‘কানেক্টিভিটি’ [connectivity] শব্দটার অর্থ করা যায় সংযোগ বা সংযোগ-প্রাপ্যতা। ভারতের কারণে বাংলাদেশের কাছে এই শব্দটার অর্থই বদলে গেছে। এখন এর অর্থ হয়ে গেছে, বিনা পয়সায় বিনা ক্ষতিপোষণে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারত করিডোর নেবে। এমনকি রাস্তাঘাট এমনকি পোর্ট সুবিধা নিবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে। ভারতের দুই অংশকে আরামে কানেক্ট করে নিবে। বাংলাদেশের বাজার নষ্ট করবে। তাই এটা হয়ে গেছে প্রায় জবরদস্তিতে এবং একপক্ষীয় (ওয়ানওয়ে) এককস্বার্থ আদায়ের এক শব্দ। ফলে এর সঙ্গে মিলে আবার কোথাও এটাকে ‘বাংলাদেশ-ভারত ডায়ালগ’ জাতীয় কথার আড়ালে রেখে ততপরতা জারি রাখতেও দেখা গেছে। তাই “বাংলাদেশ-ভারত ডায়ালগ’ জাতীয় কথা কানে আসলেই মন সতর্ক হয়ে যায়!
বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে তাই ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ডায়ালগ বা কানেক্টিভিটি ধরনের শব্দগুলো পাক্কা ছলচাতুরির শব্দই। বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়ে চাপ দিয়ে বিনা পয়সায় ভারতের একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায়ই এর লক্ষ্য।
পররাষ্ট্রনীতি মানেই যেন যা কলোনি সম্পর্কের দাঁড়ানোঃ এমনিতে নেহেরু আমল মানে ভারতের জন্ম থেকেই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হল বৈদেশিক সম্পর্ক বলতে তা ‘কলোনি সম্পর্ক’, এই বুঝের উপর এটা কাজ করা। যেন পররাষ্ট্রনীতিতে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক বা অন্য যে কোন সম্পর্ক মানেই তা কলোনি সম্পর্ক। বিশেষ করে ছোট দেশ হলেই তাকে ভারতের অধস্তন করে নিয়ে বা ধরে নিয়ে এই ভিত্তিতে সম্পর্ক করা। মানে এসবের বিপরীতে উভয়ের জন্য লাভজনক হয় এমন স্বার্থের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বলে যেন কিছু নাই, হতেই পারে না। অর্থাৎ কে কত চালাক ও অপরের উপর প্রতারণায় দক্ষ, পররাষ্ট্রনীতি যেন এরই কারবার।
আসলে কলোনি আমলে অধীনতা বা অধস্তন সম্পর্ক বলতে যা বুঝাত, তাই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বুঝ। একই ধারণা অনুসারে, একালেও ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হতে পারে যেন একটাই- সেটা হল পুরনো স্টাইলের এক কলোনিদখল সম্পর্ক; আর যেখানে ভারত হবে কলোনি মাস্টার। আর যাকে দখল করা সে হবে স্লেভ [slave] বা দাস।
এর সবচেয়ে ভাল বা আদর্শ উদাহরণ হল, নেপালের সঙ্গে ভারতের ১৯৫০ সালে করা চুক্তি,এখনও তা সংশোধন না করেই চালাতে চাওয়া ভারতের গড়িমসিরও শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি একালে ভুটানের সঙ্গে ভারতের পুনঃলিখিত নতুন চুক্তিটাও কমবেশি তাই। যেমন নেপালের সঙ্গে ১৯৫০ সালের চুক্তির একটি বৈশিষ্ট্য হল, পাহাড়ি বলে নেপালে হাইড্রোপাওয়ার বা জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা অনেক; কিন্তু সেই নিজ-উৎপাদিত বিদ্যুৎ নেপাল ভারত বাদে তৃতীয় দেশকে (সরাসরি) বিক্রি করতে পারবে না। নেপাল এক ল্যান্ডলকড দেশ; তাই সেটাকে চাপ দিবার হাতিয়ার করে এমন কথাই ঐ চুক্তির অংশ। তাহলে নেপালকে কী করতে বাধ্য? নেপাল বরং ভারতেরই কোনো কোম্পানিকে এজেন্সি দিতে হবে আগে, এরপর সে নেপালের বিদ্যুৎ (ধরা যাক বাংলাদেশকে) বিক্রি করে কমিশন খাবে। পুরানা রাজতান্ত্রিক নেপালে, সশস্ত্র ও গণবিক্ষোভের রাজনৈতিক আন্দোলনের শেষে পরিণতিতে ২০১৫ সালে রাজতন্ত্র ভেঙে জনপ্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে রিপাবলিক রাষ্ট্র ও কনষ্টিটিউশনে রূপান্তরের পেছনের প্রধান কারণ ছিল এমন চুক্তির বিরোধিতা ও নাগপাশ ভেঙ্গে বের হওয়া।
সেকালের (১৯৫০) নেপালকে এমন কলোনি চুক্তি করাতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে নেহেরুর অবস্থান ছিল আরও কড়া। ব্রিটিশ ভাইসরয় ভারত ত্যাগের আগে কলোনিদখলদার ব্রিটিশদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা যেন নেহেরুকেই হস্তান্তর করে গেছিলেন; ১৯৪৭ সালের পর থেকেই নেহেরু এই ভাব দেখাতেন। এই ভাব ও ভিত্তিহীন অনুমানের উপরে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি দাঁড় করিয়েছিলেন। আর নেপালকে অধীনস্ত বানিয়ে ভারতকে এজেন্সি না দিলে নেপাল কোনো উৎপাদন বা বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যকর করতে পারবে না- এমন শর্ত ঐ চুক্তিতে আরোপ করেছিলেন। আর ঠিক এমন অজস্র অসম সুবিধা গায়ের জোরে বড়ভাই ভাব ধরে সেখানে ঢুকিয়ে রাখা হয়ে আছে।
এখন একটা মজার তামসার কথা তুলে ধরা যায়! যেমন, ভারত বলতে চায় নেপাল ল্যান্ডলকড দেশ। চারদিকের ভারতবেষ্টিত বলে ভারত পেরিয়ে তবেই নেপাল বহিঃবাণিজ্যের জন্য কোন নৌবন্দরের দেখা পেতে পারে। কাজেই নেপালকে এজন্য কাফফারা তো দিতেই হবে। ভারতকে কমিশন অথবা অগ্রাধিকার মানে মাখন অংশটা দিয়ে দিতেই হবে নেপালকে। এই হল ভারতের সাফাই। এখন আসি তাহলে একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরনের করিডোর দিতে আমরা বাংলাদেশ বাধ্য হব কেন? আমরা কেন একই যুক্তিতে আসামের উপরে আমাদের কমিশন অথবা অগ্রাধিকার পাওয়া ন্যায্য হবেনা?? বিশেষত যেখানে আবার নর্থ-ইস্ট কিন্তু ঠিক নেপালের মত একই অর্থে ল্যান্ডলকড ভূখণ্ড নয়। বাংলাদেশের বাইরে দিয়েই, মানে নিজ শিলিগুড়ি করিডোর দিয়েও কলকাতার সঙ্গে নর্থ-ইস্ট সংযুক্ত। তবু ভারতকে আমাদের নিজ রাজস্বের পয়সায় অবকাঠামো রাস্তা গড়ে সেটা আবার বিনা পয়সায় ভারতকেই দিতে হবে কেন ও কীভাবে?।এই হল ভারতের আবদার; আর এরই নাম তারা দিয়েছে ‘কানেক্টিভিটি’ আর সঙ্গে ‘বাংলাদেশ-ভারত ডায়লগ’ জাতীয় প্রতারণামূলক শব্দ তো আছেই!
তবে এখানেও কিছুটা অলক্ষ্যে এক তামাসা আছে! সবার আগে সেকথায়; এবছর বাংলাদেশের দিক থেকে এই কথিত ‘ডায়লগ’ করতে রাজি হওয়া ভারতকে আমাদের বাঁ হাতে ফুল দেবার মত ঘটনা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কেন? বাংলাদেশ থেকে প্রতিমন্ত্রী পাঠানো হয়েছে এবার। এর পক্ষে কাভারেজ সাফাই যাই দেয়া হোক এমন হবার সম্ভাব্য অনুমিত কারণ মনে করা হচ্ছে, একালে আমাদের পিরিতি-সম্পর্কে গোলমাল শুরু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের টিকা বিপর্যয়ে ফেলে দেয়া থেকে। এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পেতেই আর অবকাঠামো বিনিয়োগের আরো অর্থ পেতে চীনের সঙ্গে গভীর কমিটমেন্টে জড়িয়ে যাওয়া ছাড়া সরকার পথ ছিল না। কাজেই সরকার এখন ভারতের দিকে ন্যূনতম তাকানো বা আমল করার অবস্থাতেই নাই। এরপরেও পূর্ণমন্ত্রীর বদলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠাতে রাজি হয়েছে এ জন্য ভারতেরই শুকরিয়া আদায় করা উচিত। কিন্তু ভারত এতে আবার পালটা মোচড় দিয়েছে যে দুই ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিও এখানে পাঠানো হবে। আর এসব তুচ্ছ বিষয় মনে করে বাংলাদেশ সরকার আর সম্ভবত আপত্তি চালিয়ে যেতে চায় নাই। কিন্তু ভারতের চাতুরিটা হল, এখানে দল বলতে বিজেপির বদলে তারা খোদ আরএসএস-কে ঢুকিয়ে দিয়েছে। দুদেশের ক্ষমতাসীন দল বলতে আওয়ামি লীগ আর বিজেপি বুঝার কথা, স্বাভাবিকভাবেই। এই প্রটোকল-টাই মানা হয় নাই এখানে। ভঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু তারা বিজেপির বদলে আরএসএস-কে টেনে এনেছে। ইসলাম বিদ্বেষ আর ঘৃণা যে দলের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা, যা বেচে মোদির ভোট জোগাড়- সেই আরএসএস এভাবে নিজেকে এই সুযোগে জাতে তুলে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের পাসে বসার জায়গা করে নিয়েছে। এজায়গায় ছাড় দেয়া একেবারেই অনুচিত ও বিরাট ভুল হয়েছে। ভবিষ্যতে এজন্য আমাদের খেসারত দিতে হতে পারে।
এটা খুবই খারাপ ইঙ্গিত তৈরি করে দিয়েছে। প্রথম কথা দল হিসাবে আওয়ামী লীগ চাইলেই অন্তত নিজেকে আরএসএসের সঙ্গে এক কাতারে বসাতেই পারে না। মূলত এক সভায় বসতে পারে না। আওয়ামী লীগ যত খারাপই হোক, আরএসএস এর তুল্য দল নয়। ভারতের সমাজ থেকে যে দল ইসলাম ও মুসলমানদের অবলীলায় এথনিক ক্লিনজিং করতে চায়, বা অনুমোদন দেয় আওয়ামী লীগ সে দলের কাতারে নিজেকে বসাতে পারে না। এথনিক ক্লিনজিং আর আধুনিক রাষ্ট্র একসঙ্গে চলতে বা কাজ করতে পারে না। তাতে বাংলাদেশের মানুষের চোখে আওয়ামী লীগের যত দোষ-ত্রুটি বা খামতিই থাকুক না কেন!
দ্বিতীয় অপরাধ হল, সিমলা সভার আগে থেকেই হুমকি দেয়া হয়েছিল গত বছর অক্টোবরে কুমিল্লায় দুর্গাপূজার ঘটনাকে তারা আলোচনার বিষয়বস্ত বানাবে; যেন জবাবদিহিতা! মানে যেন বাংলাদেশের হিন্দুদের গার্ডিয়ান হলো ভারত! আবার মজার কথা হলো এনিয়ে ভারতীয় প্রতিনিধিদের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। এমজি আকবর এটাকে ‘এও হয় ও-ও’ হয় বলে পাশ কাটাতে চেয়েছেন।
বিবিসিকে তিনি ঢাকার দুর্গাপুজা ইস্যুতে সিমলায় কথা হবে কিনা এনিয়ে বলেছেন, ”ওটা তো, ওটা তো … আসলে যে কোনও ইভেন্ট বা ঘটনাই তো কন্ডিশনস বা শর্ত তৈরি করে। আমাদের দেশেও একই ব্যাপার হয়, কেউ একটা কিছু ভাষণ দিল বা কিছু বলল – অন্য পারে তার অভিঘাত হয়, বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। “আর তাছাড়া আমরা দুটো কাছাকাছি ও ঘনিষ্ঠ দেশ – দুটোই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ – ফলে কিছু-না-কিছু (আলোচনা) হওয়াই তো স্বাভাবিক।”
এছাড়া আরএসএস-এর মুখপাত্র পত্রিকা ‘দ্য অর্গানাইজার’ এর প্রধান সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিবিসি লিখছে, ” কুমিল্লা বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে গত বছর তীব্র প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল আরএসএসের মুখপত্র ‘দ্য অর্গানাইজার’। আর ক্ষুব্ধ অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।
“আরএসএস-এর থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণঃ”
আবার ওদিকে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি শক্তের মত শ্রীরাধা দত্ত, যিনি বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন” -যেট আরএসএস-এর নিজের সাথে যুক্ত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক; আর শ্রীরাধা এরই সিনিয়র ফেলো। তিনি বিবিসিকে বলেন, সংলাপে “আরএসএসের থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ”, বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কিছু ঘটনার পটভূমিতে। তাঁর কথায়, ”এই তো দেখলাম গতকালও বোধহয় বরিশালে একটি মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিচ্ছিন্নভাবে এদিক-ওদিক এরকম ঘটেই চলেছে – যদিও আমাদের সবারই ধারণা বাইরে থেকে সরকার-বিরোধী শক্তিরাই এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করাচ্ছে”।
এই নারী সম্ভবত এক চোখে দেখেন, অপর চোখে দেখেন না। দেখলে উনি পরিস্কার দেখতেন, উত্তর প্রদেশে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কিভাবে প্রকাশ্যে মুসলমান গণহত্যার আহবান জানিয়ে আরএসএস-সংশ্লিষ্ট কথিত সাধুরা হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হুঙ্কার দিচ্ছেন। এখন শ্রীরাধা দত্তরা যেভাবে বাংলাদেশের হিন্দুদের গার্জিয়ান সাজতে চাইছেন তাহলে তো আমাদেরকেও ভারতের মুসলমানদের ত্রাতা সাজতে হয়। আর সাথে ঐ সিমলা ডায়লগ অনুষ্ঠানে ভারতের মুসলমানদের দুরবস্থা নিয়ে কথা বলতে ওরকম কিছু বাংলাদেশি দলকে পাঠাতে হত – শ্রীরাধা দত্তের দু’চোখ কাজ করলে নিশ্চয় ইনি আমাদেরকে ওরকম কিছু বাংলাদেশি দলকে পাঠাতে নিজেই বলতেন!
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতীয়দের মধ্যেও কোনো ‘সমন্বয়ই’ নাই। আর এই সুযোগে শ্রীরাধা ওভার-এক্ট বা আলগা-মাতবরির সুযোগ নিয়েছিলেন। সবাই জানে বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন থিঙ্কট্যাঙ্ক খোদ আসএসএসেরই প্রতিষ্ঠান; আর মোদির বর্তমান সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এই প্রতিষ্ঠানেরই মূল কর্তা ও নেতা।
তাহলে ভারত যদি সিমলাতে কুমিল্লা ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে পারে তাহলে আমরা ভারতের হিজাব ইস্যু নিয়ে ওই একই আসরে কথা বলতে পারব না কেন? এসব দিকে বাংলাদেশ সরকারের কড়া দৃষ্টি থাকা উচিত ছিল। আমাদের নিজেকে অপমানিত হতে দেওয়ার তো কিছু নাই। আর আওয়ামি লীগ যতদিন ক্ষমতায় আছে এসব এমন মিটিংয়ে এমন গা-ছেড়ে দিবার কিছুই হয় নাই।
তবে একটা বড় লক্ষ্যণীয় দিক হল আমাদের কোন মিডিয়াই এই ডায়লগ অনুষ্ঠান মানে ১৮ ফেব্রুয়ারির আগে এনিয়ে তেমন রিপোর্ট দেখা যায় নাই, কেবল একা বিবিসি বাংলাতেই যা সব মাত করেছিল। বুঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা একটা দায় ঠেলা ধরণের হয়ে গেছিল। কিন্তু তবু উচিত ছিল বিবিসির রিপোর্টের পরে হলেও বাংলাদেশের মিডিয়ার জন্য মেটেরিয়াল সরবরাহ করা। অন্তত কাউন্টার ইনফরমেশনগুলো যেন তারা হয়ত বাসসের অথবা কয়েকটা দেশি মিডিয়াকে কাছে ডেকে নিয়ে দেয়া ব্রিফিং সরবরাহ করা।
আর বলাই বাহুল্য এই কথিত ডায়লগও বিবিসি কানেকক্টিভিটি দিয়েই শেষ করেছিল। তাই বিবিসির রিপোর্টও শেষ হয়েছিল “বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি আলোচনা” এই উপ-শিরোনামে।
[এই লেখাটা সাপ্তাহিক “সাম্প্রতিক দেশকাল”পত্রিকার ০৮ মার্চ ২০২২ ওয়েবে আর ০৩ মার্চ প্রিন্টে “ক্ষমতার লিগ্যাসিতেও আরএসএসের পাশে বসা নয়“– এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]
পারস্পেকটিভ [Perspective] শব্দটা ইংরেজি, যার বাংলা পরিপ্রেক্ষিত বা দৃষ্টিকোণ; তবে সহজ বাংলা হল, ‘কোথায়বসেদেখছেন’।মানেএকটিঘটনাকোথায়বসেদেখছেন, তাতে ঘটনার অর্থ-তাৎপর্য ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। সেটাই ঘটেছে দুবাইয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বদলকে কেন্দ্র করে। দুবাই সরকার সিদ্ধান্তটা নিয়েছে মূলত গ্লোবাল বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে ঐ জগতেব নিজের উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রাখতে। অথচ দেশি-বিদেশি মিডিয়া গ্লোবাল পারস্পেকটিভটা বুঝতে না পেরে সেদিক থেকেই নয়, বরং দুবাইয়ের কেবল (নীল কলার) ওয়ার্কিং ক্লাস বা (সাদা কলার) চাকুরিজীবীদের দিক থেকে ব্যাপারটাকে দেখে রিপোর্ট লিখেছে।
বলা যায় এটা এক নতুন ঘটনা ঘটেছে দুবাইয়ে। গত ৭ জানুয়ারি ছিল এ বছরের প্রথম শুক্রবার। আর ইউনাইটেড আরব আমিরাত (UAE) যেটা আসলে সাত আমিরী ভূখণ্ডের এক জোট বা ফেডারেশনের নাম এবং যার রাজধানী আবুধাবি। আর এভাবে দুবাইও ঐ সাত আমিরী (আমিরাত) ভূখণ্ড-এর একটা। আমরা UAE বলতে অনেক সময় দুবাইকেই বুঝি কারণ আমরা এই দুবাইকেই বেশি চিনি। এর পিছনের কারণ, তেল বেচা অর্থ আপনি এরপর ব্যাংকে লগ্নি করে বসে সেই লাভালাভ দিয়ে শুয়ে-বসে অর্থ উড়িয়ে কাটিয়ে দিতে পারেন। আর আরেক পথ হল, ব্যবসা-উতপাদনে সেই অর্থ বিনিয়োগ করেন। দুবাই-ই একমাত্র দেশ যে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও উতপাদনে গিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সবার চেয়ে বেশি ও সবার চেয়ে আগে। যাকে পিছন থেকে একালে ধরে ফেলার প্রতিযোগিতায় আছে প্রথমে কাতার, পরে অন্যেরা। সৌদি-আরব এব্যাপারে সবচেয়ে পিছনে থাকা। কিন্তু তেলের বিকল্প ইলেক্টিক ভেহিকল নবা গাড়ি দরজায় কড়া নাড়ছে, আর পরিবেশ বা দুনিয়া গরম হয়ে যাচ্ছে, বরফ গলে যাচ্ছে এসব তথ্যও এতদিনের ‘মাটির নিচের তেল পুরিয়ে চলা’ সভ্যতার (অর্থনীতি) দিনের ইতি টানতে চাইছে। যার মানে মাটির নিচে তেল থাকুক আর না থাকুক তেল বেচাবিক্রি করলে উলটা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এমন দিনের দিকে আমরা আগাচ্ছি। এটা টের পেয়েই সৌদি যা কিছু উথাল-পাতাল বদল দেখছি আমরা। গত দশকে বলা হয়েছিল ২০৩০ সালের মধ্যে সৌদি যুবরাজ দেশের অর্থনীতিক ভিত্তি তেলবেচা থেকে বদল করে বাণিজ্য-শিল্পের দিকে নিবেন। এককথায়, মধ্যপ্রাচ্যেও এক ব্যাপক বদল আসন্ন। পুরানা অর্থনীতিক ভিত্তি এতে বদলে যাবে। এর ফলে আমাদের স্বার্থ যেখানে যুক্ত প্রবাসীদের কাজ পাওয়া তা আরো কমবে না বাড়ারই সম্ভাবনা। তবে এবার দক্ষ-শ্রমিকের চাহিদা বাড়বে। এই ইউএই [UAE] (একে এরপর থেকে সংক্ষেপে আমিরাত বলব)-তেই গত শুক্রবার থেকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার-শনিবার থেকে সরিয়ে শনি-রবিবার করা হয়েছে। অর্থাৎ দুবাইয়ে শুক্রবার এখন থেকে কাজের দিন। ছুটির দিন নয়। যেটা একে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা-আমিরদের দেশ এবং মুসলমান অধ্যুসিত দেশ।
এ নিয়ে দুবাইয়ে পাওয়া যায় এমন সাতটা পত্রিকা ঘেটে দেখার পর জানা গেল আসল কারণ। যদিও সবক্ষেত্রেই নিউজগুলোর উৎস ছিল পশ্চিমা নিউজ এজেন্সি, এক্ষেত্রে তা এএফপি [AFP] অথবা এপি [AP]। তবে সেসব ছাপা হয়েছে পশ্চিমা দেশেরই অথবা মধ্যপ্রাচ্যে বা পাকিস্তানের পত্রিকায়। যার মধ্যে আবার এনিয়ে কেবল নেগেটিভ পাবলিক প্রতিক্রিয়াকে হাইলাইট করে নিউজ করা হয়েছে পশ্চিমা পত্রিকায়। যেগুলো আসলে মানুষ যেমন বলে যে “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম”, সে ধরনের। যেমন শুক্রবার সকালে অফিস যাওয়াকে কেন্দ্র করে কারও এক টুইট মন্তব্য ছিল, “এটা খুব খারাপ হচ্ছে মনে হচ্ছিল” [‘It just feels so wrong’]। মানে বলতে চাচ্ছেন, ‘বারবার কেবল মনে হচ্ছে এটা ঠিক না’। আর এই কথা কয়টাকেই গার্ডিয়ান ও স্কাই নিউজ যারা দুটাই লন্ডন থেকে প্রকাশিত তারা এই কথাগুলোকেই শিরোনামে নিয়ে এসেছে। এরা বাদে বাকি সবাই আসলে মূলত ঘটনাকে নিয়ে নানান ফ্যাক্টসগুলোকেই শিরোনাম করেছে।
তবে একটু ব্যতিক্রম পাকিস্তানের “দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন” পত্রিকা। এই ট্রিবিউনই আসলে মুখ্য কিছু ফ্যাক্টসকে সামনে এনে তাদের রিপোর্ট করেছে। আমিরাত বা দুবাই মুসলমান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম লিডার দেশ; অন্তত পশ্চিমা দেশের সঙ্গে বিজনেস কানেকশনে ব্যপ্তির দিক থেকে যে বাকি মধ্যপ্রাচ্য সবদেশের সবার চেয়ে এগিয়ে। শুধু তাই না আসলে, মূলত ভৌগলিক অবস্থান ও (তেলবেচা অর্থ) বিনিয়োগ সক্ষমতার কারণে দুবাই এখন আসলে বাণিজ্যিক দিক দিয়ে আফ্রিকা মহাদেশের প্রবেশদার। মানে আফ্রিকার কোন দেশে কোন কিছু বেচতে বা কিনতে মানে বাণিজ্যিক লিঙ্ক পেতে চাইলে দুবাইয়ের মাধ্যমে করা সবচেয়ে সহজ ও তা সেখানেই “ভাল সাজানো আছে” েমন দেশবলা যায়। অর্থাৎ সবারই অন্তত লিয়াজোঁ বা লিঙ্ক অফিস আছে সেখানে। সেজন্য আফ্রিকার সব্দেশ আর সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মিলিয়ে মোট দেশ হয় প্রায় ৬৫টি। এই ৬৫ দেশে যে কোনো বাইরের পণ্য প্রবেশের ডিস্টিবিউশন সেন্টার (আমাদের ভাষায় পাইকারি চকবাজার) হল দুবাই। এছাড়াও আরেকটি বিশাল দিক আছে। আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও প্রথম গ্লোবাল বিনিয়োগ বা পুঁজি-বাজার। আর এর বাইরে আরও দুটা দেশে একালে গ্লোবাল ‘পুঁজি-বাজার’ বা বড় বিনিয়োগ তৎপরতার কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। এমন একটা দেশ হল সিঙ্গাপুর। দ্বিতীয়টা দুবাইয়ে।
কিন্তু এসব দিকগুলোকে উপেক্ষায় ফেলে ছাড়িয়ে আমিরাত বা দুবাইয়ের মুসলমান পরিচয়টি সামনে এনে দেখার কারণে শুক্রবারকে কাজের দিন বানানোটাই যেন এখানে মুখ্য বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা হয়েছে মিডিয়া রিপোর্টে। ফলে এ নিয়ে প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্ন হাসি-ঠাট্টা টিটকারি বেশিরভাগ মিডিয়ার খবরের পারস্পেকটিভ করা হয়েছে। অথচ ট্রিবিউন যে ফ্যাক্টস বলছে তা হল, দুবাইয়ে মূলত সাপ্তাহিক কাজের ঘন্টা কমানো হয়েছে। অর্থাৎ দুবাইয়ে সপ্তাহে আগে মোট কাজের দিন ছিল পাঁচ দিন। এখন সেটা সপ্তাহে সাড়ে চার দিন করা হয়েছে। আর এতে তবে শুক্রবার এখন কাজের দিন হলেও তা আসলে হাফ দিন মানে কেবল দুপুর ১২টা পর্যন্ত অফিস। আর সাপ্তাহিক ছুটি এখন শনি-রবিবার। এছাড়া সঙ্গে সরকার থেকে এই পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করে এক স্টেটমেন্টও দেওয়া হয়েছে।
A government statement said the move would “ensure smooth financial, trade and economic transactions with countries that follow a Saturday-Sunday weekend, facilitating stronger international business links and opportunities for thousands of UAE-based and multinational companies.”
