Category: CHINA

  • ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    গৌতম দাস

    ০১ আগষ্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4bH

     

      Russia, Turkey and Iran have in recent years been holding talks as part of the so-called ‘Astana peace process’ to end more than 11 years of conflict in Syria [File: Reuters]

     

     

    ঠাণ্ডা পানিতে গোসল, মানে “নো হিটার” গোসল; কখন? যখন তাপমাত্রা শূন্যের দিকে ধাবমান বা মাইনাসে চলে গেছে। যেকোন কারও জন্য এটা অবশ্যই একটা বড় রকমের শাস্তি। অথচ তা শুরু হয়ে গেছে!

    সারা ইউরোপেই কমবেশি আগস্ট থেকেই তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির নিচে নামতে শুরু করে আর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে চরমে ওঠে, মানে এটা শূন্য বা মাইনাসে নেমে যায়। আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে যেন রাশিয়া এখন থেকেই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমানো শুরু করেছে। বিশেষ করে জার্মানির অবস্থা ভালো না।

    বিবিসি জার্মানির হ্যানোভার শহর নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে “কোল্ড শাওয়ার [Cold showers ]” শিরোনাম দিয়ে; মানে গোসলখানায় ঠাণ্ডা পানিতে গোসল নিয়ে। রিপোর্টের সারকথা, এখন থেকেই  রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহের অভাবে ইউরোপে জ্বালানি মিতব্যয়িতা শুরু হয়ে গেছে। হ্যানোভার সিটিতে সব পাবলিক গোসলখানায় পানির হিটার বন্ধ করা হয়েছে। রুম হিটার সীমিত করা হয়েছে। এমনকি হাতে করে বয়ে নিয়ে বেড়ানো এসি, হিটার বা রেডিয়েটর ধরণের সবকিছুই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূল কারণ,  ইউরোপে রাশিয়া তার গ্যাস সরবরাহ ইতোমধ্যেই অর্ধেক করে দিয়েছে। সামনে আরো কী করে কেউ জানে না। এদিকে ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইইউর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত রাশিয়ান গ্যাসের অভাবে তারা সবাই গ্যাসের ব্যবহার এবার শীত সিজনে কমপক্ষে ১৫% কম করবে। এসব থেকেই বিবিসির এ রিপোর্ট ‘কোল্ড শাওয়ার’। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপ কি এবার ‘কোল্ড শাওয়ারের’ শাস্তি সহ্য করতে সক্ষম হবে?

    না ব্যাপারটা এমন নয় যে, রাশিয়ার গ্যাস ছাড়া ইউরোপের কোনো বিকল্পই নেই; ঠিক তা নয়, কিন্তু অন্য যেকোনো বিকল্প জ্বালানি পাওয়ার জন্য কোনো চুক্তি করা দিয়ে শুরু করতে হবে। এরপর সবচেয়ে কষ্টকর অংশ হল, সেই জ্বালানি বয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নয়া বিনিয়োগ করে নয়া অবকাঠামো গড়ে সেই জ্বালানি এনে এবার তা ব্যবহার-উপযোগী করে ঘর গরম বা পানি গরমের জায়গায় নিতে সব মিলিয়ে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগাতে হবে। এটাই ইইউ এতদিন বহুভাবে বাইডেনকে বুঝাতে চেয়েছে, পারেনি। তাহলে আগামী ২০২৭ সালের আগে পর্যন্ত তারা চলবে কী করে? নাকি আগামী ডিসেম্বরের (২০২২) আগেই বাইডেনের হাত ছেড়ে ইইউ পুতিনের হার ধরে আপস করে ঘর গরম, পানি গরমের সুখ নিতে মরিয়া হয়ে উঠবে! সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায়!
    বিবিসির ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যটা হল, ‘ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহ যুদ্ধের আগে ছিল মোট চাহিদার অর্ধের বেশি একা রাশিয়ান গ্যাস এখন যা এক-চতুর্থাংশের কম’।

    “Russian gas supplies now account for about a quarter of the nation’s needs, compared with more than half before the war.”

    রাশিয়ার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠাঃ
    দুনিয়ায় অন্য দিকের সব ঘটনাবলিতে রাশিয়া যেন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। পুতিন বিদেশ সফরে বের হয়েছেন, তিনি ইরান সফরে গেছেন। রাশিয়ার ওপর ডলার-ইউরো-ইয়েন ইত্যাদিসহ আরো কয়েকটা মুদ্রার অবরোধে রাশিয়া যেন টুপ করে ভেঙে পড়বে! বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির [Western bloc] এই ছিল প্রবল বিশ্বাস ও আকাঙ্খা যাতে তারা দেখতে পাবে পুতিন সারেন্ডার করে মাফ চাচ্ছে! কিন্তু সরি, তা বাস্তবে ঘটেনি তা তো আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। উল্টো দুনিয়াজুড়ে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই শুধু নয়, এখন বিশ্বব্যাংকই দাবি করছে, গ্লোবাল বাণিজ্য-অর্থনীতিতে মহামন্দা আসন্ন, তা এলো বলে। সাথে নিয়ে আসছে খাদ্যাভাব দুর্যোগে এলেমেলো করে দেয়া মানুষের জীবনযাত্রায় প্রবল ধাক্কা! গ্লোবাল জিডিপি ২.১% এ নেমে যাবে এ বছর আর আগামী বছর ২০২৩ সালে যা আরো নেমে ১.৫% হয়ে যেতে পারে।

    “In a news conference, World Bank President David Malpass said global growth could fall to 2.1% in 2022 and 1.5% in 2023, driving per capita growth close to zero, if downside risks materialized.” – REUTERS

    বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস এক সংবাদ সম্মেলন করে সাবধান করছেন যে, “অনেক দেশই এই ধাক্কা এড়াতে পারবে না”।  তিনি এই সঙ্কটের নামকরণ করেছে ‘মন্দা-মুদ্রাস্ফীতি’ বা ‘স্টাগ-ফ্লেশন’ [stagflation]।

    এদিকে খোদ আমেরিকার প্রথম তিনমাস বা প্রথম কোয়ার্টারের জিডিপিতেই যেখানে টানাটানিতে তা ছিল মাত্র ১.৬%। সেটা দ্বিতীয় কোয়ার্টারে আরো কমে হয়েছে  ১% এরও নিচে, তা ০.৯%। গত পরশু মানে ২৮ জুলাই তা প্রকাশিত হয়েছে। যেটাকে আমেরিকা অর্থনৈতিক মহামন্দা আসা নিশ্চিত হবার লক্ষণ বলে আমেরিকান অর্থনীতি ও বাজার জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ধারণা বলে তা হাজির হয়েছে।

    Real gross domestic product (GDP) decreased at an annual rate of 0.9 percent in the second quarter of 2022, following a decrease of 1.6 percent in the first quarter. The smaller decrease in the second quarter primarily reflected an upturn in exports and a smaller decrease in federal government spending. – BEA.GOV

    কিন্তু তবু বাইডেন নির্বিকার। তিনি ইউক্রেনকে আরো ভারী অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ আর সেই সাথে, ইইউর উপর রাশিয়ান জ্বালানি নেওয়ার চেষ্টা না করতে চাপ দিয়েছেন। আপস না করতে চাপ দেয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনোভাবেই এরা যেন পুতিনের সাথে রফা না করে ফেলে তার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন।

    তাই, এসব চাপ যে, রাশিয়ার উপর কাজ করছে না তা দেখাতেই যেন রাশিয়া গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেকারণে, পুতিন পাল্টা পশ্চিমের অবরোধে যারা কষ্টভোগী তাদেরকে সাথে মিলে নয়া জোট করে উঠে দাঁড়ানো চেষ্টা করছেন – এমনই কিছু লক্ষ্যে পুতিন ইরান সফরে গিয়েছিলেন গত ১৯ জুলাই। আসলে ইরানে এটা ছিল এক ত্রিদেশীয় সামিট। কারণ, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানও একই সাথে একই দিনে ইরান সফরে আসাতে তিন সরকারপ্রধানের এক সামিট মিটিংও অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে। কিন্তু কী ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য বা মতিগতি বা আলোচ্যসূচিইবা কী কী ছিল- তা জানতে [তা বুঝতে বাংলাদেশে খুব সিরিয়াস ডেফিনেশন নয় বরং হালকাভাবে যাদের ‘ইসলামিস্ট আকাঙ্খা’ বলে বুঝা হয়, এমন] তরুণদের ভিতর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যেমন একজন লিখছে, “পুতিনের ইরান সফর এবং বাইডেন কেন সৌদিতে, এই দুটো বিষয় নিয়ে একটা লেখায় দেখতে চাই”।

    এমনিতে কোন “আকাঙ্খাই” দোষের নয়, কেবল যদি খেয়াল রাখা থাকে যে, তা কতটা কল্পনার রঙের বা ইউটোপিয়াতে দেখা হয়েছে আর কতটা তা বাস্তবসম্মত। যেমন মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সরকার একটা গ্লোবাল ইসলামিক স্বার্থের পক্ষে একত্রে  কাজ করবে – এই হল এমনই একটা আকাঙ্খা। এখন এই আকাঙ্খা তা কতটা বাস্তব আর কতটা কল্পনার রঙে দেখা হয়েছে তা কী দিয়ে মাপব? যেকোনো দেশের সরকারকে দেশের বৈষয়িক-অর্থনৈতিক স্বার্থ- এটাকেই সব বিবেচনার শীর্ষে রাখতেই হয়। এ দিকটাই ভারী থাকে; কারণ এগুলো মানুষের বেসিক চাহিদাসংশ্লিষ্ট। আর এর পরে এসে থাকে কোনো চিন্তা-আদর্শ অনুসরণ বা হেদায়েতের কথা।

    প্রথমত, ইরানে ওই তিন সরকার প্রধানের সফর ছিল অনেক উদ্দেশ্য বা ইস্যুতে। তবে প্রত্যেকটা ইস্যুই আবার তিন পক্ষের সবার জন্য নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ছিল দ্বিপক্ষীয়। যেমন তিনপক্ষীয় বড় বা একটাই প্রধান ইস্যু ছিল – সিরিয়া বা আসাদ সরকার প্রসঙ্গ বা বিবিসির ভাষায় “সিরিয়ায় সহিংসতা কমানোর” ইস্যু যেটাকে আরো একদম সুনির্দিষ্ট করে বললে, সিরিয়ান কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপ ওয়াইপিজিকে [YPG] নিয়ে দুটো ভিন্ন মত এই তিন রাষ্ট্রের কথা বলা। এরদোগান চান এদের সামরিকভাবে হামলায় দমন-উতখাত করতে। কিন্তু রাশিয়া-ইরান চায় আলোচনায় সমাধান।

    আসলে এরদোগানের জন্য যেকোনো কুর্দি ন্যাশনালিজমের বা কুর্দি-জাতিরাষ্ট্র চিন্তার দল তা সে ইরাকি কুর্দি কিংবা সিরিয়ান কুর্দি অথবা টার্কিশ কুর্দি যেই হোক, “এই রাজনীতি” তিনি ধ্বংস করে দিতে চান ফিজিক্যালি। কারণ সত্যি সত্যিই এই তিন দেশের কুর্দিদের নিয়ে একটা নতুন কুর্দি জাতিরাষ্ট্র করতে চাওয়া এর ব্যবহারিক মানে হল এই যে,  এটা ‘কুর্দি-জাতিরাষ্ট্রীয় রাজনীতি’। মানে এতে (ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক) এই তিনটি দেশই ভেঙে যাওয়া যা যদি ঘটে তবে এই তিন দেশের কোনো শাসক সরকারই নিজ নিজ দেশের বাকি মানুষের কাছে মুখ দেখানোর লায়েক থাকবে না। যার সোজা মানে তারা আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।

    এ ছাড়া তিন দেশের কুর্দিদের জন্য তাদের নিয়ে  -একটা নয়া জাতিরাষ্ট্রই একমাত্র বা সব সমাধান – এ কথাও তো সত্যি নয়। কারণ তাতে “প্রতিটা কুর্দির রাজনৈতিক অধিকারের প্রসঙ্গটা”  তা সে তারা এখনকার যে রাষ্ট্রেরই বাসিন্দা হোক না কেন এতে, জাতি ধারণার নিচে সব চাপা পড়ে আড়ালে চলে যাবে, যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। অর্থাৎ জাতি-ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইডেনটিটি নির্বিশেষে তারা সকলেই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক  – এভাবে আর দেখা হয় নাই। চাপা পড়ে গিয়েছে। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রে ধারণাটা প্রবল হওয়াতে এর নিচে সবার নাগরিক অধিকার এবং সমান অধিকারের “সাম্য” প্রসঙ্গটা চাপা পরে গিয়েছে। সবমিলিয়ে ফলাফল এই যে বাংলাদেশ বলে রাষ্ট্র কায়েম হয়েছে ঠিকই কিন্তু নাগরিক অধিকার প্রশ্নে বা নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রসঙ্গের দিক থেকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে খামোখা।
    তাই এক নয়া জাতিরাষ্ট্র কায়েম করার রাজনীতি এটা কোন সমাধানই নয়। বরং ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক এই প্রতিটা রাষ্ট্রকেই নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা আর জাতি নির্বিশেষে সেখানকার সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার ভেতরেই আছে সব সমাধান। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বার্নিং অবস্থায় আছেন এরদোগান। কারণ আমেরিকার অবস্থান কুর্দিদের পক্ষে। এটা এরদোগানের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কুর্দিদের অধিকার বা তাদের ভিকটিম হয়ে থাকার প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়া কারো জন্যই অবশ্যই কোন দোষের নয়।  কিন্তু এই সুযোগে তাদের তিনটি রাষ্ট্র ভেঙে এক নয়া কুর্দি জাতিরাষ্ট্র গড়তে সমর্থন দেয়া অপরাধ।

    আসলে রাশিয়া-ইরানকে এরদোগান বলছেন তোমাদের সাহায্য আমার লাগবে না। তুরস্ক একাই ওয়াইপিজিকে দমন করতে পারবে। তবে দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইরানের মতে সফট লাইনে এদের বুঝানো বা পিঠে হাত বুলিয়ে কাজ হবে বলে এরদোগান মনে করেন না। তাহলে এবারের ইরান-আলোচনায় ফলাফল কী হল? ফলাফল এই যে, তবুও তিনপক্ষই অন্তত একমত যে, কুর্দি ইস্যুতে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে।
    ওদিকে ওই আলোচনায় রাশিয়া-ইরানের স্বার্থ ছিল সিরিয়াকে এক স্থিতিশীল রাষ্ট্র আর এর সব ভূখণ্ডই আসাদের নিয়ন্ত্রণে আছে তা দেখাতে চাওয়া। এ ছাড়া সিরিয়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী বা ইসলামী গ্রুপগুলোর তৎপরতা লোপ পেয়ে যাক যাতে সব কিছুর ওপর আসাদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। তাই এই সুযোগে তুরস্ক প্রস্তাব রেখেছে যে, তুরস্ক-সিরিয়ান বর্ডারে, মাঝখানে একটা ৩০ কিলোমিটারের সেফ জোন বা নিরাপত্তা জোন তৈরি করা হোক। এটা তিনি চাইছেন মূলত যাতে দুই দেশের কুর্দিরা অবাধে যাতায়াত আদান-প্রদানে করে চলে ঘোট না পাকাতে পারে!

    যখন আলোচনার বিষয় ড্রোনঃ
    তেহরানে ড্রোন আলোচনার ইস্যু হলেও এটা ছিল কেবল দ্বিপক্ষীয়- মানে রাশিয়া আর ইরানের মধ্যে আলোচনার ইস্যু। এটা এরদোগানের জন্য আলোচনার ইস্যু নয়। কারণ তিনি আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উল্টো ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহকারী। মানে ইউক্রেনের হাতে যে টার্কিশ ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে তা হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ও উপরে। তবে ইউক্রেনের হাতে থাকা সব ড্রোনই টার্কিশ নয়। বড় অংশই বরং আমেরিকার সরবরাহ করা। আর ওদিকে রাশিয়ার সব ড্রোনই ইরান থেকে নেয়া নয়। রাশিয়ার নিজস্বও আছে। যা হোক, এই ইরানিয়ান ড্রোন রাশিয়াকে সরবরাহ নিয়েই রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বিপক্ষীয় আলাপ হয়েছে এবার।

    ইউক্রেনের শস্য রফতানি ইস্যুঃ
    এটাও আরেক দ্বিপক্ষীয় ইস্যু। তবে এবার তা রাশিয়া আর তুরস্কের মধ্যে। যদিও সেটাও আবার সরাসরি রাশিয়া আর তুরস্কের স্বার্থে নয়। কেন?  মূলত বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া এদের মধ্যে আপোষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে তুরস্ক, এমনকি কখনো এরদোগান নিজে উপস্থিত থেকেই তা ঘটিয়েছেন। তাই শস্য ইস্যু যেটা হল আসলে – যুদ্ধের কারণে, ইউক্রেন শস্য রফতানির বড় দেশ হওয়া সত্বেও এ পর্যন্ত ইউক্রেনের সব শস্য রফতানি বন্ধ করে রেখেছিল  নিজ সাইলো গুদামে, যা প্রায় ২২ মিলিয়ন টন। গ্লোবাল বাজারে খাদ্যশস্যের (গম) দাম আকাশচুম্বী হওয়ার অন্তত একটা কারণ এটাকেই মনে করা হয়। তাই জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল (António Guterres ) আর এরদোগান – এরা দু’জন নিজে উপস্থিত থেকে রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে শস্য রফতানিতে রাশিয়ান সহযোগিতা করবে – এমন এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল  [Ukraine, Russia sign grain export deal]। যদিও তা স্বাক্ষরের পরেই ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে এক বোমা পড়ায় রফতানি আশঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাই এরদোগান ইরান সফরের সময়ে এই সুযোগে পুতিনের সাথে কথা বলে রফতানি যেন ঠিকমত বাধাহীন চালু হতে পারে এর আশ্বাস নিয়েছেন পুতিনের কাছ থেকে।

    বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্যে সফরে ইসরাইলের সাথে তাঁর অসৎ ঘনিষ্ঠতাঃ
    গত ১৯৭৯ সালে খোমেনির ইরান বিপ্লবের সংঘটিত হবার পর থেকে আমেরিকা ইরানকে শুধু স্বীকৃতি দেয়নি তাই নয়, ইরানের বিরুদ্ধে নানান স্যাবোটাজ করে গেছে নিয়মিত। অথচ ইরান বিপ্লবের অপরাধ কী? অপরাধ হল এই যে, ১৯৫৩ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ারের অপরাধের বিরুদ্ধে উঠে দাড়িয়েছিল, বিপ্লব করেছিল। আইসেনহাওয়ার সিআইএ পাঠিয়েছিলেন; পপুলার ইরানি সরকারকে ফেলে দেওয়া, ইরানের সব তেলের খনি দখল আর এক পুতুল সরকার হিসেবে শাহ পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো ইত্যাদি যা যা অপরাধ ঘটিয়েছিলেন, এঘটনাগুলোর ২৬ বছর (১৯৫৩-৭৯) পরে এর পরিসমাপ্তি টানা এবং ইরানিদের নিজেদের জন্য নিজেদের দেশ ও সরকার কায়েম করা। এতাই ইরানের অপরাধ!!! এরপর থেকে আমেরিকার সাথে বিল্পবী বা খোমেনির ইরানের সাথে আমেরিকার কখনো ন্যূনতম সম্পর্ক বা স্বীকৃতি বিনিময় ঘটেনি। আমেরিকান ভুল নীতি-পলিসির কারণে  অন্যকিছু ঘটবার সুযোগও ছিল না। কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামা বিড়ালের গলায় এক ঘণ্টা বেঁধেছিলেন ২০১৫ সালে!

    যদিও এই ওবামাই আইএস-এর উত্থানে সহায়তাকারী, পরে আইএসকে দিয়ে গাদ্দাফিকে হত্যাকারী, এরাই বেনগাজীতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ সব আমেরিকান স্টাফের হত্যাকারী; শেষে সিরিয়ার আসাদেরও একই পরিণতি ঘটাতে সিরিয়াতে  গিয়েও তা ব্যর্থ-অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু সেই আইএস এরপর ইরাকে ফিরে গিয়ে নিজ নামে হাজির হয়ে গেলে, তাতে পাল্টা ইরাকের ক্ষমতা তাদের হাতে প্রায় দখলের উপক্রম হয়ে গেলে এবার ওবামা ভীষণ বিপদে পড়ে ধরা খেয়ে যান। কারণ, কথিত ওয়ার অন টেররে যেসব যুদ্ধক্ষেত্র বুশের আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল, ২০১৪ সালেই ওবামা সেসব স্থান থেকে আমেরিকান সৈন্য তুলে ফেলেছেন। ইরাকেরসহ মেজরিটি সংখ্যক [মোট দশ হাজার রেখে বাকি সব ফেরত] আমেরিকান সৈন্য দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কারণ একটাই, সমাপ্তিহীন অন্তহীন যুদ্ধের ব্যয় বইবার  সক্ষমতায় আমেরিকা-রাষ্ট্রের অপারগতা, অযোগ্যতা!!

    অথচ পরের বছরই ইরাকে আইএস হাজির হয়ে গেলে তাদের তাড়াতে গেলে তো আবার প্রয়োজনীয় সৈন্য আমেরিকা থেকে ফেরত আনতে হয়, যা বিরাট খরচের দায়ভার!!কিন্তু আমেরিকার ব্যয়-নির্বাহের মুরোদ নাই। অতএব উপায় না দেখে ওবামা এই প্রথম ইরানের সাথে আপসের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইরাক থেকে ইরান নিজ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আইএস মুক্ত করে দিবে। আর এতে বিনিময়ে আমেরিকা ইরানের উপর নিজের আগে থেকে দেয়া সব স্যাংশন প্রত্যাহার করে নিবে। আর ওদিকে কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা থাকবে যদিও তা দিয়ে অস্ত্র তৈরি না করে আইনি মাত্রায় আটকে রাখবে আর তা জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে নিরীক্ষিত হবে – এই শর্তে এক চুক্তি হয়েছিল। ইরানের সাথে ২০১৫ সাল থেকে যা কার্যকর চুক্তি তার নাম ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ [Joint Comprehensive Plan of Action, JCPOA] ; যাকে অনেকে ইরানের সাথে পি৫+১ চুক্তিও বলে থাকে। কারণ এটা ছিল জাতিসঙ্ঘসহ তার নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও সাথে জার্মানিকেও নিয়ে করা। তাই (পি৫+১) বলা।

    কিন্তু পরবর্তিতে  ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সব উল্টে দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালেও ‘ইরান যথাযথভাবে চুক্তি মেনে চলছে’ বলে ট্রাম্প প্রশাসন রিপোর্ট দেয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সালের ৮ মে এই চুক্তি থেকে “আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে ট্রাম্প ঘোষণা দেন এবং পুরানা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। মূলত ইসরাইলকে ফেভার বা খুশি করতেই তিনি এসব করেছিলেন।

    যদিও সে সময়ে ডেমোক্র্যাটরা এমনকি ইইউও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ও সমালোচনা করেছিল। অথচ এখন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন সেই ট্রাম্পের পথ ধরেছেন। তিনি উসিলা খুঁজছেন কিভাবে পুরানা (JCPOA) বা ‘ইরান ডিল’ চুক্তি ফিরে তাকে না করতে হয়। সম্প্রতি সিনেটে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান মিলে আরো শর্ত চাপিয়ে একটা বিল পাস করিয়েছে যাতে সহজেই নয়া কোনো “ইরান ডিল” স্বাক্ষরিত না হয়। এটা ছিল এক রিপাবলিকান প্রস্তাব অথচ বাইডেনের দল তাতে সমর্থন দিয়েছে। এ ছাড়া বিশেষত এবার জুলাইয়ে বাইডেনের ইসরাইল সফর ও ঘনিষ্ঠতা এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

    এসব মিলিয়ে পুতিনের ইরান সফর নিয়ে করা বিবিসির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, “উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের মাখামাখি যেভাবে বাড়ছে এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে জোট বাঁধছে, সেটা ইরানকে উদ্বিগ্ন করছে। তাদের আশঙ্কা, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের বিপক্ষে নিয়ে যেতে পারে। কাজেই ইরান চেষ্টা করছে, রাশিয়ার সহায়তায় পাল্টা কিছু করা যায় কিনা”।

    এখন একটি সাম-আপ যদি করি তাহলে দেখব, প্রতিটা রাষ্ট্রই বিভিন্ন ইস্যুতে এনগেজ হয়ে থাকলেও; একটা রাষ্ট্র অন্য আরেক রাষ্ট্রের থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে বসে আছে। এগুলোকে একই জায়গায় আনা খুবই কঠিন, কখনো প্রায় অসম্ভব। এর ভেতর আবার দুটো মুসলমান প্রধান দেশ হলেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের স্বার্থ-অবস্থানে বিরাট ভিন্নতা দেখা যাবেই। এটাই স্বাভাবিক। যেমন এখানে ইরান ও তুরস্ক উপরে যে দুটো ইস্যুতে আলাপ করেছি, দেখা যাচ্ছে তারা একই অবস্থান নিতে পারছে না। আসলে কার্যত দেশ দুটো হলেই আর তাদের এক অবস্থান নেয়াটাও সহজ কাজ নয়। এই বাস্তব দিকটা মনে রেখে আমাদের চলতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৩০ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “পুতিন, এরদোগানের ইরান সফর“ এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

     

  • শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৫ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-49S

     

    Ignoring BRICS is ignoring turn of history

     

    শশী থারুর [SHASHI THAROOR] একজন ভারতীয়, কংগ্রেস দলীয় রাজনীতিবিদ। মূলত, তিনি রাজনীতিকের চেয়ে বরং একজন কেরিয়ারিস্ট; তিনি প্রফেশনাল কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি এবং গ্রাজুয়েশন করেছেন আমেরিকার স্বনামধন্য ফ্লেশ্চার স্কুল [The Fletcher School of Law and Diplomacy] থেকে। এই অর্থে তাঁর এক নামী একাডেমিক ইনস্টিটিউশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদিও তিনি ততটুকুই রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন বা চেয়েছেন যতটুকু  কেরিয়ার বাড়াতে তাঁর দরকার মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এতে তিনি যতটা যোগ্য হয়েছেন তার চেয়ে বেশি  নিজ একাডেমিক (ফ্লেশ্চার) বড়াই বা গর্ব করে থাকেন এবং তা বাড়াবাড়ি রকম। তার সমসাময়িক বা এল্যুমনিদের [alumni] মধ্যে যারা এমনকি বাংলাদেশী (ফ্লেশ্চার) তাদেরকেও এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।

    মোদির ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার আগের টানা দুই টার্ম (২০০৪-১৪) কংগ্রেসের মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় ছিল; সেই সময়কালে থারুরের কেরিয়ার ও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল। সে সময়টা ছিল কংগ্রেস সরকারের – তাই তিনি কংগ্রেস দলের (কেরালা থেকে) এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন। মানে সে সময় অন্য দলের সরকার হলে তিনি সেই দল করতেন হয়ত, এ রকম কেরিয়ারিস্ট তিনি। কেন এমন বলছি?

    বলছি, সেকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই যেমন এতদিন তিনি ছিলেন এক মোদিবিরোধী কংগ্রেসী। কিন্তু গত ৭ জুলাই ২০২২ তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate] এক আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে – অবস্থান বদলে নিতে চাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি  বাইডেনের মহাউদ্যোগে নবগঠিত বা চলতি যে ‘পশ্চিমা জোট’ শক্তি তৈরি হচ্ছে (সাম্প্রতিকালে জি-৭ আর মাদ্রিদে ন্যাটোর সম্মেলন ডেকে বাইডেন হইচই ফেলতে চেয়েছেন, ইউরোপের সাথে আমেরিকার জোটকে তিনি  ‘পশ্চিমা ব্লক জোট’  [Western bloc’s] বলে পরিচয় করিয়েছেন সেখানেই) শশী থারুর বাইডেনের এই উন্মাদনা দেখে  আর বসে থাকতে পারেননি। একেবারে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকালতি শুরু করেছেন। যেখানে এতদিন তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকার ভারত পলিসির ক্রিটিক।

    শশী থারুর নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।  সেখানে তার ব্যক্তি অবস্থান হিসেবে যে লাইন তিনি পারসু করতেন বা পক্ষে কথা বলে থাকেন তা হল যেমন – কেন আমেরিকা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেনমেন্টের [China Containment] এ’কাজের ঠিকা দিয়েছে; এর সমালোচক ছিলেন তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই চীন ঠেকানোর পুরস্কার বা মজুরি হিসেবেই ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল।

    এই ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ প্রশ্নেই থারুর  মোদির প্রো-আমেরিকান হয়ে লেপ্টে থাকার নীতির সমালোচক ছিলেন। ফলে যেন কংগ্রেসি হিসেবেই মোদির সমালোচক তিনি, এ’পরিচয় লটকে চলতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি পাশ ফিরছেন; মোদির সমালোচক হয়ে বাইডেনকে অতি আপন করে নিতে চাইছেন। যেটা অনেকে পাল্টিমারাও বলতে পারেন। কিন্তু কী প্রসঙ্গে ছিল থারুরের সেই লেখা?

    আলোচ্য সেই লেখার শিরোনাম হল  – ‘ব্রিকস থেকে ভারত কি বেরিয়ে যাবে?’ এটা বাংলাদেশে অনেকে এভাবে বাংলা করে ছেপেছে – যেটা ভালো বাংলা হয়নি। কারণ, মূল ইংরাজি ভাষ্যটা ছিল Are the BRICS Breaking Up?  বা – ‘ব্রিকস কী ভেঙে পড়বে’-এরকম।

    প্রতি বছর ব্রিকস জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার গতমাসে ২৩-২৪ জুন তা হয়েছিল চীনে। একইসাথে তা বিশেষ গুরুত্বে ‘বেইজিং ঘোষণা’ [XIV BRICS Summit Beijing Declaration] বলে এক ঐক্যমতের দলিলে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। আর এবার ব্রিকস সম্মেলন হয়েছে এমন পটভূমিতে যখন বাইডেনের ‘পশ্চিমা-শক্তি’ আগেই ঘোষণা দিয়ে যা যা বলেছে এর অর্থ হয় যে, মূলত চীন ও সাথে রাশিয়া এবং এদের সহযোগী সব রাষ্ট্রকে তারা একঘরে করবে, কোনো অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কও রাখবে না; ভিন্ন করে দিবে; যেন অ-জাত বা নিচা-জাত তারা। সেটা অনেকটা ১৯৯২ সালের আগে সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই-ব্লকে দুনিয়া ভাগ হয়ে থাকার সময়কালে দুনিয়া যেমন ছিল তেমনি।
    সেখানে আবার দুনিয়াটাকে ফিরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাইডেনের এটা এক অবাস্তব খায়েস-কল্পনা মাত্র। যেটাকে ‘কোল্ড ওয়্যার’ [cold war]-এর সেকাল বলে অনেকে চিনে থাকে যার মূল অমন বৈশিষ্ঠ যে ব্লকে ভাগ হতে পেরেছিল যে, তাতে সোভিয়েত-আমেরিকা বলে এ দুই ব্লকের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্য-পুঁজিবিনিয়োগ বিষয়ক (ফলে  জ্ঞান বা স্বাভাবিক বাতচিত-সহ সবকিছুও) মানে ভাব বা ব্যবসা কোনোকিছুরই বিনিময় সম্পর্ক ছিল না।

    ঐ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ, খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের কোনো দেশ কেউই – ১৯৪৪ সালে আইএমএফ প্রথম  জন্ম ও গঠন হওয়ার পর থেকেই – এরা কেউ  সদস্যপদ নেয়নি। আর যে সুযোগে পরে আমেরিকাও সদস্যপদ না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাইডেনের নয়া-কল্পনার খায়েস অনেকটা সেকালের মতই যা একালে আবার সেখানে পৌঁছানো যায় কি না; এই তাঁর আকাঙ্খা বা মনোবাঞ্ছা। যদিও একালে সে বাস্তবতাটাই নাই ভেঙে গেছে, মানে বাস্তবে তা আর উপস্থিতিও নেই। তবু এ জায়গায় বাইডেন নির্বিকার। কিন্তু জিদ ধরেছেন সেকালেই ফিরতে চান! বাইডেনের ভাষায় বললে, তার নেতৃত্ব গড়ে তোলা ‘পশ্চিমা শক্তির’ সাথে চীন ও এর বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নাকি ‘মূল্যবোধে’ [Beijing…. challenges the Western bloc’s ‘interests, security and values’] এক বিশাল ফারাক আছে; তাই তিনি যেন অবাস্তব জেনেও এমন জিদ ধরেছেন।

    এ ছাড়া এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেক তাৎপর্য ছিল, এতদিন এতে পাঁচসদস্য রাষ্ট্র শুধু অংশ নিয়েএসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম অতিথি হিসেবে আরো ১৩টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। যে দেশগুলো হল – আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, সেনেগাল, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আমরা বলতে পারি, এর মানে, এদের কাছে বাইডেনের উদ্যোগে নবগঠিত যে ‘পশ্চিমা ব্লক’ করেছে, চীনকে একঘরে করবে বলে হুমকি দিয়েছে- সেসব দিকগুলো এসব দেশের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। কেন এভাবে বলছি?

    গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস (BRICS) আসলে কীঃ
    এক কথায় বললে, এখনো আমেরিকা গ্লোবাল ইকোনমির নেতা হয়ে থাকলেও এর অবস্থা পড়তি শেষ পর্যায়ে। বিপরীতে চীনের নেতৃত্ব উত্থিত হয়ে তা সেই জায়গা নিতে চাইছে। আ্মাদের অর্থ-বাণিজ্যের দুনিয়া এখন এরই জংশনে আছি। আর এতে গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; যেটা নিজে আছে আবার আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণে।
    কারণ, নিয়ন্ত্রক আইএমএফ এর বড় শেয়ার মালিকানা একা আমেরিকার নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। এমনকি চীন উঠে এলেও তার সাথে শেয়ার শেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। আর তা থেকেই ওয়াল স্টিটের পরামর্শে ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম! তাহলে ব্রিকস হল সেই আগামী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান; যখন গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল ঘটবে তখন যা কার্যকরি হবে। কিন্তু তা সক্রিয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে যখন চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে তখন। কেন? এখন নয় কেন?

    ইকোনমিক-টেকনিক্যাল কারণে একই দুনিয়াতে দুইটা ‘আইএমএফ’ ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে একটা দেশে একই সাথে দুটা সরকার থাকতে পারে না। তাই ২০০৯ সাল থেকে ব্রিকসের জন্ম হলেও এখনই তা দুনিয়াজুড়ে ‘আইএমএফ’-এর সমান্তরালে সক্রিয় হয়নি, ইচ্ছা করেই।
    চীন, ভারত, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল – এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস গঠিত। যদি অনুমান করে নেই আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে কেবল এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে সমান্তরাল আরেকটা দুনিয়া যেন আছে; তবে এখন অস্থায়ীভাবে এই পাঁচ রাষ্ট্রের জন্যই শুধু ব্রিকস যেন, আর সেই দুনিয়ায় আরেক আইএমএফ হিসেবে তা আপাতত হাজির আছে।
    এভাবে মনে করা যেতে পারে। যেদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে চীন আসীন হবে সেদিন ব্রিকস আর আইএমএফ মিলিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। তবে তা আজকের আমেরিকান প্রভাবের (মানে লায়ন শেয়ার) আইএমএফ যেমন, সেই রকম তখন সেটা চীনের প্রভাবের একটা নয়া আইএমএফ প্রতিষ্ঠান হবে, তাতে নতুন নাম কিছু একটা হবে হয়ত বা পুরনোটাই থাকবে। কিন্তু নয়া মালিকানা শেয়ারে বড় ভাগটা চীনের পক্ষে পুনর্গঠিত হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। কাজেই চীনকে উপেক্ষা করে নয়া দুনিয়া সাজানো বাইডেনের আমেরিকার এক মরণ খায়েশ মাত্র। অথচ বাইডেনের এ’অবস্থানের পরোয়া না করে ১৩ রাষ্ট্রের এবার ব্রিকসের অতিথি হয়েছে – নিজেদের স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটা ঘটিয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাইডেন যেখানে চীনকে গ্লোবাল বাণিজ্য থেকে বের করে একঘরে করার জিদ ধরেছেন; সেখানে এই ১৩ রাষ্ট্র উল্টা বাইছে – এমন পদক্ষেপ নজর-আমল করার মতই বলতে হবে!

    তবে ওদিকে একই দুনিয়াতে বিশ্বব্যাংক টাইপের প্রতিষ্ঠান একাধিক হতে পারে। টেকনিক্যাল অসুবিধা নাই। যেমন ইতোমধ্যেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এডিবি ADB) অথবা ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি IDB) আসলে এরা বিশ্ব ব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছে। এছাড়া চীনা প্রভাবাধীন নয়া এআইআইবি [AIIB] অথবা ব্রিকসের ভেতরেই আরেকটা ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক [NDB]’ নামে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে আছে।

    সার কথায় এতক্ষণের কথাগুলো সারকরে বললে, ব্যাপারটি হল, শশী থারুরকে এতদিন ব্রিকস নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। বরং ভারত-আমেরিকার চীন ঠেকানো নিয়ে কথা বলতেন। সেই তিনি এখন “ব্রিকস ভেঙে যাবে কি না” তা নিয়ে কথা বলছেন!
    আসলে আগেও অনেকবার বলেছিলাম যে গ্লোবাল ইকোনমি বা আইএমএফ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় কূটনীতিকদের সাবধান হওয়াই ভাল; এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির ইস্যু বলে ঠাওরে নিয়ে কথা বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের বিদ্যের দৌড় প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে – তাই অসাবধানে এ ইস্যুর সাথে আচরণ না করা ভুল। আর ঠিক সেই ভুল ও ফাঁদে আটকে গেছেন শশী থারুর!
    আগে বলে নেয়া যাক – কেন এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ‘বেইজিং ঘোষণা’ জিনিসটা কী যার ওপরই মূলত শশী থারুর এত ক্ষোভ বা আপত্তি!

