Category: CHINA

  • নির্বাচন হয়েই যেতে পারে, এনিয়ে ভারতই ভীত! কেন?

     

    নির্বাচন হয়েই যেতে পারে, এনিয়ে ভারতই ভীত! কেন?
    গৌতম দাস
    ০২ জানুয়ারী ২০২৪  রাত   ২০ঃ ২৬
    https://wp.me/p1sCvy-5fN

    বিবিসি থেকে নেয়া

     

     

    খুবই তাজ্জব সব ঘটনা! ‘র’-এর প্রপাগান্ডা মুখপাত্র সেজে চলা সুবীর ভৌমিক এক নয়া লেখা ছেপেছেন গতকাল। এতদিনের বাংলাদেশ নিয়ে ‘র’-এর হয়ে প্রপাগান্ডা (যেমন সুবীর, আবদি বা চন্দন নন্দী ইত্যাদি) মুখপাত্রদের অবস্থান ছিল আমেরিকান স্যাংশন ও চাপে বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনার আবার জিতে আসা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ভারতের স্বার্থের কী হবে!!! এনিয়ে সরাসরি নাকি-কান্নায় সবচেয়ে আগিয়ে ছিলেন আবদি! আর এবার সেই তুলনায় একেবারে উল্টারথ অবস্থানে সুবীর ভৌমিক! তিনি হাসিনার নির্বাচন সম্পন্ন যেন না হয় সহানুভুতি ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আর এই সহানুভুতি ঘুরানোর পক্ষের কিছু উদাহরণ টানতেই বাংলাদেশে আর্মি ইলেকশনের ডিউটিতে যেতে চাচ্ছে না দাবি করে এবার তাঁর লেখা লিখেছেন। যদিও সুবীরের লেখার সত্য-মিথ্যা আমরা জানি না।

    কাজেই সুবীরের লেখার মুডটা আমাদের জন্য প্রধান ইস্যু!  সেটা হল যে, হাসিনার নির্বাচন আরামে সম্পন্ন হয়ে যাক এর পক্ষে তো নয়ই বরং বিপরীতে, মানে হাসিনার “এমন করাটা ভাল হবে না” এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তিনি বলছেন,  বাংলাদেশে আর্মি ইলেকশনের ডিউটিতে না যেতে চাওয়া মনোভাব নাকি বাড়ছে। যুক্তি হল নাকি, এই নির্বাচন বিতর্কিত। দেশে-বিদেশে সরকার ও সাংবাদিকেরা এর অগ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ক্রমাগত লিখে চলেছে। ফলে সরকারের এমন জনস্বার্থবিরোধী ততপরতার কারণে এর সাথে আর্মি প্রতিষ্ঠানটাও কালার হয়ে বা দাগ লেগে যাবে। এনিয়েই তারা উদ্বিগ্ন”। সুবীরের কথা সত্য-মিথ্যা আমরা জানি না। অন্তত প্রকাশ্যে বা মিডিয়ায় এমন নিউজ চোখে পড়ে নাই।
    যদিও এটা বুঝা কঠিন না যে বাংলাদেশ আর্মির একটা উভয় সংকট আছে। তা হল, একদিকে সরকার নির্বাচনে তাদেরকে নিয়োগ চাইছে এর কী হবে? আর বিপরীতে এতে কী তাদের এই বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ হয়ে যাবে? দেখা হবে? যেখানে, জাতিসংঘের দিক থেকে সাধারণভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে আমাদের বাহিনীকে সংশ্লিষ্ট হতে সতর্ক করা আছে! তা কী লঙ্ঘন বলে দেখা হবে? এমনিতেই এই নির্বাচন নিয়ে নিয়ে জাতিসংঘ এটাকে খুবই নেগেটিভ মার্কিং ও মূল্যায়ন করছে ও আরো করবে। আর এটা এখন প্রকাশ্য যে, ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ আমাদের নির্বাচনে নিজ সহায়তা বা সংশ্লিষ্ঠতা বুঝায় এমন সব কাজ থেকে দূরে সরে গেছে। এই অবস্থায় এটা জাতিসংঘের কাছে আমাদের সেনাদের ইমেজ ভাল হবে না এমন শঙ্কা জোরদার করবে সন্দেহ নাই।  আর অনেকেই বোধহয় জানেন যে জাতিসংঘের কাছে আমাদের রাষ্ট্রের গত ১৫ বছরের গুম-খুন-অপহরণ ঘটার অভিযোগ আর অন্যদিকে তাতে আমাদের বাহিনীর সংশ্লিষ্ঠতার অভিযোগের কারণে এখনকার জাতিসংঘের কড়া নির্দেশ হল, কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে আমাদের বাহিনী সংশ্লিষ্ট হতে পারবে না। হলে এতে মিশন তাদের জন্য আন-ওয়েলকাম বা  মিশন তাদেরকে চাচ্ছে না এমন হয়ে যেতে পারে। এই হল অনুমান।
    সুবীর  এই বাস্তবতাটাকেই কাজে লাগিয়েছে।  দাবি করেছেন, এঅবস্থায় এই নির্বাচনে ইলেকশনের ডিউটি করা মানে জবরদস্তিতে হাসিনা সরকারের নির্বাচন করে নেয়া ও আবার ক্ষমতায় থেকে যাওয়া কাজের মূল সহায়ক খুঁটি হিসাবে দেখবে দেশে-বিদেশে, এমন কথাও বলে বসেছেন। এটাকেই আমি বলছি সুবীর ভৌমিকের পল্টি দেওয়া। যারা এতদিন কেন আমেরিকা স্যাংশন দিয়ে হাসিনার সম্ভাবনা কমাচ্ছে এর পক্ষে যুক্তি দিত! কিন্তু এবার এমনকি আগের জেনারেল আজিজের ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনের ঘটনা-কর্তা হিসাবেও তার সাথে তুলনাও করেছেন। আর তা করে এখনকার বাহিনী যেন তা না করুক এমন সেদিকে সুবীরের কামনা ও সমর্থন দেখিয়ে তিনি এলেখা লিখেছেন। আর এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। এককথায় তা বললে, ইন্ডিয়া বা ‘র’-এর অবস্থান স্পষ্টত বদলে গেছে! তারা কী হাসিনার এই নির্বাচন ভন্ডুলের পক্ষে যেতে চাচ্ছে? সুবীরের এই লেখার ইঙ্গিত সেটাই!! সেই ইঙ্গিত যাই হোক – মুল প্রশ্ন হল, কেন? কেন এই বদলের আমরা দেখছি? ইন্ডিয়া বা ‘র’-এতদিনের কামনা, এত প্রিয় হাসিনার বিজয়ে এই অনিহা কেন?

    সাথে অন্যদিকে আবার বিবিসির বোমাঃ 
    এককথায় বললে এটা এক আনলাইক বিবিসি রিপোর্ট। এবং মনে রাখতে হবে, ইংলিশ বিবিসি-র রিপোর্ট এটা। আনলাইক বিবিসি মানে বিবিসি এমন করে লেখে না, এটা ব্যতিক্রম।
    আর বাংলা বিবিসির গুরুত্ব নাই কেন? মানে এই ইংলিশ রিপোর্টটা বাংলায় হলেও এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু ছিল না। বা দিতাম না! কেন?
    বাংলা বিবিসি – অর্থ-রাজস্ব আয়ের দিক থেকে মূল বিবিসির এক লুজিং কনসার্ণ। বাংলা বিবিসি এর স্টাটাস হল মূল ইংরাজি বিবিসিরও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় প্রচারিত এক প্রোগ্রাম। ঠিক যেমন উর্দু বিবিসি। কিন্তু এই ভেঞ্চারটা লাভজনক নয় এখন। সরকারের পক্ষে ভর্তুকি দিয়ে দিয়ে এটা চালানোতে তারা ক্ষমা দিতে চায়! এজন্য অনেক ছাটাইও হয়েছে।  আর সেটা করতে গিয়ে এর নীতিতেও কিছু বদল এসেছে। যেমন হাসিনা সরকার বা র-এর পক্ষে প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে আয় বাড়ানো। এমন নীতিবিরুদ্ধে কাজে বাংলাকে ছাড় দেয়া আছে। তবু যদি টিকে থাকতে পারে, এই ভেবে! এটা বাংলা বিবিসির বেলায় ছাড় কিন্তু ইংরাজি বিবিসি এটা নীতিগত কারণে করবেই না। অর্থাৎ বাংলা বিবিসি রিপোর্ট অর্থের লোভে প্রপাগান্ডা নিউজ হওয়াটাই বেশী সম্ভাবনা ও সুযোগ!  তাই, এই বিচারে বললাম এটা ইংলিশ বিবিসি তাই এই রিপোর্টের গুরুত্ব বেশী! এমনকি ইংলিশ বিবিসি – এতে বৃটিশ সরকারের অবস্থান প্রতিফলিত হয় এমন রিপোর্ট হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী! যদিও তা অপ্রকাশ্যে হবে এবং কাকতলীয় ভাবে হয়েছে ভাব ধরে তা দেখানো হবে!

    আলোচিত বিবিসির এই [রিপোর্ট দেখা যাবে এই লিঙ্কে] এর শিরোনামটাই অনেক সাহসী।  বাংলায় বললে শিরোনাম হল, “বাংলাদেশঃ যে নির্বাচন এক-নারীর নাটক হয়ে দাড়িয়েছে” । [Bangladesh: The election that has turned into a one-woman show]।
    যথেষ্ট ঠেস-মারা ভাষায় এই শিরোনাম। আর পুরা রিপোটটা হল, হাসিনার বিরুদ্ধে সব (মানবাধিকার বা রাজনৈতিক-রিপাবলিক-রাষ্ট্রের নর্মস বা আচার ভঙ্গের) অভিযোগগুলো এক সংকলন। আর সবশেষে ব্যতিক্রমি দুইটা প্যারা যেখানে আরো কড়া ভাষায় ইন্ডিয়ার কানমলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দু’কথাই হাজার কথার সংকলন হয়ে গেছে।

    বিবিসির ভারত ধোলাইয়ের দুইটা প্যারাঃ
    মানুষের শোয়ার ঘরের ভিতরে একটা হাতি ঢুকে গেল কেমন হবে? কল্পনা করেন! সেটা হবে একটা তান্ডব ও বিশৃঙ্খলা হিসাবে। কারণ হাতিটা ঘরের ভিতর নুন্যতম নড়াচড়া করলেই একেকটা দেয়ালের সাথে ধাক্কা খাবে তাতে ঘরটাই ভেঙ্গে যেতে পারে। সেটা না হলেও অন্তত ঘরে আসবাব বলতে কিছু থাকবে না। তাই, কারো কারো উপস্থিতির কারণে ঘটনাস্থল একটা তান্ডব হাজির হয়েছে বুঝাতে ঘরের ভিতর হাতির তুলনাটা ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘটনাবলিতে ভারতের অবস্থান-উপস্থিতিকে বিবিসি তাই  ঘরে হাতির ঢুকার  মত বলে তুলনা করেছে। লিখেছে  The elephant in the room is neighbouring India, which opposes…। যে ভারত বাংলাদেশের ভিতরে কোন পরিবর্তন-সংশোধন করে নেওয়ার বিরোধী। এমনকি ভারত এটাও চায় বিনা-পয়সায় বাংলাদেশের রাস্তা ও নদি দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টের অবাধ চলাচল চালু থাকুক! এমনই এর আবদার! – ভারতের এমন খারাপ মতলবের কথাও বিবিসি প্রকাশ্যে লিখে দিয়েছে!

    The elephant in the room is neighbouring India, which opposes
    any coercive action against Bangladesh.
    Delhi wants road and
    river transport access
    for its seven north-eastern states through Bangladesh.

    যদিও শেষে একটু সহানুভুতির সুরে লিখেছে, Officials in Delhi are afraid it is strategically vulnerable in any potential conflict with India’s rival, China. বাংলাকরে বললে,  দিল্লিতে ভারতীয় কর্তারা নাকি চীনের ভয়ে চিন্তিত যে যে চীনের চাপে ভারতের বড় – কৌশলগত দুর্দশা – দেখা দিতে পারে। এতে কথাটার মানে হয়ে গেছে যেন চীনের কাছে ভারতের  কৌশলগত দুর্দশা কাটানোর জন্যই হলেও জবরদস্তিতে বাংলাদেশ থেকে ভারতের করিডোর সুবিধা জায়েজ বা ভারতকে তা পাইয়ে দিতে হবে…।
    এই হল পশ্চিমা সমস্যা। মনে করে তাদের এই দালালি আমরা ধরে ফেলব না।

    এতদিন মানে ধরেন চলতি নয়া শতক যার এখন ২৩ বছর পার হল। এই তেইশ বছরে দুনিয়ার সচেতন সবাই মনে করেছিল দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব এখন আমেরিকা বনাম চীন। মানে গ্লোবাল নেতৃত্বের এক পালাবদল হতে যাচ্ছে; আর এই পালাবদলকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব।  আবার দুনিয়ার কিছু অবুঝ বেদিশ বা নাদান এটাকে অর্থহীন এক শব্দ -ভূরাজনীতি [geo-politics]  – বলেও ব্যাখ্যা করে থাকে! যাই হোক এখন দুনিয়া মানে হল, আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্ব এর দুনিয়া! আর এই দ্বন্দ্ব কাঠামোর মধ্যে ভারত তার কথিত চীনবিরোধিতা দেখানোর উসিলায় আমেরিকার কোলে চড়ে বসতে চেয়ে গেছে অন্তত ২০০৭ সাল থেকে। এটাই আমরা দেখতাম। ভারতের লক্ষ্য আমেরিকা যেন আবার তাকে চীন ঠেকানোর ঠিকা দেক! সেই ঠিকা বা এসাইনমেন্ট যেটা মোটামুটি ২০১৭ সাল থেকেই আমেরিকা  প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যদিও চীনবরোধী কোন ইস্যু থাকলে ভারত-আমেরিকা তা নিয়ে পরস্পর সমন্ব্য় করে কাছে থাকার চেষ্টা অব্যহত রাখে।

    বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব পক্ষ-বিপক্ষ এলোমেলোঃ 
    চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব ইস্যুতে এটা দেখে এতদিন মনে হতে পারে ভারত তো আমেরিকার কোলেই আছে। যদিও বাংলাদেশে আমেরিকান স্যাংশন আর ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রবল হয়ে উঠলে ভারত ছটপট করে উঠছিল। প্রকাশ্যেই তাদের লোকজন বলত যে তাহলে তো স্যাংশনের কারণে ভারতের অধীনে থাকা খেদমতগার হাসিনা আর জিতে আসতে পারবে না।  বাংলাদেশে ১৫ বছর ধরে ভারতের লুটেপুটে খাওয়ার স্বার্থের কী হবে তাহলে? কিন্তু তা সত্বেও কোথায় যেন একটা নিজেই আস্থা পেত এই বলে যে  শেষে আমেরিকা নিশ্চয় ভারতের স্বার্থকেও একোমডেট মানে ভারতের জন্য লুটের কিছু একটা জায়গা করে দিবে! সরকথায় শেষে আমেরিকা বা আঙ্কেল স্যাম ভারতকে বাঁচাবে! এমন একটা বোধ তাদের মধ্যে কাজ করত!

    কিন্তু নাঃ
    ভারত এখন টের পেয়েছে বিরাট ওলটপালট হয়ে গেছে! কেন?
    ব্যাপারটা আগে অতটা বুঝা যায় নাই। কিন্তু এখন যতই ৭ জানুয়ারি এগিয়ে আসছে ততই এক নয়া বাস্তবতা সবাই অনুভব করছে। যেটা এর আগে পর্যন্ত সবাই আঙ্কেল স্যাম এর উপর ভরসা করে বসেছিল। নিশ্চয় তিনি একটা কিছু করবেন যা সকলের জন্যই ভাল হয়! কিন্তু হায়!!!
    এটা ঠিক এক নয়া বাস্তবতা হাজির হয়েছে অবশ্যই।  যা আর অস্বীকারের উপায় নাই! তাই ভারত অস্থির হয়ে উঠেছে!
    আর ব্যাপারটা এসেছে এভাবে –  দেখি না কী করে! – সেই গল্পের মত এই ঘটনা! যে গৃহস্তের বাসায় চোর এসেছে আর গৃহস্ত ভাবছে দেখি না চোর কী করে – একেবারে শেষে ধরব! আর এটা করতে করতে চোর তার কাজকর্ম প্রায় শেষ আর বমাল নিয়ে চলে যাবার অবস্থায়…!  আঙ্কেল স্যাম এর উপর ভারতসহ সকলের ভরসারই পরিণতি হল যেন এটা!

    এখন ভারতের কাছেও পরিস্কার যে ৭ জানুয়ারি দিন শেষ সন্ধ্যা থেকেই হাসিনা দাবি করতে থাকবে যে সে বিজয়ী হয়ে গেছে!  এর চেয়েও বড়কথা এক বাস্তবতা সম্ভবত হবে এরকম যে  দুই থেকে দশদিনের মধ্যে হাসিনা চীনের সাথে  চুক্তি আলাপ আলোচনায় বসে যাবে। মানে যেতে হবেই মূলত এজন্য যে এর মুখ্য কারণ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তলানিতে, মোটা আর নগদ ডলার লাগবে। পাঠকদের কাছে চীন ভাল না মন্দ, চীন পছন্দ করেন কিনা এসব বিবেচনা এখানে একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, গুরুত্বহীন। বাস্তবতা হল, এমন নগদ অর্থ (প্রজেক্ট-প্রকল্প নয়) দিবার সম্ভাব্য দাতা যাদের কাছেই একমাত্র হাসিনার একসেস আছে, চাইতে পারে ও তারা দিতেও পারে সেটা হল চীন।
    এককথায় বললে, বাংলাদেশে নির্বাচন নামে কিছু একটা হয়েছে আর হাসিনা তাতে নির্রচিত বলে দাবি করতে পারলেই, হাসিনা চীনের কোলে শক্ত হয়ে বসে যাবার সম্ভাবনা প্রায় ষোল আনা!  এবং ইন্ডিয়ার তোয়াক্কা না করে, চীন একে পায়ের নিচে রেখে হাসিনার থেকে সবকিছু আদায় করে নিবার এরচেয়ে ভাল সুযোগ চীন আগে কখনই পায় নাই। এই অবস্থাটা তৈরি হবে সেখানে অবলীলায়! অনেকটা টিকা-ইস্যুতে যেমন হয়েছিল!  অতএব এখন ইন্ডিয়ার কানে পানি গেছে! কিন্তু তার কিছু করার নাই!

    ফলাফলঃ তাই সুবীর ভৌমিক মানে ইন্ডিয়া বা রএর অবস্থান হল তাই হাসিনার নির্বাচন হয়ে যাকে  তারা এর বিরোধী!  সবচেয়ে তামাশার কথা ২০২১ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশে আমেরিকার অবরোধ দেওয়ার বিরোধীতা করে গেছে, হাসিনা তাদের কত পেয়ারের বা হাসিনা ছাড়া বাচবে না – এনিয়ে তারা নাকি কান্না প্রদর্শন করে গেছে। মানে এতদিন তারা একটা প্রহসনের নির্বাচনেরই পক্ষে দ্বিধাহীন সমর্থক ছিল এটাই প্রকাশ্যে স্বীকার ও লিখে বলে করে চলেছিল। অথচ এখন উলটা?

    একটা তামাসা দেখেনঃ
    ভারতের গোয়েন্দা-গুষ্টির সবাইএখন যারপরনাই হাসিনার নির্বাচনবিরোধী! কিন্তু  সেটা কেমনে কী?
    সুবীর ভৌমিক এলেখায় আমাদেরকে আরেক ভারতীয়ের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। যা্র নাম শুখরঞ্জন দাসগুপ্ত [ Sukhoranjan Dasgupta ]। একে তিনি পরিচয় করিয়েছেন এক Bangladesh analyst বলে। আসলে তিনি অনেক পুরানা মানে সেই শেখের আমলের ‘র’-এর এজেন্ট। যখন তার বাইরের পরিচয় ছিল তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার ঢাকার সংবাদদাতা। পরে তিনি আনন্দবাজার ছেড়ে দেন আর কেবল ‘র’-এর এজেন্ট-ই থেকে যান। বাংলাদেশ তার খবর সোর্স এমন সংগ্রহের উতস অনেক। তিনি বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ কলাম লিখেন, সাথের মাঝে মধ্যে অন্য অনেক বাংলাদেশি ‘প্রগতিশীল’ পত্রিকাতেও। তার বরাতে এবার সুবীর বলছেন,  “সক্রিয় ও কার্যকর গণতন্ত্রিক চর্চার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বাংলাদেশে ৭ জানুয়ারির যে নির্বাচনটা হচ্ছে তা পুরানা সংসদটা ভেঙ্গে না দিয়ে আর তাতে মন্ত্রী ও এমপিদের  পদাধিকার বহাল থেকে গেছে। ফলে এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তারা প্রভাবিত করার সব সুবিধা সাথে নিয়েই নির্বাচন করছে”।

    এই বক্তব্য (ইংরাজিটা নিচে দেখেন) সুবীর আর সুখরঞ্জনের বাংলাদেশের প্রতি এক দারুণ সার্ভিস!!! যেন আমরা এটা জানতামই না।
    কিন্তু ঘটনা হল, ভারতের গোয়েন্দা-প্রবরেরা এতদিন এটা তারাই জানত না ভান করে চেপে থাকত।  কিন্তু এখন কেন? এই পল্টি দেয়া কেন?
    হাসিনাকে ছাড়া তাদের চলবেই না কিংবা আমেরিকান স্যাংশন্ ভুয়া সেসব কান্না কাটি তারা তাহলে কেন করছিলেন এতদিন?

    “Unlike in most functional democracies, Bangladesh is going into the
    January 7 polls with a prorogued and not a dissolved parliament which
    allows ruling party ministers and MPs to influence the poll process…” – 

    বাংলাদেশের জন্য একটা ভাল নির্বাচন দেখতে চাওয়ার ভারতীয় আকাঙ্খা! তা ভাল কিন্তু এতদিন উলটা গান গেয়ে চলছিলেন আপনারা??? আগে সেটা বলেন।  না। পুণ্যি করলেই কেবল এমনটা দেখতে পাওয়া যেতে পারে!
    যদিও এর নীট অর্থ কী? সেটা হল, বাংলাদেশের নির্বাচন পন্ড হয়ে যাক এটাই এখন বদলে যাওয়া ভারতীয় আকাঙ্খা…! মজা না???

    ঘটনাটা কিছু শুনেছিলাম অনেকেই বলছিলেন, পিটার হাসের ভারত সফরের ঘটনা। সেখানে ভারতের সাথে কোন আনুষ্ঠানিক কিছু ছিল না। আর সেটা প্রটোকলেও পড়বে না। তবে ভারতে পিটার হাস বেড়াতে গেলে এমবেসিতে বড়দিনের ডিনার বলে ২৫ ডিসেম্বরের সামাজিক সাক্ষাত তো হতেই পারে! আর সাথে কথায় কথায় সেখানে কিছু তিক্ত কথাবার্তাও নাকি উঠে এসেছিল। যার প্রসঙ্গ ছিল চীন! ভারতের অভিযোগ বাংলাদেশে ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ দেখা হচ্ছে না; আমেরিকা দেখছে না। অথচ ভারত তো নাকি এক আঞ্চলিক ‘মহারাজা’। তাসি এটা তো তার অপমান! …! শেষে আলোচনা – কে কত চীনবিরোধী তা জানা আছে, হয়ে গেছে –  টাইপের উদাহরণ দেয়ার দিকে নেয়া যায়। আর তা থেকেই ভারত বুঝে যায় সে একা হয়ে গেছে! বাংলাদেশে কোথাও বা বাংলাদেশকে নিয়ে কোথাও তার বেল নাই…! বলা কথাগুলো শুনেছিলাম সম্ভবত ২৮ ডিসেম্বর!  তবে সাবধান কেউ এগুলোকে হুবহু এরকমই হুবহু ভাষ্য হিসাবে নিবেন না। এটা একজন থেকে আরেকজনেরে এভাবে ছড়ানো কথা!  আমিও শুনেছি দেশের বাইরের বক্তা থেকে। তিনিও শুনেছেন আমেরিকান সোর্স থেকে, এভাবে।
    কথাগুলো পরে ভুলেই গেছিলাম। এবার বিবিসির এই রিপোর্টটা পড়ে মনে হচ্ছে পশ্চিমারা এমনি এমনি ইন্ডিয়াকে তান্ডব মানে ঘরের ভিতর হাতি এমন আপদের সাথে তুলনা করে নাই???

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৩ জানুয়ারি   ২০২৪, মধ্যরাত ১২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আমাদের নির্বাচন ও একজন প্রতীম রঞ্জন বোস

    বাংলাদেশের নির্বাচন ও একজন প্রতীম রঞ্জন বোস
    গৌতম দাস
    ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩  রাত ২০ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5ef

            Bangladesh: As elections draw close, India needs to rethink its strategies

    বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে মনে করে এনিয়ে পাড়া-পড়শি বিদেশি বিশেষ করে ভারতের ঘুম নাই। আপ্রাণ খেদমত করে চলেছে, যেভাবে পারে যেন কোনকিছুই মিস না হয়!। এর উপর আছে ভারতের মিডিয়াগুলো তারা গড়ে মনে হয় প্রতিদিন একেকটা করে মন্তব্য আর্টিকেল ছেপে চলেছে। যেসবের হিসাব রাখাও কঠিন! গত ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ তেমনই একজন প্রতীম রঞ্জন বোস [ PRATIM RANJAN BOSE]; তিনি লিখেছেন MONEY CONTROL নামে এক পত্রিকায়। যেটা বিজনেস ইনভেস্টমেন্ট ফোকাস এক ওয়েব পত্রিকা। যাকে বাংলাদেশের খুব কম মানুষই চিনে আবার নামটা বিদঘুটে  ও একটু অপ্রচলিত বলে হয়ত বাংলাদেশে অপরিচিত তো বটেই; আমিও আগে দেখেছি কিন্তু এই প্রথম এর এত ভিতরে গিয়ে খোঁজ নিলাম। কিন্তু সেটা না, এর এই লেখক বরং নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে যে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কলামিস্ট, রিসার্চার ও কনসালটেন্ট!  এসব কিছুর মধ্যে ভারতের প্রেক্ষিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট শব্দটা বড় অদ্ভুত ও বেমানান। ভারতে এখন মিডিয়া ও এর লেখক বলতে বুঝায় যারা জার্ণালিজম ভুলে পেশাদার প্রপাগান্ডিস্ট যারা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে এর ঢোল পিটানোর ওস্তাদ লোক হয়েছে! আর তাই বেশির ভাগ সময়ে দেখা যাচ্ছে যার টাকা আছে বা খোদ মোদি সরকার যে অর্থ বিলায় এরা চোখ বন্ধ করে তা খেয়ে নিয়ে এরই ঢোল পিটায়, প্রপাগান্ডা করে বেড়ায়। এটাকে সাংবাদিকতা মনে করে আবার, স্পেশালিস্ট বলে দাবিও করে।  তাতে ভারতের শেখর গুপ্তার মত সিনিয়র সম্পাদক  হলেও সবার স্বভাব এখন এক; মানে  ‘একই ওষুধ প্যারাসিটামলের’ স্বভাব বৈশিষ্ঠই সকলের! লক্ষ্য যা করেই হোক অর্থ আয় আর খেয়ে পড়ে বৌ-বাচ্চা নিয়ে টিকা থাকাই তাদের জীবন ব্রত!  মোদির পক্ষে সাফাইয়ের চিল্লা দিলে সবচেয়ে বেশী অর্থ মিলে তাই সবার লক্ষ্য এখন সেদিকে! কার উপরে কে যাবের প্রতিযোগিতা!

    তো ভারতের এমন মিডিয়া আসরে কেউ যখন লিখে দাবি করেন তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এটা একটা কাহিনী তো বটেই। এর অবশ্য এক নেগেটিভ মানেও হয় যে বাজারের যারা প্রপাগান্ডা-সওদা কিনবেন এমন কাউকে তিনি যোগাড় করতে পারেন নাই তাই তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা স্বাধীন সাজছেন হয়ত।  সেটা যাই হোক তবে আমরা সেটাও পরীক্ষা করব।

    ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেমঃ
    একটা বিতর্কে প্রবেশ করা যাক!  ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেম – সবার আগে কোনটা  মানুষের বিবেচনায় প্রধান্য হওয়া উচিত? মানুষের এদুইয়ের কোনটার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত? কোনটা বেছে নিব আমরা?  মানে, ধরা যাক কোন দেশ বা মানুষের জন্য  কোন  বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন এক্ষেত্রে দুইটার একটা বেছে নিতে হবে – ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেম – তাহলে আমাদের কী বেছে নেয়া উচিত?  এই মারাত্মক প্রশ্নটা আগে ফয়সালা করতে হবে; খুব জরুরি এটা।

    “দেশপ্রেম” নিয়ে একটু বলে নেই। দেশপ্রেম ধারণাটা প্রবল হয়ে উঠেছিল বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পরে যখন সারা দুনিয়া কলোনিমুক্ত হয়েছিল তখন আমাদের মত দেশের মানুষ স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র (নেশন স্টেট বা Nation State) হয়েছিল। জনগণের শাসনের ব্যবস্থা বলতে রিপাবলিক রাষ্ট্রই বুঝা হত। তবে তা নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র রূপ্টাই রিপাবলিক রাষ্ট্র মনে করা হত। অর্থাৎ কোন না কোন জাতি পরিচয়ের রাষ্ট্র ধারণা ছিল সেটা। আর বলা বাহুল্য সেটা এর বিপরীতে অধিকার-ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা ছিল না। যাই হোক জাতিরাষ্ট্র ধারণার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু বোধের অন্যতম হয়ে উঠেছিল এই “দেশপ্রেম” ধারণা। সে কারণে “দেশপ্রেম” ধারণাকে সর্বোচ্চ জ্ঞানের কথা  বলে জেনেছে-শিখেছে বলে মনে করাও শুরু হয়েছিল তখন। আর দেশপ্রেম-বোধ এটাকে এক উচ্চমার্গের জ্ঞানবোধ মনে করা হয়েছিল। আর এরই ফাঁদে পড়ে তারা এতদিনের ন্যায়-ইনসাফ বোধ যাকে যেকোন জ্ঞানের মুখ্য ও কেন্দ্রিয় বিষয় বলে আমাদের মত দেশের  মানুষ ভাবত যেখানে বাকি সবকিছু এর পরে সেই নীতি – এই ভুল পথে এবার তারা পুর্ব অবস্থান ত্যাগ করা শুরু করেছিল,  তুচ্ছ করে ফেলেছিল।  ফলে এদের চোখে দেশপ্রেম বড় বা প্রধান হয়ে যাওয়া থেকেই বা গণ্য হওয়াতেই ন্যায়-ইনসাফ বোধ পিছনে পরে যাওয়া শুরু হয়েছিল।  আর তারা দেশপ্রেমের চক্করে পরে নিজের বিচার-বিবেচনার উপর ভরসা না করে আবেগ বা দেশপ্রেমের আবেগ – এর ব্যবহার বা কাজে লাগানোর বাটপারীর পথেও রওনা হয়েছিল। আর তাই জাতিরাষ্ট্র মানেই হয়ে উঠেছিল হুশ হারিয়ে আবেগ-সর্বস্ব দেশপ্রেমের জয়গান গাইতে শুরু করা। অথচ যুগ যুগ ধরে একমাত্র ন্যায়-ইনসাফই সমাজকে ভিত্তি দিয়েছে, স্থিতিশীলতা দিয়ে গেছে; তা ভুলে এরা সকলে দূরে চলে যেতে লাগল। যেখানে এই কথিত দেশপ্রেমের জাতিরাষ্ট্র এমনও বলতে শুরু করল যে আমার নিজ ধর্মের অনুসারীদের পক্ষে থাকাই নাকি দেশপ্রেম! অথচ এব্যাপারে ধর্মের ভাষ্য-অবস্হানও হল ইনসাফ! দেশপ্রেম নয়।  আর ওদিকে এই আলগা বুঝের দেশপ্রেমের কারণে, তাতে দেশের সব ধরণের নাগরিক সমান অধিকার, সমাদর (সম-আদর বা ট্রিটমেন্ট) ও সমান মর্যাদার ধারণ আর জায়গা পেল না; আর এসব কথিত দেশপ্রেমিকেরা এথেকে বেখবর থেকে গেল!   অথচ ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে ও ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত ও এমন থাকার নীতিই কেবল একমাত্র এক দেশপ্রেমের রাষ্ট্র হতে পারে। যেখানে দেশপ্রেমকে ন্যায়-ইনসাফের অধীনে রাখতে হবে – এই হল নীতি!  যেখানে ন্যায়-ইনসাফ ছাড়া কোন কিছুকে দেশপ্রেমের ভিত্তি বলে বিবেচিত হতে পারে না।

    ঠিক যেমন, সমাজে গায়ের জোরে কোন ব্যক্তি শক্তিশালী এর ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হতে পারে না আর কোনটা বা কারো কোন কাজটা সঠিক তা নির্ধারণ হতে পারে না। এভাবে সমাজ উঠে দাড়ায় না। একমাত্র ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতেই সমাজ গড়ে উঠতে পেরেছিল, স্থিতিশীল হয়েছিল; এটা আমরা ভুলতে পারি না!
    আমরা শরীরের প্রবাহিত রক্ত কেমন ও কী জাতের কোন পুর্বসুরি জনজীবনের – এই অর্থে রেস [race]  এর বাংলা জাতি। এই অর্থে দুনিয়ার নানা ভুগোলে নানান মানুষ-জাতিতে আমরা অনেক রেস হয়ে দুনিয়াতে আছি। আবার  ধর্ম, সমাজ, কালচার, খাদ্যাভাস, ভাষা ভিত্তিক ইত্যাদির আরেক জাতি ধারণাও আছে যাকে এথনিক [Ethnic] জাতি বলা হয়। এটা আরেক ধরণের জাত-পরিচয়। যে অর্থে আমরা বাঙ্গালী – সেটা আসলে এক এথনিক জাতি পরিচয়। তাহলে এখন কথা হল, আমার বাঙালি জাতির লোকের পক্ষে থাকা মানেই কী সেটা আপনাতেই এক ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে থাকা হবে বা হয়ে যাবে???? কথাটা আরও সোজা করে বললে, বাঙ্গালী জাতিরাষ্ট্রে স্বার্থের পক্ষে থেকে দাঁড়িয়ে দেশপ্রেম দেখানো মানেই কী সেটা ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে থাকা হয়ে যাবে?  না, অবশ্যই না। যেকোন দেশপ্রেমের কথারও আগেই মানে, সবার আগে ন্যায়-ইনসাফের কথা বা বিবেচনাবোধ আসতেই হবে।  কিন্তু এখানে কেন দেশপ্রেমের আগেই ন্যায়-ইনসাফের কথাটা তুললাম?

    ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রতীম রঞ্জন বোস, আসলে কেঃ
    উপরের ন্যায়-ইনসাফ বনাম দেশপ্রেম তর্কটা এনেছিলাম এজন্য যে  প্রতীম নিজেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মানে স্বাধীন বলে দাবি করছে। তাতে তিনি হয়ত মোদির যুগে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়ে যাওয়া মিডিয়া মানুষ নন তিনি – এই যুগেও হয়ত কারও দ্বারা প্রভাবিত নন বা কেউ তাকে কিনে পরিচালিত করছেন এমন না; এই অর্থ সেটা হতেও পারে। কিন্তু এই অর্থেও হয়ত প্রতীম নিজেকে স্বাধীন দাবি করছেন বললেও এই কথাটাও সঠিক না। কেন? কথাটা আরেকভাবে বলি,  এটা সত্যি যে তিনি সুবীর ভৌমিক, আবদি বা চন্দন নন্দীর মত “র”-এর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট খাটা বা নেওয়া ব্যক্তিরা যেমন হয় ঠিক সেরকম লেখক নন হয়ত, এমনই মনে হয়েছে। এই বিবেচনায় হয়ত তিনি স্বাধীন নিজের মতামত-ই লিখেছেন। কিন্তু তিনি দেশপ্রেমি নেগেটিভ অর্থে! যারা ধরে নিয়েছেন দেশপ্রেমের পক্ষে থাকা মানেই তা ন্যায়-ইনসাফ এর পক্ষে নেয়া অবস্থান।  ফলে এদের কাছে কথিত দেশপ্রেম মানেই তা জায়েজ!! এই হল প্রতীম রঞ্জনের এক গভীর ও মূল সমস্যা!

