক্ষ্য করা যায়, সেই থেকে আইন প্রফেশন, বিচারকেরা হয়ে গেছেন – ন্যায়দণ্ডের বাহকের চেয়েও সবার আগে ‘দেশপ্রেমিক”। যেন দেশপ্রেমিকতা আগে দেখানো শেষ হলে এরপর বিচার-আচারে বসা যেতে পারে। এ জন্যই কি ভারতের নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসাকে কমিশনের চাকরি ছেড়ে যেতে হলো? অথচ কোনো মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা নাই!

    অথচ অশোক লাভাসা নিজে তো বটেই তার স্ত্রীও তাঁর প্রফেশনে সরকারের হাতে  নিগৃহিত ও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন।  শেষে যেটা কার্যত ক্যাডার বদল করা, এভাবেই অশোক লাভাসা এখন নির্বাচন কমিশন আগাম ছেড়ে দিয়েছেন। আর তিনি এখন মোদি প্রশাসনের তরফে সরকারিভাবে এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) ম্যানিলাতে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে থাকলে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকতেন। মানে এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন তার অধীনে হত।

    তাহলে অবস্থা দাঁড়াল এই যে এখন থেকে আইন না মানতে না চাওয়া অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীকে জায়গা করে দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। এভাবেই ভারতের আদালত আর কমিশন চলবে – ভোট কারচুপি, বাক্সের প্রোগ্রাম বদলে দিলেও এভাবেই সব চলবে। আগ্রাসি মোদিকে কিছু বলা যাবে না। আর এমন দুর্দমনীয় ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী মোদি এরপরে মুসলমান গণহত্যার হুমকি দিয়ে হিন্দু ভোট নিজ বাক্সে নিতেই থাকবেন! আর এভাবেই আগামী ২০২৪ সাল তো বটেই, আগামী ভারতে সব নির্বাচন জিতে চলবেন! আর নিশ্চয় এতে দেশপ্রেমিক ভারত অনেক উন্নতি করে এগিয়ে যাবে!!!!

    [আরেক ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করা নিয়ে আমার আগের আগের আরেক লেখা – “ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা” – সেটা পাবেন এখানে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বিচারক বা কমিশনাররা যখন সবাই দেশপ্রেমিক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • লীগ বা তার সরকার, আরএসএস-এর পাশে বসতে পারে না

    লীগ বা তার সরকার, আরএসএস-এর পাশে বসতে পারে না

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২২, ০৫:৩০ ভোর

    https://wp.me/p1sCvy-3XW

     

    Tenth round of the Indo-Bangladesh friendship dialogue

     

    ‘কানেক্টিভিটি’ [connectivity] শব্দটার অর্থ করা যায় সংযোগ বা সংযোগ-প্রাপ্যতা। ভারতের কারণে বাংলাদেশের কাছে এই শব্দটার অর্থই বদলে গেছে। এখন এর অর্থ হয়ে গেছে, বিনা পয়সায় বিনা ক্ষতিপোষণে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারত করিডোর নেবে। এমনকি রাস্তাঘাট এমনকি পোর্ট সুবিধা নিবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে। ভারতের দুই অংশকে আরামে কানেক্ট করে নিবে। বাংলাদেশের বাজার নষ্ট করবে। তাই এটা হয়ে গেছে  প্রায় জবরদস্তিতে এবং একপক্ষীয় (ওয়ানওয়ে) এককস্বার্থ আদায়ের এক শব্দ। ফলে এর সঙ্গে মিলে আবার কোথাও এটাকে  ‘বাংলাদেশ-ভারত ডায়ালগ’ জাতীয় কথার আড়ালে রেখে ততপরতা জারি রাখতেও দেখা গেছে। তাই “বাংলাদেশ-ভারত ডায়ালগ’ জাতীয় কথা কানে আসলেই মন সতর্ক হয়ে যায়!

    বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে তাই ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ডায়ালগ বা কানেক্টিভিটি ধরনের শব্দগুলো পাক্কা ছলচাতুরির শব্দই। বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়ে চাপ দিয়ে বিনা পয়সায় ভারতের একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায়ই এর লক্ষ্য।

    পররাষ্ট্রনীতি মানেই যেন যা কলোনি সম্পর্কের দাঁড়ানোঃ
    এমনিতে নেহেরু আমল মানে ভারতের জন্ম থেকেই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হল বৈদেশিক সম্পর্ক বলতে তা ‘কলোনি সম্পর্ক’, এই বুঝের উপর এটা কাজ করা। যেন পররাষ্ট্রনীতিতে দুই দেশের মধ্যে  রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক বা অন্য যে কোন সম্পর্ক মানেই তা কলোনি সম্পর্ক। বিশেষ করে ছোট দেশ হলেই তাকে ভারতের অধস্তন করে নিয়ে বা ধরে নিয়ে এই ভিত্তিতে সম্পর্ক করা। মানে এসবের বিপরীতে উভয়ের জন্য লাভজনক হয় এমন স্বার্থের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বলে যেন কিছু নাই, হতেই পারে না। অর্থাৎ কে কত চালাক ও অপরের  উপর প্রতারণায় দক্ষ, পররাষ্ট্রনীতি যেন এরই কারবার।

    আসলে কলোনি আমলে অধীনতা বা অধস্তন সম্পর্ক বলতে যা বুঝাত, তাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বুঝ। একই ধারণা অনুসারে, একালেও ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হতে পারে যেন একটাই- সেটা হল পুরনো স্টাইলের এক কলোনিদখল সম্পর্ক; আর যেখানে ভারত হবে কলোনি মাস্টার। আর যাকে দখল করা সে হবে স্লেভ [slave] বা দাস।

    এর সবচেয়ে ভাল বা আদর্শ উদাহরণ হল, নেপালের সঙ্গে ভারতের ১৯৫০ সালে করা চুক্তি,এখনও তা সংশোধন না করেই চালাতে চাওয়া ভারতের গড়িমসিরও শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি একালে ভুটানের সঙ্গে ভারতের পুনঃলিখিত নতুন চুক্তিটাও কমবেশি তাই। যেমন নেপালের সঙ্গে ১৯৫০ সালের চুক্তির একটি বৈশিষ্ট্য হল, পাহাড়ি বলে নেপালে হাইড্রোপাওয়ার বা জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা অনেক; কিন্তু সেই নিজ-উৎপাদিত বিদ্যুৎ নেপাল ভারত বাদে তৃতীয় দেশকে (সরাসরি) বিক্রি করতে পারবে না। নেপাল এক ল্যান্ডলকড দেশ; তাই সেটাকে চাপ দিবার হাতিয়ার করে এমন কথাই ঐ চুক্তির অংশ। তাহলে নেপালকে কী করতে বাধ্য?  নেপাল বরং ভারতেরই কোনো কোম্পানিকে এজেন্সি দিতে হবে আগে, এরপর সে নেপালের বিদ্যুৎ (ধরা যাক বাংলাদেশকে) বিক্রি করে কমিশন খাবে। পুরানা রাজতান্ত্রিক নেপালে, সশস্ত্র ও গণবিক্ষোভের রাজনৈতিক আন্দোলনের শেষে পরিণতিতে ২০১৫ সালে রাজতন্ত্র ভেঙে জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে রিপাবলিক রাষ্ট্র ও কনষ্টিটিউশনে রূপান্তরের পেছনের প্রধান কারণ ছিল এমন চুক্তির বিরোধিতা ও নাগপাশ ভেঙ্গে বের হওয়া।

    সেকালের (১৯৫০) নেপালকে এমন কলোনি চুক্তি করাতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে নেহেরুর অবস্থান ছিল আরও কড়া। ব্রিটিশ ভাইসরয় ভারত ত্যাগের আগে কলোনিদখলদার ব্রিটিশদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা যেন নেহেরুকেই হস্তান্তর করে গেছিলেন; ১৯৪৭ সালের পর থেকেই নেহেরু এই ভাব দেখাতেন। এই ভাব ও ভিত্তিহীন অনুমানের উপরে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি দাঁড় করিয়েছিলেন। আর নেপালকে অধীনস্ত বানিয়ে ভারতকে এজেন্সি না দিলে নেপাল কোনো উৎপাদন বা বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যকর করতে পারবে না-  এমন শর্ত ঐ চুক্তিতে আরোপ করেছিলেন। আর ঠিক এমন অজস্র অসম সুবিধা গায়ের জোরে বড়ভাই ভাব ধরে সেখানে ঢুকিয়ে রাখা হয়ে আছে।

    এখন একটা মজার তামসার কথা তুলে ধরা যায়!  যেমন, ভারত বলতে চায় নেপাল ল্যান্ডলকড দেশ। চারদিকের ভারতবেষ্টিত বলে ভারত পেরিয়ে তবেই নেপাল বহিঃবাণিজ্যের জন্য কোন নৌবন্দরের দেখা পেতে পারে। কাজেই নেপালকে এজন্য কাফফারা তো দিতেই হবে। ভারতকে কমিশন অথবা অগ্রাধিকার মানে মাখন অংশটা দিয়ে দিতেই হবে নেপালকে।  এই হল ভারতের সাফাই। এখন আসি  তাহলে একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরনের করিডোর দিতে আমরা বাংলাদেশ বাধ্য হব কেন? আমরা কেন একই যুক্তিতে আসামের উপরে  আমাদের কমিশন অথবা অগ্রাধিকার পাওয়া ন্যায্য হবেনা??  বিশেষত যেখানে আবার নর্থ-ইস্ট কিন্তু ঠিক  নেপালের মত একই অর্থে ল্যান্ডলকড ভূখণ্ড নয়। বাংলাদেশের বাইরে দিয়েই, মানে নিজ শিলিগুড়ি করিডোর দিয়েও কলকাতার সঙ্গে নর্থ-ইস্ট সংযুক্ত। তবু ভারতকে আমাদের নিজ রাজস্বের পয়সায় অবকাঠামো রাস্তা গড়ে সেটা আবার বিনা পয়সায় ভারতকেই দিতে হবে কেন ও কীভাবে?।এই হল ভারতের আবদার; আর এরই নাম তারা দিয়েছে ‘কানেক্টিভিটি’ আর সঙ্গে ‘বাংলাদেশ-ভারত ডায়লগ’ জাতীয় প্রতারণামূলক শব্দ তো আছেই!

    সিমলায় ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগঃ
    এমন প্রতারণামূলক ডায়লগ আবার এবছর শুরু হয়ে গেল ভারতের সিমলায় ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি । আর এটার নাকি ফরমাল নাম ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগ’। নাম যাই থাক মুল উদ্দেশ্য, বিনা পয়সায় করিডোর নেয়াসহ বাংলাদেশের বাজারে অবাধ প্রবেশ ও আরো কী কী নেয়া যায় এরই ফাঁক ফোকর বের করে ডিল করা।

    তবে এখানেও কিছুটা অলক্ষ্যে এক তামাসা আছে! সবার আগে সেকথায়; এবছর বাংলাদেশের দিক থেকে এই কথিত ‘ডায়লগ’ করতে রাজি হওয়া ভারতকে আমাদের বাঁ হাতে ফুল দেবার মত ঘটনা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কেন? বাংলাদেশ থেকে প্রতিমন্ত্রী পাঠানো হয়েছে এবার। এর পক্ষে কাভারেজ সাফাই যাই দেয়া হোক এমন হবার সম্ভাব্য অনুমিত কারণ মনে করা হচ্ছে, একালে আমাদের পিরিতি-সম্পর্কে গোলমাল শুরু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের টিকা বিপর্যয়ে ফেলে দেয়া থেকে। এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পেতেই আর অবকাঠামো বিনিয়োগের আরো অর্থ পেতে চীনের সঙ্গে গভীর কমিটমেন্টে জড়িয়ে যাওয়া ছাড়া সরকার পথ ছিল না। কাজেই সরকার এখন ভারতের দিকে ন্যূনতম তাকানো বা আমল করার অবস্থাতেই নাই। এরপরেও পূর্ণমন্ত্রীর বদলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠাতে রাজি হয়েছে এ জন্য ভারতেরই শুকরিয়া আদায় করা উচিত। কিন্তু ভারত এতে আবার পালটা মোচড় দিয়েছে যে দুই ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিও এখানে পাঠানো হবে। আর এসব তুচ্ছ বিষয় মনে করে বাংলাদেশ সরকার আর সম্ভবত আপত্তি চালিয়ে যেতে চায় নাই।  কিন্তু ভারতের চাতুরিটা হল, এখানে দল বলতে বিজেপির বদলে তারা খোদ আরএসএস-কে ঢুকিয়ে দিয়েছে। দুদেশের ক্ষমতাসীন দল বলতে আওয়ামি লীগ আর বিজেপি বুঝার কথা, স্বাভাবিকভাবেই। এই প্রটোকল-টাই মানা হয় নাই এখানে। ভঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু তারা বিজেপির বদলে আরএসএস-কে টেনে এনেছে।   ইসলাম বিদ্বেষ আর ঘৃণা যে দলের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা, যা বেচে মোদির ভোট জোগাড়- সেই আরএসএস এভাবে নিজেকে এই সুযোগে জাতে তুলে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের পাসে বসার জায়গা করে নিয়েছে। এজায়গায় ছাড় দেয়া একেবারেই অনুচিত ও বিরাট ভুল হয়েছে। ভবিষ্যতে এজন্য আমাদের খেসারত দিতে হতে পারে।

    এটা খুবই খারাপ ইঙ্গিত তৈরি করে দিয়েছে। প্রথম কথা দল হিসাবে আওয়ামী লীগ চাইলেই অন্তত নিজেকে আরএসএসের সঙ্গে এক কাতারে বসাতেই পারে না। মূলত এক সভায় বসতে পারে না। আওয়ামী লীগ যত খারাপই হোক, আরএসএস এর তুল্য দল নয়।  ভারতের সমাজ থেকে যে দল ইসলাম ও মুসলমানদের অবলীলায় এথনিক ক্লিনজিং করতে চায়, বা অনুমোদন দেয় আওয়ামী লীগ সে দলের কাতারে নিজেকে বসাতে পারে না। এথনিক ক্লিনজিং আর আধুনিক রাষ্ট্র একসঙ্গে চলতে বা কাজ করতে পারে না। তাতে বাংলাদেশের মানুষের চোখে আওয়ামী লীগের যত দোষ-ত্রুটি বা খামতিই থাকুক না কেন!

    দ্বিতীয় অপরাধ হল, সিমলা সভার আগে থেকেই হুমকি দেয়া হয়েছিল গত বছর অক্টোবরে কুমিল্লায় দুর্গাপূজার ঘটনাকে তারা আলোচনার বিষয়বস্ত বানাবে; যেন জবাবদিহিতা! মানে যেন বাংলাদেশের হিন্দুদের গার্ডিয়ান হলো ভারত! আবার মজার কথা হলো এনিয়ে ভারতীয় প্রতিনিধিদের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। এমজি আকবর এটাকে ‘এও হয় ও-ও’ হয় বলে পাশ কাটাতে চেয়েছেন।

    বিবিসিকে তিনি ঢাকার দুর্গাপুজা ইস্যুতে  সিমলায় কথা হবে কিনা এনিয়ে বলেছেন,
    ”ওটা তো, ওটা তো … আসলে যে কোনও ইভেন্ট বা ঘটনাই তো কন্ডিশনস বা শর্ত তৈরি করে। আমাদের দেশেও একই ব্যাপার হয়, কেউ একটা কিছু ভাষণ দিল বা কিছু বলল – অন্য পারে তার অভিঘাত হয়, বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। “আর তাছাড়া আমরা দুটো কাছাকাছি ও ঘনিষ্ঠ দেশ – দুটোই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ – ফলে কিছু-না-কিছু (আলোচনা) হওয়াই তো স্বাভাবিক।”

    এছাড়া আরএসএস-এর মুখপাত্র পত্রিকা ‘দ্য অর্গানাইজার’ এর প্রধান সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিবিসি লিখছে, ” কুমিল্লা বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে গত বছর তীব্র প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল আরএসএসের মুখপত্র ‘দ্য অর্গানাইজার’।  আর ক্ষুব্ধ অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।

    “আরএসএস-এর থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণঃ”
    আবার ওদিকে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি শক্তের মত শ্রীরাধা দত্ত, যিনি বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন” -যেট আরএসএস-এর নিজের সাথে যুক্ত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক; আর শ্রীরাধা এরই সিনিয়র ফেলো। তিনি বিবিসিকে বলেন, সংলাপে “আরএসএসের থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ”, বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কিছু ঘটনার পটভূমিতে। তাঁর কথায়, ”এই তো দেখলাম গতকালও বোধহয় বরিশালে একটি মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিচ্ছিন্নভাবে এদিক-ওদিক এরকম ঘটেই চলেছে – যদিও আমাদের সবারই ধারণা বাইরে থেকে সরকার-বিরোধী শক্তিরাই এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করাচ্ছে”।

         শ্রীরাধা দত্ত, বিবিসি বাংলা থেকে নেয়া

    এই নারী সম্ভবত এক চোখে দেখেন, অপর চোখে দেখেন না। দেখলে উনি পরিস্কার দেখতেন, উত্তর প্রদেশে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কিভাবে প্রকাশ্যে মুসলমান গণহত্যার আহবান জানিয়ে  আরএসএস-সংশ্লিষ্ট কথিত সাধুরা হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হুঙ্কার দিচ্ছেন। এখন শ্রীরাধা দত্তরা যেভাবে বাংলাদেশের হিন্দুদের গার্জিয়ান সাজতে চাইছেন তাহলে তো আমাদেরকেও ভারতের মুসলমানদের ত্রাতা সাজতে হয়। আর সাথে ঐ সিমলা ডায়লগ অনুষ্ঠানে  ভারতের মুসলমানদের দুরবস্থা নিয়ে কথা বলতে ওরকম কিছু বাংলাদেশি দলকে পাঠাতে হত – শ্রীরাধা দত্তের দু’চোখ কাজ করলে নিশ্চয় ইনি  আমাদেরকে ওরকম কিছু বাংলাদেশি দলকে পাঠাতে নিজেই বলতেন!

    কিন্তু হায়? শ্রীরাধা দত্ত খেয়াল করেন নাই যে সেরের উপর সবসময় একটা ‘সোয়া সেরের’ বাটখারা সেখানে থাকে। ওখানেও তাই ঘটেছিল।  তাদের সকলের উপর ওজনের দিক থেকে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব ছিলেন রাম মাধব।  যিনি আরএসএস এর কোন এক কমিটির নেতা ও জাতীয় কর্মসমিতির (ওয়ার্কিং কমিটি) সদস্য। এই কিছুদিন আগেও তিনি আরএসএস থেকে ডেপুটেশনে গিয়ে  বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি পদে ছিলেন। তিনি পুরা আলোচনায় পানি ঢেলে দেন দলের মূল অবস্থান ব্যক্ত করে। তিনি সেখানে বিবিসিকে বলেছেন, “এই প্ল্যাটফর্মে দুই দেশের একান্ত নিজস্ব বা অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় না। কাজেই কুমিল্লার ঘটনা সিমলাতে কোনো ছায়াপাত করবে বলে তিনি মনে করেন না”।

    অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতীয়দের মধ্যেও কোনো ‘সমন্বয়ই’ নাই। আর এই সুযোগে শ্রীরাধা ওভার-এক্ট বা আলগা-মাতবরির সুযোগ নিয়েছিলেন। সবাই জানে বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন থিঙ্কট্যাঙ্ক খোদ আসএসএসেরই প্রতিষ্ঠান; আর মোদির বর্তমান সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এই প্রতিষ্ঠানেরই মূল কর্তা ও নেতা।

    তাহলে ভারত যদি সিমলাতে কুমিল্লা ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে পারে তাহলে আমরা ভারতের হিজাব ইস্যু নিয়ে ওই একই আসরে কথা বলতে পারব না কেন? এসব দিকে বাংলাদেশ সরকারের কড়া দৃষ্টি থাকা উচিত ছিল। আমাদের নিজেকে অপমানিত হতে দেওয়ার তো কিছু নাই। আর আওয়ামি লীগ যতদিন ক্ষমতায় আছে এসব এমন মিটিংয়ে এমন গা-ছেড়ে দিবার কিছুই হয় নাই।

    তবে একটা বড় লক্ষ্যণীয় দিক হল আমাদের কোন মিডিয়াই এই ডায়লগ অনুষ্ঠান মানে ১৮ ফেব্রুয়ারির আগে এনিয়ে তেমন রিপোর্ট দেখা যায় নাই, কেবল একা বিবিসি বাংলাতেই যা সব মাত করেছিল। বুঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা একটা দায় ঠেলা ধরণের হয়ে গেছিল। কিন্তু তবু উচিত ছিল বিবিসির রিপোর্টের পরে হলেও বাংলাদেশের মিডিয়ার জন্য মেটেরিয়াল সরবরাহ করা। অন্তত কাউন্টার ইনফরমেশনগুলো যেন তারা হয়ত বাসসের অথবা কয়েকটা দেশি মিডিয়াকে কাছে ডেকে নিয়ে দেয়া ব্রিফিং সরবরাহ করা।

    আর বলাই বাহুল্য এই কথিত ডায়লগও বিবিসি কানেকক্টিভিটি দিয়েই শেষ করেছিল। তাই বিবিসির রিপোর্টও শেষ হয়েছিল “বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি আলোচনা” এই উপ-শিরোনামে।

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  সাপ্তাহিক  “সাম্প্রতিক দেশকাল” পত্রিকার  ০৮ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর  ০৩ মার্চ প্রিন্টে   “ক্ষমতার লিগ্যাসিতেও আরএসএসের পাশে বসা নয়“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোমেন এটা কী করলেন?

    মোমেন এটা কী করলেন?