    পাকিস্তানি আবদুল রহমান মক্কিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা নিয়ে তিন পর্যায় :
    প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগের সপ্তাহে ১৭ জুন, একজন পাকিস্তানি কিন্তু আইএস সদস্য আবদুল রহমান মক্কির নাম জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকায় তোলা হবে কি না এ নিয়ে ভারত-আমেরিকার এক যৌথ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন এটা আরো ছয় মাস দেরি করার পক্ষে নিজ ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে, পরের সপ্তাহে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের ভারতের মোদি নিজ বক্তৃতায় সরাসরি এ প্রসঙ্গটা উচ্চারণ না করে তবে প্রসঙ্গটা মাথায় রেখে বলেন, ‘আমাদের (ব্রিকসের সদস্যরা) একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝা উচিত, সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা দেয়া উচিত; যাতে এমন ইস্যুর রাজনীতিকরণ না হয়ে যায়।’

    Modi has said that the BRICS member nations should understand each other’s security concerns and provide mutual support in the designation of terrorists, asserting that this sensitive issue should not be “politicised”.

    আর এতে তৃতীয় ঘটনাটা হল, ব্রিকস সম্মেলন শেষে ‘বেইজিং ঘোষণা’ নামে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আর এই প্রস্তাবের  বিষয়টা সারকথায় বললে – আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যুতে ব্রিকস সদস্যরা  যখনই একসাথে জাতিসঙ্ঘে অবস্থান  নিতে পেরেছে তাতে কত ভাল কিছু ফলাফল এসেছে -সেসবের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখন থেকে আবার পরস্পরের সহযোগী হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

    কেন এসব বলেও বারবার চীন-ভারত একসাথে থাকতে পারেনি :
    এর মুলকথা হিসাবে বলা যায়, গ্লোবাল নেতৃত্বের পরিবর্তনের একালে গত ২০ বছর ধরে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে তাতে মৌলিক বোঝাবুঝিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেছে বা রাখা হয়েছে বলে এর উল্টো ফলই ভারত বারবার পেয়েছে। যেমন- ভারত মনে করে এসেছে, এযুগে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভারত এদের দুজনের মাথার উপরে উঠে যেতে পারবে। নিজ ভাগ্য গুছিয়ে নিতে পারবে, কারণ ভারতের কূটনীতি খুবই চতুর!!  কিন্তু এটা এতটাই উচ্চাশা যে, এ নিয়ে কথা বলাই সময় নষ্ট। কারণ, এখানে মূল বিষয়টা – কূটনীতিক দক্ষতা দেখানোর নয়- বরং ‘নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ও তা দেখানোর’। নিজেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করে দেখানোর।
    এতে মোদি ভাল নেতা কি না, বা দেশপ্রেমিক জাতিবাদী কি না কেবল তা দিয়ে বা এই কর্তাসত্তা দেখিয়ে দাবি করা অর্থহীন যে- ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’ অর্জন হয়ে গেছে। ফলে এখন চীন-আমেরিকাকে কূটনীতিক চাতুরি দিয়ে টেক্কা মেরে দিলেই সব অর্জন হয়ে যাবে?  না, তা হওয়ার কারণ নাই। বরং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে দেখাতে হয়। তার আগেই নিজেকে পরাশক্তি দাবি করা অর্থহীন। বাগাড়ম্বর! আর কিছু হওয়ার আগেই আমি বিরাট কিছু এই বাগড়ম্বরতাই ভারতের কিছু না হতে পারার কারণ। সর্বোপরি আছে হিন্দুত্ববাদ, এই ভুল শুধু না বিরাট ক্ষতিকর রাজনীতি।
    যেমন ধরেন, সম্প্রতি ভারতের জনসংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়েছে। বিবিসি বাংলা খবরটা ছেপেছে যেন এটা নিজেই এক অর্জনের ঘটনা।   গ্লোবাল অর্থনীতির প্রধান কেউ হতে হলে বড় জনসংখ্যা এর অর্জনের জন্য অবশ্য একটা ইতিবাচক উপায় (ফ্যাক্টর) ও সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বড় জনসংখ্যার কোনো দেশ হয়ে যাওয়া মানেই সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কারণ, ওই বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতিতে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বানাতে রূপান্তর করতে সক্ষম হতে হবে আগে – তবেই বড় জনসংখ্যা ইতিবাচক; না হলে ওই বিপুল জনসংখ্যাই হবে তখন বড় বোঝা বা ভার।

    আর এই ভারতীয় ভুল মনোভাবকেই ফুসলিয়ে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে দিল্লিকে নিয়ে গেছে, ঠিকা দিয়েছে; মানে উল্টা ভারতকে ব্যবহার করেছে। চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়েছে। অথচ আমেরিকা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘পতিত শক্তি’। অর্থাৎ ভারতসহ উদীয়মান যেকোন অর্থনীতির জন্য বিপরীত শক্তি। কাজেই আমেরিকা ভারতের দোস্ত বা এলাই হতে পারে না!!

    এবার সুনির্দিষ্ট করে জঙ্গি ইস্যু :
    চীনের উইঘুর ইস্যু। আপনি উইঘুর বাসিন্দাদের পক্ষে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন এবং যাওয়া উচিতও। কিন্তু এক শর্তে! তা হল – উইঘুররা আবার আফগানিস্তানে আইএসের সহযোগী হয়ে সশস্ত্র তৎপরতা করে বেড়াতে পারবে না। আসলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানেরাও উইঘুর [ETIM]  এদের এমন তৎপরতা করতে আপত্তি ও বাধা জানিয়েছে। এইখানে দেখেন এনিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট।
    কিন্তু তারা তবু ভারত ও আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কাজে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচরাও থাকছে।

    পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা ইনস্টিটিউটে হামলা বা পাকিস্তানে গোয়াদর ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী মারতে বেলুচদের সাথে মিলে উইঘুরের বাসিন্দারা যদি তৎপরতা চালায় তবে এরপর আপনি আর একই সাথে তাদের প্রতি চীনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরেক বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, গত ২০০১ সাল থেকে উইঘুররা আমেরিকা সরকারের “সন্ত্রাসী দলের তালিকায়” অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগ-দিয়ে  ট্রাম্প প্রশাসন এই [ETIM] গ্রুপকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে মুক্ত করে দেয়। আর পরে বাইডেন উইঘুর বাসিন্দাদের উপর চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেইজিংয়ের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। রফতানিতে চীনা তুলা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে বাইডেন আসলে কী চায়?

    সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবান গ্রুপ টিটিপির [Tehrik-i-Taliban Pakistan] সাথে এদের মিলিত তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্রয় অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তাদের তৎপরতা স্তিমিত করেছে। আসলে বটমলাইন হল – আপনি আরেক দেশে সন্ত্রাস উসকে দিয়ে নিজ দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারবেন না। আমেরিকার সাথে মিলে ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস উসকে তোলার নীতিতে চলে তারা স্ব স্ব নিজ দেশ সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে পারবে না। ভারত-আমেরিকা মিলে পাকিস্তানে [চীনা স্থাপনা বা প্রকল্পে] সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দিয়ে নিজেরা ভাল থাকতে পারবে না। সন্ত্রাস প্রসঙ্গে সবখানেই সব ফোরামেই একই নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। এটাই একমাত্র এথেকে মুক্তির উপায়। পিস-মিল করে একেক সন্ত্রাসের ঘটনায় একেক অবস্থান নিবেন কোনটা কাছে টেনে কোল দিবেন আবার কোনটাকে জাতিসংঘের তালিকায় তুলবেন – এগুলো কোনটাই কাজ করবে না। শেষ বিচারে এসব কোন কাজের অবস্থান হবে না।  কেবল নুইসেন্স সৃষ্টি করা যাবে।

    যেমন যদি প্রশ্ন করি, ভারত মুক্কি ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে আমেরিকার সাথে মিলে ভারত জাতিসঙ্ঘে যৌথ প্রস্তাব উত্থাপনে গেল কেন? একই সাথে এ ইস্যুতে চীনের সাথে কথা বলা ও একই নীতি তৈরি করে উভয়েই তাতে চলতে চাইল না কেন? সমস্যা তো এখানেই! ভারত তো আসলে মুক্কি ইস্যুতে মানে সন্ত্রাস ইস্যুতে চীনের সাথেও এক অবস্থানে যেতে চায় না। চাইলে এই পথ ধরত। ভারত চেয়েছিল আমেরিকার সাথে গলা মিলিয়ে চীনকে জাতিসঙ্ঘের আসরে বিব্রত করতে। ভারত সমাধান চাইলে আগেই চীনের সাথেও একই অবস্থান নিয়ে কথা বলত। যেটা মোদি ব্রিকসের সভায় নিজ বক্তৃতায় বলেছেন যে, “ব্রিকসের পাঁচ সদস্যের সবাই অন্যের সন্ত্রাস নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আমল করা উচিত”। কিন্তু ভারত নিজেই তো তা অনুসরণ না করার নীতিতে চলেছে। না হলে পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে মিলে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, উইঘুর বা আইএস সশস্ত্র তৎপরতাকে ক্রমাগত সাহায্য সমর্থন না করে তা থেকে দূরে সরে আসত! কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়ে কোন সশস্ত্র হামলা হয় নাই। কিন্তু সেজন্য ইমরানের সাথে মোদি সরকারের কোন ঘনিষ্ঠতা, কাজের আলাপ বা সম্পর্কের উন্নতিতে কোন পরিবর্তন আসে নাই। বরং পাকিস্তান-মুসলমান বলে বিদ্বেষ-ঘৃণা আরো বেড়েছে। মুসলমান কোপানো এখন আরো প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটা ভারতীয় নির্বাচনি প্রধান ইস্যু। এরই শেষপ্রান্তে আমরা নুপুর শর্মা-কে দেখতে পাচ্ছি!!!

    আগেই বলেছি, মূল কথা্টা হল – ভারত মনে করে চীন-মার্কিন বিরোধে ভারতকে আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকতে হবে, আর এরপর এ থেকে ফয়দা তোলার কূটনীতিতে চলতে হবে। চীন-আমেরিকার বিরোধ কাজে লাগিয়ে এভাবেই নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। যেন ভারতের কূটনীতিই খুবই বুদ্ধিমান তাই এটাই জিততে থাকবে সবস্ময়!!!  কিন্তু বাস্তবতা কী?? সময়ে তা ধরা যাক কিছুটা আদায় হলেও হতে পারে হয়ত, কিন্তু এথেকে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কীভাবে? অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সাথে কূটনীতিতে ওস্তাদ হওয়া বা না থাকার কী সম্পর্ক? চালাকি কূটনীতি আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী এক জিনিস? না কি এটা উলটা ক্ষতি করবে? করছে!! এখানে কবি নীরব! অথচ এসব নিয়ে  নুপুর শর্মা ইস্যুতে ডুবে যাওয়া দিনে শশী থারুর এ নিয়েই আমেরিকার পক্ষে তৎপর হতে উঠে দাঁড়ানোর সঠিক সময় ভাবলেন।

    ভারত কিসে ডুবে যাচ্ছে?
    মূলত মুসলমান নির্যাতন ও কোপানো। অথচ একমাত্র  মুসলমান নিধন করেই মোদি নির্বাচনে বাক্স ভরার নীতিতে তাকে চলতে হবে বলে মনে করেন। কারণ অর্থনীতির পারফরম্যান্স আগামিতে আর ভাল করার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সর্বশেষ ফরেন কারেন্সী্তে বিপর্যয়ের ধাক্কা আরো বিশাল। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাহার করে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার-  সবদেশের উপর প্রয়োগ করা ছাড়া তার অস্ত্র ভোঁতা – তাই বাইডেনের পক্ষে ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাওয়া আবার দিল্লির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রয়োগ না করা স্ববিরোধী।

    অথচ থারুর ভাবছেন মোদি তার মত বুদ্ধিমান নন। সেজন্যই নাকি সমস্যা!! তাই তিনি ভেবেছেন বাইডেনের এ নয়া উদ্যমে চীনের বিরোধিতা করার সময়গুলোতে একে ভারতের নিজের কাজে লাগাতে বাইডেনের বন্ধু হতে হবে ও আমেরিকার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ ভাব দেখাতে হবে। অথচ এসব অবস্থান মোদি-জয়শঙ্কর সব উল্টে-পাল্টে যতদুর ব্যবহার করা যায় করেছেন । এরপরেই সব অকেজো অবস্থায় তারা। ভারতের উপত লাগাতর তিনবছর ধরে  মুসলমানদের উপর আক্রমণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শুণ্যের কোঠায় আনার জন্য অবরোধ আরোপের সুপারিশ ঝুলছে। অথচ সেদিকে শশী থারুর খবর নাই। কেবল নিজেকে মোদির চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবা ছাড়া……!!!

    ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা- একথা দিয়ে শিরোনাম লেখা কেনঃ
    শশী থারুর তার লেখার শিরোনাম করেছেন ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে। কেন?
    এনিয়ে লেখায় একটাই কারণ জানা যায় যে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ঐক্যমত না দেখাতে পারা। প্রশ্ন হল, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে তা তো না। এনিয়ে ভিন্নতা ব্রিকসের জন্মের আগে ছিল। মাঝে ছিল এখনও আছে। তাহলে এখন সেকথা তুলে এই প্রশ্ন কেন? এটাই সন্দেহজনক। এমনকি মোদি  নিজে বা  সরকারের কেউ এমন “ভেঙ্গে যাওয়া” ধরণের মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন দেখা যায় নাই।  তাহলে “ভেঙ্গে যাওয়া” নিয়ে যেন আলোচনা উঠে এর কৃতিত্ব একা থারুরের। কেন? তিনি এই ইঙ্গিত তুলে মোদির আগে বা উপরে আমেরিকার প্রিয় হতে চান? আমেরিকার নয়া এজেন্সি নিতে মোদির সাথে টক্কর দিয়ে আগায় থাকতে চান? যদিও কংগ্রেস এখনও কোথাও চীন ফেলে প্রো- আমেরিকান অবস্থান নিবে এমন ইঙ্গিত এখনও কোথাও কোন ইস্যুতে দেখায় নাই। বরং একাদেমিক বা সোশাল পর্যায়ের ঘরোয়া আলোচনায়, মোদি জমানা শেষ হলে চীন-ভারত সম্পর্ক ভাল হবে এমন ইঙ্গিত নন-পার্টিজানদের দিয়ে অনেক সময় দেয়া হয়েছে।
    তো সেটা হতেই পারে। শশী থারুর তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি অবস্থান নেন, বদলান।
    কিন্তু ২০১৬ অক্টোবরের এক সংবাদ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শশী থারুর  ব্রিকস সম্পর্কে বলছেন, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ নেয়া উচিত, তাই ব্রিকস কে উপেক্ষা করলে এমন মোড় পরিবর্তন থেকে নিজেকে উপেক্ষিত করা হয়ে যেতে পারে [Ignoring BRICS is ignoring turn of history: Shashi Tharoor]। তাহলে, মিস্টার থারুর, কী দাড়ালো ব্যাপারটা?
    মনে হচ্ছে খোদ শশী থারুরেরই মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যাহোক, সেটা হতেও পারে। কিন্তু এনিয়ে তার একটা ব্যাখ্যা পেলে আমাদের জন্য সব বুঝাবুঝি সহজ হতে পারত।  তা শশী থারুর কী এখন অবলীলায় “ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকেও উপেক্ষার” পক্ষপাতি হতে বলছেন!!!! কোথায় গেল তার সে ইতিহাসবোধ!!  কেন?

    শশী থারুর গ্লোবাল অর্থনীতির ব্যবস্থাটাই বুঝেন না তা উদামঃ
    তাই শেষ কথাটা হল – শশী থারুর যে গ্লোবাল অর্থনীতি বুঝেন না সেটাই এতে উদাম হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন “ব্রিকসকে আরও চীনকেন্দ্রিক করা হোক, সেটা ভারত চায় না।’। আসলে এই হল হাজার কথার এক কথা। গোপেন এবার ধরা পড়েছে!!!! শশী থারুর যে ব্রিকস কী ধরনের প্রতিষ্ঠান এটাই বুঝেন না, তার এক শক্ত প্রমাণ এটা।

    প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে আইএমএফ কী এবং – এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ও গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ছাড়া দুনিয়াতে কোন দেশ আরেক দেশের সাথে পণ্য-বিনিময়, পুঁজিবিনিয়োগ বিনিময় ইত্যাদি চলতেই পারত না কেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা ও যুদ্ধের খরচ একক বহণকর্তা হিসাবে আমেরিকার উঠে আসা ও পরবর্তিতে আবার অর্থনীতির পুণর্বাসনে রিপেয়ারে অর্থ ঢেলেছে ঐ আমেরিকাই। এরসাথে সেই উদ্যোগ নিয়ে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  ব্যবস্থা জন্ম দিয়ে গিয়েছে বলে আজও দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা বলে একটা কিছু চলছে। তবে এটা মন্দের ভাল। আর এই ব্যবস্থা আমেরিকার দিকে কান্নিমারা ভাবেই তৈরি হয়েছে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে এই শতকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আর চীনের হাতে নয়া ও বিপুল সঞ্চিত সম্পদের কারণে একা চীনের হাতেই সবার চেয়ে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা পুঞ্জিভুত হচ্ছে। এটাই চীনের সব ধরণের ক্ষমতা বা সক্ষমতার উতস।  এই কারণেই মূলত চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সবখানে বেশি উঠছে। কিন্তু ঐ ১৯৪৫ সালের দিকে যদি আওয়াজ তোলা হত যে  (ঐকালের ব্রিকস মানে) আইএমএফ এই প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না, তাহলে কেমন হত?  এককথায় এর উত্তর হত তাহলে আজও দুনিয়ায় কোন বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুই হত না।

    উদ্বৃত সম্পদ  বা সারপ্লাস কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকাই ছিল সেকালে (মোটামুটি  ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া শতক জুড়ে)  একমাত্র রাষ্ট্র যার হাতে বা যার অর্থনীতি হচ্ছিল উদ্বৃত সম্পদে ভরপুর। সেকালের কলোনি সাম্রাজ্যের নেতা বৃটিশ বা ফরাসীদেরকে ছাড়িয়ে।  ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতাই ছিল সেকালের একমাত্র ভরসা যে যুদ্ধের পরেও এই আমেরিকার ভরসাতেই, সেই প্রথম দুনিয়াতে একটা গ্লোবাল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন গড়ে উঠে। এবং তাই হয়েছিল। তাই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। তাই আমেরিকা ছাড়া বা আমেরিকা-কেন্দ্রিক নয় এমন এক আইএমএফ গড়ার কথা কেউ যদি বলে তাহলে বুঝতে হবে তিনি আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা কী ও কেন এর দরকার সেটাই আসলে বুঝেন নাই।
    এখন সেকালে কী শশী থারুর মত টেরা কিন্তু বোকা চিন্তার কেউই ছিল না যে বলে নয়া আইএমএফ কে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না ???
    হা অবশ্যই ছিল।  আর সেটা হল ফ্রান্স।  ফ্রান্স আপত্তি তুলেছিল যে একমাত্র আমেরিকান ডলার-কেন্দ্রিক  এক আইএমএফ বাণিজ্য-অর্থনৈতিক  এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। ফ্রান্সের যুক্তি ছিল অনেকটা কথিত ‘গণতন্ত্রি’ বা রাষ্ট্রের সাম্য ধারণার মত যে একা আমেরিকা কেন সব খাবে? সব কর্তৃত্ব নিবে!!
    কিন্তু  বলাইবাহুল্য ফ্রান্সের আপত্তি সবাই নাদান বালকের আপত্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ সেকালে আমেরিকাই ছিল একমাত্র উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশ। আর উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশের মুদ্রা ছাড়া  (এটাই মূল টেকনিক্যাল যুক্তি বা কারণ) ঐ একই ন্যাশনাল মুদ্রাকে একই সাথে গ্লোবাল বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। তাই সদস্য সকল দেশই একমাত্র ডলারকেই পছন্দ না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।   

    এখন একালে, চীনকে নিয়েও প্রায় একই আচরণ দেখাচ্ছে বাইডেনের আমেরিকা। নাদান আচরণ করছে।  আওয়াজ তুলছে বাইডেন। যেমন একটা তুলনা চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পকে নিয়ে। বাইডেন এই প্রথম এই চীনা প্রকল্পকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বলে আওয়াজ উঠিয়েছে। যদিও সবাই জানে ও বুঝছে এটা অবুঝ বাচ্চার আকাশের চাঁদ পাবার জিদের মত!
    বাইডেন বহুকষ্ট পশ্চিমের সবদাতা মিলে কুথে-কাথে ছয়শ বিলিয়ন ডলার যোগাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেবল। যদিও এখনও সে অর্থ দিয়ে কাজে নামে নাই। এর ভিতর আমেরিকা দিয়েছে মাত্র দুইশ, সারা ইইউ মিলে দুইশ আর জাপান ও অন্যেরা মিলে বাকি দুইশ বিলিয়ন এভাবে। আর  এভাবে তারা সবাই মিলে বিনিয়োগ সক্ষমতা যোগাড় করেছে ছয়শ বিলিয়ন ডলার। ভাল, খুব ভাল!!

    কিন্তু চীনের বেল্ট-রোডে বিনিয়োগ কত?  
    চীন মনে করে, বেল্ট-রোড এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর স্বপ্ন। সে যা হয় হোক, এর যাত্রাশুরু মাত্র এই ২০১৩ সাল থেকে।   ইতোমধ্যেই এর বিনিয়োগ চার ট্রিলিয়ন (মানে চারহাজার বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে [China Belt And Road Projects Value Now Exceeds US$4 Trillion]।
    ব্যাপারটা সোজা। আমেরিকাও ওর অর্থনৈতিক উত্থানে যখন ওর যৌবনকালে ছিল তখন বেশির ভাগ এমন বিনিয়োগ প্রকল্প একা আমেরিকাই চালিয়েছে। সেটাই এখন শিফট করে গেছে, চীনের উত্থান ঘটছে একালে।

     তাহলে, এটা চীনা উদ্বৃত সম্পদে উত্থানের যুগঃ
    তাই সেকালে আমেরিকার নেতৃত্বে আইএমএফের বদলে একালে আমরা চীনের নেতৃত্বে হবু আইএমএফ এর ভ্রুণ হিসাবে যেন – ব্রিকসকে দেখছি। কাজেই একালে চীন ছাড়া তো ব্রিকস দাড়াবেই না। আর এতে বড় বিনিয়োগ-মালিকানাও চীনেরই হবে। যেমন এখনও আইএমএফের শেয়ার মালিকানা আমেরিকার সবার চেয়ে বেশি; তা আমেরিকা জবরদস্তিতে হলেও ধরে রেখেছে।

    তাহলে, বটম লাইন ফ্যাক্টস হল – চীন নাই এবং প্রধান ভূমিকায় নেই এটা যদি কল্পনা করি, তবে ব্রিকস বলে কোনো প্রতিষ্ঠানই হবে না, দাঁড়াবেই না। দাঁড়ানোর দরকারও হবে না।

    আসলে ব্রিকস প্রতিষ্ঠান দরকার কেন? এটা নিয়ে শশী থারুর নিজেই প্রশ্ন তুলে নিজেই যেসব জবাব দিয়েছেন তাতেই তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধির খামতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন- প্রথমত, ব্রিকস বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক নাকি ভূরাজনৈতিক জোট?

    এর জবাব হল – ব্রিকস না অর্থনৈতিক না ‘ভূরাজনৈতিক’ জোট। না বুঝে প্রশ্ন তুলতে গেলে এভাবেই ধরা খেতে হবে!!!! যেমন যদি প্রশ্ন তোলা হয় – আচ্ছা আইএমএফ কী কোন জোট? অর্থনৈতিক না ভূরাজনৈতিক জোট? এটা তেমনই এক বোকা প্রশ্ন হয়েছে।  আইএমএফ মূলত এক “গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম’ খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে  আর এই সিস্টেমের মুল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ, সাথে সহযোগী বিশ্বব্যাংক।

    আর নয়া ব্রিকস [BRICS],  এটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তবে পুর্ণ প্রস্ফুটিত নয় বা করা হয় নাই ইচ্ছা করেই। এক ঘরে দুই পীর থাকে না তাই।  এখন আইএমএফ কেমন প্রতিষ্ঠান এটা যখন শশী থারুর, আপনার ধারণায় নাই তখন ব্রিকসও আপনি বুঝবেন না। কেবল প্রশ্ন করবেন আর নিজের বোকামিটাই তুলে ধরবেন!

    কাজেই মুখ খোলার আগে শশী থারুরের উচিত হবে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটি কী – এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ফ্লেশ্চার স্কুল কিন্তু আইন আর কূটনীতি বিষয়ে জোর দেয় সত্ত্বেও এটা মান্টিশেডের সাবজেক্ট এমন প্রতিষ্ঠান। একথা বারবার বলা হয়েছে। তবে এর বাকি শেডগুলো স্টুডেন্টদেরকে নিজ যোগ্যতায় পূরণ করে নিতে হবে। থারুর সেদিকে মনোযোগ দেন নাই দেখা যাচ্ছে। অতএব তার এখন এসব ব্যাপারে দ্রুত মুখ খুলা এড়ায় চলা উচিত! এটা অপ্রয়োজনীয়! এজন্যই বারবার বলেছি এই যুগের কূটনীতিতে মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা আইআর [আন্তর্জাতিক রিলেশন] এবিষয়ে পড়ুয়াদের ক্লাসের পাঠ্য না হলেও নিজ উদ্যোগে অর্থনীতি পড়ে নিতেই হবে।

    একারণে শশী থারুর নিজে বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে, ভারত ব্রিকসের সদস্য ঠিকই হতে চান। কিন্তু তার দাবি, “চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না”। এর মানে কি?  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফে কী ভারতের জন্য কোন জায়গা আছে? আইএমএফে ভারতের উল্লেখ করার মত কোন মালিকানা নাই কেন? আর সেটা কী আমেরিকা একালে ভারতকে দেওয়ার জন্য বসে আছে? দিবে? আমেরিকার প্রিয়বান্দা হতে চাওয়া  শশী থারুর কাছে এর কী কোন জবাব আছে? অতএব তাঁর না বুঝে কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয় কী!!!

    তাহলে নবগঠিত বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান AIIB, আসেন এখানে দেখিঃ
    এটা চীনা উদ্যোগের একালের বিশ্বব্যাংক যেন। ব্রিকস (বা আইএমএফ) গড়তে গিয়ে আগেই নিজস্ব বিশ্বব্যাংকটা যেন গড়ে নিয়েছে।  ফলে চীনা প্রভাব ও সিদ্ধান্ত এখানে প্রধান ভুমিকায়। চীনের নিজের মালিকানা শেয়ার এখানে ৩০% এর মত। এটাই সবার চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হল, ভারত যার, শেয়ার মালিকানা ১০% এর মত। আমেরিকার নাই, ইউরোপের খুব কিছু উল্লেখ করার মত নয়। অর্থাৎ আর কাউকে তেমন নয়, তবে ভারতকে  চীন ঠিকই গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে পাশে রেখেছে। তাতে ভারতের সাথে চীনের যতই রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকুক।  এটা স্বাভাবিক!

    তাহলে শশী থারুর কীবুঝে বলছেন – চীনকেন্দ্রিক  ব্রিকস তিনি চাননা?? 

    ভারী কথাবার্তা থাক একটা গল্প বলে শেষ করব।
    শশী থারুর ব্রিকস চান কিন্তু চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না। আর বাস্তবতা হল, চীন না থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে উদ্বৃত্ব সম্পদ – বিনিয়োগ দিবে কে? বুঝা যাচ্ছে এদিকটা নিয়ে তিনি ভাবেনই নাই। তাহলে আইএমএফ অথবা ব্রিকস বলতে তিনি কী বুঝছেন? কেমন প্রতিষ্ঠান এর কিছুই বুঝেন নাই। আবার  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফ নিয়েও তার আপত্তি দেখি না। তাই সবমিলিয়ে, তাঁর এই অবস্থানেরই প্রতীক যেন নিচের এই গল্প!
    শ্রাদ্ধঃ  কোন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সৎকারের নানা অনুষ্ঠান হয়। এই  ক্রিয়াকর্মাদি যা কিছু করা হয় একে শ্রাদ্ধ বা শ্রাদ্ধাদির নানা অনুষ্ঠান বলে। আর কয়েকদিন ব্যাপী এমন অনুষ্ঠান শেষে সাধারণত একটা নিরামিষ ভোজ বা খাওয়াদাওয়া ভিতর দিয়ে এসবের সমাপ্তি ঘটে থাকে। এখন এক ব্যক্তি দাওয়াতে এমন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।  কিন্তু উপস্থিত হয়ে তিনি সৌজন্য আলাপ জমাতে গিয়ে  ঐ বাড়ির কর্তাগোছের এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আচ্ছা যার শ্রাদ্ধ খেতে এলাম তাঁকে দেখছিনা? তিনি কোথায়???” 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “শশী থারুরের ব্রিকস বুঝ!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • পশ্চিমের শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ?

    পশ্চিমাশক্তির শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ??

    গৌতম দাস

    ০৬ জুন ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-48q

      US Treasury Secretary Janet Yellen

    Antony Blinken

    সামনের দিনগুলোতে গ্লোবাল পরিসরে যুদ্ধ-লড়াই ক্রমেই ‘জাত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হিসেবে’ খাড়া করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। মানে, কারা নৃতাত্ত্বিক-জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ যেন এ নিয়ে হতে যাচ্ছে লড়াইটা – এ ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। কথাটা আরো সরাসরি করেও বলা যায়। যেমন পশ্চিমা শক্তি আসলে সোজা বলতে চাইছে, আগামী যেকোনো যুদ্ধ-লড়াই তারা ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’-এর লড়াই হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে তারা আগেই জানত ও জানে যে, দুনিয়াতে কোন নৃতাত্ত্বিক-জাতি শ্রেষ্ঠ – এই অনুমান বা তুলনা করাটাই অর্থহীন। প্রতিটি জনগোষ্ঠীরই একেক দিকে বিশেষত্ব থাকে, থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা, কোন অজুহাত বা জুতসই সাফাই-যুক্তি কেউ দিলেও আমরা কেউ কারো অধীনে অধীনস্থ নই বা করতে দিতে পারি না। অতএব ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রতিষ্ঠার লড়াই বলে কিছুই নেই।

    তবু দুনিয়াতে আমরা দেখেছি টানা সাড়ে তিন শ’ বছরের কলোনি দখল ও লুটেরা শাসন চলেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত যার ভুয়া সাফাই ছিল এই যে, পশ্চিমা সাদা ককেশীয়রা ছিল নাকি ‘বেশি সভ্য’। কাজেই তারা আমাদের মত দেশের  উপর শাসন কায়েম করবে লুট করবে, এ উছিলায় যে, তারা আমাদের সভ্য বানাবে ইত্যাদি।

    সবচেয়ে বড় কথা, মনে করা হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধে মুখ্যত জার্মান হিটলার ও তার দোসর-বন্ধুদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের পতনের মধ্য দিয়ে হয়তো দুনিয়া যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছে। ফলে বর্ণবাদ বা রেসিজম [RACISM] এই জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ সেবার পরাজিত হওয়ার পর ক্রমেই এই চিন্তা হয়তো চাপা পড়ে যাবে। এছাড়া তখন ধরে নেয়া হয়্বেছিল যে মানুষ শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপদ ও চরম খারাপ দিক সম্পর্কে  নিশ্চয় ইতোমধ্যে অনেক জেনেছে। ফলে কোন রেসিজমের চিন্তা আবার জেগে উঠার সুযোগ নেই। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে এই পশ্চিমা শক্তিই খোদ এবার রেসিজম, এই পুরনো ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ হয়ে ফিরতে চাচ্ছে।

    এমনিতে নয়া চলতি শতক হল অর্থনৈতিক দিক থেকে আমেরিকার পতন ও চীনের উত্থানের সময়কাল। তাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছি এটা অবজেকটিভ মানে মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ এক ফেনোমেনা। যেমন আমেরিকান কোনো প্রেসিডেন্ট কোনো যুদ্ধ লাগিয়ে চীনা উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করবেন হয়ত কিন্তু তাতেও এটা ঠেকবে না। অন্তত সেই ২০১৪ সাল থেকে তাই নিয়মিত বলে আসছি যে, এককালে পুরনো ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্যও পেছনে পড়ে যেমন উত্থিত আমেরিকার কাছে হেরে গিয়েছিল আর নানা ঘটনাপ্রবাহ শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এক গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল, আজ প্রায় ৭৫ বছর পরে এটাও আবার পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। এবার চীনা উত্থান মানে চীনের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয়, এই পুঞ্জিভবন [accumulation] ব্যাপক ও সবাইকে ছাড়িয়ে হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। এটা চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতাতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে; ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা ব্রিটিশ অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

    আমেরিকার এই ক্রমেই পতন ও চীনের ক্রমেই উত্থান প্রমাণিত সত্য হিসেবে আমেরিকার ন্যাশনাল সার্ভেতেও ২০০৮ সাল থেকে স্পষ্ট হয়ে চলেছে। গত ২০০৮ সাল ছিল এ নিয়ে প্রথম পরিসংখ্যানগত প্রকাশিত সার্ভে রিপোর্ট ও প্রমাণ, যা এরপর থেকে প্রতি চার বছর পরপর এর বিকাশ আরো স্পষ্ট করে একই রিপোর্ট তুলে ধরছে। এ নিয়ে বুশ বা ওবামা আমলে তারা উভয়েই দুই টার্ম করে ক্ষমতায় থাকলেও তাদের মিলের দিকটি হল – এদুই প্রেসিডেন্টই সার্ভে রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন ঠিকই কিন্তু নিজ সার্ভে রিপোর্টও মানতে চাননি। অস্বীকার করে গেছেন, ‘এতে তেমন কিছু হবে না’ ধরনের কথা দাবি করে। তবে তলায় তলায় উভয়েই এশিয়ায় চীন ঠেকানো বা China Containment পলিসি নিয়েছেন। সেটা হল, ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে ঠেকানোর নীতি।

    সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল তারা উভয় তাদের প্রেসিডেন্টশিপের মোট ১৬ বছর ধরে দেখেছেন এতে আমেরিকার ফেভারে কোনো অগ্রগতি নেই। তবে কেবল কয়েক বছর পরে পরে চীনের উপরে চাপ সৃষ্টি করে আমেরিকার জন্য নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা আদায় করেছেন, চীনের কাজ থেকে। চীনও কখনোই তাদের নিরাশ করেনি। এভাবেই চলে আসছিল এমনকি এত পাগলাটে ও জাতিবাদী ভাব দেখানো ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর আমলেও। তিনিও একইভাবে চীনের কাছে দাবি করেছেন আর এতে নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা তিনিও পেয়েছেন। এমনকি সর্বশেষ তা ২০১৭ সালেও যে বছর প্রথম ‘কোয়াড’ বা QUAD (আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার দেশের) জোটকে চাঙ্গা করা হয়েছিল তখনো ট্রাম্প সুবিধা পেয়েছিলেন।

    কিন্তু এরপরই আমেরিকাকে ট্রাম্প এক মহাপরিবর্তনের দিকে মোচড় দিয়েছিলেন। সেটা হল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist]। মানে আমরা সাদারাই দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি – এই ধারণা। এখানে সাদা বলতে ফর্সা হলেই হবে না। ককেশীয় ]Caucasian] নৃগোষ্ঠির  গায়ের সাদাচামড়ার অর্থে ‘সাদা’ হতে হবে।  ট্রাম্প দল হিসাবে নিজে রিপাবলিকান দলের লোক।  এর উপর নিজেকে  “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist] এর দিক ঝোঁক দেখানো! এটা স্বভাবতই এক ভয়ঙ্কর রেসিজম। কিন্তু ২০১৬ সালে নির্বাচন করতে আসার শুরু থেকেই এই ঝোঁক-অভিমুখ ট্রাম্পের সাথেই ছিল। তবে প্রথম দিকে খাপ ছাড়া বা অস্পষ্টতার কারণে সাধারণ্যে তা হয়ত স্পষ্ট হয়নি। যেমন ধরা যাক স্টিভ ব্যাননের [Steve Bannon] কথা। তিনি ছিলেন আগে ট্রাম্পের  ২০১৬ সালের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আর পরে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের পরে হন, প্রেসিডেন্ট অফিস হোয়াইট হাউজের প্রধান উপদেষ্টা হন ব্যনন। যদিও তিনি মাত্র সাত মাস এই পদে ছিলেন। আর এরপর ওই সৃষ্টপদটাই আবার অবলুপ্ত করে দেয়া হয়। রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে এই ব্যানন ছিলেন ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বড় নেতা, তাত্বিক। তবে প্রেসিডেন্টশীপের  শুরুর থেকেই তাঁর এত উগ্র অবস্থান ট্রাম্প নিতে পারেননি; তাই ব্যননকেই সরে যেতে হয়েছিল। যদিও ট্রাম্প যতই ক্ষমতামলের শেষের দিকে গেছেন ততই তিনি আরো বেশি ও প্রকাশ্যে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) গ্রুপের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে গেছেন।

    পরেরবার গত ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হলে এরপরের বাকি তিন মাস তিনি লাগাম ছাড়া, তিনি আর রিপাবলিকান না, যেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মূল নেতা হয়ে উঠেন। আর এরই সবচেয়ে বড় প্রকাশ তিনি ঘটান ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালে। ঐদিন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস [Congress] ভবন দখল করে নিয়েছিল ও এর শিখরে উঠে কংগ্রেস বিল্ডিংয়ে তাদের রাজত্ব কায়েম করে ছাদে দেয়ালে নাচানাচি-বিজয় প্রকাশ করেছিল। সরকারি হিসেবে ওদিন সাতজনের মৃত্যু ও কয়েকজনের আহত হওয়ার মধ্যে দিয়ে ঘটনা শেষ হয়েছিল।

    সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদী বলতে এরা কারাঃ
    বাংলাদেশের মত পাঠকদের মধ্যে সাধারণ্যে ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ কথাটা অনেকের কাছে আবছা ধারণায় থাকতে পারে বা তা খুব একটা পরিষ্কার না এমন হতে পারে। তাই এনিয়ে আগে একটু কথা বলে নেই। শব্দটার মূল বিষয় ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা’ বা নিজেকে সব ব্যাপারে, অন্য এথনিক জনগোষ্ঠীর চেয়ে ধর্ম-জাতি ইত্যাদি যেকোনো দিকে শ্রেষ্ঠ-বোধ করার দাবি তুলে ধরে। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে সুপ্রিমেসিস্ট [Supremacist]। আর, ইংরেজি ‘সুপার’ বা সবার চেয়ে ভাল – এ ধারণা থেকে ‘সুপ্রিমেসিস্ট’ শব্দ তৈরি করা হয়েছে। এই সুপ্রিমেসিস্ট শব্দেরই খাস বাংলা হল শ্রেষ্ঠত্ববাদী। বলাবাহুল্য, সুপ্রিমেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদী এগুলো নেতিবাচক শব্দ। এগুলো শুধু নেতিবাচক শব্দই নয়, এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘ডেরোগেটরি’ [derogatory] শব্দ মানে, কাউকে – নিচা দেখানোর-  শব্দ। বাংলায় বললে কাউকে ইচ্ছা করে ‘নিচা দেখানোর’ জন্য এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়।

