Category: গৌতম দাস

  • মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?

    মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?
    গৌতম দাস
    ০৩ মার্চ ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৭
    https://wp.me/p1sCvy-5sa

     

     

     

    একটা অন্যায়-অপরাধের প্রতিকার বলতে আরেকটা অন্যায় করা নয়! কিন্তু মানুষের জিঘাংসা এতই তীব্র, সে প্রতিহিংসার আগুনে এতই সাইকো যে মানুষ সে পথেই যায়!
    আর নিজের করা বর্তমানের অন্যায়-অপরাধের সাফাই হিসাবে সে আগে তার উপরে ঘটা অন্যায়-অপরাধকে হাজির করে!  তাতে কিছুই মুছে না, দুটাই অন্যায়-ই হয়ে জ্বল জ্বলে থেকে যায়!

    গত সপ্তাহে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত ঢাকার এক অনুষ্ঠানে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়-কে [CJI  D. Y. CHANDRACHUD]  দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল। অফিসিয়াল দাওয়াত কার্ডের লেখা অনুসারে ব্যাপারটা ছিল – “The supreme Court of Bangladesh is going to organize an international conference on “South Asian Constitutional Court in The Twenty-First Century: Lessons from Bangladesh and India” on 23 & 24 February 2024. The valedictory scession of the conference will be held on 24 February 2024, at 10:00AM at the Bangabandhu International Conference center (BICC). – এরকম।
    মানে হল এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে; যদিও এতে অংশগ্রহণকারী কেবল ভারত ও বাংলাদেশ। আবার বলা হয়েছে, এটা দক্ষিণ এশিয়ার কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপ; যেখানে আবার কেবল ভারত আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা-পাঠ [lessions] নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু ঘটনা হল, দক্ষিণ-এশিয়া বলতে কেবল ভারত-বাংলাদেশই বুঝায় না। এভাবে ভারত কখনই তার দক্ষিণ-এশিয়ার ধারণা বাস্তবের সাথে মিলাতে না পারলেও একই কান্ড করে থাকে! আসলে ঘটেছে যেটা ভারতের মিথ্যা আধিপত্যের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশ! আর সেটা ঢাকতেই এটা “দক্ষিণ-এশিয়ার ব্যাপার” বলে নোংরামি ঢেকে রাখার ভারতের এই অক্ষম প্রচেষ্টা!

     

    অনুষ্ঠানের আরো দৃষ্টিকটু দিকঃ
    ঘটনার আরো সব মারাত্মক দিক আছে। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হল, একটা জুডিশিয়ারি ক্ষমতা তা যেন এক্সিকিউটিভ (বা প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতার অধীনে আছে ও থাকতে হবে এই অনুমানে দাঁড়িয়ে সবকিছু আয়োজন করা হয়েছে। কোন রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকে না। রাখা যায় না। বিচার বিভাগ জনপ্রশাসন বিভাগের মত নির্বাহি-প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন প্রতিষ্ঠান নয়, পুলিশ বা সামরিক বিভাগের মতও নয় যে এসব অফিস বা বিভাগের মত বিচার বিভাগও প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন সরকারি অফিস-প্রতিষ্ঠান নয়। তাহলে এটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না! জনগণই ঐ প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার উতস  তা আর কার্যত থাকে না!
    সেপারেশন অব পাওয়ার” বা বিচার বিভাগকে প্রধানমন্ত্রী (বা রাজার) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করার কনসেপ্ট এটা ইউরোপে রাজতন্ত্রের আমল থেকেই চালু এক পজিটিভ ধারণা। অর্থাৎ পরবর্তিতে জনগণই সব শাসন ক্ষমতার উতস – যেটাকে ঐ শাসন ক্ষমতার উতস কোন রাজা-বাদশা নয়; তাদের ডায়নেস্টির বংশ-পরম্পরা বা রাজার ছেলে রাজাও আর নয় এমন নয়া এই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মুলকথা চালু হয়েছিল। বলা হয় যা রাজতন্ত্র ব্যবস্থাকে নির্মুল করে ক্ষমতা নিয়েছিল – সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা আসার আগেই এটা চালু হয়েছিল যে বিচার বিভাগকে রাজার (বা পরে সমতুল্য নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে  আলাদা বা সেপারেট করতেই হবে। নইলে বিচার করা অর্থহীন। নির্বাহী ক্ষমতার শাসকের মুখ চেয়ে যে রায় দেয়া হয় ওটা বিচার নয়!

    তাই একালে রিপাবলিক নামে এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা জনগণের শাসনের নামে কিছু একটা চালু আছে আমরা দেখছি  অথচ কিছু লোক মনে করছে যেন বিচার বিভাগও সর্বময় ক্ষমতার প্রধানমন্ত্রীর বাইরে থাকে কী করে?? অধীনেই তো থাকা উচিত! বিএনপি-জামাত জঙ্গীবাদ ঠেকাতে নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই বিচার বিভাগ গড়তে হবে যারা সহি মনে করছেন এটা তাঁরা গড়ে তুললে সেটা প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়ে বিচার ও রায় দিবার এক বিচার বিভাগই হবে! এর বাইরে কিছু হবার সুযোগ নাই! এমনিতেই যেটা নিয়ে সরকার-বিরোধী যেকোন নাগরিকের ইতোমধ্যেও অভিযোগ করে আসছে। আমাদের বিচার বিভাগকেই ঢেলে সাজাতে হবে বলে মনে করে এমন অভিযোগকারিরা! সেখানে সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত এই কনফারেন্স আসলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগকেই পুষ্ট করল!

    এই আয়োজনে দৃষ্টিকটু ঘটনার শেষ নাই। যেমন প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা মূলত দুদেশের সুপ্রীম কোর্টের এক অনুষ্ঠান মাত্র।  কোর্ট যেকোন নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে দুরে বা আলাদা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক হত। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে তারা এনেছে হয়ত সেটা বড় সমস্যা হত না যদি নিজ পরিমিতবোধে প্রেসিডেন্ট – তিনিও কোন রাজনৈতিক বক্তব্য আনছেন না বা এড়িয়ে গেছেন। এরপর থেমে যাওয়া উচিত ছিল।  কারণ, কোন চীফ জাস্টিস প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক আসরে হাজির থাকেন না – খুবই সীমিত ও নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতার আসর ছাড়া!  প্রধানমন্ত্রী আর বিচার বিভাগের ক্ষমতা আলাদা – এটা সব জায়গাতেই প্রতিষ্ঠিত রাখতেই হয়!

    পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [prejudes]
    সেপারেশনের ইস্যুটা ছাড়াও আরেকটা বিরাট বিবেচনা নিয়ে বিচারকদের চলতেই হয়, মানতেই হয়। সেটা হল – পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [pre-judes]। বিচারক সকালে উঠে বাসায় নাস্তার টেবিলে এক ঘনিষ্ট আত্মীয়,বন্ধু বা হয়ত নিজ স্ত্রীর মুখে মন্তব্য শুনলেন যে আজ এজলাসে যে কেসের শুনানী তিনি শুনবেন সেই আসামীই আসল বা মূল খুনী অপরাধী – এধরণের একটা মন্তব্য!  কিন্তু বিচারকের কাজ হচ্ছে কোন কারও কানকথা না শুনা, কানেই না আসে সে ব্যবস্থা করা! আর এজলাসে বসে কেস ডকুমেন্ট আর শুনানীতে বাদী-বিবাদির উকিল কী তথ্য আর যুক্তি তুলছেন কেবল সেসবের ভিত্তিতে আসামী সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা। যেটা একমাত্র এজলাসেই তৈরি হয়, শুনতে শুনতে জন্মায়। কাজের সকালে বাসায় যদি কিছু শুনেছেন আর এতে তার মন যেভাবে প্রভাবিত হয়েছে – এটাই প্রিযুডিস বা পুর্ব-সংস্কার বলা হবে। এককথায় সেটা আসলে এজলাসে-বিচারে বসার আগেই প্রভাবিত হয়ে বিচার করে ফেলার অবস্থায় নিতে পারে বিচারককে!  একজন বিচারকের জন্য প্রিযুডিস তাই সবচেয়ে বড় অপরাধের কাজ মনে করা হয়!
    বিচারকেরা তাই নিজ জীবন সাজান যেন প্রিযুডিস এড়ানো জীবনাচার হয় নিজের! এজন্য সামাজিক-পারিবারিক নিজ জীবন তিনি নিয়ন্ত্রিত করেন। সবার দাওয়াতে তিনি যান না, সব সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন না; খুবই ঘনিষ্টজনেরটা ছাড়া! যাতে আবার কোন ব্যক্তিগত আলাপে তিনি জেনে বা না-জেনে যেন কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যান! এভাবে সতর্কতা নিতে হয় তাঁকে! কাজেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা-সাক্ষাত সেটা তো অনেক দুরের যেখানে নিজ সব আত্মীয়স্বজন বন্ধুর সাথেও কোন বিচারকের ততটা মেলামিশার কথাই না!

    অথচ এখানে হয়েছে উলটা প্রধানমন্ত্রীকেই এখানে চীফ গেষ্ট করা হয়েছিল। আর প্রধানমন্ত্রী প্রায় ত্রিশ মিনিটের বক্তৃতার পুরাটাই ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য! আমাদের বিটিভির রেকর্ডেড এই বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। এটা পুরা অনুষ্ঠানেরই ভিডিও প্রায় দুই ঘন্টার বেশি; এর মধ্যে ১ঃ৪৪ মানে একঘন্টা ৪৪ মি এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুরু হয়েছে।
    ওদিকে আরেক বড় অস্বস্তিকর ব্যাপার হল, এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে বলা হয়েছে সমাপনী বক্তা অতিথি [valedictory scession]। এটা সকাল দশটায় শুরু হলেও এটাই সমাপনি অনুষ্ঠান নয়। কারন, ঐদিনই বিকালে তিনটা থেকে ২৪ তারিখেওর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে।

    এই অনুষ্ঠানের আয়োজন কেন? মূল উদ্দেশ্য কী?
    এর জবাবটা হাসিনার দিক থেকে দেখে বললে মানে, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলে যা পাওয়া যায় তা হল, এদিনটা আসলে ছিল হাসিনার ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর থেকে এপর্যন্ত তিনি কী কী অর্জন করেছে এর একটা তালিকা হাজির করা আর এসবের জন্য ভারতের সরকার সেনাবাহিনী সহ ভারতের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান প্রায় সবাইকেই ধন্যবাদ জানানো। এর ভিতরে আবার ভারতের হাসিনাকে ছয় বছর আশ্রয় দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। এর সাথে হাসিনার ভাষায় বিচার বিভাগ যেভাবে   নিয়ন্ত্রিত ভাবে আচরণ করে ১৯৭৫ সালের আগষ্টের পর থেকে বখে গেছিল একে তিনি এবার শুদ্ধ করে নিজের মত করে সাজিয়েছেন – এই অর্জনকে ভারতের সামনে তুলে ধরতে চেয়েই যেন এই কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে!
    এই হল, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার সারকথা!
    কিন্তু প্রধান বিচারপতি  চন্দ্রচূড় এর কিছু মন্তব্য সব আউলায়ে দিয়েছে।  কিন্তু এরও আগে, চন্দ্রচুড়  আবার এই কনফারেন্স সম্পর্কে হাসিনার নিজ ভাষ্যকে পাশ কাটিয়ে নিজ ভাষ্য খাড়া করেছেন।

    কনফারেন্সের দাওয়াতপত্রের ভাষ্য ভারতেরঃ
    কেন ভারতের পুরা বিচার বিভাগ না হলেও এর মাথা সুপ্রীম কোর্ট এমন কনফারেন্সে যোগ দিল – এনিয়ে তাদের মনেও অস্বস্তি ছিল তা বুঝা যাচ্ছিল। যেমন, হাসিনার সাথে ভারতের বিচার বিভাগের লেনা-দেনা কী? আমাদের বিচার বিভাগের যেকারণে আমাদের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ট হওয়া অস্বস্তিকর কারণ তাদেরকে নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সেপারেশনে দূরে থাকাটাই একমাত্র স্বাভাবিক! বাকিটা অস্বাভাবিক!! তাহলে ঠিক একই যুক্তিতে ভারতের সুপ্রীম কোর্টও তাই অস্বাভাবিক কিছু করেছে???  তাদেরও কোন লেনা-দেখা থাকতেই পারে না। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশ এদুই সুপ্রীম কোর্ট কী একাদেমিক-টেকনিক্যাল বৈশিষ্ঠের কোন কনফারেন্সে মত্ত হয়েছিল? জবাব হল যে একেবারেই না। কারণ তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাদের কোন কাজ থাকার কথা না ??

    তাই এই অস্বাভাবিক দিক, এদিকটা সাফাই দিতেই চন্দ্রচুড় এন্ড গং বিচারপতিরা তার সঙ্গি হয়ে এসেছেন – অনুমান করা যায় তারা অনুষ্ঠান সুচির পাতার শুরুতেই ১০-১২ লাইনের কিছু বক্তব্য ঢুকানো দেখে। নিচে তেমনই পাতাটা দেখেন।

    এককথায় বললে এটা ভারতের জুড়িশিয়াল পেশাদারদের কিছু অপ্রয়োজনীয় আতলামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের ভারত যেন এশিয়ায় না হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বিচারীয় বিষয়ের বিরাট কুতুব এক অথরিটি!  এমন আগাম অনুমান ধরে নিয়ে তারা কথা বলেছে! যেমন বাক্যের প্রথমেই একটা শব্দ ব্যবহার করেছে পোস্ট-কলোনিয়াল। অনেকে আবার  পোস্ট-কলোনিয়াল শব্দটা কাউকে ব্যবহার করতে দেখলে এটা যেন বক্তার বিরাট এক জ্ঞানের বহরের প্রকাশ ভেবে মাথা নিচা করে সালাম-আনুগত্য জানাতে-বুঝাতে চায়।  অথচ এই ভাষ্যের সারকথা হল, ১৯৪৫ সালের আগের পশ্চিমাবিশ্বের অভিজ্ঞতা পরের কলোনিমুক্ত দেশে যেন আর অত কাজের না। তাই লিখেছে  – where constitutional borrowing has occured in the region rather than from europe & America. -মানে হল  পোস্ট কলোনিয়াল সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার চেয়ে আমাদের এই রিজিয়নে [মানে যার একছত্র নেতা হল ভারত বলে বক্তার ভুয়া অনুমান] আমাদের নিজেদের মধ্যকার অভিজ্ঞতা ধার নেয়া বেশী ঘটেছে। ফলে ভারত হল বাংলাদেশের জুডিশিয়াল বা বিচারীয় জ্ঞানের জগতে এক একছত্র নেতা ওস্তাদ। অতএব মোদি-চন্দ্রচূড় এন্ড গং-দের কথা শুনে বাংলাদেশ তুমি অনুগত হয়ে চল!!!!  আর আমাদের সুপ্রীম কোর্ট ভারতের সুপ্রীম কোর্টকে বড়ভাই মেনে আনুগত্য করুক!  কিন্তু আসলেই কী ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এর অর্জন এতই গৌরবেই? আসেন একটু চেক করে দেখি!

    প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা তাঁর বিরুদ্ধে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় মানতে রাজি হন নাইঃ 
    ভারত রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। আর এতে ভারত এরপর থেকে নিজে আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছিল। কেন?
    গত ১৯৭২ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে ইন্দিরার আসনে তিনি কারচুপি করেছেন আর এভাবেই তিনি এমপি আর শেষে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এমন মামলা করে তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী! এই মামলার হাইকোর্টের রায় বের হয় ১৯৭৫ সালে। বিচারক তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ ত্যাগ করার সময় দিয়ে সাজা ভোগ করতে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই রায় অমান্য করতে পালটা দেশে জরুরি আইন জারি করে পরিস্থিতি নিজের হাতে এনে নিয়ন্ত্রণে নেন; যাতে সাজা ভোগের প্রসঙ্গ চাপা পড়ে। সারকথা একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ আর নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী – এরা যদি কেউ কাউকে কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যবাধ্যকতা মান্য করতে  বা কাজ করতে দিতে না চায় – এটা ছিল সেই কেস। যার সার-অর্থ হল, রাষ্ট্রটা নাই হয়ে গেছে!! ঠিক তাই হয়েছিল ভারতে।  যদিও পরে ইন্দিরা সরকারের পতন ঘটে – নির্বাচনে বিরোধী মোরারজি দেশাই এরা ক্ষমতায় আসে। আমি আর সে  সব ফারদার বিস্তারে যাচ্ছি না এখন।

    [অনেকে ভাবতে পারেন কেবল ভারত রাষ্ট্রই ইন্দিরার হাতে এমন সংকটে পরেছিল। না, একেবারেই সত্য না। শেখ মুজিবের বাংলাদেশ রাষ্ট্রও ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের হাতেই এমন নাই হয়ে গেছিল। আমার পুরানা  ২০১০ সালের লেখা পড়েন এখানে।]

    কিন্তু এরপর থেকে ভারতের আইন পেশার একাদেমিক, উকিল বা বিচারক কমিউনিটি দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যাদের মধ্যে ডমিনেটিং ভাষ্য হল, বিচার বিভাগের প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা উচিত ছিল! বিচারকদেরও প্রধানমন্ত্রী জিন্দাবাদ বলতে হত!  শহরের এলিটদের বিরুদ্ধে যেভাবে গরীবেরা দাড়াতেই পারে না আগের মানসিকভাবে হেরে গিয়ে থাকে বলে – এটা ছিল অনেকটা সেরকম!
    আর সেই থেকে ভারতে এই “দেশের স্বার্থে” বলে আপোষি জাতিবাদিদের আপোষ ধারাটাই চলে আসছে এখনও। নানান বাঁক পেরিয়ে। এমনকি এখনও এই চন্দ্রচূড়েরা একই কাজ করে চলছেন! মুসলমান নিধন অত্যাচার নিগৃহ বৈষম্য চন্দ্রচুড়েরা দেখতেই পান না!  এমনকি চন্দ্রচূড় ঢাকায় এসেছেন মোদি-হাসিনার রাজনৈতিক আলোচনার ফলশ্রুতিতে। কিন্তু চন্দ্রচুড় কেন এই আলোচনায় অংশ নিবেন? মোদি বা হাসিনার সাথে এই প্যাচ-আপে তিনি কেন অংশ নিবেন? তিনি কী মোদির অধীনে কোন মন্ত্রণালয়ের সচিব?? এর উপর আবার মোদি  যে বাংলাদেশে নিজ কলোনি শাসন – আধিপত্য কায়েম করতে চলেছেন। আর চন্দ্রচূড় “পোষ্ট-কলোনিয়াল” বলে হুঙ্কার তুলে মোদির কলোনিদখলের নৌকায় উঠে বাংলাদেশে এসেছেন!  প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা প্রধান বিচারপতির চন্দ্রচূড়ের তো পরিণতি এমনই হবার কথা; নয় কী!!!

    চন্দ্রচূড় ভাব ধরতে চান কলোনিয়াল পশ্চিমারা খুব খারাপ। একমাত্র তিনিই বীর! তো রিপাবলিক ধারণাটা কোথায় পাইছেন, মহাশয়?  ব্যক্তি-বোধ, নাগরিক, রাষ্ট্র রাজনীতি ইত্যাদি সহ ভারতে রিপাবলিক ধারণা কিভাবে এলো? মোগল আমলে ছিল?? কাজেই বকোয়াজ বন্ধ করেন। ইউরোপের আমাদের মত দেশকে কলোনি করা অন্যায় নিঃসন্দেহে! কিন্তু কলোনিদখলদারদের দেশে শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে এই হিসাবে রিপাবলিক – জনগণ ক্ষমতার উতস – রাজনীতি নাগরিক ইত্যাদি সব ধারণাওগুলো আমরা বৃটিশদের থেকেই পেয়েছি। এটা পজিটিভ পাওনা! আর বৃটিশেরাও আবার সে ধারণার গোড়াটা পেয়েছে রোমান-দের কাছে থেকে। এটা শুরুতে প্রাচীন রোম থেকে পরে হোলি রোমান এম্পায়ার সমাজ থেকে!
    এখনও আমাদের হাইকোর্টের বিচারকেরা রায় লেখার সময় দুচারটা এক্সিওম [AXIOM] বা স্বতসিদ্ধ সত্য বলে কিছু বাণীর উল্লেখ করতে খুবই ভালবাসেন। এর মাহাত্ম হল, তিনি যে রোমান এক্সিওমগুলো মুখস্ত করেছেন সেটাই যাহির করে দেখানো! এখন চন্দ্রচূড়েরা কী বৃটিশ-রোমানদেরকে কলোনি শাসক বলে তুচ্ছ বা অস্বীকার করবেন? পশ্চিমা কলোনি শাসকদের গালি দিয়ে আবার, এখন ভারতকেই  কলোনিদখলদার (বাংলাদেশকে দখল) করে গড়তে চাইবেন? মোদির হাতধরে বাংলাদেশে আসবেন???

    বৃটিশদের কাছ থেকে রাজা রামমোহন রায় বৃটিশ রিপাবলিক ধারণাটা প্রথম বুঝেছিলেন। তিনিই প্রথম এটা বুঝে তা কাজে লাগাতে গেছিলেন। কিন্তু বুঝেছিলেন উলটা। ভেবেছিলেন, রিপাবলিক জাতি-রাষ্ট্র মানে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণা। সেটা অর্জন করতেই তিনি অসংখ্য জাতে বিভক্ত হিন্দুদেরকে সহ সকলেই আগে এক নয়া এক ব্রাহ্ম ধর্মে নিতেচেয়েছিলেন। আর এরই শেষ আজ পরিণতি বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ! 
    একটু পড়ালেখা করেন বুঝা কঠিন না। কিন্তু হুদাই পশ্চিমাবিরোধী সাইজেন না! এর পরিণতিতেই তো বাংলাদেশকেই একালে ভারতের কোলোনি সম্পর্কে বেধে ফেলার কাজে মোদির সঙ্গি হয়ে এসেছেন!

    চন্দ্রচুড়ের হাত ধুয়ে ফেলার কোশেশঃ
    কিন্তু এসব সত্বেও চন্দ্রচুড় নিজের হাত ধুয়ে রাখতে চেয়েছেন। হাসিনার উপস্থিতিতে ঐ অনুষ্ঠানের সবটা বিটিভি সংগ্রহ ও রেকর্ডিং করেছে। কিন্তু ভারতের ইন্ডিয়া টুডে আবার সেখান থেকে নিয়ে নিজেই ইউটিউব ভিডিও করে ছেড়েছে, বিশেষ করে চন্দ্রচূড়ের আধাঘন্টা কথা। কিন্তু তাতেই এরা সনুষ্ট হয় নাই। এ’বাদেও ঐ আধাঘন্টা থেকে আবার বিশেষ আড়াই মিনিটের একটা বক্যব্যের ভিডিও-ও তারা ছেড়েছে। মনে রাখতে হবে ইন্ডিয়া টুডে মোদি সরকারেরই বা র-এর আরেক হাতিয়ার। যখন বাংলাদেশে বিরোধী বা বাংলাদেশকে টার্গেট করে কিছু তাদের প্রপাগান্ডা করার থাকে তখন তারা এই মিডিয়া ব্যবহার করে থাকে। সেই আড়াই মিনিটের লিঙ্ক এখানে। চন্দ্রচূড়ের এই অংশের বয়ানটুকুকে  তাই এন্ডিয়া টুডে নিচে লিখিত টেলপ দিয়ে এক মলিয়া পড়ে শুনিয়ে দিয়েছেন  যাতে কেউ মোদির দোষে অসৎ কাজের সঙ্গী বলে চন্দ্রচুড়কে অভিযুক্ত না করেন। চন্দ্রচুড় খারাপ ও অনিশ্চিত সময়ের কথা বলছেন যে এসব সময়ে সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের মত প্রতিষ্ঠানগুলো কনষ্টিটিউশনের উপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখার পক্ষে এগিয়ে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকমত সচল থাকাটা সেজন্য গুরুত্বপুর্ন।

    In a time of uncertainty and ambiguity, the pillar of democracy are put to the test. CJ DYC speaking at the south asian constitutional court conference in Bangladesh emphasis the crucial role of institution like supreme court and election commission in upholding the trust of the people in the constitution.
    Speaking at the conference, CJ DYC said, the constitution is not like the income tax act. The legitimacy of our Governance institutions hinges on their functionality.
    He stressed that the confidence of the people in the constitution solidify when these institutions rise to the occasion.

    সারকথায় তিনি বলছেন  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ। মানে তিনি রেকর্ড রাখতে চান যে এদুটা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তিনি আমাদের বুঝাইছিলেন! কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় গত পনেরো বছরে এটা হাসিনা সরকারের অধীনে একটা প্রতিষ্ঠানেরও এমন যোগ্য হয় নাই এটা কে না জানে! আর নির্বাচন কমিশন??? নিশ্চয় এবার ৭ জানুয়ারী ভোট দিয়ে জনগণ খুবই খুশি!!!! কারণ, হাসিনা বলেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে এটাই নাকি বেস্ট নির্বাচন!  অর্থাৎ চন্দ্রচুড় হুদাই কীছু বকোয়াজ করে গেলেন আরকি!
    অবশ্য ভারতের অনেকের মনে হতে পারে সব হল আমরা মুসলমানদের স্মস্যা। আমরা পশ্চাদপদ আমরা তাই কিছু পারি না!।    তাহলে আচ্ছা ভারতের সুপ্রীম কোর্ট কী খুব একটিভ আর নির্বাচন কমিশন খুবই সুনামের?
    একই কথা বার বার লেখার চেয়ে আমার নিজেরই এক পুরানা লিখার লিঙ্ক এখানে, কী ভয়াবহ অবস্থা দেখেন এখানে। লেখাটার শিরোনাম ছিল ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা । চন্দ্রচুড়ের নিজের সুপ্রীম কোর্টের অবস্থা বুঝবার জন্য। এবং এই আবেদনে নির্বাচন কমিশন ভাল হয়ে যায় নাই।
     আর ভারতের খোদ নির্বাচন কমিশন??? সে আরেক ভয়াবহ অবস্থা!!!  ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের; প্রধান ছাড়া আরো দুজন কমিশনার। কম কথায় বললে মামলা টা ২০১৯ সালে ভাএরতের নির্বাচনের। মোদিসহ আরো অনেক প্রার্থীই নির্বাচনি আইন ভেঙ্গে সাজা পেয়েছেন বা  ফাইন দিয়েছেন। কিন্তু একমাত্র নরেন্দ্র মোদি ছাড়া। তার নামে যৎগুলো অভিযোগ দায়ের হয়েছিল কমিশন তার একটাতেও কোনই পদক্ষেপ নিতেই যান নাই। এনিয়ে কমিশন প্রধান এক সদস্যকে পাশে পেয়ে দু-এক ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে কোন একশনে যান নাই। আর তৃতীয়জন অশোক লাভাসা তার নাম – তিনি এরপর সরকারি নিগ্রহের শিকার হতে থাকেন – আর তা উনার স্ত্রীসহ যিনি উচ্চপদস্ত ব্যাংকার। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতিটা সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রাখা ব্যক্তি ছিলেন। কয়েকবছর পরে আর চাপ সহ্য করতে না পেরে অশোক লাভাসা আপোষ করতে বাধ্য হন। রফাটা হল এখন তিনি নির্বাচন কমিশন ছেড়ে দিয়েছেন; [ADB] এডিবিতে ভারত সরকার পক্ষের আমলা প্রতিনিধি হিসাবে আছেন!

    অর্থাৎ সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ বলে বিরাট জ্ঞানের কথা ছাড়লেও প্রধান বিচারপতি হিসাবে তিনি সরাসরি এর জন্য দায়ী!  অথচ বাংলাদেশে এসে জ্ঞানের কথা ছাড়ছেন???

    আমি এখনও পরিস্কার না বুঝি নাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী চান? কেন চন্দ্রচুড় ঢাকায় এসেছিলেন?  আমাদের কাছে এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সিনহা তার ঘটনাবলী এখনও জলজ্যান্ত আছে। তিনি গুজরাটে গেছিলেন এক বেসরকারি ল কলেজের অডিটরিয়াম উদ্বোধন – এই আমন্ত্রণে। গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য কত কী ভাল করেছেন এর ফিরিস্তি দিয়ে বক্তৃতা করে গেছিলেন। ভুলে গেছিলেন তিনি বিচার বিভাগের লোক যা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নয়। আর তিনি কোন সচিবও নন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসব জয়গাথা ছড়ানো তার কাজ দায়ীত্বের সাথে অসামন্বস্যপুর্ণ!  কিন্তু তিনি ফাঁদে পড়লেন যে তিনি কার কথা কে বেশী গুরুত্ব দিবেন! হিন্দু মনে ভাবলেন কাকা-বাবু এখানে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রেফারেন্সিয়াল! ফলাফল আমরা সবাই জানি! এর মানে  আমাদের সব অভিজ্ঞতাই বলছে এসবের একটাও কাজ করে নাই! এরপরেও ঠিক কী জানতে বাকী আছে???? আমার বুঝাবুঝি-নাগালের বাইরে!

    একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয় “আরবিট্রেশন” – এটা ভুলে গেছিলাম, এখন যোগ করে দিচ্ছিঃ
    ধনঞ্জয় চন্দ্রচুড় তাঁর বক্তৃতায় বিচার ব্যবস্থার ভিতরেই সালিশ ব্যবস্থাও [arbitration] যোগ করার প্রস্তাব করেছিলেন।  সালিশি মানে বুঝতে হবে – যেখানে কেউ অপরাধী বলে রায় দেয়া হয় না, কাউকে সাজা দেয়া হয় না। এটা এক আপোষ-মীমাংসার পথ। ফলে স্বভাবতই কোন ক্রিমিনাল কেসে এর ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু চন্দ্রচুড় এই সালিশ-ব্যবস্থার কথাও আসলে বলেনই নাই। তাহলে?
     
    তিনি আসলে  মিন করেছেন – মানে আরবিট্রেশনের কথা বলে এই আড়ালে (হিন্দুত্ববাদী) সরকারের চাওয়ার পক্ষে রায় দেয়া। এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেটাই আমরা এখন নিচে দেখব।
    বাবরি মসজিদ ধবংস করা হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। যদিও মানুষে নানানভাবে এঘটনাকে ব্যাখ্যা করে কেবল নিজের পক্ষে সাফাই টেনে থাকে। আর আমার ধারণা হল এটা ছিল মুসলমানবিরোধী ঘৃণা সাজিয়ে  সেই উস্কানিতে আরএসএস-বিজেপি যে ভোটের রাজনীতি ক্ষমতাদখল ব্যবস্থা আনতে যাচ্ছে এরই আগমনী সিগনাল- বার্তা ছিল।  তাদের হিসাবে এটা ছিল এভাবে হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতা আনবার জন্য পারফেক্ট টাইমিং; হয়েছিলোও তাই। এরই পরিণতি-প্রমাণ হল গত দশবছরের নরেন্দ্র মোদীর শাসন! ও বিচারকদের আছে তাঁর নানান চাওয়া – এর জন্য চাপ সৃষ্টি! আর এর পুর্ণতা দিবার পিছনের অন্যতম এক বিচারক হলেন ভারতের বর্তমান প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়! তারঁ বাবা যশোবন্ত বিষ্ণু চন্দ্রচূড় [YBC]ও এর আগে প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ধনঞ্জয় [DYC] হার্ভার্ড ল স্কুল গ্রাজুয়েট ও পিএইচডি হোল্ডার।  কিন্তু হায়!
    ১৯৯২ সালের মসজিদ ধবংস মামলায়  সুপ্রীম কোর্টের ফাইনাল রায় ঘোষণা হয় ২০১৯ সালে।  ধনঞ্জয় সেখানে রায় দাতা পাঁচ  বিচারকের একজন বিচারক! যেখানে বিচারকদের রায়ের সারকথা হল, মসজিদের স্থানে মন্দির করতে দেয়া হোক আর মসজিদের জন্য সরকার আলাদা জায়গা দেক! এই হল, ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়দের বিচারের রায়ের নামে সরকারের দালালি আর ইঙ্গিত দেয়া এটাই তাদের সালিশি ব্যবস্থা????
    তার মানে ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড় কী আমাদের বিচার বিভাগকে সালিশের চর্চার কথা বলে  বিভিন্ন মামলায় সরকারের পক্ষে রায় দিবার কথা বলে গেলেন? মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর চাওয়ার পক্ষেই বিচার বিভাগকে থাকতে হবে রায় দিতে হবে – এই অভ্যাস সেই যে ১৯৭৫ সাল থেকে ইন্দিরার হাতে শুরু হয়েছিল ভারতের বিচার বিভাগ এথেকে বের হতে পারে নাই। বরং এই চামচামির ধারা বজায় রেখে নিজের আখের গুছানো বিচারক প্রধান বিচারক হওয়াটাই ভারতের বিচার বিভাগের অনুসৃত নীতি হয়ে গেছে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৭ঃ ১৯   সন্ধ্যা
    আপডেটঃ ০৪ মার্চ ২০২৪ ০৮ঃ ১০   রাত

     

     

     

     

     

  • পাকিস্তানের নির্বাচন ও সাংবাদিক হামিদ মীর

    পাকিস্তানের নির্বাচন ও সাংবাদিক হামিদ মীর
    গৌতম দাস
    ২৮ জানুয়ারি ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5kJ

     

                        Pakistan’s Elections Will Be ‘Selections’; Nawaz Sharif Will Be ‘Imposed’ as PM: Hamid Mir

     

    হামিদ মীর [Hamid Mir]।

    পাকিস্তান এর সাংবাদিক। কেরিয়ার শুরু করেছিলেন প্রিন্ট পত্রিকার সাংবাদিক হিসাবে। সবাই যেমন হয়, তেমনই। আলাদা করে মনে রাখার মত তাঁর কিছু তখন ছিল না। কিন্তু উঠে আসেন প্রধানত তিনটা ঘটনায়।   ১. ওয়ার অন টেররের আমলের এক কথিত “লিবারেল সাংবাদিক পরিচয়” বানিয়ে নিবার সুযোগে উত্থিত। ২। লা-দে-নের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন বলা হয় সেকালে। ৩। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোশাররফ এর প্রায় নয় বছরের আমলের মাঝামাঝিতে যখন পাকিস্তানের মিডিয়া – একটা তুলনামূলক কিছু খবর ছাপতে দেয় এই অর্থে লিবারেল মিডিয়া করে দেওয়ার শখ জেগেছিল প্রেসিডেন্ট বুশের।

    একই পারস্য উপসাগরে মাঝের ইরানের দুদিকে  দুবাই আর পাকিস্তান; যাদের এরিয়াল মানে বাণিজ্যিক বিমানে যাতায়াতের দুরত্ব বা ফ্লাইয়িং টাইম মাত্র দুঘন্টার। যেন একই ভারতের পুব থেকে পশ্চিমে (মুম্বাই-কলকাতা) যাবার বিমান ভ্রমণ দুরত্ব। অনেক প্রবাসী পাকিস্তানি দুবাইয়ে চাকরি করেন। এমনিতেই দুবাইয়ের ক্ষমতার করিডোরে বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের প্রবেশাধিকার নানা কারণে বেশী। ওদিকে মোশাররফ এরও বুশের পরামর্শ / নির্দেশ মানবার বাধ্যবাধকতা আছে। তাই তিনি এক আজিব ব্যবস্থা খাড়া করলেন। সেটা টিভি মিডিয়ায় তুলনামূলক এক মুক্ত আবহ। লিগালি টিভি খোলা হয় দুবাইয়ের কোম্পানি হিসাবে, সেখান থেকে প্রচারিতও। কিন্তু টার্গেট পাকিস্তানের আম-জনতা আর এটা ফ্রি মানে বাংলাদেশের স্থানীয় টিভি যেমন বাংলাদেশিরা ব্যবহার করে।
    আর মূল প্রোগ্রাম স্টুডিও কোথায় হবে? শুরুতে তা থেকে গেছিল দুবাইয়েই। পরে সাক্ষাতকার নেয়া, বা রিপোর্টিং সংগ্রহ করতে গিয়ে তা খোদ পাকিস্তানের মূল মূল শহরে কিন্তু বিদেশি টিভি হিসাবে এর আবির্ভাব ঘটেছিল। এভাবেই চালু হয়েছিল GEO TV।  [ARY টিভি গ্রুপ এটাও তেমনই একগুচ্ছ টিভি পরিচালনা করে থাকে ] আর জিও টিভির প্রধান কর্তা হিসাবে মানুষ চিনতে শুরু করেছিল হামিদ মীরকে। এই টিভির লিবারেলিজম বা উদারতা এমনই যে, যতটুকু মনে পরে সম্ভবত ২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমি বাসায় আফ্রিকায় আমার পাকিস্তানি কলিগদের সাথে বসে বাংলাদেশ নিয়ে টিভিতে আলোচনা দেখছি। আর সেখানে বাংলাদেশের ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত সাহেবই সম্ভবত আলোচনার প্যানেলে। জিও টিভি গ্লোবাল ব্রডকাস্টেড টিভি চ্যানেল ছিল তাই আফ্রিকাতে বসেই তা দেখা যেত।

    হামিদ মীর বাংলাদেশেও ঘুরে গিয়েছেন। ওয়ার অন টেররের রমরমা কালে। কিন্তু এই হামিদ মীর ক্রমশ আমেরিকান মুখপাত্র হয়ে উঠতে থাকলেন। বিশেষ করে এই ডোনাল্ড ল্যু এর যুগে এসে, সবচেয়ে আগ্রাসী ভাবে।
    ইমরানকে যখন বাইডেনের আমেরিকার ডোনাল্ড ল্যু উতখাত করতেছেন তখন ব্যাপারটা ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রধান সংবাদদাতা হয়ে উঠেছিলেন এই হামিদ মীর। প্রথম আলো পাকিস্তানের যে মিডিয়ার খবর সবচেয়ে বেশী করে কোট করে তুলে আনত তা ছিল হামিদ মীরের রিপোর্ট।  কারণ সেগুলো হত প্রো-আমেরিকান করে সাজানো।

    আর এখন?
    মানে আগামি মাসে দিন দশকের মধ্যে পাকিস্তানে (ডোনাল্ড ল্যু এর) সাধারণ নির্বাচন আটই ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
    এদিকে হামিদ মীর পুরান অভ্যাস পরিচয়ে উদার সাংবাদিক; সৎ কথা নাকি বলতে পারেন। আর ভারতের THE WIRE ওয়েব পত্রিকাটা তুলনায় মোদির আমলে যেখানে সব পত্রিকাই মোদির কাছে ভিক্ষার পাত্র বাড়িয়ে দাড়ায় থাকার যুগ পার করছে সেখানে এই মিডিয়া এখনও সেসব লোভ বা ধান্দায় নাই। যদিও উগ্র জাতিবাদী কথিত জাতিস্বার্থের ধারণার বাইরে নয় এই মিডিয়া।  ওয়ারের করণ থাপর [Karan Thapar] হামিদ মীরের এক ভিডিও সাক্ষাতকার নিয়েছেন। এর ভিতর কি আছে তা শিরোনামেই প্রকাশিত প্রতীকিভাবে। শিরোনামটা বাংলা অনুবাদ করলে তা হয়ঃ  “পাকিস্তানের (আসন্ন) নির্বাচনে  আগাম বেছে রাখা এক “সিলেকশন” হতে যাচ্ছে; নওয়াজ শরীফকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে নিয়ে তা চাপিয়ে দেয়া হবে” – হামিদ মীর। 

     Pakistan’s Elections Will Be ‘Selections’; Nawaz Sharif Will Be ‘Imposed’ as PM: Hamid Mir

    তাহলে এটা কি দাঁড়ালো?
    দাড়ালো যে তাহলে ইমরানের উতখাতের সময় থেকে এত খুশি ছিলেন কেন হামিদ মীর! সেসব এখন বিব্রতকর প্রশ্ন!!
    তবে এখন এটা পরিস্কার যে এককালে পাকিস্তানের আদালতে প্রমাণিত চোর এই নওয়াজ শরীফ এর গায়ের পচা দুর্গন্ধও ল্যু এর কাছে খুবই ভাল সুগন্ধ লাগছে!  বাইডেন-ল্যু এটাকেই তাদের বিরাট অর্জন বিজয় মনে করছেন! এটাই তাদের সম্ভবত এক মাত্র চীনবিরোধী বিজয়! ঙ্ন্তুকি হামিদ মীর জানেন এই লাশের ভার কত ওজনের! তাই তিনি আগে ভাগেই হাত ধুঁয়ে ফেলে আমাদের জানালেন যে আর এর দায় তিনি নিতে চান না!