    এমনিতেই ইন্ডিয়া হিন্দুত্ব জাতবাদী এক ‘নেশন স্টেট’ হয়ে আছে জন্ম থেকেই; এর উপর আছে আবার উগ্র-হিন্দুত্ববাদী এক রাষ্ট্র ও সরকার; ফলে এর যেখানে দেশপ্রেম মানেই হিন্দুত্ববাদ ভিন্ন আর কোন ব্যাখ্যা নাই মানে,  এখানে উগ্র দেশপ্রেমের আড়ালে চলা  উগ্র হিন্দুত্ববাদের দেশ এটা – সেখানে এই লেখক প্রতীম রঞ্জন বোস তিনিও দেশপ্রেমের নামে আউড়ালে এর মানে কী দাঁড়ায় পাঠক বুঝে নেন; আর প্রতীম তার সব কাজ জায়েজ করতে এসেছেন দেশপ্রেমের কথা তুলে!!!। বলাই বাহুল্য এটা চরম বে-ইনসাফি ন্যায়ভ্রষ্ট; এই হল মারাত্মক ফারাক! কারণ, তার কথিত দেশপ্রেম যা ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থের পক্ষে থাকার দেশপ্রেম বলে আপাত মনে হয় সেটা আসলে ন্যায়-ইনসাফের তোয়াক্কা না করা এক অন্ধ বিপদজনক দেশপ্রেম। এককথায়, ভারতের স্বার্থের পক্ষে থাকা মানেই দেশপ্রেম তাতে, এতে ন্যায়-ইনসাফের লেশমাত্র না থাকলেও তা জায়েজ! এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এলেখা লেখা হয়েছে!

    লেখা কলামের পর্যালোচনাঃ
    প্রতীমের এই লেখার শিরোনাম বাংলা করে লিখলে – “বাংলাদেশঃ এর নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, ভারতের উচিত নিজ অনুসৃত কৌশল পুনর্বিবেচনা করা” [Bangladesh: As elections draw close, India needs to rethink its strategies]।  আমাদের মানবজমিন (২২ ডিসেম্বর ২০২৩) অবশ্য এর একটা অনুবাদ ছেপেছে, শিরোনাম – বাংলাদেশে নির্বাচন আসন্ন, ভারতকে তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

    শুরুতেই প্রীতম তার লেখার এক সারসংক্ষেপ নিজেই লিখেছে এভাবেঃ “
    ভারতের এই পুবের পড়শি (মানে বাংলাদেশ) একটা নিখুঁত ফ্রি-ফেয়ার নির্বাচন-ই করতে হবে এমন গোঁ ধরা ধ্যান-জ্ঞানের দেশ কখনই ছিল না। তার মানে আবার এও নয় যে এখানে নির্বাচনকে একটা ধারাবাহিক ঠাট্টা বানায় ফেলতে হবে তা নয়। তবে এটা জানা বেশ উতসাহের হবে যে ঢাকার আজকের উপস্থিত পরিস্থিতি এটা কীভাবে ভারতের স্বার্থের পক্ষে এখন যাচ্ছে ও আগামিতেও যাবে। Holding a free and fair election was never a virtue of India’s eastern neighbour. But elections had never been as consistently farcical either. It would be of keen interest to know how the prevailing scenario in Dhaka had been helping and would help the Indian cause.

    উপরে প্রীতমের শেষ বাক্যটা লক্ষ্য করা যাক। লিখেছেন, ঢাকার আজকের উপস্থিত পরিস্থিতি এটা কীভাবে ভারতের স্বার্থের পক্ষে  এখন যাচ্ছে ও আগামিতেও যাবে। কিন্তু এমন যাওয়াটা কী ঠিক? ন্যায়সঙ্গত বা ইনসাফের? না, সরি। প্রীতম এদিকে উতসাহী নন একেবারেই। বরং  প্রতীম এটা ভারতের স্বার্থের দিকেই যাচ্ছে তাতেই চরম আহ্লাদিত!!! আর এটাকে ভারতের অন্যায়ের স্বার্থমুখী করে নেয়া হয়েছে কীভাবে ও তা কারা করেছে তা নিয়েও প্রতীম মোটেই উতসাহী হয়। তার কাছে নিজ দেশপ্রেমের স্বার্থই পরম!! সবার উপরে; আর বাকি সব মিথ্যা!
    এমনকি গত ২৮ ডিসেম্বর মোদির আরেক চ্যালা শুভজ্যোতি ঘোষ, ভারত কী করে গত ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের তিন নির্বাচনে  অন্যায়ের পক্ষে থেকে বাংলাদেশকে ক্রিমিনালের মত লুটেছে তা বিবিসিতে এক লেখায় বেপরোয়াভাবে লিখেছে। দেখুন এখানে, বাংলাদেশে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ভারতের যে ধরনের ভূমিকা ছিল। ভারত যে  ক্রিমিনাল অপরাধীর মত লুটেছে সেটা খোদ শেখ হাসিনাও মনে করেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি ভারতকে কী না দিয়েছেন (মানে তবু তিনি প্রতিদান পাননি), এটা ভারত একদিন বুঝবে (মানে আপসোস করবে)।  কিন্তু একালে প্রতীম সেসব ঘটনাবলী-ইতিহাস নিয়ে মোটেও আগ্রহি না। তাঁর দেশপ্রেমের চোখে তিনি দেখছে – নিজ দেশ পেয়েছে, পেয়ে যাচ্ছে পেয়েও নাকি যাবে। এসবই তার কাছে সুপ্রীম – ফলে ন্যায়-ইনসাফ আবার কী!!

    প্রতীম সাফাই দিতে বলছেন, “মোট ২৯ টা দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে” (বলতে চাইছেন, সুতরাং এটা নিশ্চয় নির্বাচন হচ্ছে) আর বলছেন তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি অংশ নিচ্ছে (বলতে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাহলে তো আর কথাই নাই) “A total of 29 parties including League and a faction of the third-largest, Jatiya Party, will contest the election.”। কিন্তু তিনি এখানে যা লুকালেন তা হল এই কথিত তৃতীয় পার্টিকে (এরশাদের জাতীয় পার্টি) বিরোধীদল হতেই হবে সেটা সাজিয়ে দিয়ে গেছিল ২০১৩ সালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। আর বাংলাদেশের উপর ভারতের এই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ এই  তথ্য বিবিসির শুভজ্যোতিও স্বীকার করেছেন। কিন্তু প্রতীম মহাশয় মনে হচ্ছে তবু তা জানতেই পারেন নাই!  আর সেঘটনার পুনরাবৃত্তি এবারও হয়েছে। এরশাদের ভাই এখনকার জাপা নেতা কাদেরও ভারত থেকে ফিরে সে ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলেছিলেন।  আর অনেক নাটক করে শেষে নির্বাচনে সঙ্গি হয়েছেনও। কিন্তু খুব সম্ভবত এবার তিনি অতি চালাকি আর নাটক করতে গিয়ে ধরা খাবেন, দেখা যাক! কিন্তু প্রতীক মহাশয়ের চোখে সবই ভারতের সাফল্য!!

    প্রতীমের পরের প্রসঙ্গ আর্মিঃ
    সামরিক আর বেসামরিক শাসন নিয়ে তুলনা আর শেষে খোদ যেকোন প্রকারের বেসামরিক শাসনের পক্ষে রায় দেয়া – এই চাতুরি বয়ানের  চর্চা চালু করে গেছিলেন প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান (এখন মারা গেছেন)। তিনি নিজেই একালেও বাকশালের পক্ষে কথা বলতে লজ্জা পেতেন না, এতই অবুঝ বাকশাল-প্রেমি ছিলেন। আসলে, তখন রাষ্ট্রটাকেই নাই করে দেয়া হয়েছিল এমন কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হয়েছিল; যেটাকে আমরা বাকশাল বা চতুর্থ সংশোধনী বলে চিনি। মিজানুর বলতেন রাজনৈতিক দলের এই কান্ডটাও জায়েজ কারণ তা মুজিবের বেসামরিক শাসন সেটা করেছিল।  মানে তুলনায় সামরিক শাসন সেটা খুবই খারাপ!

    এই বক্তব্য শঠতাপুর্ণ বা চাতুরির। সাধারণভাবে বাংলাদেশে –  রাজনীতি জিনিষটা কী এনিয়ে চিন্তা-বোধ এর বিকাশ খুবই দুর্বল। এর পিছনের প্রধান কারণ সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলতা ধারণা।  সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলরা মনে করেই তারাই নাকি সবচেয়ে অগ্রসর ধারণা। কাজেই রাষ্ট্র-রাজনীতি কী সেটা জানার দরকার নাই, এগুলো তো পশ্চাতপদ, ডানপন্থি বা বুর্জোয়া ধারণা। অথচ  যারা মৌলিকভাবে রাজনীতি-রাষ্ট্র জিনিষটা কী, রিপাবলিক ধারণাটা কী এসবনিয়ে নুন্যতম ধারণা জানা-বুঝার আগেই সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীল হয়ে গিয়ে এমন আত্মঘাতি হয়ে আছেন। অবশ্য সেটা এমন হয়ে যাবার যুগও ছিল, সেটা অন্তত গতশতকের শেষ অর্ধেক জুড়েই (১৯৪৫-২০০০) মৌমাছির মত সেকালের তরুণদেরকে টেনেছিল। সোভিয়েত পতনের পরে এটা আর টিকে থাকতে পারে নাই। নিজ-অযোগ্যতায় এর জোশের সিংঘভাগই এখন খামোশ হয়ে গেছে।  কিন্তু আমাদের বেলায় যা ক্ষতি করে দিয়ে যাবার তা ঘড়েগিয়েছিল। এরই প্রমাণ হল, বাকশাল সম্পর্কে – কেন বাকশাল আপত্তিকর তা হল তা নিয়ে প্রকাশিত ধারণা গুলোকে দেখেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট বা ইসলামিদল গুলোর (পরে এরা বিএনপি করা শুরু করলেও) সবার মুখে মুখে সেসময়ের বয়ান হল যে, এটা একদলীয় ব্যবস্থা আর চারটা সংবাদপত্রের শাসন; এটাই মুখ্য অভিযোগ। এই হলো আমাদের বুঝ ও সমালোচনা। অথচ রিট [writ] কী আমরা খবর নেই নাই, জানি না। একটা কনষ্টিটিউশনে যদি রিট করার সুযোগ না থাকে তাহলে কী ক্ষতি; কী আসে যায় আমরা জানি নাই। সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলতার এতই দৌরাত্ম! বাকশাল সংশোধনী আমাদের কনষ্টিটিউশন থেকে রিট করার সুযোগ তুলেই দিছিল – তা আমরা বাকশালবিরোধীরা কেউ টের পাইনি!

    মানে? মানে হল – রিট কথাটার সোজা মানে হল যে কোন কনষ্টিটিউশনের মুখ্য বা কেন্দ্রীয় বিষয় বা জায়গা হচ্ছে নাগরিকের মৌলিক অধিকার আর তার রক্ষাকবচ কিসাবে কী রাখা হয়েছে সেসব অংশগুলো। আমাদের কনষ্টিটিউশনের এটাই তৃতীয় অধ্যায়। এখন নাগরিকের প্রাপ্য মৌলিক অধিকার যদি সরকার বা কনষ্টিটিউশন প্রণেতারা রোধ করে দেয় বা রোধ-কারী কোন আইনই সংসদ পাশ করে দেয় তাহলে প্রতিকার হিসাবে নাগরিকের কী করার আছে? আইডেয়েলি বললে, নাগরিক তখন অধিকার হারানোর বিষয়টা হাইকোর্টের নজরে আনতে পারে। এটাই সব সৎ কনষ্টিটিউশন প্রণেতারা স্কোপ করে রাখেন। এভাবে আদালতের এই নজরে আনা বা প্রতিকার চেয়ে নালিশ দেয়াটাই রিট করা। পরে আদালত ঐ নালিশের শুনানিতে একমত হলে এরপর আদালত সরকারকে বাধ্য করতে আদেশ দিতে ক্ষমতা রাখে। এমনকি সংসদে পাশ করা কোন আইন তৈরি হয়ে গেলেও তা বাতিল ঘোষণা করে দিতে পারে। এই হল, খুবই সংক্ষেপে রীটের সারকথা।
    আর আমাদের ঐ বাকশাল সংশোধনীর আগের কনষ্টিটিউশনে দুই জায়গায় আলাদা করে এমন রীট করার অধিকার দেয়া ছিল। প্রথমটা নাগরিককে দেয়া তাদের যেকোন ইস্যুতে রীট করার অধিকার হিসাবে। আবার একইভাবে ১০২ অনুচ্ছেদে উচ্চ-আদালত (হাইকোর্ট ও এর উপরের) সকল বিচারককে রীট শুনবার অধিকারও পরিস্কার ও আলাদা করে দেয়া ছিল। আর গুরুত্বপুর্ণ কথা হল ২৫ জানুয়ারী ১৯৭৫ সালে পাশ হওয়া চতুর্থ সংশোধনী বা বাকশাল সংশোধনী রীট সংক্রান্ত এদুই অধিকারকেই হয় বিলুপ্ত বা স্থগিত করে রেখে দিয়েছিল। ফলে বাকশাল চালুর পরে দেশে কারও পক্ষেই আর রীট করা বা রীট শোনার আর কোন বালাই এক্তিয়ার থাকে নাই।

    মজার কথা হল পরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে জিয়াউর রহমান  তিনিই নাগরিকের রীট করা ও আদালতের তা শোনার অধিকার ফিরে কায়েম করেছিলেন – সেকালের সিনিয়র এডভোকেট বা সাবেক বিচারকদের পরামর্শে জিয়া একাজ করেছিলেন। তিনি এই মর্মে এক প্রেসিডেন্সিয়াল অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। এখন পাঠকেরাই বলেন বা ভাবেন বেসামরিক শাসন ক্ষমতার জোরে বাকশাল সংশোধনী জারি করা নাকি সামরিক শাসনের ক্ষমতাবলে (যা আবার পরে পঞ্চম সংশোধনীতে জায়েজ করে নেয়া) রিট করার অধিকার ফেরত দেয়া কোনটা জায়েজ বা কোনটা তুলনায় ভাল ও সৎ পদক্ষেপ?

    তবে আমাদের এই আলোচনার জন্য মুখ্য ইস্যু হচ্ছে এটা বুঝতে পারার যে নাগরিকের রিট করার অধিকার কেন ফান্ডামেন্টাল? কেন রিটের অধিকার না থাকার মানে সেটা  আর কোন রাষ্ট্র-ই না; বরং কার্যত তা এক রাজতান্ত্রিক শাসন, সেটা আর রিপাবলিক বা জনগণের ক্ষমতার শাসন নয়!   অথচ সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীল মন ও শিক্ষা আমাদের টেরও পেতে দিল না যে বাকশাল সংশোধনীতে বাংলাদেশ এই স্বাধীন রিপাবলিক খোদ রাষ্ট্রটাই নাই হয়ে গেছিল। এমনই সমাজতন্ত্রী বোদ্ধা সব একেকজন!  বাকশাল-কে গালি বানাতে পেরেছি কিন্তু রাষ্ট্র-রাজনীতি-জনগণ এসবের অর্থ আজও ঠিকমত বুঝি নাই! এনিয়ে আমার অনেক পুরানা একটা লেখা আছে। লেখাটা এখন খুঁজে পেয়েছি যার শিরোনাম ছিল – “পঞ্চম সংশোধনী বিতর্ক”। লিঙ্ক এখানে।  আর সেটা সেই ২০১০ সালে লিখেছিলাম। [আর ২০১০ সালে আমি তখনও জাতিসংঘে কর্মরত। আর ওয়ার অন টেররের পরে আমাদের একটা ইন্টারনাল সার্কুলার হয়েছিল যে আমরা যিন কোন রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে না জড়াই, মতামত না রাখি। রাখলে এর পরিণতি হবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেশে ফিরার টিকিট হাতে ধরিয়ে দেয়া। তাই আমি বেনামে ফিদা হাসান নাম নিয়ে লিখেছিলাম এই লেখাটা] এখনই সেই পুরানা লেখাটার একটা লিঙ্ক এখানেও পারেন।
    । সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটা লেখাও পড়তে পারেন আগ্রহিরা। এটা ২০১৭ সালে লেখা – প্রথম আলোর রাজনীতির একটি ব্যবচ্ছেদ। এটা আমার লিজের নামেই লেখা।


    কিন্তু এর সাথে প্রতীম রঞ্জনের কী সম্পর্ক?

    তিনি লিখেছেন, “Army was at the helm in Bangladesh between 1975 and 1990.”। বাংলা করলে, “১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালের দিকে বাংলাদেশে আর্মি সব ক্ষমতার শীর্ষে ছিল!”।  এই বাক্যটা মিজান খানের বাকশালী সামরিক বনাম বেসামরিক এর মধ্যে কোনটা তুলনায় ভালো এই চাতুরির ধারণা লুকিয়ে আছে। বেসামরিক শাসন হলেই একে ভাল বলতে হবে – এটা একেবারেই শঠতার এক বক্তব্য! সেজন্যই উপরে দেখালাম, বেসামরিকতা দিয়েই [বেসামরিকতা মানেই যেন এক পবিত্র ক্ষমতা] একটা জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে নাই করে দিয়ে একে রাজতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারি শাসন বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এই মিজান এন্ড বাকশালী গং আমাদেরকে বেসামরিক শাসনের পবিত্রতা শিখাচ্ছে! আর একালের প্রতীম মহাশয়ও আমাদের সেই সামরিক শাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    এমনিতেই সেকালের সোভিয়েত-মার্কিন [ সেটা ছিল ব্লকের যুগ মানে  দুই দেশের দুই ব্লকের সদস্য হওয়ার যুগ] বা কোল্ড ওয়ারের যুগে (১৯৫৩-৯১)। আমাদের মত দেশে আমেরিকা মাস-পপুলার লেবেলে  সোভিয়েত প্ররভাবের সাথে না পেরে সামরিক শাসন জারি করে আমাদের মত দেশগুলোর উপর নিজ সব ধরণের প্রভাব জারি রাখত। তাই সামরিক শাসনের সরকার ছিল প্রধান ফেনোমেনা। আবার আমাদের বেলায় ছিল আরেক সমস্য। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পৌছানো কখনই হত না যদি না আমরা সেই সময়ে স্পষ্ট করে সোভিয়েত ব্লকে যোগ না দিতাম! আবার এতে কমিউনিস্ট গিরি সমাজে রাজনীতিতে বেড়ে যাওয়াতে স্বাধীনের পরের সাড়ে তিন বছর কথিত সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি করতে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম। আর তাজউদ্দিন এন্ড গংয়ের এই প্রচেষ্টাইয় গিয়ে তা শেষে এমন পরাজয় ও ব্যর্থতা আসলো যে দুর্ভিক্ষে মানুষ মারলাম। আবার দুর্ভিক্ষের জন্য একে-তাকে দোষ চাপালাম। আবার অন্যদিকে কোন রাষ্ট্র একবার সোভিয়েত ব্লকে ঢুকলে তা থেকে বের হওয়া বিরাট খেসারত, বিরাট মুল্য চুকাতে হয়। আমাদের বেলাতেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। শেখ মুজিব আমাদের সোভিয়েত ব্লক থেকে বের করার ব্যবস্থা করে গেছিলেন কিন্তু তা দেখে যাবার আগেই জীবন দিয়েছিলেন। এই ছিল আমাদের সত্যিকার ১৯৭৫।  যা সবদিক থেকে দেখে ব্যাখ্যা করতেই হবে কারণ পুরা ফেনোমেনা-ঘটনাটা নেহায়তই কোন সামরিক শাসনের প্লট নয়! এটা শ্রেফ একটা সামরিক শাসন জারি করার মামলা একেবারেই নয়!
    আর ১৯৯০ সাল বলে – যেটা বলছেন সেটা আসলে এরশাদের ১৯৮২ সালের সামরিক ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই ক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাংকের আমাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার। ফলে এটাও কোন সামরিক প্লট না। যা সামরিক শাসন খুবই খারাপ বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না।  সেই আশির দশকের শুরুতেও আমাদের দেশে কমিউনিস্ট প্রভাব যথেষ্ট ভারি ছিল। বিশেষত ট্রেড ইউনিয়নে আর রাজনৈতিক কালচারে। যেমন প্রায় সব উতপাদন ছিল সরকারি মালিকানায়। যেকোন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার মানেই প্রথম পর্যায়ে শ্রমিক বা কর্মি ছাটাই হবেই। কিন্তু সংস্কারের বা ঢেলে সাজানোর পরে কত মানুষ চাকরি পাবে সেটা দিয়ে এর সাফল্য মাপতে হবে।  শুধু শ্রমিক ছাটাই হচ্ছে কেন তা দিয়ে নয়! এখন বাংলাদেশে সংস্কারের কাজে নামলে বিশেষত বিশ্বব্যাংক একাজে কমিউনিস্ট চাপে (বিশেষত ছাটাই ইস্যুতে) পড়তে পারে যেটা তারা মুখোমুখি হতে চায় না। তাই আগে সামরিক শাসন জারি করে নিয়ে সংস্কার কাজ শুরু করতে মনস্থ করেছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। তাই এরশাদের ক্ষমতা দখল। নিশ্চয় এরশাদ এত বুদ্ধিমান ছিলেন না যে প্রশাসনিক সংস্কার (পপুলারলি উপজেলা) তার মাথা থেকে বের হয়েছে!
    এখন এখানে এতসব দিককে আপনি স্রেফ সামরিক লোকেরাই সবকিছুর নষ্টের গোড়া বলে বাহাদুরি-গাথা গাইতেই পারেন! অজ্ঞতায় কতকিছুই না দাবি করে ফেলা যায়!
    আর কিছুই না-বুঝে  প্রতীম রঞ্জন বোস এসব  সামরিকবিরোধী বাহাদুরি-গাথার পাল্লায় পড়েছে। আসলে এতে বুঝা গেল ভারতের ১৯৯০ সালের আইএমএফের সাথে ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের ঘাটতিতে পরে তা মোকাবোলায় সেখান থেকে কেন ভারতকে সংস্কারের পথে যেতেই হয়েছিল এসব নিয়ে প্রতীম রঞ্জন বোস এর কোন স্টাডি অনুমান কিছুই নাই। এমনকি এখনও এই মোদি আমলে ভারতে আরও অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা উঠছে কেন; সেটা কখনও তিনি আমল করেন নাই বলেই মনে হয়।
    অথচ তিনি এসেছেন গাধা-বোকাদের সামরিক-বেসামরিক তর্কে প্রবেশ অরে এনিয়ে কথা বলতে!!!

    চীনা প্রসঙ্গঃ
    প্রতীম রঞ্জন বোস খুবই নাদান কিসিমের তাই যেসব ইস্যু নিয়ে তিনি কথা তোলার যোগ্য হন নাই, সাবজেক্টটা বুঝতেই শেখেন নাই তা নিয়ে তিনি কলাম লিখে ফেলায়ছেন। তার আপত্তি হল, বাংলাদেশে চীনের গুরুত্ব কেন ভারতের নাই কেন?  অথচ উনি কী জানেন  একই ভাবে খোদ ভারতের চীনের গুরুত্ব আছে, দেয়া হয়? যে জানে সে দেয়! কিন্তু চীনের গুরুত্ব কথার মানে কী?

    এটা কেউ চীনকে বেশী ভালবাসে বলে দেয় ব্যাপারটা কী সেরকম?
    একেবারেই না। চীনের গুরুত্ব কথার সিধা মানেটা হল, আমাদের মত দেশ (এমনকি ভারতেও) অবকাঠামো খাতে একালে ঋণ দেবার সক্ষমতা একমাত্র চীনের আছে। যা সমতুল্য আমেরিকারও নাই।  তবে এটাই আমেরিকারও ছিল। সেকারণেই একালে চীনের এই গুরুত্ব। এখন প্রতীম কী জানেন ভারতেও চীনা এমন অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ছিল? বিশেষত ২০১৪ সালে মোদি প্রথম ক্ষমতায় আসার পরে! কোথায় সেসব প্রকল্পগুলো, তাদের কী হল? সেগুলো বাতিল করে দেয়া হলে সেই সরকারি ঘোষণাটাই বা কই? রেল ব্যবস্থা আধুনিকিকরণ, স্টাফ ট্রেনিং সহ যে চীনা প্রকল্প ছিল তা এখন কোথায়? আগামিতে ভারতে আরো প্রায় পঞ্চাশটা শহর গড়ে উঠতে যাচ্ছে। সেগুলোর অনেকগুলোই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার অবকাঠামোগত বিনিয়োগের দায়ীত্বে চীনের যাবার কথা হয়েছিল সেগুলোই বা কোথায়? এর সব তথ্য নেট থেক সরায় নেয়া হয়েছে কেন? গৌতম আদানিরা চীনা লোন (হংকং থেকে এনেছে বলে চালিয়ে দিয়ে) বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে সেই  বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করে এবার ভারত নিজেকে চীনবিরোধী দাবি করছে? এতে করে লাভ কি?
    এখন ভারত কী অবকাঠামো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বি? নাকি ভারত নিজেই অবকাঠামো ঋণের এখনও খাতক?  কাজেই এসব সম্পর্কে নুন্যতম ওয়াকেবহাল না থেকে এক দেশপ্রেমিক ভারতীয় সেজে বাংলাদেশে সব ইস্যুতে চীন কেন – এই প্রশ্ন করা মানে বুঝিয়ে দেয়া যে আপনি ইস্যুই বুঝেন না, আর আপনার কাছে নুন্যতম তথ্যই নাই।

    তিনি লিখেছেন,
    Despite all the drumbeating about bilateral co-operation, the last five years were marked
    by unprecedented consolidation of Chinese interests in Bangladesh while Indian interests suffered.

    সারকথায় বললে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশে চীনা স্বার্থ কেন উপরে আর ভারতের স্বার্থ কেন নিচে? প্রশ্নটা তিনি তুলছেন অবকাঠামো প্রসঙ্গে। তবু প্রথম কথা হল, বাংলাদেশ এমনকি হাসিনার বাংলাদেশে তিনি কাকে বেশী গুরুত্ব দিবেন ভারত না চীনকে – এটা নির্ধারণের এক্তিয়ার তো হাসিনার?  নাকি না?  প্রতীম মহাশয় তিনি কী বলতে চাইছেন হাসিনা ভারতের দালাল তাই তিনি ভারতকে চীনের উপরে দিচ্ছেন না কেন? এরকম?
    আসলে এসব কথা নিয়ে নিজেকে ইন্ডিপেডেন্টে বুঝানো যায় না! বরং এসব ইস্যু নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে নিজে কতটা অযোগ্য তা বুঝা যায়!  আমরা কেবল এতটুকু বলতে পারি এই নির্বাচন যদি হয়েই যায় তখন ভারতের কী দুর্দশা হয় সেটা নিয়ে বরং মুরোদে কুলালে প্রতীম মহাশয় ব্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন। কারণ, এটাই সম্ভবত হট-কেকে হয়ে উঠতে যাচ্ছে!

    ভারত কেন বাংলাদেশে কখনই পপুলার নয়ঃ
    সবক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যা প্রতীক মহাশয় ডিল করলে পারেন না সেসবেই তার আগ্রহ!   এভারেজ এক ইন্ডিয়ানের মত তাঁরও পুঁজি হল কেবল এক উগ্র দেশপ্রেম? থচ columnist, researcher, and consultant.এর আকাঙ্খা রাখেন? সেকাজে তো নুন্যতম সমাজতত্ব, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতির পাঠ থাকতে হবে, নাকি? অথচ তিনি বলতেছেন,

    … India was never popular in Bangladesh, not even in December 1971, when Delhi
    became a party to their Liberation War. This is largely due to religious differences
    that were the prime inspiration behind the creation of Pakistan.

    এটা কী কোন গবেষকের বক্তব্য হতে পারে? যোগ্য? বলছেন ১৯৭১ সাল থেকেই ভারত কখনও বাংলাদেশে পপুলার ছিল না। ভালকথা, কিন্তু কেন? এর একটা বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন ব্যাখ্যা করেন তাহলে! কিন্তু না। এই মহা বিদ্যান লোক ফতোয়া দিলেন এক মহা আবিস্কারের যে নাকি ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে ভারত বাংলাদেশে পপুলার না! কান্ড দেখেন, প্রতীম রঞ্জন মফস্বলের চা দোকানের বেঞ্চিতে বসা আলাপ তুলেছেন তিনি!!!
    সাধারণভাবে বললে, প্রায়ই এই প্রশ্নটা সামনে চলে আসে যে ভারত আমাদের সাহায্য করতে আসার উসিলায় নিজের স্বার্থ হাসিলে ততপর। এখন এমন প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক। তাই আগাম এমন বুঝাবুঝি যেন না উঠে আসা তা নিয়ে সতর্ক থাকা। কিন্তু তা তো হয় নাই। বরং সব জায়গায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রতিশোধ নিবার বাসনা প্রকাশিত হয়েছে যেন! আর সবচেয়ে খারাপ কাজটা করেছেন ইন্দিরা গান্ধী! তাঁর তো অন্তত এমন কিছুই করা উচিত না যেটা ভারতের নিজের ক্ষতি ডেকে আনবে। অথচ তিনি তাই করেছেন। কেন তিনি হবু বাংলাদেশ কী হবে কী পরিচয় তা নিয়ে এমন সব ধারণা ব্যবহার করেছেন যা ভারত নিজেই নয়। যেমন কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি হয়ে হবে হবু বাংলাদেশকে! কিন্তু কেন?
    তারচেয়েও বড়কথা খোদ ভারতই তেমন কোন রাষ্ট্র নয়; আর এর কথার বেশির ভাগই অর্থহীন!  অথবা যা বলছে ওর ব্যবহারিক রূপটা এর উলটা। বরং সারকথায় বাংলাদেশ ৯০ ভাগের মত মুসলমান জনসংখ্যা। এখন কী বলে কী করে ঈই মুসলমান পরিচয় দাবিয়ে রেখে দেয়া যায় এই ছিল ইন্দিরার সব কসরতের মূল্কথা! অথচ সবচেয়ে বড় অসংগতি হল খোদ ভারত-ই তো হিন্দুত্ব বা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের দেশ হয়ে আছে যে পথ  কংগ্রেস নিয়েছে সেই ১৮৮৫ সাল থেকে! তাহলে হবু বাংলাদেশের ভারতকে অনুসরণের সুযোগ বাস্তবতা কোথায়?

    আসলে কথা একটাই জমিদার আমল থেকেই জমিদার-হিন্দুদের মুসলমানদের উপর আধিপত্যের আকাঙ্খার শুরু সেই নীতি সব জায়গায় থেকেই গেছে। মূল সমস্যা আধিপত্য – রাজনৈতিক বা সাংস্ক্ররতিক আধিপত্য ভারতকে বা জমিদার হিন্দুদেরকে করতেই হবে বা পেতেই হবে – এটাই রূপ সমস্যা। অথচ সকলেই আম=বার ব্যভারিকভাবে বুঝুক না বুঝউক   এক রিপাবলিক রাষ্ট্রই গড়তে গিয়েছে। যার সারকথা হল, নাগরিক সাম্য। মানে এক জনগোষ্ঠির অপরের উপর আধিপত্য করা বা সুযোগ নেয়া নয়। বরং আধিপত্যের উলটা, এক নাগরিক সাম্য। যেটা সেকালের না ইন্দিরা বা কোনকালে খোদ কংগ্রেস বুঝতেই পারে নাই। একেবারে প্রতীম রঞ্জন বোস পর্যন্ত একই গান চলছে!

    যা হোক, এই গল্প-কেচ্ছার শেষ নাই। কেবল আমাদেরকে আমাদের মত থাকতে দেক, এটাই কাম্য!

    প্রতীম রঞ্জনের সবচেয়ে বিরক্তিকর কান্ডটা হল, তিনি শিরোনামে বলছে ভারতকে নিজ স্ট্রাটেজি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অথচ তিনি পরিস্কার বলতেই পারলেন না বদল করে কোথায় নিবে? মানে চাপাবাজির ভাবসাব আরকি!!!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ    ৩০  ডিসেম্বর ২০২৩,   দুপুর ১২ঃ ৩৬

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

    কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়
    গৌতম দাস
    ১০ নভেম্বর ২০২৩  ২১ঃ ৫৮ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-57i

               দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায় – স্টিফেন ইবেলি বলেন, রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ভারতে ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

    আবার শুরু হয়েছে। সেই পুরানা বানানো গল্প –  ভারত নাকি আমেরিকার সাথে দেন-দরবার করে হাসিনাকে বাঁচাবে। ফিরে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখবে ইত্যাদি! মানে সেই পুরানা “আনন্দবাজারি” ও  “অগ্নি রায়” আর তাঁদের ঢাকার সহযোগী – মার্কা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। আর তা শুনে কিছু না বুঝে হাহাকার করে উঠা লোকের সংখ্যাও কম নয় যারাই মূলত – ভারত আবার হাসিনাকে বোধহয় ক্ষমতায় রেখে দিল – এই প্রপাগান্ডাকে পরোক্ষে আয়ু দিচ্ছেন। আর তাতে মিথ্যা প্রপাগান্ডার অপ-সাংবাদিকতা করে হিট বাড়ানোর অসৎ ততপরতার জয়জয়কার শুরু হয়েছে। এবার একাজের লিড হল, বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ। তিনি নেমেছেন যে নিজে ভারতীয় আর ভারতীয় বলেই যেন এক আরএসএসের কর্মির মত আচরণ করে আসছেন তিনি। আর তাত এই আচরণের পিছনে আছে আরেক পরিচয়।

    কলকাতার আরএসএস এর এককালের (২০১৬) দায়ীত্বে থাকা নেতা তথাগত রায় এখানে দেখেন তার পরিচয়,
    এরই চ্যালা-শিষ্য ছিলেন এই শুভজ্যোতি ঘোষ! 
    তথাগতের আমলে (সে সময়
    জঙ্গীবাদের নামে যা খুশি লিখতে-করতে-চালাতে পারত এরা), তাতেই এই শুভজ্যোতির উত্থান!

    শুভজ্যোতি ঘোষ, তিনিই এবার প্রপাগান্ডা লিড-নেতা! বাংলা বিবিসি-তে তিনি সত্য-মিথ্যায় মিশানো এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করেছেন। আর তা থেকেই প্রধান প্রপাগান্ডাটা শুরু হয়েছে। আর এটাই বাংলাদেশে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ ইত্যাদি এরা বিবিসির নাম না নিয়েই ঐ মেটারিয়াল দিয়ে সুত্রবিহীন স্ব স্ব রিপোর্ট করেছে।  যদিও গতদিনটা শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এরও এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট দিয়ে। সেটা এখানে দেখতে পাবেন।

    মিথা প্রপাগান্ডার শিরোনাম কীঃ
    গতকাল ১০ নভেম্বর ছিল আভ্যন্তরীণ রুটিন ঘটনা হিশাবে ভারত-মার্কিন সংলাপের দিন। আর সে উপলক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তাঁদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে সাথে নিয়ে আগের দিনই ভারত সফরে পৌছে গেছিলেন। বলাই বাহুল্য এতে বাংলাদেশের কোনই সংশ্লিষ্টতা নাই; থাকার কোন কারণও নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই ইন্ডিয়ার হাসিনাকে দেয়া মিথ্যা মিডিয়া প্রপাগান্ডা সার্ভিস যে এই সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে! কেউ কেউ সাবধানী খাড়া মিথ্যা বলতে ভয় পেয়েছে।  যেমন কালের কন্ঠ লিখেছে  “ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ : উঠতে পারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও” ।  আবার প্রথম আলো তো খুবই সাহসী মিথ্যাবাজ। তাই সে বুক ফুলিয়ে শিরোনাম করেছে,দিল্লিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।  কিন্তু প্রকাশ করার পর বুঝেছে এত হারাম কাজ দুনিয়া সহ্য করবে না। রাত দশটার মধ্যেই ঢাকার মানুষ চোরামি জেনে গেছে। মানে প্রথম আলো – এরা এত নিচে নেমেছে যে প্রথম প্রপাগান্ডা নিউজটা গায়েব করে দিয়েছে। লক্ষ্য করবেন এর রেফারেন্স লিঙ্কটা প্রিয়.কম এর। এই ওয়েবে কারো অনেকের প্রকাশিত লেখাই অটো কপি করে রাখা থাকে। তাই আমি সেখান থেকে লিঙ্ক দিয়েছে। এছাড়া ফেসবুকে যারা স্ন্যাপ কপি করে স্টাটাস দিয়েছিল ততক্ষণাত তাঁদের স্টাটাসে প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্টটা এখনও লটকানো আছে।
    তাই এবার শিরোনাম সহ সবই বদল। বলা যায় এবার দিল্লির সৌমের বরাতে প্রথম আলোর একেবারে ভাল মানুষী এবং পুরা উলটা শিরোনাম – যুক্তরাষ্ট্রকে বলল ভারত নির্বাচন কীভাবে হবে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ।

    তাহলে শুভজ্যোতি কী করেছিলঃ
    শুভজ্যোতি একদিকে প্রায় তেরশ অক্ষরের প্রপাগান্ডা রিপোর্ট-টা করছেন, শিরোনামে কায়দা করে উস্কানি দিয়ে লিখছেন দিল্লিতে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে!!!  অপরদিকে লেখা সেই রিপোর্টের একেবারে শেষে ভারতীয় মুখখপাত্র অরিন্দম বাগচির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, “বাগচি বলেছেন, আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”। 

    “বাংলাদেশের নির্বাচন একান্তভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব
    নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”, -জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র। সেই সঙ্গেই তিনি যোগ
    করেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। ঘনিষ্ঠ মিত্র ও পার্টনার
    হিসেবে আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মর্যাদা দিই।”

    যার সোজা মানে হল, শুভজ্যোতির পুরা রিপোর্বটের বক্তব্যটাই ভুয়া প্রপাগান্ডা! কারণ, অরিন্দম বাগচির কথা সত্য হলে শুভজ্যোতির কথা যে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় – এটা মিথ্যা।  অদ্ভুত, এরপরেও এমন রিপোর্ট আবার বিবিসি বাংলায় ছাপা হয়েছে সাংবাদিকতা বলে!!!!

    ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেনঃ
    সকাল থেকেই বাংলাদেশে প্রপাগান্ডা শুরু যেখান থেকে যে ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেন! প্রপাগান্ডিস্ট কালবেলার কথাই ধরেন, তার এই রিপোর্ট দেখেন।  এরা পিটার হাসকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সকাল থেকেই এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার খারাপ  প্রভাব পড়েছে! কারণ পিটার হাস দিল্লি চলে গেছেন!

    তো – তাতে কী হবে? না, তাঁদের থামার সময় নাই। পিটার হাস ইন্ডিয়া গেছে মানেই যেন ফিরে এসে তিনি হাসিনা কে নির্বাচিত ঘোষণা করে দিবেন! তাই কান্নাকাটি???
    তাঁদের কে বলি – এখন থামেন, একটু শ্বাস নেন ভাল করে; এবার শুনেন!

    প্রথম কথা হল, আজ সন্ধ্যা সাতটায় সমকালে ছাপানো ছবি-সহ নিউজ বলছে, দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়। এখন বুঝেন প্রপাগান্ডার হাত-পা, ডালপালা কতদুর বিস্তৃত!

    দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

                                                                                     এটাই বিবিসির প্রপাগান্ডা রিপোর্ট 

     

     


    এমনকি হাস যদি ইন্ডিয়া যেতেন তবুও কিছুই মানে হত না কেনঃ

    কারণ, আজ দশ নভেম্বর দিল্লিতে ভারত-মার্কিন ২+২ সভা শুরু হবে আর তাই সেখানে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন আগের দিনই এসেছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও হাস যদি যেতেন তিনি মূলত বড় জোর ব্লিঙ্কেনের সাথেই দেখা করতে যেতেন। তবু কোনভাবেই পিটার হাস ভারত-মার্কিন ২+২ সভার কেউ হতেন না। কারণ তিনি এর কেউ নন।

    আর তাতেও কী কী ‘সত্য না’ থেকেই যেতঃ
    ১। পিটার হাস ২+২ সংলাপ-সভার কেউ নন, হবেনও না। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মাত্র!
    ২। এখানে ২+২ সংলাপ মানে আসলে কী? তা হল, ভারত-মার্কিন দুপক্ষেরই দুই পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে ভারতেরও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ( তাই, ২+২) – একসাথে ডাকা নিয়মিত সভা – এমন সভার কাঠামোর নাম হল  ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে; যা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এর উদ্দেশ্যে ছিল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করা কার্যত যা, ভারতকে আমেরিকান অস্ত্র বিক্রি এবং কী কী শর্তে বিক্রি সেসব নিয়ে আলোচনা। কারণ রাশিয়ার কী কী অস্ত্র ভারত কিনলে আমেরিকা অস্ত্র ভারত পাবে না সে তর্ক আছে। আর দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সামরিক রিসোর্স ও স্টোর-গুদাম শেয়ার করতে পারে কিনা যা পরে পূরণ করে দেয়া হবে এধরণের এক আলাপের সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয়েছিল।  সুতরাং বলাই বাহুল্য, এই সংলাপে বাংলাদেশে কোন ইস্যুই না। এটাই আমাদের জন্য মূল কথা।  একারণেই বলছি পিটার হাস  ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের কেউই নন।
    ৩। মনে রাখতে হবে ২০১৮ সাল মানে সেটা ট্রাম্পের আমল। আর এবার বাইডেনের আমলেই এই সভাতেও এবার যুক্ত করা হয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক ইস্যু। যা আসলে এশিয়ায় চীন ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করতে পারে কিনা, কতটুকু? এনিয়ে তাঁদের আলোচনা। অর্থাৎ, এখানে এটাতেও বাংলাদেশ কোন ইস্যু-ই না!

    মূল কিছু কথা হাতে গুনে মনে রাখতে হবেঃ
    এক. এশিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতকে নিয়ে আমেরিকা আর যৌথ কিছুই করবে না। যেটা ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটেছিল। সে সময় এক্ষেত্রে আমেরিকান লক্ষ্য ছিল ভারতকে চীন ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করার ঠিকা দেয়া। সেই ঠিকা দেয়া-নেয়া এখন ওভার! মানে শেষ বা ইতিটানা হয়েছে। যার প্রাথমিক কাজটা করে রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালেই। তিনি এই ঠিকার বিনিময়ের বস্তুগত সুবিধায় ভারতকে আমেরিকায় (কম বা না-শুল্কে) ১৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সুবিধা বাতিল করেছিলেন।  আর পুরা এসাইনমেন্ট-ঠিকা অবলুপ্তি ঘটিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। তবে এসাইনমেন্ট বা ঠিকা দেওয়াটাও যেমন আনুষ্ঠানিক ভাবে দেয়া যায় না (এসব কাজ পাবলিকলি করা হয় না) সম্ভব ছিল না; সেকারণে এই ঠিকা বাতিল টাও আনুষ্ঠানিকভাবে করার কিছু নাই। যদিও এতে ঠিক কি ঘটেছে সেটা আমরা জেনেওবুঝে নিতে পারি বাস্তবতা দেখে। এর আগে আমার পুরানা লেখায় বিরোধী কংগ্রেস নেতা শশী থারুর লেখা থেকে – এই ঠিকা দেওয়ার –  রেফারেন্স আছে আমি দেখিয়েছিলাম! আলী রিয়াজেরাও এটা স্বীকার করতে চায় নাই!

    তবুও এর স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, বাইডেনের নয়া নীতি-পলিসিগুলো যদি খেয়াল রাখি। যেমন বার্মা এক্ট, বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখার আগ্রহ কিংবা আন্দামান নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনা (ও আমেরিকান খায়েসও বলতে পারি) ইত্যাদি এসবের দিকে যদি নজর রাখি। এসব কোন ইস্যুতেই ভারত আমেরিকার খায়েসের সাথে চলতে পারবে না – ভারতেরও ঘোষিত নীতি-পলিসি এর বিরোধী। তাই এখানে এসে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক – এই কবি এখানে নীরব থাকবে। ভারত আমেরিকান খায়েস-কে আপন করে নিতে পারবে না শুধু না বরং ভারতের অবস্থান এর চরমতম-বিরোধী! এমনকি ২০২৪ সালে যদি মোদির পরাজয়ে রাহুল বা অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রেও আমেরিকান খায়েস সম্ভবত পূরণ হবে না! এককথায়, আমেরিকান খায়েস – এই ইস্যুটার ভাগ্য অনিশ্চিত!
    সুতরাই এককথায়, বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা থাকবে এই প্রশ্নে আমেরিকান অবস্থান আর কখনও ভারতের সাথে শেয়ার করে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকা আর গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ সেটা হবে আমেরিকার একক সিদ্ধান্ত।

    দুই.
    কিন্তু তাই বলে কী এশিয়ায় চীনবিরোধী অবস্থান, স্বার্থ ততপরতা প্রশ্নে ভারত-আমেরিকা  কমন স্বার্থেও কোন সম্পর্ক বা এক সাথে কমন স্ট্রাটেজিতে কাজ সব নাই হয়ে যাবে? অবশ্যই না। এটা থেকেই যাবে কারণ এটা আলাদা ইস্যু। এমনকি বাংলাদেশে হাসিনার সাথে চীন কী সম্পর্ক রচনা করছে তা নিয়েও ভারত-মার্কিন আলাপ হতে পারে কিন্তু সেটা হবে – বাংলাদেশের ক্ষমতায় কোন সরকার থাকবে সেই প্রশ্ন বাদ দিয়ে –  যেটা একান্তই আমেরিকার একক বিষয় হয়েই থেকে যাবে!
    আমাদের সমস্যা হল, কেন ভারত হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকছে সেটা আমরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের সংঘাত ও প্রেক্ষিত থেকে দেখা বুঝা করি। যেন এর বাইরে অন্য কোন কারণ থাকতেই পারে না। ব্যাপারটা যেন হিন্দু-মুসলমানের পুরানা বিরোধই! আমি সবাইকে অনুরোধ করব একটু অন্যদিক থেকেও দেখেন! প্লিজ!! 

     তিন.  তবে এক্ষেত্রে মানে ভারত-মার্কিন সংলাপে কিছুটা  গোলমাল পাকিয়ে ফেলতে পারেন ডোনাল্ড ল্যু (সবাই নয়)। তিনিই এবার   ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের মধ্যে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বা আইপিএস (IPS) ঢুকিয়ে ফেলার মূল কারিগর। বাইডেনের ইলেকশনী প্রচার স্ট্রাটেজি সাজানোর সময় থেকেই নির্ধারিত ল্যু-এর এই অবস্থান ও পদ। কিন্তু সরি ল্যু! সো ফার তার সাকসেস প্রায় জিরো!  পাকিস্তানে আর সর্বশেষ হাসিনার বাংলাদেশে ল্যু-এর আইপিএস স্ট্রাটেজির এর অর্জন শুন্যই বলা যায়। তবে এবার তিনি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আর খুব বেশি এটা আগাবে এমন সম্ভাবনা কম!

    চার. ভারত চাইবে এই আলাপের ছায়ায় এক ফাঁকে চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি-টা আবার পাওয়া যায় কিনা! সেদিকটা উস্কে তুলতে; আবার যদি লাইগ্যা যায় – আর কী!  একদম আগের মতই না হলেও ভিন্ন মোড়কে অথবা কিছু অংশের কাজ!
    কিন্তু না। আমেরিকা এদিকে ভারতকে আবার এই ইস্যুতে ছাড় বা ঠিকা দিবার জায়গা এবং পরিকল্পনা কোনটাই নাই। আর তা থেকেই আলোচনায় ভারত বিরোধাত্মক ইস্যুগুলোকে সামনে তুলতে শুরু করে ফেলতে পারে। তাহলে, ভারত-আমেরিকার এবারের সংলাপ মোদির শেষ জমানা খারাপ পরিণতি ফলাফলের দিকে রওনা দিবে!

    পাঁচ. অথচ বিবিসি লিখেছে, “বৈঠকে দুই দেশের চারজন মন্ত্রী মিলে সার্বিকভাবে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ডোনাল্ড লু নাকি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। আসলে দোনাল্ড ল্যু এর বরাতে যা যা বিবিসিতে শুভজ্যোতি লিখেছেন এর সবটাই মিথ্যা প্রপাগান্ডা! তাই কোন রেফারেন্স এখানে নাই যে ল্যু এসব কথা কোথায় বলেছেন???

    এসব কথা থেকে পরিস্কার যে বিবিসির এই কথিত রিপোর্ট একেবারেই ভুঁয়া। ঘরে বসে ইচ্ছামত বানানো! ভারত-মার্কিন সংলাপে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে কোন আলোচনা এমনিতেই হওয়ার সুযোগ নাই। কারণ, ১। তা সংলাপ কাঠামোর মধ্যে পরে না। ২। এসময়ে ভারত বা  বাংলাদেশের কারো ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েই আলোচনা তোলাটাই ভারতের জন্য রিস্কি। কারণ, তাতে ভারতের নিজের ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা উঠে যেতে পারে।‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ ইস্যুটাই মোদির জন্য সেনসেটিভ। সেই খবর যার নাই তিনি বিবিসির এই মনগড়া রিপোর্ট লিখতে গেছেন বলেই এই সমস্যা।

    তাহলে কী দাঁড়ালোঃ
    ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ নিয়ে আজ বাংলাদেশ প্রসঙ্গের নামে যা কিছু হয়েছে এর কোন বিশ্বাসযোগ্যতাই নাই। বিশেষ করে বিবিসি এনিয়ে অপরাধী-সাংবাদিকতা করেছে।
    কিছুক্ষণ আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার বয়ানে মানবজমিনে যা ছাপা হয়েছে সেটার উপর বিশ্বাস মানবজমিনও রাখে নাই; এমন না রেখেই মানবজমিন এই রিপোর্ট ছেপেছে।
    আবার ভারত-মার্কিন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার আবার বক্তব্য কেন? তিনি কিভাবে এটা দিতে পারেন? উনি কে এখানে? দুই পররাষ্ট্র-মন্ত্রীর যৌথ বক্তব্যের পরে তিনি কে?? কী তার প্রটোকল????
    ভারতের চেষ্যেটা হল, গায়ের কাপড় খুলে গেলেও ন্নযাংটা হয়েও যদি  হাসিনার ক্ষমতাকে যেকোন উপায়ে কিছু প্রাণ পাইয়ে দেয়া যায় কীনা – এরই এক মিথ্যা প্রাণান্তকর প্রয়াস!
    ভারতের এই খামোখা প্রচেষ্টা উলটা হাসিনা ও লীগের বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনাই বেশি! মানুষ বিরক্তবোধ করবে, যে এত মিথ্যা বলার কী দরকার!  মিথ্যা কারো সঙ্গি হয় না!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ১১ নভেম্বর  ২০২৩,   দুপুর ০১ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • গ্লোবাল অর্ডার কী

    গ্লোবাল অর্ডার কী
    গৌতম দাস
    ৩০ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SG

     

                      Locking China Out of the Global Order Could Backfire

    এবারের ব্রিকস এটা ১৫তম সম্মেলন; মানে হল এটা ২০০৯ সালে প্রথম তার জন্ম সম্মেলন করে যাত্রা শুরু করেছিল। গত ২৪ আগষ্ট এর ১৫তম সম্মেলন দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ হল। কিন্তু এই প্রথম এই সম্মেলন দুনিয়াটাকে ঝাঁকি দিয়েছে – এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি। আর ততধিক বেশি করে পশ্চিমা দুনিয়া (ইউরোপ-আমেরিকা) প্রকাশ্যে নিশ্চুপ কিন্তু তাদের সবগুলো ইন্দ্রিয়ই খাঁড়া; কি জানি হচ্ছে সেদিকে কান খাড়া। এর আগে কোন বিষয় নিয়েই এত করে সবার এন্টেনা খাঁড়া করতে তাদের দেখা যায় নাই। অন্যদিকে আবার, এমনকি আমাদের মত দেশ থেকে যারা গত ২০-২২ বছরের সময়কালে আমেরিকাসহ পশ্চিনা দেশে গিয়ে থাকবার রেসিডেন্স পারমিট যোগাড় করে নিয়েছে এরাও (মানে ব্ল্যাক-ব্রাউনেরা) সাদাদের সাথে মিলে এই প্রথম তাদের সব ইন্দ্রিয় খাড়া করেছে। অথচ এরা দুচার বছর আগেও যেমন ধরেন ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে প্রবল তর্ক করেছে যেন তারা পুর্ণমাত্রায় পশ্চিমা অরিজিনের নাগরিক হয়ে গেছে ফলে তাদের  স্বার্থও পশ্চিমারাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে এলাইনড, এক লাইনে। তাই তাদের স্বপ্ন-কামনার আমেরিকা বা পশ্চিম কত মহান, কত স্টেবল কত সম্ভাবনাময় আর তা তাদের স্বপ্ন-কল্পনা পূরণের জন্য পারফেক্ট!  ফলে চীন-রাশিয়া বা জাতিসংঘের ভাষার গ্লোবাল সাউথ [global south] – এরা তাদের স্বপ্নকল্পনা পুরণের পথে বাধা হয়ে জামা টেনে ধরছে যেন – এই মনোভাব দেখছিলাম আমরা। এরাও কানখাড়া! এমন পরিস্থিতিতে এই পটভুমিটা মাথায় রেখে এবার যদি ব্রিকস এর ১৫তম সম্মেলনের দিকে তাকাই তাহলে বলতে হয়, এবারের সম্মেলন সারা দুনিয়াকে এমন এক মজার জায়গায় নিয়ে ফেলে দিয়েছে; আর যেন বলছে এখন নতুন করে হাটা শিক্ষা কর!! আগের জানাশুনায় আর চলবে না, কাজ হবে না। তাই নতুন করে আগে হাঁটতে শিখে নে তাড়াতাড়ি!  বলতে চাচ্ছি, গত প্রায় আশি বছরের  আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেটায় ফাটল ধরেছে। আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!

    ব্রিকস জন্ম নিয়েছিল সেই ২০০৯ সালে, কিন্তু কেন কী পরিস্থিতিতে কি দরকারে এর জন্ম তা বাংলাদেশের একাদেমিক বা মিডিয়া জগত এখনও বেখবর আছে। এর মূল কারণ, ব্রিকস জিনিষটা কী অথবা কেন সেটাই এখনও পুরাপুরিই স্পষ্ট হয় নাই আমাদের দেশের ‘জানার’ জগতে।  বিশেষ করে এই সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের বাংলা মিডিয়াগুলোর রিপোর্ট দেখলে তা বুঝা যায়। তবে ইংরাজি মিডিয়া গুলো একটু ব্যতিক্রম। কারণ ইংরাজি রিপোর্ট এর সুবিধা হল কপি-পেস্ট বা অনুবাদ করে তারা কোনভাবে চালিয়ে দিতে পারেন। যদিও তাতেও তাদের দুর্বলতাও অপ্রকাশ্য নয়)। কারণ, সবচেয়ে মুখ্য প্রশ্ন, কেউ জানেই না বলতে পারছে না বাংলাদেশ কেন ব্রিকস থেকে বাদ??? গত ২৪ আগষ্ট (ব্রিকস সম্মেলনের শেষ দিন) পর্যন্ত সব রিপোর্টের এই এক দশায়। এমনকি ২৪ আগষ্ট রাত বারোটা মানে ২৫ আগষ্ট তারিখের শুরুতে যাদের হুশ হয়েছে জেনেছে তারাও ঘটনা বুঝে উঠে এরপর সেই ভিত্তিতে রিপোর্টে হাজির করতে গিয়ে কেউই ২৫ আগষ্ট সন্ধ্যার আগে পারে নাই। বিশেষ করে সে খবরটা কোথায় আছে, আবার তা পেলেও কী এঙ্গেলে তা দেখতে হবে এটাই তাদেরকে বেশি ভুগিয়েছে। কারণ রয়টার্স কী-কোথায় এটা তাদের অজানা নয় – হলেও সুনির্দিষ্ট হওয়া সহজ ছিল না।  তাতে  এরপরেও দেখা যায় কোন কোন মিডিয়া হাল ছেড়ে দিয়েছে। তাই তারা ২৫ তারিখে আর ব্রিকস নিয়ে হাজিরই হয় নাই। এরা যে হাল ছেড়ে দিয়েছে তা বুঝা যায় তারা এবার ব্রিকস নিয়ে মহা মাতবর তাদের কূটনীতিক সেকশন কে ক্ষমা দিয়ে দিয়েছে। আর  ২৫ তারিখ থেকে তাদের অর্থনীতি সেকশন থেকে ব্রিকস ইস্যুতে কিছু খবর ছেপেছে। এজন্যই বাংলাদেশে সবার রিপোর্টই তাই কমবেশি হালকার উপর ঝাপসায় মারা ধরণের বক্তব্য জুড়ে দেয়া।

    আমরা নতুন কোন কিছু দেখলে বা একে চিনতে চেষ্টা করলে বা কাউকে চিনাতে গিয়ে, – ঐ নতুনের সাথে কিছু তুলনীয় এমন কিছুর সাথে তুলনা করেই  নয়া ধারণাটা পরিচিত করাতে যাই। তাতে  যতটা সমতুল্য যতটা কাছের সদৃশ্য এমন কিছু পাওয়া যায় যা আবার ইতোমধ্যেই সমাজে অনেক পরিচিত থাকে; তবেই নতুন কাউকে এর পরিচয় দেয়া সহজ হয়। মুলকথা একমাত্র কাছাকাছিও  জানা কিছুর সাথে তুলনা করেই নয়া বিষয়কে মানুষ পরিচিত করাি আমরা।
    কিন্তু ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করে?  আর এর কাছাকাছি ঘটনা ফেনোমেনাই বা কী – তাই তো আমাদের অনেকের জানা নাই! মূলস্মস্যাটা ছিল আসলে এখানে!

    ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করেঃ
    আমি আগে বহুবার বলেছি ব্রিকস যা হতে যায় করতে চায় সেই উদ্দেশ্য হল – আমেরিকার নেতৃত্বে যে গ্লোবাল অর্ডারটা কায়েম আছে এখনও (যেটাকে বেশির ভাগই  আমরা ভুল করে একে আমেরিকান “পরাশক্তি” বলে বুঝি বা ডাকি) এই গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান থাকে বা আছে।
    ঠিক যেমন একটা দেশ-রাষ্ট্রে  ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে এটা তেমনই। আসলে  (গ্লোবাল অর্ডারের জায়গায়) “লোকাল অর্ডার” বললে সেটাই দেশ বা রাষ্ট্র ধারণা হয়ে যায়।  কারণ, রাষ্ট্র মানে সেটা নিজের বা স্থানীয় এই অর্থে রাষ্ট্রকে গ্লোবাল অর্ডারের সাথে তুলনায় লোকাল অর্ডার বলেছি। আর অর্ডার মানে মূলত নিয়ম-শৃঙ্খলায়  সাজানো বা বিন্যাস্ত করা।  তাই লোকাল অর্ডার বলতে বুঝা যেতে পারে নিজস্ব রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা  মানে, বুঝতে হবে তা একটা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে।  তবে লোকাল বলাটা অবশ্যই গ্লোবাল এই ধারণার সাপেক্ষে, এটাও মনে রাখতে হবে। কারণ লোকাল শব্দটা নানান অর্থের ব্যবহার হতে পারে। আর অর্ডার [order], এই অর্ডার বলতে অনেক সময় নির্দেশ বা হুকুম দেয়া অর্থ হলেও এখানে অর্ডার কথাটার মানে নিয়ম-আইন-শৃঙ্খলাময় একটা  সিস্টেম [system] যা বাংলায় ব্যবস্থা। যে অর্থে পুলিশ-কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলা হয়।
    ঠিক সেরকম ১৯৪৫ সাল থেকে দুনিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল অর্ডার (সেবারই প্রথম) চালু হয়েছিল যেন, তা এক ‘গ্লোবাল রাষ্ট্র ব্যবস্থা’। আর এটাকেই “গ্লোবাল অর্ডার” বলছি। তবে শুধু আমি না, বুঝমান একাদেমিকেদের দেয়া ভাষা এটা; ফলে তাদের থেকে নেয়া এই শব্দ ও এর ব্যবহার। আবার রাষ্ট্রে যেমন অনেক ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে  যেমন সংসদ, নির্বাহি বিভাগ (মানে প্রধানমন্ত্রীর অফিস; আর যার অন্তর্গত থাকে এডমিনিস্ট্রেশন, অর্থ বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি মন্ত্রণালয়-বিভাগ ) আর বিচার বিভাগ ইত্যাদিতে একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় তেমন, গ্লোবাল অর্ডার এর বেলায় সেটাও কিছু “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এমন গ্লোবাল রাজনৌতিক প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক । মূলত এইদুটো দিয়েই ১৯৪৫ সালে গ্লোবাল অর্ডার খাঁড়া করা; তা  যাত্রা শুরু হয়েছিল । তবে এগুলোকে “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” এর জায়গায় যেমন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর বেলায় এগুলো মাল্টিলেটারাল বডিও [multilateral body] বলা হয়। কারণ,  এখানে  মাল্টিলেটারাল বলতে তা ‘বহুরাষ্ট্রীয়’ ফলে তা  ‘বহুপক্ষীয়’ এমন বুঝানো হয়। তবে মাল্টিলেটারাল বলতে আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল,  বহু-বাহুবিশিষ্ট। পরবর্তিতে জাতিসংঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ছাড়াও ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO) অথবা একালে পরিবেশ প্রসঙ্গে [ UNEP], হিউম্যান রাইট [UNHRC] ইত্যাদি নানান মুখ্য গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে নেয়া হয়েছে। আর এমন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়েই সমন্বয় করেই একটা “গ্লোবাল অর্ডার”  বা বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয়ে আছে।  তবে সাবধান আমি গ্লোবাল অর্ডার [Global order] বলেছি কোন জিও [Geo-Order] বলি নাই। এমনকি জিও-পলিটিক্স [Geo-politics] -ও বলি নাই। একালে মানুষ যখন একটা কিছুকে বুঝতে পারে না বা ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন এটাকে বলে জিও-পলিটিক্স  বা ভূরাজনীতি। তাই কেউ যখন বলবে, “সবই ভুরাজনীতির খেলা” এর মানে হল, বক্তা বুঝতে পারছেন না এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করে বলবেন!! এটাই বুঝতে হবে!! যার মানে হল –  যা “আমি যা জানি না, বুঝি না” সেটাই ভুরাজনীতি।

    কিন্তু আমরা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ ধারণাটা – সেটা বহুল প্রচলিতভাবে জানি নাই কেন?
    মূল কারণ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা; যার আদিগুরু সেকালের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫) সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট, প্রধান কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ স্তালিন। যিনি পরে মারা যান ১৯৫৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। ঐ যুদ্ধে ১৯৪২ সাল থেকে হিটলারের অক্ষশক্তি [Axis powers] বিরোধি মিত্রশক্তি [Allied powers] – এভাবে যুদ্ধের দু-পক্ষ; আর হিটলারবিরোধী মিত্রপক্ষের মূল নেতা ছিলেন রুজভেল্ট।  তিনিই মিত্রশক্তি নামে জোটবদ্ধতার প্রথম উদ্যোক্তা, মিত্রশক্তির সকলের হয়ে যুদ্ধের মূল মোটা খরচগুলোর একা বহনকারি দেশ, সারা পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা সেকালের সারা দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তি কিন্তু সকলেই এরা যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে গিয়ে অর্থ সঙ্কটে দেঊলিয়া অবস্থায় – এঅবস্থায় এদের সকলকেই নিজ অধীনে আনার বা  ঐ যুদ্ধে বিজয়ী হলে শেষে তারা সকলেই কলোনি দখল ত্যাগ করতবে এই শর্তে বাধ্য করে রুজভেল্ট এদের সবার সাথে চুক্তি করেছিল। এভাবে  বাগে আনা ইত্যাদির মূল কারিগর হলে আমেরিকার নেতা রুজভেল্ট। তাই এই যুদ্ধে রুজভেল্টের প্রধান নেতা হিশাবে উত্থান এভাবেই, এসব কারণেই।
    পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী এদের দেশ সেটা আর এরা, যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে বাধ্য হয়ে রুজভেল্টকে নেতা মেনে নিয়েছিল তা বুঝা গেলেও সোভিয়েত ইউনিয়নও কেন এর ভিতরে একইভাবে ঢুকে গেছিল?  কারণ, হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া স্তালিন যিনি দেখতেছেন হিটলারবিরোধী একটা জোট হচ্ছে আর আবার সেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মুখ্য খরচগুলো বইবেন – কাজেই  হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে এত ভাল সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন নাই। তিনিও তাই রুজভেল্টের নেতৃত্বের মিত্রশক্তিতে যোগ দিতে দেরি করেন নাই। আসলে, মূল পলিটিক্যাল চুক্তি মানে যুদ্ধ শেষে আমরা একটা জাতিসংঘ গড়ব – এই চুক্তিতেই ভিত্তিমূলক সবকথা লেখা ছিল যা ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যা এখন ইতিহাসে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা”
    এমনকি যুদ্ধ শেষে দেশগুলোর পুনর্গঠনের অর্থও ঋণ হিশাবে দিয়েছিল আমেরিকা। বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে এই প্রতিষ্ঠানে মুখ্য ততপরতা ছিল ইউরোপের পুনঃর্গঠন। আর বিশ্বব্যাংক[WB] যার পুরা নাম হল ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনষ্ট্রাকশন এন্ড ডেভলবমেন্ট [International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)] –  এই নামের মধ্যে রিকনষ্ট্রাকশন [বা বাংলায়] পুনর্গঠন এই শব্দটাই বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও শুরুর কর্মের ইতিহাস এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ, বিশ্বব্যাংক যেখন আমাদের মত দেশে দেশে অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে ঋণ দেয় – সেই কাজটা তো পুনর্গঠন নয়। মানে অবকাঠামো (কোন ব্রিজ বা রাস্তা অথবা কারখানা) আগে  ছিল যুদ্ধে বা কোন কারণে ভেঙ্গে গেছে এমন নয়, বরং এই প্রথম বারের মত গঠন। তা সত্বেও বিশ্বব্যাংক-কে তার জন্মের দাগ পুনর্গঠন বা রিকনষ্টাকশন শব্দটা নামের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছে।
    স্তালিন কত রুজভেল্টের ঘনিষ্ট ছিলেন, ১৯৪২-৪৫ এই তিন বছর তা বুঝার একটা ভাল উপায় হল, এই তিন বছরে যত দেশ রুজভেল্ট ভ্রমন করেছেন সেখানে তার দুই বগলে সঙ্গে থাকতেন দুই নেতা স্তালিন আর চার্চিল (সেকালের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী)। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই যুদ্ধে রুজভেল্টের  এমন নির্ধারক অবদান যতটা কম পারা যায় এমনভাবে সোভিয়েত ইতিহাসে ছাটাই করে দেয়া হয়। যাতে মনে হয়, স্তালিনের একক কারিশমাতেই তিনি হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েতকে বাঁচিয়েছেন। [আমাদের মত দেশগুলোর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা কেবল লিখিত সোভিয়েত-রুশ ইতিহাসই, সহি বলে পড়ে থাকেন। আমার বহু সিনিয়র (কমিউনিস্ট)-কে এমন ইতিহাসই বলতে শুনেছি।  এছাড়া তাদের আরেকটা রুল হল,   যা কিছু লাল বইয়ে তাই তাদের জন্য সহি (খাঁটি সত্য) ও শ্রেণীর ইতিহাস। আর লালবইয়ের বাইরের সব “বুর্জোয়া” বা “সাম্রাজ্যবাদের” ইতিহাস – মানে মিথ্যা এই বিবেচনা।]

    পরবর্তিতে বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইতিহাসের এভাবে সাফল্যের ব্যাখ্যাটাই জোরদার হয়ে দাড়ায় ও আরেক সাফাই দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুজভেল্ট মারা যান ১৯৪৫ সালের আগষ্টে। আর ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে নয়া প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার এর আমেরিকা সেটা এবার আর আগের মত “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান” গড়া অথবা গ্লোবাল জনগণের জন্য কাজ ও ইমেজ গড়ার যে আমেরিকা সেটা  বদলে হয়ে যায় এক লুটেরা স্বার্থের আমেরিকা। যা শুরু হয়েছিল সিআইএ দল পাঠিয়ে ইরান দখল দিয়ে। তখন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে খেতাব দেয় বা ডাকা শুরু করেছিল।  অথচ আজ দুনিয়ার খুব কম কমিউনিস্টই বলতে পারবে কবে থেকে কমিউনিস্ট চোখে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ হয়েছে? বরং প্রায় শতভাগই সম্ভবত বলবে জন্ম থেকে!!! ্ওযডী সেটা আবার কার জন্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন নাকি আমেরিকা!!! সে আরেক ঝামেলা!!!   আর এই সুযোগেই সোভিয়েত ইতিহাস থেকে বিশ্বযুদ্ধের নির্ধারক আমেরিকা বা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকেই মুছে ফেলার সুযোগ পোক্ত হয়ে নিয়েছিল!

    আবার একটু পিছনে যাই, ওদিকে (১৯৪২-৪৫ এই সময়কালে) মিত্রশক্তির নেতা রুজভেল্টের দেয়া সুবিধা স্তালিন নিতে গিয়ে  আমেরিকার প্রস্তাবিত গ্লোবাল অর্ডার গড়ার পরিকল্পনায় সামিল হতে স্তালিন বাধ্য হয়েছিলেন, তা বলা যায়। সেই সাথে ১৯৪৪ সালের দিকে রুজভেল্ট প্রথম তার জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ার ধারণা স্তালিনসহ সেকালের প্রধান মিত্রদের কাছে হাজির করেছিলেন। ভেটো সদস্যপদ রাখার ব্যবস্থা চালু করে স্তালিনের মূল সব আপত্তি সামলিয়েছিলেন রুজভেল্ট। এরপরে এবার স্তালিনকে ঘনিষ্টভাবে পেয়ে নিজ “গ্লোবাল অর্ডার” গড়ার স্বপ্ন-পরিকল্পনায় স্তালিনকে সামিল করে নিয়েছিলেন।  এতে স্তালিন একসাথে রুজভেল্টের সাথে মিলে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ গড়তে রাজি তো হয়েছিলেনই।  জাতিসংঘ গড়ে গড়ে উঠতে পেরেছিল। এমনকি গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে ১৯৪৪ সালে এর যে জন্মসভা বসেছিল তাতে প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। সেই প্রতিনিধি ২২দিন ব্যাপী লাগাতর চলা জন্মসভায় হাজির থাকলেও এরপর প্রত্যেক রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ করা সাপেক্ষে সদস্যপদ গ্রহণের প্রসঙ্গ আসা ও সময় থেকে সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত হয়ে যায়। সেই থেকে গ্লোবাল অর্ডার তৈরির উদ্যোগের সাথে কার্যত স্তালিন থেকেও না-থাকা হয়ে যায় – জাতিসংঘ গড়তে হ্যা কিন্তু  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে না – এভাবে। কিন্তু এনিয়ে সোভিয়েত পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে  কোন আপত্তি অথবা উচ্চবাচ্য কিছু শুনে নাই।  কেন স্তালিন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক না গড়ে ফিরে এলেন – এনিয়ে কোন আর্টিকেল লেখা বা এটা আমেরিকানদের খারাপ কাজ এমন কোন বক্তব্য আনা এমন কোনকিছুই করা বা বলা হইয়েছে জানা যায় না। এমনকি ১৯৫৩ সালে প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে আইসেনহাওয়ার – তিনি আমেরিকার ভোল বা ইমেজ বদলানো ততপরতা শুরু করেছিলেন যেটা থেকে সোভিয়েত প্রতিক্রিয়া হল যে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে কোন ভাল-মন্দ মুল্যায়ন বা নাম নেয়া ইত্যাদি সোভিয়েত সরকারের দিক থেকে হয়েছে, নেতারা কখনও করেছেন এমন কিছু জানা যায় না।
    সব মিলিয়ে এসবে রুজভেল্ট-স্তালিন মিলে যে অভিমুখ একটা গ্লোবাল অর্ডার চালু করার যতটুকু একসাথে করার যাচ্ছিল বা পরিকল্পনা ছিল তা ১৯৫৩ সালের পরে শুকিয়ে মারা যায়, কোন চিহ্নই থাকে নাই। পরের সোভিয়েত নেতৃত্ব নিকিতা ক্রুশ্চেভ থেকে ব্রেজনেভ বা গর্বাচেভ পর্যন্ত কেউ কখনও নির্দিষ্ট করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিয়ে কিছু বলেছেন জানা যায় না। তবে আমেরিকা ওটা “পুঁজিবাদী সমাজ বা ব্যবস্থা” ফলে যেন তা তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য ও পাপকাজ এমন অনুমান থেকে কথা বলা, খারাপ চোখে দেখানো এটা বজায় ছিল সব সময়েই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমালোচনা জানা যায় না।

    কিন্তু কেন এমন ছিল?  আর এর চেয়ে বড় কথা যে সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোকে (মোট প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র) আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য করে না  নেওয়াতে বা তারা না হওয়াতেই কী আমেরিকান নেতৃত্বে পশ্চিম  এরা কী একটা গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করতে ব্যার্থ হয়েছিল বা থমকে দাড়িয়ে গেছিল? সোজা জবাব হল, একেবারেই না।  বরং গ্লোবাল অর্ডার  নিজের মত করে বিকশি হয়েছে আর এখন অনেক ডালপালা গজিয়ে আরো বিস্তৃত হয়েছে। তবে অবশ্যই এই বিকাশ আদর্শ নয়, দোষত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা ও খামতিও প্রচুর। কিন্তু সাফল্যও ফেলনা নয়।
    কিন্তু মজার কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯১) গেলে তা থেকে আলাদা হওয়া ১৫ রাষ্ট্র আর এই সোভিয়েতের প্রভাবাধীন বা বাফার রাষ্ট্র হিশাবে যেমন পোল্যান্ড, রোমালিয়া ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র ছিল যারা সকলে ঐ ১৯৯২ সালেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল। এখন ছোটখাট পাঁচটা দেশ বাদে দুনিয়ার সকলেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য। মানে ১৯৩ রাষ্ট্রের জাতিসংঘের বিপ্রীতে আইএমএফ সদস্য ১৮৮, তাই।  এখনকার দুনিয়া গ্লোবাল অর্ডার বানানোর দিক থেকে অনেকটাই অগ্রসর হয়ে গেছে। তবে আগেই বলেছি অবশ্যই দোষত্রুটি প্রচুর। সেসব সংস্কার করে যেতেই হবে প্রত্যেক কালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতটা একে এলাও করে।

    কিন্তু আমাদের মত দেশের বেলায়, তারা ১৯৯১ সালের আগের সোভিয়েত অনুসারি কমিউনিস্ট হয়েই থেকে গেছেন। এরা নিজেদের জন্য আর আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে তাদের প্রভাবের কারণে এরা না নিজেরা কিছু জেনেছে না কাউকে জানতে দিয়েছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ঠিক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান। কারণ, তাদের আপত্তি এক জায়গাতেই যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উতপাদন না হওয়া – মানে তাদের সমাজতন্ত্র না হওয়া মানেই এগুলো পাপের ফসল তাই অগ্রহণযোগ্য!!! এই হলো তাদের মূলকথা।
    এতে তাদের আপত্তিটা দাড়িয়েছে এমন যদি কোন আওয়ামীলীগ নেতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়  যে বিএনপি কে নিয়ে তোমাদের আপত্তিটা ঠিক কী? আর তাতে যদি লীগ নেতা জবাব দেয় যে ওরা আওয়ামীলীগ নয় এবং  ওরা আওয়ামীলীগ করে না – তাহলে এটা যেমন জবাব হবে এটা তাই!!