    কিন্তু কোন জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এই বোধ তাদের কেউ কেউ আনে কেন? এটার দরকার কী?  আসলে যখন থেকে মানুষ টের পেয়েছে নিজের গায়-গতরের শ্রমে সম্পদ জোগাড়ের চেয়ে সহজ ভিন্ন পথ আছে; তখন থেকে শুরু হয়েছে এই সমস্যা। সেটা হল, অন্যের শ্রম-সম্পদ লুটে খাওয়া ও নেয়া, অন্যের কাঁধে চড়ে খাওয়া ইত্যাদির জন্য অন্য পুরো জনগোষ্ঠীকেই নিজ অধীনস্থ করা বা বাধ্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে যারা।

    কিন্তু তাতেও পেছনে আরো বড় কাহিনী আছে। দুনিয়াতে মানুষের থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক জীবনযাপন শুরু করা বলা হয় মোটামুটি প্রায় ছয় হাজার বছর বয়সী। সে কারণে এখান থেকেই আমাদের তৎপরতাকে আমরা সভ্যতা বলি বা ‘সিভিলাইজেশন’-এর শুরু বলা হয়। আর দুনিয়াতে এমন সভ্যতার জীবন বা কৃষিকাজে মানে থিতু হয়ে কোনো ভূগোলে বসবাস শুরু করা, যাযাবর জীবন ত্যাগ করা- এসবই শুরু হয়েছিল আর এটাই সভ্যতার শুরু। আসলে অন্তত দশের অধিক বিভিন্ন সভ্যতা যারা প্রায় কাছাকাছি সময়ে (কিন্তু পরস্পর সম্পর্কে একেবারেই না জেনে, যোগাযোগ ছাড়াই) শুরু হয়েছিল। যেমন এসব সভ্যতার বিচারে আমরা ‘সিন্ধু সভ্যতার’ অংশ (যার মূল ভূখণ্ড এখন পাকিস্তানের অংশ)। আর এর ভেতরেও আবার অনেক নৃতাত্ত্বিক-জাতির জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল, যার মধ্যে আমরা বৃহত্তরভাবে সিন্ধু সভ্যতার অংশ হলেও এর ভেতরের “বাঙালি” – এই নৃতাত্ত্বিক-জাতির অন্তর্ভুক্ত বা অংশ। যেমন এশিয়ায় আমাদের কাছাকাছি সবচেয়ে প্রভাবশালী আরেক সভ্যতার নাম হল মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক-কুয়েত), টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরের এই সভ্যতা।

    আগের দিনে এথনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বা সভ্যতাগতভাবে তাদের মধ্যে কোন সঙ্ঘাত হয়নি এমন নয়। তবে ধরনটা ছিল যেমন, দেখা গেছে দেশ যুদ্ধ-মারামারিতে অন্যের দখলে চলে গেছে পেয়েছে অথচ এরপর থেকে  দখলদারও সেই ভূমিতেই (যেভুমি থেকে সে এসেছে তা ফেলে) এর পর থেকে নিজেও বসবাস শুরু করেছে। এটাই প্রধান ধরণ ছিল। মোগল শাসকেরা এমন ধারার ছিল। তাই এতে সম্পদ পাচার বা নিজ পুরানা দেশে লুটে ফেরত নিয়ে যাওয়া এমন ফেনোমেনো তা ছিল না।   পরবর্তীতে টেকনোলজি বিকাশের সুযোগ নিয়ে এক কলোনি দখল যুগ (১৬০৭-১৯৪৫) শুরু হয়েছিল। আর এ্রতে একমাত্র দখলদার হাজির হয়ে যায় ইউরোপ যারা,  এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা সব মহাদেশকেই কলোনি, নিজের শিকার বানিয়ে নিয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছরের এই লুটেরা শাসন চলেছিল। কিন্তু এটি বিশেষ লক্ষণীয় যে, এই প্রথম ইউরোপীয় কলোনিবাজ দখলদাররা দখলের পরে সাথে এ কাজের পক্ষে সাফাই বক্তব্যও দেয়া শুরু করেছিল। আর সেই প্রথম আমরা কে সভ্য আর কে নয় এ নিয়ে  শঠতাপুর্ণ তুলনা হতে দেখেছিলাম। আর এ থেকে দেয়া সাফাইটা হয় যেমন, এশিয়ায় আমাদের চেয়ে ইউরোপীয় দখলদাররা “ভালো সভ্য” বা “বেশি সভ্য” বলেই সবার আগে তাড়া দাবি করেছিল। পরে এই মিথ্যা  সাফাই দিতে শুরু করেছিল যে  “যেন তারা আমাদের সভ্যতা শিখাতেই আমাদের দেশ দখল করেছে। এ থেকেই শুরু হয় সভ্যতা শব্দটার শঠতা বা ছলনার নেতি ব্যবহার। যেন ইংল্যান্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়া দখল করেছিল আমাদের সভ্যতা শিখাতে এসে আর এতে  আমাদের স্থায়ী মজুদ বা উদ্বৃত্ত সম্পদ সবই নিরন্তর লুট করে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের কাজ।
    আসলে সরাসরি বললে আমরা শ্রেষ্ঠ কিংবা আমরা অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এ ধারণা, এ অনুভবটা থেকেই সব অপরাধের উতস বা শুরু হতে পারে। কারণ আপনি হয়ত সতর্ক থাকলেন কিন্তু অন্যে হয়ত আপনার না করে দেয়া ধারণা-কথাটাই অন্য জনগোষ্ঠীকে পদানত বা অধীনস্থ করার সাফাই হিসেবে কেউ ব্যবহার করবেন।

    যেমন আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ ধরণের চিন্তাচর্চার ঘাঁটিঁ বা ফেবারেবল অঞ্চল। এদের মূল কথা হল, তাদের গায়ের চামড়ার সাদা (বলতে চায় সাদা ককেশীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী) অতএব তাঁরা অন্য সব নৃ-গোষ্ঠির মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যেখানে কেউ শ্রেষ্ঠ কিনা এটা অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রমাণিত ধারণা, এর চেয়েও বড় কথা এর কারণে কাউকে লুটে নেয়া, নিজ অধীনস্ত করে নেয়া অথবা  একই দেশের ভিতরে সহ-নাগরিকের সাথে কাউকে বৈষম্য করা  ইত্যাদি সব এগুলো ক্রিমিনাল অপরাধ। অথচ কেউ যখন জাত শ্রেষ্ঠত্বের মুইথ্যা বড়াই করে সে আসলে ইঙ্গিতে বলতে চায় তাদের ন্রৃ-গোষ্ঠি চার-পাঁচ শ’ বছর ধরে অনেক জনগোষ্ঠীকেই অধীনস্থ করে রাখতে পেরেছিল তাই তারা এখনও শ্রেষ্ঠ। তবে একালে ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ চিন্তা ফিরে জেগে ওঠার কারণ আরেকটু ভিন্ন।

    গ্লোবাল ইকোনমি যেখানে পরিবর্তিত হচ্ছে এর অভিমুখ হল, চীনের উত্থানে আমেরিকান ইকোনমির পতন বা তাদের অন্ততপক্ষে রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট (ভিন্ন কাজ ভিন্ন দেশ ইত্যাদি) একটি খুবই স্বাভাবিক বা প্রায়ই ঘটা ঘটনা হিসেবে উঠে আসছে। বড়লোক অবস্থাপন্ন অনেকেই তো বটেই, মিডল ক্লাসের ব্যবসা বা চাকরি প্রায়ই টলায়মান হয়ে উঠছে। আগের বাজার, আগের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে টিকে থাকছে না। আর এ’বস্থায় তাদের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ বয়ানটা  মুখরোচক হয়ে উঠে আসছে এমন যে, “আগে তারা সুন্দর দিন ‘কাটাইত”! কিন্তু অ-সাদা মানুষেরা সব নষ্ট করে দিয়েছে। মানে এখন কালো বা বাদামি চামড়ার লোকেরা তাদের পশ্চিমাদেশে এসে ছেয়ে ফেলাতেই নাকি তাদের চাকরি-ব্যবসার সব সুবিধা এরা নিয়ে গেছে।

    আসলে, স্বভাবতই এখানে অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশনের কারণ, পশ্চিমা দেশ থেকে সাদা চামড়ার মানুষ অন্য দেশে ব্যবসা-কাজের লোভে বেরিয়েছে বা অন্য চামড়ার কিন্তু সস্তা শ্রমিক বলে তাঁরা পশ্চিমা দেশে কাজ ও থাকার অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু যেকোনো উগ্র জাতিবাদের মত এই হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরা সত্য-মিথ্যা মিলিয়েই কথা বলবে। মূলকথাটা সোজা  – যখন পশ্চিমা কোনো দেশের অর্থনীতি ভাল চলে তখন বাইরের আমাদের মত দেশের সস্তা শ্রমিক পেতেই তো মাইগ্রেটেড শ্রমিক সে আমদানি করবে। কাজেই অ-সাদা চামড়াদের তখন ভালো লাগবে যখন পশ্চিমা দেশে অর্থনীতি ভালো চলবে। অতএব এর সাথে কোনো রঙের গায়ের চামড়ার মানুষ ভাল অথবা শ্রেষ্ঠ – এটা ডাহা মিথ্যা ও ভুয়া কথাবার্তা। কিন্তু তবু পশ্চিমের ঘৃণায়, নরওয়ে-তে হত্যা বা সর্বশেষ নেদারল্যান্ডসে মুসলমান বলে হত্যাকাণ্ডগুলো প্রায়ই উঠে আসছে।

    আবার গ্লোবাল ইকোনমিতে  চীনা উথান ও চীন নেতা হলেই সেটা সাদা চামড়া জনগোষ্ঠীর মানুষেরা না খেয়ে মরবে, বা তাদের জন্য খারাপ ঠিক তা নয়। তবে সুযোগ সুবিধা কমে বা ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। আবার তারাও এশিয়ায় মাইগ্রেটেড (লেবার, টেকনিশিয়ান বা যেকোনো স্পেশালাইজড) হলে তারাও ভালো করবে যেভাবে গত অন্তত শ’বছর আমরা এশিয়ানরা এভাবেই নিজেদের ভাগ্য খুলবার চেষ্টা করে এসেছি। তবে একটা জিনিষ, দুনিয়াতে গত প্রায় ছয়শ বছর ধরে একনাগাড়ে সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন চলে আসছে।  এখন গ্লোবাল ইকোনমিতে  পরিবর্তনের মোচড়ে যদি সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন দূর হয়ে যায় তাতে চীনের কী করার আছে??  আবার পশ্চিমাদেশের আধিপত্য চলে যাওয়া মানে সব হারানো তা তো নয়! আমেরিকা বৃ্টিশদের থেকে গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে বলে লন্ডন তো পরিত্যক্ত শহর হয়ে যায় নাই। একালেও এখন অনেকেই নন্ডনে সেটেল হতে চাচ্ছেন। সৎ মনোভাব নিয়ে তাকালে অনেক কিছুই খারাপ লাগার কথা নয়!

    একই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ ট্রাম্প ও বাইডেনঃ
    ট্রাম্প সম্পর্কেই উপরে বেশি কথা লিখেছি তবে তাতে ট্রাম্পই কেবল খারাপ আর বাইডেন ভাল, তিনি জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট নন অথবা কম? তাই কি? না, তা একেবারেই নয়।
    তবে নতুন যেটা তা হল, বাইডেন তাঁর যুগে সবচেয়ে বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে হাজির হতে চাইছেন। এটাই একালের সবচেয়ে বড় শিফট! এখন এটা একেবারেই পরিষ্কার যে, বাইডেন আরো বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েই ২০২১ সালে্র জানিয়ারিতে শপথ নিয়েছিলেন। তা হলে ট্রাম্প ও বাইডেন দু’জনই কি সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী? সাধারণ উত্তর হ্যাঁ-সূচক। কিন্তু তবু দু’জনের কাজের ফিল্ড বা ফোকাস ভিন্ন। যেমন, ট্রাম্প অভ্যন্তরীণভাবে মূলত আমেরিকার ভিতরে অর্থে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। আর বাইডেন সারা পশ্চিমাশক্তি মিলে, যার মধ্যে ইউরোপীয় নেতারা শামিল আর ব্যতিক্রমী জাপানিজরা। তারা মনে করে, গত পঁচাত্তর বছরে  আমেরিকার পুরনো গ্লোবাল নেতৃত্ব তারা আরো কিছু দিন যেভাবেই হোক ধরে রাখবেন।

    এতে বাইডেন এন্ড গংয়ের সবচেয়ে যেটা বড় বিভ্রম ও জিদ তা হল ইকোনমিক নেতৃত্বটা যেন সাবজেক্টটিভ বা ব্যক্তি ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়। যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা প্রধানমন্ত্রী চার্চিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দাসখতে রাজি বা বাধ্য না হয়েও বৃটিশ সাম্রাজ্য তার পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব হিটলারের হাত থেকে চাইলেই বাঁচতে ও বাঁচাতে পারত। বাইডেন আসলে এর থেকেও এককাঠি উপর দিয়ে চলেছেন। বাইডেন মনে করছেন, পাঁচ-ছয় শ’ বছর ধরে সাদা চামড়ার শাসন দুনিয়ায় চলছে। এ শাসন চীনের (অ-সাদা) নেতৃত্বের তলে পড়তে পারে না, যেভাবেই হোক টিকিয়ে রাখতেই হবে – এই জবরদস্তির উসকানি দিয়ে বাইডেন নিজ গ্লোবাল নেতার সুপ্রিমিজম যেন তিনি ধরে বা টিকিয়ে রাখতে সফল হবেন – এই হল তার বাজনার মূল সুর!

    কিন্তু বাইডেনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের খাস প্রমাণ কী?
    বাইডেন প্রশাসন এতদিন ঠিক কী বলে ইউরোপকে ইউক্রেন যুদ্ধে শামিল করেছেন, তা পাবলিকলি খোলাসা করেননি। যারা বারবার রাশিয়ান তেন-গ্যাস ছাড়া চলতে পারবে না বলে অনবরত বেঁকে বসছিল! কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল বাইডেন নিজেদের সাদা শাসন হারিয়ে যাবে এমন ভয়-উস্কানি দেখিয়ে থাকতে পারেন। সম্প্রতি তা নিয়ে একটু ডিটেইল ব্যাখ্যা করেছেন বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দুই মন্ত্রী কর্তা- পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken ] ও ট্রেজারি বা অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন [Janet L. Yellen], তবে দুই আলাদা আসরে। দুটোই লম্বা পলিসি বক্তব্য।  আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council] নামে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক আছে, এর এক বক্তৃতায় জ্যানেটের বক্তব্য গত ১৩ এপ্রিলে। জ্যানেটের দেয়া বক্তব্যের ট্রান্সক্রিপ্ট ওরেই তাদের সাইটে দিয়ে দিয়েছে এখানে।  আর ওদিকে ব্লিঙ্কেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতা দিয়েছেন গত ২৬ মার্চ ২০২২। সেখানেই তিনি ‘চীনা সরকারের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের পলিসির রূপরেখা’ দিচ্ছেন বলে এ বক্তৃতা দিয়েছেন। ইইউ এর পলিটিকো মিডিয়া তার রিপোর্টের শিরোনাম দিয়েছে, “Blinken calls China ‘most serious long-term’ threat to world order”। এককথায় চীনকে ওয়ার্ল্ড অর্ডার মানে বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলার জন্য হুমকি বলে বর্ণনা করছেন ব্লিঙ্কেন। সোজা করে বললে, চীনা অর্থনৈতিক উত্থানে আমেরিকার কষ্ট হচ্ছে অথচ সেকথাটা ব্লিঙ্কেন লুকিয়ে হাজির করছেন এভাবে যে চীন ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থার জন্য ফিট নয়!!!  আসলে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা বা গড়ে যাবার প্রায় পচাত্তর বছর পরে এসে এসব কথা অর্থহীন!  আগ্রহিরা লেখা দুইটা সরাসরি পড়ে নিতে পারেন। আমি কিছু ক্যাচি অংশ তুলে আনব। 

    এখনকার সার কথাগুলো বোঝা খুব কঠিন না। আমি ব্লিঙ্কেনে কিছু মুখ্য ভাব-শব্দ তুলে আনছি। মুখ্য শব্দগুলোর দিকে খেয়াল রাখলেই মূল বক্তব্য বুঝা যাবে। যেমন –

    এক. ইউনিভার্সাল ভ্যালু [ …… Beijing’s vision would move us away from the universal values]; ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার, ইন্টারন্যাশনাল রুল বেজড অর্ডার [we will defend and strengthen the international law, agreements, principles, and institutions that maintain peace and security] ;

    দুই. ইকোনমিক অর্ডার, ইন্টারন্যশনাল ল, প্রিন্সিপাল ও প্রতিষ্ঠান;

    তিন. রাশিয়ার সাথে চীনের অ্যালায়েন্স [……potential security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia. ] ইত্যাদি।

    এসব কিছুর সার কথা একটাই – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত যেন আমেরিকার নেতৃত্বে জাতিসঙ্ঘ ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি যেসব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল চীন এগুলোর কেউ নয়। এ-সংক্রান্ত সব মূল্যবোধ ও ইউনিভার্সাল মূল্যবোধের বাইরে চীন।

    তা হলে ব্লিঙ্কেন এখন কী করবেন?
    তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীন হল একমাত্র দেশ যার আন্তর্জাতিক অর্ডার বদলে ফেলার ইচ্ছা ও সামর্থ্য আছে- যে সামর্থ্য বলতে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, কূটনীতিক, সামরিক ও টেকনোলজিক্যাল সব বোঝায়। কিন্তু চীনের আর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ এক নয়।’ [……“China is the only country with both the intent to reshape the international order and, increasingly, the economic, diplomatic, military and technological power to do it,” ]

    তা হলে ব্লিঙ্কেনের প্রতি এখন প্রথম প্রশ্ন হল, যদি চীন আর আমেরিকার মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মূল্যবোধ বা কাম্য ও প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ার নিয়ম-শৃঙ্খলা বা গ্লোবাল অর্ডারে মিল না থেকে থাকে তা হলে চীনের সাথে আমেরিকার এত দিন চলল কী করে? জাতিসঙ্ঘ গঠন হতে পেরেছিল কী করে? যদি ধরে নেই চীন (মাওয়ের চীন) পরে এসেছে, তবু জাতিসঙ্ঘের জন্মের থেকে সবচেয়ে প্রবল্ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সক্রিয় সদস্য ছিল। কিন্তু তাই বলে কী লুটেরা কলোনি মাস্টার (বৃটিশ-ফরাসির) ইউরোপ নিশ্চয় সেকালের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মূল্যবোধ ও অর্ডার-শৃঙ্খলা (ব্লিঙ্কেন কথিত) কায়েমের পক্ষে বা দোস্ত ছিল না। তা হলে এর পরেও সেকালের রুজভেল্ট একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকেই গোনায় ধরে গ্লোবাল অর্ডার সাজাতে হয়েছিল? তা হলে আজ অন্য যে কারও প্রতি বাইডেনের এত বিতৃষ্ণা কেন? এর সাফাই কই??  রুজভেল্ট কী জানতেন না যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন পাক্কা কমিউনিস্ট ছিলেন? তবু ব্লিঙ্কেন সাহেব আজ যে মুল্যবোধের বড়াই অমিল দেখছেন তা রুজভেল্ট আমলই করেন নাই। তা করলে তো জাতিসংঘের জন্মই হওয়ার কোন কারণ নাই। আর তা হয় নাই। কাজেই ব্লিঙ্কেন অবশ্যই অর্থহীন কথা বলছেন! মূলকথা রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও তাঁরা একসাথে জাতিসংঘ গঠন করেছিলেন। আর আজ ব্লিঙ্কেন নয়া বৈরাগী হতে চাইছেন, মুল্যবোধ বুঝাবুঝির তর্ক উঠিয়েছেন!!!

    আবার চীনের কথায় আসিঃ  সত্তরের দশকে কিসিঞ্জারের আমেরিকা ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের স্বার্থসহ দুনিয়ার সব মূল্যবোধকেই পায়ে দলে চীনের মন পেতে কি গোপনে বেইজিং ছুটে যাননি? তখন সেটা কি আমেরিকার বৈষয়িক স্বার্থের ভিত্তিতে বাকি সবভুলে পা ফেলা ছিল না? তা হলে তখন আজকের তোলা মূল্যবোধের কথা কোথায় ছিল? ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক মিটিংয়ে মাওয়ের চীনকে ভেটোক্ষমতাসহ সদস্যপদ ফিরে দেয়া হয়।  আবার টানা সাত বছর (১৯৭১-৭৭) চীন-আমেরিকার নেগোসিয়েশন চলেছিল – উভয় উভয়কে যা কিছু সব বুঝে নেবার যথেষ্টের চেয়েও অতিরিক্ত সময়  দিয়েছিল। এই হিসাব শেষে ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু হয়েছিল। তা হলে তখনকার আরো কড়া কমিউনিস্ট চীনকে সহ্য হলে এখন লিবারেল চীনকে অসহ্য লাগা শুরু হবে কেন? আমেরিকান পুঁজি ওয়াল স্ট্রিটের সেকালে অবাধে চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায়, চীন অনুমতি দেয়ায় যদি তখন চীনকে ভালো মনে হয়ে থাকে – মূল্যবোধে কোনো সমস্যা না দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে এখন এমন কী ঘটেছে সেটা অবশ্যই বাইডেন-ব্লিঙ্কেনকে আগে স্পষ্ট বলতে হবে। সুপ্রিমিজম করতে দেয়া হবে না।
    আবার আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ইস্যুতে যদিও চিয়াংকাইশেকের জাতিবাদী চীন ১৯৪৫ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য।  কিন্তু ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব হয়ে যায় মূল চীন ভূখণ্ডে। চীন জাতিসঙ্ঘেরও সাধারণ সদস্য ছিল না তখন। পরে ১৯৭১ সালে তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মূল চীন (জাতিসঙ্ঘ জন্মের সময়ের )ভেটো-ওয়ালা সদস্যপদ ফিরে পেয়েছিল। আর একইভাবে চীন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় মেম্বার হয়েছে ১৯৮০ থেকে। এমনকি মাওয়ের চীন, মূলচীন ডব্লিউটিওয়ের সদস্যপদ নেয় আরো পরে, ২০০১ সালে। তা হলে জাতিসঙ্ঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের ইন্টারন্যাশনাল মূল্যবোধ না বুঝে থাকাটার আর কি চীনের বুঝতে বাকি ছিল? আর মুল্যবোধ বুঝা নিয়ে কোন সময় কোন আপত্তি আমেরিকা তুলে নাই কেন? মুখ খোলার আগে ব্লিঙ্কেন কী এতটুকু বুঝেন নাই কথা বুঝে বলতে হয়!!! গুছিয়ে মিলিয়ে কথা বলতে হয়!!

    আসলে এসব প্রশ্নের উত্তরে ব্লিঙ্কেনের খবর নেই। যেন তাদের কথা একটাই, তাদের সাদা চামড়ার নেতৃত্ব দুনিয়াতে তাদের স্থায়ী করে দিতেই হবে। না হলে চীনা মূল্যবোধ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলতেই থাকবেন???

    সবশেষে, ব্লিঙ্কেন  সম্ভবত বুঝেছিলেন তারা কথার মেরুদণ্ড নেই – খামোখা কথা বলছেন। তাই এবার তিনি বলে বসেন, “চায়নার বন্ধু রাশিয়ার’ হুমকিতে তারা ভীত [security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia]। অতএব, এটা চীনের দায়। ইউক্রেনের যুদ্ধও চীনের দায়!
    এক কথায় বললে, সাদা চামড়া সুপ্রিমিজম, জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর আওয়াজ তুলে এভাবেই ডুবে যাবে বাইডেনের আমেরিকা!! এ’ভিন্ন কোন পরিণতি নাই!

    বাইডেন আসলে কোথায় যেতে চাইছেন? কোন বাস্তবোচিত কোন চিন্তা তিনি করতে পারতেছেন তা মনে হয় না। তবে খুব সম্ভবত বাইডেন-ব্লিঙ্কেন-জ্যানেট এদের যে এক অলীক কল্পনাটা আছে সেটা খুব সম্ভবত এই যে, কোল্ডওয়ার যুগের মত মুখ্যত, একটা মূল আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া আরেকটা বাকিদের ব্লক এর বাইরে; এমন দুটা ব্লকে দুনিয়া ভাগ করা। এমন শখ বা কল্পনা অনেকের মধ্যেই প্রায় দেখা যায়। কিন্তু হার্ড ফ্যাক্টস হল, দুনিয়াতে আর কখনও দুই অর্থনৈতিক ব্লক ফিরে আসবে না। চাইলেও ফেরা যাবে না।  দুনিয়ায় ফিরে আসবে না। মূল কারণ, আমরা এখন (১৯৯১ সালের পর থেকে) সব দেশই একই  আইওএমএফ কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া চালু করে ফেলেছি। আমরা  আইওএমএফ বদল করে আরেকটা আইএমএফ বানাতে পারি, নামে বদল হিসাবে। কিন্তু আইএমএফ টাইপের কিছুই বানাবো না এটা হবে না। আর যেমন এক ঘরে দুটা পীর থাকতে পারে নাই, তাই দুনিয়াতে একসাথে দুটা ‘আইএমএফ’ থাকবে না।  মূলকথা, সকলকেই একই আইএমএফ (ধরণের প্রতিষ্ঠান) এর এবং এমন একটাই প্রতিষ্ঠানের সবাই সদস্য এভাবে – হয়েই থাকব!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৪ জুন  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ট্রাম্প ও বাইডেন, সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    গৌতম দাস

    ২৩ এপ্রিল ২০২২, ২০:৫৫

    https://wp.me/p1sCvy-439

     

    কেন শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বলে ভারতের আমলারা মোদিকে সাবধান করলেন?

    –
    প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর দুই ডজন সচিব নিয়ে চার ঘন্টা ধরে এক মিটিং করেছেন। বিষয় হল, ভারতের নাকি শ্রীলঙ্কার মত অর্থনৈতিক অবস্থা হতে পারে বলে তার সচিবেরা মোদিকে সাবধান করেছেন। খবরটা করেছে ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই [PTI]। যা ছাপিয়েছে অনেক মিডিয়াই। এমনই  এনডিটিভি-এর খবরটা এখানে দেয়া হল [States’ Freebies Flagged To PM With Lanka-Like Crisis Warning: Report]।
    কথা হল, একালে চীন নাকি খারাপ খারাপ ঋণ গছিয়ে সবার অর্থনীতিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে চলছে – একথা, এতদিন বলে প্রপাগান্ডার রাজা ভারত  চলছিল। সর্বশেষ এমনকি বাংলাদেশেও নাকি এর শিকার বলে কেউ কেউ নিউজ বা ইউটিউব ক্লিপ তৈরি করে প্রচার করছিল।। আজ, তাহলে এত সাবধানী খোদ সেই ভারতকেই আবার “ঋণের ফাঁদে” ফেলল কে? এটা তো একেবারে নিজের ফাঁদে নিজেই পড়া!   এতো দেখা যাচ্ছে এটা হল – মিথ্যা করে, বাঘ আসছে বাঘ আসছে বলে গ্রামবাসীকে উত্যক্ত করা রাখাল বালকের ঘটনা। আর এনিয়েই এবারের প্রসঙ্গ।

    শ্রীলঙ্কা গত কয়েক মাস ধরে হেডলাইনে, কারণ তার দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ প্রায় শূন্য, কোনো বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে প্রায় নাই। অবস্থা এতই করুণ যে, যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন স্কুল-কলেজের স্টুডেন্টদের লিখার কাগজ যা শ্রীলঙ্কা আমদানি করে চলে তা এখন কেনার মত বৈদেশিক মুদ্রাও তার হাতে নাই। ফলে স্কুল-কলেজে পড়াশুনা লাটে উঠেছে। এছাড়া আমদানি করা খাদ্যের বেলায় সমস্যা আরো ভয়াবহ। সব মিলিয়ে এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে।

    আর এই সুযোগেই কিছু প্রো-আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট মাঠে নেমে পড়েছে। তারা এটাকে চীনবিরোধী ক্যাম্পেইনের এক সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। এমনকি বাংলাদেশ নিয়েও – আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট যারা চীন বিরোধিতা করে থাকে তারাও কিছু আর্টিকেল বা ইউটিউব কনটেন্ট ছড়ানো শুরু করে দিয়েছে যেখানে কোনো ফ্যাক্টস ফিগারের বালাই ছাড়াই তারা বলছে যে বাংলাদেশেও নাকি শ্রীলঙ্কা হবে? আপনি হাসিনা সরকারের-বিরোধী তাতে তো কোণ সমস্যা নাই। কিন্তু তাই বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে  জিতবেন?? কতদুর যাবেন? এভাবে জেতা যাবে না। কিন্তু এটাই চলছে। যদিও এখানে এই লেখার গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এসব প্রপাগান্ডিস্টদের কবল থেকে প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা, যদিও তা ঠিক তাদের বিরোধিতা করে নয়। কারণ পক্ষ-বিপক্ষে প্রপাগান্ডা, যারা এ নিয়ে বাঁচতে চায়, কিছু কামাই করে চলতে চায় তারা তা করবেই। তাহলে ‘প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা’ বলতে ঠিক কী করতে চাই?

    গত কয়েক বছর ধরে যারা এই ক্যাম্পেইন ‘মাস্টার’, তারা যে ভাষ্যের ওপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করেছে তাদের একটা বড় অংশ হল বলা যায় যারা একেবারে  যেকোন ঋণ-গ্রহণের বিরোধি। এককথায় এরা নিজেদের প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশ এক ধারা বলে নিজেকে ভাবে। এরা মুল প্রপাগান্ডিস্ট নয়, তবে এদের ভাষ্য-অবস্থান চীনবিরোধী আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট্দেরকে সহায়তা যোগায় যেহেতু এদের বয়ান মুল প্রপাগান্ডিস্ট্দের সহায়তা করে।  এই মূল প্রপাগান্ডিস্টদের  মানে হল, কিছু প্রপাগান্ডা বক্তব্য যেমন, “চীন ফাঁদে ফেলে কোনো দেশকে অতিরিক্ত ঋণ গছিয়ে দিয়ে থাকে। তাই এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে”। তাই এই প্রপাগান্ডাকে তারা শিরোনামে বলে থাকে – ‘ডেট ট্রাপ’ [debt trap] বা ‘ঋণের ফাঁদ’ বলে। যেন চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে এক নম্বর বা সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এসব ছেচরামি করেই!!! এই হল এদের প্রপাগান্ডা বা চীনকে নিচা দেখানোর এক করুণ কায়দা!!  এতে ভাবনাটা অনেকটা ছেলে ধরার গল্পের মত যে, এশিয়ার দেশগুলো – এই তোরা আর বাইরে যাস না, চীনের ‘ঋণের ফাঁদ’-এ পড়বি!!!! তাই, তোরা ভারত-আমেরিকা ছুয়ে থাক!!
    আচ্ছা, কোন দেশকে অতিরিক্ত ঋণ দিয়ে ডুবিয়ে চীনের মত দেশের কী লাভ? এটা কী আসলেই কোন লাভ? শেষ বিচারে যখন কোন দেশ ঋণের সমস্যায় পরে যায় তাতে ক্ষমতাসীন সরকারের ইমেজ ক্ষুব্ধ পাবলিকের সামনে কোনভাবে কী আর কোন কাজে লাগে? পক্ষে যায় না যেতে পারে??

    গরীব অর্থনীতির দেশ “ঋণ না নিয়ে” চলে না কেনঃ
    আমরা পছন্দ করি বা না-করি ফ্যাক্টস হল, আমাদের মত দেশে নতুন কাজ সৃষ্টি করতে গেলে যে নয়া বিনিয়োগ লাগে তা যোগানোর মুরোদ আমাদের অর্থনীতির নাই। কাজ সৃষ্টির প্রয়োজনটা আমাদের না বুঝার কিছু নাই যে কোন নির্বাচিত সরকার অন্যতম কাজ হচ্ছে কর্মক্ষম জনগণের জন্য কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু তাই বলে কাজ সৃষ্টি করতে গেলে তো অর্থনীতিতে যে নয়া বিনিয়োগ লাগবেই তা দেশের অর্থনীতিতে থাকবে না কেন? বিনিয়োগ অন্য কোথাও থেকে আনতে হবে, অন্য দেশ দিবে ইত্যাদি  – এই ব্যাপারগুলো কী স্বাভাবিক? জবাব হল, না একেবারেই তা স্বাভাবিক নয়। বরং একেবারেই তা উল্টা। অর্থাৎ প্রত্যেক দেশের অর্থনীতিই তার দেশের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ যা আসলে “অর্থনীতিতে পুরানা সঞ্চিত সম্পদ” তা আসলে নিজেই উতপন্ন ও জমা-সঞ্চয় করতে সক্ষম থাকে। তাহলে প্রশ্ন হল আমাদের মত দেশের তা নাই কেন? কেন বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনতে হয়? এমনকি তা দুই ধরণের বিনিয়োগই – অবকাঠামোতে (infrastructure) বিনিয়োগ আর ব্যবসা-কারখানায় বিনিয়োগ (FDI) –  যা অন্যদেশ থেকে আনতে হয়। তা বিদেশ থেকেই আনতে হয়, কেন?

    প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশের মধ্যে এমন মনোভাব আছে যে ঋণ নেয়া হারাম!! কেন?
    এর জবাব আমরা সবাই জানি কিন্তু খেয়াল করি নাই। মূল কারণ ইউরোপের হাতে আমাদের কলোনি দখল হয়ে যাওয়া। আমরা বৃটিশদের হাতে কলোনি দখল হয়ে গেছিলাম বলে তাঁরা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ব সব সম্পদ লুটে তা পাচার করে তাঁরা নিজ দেশে নিয়ে গেছিল, দুশ বছর ধরে লাগাতর। আজও আমাদের দেশের বিনিয়োগের অর্থ সংকটের মুল কারণ এটাই।  এতে আমাদের দেশ পরবর্তিতে এক চরম বিনিয়োগ পুঁজি সংকটে পড়েছিল বিশেষত ১৯৪৭ সালে বৃটিশ কলোনি দখলের অবসান হয়ে যাওয়া সত্বেও। এখান থেকেই এরপর থেকে আমরা চাই বা না চাই বিদেশ থেকে বিনিয়োগ পুঁজি নিতে আমরা বাধ্য হয়ে যাই।
    কিন্তু তাতেও নতুন সমস্যা বাধে বা তৈরি করে আমাদেরই কিছু  (প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট) লোকের মাথায় “পুঁজি জিনিষটাই খারাপ” – এই ধারণা “মাথায় গেথে বসে” থাকায়। এদেরকেই আমরা প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট বলেই চিনি। পুঁজি নাড়াচাড়া করা, পুঁজির ততপরতায় জড়ানো, ব্যবসা করা ইত্যাদি কাজকে ধর্মে পাপের যে ধারণা সে চোখে যেন পাপ মনে করে বা পাপের চোখে দেখে থাকে।  অথচ ব্যবসা করা মানে তো পুঁজির ততপরতা তাই এটা পাপ ও হারাম ধরণের কাজ যেন!
    অথচ দেশে অর্থনৈতিক ততপরতা না চললে মানুষ খাবে কী? না কাজ পাবে না খাবার কিনতে পেতে পারে। যদিও এর একটাই জবাব তাদের কাছে আছে যে একমাত্র তাদের কথিত এক সমাজতন্ত্র চিন্তা যার সারার্থ তাদের কাছে – কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় উতপাদন চলতে দেয়া হবে!! এটাই একমাত্র “সহি’ অর্থনৈতিক ততপরতা। যেন এটাই তাদের ধর্ম অনুসারে একমাত্র সহি ততপরতা। এর উদাহরণ হাতের কাছেই পাবেন। বাংলাদেশের প্রথম সাড়ে তিন বছরের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিনের নেতৃত্বের অর্থনীতি অথবা ভারতে নেহেরু নেতৃত্বে কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যা ১৯৯০ সালে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে পর্যন্ত থামে নাই বা কোন সংস্কার-বদল ঘটে নাই। চরমতম “ব্যালেন্স অপব পেমেন্টের” ঘাটতিতে [মানে বৈদেশিক রিজার্ভের ঘাটতি থেকে ভাঁড়ার শুণ্যে করার দিকে যাত্রা] পরে শেষে এটা বিশ্বব্যাংকের চরণে হামলে পড়েছিল, ঐ ১৯৯০ সালে! বাংলাদেশেও তাই হয়েছিল। অন্যভাষায় এটাকে আমরা প্রচলিতভাবে বলি “চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ”। যার প্রধান এবং কমন ফেনোমেনা হচ্ছে – বৈদেশিক রিজার্ভ শুণ্য হয়ে পড়া। তাই কোন খাদ্য আমদানিরও মুরোদ না থাকা। আজকের শ্রীলঙ্কাতেও সেটাই ঘটেছে। আর তাতে আমাদের দেশে তখন হতাশ শেখ মুজিব তাজউদ্দিনকে ফেলে পাশে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি কিসিঞ্জারের সাথে কথা বলেন আর বিশ্বব্যাংকেও তদবীর করে আসেন ঐ চুয়াত্তরেই সেপ্টেম্বরের শেষে। কিন্তু সেই সাহায্য ও নীতিগত সংস্কারের সুবিধা বাংলাদেশে শুরু হবার আগেই তিনি পরের বছর (১৯৭৫) খুন হয়ে গেছিলেন। মোটামুটি ছিয়াত্তর সালের শুরু থেকেই প্রথম আমরা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও ফান্ড পাওয়া শুরু করেছিলাম।
    তাই মূলকথাটা হল, চোরে আপনার বাসার সব থালাবাসনও চুরি করে নিয়ে গিয়েছে বলে চোরের উপর রাগ করে বা “পাপমুক্ত থাকতে” কিংবা জিদ পুরা করতে আপনি আর মাটির সানকি থালাও না কিনে মাটিতে ভাত রেখে খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন না। এটা এথিকস পালন করার কোন কায়দাও না। বরং এটা সোজাসাপ্টা স্টুপিডিটি; অক্ষমের বাস্তববোধহীনতা!!!  তাহলে ঠিক কী বলতে চাচ্ছি?

