Category: CHINA

  • আমেরিকা কেমন চীন চেয়েছিল, আর পরিণতি

    আমেরিকা কেমন চীন চেয়েছিল, আর পরিণতি

    গৌতম দাস

    ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3mw

    Is American Century OVER? চীন নিয়ে আমেরিকার স্বপ্নের পরিণতি – ছবি : সংগৃহীত

    জো বাইডেন আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন দিন দশেক আগে। তাঁর ক্যাবিনেটসহ অন্য যেসব স্টাফ নিয়োগ দিয়ে তিনি প্রশাসন গড়তে চান তাদের নিয়োগের পক্ষে আলাদা আলাদা সিনেট অনুমোদন লাভের কাজও এখন শেষের পথে। কিন্তু ইতোমধ্যেই খারাপ উদাহরণ দিয়ে বাইডেন নিজের কাজ শুরু করছেন। কথিত ‘তাইওয়ান হুমকি’ আর বিপরীতে ‘তাইওয়ান রক্ষা’ – এই অজুহাতের আলোকে চীন বোমারু বিমানের আনাগোনার বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ পাঠিয়ে মহড়া – এগুলো এখন সাউথ চায়না সি’তে খামোখা উত্তেজনা তৈরির উপাদান। অথচ বাইডেন ভাল করেই জানেন এবং আমাদেরকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ তাঁর পথ নয়।
    অবস্থাটাকে বলা যায়, ক্ষমতা ছাড়ার আগে ট্রাম্প-পম্পেও যুদ্ধের উসকানি তুলে এর মধ্যে বাইডেনকে ফেলে দিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি মাতেন কি না। এখন তারা দেখছে আমরা সব ভুলে বাইডেন মেতে উঠেছেন। আমরা দেখছি, এতে অনুভূতি-বুদ্ধিসুদ্ধি হারিয়ে নির্বিকার হয়ে যাওয়া- ইংরেজিতে যাকে ‘ক্যালাস’ [callous] বলে, সেভাবেই বাইডেন ক্যালাস হওয়াই পছন্দ করেছেন আর খামোখা উত্তেজনা ছড়ানো তার কাজ বলে মেনে নিয়েছেন।

    পম্পেও-এর চুনা লাগানোঃ
    চুনা লাগানো কথাটা হিন্দিফিল্মের চালু এক ডায়লগ। মানে কাউকে কড়া মেক আপ লাগিয়ে সাজিয়ে ক্যামেরার সামনে ইচ্ছামত নাচানো বা হাজির করা। অনেকটা যেন সেরকম,  যে কাজটা করে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও ক্ষমতা ছাড়ার দশদিন আগে, বাইডেনকে “তাইওয়ান রক্ষার নামে” খামোখা উত্তেজনা ছড়ানোর কাজে নামাতে পেরেছেন সেটা হল, চীনের ‘একচীন’ নীতি। কোন রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে চাইলে একটা পূর্বশর্ত মোতাবেক চুক্তিতে চীন প্রতিশ্রুতি আদায় করিয়ে নেয় যে, ‘একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু এই ‘একচীন নীতি’ কী, কোথা থেকে এলো আর চীনই বা এটা নিয়ে এত সিরিয়াস কেন?

    ঘটনার শুরু অনেক পেছন থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতিতে আমেরিকা নতুন এক গ্লোবাল সিস্টেম খাড়া করতে সক্ষম হয়েছিল, আমেরিকা নিজের নেতৃত্বে। বলা ভাল যে, এর আগে বিশ্বব্যাপী কোনো পণ্য-পুঁজির লেনদেন-বিনিময়, বাণিজ্য করার মত কোনো  অর্গানাইজ সিস্টেম-ব্যবস্থা ছিল না। তবে খুবই সীমিত পর্যায়ে বিনিময় চালানোর উপযোগী আর ঠুনকো একটা ব্যবস্থা ছিল যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই টিকতে না পেরে তছনছ গায়েব হয়ে যায়। আসলে, সেকাল ছিল কলোনি অর্থনীতির যুগ। ফলে বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন তেমন বিকশিত ছিল না, ব্যাপক বিকশিত হওয়ারও সুযোগ ছিল না, চাহিদাও তেমন তৈরি হয়নি। মূল বিনিময়টা হত মূলত কলোনি “মাস্টার আর স্লেভ” মানে “প্রভু ও দাস’ দেশের মধ্যে। দখলদার আর কলোনি হয়ে যাওয়া এমন দুদেশের মধ্যে। আর বলাই বাহুল্য তা একপক্ষীয় ভাবে দখলদার দেশের অনুকুলে ও শর্তে।

    সে কালের দুনিয়া মানে, পাঁচ কলোনি মালিক রাষ্ট্র : মূলত ব্রিটেন ও ফ্রান্স আর এদের সাথে ছোট তরফের স্পেন, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডস। সব মিলিয়ে এদের হাতেই সারা দুনিয়ার সব ভূখণ্ড ভাগ-দখল হয়ে থাকা যার মধ্যে স্পানিশ, পর্তুগিজ এদের কলোনি দখল কেবল ল্যাটিন আমেরিকা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ,  ইস্ট এশিয়ায় নেদারল্যান্ডসের ডাচেরা ক্ষয়িষ্ণু আর বাকি বড় দুনিয়া ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ভাগ দখলে, যেখানে আবার বেশির ভাগই ব্রিটেনের। বিপরীতে, আমেরিকা ব্যতিক্রম। অন্যের দেশকে কলোনি দখলের পরিবর্তে নিজেদেরই ব্রিটিশের কলোনি আরেক আমেরিকান কলোনি হয়ে থাকার খারাপ স্মৃতি ছিল তাদের। তাই ১৭৭৬ সালে আমেরিকান স্বাধীনতার যুদ্ধে সেসব থেকে মুক্ত হওয়ার পরে তাদেরই পঞ্চাশ রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত এক ফেডারল আমেরিকায়, ভিতরের কোন এক রাজ্য যেন অন্যকে কলোনি বা আধিপত্যের সম্পর্কে জড়ানোর সুযোগ না নিতে পারে সবসময় এ নিয়েই তারা তটস্থ থাকত। কেন্দ্রীয় বা ফেডারল আইন নামে কোনকিছু যেন রাজ্যগুলোর প্রত্যেকের আলাদা আগাম সম্মতি না নিয়ে উপর চেপে বসতে না পারে, এই ব্যবস্থাই সেই সময় চালু ছিল। এরপর ধীরে ধীরে রাজ্যগুলো পারস্পরিক আস্থা অর্জন করলে পরে, সেটাই আজকের আমেরিকা এভাবে থিতু হয়েছিল। যে কারণে ১৯১৩ সালের আগে মার্কিন রাজ্যগুলো একটা কমন কারেন্সির অধীনে সবাই আসে নাই। বরং প্রতিটা রাজ্যে যতগুলা স্থানীয় প্রাইভেট ব্যাঙ্ক ততগুলো ধরণের আলাদা নোট শহরে চালু থাকত। এক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের অধীনে সব রাজ্যের থাকা সেটা ছিল অনেক দুরের ব্যাপার ছিল তখন, এভাবে আসেনি বা ছিল না। ১৯১৩ সালেই প্রথম মার্কিন রাজ্যগুলো সকলে একটা কমন কারেন্সিতে এক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অধীনে আসে।

    আবার এরই ভেতরে আমেরিকা তার অর্থনীতি ও সঞ্চিত সম্পদের দিক থেকে  ব্রিটেনকে মানে কলোনিদখলদারদের শিরোমনিকেও ছাড়িয়ে সবার উপরে উঠে গিয়েছিল। অথচ অন্য দখলদারদের মত কারো কলোনি দখল না করেই এটা ছিল আমেরিকার সবচেয়ে  বড় এক অর্জন। আর এমন আবির্ভাবের পেছনে মূল যে জিনিস কাজ করেছিল তা হল, উনিশ শতকের শেষে ১৮৮২ সালের (‘স্ট্রাটফর’ Stratfor -এর রবার্ট কাপলানের মতে) আশপাশের সময় থেকে অর্থনীতি ও সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ বা সারপ্লাসে [surplus] আমেরিকার উত্থান ঘটেছিল। সেই থেকে পরে বিশ শতকের পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধ – এর শেষে ১৯৪৫ আমেরিকা যেটা কায়েম করেছিল তা হল, একটা নতুন গ্লোবাল (নিয়ম শৃঙ্খলা) অর্ডার চালু করা। যার ফলাফল হল ১৯৪৫ সাল থেকে গুছিয়ে বসা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত  – রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘ, গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক ও সিস্টেমের প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি।

    যারা সেকালের উত্থিত্ নয়া ট্রেন্ড, এসব ঘটনা নিয়ে আরেকটু ধারণা পেতে চান তারা ১৯৪১ সালে প্রকাশিত একটু বিস্তারিত এক আর্টিকেল পাঠ করতে পারেন। সে কালের বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের মালিক-সম্পাদক হেনরি লুসের [Henry Robinson Luce (April 3, 1898 – February 28, 1967)] এক আর্টিকেল ‘দ্য আমেরিকান সেঞ্চুরি’ প্রকাশিত হয়েছিল যা ছাপা হয়েছিল টাইমেরই নতুন এক সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সাপ্তাহিক ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনের  ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

    ইন্টারন্যাশনালিস্ট বনাম আইসোলেশনিস্টঃ

    আমেরিকান ইতিহাসে এটা Internationalists বনাম Isolationists ডিবেট নামে পরিচিত। এই তর্কের তুঙ্গ কাল হল ১৯২১-৪১ এই সময় জুড়ে।  তবে ১৮৮২ সালের পর থেকেই আমেরিকান সমাজে অভ্যন্তরীণ এই মহাবিতর্ক ছিল – ইন্টারন্যাশনালিস্ট বনাম আইসোলেশনিস্ট নামে; বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগে-পরে, এর প্রথম ঝাপটা উঠেছিল। এর আগে বলেছি, আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থানের মূল বৈশিষ্ট্য হল, সে কোন কলোনিয়াল শক্তি নয়। তাই সে সাবেক কোনো সম্রাটের সাম্রাজ্য নয়। আর সুপার-পাওয়ার শব্দটার ব্যবহার শুরু সম্ভবত তখন থেকেই; যা এমপায়ার (সাম্রাজ্য) শব্দের বিপরীত হিসাবে আমেরিকায় ব্যবহার শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ তারা বলতে চাইতেন, যারা কলোনি দখলদার এদের সাধারণ ফিচার হল, তারা কোন না কোন সাম্রাজ্য-দেশ আর যাদের অর্থনীতি হল অন্যের দেশ দখলদারি বা কলোনি দখল নির্ভর। কারণ কলোনি দখলদার পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রই ছিল সম্রাটের সাম্রাজ্য থেকে উঠে আসা দেশ। আর এমন রাজতন্ত্রের বিপরীতে আমেরিকা আগে থেকেই এক রিপাবলিক, পাবলিক স্বীকৃত গণক্ষমতা এর ক্ষমতার উৎস এমন রাষ্ট্র। তাই এটা নন-কলোনিয়াল (কাউকে কলোনি করেনি), নন-ইম্পেরিয়াল (রাজতন্ত্রী নয়) কিন্তু সুপারপাওয়ার রাষ্ট্র। তাই সেই আমেরিকাতেই ১৮৮২ সালের কাছাকাছি সময় থেকেই অভ্যন্তরীণ তর্ক ভারী হয়ে উঠতে থাকে যে, আমেরিকার কি অন্যান্য কলোনি মালিক দেশের (তখন সারা দুনিয়াই ইউরোপের পাঁচ কলোনি দখলদার রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ করে নেয়া) সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের গভীরে জড়ানো উচিত কি না। তর্কটা এভাবে উঠার পেছনে মূল কারণ,  কলোনিদখলদারদের সাথে তাঁদের যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার ভয়। যারা উচিত মনে করতেন এদেরকেই বলা হতো ইন্টারন্যাশনালিস্ট। আর যারা অনুচিত মনে করতেন তারা আইসোলেশনিস্ট বা বিচ্ছিন্নরাষ্ট্র-থাকাবাদী।

    এটা কোনো এথিক্যাল তর্ক ছিল না, মানে নৈতিকভাবে উচিত-অনুচিতের তর্ক নয়। তাহলে?
    ইউরোপীয় সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়লে প্রায়ই স্থানীয় প্রাইভেটব্যাংক থেকে ধার করত। কিন্তু কোনো সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হওয়াতে (বিশেষত কোন যুদ্ধের কারণে) এর কারণে তা থেকে প্রথমে স্থানীয় ব্যাংককে ধার শোধ না করার ঘটনার শুরুতে জটিল সব সম্পর্ক-সমীকরণ তৈরি করত। ফলে তা একসময় ক্রমশ পুরা অর্থনীতির জন্য তা সঙ্কট হিসেবে হাজির হত। শুরুর দিকে অনেক সময় ব্যাংকগুলোকে সোনা রিজার্ভে রাখা ছাড়াই রাষ্ট্রের নেয়া-ঋণের সমপরিমাণ টাকা ছাপানোর অনুমতি দিয়ে, রাষ্ট্র ব্যাংকগুলোকে  ম্যানেজ করার চেষ্টা করত। কিন্তু এসব সঙ্কট সেবার একেবারেই মারাত্মক হয়ে উঠে জার্মানির উত্থানে। কারণ সেও কলোনি দখলের প্রতিযোগিতায় নামতে চায়। কিন্তু এখানে এসে এবার এমন সঙ্কট তীব্র হলে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রগুলো ইউরোপের বাইরের (বিদেশি) আমেরিকান ব্যাংক থেকে ধার পেতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। আর এ থেকেই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ তর্কও সে সময় তুঙ্গে উঠেছিল।
    আইসোলেশনিস্টরা বলতে চাইতেন, জার্মানির উত্থানের ফলে সারা ইউরোপে যুদ্ধ আসন্ন হয়ে গেছে। তাই এসময়ে আমেরিকার কোন ব্যাংক বা ব্যবসায়ী ইউরোপের বিবদমান কোনো একটা পক্ষকে ঋণ দেয়া বা বাকিতে ব্যবসা করা মানে ঐ দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ক্রমশ শত্রু হয়ে পড়া, তা থেকেই ওদের যুদ্ধে আমেরিকাকে জড়িয়ে ফেলা হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যখন এত দিন ইউরোপে রাষ্ট্রগুলোর কলোনি দখলের ঝগড়া-মারামারিটা হত ইউরোপের বাইরের সেই মহাদেশেই। মানে, যাকে এরা দখল করতে চায়, সেই মহাদেশের ভূমিতে। কিন্তু জার্মানির উত্থানের বেলায় প্রথম তা ইউরোপেই ঘরের ভেতরের যুদ্ধ হিসেবে হাজির হয়েছিল, আর এটাই তো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-৮)। বিপরীতে ইন্টারন্যাশনালিস্টরা যুক্তি তুলতেন, আরে এটাই তো বরং ইউরোপের বাজারে ঢুকার ভাল সময় বলে। এসব তর্কাতর্কিতে একপর্যায়ে ইন্টারন্যাশনালিস্টদেরকে “মৃত্যুর সওদাগর” (যুদ্ধ মানে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়া এই সুত্রে) বলে দাগ লাগিয়ে হেয় করার বয়ান হাজির হয়েছিল।

    হেনরি লুস একজন ইন্টারন্যাশনালিস্টঃ
    টাইম ম্যাগাজিনের হেনরি ছিলেন এমনই এক ইন্টারন্যাশনালিস্ট, রিপাবলিকান। তবে সাবধান ইন্টারন্যাশনালিস্ট যারা হতেন তারা বাই-পার্টিজান মানে, মানে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট দুদল থেকেই হতে দেখা যেত। যেন এত বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তিনি ডেমোক্রাট ছিলেন। যাই হোক, তবে  সেসময়ে ইন্টারন্যাশনালিস্ট এদেরই এক লম্বা ও শক্ত পরিকল্পনা ছিল যে, আমেরিকান অর্থনীতিতে যে উদ্বৃত্ত সম্পদ জড়ো হওয়া শুরু হয়েছে আর এর যে ট্রেন্ড, তাতে দুনিয়াকে কলোনি দখলের কবল থেকে বের না করতে পারলে, কলোনি শাসনের অবসান না ঘটাতে পারলে, পরে কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম না হলে আমেরিকা দুনিয়ার কোথাও বিনিয়োগের জায়গা পাবে না, খাতক রাষ্ট্র পাবে না যার সাথে সে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে পারে। কল্পিত এমন যেই দুনিয়ার নেতা হতে পারবে আমেরিকা! এই কথাটাই গুছিয়ে তুলে ধরেছিলেন হেনরি তাঁর ‘দ্য আমেরিকান সেঞ্চুরি’ নামের ওই দীর্ঘ প্রবন্ধে। বলতে চেয়েছিলেন, এতে সফল হতে পারলেই দুনিয়াতে পরবর্তী শত বছরের নেতা থাকতে পারবে আমেরিকা। তাই প্রবন্ধের নাম ছিল ‘দ্য আমেরিকান সেঞ্চুরি’। আসলে আমেরিকান সমাজের বিতর্ক আলোচনাগুলোকেই তিনি তুলে ধরে এনেছিলেন।

    মোটাদাগে বললে পরে বাস্তবে, এসব বক্তব্যের ভিত্তিতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এগিয়েছিলেন। আর তাতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের মধ্যে ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যেটা মূলত “কলোনি করা নিষিদ্ধ” বা যুদ্ধে হিটলার পরাজিত হলে চার্চিল কলোনিগিরি ছেড়ে দিবেন এরই প্রতিশ্রুতির চুক্তি। হেনরির প্রবন্ধটা প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৪১-এ, আর ওই ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৪ আগস্ট ১৯৪১, অর্থাৎ ছয় মাস পরে।

    আর ঐ বছরেরই শেষে ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে, আটলান্টিক চার্টার এই ড্রাফটটাতেই কিন্তু এবার আগের দু’জনসহ সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিন ও চীনের এক প্রতিনিধি স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। আর এটাকেই জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণা মনে করা হয়। এছাড়া পরের দিন থেকে অন্যান্য দেশও এতে স্বাক্ষরদানের জন্য উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছিল।

    ভেটো সদস্যপদের ধারণা কেন ও কোথা থেকে এলোঃ
    কিন্তু ভেটো ক্ষমতার [Veto Power] সদস্যদের বিশেষ ভেটো অধিকারের ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গড়া, এটা কেন? ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকেই বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি যোগ দেওয়াতে যুদ্ধ পুরাদমে শুরু হয়েছিল। আর প্রায়শই রুজভেল্টের পাশে পাশে তখন থেকে আরও দুজন নেতাকে দেখা যেত – স্টালিন ও চার্চিল। মূলত জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে রুজভেল্টের প্রাইমারি আইডিয়াটার পক্ষে স্টালিনকে রাজি করাতে চাইতে গেলে তিনি আপত্তি করেন। সেটা হল এরকম যে,, জাতিসঙ্ঘ নামক এই প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভিত্তিতে চালু হয় তাহলে এটা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কখনও সোভিয়েত ইউনিয়নেরই রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসতে পারে। তখন কী হবে? তখন এরই সমাধান দিতে গিয়ে আর স্তালিনকে আস্থায় নিতে চেয়ে রুজভেল্ট এর সমাধান দেন এভাবে যে, প্রথমে তারা একমত হোক দুনিয়ায় পরাশক্তি বা হবু পরাশক্তি কারা, আছে বা হতে যাচ্ছে। এরপর ঐ পরাশক্তিগুলোর যেকোন এক সদস্য যদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভায় কোনো ইস্যুতে আপত্তি করে তবে জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্তই আর গৃহীত হতে পারবে না- এমন সিস্টেম করা হবে, এটাই ভেটো দেয়া। অর্থাৎ রুজভেল্ট ভেটো আইডিয়া দিয়ে স্টালিনের উৎকণ্ঠার সমাধান টানেন। আর এভাবেই তিনি স্টালিনকে নিজের জাতিসঙ্ঘ আইডিয়ার নৌকায় তোলেন।

    কিন্তু ভেটো সদস্যধারী ওই পাঁচজন কারা ও কেন সাব্যস্ত হয়েছিল? স্টালিনের সোভিয়েত ও রুজভেল্টের আমেরিকা তো ভেটো সদস্য হবেই, জানা কথা ধরতে পারি। আর ব্রিটেন, ফ্রান্স- এরা দুনিয়ায় কলোনিদখল অবসানকে লক্ষ করে বিরাট মিত্র। এবং এরা আটলান্টিক চার্টার চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেলেও তখনো পরাশক্তি; কাজেই তারা এতে অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। এছাড়া তাদেরকে ভেতরে সদস্য করে না নিলে তারা বাইরে গিয়ে বিরোধিতা শুরু করলে হিটলারের জার্মানবিরোধী করে মিত্রপক্ষশক্তির জোট গড়াই হতো না, এই বাস্তবতাও ছিল। কিন্তু তাহলে পঞ্চম ভেটো সদস্য হিসেবে চীনকে নেয়া হয় কী যুক্তিতে? চীন তো তখন অর্থনীতি বা সামরিক অর্থে তেমন কোনো শক্তিই ছিল না। তাহলে?

    আসলে সে সময়ে রুজভেল্টের মিত্রশক্তির বিপরীতে জার্মানির হিটলারের পক্ষে ছিল দুই প্রমিনেন্ট রাষ্ট্র ইতালির মুসোলিনি আর  সামরিক নেতা মার্শাল তোজোর জাপান, যার দুই-ই ছিল কলোনি দখলদার রাষ্ট্র। জাপান ছিল পুরা কোরিয়া (তখনও দুই কোরিয়া হয় নাই) আর চীনের আংশিক দখলদার। অর্থাৎ  ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে ভেটো সদস্যপদ দিয়ে ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও রুজভেল্ট এশিয়ারই একমাত্র কলোনি দখলদার জাপানকে শায়েস্তা করতেই এর কাউন্টার ওয়েট হিসেবে চীনকে খাড়া করতে চেয়েছিলেন; তাতে চীন আন্ডার ডেভেলপড্ হলেও, পরে গড়ে নেবেন এই আশায়। আসলে সোভিয়েত আর ব্রিটেন ও ফ্রান্স এরা সবাই নিজ নিজ ভেটো সদস্যপদ বুঝে পাওয়ার পর আর চীনের বেলায় তত সিরিয়াস ছিল না। ফলে আপত্তি না করে রুজভেল্টের বাছবিচারের প্রতি সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই চীন হল জাপান দখলমুক্ত।  ওদিকে সারা চীনের জাতীয়তাবাদী নেতা চেয়াংই কাইসেক আর তাকে কেন্দ্র করেই আমেরিকার গড়ে তুলেছিলেন নিজ চীনা-স্বপ্ন, ভেটোসদস্য পদধারী চীন।।

    কিন্তু অচিরেই আমেরিকার স্বপ্ন ভেঙে যায় বা ভেঙে দেন মাও সেতুং। পরের চার বছরের মধ্যেই তিনি ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব কায়েম করে ক্ষমতায় বসেন। তবে একটা খুঁত থেকে যায়। চীনের বিশাল ভূখণ্ডের তুলনায় তাইওয়ান একটা ছোট্ট ভূমি মাত্র। তবে এরপরেও আলাদা দ্বীপ বলে এর কিছু স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব আলাদা। মাওয়ের বিপ্লবে তাইওয়ান তিনি দখল করেননি, আর ওই দ্বীপেই কাইশেক পালিয়ে আশ্রয় নিয়ে বসেন।

    এদিকে ১৯৪৯ সাল মানে হল, বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে; ততদিনে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু (এপ্রিল ১৯৪৫) হয়ে গেছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রু ম্যান নিয়ম অনুসারে সাথে সাথেই প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন। এদিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের দুই সমর্থক- সাগরেদ মূল নেতা সোভিয়েত ও ব্রিটেন এদের জন্য সেকালে এটা দেখানো খুবই জরুরি ছিল যে, ওই বিশ্বযুদ্ধ জয়ে ও জাতিসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠায় দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মানে জাতিসঙ্ঘের জন্ম হয়ে যাওয়াতে যেকোন দু’রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে যুদ্ধ না করেই কথা বলে শান্তি ও মীমাংসা এখন সম্ভব এবং তা সহজ। সেই ফ্যারে পড়ে অতএব, আমেরিকা ও সোভিয়েত পরামর্শ ও চাপে চীনের মাও তখনকার মত আর তাইওয়ান দখল স্থগিত রাখেন। তবে জাতিসঙ্ঘ বা শান্তি, এসব কথার আড়ালে আমেরিকা ও সোভিয়েতের অন্য স্বার্থ ছিল অবশ্যই।  যেকথা এখনও চীনা নেতৃত্ব অভিযোগ তুলে বলে থাকে। চীনের ব্যাখ্যা হল,  আমেরিকা চেয়েছিল তাইওয়ানকে বাঁচিয়ে রাখতে যাতে তার “চীনা-স্বপ্ন” এর সম্ভাবনা কিছুটা হলেও জেগে থাকে। মাওয়ের নয়াচীন নয়, তাইওয়ানকেই সে আসল চীনের প্রতিনিধি বানিয়ে চীনের জন্য বরাদ্দ করা আগের ভেটোক্ষমতাটা আমেরিকা তাইওয়ানের হাতে রেখে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। সম্ভবত মাওয়ের ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হয়ে যায়। এছাড়া ওদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নও চায়নি আরেক কমিউনিস্ট প্রতিদ্বন্দ্বী ভেটোক্ষমতা পেয়ে যাক! এমনটাই চীনের ব্যাখ্যা।

    কিন্তু সেকালে এথেকে মাও সিদ্ধান্ত নেন, যে কোনো রাষ্ট্র নয়াচীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে গেলে ‘একচীন’ নীতি মানতে হবে। মানে চীন মেনে নেয় নাই যে তাইওয়ান চীনা-রাষ্ট্রের অংশ নয়। আসলে কাইশেক “তাইওয়ান মুক্ত” করার জন্য কখনও লড়েছেন ব্যাপারটা তো তা নয়। তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে এটাও কখনও তার দাবি অথবা লড়াই ছিল না। সোজাকথা তাইওয়ান কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা সশস্ত্র লড়াইয়ের ফসল তা একেবারেই নয়। 

    এদিকে, আমেরিকা মাত্র এই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ‘একচীন’ নীতি মেনে প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল। কারণ, মাও তখন ইতোমধ্যেই (১৯৫৮ সালে) সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ধরণের ‘ক্যাপিটালিজম’ তিনি কায়েম করতে চান,(এটাই আজকের চীন)। তাতে চীনে ব্যাপক বিনিয়োগ আর পণ্য নিয়ে ব্যাপক বাজারের সুযোগ যদি আমেরিকা নিতে চায় তবে আগের তাইওয়ানকে দেয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতি প্রত্যাহার করতে হবে। এর বদলে চীনকেই ভেটো সদস্যদের হকদার ও আসল চীনের প্রতিনিধি মেনে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশকে বিক্রি করেই এসব ঘটেছিল। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে চীন ভেটো সদস্যপদ পায় আর তাইওয়ান জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি হারায়। আমেরিকা তখন থেকে (আজও)  তাইওয়ানকে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নিয়ে আছে। এছাড়া সে সময় আমেরিকা  অভ্যন্তরীণভাবে নিজ কূটনীতিকদের করণীয় কী এর গাইডলাইন হিসেবে এক সার্কুলার জারি করেছিল যাতে ‘একচীন’ নীতি ভঙ্গ না করতে করণীয় লেখা ছিল। সেটাই এখন একালের ঘটনা এবং এই লেখার শুরুর ইস্যু।
    এবার পম্পেও ট্রাম্পের ক্ষমতা ছাড়ার আগে সেই সার্কুলারটা প্রত্যাহারের ঘোষণা করে দিয়ে যান। ফলে বাস্তবত অভ্যন্তরীণভাবে কূটনীতিকরা এখন কোনো বাধ্যবাধকতায় নাই, যদিও চীনের সাথে সম্পর্কের বেলায় চীন-আমেরিকা সম্পর্ক চুক্তি বহাল আছে। মানে আমেরিকা একচীন মানে এই প্রতিশ্রুতি বহালই আছে।  সারকথায় আমেরিকার রাষ্ট্রের ভিতরে-বাইরে দুইকথা হয়ে গেছে।  ওদিকে বাইডেনের সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটা হল, “পাছে লোকে কিছু বলে”। ট্রাম্পের দেশপ্রেমিক জাতিবাদের তুলনায় তিনি খাটো – পাবলিক যদি এমন মনে করে!
    বাইডেন খুবই আয়েশে পম্পেও এর প্রত্যাহার আদেশটাকেই তিনি বাতিল ঘোষণা করতে পারতেন। কিন্তু এই সহজ কাজটা তিনি করেননি। সম্ভবত ইমেজের ভয়ে যে এতে তিনি ট্রাম্পের চেয়ে কম দেশপ্রেমিক হয়ে যান কি না! বাইডেন এখানেই থামেন নাই।
    বরং উল্টা তিনিও ট্রাম্পের মতোই নিজেকে দেশপ্রেমিক দেখাতে চেয়েই যেন আরেক ক্যালাস কয়াজ করে বসেন। আমেরিকায় তাইওয়ানের ট্রেড কমিশনারকে (অর্থাৎ কূটনীতিক বা রাজনৈতিক প্রতিনিধি নয়, ট্রেড প্রতিনিধি যেটা চীন অনুমোদন করে, এবং চীনেও তাইওয়ানিজ ট্রেড প্রতিনিধি আছেন) বাইডেন নিজ শপথ অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে বসেন। ট্রেড কমিশনার তাতে উপস্থিতও হন। যেখানে বাইডেনের উচিত ছিল সরকারিভাবে জানান দেয়া যে, তিনি একচীন নীতি মেনেই চলবেন সেখানে তিনি উলটা তাইওয়ানকে দাওয়াত করে বসেন। অনেকে বলতে পারেন, বাইডেনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়োগ সিনেটে অনুমোদন পেয়েছে মাত্র গত পরশু। তাই হয়ত তিনি অপেক্ষা করছিলেন। না এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য না। কারণ, সেক্ষেত্রে তিনি ইনফরম্যাল কিন্তু বিশ্বস্ত চ্যানেলে চীনকে মেসেজ পৌঁছাতে পারতেন। যেটা একালে খুবই প্রচলিত এক কূটনীতিতে খুবই প্রচলিত এক যোগাযোগে উপায়।
    এদিকে এরই ফলাফলে কথিত ‘তাইওয়ান হুমকি’ আর বিপরীতে ‘তাইওয়ান রক্ষা’ – এই অজুহাতের আলোকে চীন বোমারু বিমানের আনাগোনার বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ পাঠিয়ে মহড়া – এগুলো এখন সাউথ চায়না সি’তে খামোখা উত্তেজনা তৈরির উপাদান। যুদ্ধের ইঙ্গিত ছড়িয়ে খেলাধুলা করা খুবই দায়ীত্বজ্ঞানহীন কাজ!