    আর পাকিস্তানের বেলায় এই ডোনাল্ড ল্যু আর আমাদের বাংলাদেশের বেলায় ল্যু – এদুটা কি একই ব্যক্তি?
    হা সন্দেহতীতভাবে একই ব্যক্তি!  আর আমাদের মধ্যে একমাত্র সুজন ব্যক্তিরাই তা বুঝিয়ে আমাদেরকে বলতে পারবে!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

  • নির্বাচন হয়েই যেতে পারে, এনিয়ে ভারতই ভীত! কেন?

     

    নির্বাচন হয়েই যেতে পারে, এনিয়ে ভারতই ভীত! কেন?
    গৌতম দাস
    ০২ জানুয়ারী ২০২৪  রাত   ২০ঃ ২৬
    https://wp.me/p1sCvy-5fN

    বিবিসি থেকে নেয়া

     

     

    খুবই তাজ্জব সব ঘটনা! ‘র’-এর প্রপাগান্ডা মুখপাত্র সেজে চলা সুবীর ভৌমিক এক নয়া লেখা ছেপেছেন গতকাল। এতদিনের বাংলাদেশ নিয়ে ‘র’-এর হয়ে প্রপাগান্ডা (যেমন সুবীর, আবদি বা চন্দন নন্দী ইত্যাদি) মুখপাত্রদের অবস্থান ছিল আমেরিকান স্যাংশন ও চাপে বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনার আবার জিতে আসা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ভারতের স্বার্থের কী হবে!!! এনিয়ে সরাসরি নাকি-কান্নায় সবচেয়ে আগিয়ে ছিলেন আবদি! আর এবার সেই তুলনায় একেবারে উল্টারথ অবস্থানে সুবীর ভৌমিক! তিনি হাসিনার নির্বাচন সম্পন্ন যেন না হয় সহানুভুতি ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আর এই সহানুভুতি ঘুরানোর পক্ষের কিছু উদাহরণ টানতেই বাংলাদেশে আর্মি ইলেকশনের ডিউটিতে যেতে চাচ্ছে না দাবি করে এবার তাঁর লেখা লিখেছেন। যদিও সুবীরের লেখার সত্য-মিথ্যা আমরা জানি না।

    কাজেই সুবীরের লেখার মুডটা আমাদের জন্য প্রধান ইস্যু!  সেটা হল যে, হাসিনার নির্বাচন আরামে সম্পন্ন হয়ে যাক এর পক্ষে তো নয়ই বরং বিপরীতে, মানে হাসিনার “এমন করাটা ভাল হবে না” এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তিনি বলছেন,  বাংলাদেশে আর্মি ইলেকশনের ডিউটিতে না যেতে চাওয়া মনোভাব নাকি বাড়ছে। যুক্তি হল নাকি, এই নির্বাচন বিতর্কিত। দেশে-বিদেশে সরকার ও সাংবাদিকেরা এর অগ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ক্রমাগত লিখে চলেছে। ফলে সরকারের এমন জনস্বার্থবিরোধী ততপরতার কারণে এর সাথে আর্মি প্রতিষ্ঠানটাও কালার হয়ে বা দাগ লেগে যাবে। এনিয়েই তারা উদ্বিগ্ন”। সুবীরের কথা সত্য-মিথ্যা আমরা জানি না। অন্তত প্রকাশ্যে বা মিডিয়ায় এমন নিউজ চোখে পড়ে নাই।
    যদিও এটা বুঝা কঠিন না যে বাংলাদেশ আর্মির একটা উভয় সংকট আছে। তা হল, একদিকে সরকার নির্বাচনে তাদেরকে নিয়োগ চাইছে এর কী হবে? আর বিপরীতে এতে কী তাদের এই বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ হয়ে যাবে? দেখা হবে? যেখানে, জাতিসংঘের দিক থেকে সাধারণভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে আমাদের বাহিনীকে সংশ্লিষ্ট হতে সতর্ক করা আছে! তা কী লঙ্ঘন বলে দেখা হবে? এমনিতেই এই নির্বাচন নিয়ে নিয়ে জাতিসংঘ এটাকে খুবই নেগেটিভ মার্কিং ও মূল্যায়ন করছে ও আরো করবে। আর এটা এখন প্রকাশ্য যে, ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ আমাদের নির্বাচনে নিজ সহায়তা বা সংশ্লিষ্ঠতা বুঝায় এমন সব কাজ থেকে দূরে সরে গেছে। এই অবস্থায় এটা জাতিসংঘের কাছে আমাদের সেনাদের ইমেজ ভাল হবে না এমন শঙ্কা জোরদার করবে সন্দেহ নাই।  আর অনেকেই বোধহয় জানেন যে জাতিসংঘের কাছে আমাদের রাষ্ট্রের গত ১৫ বছরের গুম-খুন-অপহরণ ঘটার অভিযোগ আর অন্যদিকে তাতে আমাদের বাহিনীর সংশ্লিষ্ঠতার অভিযোগের কারণে এখনকার জাতিসংঘের কড়া নির্দেশ হল, কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে আমাদের বাহিনী সংশ্লিষ্ট হতে পারবে না। হলে এতে মিশন তাদের জন্য আন-ওয়েলকাম বা  মিশন তাদেরকে চাচ্ছে না এমন হয়ে যেতে পারে। এই হল অনুমান।
    সুবীর  এই বাস্তবতাটাকেই কাজে লাগিয়েছে।  দাবি করেছেন, এঅবস্থায় এই নির্বাচনে ইলেকশনের ডিউটি করা মানে জবরদস্তিতে হাসিনা সরকারের নির্বাচন করে নেয়া ও আবার ক্ষমতায় থেকে যাওয়া কাজের মূল সহায়ক খুঁটি হিসাবে দেখবে দেশে-বিদেশে, এমন কথাও বলে বসেছেন। এটাকেই আমি বলছি সুবীর ভৌমিকের পল্টি দেওয়া। যারা এতদিন কেন আমেরিকা স্যাংশন দিয়ে হাসিনার সম্ভাবনা কমাচ্ছে এর পক্ষে যুক্তি দিত! কিন্তু এবার এমনকি আগের জেনারেল আজিজের ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনের ঘটনা-কর্তা হিসাবেও তার সাথে তুলনাও করেছেন। আর তা করে এখনকার বাহিনী যেন তা না করুক এমন সেদিকে সুবীরের কামনা ও সমর্থন দেখিয়ে তিনি এলেখা লিখেছেন। আর এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। এককথায় তা বললে, ইন্ডিয়া বা ‘র’-এর অবস্থান স্পষ্টত বদলে গেছে! তারা কী হাসিনার এই নির্বাচন ভন্ডুলের পক্ষে যেতে চাচ্ছে? সুবীরের এই লেখার ইঙ্গিত সেটাই!! সেই ইঙ্গিত যাই হোক – মুল প্রশ্ন হল, কেন? কেন এই বদলের আমরা দেখছি? ইন্ডিয়া বা ‘র’-এতদিনের কামনা, এত প্রিয় হাসিনার বিজয়ে এই অনিহা কেন?

    সাথে অন্যদিকে আবার বিবিসির বোমাঃ 
    এককথায় বললে এটা এক আনলাইক বিবিসি রিপোর্ট। এবং মনে রাখতে হবে, ইংলিশ বিবিসি-র রিপোর্ট এটা। আনলাইক বিবিসি মানে বিবিসি এমন করে লেখে না, এটা ব্যতিক্রম।
    আর বাংলা বিবিসির গুরুত্ব নাই কেন? মানে এই ইংলিশ রিপোর্টটা বাংলায় হলেও এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু ছিল না। বা দিতাম না! কেন?
    বাংলা বিবিসি – অর্থ-রাজস্ব আয়ের দিক থেকে মূল বিবিসির এক লুজিং কনসার্ণ। বাংলা বিবিসি এর স্টাটাস হল মূল ইংরাজি বিবিসিরও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় প্রচারিত এক প্রোগ্রাম। ঠিক যেমন উর্দু বিবিসি। কিন্তু এই ভেঞ্চারটা লাভজনক নয় এখন। সরকারের পক্ষে ভর্তুকি দিয়ে দিয়ে এটা চালানোতে তারা ক্ষমা দিতে চায়! এজন্য অনেক ছাটাইও হয়েছে।  আর সেটা করতে গিয়ে এর নীতিতেও কিছু বদল এসেছে। যেমন হাসিনা সরকার বা র-এর পক্ষে প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে আয় বাড়ানো। এমন নীতিবিরুদ্ধে কাজে বাংলাকে ছাড় দেয়া আছে। তবু যদি টিকে থাকতে পারে, এই ভেবে! এটা বাংলা বিবিসির বেলায় ছাড় কিন্তু ইংরাজি বিবিসি এটা নীতিগত কারণে করবেই না। অর্থাৎ বাংলা বিবিসি রিপোর্ট অর্থের লোভে প্রপাগান্ডা নিউজ হওয়াটাই বেশী সম্ভাবনা ও সুযোগ!  তাই, এই বিচারে বললাম এটা ইংলিশ বিবিসি তাই এই রিপোর্টের গুরুত্ব বেশী! এমনকি ইংলিশ বিবিসি – এতে বৃটিশ সরকারের অবস্থান প্রতিফলিত হয় এমন রিপোর্ট হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী! যদিও তা অপ্রকাশ্যে হবে এবং কাকতলীয় ভাবে হয়েছে ভাব ধরে তা দেখানো হবে!

    আলোচিত বিবিসির এই [রিপোর্ট দেখা যাবে এই লিঙ্কে] এর শিরোনামটাই অনেক সাহসী।  বাংলায় বললে শিরোনাম হল, “বাংলাদেশঃ যে নির্বাচন এক-নারীর নাটক হয়ে দাড়িয়েছে” । [Bangladesh: The election that has turned into a one-woman show]।
    যথেষ্ট ঠেস-মারা ভাষায় এই শিরোনাম। আর পুরা রিপোটটা হল, হাসিনার বিরুদ্ধে সব (মানবাধিকার বা রাজনৈতিক-রিপাবলিক-রাষ্ট্রের নর্মস বা আচার ভঙ্গের) অভিযোগগুলো এক সংকলন। আর সবশেষে ব্যতিক্রমি দুইটা প্যারা যেখানে আরো কড়া ভাষায় ইন্ডিয়ার কানমলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দু’কথাই হাজার কথার সংকলন হয়ে গেছে।

    বিবিসির ভারত ধোলাইয়ের দুইটা প্যারাঃ
    মানুষের শোয়ার ঘরের ভিতরে একটা হাতি ঢুকে গেল কেমন হবে? কল্পনা করেন! সেটা হবে একটা তান্ডব ও বিশৃঙ্খলা হিসাবে। কারণ হাতিটা ঘরের ভিতর নুন্যতম নড়াচড়া করলেই একেকটা দেয়ালের সাথে ধাক্কা খাবে তাতে ঘরটাই ভেঙ্গে যেতে পারে। সেটা না হলেও অন্তত ঘরে আসবাব বলতে কিছু থাকবে না। তাই, কারো কারো উপস্থিতির কারণে ঘটনাস্থল একটা তান্ডব হাজির হয়েছে বুঝাতে ঘরের ভিতর হাতির তুলনাটা ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘটনাবলিতে ভারতের অবস্থান-উপস্থিতিকে বিবিসি তাই  ঘরে হাতির ঢুকার  মত বলে তুলনা করেছে। লিখেছে  The elephant in the room is neighbouring India, which opposes…। যে ভারত বাংলাদেশের ভিতরে কোন পরিবর্তন-সংশোধন করে নেওয়ার বিরোধী। এমনকি ভারত এটাও চায় বিনা-পয়সায় বাংলাদেশের রাস্তা ও নদি দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টের অবাধ চলাচল চালু থাকুক! এমনই এর আবদার! – ভারতের এমন খারাপ মতলবের কথাও বিবিসি প্রকাশ্যে লিখে দিয়েছে!

    The elephant in the room is neighbouring India, which opposes
    any coercive action against Bangladesh.
    Delhi wants road and
    river transport access
    for its seven north-eastern states through Bangladesh.

    যদিও শেষে একটু সহানুভুতির সুরে লিখেছে, Officials in Delhi are afraid it is strategically vulnerable in any potential conflict with India’s rival, China. বাংলাকরে বললে,  দিল্লিতে ভারতীয় কর্তারা নাকি চীনের ভয়ে চিন্তিত যে যে চীনের চাপে ভারতের বড় – কৌশলগত দুর্দশা – দেখা দিতে পারে। এতে কথাটার মানে হয়ে গেছে যেন চীনের কাছে ভারতের  কৌশলগত দুর্দশা কাটানোর জন্যই হলেও জবরদস্তিতে বাংলাদেশ থেকে ভারতের করিডোর সুবিধা জায়েজ বা ভারতকে তা পাইয়ে দিতে হবে…।
    এই হল পশ্চিমা সমস্যা। মনে করে তাদের এই দালালি আমরা ধরে ফেলব না।

    এতদিন মানে ধরেন চলতি নয়া শতক যার এখন ২৩ বছর পার হল। এই তেইশ বছরে দুনিয়ার সচেতন সবাই মনে করেছিল দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব এখন আমেরিকা বনাম চীন। মানে গ্লোবাল নেতৃত্বের এক পালাবদল হতে যাচ্ছে; আর এই পালাবদলকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব।  আবার দুনিয়ার কিছু অবুঝ বেদিশ বা নাদান এটাকে অর্থহীন এক শব্দ -ভূরাজনীতি [geo-politics]  – বলেও ব্যাখ্যা করে থাকে! যাই হোক এখন দুনিয়া মানে হল, আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্ব এর দুনিয়া! আর এই দ্বন্দ্ব কাঠামোর মধ্যে ভারত তার কথিত চীনবিরোধিতা দেখানোর উসিলায় আমেরিকার কোলে চড়ে বসতে চেয়ে গেছে অন্তত ২০০৭ সাল থেকে। এটাই আমরা দেখতাম। ভারতের লক্ষ্য আমেরিকা যেন আবার তাকে চীন ঠেকানোর ঠিকা দেক! সেই ঠিকা বা এসাইনমেন্ট যেটা মোটামুটি ২০১৭ সাল থেকেই আমেরিকা  প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যদিও চীনবরোধী কোন ইস্যু থাকলে ভারত-আমেরিকা তা নিয়ে পরস্পর সমন্ব্য় করে কাছে থাকার চেষ্টা অব্যহত রাখে।

    বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব পক্ষ-বিপক্ষ এলোমেলোঃ 
    চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব ইস্যুতে এটা দেখে এতদিন মনে হতে পারে ভারত তো আমেরিকার কোলেই আছে। যদিও বাংলাদেশে আমেরিকান স্যাংশন আর ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রবল হয়ে উঠলে ভারত ছটপট করে উঠছিল। প্রকাশ্যেই তাদের লোকজন বলত যে তাহলে তো স্যাংশনের কারণে ভারতের অধীনে থাকা খেদমতগার হাসিনা আর জিতে আসতে পারবে না।  বাংলাদেশে ১৫ বছর ধরে ভারতের লুটেপুটে খাওয়ার স্বার্থের কী হবে তাহলে? কিন্তু তা সত্বেও কোথায় যেন একটা নিজেই আস্থা পেত এই বলে যে  শেষে আমেরিকা নিশ্চয় ভারতের স্বার্থকেও একোমডেট মানে ভারতের জন্য লুটের কিছু একটা জায়গা করে দিবে! সরকথায় শেষে আমেরিকা বা আঙ্কেল স্যাম ভারতকে বাঁচাবে! এমন একটা বোধ তাদের মধ্যে কাজ করত!

    কিন্তু নাঃ
    ভারত এখন টের পেয়েছে বিরাট ওলটপালট হয়ে গেছে! কেন?
    ব্যাপারটা আগে অতটা বুঝা যায় নাই। কিন্তু এখন যতই ৭ জানুয়ারি এগিয়ে আসছে ততই এক নয়া বাস্তবতা সবাই অনুভব করছে। যেটা এর আগে পর্যন্ত সবাই আঙ্কেল স্যাম এর উপর ভরসা করে বসেছিল। নিশ্চয় তিনি একটা কিছু করবেন যা সকলের জন্যই ভাল হয়! কিন্তু হায়!!!
    এটা ঠিক এক নয়া বাস্তবতা হাজির হয়েছে অবশ্যই।  যা আর অস্বীকারের উপায় নাই! তাই ভারত অস্থির হয়ে উঠেছে!
    আর ব্যাপারটা এসেছে এভাবে –  দেখি না কী করে! – সেই গল্পের মত এই ঘটনা! যে গৃহস্তের বাসায় চোর এসেছে আর গৃহস্ত ভাবছে দেখি না চোর কী করে – একেবারে শেষে ধরব! আর এটা করতে করতে চোর তার কাজকর্ম প্রায় শেষ আর বমাল নিয়ে চলে যাবার অবস্থায়…!  আঙ্কেল স্যাম এর উপর ভারতসহ সকলের ভরসারই পরিণতি হল যেন এটা!

    এখন ভারতের কাছেও পরিস্কার যে ৭ জানুয়ারি দিন শেষ সন্ধ্যা থেকেই হাসিনা দাবি করতে থাকবে যে সে বিজয়ী হয়ে গেছে!  এর চেয়েও বড়কথা এক বাস্তবতা সম্ভবত হবে এরকম যে  দুই থেকে দশদিনের মধ্যে হাসিনা চীনের সাথে  চুক্তি আলাপ আলোচনায় বসে যাবে। মানে যেতে হবেই মূলত এজন্য যে এর মুখ্য কারণ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তলানিতে, মোটা আর নগদ ডলার লাগবে। পাঠকদের কাছে চীন ভাল না মন্দ, চীন পছন্দ করেন কিনা এসব বিবেচনা এখানে একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, গুরুত্বহীন। বাস্তবতা হল, এমন নগদ অর্থ (প্রজেক্ট-প্রকল্প নয়) দিবার সম্ভাব্য দাতা যাদের কাছেই একমাত্র হাসিনার একসেস আছে, চাইতে পারে ও তারা দিতেও পারে সেটা হল চীন।
    এককথায় বললে, বাংলাদেশে নির্বাচন নামে কিছু একটা হয়েছে আর হাসিনা তাতে নির্রচিত বলে দাবি করতে পারলেই, হাসিনা চীনের কোলে শক্ত হয়ে বসে যাবার সম্ভাবনা প্রায় ষোল আনা!  এবং ইন্ডিয়ার তোয়াক্কা না করে, চীন একে পায়ের নিচে রেখে হাসিনার থেকে সবকিছু আদায় করে নিবার এরচেয়ে ভাল সুযোগ চীন আগে কখনই পায় নাই। এই অবস্থাটা তৈরি হবে সেখানে অবলীলায়! অনেকটা টিকা-ইস্যুতে যেমন হয়েছিল!  অতএব এখন ইন্ডিয়ার কানে পানি গেছে! কিন্তু তার কিছু করার নাই!

    ফলাফলঃ তাই সুবীর ভৌমিক মানে ইন্ডিয়া বা রএর অবস্থান হল তাই হাসিনার নির্বাচন হয়ে যাকে  তারা এর বিরোধী!  সবচেয়ে তামাশার কথা ২০২১ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশে আমেরিকার অবরোধ দেওয়ার বিরোধীতা করে গেছে, হাসিনা তাদের কত পেয়ারের বা হাসিনা ছাড়া বাচবে না – এনিয়ে তারা নাকি কান্না প্রদর্শন করে গেছে। মানে এতদিন তারা একটা প্রহসনের নির্বাচনেরই পক্ষে দ্বিধাহীন সমর্থক ছিল এটাই প্রকাশ্যে স্বীকার ও লিখে বলে করে চলেছিল। অথচ এখন উলটা?

    একটা তামাসা দেখেনঃ
    ভারতের গোয়েন্দা-গুষ্টির সবাইএখন যারপরনাই হাসিনার নির্বাচনবিরোধী! কিন্তু  সেটা কেমনে কী?
    সুবীর ভৌমিক এলেখায় আমাদেরকে আরেক ভারতীয়ের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। যা্র নাম শুখরঞ্জন দাসগুপ্ত [ Sukhoranjan Dasgupta ]। একে তিনি পরিচয় করিয়েছেন এক Bangladesh analyst বলে। আসলে তিনি অনেক পুরানা মানে সেই শেখের আমলের ‘র’-এর এজেন্ট। যখন তার বাইরের পরিচয় ছিল তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার ঢাকার সংবাদদাতা। পরে তিনি আনন্দবাজার ছেড়ে দেন আর কেবল ‘র’-এর এজেন্ট-ই থেকে যান। বাংলাদেশ তার খবর সোর্স এমন সংগ্রহের উতস অনেক। তিনি বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ কলাম লিখেন, সাথের মাঝে মধ্যে অন্য অনেক বাংলাদেশি ‘প্রগতিশীল’ পত্রিকাতেও। তার বরাতে এবার সুবীর বলছেন,  “সক্রিয় ও কার্যকর গণতন্ত্রিক চর্চার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বাংলাদেশে ৭ জানুয়ারির যে নির্বাচনটা হচ্ছে তা পুরানা সংসদটা ভেঙ্গে না দিয়ে আর তাতে মন্ত্রী ও এমপিদের  পদাধিকার বহাল থেকে গেছে। ফলে এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তারা প্রভাবিত করার সব সুবিধা সাথে নিয়েই নির্বাচন করছে”।

    এই বক্তব্য (ইংরাজিটা নিচে দেখেন) সুবীর আর সুখরঞ্জনের বাংলাদেশের প্রতি এক দারুণ সার্ভিস!!! যেন আমরা এটা জানতামই না।
    কিন্তু ঘটনা হল, ভারতের গোয়েন্দা-প্রবরেরা এতদিন এটা তারাই জানত না ভান করে চেপে থাকত।  কিন্তু এখন কেন? এই পল্টি দেয়া কেন?
    হাসিনাকে ছাড়া তাদের চলবেই না কিংবা আমেরিকান স্যাংশন্ ভুয়া সেসব কান্না কাটি তারা তাহলে কেন করছিলেন এতদিন?

    “Unlike in most functional democracies, Bangladesh is going into the
    January 7 polls with a prorogued and not a dissolved parliament which
    allows ruling party ministers and MPs to influence the poll process…” – 

    বাংলাদেশের জন্য একটা ভাল নির্বাচন দেখতে চাওয়ার ভারতীয় আকাঙ্খা! তা ভাল কিন্তু এতদিন উলটা গান গেয়ে চলছিলেন আপনারা??? আগে সেটা বলেন।  না। পুণ্যি করলেই কেবল এমনটা দেখতে পাওয়া যেতে পারে!
    যদিও এর নীট অর্থ কী? সেটা হল, বাংলাদেশের নির্বাচন পন্ড হয়ে যাক এটাই এখন বদলে যাওয়া ভারতীয় আকাঙ্খা…! মজা না???

    ঘটনাটা কিছু শুনেছিলাম অনেকেই বলছিলেন, পিটার হাসের ভারত সফরের ঘটনা। সেখানে ভারতের সাথে কোন আনুষ্ঠানিক কিছু ছিল না। আর সেটা প্রটোকলেও পড়বে না। তবে ভারতে পিটার হাস বেড়াতে গেলে এমবেসিতে বড়দিনের ডিনার বলে ২৫ ডিসেম্বরের সামাজিক সাক্ষাত তো হতেই পারে! আর সাথে কথায় কথায় সেখানে কিছু তিক্ত কথাবার্তাও নাকি উঠে এসেছিল। যার প্রসঙ্গ ছিল চীন! ভারতের অভিযোগ বাংলাদেশে ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ দেখা হচ্ছে না; আমেরিকা দেখছে না। অথচ ভারত তো নাকি এক আঞ্চলিক ‘মহারাজা’। তাসি এটা তো তার অপমান! …! শেষে আলোচনা – কে কত চীনবিরোধী তা জানা আছে, হয়ে গেছে –  টাইপের উদাহরণ দেয়ার দিকে নেয়া যায়। আর তা থেকেই ভারত বুঝে যায় সে একা হয়ে গেছে! বাংলাদেশে কোথাও বা বাংলাদেশকে নিয়ে কোথাও তার বেল নাই…! বলা কথাগুলো শুনেছিলাম সম্ভবত ২৮ ডিসেম্বর!  তবে সাবধান কেউ এগুলোকে হুবহু এরকমই হুবহু ভাষ্য হিসাবে নিবেন না। এটা একজন থেকে আরেকজনেরে এভাবে ছড়ানো কথা!  আমিও শুনেছি দেশের বাইরের বক্তা থেকে। তিনিও শুনেছেন আমেরিকান সোর্স থেকে, এভাবে।
    কথাগুলো পরে ভুলেই গেছিলাম। এবার বিবিসির এই রিপোর্টটা পড়ে মনে হচ্ছে পশ্চিমারা এমনি এমনি ইন্ডিয়াকে তান্ডব মানে ঘরের ভিতর হাতি এমন আপদের সাথে তুলনা করে নাই???

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৩ জানুয়ারি   ২০২৪, মধ্যরাত ১২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আমাদের নির্বাচন ও একজন প্রতীম রঞ্জন বোস

    বাংলাদেশের নির্বাচন ও একজন প্রতীম রঞ্জন বোস
    গৌতম দাস
    ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩  রাত ২০ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5ef

            Bangladesh: As elections draw close, India needs to rethink its strategies

    বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে মনে করে এনিয়ে পাড়া-পড়শি বিদেশি বিশেষ করে ভারতের ঘুম নাই। আপ্রাণ খেদমত করে চলেছে, যেভাবে পারে যেন কোনকিছুই মিস না হয়!। এর উপর আছে ভারতের মিডিয়াগুলো তারা গড়ে মনে হয় প্রতিদিন একেকটা করে মন্তব্য আর্টিকেল ছেপে চলেছে। যেসবের হিসাব রাখাও কঠিন! গত ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ তেমনই একজন প্রতীম রঞ্জন বোস [ PRATIM RANJAN BOSE]; তিনি লিখেছেন MONEY CONTROL নামে এক পত্রিকায়। যেটা বিজনেস ইনভেস্টমেন্ট ফোকাস এক ওয়েব পত্রিকা। যাকে বাংলাদেশের খুব কম মানুষই চিনে আবার নামটা বিদঘুটে  ও একটু অপ্রচলিত বলে হয়ত বাংলাদেশে অপরিচিত তো বটেই; আমিও আগে দেখেছি কিন্তু এই প্রথম এর এত ভিতরে গিয়ে খোঁজ নিলাম। কিন্তু সেটা না, এর এই লেখক বরং নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে যে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কলামিস্ট, রিসার্চার ও কনসালটেন্ট!  এসব কিছুর মধ্যে ভারতের প্রেক্ষিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট শব্দটা বড় অদ্ভুত ও বেমানান। ভারতে এখন মিডিয়া ও এর লেখক বলতে বুঝায় যারা জার্ণালিজম ভুলে পেশাদার প্রপাগান্ডিস্ট যারা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে এর ঢোল পিটানোর ওস্তাদ লোক হয়েছে! আর তাই বেশির ভাগ সময়ে দেখা যাচ্ছে যার টাকা আছে বা খোদ মোদি সরকার যে অর্থ বিলায় এরা চোখ বন্ধ করে তা খেয়ে নিয়ে এরই ঢোল পিটায়, প্রপাগান্ডা করে বেড়ায়। এটাকে সাংবাদিকতা মনে করে আবার, স্পেশালিস্ট বলে দাবিও করে।  তাতে ভারতের শেখর গুপ্তার মত সিনিয়র সম্পাদক  হলেও সবার স্বভাব এখন এক; মানে  ‘একই ওষুধ প্যারাসিটামলের’ স্বভাব বৈশিষ্ঠই সকলের! লক্ষ্য যা করেই হোক অর্থ আয় আর খেয়ে পড়ে বৌ-বাচ্চা নিয়ে টিকা থাকাই তাদের জীবন ব্রত!  মোদির পক্ষে সাফাইয়ের চিল্লা দিলে সবচেয়ে বেশী অর্থ মিলে তাই সবার লক্ষ্য এখন সেদিকে! কার উপরে কে যাবের প্রতিযোগিতা!

    তো ভারতের এমন মিডিয়া আসরে কেউ যখন লিখে দাবি করেন তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এটা একটা কাহিনী তো বটেই। এর অবশ্য এক নেগেটিভ মানেও হয় যে বাজারের যারা প্রপাগান্ডা-সওদা কিনবেন এমন কাউকে তিনি যোগাড় করতে পারেন নাই তাই তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা স্বাধীন সাজছেন হয়ত।  সেটা যাই হোক তবে আমরা সেটাও পরীক্ষা করব।

    ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেমঃ
    একটা বিতর্কে প্রবেশ করা যাক!  ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেম – সবার আগে কোনটা  মানুষের বিবেচনায় প্রধান্য হওয়া উচিত? মানুষের এদুইয়ের কোনটার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত? কোনটা বেছে নিব আমরা?  মানে, ধরা যাক কোন দেশ বা মানুষের জন্য  কোন  বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন এক্ষেত্রে দুইটার একটা বেছে নিতে হবে – ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেম – তাহলে আমাদের কী বেছে নেয়া উচিত?  এই মারাত্মক প্রশ্নটা আগে ফয়সালা করতে হবে; খুব জরুরি এটা।

    “দেশপ্রেম” নিয়ে একটু বলে নেই। দেশপ্রেম ধারণাটা প্রবল হয়ে উঠেছিল বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পরে যখন সারা দুনিয়া কলোনিমুক্ত হয়েছিল তখন আমাদের মত দেশের মানুষ স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র (নেশন স্টেট বা Nation State) হয়েছিল। জনগণের শাসনের ব্যবস্থা বলতে রিপাবলিক রাষ্ট্রই বুঝা হত। তবে তা নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র রূপ্টাই রিপাবলিক রাষ্ট্র মনে করা হত। অর্থাৎ কোন না কোন জাতি পরিচয়ের রাষ্ট্র ধারণা ছিল সেটা। আর বলা বাহুল্য সেটা এর বিপরীতে অধিকার-ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা ছিল না। যাই হোক জাতিরাষ্ট্র ধারণার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু বোধের অন্যতম হয়ে উঠেছিল এই “দেশপ্রেম” ধারণা। সে কারণে “দেশপ্রেম” ধারণাকে সর্বোচ্চ জ্ঞানের কথা  বলে জেনেছে-শিখেছে বলে মনে করাও শুরু হয়েছিল তখন। আর দেশপ্রেম-বোধ এটাকে এক উচ্চমার্গের জ্ঞানবোধ মনে করা হয়েছিল। আর এরই ফাঁদে পড়ে তারা এতদিনের ন্যায়-ইনসাফ বোধ যাকে যেকোন জ্ঞানের মুখ্য ও কেন্দ্রিয় বিষয় বলে আমাদের মত দেশের  মানুষ ভাবত যেখানে বাকি সবকিছু এর পরে সেই নীতি – এই ভুল পথে এবার তারা পুর্ব অবস্থান ত্যাগ করা শুরু করেছিল,  তুচ্ছ করে ফেলেছিল।  ফলে এদের চোখে দেশপ্রেম বড় বা প্রধান হয়ে যাওয়া থেকেই বা গণ্য হওয়াতেই ন্যায়-ইনসাফ বোধ পিছনে পরে যাওয়া শুরু হয়েছিল।  আর তারা দেশপ্রেমের চক্করে পরে নিজের বিচার-বিবেচনার উপর ভরসা না করে আবেগ বা দেশপ্রেমের আবেগ – এর ব্যবহার বা কাজে লাগানোর বাটপারীর পথেও রওনা হয়েছিল। আর তাই জাতিরাষ্ট্র মানেই হয়ে উঠেছিল হুশ হারিয়ে আবেগ-সর্বস্ব দেশপ্রেমের জয়গান গাইতে শুরু করা। অথচ যুগ যুগ ধরে একমাত্র ন্যায়-ইনসাফই সমাজকে ভিত্তি দিয়েছে, স্থিতিশীলতা দিয়ে গেছে; তা ভুলে এরা সকলে দূরে চলে যেতে লাগল। যেখানে এই কথিত দেশপ্রেমের জাতিরাষ্ট্র এমনও বলতে শুরু করল যে আমার নিজ ধর্মের অনুসারীদের পক্ষে থাকাই নাকি দেশপ্রেম! অথচ এব্যাপারে ধর্মের ভাষ্য-অবস্হানও হল ইনসাফ! দেশপ্রেম নয়।  আর ওদিকে এই আলগা বুঝের দেশপ্রেমের কারণে, তাতে দেশের সব ধরণের নাগরিক সমান অধিকার, সমাদর (সম-আদর বা ট্রিটমেন্ট) ও সমান মর্যাদার ধারণ আর জায়গা পেল না; আর এসব কথিত দেশপ্রেমিকেরা এথেকে বেখবর থেকে গেল!   অথচ ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে ও ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত ও এমন থাকার নীতিই কেবল একমাত্র এক দেশপ্রেমের রাষ্ট্র হতে পারে। যেখানে দেশপ্রেমকে ন্যায়-ইনসাফের অধীনে রাখতে হবে – এই হল নীতি!  যেখানে ন্যায়-ইনসাফ ছাড়া কোন কিছুকে দেশপ্রেমের ভিত্তি বলে বিবেচিত হতে পারে না।

    ঠিক যেমন, সমাজে গায়ের জোরে কোন ব্যক্তি শক্তিশালী এর ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হতে পারে না আর কোনটা বা কারো কোন কাজটা সঠিক তা নির্ধারণ হতে পারে না। এভাবে সমাজ উঠে দাড়ায় না। একমাত্র ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতেই সমাজ গড়ে উঠতে পেরেছিল, স্থিতিশীল হয়েছিল; এটা আমরা ভুলতে পারি না!
    আমরা শরীরের প্রবাহিত রক্ত কেমন ও কী জাতের কোন পুর্বসুরি জনজীবনের – এই অর্থে রেস [race]  এর বাংলা জাতি। এই অর্থে দুনিয়ার নানা ভুগোলে নানান মানুষ-জাতিতে আমরা অনেক রেস হয়ে দুনিয়াতে আছি। আবার  ধর্ম, সমাজ, কালচার, খাদ্যাভাস, ভাষা ভিত্তিক ইত্যাদির আরেক জাতি ধারণাও আছে যাকে এথনিক [Ethnic] জাতি বলা হয়। এটা আরেক ধরণের জাত-পরিচয়। যে অর্থে আমরা বাঙ্গালী – সেটা আসলে এক এথনিক জাতি পরিচয়। তাহলে এখন কথা হল, আমার বাঙালি জাতির লোকের পক্ষে থাকা মানেই কী সেটা আপনাতেই এক ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে থাকা হবে বা হয়ে যাবে???? কথাটা আরও সোজা করে বললে, বাঙ্গালী জাতিরাষ্ট্রে স্বার্থের পক্ষে থেকে দাঁড়িয়ে দেশপ্রেম দেখানো মানেই কী সেটা ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে থাকা হয়ে যাবে?  না, অবশ্যই না। যেকোন দেশপ্রেমের কথারও আগেই মানে, সবার আগে ন্যায়-ইনসাফের কথা বা বিবেচনাবোধ আসতেই হবে।  কিন্তু এখানে কেন দেশপ্রেমের আগেই ন্যায়-ইনসাফের কথাটা তুললাম?

    ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রতীম রঞ্জন বোস, আসলে কেঃ
    উপরের ন্যায়-ইনসাফ বনাম দেশপ্রেম তর্কটা এনেছিলাম এজন্য যে  প্রতীম নিজেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মানে স্বাধীন বলে দাবি করছে। তাতে তিনি হয়ত মোদির যুগে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়ে যাওয়া মিডিয়া মানুষ নন তিনি – এই যুগেও হয়ত কারও দ্বারা প্রভাবিত নন বা কেউ তাকে কিনে পরিচালিত করছেন এমন না; এই অর্থ সেটা হতেও পারে। কিন্তু এই অর্থেও হয়ত প্রতীম নিজেকে স্বাধীন দাবি করছেন বললেও এই কথাটাও সঠিক না। কেন? কথাটা আরেকভাবে বলি,  এটা সত্যি যে তিনি সুবীর ভৌমিক, আবদি বা চন্দন নন্দীর মত “র”-এর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট খাটা বা নেওয়া ব্যক্তিরা যেমন হয় ঠিক সেরকম লেখক নন হয়ত, এমনই মনে হয়েছে। এই বিবেচনায় হয়ত তিনি স্বাধীন নিজের মতামত-ই লিখেছেন। কিন্তু তিনি দেশপ্রেমি নেগেটিভ অর্থে! যারা ধরে নিয়েছেন দেশপ্রেমের পক্ষে থাকা মানেই তা ন্যায়-ইনসাফ এর পক্ষে নেয়া অবস্থান।  ফলে এদের কাছে কথিত দেশপ্রেম মানেই তা জায়েজ!! এই হল প্রতীম রঞ্জনের এক গভীর ও মূল সমস্যা!

    এমনিতেই ইন্ডিয়া হিন্দুত্ব জাতবাদী এক ‘নেশন স্টেট’ হয়ে আছে জন্ম থেকেই; এর উপর আছে আবার উগ্র-হিন্দুত্ববাদী এক রাষ্ট্র ও সরকার; ফলে এর যেখানে দেশপ্রেম মানেই হিন্দুত্ববাদ ভিন্ন আর কোন ব্যাখ্যা নাই মানে,  এখানে উগ্র দেশপ্রেমের আড়ালে চলা  উগ্র হিন্দুত্ববাদের দেশ এটা – সেখানে এই লেখক প্রতীম রঞ্জন বোস তিনিও দেশপ্রেমের নামে আউড়ালে এর মানে কী দাঁড়ায় পাঠক বুঝে নেন; আর প্রতীম তার সব কাজ জায়েজ করতে এসেছেন দেশপ্রেমের কথা তুলে!!!। বলাই বাহুল্য এটা চরম বে-ইনসাফি ন্যায়ভ্রষ্ট; এই হল মারাত্মক ফারাক! কারণ, তার কথিত দেশপ্রেম যা ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থের পক্ষে থাকার দেশপ্রেম বলে আপাত মনে হয় সেটা আসলে ন্যায়-ইনসাফের তোয়াক্কা না করা এক অন্ধ বিপদজনক দেশপ্রেম। এককথায়, ভারতের স্বার্থের পক্ষে থাকা মানেই দেশপ্রেম তাতে, এতে ন্যায়-ইনসাফের লেশমাত্র না থাকলেও তা জায়েজ! এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এলেখা লেখা হয়েছে!

    লেখা কলামের পর্যালোচনাঃ
    প্রতীমের এই লেখার শিরোনাম বাংলা করে লিখলে – “বাংলাদেশঃ এর নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, ভারতের উচিত নিজ অনুসৃত কৌশল পুনর্বিবেচনা করা” [Bangladesh: As elections draw close, India needs to rethink its strategies]।  আমাদের মানবজমিন (২২ ডিসেম্বর ২০২৩) অবশ্য এর একটা অনুবাদ ছেপেছে, শিরোনাম – বাংলাদেশে নির্বাচন আসন্ন, ভারতকে তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

    শুরুতেই প্রীতম তার লেখার এক সারসংক্ষেপ নিজেই লিখেছে এভাবেঃ “
    ভারতের এই পুবের পড়শি (মানে বাংলাদেশ) একটা নিখুঁত ফ্রি-ফেয়ার নির্বাচন-ই করতে হবে এমন গোঁ ধরা ধ্যান-জ্ঞানের দেশ কখনই ছিল না। তার মানে আবার এও নয় যে এখানে নির্বাচনকে একটা ধারাবাহিক ঠাট্টা বানায় ফেলতে হবে তা নয়। তবে এটা জানা বেশ উতসাহের হবে যে ঢাকার আজকের উপস্থিত পরিস্থিতি এটা কীভাবে ভারতের স্বার্থের পক্ষে এখন যাচ্ছে ও আগামিতেও যাবে। Holding a free and fair election was never a virtue of India’s eastern neighbour. But elections had never been as consistently farcical either. It would be of keen interest to know how the prevailing scenario in Dhaka had been helping and would help the Indian cause.

    উপরে প্রীতমের শেষ বাক্যটা লক্ষ্য করা যাক। লিখেছেন, ঢাকার আজকের উপস্থিত পরিস্থিতি এটা কীভাবে ভারতের স্বার্থের পক্ষে  এখন যাচ্ছে ও আগামিতেও যাবে। কিন্তু এমন যাওয়াটা কী ঠিক? ন্যায়সঙ্গত বা ইনসাফের? না, সরি। প্রীতম এদিকে উতসাহী নন একেবারেই। বরং  প্রতীম এটা ভারতের স্বার্থের দিকেই যাচ্ছে তাতেই চরম আহ্লাদিত!!! আর এটাকে ভারতের অন্যায়ের স্বার্থমুখী করে নেয়া হয়েছে কীভাবে ও তা কারা করেছে তা নিয়েও প্রতীম মোটেই উতসাহী হয়। তার কাছে নিজ দেশপ্রেমের স্বার্থই পরম!! সবার উপরে; আর বাকি সব মিথ্যা!
    এমনকি গত ২৮ ডিসেম্বর মোদির আরেক চ্যালা শুভজ্যোতি ঘোষ, ভারত কী করে গত ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের তিন নির্বাচনে  অন্যায়ের পক্ষে থেকে বাংলাদেশকে ক্রিমিনালের মত লুটেছে তা বিবিসিতে এক লেখায় বেপরোয়াভাবে লিখেছে। দেখুন এখানে, বাংলাদেশে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ভারতের যে ধরনের ভূমিকা ছিল। ভারত যে  ক্রিমিনাল অপরাধীর মত লুটেছে সেটা খোদ শেখ হাসিনাও মনে করেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি ভারতকে কী না দিয়েছেন (মানে তবু তিনি প্রতিদান পাননি), এটা ভারত একদিন বুঝবে (মানে আপসোস করবে)।  কিন্তু একালে প্রতীম সেসব ঘটনাবলী-ইতিহাস নিয়ে মোটেও আগ্রহি না। তাঁর দেশপ্রেমের চোখে তিনি দেখছে – নিজ দেশ পেয়েছে, পেয়ে যাচ্ছে পেয়েও নাকি যাবে। এসবই তার কাছে সুপ্রীম – ফলে ন্যায়-ইনসাফ আবার কী!!

    প্রতীম সাফাই দিতে বলছেন, “মোট ২৯ টা দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে” (বলতে চাইছেন, সুতরাং এটা নিশ্চয় নির্বাচন হচ্ছে) আর বলছেন তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি অংশ নিচ্ছে (বলতে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাহলে তো আর কথাই নাই) “A total of 29 parties including League and a faction of the third-largest, Jatiya Party, will contest the election.”। কিন্তু তিনি এখানে যা লুকালেন তা হল এই কথিত তৃতীয় পার্টিকে (এরশাদের জাতীয় পার্টি) বিরোধীদল হতেই হবে সেটা সাজিয়ে দিয়ে গেছিল ২০১৩ সালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। আর বাংলাদেশের উপর ভারতের এই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ এই  তথ্য বিবিসির শুভজ্যোতিও স্বীকার করেছেন। কিন্তু প্রতীম মহাশয় মনে হচ্ছে তবু তা জানতেই পারেন নাই!  আর সেঘটনার পুনরাবৃত্তি এবারও হয়েছে। এরশাদের ভাই এখনকার জাপা নেতা কাদেরও ভারত থেকে ফিরে সে ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলেছিলেন।  আর অনেক নাটক করে শেষে নির্বাচনে সঙ্গি হয়েছেনও। কিন্তু খুব সম্ভবত এবার তিনি অতি চালাকি আর নাটক করতে গিয়ে ধরা খাবেন, দেখা যাক! কিন্তু প্রতীক মহাশয়ের চোখে সবই ভারতের সাফল্য!!

    প্রতীমের পরের প্রসঙ্গ আর্মিঃ
    সামরিক আর বেসামরিক শাসন নিয়ে তুলনা আর শেষে খোদ যেকোন প্রকারের বেসামরিক শাসনের পক্ষে রায় দেয়া – এই চাতুরি বয়ানের  চর্চা চালু করে গেছিলেন প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান (এখন মারা গেছেন)। তিনি নিজেই একালেও বাকশালের পক্ষে কথা বলতে লজ্জা পেতেন না, এতই অবুঝ বাকশাল-প্রেমি ছিলেন। আসলে, তখন রাষ্ট্রটাকেই নাই করে দেয়া হয়েছিল এমন কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হয়েছিল; যেটাকে আমরা বাকশাল বা চতুর্থ সংশোধনী বলে চিনি। মিজানুর বলতেন রাজনৈতিক দলের এই কান্ডটাও জায়েজ কারণ তা মুজিবের বেসামরিক শাসন সেটা করেছিল।  মানে তুলনায় সামরিক শাসন সেটা খুবই খারাপ!

    এই বক্তব্য শঠতাপুর্ণ বা চাতুরির। সাধারণভাবে বাংলাদেশে –  রাজনীতি জিনিষটা কী এনিয়ে চিন্তা-বোধ এর বিকাশ খুবই দুর্বল। এর পিছনের প্রধান কারণ সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলতা ধারণা।  সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলরা মনে করেই তারাই নাকি সবচেয়ে অগ্রসর ধারণা। কাজেই রাষ্ট্র-রাজনীতি কী সেটা জানার দরকার নাই, এগুলো তো পশ্চাতপদ, ডানপন্থি বা বুর্জোয়া ধারণা। অথচ  যারা মৌলিকভাবে রাজনীতি-রাষ্ট্র জিনিষটা কী, রিপাবলিক ধারণাটা কী এসবনিয়ে নুন্যতম ধারণা জানা-বুঝার আগেই সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীল হয়ে গিয়ে এমন আত্মঘাতি হয়ে আছেন। অবশ্য সেটা এমন হয়ে যাবার যুগও ছিল, সেটা অন্তত গতশতকের শেষ অর্ধেক জুড়েই (১৯৪৫-২০০০) মৌমাছির মত সেকালের তরুণদেরকে টেনেছিল। সোভিয়েত পতনের পরে এটা আর টিকে থাকতে পারে নাই। নিজ-অযোগ্যতায় এর জোশের সিংঘভাগই এখন খামোশ হয়ে গেছে।  কিন্তু আমাদের বেলায় যা ক্ষতি করে দিয়ে যাবার তা ঘড়েগিয়েছিল। এরই প্রমাণ হল, বাকশাল সম্পর্কে – কেন বাকশাল আপত্তিকর তা হল তা নিয়ে প্রকাশিত ধারণা গুলোকে দেখেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট বা ইসলামিদল গুলোর (পরে এরা বিএনপি করা শুরু করলেও) সবার মুখে মুখে সেসময়ের বয়ান হল যে, এটা একদলীয় ব্যবস্থা আর চারটা সংবাদপত্রের শাসন; এটাই মুখ্য অভিযোগ। এই হলো আমাদের বুঝ ও সমালোচনা। অথচ রিট [writ] কী আমরা খবর নেই নাই, জানি না। একটা কনষ্টিটিউশনে যদি রিট করার সুযোগ না থাকে তাহলে কী ক্ষতি; কী আসে যায় আমরা জানি নাই। সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলতার এতই দৌরাত্ম! বাকশাল সংশোধনী আমাদের কনষ্টিটিউশন থেকে রিট করার সুযোগ তুলেই দিছিল – তা আমরা বাকশালবিরোধীরা কেউ টের পাইনি!

    মানে? মানে হল – রিট কথাটার সোজা মানে হল যে কোন কনষ্টিটিউশনের মুখ্য বা কেন্দ্রীয় বিষয় বা জায়গা হচ্ছে নাগরিকের মৌলিক অধিকার আর তার রক্ষাকবচ কিসাবে কী রাখা হয়েছে সেসব অংশগুলো। আমাদের কনষ্টিটিউশনের এটাই তৃতীয় অধ্যায়। এখন নাগরিকের প্রাপ্য মৌলিক অধিকার যদি সরকার বা কনষ্টিটিউশন প্রণেতারা রোধ করে দেয় বা রোধ-কারী কোন আইনই সংসদ পাশ করে দেয় তাহলে প্রতিকার হিসাবে নাগরিকের কী করার আছে? আইডেয়েলি বললে, নাগরিক তখন অধিকার হারানোর বিষয়টা হাইকোর্টের নজরে আনতে পারে। এটাই সব সৎ কনষ্টিটিউশন প্রণেতারা স্কোপ করে রাখেন। এভাবে আদালতের এই নজরে আনা বা প্রতিকার চেয়ে নালিশ দেয়াটাই রিট করা। পরে আদালত ঐ নালিশের শুনানিতে একমত হলে এরপর আদালত সরকারকে বাধ্য করতে আদেশ দিতে ক্ষমতা রাখে। এমনকি সংসদে পাশ করা কোন আইন তৈরি হয়ে গেলেও তা বাতিল ঘোষণা করে দিতে পারে। এই হল, খুবই সংক্ষেপে রীটের সারকথা।
    আর আমাদের ঐ বাকশাল সংশোধনীর আগের কনষ্টিটিউশনে দুই জায়গায় আলাদা করে এমন রীট করার অধিকার দেয়া ছিল। প্রথমটা নাগরিককে দেয়া তাদের যেকোন ইস্যুতে রীট করার অধিকার হিসাবে। আবার একইভাবে ১০২ অনুচ্ছেদে উচ্চ-আদালত (হাইকোর্ট ও এর উপরের) সকল বিচারককে রীট শুনবার অধিকারও পরিস্কার ও আলাদা করে দেয়া ছিল। আর গুরুত্বপুর্ণ কথা হল ২৫ জানুয়ারী ১৯৭৫ সালে পাশ হওয়া চতুর্থ সংশোধনী বা বাকশাল সংশোধনী রীট সংক্রান্ত এদুই অধিকারকেই হয় বিলুপ্ত বা স্থগিত করে রেখে দিয়েছিল। ফলে বাকশাল চালুর পরে দেশে কারও পক্ষেই আর রীট করা বা রীট শোনার আর কোন বালাই এক্তিয়ার থাকে নাই।

    মজার কথা হল পরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে জিয়াউর রহমান  তিনিই নাগরিকের রীট করা ও আদালতের তা শোনার অধিকার ফিরে কায়েম করেছিলেন – সেকালের সিনিয়র এডভোকেট বা সাবেক বিচারকদের পরামর্শে জিয়া একাজ করেছিলেন। তিনি এই মর্মে এক প্রেসিডেন্সিয়াল অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। এখন পাঠকেরাই বলেন বা ভাবেন বেসামরিক শাসন ক্ষমতার জোরে বাকশাল সংশোধনী জারি করা নাকি সামরিক শাসনের ক্ষমতাবলে (যা আবার পরে পঞ্চম সংশোধনীতে জায়েজ করে নেয়া) রিট করার অধিকার ফেরত দেয়া কোনটা জায়েজ বা কোনটা তুলনায় ভাল ও সৎ পদক্ষেপ?

    তবে আমাদের এই আলোচনার জন্য মুখ্য ইস্যু হচ্ছে এটা বুঝতে পারার যে নাগরিকের রিট করার অধিকার কেন ফান্ডামেন্টাল? কেন রিটের অধিকার না থাকার মানে সেটা  আর কোন রাষ্ট্র-ই না; বরং কার্যত তা এক রাজতান্ত্রিক শাসন, সেটা আর রিপাবলিক বা জনগণের ক্ষমতার শাসন নয়!   অথচ সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীল মন ও শিক্ষা আমাদের টেরও পেতে দিল না যে বাকশাল সংশোধনীতে বাংলাদেশ এই স্বাধীন রিপাবলিক খোদ রাষ্ট্রটাই নাই হয়ে গেছিল। এমনই সমাজতন্ত্রী বোদ্ধা সব একেকজন!  বাকশাল-কে গালি বানাতে পেরেছি কিন্তু রাষ্ট্র-রাজনীতি-জনগণ এসবের অর্থ আজও ঠিকমত বুঝি নাই! এনিয়ে আমার অনেক পুরানা একটা লেখা আছে। লেখাটা এখন খুঁজে পেয়েছি যার শিরোনাম ছিল – “পঞ্চম সংশোধনী বিতর্ক”। লিঙ্ক এখানে।  আর সেটা সেই ২০১০ সালে লিখেছিলাম। [আর ২০১০ সালে আমি তখনও জাতিসংঘে কর্মরত। আর ওয়ার অন টেররের পরে আমাদের একটা ইন্টারনাল সার্কুলার হয়েছিল যে আমরা যিন কোন রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে না জড়াই, মতামত না রাখি। রাখলে এর পরিণতি হবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেশে ফিরার টিকিট হাতে ধরিয়ে দেয়া। তাই আমি বেনামে ফিদা হাসান নাম নিয়ে লিখেছিলাম এই লেখাটা] এখনই সেই পুরানা লেখাটার একটা লিঙ্ক এখানেও পারেন।
    । সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটা লেখাও পড়তে পারেন আগ্রহিরা। এটা ২০১৭ সালে লেখা – প্রথম আলোর রাজনীতির একটি ব্যবচ্ছেদ। এটা আমার লিজের নামেই লেখা।


    কিন্তু এর সাথে প্রতীম রঞ্জনের কী সম্পর্ক?

    তিনি লিখেছেন, “Army was at the helm in Bangladesh between 1975 and 1990.”। বাংলা করলে, “১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালের দিকে বাংলাদেশে আর্মি সব ক্ষমতার শীর্ষে ছিল!”।  এই বাক্যটা মিজান খানের বাকশালী সামরিক বনাম বেসামরিক এর মধ্যে কোনটা তুলনায় ভালো এই চাতুরির ধারণা লুকিয়ে আছে। বেসামরিক শাসন হলেই একে ভাল বলতে হবে – এটা একেবারেই শঠতার এক বক্তব্য! সেজন্যই উপরে দেখালাম, বেসামরিকতা দিয়েই [বেসামরিকতা মানেই যেন এক পবিত্র ক্ষমতা] একটা জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে নাই করে দিয়ে একে রাজতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারি শাসন বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এই মিজান এন্ড বাকশালী গং আমাদেরকে বেসামরিক শাসনের পবিত্রতা শিখাচ্ছে! আর একালের প্রতীম মহাশয়ও আমাদের সেই সামরিক শাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    এমনিতেই সেকালের সোভিয়েত-মার্কিন [ সেটা ছিল ব্লকের যুগ মানে  দুই দেশের দুই ব্লকের সদস্য হওয়ার যুগ] বা কোল্ড ওয়ারের যুগে (১৯৫৩-৯১)। আমাদের মত দেশে আমেরিকা মাস-পপুলার লেবেলে  সোভিয়েত প্ররভাবের সাথে না পেরে সামরিক শাসন জারি করে আমাদের মত দেশগুলোর উপর নিজ সব ধরণের প্রভাব জারি রাখত। তাই সামরিক শাসনের সরকার ছিল প্রধান ফেনোমেনা। আবার আমাদের বেলায় ছিল আরেক সমস্য। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পৌছানো কখনই হত না যদি না আমরা সেই সময়ে স্পষ্ট করে সোভিয়েত ব্লকে যোগ না দিতাম! আবার এতে কমিউনিস্ট গিরি সমাজে রাজনীতিতে বেড়ে যাওয়াতে স্বাধীনের পরের সাড়ে তিন বছর কথিত সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি করতে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম। আর তাজউদ্দিন এন্ড গংয়ের এই প্রচেষ্টাইয় গিয়ে তা শেষে এমন পরাজয় ও ব্যর্থতা আসলো যে দুর্ভিক্ষে মানুষ মারলাম। আবার দুর্ভিক্ষের জন্য একে-তাকে দোষ চাপালাম। আবার অন্যদিকে কোন রাষ্ট্র একবার সোভিয়েত ব্লকে ঢুকলে তা থেকে বের হওয়া বিরাট খেসারত, বিরাট মুল্য চুকাতে হয়। আমাদের বেলাতেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। শেখ মুজিব আমাদের সোভিয়েত ব্লক থেকে বের করার ব্যবস্থা করে গেছিলেন কিন্তু তা দেখে যাবার আগেই জীবন দিয়েছিলেন। এই ছিল আমাদের সত্যিকার ১৯৭৫।  যা সবদিক থেকে দেখে ব্যাখ্যা করতেই হবে কারণ পুরা ফেনোমেনা-ঘটনাটা নেহায়তই কোন সামরিক শাসনের প্লট নয়! এটা শ্রেফ একটা সামরিক শাসন জারি করার মামলা একেবারেই নয়!
    আর ১৯৯০ সাল বলে – যেটা বলছেন সেটা আসলে এরশাদের ১৯৮২ সালের সামরিক ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই ক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাংকের আমাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার। ফলে এটাও কোন সামরিক প্লট না। যা সামরিক শাসন খুবই খারাপ বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না।  সেই আশির দশকের শুরুতেও আমাদের দেশে কমিউনিস্ট প্রভাব যথেষ্ট ভারি ছিল। বিশেষত ট্রেড ইউনিয়নে আর রাজনৈতিক কালচারে। যেমন প্রায় সব উতপাদন ছিল সরকারি মালিকানায়। যেকোন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার মানেই প্রথম পর্যায়ে শ্রমিক বা কর্মি ছাটাই হবেই। কিন্তু সংস্কারের বা ঢেলে সাজানোর পরে কত মানুষ চাকরি পাবে সেটা দিয়ে এর সাফল্য মাপতে হবে।  শুধু শ্রমিক ছাটাই হচ্ছে কেন তা দিয়ে নয়! এখন বাংলাদেশে সংস্কারের কাজে নামলে বিশেষত বিশ্বব্যাংক একাজে কমিউনিস্ট চাপে (বিশেষত ছাটাই ইস্যুতে) পড়তে পারে যেটা তারা মুখোমুখি হতে চায় না। তাই আগে সামরিক শাসন জারি করে নিয়ে সংস্কার কাজ শুরু করতে মনস্থ করেছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। তাই এরশাদের ক্ষমতা দখল। নিশ্চয় এরশাদ এত বুদ্ধিমান ছিলেন না যে প্রশাসনিক সংস্কার (পপুলারলি উপজেলা) তার মাথা থেকে বের হয়েছে!
    এখন এখানে এতসব দিককে আপনি স্রেফ সামরিক লোকেরাই সবকিছুর নষ্টের গোড়া বলে বাহাদুরি-গাথা গাইতেই পারেন! অজ্ঞতায় কতকিছুই না দাবি করে ফেলা যায়!
    আর কিছুই না-বুঝে  প্রতীম রঞ্জন বোস এসব  সামরিকবিরোধী বাহাদুরি-গাথার পাল্লায় পড়েছে। আসলে এতে বুঝা গেল ভারতের ১৯৯০ সালের আইএমএফের সাথে ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের ঘাটতিতে পরে তা মোকাবোলায় সেখান থেকে কেন ভারতকে সংস্কারের পথে যেতেই হয়েছিল এসব নিয়ে প্রতীম রঞ্জন বোস এর কোন স্টাডি অনুমান কিছুই নাই। এমনকি এখনও এই মোদি আমলে ভারতে আরও অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা উঠছে কেন; সেটা কখনও তিনি আমল করেন নাই বলেই মনে হয়।
    অথচ তিনি এসেছেন গাধা-বোকাদের সামরিক-বেসামরিক তর্কে প্রবেশ অরে এনিয়ে কথা বলতে!!!

    চীনা প্রসঙ্গঃ
    প্রতীম রঞ্জন বোস খুবই নাদান কিসিমের তাই যেসব ইস্যু নিয়ে তিনি কথা তোলার যোগ্য হন নাই, সাবজেক্টটা বুঝতেই শেখেন নাই তা নিয়ে তিনি কলাম লিখে ফেলায়ছেন। তার আপত্তি হল, বাংলাদেশে চীনের গুরুত্ব কেন ভারতের নাই কেন?  অথচ উনি কী জানেন  একই ভাবে খোদ ভারতের চীনের গুরুত্ব আছে, দেয়া হয়? যে জানে সে দেয়! কিন্তু চীনের গুরুত্ব কথার মানে কী?

    এটা কেউ চীনকে বেশী ভালবাসে বলে দেয় ব্যাপারটা কী সেরকম?
    একেবারেই না। চীনের গুরুত্ব কথার সিধা মানেটা হল, আমাদের মত দেশ (এমনকি ভারতেও) অবকাঠামো খাতে একালে ঋণ দেবার সক্ষমতা একমাত্র চীনের আছে। যা সমতুল্য আমেরিকারও নাই।  তবে এটাই আমেরিকারও ছিল। সেকারণেই একালে চীনের এই গুরুত্ব। এখন প্রতীম কী জানেন ভারতেও চীনা এমন অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ছিল? বিশেষত ২০১৪ সালে মোদি প্রথম ক্ষমতায় আসার পরে! কোথায় সেসব প্রকল্পগুলো, তাদের কী হল? সেগুলো বাতিল করে দেয়া হলে সেই সরকারি ঘোষণাটাই বা কই? রেল ব্যবস্থা আধুনিকিকরণ, স্টাফ ট্রেনিং সহ যে চীনা প্রকল্প ছিল তা এখন কোথায়? আগামিতে ভারতে আরো প্রায় পঞ্চাশটা শহর গড়ে উঠতে যাচ্ছে। সেগুলোর অনেকগুলোই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার অবকাঠামোগত বিনিয়োগের দায়ীত্বে চীনের যাবার কথা হয়েছিল সেগুলোই বা কোথায়? এর সব তথ্য নেট থেক সরায় নেয়া হয়েছে কেন? গৌতম আদানিরা চীনা লোন (হংকং থেকে এনেছে বলে চালিয়ে দিয়ে) বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে সেই  বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করে এবার ভারত নিজেকে চীনবিরোধী দাবি করছে? এতে করে লাভ কি?
    এখন ভারত কী অবকাঠামো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বি? নাকি ভারত নিজেই অবকাঠামো ঋণের এখনও খাতক?  কাজেই এসব সম্পর্কে নুন্যতম ওয়াকেবহাল না থেকে এক দেশপ্রেমিক ভারতীয় সেজে বাংলাদেশে সব ইস্যুতে চীন কেন – এই প্রশ্ন করা মানে বুঝিয়ে দেয়া যে আপনি ইস্যুই বুঝেন না, আর আপনার কাছে নুন্যতম তথ্যই নাই।

    তিনি লিখেছেন,
    Despite all the drumbeating about bilateral co-operation, the last five years were marked
    by unprecedented consolidation of Chinese interests in Bangladesh while Indian interests suffered.

    সারকথায় বললে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশে চীনা স্বার্থ কেন উপরে আর ভারতের স্বার্থ কেন নিচে? প্রশ্নটা তিনি তুলছেন অবকাঠামো প্রসঙ্গে। তবু প্রথম কথা হল, বাংলাদেশ এমনকি হাসিনার বাংলাদেশে তিনি কাকে বেশী গুরুত্ব দিবেন ভারত না চীনকে – এটা নির্ধারণের এক্তিয়ার তো হাসিনার?  নাকি না?  প্রতীম মহাশয় তিনি কী বলতে চাইছেন হাসিনা ভারতের দালাল তাই তিনি ভারতকে চীনের উপরে দিচ্ছেন না কেন? এরকম?
    আসলে এসব কথা নিয়ে নিজেকে ইন্ডিপেডেন্টে বুঝানো যায় না! বরং এসব ইস্যু নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে নিজে কতটা অযোগ্য তা বুঝা যায়!  আমরা কেবল এতটুকু বলতে পারি এই নির্বাচন যদি হয়েই যায় তখন ভারতের কী দুর্দশা হয় সেটা নিয়ে বরং মুরোদে কুলালে প্রতীম মহাশয় ব্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন। কারণ, এটাই সম্ভবত হট-কেকে হয়ে উঠতে যাচ্ছে!

    ভারত কেন বাংলাদেশে কখনই পপুলার নয়ঃ
    সবক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যা প্রতীক মহাশয় ডিল করলে পারেন না সেসবেই তার আগ্রহ!   এভারেজ এক ইন্ডিয়ানের মত তাঁরও পুঁজি হল কেবল এক উগ্র দেশপ্রেম? থচ columnist, researcher, and consultant.এর আকাঙ্খা রাখেন? সেকাজে তো নুন্যতম সমাজতত্ব, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতির পাঠ থাকতে হবে, নাকি? অথচ তিনি বলতেছেন,

    … India was never popular in Bangladesh, not even in December 1971, when Delhi
    became a party to their Liberation War. This is largely due to religious differences
    that were the prime inspiration behind the creation of Pakistan.

    এটা কী কোন গবেষকের বক্তব্য হতে পারে? যোগ্য? বলছেন ১৯৭১ সাল থেকেই ভারত কখনও বাংলাদেশে পপুলার ছিল না। ভালকথা, কিন্তু কেন? এর একটা বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন ব্যাখ্যা করেন তাহলে! কিন্তু না। এই মহা বিদ্যান লোক ফতোয়া দিলেন এক মহা আবিস্কারের যে নাকি ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে ভারত বাংলাদেশে পপুলার না! কান্ড দেখেন, প্রতীম রঞ্জন মফস্বলের চা দোকানের বেঞ্চিতে বসা আলাপ তুলেছেন তিনি!!!
    সাধারণভাবে বললে, প্রায়ই এই প্রশ্নটা সামনে চলে আসে যে ভারত আমাদের সাহায্য করতে আসার উসিলায় নিজের স্বার্থ হাসিলে ততপর। এখন এমন প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক। তাই আগাম এমন বুঝাবুঝি যেন না উঠে আসা তা নিয়ে সতর্ক থাকা। কিন্তু তা তো হয় নাই। বরং সব জায়গায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রতিশোধ নিবার বাসনা প্রকাশিত হয়েছে যেন! আর সবচেয়ে খারাপ কাজটা করেছেন ইন্দিরা গান্ধী! তাঁর তো অন্তত এমন কিছুই করা উচিত না যেটা ভারতের নিজের ক্ষতি ডেকে আনবে। অথচ তিনি তাই করেছেন। কেন তিনি হবু বাংলাদেশ কী হবে কী পরিচয় তা নিয়ে এমন সব ধারণা ব্যবহার করেছেন যা ভারত নিজেই নয়। যেমন কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি হয়ে হবে হবু বাংলাদেশকে! কিন্তু কেন?
    তারচেয়েও বড়কথা খোদ ভারতই তেমন কোন রাষ্ট্র নয়; আর এর কথার বেশির ভাগই অর্থহীন!  অথবা যা বলছে ওর ব্যবহারিক রূপটা এর উলটা। বরং সারকথায় বাংলাদেশ ৯০ ভাগের মত মুসলমান জনসংখ্যা। এখন কী বলে কী করে ঈই মুসলমান পরিচয় দাবিয়ে রেখে দেয়া যায় এই ছিল ইন্দিরার সব কসরতের মূল্কথা! অথচ সবচেয়ে বড় অসংগতি হল খোদ ভারত-ই তো হিন্দুত্ব বা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের দেশ হয়ে আছে যে পথ  কংগ্রেস নিয়েছে সেই ১৮৮৫ সাল থেকে! তাহলে হবু বাংলাদেশের ভারতকে অনুসরণের সুযোগ বাস্তবতা কোথায়?

    আসলে কথা একটাই জমিদার আমল থেকেই জমিদার-হিন্দুদের মুসলমানদের উপর আধিপত্যের আকাঙ্খার শুরু সেই নীতি সব জায়গায় থেকেই গেছে। মূল সমস্যা আধিপত্য – রাজনৈতিক বা সাংস্ক্ররতিক আধিপত্য ভারতকে বা জমিদার হিন্দুদেরকে করতেই হবে বা পেতেই হবে – এটাই রূপ সমস্যা। অথচ সকলেই আম=বার ব্যভারিকভাবে বুঝুক না বুঝউক   এক রিপাবলিক রাষ্ট্রই গড়তে গিয়েছে। যার সারকথা হল, নাগরিক সাম্য। মানে এক জনগোষ্ঠির অপরের উপর আধিপত্য করা বা সুযোগ নেয়া নয়। বরং আধিপত্যের উলটা, এক নাগরিক সাম্য। যেটা সেকালের না ইন্দিরা বা কোনকালে খোদ কংগ্রেস বুঝতেই পারে নাই। একেবারে প্রতীম রঞ্জন বোস পর্যন্ত একই গান চলছে!

    যা হোক, এই গল্প-কেচ্ছার শেষ নাই। কেবল আমাদেরকে আমাদের মত থাকতে দেক, এটাই কাম্য!