    বলতে চাচ্ছি যে ইউরোপ বা পশ্চিম যারাই আমাদের সম্পদ লুটে চুরি করে নিয়ে গেছে তারাই একালে (১৯৪৫ সালের পর থেকে) যেন সেই সম্পদের কিয়দংশ  ফেরত দিতে চায়, যেটাকে তারা ঋণ বলছে! আর এরই অর্গানাইজেশনাল রূপ পদ্ধতির একটা সিস্টেমের নাম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক।  সোজা করে বললে এরা বিনা-সুদের অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে নামমাত্র সুদের (০.৭৫% বা, ১% পার্সেন্টের নিচে) ঋণ (যা আবার লম্বা ৪০ বছর ধরে পরিশোধযোগ্য)। আর এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অন্যদিকে প্রাইভেট কোম্পানির গ্লোবাল পুঁজি বাজার সর্বোচ্চ ৮% সুদে  বিভিন্ন ঋণ পাবার দিবার সুযোগ এসব প্রতিষ্ঠান করে থাকে।  তবে সাবধান প্রপাগান্ডায় পরা যাবে না। বিশ্বব্যাংকের কোন ঋণেই ৪% এর বেশি সুদ হয় না। আর প্রাইভেট কিন্তু গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সুদের হার সর্বোচ্চ ৮%  যা আমাদের মত দেশের জন্য দেখা গেছে ৬% এর বেশি নয়। তবে এটা একটা কাফফারা অবশ্যই। সেই সাথে আরো আছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্বভাবতই আমেরিকা বা পশ্চিমের স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে চলা সংগঠন; তা মিথ্যা নয়। তাই এর জ্বালা ও আমাদের স্বার্থহানি ঘটা বা সময়ে বড় প্রতিবাদ না করতে পারার মনকষ্ট আমাদের মত দেশের সেখানে আছে। যদিও সে কষ্টেরও একটা শেষ যেন আছে। যেমন এখনকার বাংলাদেশের ইচ্ছা (ক্ষমতাসীনদের)  অনুসারে কোন ঋণ কিভাবে নিবে অথবা একেবারেই নিবে না কিনা অথবা দেয়া শর্ত কবুল করবে বা না করবে ইত্যাদি আমরা বাছাই করার সামর্থে পৌছেছি। এছাড়া এমন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানও এখন একের অধিক হয়ে গেছে। কিন্তু কমিউনিস্ট গোয়ার্তুমি ছেড়ে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের কাছে এটা এথিক্যাল প্রশ্ন বা অবস্থানের ইস্যুই নয় যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ভাল না মন্দ। বরং এটা মন্দের ভাল, কিছুই না থাকার চেয়ে। আসলে এটা একটা খারাপ বাস্তবতাতে সেখান থেকে উঠে আসতে আমাদের বুদ্ধিমান কোন কম্প্রোমাইজ ও সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই আমাদেরকে বের  আজ হয়ে আসতে পারার অবস্থায় পৌছাতে হয়েছে।  তাই কোন পুঁজির ততপরতা খারাপ কিনা, ব্যবসা হারাম কিনা ইত্যাদি বিবেচনা করে – সারকথায় বিদেশি পুঁজি নেওয়া যাবে না এমন অলীক ভাবনা – এটা সবসময় আসলে অর্থহীন প্রলাপ। কিন্তু এই প্রলাপ বয়ানের উপর ভর করেই  আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্টেরা একালে রাজত্ব জমিয়েছে আর  চীনের তথাকথিত ঋণের ফাঁদের গল্প আমাদের শুনিয়েছে।  যেন কমিউনিস্টরা এবার বলতে চায় বলেছিলাম না বিদেশি ঋণ খারাপ জিনিষ!! আর ওদিকে প্রপাগান্ডিস্টেরা বলতে চায় যেন চীনা ঋণ হলে তা খারাপ আর আমেরিকান বা ইন্ডিয়ান ঋণ  আমাদেরকে দিলে অথবা  এ’দুই দেশ নিজের জন্য গ্লোবাল বাজার থেকে নিলে সেগুলো ভাল ও হালাল!!!  অবশ্য একটু পরেই আমরা দেখব খোদ আমেরিকা বা ভারত রাষ্ট্র নিজেরা নিজেদের বেলায় বৈদেশিক ঋণ কিভাবে নিয়েছে!

    চীনা ঋণের ফাঁদের প্রপাগান্ডা বয়ানের যুগেঃ
    বাস্তবে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর গড়া নিয়ে চীনের ঋণ নেয়ার এত কথা প্রথম প্রচারে এসেছিল। সেই বন্দর প্রকল্প পরে কার্যত শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে আর কোনো বোঝা হয়েই দাঁড়ায় নায়। কারণ, পরের প্রো-ইন্ডিয়ান সরকারের আমলেই  ঐ সরকার চীনের সাথে কথা বললে চীন এক সহজ সমাধান করেছিল। তা হল, পুরো প্রকল্পটাকে এক চীনা প্রাইভেট কোম্পানি কিনে নিয়েছিল, তাতে চীনের ঋণ পরিশোধের দায়ও ওই পোর্ট ক্রেতা নয়া কোম্পানির, তাতে শ্রীলঙ্কা সরকারকে কোনো ঋণের দায় আর বইতে হবে না, পরিশোধ করতে হবে না। চীনা সরকার এই ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিল। ফলে শ্রীলঙ্কা সরকারের কোন অর্থনৈতিক দায় আর ছিল না। ফলে এই পোর্ট প্রকল্প থেকে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে চাপ ফেলা জাতীয় কোনো প্রভাবের আর বালাই থাকেনি। অর্থাৎ পোর্ট প্রপার্টিটাই আর সরকারের থাকেনি। বরং যেকোন প্রকল্পের মোট মূল্যের প্রায় ২৫-৩০ ভাগ মালিকানা হোস্ট দেশের এমনিতেই পেয়ে যায় কোনো বিনিয়োগ করা ছাড়াই। কারণ প্রকল্পকে দেয়া জমি বা অবকাঠামো দেয়ারও একটা মূল্য ধরা থাকে বলে সরকার কোনো অর্থ খরচ না করেই তেমন প্রকল্পে ২৫-৩০ ভাগ মালিকানার ভাগ পেয়ে যায়। ফলে চীনা ওই প্রাইভেট কোম্পানি এখন হাম্বানটোটা পোর্টের বাকি অংশ, প্রায় ৭০ ভাগের মালিক। কিন্তু সেই থেকে তবু প্রপাগান্ডা আর কখনো বন্ধ হয়নি – আর তা থেকে ‘হাম্বানটোটা’ আর ‘চীনের ঋণের ফাঁদ’ এ দুই শব্দ থেকে যায় জব্বর প্রপাগান্ডা শব্দ হয়ে।

    তাহলে এই লেখা থেকে আমরা ঠিক কী করব? কী জানব?
    এসব প্রপাগান্ডার সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তিমূলক দিক যেটা তা হল, এই প্রপাগান্ডা বলতেই পারে না যে কোন দেশ কী পরিমাণ ঋণ নিলে তা ‘ঋণের ফাঁদ’ হয়ে যায়? (এক কথায় কোন দেশের জন্য কত দূর ঋণ নেয়া সেফ [safe]? তা কি আগাম জানা যায়? তা মাপার কি কোনো স্টান্ডার্ড আছে?) নাকি চীনা বা বিদেশী ঋণ মাত্রই ‘ঋণের ফাঁদ’? প্রপাগান্ডিস্টরা এটা কোনদিন পরিষ্কার করে বলে না, উহ্য রেখে পাশ কাটিয়ে থাকে? অর্থাৎ কোন দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান কী ও সেফ ঋণ নেওয়ার স্টান্ডার্ড কী তা হাজির না করেই এরা দাবি করতে থাকে চীনা ঋণ নেয়া একটা ফাঁদ! এই হলো এসব প্রপাগান্ডার কৌশল। এমনকি আমেরিকান প্রশাসন যে প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল এমন একটা রিপোর্ট হল এখানে।   এই রিপোর্টেও এ দুই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, পাশ কাটিয়েছে। তাদের ছাপানো কোনো প্রপাগান্ডা আর্টিকেলেও এ নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। বরং এটা আমেরিকান চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক অবস্থানের পক্ষে সাফাই বক্তব্য। যা ঠিক ঋণ নেয়া প্রসঙ্গে অর্থনীতি-নির্ভর ব্যাখ্যা নয়।
    এমনকি পরবর্তিতে এসব প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এক ডাচ কনসাল্টেন্টের রিপোর্ট ওই দাবি নাকচ করে আর্টিকেল ছেপেছিল যদিও সেখানেও ঋণ নেয়ার স্টান্ডার্ড কী, কত দূর ঋণ নেয়া সেফ আর আলোচ্য দেশের পরিসংখ্যান গত ফ্যাক্টস কী তা নিয়ে কোনো আলাপ করা হয়নি সেখানে। এতে সবার বক্তব্যই হয়ে গেছে শেষ বিচারে এক আন্দাজি কথাবার্তা বা সরাসরি প্রপাগান্ডা অথবা এসব প্রসঙ্গ থেকে দূরে অন্য প্রসঙ্গের বক্তব্য। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য ও প্রসঙ্গ হলঃ কোন দেশ নিজ অর্থনীতিতে কী পরিমাণের বেশি বিদেশী ঋণ নিয়ে ফেললে তা রিস্কি হওয়া শুরু হতে পারে, এ নিয়ে একটা গবেষণা স্টাডির ফলাফল পাঠকের সাথে সহজ ভাষায় আলাপ করা, শেয়ার করা।

    এনিয়ে বিশ্বব্যাংকের স্টাডি রিপোর্টের ফাইন্ডিংস কী বলেঃ
    সৌভাগ্যবশত এটা কোন খামখেয়ালি কথা নয়; গবেষণা, অবজারভেশন আর স্টাডি থেকে বাস্তবে পাওয়া রেজাল্ট। এই গবেষণাটা করেছিল বিশ্বব্যাংক এবং তা টানা ১৯৮০-২০০৮ এই ২৮ বছরের ডাটা নিয়ে। আর তা ১০১টা দেশের অর্থনৈতিক ডাটা নিয়ে যাদের মধ্যে গরিব ও ধনী উভয় ধরনের দেশই ছিল।
    কোন দেশের রাষ্ট্রীয় ঋণ পরিমাপ করার এক প্রচলিত পদ্ধতি হল তা ওই দেশের জিডিপির কত অংশ বা অনুপাতে কত তা জেনে নিয়ে প্রকাশ করা। অর্থাৎ ওই দেশের নেয়া মোট ঋণ, মোট জিডিপির কত অংশ সে অনুপাত সংখ্যা দিয়ে। যেমন যদি বলা হয় একটা দেশের ঋণ ৭৭%। তাহলে এ কথার মানে ওই দেশের জিডিপির ৭৭% – এই অঙ্কই হল ও দেশের নেয়া মোট বিদেশি ঋণ। আসলে এটাই ও দেশের ঋণ-বনাম-জিডিপির অনুপাত। যদিও বিভিন্ন দেশের মোট ঋণ সংক্রান্ত ডাটা পড়তে গিয়ে সাবধান! মোট ঋণ বললে রাষ্ট্র আভ্যন্তরীণ ভাবে নিজ কারেন্সিতে যে লোন নিয়েছে সেটাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে তাতে। তাই পরিস্কার করে বলতে ও বুঝতে হবে যে আমরা কোন দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রায় নেয়া ঋণ আমাদের আলোচ্য বিষয়।

    এই হিসাবে এই গবেষণায় পাওয়া ফাইন্ডিংস হল, কোনো দেশের নেয়া রাষ্ট্রীয় ঋণ ঐ দেশের জিডিপির ৭৭% বেশি হলে বা ছাড়িয়ে গেলে তা বিপদ জোনে প্রবেশ করেছে মনে করা হবে। তবে এই হিসাব সব্দেশের বেলার জন্য নয়। এতা কেবল অগ্রসর অর্থনীতির দেশের (যেমন জি৭ গ্রুপের দেশ [G7 countries]) বেলায় যারা পুরনো ও বড় অর্থনীতির দেশ বলে অনেক ঘাত সইবার সক্ষমতা থাকে।

    আর এর পরের ক্যাটাগরির মানে যাদেরকে উদীয়মান [Rising Economy] অর্থনীতি (যেমন জি২০ গ্রুপের দেশ) বলে, এদের ক্ষেত্রে টিপিং পয়েন্ট [Tipping point] বা বিপজ্জনক জোনে প্রবেশ ধরা হয় বা ঋণ-জিডিপি অনুপাত হল তাদের ৬৪% এর বেশি তা ছাড়িয়ে গেলে।

    এই হলো, বিশ্বব্যাংকের ওই গবেষণা ফলাফল থেকে পাওয়া ফলাফল। তাই তখন থেকে এটাই বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে মানা হয়। এই বক্তব্যগুলো পাওয়া গেছে ‘টিপিং পয়েন্ট খোঁজা কখন রাষ্ট্রের নেয়া ঋণ খারাপ ঋণে পরিণত হবে’[Finding The Tipping Point — When Sovereign Debt Turns Bad] এই শিরোনামে পাওয়া গবেষণা ফলাফল থেকে, যা বিশ্বব্যাংকের লাইব্রেরিতে রক্ষিত। আর ‘টিপিং পয়েন্ট’ বলতে সহ্য সীমা বা ভেঙে পড়ার আগের বিন্দু বুঝা যেতে পারে।

    তাহলে আমরা এখন আন্দাজে মন গড়া কথা বলে, যাকে দেখতে পারি না তার বিরুদ্ধে কথা বলা প্রপাগান্ডা থেকে চাইলেই বের হয়ে আসতে পারি। কারণ অন্তত বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে একটা কিছু আমাদের হাতে আছে। কোনো স্টান্ডার্ড মানে কোনো ধরনের মাপকাঠি যেটা ছাড়াই চীনবিরোধী প্রো-আমেরিকান বা প্রো-ইন্ডিয়ান হয়ে ইচ্ছামতো খামখেয়ালি প্রপাগান্ডা থেকে আমরা এখন চাইলে বের হয়ে আসতে পারি।

    সাথে অন্য একটা কথাঃ  যদিও বিশ্বব্যাংকের ঐ রিপোর্টে দুধরণের দেশের ক্যাটাগরির কথাই বলা আছে। তবু অনেক মিডিয়া রিপোর্টে আরেকটা বা গরিব দেশের ক্যাটাগরির কথা বলতে দেখা যায় যাদের বেলায় নেয়া বিদেশী ঋণ নিজ জিডিপির ৪০% এর বেশি হলে সেটাকে “টিপিং পয়েন্ট” বলে দাবি করা হয়েছে। এই হিসাবেও বাংলাদেশে (যতগুলো উৎস থেকে দেখা যায় এর সবটাই) এখনো ৩১% এর নিচে আছে ; কোন কোন দাবিতে এটা ১৫% বলে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করেছেন অনেক মিডিয়া রিপোর্টে।। আর বাংলাদেশের মোট ঋণের মাত্র ৬.৮১% হলো চীনের ঋণ আর সবচেয়ে বড় দাতাটা হলো বিশ্বব্যাংকের; সেটা ৩৮%।

    According to the World Bank and the International Monetary Fund (IMF), that a country will cross the danger mark if its external debts exceed 40 percent of GDP ensures that Bangladesh is in the “safe zone,” as its total foreign loan is less than 15 percent of its GDP.

    কাজেই এটা পরিষ্কার আমরা দেখছি যে, তবুও চীনবিরোধী একটা প্রপাগান্ডার নহর এখনও বয়ে যাচ্ছে।

    টিপিং পয়েন্ট নিয়ে কিছু মজার তথ্যঃ
    বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, জি৭ ভুক্ত বড় অর্থনীতির আমেরিকার বেলায় তার ঋণের টিপিং পয়েন্ট হয় ৭৭%। কিন্তু সেই ১৯৪৬ সালেই মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যখন আমেরিকা একচ্ছত্র গ্লোবাল নেতা হিসেবে উঠে এসেছিল তখনই খোদ আমেরিকার টিপিং পয়েন্ট ছিল ১০৬% যার সোজা মানে এটা ৭৭% চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তা সত্বেও আমেরিকা সেকালে গ্লোবাল নেতাই ছিল এবং অন্য সব দেশকে ঋণ দেয়ার মূল উৎস ছিল এবং তা সরাসরি দ্বিপক্ষীয়ভাবে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে গেছিল।
    তবে এছাড়া আরো বড় ঘটনাটা হল, পরে আমেরিকার এই ঋণ-বনাম-জিডিপি অনুপাত কমতে থাকে। শেষ ১৯৭৪ সালের মধ্যে এটা নেমে মাত্র ২৩% হয়ে যায়।

    তাহলে এখন কত?
    পরে ১৯৮০ সাল থেকে আমেরিকার এই অনুপাত বা রিয়েল টিপিং পয়েন্ট আবার বাড়তে থাকে; ২০০৭ সালের গ্লোবাল মহামন্দার সময় আরো বাড়ে। আর ২০০৯ সাল থেকে এটা ৭৭% এর বেশি ছাপিয়ে তা বাড়তে শুরু করেছিল যেটা এখনো বৃদ্ধির দিকে। ২০২০ সালের সেকেন্ড কোয়ার্টারে এটা সর্বোচ্চ ১৩৫.৯% ( যদিও সারা বছরের গড় ১৩৪%) হয়ে আছে।
    এর মানে সারকথাটা হল,  বিশ্বব্যাংকের টিপিং পয়েন্টই শেষ কথা নয়; একটা স্টান্ডার্ড মাত্র। ফলে এটা ছাপিয়ে গেলেই সব ভেঙে পড়বেই এমনটা সত্যি নয়, তবে হতে পারে। আর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বড় অর্থনীতি হয়ে থাকার কারণে এসব দেশের ঘাত সহ্য ক্ষমতা বেশি, অভিজ্ঞতায় তাই দেখা গেছে।

    কোন দেশ সর্বোচ্চ অনুপাতেঃ
    ২০২০ সালের হিসাবে এমন দেশ হল ভেনিজুয়েলা। তার অনুপাত ছিল ৩০৪%। আমরা সবাই কমবেশি ভেনিজুয়েলার অবস্থা জানি। তার উপর আমেরিকান তেল অবরোধ দেয়া আছে সুদীর্ঘ সময় ধরে। ফলে সুনির্দিষ্ট কিছু দেশেই সে একমাত্র তেল বিক্রি করতে পারে এবং তা ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রাতেই কেবল। আর তেল বিক্রি করে যেটুকু বিদেশী মুদ্রা আয় করতে পারে। সে কারণে ভেনিজুয়েলার অনুপাত বা টিপিং পয়েন্ট অমন উঁচু। তুলনায় সেকেন্ড সর্বোচ্চ অনুপাত ছিল জাপান ২০৪%। আর আমেরিকা ছিল ষষ্ঠ প্লেসে, ১৩৪%। তাহলে বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড ৭৭% এখানে কার্যত অকেজো! কিছুই ভেঙ্গে পড়েনি বা ট্রিপ করে যায় নাই!!

    তাহলে প্রপাগান্ডিস্ট মোড়ল ভারতের কী অবস্থাঃ
    এশিয়ার সব দেশই ‘চীনা ঋণের ফাঁদে’ পড়ে ডুবে গেল – এই হল ভারতের প্রবল প্রপাগান্ডার মুলকথা। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় আবার আমেরিকার থেকেও ভারতের গলা বেশি উঁচু। তাহলে এই প্রসঙ্গে ভারতের নিজের কী অবস্থা? সে খবর নিতে হয়। ব্লুমবার্গ [bloomberg] আমেরিকার ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ মিডিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম। সে ভারতের কুয়িন্ট [QUINT] নিউজের সাথে খবর শেয়ার করে ও ভারতে খবর ছাপে। তাদেরই এক রিপোর্ট বলছে, ভারতের ঋণ বনাম জিডিপি অনুপাত ২০২১ সালে ৮৭.৮%। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাজেট ২০২২ রাষ্ট্রের ঋণ নামিয়ে আনতে হলে একটি শক্ত অর্থনৈতিক উন্নতি দেখাতে হবে [Budget 2022: Bringing Public Debt Down Requires A Strong Groth Path]।’ আর তাহলেই নাকি আগামী বছর এই অনুপাত কমে ৮৭.৪% হতে পারে। অর্থাৎ ভারতকে যদি রাইজিং অর্থনীতির দেশ গণ্য করি, তাহলেও ওর বিশ্বব্যাংক স্টান্ডার্ড অনুপাত হয় ৬৪%। অথচ এই  আইডিয়াল টিপিং পয়েন্ট বা  স্টান্ডার্ড থেকে  রিয়েল টিপিং পয়েন্ট ৮৭% , তা অনেক দূরের ফিগার অবশ্যই। তাহলে কোন সুখে ভারত সব দেশের বিরুদ্ধে লেগে সেখানে ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ খুঁজে ফেরে?

    তাহলে ভারতের শেষ অবস্থাটা কীঃ
    গত ৪ এপ্রিল ভারতের অনেক পত্রিকাতেই একটা নিউজ ছাপা হয়েছে। তা হলো, অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে মোদি তার দু’ডজন সিনিয়র সচিব বা কর্কমর্তাদের নিয়ে লম্বা ৪ ঘণ্টার এক মিটিং করেছেন। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, ‘বুরোক্রাটেরা মোদিকে লাল পতাকা দেখিয়েছেন এই বলে যে, শ্রীলঙ্কার মতো ক্রাইসিস ভারতেও দেখা দিতে পারে।’ তারা আসলে বলতে চাইছেন ভারতেরঅনেক রাজ্যে যেভাবে নয়া প্রকল্প নেয়া হচ্ছে তা ভাল হচ্ছে না। এতে বৈদেশিক অর্থের সঙ্কটে পড়বে ভারত। হিন্দুস্থান টাইমস এ নিয়ে একটি ভিডিও ক্লিপও বানিয়েছে। আর এতে ভারতে হইচই পড়া অবস্থা যে, তাহলে কি খোদ ভারতই এখন শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে? এর সাথে এক অসমর্থিত খবরও আছে। তা বলছে, সম্প্রতি মোদিকে বাইডেন যে ফোন করেছিলেন, রাশিয়া থেকে ভারত যেন তেল আর না কিনে এই ইস্যুতে, সেখানে ভারত বাইডেনের কথায় আসলে রাজি হয়েছে। কারণ, বাইডেন মোদিকে শ্রীলঙ্কা ধরনের অর্থনৈতিক ক্রাইসিস সামলাতে ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট দিতে কবুল করেছেন। ভারতের ৬১৪ বিলিয়ন বৈদেশিক ঋণ শোধে কিস্তি দেরিতে ফেরত দিতে ও সুদ কমাবার আবেদন করেছেন মোদি। এখন একথা কতটা সত্য তা জানা যাবে যদি আমরা দেখি যে ভারত আর রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে না!!
    এবার তাহলে ভারতকেও কোন চায়না ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারল!! এটা সত্যি এক তামাসার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে!
    তাহলে দাঁড়াল এই যে কার প্রপাগান্ডা কখন যে কাকে খায়? এখন প্রধান প্রশ্ন হল, তাহলে, ভারতকে ঋণের ফাঁদে ফেলল কে সে চীন?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারতকেই ঋণের ফাঁদে ফেলল কে! “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইউক্রেনঃ আমরা একা, কেউ জবাব দেয় না ভয় পায়

     

    ইউক্রেনঃ আমরা একা, কেউ জবাব দেয় না ভয় পায়

    গৌতম দাস

    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3WL

    –

        guide to the Ukraine-Russia crisis

     

    শেষ পর্যন্ত রাশিয়ান সৈন্য ইউক্রেন অভিযান শুরু করে দিয়েছে। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে এক ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালানোর জন্য নির্দেশ দেয়ার পরেই এই অভিযান শুরু হয়ে যায়। তিন দিক থেকে ইউক্রেনের উপর আক্রমণ শুরু হয়। গত কয়েক মাস ধরেই ইউক্রেন নিয়ে সামরিক উত্তেজনা চলছিল। একদিকে পশ্চিমা দেশ ও তাদের ন্যাটো জোট আর বিপক্ষে রাশিয়া – এভাবে হুমকি পাল্টা হুমকি চলার মধ্যেই এই সামরিক অভিযান এখন সত্যি হয়ে গেল। এই লেখায় পশ্চিমা দেশ বা শুধু পশ্চিমা বললে তা আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের মিলিত স্বার্থ বুঝাতে লেখা হয়েছে; যার আরেক প্রকাশ হল ন্যাটো জোট।

    বৃহত্তর দিকটা দেখে বললে, পুরান সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙে গিয়েছিল ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে। ভেঙে গেলে পরে তা  রাশিয়াসহ মোট পনেরোটা রাষ্ট্রে আপসে বিভক্ত হয়েছিল। ইউক্রেন ওই পনেরো ভেঙে-গড়া রাষ্ট্রের একটা। আর সেই থেকেই মূলত রাশিয়া বাদে ১৪ রাষ্ট্রকে নিয়ে আরেক ধরনের ভাঙা-গড়া শুরু হয়েছিল। আর সম্ভবত তার শেষ-কাণ্ডই এখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আলাদা আলাদা ১৫ রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে বাধাহীন  জন্ম নেয়ার পরেও তারা থিতু না হয়ে উল্টো অস্থিরতার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল মূলত কিছু বাইরের উপাদান এতে হাজির হওয়ার কারণে। সেই বাইরের উপাদান ছিল ‘পশ্চিমা দেশ’। অথবা অন্যভাবেই বলা যায় ন্যাটোকেন্দ্রিক পশ্চিমা দেশ এরা, তাদের ব্যাপক খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেসব মারাত্মক ভুলগুলো করেছিল তার মাশুল দেওয়ার শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া ধরনের ঘটনাটাই বোধহয় এবার ঘটল।

    রাশিয়ার ইউক্রেনকে তিন দিক থেকে ঘিরে ধরে আক্রমণ শুরুর মূল লক্ষ্য রাজধানী কিয়েভের পতন ঘটানো তাই সেই অভিমুখে; আর তা সাময়িক হলেও লক্ষ্য কিয়েভ দখল। পুতিন ঘোষণা করেই বলছেন, ‘ইউক্রেনকে ডি-মিলিটারাইজ [to demilitarise] করা’ মানে তার সব সামরিক সক্ষমতা বিনাশ করে দেয়া আর ইউক্রেনের মনে হিটলার-গিরির ভাবনা [“denazify”], মানে ইউক্রেনের উগ্র চরম জাতিবাদী অবস্থান ছেয়ে গেছে সেটা ছেঁটে দেয়া এই অভিযানের লক্ষ্য [ Putin said he had orderd the operation to demilitarise and “denazify” the country.]। ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রুশ আর্মি রাজধানী কিয়েভের প্রবেশ মুখ পার হয়ে গেছে। এখন কার্যত সবাই কমবেশি নিশ্চিত যে, পুতিনের রাশিয়া কবে ইউক্রেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে যাবে সেটা একমাত্র তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে [Putin’s ‘prerogative to decide end of Ukraine operation’]। তবে ইউক্রেনকে রাশিয়া নিজ দখলে নিয়ে নেবে এমন কোনো পরিকল্পনা এখানে নেই বলে জানা যাচ্ছে।

    তাই এটা অনেকটা, ১৯৬২ সালে চীনের ভারতে আক্রমণ করে পুরো নর্থ-ইস্ট (আসাম) দখল করে নেয়া, এরপর কয়েক দিন এটা দখলে রেখে নিজের সক্ষমতা কতদূর এর একটা ইমেজ প্রতিষ্ঠার পরে নিজ ইচ্ছাতেই আবার সেনা প্রত্যাহার করে চলে যাওয়া – সেরকম। আর পরে এরই প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় সে যাত্রায় ভারত হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল, আর নতুন করে চীনকে ভাব-ভালোবাসার মেসেজ পাঠানো এমনকি তার এক গালভরা নামও ছিল ‘পঞ্চশীলা নীতি’ [শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি] বলে। তাতে চীন-ভারত ‘ভাই ভাই’ হয়ে গিয়েছিল। এটা তেমনি একটা কিছুর দিকে যাবে হয়ত। অথচ মূল ঘটনা হল – মাওয়ের চীন সরকার আর দালাইলামার মধ্যে তিব্বতের স্বায়ত্বশাসন নিয়ে  মতভেদ দেখা দিলে আমেরিকা তাতে দালাইলামার পক্ষে সিআইএ পাঠিয়েছিল; আর তারা ভারতের ভুমিতে নর্থইস্ট-আসামে স্টেশন করে ততপরতা শুরু করেছিল। তার তা থেকেই  নেহেরুর ভারতকে চীনের শিক্ষা দেওয়ার জিদ বা ঘটনা। কারণ, ১৯৫৩ সাল থেকে কোথাও কিছু হলেই আমেরিকা সেখানে সিআইএ পাঠানো – এভাবে হস্তক্ষেপের কূটনীতি চালু করেছিল। তাই কোনটাকে ন্যায় আর অন্যায় বলবেন?
    আবার মনে রাখতে হবে, আইনের মারপ্যাচে আপনি একটা দেশের বন্দর ব্লক করে ওদেশে প্রবেশ বা পণ্য আনা-নেয়ার পথ বন্ধ বা বাধাদেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এখন এসব ক্ষেত্রে ঐদেশের মুরোদ থাকলে সে অবশ্যই সামরিক-সহ সব পথেই বাধাদাতাদের উতখাত করবেই। রাষ্ট্রের কোর [core] ইন্টারেস্ট বা মৌলিক স্বার্থ ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া এমনই হবে; তাতে এই স্বার্থরক্ষার পক্ষে কোন দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন থাকুক আর নাই থাকুক অথবা এমনকি তা বেআইনি হোক! প্রতিক্রিয়া এমনই হবে। তাতে আপনি “আমেরিকা সেজে” সেটাকে “বেআইনি” আগ্রাসন বলার মজাও নিতে পারেন।

    বাংলাদেশের প্রধান মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়াতে স্বাভাবিকভাবে ইউক্রেন ইস্যু আছড়ে পড়েছে যদিও সেসব আলোচনার বেশির ভাগই “ন্যায়-অন্যায়” কার কতটা এদিকটাই ভারী করে। শুধু ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে অনেকেই যাবে অবশ্যই। কিন্তু কেন ঘটল এমন ঘটনা বা ঘটনাটা এ দিকে গেল কেন তা বুঝতে হলে আরো গভীর অন্য দিকে তাকাতে হবে। আবার এমন ঘটনা দুনিয়ায় নতুন নয়। সাথে আরেকটা সতর্কতা জানিয়ে রাখি; এটা কমিউনিস্ট-অকমিউনিস্ট ইস্যুও নয়। ফলে পুতিন বা কমিউনিস্টরা ভাল কিনা এই চোখে কোনো তর্ক তুলে আনাও অর্থহীন। এতে বুঝবুঝিতে অযোগ্যতাই প্রদর্শন করা হবে ও অকেজো তর্ক তুলে আনা হবে। আবার শুধু হামলার প্রসঙ্গের মধ্যে থেকে এজন্য যারা “ন্যায়-অন্যায়” খুজছেন তারা ধরে নিয়েছেন যেন এই হামলার আগে বা পরে কিছু নাই, কোন ঘটনা নাই  – জানবেন কেবল এর উপরে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছেন।

     অপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধের অভাব অনুভব কী খুবই তুচ্ছ বিষয়ঃ
    তাহলে অপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধের অভাব অনুভব কী খুবই তুচ্ছ বিষয় – “যা আমার কী আমি কেন”  আমল করব ধরণের???  একটু পরীক্ষা করা যাক!  আমেরিকান ফ্লোরিডা উপকূলের ৯০ মাইলের মধ্যে কিউবার নেতা ক্যাস্ত্রো এক কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটিয়ে বসলে, ১৯৬২ সালের এঘটনায় আমেরিকার তাতে অস্বস্তি শুরু হয়েছিল। এখান থেকে কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস বলে ১৩ দিনের এক সেনা মোতায়েন ধরে টেনশনের কাহিনী শুরু হয়েছিল। কারণ, তাতে হুমকি পাল্টা হুমকিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় মিসাইল স্থাপন ও আমেরিকার দিকে তাক করে বসিয়ে দিলে তা এক চরম উত্তেজনাকর অবস্থা তৈরি করেছিল। মূল ইস্যু আমেরিকার ‘নিজ নিরাপত্তাবোধ’। আর অন্যদিকে, কিউবান বিপ্লবকে বাধা দান না করা।  আমেরিকা ‘নিজ নিরাপত্তাবোধ’ এর অভাব থেকে আপত্তি করাতে এর সব শুরু। আর তাতে এর শেষ হয়েছিল ‘কোনো যুদ্ধ নয়’ ভাবে। মানে আমেরিকা কিউবা থেকে আক্রান্ত হবে না আর বিপরীতে আমেরিকাও কিউবান বিপ্লব ভেঙে দিতে যাবে না আক্রমণ করবে না – উভয় পক্ষ এমন প্রতিশ্রুতি  বিনিময়ে তখন ঐ বিরোধের সমাপ্তি ঘটেছিল। এ বাইরে কোনো ন্যায়-অন্যায় অথবা এরা সঠিক-বেঠিকতা নিয়ে আলোচনা করতে বসে নেই। তাহলে এখানে রাশিয়ার “নিজ নিরাপত্তাবোধ” কোন বিবেচনার বিষয় হবে না, ১৯৯৭ সাল থেকে আমেরিকা রাশিয়াকে অপমান ও কোনঠাসা করে চলবে – আর এনিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া পরিণতি হবে না – এই আশা অবাস্তব ও আকাঙ্খা দিশাহীনই হবে।

    ইউক্রেনে কী নিয়ে বিরোধঃ
    অল্প কথায় বললে এর একদিকে ‘রাশিয়ার নিজ নিরাপত্তাবোধ’। কারণ প্রো-আমেরিকান ইউক্রেন সরকার ন্যাটোতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এথেকেই রাশিয়ার নিরাপত্তা চিন্তা শুরু। এটাকে যদি একালের ঘটনা হিসাবে দেখি, তবু এর শুরু খুবই কম করে ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু এ নিয়ে আপস আলোচনার ডায়লগের পথে কখনো দু’পক্ষ যায়নি, যেতে পারেনি; যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ান সেনারা পৌঁছানোর মুহূর্তে চীন-রাশিয়ার মধ্যে এক তথ্য বিনিময় ঘটেছিল, আর তাতে চীনের দিক থেকে রাশিয়াকে এক প্রকাশ্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক নিউজে বলা হয়েছে, চীন ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে এখন ‘নেগোসিয়েশন’ করে নিতে আহ্বান জানিয়েছে [China’s Xi speaks to Putin, calls for ‘negotiation’ with Ukraine]। যদিও আপাতত ঘটনা এদিকে যাবার পক্ষে কোনো আভাস নাই।
    নিজ নিরাপত্তাবোধের অভাব- সব সমস্যার শুরু এখান থেকেই। তবে এই বিবাদের রুট অনেক অনেক পুরোনা। আর সেখানেই এই “নিরাপত্তাবোধে অভাব” ব্যাপারটা ঢুকে আছে। অটোমান সাম্রাজ্যের সময়কাল (১২৯৯-১৯২২) যার তুলনায় রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের বয়স (১৮৯২-১৯১৭) অনেক কম। কিন্তু দুটা সাম্রাজ্যের আয়ু শেষ হয়েছিল কাছাকাছি সময়েই। সাম্রাজ্য মানেই তার কিছু কলোনি বা উপনিবেশ থাকতে দেখা যায়। আর জার সাম্রাজ্যের আমলেই নানা পথ ঘুরে ইউক্রেন জারের রাশিয়ার উপনিবেশ হয়েছিল আর তা থিতু হয়েই ছিল। তবে অস্থির হয়ে যায় ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনের কমিউনিস্ট বিপ্লব থেকে।

    অনেকেই হয়তো খেয়াল রেখেছেন জারের রাশিয়ায় লেনিনের বিপ্লব হয়েছিল কেবল রাশিয়ায়, মানে  জার সাম্রাজ্যের অংশ সংশ্লিষ্ট উপনিবেশগুলোতেও না। ব্যাপারটা অনেকটা, আমরা যখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া পরিচয়ে ছিলাম তখন যদি মূল ইংল্যান্ডে কোনো কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটত তবে তখন কলোনি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতে কি কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছে মনে করা যেত? অবশ্যই ঠিক তা না। তবে কী তা কল্পিত কমিউনিস্ট ইংল্যান্ড এই নয়া-রাষ্ট্রের অংশ হয়ে যেত? নাকি তাতে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াকে তারা কলোনিমুক্ত স্বাধীন বলে ছেড়ে দিত? আলোচ্য ক্ষেত্রে যেন কমিউনিস্ট ইংল্যান্ড কলোনি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াকে নিজের অঙ্গ করে নিয়ে নয়া এক কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছিল এটা হলে যেমন হত তেমনই রাশিয়ান বিপ্লবের নয়া নাম হয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন – এক বিপ্লবী নয়া কমিউনিস্ট দেশ।

    ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরে, ইউক্রেনের ক্ষেত্রে  ঠিক এটাই ঘটেছিল। ইউক্রেন জারের উপনিবেশ ছিল বলে লেনিনের বিপ্লবের পরে কমিউনিস্ট রাশিয়ার সাথে একে যুক্ত করে নিলে তা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে হাজির হয়, ১৯২২ সাল থেকে। অর্থাৎ একা ইউক্রেন নয়, জারের সব উপনিবেশকে অন্তর্ভুক্ত করে নয়া সোভিয়েত রিপাবলিক বলে রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। এতে ইউক্রেনও রাশিয়ান কর্তৃত্বের সোভিয়েত রিপাবলিক হয়ে যায়। বিপ্লব রাশিয়াতে হলেও রাষ্ট্র হিসেবে এর নাম হয়ে যায় ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ (১৯২২ সাল থেকে) আর বলাই বাহুল্য এতে রাশিয়ান ভূখণ্ডের তুলনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়েক গুণ বড় হয়ে যায়।

    অনেকে এটাকে নয়া নামে লেনিনের উপনিবেশ এক্সটেনশন বলতে পারেন বা বলেন হয়ত। কিন্তু  এর পেছনের মূল কারণ ছিল রাশিয়ান কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুনিয়ায় প্রথম কমিউনিস্ট বিপ্লব বলে আর খোদ ইউরোপের ঘটনা আর ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যখন সবাই ব্যস্ত এই সুযোগে ফাঁক গলে লেনিনের ক্ষমতা দখল করে নেয়ার ঘটনা ছিল সেটা। ফলে পরে তারা প্রচণ্ড ভীত ছিল যে ইউরোপের কলোনিমালিকেরা (তখনকার ব্রিটেন ফ্রান্স এরা; যাদের প্রধান ব্যবসা তখনও ছিল কলোনি দখলদারি ) কখন জানি হামলা করে। ম্যাপের দিকে তাকালে দেখব, মূল রাশিয়ার মোটামুটি চার পাশে বেষ্টন করে আছে সাবেক সোভিয়েতের ইউক্রেনসহ বাকি উপনিবেশগুলো। অর্থাৎ তাদের পেরিয়ে গেলে তবেই বাইরে থেকে রাশিয়া আক্রমণ করা সম্ভব হতে পারে। আবার ইউক্রেন হলো সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড যার অপর পাড়ের দিকটাই হল পশ্চিম ইউরোপ। রাশিয়াকে যাদের ভয়ে সারাজীবন কাটাতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এরাই ইউরোপের মূল কলোনি দখলদার যারা এককালে আজকের আমেরিকাসহ সারা দুনিয়াকেই কলোনি করে রেখেছিল ১৯৪৫ সালের আগে পর্যন্ত।

    রাশিয়ার নিরাপত্তাবোধের প্রশ্ন কবে থেকেঃ
    তাহলে কমিউনিস্ট রাশিয়ার আমল থেকেই নিরাপত্তাবোধের অভাব প্রসঙ্গটা তুঙ্গে উঠেছিল যে, তারা নতুন ধরনের (কমিউনিস্ট) রাষ্ট্র বলেই পড়শিদের থেকে বা তাদের মাধ্যমে অন্যের হাতে হামলার শিকার হতে পারে এই সম্ভাবনা থেকে সব শুরু। এমনকি এই নিরাপত্তাবোধের অভাব প্রশ্নটা এতই সিরিয়াস ছিল যে, এ’থেকে ট্রটস্কি-র (Leon Trotsky)   নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব পর্যন্ত হাজির হয়ে ছিল যে, ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ করে তা টিকানো সম্ভব কিনা; সম্ভব করতে গেলে কী করতে হয় ইত্যাদি। এ নিয়ে তাদের নেতৃত্বে বিভক্তিও দেখা দিয়েছিল সেসময়। সারকথায় ওই ১৯২২ সালে রাশিয়া রাষ্ট্রের বদলে সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র (সংক্ষেপে এরপরে শুধু সোভিয়েত লিখব) গড়ার মূল কারণ ছিল নিরাপত্তাবোধের অভাব মিটানো। আর ইউক্রেন-রাশিয়ার বিশেষ নিরাপত্তা সম্পর্ক সেই থেকে। কারণ ইউক্রেন পশ্চিম ইউরোপ থেকে রাশিয়াকে প্রটেক্ট করা সবচেয়ে বড় ও মূল ভূখণ্ড।

    পরবর্তীকালে ১৯৫৩ সাল থেকে আইসেনহাওয়ার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ‘হকিশ’ [hawkish] বা বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে সব কেড়ে নিয়ে যাওয়া আচরণের খারাপ দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল এমন আমেরিকার জন্ম হয়। এটাকেই কমিউনিস্টদের ভাষায় আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ হয়ে ওঠা বলা্র শুরু। এমনকি তা কোল্ড-ওয়ার [Cold War] বা স্নায়ুযুদ্ধের কালের শুরু ধরা হয় যার অন্য একটা বড় কারণ হল ‘পারমাণবিক অস্ত্রের’ জমানার শুরুও সেটা। সোভিয়েত ও আমেরিকা দু’পক্ষই পারমানবিক অস্ত্রের  ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছিল ঐ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়েই। পারমাণবিক অস্ত্রের কথা ইউক্রেন নিয়ে আলাপে কেন তুললাম?