    গৌতম দাস

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২

    গত দু-একদিন ধরে একটা ভিডিও ক্লিপ ফেসবুক মাতিয়ে বেড়াচ্ছে, সেখানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন কিছু বক্তব্য রাখছেন। এই ধরণের ছবি বা ক্লিপে মোমেনকে দেখে আমাদের কারই ভাল লাগে নাই। আভ্যন্তরীণ ভাবে সরকার বিতর্কিত হতে পারে কিন্তু মোমেন বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজের -প্রতিরূপই থাকেন! ফলে আমাদের সবার জন্যই এটা ম্যাটার করে! এঘটনায় সরকারের মানে বাংলাদেশের ইমেজ আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
    বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটা মোটেই সুখকর চিত্র নয় যে তাদেরকে প্রতিনিধিত্বের নামে কেউ বিদেশিদের একাংশের কাছে কাকুতি-মিনতি করছে…!! তাও আবার সেটা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে – যেখানে বডি ল্যাঙুয়েজ আর ঘটনা ল্যাঙ্গুয়েজ আর পুরা সেটের সেটিংটা হল যে জয়শঙ্কর স্টেজে ডায়াসে আর মোমেন আমজনতা স্তরে নিচে……। আর জয়সঙ্কর আমাদেরকে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে …… বাহ বাহ কি দৃশ্য!
    আসলে ওটা ছিল মোমেনের মুরোদ দেখানোর বেস্ট সুযোগ। জয়শঙ্করের আপত্তি হল চীনা বিনিয়োগ আমরা কেন নিয়েছি। আর চীনা বিনিয়োগ নেয়া মানেই –  তার চোখে, এমন এয়ারপোর্ট বানানো যেখানে কোন বিমান ল্যান্ড করে নাই ইত্যাদি।
    আর এখানেই মোমেনের জিজ্ঞাসা করা দরকার ছিল ভারত আমাদের বিআরটিসি-কে লোন (কথিত লাইন অব ক্রেডিট)  দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে কেন? গত তের বছর ধরে বিআরটিসি এক অলাভজনক গলার কাটা, সরকারি রাজস্ব থেকে উলটা ভর্তুকি দিয়ে এটা টিকিয়ে রাখত্বে হয়েছে। কারণ সর্বশেষ ভারতের লিল্যান্ড-সহ নিজ  অচল গাড়ি কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভারত সরকার প্রায় দুশ কোটি টাকা ওসব কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করে দেয়। আর এখন ঐ কোম্পানিগুলোর অবিক্রিত গাড়িগুলো কোন দাম যাচাই ছাড়া ইচ্ছামত দামে আমাদেরকে কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। আর ঐ দুশকোটির টাকার (এর আগেও দফায় দফায় এই) ঋণ ও এর সুদ বইতে দায় চাপিয়েছে আমাদের উপর, এটাই লাইন অন ক্রেডিট কথার মানে।
    তাহলে অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের মত আমাদের অলাভজনক বিআরটিসি কোম্পানিকে ডুবিয়ে দেওয়ার কাজটা কী জয়শঙ্কর সাহেব করেন নাই???
    মোমেনের উচিত ছিল এই জবাবদিহিতা জয়শঙ্করের কাছে চাওয়া…। এটা হতে পারত স্মার্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মত কাজ।এছাড়া একই রকম যেসব চীনা বিনিয়োগ ভারত নিয়েছে মোদির প্রথম পাঁচ বছরে সেসব প্রকল্পের তথ্য ভারত ওয়েব সাইট থেকে সরিয়ে রেখেছে কেন? ভারতে চীনা বিনিয়োগের তথ্য আগে জয়শঙ্করের উচিত পাবলিক করে দেয়া। এরপর অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের গল্প আমরা শুনতে রাজি হব। এটাই সমান সমান হতে পারে তাই না!!!!
    মোমেন কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে আপনাকে সাধারণ্যে বসতে হতেই পারে, এড়ানো যায়না এমন স্তরে বা পরিস্থিতিতে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাই বলে সেটাকে আরও কোন রাজ-সভাসদের অর্থ তৈরি করতে পারেন না – যেখানে আপনাকে অনুগ্রহপ্রার্থি প্রজা মনে হয় এমন পরিস্থিতি নিজেকে নিচা দেখানোর বা নিচে ফেলার তো দরকার নাই! নাকি???
    ওখানে ভুলে যাওয়া হয়েছে যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন আপনি ওখানে ব্যক্তি মোমেন নন। আপনি সেখানে অবশ্যই সব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে সমান মর্যাদার আরেক ও নিজ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। কিন্তু মোমেনের বক্তব্য দেয়া আর প্রশ্ন করার মধ্যে সেটাই অনুপস্থিত ছিল। যেন ব্যক্তি মোমেন কিছু বাকা প্রশ্ন করতে চাইছেন, মান-অপমানের কথা ভুলে।
    ঘটনা হল বাংলাদেশ চীনের সাথে গভীর সম্পর্ক গিয়ে নিজেকে জড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট এখনকার বাংলাদেশ সরকার সঠিক বা বেঠিক যেভাবেই হোক তা করেছে। কিন্তু সেজন্য আমরা কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে যাব কেন?? আমরা তা করতে যেতে পারি না! সেজন্য মোমেন ইন্ডিয়ার মাধ্যমে প্রায় সত্তরটা দেশের কোন সভায় গিয়ে জবাবদিহিতা করতে যাবেে কেন? তাও কার্যত ভারতের জয়শঙ্করের মাধ্যমে???
    মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স বা এমএসসি [MSC], ১৯৬৩ সালে জন্ম নেয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সিকিউরিটি প্রসঙ্গে ডায়লগের একটা জোট। ওর নিজ ভাষ্য অনুসারে তা ট্রান্স-আটলান্টিক মানে আটল্যান্টিকের দুইপাড়ে মানে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ-কে নিয়ে করা এক জোট।
    এখন কোন যুক্তিতেই আমরা ট্রান্স-আটলান্টিক ভূগোলের কেউ নই। অথবা কোন বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ বা অর্থনীতির কেউ হই নাই। তাহলে আমরা এমএসসি তে গেছি কেন?? কোন সুখে?? আমাদের কোন স্বার্থই এখনও নাই, হয় নাই যে ওমন সভায় যাওয়া যখন প্রয়োজনীয় হয়েছে!! একমাত্র যদি আমাদের অপমানিত হবার সাধ না হয়ে থাকে! অথচ কার সামনে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে ক্ষমতা রক্ষার বন্দোবস্ত কখনও দুনিয়াতে কেউ অর্জন করতে পারে নাই।
    এই হল সরকারের প্রথম মারাত্মক অসংগত আচরণ!
    ফলে যেন নিচা হবার জন্য ওখানে মোমেন গিয়েছেন!
    ঘটনা হল, ঐ এমএসসি সংগঠন জন্ম থেকেই কোল্ড ওয়ার যুগে এন্টি-সোভিয়েত এক ডায়লগের জোট। কিন্তু একালে সেসব হারিয়ে তা এখন কার্যত এক চীন-বিরোধী টান্স-আটল্যান্টিক জোট হয়েছে। তাও আবার এখন এমন এক সময়ে যখন ইইউ বাইডেনের সাথে আর এক সুরে নাচবে না, স্টেপ মিলাবে না – সেটাই এখন সবখানে একেবারেই স্পষ্ট। যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ বাইডেনের সাথে হাত ধরে হাটছে না, পা ফেলছে না…।
    তাহলে সেরকম একটা জোটের সভায় গিয়েই হাসিনাকে তার চীনের সাথে সম্পর্কের গভীরে যাওয়াটা উচিত-অনুচিত যাই হোক, কেন তাকে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে ঐ সভায় যেতে হবে?? আর জয়শঙ্করের কাছে কেন? সে কে??
    কোয়াড জোট – তা অবকাঠামোর জন্য স্বল্পসুদের ঋণ দিবার সংগঠন নয় – এর সে মুরোদও নাই এটা তেমন জোটও নয়। সারা দুনিয়া এটা জানে। তাহলে কোয়াড এমন ঋণ দিতে পারলে তবেই আমরা কোয়াডে যাব অথবা চীন এমন ঋণ দিতে পারে কেবল এজন্যই আমরা চীনের কাছে গিয়েছি – এসব বয়ান তুলে ধরতে মিউনিখ যাওয়া কেন? আর অপমানিত হওয়া কেন? দুনিয়া সম্পর্কে আমরা কী এতই বেখবর??
    প্রথমত ভুল অথবা সঠিক দিদ্ধান্ত আমরা যেটাই নেই না কেন কারও কাছে জবাবদিহিতার সম্পর্ক আমাদের হতেই পারে না। এর মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার মত কোন কাজ কোন ঘটনাই থাকতে পারে না। অপমানিত হওয়া ছাড়া। আর সেটাই মোমেন করেছেন, যেকোন সম্ভবত কোন উপদেষ্টা, কারও বোকামি নির্দেশে।
    কোয়াডের কথাই যদি এসময় মাথায় থাকে তাহলে এর বাস্তবতাটা হল এখন ইউরোপ-আমেরিকা একই চোখে ঘটনা দেখছে না। এমনকি কোয়াডের চার দেশই একই তালে নাই। অকাস সামরিক জোট গঠনই এর প্রমাণ। আবার পরিণতিতে অকাস (AUKUS) বা কোয়াড (QUAD) দুটাই স্থবির। বরং আমেরিকার বাংলাদেশে অবরোধ দেওয়ার গ্লোবাল পলিটিক্যাল সোজা মানেটা হল বাইডেনের কাছে অকাস বা কোয়াড কোনটাই আর ফোকাসে নাই। তার ফোকাস এখন বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট ইত্যাদি এসব। আর বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট মানেই ভারতের সাথে আমেরিকার জন্মের সর্ববৃহত স্বার্থ-সংঘাত হবে সেটা।
    আবার খোদ ভারত-ই কী এখন কোন জোটে কারও সাথে আছে?? আজ বাইডেন তো কাল পুতিন – এই অবস্থায় চলে গেছে ভারত; পা কাঁপছে। ওদিকে পুতিনও ভারতের উপর ভরসা করে বসে নাই। তাহলে পুতিনের পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ঘনিষ্ঠতার নয়া যুগ শুরু করত না। ইমরানের সাম্প্রতিক রাশিয়া সফর ইঙ্গিত করে যে পাকিস্তানের জন্মের পরে এই প্রথম সে মেরু বদল করছে। যার মানে পুতিনের কাছে ভারতের চেয়ে পাকিস্তান বেশি গুরুত্বপুর্ণ এখন। তাহলে এই পরিস্থিতিতে ভারতকেই পুতিনের কাছে যেতে হবে নিজ তাগিদেই, সব অপমান বা তুচ্ছ হবার কথা জেনেই।
    তাহলে মোমেন কোন ভারতের কাছে যাচ্ছে, নিজ চীনের সাথে সম্পর্ক এর সাফাই দিতে যাচ্ছে কেন? হাসিনার সরকারের ভারতের কাছে ঠেকা টা কোথায়? কে ভারত? কোন ভারতের কাছে সে যাচ্ছে??
    এক হতে পারে যদি সরকার পরে যায় তো কর্মিদের আশ্রয়স্থল হতে পারে এমন কাজে লাগা ছাড়া এই “একাকী” হয়ে পড়া ভারত হাসিনার কেউ না। কোন কাজে লাগবে না। এটা হতেই পারে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকা চলতি সরকারকে এককালে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কি সেই কৃত্যজ্ঞতা তো ২০১৪ সাল থেকে মিটে গেছে।
    কেউ কার কাছে সাফাই দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যায়নি, যাবে না।
    আর মোমেন সাহেব কোন মিটিংয়ে যাবার আগে ঐ হবু মিটিংয়ের ফরমাট আগে জেনে নিয়ে তবেই তার যাওয়া উচিত। আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনাকে মাটিতে রেখে ডায়াসেে বসবে ভারতের জয়শঙ্কর – এই ফরমাট কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোন ধরণের বাংলাদেশের সরকারের জন্যই এটা ইজ্জতের প্রশ্ন।
    প্রটোকল প্রটোকল বলে চেচিয়ে লাভ নাই, প্রটোকল আগে বুঝতে হবে। কোন প্রটোকল চিন্তায় মোমেন সাহেব মিউনেখ গেছিলেন?? এখানে হাসিনার লাভালাভের চিন্তায় তিনি কিছুই হাসিল করতে পারেন নাই, উলটা তিনি বাংলাদেশের মান-সম্মান ডুবিয়ে দিয়ে এসেচেন।

    সবশেষ হাসিনা সরকারের কী হবে এটা এখন অবজেক্টিভ বাস্তবতায় নির্ধারিত হবে। সাবজেক্টিভ কর্তা হিসাবে হাসিনা তাতে হাত ঢুকায়ে কিছুই আগাবে না – এমন শত মিউনিখ মিটিং সরকারকে রক্ষা করতে পারবে না! লাভের লাভ হবে অপমানিত হয়ে ফিরে আসা…! আর সেটাও সরকারের বিরুদ্ধেই যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com[লেখাটার প্রথম ভার্সান আজ (২২ফেব্রু ২০২২) সকালের সরাসরি আমার ফেসবুকে দেয়া হয়েছিল।
    পরে তা আরও আপডেট করে, আমার এই ওয়েব সাইটে দেয়া হয়েছে। আর সেই ভার্সান টাই ফিরে লোড করা হল  আজই আমার ফেসবুকে এখনই সকাল ১১ঃ৩৪ এ।
    এই আপডেটে অনেক নতুন তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।]
  • জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    গৌতম দাস

    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Vn

     

     

          MEA spokesperson Arindam Bagchi. | Photo Credit: twitter/@abagchimea

    ইংরেজি কমিউনাইজ [communize] শব্দটি খুবই ইতিবাচক এক শব্দ। যার রুট শব্দ কমিউন [commune]। ল্যাটিন অরিজিন কমিউনিস [communis] সেখান থেকে ইংরাজিতে যার অর্থ কমন [common] বা সাধারণ। সেখান থেকে সম্ভবত ফ্রেঞ্চ comuner (মানে ভাগাভাগি শেয়ার করা), হয়েও অরিজিনাল কমিউনাল [communal] (জোর করে দেয়া হিন্দু-ভারতীয় নেতি অর্থটা না) খুবই ইতিবাচক শব্দ যার অর্থ যে কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করে, আর কমিউনিটির কষ্ট-আরামসহ সবই যে শেয়ার করে; এবং এক সম্প্রদায় হিসেবে মিলেমিশে থাকে। এছাড়া, অনেক সময় প্রকৃতির সাথে স্পিরিচুয়ালি সম্পর্কিত করে দেখা অর্থে ‘কমিউনাইজ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দেখা যাচ্ছে রুট কমিউন এর যতগুলা অর্থ হয় সবই ইতিবাচক। কোন নিচা মানে যেটাকে ইংরাজিতে নেতিবাচক বা derogatory অর্থে ব্যবহার হয় এমন কোন ডেরিভেটিভ শব্দ বা অর্থই নাই।

    অথচ বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সমাজের জমিদার-হিন্দুরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য খাটাতে গিয়ে  সেই দরকারে অরিজিনাল  কমিউনাল শব্দের অর্থ-বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তাই ডিকসনারিতে না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী ধারণা ও ঘৃণায় হিন্দুত্ব-জাতির জোশে তারা সব ঢেকে ফেলতে চেয়েছিল। আর তাতে সবচেয়ে ইতিবাচক কমিউন শব্দটাকেও জবরদস্তিতে নেতিবাচক অর্থ দিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু শব্দটা ইংরাজি, ফলে ইংলিস ডিকসনারি তাদের এই নেতি অর্থ গ্রহণ করে নাই। একারণে বলা যায় জমিদার-হিন্দুরা  কমিউন শব্দের বাংলা – ‘সম্প্রদায়’ শব্দটাকে করেছে ‘সাম্প্রদায়িক’ যা খুবই নেতিবাচক অর্থ। তাই ভারতে ছেপে নেওয়া ছাড়া অন্য কো্ন ইংরেজি ডিকশনারিতে নেতি ‘কমিউনাল’ শব্দটাই পাওয়া যাবে না। কমিউন বা কমিউনিটি অথবা ইতিবাচক-কমিউনাল শব্দ পাওয়া যাবে। যার সবগুলোও অবশ্যই ইতিবাচক শব্দ।

    এখন জমিদার-হিন্দুর দেয়া এই কমিউনাল শব্দের অর্থ কী? তারা কী বোঝাতে চান?
    প্রথমত তারা বলতে চান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানেরা বাঙালি না। আর জমিদার-হিন্দুর রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল আধিপত্য অবিভক্ত বাংলার সবাইকে মানতেই হবে। আর সেই জবরদস্তি ক্ষমতার জমিদার-হিন্দুর দাবি  – বাঙালি মানেই কেবল হিন্দু; মুসলমানেরা এথনিক পরিচয়ে বাঙালিই নয়। মানে যেন কারও এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্য কারও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যায়।
    সারা মোগল আমলের নিয়ম  খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমিতে যেই চাষাবাদ করে জমি ভোগ-দখলের অধিকার তাঁর। বৃটিশ কলোনি-দখলদার শাসকেরা প্রথম এই জমি মালিকানা ভিত্তি ভেঙ্গে দেন। তারা জোর করে জমির আগের টাইটেল এবার অর্থের বিনিময়ে ‘জমিদার নামে নয়া গোষ্ঠির কাছে সেই জমির টাইটেল হস্তান্তর বা লিখে দিয়েছিল। অথচ তখনও জমি ভোগ-দখলের অধিকার পুরানা জমির চাষাবাদ-কারিদেরই ছিল।

    তাই এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণী নিজ ক্ষমতা আধিপত্য দেখাতে  মুসলমানদের এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ চালু করেন। দাবি করেন মুসলমানেরা বাঙালি না। এরই বিপরীতে দুবার জবাব দিয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রধান সংখ্যা-শক্তি হয়ে দেখিয়েছে তারা অবশ্যই মুসলমান। আর পরে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ করে দেখিয়েছে – তারা বাঙালিও।  জমিদার কলকাতা তাদের বাঙালিত্ব কেড়ে নিতে পারে নাই, পারবে না। ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথায় নিষ্পেসিত অন্তজ কিন্তু লড়াকু বাঙালির যে অংশটা ভালভাবে বাঁচতে ও লড়াবার সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এরা বাঙালি মুসলমান অবশ্যই। কিন্তু একারণে তার এথনিক-জাতি পরিচয়, যে ভাষায় সে মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক করে তা বদলে যাবে কেন? মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কোন জমিদার-হিন্দু মাতবর কেড়ে নিতে পারে না। মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কেড়ে নিবার ক্ষমতা জমিদার-হিন্দুর নাই,  জমির মালিকানা টাইটেলের মত এই বাঙালি পরিচয় কেড়ে নেয়া যায় না সম্ভব নয়। মানুষের এথনিক পরিচয় প্রায় অর্গানিক; ফলে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা যে ঘরে জন্ম নেই সে ভিত্তিতে এই পরিচয় সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এজন্য  এথনিক-সাংস্কৃতিক অর্থে জাতি বা জাতিবোধ কথাটা আগে বুঝতে হবে। এটা জবরদস্তির বিষয় না। মুসলমান বাঙালি তাই বাংলা ভাষা ছাড়ে নাই ছাড়তে পারে না, বাঙালি খাদ্যাভাস ইত্যাদিও ছাড়বে না আর সর্বোপরি মুসলমানিত্বও ছাড়ে নাই। তাতে শরতচন্দ্র হয়ে যতই আপনি “বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা” দেখানোর উপন্যাস লেখেন না কেন!

    কিন্তু বৃটিশ-ভারতের কলকাতার জমিদার হিন্দু সেই জবরদস্তিটাই করেছিল। বিশেষত মুসলমানেরা তাদের মানতে না চাইলে অথবা পাল্টা তাদেরকে ভিন্ন কোন নিজ ধর্মীয় সামাজিক চিহ্ন দেখানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে “সাম্প্রদায়িক ডাকা হবে” – এটা ছিল জমিদারশ-হিন্দুর সিদ্ধান্ত। তাদের আধিপত্যের সমাজে থাকতে গেলে তাদের সংজ্ঞায়িত করা ধারণা মানতে বাধ্য করার কায়দা হল এটা। মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া তাদের কথিত সব শিষ্টাচার ও কোড ফলো করলেই কেবল তারা স্কুল-কলেজ বা চাকরিতে তাদের সমাজে প্রবেশাধিকার দেবে, পাশে বসতেও দিতে পারে। আর যে তাদের কোড মানে না, ডমিনেন্স মানে না তাকে জমিদারেরা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলত।  একারণেই আজও সাম্প্রদায়িক শব্দটাই জমিদার-হিন্দুর সেই অত্যাচারেরই স্মারক চিহ্ন। কাজেই  এই সাম্প্রদায়িক শব্দটা ব্যবহারে আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন! প্রয়োজন ব্যবহার বাদ দেয়া।
    মনে রাখতে হবে  মুসলমানের বিরুদ্ধে জমিদার-হিন্দুর  বুকভরা বিদ্বেষ আর ঘৃণার ঝড় তোলা শব্দটাই হল ‘সাম্প্রদায়িক’।

    ভারতের বিদেশ বিভাগ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি একজন বাঙালি হিন্দু; উনার ‘বাগচি’ টাইটেল তাই নির্দেশ করে। এদিকে হিজাব ইস্যুতে স্বভাবতই ওআইসি বা ইসলামি ঐক্য সংস্থা [Organisation of Islamic Cooperation (OIC)]  ভারতের মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানোর নীতির নিন্দা করে অন্যান্যদের মতই বিবৃতি দিয়েছিল। এটা সহ্য হয় নাই ভারতের বিদেশ বিভাগের। ব্যাপারটাকে তারা দেখেছে যেন পুরানা জমিদার-হিন্দুর চোখে, তাদের আধিপত্য অস্বীকারের চেষ্টা হচ্ছে যেন। তাই পুরা জমিদার-হিন্দুর ঘৃণার হুঙ্কার দিয়েছেন অরিন্দম বাগচি। বলেছেন এটা নাকি ওআইসির সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট। এছাড়া অরিন্দম দাবি করছেন ভারতে নাকি একটা “কনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ও মেকানিজম” কার্যকর আছে আর ওর সাথে নাকি  আছে – “ডেমোক্রাটিক ইথোস (মুল্যবোধ) ও পলিটি (রাজনৈতিকতা)” ।

    ……constitutional framework and mechanisms, as well as democratic ethos and polity. The communal mindset of the OIC Secretariat does not allow for a proper appreciation of these realities

    কিন্তু সরি,  অরিন্দম! ভারতে এগুলোর কোনটাই নাই, ভারতের জন্ম থেকেই নাই। আছে কেবল দগদগে ঘা, এক হিন্দুত্ব। পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই।  এমনকি কান পেতে শুনেন আরএসএস প্রধানের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা দিবার পরিকল্পনা শুনতে পাবেন। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজ্যকে মুসলমান-শুণ্য করতে হবে, শেখানে তারা থাকতে পারবে না – এই ডাক ও পরিকল্পনাও শুনতে পাবেন।  আর চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে সব হারিয়ে মোদির ভোট যোগাড়ের এতে একমাত্র উপায় মুসলমান গণহত্যার হুমকি, মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো আর বিজেপি প্রার্থী না জিতলে মুসলমান মারবেন, বুলডোজার চালাবেন এই হুমকি দিচ্ছে। এগুলো কী কনষ্টিটিউশনাল আচরণ ?? ভারতে কী সুপ্রীম কোর্ট অথবা কোন নির্বাচন কমিশন বলে কিছু আর আদৌ আছে??? যাদের প্রত্যক্ষ কনষ্টিটিউশনাল দায়িত্ব ছিল মুসলমান ভোটারদের উপর এত চরম হুমকির বিরুদ্ধে তাতক্ষণিক সকল ব্যবস্থা নেয়া। অথচ এমন কোন কিছুই করা হয় নাই। মানে  ভারতের দুর্বল যে কনষ্টিটিউশন যে কনষ্টিটিউশনালিজম তাই তো  আজ একেবারেই নিস্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা প্রমাণিত। সে কারণে এসবের বিরুদ্ধে ওআইসি তো কোন ইসলামি আলেম ডেকে আনার কথা বলে নাই, পরামর্শ দিতে যায় নাই।  বরং আহবান রেখেছে [……OIC called upon the U.N. and the Human Rights Council to take “necessary measures”] জাতিসংঘ ও এর হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের কাছে তাদেরকে “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে বলেছে। অথচ দেখা যাচ্ছে এটাও মুখপাত্র অরিন্দমের সহ্য হয় নাই।   তাহলে?