    কাজেই এগুলো চুলকিয়ে ঘা করা অদূরদর্শী আচরণ ছাড়া অন্যকিছু ভাবার সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। তবে কি বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে কড়া সঙ্ঘাতপূর্ণ সম্পর্ক করতে চাইছেন? না, এরও কোনো আলামত তিনি বা হবু ক্যাবিনেটের কেউ দেননি। মানে যা আপনি করতেই চান না, সেটার ইঙ্গিত বাতি জ্বালাচ্ছেন কেবল! অর্থাৎ কেবল বিভ্রান্তি আর বিভ্রান্তি বাড়ানোই যেন বাইডেনের উদ্দেশ্য! ফলে স্বভাবতই এটা খুবই খারাপভাবে শুরু, সন্দেহ নেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ৩০ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীন নিয়ে আমেরিকার স্বপ্নের পরিণতি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    গৌতম দাস

    ২০ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-36q

     

    https://www.dailymail.co.uk/news/article-3413556/

    চীন-ইরান এলায়েন্স থেকে গ্লোবাল পালাবদলের শুরু হবে,
    আর ইউরোপের চীনের দিকে ঝুঁকবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলঃ

    বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাকে আমরা অনেকে “গ্লোবাল অর্ডার” বলে বুঝে থাকি, এর আসন্ন পালাবদলে [Global Economic Order] নির্ধারক এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। চীন ও ইরান এক দীর্ঘমেয়াদি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক উন্নতিকে ফোকাস করে এক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটা হবে দীর্ঘস্থায়ী  ও স্ট্র্যাটেজিক সাথে বাণিজ্যিকভাবেও এদুই দেশের গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। অবস্থা এমন হয়ে যাবে যাতে ইরানের গায়ে কেউ ফুলের টোকা দিলেও সেটা চীনের গায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, চীনের স্বার্থের উপর এর প্রভাব থাকবে, এমন অবস্থা হয়ে যাবে। অর্থাৎ এদুই দেশ স্বার্থের প্রশ্নে তারা বহুদূর কমন স্বার্থ হয়ে হাঁটবে। তাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাদা করে কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত থাকুক আর নাই থাকুক।

    এনিয়ে মিডিয়ায় দুনিয়াজুড়ে  মন্তব্যের ঢল বইছে। মন্তব্যগুলো মূলত আমেরিকা ও ভারতের ব্যর্থতা বা অকর্মন্নতার  দিকে আঙুল তুলছে আর বলছে এরা দুই হল হারু পার্টি – They are the losers। যদিও লুজার শব্দটা কারোরই শুনতে ভাল লাগে না। তবু তেমনটাই কয়েকটা পত্রিকা লিখছে – ১।  ট্রাম্পের মহাকাব্যিক পরাজয় । ২। এই পার্টনারশিপ আমেরিকার জন্য ভয় পাইয়ে দিবার মত ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ৩। এই প্যাক্ট এশিয়া্র সাথে আমেরিকার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। আবার বোকা গাড়োলের মত এক মন্তব্যও আছে আর এটা সম্ভবত এই প্যাক্ট নিয়ে আমেরিকার প্রথম সরকারি মন্তব্য। বর্তমানে ইরানের উপর অস্ত্র-ক্রয় বিষয়ে জাতিসংঘের এক নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে যেটা আগামি তিন মাস পরে অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (বিদেশমন্ত্রী) মাইক পম্পেও বোকার মন্তব্য করেছেন – “এই প্যাক্টই বলে দিচ্ছে আমাদেরকে আবার একটা শক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে“। ঘটনা হল, জাতিসংঘের কাঠামোতে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা যেকোন একরাষ্ট্র  না-ভোট দিয়ে দিলে এরপরে ঐবিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত হবার সুযোগই নাই। চীন ইতোমধ্যেই সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। এখন এখানে ভেটো ক্ষমতাধর চীন থাকার পরেও এতে পম্পেও-এর এমন আওয়াজ ছাড়ার কোন অর্থ আছে?
    আচ্ছা, আপাতত আর এদিকে আগে না গিয়ে, প্যাক্ট বা চুক্তিপত্রের ভিতরে প্রেবেশ করি।

    চুক্তির খসড়া দলিল তৈরির কাজ শেষ। তবে এখানে খসড়া কথার মানে হল, এর  অনুমোদনের অংশ বাকি বা প্রক্রিয়াধীন যা দুদেশের পার্লামেন্টে আলোচনা ও পাস হওয়া এরপর রাষ্ট্রপ্রধানদের  অনুমোদনের ধাপ আছে তা সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে বা কিছু শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এরই ফাঁকে প্যাক্টটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে, তাদের এক সফল গোয়েন্দাগিরি সম্পন্ন হয়েছে, বলতে হয়। আর চীন-ইরানের দিক থেকে দেখলে কোনো বিশ্বাসঘাতক, হলুদ কাগজের ১৮ পৃষ্ঠার এই খসড়া দলিলটা্র কপি চুরি করেছে আর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেটা হাতে পেয়ে ছেপে দিয়েছে। পত্রিকাটার দিক থেকে দেখলে, হাতে পেলে তো তারা ছাপবেই। যদিও চুরি করে পাওয়া একটা দলিল ছাপানোতে, এতে  গোপন রহস্য ধরনের ভাব তৈরি হয়েছে যেনবা চীন-ইরান কোনো অপরাধ করছিল যা (নিউ ইয়র্ক) টাইমস প্রকাশ করে দিয়েছে, এই ভাবের। না, কোনোভাবেই এটা তেমন কিছুই নয়। কোনো ধরনের অপরাধ তো নয়ই। ট্রাম্পের আমেরিকা এপর্যন্ত  ইরানের উপর দীর্ঘদিন ধরে  যেসব সীমাহীন অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে তাতে ইরান একেবারেই কোণঠাসা, অর্থনীতি ধুঁকছে, এই করোনাকালে ইরানিদের জীবন থমকে গেছে যেখানে। তবে ট্রাম্পের এসব অবরোধ আরোপের নেতি উদ্দেশ্য আর এতে কৃত আসল অপরাধ হল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হয়ে ভাড়া খাটা আর শত্রুতামূলক কাজ করা। যদিও এই অবরোধ জাতিসঙ্ঘের নয়, কেবল আমেরিকার আরোপিত বলে তা মানতে কোনো দেশের উপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু টেকনিক্যালি আমেরিকা আমাদেরকে বাধ্য করতে পারে এসুযোগ আমেরিকার হাতে আছে।

    তবে অবশ্যই, আমেরিকার অবরোধ আরোপ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অপব্যবহার করা হচ্ছে এখানে। মূলত “আমেরিকান অবরোধ আরোপ” কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, আমেরিকার ইরানকে নিষেধ করে দেয়া যে তুমি আমেরিকান ডলারে কোন আন্তর্জাতিক কেনাবেচা করতে পারবে না। কারণ দুই দেশ ডলারে কোন বেচাকেনা করলে “আমেরিকান কোন ব্যাংকের” কাছে যাওয়া ছাড়া এই লেনদেনের একাউন্ট ট্রান্সফার সম্পন্ন হবে না।   অতএব এর প্রতিকারের ব্যাপারটা এখন গায়ের জোর। এই অবস্থায় গায়ের জোরের মুরোদে কুলালে সবার আগে ঐ আমেরিকান অবরোধ উপড়ে ফেলে দেয়াটাই হবে খুবই জায়েজ কাজ।  সেটা কেমন, সেদিকে যাব।

    চুক্তিটা ঠিক কী নিয়েঃ
    সামগ্রিকভাবে উপর থেকে দেখলে, ইরানের এটা চীন থেকে পুঁজি আর টেকনোলজি ধার নিয়ে নিজের অবকাঠামো, শিল্প আর সাথে সামরিক ব্যবস্থাদিতেও সহযোগিতা নিয়ে সেসব গড়ে নেয়া। (নিউইয়র্ক)  টাইমসের ভাষায়, ইরান ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর, রেলওয়েসহ আরো ডজনখানেক প্রকল্প হাতে নিবে; এছাড়া সামরিক সহযোগিতা, গবেষণা, ট্রেনিংসহ এসব বিষয় দেয়ানেয়া করবে। এভাবে ইরান নিজেকে সবল বাণিজ্যিক পার্টনার হিসাবে গড়ে তুলবে। আর নেয়া ঐ ঋণ শোধ দিতে চীনকে ইরানের তেল-গ্যাস সরবরাহ করবে। ফলে মোট ২৫ বছর এনার্জি দিয়ে বিনিময়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও টেক পাওয়ার চুক্তি এটা।  টাইমসের ভাষায়, এজন্য এটা এক ‘বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার’ প্যাক্ট [Economic and Security Partnership]। একটা তুলনা দিয়ে বলা যাক এটা কত বড় অঙ্কের অর্থ। বিশ্বব্যাংক  সবখাতক রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার মোট বাজেট হল বছরে ৫০-৬০ বিলিয়ন। আর তুলনায় ইরানের এই ঋণ হল গড়ে একাই কেবল নিজ-রাষ্ট্রের জন্য প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে, এবং তা ধারাবাহিক ২৫ বছর।

    ইরানের কাছে এই ঋণের গুরুত্ব কীঃ
    কম করে বললে সেই ১৯৫৩ সাল থেকে ইরান ধুঁকে মরছে, লড়ছেও। আমেরিকা যখন ফিজিক্যালি সিআইএ এজেন্ট পাঠিয়ে (যেটা একালে (2013) আমেরিকান সরকারের স্বীকার করার কারণে প্রতিষ্ঠিত সত্য) ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে ফেলে দিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে চার দেশ মিলে ইরানের তেল লুট করে নেয়ার চুক্তিটা করে নিয়েছিল, সেই থেকে। এর চেয়ে প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা আর কী হতে পারে! এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের খোমেনির বিপ্লব সফল হয়েছিল। এক সবল পালটা থাপ্পর।  আর তাতে লুটেরাদের হাত থেকে ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব সামলে ছিল কিন্তু সেটাকে সংহত সুরক্ষিত করতে গিয়ে ইরানিদের অর্থনৈতিক জীবনটা আর কখনো স্থায়িত্ব দেয়া, একটু থিতু হওয়া আর কখনই সম্ভব করতে পারে নাই। প্রধান সঙ্কট থেকে গেছে, প্রয়োজনীয় পুঁজি-বিনিয়োগে ঘাটতি ও টেকনোলজি পাওয়া আর ওদিকে নিজের এনার্জি পণ্য, অবরোধের কারণে বিক্রি করতে না-পারা, সবসময় এগুলোই তাদের বেঁধে রেখেছে। এই যে চার দিকে নেই নেই অথচ দেশের প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে গরিব দেশ নয় – এঅবস্থা থেকে ইরান সম্ভবত এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই প্রথম ইরানের বিনিয়োগে খরা কাটতে যাচ্ছে। ইরানের শিক্ষিত বা সক্ষম মানুষেরা কাজ পায় না বেকার, সে দুঃখ সম্ভবত  ঘুচবে এবার।

    উপচে ওঠা প্রভাবঃ
    হবু এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে এটা আর পাঁচটা দেশের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতই কিছু ঘটনা হয়ত। কিন্ত তাই কী? আর এতটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? অবশ্যই না। কারণ, এতে বেশ কিছু প্রভাব তৈরি হবে তা অন্যান্য প্রভাবের উপর পড়বে আর তাতে প্রভাবগুলোর মোট যোগফল বা কিউমিউলেটিভ ফলাফল পরিণতি হবে গভীর। আর এটাই “গ্লোবাল অর্ডারে” বড় ধরনের পালাবদল ঘটিয়ে ফেলবে। সব গ্লোবাল উত্তেজনা তাই এখানেই। খুব সম্ভবত আগামী ইতিহাসে, কোন কোন ঘটনা থেকে পালাবদলে গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্ব পুরানা স্থিতি ছেড়ে চীনের হাতে চলে এসেছিল – এর অন্যতম হিসেবে চীন-ইরানের এই হবু চুক্তির কথা লেখা হবে। এই চুক্তি এমনই বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং হওয়ার মতই প্রবল পটেনশিয়াল।

    যেমন একটা পটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাব্য আড়ালে থাকা ক্ষমতার কথা বলি। এক কথায় বললে, আমেরিকার ইচ্ছামতো যাকে খুশি যেকোনো দেশের উপর “অবরোধ আরোপ করে” তাকে ডলারে কেনাবেচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এর টেকনিক্যাল সুযোগ সে পড়ে পাওয়া চার আনার মত পেয়েছে ও নিয়েছে। ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় এর সদস্যরা একমত হওয়াতে একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই (এবং এটাই তখন সব শর্তপুরণ করতে পারে এমন একমাত্র যোগ্য মুদ্রা ছিল) আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ মুদ্রার বাস্তব অসুবিধা হল, কোন না কো রাষ্ট্রীয় মুদ্রাকেই একই সাথে তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়। কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রার বড় ইতিগুণ হল, এটাই একমাত্র বাস্তব কার্যকর ও ব্যবহারিক মুদ্রা। ফলে যা লোকাল একটা দেশের মুদ্রা যে মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ওই দেশের হাতে তাকেই উপায়হীন হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়েছিল। এটাই মুদ্রার গুণ-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা। মুদ্রার এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর কোনো সমাধান এখনো দুনিয়াতে নাই।
    তাই  আইএমএফ-স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে যদিও ডলারে কেনাবেচা করতে ইরানকে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারণ ইরানও আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমেরিকা এর বিপরীতে বলবে সে নিজের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে যে ডলার সেই ডলারে বেচাকেনা করতে ইরানকে বাধা দিতেই পারে। এই এক্তিয়ার তার আছে। সোজা কথা, মুদ্রার গুণগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বাড়তি এই ক্ষমতাটা অপব্যবহার করে থাকে। আমেরিকার এই অপব্যবহার এতই মারাত্মক যে গত ২০০৮ সাল থেকে বারো বছর ধরে রাশিয়াকে সে আজও ডলার-অবরোধ দিয়ে রেখেছে। পরিণতিতে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মূল্য অর্ধেক হয়ে আছে।
    শেষে প্রায় ইরানের মতনই রাশিয়াও সেকালে চীনের সাথে এক এনার্জি চুক্তি করে এর বিনিময়ে নিজ অর্থনীতি সামলিয়েছে। অবশ্য এছাড়াও ওদিকে ব্রিটেন রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে আর সেই গ্যাসের মূল্য থেকে পাওয়া আয় রাশিয়া আবার ব্রিটিশ বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছে বলে ব্রিটেনের বিশেষ অনুরোধে আমেরিকা কেবল এই অর্থটা অবরোধ আরোপের বাইরে ছাড় দিয়ে রেখেছে। তবে মূলত চীনের সাথে লেনদেনের ভরসায় রাশিয়া বাজারে টিকে আছে। মনে রাখতে হবে, অবরোধের আরেক ব্যবহারিক মানে হল গ্রামে কাউকে যদি একঘরে করে রাখা হয় – এর প্রভাব একটা রাষ্ট্রের উপর তেমনই। সেটা যাই হোক, এটাই আবার চীন-রাশিয়ার বর্তমান বিশেষ সম্পর্ক ও  এলায়েন্সের আসল ভিত্তি। তাদের আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের গোড়ার কথা এটা। যদিও কেউ কেউ এখনো ভুল করে ‘কমিউনিস্ট ইডিওলজি’ এদের সম্পর্কের ভিত্তি মনে করে; যা একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ইডিওলজির সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে আজকে নয় সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই তা ভেঙে চুকেবুকে গেছে। বরং আমেরিকার ডলার-অবরোধের ক্ষমতা ভাঙতে চীনের মিত্র হিসাবে সবচেয়ে আগ্রহী শক্তি রাশিয়ার পুতিন। অতিরিক্ত ছটফটে পুতিন পারলে এখনই কিছু করে এমন যেকোনো কিছু করতে রাজি। তবে এ নিয়ে চীনের সাথে রাশিয়ার লম্বা যৌথ পরিকল্পনা আছে।

    ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া মানে কীঃ
    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপারটা কী তা কমিউনিস্টদের আজো ঠিকমতো বোঝা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চালু ও দাঁড়িয়ে আছে এটাই তারা রিয়েলাইজ করে না। এই ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেলেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো তখন এতে অংশ নেয় নাই (আবার আমেরিকাও নেতিবাচক মনোভাব রাখাতে যেমন, সুনির্দিষ্ট করে পোল্যান্ডের সদস্য-পদলাভের আবেদন না করে দিয়েছিল আমেরিকা)।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো সেই থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল। তবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমিতভাবে বার্টারে কিছু পণ্য বিনিময় হত। কিন্তু এভাবে কতদিন?  এভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এরপরে এরা সবাই আইএমএফের সদস্যপদ পায় ও নেয়। তত দিনে দুনিয়ার বাণিজ্যে কেনাবেচা প্রধানত ডলারেই সম্পন্ন হওয়া প্রবলে  শুরু হয়ে গেছে। প্রধানত মানে? মানে হল, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের  সত্তর ভাগের বেশি লেনদেন যদি কোন একক মুদ্রায় সম্পন্ন হয় তাহলে সেটাই প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধরতে পারি। এটা অনেকটা খুব চালু দোকানের খাবারের মত। খুব চালু বলেই ওর খাবার সবসময় টাটকা ও ভেরাইটি থাকে। ফলে ওর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য দোকান কেউ দাড়াতেই পারে না। কিন্তু একবার যদি তার বিক্রি পড়ে যায় তবে ঐ দোকান শেষ। একইভাবে, ডলারের ক্ষেত্রে, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে একবার সত্তর ভাগের কাছাকাছি চলে গেলে ডলারের দফারফা হয়ে যাবে। এটাই ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া। এদিকে ইতোমধ্যে  চীনা ইউয়ান শর্ত পূরণ করাতে পারায় গত ২০১৫ সাল থেকে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আইএমএফের স্বীকৃতি পায়। আর সেই থেকে রাশিয়ার সাথে চীন পরিকল্পনা করে করে আগাচ্ছে।

    চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানোঃ

    China's annual average crude oil imports

    Source: China General Administration of Customs, based on Bloomberg, L.P.

    এখনকার মুল পরিকল্পনাটা হল, চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক। বড় অর্থনীতি বলে চীনকে প্রচুর জ্বালানি কিনতে হয় [World’s largest Importer]  …..more than 10 million barrels a day last year। মানেই তার পরিশোধ করা এক বড় পেমেন্ট হল জ্বালানির মূল্য শোধ করা। অতএব হিসাবটা হল, এই পেমেন্ট যদি সে ডলারে না করে নিজ মুদ্রা ইউয়ানে করে তাহলে ঐ ৭০% গ্লোবাল লেনদেন থেকে ডলারকে হটানোর পথে অনেক দূর আগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন এই পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা বা গালফকেন্দ্রিক, বাদশাহরা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে একবার রাজি হয় ভরসা করে – এভাবে। কিন্তু এর ভিতরে  ইরানকে নিয়ে গোনায় ভাবা হয়নি। কারণ ইরান আজকের হবু সম্পর্কের মধ্যে আসতে চায় এমন আগ্রহ আগে কখনও  দেখায়নি। আর ইরানের কাছে চীনের দেয়া প্রস্তাব ছিল সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী, এখনকার হবু চুক্তির মত হতে হবে এই শর্তের।  ইরানের আগে অনাগ্রহটা কেন ছিল তা বুঝতে ইরানের বিরোধী নেতা আহমদিনেজাদের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে আমরা অনেক বেশি চীনা নির্ভরশীল হয়ে যাব। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে লড়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রশ্নাতীতভাবেই ইরান চীনা নির্ভরশীল তো হবেই, কথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হল ইরানের হাতে এর বিকল্প আর কী আছে? ব্যাপারটা হল, পোলাও পাতে আসার অপশন যদি নাই থাকে তবে পোলাও খাবো কি না সেই বাছাবাছির অর্থ কী! এই হল ইরানের বাস্তবতা। যদিও ইলেকশনি ইস্যু হিসেবে দেখলে আহমদিনেজাদের বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝা যেতে পারে।

    সেটা যাই হোক, এবারের সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ট্রাম্প আরো  কড়া অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এতে এক চীন আর ভেনিজুয়েলা (একে তেল পাঠানো রি-সেল করার জন্য) ছাড়া কোথাও ইরানি তেল বেচা যায়নি। ভারত এই প্রথম কোন তেল কিনে নাই। তাও সেটা আবার সকলকেই  কনসেশন রেটে আর ইরানি নৌবাহিনীর পাহারায় নিজ ট্যাংকার-ক্যারিয়ারে করে তা পাঠাতে এবার ইরানি-অফার ছিল তা সত্ত্বেও। ফলে ইরানের পাবলিক তাদের জীবনযাত্রায় আর কত গভীর চাপ, আর কত দিন সহ্য করতে পারা সম্ভব- এটাও মুখ্য বিবেচনার দিক হয়ে উঠেছিল এখানে। সম্ভবত সে কারণে এর আগে সহসা ইরান রাজি হতে পারেনি এমন হলেও এবার বাধ্যবাধকতা বেশি অনুভব করায় রাজি হয়েছে। এতে গালফ বাদশাহদের ইউয়ানের চীনা তেলের পেমেন্ট নেয়াতে রাজি করানো যতটা কঠিন ছিল এখানে সে কাজ অনেক সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, দেখা যাচ্ছে। কারণ খসড়া চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে সব লেনদেন হবে চীনা ইউয়ানে, একথা ইতোমধ্যেই লেখা আছে। সুতরাং এটা একটা বিরাট অগ্রগতি। অর্থাৎ পালাবদলের ধাক্কা দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ হয়েছে এটা। অর্থাৎ এই চুক্তির ইমপ্যাক্ট কেবল ইরানের কী লাভ-সুবিধা হল ততটুকুতেই নয় বরং নতুন এক চীনা গ্লোবাল ক্ষমতায় প্রভাব প্রতিপত্তিতে হাজির হতেও বড় ভূমিকা রাখবে। যেখানে ইরান সেই নতুন ক্ষমতার পাশে বুক ফুলিয়ে হাটবে তা বলাই বাহুল্য!  এজন্যই বলা হচ্ছে এই চুক্তি পালাবদলের শুরুর ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

    সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্যতম হবে ভারতঃ
    ভারতে চিন্তাবিদরা এখন বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন ও প্রকাশিত যে, তাদের চিন্তার ক্ষমতা-সামর্থ্য কত সীমিত! এই চিন্তাবিদ বলতে নানান রঙের কথিত থিংকট্যাংক বা একাডেমিক বা কনসাল্টিং ফার্মের কথা বলছি। এক কথায় বললে, এই চুক্তি ভারতকে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধসিয়ে দিবে, দিশেহারা করে দিবে। অথচ, এর আগাম কোনো হদিস এই কথিত চিন্তাবিদরা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দিয়েছে প্রমাণ জানা যায় না।  বরং আমরা বিস্মিত হই দেখে যে, হবু-চুক্তি প্রকাশ হবার পরে সবচেয়ে বেশি অহেতুক বাজে কথা বলা হামবড়া লোকটাই এখন সবার আগে মাথা নিচা করেছে। বিসিসিকে এরা যা বলেছে এর সারকথাটা হল, তারা হেরে সব মেনে নিয়েছে। বিবিসি লিখছেঃ

     “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও কার্যত মেনে নিচ্ছেন, চাবাহারে ভারত বিপুল পরিমাণ লগ্নি করার পরও এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হয়তো শেষ পর্যন্ত চীনের কাছেই হাতছাড়া হয়ে যাবে। মি. চক্রবর্তীর কথায়,”ইরান বলছে ওই রেল প্রকল্পে ভারত ঠিক সময়ে টাকাপয়সা দেয়নি। আমরা যেটা দেখছি,চাবাহার নিয়ে ভারতের মধ্যেও এখন একটা দ্বিধা কাজ করছে – কারণ ওই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” “আমার ধারণা চাবাহার বন্দর প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত ভারতেরও শেয়ার থাকবে – কিন্তু চীনই শেষ পর্যন্ত ওখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার হিসেবে উঠে আসবে।”
    —এরপর আর আমাদের কিছুই কী বলার আছে!

    এর মানে, এই চুক্তির কারণে ভারত মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা বাণিজ্য সহায় সমর্থনহীন অবস্থায় পড়ে সব গুটিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরতে মানসিকভাবে তৈরি। কিন্তু ভারতের দুর্দশা তো এতেও শেষ হবে না। এই হবু চুক্তির আয়োজনের ফলে ভারতকে চীন এমন কঠিন এক  দুর্দশা পরিস্থিতিতে ফেলে দেবার মুখে নিয়ে যাবে যেখানে – ভারতকে এখন খোলাখুলি চীন অথবা আমেরিকা কোনো একটা পক্ষকে বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই সময় এসে গেছে যখন ‘এ-ও হয় ও-ও হয়’ বলে দু’দিকেই নৌকায় পা দিয়ে থাকার সুবিধা এনজয় করার দিন শেষ। এতে ভারত যদি আমেরিকা ক্যাম্পে যায় তা গেলে হয়ত সামরিক দিকে কিছু সুবিধা হতে পারে। কিন্তু সাথে খামোখা অনেক দায় আসবে যেগুলো  আসলে হুদাই পশ্চিমের ব্যাগেজ টানা হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে  সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে বাইরে থেকে সব অর্থনৈতিক সাহায্য সমর্থন পাওয়ার দিন শেষ হবে। আর যদি চীনের ক্যাম্পে মাথা নিচু করে ফিরে তবে চীনের টার্মেই ফিরতে হবে। কম দরে বিক্রি হতে হবে।

    আবার উপরে এই যে অবলীলায় বলছেন,  “ভারতেরও শেয়ার থাকবে” – এই কথা কয়টা তো মারাত্মক ভীতিকর। মানে ব্রিকস ব্যাংক বা এআইআইবি ব্যাংক ইত্যাদি এমন সবখান থেকে ভারত গুটিয়ে যাবে কেবল নিস্ক্রিয় পার্টনারের মত  শেয়ার মালিকানা নিয়ে থাকবে – তাই কী? তার মানে গত এক সপ্তাহের মধ্যে কথার চাপা আর তুবরি ছুটানো লোকগুলো সব হার মেনে নিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে  -সেলফ, নিজ উদ্যোগে??