    তো সে যাই হোক তাদের আপত্তি তাদের সাথে থাকুক সেটা কোনই সমস্যা নয়।
    কিন্তু তাদের প্রভাব আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডারটা কী এসম্পর্কে বেখবর করে রেখে দিয়েছে। এদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে এক অর্ডারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা তো বহাল হয়ে এর বয়স  প্রায় আশি বছর হয়ে গেছে। আর ওদিকে রাইজিং চীন যে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্ব নিতে উঠে চলেছে (যদিও আরো সময় লাগবে)। ফলে নেতৃত্বের পালাবদলটাই আসন্ন হয়ে উঠেছে আর তাতে চীনা নেতৃত্বের  নতুন গ্লোবাল (যা আপাতত কেবল) অর্থনৈতিক অর্ডারটা কেমন হতে পারে – এটা নিয়ে লড়াই ঝগড়ায় তা কোথায় গিয়ে থিতু হবে – এরই সময়কাল চলছে। এখন। একথা শুনে মনে করার কারণ নাই যে এটা কেবল চীন-আমেরিকার লড়াই। তা একেবারেই নয়।
    বরং উভয় পক্ষই বাংলাদেশকে নিজের যেদিকে সুবিধা মনে হয় সেদিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইবে,চাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোন্দিকে যাব বা এই তানাতানি কিভাবে সামলাবো এর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা কী তাই তো বুঝিনাই!! গ্লোবাল শুধু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক যে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এটাও তো বুঝি নাই!! কমিউনিস্ট জ্ঞানিদের তো আরো ধারণা নাই। তাহলে? বাংলাদেশের একাদিমিক জগত বা সুনির্দিষ্ট করে আই আর বা অর্থনীতি কেউই তৈরি নয় – প্রয়োজনটাই বুঝে সারতে পারে নাই অবস্থা!!!!
    তাদের আল টপকা কথা হল, হাসিনা চাইলে ব্রিকসে যোগ দিতে পারে!!! যেন বিরাট এক জ্ঞানের কথা বলেছে!!

    আমরা নিজের জন্য কী করতে পারিঃ
    এদিকে গ্লোবাল পালাবদলে এতদিনের আমেরিকান নেতৃত্বের অবস্থানে চীন উঠে আসতে চলেছে। অথচ কমিউনিস্টেরা ১৯৪৫ সালে দুনিয়ায় কী গুরুত্বপুর্ণ বদলে এসেছে তা খেয়াল করে নাই। শুধু তাই না, দেশের একাদেমিক জগতকেও এটা খেয়াল করা বা বুঝার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নেতি ধারণাই দিয়েছে।  তাই  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান ও কেন, তা নিজেও জানে নাই, অন্যদেরও জানা হয় নাই। তাহলে এখন যখন প্রায় আশি বছর পরে আমেরিকান নেতৃত্বের বিকল্প হিশাবে চীনের নেতৃত্বের ব্রিকস খাড়া হতে চলেছে আর এরই প্রথম অর্থপুর্ণ কিছু পদক্ষেপ চীন নিয়ে ফেলেছে তখন এই ঘটনা-ফেনোমেনা নিয়ে আমাদের একাদেমিক বা কমিউনিস্টেরা কীভাবে আর কথা বলবে, যেটা সে আগে খেয়ালই করে নাই, প্রস্তুতি নেয় নাই?
    এজন্যই বলেছি আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেখানটায় ফাটল ধরেছে। তা আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!
    ফলে কী কী ও কেমন ধরণের বদল আসন্ন তাতে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী কী হতে পারে সেসব বুঝাবুঝির তরিকা জানতে হবে, পদ্ধতি জানতে হবে – দেখার নতুন অভ্যাস চর্চা লাগবে ইত্যাদি…। তবে সাবধান এটা ১৯৪৫ সালের মত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বদল যেমন ঘটেছিল এবার আগে থেকেই পরিস্কার যে এটা কেবল চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতিক এক অর্ডার আসতে পারে মাত্র।  ফলে ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কমে যাবে হয়ত কিন্তু নাই হবে না।  আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে যাচ্ছে না। আবার রাজনী আর  অর্থনৈতিক গ্লোবাল নেতৃত্ব যদি আলাদা হয় তবে কেমন ফিট করবে্‌, কার্যকরভাবে চলতে পারবে কিনা সেটা এক বিরাট প্রশ্ন যার জবাব অজানা!
    সবচেয়ে বড়কথা এই পালাবদল যদি আপোষে না হয়ে যুদ্ধ লেগে যায় বা এড়াতে না পারে মানে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ফয়সালার দিকে চলে যায় তাহলে কী হবে! আর এতে সব পক্ষের জন্যই তা মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে সন্দেহ নাই।  এর একটা চিহ্নের কথা বলা যায়। তা হল, আগামি বছর শুরুতে যদি ইউক্রেন যুদ্ধ না থামে তবে সেটা হবে খুবই খারাপ চিহ্ন। কেননা এর মানে হবে আমেরিকার আগামি নির্বাচন যেটা ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়ার কথা সেটাও যুদ্ধের মধ্যেই হবে??
    আর সেসব নিয়ে বুঝাবুঝি আর তাতে গ্লোবাল স্বার্থের ঝগড়াগুলোর মাঝে নিজ-রাষ্ট্রের ভালমন্দ বুঝবার জন্য আমরা কতটুকু যোগ্য হয়ে উঠব? যতটুকু পুরান কমিউনিস্ট প্রভাবের মধ্যে আমরা যে যেমন থেকে যাব তারা তক্তি গভীর অবুঝ থেকে যাব। এর বিকল্প হল, একটা ফ্যাক্টসকে আদর্শগত পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করা বা ব্যখ্যা করা বা ব্যাখ্যা দেয়া ত্যাগ করতে হবে।  সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে ঐ আদর্শগত বুঝাবুঝিতে খামতি আছে। সেই খামতি পূরণ করে বরং সামলানো – নিজের চিন্তাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।   একথাটাই আরেকভাবে বললে, আমি কমিউনিস্ট তাই কমিউনিস্ট-চিন্তা-ফ্রেমে ফেলেই আমাকে যেকোন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে হবে – এই জিদ ত্যাগ করতে হবে।

    আপডেটেডঃ    আগষ্ট  ২০২৩; 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • চীনের ‘গায়েব’ কালচার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গ্যাং

    চীনের ‘গায়েব’ কালচার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গ্যাং
    গৌতম দাস

    ২৯ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4LB

     

    Where is China’s foreign minister?

     

    চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী একমাস গায়েব ছিলেন; মানে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলেও মাফ পান নাই। তিনিও ডিসাপিয়ার্ড [dissappeared]  হতে পারেন এবং হয়েছেনও। ‘পার্টি’ যে কাউকে এমন শিকার হতে বাধ্য করতে পারে!!!  কী ‘সুন্দর’ একটা প্রাকটিস তাই না!!! এটা চরম ভীতিকর, অগ্রহণযোগ্য! এটা রাজনীতি হতে পারে না!  সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে সরকার থেকে গত ২৫ জুলাই এরপর জানালো হল যে তিনি সদ্য অপসারিত হয়েছেন। আর সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম চিন গ্যাং [QIN GANG]। উনার সরকারী বায়োডাটা উনার নামের সাথে দেয়া লিঙ্কে বা এখানে পাওয়া যাবে।   চীনা শব্দের সঠিক উচ্চারণ নিয়ে বিতর্ক সবসময় হয়। তারা নিজেরাই দুবার উচ্চারণের স্টাইল বদলিয়েছে এটাও  এর এক কারণ। যেমন মাও সে তুং [ইংরেজি: Mao Zedong ] আর হবে না, মাও জে দং বলতে হবে, এ’হলো এমনই এক বদল। তবে এখানে এখন যে তত্ব ফলো করেছি সেটা হল চীনা শব্দ যেটা ইংরাজি ‘Q’ শব্দ দিয়ে করা হয় এর (ফোনেটিক্যাল) উচ্চারণ করতে হবে চ [ch]। আর এই সুত্রে নামটা চিন গ্যাং [QIN GANG] লিখেছি। যদিও অনেকে ইংলিশ ফোনেটিক বা আক্ষরিক উচ্চারণের নীতি অনুসরণ করলে বলবেন এটা কুইন [QIN]। নাম বা উচ্ছারণের প্রসঙ্গের এখানেই ইতি টানছি।

    এই অপসারণের মাধ্যমে চীনা কমিউনিস্টদের কালচার-চর্চার বিরুদ্ধে যে কঠোর সমালোচনা দুনিয়া জুড়ে চালু বা অগ্রহণযোগ্যতা আছে তাতে এখন আরেকটা বাজে উদাহরণ বা কলঙ্কের মুকুট যোগ হলো। বুঝা গেল এমন কলঙ্কের ঘটনা সহসা বা সহজেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ছেড়ে যাচ্ছে না। চীনা কমিউনিস্টদেরও এথেকে মুক্তি নাই। বদনাম যা হয়েছে  ও দাগ যা লেগেছে তা আরো বয়ে বেড়াতে হবে।

    কেন এটা কলঙ্কঃ
    চিন গ্যাং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন মাত্র সাত মাস আগে। রয়টার্সের এক বিস্তারিত রিপোর্ট চিন গ্যাং এর ঠিকুজি মানে জন্ম ও কর্ম-বৃত্তান্ত সব ছাপিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম – “চীনা চিন গ্যাং এর উল্কাগতিতে উত্থান ও মুহুর্তেই পতন” [China’s Qin Gang had meteoric rise and swift removal]।  সেখানে দেখা যাচ্ছে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে এক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আছে University of International Relations [UIR] এই নামে। বুঝাই যাচ্ছে এটা ‘আই আর’ মানে ‘ইন্টারন্যশনাল রিলেশনস’ বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক; মানে যা কেবল বা মূখ্যত বৈদেশিক বা পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক স্টাডির এক বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়। রয়টার্সের ভাষায়, এটা খুবই প্রেস্টিজিয়াস [prestigious] বা উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়।  চিন গ্যাং সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন করেই সরকারের কুটনীতিক সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে টানা দীর্ঘদিন পররাষ্ট্র বিভাগেই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পোস্টিং পেয়ে চলেছেন। এতে তিনি দুইদুবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হয়েছিলেন, দুবার ওর প্রটোকল অফিসারও। শেষে বৃটেনে চীনা রাষ্ট্রদুত ছিলেন। আর একেবারে শেষে গত ডিসেম্বর ২০২২ সালে মানে এখন থেকে সাতমাস আগে, খোদ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিশাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আর এর ঠিক আগে পর্যন্ত ছিলেন আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদুত।
    বলা হয়েছে ৫৭ বছর বয়স্ক তিনি এপর্যন্ত চীনের সর্বকনিষ্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। আবার কমিউনিস্ট পার্টি রেওয়াজের কারণে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যাওয়াতে পরে আরেক গুরুত্বপুর্ণ পদ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটবুরোর মেম্বার হয়ে যান চিন গ্যাং। যা পার্টির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর সক্রিয় কমিটি।   তাঁর নিয়োগের পর থেকেই মিডিয়ায় বলা শুরু হয়, তিনি বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর নেকনজরে আছেন; তাই  চিন গ্যাং এর এই খাঁড়া উত্থান। প্রেসিডেন্ট শি তুলনায় কমবয়সীদের সুযোগ দিতে চান – এর সুবিধাগুলো কাজে লাগাতে চান তাই নাকি ‘এই উত্থান’। এমনকি অনেক বিশ্লেষক বা বিশেষজ্ঞরাও অনুমান করে বলা শুরু করেছিল যে , চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে শক্ত ও গঠনমূলক স্থিতিশীলতা [to help stabilise relations with the U.S] দেওয়ার জন্যই নাকি প্রেসিডেন্ট শি এর এই  পরিকল্পনা। বিশেষ করে অ্যামেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের সাথে তাঁর প্রথম লম্বা বৈঠকের পরেই এই জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছিল।

    কিন্তু হায়! সব ভুল প্রমাণিত হয়ে গেল। সব মিথ্যা আর সবকিছুই ‘না’ করে দিয়ে, মাত্র সাতমাসের মাথায় সব ভেঙ্গেচুড়ে ছাড়খার হয়ে গেল। গত ২৫ জুনের পর থেকেই চিন গ্যাং “জনসমক্ষে অনুপস্থিত” হতে থাকলেন।  চীনা গায়েব হয়ে যাওয়ার সেই ট্রাডিশন আবার চালু হয়ে গেল।  কেউ তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখতে পেল না। তবে একবার গায়েব ঘটনার কেবল দুসপ্তাহ পরে (১১ জুলাই) তাঁর মন্ত্রণালয় জানালো যে অজানা স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি নাকি তার পুর্ব নির্ধারিত ইন্দোনেশিয়া সফরে যাচ্ছেন না। এতটুকুই।  এরপর?

    এরপর আকাশ থেকে ফেলে দেওয়া। মানে তিনি মোট প্রায় এক মাস গায়েব থাকার পরে,  গত ২৫ জুলাই এর সরকারী ঘোষণায় জানানো হল যে চিন গ্যাং-কে অপসারণ করা হয়েছে। আর এর সাথে জানানো হয়েছিল যে আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই [Wang Yi ] কে আগের জায়গায় মানে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে স্থলাভিসিক্ত করা  হয়েছে। এভাবে চীনের মানে, কমিউনিস্টদের এই কলঙ্ক বাড়ছে তো বাড়ছেই।

    কমিউনিজম আর ইনসাফ কী পরস্পরবিরোধীঃ
    কমিউনিজম আর ন্যায় (বা ইনসাফ) এর ধারণা এদুটো যেন একসাথে চলতেই পারবে না, এরা পরস্পর বিরোধী।  সম্ভবত কমিউনিস্ট পার্টির কাছে তাই। সেই যে লেনিনের [Vladimir Lenin] হাতে দুনিয়াতে প্রথম (১৯১৭) কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটেছিল কিন্তু তা সত্বেও ন্যায়ের ধারণা কমিউনিস্টদের হতে পারল না। সেসময়ই বিপ্লবী লেনিন প্রথম যে হোচট খান তা হল, তারা বলশেভিক বিপ্লবীরা বা তাদের বলশেভিক পার্টি বিপ্লবের প্রথম গণভোটেই ফেল করেছিলেন। আর সেই থেকে পাবলিক ধারণাটার উপরেই কমিউনিস্টদের বিতৃষ্ণা এসে যায়। বলা যায় “পাবলিক” এই কনসেপ্ট এটা সেই থেকে পার্টি ও সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টদের জন্য আর আপন হয় নাই ও ক্রমশ পাবলিক বা জনস্বার্থ ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে থেকে যায়। অবস্থা হয় এমন যেন – “হারামজাদা জনগণ তোরা থাক, আমরা চললাম সুন্দরবন”।  এমনিতে এই সোভিয়েত বিপ্লবের আগে থেকেই,  তাত্বিকভাবে বললে কমিউনিস্ট থিওরিতে কার্যত ‘পাবলিক’ বা জনগণ ধারণাটাই নাই। কথাটা শুনে অনেকের অদ্ভুত লাগতে পারে, অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। মনে হতে পারে আমি মিথ্যা বলছি বা প্রপাগান্ডা করছি। কিন্তু আপনারা কমিউনিস্টেরা নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। কেবল আগেই ধরে নিবেন না যে পাবলিক বা জনগণ ধারণাটা আছে; বিশেষত বিপ্লব বা ক্ষমতাদখলের পরে।  কিন্তু কেন নাই?

    কী জিজ্ঞাসা করবেনঃ
    ছোট্ট উত্তর – জনগণ ধারণাকে কমিউনিস্টেরা ‘শ্রেণী’ বলে এক ধারণা দিয়ে বদলে নিয়েছে কেন, তা জিজ্ঞাসা করবেন। 
    ‘সমাজটা শ্রেণীতে বিভক্ত’
    – এটা কমিউনিস্টদের খুবই কমন কথা। আর খুবই ডিপ রুটেট – মনের গভীরে ঢুকে থাকা তাদের এক ধারণা এটা। এমনকি এটা তাদের গর্ব করার এক ধারণা।   “তাই সবকিছুকে শ্রেণী দিয়ে, শ্রেণীর ভিত্তিতে বিচার করে দেখতে হবে”; এই হল কমিউনিস্টদের দাবি ও অনুমান।  অর্থাৎ কমিউনিস্টেরা বলছে – শ্রেণী নির্বিশেষে –  সাধারণভাবে জনগণ বলে কিছু নাই। বরং আছে কেবল শ্রেণী। কথা বলতে গেলে মানুষকে কোন না কোন শ্রেণীর পক্ষেই কথা বলা হয় বা হয়ে যায়, যাবেই – বলে কমিউনিস্টেরা বিশ্বাস করে। এটাই কমিউনিস্টদের আদি ও মৌলিক বক্তব্য অবস্থান। তা নিশ্চয় কমিউনিস্টেরা অস্বীকার করবেন না।  যেমন পাবলিক ইন্টারেস্ট বা গণমানুষের স্বার্থ, গণস্বার্থ বলে তাই শ্রেণী-বুঝের কমিউনিস্টদের কাছে কিছুই নাই। গণস্বার্থ নয় তাদের আছে শ্রেণী স্বার্থ ধারণা। ঠিক কিনা নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নেন, একান্তে।  যারা সতর্ক কমিউনিস্ট তারা পাবলিক আর শ্রেণী ধারণার ফারাকটা স্বযত্নে মনে রাখেন।

    কিন্তু এই শ্রেণী ধারণার কারণেই এরপরে আর পাবলিক বলে কোন ধারণা কমিউনিস্ট সাহিত্য বা ভোকাবুলারি থেকে বাদ হয়ে যায়। ( এখানে পাবলিক, মাস পাবলিক (mass public), জনগণ বা আম-জনতা ইত্যাদি এসব ধারণাগুলোকে এককথায় পাবলিক বলা হয়েছে)। কেন বলছি? কারণ পাবলিক কথাটার অর্থ শ্রেণী নির্বিশেষে আম-জনতা।  আবার আরো আগিয়ে জনগণ বলতে যদি সিটিজেন বা নাগরিক ধারণাটার দিকে যদি আগাই তাহলে নাগরিক কথাটাও আর কমিউনিস্টদের থাকে না;  আসলে নাইও। কমিউনিস্টরাই উলটে নাগরিক ধারণাটাও তাদের বলে দাবি ছেড়ে দিয়েছে; তাদের কঠোর শ্রেণীবোধ এর কারণে। এককথায় কমিউনিস্ট চিন্তায় শ্রেণী ধারণাটা সব ধারণার আগে বা সেন্ট্রাল করে রাখাতে এই  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা কমিউনিজমে নাই; তারা আর থাকতে পারে নাই এমন হয়ে গেছে। মূলত সোভিয়েত বা রাশিয়ান বিপ্লবের পরেই এমনটা স্পষ্ট করেই হয়ে গিয়েছে।
    যদিও পরে ১৯৪৯ সালের মাওয়ের চীন বিপ্লবের বেলায়ও শ্রেণী ধারণাটা সেন্ট্রাল শুধু না, সম্ভবত আরও কড়াভাবে সেন্ট্রাল বা মুখ্য করা হয়। যেমন মাওবাদীদের ক্ষেত্রে সবধারণার শুরু শ্রেণীদ্বন্দ্ব ধারণা থেকে আর শ্রেণীদ্বন্দ্ব ধারণা দিয়ে। তাই এখানেও বাস্তবত  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা চীনা কমিউনিজমেও নাই।  কিন্তু তবু একটা কিন্তু করে রাখা হয়েছে। ডেকোরেটিভ (decorative) বা অর্নামেন্টাল (ornamental) অর্থে  মানে বাংলায় বললে, কেবল অলংকারে সাজানো অর্থে  পিপলস [peoples] শব্দটার ছড়াছড়ি আছে চীনে।  যদিও এটা ঠিক পাবলিক বা জনস্বার্থ বলতে যা বুঝাই পিপলস এর অর্থ এখানে ঠিক তা নয়। খুব সম্ভবত দুনিয়ায় দ্বিতীয় কমিউনিস্ট বিপ্লব হিশাবে চীনা বিপ্লব; ফলে রাশিয়ান বিপ্লবের অনেক কিছুর দায় বা সাথে মিলিয়ে চীনের নিজের বিপ্লবকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল। তাতে সোভিয়েত শব্দ ও ধারণাটা যেটা রাশিয়ান বিপ্লবের মুখ্য বৈশিষ্ট – যার একচুয়াল অর্থ পাড়া মহল্লা বা এলাকার প্রতিরোধ কমিটি। বাংলাদেশের সাথে তুলনায় আমাদের যেকোন আন্দোলনে যেটা আমরা বলি “সংগ্রাম পরিষদ” – এটাই সেই সোভিয়েত ধারণার বাংলাদেশীকরণ। [এটাই দাদা সিরাজুল আলম খানের এক সুচিন্তিত অবদান]।
    রাশিয়ান বিপ্লবে লেনিন ও সহযোগীদের সমস্যা ছিল এটা কেমন বিপ্লব বলে তারা পরিচয় করাবে? তাদের বহুকাঙ্খিত রাশিয়ান কমিউনিস্ট বিপ্লবকে [তাঁরা ইউরোপে যেমন হয়েছিল রিপাবলিক বিপ্লব মানে রাজা-বাদশার শাসনের বিপরীতে প্রথম জনগণের শাসন বা পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন বলে থাকে] – যেটাকে আবার কমিউনিস্টেরা তাদের চোখে বুর্জোয়া বিপ্লব বলে চিনিয়ে এসেছে – তাই তারা কোনভাবেই রাশিয়ান কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এসব পুরানা শব্দের কোনটাই ব্যবহার করে চিনাতে চায় নাই। আর সত্যি সত্যি রাজধানী ক্রেমলিনের এলাকা এলাকায় প্রতিরোধ কমিটি বা সোভিয়েত গড়ে তুলেই এই বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল বলে এই সোভিয়েত বা প্রতিরোধ কমিটি গড়া ও নাম দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল যেটা থেকে কমিউনিস্ট সাহিত্যে একে সোভিয়েত বিপ্লব বলে চিনানোর।
    কিন্তু এটাই আবার সমস্যা হয়ে যায় চীনের বিপ্লবের বেলায়। কারণ, চীনের ক্ষমতাদখলের ক্ষেত্রে তাদের স্টাইলে কোন প্রতিরোধ কমিটি বা সোভিয়েত গড়ে তা আগিয়ে নিয়ে এটা সম্পন্ন করা হয় নাই। তাই চীনে ‘সোভিয়েত’ শব্দের বিকল্প হিশাবে ‘পিপলস’ শব্দটা চালু করা হয়েছিল। আর মনে রাখতে হবে – এই পিপলস এর অর্থ ঠিক  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা একেবারেই নয়। কেন নয়?  কারণ,  শ্রেণী নির্বিশেষে কোন পাবলিক বা নাগরিক ধারণা কমিনিজমে নাই, শ্রেণী আছে।  আর কমিউনিস্ট পার্টি তো কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার্তে রাষ্ট্র কায়েম করেছে বলে পার্টি মনে করে।

    আর এসব কারণেই,  যেকোন কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখলের পরে সবকিছুর মূলকর্তা হয়ে যায় পার্টি – মানে কেবল  শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ (আম-জনতার স্বার্থ নয়) রক্ষার জন্য ক্ষমতাদখল করেছে যে  পার্টি।  । তাও আবার এই মূলকর্তা বলতে কতদুর বুঝিয়েছি ? আসছি সেখানে, তবে এর আগে কিছু কথা।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে একারণেই নাগরিক সবারই কিছু মৌলিক ও কমন স্বার্থ রক্ষার জন্য বা সবারই মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষার জন্য (রিপাবলিক) রাষ্ট্র গঠন করা হয় – এধারণাটাই কমিউনিজমে নাই, তাদের রাষ্ট্রে নাই।  আছে কেবলমাত্র শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার কথা। সবকিছু তাই সেখানে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের জন্য। এখন এতে আরেক সমস্যা তাহলে হাজির হয় যে তাহলে  কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের রাষ্ট্রে কোনটা শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ তা বুঝা যাবে কী করে? এর জবাব থেকেই পার্টি ধারণাই মুখ্য কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ধারণা হয়ে যায়। কেন? যেটা শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি বলবে, সাব্যস্ত করবে সেটাই কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ বলে বুঝতে হবে।
    আর এভাবে সাব্যস্ত করাতেই কমিউনিস্ট সমাজে এরপর থেকে বিচার, ন্যায়বিচার, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, বিচার প্রক্রিয়া ইত্যাদি যত সম্পর্কিত শব্দ আছে এর সবকিছু নাই ও বাতিল হয়ে যায় অথবা পার্টির হুকুমের অধীনে হয়ে যায়।  কিন্তু ইনসাফ বা ন্যায় জিনিষটাই এমন যাকে স্বাধীন থাকতেই হয় নইলে তা ইনসাফ নয়। বিশেষ করে শাসক-ক্ষমতার অধীনে যে যেতেই পারে না। কারণ সেক্ষেত্রে এটা শাসকের ইচ্ছাই হয়ে যাবে। ইনসাফ-বিচার কখনই শুধু শাসক কেন, কারো অধীনের যেতে পারে না। তাহলে সেটা আর ইনসাফ-বিচার একেবারেই নয়। এটাই প্রিযুডিস।  একারণেই, সেপারেশন অব পাওয়ার না থাকা, প্রিযুডিস (prejudice) হয়ে থাকে বা  কোন আগাম অনুমান মাথায় নিয়ে বিচারক বিচার এজলাসে বসলে সেটা আর বিচার-ইনসাফই নয়, হবে না। অথচ কমিউনিস্ট দেশে খোদ পার্টি মানে শাসন ক্ষমতাও যার হাতে সেই-ই হয়ে আছে কার্যত বিচারকের ভুমিকায়। এজন্যই পার্টিই বিচারক বা রায় দাতা যে কে শ্রমিক শ্রেণী আর কে বুর্জোয়া তা কেবল পার্টিই বলে দিতে পারে!  তাই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর অপরাধ কী? কে তার বিচার করেছে আর কিসের ভিত্তিতে এসবে বিচার সাব্যস্ত হয়েছে এনিয়ে চীনা পার্টি নিরুত্তর। কোন জবাব তারা দিবে না এটাই কমিউনিস্ট কালচার। ক্ষমতা চর্চার কালচার!। সবচেয়ে লোমহর্ষক কালচার!!!  দুঃখের কথা, এটা রিপাবলিক বা মর্ডাণ যুগের রাজনৈতিক মুল্যবোধ চিন্তা ও চর্চা তো নয়ই এটা এরও পিছনের দিনের কোন মনার্কি [ monarchy] রাজতন্ত্র বা  কোন রাজা-বাদশার কালেও যেটুকু বিচার ব্যবস্থা ছিল কমিউনিজম সেটুকুওও নয়। বরং এরও পিছনের পর্যায়ের কোন সমাজের চিন্তা ও চর্চার কাহিনী!!!

    যেকোন মানব সমাজ জন্মানো শুরু হয় ন্যায় বা ইনসাফের ভিত্তি থেকেঃ
    এটা বহু আগেকার প্রতিষ্ঠিত ও ব্যবহারিক সত্য যে যেকোন সমাজ জন্মানো শুরু হয় ন্যায় বা ইনসাফের ভিত্তিমূলক ধারণা থেকে। কথাটা আরও ভালভাবে বুঝবেন যেমন ধরেন কেউ কোন কাজ বা সেই কাজটা করে ঠিক করেছে কিনা এটা সেই সমাজ কী দিয়ে সাব্যস্ত হবে? সমাজ কী দিয়ে কিসের ভিত্তিতে তা সাব্যস্ত করবে? গায়ের জোর নাকি ন্যায় ইনসাফের ধারণায়? – এটা যেকোন সমাজের জন্য খুবই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন!!  অর্থাৎ – ন্যায়বিচার সংক্রান্ত মুল্যবোধ দিয়ে নাকি যার গায়ের জোর যার বেশি সেই সঠিক বলছে ধরে নিতে হবে?  মনে রাখতে হবে ন্যায়বিচার সংক্রান্ত মুল্যবোধ বা ইনসাফের ধারণা এখানেই ধর্মতত্বেরও এক বিরাট প্রভাবক ভুমিকা আছে এবং থাকবেই। কাজেই এসব দিকগুলোকে একটা সংজ্ঞায়িত করা নাই এমন ক্ষমতা দিয়ে – পার্টিক্ষমতা দিয়ে সব রিপ্লেস করে ফেলবেন – এটা কখনও ঘটবে না,চলবে না!  এটাই কমিউনিস্ট ক্ষমতার ফান্ডামেন্টাল ত্রুটি ও অযোগ্যতাই হয়ে আছে ও থাকবে; এই ত্রুটি প্রকাশ করতেই থাকবে।
    তাই আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি যে একটা নুন্যতম বিচার-ইনসাফ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে – এই ইনসাফের ভিত্তিতে দাড়িয়েই কেবল সমাজ শুরু হয় হয়েছে এবং আছে।  না হলে মানুষ এতদিন সকলকেই কেবল সারাদিন ডন-বৈঠক করে জিমে কাটিয়ে গায়ের জোরের চর্চা করত! কারণ অর্থ-সম্পত্তি ও ঘরের মেয়েদের রক্ষা করতে হবে তো!
    এখন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা মানে কী ধরণের বিচার ব্যবস্থা ও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা – সেটা কী কাজী ব্যবস্থা বা রোমের বিচার ব্যবস্থারই আধুনিকায়ন করে নেয়া কোন ব্যবস্থা – এমন যেকোন কিছুই হতে পারে।  মানে বলতে চাচ্ছি মানুষের সমাজ আর এর সাথে একটা না একটা বিচার ব্যবস্থা একেবারে হাতে হাত ধরে হেঁটেচে তবেই কেবল আমাদের সমাজ সভ্যতাগুলো একালে পৌছিয়েছে।

    আবার এর ভিতর একটা বড় তর্ক ছিল যে কেউ অপরাধ করেছে কীনা এটা কে সাব্যস্ত করবে? যে কেউ আঙুল তুললেই হবে? নাকি সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা, শাসক যদি আঙুল তুলে তাহলেই তা কী কেউ অপরাধী সাব্স্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে?  এরাই সদুত্তর ছিল না, বরং একটা  বিচার ব্যবস্থা দাড় করাতে হবে। শুধু তাই না, সেই  বিচারব্যবস্থার উপর শাসকের খবরদারি রোধ করে রাখা হয়েছিল। এটাই ইউরোপের অর্থে সেপারেশন অফ জুডিশিয়ারি তর্ক।

    কিন্তু সরি! কমিউনিস্ট সমাজ বা কমিউনিস্ট আন্ডারস্টান্ডিং ঠিক এরকম এর ধারেকাছেই নয়। যেটা এতক্ষণ বললাম,   এর মূলে আছে একদিকে এর কথিত শ্রেণী ধারণা আর অন্যদিকে পার্টিই সর্বময় ধারণা। আর এতে কোন বিচারবিভাগ নয়, পার্টিই সাব্যস্ত করে দিবে কেউ অপরাধী কিনা!
    এমনিতেই কে কোন শ্রেণীর লোক তা সে নিজে বললে হবে না। পাটি যদি বলে কেউ বুর্জোয়া তো সে বুর্জোয়া। দ্বিতীয়ত, কমিউনিস্ট চিন্তা বলে কয়েই শুরু করে থাকে যে সে নিজে এক একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা। আর এই একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা বলতে তা এমনই যে যাকে সে বুর্জোয়া মনে করবে তার সাথে সে বলে কয়ে বৈষম্য করবে – সমান আইনি সুযোগ বা ন্যায়বিচার তাকে দিবে না। এটাই তার একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা।  প্রথমত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক মাত্রই সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এই ধারণা সেখানে কাজ করে না, নাই। কারণ, কমিউনিজমে নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই।  আছে কেবল শ্রেণী ধারণা; তাও সেটাও একমাত্র পার্টি ঠিক করে দিবে যে কে কোন শ্রেণীর লোক।  তাই নাগরিক অধিকার বলেও কোন ধারণাই নাই। যদিও পাবলিক শব্দের ব্যবহারে যথেচ্ছচার আছে। যেমন আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক যা সাধারণ ভাবে আমাদের সেন্ট্রাল কন্ট্রোলিং ব্যাংক- এর ধারণা।  চীনে এর সমতুল্য ব্যাংকের নাম PBOC। মানে হল পিপলস ব্যাংক অব চায়না।  এমনকি দেশের নাম পিপলস রিপাবলিক অব চায়না [PRC]। সেনাবাহিনীর নাম পিপলস আর্মি ইত্যাদি। 

    আসল সমস্যাটা হল, পার্টি সবক্ষমতার অধিকারী এটা যতটা কনসেপ্টের সমস্যার এর চেয়েও বেশি সমস্যা তা হল, পার্টি কিসের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সে পাবলিককে বলবে না; জনসমক্ষে বলবে না।  বিচারক যেমন রায় লেখার সময় তাকে রায়ের পিছনের সাফাইটা কী বা কোন আইনে দেয়া ক্ষমতা অনুসারে সে ঐ এই রায় দিচ্ছে সেই সাফাই, সেই ব্যাখ্যা লিখিত রায়ের সাথে জুড়ে দিতেই হবে। আর ঐ রায় তো ওপেন। তাই যে কেউ রায় যাচাই করতে পারে। কিন্তু কমিউনিস্টদের বেলায় তা এটা মানে না। অথচ এমনিতেই পার্টি হল শাসক তাই শাসক নিজেই আবার একই সাথে বিচারক হতেই পারে না। কোন প্রধানমন্ত্রী যদি প্রকাশ্যে ও সরাসরি বিচারকের ভুমিকা নেয় – এটা তেমনই এক ঘটনা হবে তাহলে।  অথচ এটা তো কোন এথনিক-কালচারাল সমাজের সাধারণ ন্যায়বোধও অনুমোদন করে না।   কিন্তু কমিউনিস্টদের বেলায় তারা এই “সেপারেশনের” ধারণা দূরে থাক তারা কোনকিছুই মেনে চলে না। তাদের শ্রেণী ধারণা এমই ঘামন্ডি, গোয়াড় একচোখা ও উদ্ধত!! আসলে এটা শুনতে খারাপ লাগলেও এটা মূলত এক বেইনসাফ বা অবিচারের ধারণা।  এর উপর আবার পার্টি কোন আইনে বা কিসের ভিত্তিতে রায় দিচ্ছে সেটাও ত বলবেই না।

    আর জনসমক্ষে পার্টির এই বলতে না পারার যে প্রাকটিস এরই বাইরের প্রকাশটা হল হঠাত করে লোকটার জনসমক্ষ থেকে গায়েব ডিসাপিয়ার্ড [dissappeared] হয়ে যাওয়া বা গায়েব করে দেওয়া। এজন্য হাসিনা আর কমিউনিস্টদের সখ্যতার ভিত্তি এটাই।  কিন্তু একালে আসলে এটা কী চলে? চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেলায়, এই গায়েব রাখার এসময়ে পার্টি তাকে বলপ্রয়োগ করে বাধ্য করেছে একটা স্বীকারোক্তি দিতে যে সেই দোষী বলে পদত্যাগ করছে বা সব মেনে নিচ্ছে। আর এই স্বীকারোক্তি পেলে এবার আবার তার জনসমক্ষে হাজির হওয়া তবে সব ক্ষমতা পদ নাই হয়ে থাকা অথবা পার্টি যা শর্ত দিয়েছে সে অনুযায়ী কিছু একটা তার নাই হয়ে যাওয়া বা থাকা।
    এককথায় জনসমক্ষে কোন ন্যায়ের ধারনা পার্টি চর্চা করে না বা করতে পারে না বলেই এই গায়েবী কালচার!!!