    পারমাণবিক অস্ত্রের কথায় ইউক্রেন নিয়ে আলাপে কেনঃ
    কারণ ওসব পারমাণবিক অস্ত্রের একটা বড় অংশই রাশিয়া মোতায়েন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মুখ ভূমি [frontal state-land], ফ্রন্টাল স্টেট হিসেবে ইউক্রেনে। কারণ পশ্চিম ইউরোপ থেকেই রাশিয়া আক্রান্ত হতে পারে বলেই রাশিয়াকে  রক্ষা করতে বাফার ইউক্রেনেই সেসব পারমানবিক অস্ত্রগুলোর বেশিরভাগ মোতায়েন করা হয়েছিল। পরে সোভিয়েত ভেঙে  গেলেও সেই থেকে ১৯৯২ সালে ইউক্রেন আলাদা রাষ্ট্র হবার পরেও অনেকদিন তা আগের মতই মোতায়েন ছিল।   পরে আস্তে আস্তে সেসব পারমাণবিক অস্ত্র তুলে বা খুলে ফেলা হয়।

    এখন অনেকে যুক্তি তুলছেন, সেসময় ওসব অস্ত্র রেখে দিলে আজ ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে মার খেতে হতো না। এমন কথা কিছু ফ্যাক্টস নজরে না থাকার কারণে বলা হচ্ছে। প্রথমত পারমাণবিক অস্ত্র নিজেই এক বিরাট রাজনৈতিক তো বটেই এমনকি অর্থনৈতিক বোঝা। এর প্রধান কারণ অহেতুক (তুল্য রিটার্ণ নাই) বিরাট খরচ; যে খরচের পক্ষে সাফাই জোগাড় করা কঠিন। এছাড়া টেকনিক্যালি সাউন্ড স্টাফ লাগে প্রচুর আর এমন মোতায়েন থাকা অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করা আরেক বাড়তি খরচ।  যেমন উত্তর কোরিয়া নিয়ে নিরন্তর আমেরিকার সাথে খোচাখুচি টেনশনের মুখে এখন চীনের পজিশন হল – ঐ পুরা অঞ্চলকেই পরমানু-মুক্ত রাখা। সবপক্ষই  অপরের সামরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সকলে মিলে একটা কোন চুক্তি করুক, এটাই চীনের অবস্থান।  এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কথাগুলো এভাবে বলা হছে এজন্য যে, অস্ত্রগুলো ইউক্রেনের ভূখণ্ডে মোতায়েন হলেও এর মালিক-কর্তা ও খরচ বহনকারী ছিল খোদ রাশিয়া। ফলে সোভিয়েত ভেঙে গেলে এটা ইউক্রেনের জন্য দায় হয়ে উঠেছিল। মোতায়েন অস্ত্রে জং ধরিয়ে তো কারো কোনো স্বার্থ নেই। তবে উল্টা স্বার্থ ছিল ন্যাটোর। অস্ত্রগুলো পশ্চিম ইউরোপের দিকে, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি – এসব দেশের দিকে তাক করা। কাজেই তাদেরই বড় স্বার্থ ছিল কেবল ইউক্রেনকে যেন  পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করে দেয়া হয়। এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এখন পাঠকেরা বুঝবেন ইউক্রেনে হামলা স্রেফ ন্যায়-অন্যায়ের ইস্যু না। শুধু রাশিয়ান হামলার ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা দিয়ে এর সমস্যা বা সমাধান কিছু বুঝা যাবে না।

    সোভিয়েত ভেঙে যাবার পরেঃ
    বেশির ভাগ মানুষই কোল্ড-ওয়ার [cold war] বলতে সেকালে সোভিয়েত-আমেরিকার রেষারেষি-টেনশন যেটা যেকোনো দুটো দেশের মধ্যে হয়েই থাকে  তেমনই কিছু একটা বলে বুঝে থাকে। এটা ভাল অনুমান না। গভীর তলদেশ কত গভীরে তার আন্দাজ না নিবার মত ভুল। কোল্ড-ওয়ার বা এই এনিয়ে টেনশনের এক মূল বৈশিষ্ট্য হল দুই ধরনের অর্থনীতি। না, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বা যেটাকে ম্যাক্রো [macro] অর্থনীতি বলে সেটার কথা বলছি না। বলছি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বা গ্লোবাল বাণিজ্যের দিক থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্থে। তাই কোল্ড-ওয়ার বলতে তাদের মূল এক বিভক্তি হল – আমেরিকার নেতৃত্বে একদল দেশ, গ্লোবাল বাণিজ্যের প্রয়োজনে এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম চালু করে সবাই তাতে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আরেক দল (এরাই কমিউনিস্ট বা সোভিয়েত ব্লকের) বলছে, গ্লোবাল বাণিজ্য দূরে থাক, আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও দরকার নেই। তাই আমরা ওদের সাথে নাই।  প্রথম দল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে এই বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ’ব্যবস্থাটা একটা শৃঙ্খলার সিস্টেম  চালু করেছে। যদিও এটা বৈষম্যমূলক, এর মাখন যায় মাতবর রাষ্ট্রের ঘরে। অন্যদের জন্য তবু তা মন্দের ভাল; বিনিয়োগ বা কাজ-চাকরিহীন হয়ে না খেয়ে মরার চেয়ে। তাই সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো কেউ আইএমএফের সদস্য হয় নাই, (আমেরিকাও আগ্রহ দেখাতে চায় নাই এটাও একটা কারণ) একারণে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে যোগ দিতে চাইলেও তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
    আমাদের মনে রাখতে হবে পুরান কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের দুটা পরিণতির উদাহরণ হয়ে (তবে আদর্শ হিসাবে দেখতে বলছি না) তা আমাদের সামনে হাজির আছে। চীন আজ গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের পথে উঁচুতে অথচ উল্টাদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে, রাশিয়া হয়ে ধুঁকছে। আজ পাশে চীন না থাকলে আমেরিকার বিরুদ্ধে “কেঁদে উঠতেও” পারত না। কিন্তু সাবধান চীন-রাশিয়ার  তারা পুরান কমিউনিস্ট বলে হয়েছে তাদের সম্পর্কটা হয়েছে – এমন ধরে নেয়া একেবারেই না। মনে এই ভুল লালন করা যাবে না। বরং তাদের প্রধান এনিমি বা বাধা আমেরিকান আধিপত্য – এই কমন প্রধান এনিমির জন্যই তারা কাছাকাছি ও এটাই তাদের সখ্যতার ভিত্তি।

    তাহলে কোল্ড-ওয়ার থাকলেও সোভিয়েত ভেঙে গেলে  -সবার আগে দুটা অর্থনীতি বা অর্থনীতিগত ফারাক – এখানেই প্রধান পরিবর্তনটা ঘটেছিল। সোভিয়েত ব্লক – ১৯৯২ সালের মধ্যেই এরা সবাই আইএমএফের সদস্য হয়ে যায়, এমনকি রাশিয়াও। অর্থাৎ তখন থেকে দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের অংশ হয়ে যায়।সবার সাথে সবার  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও সম্ভব হয়ে  উঠে তাতে। কিন্তু তাহলে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশগুলোরও উচিত ছিল বিষয়টাকে গঠনমূলকভাবে দেখার, পরিকল্পিত ও সহযোগিতামূলক ভাবে দেখার।

    এই অংশটা আমার বক্তব্যের সার কথাঃ
    গ্লোবাল নেতৃত্ব কথাটার তাতপর্য বুঝতে হবে।  গ্লোবাল নেতা হিসাবে ১৯৯১ সালের পরে আমেরিকার এখানে এক বিরাট করণীয় ভুমিকা ছিল। যেটা সে করে নাই বলে আজকের এই সংকট ও তার ব্যর্থতা। এবং এটা আজকে গ্লোবালি আমাদের সকলকেই এক সংকটেরর মুখোমুখি করেছে। কী সেটা?
    এককথায় ইন্ট্রিগেশন বা সমন্বয়। এবং ইতিবাচক দৃষ্টিতে সমন্বয়।  দুটা ধারার অর্থনীতিতে  থাকা ভিন্নতা ভেঙ্গে তাদের এক হবার এক ধারা হবার সুযোগ এসেছে এটাকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্নতা মিশে যাবার ব্যবস্থা নেয়া। কারণ দুটা পক্ষ অসংখ্য সামরিক টেনশন ও সংঘাতে থেকে বের হয়ে আসার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে সেটাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো। কাজটাও যথেষ্ট কঠিন ছিল। কী করে পুরোনা ১৫ রাষ্ট্রকে একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের অংশ করবে – যার প্রধান দিকটা ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে এক বাণিজ্যিক লেনদেন, বিনিময় ব্যবস্থা কার্যকর ভাবে খাড়া করা।  এসব দেশ থেকে যেসব পণ্য প্রতিযোগিতায় বাইরের সবার জন্য সবচেয়ে সস্তায় দেয়া সম্ভব সেগুলোকে উতসাহিত করা। আর এটা সম্ভব হলেই বিনিময়ে তাদের যেসব পণ্য পশ্চিমা জগত থেকে লাগবে চাহিদা আছে সেসব আমদানির অর্থনৈতিক সক্ষমতাও হাতে পাবে বলে আমদানি করবে; আর বলা বাহুল্য সেটা পণ্য, বিনিয়োগ সেবা সবকিছুতেই।  এই লক্ষ্যে একটা ব্যাপক স্টাডিভিত্তিক পরিকল্পনা দিয়ে শুরু করতে পারত। আর একাজ করতে গিয়ে ঐ ১৫ দেশের নিজ নিজ কোর স্বার্থগুলো কী, ওদের জনগণের মানে পাবলিক এক্সপেক্টেশন গুলো কী তা জেনে নিতে হত। আর সেবগুলো অর্থনৈতিক সমন্বয়ের পরিকল্পনায় প্রতিফলিত করতে হত। আর এতেই পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক্টা আগেই তৈরি হয়ে যেত।
    তবে একাজ আগে অর্থনীতি দিয়ে শুরু করতেই হত। কারণ বস্তুগত সম্পর্কটা আগে তৈরি হয়ে গেলে পরে রাজনৈতিক ভিন্নতাগুলো তৈরি হয়ে যাওয়া  অর্থনৈতিক স্বার্থে আপোষে মিটিয়ে নেয়া সহজ হয়ে যেত।

    কিন্তু না। গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা এখানে কোন স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা করে নাই।  অথবা না করলেই বা চাপ ফেললেই তাদের বেশি লাভ এমন অনুমান কাজ করেছিল।

    কিন্তু আমেরিকা বুঝেছিল উলটা।  প্রথমত সোভিয়েত পতনটাকে সে নিয়েছিল উতযাপনের বিষয় হিসাবে। কী উতযাপন? না, দুনিয়াতে আমেরিকা তাহল তখন থেকে একক পরাশক্তি। এবং এর চেয়েও বড় কথা এই পরাশক্তি-বোধ এক চরম দায়-দায়ীত্বহীন কথিত পরাশক্তির। যেন যে পরাশক্তি হয়ে যায় তার আর দুনিয়া নিয়ে  কোন দায়দায়িত্ব থাকে না। যা ইচ্ছা তাই যেন সে করতে পারে এমন এক চরম বা এবসলিউট স্বাধীনতা-বোধের ফ্যান্টাসি ছাড়া এটা আর কিছুই নয়। কথাটা একটুও বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না। মিলিয়ে দেখা যাক।
    সেটা ছিল ক্লিনটনের যুগ (১৯৯৩-২০০১) মানে ২০০১ সালে জুনিয়র বুশের ক্ষমতায় আসার আগের আট বছর। এতে আমাদের মত দেশে বেধরক সামরিক ক্যু ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল – এই নীতি অন্তত তিনি বদলানোর পক্ষে চলে যান মূলত কিছু থিঙ্কট্যাংকের চাপাচাপিতে।  যার ফলস্রুতিতে একটা বড় উদাহরণ হল পাকিস্তান। তবে ভারতের বেকুবি প্ররোচনা আর নওয়াজ শরীফের তাতে পা-দেয়ার পরিণতিতে মোশাররফের ক্যু ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্যু হয় নাই। যদিও এই নীতি পরের আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা চালু রাখতে পারে নাই। সিভিলিয়ান মুখোস পরে করেছেন। বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন এর প্রমাণ।   ্তাতে যতটুকু যা নয়া কাজ!

    আর ২০০১ সালে থেকে নির্মম ও বেপরোয়াভাবে বুশের ওয়ার অন টেররে যেকোন (বিশেষত মুসলমান) দেশে রেজিম বদল হয়ে উঠেছিল তার প্রধান নেশা। আর এর পিছনের চিন্তাটাই ছিল “আমেরিকা এখন একক পরাশক্তি” ফলে যা ইচ্ছা তাই।  অথচ বুঝতেও পারে নাই দায়দায়িত্ব কী জিনিষ গ্লোবাল নেতৃত্ব কী জিনিষ! তাই পাঁচ বছরের মধ্যে (২০০৬) মূল স্ট্রাটেজিক প্লানারেরা বুঝে যায় তারা ডুবে যাচ্ছে, হাত-পা আটকে গেছে।

    ওদিকে পুরান সোভিয়েতেও তারা একাজটাই করেছে আরো ভয়ানকভাবে। রাশিয়াকে গুনেছে বুড়া বাঘ হিসাবে আর বাকি ১৪ রাষ্টকে ব্যবহার করেছে একেকটা পুতুল সরকার বসিয়ে, ওসব দেশে এনজিও খুলে আর এর মাধ্যমে কাকে পুতুল করা হবে সেই বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করে। অথচ আমেরিকা দেখতে পায় নাই এর অর্থ হল ওসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সোভিয়েতের কারণে এমনিতেই ছিল দুর্বল অবিকশিত আমেরিকা সেটাকে আরও দুর্নীতিবাজ ও প্রো-আমেরিকান করে গড়ে তুলতে।  অথচ বুঝতেই চায় নাই এমন প্রো-লাগালোর অর্থ হল ঐ ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এইবার প্রো-রাশিয়ান আরেক প্রতিরুপ গড়ার দিকে আমেরিকা নিজের ঠেলে দেওয়ার কর্মসুচি নেয়া হচ্ছে সেটা। প্রো-আমেরিকান বা প্রো-রাশিয়ান পুতুল – এটা কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থা হতে পারে না। অথচ আমেরিকা এর ভিতরে ঐ ১৪ রাষ্টড়কে নিয়ে গেছে। আর তাতেও সামলাতে না পেরে এবার “ন্যাটোর মেম্বার বানিয়ে নেয়া” – এই নতুন কায়দা শুরু করেছিল। কেউ প্রশ্ন তুললেই বিরোধী মানে তারা গণতন্ত্রবিরোধী। যেন কাউকে কৌশলে ন্যাটোর মেম্বার করে সবার মুখ বন্ধ করা খুবই “গণতন্ত্রী কাজ” ও সমাধান। মাঝে ১৯৯৮  সালে খোদ রাশিয়াকে  লোভ দেখিয়ে জি৭ এর সদস্য বানিয়ে নিয়ে সেটা নিজে জি৮ করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার মুখবন্ধ করে রাখার এই পরিকল্পনা কাজ করে নাই। এককথায় কোন দায়ীত্ববান গ্লোবাল নেতার ভুমিকা নিয়ে নয় খাবলা দিয়ে খাবার মত ছল-বলে কৌশলে ঐ ১৪ দেশের উপর রাজনৈতিক-সামরিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে গেছে আমেরিকা। আর একালে কিছু হলেই সবার উপরে অবরোধ আরোপ – হয়ে গেছে আমেরিকানদের ঢলে পড়া গ্লোবাল নেতৃত্ব টিকবে না জেনেও তা টিকানোর আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেছে। এরই এক পর্যায়ে অসহ্য হয়ে পড়া রাশিয়া এবার পালটা আঘাত করেছে। যদিও আঘাত বা পালটা আঘাত এদের কোনটাই সমাধান নয়। দরকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গটে তোলা, সেটা গ্লোবালি এবং ওসব ১১৪ বা ১৫ দেশেও।

    আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম এখানেই ব্যর্থ আর তা থেকেই এরই এক প্রকাশ হল,  বর্তমান সঙ্ঘাত।
    অনেক সময় আপনি যাকে শত্রু মনে করেন, তা সত্ত্বেও এটাও সত্যি যে তাকে কিছু ট্রেনিংয়ের ভেতর দিয়ে যদি নিতে পারেন তবে সেটা আপনাদের উভয়েরই ভাল হতে পারে। অহেতুক স্বার্থ সঙ্ঘাত তাতে লোপ পেতে পারে।

    সাধারণভাবে বললে, পশ্চিমের উচিত ছিল প্রথমে অর্থনৈতিকভাবে যতদূর সম্ভব ঘনিষ্ঠ ও পরস্পর নির্ভরশীল ও সহযোগিতায় এক বাণিজ্য সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া বা গড়ে তোলা। পরে রাজনৈতিক স্বার্থ অবস্থান ভিন্নতাগুলো কমানোর বিষয়ে কাজ করা। এতে পূর্ব-ইউরোপের সাথে ইন্ট্রিগেশন সহজ ও কম, বাধাহীন হত। মূলত এটাকেই বলছি পরিকল্পিতভাবে কাজ করা। কিন্তু আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম ইউরোপ এ কাজটা করেছে অপরিকল্পিত হেলাফেলায়। তার চেয়েও চাপে ফেলে বাধ্য করায়, আর অপর পক্ষের উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করে। সর্বোপরি এনজিও বা অন্য কোনো উপায়ে পাপেট সরকার বসিয়ে প্রভাবিত করা আর সাথে, যেকোনো উপায়ে ওসব দেশকে ন্যাটোতে ঢুকিয়ে নেয়া।
    এর মধ্যে সবচেয়ে অবিবেচক ও অন্যায় কাজটা  হল ন্যাটো টিকিয়ে রাখা। আর এটাকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐ ১৪ দেশকে ধরার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা।  ন্যাটোর জন্ম হয়েছিল  পশ্চিমাদের ঘোষিত রাশিয়াবিরোধী সামরিক জোট হিসাবে ১৯৪৯ সালেই। আর যার এক মারাত্মক নীতি হল, এর কোনো এক সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যের সবাইকে ওর পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে যুদ্ধে যেতে হবে। তা থেকেই এখনকার ইউক্রেন দ্বন্দ্বের জন্ম; যেটাতে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করে নিয়ে রাশিয়ার ওপর পাল্টা আধিপত্য কায়েম করে নিতে চাচ্ছে। আর রাশিয়ার আপত্তি হলো আমার নিরাপত্তা স্বার্থ উপেক্ষা করলে আর আমার ওপর রুস্তমি করতে চাইলে আমি সর্বাত্মক বাধা দেব। পশ্চিমের হুমকির মুখে তাই ইউক্রেনকে রাশিয়া কিছুতেই ন্যাটোর সদস্য করে নিতে দেবে না।

    এই হলো আমেরিকার অপরিকল্পিত ও হামবড়া দেখানোর সুবিধার ওপর চালিয়ে দেয়া কাজ। আমেরিকার ধারণা, সে ন্যাটোতে যোগদান করা ইউক্রেনের ‘অধিকার’ বলে চালিয়ে দিতে পারবে। এই সাফাই দিয়ে নিজের সব আকাম চাপা দিতে পারবে।  এটা ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাপার বলে চালিয়ে দিতে পারবে।

    প্রথমত আমেরিকা নিজের বেলায় এভাবে বিষয়টাকে দেখে নাই। অর্থাৎ ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস যেটাকে বলে তখন, আমেরিকা কিউবার মিসাইল মোতায়েনকে কিউবার ‘অধিকার’ হিসেবে দেখতে পারেনি কেন? ন্যায় হিসেবে দেখতে পারেনি কেন? কেন নিজের নিরাপত্তাবোধকে আপত্তির ইস্যু করেছিল?

    এখানে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপের প্রধান স্ববিরোধিতা হল, পুরনো সোভিয়েত ব্লককে ঘরে ডেকে নেয়া বা স্বাগত জানাতে না পারা। তারা সেটা তো করেইনি, উল্টা ন্যাটোকে শক্তিশালী করছে; তাও আবার সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোকেই ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে। সোভিয়েত ভেঙ্গে গেছে; এরপরে আর ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা থাকা যেখান প্রশ্নের মুখে সেখানে  আমেরিকা যদি রাশিয়ার সাথে যদি নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক চায় তবে ঐ ১৪ দেশকেই ন্যাটোতে ঢুকাতে হবে কেন? ফলে পশ্চিমের উদ্দেশ্যটাই অসৎ হয়ে গেছে, সে রাশিয়ার জন্য উপযুক্ত পার্টনার নয়। এটা তো কাজ করবে না সংঘাতই ফিরে আসবে।

    এ ছাড়া পুরোনা সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে এনজিওর তৎপরতাকে পাপেট সরকার বসানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা আর পরিস্থিতিকে এমন দিকে ঠেলে দেয়া যেন এখন ইউক্রেনের মতো দেশগুলো হয়েছে রাশিয়া আর পশ্চিম দু’পক্ষেরই নিজ নিজ পাপেট সরকার বসানোর প্রতিযোগিতা। এটা পশ্চিমের জন্য কোনো যুক্তিতেই তাদের পলিসি হতে পারে না- তাদের দাবি অনুসারে তারা তো ডেমোক্র্যাসির বরপুত্র! নাকি? কোনো দায়িত্ববান ব্যবসায়ীও এমন অবস্থান নিতে পারে না।

    রাশিয়ান হামলার মুখে আমাকে একা ফেলে পালিয়েছে পশ্চিমঃ
    এই কথাগুলো হলো হামলার দ্বিতীয় দিন, মানে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির বোধোদয়! “Who is ready to fight alongside us? I don’t see anyone,” এই হলো পাপেটের করুণ দশা। এ কথার সোজা মানে হল, সারা পশ্চিম তাকে ছেঁকা দিয়েছে; এতিম করে ফেলে পালিয়েছে এবং এজন্য পশ্চিম দায়ী অবশ্যই। কিন্তু প্রধান দায়ী প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নিজেই। কেন তিনি আগে চিনতে পারেননি? কাদের হাত ধরে ও উসকানিতে জেলেনস্কি পুতিনের সাথে শত্রুতা করতে গিয়েছিলেন? লাগতে গিয়েছিলেন কেন?
    এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় যে এই খবরটা কোন পশ্চিমা মিডিয়া কাভারই করে নাই। এসেছে evening standard স্থানীয় পত্রিকায় আর নয়ত আল জাজিরায়। কেন? দেশের দোষ ঢেকে রাখার দেশপ্রেমিকতা? নাকি এটাই এমবেডেড জার্ণালিজম???

    তাহলে এক মাস আগে পোল্যান্ডে ও রোমানিয়ায় পর্যন্ত বাইডেনের আমেরিকা নিজ সেনা মোতায়েন করেছিল কেন? আবার মোতায়েন করার পর যখনই নিশ্চিত হয়েছে যে  রাশিয়া আক্রমণ করবেই স্রেিরিয়াস আগেই সেনা প্রত্যাহার করে আমেরিকা ভেগে যায়। আর এখন বলছে আমেরিকা রাশিয়ার সাথে বা ইউক্রেনের ভূমিতে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করবে না। কী তামাসা! এ কথা আগে বলেনি কেন? এটা কি প্রতারণা না?

    কেন এমন পরিণতিঃ
    কারা কারা রাশিয়ার ওপর স্যাংশন দিয়েছে এই তালিকাটাও বেশ মজার। এক কথায় এটা হল বাইডেনের সাজানো অ্যান্টি-চায়না ব্লক; একেবারে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। মানে হল বাইডেনেকে যদি তারা শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে থাকে তবে এটা হবে সবাইকে না খাইয়ে মারার বুদ্ধিতে গড়া এক ব্লক যাদের মূল বৈশিষ্ট্য তাদের আর ‘গ্লোবাল’ হওয়ার ব্যাপারটাই কখনই বুঝে নাই। এছাড়া বুঝার মুরোদ নেই সেতা তো বহু পুরানা। মানে হল, তাদের যুদ্ধের খরচ বইবার অর্থেও কারো সাথে যথেষ্ট সারপ্লাস সম্পদ নেই অথচ গ্লোবাল নেতা হওয়া বা থাকার ক্ষেত্রে যা এক নম্বর শর্ত। আর মূলত একারণেই তাদের কেউ একটা দেশও ইউক্রেনের পক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়ায় নাই। যদি না দাড়াতে পারে, দাড়ালে বিশযুদ্ধ লেগে যাবার ভয় আছে মনে করে তাহলে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে সদস্য করে নিতে চাওয়াটাই তো অর্থহীন।

    কিন্তু বাইডেনের পরামর্শক বা থিংকট্যাংকের ফেলোরা তবু বুদ্ধি দিয়ে যাচ্ছেন, আমেরিকা এখনো সামরিক দিক থেকে চীনের ছয় গুণ শক্তিশালী। কাজেই তারাই গ্লোবাল নেতা।’ এদের কে বুঝাতে পারবে গ্লোবাল সক্ষমতা বলতে প্রধানত অর্থনৈতিক সক্ষমতা বুঝায়। এরপরে সামরিক আসতে পারে, আগে নয়।

    তাতে ফলাফল? এখন নিম্নচাপ! মানে?
    মানে হল, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটোর খরচ কে দেবে? এর উত্তর নেই বলে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির রাস্তায় পড়ে থেকে কাতরাচ্ছে! আর পশ্চিম ইউরোপের কথা, আমেরিকা ন্যাটোতে খরচ না দিলে তারা নড়াচড়া করবে না। তাই সাত মণ ঘি ঢালা হয়নি, আর তাতে রাধাও নাচেনি। আবার এটা এমনই লজ্জার কথা, তারা সেটা প্রধান কারণ মিডিয়ায় আনে নাই। প্রায় ৪৮ ঘন্টা পরে লজ্জার মাথা কাটা গেলে ৬০০ মিলিয়ন ডলারে হয়াত খউলেছে। যার অর্ধেকেরও বেশি ফ্রান্স অস্ত্রের ব্যবসা করে নিতে নিয়েছেন, ইউক্রেনকে দূর থেকে কিছু অস্ত্র পাঠাবেন বলে  অথচ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অভিযোগ তাকে ভালুকের মুখে ফেলে পালিয়েছে- এই বক্তব্যের ফলে পশ্চিমের কার মুখ-সম্মান এখনো বেঁচে আছে? আমেরিকান সংসদে অর্থের মঞ্জুরি হবে, এরপর বাইডেন অর্থ পাঠাবে আর এরপর ফ্রান্সের মত কেন অর্থের ভাগ পেলে অস্ত্র পাঠাবে ? এর ভাবেই যুদ্ধ করতে এমেছিলেন  প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি??? এটা কী যুদ্ধ!
    আবার রাশিয়ার দিক থেকে এটা প্রতিশোধের খায়েশ কিছু মিটানো ছাড়া কিছুই নয়। দিন শেষে সবাইকেই কথা বলতে বসতে হবে। দেশের ভিতরে বা বহুরাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবহা গড়ে তোলার মধ্যেই  সমাধান আছে। সবাইকে সেখানে যেতে হবে।

    আর এর মধ্য দিয়ে আমেরিকার অসহায়ত্ব আরো স্পষ্ট হয়েছে। আর নিশ্চিত হওয়া গেছে ট্রাম্প আর বাইডেন দুজনেই আসলে  পরাজিত আমেরিকার সৈনিক – তবে একই মুদ্রার দুই দিক। ফলে এই ট্রাম্প বলছেন, তিনি আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতাগিরিই ছাড়াতে চান! আর জাতিবাদী “সাদারাই শ্রেষ্ট” রাজনীতিতে আমেরিকাকে সাজাতে চান!  আর বিপরীতে বাইডেন মনে করেন – আরে আমেরিকা এখনও গ্লোবাল নেতা; তাদের কত কী ক্ষমতা আছে ট্রাম্প সেগুলার ব্যবহারই জানে না। তাই তিনি এবার সেগুলো ব্যবহার করে সবাইকে দেখিয়ে দিবেন। শেষে আমরা এখন দেখছি সে ফাটা ঢোল স্যাংশন! কিন্তু সেটাও হয়ত তাকে অন্তত বেইজ্জতিতে ফেলত না! কিন্তু  প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে গাছে তুলে নিয়ে দেখেন, তার পকেটে মানিব্যাগই নাই। এটা ওনেকটা বাসে উঠে টের পেলেন পকেটে কোন টাকা নাই। শেষে কন্টাকটরকে হাত ঘড়ি খলে দিয়ে কোন মতে বাসায় ফেরা, এই আর কী!

    আমেরিকার দিন ফুরানোর ইঙ্গিত এগুলো তাতে ট্রাম্প না বাইডেন এর প্রেসিডেন্ট, কিছু এসে যায় না। এরা একই মুদ্রার দুই দিক মাত্র!
    আর ওদিকে পুতিন যদি টার্গেট পুর্ণ করে ইউক্রেন থেকে ফিরে আসতে চান তবে ১৪ দিন অনেক বেশি, ৭-১০ এর মধ্যে শেষ করতে হবে। নইলে পা দেবে গেলে বের হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আর ন্যাটোর কেউ যদি সেনা নিয়ে ইউক্রেনের পক্ষে দাড়ানোর চিন্তা করে তবে এক নয়া বিশ্বযুদ্ধ সকলকে তাতে টেনে নিয়ে যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভালুকের মুখে আমাকে একা ফেলে পালিয়েছে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেনকে স্যাংশন আরোপের ক্ষমতা কোন মহাপ্রভু দিয়েছে!

    বাইডেনকে স্যাংশন আরোপের ক্ষমতা কোন মহাপ্রভু দিয়েছে!

    গৌতম দাস

    ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-3Wm

     

    শিরোনামটা আমার না বাইডেনের থেকে ধার করা। এক তামাসার নিউজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

    Who in the Lord’s name gives him the right to declare new so-called countries on territory that belongs to his neighbors?” – Joe Biden tackles Putin

    ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেন এর বাকযুদ্ধ এখন প্রতিদিনের ঘটনা। যেন প্রতিদিনের সন্ধ্যায় মিডিয়ায় হানিফ সংকেত মার্কা এক নম্বর সোপ অপেরা [soap opera] চালু হয়েছে এটা।  ম্যাপের দিকে তাকালে দেখব ইউরোপ (মানে যা আসলে পশ্চিম ইউরোপের মাতবর দেশগুলোর ভুমি। এদেরকে আমরা বুঝাই) সেই পশ্চিম ইউরোপ আর রাশিয়ার মাঝের রাষ্ট্র মানে বাফার রাষ্ট্রটাই হল ইউক্রেন।  সম্প্রতি বাইডেন একটা বাণী দিয়েছেনঃ  পুতিনকে তার প্রতিবেশীদের অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ডে নতুন তথাকথিত দেশ ঘোষণার অধিকার কে দিয়েছে?

    প্রসঙ্গটা অরিজিনালি হোয়াইট হাউজে এক সাংবাদিক সম্মেলনের। আবার সেখানের প্রসঙ্গটাকে সময় দিয়ে সিএনএন-ই একমাত্র তুলে এনেছে। আর বাংলাদেশে  এর একটা অনুবাদ  রিপোর্ট করেছে টিভি ‘চ্যানেল ২৪’। ওটা একমাত্র বাংলায় বলে আমি ওটাই রেফারেন্স হিসাবে এনেছি। বাইডেন প্রশ্ন তুলেছেন, “পুতিনকে তার প্রতিবেশীদের অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ডে নতুন তথাকথিত দেশ ঘোষণার অধিকার কে দিয়েছে? এটি ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’।” অর্থাৎ তিনি পুতিনের অথরিটি বা কর্তৃত্বকে লিগাল চ্যালেঞ্জ করতে চাইছেন।

    এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হবে উলটা বাইডেনকেই সাবধান হতে বলা। এটা তার জন্যই ভাল হবে। নইলে এনিয়ে বেশি আগালে হৈচৈ করলে নিজেরই কাপড় খুলে যেতে পারে। কেন?

    সরাসরি ও শর্টকাটে বললে,  আমেরিকা বিভিন্ন দেশের উপর ইচ্ছামত যখন ইচ্ছা স্যাংশন [sanction] আরোপ করে থাকে।  এই ক্ষমতা আমেরিকাকে কোন মহাপ্রভু দান করেছে??? কোন আন্তর্জাতিক আইনই আমেরিকাকে এই ক্ষমতা দেয় নাই। তাহলে  ২০১৪ সাল থেকে লাগাতর নানা অজুহাতে রাশিয়ার উপর আমেরিকাকে  স্যাংশন আরোপের ক্ষমতা-কর্তৃত্ব আমেরিকাকে দিয়েছে?? একইভাবে প্রায় ইরানের বিপ্লব (১৯৭৯), এই জন্মের পর থেকে  আমেরিকাকে  স্যাংশন আরোপ করে চলছে। আমেরিকাকে এই ক্ষমতা-কর্তৃত্ব কে দিয়েছে?