    আবার যে কথাটা বলছিলাম ভারতীয় চিন্তার সামর্থ্য – এখন এটা ভারতের রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের জন্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে, চীন-ইরান যে এমন একটা দীর্ঘস্থায়ী এলায়েন্স করে বসতে পারে তা তারা বিন্দুমাত্র আগে জানত। অর্থাৎ ইরানি তেল না কিনলে মুখ ঘুরিয়ে নিলে যে ভারতেরই বহুমুখী স্বার্থ  যে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে সেটা তারা আগে দেখতেই পায়নি, টেরই পায় নাই! তাদের চোখে “মেরা ভারত মহান” হয়েই ছিল বা “অনেক ক্ষমতাবান” হয়েই ছিল! তার মানে দাঁড়াল ভারতে শুধু উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতি আছে তাই নয়, চিন্তার সামর্থের দিক থেকেও  বহু পিছনে আছে। আমেরিকান থিংকট্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ব-ক্ষমতাটাও শেষ।

    ভারত ইরানের জাভেদ জারিফকে প্রবল হতাশায় ফে্লে এর পরিণতি খাটো করে দেখেছিলঃ  
    আবার ঘটনা দেখেন সেদিন কীভাবে ঘটেছিল। তেলকেনা বিষয়ে ভারতের পিছলানির আলাপ সেই ২০১৮ জুনে নিকি হেলির ভারত সফরের সময় থেকে শুরু আর মোচরানি দিতে শুরু করেছিল। ভেবেছিল কী জানি বিরাট ক্ষমতাবান এক ভারতীয় পাঞ্জাব অরিজিনের মানুষ হাতে লেগে গেছে, ভারতকে আর পায় কে!  তাই সেসব মোচরানি! এছাড়া  সর্বশেষ যেদিন ১৩ মে ২০১৯ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ [Mohammad Javad Zarif] এক দিনের ঝড়ো সফরে ভারত এসেছিলেন এবং খুবই মনোক্ষুন্ন হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ এর আগেই ২ মে ২০১৯ থেকে ইরানের অনুরোধ ফেলে মাড়িয়ে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল; আমেরিকান অবরোধের অজুহাত দেখিয়ে। অথচ  চীন তখনও তেল কিনা জারি রেখেছিল। বিশেষত সেবার যেখানে তেল ইরানি পাহারায় ইরানি ট্যাঙ্কারে ভারতের তীরে পৌছে দেওয়ার সস্তা অফার ছিল। তবু ভারত এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তাই অন্তত শেষবারের মত “ফাইনাল ওয়ার্ডস” শুনতে এসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ। এমনকি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ঐ আমেরিকান থিংকট্যাংক- সিএসআইএস [CSIS] -তোমাদের ডুবিয়ে ছাড়বে, এদের পাল্লায় পড়ো না। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। এমনকি পরের ২ অক্টোবর ২০১৯ এ আমেরিকায় মিডিয়াকে জয়শঙ্কর দাবি করে বুঝাচ্ছিলেন [Iran not disappointed with India for not buying oil from Tehran: Jaishankar] তেল কেনা বন্ধ করে দেয়ায় ইরান ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়নি। আরো ভয়ঙ্কর সাফাই দিয়ে বলেছিলেন, [we frankly understand each other’s compulsions and possibilities,] – “যার যার দেশের বাধ্যবাধকতা আছে আর (আরেক দিকের) সুবিধাও আছে”। এর মানে তাহলে এখন চীন-ইরান নতুন চুক্তির পথে চলে যাওয়ায় নিশ্চয় ভারতের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হয়নি, তাই নয় কি? বুঝে শুনেই তো যার যার লাভালাভের সন্ধানে ভারত ইরানকে ছেড়ে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছিল! তাহলে চার দিকে আজ চীন-ইরান চুক্তির খবরে মিডিয়ায় ভারতের নাকিকান্না কেন? জয়শঙ্করের সম্ভবত অনুমান এই যে আমেরিকার CSIS থিঙ্কট্যাঙ্কে দাওয়াত পেলে জাতে উঠা যাবে।  কিন্তু গ্লোবাল সিস্টেমটাকে বুঝবার  যে দুনিয়াদারি সেখানে আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা গ্লোবাল অর্ডার যে ভেঙ্গে পড়েছে  এটা তো নিজের যোগ্যতায় জেনে নিতে হয়, আর ঠিক করতে হয় কী কী করব না!
    যদিও বেশির ভাগ মিডিয়া ভারতের ক্ষতিটা ঠিক কী হয়েছে সেটাও বুঝেনি মনে করার কারণ আছে। যেমন দ্য হিন্দু। এটাকে অনেক বুদ্ধিমান অগ্রসর মিডিয়া বলে মানুষ মানে। কিন্তু ওর শিরোনাম দেখুন, “ইরানে চাবাহার রেল প্রজেক্ট থেকে ভারতকে বের করে দিয়েছে ফান্ড দিতে ভারতের দেরি দেখে”। এর মানে ঘটনাকে কত ক্ষুদ্র সংকীর্ণ জায়গা থেকে দেখছে। ভাবছে ব্যাপারটা হল ভারতকে কেবল একটা রেল প্রজেক্ট থেকে বের করে দেওয়া।  ঠিক একই নাদান বুঝ  বিবিসিকে দিয়েছে ভারতের এক সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা। বলেছেন তাদের ঠিকাদার কোম্পানিটা আসলে নাকি ঢিলা!  কিন্তু ঘটনাটা কী এতই সহজ আর এতটুকুই! অথচ হিন্দুর ঐ রিপোর্টেই ভেতরে ঐ চীন-ইরান চুক্তির সবকিছুর উল্লেখ আছে। ভারতকে যে  মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়শুণ্য বের করে দিবে সেদিকটা দেখতেই পায় নাই। এছাড়া নিজে  অন্তত অবকাঠামো বিনিয়োগে ঘাটতি  সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে সেসব তো আছেই।
    এর সোজা মানে হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদকে হতাশায় ফিরিয়ে দেয়াকে তারা দেখেছিল – আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এত বিশাল কিছু আর এতে ভারতের জন্য অর্জন এতই বড় যে, ভারতের এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ইরানের কথাগুলো নিয়ে ভাবা অপ্রয়োজনীয়, খুবই স্মল। কাজেই তখনকার এসব অনুমানের উপর খুশিতে ডগমগ আত্মতুষ্টিতে থাকা ভারত এখন কিভাবে অনুসিদ্ধান্ত টানে যে এখন ভারতের যা ক্ষতি তাতে সব দোষ চীনে্র? বড়ই বিচিত্র ভারতের ভিকটিমহুড মন!
    যেমন দেখেন এনিয়ে আরো কিছু মিডিয়ায় শিরোনামঃ ‘”চাবাহার প্রকল্পে ধাক্কা ভারতের, নেপথ্যে চিন”, “ইরানের একটি বড় প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ” – এটা নাকি আবার আমাদের প্রথম আলোর সারা দুনিয়ার মিডিয়া ঘেটে করা এক ডেস্ক রিপোর্ট।  বুঝেন অবস্থা তাদের চোখ কত সংকীর্ণ। আবার “চীন-ইরান দোস্তি, যুক্তরাষ্ট্রে অস্বস্তি”। কিন্তু ট্রাম্প বাবাজি অস্বস্তিতে পড়বে কেন? তিনি কী ইরানের সাথে পারমানবিক চুক্তি কেন ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?  অর্থাৎ এর মানে হল,  এই চুক্তির বড় পিকচার বা গ্লোবাল প্রভাবের দিকটা তিনি আমল করতে পারেনি।  আসলে এখনও অনেকেই ব্যাপারটাকে নেহাতই একটা ইরানি প্রকল্প থেকে ‘চীনের প্রভাবে’ ভারতকে বের করে দেয়া হিসেবেই বুঝেছে। এভাবে চীনকে দোষারোপ করে নিজেদের চিন্তা করারও অযোগ্যতা তারা ঢাকতে চাচ্ছে। আবার ভারত আমেরিকান সখ্যকে অতিগুরুত্ব দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে  – ভারত চাইলে  ইরানি তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে কিন্তু ইরান ভারতকে কোন প্রজেক্ট থেকেই বাদ দিতে পারে না! আহা কী সুবিধা!

    এর চেয়ে বরং কংগ্রেসে আমরা কিছুটা বুদ্ধিমান লোকজন আছে মনে হচ্ছে। তারা বলেছে,‘চীন বেটার ডিল দিয়ে ইরানকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে অথচ মোদী সরকার সেটা আগে বুঝতেই পারেনি।’ অর্থাৎ  কংগ্রেস অন্তত বিনা প্রসঙ্গে চীনকে দোষী করার দিকে যেতে চায়নি; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছে।

    মাথা নিচা ভারতের বুদ্ধিমানেরাঃ
    তবে এই প্রথম আমরা এক নতুন ধরণের ভারতকে দেখতে পাচ্ছি যারা চীন-ইরান হবু চুক্তির কথা প্রকাশিত হবার পর একেবারেই চুপসে গেছে, যেন তাদের দম্ভ কমেছে অন্তত কিছুটা। বিশেষ করে থিঙ্কট্যাকের সাথে সংশ্লিষ্ট আছেন যারা এমন ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে। বিশেষত বাংলাদেশের ১/১১ এর সময়ের ভারতীয় রাষ্ট্রদুত  পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর পরিবর্তন অবাক করার মত। ওআরএফ – এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে  সর্বশেষ জড়িত এই সাবেক কূটনীতিক, যেখানে সেখানে কটু কথা বলার ক্ষেত্রে খুবই খ্যাত, তিনি বিবিসির সাথে যেভাবে কথা বলেছেন তার ইঙ্গিতটা হল যেন বলা যে, আমরা চীন-ইরান চুক্তির কাছে হেরে গিয়েছি আর তা মেনে নিচ্ছি বলেই আমাদের স্বর এমন নরম হয়ে বদলে গেছে। তবে  স্বর বদলে  নরম করে নেয়া প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জনকেও ছাড়িয়ে গেছেন আরেক নারী ব্যক্তিত্ব, তিনি  দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজ নামে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্কের ফেলো অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী। বিবিসির কাছে তিনি প্রায় সব প্রশ্নেই ভারতের দোষ দেখেছেন বা হার স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন তিনি  “ভারতকে সরানোয় চীনের ভূমিকা আছে কি না তা বলা মুশকিল”  বলেছেন। এছাড়া বলেছেন, “ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তেহরান দিল্লির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল, সেটা তারা পায়নি তাতেও কোনও ভুল নেই!”।  মানে একদম গুলে গিয়ে সবাই যেন মোম হবার দশায়।  যদিও তিনি বলছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত চরমে উঠেছে, চীন খুব ভালভাবেই তার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে”। মনে হতে পারে তিনি এখানে পরোক্ষে হলেও চীনকে দায়ী করছেন সুবিধা তুলে নেওয়ার জন্য। যেখানে ব্যাপারটা হল আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিকে যদি বোকা হয়ে সুবিধা করে দেন সেক্ষেত্রে সে সুবিধা তো নিবেই। গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের দিনগুলোতে সামলে না চললে প্রতিদ্বন্দ্বি সুবিধা ত নিবেই। সেখানে প্রেসিডেন্টের নানান ক্ষমতার মর্ম ও ওজন বুঝে না এমন কোন দেউলিয়া ব্যবসায়ী যদি হঠাত করে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের আসনে বসে পড়ে তবে তার ‘কেলাসনেস’ বা অযোগ্যতা আমেরিকার ক্ষতি তো করবেই। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি এভাবেই সুযোগ নিয়ে নিয়ে সামনে ধেয়ে আসছে এবং আসবেই – এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। আর এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে তার চিন্তা করার প্রকৃত সামর্থ ও যোগ্যতা তার যে লেবেল বা মানের তাতে শেষে আজ সে ঠিক সেই মাপের বামন হয়ে গেছে।  ইরানকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা খাটো করে দেখা বা ইরানের তেল না কিনলে ভারতের কিছুই হবে না এই হামবড়া ভাব – এভাবে ট্রাম্প আর মোদী মিলে ধারাবাহিক ভাবে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করে যেন ইরানকে ঠেলতে ঠেলতে চীনের কোলে ফেলে দিয়েছে। এখন এর কাফফারা দিতে দিতে এরা কোথায় গিয়ে ঠেকে তাই দেখার বিষয়!

    চিন্তায় অযোগ্য আর বেপরোয়া মানুষেরা এমন কাফফারা দিতে দিতেই শেষ হয়ে যায়! দিন সবারই একদিন আসে, আগে আর পরে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ইরান এলায়েন্স,পালাবদলের শুরু” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

    দেশে নতুন চীনা ঋণ আপাতত স্থগিত কেন

    গৌতম দাস

    ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৪৬ বৃহস্পতিবার

    https://wp.me/p1sCvy-2My

     

    –

    গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় একটা ছোট নিউজ ছাপা হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল, “চীন আপাতত বাংলাদেশে কোনো নতুন প্রকল্পে আর অর্থ জোগাবে না’ [China won’t bankroll new projects for now]। কেন?

    বাংলাদেশকে নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা না বলে, ভুল লাইনের রেষারেষি চলে, এটা বলাই ভাল। ব্যাপারটাকে সারকথায় বললে, “বাংলাদেশে যে সরকার আছে সেটা তো ভারতেরই” – এমন দম্ভ ভারতের মিডিয়ায় প্রায়ই প্রকাশ হতে দেখা যায়। ভারতের সরকারি পাতিনেতা বা মন্ত্রীরাও অনেক সময় এমন মন্তব্য করে থাকেন। তারা বলতে চায়, বাংলাদেশের সরকার তাদেরই বসানো। ফলে চীন কেন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ হতে চাইবে বা ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করবে – তাদের বক্তব্যের সারকথাটা আকার ইঙ্গিতে ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে এরকমই থাকে।

    কিন্তু বাংলাদেশে কে ভাল বিনিয়োগের সক্ষমতা দেখিয়েছে – চীন না ভারত, কার অবকাঠামো বিনিয়োগ বেশি – এই প্রসঙ্গ এলে এবার অবশ্য আবার তারা নিজেরাই কুঁকড়ে গিয়ে বলে ভারতের তো বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তাই বাংলাদেশে আমরা চীনের কাছে হেরে যাই। তবু এমন ভারতের ন্যূনতম মুরোদ না থাকলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত চীনের সাথে সে টক্কর দিয়ে চলছে এই ভাব তাকে দেখাতেই হবে, এমনই জেদ ও গোঁয়ার্তুমি ঘটতে আমরা সবসময় দেখে থাকি। শুধু তাই নয়, ভারত চীন নিয়ে অজস্র ভুয়া বা নেতি-মিথ ছড়িয়ে রেখেছে, যার প্রবক্তা ও শিকার আমাদের ও ভারতে মিডিয়াও।

    যেমন আবার ভারতকে পিছনে ফেলে চীন বাংলাদেশকে দখল করে ছেয়ে ফেলছে বা নিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে? না, চীন বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক উপস্থিত হয়ে আছে বা বিনিয়োগ করে আছে। কিন্তু ফ্যাক্টস অর্থে বাস্তবতা হল এটা একেবারেই কেবল সেদিনের ফেনোমেনা; যে চীন বাংলাদেশে ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। গত ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে আসার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের কোন উল্লেখ করার মত বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রায় ছিলই না। তাই এ কথাগুলোও পুরোপুরি ভিত্তিহীন। তবে ২০১৬ সালের আগের সেই সময়কালে বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটা কন্ট্রাক্টর বা বিভিন্ন প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে, বিনিয়োগকারি হিসাবে না। এছাড়া বাংলাদেশে চীনের অনেকগুলো প্রকল্প যেমন কয়েকটা বুড়িগঙ্গা মৈত্রী সেতু অথবা মৈত্রী অডিটোরিয়াম ধরনের ছোটখাটো বিনিয়োগ প্রকল্প এসব অনেক পুরনো। এগুলো টেনে আনলে এমন ছোট ছোট চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই আছে। কিন্তু কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বিনিয়োগকারী হিসেবে চীন ছিল না। বরং চীনা প্রেসিডেন্টের ২০১৬ সালের অক্টোবরে ঐ বাংলাদেশ সফর থেকেই ব্যাপক বিনিয়োগ আসা শুরু হয়, সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলেন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের। এ নিয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে সে সময় ভারতের এনডিটিভি-তে লাইভ-ইনহাউজ, চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে একটা টকশো ধরনের আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের ক্ষমতাসীনেরা পাতিনেতাসহ যেমন বলে থাকেন, বাংলাদেশ তো তাদেরই, এটাই মিডিয়াও শুনে আসছে। তাই যদি হয় তবে চীনা প্রেসিডেন্ট এত ঘটা করে বাংলাদেশে আসছেন এটা তারা দেখতে পাচ্ছে কেন? তাদের এই চোখ আর কানের বিবাদ মেটানো, এই বিষয়টা পরিষ্কার করা ছিল এনডিটিভির উদ্দেশ্য।

    তাদের ঐ আলোচনা থেকে তাদেরই করা হতাশ উপসংহার ছিল “দিল্লি আসলে অনেক দূরে”। মানে কী? মানে, চীনের সক্ষমতার তুলনায় ভারত কোনও বিনিয়োগকারীই নয় এখনও। খোদ ভারতই যেখানে বিনিয়োগ-গ্রহীতা। কাজেই বিনিয়োগের, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের দিক থেকে বাংলাদেশে ভারত কেউ না। তাই এনিয়ে চীনের সাথে ভারত কোন তুলনার যোগ্য না। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশে সরকারকে ভোটবিহীন অর্থে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতায় থাকতে হলে ভারতের সমর্থন পাওয়া আমাদের সরকারের জন্য জরুরি এমন বুঝের ক্ষেত্রে একটা ফ্যাক্টর অবশ্যই, বলে মনে করা হয়। যদিও এটা একটা পারসেপশনই কেবল। কারণ কখনই এটা পরীক্ষা করে দেখা হয় নাই বা এই ধারণাটা চ্যালেঞ্জ করে কেউ দেখে নাই কখনও যে আদৌও ভারতের সমর্থন অনিবার্য কিনা বা কেন? তবে সেটা যাই হোক তবু ভোটারবিহীন ক্ষমতা কায়েম থাকার ইস্যুতে আবার চীন ভারতের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। অথবা চীন আগ্রহী হতে চায় এমন কখনও দেখা যায় নাই তা  বলাই বাহুল্য। অতএব ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর – সেটাই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে মিডিয়ায় ব্যাপক হইচই পড়বে হয়ত সেটা স্বাভাবিক। এ ছাড়া ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে আসা সেটাও তো কোন হাতের মোয়া নয়। চীন নিজেই সেই সফরকে “মাইলস্টোন” বলেছিল, আর তাতে বাংলাদেশে প্রো-ইন্ডিয়ান বিডিনিউজ২৪সহ আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াগুলোও সবাই অনুরণিত করেছিল যে, এটা চীনা প্রেসিডেন্টের “মাইলস্টোন” সফর। এমনটা না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। যেমন সফর শেষে ফাইনালি দেখা গেল, মোট ২৭টা প্রকল্পের জন্য প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারে চুক্তি বা এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছিল তখন।

    এছাড়া আরও ঘটনা হল, সেটা আবার এখন ২০১৯ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই ফিগারটাও ছাড়িয়ে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে। আর তাহলে এরপর এখন?

    খুব সম্ভবত, “কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে” চীন একটু দম নিতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, দম নেয়াই বলছি; অর্থাৎ সাময়িক বিরতি। মানে এটা ঠিক মুখ ফিরিয়ে নেয়া নয়। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের চীনা দূতাবাসের বাংলাদেশকে ফিরতি জবাব লেখা চিঠির বরাতে লিখেছে, “চলতি ২৫ বিলিয়ন ডলারের ২৭ প্রজেক্টের বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কিছুতে চীন এখন মন দেবে না। [It has also requested Bangladesh to concentrate more on the timely execution of existing 27 projects for which it pledged more than $25 billion.]

    এছাড়া ঐ জবাবি চিঠিতে আরও জানিয়েছে, “বিগত নেয়া প্রকল্প কাজগুলোর একটা মূল্যায়ন করতে সে লম্বা সময় নেবে’। [China will take a long time to evaluate and implement the listed projects involving large amounts, said a letter sent to the external relations division of finance ministry recently] তাই বাংলাদেশ সরকার যেন আপাতত নতুন আরও কোনো প্রকল্প নিতে নতুন প্রস্তাব না পাঠায়।

    আসলে ঘটনাটা শুরু হয়েছিল একটা নতুন প্রকল্পের অনুরোধ নিয়ে। আমাদের দেশের সরকার জি-টু-জি সহযোগিতার অধীনে চীনের কাছে বরিশাল-পটুয়াখালি-কুয়াকাটা চার লেনের সড়ক প্রকল্প নেয়া যায় কিনা সেই অনুরোধ করে এক প্রস্তাব পাঠালে এর জবাবে এসব চীনা প্রতিক্রিয়া বাইরে এসেছিল।

    এই খবর থেকে বাংলাদেশ জুড়ে একটা কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে যে, তাহলে চীনও কী হাত গুটিয়ে নিচ্ছে? তারা কী সরকারের ওপর নাখোশ? সরকারকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে? সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে? বাংলাদেশ কী আর কোনো চীনা বিনিয়োগ কোনোদিন পাবে না? ইত্যাদি নানান অনুমানের কানাঘুষা গুজব শুরু হতে দেখা গেছে। এর সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে সেটাই এখানে আলোচনার মূল প্রসঙ্গ।

    সার কথায় বললে, খুব সম্ভবত এটা নতুনভাবে নতুন নিয়ম-কানুনে চীনের আবার বিনিয়োগে বাংলাদেশে ফিরে আসার পূর্বপ্রস্তুতি নেয়ার কালপর্ব। এ কারণে এটা সাময়িক বিরতি। যে ধরনের সম্পর্ক কাঠামো বা চুক্তি-কাঠামোর মধ্যে চীন এতদিন অবকাঠামো বিনিয়োগ করে এসেছে, তাকে আরো স্বচ্ছ করে নিতেই সম্ভবত চলতি বিরতি এটা। আর এই ঢেলে সাজানোটা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, এটা যেকোনো দেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগের বেলায় নেয়া এমন পরিবর্তন হাওয়া বইবার কথা।
    আমাদের এই সম্ভাব্য অনুমান যদি সঠিক হয় তবে আমাদের কথা শুরু হতে হবে ‘জিটুজি’ থেকে। জিটুজি মানে ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ বা সরকারের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি। কী নিয়ে বুঝাবুঝি?

    জিটুজি ও কনসালটেন্টঃ
    চীনের সাথে নেয়া বাংলাদেশের বেশির ভাগ অবকাঠামো প্রকল্প এগুলো আসলে জিটুজির অধীনে নেয়া। যার সোজা অর্থ হল, কোন প্রকল্প নির্মাণে কত মূল্য বা খরচ পড়বে তা নির্ধারণ নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডার এখানে হবে না, তাই সবার জন্য কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ডাকা আর সেখান থেকে সে মূল্য যাচাই করে নেয়া হবে না। কিন্তু এমন টেন্ডারবিহীনতাকে আইনে বাঁচাতে এখানে ‘সরকারের সাথে সরকারের চুক্তি’ হয়েছে বলে এই উসিলায় ‘খরচের কাহিনী’ আন্ডারস্টান্ডিং করে নির্ধারিত হয়েছে বলা হবে। এটা চীনা বিনিয়োগের অস্বচ্ছ দিক নিঃসন্দেহে; এক কথায় উন্মুক্ত টেন্ডার না হওয়া যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই একটা কালো দিক, তা বলাই বাহুল্য।
    এছাড়া আর একটা দিক। যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ওর টেকনিক্যাল দিক থেকে ঐ প্রকল্প ব্লু-প্রিন্ট মোতাবেক ঠিক ঠিক নির্মিত হয়েছে কি না, তা নির্মাণ কোম্পানি সম্পন্ন করেছে কি না তা প্রকল্প-গ্রহীতা মানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে এক আলাদা কনসালটেন্ট কোম্পানি। মানে সরকার একাজে আলাদা একটা ইঞ্জিয়ারিং কনসালটেন্ট কোম্পানিকে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এটা প্রকল্পে স্বচ্ছতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকল্প-গ্রহীতা রাষ্ট্র নিজস্বার্থে প্রকল্প বুঝে নেয়ার কাজটা করে থাকে সাধারণত এক বিদেশী কনসালটেন্ট কোম্পানিকে দিয়ে। যেমন বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প যমুনা সেতুর বেলায় তাই দেখা গিয়েছিল।

    কিন্তু এর আবার এক খারাপ দিক আছে। এই কনসালটেন্ট কোম্পানিই হয়ে দাঁড়ায় ঘুষের অর্থ সরানোর উপায় কোম্পানি। নির্মাণ কন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে ঘুষের অর্থ নিয়ে সরকার বা সরকারের লোকের কাছে পৌঁছে দেয়ার কোম্পানি। কারণ কাজের বিল ছাড় করতে অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে ঐ কনসালট্যান্ট কোম্পানির হাতে।
    কিন্তু চীনা জিটুজির বেলায় চীন কোন কনসালট্যান্ট রাখা পছন্দ করে না। তবে, প্রকল্পের খরচে না হলেও গ্রহীতা-রাষ্ট্র চাইলে নিজ আলাদা খরচ করে  সমান্তরালভাবে কোনো কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে প্রকল্পে নিয়োগ দিতে পারে। এটা সে অনুমোদন করে। তাহলে কী চীন বিশ্বব্যাংকের নিয়মের চেয়ে স্বচ্ছ দাতা? যেহেতু এখানে কনসালটেন্ট কোন কোম্পানিই রাখে না?

    না, সেটা একেবারেই নয়। কারণ বিশ্বব্যাংকের বেলায় প্রথমত তো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া কাজ দেয়ার নিয়মই নেই। আর টেন্ডারে কাজ দেবার পর সেখানে এক বিদেশি কনসালটেন্ট কোম্পানিও বিশ্বব্যাংকের নিয়মে নিয়োগ পায়! যদিও ঘুষের সুযোগ থাকে সেখানে। কানাডার লাভালিন তেমনই এক কোম্পানি ছিল।  তাহলে?
    আসলে চীন বলতে চায় যেহেতু এটা জিটুজি, ফলে সরকারই অন্য সরকারকে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারে। তাহলে কনসালটেন্টের আর প্রয়োজন কী? কিন্তু তাহলে এক্ষেত্রে কী ঘুষের ব্যাপার নাই? বা থাকলে ঘুষের অর্থ স্থানান্তরের প্রতিষ্ঠান কে হয়? সহজ উত্তর, চীনা নির্মাণ কোম্পানির এক স্থানীয় বাংলাদেশী এজেন্ট কোম্পানি থাকতে দেখা যায়। সাধারণত এটাই সেই অর্থ স্থানান্তরের কোম্পানি হয়ে থাকে।
    অন্যদিকে আবার কনসালট্যান্ট কোম্পানি রেখেই বা লাভ কী হয়? সে প্রশ্নও ভ্যালিড। কারণ, যমুনা সেতু নির্মাণের ১০ বছরের মাথায় কিছু ফাটল বা নিচের বেয়ারিং বদলের প্রয়োজন দেখা গিয়েছিল। এর দায় কনসালট্যান্ট কোম্পানিকে নিতে দেখা যায়নি। এ কথাটাও তো সত্যই। তাই সার কথাটা হল, কনসালটেন্ট সম্পর্কিত একটা অস্বচ্ছতা থেকেই যায় সবখানে। এছাড়া টেন্ডার না হওয়াতেও প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল্য ইচ্ছামত সাজিয়ে নিবার অভিযোগ সামলানোর কোন উপায় এখানে থাকে না। তাই জিটুজি তুলনামুলক একটা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থা।

    ঋণের ফাঁদঃ
    এদিকে ইতোমধ্যে গত দুই বছর ধরে চীনবিরোধী বিশেষ করে গত বছর আমেরিকান সরকারি উদ্যোগে কিছু একাডেমিককে দিয়ে একটা প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছিল, যার সার বক্তব্য হল যে, বিভিন্ন দেশে চীনের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ-ঋণ দেওয়ার নামে চীন “ঋণের ফাঁদ’ তৈরি করছে ও ঋণগ্রহীতা দেশকে এতে ফেলছে। এ নিয়ে চীনবিরোধী ব্যাপক ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছিল।

    পশ্চিমা ঋণ মানে মূলত সিংহভাগ যার আমেরিকান অবকাঠামো-ঋণ, তা রাষ্ট্র নিজে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করে, দুনিয়াজুড়ে এটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠেছিল। কম কথায় বললে, আগে কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো বিশ্বযুদ্ধের শেষে মুক্ত-স্বাধীন দেশ হতে হয়েছে; এরপরই বিশ্বযুদ্ধের শেষেই কেবল খোদ বিশ্বব্যাংকেরই জন্ম হতে হয়েছে। আর এরও পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো তারা বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে শেষে লোন নেয়া শুরু করেছিল। এ কারণে সবটাই বিশ্বযুদ্ধের পরের ফেনোমেনা। তাও আবার আরো কাহিনী আছে। জাপান বাদে যে এশিয়া, এর বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল অন্তত আরও ২০ বছর পরে। এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক – সেটা ষাটের দশকের আগে একেবারেই আসে নাই। অর্থাৎ ১৯৪৫ সাল থেকে পুরো ষাটের দশক পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপ ও এদিকে একমাত্র জাপানকে পুনর্গঠনে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ দিয়ে সাহায্য করেছিল। যার চিহ্ন হিসেবে সেই থেকে “রি-কনস্ট্রাকশন” শব্দটা বিশ্বব্যাংকের নামের সাথে জড়িয়ে যায়; এভাবে “ব্যাংক অব রি-কন্সট্রাকশন এন্ড ডেভেলবমেন্ট”। আর সেই বিনিয়োগ যা সেকালে আমেরিকান ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত ছিল, তা ইউরোপে  বিনিয়োগ ঢেলে স্যাচুরেটেড কানায় কানায় ভর্তি হয়ে উপচিয়ে না পড়া পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক ইউরোপ আর জাপান থেকে সরেনি, এশিয়াতেও আসেনি। বরং এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক পুরোদমে ঋণ দিতে শুরু করেছিল ১৯৭৩ সালের পর থেকে। ততদিনে আবার বিশ্বব্যাংক প্রথম ম্যান্ডেট (যেটা হল, সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে তবেই সমতুল্য মুদ্রা ছাপানো শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা) অকার্যকর হয়ে গেছিল ও এই পরাজয় সামলাতে পরে ১৯৭৩ সালে নতুন ম্যান্ডেটে বিশ্বব্যাংকের পুনর্জন্ম হয়েছিল। আর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রথম তৎপরতায় এসেছিল ১৯৭৫ সালের শেষভাগে। তবুও সেই থেকে বাংলাদেশে গত ৪৫ বছরে বিশ্বব্যাংক যে মোট ঋণ দিয়েছে তা গত তিন বছরে চীন একা যে অবকাঠামো ঋণ দিয়েছে তার চেয়েও কম। মূল কথা, বিশ্বব্যাংকের মোট সামর্থ্যরে চেয়ে চীনা সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু এতদিনে বিশ্বব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পেশাদারিতে ও ইন্ট্রিগিটিতে নিজেকে যতটা তুলনামূলক বেশকিছুটা স্বচ্ছ করতে সক্ষম হয়েছে, আর এই বিচারে আবার চীন অনেক পেছনে আছে, একথা মানতে হবে।

    যদিও এ ব্যাপারে অবশ্য চীনের কিছু পাল্টা যুক্তি ও শেল্টার আছে।
    কোনো দেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা ও সেই নির্মাণকাজ ধরা প্রসঙ্গে চীনের যুক্তিটা অনেকটা এরকম যে গ্রহীতা রাষ্ট্র-সরকার চোর হলে আমরা ওর সহযোগী হয়ে যাই ও বেশ করে ঘুষের ব্যবস্থা করে দেই। আবার তারা যদি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার সরকার হয় সে ক্ষেত্রেও আমরা তার সহযোগীই হয়ে যাই। যার বাংলা মানে হল, আমরা ঘুষ না দেয়ার কারণে কাজ হারাতে চাই না।