তাতে বলা হয়েছে, ‘উইক অ্যান্ড হিসাবে যেসব দেশ শনি-রবিতে অভ্যস্ত সেসব দেশের সঙ্গে ফাইন্যান্সিয়াল, ট্রেড ও ইকোনমিক লেনদেনের বাধা ও অসুবিধাগুলোকে সহজ করতে এটা করা হয়েছে। যাতে হাজারো দুবাইভিত্তিক বা বহুজাতিক কোম্পানির আন্তর্জাতিক বিজনেস লিঙ্ক ও এর সুবিধাদি শক্তিশালী ও সহজতর করা যায়।’
শুক্রবার ওয়ার্কিং ডে ছিল না আগে, তখন কী অসুবিধা হতঃ আসলে শুক্রবার ওয়ার্কিং ডে না হলে আগে কী অসুবিধা হত? তাতে সেসময় শুক্র-শনি-রবি এই টানা তিন দিন কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক তথ্য দেয়ানেয়ার কমিউনিকেশন আদান-প্রদান বা ব্যাংক লেনদেন একেবারেই বন্ধ থাকত। আর এখন অন্তত মাঝের হাফ দিন (শুক্রবারেও) তা চালু থাকবে। আর এটুকু পেতেই সাপ্তাহিক কাজের ঘণ্টা বাকি (শুত্রবারের) আর্ধেক দিন কমিয়ে দেয়া হয়েছে। সেজন্য সরকার এটাকে বলছে, মানুষের “কাজ ও জীবনের মধ্যে ব্যালেন্স” আনার চেষ্টা। অর্থাৎ যথেষ্ট ভাল্ভাবে সরকার সাফাই যুক্তি পেশ করেছে।
গত প্রায় ৭৫ বছরের গ্লোবাল সমাজঃ
গত প্রায় পঁচাত্তর বছরে দুনিয়ার জীবনযাত্রায় ব্যাপক ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। এর একটি হল নিজ নিজ দেশে অন্যের কলোনি বা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা আর নয়। এতে বিচ্ছিন্ন থাকা মানে যেমন, তখন ভারত-শ্রীলঙ্কা কোন সম্পর্ক ছিল না। মানে কী? মানে দুটা দেশই বৃটীশ কলোনি দখলের অধীনে ছিল। ফলে ভারত-শ্রীলঙ্কা বলে কোন সম্পর্ক থাকলেও সেটা আসলে হয় বৃটিশ কলোনি শাসকের সম্পর্ক। দুই ভারতীয় বা শ্রীলঙ্কান বাসিন্দার সম্পর্ক নয়। ফলে আমরা বিচ্ছিন্নই ছিলাম, থাকতাম। ফলে ভারত-শ্রীলঙ্কার মধ্যে কোন পণ্য দেয়ানেয়ার বাণিজ্য সম্পর্ক ছিলই না। মূল্কথা আমরা কেউই নিজ নিজদেশের কর্তা-মালিক ছিলামই না। এভাবে শুধু ভারত-শ্রীলঙ্কাই নয় বরং যেকোন দুই কলোনি হয়ে থাকা দেশের অবস্থা ছিল। কলোনিদখল কালের সম্পর্ককে এভাবে যত সম্ভব খুলে বুঝতে হবে।
আর এই কলোনি দখল সম্পর্কেরই আনুষ্ঠানিক ও আইনগত সমাপ্তি টানা হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের পর থেকে। সর্বপ্রথম এশিয়ার দেশগুলো পরে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার সবাই কলোনিমুক্ত দেশ হয়ে যায়। পশ্চাশের দশকের মধ্যে সারা এশিয়ায়, ষাটের দশকের মধ্যে আফ্রিকায় এভাবে বেশির ভাগ দেশ স্বাধীন কলোনিমুক্ত দেশ হয়ে যায়। পরে সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া লাওস ইত্যাদি এশিয়ার বাকি দেশগুলো এভাবে সর্বশেষ কলোনিমুক্ত দেশ বলা হয় সাউথ আফ্রিকা, ১৯৯৪ সালে। আর তাতে ইতোমধ্যে এসব বদলের কারণে, বরং নিজ স্বাধীন দেশে থাকা আর প্রতিটা দেশের সাথেই অপর দেশের পণ্যবিনিময় সম্পর্ক করা সম্ভব হয়। এর ফলে গ্লোবাল কানেকটেড জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে বসবাস আজ আমাদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এই বিচারে ১৯৪৫ সাল প্রথম কলোনিমুক্ত দেশ ও জীবন এবং সঙ্গে একটি গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম এবং অর্থনৈতিক মুদ্রা বিনিময় সিস্টেমের মধ্যে আমাদের বসবাসের শুরু হয়েছিল।
আশির দশকের গ্লোবালাইজেশনঃ
দ্বিতীয় মোড় ঘোরার ঘটনাটা ছিল ১৯৮০ এর দশকের শুরু থেকেই চালু হওয়া গ্লোবালাইজেশন। যার নেগেটিভ দিকটি অনেকে প্রধান করে দেখে থাকে। যদিও এর তাতপর্যময় দিকটা হল এটা ছিল কার্যত অর্থনৈতিক জাতিবাদ ভেঙ্গে দেয়া। যদিও এমন ভেঙ্গে দেয়া এর লক্ষ্য ছিল না। লক্ষ্য ছিল পশ্চিমের হাতে জমে যাওয়া বিপুল উদ্বৃত্ব সঞ্চয়কে বিনিয়োগে নিয়ে আসা। অর্থাৎ প্রত্যেকটা সদ্যস্বাধীন ছোট দেশ কেবল নিজ দেশেই যা যা সম্ভব, তা নানান সীমাবদ্ধতায় উৎপাদন করে আর তা নিজেই ভোগ করে, এই জাতিবাদি ব্যবস্থার বিপরীতে নানান দেশের উৎপাদনগুলোকে আবার নানা দেশে ভোগ-বিতরণের এক নয়া ব্যবস্থায় প্রবেশ করা – এভাবে সবকিছুরই এক গ্লোবাল বিনিময় ব্যবস্থার দিকে আমরা চলে গেছি। যার মূল দিকটি হল আসলে এভাবে গ্লোবাল এক শ্রম-বিনিময় চালু হয়েছে। আর সেখান থেকে প্রত্যেক উৎপাদক দেশের শ্রম মানে ‘এডেড ভ্যালু’, আর তা একই প্রডাক্টের ভেতরে এক দিকে সংশ্লিষ্ট সকল দেশের শ্রম ‘এডেড ভ্যালু’ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে আবার সেই ফাইনাল প্রডাক্টের ভোক্তা হচ্ছে ‘ভ্যালু এড’ করা সকল দেশ। এটাকে বলা হচ্ছে ভ্যালু এডেড চেইন, এই যোগে সংশ্লিষ্ট দেশের এক অর্থনৈতিক জোট। এমনই এক জোট হলো Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP)। স্বভাবতই এগুলো আগামী দুনিয়ার অভিমুখ। এবং দুবাই হয়ে উঠতে পারে এরই এক আঞ্চলিক ডিস্টিবিউশন কেন্দ্রদেশ।
এখন আমরা চাই আর না চাই গত চল্লিশ বছরব্যাপী এটা এতই বিকশিত জায়গায় চলে গেছে যে, পিছন ফিরবার পথ নেই। অনেকটা নদী পেরিয়ে এরপর নৌকাডুবিয়ে দেবার মত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তবু এক উলটা পথে হাঁটার চেষ্টা করে ফেল করে গেছেন। কার্যত তার “আমেরিকান জাতিবাদ” পরাজিত হয়ে গেছে। যদিও এর আরেক রূপ সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ [পশ্চিমাদেশ মানে সাদা ককেশীয়দের দেশ এবং তাই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব সেখানে ফিরে কায়েম করতে হবে, অ-সাদাদের বের করে দিতে হবে ইত্যাদি বয়ান] এখনও জীবিত এবং এরা এখন থেকেই আগামি ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হাতগুটানো মাসল দেখানো শুরু করে দিয়েছে। আর ট্রাম্পের জাতিবাদি অর্থনীতি করার প্রচেষ্টার প্রভাবে এর খারাপ পরিণতি-প্রতিক্রিয়া এখন এসে পড়েছে বাইডেনের ঘাড়ে, এখনকার আমেরিকান ইকোনমিতে। যেটা এখনকার ভাষ্যে বললে এক ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। যেটা আমেরিকায় এবং গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান সমস্যা হিসেবে হাজির।
কিন্তু এগুলোর সঙ্গে দুবাইয়ের সাপ্তাহিক কাজের ও ছুটির দিন বদলের কী সম্পর্ক? একালে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর ক্রমশ আরেক বিশাল প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, এমনিতেই শুরু থেকেই এতে মুসলমানদেরকে বৈষম্যমূলক ট্রিটমেন্ট সহ্য করতে হয়েছে, হচ্ছে। আর তা থেকে প্রতিকার হিসাবে অনেকে এথেকে মুসলিম আইডেনটিটির ভিত্তিতে কেবল মুসলমানের এক গ্লোবাল উত্থানের স্বপ্ন দেখছে। অনেকে এথেকে প্রতিক্রিয়ায় এক গ্লোবাল খেলাফত ব্যবস্থা কায়েম হবে এমন স্বপ্ন-কল্পনাও হাজির হয়েছে বলছেন। যা আবার এর বাস্তবায়ন কেন সম্ভব বা কেন অসম্ভব সে আলোচনা এখন পর্যন্ত উহ্য থাকছে বলছেন অনেকে। তুলনায় আবেগ ও স্বপ্ন দিয়ে বাস্তবতা বিচারের ঝোঁক আর এর ভিত্তিতে আকাঙ্খার তীব্রতা অনেক বেশি।
তবে এসব তর্ক উহ্য রাখা হোক আর নাই হোক, উপরে গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যে অভিমুখ কিছুটা এঁকেছি সেই অর্থনৈতিক অভিমুখের সঙ্গে এই ‘গ্লোবাল খেলাফতের স্বপ্ন-কল্পনার’ সম্পর্ক সংঘাতের। কিন্তু এই সংঘাতের বিশেষত্ব হল, এটা এক বাস্তব ও অবজেকটিভ ফেনোমেনার (গ্লোবাল অর্থনৈতিক অভিমুখের) সঙ্গে কিছু মানুষের আইডিয়া বা কল্পনার সংঘাত। আর সবচেয়ে বড় কথা, এসব ক্ষেত্রে সাধারণত বাস্তব অবজেকটিভ ফেনোমেনাকে (যেমন জলোচ্ছ্বাসের মতো অবজেকটিভ ঘটনা) পরাজিত করা সবসময় অসম্ভব হয়ে যায়। এসব কল্পনা যতটা অবাস্তব আন-রিয়েলিস্টিক তার হেরে যাওয়া বা টিকতে না পারার সম্ভাবনা তত বেশি হয়ে থাকে।োল
কাজেই এখান থেকে সারকথাটা হল, নতুন যেকোন রাজনৈতিক আইডিয়াকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অভিমুখের সাথে তাল মিলিয়ে হাজির করতে হয়। সরাসরি মুখোমুখি সংঘাত এড়িয়ে চলতে হয়। নইলে সব পন্ডশ্রম হয়ে উঠতে পারে। দুবাইয়ের শাসকেরা এসব দিক বিচারে নিজেদের প্রধান বিবেচ্য করণীয় বা প্রায়োরিটি ঠিক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যেমন দুনিয়ার মূল অপ্রতিরোধ্য অভিমুখ হল, দুনিয়ার সব কোণের সব শ্রম পরস্পরের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে লেনদেনে সম্পর্কিত হয়ে উঠতে চাইছে ও চাইবেই। শ্রম বা ভ্যালু যোগ হওয়া পণ্য বিনিময় ঘনিষ্ট হয়ে উঠতে চাইছে। এবং তাতে কার কী রাজনৈতিক, এথনিক, রেসিয়াল ধর্মীয় পরিচয় ইত্যাদি সব নির্বিশেষে মাখামাখি সম্পর্কিত হয়ে উঠতে চাইছে। এর বিরুদ্ধে মুসলমান পরিচয়ে একটি আলাদা দুনিয়া, কিংবা নিদেনপক্ষে কোল্ডওয়ারের জমানার মতদুই ব্লক দুনিয়া খাড়া করার কল্পনা একেবারেই আন-রিয়েলিস্টিক। যেমন চাল আর ডাল মিশানোর আগে পর্যন্ত সব ঠিক আছে; কিন্তু একবার মিশিয়ে ফেললে তা আর আলাদা করা যায় না।
পুরানা সোভিয়েত ব্লক এখন ভেঙে গেছে শুধু না, তারা এখন রাশিয়া-সহ ১৫ রাষ্ট্রে আলাদা হয়ে গেছে। আবার ওই ১৫ সবাই-ই এখন আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। অর্থাৎ সারা দুনিয়াই এখন প্রায় সবদেশের সাথে তারা একই গ্লোবাল অর্থনীতির সদস্য। এবং সবার সাথে বাণিজ্য বিনিময়ের উপযুক্ত হয়ে গেছে। তাই সবার সঙ্গে সবার সব ধরনের পণ্য-শ্রম-পুঁজি এরা বিনিময়ের যোগ্য হয়ে গেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ফিরে আগের জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয় [reversible নয়]। কাজেই এই ১৫ দেশকে আবার কোন সোভিয়েত বা অন্য নামের ব্লকে ফেরত নিয়ে যাওয়া এখন অসম্ভব। খিচুরির চাল-ডাল একবার মিশিয়ে দিলে আর আগের জায়গায় ফিরিয়ে চাইলেও তা নিতে চাল ও ডাল আলাদা করা যায় না।
এমন সম্পর্কের আরেক উপযুক্ত উদাহরণ হল, চীন-ভারতের অর্থ-বাণিজ্যিক সম্পর্ক। একদিকে এদুই দেশের মধ্যে সামরিক, রাজনৈতিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ সংঘাত বেড়ে চলেছে। অথচ উল্টা কথাটা হল, ভারতে চীনাপণ্য আমদানি-বাণিজ্য গত তিন বছরে না কমে আরো বেড়েছে। ভারতে চিনাপণ্য আমদানি ৪৩% এর বেশি বেড়েছে।
কাজেই এভাবে বলা যায় দুবাইয়ের ওয়ার্কিং-ডেতে বদল গ্লোবাল অভিমুখের সঙ্গে দুবাইয়ের আমীরেরা তাদের নিজেদের সমন্বয় করা উচিত বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এই পারস্পেক্টিভ থেকে দেখলে ও বুঝলেই কেবল অর্থবোধকভাবে অনেক কিছুই ফুটে উঠতে পারে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[এই লেখাটা সাপ্তাহিক “সাম্প্রতিক দেশকাল”পত্রিকার ১৫ জানুয়ারি ২০২২ ওয়েবে “দুবাইয়ে শুক্রবার ওয়ার্কিং ডে চালু”– এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]
সবার আগের প্রসঙ্গঃ
আফগানিস্তানে এক দুর্ভিক্ষ আসন্ন আর সেইসাথে সেখানকার পাহাড়ি-শীত জেঁকে বসল বলে। এর চেয়েও বড় কথা আফগান অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। এমনিতেই আফগানিস্তানে ২০ বছরের দখলি শাসন অবসানের পরে একটা নিজ রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। এর উপর তাতে কার্যকর একটা অর্থনৈতিক সিস্টেম আবার খাড়া ও চালু রাখা খুবই কঠিন কাজ। বিশেষত যখন ঐ দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থাটাই অকার্যকর হয়ে আছে। বলা যায় আফগানিস্তান এখনো ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার’ সাথে একই বোঝাবুঝিতে নেই, ন্যূনতম কার্যকর রাজনৈতিক সহমত তৈরি নাই বা হচ্ছে না। ফলে বাস্তবত আফগানিস্তান বাইরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম ও গ্লোবাল মুদ্রাব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত নয়, বিচ্ছিন্ন। ফলে আফগান অর্থনৈতিক কাঠামোটাই নড়বড়ে, নিজে নিজে কোনো মতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। দুর্ভিক্ষাবস্থার মূল সঙ্কট এখানেই।
এদিকে পাকিস্তানের ‘ডন’একটি খুবই খারাপ খবর ছেপেছে। জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হকের বরাতে পত্রিকাটি লিখেছে, তা অনুবাদ করে লিখছি : ফারহান বলছেন, “মানবিক সাহায্য বিতরণ নিয়ে কাজ করা আমাদের সহকর্মীরা সতর্ক করে জানাচ্ছে যে, আফগানিস্তানের প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ লোক যারা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি (৫৫ শতাংশ), তারা অতি জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসঙ্কট ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে চলতি নভেম্বর ২০২১ থেকে মার্চ ২০২২ এই সময়কালটায়” [“Our humanitarian colleagues warn that nearly 23 million people — or 55 per cent of the Afghan population — are estimated to be in crisis or experiencing emergency levels of food insecurity between November 2021 and March 2022,” Mr. Haq said.]।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে, ১৯৭৪ সালের দিকে যাদের বয়স তখনই ১০ বছর বা এর বেশি ছিল তাদের স্মৃতিতে আবছা বা স্পষ্ট থাকার কথা যে, দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পরে খাদ্যসঙ্কট, দুর্ভিক্ষ আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অকার্যকর হয়ে পড়া বা থাকা ওদেশের মানুষের জন্য কেমন অসহায় অবস্থায় এক চরম সঙ্কট-বিপর্যয় তৈরি করেছে! আজ বাংলাদেশে নিজেরা জীবনমানের দিক থেকে যে উঁচু জায়গাতেই থাকি পুরনো সেই স্মৃতি আমাদের জানান দেয় আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ এখন কী অমানবিক দুর্দশায়! চার দিকে খাদ্যের জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা – মিডিয়ায় শুধু পুরুষ লাইন না, নারীদের লাইনও বলে দেয় তাদের অসহায় অবস্থার কথা!
এদিকে আমেরিকান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মূলত মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করে। গত ১১ নভেম্বর তার রিপোর্টের শিরোনাম‘আফগানিস্তান দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি’ [Afghanistan Facing Famine]। মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ফেলা ও রাখা চেয়ে বড় মানবাধিকার ও মর্যাদার সঙ্কট আর কি-ই-বা হতে পারে? তাদের রিপোর্টের সারাংশ করে লিখেছে, ‘জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, আমেরিকার উচিত যা কিছু বাধানিষেধ বা অর্থনীতিক অবরোধ বা পলিসি তারা আফগানিস্তানে আরোপ করতে চায়, তা অবশ্যই যেন বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে শিথিল করে নেয়” [UN, World Bank, US Should Adjust Sanctions, Economic Policies]।’
পরের প্রথম বাক্যেই লিখছে, ‘দাতা দেশ, জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আফগানিস্তানের ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তা গড়িয়ে সর্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ অবস্থা না তৈরি করে – আজ (১১ নভেম্বর) হিউম্যান রাইট ওয়াচ এ কথা বলেছে।”।
Donor countries, the United Nations, and international financial institutions should urgently address Afghanistan’s collapsed economy and broken banking system to prevent widespread famine, Human Rights Watch said today.
আফগানিস্তান নিয়ে দুটা গ্লোবাল উদ্যোগঃ
এ’সপ্তাহে আফগানিস্তান নিয়ে দুটো উদ্যোগ থেকে মিটিং ডাকা হয়েছে। একটার আয়োজক ভারত, অন্যটার পাকিস্তান। এর মধ্যে ভারতেরটাকে বলা যায় ভারত কিভাবে আফগানিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে আর পাকিস্তানেরটা হল, আফগানিস্তান কিভাবে গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে স্বীকৃতি যোগাড় করে এক সাথে লেনদেন বিনিময় সম্পর্কে যুক্ত হতে পারে তা নিয়ে। এটাই প্রকাশ পেয়েছে কে কোথায় আমন্ত্রিত হয়েছে সেই তালিকায়। যেমন ভারত আফগানিস্তানকে আমন্ত্রণই জানায় নাই, কিন্তু পাকিস্তানের আয়োজনে আফগানিস্তান আমন্ত্রিত।
এছাড়াও ভারতের তালেবানদের আফগানিস্তান নিয়ে সভা ডাকাতে এনিয়ে অনেক পাঠক কৌতুহলি হতে পারেন ঠিক প্রথমত যে আমি ঠিক ভারতই বুঝাতে চেয়েছি কি না। কারণ আমরা জানতাম আমেরিকার বসানো পুতুল – গনি সরকারকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া ভারত অন্য কোনো কিছুতে আস্থা রাখে না, এমন ভারতকেই আমরা চিনতাম। হ্যাঁ, তা বটে। কিন্তু ইদানীং তাতে ছোট্ট কিছু মোচড় দেখছি আমরা। তা হলো ভারত হঠাৎ করে জানাল তারা (নাকি আফগানিস্তানকেই দাওয়াত না করে তবে) আফগানিস্তান ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের নিয়ে এক সভা করতে চায়। এমন ইচ্ছা করাটাই অবশ্য ভারতের ‘গনি সরকার’ ছেড়ে অন্য কিছুর তালাশ করার স্পষ্ট লক্ষণ।। তাই ভারতের দিক থেকে এটা বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া যে, ‘গনি সরকারকে’ ফিরিয়ে আনতে আবদার এটি বাস্তবের মাটিতে পা রেখে দাঁড়ানো কোনো পক্ষের জন্য কোনো অপশনই নয়। তাই বলা যায়, ভারত যে আফগান ইস্যুতে এক দিকভ্রান্ত মুসাফির হয়ে গেছে; যে আবার দিশা খুঁজতে এবার পথে নেমে পড়েছে তা আর লুকানো থাকল না।
Uzbekistan’s Security Council Secretary Victor Makhmudov, Turkmenistan’s Security Council Secretary Charymyrat Amanov, Tajikistan’s Security Council Secretary Nasrullo Rahmatjon Mahmudzoda, Russia’s Security Council Secretary Nikolai Patrushev, India’s National Security Advisor Ajit Doval, Secretary of Iran’s Supreme National Security Council Ali Shamkhani, Kazakhstan’s Chairman of the National Security Committee Karim Massimov, Kyrgyzstan’s Security Council Secretary Marat Imankulov pose before attending the “Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan” in New Delhi, India, November 10, 2021. India’s Ministry of External Affairs/Handout via REUTERS
আবার আফগানিস্তান ইস্যুতে কিছু করতে বা পেতে চাইলে চীন ও পাকিস্তান যে গুরুত্বপুর্ণ অংশীদার সে কথা আর ভারত অস্বীকার না করে স্বীকার করে নেওয়ার প্রমাণও হাজির রাখল। ভারত পাকিস্তান ও চীনকে তাদের সভায় যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই আমন্ত্রণে সব চেয়ে বেমানান ঘটনাটা হল, কোন জিনিষ হঠাত করে শুরু হয় না। প্রথমত গত আগষ্টে তালেবানেরা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এটা যে ভারত মানে না সেটা ভারত সবসময় প্রকাশ করে গেছে। যদিও ব্যাপারটা এমন না যে সারা দুনিয়াতেই তালেবানদের ব্যাপারে সব রাষ্ট্রশক্তি একে গ্রহণ করে নিয়েছে। তবে কোন আপত্তি তোলার চেয়ে কি করে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় সকলেই এই এপ্রোচ নিয়েই আগিয়ে এসেছে। তালেবানেরা কিভাবে সবার স্বীকৃত আফগান শাসক হয়ে উঠতে পারে এটাই ছিল মুখ্য দিক। তাই ভারতের জন্য এই সভা ডাকা নিয়ে সবচেয়ে যা বেমানান তা হল কেউ উজানে বাইতে বাইতে হঠাত যদি ভাটিতে নেমে যায় তেমন অবস্থা। ভারত প্রতিটা ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের জন্য পাকিস্তানকে উঠতে বসতে দায়ী ও খারাপ ভাষা প্রয়োগ করে এসেছে। কথা একটাই বলে এসেছে “পাকিস্তান সব সন্ত্রাসবাদ ঘটাচ্ছে”। এ’অবস্থায় হঠাত করে সেই তালেবানের আফগানিস্তান নিয়ে সম্মেলন ডাকা আর তাতে পাকিস্তানকেই দাওয়াত দেয়া – এটা কেন? সবচেয়ে বড় কথা এটা কেন ভারত কী মূল্যায়ন বদলিয়েছে? তাই ভিন্নভাবে বাস্তবতা দেখছে? এর জবাব হল, না ভারত তা মুখে স্বীকার করে কিছু বলছেনা। তাহলে পাকিস্তান আসবে কেন? এর জবাব ভারতের আছে নাই। ফলে তাই হয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টার দাওয়াত প্রত্যাখান নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মঈদ ইউসুফ-এর ভারতের আহুত সভায় না যাওয়া এবং সাথে ক্ষুবশ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, কোন শান্তি ভন্ডুলকারি আবার নিজেই শান্তিসভার আহবায়ক হতে পারে না ‘A spoiler can’t be a peacemaker’। শুধু তাই না তিনি ভারতের আহুত সভাকে খামোখা [moot] সভা বলে বলেন তিনি কোন খামোখা সভায় যাচ্ছেন না [not attend an upcoming moot]। অন্যদিকে চীনেরও ভারতের সভার যোগদান প্রত্যাখানটা তুলনামূলক নরম বা ঠান্ডা ভাষায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিফিংয়ে জানান তারা ঐ সময়ের ব্যস্ততার মধ্যে সময় মিলাতে না পারায় [“scheduling reasons”……”inconvenient” ] যেতে পারছে না তা ভারতকে জানিয়েছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া এত খারাপ হত না হয়ত যদি ভারত আমেরিকা অথবা খোদ রাশিয়াকে দিয়েই পাকিস্তানকে লবি করাতো। অর্থাৎ বলা যায় ভারত ঐ পর্যায়ের সিরিয়াস ছিল না। আবার এমন সিরিয়াস না থাকার পিছনের বড় কারণ খোদ মোদি ও তার হিন্দুত্ববাদ। কারণ ,মোদি তার শাসনের গত প্রায় আট বছর ধরে নিয়মিত পাকিস্তানকে ব্যবহার করে এসেছে তার নির্বাচনে তার বাক্সে হিন্দুভোট যোগাড়ের অপব্যবহারে। সেই পুরাণ ফর্মুলা যে, পাকিস্তান মানে মুসলমান । তাই পাকিস্তান বা মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াকু হিন্দু-বীর হলেন মোদি অতএব সমস্ত হিন্দুভোট মোদির দলের প্রাপ্য। কিন্তু এতে ভারত তো একটা রাষ্ট্র যার অনেক স্বার্থ আছে পাকিস্তানের সাথে একসাথে একমতে কাজ করার। কিন্তু না, সেটা সেকেন্ডারি। হিন্দুত্ববাদের ভোট যোগাড়ই মোদীর প্রধান স্বার্থ হয়ে থেকে গেছে। এবং আগামি অন্তত ২০২৪ মে নির্বাচন পর্যন্ত এটাই থাকবে।
শুধু কি তাই? ভারত কি মনে করে আফগান ইস্যুতে এই সভা-সম্মেলন করে এবার পথে পেয়ে যাবে? এক কথায় উত্তর, একেবারেই না। কিভাবে তা জানা গেল? ভারতের মিডিয়ারই ভারতের এই আফগান ইস্যুতে উদ্যোগ থেকে কোনো ফলাফল আসা নিয়ে আস্থায় নেই। যেমন ধরা যাক, দৈনিক প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি লিখছেন এভাবেঃ “পাকিস্তান বেঁকে বসেছে। মুখ ফিরিয়েছে চীনও। এখন আফগানিস্তান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভারতের উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে। তবু ভারত চেষ্টা ছাড়তে রাজি নয়”। [দেখেন চীন-পাকিস্তানকে ছাড়াই উদ্যোগী ভারত] অর্থাৎ স্পষ্ট করেই নয়াদিল্লি প্রতিনিধি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ভারতীয় উদ্যোগের উপর তার কোনো আস্থাই নেই।
কেন ভারতও এমন সম্মেলন করতে গেলঃ
ভারতের এ উদ্যোগে রয়টার্স বলছে দাওয়াত পেয়েছিল ইরান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান [India, Iran, Russia, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, Turkmenistan and Uzbekistan]। তবে আসলে এখানে ভারতসহ আট রাষ্ট্রকে দেখা গেলেও এতে মূল গুরুত্ব ইরান ও রাশিয়ার। এ দুটোর মধ্যে আবারও মূল ওজনটা একমাত্র রাশিয়ার; যদিও ভারত এই সম্মেলনের শিরোনাম দিয়েছে এভাবে : ‘দ্যা দিল্লি রিজিওনাল সিকিউরিটি ডায়লগ অন আফগানিস্তান…’ [Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan…… ]।
কিছু কথা এখানে খুলে বলাই ভাল, বুঝতে সুবিধা হবে তাতে। যেমন গত আগস্ট থেকে আফগানিস্তান ইস্যু ভারতের কেন ‘ঘুম হারাম’ হয়েছে সে কথা কাউকে সে খুলে বলতে পারছে না। প্রধানত ঘুম হারাম ঘটনাটা হল কাশ্মিরকে নিয়ে; অর্থাৎ কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ বা তা হাত ছাড়া হয়ে যায় কি না! কেন?