    আপাতত আর আরও  প্রমাণ-উদাহরণ না দিয়ে  এখানেই থামলাম!  কাজেই বাইডেনের উচিত হবে না ক্ষমতা-কর্তৃত্ব বিষয়ক কথা আর বাড়ানো। একেবারে কাপড় খুলে যাবে…।

    আমেরিকাকে অর্থনৈতিক  স্যাংশন এর মানে কী?
    আমেরিকাকে অর্থনৈতিক  স্যাংশন দেয়ার সোজা মানে হল, যেকোন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে পণ্য কেনাবেচায় যে ইনভয়েস (বা রশিদ) মানে পণ্যের দামাদাম লিখা হবে তা কোন দেশের মুদ্রায় লেখা হবে – এই হল প্রশ্ন! সবাই বেশি প্রফার করে আমেরিকান ডলারে তা লিখতে। এর সুবিধা হল বিক্রেতা এরপরে পণ্য বেচা অর্থ দিয়ে ডলারে অন্য যেকোন দেশের পণ্য সহজেই সে আবার কিনতে পারে। কারণ ডলার গ্রহণ করতে সব বিক্রেতাই প্রেফার করে। আবার দুপক্ষের জন্যই অসুবিধা হল, ঐ ইনভয়েসে লেখা ডলারের অর্থ ছাড় করতে একটা না একটা আমেরিকান ব্যাংকের মাধ্যমেই তা করতেই হবে। এখন কোন আমেরিকান ব্যাংক একাজে আপনাকে সাহায্য করলে ঐ ব্যাংক-কে  আমেরিকান রাজস্ব-বিভাগ বিলিয়ন ডলার ফাইন করে থাকে – এটাই হল অবরোধ আরোপ সোজা পরিণতি।  তাই অবরোধ আরোপ মানে হল, আপনাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়া।

    তাহলে ইউক্রেন ইস্যু এটা কিসের লক্ষণ?
    চীন-রাশিয়া মিলে এখন আমেরিকার এই যত্রতত্র কোন আন্তর্জাতিক আইনী নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্যাংশন  আরোপ করা্র যুগের সমাপ্তি চিরদিনের মত শেষ করে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। ডলার বাদে বাকি সব কারেন্সিতে লেনদেনের এক নয়া গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়তে চাচ্ছে। অন্তত “ডলার রেজিম” সমাপ্ত করতে হবে এই তাদের মূল লক্ষ্য। [সেটা কতদুর কী পারবে সে অন্য আলাপ।] তবে এর  সাথে তাদের বন্ধুরাও যোগ দিয়েছে যেমন ইরান ও চীন-রাশিয়ার প্রভাবাধীন রাষ্ট্রগুলো। আর এতে বেদিশা হয়ে ততই আমেরিকা অবরোধ-আরোপে অপব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। যেটা অনেকটা “জন্মের খাওয়ার” মত!  যেখানে খাদক খাইতে খাইতেই শেষে মারা যায়!

    তাই সম্ভবত বাইডেনই হবেন শেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যার আমল পর্যন্ত তৃতীয় দেশে হস্তক্ষেপ, সরকার বদলানো এমনকি সিআইএ পাঠিয়ে ক্ষমতা দখলদারি করার চর্চা জারি ছিল, এটাই আগামি ইতিহাসে লিখা থাকবে।  মানে এরপরেও আমেরিকা থাকবে অবশ্যই তবে অন্যের সরকার বদলানোর ক্ষমতা বদলানোতে ঠুঠো হয়ে থেকে।

    অন্য দেশে খোদ সরকারই উপরে ফেলার ক্ষমতা সিআইএ বা আমেরিকার কোন মহাপ্রভু দিয়েছে???
    আমরা অনেক সময় চুপ থাকি নিরুপায় হয়ে বা আমাদের সাময়িক স্বার্থের জন্য বা কৌশলগত কারণে। কিন্তু কখনই আমরা মন থেকে আমেরিকার এই অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন [unruly] ক্ষমতা পছন্দ করি না। করতে পারি না!

    কাজেই বাইডেনের আমেরিকার প্রতি আমাদের পরামর্শ হবেঃ “ডলার-রেজিম এই ক্ষমতার” অপব্যবহারকারি হয়েন না। ছাড়ান দেন। আর পুতিন বা বাইডেন আপনারা কারোই আরেক দেশে সেনা পাঠানোর আগে এই ইস্যু বিষয়ক গ্লোবাল কনভেনশন-আইন করেন; পরস্পর দোষারোপ করে কতদুর যাবেন! নইলে এসব চাতুরিপুর্ণ বয়ান আপনার পক্ষে কাজ করবে না…। বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্য এভাবেই একদিন অস্তে ডুবে গেছিল!

     

  • আমেরিকা সাথেও কাজের সম্পর্ক হবে! তাই কী??

    চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বে,
    আমেরিকা সাথেও কাজের সম্পর্ক হবে! তাই কী??

    গৌতম দাস

    ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Up

     

    At a time when hostality between China and USA has intensified

     

    সেটা ছিল আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে আমাদের ভাষায় আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইস [Ned Price] এর এক রেগুলার রুটিন প্রেস ব্রিফিং। কিন্তু ব্যাপারটা আর রুটিন থাকেনি। মনে হয়েছে তা “বিশেষ” হয়ে গেছে। প্রাইস অন্য এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলে বসেন, পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার – “Pakistan is a strategic partner of the United States.”’।

    পাকিস্তান অবশ্যই আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার – কিন্তু একালে কোন কথা প্রসঙ্গে সে কথা উঠে গেলেও সাথে বলে দেয়া হয় ওটা পাস্ট টেনস; যেন বলা মানে ওটা এককালে সত্যি ছিল। মানে চলতি একুশ শতকের শুরুতে ২০০১ সালে আমেরিকার আফগানিস্তান দখল শুরু থেকে ঐ দখল বাস্তবায়নের প্রয়োজনে সেই থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ‘স্ট্রাটেজিক পার্টনার’ করে রেখেছিল, সেটা জোর জবরদস্তি করে হলেও!

    আর সেটা টিকে ছিল এবং অত্যন্ত সরবভাবে অন্তত ওবামা আমল মানে, ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত। যা এরপর থেকে ট্রাম্পের আমলে এসে অনুচ্চারিত হতে হতে “নাই” হয়ে যায়। আর ট্রাম্পের আমলের আমেরিকার ব্যবহারিক আচরণ ও তৎপরতা দেখেই সবাই বুঝে গিয়েছিল “দিন বদলে গেছে”। কারণ আমেরিকা ততদিনে আফগানিস্তানে যুদ্ধের খরচ বইবার মুরোদহীন হতে হতে ভারে কাত হওয়া শুরু করেছে। কারণ তখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার আমেরিকার ব্যয় হাসিঠাট্টার ইস্যু নয় নিশ্চয়। আমেরিকার এই আচরণ যে আমেরিকার – ‘আফগানিস্তানকে ফেলে পালাতে পারলে বাঁচি’, এমন জায়গায় পৌঁছেছে তা তখন সবাই বুঝে গিয়েছিল। ফলে ‘পাকিস্তান আর আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার’ তখনো কি না, সেটা অনুচ্চারিত থাকাকেই সবার কাছে স্বাভাবিক ঠেকেছিল বা সয়ে গেছিল।

    কিন্তু এখন মানে, প্রায় পাঁচ বছর পরে ২০২২ সালের শুরুতে আবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র যিনি সাধারণত তা^র বিভাগের স্থায়ী কিছু অবস্থান-সিদ্ধান্তগুলোর উপরে দাঁড়িয়ে প্রেসের সাথে কথা বলে থাকেন, তিনি যখন আবার সে কথা ফিরে উচ্চারণ করে বলেন যে “পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার”, তখন তা আমাদের জন্য একটা নড়েচড়ে বসে নজর করার মত ঘটনা তো বটেই। শুধু তা-ই নয়, মানে এটা বিচ্ছিন্ন একটা বাক্য নয়। কারণ তিনি শুধু ঐ বাক্যটাই নয়। এর পরে তিনি ওই বাক্যকে ফিরে আরো শক্তপোক্ত করতে আরো কয়েকটি বাক্যও যোগ করেছেন।

    ঘটনার শুরু যদিও ইন্ডিয়া থেকেঃ
    ঘটনার শুরু ইন্ডিয়া থেকে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দায়ী করে বলেছিলেন, ‘তার ভুল ও অবিবেচক কূটনীতির কারণে , ‘‘পাকিস্তান ও চীনকে একত্র হতে সাহায্য করেছেন মোদি৷’’ অর্থাৎ চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক আগের চেয়ে এত বেশি ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে গেছে। এদিকে ভারতে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে উত্তরপ্রদেশসহ পাঁচ রাজ্যে প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে পাঁচ-সাত পর্বের এই নির্বাচন মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে চলবে, পরে্র মাসে ১০ মার্চ একসাথে সব ফল প্রকাশ করা হবে। এই নির্বাচনের ফলাফল ভারতের রাজনীতি এলোমেলো করে দেয়ার মত এক মুখ্য ঘটনাও হয়ে যেতে পারে। কারণ বিজেপি নিজেই প্রকাশ্যে নিজের মনের কথা বলেছে যে, এবারের উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে যদি বিজেপি হেরে যায় সেটা ২০২৪ সালের মোদির কেন্দ্রীয় নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা ও প্রভাব ফেলবে; মানে সে নির্বাচনে জেতা কঠিন হয়ে যাবে।

    তবু এখনো এ’ঘটনা ভারতের জন্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিতে তা এখনো এক স্থানীয় ঘটনাই। বিরোধী রাহুল গান্ধী মোদি ও বিজেপিকে ঘায়েল করতে এমন মন্তব্য করেছেন – যেমনটা ইলেকশনের আগে এমন কিছু কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েই থাকে। কিন্তু মোদির পক্ষের লোক সেই ইস্যুটাকে আমেরিকান প্রেস ব্রিফিংয়ে পর্যন্ত তুলে সেখান থেকে জবাব এনে রাহুলের  উপর আপার-হ্যান্ড নিতে চেয়েছিলেন সম্ভবত; আর তা থেকেই ঘটনা শুরু..।

    আমেরিকান মুখপাত্র নেড প্রাইস ব্যাপারটাকে ভারতের এক স্থানীয় ঘটনাই করে রেখে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতেন। কিছুটা করেও ছিলেন। বলেছিলেন তিনি চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ককে তাদের উপরই ছেড়ে দিয়ে রাখতে চান, এতে নিজে ঢুকতে চান না। তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তাই বলে রাহুলের বক্তব্যকে অনুমোদন দিয়ে তিনি এর পক্ষেও দাঁড়াচ্ছেন না।
    কিন্তু তা থেকেই আরো উসকানিমূলক প্রশ্ন করার সুযোগ করে নেন প্রশ্নকর্তা; যেটাকে অনেকে ‘অ্যারেঞ্জড’[arranged] মানে আগে থেকে আগাম-আঁতাত-বোঝাবুঝিতে থাকা উভয়ের এক সওয়াল-জবাব পরিস্থিতি তৈরি করে কথাবলা বলে অনেকে মনে করতে পারেন। এটা খুব আন-কমন ব্যাপার নয়; যদিও তা মূলত খুবই সীমিত পর্যায়ে  রেখে এমনটা অনেক সময় হয়েই থাকে। তবে সেটা আবার আমাদের  সাংবাদিকের একেবারে “তেলের ভাণ্ড” নিয়ে তেল মেরে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন (নাকি তোয়াজ) করতে বসার মতও নয় অবশ্যই। তেমন মনে করা মারাত্মক ভুল হবে।
    যা হোক সে প্রশ্নটা ছিল, পাকিস্তানের এমন আমেরিকা থেকে দূরে চলে যাওয়া অথবা খুবই চীন-ঘনিষ্ঠ হয়ে যাওয়া কেন? এটা কী  আমেরিকার তাদেরকে (বিশেষত পাকিস্তানকে) পরিত্যাগ করে ফেলে পালানোর জন্য ঘটছে কি না – এ প্রশ্ন তুলে বসেন [do you think they’re – they feel abandoned by the U.S.?]।
    আর এমন প্রশ্নের জবাব দেয়ার সুযোগ নিয়ে এবার যেন নেড প্রাইস তার নয়া বিস্তারিত মেসেজ হাজির করার সুযোগ নিলেন। আর তাতে তিনি মূলত আরো দু’টি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।

    এক. প্রাইস বলছেন, আমরা অনেক দিন থেকেই বলছি, ‘যেকোনো একটা দেশের জন্য তারা আমেরিকা না হলে চীনকে বেছে নিতে হবে, ব্যাপারটা একেবারেই এমন প্রয়োজনীয় নয়” [We’ve made the point all along that it is not a requirement for any country around the world to choose between the United States and China. ] ।’ তবে এরপরই প্রাইস চীনের চেয়ে আমেরিকা কেন অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ভালো এবং তাদের অনেক বাড়তি সুবিধা ও সে দেশকে মুক্ত থাকতে দেয় – এসব দিক নিয়ে নিজের কিছু বিজ্ঞাপনও প্রচার করে নেন।

    দুই. এরপর প্রাইসের সেই উক্তি যে “পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার”। আর এ’কথা বলার পরে তাঁর আরো দুই বাক্য হল, “ইসলামাবাদের সাথে আমাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পর্ক আছে। আর আমরা এই সম্পর্ককে বিভিন্ন পরিসরে খুবই মূল্য দিয়ে থাকি” [We have an important relationship with the government in Islamabad, and it’s a relationship that we value across a number of fronts.]। অর্থাৎ তিনি যেন বলতে চাইছেন আমরা যেন এগুলোকে কথার কথা হিসেবে না, সিরিয়াস কথা বলে দেখি।

    “We’ve made the point all along that it is not a requirement for any country around the world to choose between the United States and China. It is our intention to provide choices to countries when it comes to what the relationship with the United States looks like. And we think partnership with the United States conveys a series of advantages that countries typically would not find when it comes to the sorts of partnerships that – “partnerships” may be the wrong term; the sorts of relationships that the PRC has seeked to – has sought to have around the world.”

    নেড প্রাইস কেন এখন এ কথাগুলো বলছেনঃ
    এখানে একটা ব্যাকগ্রাউন্ড বা যে পটভুমিতে এ কথাগুলো উঠেছে তা পাঠককে মনে করিয়ে দেই। সেই পটভুমিটা হল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান এখন ইতোমধ্যেই চার দিনের (৩-৬ ফেব্রুয়ারি) চীন সফরে আছেন। যদিও সফরের মুখ্য কারণ চীনে আয়োজিত এবারের অলিম্পিক, এই গ্লোবাল স্পোর্টসে অন্যান্য সরকারপ্রধানের সাথে ইমরান খানের যোগ দিতেই চীন সফর। আবার বিশেষত এই অলিম্পিককে বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কটের ডাক দিয়েছেন […White House confirmed reports that it was instituting a diplomatic boycott on the Beijing 2022 Winter Olympics.]। আর কারণ দেখিয়েছে সেই পুরনো উইঘুর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তিনিও জানেন যে, এমন বারবার একই কারণ দেখানোটা মানুষ ভালো মনে করছে না আর তিনি নিজেও এতে সিরিয়াস নন ও মন শক্ত না করে অস্পষ্টভাবে উইঘুরের কথা তুলছেন। তাই এমন মনে করার কারণ আছে। যার কারণ হল, উইঘুর সশস্ত্র গ্রুপ [ইস্টার্ন টার্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM) ] এখন আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধবাদী আইএস-খোরশান এর সাথে মিলে সশস্ত্র তৎপরতায় জড়িত হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানে এরা যে বোমা হামলায় জড়িত হয়েছে তাতে ভারত-আমেরিকার সাহায্য সমর্থনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে উইঘুর কি নিজে ভিকটিম না আইএসের সহযোগী সন্ত্রাসী – এ প্রশ্ন এখন বাইডেনের সামনে ঝুলছে। কেন ট্রাম্প এই সংগঠনকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে নাম উঠিয়ে নিয়েছে আর বাইডেন প্রশাসন তাদেরকে বোমা হামলার কাজে ব্যবহারে সম্মতি দিচ্ছে?  এসব প্রশ্ন যেখানে উঠে আছে শেখানে বাইডেনের “উইঘুর মানবাধিকার লঙ্ঘন” এর জন্য চীনা অলিম্পিক বয়কটের ডাক – এটা একটা “দাগী” আচরণ। আর স্বভাবতই এটা দায়ীত্বশীল রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ হয় নাই!

    আমরা ইমরান খানের চীন সফরে ফিরে আসি। ইমরানের এবারের চীন সফরের মুখ্য দিক অলিম্পিক অবশ্যই নয়। এটা বরং রথ দেখার সাথে কলা বেচার অংশ। সেই মূল কাজে, তিনি এবার চীনা সরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে নয়, বরং এবার বিপুল চীনা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই বা FDI) মানে ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে ফিরবেন। সে কারণে পাকিস্তানের মিডিয়াগুলোতে একটাই নিউজ, ‘চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক এতে আরেক উচ্চতায় যাচ্ছে [….most likely take the Sino-Pakistan relations to new levels.]। আমাদের মত অর্থনীতির দেশে এফডিআইকে বাড়তি আকর্ষণীয় সুবিধা হিসেবে দেখা হয় এ’জন্য যে, অবকাঠামো নির্মাণে কোনো দেশের সরকার মূলত বিদেশী সরকারি ঋণ নেয়। কিন্তু এই এফডিআই বিনিয়োগ নেয়া – এটাও এক ঋণ নেয়া হলেও সরকার তা নেয় না। ফলে  তা সরকারের উপর ঋণের বোঝা বাড়ায় না তো বটেই, উল্টো ঋণের বোঝা কমাতে বা পরিশোধে এই বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে সাহায্য করে। কারণ ওই বিনিয়োগ বিদেশী মুদ্রায় বলে এই অর্থ ছাড় করতে সরকারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে তা হতে গিয়ে সেই বিদেশী মুদ্রা সরকারি কোষাগারে চলে যায় আর বিনিয়োগ আনা প্রাইভেট কোম্পানি বিনিময়ে স্থানীয় মুদ্রা হাতে পায়।

    আসলে  ক’দিন আগেই খুব কড়া শর্ত চাপিয়ে আইএমএফ পাকিস্তানকে এক বিলিয়ন ডলার লোন ছাড় করেছে। আইএমএফ জানত তাদের দেয়া এই ঋণের খবর পাকিস্তানকে  গ্লোবাল পুঁজি বাজারে আস্থার আসনে নিয়ে যাবে। তাই সুযোগ বুঝে এই কড়া শর্ত। আর তা করতে গিয়ে ইমরানকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে [SBI] বিশেষ অনুমতি দিতে নয়া আইন পাশ করাতে হয়েছে। যেটাকে ইমরানের বিরোধিরা এতে দেশের সার্বভৌমত্বের উপরে আঘাত বলে প্রচার করেছে।  তাই ভাল ইমেজের আসনে বসা এই পাকিস্তান তাই এখন অনুমান করা হচ্ছে চীন সেই ঋণ কিস্তি নিয়মিত যেন পরিশোধে পাকিস্তানকে এফডিআই জোগাড় করে দিয়ে সাহায্য করতে যাচ্ছে। সারকথায় পাকিস্তান তাহলে ইমরানের এ সফরের মাধ্যমে আরো গভীর সম্পর্কে চীনের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। আর এটাই ভারত ও আমেরিকার জন্য আরো অস্বস্তিকর ঘটনা হয়ে হাজির হয়েছে। এই ইস্যুতে তাদের স্ব স্ব মিডিয়া রিপোর্টিংয়ে সেটাই প্রতিফলিত হয়েছে।

    অতএব সে জন্যই কি নেড প্রাইস ঐ প্রেস ব্রিফিং থেকে নতুন সম্পর্ক সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

    কেন আমেরিকার পাকিস্তানকে এখনও খুবই দরকারঃ
    গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ রয়টার্সের এনিয়ে এক নিউজ
    [Blinken says U.S. will assess Pakistan ties over Afghanistan’s future] বলছে, আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিঙ্কেন তাদের সংসদ বা কংগ্রেসের শুনানিতে কেন আমেরিকার পাকিস্তানকে জরুরি দরকার তা ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তিনি পরিষ্কার করে রাখেন যে, আফগানিস্তানে “পাকিস্তানের বহুবিধ স্বার্থ আছে যেগুলোর অনেকটাই আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থের সাথে মিলে [Pakistan has a “multiplicity of interests some that are in conflict with ours.”]। যেমন আমেরিকা চাইবে অন্তত তালেবানদের গাইড করা এবং তালেবানের প্রতিদ্বন্দ্বি যেসব আরো রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপ আছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদিতে পাকিস্তান তাদের সহায়তা করুক। এ কারণে পাকিস্তান আমেরিকার কাছে খুবই প্রয়োজনীয় এবং তাই পাকিস্তান আমেরিকার চোখে পার্টনার হতে পারে।
    কিন্তু ব্যবহারিক জায়গায় আপাত যে সমস্যা দেখা যাচ্ছে যে পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক থমকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই অক্টোবর ২০২১ সালে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সফরের পর থেকে কিছুই যেন নড়েনি। সেটা কয়েক মাস ধরে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত না থাকা মানে, সে কাজ এক অস্থায়ী রাষ্ট্রদূত দিয়ে চালানোতেই প্রকাশ পায় [Islamabad has been without a full-time ambassador since Richard Olson left. ] – এমন মনোভাব প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের এক থিংকট্যাংক গবেষক। তিনি আরো ঘটনা তুলে ধরে বলছেন, গত ৯-১০ ডিসেম্বর বাইডেনের অবরোধ আরোপের সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে যার নাম ডেমোক্রাসি সামিট – সেখানে এক অগুরুত্বপুর্ণ গ্রুপে ইমরানকে মাত্র তিন মিনিটের এক রেকর্ডেড অনলাইন বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল। ফলে ইমরান খুব বিনয়ের সাথে ঐ সম্মেলনে যোগ দিতে বাইডেনকে অপারগতা জানিয়ে দেন। খুব সম্ভবত তখন ইন্ডিয়াকে তোয়াজ করতে বাইডেন পাকিস্তানকে তারা ভারতের সমান মনে করছে না, বা তাদের মধ্যে দুরত্ব আছে এটা প্রদর্শন করা মুখ্য বিবেচনা করেছিল। কিনতি ফাইনালি আমরা দেখলাম উলটা ভারতই বাইডেনকে ছেড়ে রাশিয়ার সাথে তাল দেয়া শো করেছে। এসব দিক যেমনই হোক, মূলকথা হল – আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক আসলে একটা খাদে পড়ে আছে। আমেরিকা সম্ভবত সেখান থেকে নিজেদের তুলতে চায় – সেকারণেই কী নেড প্রাইস???

    আসলে সোজাসাপ্টা বললে এখন, বাইডেন প্রশাসন সম্ভবত ইমরানের এই লম্বা চীন সফর নিয়ে খুবই অস্বস্তি ও বিরূপ অবস্থায় পড়েছেন। যেমন যদি পাকিস্তানকে তাদের এত দরকারি মনেই হয় তবে গত অক্টোবরের পর থেকে আমেরিকার আগ্রহ অগ্রগতিতে এর প্রকাশ নাই কেন? আসলে এ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা নাই বাইডেন প্রশাসনের হাতে। তাই খুব সম্ভবত কিছু শুভ-ইঙ্গিত বা বন্ধুত্বের ইঙ্গিত পাঠিয়ে সুচনা করতে চাইছে আমেরিকা!! আর সেটা করতেই হয়ত নেড প্রাইসের এই “আমরা এখনো স্ট্রাটেজিক পার্টনার” বক্তব্য! তবে প্রাইসের আচরণের এই ব্যাখ্যা কী তানিয়ে আমাদের আরো নিশ্চিত হতে হবে। মানে, এখনো নিশ্চিত বলে ধরে নেয়া ঠিক হবে না এবং তাই আরো মনিটর করতে হবে।

    কিন্তু যেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ তা হল, নেড প্রাইস একটা ইঙ্গিতে যেন বলে ফেলেছেন যে, আমাদের মতো দেশ চীনের সাথে বিনিয়োগ পাওয়ার সূত্রে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার পরও সমান্তরালে আমেরিকার সাথেও আমরা একসাথে কাজের সম্পর্ক করতে পারি। আর বলা বাহুল্য তা হতে অন্য ইস্যুতে তবে উভয়ের অভিন্ন স্বার্থের ইস্যুতে!!!

    এমন অনুমানের ভিত্তি হল, আফগানিস্তান বা অন্য কোনো ইস্যুতে আমেরিকার কাছে এখনো যদি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক জরুরি হয়ে থাকে তবে আমেরিকা সেই স্বার্থ হাসিল করার একমাত্র খোলা থাকা উপায় হল , চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হলেও সমান্তরালে পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক যতটুকু এগিয়ে নেয়ার বা করে নেয়ার সুযোগ আছে তা কাজে লাগানো।
    তা না হলে   – ইসলামাবাদের আমেরিকার সাথেও সম্পর্ক করতে চীনের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে টান টান উত্তেজনা ও চাপ অনুভব করার কিছু নেই। নেড প্রাইসের এই নতুন তথ্য পেশ করার কোন মানে হয় না [For the first time in years, the United States emphasised its strategic partnership with Pakistan, clarifying that Islamabad does not need to strain its relations with China to maintain ties with Washington.]।  প্রাইসের এমন  রাস্তা ধরে আগানোর কোন কারণ খুজে মেলেনা।

    “State Department’s spokesperson says
    Islamabad does not need to strain its
    ties with Beijing”

    তাহলে আমরা কি আসলে পাকিস্তান-আমেরিকার সম্পর্ক বুঝার জন্য এতক্ষণ এত কথা বলছি? না, মোটেও তা নয়। বাংলাদেশের আমেরিকার সাথেও সম্পর্কিত হতে হলে আগে থেকেই চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক থাকা নিয়ে টান টান উত্তেজনা ও চাপ অনুভব করার কিছুই নেই – সেটা কী আমাদের বেলাতেও সত্যি হবে??? সেটা বুঝা দরকার!
    ব্যাপারটা এমন কি না বা কতটুকু- সেটা জানাই আমাদের মূল আগ্রহ এবং এত কথা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৫ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বে আমেরিকা!!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    বাইডেনের অবরোধঃ
    অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২১   ১৭ঃ১৮ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3R1

       US President Joe Biden’s Summit for Democracy

     

    ঘোর ঘনঘটা। অন্ধকার ছেয়ে আসছে!
    যদিও এই অন্ধকার মানে এটা নয় যে এখন বাইডেন হাতে আলোর প্রদীপ আছে অথবা হাতে প্রদীপ নিয়ে তিনি মঞ্চে আসছেনই! না ব্যাপারটা একেবারেই এবার ২০০৭ সালের মত এত সরল নয়। বরং উল্টা-পালটা বহু কিছুরই সম্ভাবনা। সবচেয়ে বড় কথা এক প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা আর গভীর অনিশ্চয়তা ছেয়ে আসতে যাচ্ছে! সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সে “আমেরিকান অথরিটি” আর নাই। অথচ ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে একমত নাই। যেটুকু গত ৭৫ বছরে তোইরি হয়েছিল তা সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকা অপব্যবহার করাতে সবকিছু এখন অন্ধকারে। সারকথায় পুরান ওস্তাদের অথরিটি দুর্বল এমনকি চ্যালেঞ্জড হয়ে যাচ্ছে অথচ  ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে যেটুকু ঐক্যমত্য ছিল তাই ভেঙ্গে পড়তেছে। ইউক্রেন নিয়ে হুঙ্কার পালটা হুঙ্কার এর প্রমাণ। তবে আমাদের প্রসঙ্গ বাইডেনের অবরোধ আরোপ।

    বাইডেন বাংলাদেশের উপর অবরোধ আরোপ করেছেন। আর এটা ২০০৭ নয়, ২০২১ সাল। যখন আমেরিকার গ্লোবাল কর্তৃত্ব ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে; অর্থাৎ সিংহ এবার আরও বুড়া ও বেশি উত্থান-রহিত হয়ে গেছে। অথচ বাইডেন সেদিকটা আমল না করে উলটা বুড়া সিংহ আমেরিকাকে ওভার স্ট্রেস মানে আরও ভারের বোঝা চাপিয়ে দিলেন এই অবরোধ আরোপ করে। আর তাতে এটা মোটেই অসম্ভব নয় যে এতে বুড়া সিংহের ঘারে সবকিছু হুরমুর করে ভেঙ্গেচুড়ে পড়ল। ফলাফল  আরো এক গভীর নিম্নচাপ!
    উপরে এসব কথার অর্থ আবার কোনমতেই এটা নয় যে এখানে আমাদের সরকার সেফ থাকবে এমন কোন ইঙ্গিত দিচ্ছি। সেটা নয় তবে বহুকিছুই অনিশ্চিত বলছি ফলে স্বভাবতই এর মধ্যে সরকারের টিকে যাওয়াটাও অনিশ্চয়তা থেকে বাইরে থাকবে কী করে! মোট কথা যাদের হাতে যা কিছু নিয়ন্ত্রিত থাকতে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম সেসব সম্ভবত আর তেমন থাকছে না।  ফলে সবার আগে ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে পুরাতন ভারসাম্যটা।

    তবে একটা সারকথা একেবারে আঙুলে গুনে আমরা মনে রাখতে পারি যে, এবারের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” বা সেখান থেকে ঘোষিত অবরোধের নিষেধাজ্ঞার তালিকা প্রকাশের পর থেকে দুনিয়াটা আর আগের মত নাই, আগের জায়গায় তা আর স্থির নাই হয়ে গেছে। যদিও ক্রমশ ঘটনা গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ঘটনায় সেদিকেই যাচ্ছিল। তাতে বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা হল এসবের ‘ফাইনাল এলার্ম’ বাজানো।
    কিন্তু মজার কথাটা হল যদি প্রশ্ন জাগে বাইডেন কী জানতেন যে তিনি একটা “ফাইনাল এলার্ম” বাজিয়ে দিচ্ছেন! এর জবাবটা হবে খুব সম্ভবত না। তিনি বরং আমেরিকান সক্ষমতা আগের মত আছে মনে করে স্বাভাবিক মনে করেই একাজ করেছেন। হয়ত এখন ক্রমশ বুঝতেছেন বা বুঝবেন। এর একটা লক্ষণ হল থিঙ্কট্যাংক ফেলো কুগেলম্যান এর মন্তব্য যেটা প্রথম আলোতে অনুবাদে ছাপা হয়েছে। আর যার শিরোনাম “এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য খারাপও হতে পারে”। অর্থাৎ তিনি আমেরিকার জন্য খারাপ কথাগুলো সবটা উচ্চারণ করলেন না। কেবল কিছু ইঙ্গিত দিলেন।

    দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছেঃ
    আসলে আমাদের বেশির ভাগের অলক্ষ্যেই দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছে।  পোলারাইজেশন বা বাংলায় মেরুকরণ মানে কে কার দলে বা পক্ষে; সেই পক্ষা-পক্ষির ব্যাপারটা বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে যেভাবে সাজানো থেকে কাজ করত তা ভেঙ্গে গেছে। যেমন ভারতের কথাই যদি ধরি, বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগের দিনে,  ভারত আমেরিকার খুবই ঘনিষ্ট একথা মানতে কারও অসুবিধা হত না। এমনকি অকাসের না হোক অন্তত কোয়াডের প্রসঙ্গ উঠলে ভারত অবশ্যই চীনবিরোধী প্রথম সারির আমেরিকা ঘনিষ্ট, তা বলা যেত।  কিন্তু এখন এটা পুরাটাই আবছা অস্পষ্ট!  কিন্তু  এটাকে “বদলে গেছে” না বলে ভেঙ্গে গেছে বললাম কেন? বললাম এজন্য যে ভাঙ্গার পরে এটা এখন কোনদিকে যাবে থিতু হবে সেই নিশ্চয়তা এখানে এখনও নাই। এজন্যই বলছি পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত।

    যেমন এখন দশাটা এমন যে না চাইতেও একটা আপনাআপনি বা অবজেকটিভ পোলারাইজেশন এখানে তৈরি হয়ে আছে। তা হল, কে কে এখন বাইডেনের ‘ডেমোক্রেসি সামিট’ বা কথিত গণতন্ত্রের ছড়ি ঘুরানোর পক্ষে আর কে নয়।  তাতে একেবারেই একা বাইডেন একদিকে এমনকি ইউরোপও সেখানে বাইডেনের সাথে নয়, সম্ভবত এর মধ্যে বিপদ আঁচ করে দূরে থাকতে চাইছে। আর অন্যদিকে, শুধু চীন না, এখনকার গুরুত্বপুর্ণরা হল  রাশিয়া, চীন এবং ভারত ইত্যাদি। হা ভারত!  এবং এই নব সংযোজন ভারত এটা ১৩৫ কোটির দেশ তবে মোদির ভারত।  অথচ গত টানা বিশ বছর ধরে আগে কখনও দেখা যায় নাই এমনভাবে আমেরিকা-ভারত গাঁটছাড়া বেধে চলে আসছিল। সবাই এটাই জানত তারা ঘনিষ্ট বন্ধু – যেহেতু ভারত আমেরিকার চীন ঠেকানো [containment] এর বন্ধু অতএব এই সম্পর্ক এক লম্বা পথ হাটবে; অবশ্যই সহসা ভাঙবে না। এটাই ছিল সবার অনুমান!
    কিন্তু না। সবাইকে হতাশ করে দিয়ে এবার এক পুরান সত্যঃ রাষ্ট্র মানেই তা কেবল একান্তই নিজ নিজ স্বার্থ – সে কথাটাই ভেসে সামনে এলো। সেকথার ভাষ্যটা অনেকে এভাবে ঠাট্টা করে বলছেন, ভারত ‘বাবা’ বদলিয়েছে। আমেরিকার বদলে ভারতের বাবা এখন রাশিয়া। গত সপ্তাহে ৬ ডিসেম্বর রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত সফরে এসেছিলেন। আর সেটাকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রচন্ড হাইপ তুলে প্রপাগান্ডা করেছে [এটা নাকি ডিফাইনিং মোমেন্ট] যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের নজরে পরে এই এলান। স্বভাবতই এর প্রধান টার্গেট শ্রোতা হোক বাইডেনের আমেরিকা এই ছিল ভারতের আকাঙ্খা! আর এসব প্রচন্ড হাইপ তোলা এটাকেই অনেকে ভারতের বাবা বদল বলছেন!

    এমনিতেই বাইডেনের প্রেসিডেন্ট জিতে যাওয়া মোদির জন্য কাম্য ছিল না। তা অপ্রকাশ্য ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন নিজ নির্বাচনের এক ক্যাম্পেইন-করণীয় বানিয়েছিলেন কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুকে। বলেছিলেন তিনি এই ইস্যুতে প্রশ্ন  তুলবেন। তাই মোদির দিক থেকে তার অপছন্দের কিছুই লুকানো ছিল না বা ক্ষমতায় এলে পরে দেখা যাবে – এমন ইস্যু ছিল না। তাই মোদি নিজ অবস্থান ভেবে রেখেছিলেন যে বাইডেনের কাছাকাছি মুখোমুখি না হবার বা এড়িয়ে চলার। আর কামনা করতেন, চীন-আমেরিকার ট্রেড সংঘাত তীব্র হোক যাতে কাস্মীর ইস্যু নিয়ে তিনি এর আড়ালে প্রথম দুয়েক বছর কাটাতে পারেন। কিন্তু এমন কামনা পূরণ করনে-ওয়ালার কাছে ভিত্তি পায় নাই।

    অন্যদিকে আরও জটিল সমস্যা। বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হলে তা বিস্তারে নোট  করা আর তা নিয়ে মামলা সাজানোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক স্বাধীন কমিশন আছে। যারা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে বার্ষিক রিপোর্ট পাঠায়। এর নাম USCIRF (United States Commission on International Religious Freedom)।

    ভারত সম্পর্কে এই প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট খুবই খারাপ। এমন খারাপদেরকে তারা সিপিসি ক্যাটাগরিতে ফেলে চিহ্নিত করে থাকে। “কান্টি অফ পার্টিকুলার কনগার্ণ (CPC) বা “বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ এই ক্যাটাগরিতে। ভারতে মুসলমানদের উপরে নিপীড়ন প্রশ্নে ভারত এখন সিপিসি তালিকার দেশ। গত কয়েকমাসে মোদির সরকারের উপর এবার যুক্ত হয়েছে চার্চেও হামলার অভিযোগ।

    অতএব এ’দুই উদ্বেগের বিচারে বাইডেনের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” এর দিন যত ঘনায়ে আসছিল তাতে বাইডেন এবার ভারতের উপর কোন অবরোধ আরোপ দিতে পারে এই ছিল মোদি সরকারের অনুমান। কারণ ২০২১ সালের সিপিসি রিপোর্টে এটাই সুপারিশ করা ছিল। যেটা ট্রাম্পের আমল থেকেই এমন রিপোর্টগুলো উপেক্ষা করে চলছিল।  আবার মোদির দিক থেকে দেখলে এই ধর্মীয় নিপীড়নই তার শেষ ভরসা। মোদির ধারণা আগামি বছর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে পাবলিক রেটিং খারাপ অবস্থাতেও তার জিতে আসবার একমাত্র উপায়। ফর্মুলা সেই পুরানা; গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীত্বের আমল থেকে গত আট বছরের মোদির প্রধানমন্ত্রীত্ব পর্যন্ত যে – যত মুসলমান নিপীড়ন ততই ভোটার পোলারাইজেশন এবং ততই বেশির ভাগ হিন্দুভোটার মোদির দলের বাক্সে। এই অনুমানে যে মোদি হল বাঘের বাচ্চা যে অন্য ধর্মের লোকেদের দাবড়িয়ে বেড়াতে সক্ষম; “হিন্দুধর্মই শ্রেষ্ঠ যা ধরে রাখার নায়ক মোদি”! কাজেই মোদির পক্ষে মুসলমান কোপানো একটু আপাতত কমানোও অসম্ভব! কাজেই মোদির পক্ষে বাইডেনের অবরোধ নিয়ে ভাববার সুযোগ নাই।

    আবার অবরোধের ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আরো আছে। অন্যের (আমেরিকান) বোমারু বিমান ঠেকানোর মিসাইল রাশিয়ার তৈরি S-400 । কিন্তু এই মিসাইল ক্রয়কারি রাষ্ট্রকে ঠেকাতে বা এক ধরণের অপরাধী বলে চিহ্নিত করার আইন আমেরিকা সাজিয়েছে যার নাম (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act,  CAATSA) ।  অর্থাৎ যে রাশিয়ান এই মিশাইল কিনবে সে আমেরিকার ঘোষিত শত্রু হবে তাই তার উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ করা হবে। ভারতের এমন ক্রয়াদেশের পাবার পরে রাশিয়ান মিসাইল পাঠানো রাশিয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এখনও বাইডেন অবরোধ দিবেন নাকি ভারতকে এই আইন থেকে ছাড় দিবেন এসবের কোনটাই এখনও ঘোষণা করেন নাই। অর্থাৎ সব এখনও বকেয়া বা পেন্ডিং হয়ে পড়ে আছে।

    এবার বাস্তবে কী ঘটেছে? এরই মধ্যে এবার বাইডেনের ডেমোক্রেসি সামিটে ভারত গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় দাওয়াত প্রাপ্ত দল ছিল। কিন্তু ঐ সামিট থেকে যেসব দেশের উপর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে সে তালিকায় ভারত নাই। এককথায় ভারতের উপরে আমেরিকার কোন অবরোধই আরোপ করা হয় নাই।

    আসলে এর মানে, উলটা বাইডেনই মোদির ভারতের হাতে বাঘবন্দি হয়ে গেছেন যেন। কেন এমন হল?