    এছাড়াও চীন বলতে চায় (বুর্জোয়া) আমেরিকার চেয়ে তবু আমরা ভাল। কারণ ঐ ঋণগ্রহীতা দেশে ক্ষমতায় কে আসবে বসবে তা নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। দেখাই না। কিন্তু আমেরিকার ষোল আনা আছে। আমরা বরং এসবক্ষেত্রে আমেরিকার কাছে নিশ্চয়তা নিয়ে নেই যে, তার পছন্দে নির্ধারিত হবু যেকোনো সরকার যেন আমার অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে দেয়। তাহলে আমেরিকা সরকার বানাতে সেদেশ কী করছে এটা নিয়ে আমরা আর মাথাব্যাথা দেখাই না। চীন আসলে বলতে চায়, চীনের অর্থনীতির উত্থান ও বিকাশের এই পর্যায়ে তৃতীয় দেশে সরকারকে প্রভাবিত করতে আপাতত আমেরিকার সাথে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না জড়ানোর নীতিতে চলে চীন। এটাই চীনের আপাতত অবস্থান ও কৌশল।

    কিন্তু উত্থিত অর্থনীতির চীনের বিরুদ্ধে বাস্তব এমন পরিস্থিতিতে, শুরু থেকেই বিশেষত একালে “চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প” নিয়ে হাজির হওয়ার পর  তবুও আমেরিকার পক্ষে আর বসে থাকা সম্ভব হয়নি। আমেরিকা চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে, নিজের গ্লোবাল নেতৃত্বকে চীনের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিরোধ দেখিয়েছিল চীনের বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ [AIIB] ব্যাংকের জন্মের সময় থেকে। এক কথায় দিন কে দিন আমেরিকা স্পষ্ট জানছিল যে, সত্তর বছর ধরে তার পকেটে থাকা গ্লোবাল নেতৃত্ব এটা চীন কেড়ে নিতে চ্যালেঞ্জ করতে উঠে আসছে। আর তাতে আমেরিকা ২০০৯ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, চীনের এই উত্থানকে আমেরিকা নিজের পাশাপাশি সমান্তরালে উঠতে বা চলতে দিতে চায় না। বরং যতদূর ও যতদিন পারে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে – এই নীতি নিয়েছিল। এই নীতিরই এক সর্বশেষ অংশ হল চীন ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলতে চাচ্ছে, এই ক্যাম্পেইন শুরু করা।

    এই ক্যাম্পেইনে আমেরিকা যা প্রচার করতে চায় তা হল, প্রথমত, চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলা যে, চীন দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে আসেনি। বরং ‘ঋণের ফাঁদ’ ফেলে চাপ দিয়ে লুটপাট, মুনাফা লাভালাভ এই বাড়তি সুবিধা নেয়া আর অর্থ কামানো, যেন এটাই চীনের ব্যবসা। এমন একটা প্রচারণার আবহ তৈরি করেছে আমেরিকা যেটা ডাহা ভিত্তিহীন ক্যাম্পেইন। এমনকি সত্তর-আশির দশকের বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেও যেসব অভিযোগ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা করত এটা তাঁর তুল্য নয়। যেমন অভিযোগ করত যে, ঋণের অর্থ বিশ্বব্যাংক অপচয় বা নিজের কর্মীদের সে অর্থ পকেটে ভরা অথবা কনসালট্যান্টের নামেই ঋণের অর্ধেক টাকা মেরে দেয়া বা ফিরিয়ে নেয়ার অভিযোগ ইত্যাদি। অবশ্য যারা এই অভিযোগ তুলত এদের জানাই নেই যে, কনসালটেন্সিতে দাবি করা অর্থ মোট প্রকল্পের পাঁচ শতাংশের বেশি দেখানোও প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব। তবু এসব অভিযোগ চালু ছিল, আর তাতে যতটুকু বাস্তবতা ছিল, একালে চীনবিরোধী এই ক্যাম্পেইনে তাও নেই। তবে আবার চীনের বিরুদ্ধে কোনই অভিযোগই নেই, সে কথাও মিথ্যা। ঠিক যেমন বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, এ কথাও ডাহা মিথ্যা।

    প্রথমত কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়াই তথাকথিত জিটুজিতে প্রকল্প নেয়া, এটাই তো চীনা প্রকল্পের সবচেয়ে কালো আর বড় অগ্রহণযোগ্য দিক। যা চূড়ান্তভাবে অস্বচ্ছ। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক অন্তত নব্বুইয়ের দশকের শেষ থেকে সতর্ক ও সংশোধিত হয়েছে। কঠোর ইন্ট্রিগিটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও তা দিয়ে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া এখন নিয়ম হল যে, অবকাঠামো ঋণের দাতা যে দেশই হোক না কেন, তাতে ওই প্রকল্পের কাজ সেকারণে দাতাদেশকেই টেন্ডারে পাইয়ে দিতে এমন কোন সম্ভাবনা নাই। বরং বিশ্বাসযোগ্য খোলা টেন্ডার হতে হবে – বিশ্বব্যাংক যেখানে ইতোমধ্যেই এই নীতিতে পরিচালিত [যমুনা সেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা ছিল জাপান। কিন্তু জাপান এই সেতু প্রকল্পে কোন নির্মাণ কাজ পায় পাই।] , চীনা ঋণ নীতি এখনো এই মান অর্জন করতে পারেনি। কাজেই  টেন্ডার-ছাড়া কাজ পাওয়া এই চীনা অবস্থান গ্রহণযোগ্য হতেই পারে না।
    তবে চীনের ক্ষেত্রে আবার এ কথাও সত্য যে, ঋণগ্রহীতা দেশ ঋণ-পরিশোধের সমস্যায় পড়ে যায় এমন বেশি ঋণ যদি হয়েও যায়, তবে চীন তা গ্রহীতা দেশের ঘটিবাটি সম্পত্তি বেঁধে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়, তা-ও কখনোই ঘটেনি। বরং পুরা বিষয়টাই পুনর্মূল্যায়ন করে – সুদ কমিয়ে দেয়া বা পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেয়া থেকে শুরু করে এক কথায় যেকোনো রি-নিগোশিয়েশনের সুযোগ এ পর্যন্ত সব দেশের ক্ষেত্রেই চীন দিয়েছে। যেমন মালয়েশিয়া বা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আমরা তাই দেখেছি। আর শ্রীলঙ্কার বন্দর নির্মাণের ঋণ পরিশোধের জটিলতার যেটা নিয়ে চীনা “ঋণের ফাঁদ” হিসাবে একে সবচেয়ে বড় উদাহরণ বলে ক্যাম্পেইন করা হয় তা মূলত শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির খেয়াখেয়ি থেকে উঠে এসেছে। নিজের মাজায় জোর নেই এমন শ্রীলঙ্কার একটা রাজনৈতিক দলকে বাগে এনে ভারত তাকে কাছে টেনে উসকানি দেয়া থেকে এটা তৈরি হয়েছে। যার কারণে অনেক বাড়তি সমস্যা উঠে এসেছিল। বন্দর তৈরি হয়ে যাওয়ার পরও তা চালু করা যায়নি। পরের পাঁচ বছর এটা অকেজো ফেলে রাখা হয়েছিল ও এতে আয়হীন ঋণের দায় আরো বাড়ছিল। তাই বলে আবার চীন ওই বন্দর নির্মাণ ঋণ পরিশোধে চাপ দিচ্ছিল এমন কোনো ব্যাপার সেখানে ছিলই না। কিন্তু  তারা নিজেরাই দুই দলের টানাটানি সামলাতে না পেরে নির্মিত এই বন্দরের মালিকানা শ্রীলঙ্কা নিতে অপারগ বলে চীনকে  জানালে চীন এক প্রস্তাব দেয়। যে ঐ বন্দর নিজে অপারেট করে চালিয়ে আয় তুলে আনার কোম্পানি হিসেবে চীন বাধ্য হয়ে অন্য এক চীনা কোম্পানি সামনে এনেছিল।  ঐ কোম্পানি পুরাটাই দায় নিতে চেয়েছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকার বন্দরের ৭০% মালিকানা কিনে নিতে দিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার সরকারের ঋণের দায় মুক্তি ঘটেছিল।  ব্যাপারটা আসলে ফয়সালা হয়েছিল এভাবে যে বন্দর নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার কোন ঋণ নাই। কারণ বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। আর শ্রীলঙ্কায় চীনা ঐ কোম্পানীর একটা সম্পত্তি আছে – সেটা হল ঐ বন্দর। আর এর পরিচালনা ও নিরাপত্তার ভার কেবল শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীই নিবে [চীনা নৌবাহিনী নিবে বলে প্রপাগান্ডা করা হয়েছিল], এটাই বাস্তবায়ন হয়েছিল।

    ঋণের ফাঁদ – এই বিতর্কে আবার আর এক গুরুত্বপুর্ণ দিক হলঃ  প্রথমত, কোনো রাষ্ট্রে ‘অতিরিক্ত ঋণ” নিয়েছে – এটা বুঝাবুঝি ভিত্তি বা ক্রাইটিরিয়া কী?  এই তর্কের ভিত্তি কী তা কোনো দিনই সাব্যস্ত করা যায়নি যা, দিয়ে বুঝা যাবে অতিরিক্ত ঋণ নেয়া বা গছানো হয়েছে?  যে সব যুক্তি আমেরিকান প্রপাগান্ডার একাদেমিকেরা তুলেছেন তা হল ঋণ জিডিপির অনুপাত।  কিন্তু  নেয়া-ঋণ, জিডিপির কত পার্সেন্ট হয়ে গেলে সেটা অতিরিক্ত ঋণ বলে গণ্য হবে এর সর্ব-গ্রহণযোগ্য নির্ণায়ক কোথায়? তা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে কিস্তি না দিলে টুঁটি চেপে ধরতে হবে, চীনের এমন কোনো নীতিই নেই। কোন উদাহরণ নাই। আবার এই নীতি মানলে ভুটানে ভারতের বিনিয়োগও একই দোষে দুষ্ট। মানে ভুটানে ভারতও ঋণের “ফাঁদ পেতেছে” – এই একই যুক্তিতে অভিযোগ উঠানো যাবে, এর কী হবে?

    আসলে কোন নেয়া-ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি, কিন্তু সাথে পরিশোধের সক্ষমতাও যদি বেশি হয় – অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যদি ভাল থাকে তাহলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও হারও কোনই সমস্যা নয়। আসলে কোন বড় প্রকল্প নেয়ার পরেই ওর ইকোনমিক ভায়াবিলিটি বা ফিজিবিলিটি টেস্ট করে নেয়া মানে সুনির্দিষ্ট ঐ দেশের ঐ সময়ের অর্থনীতি ঋণ পরিশোধের জন্য যোগ্য কিনা – এনিয়ে একটা স্টাডি করে নিলেই সব বিতর্কের মীমাংসা হয়ে যায়। যমুনা সেতুর বেলায় এই টেস্ট করা হয়েছিল আর তাতে পাস করেছিলাম আমরা। আবার বাস্তবে যমুনা সেতুর ঋণ পরিশোধের হার (যেহেতু এই সেতুর ব্যবহার অনুমিতের চেয়ে বেশি মানে ট্রাফিক বেশি, তাই টোল আদায় বেশি) অনুমিত হারের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই ঋণ যদি অনেক বেশিও হয় তাহলেই চীন “ঋণের ফাঁদ” পেতেছে এটা যেমন মিথ্যা, তেমনি আবার চীনের অবকাঠামো ঋণ নীতি সব স্বচ্ছ; তাও একেবারেই সত্যি নয়। এমনকি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে চীন আপটুডেট এখনকার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে, তাও সত্যি নয়।

    সার কথায়, আমেরিকার এসব তৎপরতা নেতিবাচক ও চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা। আর ভারতও সুযোগ বুঝে এতে সামিল হয়েছে আর নিজের মিডিয়ায় এসবের প্রগান্ডায় ভরিয়ে ফেলেছে। এমনকি আমাদের প্রথম আলোও নিজস্ব কোন বাছবিচার বা ক্রিটিক্যাল অবস্থান না নেয়া ছাড়াই ভারতের মিডিয়ার খবর অনুবাদ করে ছাপাচ্ছে। ইদানীং অবশ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, হঠাৎ এমন প্রপাগান্ডায় ভাটা পড়েছে। হতে পারে প্রপাগান্ডাকারীদের সাথে আমেরিকার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে!

    ইইউ চীনের বেস্ট বন্ধুঃ প্রপাগান্ডা করে খাওয়ার দিন যে শেষ করে দিবে
    সেটা যাই হোক, আমরা আরও ইতিবাচক জায়গায় ইতোমধ্যে পৌছে গেছি। আসলে নতুন অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। ব্যাপ্যারটা হল, এই বিতর্ক বা প্রপাগান্ডাকে মেরে ফেলতে সক্ষম এমন নতুন এক স্টেজ তৈরি হয়ে গেছে। সেই আসরের প্রধান ইতিবাচক নেতা ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর এর সূত্রপাত, চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে চীন সারা ইউরোপকে সাথী হিসেবে পেতে যাচ্ছে – নতুন এই বাস্তবতা এখান থেকে। অথবা কথাটা উল্টা করে বলা যায়, চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পের ইউরোপে বিস্তৃতিকে ইইউ নিজের জন্য বিরাট সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছে ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর ঠিক এ কারণে আমেরিকার যেমন অবস্থান হলো চীনকে কোনো সহযোগী স্থান না দেয়া, চীনের সাথে কোন সহযোগিতা নয়। চীনের সাথে মিলে কোন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা নয় বরং চীনের স্ট্যান্ডার্ড নাই বলে অভিযোগ তুলে নাকচ করে চীনকে কোণঠাসা করা। ঠিক এরই বিপরীতে ইইউয়ের অবস্থান হলঃ চীনকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে উঠে আসতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সেই স্ট্যান্ডার্ড যৌথভাবে আরো উঁচুতে উপরে উঠাতে ভূমিকা নিতে হবে। আর এই শর্তেই কেবল বেল্ট-রোডসহ চীনকে আপন করে নিতে হবে।

    এ ব্যাপারে গত ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল  চীন-ইইউ যৌথ সম্মেলনসহ ঘটনা অনেক দূর এগিয়ে কাজে নেমে গেছে। আর ঐ দিনই একমতের করণীয় নিয়ে এক যৌথ ঘোষণাও ফুল টেক্সট এখানে প্রকাশিত হয়ে গেছে। যদিও অবকাঠামো ঋণদানসহ অর্থনৈতিক তৎপরতায় স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি কথাটা শুনতে যত সহজ মনে হয়, ব্যাপারটা ততই সহজ-সরল নয়।
    মূল কারণ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কথাটা বলা মানেই আপনা থেকেই উঠে আসবে জাতিসংঘের কথা। জাতিসংঘের ঘোষণা, জাতিসংঘের চার্টার, নানান আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন  – এককথায় অধিকারবিষয়ক সবকিছুই। মূল কারণ জাতিসংঘ দাঁড়িয়ে আছে ‘অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র’ – এরই একটা সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে।

    কিন্তু তাতে সমস্যা কী?
    সমস্যা বিরাট। মৌলিক সমস্যাটা হল কমিউনিস্ট রাজনীতি অধিকারভিত্তিক রাজনীতি বা রাষ্ট্রচিন্তা নয়। যদিও জাতিসঙ্ঘের পাঁচ ভেটোওয়ালা রাষ্ট্রের দুটাই কমিউনিস্ট। অন্তত চীন ও রাশিয়া কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের রাষ্ট্র। যার সোজা অর্থ হল ‘অধিকারের রাষ্ট্র’ কথাটায় কমিউনিস্টদের ‘ঈমান’ কম। অধিকারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি এটা কমিউনিস্টদের রাজনীতি নয়, কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক এজেন্ডাও নয়। অথচ কমিউনিস্টরাও বহাল তবিয়তেই জাতিসঙ্ঘে সক্রিয় আছে। কিন্তু জাতিসংঘের যেসব জায়গায় অধিকারবিষয়ক নীতি বা কথাবার্তায় প্রাবল্য আছে, সেসব সেকশন বা বিভাগ অথবা ইউএন- হিউম্যান রাইট ধরণের উপ-সংগঠনে কমিউনিস্টরা তেমন অংশ নেয় না বা পাশ কাটিয়ে চলে। কখনও আড়ালে টিটকারীও দেয়। এগুলো এতদিনের রেওয়াজের কথা বলছি।
    কিন্তু আমরা যদি এ নিয়ে চীন-ইইউয়ের যৌথ ঘোষণা পাঠ করি, তাহলে বুঝব ঘটনা আর সে জায়গায় নেই। পানি অনেকদূর গড়িয়েছে। উল্টা এই প্রথম যৌথ ঘোষণায় জাতিসঙ্ঘের অধিকারবিষয়ক ভিত্তিগুলোর রেফারেন্স উল্লেখ করে বলা হয়েছে চীন ও ইইউ এগুলোকে মেনে চলে ও ভিত্তি মনে করে – একমতের সাথে। এমনকি বলা হয়েছে, এখন থেকে প্রতি বছর চীন ও ইইউ জাতিসংঘের মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝি বাড়াতে ও একমত হতে আলাদা করে নিজেদের যৌথ সেশনের আয়োজন করবে।

    আরও অগ্রগতিঃ
    এমনকি চীন-ইইউ ঐ সম্মেলনের পরে এ বছরের চীনা বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনেও [২৭ এপ্রিল ২০১৯] যে যৌথ ঘোষণা গ্রহীত হয়েছে সেই যৌথ ঘোষণাও আসলে চীনা-ইইউয়ের আগের যৌথ ঘোষণার ছাপে তৈরি করা।

    এই সবগুলো অভিমুখ বিচারে, বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগে বিরতি এবং চীনা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের কথা যেগুলো শোনা যাচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হল চীন অভ্যন্তরীণভাবে অবকাঠামোতে ঋণদান বা বিনিয়োগ নীতি বদলাচ্ছে। এরই ছাপ এখানে পড়ছে বলে অনুমান করা আশা করি ভুল হবে না। লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট! চীন আবার আরও স্বচ্ছ নীতিতে অবকাঠামো ঋণ দিতে এগিয়ে আসবেই। এসব তারই পুর্বপ্রস্তুতি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত  – এর ১৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে পদার্পন উপলক্ষে গত  ২৭ অক্টোবর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “বাংলাদেশে কেন স্থগিত হলো চীনা ঋণ!“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • চীন সফর ইতিবাচক

    চীন সফর ইতিবাচক

    গৌতম দাস

    ০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2BN

    –

    বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুলাই মাসের শুরুতে ১-৬ জুলাই চীন সফরে যাচ্ছেন। এটা তার চলতি গত ১০ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে প্রথম ২০১০ সালের মার্চেরটা সফরটা সহ ধরলে এটা তৃতীয় চীন সফর হবে। তবে আগের ২০১৪ সালের জুনের  সফরটা ছিল ২০১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে। এবারো প্রায় তাই, ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরের ছয় মাস শেষে। গতবারের সফরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর পরিকল্পিত থাকা সত্ত্বেও চীন সফরে গিয়ে তিনি মত বদলিয়ে তাতে স্বাক্ষর করেননি। মনে করা হয়, ভারতের আপত্তিকে গুরুত্ব দিতে তিনি বিরত থেকেছিলেন। যদিও তখন চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প কেবল শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এই মহাপ্রকল্পের কোনো ছাপ বা প্রভাব সেবারের কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই ছিল না। কিন্তু আসল ঘটনা ছিল ভারতের ভাষায় “আমার প্রভাব বলয়ের” বাংলাদেশ কেন চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতায় যাবে, এই মনোভাব। না, এটা কোন জল্পনা-কল্পনা ছিল না। ভারত মনে করত যে, এশিয়ার পড়শি দেশগুলো হল ভারতের খাস তালুক যেন নিজ বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ির উ্ঠান। আর সে জন্য এটা তার “প্রভাববলয়ের” এলাকা। তবে অবশ্য ভারত নিজেই পরে এ থেকে পিছু হটে।

    নীচের প্যারা দুটা গত ২০১৮ সালের পুরানা লেখা থেকেঃ

    [‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

    সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।]

    এটা ঘটেছিল ট্রাম্পের আমেরিকার হাতে পড়ে এর আগে আমেরিকা থেকে ভারত যা যা পেত – প্রাপ্ত প্রায় সে সব সুবিধা গুটিয়ে যাওয়া অথবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই যখন ভারত নিজ-কল্পিত দেবতা ট্রাম্পের উপর পুরা হতাশ হয়ে চীনমুখী পথ ধরেছিল; এর শুরুতেই তখন ভারত নিজ মিডিয়াতেই যেচে স্বীকার করে বলেছিল যে, তার এমন মুরোদ নেই। “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক”।

    যা হোক, ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে। বাংলাদেশে আমরা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছি বলে বেড়িয়েছি, আবার সময়ে পিছিয়েও গিয়েছি। এ কথাও বলেছি, “আমরা যা দিয়েছি ভারতকে মনে রাখতে হবে”। এমনকি উল্টো ভারতকেই বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে সাহসের সাথে আহবান রেখেছি। আবার পরক্ষণে চাপের মুখে বলেছি, বাংলাদেশের জন্য আমরা “চীন না অন্য বিকল্প বিনিয়োগকারী খুঁজছি”। আবার চীনা রাষ্ট্রদূতের সাহসের বলে বাইরে বের হয়ে বলেছি বেল্ট-রোড প্রকল্পে আমরা জিন্দা আছি। আমরা বিএনপিসহ সর্বদলীয় “বাংলাদেশ-চায়না সিল্ক রোড ফোরাম নামে অধিকাংশ দলের এক সমিতি গঠন করে ফেলেছি।

    এমনই এক পটভূমি পরিস্থিতিতে আর বিশেষ করে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার চীন সফরে যাচ্ছেন। এখন এবারও কী প্রধানমন্ত্রীর এই সফর আগের সফরের বকেয়া প্রকল্পগুলো নিয়ে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তা তুলে ধরে এগিয়ে যেতে পারবে? সার কথায়, যেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ, এর পক্ষে সবলে দাঁড়িয়ে চীনের সাথে গভীর সম্পর্কে গড়তে এগিয়ে যেতে সাহস করবে? এতে কে কী মনে করবে তা পেছনে ফেলে সফলভাবে নিজ লক্ষ্য অর্জনে লিপ্ত হতে পারবে? এগুলো সবই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন, সন্দেহ নেই।

    তবে প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে এই চীন সফর আয়োজন করে ফেলা – এটাই ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ও সঠিক পদক্ষেপ। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক আপত্তি বা সমালোচনা যা আছে সব সহই এ ঘটনাকে আমরা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারি; অন্তত এ কারণে যে এই সফরটাই ভারতের স্বার্থের অধীন থেকে বা এর কবল থেকে বাইরে বেরিয়ে বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে নেয়া এক ইতিবাচক পদক্ষেপ।

    যদিও এখানে একটা লুকোছাপা আছে। ভারতের একটা নিমরাজি সম্মতি আছে এই সফরে। ভারতের নিজ মুখরক্ষার একটা বয়ানও আছে। সেটা হল এমন, যেন নিজে নিজেদেরই সান্ত্বনা দিয়ে বলছে, ‘বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা আছে। এই সমস্যার হাল করতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব-শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক ও কিছু মাত্রায় ঘনিষ্ঠতায় যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই। তাই ভারত এটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হতে দিচ্ছে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব-বলয় আগের মতোই আছে বা থাকছে- এই অনুমান। যেমন আনন্দবাজার এমনই সাফাই দিয়ে লিখেছে,

    “এক দিকে ওবর (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) মহাপ্রকল্পে বাংলাদেশকে কাছে টানা, অন্য দিকে প্রস্তাবিত বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চিন, ভারত, মায়ানমার) অর্থনৈতিক করিডরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা। চিনের এই যৌথ কৌশল ভারতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল বলে মনে করছে বিদেশ মন্ত্রক। দেশে নতুন সরকার আসার পরে এই করিডরটি নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করবে চিন, এমন ইঙ্গিত মিলেছে। এ বার বাংলাদেশের স্বার্থকে করিডরের সঙ্গে আরও বেশি করে তারা যুক্ত রাখবে, যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না”।

    রোহিঙ্গা ইস্যুঃ
    রোহিঙ্গা ইস্যুকে আমাদের সরকার সামনে নিয়ে এসেছে এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। তবে এ প্রসঙ্গে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসাই মূলত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ কথাও খুবই সত্যি যে, এটা ষাটের দশক নয় যখন  কোন জনগোষ্ঠীকে দিনের পর দিন উদ্বাস্তু করে অনিশ্চিত ফেলে রাখা হবে আর তারা চুপচাপ নিরীহ বসে থাকবে। আগে যাই ঘটে থাকুক, এই শতক শুরুই হয়েছে সশস্ত্রতায় – হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া দিয়ে। ফলে গ্লোবাল পরিস্থিতি হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার পক্ষে অথবা বলা যায় অভ্যস্ত। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগাতে তৎপর পরস্পরবিরোধী ছোট-বড় স্বার্থ এত বেশি যে, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ধরে রাখাই এক কঠিন কাজ। হোস্ট বাংলাদেশের প্রশাসন প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে একাজে।

    তবে মনে রাখতে হবে চীনকে কোন কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও চীনা কূটনীতির শক্তি এখানে অর্থনীতিক, ঠিক রাজনৈতিক নয়। চীন রোহিঙ্গা সমস্যাকে দেখে থাকে, রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ বা অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব এটাই মূল কারণ। ফলে চীনের দেখা এর সমাধানও এখানে ব্যাপক বিনিয়োগ করার মধ্যে – এভাবে। রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগ সমস্যা আছে  একথা হয়ত সত্য হলেও কিন্তু সেটাই রোহিঙ্গাদের চরম নিপীড়িত ও উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণ নয়। মূল সমস্যা রোহিঙ্গারা মুসলমান এই রেসিয়াল ঘৃণা তো বটেই; এ ছাড়া বরং নিজ বার্মিজ জনগোষ্ঠীর বাইরে সবাইকেই এই বার্মিজ জেনারেলরা প্রচন্ড বর্ণবাদী ঘৃণার চোখে দেখে থাকে। আর একারনেই রোহিঙ্গাসহ জেনারেলদের অপছন্দ এমন সব জনগোষ্ঠীকেই একমাত্র স্মূলে নির্মূল করার মধ্যেই তাঁরা সমাধান দেখে থাকে। এমন বার্মিজ শাসকদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে কাজ আদায়ের কৌশল কতটা কাজ করবে তাতে আস্থা রাখা কঠিন। সারকথায় চীনা এই পদ্ধতিতে কাজ আদায় বা চাপ দেয়া – টুলস হিসেবে খুবই দুর্বল। আসলে বিনিয়োগের লোভ দেখিয়ে নয় “রাজনৈতিক চাপ” সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছুরই কাজ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

    চাপ হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন তোলা ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশনের জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইট বা বিচারের আইসিসির তৎপরতা ঘটানো – এটাই একমাত্র “রাজনৈতিক চাপ” এর উপায় নয় নিশ্চয় তা হলেও সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু যেকোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের মত চীন এই পথে খুবই দুর্বল। হিউম্যান রাইট কমিউনিস্টদের হাতিয়ার নয়। যদিও অন্য কোন কিছুও হাতিয়ার হতে পারে। যেমন কমিউনিস্ট পটভূমির রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও পশ্চিমের আমেরিকাসহ যারা হিউম্যান রাইট ইস্যুতে চাইলে গ্লোবাল ক্ষমতার করিডোরে খুবই সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে, মিয়ানমারের জেনারেলদের নাস্তানাবুদ করতে পারে – আমেরিকা বা ইউরোপের হিউম্যান রাইট বিষয়ক ততপরতার দিক থেকে এই চাপ এখনও খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে, এই সুযোগ এখনো হারিয়ে যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কেবল চীনামুখী বা চীনা নির্ভরতা হয়ে পড়া হবে মারাত্মক ভুল। বরং রোহিঙ্গা শরণার্থীর দায় আমরা এককভাবে নিয়ে যে ইউরোপসহ পশ্চিমা শক্তিকে রক্ষা করেছি সে কথা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি। আর সেই সাথে  দায়-কর্তব্যের তাদের পার্ট মনে করাতে এক ক্যাম্পেন করতে পারি। এর পরিপূরক হিসেবে অন্তত অর্থনৈতিক দায় বইতে তাদেরও আমাদের সহায়তা দেয়া ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে তাদেরকেও চাপ দেয়া ও বাধ্য করতে পারি।

    সারকথায়, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমাশক্তি আর অন্যদিকে চীন এভাবে সবার চাপ সৃষ্টির শক্তিকে একসাথে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। এটা না করতে পারলে বরং মিয়ানমারের জেনারেলেরা চীনকেই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে ফেলবে, যা করে এত দিন সে টিকে আছে।

    এ দিকগুলো বিবেচনা করে কথা বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্ম পরিকল্পনায় নিয়ে আসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

    সামার দাভোস সম্মেলনঃ
    তবে এই চীন সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও আরেকটা টুপি বা আড়াল আছে তা হল – ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (এখন থেকে সংক্ষেপে কেবল ‘ফোরাম’ লিখব)। অফিশিয়ালি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন যাচ্ছেন কারণ ফোরাম-এর “সামার দাভোস সম্মেলন” [“Summer Davos“. Organised by the World Economic Forum] চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কাজেই আড়ালটা হল, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ১-৩ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য সেই- ‘সামার দাভোস সম্মেলনে’ যোগ দিতে যাচ্ছেন। ফোরামের খুব সংক্ষেপে পরিচয় দিলে, এই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জন্ম ১৯৭১ সালে, যা মূলত রাজনীতি ও ব্যবসায়ের নেতা এবং গ্লোবাল সমাজের অন্যান্য নেতাদেরকে একসাথে বসিয়ে গ্লোবাল, রিজিওনাল বা শিল্প-কলকারখানা-বিনিয়োগের নানা ইস্যুতে কথা বলানো, যাতে তা পরিণতিতে এটা দুনিয়াকে নতুন ইতিবাচক আকার দিতে সহায়ক হয় – এমন কথা বলানোরই প্লাটফর্ম হল এই ফোরাম।