কারণ মোদি-অমিত খুবই ভীত এ জন্য যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তারা একেবারেই গায়ের জোরে কাশ্মির (পুরোটাই মানে, শুধু ভারতের দখলে থাকা অংশ না – পাকিস্তান ও চীনের দখলে থাকা অংশসহ) ভারতের স্বাভাবিক অঙ্গ-ভূখণ্ড বলে সংসদে ঘোষণা করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এখানে “গায়ের জোরে” বললাম অনেক কারণে। প্রথমত, নেহরু জানতেন কাশ্মির ভারতের নয়; তাই তো জাতিসঙ্ঘের কাছে তিনি চিঠি লিখে মতামত চাইলে জাতিসঙ্ঘ গণভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত নিতে ফয়সালা দিয়েছিল। এটাই “নেহরু জানতেন” একথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু ভারত জাতিসংঘের রায় কখনোই অনুসরণ করেনি। তবে একেবারেই কোনো পদক্ষেপ না নেয়াটা সরাসরি জাতিসংঘ অমান্য করা হয় – সম্ভবত এমন অনুমানে তিনি কিছু “বিশেষ শর্তে” (যেমন ভারতের মূল ভূখণ্ডের কেউ কাশ্মিরে জমি কিনতে পারবে না ইত্যাদি) কাশ্মিরকে ভারতভুক্ত করে নেন। আর সেসব “বিশেষ শর্ত” সেটাই হল – ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা। আর গত ২০১৮ সালেও ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিজেপি সমর্থক এক ব্যক্তি মামলা করেছিলেন ৩৭০ ধারা বাতিল করে রায় দিতে; তা এই যুক্তিতে যে সেসময় “ভারতের মূল কনস্টিটিউশন প্রণয়ন কমিটি” ৩৭০ ধারা যুক্ত করেছিলেন একে ‘অস্থায়ী’ বলে উল্লেখ করে। কিন্তু পরবর্তিতে এ নিয়ে আর কোনো কাজ না করেই ওই প্রণয়ন কমিটি তার আয়ু শেষ, তাই ‘বিলীন’ (ডিসল্ভ) বলে ঘোষণা করে দেয়া হয়। অতএব কোর্ট এখন ৩৭০ ধারাকে বাতিল ঘোষণা করুক – এই ছিল আর্জি। কিন্তু কোর্ট রায় দেন, এমন করা যাবে না। কারণ এমনটা করা হলে আইনিভাবে কাশ্মির আর ভারতের অংশ থাকবে না। তাই আদালত ওই রিট আবেদন বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন।
এর অর্থ ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এক অবৈধ কাজ। কিন্তু যেহেতু কেউ এখনো এ ব্যাপারটা আদালতের দৃষ্টিতে আনেনি, তাই এটা অটুট থেকে যাচ্ছে।
আবার সুপ্রিম কোর্টের ওই রিট মামলার রায়ে দেখা যাচ্ছে সেখানেও আসলে পরোক্ষে ধরে নিয়ে রায় দেয়া হয়েছে যে, কাশ্মির ভারতের নিজ মূল ভূখণ্ড নয়। তা হলে অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এবং কাশ্মিরকে সরাসরি ভারতের নিজভূমি বলে দখল করে নেয়া – এটাও তো অবৈধ। কিন্তু এটাও আদালতের দৃষ্টিতে কেউ আনেনি, তাই এটাও কোন চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে টিকে আছে। এ ছাড়া মোদির জমানায় আদালতের ট্রেন্ড হল, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করতে হয় এমন ইস্যু হলে আদালতের ঐ মামলা এড়িয়ে চলা বা বছরের পর বছর ফেলে রাখা অথবা কোনো একবারের প্রধান বিচারপতি আন্ডারহ্যান্ড ডিলের অভিযোগ মাথায় নিয়েও সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে দেয়ার ঘটনা অনেক। এসবই মামলা না হওয়া অথবা আদালতের দ্বারস্ত না হওয়া বা জনস্বার্থের মামলাগুলো করার মত লোক গরহাজিরা পিছনের কারণ মনে করা হয়।
এভাবেই মোদি-অমিত তাদের রামরাজত্বের হিন্দুত্বের শাসন চালিয়ে যেতে পারবেন মনে করা হয়েছি। কিন্তু না! উপরে উল্লেখিত এসব ‘গায়ের জোরের’ মতো হঠকারি কাজ – আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পরে থমকে যায় আর মোদি-অমিতও চমকে ওঠেন। কারণ এর সরাসরি প্রভাব কাশ্মিরে জমানো রামরাজত্বের উপর পড়বেই। এর প্রভাবে আজকের কাশ্মিরে (যেখানে মানুষের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, প্এরতিনিধিত্টিবশীল শাসন নাই, এখন রাজ্যের মর্যাদায় নেই, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের কোনোই আইনি ব্যবস্থা বা কাঠামোই, [ রাজ্য সরকার] নাই)। একারণে এবার যদি আবার সশস্ত্র আন্দোলন চাঙ্গা হয়, কি তুঙ্গে ওঠে আর যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মত পরিস্থিতি এসে যায়; তবে সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাই ফিরে মোদি-অমিতের চরম বিরুদ্ধে চলে যাবে এই বলে যে, “গায়ের জোরে কাশ্মির ভারতের বলে দখল, ৩৭০ ধারা বাতিল’ করতে যাওয়াতেই এই বিপর্যয়! অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদ ব্যাকফায়ার শুরু করবে!
মূলত একারণেই মোদি-অমিত এখন চান যেই আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসুক সে যেন প্রতিশ্রুতি দেয় যে কাশ্মিরে স্বাধীনতাকামী কাউকে আফগান-সহযোগিতা দেওয়া হবে না। মজার কথা হল, মোদি-অমিতের কাছে এই ঘোরতর মাথাব্যথার ইস্যু কাশ্মির অথচ, এনিয়ে বাইডেন প্রশাসন অন্তত কোনো সমর্থনের অবস্থানে নেই; বরং উল্টো ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু আমেরিকার অভিযোগের তালিকায় আছে। কিছু কংগ্রেস সদস্যও এ নিয়ে সোচ্চার।
রাশিয়া কেনঃ তাহলে দেখা যাচ্ছে এখন সব মিলিয়ে ভারতের কাছে একমাত্র ভরসা মুরুব্বি রাশিয়া! কিন্তু সে কেন ভারতকে এই কোল দিতে গেল যাতে ভারত একটি সম্মেলন ডাকতে পারে?
তালেবানরা এবার গত আগষ্টে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাশিয়া মূলত খুবই খুশি। তার অনুমান, এবার দিন তার পক্ষে এসেছে ও যাবে; আর আমেরিকার বিপক্ষে। কিন্তু একই রাশিয়ারই আবার এক প্রবল শঙ্কা; কারণ সে আবার সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয় রাষ্ট্রের কাছে (এরই চার রাষ্ট্র ভারতের সম্মেলনে যোগ দিয়েছে) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা তাদের হবু আক্রমণ থেকে এই রাষ্ট্রদেরকে সুরক্ষিত রাখবে। আর একাজে আবার রাশিয়া তালেবানদের ওপর নির্ভর করতে হবে, বিকল্প নাই। ফলে টেনশন আছে।
এসব কিছু অবশ্যই রাশিয়ার বড় স্বার্থ। কিন্তু এসব ছাড়াও রাশিয়ার আরেক বড় স্বার্থ আছে। যেমন সেটি হল, রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইলের হবু ক্রেতা ভারত; যার একটার দামই আধা বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আরও কাহিনী হল – ভারত এটা কিনলে আমেরিকা ক্ষেপে গিয়ে ভারতের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ বহু ধরনের বাধা আরোপ করবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে আগেই জানানো হয়ে আছে, বাইডেন ক্ষমতা নিবার পরের মাসেও বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরে তা ভারতকে জানানো হয়ে আছে। তাই ভারত চেষ্টা-তালাশ করছে কোনো ছাড় পাওয়া যায় কি না। কিন্তু ইতোমধ্যেই উদাহরণ হল, একই পথে তুরস্কের বেলায় সে ব্যর্থ হয়ে আছে। এসব কারণে, রাশিয়ার আগ্রহ হল, ভারতকে কিনাতে পারলে তা আমেরিকার উপর একটা বড় চাপ তৈরি হবে।
তাই এসব মিলিয়ে অনুমান করা যায় রাশিয়ার হবু ক্রেতা ও আগে অন্য অনেক সমরাস্ত্রের এরই মধ্যে ভালো ক্রেতা এই ভারতের ‘মন রক্ষা’ করতে রাশিয়া সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র সাথে নিয়ে ভারতের সম্মেলনে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। তবে সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র – এদের দিক থেকে দেখলে তাদের নিজস্ব বড় স্বার্থও এটা যে, তারা তালেবানদের ভরসা করেই যেকোনো রেডিক্যাল ইসলাম থেকে সুরক্ষিত থাকতে চায়। এটি তাদের ভাইটাল স্বার্থ!
তা হলে ইরান কেন?
ইরান ভারতের সম্মেলনে কেন – এটাও এক মজার প্রশ্ন। তবে জবাবটা সহজেই এভাবে বলা যায় যে, সম্প্রতি আফগানিস্তানে শিয়া মসজিদে হামলা পরপর সম্ভবত তিনবার বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। আর প্রতিবারই দেড় শতাধিকের উপর লোক মারা গেছে। এটা শুধু শিয়া মসজিদে হামলা – এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থেকে দেখাভুল হবে, এটা তা না; এরা ছিল মূলত আফগানি হাজারা শিয়া এথনিক গোষ্ঠি – তাদের উপর হামলা।
ওরা শিয়া এই সেন্টিমেন্টের ওপর ভর করে এ হামলা করা ও তাতানো হয়েছে। কিন্তু এরা মূলত আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম এথনিক জনগোষ্ঠী। আমাদের মত দেশগুলোর ভূখণ্ডের সীমানা টেনেছে কলোনিয়াল শক্তিগুলো তাদের নিজের একান্ত স্বার্থে। আর এতে একই এথনিক জনগোষ্ঠী কাটা পড়ে সীমানা দুই দেশে বিভক্ত করা হয়ে গেছে। যেমন আমাদের বেলায় একই বাঙালি অথবা পাঞ্জাবি এথনিক জনগোষ্ঠী যেমন ভারতে থেকে গেছে; যাদের আরেক অংশ বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে আলাদা কাটা পরে আছে। তেমনি আফগান হাজারা জনগোষ্ঠী আরেক বড় অংশ আছে ইরানে। ফলে আফগানিস্তানের অংশ হামলায় বিপদগ্রস্ত হলে ইরানের বড় দুটো সমস্যা। স্বাভাবিকভাবে ইরানে সেন্টিমেন্ট তৈরি হয় হাজেরা আফগানদেরকে উদ্ধার ও রক্ষার। আবার আরেক বিপদ হলো, ইরান না চাইলেও তারা রিফুজি হিসেবে ইরানে ভিড় করে, করবেই – এটাই স্বাভাবিক। আর ইরান সেই দায় ঠেলে ফেলেও দিতে পারে না।
কাজেই তালেবানরা যদি হাজারা, এরা শিয়া (ওরা কম মুসলমান বা সহি মুসলমান না ইত্যাদি ধরনের যেসব এথনিক ঘৃণা আফগান পশতুন ডমিনেটেড সমাজে প্রচলিত আছে) এই ধর্মীয়-সামাজিক মনোভাবের আলোকে উপেক্ষায় আইএসের হাতে হামলায় মারা যেতে দেয়, নাগরিক নিরাপত্তা না দিতে পারে তা হলে গত আগস্টে তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইরান সরকারের যে সমর্থন ও ইতিবাচক মনোভাব তালেবানদের প্রতি বজায় আছে তা ইরান চাইলেও আর বজায় রাখতে পারবে না। যেমন আফগানিস্তানের প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ এখনো ইরান করছে; যেখানে এর অর্থ পরিশোধের কী ব্যবস্থা হবে, সেটা এখনো অনিশ্চিত, তা সত্বেও। কারণ, তালেবানদের হাতে কোন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ নাই, ব্যবস্থা নাই।
অতএব ইরানের ভারতের সম্মেলনে যোগ দেয়া বলতে গেলে তালেবানদের ওপর অপ্রকাশ্য অসন্তুষ্টির পরোক্ষ প্রকাশ বা বলা যায় তা প্রকাশ করার সুযোগ নেয়াঃ যেন তালেবানদেরকে বলা যে, তুমি আফগান হাজেরাদের উপর আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামিস্টদের যদি আফগানিস্তান থেকে দূরে রাখতে না পারো, তবে ইরানের তোমার বিপরীতে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।’
তাহলে এখন উলটা করে বলা যাকঃ এর মানে কি যারা আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামীদের থেকে মুক্ত এক আফগানিস্তান দেখতে চায়; তাদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? ভাবটার একটা আবছা শেড থাকলেও সেটা কখনও নয়, সত্যিকারভাবে নয়। যেমন আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপ – এই হলো অ্যালার্জি বা অগ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি যদি ধরি, তা হলে কি বলা যাবে এমন গ্রুপের বিরোধীদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? এটি বলা যাবে না। কেন?
কারণ বাইরে থেকে মনে হতে পারে, হিন্দুত্ববাদী ভারত নিশ্চয় এমন রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপদের বিরোধিতা পছন্দ করবে। কিন্তু না, করবে না। কেন? আর প্রমাণ কী?
ইদানীং পাকিস্তানের ইমরান খান কী নিয়ে পেরেশান সেটা লক্ষ্য করতে হবে। দুটা ইসলামী গ্রুপ নিয়ে তিনি পেরেশান – TTP (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) আর TLP (তেহরিক-ই-লাব্বায়েক পাকিস্তান)। আধা সশস্ত্র এরা আবার রাজধানীতে প্রকাশ্যে রেডিক্যাল মিছিল সমাবেশ করে থাকে। টিএলপির প্রধান আবার এখন গ্রেফতার হয়ে আছেন। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সমন জারি করে ডেকে অসন্তুষ্ট জানিয়েছেন। কারণ, ২০১৪ সালে পেশোয়ারের এক আর্মি স্কুলে টিটিপির অস্ত্রধারী জঙ্গিরা হামলা চালালে ১৩২ শিশুসহ মোট ১৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এরই বিচার এখনও চলছে। তাই আদালত প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সরাসরি আদালতে দেকে নিয়ে এসে ভর্ৎসনা করেছেন। তাই এবারের ইস্যুতে এদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী আভ্যন্তরীণভাবে অবস্থান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর ভিন্নমত হল তারা মনে করে এতে জীবন ও সম্পদ ক্ষয় হবে মাত্রাতিরিক্ত। তাই কৌশল হিসেবে এখনই সামরিক পদক্ষেপ বাতিল করা হয়েছে, আর সুযোগের অপেক্ষায়।
মজার কথা, এ খবর আরো বিস্তারিত ছাপা হয়েছে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা। আর যা খুবই কম ঘটে থাকে – আমাদের অবাক করে প্রথম আলো এসব খবর ছেপে দিয়েছে ডন-এর রেফারেন্সে, বিনা দ্বিধায়।
কিন্তু কেন ‘মজার খবর’ বলছি? ডন-এর খবরে লেখা হয়েছে, সশস্ত্র গ্রুপগুলো ভারতের সাথে সম্পর্কিত। প্রথম আলোর এই রিপোর্টের শিরোনাম টিএলপির সঙ্গে চুক্তি প্রকাশ হচ্ছে, শক্তি প্রয়োগ চেয়েছিলেন ইমরান, নারাজ সেনাবাহিনী। প্রথম আলো ডন-এর রিপোর্ট থেকে অনুবাদ করে লিখেছে, ”
প্রথম আলো লিখেছে“পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি”।
“পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি।’ এ ধরনের পাকিস্তান সরকারের পুরো মনোভাব ও পরিকল্পনাই ওই রিপোর্টে আছে। কিন্তু আমাদের এখানকার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, মোদি-অমিতের কাশ্মির বাঁচাতে তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তর অস্থিতিশীল করতে সশস্ত্র ইসলামী গ্রুপের ওপর নির্ভর করতেও রাজি; অর্থাৎ যে অভিযোগ আগে কেবল বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত অথবা একালে উইঘুর সশস্ত্র গোষ্ঠী (ETIM)-এর কথা উঠছে; এখন তা অনেক দূরে বিস্তৃত। এখানে উল্লেখ্য যে, হাজারাদের ওপর আইএসের যে তিন হামলা, তাতে সর্বশেষটাতে হামলাকারী হিসেবে ধৃত ব্যক্তি উইঘুর জনগোষ্ঠীর লোক। কেন এমন হচ্ছে? কারণ তালেবানরা এই ETIM গ্রুপকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেবে না বলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর থেকে এই উইঘুর গ্রুপ আইএস এর সাথে হাত মিলিয়ে যোগ দিয়েছে, তাই এ ঘটনা।
বিপরীতে পাকিস্তানের আয়োজিত সম্মেলন কী ও কাদের নিয়েঃ
এক কথায় জবাব, যদিও এ সম্মেলনের হোস্ট বা আয়োজক হল পাকিস্তান কিন্তু এটা আসলে ‘ট্রয়কা প্লাস’ [TROIKA+] -এর বৈঠক। [এনিয়ে আমার পুরান লেখা রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে] কোন ‘ট্রয়কা প্লাস’? গত ১৫ আগস্ট তালেবানরা ক্ষমতা নেয়ার আগে রাশিয়ার উদ্যোগে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীনকে এই শক্তিধর তিন দেশীয় গঠন করা হয়েছিল তালেবান-আফগান ইস্যুতে তাদের কমন অবস্থান প্রকাশের জোট, সেটাই ট্রয়কা বা ত্রিদেশীয় জোট। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তালেবানদেরকে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের অধীনে আসতে সাহায্য করা যাতে তারা নয়া আফগানিস্তানকে নিয়ে গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে সহজেই প্রবেশ করতে পারে।
আসলে নিরাপত্তা পরিষদের আফগান ইস্যুতে পাস হওয়া এক সর্বসম্মত প্রস্তাবকে তাদের গঠনভিত্তি হিসেবে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। পরে পাকিস্তানকে ওই ট্রয়কাতে কোঅপ্ট করে নেয়া হয়; কারণ আফগানিস্তানে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে পাকিস্তানের মাধ্যমে তা করা অর্থপূর্ণ ও সহজ। অন্তত দুটো কারণে – এক. পাকিস্তান এই প্রথম ২০ বছরের আমেরিকার স্বার্থের যুদ্ধের দায় থেকে মুক্ত হয়েছে। তারপরও এখনো আফগানিস্তানে যেকোন অস্থিতিশীলতা ঘটলে তাতে সবচেয়ে বেশি পুরনো দায় ফিরে আসবে পাকিস্তানের উপর, নিজে সেই অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত হবে ও সামরিক-অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হবে পাকিস্তানের। তাই পাকিস্তান না চাইলেও ‘স্থিতিশীল এক আফগান দেখার পক্ষে অবস্থান’ সে নিতে বাধ্য। দুই. আফগানিস্তান কিন্তু এক ল্যান্ডলকড ভূখণ্ড। ফলে পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম একটি তাল মিলিয়ে চলতে আফগানিস্তানও বাধ্য। এবং বাইরের কোন রাষ্ট্রও আফগানিস্তানে কিছু করতে চাইলে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে করলে তা বাস্তবায়ন সহজ ও সম্ভবত সম্ভব।
অতএব পাকিস্তানকে গ্রুপে নেয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতে ভারতের জন্য তা এটা ততোধিক বিব্রতকর হয়ে যায়; কারণ এতে ভারতের অভ্যন্তরীণ পাবলিকের কাছে হিন্দুত্ববাদীরা যে প্রপাগান্ডা চালাত এই বলে যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ লালনকারী, তা এখানে উল্টে যায়। কারণ, এখানে পাকিস্তান হইয়ে যায় বাস্তবত – জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সন্ত্রাসবিরোধী সবচেয়ে নির্ভরশীল মিত্র, বিশেষ করে এখনকার সময়ের সবচেয়ে শক্তিধর তিন দেশ ও তাদের জোটের নির্ভরশীল মিত্র।
এবার সবচেয়ে কঠিন সত্যটা আগে বলে রাখি। তা হলো আফগানিস্তানে তালেবানরা ফেল করলে এর বিকল্প বা অন্য শক্তিটা হল এককথায় আইএস। মূলত আইএস আর সাথে ওর সমমনা আরো ছোট ছোট নানা, মূলত ‘পড়শিদেশীয়’ গ্রুপ। সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর বাস্তবতা হল, যেকোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তি তো বটেই, এমনকি এশিয়া অমুসলিম রাষ্ট্রগুলো তো বটেই, এদের কেউই বা অন্য ইসলামী ধারা কেউই আইএসের সাথে পাশাপাশি পরস্পরকে স্বীকার করে টিকতে বা চলতে পারবে না, তা আইএস তো বটেই কেউই মনে করে না। অর্থাৎ একা আইএস-এর রাজত্ব কায়েম হব। ফলে তালেবানরা ফেল করার মানে সবার কাছেই পরিষ্কার।
তাই তালেবানকেন্দ্রিক এখনকার বাস্তবতা হল, সংশ্লিষ্ট অন্য দেশের এক কমন আকাঙ্ক্ষা যে, তালেবানরা ফেল করা নয় বা আইএস আসা একেবারেই নয়। তাই তালেবানদের ফেল করতে দেয়া যাবে না। এতে সবার ক্ষতি। কিন্তু জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে, তার ভিত্তিতে তালেবানরা আফগানিস্তান শাসক হিসেবে নিজেদের গড়ে নিক। আর সেই আফগানিস্তান যেন পড়শি যেকোনো দেশে সশস্ত্র হামলাকারী কোনো গোষ্ঠীকে আশ্রয়দানকারী ভূখণ্ড না হয়, এটি নিশ্চিত করতে হবে।
এটি বাস্তবায়নে তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
অনেকে মনে করেন, তালেবানরা ভাবছে যেহেতু আফগানিস্তান যেন রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা আক্রমণকারীদের আশ্রয়ভূমি না হয় এটা নিশ্চিত করা প্রায় সারা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রস্বার্থ। কাজেই তালেবানরা রাজনৈতিকভাবে কেমন শক্তি (আরেকটি আইএস কি না বা রাজতন্ত্র যেমন এক সালতানাত বা আমিরের দেশ কি না) তা দেখাদেখি ট্রয়কাকে বিবেচনা বন্ধ করতে হবে বা ছাড় দিতে হবে।
অথবা আফগানিস্তানেও দুর্ভিক্ষ লেগে যেতে পারে এই ভয়ে ট্রয়কাসহ সবাই তালেবানরা যেমন আছে এভাবেই মেনে নিতে বাধ্য হতে হবে।
তালেবানদের নিজের সম্পর্কে এই অতি-অনুমান যে তারাই হলো দুনিয়াকে স্থিতিশীল রাখার একমাত্র শক্তি – এটিই তালেবানদের সব কিছুকে স্থবির করে রেখেছে।
ট্রয়কা উদ্যোগ ফেল করলে এর প্রথম শিকার হয়ে যাবে আফগানিস্তানের খাদ্যসঙ্কটে থাকা ৫৫ শতাংশ জনগণ।
দ্বিতীয় সত্য হল, ট্রয়কার তালেবানের সাথে কোনো ছাড় দেয়া যদি ঘটেও সেই তালেবান শক্তির শাসনও ফেল করবেই। ফলাফল হবে আইএস ও সমমনাদের উত্থান। সেই আফগানিস্তান হবে আফ্রিকার সোমালিয়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো ভূখণ্ড। সারা দুনিয়ার জন্য এক নো গো [no go] এরিয়া!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা গত ১৩ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “আফগানিস্তান : ভারত ও পাকিস্তানের উদ্যোগ“– এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন-সহ আমাদের হাসিনা সরকারের নিশীথ ভোট বিষয়ক সমস্যা আছে সবাই জানি। এছাড়া এমনই আরো অনেক সমস্যা ছাড়াও এর উপর এসে পড়েছে লাভে টিকা কিনতে গিয়ে ঠগের পাল্লায় পড়ে পাবলিকের সামনে সরকারের ইজ্জত খোয়ানো! ভারতের টিকা নিলে নাকি রথ দেখা কলা বেচা দুটাই হবে, ঠগের দেখানো নগদ এমন লাভের লোভে পড়ে এখানে সরকারের চরম বেইজ্জতি অবস্থায় পড়েছিল।
মূল বেইজ্জতিটা অবশ্য ছিল এই যে, এরপর সরকারের হাতে কোন ব্রান্ডেরই কোন টিকা নাই, কোন উতপাদনকারি-দাতা নাই। যদিও ক্ষুন্ধ চীন আছে কিন্তু ‘সরি’ বলে তার গালমন্দ শুনে হলেও রাগ ভাঙাতে পারতে হবে! এককথায় কোন ভায়াবল সোর্সই নাই, ছিল না দুনিয়াতে যে নতুন করে সরকারের টিকা সরবরাহকারি হতে পারে। তাও যখন আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে গেছে। বিরাট গল্পে গগন ফাটিয়ে দেয়া ভারত গ্লোবালি সবাইকে টিকা দিবে, টিকা কূটনীতি করবে – কিন্তু শেষে গোমুত্র এর উপর ভরসাকারি ভারত হয়ে গেল সে।
এই ভন্ড ভারত, দেখা গেল আমাদেরকে দূরে থাক, শুধু ভারতের সব পাবলিক সবার জন্য টিকা উতপাদনেরই অযোগ্য। কারণ তার কারখানার সেই উতপাদন ক্যাপাসিটিই শুরু থেকেই নাই ছিল না। অথচ সবাই মোদীর চাপাবাজিতে বিশ্বাস করেছিল। সেরাম কোম্পানির মূল ও মোট উতপাদন ক্যাপাসিটি কত তা কেউ চেক করে নাই। ফলে তারা আগাম বাংলাদেশের টাকা নিয়ে নিজ কারখানার উতপাদন ক্যাপাসিটি বাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু আমাদেরকে টিকাও দেয় নাই, আমাদের টিকা নিজেরা ব্যবহার করেছে। আবার টাকাও ফেরত দেয় নি। আমাদের সরকার কমপ্লিট প্রতারিত অবস্থায়!
বলা যায়, হাসিনাকে গত ১৪ বছরে বহুবার চীনের সাথে নানান ইস্যুতে ডিল করতে হয়েছে, করতে পেরেছেন কিন্তু কখনও এত নিচা নামতে হয় নাই। নিচে ঝুকে কথা বলতে হয় নাই। এবার হয়েছে। কারণ বাস্তবত দুনিয়াতে বাংলাদেশের জন্য চীনই একমাত্র সমাধানদাতা অবশিষ্ট ছিল । চীন নিশ্চিত করেছে আমাদের টিকার প্রাপ্যতা ও সাথে বিনিয়োগ, টেকনিক্যালিটি ইত্যাদি যা যা লাগে সব যোগাড় করে দিবে। মনে হচ্ছে হাসিনার ইজ্জত চীন রক্ষা করে দিতে যাচ্ছে। হাসিনার কাছে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কী!
তবু সর্বশেষ, ঘটনার শেষের দিক থেকে বলা শুরু করলে বলতে হয়, কয়েক ঘন্টা আগে সাংবাদিক সম্মেলনে মোমেন বাংলাদেশের মিডিয়া্র কূটনীতিক জগতকে একটা ভাল শিক্ষা দিয়েছে। একেবারে তুলে আছাড় মেরে দিয়েছেন। কারণ কেউ কোন দেশ কোনদিনই বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দিতে অফার করে নাই। কোয়াড নিজেই যে ম্যাচুরিটিতেই এখনও যায় নাই, তাই। এই কঠিন সত্যির খবর না নিয়েই আমরা ……।
অতএব এসব কথিত সাংবাদিক-কূল তার সামনে কতটা নাদান তাই তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। হয়ত এই শিক্ষা তাদের জন্য পাওনা ছিল। এটা ইতিবাচক হবে। এখন তিনি যদি দয়া করে একটা ইস্কুল খুলেন আর মিডিয়ার সম্পাদকেরা যদি তাদের কথিত কূটনীতিক কর্মিদের সেখানে পড়তে পাঠান তাহলে মনে হয় আমরা সবাই একটা রাস্তা খুজে পাব! পেতেও পারি!
খুব অল্প কথায় বললে, প্রথম আলো ও তার রিপোর্টার প্রথম থেকেই দাবি করেছিল, “যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ভারতসহ চারটি দেশের কৌশলগত অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সংলাপ বা কোয়াড নিয়ে চীন তার উদ্বেগের কথা” – এটাই নাকি বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন জানাতে এসেছিল। চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ২৭ এপ্রিলে বাংলাদেশে কয়েক ঘন্টার সফরে নাকি তাই ঘটেছিল।
যদিও প্রথম আলোর ঐ রিপোর্ট পড়ে মনে হয় নাই যে “কোয়াড কী” সে সম্পর্কে রিপোর্টার জানেন বা খবর রাখেন।
যেমন ধরেন, ১। কোয়াড নিজেই কী এতটুকু সংগঠিত যার অন্তত একটা নিজস্ব ফাংশনাল সেক্রেটারিয়েট আছে?.জবাব হল – এটা অতদুরে সংগঠিত পারে নাই এখনও। কেবল বাইডেন আসার পর এই প্রথমবার কোয়াড এক যৌথ বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়েছিল। অথচ কোয়াডের জন্ম নাকি ২০০৭ সালে, কেউ বলে এরও আগে।
২। কোয়াড কী সামরিক জোট না বাণিজ্যিক না স্টাটেজিক – না কি সবকিছু? এই ব্যাপারটা কী চাররাষ্ট্রের মধ্যে সেটেল্ড? তারা নিজেরা কথা শেষ করতে পেরেছেন নিজেদের মধ্যে? না, বরং এটা একেবারেই অনালোচিত। ফলে একটা সিদ্ধান্তে আসা দূর কা বাত। আর এটা সামরিক জোট হতে চাইলে ভারত সম্ভবত সবার আগে বের হয়ে যাবে, সেই সম্ভাবনা আছে।
৩। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোয়াড রাষ্ট্রগুলো কী নিশ্চিত তারা এই জোটকে বাড়াবে, মানে পঞ্চম কোন রাষ্ট্রকে ভিতরে নিবে? জবাব হল, তারা নিজেরা চারজনই যেখানে নড়বড়ে কে কতটুর থাকে ঠিক নাই, আবার কোয়াড নিজেই অস্পষ্ট যে সে কতদুর যেতে চায় সেখানে পঞ্চম রাষ্ট্রের যোগদান নিয়ে আলাপ কোথা থেকে হবে? এমন কথা বলার মানে এরা তো মফস্বলি সাংবাদিক হওয়ারও যোগ্য না।
তাহলে একেবারেই কী বাংলাদেশকে কেউ কোয়াড নিয়ে অফারই করে নাই? হা ঠিক তাই। মোমেন শতভাগ ঠিক বলছেন। “যে প্রতিষ্ঠানের (কোয়াড) কথা বলেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের লোকজন আমাদের কাছে এখনও অ্যাপ্রোচই করে নাই”। তাহলে?
