Tag: GOUTAM DAS

  • হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন

    হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন
    গৌতম দাস
    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-5la

     

     

    হাসিনা সম্ভবত  ভুল করতেছেন। ভুল পথে ধরতে যাচ্ছেন।  আর এতে চীনের থেকে “বাজেট সহায়তা” বলে নগদ ডলারে, প্রায় দুই ডিজিটের ঋণ আনা বোধহয় তাঁর হাত ছুটে যাবে! আর তাতে সব মিলিয়ে মানে কি দাঁড়াবে? বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে ভাঙ্গা অর্থনীতি! যা ক্রমশ আমাদেরকে দুর্ভিক্ষদের দিকে নিবে? আর আমরা তা দাঁড়ায় দাঁড়ায় দেখব?

    কেন বলছি একথা?
    এটা আর লুকানোর কিছু না যে সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কাঁধে নিয়ে হাসিনার একটা খেলনা নির্বাচন শেষে নিজেকে তাতে বিজয়ী-প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা কললেন বটে কিন্তু তাতে করে তার ক্ষমতায় খাড়ায় যাবার চেয়েও আরো বড় ও মারাত্মক সঙ্কট হল ‘অর্থনৈতিক’  – সেটাই এখন সরকারকে জাপটে চেপে ধরেছে! গত মাসে নয়া সরকার গঠনের পর থেকেই ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদুত প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে সাক্ষাতের রিপোর্ট  হচ্ছে মিডিয়ায়। আর এসব রিপোর্টে কেন চীনের এসব সাক্ষাত হচ্ছে বা ইস্যু কি; তা নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনাও করতে হচ্ছে না। যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত ইয়াও ওয়েন এর সাথে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এর যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত হয়েছে এনিয়ে হাতের কাছে দুটা রিপোর্ট দেখছি। বিবিসি বাংলার বেলায় শিরোনাম, “বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?” –  আর বণিকবার্তায় শিরোনাম, বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত” – মানে দুটাই প্রায় একই ভাষার শিরোনাম।

    “ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বেশ কয়েকমাস যাবত বলে আসছেন যে বাংলাদেশ
    রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন পাশে দাঁড়াবে। কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে বৈঠকের
    পর চীনের রাষ্ট্রদূত আবারো একই কথা বলছেন,
    যেটি সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে।” – বিবিসি

    অর্থাৎ আমাদের জল্পনা-কল্পনার কিছু নাই, কারণ ব্যাপারটা খোলাখুলি-ই যে বাংলাদেশের কঠিন রিজার্ভ সংকট বর্তমান। আর এতে সহায়তা দিতে চীন আগ্রহী বা রাজিও আছে। এরই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া বিবিসি দুজন মন্তব্যকারীকেও নিয়ে এসেছে সংকট নিয়ে তাদের মতামত দিবার জন্য। একজন হলেন সিপিডির কর্তা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আর অন্যজন ডঃ জাহিদ হোসেন যিনি নিজ কেরিয়ার গড়তে সেই আশির দশকের শেষ থেকেই বিশ্বব্যাংক ওয়াশিংটনের এর সাথে কাটিয়ে শেষটা বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের চীফ ইকোনোমিস্ট হিসাবে শেষ করেছেন। এরপর আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও কনসালটেন্ট হিসাবে বিশ্বব্যাংক ঢাকার এক্সটারনাল বা ছুটাকাজ-সম্পর্কে জড়িত ও অভিজ্ঞ মতামত দিয়ে থাকেন।

    দেবপ্রিয় সম্পর্কেও আরেকটু বিস্তারে পরিচয় বলা দরকার। এককথায়, দেবপ্রিয় এখন শুধু সিপিডির কর্তাব্যক্তি শুধু তাই নয়, তিনি প্রায় যেন ভারতের মুখপাত্র হয়েছেন। যদিও বলা হয় সিপিডির জন্ম ১৯৯৩ সালে কিন্তু এটা প্রথম লাইম-লাইটে  এসেছিল ২০০৪ সালে। তাও আবার পরের ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পক্ষে প্রস্তুতিমূলক কাজ ২০০৪ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল বলে। কিন্তু সার অর্থে সেটা ছিল আসলে ভারতের স্বার্থের পক্ষে ‘কনসালটেন্সি’ এবং তা খোলাখুলি। বিশেষত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর দেয়ার ওকালতি। এমনকি যারা সিপিডির এই দালালি ব্যবসার সাথে একমত নয় তারা সবই নাকি “অশিক্ষিত” এমন মন্তব্যও করেছিলেন রেহমান সোবহান।

    এটুকুই নয়, একেবারে সাম্প্রতিককালে দেবপ্রিয় একেবারে রানা দাসগুপ্তের সাথে পাল্লা দিয়ে তবে একসঙ্গে বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার হতেও আপত্তি করছেন না। দেবপ্রিয়ের মুল পেশা “উন্নয়ন কনসালটেন্সি” কিন্তু একালে তিনি (সাথে সিপিডির বস রেহমান সোবহানও)  এই পরিচয় ছাপিয়ে ভারত-সমর্থিত হিন্দু নেতা হতে দ্বিধা করছেন না। কোন প্রফেশনাল মানুষের এমন কাজ ও নিচা মানের কমবিনেশন  (কনসাল্টেন্সি আর প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার একত্রে) আমরা আগে দেখি নাই। কিন্তু এমন কেন? কারণ, দেখতে দেবপ্রিয়র এটা দুটা পেশা-ততপরতা হলেও এদের মিলটা হল দুইটাই ভারতের স্বার্থ আর তিনি বাংলাদেশে থেকেও সেই স্বার্থের প্রতিনিধি।

    মুল ও গুরুতর প্রসঙ্গ হল বাংলাদেশ রিজার্ভঃ
    উপরে দেখলাম আমরা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভের মারাত্মক সংকট আছে, তা এখন সরকারিভাবেও স্বীকৃত। তা চীনা রাষ্ট্রদুত আর নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম আলাপেই আলোচিত ও রিপোর্টেড। আর এই সংকট মিটাতে চীন সবচেয়ে সম্ভাব্য এক মুশকিল আহসান বটে! কিন্তু এক বড় কিন্তু আছে।  সেটা হল, চীন কেন বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রা দিবে?

    এছাড়া এখানেও আবার সব পরিসরেই আরেকটা ভুল বুঝাবুঝি আছে সেটা হল – রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ ; এই রিজার্ভ সংকট মানে ঠিক আসলে কি? বাংলাদেশের হাতে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয় বা মজুদে ‘যথেষ্ট’ নগদ ডলার নাই। আর এটা কমপক্ষে গত দুবছরের ফেনোমেনা।  বলা যায় ২০২২ সালের আগষ্টে তেলের দাম ৫১% বাড়ানোর সময়কাল থেকেই রিজার্ভ সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছিল যা এখন সম্ভবত চরমকাল পার করছে।
    কিন্তু যে “রিজার্ভ সংকট” শব্দে এটা বলা হচ্ছে সেটা কি চীন যে ২০১৬ সাল থেকে ঢেলে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দিয়েছে সেসব প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় দেয়া ত্বরান্বিত করা অথবা নতুন করে চীন বাংলাদেশকে আরো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে কি??
    এর সরাসরি জবাব হল  -‘না’ সেটা না। আসলে বলা হচ্ছে ১. চীনের বাংলাদেশকে নগদ ডলার এবং ২. তা বড় পরিমাণ (ধরা যাক দশ বিলিয়নের মত) নগদ ডলার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাথে চালু চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়ের কথা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা এখানে গৌণ ও ভিন্ন বিষয়! চীনের আমাদেরকে নতুন করে নগদ ডলার ঋণ দেয়া আর  চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড় – এদুইটা একই জিনিষ একেবারেই না। আর এখানেই এদুটাকে মাখামাখি করে অনেকের মধ্যেই বুঝাবুঝিতে জট পাকানো ধারণা আছে।
    বাংলাদেশের রিজার্ভের দিক থেকে দেখলে একটা ২০ বিলিয়ন ডলারের চীনাসহ যে কারো কোন উন্নয়ন প্রকল্প শুনতে অনেক বড় মনে হলেও প্রতিবছর এর  অর্থছাড় বড় জোর মাত্র এক বিলিয়ন ডলার হবে। কারণ প্রকল্প যত বড়ই হোক পুরা প্রকল্পের অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) তো শুরুতে বা একবারেই বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হয় না। বরং প্রকল্প যতটুকু বাস্তবায়ন হয় ততটুকুই অর্থছাড় ঘটে। এছাড়া প্রতিবছরের অর্থছাড়ের সব অর্থ দিয়েই তো যা কেনা হয় এর সবকিছুই বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম নয়। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনা মানেই সেই অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) আবার বিদেশেই চলে যাবেই। তাই সারকথায়, উন্নয়ন প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে্র মধ্যে ধরে রাখা খুবই কঠিন। কারণ, অর্থছাড় ব্যাপারটা আসলে ধীরগতির কাজ-বাস্তবায়ের হারের উপর নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত; এছাড়া অর্থছাড় হলেও তা দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম কেনা হবে যতটুকু কেবল ততটুকু বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের রিজার্ভে থেকে যাবে। একারণে আমাদের রিজার্ভ সংকট – এটা যত বড়ই বিদেশি উন্নয়ন প্রকল্প নেই না কেন – এটা মিটবে না।

     আমাদের দরকার নগদ ডলারঃ
    অর্থাৎ আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটাতে গেলে আরো বড় বড় নতুন বা পুরানো প্রকল্পের দ্রুত অর্থছাড় দিয়েও মিটবে না। তাই আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটানোর চাহিদাকে পরিস্কার করতে বুঝাতে বলা হবে নগদ ডলার (বৈদেশিক মুদ্রা) লাগবে। আর এটা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ একেবারেই নয় – এভাবেই বুঝতে হবে।

    কিন্তু কি নামে দেশে সাধারণত এসে থাকে নগদ ডলার?
    এককথায় জবাব – বাজেট সহায়তা নামে এসে থাকে। এটাই এর টেকনিক্যাল বা খাতওয়ারি নাম! মানে সরকারের বাৎসরিক বাজেটের বৈদেশিক মুদ্রা অংশের দায় মিটাতেই কেবল সরকার এই নগদ ডলার ব্যবহার করতে পারবে।  এজন্য অনেকে এটাকে “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের দায়” মিটানোও জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও বলে থাকে। তবে মূল কথাটা হল, এটা প্রকল্প ঋণ সহায়তা নয়। আমরা যেন দুটা ধারণাকে মাখায় না ফেলি।
    ব্যাপারটা আমরা দেখছি একমাত্র স্পষ্ট করে ধরতে পেরেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন ডঃ জাহিদ হোসেন,  ঢাকা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

    “চীন তো বলেনি যে বিনিয়োগে সমস্যা হলে, তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তারা বলেছে, রিজার্ভের সমস্যা হলে পাশে থাকবে।
    তার মানে তোমার ক্যাশ নাই, আমরা তোমাকে ক্যাশ দেব। এটাই তো মিন (বোঝানোর) করার কথা।”
    জাহিদ হোসেন মনে করেন, তিনভাবে এই সহায়তা বা পাশে থাকার বিষয়টি হতে পারে। … বাজেট সহায়তা কিংবা ব্যালেন্স
    অব পেমেন্ট সহায়তা হতে পারে।” – বিবিসি

    কিন্তু কোন দাতাদেশই নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা দিতে চায় নাঃ
    কেন? কারণ, ২০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প দেয়া তুলনায় সহজ; অথচ ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেয়া কঠিন। দাতা দিতে চায় না।  তুলনা করে বললে, ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের কোন উন্নয়ন প্রকল্পের সব অর্থ যদি দাতা একবারেই একাউন্ট ট্রান্সফার করে দেয় তবে সেটাই তখন কার্যত বাজেট সহায়তা হয়ে যায়। এতে তাহলে সরকার কাজ বাস্তবায়ন অনুযায়ী বছরে মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে আর বাকি ডলার আমদানি ব্যয়-সহ এমন সব কাজেই ব্যবহার করতে পারবে। একারণে, বাজেট সহায়তা ঋণ কোন সীমার বাইরে খরচ-ব্যবহার করা যাবে না তা কড়াভাবে বলা বা শর্তে বলা থাকে। এই অর্থে বাজেট সহায়তা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের চেয়েও অনেক বাড়তি সুবিধা ঋণ গ্রহিতা পাবে বা তাকে দেয়া হয় এমন এক ঋণ। এক স্পেশাল ঋণ, যার মোবিলিটি বা ব্যাবহারযোগ্যতা ঋণ গ্রহিদার জন্য বহুগুণ!

    তাহলে কোন দাতা দেশ এমন বহুল সুবিধা সম্পন্ন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ কখন ও কেন দিতে রাজি হবেঃ
    এককথায় জবার, দাতাও যখন বিনিময়ে অন্য অনেক সুবিধা পাবে! যেমন বাংলাদেশে চীন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ দিবে তখন যখন সে বিনিময়ে বিশেষ স্ট্রাটেজিক সুবিধা পাবে; এমন হতে পারে !  এককথায় বিশেষ সুবিধার ঋণ তাই দাতাও এথেকে বিনিময়ে তার বিশেষ সুবিধা আদায় করতে বা পেতে চাইবেই।  সম্প্রতি শেয়ার বিজ পত্রিকা ভারতের ঋণ প্রসঙ্গে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল, “পাইপলাইনে আটকে আছে ৮০ শতাংশ ঋণ” । তাও আবার সেটা ১৩ বছর ধরে। এছাড়া এসব ঋণের ৭৫% পণ্য বা শ্রম ক্রয় ভারত থেকে হতে হবে এমন শর্ত দেয়া। এমনিতেই ভারতের এসব প্রকল্প মানেই হল যা বাস্তবায়ন হলে সুবিধা কেবল ভারত পাবে – এমন! মানে বাংলাদেশ থেকে কড়িডোরের সুবিধা নিবে ভারত তাও বিনা পয়সায় আর সেজন্য যে রাস্তাঘাট ব্যবহার ভারত করবে – বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐ রাস্তাঘাট নির্মাণের খরচ মানে ঋণ গ্রহণ ও সুদ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এই হল ভারতীয় স্টাইল! যেমন ভারত কলকাতা-ত্রিপুরা রোড বা ট্রেন চলাচলের সুবিধা নিবে; ভারত পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে আর সেতুর চীনা-ঋণ নেয়া ও পরিশোধের দায় বাংলাদেশ নিবে। আর ভারত কেবল আখাউড়া থেকে  ত্রিপুরা লাইনে পাঁচ-ছয় কিমি ট্রেন লাইন প্রকল্পে অর্থ খরচ করে (যেন পুরা প্রকল্পেই) সেটাতে ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দিয়েছে বলে দেখাবে।  এককথায় বললে এভাবেই ভারত সমস্ত স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয় ভাবে ব্যবহার করবে। আর দাবি করবে ভারত নাকি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ঋণদাতা! এমনকি আজকাল অনেক তরুণ ফেসবুকার কেও পাওয়া যাবে যে প্রমান করে দিবে যে বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ঋণ চীনের চেয়েও পরিমাণে বেশী!

    কেন এভাবে এই তুলনা করে দেখালাম?
    দেখালাম এজন্য যে জাহিদ হোসেনের সাথে একই প্রশ্ন দেবপ্রিয়কে করেছিল বিবিসি। দেবপ্রিয়-ই ভারতের সাথে তুলনা ডেকে এনেছিলেন। বিবিসি লিখেছে “…ভারতের দেয়া ক্রেডিট লাইনের কথা উল্লেখ করে মি. ভট্টাচার্য…”। এটা কি তুলনীয় ঘটনা? ভারত কি অবকাঠামো ঋণ দেয়ার মত নিজে যোগ্য অর্থনীতি হয়েছে? দেবপ্রিয় এর সেখবর নাই, তবুও তিনি কোশেশ চালিয়ে গেছেন। এমনই খেদমতগার তিনি! যে ভারত বিনা পয়সায় স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয়ভাবে নিচ্ছে তার সাথে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা ভুমিকার তুলনা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, কেন বাংলাদেশ চীনের নগদ ডলার দেওয়ার বাজেট সহায়তা শিরোনামের ঋণ নিতে পারবে না – এম মিথ্যা ও ভুয়া ধারণায় ভয় দেখিয়েছে।

    “তবে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হতে পারে বলে
    উল্লেখ করেন মি. ভট্টাচার্য। কারণ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।
    এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়, বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।” – বিবিসি

     

    দেবপ্রিয় মস্কোর প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা ও পিএইচডি। ফলে সারাজীবন তিনি “পশ্চিমা পচা-গলা পুঁজিবাদের”  বিরোধীতা ও নিন্দা করে এসেছেন। যা বুঝি না তার নিন্দা করা তো খুব আরামেরই।  আর এখন মোদির “হিন্দুত্ববাদের পুঁজিবাদ” তাঁর কাছে খুব মিস্টি ও উপাদেয়। অথচ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তার কাছেও নিপাত যাক সংগঠন। সুযোগ পেলেই তিনি এ’সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষ উগলে দেন। অথচ উনার নিজ অযোগ্যতা হল, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা কি ও কেমন প্রতিষ্ঠান অথবা ১৯৪৫ সালের পরে গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যাবস্থা হিসাবে এটা কিভাবে কাজ করে? আবার এটা কোথায় কোথায় গরীব দেশের বিরোধী আবার কোথায় ঐ গরীব দেশের কাছেই “অন্ধের  কাছে তাঁর লাঠির” মতই সহায়ক – ইত্যাদি এসব দিকে তিনি বেখবর! এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমটা চালু আছে বলেই কিন্তু তিনি আয়-ইনকাম করার সুযোগ পেয়েছেন সেতাই তিনি মনে হয় খেয়াল করেন নাই!