    … ভারতে আছে কেবল দগদগে ঘা – যার নাম হিন্দুত্ব। যেখানে পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই, পারে না।

    অর্থাৎ  মুখপাত্র অরিন্দম এখনও জানেনই নাই যে ও আইসি-কে সাম্প্রদায়িক বলা – এটা একটা এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর কাজ। কারণ এই “সাম্প্রদায়িক” শব্দ ও ধারণাটাই জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষী ধারণা ও সেকালে তাদের হাতেই যার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল।  অন্যের এথনিক পরিচয় অরিন্দম আপনি পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু আপনি অন্য এক জনগোষ্ঠিকে তার এথনিক পরিচয় ও ইতিহাস তুলে কথা বলতে পারেন না; জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষের ইতিহাসের পক্ষে সাফাই দিতে পারেন না। বিশেষ করে আপনি যখন একটা দেশের বিদেশবিভাগের মুখপাত্র!! খেয়াল করেন, হিজাব নিয়ে বিবৃতি, আপত্তি তো আমেরিকাও তুলেছে। ওখানে অরিন্দম বাগচির মুরোদ হয় নাই  “সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট” শব্দ ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে  কথা বলার!
    এদিকে বর্তমান চালু নির্বাচনে মরিয়া মোদিকে জিতাতে,  খুঁচিয়ে ঘা করা এক পদক্ষেপ হল ভারতের স্কুল-কলেজে হিজাব ইস্যু খাড়া করা। এতে চরম এক মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণায় বৈষম্যমূলক আচরণে সমাজ তোলপাড় করা ফেলা, এটাই চলছে এখন। এতে আমেরিকা, ইউরোপ আর এদিকে পাকিস্তান বা ওআইসির নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে;  আর আসলে এতে ভারত কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। কারণ, কূটনৈতিক রেওয়াজে এ’বিষয়টা হল,  আপনি আপনার দেশের সব চিহ্ন-পরিচয় নির্বিশেষে আপনার নাগরিকের প্রতি অ-বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সাম্যের চোখে দেখতে বাধ্য থাকবেন ও দেখবেন – এটাই “আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল অর্ডার” আশা করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এবার  ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  আর তাতেই কূটনৈতিক ভাষা ও ভাষ্য হারিয়ে বেহাল দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে যায় ভারত।  এমন বে-দিশায় পড়ে, ওআইসি-কেই ঐ পুরানা জমিদার-হিন্দুর বয়ানের সাহায্যে “সাম্প্রদায়িক” বলে গালি দেয়া হয়েছে। আর এতে যেন সারা দুনিয়াটা জমিদার-হিন্দুর রাজত্ব – এটাই ধরে নেয়া হয়ে গেছে!  আবার তাদের হিসাব টনটনে, একইভাবে তারা আমেরিকাকে তাদের নিন্দার জবাব দিতে যায় নাই! অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই তারা যেনবা জমিদার-হিন্দুর প্রজা এই অনুমান শেখানে খাটাতে যায় নাই!
    তাই, এরপরে আমাদের আশা থাকবে যে “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার অর্থ-ইতিহাস-তাতপর্য বুঝে এটাকে কিভাবে আমল ও সুলুক করতে হবে তা আমরা নিজেরাই বুঝে নিতে পারব। কারণ জমিদার-হিন্দুর এমন মুসলমান-বিদ্বেষে ভরপুর শব্দের ইতিহাসের পক্ষে আমরা দাড়াতে বা প্রমোট করতে পারি না।

    মুসলমান কোপাতে হবে ও ইসলামবিদ্বেষ একমাত্র ভরসা মোদিরঃ
    প্রায় তিন সপ্তাহ আগের এক লেখায় পরিষ্কার করে লিখেছিলাম যে, একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত ২০২১ সালে। সেবারের মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয় আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রীর রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা তিনি দেশে  না দেখিয়েও পারছেন না আবার দেখালে মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো ‘নিচা’; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? তাই তিনি ঐ ট্যাংকারের উপর রঙ লাগিয়ে সৌদি সব চিহ্ন ঢেকে ঐ অক্সিজেনই ব্যবহার করেছেন, ক্রেডিট নিয়েছেন!  আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দু দৈনিকের কূটনীতিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাদের ভারত আসলে, মোদি তাকে যা বুঝায়ছিলেন, এমন কোনো পরাশক্তি নয়! যা নিয়ে মৌদির বয়ানে এতদিন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।  কেবল তখন সেটা তাস্র কাছে পরিস্কার হয়েছে যে ভারত কোন পরাশক্তি নয়। বলেছেন, ভারত নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন? এ’এক অদ্ভুত ভারতের মিথ্যাবলা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তার সাংবাদিক যার নিজস্ব বুঝাবুঝির মেকানিজমই বিকশিত হয় নাই!

    সেখানে আরো বলেছিলাম, চলতি এই নির্বাচনে “মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই হবে মোদির একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফেরানোর একমাত্র উপায়। আর তাই ঘটছে। এ’কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন, মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই মোদির রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় ঠাউরানো যার সোজা মানে, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!”

    নির্বাচন শুরু হয়েছে, খবর ভালো নাঃ
    শিডিউল মোতাবেক গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কিছু রাজ্য বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। আর এর সাথে  মোদির পক্ষে পরিকল্পিতভাবে দুটো চরম ঘৃণা ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করে নেয়া হয়েছে। প্রথমটি ঘটানো হয়েছে, গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ১৭-১৯ লাগাতার এই তিন দিন। দুই কথিত ‘সাধু’ নরসিংহআনন্দ ও প্রবোধানন্দ গিরি, তারা এর আয়োজক ও বক্তা। এরা আবার বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন নামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতা। তারা শেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক হিন্দুকে ‘সাফাই অভিযান’ পরিচালনার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই”। [every Hindu must pick up weapons and we will have to conduct this cleanliness drive (safai abhiyan). There is no solution apart from this.”] আর প্রথমজন বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ায় যদি মানুষকে টিকে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে জিহাদিদের উপর সাফাই অভিযান চালাতে হবে” [“In the entire world, if we want humanity to last, we will need to clean it of jihadis. ]। এর পরও কারো বুঝতে অস্পষ্টতা যাতে না থাকে তাই বলে দেই, এখানে এই সাফাই অভিযান মানে হল জাতিগতভাবে (মুসলমানদের) সবাইকে নির্মূল করা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে বোঝায়। দুনিয়াতে প্রথম হিটলার ও তার সহযোগীদের এই এথনিক ক্লিনজিং’ এর অভিযোগে বিচার হয়েছিল। সেই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের চোখে এটা সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। যার বেলায় শাস্তি হল সর্বোচ্চ দন্ড। সেই থেকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এটাই একাডেমিক বইপত্রে ও আইন-আদালতের ভাষাও সবচেয়ে বড় গোত্রের এক অপরাধ মানা হয় বটে।  এটাই এখন মোদি ও তাঁর গোষ্ঠির প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়। অথচ মোদি সরকারের বিদেশ বিভাগের মুখপাত্র সমালোচকদেরই উলটা “সাম্প্রদায়িক” বলছেন!

    গত ডিসেম্বরে কথিত সাধুদের ঘৃণা-সভার পরে প্রায় এক মাস ধরে চলে এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দেয়ার-নেয়ার পুলিশি প্রচেষ্টা; এছাড়া কোনো বাদি-অভিযোগকারী পাওয়া যাচ্ছে না, এ অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ জানুয়ারি কেবল নরসিংহ-আনন্দকে গ্রেফতার করা হয়। তবুও এমন সব আইনে গ্রেফতার দেখানো যাতেসে সহজেই জামিন পেতে পারে। অথচ ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ’ বা ‘জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’ – শুধু এ’অভিযোগে কাশ্মির বা নর্থ-ইস্টে অনবরত এমন আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতার করে কয়েক বছরের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে; এমন অন্তত চারটি আইন আছে। এসব আইন প্রয়োগ করে তারা, জঙ্গি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বলে থাকে। অথচ নরসিংহআনন্দের উপর একটা পুরা কমিউনিটিরর উপর এথনিক ক্লিনজিং,  গণহত্যা বা হত্যার হুমকি এসবের কোনটাই অভিযোগ আনা হয় নাই। কেবল ৫০৯ দারার একটা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল যে নারী ও সাংবাদিকদের উপর আপত্তির ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে [under section 509 of the Indian Penal Code (IPC) for making objectionable remarks against women and abusing a journalist.]। ফলে স্বভাবতই   ইতোমধ্যে তাঁর জামিনে মুক্তিও  হয়ে গেছে।

    এখন এমন গণহত্যার হুমকির ঘটনার পর এক মাস কেন বিভিন্ন অজুহাতে কোনো গ্রেফতার বা মামলা না করে অপেক্ষা করা হল? মূল কারণ এবছরের পাঁচ রাজ্য নির্বাচন শুরু হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক মাস ধরে কয়েক পর্বে। তাই ১৭-১৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে ঐ এথনিক ক্লিনজিং আর চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য দেয়ার পরও কোনো পুলিশ অ্যাকশন না ঘটানোতে – হিন্দু ভোটারদের মনে উসকানির ঝড় তুলে মানসিকভাবে তাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেয়া হয়। এভাবে এক মাস কাটিয়ে দেয়ার পরে নরসিংহআনন্দ এরপরে গ্রেফতার হয়েছে কি না বা জামিন হয়েছে কি না তা এসব আমজনতা হয়ত ব্যাপারটা আর খেয়াল রাখবে না; বেশির ভাগই মনে রাখবে না – এই ভরসায়। কিন্তু এদিকে হিন্দু ভোটারদের উসকানি দিয়ে এর নগদ ফলাফলে মোদির ভোটের বাক্স পর্যন্ত আনার লক্ষ্যে তাদের মনের ওপর ছাপ ফেলার ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়া তো হয়েই গেছে। এই ছিল পরিকল্পনাটা।

    এবার দ্বিতীয় ঘটনা – স্কুল-কলেজে হিজাবঃ
    নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে সেসব রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা মান্য করা সব-বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সে কারণে হিজাবের ইস্যুটা উঠানো হয়েছে এমন এক বিজেপিশাসিত রাজ্যে যেখানে এবছর নির্বাচন নাই। ফলে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু বলার নাই। কিন্তু আবার ইস্যুটা হাজির করা হয়েছে এমনভাবে যার এফেক্ট ভারতব্যাপী বিস্তৃত হয়। স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ ইস্যু যে কারণে এটা কেবল কর্নাটক রাজ্যের ঘটনা। এর ওপর আবার এটা এক-দু’টা স্কুল-কলেজের স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। সারা  রাজ্যে বা কর্নাটক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও নয়। একটা জেলার দু-একটা স্কুল-কলেজে। কিন্তু পাশের আরো দুটো জেলায় জবরদস্তিতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই শুরু করে দেয়া, আন্দোলন, এসব শুরু হয়েছে মোদির ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে; অথচ  সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি নিশ্চুপ।

    এতে কার্যত হিজাদ নিষিদ্ধ ইস্যুটা সারা কর্নাটক তো বটেই, সারা ভারতের সব রাজ্য ছাপিয়ে ভারতের বাইরে আমেরিকার নিন্দা প্রস্তাব, ওআইসি নিন্দা প্রস্তাব ঘটিয়ে এটা এখন ভারতের জন্য এক গ্লোবাল কূটনীতিক ইস্যু হয়ে গেছে। এতে বলাবাহুল্য এর এফেক্ট নির্বাচন চলছে এমন পাঁচ রাজ্যের উপরই পরিপূর্ণভাবে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। আর এবার তা সেখানকার প্রতিটি ব্যালট বাক্সে গিয়ে আছড়ে পড়বে, বিজেপির ভোটের বাক্সগুলো এখন নিশ্চয় উপচে পড়বে আর মোদি-বিজেপি এরই অপেক্ষায়! এ হল পরিকল্পনা!

    কথিত নিরপেক্ষ হিন্দুত্বের আদালতঃ
    এছাড়া এবার ঘটনাকে আরো পোক্ত করতে কোনো উপায়ই ছাড়া হয়নি; তাই আদালতও।  এদিকে আদালত মানেই ভীষণ বিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষে তা ভরপুর থাকে। তাদের সামাজিক সম্মানও অনেক উঁচুতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকেও এ’ইস্যুতে বলা হল, তারা এখন হস্তক্ষেপ করবে না; কখন করবে তা তারাই ঠিক করবে বলে রায় দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে স্থানীয় রাজ্য হাইকোর্ট বিরাট নিরপেক্ষতার ভান নিয়ে হাজির। তারা এক সাময়িক রায় দিয়ে দিয়েছে। সেটা হল, “স্টাটাস কো”;  যার আইনি মানে হল বিবদমান পক্ষগুলো বিবাদ শুরুর আগে যে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে গিয়ে স্থিতাবস্থায় থাকবে, যত দিন আদালত ইস্যুটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে কোনো ফাইনাল রায় না দেয়। এটাই ইউজুয়াল প্র্যাকটিস হয়ে থাকে।

    কিন্তু এখানে বাড়তি একটি টুইস্ট দেয়া হয়েছে। বলছে ‘স্ট্যাটাস কো’; কিন্তু সাথে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে যে, এর মানে হল, এই অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সময়ে কেউ কোনো ধর্মীয় পোশাকে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না। অথচ এ বলাটাই বেআইনি। এটা নিজেই এক বিরাট বৈষম্য – একেবারে এক সূক্ষ্ম কারচুপি করা যাকে বলে।

    কারণ হিজাব ইস্যু হওয়ার আগে যে যেমন খুশি হিজাব, পাগড়ি, ঘোমটা প্রভৃতি পরে স্কুল-কলেজে যেতে পারত ও আসতও। কাজেই ‘পূর্বাবস্থা’ বলতে এটাকেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাখ্যায় তা না বলে উল্টো ধর্মীয় পোশাক পড়া যাবে না [we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing]  এ কথা বলে আসলে কথিত এই সাময়িক সময়ের রায়ের কথা বলে যারা হিজাববিরোধী মোদি-বিজেপির লোক এদের দাবিকেই মেনে নেয়া ও এদের পক্ষেই রায় দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ দুপক্ষের কথা শুনে বিচার বিবেচনা করে ফাইনালি রায় হবার আগেই we restrain বলে হিজাবকেই বাদ দেওয়ার কর্তৃত্ব কোন বিচারকেরই নাই। কিসের ভিত্তিতে আপনারা we restrain বললেন???  কারণ, এই সাময়িক রায়টাও তো কোন শুনানির শেষে দেয়া নয়,  করা হয়নি। অথচ, আদালত যেন খুবই একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সিদ্ধান্ত দিয়েছে এই ভাব করে তাদের হিন্দুত্বের খেয়াল এটাই চাপিয়ে দিয়েছে।

    “Pending consideration of all these petitions, we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing saffron shawls (Bhagwa), scarfs, hijab, religious flags or the like within the classroom, until further orders.”

    এখন পরে কী ফাইনাল রায় হবে তা আগেই বলে দেয়া যায়। এ’বছরের নির্বাচন কেবল এই পাঁচ রাজ্যে আর তা কেবল ১০ মার্চ পর্যন্ত। এর মানে হল ১০ মার্চের পরে আদালত ফাইনাল রায় দিলে আর সেখানে আবার হিজাব পরে স্কুল-কলেজে আসার পক্ষেও যদি আদালত রায় দেয় তো বিজেপির আপত্তি হবে না; কারণ পরের বছরের আগে আর নির্বাচন নাই। অর্থাৎ এখনকার এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাটা যেঁ বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়ে আদালত বিজেপির হিন্দুত্ব ও ভোট জোগাড়কে সাহায্য করল। আবার ফাইনাল রায় হিজাব পড়ার পক্ষে  দিবার পথ খুলে রেখে বিচারক বিরাট উদার সাজবার পথ পরিষ্কার রেখে দিলেন, এবং তেমন রায়ও দিতে পারবেন।

    ভারতের উচ্চ আদালতগুলোর ভেঙে পড়ার ইতিহাসঃ
    এমনিতে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের চোখে আমাদের দেশের অনেকে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। কিন্তু বটম অব দ্য ফ্যাক্টস হল, ভারতের আদালতগুলো রাজনীতি বা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় নিজেদের সব ক্ষমতা সমর্পণ করার পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কেন ও কখন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির জাজমেন্টে তাকে দোষীকরে রায় দেয়া হয়ে যায়। এরপর বাকি ছিল তিনি কিভাবে শাস্তি হিসাবে জেলে যাবেন তার ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেয়া কেননা তিনি সিটিং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এরপর ইন্দিরার উপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ত্যাগ করে নিয়ে এরপর শাস্তিভোগের জন্য তৈরি হয়ে আসতে আদালতের সিদ্ধান্ত-রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা আদালতের সেই নির্দেশ পালন না করে, রায় উপেক্ষা করে –  ক্ষমতায় থেকেই উল্টো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। এভাবে তিনি এই শাস্তি গ্রহণ  জীবনেও আর করেন নাই।

    আর সেই থেকে আইন পেশার সব লোক, রাজনীতিবিদ মিলে মূল্যায়নে গিয়েছিলেন যে, জাজদের অমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাথে সংঘাতে যাওয়াতে তাতে কোন লাভই হয়নাই  উলটা ভারত-রাষ্ট্রই নাকি  দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তাদের আপস করা উচিত ছিল।’ এমন সঙ্ঘাতের এই নাকি মহিমা। অর্থাৎ আদর করে যেন বলা যে “রাজনীতিবিদেরা খুব দুষ্ট”।  অতএব মন্দের ভাল হিসেবে ক্ষমতার সাথে আপস করাই নাকি ভাল – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কেন?

    কারণ না হলে জরুরি অবস্থা দিলে তো তা রাষ্ট্রই না থাকার সমান, এই ক্ষতি হয়। ফলাফলে জরুরি অবস্থা পাওয়ার চেয়ে তাই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস করা অথবা এড়িয়ে চলা হলো -এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এটাই নাকি আদালতের পথ। যদিও এর কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে না, তবে এটাই সেই থেকে তাদের অলিখিত চর্চা ও বুদ্ধিজীবিতা!  আর এ সুযোগে দেখা যাচ্ছে এখন যেটা হয়েছে, একদল বিচারক হয়েছেন যারা এ সুযোগে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে নানা পার্সোনাল সুবিধা আদায় করে নেয়ার সূক্ষ্ম তৎপরতা চালিয়ে, কে কত বুদ্ধিমানের মত মোদির সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছেন সেই ক্রেডিটের গর্ব ও এর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। তাতে  ভারতের পরপর গত দুই প্রধান বিচারপতি যে এই দোষ দুষ্ট আছে তা আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বিশেষ মটর সাইকেল চড়ার খায়েস মিটালেন। অপরজন আসাম জাতিবাদের পক্ষে জাতির-সৈনিক হয়ে গেলেন!
    এতে প্রায়ই ভারত-রাষ্ট্রের বড় বড় দুর্বলতা বা ‘ফুটাফাটা’ এসবের কারণে, এটি ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে বলা হয় – সে পথের সবচেয়ে বড় এক গর্ত হল, এই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস, এড়িয়ে যাওয়া তথা হবু জরুরি অবস্থা এড়ানোর বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ-কথা!

    মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর সাথে ভোটের সম্পর্কঃ
    অনেকের মনে হতে পারে মোদির মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর নীতি-পদক্ষেপের সাথে ভোটের সম্পর্ক কী? আমরা বোধহয় বাড়িয়ে দেখছি ব্যাপারটাকে। তা অবশ্যই না। ভারতে এখন রাজ্য নির্বাচন চলছে পাঁচ রাজ্যে যেখানে সবচেয়ে বড় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যও আছে। কত বড়? ভারতে কেন্দ্র সরকার গড়তে মোট ন্যূনতম ২৭২ আসনে জিততে হয়। এই ২৭২টার ৮০ আসন সংগ্রহ করা সম্ভব একা এই উত্তরপ্রদেশ থেকেই, যার মানে ২৭২ এর প্রায় তিনের এক ভাগ আসন পেয়ে যাওয়া। একারণে বলা হয়, কেউ কেন্দ্রে সরকার গড়তে চাইলে উত্তরপ্রদেশে জেতা গুরুত্বপূর্ণ’ যদিও এখন যা চলছে তা কেন্দ্রের নির্বাচন না; রাজ্য নির্বাচন। কিন্তু এখন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচনে জিতলে তবেই না ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্বাচনেও  উত্জেতরপ্তারদেশের আশি আসনের বেশির ভাগ পাওয়া সম্ভব! একারণে এবারের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মোদি মুসলমান কোপায়ে যেকোনোভাবে জিততে মরিয়া!