কোয়াড নাকি ইন্দো-প্যসেফিকঃ
এমনিতেই ইন্দো-প্যসেফিক নিয়ে জোট বা আরেক উদ্যোগ যেটা আছে ওর সাথে আবার এই কোয়াডের সম্পর্ক কী তা স্পষ্ট নয়। এখনও পরিস্কার করে নাই তারা কেউ। আর গত বছর ট্রাম্পের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্তিফান বিগান অক্টোবরে যে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তখন ইন্দো-প্যসেফিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার জন্য অফার করতে পারে বলে কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু বিগান ঢাকার পৌছানোর আগের দুদিন ধরে মন্ত্রী মোমেন মিডিয়ায় যে কামান দেগেছিলেন সেটা থেকে সবকিছু আমাদের বুঝতে পেরে যাওয়া উচিত। তিনি আমেরিকাকে উদ্দেশ্য করে মিডিয়ায় বলেছিলেন – (অ্যামেরিকার স্তিফান এসে অফার দিলেও) আমরা কোন সামরিক জোটে যেতে পারব না, অস্ত্র কিনতে পারব না। কেবল অবকাঠামো খাতে যদি ঋণ দিবার মুরোদ থাকে (যা অ্যামেরিকার নাই) তাহলে কিছু আলাপ হতে পারে। এই ছিল তার সার কথা। আমার পুরান লেখায় দেখতে পারেন। এভাবে সরাসরি আর ফ্লাট এক অবস্থান আর প্রকাশ্যে তা মুখের উপর টাঙিয়ে রেখেছিলেন তিনি।
তাহলে কী অ্যামেরিকার সাথে “ব্যাপারস্যাপার” বলে বাংলাদেশের কী কিছুই ছিল না, নাই? হা, অবশ্যই আছে। মূল কথায় তা হল, বাস্তবতা হল গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হিসাবে আমেরিকা হেরে যাচ্ছে চীন উঠে আসছে। এই পটভুমিতে আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্বে কোন কোন রাষ্ট্র চীনকে ফেলে আমেরিকার পক্ষে যাবে এরই একটা ভাসা ভাসা জোটের ধারণা অবশ্যই আছে। ভাসা ভাসা বলছি এজন্য যে জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত এই তিন রাষ্ট্রই এখনও চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের ইস্যুতে চীনকে একেবারেই ত্যাগ করে ফেলে আসতে রাজী তা একেবারেই না। তারা কেউ সিদ্ধান্ত নেয় নাই, নেওয়াটা বাস্তবেও খুবই কঠিন। বরং বলা যায় “অ্যামেরিকার দিকে চললাম” এমন সম্ভাবনার কথা ঝুলিয়ে রেখে এটাকে প্রচ্চন্ন হুমকির মত ব্যবহার করে তারা চীনের বিরুদ্ধে অ্যামেরিকার দিকে বা ভাইসভারসা উলটা আমেরিকার থেকে আরো বাণিজ্য বা অন্য-সুবিধা আদায়ের পক্ষপাতি। এবং তা পেলে একেবারেই অ্যামেরিকাকে হাত ছেড়ে চীনের সাথেও জুড়তে পারে। সে সম্ভাবনাও বাদ দেয়া যায় না।
আবার কোয়াড সামরিক জোটে রূপ নিতে গেলে সবার আগে ভারত বের হয়ে যাবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে এখন আমেরিকা, চীন আর ভারত তিনপক্ষ যার যার নিজের অবস্থানের পক্ষে একা দাড়ানোর দিকে পরিস্থিতি যাচ্ছে। মূল কারণ আমেরিকান সেভেন্থ ফ্লিট বঙ্গোপসাগরে মোতায়েনের ইচ্ছা। তাহলে ইন্দো-প্যসেফিক বা কোয়াড – কিসের কী? তা আর থাকে বা টিকে থাকে কোথায়?
এছাড়া আরো কিছু মুখ্য তথ্য হল, শেখ হাসিনার অবস্থান তো লুকানো নয়। ২০১২ সালের পর থেকে হাসিনা আর কখনও অ্যামেরিকার প্রশাসনের সাথে কোন ডিল বা বিশেষ সম্পর্কে যান নাই এবং সম্ভবত কখনও যাবেন না। কারণ তিনি তাদের উপর আস্থা রাখেন না, বিশ্বাসভঙ্গকারি মনে করেন। তবে অবশ্যই হাসিনা এসব কথা লিখে উচ্চারণ করে বলেন নাই, কাজে বুঝিয়েছেন। যেমন স্তিফান বিগানের সফরে!
এখন উপরে ধারাবাহিকভাবে যেসব খবরের কিছু লিখলাম সেসব খবরগুলো যিনি রাখেন নাই, যা লুকানোও নয়, – এখন আপনারাই বলেন তার কী কূটনীতিক পাড়ায় থাকা উচিত। এককথায় বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দিবার প্রসঙ্গই যেখানে নাই, আতাপাতাও নাই সেখানে প্রথম আলোর চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বরাতে এতসব দাবি করার অর্থ কী? যদিও আপনারা বাংলাদেশ, আমেরিকা-ভারতের দিকে চলে যায়েন না – টাইপের আবছা কথাবার্তা তো হতেই পারে। যদিও মনে হয় না, তা আনুষ্ঠানিক কিছু হবে না। কারণ মূলকথা এর কিছুই এখনও ম্যাচুইরিটি পায় নাই।
তাহলে চীনা রাষ্ট্রদুত কোয়াড নিয়ে এত কড়া কথা বললেন কেন?
বলেছেন এজন্য যে পড়ে পাওয়া সুযোগ দেখেছেন, তাই। আর তার তা এবার তুলে নিলে চীনের লাভ দেখেছেন, তাই।
যেমন আমাদের সাংবাদিকেরাই নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ নাকি কোয়াডে ঢুকার অফার-দাওয়াত পেয়েছে। এটা ধরে নিয়ে তারা সব কথা বলে গেছেন। যদিও বাস্তবত আসলে এটা যদি টাইপের কথা। কথাটা বায়োবীয় হয়, মানে যদির কথা নদির পাড়ের হয় তাহলে এই সুযোগে দুটা কথা বলার সুযোগ চিনা রাষ্ট্রদুত দেখবেন তো নিবেনই না কেন! যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত বলল ধরেন, দেখেন টিকা নিয়ে ভারত আপনাদের প্রতারিত করেছে। কাজেই আপনারা বাংলাদেশ কিন্তু, আমেরিকা-ভারতের দিকে যায়েন না – এটাইপের আবছা কথাটা যদি তিনি এই সুযোগে স্পষ্ট করে বেটার বলতে পারেন যে – কোয়াডে যোগ দিলে বাংলাদেশের সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে (কথাটা সত্যিও বটে); তো রাষ্ট্রদুত সেসুযোগ নিবেন না কেন? কারণ, মনে রাখবেন চীনা রাষ্টদুত নিশ্চিত করছেন না যে আমরা কোয়াদে ঢুবার অফার পেয়েছি কী না। এটা নিশ্চভিত করছি আমাদের সাংবাদিকেরা……; রাইট! কাজেই এতে রাষ্ট্রদুতের দায় কী?
এককথায় বোকা সাংবাদিকেরা অজান্তে চীনা রাষ্টদুতকে সুবিধা করে দিয়েছেন আর তিনি তা নিয়েছেন!
আবার সাংবাদিকেরা যদি মনে করেন চীনা রাষ্ট্রদুতের মুখ থেকে এইকথা বের করে দিয়ে অ্যামেরিকার কোন বিশাল লাভ করে দিয়েছেন তারা তাহলে সেটাও ভিত্তিহীন ধারণা। কারণ আমেরিকানদের এসব কথা অজানা থাকার কোন কারণ নাই!
ARTICLE 356, The Colonial Legacy & the deep Love to Colonial Power of NEHRU &…
রিভিউ বা ফিরে দেখা মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। জওহরলাল নেহেরু কেবল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ১৯৪৭ সালের আগষ্টে স্বাধীন দুই রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তানের জন্মের সময়ের রাজনীতির এক মুখ্য চরিত্র। ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক থেকে বহু ঘটনার নির্ধারক নির্ণায়ক ছিলেন তিনি। আমাদের রাজনীতির বহুকিছুর হাল ‘এমন বা ওমন’ কেন এর জবাব পেতে আমাদেরকে বারবার সেসব পুরান দিনের ঘটনা রিভিউ বা ফিরে দেখায় যেতে হয়। সেকাজে বলাই বাহুল্য নেহেরু এক বড় চরিত্র হয়ে হাজির থাকে।
সেখানে বহুবার আমরা দেখেছি, নেহেরুর চিন্তায় “গণপ্রজাতন্ত্রী” রাষ্ট্র ও ক্ষমতা এই ধারণাটা যতটা না ‘মর্ডান রিপাবলিক’ প্রসুত তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেকে কলোনিয়াল মাস্টার মনে করা প্রসুত। বারবার তিনি উপনিবেশ বা কলোনিয়াল সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ধারণা দিয়ে আপ্লুত হয়ে থেকেছেন, তা দেখতে পাই। যেমন নেপাল বা ভুটানের সাথে, ১৯৪৭ সালের পরবর্তি স্বাধীন ভারতের তথাকথিত ‘শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তির’ ধারাগুলোতে আমরা তা দেখতে পাই। অথচ ভারত তখন ইতোমধ্যেই এক স্বাধীন রিপাবলিক হওয়া সত্বেও নেপাল বা ভুটানের ভারতের সাথে চুক্তিতে নেহেরু একাজ পুরাটাই করেছেন আগের কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার সাথে নেপাল বা ভুটানের যে চুক্তি ছিল ওর ধারাগুলোই কপি করে; যেন স্বাধীন ভারত পুরান বৃটিশের জায়গায় এক নতুন “কলোনিয়াল পাওয়ার” হয়ে হাজির। অর্থাৎ কলোনি-শাসনমুক্ত হয়ে যাবার পরেও স্বাধীন “গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তখনও নিজেকে বৃটিশ জুতা পায়ে গলানো এক “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবছেন। একালের ভারত বিশেষ করে চলতি মোদীকে ব্যাখ্যা করতে পারতে হলে, নেহেরুকেও বুঝতে হবে। আর তাতে সক্ষম হতে গেলে নেহেরুর এই বিশেষ বৈশিষ্ট পাঠ করতে পারতে হবে। আগা-পাছ-তলা এই নেহেরু আসলে কলোনিয়াল ধরণের সম্পর্ক ও ক্ষমতা প্রতি প্রবল লোভ এবং চিন্তার ঝোঁকের এক নেহেরু; তাতে তিনি এটা “গণপ্রজাতন্ত্রী” ভারত গড়তেছেন বলে যত চিল্লাই দিয়ে থাকেন না কেন!
ভারত রাষ্ট্রগঠন বা ওর কনষ্টিটিউশন রচনাকালে, ওর বিভিন্ন আর্টিকেল বা ধারায় – নেহেরু এবং তাঁর চিন্তার বন্ধুদের নিজেদেরকে এমন “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবনা-চিন্তার ছাপ অনেক স্তরেই পাওয়া যাবে। তেমনই গভীর ছাপ ফেলা এক বিতর্কিত আর্টিকেল হল ৩৫৬; যা কোন নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ভেঙ্গে দিয়ে ঐ রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ক্ষমতা সংক্রান্ত।
গত মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। প্রথম কথা হল, হ্যাঁ বিপদে তো তিনি আছেনই; তার কপালে শনি লেগেছে – লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ যেদিন হয়েছে সে দিন থেকেই। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৫৬ হল অদ্ভুত এক আর্টিকেল, এটাই আপাতত মমতার সেই “শনির বিপদের” নাম। এটা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়ে মোদির কেন্দ্রীয় সরকার ছলে-বলে-কৌশলে চাইলে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। কনস্টিটিউশন অনুসারে এটাই “রাষ্ট্রপতির শাসন”।
ভারতে রাজ্য মানে, সেখানেও নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ ও সরকার আছে। যারা স্বতন্ত্র টাক্স আরোপ করতে পারে এবং কনষ্টিটিউশনে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া যেসব বিষয় আছে ওর তদারকি করা ও যেসব সার্ভিস জনগণকে দেয়ার আছে , আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ইতাদি এসবই তার কাজের এক্তিয়ার। এছাড়া শহুরে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা মিউনিসিপাল্টি ব্যবস্থাও আছে। এখন প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের কোন অভিযোগ থাকলে এর প্রতিকার পেতে প্রত্যেক রাজ্যেই সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে হাইকোর্ট – সেখানে কেউ নালিশ দিতে পারে। এছাড়া মিছিল মিটিং প্রতিবাদ দিয়ে প্রতিকার দাবি সে তো আছেই। আরও সর্বোচ্চ তবে পরোক্ষ এক পদক্ষেপ হল, নিয়মিত বিরতিতে পরের নির্বাচনে প্রার্থী বা তার দলকে ভোট না দিয়ে শাস্তি দেয়া – সে সুযোগ তো আছে।
কিন্তু এসব সত্বেও আর্টিকেল ৩৫৬ তে রাষ্ট্রপতিকে রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েমের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।এখানে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির এই ভুমিকা কার্যত ব্যবহার ও প্রয়োগ হবে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার মাধ্যমে। যদিও রাষ্ট্রপতির নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ হবে তার প্রতিনিধি রাজ্যপালের মাধ্যমে কিন্তু তা আবার কাজ করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে। তাই সোজা সাপ্টা বললে, এটা রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে এর উপর কেন্দ্রীয় সরকারের দখল নেয়া।
তবে এই আর্টিকেলে এখন কিছু সংশোধনী আনার পর, ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় সংসদে অনুমোদন করিয়ে আনতে হয়। অর্থাৎ এই আর্টিকেল অনুসারে মোদীর সরকার মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দিতে পারে। আর এখন কেন্দ্রীয় সংসদে মোদীর নিজ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এই চর্চা ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের, নেহরুর আমল থেকেই এভাবে চলে আসছে। দেখা গিয়েছে যখনই মোদী-মমতার মত রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার একই দলের থাকে না, তখনই এই অসুস্থ চর্চা শুরু হতে দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে ভারতে কনষ্টিটিউশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত মোট ১১৫ বার এভাবে এই আইন প্রয়োগ করে নানান রাজ্যে সরকার ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ১৯৭৫-৭৯ সালের মধ্যে ২১ বার, আর ১৯৮০-৮৭ সালের মধ্যে ১৮ বার। এর বেশির ভাগটাই নেহেরু বা কংগ্রেস ব্যবহার করেছে। যেটা এখন করছে বিজেপির মোদী।
একবার ক্ষমতা নিলে পরে এটা ছয়মাস করে করে বাড়িয়ে তিন বছর পর্যন্ত রাখা যায়। যদিও পাঞ্জাবে এরচেয়েও বেশি বছর প্রয়োগের “বিশেষ” উদাহরণ আছে। এতে কেন্দ্রের সরকারি দলের আসল সুবিধাটা হল, একবার বিরোধী রাজ্য সরকার ও প্রাদেশিক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল রাজ্যে নিজস্ব এক অনির্বাচিত সরকার কায়েম করে নিতে পারে। আর পরবর্তিতে ঐ তিনবছর সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে্র রাজনৈতিক দল নিজ ‘সুবিধাজনক’ সময়ে – মানে রাজ্যে যখন নির্বাচন দিলে নিজে জিতে আসবে বলে আস্থা পায় – তখন নির্বাচন করিয়ে নিজ দলের রাজ্যসরকার কায়েমের সবচেয়ে সহজ উপায় হয় এটা। তাই, সদ্য লোকসভা নির্বাচন শেষে ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০ মে সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অজুহাত তৈরি করছে বিজেপি!”।
কিন্তু ভারতের কনস্টিটিউশনে কেন এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, এর পক্ষে যুক্তি কী? যেখানে আমেরিকায় এর কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কোন একটায় ক্ষমতা দখল করেছেন, এটা কেউ কল্পনাও করে না। কিন্তু ভারতে ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ জারি খুব কমন অভ্যাস বা চর্চা। এককথায় বললে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ একটা ব্যাপক ‘অপব্যবহারযোগ্য’ এক দাগী-ক্ষমতা।
প্রথমত এই আর্টিকেল-৩৫৬ ভারতের কনস্টিটিউশনে এল কীভাবে? গত ২০০১ সালে আর্টিকেল-৩৫৬ নিয়ে – বিচারক ও একাদেমিকদের সমন্বয়ে এক ‘রিভিউ কমিশন’ বসেছিল। ঐ স্টাডির শেষে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আদৌও আর্টিকেল-৩৫৬ একটা মর্ডান রিপাবলিকের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ পুর্ণ কী না, ফলে ভারতের কনষ্টিটিউশনে এই আর্টিকেল থাকতে পারে না – অতএব বাতিলের সুপারিশ – এসব প্রশ্নের দিকে তারা যান নাই। [আইন পেশায় একাদেমিক আগ্রহ যাদের তারা এই রিভিউ রিপোর্ট এখানে পেতে পারেন।] তবে ঐ রিভিউ রিপোর্টে এক জব্বর স্বীকারোক্তি আছে – এই আর্টিকেল-৩৫৬ কেন, কীভাবে এসেছিল সেই জন্ম ইতিহাস প্রসঙ্গে।
সোজা কথাটা হল বৃটিশ-ভারতে বৃটিশেরা ভারতের ঠিক নাগরিক নয় বরং ছিল এক “কলোনি দখলদার শক্তি”। আর কিভাবে বৃটিশ-ভারতকে তারা শাসন করা হবে এনিয়ে ই্ংল্যান্ডের বৃটিশ সরকার অধ্যদেশ জারি করত – সাধারণভাবে এটা “ভারত শাসন আইন [Govt of India Act] নামে পরিচিত, যা বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এটার প্রথম ভাষ্য শুরু হয়েছিল “Govt of India Act 1858” দিয়ে। আর অনেকবার সংশোধিত হবার পর শেষেরটা সম্ভবত “Govt of India Act 1935″। এই শেষের (১৯৩৫ সালের) সংশোধনীতেই তারা প্রথম ভারতীয় নেটিভ নিজেরা বড়জোর নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার গড়তে পারবে, এই অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তব কথাটা হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন ভারত-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এর পটভুমিতে দাঁড়িয়ে দেখলে Govt of India Act মূলত এক দাগী কালো আইন। কারণ এই আইন দিয়ে বৃটিশেরা বৃটিশ-ইন্ডিয়া চালালেও, এই শাসকেরা আসলে তো “কলোনি দখলদার শক্তি”। ফলে অবৈধ। ভারতের নাগরিকেরা তাদেরকে শাসন ক্ষমতার কোন অনুমতি দেয় নাই। ক্ষমতা বৃটিশেরা জবরদস্তিতে নিয়েছে। তাই এই ক্ষমতা অবৈধ।
এখন, এই অবৈধ ক্ষমতা জানত যে সে অবৈধ, বাপ-মায়ের ঠিকানা নাই, ভারতীয় নাগরিকেরা কখনও তাকে শাসন ক্ষমতা দেয় নাই। তাই ১৯৩৫ সালের সংশোধনিতে কেবল তিন প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগগুলোতে, তাই সেই সুত্রে প্রথম বাংলা প্রেসিডেন্সিতে, ভোটে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাদেশিক পর্যায়ে এভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে দিয়ে বৃটিশ শাসকেরা না কোন বিপদে পড়ে এই ভয়ও তাদের মনে উদয় হয়েছিল। কারণ, এই সরকার প্রাদেশিক হলেও কখনও যদি কলোনি দখলদার শক্তি খোদ বৃটিশ কর্তৃত্বকে মানতে অস্বীকার করে বসে – তাহলে কী হবে? অতএব সম্ভাব্য সেটা ঠেকাতে, নিজেরা আশঙ্কা মুক্ত হতে বৃটিশ ভাইসরয়-এর হাতে এক নতুন আইনি ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার নির্বাচিত হলেও তিনি যেকোন সময় নির্বাচিত ঐ সরকার ভেঙ্গে দিতে পারবেন। Govt of India Act 1935 এর আইনে এটাই ৯৩ ধারা।
শুরুতে বলেছি নেহেরু আর তার বন্ধুরা কলোনিয়াল “দাগী ক্ষমতা” খুবই পছন্দ করত, বৃটিশেরা কলোনি ত্যাগ করে চলে গেলেও এরা নিজেদের “ভাইসরয়” ভাবতে চাইত। তাই তাঁরা Govt of India Act 1935 এই আইনের ৯৩ ধারাটাকে ভারতের নতুন কনষ্টিটিউশনে কপি করে তুলে এনে ঢুকিয়ে ফেলেছিল। এটাই নতুন নামে, আর্টিকেল ৩৫৬। আমাদেরকে পরিস্কার থাকতে হবে আগের ৯৩ ধারা ছিল কলোনি দখলদার শক্তির পক্ষে শাসিত নেটিভেরা যেন স্বাধীন হয়ে যায় তা ঠেকানোর জন্য তাদের উপর বৃটিশদের অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন। অথচ ১৯৪৯ সালের ভারত সে তো তখন স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্র। তাই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক কোন কলোনি দখলদার শক্তির, ক্ষমতা-সম্পর্ক আর নয়। কিন্তু তবু আমাদের নেহেরু ও অম্বেদকারের মত তাঁর বন্ধুদের কলোনিক্ষমতার প্রতি প্রীতিভালবাদা ও লোভ এতই তীব্র যে পুরানা অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন স্বাধীন ভারত রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে ঢুকিয়ে রেখেছেন অবলীলায়। ঐ রিভিউ রিপোর্টে তাই সোজা স্বীকার ও ছোটখাট কিছু বর্ণনা দিয়ে লিখেছে, “Article 356 is inspired by sections 93 of the Government of India Act, 1935। অর্থাত এর সোজাসাপ্টা মানে দাঁড়াল, নেহেরু ও অম্বেদকারেরা কলোনি শাসন ক্ষমতার অনুরাগী ছিলেন। ভারতীয় নাগরিকদের সাথে তাঁরা নিজেদের সম্পর্ককে তারা তাহলে নিজেরা “কলোনি দখলদার শক্তি” ভেবে নিয়েছিলেন। তাই একটা “কলোনি শাসিত রাষ্ট্র” আর একটা “স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র” এদুইয়ের কোন ফারাক তারা দেখতে পান নাই, ফারাক করেন নাই। স্বাধীন রিপাবলিক ভারতে অবলীলায় আর্টিকেল ৩৫৬ ঢুকিয়ে রেখেছেন। যে আর্টিকেল কেন্দ্রীয় সরকার যেকোন রাজ্য সরকারকে উলটে দিতে পারে এই “উপনিবেশী ক্ষমতা” জারি রেখেছে।
এখানে মজার দিক হল, রাষ্ট্রপতি কী অজুহাতে রাজ্য সরকার ভাঙতে পারবেন – সেই ভাষাটাই দখলদারের ভাষা। এর সাধারণ লক্ষণ হল, এই ক্ষমতা প্রয়োগের অজুহাতের কথাগুলো দেখা যাবে অস্পষ্ট, আবছা রেখে দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন আর্টিকেল-৩৫৬ তে বলা হয়েছে, রাজ্যে “সরকার চালাতে পারেনি” বা “সরকার কনষ্টিটিউশন অনুসারে পরিচালিত হয়নি” বলে রাষ্ট্রপতির মনে হলেই হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কী দেখতে পেলে রাষ্ট্রপতি এমন মনে করবেন তা উহ্য রেখে দেখা হয়েছে। এভাবে ‘আবছা’ রেখে দেয়াতেই ইচ্ছামতো রাষ্ট্রপতির (কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের) পদক্ষেপকে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়া থাকছে। বলা হয়ে থাকে নেহরু রাজ্য সরকারগুলোকে নিজের, মানে কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতেই’ এভাবে বৃটিশ শাসকের মত ক্ষমতা পেতে আর্টিকেল-৩৫৬ লিখিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই ভারতে ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে, এর এক অন্যতম উৎস হয়ে আছে আর্টিকেল-৩৫৬।
নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা বা ডিফাইন্ড (defined) পাওয়ার
রিপাবলিক মানে, রাজতন্ত্র অথবা কলোনি দখলি শাসনের বিপরীতে এক উপযুক্ত বিকল্প ধারণা। কলোনি দখলদারি ক্ষমতার বিপরীতে এক ‘গণসম্মতির’ ক্ষমতা। রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের সময় অভিজ্ঞতালব্ধ একটা গভীর মৌলিক ধারণা মেনে চলা হয়ে থাকে। তা হল – যে কোন ক্ষমতাকে অবশ্যই “ডিফাইন” করে রাখা ক্ষমতা হতে হবে। তা না হলে এটা দাগী ডাকাতের মত “দাগী ক্ষমতা” বা ‘ডেসপটিক পাওয়ার’ [Despotic Power] তৈরি করবে বা হাজির হবে। তাই ডিফাইন করা বলতে এখানে বুঝতে হবে – কোন ক্ষমতার উৎস কী, ক্ষমতা কে তাকে দিল মানে কোথা থেকে পেয়েছে [how the power is drawn], অথবা কিভাবে এই ক্ষমতা হাজির হয়েছে – তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথেষ্ট বর্ণনায় পরিস্কার করে রাখা হতে হবে। নাগরিকদের যে সম্মিলিত ক্ষমতা আছে তা থেকে উৎসারিত এক গণসম্মতি প্রকাশিত হলে; এভাবে তৈরি হওয়া ক্ষমতা কাউকে অনুমোদন দিলে, সেটাই “গণসম্মতির ক্ষমতা”। এটা ডিফাইনড ক্ষমতা। নিজ ক্ষমতার উৎস নিজেই স্পষ্ট বয়ান করতে পারে এমন ক্ষমতা। এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্র ক্ষমতা।
আর্টিকেল-৩৫৪-এর অস্পষ্টতার দিক হল – কী হলে বা কী দেখলে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন, ওই রাজ্য সেখানকার “সরকার চালাতে পারেনি”? বলা হয়েছে, [……government of the State cannot be carried on in accordance with he provisions of this Constitution]। কিন্তু মানা যে হয়নি তা কী দেখে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন তা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নাই। এ পর্যন্ত এই আর্টিকেল ব্যবহার করে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন অজুহাত দেখা গেছে – “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি”। কিন্তু কী দেখিয়ে বুঝা বা বুঝানো হয়েছে যে, কোনো “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” ঘটেছে? সাধারণত এর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, শহরে কোনো দাঙ্গা হয়েছে কি না অথবা তাতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই ফিগার। এই সেই কমন অজুহাত। এটা আবছা রাখা হয়েছিল কারণ বৃটিশ কলোনি শাসকদের তো এমনটাই দরকার যাতে যেকোন অজুহাত তুলে নিজেদের অবৈধ ক্ষ্মতার নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা যায়।
এজন্য এই আর্টিকেলের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, যদি কোনো রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ বলে দাবি ওঠে তবে তা যাচাইয়ের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো লিগ্যাল বডি বা কনস্টিটিউশনাল আদালতকে দিয়ে তা যাচাই, এমন কোন সুযোগ ৩৫৪ আর্টিকেলে রাখা নাই। অর্থাৎ জুডিশিয়াল যাচাই না, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কেবল নিজে “মনে করলেই” হবে, ফলে দেখাই যাচ্ছে এটা অবাধ এক খেয়ালি – আন-ডিফাইনড [un-defined] ক্ষমতা। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, যা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা – এই দলীয় ক্ষমতার (মোদী) তার বিরোধী (মমতা) রাজনীতিকে দমনের এমন সুযোগ ছেড়ে দেয়ার কারণই নেই। তাই স্বাধীন ভারতের জন্মের পর থেকে এটা অপব্যবহার করে গেছে কংগ্রেস আর এখন তা মোদীর হাতে এসেছে।
এদিকে ভারতীয় মনও এই অপব্যবহার দেখতে এতই অভ্যস্ত যে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছিল, কবে পশ্চিমবঙ্গে কোথায় দাঙ্গা লাগানো হছে বা হয় কি না। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের পরে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসনের এক কমন প্রয়াস দেখা যায়, নির্বাচনকালে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও জন-বিভক্তিগুলোকে এবার বিদায় দেয়া। কিন্তু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এটা ছিল অনুপস্থিত। মূল কারণ, মোদী-অমিত অস্থির হয়ে মুখিয়ে আছেন মমতাকে এখনই সরিয়ে কীভাবে রাজ্য সরকার দখল করা যায়; অথচ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে।
‘সন্দেশখালি’ ইস্যু
রাজ্যে “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” হয়ে গেছে অথবা সরকার “রাজ্য চালাতে পারছে না” – এই অজুহাত তুলে “রাষ্ট্রপতির তা মনে হওয়ানোর” রাজনীতি চলছে এখন পশ্চিমবঙ্গে। লোকসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এভাবে অজুহাত তুলার যে মঞ্চ প্রথম তৈরি করা হয়েছিল এমন মোক্ষম কেস হল – “সন্দেশখালি” ইস্যু। উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার এক এলাকার নাম সন্দেশখালি। সেখানে তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলাজনিত সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য, ঘটনার পরস্পরবিরোধী বয়ান আমরা এখানে পাবো। এছাড়া এখানে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, এই ফিগার যেহেতু রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের সাফাইয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর – তাই ওই দাবি বেড়ে পরে হয়েছে আটজন। এর ওপর আবার বিজেপির নিখোঁজ বলে দাবি ১৮ জন পর্যন্ত উঠেছে।
হামলার ঘটনার সেই সন্ধ্যাতেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কাছে কলকাতার বিজেপি নেতারা সরাসরি রিপোর্ট করেছেন, সেকথা টুইটও করেছেন। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতিরা যেভাবে অপেক্ষা করেছেন, সেভাবেই এবারের অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতিও কলকাতার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে রিপোর্ট চাইলে তিনি দিল্লি গিয়ে রিপোর্ট পেশ করেন এবং মোদী-অমিতের সাথে দেখা করেছেন।
মৃত্যুর ফিগার যথেষ্ট বড় নয়
তবে খুব সম্ভবত ঘটনা শুনেবুঝে বিজেপির মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য মৃত্যুর এই ফিগার যথেষ্ট নয়। এছাড়া শুরু থেকেই সমস্যা হল, বিজেপির এখনকার ম্যাজিক্যাল নেতা মুকুল রায়, হামলার সন্ধ্যাতেই নিজ টুইটে সংখ্যা বলে ফেলেছিলেন মাত্র তিনজন, [3 BJP workers shot dead……]। এ ছাড়া তৃণমূলের ক’জন মারা গেছে সেই সংখ্যা তিনি উল্লেখ করতে পারছেন না। ওদিকে রাজ্যপাল দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর মিডিয়ায় “রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে দিল্লির আপাত নেতি” অবস্থানের ধারণা দিয়েছিলেন। ১১ জুন আনন্দবাজার লিখেছে, প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল কেশরী বলেছিলেন, “এটি (৩৫৬ ধারা জারি) আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না”। কিন্তু পরে একটি বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “(৩৫৬ ধারা জারি) হতেও পারে। যখন দাবি উঠবে, তখন কেন্দ্র তা ভেবে দেখবে”।
ওদিকে মৃত্যুর ফিগার নিয়ে ঝগড়াটা ‘ন্যাংটা’ হতে চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেন, তিনি “নির্বাচনোত্তর হিংসায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে অমিত শাহকে জানিয়েছেন। অথচ মমতার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোকসভা ভোটের পর দিনহাটা, নিমতা, সন্দেশখালি, হাবড়া ও আরামবাগে পাঁচজন তৃণমূল কর্মী এবং সন্দেশখালিতে দু’জন বিজেপি কর্মী মারা গেছেন। তাই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, “নিয়মমাফিক রাজ্যসরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই রাজ্যপালের রিপোর্ট পাঠানোর কথা। কিন্তু এখানে বিজেপির দেয়া সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে”। তাই ঘটনার সারাংশ হল, সন্দেশখালি যথেষ্ট নয়, আরো ইস্যু লাগবে। ফলে দ্বিতীয় ইস্যুতে চেষ্টা, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাফাইটা এবার শক্তভাবে পাওয়া যায়।
হাসপাতাল ইস্যু
দ্বিতীয় ইস্যুকে আমরা “হাসপাতাল ইস্যু” বলতে পারি। এটা আপাতত অনেক ছোট ইস্যু, কিন্তু বিরাট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনা আমাদেরও খুবই পরিচিত। কলকাতার (রাজ্য পরিচালিত) প্রাচীন সরকারি হাসপাতাল – নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানে “ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্য” হয়েছে – এজাতীয় উত্তেজনায় ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়া, তা থেকে ডাক্তারদের ধর্মঘট – এই হল মোটাদাগে বলা কাহিনীটা। ঘটনা ছিল আসলে আরো ছোট। এক রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের পরামর্শে রোগীর আত্মীয় কোন সিনিয়র ডাক্তার খুঁজে আনতে বের হন। কিন্তু কয়েকজনকে অনুরোধ করে, অপমানিত হয়েও আনতে না পেরে শেষে একজন সিনিয়রকে একটু জোরাজুরি করে কব্জিতে ধরে তাকে আনেন। এই হলো “মূল অপরাধ”। ইতোমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে লাশ আনতে গেলে এবার ডাক্তারেরা “ক্ষমা না চাইলে লাশ দেয়া হবে না” বলে জানিয়ে দেন।
এটা আনন্দবাজারের রিপোর্ট। উত্তেজনা-মারামারি যা কিছু তা কিন্তু কেবল এরপর থেকে শুরু হয়েছিল। রোগীর বাড়ি হাসপাতাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। তাই ট্রাকে করে লোক জড়ো করে তাঁরা এবার ফিরে আসে। এসে সামনে পড়া দুই জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে আত্মীয়েরা মৃতরোগীর লাশ নিয়ে ফেরত যায়। আর ঐ হামলায় ডাক্তারদের একজনের আঘাত একটু গুরুতর ছিল, তবে এখন তিনি বিপদমুক্ত, তাই হাসপাতালের সাধারণ বেডে আছেন। আর ঞ্ছোট বড় ডাক্তাররা সবাই ধর্মঘটে। কিন্তু সময়টা ‘রাষ্ট্রপতির শাসন জারি’ করার ইস্যু খোঁজার অনুকূল; তাই এখন ‘বিরাট’ ঘটনা বানাতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ধর্মঘট ডেকে দেওয়া পর্যন্ত বিজেপি ঘটনা গড়িয়ে নিতে পেরেছে।
এসব ক্ষেত্রে ডাক্তারেরা বা আমাদের পাবলিক মাইন্ডসহ সবাই – ঘটনাকে দেখে থাকে সাধারণত এভাবে যে, ঘটনার জন্য ‘সরকার দায়ী ’ – ঠিক তা নয়, তবে কেন সরকার মধ্যস্থতা করে বা পদক্ষেপ নিয়ে ইস্যুটা তাড়াতাড়ি মেটাচ্ছে না? কিন্তু “হাসপাতাল ইস্যুতে” ঘটনা এখানে উল্টা। ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দায়ী করছেন। তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের শিরোনাম “মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলুন, এই ঘটনা আর ঘটবে না, দাবি চিকিৎসক মহলের”। আসলে এই দাবি দেখে বুঝা যাচ্ছে ডাক্তারেরা কত গভীরে বিজেপির কব্জায় চলে গেছে। বিজেপির টার্গেট মমতার বেইজ্জতি, ইমেজ নষ্ট। আর সম্ভব হলে ঘটনাকে পাকিয়ে উঠাতে পারলে, এটাকেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ইস্যু করা। কিন্তু ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী বা অপমান করতে হবে – বিজেপির এমন ইচ্ছা, এদিকে যেতে পারল কেন? আর সবাই জানে বাস্তবত “এমন ঘটনা আর ঘটতেই পারবে না” এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারবে না। তবে যাতে না ঘটে এই লক্ষ্যে সিরিয়াস হয়ে কাজ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী – এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তেজনা মিটানোর দিকে ঘটনা গেল না কেন?