    একেবারে স্বল্প কথায়, এটা হলো ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের বসিয়ে কথা বলানো – কথা বলানোর এক ফোরাম। এতে এর বার্ষিক সম্মেলন একই সময় একাধিক প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হবে এভাবে আগাম ঠিক করা ইস্যুতে রাষ্ট্রপ্রধানসহ যে কাউকে বক্তা ও শ্রোতা বানিয়েীটা আয়োজন করা হয়। আয়োজক এই ফোরাম নন-প্রফিট দাতব্য ধরনের সংগঠন, যা নিজেরা নিজেদের ‘প্রাইভেট-পাবলিক’ সংগঠনের মিলনমেলা বলতে পছন্দ করে। বরাবর প্রতি বছর জানুয়ারিতে এই ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ২০০৭ সাল থেকে এর বার্ষিক সম্মেলন দুইবার করে হচ্ছে। প্রতি জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোস জেলা শহরের মুল সম্মেলনটা ছাড়াও ২০০৭ সাল থেকে সব সময় চীনে আরেকটা সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের দালিয়ান ও তিয়ানজিং এ দুই শহরের একেকবার একেকটায়, প্রতি জুলাইয়ে তা ঐ একই ফোরামের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। এটাকেই ‘সামার দাভোস’ নামে ডাকা হচ্ছে। তবে এখানে প্রাধান্য পায় উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো। একারণে সামার দাভোসের আর এক নাম হল “Annual Meeting of the New Champions“। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এখানেই যোগ দিতে যাচ্ছেন। আর যেহেতু চীনে যাচ্ছেনই, তাই যেন তিনি চীনের সাথে এই ফাঁকে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৈঠকগুলোো করে নেবেন ৩-৬ জুলাই, ব্যাপারটা হাজির করা হয়েছে অনেকটা এ রকমভাবে।

    এই সফরে কী কী চুক্তি স্বাক্ষর হবে সে বিষয়ে মিডিয়ায় যা প্রকাশ হয়েছে তা হল মোট আটটা চুক্তি (বা কোনটা সমঝোতা স্মারক)। যার প্রথম চারটিই হল, পটুয়াখালির পায়রায় যে তেরো শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণ হচ্ছে তা উৎপাদনে গেলে পরে এই বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিতে হলে নতুন কিছু “বিদ্যুৎ বিতরণ কাঠামো” নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ গ্রিড নির্মাণ, লাইন টেনে পরিচালন ও তা বিতরণ ইত্যাদি- এই কাঠামো তৈরিতে যে বিনিয়োগ লাগবে এমন বিষয়ক চুক্তি। এমন প্রথম চার চুক্তির কেবল অর্থমূল্য হিসেবে তা সম্ভবত মোট মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলার। বাকি পরের দুই চুক্তি হল, চীনের সাথে যেসব বিনিয়োগ আগামীতে হবে এর টেকনিক্যাল দিক – মানে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতার চুক্তি। এ ছাড়াও অন্য একটা চুক্তি হল, ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎস চীনে, সে অংশ ও আমাদের অংশের প্রবাহবিষয়ক তথ্যবিনিময় ও তা ব্যবহারে সহযোগিতাবিষয়ক। আর শেষের চুক্তিটা হল, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে। এই হল মোট আট চুক্তি।

    BCIM প্রকল্পঃ
    অতএব, ঠিক বড় বিনিয়োগ আনতে বা এখনই বড় কোনো প্রকল্প চুক্তি হতে যাচ্ছে এই সফর ঠিক তেমন নয়। তা হলে? চোরের মন পুলিশ পুলিশ। ভারতের প্রবল অনুমান যে এই সফরে মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে BCIM প্রকল্প। BCIM নামটা চার রাষ্ট্রের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি। এপ্রসঙ্গে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের এক খবর ভারতের অনেক মিডিয়াই ছেপেছে। পিটিআই বলছে,  [BCIM] ‘বিসিআইএম(কলকাতা থেকে ঢাকা কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং- এই সড়ক ও রেল সংযোগ) প্রকল্পকে চীনারা সাম্প্রতিককালে আবার জাগিয়েছে” [China lately is making efforts to revive the BCIM.]। আসলে এই প্রকল্প কখনোই বাতিল করা না হলেও ভারত একে মৃত বলতে, এমন রটনা করতে পছন্দ করে থাকে। কারণ ভারত চায় না এই বিসিআইএম প্রকল্পে সে নিজে জড়িয়ে থাকে অথবা তাকে বাদ দিয়ে এটা সফল হয়ে যাক তা-ও চায় না। এখনকার এর কারণ, চীনের নতুন প্রস্তাব হল BCIM প্রকল্প বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হোক,  এতে বাংলাদেশ খুবই আগ্রহী; কিন্তু ভারত একেবারেই নয়। তবে এই প্রস্তাবের আগেও ভারতের অবস্থান ছিল নেহায়তই না বলতে না পেরে যুক্ত থাকা। কারণ আবার ভারত চায়, বিসিআইএম প্রকল্প বলতে এর মানে হোক শুধুই সড়ক ও রেল সংযোগ। কোন গভীর সমুদ্র বন্দর নয়।

    অথচ এর বড় এক মূল অনুষঙ্গ ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দর ছাড়া এই “সংযোগ” অবকাঠামো গড়া অর্থহীন। এমনকি তা অর্থনৈতিকভাবে বিচারে এতে বিনিয়োগ করলে তা ভায়াবল হবে কি না বা খরচ উঠবে কি না সন্দেহ। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা হলেও, ভারত শুরু থেকেই বন্দর নির্মাণকে বিসিআইএম প্রকল্পের অংশ নয় মনে করতে চায়। অতএব চীন-বাংলাদেশের বিসিআইএম নিয়ে আলোচনা মানেই তা সোনাদিয়া বন্দরসহই। আর এটাই ভারতের জন্য অস্বস্তির।

    তবে ভারতের আপত্তির যুক্তি বড়ই অদ্ভুত আর তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বলছে সে চাচ্ছে না ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্টের ভেতর দিয়ে এসে চীন বাংলাদেশের কোনো বন্দর ব্যবহার করুক। আনন্দবাজারের ভাষায় বললে, “বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে। ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”। কিন্তু ঘটনা হল। বিসিআইএমের রুট হল, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে মান্দালয় হয়ে কুনমিং। এটা ভারতের সব মিডিয়া নিজেই লিখছে এই রুট মোট দুই হাজার ৮০০ কিলোমিটারের। যেমন এভাবে, [The 2800-km BCIM corridor proposes to link Kunming in China’s Yunnan province with Kolkata, passing though nodes such as Mandalay in Myanmar and Dhaka in Bangladesh before heading to Kolkata.]।

    অথচ ওদিকে ভারতের আসামসহ নর্থ-ইস্ট হল,  বাংলাদেশের দিনাজপুর-সিলেট এই পুরা উত্তর ভূখণ্ডেরও আরো উত্তরে, যা বিসিআইএম’র রুটেই নয়। বিসিআইএম’র রুট হল বলতে গেলে, কলকাতা-যশোর-ঢাকা হয়ে এবার পুরা দক্ষিণে বা দক্ষিণ-পুবে, আর নর্থ ইস্ট হল এর পুরো উত্তরে। তাহলে?

    আসলে BCIM প্রকল্পে চীন বলতে সকলে কুনমিং বুঝলে ও বুঝালেও (কুনমিং আমাদের কক্সবাজার থেকে বার্মার মান্দালয় পার হলে তবেই পৌছানো যাবে) এমন হলেও ভারত জবরদস্তিতে মানে করতে চাচ্ছে – এটা ভারতের নর্থ-ইস্টের অংশ অরুনাচল প্রদেশে চীন-ভারত সীমান্তের ওপারের চীন। হতে পারে ভারতের ভয় এখন চীন বলতে কুনমিং বুঝলেও ভবিষ্যতে প্রকল্প গড়া শেষ হলে চীন তখন আসাম-অরুনাচল সীমান্তের অপর পারের দিক থেকে চীন হিসাবেও আসাম-বাংলাদেশ হয়ে সোনাদিয়া বন্দর ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

    আর সম্ভাব্য এখানেই চীনকে আসাম করিডোর ব্যবহার করতে দিতে ভারতের ভীতি ও আপত্তি আছে, ধরা যাক ভারত এটাই বলতে চাইছে। ভারতের এই কথার মানে হল, তাহলে কাউকে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ জায়েজ। অতএব, বাংলাদেশ কেন নিজ ভুখন্ড পেরিয়ে ভারতকে নর্থ-ইস্টে করিডোর দিতে ভীতি ও আপত্তি প্রকাশ করবে না।

    আবার মজার কথা হল, আসামসহ নর্থ-ইস্টকে চীন করিডোর হিসেবে যাতে ব্যবহার না করতে পারে বা করে ফেলবে এই ভয়ে ভারত নর্থ-ইস্টকে চরম পিছিয়ে পড়া, অবকাঠামোহীন এক অঞ্চল করে গত সত্তর বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রেখেছে। এটাই আসাম সংকটের মূল কারণ; ওখানকার বাসিন্দাদের স্থবির হয়ে থাকা ও রাখা অর্থনৈতিক জীবনের। অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হচ্ছে যে মুসলমানেরা এর কারণ। বাসিন্দাদেরকে ভুল বুঝিয়ে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে ঘৃণা জাগাতে। আর মুসলমান মানেই যেন এরা নিশ্চয় বাংলাদেশের – এই অদ্ভুত প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আর এখান থেকেই এনআরসি (NRC), মুসলমান খেদানো, ৪০ লাখ মানুষকে রিফুউজি ক্যাম্পে মানবেতরে জীবনে ফেলে রাখা ইত্যাদি কী নয়! অর্থাৎ এ যেন, নিজ সন্তান হত্যা করে হলেও প্রতিবেশীর ক্ষতি করতে হবে – এই মনোভাব। সত্যি অদ্ভুত এই হিন্দুত্বের রাজনীতি!

    অদ্ভুত এক বাস্তবতা হল, হাসিনার এই আসন্ন সফর নিয়ে ভারতের এই “হিন্দুত্বের রাজনীতি” চরম অস্থির ও খামোখা উদ্বিগ্ন। পিটিআই’র [PTI] ওই রিপোর্ট আরও লিখেছে, ‘সম্প্রতি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী মোদি সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশনের সামিট মিটিংয়ের (১৩-১৪ জুন) সাইডলাইনে কথা বলেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি দীর্ঘ সময়ের পরে বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে কথা তোলেন”। [After a long gap, Xi raised the BCIM project during his meeting with Prime Minister Narendra Modi at Bishkek on the sidelines of the Shanghai Cooperation Organisation summit early this month.]।

    লক্ষণীয়, এখানে বিসিআইএম প্রকল্প চীন আগে বাতিল করেছিল তা বলা হয়নি, বলা হয়েছে আফটার লং গ্যাপ- অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পরে প্রেসিডেন্ট শি ইস্যুটা নিয়ে কথা বলেছেন। পিটিআই’র এমন লেখার পেছনের কারণ পাওয়া যায় এখানে, গত ১০ জুন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট [China denies abandoning BCIM corridor। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত প্রতিদিন এক সাংবাদিক প্রেস ব্রিফিং করে থাকে। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের কথা ভেবে ভারতীয় সাংবাদিক সেখানে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসে যে, চীন বিসিআইএম প্রকল্প বাতিল করেছে কিনা। স্বভাবতই ব্রিফিং কর্মকর্তা তা নাকচ করেন ও বলেন যে, না তা চালু আছে [“the BCIM has not been abandoned. It is very much on board.”]। আর তা থেকেই হিন্দুত্বের রাজনীতি অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে যে হাসিনার চীন সফরে গুরুত্বপুর্ণ আলোচনার বিষয় বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে কথা হবে। বাংলাদেশ নিজ একান্ত স্বার্থে তার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কী স্বাধীনভাবে শেষ পর্যন্ত এবিষয়ে আলোচনা আগিয়ে নিয়ে সক্ষম হবে! আমরা বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছি!

    আমেরিকাও কান পাতাঃ
    হাসিনার আসন্ন চীন সফর নিয়ে আরেক লক্ষণীয় দিক হল – কেবল ভারত নয়, আমেরিকাও কান পেতে এ সফরকে জানা ও শুনার জন্য গভীর আগ্রহী। এর আগে এসব ক্ষেত্রে দেখা যেত এনিয়ে একটা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার রিপোর্টই তাদের যথেষ্ট ছিল। ইদানীং দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কিছু মিডিয়া হাসিনার চীন সফর নিয়ে ভারতের মতোই আগ্রহী রিপোর্ট ছেপেছে। ‘রেডিও ফ্রি এশিয়া’ বা এর এফিলিয়েটেড ‘বেনার নিউজ’ এমন আমেরিকান সরকারের বিদেশনীতির আলোকে রিপোর্ট লিখেছে। এরা পরস্পর একই রিপোর্ট শেয়ার করে থাকে।  Radio Free Asia, এই নাম বা শব্দের মধ্যে “FREE” শব্দটা ইন্টারেস্টিং। কোল্ড ওয়ারের যুগে সোভিয়েত বিরোধী প্রপাগান্ডা লড়তে আমেরিকার প্রিয় শব্দ ছিল ফ্রি। মানে বদ্ধ সোভিয়েত দুনিয়া থেকে মুক্ত দুনিয়ায় আহবান। ব্যাপারটা এখানেও প্রায় তেমনই। বলা হয়েছে এশিয়ার যেসব দেশের জনগণকে তাদের সরকার সত্যিকথা শুনতে জানতে দেয় না, এই রেডিও তাদের জন্য। অর্থাৎ এটা এখন একালে চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডার কাজে লিপ্ত। যা হোক এটা কেবল রেডিও হলেও এদেরি সহযোগী এফিলিয়েটেড আর প্রতিষ্ঠান হল, BenarNews. এরা ইংরাজি ছাড়া আরও বাংলাসহ চার ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন নিউজ।

    বাংলাদেশ কতটা চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চলে গেল এ নিয়ে ভারতের মতই আমেরিকার উদ্বিগ্নতা – এটাই তাদের রিপোর্টে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কলাপাড়া, পটুয়াখালীতে দুর্ঘটনায় এক স্থানীয় শ্রমিকের মৃত্যু হলে শ্রমিকদের সাথে চীনা ঠিকাদারের ম্যানেজমেন্টের বিরোধে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একজন বাংলাদেশী শ্রমিক ও একজন চীনা টেকনিশিয়ান নিহত হয়েছেন। মূলত নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকের “লাশ গুম হওয়ার গুজব ছড়িয়ে” পড়লে মূলত তা থেকেই সংঘর্ষের শুরু।

    এই পরিস্থিতির উত্তেজনা সামলাতে ও ঠান্ডা করতে আপাতত সবাইকে দু’সপ্তাহ ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। বেনার নিউজ লিখছে, It was not immediately clear whether Hasina and the Chinese leaders will discuss the recent fight between Chinese and Bangladeshi workers at a site of a partly built China-funded power plant.]। সারকথাটা বাংলা করে বললে তারা ‘পরিষ্কার নয় যে, এটা ইস্যু হিসেবে চীন-বাংলাদেশ সামিটে আলোচনা হবে কি না’!

    আসলেই, এটা Benar এবং RFA এর গভীর উদ্বেগপ্রসূত “আশা”! কিন্তু সমস্যা হল, শকুনের বদ দোয়াতে গরু কখনও মরে না। তবে আমরা পরিস্কার থাকতে পারি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টও লিখে এমন “শকুনি আশা” জানাবে না। ঘটনা হল, এই প্রকল্পের মালিক বাংলাদেশ আবার বাংলাদেশী শ্রমিকের অধিকার রক্ষাও বাংলাদেশের স্বার্থ – দুটোই আমাদের স্বার্থ। দুটোই আমাদের সবল রক্ষা করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এটা নিয়ে “সামিট লেবেল” কথা বলতে হবে? এটা কী চীন-বাংলাদেশ কোন বিরোধ? ঐ রিপোর্ট কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন?  এটা তো রিপোর্টিং নয়, বেয়াদবি খোঁচাখুচি!  ভাষা লক্ষ্য করার মত লিখেছে এটা নাকি “চীনা ও বাংলাদেশি শ্রমিকের ফাইট” [fight between Chinese and Bangladeshi workers] এর ইস্যু। ব্যাপারটা বড়জোর বাংলাদেশী প্রকল্প পরিচালক আর ওই চীনা ঠিকাদার কোম্পানির মিলিতভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক সৎ উদ্যোগ এ সমস্যা মিটিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। অথচ …। বাংলাদেশ-চীনের প্রকল্প ভালো না চললে বা তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেই যেন রিপোর্টারের লাভ, তাই তিলকে তাল। বদ দোয়াই ভরসা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৯ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন সফর ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • মাহাথির কায়দায় ‘ঋণফাঁদে’র গল্প মোকাবেলা

    মাহাথির কায়দায় ‘ঋণফাঁদে’র গল্প মোকাবেলা

    গৌতম দাস

    ২৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2zH

     

    মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ, বাংলাদেশে তাকে চেনেন না এমন লোক খুব কমই আছে। অবশ্য নিজ স্বার্থে কেউ কেউ নিজের আকামের পক্ষের সাফাই হিসাবে তাঁর নাম মুখে নিয়ে থাকেন  ঢাল হিসেবে মাহাথিরকে ব্যবহার করে থাকে। মালয়েশিয়ার টানা পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী আর ১৯৮১-২০০৩ সাল, এই ২২ বছরের সক্রিয় রাজনীতিবিদ তিনি। প্রাকটিসিং সরকারি ডাক্তারির চাকরি রেখে ১৯৬৪ সাথে প্রথম পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল। তার শাসনকালের প্রধান সাফল্য মনে করা হয়, মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে তিনি বিপুল উঁচু স্তরে উঠিয়ে দিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ার শিল্পায়িত ভবিষ্যত তাঁর হাতেই আলো দেখেছিল। আবার তিনিই এমন রাজনীতিবিদ ষাটের দশকের শেষভাগে যেটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথমপর্যায় ছিল, তখন  তারই লেখা একটা বই – তারই দলের সরকার এর প্রকাশনা ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরিণতিতে যা তাঁকে রাজনীতি ও দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। কারণ প্রকাশিত “মালয় ডিলেমা” নামে ঐ বইয়ে তিনি স্থানীয় মালয়বাসীর পক্ষে, তাদের জীবনে অসাম্য দূর করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। মালয়েশিয়া মূল চারটা নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠির [race or ethnic groups] দেশ মনে করা হয়। [এই কথাগুলো মালয়েশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান বিভাগের এই রিপোর্ট থেকে নেয়া হয়েছে।] সেখানে ২০১০ সালের জনসংখ্যা রিপোর্টের উপর দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলা হয়েছে। ঐ চার এথনিক গোষ্ঠি মধ্যে ভুমিপুত্র [Bumiputera (inclusive of Malay and Indigenous)]  মিলিয়ে এরা ৬০ ভাগ বলা হয়েছে [Bumiputera, the main ethnic constituted 60.3 per cent]। আর চীনা-অরিজিন মালয়েশিনেরা ২২.৯% [Chinese and Indians at 22.9 and 6.8 per cent] বলা হয়েছে।  ভুমিপুত্ররা সংখ্যায় বেশি কিন্তু চীনা-অরিজিন মালয়েশিয়ানদের চেয়ে বেশি গরীব বলে মাহাথির ঐ বইয়ে দাবি করেছিলেন ভুমিপুত্রদের সামাজিক-অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধায় কিছুদিন বেশি দেয়া হোক। (আমাদের পাহাড়ি কোটার মত যেটাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘এফারমেটিভ একশন'[affermative action] বলা হয়ে থাকে।) কিন্তু ততকালীন প্রধানমন্ত্রী আব্দুল রহমান [Prime Minister Abdul Rahman] এসব কথা তোলাতে এথনিক বিবাদ লড়াই না উস্কে উঠে এই ভয়ে তা চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। এথেকেই সেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এগুলো সবই ১৯৭২ সালের আগের ঘটনা। তবে ১৯৭২ সালে ঐ প্রধানমন্ত্রীর টার্ম শেষ হয়ে তিনি অবসরে গেলে, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে, মাহাথির আবার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যান। এর পর থেকে তার রাজনৈতিক জীবনের কালো দিন কেটে যায়, তাকে আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি। ১৯৭৪ সালে তিনি মন্ত্রীসভায় স্থান পান, আর ১৯৮১ সালের পর থেকে টানা পাঁচ টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্বের দিন শুরু হয়ে যায়। তবে তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁর গৃহিত অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য দিয়েই তিনি বিভক্ত এথনিক জনগোষ্ঠিগত অসাম্য দূর করেছিলেন। [Mahathir sought to bridge Malaysia’s ethnic divisions by increasing general prosperity. ]

    এ সময়কালে এক দিকে তার পরিচালিত সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্য যেমন সত্য, তেমনি অন্য দিকে তিনিই ১৯৮৭ সালে ‘ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ [Internal Security Act] নামে কালো আইন পাস ও তা আরোপ করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। এভাবে ২০০৩ সালে তিনি তাঁর পাঁচ টার্ম প্রধানমন্ত্রীত্ব শেষ করে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের দিনে (২০১৮ সালের নির্বাচন থেকে) তিনি আবার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী আনোয়ার ইব্রাহিমকে জোটসঙ্গী করে নির্বাচনে জিতে এখন ক্ষমতায়। যদিও সেকালে ঐ ১৯৮৭ সালের কালো আইন দিয়েই মাহাথির, আনোয়ার ইব্রাহিমসহ বহু বিরোধী নেতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টকে বন্দী করে রেখেছিলেন। এতে সেসময় মোট চারটি দৈনিক পত্রিকা বন্ধ এবং মোট প্রায় ১০৬ জন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাকে গ্রেফতার করেছিলেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ক্ষমতা খর্ব এবং কাউকে কাউকে পদত্যাগ করতে বাধ্যও তিনিই করেছিলেন। এভাবে বেপরোয়া মানবাধিকার কেড়ে নেয়াতে আমেরিকাসহ দেশী-বিদেশী অনেকের ভাষায় ও চোখে তিনি ‘স্বৈরশাসক ও নিপীড়ক’ হয়ে উঠেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই বৈপরীত্যের কারণে আমাদের কালের অনেক “স্বৈরশাসক” নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতে মাহাথির মোহাম্মদের নামের আড়ালে নিজেদের অপকর্ম লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকেন।

    ২০০৩ সালে মাহাথির রাজনীতি থেকে অবসরে চলে গেলেও তিনি মালয়েশিয়ার নির্বাচনে (গত ২০১৮ সালের মে মাসে) কোয়ালিশন জোটে বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছেন এবং ৯৩ বছর বয়সে এখন আবার প্রধানমন্ত্রী। একালের মাহাথিরসহ তাঁর জোটসঙ্গীদের দাবি, এই জোট গড়ার মূল কারণ নাজিব রাজাকের অপশাসন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাকের আমলের কুশাসন ও ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতি থেকে মালয়েশিয়াকে বাঁচাতে জেলে বন্দী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথেই জোটবদ্ধ হয়ে মাহাথির আবার নির্বাচনে নামেন এবং বিজয়ী হয়ে জোটের বোঝাপড়া অনুসারে, এখন প্রথম দুই-তিন বছরের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আছেন।

    আমাদের আজকের আলোচনার বাকি অর্ধেক অংশের প্রসঙ্গ চীন। এটাকে বলা যেতে পারে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের চীন অথবা নতুন করে চলতি চীন-মালয়েশিয়া গভীর সম্পর্ক স্থাপন কেন সম্ভব হল, সেটাই প্রসঙ্গ।

    আগের প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের শাসনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল, ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট। আর এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ঘটনা হল 1MDB প্রকল্প। 1MDB মানে ওয়ান মালয়েশিয়ান ডেভেলবমেন্ট লিমিটেড” (মালয় ভাষায় বেরহাড) নামে এক কোম্পানি। এটা মালয়েশিয়ান অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজ মালিকানাধীনে  “উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার চিন্তায়” নেয়া এক কোম্পানির নাম। আগ্রহিরা প্রভাবশালি মিডিয়া ব্লুমবার্গের এই রিপোর্ট-টা পড়ে নিতে পারেন।  কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা কখনো নিজ-সক্ষমতার [insolvent] কোম্পানি হয়ে উঠতে পারে নাই। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে অচচ্ছভাবে  লেনদেন, মানি লন্ডারিং, অর্থ নয়ছয় ও চুরির অভিযোগে নজরদারিতে পরে যায়। ব্লুমবার্গ এনিয়ে রিপোর্টের শিরোনাম থেকেই একে মহা অর্থ-কেলেঙ্কারি Scandal বলে চিহ্নিত করেছে।

    বলা হয়েছিল, এটা আসলে মালয়েশিয়া সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন প্রকল্প, লক্ষ্য ফান্ড সংগ্রহ; কিন্তু বাস্তবে এটা আমেরিকা-সুইজারল্যান্ডসহ সাত দেশের বিভিন্ন বিনিয়োগ ফান্ড কোম্পানির সাথে মিলে দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ নিয়ে যাওয়াসহ বহু অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির এক প্রকল্প হিসেবে হাজির হয়। মোট প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার এখানে ‘নয়ছয়’ হয়েছে। এ ছাড়া, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের গত কয়েক বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ষ বিনিয়োগ কোম্পানি “গোল্ডম্যান স্যাস” [Goldman Sachs ] এতে জড়িত বলে আমেরিকার আইন বিভাগ সে অভিযোগ তদন্তে নেমেছে, মামলা করেছে। স্যাক্সের অন্তত তিনজন ব্যাঙ্কার এই মামলায় আসামি।  ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজাক ও তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে এই প্রকল্প থেকে প্রায় বিলিয়ন ডলার অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কীভাবে এত অর্থ রাজাকের একাউন্টে এল, গত নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাজাক এর কোন সদুত্তর দিতে পারেন নাই। এভাবে এক মহা-কেলেঙ্কারির দুর্নীতি মামলায় রাজাক ও তার স্ত্রী এখন জেলে।

    East Coast Rail Link (ECRL) from railprofessional.com

    ওদিকে এই 1MDB প্রকল্প ছাড়াও আরও এর বাইরে চীনের সাথে নেয়া বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্পে মালয়েশিয়াকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে মাহাথির জোটের অভিযোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হল, চীনের সাথে নেয়া “ইস্ট কোস্ট রেল লিঙ্ক প্রকল্প” (East Coast Rail Link, ECRL)। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এটা এক বড় প্রকল্প এবং  নির্মিত হয়ে গেলে এটা চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পের সাথে যুক্ত ও অংশ হয়ে যাবে। মালয়েশিয়ার পূর্ব-পশ্চিম দু’দিকেই সমুদ্রসীমানা। এই প্রকল্প পূর্বের কেলানতান বন্দর থেকে উপকূল বরাবর নেমে পশ্চিমে গিয়ে সেখানকার ক্লাঙ্গ বন্দরের সাথে যুক্ত হবে – এমন রেল যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রকল্প এটা। বলা হয়, নাজিব সরকার বিপুল ব্যয় করে এই প্রকল্প নিয়েছিল ‘ভালো কমিশন’ পাওয়ার স্বার্থে। তাই এত বড় বিনিয়োগের ভার তাদের অর্থনীতি বইতে পারবে কি না সে দিক উপেক্ষা করেছিল।

    মাহাথির এবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ২০১৮ সালের মে মাসের নির্বাচনে। এর তিন মাসের মধ্যে আগষ্ট ২০১৮ তিনি চীন সফরে চলে যান যার মূল ইস্যু এই ECRL প্রকল্প। সেকালে এই প্রকল্প নিয়ে মাহাথিরের জনসমক্ষে বলা প্রধান যুক্তি ছিল, “আমার দেশ এত বড় বিনিয়োগের ভার সইতে পারবে না, অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে”।  তিনি চীনাদেরকে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পরে যেতে পারা – এই দুর্দশার দিকটা আমল করতে বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ভুল বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প – এমন বলছেন না। এদিকে চীনা ঠিকাদার কোম্পানির হাতে প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে, মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হয়েই চীনের সাথে কথা বলে প্রকল্পের কাজ স্থগিত করিয়ে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন।

    একালে এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ব্যাপক হারে অবকাঠামো খাতে চীনা বিনিয়োগে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেখা যায়। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই আবার চীনা ‘বেল্ট-রোড’ মহাপ্রকল্পে যুক্ত হওয়ার কথা। তাই  চীন-ঠেকানোর বুদ্ধিতে স্বভাবতই এসব প্রকল্পের চরম বিরোধী অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্পের আমেরিকা। সাথে কিছু থিংক-ট্যাংক প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এমনই এক প্রপাগান্ডা শব্দ-চিহ্ন হল – “ঋণের ফাঁদ” [Debt Trap]।

    এই প্রপাগান্ডার সারকথা বা দাবি হল, চীন বিভিন্ন দেশকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে নিজের কব্জায় নিয়ে ফেলছে। এমন অভিযোগ সত্তর দশকে এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রথম আগমনের সময় থেকে বিশ্বব্যাংকের, মানে আমেরিকার বিরুদ্ধেও ঊঠেছিল বা দেয়া হত। মজার বিষয় হল, আমেরিকা এখন সেই ভাষাতেই  চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা-অভিযোগ আনছে। এটা চীনবিরোধী মোক্ষম প্রপাগান্ডা বলে তা ভারতের (বিশেষ করে তার মিডিয়ার) কাছেও খুবই লোভনীয়। নিয়মিতভাবেই ভারতের মিডিয়া এই ফাঁদের প্রপাগান্ডায় মেতে আছে।  একারণে “ঋণের ফাঁদ” বিষয়ক ভারতীয় উৎসের যেকোন রিপোর্ট পাঠ বা রেফার করার সময় সতর্কতা থাকা জরুরি যাতে ভারতীয় মিডিয়া-প্রপাগান্ডার শিকার না হতে হয়। ভারতের কৌশলগত কূটনৈতিক অবস্থান হল চীন-ঠেকানোর এই প্রপাগান্ডায় অংশ নেয়া। কিন্তু ঘটনা হল, এমনকি জেনে অথবা না জেনে আমাদের প্রথম আলোতেও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