    প্রতীম রঞ্জনের সবচেয়ে বিরক্তিকর কান্ডটা হল, তিনি শিরোনামে বলছে ভারতকে নিজ স্ট্রাটেজি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অথচ তিনি পরিস্কার বলতেই পারলেন না বদল করে কোথায় নিবে? মানে চাপাবাজির ভাবসাব আরকি!!!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ    ৩০  ডিসেম্বর ২০২৩,   দুপুর ১২ঃ ৩৬

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়

    প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়
    গৌতম দাস
    ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৩১
    https://wp.me/p1sCvy-51v

     

     

     

                         PROGRESSIVE LOGO

    শুধু প্রগতি [progress] শব্দটার একটা অর্থ অগ্রগতি। মানে, কোন একটা কিছু আগাচ্ছে কিনা, ভাল হচ্ছে কিনা, উন্নত হচ্ছে কিনা, ইতিবাচক রূপান্তর হচ্ছে কিনা ইত্যাদি এমন অর্থে।  এছাড়া শব্দটা মানুষের উপর প্রয়োগ-ব্যবহার করতে চাইলে মানে মানুষের গুণ-বৈশিষ্ট হিশাবে ব্যবহার করতে চাইলে রুট শব্দটা একটু বদলে লিখি প্রগতিশীল [progressive]।  এর একটা সাধারণ অর্থ হতে দেখা যায় যে যিনি সংস্কার চান মানে, রক্ষণশীল [conservative] নন বা পুরানাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান না, এমন অর্থে। তবুও আমরা যে প্রগতিশীলতা খুঁজছি এগুলো তা না।   কারণ, আমরা এখানে খুঁজছি রাজনীতির মাঠে বা পাড়ায় প্রগতিশীল বা প্রগ্রেসিভ চিন্তা বা দল বলতে ঠিক কী বুঝায় তা বুঝতে।
    সবার আগে জানিয়ে রাখি প্রগতিশীল শব্দটা আবার একেক ভৌগলিক ইতিহাস ভেদে অর্থের ভিন্নতাও আছে। আমাদের অনুসন্ধান ভারতীয় উপমহাদেশ বা অখন্ড বিবেচনায় ভারতের ভুগোলে মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে আলোচনা।  এর বাইরে বৃটিশ কালচারে একালের আলোচনায় রক্ষণশীলেরাও প্রগতিশীল হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। যেমন, বিবিসির তবে (ইংরাজি বিবিসি) এর এক রচনার শিরোনাম হল, So, what exactly is ‘progressive’ in politics? এরকম! আর সেখানে …while the Lib Dem/Conservative coalition were “new progressives”. এমন বাক্যও পাওয়া যাবে। [এখানে Lib বলতে Liberal এর সংক্ষিপ্ত রূপ আর Dem বলতে Democrat বুঝতে হবে ]। স্বভাবতই এগুলো ব্যতিক্রম বা সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রকাশিত অর্থ, এভাবে বুঝতে হবে। তবে আমরা এত জটিলতায় না গিয়ে প্রগতিশীল এর অর্থ আমাদের অঞ্চল মানে বৃটিশ-ভারতে সীমাবদ্ধ থেকে কথা বলব। আবার আমেরিকান প্রগেসিভ বলেও ধারণা আছে। এতসব দিকে আমরা এখন যাব না।

    প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়ঃ
    এর আগের লেখায় যেকথা দিয়ে শুরু করেছিলাম যে  – আজকাল অনেকে “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” নিয়ে বক্তৃতা হচ্ছে, করছেন। এটা কীসের ফেনোমেনা??
    সরাসরি বললে এটা “প্রগতিশীলতা”। যা ঠিক আধুনিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের আলাপ নয়। কিন্তু এখন কেন?
    অনুমান করা ধারণাটা হল, প্রথমত প্রগতিশীলেরা হল আওয়ামী লীগ বা হাসিনার ক্ষমতার, গত ১৫ বছরের ক্ষমতার পক্ষে মূল সাফাইদাতা। ক্ষমতা মানে অবশ্যই ফিজিক্যাল বলপ্রয়োগর সক্ষমতা। এমন সক্ষমতায় যে ক্ষমতায় আসীন। কিন্তু এর বাইরে আরেকটা ক্ষমতাও দরকার, যেটা আবার ঠিক ফিজিক্যাল বলপ্রয়োগ নয়।  সেটা হল ক্ষমতায় যে আছে তার ক্ষমতাটা জায়েজ বা জাস্টিফায়েড [justified] তা দাবি করা, সাফাই দেয়া; ফলে এটা ন্যায্য এমন কথা বলা – এটাকে আমরা সাফাই ক্ষমতা বলতে পারি। সাফাই ক্ষমতা মানে ক্ষমতাসীনের পক্ষে শক্ত সাফাই-ও থাকতেই হবে।  এমন শক্ত সাফাই কথাও ক্ষমতাসীনের জন্য খুবই দরকারি। বলপ্রয়োগের সক্ষমতার মতই সমান দরকারি।  ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে যে কেউ ক্ষমতা ঠিকই পেয়েছিল কিন্তু ক্ষমতায় থাকতেই পারে নাই, রাখতে পারে নাই। কারণ এই ক্ষমতাটা যে ন্যায্য বা একটা ইনসাফের ক্ষমতা এমন কোন সাফাই সে তৈরি করে নেয় নাই বা তুলে ধরে দেখাতে পদক্ষেপ নেয় নাই। হয়তবা খেয়ালই করে নাই। তাই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। অতএব যেকোন বলপ্রয়োগের সক্ষমতার সাথে সাথে একটা সাফাই ক্ষমতা পাশাপাশি থাকাও সমান জরুরি বিষয়। হাসিনার গত ১৫ বছরের ক্ষমতাটাকে সমাজের যারা সাফাই ক্ষমতা-ও হয়ে তা সরবরাহ করে টিকিয়ে রেখেছে এরাই প্রগতিশীল, রাজনৈতিক পরিচয় প্রগতিশীলতা।
    তবে এখানে সেসব কথা তোলা তাদেরকে অভিযুক্ত করা যতটা না এর চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক অনুভবে [social realization] তা নিয়ে আনার জন্য এবং তা অবশ্যই খুবই ইতিবাচকভাবেও হতে হবে।

    কিন্তু এতে প্রগতিশীলেরাই জায়গা পেয়েছিল কেন?
    কারণ সেটা ওয়ার অন টেররের আমল, হাসিনার ম্যান্ডেটে ছিল তাদের ‘টেররিজম’ সামলানো। হাসিনা্র ক্ষমতা তাই এর একটা আজীব বাংলাদেশি ভার্সান বের করে নিয়েছিল। সেটা হল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে এর আড়াল নিয়ে এই ক্ষমতাটা যেন এই বুড়াকালেও বসে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও বিরোধিতা করছে – এই ঝুটা ভাব ও সাফাইয়ের আড়ালে কাজটা করতে চেয়েছিল। এতে আরাম হবে আর এছাড়া এই স্টাইলটা ইউনিক হবে;  কারণ এতে প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির চেয়ে হাসিনার লীগকে আমেরিকার কাছে আগিয়ে রাখবে – এমন ইচ্ছা-অনুমানও ছিল। তবে একটা জিনিষ পরিস্কার ছিল যে  এই আড়ালে বসে এই ক্ষমতাটা সাধারণভাবে ইসলাম কোপাবে। আর সেটা করবে “জঙ্গীবাদ দমনের” নামে।  বলা বাহুল্য এটাকে  “ওয়ার অন টেররের কাজ” মনে করে আমেরিকা এতে সমর্থন দিবে বা বাধ্য হবে সে অনুমানও ছিল। তবে পরিণতিতে এখন যেটা পরিস্কার যে এতে একটা দানব ক্ষমতা হিশাবে হাসিনার উত্থান হয়েছে। যাকে অনেকে ফ্যাসিজম-সহ অনেক নামেও ডাকছেন। কিন্তু এটা আসলে এক একচেটিয়া জবাবদিহিতা-হীন ভয়ঙ্কর ক্ষমতা।  তাই হাসিনা প্রথম থেকেই দানব ক্ষমতা হয়ে উঠার পর থেকেই সে এরপর থেকে আরেক ভুমিকাতেও হাজির হয়ে আছে। তা হল তাঁর এমন ক্ষমতার যত রাজনৈতিক বিরোধী বা প্রতিদ্বন্দ্বি আছে, তারা ইসলাম সম্পর্কিত হোক বা হা হোক, তারাও জঙ্গি এই অজুহাত তুলে তাদের উপরেও গুম, খুন অপহরণ ইত্যাদি অবাধে করে গেছেন হাসিনা। যাতে নিজ ক্ষমতা নিষ্কন্টক বা কাঁটাহীন ভাবে পাওয়া যায়!!!
    আর ওদিকে এতে প্রগতিবাদের ভুমিকাটা হল,  যেহেতু এটা  “জঙ্গীবাদ দমনের” নামে  সাধারণভাবে ধর্ম কিন্তু আসলে কেবল ইসলাম কোপানো – তাই এর পক্ষে সবচেয়ে ভাল সাফাইদাতা হিশাবে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদেরকেই  একাজে হাসিনা তাদের বেছে নিয়েছিল। এককথায় বললে, কাজটা হাসিনা করেছিলেন তাদের নানা ধরণের ফেবার করে – অর্থ, সুযোগ সুবিধা, গুরুত্ব ও সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব দিয়ে। এদের ততপরতার প্রতীক বলা যায় “শাহবাগ আন্দোলন” বা যা থেকে এরা “শাহবাগী” এই ধারণা সমাজে আছে। যদিও শুরুতে এরা হাসিনার পোষ মানতে অস্বীকার করেছিল; কিন্তু তাদেরকে নিরাপত্তাহীনতা শঙ্কা বা খুন হয়ে যাবার ভয় দেখিয়ে ক্রমশ নিজ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এনেছিল।

    আমাদের এদিকের প্রগতিশীলতার প্রধান বৈশিষ্ট হল এরা ইসলাম কোপাতে সিদ্ধহস্ত; যদিও মুখে বলে তারা যেকোন ধর্মবিরোধী। যেটার কার্যকর রূপটা হল এরা চরম ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি; যেটা কে একটা রেসিজমের পর্যায়ে তারা নিয়ে গেছে, সে খবর রাখেনি। তবে এই প্ররগতিশীলতার মূল উৎস কী – মানে কী গ্তারাউন্ড ওয়ার্ক ছিল যেকারণে এরা এমন প্রগতিশীল বলে সহজে হাজর হতে পেরেছিল তা খুঁজলে,  ১৭৯৩ সালের জমিদারি আইন বা এক নয়া ‘ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা’ চালুর পরে যেটা মোটামুটি ১৮০০ সালের পর থেকেই ক্রমশ এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণীর গড়ে উঠেছিল এরাই বৃটিশ সরকারের অধীনস্ত থেকেও লোকাল অর্থে  সামাজিক-অর্থনৈতিক-কালচারাল দিকনির্দেশনার প্রধান নির্ণায়ক ক্ষমতা হয়ে উঠেছিল। মূলত এই জমিদার-হিন্দুর কালচারাল আধিপত্য ও নির্দেশনা, মানে তাদের হুকুম চর্চার প্রতীক হয়ে উঠেছিল সাম্প্রদায়িকতা বলে এক ধারণা।   প্রথম কথা হল, জমিদার শাসনে মুসলমানেরা হিন্দুদের ( উভয়েই প্রজা হলেও) সমান না – এই হল জমিদার শাসনের প্রথম ভিত্তি। সমান না কারণ, মুসলমানেরা নাকি বাঙালি নয় – এই ফতোয়া। যে এখনো কলকাতার সবচেয়ে ডমিনেটিং প্রায় একছত্র বয়ান; আর সেটার খাতক বিজেপির তো বটেই তবে শুধু বিজেপি নয়, অনেক তৃণমুল সমর্থক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকও এমন বয়ানের আজও অনুসারী।  এমনকি সরকারী স্কুলের শিক্ষক কিন্তু মুসলমান শিক্ষক বলে সে কলকাতায় হোটেলে থাকতে পারে নাই – এমন পত্রিকা রিপোর্টো আছে।  তবে মুসলমানেরা নাকি বাঙালি নয় এই বৈষম্যপুর্ণ অবস্থান এটাই ছিল জমিদার হিন্দুর মূল সাফাই।  তাহলে সাম্প্রদায়িকতা এই সাইনবোর্ডের তলে কী আছে? এটা বুঝাতে চায় যে  মুসলমাত্রই সে সামাজিক অবস্থানের বিচারে যেকোন হিন্দূর নিচে, সবচেয়ে নিচাজাতের হিন্দুরও নিচে। এখন এদের তো পাতে তোলা যায় না -অপাংক্তেয় করে রাখলেও তাদের বিপদ হবে ভেবে জমিদার-হিন্দুরা নয়া কিছু শর্ত তৈরি করেছিল – এটারই সাইনবোর্ড শব্দ হল অ-সাম্প্রদায়িকতা! মানে মুসলমানদেরকে অ-সাম্প্রদায়িক হতে হবে এই হল সেই শর্ত।।  তাদেরকেও স্কুল-কলেজে শিক্ষা বা চাকরি ইত্যাদি সামাজিক সুবিধা দেয়া যেতে পারে, হিন্দুদের পাশে বসতে, একই ঘরের ভিতর বসে চাকরি করতে দেয়া যেতে পারে যে শর্ত সেটাই কথিত অ-সাম্প্রদায়িকতা। তবে দেশভাগের পরে ব্যাপারটাতে লজ্জায় পরে প্রগতিশীলেরা এর অর্থ কিছুটা এক্সটেন্ড করে নেয় যে হিন্দু-মুসলমানের ভিন্নতা অসমান এরা এনিয়ে যে কথা বলে সেই সাম্প্রদায়িক। যেটা কার্যত বাংলাদেশের উপরেই প্রযোজ্য হয়েছে, কলকাতায় যার কোন আছর বা ইম্প্যাক্ট নাই। এককথায় কালচারাল দিক থেকে মুসলমানদেরকে হিন্দুদের সামাজিক সব অভ্যাস-রীতি রেওয়াজের ভিতরেই মুসলমানদেরকে থাকতে হবে। এই হল অসাম্প্রদায়িকতা যার সার কথা দাড়িয়েছে এখন জমিদারি থাক না থাক, জমিদার-হিন্দুর বয়ান ও দাবি যে তাদের আধিপত্যের মধ্যে মুসলমানদের থাকতে হবে।  কোন মুসলমানি চিহ্ন প্রদর্শন করা যাবে না। একটু ভেঙ্গে বললে দুটা ধর্মীয় অভ্যাস পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধার সাথে থাকলেও তারা একে অপরকে প্রভাবিত করবে কিন্তু তা ন্যাচারালি ন্যাচারাল – এটা হতেই পারে। কিন্তু এটা তা নয়। এটা একের উপরে অন্যের ঘোষিত আধিপত্য যে, মুসলমান (তুমি বাঙালি না) তুমি আমার (আমি হিন্দু) সমান নও, অধস্তন। এই চরমতম বৈষম্যের সমাজ ও এর চর্চার ভিতর দিয়েই জমিদার হিন্দুর আধিপত্য ও শাসন চলেছিল, অন্তত একেবারে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ ও পাকিস্তান কায়েমের আগে পর্যন্ত। এরপরে ১৯৫১ সাল থেকে জমিদারী ব্যবস্থা উচ্ছেদ হয়ে গেলে।

    কিন্তু তবু এরা হেরেও হারতে চায় নাঃ
    কিন্তু তবু জমিদার হিন্দুর কালচারাল বয়ান এটা হেরেও হার স্বীকার করতে চায় না। সে ভোল বদলায়, সে কমিউনিস্ট হয়ে যায়, দলে যোগ দিয়েছিল। কেন?
    কারণ, ততদিনে জমিদা্ররি হারানোর পরে জমিদার-হিন্দুর কালচারাল ধারা জেনে যায় টের পায় যে  ১৯১৭ সালে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম কমিউনিস্ট, রাশিয়া (পরে ১৯২২ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন) এরা ধর্ম [অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটি] কোপায় ক্ষমতায় এসেছিল। ফলে এই কমিউনিস্ট রাজনীতি তাদের খুব পছন্দ হয়ে যায়। তাই কমিউনিস্ট ভেক ধরলে সে এর আড়ালে বসে ইসলাম কোপাতে পারবে। তাতে যতটুকু হারানো আধিপত্য ফেরত আসে।
    এখানে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে – না ১৮০০ সালের পরে উত্থিত জমিদার হিন্দু শ্রেণী অথবা না ১৯১৭ সালের কমিউনিজম – এরা কেউই রাজনৈতিক অধিকারে, সামাজিক মর্যাদায় সবাই সমান – এই রাজনীতির খাতক বা গ্রাহক তারা নয়।  স্পষ্ট বললে, নাগরিক মাত্রই সবাই সমান – সমান অধিকারের এমন চিন্তা এদুই রাজনৈতিক শক্তির কাছে এটা তাদের কোন এজেন্ডাই নয়। এরা বেখবর  শুধু না, এরা খাতক নয়, এটাই হওয়া উচিত মনে করে। এককথায় বৈষম্যহীন কোন রাজনৈতিক সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা তাদের কাম্যই না।

    কিন্তু আমরা দেখি, জমিদার হিন্দুর কালচারাল বয়ান আকড়ে যারা ১৯৪৭ সালের পরের সমাজে নতুন করে কমিউনিস্ট পার্টির নামে সংগঠিত হয়েছিল – এদের প্রথম সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি হলেও, ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের আমলেই সেই কমিউনিস্ট দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কারণ, তারা অবিভক্ত পাকিস্তানে সর্বপ্রথম এক সামরিক ক্যু – এভাবে ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে ব্যার্থ হয়েছিল। যদিও এই ততপরতার কেন্দ্রটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে পুবে নয় আর তা ছিল মূলত সেকালের কাশ্মীর রক্ষা করতে  যাওয়া পাকিস্তানের সামরিক অংশ।  তাই তারা আবার দল পাল্টায়। তখন এরা এর আগেই ১৯৪৯ সালে গঠিত হওয়া আওয়ামী লীগে তবে ১৯৫১ সালের পর থেকে তাতে যোগ  দেয়া শুরু করেছিল। এরাই তখন থেকে কমিউনিজমের একটা সফট ভার্সান এবং শিথিল ও বৃহত্তর রূপ হিশাবে যে নয়া শব্দ ও ধারণাটা চালু করেছিল, মোটাদাগে সেটাই হল প্রগতিবাদ বা প্রগ্রেসিভ চিন্তা।
    পরে ১৯৫৭ সালের প্রধানমন্ত্রী সোহরওয়ার্দির (সংক্ষিপ্ত এক বছরের শাসন আমলে) কমিউনিস্টেরা আওয়ামি লীগ ছেড়ে এবার (আওয়ামি লীগের সভাপতি) ভাসানীর নেতৃত্বে আলাদা দল করে ভাগ হয়ে যায় যেখানে নয়া দল হয় – ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি এটাই সংক্ষেপে ন্যাপ [NAP]।  আরো পরে কমিউনিস্টেরা মস্কো-পিকিংয়ে ভাগ হয়ে গেলে ১৯৬৪ সালে (পুর্ব-পাকিস্তান) বাংলাদেশের মস্কো সমর্থিত অংশটার নাম হল ন্যাপ (মোজাফফর); পিকিং সমর্থিত অংশটা ভাসা্নী ন্যাপ।

    কমিউনিজম ও প্রগতিবাদঃ
    উপরে বলেছি,কমিউনিজমের একটা সফট ভার্সান এবং শিথিল ও বৃহত্তর রূপ হিশাবে নয়া শব্দ ও ধারণাটা হল প্রগতিবাদ বা প্রগ্রেসিভ চিন্তা।  এছাড়া আরেকটা দরকারি দিক ছিল।  শুরুতেই বলেছি, কমিউনিজমের সাথে মর্ডানিজম বা আধুনিকতার কোন সম্পর্কও নাই। কার্ল মার্কস আধুনিকতা নিয়ে দু’লাইনও লিখেন নাই। এবং আধুনিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কেও। বরং আমরা মনে রাখতে পারি,  মার্কসের কাছে রাষ্ট্র হল শ্রেণীর রাষ্ট্র।  যার সোজাসাপ্টা মানে হল, একটা আধুনিক রাষ্ট্রে সবাই নাগরিক, বৈষম্যহীন সমান নাগরিক, সমান অধিকারের নাগরিক এসব কথা তিনি আমল করেন নাই।  তাই মার্কসের চিন্তায় নাগরিক, অধিকার, স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা -ইত্যাদি কোন ধারণাই নাই। তাই কমিউনিস্ট চিন্তায় এমনকি রাষ্ট্রগঠন, কনষ্টিটিউশন, কনষ্টিটুয়েন্ট, জনপ্রতিনিধি ইত্যাদি কোন ধারনার বালাই নাই; দরকার হয় নাই। আছে কেবল, ক্ষমতাসীন “শ্রমিক শ্রেণী” – আর এর এক পার্টি ধারণা যা দিয়ে পার্টি যাকেই বুর্জোয়া আখ্যা দিবে তাকে (আর কোন বিচার-আদালত লাগবে না) গুম, খুন, অপহরণ বা কোন ‘আয়নাঘরে’ বন্দি করে রাখা, গায়েব (disappeared) করে দেয়া, পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া ইত্যাদি সব জায়েজ।
    তবে এতে আরেক সমস্যায় পড়েছিল তারা মানে, ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা (মানে এটা মার্কস নয় এমনকি ঠিক লেনিনও নয় ব্যবহারিক কমিউনিস্ট মুখ্য নেতা হলেন স্তালিন) তাই দুনিয়াতে ছেয়ে থাকা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের উপস্থিতি ও ততপরতার সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে, বিশেষ করে আমাদের মত দেশে,  মূল কমিউনিস্ট পার্টি কে সাথে নিয়ে তো  সমাজে হাজির হওয়া মুশকিল ফলে কাজে আসবে না। এছাড়া কমিউনিস্ট হলে নাকি সাধারণ মানুষের সব সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে যাবে এধারণাও যথেষ্ট প্রবল ফলে ভীতিকর ছিল। সব মিলিয়ে এসব ক্ষেত্রে তাই (কমিউনিজমের লিবারেল ভার্সান) নরম করে বলা বা হাজির হওয়া – এটাই প্রগ্রেসিভ পার্টি ও প্রগতিবাদ খুব কাজ দিবে এখানে মনে করা হয়েছিল। মোটাদাগে এসব থেকেই প্রগতিবাদের উত্থান। এই অর্থে ন্যাপ এক প্রগেসিভ পার্টি। 

    কিন্তু তাতে কী? এর ফলে আধুনিকতার সাথে প্রগতিবাদের সম্পর্ক কী – এর জবাব মিলেছে বা দেয়া গেছে কী? অবশ্যই না, একেবারেই না। কারণ প্রগতিবাদী চিন্তার উৎস থেকে গেছে কমিউনিজম এবং বিশেষ করে কমিউনিজমের ধর্মবিরোধিতার বৈশিষ্ট। আর বিপরীতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের ধারণা এর মূল ভিত্তি ব্যক্তিবোধের উত্থান থেকে – পরে নাগরিক-বোধ, জনগণ, জনপ্রতিনিধি, মানুষের মর্যাদা, ইনসাফ, অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি মৌলিক ধারণাগুলোতে সে ধারণার বিস্তার।  অতএব এককথায় প্রগতিবাদ বা প্রগতিশীলতা কোন অর্থেই আধুনিকতা নয়।

     কিছু কথা সকলের জন্য, বিশেষত প্রগতিশীলদের জন্য জরুরীঃ
    এখন আসব
    সকলের জন্য কিছু কথায়, যা বিশেষত প্রগতিশীলদের জন্য খুবই জরুরী। আধুনিকতা, আধুনিক রিপাবলিক ধারণার উৎস কীভাবে – চিন্তার কোন পথ-পরিক্রমায়?  প্রথমত বলে নেই আমার একথাগুলো মেনে নিবার কোনই দরকার নাই। তবে কেবল আপাতত যা এখানে বলেছি ঠিক-ঠাক সেটাই বুঝে নিলে হবে। বুঝা আর মানা এককথা নয়।  সেটা মানলেই চলবে। আমরা রিপাবলিক (রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠা নিয়ে কথা বলছি, এর আগের লেখায়। এটাও বলেছি  রিপাবলিক মানে এটাই  আধুনিক (মর্ডান) রাষ্ট্র ধারণাও। কিন্তু কোন মর্ডানিটি?  সেই মর্তাডানিটি বলতে কী বুঝব? তা নিয়েই এখানে স্বল্পে কথা বলব!

    রেনেসাঁ [Renaissance] থেকে যার শুরু, পরে এনলাইটেনমেন্ট [enlightenment]
    হয়ে
    রেশনালিটি [rationality] বা বিজ্ঞান [science] – মানে যেটা মানুষের চিন্তার
    পদ্ধতি সম্পর্কে
    প্রথম আত্ম-সচেতনতা; সে পর্যন্ত পৌছানো [ তবে আত্ম-সচেতনতা এর কথা
    বললেও তা
     হেগেল নয় বড়জোর কান্ট পর্যন্ত]। আর এই পুরা রাস্তায় ভিতরে ক্রমশ
    ব্যাক্তিবোধের উন্মেষ ঘটে যাওয়া।
    আর এতে সবকিছুই পরিণতি পায় ‘আধুনিকতায়’। রেনেসাঁ
    এক ইতিবাচক গন্তব্য পায় যেখানে। আর সেখান থেকে
    মর্ডান রিপাবলিক স্টেট বা আধুনিক
    রিপাবলিক রাষ্ট্রের
    আবির্ভাব।

    এখন লক্ষ্য করবেন উপরের ছোট প্যারায়, চিন্তার পথ পরিক্রমার একটা সংক্ষেপ হাজির করেছি। আর  এই পুরা যাত্রা পথে প্রগতিশীলতা কোথাও নাই। কারণ প্রগতিশীলতার বড়-ভাই কমিউনিজম তখনও আসে নাই।  আর সেটা আসতে গেলে আগে চিন্তা পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচেতনতার [self conciousness] আরেক ধাপ (কান্টের পরের ধাপ) পার হতে হবে; তবে সেটা আবার কান্টের হাত ধরে নয়, এবার হেগেলের হাত ধরে। তাতে আমরা ফেনোমেনা বুঝতে শুরু করব। পরে এসব কথার ব্যবহারিক রূপ দানকারি কার্ল মার্কস-কে জানতে চাইলে  জানতে পারব! তবেই না এরও আরো কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর পরে মার্কসের কমিউনিজমের ছায়ায় স্তালিনের সমাজতন্ত্র পর্যন্ত আসতে পারব!  সেটা কায়েম হতে হবে আগে; কেবল এরপরেই কমিউনিজম লিবারেল বা স্মল ভার্সান হয়ে প্রগতিশীলতা [progressive] বলে কিছু হাজির হবে। যদিও মনে রাখতে হবে, প্রগতিশীলতা দরকার হয়েছিল ধর্মকে কোপাইতে। বিশেষ করে এর ভারতীয় ভার্সান হল – ইসলাম-মুসলমান কোপাইতে।

    কিন্তু তামসাটা হল, প্রগতিবাদীরা তবুও একই গোঁ ধরে থাকে। আধুনিকতাই যেন প্রগতিশীলতা এই ভাব ও ভান ধরে থাকতে চায় তারা। তবে এটা একদিকে না জানা থাকা অন্যদিকে দরকারের তীব্রতাতেই এই পরিণতি!  এমনকি অনেকে মনে করে আকড়ে থাকতে চায় যেন প্রগতিশীলতা আধুনিকতার  সাথে সম্পর্কিত কোন পুর্বসুরি বা উত্তরসুরি না হলেও ভাইরাভাই!  আর এর স্বপক্ষে রেফারেন্স হিশাবে ব্যবহার করতে চায় রেনেসাঁকে বা অনেকে আধুনিকতাকেও। বিশেষত এটা আবার কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রবল; এমনটা প্রগতিশীল রাজনীতিকের বেলায় নয় বা কম। দেখা যায় এমন কবি-সাহিত্যিকদের আধো রেনেসাঁ-বোধের ভিত্তি রোম তো নয়ই পশ্চিমকে পাঠ নয় – এমনকি যারা ইংরাজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন তারাও নয়, এদের রেনেসাঁ বুঝাবুঝির উৎসও কলকাতা অন্নদা শঙ্কর রায় টাইপের!! যারা আগেই ইসলাম কোপানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে এখন এসেছেন এর পক্ষে রেনেসাঁকে সাফাই হিশাবে ব্যবহার করতে গিয়ে যেসব লিখেছেন।
    কিন্তু এখানকার জন্য বেজ ফ্যাক্টস হল,  উপরে  চিন্তার যে একটা খসড়া গতিপথ দেখালাম সে প্রসঙ্গে,  মার্কস এর কোন লেখায়  – না রেনেসাঁ সম্পর্কে না এর শেষের রূপ আধুনিকতা বা রিপাবলিক রাষ্ট্র ইত্যাদি এসবের কোনটাকেই রেফারেন্স হিশাবে – মার্কস নিজ চিন্তাকে হাজির  করার ক্ষেত্রে এজন্য জরুরি মনে করেন নাই। এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, মার্কসের (১৮১৮-৮৩) আয়ুর সক্রিয়তার কাল যেটা তখন রিপাবলিক রাষ্ট্রের ধারণা ইউরোপে বাস্তবায়িত ও প্রতিষ্ঠিত-থিতু হয়ে গেছে ভালভাবেই। কিন্তু আমরা দেখছি এর প্রভাব মার্কস নিজের উপর নেন নাই।   তাই এসবের একটার সম্পর্কেও মার্কসের রচনায় কোন বক্তব্য নাই। দু’লাইন লেখা নাই। রিপাবলিক রাষ্ট্রের চেয়ে তার কাছে ও চোখে সারপ্লাস ভ্যলু থিওরি সবার উপরে গুরুত্বপুর্ণ। সেকারণে সম্ভবত আধুনিকতা বা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে তিনি কিছুই বলেন নাই। এছাড়ার তাঁর শ্রেণীর রাষ্ট্র চিন্তা – এটা কোন আধুনিক রাষ্ট্র চিন্তা তো একেবারেই নয়। বরং একেবারেই ভিন্ন কিছু ও আলাদা।  আধুনিক রিপাবলিক যেখানে সকল নাগরিককে অধিকার ও নিরাপত্তাদান এর দায়ীত্ব নিচ্ছে বলতে চায়; শ্রেণীর রাষ্ট্র সেখানে এক ক্ষমতাসীন শ্রেণী অন্য সকল শ্রেণীকে খোলাখুলি কোপায় মারবে। গুম, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি সব এই শ্রেণীযুদ্ধে নাকি জায়েজ। শুধু তাই না এর মধ্যে আবার কোন বিচার ব্যাবস্থা, কোন লিগাল প্রসেস বা আইন-আদালত প্রক্রিয়া ও ভুমিকা ইত্যাদি কিছুই লাগবে না।

    কিন্তু প্রগতিবাদের এর মধ্য থেকে কেবল ঐ কোপাকুপিটা দরকার; তার ইসলাম কোপানোর দরকার!  তাই তারা কমিউনিজমের কাছে গিয়েছেন। আর যা যা ধার করে এনেছেন সেটাই প্রগতিবাদ। যার সোজা অর্থ হল,   প্রগতিশীলতার সাথে কোনভাবেই আধুনিকতা সম্পর্কিত  ধারণা নয়! তাহলে কী প্রগতিবাদিরা কার্ল মার্কসের কমিউনিজমের কাছে ধর্ম কোপানোর তত্ব আনতে গেছিলেন?
    না ঠিক তাও নয়। প্রথমত একটু কারেকশন লাগবে। প্রগতিশীলেরা কার্লমার্কসের কাছে নয় তারা গেছিলেন স্তালিনের কাছে। তবে সেটা স্তালিন বেশি খারাপ লোক সেজন্যও না। বরং একটা ব্যবহারিক কারণে। অন্যদিকে, মার্কসের চিন্তা কখনই ঠিক ধর্মবিরোধী নয়।  বা সেটা অন্য কোন ধর্ম বা ইসলাম কোপানো মার্কসের চিন্তা-কাজের কোন লক্ষ্যই নয়। তাহলে?

    ব্যাপারটা হল ধর্ম কোপানো মার্কসের কমিউনিজম ধারণার অংশ না হলেও স্তালিনের সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে ও এই সুত্রে ব্যবহারিকভাবে তাই হয়ে গেছিল। যদিও ধর্ম কোপানো কমিউনিজমের জন্য ঠিক এসেনশিয়াল (essencial) অর্থে জরুরি না।

    এনিয়ে ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধারণা ও কথাঃ
    ঘটনা হল, রাশিয়া মানে সারা পুর্ব-ইউরোপে জুড়ে এই জনগোষ্ঠি অর্থডক্স [orthodox] ক্রিশ্চানিটির অনুসারী; ফলে এই ধর্ম ও এর বিশেষ চর্চার প্রভাব ছড়িয়ে আছে ঐ’অঞ্চলে। আর সেই বিশেষত্বটা হল যেমন, অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটিতে,  মূল পাদ্রী বা প্যাট্রিয়াক [patriarch] এর ধারণা আছে যা খুবই সেন্ট্রাল। তিনি এসব  অর্থডক্ম সমাজেই খুবই প্রভাবশালী ও একক ক্ষমতাবান। প্যাট্রিয়াকের কথায় পুরা অর্থডক্স সমাজ উঠে আর বসে – এটা অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটির বিশেষ বৈশিষ্ট; যেটা ক্রিশ্চানিটির অন্যান্য ধারা বা ফ্যাকরায় পাওয়া যাবে না;  অন্য ফ্যাকড়ায়, সেন্ট্রাল ব্যক্তিত্ব বলে কেউ আছে এমন না।  [ব্যক্তিগতভাবে আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় প্রায় তিনবছর বসবাস আমাকে অর্থডক্স বৈশিষ্ট সম্পর্কে সচেতন করেছিল। একেবারে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছিল। ]  আমার ধারণায়, কোন অর্থডক্স সমাজে কমিউনিস্ট-সহ যেকোন বিপ্লবী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন এর চেয়ে ডাবল কঠিন। কারণ, সেখানে প্যাট্রিয়াক একজন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি না হলেও প্রায় সমান ক্ষমতাশালী। তফাত কেবল একটাইঃ এর একটা হল রাজনৈতিক ক্ষমতা আর অন্যটা ধর্ম-সামাজিক ক্ষমতা।  অর্থডক্সে ইস্টারের উপাস পালন টানা কমপক্ষে ৪০ দিনের; গভীরভাবে পালন ওয়ালারাদের কাছে  তা বছরের ১৮০ দিনেরও। যেটা অন্য খ্রীশ্চানিটি ফ্যাকড়ার বেলায় বড় জোর তিন দিন। এসময়ে এর পালনে সকাল থেকে তিনটা পর্যন্ত না খেয়ে প্রেয়ারেই কেটে যায়। পালনকালে এসময়ে কোন প্রাণীজ প্রোটিন খাওয়া নিষেধ। রাজধানী আদ্দিস-আবাবায় এসময়কালে কোন বেকারীতে কেক খাওয়া মানে শাস্তি পাওয়া। কারণ, কেকে ক্রিম নাই, ডিমও দেয়া হয় নাই। বাজারে মাছ-মাংসের দোকানই বন্ধ। তবে ইথিওপিয়ায় আগের প্যাট্রিয়াক যখন ক্ষমতায় অভিসিক্ত ছিলেন তখন তবু মাছ খাওয়া চলত। কিন্তু আমার বসবাসের সেসময়ের প্যাট্রিয়াক (তেলাপিয়া) মাছও খাওয়া নিষিদ্ধ করে ফতোয়া দিয়েছেন। এখন এমন ক্ষমতা ও প্রভাবের প্যাট্রিয়াক যদি কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে কোন ফতোয়া দিয়ে দেন, যদি মনোমালিন্য অপছন্দ শুরু হয়ে যায় তাহলে কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা মাথায় উঠবে, তা কায়েম রাখা অসম্ভব হয়ে যাবে। ইথিওপিয়াতেও ১৯৯১ সালের দ্বিতীয় কমিউনিস্ট বিপ্লবের পরে সবার আগেই পার্টি কৌশল-কায়দা করে ফেবারেবল ও পছন্দের এক প্যাট্রিয়াক বসিয়ে নেয়া হয়েছিল। প্যাট্রিয়াক বানানোর যে বোর্ড আছে সেখানেও যখন তখন প্যাট্রিয়াক বদলানোর সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না, আগের জনের স্বাভাবিক মৃত্য না হলে।
    অর্থডক্স বৈশিষ্টের এসব ব্যবহারিক কারণে, আমার ধারণা অনুমান হল, বিশেষত স্তালিন  অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটি ব্যবস্থা বা সাধারণভাবে ধর্মের বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করার দিকে গিয়েছিলেন। তাতে কমিউনিজম ধর্মবিরোধিতা থাক আর নাই থাক!  যদিও পরবর্তিতে সমাজতন্ত্র মানেই ধর্ম কোপানোই এটাই প্রতিষ্ঠিত ধারণা হয়ে যায়। তাই শুরুতেই বলে রাখা ভাল আমার এই ধারণা প্রকাশ তাই কমিউনিজমকে মোলায়েম ভাবে হাজির করা একেবারেই নয়। অথবা এই উপস্থাপনের পরে তা মোলায়েম হয়ে যাবে না। বাস্তব সমাজের ধারণাতে, কমিউনিজমের শরীর থেকে ধর্ম কোপানোরপরিচিতি বা বৈশিষ্ট যা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তা আগামিতেও কাটবে না।
    আসল কথাটা হল,  অন্যান্য দেশে যারা যারা নিজ দেশে ধর্ম কোপাতে দরকার মনে করেছে সে কমিউনিস্ট না হলেও প্রগতিশীল সেজে সেই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল সাফাইয়ে ধর্ম কুপিয়েছে। এই হল আসল কথাটা।
    দুনিয়াতে এমন প্রমিন্যান্ট তিনটা দেশ দেখা যায়; ভারতীয় উপমহাদেশে, বৃটিশ ও ফরাসী দেশে। উপরে লেখায় দেখিয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে কিভাবে জমিদার-হিন্দুরা কিভাবে ক্রমশ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল হয়ে গেছিল। আর সেই থেকে মুসলমান কোপানি আর তাদের উপর সব ধরণের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতেই  হিন্দুত্ববাদ=প্রগতিশীলতা হয়ে আছে।
    এছাড়া বৃটিশ ও ফরাসীরাও প্রায় এমনই হয়েছে। তবে একটু ভিন্ন কারণে যদিও এর মুখ্য ব্যবহার এদের বেলায় তারা ভিন্নভাবে শুরু করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে পরে এই সাম্রাজ্যভুমি  বৃটিশ ও ফরাসীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা একটু ভিন্ন আগেই বলেছি। তা হল, শাসক হিশাবে তারা ক্রিশ্চান কিন্তু শাসিতেরা মুসলমান।  সাধারণ ক্ষেত্রে এটা হয়ত তেমন সমস্যার নাও হতে পারত। কিন্তু ইউরোপের সাথে তুরস্ক মানে হল ক্রসেড যুদ্ধের সম্পর্ক, ইউরোপের ক্রিশ্চানিটির হেরে যাবার সম্পর্ক।  পরে যদিও ইউরোপ তাদের চার্চকে পিছনে ফেলে রাজনৈতিক ক্ষমতা হিশাবে তারা মর্ডান রিপাবলিক হয়ে গেছে। ওদিকে তুরস্ক তখন এই প্রথম অটোমান (পরাজিত বলে) থেকে বের হয়েছে। কিন্তু এরা হল সেই অটোমান তুরস্ক যারা আট থেকে বারো ক্রুসেডেও বিজয় লাভের পরে অটোমান সাম্রাজ্য শাসন শুরু করেছিল। ফলে পরাজিত অটোমান রাজতন্ত্র  বলে সেখান থেকে বের হওয়া তুরস্কের বাসিন্দারা কিভাবে নয়া ক্রিশ্চিয় বৃটিশ ও ফরাসী শাসন কে নিবে – এই ছিল বৃটিশ ও ফরাসীদের টেনশন ও শঙ্কা। সেকারনে আমরা দেখেছিলাম বৃটিশ ও ফরাসী নিজেকে প্রটেকশন এর চিন্তা। আর সেটাই ছিল কামাল তুনে কামাল কিয়া ফেনোমেনা মানে কেমেলিয়ান চর্চায় শয়তানির কথিত সেকুলারিজম আর রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার বকোয়াজি! অন্যভাষায় এটাই বৃটিশ ও ফরাসীদের ইসলাম কোপানো!  খেয়াল রাখতে হবে, ইংল্যান্দের রাজা যখন এঙ্গলিকান [anglican বা ইংলিশ] চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান – সেটা থাকা অবস্থায় ( আর যেটা এখনও তাই) অবস্থায় বৃটিশেরা রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার বকোয়াজি! তখনও শুরু করেছিল এখনও জারি রেখেছে!! 