    প্রথম কথা হল, কোন দেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে ওর একটা দিক হল (সবটা নয়) নগদ ডলারের অভাব বা প্রয়োজন হয়ে পরে। এর সবটা আইএমএফ দেয় না বা যোগান দিতে পারে না। এছাড়া এমন সংকটে আইএমএফের কাজ ও প্রধান ভুমিকাটা ঠিক ঋণ দেয়া বা নগদ ডলার যোগান দেয়া না। বরং ১৯৪৫ সাল থেকে আইএমএফের কাজের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া যে পেশাদার অভিজ্ঞতা তা দিয়ে সে কোন দেশের পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার পথ বাতলানো (যেটাকে কমিউনিস্টেরা আধো বোলে শর্ত দেয়া বলে না-বুঝা হৈ চৈ করে থাকে)। মানে পড়ে যাওয়া ট্রেনকে আবার লাইনে তোলার মত! সেকারণে গ্লোবাল পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট যেকেউ এসব ক্ষেত্রে ঐ পতিত দেশের অর্থনীতি কারকশন পদক্ষেপগুলো নিয়ে উঠে এসেছে কিনা এব্যাপারে কেবল আইএমএফ এর বক্তব্য-কেই বিশ্বাস করে। এখন অসুবিধা হল মাঙনা পরামর্শ দিলে পতিত দেশ তা আমল করতে চায়না; যেন এতে সিরিয়াসনেস আনতেই বা সেটা ঠেকাতেই কিছু ঋণ ঐ সংকটে পতিত দেশকে আইএমএফও দিয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের এখন ৫-১০ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার লাগবে বলে কথা উঠেছে সেখানে আইএমএফের দেয়া এখনকার (বছর দেড় আগে শুরু হওয়া) ঋণ হল ৪.৭ বিলিয়ন। কিন্তু তা দেয়া হবে প্রতি ছয় মাসে মাত্র ৬৮২ মিলিয়ন (৬৮.২ কোটি) ডলার করে; মানে সাড়ে তিন বছর ধরে। এভাবে সাত কিস্তিতে অর্থ পাবে। তাও আবার প্রতিবার উন্নতির (রিকভারির) যে টার্গেট  আইএমএফ দিবে তা পূরণ সাপেক্ষে পরের কিস্তির অর্থ ছাড় হবে – এভাবে।
    কিন্তু ছয় মাসে ৬৮২ মিলিয়ন মানে মাসে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মত; এটা কোন অর্থই না।  যেখানে শুধু জ্বালানি আমদানিতে আমাদের প্রতি মাসে ব্যয় এক বিলিয়ন ডলার। মানে শুধু জ্বালানি আমদানির মোট অর্থের দশভাগের একভাগ মাত্র আইএমএফের দেয়া ঋণ প্রতি মাসে। অর্থাৎ আইএমএফের ঋণটা “টোকেন” (token) ; বা নাম কা ওয়াস্তে!
    আগের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এই কিস্তির ডলার উনি একলা নিজেই বাংলাদেশকে দিতে পারেন। যেটা এতই অল্প!

    অথচ জ্ঞানী দেবপ্রিয় আন্দাজে বলতেছেন যেহেতু “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।”– তাই আমরা আর এখাতে চীনের থেকে নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা খাতে নাকি ঋণ নিতে পারব না। যেন বাচ্চা বয়সে আমাদেরব শোনা সেই ডায়লগ যে বলতে চাচ্ছেন-  “না না অমন করেনা মা বকবে”।  তাই সেই ভাষায় দেবপ্রিয় বলছেন, “এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়”।

    আসলে দেবপ্রিয় বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশ বা হাসিনা যেন চীনের কাছে না যায়। এ্যটাই তাদের মন-কামনা!!!  আর এখানে এই তাদের মানে ভারতীয় স্বার্থের বুঝতে হবে!  হাসিনা যেন চীনের থেকে বাজেট সহায়তার নগদ ডলার ঋণ করতে না যায়।  কেন? এতে দেবপ্রিয় এর কি অসুবিধা?
    দেবপ্রিয় বলতে চাইছেন এতে ভারত রাগ করবে। কারণ, হাসিনার চীনের কাছে যাওয়া মানে তিস্তা প্রকল্প জাতীয় আরো অনেক (ভারতের মাতব্বরি অস্বীকার করে সম্মতি দেয়া) প্রকল্পে হাসিনার সম্মতি দেওয়া বা হাসিনাকে নগদ ডলার সহায়তা ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে চীনকে স্ট্রাটেজিক সুবিধা দেয়া। এখন বাংলাদেশ তার নিজ স্বার্থে চীনকে কি দিবে নিবে সেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ! এখানে ভারতের বলার কি আছে? কিন্তু দেবপ্রিয় মনে করেন এটা তার ও ভারতের স্বার্থবিরোধী!

    এবার এর উলটা দিক থেকে দেখি। হাসিনা নগদ ডলার সহায়তা যদি না আনতে পারে তাহলে কি হবে? আগামি মাস থেকেই আমদানি ব্যয় মিটাবার সামর্থ ভেঙ্গে সব এলোমেলো হয়ে পড়বে বলা হচ্ছে। অর্থনীতি চরম বিশৃঙ্খলায় পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুবে করবে – ধরাম করে ছাদে ঠেকবে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বি হওয়া কথাটার-ই আরেক ভাষ্য হল, গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শেষ। নুন্যতম খাদ্য কেনার সামর্থটাও নাই হয়ে যাবে। এটাই দুর্ভিক্ষের আরেক নামে। এজ্জন্য কোন দেশের ফরেন রিজার্ভ শুণ্যের দিকে কিনা এটাও দুর্ভিক্ষ আসবার একটা বড় সিগনাল!  অর্থাৎ ভারত বা তার এজেন্ট দেবপ্রিয় আমাদের হুমকি-ভয় দেখাচ্ছেন যেন হাসিনা চীন না ভ্রমণে না যায়। কারণ, এতে নাকি ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ চীনের কাছে ক্ষুন্ন হবে! কি আবদার!! অথচ এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফেল করলে যে দুর্ভিক্ষের দিকে যাবে তবু হাসিনা তা ঠেকাতে ব্যবস্থা না নেক এটাই ভারতের আবদার!
    অথচ এনিয়ে ক্রমান্বয়ে ভারত হাসিনার উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সর্বশেষ বিনা পাবলিক ঘোষণায় অজিত দোভালের সফরও বাংলাদেশ সফরও সেকারণে বলে কানাঘুষা চলছে!

    একটা সমতুল্য অভিজ্ঞতাঃ
    করোনার টিকা আমরা কোথা থেকে কিনবো?  এই টিকা প্রথম অনুমোদন পেলে দেখা দিয়েছিল কাড়াকাড়ি। কারণ, বড়লোক পশ্চিমা দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার ছয়-সাত গুণ বেশী টিকা নিজেদের জন্য সংগ্রহ-মজুত শুরু করেছিল। খামোখা নিজ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্খায়। আর এটাই আমাদের মত গরীর দেশের অবস্থা আরো শোচণীয় করেছিল। চীন অফার দিয়েছিল তাদের টিকার গবেষণার শেষ বা তৃতীয় ফেজে যুক্ত হবার বিনিময়ে টিকা পাওয়ার। কিন্তু এতে ভারতের চেয়েও চীনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব বেড়ে যাবে তাই এক শয়তানি চাল দিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ভারতের টিকা কারখানায় বিনিয়োগ করলে তারা  আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহ করবে। তাহলে টিকা ক্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যবসায়ী- মন্ত্রী উপদেষ্টারা এই সুযোগে বিরাট আয় করে নিতে পারবে। অর্থ্বের লোভে সরকারও সেদিকেই রওনা দিয়েছিল; সরকারি সহায়তায় বেসবকারি বিনিয়োগও দিয়ে যুক্ত হয়েছিল ভারতের সাথে।  তবু চীন এনিয়ে একটাও কথা পাবলিকলি বলে নাই। রয়টার্স মুখে মাইক ধরলেও বলেছিল – নো কমেন্ট!
    আর সরকার-বেসরকারি দালালেরা ভেবেছিল তারা সহজেই জিতে গিয়েছে। ভেবেছিল চীন কি বোকা যে সহজেই ওয়াক ওভার দিয়ে দিছিল। আর তারা স্বপ্নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে কত হচ্ছে তা গুণা-গুনতি শুরু করেছিল!
    কিন্তু না, সব হিসাব ভুল!
    কয়েকমাসের মধ্যে মোদি ঘোষণা করে বলেছিলেন বাংলাদেশে টিকা পাবে না। আগে ভারতের জনগণ সকলে টিকা পাবে এরপর দেখা যাবে! কিন্তু তখন হাসিনা টিকা পাবেন এমন বিকল্প কোথায়? পশ্চিম উতপাদকেরা সবাই নিজেকে বা অন্য পশ্চিমাদের নিয়েই ব্যস্ত!  ফলে হাসিনার আবার সেই চীনের কাজে গিয়েই হাতেপায়ে ধরা! স্বভাবতই চীন এবার হেসেছিল কিনা আমরা জানি না! কিন্তু বাংলাদেশ থেকে চীন তাদের স্টাটেজিক সুবিধা যা তারা আগের বেছে রেখেছিল তা এবার উসুল করে নেওয়ার বিনিময় আমাদেরকে টিকা দিয়েছিল। সেজন্য টিকা চুক্তি করতে চীনা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না এর বদলে  তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসেছিল। বড় শিরোনামে বললে, এটাই কক্সবাজারে ছয় কিলোমিটারের (রিফুয়েলিং) রানওয়ে নির্মাণ ও এর সাথে আরো অনেক চীনা স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক বিষয়ে তা পাইয়ে দিতে চুক্তিতে উপণীত হতে হয়েছিল আমাদেরকে। তার মানে দাঁড়ালো সেকালে হাসিনাকে এই কাজে ভারত-ই ঠেলে দিয়েছিল!  এবারও বাজেট সহায়তা আনতে হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরকে কেন্দ্র করে কি একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে?

    এখন ভারতের মোদিসহ বিরাট বিরাট সব স্ট্রাটেজিক এনালিস্ট, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সব যারা যারা আছেন তারা হিসাব দেন! বলেন, বাংলাদেশকে শুরুতে চীনা টিকা গবেষণায় যুক্ত হয়ে টিকা যোগাড়ে বাগড়া দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? অবশ্যই কোন লাভ হয় নাই। উলটা ক্ষতি হয়েছে। স্ট্রাটেজিক দিক থেকে চীনারা ভারতের ও আমেরিকার উপরেও আগিয়ে গেছে।  আর ভারতের এসব তথাকথিত স্ট্রাটেজিক পরিকল্পকেরা আপনারা তো নিজের স্বার্থই রক্ষা করতে জানেন না। এটাই প্রমাণিত হয়েছে।  মনে করেন অর্থের লোভ আর মনি-পরী হানিট্রাপের মাধ্যেমেই সব অর্জন করে ফেলবেন। আপনারা এতই বুদ্ধিমান! আর ‘র’-এর কাজ আগানোর ভিত্তিও এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ করা! অথচ আপনারা ভাবছেন চীনের বুদ্ধি-পরিকল্পনার উপরে আপনি এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ দিয়ে জিতে যাবেন; রাজত্ব করবেন!    এর সোজা মানে দাঁড়ালো এখন জবাব নাই আপনাদের কাছে? বাংলাদেশের করোনার টিকা চীন থেকে সংগ্রহের প্রথম পরিকল্পনাকে ফেল করিয়ে দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? নাকি আলটিমেটলি ভারতই বাংলাদেশকে আরো বেশী করে চীনে কোলে উঠিয়ে দিয়েছে?
    ভারতের স্ট্রাটেজিক জ্ঞানীরা এখন আমাদের দিকে না তাকিয়ে ভারতের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে মুল্যায়ন করেন আগে; সাহস থাকলে!

    এরপরে এর ভিত্তিতে ঠিক করেন হাসিনাকে আবার এখন চীন সফরে (বাজেট সহায়তা আনতে) যেতে বাধা দিবেন কোন সাহসে? কোন লক্ষ্যে ও যোগ্যতায়? আপনাদের মূল সমস্যা তো অর্থনৈতিক সামর্থ নয়, হিংসা-ভিত্তিক চিন্তা! তাই চিন্তা, বুদ্ধি পরিকল্পনা সবই এখানে এসে সব শুকিয়ে যাবে আপনাদের!  অথচ সেই পুরানা পথ; অজিত দোভালকে পাঠিয়ে চাপ দিবেন??? পেটি (petite বা উচ্চারণে পেতিত মানে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ) চিন্তা, পেটি দোকানদারি মানসিকতা বা হাভাতে এরা অবশ্য এগুলাই করে থাকে! যারা বিরাট চকচকে লোভের চিন্তায় শেষে সবসময় আত্মঘাতি হয়ে থাকে! মোদি কেন এর ব্যতিক্রম হবেন!

    ভারত-চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হইঃ
    এই বক্তব্যটা মন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদেরের। গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুরা বক্তব্যটা নিয়ে মিডিয়া শিরোনাম ছিল – আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই: ওবায়দুল কাদের ।  দেখে পড়ে মনে হতে পারে যে হাসিনা খুবই সতর্ক বোধহয় তাই চীন-ভারত দুটা দেশ থেকেই দূরে থাকতেই হাসিনা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। না, এই অনুমান ভাবনাটা ভুল! কারণ, এটা হল আসলে সম্ভবত হাসিনা এখন আর চীন সফরের কথা ভাববেন না! আর তাতে সবকিছু সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে বসে থাকতে চাইছেন। কারণ, হাসিনার চেয়ে কে সবচেয়ে বেশী জানে যে চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার না আনা মানে অর্থনৈতিক রিকভারি হবে না; মানে দেশকে ক্রমশ এক দুর্ভিক্ষ এ’দিকে ঠেলে দেয়া হবে?

    হাসিনার কাছে পরিস্থিতিটা এখন কোন দুরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের শিকার জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়ার  হিসাবে দেখতে যাওয়াটাই ভুল! হাসিনার জন্য বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যটা হল  অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে, দুর্ভিক্ষ এড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা এতে কোন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়া যাই ঘটুক – তবুও দুর্ভিক্ষ যদি এড়াতে পারে তবে সবের দায় জনগণ এর কাছে সারেন্ডার করলে তারা তা শেয়ার করবে। কিন্তু কেবল মনে রাখেন একটা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এটা বাংলাদেশের অভিমুখ, গতিপথ অপরের প্রত এটিচ্যুড ইত্যাদি সব বদলে দিয়েছিল। পুরা পঁচাত্তর সালটা আমাদের খুনাখুনিতে কেটেছে। ১৯৮১ সালের আগে কিছুই নুন্যতম থিতু হয় নাই! আর সেই থেকে খুড়িয়ে চলা, পড়ছি আর উঠছি, খুড়িয়ে চলছি – জনমত বিভক্ত! কোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকেই এরপরে আমরা নুন্যতম বের হতে পারছি না! প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি নেগেটিভ এটিচ্যুড বার বার ছাপিয়ে উঠছে!

    হাসিনা কি করতেছেন তা তিনি নিজেই স্থির মনে এখানে খুঁজে দেখতে পারেন। যেমন, তিনি মনে করেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর হয়ে ক্ষমতা নিয়েছেন। ধরে নিলাম তিনি ঠিক ও সৎ ও ন্যায্য কথাই বলছেন। কিন্তু তাহলে স্কুলের পাঠ্যবই তা ভারতে পাঠিয়ে ছাপানোর নামে তাদের অনুমোদন নিতে পাঠান কেন? এটা কি কোন মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর কাজ হতে পারে? সালমন রহমান কখনও বইয়ের ব্যবসা করেন নাই, ছিলেন না। অথচ তাকেই কেন বই ছাপিয়ে আনার দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে কেন? পাঠ্যবই ছোটখাট জিনিষ না।  ভারতীয়দের সম্পাদিত বই পড়ালে কি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের কথিত জঙ্গীবাদী মানসিকতা দূর হয়ে যাবে? কথিত ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে গেলে জঙ্গীবাদ চলে যাবে – এটাই কি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর এসব চিন্তার ভিত্তি নয়? অথচ এটাই তো ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের নিচে বাংলাদেশকে রেখে দেওয়া; নয় কি? আচ্ছা ভারতের পাঞ্জাবের খালিস্তান মুভমেন্ট কি জঙ্গীবাদ নয়, এটাও কি ভারতের সরকারি পাঠবই পড়েই আর তা পড়ার পরেও জন্মাইছে। তাই নয় কি? হায় মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী!!! তাহলে আমরা কোথায় দাড়াবো? আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছেন আপনারা?