    চীনা “ঋণের ফাঁদ” বা বেল্ট-রোড বিরোধী প্রপাগান্ডার এপর্যন্ত সবচেয়ে মোক্ষম রিপোর্ট হল, থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভলবমেন্টের রিপোর্ট। আবার এর যুক্তিগুলোকে কেটে পালটা বক্তব্যের অবস্থানও আছে এখানে এক ডাচ কনসালটেন্টের বক্তব্যে।

    কিন্তু ভারতের চীনের বিরুদ্ধে আপত্তির বিপরীতে একটা মজার দিক আছে। সেটা হল, খোদ ভারতেও চীনা বিনিয়োগের অর্থে নেয়া এমন অবকাঠামো প্রকল্প কম নয়। এমনকি চীনা ‘ব্রিকস’ উদ্যোগে নেয়া ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (যা বিশ্বব্যাংকের মত প্রায় একই কাঠামোতে চলে) নামে একটা অবকাঠামো ব্যাংক আছে – যার বিনিয়োগ প্রকল্পের একমাত্র খাতক হল ভারত; কিন্তু এসব চীনা প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের জন্য তা ‘ঋণের ফাঁদ’ এমন কোনো অভিযোগ নেই ভারতের। এর মানে, অন্তত বোঝা গেল যে, চীনা ‘ঋণফাঁদের’ খারাপ স্বভাব চরিত্র ভারতে এলে ভাল হয়ে যায়। যেন খারাপ “চীনা খাসিলত” আর কাজ করে না।

    তবে লক্ষণীয় হল, এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান বা মালয়েশিয়ায়- যেখানে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয়েছে- সরকার বদলের সাথে সাথে সব দেশেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব আপত্তি নিয়ে নতুন সরকারগুলো চীনা সরকারের সাথে কোনো সঙ্ঘাতের সম্পর্কে যাওয়া ছাড়াই বরং আপস আলাপ আলোচনা সব ক্ষেত্রই আপত্তি মীমাংসা করতে পেরেছে। অর্থাৎ সে সুযোগ ছিল এবং তা নেয়া হয়েছে বোঝা গেছে। আর এই আলোচনা শেষ হয়েছে পুনরায় নেগোসিয়েশন ও আগের চুক্তিটা সংশোধিত ও নবায়ন করার ভেতর দিয়ে। সারকথায় কোথাও কোনো প্রকল্প অমীমাংসিত বিতর্কে আটকে যায়নি। বড় জোর এক বছরের মধ্যে নিরসন করা হয়েছে মানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে যায়নি এবং এটা সব দেশের ক্ষেত্রেই হয়েছে। চীন কোন আদালত ‘আইন’ দেখায় নাই;  বাড়তি ক্ষতিপূরণ দাবি, জোরাজুরি বা চাপ দিচ্ছে এমন অভিযোগ কোথাও – এমনকি আমেরিকান প্রপাগান্ডার ভেতরেও নেই।

    যদিও একথা সত্যি যে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চীনা প্রকল্প নেয়ার সময় এশিয়ার সরকারগুলোকে প্রকল্প থেকে বেনামে কমিশন দেয়া হয়েছে। আর একালের বিশ্বব্যাংকের নেয়া প্রকল্পের সাথে তুলনা করলে বলা যায়, এ ব্যাপারে চীনা প্রকল্প কম স্বচ্ছ এবং এ’পর্যন্ত দাঁড়ানো বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা যেন ওর লক্ষ্যই নয়।

    যা হোক, মাহাথিরের ক্ষেত্রেও এবার তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তিন মাসের মধ্যে (আগস্ট ২০১৮) চীন সফরে প্রকল্প নিয়ে তার আপত্তি একইভাবে চীন আমলে নিয়েছিল। সফর থেকে ফিরে তিনি বলেছিলেন, ‘এই প্রকল্পের খরচ বেশি, যা আমাদের বইবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই, তাই এখনকার মতো এটা বাতিল করতে হচ্ছে।’  [‘We just can’t pay’: Mahathir ] তবে ‘চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক অটুট থাকবে, কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলা ছাড়াই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’ [Malaysia has seen a change of government, its foreign policy concerning China remains the same.”]।

    পরে এ বছর জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা এই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে মালয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বরাতে রয়টার্স জানাচ্ছে, অর্থমন্ত্রীও একই কারণ জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রকল্প বাতিলের জন্য ক্ষতিপূরণ কত দিতে হবে এ নিয়েও ঠিকাদারের সাথে কথা চলছে বলে জানিয়েছিলেন।

    এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল ভারতসহ আমেরিকান প্রপাগান্ডিস্টরা। চীনা প্রকল্প নিয়ে কতগুলো দেশ পরে সরকার বদলের সাথে প্রকল্প বাতিল বা সংশোধিত চুক্তি করেছে, এই উদাহরণের তালিকায় মালয়েশিয়াকে যুক্ত করে আরেকটা দেশ হিসেবে দেখিয়ে কথিত চীনা ‘ঋণের ফাঁদের’ কথিত ভয়াবহতা তুলে ধরতে শুরু করেছিল তারা। এর পর থেকে প্রপাগান্ডা জোরে শোরে চলছিল চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এক আমেরিকার ভদ্রলোক লিখেছিলেন, “the debt-trap argument gained further credence after Malaysian Prime Minister Mahathir Mohamed cancelled $23 billion in BRI projects and warned China against falling prey to ‘a new version of colonialism,’” according to Haenle.

    কিন্তু গত ১২ এপ্রিল এই প্রসঙ্গে হংকংয়ের এক মিডিয়া  “সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট” সব উলটে যাবার খবর দিয়ে লিখছে , ১২ এপ্রিল মালয়েশিয়া জানিয়েছে যে, বাতিল হয়ে যাওয়া রেল প্রজেক্ট নিয়ে তারা আবার এক নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরো লিখছে, গত কয়েক মাসে কিছু ভুল কথা আর মাহাথিরের দুই ধরনের বক্তব্যের পরে এই চুক্তি আবার স্বাক্ষর হলো” [after months of false starts and contradictory statements from Prime Minister Mahathir Mohamad’s government on the future of the multibillion-dollar project”.।

    বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে এবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হলো প্রপাগান্ডিস্টদের। কিন্তু কেন এমন ঘটল? কেন বাতিল চীনা রেল প্রকল্প মালয়েশিয়ায় আবার ‘জিন্দা’ হলো?

    গরিবের অনাদরে পড়ে থাকা খাদ্য পামবীজ বা তা থেকে পিষে তৈরি করা পামঅয়েলকে মাহাথিরের মালয়েশিয়া দুনিয়াজুড়ে ভোজ্যতেলের প্রধান উৎস হিসেবে হাজির করেছিল। গুরুত্বপুর্ণ হল, তা আমেরিকান সয়াবিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এর ছাঁকনি টেকনোলজিসহ তেল বের করার পুরা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক টেকনিক্যাল অগ্রগতি হলে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসহ ওই অঞ্চলই ভোজ্যতেলের প্রধান সরবরাহকারী এলাকা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও সয়াবিন নামে যা বিক্রি হয় এর বেশির ভাগই আসলে রিফাইনড পামঅয়েল। এগুলো আমরা কমবেশি সবাই জানি। আমেরিকার সয়াবিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব সময় আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিত থাকতে হয় মালয়েশিয়াসহ উৎপাদক দেশগুলোকে। এভাবে ইউরোপের বাজারেও একটা বড় মার্কেটশেয়ার তৈরি করে ফেলেছিল মালয়েশিয়া; কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চলা কানাঘুষা এবার বোঝা গেল সত্যি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ‘পামঅয়েল চাষাবাদের কারণে ব্যাপকভাবে বনজঙ্গল ধ্বংস ঠেকাতে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে পামঅয়েল ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দেবে”[This month, the European Commission concluded that palm oil cultivation results in excessive deforestation and its use in transport fuel should be phased out by 2030.]।

    খবরটা শুনে মাহাথির স্বভাবতই খুবই হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি এটাকে ইইউ’র বিবাদ-সঙ্ঘাত লাগিয়ে চলার মনোভাব হিসেবে দেখে বলেন, আমরা পামঅয়েল বিপ্লব ঘটানোতে যেখানে ‘এটা এখন চকোলেট থেকে লিপস্টিকসহ প্রসাধনী ও সাবানের প্রধান কাঁচামাল হয়ে গেছে- তখন ইইউ নিজের পণ্য, রাইসরিষার তেলের বাজার সংরক্ষণের জন্য এই দুশমনি’ শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ এমন ভালো জিনিস নয় যে, আমরা তা প্রমোট করতে চাই। কিন্তু তা বলে বড়লোকের দেশের গরিব দেশের মানুষকে আরো গরিবি হালে ফেলার চেষ্টা- এটা মারাত্মক অবিচার” [Mahathir, 93, said the EU’s increasingly hostile attitude towards palm oil, a commodity used in everything from chocolate spread to lipstick, was an attempt to protect alternatives that Europe produced itself, like rape seed oil.]।
    এই মারাত্মক অবিচারের প্রশ্ন তুলতে পারা- এটাই মাহাথির যে আসল নেতা- এর পরিচয়। তিনি ইইউ’র বাজার দখল করার দিকটাকে সামনে আনলেন।

    গত জানুয়ারি মাসে রেল লিঙ্ক প্রকল্প বাতিল করার পর থেকে নানা প্রসঙ্গে মাহাথির চীনের নেতৃত্ব নিয়ে নিজে অনেক ক্রিটিকাল হয়ে ভালমন্দের বিচার করেছেন। তবে ইতিবাচকভাবে ভাবনাগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে আমেরিকার নেতৃত্বে কথিত “ঋণের ফাঁদের” কথা তোলা অথবা চীন নিজের হুয়াওয়ে ফাইভ-জি মোবাইল টেকনোলজি দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে ইত্যাদি প্রপাগান্ডা প্রসঙ্গে একপর্যায়ে তিনি পাশ্চাত্যবিরোধী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি সরাসরি স্পষ্ট করে বলে বসেন, ‘ধূর্ত আমেরিকানদের মোকাবেলা করতে ধনী চীনাদের পক্ষ নেবো” [I’d side with rich China over fickle US: Malaysia’s Mahathir Mohamad”]। শুধু তাই নয়, চীন প্রসঙ্গে তার অবস্থান আরো স্পষ্ট করতে তিনি বলেছেন, ‘উদীয়মান শক্তি চীন থেকে ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়ার চেয়ে ওদের সাথে কাজের সম্পর্ক গড়ে তোলার একটা ভালো উপায় বের করতে হবে আমাকে” […to find ways of working with the rising power rather than to let fears…]। আবার বলছেন, ‘আমরা যখন থেকে চীনের সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছিলাম সে সময়ের গরিব চীনের দিকে আমরা ভীত চোখে তাকাতাম। আজ চীন বড়লোক, এখনো আমরা ভীত। এটা চলবে না। আমার মনে হয়, চীনের সাথে সম্পর্ক পাতানোর একটা ভালো উপায় আমাদের বের করতে হবে” [I think we have to find some way to deal with China.]।

    মাহাথিরের সে উপায় হল, চীনের সাথে বাজার শরিক করার সম্পর্ক ও বুঝাবুঝি তৈরি করা। এই ফর্মুলায় সহজেই তিনি বিভিন্ন চুক্তিতে উপনীত হয়ে গেলেন। তাতে এখন থেকে আমেরিকান সয়াবিন নয়, বরং চীন হবে মালয়েশিয়ান পামঅয়েলের একচেটিয়া ভোক্তা। সেই খুশিতে মাহাথির এবার সেই পরিত্যক্ত চীনা রেল লিঙ্ক প্রকল্প- এতে বিভিন্ন জায়গায় সংশোধনী এনে হলেও আবার চীনের সাথেই এ নিয়ে চুক্তি করে ফেলেছেন। [Malaysia to ‘take advantage’ of ECRL deal to sell China more palm oil: Mahathir Mohamad]। তিনি চীনাদেরকে ভাল ব্যবসায়ী বলে প্রশংসা করে এক লম্বা ইন্টারভিউ দিয়েছেন এখানে, ‘Chinese by nature are very good businesspeople’: Malaysian Prime Minister ।

    শুধু তাই নয়, গত ২৫ এপ্রিল চীনে দ্বিতীয় বেল্ট-রোড সামিট মানে, বেল্ট-রোড ফোরামের সম্মেলন শুরু হয়েছে। আড়ম্বরের সাথে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তিন-চারজন অতিথি-বক্তার একজনও তিনি।

    হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা “ঋণফাঁদের” অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মাহাথিরের পক্ষ পত্রিকা খোদ এডিটোরিয়াল লিখেছে। Editorial by SCMP Editorial।

    কারও প্রপাগান্ডায় ভয় পাওয়া কোনো কাজের কথা নয়; বরং নিজ বুদ্ধিতে চীনের সাথে চলার উপায় বের করে আগানো শিখতে চাইলে মাহাথির আমাদের সামনে শিক্ষণীয় হয়ে থাকলেন। আমরা কী এই শিক্ষা চর্চার জন্য যোগ্য হতে পারব না!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত  ২৭ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “‘ঋণফাঁদে’র গল্প মোকাবেলার মাহাথির-পথ “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

     

  • ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

    ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

    গৌতম দাস

    ০১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2yM

    প্রেসিডেন্ট দাবিদার হুয়ান গুয়াইদো ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো – ফাইল ছবি

    ল্যাটিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। এই ভেনিজুয়েলারই নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ [Hugo Chávez] কমিউনিস্টদের নয়নমণি, তাদের সাফল্যের প্রতীক ছিলেন। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অসুস্থতায় তিনি মারা যান। যদিও সেনাবাহিনীর এই সাবেক লে. কর্নেল ক্ষমতায় তার উত্থান এই সেদিন, মানে ১৯৯৮-৯৯ সালের এবং তা স্বল্পকালীনও – মাত্র ১৪ বছরের শাসন। ভেনিজুয়েলায় যা তার উল্লেখযোগ্য অবদান বলে কমিউনিস্টেরা মনে করে তা হল একধরনের “সমাজতন্ত্র কায়েম” করেন তিনি, বিশেষত ২০০৭ সালের পর থেকে। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। খুবই মার্জিনাল (৫০.৬২%) ভোটে তিনি সেবার জিতেছিলেন।

    আর এর পরের টার্মের নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। কিন্তু এখানে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিরোধীরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবুও মাদুরো নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শপথ নেন। ওদিকে গত ২০১৫ সালে ভেনিজুয়েলার পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল, যার ফলাফল ছিল বিরোধী দলের বিজয়-প্রাধান্যে। তাই মাদুরোর শপথের প্রতিক্রিয়ায় পার্লামেন্ট হয়ে উঠে বিরোধীদের বিকল্প ক্ষমতা প্রদর্শনের কেন্দ্র। মাদুরোর এই দ্বিতীয় শপথের পর থেকে পার্লামেন্টে থেকে তারা মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট না মানার তৎপরতাও শুরু করেছিল। তারা পাল্টা প্রস্তাব পাস করে, মাদুরো সঠিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নন, তাই পার্লামেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংসদের বিরোধী দলের নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে [Juan Guaidó] মনোনীত করছে [declared himself interim president on 23 January ]। এতে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকার উপস্থিতি ও স্বার্থ খুবই খোলাখুলি হয়ে যায়। আর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, এক রাষ্ট্রে দুই প্রেসিডেন্টের দাবিদার – বলাই বাহুল্য, এটা ঐ রাষ্ট্রের ইমেজের জন্য খুবই খারাপ।

    দেশে-বিদেশে এর বিভক্ত প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। তবুও এক সোজা লাইন টেনে বলা যায়, দেশের ভেতরে তবে পার্লামেন্টের বাইরে আর কেউই এটা মানেনি বা প্রভাব নেই। অর্থাৎ নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মাদুরোর নিয়ন্ত্রণে স্বভাবতই সব সরকারি অফিস প্রশাসন তো আছেই; সেই সাথে বিচার বিভাগও তার পক্ষে। ফলে দাঁড়ায়, পার্লামেন্ট ছাড়া রাষ্ট্রের অবশিষ্ট দুই মূল প্রতিষ্ঠান মাদুরোর পক্ষে। তবে সেই সাথে নির্ধারক সেনাবাহিনীর জেনারেলরাও মাদুরোর পক্ষে। মাদুরো জেনারেলদের সাথে ক্ষমতা ও বৈষয়িক সুবিধা শেয়ার করেন বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু দেশের বাইরে?

    ট্রাম্পের আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আঞ্চলিক দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র জোট  ওএএস [ Organization of American States, OAS] , এসব মিলিয়ে মোট প্রায় ষাটেরও বেশি বিভিন্ন রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর পাল্টা রাশিয়া এবং চীন থেকে ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক, এরা মাদুরোর পক্ষে। এক কথায় যেন নতুন করে এক ‘কোল্ড ওয়ার’-এর দুই পক্ষ দল। এ ঘটনায় সবচেয়ে বাজে দিক হল এটাই। যার কারণেই হোক, পরিস্থিতিকে ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকা’ এমন দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে কোল্ড ওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধেরীক লড়াই যেন ফিরে এসেছে – এমন ভাব তৈরি করা, এভাবে ফেলে দেয়া একেবারেই ঠিক হয়নি। কারণ, দুনিয়াকে আমরা চাইলেই আবার ‘দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়’ ফেলে দিতে পারব না। কারণ, দুনিয়ায় এমন কিছুই আর বাস্তবে নেই। এ জন্য এমন ভান ভনিতা ছায়ার সাথে লড়াই – এটা কারো পক্ষেই কোনো কাজের কাজ হয়নি। এটা দুই পক্ষের জন্যই এক অচলাবস্থা।

    আরও কঠিন বাস্তবতার দিকটা হল, এখন কথিত সেই ‘সমাজতন্ত্র’ কোথাও আর টিকে থাকতে পারেনি, টিকে নেই কোথাও। কাজেই ভান করে যেন মাদুরোর পক্ষে এক “সমাজতান্ত্রিক জোট” উঠে দাড়িয়েছে, এই ভাব ধরার সুযোগ নেই। কারণ, রাষ্ট্রের সব কিছুই একমাত্র সরকারি মালিকানায় – এমন চিত্রের সেই সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্র বলতে একালে আর কেউ অবশিষ্ট নাই। ফলে যে চিত্রের রাষ্ট্রগুলো এখন আর নাই তাই এদেরই কোন “সোভিয়েত” ব্লক বা আলাদা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোন রাষ্ট্র-জোট আর নাই। গত ১৯৯১ সালের পর থেকে বলা যায়, সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার অন্তর্গত। এমনকি মিয়ানমার অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বলতে হয় উত্তর কোরিয়াও এখন মূলত চীনের মাধ্যমে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থায় যুক্ত। কাজেই এ কালে প্রতারণা করা ছাড়া, “কথিত সমাজতন্ত্রী” ভাব ধরার আর কিছুই নেই। ‘সমাজতন্ত্র’ কারও কাছে খুব ভালো জিনিস হয়ত। ছিল অথবা আছে এখনও। তবুও দুনিয়ায় এমন কিছু একটা এককালে চালু থাকলেও এখন সেটা “এক মৃত অভিজ্ঞতা” ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই এ কালের রাশিয়া অথবা প্রেসিডেন্ট পুতিন মানেই “সমাজতন্ত্রী” নয়। এমন আকার ইঙ্গিত করা,  ভং-চং ধরারও কিছু নাই। এমনকি তার সাগরেদ হিসেবে ইঙ্গিতে চীনকে সাথে দেখতে পেলেও কথা একই থাকে।

    বরং, একালে বলা যায় চীন-রাশিয়া মিলে তারা হয়ত আমেরিকার বিরোধীও। তবুও তা যেকোনো দুই বিরোধী স্বার্থের রাষ্ট্রের মতই। এর বেশি গুরুত্ব বা  তাতপর্য এর নাই।  এটা “সাম্রাজ্যবাদ” হিসেবে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়া কোন অবস্থান এমন মানের ইঙ্গিত দিয়ে নৈতিকতার সুড়সুড়ি তুলতে হবে – এমন চেষ্টা ফাঁপা কাজ তো বটেই, তা অগ্রহণযোগ্য ও খারাপ কাজ। কাজেই ‘সমাজতন্ত্রের’ পক্ষ নেয়া হচ্ছে মনে করে এখনকার রাশিয়া বা চীনকে সমর্থন করা কিংবা সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে থাকা বুঝা; কিংবা আমেরিকার ও ইইউর বিরোধিতা করা কিংবা ভেনিজুয়েলার মাদুরোকে কোলে তুলে নেয়া – এসব প্রতিটি কাজই এখন নিজের সাথে প্রতারণা, মিথ্যা প্রবোধ দেয়া হয়ে দাঁড়াবে। এর চেয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া কাজের হতে পারে। ভেনিজুয়েলা সঙ্কটের গোড়া কোথায় তা নতুন করে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি।

    কমিউনিস্টরা বলতে পছন্দ করবেন হয়ত যে শ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ জাতীয়করণ করেছেন, গরিবের জন্য তেল বিক্রির অর্থ পাকা বহুতল বাড়ি, শিক্ষা-চিকিৎসায় ব্যয় ইত্যাদির ‘সমাজতন্ত্র কায়েম’ করেছিলেন; সে জন্য “সাম্রাজ্যবাদীরা” ভেনিজুয়েলার জন্য বাধা ও নানান সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ভেনিজুয়েলার বর্তমান সঙ্কটে রাশিয়া ঠিক এ ব্যাখ্যাই দিচ্ছে।

    আসলে তেল জাতীয়করণ আর গরিবের জন্য খরচ ব্যাপারটাকে সমাজতন্ত্র বলি আর না বলি, ভেনেজুয়েলার সঙ্কট সেজন্য হয়নি। আবার যদিও বেজ ফ্যাক্টস হল, ভেনিজুয়েলায় তেল জাতীয়করণ শ্যাভেজ করেননি, এটা ১৯৭৬ সাল থেকে আগেই করা ছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি (PDVSA) -এর জন্ম তখন থেকেই। শ্যাভেজ ২০০৭ সালে যেটা করেছেন, সেটা কী তাহলে? দুনিয়ায় যা তেল প্রতিদিন ভোগ-ব্যবহার হয়ে যায়, ভেনিজুয়েলা এর ১৩ শতাংশ একা উৎপাদন করে থাকে বা সক্ষম। কিন্তু তার এই সক্ষমতার প্রধান তেলক্ষেত্র এমন এলাকাকে বলে ‘অরিনোকো বেল্ট’। [ ভেনেজুয়েলায় একুশশত কিলোমিটার লম্বা বিস্তৃত অরিনোকো নদীর দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে দুনিয়ার বৃহত্তম এই তেল ক্ষেত্রে ]।  কিন্তু যেখানকার তেল তুলতে বড় বাধা ছিল যে, প্রথম দিকে এই তেল ক্ষেত্রে প্রস্তুত করতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল।

    সে কারণে সরকারি মালিকানাধীন তেলক্ষেত্রের উপরই তা তেল তোলার অবস্থায় আনতে “তেল উত্তোলন বিনিয়োগ প্রকল্প” নেয়া হয়েছিল। আর বিদেশী কোম্পানিকেই বিনিয়োগ এনে এই প্রকল্প চালাতে দেয়া হয়েছিল।  আসলে মুল কারণ ছিল, দুনিয়াতে তেলের চাহিদা ক্রমে বাড়তে থাকায়  ১৯৯৭ সালের দিকে ভেনেজুয়েলার ‘অরিনোকো বেল্ট’ এর তেল উত্তোলনে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এভাবে কূপ তৈরি বহু আগেই শেষ করে কোম্পানিগুলো, যখন বহু আগেই উৎপাদনেও চলে গেছিল, এরই কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে ওই কোম্পানিগুলোকেই হুগো শ্যাভেজের সরকার চাপের মুখে দেশ থেকে বের করে দেয়। এ কাজকে ‘সমাজতন্ত্র’ বলে দাবি কমিউনিস্টরা করুক আর যা-ই করুক, আইনি দিক থেকে ব্যাপারটা হল একটা প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে যে পার্টনার, তাকেই কোম্পানি থেকে গায়ের জোরে বের করে দেয়ার মত। তাই এসব ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে যেমনটা হয়, তেমনই এখানেও ক্ষতিপূরণ মামলা হবেই, হয়েছিলও। আর তাতে কোন কোনটার মালিকানা বিতর্ক মামলায় ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে গেছে, আবার কোনটার মামলা এখনো পেন্ডিং। এখন একে ‘সমাজতন্ত্র’ নামে ডেকে কেউ সুখ পেতে চাইলে পেতে পারে, প্রপাগান্ডা করতে চাইলে করতে পারে।

    তবে হুগো শ্যাভেজ এর চেয়েও আরো গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট তৈরি করেছিলেন অন্যখানে। আমরা সে দিকটা বুঝতে যাবো। মাটির নিচের তিন ডলারের তেল ১৭০ ডলারে বেচার চেয়ে আরামের কাজ আর কী হতে পারে! এর চেয়ে আরামের ‘সমাজতন্ত্র’ আর কী হতে পারে! শ্যাভেজ এ মজাই খেয়েছেন। দুনিয়ায় তেলের দাম কিন্তু সব সময়ই সাব্যস্ত হয়েছে কোন ‘সমাজতন্ত্র’ ব্যবস্থা নয় বরং, ‘বাজার’ মানে, একেবারে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারব্যবস্থা দিয়ে। ২০০৭ সালের দিকে তেলের বাজার তখনও তুঙ্গে ছিল, কারণ চীনের জিডিপি তখনো ডাবল ডিজিটে। তাই চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিতে তার জ্বালানি চাহিদা মানে চীনের সম্ভাব্য ব্যাপক তেলের চাহিদাও ছিল তুঙ্গে ফোরকাস্ট। এ দিকটায় নজর করে তেলের বাজারের ফোরকাস্ট খুবই তেজী ছিল।  যদিও ২০০৭ সালের শেষে (২০০৭-০৮) এসে, আমেরিকা টের পায় যে আফগান-ইরাক ওয়ার অন টেররের অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকান রাষ্ট্র নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়িয়ে খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু ওদিকে যুদ্ধ শেষেরও কোন নামগন্ধ নাই। সামগ্রিক পরিণতিতে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতিতে (দ্বিতীয়) মহামন্দা হাজির হয়েছিল।

    এতে আমেরিকা-ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়লেও কিন্তু চীনের অর্থনীতির গতি কিছু কমে  সিঙ্গেল ডিজিটের জিডিপিতে এসে আটকে বহাল ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষে (এনার্জি স্টাটিস্টিক্সের প্রতিষ্ঠান, US Energy Information Administration (EIA); এটা আমেরিকান সরকারের হলেও তেলের বাজারে সবার কাছে বিশ্বস্ত) EIA -এর দেয়া চাহিদার ফোরকাস্ট (নিম্নহার) প্রকাশ পায়। এর ফলে তেলে বিনিয়োগকারীরা সদলে আগেই পুঁজি তুলে নেয়া শুরু করেছিল। এতে এরপর থেকে তেলের দাম প্রবলভাবে ক্রমেই কমতে কমতে একপর্যায়ে ৩০ ডলারেও গেছিল, যা এখন ৫৫-৬০ ডলার/ব্যারেলের মধ্যে। সেই থেকে এর ধাক্কা ভেনিজুয়েলার মতো রাষ্ট্র ও ‘সমাজতন্ত্রী’ সরকার আর সহ্য করতে পারেনি। তত দিনে অবশ্য শ্যাভেজ মারা (২০১৩) গেছেন, মাদুরো এসেছেন ক্ষমতায়।

    তাহলে ভুলটা কোথায়? মফস্বলের এক দোকানদার বাবা তার দুই ছেলেকে নিয়ে ব্যবসা করেন। সারা দিন তার দোকান খোলা থাকে আর প্রতিদিন তার ক্যাশবাক্স ভর্তি হতে থাকে নগদ ও গোনা হয়নি এমন পরিমাণ টাকায়, তার ব্যবসা এমনই চালু। কিন্তু প্রতিদিন সেই বাবা সন্তানদের সাবধান করে একটা কথাই কেবল বলেন, বাবারা মনে রাখবা, বাক্সের সব টাকা আমার নয়। ব্যবসায় লভ্যাংশ যেটা, কেবল সেটা আমার, সেই টাকা থেকে সংসারে খরচ করতে পার। কেন? কারণ তিনি আসলে বলছিলেন ব্যবসার পুঁজিতে হাত না দিতে, পুঁজি না খেয়ে ফেলতে। ক্যাশবাক্সের কাঁড়ি কাঁড়ি মোট টাকা মানে তা হল ব্যবসায় বিনিয়োগ আর মুনাফার যোগফল। কাজেই, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দেখে ছেলেদের যেন মাথা খারাপ না হয়ে যায়।

    সমাজতন্ত্রী শ্যাভেজ-মাদুরোরা বাজার খুবই অপছন্দ করেন, কিন্তু ফুলে-ফেঁপে ওঠা ১৭০ ডলারের তেলের বাজার কামনা করেন, ব্যাপারটা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৭০ ডলার এক ব্যারেল তেলের মধ্যে ১৭০ ডলার পরিমাণ ভ্যালু (value addition) ভেনিজুয়েলা যোগ করেনি। তবুও ওই দামেই তা বিক্রি হয়েছে, কারণ বাজারের প্রবল চাহিদা। আর সেটা আবার কোনো স্থানীয় বাজার না গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারে সেটি নির্ধারিত। ফলে এই বিপুল আয়ের ওপর চোখবুজে ভরসা করে খরচের ফর্দ আর দায় নিয়ে ফেলা অনুচিত হলেও শ্যাভেজরা তাই করেছিল। সরকার সমাজতন্ত্রের নামে ‘গরিবের জন্য অর্থ ব্যয়ের পপুলার কর্মসূচি’ খুলে বসেছিল। ফলে এটা স্থায়ী সরকারি ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছিল। বিপরীতে আয়ের সংস্থানের ব্যবস্থাটার কোন স্থায়ীত্ব না থাকলেও। তাই তেলের দাম পড়ে গেলে তখন এই ব্যয় নির্বাহে সরকার হিমশিম। ফলাফলে অতিরিক্ত টাকা ছাপানো, ফাইন্যান্সিয়াল মিসম্যানেজমেন্ট, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি।