    ঘটনার কেন্দ্র কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলনঃ
    এই প্রথম এটা রেকর্ড যে, একটা কৃষক আন্দোলন ১৫ মাস ধরে লাগাতার ভারতের হাইওয়ে রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করে শেষে জয়ী হয়েছে। দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের সংযোগ হাইওয়ে সড়কের মুখ্য শহর গাজিপুর। এটাই ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। হিন্দু জাতিবাদী আনন্দবাজার পত্রিকাও একে ‘ধাত্রীভূমি’ [ইতিহাসের ধাত্রীভূমিতে কি ক্ষতির আশঙ্কায় বিজেপি? ] বলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। এঅঞ্চলটাকে ‘পশ্চিম উত্তরপ্রদেশও’ বলা হয়। এটাই মোদির জন্য কাঁটা বিছানো ভূমি। এখানে মোদি হাঁটলে পায়ে কাঁটা বিঁধবে খালি। অথচ বিরোধী অন্যদের বেলায় হবে উল্টোটা। দিল্লিসহ এ অঞ্চলের আবহাওয়া হল – গ্রীষ্মে যত তপ্ত গরম, শীতকালে ততই শীত। অথচ এখানেই ১৫ মাস ধরে অনেকেই বউ-সংসার সাথে নিয়ে রাস্তায় বসে-শুয়ে কষ্ট করে গেছেন। শেষে মোদি তাদের সবার কাছে হার স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন, চালু করা তার তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার বা বাতিল করেছেন। কেন?
    এ অঞ্চলটা আশপাশের হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের বাকি যারা বাণিজিক কৃষিকাজ করে থাকেন, তাদের সবার চেয়েও সমৃদ্ধ এবং আসলে অগ্রগামী স্বার্থের বড় কৃষক লোকেদের বসবাসের স্থল। এদের জাট বা জাঠ, ইংরেজিতে জাঠল্যান্ডার বলা হয়; এমন এদের বৈশিষ্ট্য হল – মিনিমাম পাঁচ একর বা বেশি ও উর্বর জমিকে ঘিরে এদের কারবার এবং পাইকারি কৃষিপণ্যের বাজারের  (মান্ডির) বড় সাপ্লায়ার এমন কৃষক এরা। পাকিস্তানের করাচিতে বা কাশ্মিরেও এমন ‘জাঠদের’ দেখা মিলবে। আর তত্ত্বটা হল, যত আরবাইনাইজেশন বা শহুরেকরণ ঘটবে, ততই জাঠ কালচার বড় হবে, তাদের প্রভাব বাড়বে। এরাই ছিল ঐ কৃষক আন্দোলনের মূল আপসহীন অংশ। কিন্তু এমন জাঠ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান জাঠের টেনশন প্রায়ই ঘটে থাকে, হয়েছেও স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা আবার জাঠ ও মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে বুঝে।

    মোদির ২০১৪ সালের প্রথম কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্বাচনের আগের প্রায় এক বছর অমিত শাহ, ‘দা মাস্টারমাইন্ড অব দাঙ্গা’ – তিনি এসে এই উত্তরপ্রদেশে কাটিয়েছেন। তারই পদক্ষেপে মুজাফফরনগরে তিনি পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন, যার নগদ পরিণতি হল জাঠ-মুসলমান শত্রুতাকে চরমে তোলা, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। আর সেটারই ব্যালট ফলাফল ছিলল, ২০১৪ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট কেন্দ্রিয় ৮০ আসনের ৭২ আসন মোদির ব্যাগে। এমনকি অমিত শাহের এই ‘শত্রুতা’ বিক্রি করেই বিজেপি পরে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বা ইউপি রাজ্য নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছিলেন।  এবং পরে ২০১৯ সালে মোদির দ্বিতীয়বার সরকারের আসার জয়ও সম্পন্ন করেছিলেন, একই জাঠ-মুসলমান বিভক্তির কাধে চড়ে। কিন্তু এবার আর নয়। কেন?

    এরই মধ্যে এবার এই জাঠ ও মুসলমান একযোগে মোদির বিরুদ্ধে রাস্তায় কৃষি আন্দোলন করে ফেলেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। আর এতেই মোদি মাফ চেয়েও যে এই বিরোধী ঐক্যের পাথর সরাতে পারবেন না, তা জেনেও যতটা যা করা যায় মনে করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে মাফ চেয়েছেন। আর তার একমাত্র করণীয় করেছেন যে মুসলমান কোপানো আর বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো তুঙ্গে তোলা প্রবলতরভাবে তা সম্পন্ন করতে গেছেন, আর এখান থেকেই বাড়তি হিজাব বিতর্ক। স্কুলের ছোট বা টিন-এজ মেয়েগুলোকে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে অপমানের অভিজ্ঞতায় অবলীলায় ডুবিয়ে দেয়ার এই নিষ্ঠুরতা।

    ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫৮ ও ৫৫ আসনের এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে; বিশেষ করে প্রথম ৫৮ আসন – এই-ই সেই জাঠ অঞ্চলের। মোদির ভাগ্য এখানেই নির্ধারিত হবে। তবে এর ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১০ মার্চ। যদিও এরই মধ্যে আগাম মিডিয়া পূর্বাভাস মোদির বিরুদ্ধেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ওআইসিকে বলে সাম্প্রদায়িক!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    গৌতম দাস

    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3UR

     

                                            Lata Mangeskar (1929-2022)

    _

    সমাজ কোনো ব্যক্তির গুণাবলিকে তুলে ধরতে সহায়তা করে থাকে, তার ভাল গুণ থাকলে তা ফুটিয়ে তোলার কাজটা করে থাকে। উল্টা করে বললে, সমাজের ওপর ভর করেই ব্যক্তি ফুটে ওঠে, ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে। এমনকি তার গুণের উচ্চতা যদি অনেক উপরের হয় তাতে অনেক সময় তার বড় কিছু ত্রুটি যদিও ওই গুণের উচ্চতার নিচে-আড়ালে চলে যায়, তবু এসব অর্থে আমরা বলি, ব্যক্তিত্ব সমাজের সৃষ্টি।

    আবার কোন কোন ব্যক্তিত্ব তার ভাল-মন্দ যাবতীয় গুণ ও ত্রুটিসহই কখনও সমাজের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তেমনি এক ব্যক্তিত্ব সম্ভবত গত আট যুগের বিখ্যাত গায়িকা লতা মঙ্গেশকর। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার কেরিয়ার বা পেশাদার গায়িকা জীবনই অনেক লম্বা, প্রায় ৭২ বছর। এক মারাঠি পরিবারে জন্ম নেয়া লতার পেশাদার গানের জগতে প্রবেশ বা প্রথম তাঁর গলায় সিনেমার গান  রেকর্ডিং বলা হয় ১৯৪৮ সালের আশপাশের সময়ে। ব্রিটিশ-ভারত মানে অখণ্ড ভারত থাকার সময় থেকেই ভারতে সিনেমা – এই নয়া মিডিয়ার জন্ম হয়েছিল। তাতে নির্বাক-সবাক হয়ে চলচিত্রের উত্থানের শুরুর কালেই লতার আগমন। তবে এই সিনেমা নির্মাণ যখন নিজের জন্যই একদিকে নিজের বোদ্ধা দর্শক ও প্রশংসাকারী জড়ো করছে আর অন্য দিকে টেকনিশিয়ানগোষ্ঠী তৈরি করে সাজিয়ে বসতে শুরু করেছিল ততদিনে দেশ ভাগ হয়ে যায়। তবু ভাগ হওয়া আজকের তিন দেশে ভারতীয় সিনেমার প্রতি আগ্রহ ভাগ হয়ে যায়নি বা কমে যায়নি।

    সম্ভবত এর মূল কারণ  কমন অরিজিনের এক সাংস্কৃতিক বন্ধন; এ’তিন দেশের সংস্কৃতির মৌল উৎসগুলো একই জায়গার। এথনিক অর্থে মানুষ মাত্রই তার জাতিগত পরিচয় থাকে। আবার আমরা কোনো না কোনো সিভিলাইজেশনের অন্তর্গত থেকে বড় হই। এই বিচারে আমরা সবাই সিন্ধু সভ্যতার অংশ। তাই সিভিলাইজেশন অর্থে এর একই এথনিক জাতি পরিচয় আমরা তিন দেশেরই কমন বৈশিষ্ট্য। সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রাচীন ভারতের যত প্রকাশ দেখা যায় বা এ সম্পর্কে জানা যায় এর এক বড় চিহ্ন হল সংস্কৃতিতে গানের ধারা এবং ধরনগুলোর স্টাইল ও বৈশিষ্ট্য। যেমন আমাদের এই গানের ধারা পশ্চিমের সভ্যতার কোন ধারা অথবা আরব বা মেসোপটেমিয়ার ধারাও হওয়ার কথা নয়। প্রাচীন ভারত বলতে গেলে এর দাবিদার আমরাও কারণ এর বহু চিহ্নবৈশিষ্ট্য আমরা এখনো বহন করি। যেমন একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এর কেন্দ্রে আছে; এমন এক চিহ্ন সম্ভবত রাগসঙ্গীত ও এর ঘরানা মানে স্কুলগুলোতে যার প্রকাশ। তাই সভ্যতার চিহ্ন হিসেবে ক্লাসিক মিউজিক একটা খুবই শক্ত চিহ্ন হয়ে আছে। তবে এখন পলিটিক্যালি ডিভাইডেড দেশ তিনটাতে সভ্যতার রূপ-পরিণতিতে কী কী রূপ নিয়ে প্রকাশিত আছে, সেখানে অর্জনগুলো কেমন কী, আর তা কে কত অবিকশিত অর্থে ছোট বা বড় এসবের বিচারের ক্ষেত্রে তুলনায় ফারাক যতই যা নজরে আসুক, ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সংস্কৃতিতে গানের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন একই।

    কোক স্টুডিও-এর যুগেঃ
    গত ১৯৪৭ সাল থেকে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের গানের ভিত্তি এক হওয়া সত্ত্বেও আমরা কে কেমন কতদূর বিকশিত হয়েছি, অর্জন করেছি তা এক সহজ তুলনা করে বুঝার উপায় হতে পারে এমন কিছু সম্ভবত এখন এসে গেছে। সেটা হল কোক স্টুডিও।
    এখানে স্টুডিও বলতে মূলত গানের রেকর্ডিং স্টুডিও। অর্থাৎ রসুইখানা যেখানে ফাইনাল প্রডাকশনটা তৈরি হয়েছে। আর কোক বলতে বহুজাতিক পানীয় প্রস্তুত কোম্পানি ‘কোক’ এর কথাই বলা হচ্ছে, অবশ্যই। তবে এখানে এর ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করা সূত্রে যতটুকু; যাতে জোগানো তাদের অর্থের বিনিময়ে এই গানের তৎপরতা ও প্রচারের সাথে জুড়ে থাকার সুবিধায় কোক কোম্পানিও প্রচার ও প্রসার পায়। এ’থেকেই নামের ব্রান্ডিং  আর সেই ব্রান্ড নাম ও শব্দটা হয়ে দাঁড়ায় কোক স্টুডিও।

    এর শুরু ২০০৮ সালে পাকিস্তান থেকে। সাধারণত এমন গানের আয়োজন মানে, সংস্কৃতিতে গান এই শিল্পকলা সৃষ্টির আয়োজনে এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব লাগে। আর তাঁকে  অর্গানাইজার বা সংগঠক হতে হয়; আর তাঁকে গানের ও সমাজের এমন দুই অর্থেই সংগঠক হতে হয়। অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, কোক স্টুডিওতে এমন সংগঠক যারা হচ্ছেন  তাদের টেকনিক্যাল গুণ হল তারা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড বা মিস্কিং ইত্যাদি এসব অন্তত বুঝেন ভাল; আর সাথে সেন্স অব মিউজিক। স্বভাবতই তা নিশ্চয় পশ্চিমা-কালচারাল গানের বোধ বুঝাচ্ছি না। সেটা থাকলে তা বাড়তি ভাল, তুলনা করে তাঁরা নিজের বোধগম্যতা বাড়াতে পারবেন। কিন্তু মূল জিনিস হল, নিজের এথনিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও ইতিহাস সম্পর্কে একটা ভালো রকমের বোধ থাকতে হবে।

    পাকিস্তানে গত ২০০৮ সালে পাকিস্তান-কোক-স্টুডিও শুরু হয়েছিল এমন যে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বের হাত ধরে তার নাম রোহেইল হায়াত [Rohail Hyatt]। গত ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানে গানের কম্পোজার হিসাবে  তাঁর আগমন; এসে পাঁচবছরের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করেছিলেন, বলা হয়। এরপর নানা এলবামে কাজ করার পর তার উল্লেখযোগ্য  সব ছাপিয়ে গুরুত্বের কাজটা হল কোক স্টুডিও, এই প্রডাকশন।  এখানে পাকিস্তান সমাজের কাদের কাদেরকে বেছে তুলে এনে রোহেইল তাঁর গানের ধরন ও বৈচিত্র্য বা কম্বিনেশনের ডালি সাজাচ্ছেন তা লক্ষণীয়। সে দিকটা খেয়াল করলে তার ওজন বুঝা যাবে। পাকিস্তান কোক স্টুডিও-এর সফলতার তিন বছর পরে ভারতে একই আইডিয়াতে ইন্ডিয়ান কোক স্টুডিও শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে; দক্ষিণী কম্পোজার বা সুরকার লেসলি লুইসের [Leslee Lewis] হাত ধরে। আরেক দক্ষিণী গায়ক হরিহরণকে সাথে নিয়ে ১৯৯৬ সালে তার বহুল আদর পাওয়া অ্যালবামের নাম “কলোনিয়াল কাজিন”। তরুণদের টিভি এমটিভি এর কল্যাণে,  এ’নামেই লুইসকে বেশি মানুষ চেনে।

    দুই কোক স্টুডিও-এর তুলনা আমাদেরকে আমাদের একই প্রাচীন উৎস এবং একই সাথে আমাদের ভিন্নতা সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারে, পরিচয়  করাতে পারে। আগেই বলেছি অবিভক্ত ইন্ডিয়ান ধারার সংস্কৃতিতে এক বড় কমন চিহ্ন হল ক্লাসিক মিউজিক যা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় আমাদের কালচারাল উৎস একখানে। ক্লাসিক গান বা রাগ-প্রধান গান শুনে সচেতনরা ছাড়া অন্যদের বোঝা মুশকিল হতে পারে যে, সেটা ভারত না পাকিস্তানের উপস্থাপন।

    কিন্তু এরপর যদি ভারত-পাকিস্তান কোক স্টুডিওর মধ্যে ফারাক – মানে কে কোন দিকে গেছে বিকশিত হচ্ছে অভিমুখ কী তা তুলনা করে বুঝতে চাই তা হলে, ভারতের কোক স্টুডিও দেখে বোঝা যাবে ভারতের গানের জগত বাণিজ্যিক ভিত্তি খুঁজে নিতে পেরেছে। বাণিজ্যিক ভিত্তি বলতে “মডার্ন ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি” জগতের ভারত যার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হল ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমা। অর্থাৎ ভারতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ইন্ডিপেনডেন্ট অর্থে স্বাধীন নয় বরং তা  এক সিনেমা জগতকেন্দ্রিক। ফলে ভারতীয় কোক স্টুডিওতে এর গান, অর্জন ও পারফরমেন্সে এটা মডার্ন এবং সিনেমাকেন্দ্রিকতার ছাপে ভরপুর।

    তুলনায় পাকিস্তান কোক স্টুডিওর বৈশিষ্ট্য হল, সে দেখিয়েছে সে পাকিস্তান এলিট ঘরের কিন্তু গভীর মিউজিক সেন্সের তরুণ যারা পপ বা রক ধরনের মিউজিক থেকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লাসিকে এসে গেছে; তাদেরকে রোহেইল তুলে এনেছেন। কিন্তু সেই সাথে রোহেইল শেষে একেবারে ক্লাসিক কাওয়ালি বা বুল্লেহ শাহকে পর্যন্ত একাকার করে  পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের।  এমনকি বিস্ময়কর এক ব্যক্তিত্ব হলেন সাইন জহুর  যিনি আমাদের মত অক্ষরের-শিক্ষায় জীবন যাপন করেন না। তাঁর ফোনেটিক্যাল মানে শব্দ উচ্চারণের দুনিয়ায় এই মাধ্যমে তাঁর চলাচল। অক্ষর না চিনে নিজের গলার স্বর বা শব্দের উচ্চারণ দিয়ে নিজের জগত গড়েছেন; গানের লিরিক যিনি অক্ষরে দিয়ে না আঁকিবুঁকিতে নোট নেন; তাঁকেও রোহেইল আবিস্কার করে আমাদেরকে পরিচয় করে দিয়েছেন।  পাকিস্তান কোক স্টুডিও আমাদের দেখাচ্ছে পাকিস্তানেরও গানের শক্তিমত্তা কত সমৃদ্ধ কত বিস্তৃত। বুল্লেহ শাহদের আখড়া এখনও কত সক্রিয়, নুসরত ফলে আলীদের ঘরানা এখনও কেমন দাপটের সাথে টিকে আছে। তাঁরা এখনও পাকিস্তানে হারিয়ে যান নাই, নিজের মত সারভাইবালের স্ট্রাগল করে হাজির থাকার চেষ্টা অরে যাচ্ছেন।
    তবে একই ক্লাসিক কালচারাল অরিজিনের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গানের শক্তিমত্তার দিক থেকে পাকিস্তান সম্ভবত এগিয়ে কিন্তু আবার এই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ক্ষেত্রে, বাণিজ্যিক ভিত্তি দেয়ার ক্ষেত্রে ভারত অতুলনীয় উঁচুতে উঠে গিয়েছে। যে ভারতে শিল্পকলার মুখ্য বা ফোকাস ইন্সটিটিউশন যদিও ঠিক গান অথবা নাটক থিয়েটার নয়, সিনেমা। ফলে কাউকে বা কারও অর্জন ফেলে দিবার নয়! স্বভাবতই এ কারণে দেশগুলো যার যার বাড়তি সুবিধার বা অর্জনের দিক অথবা অসুবিধা বা অবিকশিত নেতিদিকও অবশ্যই আছে ও তৈরি হয়েছে।

    কেন লতার আলাপের মধ্যে এদিকে এত দূরে এলামঃ
    মানুষের আবেগ-অনুভূতির ওপর দাঁড়ানো মানুষের শিল্পকলা বা ক্রিয়েটিভিটি [creativity] চর্চার দিক – সাধারণভাবে দেখলে মানুষের জীবনে একটা পেশা খুঁজে পাওয়া বা নেয়া যতটা কঠিন, ক্রিয়েটিভিটির জগতে এটা তার চেয়েও কঠিন।  মানুষের শিল্পকলা-বোধের জন্ম থেকেই এটা এমনই কঠিনতর।  তাই, জন্ম থেকেই শিল্পকলা-বোধের আদি লড়াই হল খোদ নিজ নিজ বিষয়-আশয়ের জীবনের সাথে। সোজা বাংলায়, পেটের সাথে। কেউ যে শিল্পকলা চর্চায় লিপ্ত হবে তো খাবে কী অথবা কে তাকে খাওয়াবে এই হল সেই মুখ্য প্রশ্ন। এটাকেই আরেক শব্দে প্রকাশ করতে বলা হয়”পৃষ্ঠপোষকতা” কে দিবে? মানে কার অর্থে ‘পেটের চিন্তা’ না করেও নিশ্চিন্তে শিল্পকলা চর্চায় ব্যস্ত হওয়া যায়? কোন যুগ-কালেই এই প্রশ্নের কোন জবাব কেউ দিতে পারে নাই। কারণ এর সমাধান নাই। তাই পায় নাই সেকালেরও শিল্পকলা-বোধের মানুষেরা……।

    অতএব, এই প্রশ্নে শিল্পকলা সব সময় একটা আপস করেই এপর্যন্ত চলে এসেছে বা টিকে গেছে, আছে। যেমন সেটা হল, যদি সেটা রাজ-রাজড়ার আমল হয় তো রাজাদের স্তুতিমূলক গানের  তৎপরতা কেটেছে। যেমন রাজ-বন্দনামূলক গান।  আর এটাকে বলেছি রাজ- পৃষ্ঠপোষকতা। অথবা অন্যদিকে ফিরলে আমরা পাই মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটানোর গান, ভক্তিসঙ্গীত, ভজন, কাওয়ালির ধরনে চলে যাওয়া। আর এখান থেকে গণমানুষের দান, ভালোবেসে দান, এমন সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতায় বেঁচে থাকা। কিন্তু এখানের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল – এই ধারা আরো খুবই সিরিয়াস ক্লাসিক্যাল ধারা।  যেন শ্রেফ ভাল পৃষ্ঠপোষকতা নয়। সে সবকে ছাড়িয়ে মোক্ষলাভের জন্য সে মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটাতে হাজির হয়েছে। নিজ আত্ম-ক্ষুধায় গানের ভিতর দিয়ে সে কোন একক স্পিরিটে পৌছানোর কসরত করছে!! এমনকি জমিদারির কালে, বাঈজি জীবনের মধ্য দিয়ে ক্লাসিক গানকে টিকে থাকতে হয়েছে। সেকালে এমন আরেক রূপ করাচিতে দেখা যেত ‘মুজরা’ বসানো…।  শিল্পকলায় স্ট্রাগল-এর কোন শেষ নাই…।

    বলা হয়, আসলে যা “মনের থেকে” ভাল লাগে তার “দাম” [beyound value] হয় না। আবার উল্টা দিকটা হল যে ব্যক্তি এটা শিল্পকলা-বোধে  ‘সৃষ্টি’ করে আপনার সামনে হাজির করেছে তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন কী করে, সে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকবে কী করে? তাই একটা বিনিময় মূল্য তাঁর অবশ্যই লাগবে। এই প্রশ্নও কম জরুরী নয় বরং  আরেক ভাইটাল প্রশ্ন! যার জবাব দিতে হবে বা পেতে হবে!

    আর বাণিজ্যিক সম্পর্কের যুগে এরই এক ধরণের আপাত সমাধান হল, পেশা হিসেবে শিল্পকলার যেকোনো এক শাখায় এতে পেশাদার পারফরমার হিসেবে একদিকে শিল্পকলার চর্চা, অন্যদিকে পেটের চিন্তার সমাধান পেতে হবে বা ব্যবস্থা করতে হবে ও হয়েছে। তবে বলাই বাহুল্য, এই বাণিজ্যিক সমাধান – এটাও এক বড় কম্প্রোমাইজ। জন্ম থেকেই কোন আপোষ করা ছাড়া কোনো শিল্পকলা চর্চা নাই, ঘটে নাই। মানে, মানুষের শিল্প-চিন্তার প্রকাশ সেটাকে “বেচাবিক্রির বস্তু” করতেই হয়েছে। আর বেচাবিক্রির বস্তু  না করে কেমনে নিজের ভরণ-পোষণ হবে – সেই প্রশ্ন  এড়িয়েই শিল্পকলাকে এই আপস করেই  নিজেকে বাস্তব করে চলতে হয়েছে। তাই একেই শিল্পকলা আছে – বলা যাচ্ছে!