    তাহলে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর শত্রু হল  ইসলামি জঙ্গীবাদ মানসিকতা আর এটাকে ধুয়ে পরিস্কার করতেই গঙ্গায় ডুব দেওয়ানো্র জন্যই এমন পাঠ্যবই ব্যবস্থাপনা?  এভাবে আমরা কি আমাদের মুসলমান পরিচয়কে এভাবে শুদ্ধ ও হিন্দুত্ববাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে নিতে পারবো? নাকি এরপরও মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে? আসলে, হিন্দুত্ববাদের অধীনস্ত হয়ে একটা “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” বা হাসিনার বাংলাদেশ বলেও কিছুই থাকবে না! মানে হবে না!! কারণ, নিজের অস্তিত্বের অর্থ তাতপর্য নিজেকেই তৈরি করতে হয়!

    ভারত তার পেটি স্বার্থে যতই বাধা সৃষ্ট করুক সিদ্ধান্ত নিতে হবে একান্তই নিজ দেশ-মানুষের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে তাতে চীনের খুশি-অখুশি নাকি ভারতের  খুশি-অখুশি এসব অনেক নিচের প্রায়োরিটি! বাংলাদেশের কাছে নিজ স্বার্থের উপরে কেউ নাই, থাকতে পারে না!
    অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে , দুর্ভিক্ষ এড়ানো এটাই আমাদের মুখ্য স্বার্থ। আমরা আরেকবার দুর্ভিক্ষ দেখতে পারি না!  এতে ফেল করা বা পরাজিত হওয়া যাবে না!!!
    কাজেই “আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই”-এটা হতাশা আর সংকটে পালিয়ে যায় যারা তাদের কথা!

    আমাদের শাসকদের নিজ স্বার্থ বুঝতে অন্তত সুমতি হোক!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৬ ফেব্রুয়ারি   ২০২৪, সন্ধ্যা  সাতটা

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা

     নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা
    গৌতম দাস

    ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৫
    https://wp.me/p1sCvy-5j8

     

                  বিএনপি ক্ষমতায় আসতে অন্ধকার গলি খুঁজছে: প্রধানমন্ত্রী

     

    আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতার আয়ু রাখা হয়েছে (আমাদের মত পাঁচ বছর না) চার বছরের। তাই বাইডেনের আয়ুকাল (২০২১-২৪), মানে ২০ জানুয়ারি ২০২১ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৫। যে কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব এর বিচারে বাইডেন প্রশাসন এক ব্যতিক্রম হবেন। ইতিহাসে বাইডেনই সম্ভবত বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আর দীর্ঘ প্রভাব ফেলা প্রেসিডেন্ট হবেন।  ফেলে ছড়িয়ে একটা ঢিলেঢালা হিসাব করলেও বাংলাদেশের উপর বাইডেনের প্রভাবের ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই প্রায় দুবছরের।  আর সেই সময়কাল বলা যায় গত ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের বছর শেষ – এভাবে মোটামুটি এই দুবছরের কথা বলছি।  আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাইডেনের সম্ভবত চরমতম প্রভাবিত করার আয়ুকাল ছিল এই দুই বছর। যদিও এদুই বছর চরমতম প্রভাব বিস্তারের ফলাফল কী হয়েছিল বলে আগামিদিনের ইতিহাসে কী লেখা হবে?

    বাংলাদেশের আগামিদিনের ইতিহাসে বাইডেনের আমেরিকাকে নিয়ে কী লেখা হবেঃ
    প্রথমত লেখা হবে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক ওলটপালট ঘটিয়ে দিবার কান্ডটা করেছেন এই বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের কপালে যাই হোক প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজের দেশের জন্য বাংলাদেশ থেকে কিছু গালাগালি আর হতাশা ছড়ানোর দায় ভিন্ন খুব কিছুই ফেরত নিতে পারেন নাই। তিনি এদুই বছর বিরাট খাটাখাটনি করেছেন, কিন্তু সবই ব্যর্থ আর পন্ডশ্রম! মানে প্রচুর দামি এই শ্রম তা হলেও এটা কারোরই ভোগে লাগে নাই! বেকার গেছে। এজন্য দায়ী বাইডেন প্রশাসনের কিছু হামবড়া কর্তা যেমন আজরা জেয়া বা ডোনাল্ড ল্যু ইত্যাদি।
    আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হিসাবে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে, আমাদের মত দেশে অপছন্দের সরকার হলে তাকে ফেলে দেয়া এই ছিল আমেরিকার স্টাইল।  এরপর নয়া সরকারকে দিয়ে আমেরিকা যা চায় তাই আদায় করে নিত। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে এই হামবড়া কর্তারা তাতেও এবার পরিবর্তন আনতে গেছেন। এরা যে স্টাইল ফলো করতে গেছেন তা হল ঠিক সরকার ফেলানো না বরং সরকার রেখেই অর উপর চাপ দিয়ে আমেরিকার পছন্দমত কাজ বা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা। অনেকটা এই কর্তারা যেন বলতে চান যে সরকার বদলে আমরা কি করব ওর চেয়ে বরং একে আমার স্বার্থের পক্ষে চুক্তি করা বা অবস্থান নিতে বাধ্য করলেই তো বেশী লাভ! আর এতে ফলাফল হয়েছে এমন যে না আমেরিকানেরা কিছু পেয়েছে না বাংলাদেশের বিরোধীদলের ভাগ্যে কিছু জুটেছে! অথচ বাইডেন প্রশাসন এই নয়া এক্সপেরিমেন্ট করতেই সবটা সময় ব্যয় করে ফেলেছে – যার আলটিমেট ফলাফল শুন্য থেকেছে!

    ওদিকে বরং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, বাংলাদেশের। এখনকার অবস্থা হয়েছে সব রাজনৈতিক দলের (মানে সরকার ও বিরোধী সব দলের) কথা বলছি – সকলেই প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে; একেবারেই দিশাহীন ওল্টপাল্ট অবস্থা হয়েছে সবার।
    শব্দটা সবার বলেছি, মানে হাসিনা সরকারেরও। যদিও কেউ কেউ বা হাসিনা নিজেও এটাকে মনে করতে পারেন কথিত নির্বাচন তিনি সম্পন্ন করেছেন ও নিজেকে আবার বিজয়ী ঘোষণা করতে পেরেছেন; সুতরাং এটাই বাইডেনের উপর দিয়ে তার ক্রেডিট!  বিশাল বিজয় হয়েছে। কিন্তু – তাই কী?
    না,  তা একেবারেই নয়। কেন? ৭ জানুয়ারি নির্বাচন শেষ হয়েছে এখন থেকে কম করে হলেও সাতদিন আগে। কিন্তু খেয়াল করেন পুরা আওয়ামী লীগের কথাও না ধরে যদি ৩০০ এমপির (২২৩ জন খোদ লীগের নিজের আর বাকিরা ব-কলমে তো লীগেরই নয়ত লীগের অনুগ্রহপ্রাপ্ত) কথাই ধরে কথা বলি এই এমপিরা কেউ জানে না যে এখন কী? কী বলতে হবে? মানে তারা কী অর্জন করেছে বলে এখন বলতে হবে তারা কেউ জানে না! মুল কারণ, এনিয়ে হাসিনার কোন নির্দেশ আসে নাই।
    যদিও এটা ঠিক এবারের কথিত নির্বাচিতেরা সকলেই এই নির্বাচনের পরে কঠোরভাবে হাসিনার হাতের মুঠোতে সংহত বা কেন্দ্রীভুত! কিন্তু সবাই কাঠের পুতুল হয়ে আছে! কে কে জিতবে সেটা নির্ধারণ থেকে শুরু করে পরে কাকে কাকে ও কেমন মন্ত্রী করে নেয়া হবে বা কে কে বাদ পড়বে বা কেন ইত্যাদি সবই এককভাবে হাসিনার মুঠোয়! তাঁর বাইরের কেউই জানেন না ঠিক কোন লজিক বা বিবেচনায় কে বাদ পড়ছেন বা উপরে উঠছেন! অথচ সকলেই তটস্ত যে না জানি কি করার কারণে এমপি হতে বা পরে মন্ত্রী হতে বাদ পড়ে যাবেন বা গৃহিত হবেন! এমনকি নৌকা মার্কা পেলেও বাদ পড়তে পারেন!  পরে এখন তিনি যাবেন কোনদিকে কোথায় সেটাও কেবল হাসিনাই জানেন! আমাদের এই বক্তব্যগুলোর ভিত্তি গত সপ্তাহ-দশদিন ধরে বাংলাদেশের টিভিতে প্রকাশিত রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ছবি ও বর্ণনা নিয়ে রিপোর্ট সেগুলো!  নির্বাচনের পরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা যেকোন মন্ত্রী – ধরেন জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক; টিভিতে তার চোখের ভাষা দেখে মনে হয় সেখানে যেন লেখা আছে যে তিনি কিভাবে জিতলেন, কেন জিতলেন এমনকি প্রতিমন্ত্রী পদটাও টিকে গেল কেমনে – তিনি জানেন না। সেজন্য কেবল শুকরিয়া আদায় – এটাই কেবল তার নিজের করা বাকি সবই তাঁর!! অথচ এলাকা হিসাবে পলকের পড়শি সদ্য প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার তার কেন এমন হল তা কেউ জানে না!  কেবল এটা সেটা কিছু অনিশ্চিত অনুমান করতে পারেন মাত্র!

    তাতপর্যপুর্ণ ১১ জানুয়ারিঃ
    কেন তাতপর্যপুর্ণ বলছি? নির্বাচনের তারিখ ছিল ৭ জানুয়ারি। এর ফলাফল কি ঘোষণা দিবে তা আন্দাজ থাকলেও এই তিনশ আসনের ফল সাজিয়ে গুছিয়ে প্রকাশ করতে ৮ জানুয়ারি দুপুর গড়িয়ে যায়।  আর এরপরের ৯-১১ জানুয়ারি এই তিনদিনে সরকার যেসব মেজর কাজ দ্রুততার সাথে হাসিনার লোকেরা শেষ করেছেন তা হল বিজয়ী তালিকা গেজেট করা মানে, নয়া সংসদ সদস্যদের তালিকা আনুষ্ঠানিক করে বানানো এরপর তাদের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করা আর এরচেয়েও আরেক কঠিন কাজ মন্ত্রী বাছাই করা। মানে নেয়া বা বাদ দেয়া। বলা হয়েছে “সর্বশেষ গত (১১তম সংসদে) মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৮ জন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন ২৫ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রী।  এদের মধ্যে ৩০ জনকেই বাদ দেয়া হয়েছে ” । মানে এক বিশাল ঢেলে সাজানো আর তাতে পুরান মন্ত্রীদের দুই-তৃতীয়াংশ  বাদের খাতায় চলে গেছেন। আর এমন বাদ দিবার পরে শেষে নতুন মন্ত্রীসভা হয়েছে ৩৭ জনের। আর তাদের মন্ত্রণালয় নয়া বন্টনো সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে বোধহয় সবচেয়ে কম সময়ে ঘটা এমন ঘটনা। মাত্র তিনদিনে এটা সম্পন্ন।
    তাই বলা যায় ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যারাতের মধ্যেই সব কাজ শেষ; এটা তাতপর্যপুর্ণ। কিন্তু তর্ক এখান থেকেই! যে এত তাড়াতাড়ির পিছনের কারণ কি?

    একদিকে সরকারবিরোধীরা এর সমালোচনা করে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে চেয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে বা নিজ মনোমত ব্যাখ্যা খাড়া করেছে যে সরকার ভীত সেকারণেই এই তাড়াহুড়ো করে নয়া মন্ত্রীসভা গঠন শেষ করেছে। রাজনীতিতে ঠেস মেরে বা খোটা দিয়ে সরকার আর বিরোধীদের মধ্যে বাকযুদ্ধ চলা খুবই কমন জিনিষ, যা আমাদের মত প্রায় সবদেশেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধীদলের অযোগ্যতাটা অন্য খানে!

    হাসিনা এর পালটা জবাব দিয়েছেন যার সারকথা হল, আমাদের মুরোদ আছে তাই করেছি। বলেছেন, “আরে তাড়াতাড়ি, আমাদের তো সব তৈরি আছে। করব না কেন? আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হই না। জানি নির্বাচন হবে। নির্বাচনে জিতলে কী করব, হারলে কী করব—এগুলো সব আগে থেকেই তৈরি করা থাকবেই। তাই আমাদের সময় লাগবে কেন? সময় নষ্ট করব কেন? আমাদের একটা দিনেরও মূল্য আছে। উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখতে হবে।’” – এইসব কথা।
    আসলে বিরোধীদের লক্ষ্য ছিল কথিত নির্বাচনে হাসিনা দলকে বিজয়ী বলে পেশ করাতে নিজ কর্মি-সমর্থকদের ভাঙ্গা মনোবল চাঙ্গা করা। ভাঙ্গা কারণ তারা  নির্বাচন ঠেকায় দিতে বা হাসিনারে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অর্থে বিরোধীদের পরাজয় হয়েছে এটা তো দিনের আলোর মত পরিস্কার, তা অস্বীকারের জো নাই। তবু তারা চেষ্টা করেছে এটা বুঝাতে যে এখনও যেন হাসিনা সরকারকে চাপ দিয়ে আমেরিকা অনেক কিছুই বাধ্য করতে পারে! আর এর প্রমাণ হল, হাসিনা সরকার গঠনে তাড়াহুড়ো করছে। কিন্তু আসলে কি এটা সত্যি? কতটা সত্যি?

    নয়া সরকার গঠনে হাসিনা তাড়াহুড়ো করেছে সত্য। কিন্তু কেন, এটাই প্রশ্নঃ
    কথা সত্য দেখলাম আমরা হাসিনা তিনদিনের মধ্যে সরকার গঠনের সব করেছে এমনকি দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি শেষে ১৫ তারিখ সকালেই প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠক করে ফেলেছেন। কিন্তু এত তাড়া কেন?
    কানখাড়া করে আমাদের শুনা ও বুঝা উচিত এটা কোনই আমেরিকান চাপ নয়।  বরং বাস্তবত আমেরিকা এধরণের সব চাপ দেয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে বা নিজেই নাই করে ফেলেছে। এটা হল কঠিন সত্যিটা। কিন্তু বিরোধীরা এটা নিজেরা বিশ্বাস করতে বা মানতে পারছে না। বা চাচ্ছে না – ব্যাপক হতাশা আসবে বলে। কেন? মানে কেন এমন হল?

    আসলে এটা মুখে মাটি ঢুকে যাওয়ার মত অবস্থা! মাটি আমাদের খাদ্য না। তাই মুখে কোন কারণে মাটি পড়লে থু থু করে ফেলা আর বারবার মুখ ধুয়ে পরিশুদ্ধ, মন কে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। বিরোধীদের সেই মাটি খাওয়া দশাটাই হল, তাদের আত্মত্যাগ, শতকষ্টের শেষ দুবছরের আন্দোলনে প্রায় শতভাগ তারা আমেরিকা-নির্ভর করে সাজানো কৌশলের মধ্যে থেকে আগাতে চেয়েছে।  এই একপেশে পশ্চিমা অতিনির্ভরতাই তাদের খেয়ে ফেলেছে, সব শ্রম-ঘাম পানি করে দিয়েছে। তাই তারা এখন বিশ্বাস করতে চায় নাই আমেরিকা ফেল করতে পারে অথবা বাইডেনের আমেরিকারই চরম অযোগ্যতাও আছে।

    আর সবার আগে, বাংলাদেশের বিরোধীরা এদিকটা যেন বুঝতেই চায় নাই যে বাইডেনের আমেরিকারই কিছু গভীর নিজস্ব স্বার্থ আছে সেটাই বাইডেনের প্রায়োরিটি বা প্রথম বিবেচনাই শুধু নয়; সরাসরি বললে সেই স্বার্থই বাইডেনের কাছে তার সব ততপরতার একমাত্র নির্ধারক উপাদান। মানে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা ও নির্ভরতার কথা আছে মানেই এটা নয় যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বাইডেনের কাজকর্মের চালিকাশক্তি বা ড্রাইভিং ফোর্স। অথচ আমাদের বিরোধীরা সেটাই বিশ্বাস করেছে!
    অথচ আমরা কি ভুলতে পারি হাসিনার এই দানব ক্ষমতাটা আমেরিকারই তৈরি। জঙ্গীবাদ দমনের নামে হাসিনা যে তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদেরকেও নির্মুল করে ফেলতেছে, বাংলাদেশ একটা গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে উঠতেছে ইত্যাদি – সেটা কি আমেরিকাসহ পশ্চিমারা দেখে নাই? জানে না?  বরং তারা সেসব দেখেও এরাই হাসিনাকেই পিঠচাপড়ে বাহবা দিয়ে যেতে আমরা দেখেছি। এর পিছনের কারণ একটাই পশ্চিমাদের চীন ঠেকানোর স্বার্থ – এটাই সুপ্রীম। আর একাজের ভেট-উপহার হিসাবে তারা বাংলাদেশকে অবলীলায় ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। আমেরিকার স্বার্থ এতই নির্মম ও নিষ্ঠুর একচোখা আত্মস্বার্থকামী! যার কাছে তার আপন-স্বার্থই সব! এটা তো আমেরিকা সব সময়ই!