    কারণ মোদির উলটা চাল, তিনি পুতিনকে ভারতে ডেকে এনেছেন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক নানা কথা আর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জয়েন্ট ভেনচার নিয়ে আলাপ করেছেন। আর তাতেই বাইডেনের যেন বলতি বন্ধ!  ভারত এরপরে আর বাইডেনের চীন ঠেকানোর কাজে নাই লাগুক তবু ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার ভারতীয় বাজার যার লোভ দেখিয়ে ভারত সবসময় তার অপনেন্টকে এভাবেই শায়েস্তা করেছে। এটাই আরেকবার প্রমাণ করেছে যে পচাত্তর বছর আগের যে আমেরিকা ছিল, বাইডেনের আমেরিকা সেটা আর নয়। বাইডেনের আমেরিকাই উলটা ভারতের কাছে কেঁচো হয়েছে – নত হয়েছে, অকেজো হয়ে গেছে। অন্তত এখন আমরা এটাই দেখছি!

    তাই বাইডেন ভারতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্টিফিকেট দিয়ে দাওয়াত করেছেন আর যত পেন্ডিং অবরোধ-করার কথা ছিল এর একটাও প্রকাশ করতে পারেন নাই উলটা সবগুলোকে নিজের মুখের মধ্যে আটকে রেখে তা নিজেকেই  গিলে খেতে হয়েছে – এটা কোন আমেরিকা???

    ফলাফল কী? এর নেতি ফলাফলও আছে। আগে হলে আমেরিকান চাপে মোদির ভারত ইসলামবিদ্বেষ কিছুটা আড়াল করে হয়ত সরাসরি ইসলাম কোপানো অন্তত কিছুদিন বন্ধ রাখত।  যেমন বেশিদিন আগের কথা নয়। মোদির ক্ষমতায় আসার পরের বছর (২০১৫) ওবামা ভারত সফরে এসে (সেসময় মুসলমান ও খ্রীশ্চান নিপীড়ন, চার্চে হামলা শুরু হয়েছিল) মোদিকে চাপ দেওয়াতে শেষে মোদি বিজেপির নীতি-রাজনীতি আর তার সরকারের নীতি আলাদা বলে ঘোষণা করেছিলেন। সরকারের নীতি হিসাবে সব ধর্মাবলম্বির ধর্মপালনের স্বাধীনতাকে মোদি স্বীকার করে প্রটেক করার দায় কবুল নিয়েছিলেন। দিল্লির এক চার্চের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়ে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। [আগ্রহিরা এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত জানতে আমার পুরামা ২০১৫ সালের মে মাসের এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন। ওখানে সেকালে চার্চের অনুষ্ঠানে দেয়া মোদির ভাষণটাও সংযোজিত আছে।]  অথচ এবার উলটা, ভারতই বাইডেনকে চ্যালেঞ্জ করে গেল! আমেরিকা কিভাবে ক্রমশ কর্তৃত্ব হারাচ্ছে এর এক জলজ্যান্ত প্রমাণ এটা।

    রাজনাথের কারিগরিঃ
    এদিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের ৫০ বছর স্মরণে এক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে ছিলেন। এতদিন এধরণের অনুষ্ঠানে ভারত বড়জোর দাবি করত যে তারা বাংলাদেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। কিন্তু এবার তিনি দাবি করেন ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে।  আবার দেখা যাচ্ছে, ভারতের এক নামী সম্পাদক- কলামিস্ট লিখেছেন বাংলাদেশে আমেরিকান অবরোধে ভারতের নিশ্চুপ থাকার বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে অনেকেরই অনুমান-কল্পনা হল আবার কী তাহলে  আমেরিকার হাত থেকে প্রটেকশন পেতে বা হুজুর ধরতে মোদী-হাসিনা গভীর সম্পর্ক হতে যাচ্ছে, তাই কী ?
    দিন সবসময় একরকম থাকে না। না, এটা এখন বাস্তবতাতেই অসম্ভব। ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের কথা অবশ্যই আমরা কেউ বলছি না। ফলে কথাটা হচ্ছে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যের। এমন রুটিন সম্পর্কের (আমরা ১৯৭১ সালে এটা সেটা ছিলাম টাইপের) বাইরে অন্য কোনদিকে এখন আর আগাবার সম্ভাবনা নাই। আর এদিকে হাসিনা সরকার কখনও যদি ফেল না করে তাহলে চীনের সাথে তার সম্পর্ক একটুও ঢিলা হবার কোন সম্ভাবনা নাই।
    তবে সরকারের জন্য এখনকার চ্যালেঞ্জ হল – অবরোধ আরোপের ফলে আমলা আর দলীয় কর্মি-নেতাদের যাদের সক্রিয়তা সরকার টিকাতে ম্যাটার করে এদের মনোবল নিঃসন্দেহে চাপ খাবে – সেটা কতদুর সামলাতে পারে তা দেখতে হবে।  অবরোধের পাল্লায় পড়া যাবে না যা “অর্জন” তা সামলাতে হবে – তাদের এই পালাই পালাই মনোভাব ডমিনেট করবে।  সরকারের পাবলিক রেটিং থাকলেই একমাত্র যা দিয়ে এমন চাপ মোকাবিলা সহজেই সম্ভব হত হয়ত।
    আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে!

  • বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    গৌতম দাস

    ১৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3QG

     

       US  Democracy Summit 9-10 Dec 2021

    “Summit for democracy an ‘anti-China ideological clique’”

    গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আয়োজিত “ডেমোক্র্যাসি সামিট” [Democracy Summit] সমাপ্ত হয়েছে। যদিও করোনার কথা ভেবে এটা অন-লাইন বা ভার্চুয়াল সামিট ছিল। রয়টারের তথ্য মতে ১০০ এরও বেশি দেশ এখানে অংশ নিয়েছিল।  বাইডেন একে নাম দিয়েছিল  “ডেমোক্র্যাসি সামিট”। যেটা আসলে কার্যত   স্ট্রাটেজিক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” বা একে বাংলায় বললে এটা হয়ে যায় “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”। কিন্তু কৌশলগত কেন? এর মানে কী? 

    ছলনার কৌশলঃ
    বাইডেনের মূল সংকট হল কোন মানদন্ড ছাড়া তিনি ডেমোক্রাসি শব্দটা এস্তেমাল করতে চান।
    আর এভাবে আমাদের মত অনেক দেশেই আমেরিকা  অবরোধ আরোপ করতে চান এবং বিশেষ করে চীনের উপরে অবরোধ আরোপ না হলেও অন্তত বিব্রত করতে চান। কিন্তু কাজটা তিনি করেছেন বা তার করার পথটা অসৎ। যেমন ঘটনা হল আমাদের মত সেসব দেশ এমনকি চীনেও উপযুক্ত ও স্পষ্ট “জন-প্রতিনিধিত্বশীল” রাষ্ট্র থাকা বা না-থাকার ঘাটতি আছে। কিন্তু আমেরিকা  কোন মানদন্ড কাউকে
    ডেমোক্রাসির রাষ্ট্র  বলে দাওয়াত দিচ্ছেন বা কাউকে বাদ দিচ্ছেন তা প্রতকাশ করে নাই। ফলে সামিটে দাওয়াত দিয়েছে মূলত বাইডেনের আমেরিকার এখনকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতে। এটাই সেই বড় অসততা!  এটা হতে নুন্যতম আমেরিকা বা অন্যকোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থের উর্ধে, তা পরোয়া না করে। এবং ইন্ডিপেন্ডন্ট মানদন্ডে।  আমেরিকা যে তা মেনে করে নাই এর বড় প্রমাণ হল আমেরিকা কোথাও তার মানদন্ড প্রকাশ করে নাই। ফলে এটা অস্বচ্ছ আর তাই অসততা হয়েছে। একারণে সামিটের গায়ে কালি লেগে গেছে।

    আমাদের দেশে ‘কৌশল করা’ শব্দের একটা অর্থ হল ছলনা করা। ফলে কৌশলের সোজা কমন মানুষের বুঝ হল যে কেউ যখন যা বলবে তা করবে না বা করবে আরেকটা – এটাই কৌশল। ঠিক এ’অর্থেই বাইডেনের আমেরিকা এক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” ডেকেছিলেন। এর অর্থ হল আমেরিকা যাকে যাকে “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” মনে করে তারাই এই সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েছিলেন। কিন্তু তবু কথা বা কিন্তু আরও আছে।  আমেরিকার এই মনে করাটা হয়ত আগে আমেরিকা ‘মনে করত’ হলেও হবে না। এখনকার বাইডেন সরকারের নিজ লাভালাভের মানদণ্ড দিয়ে যদি বলেন তা হলেই কেবল সেটা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” বলে মানা হবে। 

    এক কথায় বললে, বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ এতই দেউলিয়া যে, এর ‘ডেমোক্র্যাসি’ ধারণার কোনো সংজ্ঞায় যাওয়ার মুরোদ নেই। তাই দেয়া হয়নি বা কাজ করে না। কোনো ক্রাইটেরিয়াই নেই। কী কী থাকলে ‘ডেমোক্র্যাসি’ মানা হবে তাও জানা যায় না। তারা বলতে পারেন না। যেন এটা কেবল বাইডেন প্রশাসনের স্বার্থের খেয়াল যে, তারা কাকে কাকে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ মনে করবে।

    কেন এটা এমন হয়ে গেলঃ
    এমনিতেই বাইডেনের সমস্যা দাড়িয়েছিল কাকে ডাকবেন আর কাকে না। বা অন্যভাবে বললে, কারা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” তা বলতে না পারলে ডাকবেন কী করে? অথবা কোন রাষ্ট্রকে ডেকে বসা মানে তো হয়ে যাবে বাইডেন তাহলে ঐ রাষ্ট্রকে তাহলে আপনাতেই বাই ডিফল্ট [by default] গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে করছেন। এছাড়া বাইডেনের মনে আরো এক বড় “চোরামি” তো কাজ করছেই যে তিনি চীনকে বিব্রত করবেন কোপাবেন!  

    তাই সব মিলিয়ে খুব সহজ সেই একই পন্থা অনুসরণ করেছেন!। তা হল যেমন, কোনো ঘটনাকে তারা ‘টেররিজম’ বলবেন বা বলেন? এরও কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখনো নেই। কখনো দেয়া হয়নি। এভাবেই চলছে। আর আছে এর বদলে তাদের একটা তালিকা। ওই তালিকায় যেসব রাষ্ট্রের নাম আছে সেটাই তখন থেকে টেরর বা জঙ্গি রাষ্ট্র। এই হল অসততার স্টাইলটা। বুশের আমল থেকে এ ব্যবস্থা চালু আছে আমেরিকায় এবং তা এখনো বহাল করে রাখা আছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘেরও টেরর রাষ্ট্রের কোনো সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া নেই। সেখানেও একই পদ্ধতি। এগুলোকেই বলা যায় ‘মাতবর’ রাষ্ট্রগুলোর বৈষয়িক মানে বিষয়-আশয়ের স্বার্থের ভিত্তিতে ওই তালিকায় নাম ঢুকানো বা বের করা।
    কাজেই এটা পরিষ্কার, বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে বড় মানবাধিকারের দোকানদার ও স্বার্থবাজ আর কেউ নেই। আমাদের ব্যবহারিক অসুবিধা এবং কঠিন সমস্যাটা হল, ক্ষমতাবান প্রধান রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ছাড়া হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ইস্যুতে সেই লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে  কোনো পদক্ষেপ আসার কোনো সুযোগই নেই। একমাত্র এখন এক বিকল্প হল যতটুকু যা সম্ভব তা হল, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনমতের চাপ কোন ইস্যুতে যদি তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের বেলায় এমন গ্লোবাল জনমত তৈরি প্রায় অসম্ভব। তবুও আমাদের লড়তেই হবে, এটা বটম লাইন। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

    থিঙ্কট্যাংক ফেলো এরা কী বলেনঃ
    গত লেখায় আমেরিকান “ফরেন পলিসি” পত্রিকায় মাইকেন কুগেলম্যানের নিয়মিত ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফিং’-এর কথা বলেছিলাম। এটা সাপ্তাহিক ব্রিফিং বা কলামের মত। চলতি এই সপ্তাহে সেই কুগেলম্যানও বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটকে’ ইস্যুতে সম্ভবত সরাসরি সমর্থক হওয়াটার বিপদ বুঝেছেন। তাই তিনি কিছুটা সমালোচক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন। তিনি আগেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটে’ দাওয়াতি কারা হবেন এ নিয়ে কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখানে নেই। তিনি লিখছেন তালিকায় নাম থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে আর এতে এই অনুমান তৈরি হয়েছে যে, বাইডেন প্রশাসন ‘অযোগ্য দাওয়াত-দাতা’ […controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host……]। কুগেলম্যানের ভাষায় ‘আনফিট হোস্ট’ এবং তিনি বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার নিমন্ত্রিত দেশের তালিকা দেখে বোঝা গেছে, এই সামিটে দাওয়াত পাওয়ার যোগ্যতা বা একমাত্র মানদণ্ড ডেমোক্র্যাটিক পারফরম্যান্স ছিল না; এটি প্রমাণিত। মানে, অন্য অনেক কিছু ছিল। কুগেলম্যান এমনকি ব্রিটিশ ফ্রিডম হাউজের র‌্যাংকিংয়ের সাথে তুলনা নিয়ে এসে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বাইডেন কোনো মানদণ্ডই মানেননি, এখানে অনুসরণ করেননি।

    “The Biden administration’s Summit for Democracy, hosted virtually today and Friday, comes at a moment of global democratic backsliding. However, controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host, has accompanied the event. The South Asian invitees prove democratic performance isn’t the sole criterion for a seat at the summit.” – ,

    এবার তিনি সরাসরি লিখেছেন, আসলে এশিয়ার যেসব দেশের নাম তালিকায় রাখলে ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হাসিল হয়’ (বেস্ট সার্ভ ইটস কারেন্ট ইন্টারেস্ট) সেসব দেশের নামই ওখানে রাখা হয়েছে; অর্থাৎ বাইডেনের তালিকার গরমিলের বোঝা এতই ভারী যে, তিনি সোজা এর দায়দায়িত্ব নেননি; ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। উল্টো নিজেই সমালোচকদের দলে ভিড়ে গেছেন।

    থিংকট্যাংক ফেলোঃ
    এখন আরেকজনের নাম করব তিনিও মাইকেল কুগেলম্যানের মতোই থিংকট্যাংক ফেলো- আলী রিয়াজ; তিনি কিন্তু একেবারে ‘ধরাশায়ী’ হয়ে গেছেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছেন থিংকট্যাংকের সিনিয়র বা জুনিয়র ফেলো হওয়ার কাজটা হল – উপস্থিত আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া। এমন ভাবাটা এশিয়ান অরিজিন মানুষের সমস্যা কি না, জানি না। আলী রিয়াজ ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ ইস্যুতে কুগেলম্যানের উল্টো অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন পত্রিকায়  [বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলন আলী রীয়াজের মূল্যায়ন] বিরাট এক সাক্ষাৎকারে বাইডেনের পক্ষে ব্যাপকভাবে সাফাই জোগানোর চেষ্টা করেছেন।

    বলাবাহুল্য, সাফাইটা দাঁড়ায়নি। কারণ, সম্ভবত কতটা উজানে বাওয়া যায় তারও তো কিছু সীমা থাকে! কারণ বাইডেনের রাষ্ট্রস্বার্থের খেয়ালে যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তার স্বপক্ষে সাফাই তিনি কোথা থেকে আনবেন?

    এমনকি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কী? গত ২০০৭ সালে এই একই কথিত ‘গণতন্ত্র’, মানবাধিকার আর দুর্নীতিবিরোধী কথা বলে আমেরিকান গণতন্ত্রী যারা  ‘তাদের’ আগমন ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ছিল এর পরিণতি! এটা কে অস্বীকার করতে পারবে? তা হলে আলী রিয়াজ আজ কোথা থেকে কী আর সাফাই আনবেন? কী সাফাই দেবেন? এরা গণতন্ত্রী???

    তাই বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন আসলে হয়ে গেছে কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন; অর্থাৎ কৌশলগত; মানে যা বলে তা করে না; করে আরেকটি। ছলনা করে। নানান নখরাও করে। কেন? ইংরেজি স্ট্রাটেজিক শব্দটার বাংলা করা হয় কৌশলগত বা কৌশলী। তাই আমরা দেখেছি আলী রিয়াজের মানবজমিনে দেয়া বক্তব্যে তিনি উপায়ন্ত না পেয়ে নিজের ইজ্জত ঢাকতে শেষে এই ‘স্ট্রাটেজিক” শব্দটা এনেছেন। অর্থাৎ তিনি সংজ্ঞাহীনতা বা মানদন্ড না থাকার সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েই যেন বলেছেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে, তা নয়। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এ অঞ্চলে ও অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে, সে দিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। এ কথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই ‘গণতান্ত্রিক দেশ’ বলতে পারব না।’

    “পাকিস্তান এবং ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে সেটি নয়? এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে এবং অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। একথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক দেশ বলতে পারবো না” – আলী রীয়াজের মূল্যায়ন মানবজমিন

    এখানে তিনি পুরো সারেন্ডার করেছেন; অর্থাৎ তার গণতন্ত্র এখন আর বিশেষণ ছাড়া শুধু গণতন্ত্র নয়। এর বিশেষণ এখন ‘কৌশলগত’ এই শব্দটা সামনে জুড়ে দিয়ে। তবুও সাফাই দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করেননি। তাই এবার কৌশলগত শব্দের আমদানি। অথচ কে না জানে যা কৌশলগত তা আর কোনো ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি নয়। এটা একান্তই বাইডেনের আমেরিকার নগদ লাভালাভের স্বার্থ!

    ইমরানের রসিক জবাবঃ
    তবে আমেরিকান দাওয়াত মানে গণতন্ত্রের সার্টিফিকেট বেচা বিক্রিটার মধ্যে এক চরম তামাশা ঘটিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি এই দাওয়াতে যেতে অপারগতা (decline) জানিয়েছেন [Pakistan declines US democracy summit invitation]। সাথে বলেছেন, তারা চীন-আমেরিকা এমন দলাদলি বা ব্লক ভাগাভাগিতে পড়তে চান না! [We don’t want to enter bloc politics: PM] বলাই বাহুল্য এ’এক ইমরানের ভাল “স্মার্ট মুভ”।

    যা হোক, মনে হচ্ছে আলী রিয়াজ কুগেলম্যানের কাছে জেনে নিতে পারতেন যে, থিংকট্যাংক ফেলোর চাকরি নেয়া মানেই আমেরিকান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে ‘পক্ষে’ লিখতেই হবে তা নয়। দায় না নিয়েও এবং সাথে সমালোচনা করে বা নিদেনপক্ষে অন্যরা কী সমালোচনা করেছে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেও সেসব উল্লেখ করে কথা বলা সম্ভব।

    তবে আলী রিয়াজের লম্বা সাক্ষাতকারে সমস্যা হয়তো অন্যখানে এবং তা আরো জটিল হয়ে গেছে; মুল কারণ সম্ভবত আলী রিয়াজ অহেতুক কমিউনিস্ট ও নন-কমিউনিস্ট ভাষ্যের বিতর্কে ঢুকে গেছেন। একালে কোনো রাষ্ট্র আর কমিউনিস্ট কি না, এটা কোনো ফ্যাক্টর বা ইস্যুই নয়।  যেমন স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র হতে গেলে তাকে কমিউনিস্ট হতে হবে, তা তো নয়। মোদির হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়ই কমিউনিজম নয় বা এই দোষে দুষ্ট নয়। আবার আজ পুতিনের রাশিয়া নিজেও দাবি করে না যে, সে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এছাড়া একালে ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় সদস্য হয়ে গেছে; কারণ এই সক্রিয় সদস্যপদ না থাকলে রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধা থাকে না। আর না থাকলে মানুষকে কাজ দেয়া খাবারসহ দেয়া এসব রাষ্ট্র চালানোই মুশকিল, একালে প্রায় অসম্ভব। এই মাপকাঠিতে চীন-রাশিয়া সবাই আর কমিউনিস্ট কি না সে প্রশ্ন তোলা এমন কমিউনিস্ট কে আছেন? অন্তত কমিনিস্টদের নিজের এই মাপকাঠি অনুসারে!  আর চীনের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন তো আরো অচল। কারণ আমেরিকা ক্রমশ আরো দুর্বল হচ্ছে এভাবে সব সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তাকে সরিয়ে চীন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা অর্থনীতির নেতার আসনে বসতে যাচ্ছে। কাজেই সে কমিউনিস্ট কি না, এটা নিয়ে আর কী করবেন? অবশ্য অভ্যন্তরীণভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি পুরনো বক্তব্যের সাফাইয়ের ওপরই চলে এবং কমিউনিজম-২ বলে কিছু একটা করার ভাবনা আছে, এ কথা ভাবছে।

    কাজেই আলী রিয়াজ যেমন লিখছেন, “সারা বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি হয়েছে যার একটির প্রতিনিধিত্ব করে যুক্তরাষ্ট্র। অপরটির প্রতিনিধিত্ব করে চীন ও (বলা যায়) রাশিয়া”  – এগুলো একেবারেই ভুয়া কথাবার্তা এবং অচল মুখস্থ কথাবার্তা। একালে এটা আর কোন বুদ্ধিমানের পর্যবেক্ষণ বা মিনিংফুল অবজারভেশন হয়নি। তবে ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’কে কমিউনিজমের বুদ্ধি বা ক্রাইটেরিয়া দিয়ে সাফাই ব্যাখ্যা দেয়া আসলেই বেশ অভিনব। তা হলে চীন যখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা হবে (ইতোমধ্যেই অনেকদুর আগিয়েছে), তখন কথিত ‘আদর্শিক অবস্থান’ জিনিসটা কোথায় থাকবে?

    আসলে আমাদের ভেবে কথা বলতে হবে। পুরনো কমিউনিজম কী শিখিয়েছে তাই শেষ কথা বা সবচেয়ে জ্ঞানের কথা মেনে নেয়াটাই তো ভিত্তিহীন এবং তা অবাস্তব, ননপ্র্যাকটিক্যাল। পুরান কথা আকড়ে ধরা নয়, বরং পর্যালোচনা, নিরন্ত্রর পর্যালোচনাই তো রাস্তা!

    কথা আরো আছে। এই যে গণতন্ত্র শব্দটা আমেরিকা চালু করল মডার্ন রাষ্ট্র সম্পর্কে এটা তো মূল শব্দ বা ধারণা কোনটাও নয়। মূল ধারণামূলক শব্দটা হল ‘রিপাবলিক’ [republic] বা মডার্ন রিপাবলিক। অথচ এই ধারণাটাই ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমেরিকা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে শব্দটি বদলে আনা হল নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’। এর পেছনের মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন  – এ’দুই রাষ্ট্রই তাদের স্ব স্ব  বিপ্লবের পরে নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে এই “রিপাবলিক” শব্দটা রেখেছিল। ইউএসএসআর (USSR) এই নামের মধ্যে ‘আর’ মানে রিপাবলিক। ওদিকে চীনের আনুষ্ঠানিক নাম পিআরসি (PRC) বা পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। অর্থাৎ এখানেও ‘রিপাবলিক’ শব্দ হাজির। তাই আমেরিকার পক্ষে  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো রিপাবলিক নয়, তা বলা সম্ভব হচ্ছিল না; যদিও তাদের ক্ষমতা কাঠামোতে সমস্যা আছে। তাই আবার সেই আমেরিকান কৌশল খাটানো বা স্ট্রাটেজি!

    রিপাবলিক শব্দটি ফেলে দিয়ে প্রমিনেন্ট করা হলো নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’কে। আর তাতে সবচেয়ে জোর দেয়া হল, যা কমিউনিস্ট দেশে নেই বা দুর্বল অপুষ্ট; এর একটা যেমন ভোট বা নির্বাচন। যার মূল এবং মৌলিক ধারণাটা হল জনপ্রতিনিধিত্ব। অথচ আমেরিকান কথিত “গণতন্ত্রের” ধারণায় জনপ্রতিনিধিত্ব ধারণাটার গুরুত্বই নেই।  সামনে আনা হয় না। ভোট মানেই গণতন্ত্র আর এই ভোটের ধারণার নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।  আবার ওদিকে যেমন বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা; অর্থাৎ যেসব শব্দ উচ্চারণ করলে কমিউনিস্টরা বিব্রত হবে সেসব শব্দকে সামনে আনা হয়েছে। এতে গ্লোবাল আইডিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকা মাইলেজ পেয়েছে, সন্দেহ নেই বিশেষ করে কোল্ড ওয়্যারের আমলে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণাগুলো বোঝাবুঝিতে, রাজনীতির বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে। রাজনীতি বা রাষ্ট্র মানে তা নেমে এসেছে ভোটাভুটিতে। এ ছাড়া সবচেয়ে ক্ষতি করেছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণার বিকাশ ঘটতে না দিয়েও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটানো হয়ে গেছে।

    যেমন কেন রিপাবলিক ধারণাটা? এটি যে মনার্কি[monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে রাজতন্ত্রের পেট চিরে একটি নতুন ধারণা বা সমাধান তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে – আমেরিকার এই গণতন্ত্র শব্দটি এনে। যেমন আরো গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল, ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ, এর ইতি ও নেতি দিক, পারসোনাল লিবার্টি, রাইট টু লাইভ, বেঁচে থাকার বা জীবনের অধিকার এমনকি খোদ রাজনীতি বা রাজনৈতিকতা শব্দটার অর্থ কী? এসব কিছুকে আড়ালে ফেলা শুধু নয়, কবরে মাটিচাপা দেয়া হয়ে গেছে। আর সব কিছুকে নামিয়ে আনা হয়েছে ‘গণতন্ত্র’ আর ভোটাভুটিতে। কোল্ড ওয়্যারের যুগের এই আমেরিকা-সোভিয়েত এই ব্লক রাজনীতির ধারণার আড়ালে। অথচ আজো এসব বাজে তর্ক- আমেরিকা-সোভিয়েত ঠাণ্ডা যুদ্ধে কার পক্ষে মাইলেজ আসবে- সেসব নিজ অযোগ্যতাতেই এখন আপনাআপনিই ক্ষয়ে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রশ্নটা আমেরিকা না সোভিয়েত- কে ভালো এর তর্ক একেবারেই নয়। কারণ আমাদের জানতে ও চিনতে হতো ও হবে রাষ্ট্রকে। নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে গড়তে। আমরা আমেরিকা না সোভিয়েত রাষ্ট্রের সমর্থক হব মামলাটা সেটা নিয়ে কখনই নয়।

    তবে আমেরিকার সমালোচনা করা হচ্ছে মানে চীনা বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র আদর্শস্থানীয় তা নিশ্চয়ই  নয়। কমিউনিস্টদেরও বয়স মানে রাষ্ট্র অভিজ্ঞতাও শত বছর হয়ে গেল। লেনিনের প্রথম গনভোটে পরাজিত বা অভিজ্ঞতা সুখকর হয় নাই বলে জন-প্রতিনিধিত্ব ধারণার বাস্তবায়ন নিয়ে আর ভাবা যাবে না এর কোন মানে নাই। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল দিকটা নিয়েও চীনকে ভাবতেই হবে। চীন নিজে আভ্যন্তরীণভাবে আজ ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত আছে থাকছে সেটা হতেই পারে। কিন্তু কাল নাও থাকতে পারে! মানুষের বাস্তবায়নযোগ্য আকাঙ্খায় লাগাম পরিয়ে রাখা যায় না। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল বলেও আলাদা কিছু আছে ;  কিন্তু গ্লোবাল নেতৃত্বের দৃশ্যপটের আস্থা অর্জনও কম জরুরী। এদিকগুলো ছাড়া চীনের কেবল গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়াটা আদৌও কতটা সম্ভব অথবা কতটা সুখকর অভিজ্ঞতা ও সফল বা শান্তিপুর্ণ থাকবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজেই আমাদেরটাও  “আমাদের মত গণতন্ত্র” – এটা মুখরক্ষায় বা সার্বভৌমত্বের অজুহাতে বলা যায় হয়ত কিন্তু অর্থ হয় না।  আর অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব মানুষের ভোগ-সংশ্লিষ্ট ফলে বৈষয়িক বিষয়গুলোকে ১৯৬৬ সালে কোনমতে জোড়াতালিতে জাতিসঙ্ঘের দলিলে কমিউনিস্ট মানবাধিকার বলে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে বটে। কিন্তু সরি, এই পাঁচটার একটাও “রাজনৈতিক” ধারণাই নয় বৈষয়িক-ভোগের ধারণা – যা রাজনৈতিক নয়। ফলে যা “রাজনৈতিক” ধারণা নয় তা “অধিকার” হবে কী করে? সবার আগে “রাজনীতি” শব্দের অর্থ ধরতে পারতে হবে। মানুষ কেবল ভোগী এক মেশিন তো নয়। সে আপাদমস্তক পলিটিক্যাল। এসব কথার অর্থ বুঝতে হবে। এর উপর আবার মানুষের স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা আছে। তাকেও জায়গা করে দিতে হবে।  এসব ছোটখাট বিষয় নয় বরং গভীর দর্শনের বিষয়। মানুষকে অনেক দূর যেতে হবে, আবার অনেক কিছু বাকি! ওদিকে কমিউনিস্ট অর্জনও নিশ্চয় অনেক। কিন্তু সব শেষ নয় অবশ্যই। বহু সংস্কারই বাকি! 

     আমাদের আগের প্রসঙ্গে ফিরি। একালে এসে কে কমিউনিস্ট আর কে মেন-স্ট্রিম এসব কোল্ডওয়ারের ভাগাভাগি কমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নাই-ই। তবু অনেকের জন্য সম্ভবত এটা কষ্টসাধ্য যে, একটা মনার্কি সিস্টেমের বিপরীতে রিপাবলিক-কে বুঝতে হবে এবং তুলনা করে। এছাড়াও এটা না বুঝলে জানা যাবে না যে, রাজতন্ত্রে ব্যক্তি-মানুষ বলে কিছু নেই। ছিল না কেন? ধারণাটাই নেই, তখনও উন্মেষ ঘটে নাই তাই।  আমেরিকা কী করে ‘লিবার্টির’ আমেরিকা হয়ে উঠেছে; আমেরিকান হিস্ট্রি গুরুত্বপুর্ণ সেই ইতিহাসে কমিউনিস্টদের আগ্রহ নেই। আগ্রহ হল, আমেরিকা কী করে ‘গণতন্ত্র’ নামে একটি ধাপ্পাবাজির প্রচারক হয়েছে অথবা এটা দিয়ে সোভিয়েতকে হারিয়েছে, সেখানে।

    ইতিহাসে এক গোত্র বা ট্রাইবাল [tribal] সমাজ পেরিয়ে অনেক পরে ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ হয়েছে তাও আবার রাজতন্ত্রের যুগের শেষপ্রান্তে এসে। তাও তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তির উন্মেষের খবর হয়নি, জানা হয়নি অনেক সমাজে। যেমন যেকারণে আমেরিকা তালেবানদের পশ্চাৎপদ বলে সুযোগ নেয় কিংবা এই সুযোগে ইসলাম পশ্চাৎপদ বলে প্রপাগান্ডা করতে ভালোবাসে। আর এসব বলাবলিকে কাজে লাগাতে চায় এভাবে যে, ওরা পশ্চাৎপদ; কাজেই তালেবানদের এখন আমেরিকান আধিপত্য মেনে নিতে হবে, কায়েমের কাজে লাগতে হবে। অথচ নিজেরা যে কথিত ‘গণতন্ত্রের’ প্রচারে লেগে আছে যেটা স্রেফ ভোটাভুটি আর আমেরিকার তাতে স্বীকৃতি। অথচ এসবের বিপরীতে আমাদের দরকার নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্রধারণার বিকাশ, নিজ রাষ্ট্র গড়ে তোলা। ট্রাইবাল সমাজের অভ্যাস রীতি কেন ব্যক্তি-উন্মেষ হয়ে যাওয়া সমাজে খাটবে না সেটা আগে উপলব্দি করা।

    একালের আমেরিকা আরো ভয়ঙ্কর। একটা উদাহরণ দিব, বাকিটা সবাই বুঝবে। ইটিআইএম- ইস্টার্ন টার্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM)। নাম শুনে অনেকের বুঝতে কষ্ট হতে পারে, তাই চিনিয়ে দেই। এরাই হলো চীনা উইঘুরের সশস্ত্র সংগঠন। এই সংগঠন সম্পর্কে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকের তথ্য-ভাষ্য এখানে।  এই সশস্ত্রতা, এদের এখনকার বসবাস ও তৎপরতা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে।

    বুশের আমল থেকেই এরা টেরর বা সন্ত্রাসের দল হিসেবে আমেরিকান ও ইউএনের লিস্টে তালিকাভুক্ত। কিন্তু তা এখন ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে; কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প তো খুবই বুদ্ধিমান ও ধূর্ত করিৎকর্মা। তিনিই এই ইটিআইএম দলকে নিজ সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন।  অথচ ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান, কিরঘিজস্তান, আমেরিকা ও চীন  [Afghanistan, Kyrgyzstan, the United States, and China] এদের সবার আবেদনে জাতিসংঘ এই সংগঠনকে তালিকাভুক্ত করেছিল। এনিয়ে আমেরিকান ট্রেজারি ডিপার্ট্মেন্টের এই বিবৃতি এখানে।  তাহলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী? খুবই ‘মহৎ’! আর ইটিআইএম এখন কী নিয়ে ব্যস্ত ও কোথায়?

    পাকিস্তানে চীনা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের শেষ নেই। তেমনই এক প্রকল্পের এলাকায় ভেতরের ঘটনা। প্রকল্প কম্পাউন্ডের ভিতরে সেটাও কয়েক মাইল বলে তাদের অভ্যন্তরীণ নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু করা আছে, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার থেকে শ্রমিক বা যেকোনো কর্মী চলাচল করে থাকে। তেমনই এক বাসে বোমা বেঁধে রেখে তা দিয়ে হামলা পরিচালনা করে ইটিআইএম। আর এতে ঐ বাস পাশের নদীর তীরে বা খাদে পড়ে যায়। এতে ১৩ জন চীনা ইঞ্জিনিয়ার মারা যান। আর এ হামলার নায়ক ইটিআইএম এর এক কর্মী।

    ট্রাম্পের তালিকামুক্তি কেন তা আমরা নিশ্চয় বুঝলাম। এখানে এনিয়ে একটা ইন্ডিয়ান রিপোর্ট আছে। কিন্তু খেয়াল করতে হবে; তা হলে এটা কি চীনের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধ লড়বার ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি! কী তামাসা!  না, তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই যে, বাইডেন এসব থেকে দূরে।  অথবা ট্রাম্প একমাত্র গণতন্ত্রী, আর বাইডেন তা নয়!   ট্রাম্প এই তালিকামুক্তি দিয়েছিলেন ক্ষমতা ছাড়ার অল্প আগ দিয়ে। মানে হল, এর পুরো ‘লাভালাভ’ ও পারফরম্যান্স সব ক্রেডিট এবং বাকি অনুমোদন বাইডেনের নামে।

    এরপরে আরো ঘটনা হল,  তালেবানরা গত আগস্টে কাবুলে ক্ষমতা দখলের আগে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তাদের নেতারা এক সাক্ষাৎ করেছিল। ওই মিটিং শেষে তালেবানরা প্রকাশ্যেই মিডিয়াকে জানিয়েছিল, এমন সশস্ত্র গ্রুপগুলো যারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে অন্য দেশে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের আর আশ্রয় দেয়া হবে না”। আমরা অনেকেই জানি এখনকার আফগানিস্তানে আইএস (কে) বা খোরাসান গ্রুপ যারা তালেবানদের চেয়েও আরো রেডিক্যাল ও আলাদা, তাদের কামনা তালেবানরা যেন বিফল ও পরাজিত হয়, তারা অপেক্ষা করছে। এদিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঐ সাক্ষাতের পরে ইটিআইএম (ETIM) এরপর থেকে অবাধে আফগানিস্তানে চলাচল সীমিত করে ফেলে শুধু না তারা ঐ আইএস (কে) এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রটেকশনে থেকে তৎপরতা চালু রেখেছে। এরই এক ততপরতা ছিল পাকিস্তানের ঐ চীনা প্রকল্পে হামলা।
    চীন-আমেরিকার স্বার্থবিরোধ থাকতেই পারে; থাকা খুবই স্বাভাভবিক!। কিন্তু সেই বিরোধে আপার-হ্যান্ড পেতে ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপকে লেলিয়ে দিতে হবে, ব্যবহার করা হবে? এটা কোন গণতন্ত্র?  

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল, বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ – এই বুলির মূল কথা কী?

    যেটা আমেরিকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থ, সেটাই গণতন্ত্র!