    এ ব্যাপারে ভারতে যে বিকাশিত রূপটা হাজির হয়েছে সে দিকে তাকিয়ে বললে ভারতে শুধু বা মূলত গানকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা দাঁড় করানোতে যায়নি। বরং আরেকটা আরো বড় মাধ্যম তৈরি করে নিয়েছে; আর এটাই হল সিনেমা জগত। আর সিনেমারই এক গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ হতে পেরেছে বলেই গান এই শিল্পচর্চাটা টিকে গেছে ও আছে, সিনেমার আরেক শিল্পকলা রূপ হিসেবে  গান সাথে জুড়ে গিয়েছে। তাই এখন এভাবে বলা যায়, বাণিজ্যিক সিনেমার ভেতর দিয়ে টিকে আছে ক্লাসিক মিউজিক। তবে ঠিক ক্লাসিক রূপে না, মডার্ন মিউজিক হিসেবে।
    এখন অলক্ষ্যে এ দুইয়ের সম্পর্কটা বলে রাখা যাক। সেটা হল ক্লাসিক মানে ব্যাকরণসম্মত দিক এবং যা ভিত্তিমূলক দিক – শুধু তাই না। যেকোন ক্লাসিক দিকের মর্ম উপলব্ধি করতে গেলে “বোদ্ধা ট্রেনিং” থাকা লাগবে। এপ্রিশিয়েশন [appriciation] বোধ হুশ-জ্ঞান লাগবে। সেটা না জানলে প্রশংসা বা মূল্যায়ন করা যায় না – এই হল সুত্র।  কিন্তু আবার আরেক সমস্যা হল কাজটা ক্লাসিক হলেও তা হাজির করতে হবে সাধারণ্যে এবং তা জন-সাধারণের বোধের সীমায় পৌছে দিয়ে। অন্যভাবে বললে তত্ব নয় ব্যবহারিক রূপ লাগবে। আর সেটাই ব্যবহার দক্ষতায় ব্যবহৃত ও সৃষ্ট নতুন রূপটা আম আদমির সামনে পেশ-প্রদর্শন করে তাদের কোনো না কোনো বোধগম্যতায় তা আনা; আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে আনন্দ-মজা দেয়া; সাধারণের জীবন অসংখ্য টেনশনের জীবন – সেটাকে রিল্যাক্স করার বা স্ফুর্তি জাগানো যার লক্ষ্য  – এই রূপটাই আধুনিক গান। সেকারণের যার গানের ক্লাসিক দিক নিয়ে নুন্যতম বোধ অভিজ্ঞতা আছে সেই  ফিরে আধুনিক গানে ভালকিছু করতে পারবে ও দীর্ঘযাত্রায় টিকে যাবে।

    তাহলে লতা মঙ্গেশকর আমাদের কে?
    সাধারণভাবে বললে, এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতায় অরিজিনে মিল অর্থে এখনকার ভারত আসলে আমাদের এক কাজিন যেন; চাচাত-মামাত ভাই-বোন যেমন। যদিও একই ব্লাড, ডিএনএ ইত্যাদি আমাদের। তবুও আপনার কাজিন আপনার চেয়ে বহু ও বেশি গুণে গুণান্বিত হতেই পারে। আবার আপনার থেকে খারাপ এবং কদর্যও হতে পারে। কিন্তু ‘কাজিন’ বলছি কেন? মূল কারণ এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতাগত মিল ও একই হবার কারণে।

    এখন ভারতেই কেবল শিল্পকলা প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পেরেছে – মুম্বাইভিত্তিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বা বাণিজ্যিক সিনেমা রূপে। আরই এরই বগলে লেগে ঝুলে হাটছে গানের চর্চা। আর লতা মঙ্গেশকর হলেন ওই গানের জগতে টানা এক ৭২ বছরের পেশাদার। ব্রিটিশ-পিরিয়ড থেকে একাল পর্যন্ত কালদর্শী একজন পেশাদার।

    কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও লতার সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? এনিয়ে আগেই বলেছি শিল্পকলার প্রধান শত্রু হল শিল্পীর ব্যক্তি-বৈষয়িক জীবনের চাহিদা। জীবনে বৈষয়িক চাহিদার মিটানোর উপায় কী হবে তা না খাড়া করে শিল্পকলা চলতে পারে না। ফলে একদিক থেকে বললে এটা  এটাকে পেশা হিসাবে নেয়া মানে তা শিল্পকলার আপোষ, আবার অন্যদিক থেকে বললে এটাই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা ও সুযোগ এবং সম্ভবত একমাত্র সম্ভাবনা। আমাদের এই তিন দেশের মধ্যে ভারতই বাণিজ্যিক সিনেমা এই মিডিয়াকে সফলভাবে শিল্পকলা-সংশ্লিষ্ট মানুষদের পেশা হিসেবে নেয়ার এক স্থিতিশীল ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করতে পেরেছে। আর এই এক্সপেরিমেন্ট যখন শুরু হয় সেটাকে বলা যায় ১৯১৩ সালের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র যা পরে আরো বিকশিত হয়ে হয় ১৯৩১ সালের সবাক চলচ্চিত্র হয়েছে।

    আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হল, এক সময়ে আমরা সবাই অবিভক্ত ভারতের অংশীদার ছিলাম বলে ওর সব অর্জন ও ব্যর্থতারও ভাগিদার ছিলাম। ফলে সিনেমার এই শিল্পকলার বিকাশে মুখ্য ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অবিভক্ত সবার সাথে সে সময়ের পূর্ববঙ্গের বুঝমানেরাও প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিল। নিজের শিল্পকলার ভবিষ্যত খুঁজে ফিরেছিল।

    সে আগ্রহ দেশভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে পরেও থেমে যায়নি। কারণ আগ্রহটা আমাদের কালচারাল ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা পাকিস্তান-বাংলাদেশ (পূর্ববঙ্গ) হয়ে গেলেও রাজনৈতিক বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে যতটা সম্ভব পরস্পর কালচারালি কানেকটেড থাকার চেষ্টা করেছিলাম আমরা, যা স্বাভাবিক। ফলে সেই ঐতিহ্যের স্মরণ থেকেই একালে লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান পর্যন্ত; তাঁর  শোকবার্তা প্রেরণ খুবই ভ্যালিড ও স্বাভাবিক এক তৎপরতা। অবশ্য এর আরো একটা বড় কারণ ‘স্মৃতি’।

    স্মৃতি মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়ঃ
    বড় কারণ ‘স্মৃতি’, যা আমাদের তাড়া করে অনেকেই লক্ষ্য করেছেন হয়ত, ছোটবেলায় শোনা অনেক গান দু-একটা যা তখনই খুব অপছন্দ লাগত ফলে কম বা না শুনতাম আমরা হয়ত ব্যক্তিগতভাবে। অথচ আজ বড় হয়ে ধরা যাক সাবিনা ইয়াসমিনের সেই গান যা আমার অপছন্দের গান সেটাই খুব ভালো লাগছে! কেন, এর কারণ কী? এর কারণটা অদ্ভুত!! মানুষ পরিণত বয়স হলে তখন আমরা আর শুধু গান শুনি না। কোন ভেসে আসা গানশুনার সাথে সাথে আমরা তরুণ বা ছোটবেলার সেসব সময়ের টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতি মনে ভেসে উঠতে থাকে। আর এতে গান ছাড়িয়ে ওই স্মৃতিতে ডুবে যাই আমরা। অসংখ্য খারাপ বা ভালোর সুখবোধ আর ওদিকে হয়ত লজ্জা কিংবা অপরাধবোধ, মিলবার আকুতি ইত্যাদি জেগে ওঠে। নস্টালজিক ক্ষোভ হতাশা ফ্যান্টাসি ইত্যাদি সব এসে মাথায় ভিড় করে। আর ভালো লাগাটা মূলত ওখান থেকে। ফলে সাবিনার সেটা ধীর-লয়ের গান ছিল বলেই হয়ত টগবগে তরুণ বয়সে যেটা ভাল লাগেনি, সরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু পরিণত বয়সে স্মৃতির গুণে  সেটাই এখন মহার্ঘ্য হয়ে উঠতে পারে। অতএব গানের আরেক নাম এখানে গভীর স্মৃতি! লতা আমাদের স্মৃতির আরেক নাম!

    তাহলে একালে লতার গান কথার আসল মানে হল আমাদের পুরনো সেসব দিনের ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখের খুটিনাটি স্মৃতি। আমরা ভাগ হয়ে ছিটকে তিন দেশে পড়েছি কিন্তু লতার গান হল আমাদের পুরান সেসব স্মৃতির গ্রন্থি-কার। বুনে বুনে যে আবার তা জোড়া দেয়!!! মোটামুটিভাবে বললে, পঞ্চাশ তো বটেই ষাটের দশক পর্যন্ত আমরা ভারতের  সিনেমাকেন্দ্রিক পেশাদার শিল্পকলার যে উত্থান তার খবর নিতে পেরেছিলাম। এরপর থেকে রাজনৈতিক বিবাদ অনেক ভারী হয়ে যায়, প্রজন্মও বদলে যায়। স্মৃতি ফিকে হয়ে আসতে থাকে। তবু যাদের বয়স এখন ষাট বা এর বেশি তাদের স্মৃতিতে এখনও ভারতীয় সিনেমা বা লতা বাস করে, এটা কম কথা নয়!

    তবু ঠিক কেন লতা মঙ্গেশকর আজ এখানে প্রসঙ্গঃ
    লতা আজ এখানে লেখার প্রসঙ্গ হলেও এনিয়ে আরো কিছু কথা আছে। তবে সেসব অন্যদিকের কথায় এখন যাব…।
    এটা এখন সবাই স্বীকার করে নিয়েছে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক তৎপরতায় বাকি মহাদেশকে ছাড়িয়ে এশিয়াই প্রধান গ্লোবাল কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই কথাটা মাথায় খেয়াল রেখে  আরো অনেক কিছু দিয়ে আমাদের প্রভাবিত করতে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক ফেলো মাইকেল কুগেলমানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে; যিনি আমেরিকান ফরেন পলিসি নামের ম্যাগাজিনে এশিয়ার ঘটনাবলি প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক নিজের এক কলাম লিখে থাকেন। কুগেলমানের এবারের প্রসঙ্গে দেখি, লতা মঙ্গেশকর উঠে এসেছে  [Lata Mangeshkar Was a South Asian Icon]। তবু গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু তাঁর একটা শুরুর বাক্য ছিল এমন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার কাছে কমন কিছু ব্যক্তিত্ব হয়ে হাজির হওয়া সহজ নয়। কিন্তু লতা হয়েছেন, এধরণের সেই বাক্যটা। তবু তার ব্যাখ্যাটা পূর্ণ মনে হয়নি। কুগেলম্যান লিখেছিলেন…  “Her music united a region that has few shared heroes and often struggles to come together around common causes.”  অর্থাৎ লতা নাকি এই অঞ্চলকে (তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন আমাদের তিন দেশ) ঐক্যবদ্ধ করেছেন যেখানে আমাদের কমন হিরোর সংখ্যা খুবই কম আর একই কারণে একমতে ও একসাথে হবার উদাহরণ অনেক কম।

    কুগেলম্যান  কথাগুলো আনাড়ির মত বলেছেন, আর জোর করে মিলিয়ে বলেছেন। ফ্যাক্টস হল, ঠিক লতা মঙ্গেসকর আমাদের তিন দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেন নাই। উপরে এতক্ষণ সেকথাগুলোকেই খুঁড়ে বিভিন্ন দিক থেকে তুলে এনে বলার চেষ্টা করেছি। যার সারকথা হল, আমরা তিনদেশ লতার পেশাজীবন শুরুর পরে একটা বড় সময় পর্যন্ত একদেশ হিসাবেই ছিলাম। এবং এখনও সাংস্কৃতিক অরিজিন হিসাবে আমরা একই রূট শেয়ার করি। শত রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও লতা  অবশ্যই আমাদের শেয়ারড লাইফের এক প্রতীক। কিন্তু কোথায় আমরা ঐক্যবদ্ধ? এটা তো না থাকলেও জোর করে কাউকে খুশি করার জন্য বলার বিষয় নয়। বাস্তবতার কথাটা বললে অসুবিধা কী? এদিকটা তিনি না জেনে উলটা ব্যাখ্যা করতে গেছেন। তাই এখন নিচে আমরা দেখব আমাদের রাজনৈতিক ভিন্নতার শুরু কোথা থেকে, যেটা কুগেলম্যানের বুঝাবুঝিরই বাইরে…।

    কুগেলম্যান আমাদের তিন দেশে ভাগ হয়ে যাওয়া এবং এখনো তা নিয়েই আমাদের মধ্যে বড় রাজনৈতিক মতবিরোধে জড়িয়ে থাকাকে ইঙ্গিত করছেন?  অথচ তিনি লতার হিন্দু মহাসভা, আরএসএস বা বিজেপির মোদির প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য অনুভব করার দিক নিয়ে বেখবর।  আর স্বভাবতই এ নিয়ে লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তি রাজনৈতিক মতামত বা পছন্দের প্রশ্নে তাঁর হিন্দু-মহাসভা থেকে উঠে আসা আরএসএস-বিজেপি মোদির প্রতি ভালোবাসা আবেগ দেখানো; ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে  মোদি যেন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন সেই দোয়া-কামনা পাবলিকলি প্রকাশ করা থেকে শুরু করে, অবলীলায় বাবরি মসজিদ ভাঙার পক্ষে গান গেয়ে দিয়ে অংশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আমার মনে পড়া থেকেই তো এটা সবদিক থেকে লিখতে তাগিদ অনুভব করেছি।

    আমি আগেও অনেকবার বলেছি, রাজনৈতিক চিন্তায় একটা খামতি কত যুগ ধরে আমাদের তিন দেশকে গর্তে ফেলেছে এর আদর্শ উদাহরণ, এমন ব্যক্তিত্ব হলেন রাম মোহন রায়। গত ১৮১৫ সালে তার ‘আত্মীয় সভা’ নামে পাঠচক্র(?) থেকে (ব্রাহ্মণ নয়)  ব্রাহ্মধর্ম প্রচলনের প্রস্তাব করেন তিনি। সেখান থেকে ব্রাহ্মসমাজ গড়া শুরু করা এটাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। তিনি ভুল অনুমানে বুঝেছিলেন, ব্রিটিশরা একাট্টা অ্যাঙ্গলিকান বা ইংলিশ-ক্যাথলিকভিত্তিক এক ‘জাতি’ বলেই নাকি তারা মডার্ন ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র হতে পেরেছে। কাজেই ভারতকেও জাতি-রাষ্ট্র হতে হলে আগে একেও এক জাতি হতে হবে। তাই এক ‘ব্রাহ্ম-জাতি’ হয়ে নিতে হবে আগে। কারণ তাঁর অনুমান আমাদের অবিভক্ত ভারতে সনাতন ছাড়াও মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মও আছে। এর চেয়েও বড় বিষয়, হিন্দুধর্মেই অগুনতি জাতিভেদ বর্ণপ্রথা আছে। কাজেই আগে সবাইকে এক ধর্মে এনে নিতে হবে। নাহলে জাতি-রাষ্ট্র গঠন করা যাবে না। এই হলো তাঁর বোঝাবুঝিতে প্রধান ও পরিপুর্ণ ভুল অনুমান। আর এই ভুলের উপর দাঁড়িয়ে তিনি ব্রাহ্মধর্ম প্রচলন করে নিতে হবে বলে এক পূর্বশর্ত আরোপের কারণ। তবে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটা আমাদের মনে রাখতেই হবে, ভারতীয় কমিউনিস্ট ইতিহাসের চোখে, তাদের লিখিত ইতিহাস অনুসরণের ব্যাখ্যায় রামমোহনই নাকি কমিউনিস্টদের কথিত “বেঙ্গল রেনেসাঁ’র আদিগুরু”।

    পরবর্তিতে এর আঠারো বছরের মধ্যে রামমোহনের মৃত্যু হয়, আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্মসমাজ তিন টুকরা হয়ে ওই ব্রাহ্ম প্রকল্প অকেজো হয়ে যায় যদিও তা পরে উনিশ শতকেও কেবল টিকেই ছিল। কিন্তু অকেজো হয়ে যাওয়ার পর থেকে বা বলা যায় এ সুযোগে নতুন তত্বকার বা অভিমুখ দাতা হয়ে আসেন কপালকুন্ডলার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনিই যুক্তি সাজান যেহেতু ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে, তাই বিকল্প হিসেবে হিন্দু-জাতির ভিত্তিতে ভারত জাতি-রাষ্ট্রের সংশোধিত প্রকল্প নেয়া হোক। আর এর ভিত্তিতেই পরে কংগ্রেস দলের জন্ম দেয়া হয় ১৮৮৫ সালে। পরিণতিতে ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগের জন্ম। আর ওদিকে কংগ্রেসের চেয়েও আরো কট্টর উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী দল হিসাবে তৈরি হয় হিন্দু মহাসভা যেটা আরএসএস-বিজেপির আদি বা পুর্ব সাংগঠনিক রূপ।

    এখন লতার পছন্দ এই আরএসএস-বিজেপির মোদির রাজনীতি। কিন্তু সাবধান, এটা সাধারণভাবে যেমন বলা হয়, যার যা রাজনৈতিক দল পছন্দ সে তা করবে – এটা এমন ব্যাপার নয়। আপনি দেশের আরেক জনগোষ্ঠী-অংশকে কোপাবেন কাটবেন হত্যা করবেন, নির্মুল করে দিবেন – এটা কোনো রাজনীতি?? এই চিন্তা দিয়ে এক ভারতে সবাইকে ধরে রাখবেন কী করে?? এটা তো কারো পছন্দের রাজনীতি হতে পারে না, ফলে এটা সবার পছন্দের গায়িকা হতে চাওয়া কারও পছন্দের রাজনৈতিক মতামত হতেই পারে না। আবার যিনি সমাজের জন্য গান গাইবেন তিনি এমন রাজনীতি ভালোবেসে একই সাথে সুকুমারবৃত্তির চর্চাও করবেন কিভাবে? এটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন, বোধশক্তিহীন চিন্তা ও কাজ।

    ফলে এক দিক থেকে আমরা লতাকে  রাজনৈতিক দিক বাদ বা পাশে সরিয়ে রেখে কেবল আমাদের স্মৃতিগুলোকে রক্ষা করতে তাঁর গান মানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই; আমাদের দায়িত্ব পরিপালন করেছি। আমরা আমাদের স্মৃতির হত্যাকারী তো হতে পারি না, তাই। কিন্তু একই সাথে একই নিঃশ্বাসে লতার চিন্তার অন্ধত্ব, রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রতি বেহুঁশ ভালোবাসা থাকা এটা আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য; সেটাও জানিয়ে রাখতে চাই!

    তবে এটাও সত্য, গানের জগতের বহু বিখ্যাত লোক কিন্তু যারা বুদ্ধিমান তারা তাদের রাজনৈতিক পছন্দ  বাইরে আনেন না। ব্যক্তিগত জগতেই রেখে দেন। মূল কারণ তাদের গান পছন্দকারিরা নানান রাজনৈতিক মতের হতেই পারে্ন। এখন তিনি নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশ্যে দেখিয়ে ওসব পছন্দকারিদের মধ্যে বিভক্তি আনতে পারেন না।   বুদ্ধিমানদের এতটুকু সচেতনতার আছে বলে এজন্য আমরা তাদের নিয়ে ঘাটাতে চাই না।

    কিন্তু লতা মঙ্গেশকর এতই বোধশক্তিহীন যে, তিনি প্রকাশ্যেই তার ব্যক্তিগত দিক পাবলিক করে দেন। এবং বেপরোয়াভাবে হিন্দুত্ববাদে লিপ্ত হয়ে যান। ফলে মানুষের সুবৃত্তি আমল করার অযোগ্য ব্যক্তিত্ব তিনি যা শিল্পকলার সাথে আনফিট! অবশ্য অনেক সময় পেটের দায়ে মানুষ শিল্পকলার জগতে এসে পড়ে, সেটাও ঠিক!

    জুনিয়রদের উঠতে না দেয়াঃ
    আবার ভারতেই লতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের আরেক বড় ও গভীর অভিযোগ হল তিনি নবাগতেরা যেন তাদের কোন প্রতিভায় যেন তারা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠতে না হতে পারেন, এজন্য নিম্নশ্রেণীর আচরণ পদক্ষেপ বারবার তিনি নিয়েছেন।  এপ্রসঙ্গে ভারতের কিছু গায়িকা যেমন সুমন কল্যাণপুর বা অনুরাধা পরোয়াল [Suman Kalyanpur, Anuradha Paudwal] এদের কথা জানা যায়। এসব গায়িকারা যেন গানের গায়িকা বাজারে কাজ না পায় এমন এক একচেটিয়া অবস্থা সৃষ্টি অভিযোগ লতার বিরুদ্ধে বহু পুরানা। এমন শর্ত তিনি প্রযোজক-পরিচালকদের দিয়ে থাকে। অন্যভাবে বললে একটা একচেটিয়ার ব্যবস্থা কায়েম করে সবস্ময় টিকতে চেয়েছেন তিনি। অথচ তার নিজ প্রতিভা তো কম ছিল না! তাহলে তিনি কী নিজের উপর আস্থা রাখতে পারেন নাই? ইন-সিকিউরিটিতে ভুগতেন কেন??
    যেমন  খুব সম্ভবত সত্তর দশের শেষের দিকে্র ঘটনা যতটুকু মনে পড়ে, আমাদের রুনা লায়লাও এর শিকার হয়েছিলেন। একটা সিনেমায় গড়ে পাচটার মত গান থাকতে দেখা যায়। ঐ প্রযোজক পরিচালক রুনাকে দিয়ে তার সিনেমার দুটা গান রেকর্ডিং করিয়েছিলেন। এমনকি সেই গান সিনেমায় ছাড়ার আগেই বাজারেও ছাড়া হয়ে গেছিল। কিন্তু এবার লতা বললেন তিনি বাকি গানগুলো আর গেয়ে দিবেন না। যদি গাওয়াতে হয় তবে সবগানগুলোই (মানে যেদুটা রুনা গেয়ে ফেলেছে  সে দুটা সহ) আবার তাঁকে দিয়েই গাওয়াতে ও রেকর্ডিং করাতে হবে।  প্রযোজক বাধ্য হয়ে সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ফলাফল হল এই যে লতার একচেটিয়ার হাতে গান জিনিষটাই জিম্মি হয়ে থেকে গেছিল।

    এমনকি পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাট রেল স্টেশনে বসে গায়ে গেয়ে  পয়সা তুলে পেটের ভাত যোগাড় করা রানু মন্ডল কিভাবে যেন ঐ গান গেয়েই আধুনিক জগতের টিভি-রেকর্ডিং স্টুডিও পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তাকেও সহ্য করতে পারেন নাই লতা। বলেছেন রানুরা যেন আগে তাঁর গাওয়া বা রেকর্ডেড হওয়া গান কোন না করেন। কেন? তাঁর গাওয়া সব গানের সব ক্রেডিট কী তাঁর একার? সুরকার, লিরিসিস্ট, এরেঞ্জার, বাদকেরা ইত্যাদি আর কারও কোন অবদান নাই?? শেষ বয়সে এসেও এত উদ্ধত কেন? আচ্ছা তিনি যেটা “শ্রদ্ধাঞ্জলি” নামের প্রায় ৪৫ মিনিটের যে এলবামটা বের করেছেন স্টেজে গেয়েছেন সেটা তো চল্লিশের দশকয়ের গান থেকে শুরু করা হয়েছে যেগুলোর বেশির ভাগই তো অন্যের গাওয়া। তাহলে সেগুলো তিনি ফিরে গেয়েছেন কেন? আবার তারই গাওয়া গান অন্যেরা একালে গাইতে গিয়ে কোন নতুন নোট লাগানো এবং উপযুক্ত কারিশমায় গায়কিতে তা উপস্থাপন কী করা যায় না – এমনকি নয়া কোন এক্সপেরিমেন্ট নি্রীক্ষা করতেও কী তিনি দিবেন না!!!  শুনেছি রানু এখন সবছেড়ে  ফিরে গেছে তার পুরান রেল স্টেশনে…।
    এই একচেটিয়াত্ব ও ঈর্ষার শিকার হওয়া থেকে লতারই ছোট বোন আশা ভোঁশলেও বাদ যায় নাই। এসব দিক নিয়ে আরও জানতে আগ্রহিরা ভারতেরই দুটা আর্টিকেল এখানে ও এখানে পাবেন।