    কিন্তু অবজেকটিভিটি বা প্রকৃতির মার-প্রতিশোধ বলে কথা আছে যা কেউ এড়াতে পারে না। আর সেটাই ঘটে চলেছে বারবার। যেমন ২০০৭ সাল থেকে যখন এটা আমেরিকার কাছেই সত্য প্রমাণিত যে আফগানিস্তানে তার পা আটকে গেছে। আর এতে আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিতে যে পিছিয়ে পড়া শুরু এটাই চীনের কাছে ‘পড়ে পাওয়া সুবিধা’ হয়ে হাজির হবে ও হয়েছেও। সেই থেকে আমেরিকা যেটাতে হাত দিয়েছে সব ক্ষেত্রেই হারতেই আছে! এখন এতে বিদেশিদের কি বিপদ হল তা ছেড়ে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে আসি!

    হাসিনাবিরোধী সকলের শর্টকামিং বা প্রধান খামতিঃ 
    মূল বিষয়টা ক্ষমতা ধারণা। রাষ্ট্র-ক্ষমতা কি একে বুঝতে পারা। এবারের আন্দোলনে বিরোধীদলের শ্রম-ঘাম পরিশ্রম ব্যয় সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ!  তবু তাদের পদক্ষেপ দেখে কখনই মনে হয় নাই যে তারা ক্ষমতা ধারণাটা বুঝে। এই সোজাকথাটা হল, বলপ্রয়োগ। হাসিনা বলপ্রয়োগে সক্ষম ও সফল। যেই সক্ষমতাটা ব্যবহার করেই সে ক্ষমতায় আছে আর বারবার নিজেকে নির্বাচিত বলে দাবি করছে। তাহলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত কেউ করতে চাইলে তাকেও পালটা সেও বলপ্রয়োগের যোগ্য আর সেটা আরো শক্তিশালী ক্ষমতা এটাই প্রমাণ করতে হত। মানে সেভাবে হাজির হতে হত। এটাি বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর লড়াইয়ের মূল কথা। এর বাইরে বাকি সবই এর ঝালর-সাজসজ্জা (ডেকোরেটিভ ও প্রেজেন্টেশন এর অংশ)।  অন্যভাষায় এটাকেই আমি প্রায়শই বলি মুরোদ। মানে পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ। আপনার এই মুরোদ আছে তো আপনি রাজনীতিতে আছেন। মুরোদ নাই তো রাজনীতিতে আপনি কেউ না হয়ে থাকবেন।

    তাহলে নির্বাচন কি? এর কি কোন ভুমিকাই নাই?
    অবশ্যই আছে। আর সেটা হল, যাদের যাদের পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আছে এমন দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতার নিয়ম সেটা। কিন্তু সাবধান; এখানে লক্ষ্য করবেন প্রমাণিত পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আপনার আছে আপনিও সক্ষম – এভাবে সাথে আপনারও থাকলেই এরপর আপনি ঐ সমঝোতা নিয়মের সদস্য বিবেচিত হবেন, নইলে নয়। আর কি সেই সমঝোতা? সেটা হল, যাদের যাদের মুরোদ আছে কেবল তাদের মধ্যেই যে সবচেয়ে বেশী জনসমর্থন বা ভোট-কনষ্টিটুয়েন্সি আছে সেই সেবার ক্ষমতায় যাবে।
    তবে সাবধান, আপনি ক্ষমতায় গেলেও অন্য আর যারা  পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ ওয়ালা সদস্য তাদেরও কিছু কমন স্বার্থ ও সুবিধা আপনি তাদেরকেও দিতে বাধ্য থাকবেন। যেমন আপনি ক্ষমতায় আছেন বলে আমার গণ-সমাবেশ আপনি গ্রেনেড (এটা মিলিটারি গ্রেড আর্মস যা পুলিশের হাতে রাখা হয় না) হামলা করতে বা ভেঙ্গে দিতে পারবেন না। আমি রাস্তায় সমাবেশ করে আমার কথা বলতে পারব কিন্তু সেজন্য ক্ষমতাসীন আপনি মিছিলে আমাকে পায়ে-থাইয়ে গুলি করে আমাকে পঙ্গু করে দিতে বা সরাসরি বুকে গুলি করে আমাকে খামোশ বা বাধা দিতে পারবেন না। অথবা এরই আরেক বর্ধিত রূপ ক্ষমতাসীন আপনি আমাকে গুম-খুন-অপহরণ করে বাধা তৈরি করতে পারবেন না। এটাই সেই সমঝোতার নিয়ম। আরেক ভাষায় এটাই নাগরিক সকলের কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এমনকি এই যেটাকে মুরোদওয়ালাদের সমঝোতা  বলছি এটাই আমেরিকান কনষ্টিটিউশনের প্রথম সংশোধনী (১৭৯১)।   আর এটাকেই আমরা এর এই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ দিকটা পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়ে বলি “সিভিল রাজনীতি”, বা আবেগে বলি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি। মানে যেটাকে কমিউনিস্টেরা বলে গণ-আন্দোলন (যেটা সশস্ত্র নয়) বা মাস-লাইন এর রাজনীতি।  আর আমরাও এথেকেই ভাব মারি যেন রাজনীতি মানেই ক্ষমতা নয়; মানেই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ নয়।  কাম্য রাজনীতি মানে হল যেন সিভিল রাজনীতি!!! আর সেকারণেই বলেছি এই মুরোদওয়ালাদের মধ্যে সমঝোতা – এই সমঝোতা কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এই রাইট বা খেলার নিয়ম যখন ক্ষমতাসীনেরা মানবে না , অস্বীকার করবে বুঝতে হবে এই অমান্য মানেই তখন পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ এর দিকে রাজনীতিকে নিতেই হবে। আর এখানটাতেই আমাদের বিরোধী দলেরা নিজেদেরকে ব্যর্থ বলে তুলে ধরেছে। ভেবেছিল আমেরিকা একাজটা করে দিবে!

    কিন্তু এবারের দুবছরের আন্দোলনে কি হয়েছেঃ
    প্রথম অপরাধ হল, রাজনীতিতে ক্ষমতায় আসতে চাইলে তা যে বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ – এই মূলসুত্র বিরোধীদলেরা মান্য করি নাই। যেন ভুলে গেছি বা থাকতে চেয়েছি।
    এর চেয়েও বড় অপরাধ হল, ধরেই নিয়েছি সব আমেরিকা করে দিবে। যেন আমাদের কাজ হল কেবল বড় সমাবেশ করে দেখিয়ে দেয়া। কিন্তু সরকার পড়বে কি করে? অনেক বড় নেতাকে বলতে শুনেছি বা জেনেছি তারা বলেছেন – সরকার কি করে পড়বে এ’দায় নাকি তাদের নয় আমেরিকার!!! সাথে এটাও বলেছেন, এভাবে আমেরিকা  তার দায় সম্পন্ন করে দিলে মানে সরকার পড়ে গেলে তারা তখন আবার নির্বাচন দিতে হবে বলে দাবি করতে থাকবে!!!!  আর এটাই শুধু অতি আমেরিকা-নির্ভরতাই নয় যেন নিজ বিবেচনা জ্ঞান-বুদ্ধি খুলে পাশে ফেলে রেখে নিজেই গাধা সেজে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া! আত্মপ্রবঞ্চনাও বোধহয় এমন ভোলেভালা হয় না! 

    এই আলোচনা থেকে এটা পরিস্কার যে এবারের দুবছরের আন্দোলনের প্রধান খামতি হল এরা জানে না বা ভুলে ছিল যে রাজনীতিতে ক্ষমতা মানে তা বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ। আর এর বাইরে কোন সত্য নাই।  সেকারণে, যেখানে দরকার ছিল আভ্যন্তরীণ যত শক্তি বা যত পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ সমাজের যাদের যাদের আছে যারা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ তাদের সকলকে সবার আগে জড়ো ও যোগাড় করা; আর পরে এর উপর দিয়ে আমেরিকান সহায়তা যত যা পাওয়া যায় তা সামিল করে পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ দেখানো এভাবে; সেখানে বাস্তব ঘটনাটা হয়ে দাড়িয়েছিল যে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ – এই অংশটাই একেবারে অনুপস্থিত। আর সাথে সব আমেরিকা করে দিবে এই মনোভাব সপ্তমে উঠানো হয়েছিল! এমনকি ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ সেটা আহবানের পিছনেও – সব আমেরিকাই করে দিবে আর আমাদেরকে অহিংস হয়ে বসে থাকলেই হবে -এ’ছিল তাদের স্পষ্ট ভাবনা! তাই এক সাউন্ড গ্রেনেডে্র শব্দে সব অক্কা পেয়েছিল!  মঞ্চে বক্তৃতারত অবস্থাতেই সব ফেলে পালানো ঘটেছে। আর এটা হঠাত নয়, এটাই আগাম সিদ্ধান্ত ছিল! যেন আমেরিকাকে বলা যে ভাইসাব আমরা কিন্তু আমাদের করণীয় পার্ট শেষ করলাম; বাকিটা দেইখেন!

    অথচ উলটা করে চিন্তা করেন। ২৮ অক্টোবরের কর্মসুচি সেদিন না থাকলেই মানে কোন কর্মসুচি না থাকলেই সেটাতে  বিরোধীদের পক্ষে পরিস্থতি থাকত! কারণ, হাসিনা অপেক্ষা করছিল কিভাবে সহিংসতা, জঙ্গিত্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী আন্দোলনকে মাঠ থেকে বিদায় করবে, সাজা দিয়ে জেলে রাখবে আর তার কারচুপির নির্বাচন আয়োজনের পথে ফাইনালি রওনা দিবে।
    আবার দেখেন ২৮ অক্টোবর থেকে ৭ জানিয়ারি বা এর পরেও আমেরিকা নিশ্চুপ যাকে বলে নট নড়ন-চরণ!! তার মানে বিরোধীরা – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন – বলে যে মঞ্চ ছেড়ে ভেগেছিল  সেটা তারা করেছিল এবিষয়ে আমেরিকান মনোভাব কি – তারা এরপরে আসলেই কি কিছু করবে বা করতে পারে – এনিয়ে কিছু না জেনেই। তাহলে কিসের ভিত্তিতে কি লক্ষ্য করে ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ ডাকা হয়েছিল? এটাই কি আবেগে ধরে নেয়া নয় বা ছিল না যে – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন????

    মানে, মনে করা হয়েছিল গণ-মহাসমাবেশ সফল করা মানেই বিরোধীদলের দায়দায়িত্ব করণীয় সব শেষ ওখানে। এটাই কি হাসিনার বলপ্রয়োগের জোরে ক্ষমতা ধরে রাখার বিরুদ্ধে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ দেখানো??? অবশ্যই না। এটাসি তো সবচেয়ে বড় ভুল! কারণ, তাদের ভাষাতেও যদি বলি তবে গণ-মহাসমাবেশ আর গণ-অভ্যুত্থান তো এক কথা নয়। বরং দুইয়ের দুরত্ব বহুদুর! এছাড়াও একালে গণ-অভ্যুত্থান এটাও সহজ যা যথেষ্ট নয়!  এটাও বহু কঠিন হয়ে গেছে, যেটা ১৯১৭ সালে পারা যেত সেটা এখন খুবই কঠিন। এখানে তা নিয়ে বিস্তারে বলার সুযোগ নাই তাই সংক্ষেপে বলব, একালে ১৯১৭ সালের রাশিয়ার মত হবু বা গণ-অভ্যুত্থানকামী দেশটা বাকি দুনিয়া থেকে আর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রত্যেকটা রাষ্ট্র এখন বিপুল্ভাবে বিকশিত হয়ে পরা গ্লোবাল বাণিজ্যের কারণে এই গ্লোবাল বাণিজ্যে নানান স্বার্থের অংশ হয়ে গেছে। তাই এখন বাংলাদেশে কি হয় তাতে ওসব দেশের বিশেষ করে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি স্বার্থের দিক এখন জ্বলজ্বলে!  এমনকি ১৯৬৯ সালের আমাদের সাতদিন আয়ুর যে গণ–অভ্যুত্থান যেটা বলা হয় সেটাও ছিল অর্কেস্টেডেড বা সাজানো! তাই টিভি-তে এসে সেকালে আয়ুব খানের সারেন্ডার-বক্তৃতা ছিল যে,  আসেন গোলটেবিল করি, ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থার করি।

    তাহলে মূল পয়েন্টটা হল, সবার আগে সরকারবিরোধী এভেলেবল দেশীয় সকল শক্তি (সরকারি ইন্সটিটিউশন প্রশাসন যারা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ) এমন সকল সরকারবিরোধী স্বার্থ – এমন সকলকে নিয়ে একটা বুঝাবুঝি তৈরি করা এরপরে আমেরিকার কথা আসতে পারে – এমন হতে হত। এর বদলে সবই পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ এর খবর নাই তা ভুলে কেবল এক আমেরিকা ভরসা! এমনই বোকা আর এবসার্ড কাজটাই আমরা করতে গেছিলাম!

    এখানে সাথে আর একটা সাবধান বাণীঃ বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ বিষয়টা বুঝবার সময় ভুলেও এটা ন্যায় নাকি অন্যায় – এমন বিবেচনা এর ভিতর আনবেন না। মুরোদ-ই সত্য! যো জিতা ও-হি সিকান্দার! যে নিজেকে ডিফেন্ড করতে সক্ষম তার জন্যই এই দুনিয়া! বাকি সবকিছু আসবে এরপরে। সবার আগে ক্ষমতা এরপরে আইন বা ন্যয়-অন্যায় বা অধিকার বোধ ইত্যাদি! যার সোজা মানে হল, আগে মুরোদ এর বিজয় এরপরে সেই মুরোদকে গণ-মানুষের স্বার্থ, গণস্বার্থ (পাবলিক ইন্টারেস্ট), ন্যয়-অন্যয় বোধ, অধিকার বোধের পায়ে সমর্পণ বা উতসর্গ করে দেয়া! দিতে হবে! এই হল পথ! এর কোন উল্টা-পাল্টা বা আগে-পিছে করা যাবে না!  আর মুরোদ না থাকলে না বুঝলে রাজনীতি তার জন্য নয়!

    এমবেসি পাড়ার ক্ষমতার করিডোরে কান পেতে ইনফরমাল যা জানা যায়ঃ
    কেন আমেরিকা বা ওর প্রতিনিধি পিটার হাস ২৮ অক্টোবরের আগে থেকেই ক্রমশ  নিশ্চুপ? প্রায় নো এক্টিভিটি? নো স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চলে গেছিলেন?
    এর অনেকগুলো ভাষ্য-ই পাওয়া যায় যার মধ্যে বেশী মুখে মুখে ফেরা ভাষ্যটা হল যে, গত দুবছরের এই শেষের দিকে এসে আমেরিকার কাছে পরিস্কার হওয়া শুরু করেছিল যে আমেরিকা যদি এরচেয়েও বেশী  স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চাপ হাসিনা সরকারের উপর প্রয়োগ করে তবে সেটা আনবেয়ারেবল বা অসহ্য হয়ে যাওয়াতে এই সরকার এখনও যেভাবে একটু ব্যলেন্স রেখেছে যে কেবল চীন নয় (যদিও একটু বেশী নির্ভরতার) তবুও পশ্চিমের সাথেও পাশাপাশি যোগাযোগ ও লেনদেন সম্পর্ক একটা রেখে চলে। কিন্তু এটাই আর তখন একেবারেই থাকবেই না। একপেশে হয়ে সরকার একেবারেই সবকিছুর জন্য চীন-মুখি হয়ে বা চীনের কোলে উঠে যাবে। পশ্চিম থেকে পুরাটাই বিচ্ছিন্ন হয়েই বিকশিত হতে থাকবে! যেটা আমেরিকার একেবারেই কাম্য নয়!
    অনেকে আবার  একটু পাকামো করে এখানে ভারতকে টেনে তাকে ক্রেডিটটা দিতে চায় যে ভারত দীর্ঘদিন থেকে এমন ঘ্যানর ঘ্যানর করলেও বাইডেন প্রশাসন এটাকে গুরুত্ব দেয় নাই। সেটাই নাকি এখন এই ডিসেম্বরে এসে পিটার হাসের আমল পেয়েছে।
    এক্ষেত্রে আমাদের পালটা বক্তব্য হবে তাহলে – এর মানে হল “কি করিলে কি হইবে” সেসব পুর্ণ হোমওয়ার্ক সবার আগে  সম্পন্ন না করেই বাইডেন প্রশাসনের এসব আজরা জেয়া বা -ডোনাল্ড ল্যু রা মাঠে নেমেছিল??? আচ্ছা এসব লোকগুলো কি ফাজলামো না সিরিয়াস কাজ করতে এসেছিল?? যারা হোমওয়ার্ক শেষ না করেই সিদ্ধান্ত নেয় কাজে নেমে আসে তাদেরকে আমরা কি বলবো???