    এখন লেনিনের আমলে মানে, আজ থেকে একশ বছর আগে যা পার হয়ে গেছে যখন এই পার্টি ধারণা ও এর চর্চা শুরু হয়েছিল। এখন  জনসমক্ষে এবং কোন ন্যায়ের ধারণার চর্চা ছাড়া কোন রাষ্ট্র প্রসঙ্গে ধারনা অচল ও অগ্রহণযোগ্যই হবে অবশ্যই। এর উপর আবার চীন যদি আগামিতে আমেরিকার মত না হলেও অন্তত কেবল অর্থনৈতিক অর্থে গ্লোবাল নেতা হতে চায় তাহলে এটা হবে নেতার  গ্লোবাল পাবলিক বা সারা দুনিয়ার চোখে সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য স্বভাব-বৈশিষ্ট! এককথায় বললে, পার্টি-ক্ষমতা এই বিষয়টাকে এর – ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা এক ক্ষমতা – এভাবে হাজির করতেই চায় না।  যা আসলে একটা কোটারি-ক্ষমতা মানে এক অলিগর্কি ক্ষমতা [oligarchy]  করে রেখে দিতে চায়। একারণে, এটা বারবার  কমিউনিস্ট ক্ষমতার ধারনা “এক অন্যায্য ক্ষমতা” – আনজাস্টিফায়েড ক্ষমতা হিসাবেই হাজির হতে থাকবে।  আর এভাবে ক্রমশ চরম ভাঙনের দিকেই যেতে থাকবে; সোভিয়েত ক্ষমতা যেভাবে গিয়েছে।

    জ্যাক মা সমস্যাঃ
    জ্যাক মা রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্র অথবা ক্ষমতা  সংফশ্লিষ্ট কেউ না; তিনি ব্যবসায়ী। নয়া আইডিয়ায় গ্লোবাল মার্কেটিং ব্যবসা এটা। এখন হতেই পারে তিনি অসৎ সুযোগ নিয়ে দেশের নয়ম ভেঙ্গে কোন ব্যবসায়িক ততপরতা করেছেন। কিন্তু তাকেও মাসের পর মাস গায়েব ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রেখে দেয়া হয়েছিল। এর অর্থ আইনিভাবে জ্যাক মা কে নিয়ন্ত্রণ করার কোন মেকানিজম চীনা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নাই। তাই নয় কী? চীনা রাষ্ট্রে এমন প্রকাশ্য আইনি বিচার ব্যবস্থা তাহলে নাই!  তাই কী? তার মানে এই  ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রাখার ব্যবস্থা – এটা তো কোন রাজা-বাদশার সমাজ-শাসন ব্যবস্থাতেও অচল। হয়ত কোন এক গোত্র-সমাজের ব্যবস্থায় তা ছিল!!  এভাবে কিছুদিন পরপর ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রাখার ব্যবস্থা করে হবু গ্লোবাল নেতা চীনের কী ইমেজ বাড়তেছে?  এর অর্থ চীনের রাষ্ট্র একটা নুন্যতম “স্বাধীন বিচার সিস্টেম” দাড় করাতে সবসময়ই অপারগ থেকে যাবে। এতে পার্টি মানে তাদের শ্রেণী-চিন্তায় এটা পারমিশেবল নয়, অ-অনুমোদিত থেকেই যাবে! চীন অন্তত তার চীনের ‘গায়েব’ কালচার দিয়ে কোন গ্লোবাল নেতা হতে পারবে না! তা এখনই বলে দেয়া যায়!

    কোন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত যুক্ত হতে চায় না চীনঃ
    অনেকের মত আমারও ধারণা ছিল এই যে, গ্লোবাল নেতা হতে চায় চীন তাতে কোন অসুবিধা কী! কিন্তু এর মানে এই না যে আমেরিকার মত চীনকেও কোন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত ঢুকে পড়তে হবে, হতেই হবে; এই অনুমান তো অবশ্যই ভুল।  চীন তেমন হতে চায় না। অন্তত এখনই। কিন্তু টের পাচ্ছি  আমাদের এই ধারণায় ক্রমশ চির ধরাচ্ছে চীন নিজেই।  প্রথমত, কম্বোডিয়া। এটা খুবই এক বাজে উদাহরণ হয়ে উঠে এসেছে।
    টানা গত ৩৮ বছর ধরে হুনসেন ক্ষমতায় আছেন। মানে খেমার রুজদের তান্ডব শ্রেণী শত্রুর নামে নির্বিচারে (পাঁচশ টাকার টংয়ের দোকানিকেও মালিক)  বুর্জোয়া বলে হত্যার কমিউনিজমের শেষ পর্বে ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন। এরপর [1991 Paris Peace Agreements] জাতিসংঘের অধীনে শান্তি চুক্তি এর সুবিধার সব মাখনটাও তিনি খেয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে গেছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে তিনি আরেক ত্রাস হয়ে উঠলেন।
    গত ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় থেকে অনেক প্রত্যক্ষভাবে  লক্ষ্য করছি কম্বোডিয়ার সব বিরোধীদলীয় নেতাদেরকে জেলে রাখা হয়েছে বা বিদেশে আশ্রয়প্রার্থী হতে বাধ্য করা হয়েছে। অথবা নানা উসিলায় দল নিষিদ্ধ বা নানা শর্ত আরোপ করে রাখা হয়েছে। সেসময়ের হংকংয়ের এক মানবাধিকার সম্মেলনে তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। জেনেছিলাম তাদের একদলীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধীদল শুন্য হয়ে থাকার ইতিকথা। এরপরে ২০১৮ সালের আর একবার একদলীয় নির্বাচন; পরে এবার  ২০২৩ সালের একইভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।  কিন্তু পরিস্থতির কোন উন্নতি বা পরিবর্তন নাই।  বরং এবার আরো নিম্নমুখি অবস্থাটা হল, এতদিন হুনসেন তার ছেলেকে সেনাপ্রধান করে রেখেছিলেন। আর এবার এখন তিনি নিজে পদত্যাগ করে ঐ সেনাপ্রধান ছেলেকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাবেন; এর পরিকল্পনাতেই এবারের কথিত নির্বাচনটা হয়েছে। যা আমাদের পরিস্থিতির সাথে বহুলাংশে মিলে! যেটা বুঝে আসে না – কেন চীনকে আরেকটা দেশের একটা খেলনা নির্বাচনে জড়িত হতেই হবে। এত নিচে নেমে চীনের স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে? চীনের এত কী ঠেকা?  চীন কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাথা ঘামায় না – এটা কী এর উদাহরণ আর থাকলো?  আর এভাবেই কম্বোডিয়া যেন চীনের যেন লাগাতর নিজ প্রভাবাধীন করে রাখতেই হবে সেও ব্রত পূরণ করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে – এই বেপরোয়া চীন এটা কেন???
    মূল কথাটা হল,  এতে কোন একটা দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতা সুস্থভাবে গড়ে না উঠে একে বরং মারাত্মক ব্যহত করে দেয়া হচ্ছে। এজায়গায় কম্বোডিয়ার সাথে বাংলাদেশের মিল আছে। এটা খুবই ভয়ংকর টেনডেন্সি। কম্বোডিয়া বা বাংলাদেশের মত দেশগুলো তাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ুক, এসব দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদলের ব্যবস্থা অসুস্থ হয়ে পড়ুক – সেটা কী চীনের কাজ এক্তিয়ার হতে পারে – এটা তো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় বা কাম্যও নয়। তাতে সেটার জন্য দায়ী চীন অথবা আমেরিকা অথবা উভয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা যাই হোক না এটা  গ্সরহণ হ্য করা যায় না। নুন্যতম গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না।  অন্তত এটা চীনের জন্য এক বিরাট আত্মঘাতি কাজ হচ্বেছে ও হবেই; যার অনেকটাই সম্ভবত ঘটা শুরু হয়ে গেছে। মাত্রার দিক থেকে বাংলাদেশের তুলনায় আগানো কম হলেও কম্বোডিয়া ইতমধ্যেই মারাত্মক বিপদজনক জায়গায় চলে গেছে। খুব সম্ভবত চীন অতিরিক্ত রিস্ক নেয়ার পথে হাটা শুরু করে দিয়েছে।
    এটা হবু গ্লোবাল নেতা চীনের জন্য কোন পথ বা পদ্ধতি হতে পারে না। এটা চীনের জন্যই আত্মঘাতি ও নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করার পদক্ষেপ হয়ে দাঁড়াবে, দাঁড়াতে বাধ্য। একটা গ্লোবাল অর্ডার – রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নতির বদলে একে আরও নিম্নগামি করা হবু নেতা চীনের আচরণ হতে পারে না; কাম্যও নয়। আমরা আমাদের দেশকে গুম-খুন আর অপহরণের দেশ করে গড়তে পারি না! কাউকে এলাও করতে পারি না।  সেটা যেই বহিঃশক্তিই – চীন বা আমেরিকা – একাজে দানব সরকারকে সহায়তা করুক!

    জঙ্গীদমনের নামে আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয় ঠিক তেমনই,  শ্রেণী শাসনের নামে চীন এর বাংলাদেশকে  গুম-খুন আর অপহরণের দেশ বা সম্পদপাচার লন্ডারিংয়ের দেশ হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া এটাও গ্রহণযোগ্য নয়।  এসব থেকে তাদের অবশ্যই দূরে থাকতেই হবে। এটা কোন উদাহরণ হতে পারে না।  আগে যেকোন বহিঃশক্তিকে এসব থেকে দূরে যেতে হবে।  এরপরেই আমরা অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, অবকাঠামো ঋণ সহায়তা ইত্যাদি দিকে সবার সাথেই একমাত্র সম্পর্কিত হতে চাইবে।

    এছাড়া নয়া কোন গ্লোবাল নেতা মানেই আমাদের বুঝতে হবে এর শুরুতেই খোদ জাতিসংঘের একটা সংস্কার হতে হবেই। আর তাতে কী এমন হস্তক্ষেপ এটাই নয়া জাতিসংঘের রেওয়াজ হবে???? আমাদের মত দেশগুলো চীনা সমর্থনে  গুম-খুন আর অপহরণের দেশ হয়ে উঠবে??? বুঝাই যাচ্ছে চীন এসব বিষয়ে এখনও নাদান!
    যারা বাংলাদেশকে ইতোমধ্যেই গুম-খুন আর অপহরণের দেশ বা সম্পদপাচার লন্ডারিংয়ের দেশ বানিয়েছে অথবা যারা এতে সমর্থন দিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছে সেসব দলগুলোর সাথে চীনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো আমরা খেয়াল করেছি। দেশে রাতের ভোটে ক্ষমতাসীন হবে আর চীন তাদের এই কথিত ভোটের খরচ যোগানো দেশ হয়ে উঠবে এটা চলতে পারে না, এটা কাম্য নয়। তার মানে –  আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত চীন যুক্ত হতে চায় না – এটা আর সেই চীন নয়। এটাই হতে যাচ্ছে। তাই যথেষ্ট ভেবেচিন্তে এবিষয়ে চীনকে সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ  নিতে হবে। বলাই বাহুল্য এমন পদক্ষেপ এগুলো একেবারেই কাম্য নয়! আর এতে চীনের কোন গ্লোবাল সম্ভাবনা কিছু ঘটবার আগেই সব ভেঙ্গেচুড়ে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য!!!

    এককথায় চীন নিয়েও একালে এখন আমাদের পশ্চিমাদেশের মত উদ্বিগ্নতা বাড়ছেই! যা চীনের জন্য ভাল লক্ষণ নয়!!!

    আপডেটেডঃ    ০৬ আগষ্ট ২০২৩; দুপুর ১১ঃ০২
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বেচারা আবদি

    বেচারা আবদি
    গৌতম দাস

    ৮ জুন ২০২৩    ০০ঃ ০১ মধ্য রাত
    https://wp.me/p1sCvy-4AX

     

    India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election

     

    এমন আবদি সাব-রে লইয়া আমরা কী করিবঃ
    এসএনএম আবদি [SNM ABDI]
    ভারতের প্রিন্ট মিডিয়া জগতে একজন সম্পাদক। এখন অবশ্য কোন মিডিয়ায় নাই, তবে ‘র’-এর সাথে সম্পর্কিত। তার এক দুঃখ-কাহিনী ভরা লেখা প্রকাশিত হয়েছে গতকাল ৬ জুন, ভারতের কুইন্ট [The QUINT] পত্রিকায়। সেখানে লেখার শেষে আবদির পরিচয় দেয়া হয়েছে  আউটলুক পত্রিকার সাবেক ডেপুটে এডিটর হিশাবে। আউটলুক-কে ভারতের মাপে “প্রগতিবাদী” মিডিয়া গণ্য করা হয়। আর কথিত মোদির-সেকুলার ভারতে কোন মুসলমান এডিটরের জন্য “প্রগতিশীলতাই” সবচেয়ে ভাল সার্টিফিকেট হয়ত!
    কিন্তু আবদি সাব এখন দেখি লেখাটা লিখেছেন য়াগের মতই ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের জন্য বা হয়ে। আজকাল তাঁর মত লেখকেরা এতই বেপরোয়া হয়েছেন যে সরাসরিই ‘র’-এর নাম লিখতেও  আর এদের ডর-লজ্জা করে না। ভদ্র ড্রয়িইং রুমে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা অসভ্যতা, বেয়াদবি মানা হবে এজন্য যে র [RAW] এই সংগঠন ভিনদেশে অন্তর্ঘাতমূলক বা subversive কাজ করে, অবলীলায় নিজ স্বার্থে সেদেশের নিরীহ মানুষও মেরে ফেলতে পারে, কেবল  এই হত্যাকে নিজদেশের স্বার্থ মনে করলে। যেটা বলাই বাহুল্য, মানুষ জগতের কাছে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য আদব-স্বভাব নয়; যদিও তা কোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থ হতেই পারে। একারণে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্য উচ্চারণ এড়িয়ে চলা ভদ্রতার রেওয়াজ!  যেমন আপনি কখনই বলতে পারেন না বা বলবেন না যে ওমুকের বাসা থেকে আপনি এটা চুরি করে এনেছেন! এটা হয় না!  কিন্তু  একালে আবদি বা সুবীর ভৌমিক দেখা যাচ্ছে এসব পরোয়া করা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের কাছে  ভদ্র-অভদ্র হলে কিছুই যায় আসে না।  বরং ‘র’-এর ক্ষমতা বা সাফল্য দেখানোই যেন গর্বের কাজ!

    আবদির এলেখার মুলকথাটা হল – লিখেছেন, বাংলাদেশে আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা এতে “ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, বিদেশে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা চালানো গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’, ন্যাশনাল সিকিউরিটি সমন্বয়ক সেক্রেটারিয়েট এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অফিস সকলেই বিরাট এক ঝাঁকি [jolted ] খেয়েছে”। মানে আবদি সাব বেচারা দুঃখ পেয়েছেন এমনভাবে ভারতের গুরুত্বপুর্ণ সকলকে ঝাঁকি দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়াতে! দেখেন নিচের ইংরাজিটা……

    It has jolted the Ministry of External, Affairs,
    the Research and Analysis Wing,
    the National Security Coordination Secretariat, and even the Prime Minister’s Office.

    দুবছর আগেও এমনই গোয়েন্দা বিভাগের এক ফরমায়েসি লেখা লিখছিলেন আবদি। আর এসবেরও আগে ২০১১ সালে তিনি বাংলাদেশে  প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সফরসঙ্গী হিশাবে এসেছিলেন। তখন অবশ্য তিনি দ্যা ফাস্ট পোস্ট -এই নামের ইংরাজি দৈনিকের সম্পাদক ছিলেন। মানে এখন [কংগ্রেস-ভার্সানে] গোয়েন্দাবিভাগের সাথে সম্পর্কিত তিনি। আর মনমোহনের যেই সফরটা ছিল এক প্রতারণার সফর – তিস্তার পানির বিনিময়ে করিডোর নেওয়ার কথা থাকলেও আজও সেই প্রতিশ্রুতি ভারত পূরণ করেনি, অথচ করিডোর ভোগ করে চলেছে সমানে ও অবলীলায়। এটাকেই ভারতের সাফল্যও মনে করছেন এরা।

    এবার যে পত্রিকায় আবদির লেখা ছাপা হয়েছে তার সম্পর্কেও দুকথা বলা দরকার। একালে নাগরিক অধিকারের উপর আক্রমাণাত্মক মোদি সরকারের ভারতে, এখনও সবার চেয়ে মাথা উচু করা সাহসী ভারতীয় মিডিয়াটা হলে ওয়াইর [WIRE] । বাকিরা  টিকতে পারে নাই। আর ওয়াইর-এর পরে যে এখনও মোদির টাকার লোভ আর চাপ সামলিয়ে এখনও  কিছু করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে সেই পত্রিকা হল কুইন্ট [the QUINT]।   যদিও আবদির লেখার কোন দায়িত্ব তারা নিতে চায় না তা জানিয়ে রেখেছে।

    আবদির গতকালের লেখা প্রসঙ্গেঃ
    এলেখার  শিরোনামেই বাংলাদেশে ভারতের হার ও ভারতের স্বার্থ বিপদে আছে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে আর এরপর ছটপটানি-তে বাঁচার চেষ্টা করছেন যেন, এভাবে লেখা। যার শিরোনাম লিখেছে এভাবে, India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election মানে “বাংলাদেশের নির্বাচন ইসুতে আমেরিকার হাত-মুচড়ানো থেরাপির প্রয়োগে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধরা”।
    শুরুর প্যারায় লিখছেন, বাংলাদেশে “আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞার চাপ এটা ভারতের জন্য সত্যিই এক খারাপ সংবাদ” [is really bad news for India]। কিন্তু তিনি কেন বাংলাদেশের উপর আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এক ভিন্ন দেশ ভারত এতে নিজের বিপদ দেখছে?? তা জানা যায় না!

    তবে তাঁর পরের প্যারাটা সবচেয়ে মজার। এবার এখানে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে হাসিনা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে হাসিনা অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইন-বহির্ভুত কায়দায় জিতেছিলেন। তাই লিখেছেন, “ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য পরিস্কার। এটা হাসিনা সরকারকে এমন এক শক্ত-ঘেরটোপের ভিতরে ফেলেছে তাতে হাসিনা যেন আর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মত করে অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইনবহির্ভুত উপায়ে ভোটে কারচুপি করতে না পারে। কিন্তু বিপরীতে দিল্লি যেকোন উপায়ে হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়” । দেখেন দেখি আবদির আবদার!!!

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means”.

    আবদির এই প্যারাটা একদিকে সততার সাথে মন খুলে বলা তার মনের কথা (মানে চোরের মনে কথার মত) আর বলাই বাহুল্য তা চোরামির গল্প সবাইকে খুলে বলার মতই এক গাধামি অবশ্যই!  আবার অন্যদিকে যেকোন সাফাই-বক্তব্যে অন্যতম দিক হলে সেটাকে একটা ন্যায়-ইনসাফের উপর দাঁড়ানো কথা হতেই হয়। অথচ আবদি আমলই করছেন না যে তার খায়েস-আকাঙ্খা যেটা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বা মোদি সরকারের খায়েস-আকাঙ্খা  – সেটার পিছনে কোন ন্যায়-ইনসাফের লেশ মাত্র নাই!
    যেমন আবাদির শেষ বাক্যটা দেখেন  New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means” – আমেরিকার ইচ্ছার বিপরীতে ভারত চায় যেকোন উপায়ে নির্বাচনে জিতানো ।
    আচ্ছা আবদি সাব, বলেন তো দেখি  তার মানে যেটা হাসিনাকে যেকোন উপায়ে জিতানোর ভারতীয় খায়েস সেটা কী আর কোন “নির্বাচন” থাকে?? না কারচুপি হয় সেটা??? এছাড়া এভাবে ভারত অন্যায়-বেইনসাফিতে যদি হাসিনা জিতাতে চায় তাহলে বিপরীতে আমেরিকার বাংলাদেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপকে হস্তক্ষেপ বলার সুযোগ বা নৈতিকতা কী আর ভারতের থাকে??? আবদি ‘র’-এর খেদমতে এতই মশগুল যে এই বেইনসাফি দিকটার দিকে তাঁর কোন চোখ নাই, আমল নাই!!!

    ভারতীয় লেখকেরা বিশেষ করে যারা মোদির কোলে বসে লেখেন তারা এত উচ্চমাত্রার উগ্রজাতিবাদে ভুগেন যে তাদের কাছে ন্যশনাল ইন্টারেস্ট বলে এক  আজিব ধারণা তাদের লালন করতে দেখা যায় যা অনুসারে ভারতের স্বার্থ-রক্ষার্থে তারা যাই করুক তা জায়েজ ও বৈধ হয়ে যাবে – বলে এক আজিব ধারনা তারা লালন করে থাকে। আবদিও এমনই এক লোক।
    আবদি লিখছেন, “একদিকে আমেরিকা হাসিনার প্রতি অবিশ্বাসে মাত্রা তুঙ্গে নিয়ে গেছে যে সে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, অন্যদিকে ভারতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে যেকোন উপায়ে হাসিনাকে ২০২৪ এর নির্বাচনে চতুর্থবারের মত জিতিয়ে আনা; আর এটাই
    তার বিদেশনীতি-কাম নিরাপত্তা স্বার্থ”।
    নিচে মূল ইংরাজিটা।

    “On the one hand, the US has such grave misgivings about Hasina that it wants to evict her from power. And on the other hand, the biggest priority of India’s foreign policy-cum-security establishment is to get Hasina re-elected in January 2024 for a fourth successive term at any cost.”

    তাঁর মানে যেটাকে ভারতের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” মনে করা হবে সেটা ভারত চাইলেই পাবে আর তা পাওয়ার জন্য ভারত সবকিছু করতে পারবে; তাতে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ বা নিজ রাষ্ট্রীয় এক্তিয়ারের বাইরে তা চলে গেলেও অথবা  অন্যদেশের সার্বভৌমত্ব এক্তিয়ার ভঙ্গ করলেও যেন কিছু এসে যায় না। অর্থাৎ সারকথাটা হল, ভারত সেটাকে তার জাতীয় স্বার্থ মনে করছে কিনা – এই হবে মাপকাঠি। এই মাপকাঠি ধরে সব জায়েজ মনে করতে হবে!! যদি খালি  ভারত মনে করে তাহলেই ভারত তা আদায় করতে পারবে!!!!
    তবে এই কথা শুনে তো আমাদের হাততালি দিয়ে উঠা উচিত। কারণ তাহলে, মোদি দেখতে খুবই খারাপ তুলনায় রাহুল অনেক হ্যান্ডসাম ছোকড়া। ফলে বাংলাদেশ যদি মনে করে মোদিকে উপড়ায়ে ফেলায় দিয়ে রাহুল কেন  বরং মমতাদিদিকে যদি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় নিয়ে আসি আর খালি সেটা যদি বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট বলে ঘোষণা করে দেই তাহলে তো আমরাও  ইচ্ছামত ভারতের সরকার বদলাতে পারব, তাই না??? কী মজাই না হবে!!! সত্যি! আবদি নিশ্চয় এতে খুশি হয়েছেন?

    এরপরে এসে এই বার আবদি সাবের হুশ এসেছে যে তাহলে বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকা-ভারতের কাড়াকাড়িতে তাহলে ভারত কী সবসময় মার খেয়েই যাবে? পরিস্থিতি সবসময় আমেরিকার পক্ষে ছেড়ে দিয়ে ভারত কী স্যাক্রিফাইস করেই যাবে নাকি উলটা আমেরিকাকে অমান্য করবে অথবা এমন অমান্য করা কী ঠিক হবে?  এই ধরণের লোমছোম কথাবার্তা  লিখে চলেছেন আবদি……The gaping chasm underlines the India-US conflict over Bangladesh and raises valid questions about India’s capabilities to pursue its goal defying the US – and whether it is wise to do so. It also flags gross US insensitivity to India’s interests even in India’s own backyard and how the US always expects India to quietly sacrifice its interests for America if they happen to clash!

    মজার কথা হল, এরপরেও আবদি মনে করেন, বাংলাদেশ হল নাকি ভারতের বাগানবাড়ি বা শখের মামাবাড়ি  ফলে সেখানে কেন আমেরিকান মাতব্বরি চলবে [India’s interests even in India’s own backyard] এনিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের কোন বাপের বাগানবাড়ি সেটা অবশ্য আমরা বাংলাদেশিরা জানি না বা মানিও না…।

    তিনি এরপরেও আবার ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের কথা তুলেছেন। বলছেন ভারতের কাছে পরীক্ষিত বন্ধু হল নাকি হাসিনা! আর ওদিকে আমেরিকা সে না হাসিনার পক্ষে না আওয়ামি লীগের পক্ষে – আমেরিকা কেবল সরকার বদল বা শাসক বদলে দিবার পক্ষে!!! For India, there is no alternative to Hasina – New Delhi’s tried and tested ally. But the US is neither in Hasina’s nor Awami League’s favour – it is in favour of an outright regime change, no less.
    মানে হল আবদি বলছেন ভারত নামের এই বাচ্চাটার মুড়ির মোয়া ভালো লেগেছে এখন তাকে তার হাতে সেটা না  দিয়ে অন্যকিছু দিলে কী তার ভাল লাগবে? আসলে আমেরিকা কতই না নিষ্ঠুর আর কী বলব!!! মাসুম বাচ্চা ভারতের কথা একবারো ভাববে না?????

    এরপর তিনি হাসিনাকে এক মারাত্মক সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে তা ভেবে সাবধান করেছেন। বলছেন, সাবধান “…… There is a very high probability of visas of Hasina’s immediate family members……” কথাটার বাংলা করলে,  হাসিনার আপন পরিবারের সদস্যদের উপরও আমেরিকা ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ [মানে তারাও যেন আমেরিকায় প্রবেশাসধিকার না পায় বা থাকলে বের করে দেয় ] এমন ব্যবস্থা জারি হতে পারে……।।

    তবে আসলে,  আবদি লোকটার চিন্তা ভাবনা খুবই ভোঁতা আর বোকা-বোকা কিসিমের, সন্দেহ নাই। যেমন বলতেছেন, হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ নাকি চীন আর পাকিস্তানিতে ভরে যাবে। মানে সেই আশির দশকের সব অচল চিন্তাভাবনা – হিন্দু-মুসলমান রেষারেষিতে ফেলে পেটি-মধ্যবিত্ত যেভাবে চিন্তা করে বা করত!  এর মানে  উনি জানেনই না যে হাসিনার সাথে একালে খুবই ও সবচেয়ে ভাল সম্পর্ক হল পাকিস্তানের; বাংলাদেশ পাকিস্তানি হাই-কমিশনারেরও। এছাড়া, চীন ২০১৬ সাল থেকে চীনের হাত খুলে অবকাঠামো ঋণ দেয়া যা একচোটে প্রায় ২৬ বিলিয়ন যা বাংলাদেশের জীবনে মোট বাকি সবার দেওয়া ঋণের চেয়েও বেশি। আর এটাই হাসিনার উন্নয়নের গল্পের পিছনের মূল রসদ। তাদের দলের চোরদের খাই মিটানোর উপায়!! একই অবস্থা ভারতের। চীন-ভারতের বাণিজ্য এখন বছর ১১৫ বিলিয়নের (যার মধ্যে চীন থেকে ভারতে আমদানি ৯৮.৫বিলিয়ন বাকিটা চীনে রপ্তানি) কাছাকাছি তাতে লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারতের যতই লড়াই ঝগড়া থাক। আবাদি-কে এসব দিকে চোখ তুলে তাকাতে শিখতেই হবে – আশির দশকের পরে এখনও পুরাণা চিন্তা বা পুরাতন গল্প ইত্যাদি এসবের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেই চলার এটা হল বেকুবের সাহস!

    এককথায় বললে আবদি আসলে হারু পার্টি। তিনি আগাম ধরে নিয়েই লিখতে বসেছেন যে [যেটা উনি ঠিকই বুঝেছেন] যে গত পনেরো বছর ধরে ভারত হাসিনার বাংলাদেশকে  যে চুসা চুসে গিয়েছে সেসব দিন এখন ফুরিয়ে আসছে। তাই প্রতিটা বাক্যে আবদি তিনি আপসোস ঝড়িয়ে কথা বলেছেন। এমনকি আরেক বাঙালি পেটি কর্মকর্তা – ঢাকায় ভারতের সাবেক এক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী – তাঁর কথিত এক বাণী স্মরণ করেছেন আবদি। আবদি বলছেন ২০১৮ সালের দিকে পিনাক রঞ্জন লিখেছিলেন – “হাসিনার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া এই অসৎ উদ্দেশ্যে করা একটা কাজ …the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”. ” –  যেটা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার উপর হস্তক্ষেপ করতে চেয়ে করা কাজ…”।

    In a rare criticism of Hasina by an Indian official, Pinak Ranjan Chakraborty who served as India’s Ambassador in Dhaka from 2007 to 2009, wrote in 2018 post-retirement that the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”.

    শেষ কথাটা হল, আবদি দেখতে পেয়েছেন, “বাংলাদেশ এখন আমেরিকার পরামর্শের পক্ষেই ক্রমশ ঝুকে যাকচ্ছে এবং যাবেই; আর এতে সবকিছুই বিএনপির পক্ষে চলে যাচ্ছে…”

    আমাদের শেষের বাক্যে মাত্র দুইটা শব্দ – বেচারা আবদি!  

    >>>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ জিনিষটা কী; বাংলাদেশ কোথায়?

    ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ জিনিষটা কী; বাংলাদেশ কোথায়?
    গৌতম দাস

    ২৭ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4vF

     

           ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটিজি: যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনকে মোকাবেলা করবে

     

    বাংলাদেশে এখন পড়াশুনা করার চেয়ে আঁতলামো বেশি গুরুত্বপুর্ণ হয়ে গেছে। এতে আমাদের সাংবাদিক বন্ধুটাও ‘কূটনৈতিক রিপোর্টার’ বলে নিজ পরিচয়টা বোল্ড করে লিখতে যতটা আগ্রহী এর চেয়ে ঠিক এর উলটা – ততোধিক যেন তাঁর অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে কোন দেশি বা আন্তর্জাতিক ইস্যুকে বুঝার ব্যাপারে।  যেমন, ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি জিনিষটা কী অথবা কবে কোথা থেকে এলো তা আমাদের মিডিয়া নিজে বুঝেছে ও পাবলিককে কিছু স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে, এমন জানা যায় না। কেবল ভাষাভাষা আর এমনিতেই  যতটুকু যা আন্দাজে ঢিল মেরে যেটুকু যা মিলে সেটুকুতে তারা বুঝে যে, আমেরিকা কিছু একটা আমাদের সরকার থেকে চাচ্ছে! কিন্তু কী সেটা? সাংবাদিকেরা তা জানে, এমন মনে হয় না।

    এর উপর আবার লেটেস্ট খবর হল, হাসিনা সরকার নাকি তার ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ কী তা লিখে আমেরিকার হাতে দিয়েছে, জানিয়েছে। তা খারাপ না ভাল আমরা তেমন জানি না।  কিন্তু, কি লিখা আছে সেখানে? অন্তত কয়েকটা বাক্যে  সরকারের জবাবের সারকথাটা কীঃ অথবা ধরাযাক এছাড়া লিখতে গিয়ে সরকার কী কী অসুবিধা ও কী বাধা ঠেকছিল ইত্যাদি নিয়ে আমাদের পাঠককে সেটা আমাদের মিডিয়া জানাতে পারে নাই। এনিয়ে একমাত্র রিপোর্ট যা পাওয়া যায় তা হল বাংলা বিবিসির – সেটাই কোন কোন মিডিয়া তুলে এনে ছাপিয়ে দায় শেষ করেছে। ছাপিয়েছে। আবার কেউ কেউ আবার এনিয়ে কলাম লিখেছেন যা এতই অখাদ্য যে সেগুলো আবার বিরাট গেম বা খেলা হবে টাইপের…। তবে সকলের মধ্যেই একটা ভাব আছে যেন  সরকারের ডিএসএ [ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্ট] আইনের ভয়েই যেন তারা কিছু লিখে নাই। যা শতভাগ এক মিথ্যা কথা। কারণ সরকার প্রধান নিজেই বক্তৃতায় এনিয়ে তাঁর নিজের কথা তুলে ধরেছেন। তাই পাবলিকলি হাসিনার বলা সেসব কথাগুলোই রিপোর্ট আকারে অবশ্যই ছাপিয়ে দেয়া যেত, কোন সমস্যা ছিল না।
    ঘটনা আরও আছে এনিয়ে ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদুত আবার বলেছেন, ঢাকার প্রকাশিত ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি – এটা নাকি তাদের ফেবারে!!! বলেছেন “জাপানের উদ্যোগ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) নিয়ে সঠিক পথেই হাঁটছে ঢাকা”। ]  আবার অনেকে বলছেন,  আমেরিকাও অনেকটা তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়! বলেছে, ঢাকা সম্প্রতি তার ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক (আইপিও) প্রকাশ করেছে, যার অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) মিল রয়েছে।  পরের এই খবরটার আবার এটা যেখানেই ছাপা হোক এর মূল সোর্স হল সরকারি বাসস। এর মানে সরকার নিজেই মনে করে, এই ভাষ্যটা সঠিক! এমনকি  অ্যামেরিকান বা কুগেলম্যানের ফরেন পলিসিও এমন এক রিপোর্ট ছেপেছিল।

    আচ্ছা তাই যদি শেষমেশ  দশা-পরিস্থিতি হয়, তাহলে ভারি মজার কথা তো!!
    মানে তাহলে তো আমেরিকা হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই দিবে বা দিচ্ছে নাকি – আর ঝামেলা নাই কী বলেন!!!  এমন কী বলা যায় না, রিপোর্ট করে দেয়া যায় না?  না আ আ … এবার আর এমন “রিপোর্টার” কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; সবাই নাকি “গোপন সব খবর” মানে স্কুপ নিউজ খুজাতেই খুবই ব্যস্ত হয়ে আছে!
    আচ্ছা তাহলে আমাদের – আই আর [IR] – মানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস’ ডিপার্টমেন্টগুলো নিশ্চয় অনেক কিছু না হলেও কিছু জানে ও বলতে পারত! না,  তাও মনে হচ্ছে না। কারণ তাদেরকে রেফার করে কোন মিডিয়ায় ত কোন নিউজ নাই! তাহলে?? আমাদের কী হবে? এই হলো আমাদের মিডিয়া!!

    ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ এই জিনিষটা কীঃ
    এর আদ্যোপান্ত নিয়ে খুঁটিনাটি সব নিয়ে এখানে কথা বলতে গেলে পাঠক অতি-তথ্যের ভারে হারিয়ে যাবেন। তাই এখন অল্পকথায় মুল বিষয়টা বলার চেষ্টা করব। যদিও এনিয়ে কয়েকবছর আগে আমার অন্তত একটা ছিল যেটা খুজতে এখন একটু টাইম লাগবে। তবে ইতোমধ্যে পেয়ে গেলে সেই রেফারেন্সও দিব।

    ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ ইস্যুটা বুঝার জন্য সবচেয়ে ভাল মানে সহজ এপ্রোচ বা উপায় হতে পারে এই যে,  খেয়াল করলে দেখব এই ইস্যুটা একটা আগাম অনুমানের উপর দাড়ায়ে আছে; সেই ধরে নেয়া অনুমানটা কী, তা যদি আগেভাগে বুঝে নেই। সে অনুমানটা হল যে, “চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না”।  এখানে আন্তর্জাতিক রুল বলতে বুঝতে হবে জাতিসংঘের হেফাজতে থাকা নানান আন্তর্জাতিক আইন-কানুন, আন্তরাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধ মিটাবার জন্য অতীতে নানান সময়ে ডাকা রাষ্ট্রগুলোর সভায় নেয়া সিদ্ধান্ত ও কনভেনশন ইত্যাদি।

    এখন ‘চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না’ এই আগাম অনুমান যদি সত্যি ধরে নেই তবে এর ভিত্তিতে পালটা আমেরিকার নেতৃত্বে ও চীনবিরোধী হয়ে যে জোট তৈরি করতে হবে – সে দাবিই হবে ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ ইস্যুটার মূলকথা। কারণ তাহলেই এতে সহজেই আমেরিকা চীনকে কোনঠাসা করে ফেলবে বা পারলে একঘরে করে রাখার পথে  হাঁটবে – এই হল আমেরিকার মূল স্ট্রাটেজি। কিন্তু এটা আমেরিকার মূল স্ট্রাটেজি হলেও আমেরিকা ও তার বন্ধুরা “চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না” – এভাবে কথাটা বলতে চায় না।  কথাটা তারা ভিন্ন ভাষায় বলতে চায়।  তাই অনেক ঘষাঘষি ড্রাফট মুসাবিদা করার শেষে যে ভাষ্য-রূপটা দেখা যায় সেটা হল – “…advancing the  common vision of a free, open, inclusive, peaceful, and secure Indo-Pacific region“ ; যার বাংলা করে বললে – একটা অবাধ ফ্রি, খোলামেলা, সবাইকে নিয়ে, শান্তিপুর্ণ ও নিরাপদ এমন কমন দৃষ্টিভঙ্গিতে – ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়ন গড়ে আগানো।

    এখন সবার আগে একটা কথা বলে নেই। এই যে – “advancing the common vision of a free, open, inclusive, peaceful, and secure Indo-Pacific region”  – এই যে ভাষ্যটা এনেছি এটা আসলে  ২০২০ সালের; এখণকার নয়। মানে বাইডেনের আগের ট্রাম্প আমলের; আর সে আমলে ট্রাম্পের শেষ বছর ২০২০ সালে তিনিও অ্যামেরিকান কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের কারণে বাধ্য হয়েছিলেন এই ভাষ্যের অ্যামেরিকান কৌশল নিয়ে এশিয়ায়, তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি স্টেফান বিগান [Stephen Biegun] কে পাঠিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৪ অক্টোবর ২০২০; উদ্দেশ্য এশিয়ায় আমেরিকার এই স্ট্রাটেজি প্রচার করে এরপক্ষে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে দলে ভিড়ানো। এখানে লক্ষ্যণীয় যে তখন এই স্ট্রাটেজিকে ডাকা হত ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়ন এর স্ট্রাটেজি বলে। যেটা এখন বাইডেন আমল থেকে সরাসরি, ” ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি” বলে ডাকা হচ্ছে।  আর এছাড়া বড় ফারাক হল তখন ছিল সবাইকে আমেরিকার নিজ-স্ট্রাটেজিতে সামিল হতে ডাকার; যেজন্য ডেপুটি সেক্রেটারি স্টেফান বিগান এসেছিলেন। আর এখন বাইডেন ডাইরেক্ট একশন করতে চান; তাই এবার এটা সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু এর আমলে সেটা এখন হয়েছে ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’- যার মানে আর করণীয় হল এশিয়ার বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেক দেশকে  তার ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ কী তা লিখে আমেরিকার কাছে জানাতে হবে। মানে হল, ঐদেশ কী  “চীনকে আন্তর্জাতিক রুল মানে না” – বলে মনে করে কিনা সেটাই বলতে হবে।  তবে কথাটা ঘুরায় বলতে হবে অর্থাৎ  বলতে হবে ঐদেশ ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে অবাধ ফ্রি, খোলামেলা, সবাইকে নিয়ে, শান্তিপুর্ণ ও নিরাপদ এমন  দেখতে চায় কিনা।!! এদিক থেকে!
    যদিও সব ততপরতার সারকথাটা হল, যেন আপনাকে আগেকার দিনের সোভিয়েত-আমেরিকা বলে কোল্ডওয়ারে বিভক্ত দুই ব্লক বা জোটের ঝগড়ার মত; তবে একালের চীনকে রুল মানে না – অথবা চীন খারাপ দেশ – এসব ট্যাগ দিয়ে যেন আপনি চীনের বদলে অ্যামেরিকান   ব্লকে আপনি আসছেন কিনা – এরই ভাগাভাগির তুলে দেখানোটাই হল একালের ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’। যদিও মনে রাখতে হবে একালের ধারণাটা আরো অনেক সুনির্দিষ্ট। যেমন, আপনার দেশ নিজ অবকাঠামো এবং ডাইরেক্ট ঋণ- বিনিয়োগ সেটা চীনের থেকে নিবেন আর চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা গড়বেন সেটা হবে না।  কারণ একালে দেখাতে হবে যে চীন তো আন্তর্জাতিক সমাজে চলার দেশ না, [UNRULY] দেশ যে কোন নিয়ম মানে না, আর ঘামন্ডি বেয়ারা দেশ – একথা যদি মানেন তবে আপনি চীনের সাথে ঋণ-বিনিয়োগের সম্পর্ক, মাঙনা টিকার চালান নেয়া কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য এমন কোন কিছুই করতে পারেন না – এই হল ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির মূল আর্গুমেন্ট, এমন হতে হবে।

    তবে বলাই বাহুল্য এসব কথাগুলো নিজ রাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ লেখার সময় সরাসরি চীনের নাম নিয়ে বললে অনেক কূটনীতিক বিপত্তি, ঝামেলা দেখা দিবেই। তাই চীনের নাম না ধরে বলতে হবে  আর সেই স্টান্ডার্ড ভাষ্যটা  হল,  ইন্দো-প্যাসেফিক মহাসাগরের  সাউথ চায়না সি- অঞ্চলে  আকাশপথ বা সমুদ্রপথকে অবাধ ফ্রি, খোলামেলা, সবাইকে নিয়ে, শান্তিপুর্ণ ও নিরাপদ চলাচল দেখতে চায় আমার দেশ। আর এই কথাটা বিভিন্ন দেশকে বলায় নেয়াটাই হচ্ছে আমেরিকার ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’- এর সারকথা। তবে যতদিন যাচ্ছে আমেরিকা এই মূল ভাষ্যটা আরও আপডেট ও বিস্তারিত করে সাজাচ্ছে। যেমন ইউ.এস.এইড [USAID] – এটা আমেরিকার বিদেশি সাহায্যদাতা মূল প্রতিষ্ঠান। এর ওয়েবসাইটে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’র অনেক বিস্তারি ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। উপরের লাইনে আমার লালকালিতে লেখা প্রতিটা শব্দের আরো বিস্তারি ব্যাখ্যা সেখানে পাওয়া যাবে।   আর সেখানে দেখবেন মূল লালকালির কথাগুলো আর ছোট করে বলা হয়েছে। যেমন  লেখা হয়েছে, “Strategic Approach to the U.S. Vision for a Free, Open, and Resilient Indo-Pacific”। যদিও ব্যাখ্যা দিবার সময় তা আরো বিস্তার করা হয়েছে।   পাঠকদের কেবল একটাই অনুরোধ করব যে দয়া করে এসব পাঠ করার সময় এগুলোকে – দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অথবা অ্যামেরিকান ষড়যন্ত্র বা সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে  দেখবেন না। এটা বরং গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের যুগে চীনের বিপরীতে চীনের স্বার্থের স্ট্রাটেজির বিপরীতে আমেরিকার স্বার্থ-উদ্ধারের স্ট্রাটেজি – এজায়গা থেকে দেখা ও বুঝার চেষ্টা করলে ভাল হবে।  সেখান থেকে তাহলে বাংলাদেশ কী অবস্থান নিবে, নেওয়ার সুযোগ আছে তা বুঝার লক্ষ্য নিয়ে পাঠ করতে বসতে হবে।

    ট্রাম্পের আমলের ‘ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়ন এর অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি’ হাসিনা কিভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলঃ
    উপরে বলেছি একালে বাইডেনের আমলের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি – সেটাকে ট্রাম্পের আমলের বলা হত ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি। আর সেই কাজে ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান বিগান  বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবরে। আমি সেদিনের বাংলাদেশের ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার খবরের রেফারেন্স দিয়েছে এখানে।  আপনারা চাইলে এখানে অথবা  এখানে আরো ওদিনের পত্রিকা  দেখতে পারেন। সেদিনের রিপোর্টেই প্রথম অবশ্য, “দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে না ওয়াশিংটন” প্রসঙ্গ উঠেছিল।  স্টেফানের সফরে তিনি মূল যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন তা হল, বাংলাদেশ যেন ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজির সাথে এলাইন [align] হয়।
    কিন্তু এই প্রস্তাবের ভিতরের আসল কথাটা কী? তা হল, বাংলাদেশ যেন চীনের সাথে ঋণ-বিনিয়োগ নেয়া বা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত না হয় কারণ চীন যেহেতু আনরুলি [unruly] নিয়ম বা আইনের শাসন মানে না, তাই। এখন এই অ্যামেরিকান প্রস্তাব নিয়ে হাসিনা সরকারের সমস্যা হল, সে ২০১৬ সাল থেকে চীনের অবকাঠামো ঋণ, বিনিয়োগ আর ব্যবসার উপর নিজ অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ দিয়ে অনবরত উন্নয়নের বুলি বের হচ্ছে।  কারণ, বিপুল অবকাঠামোর নির্মাণের জন্য বাংলাদেশে ঋণ যোগাড় করতে হবে – সে বিপুল খামতিতে আছে আর  তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক অপ্রতুল, এছাড়া আমেরিকা সে একক দাতা বলে ভারসাম্য তার দিকে তার ইচ্ছাই সব ইচ্ছা – এভাবে জন্ম থেকে পরের সত্তর বছর এভাবেই চলেছে। কাজেই চীনকেই হাসিনার দরকার; বিশেষ করে আবার হাসিনার নিজদলের কর্মীদের আনুগত্য-লোভ ঠিক রাখতে গেলে এমন বিপুল ঋণ-বিনিয়োগের কিছু অংশ তাদের পিছনে ঠিকাদারি বা সরাসরিভাবে ব্যয় সম্ভব। আবার চীনা ঋণের প্রকল্পের টেন্ডার হয় না। কাজেই এই ইলাহি-রাজ-রাজারার কারবার ব্যবস্থা চীনের সাথে বিশেষ সম্পর্কের জন্যই সরকারের পক্ষে  সম্ভব হয়েছে।  উল্টাদিকে যদি তা চীনের হাত ছেড়ে দেয় তবে আমেরিকা নিজে বা বিশ্বব্যাংক এর মাধ্যমে কী চীন যেভাবে ঋণ-বিনিয়োগ ও বাণিজ্য দিচ্ছে এর নামমাত্র কিছু অংশ দিতে পারবে – আমেরিকা কী এক্ষেত্রে চীনের তুল্য না হোক নুন্যতম বিকল্প? এককথায় এর জবাব হল, না। আমেরিকার সেসক্ষমতা শুকিয়ে গেছে।
    আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকার স্ট্রাটেজিই তো ছিল ভুল। কারণ ২০১২ সালে এি কৌশল শুরু হবার পর থেকে এটা বহুবার আমেরিকা ঢেলে সাজিয়েছে নতুন নামে। কিন্তু সবসময় এই কথিত  ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি সামরিকতা নির্ভর করে সাজানো হয়েছে।  সেখানেও বাস্তবতাহীনভাবে ধরে নেয়া হয়েছে যে পুর্ব থেকে দক্ষিণ এশিয়া (যার কল্পিত কেন্দ্র হল সাউথ চায়না সি) এই সারা অঞ্চলের দেশগুলোর চীনের সাথে অমীমাংসিত সমুদ্রসীমা আছে তাই এই ইস্যুতে নিরাপত্তার অভাব আছে। কাজেই আমেরিকা সহজেই এসব দেশকে চীনের বিরুদ্ধে  নিজেকে প্রটেকশন দাতা করে নিয়ে দাড়াতে পারবে বলে অনুমান করেছে। তাই দেশগুলো সহজেই আমেরিকার নিরাপত্তা নৌকায় উঠে পড়বে, এই ছিল আমেরিকার অনুমান।  এই ছিল আমেরিকার গভীর অনুমান; কিন্তু একেবারেই অকেজো অনুমান!!! এজন্যই ওবামার ২০১২ সালের স্ট্রাটেজির নাম ছিল এশিয়া পিভট [PIVOT].  পিভট মানে দাড়িপাল্লায় দুই পাল্লা যে দন্ডের দুই মাথায় ঝুলে থাকে সেই দন্ডের ঠিক মাঝখানের বিন্দু হচ্ছে পিভট। পাল্লার একদিকে চীন আর অন্যদিকে চীনের থেকে নিরাপত্তার অভাব বোধ করবেই ধরে নেয়া এমন দেশগুলো – এভাবে দুইপাল্লার মাঝখানে পিভট হয়ে বসবে আমেরিকা আর সে বানরের পিঠাভাগ করার ভুমিকায় নেমে যাবে।

    কিন্তু কেন অ্যামেরিকান এমন কল্পনাঃ 
    কারণ চীনের ভৌগলিক অবস্থান; – চীন মূলত তার সাড়ে তিনদিক পাহাড় বা ভুমিতে ঘেরা এক ভুখন্ড। ওর কেবল উত্তরপুবদিক দিয়েই সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশ বা  বের হওয়া সম্ভব।  আবার মূল ডাঙ্গা ভুখন্ড থেকে বের হলেই সামনে ক্রমশ কোন এক মহাসাগর তা নাই। যেমন বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে বের হলে বঙ্গোপসাগর ছেড়ে সামনে আগালে তা ক্রমশ গভীর মহাসাগরের নাগাল পাবে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তেমন নয় বরং চীন থেকে বের হলে সামনে চীন সাগরের চার পাশে অনেক দ্বীপ-ভুখন্ড যেগুলো নানান রাষ্ট্র যারা চীনের পড়শি দেশ।      ফলে প্রায় সবার সাথেই সমুদ্রসীমা এনিয়ে বিতর্ক আছে এবং এতা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের সামনে মানে আমাদের সমুদ্রপথের ডাইনে বামে না সামনে আর কোন দেশ-ভুখন্ড নাই। আমাদের ডাঙ্গা থেকে সমুদ্রে যাবার পথে ডাইনে ভারত বামে বার্মা আছে তাতেই আমাদেরকে জাতিসংঘের [UNCLOS – United Nations Convention on the Law of the Sea] এই সালিশি প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে হয়েছিল – বিতর্ক-মারামারি না করে দুই পড়শিদের সাথে আপোষে মাপামাপির সমাধান পেতে। কাজেই চীন যার সমুদ্র-অঞ্চলের চারদিকে ভিনদেশের-ভুখন্ড তার কী অবস্থা তা অনুমেয়।
    আমেরিকা অনুমান করে নিয়েছিল চীনের এই ভৌগলিক অবস্থানের কারণে চীনের সাথে পড়শিদের সংঘাত তো আসন্ন হবেই! কিন্তু না, বাস্তবতা  সেপথে হাটে নাই, ঘটনা  হয়ে যায় ভিন্ন। তার আগে চীনের পড়শি কারা কেমন রাষ্ট্র তারা? এর এক বড় অংশই হল আসিয়ান (ইস্ট-তিমুর যোগদান ছাড়া একে বাদ রাখলে আসিয়ান এটা  দশ রাষ্ট্রীয়  মূলত এক অর্থনৈতিক জোট) জোটের সদস্য। আর অর্থনীতিক দিক থেকে যারা মধ্যম আয়ের, তবে বাংলাদেশের চেয়ে উপরে অবস্থান। সম্ভবত অর্থনৈতিক জোট হবার কারণে তাদের কমন অবস্থান চীনবিরোধী অ্যামেরিকান ইচ্ছা অনুসারের এক  আসিয়ান এমন হয় নাই। বরং জোটের দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার উপরে রেখেছে। তাই তাদের চীনের সাথে সমুদ্রসীমা বিতর্ক থাকলেও তা মিটানোর জন্য তারা আমেরিকার সাহায্য-সহায়তার জন্য দারস্থ হয় জোট তা চায় নাই।
    এর কারণ এক. তারা চায় নাই যে চীন-আমেরিকার সামরিক টেনশন বা স্বার্থঝগড়ার সমাধান  তা আসিয়ান কোন দেশের কাঁধে বন্ধুক রেখে সম্পন্ন হোক। দুই. এটা ছিল প্রথমটার চেয়ে অনেক বেশি নির্ধারক।  অনেকের হয়ত জানেন যে বিশ্বব্যাংক আপার [upper] মধ্যম আয়ের সদস্য দেশের (যে দেশের গড় মাথাপিছু হিশাবে আয় ৪০৪৫ ডলারের বেশি এই ক্যাটাগরি্তের দেশের) জন্য ঋণ পেতে কাজে লাগে না। কারণ, বিশ্বব্যাংক মূলত জোর দেয় এমন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দিকে যাদের মাথাপিছু গড় আয় একহাজার ডলারের নিচের। তাই যেকোন অবস্থায় এমন দেশগুলোকে বিশ্বব্যাংক নিজের আইডিএ (IDA) স্লট বলে, এই ক্যাটাগরিতে ঋণ দেয় যেটাদের সুদের হার মাত্র ০.৭৫%, আর যেটাতে ঋণশোধের জন্য ৪০ বছরের মত লম্বা সময় দেয়। যাতে খাতক দেশের ঋণশোধের কিস্তির চাপ কম হয়।  বিশ্বব্যাংকেই এই IDA ক্যাটাগরি ছাড়াও এর উপরে আরেকটা ক্যাটাগরিতে ঋণ দেয় যাদের আয় লোয়ার [lower] মধ্যম আয়ের শুরু্তের দিকের; মানে যারা গড় মাথাপিছু ১০৩৬ ডলারের উপরে চলে গেছে কিন্তু তা এর আপার লিমিট ৪০৪৫ ডলার এই প্রান্ত দিকে যায় নাই। তাদেরকেও বিশ্বব্যাংক লোন দেয় কিন্তু এবার সুদের হার ২% এর উপরে। তাই এর উপরের মাথাপিছু আয়ের দেশগুলার কাছে ঋণ পাবার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক কোন কাজে লাগে এমন প্রতিষ্ঠান নয় হয়ে আছে। একারণেই ২০১৩ সালে যখন চীনা সিঙ্ঘভাগ মালিকানার চীনা হাতে থাকা – ও  বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ষ্ঠানের [AIIB] জন্ম দেয় তখন চীন AIIB ব্যাংককে আপার [upper] মধ্যম আয়ের  খাতক দেশগুলোকে  টার্গেট করে সাজিয়ে নিয়েছিল। অর্থাৎ এদুই কারণে আসিয়ান দেশগুলোর কাছে অর্থনৈতিক বিচারে চীনের আলাদা বিশেষ মূল্য আছে। তাতে চীনের সাথে তাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে অমীমাংসেয় ইস্যু আছে – সেটা সত্বেও। কিন্তু অর্থনৈতিক ইস্যুতে চীন তাদের কাছে  সাহায্যকারি দেশ তাই, চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক  তাদের কাছে প্রায়রিটি ইস্যু হয়ে থাকে যায়। তবে এটা তাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে দাবি্কে কোনই ছাড় দেয়াও নয়।
    সবমিলিয়ে তাই ওবামা আমলেই ২০১৫ সালে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকার পিভোট স্ট্রাটেজি অকার্যকর। কিন্তু ইতোমধ্যেই আমেরিকা যেখানে যা বিনিয়োগ করেছিল তাও পানিতে চলে যায়। যেমন আমেরিকা অষ্টেলিয়াতে একটা নিজ সামরিক ঘাটি বানিয়েছিল যেটা নির্মাণের পরে ২০১৬ সালে চালু করা হয়, তাও তেমন কাজ আসে নাই। পরবর্তিতে ২০১৭ সালের আগে ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে অ্যামেরিকান নতুন করে কোন নয়া স্ট্রাটেজি চালু হতে পারে নাই। কোয়াড [QUAD] নামে চারদেশীয় নয়া উদ্যোগ সেবারই  নিজ জন্মের দশ বছর পরে চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ঐ ২০১৭ সালেই তা চারদেশ এক সাথে একই ভাষায় কোন বিবৃতিও দিতে পারে নাই। কারণ ঐ চারদেশের প্রত্যকেই চীনের দেয়া বিশেষ ব্যবসায়িক সুবিধা ভোগ করে বসে ছিল বলে কারও কলম উঠে নাই। ট্রাম্পের মিড-টার্মের (২০১৮) পরে বিশেষত শেষ বছর ২০২০ সালে নতুন করে  “ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে” অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি চালু হয়েছিল। আর এরই পরের রূপ হয় ২০২১ সাল থেকে বাইডেনের   ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি -এই নামে।
    আর হাসিনা ২০২০ সালে স্টেফান বিগিন-কে  খাড়া ভাষায় বলেছিল, আমরা কোন যুদ্ধজোটে বা এর কোন পক্ষে যাবো না। বরং আপনাদের যদি ঋণদান প্রকল্প থাকে যেমন চীনের বেল্ট-রোড ধরণের তবে পরে আইসেন। ফলে স্টেফান বিগিন হাসিনার উপর কোন চাপ বা ছাপ ফেলতে পারে না। সম্ভবত এখান থেকেই ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি নিজের অধীনে IPEF [Indo-Pacific Economic Framework] নামে অবকাঠামো ঋণদানেরও এক প্রতিষ্ঠান চালুর চেষ্টা করেছিল যেটা এখনও অসমাপ্ত, প্রস্তুতির ভিতরেই আছে। চালু হতে পারে নাই। কিন্তু বাইডেন প্রশাসনইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি নামে প্রচন্ড  চাপ সৃষ্টি করা ও সবাইকে নিজ নিজ স্ট্রাটেজি দেখাতে বলাতে এবারই প্রথম হাসিনা সরকার তা করতে বাধ্য হয়েছিল।
    তাহলে আমাদের সরকার নিজের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বলে যা প্রকাশ করেছে (যার নাম দিয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক আউটলুক) সেখানে কী আমাদের সরকার চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, নিন্দা করেছে???  নাহলে,  জাপান কেন বলল সঠিক পথেই হাঁটছে ঢাকা আর ওদিকে আমেরিকা বলল, তারা নাকি আমাদের কৌশলপত্রের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) অনেক মিল পাইলো! কেন?

    এমাসেই ইন্ডিয়ান ওশেন কনফারেন্সে ভারতকে উপরে তুলে ধরতে এটাতে বাংলাদেশ হোস্ট হয়েছিল। কিন্তু এটা এতই অগোছাল ছিল যে অংশগ্রহণকারি দেশ মানে বক্তৃতার বক্তারা সবাই একই প্রসঙ্গে কথা বলতে পারে নাই। যে যেটা পেরেছে সে প্রসঙ্গে কথা বলেছে। যেমন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক আউটলুক এখানে কী অবস্থান নিয়েছেন তা নিয়ে নিজেই বক্তৃতায় বলেছেন।  তো সরকার প্রধান ঐ বক্তৃতায় বলেছেন, “……ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতার অনুশীলনকে সমুন্নত রাখার আহ্বান” জানান।
    এছাড়া আরেক স্থানে বলেছেন, এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য …ইত্যাদি। এখন এর মানে কী এর মাধ্যমে মানে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতারঅনুশীলনকে সমুন্নত রাখার”  কথা বলে হাসিনা চীনের প্রতি কী নিন্দা  জানিয়ে ফেললেন?? অবশ্যই নয়। তাহলে  আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতার… পক্ষে কথা বললেন যে?  তবুও তাতেও এটা চীনের নিন্দা আর আমেরিকার পক্ষে দাঁড়ানো নয়; হয় নাই। কেন?

    আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের প্রসঙ্গের মধ্যে  এখানে আন্তর্জাতিক আইনবলতে বুঝতে হবে জাতিসিংঘের হেফাজতখানার দলিলে যা আছে। তো সেকথা উচ্চারণ করাতে জাতিসংঘের কোন সদস্য দেশের এতে কোনই অসুবিধা নাই।  এমনকি এই কথাগুলো চীনও যদি তাদের কোন বিবৃতিতে উল্লেখ করে তবু সেটা চীনের বিপক্ষের বক্তব্য বলে মনে করা যাবে না।  কারণ এই বক্তব্যে লেখা নাই যে  “আন্তর্জাতিক আইন  অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতার  কথা যা বলা আছে তা চীন বা অন্য কোন দেশ লঙ্ঘন বা ভায়োলেট করেছে। তাই এটা চীনের বিরুদ্ধের বলা কোন বক্তব্যই নয়।
    কিন্তু একালে  স্টেফান বিগিন-কে বাংলাদেশের হাসিনা কখনও “নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতা” নিয়েই কিছু বলেন নাই।  তিনি স্টেফান-কে বলেছিলেন, এসব যুদ্ধের অস্ত্র বেচা বা পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিবার কথা তিনি যা বলছেন যা নিয়ে বাংলাদেশ আগ্রহি নয়। বরং অবকাঠামো ঋণ নিয়ে আমেরিকা যদি বিতরণ করা শুরু করে, তখন তারা নক দিতে পারে  সেটা দিয়েন কিন্তু এখন যান……। কিন্তু এবার বাইডেন-লু এর আমলে তিনি আরেকটু আগিয়ে বলেছেন আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতা থাকার কথা আছে। তবে এর সাথে আবার  এমন কোন কথা  বলা হয় নাই যে চীন এটা অবমাননা করেছেন – তাতে আমেরিকা মনে করতে পারে যে তার উপস্থাপিত ইস্যু হাসিনা গ্রহণ করেছে অবশ্যই। কিন্তু এর সাথে চীনকে কোনই নিন্দাবাক্য জানায় নাই। ফলে এই মূল জায়গায় হাসিনা সরকার আগের ভুমিকাতেই আছে। মাএ হাসিনা সরকারের ইন্দো-প্যাসেফিক আউটলুকে চীন প্রসঙ্গে অবস্থান আগের মতই আছে। এটাই ফাইনাল অবস্থান!

    তাহলে সারকথাটা হল,  হাসিনা সরকারের আমেরিকার বিরুদ্ধে সোজা খাড়ায় যাওয়া না হোক – অন্তত আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে চীনকে দেখা বা চীনকে আমেরিকার স্টাইলে নিন্দা করা  -এগুলো কিছুই না করেও টিকে ছিল। যার সোজা মানে হল আমেরিকার কথা না শুনে চীনের সাথে অবকাঠামো ঋণ বা চীনা বিদেশি বিনিয়োগ নেয়া এবং অবাধে চীনের সাথে ঘোরতর ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক গড়ার কাজ চালিয়ে যাওয়া সবই করেছিল বা এখনও করছে। কিন্তু এই অর্জন পাবলিকের অর্জন হতে পারল না। পাবলিকের অর্জন বলে হাসিনা পাবলিকের অনুমোদন প্রশংসা লাভ সেটা করতে পারছে না কেন? এক অ্যামেরিকান “ভিসা দেয়া হবেনা” – উলটা চোর আর নাগরিকের মৌলিক অধিকার ভঙ্গকারিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিবে আমেরিকা একথাটা সদর্পে বলেই বরং খোদ আমেরিকাই বাংলাদেশের পাবলিকের কাছে হিরো হয়ে গেছে। এমনটা আজ কেন হল?  মূল কারণ, হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তো সঠিক! এটা পাবলিক মনে করে। আর এরই প্রকাশ তো আমেরিকার পক্ষে হাততালি! দেখেন ২০১৪ আর ২০১৮ সালে দুইদুবার নির্বাচনে হাসিনার চরম অস্বচ্ছতায় নিজেকে জবরদস্তিতে বিজয়ী ঘোষণা করে আনার  সুখ – এটা দশবছরের জন্য ক্ষমতা পেয়ে যাবার সুখ নিঃসন্দেহে সীমাহীন!  আবার ওদিকে চীনের সাথে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প পাস যার কোন ওপেন টেন্ডার হয় না, জি-টু-জি বা সরকার-সরকারে চুক্তির নামে ওপেন কোন টেন্ডার না করেই প্রকল্পমুল্য ইচ্ছামত লেখা গেছে সেখানে, অর্থ লুট আর ভাগবাটোয়ারা করা যায় – এমন কাজের সুখ সীমাহীন, তা বলাই বাহুল্য! 
    কিন্তু সেসবেরই কাফফারা দিতে হচ্ছে এখন।  অ্যামেরিকান পক্ষে বাংলাদেশে পাবলিক ইমেজ বাংলাদেশে কখনই তেমন উজ্জ্বল নয়, ছিল না। তা সত্বেও এখন অ্যামেরিকান ভিসা দেয়া হবেনা বলাতে কমন মানুষ হাততালি দিচ্ছে মানে ঐ আমেরিকাকেই অন্তত এখনকার জন্য ত্রাতা ভাবছে – মানে কে দেশী আর কে বিদেশি এদিক দিয়ে আর দেখছে না এটা মারাত্মক ডেনজারাস হয়ত – কিন্তু হাসিনার চরম পরাজয় এখানেই! কারণ সে জনবিচ্ছিন্ন! আর কতটা জনবিচ্ছিন্ন তা – ভিসা দেয়া হবেনা – বলাতে জনউল্লাস দেখে সকলেরই বুঝতে পারা সম্ভব!
    এককথায় বললে কূটনীতিতে হাসিনা আমেরিকার বিরুদ্ধে সফল ফাইট দিতে দাঁড়াতে পারলেও চীনের সাথে “চুরির সম্পর্কে অস্বচ্ছ সম্পর্কে” জড়িয়ে যাওয়াতেই – হাসিনার এসব অর্জনকে পাবলিক এনডোর্স [endorse] বা অনুমোদন করছে না, পাচ্ছে না। পাবলিক এসবকে নিজের অর্জন মনে করতে চাচ্ছে না। গুম-খুনের অভিযোগ-দাগের এই হল কাফফারা!  আবার নিন্দনীয় কমিউনিস্ট কায়দায় সিপিবি এই অন্যায় টাকে বিবৃতি দিয়ে সাফাই গাইতে গেছে।  এটা নাকি  ” অ্যামেরিকান হস্তক্ষেপ” – এই  বলে চালিয়ে দিবার চেষ্টা করেছে। তাহলে তো হিটলারের বিরুদ্ধেও আমরা তো বাইরের লোক তাই আমাদের কিছু বলার সুযোগ নাই। কারণ সেটা সার্বভৌম জর্মান সরকারের বিরুদ্ধে “বাইরের হস্তক্ষেপ” হয়ে যাবে, তাই কী!!!!  কোনটা দালালি আর কোনটা রাজনীতি তা ফারাকের বোধশক্তিহীন এরা!
    আবার বাংলাদেশে যারা আমেরিকা আমাদেরকে আগের মত ফেলে চলে যাবে অথবা হাসিনা-আমেরিকা আপোষ হয়ে যাবে, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে দিবে ইত্যাদি বল ও অবস্থান নিয়েছিল – তারা এখন থেকে ভুল বলে আপাতত প্রমাণিত হয়ে গেল।  হাসিনা-আমেরিকা আপোষের জায়গা নাই হয়ে গেল বা কোন ঘনিষ্ট সম্পর্কে থাকার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেল! অ্যামেরিকান ভিসা দেয়া হবেনা একথার সার অর্থ এটাই!

    সবশেষে, আমার কথ আনা বিবিসির; বিবিসি লিখেছে, “ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যত মিত্র দেশ আছে, এই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিতে তাদেরকে একটি চীন-বিরোধী জোটে জড়ো করতে চায়। এই জোটের অনেক ধরণের লক্ষ্য আছে- সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক”।
    আর এজন্যই চীনের অবস্থান নিয়ে বলছে – সুনির্দিষ্ট কোন একটা দেশকে টার্গেট-বিরোধিতা করে বা তাকে বাইরে রেখে দুনিয়াতে কোন একটা জোট গঠন করা কী জায়েজ, এটা কেমন ততপরতা?

    “ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যত মিত্র দেশ আছে,
    এই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিতে তাদেরকে একটি চীন-বিরোধী জোটে জড়ো করতে চায়।
    এই জোটের অনেক ধরণের লক্ষ্য আছে- সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক। “– – – – – –

    হা, এই প্রশ্ন আমাদের নাগালের মধ্যে থেকে বেশি তুলেছেন বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদুতেরা। এই জায়গায় আমেরিকা বেশ গুটিয়ে আছে জবাবহীন হয়ে!
    শেষ করার আগে জানিয়ে দেই আমি ঐ প্রশ্নের জবাব নিয়ে আর লিখি নাই। সেটা হল, যে এজাম্পশন [assumption] এর উপর আমেরিকা দাড়িয়েছে যে সে অনুমানটা হল যে, “চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না”। – এই অনুমান টা আমেরিকার কেন হল? প্লাস এটা কতদুর সত্য-মিথ্যার চেয়ে কেন আমেরিকা এই অবস্থান নিল সেটা বুঝা বেশি জরুরি – এভাবে নেওয়াই উপযুক্ত হবে। সেজন্য এনিয়ে একেবারেই এখানে আগাই নাই, টাচ করি নাই। সেটা শুরু করলে এওলেখার আয়তন দ্বিগুণ হয়ে যেত। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে আলাদা করে লিখতে হবে। পরে হয়ত সবগুলো জুড়ে একটা বই করা যেতে পারে। তবে ব্যাপারটা গুরুত্বপুর্ণ আর এই ইস্যুতে চীন-আমেরিকার রেষারেষির শুরু কম করে হলেও ২০০৮ সাল থেকে। সেসব দলিল দস্তাবেজ যার কিছু আমার সংগ্রহে আছে তা পাবলিকের সামনে আনতে হবে। পরবর্তিতে তা করতে হবে। আপাতত এখানেই শেষ!
    আপডেটেডঃ ২৭ মে ২০২৩ সকাল ১১ঃ ২৯

    +++++
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

     

    ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

    গৌতম দাস

    ১৮ জানুয়ারী  ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4m2

     

        What is the message Donald Lu left for Bangladesh? Daily Star

    ডোনাল্ড ল্যু ঢাকা সফর শেষে চলে যাবার পরে আমাদের সমাজের প্রায় সব কোণে বিস্তর আলাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা শুরু হয়েছে এই বলে যে হলো-টা কী বা ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়ালো – এধরণের!
    তবুও এটা এখন কমবেশি পরিস্কার – যেটা সোজাসাপ্টা বললে, ডোনাল্ড ল্যু কিছুটা  পিছু হটাছেন অথবা এক দিশা হারানো বাইডেন প্রশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এবং সেই অনুসারে তাদের এখনকার অবস্থানই যেন জানাতে এসেছিলেন।  তারা যে তাদের আগের অবস্থান থেকে অন্তত কিছুটা সরে গেছেন সেই পিছু হটা অবস্থান অনুসারে বাকি সবকিছু এডজাস্ট করে নিতে বা সে অনুযায়ী একটু ঢেলে সাজিয়ে নিতে এসেছিলেন তিনি।  যদিও মনে রাখতে হবে এই “পিছু হটা’ – এটা সাময়িক হতে বাধ্য! আমার বিচারে এটা স্থায়ী অবস্থা হবে না, বরং সাময়িক হতে বাধ্য।  মানে বলতে চাচ্ছি ল্যু ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা তাদের এই পিছু হটা অবস্থানও ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে; ফলে আবার আগের জায়গায় যেতে তাদের চেষ্টা করতে হবে! এজন্যই এটাকে ‘সাময়িক’ বলছি। কিন্তু এখন অবশ্যই এটা কিছুটা হলেও পিছু হটা !