    His Majesty the King is the Supreme Governor of the Church of England.
    The King appoints archbishops, bishops and deans of cathedrals on the advice of the Prime Minister.

    ওয়ের চেয়ে বড় নখড়ামি আর কী হতে পারে?? আবার ওদিকে ফ্রান্সের এসিমিলেশন [assimilation] যার সোজা বাংলা হল, “তোমাকে আমার মতই হতে হবে“। আমার ধর্ম-কালচার সামাজিক অভ্যাস যা আছে হুবহুই তোমাকে মেনে নিতে হবে, তুমি নিজেকে বদলিয়ে আমার মত হয়ে যাও।  হতেই হবে। এই হল ফরাসি ফাজলামি! এনিয়ে আমার পুরানা লেখা দেখতে পারেন।

    ৩০ বছরের ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধঃ
    আসল প্রসঙ্গটা হল, বৃটিশ-ফরাসিদের কথিত ‘সেকুলারিজমের’ ধান্দাপানি। উপরে দেখিয়েছি রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার বকোয়াজিটা কী ও কেন।  আর এখন বলব, ক্লাসিক্যাল তবে পরোক্ষ এক সেকুলারিজমের ধারণা (যেটাকে আমি ক্লাসিক্যাল সেকুলারিজমও বলি) ইউরোপেই ছিল ও আছে তবে তা চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। সে প্রসঙ্গে যেতে কথা শুরু করতে হবে উলটা করে। আর সেকাজেই ৩০ বছরের ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধ কথাটা। তবে সাবধান কথাগুলো আমি বানাই নাই। আপনারা নেটে Thirty Years’ War – এটা লিখে সার্চ দেন এরপর নিজেই পড়ে দেখেন। আমার কোন পুরানা লেখাতেও পাবেন। আরেকভাবে পেতে পারেন যারা ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফিলিয়া সম্মেলনের [Treaty of Westphalia] বা সমঝোতা সম্পর্কে জানেন। যারা  ইসলামবিদ্বেষ থেকে দুূরে সৎভাবে মন ও চিন্তা সাজাতে চান তারা চিন্তা বাধাহীন উন্মুক্ত করতে চাইলে ইউরোপের ইতিহাস বুঝতে চাইতে পারেন। মনগড়া জমিদার-হিন্দু বয়ানের খপ্পর থেকে তাদের বের হতে হবে। ইউরোপীয় রাজারা তাদের আমলে ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধ (যেটা আসলে খ্রীশ্চানিটির নানা ফ্যাকড়া বা ইন্টারপিটেশনের মধ্যের ঝগড়া ও যুদ্ধ) যা তারা ধর্মযুদ্ধ না বলে গৃহযুদ্ধ বলে মোলায়েম রাখতে চায় এরই কাহিনী। তবে মুখ্যত সেকালের শাসন ব্যবস্থায় এর সমাধান তারা কী বের করেছিল, যা আজও শিক্ষণীয়, তা জানা দরকার। যার সেই সমাধানের সারকথাটা হল, নাগরিককে সমান অধিকার ও মর্যাদায় রাখতে হবে। রাজাদের বেলায়, রাজার পালিত খ্রীশ্চানিটির ধারার লোক প্রজা না হলে, রাজা কী সেই প্রজাকে একঘরে করবেন, বৈষম্য করবেন, শাস্তি দিবেন? আর তাতে দুই প্রজা দুই ধারার খ্রীশ্চানিটির অনুসারী হলে কী তারা একে অপরকে খুন করে সমাধান আনবেন?
    এরই সহজ সমাধান করা হয়েছিল ১৬৪৮ সালে জর্মানির এক শহর ওয়েস্টফিলিয়া-তে বসে এক সমঝোতা সম্মেলনে।  আর সেটা ছিল ১৬১৮-৪৮  এই ত্রিশ বছর ধরে ধর্মযুদ্ধ করার পরে র সমাধান হিশাবে। কি সেই সমাধান?
    খুবই সহজ রাজা ফ্যাকড়া নির্বিশেষে সকল ধারার খ্রীশ্চনিটির অনুসারী প্রজার সাথেই কোন বৈষম্যহীন, সমান ব্যবহার ও সুযোগ সুবিধা দিবে – এই নীতি অনুসরণ করে। এটাই মর্ডান রিপাবলিকের মূল নীতি। সকল নাগরিকের সাথে বৈষম্যহীন সমান অধিকার ও মর্যাদাদান। এটাই বাই ডিফল্ট যে কোন মর্দান রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করলে সাথে আসা প্যাকেজের মত এক সেকুলারিজম। এটা শয়তানি ইসলামবিদ্বেষ আর কোপানি নয়। এটা করতে, সেকুলার বলে কোন কিছু কনষ্টটিউশনে লেখে রাখার শয়তানি বা ইসলাম-মুসলমান ঘৃণা ছড়ানির হিন্দুত্ববাদ নয়, প্রগতিশীলতা বলে আড়াল নেয়াও নয়!
    লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই এখানে এখন শেষ করছি। নিজের উপর শয়তানকে ভর করতে দিয়েন না। দয়া করে নিজে বুঝে শুনে প্রগতিবাদ ছাড়েন!  সবাইকেই নিয়ে এক সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাসের রাস্তা খুঁজেন!
    সবচেয়ে ক্ষতিকর আত্মঘাতি ধারণা প্রগতিবাদ যার হিন্দুত্ববাদের বাহক বা ক্যারিয়ারও। তাই হিন্দুত্ববাদ=প্রগতিবাদ। প্রগতিবাদ থেকে পরিস্কার ভিন্ন রাস্তা হল আধুনিকতা।

    আধুনিকতা আপনাকে আধুনিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার দিকে সদর রাস্তায় নিতে পারে।

    আপডেটঃ  ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩; ভোররাত ০৩ঃ ৫৪ 
    সর্বশেষ আপডেটঃ  সেপ্টেম্বর ২০২৩; ভোর 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বাংলাদেশে ‘মুসলিম জাতিবাদ’ মানে কী ও কেন

    বাংলাদেশে ‘মুসলিম জাতিবাদ’ মানে কী ও কেন
    গৌতম দাস
    ২৪ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Rc

     

    ভারত-বাংলাদেশের মিলে কিছু আওয়ামি সাংবাদিক একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছিল যে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন অ্যামেরিকান চাপে ফেয়ার নির্বাচন হতে গেলে হাসিনা বিজয়ী হবে না, আর সেটা ভারত-আমেরিকার জন্য অলাভজনক, ক্ষতিকর স্বার্থের হবে। তাই, মোদি সরকার এনিয়ে  নাকি আমেরিকাকে কূটনীতিক নোট পাঠিয়েছে!!! যার কোন সত্যতা পাওয়া যায় নাই। কিন্তু  এই প্রপাগান্ডার চাপের মধ্যে বক্তব্য দিয়ে গিয়ে এর মধ্যে জড়িয়ে বিএনপির সেক্রেটারী মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর আগ বাড়িয়ে বলেছিলেনঃ

    ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল
    এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের
    ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায়
    আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”
    ।

    সার সংক্ষেপঃ  [সেখান বর্ণনা করা এই মৌলবাদ মানে কী? এর অনুষঙ্গি অর্থ ও সাথে জড়ানো আরো অর্থ নিয়ে আলোচনা বিস্তার ঘটাতে গিয়ে অনুষঙ্গী হিশাবে মুসলিম জাতিবাদ ধারণাটা সেখানে এনেছিলাম। আমার সেই আগের বা পুরানা লেখাটা (এখানে লিঙ্ক) থেকে  মুসলিম জাতিবাদ  ধারণাটা আলাদা করে তুলে এনে তা আলাদা লেখা হিশাবে এখানে ছাপাচ্ছি। কারণ, মুল ধারণাটা প্রথমে অনেক সংক্ষেপিত ছিল। পরবর্তিতে, ওখানে দুদিন পরে ঐলেখার অনেক স্থানে স্থানে নয়া সংযোজনে বহু বিস্তার ঘটিয়েছি। যেটা হয়ত প্রথম দিনের পাঠকেরা পরে আর দেখেন নাই বা খেয়াল করেন নাই। তাই এখন সকলের চোখে পরার জন্য  কেবল “মুসলিম জাতিবাদ” অংশটাই এখানে আলাদা করে উঠিয়ে এনেছি।]


    মির্জা ফকরুল এর এই মৌলবাদ বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    আপডেটেডঃ
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    গৌতম দাস

    ২৪ অক্টোবর ২০২২  ০০ঃ০৬ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-4gr

     

          ..condemning hate speech unequivocally: U.N. Secretary-General António Guterres

    ‘ইউনাইটেড নেশনস’[United Nations] শব্দটার বাংলা হিসাবে ‘জাতিসংঘ’ শব্দটার ব্যবহার সম্ভবত বেশিরভাগ বাঙালি করে থাকেন। তবে কলকাতার আনন্দবাজার অনুবাদ করে ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ’ লিখে থাকে।  আনন্দবাজারের বেশির ভাগ ততপরতা অপছন্দের হলেও এই অনুবাদটা বেশি সঠিক ও অনেক অর্থপুর্ণ। কারণ ‘জাতি’ শব্দ ও ধারণা-টা মানে কোনভাবেই তা রাষ্ট্র নয়; যদিও না জেনে আমরা অনেকেই এই ভুল করে থাকি। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জ (বা জাতিসংঘ) – এই প্রতিষ্ঠানই জন্মের সময় থেকে নিজেকে ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আসছে। তবে এর স্বপক্ষে একটাই সাফাই-যুক্তি এবং তা খুবই দুর্বল সেই যুক্তিটা হল – সেসময় বেশির ভাগ রাষ্ট্র মানে মর্ডার্ণ রাষ্ট্র বলতে সেটা এক ‘জাতিরাষ্ট্র’ বা Nation State ধারণা বলে বুঝবার প্রাবল্য ছিল। যেটা পরের আট বছরের মধ্যে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের বেশির ভাগ রাষ্ট্র এই ভুল সংশোধন করে নিয়েছিল। যার পর থেকে ইউরোপের অন্তত ৪৬ টা রাষ্ট্র  আর নেশন স্টেট নয়, অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র হয়ে যায়। [ এনিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন কাউন্সিল অফ ইউরোপ [COE]।   রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল হলেন আন্তোনিও গুতেরেস (Antonio Guterres)। এই সেক্রেটারি জেনারেল-ই হলেন রাষ্ট্রপুঞ্জ-এর সর্বোচ্চ নির্বাহি প্রধান।

    এখন আজকের প্রসঙ্গে আসি। ঘটনা হল, ভারত বিশেষ করে এর প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্ভবত আর কোনদিন যাতে গুতেরেস ভারত সফরে না আসতে পারেন এর সব বন্দোবস্ত করবেন; তা অবশ্যই নিশ্চিত করবেন! কেন?
    গুতেরেস ভারত সফরে এসেছিলেন গত বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর সরকারি আমন্ত্রণে। গত ২০০৮ সালের ভারতের ভাষ্যমতে মুম্বাইয়ে “টেররিস্ট আক্রমণের বার্ষিকী” পালনের অনুষ্ঠানে, ঐ হামলার আহত-নিহতের প্রতিশ্রদ্ধা জানাতে। আর ঐ হামলা ছিল কাশ্মীর-কেন্দ্রিক কিছু সশস্ত্র প্রতিবাদী গ্রুপের যারা পাকিস্তান থেকে ভারতের মুম্বাইয়ে এসে ২০০৮ সালে “তাজমহল প্যালেস হোটেল” দখল করে ঐ হামলা চালিয়েছিল।

    তবে এবার, মোদি সম্ভবত চেয়েছিলেন গুতেরেসের এই সফর থেকে তিনি গ্লোবাল মিডিয়া মনোযোগ হাসিল করতে পারবেন যাতে তিনি ভারত সরকারের কাশ্মীর নির্যাতন নিপীড়ন দমনের অভিযোগ আড়াল করে এর উপরে বা বিরুদ্ধে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রসবাদী আক্রমণের কথা তুলে সেটা ঢেকে ফেলতে বা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিপীড়ন-কে জায়েজ করতে পারবেন।
    নেহেরুর আমল থেকে ভারত চেষ্টা করে যাচ্ছে এটা দেখাতে যে ভারতের কাশ্মীরের সমস্যা যেনবা কাশ্মীরীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে হাজির হয়েছে। এটা যেন এক “সন্ত্রাসবাদি” সমস্যা! এবং তা যেন সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছে! অথচ এটা শতভাগ মিথ্যা। ভারতের কাশ্মীরে সশস্ত্র ততপরতার শুরু ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের রাজ্য নির্বাচনে কেন্দ্রসরকারের ব্যাপক কারচুপির ঘটনা থেকে। কারণ ঐ কারচুপির পরে ক্ষুব্ধ ও হতাশায় পড়া কাশ্মীরীদের প্রতিক্রিয়া থেকে তারা সশস্ত্র ততপরতার দিকে ঝুঁকে যায়; আপন করে নেয়। অর্থাৎ (১৯৪৭ সালের পর থেকে) ১৯৮৭ সালের আগে পর্যন্ত এর আগে ভারতের কাশ্মীরে যত বিবাদ বা ক্ষোভই থাক না কেন; সেখানে একটা রাজ্য-নির্বাচনী ব্যবস্থাই চালু ছিল আর এই নিরস্ত্র ব্যবস্থাটাই ছিল ক্ষুব্ধ কাশ্মীরীদের প্রধান রাজনৈতিক ততপরতা। সারকথায়, ভারত সরকারই রাজ্য নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপি করে ফলাফল উলটে দিয়ে কাশ্মীরীদেরকে সশস্ত্রতার পথে ঠেলে দিয়েছিল।

    মোদি ভেবেছিলেন এবার গুতেরেসকে অতিথি করে এনে তিনি কথিত সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে জনমত যোগাড় করে নিজ আকামের পক্ষে মিডিয়া মাইলেজ যোগাড় করে নিবেন। কিন্তু এখন ফল হয়েছে উলটা। মোদি ও তাঁর সরকার আত্মঘাতি গোল খেয়ে গেছেন। কারণ,  গুতেরেস উলটা মোদি সরকারের হিউমান রাইট লঙ্ঘণ ও মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন বৈষম্যের কথা তুলে বক্তৃতা করেছেন আর  মোদি সরকারকে তা সংশোধনের আহবান রেখে গেছিল। তবে এই আহবান তিনি মূল অনুষ্ঠানে নয় বরং পরে, মুম্বাইয়েরই আরেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
    সেখানে, একাজে তিনি শব্দ হিসাবে ব্যবহার করেছেন ডাইভারসিটি [Diversity] ও প্লুরালিজম [Pluralism] । মানে গুতেরেস বলতে চাচ্ছেন, একটা রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ভিত্তিতে –  বহু ধর্ম ও বহু মত ও পথ কে পাশাপাশি কার্যকর থাকতে পারে এমন ভিত্তির একটা রাষ্ট্রগড়ে তুলতে পারলে একমাত্র তাতেই একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব হতে পারে। এভাবে বৈচিত্র ও ভিন্নতায় নাগরিকেরা সকলে পাশাপাশি কার্যকর থাকা ও পরস্পরকে জায়গা করে দেওয়া নিশ্চিত করতে পারলে সেটাই হবে রাষ্ট্রের শক্তি।
    ভারতের দ্যা হিন্দু লিখছে তিনি বলেছেন,   “রাষ্ট্রে জনবৈচিত্র থাকলে সেটাই সমৃদ্ধি আনবে যা একটা দেশকে শক্তিশালী করে। এই বোধ-অনুভবকে লালন ও শক্তিশালী করা এবং প্রতিদিনের চর্চায় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা উর্ধে তুলে ধরে তা শক্তিশালী ও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত যারা দুঃস্থ অবস্থায় আছে তাদেরকে সাথে নিতে বহু-সংস্কৃতি, বহু ধর্ম ও এথনিক জনগোষ্ঠির এক সমাজ গড়তে হবে; যেখানের সকলে একসাথে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তব্যকে একস্বরে নিন্দা জানাতে হবে”।
    আর এখান থেকেই মূল শব্দ উঠে এসেছে “হেট স্পিচ” [Hate Speech] বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তৃতা – এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহবান।

    “Diversity is a richness that makes your country stronger. That understanding…must be nurtured, strengthened and renewed every day by practising the values of Gandhi; by securing and upholding the rights and dignity of all people, especially the most vulnerable; by taking concrete action for inclusion, recognising the enormous value and contributions of multi-cultural, multi-religious and multi-ethnic societies; by condemning hate speech unequivocally,” Mr. Guterres said

    স্বভাবতই এতে পুরা ব্যাপারটাই মোদির হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে শক্ত সমালোচনা ও নিন্দা হয়ে উঠে এসেছে। ফলে তা হয়ে উঠেছে মোদির হিন্দুতেবাদেরই কঠোর সমালোচনা। কারণ, গত অন্তত তিন বছরে মোদি এই হেট স্পিচের উপরে ভর করে যাচ্ছেন; মোদি যেকোন নির্বাচনে জিতবার উপায় হিসাবে একে হিন্দু-ভোট মেরুকরণ ও ভোটবাক্স ভর্তি করার কৌশল ব্যবহার করে চলেছেন।

    তবে গুতেরেসের হেট স্পিচের কঠোর সমালোচনা দিয়েই প্রসঙ্গটা শেষ হয়ে যায় নাই। বরং বলা যায়, এতে সরকার প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ন্যাংটা করে ছেড়েছে। যদিও সেটা ছিল প্রথম পর্যায়। এবার এর দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে লিখছি।

    ঘৃণা-ভাষণের বিরুদ্ধে কঠোর না-হলে অবমাননার মামলা, প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

    হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলিঃ
    আসলে এখন শুরু হয়েছে এই হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলি! এখানে আসামি বা পার্টি আসলে তিনটা! কথাটা অন্যভাবে বললে,  একটা রাষ্ট্র ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যায় মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠানের নিস্ক্রিয়তায়। যার প্রথমটা হয়ে থাকে সরকার বা ক্ষমতার নির্বাহি বিভাগ’ অর্থাৎ এর বৈষম্যমূলক আচরণ ততপরতা থেকে। এদের নিজ বিশেষ দল ও শ্রেণীর নাগরিককে ফেবার করা ও অন্যান্যদেরকে নিগৃহিত করা থেকে এর শুরু হয়ে থাকে।
    এখন  নির্বাহি ক্ষমতার এই গর্হিত কাজকে যদি বিচার ব্যবস্থা আমল না করে এবং ক্ষতিগ্রস্থ নাগরিককে প্রতিকার না দেয় এখান থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়। এমনকি যেখানে বিচার ব্যবস্থার হাতে স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবার ক্ষমতা দিয়েই রাখা থাকে; তবুও দেশের বিচার বিভাগ সেই ক্ষমতাকে প্রয়োগ-ব্যবহার না করে পাশ কাটিয়ে  যাওয়া থেকেই সংকট শুরু হয়ে থাকে। আর তৃতীয় পর্যায়টা হল নির্বাচন কমিশনের, এদের অকেজো হয়ে বয়াসে থাকা থেকে। কারণ তাদেরকেও ক্ষমতা দেয়া থাকে যে ক্ষমতাসীন বা বিরোধি দল যখন নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করতে ডুবে যাচ্ছে অথচ কমিশন এনিয়ে কোন ব্যবস্থা না নেয়। অথচ কমিশন যেকোন রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে শুনানি শেষে অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রতিকার হিসাবে ঐ দলের রেজিষ্টেশন বাতিল করে দিতে পারে।

    সারকথায় বললে,  এখন শুরু হয়েছে এই তিন পর্যায়ের তিনটা প্রতিষ্ঠান যাদের দায় ছিল ক্ষমতাসীনদের হিন্দুত্ববাদের ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; অথচ এই তিন প্রতিষ্ঠানের কেউই তা করে নাই। অর্থাৎ  নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে থাকা প্রশাসন এর দায়ীত্ব ছিল মানে আমাদের ভাষায় ডিসি-এসপির দায়ীত্ব ছিল হেট স্পিচের বিরুদ্ধে একশনে যাওয়ার। কিন্তু তারা কেন্দ্র সরকার বা রাজ্যের হিন্দুত্ববাদি দলীয় আচরণের পক্ষে চুপ করে থেকে তাদের সহায়তা করে গেছে। যেমন,  পশ্চিম দিল্লির বিজেপি সাংসদ পারভেশ ভার্মা হিন্দু সভার একটি বৈঠকে মুসলিম সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে বয়কটের ডাক দেন। তিনি বলেন, “ওদের সবজি কিনবেন না। ওরা মাছ-মাংসের দোকান খুলে বসবে। ওদের সোজা করতে সামাজিক বয়কট করুন”। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন একশন হয় নাই। সবচেয়ে বেশি ঘটনা উদাহরণ ঘটেছে যোগীর উত্তর প্রদেশে। এছাড়া, ত্রিপুরা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ বা কর্ণাটক রাজ্যে হিজাব ইস্যুসহ নানান মুসলমান নিপীড়ন-মূলক সরকারি সিদ্ধান্ত বা একশন ঘটেছে।  দিল্লিতে পরিকল্পিত দাঙ্গায় সব তছনছ করে দেয়া হয়েছে।  দিল্লিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক সভায় বক্তা হিসেবে ছিলেন জগৎ গুরু যোগেশ্বর আচার্য। তিনি বলেন, ‘যদি দরকার হয়, হাত কেটে নাও। গলা নামিয়ে দাও। সবচেয়ে বেশি তোমার জেল হবে। কিন্তু এই সমস্ত লোককে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। বেছে বেছে মারো।’
    কিন্তু বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন এসব ঘটনা আমলই করে নাই; পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে।

     

    কিন্তু এখন ঘুম ভাঙ্গে নাই, বরং দায় অন্যের ঘাড়ে ঠেলে ফেলার দৌড়াদুড়ি শুরু হয়েছে। গুতেরেস বক্তব্য রেখেছিলেন ১৯ অক্টোবর ২০২২। আর ২১ তারখেই ভারতের সুপ্রিমকোটে প্রধান বিচারপতি যেন জেগে গেছেন। আনন্দবাজার লিখেছেঃ ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।

    ভারতে ঘৃণা-ভাষণের প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে দিন দুয়েক আগে সরব হয়েছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস। এবার সেই প্রসঙ্গেই কড়া মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।  …… শুক্রবার সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে। ঘৃণা-ভাষণ সংক্রান্ত ওই মামলায় বিচারপতিদের মন্তব্য, ‘‘আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ধর্মের নামে কোথায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা?’’

    তার মানে দেখা যাচ্ছে – ” ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে – সুপ্রীম কোর্টের এই ক্ষমতা তো আগেও ছিল কিন্তু তা এতদিন ব্য৭বহার করা হয় নাই কেন?
    সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশের সুপ্রীম কোর্ট কে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের সমালোচনার পরে জেগে উঠতে হয়, নিজ ক্ষমতা নিয়ে সে জেগে উঠে – সেদি রাষ্ট্র আসলে অনেক আগেই মৃত! আর এতে এখন আমরা যা দেখছে সেটা ব্যক্তির দায় নিয়ে ঠেলাঠেলি বৈ আর অন্য কিছু নয়!

    বরং সুপ্রীম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করে যে ভারতের এই বিচার বিভাগ আসলে মৃত! হিন্দুত্ববাদ পুরা রাষ্ট্র আর তার আসব অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সবকিছুকে আসলে খেয়ে ফেলেছে…। 

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • নাসিরুদ্দিন শাহরা ‘কথিত সেকুলার’ ভাঁড়ে পরিণত 

    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা “কথিত সেকুলার” ভাঁড়ে পরিণত 

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০৫ পিএম  

    https://wp.me/p1sCvy-3LG

     

    Had great faith when Modi ascended to power in 2014: Naseeruddin Shah

    [সার-সংক্ষেপঃ  ভারতের নাসিরুদ্দিন শাহরা অবুঝের মত কথা বলছেন। তারা ভারতের রাজনীতি নাকি নিজের ধর্ম – কোনটার সংস্কার চান, সেটাই পরিষ্কার নন বা পরিস্কার করছেন না। তিনি যে ধারণার উপর ফিরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন তা কংগ্রেসের কথিত-‘প্রগতিবাদী’ রাজনীতি; যা এখন নিজগুণেই পরাজিত ও মৃত।  আমরা তিন দেশ ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে এটাই জন্ম থেকেই আজও অশান্ত ও দুর্বল করে রেখেছে। এবং এখনও সমাধান করতে সক্ষম না হলে আগামিতেও আরও অশান্ত থাকতে বাধ্য হবে।  অথচ নাসিরুদ্দিন শাহরা তা বুঝতে পারছেন মনে হয় না।]

    কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের রাজনীতি ভারতেই আজ মৃত। কংগ্রেসের ক্রমে নিঃশেষ, মুছে যাওয়া আর বিজেপির দু’বার বিজয়ই এর প্রমাণ। হিন্দুত্ববাদের বিজেপি হয়ত আবার জিতবে বা জিতবে না, কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতি শেষ ও বিলুপ্ত, এটা আর ফিরে আসবে না, তা আমার কথা নয়। গত নির্বাচনে রাহুল গান্ধী নিজেই “সফট হিন্দুত্ববাদের” ভিত্তিতে ও পক্ষে ভোট চেয়ে তা প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ ভারতে প্রধান দুই দলের এখন একটাই রাজনীতি – হিন্দুত্ববাদ। সাথে এখানে বলে রাখা ভাল অনেকের হয়ত খেয়াল করে দেখাই হয় নাই যে “হিন্দুত্ববাদ” জিনিষটা কী!

    আগে বলে নেয়া যাক হিন্দুত্ববাদ কী নয়! এর মানে, কেউ হিন্দু (বা সনাতন) হলে সে হিন্দুত্ববাদী বা খারাপ তা এখানে বলা হচ্ছে না, হয় না। হিন্দু হওয়া খারাপ তাও না। এককথায়, হিন্দুত্ববাদ আর হিন্দু মানে একই কথা একেবারেই নয়। কেউ হিন্দু হয়েও হিন্দুত্ববাদি নাও হতে পারেন। তবে হিন্দুত্ববাদি সকলেই হিন্দুও।   ব্যাপারটা হল আজও কংগ্রেস এবং বিজেপি – প্রথমটা সফট [soft]  আর পরেরটা ভারি হিন্দুত্ববাদী হলেও এদুই দলের বাইরে এখনও অনেকেই হিন্দু থাকতে পারেন এবং তারা আছেনও।

    আবার, কেউ হিন্দুত্ববাদী হলে সেটা খারাপ এজন্য যে এটা উগ্র হিন্দু জাতিবাদ বা ন্যাশনালিজম। তবে উগ্র বা নরম যেটাই হোক এটা খারাপ। চিন্তা হিসাবে বিপদজনক। কারণ এগুলো “আমার জাতি শ্রেষ্ঠ” ফলে অন্যদের উপরে আমার স্থান – এধরণের জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর ধারণা; বলাই বাহুল্য সব জাত শ্রেষ্ঠত্ব ধারণাই বিপদজনক ও ক্ষতিকর। হিটলারের মত অন্য-সব জাতিগোষ্ঠিকে পুড়িয়ে মারার মত ধারণা –  এথনিক ক্লিনজিং ধারণা।  কোন ধর্ম বা কোন জনগোষ্ঠির মনের গহীনে “নিজ-জাত-শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা দুনিয়ার বাকি সব জাতিগোষ্ঠির জন্য বিপদজনক এবং পাশাপাশি অন্য কোন জাতিগোষ্ঠির সাথে বসবাস-অযোগ্য এক “জাতিবোধ।  তাতে এই জাত বলতে তা ইংরাজিতে race অথবা ethnic যাই বুঝাক বা যে অর্থেই জাত বা জাতি বুঝাক না কেন। সবার বেলাতেই সত্য। হিন্দুত্ববাদ একটা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারণা।

    আসলে, যেকোন  ধরণের জাতি-ধারণা মধ্যেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণা সুপ্ত বা লুকানো থাকেই।  আর তাই যেকোন সময় তা বের হয়ে এসে আমরাও একেকটা জাতি হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলারের মত “আমরা দেহে নীল চোখের এরিয়ান রক্ত বা ব্লাড, আমরা হলাম দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আমরা জাত-শ্রেষ্ঠ। এই ছিল হিটলারের মুখ্য বয়ান। আর এটাই সব রেসিস্ট (বর্ণবাদী racist) – এদের কমন ডায়লগ আর চরম ক্ষতিকর বয়ান। দুটা শব্দ দিয়ে এদের চিনা বা চিনানো সম্ভব। আমরা চেক করতে পারি তারা রক্ত  অথবা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলছে কিনা!  অথবা আমরা মহান বা  আমরা মহান জাতি; আমার ভারত মহান বা আমার জর্মানি মহান ইত্যাদি ধরণের বয়ান দেয় কিনা! আর এখানে  রক্ত মানে তাদের রক্ত নাকি সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ, এই তাদের দাবি।  একারণে কংগ্রেস বা বিজেপির “হিন্দুজাতি রাষ্ট্র” গড়তে চাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ গড়া একই কথা।  অনেক সময় আমরা অজানায় আরেকটা জনগোষ্ঠিকে  নিচা দেখানো যায় এভাবে শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে ফেলি – তাই এটা অবশ্যই রেসিজম এবং ক্ষতিকর । [যেমন পাকিস্তানিদের আমরা ‘পাকি’ বললাম।] আর এভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিক হল, এতে একটা রাষ্ট্রের ভিতরে আর সকলেই সম-নাগরিক অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ বা সম্ভাবনা থাকে না। নাই হয়ে যায়।  কাজেই মূলকথা কারও হিন্দু নাগরিক হওয়া (যেটা কোন সমস্যা নয়) আর হিন্দুত্ববাদী নাগরিক হওয়া এক কথা নয়।

    ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রভাব অর্থে বা ট্রেন্ড অর্থে বলতে পারি কংগ্রেসের রাজনীতির পতন হয়েছে।  অর্থাৎ উগ্র-হিন্দুবাদকে লুকানো রেখে আড়াল নেয়া হিন্দুত্ববাদ পরাজিত হয়েছে। আর এতে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দুজাতিবাদ উদাম হয়ে বিজেপি নামে ক্ষমতাসীন। অথচ নাসিরুদ্দিনরা যা নাই, যা মৃত, সেই কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের অলীক সেক্যুলার ভারতে ফেরার দাবি করছেন! গত বছর (২০২১) সেপ্টেম্বরে তার ফেসবুক ইউটিউবে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু বক্তব্য প্রচার করছেন সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    মনে রাখতে হবে, রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজেরই পরিণতি হল – এক হিন্দুজাতি রাষ্ট্র, হিন্দু নেশন স্টেটের ধারণা-কল্পনা। আর শেষে এরই বাস্তব রূপ হল ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া  ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া অনুমোদিত প্রথম রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ বা সংক্ষেপে কংগ্রেস। হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র কায়েম যার লক্ষ্য। বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে উস্কে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে পরিণতিতে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের আরেক রাষ্ট্র গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হবে। তাই হয়েছে …

    নাসিরউদ্দিন শাহ এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ
    নাসির উদ্দিন শাহ এর মূল পাবলিক পরিচয় তিনি দক্ষ শক্তিমান অভিনেতা ও পরিচালক তো বটেই; তিনি তিনবারের “ফিল্মফেয়ার” পুরস্কার প্রাপ্ত, তিনবার ভারতীয় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং একজন “পদ্মভূষণ” পুরস্কারপ্রাপ্ত। দিল্লির স্বনামে পরিচিত, “ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা” [NSD] এই ইন্সটিটিউটের ১৯৭৩ সালের গ্রাজুয়েট। আমার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতায় বললে, আমাদের তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়  জীবনে আশির দশকে আমরা তাঁর বিখ্যাত অভিনয় ও সিনেমাগুলো দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। নিঃসন্দেহে তিনি একজন ভাল পারফর্মার। হাতে গোনা কিছু সফল লোকেদের একজন একজন তিনি। যদিও সেকালের এক অর্থহীন আবেগী ভাষ্য অনুসারে বললে, আমরা “পুঁজিবাদবিরোধী সিনেমা” দেখতে চাই এমন ভাষ্যের কথা চালু হয়েছিল। এরই অধীন   কথিত “প্যারালাল সিনেমা” আন্দোলন এক ব্যর্থ অভিজ্ঞতা ছিল সেগুলা, তা অবশ্যই। কিন্তু এখানে আমাদের আলোচনার  বিষয় এসবের একেবারেই বাইরে। তাই এখন আর সেদিকে যাচ্ছি না।