    কাজেই দেখা যাচ্ছে এই বয়ানও সুবিধাজনক হল না। তাই আরেক বয়ানের হদিস পাওয়া যায়। সেটা হল প্রধানমন্ত্রীর সন্তানকে মানি লন্ডারিং মামলায় আটকে চাপ দিলে সেটা বাইডেনের আমেরিকার জন্য অব্যর্থ অস্ত্রের মত কাজে দিবে, এটাই নাকি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু  প্রধানমন্ত্রীর এজেন্ডা-ক্রম এর ভিতরে সন্তানকে বাঁচানো  – এটাকে তিনি কোন এজেন্ডাই করেন নাই বা  রাখেন নাই। তাই আজরা জেয়াদেরও কপাল ফুটা হয়ে হাজির হয়!  মানে হাসিনার পরিকল্পনার কাছে তারা সবাই হেরে যায়!
    এটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক বরং আমরা দেখেছি হাসিনা সরকারের সবার আগেই প্রায়োরিটি ছিল যে – নির্বাচন-সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে দেখানো। একাজকেই প্রথম ধ্যান-জ্ঞান করে নেমে পড়া। কারণ, এটাই হল তাঁর সব ক্ষমতার ভিত্তি না শুরু! কথা সত্য। কিন্তু তাহলে কি এরপরে সন্তান বাচানোর ইস্যু আসবে?  না তাও নয় তিনি তা করেন নাই; আগেই বলেছি এটা এখন তাঁর এজেন্ডাতেই নাই। আর এতেই বাইডেন প্রশাসনের কুতুবেরা নাকি বোবা হয়ে যায়! মানে এই প্রশাসন হাতে -বার্গেনিংয়ের বুটি – শুন্য হয়ে সব অকেজো হয়ে যায়! আর এটাই নাকি পিটার হাসের ক্রমশ নিশ্চুপতা!!!!! এর সত্য-মিথ্যা আমরা নিশ্চিত নই। তবে সন্তান বাঁচানোকে কোন প্রায়োরিটিতে না রাখার সিদ্ধান্তই সফল ও কার্যকর!
    তাহলে হাসিনার এরপরের বা সেকেন্ড প্রায়োরিটি কি?

    হাসিনার দুঃচিন্তা কি নিয়েঃ
    বলার পেক্ষা রাখে না হাসিনা নিজের এই সেকেন্ড প্রায়োরিটি সফল হবে কিনা এনিয়ে চিন্তিত। যদিও কোনভাবেই সেটা বাইডেন আবার নয়া সরকারের ক্ষমতার উপর চাপ দিতে পারে – এটা তা নয়! এটা আন্দাজে ঢিল ছোড়া আর যার মূল লক্ষ্য হতাশ কর্মীদের মনোবল খাড়া করা। এই অ্আন্দাজি কাজ এটা আত্মঘাতিমূলক! যেখানে বিরোধীদের সকলের কাজ এখন নিজেদেরকেই সঠিকভাবে মুল্যায়ন, কি কি ভুল হয়েছে এটা খুজে দেখে স্বীকার ও কারেকশন করে নেয়া সেখানে চাতুরি উলটা নেগেটিভ ভুমিকায় হাজির হবেই!
    তাহলে হাসিনার সেকেন্ড প্রায়োরিটি বা দুঃশ্চন্তা কি নিয়ে?

    এই পিটার হাস বা বাইডেন প্রশাসন স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা এটা এখন ক্রমশই অকেজো দুর্বল হয়ে যাবে। সেকথায় আরেকটু বিস্তারে আসব।
    এর আগে, নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে সক্ষম হলেও এই ২০২৪ সালেই হাসিনার জন্য অন্তত দুইটা বিপদ বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সবচেয়ে বড় বিপদের ইস্যু হল দেশের অর্থনীতির বেহাল – এই হাল! এটাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তার সামনে। পড়িমরি অবস্থা! এটা তিনি জানতেন তাই অনেক আগেই বলেছিলেন আমেরিকা নাকি দেশে দুর্ভিক্ষ আনবে।

    গত ৯ ডিসেম্বর কালের কন্ঠের এই শিরোনাম ছিল মার্চের দিকে দুর্ভিক্ষ ঘটাতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে – গোপাল্গঞ্জে শেখ হাসিনা। কিন্তু কেন বলেছিলেন অথবা এর ঘটনা পরম্পরা কি?
    এর একেবারে প্রথমে বা শীর্ষে আছে আপাদমস্তকে চোর একটা শ্রেণী। এটা ঠিক ধনী-গরীবের ধনি শ্রেণী বলতে যা বুঝাই ঠিক তা নয় যে যেকোন সরকারের বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগ থাকে যে সরকার ধনীদের পক্ষে কাজ করে গরীরসহ বাকি দেশের সকলকে ডুবিয়েছেন। বরং এরা হোল চোর-লুটেরা আর হাসিনাকে এমন চোরদের উপর ভরসা করেই নিজ ক্ষমতা-শ্রেণী সাজাতে হয়েছিল। হাসিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা খামতির দিক হল তাঁর অবস্থান ঠিক রাজনীতি না, প্রতিহিংসা! বাবার হত্যার প্রতিশোধ! তাই আকন্ঠ নিমজ্জিত চুরির সুবিধা খাওয়া একটা শ্রেণী যারা জিন্দাবাদ দিয়ে হাসিনার চোখবুজা সমর্থক সেজেছে। হাসিনা তাদের আনুগিত্য কিনেছে। অথচ প্রশাসনের ভুল পরামর্শে হাসিনা যখন তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়েছিল এই আকন্ঠ লুটেরারা সবার আগে সকলে মিলে মানে তারা প্রায় সকলেই ব্যাংক ঋণএর ডিফল্টার তারা কব্জায় থাকা সকল টাকা একসাথে ডলারে কনভার্ট করে দেশ ছাড়তে ততপর হয়েছিল। এতে সৃষ্ট যে ডলারের চাহিদা এটা একেবারেই কৃতিম, স্বাভাবিক অর্থনীতিতে যে ডলার লাগে সেই চাহিদা নয়। আর আমাদের অর্থনীতি এই সীমাহীন যোগান দিতেও সক্ষম ঠ্যাকার কোন কারণ নাই। এই ভারসাম্যহীনতাকেই এই এলোমেলো দশা আমরা বলছি দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। অর্থাৎ হাসিনা নিজেই যে অর্থনৈতিক শ্রেণীর উপর ভর করে তার প্রতিহিংসা বা বাবার নাম প্রতিষ্ঠার কাজ হাতে নিতে চেয়েছিলেন সেটাই তার আসল শত্রু!
    তাহলে এখন হাসিনার চ্যালেঞ্জটা কি? তিনি চিন্তিত কেন?
    সোজা কথায় দুইটা কাজ তাকে করতেই হবে বা অর্জন করতেই হবে। এক নগদ (ক্যাশ) ডলার ঋণ যা কমপক্ষে দশ বিলিয়নের আশেপাশে। যদিও তাঁর আসল প্রায়োরিটি অর্থে প্রধান বিষয় হল, আইএমএফ এর কাছ থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে একটা পজিটিভ বা ভাল রিপোর্ট। মনে রাখতে হবে বিদেশী পুঁজি বাজারের কাছে কোন দেশের অর্থনৈতিক হাল মানে এর সম্ভাবনা-সংশয় নিয়ে (সেই ১৯৪৫ সালে প্রথম আইএমএফ এর জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত) আইএমএফ এর দেয়া রিপোর্ট বাজারের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, আন-বায়াসড রিপোর্ট বলেই মনে করা হয়। যদিও অনেকে ভুল্ভাবে মনে করে থাকেন এমন রিপোর্ট না, যেন আইএমএফ এর কাছ থেকে পাওয়া ঋণই আসল বিষয়। অবুঝ কমিউনিস্টেরা এই বোকা বুঝ তৈরি করেছে। দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে আইএমএফ এর রিমেডি বা প্রতিকার বাতলে দেয়। আর এটাকেই কমিউনিস্টেরা হুদাই শর্ত দিল কেন বলে অবুঝ হৈচৈ শুরু করে থাকে। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কোন দেশের এমন অরররথনৈতিক দুর্দশায় যদি আইএমএফ এর হিসাবে প্রতিকার-বুদ্ধিতে ২০ বিলিয়ন ডলার দরকার হয় তবে আইএমএফ নিজে ছয় বিলিয়নের বেশী দেয় না। অর্থাৎ আইএমএফ এর লোন দেয়াটা মুখ্য না ওর রেকমেন্দেড করণীয় পরামর্শটাই মুখ্য। এটা ২০১৮ সালে পাকিস্তানের ইমরানের ক্ষেত্রে কি হয়েছিল সেই উদাহড়ণ মাথায় রেখে বলছি। চীন পুরা ২০ বিলিয়ন একাই দিতে চেয়েছিল, ইমরান নেন নাই। আইএমএফ ৬, চীন ৬ আর বাকিটা সৌদি (তেল শোধনাগার প্লান্ট) থেকে এভাবে নিয়েছিলেন। কারণ বাজার এসব পরিস্থিতিতে একমাত্র প্রফেশনাল বিশ্বাসযোগ্য আইএমএফ পাকিস্তানের অর্থনীতির অলিগলিতে ঢুকে সব দুর্বলার কথা জেনেছে কিনা।
    অদিকে এখন বলাই বাহুল্য আইএমএফ এর এক নম্বর শর্ত হবে চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণ উদ্ধার করে নিয়ে আসো।  ডলারের দুধরণের বা নানান রেট বন্ধ কর। সরকারী-ব্বসরকারির মধ্যে একদুই টাকার ফারাক এমন স্থিতিশীল ডলারের মূল্য-হার ফিরিয়ে আনতেই হবে। এটাই মূল জিনিষ। অতেব নগদ ডলারের ঋণ যোগাড় আর তা নিয়ে এরপর আইএমএফ এর প্রতিকার-পরামর্শ পালন শেষ করে আইএমএফ এর কাছ থেকে ভাল অর্থনৈতিক অবস্থার একটা সার্টিফিকেট যোগাড় – এই হল হাসিনার দুই মাথা ব্যাথার নাম!
    দুটাই কঠিন কাজ!

    চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণের অর্ধেক্টাও কি উদ্ধার করতে পারবেন?  মনে রাখতে হবে এরাই কিন্তু হাসিনার সমর্থক ও পোষ্য শ্রেণী; মানে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে নামার মত কাজ এটা! কাজেই ………!!!

    দুই বা দ্বিতীয়টা হল চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার ঋণ আনা! কিন্তু চীন কি হাসিনার উপর আস্থা রাখবে? হাসিনা বিনিময়ে চীনকে সবকিছু দিতে রাজী থাকলেও চীন আপত্তি করতে পারে এই বলে যে তুমি তো বারবার কথা দিয়েও ভারত-প্রেমি! তাই আস্থা নাই!

    এখানে আমরা একটা কথা মনে রাখতে পারি যে এবারই প্রথম হাসিনা আমেরিকার চাপ সামলানোর জন্য ভারত-নির্ভর নয়। যেটা অন্তত ২০১২ সাল থেকেই হাসিনার ভারত-নির্ভরতার মূল কারণ! যেটা এবারই ভারতের আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ করেছে আর হাসিনা এর বিনিময়েই ক্ষমতায় তা নয়। কাজেই এবার ভারতের স্বার্থ নিয়ে পরে দেখব মনে করার সুযোগ হাসিনার আছে।  আর সেই লিভারেজ ব্যবহার করে সে চীনকে সন্তুষ্ট করতে লেগে পড়তে পারে! চাইকি এজন্য এবার যদি হাসিনাকেই এক নম্বর ভারত-বিরোধী ভুমিকায় দেখা যায় তাতে অবাক হবার কিছু নাই! যদিও কি হয় কি দাড়ায় সেটা আমাদের বাস্তবে দেখে বুঝতে হবে।

    আর এসব কিছুর শেষ কথাটা কীঃ
    শেষ কথাটা হলো – দেশের অর্থনীতির বেহাল দশা, নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রাস্ফিতিতে গরীব মানুষ ক্রয়ক্ষমতা না হারিয়ে ফেলে; খাদ্য ক্রয় করা টিকে থাকার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলার আসল নাম হল দুর্ভিক্ষ – এটা যে আমরা না ভুলি! বিরোধীদলেগুলো যত দ্রুত ঐ আমেরিকা আসতেছে – এই মিথ্যা ত্যাগ করে বাস্তবে ফিরে আসে এটা প্রথম কাজ্জ। এরপর হাসিনার চ্যাক্ষমতার চ্যালেঞ্জ বা দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থাটার গুরুত্ব বুঝতে পারে আর তা থেকে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে এবং তা ইতিবাচকভাবে এটাই হতে পারে তাদের বেরিয়ে আসার পথ! 

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    গৌতম দাস
    https://wp.me/p1sCvy-5i1

    খুবই তাতপর্যপুর্ণ হিন্দুস্তান টাইমসের এই কার্টুন যা ছাপা হয়েছে এক রিপোর্টের সাথে। সারকথায় যা I WON! আর  BANGLADESH LOST! মানে হল  ইন্ডিয়ান অন্তত এই মিডিয়া আর হাসিনার সাথে নাই! 

     

     

    আমি বিরক্ত! যারপরনাই বিরক্ত! আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে? তাহলে?
    [যারা মনে করেন – “আমেরিকা পালাবে? আমার বিশ্বাস হয় না!” – আমি তাদের ধারণাকে সম্মান জানাচ্ছি। আর আপাতত আমরা দেখি ঘটনা কোন দিকে যায়। এর আগে পাশাপাশি থাকতে আমি অসুবিধার কিছু দেখছি না।]

    হাসিনা তো এই প্রথম নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করল না, এসব তো সে আগেও করেছে ফলে সেদিক থেকে নতুন কিছু না, সেসব। ফলে আমাদের অজানা নয়!

    কিন্তু বিরোধীরা মানে, যেমন ধরেন সুনির্দিষ্ট করে ফেসবুক-ভিত্তিক কিছু সরকারবিরোধীদের কথাই যদি ধরি – এদের মধ্যে কিছু লোক যারা বাস্তবতা ফেস করতে পারছেন না।  আচ্ছা বলেন ত – আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে এটা কী আমরা জানি না!  দেখি নাই কখনো? তাই কী এখন  অনেকে বুঝতে পারছে না যে কী হইতেছে! আমাদের উচিত হবে আমেরিকা পলাইতে নিলে এর আগে (২০১৮ নির্বাচনের পরে) আমরা কী দেখেছিলাম সেই স্মৃতি হাতড়ানো! সব খুঁজে বের করা।

    এমনিতে যারা সহজে ভাবতে পারছেন না, সমস্যা তাদের একটা না অনেক। এই সমস্যা মনোগঠনগত! যেমন বাস্তব কী, রিয়েল [real]  কি – এটা তাদের কাছে অস্পষ্ট। মনে করেন বুঝেছেন কিন্তু আসলে না। আইডিয়েল কেই তারা রিয়েল মনে করেন তাই এরা কনফিউজড বা বিভ্রান্ত, আইডিয়াল [ideal] এর সাথে রিয়েলের ফারাক করে বুঝতে হবে।  আইডিয়েল মানে যা হওয়া উচিত জ্ঞান করে ব্যাপারটা জেনেছিলেন বা শিখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নাই। কারণ বাস্তবে যা হয় ওটাই তো সত্যি, বাস্তব অর্থে সত্য [reality]!
    অথচ আমাদের সরকারবিরোধী সমর্থকেরা এদের অনেকে হল এমন, যা তারা দেখতে চায় না যেন সেটা বাস্তবে ঘটতে পারবে না বা ঘটেই নাই; ঘটবে না – এমন মনে করা ব্যক্তি বা চিন্তা করে এমন ব্যক্তিত্ব!
    এটাকেই অনেকে পুষ্ট না-হওয়া মানসিক বিকাশ বলবেন হয়ত তা বলুক!  তবে  এদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা দেখা যায় যখন সাময়িক পরাজয় আসে! আর তাতে এরা আরো বাস্তবতা বিমুখ হতে শুরু করে। আর এতে সাধারণত সবচেয়ে ক্ষতিটা হয়, এরা আবার দ্রুত উঠে দাড়াতে পারে না!