    [ফুট নোটঃ আসলে ইন্ডিয়ান ক্যাপিটালিজমের বিকাশ এই  ইতিহাস পাঠের এক বড় অংশ হতে পারে। আর তা ভালভাবে পাঠ করতে চাইলে এর এক ভাল  উপায় হতে পারে  – ভারতীয় সিনেমার বিকাশ  ও এটা একচেটিয়া পথ কেন সে অনুসরণ করল – সেটা স্টাডি  করা।  আর এখান থেকেই নেহেরুর তথাকথিত কমিউনিস্ট ইকোনমির মুখ থুবড়ে পরা পরিণতি এসবকিছুর স্টাডি  করতে হবে সেক্ষেত্রে। এসবই পরিণতিতে ইন্ডিয়ার প্রথম “ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এর ক্রাইসিস ১৯৯১” তৈরি করেছিল। যেটাকে  বলা যায় আধা-বুঝের  নেহেরুর কথিত কমিউনিস্ট ইকোনমি কিভাবে আইএমএফের কাছে মুখ থুবড়ে সারেন্ডার করেছিল আর পরে  ব্যাপক সংস্কার করে নিজের ইজ্জত রক্ষা করেছিল এরই ইতিহাস!  ভারতীয় সিনেমা একচেটিয়া ভাবেই বিকশিত হয়েছে, মূলত এমন নেহেরুয়ান অর্থনীতির কারণে। এটাই লতার একচেটিয়া বা নিজে ‘শ্রেষ্ট’ হয়ে থাকার খায়েস – এসবকে কতটা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে তা নিয়ে কোন এক আগামিতে দেখা হতে পারে… ]

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১২ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “আমাদের স্মৃতি ও অসংবেদী লতা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    গৌতম দাস  ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3TZ

     

    [সার-সংক্ষেপঃ রাজনৈতিক আন্দোলনে সশস্ত্র ধারায় অথবা নিরস্ত্র গণ-আন্দোলনের ধারা হতে পারে।  কিন্তু সশস্ত্র ধারা হলেই সেটাকে উচ্চমার্গের আন্দোলন মনে করা অর্থহীন ও ভুল মাপকাঠির জ্ঞান। এর উপর যদি সে সশস্ত্রতা আবার হিটলারের ধারার যুদ্ধের ক্যাম্পের সাথে যুক্ত হয়ে করার চেষ্টা হয় অর্থাৎ যার অর্থ হল স্বাধীনতা বা ‘ফ্রিডম’ নিয়ে কথা বলা অথচ রাজনীতির ঠিক নাই। কী রাষ্ট্র তারা গড়বে সেটাও শেখানে বেখবর-ই থাকে! ভারতের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ঠিক এরই প্রতীক।  তিনি জাপানের সামরিক সহায়তায় বৃটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে মন-কামনা করেছিলেন যা ব্যর্থ হয়।  ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এদেরও হিটলারের আদর্শী ও অনুসারী। আরএসএস লেবেলে হিটলারের কাজ-ততপরতা নিয়ে তাদের উচ্ছাসমূলক অবস্থান দেখা যায়। কারণ তারা চরম জাতিবাদি – এথনিক ক্লিনজিং বা এথনিক জাতিকে নির্মুল করা জায়েজ মনে করার রাজনীতি করে। যদিও এখানে আমরা দেখব, ভারতের মোদি ও মমতা দুই রাজনীতি করলেও একই ‘নেতাজীকে’ দখল নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে তারা লড়ছে।]

              Taiwan offers to open national archive to ‘rediscover legacy’ of Netaji Subhas Chandra Bose

    সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫) [Subhas Chandra Bose], বৃটিশ আমলে কলকাতার বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং একসময়ে কংগ্রেসের সভাপতি;  যাকে কথিত পাবলিকের দেয়া খেতাব-নাম হল ‘নেতাজী’।  এখনকার কলকাতায় তাকে মূলত নেতাজী নামেই সবাই ডাকে ও পরিচিত।
    এই নেতাজী কিভাবে তিনি মারা গেছেন তা অবিশ্বাস করে এনিয়ে তাঁর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য” বলে আলোচনা সেই পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায়ই উঠেছে। কিন্তু একালে তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা মমতা ব্যানার্জি এই নেতাজী ইস্যুকে মোদির বিরুদ্ধে মানে আরএসএস-বিজেপির হিন্দি-বলয়ের আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছেন। আর  কলকাতা বিজেপিকে কোণঠাসা করতে এটাকে হাতিয়ার করেছেন। কলকাতা বলতে এখানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রতীক হিসাবে দেখে বলা হচ্ছে এবং এই কলকাতা যা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানীও বটে।
    যদিও মমতার মূল তর্ক এখানে আসলে  – কলকাতা কী আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের হিন্দু-বাঙালি অংশ? নাকি কলকাতার নেতা নেতাজীর বাঙালি, এই বাঙালি-হিন্দু এরা আলাদা এথনিক জাতি এবং এরা রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের কোন অংশই নয়? এই তর্ক সামনে এনেই হিন্দুত্ব পরিচয়ের বাইরে হিন্দিবিরোধী বাঙালি-হিন্দু জাতিবাদের জোয়ার পশ্চিমবঙ্গে সফলভাবে তুলতে পেরেছিলেন তৃণমুল দলের সভাপতি মমতা বন্দোপাধ্যায়। আর তা পেরেছিলেন বলেই গত ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি-মোদিকে ঠেকিয়ে দিয়ে বিপুল বিজয়ী হয় তৃণমুল এবং তা থেকে তৃণমূলের মমতা এখন ক্রমেই মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ফিগার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সম্প্রতি এক জনমত জরিপ সমীক্ষাতে মমতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর চেয়েও পপুলার রেটিংয়ে এগিয়ে থাকা নেতা এবং মোদির প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদ। ওই রিপোর্ট লিখেছে– “১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে দেখছেন ১১ শতাংশ”। কাজেই নেতাজী হলেন কলকাতার বাঙালি-হিন্দুর নেতা, আর হিন্দি-বলয়ের যারা এই নেতাজীকে নেতা মানে না তারাই বিজেপি – এই হল মমতার ডিফারেন্সিয়াল পয়েন্ট। আর মমতার এই “ভাগ দেখানো” বয়ানের সামনে কলকাতা বিজেপি পুরাপুরি অপ্রস্তুত ও বোকা! মূলত নেতাজী সুভাষকে নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত; ছুড়ে ফেলবেন নাকি কোলে তুলে নিবেন তা জানেন না! কারণ এনিয়ে তাদের কেন্দ্রীয় বিজেপির থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা কখনো পায়নি, সে রকম কোন ইঙ্গিত অবস্থানই নাই।

    ইন্ডিয়া টুডের জানুয়ারি সংখ্যার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ সমীক্ষায় এই চিত্র ফুটে উঠেছে। সমীক্ষায় যোগ দেওয়া ১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধিকে দেখছেন ১১ শতাংশ মানুষ।

    এখন বিজেপি তার হিন্দুত্বের চোখে দেখা ভারতের নেতাজীকে কোনো নেতা মানবে কী? এর উত্তর দেয়া ছাড়া কলকাতা বিজেপিকে কলকাতার-বাংলায় “বাইরের লোক” হিসেবেই থাকতে হবে। মমতার এই ইঙ্গিতপূর্ণ বয়ান এজন্য মোদির জন্যও কণ্টকময়!

    গত তিন বছরে এনিয়ে বহু ধাক্কা খাবার পরে মোদি তাই এবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। তিনি মমতার চ্যালেঞ্জের মুখে নিজে বাঁচতে নেতাজীকে ‘আপন” করে নেয়ার সিদ্ধান্ত-পরিকল্পনা এঁটে নিয়েছেন। গত ২৩ জানুয়ারি ছিল নেতাজী সুভাষের জন্মদিন। মোদি  ঐদিন দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে নেতাজীর হলোগ্রাম মূর্তির উদ্বোধন করেছেন। অর্থাৎ মোদিও এবার প্রতিযোগিতায় নেমে  মমতার কাছে নেতাজীর শেয়ার নিতে চাইছেন! কিন্তু এই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কে; কী তাঁর রাজনীতি?

    নেতাজী সুভাষের রাজনৈতিক জীবনঃ
    জওয়াহেরলাল নেহরু নেতাজীর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও নেহরুর আগেই নেতাজী কংগ্রেস দলের সভাপতি হয়েছিলেন ১৯৩৮-৩৯ সালের সময়কালে। নেতাজী পড়াশোনা শেষে লন্ডন থেকে ফিরে ১৯২১ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে গান্ধীর কংগ্রেস দলে যোগ দিয়েছিলেন। যখন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর বয়স ৫১ বছর। আর তখন নেতাজীর রাজনৈতিক গুরু বা মেন্টর [mentor] ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। এই চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন কলকাতার মেয়র, নামকরা ব্যারিস্টার আর এছাড়া কিছুটা আগ্রাসী জাতিবাদী। কিন্তু পরবর্তীতে গান্ধী আর নেতাজীর মধ্যে প্রায় প্রতিনিয়ত বড় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিতে শুরু করেছিল। তাদের মূল মতপার্থক্যকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবে যে, গান্ধী রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন, কিন্তু অহিংসভাবে। আর এর বিপরীতে সুভাষও রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন কিন্তু রাজনৈতিক বলপ্রয়োগে, যতটা পরিস্থিতি অনুমোদন করে এবং সময় সুযোগ হলে সশস্ত্রভাবেও। গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার চেয়ে সুভাষের রাজনীতি অনেক রেডিক্যাল এভাবেও সম্ভবত বলা যায়।
    এথেকে দীর্ঘ সময় দলের অভ্যন্তরীণ লড়াই সঙ্ঘাতে গান্ধী নেতাজীকে কোণায় বা আড়ালে ফেলে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আর এসবের পরিণতিতে নেতাজী দ্বিতীয়বার কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৩৯ সালে ঠিকই কিন্তু গান্ধীর প্রবল বিরোধিতায় গ্রুপিংয়ের চাপে বেশি দিন টিকতে পারেননি; একপর্যায়ে সভাপতির পদ তিনি ত্যাগ করেন। এরই  আরেক পর্যায়ে ইনি কংগ্রেস দলও ত্যাগ করেন। পরে ঐ ১৯৩৯ সালেই তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক” নামে নতুন দল গড়েন। কিন্তু ওই বছরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বৃটিশদের বিরোধী জোটপক্ষ হিটলারের জার্মানি-জাপান জোটের সাথে বিশেষ করে জাপানের সহযোগিতায় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র যুদ্ধের লড়াইয়ে নামেন। যদিও খুব বড় কোনো সফলতার ঘটনা সেটা ছিল না। এদিকে বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের কালে ১৯৪৫ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে বিধ্বস্থ বিমান থেকে তার শরীর আগুনে ঝলসে যায়। পরে এখনকার তাইওয়ান যার এক অংশ সেকালে জাপান কলোনি ছিল, সেখানকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার সমর্থকরা তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে “রহস্যজনক” বিমান হামলায় নিখোঁজ হয়ে যান ধরনের এক ফ্যান্টাসির বর্ণনায় বিশ্বাস করেন। এটাই তাদের চোখে নেতাজীর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য”!  এই হল একেবারে সারাংশে সুভাষের জীবনী।

    কলকাতার বীর নেতাজীঃ
    কিন্তু সেই থেকে কলকাতায় ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসন প্রত্যাহার ও কলোনি প্রশাসন গুটিয়ে চলে যাবার পরে বিশেষত কংগ্রেসবিরোধী মহলে নেতাজীকে এক বীর বানানোর তৎপরতা দেখা যায়। তারা নতুন করে গান্ধীর কংগ্রেসবিরোধী হয়ে নয়া বয়ান খাড়া করতে তৎপর হন। মূলত তরুণ ও পেটি মধ্যবিত্ত মহলে যা কথিত ‘অন্তর্ধান রহস্য’ এমন ‘রহস্যময়’; তাই নিশ্চয় আরো অনেক কিছু অজানা এ’ধরনের প্রপাগান্ডা যেটা সারবত্তায় এক গভীর কিন্তু ফাঁপা আবেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও গান্ধী-নেহেরুরা বাংলার নেতাজীকে জায়গা দেয় নাই, মুল্যায়ন করে নাই ধরণের বঞ্চিতবোধ থেকে অভিমান গোসসা কলকাতায় সেই থেকে সবকালেই বেশ  সরব। বিশেষত তরুণদের আক্ষেপ হল, তাদের ভারত ‘স্বাধীন’ হয়েছে তারা জানছে; ‘স্বরাজ’ বা কথিত ব্রিটিশবিরোধী “স্বাধীনতার আন্দোলন” হয়েছে তাদের জানানো হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে এটা তো টেবিলে বসে আপস আলোচনায় স্বাধীনতা পাওয়া বলেই তারা দেখছে। তাই এতে জোশ নাই!!!

    আর তাই  উত্তেজনাহীন স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘটনা-বর্ণনার বিপরীতে এর বিরুদ্ধে তাদের সুভাষ বা নেতাজী (কলকাতায় তার সমর্থকদের দেয়া নাম) হলেন তাদের আসল সশস্ত্র যোদ্ধা – এই হল সেই বয়ান। আর যেহেতু হিন্দু-বলয়ে ভারতের প্রথম প্রতিভূ হল কংগ্রেস আর এর নেতা নেহেরু-গান্ধী যারা কলকাতার নেতাজীকে কোণঠাসা করেছিলেন, কাজেই কলকাতা বাঙালি-জাতিবাদের নেতা হিসেবে মমতা মোদিকেও দায়ী ও বিজেপিও  বাংলায়  বহিরাগত – এই ইঙ্গিত খাড়া করে চলছিলেন। আর সেটাই এবার মোদি সংশোধিত করে নিলেন।

    নেতাজীকে আমরা কী চোখে দেখবঃ
    প্রথমত কলকাতা শুরু (১৭৮৯) থেকেই আমাদেরকে গোনায় না ধরা আলাদা ভেবে এসেছে। বিশেষত পুর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠি মুসলমান এরা আদৌ বাঙালি কিনা  বা বাঙালির অংশ কিনা এসব প্রশ্ন তুলেছে। তবে আমরা অবশ্যই সেকালের হিসেবে পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের লোক। আমরা আমাদের মতই অবশ্যই বাঙালি, রক্ত দিয়ে স্বাধীন করে বাংলাদেশ পেয়েছি। তাহলে এখন আমরা কলকাতার ‘নেতাজী’কে কিভাবে দেখব? তৃণমূলের মমতার চোখে? নাকি কোনো প্রগতিবাদী চোখে?  এর জবাব হল – বস্তুতঃ  দুটোর কোনোটাই না। আসলে আমাদের চোখ মানে দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ আলাদা হয়ে গেছে বহু আগে থেকেই।

    সে স্বার্থ দিয়ে চিনতে চাইলে – বাংলাদেশের মূল স্বার্থ হল, জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ, তাই বরাবর সেকালের জমিদারি ব্যবস্থা ও শাসনের বিরোধিতা ছিলাম এবং তা করে গেছি আমরা। ফলে এই সূত্রে জমিদার হিন্দুরা যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আধিপত্য কায়েম করে নিয়েছিল; আর মুসলমানরা বাঙালি নয় বা বাঙালি স্বীকার করত না, আজও সেসবের কালচারাল প্রভাব ও জের অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান দেখা যায়। সেই থেকে মুসলমানবিদ্বেষের প্রচলন শুরু হয়েছিল; যে কারণে আজও প্রগতিবাদ ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রায় সমার্থক!
    তাই আমরা দেখেছিলাম, আমাদের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালে একমাত্র বাংলার ভাগ হওয়াই ছিল আমাদের স্বার্থ। কারণ বাংলা ভাগ ছাড়া জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ সম্ভব ছিল না। তাই বাংলা ভাগ মানেই হয়ে যায়, সেকালের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের স্বার্থ।

    এর বাইরে আমাদের জন্য অন্য কোন অপশন খোলা ছিল না। তাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে দু’বারই যারাই বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে দেখা গেছে তারা জমিদার হিন্দুস্বার্থের লোক; প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ তাদের স্বার্থের লোক। এজন্য আমাদের স্বার্থ কী তা বুঝবার সোজা ফর্মুলা হল, যারাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে এরাই আমাদের বিরোধী জমিদার-হিন্দু স্বার্থের লোক, আর এরাই প্রগতিশীল। আর প্রগতিশীলতাই তো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ নিয়ে আন্দোলন পর্যন্ত আমাদের বিরক্ত করে চলেছে, পিছু ছাড়েনি। যেমন দেখেন, ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন; অতএব বাস্তব ভিসির মুখে দাড়ি থাক আর না থাক ভিসি-ব্যঙ্গ করা ছবিতে ভিসির মুখে মুসলমানি দাড়ি লাগিয়ে তারা দিবেই! আর ভিসি অবশ্যই এবার ‘তালেবান’ হয়ে যাবেন! কারণ তাদের ভিসি তো কথিত ‘প্রগতিশীলতা’র বিরোধিতা করেছেন!
    তা হলে এত কথার সাথে এখানকার প্রসঙ্গ নেতাজী সুভাষের সম্পর্ক কী? প্রথমত, একটা রেফারেন্স জানিয়ে রাখি। গত ২০১৯ সালের আমার একটা লেখার শিরোনাম ছিল- “কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না“। অর্থাৎ আমাদের অবস্থানটা কী, এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এখন দরকার এর একটা আপডেট জানা।

    পুর্ববঙ্গের স্বার্থে নেতাজী কখনও অবস্থান দেখান নাইঃ
    এটা ঠিক নেতাজীকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থের পক্ষে কখনও অবস্থান দেখাতে হয় নাই। একটা সুবিধা তিনি পেয়েছিলেন।  আসলে নেতাজী রাজনীতিতে এসেছিলেন ১৯২১ সালে, অর্থাৎ ১৯০৫ সালে তিনি রাজনীতিতে কেউ নন, মাত্র আট বছর বয়সী তিনি। আবার কার্যত ১৯৩৯ থেকেই তিনি মূলধারা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা দূরে। আর ১৯৪৭ সালের দেশ বা বাংলাভাগের আগেই মানে ১৯৪৫ সালেই তিনি মৃত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গের কোনো সময়ে কোনো ইস্যুতে পক্ষ-বিপক্ষে  কোনো অবস্থান তার ছিল কী, জানা যায় না। তা হলে কী দিয়ে তাকে সুনির্দিষ্টভাবে বিচার মূল্যায়ন করতে পারি?
    তার জাপানের সহায়তা নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ের তাৎপর্য কী? প্রথমত ব্রিটিশবিরোধী তার সশস্ত্র তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা ছিল না, হয়ে উঠতে পারে নাই। প্রশ্নটা আর একটু এগিয়ে স্বচ্ছ করে করতে পারি এভাবে যে, ব্রিটিশ শাসকরা কলোনি ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পেছনে নেতাজীর গঠিত সেনাবাহিনী ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর তেমন কোনো অবদানই নেই, ছিল না।

    মূলত ঘটনা হিসেবে জাপানের সহায়তায় নেতাজীর ব্রিটিশ-ভারতের সশস্ত্র বিরোধিতা ছিল খুবই সীমিত। সেই আক্রমণ ছিল ভারতের নর্থ-ইস্টের এখনকার রাজ্য নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায়; ব্রিটিশ-ভারতের কোহিমা সীমান্তে এক-দুইটা বর্ডার-পোস্টে আক্রমণ মাত্র। যা ঘটনা হিসেবে খুবই নগণ্য, যেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমি দখলের কথাও জানা যায় না। তাহলে?

    বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা কখনও কলোনির নিয়ন্ত্রণ হারান নাইঃ
    এবার সাধারণভাবে বলা যাক। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ছিল মোট প্রায় ২০০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭)। এসময়ের মধ্যে কখনই কলোনি শাসকরা নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। তাদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জড হয়ে যায়নি। তবু তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হামলা আক্রমণের ঘটনা হল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, সেটাও নিয়ন্ত্রণ হারানোর মত কোন ঘটনা হয়ে উঠতে পারে নাই। এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল আমরা এই ঘটনাকে ডাকি সিপাই বিদ্রোহ বলে – সিপাই বিপ্লব বলি না।
    বিদ্রোহ মানে হল উপস্থিত শাসন অসহ্য হয়ে গেছে তাই মানছি না বলে উত্থান। কিন্তু এর পরে কোথায় যাব সেই পরিনতি পরিকল্পনা নিয়ে কোন ভাবনা নাই, এখনও দানা বাধে নাই। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক হুশ-জ্জান বোধ তখনও নাই। একারণে ওটা বিদ্রোহ অবশ্যই  কিন্তু পরে ক করব এই রাজনীতিক প্রস্তুতি নাই বলে তা আর কোন বিপ্লব নয়। 

    আর তাই শেষে বৃটিশ শাসক ঐ বিদ্রোহকে “ওভার-পাওয়ার” করে বিদ্রোহ দমন করে ফেলতে সক্ষম হয়। পরে বিদ্রোহীদের ওপর ভয়ার্ত নৃশংসতা ঘটিয়ে এর শেষ হয়েছিল। ফলে তাদের শাসন ফিরে নিজেকে সংহত করে নেয় যদিও সেই থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলোনি দখল শাসনের বদলে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হই আমরা।
    অন্যদিকে, এছাড়া ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে ১৯০০ সালের পর থেকে কলোনি ত্যাগের আগে পর্যন্ত সময়ে।  যেখানে ১৯০০ সালের আগে অনেক বিদ্রোহই হয়েছে – ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই ব্রিটিশ শাসকের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো তো নয়ই; বেগ পেতে হয় এমন কোনো উচ্চতার আন্দোলন সেগুলোর কোনোটাই ছিল না। কাজেই নেটিভ বা ভারতীয়দের কোনো আন্দোলনের কারণে কলোনি শাসকরা অখণ্ড ভারত ছেড়ে যায়নি।  আর অখন্ড ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের জন্মই যেখানে ১৮৮৫ সালে। তাই কথাটাকে আরো বড় প্রেক্ষিত থেকে বললে, এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশের কোনো কলোনি হয়ে থাকা দেশের স্থানীয়দের আন্দোলনের ঠেলায় কলোনি শাসকরা তাদের মুক্ত করে দিয়ে পলায়ে যায় নাই। এমন উদাহরণ জানা নাই।
    বরং আমরা চোখ আরো বড় করে তাকাতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরে কেবল ব্রিটিশ কলোনি দখলদার নয়; এর সাথে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসসহ সব কলোনি দখলদারেরাই দখলদারি ছেড়ে সব দেশকেই কলোনিমুক্ত করে দিয়ে গিয়েছিল স্বেচ্ছায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো, কোনো দখলী দেশের স্থানীয় আন্দোলন-সংগ্রামের কারণেই তারা সেই কলোনি ত্যাগ করে যায়নি। কলোনি মুক্তি ঘটেছিল কার্যত স্বেচ্ছায়। অর্থাৎ মামলাটা কেবল বৃটিশদের বেলায় নয়, সকল কলোনিদখলদারেরাই স্বেচ্ছায় ছেড়ে চলে গেছিল। কিন্তু কেন?