মৃত রোগী ছিলেন মুসলমান, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আর যারা এসে মাথা ফাটিয়ে লাশ মুক্ত করে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, এদের এই একশনকে নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে একটা বিরূপ কানে-কানে বলাবলি করে এক প্রচার [whispering campaign] হয়েছিল যে, “দেখেছিস, মুসলমানদের কত্ত বড় সাহস!”। “এদের খুব বাড় বেড়েছে” – এধরণের। তবে এঘটনার বহু আগে থেকেই সাধারণভাবে “মুসলমানদের আশকারা” দেয়ার জন্য গত কয়েক বছর ধরে মমতাকে দায়ী করে থাকেন তার সব বিরোধী। কলকাতা বিজেপির ফেসবুক পেজগুলো এই ভাষ্যে ভর্তি থাকতে দেখা যায়। কলকাতাজুড়ে এর মূল প্রকাশ্য ক্যাম্পেইন করে থাকে বিজেপি। আর তৃণমূলবিরোধী সিপিএমসহ বাকি অন্যান্য বেশির ভাগ সব ব্যক্তি ও দল এর প্রতি প্রকাশ্য বা মৌন সমর্থন দিয়ে থাকে। ঠিক একারণের ডাক্তারেরা দাবি করছেন মমতাকেই [মূলত মুসলমানদের সাহস বা বাড় বাড়ানোর পক্ষে তিনি নেপথ্য ব্যক্তিত্ব বলে] মাফ চাইতে হবে। যেমন এই কথাটাই আর একটু নেপথ্যে রেখে হাসপাতালের পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় [মুসলমান শব্দ উচ্চারণ না করে] বলছেন, “জুলুমবাজদের ক্ষেপিয়ে তোলা” এবং “লেলিয়ে দেওয়া” বন্ধ হবে কবে? কিন্তু তিনি কে কাকে লেলিয়ে দিবার কথা বলছেন? বলতে চাইছেন, মমতা মুসলমানদেরকে লেলিয়ে দিয়েছেন।
মমতা মুসলমানদের “সাহস” “বাড় বাড়ানো” আশকারা দেয়া ইত্যাদি করেছেন কী না – এসব খুবই ঘৃণাবিদ্বেষী ও অরাজনৈতিক বক্তব্য। মমতা কী মুসলমানেরা মুসলমান হন আর যাই হন তিনি কী কিছু নাগরিককে যারা মারজিনাল কোনায় হয়ে পড়েছিল তাদের অধিকার ফিরে পেতে সাহায্য করেছেন? আর সেটা কী কোন নতুন বৈষম্য করে, অন্যদের অধিকার কেড়ে নিয়ে? বা, বেআইনিভাবে? এগুলোই একমাত্র হতে পারে মমতার পদক্ষেপগুলোকে বিচার করার নির্ণায়ক? কিন্তু বিজেপি তা করছে না। তাদের অভিযোগ হল মুসলমানেরা সমাজে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? কেউ কম বা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এটা অরাজনৈতিক বক্তব্য। বিজেপিকে বলতে পারতে হবে এটা মমতার পদক্ষেপ কেন বেআইনি? তা কি কোন অধিকার বৈষম্যের? কিভাবে? সবচেয়ে অধপতিত বিষয় হল, সিপিএম বা কংগ্রেসও বিজেপির উস্কানিতে মৌন বা প্রকাশ্য সমর্থন দিচ্ছে। একই অরাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। মমতার কোন পদক্ষেপ – মুসলমানদের কোনায় ফেলে রাখা থেকে বের করে আনা কী অন্য কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া? হলে কিভাবে? যদি তাই হয়ও তা নিয়ে হাইকোর্টেও তো যাওয়া যেতে পারে। তা না। সবাই বিজেপির হিন্দুত্ব আর ধর্মীয় মেরুকরণের উস্কানিতে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই মরিয়া।
কিন্তু ঘটনাবলীর পিছনে বিজেপির সমর্থন ও ততপরতা কত তীব্র তা বুঝবার এক ব্যবস্থা করেছে আনন্দবাজার। অবস্থা দেখে তারা মন্তব্য করেছে, “এবারই প্রথম হাসপাতালের মূলগেটে তালা দিয়ে ধর্মঘট চলছে। মূলগেটে তালা দেয়া আগে কখনও হয় নাই”। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরিচালক অথবা প্রশাসনিক স্টাফ নিজে ডাক্তার হলেও তারা কখনই ধর্মঘটে যোগ দেন না। কারণ তারা দায়িত্ববান কর্মকর্তা ফলে বিরোধ মিটাতে দুতয়ালির ভুমিকা তাদের নিতে হয় বলে। কিন্তু কলকাতায় এসব স্টাফেরাই মূল নেতা, সক্রিয়। অর্থাৎ স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাহস যোগান তখন আর কে কাকে পরোয়া করবে!
ওদিকে ক্ষমতা হারিয়ে ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া সিপিএমের এ্মন মরিয়া দশা দেখা গেছিল সেই ২০১৪ সালের শেষে, যখন অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। বর্ধমানে বোমায় কথিত জেএমবি, জামাত, বাংলাদেশ, জঙ্গি ইত্যাদি মিলিয়ে যে প্রপাগান্ডা-গল্প যে সব কিছুর সাথে মমতা আছেন – এই প্রপাগান্ডার ঝাঁপি নিয়ে এসেছিলেন অমিত শাহ। সেকালে সিপিএম কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে যে জনসভা ডেকেছিল, তাতে অমিতের দেয়া ঐ একই বয়ানে তারা মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। পরে অবশ্য মোদি-অমিত কৌশল বদলান, এই গল্প নিয়ে আর আগাতে চান নাই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস থেকে এক বিবৃতি সংসদে দিয়ে বলা হয়েছিল, অমিতের দাবি আর সরকারের অবস্থান এক নয়।
আমাদের প্রথম আলোতেও এমন এক কলকাতার কমিউনিস্টের (শান্তনু দে) লেখা ছাপা হয়েছে, শিরোনাম, “বাঁকের মুখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি”। তিনি সিপিএম কত ভাল ছিল এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু কলকাতায় ধর্মীয় মেরুকরণ হয়ে যাবার জন্য শেষে বিজেপি না মমতাকেই দায়ী করেছেন। লিখছেন, …… দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি”।কিন্তু বিজেপির ঘোষিত নীতিই যেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ সেখানে মমতা কিভাবে দোষী? কারণ সিপিএমও “মুসলমানদের সাহস” বা “বাড় বাড়ানোর” জন্য মমতাকে দায়ী করার জন্য তৈরি, তাই বুঝা যাচ্ছে এখানে।
যা হোক, “রোগী মুসলমান” বা “মুসলমানদের সাহস!” -এভাবে তোলা ডাক্তারদের সেন্টিমেন্টের পক্ষে প্রথম ইঙ্গিত তুলে হাজির হতে ক্ষেপিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছিলেন, এর ‘পেছনে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত’ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সরাসরি ঘটনা ক্যাশ করার লোভ না সামলে বলে বসেন, “হামলাকারীরা সেই সম্প্রদায়ভুক্ত, রাজ্যে যাদের ২৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। হাসপাতালসহ রাজ্যে যেকোনো গোলমালের নেপথ্যেই ওই সম্প্রদায় রয়েছে”। মমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, “তৃণমূল সরকার ওদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অনুরোধ, তৃণমূলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না”।
তবে ডাক্তাররা বিজেপির চেয়ে বুদ্ধিমান থাকতে চেয়েছেন। তাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বিজেপির অবস্থানকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে তারা বলেন, “যারা আক্রমণ করে তারা সমাজের দুষ্কৃত। এখানে কোনো জাতি-ধর্মের বিচার নয়”। ওদিকে কংগ্রেস-সিপিএমও এই দায় না নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কলকাতার হাসপাতালে রোগী-ডাক্তার এই সঙ্ঘাত প্রায় আমাদের দেশের মতই। অথচ এর সবচেয়ে সহজ ও আসল সমাধান হতে পারত – সবপক্ষকেই যার যার আচরণ এক জবাবদিহিতার মধ্যে আনা। প্রথম কাজ, রোগী বা তার আত্মীয়দের মনে সত্য বা মিথ্যা যত ক্ষোভই থাক তাকে বের হতে ‘জানালা খুলে দেয়া” [ventilation]। এ জন্য হাসপাতালের পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে “তদারকি ও সান্ত্বনাদান” জাতীয় উইং খোলা যেতে পারে। এর মূল কাজ হবে রোগীর আত্মীয়দের ক্ষোভ মনোযোগ দিয়ে শোনা। হাসপাতালের কারও গাফিলতি থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া। এ ছাড়া সময় নিয়ে আর মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সাথে নিয়ে (সর্ট ও লং) দুই ধরনের তদন্তের ব্যবস্থা রাখা। তবে অবশ্যই কেস কিছু থাকবে, যা মূলত হাসপাতালের রিসোর্সের সীমাবদ্ধতার কারণ ঘটেছে, সে অপারগতাগুলো রোগীকে বুঝিয়ে বলার মতো প্রফেশনালদেরকে রাখতে হবে। ফলে মমতাকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে যারা চাচ্ছেন, এরা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট বোঝেন না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা প্রফেশনাল ডাক্তার। বরং উলটা বিজেপির মমতাকে বেইজ্জতি করার প্রোগ্রামে তারা মিশে গেছেন বুঝে না বুঝে।আর মূলত তা ঘটেছে [whispering campaign] এর কারণে।
ডাক্তারের মাথা ফাটানো নিশ্চয়ই কোনো সমাধান নয়। কিন্তু সাবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ – “ক্ষমা না চাইলে মরদেহ দেয়া হবে না”, এটা বলার তাঁরা কে? এটাই তো মূল ক্রাইম। অথচ সরকারি/বেসরকারি কোন ডাক্তার রোগীর আত্মীয়দের এ কথা বলার অধিকার বা এখতিয়ার নেই। আর এ কথা বলে ডাক্তারেরা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া আর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে ।
আর পুরা ঘটনায় ডাক্তারদের মধ্যে, তারা নিজেরা একটা উচ্চ এলিট শ্রেণীর (ধর্মীয় পরিচয় আর গরীব-বড়লোক শ্রেণী পরিচয় এই দুই অর্থেই)- এমন ধারণা কাজ করছে। বিজেপির প্ররোচনায় ডাক্তারেরা এলিট ভুমিকায় অন্যদের সাথে এই বৈষম্য করে গেছে অবলীলায়। আবার বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে এমনই ঘটনায় এক আইন প্রচলন করা হয়েছিল যে, “হাসপাতালে এমন হাঙ্গামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে”। তাই ডাক্তারদের সঠিক পদক্ষেপ হত বড়জোর পুলিশের কাছে যাওয়া মামলা করা, আইনের আশ্রয় নেয়া। বাস্তবে কিন্তু রোগীর সেই হামিলাকারি আত্মীয়ের নামে মামলা হয়েছে, এখন সে জেলে আটক আছে। এছাড়া আর এক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য যে, রোগীর আত্মীয়রা স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশকে দিয়ে লাশ ছেড়ে দিতে ডাক্তারদের অনুরোধ করিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা তবু লাশ আটকে রেখেছিলেন। [এন্টালি থানার পুলিশ গিয়ে চিকিৎসকেদের বোঝান। তাতেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। ] তাদের এই উদ্ধত্ব দেখে বুঝা যায় বিজেপি কী পরিমাণ ডাক্তারদের বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি পিছনে থাকলে – যারা নিজেরাও একটা রাষ্ট্রপতির শাসন জারির জন্য বেপরোয়া – এসব মিলিয়ে সবকিছুই বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন না হলে সেটাই অস্বাভাবিক হত।
অর্থাৎ বিজেপি ডাক্তারদের এতই প্রটেকশন দিয়ে বেপরোয়া হতে উসকানি দিয়েছিল যে, তারা তাদের আইনি সীমা ও দায় সব ভুলে গেছিলেন। ওই দিকে কলকাতার কমিউনিস্ট ভাইয়েরা, তারাও ডাক্তারের পক্ষে, মানে নির্বাচনকালের মতই বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছেন, হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার ইমেজ ভাঙলে তাদের দিন ফিরবে।
না ফিরবে না। এবারের নির্বাচন তাদের কেটেছে নিজের দলীয় পরিচয়ে, কিন্তু বিজেপির ক্যাম্পে বসে। এই সহযোগিতায় বিজেপি এবার একলাফে ১৮ আসন পেয়েছে। আর কমিউনিস্টদের ভোট গিয়ে ঠেকেছে ৭%। এটাই তাদের শেষ কমিউনিস্ট পরিচয়। কারণ, ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে এই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবেন সরাসরি বিজেপি নাম নিয়ে, এটা দেখতে পাবার সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ বাস্তবতা হল, কমিউনিস্ট পরিচয়ে আর না আছে আইডিয়ার ধার বা ভার, না আছে পকেটে টাকা। বরং পকেট ভরা টাকা আছে বা দিবে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিতে যোগ দেয়া খারাপ, এটা বলার মত নৈতিক সাহসও কমিউনিস্ট নেতাদের আর নেই। কাজেই…।
বিজেপি কতদুর বেপরোয়া হয়ে গেছে এর এক উদাহরণ হল, মমতাকে নিয়ে বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের মন্তব্য। তিনি নিজের আঞ্চলিক দল জেডিইউ এর সভাপতি। তার দল গত রাজ্য নির্বাচনে (২০১৬ সালে) বিজেপিবিরোধীদের সাথে নির্বাচনি জোট করে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তিতে তিনি মেরু বদল করে বিজেপির জোট যোগ দিয়েছেন। আর এখন বিজেপির কোলে উঠে একেবারে সরাসরি বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষী রাজনীতি করছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ “মিনি পাকিস্তানে”(mini Pakistan) পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে “বিহার থেকে “রোহিঙ্গারা” বিহারিদের তাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য” করল তার বিহারে এনডিএ-সরকারের মূল দল জেডিইউ (JDU)। মোদীর মন পেতে ইসলামবিদ্বেষের যেকোন পর্যায়ে নামতে তিনি রাজি। ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে এরই এক প্রতীকী প্রকাশ এটা।
মমতারও দোষ, ভুল বা গোঁয়ার্তুমিও যে নাই তা নয়। ডাক্তারদের পিছনে বিজেপি-সিপিএমের সমর্থন আছে কিন্তু এদেরকে বহিরাগত বলে ঘটনা তার দিকে ফিরে নাই। আবার চার ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারদের কাজে যোগ দিতে বলাও তার বিরুদ্ধে গিয়েছে। প্রশাসক আর রাজনৈতিক নেতার ভুমিকা মাখায় ফেলেছেন তিনি। উচিত ছিল কেবল মুখ্যমন্ত্রীর ভুমিকায় থাকা, তাহলে ফল পেতেন। এছাড়া গত পঞ্চায়েত ভোটে ৩৪ শতাংশ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা’র কাফফারাও আছে। তবে হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার আপোসী ধারার আর একটা সফট লাইন কার্যকর আছে বলেই মনে হচ্ছে – মেয়র ফিরহাদ, তার ডাক্তার মেয়ে, আর মমতার আরেক ডাক্তার ভাইপো প্রমুখের মাধ্যমে। সম্ভবত হাসপাতাল ইস্যু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আগেই তিনি আপসে এসব মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এতে বিজেপি্র হাতে তাঁকে কোণঠাসা করার সব চেষ্টা মাঠে মারা যেতেও পারে। দেখা যাক, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনতে ‘হাসপাতাল ইস্যু’ ব্যবহার হয় কি না। নাকি নতুন অন্য ইস্যুর খোজ পড়ে!
সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এর পক্ষে তখন বিপক্ষে লোক দেখতে পাওয়া ত আসলেই কঠিনই হবে! ধর্মীয় মেরুকরণ তাতিয়ে ক্ষমতাদখলের প্রচেষ্টা – এটা সবপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে, এক মারাত্মক আত্মঘাতি পরিস্থিতি আনবে, যা এখন বিজেপি ও গংয়ে্রা আমল করার অবস্থায় নাই। পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ সেই ভয়ংকর দিকে আগাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ জুন ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনার জন্য“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]
ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন হওয়ার সময় আরও কাছে ঘনিয়ে এসেছে। গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে বলা যায়, পুরো এপ্রিল-মে মাসজুড়ে এবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা হবে কয়েকটা পর্বে, যেমন গতবার হয়েছিল নিরাপত্তার স্বার্থে পাঁচ পর্বে দুই মাস ধরে বিভিন্ন দিনে। আর সবশেষে মে মাসের মাঝামাঝি একসাথে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি নতুন সরকারও গঠিত হয়ে শপথ নিয়েছিল মে মাসের মধ্যেই। অর্থাৎ সেই হিসাবে কথা বললে আর এক মাস পর থেকেই ভারতে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের আওতায় চলে যাবে প্রশাসনিক কাঠামো।
আর সেই সাথে সরকার চালানো আর রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর কমিশনের বিভিন্ন বাধানিষেধ বা গাইডিং নানা নিয়ম আরোপিত হতে শুরু করবে – মানে এবিষয়গুলোও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। মোদির সরকারের ‘ফ্রি হ্যান্ড’ মাতবরিতে বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্র-প্রশাসনকে অপব্যবহারে প্রয়োগের সুযোগ ইদানীং প্রবল হয়েছে; যেমন- অপছন্দের বিরোধী দলকে বেকায়দায় ফেলতে বা বিজেপির কাছে নত হতে বা কোণঠাসা করতে বাধ্য করছে। সেসবের সুযোগ আর থাকবে না। দুর্নীতি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের নামে ভারতের কথিত সিবিআই (Central Bureau of Investigation – CBI) বা ইডি (Enforcement Directorate, ED) -কে ব্যবহার করে মমতার মত মোদীবিরোধীদের হয়রানি করার অভিযোগ যা ইদানিং প্রবল, মোদীর সেসব কাজ করার সুযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
ফলে ওদিকে ইতোমধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে কী কী ইস্যু প্রধান হয়ে উঠবে, তাও পরিষ্কার হয়ে গেছে। যে কথা বলছিলাম, সিবিআই-ইডির কথা। ‘মোটা দাগে’ বললে, এর গঠন আমাদের দুদকের মত না হলেও এটা বরং ভারতের কেন্দ্রীয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তবে পুলিশ প্রশাসনের ( Delhi Special Police Establishment Act, 1946.) এক আইনী ক্ষমতায় পরিচালিত বিশেষত দুর্নীতিবিরোধী এক বিশেষ তদন্ত-অনুসন্ধানের সংস্থা। আর ইডি হল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অর্থনীতিবিষয়ক আইন প্রয়োগ ও সম্পর্কিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়বার সংগঠন। এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাইরের যেকোনো হস্তক্ষেপ বা প্রভাবমুক্ত থেকে আদালতের নির্দেশ-সিদ্ধান্তে এর হাতে দেয়া কোনো ঘটনা-মামলার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত-অনুসন্ধান রিপোর্ট পাওয়া এবং তা আইনের আওতায় আনা। বাংলাদেশের দুদকের মত প্রতিষ্ঠান কাজের নামের মিল ছাড়া আর কোনদিক থেকেই সিবিআই তুলনীয় নয়। আর সিবিআই অনেক বেশি সফল, শক্তিশালী ও পেশাদার ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের দুদক দেখে মনে হয় কেবল সরকার বিরোধীদের সাইজ করার ওর কাজ। আর ওদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তবুও সিবিআইয়ের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে চলছে; তাই অপব্যবহারমুক্ত প্রতিষ্ঠান বলা যাচ্ছে না।
এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ ছিল গত ০৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতার রাজ্য পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই লেলিয়ে দেয়া – যা আসলে আক্ষরিক অর্থেই রাজ্য পুলিশ বনাম কেন্দ্রের সিবিআই অফিসের লড়াইয়ের ঘটনা। এতে মাঠের চেহারা দাঁড়ায় এমন যে, কলকাতায় এসে রাজ্য পুলিশ কমিশনারকে গ্রেফতার বা জিজ্জাসাবাদ করতে তার বাসায় কেন্দ্রের সিবিআই দল পৌছালে তাদেরকেই রাজ্য পুলিশের বাধা দেয়া শুধু নয়, উল্টো সিবিআই অফিসারদের গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে কাছের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
মোটামুটি ঘটনা-সংক্ষেপটা হল, আমাদের ডেসটিনির মত মানুষের টাকা নিয়ে সুদসহ ডাবল ফেরত দেয়া বা এমএলএম করবে বলে শেষে পুরা টাকাই মেরে দেয়ার ঘটনা। ঘটনাকাল মমতার জমানার আগে এবং ধরা পড়া মমতা-কালীন। তবে এখানে মমতার দলের কিছু নেতা সহ অনেক কয়টা রাজনৈতিক দলের (কংগ্রেস, সিপিএম অথবা আগে তৃণমুলের নেতা এখন বিজেপি করা এমন সকলে অভিযুক্ত) নেতাকেই মাসোহারা বা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে সম্পর্কিত করে নেয়া ছিল। মমতার আমলে এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়লে তিনি রাজ্য-পর্যায়ে যে তদন্ত কমিটি করেছিলেন ও রিপোর্ট দিয়েছিলেন তা হয়েছিল এই আলোচ্য পুলিশ কমিশনার রাজীবের নেতৃত্বে। এদিকে কেন্দ্র সরকারও সিবিআইকে দিয়ে ঘটনা তদন্ত, মামলা ও চার্জশীট দেওয়ায়। তাহলে এখন ইস্যু কী? সেটা হল সিবিআইয়ের দাবি তারা পরে জেনেছে রাজীব তদন্তের সময় কথিত এই ডাইরি পেয়েছিলেন যা তিনি সিবিআইকে দেন নাই বা জানান নাই। যদিও আসামিরা বলছে এমন ডাইরির কথাটাই ভুয়া। কিন্তু এখানেই নির্বাচনের আগে মোদীর ইচ্ছা তিনি এই কথিত (দুর্নীতি) অনিয়মের কথা তুলে মমতাকে একটু বেকায়দা ফেলে ভোটারের স্মৃতিতে বছর দশের আগের ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয়া এই অনুমানে যে তাহলে আসন্ন নির্বাচনে্র ভোটে কিছু মাইলেজ বা বাড়তি সুবিধা তিনি পেয়েও যেতে পারেন। মামলা ইতোমধ্যেই রাজ্য হাইকোর্ট ছেড়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে বিচারাধীন। বাকি বিষয়টা কী হল তা সংক্ষেপ করার জন্য এনিয়ে দুপক্ষই এবার আদালতে গেলে প্রধান বিচারপতি কী নির্দেশ দিলেন তা দেখব। বিচারকের সারকথাটা ছিল, রাজীবকে সিবিআইয়ের গ্রেফতার করতে পারবে না, এটা অপ্রয়োজনীয়। তবে সিবিআইয়ের রাজীবকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে সে অবশ্যই সহযোগিতা করে মুখোমুখি বসবে, তবে তৃতীয় নিরপেক্ষ জায়গায়। ইতোমধ্যে শিলং শহরে সিবিআই আর রাজীব মুখোমুখি সাক্ষাতও ঘটে গেছে, শান্তিপুর্ণভাবে। রাজীব এখন নিজের কাজে। এর মানে, প্রধান বিচারপতির এই রায় বা নির্দেশই প্রমাণ করে যে মোদী সিবিআই লেলিয়ে রাজীবকে গ্রেফতারে উঠায় নিয়ে যেতে আর তাতে নির্বাচনের আগে মমতাকে এনিয়ে অস্বস্তিতে ফেলতে চেয়েছিল। যেমন এক প্রাক্তন সিবিআই প্রধান মন্তব্য করছেন, রাজীব সিবিআইয়ের সাথে সহযোগিতা না করলে তাকে তো সহজেই আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা যেত। সিবিআই সে পথে না গিয়ে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু তৈরির পথে গেল কেন? খুব জেনুইন প্রশ্ন। যার সহজ জবাব মোদী তো আসলে এক হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যুই চেয়েছে। আর এটাই তো অপব্যবহার। তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা হল, মমতাও কম যান না। রাজীবের বাসায় যে সন্ধায় সিবিআই যায় সেই তখন থেকে এর প্রতিবাদে রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করতে বসে যান, আর তা চলে লাগাতর তিনদিন যতক্ষণ না আদালতে প্রধান বিচারপতি নির্দেশ জারি করেন। আর এই তিন দিনে সব বিরোধীদলের নেতাই বিবৃতি দিয়ে ও ব্যক্তি প্রতিনিধি পাঠিয়ে মমতার ঐ অবস্থান ধর্মঘটে স্ব স্ব দলের সমর্থন ও সহ-অবস্থান জানান দিলেন। তাতে সবার কমন এক স্বরে অভিযোগ ছিল যে মোদী নিজ দলের সংকীর্ণ স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেলিয়ে অপব্যবহার করছেন। সারকথায় সব মিলিয়ে এতে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু অবশ্যই একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা মমতার পক্ষে গিয়েছে।
কিন্তু ঘটনার অন্য এক মাত্রার দিক আছে। সাদা চোখে দেখলে ব্যাপারটাকে মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই-ঘটিত নেহায়েতই এক অপব্যবহার মনে হলেও এর ভেতরে জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্র-এর এক গাঠনিক দুর্বলতা [ফেডারল রাষ্ট্রক্ষমতা না হয়ে ভুতুড়ে কেন্দ্রের কুক্ষিগত ক্ষমতা] আর তাতে ভুতুড়ে ক্ষমতার শিকার হওয়া ইস্যু আরো উদোম হয়ে সামনে আসাও নজরে আসবে। এটাই মূলত ভারত রাষ্ট্রক্ষমতার ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্যের লড়াই’ – মমতা যে লড়াইয়ের সোচ্চার অগ্রসেনানি। ভারত রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সময়ের মৌলিক ও গভীর দুর্বলতা এটাই।
ভারত এখন মোট ২৯টি রাজ্যের দেশ। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা মূলত কোন রাজ্যের হাতে? সে রকম কোনো একটা রাজ্য অন্যান্য রাজ্যের ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নকে ভারতের জন্মের সময় থেকেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এভাবেই বাস্তবতা হল। কথিত এই “কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটাই” এক ভুতুড়ে [না বলা কওয়া, অ-সংজ্ঞায়িত (un-defined power) লুকানো ক্ষমতা ] ক্ষমতা হিসেবে থেকে গেছে। এই ক্ষমতা কার হাতে এবং কেন এর জবাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘হিন্দি-বলয়’ বা ‘হিন্দিতে কথা বলা’ রাজ্য নামে একটি পরিভাষা দিয়ে বলা হয়েছে, এদের হাতেই ভারতের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এ পর্যন্ত বিরাজ করে এসেছে। আর অন্য সব রাজ্যের ঘাড়ের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের আদায়কৃত রাজস্ব কাকে কতটা দেবে কেন্দ্রীয় এই ক্ষমতা তা নিয়ন্ত্রণ করে, বরাদ্দ দেয়। আর এই বরাদ্দ নিয়ে বিরোধী দলের রাজ্য সরকার (যেমন মমতা) নিয়মিত হৈ চৈ করে তুলছেন। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের নামে এই ভুতুড়ে ক্ষমতা রাজ্যগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার ভাষায়- ক্ষমতার কেন্দ্র বনাম রাজ্যের বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তার মূল লড়াই, এটাই তার রাজনীতি। এরই একটা প্রকাশ হল সিবিআই প্রতিষ্ঠানকে রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অপব্যবহার করা।
আর সব রাজ্যই অনুভব করে ‘কেন্দ্র’ নামে এক ভুতুড়ে ক্ষমতা তার ঘাড়ে চেপে আছে। কিন্তু কী করে এর বিরুদ্ধে লড়বে, তাদের কাছে তা এখনো অস্পষ্ট। মমতাই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে, কী করলে এর সমাধান আসবে তা তিনিও সুনির্দিষ্ট করে বলার ক্ষেত্রে তিনিসহ পুরা ভারতের রাজনীতিবিদ, একাডেমিকসহ সমাজের সবাই অস্পষ্ট। বলা যায়, একাডেমিক স্তরেও ইস্যুটি নিয়ে আলোচনাই শুরু হয়নি। সকলেই ভীত যে এতে না ভারত বিভিন্ন রাজ্যে টুকরা হয়ে যায় শেষে। যদিও মমতা বৈষম্যের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আসল কথা, সমাধান কী? এর এক কথার জবাব হলো কথিত, ভারত রাষ্ট্রের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে দিয়ে এক ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থায় চলে যাওয়া। এমন রাষ্ট্র হিসাবে যার আদর্শ উদাহরণ আমেরিকা, তার ফেডারেল স্টেট কাঠামো। এ কারণে ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কখনও এমন অভিযোগ নাই যে কোন এক-দুইটা রাজ্য বাকি সব রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে মাখন তুলে নিয়ে খাচ্ছে, বা মাতবরি করছে। এমন অভিযোগ আজ আমেরিকার জন্মের আড়াই শ’ বছর পরও উঠেনি। একারণেই বলা যায় আমেরিকা রাজ্যগুলোর সত্যিও এক স্বাধীন ইউনিয়ন। কেউ বা অন্য রাজ্য তাদের বাধ্য করে নাই। নিজের স্বার্থে বুঝে বুঝে নিয়ে তেমন নিয়ম আইন করেই একই ফেডারল রাষ্ট্রে সকলে সামিল হয়েছে। কথিত ইউনিয়ন-ভারত আসলে নেহেরুর বলপ্রয়োগে বাধ্য করা এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারত; যেখানে বহু ক্ষমতার উৎসের হদিস নাই, কেন এই ক্ষমতা তার – এর কোন ব্যাখ্যা নাই, এমন ক্ষমতা। বরং ইতোমধ্যেই সমালোচক ও বিরোধীদের দাবি, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা খাতেও “রাজনৈতিক দলাদলি ঢোকাচ্ছে মোদির সরকার“।
তবে এখনকার সারকথা হল, কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্য, এ বিষয়টিকে মমতা নির্বাচনে ইস্যু হিসেবে হাজির করতে সফল হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের দায়ে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি বাকি সব বিরোধী দলকেও একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটাই আসন্ন নির্বাচনে একটা মুখ্য ইস্যু হিসেবে রূপ পেয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু,
এই নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু হল, চাকরি বা কাজ সৃষ্টি। গত ২০০৪ সাল থেকে পরের ১৫ বছরে ভারতের তিন সরকারের আমলে প্রথম প্রধান ইস্যু ছিল এটা। অন্য ভাষায়, ইস্যুটার নাম সরকার “অর্থনীতিতে ভাল” করেছে বা সাফল্যের সাথে তা চালাতে পেরেছে কি না। এর জবাব বা আসন্ন নির্বাচনের আগের মূল্যায়নে বলা যায়, এই ইস্যুতে মোদী ইতোমধ্যেই প্রকাশিত যে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। আর এর সর্বশেষ প্রমাণ হল, এক পরিসংখ্যান রিপোর্ট। মোদির সরকার নির্বাচনের আগে এর স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটতে দিতে বাধা দিয়েছে – এই অভিযোগে জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানসহ দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। [কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এই রিপোর্ট চেপে রাখার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশন-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান পি সি মোহনন। ] সে রিপোর্ট বলেছে, কাজ সৃষ্টি বা চাকরির সংস্থান এই সরকারের আমলে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তা ভারত রাষ্ট্রের জন্য আরেক কারণে খুব খারাপ ইঙ্গিত। ১৯৮৫ সালের পর থেকে ভারতের ‘কেন্দ্রীয় সরকার’ (যেটা ভুতুড়ে বা অস্পষ্ট সাফাইয়ের ক্ষমতা বা হিন্দি বলয়ের কোটারি ক্ষমতা) ধারণাটাই দুর্বল হতে শুরু করেছিল। কেন? কারণ, কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোনো সর্বভারতীয় দলের আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয় লাভ করে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা আসীন হতে আর সক্ষমতা পারে নাই। মানে এ’দুই দল ভুতুড়ে ক্ষমতাতেও আসতে সক্ষমতা ছিল না- এ দৃশ্যই প্রধান ফেনোমেনা হিসেবে সামনে আসতে শুরু হয়েছিল। এর বদলে আমরা দেখছিলাম, সর্বভারতীয় দল দু’টি আর এককভাবে নয়, বরং আঞ্চলিক দলের সাথে জোট করে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা – এই নতুন ফেনোমেনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ বা বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট – এভাবে কোয়ালিশন গড়া – এভাবে সরকার গঠনঅই প্রধান ধারা বলে হাজির হয়েছিল। তবে আবার গত ৩০ বছরের এই ফেনোমেনার বিরুদ্ধে ব্যতিক্রম হল, ২০১৪ সালের বিজয়ী চলতি মোদী সরকার। যদিও এটাও একটা এনডিএ কোয়ালিশন সরকার, সে কথা সত্য। কিন্তু এই এনডিএ জোট গঠন ছাড়াই মোদীর বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও আছে। মোদীর বিজেপি সেবার এই ব্যতিক্রম ঘটাতে পেরেছিলেন কেন? কারণ, মূলত কাজ সৃষ্টির ইস্যু। ২০১৪ সালের মোদি প্রবল প্রচারণা চালিয়ে হতাশ [এর আগে কংগ্রেসের দ্বিতীয় ইউপিএ জোটের সরকারের অর্থনীতিক ব্যর্থতায় ] ভোটারদেরকে ফিরে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি সেবার কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে পারলে (অর্থনীতিতে ভালো করে) ব্যাপক কাজ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু পাঁচ বছর শেষে এবার ২০১৯ সালে হতাশ ভোটাররা দেখছেন, সেই আস্থা এখন আবার ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। অর্থাৎ মোদীর চাকরি সৃষ্টিতে ব্যর্থতা-হতাশার মানে হল, এবারে ভারতের নির্বাচনে আবার সর্বভারতীয় দল দু’টির ওপর প্রবল অনাস্থা (কেন্দ্রীয় ভুতুড়ে ক্ষমতার ওপর অনাস্থা) – এটাই স্থায়ী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থাৎ বিজেপি বা কংগ্রেস বাদে কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর কোন এক কোয়ালিশন সরকার – এটাই মুখ্য ফেনোমেনো বলে এখন থেকে হাজির হয়ে যেতে পারে।
এর সোজা অর্থ আরো ব্যাপকভাবে, এবার বিজেপি অথবা কংগ্রেসের নেতৃত্বের আঞ্চলিক দলগুলোকে সাথে নিয়ে কোনো কোয়ালিশন সরকার আর নয়, বরং (১৯৯৬ সালের দেবগৌড়া সরকারের মত) কেবল আঞ্চলিক দলগুলোরই কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মোদির ‘কাজ সৃষ্টিতে’ চরম ব্যর্থতার প্রভাবে এমন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনের তৃতীয় ইস্যু,
গরু, গো-মাতা বা গো-রক্ষক মোদি ইস্যু! হিন্দুত্বের হুজুগ বা জোয়ার তুলে সমাজে মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোটের বাক্স ভরতে হবে- এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতির সারকথা। এই উদ্দেশ্যে গরুকে হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক বানিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে কথিত মুসলমানেরা মাংস বহন করেছে বা ফ্রিজে রেখেছে অথবা গরু কেটেছে ইত্যাদি হুজুগ তুলে পাবলিক লিঞ্চিংয়ের ব্যাপকতা দেখা গেছে। এমন সামাজিক তাণ্ডবে মোদী নিজেকে গরু-পূজারী, গো-মাতা বা গো-রক্ষক হয়ে হাজির করে গেছেন। কিন্তু মোদী এই ‘গরুর রাজনীতি’তেও পরাজিত। মোদী ভেবেছিলাম গরুর রাজনীতির জজবা দিয়ে বাক্স ভরবেন। কিন্তু সেটা আগেই ব্যাকফায়ার করে গেছে। কীভাবে?
যেকোনো দলীয় কর্মসূচি তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও টেকসই বা বাস্তবায়িত (viability) করা সম্ভব কি না তা আগাম যাচাই করে নিতে হয়। মানে, সেদিক থেকেও টিকে থাকার সক্ষমতা থাকতে হয়। মোদির গরুর রাজনীতির অর্থনৈতিক দিকও টেকসই কি না তা আগেই পরীক্ষা করে নেয়া হয় নাই এবং তা টেকসই নয়। তা না করাতে, এর ব্যর্থতা থেকেই মোদী এখানে হেরে গিয়েছেন। যে সমাজে গরু কৃষির উপকরণ সে সমাজে মাংস হিসেবেও গরুর ব্যবহার থাকতে হবে বা থাকবেই। এর বিরুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা অবাস্তব। এমনকি ধর্মীয় বা কোনো কারণে, মাংস নিজেরা না খেলেও, অন্তত মাংস রফতানি করতেই হবে। এই সত্য মোদি মানতে চাননি, বোঝেননি- তাই তিনি ব্যর্থ।
মূল ব্যাপারটি হল, একটা বয়সের পরে গৃহপালিত গরুকে আর কৃষিতে বা মাল টানার কাজে ব্যবহার করা যায় না। তখন থেকে গরুকে আর বসিয়ে খাওয়ানো মালিকের পক্ষে অসহনীয় দায় হয়ে যাবেই। এটাই হিন্দুত্বের রাজনীতি বুঝতে অক্ষম। অথচ এর সামাজিক সমাধান ছিল, গরুকে বিক্রি করতে দেয়া। যার সোজা অর্থ হল, গরু নিজে না কাটলেও, অন্যকে মাংসের উৎস হিসেবে গরুকে ব্যবহার করতে দিয়ে দেয়া, যার মাধ্যমে গরুর জীবনচক্রের একটা পরিসমাপ্তি টানা। কিন্তু মোদীর রাজনীতি হিন্দুত্বের জোশে – মাংসের জন্য গরুকে বিক্রি করতে দেয়া যাবে না বলে অবিবেচক বাধা তৈরি করেছিল। কিন্তু গরুকে সেই পর্বে খাওয়াবে কে, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করলেন না। নামকাওয়াস্তে কিছু গো-শালা বানালেও তা রক্ষণাবেক্ষণ আর গরু্কে খাওয়ানোর অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করলেন না।
আসলে বাস্তবে কতগুলোই বা গো-শালা বানাবেন? বাড়ি থেকে গো-শালা বেশি দূরত্বের হলে গাড়ি ভাড়া করে কেউ গরু গোশালায় দিতে যেতে চাইবে না। এতে যেহেতু গরুকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে কৃষক/ গরুমালিক অপারগ, তাই সে – এবার গরুর দড়ি খুলে ছেড়ে দেয়াকেই একমাত্র ও সহজ উপায় মনে করল। কিন্তু তাতেও ‘গরু খাবে কী’ ব্যাপারটা শেষ হলো না। গরু তাই এবার ব্যাপক হারে কৃষকের ফসলি জমিতে গিয়ে হামলে পড়ল। ফলে রাত-দিন জমি পাহারা দিয়ে ফসল বাঁচানো এক বিরাট মাথাব্যথা আর খরচের নতুন খাত হিসেবে হাজির হল। ব্যাপারটা এতই মারাত্মক হয়ে গেছে যে, গত ডিসেম্বরে রাজস্থানের রাজ্য নির্বাচনে ‘ছাড়া গরু’ মোকাবেলা করা নির্বাচনী ইস্যু হয়ে হাজির হয়েছিল। অর্থাৎ ছাড়া গরু ইস্যু উল্টো মোদির ভোটকেটে দিয়ে রাজস্থানে বিজেপি পরাজিত করেছিল। তাই এখন চাকরি সৃষ্টি না করতে পারার ব্যর্থতা, না ছাড়া গরুর সমস্যা- কোনটা মোদির প্রধান ব্যর্থতা বলে হাজির হবে, তা নিয়ে এখন জল্পনা-কল্পনা। এমনই এক আর্টিকেল আছে এখানে – লোকসভা নির্বাচনে মোদির বিজেপি’র জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে কোনটি – গরু না বেকারত্ব?।
আসন্ন নির্বাচনের চতুর্থ ইস্যুঃ
চতুর্থত, হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিল। নতুন এই আইন লোকসভায় বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে বিজেপির আনা বিল হলেও এটা মোদী এনেছিলেন মূলত সারা ভারতে এটা প্রযোজ্য হবে- তেমন ভেবে নয়। বরং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্ট – এদুই পকেটের রাজ্যগুলোর জন্য। তারা আবার মোট আট রাজ্যের (নর্থইস্ট সাত রাজ্য আর পশ্চিমবঙ্গ) হলেও এখানে লোকসভার মোট আসন হলো ৬৬টা। ভারতের লোকসভার মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে সরকার গড়ার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন পেতে হয় ২৭২টা। আর, এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্টের মোট ৬৬ আসনের কথা মাথায় রেখেই মোদী নাগরিকত্বের বিলটা এনেছিলেন। কিন্তু তার কপাল এখন একেবারেই ফাটা, যেখানে হাত দেন সব ব্যর্থ।
তার অনুমান ছিল এই বিল তাকে নির্বাচনের ৬৬ আসনে বিজেপির পক্ষ জিততে বাড়তি সুবিধা বা মাইলেজ দেবে। অথচ এটা ছিল তার সবচেয়ে ভুল অনুমান। ফলাফলে ইতোমধ্যেই তিনি ব্যর্থ। কারণ, নর্থইস্ট সাত রাজ্যের বেলায় তা ‘ব্যাকফায়ার’ করেছে। এই বিল আনার কারণে মোদীর ভোট পাওয়া দূরে থাক, ওই সাত রাজ্যে তারা এখন ইউনিয়ন ভারতের সাথে থাকবে কী না সেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। প্রতিদিন এখন এনিয়ে ভারত ছেড়ে, ‘ভেগে যাওয়া’র আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। আর এদিকে আসামে? সেখানে এখন রাজ্য সরকারে আছে বিজেপি। কিন্তু আসামের মূল নাগরিকদের সব দল ও পক্ষই এখন সেই বিজেপির প্রবল বিরুদ্ধে। জনসম্মতির রেটিংয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় বিজেপি। এই বিল আনার কারণে বিজেপিকে ১৯৮৫ সালের চুক্তির সাথে প্রতারণার কৃতিদার হিসাবে বিট্রেয়ার মনে করছে। বাকি থাকল পশ্চিম বাংলা। সেখানেও মোদীর বিরুদ্ধে মমতার সংগ্রাম ও বিরোধিতা প্রবল আর সফলই বলা যায়। বরং উলটা, মমতা তার নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলগুলোকে বিজেপির এবং মোদীর বিরুদ্ধে একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন, আর স্বভাবতই এতে মোদীর বিরুদ্ধে “বাংলার স্বার্থের আসল ধারক” হলেন মমতা – এ কথা বলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ভোটারের সহানুভূতি মমতা নিজের ব্যাগে তুলে ফেলেছেন।
তাহলে কী দাঁড়াল? কারা এই বিলের পক্ষে? বাংলাদেশের মতো পড়শি দেশের যেসব হিন্দু আছেন, এদের অনেকে মোদীর চরম ভক্ত। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির প্রধান ধারা এখন আরএসএস-মুখি অথবা ডমিনেটেড। কিন্তু তাতে মোদীর কোনো লাভ নেই এ জন্য যে, তারা খুব কম জনই মোদীর ভোটার। কাজেই পড়শি দেশের হিন্দুদের স্বার্থে পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা কতটা মোদীর ভোটের বাক্সে ভোট দিতে য়াগিয়ে আসবেন তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, মমতার কারণে কেন্দ্র ও রাজ্য ক্ষমতার লড়াই ব্যাপারটাকে মুখ্য করে তোলাতে এখন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারেরা স্থানীয় স্বার্থে তারা এখন হিন্দিবলয় বিরোধী; মমতা সেখানে মোদীকে “ভিলেন” হিসেবে দেখাতে পেরেছেন।
মোদীর আরও বিপদ আছে। কারণ মোদী সরকারের দায় খোদ আরএসএস আর নিতে চাচ্ছে না। বরং তাঁরা এখন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের পক্ষে সহানুভূতি দেখিয়ে নিজের ইমেজ বাঁচাতে ব্যস্ত। আনন্দবাজারের শিরোনাম- “বেকারত্ব বাড়ছে, বিরোধীদের সুরে সঙ্ঘ প্রধান, অস্বস্তিতে মোদি’। ওদিকে বিজেপি দলের ভেতরেই মোদী-অমিত গ্রুপের বিরোধিতাকারীরা- যেমন- মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী মোদীর থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করতে চাইছেন। এদিকে শত্রুঘ্ন সিনহা বা যশবন্ত সিনহা ও অরুণ সুরি- এরা প্রকাশ্যেই বিরোধিতায় নেমেছেন। এমনকি মোদীবিরোধী মমতার সমাবেশ র্যালিতেও অংশ নিচ্ছেন।
তাই সব মিলিয়ে আমরা লক্ষ করছি- আসন্ন নির্বাচনী ফলাফলের সম্ভাব্য ঝোঁকটা হল, মোদির বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে কমছেই আর কমছেই। কিন্তু এর মানে কী? তা সত্ত্বেও আবার বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে কোনো কোয়ালিশন ক্ষমতার দাবিদার তারাও নয়। বরং কেবল আঞ্চলিক দলগুলো – এদেরই কোনো কোয়ালিশন সরকারের সম্ভাবনা ক্রমেই জেঁকে বসা, এটাই প্রবল হচ্ছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু?” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]
[সার সংক্ষেপঃ বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক-গুলোকে বেশ বিপদেই ফেলেছে, মনে হচ্ছে। তারা সাধারণ ও সোজা যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়ে অর্থপূর্ণ একটি লেখা দাঁড় করাতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে এর আগে একটা লেখা ছাপিয়েছিলাম যেগুলো মূলত ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকদের লেখা নিয়ে। সেসব লেখায় দেখেছিলাম – সেখানে এ জাতীয় সমস্যা দেখা যায়নি। থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকেরা স্বাধীনভাবেই তাদের মনের কথা পরিষ্কার বলেছিলেন। কিন্তু থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিতরের লেখকেরা? বুঝা যাচ্ছে থিঙ্কট্যাঙ্কের লেখকেরা ভারত সরকারের অবস্থানের সাথে মিল রেখে কথা বলার দায় রেখে লিখছেন। তাতেই অর্থপুর্ণ বাক্যগঠন ঠিক রাখতে পারছেন না। অথচ যেভাবেই হোক নির্বাচনের ফলাফলের পক্ষে সাফাই খাঁড়া করতে চাইছেন। এতেই এলোমেলো সব বিপদ ভেসে উঠছে। ]
এমনিতেই ভারতে বিদেশের (মূলত আমেরিকা) সাথে সম্পর্কিত থিঙ্কট্যাঙ্ক (Pro-US Think Tank) আর অপর দিকে ভারত থেকে প্রকাশিত বিদেশি মিডিয়া (পাবলিশিং অথবা এজেন্সি, যেমন রয়টার্স)- এদেরকে নিয়ে এক বিরাট সমস্যা। বোঝা যায়, ভারত থেকে এগুলো প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের বিদেশনীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা অথবা এদের অবস্থান যেন সরকারি অবস্থানের বিপরীত হয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে, সম্ভবত অলিখিত কোনো শর্তে, তা প্রকাশিত হতে গিয়ে এসব সমস্যা হাজির হয়। যেমন- কিছু থিঙ্কট্যাঙ্কের দৌরাত্ম্যের প্রাবল্য এত দিন যা নিয়ে ভরপুর ছিল তা হলো চায়নাব্যাশিং বা চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা থেকে প্রকাশিত নানান প্রপাগান্ডা। অর্থাৎ তারা আর মূলত থিংকট্যাংক থাকতে চাইছিলেন না বা ছিল না। আমেরিকার স্বার্থে চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার ‘ঘেঁটু’ হয়ে উঠতে চাইছিল এরা। বাক্যে মিল থাকুক আর না-ই থাকুক, অর্থপূর্ণ যুক্তি সাজানো হোক আর না-ই থাক, চীনবিরোধী প্রপাগান্ডায় সরব থাকতে হবে – এই ছিল তাদের কান্ডকাখানা।
তবে এই সমস্যা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের স্বস্তি দিয়ে বাঁচিয়েছেন। ভারতে বসে আমেরিকান থিংকট্যাংকের চীন ঠেকানোর প্রপাগান্ডায় অর্থ ঢালা অথবা ভারতকে এর বিনিময়ে কোনো বাণিজ্য সুবিধা দেয়া – এসবের মধ্যে তিনি আগের প্রেসিডেন্টদের মত তিনি নাই, থাকতে চান না – এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণে ভারতের কিছু থিংকটাংকের খামাখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ইদানীং আর দেখা যায় না। বিশেষ করে, এপ্রিল ২০১৮ সালে চীনে অনুষ্ঠিত মোদি-শি জিনপিং এর মধ্যে য়ুহান সামিটের [Wuhan Summit] পরে। বলা যায় এই সামিট থেকেই আমেরিকার হয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা থেকে ভারত সরে আসতে শুরু করে। তবে এ ছাড়াও এর আরেক কারণ, বুদ্ধিমান মোদী সরকার চীনের সাথে ঐ সামিট-সুখালাপের সময় যাতে কোন বিরূপভাব তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করতে চীনবিরোধী এধরনের থিংকট্যাংকগুলোর তৎপরতা বন্ধ করতে তাদেরকে সভা-সেমিনার করার অনুমতি না দেয়াকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এতে এগুলোর অনেকেই তৎপরতা গুটিয়ে গিয়েছিল বা সরাসরি গুটিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবুও ভারতের সরকারি নীতির পক্ষে প্রচারে থাকা কিছু থিংকট্যাংক এখনো আছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে লিখতে গিয়ে এরাই সমস্যায় পড়েছে।
সাধারণভাবে মানুষের পক্ষে লেখা ও চিন্তা করা সমান্তরাল কাজ, যা প্রায় সমার্থক। এ জন্য দরকার মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা; এ কারণে, এক দিকে ফরমায়েশি সরকারি অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে আবার নিজ মনে (ফ্রি আরগুমেন্টে) লিখতে হবে – এ দুই কাজ এক সাথে করা কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তবুও চাকরি বাচাতে অনেককে এমনটা করতেই হয়। সেক্ষেত্রে ফরমায়েশি সে লেখা শেষ করলেও এটা যে ফরমায়েশি, এর ছাপ লেখাতেই থেকে যায়। এ জন্য বলা হয়, চিন্তাকে বন্ধক রেখে গবেষক বা একাডেমিক হওয়া যায় না। থিংকট্যাংক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন” বা ওআরএফের [ORF] ফেলো ডঃ জয়িতা ভট্টাচার্য আর বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন বা ভিআইএফের [Vivekananda International Foundation (VIF)] ফেলো ডঃ শ্রীরাধা দত্তেরবাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দুটা আলাদা আর্টিকেল রচনায় তাদের সেই হাল হয়েছে। ভারতের মিডিয়ায় ভিআইএফ -কে বিজেপির মোদী সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্ক বলা হয়েছে।
এমনিতেই কোন একাডেমিক পরিচয়ধারী যদি আবার আনক্রিটিক্যাল হন – এটা খুবই অযাচিত কম্বিনেশন। আন-ক্রিটিক্যাল মানে যে ক্রিটিক্যাল নয় অর্থাৎ আগে থেকেই সব জানার অজুহাতে, যেকোনো জিনিসকে পুনরায় উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখে না, যাচাই-বাছাই বা সন্দেহ করার দৃষ্টি যার তৈরি হয়নি, এদের পক্ষে নিজের একাডেমিক পরিচয়ের প্রতি সুবিচার করা কঠিন। কিছু একাডেমিকের “ভারতীয় সেকুলারিজম” বিষয়ক ধারণা ও এর ব্যাখ্যার প্রতি আস্থা-বিশ্বাস এতই আনক্রিটিক্যাল যে, এটা পোপের বাইবেলের উপর আস্থা-বিশ্বাসকেও হার মানায়। অনেকের ধারণা – থিওলজিতে কারও ক্রিটিক্যালনেস বলে কিছু নেই; কিন্তু সেটিও আসলে ভিত্তিহীন। আধুনিকতাতেই শুধু ক্রিটিক্যালনেস বা উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখা ও যাচাই করা আছে, এ কথা সত্য নয়। থিওলজিতেও ক্রিটিক্যালনেস দেখা যায়। এর ভালো প্রমাণ হল, থিওলজির ইন্টারপ্রিটেশনে বা তাফসিরে ভিন্নতা। আর সেখান থেকেই একই ধর্মের নানান ইস্যুতে বিভিন্ন ব্যাখ্যার উৎপত্তি। আর তা অনুসরনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধারা বা Sect দেখতে পাওয়া যায়, যা খুবই স্বাভাবিক। তবুও ভারতীয় সেকুলারিজম ও এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোন ক্রিটিক্যাল অবস্থান দেখা যায় না।
জয়িতা ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচনের আগেই ২৬ ডিসেম্বর এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। ঐ লেখার প্রথম তিন অনুচ্ছেদ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে। এর মধ্যে এক উপশিরোনাম আছে, তা হল- “নির্বাচন কমিশনে ৭০টা রেজিস্টার্ড দলের মধ্যে ১০টাই ধর্মীয় রাজনৈতিক দল” [10 Out of 70 Religious Political Parties Registered With EC]। কিন্তু তাতে জয়িতা সমস্যা দেখছেন কোথায়? মানে তিনি এটাকে বাংলাদেশের জন্য ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন কেন? ওরা ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বলে? আর এখানে ধর্মটার নাম ‘ইসলাম’ বলে? তাই কী?