    তা হলে বাইডেনের এই ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ কী বস্তু? আলী রিয়াজ আমাদের গণতন্ত্রের ‘দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি’ শিখিয়েছেন। আমরা নিশ্চয় এখন এর মর্মবস্তু বুঝতে পেরেছি। আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থটাই হল আমেরিকান ‘গণতন্ত্রের আদর্শ’।

    তা হলে আমাদের বাংলাদেশের সরকার সে তো অবশ্যই নিপীড়ক; গুম-খুন থেকে পায়ে গুলি, নিশীথ ভোট ইত্যাদি সকল ইস্যুতেই তের বিরুদ্ধে  অভিযোগের এখানে শেষ নেই। আমরা সবাই এসব নিয়েই আছি, নিরন্তর ভুগছি।

    এখন এতে আমেরিকা যদি আগ্রহ নেয় তার মানে যেটা ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ সেটাই গণতন্ত্র!’ চলবে এখানে? এই সূত্র অনুসারে এগিয়ে আসে তা হলে আমাদের এখন খোঁজ নিতেই হয় যে এখানে আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থটা মানে গণতন্ত্রটা ঠিক কী? আর তা এবার কী মুল্যে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’সম্মেলন”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আফগানিস্তান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা উদ্যোগ

    আফগানিস্তান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা উদ্যোগ

    গৌতম দাস

    ১৫ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3NQ

     

    A Taliban fighter stands guard as women wait in line during a World Food Programme food distribution in Kabul on November 6, 2021. (Photo by Hector RETAMAL / AFP)

    Afghans attempting to withdraw money from a bank in Kabul, Afghanistan, where lost income and cash shortages are worsening severe food insecurity, September 21, 2021. © 2021 Haroon Sabawoon/Anadolu Agency via Getty Images

    সবার আগের প্রসঙ্গঃ
    আফগানিস্তানে এক দুর্ভিক্ষ আসন্ন আর সেইসাথে সেখানকার পাহাড়ি-শীত জেঁকে বসল বলে। এর চেয়েও বড় কথা আফগান অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। এমনিতেই আফগানিস্তানে ২০ বছরের দখলি শাসন অবসানের পরে একটা নিজ রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। এর উপর তাতে কার্যকর একটা অর্থনৈতিক সিস্টেম আবার খাড়া ও চালু রাখা খুবই কঠিন কাজ। বিশেষত যখন ঐ দেশের অর্থনীতিতে  বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থাটাই অকার্যকর হয়ে আছে। বলা যায় আফগানিস্তান এখনো ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার’ সাথে একই বোঝাবুঝিতে নেই, ন্যূনতম কার্যকর রাজনৈতিক সহমত তৈরি নাই বা হচ্ছে না। ফলে বাস্তবত আফগানিস্তান বাইরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম ও গ্লোবাল মুদ্রাব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত নয়, বিচ্ছিন্ন। ফলে আফগান অর্থনৈতিক কাঠামোটাই নড়বড়ে, নিজে নিজে কোনো মতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। দুর্ভিক্ষাবস্থার মূল সঙ্কট এখানেই।

    এদিকে পাকিস্তানের ‘ডন’ একটি খুবই খারাপ খবর ছেপেছে। জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হকের বরাতে পত্রিকাটি লিখেছে, তা অনুবাদ করে লিখছি : ফারহান বলছেন, “মানবিক সাহায্য বিতরণ নিয়ে কাজ করা আমাদের সহকর্মীরা সতর্ক করে জানাচ্ছে যে, আফগানিস্তানের প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ লোক যারা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি (৫৫ শতাংশ), তারা অতি জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসঙ্কট ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে চলতি নভেম্বর ২০২১ থেকে মার্চ ২০২২ এই সময়কালটায়” [“Our humanitarian colleagues warn that nearly 23 million people — or 55 per cent of the Afghan population — are estimated to be in crisis or experiencing emergency levels of food insecurity between November 2021 and March 2022,” Mr. Haq said.]।

    বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে, ১৯৭৪ সালের দিকে যাদের বয়স তখনই ১০ বছর বা এর বেশি ছিল তাদের স্মৃতিতে আবছা বা স্পষ্ট থাকার কথা যে, দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পরে খাদ্যসঙ্কট, দুর্ভিক্ষ আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অকার্যকর হয়ে পড়া বা থাকা ওদেশের মানুষের জন্য কেমন অসহায় অবস্থায় এক চরম সঙ্কট-বিপর্যয় তৈরি করেছে! আজ বাংলাদেশে নিজেরা জীবনমানের দিক থেকে যে উঁচু জায়গাতেই থাকি পুরনো সেই স্মৃতি আমাদের জানান দেয় আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ এখন কী অমানবিক দুর্দশায়! চার দিকে খাদ্যের জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা – মিডিয়ায় শুধু পুরুষ লাইন না, নারীদের লাইনও বলে দেয় তাদের অসহায় অবস্থার কথা!

    এদিকে আমেরিকান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মূলত মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করে। গত ১১ নভেম্বর তার রিপোর্টের শিরোনাম ‘আফগানিস্তান দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি’ [Afghanistan Facing Famine]। মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ফেলা ও রাখা চেয়ে বড় মানবাধিকার ও মর্যাদার সঙ্কট আর কি-ই-বা হতে পারে? তাদের রিপোর্টের সারাংশ করে লিখেছে, ‘জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, আমেরিকার উচিত যা কিছু বাধানিষেধ বা অর্থনীতিক অবরোধ বা পলিসি তারা আফগানিস্তানে আরোপ করতে চায়, তা অবশ্যই যেন বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে শিথিল করে নেয়” [UN, World Bank, US Should Adjust Sanctions, Economic Policies]।’
    পরের প্রথম বাক্যেই লিখছে, ‘দাতা দেশ, জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আফগানিস্তানের ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তা গড়িয়ে সর্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ অবস্থা না তৈরি করে – আজ (১১ নভেম্বর) হিউম্যান রাইট ওয়াচ এ কথা বলেছে।”।
    Donor countries, the United Nations, and international financial institutions should urgently address Afghanistan’s collapsed economy and broken banking system to prevent widespread famine, Human Rights Watch said today.

     

    Pakistan hosts US, China, Russia to discuss Afghanistan

    আফগানিস্তান নিয়ে দুটা গ্লোবাল উদ্যোগঃ
    এ’সপ্তাহে আফগানিস্তান নিয়ে দুটো উদ্যোগ থেকে মিটিং ডাকা হয়েছে। একটার আয়োজক ভারত, অন্যটার পাকিস্তান। এর মধ্যে ভারতেরটাকে বলা যায় ভারত কিভাবে আফগানিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে আর পাকিস্তানেরটা হল, আফগানিস্তান কিভাবে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে স্বীকৃতি যোগাড় করে এক সাথে লেনদেন বিনিময় সম্পর্কে  যুক্ত হতে পারে তা নিয়ে। এটাই প্রকাশ পেয়েছে  কে কোথায় আমন্ত্রিত হয়েছে সেই তালিকায়। যেমন ভারত আফগানিস্তানকে আমন্ত্রণই জানায় নাই, কিন্তু পাকিস্তানের আয়োজনে আফগানিস্তান আমন্ত্রিত।

    এছাড়াও ভারতের তালেবানদের আফগানিস্তান নিয়ে সভা ডাকাতে  এনিয়ে অনেক পাঠক কৌতুহলি হতে পারেন ঠিক প্রথমত যে আমি ঠিক ভারতই বুঝাতে চেয়েছি কি না। কারণ আমরা জানতাম আমেরিকার বসানো পুতুল – গনি সরকারকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া ভারত অন্য কোনো কিছুতে আস্থা রাখে না, এমন ভারতকেই আমরা চিনতাম। হ্যাঁ, তা বটে। কিন্তু ইদানীং তাতে ছোট্ট কিছু মোচড় দেখছি আমরা। তা হলো ভারত হঠাৎ করে জানাল তারা (নাকি আফগানিস্তানকেই দাওয়াত না করে তবে) আফগানিস্তান ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের নিয়ে এক সভা করতে চায়। এমন ইচ্ছা করাটাই অবশ্য ভারতের ‘গনি সরকার’ ছেড়ে অন্য কিছুর তালাশ করার স্পষ্ট লক্ষণ।। তাই ভারতের দিক থেকে এটা বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া যে, ‘গনি সরকারকে’ ফিরিয়ে আনতে আবদার এটি বাস্তবের মাটিতে পা রেখে দাঁড়ানো কোনো পক্ষের জন্য কোনো অপশনই নয়। তাই বলা যায়, ভারত যে আফগান ইস্যুতে এক দিকভ্রান্ত মুসাফির হয়ে গেছে; যে আবার দিশা খুঁজতে এবার পথে নেমে পড়েছে তা আর লুকানো থাকল না।

    Uzbekistan’s Security Council Secretary Victor Makhmudov, Turkmenistan’s Security Council Secretary Charymyrat Amanov, Tajikistan’s Security Council Secretary Nasrullo Rahmatjon Mahmudzoda, Russia’s Security Council Secretary Nikolai Patrushev, India’s National Security Advisor Ajit Doval, Secretary of Iran’s Supreme National Security Council Ali Shamkhani, Kazakhstan’s Chairman of the National Security Committee Karim Massimov, Kyrgyzstan’s Security Council Secretary Marat Imankulov pose before attending the “Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan” in New Delhi, India, November 10, 2021. India’s Ministry of External Affairs/Handout via REUTERS

    আবার আফগানিস্তান ইস্যুতে কিছু করতে বা পেতে চাইলে চীন ও পাকিস্তান যে গুরুত্বপুর্ণ অংশীদার সে কথা আর ভারত অস্বীকার না করে স্বীকার করে নেওয়ার প্রমাণও হাজির রাখল। ভারত পাকিস্তান ও চীনকে তাদের সভায় যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই আমন্ত্রণে সব চেয়ে বেমানান ঘটনাটা হল, কোন জিনিষ হঠাত করে শুরু হয় না। প্রথমত গত আগষ্টে তালেবানেরা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এটা যে ভারত মানে না সেটা ভারত সবসময় প্রকাশ করে গেছে। যদিও ব্যাপারটা এমন না যে সারা দুনিয়াতেই তালেবানদের ব্যাপারে সব রাষ্ট্রশক্তি একে গ্রহণ করে নিয়েছে। তবে কোন আপত্তি তোলার চেয়ে কি করে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় সকলেই এই এপ্রোচ নিয়েই আগিয়ে এসেছে। তালেবানেরা কিভাবে সবার স্বীকৃত আফগান শাসক হয়ে উঠতে পারে এটাই ছিল মুখ্য দিক। তাই ভারতের জন্য এই সভা ডাকা নিয়ে সবচেয়ে যা বেমানান তা হল কেউ উজানে বাইতে বাইতে হঠাত যদি ভাটিতে নেমে যায় তেমন অবস্থা।  ভারত প্রতিটা ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের জন্য পাকিস্তানকে উঠতে বসতে দায়ী ও খারাপ ভাষা প্রয়োগ করে এসেছে।  কথা একটাই বলে এসেছে “পাকিস্তান সব সন্ত্রাসবাদ ঘটাচ্ছে”। এ’অবস্থায় হঠাত করে সেই তালেবানের আফগানিস্তান নিয়ে সম্মেলন ডাকা আর তাতে পাকিস্তানকেই দাওয়াত দেয়া – এটা কেন?  সবচেয়ে বড় কথা এটা কেন ভারত কী মূল্যায়ন বদলিয়েছে? তাই ভিন্নভাবে বাস্তবতা দেখছে? এর জবাব হল, না ভারত তা  মুখে স্বীকার করে কিছু বলছেনা।  তাহলে পাকিস্তান আসবে কেন?  এর জবাব ভারতের আছে নাই। ফলে তাই হয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টার দাওয়াত প্রত্যাখান নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মঈদ ইউসুফ-এর ভারতের আহুত সভায় না যাওয়া এবং সাথে ক্ষুবশ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, কোন শান্তি ভন্ডুলকারি আবার নিজেই শান্তিসভার আহবায়ক হতে পারে না ‘A spoiler can’t be a peacemaker’। শুধু তাই না তিনি ভারতের আহুত সভাকে খামোখা [moot] সভা বলে বলেন তিনি কোন খামোখা সভায় যাচ্ছেন না [not attend an upcoming moot]।  অন্যদিকে চীনেরও ভারতের সভার যোগদান প্রত্যাখানটা তুলনামূলক নরম বা ঠান্ডা ভাষায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিফিংয়ে জানান তারা ঐ সময়ের ব্যস্ততার মধ্যে সময় মিলাতে না পারায় [“scheduling reasons”……”inconvenient” ] যেতে পারছে না তা ভারতকে জানিয়েছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া এত খারাপ হত না হয়ত যদি ভারত আমেরিকা অথবা খোদ রাশিয়াকে দিয়েই পাকিস্তানকে লবি করাতো।  অর্থাৎ বলা যায় ভারত ঐ পর্যায়ের সিরিয়াস ছিল না।  আবার এমন সিরিয়াস না থাকার পিছনের বড় কারণ খোদ মোদি ও তার হিন্দুত্ববাদ।  কারণ ,মোদি তার শাসনের গত প্রায় আট বছর ধরে নিয়মিত পাকিস্তানকে ব্যবহার করে এসেছে তার নির্বাচনে তার বাক্সে হিন্দুভোট যোগাড়ের অপব্যবহারে। সেই পুরাণ ফর্মুলা যে, পাকিস্তান মানে মুসলমান । তাই পাকিস্তান বা মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াকু হিন্দু-বীর হলেন মোদি অতএব সমস্ত হিন্দুভোট মোদির দলের প্রাপ্য। কিন্তু এতে ভারত তো একটা রাষ্ট্র যার অনেক স্বার্থ আছে পাকিস্তানের সাথে একসাথে একমতে কাজ করার।  কিন্তু না, সেটা সেকেন্ডারি। হিন্দুত্ববাদের ভোট যোগাড়ই মোদীর প্রধান স্বার্থ হয়ে থেকে গেছে। এবং আগামি অন্তত ২০২৪ মে নির্বাচন পর্যন্ত এটাই থাকবে।

    শুধু কি তাই? ভারত কি মনে করে  আফগান ইস্যুতে এই সভা-সম্মেলন করে এবার পথে পেয়ে যাবে? এক কথায় উত্তর, একেবারেই না। কিভাবে তা জানা গেল? ভারতের মিডিয়ারই ভারতের এই  আফগান ইস্যুতে উদ্যোগ থেকে কোনো ফলাফল আসা নিয়ে আস্থায় নেই। যেমন ধরা যাক, দৈনিক প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি লিখছেন এভাবেঃ “পাকিস্তান বেঁকে বসেছে। মুখ ফিরিয়েছে চীনও। এখন আফগানিস্তান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভারতের উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে। তবু ভারত চেষ্টা ছাড়তে রাজি নয়”।  [দেখেন চীন-পাকিস্তানকে ছাড়াই উদ্যোগী ভারত] অর্থাৎ স্পষ্ট করেই   নয়াদিল্লি প্রতিনিধি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ভারতীয় উদ্যোগের উপর তার কোনো আস্থাই নেই।

    কেন ভারতও এমন সম্মেলন করতে গেলঃ
    ভারতের এ উদ্যোগে রয়টার্স বলছে দাওয়াত পেয়েছিল ইরান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান [India, Iran, Russia, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, Turkmenistan and Uzbekistan]। তবে আসলে এখানে ভারতসহ  আট রাষ্ট্রকে দেখা গেলেও এতে মূল গুরুত্ব ইরান ও রাশিয়ার। এ দুটোর মধ্যে আবারও মূল ওজনটা একমাত্র রাশিয়ার; যদিও ভারত এই সম্মেলনের শিরোনাম দিয়েছে এভাবে : ‘দ্যা দিল্লি রিজিওনাল সিকিউরিটি ডায়লগ অন আফগানিস্তান…’ [Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan…… ]।

    কিছু কথা এখানে খুলে বলাই ভাল, বুঝতে সুবিধা হবে তাতে। যেমন গত আগস্ট থেকে আফগানিস্তান ইস্যু ভারতের কেন ‘ঘুম হারাম’ হয়েছে সে কথা কাউকে সে খুলে বলতে পারছে না। প্রধানত ঘুম হারাম ঘটনাটা হল কাশ্মিরকে নিয়ে; অর্থাৎ কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ বা তা হাত ছাড়া হয়ে যায় কি না! কেন?

    কারণ মোদি-অমিত খুবই ভীত এ জন্য যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তারা একেবারেই গায়ের জোরে কাশ্মির (পুরোটাই মানে, শুধু ভারতের দখলে থাকা অংশ না – পাকিস্তান ও চীনের দখলে থাকা অংশসহ) ভারতের স্বাভাবিক অঙ্গ-ভূখণ্ড বলে সংসদে ঘোষণা করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এখানে “গায়ের জোরে” বললাম অনেক কারণে। প্রথমত, নেহরু জানতেন কাশ্মির ভারতের নয়; তাই তো জাতিসঙ্ঘের কাছে তিনি চিঠি লিখে মতামত চাইলে জাতিসঙ্ঘ গণভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত নিতে ফয়সালা দিয়েছিল। এটাই “নেহরু জানতেন” একথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।  কিন্তু ভারত জাতিসংঘের রায় কখনোই অনুসরণ করেনি। তবে একেবারেই কোনো পদক্ষেপ না নেয়াটা সরাসরি জাতিসংঘ অমান্য করা হয় – সম্ভবত এমন অনুমানে তিনি কিছু “বিশেষ শর্তে” (যেমন  ভারতের মূল ভূখণ্ডের কেউ কাশ্মিরে জমি কিনতে পারবে না ইত্যাদি) কাশ্মিরকে ভারতভুক্ত করে নেন। আর সেসব “বিশেষ শর্ত” সেটাই হল –  ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা। আর গত ২০১৮ সালেও ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিজেপি সমর্থক এক ব্যক্তি মামলা করেছিলেন ৩৭০ ধারা বাতিল করে রায় দিতে; তা এই যুক্তিতে যে সেসময় “ভারতের মূল কনস্টিটিউশন প্রণয়ন কমিটি” ৩৭০ ধারা যুক্ত করেছিলেন একে ‘অস্থায়ী’ বলে উল্লেখ করে। কিন্তু পরবর্তিতে এ নিয়ে আর কোনো কাজ না করেই ওই প্রণয়ন কমিটি তার আয়ু শেষ, তাই ‘বিলীন’ (ডিসল্ভ) বলে ঘোষণা করে দেয়া হয়। অতএব কোর্ট এখন ৩৭০ ধারাকে বাতিল ঘোষণা করুক – এই ছিল আর্জি। কিন্তু কোর্ট রায় দেন, এমন করা যাবে না। কারণ এমনটা করা হলে আইনিভাবে কাশ্মির আর ভারতের অংশ থাকবে না। তাই আদালত ওই রিট আবেদন বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন।
    এর অর্থ ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এক অবৈধ কাজ। কিন্তু যেহেতু কেউ এখনো এ ব্যাপারটা আদালতের দৃষ্টিতে আনেনি, তাই এটা অটুট থেকে যাচ্ছে।
    আবার সুপ্রিম কোর্টের ওই রিট মামলার রায়ে দেখা যাচ্ছে সেখানেও আসলে পরোক্ষে ধরে নিয়ে রায় দেয়া হয়েছে যে, কাশ্মির ভারতের নিজ মূল ভূখণ্ড নয়। তা হলে অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এবং কাশ্মিরকে সরাসরি ভারতের নিজভূমি বলে দখল করে নেয়া – এটাও তো অবৈধ। কিন্তু এটাও আদালতের দৃষ্টিতে কেউ আনেনি, তাই এটাও কোন চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে টিকে আছে। এ ছাড়া মোদির জমানায় আদালতের ট্রেন্ড হল, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করতে হয় এমন ইস্যু হলে আদালতের ঐ মামলা এড়িয়ে চলা বা বছরের পর বছর ফেলে রাখা অথবা কোনো একবারের প্রধান বিচারপতি আন্ডারহ্যান্ড ডিলের অভিযোগ মাথায় নিয়েও সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে দেয়ার ঘটনা অনেক। এসবই মামলা না হওয়া অথবা আদালতের দ্বারস্ত না হওয়া বা জনস্বার্থের মামলাগুলো করার মত লোক গরহাজিরা পিছনের কারণ মনে করা হয়।
    এভাবেই মোদি-অমিত তাদের রামরাজত্বের হিন্দুত্বের শাসন চালিয়ে যেতে পারবেন মনে করা হয়েছি। কিন্তু না!  উপরে উল্লেখিত এসব ‘গায়ের জোরের’ মতো হঠকারি কাজ – আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পরে থমকে যায় আর মোদি-অমিতও চমকে ওঠেন। কারণ এর সরাসরি প্রভাব  কাশ্মিরে জমানো রামরাজত্বের উপর পড়বেই। এর প্রভাবে আজকের কাশ্মিরে (যেখানে মানুষের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই,  প্এরতিনিধিত্টিবশীল শাসন নাই, এখন রাজ্যের মর্যাদায় নেই,  রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের কোনোই আইনি ব্যবস্থা বা কাঠামোই, [ রাজ্য সরকার] নাই)। একারণে এবার  যদি আবার সশস্ত্র আন্দোলন চাঙ্গা হয়, কি তুঙ্গে ওঠে আর যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মত  পরিস্থিতি এসে যায়; তবে সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাই ফিরে মোদি-অমিতের চরম বিরুদ্ধে চলে যাবে এই বলে যে, “গায়ের জোরে কাশ্মির ভারতের বলে দখল, ৩৭০ ধারা বাতিল’ করতে যাওয়াতেই এই বিপর্যয়! অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদ ব্যাকফায়ার শুরু করবে!
    মূলত একারণেই মোদি-অমিত এখন চান যেই আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসুক সে যেন প্রতিশ্রুতি দেয় যে কাশ্মিরে স্বাধীনতাকামী  কাউকে  আফগান-সহযোগিতা দেওয়া হবে না। মজার কথা হল, মোদি-অমিতের কাছে এই ঘোরতর মাথাব্যথার ইস্যু কাশ্মির অথচ, এনিয়ে বাইডেন প্রশাসন অন্তত কোনো সমর্থনের অবস্থানে নেই; বরং উল্টো ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু আমেরিকার অভিযোগের তালিকায় আছে। কিছু কংগ্রেস সদস্যও এ নিয়ে সোচ্চার।

    রাশিয়া কেনঃ
    তাহলে দেখা যাচ্ছে এখন সব মিলিয়ে ভারতের কাছে একমাত্র ভরসা মুরুব্বি রাশিয়া! কিন্তু সে কেন ভারতকে এই কোল দিতে গেল যাতে ভারত একটি সম্মেলন ডাকতে পারে?
    তালেবানরা এবার গত আগষ্টে  ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাশিয়া মূলত খুবই খুশি। তার অনুমান, এবার দিন তার পক্ষে এসেছে ও যাবে; আর আমেরিকার বিপক্ষে। কিন্তু একই রাশিয়ারই আবার এক প্রবল শঙ্কা; কারণ সে আবার সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয় রাষ্ট্রের  কাছে (এরই চার রাষ্ট্র ভারতের সম্মেলনে যোগ দিয়েছে) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা তাদের হবু আক্রমণ থেকে এই রাষ্ট্রদেরকে সুরক্ষিত রাখবে। আর     একাজে আবার রাশিয়া তালেবানদের ওপর নির্ভর করতে হবে, বিকল্প নাই। ফলে টেনশন আছে।
    এসব কিছু অবশ্যই রাশিয়ার বড় স্বার্থ। কিন্তু এসব ছাড়াও রাশিয়ার আরেক বড় স্বার্থ আছে। যেমন সেটি হল, রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইলের হবু ক্রেতা ভারত; যার একটার দামই আধা বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আরও কাহিনী হল – ভারত এটা কিনলে আমেরিকা ক্ষেপে গিয়ে ভারতের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ বহু ধরনের বাধা আরোপ করবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে আগেই জানানো হয়ে আছে, বাইডেন ক্ষমতা নিবার পরের মাসেও বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরে তা ভারতকে জানানো হয়ে আছে। তাই ভারত চেষ্টা-তালাশ করছে কোনো ছাড় পাওয়া যায় কি না। কিন্তু ইতোমধ্যেই উদাহরণ হল, একই পথে তুরস্কের বেলায় সে ব্যর্থ হয়ে আছে। এসব কারণে, রাশিয়ার আগ্রহ হল, ভারতকে কিনাতে পারলে তা আমেরিকার উপর একটা বড় চাপ তৈরি হবে।
    তাই এসব মিলিয়ে অনুমান করা যায় রাশিয়ার হবু ক্রেতা ও আগে অন্য অনেক সমরাস্ত্রের এরই মধ্যে ভালো ক্রেতা এই ভারতের ‘মন রক্ষা’ করতে রাশিয়া সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র সাথে নিয়ে ভারতের সম্মেলনে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। তবে সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র – এদের দিক থেকে দেখলে তাদের নিজস্ব বড় স্বার্থও এটা যে, তারা তালেবানদের ভরসা করেই যেকোনো রেডিক্যাল ইসলাম থেকে সুরক্ষিত থাকতে চায়। এটি তাদের ভাইটাল স্বার্থ!

    তা হলে ইরান কেন?
    ইরান ভারতের সম্মেলনে কেন – এটাও এক মজার প্রশ্ন। তবে জবাবটা সহজেই এভাবে বলা যায় যে, সম্প্রতি আফগানিস্তানে শিয়া মসজিদে হামলা পরপর সম্ভবত তিনবার বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। আর প্রতিবারই দেড় শতাধিকের উপর লোক মারা গেছে। এটা শুধু শিয়া মসজিদে হামলা – এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থেকে দেখাভুল হবে, এটা তা না; এরা ছিল মূলত আফগানি হাজারা শিয়া এথনিক গোষ্ঠি – তাদের উপর হামলা।
    ওরা শিয়া এই সেন্টিমেন্টের ওপর ভর করে এ হামলা করা ও তাতানো হয়েছে। কিন্তু এরা মূলত আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম এথনিক জনগোষ্ঠী। আমাদের মত দেশগুলোর ভূখণ্ডের সীমানা টেনেছে কলোনিয়াল শক্তিগুলো তাদের নিজের একান্ত স্বার্থে। আর এতে একই এথনিক জনগোষ্ঠী কাটা পড়ে সীমানা দুই দেশে বিভক্ত করা হয়ে গেছে।  যেমন আমাদের বেলায় একই বাঙালি অথবা পাঞ্জাবি এথনিক জনগোষ্ঠী যেমন ভারতে থেকে গেছে; যাদের আরেক অংশ বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে আলাদা কাটা পরে আছে। তেমনি আফগান হাজারা জনগোষ্ঠী আরেক বড় অংশ আছে ইরানে। ফলে আফগানিস্তানের অংশ হামলায় বিপদগ্রস্ত হলে ইরানের বড় দুটো সমস্যা। স্বাভাবিকভাবে  ইরানে সেন্টিমেন্ট তৈরি হয় হাজেরা আফগানদেরকে উদ্ধার ও রক্ষার। আবার আরেক বিপদ হলো, ইরান না চাইলেও তারা রিফুজি হিসেবে ইরানে ভিড় করে, করবেই – এটাই স্বাভাবিক। আর ইরান সেই দায় ঠেলে ফেলেও দিতে পারে না।
    কাজেই তালেবানরা যদি হাজারা, এরা শিয়া (ওরা কম মুসলমান বা সহি মুসলমান না ইত্যাদি ধরনের যেসব এথনিক ঘৃণা আফগান পশতুন ডমিনেটেড সমাজে প্রচলিত আছে) এই ধর্মীয়-সামাজিক মনোভাবের আলোকে উপেক্ষায় আইএসের হাতে হামলায় মারা যেতে দেয়, নাগরিক নিরাপত্তা না দিতে পারে তা হলে গত আগস্টে তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইরান সরকারের যে সমর্থন ও ইতিবাচক মনোভাব তালেবানদের প্রতি বজায় আছে তা ইরান চাইলেও আর বজায় রাখতে পারবে না। যেমন আফগানিস্তানের প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ এখনো ইরান করছে; যেখানে এর অর্থ পরিশোধের কী ব্যবস্থা হবে, সেটা এখনো অনিশ্চিত, তা সত্বেও। কারণ, তালেবানদের হাতে কোন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ নাই, ব্যবস্থা নাই।

    অতএব ইরানের ভারতের সম্মেলনে যোগ দেয়া বলতে গেলে তালেবানদের ওপর অপ্রকাশ্য অসন্তুষ্টির পরোক্ষ প্রকাশ বা বলা যায় তা প্রকাশ করার সুযোগ নেয়াঃ যেন তালেবানদেরকে বলা যে, তুমি আফগান হাজেরাদের উপর  আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামিস্টদের যদি আফগানিস্তান থেকে দূরে রাখতে না পারো, তবে ইরানের তোমার বিপরীতে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।’

    তাহলে এখন উলটা করে বলা যাকঃ  এর মানে কি যারা আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামীদের থেকে মুক্ত এক আফগানিস্তান দেখতে চায়; তাদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? ভাবটার একটা আবছা শেড থাকলেও সেটা কখনও নয়, সত্যিকারভাবে নয়। যেমন আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপ – এই হলো অ্যালার্জি বা অগ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি যদি ধরি, তা হলে কি বলা যাবে এমন গ্রুপের বিরোধীদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? এটি বলা যাবে না। কেন?
    কারণ বাইরে থেকে মনে হতে পারে, হিন্দুত্ববাদী ভারত নিশ্চয় এমন রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপদের বিরোধিতা পছন্দ করবে। কিন্তু না, করবে না। কেন? আর প্রমাণ কী?
    ইদানীং পাকিস্তানের ইমরান খান কী নিয়ে পেরেশান সেটা লক্ষ্য করতে হবে। দুটা ইসলামী গ্রুপ নিয়ে তিনি পেরেশান – TTP (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) আর TLP  (তেহরিক-ই-লাব্বায়েক পাকিস্তান)। আধা সশস্ত্র এরা আবার রাজধানীতে প্রকাশ্যে রেডিক্যাল মিছিল সমাবেশ করে থাকে।  টিএলপির  প্রধান আবার এখন গ্রেফতার হয়ে আছেন। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সমন জারি করে ডেকে অসন্তুষ্ট জানিয়েছেন। কারণ, ২০১৪ সালে পেশোয়ারের এক আর্মি স্কুলে টিটিপির অস্ত্রধারী জঙ্গিরা হামলা চালালে ১৩২ শিশুসহ মোট ১৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এরই বিচার এখনও চলছে।  তাই আদালত প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সরাসরি আদালতে দেকে নিয়ে এসে ভর্ৎসনা করেছেন।  তাই এবারের ইস্যুতে এদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী আভ্যন্তরীণভাবে অবস্থান জানিয়েছিলেন। কিন্তু  সেনাবাহিনীর ভিন্নমত হল তারা মনে করে এতে জীবন ও সম্পদ ক্ষয় হবে মাত্রাতিরিক্ত। তাই কৌশল হিসেবে এখনই সামরিক পদক্ষেপ বাতিল করা হয়েছে, আর সুযোগের অপেক্ষায়।

    মজার কথা, এ খবর আরো বিস্তারিত ছাপা হয়েছে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা। আর যা খুবই কম ঘটে থাকে – আমাদের অবাক করে প্রথম আলো এসব খবর ছেপে দিয়েছে ডন-এর রেফারেন্সে, বিনা দ্বিধায়।

    কিন্তু কেন ‘মজার খবর’ বলছি? ডন-এর খবরে লেখা হয়েছে, সশস্ত্র গ্রুপগুলো ভারতের সাথে সম্পর্কিত।  প্রথম আলোর এই রিপোর্টের শিরোনাম টিএলপির সঙ্গে চুক্তি প্রকাশ হচ্ছে, শক্তি প্রয়োগ চেয়েছিলেন ইমরান, নারাজ সেনাবাহিনী। প্রথম আলো ডন-এর রিপোর্ট থেকে অনুবাদ করে লিখেছে, ”

    প্রথম আলো লিখেছে  “পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি”। 

    “পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত।  পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি।’ এ ধরনের পাকিস্তান সরকারের পুরো মনোভাব ও পরিকল্পনাই ওই রিপোর্টে আছে। কিন্তু আমাদের এখানকার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, মোদি-অমিতের কাশ্মির বাঁচাতে তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তর অস্থিতিশীল করতে সশস্ত্র ইসলামী গ্রুপের ওপর নির্ভর করতেও রাজি; অর্থাৎ যে অভিযোগ আগে কেবল বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত অথবা একালে উইঘুর সশস্ত্র গোষ্ঠী (ETIM)-এর কথা উঠছে; এখন তা অনেক দূরে বিস্তৃত। এখানে উল্লেখ্য যে, হাজারাদের ওপর আইএসের যে তিন হামলা, তাতে সর্বশেষটাতে হামলাকারী হিসেবে ধৃত ব্যক্তি উইঘুর জনগোষ্ঠীর লোক। কেন এমন হচ্ছে? কারণ তালেবানরা এই ETIM গ্রুপকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেবে না বলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর থেকে এই উইঘুর গ্রুপ আইএস এর সাথে হাত মিলিয়ে যোগ দিয়েছে, তাই এ ঘটনা।

    বিপরীতে পাকিস্তানের আয়োজিত সম্মেলন কী ও কাদের নিয়েঃ
    এক কথায় জবাব, যদিও এ সম্মেলনের হোস্ট বা আয়োজক হল  পাকিস্তান কিন্তু এটা আসলে ‘ট্রয়কা প্লাস’ [TROIKA+] -এর বৈঠক। [এনিয়ে আমার পুরান লেখা রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে] কোন ‘ট্রয়কা প্লাস’? গত ১৫ আগস্ট তালেবানরা ক্ষমতা নেয়ার আগে রাশিয়ার উদ্যোগে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীনকে এই শক্তিধর তিন দেশীয় গঠন করা হয়েছিল তালেবান-আফগান ইস্যুতে তাদের কমন অবস্থান প্রকাশের জোট, সেটাই ট্রয়কা বা ত্রিদেশীয় জোট। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তালেবানদেরকে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের অধীনে আসতে সাহায্য করা যাতে তারা নয়া আফগানিস্তানকে নিয়ে গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে সহজেই প্রবেশ করতে পারে।
    আসলে নিরাপত্তা পরিষদের আফগান ইস্যুতে পাস হওয়া এক সর্বসম্মত প্রস্তাবকে তাদের গঠনভিত্তি হিসেবে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। পরে পাকিস্তানকে ওই ট্রয়কাতে কোঅপ্ট করে নেয়া হয়; কারণ আফগানিস্তানে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে পাকিস্তানের মাধ্যমে তা করা অর্থপূর্ণ ও সহজ। অন্তত দুটো কারণে – এক. পাকিস্তান এই প্রথম ২০ বছরের আমেরিকার স্বার্থের যুদ্ধের দায় থেকে মুক্ত হয়েছে। তারপরও এখনো আফগানিস্তানে যেকোন অস্থিতিশীলতা ঘটলে তাতে সবচেয়ে বেশি পুরনো দায় ফিরে আসবে পাকিস্তানের উপর, নিজে সেই অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত হবে ও সামরিক-অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হবে পাকিস্তানের। তাই পাকিস্তান না চাইলেও ‘স্থিতিশীল এক আফগান দেখার পক্ষে অবস্থান’ সে নিতে বাধ্য। দুই. আফগানিস্তান কিন্তু এক ল্যান্ডলকড ভূখণ্ড। ফলে পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম একটি তাল মিলিয়ে চলতে আফগানিস্তানও বাধ্য। এবং বাইরের কোন রাষ্ট্রও আফগানিস্তানে কিছু করতে চাইলে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে করলে তা বাস্তবায়ন সহজ ও সম্ভবত সম্ভব।

    অতএব পাকিস্তানকে গ্রুপে নেয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতে ভারতের জন্য তা এটা ততোধিক বিব্রতকর হয়ে যায়; কারণ এতে ভারতের অভ্যন্তরীণ পাবলিকের কাছে হিন্দুত্ববাদীরা যে প্রপাগান্ডা চালাত এই বলে যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ লালনকারী, তা এখানে উল্টে যায়। কারণ, এখানে পাকিস্তান হইয়ে যায় বাস্তবত – জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সন্ত্রাসবিরোধী সবচেয়ে নির্ভরশীল মিত্র, বিশেষ করে এখনকার সময়ের সবচেয়ে শক্তিধর তিন দেশ ও তাদের জোটের নির্ভরশীল মিত্র।

    এবার সবচেয়ে কঠিন সত্যটা আগে বলে রাখি। তা হলো আফগানিস্তানে তালেবানরা ফেল করলে এর বিকল্প বা অন্য শক্তিটা হল এককথায় আইএস।  মূলত আইএস আর সাথে ওর সমমনা আরো ছোট ছোট নানা, মূলত ‘পড়শিদেশীয়’ গ্রুপ। সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর বাস্তবতা হল, যেকোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তি তো বটেই, এমনকি এশিয়া অমুসলিম রাষ্ট্রগুলো তো বটেই,  এদের কেউই বা অন্য ইসলামী ধারা কেউই আইএসের সাথে পাশাপাশি পরস্পরকে স্বীকার করে টিকতে বা চলতে পারবে না, তা আইএস তো বটেই কেউই মনে করে না।  অর্থাৎ একা আইএস-এর রাজত্ব কায়েম হব।  ফলে তালেবানরা ফেল করার মানে সবার কাছেই পরিষ্কার।

    তাই তালেবানকেন্দ্রিক এখনকার বাস্তবতা হল, সংশ্লিষ্ট অন্য দেশের এক কমন আকাঙ্ক্ষা যে, তালেবানরা ফেল করা নয় বা আইএস আসা একেবারেই নয়। তাই তালেবানদের ফেল করতে দেয়া যাবে না। এতে সবার ক্ষতি। কিন্তু জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে, তার ভিত্তিতে তালেবানরা আফগানিস্তান শাসক হিসেবে নিজেদের গড়ে নিক। আর সেই আফগানিস্তান যেন পড়শি যেকোনো দেশে সশস্ত্র হামলাকারী কোনো গোষ্ঠীকে আশ্রয়দানকারী ভূখণ্ড না হয়, এটি নিশ্চিত করতে হবে।

     

    এটি বাস্তবায়নে তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
    অনেকে মনে করেন, তালেবানরা ভাবছে যেহেতু আফগানিস্তান যেন রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা আক্রমণকারীদের আশ্রয়ভূমি না হয় এটা নিশ্চিত করা প্রায় সারা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রস্বার্থ। কাজেই তালেবানরা রাজনৈতিকভাবে কেমন শক্তি (আরেকটি আইএস কি না বা রাজতন্ত্র যেমন এক সালতানাত বা আমিরের দেশ কি না) তা দেখাদেখি ট্রয়কাকে বিবেচনা বন্ধ করতে হবে বা ছাড় দিতে হবে।
    অথবা আফগানিস্তানেও দুর্ভিক্ষ লেগে যেতে পারে এই ভয়ে ট্রয়কাসহ সবাই তালেবানরা যেমন আছে এভাবেই মেনে নিতে বাধ্য হতে হবে।

    তালেবানদের নিজের সম্পর্কে এই অতি-অনুমান যে তারাই হলো দুনিয়াকে স্থিতিশীল রাখার একমাত্র শক্তি – এটিই তালেবানদের সব কিছুকে স্থবির করে রেখেছে।

    ট্রয়কা উদ্যোগ ফেল করলে এর প্রথম শিকার হয়ে যাবে আফগানিস্তানের খাদ্যসঙ্কটে থাকা ৫৫ শতাংশ জনগণ।

    দ্বিতীয়  সত্য হল, ট্রয়কার তালেবানের সাথে কোনো ছাড় দেয়া যদি ঘটেও সেই তালেবান শক্তির শাসনও ফেল করবেই। ফলাফল হবে আইএস ও সমমনাদের উত্থান। সেই আফগানিস্তান হবে আফ্রিকার সোমালিয়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো ভূখণ্ড। সারা দুনিয়ার জন্য এক নো গো [no go] এরিয়া!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৩ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান : ভারত ও পাকিস্তানের উদ্যোগ “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]