    তবে দ্বিতীয় আরো বড় ভুলটা হল, তেল বেচে পাওয়া অর্থ থেকে সরাসরি পপুলার সামাজিক কর্মসুচিতে খরচ না করে বরং একে আগে কোনো উৎপাদনে, কোনো কৃষি বা শিল্প কাজে বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। এরপর সেই উৎপাদনের লাভালাভ থেকে একটা অংশই কেবল ‘গরিবের জন্য অর্থব্যয়ের পপুলার কর্মসূচিতে ব্যয়’ বা ব্যবহার করা উচিত ছিল। এতে শুরুতে গরিবের জন্য কর্মসূচি চালু করতে কয়েক বছর একটু দেরি হত অবশ্যই। কিন্তু ক্রমেই একবার চালু করতে পারলে তা স্থির ও দৃঢ়ভাবে চলত। মাঝপথে তেলের দাম পড়ে গেলেও তা রাষ্ট্রের জন্য দায় হয়ে উঠত না। তেলের আয়ের সাথে গরিবের জন্য ব্যয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না করা ছিল এর সূত্র বা চাবিকাঠি।

    ক্যাপিটালিজমের স্বভাব না বুঝে ক্যাপিটালিজমের বিরোধিতা, খামখা সব পদক্ষেপ আর উদ্ভট দাবি অনেক অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে পারে। সমাজতন্ত্রীরা আজীবন এগুলোই করে এসেছে। সমাজতন্ত্রী চিন্তার আরেক আজিব বৈশিষ্ট্য হল – নাগরিকের সব মৌলিক খরচের (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান) দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে – তা সবার আগেই দাবি করে অথবা ধরে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্র কোথা থেকে তা জোগাড় করবে, সামর্থ্য আছে কি না, হয়েছে কি না বা কতটা সেসব কোনো কিছু দেখা ছাড়াই এমন দাবি তারা করে থাকে। তারা ধরে নেয় রাষ্ট্রের এই সামর্থ্য আছে বা থাকবেই বা থাকে। অথচ প্রথম কাজ ছিল রাষ্ট্রের আয় ও খরচের সামর্থ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়া।  আর পরে বাড়া সামর্থের অনুপাতে খরচের পরিকল্পনা করা।

    আফ্রিকার দেশগুলো কলোনিমুক্ত স্বাধীন হয়েছিল মোটামুটি ষাটের দশকের শুরু থেকে। তাদের কাছেও সমাজতন্ত্র-ভাবনা এমন এক কাঙ্খিত বটিকাও ছিল। আফ্রিকার  জাম্বিয়া ১৯৬২ সালে স্বাধীন হয়েছিল। এর এমন স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্টের নাম কেনেথ কাউন্ডা। এ কালে চাকরি সুত্রে জাম্বিয়ায় বসবাস কালে শুনেছি, তিনি নাকি সেকালে বাসায় তৈরি মদ খেয়ে জনগণের পেট খারাপের কষ্ট পাওয়া পছন্দ করতেন না। তাই কারখানায় তৈরি মদ ট্যাঙ্ক লরিতে নিয়ে বিতরণের ব্যবস্থা করতে গেছিলেন। সম্ভবত মদও যেহেতু এক প্রকার খাওয়া্‌ মানে অন্নের সংস্থান। ফলে সেটাও রাষ্ট্রের খাওয়ানোর দায় নিতে গেছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের পর এসে জাম্বিয়া রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে গেছিল, যা এখন একালে আবার অনেক কষ্টে ধীরেসুস্থে বিদেশী (চীনা ও বিশ্বব্যাংকের) বিনিয়োগ, দান-অনুদানে আবার জাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

    ভেনিজুয়েলার সঙ্কট অবশ্য ওপরে যেগুলো বললাম, এগুলোই সব নয়। এর উপরে আরো নানান ডালপালাও আছে। যেমন ওই ২০০৭ সালের আরো ঘটনা হল, যখন সমগ্র দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র এক মৃত অভিজ্ঞতা মাত্র, (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ভেঙে গেছে) যা নিজ উদ্যোগে ভেঙে পড়েছে তা সবাই জানে। কিন্তু তবু শ্যাভেজ সেখান থেকে কোন শিক্ষা , সাবধানতা সতর্কতা ছারাই ভেনিজুয়েলার টেলিকম, বিদ্যুৎ, পানি, সিমেন্ট, স্টিল, ব্যাংক ইত্যাদি সব কিছু জাতীয়করণ করেন। পরবর্তীকালে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনের বিস্তারিত সব দিক প্রসঙ্গ যদি সরিয়েও রাখি, তবুও ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে এর প্রধান প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল এবং এখনও হয়ে আছে – এগুলোর অদক্ষভাবে প্রচুর খরচে পরিচালনা।

    আর সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া দিক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া, সেটা তো আছেই। সরকারের হাতে মালিকানা রাখলে সে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট বা পরিচালনা যে এক অসহনীয় সমস্যা, এ কথা তো ২০০৭ সাল নাগাদ সমগ্র দুনিয়ার সমাজতন্ত্রীদের কানে ঢুকে যাওয়ার কথা। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেটা ঘটেনি। ভেনেজুয়েলার দুর্নীতি জনমনে কত মারাত্মক উদ্বেগের তা একটা চিহ্ন হল – এ বছর জানুয়ারিতে মাদুরো প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে তিনি তা উল্লেখ করে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ নেবেন। [He concluded by highlighting that the recovery of Venezuela’s economy and the fight against corruption and indolence are the government’s priorities for the near future,]। এমন সব কিছু অব্যবস্থার প্রভাব কত প্রবল তা বোঝার আরেক সহজ জায়গা হল মুদ্রাস্ফীতি। আপনার যদি ১০ হাজার টাকা থেকে থাকে, তবে এক বছর পর ওর মূল্য ভেনিজুয়েলায় এখন ৫৯ পয়সা। বলা হচ্ছে, ভেনিজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০৮৭.৫২ শতাংশ। [which means that bolívar savings worth $10,000 at the start of the year dwindle to 59 cents by the end. ]

    অনেকে ইঙ্গিতে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, ভেনিজুয়েলা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সে জন্য নাকি পুতিনের রাশিয়ার সাথে খুব দহরম-মহরম। এমন ভিত্তিহীন অনুমান অনেকের মনে কাজ করে থাকে। কিন্তু পুতিনের সাথে সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক কী? পুতিন বা রাশিয়া কী এমন দাবি করেছে  যে রাশিয়া সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, আছে? তবু এমন “সমাজতন্ত্র- বিক্রেতা” এখনও আছে। এরা আসলে রাশিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থের তাঁবেদার ও ভাঁড়। বাস্তবে, ভেনিজুয়েলা এখন রাশিয়ার বিরাট বিনিয়োগের ক্ষেত্র, ২০০৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট বিনিয়োগ প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার [Since 2006 Russia has lent Venezuela at least $17bn. ]। ইকোনমিস্ট এক রিপোর্টের শিরোনাম বলছে, [Vladimir Putin fights for his own future ] অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে মাদুরোকে যদি শেষে বিদায়ই নিতে হয়, তবে নিজের বিনিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাশিয়া।

    অর্থনীতি ভেঙে পড়া, দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া ও অব্যবস্থায় অচল ইত্যাদির সরকারের ক্ষেত্রে যা হয়, এখানে তা ঘটেছে। এর একপর্যায়ে সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের পক্ষে সরাসরি ক্যাডার গুণ্ডা বা মিলিশিয়া নামাতে হয়, বিরোধী জমায়েতে হামলা করতে হয় যারা আবার পুলিশবাহিনীর প্রটেকশন পেয়ে থাকে – এসবই ঘটে গেছে ভেনিজুয়েলায়। জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থাকার সব কর্মাদি এখানে সম্পন্ন করা হয়েছে। সবার ওপরে মাদুরোকে  আবার কেউ উলটে ফেলে দেয় তা থেকে রক্ষা করতে পুতিনের দেয়া প্রটেকশন, সেটা তো আছেই।

    ইকোনমিস্টের আরেক অবজারভেশন হল – […hollowing out of institutions and the privatisation of state power is precisely what Russia and Venezuela have in common]। অর্থাৎ এখানে মাদুরো আর পুতিনের মধ্যে এক বড় মিল আছে। সেটা হল, উভয় ব্যক্তিরই দখলে থাকা বা পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যার যা ভূমিকা তা হল, প্রশাসন পাবলিকের পক্ষ থেকে গণস্বার্থ দেখা ও মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি সব দায়িত্ব বাদ দিয়ে এখন উলটা্ “প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ফোকলা” আর অকেজো করে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনিক বিজনেস রুলের রুল বই দিয়ে এগুলো আর পরিচালিত নয়। এগুলো পরিচালিত হয় ব্যক্তি-মুখের নির্দেশে। এটা যেন ‘রাষ্ট্রক্ষমতারই এক প্রাইভেটাইজেশন’ এমন ঘটে গেছে। আর কে না জানে, যখন রাষ্ট্রের নির্বাহীদের কেউ কব্জা করে নেয়, তখন তার রাষ্ট্রীয় সম্পদও তাদের দখলে চলে যায়, রাষ্ট্র এক পরিত্যক্ত এলাকা হয়ে যায়।

    এসবের মিলিত এখন আর এক রূপ হল, ‘প্রাইভেট আর্মির’ সমাধান। ইকোনমিস্ট-সহ অনেকে জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে মাদুরোর কোনো সম্ভাব্য ক্ষমতাচ্যুতি ঠেকাতে রাশিয়া ইতোমধ্যে কয়েক শ’ রাশিয়ান ‘প্রাইভেট আর্মি’ বা ওয়াগনার (Wagner mercenaries) পাঠিয়েছে।

    ‘প্রাইভেট আর্মি’- এটা ইদানীংকালের আরেক নতুন ফেনোমেনা। তবে সাবধান, এটা পুতিনের রাশিয়াই প্রথম দেখিয়েছে তা মোটেও নয়। ইরাকে বা আফগানিস্তানে ব্লাক-ওয়াটার[Blackwater] বাহিনীর কথা আমরা শুনেছিলাম। এরাই ছিল সেখানে আমেরিকান ‘প্রাইভেট আর্মি’ সরবরাহের কোম্পানি। পরে অবশ্য এক স্থানিয় বাজারে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গুলি ছুড়ে মারার অভিযোগে কেলেঙ্কারিতে পড়ে এই বাহিনী আমেরিকায় ফিরে যায়। মজার ব্যাপার হল, মিয়ানমারের এক ইংরেজি দৈনিক খবরে দাবি করা হয়েছে যে, চীন সেই ব্লাক-ওয়াটার কোম্পানিকেই নতুন নামে মিয়ানমারে নিয়োগ করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার চুলায় যাক, আমেরিকা, রাশিয়া অথবা চীন প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে প্রাইভেট গুন্ডাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও তা করতে চায়। এব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন নীতিগত ফারাক নাই।

    ভেনিজুয়েলাবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলার ক্ষেত্রে আরেক বিরাট অবদান ট্রাম্পের আমেরিকার। এ কালে আমেরিকা যার ওপরে ইচ্ছা “অবরোধ আরোপ” করে রাখছে। এই অবরোধের সোজা মানে, সেই রাষ্ট্রের পক্ষে ডলারে কোনো কিছু বেচা/কেনা করা বন্ধ করে দেয়া। ফলে ভেনিজুয়েলার এখন ডলারে তেল বিক্রি বন্ধ। এ ছাড়া ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয়গুলো পণ্যের আমদানিতেও এর বাধা তোইরি করে রাখা  তো আছেই। অথচ ১৯৪৪ সালে ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে গ্রহণ করার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল নিজে অন্য রাষ্ট্রকে ডলারে পণ্য কেনাবেচা করতে বাধা দিবার সুযোগ নিজের হাতে রাখবে এমন কোনো শর্ত ছিল না।

    সামগ্রিক দিক থেকে দেখলে ভেনিজুয়েলার বিরাট আরেক ভুলটা হল বিপ্লবীপনার মোহে শেষে রাশিয়া ও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার ফাঁদে পড়া। অথচ সরাসরি কারো কব্জায় পড়া এড়িয়ে যাওয়া – এই নীতি অনুসরণ করে পথ চলা সঠিক ছিল। এ ছাড়া নিজ দেশের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ যতই বিরোধ থাক, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবিতর্কিত রাখা খুবই জরুরি। অন্যথায় আভ্যন্তরীণ বিরোধকে ছোট বা সীমিত  ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে যায়। কারণ, সমাজে নানা রকম স্বার্থদ্বন্দ্ব থাকবেই, যা এক চলমান ঘটনা। কিন্তু তা এক ‘পারমিশিবেল রেঞ্জের’ মধ্যে রাখতে পারতে হয়। আমরাই একমাত্র ভাল অথবা সমাজতন্ত্রী এসব প্রচার করে সমাজকে অন্তত গভীর দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেললে নিজের দেশ বাইরের দেশ ও লোকের স্বার্থের ঘুঁটি হয়েই ওঠে। ভেনিজুয়েলার অবস্থা হয়েছে এটাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভেনিজুয়েলা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

     

     

  • “ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

    “ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

    গৌতম দাস

    ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2wO

     

    –

    বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে; অফিসিয়াল ফলাফল প্রকাশ, শপথ নেয়াসহ মন্ত্রিসভা গঠন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। সরকারের দেশি-বিদেশি সুবিধাভোগীরা এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি’ [Land Slide Victory], বা বাংলায় “ভূমিধস বিজয়” শব্দ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যা করছে। কারণ, দাবি অনুযায়ী এই ফলাফলে  ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আওয়ামী জোটের ব্যাগে এসেছে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ আসন পেয়েছে সরকার। তাই অফিসিয়ালি ফলাফলে ৯৭ শতাংশের বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভূমিধস ধরনের শব্দ খুঁজে এনেই সম্ভবত একমাত্র এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যায়।

    কিন্তু ভারতের মিডিয়ায় বিস্ময়কর এক “কিন্তু” আমরা লক্ষ করছি। নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হওয়ার অন্তত এক দিন পর থেকেই ভারতের মিডিয়ায় এই ফলাফল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই তারা বিভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাদের অস্বস্তিকর মন্তব্যগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছে। আর এতে প্রায় প্রত্যেকের রিপোর্টের শিরোনামে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ধরনের শব্দ দেখা যাচ্ছে। যে বক্তব্যগুলোর সারকথা হল, তাদের অনুমান এই নির্বাচনী ফলাফল ভারতের স্বার্থের জন্য অন্তত লং টার্মে বা শেষ বিচারে শুভ ইঙ্গিত নয়। খারাপ কিছুর কু-ইঙ্গিত। তাই এখান থেকেই ফলাফল গ্রহণে অস্বস্তির শুরু। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে কয়েকটা এখানে তুলে এনে আলোচনা করা হল।

    একঃ কাঞ্চন গুপ্ত
    যেমন ভারতের এমন ‘কিন্তু’ দৃষ্টিভঙ্গির মন্তব্যের এক লেখক হলেন কাঞ্চন গুপ্ত। তিনি সবার চেয়ে আগে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর, নির্বাচনের পরের দিনই কাঞ্চন গুপ্তের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আর তার লেখা ছেপেছে আবার ভারতের প্রভাবশালী বেসরকারী থিঙ্কট্যাঙ্ক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন”। যদিও কাঞ্চন গুপ্ত তাদের নিজেদের স্টাফ নন, তাই বাইরের লেখকের লেখা হিসেবে তারা ছেপেছে। কাঞ্চন গুপ্তের পরিচয় খুবই কম করে বললেও তা হল, তিনি একসসময়ের বাংলাদেশ (পুরানা পুর্ববঙ্গের) এক ব্রাক্ষ্মসমাজ পরিবারের সদস্য, এখন দিল্লি-নিবাসী এক প্রবীণ সাংবাদিক; যার আবার চলতি শতকের শুরুতে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বা মন্ত্রী আদভানির টেকনিক্যাল এইড বা মিডিয়াসংক্রান্ত সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারই লেখার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে এখন একদলীয় গণতন্ত্র’[Bangladesh now one-party democracy] । একদিক থেকে দেখলে এটা কোন খাতির বাছবিচার ছাড়া খুবই খাড়াভাবে তাঁর বক্তব্য হাজির করা হয়েছে। এছাড়া ঐ লেখার ভেতরের বিশেষ জোর দেয়া কিছু বুলেট বক্তব্য আছে। সেখান থেকে তুলে আনা এমন চারটা বক্তব্য হলঃ
    যেমন- ১. “সব ব্যবহারিক অর্থে বাংলাদেশ এখন একটা একদলীয় রাষ্ট্র, যদিও ঐ দেশে এখনও “কিছু আসে-যায় না” ধরণের কয়েকটি দল রয়ে গেছে – যেন এটি প্রমাণ করার জন্য যে কনস্টিটিউশনাল বর্ণনায় বাংলাদেশ বহুদলীয় রাষ্ট্র”। [For all practical purposes Bangladesh is now a single-party state with inconsequential parties keeping alive the country’s constitutional description as a multiparty democracy.]
    ২. ” অভিযোগ হল, আওয়ামি লীগ ভিন্নমতকে নিশ্চুপ করে এক নির্বাচন আয়োজন করেছে যেটা না প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীন না ন্যয়নীতিতে পরিচালিত – এখন সেই অভিযোগকারিদেরকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা হয়েছে”। [Equally irrelevant are those who accuse the Awami League of silencing dissent and organising an election that was neither free nor fair.]

    ৩. “নিজস্ব কায়দায় চালানো শেখ হাসিনার এক ওয়ার অন টেররের তৎপরতা আছে। এই ততপরতায় টার্গেট করে হত্যা করা বা গুম করে দেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে অনেক কথা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রমেই ভায়োলেন্ট রেডিক্যালিজমের দিকে গড়িয়ে পড়া থেমেছে – এ কথার পক্ষে যায় এমন কোনো প্রমাণ নেই বললেই চলে”। [Much has been said and written of Sheikh Hasina’s own war on terror through targeted killings and alleged disappearances. There is little evidence to suggest that has halted Bangladesh’s slide towards violent radicalism.]
    কাঞ্চন গুপ্তের এই বাক্যটা সম্পর্কে একটা মন্তব্য করা জরুরি যে, তাঁর একথাগুলো রাখঢাক না করে আবেগহীন ভাবে বলা সত্য, যা ভারতের স্বার্থের পক্ষে গেল কী না এই বিবেচনা না রেখেই তিনি বলেছেন।

    তবে সব ছাড়িয়ে কাঞ্চন গুপ্তের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্তব্য আছে যা এখানে এখন আনা হবে। এর প্রথমটা হল তাঁর লেখার প্রথম বাক্য। খুবই চাচাছোলাভাবে তিনি আমাদের বলছেন, “প্রথম ভোটটা বাক্সে পড়া বা বাক্স গণনা শেষ হওয়ার আগে জানাই ছিল ফলাফল কী আসবে। কেবল বাকি ছিল এ কথা জানা যে, তিনি কত আসন সাথে নিয়ে আসবেন – যা প্রমাণ করবে হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে যোগ্য কেউ নাই”। [The results of the 11th parliamentary election in Bangladesh were known even before the first vote was cast last Sunday or the first ballot was counted in the evening on the same day. It was only a question of how many seats would Sheikh Hasina Wajed’s Awami League tote up to prove its point that it faces no opposition worth its name.]

    এ ছাড়া কাঞ্চন গুপ্তের প্রথম মন্তব্য শুনে যাতে পাঠক আবার আশাবাদী না হয়ে যান সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হলঃ “বিরোধী দল এখন যতই ফ্রেশ নির্বাচনের দাবি জানাক সেটা ঘটবে না; তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকা এর পক্ষে কোনো আগ্রহ নিয়ে হাজির হবে বলে মনে হয় না”।’ [The opposition can keep demanding fresh elections but that will never happen. It is unlikely that either the US or the EU will strike a particularly harsh posture on the quality of Sunday’s election …… ]

    এই হলেন কাঞ্চন গুপ্ত ও ভারতের মিডিয়ায় তাঁর আবেগহীন পর্যবেক্ষণ, যেটা এক অস্বস্তিকর প্রকাশও বটে।আর তার নিচের বাক্যটা হল চীনভীতি হতাশার। বলছেন, হাসিনা যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ কথাটি অনুসরণ করে সবার চেয়ে বেশি খুশি হবে আসলে চীন। [……would bear testimony to her claim that Bangladeshis have voted for development and progress. China would be more than willing to oblige.] তিনি বলতে চাইছেন এই বাক্য ত চীনের পক্ষে গেল!

    দুইঃ ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণ
    এবার দ্বিতীয় মিডিয়া মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া হল, ৩ জানুয়ারিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণের লেখা। তার লেখার শিরোনাম, “গণতন্ত্রের জন্য বা ভারতের স্বার্থের জন্য এটা কোনো অর্জনই নয়”।[No gain for democracy, or for India’s interests]। এছাড়া পরে বিস্তারে ভেঙে বলছেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল ঐ দেশের গণতন্ত্র অথবা দক্ষিণ এশিয়া বা বাইরে ভারতের লংটার্ম স্বার্থের জন্য কোন অগ্রগতি বয়ে আনবে না”। [The Bangladesh election results are neither going to further democracy in that country nor India’s long-term interests in South Asia, and beyond.]
    তবে একটা মিলের দিক হল, ভরত ভূষণও উপরের কাঞ্চন গুপ্তের মত মনে করেন, “বিরোধীদের পুনর্নির্বাচনের দাবি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যাকে বিরোধীরা সরকারি দলবাজ বলছেন, সেও আমল করবে না”। কিন্তু ভরত ভূষণের অভিযোগ আরও খাড়া এই অর্থে যে তিনি খোদ হাসিনা সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তিনি মনে করেন, “সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটার বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন তাদের ইমেজ হারিয়েছে। মিডিয়াও সরকারি খবরদারির বয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। সরকার ও সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের মানে, এমন কর্তাব্যক্তিদের রেকর্ড আছে যে তারা বিরোধীদের ওপর হামলা করেছেন। এ অবস্থার মুখে গণস্বার্থ নিয়ে কথা বলা বুদ্ধিবৃত্তির লোকেরা ও স্বাধীন ব্লগাররাও জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছে”।’ [Due to political manipulation by the State, the judiciary and the Election Commission have also lost their sheen in the country. The media has fallen in line with state diktats. Given a history of attacks by both state and non-state actors, public intellectuals and independent bloggers fear for their lives.]

    তবে ভরত ভূষণের মূল উদ্বেগের পয়েন্ট হলঃ তিনি লিখছেন, “ভিন্নমত প্রকাশ হতে দেয়ার সুযোগ না রাখায় দমবন্ধ পরিবেশে আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নমতের লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাতে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলা হচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যেই ইসলামী রেডিক্যালদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি আছে। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না রাখার ব্যর্থতা – এটাই যেকোনো ধরনের রেডিক্যাল রাজনীতির জন্ম ও বিস্তারের জন্য তা খুবই উর্বর ভূমি হিসেবে হাজির হয়। এধরনের অবস্থা-পরিস্থিতিগুলোই মানুষকে ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মিসর বা আলজেরিয়ায় ঘটেছিল। [The absence of democratic safety valves and with institutions of the state “weaponsied” against dissent, is a particularly dangerous situation for countries which have a significant presence of Islamic radicals. The failure of political processes creates a fertile ground for the expansion of radical politics. The people can then easily turn to Islamic radicalism, as happened in Egypt and Algeria.]।

    তিনি সঠিকভাবেই মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে বলছেন, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপগুলোকে অকেজো করে ফেলা হচ্ছে তড়িত নগদ কিছু ফল পাবার আশায় অথচ ক্ষমতাসীনেরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায় ইয়াদের হাতেই এটা হচ্ছে”। [The democratic institutions of Bangladesh have been eroded for short-term gains by those in power for a long time.]

    শেষ কথা হিশাবে তিনি বলছেন, “এ ছাড়া এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে আসন্ন স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব যা নিয়ে আসবে তা শেষ বিচারে এর ফসল চীনের পক্ষেই যাবে আর তাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ শুকিয়ে চিপার মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই দেখার বিষয় হবে। [China wants a strategic foothold in Bangladesh to counter the United States, and secondarily, India…….As this great game unfolds, it remains to be seen whether or not Indian intersts will get squeezed out of Bangladesh.]

    তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত তার মারাত্মক ক্রিটিকাল পয়েন্ট হল, তিনি এমন একতরফা নির্বাচনের নিন্দা বা অসম্মতি প্রকাশ করতে বলছেন, “ভারতের জন্য নিরন্তর যেটা ভয়ের বিষয় বাংলাদেশে কোন ইসলামি রেডিকেলের উত্থান আর সীমান্ত পেরিয়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা – এমন একপক্ষীয় নির্বাচন সেই আশঙ্কাকেই আয়ু দিবে। ভারতের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের দিক থেকে দেখলে পকেটে গানপাউডার নিয়ে ঘুরা এক বাংলাদেশের চেয়ে সুস্থির নিয়মতান্ত্রিক বাংলাদেশই ভারতের জন্য কাম্য”। [As for India’s primary bugbear, the rise of Islamic radicals in Bangladesh and its consequences across the border, a one-sided election may have given it a new  breath of life. In the long run, it might be easier to deal with a stable and democratic Bangladesh than one that may become a powder keg.]

    তিনঃ একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলী
    আমাদের তৃতীয় উদাহরণ হল, একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলির লেখা এক রচনা। সুমিতের পরিচয় হল, তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রফেসর। এ ছাড়া, তিনি আমেরিকান ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় কালচার ও সভ্যতা বিষয়ের রবীন্দ্র চেয়ারের অধ্যাপক। আর তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’(Foreign Policy)  পত্রিকায় ৭ জানুয়ারিতে।

    তার লেখার শিরোনাম হল, ‘বিশ্বের বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যর্থতার দিকে নজর করা উচিত”। [The World Should Be Watching Bangladesh’s Election Debacle]। আর এই লেখার দ্বিতীয় শিরোনাম হল, “ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটা তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে, ইসলামী চরমপন্থার অসুস্থ ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করেছে আর দেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে”। [The ruling party is making a mockery of the electoral process, pandering to Islamic extremists, and turning the country into an authoritarian state]। তাঁর অস্বীকৃতি প্রকাশের লক্ষ্যে খুবই কড়া কড়া শব্দ প্রয়োগ সন্দেহ নাই। যদিও এই লেখকের দেখার অবস্থান একজন ইসলাম-বিদ্বেষী আন-ক্রিটিক্যাল সেকুলারের। কিন্তু সেদিকটাকে পাশে ফেলে রেখে আমরা তাঁর কথা আমল করব এখানে।

    প্রথমত, তিনি একে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের (questionable results)’ নির্বাচন মনে করেন। তাঁর লেখা শুরুর দ্বিতীয় বাক্য হল এরকম  The questionable results ended in a sweeping victory …।] এবার তাঁর লেখা থেকে তিনটি বুলেট বাক্য উঠিয়ে আনব এখানে।

    তিনি মনে করেন- ১. ‘সস্তা রাজনৈতিক লাভালাভের স্বার্থে এই দল (মানে আওয়ামী লীগ) ধর্মীয় সহিংস দলের উত্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভোটারদের [হেফাজতের সাথে আপোষ সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন] সাথে আপস করেছে। [For reasons of political expediency the party has failed to fashion a concerted strategy to curb the rise of such religious militancy; it prefers to court religious voters.]
    ২. আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী বিজয় বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর, যেখানে গণতন্ত্রের আলখাল্লায় ঢেকে এটা এক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি পয়দা ও সংহত হতে সাহায্য করবে। [The Awami League’s questionable electoral victory is bad news for Bangladesh, where it will aid the consolidation of an authoritarian political order with a democratic facade.]
    ৩. এই দানব ক্ষমতার বিরোধীদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমল না করার একমাত্র চিহ্ন নয়। [The regime’s hostility toward the opposition was not the only marker of its disregard for democratic procedures.]

    উপরের বাক্যগুলো নিজেই নিজের ব্যাখ্যা, তাই বিস্তারে যাওয়া হল না। তবে এছাড়া, সবশেষে সুমিত গাঙ্গুলিও মনে করেন, “ট্রাম্প বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না। এর বদলে আফগানিস্তানে আমেরিকার ভবিষ্যত নিয়েই সে বেশি চিন্তিত। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা বাংলাদেশের সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিক করা বা ঘাটতি পুরণের জন্য শক্তি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না”। [Finally, the Trump administration, to the extent it has devoted any attention to South Asia, has mostly been preoccupied with the future of the U.S. involvement in Afghanistan. It has paid little attention to political developments in Bangladesh or elsewhere in the region. Consequently, it seems highly unlikely that Washington will expend much energy, let alone political capital, to address the shortfalls of this election.