কিন্তু ব্যাপার হল, ইসলামি দল হলেই এমন খড়্গহস্ত হওয়া অপ্রয়োজনীয়। বরং এমন চিন্তার মানে, দেখা যাবে হয়ত কথিত এই ‘সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি” আসলে নিজেই ইসলামোফোবিক। আবার ভাবনা-চিন্তা করা দরকার যে এই ১০টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে ভারতে হিন্দুত্বের দল বিজেপির ফারাক কিসে? জয়িতা বিজেপিকে সহ্য করতে পারলে বাংলাদেশের এই ১০টি ইসলামী দলকে করতে পারছেন না কেন? আরও সিরিয়াস কথায় আসা যাক। জয়িতার সম্ভাব্য আপত্তি বা বিচার করার ক্রাইটেরিয়া কী? স্বভাবতই আগে ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি ঠিক না করে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব বা ফোবিক [-phobic] অথবা বিদ্বেষী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আসল কথায় আসি। জয়িতা জানাচ্ছেন – এই ১০টি দল নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড। আমরা নিশ্চয়ই বুঝি ‘রেজিস্টার্ড’ শব্দের মানে। এর সোজা অর্থ হল – বাংলাদেশের রিপাবলিক কনস্টিটিউশনকে মেনে সে অনুসারে রাজনৈতিক দলের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকতে বাধ্য বলে (দলটা নয়) নির্বাচন কমিশন মনে করে, সেসব শর্ত এই দলগুলো পূরণ করেছে। সে কারণে এরা রেজিস্টার্ড দল, সার্টিফায়েড। এখন এসব রেজিস্টার্ড দলের গায়ে গন্ধ, চিহ্ন, শব্দ ও রঙের মধ্যে যতই স্পষ্ট করে ইসলাম প্রকাশ পাক না কেন, যেহেতু বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন মেনেই এরা রেজিস্টার্ড হয়েছে, রাজনীতি করতে চাইছে, তাতে আর সমস্যা কী? একে এরপরও সমস্যা ভাবার কারণ কী? বরং এরপরও কারো কাছে ‘সমস্যা’ মনে হলে সেটি তারই ইসলামবিদ্বেষ মানে, মনের ফোবিয়ার সমস্যা হতে পারে। যেখানে এমনকি আগামীতেও নির্বাচন কমিশন যদি বাড়তি কিন্তু কনস্টিটিউশন কাভার করে, এমন কোনো নতুন শর্ত আরোপ করে, সেটাও তো এসব রাজনৈতিক দল মানতে বাধ্য থাকবে। তাহলে এরপরে আর আপত্তির কী আছে? আপনি আর কী চাইতে পারেন? আসলে সবার আগে আমাদেরকেই “চাইতে” জানতে হবে। একটা ইসলামী দল রিপাবলিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই থাকতে চাইছে, আর কী চান আপনারা? আসলে এর পরের স্তর হল, রজনীকান্তের সেই গানের কলি- “ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়”। আসলে রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য অথবা রাষ্ট্র কী, তা জানা বোঝা সম্পন্ন না হয়ে মানে, বাকি রেখে কোনো আপত্তি প্রকাশ করতে গেলে তা শেষে ‘ফোবিয়া’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।
জয়িতা ভট্টাচার্যের ওই রচনায় আর একটা উপশিরোনাম হল – তিনি বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে “ধর্মভিত্তিক দলের ভোট-শেয়ার গুরুত্বপূর্ণ নয়” [Vote-Share of Religion-Based Parties Not Too Significant]। বাস্তবে জয়িতার এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ, যেমন বলা যায় গত ২০১৩ সালের ৫ মের পরে প্রথম নির্বাচন ছিল ঢাকার বাইরের গাজীপুরসহ কিছু শহরের “মেয়র নির্বাচন”। ঐ নির্বাচনে সরকার সবখানেই গো-হারা হেরে যায়। কেন? কারণ, জামায়াত নয় এমন কিছু ধর্মীয় দল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের প্রার্থীকে ভোট না দিতে ক্যাম্পেইনে নেমেছিল; মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছিল। আর তাতেই ঐ ফলাফল হয়েছিল। তাই কেউ নিজে ভোটে দাঁড়ালে কয়টা ভোট পাবে সেটাই নয়, বরং অন্যের ভোট কত কাটতে পারবে, সেটাও এক বিরাট সক্ষমতা ও নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর এরপর থেকে, “নির্বাচনের মা মারা যাওয়াতে” সেই শোকে ঐ নির্বাচনের পর থেকে (আগের মানের) “অবাধ নিরপেক্ষ” নির্বাচন বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যায়; তা আর কখনো হয়নি। বুদ্ধিমান জয়িতা নিশ্চয়ই এসব কথা বুঝবেন। এছাড়া আরও বিস্তারে জানা ও যাচাই করতে তিনি গোয়েন্দা লাগাতে বা খোঁজ নিতে পারেন। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম আর রাজনীতির সম্পর্ক বুঝা, তা বিশেষ করে ভারতীয় সেকুলারিজমের বুঝ দিয়ে বুঝতে যাওয়া, আরও অসম্ভব।
জয়িতা ভট্টাচার্য এবং রাধা দত্তের রচনায় এক অভিন্ন ত্রুটি হল, তাঁরা আগে বলে নিচ্ছেন না যে, তারা কেবল নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে লিখছেন। কারণ, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে কি না, তা অবাধ ছিল কি না, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন কেমন ইত্যাদি আনুষঙ্গিক দিক সম্পর্কে চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এরা সেসবের কোন খোঁজ নিয়েছেন, তাদের জানাশোনা আছে, তা মনে হয় নাই। তাঁরা দাবিওও করেন নাই। কেবল সব জায়গায় “নিষ্ঠাবান যুধিষ্ঠির” (পুরাণে যে কখনও মিথ্যা বলেন নাই বলে মনে করা হয়) ভেবেছেন আমাদের নির্বাচন কমিশনের বচনকে। বলা যেতে পারে, কমিশনের বয়ানের বাইরে্র কোন উৎস ও তথ্যকে তাদের বিবেচনায় তারা কোন কারণে আনতে পারেননি বা আনেননি। এ অবস্থাতেই তাদের ওই রচনা লিখিত হয়েছে।
জয়িতার দ্বিতীয় এই লেখায়, তৃতীয় প্যারা থেকে পরের চার প্যারা মিলিয়ে তিনি একটা বয়ান সাজিয়েছেন। এর প্রথম প্যারায় বলেছেন, “বিএনপি ভোটে কারচুপির অভিযোগ করেছে”। এর পরের প্যারায় বলছেন, “কিন্তু নির্বাচন অবজারভারেরা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেনি”। [অর্থাৎ পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হল, বিএনপির অভিযোগ বাতিল হয়র গেল।] এবার পরের প্যারায় জয়িতা বলছেন, “১৯ জন লোক মারা গেছে। সুতরাং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি”। এর শেষে বলছেন, “নির্বাচনের আগে বিরোধীরা আওয়ামি লীগের ক্যাডারদের সন্ত্রাস ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। আর একইভাবে লীগও বিরোধীদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ এনেছে”। [পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]। অথচ এরপরেই আবার লিখছেন, “নির্বাচনপূর্ব ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে মানুষ ভোট দিতে আসে কিনা এনিয়ে আশঙ্কা ছিল”। কিন্তু ভোটের শেষে কমিশন বলেছেঃ আশি ভাগ ভোট পড়েছে; তাই ওই ভয়-আশঙ্কা ছিল ভুয়া”। [মানে এখানেও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]
আসলে এসব বাক্যের মাধ্যমে জয়িতা নিজের পরিচয় “থিংকট্যাংক গবেষক” থেকে “প্রপাগান্ডিস্টের” স্তরে নিজেই নামিয়েছেন। কারণ এটা কোনো গবেষকের কাজ নয়, কাজের পদ্ধতিও নয়। সাধারণ বিবেচনা হল, দু’টি বিবদমান পক্ষের বেলায় কার কথা গ্রহণ করা হবে, তা ঠিক করতে হয় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় ওয়াকিবহাল পক্ষের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি আগেই একটা পক্ষ বেছে নিয়েছেন। এটা গবেষকের উচিত নয়, কাজও হতে পারে না। কথিত কিছু নির্বাচন “অবজারভারদের” বরাতে জয়িতা বলছেন, “ভোটে কারচুপি হয়নি, কারণ অবজারভারেরা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি”। কিন্তু খোদ “অবজারভারদেরই” গ্রহণযোগ্যতা কী ছিল? তা কি তিনি জেনে নিয়েছিলেন? সম্প্রতিকালে ঐ “অবজারভারদের” অনেকেই এখন “তওবা” পড়ছেন, বড় ভুল হয়ে গেছে বলছেন। তাহলে জয়িতা এখন কী বলবেন?
শেষের প্যারায় তিনি একবার ভায়োলেন্সের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে এটা ‘ডিসমিস’ করছেন। অথচ পরের বাক্যেই বলছেন, ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে [Considering the level of pre-poll violence] ভোটার আসে কি না সে শঙ্কা ছিল। এর মানে জয়িতাই আবার মেনে নিচ্ছেন যে, আসলে উল্লেখযোগ্য মাত্রারই ভায়োলেন্স সেখানে হয়েছিল। তাহলে? মোট কথা, তার গল্পটা এখানে এসে আর মিল রাখতে পারল না।
আবার লক্ষণীয়, ১৯ জন মারা গেছে দাবি করে তিনি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, এর মানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি। আসলে এ কথার মানে হয় না। কারণ, ঠিক কতজন মারা গেলে কোনো নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ’ হবে? কোথাও এমন কোন মাপকাঠি কী আছে? আর এই মাপকাঠি কে দিয়েছে? ওদিকে আবার এই ১৯ জন কারা? কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে? এটা কেবল লীগের দেয়া ফিগার। এদের মধ্যে আওয়ামিলীগেরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যু কয়জনের? সে খোঁজ কি নেয়া হয়েছে? অথচ ‘১৯ জন মরেছে – মানে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়নি” – এসব মুখস্থ বলছেন তিনি। কোনো সিরিয়াস মানুষ বা গবেষক এভাবে মুখস্থ কথা বলার কথা না।
আবার তার লেখায় (শেষের দিক থেকে গণনায়) চতুর্থ প্যারায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনে বাধা’ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন জয়িতা। অথচ এর আগে আমরা দেখেছি বিরোধীদের তোলা অভিযোগ নাকচ করেছিলেন জয়িতা। কেন? সে ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। তাহলে শেষে দাঁড়ালো কী? জয়িতার লেখা পড়ে মনে হয়েছে সরকারি “ব্রিফিং ঠিক রাখতে আর, ভাষ্য ব্যালেন্স করতে গিয়েই তিনি তাল হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ কারও ভাষ্যের ব্রিফিং ঠিক রাখা, সেই তালে কথা বলা কোনো গবেষকের কাজ হতে পারে না। এভাবে তিনি নিজেই নিজের কাজের মান প্রকাশ করলেন।
শ্রীরাধা দত্তের লেখা : আমাদের নির্বাচনের পরে তাঁর লেখা দেখেছি একটাই। আর সে লেখার চার ভাগের তিন ভাগই হল, আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর দিয়ে ভারতের কত কী উন্নতি করে দিয়েছেন, এরই ফিরিস্তি। অথচ এই লেখার মূল প্রসঙ্গ আমাদের নির্বাচন কাভারেজ। অর্থাৎ এই লেখার সাথে বাংলাদেশের নির্বাচন বা শেখ হাসিনার বিজয়ের সম্পর্ক কী? অথবা এটা কি বাংলাদেশের কোনো উন্নয়নের গল্প? হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর উন্নয়ন করে দিয়েছেন, তাই কী? সেটা যাই হোক ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।
শ্রীরাধার লেখায় শেষের একটা প্যারায় এক অদ্ভুত কথা আছে। তিনি লিখেছেন- “বিএনপি নিজেই দায়ী”। কোথায় কী বিষয়ে আমরা তা দেখব। তবে রাধা সবচেয়ে কড়া এক বাক্য লিখেছেন। সে কথাটি হল – আওয়ামী লীগের জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পেল আর বিএনপি জোট মাত্র সাতটি পেল; এটা ”মনে হচ্ছে আমি মানতে পারলাম না”[looks unconvincing]।
কিন্তু তিনিই শেষের দিকে বলছেন, “২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ওয়াকওভার দিয়েছে”। কিন্তু এবারের ফলাফলের জন্য অন্য কেউ নয় তাঁরা নিজেরাই দায়ী। এমনকি যদি কেউ মেনেও নেয় যে নির্বাচনে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সর্বত্র হাত ঢুকানোর অভিযোগ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, আর যেকোন ভিন্নমতের প্রতি তাঁর দমনের নীতি তবুও সরকার বিরোধীরা নিজেই আসলে নিজেদেরকে কোণায় চিপার মধ্যে ফেলার জন্য দায়ী। […this time around they have none to blame for their dismal performance. Even if one accepts the allegations of executive overreach, Hasina’s intolerance, and her increasing repressive ways towards any contrarian views, the opposition had really bound themselves into a corner]।
অর্থাৎ বলছেন- “এবারো খারাপ ফলাফলের জন্য বিরোধীরা অন্যকে দায়ী করতে পারে না। যদি নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, ক্রমবর্ধমান বিরোধী মত দমন এসব অভিযোগ যা-ই ঘটুক তা সত্ত্বেও বিরোধীরা নিজেই নিজেদের এক কোনায় বন্দী করেছে”।
এটি কি নুন্যতম অর্থপূর্ণ কোন কথা? না পুরাটাই স্ববিরোধী? দুঃখিত, আসলেই বুঝতে অপারগতা জানাচ্ছি। পাঠক নিজেকে সাহায্য করেন……।
এ কারণেই, শুরুতে বলেছি বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন ভারতের থিংকট্যাংকগুলোকে অর্থপূর্ণ অন্তত কয়েকটা বাক্যও লিখতেও বিশাল বিপদেই ফেলে দিয়েছে, দেখা যাচ্ছে!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নির্বাচনঃ ভারতের থিংকট্যাংকের বিপদ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যেভাবেই হোক, শেষ হয়েছে। সেই সাথে শেষ হয়েছে এ নিয়ে ইতি বা নেতিবাচক বিভিন্ন উচ্ছ্বাসও। এই নির্বাচনে বিদেশী মিডিয়ার নজর পড়া যথেষ্টই ছিল বলা যায়। নির্বাচনি খবর সংগ্রহ করতে এসে তাদের তৎপরতা দেখা গিয়েছিল নির্বাচনের আগে-পরে মিলিয়ে মোট প্রায় দশ দিনের মত, যা এখন আস্তে আস্তে কমে আসছে বা নেই।
নির্বাচনের আগে বা ফল প্রকাশের পরে বিদেশী মিডিয়া বিশেষ করে যারা অর্থনীতি-ফোকাসের মিডিয়া যেমন, লন্ডন ইকোনমিস্ট বা আমেরিকার ব্লমবার্গ– এদের রিপোর্ট হল মুখ্যত জিডিপি-দেখা কেন্দ্রিক। আর এদের সাফাইয়ের সরল বয়ান কাঠামোটা হল – ‘বাংলাদেশের জিডিপি ভাল মানে, বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে, অতএব হাসিনা আবার জিতবে’, অথবা ‘জিতেছে’। এ ছাড়া আরও যারা বাংলাদেশে নির্বাচনি ইস্যুতে এসেছিলেন এমন অন্যদের মধ্যে ছিল যেমন, লন্ডনের গার্ডিয়ান, আমেরিকার ভোয়া, গ্লোবাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স,দক্ষিণ ভারতের দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয় অথবা নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম ইত্যাদি- এরা সবাই অন্য যে বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছে তা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের নাগরিক অধিকারহীনতার দুর্দশা। অর্থাৎ নাগরিক অধিকারের খবর নাই, জিনিষটাই অনুপস্থিত বা গায়েব। ফলে এর অনুষঙ্গ – গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা তথা বিরোধী দল বা সরকার-বিরোধীদের গায়েবি মামলা থেকে পালিয়ে বেড়ানো বা গ্রেফতার; অথবা কোনমতে নির্বাচনে থাকলেও সমান সুযোগ না পাওয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ এরাই মূলত রাজনৈতিক দিক মুখ্য করে লেখা রিপোর্ট বা আসল রিপোর্ট করেছে। যদিও এই দ্বিতীয় তালিকার মিডিয়াগুলোও তাদের দ্বিতীয় পয়েন্ট হিসাবে “ভাল জিডিপি” বিষয়টাকে সরকারের পুনর্বার জিতবার ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হিসাবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ কমবেশি সব বিদেশী মিডিয়া যে তর্কের চক্কর তৈরি করে রিপোর্ট লিখেছে তা পশ্চিমের ভাষায় বললে – ‘ডেমোক্রেসি বনাম ডেভেলপমেন্ট’- এর নির্বাচন। অর্থাৎ রাষ্ট্রে ‘নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার’ [Political Right] থাকাটা জরুরি নাকি ‘উন্নয়ন’ হলেই চলে – এভাবে তর্কটাকে হাজির করে এবার দাবি করা যে ‘উন্নয়নের’ কারণে হাসিনার জেতা উচিত বা জিতবে। এই হলো বয়ান।
খুবই চাতুরি তর্ক সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেক রূপে এই তর্কের হাজিরা অনেক পুরনো, সেই পাকিস্তান আমলের। আইয়ুব খানের শাসনের দশককে (১৯৫৮-৬৮) প্রশংসা আর সাফাই যোগান দিতে তখন যা বলা হত ওর সার কথা ছিল – পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে ঠিকমত কখনই ওর একটা কনস্টিটিউশন রচনা করতে ক্ষমতাসীনরা সক্ষমতা দেখাতে না পারলেও সেকালের শাসক আইয়ুব খান প্রচুর ‘উন্নয়ন’ করেছিলেন। সুতরাং আইয়ুবের শাসন জায়েজ। আর তাই ঢং করে বলা হত “আয়ুবি ডেভেলবমেন্ট ডিকেড”। পুরনো সেই তর্কটাই এবার আবার বাংলাদেশে ভেসে উঠেছে। কিন্তু কবে থেকে? অনেকে আবার সেটা খেয়াল করেনিই হয়ত।
ব্যাপারটা ঘটেছিল গত ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকার গড়ার পরে। আসলে সে সময় হাসিনার ওই “বিশেষ নির্বাচন ও সরকারের” পক্ষে একটা সাফাই যোগাড় ও খাড়া করে দেয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই আমরা দেয়ালে চিকা মারা দেখেছিলাম যে “হাসিনা হলেন বাংলাদেশের মাহাথির”। মাহাথির-এর নাম নেয়া এজন্য যে,যারা উন্নয়নের আড়ালে সব রাজনৈতিক দুর্বলতা ও খামতি ঢেকে ফেলতে দক্ষ তাঁরা বলেন মালয়েশিয়ার “উন্নয়নের” প্রতীক মাহাথির, তবে তাঁরা সাবধান থাকেন যাতে তা নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের নেতা বলে কেউ ভুলে না বুঝে। তবে বাংলাদেশে এবারের নির্বাচন শুরুর এক বছর আগে থেকেই উন্নয়নের স্লোগান দিয়েই হাসিনা আসন্ন ভোট বা পাবলিক মোকাবেলা বা তাঁর সমালোচনা মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।
সব জিনিসের বিকল্প হয় না, আমরা করি না। একটার বদলে অন্য একটা হলেও চলে এই অর্থে বিকল্প খুঁজি না বা সন্তুষ্ট হই না। মানুষের জীবন চাহিদায় এমন বহু কিছু বিষয় আছে। এ রকম বিষয়টা বুঝাতে ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে ‘নন-নিগোশিয়েবল’(non-negotiable)। মানুষের জীবনের যেসব বিষয়ের বিকল্প হয় না বলে মনে করা হয়, আমরা বিকল্প খুঁজিই না, সেগুলোই আসলে নন-নিগোশিয়েবল । যেমন ‘মায়ের ইজ্জত’ নিয়ে নিগোশিয়েশন চলে না, তাই এটা নন- নিগোশিয়েবল। ঠিক তেমন কোন রাষ্ট্রে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার বা মৌলিক মানবিক অধিকার একেবারেই নন-নেগোশিয়েবল। কথাটার বইয়ের ভাষা থুয়ে, ব্যাপারটা আর ভেঙে বলা যাক। যেমন বলা হল – রাষ্ট্র আপনাকে পেট পুরে খেতে দেবে, চাকরি, আরামসহ আরো বহু কিছু দেবে এবং একদম নিশ্চয়তার সাথে। কিন্তু আপনি বেমালুম গুম, খুন হয়ে যেতে পারেন সে সম্ভাবনাও সাথে আছে; রাষ্ট্রের দিক থেকে এসব থেকে কোন সুরক্ষার নিশ্চয়তা নেই, প্রতিশ্রুতি নেই। এখন আপনি কি রাজি আছেন? এটাই উন্নয়ন দিয়ে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করা বা ভাবার প্রশ্ন। আসলে রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল করে ফেলা যায় মনে করা আর এর বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নতিকে মুখ্য ও বিকল্প কাম্য মনে করা – এটাই ‘উন্নয়নের রাজনীতির’ ভাবনা। দুনিয়ার সব স্বৈর শাসকের কমন লক্ষণ এটা।
বস্তুত নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার নন-নেগোশিয়েবল। আমরা উন্নয়ন খেয়ে এর বিনিময়ে গুম-খুন হয়ে যেতে রাজি হতেই পারি না। তাই এটা নেগোশিয়েবল বলে মনে করার সোজা মানে হল, আসলে আপনার রাষ্ট্রটাই নাই। কারণ রাষ্ট্র- এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উদ্দেশ্য ও কাজ হল নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়া, বাস্তবে এই সুরক্ষা দেয়া, প্রতিরক্ষা বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র যদি তা না করতে পারে, না দেয় তাহলে সে রাষ্ট্র অপ্রয়োজনীয়, খামোখা। এর বদলে রাষ্ট্র হয়ে যায় তখন বড়জোর একটা পৌরসভা। কিন্তু রাষ্ট্র কখনই পৌরসভা নয়। রাষ্ট্রের কাজ ও ভুমিকা – পানি বিদ্যুত ড্রেনেজ রাস্তা ইত্যাদির মত উন্নয়ন দেয়া নয়। সেকাজের জন্য একটা পৌরসভা বা মিউনিসিপাল্টিই যথেষ্ট। রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা, ইনসাফ দেয়া, সিরক্ষা এগুলোর নিশ্চিতের জন্যই মূলত আমাদের রাষ্ট্রগঠন নির্মাণ দরকার। তাই উন্নয়ন এর কথা বলা মানেই রাষ্ট্রকে পৌরসভায় নামিয়ে আনা। অথচ রাষ্ট্র [State] কোনভাবেই পৌরসভা নয়।
কাজেই কোনো দেশের নির্বাচনের আসরে এসে বিদেশী বা দেশী মিডিয়ায় সরকারের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার রেকর্ডের আলোচনাকে পেছনে ফেলা বা আড়াল করে ফেলাটা খুবই খারাপ ধরণের চাতু্রি। জেনে বা না জেনে নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে নেগোশিয়েবল বিষয় করে ফেলা – বিকল্প হিসাবে উন্নয়ন বা জিডিপির ফিরিস্তি তোলার মিডিয়া রিপোর্ট – এটা সেই বিরাট চাতুরী। তারা অর্থনীতির মিডিয়ার লোক তাই রাজনীতি বোঝে না – এমন বুঝে নাই ভাব ধরে এরা পিঠে ছুরি মারে।
অথবা এই চাতুরী যেন উট আর বিড়ালের গল্প। যেমন একবার এক হাটে এক উট বিক্রেতা উটের দাম চাচ্ছে মাত্র এক টাকা। কিন্তু শর্ত হল ওই উটের সাথে একটা বিড়াল নিতেই হবে; যে বিড়ালের দাম পাঁচ লাখ টাকা।
এই ব্যাপারগুলো বিদেশী প্রভাবশালী মিডিয়াতেই বেশি হচ্ছে ও হয়ে থাকে। এর পেছনের মূল কারণ, এই মিডিয়াগুলো মূলত আমাদের মত দেশে দেখতে আসে বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের চোখ – এমন মিডিয়া হিসাবে। বিদেশী ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের পয়সাতেই তাদের আয় ও জীবিকা। তাই উন্নয়ন ও জিডিপি দিয়ে তাদের একটা নির্বাচন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার ঝোঁক দেখা যায়।
বাংলাদেশে নির্বাচন উপলক্ষে প্রকাশিত যাদের রিপোর্ট আমাদের নজরে এসেছে এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে অনেকে ব্লমবার্গকে (Bloomberg) মনে করেন। কারণ এই মিডিয়াটা “ওয়াল স্ট্রিট” ধরণের বিনিয়োগ কোম্পানীর সরাসরি মালিকানা বা বিনিয়োগ আছে। এবারের বাংলাদেশ নির্বাচনের আগে, তাদের রিপোর্টের সার কথাকে শুরুতে দেয়া দুই বুলেট বাক্য হল – ১. দ্রুত বেড়ে চলা অর্থনীতি হাসিনাকে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আনতে পারে। ২. বিরোধী নেতা জেলে বলে ভায়োলেন্স নতুন করে বাড়তে পারার শঙ্কা।
Fast-growing economy may propel Hasina to third term in power
Fears of fresh violence grow as opposition leaders jailed
অর্থাৎ এখানে সরাসরিই বলা হচ্ছে, রাজনীতিক অধিকারের দশা পরিস্থিতি নয়, জিডিপিই নির্বাচনে বিজয়ের একমাত্র নির্ণায়ক – এই আগাম অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে আবার বলে রাখা ভালো যে, ব্লমবার্গ- এই মিডিয়া গ্রুপ না হলেও অন্য অনেকে আবার অনেক সময় ‘পেজ-বিক্রি’ করার কারণেও এমন রিপোর্ট করে থাকে।
কিন্তু তবুও জিডিপিভিত্তিক আগাম অনুমানের এমন রিপোর্ট – যেটা দাবি করছে যে বাংলাদেশের জিডিপি ভাল এর মানে এটা হাসিনা মেলা উন্নয়ন করেছে তার প্রমাণ – একথা কী গ্রহণযোগ্য? সম্ভবত না। এটাও যথেষ্ট সাফাই নয় বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ জিডিপি বাড়লেই তা সরকারের সাফল্য কি না, এর সপক্ষে ঐ রিপোর্টে সরাসরি কোনো সাফাই নাই। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতি খুবই ব্যতিক্রমী ধরণের। তাই জিডিপি বাড়া মানেই তা সরকারের প্রত্যক্ষ সাফল্য এটা নাও হতে পারে। বাংলাদেশ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের তাই গতানুগতিক চোখে কেবল জিডিপির বাড়া-কমা দিয়ে সাফল্য মাপতে যাওয়া, হদিস করা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন, দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ১৭০ দিন হরতাল থাকলেও জিডিপিতে এর প্রভাব নেই। জিডিপি একই রকম থেকেছে।
যদিও এর সম্ভাব্য কারণ কী, এ নিয়ে কোনো ফরমাল স্টাডি নাই। তবুও এর সম্ভাব্য কারণ বলে যা অনুমান করা হয় সেই ফ্যাক্টরটা হল – রেমিট্যান্স। খুব কম দেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স এমন ফ্যাক্টর হয়ে থাকে। তাই এটা আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ বৈশিষ্ট বা ব্যতিক্রম। বিদেশে গরিব শ্রমিকের শ্রম বেচা অর্থ – বিদেশী মুদ্রা নিয়মিত আসে। এটা বলাই বাহুল্য, যে দেশের হরতালের সাথে এই আয়ের কম-বেশি হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই। এ ছাড়া আরেক গুরুত্বপর্ণ দিক হল, ৯০ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার আয় আসে গার্মেন্টস থেকে। এখন এর থেকে কাঁচামাল, মেশিনারিসহ ইত্যাদি্র বৈদেশিক মূল্য পরিশোধে বাদ দেয়ার পর যা নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয় থাকে; দেখা যায় প্রতি বছর এর পরিমাণ যদি ১৪ বিলিয়ন ডলার হয়, তবে মোট রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও দেখা যায় আরও ১৪ বিলিয়ন ডলার, মানে প্রায় এর সমান। অর্থাৎ রেমিটেন্স আর রপ্তানি আয় প্রায় কাছাকাছি।
এখন যদি রপ্তানি আয়ের জন্য সরকারকে ক্রেডিট দেই তাহলে ঠিক আরও সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আয়ের অবদানের জন্য তো কাউকে ক্রেডিট দিতে হয়! অথচ ফ্যাক্টস হল, রেমিট্যান্স আয় লাভের সাথে সরকারের পারফরমেন্স খুব কিছু সম্পর্ক নাই। মূলত এ কারণেই আমাদের অর্থনীতিকে বলা হয় রুটিন অর্থনীতি, মানে বিশেষ সরকারের খুবই বিশেষ ভূমিকা এখানে থাকে না। বিদেশি সাংবাদিকেরা এসব দিক আমল না করে যেকোনো দেশের মত শুধু জিডিপি দেখে ধারণা বা অর্থনীতি বুঝতে চাওয়া তাৎপর্যহীন। তবে কোন মিডিয়া রিপোর্ট যদি জিডিপি ফিগারকে দেখিয়ে তা সরকারের প্রত্যক্ষ পারফরমেন্স বলে দাবি করতেই চায়, সে ক্ষেত্রে তাকে সবার আগে – সম্পর্ক বা প্রমাণ দেখাতে হবে যে সরকারের অমুক বিশেষ নীতি-পলিসি-পদক্ষেপের কারণে জিডিপি বেড়েছে। এমন দেখানোর আগে কোন দাবি হবে অমূলক ভিত্তিহীন। আমরা কোথাও এমন প্রমাণ এখনও দেখি নাই। তাই জিডিপি বৃদ্ধিকে সরকারের পারফরমেন্স এর সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করা ভিত্তিহীন।
তাই সার কথাটা দাড়াচ্ছে, জিডিপি বা উন্নয়নের সাফাই দিয়ে বিদেশি মিডিয়ার নির্বাচনী রিপোর্ট- এগুলো সারবত্তাহীন প্রপাগান্ডা; কোন ভিত্তি প্রতিষ্ঠা আগে না করে করা উড়া দাবি মাত্র।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে গত 0৫ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “বিদেশী মিডিয়ার নির্বাচনী কাভারেজ“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]
পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কেমন? মানে সম্পর্ক বলতে ভেঙ্গে বললে, স্ট্রাটেজিক, ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল সম্পর্ক কেমন, এই হল প্রশ্নটা। কোন দুই রাষ্ট্র তা ঘোষণা দিয়ে বললে স্বভাবতই তা বুঝতে সহজ হয়। তবে না বললেও আন্দাজ অনুমান করে অনেক কিছুই প্রায় সঠিক জানা যায়। আসলে আমেরিকা এবং বিশেষ করে ভারতের সবচেয়ে গভীর আগ্রহ হল, স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী – তা জেনে ফেলার। ভারতের এই আগ্রহের তীব্রতা টের পাওয়া যায়, তাদের সব মিডিয়ায় ব্যবহৃত একটা শব্দ থেকে। সেটা হল, “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” (all weather friend); যেমন তারা খোঁচা দেওয়া মন্তব্য হিসাবে প্রায়ই লিখে থাকে যে – চীনের “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” পাকিস্তান ওমুকটা করতে যাচ্ছে……। তবে “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” লেখাটা যতটা না খোঁচা দিয়ে বলা এর চেয়ে বেশি এটা আসলে এক ঈর্ষামূলক আক্ষেপ। “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” মানে যারা খারাপ বা ভাল যে কোন পরিস্থিতিতেই বন্ধুই থেকে যায়। এছাড়াও আর একটা বিষয় হল, সাধারণভাবে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী তা জানাবুঝা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট করে “চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের” [CPEC projects] পিছনে স্ট্রাটেজিক বিষয়াদি কী লুকানো আছেও তা জানতে ভারত ও আমেরিকা বিশেষভাবে আগ্রহী।
পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকার এ’এক নতুন ধরনের ক্ষমতা। আমাদের আগের দেখা বা পুরনো অভিজ্ঞতায় যেসব ধারণা আছে তা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন। আমাদের মত রাষ্ট্র মাত্রই, আমরা সাধারণত দেখি এক বিশেষ কোটারি অথবা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ও দুর্নীতি সেখানে ঘটবেই। এটা গেল এক দিক আর অন্য দিকে থাকবে ঐ গোষ্ঠী নিজেদের কোটারি কোনো লাভালাভের লোভে বিদেশী কোনো স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মুখস্তের মত আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ইমরানের আগমন অন্তত এই অর্থে নতুন যে, এই ক্ষমতা আমাদের দেখা বা জানা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে অনেক কিছুই আমরা ভিন্ন দেখব, তা অনেকেই আশা করে।
কিন্তু কতটুকু নতুন বা ভিন্ন? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ ফিরানো দরকার। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য কাজ বা পদক্ষেপ নিতে পারে না। অন্তত পারেনি। পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করে এসেছে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যে ধরনের যুদ্ধকে আমরা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলি। মানে অন্যের স্বার্থে তার যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সেই যুদ্ধ করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। যেখানে সাধারণভাবে প্রক্সি মানে হল, স্কুলের ক্লাসরুমে নাম ডাকার সময় অনুপস্থিত বন্ধুর হয়ে “উপস্থিত” বলার মত। আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ খেটে দেওয়া – এবিষয়ে আদি গ্লোবাল ঐতিহাসিক ঘটনা বা শুরুর ঘটনাটা হল, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়া, আর তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্ত মধ্য এশিয়ায় এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয় পেয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের (বাফার গড়তে) আফগানিস্তান দখল করা; আর এবার তা ঠেকাতে বা উল্টে দিতে আমেরিকা, পাকিস্তানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে নিজের প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা – মানে মোজাহিদিন লড়াই শুরু করা – এটা ছিল প্রথম পর্ব। আর এরই লেজ ধরে দ্বিতীয় পর্বে, আলকায়েদা-তালেবান বনাম আমেরিকার ওয়ার-অন টেরর যুদ্ধে এরই ময়দান হিসেবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত হওয়া, যুদ্ধে ঝাপায় পড়ার পাটাতন হিসাবে আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভুমি ব্যবহার করতে দিয়ে নিজে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।
ফলে এই দুই ইস্যুতে গত ৩৮ বছর ধরে পাকিস্তান অন্যের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। না এটা অবশ্যই পাকিস্তানের স্বেচ্ছায় করা কাজ নয়। এছাড়া এর মধ্যে তা যতটা না নিজ স্বার্থে এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আমেরিকান স্বার্থে আর আমেরিকার চাপের বাধ্যবাধকতায় পাকিস্তান করেছে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে যে পাকিস্তান আর আমাদের মত এক আম- রাষ্ট্রের মতো থাকেনি। এ এক বিরাট ব্যতিক্রমী, বিশেষ রাষ্ট্র হয়ে গেছে। যে নিজের স্বার্থ না থাকলেও আমেরকান স্বার্থে নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েই শেষ হয় নাই। এরপর আবার আমেরিকাই অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই বিচারে পাকিস্তান আমাদের মত একই পাল্লায় তুলনাযোগ্য রাষ্ট্র কি না সেই প্রশ্ন অনেকে তুলতে পারেন। তবে এই আলোকেই সার কথাটা হল, গত ৩৮ বছরে পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য, নিজের জন্য রাষ্ট্র থাকেনি, কাজ করেনি।
কিন্তু ওদিকে আরেক সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা হল, পাকিস্তান নিয়ে যেকোনো আলোচনার সময় বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেকোন সিদ্ধান্ত যে পাকিস্তানের নয় – এই প্রক্সি-খেটে বেড়ানো, বিশেষ করে আমেরিকান স্বার্থের দায়ের বাধ্যবাধকতায় চলে বেড়ানো, সে কথা মনে রাখে না। মনে রেখে কথা বলে না। পাকিস্তান যেন স্বাধীন – এই অনুমান ধরে নিয়ে এরপর পাকিস্তানের সমালোচনা ও মূল্যায়ন শুরু করেন। সবচেয়ে তামাশার কথা হল, বুশের আমল থেকে পরের সব আমেরিকান প্রশাসন পাকিস্তানের যেকোনো সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ যে আমেরিকারই স্বার্থে প্রক্সি পদক্ষেপ সে কথা স্বীকার না করে, দায় না নিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকেন।
তবু এগুলোও মূল বিষয় নয়, আরো দিক আছে। তা হল, প্রক্সি যুদ্ধের এই কালের পাকিস্তানের অপর দুটা রাজনৈতিক দল, নওয়াজ শরীফের পিএমএল (PML-N) আর ভুট্টো পরিবারের পিপিপির (PPP) ভূমিকা। তারা এই প্রক্সি যুদ্ধের পাকিস্তান পরিস্থিতিতে নিজেরা যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছে তা হল – যেহেতু আমেরিকান ইচ্ছা, চাহিদা বা সিদ্ধা্নতের পক্ষে থাকা তাদের আমলের সরকারের পক্ষে এড়ানো বা ভিন্ন কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থেকে চুরি আর লুটপাটের বন্যা বইয়ে দেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ – কারণ আমেরিকানদের খেদমতে খেটে যাবার করার কারণে ক্ষমতা তো নিশ্চিত! আর তাতে দায় দোষারোপ সব আমেরিকার ওপর দেয়া যাবে। এই দুই দল এখান থেকে পাকিস্তানকে দেখেছে – আর এটাই পাকিস্তানের দুরবস্থায় সবকিছুর উপরে দুর্ভাগ্যের দিক। এ কারণে আজ পাকিস্তানের ক্ষমতার করিডোরের আলাপে এক চালু হিসাব হল, নওয়াজ অর্থ লোপাট করে বিদেশে রেখেছে দুই বিলিয়ন ডলার, আর ভুট্টো পরিবার রেখেছে এক বিলিয়ন ডলার।
এভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থায়। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান এবার ক্ষমতায় এসেছেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট স্বাক্ষ্য দিয়ে, ডাটা ও গ্রাফ এঁকে দিয়ে বুঝিয়ে, বলছে পাকিস্তানের চরম খারাপ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য ইমরান দায়ী নয়। আগের সরকার নওয়াজ শরীফ দায়ী। [The economy’s troubles are not Mr Khan’s fault.] তবে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের দেউলিয়া এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে এখন ১৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পাকিস্তান রুপির ডলার বিনিময় মূল্যমান গত এক বছরে ৯১ থেকে নেমে এখন ১৩৪ রুপিতে ঠেকেছে। কথাগুলো বলা হচ্ছে এ জন্য যে, ইমরানের ক্ষমতার শপথের পরের প্রথম মাস তার কেটেছে সৌদি, চীন নাকি আইএমএফ – কার কাছ থেকে নুন্যতম ঋণ-মুক্তির অর্থ বা “বেল আউট”-এর অর্থ পেতে পারে সেই খোঁজাখুঁজিতে। সৌদিদের উপর প্রবল ভরসা করে ইমরান নিজেই প্রথম সফর হিসাবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঋণ দেওয়ার বদলে, CPEC projects এ বিনিয়োগের শেয়ার নিতে স্বেচ্ছায় এক পালটা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমরানের বিবেচনায় সঠিকভাবেই এই প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে খামোখা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ সৌদি প্রস্তাবে একমত হতে চীনকেও বুঝাতে হবে, রাজি করাতে হবে ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। তাই সৌদি প্রস্তাব ফেলে রাখা ছাড়া ইমরান উপায় দেখেন নাই।
গ্লোবাল অর্থনীতির (Global Economic Order) দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের যুগ চলছে; অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পালাবদলে এটা আমেরিকার জায়গায় চীনের আগমন ও সেই স্থান দখলের কাল। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদুর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এ দিকে এই মূল লড়াইয়ে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, একাজে বাড়তি সুবিধা পেতে ভারতকে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে দেখা যায়। যদিও সবসময় আবার তা নিজ অন্য স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে না, সেকথাও সত্য।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (China–Pakistan Economic Corridor বা CPEC projects) – মোট ৬২ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প যা উত্তর দক্ষিণ বরাবর পাকিস্তানের বুক চিড়ে করাচির গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে একেবারে চীনের জিনঝিয়াং (Xinjiang Uyghur Autonomous Region) উইঘুর প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত এক হাইওয়ে তৈরি হচ্ছে। তাই এই প্রকল্পটা আসলে চীনকেই পাকিস্তানের করিডোর দেয়া। অর্থাৎ পুরোটাই কেবল পাকিস্তানের স্বার্থে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়। চীনের উইঘুর প্রদেশ ল্যান্ডলকড অঞ্চল; ফলে এর বধ্যদশা ঘুচাতে, অঞ্চলটাকে সমুদ্রপথেও যোগাযোগ করিয়ে দিতে, রাজনৈতিকভাবে উইঘুর মুসলমানদের মন-জয় করতে, তাদের পিছিয়ে থাকা দশা থেকে মুক্ত করতে – চীন এটা নিজের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মনে করে।
কিন্তু আমেরিকা (সাথে ভারতও) নিজেদের সন্দেহ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে চীন-পাকিস্তানের এই বাস্তব বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চরমতম বিরোধিতা করে থাকে। পাকিস্তান আমেরিকার প্রভাবের হাত থেকে ছুটকারা পেয়ে যাচ্ছে এই প্রকল্পের মত তৎপরতার কারণে। ফলে এই প্রকল্প পুরোটাই আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে এরা দেখে। কিন্তু ওদিকে আমেরিকা ও ভারতের জন্য আর এক চরম অস্বস্তিকর একটা ফ্যাক্টস হল, করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের মূল চার প্রদেশকে এক সাথে এক জায়গায় এনেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর দিয়ে গেছে, তাই এটা কেবল কেন্দ্রের নয় পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক সরকারও স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের দিক থেকে এই প্রকল্পকে অনুমোদন করে স্ব স্ব প্রাদেশিক পার্লামেন্টেও সিদ্ধান্ত পাশ করেছে। এমনকি বেলুচিস্তান যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে তাদেরও কোনো পক্ষই এই প্রকল্পের ঠিক বিরোধী নয়।
এসব কিছুর মূল কারণ সব প্রদেশের জনগণও এই প্রকল্পকে দেখে থাকে এক হাইওয়ে ধরে রপ্তানিতে গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ, এতে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্রিয় হতে নিজ নিজ প্রাদেশিক স্বার্থেও বিকশিত হওয়ার জন্য এই প্রকল্পকে বিরাট নিয়ামতের মত মনে করে। ফলে চার প্রদেশ অন্তত একটা ইস্যুতে পুরো পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার চীনেরও স্বার্থে এই অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবহৃত হবে বলে এর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করার দায়ভার এবং এর ঋণ পরিশোধের দায়ভার পাকিস্তানের সাথে চীনেরও। কিন্তু এসব বিষয়গুলো কিভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে লেখা আছে – সেটা বিলিয়ন ডলারের এক কৌতূহল আমেরিকার (সাথে ভারতেরও) কাছে। তাদের গভীর অনুমান যে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে।
আসলে অর্থনৈতিক স্বার্থ মানেই সাথে জড়ানো থাকে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থঃ এই প্রকল্পের শিরোনামেই বলা আছে এটা “অর্থনৈতিক” প্রকল্প। অর্থাৎ এটা কোন সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থে নেয়া যুদ্ধ করার প্রকল্প নয়। তবুও তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ শতভাগ যেকোন অর্থনৈতিক প্রকল্পেও ওর নিরাপত্তার দিক থাকবেই; ফলে সেই সুত্রে ওর সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকও থাকেই, তা আলাদা করা যায় না। এই ব্যাপারটা আমেরিকা বা ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। যখন চীন অর্থনৈতিক ভাবে কেবল জাগতে শুরু করছে কেবল, সেই ২০০৮ সালের একটা ঘটনা হল – মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন এফেয়ার হাউজ কমিটির সামনে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হায়ার করে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের আলোচনায় চীন উত্থানের প্রভাব কী এনিয়ে মুল্যায়ন রিপোর্ট করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রফেসরকে কংগ্রেস কমিটিতে শপথ করিয়ে যেমন জেরার শুনানি চলে তা চলেছিল। যেখানে প্রফেসর স্বাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল চীনের অর্থনীতিতে বাধা সৃষ্টি করে একে ডুবিয়ে দিবার উপায় কী। চীনে জ্বালানি তেল আনা আর রপ্তানি পণ্য পাঠানোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে, চোকিং পয়েন্ট মানে ঠুটিই চিপে শ্বাস রুদ্ধ করে ধরা সম্ভব এমন এক চিকন হয়ে পড়া নৌচলাচল পথের অংশ আছে, (Strait of Malacca বা বাংলায় মালাক্কা প্রণালী নামে) মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মাঝে। যা চিপে ধরলে মানে এই ৯০০ কিমি চিকন হয়ে থাকা নৌপথে – ইচ্ছা করে কোন জাহাজ ডুবিয়ে নৌচলাচল ব্লক করে দিলেই চীনের অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে আমেরিকাকে আর যুদ্ধ করতে লাগবে না। এই ছিল ঐ প্রফেসরের যুক্তি ও পরামর্শ। এখন আমেরিকান সিনেট যদি চীনের ক্ষতি করতে এই আলাপ করতে পারে তাহলে চীন পালটা তার দুর্বল জায়গা – ঐ মালাক্কা প্রণালীর অনেক অনেক বিকল্প তৈরি করে রাখবে না কেন? আর চীন তা করলেই, “চীন অর্থনীতির সাথে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ” মিলিয়ে ফেলছে – আমেরিকা ও ভারতের এই ভুয়া চিৎকার অর্থহীন। ফলে পাকিস্তানের গোয়াদর অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতায় [এমন কি হবু বাংলাদেশের সোনাদিয়ায়ও আর একটা ] গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে তা ব্যবহার করে – চীন মালাক্কা প্রনালীর বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের উপায় করে নিবে – এটাই কী সবচেয়ে স্বাভাবিক নয়? এই অবস্থায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে কেবল “ভারতকে মুক্তা মালার মত ঘিরে ফেলতেছে”, তাই ভারতের হাসিনাকে চাপ দিয়ে বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় আর একটা বন্দর করা ঠেকিয়ে রাখতে হবে – এসব বক্তব্য কোন এক পেত্নির নাকি-কান্না ছাড়া আর কী? তাহলে সারকথা, কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প যত বড় হবে তাতে উল্লেখ করা থাক আর না থাক, ওর সাথে সাথে এক সামরিক -স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ততই বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোন (৫ থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলারের) বড় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রকল্প কোন রাষ্ট্র কেন নিবে? বরং নিতেই পারে না।
কিন্তু প্রশ্ন এত দূরে কেন উঠছে? কারণ, পাকিস্তান ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরে এখন আইএমএফ টিমের চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তান সফর এবং মূল্যায়নে বসা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে খবর হল, পাকিস্তান সফর করছে এমন আইএমএফের টিম বলেছে, তাদেরকে CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে যে পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া আইএমএফের জন্য কতটা রিস্ক বা দায় নেয়া হয়ে উঠতে পারে। যদিও পাকিস্তান এই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু ভারতের মিডিয়া প্রবল আগ্রহ তৈরি করেছে যে এইবার “আঙ্কেল স্যাম” তাদেরকে CPEC করিডোর চুক্তির হদিশ পাইয়ে দিবেই।
এখানেই হল আসল ইস্যু। আগেই বলেছি, আমেরিকার (সাথে ভারতও) কাছে তাদের অনুমান হল, চীন-পাকিস্তানের ওই প্রকল্পের চুক্তিতে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি কী আছে তা এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে। তাই তাদের প্রবল কৌতূহল ওই চুক্তিতে কী আছে তা জানার।
এখন আইএমএফকে দিয়ে চুক্তির “স্টাটেজিক তথ্যের দিক হাতিয়ে” আমেরিকা কি তার সেই প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল মিটিয়ে নিতে পারবে? আমরা স্মরণ করতে পারি, ইমরান খান সরকারের শপথ নেয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানের লোন প্রসঙ্গ উঠতেই আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে চীনের ঋণের দায় শোধ করা যাবে না”। [Pompeo warns against IMF bailout that pays off Chinese lenders]। এটা অবশ্যই আমেরিকার কোন বুদ্ধিমান মন্তব্য ছিল না। ছিল, ডুবে যাচ্ছে এমন মরিয়া এক আমেরিকান আস্ফালন।
তাই মনে করার কারণ আছে যে, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট লাগার্দের (Christine Lagarde) কথিত এখনকার মন্তব্য যে আমাদেরকে “CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে” [যদিও কোন মিডিয়াই লাগার্ডে বা আইএমএফের কোন কর্ককর্তার সরাসরি বরাতে একথা বলতে পারে নাই। সবাই “সোর্স বলেছে” বলে লিখেছে। ] এটা আগের পম্পেই হুঙ্কারেরই নরম ও কারেক্ট ভার্সন। এখন দেখার বিষয় চীন-পাকিস্তান করিডোর চুক্তি পুরোটাই বা অংশ ওপেন না করেও পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ হাসিল করতে পারে কি না!
তবে ভারত ও আমেরিকার দুটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এখানে আলাদা করা দরকার। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ কী, চীনা CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ? এপর্যন্ত কোন দেশি বা বিদেশি মিডিয়া রিপোর্ট এই দাবি করেছে এমন দেখা যায় নাই। কিন্তু সকলেই এমন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত করার চেষ্টা করে থাকে। ইমরানের পাকিস্তান সরকার এবিষয়ে নিজেই কিছু ফ্যাক্টস প্রকাশ করে এমন ইঙ্গিত ও প্রপাগান্ডাকে নস্যাতে উড়িয়ে দিয়েছে। ইমরানের সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় – তারা বলেছে, “The CPEC deals are open and transparent,” said Noor Ahmad, a spokesman for the Ministry of Finance.
এছাড়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের এপর্যন্ত প্রাপ্ত মোট বিদেশি ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৬ বিলিয়ন বা ৬.৩% হল CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ। [Pakistan has already brushed aside criticism on growing indebtedness of the country due to CPEC, saying the share of the CPEC loans was only $6 billion or 6.3% in total outstanding external debt of $95 billion as of end June this year.] আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল, আইএমএফ এবারই প্নরথম নয় আগেও (২০১৪) করিডর প্রকল্পের এক মুল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিল। করিডোর প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর এটা জানিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসা্রে, আইএমএফ লিখেছিল, [The IMF report has then stated that the CPEC infrastructure and transport projects are financed by long-term concessional government borrowing from China.] অর্থাৎ এই প্রকল্প চীনের স্বল্প সুদে (concessional) দেয়া ঋণ” বলে মনে করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় “কনসেশনাল” ঋণ মানে হল – (১% এর কম,) ০.৭৫% বাৎসরিক সুদ, চল্লিশ বছরে শোধ করতে হবে তবে প্রথম দশ বছর কোন কিস্তি দিতে হবে না, মাফ পাবে। এখানে “কনসেশনাল” ঋণ মানে সুনির্দিষ্ট করে কী বুঝানো হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। এছাড়া ঐ রিপোর্টে আর একটা মন্তব্য আছে, CPEC-related outflows would peak at about $3.5 billion to $4.5 billion per annum by fiscal year 2024-25. – মানে ঋণ শোধের দায় সবচেয়ে চড়া হয়ে উঠবে ২০২৪-২৫ সালে, যখন বছরে প্রায় চার বিলিয়ন করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ তখন এটা পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে পারে। এই বিষয়গুলো পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্ট। কাজেই আমেরিকা ও ভারতের ভুয়া ক্যাম্পেইনের পাল্লায় পড়া থেকে এবার সকলে সাবধান।
দুনিয়ার জন্য বর্তমানে এক ইউনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যখন চীনের উত্থান ঘটেইনি সেই পরিস্থিতি মানে, যখন দুনিয়াতে আমাদের মতো রাষ্ট্রের কোনো ঋণ পাওয়ার একমাত্র উৎস ছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সেসব দিন পেরিয়ে, এখন চীন উত্থিত ও বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের একালে দুনিয়াকে নতুনভাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককেও আমল করতে হচ্ছে। কারণ এখন আর সে একক ঋণদাতা নয়। শুধু তাই নয়, আইএমএফ যদি প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানের মত না হয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির ভাঁড় হয়ে থাকতে চায়, ঐ বিদেশনীতি সরাসরি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকতে চায় তবে এই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানও একদিন আমেরিকার সাথে শুকিয়ে ছোট হয়ে যাবে – সেটাও আশা করি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আমল করে চলে, আমরা দেখতে পাব!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)“চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস জানা“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]
থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!
কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।
যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.
এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।
আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।
এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।
সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল। “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে” দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।
সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল, ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে। তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।
চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।
মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন, ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।
মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট। তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”। এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।
তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা। সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।
তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]। ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।
এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।
আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।
ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।
সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে? তিনি লিখেছেন,
Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com
[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]