    ভগ্নদুত কীঃ
    পুরানা বা সংস্কৃত ঘেষা বাংলায় একতা শব্দ আছে ‘ভগ্নদুত’ বলে। আগেরকার রাজাদের দিনে, যেখানে কোন যুদ্ধ চলতে তা থেকে রাজধানী বা রাজার আবাসস্থল অনেক দুরেই হত। এখন সেসব যুদ্ধের খবরাখবর দেয়া-নেয়ার জন্য বিশেষ দক্ষ বিশ্বস্ত রাজদুত ছিল। তাদের মাধ্যম্বের রাজা যুদ্ধের খবরাখবর নিতেন। এখন কোন যুদ্ধে রাজার পক্ষ যদি পরাজিত হত তো সেই খবরও তো রাজার কাছে পৌছাতে হত, কেবল সাফল্যের খবরগুলোই রাজার কাছে পাঠাত তা তো না! কিন্তু সমস্যা বাধত তখনই!
    দুনিয়াতে মাথাগরম গাধার মত বোকা রাজার সংখ্যাও তো কম ছিল না। তো তেমনই রাজারা অনেকে যে কান্ডটা করে বসত তা হল, রাজার পক্ষের পরাজয়ের বার্তা বয়ে আনতে যে রাজদুত, রাজা পরাজয়ের বার্তা শুনে তাকেই খুন করে ফেলত। যেন বিরাট বিরত্ব দেখিয়েছেন ভাবত। আর এতে মানে দাড়াতো যেন দুত নেহায়ত খবরটাই ক্যারিয়ার বা বাহক নন। ঐ বাহক-ই যেন রাজাকে যুদ্ধে হারিয়েছেন! মানে হল, পরাজয়ের বার্তা যে বয়ে আনছেন আর রাজা যুদ্ধে হেরেছেন যে কারণে এদুটা যে একই জিনিষ না তা এসব গাধার বুদ্ধির রাজারা বুঝতে চাইত না। আর কিছু চামচা পারিষদ এতে তাল দিত যে দেখেছো তাদের রাজা কত সেনসেটিভ এই বলে তেল মারত।
    তো বাংলাদেশে এখন হয়েছে তাই। যারা বিরোধীদের খবর স্বীকার করে কথা বলছে তাদেরকেই দায়ী করা লোকের সংখ্যা বাড়ছেই। ভগ্ন দুত-কে হত্যা করাটাই এখন বীরত্ব! আশা করি এখন এমন বীরত্ব তারা ত্যাগ করবেন!

     

    আচ্ছা, আমেরিকা হেরে গেলে পরে, কী করে থাকেঃ
    প্রথম কথা হল, আমেরিকা হেরে গেলে কী করে? মানে পলায় কেমনে?
    তা আমরা কী আগে দেখি  নাই? মানে বলতে চাচ্ছি, এই ২০২৪ সালের আগে দেখি নাই?

    যেমন ধরেম ২০১৮ সালের নির্বাচনে, যখন বিএনপিকে সাত আসন পাইতে দেওয়া হয়; বিশেষ করে সে নির্বাচনের পরে কী হয়েছিল?
    সাহস করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন তো দেখি, কার আশ্বাসে বিরোধীরা সেবার নির্বাচনে গেছিল? সেবার হঠাত বিরোধীরা “নির্বাচনে যাবার কৌশল” – এপথ নেয় নাই নিশ্চয়!
    আমেরিকার কোন আশ্বাস ছাড়া তো সেটা হয় নাই! যেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যাই হোক! এখন হতেই পারে সে আশ্বাসের বাহক ছিল কামাল হোসেন! অথবা বিরোধীদলগুলো নিজেই যে যার মত বাড়তিভাবে আমেরিকান কর্তা বা দুতাবাসের সাথে কথা বলে নিয়েছিল! মিনিমাম এতটুকু না হলে তো সেবার নির্বাচন কৌশল ওমন হয় নাই! তা বলাই বাহুল্য!

    তাহলে এখন আসেন। ঐ নির্বাচনের দিন সকালে উঠে যখন সকলে জানতে পারল যে ভোট আগের রাতে হয়ে গেছে – এমনকি জেনেছি তখনকার আমেরিকান রাষ্ট্রদুত রবার্ট মিলার [Earl R. Miller]তিনিও এর বাইরের নন! এখন বলেন তিনি কেন আম জনতার মত সকালে উঠে জানলেন? আগে কেন জানতে পারলেন না?
    আসলে কথার পিঠে কথা আসে। এই রবার্ট মিলার কোথা থেকে দৃশ্যপটে আসলেন? রাষ্ট্রদুত তো ছিল মার্শা বার্ণিকাট। হা, আমাদের ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক ৪২ দিন আগে আমেরিকা, বাংলাদেশে তার রাষ্ট্রদুত বদল করেছিল। বার্ণিকাটের বদলে মিলারকে এনেছিল।
    আর পাঠক এটা নিশ্চয় জানেন আমেরিকা কখন মাঝপথে তার রাষ্ট্রদুত বদল করে দেয়? সরকারের রানিং পলিসি আচমকা বদলে গেলে মানে আমেরিকা বদলালে  তারা পরিস্থিতি সামলাতে সাথে রাষ্ট্রদুতও বদলে দেয়। এমনকি এর আগেও ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের ঘটক রাষ্ট্রদুত বিউটিনিস-কে ১/১১ ঘটনার ছয়মাসের মধ্যে প্রত্যাহার করে বদলে দিয়েছিল আমেরিকা!  তাহলে আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে – এটা তো আমরা কিছু এক্সপেরিয়েন্স রাখি! অভ্যস্ত আমরা। তাহলে এখন বাস্তবতাকে মানতে না চাওয়া কেন?
    বরং, এখনকার প্রধান করণীয় তো বাস্তবতা বা রিয়েলিটিকে আপন করে নিয়ে আবার উঠে দাড়াতে চান যারা তারা মুল্যায়নে বসেন নয়া রাস্তা খুজেন।

    কাউকে দেবতা বানানোটা নিজেরই ভুলঃ
    এধরণের বহু বাণী আমরা জানি যে – কারো উপর এত আস্থা রেখেন না যেন সে নিজেই নিজেকে দেবতা গণ্য করতে থাকে। আমাদের এমন অসচেতনাতেই আমাদের কেউ কেউ আমেরিকাকে দেবতা গণ্য করে নিয়েছিল। আর বলাই বাহুল্য সেটা বিরাট ভুল। আর তা বুঝতে আর এই ভুল কাটাতেও তাদের বেশী সময় লাগছে বা লাগবে। এর একনম্বর ভুলটা হল, আমেরিকা হল মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক – পাহারাদার গণ্য করার পর্যায়ে নিয়ে গেছিলাম বুঝে না বুঝে কেউ কেউ।  এর বাস্তব দিকটা বুঝতেই চাই নাই। এভাবে বুঝতেই চাই নাই যে মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক আমেরিকা যে নয় তা সে নিজেও জানে। সে এসেছিল এটাকে ব্যবহার করতে, এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতিতে এটাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন; এতটুকুই। আমরা কী জানতাম না যে গত পনেরো বছর ধরে আমেরিকান সমর্থনেই জঙ্গী তাড়ানোর অজুহাতে হাসিনা সরকার দানব হয়েছে? এমনকি দুমাস আগেও ইইউ এর নেতারা (অন্তত তিনটা দেশ) তর্ক করেছে যে হাসিনা তো ভালই নাকি জঙ্গী তাড়িয়েছে! সুতরাই তাকে সরাতে চাই কেন আমরা? হাসিনা যে কিছু হলেই জঙ্গী তাড়ানোর নামে তার সব রাজনৈতিক-বিরোধীদের নির্মুল করে দিয়েছে এটা কী আমেরিকা-ইইউ জানত না, দেখে নাই?
    কাজেই আমাদের পুরা ভার ছেড়ে দিয়ে এত আস্থা রাখা কেন? এজন্যই গত দুবছরের আমাদের মাঠের ততপরতার উপর  আমেরিকা-ইইউ এর যদি নয়া কোন সমর্থন দিয়ে থাকে সেটাকে তাদের কাফফারা হিসাবে দেখা আমাদের জন্য সবচেয়ে সঠিক হত।  যদিও বড় বিরোধী দলগুলো এপথের চেয়ে বরং পুর্ণ ভক্তি দেখিয়ে “আমরা এবিষয়ে আমেরিকান অবস্থান সমর্থন করি” ধরণের বয়ান দিয়ে গেছে আমরা দেখেছি।

    তবে এমন চিন্তার ভুল বাংলাদেশে বহুদিনের। যেমন ধরেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম কিনা! এনিয়ে সবচেয়ে বেশী করে নিজের অজ্ঞতা দেখিয়ে থাকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা। আর এদেরই প্রভাবে বেশ খানিকটা গত দুবছরের মাঠের বিএনপি।
    যেমন ধরেন, জাতিসংঘকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আচ্ছা বাংলাদেশ কী সার্বভৌম? তাতে ঐ কর্তা বলবে অবশ্য অবশ্যই। চাই কী তিনি জাতিসংঘের ম্যান্ডেট খুলেও দেখায় দিতে পারেন যে জাতিসংঘের চোখে বাংলাদেশ সার্বভৌম। কিন্তু এবার যদি সেই কর্তার কাছে আবার দাবি করেন যে আমি যে আমাদের দেশের জন্য যেকোন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত  নিতে যে ক্ষমতা লাগবে সে ক্ষমতা আমারটা আমাকে বুঝায়ে দেন! তাহলে কী হবে?
    এবার সেই কর্তা বলবে আমি বিনয়ের সাথে বলছি, আসলে সার্বভৌম নিজেই হয়ে উঠতে হয়, আপনার সার্বভৌমত্ব অন্য কেউ গুনে গুনে আপনাকে আপনার সার্বভৌমত্ব বুঝিয়ে বা ফিরে দিতে পারে না! মানে নিজেই উঠে দাড়াতে হয়।

    এবারও তাই হয়েছে, আমরা বুঝেছি উল্টা। আর ওদিকে আমেরিকা চেয়েছিল আপনাদের মানবাধিকার-গণতন্ত্র ফেরত দিবার অজুহাতে এই অঞ্চলে তার কিছু এজেন্ডা ছিল ভেবেছিল তা কতটা পরিপুরণ করে নিতে পারে।  কিন্তু আপনারা সেদিকটা না খেয়াল করে যারা যারা তাকে দেবতার আসনে বসিয়ে ছিলেন তাদের এখন সেখান থেকে বের হতে একটু সময় লাগবে, লাগছে হয়ত। কিন্তু বের হতেই হবে কারণ এটাই বাস্তবতা!
    আবার এখন এসব কথা তুলছি বলে ফিরে এক প্রান্ত থেকে উলটা আরেক প্রান্ত মানে চীনকে দেবতা মানতে শুরু করে দিয়েন না!

    তাহলে এখন কী হবেঃ
    এখন যা হবে তা সবই মূলত রুটিন। সারকথায় সবাই জানাবে হাসিনা খুবই খারাপ! অন্যজনও বলবে হা সে তো অবশ্যই খারাপ!
    হাসিনা আমাদের উত্তর কোরিয়া বানায়ে ছাড়বে অথবা বাংলাদেশ একদলীয় দেশ হয়ে যাবে ইত্যাদি কথা উঠবে।
    হ্যা অবশ্যই সন্দেহ নাই। কার্যত তাই হওয়া শুরুওও হয়েছে। যদিও এর কোন প্রভাব হাসিনাকে থামাবে না বা তারা থামাতে আসবেও না।

    তবে এবার কথিত যে সংসদ কায়েম হল, তাতে ৬১ জনের বেশী স্বতন্ত্র হিসাবে বিজয়ের দাবিদার। এদের মধ্যে আবার ৯৫% এর মত হবেন যারা এখনও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটির সক্রিয় সদস্য। মানি সক্রিয় আওয়ামী লীগার! তাই আগামিতে আর জাতীয় পার্টি নয়। বিরোধীদল বানাবার এবারের নয়া ফর্মুলা হবে এসব স্বতন্ত্র (আধা- মূলত আওয়ামী লীগারেরা) এরাই এবার এক সংসদে বসেই সংসদীয় বিরোধী-জোট বানায় নিবে। আর এবাই বিরোধী দলের আইনি মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা দাবি করবে। এরকমই একটা ‘বিরোধীদল’ হতে যাচ্ছে খুব সম্ভবত।  এতে হাসিনাও বাঁচবে; আর কত! বার বার এই নির্বাচন আসলেই দরাদরি  আর জাপা তারা আজকাল অনেক ডাট মারে এমনকি মাঙনা বিদ্যুতকেন্দ্র রেন্টাল বিদ্যুৎ এর মালিকানা চেয়ে বসে; সেগুলো আর কত হাসিনা সহ্য করবেন?  এছাড়া এদের জন্য হাসিনাকেও ভারতের হাত-পা ধরতে হয় যেন (জাপা) কাদেরদেরকে একটু বলে বা বকে দেয়! তাই এবারই সেসবের বালাই শেষ। এখন থেকে সবাই স্বাধীন!
    আর বাকিরা  মানে বিদেশিরা কি করবে? তারা সকলেই একটা করে বিবৃতি দিয়ে তাদের দায় শেষ করবে।

    আমেরিকান বিবৃতিঃ
    রুটিন যেভাবে বলে থাকে – মার্কিন  পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে একমত যে, এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ না করায় আমরা হতাশ”। ফলে বুঝতেই পারছেন আমেরিকা এখন কী সুবিধায় আছে। মানে হল এখন উলটা দাঁড়ালো যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আমেরিকা হতাশ! কী তামসা! সাথে বিরোধীদলের প্রতি পরামর্শও রেখেছে আমেরিকা – “সব দলের প্রতি সহিংসতাকে পরিহার করারও আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন” – কিন্তু কেন এমন পরামর্শ?
    কারণ এখন আবার বিরোধীরা কোন আন্দোলন করতে গিয়ে যদি হতাহত খুনোখুনি মৃত্যু হয় তাই, আগেভাগেই আমেরিকা হাত ধুয়ে নিল যে আমেরিকা কিন্তু এতে নাই!

    আরও আছে কিছু কথার কথা, নিচে দেখেনঃ

    “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন
    লক্ষ্যে কাজ করা, বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও নাগরিক সমাজের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের
    জনগণের মধ্যে ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

     এর প্রথমে আছে বাইডেনের হারু প্রোগ্রাম IPS বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি। যেটার বা এই ব্যর্থতার নেতা স্পেশালিস্ট  ডোনাল্ড ল্যু এর গলার এই হারু-মালা চড়ায়ে দেয়া ছাড়া এর আর কোন মূল্য নাই। বাইডেনের IPS এর ঘন্টা বেজে গেছে। এই কঠিন কথাগুলো বলছি এজন্য যে একবার তাকায় দেখেন যে এগারোটা দেশ হাসিনাকে তাঁর বিজয়ে গতকালই অভিনন্দন জানিয়েছে এই প্রথম সাত রাষ্ট্র কারা?

    শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানালেন যে ৭ দেশের রাষ্ট্রদূতেরাঃ
    লিঙ্ক এখানে
    । এই সাত দেশের মধ্যে চীন, রাশিয়া, ভুটান ও ভারত – এই চারজন হল হাসিনা বা চীনের ঘরের লোক! মানে এরা এ তো হোনাই থা ধরনের! কিন্তু বাকি তিন রাষ্ট্র ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা – এরা তো এখনকার খোদ আমেরিকার প্রত্যক্ষ স্ট্রাটেজিক প্রভাবের দেশ! যার মধ্যে আবার ফিলিপাইনো???? কি সাংঘাতিক?? কোল্ডওয়ার যুগের ফ্যাসিস্ট জেনারেল মার্কোস এর ছেলের ফিলিপাইন? মানে মার্কসের ছেলে যার বর্তমান প্রেসিডেন্ট! শুধু তাই না! এই যে একটু আগে আমরা আমেরিকান বিবৃতিতে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার খায়েস পুনঃব্যক্ত হতে দেখলাম সে খায়েসের এখনকার প্রধান রাষ্ট্রই হল এই ফিলিপাইন। ফিলিপাইনকে দিয়ে আমেরিকা নিয়মিত চীনের সঙ্গে ফিলিপাইনের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিবাদ জীবন্ত রেখে চলেছে। তাহলে সেই ফিলিপাইন হাসিনার সমর্থনের প্রায় এক নম্বরে সমর্থন জানাতে এসে পড়েছে, সেটা কি কারণে? তাহলে বাইডেনের আমেরিকা কোথায়? তারা ফিলিপাইনকে এলাও করল কেন???

    সব আউলাইনা লাগতেছে! জেনারেল মার্কোসের ছেলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বংবং মার্কোস [Bongbong Marcos] আমেরিকার বাইরে এসে এ’কোন খেলা!!!