    বলা যায় মোদির আমলের ভারত (২০১৪-এখনও) এইকালে চরম অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ নাসিরউদ্দিন শাহ এর ক্ষোভ আর তা থেকে তোলা হিন্দুত্ববাদী বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ে নাই। বিশেষ করে গত বছর থেকে। যার মূল কারণ হল, চরমতম মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন মোদি বিজেপি ও তার দলবল। যার পিছনে আছে ভারতের কোভিড দুরবস্থায় মোদি প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ফেল করা থেকে। সেখান থেকে অর্থনৈতিক সংকট, কাজ হারানো, চিকিতসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া ইত্যাদি। আর এত হারিয়ে ফেলা জনমত যা মোদিকে কোনঠাসা করে তুলেছে আর এই সংকট মোকাবিলায় মোদি নিয়মিত চলমান মুসলমানবিদ্বেষকে আরো চরমে তুলে এথেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হিসাবে একে হাজির করেছেন।
    যেমন, আফগানিস্থানে তালেবান-উত্থানে ভারতীয় মুসলমানদের উচ্ছাস প্রকাশ – এর বিরুদ্ধে নাসিরউদ্দিন শাহ  নিজের কথিত “সেকুলার অবস্থান” দিয়ে মোকাবিলা করতে গেছিলেন। আর এতে পরিণতিতে তিনি না ঘরের না ঘাটের অবস্থান পড়েছেন। এতে না ভারতীয় মুসলমানদের আম প্রধানধারা তাকে আপন করতে পেরেছে না এখনকার হিন্দুত্ববাদ প্রভাবিত ভারতের প্রধানধারা তাদেরঅও অন্তত এলিট বা সেলিব্রেটি বলে নাসিরউদ্দিনকে জায়গা করে দিয়ে পেরেছে। অথচ সবখানেই নাসিরউদ্দিন শাহ তার কাম্য তবে মৃত ও কথিত সেকুলারিজম খুজে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।
    কাশ্মীরের মুসলমান হত্যা-নিপীড়ন এর পক্ষে হিন্দুত্ববাদী সাফাই বয়ান তৈরির সিনেমা “কাশ্মীর ফাইলস নিয়েও নাসিরউদ্দিন শাহ কড়া প্রতিবাদ করেছেন। করেছেন তার কথিত সেকুলারিজম এর উপর দাঁড়িয়ে। অথচ এই কংগ্রেসি সেকুলারিজম (১৯৪৭-৯০ এর দশক) সেকালেও কিছুর সমাধান করতে পারে নাই। গান্ধী নিজেই খুন হয়ে গেছেন তাও না! আর নব্বই এর দশক থেকে ভারতে  কথিত সেকুলারিজম ক্রমেই শেষ প্রভাবটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। আর এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদের জমানা।
    মূলকথাটা হল, স্বাধীন ভারত জন্মের আগে থেকেই “কংগ্রেসি সেকুলারিজম” – এটা ছিল এক মিথ্যা অবলম্বন। অকেজো রাষ্ট্রনীতি। কারণ খোদ কংগ্রেসের জন্মই হয়েছে খোদ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়ার খায়েসে। যার সুপ্ত ও মৌলিক লক্ষ্য হল “হিন্দু আধিপত্য” কায়েম। এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র-সমাজ গড়তে হবে।
    অথচ কোন আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার চিন্তার মধ্যে যেকোন জনগোষ্ঠির যদি অন্যের উপর “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনা থেকে যায় তবে নিয়মিত সামাজিক সংঘাত তো চলারই কথা! এবং তাই ঘটে চলেছে। সারা কংগ্রেসি আমল এটা এভাবেই চলেছে। আর এই নোংরা চেহারা ঢাকতেই মিথ্যা-প্রলেপ হিসাবে আনা হয়েছিল কথিত ও অর্থহীন সেকুলারিজম ধারণা। অথচ সারা কংগ্রেসি আমলে হিন্দু “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনায় কোন বদল আনা হয় নাই। তাই, এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। তা সত্বেও নাসিরউদ্দিন শাহ এর মত ভারতীয় মুসলমানেরা নিজের সাথেই প্রতারণা করে নিজেকে বুঝ দিয়েছে যে না – কংগ্রেসি সেকুলারিজম ভাল ও তাদের কাম্য। তাদের সুরক্ষা দিবে!! এটা দিতে পারবে না। কারণ, হিন্দু “আধিপত্য” কায়েম কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য – তাই এটা জারি রেখে এরপর আর মুসলমানদের জন্য এটা আর রক্ষাকবজ হতে পারতে না।

    এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণাঃ
    অথচ এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল  এর সাথে আরেকটা শব্দ আছে “অসাম্প্রদায়িক”। মুল শব্দটা তারা বানিয়েছে – সাম্প্রদায়িক বা কমুনাল (communal)। এখন কমুনাল বা সাম্প্রদায়িক শব্দের মানে কী?
    সাম্প্রদায়িক শব্দটা আসলে “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের যে বাসনা তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এরই এক্সটেনশন বা বিস্তার করতে গিয়ে তৈরি এক ধারণা। যেমন এই প্রশ্নের জবাব কী যে, “হিন্দু আধিপত্যের সমাজ গড়ার যে বাসনা তাহলে মুসলমান বা অন্যধর্মের লোকেরা  সেখানে কীভাবে বসবাস করবে? এর জবাবে “হিন্দু আধিপত্য” আগ্রহিরা বলবে, আমার সমাজে তুমি মুসলমান থাকতে চাইলে আমি কিছু শর্ত দিব যা তোমাকে মেনে চলতে হবে বা সে অনুযায়ী তোমার নিজেকে সাজিয়ে নিতে হবে। আর সেসব শর্তগুলো মানলে তোমাকে আমি যে খেতাব দিব তার নামই হল “অসাম্প্রদায়য়িক”। মানে হল আমি হিন্দু আমি আমার আধিপত্যের সমাজ কায়েম করব, আমার ধর্মিয় আধিপত্য বা শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্নগুলো প্রদর্শন করব। কিন্তু তুমি মুসলমান তোমার চিহ্ন – টুপি বা পাঞ্জাবি ধরণের ইসলামি চিহ্ন প্রদর্শন করতে পারবা না। বরং আমার নির্দেশিত কালচারাল আইকন বা চিহ্নে নিজেকে সাজিয়ে নিবা। একমাত্র তাহলেই আমি তোমাকে আমার পাশে বসতে দিব। আমার স্কুল-কলেজে আমার পাশে বা একই সুবিধায় চাকরি-কাজের স্থলেও আমার পাশে তোমাকে বসতে দিব। যাতে তুমি যে আমার অধীনে তা জ্বলজ্বল করে প্রকাশ্য থাকে। সারকথায় বললে, অসাম্প্রদায়িক হলে মানে  নিজেকে ভুলে আমার শর্তে নিজেকে সাজালে কেবল তবেই আমি তোমাকে আমার সমাজে জায়গা দিব।
    এই কারণে বলা যায়, সাম্প্রদায়িক শব্দটার উপস্থিতি আর ধারণা থেকেই বুঝা যায়  “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের মুল  বাসনার বাস্তবায়ক শর্ত হল “অসাম্প্রদায়িকতা”।

    ভারতীয় মুসলমানদের উপর এই “অসাম্প্রদায়িকতার” শর্ত আজও চাপিয়ে রাখা আছে। আর নাসিরুদ্দিন শা বা কবি গীতিকার জাভেদ আখতার এর মত ভারতের কালচারাল জগতের লোকেরা  এই ভিত্তিতে নিজেদেরকে সেকুলার বলে পরিচয় দিয়ে বেদম খুশি ছিল। তারা মানতেই চায় নাই যে এট অধীনস্ততা!
    তারা এটাও মানতে চায় নাই যে কংগ্রেসের সেকুলারিজম আসলে ইসলাম কোপানোর আর ইসলামবিদ্বেষের সেকুলারিজম!

    যারা হিন্দুত্ববাদ বিরুদ্ধে লড়তে চান তাদের উচিত অসাম্প্রদায়িকতা বা কমুনাল শব্দগুলো একেবারে পরিত্যাগ করা।
    এগুলো হিন্দু আধিপত্য কায়েমের শব্দ ও চিহ্ন। আমাদের যেকোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন সেকুলারিজমই নয়। তাহলে এখন মুল সমস্যাটা কী? সেটা হল, না তারা হিন্দুত্ববাদের প্রতিবাদকারি না তারা অন্য মূসলমানদের সাথে একাত্ম। বরং তারা আজ একা! আর সর্বপরি তাদের পেয়ারের কংগ্রেস নিজেই আজ নিজেকে সফট হিন্দুত্ববাদী বলে নিজেদেরকে তুলে ধরছে।

    বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের দিকে ঠেলে দেয়া হবে। হয়েছেও তাই। কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগ বলে আলাদা দল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। যা পরে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল। পববর্তীতে কংগ্রেস তো বটেই বিশেষত কমিউনিস্টরা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার জন্য জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের ওপর সবদোষ চাপিয়ে প্রপাগান্ডা করে চলেছে। অথচ সবার আগে হিন্দুজাতি রাষ্ট্রের ভারতের কল্পনা ও এর ভিত্তিতে কংগ্রেসের জন্ম তারা দিয়েছে, এই খবর তারা লুকিয়ে রাখে।

    তাহলে একালে নাসিরুদ্দিনরা কী চাইছেন? তারা বলছেন তাদেরকে ওই হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেসের সরকার বা জমানাটা ফিরে এনে দিতে, যে হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেস চেহারা লুকাতে ‘সেক্যুলার’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ জামা গায়ে দিয়ে ঘুরত। আমরা নাসিরুদ্দিনদের খুশি করতে এখন চাইলেও সেই কংগ্রেসকে ফিরে আনতে পারব না। কারণ সে মৃত আর সে জায়গায় স্বরূপে আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদ কায়েম হয়েছে। কংগ্রেস আর জাগবে না। সে ইতিমধ্যে সফট হিন্দুত্ববাদে চলে গেছে।

    আসলে নাসিরুদ্দিনদের খেয়াল করলে দেখতেন তারা আসলে কংগ্রেসের হিন্দুজাতি ধারণার ভেতরে যে মার্জিনালাইজও চাপা পরে থাকা (কথিত সেক্যুলার) ‘মুসলমান’ ধারণা তৈরি হয়েছিল সেখানে ফেরত যেতে চাইছেন। কিন্তু সেটা তো নিজগুণেই এখন মৃত!

    নাসিরুদ্দিন শাহদের অনেক আগেই বুঝে নেওয়া দরকার ছিল যে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে টাইপের বৃটিশ শয়তানি ব্যাখ্যার সেকুলারিজম যা ভারতীয় কথিত সেকুলারিজম – এর সাথে ক্লাসিক সেকুলারিজমের কোন সম্পর্ক নাই। ক্লাসিক সেকুলারিজমের মুল বৈশিষ্ট ও তাতপর্য হল ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকই সম- অধিকারের নাগরিক।   ফলে এর ভিতরে “রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে বলাটাই শয়তানি”, হিন্দু আধিপত্য নিশ্চিত করার ছুপা খায়েস।
    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা এসব মৌলিক ধারণা থেকে বহুগুণ দূরে…।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা   গত  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “নাসিরুদ্দিন শাহরা ভাঁড়ে পরিণত হবেন“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৫ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-49S

     

    Ignoring BRICS is ignoring turn of history

     

    শশী থারুর [SHASHI THAROOR] একজন ভারতীয়, কংগ্রেস দলীয় রাজনীতিবিদ। মূলত, তিনি রাজনীতিকের চেয়ে বরং একজন কেরিয়ারিস্ট; তিনি প্রফেশনাল কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি এবং গ্রাজুয়েশন করেছেন আমেরিকার স্বনামধন্য ফ্লেশ্চার স্কুল [The Fletcher School of Law and Diplomacy] থেকে। এই অর্থে তাঁর এক নামী একাডেমিক ইনস্টিটিউশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদিও তিনি ততটুকুই রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন বা চেয়েছেন যতটুকু  কেরিয়ার বাড়াতে তাঁর দরকার মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এতে তিনি যতটা যোগ্য হয়েছেন তার চেয়ে বেশি  নিজ একাডেমিক (ফ্লেশ্চার) বড়াই বা গর্ব করে থাকেন এবং তা বাড়াবাড়ি রকম। তার সমসাময়িক বা এল্যুমনিদের [alumni] মধ্যে যারা এমনকি বাংলাদেশী (ফ্লেশ্চার) তাদেরকেও এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।

    মোদির ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার আগের টানা দুই টার্ম (২০০৪-১৪) কংগ্রেসের মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় ছিল; সেই সময়কালে থারুরের কেরিয়ার ও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল। সে সময়টা ছিল কংগ্রেস সরকারের – তাই তিনি কংগ্রেস দলের (কেরালা থেকে) এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন। মানে সে সময় অন্য দলের সরকার হলে তিনি সেই দল করতেন হয়ত, এ রকম কেরিয়ারিস্ট তিনি। কেন এমন বলছি?

    বলছি, সেকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই যেমন এতদিন তিনি ছিলেন এক মোদিবিরোধী কংগ্রেসী। কিন্তু গত ৭ জুলাই ২০২২ তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate] এক আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে – অবস্থান বদলে নিতে চাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি  বাইডেনের মহাউদ্যোগে নবগঠিত বা চলতি যে ‘পশ্চিমা জোট’ শক্তি তৈরি হচ্ছে (সাম্প্রতিকালে জি-৭ আর মাদ্রিদে ন্যাটোর সম্মেলন ডেকে বাইডেন হইচই ফেলতে চেয়েছেন, ইউরোপের সাথে আমেরিকার জোটকে তিনি  ‘পশ্চিমা ব্লক জোট’  [Western bloc’s] বলে পরিচয় করিয়েছেন সেখানেই) শশী থারুর বাইডেনের এই উন্মাদনা দেখে  আর বসে থাকতে পারেননি। একেবারে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকালতি শুরু করেছেন। যেখানে এতদিন তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকার ভারত পলিসির ক্রিটিক।

    শশী থারুর নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।  সেখানে তার ব্যক্তি অবস্থান হিসেবে যে লাইন তিনি পারসু করতেন বা পক্ষে কথা বলে থাকেন তা হল যেমন – কেন আমেরিকা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেনমেন্টের [China Containment] এ’কাজের ঠিকা দিয়েছে; এর সমালোচক ছিলেন তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই চীন ঠেকানোর পুরস্কার বা মজুরি হিসেবেই ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল।

    এই ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ প্রশ্নেই থারুর  মোদির প্রো-আমেরিকান হয়ে লেপ্টে থাকার নীতির সমালোচক ছিলেন। ফলে যেন কংগ্রেসি হিসেবেই মোদির সমালোচক তিনি, এ’পরিচয় লটকে চলতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি পাশ ফিরছেন; মোদির সমালোচক হয়ে বাইডেনকে অতি আপন করে নিতে চাইছেন। যেটা অনেকে পাল্টিমারাও বলতে পারেন। কিন্তু কী প্রসঙ্গে ছিল থারুরের সেই লেখা?

    আলোচ্য সেই লেখার শিরোনাম হল  – ‘ব্রিকস থেকে ভারত কি বেরিয়ে যাবে?’ এটা বাংলাদেশে অনেকে এভাবে বাংলা করে ছেপেছে – যেটা ভালো বাংলা হয়নি। কারণ, মূল ইংরাজি ভাষ্যটা ছিল Are the BRICS Breaking Up?  বা – ‘ব্রিকস কী ভেঙে পড়বে’-এরকম।

    প্রতি বছর ব্রিকস জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার গতমাসে ২৩-২৪ জুন তা হয়েছিল চীনে। একইসাথে তা বিশেষ গুরুত্বে ‘বেইজিং ঘোষণা’ [XIV BRICS Summit Beijing Declaration] বলে এক ঐক্যমতের দলিলে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। আর এবার ব্রিকস সম্মেলন হয়েছে এমন পটভূমিতে যখন বাইডেনের ‘পশ্চিমা-শক্তি’ আগেই ঘোষণা দিয়ে যা যা বলেছে এর অর্থ হয় যে, মূলত চীন ও সাথে রাশিয়া এবং এদের সহযোগী সব রাষ্ট্রকে তারা একঘরে করবে, কোনো অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কও রাখবে না; ভিন্ন করে দিবে; যেন অ-জাত বা নিচা-জাত তারা। সেটা অনেকটা ১৯৯২ সালের আগে সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই-ব্লকে দুনিয়া ভাগ হয়ে থাকার সময়কালে দুনিয়া যেমন ছিল তেমনি।
    সেখানে আবার দুনিয়াটাকে ফিরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাইডেনের এটা এক অবাস্তব খায়েস-কল্পনা মাত্র। যেটাকে ‘কোল্ড ওয়্যার’ [cold war]-এর সেকাল বলে অনেকে চিনে থাকে যার মূল অমন বৈশিষ্ঠ যে ব্লকে ভাগ হতে পেরেছিল যে, তাতে সোভিয়েত-আমেরিকা বলে এ দুই ব্লকের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্য-পুঁজিবিনিয়োগ বিষয়ক (ফলে  জ্ঞান বা স্বাভাবিক বাতচিত-সহ সবকিছুও) মানে ভাব বা ব্যবসা কোনোকিছুরই বিনিময় সম্পর্ক ছিল না।

    ঐ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ, খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের কোনো দেশ কেউই – ১৯৪৪ সালে আইএমএফ প্রথম  জন্ম ও গঠন হওয়ার পর থেকেই – এরা কেউ  সদস্যপদ নেয়নি। আর যে সুযোগে পরে আমেরিকাও সদস্যপদ না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাইডেনের নয়া-কল্পনার খায়েস অনেকটা সেকালের মতই যা একালে আবার সেখানে পৌঁছানো যায় কি না; এই তাঁর আকাঙ্খা বা মনোবাঞ্ছা। যদিও একালে সে বাস্তবতাটাই নাই ভেঙে গেছে, মানে বাস্তবে তা আর উপস্থিতিও নেই। তবু এ জায়গায় বাইডেন নির্বিকার। কিন্তু জিদ ধরেছেন সেকালেই ফিরতে চান! বাইডেনের ভাষায় বললে, তার নেতৃত্ব গড়ে তোলা ‘পশ্চিমা শক্তির’ সাথে চীন ও এর বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নাকি ‘মূল্যবোধে’ [Beijing…. challenges the Western bloc’s ‘interests, security and values’] এক বিশাল ফারাক আছে; তাই তিনি যেন অবাস্তব জেনেও এমন জিদ ধরেছেন।

    এ ছাড়া এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেক তাৎপর্য ছিল, এতদিন এতে পাঁচসদস্য রাষ্ট্র শুধু অংশ নিয়েএসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম অতিথি হিসেবে আরো ১৩টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। যে দেশগুলো হল – আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, সেনেগাল, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আমরা বলতে পারি, এর মানে, এদের কাছে বাইডেনের উদ্যোগে নবগঠিত যে ‘পশ্চিমা ব্লক’ করেছে, চীনকে একঘরে করবে বলে হুমকি দিয়েছে- সেসব দিকগুলো এসব দেশের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। কেন এভাবে বলছি?

    গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস (BRICS) আসলে কীঃ
    এক কথায় বললে, এখনো আমেরিকা গ্লোবাল ইকোনমির নেতা হয়ে থাকলেও এর অবস্থা পড়তি শেষ পর্যায়ে। বিপরীতে চীনের নেতৃত্ব উত্থিত হয়ে তা সেই জায়গা নিতে চাইছে। আ্মাদের অর্থ-বাণিজ্যের দুনিয়া এখন এরই জংশনে আছি। আর এতে গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; যেটা নিজে আছে আবার আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণে।
    কারণ, নিয়ন্ত্রক আইএমএফ এর বড় শেয়ার মালিকানা একা আমেরিকার নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। এমনকি চীন উঠে এলেও তার সাথে শেয়ার শেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। আর তা থেকেই ওয়াল স্টিটের পরামর্শে ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম! তাহলে ব্রিকস হল সেই আগামী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান; যখন গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল ঘটবে তখন যা কার্যকরি হবে। কিন্তু তা সক্রিয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে যখন চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে তখন। কেন? এখন নয় কেন?

    ইকোনমিক-টেকনিক্যাল কারণে একই দুনিয়াতে দুইটা ‘আইএমএফ’ ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে একটা দেশে একই সাথে দুটা সরকার থাকতে পারে না। তাই ২০০৯ সাল থেকে ব্রিকসের জন্ম হলেও এখনই তা দুনিয়াজুড়ে ‘আইএমএফ’-এর সমান্তরালে সক্রিয় হয়নি, ইচ্ছা করেই।
    চীন, ভারত, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল – এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস গঠিত। যদি অনুমান করে নেই আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে কেবল এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে সমান্তরাল আরেকটা দুনিয়া যেন আছে; তবে এখন অস্থায়ীভাবে এই পাঁচ রাষ্ট্রের জন্যই শুধু ব্রিকস যেন, আর সেই দুনিয়ায় আরেক আইএমএফ হিসেবে তা আপাতত হাজির আছে।
    এভাবে মনে করা যেতে পারে। যেদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে চীন আসীন হবে সেদিন ব্রিকস আর আইএমএফ মিলিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। তবে তা আজকের আমেরিকান প্রভাবের (মানে লায়ন শেয়ার) আইএমএফ যেমন, সেই রকম তখন সেটা চীনের প্রভাবের একটা নয়া আইএমএফ প্রতিষ্ঠান হবে, তাতে নতুন নাম কিছু একটা হবে হয়ত বা পুরনোটাই থাকবে। কিন্তু নয়া মালিকানা শেয়ারে বড় ভাগটা চীনের পক্ষে পুনর্গঠিত হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। কাজেই চীনকে উপেক্ষা করে নয়া দুনিয়া সাজানো বাইডেনের আমেরিকার এক মরণ খায়েশ মাত্র। অথচ বাইডেনের এ’অবস্থানের পরোয়া না করে ১৩ রাষ্ট্রের এবার ব্রিকসের অতিথি হয়েছে – নিজেদের স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটা ঘটিয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাইডেন যেখানে চীনকে গ্লোবাল বাণিজ্য থেকে বের করে একঘরে করার জিদ ধরেছেন; সেখানে এই ১৩ রাষ্ট্র উল্টা বাইছে – এমন পদক্ষেপ নজর-আমল করার মতই বলতে হবে!

    তবে ওদিকে একই দুনিয়াতে বিশ্বব্যাংক টাইপের প্রতিষ্ঠান একাধিক হতে পারে। টেকনিক্যাল অসুবিধা নাই। যেমন ইতোমধ্যেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এডিবি ADB) অথবা ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি IDB) আসলে এরা বিশ্ব ব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছে। এছাড়া চীনা প্রভাবাধীন নয়া এআইআইবি [AIIB] অথবা ব্রিকসের ভেতরেই আরেকটা ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক [NDB]’ নামে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে আছে।

    সার কথায় এতক্ষণের কথাগুলো সারকরে বললে, ব্যাপারটি হল, শশী থারুরকে এতদিন ব্রিকস নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। বরং ভারত-আমেরিকার চীন ঠেকানো নিয়ে কথা বলতেন। সেই তিনি এখন “ব্রিকস ভেঙে যাবে কি না” তা নিয়ে কথা বলছেন!
    আসলে আগেও অনেকবার বলেছিলাম যে গ্লোবাল ইকোনমি বা আইএমএফ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় কূটনীতিকদের সাবধান হওয়াই ভাল; এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির ইস্যু বলে ঠাওরে নিয়ে কথা বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের বিদ্যের দৌড় প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে – তাই অসাবধানে এ ইস্যুর সাথে আচরণ না করা ভুল। আর ঠিক সেই ভুল ও ফাঁদে আটকে গেছেন শশী থারুর!
    আগে বলে নেয়া যাক – কেন এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ‘বেইজিং ঘোষণা’ জিনিসটা কী যার ওপরই মূলত শশী থারুর এত ক্ষোভ বা আপত্তি!

    পাকিস্তানি আবদুল রহমান মক্কিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা নিয়ে তিন পর্যায় :
    প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগের সপ্তাহে ১৭ জুন, একজন পাকিস্তানি কিন্তু আইএস সদস্য আবদুল রহমান মক্কির নাম জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকায় তোলা হবে কি না এ নিয়ে ভারত-আমেরিকার এক যৌথ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন এটা আরো ছয় মাস দেরি করার পক্ষে নিজ ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে, পরের সপ্তাহে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের ভারতের মোদি নিজ বক্তৃতায় সরাসরি এ প্রসঙ্গটা উচ্চারণ না করে তবে প্রসঙ্গটা মাথায় রেখে বলেন, ‘আমাদের (ব্রিকসের সদস্যরা) একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝা উচিত, সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা দেয়া উচিত; যাতে এমন ইস্যুর রাজনীতিকরণ না হয়ে যায়।’

    Modi has said that the BRICS member nations should understand each other’s security concerns and provide mutual support in the designation of terrorists, asserting that this sensitive issue should not be “politicised”.

    আর এতে তৃতীয় ঘটনাটা হল, ব্রিকস সম্মেলন শেষে ‘বেইজিং ঘোষণা’ নামে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আর এই প্রস্তাবের  বিষয়টা সারকথায় বললে – আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যুতে ব্রিকস সদস্যরা  যখনই একসাথে জাতিসঙ্ঘে অবস্থান  নিতে পেরেছে তাতে কত ভাল কিছু ফলাফল এসেছে -সেসবের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখন থেকে আবার পরস্পরের সহযোগী হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

    কেন এসব বলেও বারবার চীন-ভারত একসাথে থাকতে পারেনি :
    এর মুলকথা হিসাবে বলা যায়, গ্লোবাল নেতৃত্বের পরিবর্তনের একালে গত ২০ বছর ধরে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে তাতে মৌলিক বোঝাবুঝিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেছে বা রাখা হয়েছে বলে এর উল্টো ফলই ভারত বারবার পেয়েছে। যেমন- ভারত মনে করে এসেছে, এযুগে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভারত এদের দুজনের মাথার উপরে উঠে যেতে পারবে। নিজ ভাগ্য গুছিয়ে নিতে পারবে, কারণ ভারতের কূটনীতি খুবই চতুর!!  কিন্তু এটা এতটাই উচ্চাশা যে, এ নিয়ে কথা বলাই সময় নষ্ট। কারণ, এখানে মূল বিষয়টা – কূটনীতিক দক্ষতা দেখানোর নয়- বরং ‘নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ও তা দেখানোর’। নিজেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করে দেখানোর।
    এতে মোদি ভাল নেতা কি না, বা দেশপ্রেমিক জাতিবাদী কি না কেবল তা দিয়ে বা এই কর্তাসত্তা দেখিয়ে দাবি করা অর্থহীন যে- ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’ অর্জন হয়ে গেছে। ফলে এখন চীন-আমেরিকাকে কূটনীতিক চাতুরি দিয়ে টেক্কা মেরে দিলেই সব অর্জন হয়ে যাবে?  না, তা হওয়ার কারণ নাই। বরং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে দেখাতে হয়। তার আগেই নিজেকে পরাশক্তি দাবি করা অর্থহীন। বাগাড়ম্বর! আর কিছু হওয়ার আগেই আমি বিরাট কিছু এই বাগড়ম্বরতাই ভারতের কিছু না হতে পারার কারণ। সর্বোপরি আছে হিন্দুত্ববাদ, এই ভুল শুধু না বিরাট ক্ষতিকর রাজনীতি।
    যেমন ধরেন, সম্প্রতি ভারতের জনসংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়েছে। বিবিসি বাংলা খবরটা ছেপেছে যেন এটা নিজেই এক অর্জনের ঘটনা।   গ্লোবাল অর্থনীতির প্রধান কেউ হতে হলে বড় জনসংখ্যা এর অর্জনের জন্য অবশ্য একটা ইতিবাচক উপায় (ফ্যাক্টর) ও সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বড় জনসংখ্যার কোনো দেশ হয়ে যাওয়া মানেই সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কারণ, ওই বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতিতে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বানাতে রূপান্তর করতে সক্ষম হতে হবে আগে – তবেই বড় জনসংখ্যা ইতিবাচক; না হলে ওই বিপুল জনসংখ্যাই হবে তখন বড় বোঝা বা ভার।

    আর এই ভারতীয় ভুল মনোভাবকেই ফুসলিয়ে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে দিল্লিকে নিয়ে গেছে, ঠিকা দিয়েছে; মানে উল্টা ভারতকে ব্যবহার করেছে। চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়েছে। অথচ আমেরিকা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘পতিত শক্তি’। অর্থাৎ ভারতসহ উদীয়মান যেকোন অর্থনীতির জন্য বিপরীত শক্তি। কাজেই আমেরিকা ভারতের দোস্ত বা এলাই হতে পারে না!!

    এবার সুনির্দিষ্ট করে জঙ্গি ইস্যু :
    চীনের উইঘুর ইস্যু। আপনি উইঘুর বাসিন্দাদের পক্ষে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন এবং যাওয়া উচিতও। কিন্তু এক শর্তে! তা হল – উইঘুররা আবার আফগানিস্তানে আইএসের সহযোগী হয়ে সশস্ত্র তৎপরতা করে বেড়াতে পারবে না। আসলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানেরাও উইঘুর [ETIM]  এদের এমন তৎপরতা করতে আপত্তি ও বাধা জানিয়েছে। এইখানে দেখেন এনিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট।
    কিন্তু তারা তবু ভারত ও আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কাজে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচরাও থাকছে।

    পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা ইনস্টিটিউটে হামলা বা পাকিস্তানে গোয়াদর ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী মারতে বেলুচদের সাথে মিলে উইঘুরের বাসিন্দারা যদি তৎপরতা চালায় তবে এরপর আপনি আর একই সাথে তাদের প্রতি চীনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরেক বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, গত ২০০১ সাল থেকে উইঘুররা আমেরিকা সরকারের “সন্ত্রাসী দলের তালিকায়” অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগ-দিয়ে  ট্রাম্প প্রশাসন এই [ETIM] গ্রুপকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে মুক্ত করে দেয়। আর পরে বাইডেন উইঘুর বাসিন্দাদের উপর চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেইজিংয়ের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। রফতানিতে চীনা তুলা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে বাইডেন আসলে কী চায়?

    সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবান গ্রুপ টিটিপির [Tehrik-i-Taliban Pakistan] সাথে এদের মিলিত তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্রয় অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তাদের তৎপরতা স্তিমিত করেছে। আসলে বটমলাইন হল – আপনি আরেক দেশে সন্ত্রাস উসকে দিয়ে নিজ দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারবেন না। আমেরিকার সাথে মিলে ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস উসকে তোলার নীতিতে চলে তারা স্ব স্ব নিজ দেশ সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে পারবে না। ভারত-আমেরিকা মিলে পাকিস্তানে [চীনা স্থাপনা বা প্রকল্পে] সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দিয়ে নিজেরা ভাল থাকতে পারবে না। সন্ত্রাস প্রসঙ্গে সবখানেই সব ফোরামেই একই নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। এটাই একমাত্র এথেকে মুক্তির উপায়। পিস-মিল করে একেক সন্ত্রাসের ঘটনায় একেক অবস্থান নিবেন কোনটা কাছে টেনে কোল দিবেন আবার কোনটাকে জাতিসংঘের তালিকায় তুলবেন – এগুলো কোনটাই কাজ করবে না। শেষ বিচারে এসব কোন কাজের অবস্থান হবে না।  কেবল নুইসেন্স সৃষ্টি করা যাবে।

    যেমন যদি প্রশ্ন করি, ভারত মুক্কি ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে আমেরিকার সাথে মিলে ভারত জাতিসঙ্ঘে যৌথ প্রস্তাব উত্থাপনে গেল কেন? একই সাথে এ ইস্যুতে চীনের সাথে কথা বলা ও একই নীতি তৈরি করে উভয়েই তাতে চলতে চাইল না কেন? সমস্যা তো এখানেই! ভারত তো আসলে মুক্কি ইস্যুতে মানে সন্ত্রাস ইস্যুতে চীনের সাথেও এক অবস্থানে যেতে চায় না। চাইলে এই পথ ধরত। ভারত চেয়েছিল আমেরিকার সাথে গলা মিলিয়ে চীনকে জাতিসঙ্ঘের আসরে বিব্রত করতে। ভারত সমাধান চাইলে আগেই চীনের সাথেও একই অবস্থান নিয়ে কথা বলত। যেটা মোদি ব্রিকসের সভায় নিজ বক্তৃতায় বলেছেন যে, “ব্রিকসের পাঁচ সদস্যের সবাই অন্যের সন্ত্রাস নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আমল করা উচিত”। কিন্তু ভারত নিজেই তো তা অনুসরণ না করার নীতিতে চলেছে। না হলে পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে মিলে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, উইঘুর বা আইএস সশস্ত্র তৎপরতাকে ক্রমাগত সাহায্য সমর্থন না করে তা থেকে দূরে সরে আসত! কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়ে কোন সশস্ত্র হামলা হয় নাই। কিন্তু সেজন্য ইমরানের সাথে মোদি সরকারের কোন ঘনিষ্ঠতা, কাজের আলাপ বা সম্পর্কের উন্নতিতে কোন পরিবর্তন আসে নাই। বরং পাকিস্তান-মুসলমান বলে বিদ্বেষ-ঘৃণা আরো বেড়েছে। মুসলমান কোপানো এখন আরো প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটা ভারতীয় নির্বাচনি প্রধান ইস্যু। এরই শেষপ্রান্তে আমরা নুপুর শর্মা-কে দেখতে পাচ্ছি!!!

    আগেই বলেছি, মূল কথা্টা হল – ভারত মনে করে চীন-মার্কিন বিরোধে ভারতকে আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকতে হবে, আর এরপর এ থেকে ফয়দা তোলার কূটনীতিতে চলতে হবে। চীন-আমেরিকার বিরোধ কাজে লাগিয়ে এভাবেই নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। যেন ভারতের কূটনীতিই খুবই বুদ্ধিমান তাই এটাই জিততে থাকবে সবস্ময়!!!  কিন্তু বাস্তবতা কী?? সময়ে তা ধরা যাক কিছুটা আদায় হলেও হতে পারে হয়ত, কিন্তু এথেকে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কীভাবে? অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সাথে কূটনীতিতে ওস্তাদ হওয়া বা না থাকার কী সম্পর্ক? চালাকি কূটনীতি আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী এক জিনিস? না কি এটা উলটা ক্ষতি করবে? করছে!! এখানে কবি নীরব! অথচ এসব নিয়ে  নুপুর শর্মা ইস্যুতে ডুবে যাওয়া দিনে শশী থারুর এ নিয়েই আমেরিকার পক্ষে তৎপর হতে উঠে দাঁড়ানোর সঠিক সময় ভাবলেন।

    ভারত কিসে ডুবে যাচ্ছে?
    মূলত মুসলমান নির্যাতন ও কোপানো। অথচ একমাত্র  মুসলমান নিধন করেই মোদি নির্বাচনে বাক্স ভরার নীতিতে তাকে চলতে হবে বলে মনে করেন। কারণ অর্থনীতির পারফরম্যান্স আগামিতে আর ভাল করার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সর্বশেষ ফরেন কারেন্সী্তে বিপর্যয়ের ধাক্কা আরো বিশাল। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাহার করে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার-  সবদেশের উপর প্রয়োগ করা ছাড়া তার অস্ত্র ভোঁতা – তাই বাইডেনের পক্ষে ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাওয়া আবার দিল্লির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রয়োগ না করা স্ববিরোধী।

    অথচ থারুর ভাবছেন মোদি তার মত বুদ্ধিমান নন। সেজন্যই নাকি সমস্যা!! তাই তিনি ভেবেছেন বাইডেনের এ নয়া উদ্যমে চীনের বিরোধিতা করার সময়গুলোতে একে ভারতের নিজের কাজে লাগাতে বাইডেনের বন্ধু হতে হবে ও আমেরিকার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ ভাব দেখাতে হবে। অথচ এসব অবস্থান মোদি-জয়শঙ্কর সব উল্টে-পাল্টে যতদুর ব্যবহার করা যায় করেছেন । এরপরেই সব অকেজো অবস্থায় তারা। ভারতের উপত লাগাতর তিনবছর ধরে  মুসলমানদের উপর আক্রমণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শুণ্যের কোঠায় আনার জন্য অবরোধ আরোপের সুপারিশ ঝুলছে। অথচ সেদিকে শশী থারুর খবর নাই। কেবল নিজেকে মোদির চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবা ছাড়া……!!!

    ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা- একথা দিয়ে শিরোনাম লেখা কেনঃ
    শশী থারুর তার লেখার শিরোনাম করেছেন ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে। কেন?
    এনিয়ে লেখায় একটাই কারণ জানা যায় যে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ঐক্যমত না দেখাতে পারা। প্রশ্ন হল, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে তা তো না। এনিয়ে ভিন্নতা ব্রিকসের জন্মের আগে ছিল। মাঝে ছিল এখনও আছে। তাহলে এখন সেকথা তুলে এই প্রশ্ন কেন? এটাই সন্দেহজনক। এমনকি মোদি  নিজে বা  সরকারের কেউ এমন “ভেঙ্গে যাওয়া” ধরণের মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন দেখা যায় নাই।  তাহলে “ভেঙ্গে যাওয়া” নিয়ে যেন আলোচনা উঠে এর কৃতিত্ব একা থারুরের। কেন? তিনি এই ইঙ্গিত তুলে মোদির আগে বা উপরে আমেরিকার প্রিয় হতে চান? আমেরিকার নয়া এজেন্সি নিতে মোদির সাথে টক্কর দিয়ে আগায় থাকতে চান? যদিও কংগ্রেস এখনও কোথাও চীন ফেলে প্রো- আমেরিকান অবস্থান নিবে এমন ইঙ্গিত এখনও কোথাও কোন ইস্যুতে দেখায় নাই। বরং একাদেমিক বা সোশাল পর্যায়ের ঘরোয়া আলোচনায়, মোদি জমানা শেষ হলে চীন-ভারত সম্পর্ক ভাল হবে এমন ইঙ্গিত নন-পার্টিজানদের দিয়ে অনেক সময় দেয়া হয়েছে।
    তো সেটা হতেই পারে। শশী থারুর তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি অবস্থান নেন, বদলান।
    কিন্তু ২০১৬ অক্টোবরের এক সংবাদ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শশী থারুর  ব্রিকস সম্পর্কে বলছেন, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ নেয়া উচিত, তাই ব্রিকস কে উপেক্ষা করলে এমন মোড় পরিবর্তন থেকে নিজেকে উপেক্ষিত করা হয়ে যেতে পারে [Ignoring BRICS is ignoring turn of history: Shashi Tharoor]। তাহলে, মিস্টার থারুর, কী দাড়ালো ব্যাপারটা?
    মনে হচ্ছে খোদ শশী থারুরেরই মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যাহোক, সেটা হতেও পারে। কিন্তু এনিয়ে তার একটা ব্যাখ্যা পেলে আমাদের জন্য সব বুঝাবুঝি সহজ হতে পারত।  তা শশী থারুর কী এখন অবলীলায় “ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকেও উপেক্ষার” পক্ষপাতি হতে বলছেন!!!! কোথায় গেল তার সে ইতিহাসবোধ!!  কেন?

    শশী থারুর গ্লোবাল অর্থনীতির ব্যবস্থাটাই বুঝেন না তা উদামঃ
    তাই শেষ কথাটা হল – শশী থারুর যে গ্লোবাল অর্থনীতি বুঝেন না সেটাই এতে উদাম হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন “ব্রিকসকে আরও চীনকেন্দ্রিক করা হোক, সেটা ভারত চায় না।’। আসলে এই হল হাজার কথার এক কথা। গোপেন এবার ধরা পড়েছে!!!! শশী থারুর যে ব্রিকস কী ধরনের প্রতিষ্ঠান এটাই বুঝেন না, তার এক শক্ত প্রমাণ এটা।

    প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে আইএমএফ কী এবং – এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ও গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ছাড়া দুনিয়াতে কোন দেশ আরেক দেশের সাথে পণ্য-বিনিময়, পুঁজিবিনিয়োগ বিনিময় ইত্যাদি চলতেই পারত না কেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা ও যুদ্ধের খরচ একক বহণকর্তা হিসাবে আমেরিকার উঠে আসা ও পরবর্তিতে আবার অর্থনীতির পুণর্বাসনে রিপেয়ারে অর্থ ঢেলেছে ঐ আমেরিকাই। এরসাথে সেই উদ্যোগ নিয়ে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  ব্যবস্থা জন্ম দিয়ে গিয়েছে বলে আজও দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা বলে একটা কিছু চলছে। তবে এটা মন্দের ভাল। আর এই ব্যবস্থা আমেরিকার দিকে কান্নিমারা ভাবেই তৈরি হয়েছে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে এই শতকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আর চীনের হাতে নয়া ও বিপুল সঞ্চিত সম্পদের কারণে একা চীনের হাতেই সবার চেয়ে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা পুঞ্জিভুত হচ্ছে। এটাই চীনের সব ধরণের ক্ষমতা বা সক্ষমতার উতস।  এই কারণেই মূলত চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সবখানে বেশি উঠছে। কিন্তু ঐ ১৯৪৫ সালের দিকে যদি আওয়াজ তোলা হত যে  (ঐকালের ব্রিকস মানে) আইএমএফ এই প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না, তাহলে কেমন হত?  এককথায় এর উত্তর হত তাহলে আজও দুনিয়ায় কোন বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুই হত না।

    উদ্বৃত সম্পদ  বা সারপ্লাস কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকাই ছিল সেকালে (মোটামুটি  ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া শতক জুড়ে)  একমাত্র রাষ্ট্র যার হাতে বা যার অর্থনীতি হচ্ছিল উদ্বৃত সম্পদে ভরপুর। সেকালের কলোনি সাম্রাজ্যের নেতা বৃটিশ বা ফরাসীদেরকে ছাড়িয়ে।  ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতাই ছিল সেকালের একমাত্র ভরসা যে যুদ্ধের পরেও এই আমেরিকার ভরসাতেই, সেই প্রথম দুনিয়াতে একটা গ্লোবাল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন গড়ে উঠে। এবং তাই হয়েছিল। তাই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। তাই আমেরিকা ছাড়া বা আমেরিকা-কেন্দ্রিক নয় এমন এক আইএমএফ গড়ার কথা কেউ যদি বলে তাহলে বুঝতে হবে তিনি আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা কী ও কেন এর দরকার সেটাই আসলে বুঝেন নাই।
    এখন সেকালে কী শশী থারুর মত টেরা কিন্তু বোকা চিন্তার কেউই ছিল না যে বলে নয়া আইএমএফ কে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না ???
    হা অবশ্যই ছিল।  আর সেটা হল ফ্রান্স।  ফ্রান্স আপত্তি তুলেছিল যে একমাত্র আমেরিকান ডলার-কেন্দ্রিক  এক আইএমএফ বাণিজ্য-অর্থনৈতিক  এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। ফ্রান্সের যুক্তি ছিল অনেকটা কথিত ‘গণতন্ত্রি’ বা রাষ্ট্রের সাম্য ধারণার মত যে একা আমেরিকা কেন সব খাবে? সব কর্তৃত্ব নিবে!!
    কিন্তু  বলাইবাহুল্য ফ্রান্সের আপত্তি সবাই নাদান বালকের আপত্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ সেকালে আমেরিকাই ছিল একমাত্র উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশ। আর উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশের মুদ্রা ছাড়া  (এটাই মূল টেকনিক্যাল যুক্তি বা কারণ) ঐ একই ন্যাশনাল মুদ্রাকে একই সাথে গ্লোবাল বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। তাই সদস্য সকল দেশই একমাত্র ডলারকেই পছন্দ না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।   

    এখন একালে, চীনকে নিয়েও প্রায় একই আচরণ দেখাচ্ছে বাইডেনের আমেরিকা। নাদান আচরণ করছে।  আওয়াজ তুলছে বাইডেন। যেমন একটা তুলনা চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পকে নিয়ে। বাইডেন এই প্রথম এই চীনা প্রকল্পকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বলে আওয়াজ উঠিয়েছে। যদিও সবাই জানে ও বুঝছে এটা অবুঝ বাচ্চার আকাশের চাঁদ পাবার জিদের মত!
    বাইডেন বহুকষ্ট পশ্চিমের সবদাতা মিলে কুথে-কাথে ছয়শ বিলিয়ন ডলার যোগাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেবল। যদিও এখনও সে অর্থ দিয়ে কাজে নামে নাই। এর ভিতর আমেরিকা দিয়েছে মাত্র দুইশ, সারা ইইউ মিলে দুইশ আর জাপান ও অন্যেরা মিলে বাকি দুইশ বিলিয়ন এভাবে। আর  এভাবে তারা সবাই মিলে বিনিয়োগ সক্ষমতা যোগাড় করেছে ছয়শ বিলিয়ন ডলার। ভাল, খুব ভাল!!

    কিন্তু চীনের বেল্ট-রোডে বিনিয়োগ কত?  
    চীন মনে করে, বেল্ট-রোড এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর স্বপ্ন। সে যা হয় হোক, এর যাত্রাশুরু মাত্র এই ২০১৩ সাল থেকে।   ইতোমধ্যেই এর বিনিয়োগ চার ট্রিলিয়ন (মানে চারহাজার বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে [China Belt And Road Projects Value Now Exceeds US$4 Trillion]।
    ব্যাপারটা সোজা। আমেরিকাও ওর অর্থনৈতিক উত্থানে যখন ওর যৌবনকালে ছিল তখন বেশির ভাগ এমন বিনিয়োগ প্রকল্প একা আমেরিকাই চালিয়েছে। সেটাই এখন শিফট করে গেছে, চীনের উত্থান ঘটছে একালে।

     তাহলে, এটা চীনা উদ্বৃত সম্পদে উত্থানের যুগঃ
    তাই সেকালে আমেরিকার নেতৃত্বে আইএমএফের বদলে একালে আমরা চীনের নেতৃত্বে হবু আইএমএফ এর ভ্রুণ হিসাবে যেন – ব্রিকসকে দেখছি। কাজেই একালে চীন ছাড়া তো ব্রিকস দাড়াবেই না। আর এতে বড় বিনিয়োগ-মালিকানাও চীনেরই হবে। যেমন এখনও আইএমএফের শেয়ার মালিকানা আমেরিকার সবার চেয়ে বেশি; তা আমেরিকা জবরদস্তিতে হলেও ধরে রেখেছে।

    তাহলে, বটম লাইন ফ্যাক্টস হল – চীন নাই এবং প্রধান ভূমিকায় নেই এটা যদি কল্পনা করি, তবে ব্রিকস বলে কোনো প্রতিষ্ঠানই হবে না, দাঁড়াবেই না। দাঁড়ানোর দরকারও হবে না।

    আসলে ব্রিকস প্রতিষ্ঠান দরকার কেন? এটা নিয়ে শশী থারুর নিজেই প্রশ্ন তুলে নিজেই যেসব জবাব দিয়েছেন তাতেই তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধির খামতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন- প্রথমত, ব্রিকস বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক নাকি ভূরাজনৈতিক জোট?

    এর জবাব হল – ব্রিকস না অর্থনৈতিক না ‘ভূরাজনৈতিক’ জোট। না বুঝে প্রশ্ন তুলতে গেলে এভাবেই ধরা খেতে হবে!!!! যেমন যদি প্রশ্ন তোলা হয় – আচ্ছা আইএমএফ কী কোন জোট? অর্থনৈতিক না ভূরাজনৈতিক জোট? এটা তেমনই এক বোকা প্রশ্ন হয়েছে।  আইএমএফ মূলত এক “গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম’ খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে  আর এই সিস্টেমের মুল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ, সাথে সহযোগী বিশ্বব্যাংক।

    আর নয়া ব্রিকস [BRICS],  এটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তবে পুর্ণ প্রস্ফুটিত নয় বা করা হয় নাই ইচ্ছা করেই। এক ঘরে দুই পীর থাকে না তাই।  এখন আইএমএফ কেমন প্রতিষ্ঠান এটা যখন শশী থারুর, আপনার ধারণায় নাই তখন ব্রিকসও আপনি বুঝবেন না। কেবল প্রশ্ন করবেন আর নিজের বোকামিটাই তুলে ধরবেন!

    কাজেই মুখ খোলার আগে শশী থারুরের উচিত হবে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটি কী – এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ফ্লেশ্চার স্কুল কিন্তু আইন আর কূটনীতি বিষয়ে জোর দেয় সত্ত্বেও এটা মান্টিশেডের সাবজেক্ট এমন প্রতিষ্ঠান। একথা বারবার বলা হয়েছে। তবে এর বাকি শেডগুলো স্টুডেন্টদেরকে নিজ যোগ্যতায় পূরণ করে নিতে হবে। থারুর সেদিকে মনোযোগ দেন নাই দেখা যাচ্ছে। অতএব তার এখন এসব ব্যাপারে দ্রুত মুখ খুলা এড়ায় চলা উচিত! এটা অপ্রয়োজনীয়! এজন্যই বারবার বলেছি এই যুগের কূটনীতিতে মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা আইআর [আন্তর্জাতিক রিলেশন] এবিষয়ে পড়ুয়াদের ক্লাসের পাঠ্য না হলেও নিজ উদ্যোগে অর্থনীতি পড়ে নিতেই হবে।

    একারণে শশী থারুর নিজে বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে, ভারত ব্রিকসের সদস্য ঠিকই হতে চান। কিন্তু তার দাবি, “চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না”। এর মানে কি?  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফে কী ভারতের জন্য কোন জায়গা আছে? আইএমএফে ভারতের উল্লেখ করার মত কোন মালিকানা নাই কেন? আর সেটা কী আমেরিকা একালে ভারতকে দেওয়ার জন্য বসে আছে? দিবে? আমেরিকার প্রিয়বান্দা হতে চাওয়া  শশী থারুর কাছে এর কী কোন জবাব আছে? অতএব তাঁর না বুঝে কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয় কী!!!

    তাহলে নবগঠিত বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান AIIB, আসেন এখানে দেখিঃ
    এটা চীনা উদ্যোগের একালের বিশ্বব্যাংক যেন। ব্রিকস (বা আইএমএফ) গড়তে গিয়ে আগেই নিজস্ব বিশ্বব্যাংকটা যেন গড়ে নিয়েছে।  ফলে চীনা প্রভাব ও সিদ্ধান্ত এখানে প্রধান ভুমিকায়। চীনের নিজের মালিকানা শেয়ার এখানে ৩০% এর মত। এটাই সবার চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হল, ভারত যার, শেয়ার মালিকানা ১০% এর মত। আমেরিকার নাই, ইউরোপের খুব কিছু উল্লেখ করার মত নয়। অর্থাৎ আর কাউকে তেমন নয়, তবে ভারতকে  চীন ঠিকই গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে পাশে রেখেছে। তাতে ভারতের সাথে চীনের যতই রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকুক।  এটা স্বাভাবিক!

    তাহলে শশী থারুর কীবুঝে বলছেন – চীনকেন্দ্রিক  ব্রিকস তিনি চাননা?? 

    ভারী কথাবার্তা থাক একটা গল্প বলে শেষ করব।
    শশী থারুর ব্রিকস চান কিন্তু চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না। আর বাস্তবতা হল, চীন না থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে উদ্বৃত্ব সম্পদ – বিনিয়োগ দিবে কে? বুঝা যাচ্ছে এদিকটা নিয়ে তিনি ভাবেনই নাই। তাহলে আইএমএফ অথবা ব্রিকস বলতে তিনি কী বুঝছেন? কেমন প্রতিষ্ঠান এর কিছুই বুঝেন নাই। আবার  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফ নিয়েও তার আপত্তি দেখি না। তাই সবমিলিয়ে, তাঁর এই অবস্থানেরই প্রতীক যেন নিচের এই গল্প!
    শ্রাদ্ধঃ  কোন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সৎকারের নানা অনুষ্ঠান হয়। এই  ক্রিয়াকর্মাদি যা কিছু করা হয় একে শ্রাদ্ধ বা শ্রাদ্ধাদির নানা অনুষ্ঠান বলে। আর কয়েকদিন ব্যাপী এমন অনুষ্ঠান শেষে সাধারণত একটা নিরামিষ ভোজ বা খাওয়াদাওয়া ভিতর দিয়ে এসবের সমাপ্তি ঘটে থাকে। এখন এক ব্যক্তি দাওয়াতে এমন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।  কিন্তু উপস্থিত হয়ে তিনি সৌজন্য আলাপ জমাতে গিয়ে  ঐ বাড়ির কর্তাগোছের এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আচ্ছা যার শ্রাদ্ধ খেতে এলাম তাঁকে দেখছিনা? তিনি কোথায়???” 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “শশী থারুরের ব্রিকস বুঝ!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • সভ্যতা মানে কী

    সভ্যতা মানে কী
    সিন্ধু সভ্যতাঃ এই প্রেক্ষিতে

    গৌতম দাস
    ১২ মে, ২০২২  ১৪ঃ৫২ বৃহস্পতিবার

    https://wp.me/p1sCvy-44A

    দ্বিতীয় পর্ব পেতে এখানে https://wp.me/p1sCvy-47s

     

    Machu Picchu is an ancient city from the Inca civilization.

    Ancient ruins of Karnak temple in Luxor. Egypt. Image credit: Zbigniew Guzowski/Shutterstock.com

    দুনিয়াতে একেকজন মানুষ বিচ্ছিন্ন কেউ নয়, বিচ্ছিন্নভাবে একা একা তারা আসেনি বা দুনিয়াতে বসবাস শুরু করে নাই। দল বা গোষ্ঠিবদ্ধ ভাবে এসেছিল। জৈবপ্রাণ প্রজাতির টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত হিসাবে শুরুতেই এক পর্যায়ে তাদের হাজিরা হয়ে ইঠেছিল দলবদ্ধ, একথা বলা যায়। কারণ জৈবপ্রাণ প্রজাতিগুলো দুনিয়াতে টিকে যাওয়ার পিছনে এটা একটা গুরুত্বপুর্ণ শর্ত কাজ করেছে বলে অনুমান করা যায়। এছাড়া দুনিয়ায় সবকালেই  মানুষের উপস্থিতির যতগুলো রূপ-ধরণ আমরা এখন পর্যন্ত দেখি তাতে সবকালেই মানুষ মাত্রই তারা যৌথ মানে, তাকে দল বা গোষ্ঠিবদ্ধ ভাবেই দেখি। অর্থাৎ মানুষ একা জন্মায় হয়ত ঠিকই কিন্তু জন্মানোর পর থেকে বসবাস তার গোষ্ঠিবদ্ধতায় অথবা সেই থেকে গোষ্ঠির ভিতরেই তার সব প্রজন্ম ও তাদের বড় হওয়া ঘটেছে দেখি আমরা। তবে কথাটা এভাবে বলায় অন্য এক  লক্ষ্যণীয় দিক হল এখানে ব্যাপারটাকে পেশ করবার চেষ্টাটা হল দুনিয়াতে একেবারে শুরুর দিক থেকে মানুষ প্রজাতির কবে কখন এসেছে বা যুক্ত হয়েছে সেদিক থেকে কথা বলবার চেষ্টা করা হল।

    তা সত্বেও এভাবে “শুরু” থেকে বলার অসুবিধা হল, এক্ষেত্রে বেশিরভাগ তথ্যই কোন প্রমাণিত উৎস থেকে সংগ্রহ করা সহজ নয়। যদিও ইন্টারনেটের যুগে অনেক কিছুই আমাদের কাছে এখন লেখাপড়া বা স্টাডির জন্য সহজ লভ্য হয়ে উঠেছে। তবু অনেক উৎস আমাদের এখনও নাগালে নাই।

    এছাড়া এক্ষেত্রে আর সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল এরপরেও মানুষের ইতিহাসের সব মানুষের জানা হয়ে গেছে, খুঁড়ে দেখা ও খোঁজাখুজি করা হয়ে গেছে আবার পাওয়াও গেছে ব্যাপারটা তা তো নয়। ফলে  বহু প্রসঙ্গই একেবারেই অজানা বা জানার মাঝেও অনেক অজানা পকেট বা ফাঁকা থেকে গেছে হয়ত।  এমনটাই স্বাভাবিক।

    লিখিত ইতিহাসঃ
    মূল কারণ হিসাবে বলা যায়, আমরা যে আদি মানব রূপ নিয়ে কথা তুলেছি এসব ঘটনা প্রসঙ্গগুলো হল কমপক্ষে কয়েক মিলিয়ন (এক মিলিয়ন মানে দশ লাখ) বছর আগের ঘটনা [One of the earliest known humans is Homo habilis, or “handy man,” who lived about 2.4 million to 1.4 million years ago in Eastern and Southern Africa.]। আবার অন্যদিকে,  যেমন দুনিয়ায় মানুষ-সহ অনেক জৈবপ্রাণ প্রজাতি আছে। এর মধ্য মানুষ এই প্রজাতির বয়স ধরা হয় (গুগলের বিচারে)  যতগুলো তত্বগত ধারণা আছে এর কোনটাই দুই লাখ বছরের কম না। কাজেই এমন প্রসঙ্গের সব তথ্য সহজ লভ্য হবার কোনই কারণ নাই। এটাই স্বাভাবিক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায় একালে আমাদের জানা আছে ততটুকুই যখন থেকে কিছু  লিখিত ইতিহাস আছে। তাহলে লিখিত ইতিহাস কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।

    তবে তাহলে আবার আরেকটা কথা এসে গেল যে  যদি লিখিত ইতিহাসের কথা ধরে বলি, লিখিত ইতিহাস? এর মানে কী বুঝব? যখন থেকে ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে? তা বলতে পারি হয়ত তবে তাও একেবারেই এত সহজ কথা নয়। কেন?
    যেমন শুধু ‘লিখিত’ শব্দটার অর্থ প্রচলিত বা চালু হওয়ার আগেই অন্তত কয়েক হাজার হাজার বছরের মনুষ্য-জীবন এবং তা দলবদ্ধ  ধরণের বিশেষ জীবন পার হয়ে যেতে হয়েছে। মানেই এর আগে বহু বহু কিছু ঘটে যেতে হয়েছে এবং তা অবশ্যই আবার কয়েক হাজার বছরের ফেকড়া। কেমন সেটা?

    সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনঃ
    বড় হেড লাইনে বললে, একটা নতুন শব্দ এই আসরে আনব – শব্দটা হল সভ্যতা।  সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন (civilization) যখন থেকে শুরু। অর্থাৎ দুনিয়াতে অন্য অনেক জৈবপ্রাণ প্রজাতির মত মনুষ্য-প্রজাতির আগমন – এটা একটা কয়েক লক্ষ বছরের পুরানা ঘটনা। কিন্তু তা সত্বেও অপর আর একটা  রেফারেন্সের দিক থেকে আমরা কথা বলতে অভ্যস্ত – সেটাই “সভ্যতার” রেফারেন্সে কথা বলা। এই সভ্যতা মানে কী? শারারণভাবে বললে,  তখন কথাটা এভাবে বলা যায় যে যেখানে  মানুষের খোঁজ পাওয়া যায় এমন পুরানা সভ্যতাগুলোও মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরানা। এছাড়াও কথাটা এভাবে সম্ভবত বলা যায় যে সব মানুষের জনগোষ্ঠিই কোন না কোন এক সভ্যতার অংশ; যেমন এই বিচারে আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ।
    আর সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, উপরে যে লিখিত ইতিহাসের কথা বলছি সেটা ঘটেছিল কেবল ‘মানুষের সভ্যতা’ শুরুর পরেই। এটাই এর অপরিহার্য শর্ত, তা বলা যেতে পারে। তাহলে আবার ফিরে প্রশ্ন থেকে গেল যে সভ্যতা তাহলে কী?
    এর খুবই সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞাটা হল, মানুষ আদি মানব রূপ [homo sapiens] – এভাবে  কয়েক লাখ বছর আগে দুনিয়াতে হাজির হলেও মানুষের কৃষিকাজের জীবন যাপন শুরু বড়জোর ছয় হাজার বছরের বছরের পুরানা। মানুষের কৃষিকাজ শুরু খুবই গুরুত্বপুর্ণ হদিস। কারণ কৃষিকাজ মানে আর যাযাবর জীবন নয়। থিতু হয়ে যেখানে তাঁর চাষের জমি তারই সংলগ্ন হয়ে বসবাস করতে সে বাধ্য হয়েছে। মানুষের এই জোবনের শুরু মাত্র কয়েক হাজার বছরের পুরানা। তুলনায় মানুষের দুনিয়ায় আদি মানব রূপে আগমন হিশাব করতে হয় লাখে।   অর্থাৎ লাখ নয় কয়েক হাজার বছরের আগে যে মানুষের কৃষিকাজ-ভিত্তিক জীবন-যাপন শুরু হয়েছিল এটাকে আমি একেকটা মানুষের সভ্যতার জীবন বলি। এর আরো বিস্তারিত পরে আসবে।

    “লিখিত ইতিহাস” এর আবশ্যিক পুর্বশর্তঃ
    এমনিতে লিখিত ইতিহাস বলতে সেটা আসলে একালে বসে পুরানা ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহ। যদিও আবার ইতিহাস মানে ‘শ্রেফ অতীত প্রসঙ্গে তথ্য সংগ্রহ ও এর সমাহার নয়’। কারণ ইতিহাসের জন্য আরেক বড় অধ্যায় হল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটাই শুধু না, এর শেষে মূলত আত্মসচেতনতার [self-consciousness] জগতে প্রবেশ করা এবং আরো এগিয়ে যাওয়া। চিন্তা যে চিন্তা করে তা জেনে বুঝে যাওয়া। চিন্তারও বিভিন্ন পর্যায়, বিশেষত চিন্তারও যে পদ্ধতি আছে তা সম্যক জানাশুনা করে নেওয়া। এরই প্রথম পর্যায়টা হল  র‍্যাশনালিটি [rationality] মানে যুক্তি-তর্ক করতে শিখে ফেলা – এই অর্জনটা লিখিত ইতিহাসের আগে থাকা জরুরি [essential pre-condition]। মানুষের চিন্তার এই নুন্যতম পর্যায়টা পার হলে তবেই “লিখিত ইতিহাস” সম্ভব হয়। অর্থাৎ কত লাখ বছর আগে মানুষ হোমো সেপিয়ান যুগে তার আদিরূপ ছেড়ে এসেছে সেটা যথেষ্ট নয়; পরবর্তিতে সে তাঁর লম্বা যাযাবর [nomad বা  Pastoral] জীবন ছেড়ে কৃষিকাজের লোভে বা এই নয়া জীবনকে তুলনায় সহজ মনে হওয়াতে কোন মাটিতে থিতু হয়েছিল – সে ঘটনা এই তো মাত্র তিন-ছয় হাজার বছর আগে। এই স্থির হয়ে কোন নিদির্ষ্ট ভুমিতে বসে পড়া আর কৃষিকাজ যেখানে তার পেশা এখান থেকে সভ্যতার শুরু। দুনিয়ায় মানুষের সব সভ্যতাগুলো কমবেশি শুরু হয়েছিল এরপর থেকে এবং তারা পরস্পর পরস্পরকে জানাশুনা না রেখেই বিভিন্ন সময়কালে শুরু হয়েছিল।  এই সভ্যতার জীবনেরই আবার শেষের দিকে মোটামুটি হাজার বছরের অগ্রগতি হল – তবেই মানুষের এই লিখিত ইতিহাসের যুগ প্রবেশ ও পেরোনো। এভাবে শেষে আজকের জায়গায় আসা।
    এসবের পিছনের মূল কারণ, এটা মানুষের চিন্তাজগতের এক বড় অর্জন এবং তার নুন্যতম চিন্তায় পরিপক্ক হওয়া বা ম্যাচিউরিটি [maturity]। এমন ঘটবার পরেই মানুষ পুরানা সেসব সময়কালের কী কী ডকুমেন্ট সংগ্রহ করবে বা রাখবে, সাংস্কৃতিক কী কী চিহ্ন-বৈশিষ্ঠ খুঁজবার ও বুঝবার দিকে নজর-মনোযোগ নিবদ্ধ করবে আর এছাড়া মুখে মুখে মানে, মুখ আর কানে বয়ে চলা প্রজাতি পরম্পরায় ধরে রাখা তথ্যকেও যতটা সম্ভব  “ডকুমেন্ট” করে রাখার কথা ভাববে ইত্যাদি  – কেন গুরুত্বপুর্ণ তা বুঝেছে। অর্থাৎ মানুষের পক্ষে এই গুরুত্ব অনুভব করার যোগ্য হতে হতেই হয়ত আরো হাজার বছর কেটে গেছে। আর পরিস্কার মনে রাখতে হবে মানুষের লিখিত ইতিহাস কেবল অন্তত কোন একটা জনগোষ্ঠির এক সভ্যতার যাত্রা শুরু করতে পেরেছিল কিছু অপরিহার্য শর্ত পূরণের পরেই তা সম্ভব হয়েছিল। অন্যভাবে বললে, নিজের একটা সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনের কোলে কোন জনগোষ্ঠি থিতু হয়ে বসতে পারলে এরও বহু্বছর পরে একটা লিখিত ইতিহাস শুরু হওয়া সম্ভব হয়েছিল।

    সুমেরীয় সভ্যতাঃ
    আগে বলেছি দুনিয়াতে সব সভ্যতা একই সময়ে যাত্রা শুরু করে নাই। অর্থাৎ সভ্যতাগুলো বিভিন্ন সময়কালে যাত্রা শুরু করেছিল এছাড়া সেকালের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে তারা পরস্পরের কাছে অজানাই ছিল। তবুও দুনিয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে  সভ্যতাগুলোর কোনটাই মোটামুটি ছয় হাজার বছরের বেশি বয়সী নয়। এছাড়া আগে বলেছি আমরা বৃহত্তর বাঙালি অর্থে এই এথনিক জনগোষ্ঠি আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ।  আমাদের কাছাকাছি ভুগোলে আরো অনেক সভ্যতার কথা জানা যায়। এদের মধ্যে কাছাকাছি ভুগোলে প্রভাবশালী সভ্যতা হল সুমের সভ্যতা।
    সুমের (Sumer)বা সুমেরীয় সভ্যতা  এর ভৌগলিক অবস্থান হল আজকের ইরাক, কুয়েত ও  অংশত সিরিয়া যেখানে। অন্যভাবে বললে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝের ভুমিতে এই অববাহিকায় গড়ে উঠে সভ্যতা। আর সুমের হল আসলে মেসোপটমীয়া এই সভ্যতা-ভুমির প্রধান নগরের নাম। ফলে অনেক সময় সুমেরীয় সভ্যতাকে মেসোপটমীয় [Mesopotamia] সভ্যতাও বলা হয়।

    এই সভ্যতার বিশেষ এক বৈশিষ্ঠ হল এর লিখিত ইতিহাস বা ইতিহাসের উপাদান এখানে পাওয়া গিয়েছে। ফলে এই সভ্যতার অনেক কিছুই ডকুমেন্টেড।  এর সেই লিখিত ধারার নাম আবার কিউনিওফর্ম (Cuneiform)। এই শব্দের অর্থ বাংলায় গোঁজ বা খুটা (গরু বাধা দড়ির যার প্রান্তে আটকানো থাকে)। ইংরাজিতে (wedge)বা গোঁজ দিয়ে নরম কাঁদামাটির স্লেটের উপর চিহ্ন এঁকে লেখা,যা পরে শুকিয়ে-পুড়িয়ে স্থায়ী করে নেয়া – এই হল এর লেখা ও সংরক্ষণের পদ্ধতি। সেখান থেকে এটা ‘সুমেরীয় কিউনিওফর্ম স্ক্রীপ্ট’ এই নামের এক প্রাচীন লিখিত ইতিহাস রাখার পদ্ধতি বলে পরিচিত আছে।

    আবার মেসোপটমীয়াকে সব সভ্যতার সুতিকাগার বা দোলনাঘর (cradle of civilization) বলা হয়। অর্থাৎ এটা সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা। এছাড়াও, কোথাও সভ্যতা গড়ে উঠতে গেলে যেসব উপাদান সেখানে থাকলে তা গড়ে উঠার জন্য সবচেয়ে সহায়ক বলে মনে করা হয় সে বিচারে  মেসোপটমীয়া সভ্যতা সবার চেয়ে  আগিয়ে মানে তাতে সহায়ক উপাদান সবচেয়ে বেশি ও আদর্শভাবে উপস্থিতি পর্যাপ্ত বা বেশি।

    সেসব উপাদানকে সহায়ক শর্ত ধরা হয় সেপ্রসঙ্গে যাবার আগে কিছু সাধারণ কথা। যেমন সভ্যতা বিষয়ে আমরা কয়েকটা কথা একেবারে মুখস্ত রাখতে পারি। সভ্যতা শব্দটার প্রায় সমান্তরাল আরেকটা শব্দ হল ডমেস্টিক (domestic) বা গৃহপালিত। এটা প্রচলিতভাবে ডোমেস্টিক শব্দটা আমরা ব্যবহারে যেভাবে অভ্যস্ত তার চেয়ে একটু ভিন্ন। কেন?

    মিলিয়ন বছরের মানুষ এই প্রজাতি (spacies) ছয়হাজার বছরের সভ্যতার যুগে প্রবেশেরও আগে অবশ্যই অনেক কিছুর বিপরীত স্রোতের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া যেখানে মাঝের এই সময়গুলোর মানে, মিলিয়ন থেকে হাজার বছরে নেমে আসার বড় একটা অংশই কেটেছে – প্রকৃতির সাথে ভাল “খাপ খাইয়ে নেয়া” প্রজাতি হয়ে উঠতে। অর্থাৎ মানুষের স্বভাব ও শরীরের যেসব বৈশিষ্ঠ বাস্তবের প্রকৃতিতে টিকে থাকার উপযোগী ছিল না এটা বলা অতুক্তি হবে না যে হয় তা মানুষ তার নিজের বাইরের প্রকৃতির সাথে প্রকৃতির উপযোগী হতে বা খাপে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে নিজেকে নিজের শারীরিক গঠন সহ বহু কিছুতে ব্যপক ভাবে বদলে নিতেই হয়েছে, বদলে গিয়েছে। আর নয়ত টিকতে না পেরে ঐ বিশেষ মানুষ-প্রজাতিটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে এর জবাব সোজা বলে দেয়া যায় যে যা তার পরিচিত ও গমনযোগ্য [accessable] ভূমিতে ঐকালে প্রচুর পাওয়া যেত তারই কোন একটাই তার খাদ্য হয়েছিল; তবে অবশ্যই যা তার খাদ্য হবার উপযুক্ত কেবল সেগুলোই। আর একটা দীর্ঘ সময় মানুষের গড়ন-বৈশিষ্ঠের এই ভাঙ্গা গড়ার ভিতর দিয়েই কেটেছে তা আমরা নিশ্চিত ধরে নিতে পারি।

    তবে একটা কথা পরিস্কার মনে রাখতে বলা যায় যে দুনিয়ার ভুগোলের কোন ভুমিতে সভ্যতা গড়তে বসা শুরু হবে তা শুরুর আগের মানুষের যে রূপ ও জীবন – সেটাই ছিল এক ব্যাপক যাযাবর (nomads) জীবন। অর্থাৎ মিলিয়ন বছর থেকে মানুষের বয়স যখন কয়েক হাজারে নেমে এসেছিল এই মাঝের দীর্ঘ সময়কাল এটাই মানূষের যাযাবর জীবনকাল। যাযাবর মানে হল খাবার টোকায় খেয়ে বা গাছ থেকে পেড়ে খেয়ে এক লম্বা শিকার ও সংগ্রহের জীবন মানুষকে পাড়ি দিতে হয়েছিল। মানে, হান্টিং এন্ড গ্যাদারিং [hanting & gathering]  জীবন ছিল সেটা!

    এখানে যাযাবর বা নোমাড জীবন আর পশুপালক (pastoral)এদুইয়ের জীবনের মধ্যে মধ্যে একটা ফারাক মনে রাখা যেতে পারে। পশুপালকেরা সাধারণত যাযাবর হয় কিন্তু যাযাবরেরা পশুপালক নাও হতে পারে। কারণ হয়ত খাদ্যের প্রাপ্যতা [availability] জন্য, যে ভুমিতে সে ছিল তাতে কিছুদিন পর পর খাদ্য ফুরিয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তখনকার মানুষ কৃষিকাজ কী তা জানত না। অর্তঝাত প্রকৃতি নিজের খেয়ালে যা কিছু ফল-ফলারি গাছে জন্মাত তা পেড়ে সংগ্রহ করেই পাওয়া এমন খাদ্য দিয়েই কেবল ঐ ভুমির মানুষদেরকে চলতে হত। তাই খাদ্যাভাব মানে চাষাবাদ জ্ঞানহীন জীবনের মানুষ গাছের ফল-মূল সংগ্রহ করে খেয়ে চলতে। তাই কোন ভুগোলের ভুমিতে খাদ্যের প্রাচুর্য আছে সেই খোজ রেখে তাকে যাযাবরের জীবন যাপন করতে সে বাধ্য ছিল। এমন অস্থিরতার জন্যও মানুষ যাযাবর হতে হত। যদিও যাযাবর এর সাধারণ সংজ্ঞা হল যে এক দেশ-ভুগোলের ভূমিতে বেশিদিন বসবাস করে না। কারণ খাদ্য প্রাপ্যতার অভাবেও (একই ভুমিতে খাদ্য ফুরায়ে গেলে) তার  যাযাবর হওয়া প্রয়োজন হয়েছে।

    তবে আবার এই একটা কথায় অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। যেমন এর মানে হল সে সময়ের মানুষ বা নোমাড মানুষ মানে এরা ১। তখনও এমন মানুষ যারা কৃষিকাজ জানে না বা তা করতে শুরু করে নাই। ২।  তখনও অর্থাৎ এটাকে বলে সংগ্রহ বা গেদারিং সমাজ (gathering society)- এমন সমাজ হয়েই তারা ছিল কেবল। যেমন কোন কোন গাছের ফল পাওয়া যায়, তা পেড়ে আনা বা সংগ্রহ করা যায়, কোথাও তা প্রচুর পাওয়া যায় ইত্যাদি সবকিছু সভ্যতা-পুর্ব কালের মানুষের ভাল জানা ছিল। এটা সভ্যতা শুরুর পুর্ব সমাজ কেন বললাম?