    হ্যাঁ, একটা ‘তবে’ অবশ্যই ছিল। সেটা হলো আটলান্টিক চার্টার চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্টে। ওই চুক্তিকে একটা দাসখত বলা যায় যেখানে চার্চিল রুজভেল্টকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হিটলারের পরাজয়ের ওই বিশ্বযুদ্ধে বিজয় ঘটলে দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসনের সমাপ্তি টানা হবে। যুদ্ধ-পরবর্তী দুনিয়াতে আর কোন কলোনি শাসন থাকবে না। আর এই শর্তেই আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, নেতৃত্বে বড় ভূমিকা নেয়া যুদ্ধের খরচের বেশির ভাগ একা বয়েছিল ইত্যাদি। আর এখান থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব শুরু হয়েছিল।

    কাজেই নেতাজী সুভাষও অখণ্ড ভারত বা কলকাতার বিরাট ভূমিকা রাখা কোন রাজনীতিক হতেই পারেননি, ছিলেন না।

    তবে দ্বিতীয় আরেক প্রসঙ্গঃ
    নেতাজী সুভাষ আরেক বিরাট অবিবেচক কাজ করেছিলেন। তাঁর রাজনীতির বোধ-বুদ্ধির খামতি এখানে ধরা পড়ে। তিনি আসলে প্রথমে গিয়েছিলেন জার্মানিতে, সরাসরি হিটলারের সাথে দেখা করতে। কিন্তু হিটলার এশিয়ায় তাঁর সামর্থ্য নিয়ে আসতে ছড়িয়ে পরতে চাননি। ফলে অপারগতা প্রকাশ করে তিনিই  এশিয়ায় হিটলারের র্জামানির বন্ধু ও পক্ষশক্তি  জাপানের কাছে যেতে বলেন। আর সেখান থেকেই নেতাজীর জাপানের সাথে সম্পর্কের শুরু। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই ফর্মুলা অনুসারে এটা হয়ত জায়েজ বা  অন্যায় মনে হচ্ছে না। কিন্তু আসলে এটা অন্যায় এবং বিরাট ভুল-ও। কেন?

    প্রথমত ১৯৪২ সালের পয়সা জানুয়ারি থেকেই বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ একদম স্বচ্ছ হয়ে যায়। এমনকি মনে রাখতে হবে ঐ পয়লা জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করার দিন।  যারা ঘোষণা করে দিয়েছিল যুদ্ধে জিতলে সেই নতুন দুনিয়াতে সব কলোনি শাসন নিষিদ্ধ থাকবে। অথচ নেতাজী নামে কথিত নেতা সেটার খবর রাখেন নাই। তার রিডিং বা ইতিহাস-পাঠই ভুল, ডাহা মিথ্যার উপর দাঁড়ানো। তাই তিনি অবলীলায় যাচ্ছেন হিটলারের কাছে??????? যারা এর বিপরীত পক্ষ!!!

    আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান বিজয়ী হলে, নেতাজীও হয়ত বিজয়ী হতেন! কিন্তু সেই ভারত অথবা বেঙ্গলের এই বিজয়ী নেতাজী আমাদের জন্য নিজেই এক হিটলার হতেন! রোহিঙ্গাদের শাসক বার্মিজ শাসক জেনারেলরা যেমন, ঠিক সেরকম!। কেন এমন কথা বলছি? জাপানিরা ১৯৪২ সালেই বার্মাকে ব্রিটিশ কলোনি শাসন থেকে বের করে নিজের অধীনে নিয়েছিল। এই অর্থে স্বাধীন করে দিয়েছিল। অং সান সু চির বাবাসহ ত্রিশজন বার্মিজকে জাপানিজ আর্মি বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল। পরে তাদের নেতৃত্বেই এক সেনাবাহিনী গড়ে দিয়েছিল জাপানিরা যারা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে ‘মুক্ত’ করেছিল।
    আবার লক্ষ্য করা যাক,  ভারতের এত জায়গা থাকতে নেতাজী কোহিমায় গেছিলেন কেন? সেটা এজন্য যে, কোহিমা সীমান্তের ওপারেই ছিল জাপান সমর্থিত ঐ বার্মিজ বাহিনী। তাদের সাহায্যেই নেতাজী দুই একটা বর্ডারপোস্ট সাময়িক দখল নিতে পেরেছিলেন, যা টেকেনি।

    এখন আসেন কেন এখনকার বার্মার কথা তুললাম?
    আমার একটা লেখার শিরোনাম হল, মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব। সেখানে দেখিয়েছি বার্মা কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়। এর মূল তাতপর্য হল যেহেতু বার্মাকে ব্রিটিশমুক্ত করে দিচ্ছে জাপানিজ আর্মি। খুবই ভালো কথা হয়ত! মনে হতে পারে। কিন্তু ঐ জাপানের নিজের রাজনীতিক ব্যবস্থা কী ধরনের? জাপান তখন সরাসরি একটা রাজতন্ত্র। তাও আবার কিছু নৃশংস জেনারেলের এক সেনাবাহিনী সহায়তায় ওটা একটা সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ; এবং এক এশিয়ান কলোনি শাসক। পুরা কোরিয়া (তখন দুই কোরিয়া এক অখন্ড) এবং চীনের প্রায় ২৫% তখন জাপান কলোনিদখল করে রেখেছে। অর্থাৎ সোজাসাপ্টা বললে, জাপান তখন বৃটিশের মতই কলোনিদখলদার কিন্তু রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্য। মানে  কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়; কোনো জন-রাষ্ট্র বা রিপাবলিক নয়। আর যা রিপাবলিক নয়, তা কোন রাষ্ট্রই নয় এবং রাজনৈতিকও নয়। জনগণ বা পাবলিক বলে কোন শব্দ বা ধারণা প্রচলিত নাই। আছে রাজা-আমির আর এর বিপরীতে সবাই প্রজা।

    রাজনৈতিক রাষ্ট্র হওয়ার পূর্বশর্ত হল, দেশ-রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস সেখানে থাকে জনগণ। জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে বলে স্বীকার করার প্রশ্ন তখন আসে। রাজা-শাসক বলে শেখানে কেউ থাকে না। আগে জনপ্রতিনিধি হতে হয়, তবেই সে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি।

    এমনকি এখনো জাপান কোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। জাপানের ফর্মাল নাম ইউনিয়ন অব জাপান। নামের সাথে কোথাও ‘রিপাবলিক’ শব্দটা নেই যদিও সেখানে নির্বাচন হয়, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকে।অর্থাৎ তারা “গণতন্ত্রী” হয়ত কিন্তু কোন জনরাষ্ট্র, জনপ্রতিনিধিশীল রিপাবলিক রাষ্ট্র সেটা এখনও নয়।  আর এ কারণে সেকালে জাপানিজদের দেয়া সব ট্রেনিংয়ে বলাই বাহুল্য কোন রাজনীতি, পাবলিক, জনস্বার্থ, পিপলস রাইট ধারণাগুলো থাকে নাই; কাজ করে নাই। এ কারণে বলেছি, সেকালের বার্মা বা কলকাতার নেতাজী এরা রাজনীতি কী তাই জানতেন না, গুরুত্ব দেন নাই। অথচ স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন! একারণে  বর্তমানেও বার্মা বা মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব যারা ওর ক্ষমতায় আছে, শাসন করছে মাত্র।

    সারকথাঃ যে নিজেই এক সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ, সেই শাসক আমাকে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার ট্রেনিং দিতে পারেই না।

    আর  একারণেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কোন রিপাবলিক জনরাষ্ট্র গড়ার সৈনিক ছিলেন না। “রাজনীতি” বা পাবলিক শব্দের অর্থ না বুঝা নেতাজী কেবল সশস্ত্রতা আর সাথে স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন। দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার কথা বলে আবেগী করে তুলতেন। অতএব তার জাপানের বিজয়ের পরিণতিতে এশিয়ার দেশগুলো হত একেকটা বার্মা – নেতাজীর  সেই পরিণতি হত একটা ‘গর্ভস্রাব’।  কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণা নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণাই নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কিন্তু তবু সাবধান! তৃণমূলের মমতাকে মোদির সাথে তার নেতাজী নিয়ে লড়াই করতে দিতে হবে; এটা আমরা নাকচ করব না। কারণ এটা ঠিক ‘নেতাজীকে’ নিয়ে কোনো লড়াই নয়। নেতাজীর আড়ালে এটা মোদির হিন্দুত্বে ভারতের অধীনের কলকাতা নাকি বাঙালি হিন্দুর কলকাতা থাকবে, এর লড়াই এটা।  এটাই কলকাতা বা মমতার নিজস্ব লড়াই – নিজি মামলা – যেখানে আমরা কেবল কামনা করতে পারি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বিজয়ী হোক! টিকে থাকুক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৯ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “মোদি-মমতার ‘নেতাজী’ বিবাদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Tp

    Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress

     

    ঘটনা এখানে দু’টা কিন্তু কারণ একই। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূর থেকে দূর-অস্তে চলে যাচ্ছে। সেই সুত্রে, কোন ভারত-ঘনিষ্ট ও নির্ভরশীল কোন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্র্ককের সুযোগ ও সম্ভাবনাঢ় বাস্তবতা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা-বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় চলে যাবে কেন?

    যদিও এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ঘটছে  ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। তবে, সম্পর্কিত। কিভাবে? যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা সেটা কেবল বাংলাদেশের উপর না আরো অনেক দেশসহ সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল  এই মার্কিন অবরোধের মূল কারণ – “মানবাধিকার লঙ্ঘন”। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে… [to infuse human rights into its foreign policy,] । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়া – এ’দুই ঘটনার পেছনের কারণ একটাই আর তা হল – (আমেরিকার ভাষ্যমতে) মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র‌্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা সেটাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টার ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।

    ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া [Human Rights and US Foreign Policy: Implications for India and China]। যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ছিল ভারত প্রসঙ্গেঃ বলাই বাহুল্য তা ভারতের জন্য ছিল খুবই হতাশার। এমনকি সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসিঃ পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ [Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress]।

    ‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে কংগ্রেস সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক “স্টেট অব দা ইউনিয়নের” ভাষণও দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উদ্যোগে। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারে যেতে আগ্রহিরা দেখতে পারেন – Table 2: Comparison of tabled resolutions on India’s abrogation of Article 370 in Kashmir]।  আর সেখান থেকেই এই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে। যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এমনকি এটাও লিখেছে যে, আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

    কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনার অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কাশ্মির ইস্যু যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা “জঙ্গি-টেরর” , ফলে তারা খারাপ লোক! অথচ এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, একেবারে ফ্যাক্টস লুকানো বা উল্টেদেয়া কথা। অথচ মূল ঘটনা গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্য নির্বাচনে পরিকল্পিত ব্যাপক কারচুপি। ঐ নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ফারুক আব্দুল্লাহ (মানে তখনকার কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কারচুপির পক্ষে গোপন ভাষ্যে সাফাই কী ছিল?
    তাদের খোড়াযুক্তি আর কানে-কানে প্রচার করা সাফাইটা ছিল যেহেতু ঐবছর মুফতি মোহম্মদ সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ইসলামি দলের একটা জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং তারা পপুলার ও জিতে যাবার প্রবল সম্ভাবনা; অতএব এদেরকে যেকোন উপায়ে ঠেকানো জায়েজ।  এককথায় বললে রাজীব-আব্দুল্লাহর অন্যায় জোট কাশ্মিরে আইনি রাজনীতি, প্রকাশ্য ও কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতি আর থাকবে কিনা সে পরোয়া করলেন না। এনিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখা এখানে আগ্রহিরা পড়তে পারেন।  তারা আইনি রাজনীতিক ব্যবস্থায় কবর দিয়ে হলেও কারচুপি করে মুফতি সাঈদের জোটকে পরাজিত দেখানোর জিদে ডুবে গেলেন।  আর তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে – এই রাজনৈতিক ধারা কাশ্মিরে মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে এর বিপরীতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে তিনিই প্রথম মিথ্যা বয়ান চালু করলেন। তিনি দাবি করতে থাকলেন, ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তানই এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভাররের কাশ্মিরকে অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে তথাকথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ানে গ্লোবাল জোট বেঁধে ছিল।

    সেই ১৯৮৭ সালের পর থেকে হিসাব করলে, গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার ভাটা বা নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়েই ওআরএফ-এর এই রিপোর্ট। মজার কথা হল – এই বাজপেয়িকেই তিনি  নাকি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলে ভারতের অনেকে প্রচার করে থাকেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনাও করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই যোগানদার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।

    বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই মারাত্মক অসৎতার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে থাকা নয়, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে বা ভাটায়’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন – ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে – সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল বা  উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখছে।

    অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, ভারতের নিজেকে ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারতও তৈরি হচ্ছিল। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বা এক মাসেরও আগে থেকে ঐ সামিটের দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল প্রথমতঃ, আমরা এখন খুজলে দেখব মোদি ওই আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তখন তা খেয়াল করিনি। যার মূল কারণ হল,  মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ ফ্যাক্টস হল মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!

    এসব অস্বস্তিকর সময় ও সভা মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এসব কিছুটা হাল্কা করতে ওর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) এক ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক  রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়। কিন্তু যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। নয়নিমারা হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিটের সেসব সাংবাদিক যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করিয়েছে যে “ভারত একটা পরাশক্তি” হয়ে গেছে। আর তারা কোন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকুক বা না তারা এটা বিশ্বাস করা সাংবাদিক। তেমনই আরেকজন হল, দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার। সে যাই হোক, গত ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত ছিল সেটা – তা আজো কেউ বলল না বা জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে “চীনকে মেসেজ দিচ্ছে_ বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে – সেটা! তাহলে চীন এলো কোথা থেকে ও কেন?

    আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারতই হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ফোকাস” বা সব কিছু ইত্যাদি বলে  বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার একেবারে  সমাপ্তি ঘোষণা না হইয়ে গেলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এখনভারতের পাশে আমেরিকা আর নাই – ফলে  এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায় – মূলত এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া। মালহোত্রার লেখার শিরোনাম খেয়াল করেন, [Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China]।

    এরপরেও এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, বুঝা যাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
    অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে – যেমনঃ ভারতের কাশ্মিরের মানবাধিকার লঙ্ঘন অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে আরো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?

    এর জবাব হলো – না, এর অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হল, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!

    আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
    একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মত উৎখাত হয়ে যাবার মত অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার  প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত আসলে  নিশ্চয় কোন পরাশক্তি নয়!!! নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন???

    জীবিত মানুষ আর মৃত-লাশের গভীর সম্পর্কঃ
    মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? আসলে এসব প্রশ্ন ছেয়ে ফেলেছিল সে সময়ের মোদির হিন্দুত্বের ভারতে!   মূল কারণ, মানুষ মূলত যেকোন মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা – ব্রিজের উপর থেকে তাঁর লাশও নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! বা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা, নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না; অথবা যা পরে ভাসেতে ভাসতে গঙ্গা নদী ধরে আরেক রাজ্যে পঁচা-গলা লাশ হিসাবে উঠবে কীনা …… ইত্যাদি। সারা ভারতের মানুষ এসব দেখে মানে নিজের সম্ভাব্য পরিণতি দেখে আঁতকে উঠেছিল!!! ভারতের মানুষেরা নিজের এই পরিণতি এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছিল। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা কী দরকার; এটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
    মোদি এসব জানতেন যে তার সম্পর্কে মানুষের গভীর মনে অন্তঃস্থলে তিনি কী পরিচয়ে আছেন?? তিনি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন!

    সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর শেষে (২০১৯ সালের মে মাস থেকে তিনি সেকেন্ড টার্মের প্রধানমন্ত্রী)। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এদের সবার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় – ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!

    কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে যেখানে এসে ঠেকে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!
    অবস্থা এখন এমন যে ইমরান খানের পাকিস্তান এই প্রথম এক নিজ ‘জাতীয় নিরাপত্তা পলিসি” [NSP] প্রণয়ন করেছে। যেটা আগের মত গতানুগতিক কেবল ভারতবিরোধিতার উপর দাঁড়ানো নয়। আর কেবল সরাসরি সরাসরি সামরিক নয় বরং সামগ্রিক। এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়াও পাকিস্তানের সহবস্থানের মনোভাবে লেখা এই নীতির প্রশংসা করেছে। এছাড়া প্রফেসর আয়েশা সিদ্দিকা যিনি পাকিস্তান অরিজিন লন্ডন  SOAS এর শিক্ষক কিন্তু  যিনি তার সেনা-ঘৃণা ম্যানিয়াকের জন্য কুখ্যাত, তিনিও অংশত এই পলিসিকে খারাপ বলতে পারেন নাই। পরোক্ষে প্রসংসা করেছেন বলা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদি বা তার সরকার এর সুযোগে ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার দিকে আগাবেন সেই সুযোগ মোদির নাই। কারণ ইমরান কেন যেকোন পাকিস্তানই তার কাছে এখন একমাত্র একটাই প্রয়োজনীয় – পাকিস্তান কোপানো মানে মুসলমান কোপানো আর তাতে ততই হিন্দুভোট নিজ বাক্সে — এই চিন্তার বাইরে যাবার অবস্থায় নাই মোদি। বরং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আরেকবার ফেক একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে এই রচনা আর মোদি তাতে বিজয়ী এটা দেখানো যায় কী করে এটাই মোদির লক্ষ্য আর তিনি তা খুজছেন!!

    এই একই সুত্রে, কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাময় নয়। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, হাসিনার ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতই পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে।  অর্থাৎ আগে ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধুত্ব জোরদার ছিল বলেই হাসিনা সরাসরি আমেরিকাকে এড়িয়ে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে পারত। আর এতে ভারত সরকার এবং এমনকি ‘র’-এর বহু অন্যায় আবদার হাসিনাকে সহ্য করতে হত। সেসব পরিস্থিতি গত ১৬ ডিসেম্বরের পরে একেবারেই লক-আপ হয়ে গেছে। যা আর ফিরবে না। মূল কারণ, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক দূর অস্তে চলে গেছে। এটা কোনভাবেই আর আগের সময়কালে একেবারেই নাই। আর এটা যে নাই তা সবগুলো পক্ষের কাছেই উদাম।  উপায়ন্ত না পেয়ে  ওআরএফ-এর আরেক ফেলো, সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর লেখায় তার ছাপ পড়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি ওআরএফ-এর সাইটে যে লেখা দিয়েছেন তাতে চীনার পাকিস্তানকেই কোপানোর চেষ্টা করে গেছেন। সাথে যেমন বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের “অনন্য সম্পর্কটা” চীনের কারণে “উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা” হয়ে দাড়িয়েছে। ঐ লেখার লম্বা শিরোনামটা  হলঃ “এক অনন্য সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন: উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ভারত এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব” – এর মূল  অর্থ এটাই। আরো সোজা করে বললে পিনাক সবকিছুকে নামিয়ে এনেছেন ভারতের অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের আপত্তিতে।
    ঠিক যেমন ও যে কারণে ভারত কোন চীনা অস্ত্র কিনে না, কিনবেও না; সস্তা ও মাঙনা হলেও নিবে না – ঠিক একই কারণে বাংলাদেশ ভারতের অস্ত্রের গুনাগুণ নুন্যতম ভাল কোয়ালিটির হলেও অথবা তা বাংলাদেশকে মাঙনা দিলেও বাংলাদেশ নিবে না।  এটা পানির মত সরল সত্য! এটা না বুঝার কিছু নাই। কিন্তু না বুঝার ভান ধরে পিনাক রঞ্জন এখন চীনের বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন ঐ লেখায়। আবার এনিয়ে একটা মিথ্যা বা শব্দ বদল করে নেয়া ক্যাম্পেইনও করছে অনেকে। শিরোনাম লিখেছে,   “চীনের ওপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে: পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী! – এভাবে। যেটা করেছে ক্যাম্পেইন পত্রিকা আমাদের সময়। অথচ পিনাক রঞ্জনের মূল বক্তব্যে ছিল,  “চিন থেকে আমদানি করা সামরিক সরঞ্জামের উপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে”। মূল লেখা ওআরএফ-এর বাংলায় সাইট থেকে দেখতে পারেন এখানে।  অর্থাৎ সাধারণভাবে সব ব্যাপারে বাংলাদেশে চীন-নির্ভরতা নাকি কেবল অস্ত্র কিনাতে এই নির্ভরতা – এই দুটাকে এক করে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। পিনাক রঞ্জন এখানে কেবল “অস্ত্র কেনার” ক্ষেত্রের কথা তুলেছেন।

    তবে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে পড়া ভা ভাটায় চলে যাওয়া নিয়ে  ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংকের লেখা বা রিপোর্টে। আমেরিকা ভারত থেকে অনেক দূরের কেউ – এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমনঃ “আমেরিকা কি অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সঠিক ভাবে পা ফেলছে?” – এটা ওআরএফ-এর আরেক ফেলোর লেখা, এখান এমন সুর দেখা যাবে। যা অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউ/স্বামী এর সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে।
    সব মিলিয়ে  নতুন করে এক ‘গ্লোবাল পোলারাইজেশন’ সাজিয়ে উঠা আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে!
    আর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা – এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও আরও হবে ভারতের। বাংলাদেশ তী ভারতেরই – যেন তার গ্রামের বাগানবাড়ি – এই অতি আহ্লাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকের অনুমান এটা শেষ হবে  ২০০৬ সালের আগের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যায়গায় –  “ব্যাক টু দ্যা প্যাভেলিয়ানে”!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২২ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কোন দিকে কোথায় চলেছে

    কোন দিকে কোথায় চলেছে

    ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3SI

     

    –

    চারদিকে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের কথাই ধরা যাক। দৈনিক যুগান্তরের এক শিরোনাম বলছে, “যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ, আমাদের ভুল থাকলে সংশোধনের চেষ্টা করব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী”।  আর খবরের ভিতরে, মানে বডির শুরুতেই বলা হয়েছে, “কিছু দেশের যদি বাংলাদেশের প্রতি অসন্তোষ থাকে তবে আমরা তা দূর করব। আমাদের লক্ষ্য হলো সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। কোনো কারণে কিছু দেশের আমাদের প্রতি অসন্তোষ থাকতে পারে। আমরা ওই সব কারণ খুঁজে বের করব”।

    প্রথমত, এটা খুবই অসহায়ের এক বক্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সোজা মানে হল  আপনি অসহায়, নিজের উপরই আস্থা হারায়েছেন। একটা দেশের সরকার মানে অথরিটি বা কর্তা। ক্ষমতার কর্তা। তা হলে ক্ষমতার কর্তা আর অসহায়ত্ব একসাথে? সরি, এ দু’টা একসাথে যায় না। যখনই এমনটা দেখা যায় এর মানে সরকার দুর্বল হয়ে গেছে কিংবা ক্ষমতা অর্ধেক হয়ে গেছে। এটা অকল্পনীয়; কারণ এখান থেকেই এরপর উঠবে ক্ষমতাচ্যুতির আলাপ আলোচনা।

    শুধু তাই না, এর আরো অন্যদিক আছে। অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি ও দাতা যেমন চীনও ভয় পেয়ে যাবে। সরকারের আয়ু নিয়ে সন্দেহ করবে। আর এসবের প্রথম প্রতিক্রিয়া সাধারণত হইয়ে থাকে যে সম্পর্ক মিনিমাম জায়গায় গুটিয়ে নেয়া, আর অপেক্ষা করা। কারণ বিনিয়োগ খুবই সেনসিটিভ জিনিষ। জোঁক আর নুনের সম্পর্কের মত। একবার যদি অস্থিরতার গন্ধ পায় সে সাথে সাথে নিজেকে গুটিয়ে নিবে। হাতের মুঠি বন্ধ করে দিবে। অস্থিরতা মানেই বিনিয়োগের অর্থ রিস্কের মধ্যে আটকে যাওয়া। তাই বিনিয়োগ এত সেনসেটিভ!