    কথাটা সম্ভবত আরেকভাবে বলা যায়। যদি অনুমান করে নেয়া যায়, বাইডেন প্রশাসনের ভিতরে দুটা ধারা আছে বা হয়ে গেছে।  যার একটা ধারা যেটাকে আমরা এতদিন একমাত্র জ্ঞান করেই এসেছি সেটা হলঃ বাইডেন প্রশাসন ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এই অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে আর এভাবেই এশিয়ায় চীনবিরোধি আমেরিকান স্বার্থগুলো ভাল আদায় হবে বলে এতদিন মনে করে এসেছে এরা। এই ধারারই বাংলাদেশে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের গুম-খুন-অপহরণ-গায়েবের যেসব ভিকটিম আছে তাদের সাথে দেখা করার প্রোগ্রামে শাহীনবাগে যাওয়া। আর তা থেকেই হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সরাসরি কিছুটা সংঘাতময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

    অন্যদিকে, প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারাকে চিনাতে বলা যায়, এরা মনে করে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে হাসিনা সরকারের উতখাতের ঝামেলায় যাবার দরকার নাই। অন্যভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে…।

    সেক্ষেত্রে তাহলে জানতে হবে বা শুরু করতে হবে যে তাহলে বাইডেনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখান থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এমন চিন্তা করা বা পিছু হটার কথা সহজেই  বলতে পারছে কেন? আর কীইবা সেই উদ্দদেশ্য??
    বাইডেন প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে “মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা’ একেবারেই নয়। বরং সে জায়গায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘বার্মা দখল’! কিন্তু  সেক্ষেত্রে  ‘বার্মা দখল’ করতে চাইলে হাসিনা উতখাতের দায় সাথে নিয়ে আগানো কেন? সেকথায় পরে আসছি।

    আসলে প্রথম ধারার পথে চলতে গিয়ে এটা এখন অনুমানে বলাই যায় যে বাইডেনের আমেরিকার নিজ ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজি” ধরে আগাতে গিয়ে এমনভাবে হাসিনা সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে যাবে এটা তাদের কল্পনায় ছিল না। আগের দিনের মত সবই চুপচাপ পাড়িয়ে যেতে পারবে! কারণ, বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হবার পর থেকে প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল – সেই অভ্যাস মতে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকান প্রভাবে তারা যা করতে চেয়েছে মোটামুটি তাই হয়েছে ও পেয়েছে।

    কিন্তু বারে বারে বলেছি এটা “পালা-বদলের কাল” যখন আমেরিকাকে চীনা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতায় মোকাবিলা করতে হবেই ও হচ্ছে। পালা-বদল” মানে যেটা গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব বদলের এটা সময়কাল। যেটাকে অনেকেই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারে না অক্ষম বলে তারা তাদের চিন্তার অসক্ষমতা, দুর্বলতা ঢাকতে “ভূরাজনীতিক” বলে একটা আবছা অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে নিজের অস্পষ্ট চিন্তার প্রকাশ ঘটায়ে থাকে। এই পালাবদলে “ভূ-” বা কোন দেশের বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” জন্য এসব ঘটছে তা একেবারেই নয়; তা ভাবার কোন সুযোগও নাই। ভুরাজনীতি শব্দটার ব্যবহার ও আবির্ভাব প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে তবে এর শেষের দিকে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল ১৯৪৪-৫ সালে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও উত্থান ঘটে যাবার পরে  মানে এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও উদিত প্রভাবের পরে  ‘ভুরাজনীতি’ শব্দটা সেবার হারিয়েই যায়। এর মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কেন আমেরিকা এর একছত্র নেতা হিশাবে উঠে আসবে আর এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়া এক গ্লোবাল অর্ডার [new Global Order] বা বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা চালু হবে সেটা কোন দেশেরই বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” কারণে-পরিণতিতে এমনটা  ঘটে নাই। সে জন্য যারাই এই তিন প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও এদের সেকাল থেকে নয়া ভুমিকা ও তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে অপারগ তারাই geo- বা ভ্যু- বলে একটা পরাজিত ধারণাকে ধুয়ে মুছে আবার একালে খাড়া করে নিজেদের অকর্মণ্যতা আড়াল করে থাকে।

    তবে এখন যেটাকে পালাবদল  বলছি এতেও এমন অনুমান ভুল হবে যে, এতে আমেরিকা যেভাবে সেকালে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল চীনও একইভাবে একই ধরণের নেতা হবে। এই অনুমান অতি সরলিকরণও হবে। তাই সাবধান থাকতে হবে। তবে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক যে বিশ্ব ব্যবস্থা তখন জন্ম নিয়েছিল ও এখনও ধুকে হলেও চলছে – এখন পালাবদলে যেটা কেবল আমেরিকার জায়গায় চীনা নেতৃত্ব হয়ে যাবে এমনটা হল এক কপি-পেস্ট ধারণা। দুনিয়ায় কোন ঘটনাই একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ঘটে না। যদিও জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত আবার পুনর্গঠিত হবেই।

    আবার, এসব পালাবদল প্রসঙ্গে খোদ আমেরিকানদের কোন স্টাডি নাই বা ফেনোমেনাটা জানা নাই তা একেবারেই নয়। তবু তারা যেন নানার আমলে খাঁটি ঘি খাবার অভ্যাসে এখনও সহজেই আগের মতই তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করে ও ফেল মারতে থাকবে। কারণ পরিস্থিতি যে আর আগের মত একই রকম নাই তাই তারা সময়ে ভুলে যায়। আর বার বার পরাজিত হয়। এধরণের উদাহরণের অভাব নাই। যেমন ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটা ঘটনা। সে সময় আমেরিকা-বিশ্বব্যাংকের আগ্রহে তারা হাসিনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা। এই দুর্নীতির মামলা সত্যি হোক বা না হোক, এটা মনে করা ভুল হবে না যে এমন মামলা করার পিছনের তাদের অপর উদ্দেশ্যের দিক ছিল। সম্ভবত তা হল, যাতে আরো ভাল করে আমেরিকার অধীনস্ততায় আনা যায় যাতে হাসিনা আরো অনুগত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আমেরিকান বেকুবিটা হল দুর্নীতি মামলাটা যখন আনলই তখন কয়েক বছর পরেই আবার শেষে আদালত থেকে ঐ মামলাটাই বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কেন? অথচ তাতে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নয়া এক হারুপার্টিতে পরিণতি পেল!  সেটা কিভাবে?

    বিশ্বব্যাংক মানে হল নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে কম সুদে যে ঋণদাতা – তা ছোট বড় সব প্রকল্পে সে এমন ঋণ দিয়ে থাকে। আর এথেকেই “পড়ে পাওয়া বাড়তি চার আনার মত ঘটনাটা হল – আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বেড়ে যাওয়া।
    তাহলে দুর্নীতির মামলা এনে পরে পিছু হটে যাওয়ার আমেরিকানদের পরিণতি কী হয়েছিল? হয়েছিল এই যে নয়া ঋণদাতা উতস হিশাবে ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণদাতা’ হতে অপেক্ষা করছিল চীন বা প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চেয়ে অপেক্ষা করা চীন এই ফাঁকে সে বাংলাদেশে প্রবেশ ও নিজের হাজিরা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। যেটা এরপর হাসিনার চীন-সফর আর পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট  সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর শেষে ২০ বিলিয়ন ডলারের অধিক (যেটা পরে ঠেকেছিল ২৬ বিলিয়নে) প্রকল্পের বন্যা বাংলাদেশে বয়ে গেছিল।

    তাহলে চীনকে অবকাঠামো ঋণদাতা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে রাস্তা করে দিয়েছিল কে??? এটাই আমেরিকান বেকুবি!!   অথচ ঋণদাতা মানেই ওর ঋণগ্রহিতা দেশের উপর দাতার প্রভাব হাজির হওয়া বা বেড়ে যাওয়া। অনেকে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বলতে পরাশক্তির ‘সামরিক ক্ষমতা’ বলে বুঝে থাকে। এটা ভুল মিথ্যা। গ্লোবাল নেতা দেশের প্রভাব-আধিপত্য বলতে সেটা প্রধাণত নেতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানে যেমন তার ব্যাপক ‘ঋণদানের সক্ষমতা’ একেই বুঝায়।  তাহলে দাড়ালো যে আমেরিকা সেই বার নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল আর তাতে চীন উত্থান বা চীনা প্রভাব কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এবারও দ্বিতীয়বারও এমন কিছু একটা ঘটতে পারে সে ইঙ্গিত ফুটে উঠছে!!

    এবার বাইডেন প্রশাসন শপথ নিবার পর থেকে আমরা দেখছি তিনি আরেক “বাংলাদেশ প্রকল্প” খুলতে চাচ্ছেন – যেটাকে আমরা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প বলে চিনাতে পারি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ অবস্থায় উঠেছে এব্যাপারে সন্দেহ নাই।  কিন্তু প্রশ্ন হল বাইডেন কী আসলেই বাংলাদেশের মানবাধিকার চরম লঙ্ঘণ নিয়ে উদ্বিঘ্ন? মিন করেন? ঠিক তাই বুঝাতে চান???

    না একেবারেই না। তা সরাসরিই বলা যায়। যেমন এবার বাংলাদেশের বা হাসিনার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার পিছনে আমেরিকার দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি উদ্দেশ্যটা কী সেদিকে মনোযোগ দেই।  বাইডেনের আরেক উদ্দেশ্য বা মুল উদ্দেশ্য ছিল ও এখনও আছে – তা হল ‘বার্মা দখল”। এটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এটাকে পরোক্ষে বা পিছনে লুকিয়ে রেখে বাইরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্যটা বাইডেন মিথ্যা করে জানিয়ে চলছিলেন যে বাংলাদেশের হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য। আবার হাসিনার গুম-খুন-অপহরণ উঠায়ে নেয়া- ক্রসফায়ার ইত্যাদিতে মহামারি লাগিয়ে দেয়া এগুলোও বাস্তব ও সত্য। অর্থাৎ বাইডেনের “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প তো বাস্তবতার উপরেই দাঁড়ানো। হা অবশ্যই তাও সত্য । কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন গত পনেরো বছরের যেগুলো হাসিনা গুম-খুনের মহামারি হয়ে চলছিল তা তো আমেরিকা অজানা ছিল না। তবুও তখন কোন আমেরিকান প্রশাসন এদিকে মনোযোগ দেয় নাই – আসে নাই বা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিয়ে তাদের কোন কথা ছিল না কেন? যেটা আসলে অন্ধ ও নিশ্চুপ হয়ে পরোক্ষে হাসিনাকে সমর্থন দেয়া – তা করে গেছিল কেন? এর জবাব মিলে না!  কবি নীরব এখানে!
    এর জবাব হল, ডোনাল্ড ল্যু যতই বলুক যে আমেরিকার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্টে [1st amendment of US constitution, 1791] যে পাঁচ মৌলিক অধিকারের কথা দেয়া বা বলা আছে এনিয়ে আমেরিকা দেশে দেশে কথা বলবেই – সেকথা সবটা সত্যি না। সত্যিটা হল, ঐ পাঁচ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ হলেই হবে না সাথে ঐ লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে তখনই প্রশাসন কিছু বলবার পক্ষ নিবে যখন আমেরিকান রাষ্ট্র নিজের গভীর স্বার্থ ওর মধ্যে দেখবে বা থাকতে হবে তবেই আমেরিকা আগাবে এবং “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আগাবে।  আর আমেরিকান রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থগুলোকে আড়ালে ও পরোক্ষে রেখে দিবে। তাহল বাংলাদেশেও  হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড নিয়ে এগিয়ে আসার পিছনের আমেরিকান গভীর স্বার্থটা কী?

    গোড়ার স্বার্থ আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতেঃ
    হা, আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতে আর এটাই তার গোড়ার গভীর স্বার্থ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশকে জড়ানো কেন? বা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা পর্যন্ত উঁকি মারা কেন? কী দরকারে?

    আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো।

    কিন্তু বার্মা দখল মানে তো নুন্যতম একটা সেনা সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপার। হা তাই। তবে দখল কাজটা কম পয়সা খরচে, নিজ সেনা কম করে জড়িয়ে ও আয়েসে এই দখল ঘটাতে গেলে আমেরিকান স্টাইলটা হল, নিজ দেশের “এরিয়াল সাপোর্ট”[aerial support] দেয়া আর এই ছায়ায় সম্ভাব্য কোন দেশের (বাংলাদেশের!) একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল নেয়া।  তাই হাসিনাকে সরানো দরকার – এইছিল এতদিনের বাইডেনের গৃহিত লাইন এবং মূল স্বার্থ। কারণ তাহলে  সহজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সময়ের পদাতিক বাহিনীকে দিয়ে বার্মা দখল সহজ!  যেটা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে বাইডেন সেরে ফেলতে চেয়েছিল।

    এরিয়াল সাপোর্ট মানে কী?
    আরেক ভাষায় বললে এর অর্থ বার্মার নিজের আকাশ সীমানার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সেটা এই বলে যে, বার্মিজ বিমান বাহিনী যেন কোন উড়া-নড়াচড়া না করতে পারে এই মর্মে বার্মিজ বিমান বাহিনীর উপর এক  ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে দেয়া। সেটা আবার কী? মানে হল, বার্মার আকাশ-সীমার উপর আমেরিকার ‘নো ফ্লাই জোন’ঘোষণা বা দাবি জানিয়ে দেয়া।  আর তাতে এরপরে বার্মীজ কোন আকাশযান মানে কোন সামরিক-এয়ারফোর্স সক্ষমতা যাই থাক – বার্মার কোন হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান বার্মার নিজ আকাশের উপর দিয়ে উড়তে চাইলেও সেই বিমানের উপর আমেরিকান কোন জেট সেটার উপর বোমা ফেলে  গুড়িয়ে দিবে এই হুশিয়ারি আগাম দিয়ে রাখা।

    এতে সুবিধা হল, যেহেতু বিমান সক্ষমতা বার্মার থাকলেও সে ব্যবহার করতে পারবে না বা করলে তা মোকাবিলা করবে কোন আমেরিকান জেট ফলে সেই আড়ালে একেবারে সহজেই কেবল একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল করে নেয়া সহজ। এই কারণে “বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনীই” বাইডেনের আকাঙ্খা ও মূল কাম্য এবং টার্গেট। আর সে প্রয়োজনেই মূলত হাসিনার অপসারণ বা না-অপসারণের ‘এদুই লাইনের’ মাঝে দোল খাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

    আর বরং হাসিনাই যদি বাইডেনের বার্মা দখল আকাঙ্খায় পদাতিক বাহিনী সরবরাহকারি হিশাবে সামিল হতে রাজি হয়ে যায়??? এরাই হল সেকেন্ড অপিনিয়নধারী!!!! বা দ্বিতীয় ধারা!
    কিন্তু “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এর আড়ালে তো বাইডেন ভালই আগাচ্ছিল, এখন নয়া এপথের উত্থান হল কেন? দুইটা কারণে।

    কী সেই দুই কারণঃ
    এক. মূলত বার্মা দখলের আমেরিকার এই আকাঙ্খাটাই অবাস্তব। মনে হচ্ছে এনিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক আগে করে নেওয়ার দিক থেকে আমেরিকার ঘাটতি আছে!  যেমন যেটা আমেরিকার প্রাথমিক অনুমান যে সরাসরি “বার্মা দখল” এই ভাষায় না বলে ‘আরাকান ভুখন্ড’ দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া – এমন মানে জুড়ে দিয়ে কথাটা তারা বাংলাদেশকে বলতে চেয়েছিল। মনে করেছিল – এভাবে বললে নিশ্চয় বাংলাদেশ খুব খুশি হয়ে সামিল হতে চাইবে! বা পদাতিক বাহিনী নিয়ে সামিল হবে!!!  সেই কূটচাল এই হাসিনাই বহু আগেই (২০১৯ সালেই) প্রত্যাখান করে দিয়েছিলেন খুবই সঠিক ও কঠোর ভাষায়।
    কারণ কোন দেশের ভুখন্ড আমেরিকা অপর দেশের সাথে জুড়ে দিবার ক্ষেত্রে কে??  কেউই নয়! আমেরিকার কোন এক্তিয়ারই নাই। কোন দেশই একাজ করতে পারে না, ক্ষমতা রাখে না। জাতিসংঘের চোখে এটা গর্হিত ও অপরাধ্মূলক কাজ।

    একারণেই বার্মার ক্ষমতাসীন জেনারেলদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আড়ালে আমেরিকা আমাদেরকে বলতে চায় এতে আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা মিটিবে বলে আমেরিকার ধারণা আমরা খুশি হব এতে। অথচ এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও ২০১৯ সালে হাসিনার এই আমেরিকান প্রস্তাব প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে  মুল চালিকা ছিল চীনের এব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া; শুধু তাই না ভারতও আমেরিকার এই খায়েশের বিরুদ্ধে ছিল। ওদিকে আমেরিকানদের ধারনা তারা বার্মার দখল নিয়ে কোন এক পছন্দের জেনারেলকে বা সুচি-কে বসিয়ে নয়া বার্মা সরকার চালু করতে পারলে সেটা এক প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকারই হবে! কিন্তু বলাই বাহুল্য ঠিক এই দিকটার কারণের ভারত ও চীন ঘোরতরভাবেই এই ইস্যুতে আমেরিকার চরমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। বার্মাদেশের সাথে চীন ও ভারতের লম্বা সীমান্ত আছে তাই এদুই দেশ কিছুতেই বার্মায় এক  প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকার দেখতে চাইতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক!

    শুধু তাই না বাইডেন এমন এক সময়য়ে তার বার্মা দখলের খায়েশের পিছনে ছুটছে যখন আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে শুধু চীন-ভারতই না রাশিয়াও (ইউক্রেন যুদ্ধের পুটভুমিতে) খুবই সবল বিরোধীতা করতে আসবে। গত ২০১৯ সালের দিকে পরিস্থিতি ছিল একরকম কিন্তু এখনকার পটভুমিতে আমেরিকান নো ফ্লাই ছত্রছায়ায় যেকোন দেশের পদাতিক বাহিনী সীমানা অতিক্রম করে বার্মায় প্রবেশ মানে সেটা এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত যুদ্ধের ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হবে; বলে আমেরিকা এতই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
    মানে হল, আমেরিকার বার্মা দখলের উদ্দেশ্য হল চীনকে দুর্বল করা, চীনের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলা মত কাজ। অথচ এখন এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মাত্রই চীন দুর্বল হবার পরিবর্তে উলটা আমেরিকার তিন শত্রুদেশ (চীন-ভারত-রাশিয়া) একজোট হয়ে যাবে। একেবারে হিতে-বিপরীত অবস্থা। একারণের পিটার হাসের শাহীনবাগ ততপরতায় কিছুটা বাধা পেয়ে আমেরিকান প্রশাসন আভ্যন্তরীণ রিভিউয়ে বসলে সেই উসিলায় প্রশাসনের এসব দুর্বলতার দিক সামনে চলে এসেছিল বলে অনুমান করা যায়। আর তাতেই এই ডামাডোলে দ্বিতীয় ধারা যারা হাসিনাকে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অপসারণের পক্ষে কাজ করতে চায় না – এই ধারা উপরে উঠে বা সামনে চলে আসে।

    পরে তাদের প্রস্তাব হল, তাহলে বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো।  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে।

    আদর্শ উদাহরণ মাইকেল কুগেলম্যানঃ
    এই প্রসঙ্গে আগ্রহিরা কুগেলম্যানের লেখা ও আরেক সাক্ষাতকার পড়ে দেখতে পারেন।  মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] হচ্ছেন মূলত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের [WILSON Centre] ফেলো। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর। কিন্তু অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কের চেয়ে এই সেন্টারের ফারাক হল এই প্রতিষ্ঠানটা সেমি-গভর্মেন্ট। মানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফান্ড সরকারের দেয়া। এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের অনেক কথা বলার সুযোগ বা পছন্দ প্রকাশের সুযোগ আছে। ফলে কুগেলম্যান-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার পরে পরেই; আর তা এই চিন্তা করে যে কুগেলম্যান সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাইডেনের চোখের দেখে তাঁর অবজারভেশন ফরেন পলিসি [Foreign Policy] পত্রিকায় নিয়মিত লিখবেন। যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক ভাল ফিডব্যাক। এককথায় কুগেলম্যান অনেক বেশি বাইডেন প্রশাসন ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এখন আসল কথাটা হল যে কুগেলম্যান গত তিনমাসের বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নাখোস! বিএনপির জনসমাবেশকে তাই তিনি লাখে নয় হাজারে গুনে বলা উচিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আসলে প্রায় একজন – বাইডেনের ওবায়দুল কাদের। মানে হাসিনার জন্য একটা ওবায়দুল কাদের অবশ্যই সামঞ্জ্যপুর্ণ যেটা বাইডেনের জন্য বা এক্ষেত্রে একটা ভাঁড় অবশ্যই। তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are people who see reasons to support it. বাংলাদেশে এই লেখা ইংলিশ এবং বাংলায় ছাপা হয়েছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

    তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে,
    ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are

    people who see reasons to support it.।

    কুগেলম্যান এর এই অবস্থান এটাই বাইডেন প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারা। এটা প্রমাণ করে “মানবাধিকার” বাইডেনের ইস্যুই না; এটা কেবল  হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটাকে পুঁজি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা বাইডেনের লক্ষ্য।

     


    তাহলে  আইলিন লা বাকারকে পাঠিয়ে তাদের কী লাভ বা অগ্রগতি হলঃ

    মূলত তিনি এসেছিলেন দুটা সমর বিষয়ক চুক্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা যায় কিনা, তা দেখতে। নাম হিশাবে এরা হল General Security of Military Information Agreement (GSOMIA) and the Acquisition Cross-Servicing Agreement (ACSA)। তবে প্রথমটার ব্যাপারে আমেরিকা খুবই আগ্রহি, এটা সামরিক তথ্য সুরক্ষা ও শেয়ার বিষয়ক। যেটা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে এর আগেও বাংলাদেশের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। আর এবার এনিয়ে আলোচনার ফাঁকে হাসিনা সরকার বার্মায় পদাতিক বাহিনী পাঠানোতে আগ্রহি হতে পারে কিনা সে চেষ্টাও বাজিয়ে দেখা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    আবার অনুমান করা হয় যে এই একই অনুমানের কারণেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভোর রাতে এসে হাজির  হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় যে সরকার চীনের সাথে কোন প্রতিশ্রুতিতে যায় নাই। এতে বলা যায় অসন্তুষ্ট হয়েই চীনা মন্ত্রী মাত্র আধাঘন্টা মিটিং করে ঐ রাতেই চলে যান। কিন্তু এর মানে আবার আমাদের সরকার আইলিন লা বাকার-কেও কোনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা করেছেন তাও না। কিন্তু তাতে পুরা আসরের সব পক্ষগুলো পরস্পরের প্রতি পরস্পর সন্দেহ করে গেছেন, তা এড়ানো যায় নাই।
    বাংলাদেশের যেকোন রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ তাতে সে সরকার বা বিরোধী যাই হোক এদের সবার জন্য যেটা নো-গো এরিয়া [no-go area] তা হল, সামরিকভাবে কোন দেশের পক্ষে বা বিপক্ষের সাথেই না জড়ানো; এটা করাই যাবে না। এমন ভিমরতি যেন কাউকে না ধরে। আর একটা দিক হচ্ছে চীন ও আমেরিকা প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্যাচালে আমাদের (লীগ বা বিএনপি) কোন দলই যেন এদুই দেশের মধ্যে একেকটা দেশের পক্ষে একেকটা দল তাদের এজেন্ট এর ভুমিকা না নিয়ে বসে। যেমন লীগ যদি এই সীমারেখা না মেনে আমেরিকার এজেন্ট হয়ে বসে তবে সিওর বিএনপি তখন চীনের এজেন্ট হয়ে বসবে – অথবা ঠিক এর উলটা বা ভাইস-ভারসা! তাই সীমারেখা লঙ্ঘনের পরিণতি কী হবে তা সবার আগে থেকে জানা থাকতে হবে; কেউ যেন না বলে আমি আগে বুঝি নাই। এই সুযোগ নাই।  আজকের শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ক্ষমতায় থাকার লোভে তারা এই সীমারেখা ভেঙ্গে এখন পস্তাচ্ছে! এই সীমা ভাঙ্গার কাজ করা যাবে না।

    তাহলে ডোনাল্ড ল্যু এর ভারত সফরের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    আসলে পিটার হাসের শাহীনভাগ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর  পরে হোয়াইট হাউজের রিভিউ মিটিংয় থেকে সবাই বুঝে যায় বার্মা দখল বা হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ততপরতার কথা তাদের যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেভাবে আগায় নাই। মূল কারণ, বার্মা দখল এর চিন্তাটাই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে করা হয় নাই। তাই বার্মা দখলের খায়েসে তা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এক মোক্ষম জবাব হবার পরিবর্তে তা উলটা হয়ে গেছে; তা হয়ে গেছে আমেরিকার তিন শত্রু চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছাকাছি ঘনিষ্ঠতায় এনে দেওয়া। যা বার্মা দখল নিয়ে ফারদার চিন্তা পরিকল্পনাটাকে অসম্ভব, অকেজো করে তুলেছে।
    এই কারণে,  ডোনাল্ড ল্যু ভারত এসেছিলেন ভারতকে ঐ ‘ঘনিষ্ঠতা’ থেকে আলাদা করা যায় কিনা তা যাচাই করতে। ডোনাল্ড ল্যু এর সাথে NDTV এর এক সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে ল্যু ব্যাখ্যা করছিলেন তার সফরে আসার কারণ ও কী তিনি ভারতকে অফার করতে চান।
    বুশ ২০০৬ সালের মার্চে প্রথম ভারত সফরে এসেছিলেন। গত ২০০১ সাল থেকে ওয়ার অন টেররের প্রধান এলায়েন্স পার্টনার হিশাবে ভারতকে আরও কাছে টেনে চীনের উত্থান ঠেকানোর কাজে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চাওয়ার খায়েস থেকে। তখন থেকে বুশ অফার করেছিলেন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার জিএসপি এক্সপোর্ট সুবিধা ভারত পাবে তাতে। যে সুবিধাটা ট্রাম্পের আমলে ২০১৭ সাল থেকে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরই এক্সটেনডেড অংশ হল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকেও   ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  ল্যু বলছিলেন আগের দেয়া ঐ এক্সপোর্ট সুবিধা আবার ভাববার কথা। ল্যু এর কথাবলার স্টাইলও ছিল এপিজিং [appeasing] বা তেলানোর…। ওদিকে ল্যু এর সারকথা ছিল ভারত যদি আমেরিকার বার্মা দখলে আমেরিকার পক্ষে থাকে তাহলে সে কৃতার্থ হয়……।

    এনিয়ে সুবীর ভৌমিক কী বলেছেনঃ
    সেকথারই আরো বিস্তার পাওয়া গেছে সুবীর ভৌমিকের লেখায়। বলা যায় এই লেখায় সুবীর আমাদের অনুমানগুলোকেই যেন বাস্তবতা দিয়েছে।
    উপরে বার্মা দখল প্রশ্নে বাইডেনের যে এরিয়াল সাপোর্টের কথা বা নো ফ্লাই জোন বানানোর কথা বলেছিলাম,  সুবীরও সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সুবীরের লেখার শিরোনাম – “ আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারত সামিল হবে” [Will US do a Bosnia on Myanmar? No-fly-zone move may involve India]? ক্লিনটনের আমলে বসনিয়াকে রক্ষার জন্য তিনি বসনিয়ার আকাশের উপর এমন “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা করেছিলেন। বাবা অথবা সিনিয়র বুশ এবং ক্লিনটনও ততকালীন সাদ্দামের ইরাকের উপরে “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা দিয়ে সাদ্দামকে অকেজো করে দিয়েছিলেন।  তো বুঝা যাচ্ছে যে ল্যু এর ভারত সফরের উদ্দেশ্য হল, ভারতকে নো ফ্লাই জোন আরোপে আমেরিকার সাথে সামিল করে বার্মা দখল পরিকল্পনায় সম্ভাব্য জোটবদ্ধ করে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই। যাতে “চীন-রাশিয়া-ভারত” এই জোট থেকে ভারতকে আলাদা করার চেষ্টা করে দেখা যায়। যদিও দিনকে দিন এটা পরিস্কার হচ্ছে যে বার্মা দখল পরিকল্পনা নিয়ে দুর্বল হোমওয়ার্কের কারণে এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা পরিত্যক্ত হবার দিকে আগাচ্ছে!

    যদিও ভারতীয়দের মধ্যে এমন ধরণের একটা ভ্যানিটি ভেসে থাকতে দেখা যায় যেন লেখক (সুবীর) বলছে চান যে “দেখেছো চীন-আমেরিকার আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়িয়ে আমার দাম কত উপরে উঠেছে?” – সুবীরের আলোচ্য লেখাটাও আসলে এদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। আসলে ভারতের ইন্টেলেক্ট বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই বলে একটা ভাবনা কার্যকর থাকতে দেখা যায় যে সে আর চীন বা আমেরিকা কোন একটার পক্ষে সহসা ঝুকবে না। কেবল নিজের দাম বাড়িয়েই চলবে যাতে এক পর্যায়ে এই উত্থিত দামকে ব্যবহার করে সে চীন-আমেরিকারও উপরে উঠে যেতে পারে!! এমন ভাবনার বিষয়টা অবশ্যই আবেগে টইটম্বুর বা স্বপ্নে পোলাও খাওয়ার মত, বিশেষত যখন আমার জানাই নাই যে পোলাও কী করে পেতে হয়, রান্না করতে হয় ইত্যাদি। গত ২০১৩ সালে চীনা বেল্টরোড উদ্যোগ প্ররকল্পের প্রথম সম্মেলনের সময়ে ভারতকে চীনা দাওয়াত দেওয়ার পরে ভারত এভাবে বলেই তা প্রত্যাখান করেছিল।

    তবে সেসব যাই হোক ভারত এখন একালে বাইডেন আর পুতিনের তুলনায় অনেক বেশি পুতিনের দিকে থাকতে মন বেধে ফেলেছে। যদিও মুখে বলছে রাশিয়ার উপরে ভারতের গোলাবারুদে ৬০% নির্ভরশীলতার কারণে সে এই পথ সে নিয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার সস্তা তেলের সরবরাহ পাওয়া এর পিছনের কারণ। এমন কী তৃতীয় দেশে তা পাচার করার সুবিধাও ভারত পাচ্ছে। যেমন খোদ বৃটেনের ঋষি সুনাক তিনিও গোপনে রাশিয়ার তেল কিনছে ভারতের মাধ্যমে। আসলে খারাপ গ্লোবাল অর্থনীতি অ এতে ধস নামার সময়ে সস্তায় রাশিয়ান তেল পাওয়াকে সকলেই বিশাল রিলিফ বলে গণ্য করছে!! আর সাধারণভাবে ভারত আবার  আমেরিকার ঘনিষ্ট হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত ভারত তলে রেখেছে – ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের পরে, দেখে শুনে তখন তারা সিদ্ধান্ত নিবে!