    চারঃ প্রাক্তন সচিব অভিজিত চক্রবর্তী
    চতুর্থ ও শেষ উদাহরণ টানব অভিজিত চক্রবর্তীর লেখা। অভিজিত ভারত সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সাবেক বিশেষ সচিব ছিলেন বলে লিখেছেন। অনুমান করা হয়, এ ধরনের বিশেষ সচিবের মানে এরা আসলে গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা হয়ে থাকেন। সে যাই হোক, তার লেখা ছাপা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে, (Economic Times), ৭ জানুয়ারি।

    তার লেখার শিরোনাম, “বাংলাদেশের রাজনৈতিকতা রেডিক্যাল হয়ে যাচ্ছে ভারতের শঙ্কিত হওয়া উচিত”। [India should be wary of radicalisation of Bangladesh’s polity]। রেডিক্যাল বলতে আমরা সাধারণভাবে সব ধরনের “সশস্ত্র রাজনীতি” বলে  বুঝতে পারি। যদিও তিনি এখানে সুনির্দিষ্ট করে ইসলামি রেডিক্যাল বুঝাতে চেয়েছেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি এক মারাত্মক হাতেগণা অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। বলছেন, “আওয়ামী লীগের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয় এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের সংখ্যার ব্যবধানে বিজয় দেখানো, এই নির্বাচন পরিচালনাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে; বিশেষত যদি, আমরা বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত সমর্থক ভো্টার ভিত্তির কথা মনে রাখি”। [The win in over 90% of the seats contested by the Awami League and some with astounding victory margins have contributed to the questionable conduct of the elections, given the committed vote base of the BNP and JeI. অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই ৯০% এর বিজয় যদি মানি তাহলে একা বিএনপির প্রায় স্থায়ী ভোটার বেজ ৩০-৩৫% যা বলা হয় সেটাকে ব্যাখ্যা করব কী করে? এছাড়া জামাতের ভোট ত আছেই!

    এছাড়া তিনি আরও বলছেন, ‘এই নির্বাচন শুধু বিরোধীরা নয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ; তারা এর তদন্ত দাবি করেছেন”। [The latest election falls short of widespread acceptability as not only the opposition parties, but also the EU and US have questioned the process and demanded investigation into the reports of harassment, intimidation and violence.]

    এরপর তিনি সবশেষে একটা মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন, “এসব ফ্যাক্টর একটা দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যে দেশ অতীতে ধারাবাহিকভাবে বিরতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখে এসেছে”। [All these factors may pose a challenge to the establishment of a stable democracy in a country that has seen periodic military interventions in the past.]।
    স্যরি, অভিজিত চক্রবর্তীকে বলতেই হচ্ছে, এই শেষ বাক্য তিনি না জুড়ে দিলেই ভালো হত। সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে এই মন্তব্য খুবই হাল্কা ও উস্কানিমূলক হয়েছে। এতে তিনি নিজের বিদ্যাবুদ্ধি, পেশা, তথ্য যোগাড় ও দক্ষতার মান নিচে নামিয়ে দিলেন।

    সে যাই হোক তিনি হেফাজতের সাথে আওয়ামি লীগের আপসে চরম ক্ষুব্ধ। তিনি বলছেন, “গত দশ বছর তিনি শাসন ক্ষমতায় একনাগাড়ে থাকলেও ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এতে সমাজে দেশের ইসলামী পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির সামাজিক সুবাতাস পেয়েছে”। [The wooing of radical elements by all the political parties is an indication that despite 10 years of the Awami League government, the societal winds continue to favour a strong Islamist identity in the country. ] এটা বেশ ইন্টারেস্টং যে তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে “ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে” প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
    তবে তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন, “এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বাংলাদেশকে রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়া হল”। এ ছাড়া সেকুলারিজমের মৌলিক বীজ ও চিহ্নগুলোকে ক্ষয়ে ফেলা হয়েছে। [The erosion of secular ethos will not only affect minorities, ………. ] ফলে তিনি এবার এক সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। বলছেন, সব মিলিয়ে “এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত”।  [These developments could pose security challenges for India, especially in the northeast.] অর্থাৎ তার কথা সঠিক বলে মানলে হাসিনার এ নির্বাচনী ফলাফল ও পরিচালনা ভারতের জন্য নিরাপত্তার ক্ষতি বয়ে এনেছে বা আনবে।
    এসব কথার সূত্র ধরে তিনি এবার নতুন হাসিনা সরকারে চীনের প্রভাব বেড়ে যাবে বলে দেখছেন। তাই তার শেষ কথা “ভারত এসব দেখে শঙ্কিত না হয়ে” ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
    তার পু্রা কথার মধ্যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলছেন আর এতে তিনি ভারতের জন্য বিপদ দেখছেন।

    সবশেষেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
    আনন্দবাজার পত্রিকার উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। এটা ১ জানুয়ারির রিপোর্ট, শিরোনাম হল– ‘ভোটে জিততে মুখ চাই, কংগ্রেসের হারের সাথে বিএনপির মহাবিপর্যয়ের তুলনা টানলেন হাসিনা।’ আনন্দবাজারের শিরোনাম এমন পেঁচানো হয় যে, খবরটা আগে পড়া শেষ না করলে শিরোনামের অর্থ জানা যায় না। এই রিপোর্টেরও সারকথা – আনন্দবাজারেরও একই উদ্বেগ, জয়লাভের পারসেন্টেজ বেশি হয়ে গেছে- বিরোধী দল থাকল না।

    লিখেছে, “ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে, জাতীয় পার্টি এবং আরও ৬টি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনার মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি”।  অর্থাৎ সরকারি জোট একাই ৯৭% আসন পেয়ে গেছে। “সেই অর্থে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আর তেমন কোনো অস্তিত্বই থাকল না”। এই হল আনন্দবাজারের উদ্বেগ। এখন এখানে এক তামশা দেখলাম আমরা। আনন্দবাজারের এই উদ্বেগ তাড়াতে একপর্যায়ে উপায় না পেয়ে হাসিনাকেই বলতে হল, “আগামীতে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসে যেতে পারে”। এর উদাহরণ হিসেবে বললেন, “আজকের বিজেপিও তো একসময় ভারতের সংসদে মাত্র দু’টি আসন পেয়েছিল”। এ ছাড়া, হাসিনাকে বিএনপির হারের ব্যাখ্যাও নিজেই কান্ধে নিয়ে দিতে হয়েছিল। হাসিনা ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিএনপি জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি না বলাতেই নাকি তারা মূলত হেরেছে।
    যা হোক সারকথাটা হল, ৯৭ শতাংশের মত আসন পেয়ে আওয়ামি লীগের শান্তি ছুটে গিয়েছে। উল্টো আওয়ামী লীগকেই বিএনপির আগামী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আপাতত নিজের জিতবার সাফাই দিতে হয়েছিল।

    তবে এর বাইরেও অনেক রিপোর্ট, মন্তব্য, কলাম আছে পাওয়া যাবে; যা এখানে আনা হয়নি। যেমন সরাসরি ট্রাম্পকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছে এমন রচনাও আছে। তবে ভারতের এসব মুল্যায়ন প্রকাশের সাধারণ সুরটা হল, এই নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ভারত আগামী দিনে নিজ দেশের জন্য লুকানো বিপদ বলে মূল্যায়ন করছে। সে কারণেই এত অস্বস্তি।
    আর একটা সোজা ফ্যাক্ট হল, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এতে যে ঐ খালি জায়গার দখল পাচ্ছে সেই লাভের ফসল যাচ্ছে মূলত চীনের ঘরে। কারণ, রাজনৈতিক অধিকারের (Political Right) বদলে “উন্নয়নের রাজনীতির” – হাসিনার এই রাজনীতিতে বিজয়ের সোজা অর্থ -ক্রমশ  হাসিনার কাছে আপন হয়ে উঠবে চীন যেখানে ভারত হবে তুচ্ছ, পরাজিত পার্টি! যার অন্তত কিছু কারণ ভারতের কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই। আর আমেরিকার হবু কোন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রায় নাই বলে এর বিরুদ্ধে  ভারতের সুপারিশ আর জরুরি না।  যার ফলাফল, চীনের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ এক বাংলাদেশ। আর তাতে ততই শিরশিরে ঠাণ্ডা চিলিং অনুভুতির এক ভারত – হতে দেখছি আমরা।
    এ ছাড়া মানুষের রাজনৈতিক অধিকার  দাবড়ে রেখে হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো, “উন্নয়নের রাজনীতির” আওয়াজে সব আড়াল করা এসব কিছুর ফলে  সত্যি সত্যিই  রেডিক্যাল – শুধু ইসলামের নয় যেকোন – রাজনীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, সেটা তো আছেই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “‘ভূমিধস’ বিজয়ে ভারতের মিডিয়ার শঙ্কা“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

    চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

    গৌতম দাস

    ২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2w6

     

    নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং – ফাইল ছবি

    আমরা এমন এক দুনিয়ায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলে। শুনতে স্ববিরোধী মনে হলেও কথাটা সত্য। আর তা বোঝার জন্য কথা আরো ভেঙে বলা যেতে পারে। এখন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একই সাথে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলে, এজন্য যে এখন কূটনীতি চলে ইস্যুভিত্তিক। ইস্যুটা কী – আলাদা করে শুধু সেই ইস্যুর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের অবস্থান বা নীতি-পলিসি নিতে হয়। তাই অপর রাষ্ট্রের সাথে একটা ইস্যুতে মিত্রতা বা আপসের একই অবস্থান আছে, অথচ দেখা যাবে হয়ত অন্য ইস্যুতে অপর ঐ রাষ্ট্রের সাথেই শত্রুতা, মানে প্রবল ঝগড়া-দ্বন্দ্বের অবস্থান দাঁড়াতে পারে, দাঁড়াতে হয়। এর অনেক উদাহরণই আছে, তবে এব্যাপারে সম্ভবত সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, চীন-ভারত সম্পর্ক।

    ভারত-চীন দুই রাষ্ট্রের নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত বর্তমানে অন্তত চলতি বছরের প্রথম কোয়ার্টার থেকে খুবই নরম ও ঐক্যকামী। কিন্তু এশিয়ার তৃতীয় যে কোনো রাষ্ট্রে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়া দেখা গেলে ভারত এর বিরুদ্ধে চরমতম বিরোধীতায় ততপর। সম্পর্ক-অবস্থান ইস্যুভিত্তিক বলে, ভারত-চীনের এমন খারাপ-ভাল অথবা উত্থান-পতনের সম্পর্কের মাঝেও তাদের এক বড় সফলতা হল য়ুহান সম্মেলন (Wuhan, April 2018)। এটা ছিল যারা ভারত-চীনের ঘনিষ্ঠতায় নিজের স্বার্থহানি দেখেন এমন প্রো-আমেরিকানদের মুখে ছাই দিয়ে, চীন-ভারতের প্রথম কাছাকাছি আসার ভিত্তি তৈরির উদ্যোগে, চীনের য়ুহান শহরে শীর্ষ সম্মেলন।   প্রধান সব রাষ্ট্রের আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির উপর ট্রাম্পের  বাড়তি ট্যারিফ শুল্ক আরোপের যুদ্ধে ভারতকেও তালিকায় যুক্ত করাতে ভারত আমেরিকায় রফতানি বাজার হারানোর পর থেকে এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু। এতে চীন-ভারতের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধে তা পুরা মিটিয়ে না হলেও কমিয়ে আরও কাছাকাছি আসার বিরাট উদ্যোগ ছিল এটা। মোদী চীনের য়ুহান প্রদেশ সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক বিশেষ ধরনের বৈঠকে বসেছিলেন। এই সম্মেলন আর এর প্রবল প্রভাবের কাল ছিল এ বছরেরই গত এপ্রিল-মে মাসজুড়ে।

    এটা বিশেষ ধরনের বৈঠক মানে এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে এখানে বলা হয়েছে, এটা ছিল এক “ইনফরমাল সামিট”; মানে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন। অর্থাৎ যে বৈঠকের কথা বিস্তারিত প্রকাশ করতে হবে না। আবার কোনো ইস্যুতে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটি যেহেতু অনানুষ্ঠানিক, তাই এমন বা অমন কথা হয়েছে সে রকম কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড [রেকর্ড অবশ্যই থাকবে কিন্তু তা কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে রেফার/স্বীকার করা হবে না। ] রাখার দায়ও কোনো পক্ষের নেই। এ এক বিরাট সুবিধা। বিশেষ করে ভারতের। কারণ, ভারতে রাজনীতি চর্চার স্টাইল ভোটের সস্তা পপুলিস্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অন্য বিরোধীরা বিদেশে আপোষ করে এসেছে বলে প্রপাগান্ডার নানা অভিযোগ তুলে বসে। আর এই ভয় থাকার কারণে কিছু বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অনেক বিরোধ আর কাটে না।

    এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল, পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতের যেকোনো সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ। এই বিচারে য়ুহান সম্মেলনে আলোচনার কাঠামোই এমন ছিল যে, এখানে সেসব সমস্যা নেই। ফলে এই সম্মেলনে চীন-ভারতের বহু বা প্রায় সব ইস্যুতে দুই শীর্ষ নেতা মন খুলে কথা বলেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণ রাখার ভয় ভুলে, না রেখে বা ফরমাল নোট না রেখে। দোভাষী ছাড়া অন্য কোনো সহায়ক ব্যক্তিকেও কোনো পক্ষ সাথে সেখানে রাখেন নাই।

    অথচ এখানেই উভয়পক্ষ বহু বিষয়ে বিরোধ মীমাংসার মৌলিক নীতিগত দিক সেটেল করেছেন। যাতে এই মৌলিক নীতিগত দিকের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বহু অমীমাংসিত ইস্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান টানা হতে পারবে। এটি ছিল এই সম্মেলনের বড় সুবিধা।

    তবে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি নিয়ে চলার দুনিয়ায় আমরা এসে পৌঁছানোতে কি ব্যাপারটা খারাপ হয়েছে?  না, অবশ্যই নয়। তাহলে খারাপের ধারণা কেন আসছে?  আসলে ‘খারাপ’ হতে পারে এই ধারণাটাই হল – কোল্ড ওয়ার আমলের (১৯৫০-৯১) চিন্তার অভ্যাসে বলা কথা। কারণ, কোল্ড ওয়ার মানেই দুনিয়াকে পরস্পর দুই শত্রুর দু’টি রাষ্ট্রের গ্রুপে – সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা এভাবে দুটো ব্লকে দুনিয়াকে ভাগ করে ফেলা। এটা এমনই ব্লক যে, এখানে শত্রুতা ছাড়া অন্য কিছুর জায়গাই নেই। একেবারে হিন্দু জাতপ্রথার ছোঁয়াছুঁয়ির মত দুই রাষ্ট্রজোটের পরস্পরের সাথে সম্পর্কহীন থাকা আর শত্রুতাই এর একমাত্র বাস্তবতা। তবে আলোচ্য এখানকার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল, কেন এমন সম্পর্কহীনতার দুই ব্লক সেকালে চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল? এর জবাব হল, মুল কারণ যেহেতু দুই ব্লকের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, তাই এটা টিকে ছিল। অর্থনৈতিক বা বিনিময় সম্পর্ক মানে হল – কোনো পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগ এর বিনিময় সম্পর্ক। ফলে এমনকি কোনো ভাব বিনিময় সম্পর্কও সেখানে ছিল না। তাই সম্পর্কহীনতার দুই রাষ্ট্রজোট বা ব্লক চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল।

    বিপরীতভাবে বললে, এ কালে সম্পর্কহীনতার এমন কোনো দুই ব্লক থাকা সম্ভব নয়। অথবা ইতিবাচকভাবে বললে, একালেই ‘য়ুহান ইনফরমাল সামিট’ সম্ভব। কেন? এর মূল কারণ দুনিয়ায় এখন আগের সোভিয়েত ব্লকের সকলেসহ সব রাষ্ট্র একই “গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার” – এর নিয়মশৃঙ্খলার অংশ। তাই সবধরণের পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগসহ সব ধরণের বিনিময় সম্পর্ক ওতপ্রতভাবে জড়িত। ভাব-ভাষাও।

    পুঁজির জন্ম-স্বভাব হচ্ছে গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবাল থাকা; তাই সে দুনিয়াজুড়েই বিস্তৃত হবে। লোকাল পুঁজি বা কেবল কোন এক ছোট ভুগোলের পুঁজি বলে কিছুই থাকবে না। তাই, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের প্রতিটি কোনায় বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া পুঁজিতান্ত্রিক তৎপরতাগুলো ক্রমেই অপরাপর কোণের ততপরতাগুলো এরা পরস্পরের হাত ধরে ফেলবে, আর ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতরভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাবে। আর এই সম্পর্ক মানে? মনে রাখতে হবে, এটা হল পরস্পরের ওপর পরস্পরের গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক সম্পর্ক। এক গ্লোবাল সমাজ হয়ে উঠা। আবার একই ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার’ – এই সিস্টেম শৃঙ্খলার অংশ বলেই এটা সহজ এবং তা হতে বাধ্য। এই ইতিবাচক দিকটিই চীন-ভারতের চরম স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাতের মধ্যেও “য়ুহান ইনফরমাল সামিট” ঘটিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছিল।

    চলতি ২৩-২৪ নভেম্বর ২০১৮, চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার ২১তম বৈঠক শুরু হয়েছে। ২১তম মানে এ ধরনের বৈঠকের শুরু অনেক পুরানা দিনে, সেই ২০০৩ সালে বাজপেয়ির চীন সফর থেকে। চুক্তি বা বুঝাবুঝি অনুসারে এর বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দুই রাষ্ট্রপক্ষের পূর্বঘোষিত স্থায়ী দুই ‘স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ থাকবে। আর তাদের উদ্যোগে ডায়ালগের মাধ্যমেই চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধের সমাধান তারা খুঁজবে। ভারত-চীনের সীমান্তের অনেক জায়গায় উভয়পক্ষের একমতে টানা সীমান্ত বা ‘ডিমারকেটেড’ বা চিহ্নিত নাই। এই অচিহ্নিত সীমান্ত সমস্যা সেই কলোনি আমল থেকে, এটা অমীমাংসিত হয়ে থেকে যাওয়া সমস্যা। সেটাই মিটানোর চেষ্টাই এর উদ্দেশ্য। সে হিসেবে এই বৈঠক এখন রুটিনের মতো হয়ে গেলেও য়ুহান ‘ইনফরমাল সামিট’-এর পরে এর গুরুত্ব এবার অনেক বেশি। কেন?

    কোনটা, কত দূর কার সীমানা – সে ব্যাপারে উভয়ের একমত হয়ে এভাবে পুরো চীন-ভারত সীমান্তকে ‘চিহ্নিত সীমানা’ হিসেবে এঁকে ফেলা অবস্থায় পৌঁছানোই ‘এমন বিশেষ বৈঠক’ উদ্যোগে এবারের লক্ষ্য।  এখানে LAC বা ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ বলে উভয় পক্ষের একমতে একটা ধারণা আছে। সেটা হল, এক মতে “সীমানা চিহ্নিত” করে ফেলার আগে এখন সীমান্ত-ভূমি যেখানে যার দখলে যা আছে ও স্থিতাবস্থায় আছে, সেটাকেই উভয়ে “লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি” বলে মানে। যেটাকে আসলে “অস্থায়ী কিন্তু বাস্তব সীমানা’ বলা যায়। এবারের ২১তম আলোচনায় উভয়পক্ষ এখানেই এক নীতিগত জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। তা হল, সীমানা বিরোধ মিটানোর কাজে অগ্রগতি আর কিছু হোক আর না-ই হোক, বর্তমান এলওসি বা “অস্থায়ী বাস্তব সীমানা”- এটাকেই উভয়পক্ষ ‘বেস্ট অপশন’ বা সবচেয়ে ভাল সমাধান বলে মেনে নিবে। [“best option is “as it is; where it is”.] এ বিষয়ে উভয়ের ঘোষিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। এরপর আরও আলোচনা চলবে উভয়ের একমতে এরচেয়েও ভাল সমাধান খুঁজে পেতে।

    সুতরাং চীন-ভারতের সীমান্ত আলোচনায় “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” কথাটার বিশেষ মানে আছে। এখানে ভারত-চীন কাকে নিজ নিজ পক্ষের “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” বলে ঘোষণা করে রাখবে – সেটা এপর্যন্ত দেখা অভিজ্ঞতা বলছে এটা চলতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নিরাপত্তা  উপদেষ্টা অথবা চীনের ক্ষেত্রে পলিটব্যুরোর বিশেষ সদস্যকেও হতে দেখা গেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এবার থাকবেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। আর চীনের দিক থেকে ছিলেন  পলিটব্যুরোর এক বিশেষ প্রভাবশালী সদস্য। এবার সভা থেকে তাঁর বদলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই দায়িত্বে পাবেন। আসলে “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” এরা মূলত সীমান্ত ইস্যুতে কথা বলার জন্য হলেও এর একটা স্থায়ী দায়ীত্বের পোস্ট বলে এদের কিছু আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ উভয়পক্ষ বাড়তি ইনফরমালি অনেক মনের কথা বলার সুযোগ ও দায়িত্ব এরা পালন করে থাকে। যেমন এরা এবার চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ”(BRI) [ এতে যোগ দেওয়ার অফার এপর্যন্ত ভারত ফিরিয়ে দিয়ে আসছে ] নিয়েও কিছু কথা বলবেন।  ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে,  “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” অজিত দোভাল এলএসি, বিআরআই এবং অন্যান্য ইস্যুর সাথে নিরাপত্তা নিয়েই কথা বলবেন। [Ajit Doval will discuss security along the Line of Actual Control (LAC), belt and road initiative (BRI) and other issues]।

    ভারতের এক প্রাক্তন কূটনীতিক এমকে ভদ্রকুমার। ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান; মানে প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নিতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি হাতেগোনা দু-তিন কূটনীতিকের মধ্যে একজন, যিনি তা নন। উজবেকিস্তান ও তুরস্কে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভদ্রকুমার, যিনি ভারতের ভবিষ্যৎ আমেরিকার মধ্যে দেখেন না। সেই ভদ্রকুমার দেখছেন, চীনের সাথে ভারত তার নানান বিরোধের ইস্যুগুলো মিটাতে এখন প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠতে; একালের চলতি সময়ে মোদির ভারতকে।

    অবশ্য শুধু সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার বৈঠক দেখে তিনি এ কথা বলেননি। তিনি আরো এক ইস্যু দেখেছেন। এই ১৩-১৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটা আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ মোট ১৮ রাষ্ট্রের এক সম্মেলন; যার শুরু হয়েছিল আসিয়ান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সাথে অন্যান্য ইস্ট এশিয়ান রাষ্ট্রকে নিয়ে। অর্থাৎ এখন এতে বাড়তি অনেককেই সদস্য করে নিয়েছে।

    এবারের এই বৈঠক থেকে চীনের অর্জন অনেক। এখানে চীন-সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপগ্রেড ভাষ্য) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভদ্রকুমার বলছেন,  এতে এই প্রথম “বেল্টরোড উদ্যোগ”ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। [One highlight is the signing on Monday of an upgraded Free Trade Agreement between China and Singapore to include Belt and Road Initiative for the first time.] বলাই বাহুল্য, যারা চীনের ‘বেল্টরোড উদ্যোগে’ অন্তর্ভুক্ত হতে আপত্তি বা দ্বিধা করে থাকে, তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম ছিল। বিশেষ করে যেখানে আবার পশ্চিমের কাছে সিঙ্গাপুর এক বিশেষ অর্থ ও গুরুত্ব বহন করে। যেখানে তারা সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলেছিল ফ্রি-পোর্টসহ পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের এশিয়ান স্টোর/গোডাউন হিসেবে; আর একই সাথে ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ পুঁজির স্থানীয় বা বর্ধিত অফিস হিসেবে। এই হল ফ্রি-পোর্ট সিটির সিঙ্গাপুর; মানে বিনা মাশুলে পুনঃরফতানিযোগ্য করে নিয়ম বানানোর সিঙ্গাপুর। পশ্চিমের সেই সিঙ্গাপুরে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগকে একালে জায়গা করে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, আজকাল খোদ সেই সিঙ্গাপুরও চীনের ওপর কত বিরাট নির্ভরশীল। সেটা কী রকম?

    পশ্চিম চীনের সাথে বহু সম্পর্কই করে থাকে সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, সিঙ্গাপুরে অফিস খুলে। যেমন একটা উদাহরণ দেই। আজকাল চীনে উঠতি সম্পদের মালিক যারা, এমন যাদের এক মিলিয়ন ডলার বা এর বেশি অর্থ বাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আছে – এমন এদেরকে বাজারে নিয়ে আসা সহজ করতে সাহায্য করতে, এমন ব্যক্তি ক্লায়েন্টদের ধরতে আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে অফিস খুলেছে। আর সেখান থেকে তাদের রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা চীনে সরাসরি ক্লায়েন্টদের বাসা সফর করছে। ফলে সার কথায় সিঙ্গাপুর আর কেবল পশ্চিমের এক্সটেনডেড দোকান থাকেনি, চীনেরও হয়ে উঠছে। তাহলে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগে নতুন অন্তর্ভুক্তি, সেটা শুধু কি সিঙ্গাপুরই?

    না আরো আছে, আরও বড় সে নাম হল খোদ জাপান। কারণ কী? ব্যাপারটা হল, চীনের নতুন এক সিদ্ধান্ত। এমনিতেই চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগ এক বহুরাষ্ট্রীয় (৬৫ রাষ্ট্রেরও বেশি) অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প। ফলে ভুগোলের বিচারে এতে বিনিয়োগ সুযোগের বড় অংশই চীনের বাইরে। চীন ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগের’ অংশ হিসেবে তৃতীয় রাষ্ট্রে চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগে সিঙ্গাপুর বা জাপানকে সংশ্লিষ্ট হতে চীন অফার (Investment in Third Country) দিয়েছে। এতে সিঙ্গাপুরের মত জাপানও প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

    ওদিকে সবকিছুর পালটা কিছু থাকে। তাই, এশিয়ায় চীনের ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’-এর পাল্টা আমেরিকান নেতৃত্বের যে উদ্যোগ আছে, সেটি মূলত “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি” নামে হাজির আছে। আর এর সহযোগী উদ্যোগ হল “কোয়াড”(QUAD) , মানে চীনবিরোধী ‘আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া’ এই চারদেশীয় জোট। কিন্তু কখনই এই চার দেশ একসাথে একমতে খাড়া হতে পারেনি। কমন ভাষায় একটা বিবৃতি দিতে পারে নাই। এর মূল কারণ, এরা সবাই চীনের সাথে নানান ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িয়ে আছে আবার একই সাথে অন্যন্য স্বার্থবিরোধে জড়িয়ে থাকার কারণে আমেরিকার সাথে এক কমন প্লাটফর্মে আসতে চেয়েছে কিন্তু বড় কিছু করে দেখাতে অসফল। ফলে সব সময়ই দেখা গেছে এই চারের কেউ একজন চীনের সাথে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাবল্য অনুভব করে বাকিদের সাথে থাকেনি।

    ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’ চীনের সাথে তৃতীয় রাষ্ট্রে যৌথ বিনিয়োগের অফার পাওয়া জাপান, তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝাতে ভদ্রকুমার কিছু ঘটনা টেনেছেন। তাঁকে এক জাপানি কূটনীতিক বলছেন, “আমাদের কিছু আসিয়ান সদস্য বেল্ট-রোড উদ্যোগের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে তুলনা করতে পছন্দ করছে না”। [“Some ASEAN members didn’t like the idea of having to make a choice between an Indo-Pacific strategy and the Belt and Road Initiative]।  ফলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে এরপর “ইন্দো-প্যাসিফিক” শব্দটি বলা বন্ধ করেছেন। তা না বলে এর বদলে বলছেন “ভিশন”। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাপানি কর্মকর্তা বলছেন, আসলে “স্ট্র্যাটেজি শব্দটির মধ্যে অন্য রাষ্ট্রকে পরাজিত করানোর একটা অর্থ লেপটে আছে, সে কারণেই এই পরিবর্তন”। অর্থাৎ জাপানও কোয়াড থেকে নিজেকে দূরে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ছাড়া ছাড়াভাবে চলা কোয়াডের যুগ্মসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকে ভারত যোগ দিচ্ছে। সেই রেফারেন্স তুলে ভদ্রকুমার বলছেন, জাপান ভারতকে পেছনে ফেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেল। এভাবে এশিয়া-প্যাসিফিকের ভূকৌশলগত অবস্থা পরিস্থিতিই বদলে যাচ্ছে। আর মোদির ভারত এতে বিরাট কিছু সুবিধা হারাচ্ছে, অথচ নিজ অবকাঠামোগত সুবিধা পাওয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

    শেষ কথাঃ
    শেষ বিচারে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক গন্তব্য-অভিমুখ হল তাদেরকে পরস্পর ঘনিষ্ট হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে হাত ধরে উঠে দাঁড়ানো। আমেরিকা দুনিয়ার অতীত, যেখানে চীন আগামি। ভারতকেও আগামির অংশ হওয়ার খাতিরে খাবলা-সুবিধা নেয়া ত্যাগ করে স্থির-পক্ষ নিতে হবে। কিন্তু মায়ের দুষ্ট ছেলের মত প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে ভারত প্রায়ই টেবিল ছেড়ে চলে যায়; যার অনিরাপদবোধও আছে। এসবের মানে আবার এই না যে চীনের সিদ্ধান্ত বা অবস্থান সবসময় ফেয়ার বা বেস্ট হয় বা থাকে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন-ভারতের শত্রুতা ও মিত্রতা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

    ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

    গৌতম দাস

    ২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

    https://wp.me/p1sCvy-2vW

     

     

    এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

    হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

    সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

    প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

    এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

    কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

    মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

    এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
    বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

    চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

    তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

    ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

    গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

    তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

    তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

    তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

    যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

    ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

    শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

    তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

    নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

    গৌতম দাস

    ২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2sO

    Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

    তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

    তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

    কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

    এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

    ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
    নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

    তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

    শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

    তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

    অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

    তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

    তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

    চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

    সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

    অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

    [Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

    তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

    তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

    ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

    [New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

    এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

    ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

    একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

    এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
    আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

    না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

    আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

    বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

    ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

    কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

    আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

    তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

    তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]