    দ্বিতীয়ত, সরকার কার ‘অসন্তোষের’ কথা বলছে? আমল করেছে বলে জানাচ্ছে? বলেছে, “কিছু দেশের” বা “যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ”। লক্ষণীয়, এতে সরকার মানে যা সর্বময় ক্ষমতার উৎস হওয়ার কথা হলেও তার উপরে বা বাইরের এক ক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে এখানে। এমনকি আবার যার কাছেই সরকার অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে!

    তাতে এটা পরিষ্কার সেই কথিত  “উপরের” ক্ষমতা পাওয়ারফুল এবং তা পাওয়ারফুল বলে স্বীকার করে নেয়া মোমেনের চোখেমুখে এবং কথায় তা ফুটে উঠেছে। অনেকে এটাকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ব্যাপারের দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, সে চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু  সে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করা ভুল হবে। কারণ যারা সরকারের বিরুদ্ধে  সিরিয়াস মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে তারা সেসব কথার কোনোটাই বাংলাদেশের কোনো পাবলিক এমনকি কোনো গ্রুপ অব পাবলিকের দিকে তাক করে তুলে নাই। বরং আমেরিকা অভিযোগ করেছে সুনির্দিষ্ট কিছু সরকারি কর্তা আর  সংশ্লিষ্ট সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, এসব অভিযোগ আবার আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ। তবে আমেরিকা এসব অভিযুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সংশ্লিষ্ট নিকট আত্মীয়রা যাতে আমেরিকান নেতৃত্বে থাকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ আর না পায় এমন নিষেধাজ্ঞাই আরোপ করেছে। যেহেতু এ ব্যবস্থাটা মার্কিন ডলার-কেন্দ্রিক তাই আমেরিকার একা নিজ হাতেই কেবল এই বাড়তি সুবিধাটা আছে।

    আসলে মন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য আমেরিকার এই সক্ষমতাটাকে বৈধ বলে মেনে কথা বলা হয়ে গেছে। যেন বাইডেনের আমেরিকা বলছে, ‘বাংলাদেশ সরকার তুমি তোমার নাগরিক যারা, এমন বেশ কিছু জনগণের অংশের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছ। যদি তুমি বাংলাদেশের পাবলিকের সরকার হয়ে থাক তবে তোমার যেখানে উচিত ছিল তাদের অধিকার রক্ষা করা। অথচ তুমি করেছ উল্টা, তাই তুমি অপরাধী’।

    এখন একটা হতে পারত যে সরকার বুক ফুলিয়ে দাবি করত, প্রমাণ দিত যার সারকথা হত যে, আমি এসব অপরাধ করিনি। কিন্তু এখানে তা হয়নি। মন্ত্রী মোমেন বলেছেন, “আমাদের ভুল থাকলে সংশোধনের চেষ্টা করব”; “অসন্তুষ্ট দেশকে সন্তুষ্ট” করার চেষ্টা করব ইত্যাদি; অর্থাৎ একেবারেই সাবমিসিভ [submissive] বা অধস্তন করে ফেলেছেন তিনি নিজে-সহ পুরা বাংলাদেশকেই, এই হল তাঁর অবস্থান। এর মাধ্যমে সরকার নিজেও আর ‘বাইরের’ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে না। আর তাতে শুধু সে অধস্তনই নয়, নিজেকে অনুগ্রহ লাভের প্রার্থী হিসেবে হাজির করেছে। আর এখান থেকেই, আমাদের সরকার নিজ জনগণের আর কোনো প্রতিনিধিই নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত জনঅধিকার সুরক্ষাকারীও কেউ নয়; নুন্যতম প্রতিনিধিত্বও করছে না আমাদের কেউ না – এমন হয়ে গেছে।

    বরং সরকার ব্যস্ত হয়ে গেছে কেবল নিজেকে (সরকারকে) রক্ষা এবং কেবল ওই সব সরকারি কর্তাকে কী করে রক্ষা করবে, সেই কাজে। আর এ’কাজে বাংলাদেশের সরকার নিজেই আমেরিকান সরকার-প্রশাসনের অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়ে গেছে। অর্থাৎ এখানে প্রধান লক্ষণীয় হল, যারা সরকারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক, যারা গুম হয়েছেন, যাদের ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে ইত্যাদি, এরা কিন্তু এখানে কোনো প্রসঙ্গই নয়। করা হয় নাই। প্রসঙ্গটা হল, সরকার টিকানো এবং সরকার, সরকারি কর্তা ও অফিসের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া যায়। যেন মামলাটা হল – বাংলাদেশের পাবলিক নয়, সরকারের নিজ স্বার্থ আর আমেরিকার প্রশাসনের মধ্যকার! মোমেনের বক্তব্য প্রকারান্তরে ইস্যুটাকে সেখানে নিয়ে গেছে।  যার সারার্থ হল, সরকার বলতে এখানে কিছুই নাই…। কেবল গুটি কয়েক ব্যক্তিস্বার্থবাজ লোক তারা সরকার বলে ভান করছে।

    সাধারণত কোনো নুন্যতম সৎ-ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম হল, তার বিরুদ্ধে কোনো বড় অভিযোগ উঠলে একটা কোন স্বাধীন নিরপেক্ষ আইনি কমিশন গঠন করে তাদেরকে দিয়ে তদন্ত করা এবং সত্য উদঘাটন (ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং) করা। কিন্তু এখানে কী চলছে? পুরা উল্টা। বলা হচ্ছে, কেউ মার্কিন সরকারকে “ভুল বুঝিয়েছে” কি না। যদিও মার্কিন  নিষেধাজ্ঞা আরোপের উৎস প্রথমে আমেরিকান সংসদ ও সিনেট কমিটি আর সেখান  থেকে পরে প্রেসিডেন্ট, এভাবে। তার মানে এখানে বাংলাদেশে  কোনো ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং হচ্ছে না, বসছে না এবং  হবে না। ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকরাও এখান থেকে নুন্যতম কিছু প্রতিকারও পাবে না।

    দুই দিন আগে বিবিসি একটা রিপোর্ট করেছে, শিরোনাম “মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিধিনিষেধ প্রত্যাহারে কী তৎপরতা চালাচ্ছে?”। এতে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলছেন, “নিশ্চয়ই আমেরিকা সরকারকে কনভিন্স করা হয়েছে। কাজেই যে তথ্যের ভিত্তিতে দিয়েছে, সেই তথ্য যতটুকু আছে সেটি কতটুকু সত্য কতটুকু মিথ্যা বা সঠিক কী সঠিক নয়- এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে একটা বক্তব্য যাবে”।……। “এ ছাড়া আমেরিকাতে লবিস্ট নিয়োগের একটি কালচার আছে, সেই লবিস্ট নিয়োগ করে আমেরিকান সরকারকে বোঝাতে হবে। আর ব্যক্তিদের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা সেটি প্রত্যাহার চেয়ে আমেরিকা সরকারের কাছে আপিল করতে হবে”।  অর্থাৎ তিনিও কোন ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিশন  নয়,  বাইডেন প্রশাসনের সাথে এক’টা ‘ডিল’ করার কথাই বলছেন; অর্থাৎ লক্ষণীয় মুখ্য পয়েন্ট ইন্ডিপেনডেন্ট ফ্যাক্টস যাচাই নয়, একটা লেনদেন বা ‘ডিল’ হয়ে উঠেছে সরকারের প্রধান বিবেচ্য ও করণীয়!

    এর আগে ডয়েচ ভেলেতে ছাপা হওয়া ‘আসক’ [আইন সালিসি কেন্দ্র]-এর দেয়া সংগৃহিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে তারা লিখেছিল,” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ারে ২০১৬ সালে মোট ১৭৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা কমে ১৪১ জনে নেমে আসে। এর পর থেকে গতি আবার বাড়তে শুরু করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন ও মাদকবিরোধী অভিযান ক্রসফায়ারের নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। পরের বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৪২১ জন, যা আগের বছরের চেয়ে তিনগুণ বেশি। ২০১৯ সালেও এই ধারা অব্যাহত ছিল, ৩৬১ জনের বেশি”। নির্বাচনের আগেই এনিয়ে আপত্তি প্রতিরোধ হৈচৈ -গুলোকে দাবিয়ে দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছিল।
    সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। এখান থেকে অনুমান করলে বের হয়ে আসে যে, সরকার ক্রমেই এমন ‘হত্যা-নির্ভরশীল’ একটা সরকার হয়ে গেছে। সাধারণত যেটা দেখা যায়, একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে ফেলতে পারলে সেটা সরকারের জন্য খুব কাজের হয়। কোনো সরকার একবার এতে সফল হয়ে গেলে পরে দেখা যায় এর পর থেকে সে বিরোধিতাহীন বা বাধাহীন এক সরকার হয়ে উঠতে পারে।

    তা হলে এ তথ্যাবলি আরেকটা ইঙ্গিত দেয় যে, ধরা যাক আমরা একটা উপরে কথিত মতে ‘ডিল’ যদি দেখতে পাইও এছাড়া সেই ডিল উপস্থিত সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই যদি করতেই হয়, তবে সেই সাথে এসব ক্রসফায়ার বা গুম প্রভৃতিতে মাসে মাসে কমপক্ষে ৩৫-৪০ জনকেও “বলি” দিতে রাজি থাকতে হবেই। কারণ প্রশাসন ভয়ের সংস্কৃতি বা হত্যা-নির্ভরশীল হয়ে গেছে! এই ক্ষিধাও পূরণ করতেই হবে। নইলে সরকার টিকবে না। মানুষে মানবে না। এই প্রসঙ্গে বিবিসিকে লিখেছে, “মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বাস্তবতায় র‌্যাবের কার্যক্রমে একটা সংস্কারের সুযোগ আছে বলেও মনে করেন সাবেক আইজিপি শহীদুল হক”।…..”সংস্কার করতে হলে বেপরোয়াভাবে যেন কিছু না হয়। সব কিছু কন্ট্রোলের মধ্যে রাখতে হবে”। …… তিনি বলেন, “আপনি গুলি করবেন এনকাউন্টার, আপনি বিপদে পড়েছেন, দুষ্কৃতকারীরা আপনাকে হামলা করছে সে ক্ষেত্রে ব্রাশফায়ার করে মানুষ মারতে থাকলে তো হবে না। আপনাকে বাঁচানোর জন্য যতটুকু করার দরকার অতটুকুই করতে হবে। এ সংস্কারটা আনতে হবে”।  তার মানে তামাশাটা হল, সাবেক এই আইজিপিও এখন একটু কম হত্যার এক সংস্কারের কথা বলছেন; অথচ তার নিজের আইজি কার্যকালে (২০১৫ সালের শুরু থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি) গুম ও ক্রসফায়ারের কিছু পরিসংখ্যান উপরে দেখেছি।

    মাছ খাবো নাঃ
    বিড়াল কি মাছ খাবো না বলতে পারে? মানে যেটা স্বভাব হয়ে গেছে বা যাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তা কি সে ছাড়তে পারে? তাই সাবেক আইজিপির কথিত সংস্কারটাও যদি করে নেয়া হয় তবুও উপস্থিত সরকারকে তিনিও ক্ষমতায় রাখতে পারবে না। কারণ, এরা হত্যা-নির্ভরশীল সরকার হয়ে গেছে। সেটার কী হবে???

    তা সত্ত্বেও এমনকি ধরা যাক, কোনো ডিল হয়ে গেল। বিবিসির ঐ রিপোর্টে এক ইন্ডিয়ান-অরিজিন আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক প্রশান্ত পরমেশ্বরণের কথা এনেছে। তিনি বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যেহেতু কিছু সুনির্দিষ্ট আচরণকে (তিনি বলতে চাইছেন র‍্যাবের গুম-হত্যা ক্রসফায়ার) তুলে ধরা হয়েছে, তার (এই সমস্যার) সংশোধন বা সমাধানের কথা বলেছে”। কিন্তু তিনিও একটা ডিল বা রফা করার ইঙ্গিত করেছেন। বলেছেন, “বহুমুখী পন্থায় কাজ’ করতে। ‘সুনির্দিষ্ট আচরণ’ যেগুলো নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে, ‘তার সংশোধন বা সমাধান করে’ নিতে বলেছেন আগে। অথচ আমরা উপরে দেখেছি সরকার হত্যা-গুম জাতীয় কাজে অভ্যস্ত বা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা ছাড়া সরকার চালানো বা টিকানো অসম্ভব। এ ছাড়াও এমনকি আরেক মারাত্মক ইঙ্গিতে তিনি এনে বলেছেন, “এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতির অগ্রাধিকার কী- সেখানে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে চীনের ব্যাপারে”।

    বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতির অগ্রাধিকার কী- এটুক বলে তিনি ফারদার কিছু খোলসা করেননি। কিন্তু আমেরিকা চাইছে কী?
    এনিয়ে যতটুকু জানা যাচ্ছে যেমন, কক্সবাজারে এয়ারপোর্ট রানওয়ে প্রকল্প যেটাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যাত্রী ও কার্গো বিমানের ব্যবহার-উপযোগী করে গড়ে তোলার একটা প্রকল্প। বলা হয়েছে, এটাকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের রুটে একটা হাব [hub] ও রিফুয়েলিং স্টেশন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এতদূর পর্যন্ত এটাকে বাণিজ্যিক দিক থেকে এক উপস্থাপনই হল। বিবিসি বাংলাতেও গত ২৮ আগস্ট ২০২১ এক প্রতিবেদনে এটাকে বাণিজ্যিকভাবেই দেখানো উপস্থাপন করা হয়েছে।

    কিন্তু এখন দুর্জনরা বলছে, এই প্রকল্প চীনকে দেয়া হয়েছে এক স্ট্র্যাটেজিক (যুদ্ধকৌশলগত) কারণে। আর মালদ্বীপে চীনের যে জাহাজ চলাচলের অবজারভেটরি স্থাপনা আছে তার সাথে এটাকে সম্পর্কিত করে দেখতে হবে। অন্য দিকে এসবেরই পাল্টা বহুদিনের আমেরিকান এক আবদার হল, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে তার সপ্তম নৌবহরকে স্থায়ী নোঙর করতে দিতে হবে। এটা ঘটার বিরুদ্ধে চীনের চেয়েও ভারত এই প্রশ্নে বেশি চরম কঠোর আমেরিকাবিরোধী।
    অথচ আমেরিকার এই খায়েশকেই সম্ভবত বিশ্লেষক প্রশান্ত পরমেশ্বরণ আমেরিকার ‘পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার কী- সেখানে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখতে হবে’ বলে অস্পষ্ট রেখে ছেড়ে রেখে দিয়েছেন! এসব ইঙ্গিত খুবই খারাপ ও বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর! কারণ এর অর্থ হবে সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির প্রশ্নটা শেষে না পিছলে গিয়ে তা আমাদের ভূখণ্ডকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে আমেরিকা-চীন ও ভারত তাদের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই শুরু করে দেয়!

    অথচ বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ হল, যে অবস্থানে এলে এই তিন দেশকে নিউট্রাল রাখা যায়; কারণ আমরা কারো যুদ্ধের পাটাতন হতে পারি না।

    কিন্তু সমীকরণ যে দিকেই মিলাই আমাদের হত্যা-নির্ভরশীল উপস্থিত সরকার মনে হচ্ছে না কাউকে সাহায্য করতে পারবে; অর্থাৎ তার নিজের টিকে থাকা – এই স্বার্থ, এটাই চতুর্থ ও মুখ্য স্বার্থ হিসেবে সবার উপরে হাজির হয়ে থাকতে চাইছে। অথচ বাস্তবতা হল, হত্যা-নির্ভরশীল সরকার-প্রশাসন সাবেক আইজির কথিত নামকাওয়াস্তে কোনো সংস্কার করতেও অক্ষমই থেকে যাবে।

    উভয় সঙ্কটঃ
    বর্তমান সরকার আসলে মারাত্মক উভয় সঙ্কটে। এখনকার উভয় সঙ্কট হল, যেকোন সরকার নিজের বিরোধী দলদেরকে তাদের জনসমাবেশের অধিকার দিতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের সরকারের অবস্থা এমন যে  যদি সরকারবিরোধীরা মিছিল সমাবেশ করতে চায় তাতেই সে কাত! সে ভীত যে, এটা না  সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। কারণ জমে থাকা পাবলিকের ক্ষোভ তাতে উপলক্ষ করে প্রকাশ্যে বের হয়ে যদি আসে! এ অবস্থায় সে যদি তাদের মিছিল-মিটিংয়ের অধিকার মেনে নেয় তো তাকে নিজ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে বাস করতে হবে। আর যদি উল্টা নির্বিচারে আগের মত গুম-খুন ক্রসফায়ারে তা দমন করে চালাতে যায় তবে সেটা আরও বড় মার্কিন অবরোধের কারণ হতে পারে। আর এর আগেই বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে এক রক্তাক্ত রণভূমি!

    পরিণতিতে কী হচ্ছে?
    সেটাই কি কাওয়ালি অনুষ্ঠানেও হামলা? সরকার দলীয় হামলা করে চলা অবস্থায় আয়োজন কাওয়ালীর অনুষ্ঠান ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। অথচ  সরকার এখনো কার্ড দেখাতে পারেনি, প্রকাশ্যে বলতে পারে নাই যে, তারা এ হামলার পক্ষে না বিপক্ষে? এসব খারাপ লক্ষণ। তাতে সরকারের লাভ না ক্ষতি হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হল, সরকারবিরোধীরা সবাই জোটবদ্ধ হয়ে কাওয়ালির পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রথম আলো-স্টার থেকে ছোটবড় বা কড়া ইসলামিস্ট সবাই একত্রে মিলে গেছে। অথচ এমন না যে, কাওয়ালি নিয়ে তাদের আপত্তি নেই; বরং অনেকেরই বড় বড় কঠিনতম আপত্তি আছে। সেকুলার-প্রগতি অথবা ইসলামিস্ট সবারই নিজ নিজ স্টাইলে-ব্যাখ্যায় আপত্তি আছে।  অথচ ক্ষমতার তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ঐক্য দেখাতে তারা সেসব আপত্তি মাটি চাপা দিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে তারা একত্র, এই ব্রডবেজ ইউনিটি শোকরেছে তারা; এই  বিরোধীতায়  তারা জোটবদ্ধতা শো করতে চায়। অবশ্য এমনটাই হয়ে থাকে। কমন এনিমি এই বড় শত্রুবিরোধী বিরূদ্ধতা-জ্ঞান সবসময় এভাবেই কাজ করে থাকে!

    আবার হামলাকারী যারা সঞ্জিত-সাদ্দাম গং, এদের পক্ষে কথিত প্রগতিশীলতার নামে হিন্দুত্ববাদের কোনো হাইকমিশন এর পক্ষে কি?  তা হলে আমরা এরই প্রকাশ্যে অবস্থান এখানে আমরা দেখে ফেললাম? নেত্রী কি এটাই চেয়েছেন? তা এখনো স্পষ্ট করা যায়নি! মানে সরকার কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না!!! আবার ঘটনার তিন দিন পার হয়ে গেল কোনো অবস্থান না দেখানো সত্ত্বেও, তাহলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, অন্যরা যা খুশি করছে ভাঙছে, তা কি? সরকার কি তা হলে কর্তৃত্ব হারিয়েছে, এমন অনেক কথা উঠছে। সরকার কিছুই না বললে এমন উলটাপালটা গুজব কানাঘুষা অর্থই তো হবে!!! এবং এটা সামনে আরো বাড়বেই!

    এমনিতেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর থেকে সরকার, অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে। যা খুব খারাপ ইঙ্গিত! এর উপর আবার দলের ভেতরে ততোধিক যেন উপধারা বা উপস্বার্থের আবির্ভাব ঘটেছে। বেশির ভাগ নেতা কমপক্ষের দুটো স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছেন, ঘুরছেন। মুখে বলছেন একটা করছেন আরেকটা। এর মধ্যে আবার ‘আপার’ অবস্থান কোনটা  বুঝা যাচ্ছে না। এরই “আদর্শ প্রকাশ” স্থল হচ্ছে এখন নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে। কে যে কার পক্ষে কাজ করছেন, তাল পাওয়া যাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ রাতে ছাত্রলীগের নেতাদের বাসায় গিয়ে হুমকি দিচ্ছে কেন? নানক শামীম ওসমানকে হুমকি দিয়ে কথা বলছে কেন ……। যেন এক পথ হারানো পরিস্থিতি!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১৫ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “দণ্ড কার হাতে, কোথায় চলেছি”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]