    আবার দেখেন বৃটেন। নির্বাচনের আগের তিনমাস আমার কান ঝালাপালা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীদেরকে বারবার তিনদেশের নাম শুনতে হচ্ছিল – বৃটেন (যুক্তরাষ্ট্র) ফ্রান্স ও জর্মানির। এদের কথা হল, হাসিনা নাকি ভালই জঙ্গি তাড়িয়েছে তাহলে আমরা হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি চাই কেন? ইত্যাদি। আর আজ দেখেন কী তামসা! রাত না পোহাতেই আমেরিকান বিবৃতি অনুসরণে সাথে সাথে বিবৃতি বাংলাদেশের নির্বাচন গণতান্ত্রিক হয়নি: যুক্তরাজ্য! মানে এরা সবদিকেই আছে লিপ সার্ভিস নিয়ে।
    আবার নিরুত্তর প্রশ্নো আছে। যেমন ধরেন এখন মানে আট জানুয়ারি তারা জানাচ্ছে  –নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠায়নি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা। অথচ এই খবরটা আগে মানে নির্বাচনের জানায় নাই কেন? বাংলাদেশে স্ব স্ব দেশের এমবেশী কী করছিল? অথচ নির্বাচনের পরে বলাতে এসব ভুয়া পর্যবেক্ষক তারা যা করতে এসেছিল এর সবটাই পুরণ করে ফেলেছে। এমনকি গতকাল বিকেলের সাংবাদিক সম্মেলন করে আরো বিভ্রান্তি ছড়ানো পর্যন্ত! আমরা এজন্য কাকে দায়ী করব?

    কিছুক্ষণ আগের, নয়া ১৯ দেশের অভিনন্দনঃ
    এই সমর্থন-অভিনন্দন গুলোর অর্থ হচ্ছে যে আপনাদের দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে কিনা আমি আগ্রহী নই। কিন্তু আমি আপনারদেশের সাথে ব্যবস্থা চাই। আর এই উনিশ দেশের মধ্যে আছে, সৌদি আরব আর জাপান। জাপান মানে? হা এটা চীনবিরোধী আমেরিকান সবচেয়ে বড় স্ট্রাটেজিক মিত্র! আমরা তাই জানতাম। অন্তত ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যু বা অন্তত এশিয়ায় আমেরিকার চীন বিরোধীতার প্রশ্নে। অথচ হায় হায় তাহলে এ আমরা কী দেখছি? কেন?  আরো মেট্রো রেল বা সমুদ্রবন্দর প্রকল্প!!! সব চীন পেয়ে যাবে এই ভয়ে? ভাগ পেতে?
     সৌদি নয়া তেলশোধনাগার প্রকল্প! বাকিটা পাঠক বুঝে নেন।

    আসেন এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধানঃ
    এটা নতুন না যে জাতিসংঘের বইয়ে বা দলিলে যাই থাক, জাতিসংঘ গলা চড়ায় ততটা যতটা আমেরিকা তাদের চাবকায়! গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে আছে “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান এর তো তাতে কোন খবর ছিল না। তবে গত একদেড় বছর আমেরিকা চাবকিয়েছে তাই তাদের কিছু চিৎকার শুনেছি। এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান – হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক; এটাই তার সম্ভবত শেষ চিৎকার!  যদিও জোশের ঠেলায় একটু বেশী বলে ফেলেছেন। বলেছেন, “পথ পাল্টান, সত্যিকার অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পরিবেশ তৈরি করুন”! 

    কথাগুলো শুনতে খুবই ভাল লেগেছে সন্দেহ নাই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল হাসিনাকে কী পাগলা কুত্তায় কাটছে? তিনি এসব করবেন কেন? তার ঠেকা লাগছে? তার তো কোন ঠেকা নাই!

    তাহলে কী হবে, ঠিক কী বলতে চাইঃ
    কথা খুব সহজ! যার মাথা ব্যাথ্যা তাকেই ওষুধ খুঁজে আনতে হবে। সেই মুরোদও লাগবে! মুরোদ যার ক্ষমতা তারই হবে, তার কাছে ফিরে আসতে পারে তা!!!
    এভিন্ন সবকিছুতেই রুটিন বিবৃতিই চলতে থাকবে!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৯ জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • যেন এইবার ইন্ডিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র’ ফিরে আসবে

    যেন এইবার ইন্ডিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে “গণতন্ত্র” ফিরে আসবে!
    গৌতম দাস
    ৩ ডিসেম্বর ২০২৪  রাত  ২১ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-5gC

     

     


                 
    SREE-radha Dutta in DW Bangla 

    যেন এইবার ইন্ডিয়া বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। নাকি অন্যকিছুর পায়তারা??? তবে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সর্বশেষ ভারতের শ্রীরাধা দত্ত আজ ডি ডাব্লু বাংলা [DW Bangla] তে জায়গা কিনে [ব্রডকাস্টিং টাইম কিনে] কিছু একটা ছেড়ে দিয়েছে।  তাতে এটা পরিস্কার যে গত ১ জানুয়ারি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম ভারতের পেট কামড়ে উঠেছে। কিছু একটা বের হতে চাচ্ছে। সেজন্য সুবীর ভৌমিক বা চন্দন নন্দি একযোগে মাঠে নেমে এসেছিল। আমাদের আর্মির বিরুদ্ধে সব উস্কানি দেয়া ভিত্তিহীন ‘নিউজ’ করেছিল। আজ শ্রীরাধাও বক্তব্য রেখে ভারতের সেই ততপরতার প্রথম পর্ব পর্যন্ত শেষ করলেন। পরে যার আরও পর্ব আছে, আসছে।
    এটা আসলেই একটা রেকর্ড যে ভারতের কোন সরকারি কর্তা এমনকি মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী অথবা একাদেমিক, গবেষক ইত্যাদিদের কেউ বাংলাদেশে তো বটেই এমনকি কোন পড়শি দেশে দুইটা সুনির্দিষ্ট কথা গণতন্ত্র আছে কী নাই, নির্বাচন ঠিক হচ্ছে না এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু শ্রীরাধাদত্ত আজ রেকর্ড করলেন। এমনকি একদুই বছর আগেও শ্রীরাধা বাংলাদেশ নিয়ে এমন কথা কখনও বলেন নাই।  এবার শুধু তাই না, আরো সরেস তিনি, –  অভিযোগ করে বলেছেন,   “গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিয়ে বিভ্রম তৈরি করছে আওয়ামী লীগ’।  অবিশ্বাস্য!!! ভারতের এই শ্রীরাধাদত্ত কে আমরা আগে দেখি নাই। চিনি না।  এতদিন শ্রীরাধাসহ সকল ভারতীয়ের যে বার্তা বা বক্তব্য দিতেন তা ছিল সরকথায়  যে – আমাদের হাসিনা কেই চাই, আমরা ভাল পাই। আমাদের খুব সুখ হয় – চার হাত পায়ে লুটে খেতে পাই বাংলাদেশকে। এটা আমাদের মুখ থেকে কেড়ে নেয়া যাবে না। কোথাকার কোন আমেরিকা স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে সরানোর চেষ্টা করে কেন?  এমনকি আরো এগিয়ে মহাকূটনীতিক অবস্থান যেন ভারত প্রকাশ করতেছে এমন ভাব দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবেও বলেছে – দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া এটা ভারতের বাগান বাড়ি। এখানে আমেরিকা ভারতের সুখের দিকটা আমল না করে হাসিনাকে সরাতে চেষ্টা করতে পারে না।  অথচ এধরণের ছ্যাচরামো বক্তব্যে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ কী তা বুঝা গেলেও বাংলাদেশের বাসুন্দা-নাগরিক যারা তাদের ইচ্ছা মতামত কেউ আমলে নেই নাই – সেখবর নাই। সবই যেন ভারত আর আমেরিকার কামড়াকামড়ি  করে নির্ধারণ করবে! আমরা বাংলাদেশিরা কেউ না।

    আজ শ্রীরাধাদত্ত একেবারে “গণতন্ত্র” দিয়ে সব ভাজা-পোড়ার আইটেম সব খেয়ে এসেছেন । তাই মুখ খোলা মাত্রই কেবল গণতন্ত্রই বের হয়েছে। আজিব কথা হল, তিনি বলছেন ২০১৪ আর ২০১৮ নির্বাচনও নাকি সুষ্ঠ হয় নাই। ও মোর খোদা একী শুনতেছি?? হে প্রভু……!
    তাহলে সুজাতা সিং ভারতের কে? শ্রীরাধাদত্ত কী ভারতের এই কুখ্যাত পররাষ্ট্র সচিব-কে অস্বীকার করছেন? তিনিই বাংলাদেশে সেই কারিগর  যিনি ২০১৩ সালে বিরোধীদল কে হবে – মানে জাতীয় পার্টি-ই হবে এর নির্ধারক সেটিং-কারি কর্তা! আমরা কীভাবে সুজাতাকে ভুলি???
    তাই এখনও এটা অবিশ্বাস্য-ই যে তিনি কাল সকালেই আবার বলবেন না তো যে সাময়িক হ্যাক হয়ে গেছিলেন ঠিক যেমন শুনি মানুষের ফেসবুক একাউন্ট নাকি হ্যাক হয়ে যায়???  দেখা যাক! DW বাংলা কিন্তু কার্যত পেইড চ্যানেল। মানে এটা সাংবাদিকতা নয়! ফেলো কড়ি কড়ি মাখো তেল!  সবাই আপন!
    তবে শ্রীরাধার মূল বাক্য যেটাকে শিরোনাম করা করেছেন তারা তা হল, ‘বহুদলীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বিভ্রম তৈরি করছে আওয়ামী লীগ’।

    তার মানে কী এখন নির্বাচন স্থগিত করে দিয়ে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লিডার এবার ইন্ডিয়া হয়ে যাচ্ছে???? না! মাথা ঘুরাচ্ছে!
    আসলে কোন প্রশ্নেরই উত্তর নাই অথচ শ্রীরাধা বিরাট এক মুখ হা করে খুলে রেখেছেন! যেমন তাহলে হাসিনার কী হবে? এটা কী শুরু না শেষ? শেষেই বা কী হবে???

    আর বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন এটা কোন ভারত? কেন সে এতদিন পরে পল্টি দিতেছে? কী উদ্দেশ্যে? সে কী জানে বাংলাদেশে ভারতের কোনই বেইল নাই! নুন্যতম কোনই বিশ্বাসযোগ্যতা নাই!

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৪ জানুয়ারি   ২০২৪,  মধ্যরাত  ১২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আরব স্প্রিং – বাঘ আসছে বলে এক ভুয়া প্রপাগান্ডা

    আরব স্প্রিং – বাঘ আসছে বলে এক ভুয়া প্রপাগান্ডা
    গৌতম দাস
    ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৭

    https://wp.me/p1sCvy-5bf

     

                      Timeline: How the Arab Spring unfolded

    শেষের কথা এখন শুরুতেঃ
    আজ এখন ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ রাত পোনে বারোটা। আজ এনটিভি নিউজে দেখলাম ঢায় রাশিয়ান রাষ্ট্রদুতের একটা বক্তব্য প্রচার ও দেখানো হয়েছে। যার সারকথা হল, তিনি বলছেন রাশিয়া বাংলাদেশে বয়াসে আমেরিকার সাথে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা করবেন না – মোটাদাগে এই হল বয়ান। যেটা ঢাকায় ম্যানুফাকচার্ড আরব স্প্রিং সংক্রান্ত অসৎ প্রপাগান্ডা থেকে তারা সরতে চায় এমন বলে মনে হয়েছে।

    প্রিন্ট মিডিয়া থেকে এখন ভোরবেলা পাওয়া বয়ানটা হলঃ
    “বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে কোনও প্রতিযোগিতা করছে না রাশিয়া। তবে পশ্চিমা দেশগুলো কী করেছে, আর কী করতে পারে, তা মস্কো তুলে ধরেছে”।

    কিন্তু কী করতে পারে বলে আগাম যা ঘটে নাই তা নিয়ে এই প্রপাগান্ডার দরকার কী?  সেটা আমরা বুঝতে পারি নাই। একাজটা নিজেই কী এক হস্তক্ষেপ নয়? ঢাকার রাশিয়া দুতাবাসের কী কাজের অভাব পড়েছে? বাংলাদেশের পাবলিক কী নিজস্বার্থ নিজে বুঝতে অক্ষম? disgusting! এটা রাষ্ট্রদুত-সুলভ এক্সপেক্টেড আচরণ হয় নাই!

    এমনিতেই সবচেয়ে বড় কথা মুখপাত্রের  জাখারভা কথিত বিবৃতি যেই দিয়ে থাকুক এটা সীমা ছাড়ানি। ঐ বিবৃতি লিখেছে – “গত ১২-১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সরকারবিরোধীরা রাস্তাঘাট অবরোধ করে, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়”। এই বক্তব্য একেবারে খুবই এক্তিয়ার বহির্ভুত। ফলে এটা রাশিয়ার প্রমাণিত হস্তক্ষেপ। কারণ,  রাশিয়া কিভাবে নিশ্চিত হল যে  গত ১২-১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সরকারবিরোধীরা রাস্তাঘাট অবরোধ করে, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে??? এটা রাশিয়ার কেউ কিভাবে জানল, নিশ্চিত হল? কোন জুডিশিয়াল তদন্ত কী হয়েছে? কে করেছে? তদন্তকারীদের সাথে রাশিয়ার যেকেউ এর কী সম্পর্ক? কী এক্তিয়ার???   ঢাকার রাশিয়ার দুতাবাসের আমেরিকা হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেই চলেছে।

    তাহলে সেই রাশিয়ান দুতাবাসের এই লিখিত বয়ান এটা কী আমেরিকানদের হস্তক্ষেপ এর চেয়ে বড় হস্তক্ষেপ নয়? তারা তো আমাদের ঠুঠো বিচার বিভাগেরও বাপ হয়ে বসেছে যে রায় দিয়ে বলে দিচ্ছে কে আগুন দিয়েছে!!! এটা কিভাবে তারা করতে পারে??????

    মূল লেখার শুরু এখান থেকেঃ
    আরব স্প্রিং – এই বাঘ আসছে বলে প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে! বলা হচ্ছে এনিয়ে নাকি এক বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়া! এনিয়ে বাংলায় রিপোর্ট করেছে সমকাল; যদিও তাদের প্রিন্ট ভার্সানে এর হদিস পাওয়া যায় নাই। তবে বাংলা বিবিসি আবার অফ চান্সে কিছু কামিয়ে নিতে নিজ মুরোদে বা বরাতে না বরং, সমকালের প্রিন্ট বা ই-পেপার ভার্সানের ঘাড়ে চড়ে একখানা রিপোর্ট ছেড়ে দিয়েছে। আবার যুগান্তর এর রিপোর্টটা এককাঠি সরেস আর সেটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। মিথ্যা বলছি কারণ যুগান্তর লিখেছে, ১৫ ডিসেম্বর এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। খবর তাসের। অথচ এই প্রপাগান্ডা খবরটা তাস (রাশিয়ান নিউজ এজেন্সী তাস বা TASS) এর সাথে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় নাই।

    আরেকটু ভেঙ্গে বলা যাক!
    এই প্রপাগান্ডা খবরের সোর্স বা উতস বানানো হয়েছে ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাসের ফেসবুক ভেরিফায়েড পেজ থেকে করা এক স্টাটাস কে। যদিও সেখানেও একটা টুইস্ট আছে। বলা হয়েছে এটা রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারভা তাঁর এক মন্তব্য থেকে নেয়া [Comment by Russian Foreign Ministry Spokesperson Maria Zakharova on the danger of destabilization of the situation in Bangladesh], কিন্তু সেই মন্তব্য কোথায় পাবলিকলি দেখা যায়, ছাপা হয়েছে এমন এর হদিস দেয়া হয় নাই। মানে পাবলিকলি কোথায় ছাপা হয় নাই, হয়ত আভ্যন্তরীণভাবে রাশিয়ান সরকারি ইন্টার-অফিস মেমো কোন হতে পারে। অথবা আসলে জাকারভা এমন কোন মন্তব্য করেনই নাই। তবে ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাসের এই ফেসবুক পেজ – এটা ভেরিফায়েড পেজ সেখানে এটা ছাপা হয়েছে– তাই এটাই কেবল ভরসা! আর আমাদের সাদা চোখে  অন্তত এটুকু বলা যায় যে – ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাস-ই সবকিছুর জনক!!

     

    এটা তাসের খবর নয়ঃ
    কিন্তু যুগান্তরের ভাষ্য অনুসারে “এটা তাসের খবর” এর প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। যদিও এটা সত্য যে মুখপাত্র মারিয়া জাকারভার তাস-কেই তার বিবৃতিগুলো সাধারণত দিয়ে থাকেন। কিন্তু কথিত এই আরব স্প্রিং- নিয়ে খররেরটা – এটা তাসের লিস্টে নাই। জাকারভা তাসকে যে বিবৃতির কপি দিয়ে থাকেন তার চলতি এমাসের লিস্ট এখানে দেয়া হল, তাস এর ওয়েব সাইট ঘেটে। তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কোন বিবৃতি নাই। কাজেই যুগান্তর এর দাবি ভিত্তিহীন!