    সভ্যতা শুরুর পুর্ব সমাজঃ
    কারণ, সভ্যতা শুরু হতে গেলে এক অপরিহার্য শর্ত হল, মানুষকে সেক্ষেত্রে থিতু হয়ে কোন ভুগোল-ভুমিতে এর আগেই বসবাস শুরু করতে হবে। আর স্বভাবতই এর আগে পর্যন্ত মানুষ যে যাযাবর ছিল  সেই যাযাবর জীবনযাত্রায় তার আগে ইতি টানতে হয়েছিল। সোজা কথায় যাযাবর জীবনের মানে সভ্যতা শুরুর হয়েছিল যেখান থেকে এমন  জীবন সেটা। 

    কারণ যাযাবর জীবন কালও অনেক লম্বা ছিল যা লাখে হিসাব করতে হবে। সাধারণত এর শেষের কালটা হল পশুপালক-যাযাবর (pastoral) জীবন। অর্থাৎ যখন পশু চড়িয়ে বেড়ানো তাঁর পেশা। তবে সাবধান এটা আমাদের এখনকার কল্পনায় দেখা বা বইয়ে পড়া কোন রাখাল বালকের গরু চড়ানো মত কোন গল্প নয়, এমন সরলও নয়। কারণ তখনও সে নোমাড বা যাযাবর। ফলে তারা “গৃহস্থ” হয়ে উঠে নাই তখনও। অর্থাৎ ‘বাসা’ বা আবাসস্থল বলে কোন ধারণা তখনও তাদের নাই। অর্থাৎ যেখানে সে রাত কাটায় সবটাই অস্থায়ী। তাই বাড়ি বা বাসা ধারণাটা তখনও মানুষের মধ্যে আসে নাই। এমন পশুপালক ((pastoral)) জীবন এখনও দেখতে পাওয়া  যেতে পারে আফ্রিকার কোথাও কোথাও।  যেমন কেনিয়ায় মাসাইমারা ট্রাইবে [Maasai mara Tribe & culture], ইথিওপিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে [Gambella Region] [In Ethiopia, about 10 million pastoralists rely on animal husbandry as a key source of wealth and subsistence.] বা  ইথিওপিয়ারই সোমালি অঞ্চলে। এদের কমন ফিচার হচ্ছে তারা ট্রাইব (Tribe) গোত্রবাদি সমাজে বসবাস করে। অর্থাৎ এরা একটা বৃহত অঞ্চলে একালের রাজনৈতিক ভুগোলে বসবাস করলেও  এরা গোত্র সমাজের লোক – মানে ঠিক হান্টিং-গেদারিং সমাজের যাযাবর বলতে যা বুঝায় তা নয়। আবার মনে রাখতে হবে কোন ভুমিতে থিতু হয়ে বসা মানুষের জীবন-সমাজেরও আবার দুটা পর্যায় দেখা যায় কোথাও কোথাও। যেমন এর প্রথম রূপ হল গোত্র-সমাজ। যেটার আরেক রূপ  ব্যক্তিভিত্তিক সমাজ।  আর অবশ্যই “ব্যক্তিভিত্তিক সমাজের” আগের রূপ হল গোত্রভিত্তিক সমাজ।

    এই সুযোগে গোত্র সমাজ নিয়ে কিছু কথাঃ
    মূলকথা, গোত্রসমাজ আর ব্যক্তি সমাজ দুটাই সমাজ মনে হলেও দুটা একেবারেই এক নয়।  আবার “সমাজ” বলছি যখন তখন এটা অবশ্যই আগের মানুষের নিরন্তর যাযাবর জীবনের পরিসমাপ্তিতেই তা এসেছে আমরা ধরে নিতে পারি।  তবে হান্টিং এন্ড গেদারিংয়ের যাযাবর জীবন ধারা শেষে  সরাসরি কোন ভুমিতে থিতু হয়ে যারা কৃষিকাজের জীবন সমাজ শুরু করে নাই – ফিরে আবার পশুপালক (pastoral) জীবন যারা শুরু করেছিল এদের মধ্যেই গোত্রসমাজ সবচেয়ে দীর্ঘসময় টিকে যেতে দেখা যায়। সাধারণভাবে বলা যায় এশিয়ার সমতল-ভুমি অঞ্চলে গোত্রসমাজ সবার আগে উঠে গেছে মানে ক্ষণস্থায়ী ছিল। এর বাইরে যত হাইল্যান্ডার বা মরুভুমি অঞ্চল বা সংলগ্ন অঞ্চল – সেখানে গোত্রসমাজ দীর্ঘকাল টিকে থাকতে দেখা যায়।

    গোত্রসমাজে ব্যক্তিবোধ নাই বা তখনও আসে নাই। ফলে ব্যক্তি সম্পত্তি নাই, গোত্র সম্পত্তি আছে। গোত্রসমাজে গোত্র-প্রধানই সব। তিনিই গোত্রের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেন বা দেন। আর এটাক ভেঙ্গে পড়লেই ব্যক্তি-সমাজ গড়ে উঠে। আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠি তাদের এখনও গোত্রপ্রধান বলে পদ আছে। যদিও তার কর্তৃত্ব নাই। এদিকে তারা এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনত নাগরিক। আর যে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র মানেই তা ব্যক্তিভিত্তিক। এছাড়া পাহাড়িদের পাশের বড় ও প্রভাবশালী বাঙালিরা ব্যক্তিসমাজ এর পর্যায়ে উঠে গেছে। সব মিলিয়ে তাই তাদের গোত্র সমাজ মূলত ভেঙ্গে গেছে, ব্যক্তি সমাজের দিকে রওয়ানা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক ভাবে পুরানা গোত্রসমাজের সংস্কৃতির চর্চা-অভ্যাসগুলো রয়ে গেছে – যা বার বার উঠে আসছে আর সেগুলো তাদের “নিজস্ব কালচার” এই যুক্তিতে; যদিও সেগুলো আসলে তাদের পুরানা গোত্র (ব্যক্তিবোধ না জাগার কালের) কালচার।
    গোত্রসমাজের বৈশিষ্ট বা কালচারাল ধরণ দেখে সহজেই চেনা সম্ভব। যেমন, পাকিস্তানের উত্তর সীমান্তের ভিতর থেকেই আরো উপরে দিকে যতই আফগানিস্তানের দিকে যাওয়া যাবে ততই ঐ অঞ্চলটাই গোত্রসমাজের প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট গোত্র কালচারের আধিপত্য দেখতে পাওয়া যায়। যেমন শহুরে জীবনের চোখে তাদের সম্পর্কের আমরা দেখি মিডিয়ায় লেখা হয়েছে – “অনার কিলিং” (honour killing) এর কথা।  এটা কী জিনিষ?
    শহুরে চোখে তা খুব আজিব লাগে, আধা বুঝ বা না-বুঝা লাগে হয়ত। ঘটনা বর্ণনা হয়ত শুনব এভাবে যে ওমুক গোষ্ঠির এক টিন-এজ মেয়ে নিজের পছন্দের কোন ছেলেকে বিয়ে করতে গেছে বলে ঐ মেয়ের ভাই নিজ বোনকে খুন করেছে। বর্ণনা শুনে এটাকে আমাদের মতই কোন ব্যক্তিসমাজের ঘটনা বলে ভেবে সে বিচারে  ব্যাপারটা”একটু উগ্র” মনে হবে হয়ত।  কিন্লেতু কেন তাদের সমাজ ওরকম? আর এই খন করার মধ্যে “অনার” মানে সম্মান রক্ষা করার ঘটনা কোনটা? কারই বা সম্মান??
    আসলে এখানে এটা পুরাটাই এক গোত্রবাদী কালচারের চর্চা ও এর প্রভাব বা ওরই প্রাকটিস ওখানে করা হয়েছে। কেন ও কীভাবে?

    গোত্র সমাজে ব্যক্তিবোধ নাই, থাকে না বা কাজ করে না। গোত্র সমাজে গোত্রপ্রধান থাকে আর তার হুকুমেই চলে। সেখানে তাই গোত্রপ্রধানের সিদ্ধান্তই সবার পালনীয়।  গোত্র পরিবারের কে কার সাথে বিয়েতে বসবে সেটাও গোত্রপ্রধানের বা তাঁর মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অর্থাৎ গোত্রের সদস্যরা ব্যক্তি বলে গণ্য হয় না; নিজেদের তারা ব্যক্তি গণ্য করে না। এমন গোত্র সদস্য তারা। অতএব কোন ব্যক্তিবোধের চর্চা সেখানে থাকত না। আসলে ব্যক্তি নাই মানে সেখানে প্রেম বলে কোন নাই। কারণ প্রেমের পুর্বশর্ত হচ্ছে – দুজনাই স্বাধীন ব্যক্তিবোধ হাজিরা আর তা তাদের স্বজ্ঞানে বা অজ্ঞানে। (যদিও সেটা প্রেমের পরে বাস্তব পরিবার চর্চায় সেটা আর ততটা বাস্তবে ক্রিয়াশীল নাও থাকতে পারে।)  কাজেই কোন গোত্র পরিবারের সদস্য কোন ছেলে বা মেয়ে নিজ পছন্দের বিয়ের পথে যেতেই পারে না। এটা গোত্রপ্রথারই বা গোত্রপ্রধানেরই বিরুদ্ধাচারণ।
    কিন্তু একালে এসে হয়ত কোন পুরানা গোত্রসমাজ ঠিক ভেঙ্গে যায় নি; ফলে নয়া ব্যক্তিসমাজও উদয় হয় নাই। কিন্তু একটা মাঝামাঝি দশায় আছে। ফলে সেটা ঠিক গোত্র কালচারের ভেঙ্গে পড়া কিন্তু আধাখেচড়া অবস্থা। ফলে গোত্রপ্রধানের নিয়ন্ত্রণও  ঢিলা তবে তা একেবারে ভেঙ্গে না পড়ে নাই হয়ত। এছাড়া পাশে হয়ত আছে কোন বড় ও ভিন্ন ব্যক্তিভিত্তিক সমাজের উপস্থিতি আছে। ঠিক যেমন, আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠির পাশে আমরা বাঙালি জনগোষ্ঠি যারা। আমরা পাহাড়িদের অনেক আগেই আমাদেরও হয়ত কোন গোত্রজীবন যা আগে ছিল তা শেষ ও ত্যাগ করে এসে গেছি। পাহাড়িদের তুলনায় আমরা সংখ্যাতেও অনেক বড়। তাই সব মিলিয়ে এসব কারণে আমাদের প্রভাবই ওদের উপরে পড়তে ও কাজ করতে বাধ্য।  এরকম পরিস্থিতেই অনার কিলিং ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। যার শাস্তি হল পরিবারের তরফ থেকে (পুরুষ ডোমিনেটেড পরিবার বলে) মেয়ে সদস্যকেই আগে হত্যা করে ফেলা, সাজা দেয়া হতে দেখা যায়। অর্থাৎ গোত্র-পরিবারেরর সম্মান রক্ষার্থে হত্যা এটাই “অনার কিলিং” (honour killing)। একালের পরিভাষায় হয়ত ভাই বলবে “এটা পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে হত্যা”। কিন্তু পিছনের কারণ এটা গোত্রসমাজের মুল্যবোধ ও প্রথা অনুসরণ করে করা হয়েছে। এছাড়াও, যেমন চোখের বদলে চোখ তুলে নেয়ার প্রথা অথবা যাকে অপরাধী মনে করা তাকে নিজের হাতে শাস্তি দিয়ে চাওয়া – এগুলো গোত্রসমাজ কালচারেরই পুরানা জের ও এর প্রভাব। যেমন ব্যক্তিসমাজের দৃষ্টিতে কেউ যদি প্রেমের কারণে  নিজ বোনকে হত্যা করে তবে নাগরিক রাষ্ট্রের আদালত পুরানা গোত্রপ্রথার যুক্তি-সাফাই মানবে না, গ্রহণ করবে না।  বরং ভাইকে সোজা হত্যাকারি বলে উলটা ফাঁসির সাজা দিবে এই বলে যে ঐ ভাই তাঁর আপন বোন যে ঐ রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক তাকে খুন করেছে – আর কোন স্বাধীন নাগরিককে আরেক ব্যক্তি খুন করতে পারে না – এই অপরাধে ব্যক্তি-ভাই মৃত্যুদন্ড সাজা পাবে।
    আবার এর উল্টাও হতে পারে। যেমন ব্যক্তিসমাজ হলেও কখনও সেখানে গণপিটুনির (মব লঞ্চিং বা Mob lynching) ধারণা দেখতে পাওয়া যায়। যার সোজা মানে হল ব্যক্তিসমাজে বিচারবিভাগ বলে আলাদা কিছু একটা আইন-বিচার আদালত চালু হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু দুর্নীতি আর স্বৈর হস্তক্ষেপের কারণ বিচার ব্যবস্থা গণ-মানুষ মানে পাবলিকের আস্থা পায় নাই। এই অবস্থায় ঐ ব্যক্তিসমাজে “গণপিটুনির ধারণা” ক্রিয়াশীল দেখা যেতে পারে। আমরা এখন আবার একটূ পিছনে ফিরে শুরু করব!

    সংগ্রহ বা গেদারিং (gathering) সোসাইটিঃ
    আরেকটা গুরুত্বপুর্ণ দিক নিয়েও আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি – কী সেটা? আগে উল্লেখ করেছিলাম গেদারিং (gathering)) সোসাইটি। মানে তখন মানুষ বড় জোর গাছের ফলফলারি সংগ্রহ করে খাওয়া ও এ৪ভাবে দুনিয়াতে নিজেকে টিকিয়ে রাখা শিখেছে – ঐ সময়কালের মানুষ। কিন্তু কী করে তা আমরা জানলাম? কারণ গেদারিংয়ের পাশে বা সাথে আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করা হয় –  যেমন হান্টিং (hunting) এন্ড গেদারিং সোসাইটি। অর্থাৎ শিকার ও সংগ্রহকারী সমাজ। অর্থাৎ সাথে পশু শিকার -এর কথা বলে হচ্ছে। পশু খাওয়া যায় কীনা এটা মানুষের জানা ও খেতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে  অবশ্যই মানুষের কাছে আগুন আবিস্কার হয়ে থাকতেই হবে।  কারণ মানুষের পক্ষে অন্য পশুর মাংস সরাসরি খাওয়া যায় না বলে তা প্রক্রিয়াজাতকরণ বা আগুনে রান্নার কালচারাল অভ্যাস মানুষের রপ্ত বা জানা থাকতে হবে। মানে আগুনে সিদ্ধ বা ভাজা-পোড়া করা না জানলেও অন্তত ঝলসিয়েই কেবল পশু খাওয়া যায় – একাজে আগুন আবিস্কার আগেই জানা হয়ে থাকলে তবেই পশুর মাংস মানুষের খাদ্য হয়েছে। অর্থাৎ আগুনের ব্যবহার জানা আগে; এরপরে পশু মানুষের খাদ্য হতে পারে। সারকথায় তাই হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটি মানে হল পরের কৃষিকাজ ভিত্তিক থিতু সমাজের পৌছানোর বহু আগের এবং তা এক অবশ্যই নোমাড ও পশুপালক সমাজ পার হয়ে আসতে হবে। তবে শুধু গেদারিং সোসাইটি  মানে হল এটা যাযাবর জীবনের লক্ষণ; অন্তত আগুন আবিস্কারের আগের মনুষ্য-জীবন সেটা!!

    তাই সোজা সিদ্ধান্ত হল, মানুষের কৃষিকাজ ভিত্তিক সমাজে পৌছানো মানে এই থিতু সমাজে পৌছানোর আগে মানুষকে বহুকিছুতে জীবন-অভিজ্ঞতার পর্ব শেষ  করে আসতে হয়েছে। সেগুলো, ফলমুল খাদ্যের কিন্তু নোমাড সমাজ, এরপর হান্টিং শিখা কিন্তু এর আগে আগুনের আবিস্কার জেনে রাখা। এরপর হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটিতে বসবাস যেটা তখনও নোমাড। এরপর সবশেষে পশুপালক (pastoral)জীবন। আর পশুর খাদ্য পাওয়া সহজ করতে যেদিকে পশুর খাদ্য ধরণের গাছপালা বেশি পাওয়া সেদিকে ক্রমান্বয়ে নোমাড মানুষের যেতেই থাকতে হবে। তাই এটাও সেই লম্বা নোমাডিক বা যাযাবর জীবন এর সম্ভবত শেষ ভাগ। আর এসবের সমাপ্তি ঘটলে তবে আসতে পারে  মানুষের কোন কৃষিকাজ জীবন। এটা আসলে আরো অনেক কিছু  যেমন, যেমন এখান থেকেই মানুষের গৃহস্থ হওয়ার শুরু। আর সর্বোপরি এটাকেই আমরা মানুষের সভ্যতার শুরুর যুগ বলছি!!

    সভ্যতার শুরু মানে মানুষের কৃষিজীবনের শুরুঃ
    হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটির জীবন এরও বহু পরে কৃষিকাজের জীবনে পৌছানো মানুষের জীবন-ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। যেমন  মানুষের কৃষিকাজের জীবনে পৌছানো  এর এক নম্বর লক্ষণ হল নোমাড পশুপালক জীবনসহ পিছনের পুরা যাযাবর জীবন পার হয়ে সেসবের ইতি টানা। কিন্তু এটাকে থিতু জীবন বলা হচ্ছে কেন? কারণ, খুব সহজ! সেটা এজন্যই যে এটা আগের যাযাবর জীবনের ইতি অথবা অন্যভাবে বললে কৃষিকাজ মানে তখন থেকে কৃষির জমির সাথে মানুষের জীবনযাপন বসবাসের জীবন আটকে যাওয়া। তখন মানুষ চাইলেও আর পুরানা যাযাবর জীবন যাপনে ছেদ পড়তে বাধ্য। কৃষিকাজ মানে ঐ জমির সাথে মানুষের গাটছাড়া বেধে যাওয়া।  জোবঙ্ঘুরেফিরে ঐ জমিতেই বা আশে[পাশে ফিরে আসতেই হবে এক-মন দশায় আটকে যাওয়া। সব সময় মনে রাখতে পারি মানুষের আগের জীবনের যেকোন স্বভাব তখনই বদলাবে বা বদলিয়ে যেতে পারে যখন আগের চেয়ে সেটা সহজ  ও বেটার জীবনযাপনের উপায় – এই বুদ্ধিশুদ্ধি সে জেনে গেছে এবং সেটা আগের জীবনযাপনের ভিতরেই কিন্তু হঠাৎ করে ঘটনা-দুর্ঘটনায় সে জেনে গেছে মানে তা বেশিরভাগ সময় এক্সিডেন্টালি ঘটে থাকে!

    নয়া এক কৃষিকাজের জীবনে আসতে গেলে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধিতে একটা বড় উল্লম্ফন ঘটাতে, মানে এক গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছিল। সেটা হল জ্ঞানবুদ্ধির অনেক পরিশীলিত ব্যবহারের জগতেও প্রবেশ করতে হয়েছিল;  অর্থাৎ  গায়ে-গতরে বলপ্রয়োগের জীবন থেকে বাদ দেয়া অবশ্যই নয়, তবে এবার আর এশুধু গায়ে-গতরে বলপ্রয়োগ করে জীবন কাটানো আর নয়।
    যদিও কৃষিকাজ মানে প্রথমত মানুষের নিজ জ্ঞানবুদ্ধিতে আগের জীবনের চেয়ে অনেকানেক বেশি ব্যবহারে অভ্যস্থতা। এতা অবশ্যই জ্ঞানবুদ্ধিতে মানুষের এক নয়া পরিশীলিত অবস্থা। কেন? কারণ এই জীবনের পুর্বশর্ত হল বিপুল পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারি আগে হতে হবে।  যেমন ছোট-বড় সব গাছগাছালির প্রকৃতি – অর্থাৎ এখন যাকে আমরা উদ্ভিদ বলতে অভ্যস্ত এর জীবন প্রণালী খুবই মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছিল। অর্থাৎ এর আগে পর্যবেক্ষণ কী জিনিষ সেটাই বুঝে ফেলতে হয়েছিল। কোনটা ধান বা গমের বীজ বা কাকে বীজ বলে তা বুঝেসুজে আর কেমন মাটিতে কী করে ফেললে তা থেকে আবার নয়া গাছ হয় ইত্যাদি সেসব “উদ্ভিদ জীবনচক্র” বুঝে ফেলতে হয়েছিল।

    আবার এর আগেই আরেক পর্ব অবশ্যই ছিল। যেমন মানুষের শরীর টিকাতে গেলে দু’বৈশিষ্ঠের দুটা খাদ্য লাগবেই। বিজ্ঞানের ভাষায় কার্বোহাইডেট আর প্রোটিন, এছাড়াও সাথে অবশ্যই আরো অনেক কিছু বাড়তি খাবার কথাও ছিল। আর ঠিক উপাদানের উপযুক্ত নাম জানা নয় কোন ধরণের খাদ্যে তা থাকে এটা জানার কথা বলছি।   তাই সম্ভবত সব সভ্যতার মানুষেরা শুরুতেই মানুষই বুঝে ফেলেছিল তার অন্তত একটা কার্বোহাইডেড বা স্টার্চ (starch)এই উপাদানের কোন একটা উতস খাদ্য হিসাবে লাগবেই। কমন ভাষায় যাকে আমরা প্রধান খাদ্য বা স্টেপল ফুড (staple food) বলি। যেমন, চাল, গম, ভুট্টা, বা মাটির নিচে জন্মানো মিস্টি আলু অথবা তেফ (teff, এক ইথিওপিয়ান স্টার্চ যা গমের আটার মত পিষিয়ে নিয়ে তা খাওয়া যায় এমন খাদ্য) ইত্যাদি এসবগুলো বিভিন্ন সভ্যতায় প্রধান খাদ্য কার্বোহাইডেট-এর উৎস। বলাই বাহুল্য এমন গাছ বা খাদ্য কে চিনে নেওয়া ও বেছে নেওয়া এটাই হিউম্যান প্রজাতির এক বড় অগ্র-পদক্ষেপ –  এক বিরাট পর্যবেক্ষণ শক্তির অধিকারি হয়ে উঠা।
    যেটার কারণে, আর হান্টিং এন্ড গেদারিং সমাজে অভ্যস্ত পুরানা যাযাবর মনুষ্য-জীবন  আর নয় বা একে বাই বলা সম্ভব হয়েছিল।
    তাই আসলে কৃষিকাজ মানে  – এটা মানুষের শুধু বিশাল এক  পর্যবেক্ষণ শক্তি গুণই নয়, আরও বহু বহু কিছুর এক নব অধ্যায়!!

    যেমন আগে যে কথা বলছিলাম মানুষের কৃষিকাজের জীবনে প্রবেশ ঘটা – এটা তার জীবনে এক বিরাট নতুন শর্ত তার অজান্তে জুড়ে দিয়েছিল।  যেমন যে কৃষিকাজে অভ্যস্ত সে আর নোমাড থাকা সম্ভব না। আল্লাহর দুনিয়ায় কোন না কোন ভুগোল-ভুমিতে তখন থেকে তাঁকে  থিতু হয়ে গেড়ে বসতেই হবে। কারণ চাষাবাদ একেক দিন একেক জায়গায় করার জিনিষ তো নয়ই  বা একেক বছরে আরেকটা পাড়াতে বা আরেক দেশে গিয়ে করতে বসা তো আর  যাবেই না। কৃষিকাজ মানেই একই জমি একই পদ্ধতি ফলে একই ভুমিতে তা হতেই হবে। অতএব, এই প্রথম যাযাবর স্বভাব ত্যাগ করে, মানুষের থিতু হওয়া অর্থাৎ মানুষ মাত্রই সুনির্দিষ্ট কোন ভুমির মানুষ হতেই হবে – এমন হয়ে যাওয়া শুরু হয়ে যায়। মানুষ মানেই তখন থেকে গোপালগঞ্জের মানুষ কিংবা ছাগলনাইয়ার মানুষ কিংবা মানুষ তখন বাবুনগর গ্রামের বলে “বাবুনগরী” হয়ে যাবে। এমন করেই সে তখন  এশিয়ার বা আফ্রিকার মানুষ হতেই হবে – এমন এই ভুগোলের শর্তযুক্ত হয়ে গিয়েছিল মানুষ।

    এখন এই জীবনের সাথে আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করব তাতে আমি যা বলতে চাচ্ছি  তা বুঝতে আরেকটু সহজ হয়ে যাবে। শব্দটা হল ডমেস্টিক (domestic) বা গৃহপালিত। শব্দটা আমাদের খুব কম মানুষের কাছেই অপরিচিত। তবু আমি কিছু বিশেষ দিক থেকে শব্দটাকে পরিচিত করাব। যেমন, কী গৃহপালিত নয়? এই প্রশ্ন থেকে তা বুঝা যেতে পারে। সংক্ষেপে জবাব হল যা বন্য [wild] তা আর গৃহপালিত নয়।  আসলে মানুষের কৃষিকাজভিত্তিক ভৌগলিক-ভুমিতে স্থিতির যে  জীবন, যা কিছু এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ তাই গৃহপালিত। এটাই হল এর বৃহত্তর সংজ্ঞা! যেমন, গৃহ শব্দটা খেয়াল করেন। যাযাবরের একেবারেই উলটা শব্দ এটা। যেমন সন্ধ্যাবেলায় যে পশু নিজ স্বভাবে ‘বাসায়’ (এখানে শুরও বাসা থাকে) ফিরে না (মানে নিরাপদ জীবনে) সেটা গৃহপালিত নয়। যে তখনও ‘বন্যই’ মানে পুরানা প্রাকৃতিক স্বভাবেই থেকে গেছে।  মানুষের সভ্যতার জীবন বা কৃষিজীবন শুরুর সাথে সাথে  প্রকৃতিতে প্রধান যে বাঁক বদল ঘটে গেছে শব্দ হিসাবে সেটাকেই আমরা বলে গৃহপালিত করে নেওয়া (domestication)। অন্য আরেকটা শব্দ আছে যেটা (tame)বা স্থিতিজীবনের উপযোগী করে নেওয়া। অর্থাৎ দুনিয়াতে মানুষই কেবল একা কোন গৃহে কোন ভুমিতে নিজেকে আবদ্ধ করে নাই। বরং যতটুকু তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতা বিস্তৃত সবটাকেই নিজের জীভবনের সাথে বদলে নিয়েছে। কিছু পশু গাছপালা ইত্যাদি সবকিছুকেই সে বদলে পোষ-মানিয়ে মানে নিজের নয়া কৃষিজীবনের উপযোগী করে নিয়েছে। নইলে সেই প্রজাতিকে লোপাট করে দিয়েছে।  যেমন বিছুটি পাতা, যারা গ্রাম-জীবনের সাথে এখনো সম্পর্কে রাখেন তারা চিনবেন; তবে হয়ত ভিন্ন নামে। এই পাতা মানুষের গায়ে লাগলে ঐ জায়গা চিলকায় ফুলে উঠে, লাল হয়ে যায়। আর এর প্রভাব অন্তত আর্ধেক দিন পর্যন্ত থাকে। সাধারণত মাঠে মানুষের  হেঁটেচলার পথের ধারে তা জন্মায়। কিছু সমাজে এই গাছ দেখলে তা উপড়ে ফেলে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কেন?
    এরা বলতে যায় এই গাছের “ডমেস্টিক স্বভাব” নাই। মানে এই গাছ tame হয় না। মানুষের থিতুজীবনের সাথে যায় না। তাই এরা যে বনে মানুষ যায় না বা কম যায় কেবল সেখানেই থাকুক। তাই এই গাছে দেখা মাত্র তা উপড়ে ফেলে দেওয়ার সামাজিক অভ্যাস রপ্ত করেছে।

    গৃহপালিত শব্দের আসল মানে কীঃ
    মজার কথা হল, সভ্যতা কোথায় বসে, কোন ভুমিতে? এই প্রশ্ন যদি করেন তাহলে এর জবাব হল, যেই মাটি ডোমেস্টিক বা যেটা (tame)বা স্থিতিজীবনের উপযোগী করে নেয়া যায়; মানে ‘পোষ মানানো’ বলে যে শব্দটা আছে সেরকম! যেমন যে মাটি সফট নয় পাথুড়ে, নাঙল দিয়েও ভাল নরম করে নেয়া যায় না, একেবারেই পানি ধারণ করে না ইত্যাদি এমন হলে হবে না। গৃহপালিত বা  কৃষিকাজভিত্তিক থিতু জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ হতে হবে এককথায় বললে  যেন উদ্ভি্দের  চারা মাটি  ভেদ করে সহজেই উঠার উপযোগী হয় – কারণ এটা এক অন্য ধরণের জীবনযাপন ব্যবস্থা। এটাই সবচেয়ে বড় শর্ত। এটাই গৃহ বা গৃহপালিত শব্দের আসল মানে।

    আর সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী শর্ত বা ঘটনাটার কথা এখন বলব। মানূষের চাষাবাদ কৃষিকাজ শিখে-জেনে ফেলার তাতপর্য কী?  জবাব হল, আগে প্রকৃতি যেভাবে যে রূপে তার সামনে হাজির হত মানুষ কেবল সেভাবেই ঐ রূপের সাথে নিজেকেই খাপখাইয়ে বদলে নিয়ে তবেই একে ব্যবহার করতে পারত। নিজের ভরণপোষণের উপায় হিসাবে তা কাজে লাগাত। কিন্তু মানুষের কৃষিকাজ-চাষাবাদের জীবন সব বদলে দিয়েছে।

    যেমন  কৃষিজীবন শুরুর আগের সেই প্রাকৃতিক ধানগাছটাই এখনও হবে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে হবে না। মানুষ কেবল মাঝে একটু হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। কথাটা এভাবে বলা যায়  – সেটাই এখনও হবে তবে যেভাবে হলে মানুষের জন্য একটু সুবিধা হয় সেভাবে বা সেদিক একটু ঘুরে হলেও এরপরে আবার আগের প্রক্রিয়া প্রণালিটাই চালু রেখেছে মানুষ। ধরা যাক, কোন কোন মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে আগে ধান হয়ত হত না, এখন মানুষ হওয়াইতেছে। এছাড়া যেমন পরিমাণেও কম-বেশি করতেছে। কোন মাটিতে বন্য (মানে আগের প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত যেমন সেটাই) না গৃহপালিত চাষাবাদ হবে তা মানুষ ঠিক করে দিচ্ছে।

    এতে আগের পুরা প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত উদ্ভিদ-প্রকৃতিটা যা ছিল তা জন্মানো ঠিক বন্ধ করা নয়, তবে আগের মতই কিন্তু একটু মানুষের স্বার্থের দিক-ঘুরে প্রবাহিত এক উদ্ভিদ-প্রকৃতির দুনিয়া হয়ে প্রাকৃতিকতা বজায় রাখছে। এটাকেই আমরা বলতে পারি – গৃহপালিত মানুষের স্বার্থের দিক-ঘুরে প্রবাহিত হচ্ছে – এটাকেই আমরা কৃষিকাজ বলছি মানে, নতুন শর্তযুক্ত করে নেওয়া বলছি।

    এখান থেকেই সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনাটা দুনিয়া ঘটে গেছে। কীভাবে?
    এতে দুনিয়া আগের মতই দুনিয়াটা থাকবে তবে একটা কিন্তু সহ। আগে প্রকৃতি আমার জন্য প্রাকৃতিক ভাবে বা স্ব স্বভাবে এখন খাদ্য উতপাদন নাও করতে পারত। এই হাত ঢুকানোর কারণে মানুষ তা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রকৃতি এখন মানুষের খাদ্য উতপাদন করেই – এমন পরিবর্তনের ভিতর দিয়েই যেন গাছের জীবনচক্র বদলায় – এই শর্ত ঢুকিয়ে দেয়া হয়ে গেছে।

    তবে এটা হল, আমরা প্রকৃতিকে একটা সীমার মধ্যে থেকে বদলে নিয়েছি। আগে প্রাকৃতিক ভাবে ঠিক হত সারা দুনিয়ায় ধান উতপাদন আর হবে নাকি প্রকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা প্রকৃতির মৌলিক স্বভাবের নিয়ম মান্য করে ওর শর্ত-সীমার মধ্যে থেকে ধান উতপাদন চালু থাকা নিশ্চিত করেছি। সারকথায় প্রকৃতিতে আগের মতই বদল ঘটছে তবে এই বদল মানুষের স্বার্থের বাড়ীর পাশ দিয়ে যাচ্ছে – এটাই বাড়তি। তবে এই বাড়তি ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য ও সঠিক হবে যদি না এটা প্রকৃতির মৌলিক কোন স্বভাব বা শর্ত-সীমা লঙ্খন না করে।  কতটা বাড়ানো বা বদল হলেও ভারসাম্য ঠিক থাকবে সেটা মেনে চলার মধ্যে থাকা এটাই অন্যভাষায় পরিবেশসম্মত বসবাস। যদিও লোভী মানুষদের খপ্পরে পরে প্রায়শই এই ভারসাম্য ভাঙছে।

    কিন্তু সেজন্য সাবধান; প্রকৃতির মৌলিক স্বভাব-ধরণ বুঝতে হবে। আবার খোদ মানুষই তো প্রকৃতির অংশ একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না। প্রকৃতির স্বভাব  থেকে মানুষ নিজের মৌলিক স্বভাবও ঠাহর করতে পারে। অতএব খুব সাবধান প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম বা স্বভাবে হাত দেয়া যাবে না, ভাঙ্গা যাবে না। না ভেঙ্গে মানে মৌলিক স্বভাবে হাত না দিয়ে যতটা ছোট বা সীমিত শর্তযুক্ত করে বদল ঘটানো যায় মানুষকে ওর মধ্যে ঐ সীমার মধ্যে থাকতেই হবে। যদি মানুষ নিজেরর সীমা না বুঝে ভেঙ্গে ফেলে তবে খোদ প্রকৃতিই ধবংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ তাতে প্রকৃতি বা নেচারের উপর নির্ভরশীল মানুষও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
    এটাকে আরেক ভাষায় পরিবেশসম্মত বসবাস, এনভায়রণমেন্ট সেনসেটিভ, প্রাণ পরিবেশের জ্ঞানসম্মত বসবাস ইত্যাদি কথাগুলো বলা হচ্ছে।

    লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    দ্বিতীয় পর্ব পেতে এখানে https://wp.me/p1sCvy-47s

     

    [এই লেখাটা এর আগে এক প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ছাপা হয়েছিল “ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন” – এই নামের ছাত্র সংগঠনের এক সংকলনে। সেটা ছিল গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, তাদের কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত “সভ্যতা ও সংস্কৃতি” এই শিরোনামে এক প্রকাশনায়। সেই প্রিন্টেড সংকলনে এ’লেখার শিরোনাম ছিল  “সিন্ধু সভ্যতায়ঃ সভ্যতা মানে কী”।   যদিও দুঃখের বিষয় ঐ প্রিন্টেড সাময়িকীর কোন অনলাইন ভার্সান এখনও তাঁরা বের করে নাই।  হয়ত পরে করবে। তবে সেই পুরানা ছাপা লেখার একটা পিডিএফ কপি এখানে পাওয়া যাবে।  এছাড়া  সেই লেখাটারই আরেক ফাইনাল ভার্সান যেখানে এখন প্রচুর সংযোজন-বিয়োজন ও এডিট করে নয়া ভার্সান হিসাবে এখানে প্রকাশ করা হল। তাতে আগের শিরোনাম যেটা ছিল তা একটু বদল করা হয়েছে।  আর এবার লেখাটা বড় হয়ে যাওয়াতে তা দুই পর্ব করে, এখানে আজ কেবল প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হল।  দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আগামি সপ্তাহে প্রকাশিত হবে। ]