    সবশেষে বলি, লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই সংক্ষেপে।
    তাহলে কী ল্যু এর পিছু হটা বা  বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকার হাসিনাকে টলাতে ফেল করার পর ল্যু যা প্রলেপ দিয়ে গেলেন যেটাকে অনেকেরই কল্পনায় ধরা আছে দেখা যাচ্ছে। যে কল্পিত  হাসিনা ও ল্যু এর মধ্যে কোন রফা হোক আর নাই হোক আর তাতে আমেরিকার সাথে বিএনপির সম্পর্কের মধ্যে এখন কোন দুরত্ব বোধ আমরা কেউ দেখতে পাই আর নাই পাই  – আগামিতে সম্ভবত মাস খানেকের মধ্যে ল্যু বা বাইডেন প্রশাসনে আবার পল্টি আসবে। প্রথম ধারা আবার জেগে উঠার সম্ভাবনাই বেশি নানান কারণে।  মানে মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে নিয়ে আগের মতই বাইডেন প্রশাসন আবার স্পষ্ট করে সোচ্চার হবে, এমন অনুমান করছেন অনেকেই!!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকালঃ ০৭ঃ৩০

     

  • মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    গৌতম দাস

    ২৪ অক্টোবর ২০২২  ০০ঃ০৬ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-4gr

     

          ..condemning hate speech unequivocally: U.N. Secretary-General António Guterres

    ‘ইউনাইটেড নেশনস’[United Nations] শব্দটার বাংলা হিসাবে ‘জাতিসংঘ’ শব্দটার ব্যবহার সম্ভবত বেশিরভাগ বাঙালি করে থাকেন। তবে কলকাতার আনন্দবাজার অনুবাদ করে ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ’ লিখে থাকে।  আনন্দবাজারের বেশির ভাগ ততপরতা অপছন্দের হলেও এই অনুবাদটা বেশি সঠিক ও অনেক অর্থপুর্ণ। কারণ ‘জাতি’ শব্দ ও ধারণা-টা মানে কোনভাবেই তা রাষ্ট্র নয়; যদিও না জেনে আমরা অনেকেই এই ভুল করে থাকি। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জ (বা জাতিসংঘ) – এই প্রতিষ্ঠানই জন্মের সময় থেকে নিজেকে ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আসছে। তবে এর স্বপক্ষে একটাই সাফাই-যুক্তি এবং তা খুবই দুর্বল সেই যুক্তিটা হল – সেসময় বেশির ভাগ রাষ্ট্র মানে মর্ডার্ণ রাষ্ট্র বলতে সেটা এক ‘জাতিরাষ্ট্র’ বা Nation State ধারণা বলে বুঝবার প্রাবল্য ছিল। যেটা পরের আট বছরের মধ্যে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের বেশির ভাগ রাষ্ট্র এই ভুল সংশোধন করে নিয়েছিল। যার পর থেকে ইউরোপের অন্তত ৪৬ টা রাষ্ট্র  আর নেশন স্টেট নয়, অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র হয়ে যায়। [ এনিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন কাউন্সিল অফ ইউরোপ [COE]।   রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল হলেন আন্তোনিও গুতেরেস (Antonio Guterres)। এই সেক্রেটারি জেনারেল-ই হলেন রাষ্ট্রপুঞ্জ-এর সর্বোচ্চ নির্বাহি প্রধান।

    এখন আজকের প্রসঙ্গে আসি। ঘটনা হল, ভারত বিশেষ করে এর প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্ভবত আর কোনদিন যাতে গুতেরেস ভারত সফরে না আসতে পারেন এর সব বন্দোবস্ত করবেন; তা অবশ্যই নিশ্চিত করবেন! কেন?
    গুতেরেস ভারত সফরে এসেছিলেন গত বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর সরকারি আমন্ত্রণে। গত ২০০৮ সালের ভারতের ভাষ্যমতে মুম্বাইয়ে “টেররিস্ট আক্রমণের বার্ষিকী” পালনের অনুষ্ঠানে, ঐ হামলার আহত-নিহতের প্রতিশ্রদ্ধা জানাতে। আর ঐ হামলা ছিল কাশ্মীর-কেন্দ্রিক কিছু সশস্ত্র প্রতিবাদী গ্রুপের যারা পাকিস্তান থেকে ভারতের মুম্বাইয়ে এসে ২০০৮ সালে “তাজমহল প্যালেস হোটেল” দখল করে ঐ হামলা চালিয়েছিল।

    তবে এবার, মোদি সম্ভবত চেয়েছিলেন গুতেরেসের এই সফর থেকে তিনি গ্লোবাল মিডিয়া মনোযোগ হাসিল করতে পারবেন যাতে তিনি ভারত সরকারের কাশ্মীর নির্যাতন নিপীড়ন দমনের অভিযোগ আড়াল করে এর উপরে বা বিরুদ্ধে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রসবাদী আক্রমণের কথা তুলে সেটা ঢেকে ফেলতে বা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিপীড়ন-কে জায়েজ করতে পারবেন।
    নেহেরুর আমল থেকে ভারত চেষ্টা করে যাচ্ছে এটা দেখাতে যে ভারতের কাশ্মীরের সমস্যা যেনবা কাশ্মীরীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে হাজির হয়েছে। এটা যেন এক “সন্ত্রাসবাদি” সমস্যা! এবং তা যেন সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছে! অথচ এটা শতভাগ মিথ্যা। ভারতের কাশ্মীরে সশস্ত্র ততপরতার শুরু ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের রাজ্য নির্বাচনে কেন্দ্রসরকারের ব্যাপক কারচুপির ঘটনা থেকে। কারণ ঐ কারচুপির পরে ক্ষুব্ধ ও হতাশায় পড়া কাশ্মীরীদের প্রতিক্রিয়া থেকে তারা সশস্ত্র ততপরতার দিকে ঝুঁকে যায়; আপন করে নেয়। অর্থাৎ (১৯৪৭ সালের পর থেকে) ১৯৮৭ সালের আগে পর্যন্ত এর আগে ভারতের কাশ্মীরে যত বিবাদ বা ক্ষোভই থাক না কেন; সেখানে একটা রাজ্য-নির্বাচনী ব্যবস্থাই চালু ছিল আর এই নিরস্ত্র ব্যবস্থাটাই ছিল ক্ষুব্ধ কাশ্মীরীদের প্রধান রাজনৈতিক ততপরতা। সারকথায়, ভারত সরকারই রাজ্য নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপি করে ফলাফল উলটে দিয়ে কাশ্মীরীদেরকে সশস্ত্রতার পথে ঠেলে দিয়েছিল।

    মোদি ভেবেছিলেন এবার গুতেরেসকে অতিথি করে এনে তিনি কথিত সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে জনমত যোগাড় করে নিজ আকামের পক্ষে মিডিয়া মাইলেজ যোগাড় করে নিবেন। কিন্তু এখন ফল হয়েছে উলটা। মোদি ও তাঁর সরকার আত্মঘাতি গোল খেয়ে গেছেন। কারণ,  গুতেরেস উলটা মোদি সরকারের হিউমান রাইট লঙ্ঘণ ও মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন বৈষম্যের কথা তুলে বক্তৃতা করেছেন আর  মোদি সরকারকে তা সংশোধনের আহবান রেখে গেছিল। তবে এই আহবান তিনি মূল অনুষ্ঠানে নয় বরং পরে, মুম্বাইয়েরই আরেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
    সেখানে, একাজে তিনি শব্দ হিসাবে ব্যবহার করেছেন ডাইভারসিটি [Diversity] ও প্লুরালিজম [Pluralism] । মানে গুতেরেস বলতে চাচ্ছেন, একটা রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ভিত্তিতে –  বহু ধর্ম ও বহু মত ও পথ কে পাশাপাশি কার্যকর থাকতে পারে এমন ভিত্তির একটা রাষ্ট্রগড়ে তুলতে পারলে একমাত্র তাতেই একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব হতে পারে। এভাবে বৈচিত্র ও ভিন্নতায় নাগরিকেরা সকলে পাশাপাশি কার্যকর থাকা ও পরস্পরকে জায়গা করে দেওয়া নিশ্চিত করতে পারলে সেটাই হবে রাষ্ট্রের শক্তি।
    ভারতের দ্যা হিন্দু লিখছে তিনি বলেছেন,   “রাষ্ট্রে জনবৈচিত্র থাকলে সেটাই সমৃদ্ধি আনবে যা একটা দেশকে শক্তিশালী করে। এই বোধ-অনুভবকে লালন ও শক্তিশালী করা এবং প্রতিদিনের চর্চায় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা উর্ধে তুলে ধরে তা শক্তিশালী ও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত যারা দুঃস্থ অবস্থায় আছে তাদেরকে সাথে নিতে বহু-সংস্কৃতি, বহু ধর্ম ও এথনিক জনগোষ্ঠির এক সমাজ গড়তে হবে; যেখানের সকলে একসাথে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তব্যকে একস্বরে নিন্দা জানাতে হবে”।
    আর এখান থেকেই মূল শব্দ উঠে এসেছে “হেট স্পিচ” [Hate Speech] বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তৃতা – এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহবান।

    “Diversity is a richness that makes your country stronger. That understanding…must be nurtured, strengthened and renewed every day by practising the values of Gandhi; by securing and upholding the rights and dignity of all people, especially the most vulnerable; by taking concrete action for inclusion, recognising the enormous value and contributions of multi-cultural, multi-religious and multi-ethnic societies; by condemning hate speech unequivocally,” Mr. Guterres said

    স্বভাবতই এতে পুরা ব্যাপারটাই মোদির হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে শক্ত সমালোচনা ও নিন্দা হয়ে উঠে এসেছে। ফলে তা হয়ে উঠেছে মোদির হিন্দুতেবাদেরই কঠোর সমালোচনা। কারণ, গত অন্তত তিন বছরে মোদি এই হেট স্পিচের উপরে ভর করে যাচ্ছেন; মোদি যেকোন নির্বাচনে জিতবার উপায় হিসাবে একে হিন্দু-ভোট মেরুকরণ ও ভোটবাক্স ভর্তি করার কৌশল ব্যবহার করে চলেছেন।

    তবে গুতেরেসের হেট স্পিচের কঠোর সমালোচনা দিয়েই প্রসঙ্গটা শেষ হয়ে যায় নাই। বরং বলা যায়, এতে সরকার প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ন্যাংটা করে ছেড়েছে। যদিও সেটা ছিল প্রথম পর্যায়। এবার এর দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে লিখছি।

    ঘৃণা-ভাষণের বিরুদ্ধে কঠোর না-হলে অবমাননার মামলা, প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

    হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলিঃ
    আসলে এখন শুরু হয়েছে এই হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলি! এখানে আসামি বা পার্টি আসলে তিনটা! কথাটা অন্যভাবে বললে,  একটা রাষ্ট্র ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যায় মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠানের নিস্ক্রিয়তায়। যার প্রথমটা হয়ে থাকে সরকার বা ক্ষমতার নির্বাহি বিভাগ’ অর্থাৎ এর বৈষম্যমূলক আচরণ ততপরতা থেকে। এদের নিজ বিশেষ দল ও শ্রেণীর নাগরিককে ফেবার করা ও অন্যান্যদেরকে নিগৃহিত করা থেকে এর শুরু হয়ে থাকে।
    এখন  নির্বাহি ক্ষমতার এই গর্হিত কাজকে যদি বিচার ব্যবস্থা আমল না করে এবং ক্ষতিগ্রস্থ নাগরিককে প্রতিকার না দেয় এখান থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়। এমনকি যেখানে বিচার ব্যবস্থার হাতে স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবার ক্ষমতা দিয়েই রাখা থাকে; তবুও দেশের বিচার বিভাগ সেই ক্ষমতাকে প্রয়োগ-ব্যবহার না করে পাশ কাটিয়ে  যাওয়া থেকেই সংকট শুরু হয়ে থাকে। আর তৃতীয় পর্যায়টা হল নির্বাচন কমিশনের, এদের অকেজো হয়ে বয়াসে থাকা থেকে। কারণ তাদেরকেও ক্ষমতা দেয়া থাকে যে ক্ষমতাসীন বা বিরোধি দল যখন নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করতে ডুবে যাচ্ছে অথচ কমিশন এনিয়ে কোন ব্যবস্থা না নেয়। অথচ কমিশন যেকোন রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে শুনানি শেষে অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রতিকার হিসাবে ঐ দলের রেজিষ্টেশন বাতিল করে দিতে পারে।

    সারকথায় বললে,  এখন শুরু হয়েছে এই তিন পর্যায়ের তিনটা প্রতিষ্ঠান যাদের দায় ছিল ক্ষমতাসীনদের হিন্দুত্ববাদের ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; অথচ এই তিন প্রতিষ্ঠানের কেউই তা করে নাই। অর্থাৎ  নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে থাকা প্রশাসন এর দায়ীত্ব ছিল মানে আমাদের ভাষায় ডিসি-এসপির দায়ীত্ব ছিল হেট স্পিচের বিরুদ্ধে একশনে যাওয়ার। কিন্তু তারা কেন্দ্র সরকার বা রাজ্যের হিন্দুত্ববাদি দলীয় আচরণের পক্ষে চুপ করে থেকে তাদের সহায়তা করে গেছে। যেমন,  পশ্চিম দিল্লির বিজেপি সাংসদ পারভেশ ভার্মা হিন্দু সভার একটি বৈঠকে মুসলিম সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে বয়কটের ডাক দেন। তিনি বলেন, “ওদের সবজি কিনবেন না। ওরা মাছ-মাংসের দোকান খুলে বসবে। ওদের সোজা করতে সামাজিক বয়কট করুন”। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন একশন হয় নাই। সবচেয়ে বেশি ঘটনা উদাহরণ ঘটেছে যোগীর উত্তর প্রদেশে। এছাড়া, ত্রিপুরা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ বা কর্ণাটক রাজ্যে হিজাব ইস্যুসহ নানান মুসলমান নিপীড়ন-মূলক সরকারি সিদ্ধান্ত বা একশন ঘটেছে।  দিল্লিতে পরিকল্পিত দাঙ্গায় সব তছনছ করে দেয়া হয়েছে।  দিল্লিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক সভায় বক্তা হিসেবে ছিলেন জগৎ গুরু যোগেশ্বর আচার্য। তিনি বলেন, ‘যদি দরকার হয়, হাত কেটে নাও। গলা নামিয়ে দাও। সবচেয়ে বেশি তোমার জেল হবে। কিন্তু এই সমস্ত লোককে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। বেছে বেছে মারো।’
    কিন্তু বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন এসব ঘটনা আমলই করে নাই; পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে।

     

    কিন্তু এখন ঘুম ভাঙ্গে নাই, বরং দায় অন্যের ঘাড়ে ঠেলে ফেলার দৌড়াদুড়ি শুরু হয়েছে। গুতেরেস বক্তব্য রেখেছিলেন ১৯ অক্টোবর ২০২২। আর ২১ তারখেই ভারতের সুপ্রিমকোটে প্রধান বিচারপতি যেন জেগে গেছেন। আনন্দবাজার লিখেছেঃ ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।

    ভারতে ঘৃণা-ভাষণের প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে দিন দুয়েক আগে সরব হয়েছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস। এবার সেই প্রসঙ্গেই কড়া মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।  …… শুক্রবার সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে। ঘৃণা-ভাষণ সংক্রান্ত ওই মামলায় বিচারপতিদের মন্তব্য, ‘‘আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ধর্মের নামে কোথায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা?’’

    তার মানে দেখা যাচ্ছে – ” ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে – সুপ্রীম কোর্টের এই ক্ষমতা তো আগেও ছিল কিন্তু তা এতদিন ব্য৭বহার করা হয় নাই কেন?
    সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশের সুপ্রীম কোর্ট কে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের সমালোচনার পরে জেগে উঠতে হয়, নিজ ক্ষমতা নিয়ে সে জেগে উঠে – সেদি রাষ্ট্র আসলে অনেক আগেই মৃত! আর এতে এখন আমরা যা দেখছে সেটা ব্যক্তির দায় নিয়ে ঠেলাঠেলি বৈ আর অন্য কিছু নয়!

    বরং সুপ্রীম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করে যে ভারতের এই বিচার বিভাগ আসলে মৃত! হিন্দুত্ববাদ পুরা রাষ্ট্র আর তার আসব অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সবকিছুকে আসলে খেয়ে ফেলেছে…। 

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    গৌতম দাস

    ১৭ অক্টোবর ২০২২  রাত ০১ঃ১৮

    https://wp.me/p1sCvy-4gb

     

           Pakistan’s Foreign Minister Bilawal Bhutto-Zardari speaks following his meeting with U.S. Secretary of State…..

     

    একটা দৃশ্যমান স্ববিরোধ বা পরস্পরবিরোধী ঘটনা আজকের লেখার বিষয়। কোথায় ঘটেছে এটা? বাইডেনের আমেরিকার বিদেশ নীতি-পলিসিতে বা তাঁর সাম্প্রতিক কিছু ততপরতায়।  কী সেই পরস্পরবিরোধী দুই ঘটনা?
    এক. মূল বিরোধের স্থান হল,  গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের যুগে চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের পটভুমি। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটনা গড়াতে গড়াতে এখন চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে আমেরিকাবিরোধী এক মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলেছে। বিশেষত সর্বশেষ গতমাসে ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর চীনের সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও বা SCO) এর বার্ষিক সভা থেকে এই মেরুকরণ আরো দৃশ্যমান করে দেখানোর সুযোগ হিসাবে চীন-রাশিয়া-ভারত নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ভারত ও পাকিস্তান এর জন্মবিরো্‌ধ – এই প্রাচীনবিরোধকে উস্কে দিয়ে যেন আমেরিকা সেখান থেকে কোন নিজ সুবিধা বের করতে না পারে তাই ২০০১ সালে জন্ম নেয়া চীন-রাশিয়ার জোট এসসিও-তে ভারত-পাকিস্তান এদুইদেশকে একসাথে ২০১৫ সালে এসে একই দিনে SCO এর সদস্য করে নেয়া হয়েছিল। তা সত্বেও, বাইডেন ঐ মেরুকরণের পালটা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের উপর সওয়ার হয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ উস্কে তুলে দিল।
    সারকথায় বললে,  আমেরিকাবিরোধী চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে তাদের নয়া মেরুকরণ-কে দুর্বল করতে সাম্প্রতিককালে আমেরিকা ভারত-পাকিস্তানের বিভেদ উস্কে তোলার কৌশল নিয়েছে। যেমন এর শুরুটা হল, পাকিস্তানকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য প্রায় আধা বিলিয়ন ডলারের সহায়তার জন্য বাইডেনের হাত বাড়ানো। স্বভাবতই এটা ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষি উস্কে তুলতে যথেষ্ট। যদিও জয়শঙ্কর চেষ্টা করেছেন বিরোধটাকে ঠিক পাকিস্তান-ভারত নয় বরং  ভারত-আমেরিকার বিরোধ হিসাবে কেন্দ্রীভুত রাখতে। তিনি ভারতে বসে বা আমেরিকা সফরে গিয়ে এনিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে  খুবই কড়া মন্তব্য বা অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন। [এখানে বিস্তারিত ] যদিও তাতে পাকিস্তানে ইমরানকে হটিয়ে আমেরিকার বর্তমান ক্ষমতাসীন শাহবাজ সরকারকে ক্ষমতায় আনা-কেন্দ্রিক ততপরতা অথবা তাতে যে আমেরিকা-ঘনিষ্টতা শুরু হয়েছিল তা এখন আপত্তিকর ‘অতি ঘনিষ্ঠতা’ হয়ে গেছে, যা আন-এথিক্যাল। কারণ এটা আর এখন পাকিস্তানের স্বার্থে যতটা নয়, তার চেয়ে আমেরিকার স্বার্থে শাহবাজ সরকারকে জবেহ দেওয়ার সামিল হয়ে গেছে। ভারতের সাথে পাকিস্তানের অমীমাংসিত বিরোধ আছে এটা সত্য। কিন্তু তাই বলে সেটাকে অপব্যবহার ঘটানো আর তাকেই আমেরিকা যেন একমাত্র, মুখ্য ও চোখা করে উঠিয়েছে এবং নিজ বাজে স্বার্থে!

    কিন্তু আসলেই কী আমরা বাইডেনের পদক্ষেপ-গুলো বুঝেছিলামঃ
    বাইরের আমরাও ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় ঘটনা, মেরুকরণ ইত্যাদির গতিপ্রকৃতি বুঝেতেছি। কিন্তু না আবার কিছু নতুন ঘটনা হাজির হয়েছে যাতে আমাদের ঘটনা বুঝতে এখনো অনেক বাকি – এটাই সবার উপরে ভেসে উঠেছে।
    কিন্তু কী সেটা? সে ঘটনা আবার দুইটা। এক, শাহবাজের পাকিস্তান তো এখন থেকে বাইডেনকে ভালই সার্ভিস দিতে থাকবে, এটাই ধরে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু না। আমরা দেখলাম, বাইডেন হঠাৎ গত পরশু (১৪ অক্টোবর) পাকিস্তান সম্পর্কে খুবই কঠোর, কটু ও অমর্যাদাকর মন্তব্য করেছে। যার ফলে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদুতকে শাহবাজ সরকার ডেকে এনে তাঁর হাতে পাকিস্তানের কড়া আপত্তি ধরিয়ে দিয়েছে। তাহলে কী দাঁড়ালো এটা?  পাকিস্তান সম্পর্কে বাইডেন বলেছেন, “পাকিস্তান হচ্ছে সম্ভবত দুনিয়ার সেসব মারাত্মক ক্ষতিকর বিপদজনক রাষ্ট্রগুলোর একটা যার হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে কিন্তু দায়ীত্ববান নিয়ন্ত্রণ নাই”। “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”. …।।

    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে তাইঃ
    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে – একথার মানে কী বা বলতে কী বুঝব? অথবা কতটুকুর বেশি বুঝলে ভুল হবে?
    একালের বিচারে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বলতে বুঝতে হবে, কোন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও রুটিন কিছু সম্পর্ক তবুও থেকেও যাওয়া।  অর্থাৎ  ভেঙ্গে যাওয়ার আগে যে  সম্পর্কে ‘বিশেষ ঘনিষ্ঠতার’ জায়গাগুলো ছিল কেবল সেসব ক্ষেত্রগুলোর তাতে পরিসমাপ্তি ঘটা। কিন্তু এরপরেও কূটনৈতিক সম্পর্কসহ রুটিন যেসব সম্পর্কে ঐ দুই দেশের মধ্যে আগেও ছিল যেমন, এসবের মধ্যে পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেগুলো ছিল সেগুলো সবই তা চলতে থাকবে। এটাকে বলছি ‘একালের বিচারের’ ঘটনা। কেন? কারণ,  এর আগে মানে ১৯৯২ সালের আগে আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ক এর কথাই যদি ধরি – এটাই মুখ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা ধরণ এবং এতাই স্টান্ডার্ড বলে মনে করা হত। আর এর মূল বৈশিষ্ট ছিল আমেরিকা-সোভিয়েত এ’দুই ব্লক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন – পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ই ছিল না –  এমনকি ভাষা, কালচার বা শিল্পকলার বিনিময় বলতেও তেমন কিছুই ছিল না। যার সারকথাটা হল – ‘নো এক্সচেঞ্জ’। এটাই ছিল সেকালের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের স্টান্ডার্ড রূপ। আর এর ঠিক উলটা হল একালের বিচারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যেখানে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বললেও বুঝতে হবে তবু একধরণের রুটিন সম্পর্ক যেমন সাধারণ বাণিজ্য সম্পর্ক তবু থেকে যাবে। বিস্তারে যাব না কেবল সংক্ষেপে বলব, একালের সম্পর্ক মানে সকলেই একই আইওএমএফের সদস্য তাই বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে যাবেই। আর তাছাড়া একবার বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি ও শুরু করে ফেললে কিছু কিছু পণ্যে পারাস্পরিক ও আন্তঃনির্ভরতা তৈরি হয়ে যাবেই। এটাই মনে রেখে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া ধারণাকে একালে বুঝতে হবে।
    তাহলে একালের বিচারে  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে বলতে কি বুঝায়, এর অন্তত কিছু বুঝলাম। আর তাতে ভারত যেসব সুবিধা হারিয়েছে সেগুলো হল যেমনঃ ১। আমেরিকার-ভারত একসাথে হয়ে আগে পাকিস্তান কোপাতে পারত। মানে আমেরিকার-ভারতের ইসলাম-বিদ্বেষকে তারা পাকিস্তানেরই দোষ বলে উলটা চাপিয়ে দিতে পারত। তাতে দাবি করত, পাকিস্তান একটা ‘নিচা’ দেশ – এরা পশ্চাদপদ, এরা জঙ্গী, আনকালচার্ড কিংবা এদের ধর্মটাই অপুষ্ট বা দুষ্ট ধরণের ঘৃণামূলক অবুঝ বা না-বুঝের কথাবার্তা  ইত্যাদি; এই ভাষ্যের উপর দাঁড়িয়ে এরা পাকিস্তানকে ডিকটেট করতেও সেকালে চাইতে পারত। বাস্তবত  আমেরিকার-ভারতই যে মূলত স্ব স্ব দেশে মুসলমানদের সাথে সীমাহীন বৈষম্য করে চলেছে, বৈষম্যের জাল ফেলে রেখেছে সেটাকে আড়ালে রেখে তাদের সব যৌথ ততপরতাই হল জঙ্গি, ইসলামি রাডিক্যালিজম নামে চালানো সব ঘটনার আদি উতস!
    সেটা যাক হোক,  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে আর এতেই ভারত আর যে পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ‘বয়ানের জায়গা নাই হয়ে গেছে  পাচ্ছে না, চালু থাকতে পারছে না। এর এক সরাসরি ক্ষতি হয়েছে মোদি সরকারের। তিনি ভারত “পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ” এই  ভুয়া বয়ানের উপর দাড়িয়েই ভারতের মুসলমানেরাই খারাপ বা যেন এজন্যই  এরা নিপীড়িত হবার যোগ্য এই সাফাই তৈরি করেই হিন্দুত্ববাদের জজবা তুলে সেই জোশগুলোকে ভোটের বাক্সে জড়ো করে নিজ ক্ষমতা টিকায় রাখতে ব্যবহার করে চলতে পারত। এটা মোদির এক সরাসরি ক্ষতি।

    তেমনই ভারতের আরেক ক্ষতি হল বাংলাদেশেঃ
    আমেরিকা আর বাংলাদেশ – এরা সরাসরি নিজেরা দুই দেশের স্বার্থের ভাল-মন্দ বা পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে নিজেরাই ডিল করুক – এভাবেই আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে উঠুক?? তাতে ভালবাসা বা শত্রুতা করুক এটা ভারতের কাম্য নয়! না তা নয়। ভারতের ইচ্ছা বাংলাদেশ আমেরিকা-বাংলাদেশ এর সম্পর্কটাকে সরাসরি নিজেরা নয়; বরং ভারতের মাধ্যমে ডিল করুক। মানে আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক – এর লেনদেন, সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি সবটা ভারতের মাধ্যমে ঘটুক। আর এভাবে ভারতকে একটা আলগা মাতবরি বা কুতুবি করতে দেক। যেটা আদতে বাংলাদেশের উপর ভারত একটা আলগা দালালি ও খামখা অভিভাবকগিরি হয়ে উঠুক। বিনিময়ে যেটা বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বলে যেন ভারত দাবি ও উপভোগ করতে পারে!! গত ২০০৭ সাল থেকে এটাই কায়েম হয়ে ভারতের রুস্তমি রাজত্বের ভিত্তি হয়ে থাকা শুরু হয়েছিল। হাসিনা নিজ ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে এটা মেনে নিয়েছিল বলেই এটা চালু হতে পেরেছিল।

    কিন্তু  আমেরিকার ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে যাওয়াতে এসব কিছুই একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। এতে বাস্তবতা হল খুব সহসাই আবার  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক নুন্যতম জেগে উঠুক বা উঠবে এর কোন সম্ভাবনাই নাই, বরং আরো শত্রুতামূলক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। তাই এই পরিস্থিতিতে ভারত নতুন কিছু করে বাংলাদেশের সরকারের উপর প্রভাব সামান্যও যদি ফেরত পায় এমন সব চেষ্টা জারি রেখেছে। এরই একটা রিপোর্ট হল, “বাংলাদেশের ১৯৭১ সালে ঘটা নৃশংসতাগুলোকে আমেরিকান কংগ্রেসে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করে প্রস্তাব পাশ”  ‘Resolution in US house to recognise 1971 atrocities in Bangladesh as genocide’ ।

    ঘটনা পুরানা একাত্তর সালের কিন্তু এটা এখন শাহবাগী রাজনীতি।  সংক্ষেপে বললে বিষয়টা হল, কোন রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার ঘটনাকে জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ও সীমানায় জেনোসাইড বা ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করানো ও স্বীকৃতির ইন্টারন্যাশনাল লিগাল মুল্য অনেক। এছারা এতে ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার অনেক কাছে চলে যাওয়াও হয়। কিন্তু নানান টেকনিক্যাল কারণে, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ঘটনা জাতিসংঘের চোখে গণহত্যা বলে স্বীকৃত নয়। এখন এই আলোকে আমেরিকান কংগ্রেস যদি  এমন গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দেয় তবু সেটা অবশ্যই সমতুল্য কোন ঘটনাই নয়। তবুও এর কেবল কিছুটা ক্যাম্পেইন, প্রপাগান্ডা মুল্য মাত্র এতে থাকবে। এছাড়া এটা লিগাল রায় নয়। পক্ষ-বিপক্ষেরের রাজনৈতিক জোটের মতামত মাত্র।

    কিন্তু তা হলেও এমন মতামত আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস থেকে উদিত হতে পারল কেন?  এটা তো সত্তরের দশকেও হয় নাই। তাহলে এখন কেন?

    আমেরিকা লবির দেশ, লবি করা বৈধঃ
    বহু দেশের নাগরিকই পরবর্তিতে মাইগ্রেটেড হয়ে আমেরিকার নাগরিক হয়। আমেরিকান নাগরিক মানে এটাই। এটাই আমেরিকান নাগরিক হওয়াদের প্রধান ধারা। ফলে কেউ পুর্ণ নাগরিক হয়ে গেলেও তারা স্ব স্ব অরিজিন দেশের স্বার্থের প্রেশার গ্রুপের ভুমিকার ভোটার-নাগরিক হয়ে যেতে পারে। তবে সেটা একমাত্র একই অরিজিন দেশের আমেরিকানেরা সংগঠিত হতে পারলে তবেই এরা সম্মিলিতভাবে ফেলে আসা দেশের পক্ষে বিশাল লবি গ্রুপ হয়ে উঠতে পারে।  বাংলাদেশেরও বহু মানুষ একালে আমেরিকার নাগরিক হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এখনো বাংলাদেশ লবি গ্রুপ হবার পরিবর্তে  বরং দেশের মতই দ্বিদলীয় ভাগ হয়ে দলদাস হতেই আগ্রহি।

    কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে, তারা অনেক জনসংখ্যার বলে, সরকারের দিক থেকে আমেরিকায় এমবেশি থেকে পরিচালিত এটা সংগঠিত করে নেয়া বলে এটা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের হয়ে তবে বিশাল লবি গ্রুপ – এক র‍্যাকেট হয়ে ততপরতা করে থাকে। কংগ্রেস সদস্যও নির্বাচন করে থাকে। কোন সিনেটরের পিছনের সাপোর্ট গ্রুপ হয়েও কাজ করে থাকে সময়ে। তবে কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর এসব জনপ্রতিনিধি সবসময় সরাসরি ভারতীয় অরিজিনের এমন ব্যক্তি নাও হতে পারেন। তবে অবশ্যই তাদের কনষ্টিটুয়েন্সি ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান ভোটাররাই হয়ে থাকেন। এছাড়া আরেক ধরণের জনপ্রতিনিধিকে দেখা যায় যারা আমেরিকায় ভারতের স্বার্থের পক্ষে কাজ করে থাকেন। এরা হল, আসলে কোন এক বা একদল হোয়াইট আমেরিকান ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি যাদেরকে ভারত তাদের দেশের ব্যবসা পাইয়ে দিয়েছে, সহজ করে দিয়েছে। আর বিনিময়ে তারা ভারতের পক্ষে ও স্বার্থে কাজ করবে এমন এক বা একাধিক জনপ্রতিনিধি জুটিয়ে দিয়েছে হয়ত।

    আলোচ্য ক্ষেত্রেও আমেরিকান কংগ্রেসে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে,  দুই কংগ্রেসম্যান এই প্রস্তাবটা তুলে এসে পাশ করিয়েছেন –  স্টিভ শ্যাবট [Steve Chabot ] ও আরও খান্না [Ro Khanna ] নামের দুই আমেরিকান কংগ্রেসম্যান। স্বভাবতই খান্না  এই পাঞ্জাবি টাইটেল এর  মানে তিনি ভারতীয় অরিজিন।

    তাহলে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট “এই প্রস্তাব” তাদের এত আগ্রহ করে আনার কারণ কী? কারণ এটাই মোদি সরকারের আগ্রহ। কিন্তু সরকারের আগ্রহ কেন? কারণ, এই প্রস্তাব মানে হল,  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক সরাসরি না হয়ে সেটা ভারতের মাধ্যমে  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক করার বা হবার লাইনের প্রস্তাব – এরই আকুতি। আর এটাই এতদিন হাসিনা সরকারের স্বার্থ ছিল। বা স্বার্থের গৃহিত লাইন ছিল। যেটা এখন অকার্যকর। হাসিনা মনে করে ভারত এব্যাপারে এখন মুরোদহীন; যার নিজেরই আমেরিকার কাছে বেইল নাই। আর খোদ আমেরিকাই এখন হাসিনা সরকারের উপর বিলা! কিন্তু তবু ভারত নাছোড়বান্দা। যেন দেখাতে চায় এখনো আমার কিছু আমেরিকান জনপ্রতিনিধির উপর প্রভাব আছে আর সেটা আমরাই বাংলাদেশে বেচতে চাই!!

    তাহলে এখন এই লেখার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেটা হল, বাইডেন কেন চীন-আমেরিকার বিরোধ প্রসঙ্গে এখন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার কাজে লাগানো সম্পন্ন করেও আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই পারমানবিক বোমার অধিকারি দেশ প্রশ্নে অযোগ্য [without any cohesion] রাষ্ট্র বললো?

    Biden in a speech said Pakistan “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”.

    আসলে এর মূল কারণ, দুটা দুই কনটেকস্ট (context) বা পটভুমিতে। প্রথমটা ভারতের চীন-রাশিয়ার পক্ষে চলে যাওয়ার শাস্তি হিসাবে যেটা আগেই অনেক বলেছি। আর দ্বিতীয়টার হল, আমেরিকায় নির্বাচন আগামি ৮ নভেম্বর ২০২২, সেই প্রসঙ্গে ও পটভুমিতে। নির্বাচন মানে?

    বাইডেনের চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার দুইবছর বা অর্ধ-আয়ু পার হবার দিন হল আগামি ৮ নভেম্বর। আর ঐদিনই আবার আমেরিকান সিস্টেম অনুসারে এক-তৃতীয়াংশ সিনেট ও পুরা কংগ্রেসের সদস্যদের আসনে মেয়াদ শেষ ও নয়া-নির্বাচনের দিন। আরেকটু ভেঙ্গে বললে, আমেরিকার কংগ্রেসে (আমাদের ভাষায় সংসদে) সদস্যরা মাত্র দুবছরের জন্য নির্বাচিত হন। তাই প্রতিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ও ওর সাথে একবার আর আরেকবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দুবছর পার হলে পরে (যেটাকে মিড-টার্ম বলে) – এভাবে দুই সময়ে দুবছর পরপর আমেরিকান কংগ্রেস সব সদস্যদের (মোট ৪৩৫+২ ) আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

    আর আমেরিকান কংগ্রেসের নির্বাচনের সাথে একই সময়ে এভাবে সিনেটরদেরও নির্বাচন হইয়ে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে এক জায়গায় শুধু একটু ফারাক আছে।   তা হল, সিনেটরেরা কংগ্রেসের মত দুবছরের মেয়াদে নয়, বরং টানা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তবে প্রতি দুই বছর পরপর মোট আসনে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

    তাহলে সারকথায় মিড টার্ম নির্বাচন মানে কী দাড়ালো? তা হল, একঃ  সব কংগ্রেসের আসনেই (৪৩৫+২) নয়া নির্বাচন এর দিন সেটা। দুইঃ  সিনেটের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচনের দিন সেটা। আর তিনঃ প্রতি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মেয়াদের অর্ধ-মেয়াদ বা দুবছর পার করার দিন সেটা। যদিও এই মিড-টার্মের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের (বাইডেনের ডেমক্রাট) দলের জনপ্রতিনিধিরা কংগ্রেস ও সিনেটের যেকোন এক জায়গায় বা দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তাতে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা হারাতে হবে না। মানে ডেমক্রাটেরা আগামি এই মিড টার্মে কংগ্রেস ও সিনেটের সবজায়গায় হেরে গেলেও বাইডেনই প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন। চারবছর পুর্ণ প্রেসিডেন্টই থেকে যাবেন।

    এবার আমাদের প্রাসঙ্গিক কথা হল, আসন্ন মিড-টার্মের নির্বাচনে ডেমোক্রাট কংগ্রেসম্যান যারা ভারত-প্রভাবিত তাদেরকে জিতাবার জন্যই বাইডেন পাকিস্তান-বিরোধী অমন কথা বলেছেন। অর্থাৎ এর সাথে ভারতের আমেরিকাকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার সাথে তাদের জোটে চলে যাবার কোন সম্পর্ক নাই।
    আমার একথা সবচেয়ে ভাল বুঝা যাবে বাইডেন কোথায় গিয়ে এইকথাগুলো বলছেন সেদিকে যদি খেয়াল করেন। লেখা আছে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচন উপলক্ষ্যে ডেমোক্রাট কংগ্রেস প্রার্থীদের পক্ষে ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে [……Biden made the comments during a reception of the Democratic Congressional Campaign Committee on Thursday ]। ঐ ক্যাম্পেইন শুরুর আগে ক্যাম্পেইন কমিটির সভায় তাদেরকে উতসাহ দিতে  বাইডেন সেখানে গিয়েছিলেন।  ঐ বক্তৃতাতেই তিনি পাকিস্তানকে ক্ষেপিয়ে ঐকথা বলেছেন।
    এককথায় বললে, যেমন  ডেমোক্রাট Ro Khanna [ROHIT KHANNA] এর মত ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান কংগ্রেসম্যানদেরকে মিডটার্মে আবার জিতাবার জন্য বাইডেন পাকিস্তানকে ঠেস দেয়া বা নিচা দেখানো ঐ বক্তব্য দিয়েছেন। আবার যেমন Ro Khanna কে জিতাবার জন্য বাইডেন কাজ করছেন বলে এর মানে এমন নয় যে বাইডেন আমেরিকা-ভারতের ঘনিষ্ট আগেকার সম্পর্কটাই আবার ফিরিয়ে আনার পক্ষে কাজ করছেন। এমন বুঝা ভুল হবে!

    এই হল মূল কথা। আর এখন একটু বাড়তি কথা বলে নেই এই সুযোগে। এই মিড-টার্মে বাইডেনের দল ডেমোক্রাটেরা গোহারা হারবে বলে পুর্বাভাস বলছে। কারণ প্রায় ৯% মুদ্রাস্ফীতি আর এতে মিডল-ক্লাস ও নিম্ন মধ্যবিত্ত এরা প্রচন্ড ক্ষেপে ক্ষুব্ধ। এছারা প্রায় দেড় বছর ধরেই তাদের পছন্দের ও নাগালের মধ্যে মুল্যের চীনের তৈরি গৃহস্থলিতে ব্যবহার হয় এমন ওয়াসিং মেসিন বা এসি ইত্যাদি আমদানি পণ্যের উপর ২৫% বা এর উপরে কোথাও ৬৬% পর্যন্ত অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানোতে ক্ষুব্ধ ছিল তারা। যদিও এই বাড়তি ট্যাক্স বসিয়েছিলেন ট্রাম্প তাঁর ক্ষতা ছাড়ার আগে কিন্তু এর এফেক্ট শুরু হয় বাইডেনের আমলে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ট ভোটারেরা বাইদেনের দলের বিরুদ্ধে যাবে বলে অনুমান। এতে যদিও বাইডেন ক্ষমতাচ্যুত হবেন না। তবে, যেগুলো অর্থ-বিল মানে যেখানে প্রেসিডেন্ট কোথাও কোন দেশে অর্থ বরাদ্দ দিতে চান এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চান সেগুলো আগে তাকে সংসদ-সিনেটে অনুমোদন নিতে হবে। আর এই অনুমোদন নিতে গিয়েই তিনি বাধার সম্মুখীন হবেন।

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com