     

    প্রসঙ্গ দুইঃ আরব স্প্রিং নিয়ে মূল ফেসবুক স্টাটাসে কী লেখা আছে
    আগেই বলেছি এই প্রপাগান্ডা খবরের একমাত্র উতস হল ঢাকার রাশিয়ান এমবেসি এর ফেসবুক পেজ।  আর সেখানে আরব স্প্রিং প্রসঙ্গে এক প্যারায় শেষ বাক্যে কয়েকটা শব্দ আছে মাত্র। তা হল,……the lines of the Arab Spring are likely.। বাংলায় বললে আমেরিকা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে, আরব স্প্রিংয়ের লাইন নিতেও পারে – এরকম।
    এর বাইরে আরব স্প্রিং সংক্রান্ত কোন ভাষ্য-বক্তব্য ঐ বিবৃতিতে নাই। এর সোজা মানে হল আরব স্প্রিং বলতে  রাশিয়ান এমবেসি আসলে অস্থিতিশীলতা মানে আমেরিকার তৈরি অস্থিতিশীলতা বুঝিয়েছে। কিন্তু আরব স্প্রিং জিনিষটা কী?  মনে করার কারণ আছে যে ঢাকার রাশিয়ান এমবেসি বা মুখপাত্র জাকারভা -প্রমুখের আরব স্প্রিং বুঝাবুঝিতে ঘাটতি আছে!

    আরব স্প্রিং জিনিষটা কীঃ
    প্রথম কথা বাংলাদেশ সরকার বহুদিন থেকেই আমেরিকান সরকারকে বাংলাদেশ আরব স্প্রিং কর্মসুচী চালাতে সহযোগিতা করে আসছে। কিভাবে সেটা?
    আর বহুদিন থেকেই মানে কবে থেকে?  আরব স্প্রিং এর জন্ম মোটামুটি ২০১১ সাল থেকে, সেসময় থেকেই। উপরে সেই টাইম্লাইন নিয়ে আল-জাজিরার একটা রিপোর্টে প্রকাশিত ছবিতে সেই লিঙ্ক দিয়েছি। বাংলাদেশের প্রধান সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা অনেক কলেজে ইয়ুথ প্রোগ্রাম বলে একটা কিছু চালু আছে । এই ইয়ুথ প্রোগ্রাম টাই আরব স্প্রিং এর থিতু ভার্সান।  এটাই আমেরিকান সরকারি দাতা প্রতিষ্ঠান USAID এর প্রধান প্রোগ্রাম বা কর্মসুচী। আর আরব স্প্রিং অবশ্যই আমেরিকার সরকারি কর্মসুচি কিন্তু এর উদ্দেশ্য কোন দেশকে ঠিক “অস্থিতিশীল করা” – এটা বেশি কথা বলা, too much। তবে অবশ্যই এটা ওয়ার অন টেরর [war on terror] এর সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ।

    কিন্তু পাঠকেরা এখন খুঁজে দেখতে পারেন দুনিয়া ১৯৩ টা দেশ (যারা সবাই জাতিসংঘের সদস্য) এদের মধ্যে কেন দেশের সরকার এতে সামিল ছিল না? বরং সবাই বুশের জমানায় (২০০১-২০০৯) বিশেষত প্রথমদিকে ওয়ার অন টেরর এরঅংশ বা সমর্থক ছিল !!! যেমন সেসময়ের পুতিনের রাশিয়া চেচেন সমস্যার কারণে, চীন উইঘুর সমস্যার কারণে (ওদিকে ভারতের কথা আর কী বলব) এতে এমন সবাই সক্রিয়ভাবে ওয়ার অন টেররে যুক্ত ছিল; মানে এভাবে কোন দেশের সরকারই বাদ ছিল না। আর সেসময়ে বাদ থাকার চেষ্টা করলে কী হত এর উদাহরণ বাংলাদেশের বিএনপি!  কারণ, সেটা ছিল বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের আমল (২০০১-৬)। এই দল ‘বুদ্ধিমান’ সাজতে গিয়ে বেশি করে ধরা খেয়েছিল, যার প্রভাবে এখনও বিএনপি ভুগে থাকে!! বিএনপি’র সরকার বুদ্ধিমান সাজতে আমেরিকার সাথে ‘এলাইনে না থেকে’ গড়িমসি করতে গেছিল, দুনিয়া বা জাতিসংঘ বুঝে নাই বলে! তাই আমেরিকান থাবড়া খেয়েছিল। আর ঠিক এটারই সুযোগ নিয়ে হাসিনা কথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তো  পরে ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় এসেছিল।

    ঘটনা হল ২০০৫ সালের মাঝামাঝিতেই এটা আমেরিকার পলিসি লেভেলে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে এই ওয়ার অন টেরর-এ বিশেষত, আফগানিস্তানে আমেরিকার পা আটকে গেছে। কোনদিন শেষ হবে না এমন এক যুদ্ধে আমেরিকা আটকে গেছে। এমনকি আবার এই যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করে গুটিয়ে বাড়ী ফিরে যাওয়াও সহজ না। সেটা ছিল আমেরিকার এমনই এক দশা পরিস্থিতি। অথচ এই যুদ্ধের সব শরীকদের খরচও আমেরিকাকে একা বইতে হচ্ছিল। তাই প্রথম কাজ হয়ে পড়েছিল বিকল্প কী করা যায় এনিয়ে পলিসি বদলাবার জন্য গবেষণায় নামা। একাজে যে গবেষণা ও সুপারিশটা বেশি গৃহিত হয়েছিল সেকাজটা ছিল RAND Corporation  (এক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান, ‘স্বাধীন’ থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ধরণের) এর করা গবেষণা-সুপারিশ।  [ এনিয়ে আমার পুরানা লেখায় বিস্তারিত আছে। এমনকি এনিয়ে RAND এর রিপোর্টটা তারা পাবলিকলি কপি পাবার ব্যবস্থা করেছিল সেসময়, আমার সে লেখায় এর হদিস ও রেফারেন্স আছে। আমাকে খুজে বের করতে পাঠক একটু সময় দিবেন।] লিঙ্কটা এখন পেলাম এখানে  । আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ RAND এর সেই রিপোর্ট এখানে দিলাম।

    এখন বুশের দুই টার্মের পরের ওবামা-হিলারি প্রশাসন (২০০৯-২০১৭ জানুয়ারি) ক্ষমতায় এলে তাঁরা এই  RAND এর রিপোর্টটা বাস্তবায়নের জন্য কাজে নেমে পরেছিল। ওবামার সেই নয়া পলিসিরই টোকেন নাম ছিল আরব স্প্রিং [Arab Spring]। যদিও আমেরিকান রেওয়াজ অনুসারে ওবামা প্রশাসন এনিয়ে তারর মূল পলিসিটা (RAND এর রিপোর্টটার কোনটা আর কতখানি এর বিস্তারিত দিকটা) প্রকাশ্য পাবলিক ডকুমেন্ট করা হয় না। তবে তাদের প্রশাসনের প্রকাশ্য কাজগুলো অনুসরণ করলে বা এনিয়ে কংগ্রেস-সিনেটের তৎপরতা একেবারেই প্রকাশ্যে লাইভ-টিভিতে দেখানোর যোগ্য বলে  তাদের থেকে এর অনেকটাই জানা যায়। এছাড়া, আমেরিকান এলিটদের ফরেন এফেয়ার্স ম্যাগাজিনে হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কি কী লেখা ছেপেছিলেন [তা নিয়ে দুইটা লেখা এখানে আর এখানে পাবেন]। তাথেকেও অনেকটাই জানা যায়।

    আরব স্প্রিংয়ের দুই(!) ভার্সানঃ
    কমকথায় সংক্ষেপে বললে, ওবামার এই আরব স্প্রিং [Arab Spring]  এর আবার দুটা ব্যবহারিক রূপ বা ভার্সান দেখতে পাওয়া যায়। একটা বলা যায় কাতার-কেন্দ্রিক; যার মধ্যে জড়িত ছিল ইসলামি স্কলার কারযাভী [Yusuf al-Qaradawi]। এরই আবার সবচেয়ে বড় প্রোগ্রামটাই ছিল মিসরেরটা; যেটা পরিণতিতে মিসরে মোরসি’কে ক্ষমতায় এনেছিল। যদিও রাখতে পারে নাই। আর বাংলাদেশ থেকে অনেককেই এই ভার্সানটা দেখতে-জানতে কাতারে দাওয়াত করা হয়েছিল। তার গিয়েছিলেনও। যতদুর মনে পরে হাসিনা নিজেও আমেরিকান আমন্ত্রণে তা দেখতে গেছিলেন। আবার জামায়াতের নিজামী-মুজাহিদ তখনও বেঁচে। তাদের থেকেও একটা টিম গেছিল। মূল কারণ, সেখানে মানে কাতারে কারযাভীর নেতৃত্বে আরব স্প্রিং [Arab Spring] অফিস-ট্রেনিং কর্মসুচী যেমন ছিল তেমনি খোদ আমেরিকান প্রশাসনের আরব স্প্রিং এর নিজ অফিসও কাতারে ছিল।

    আবার ওবামা-হিলারির আরব স্প্রিংয়ের নামে আরেক ভয়ঙ্কর ভার্সানও ছিল। যেমন লিবিয়ার গাদ্দাফিকে হত্যা ও উতখাত; যেটাতে পরে  বেনাগাজীতে আমেরিকান নিজ রাষ্ট্রদুতসহ স্টাফেরা খুন হয়ে যান। কারণ, সেটা ছিল বেনামে আই-এসের সাথে এলায়েন্স তবে তখনও এই গ্রুপ আই-এস নামধারণ করে নাই। আবার এই গ্রুপকেই কথিত আছে যে আমেরিকা সিরিয়ায় আসাদকে নামানোর প্রোগ্রাম দেয়া হয়েছিল।  কিন্তু ততদিনে এরা আই-এস নামধারণ করে নিয়েছে। আর তাদের স্বার্থ ও লক্ষ্য ছিল বা হয়ে যায় ইরাক ফিরে দখল। কিন্তু এবার ওবামা এই আই-এস গ্রুপকেই দমন ও খতম করতেই ইরানের সাথে এলায়েন্স করে [ যেটা P5+1 চুক্তি] ও ইরানকে দিয়েই আই-এস কে উতখাত করে এই ধারার আরব স্প্রিং-র পরিসমাপ্তি ঘটায়।
    তবে মনে রাখতে হবে এই  দ্বিতীয় ধারার আরব স্প্রিং যেটা বলা হচ্ছে এর ততপরতাগুলো RAND এর সুপারিশের মধ্যে ছিল না। তাই একাদেমিশিয়ানেরা  আই-এস এর সাথে জড়িয়ে পরা বা সশস্ত্রভাবে ইসলামের নামেই এসব বিরুদ্ধ কাজ-ততপরতাগুলোকেও আরব স্প্রিংয়ের আরেক ধারা বলতে নারাজ। কারণ তাদের যুক্তি হল, আরব স্প্রিংয়ের মৌলিক সারকথা এটা থেকে আলাদা। আর ইরাক-লিবিয়া-সিরিয়া নিয়ে যাকিছু ওবামা-হিলারি করেছেন বা কংগ্রেসে সমালোচিত হয়েছেন সেসব ছিল RAND এর সুপারিশের অবশ্যই বাইরের; তবে সেগুলো ওবামা প্রশাসন-সরকারেরই  আলাদা কাজ-প্রোগ্রাম বা স্বার্থ বটে!

    আরব স্প্রিংয়ের সারকথা কীঃ
    সারকথা হল, মুসলমান দেশ-রাষ্ট্রের বাসিন্দাদেরকে নাগরিক অধিকার এর ধারণা বা বোধ শিখানো – এভাবে সাজিয়ে নেয়া। এজন্য এখন ঢাকায় যে ইয়ুথ প্রোগ্রাম চলছে এর প্রধান দিক হল, বাংলাদেশ রিপাবলিক রাষ্ট্রের তরুণ নাগরিকদেরকে অধিকার শিখানে বা একটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টগুলো সম্পর্কে ওয়াকেবহাল করা।  বাংলাদেশের কলজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ুথ প্রোগ্রাম বলতে এটাই এখনও কার্যকর। অনেক স্টুডেন্ট কে দেখবেন ফেসবুকে পরিচয় হিসাবে নিজেই ইয়ুথ কর্মসুচীতে নিজের যোগ দেওয়ার কথা বলছেন। এর আরেক সবচেয়ে ভাল বা উপযুক্ত উদাহরণ হল মিসরের “অক্টোবর সিক্স গ্রুপ”। যেটা মিসরের মোরসির নির্বাচিত হওয়া পর্যন্তও ছিল সামাজিক সংগঠন। আর এখন যা এক রাজনৈতিক দল যারা নাগরিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চায়, এমন রাজনীতি সচেতন একটা দল।

    কেন RAND এমন সুপারিশে গেছিলঃ
    বুশের ওয়ার অন টেরর সম্পর্কে একটা মৌলিক মুল্যায়ন হল, যে তিনি সেখানে আগ্রাসী ও মুসলমান-বিদ্বেষী হয়েছিলেন; এই অর্থে যে এথনিক-ধর্মীয় মুসলমানকে তিনি  নিচা ও বৈষম্যমূলক চোখে দেখে চলেছিলেন। তাই কেউ সশস্ত্র ইসলামি রাজনৈতিক ধারার না হলেও মুসলমান মাত্রই যে কেউই বুশের বৈষম্য ও নৃশসতার শিকার হয়েছিলেন। এছাড়া সাথে ছিল আরেক কারণ যে, সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকা তখন  দুনিয়ায় একক মেরুর ঝান্ডাধারী। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতন হয়ে গেছে বলে।  ফলে বুশের আমেরিকা চাইলে যাখুশি করতে পারে – এই মিথ্যা ও বোকার উদ্ধত্য ছিল বুশের!! ঘটনাচক্রে, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকান রিপাবলিকান পার্টি নয় ক্ষমতায় নয় বরং দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্রাট ক্লিনটন। যারা রিপাবলিক বুশের চোখে বোকা অকর্ম! যারা (তখন আমেরিকা একক পরাশক্তি ফলে ) পড়ে পাওয়া সুবিধা নাকি নিতে জানে না!!!  ইত্যাদি এসবই বুশ-কে কার্যত এমন  মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ব ও বোকার উদ্ধত্য – এরই প্রেসিডেন্ট বুশ বানিয়েছিল। যেকোন বিশেষত, মুসলমান অধ্যুসিত রাষ্ট্র হলে তো কথাই নাই – প্রেসিডেন্ট বুশ – তিনি হতে চেয়েছিলেন এমন যেকোন দেশের রেজিম চেঞ্জের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট!

    RAND রিপোর্ট তাই উদাহরণ হিসাবে বলেছিলঃ মানে তারা সেসময়ের ওয়ার অন টেররের আমলের (আমাদের মত) গরীব মূসলমানের দেশের এক সন্ধ্যাবেলার চিত্র এঁকেছিল এভাবে; যে সন্ধ্যার পর ডিনার টেবিলে পরিবার যখন টেবলে একত্রিত হত তখন কোনায় রাখা টিভিটা চালু করে তাদের কমন প্রথম ডায়লগের বাক্যটা হত – “আজ কয়জন”? মানে হল আজ কয়জন আমেরিকান সেনা মরল!   আর সেটাই এরা উতযাপন করত! কারণ এমন প্রত্যেকটা দেশেই থাকত এক স্বৈরাচারি জনবিচ্ছিন্ন সরকার যে আমেরিকা সমর্থিত বলে জন-ঘৃণিত। অতএব ওমন দেশে মধ্য বা উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজ পরিবারগুলো নিজ সরকার-রাজনীতিকে না বলত, দূরে থাকত। অথচ একেবারে গ্লোবাল পরিসরে্র মূল হোতা আমেরিকাকেই গালাগালি মুন্ডপাত করত।  তাই এককথায় যেকোন তৃতীয় বিশ্বের দেশে আমেরিকা-বিরূপতা কমানো RAND এর লক্ষ্য ছিল। আর তা অর্জনের জন্য মুসলমান অধ্যুসিত দেশগুলোতে সরকার ব্যবস্থায় সংস্কার, নুন্যতম জবাবদিহিতা ও পাবলিক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল লক্ষ্য। আর এতে নুন্যতম অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তায় এক রিপাবলিক হয়ে উঠুক তাদের নিজ নিজ দেশ এই ছিল লক্ষ্য; যাতে  মুসলমান অধ্যুসিত দেশগুলোতে স্থানীয় জনগণ আমেরিকাবিরোধী কম হয় ও নিজদেশের সরকারের সাথে সংস্লিষ্টতাবোধ বাড়ে!

    তবে সাবধান এর সাথে একালে বাইডেনের  মানবাধিকারের পররাষ্ট্রনীতি বা স্যাংশন আরোপ করে চাপ সৃষ্টি ইত্যাদি এসবের সাথে  সেকালের আরব স্প্রিং এর কোন সম্পর্ক নাই, ছিল না। আমরা যেন মাখায় না ফেলি।

    তাহলে কথাগুলো এখন গুছিয়ে সারাংশে বললে,
    ১। গত ২০০৩ সালে বুশের ইরাক দখলের আগে পর্যন্ত দুনিয়ার প্রায় সব সরকারই নিজ নিজ স্বার্থে ওয়ার অন টেররের এককাট্টা পক্ষে ছিল বা থাকতে বাধ্য হয়েছিল; এমনকি জাতিসংঘের যেকোন সিদ্ধান্তেও এরা সকলে একপক্ষে ছিল। যেমন আফগানিস্তান ইস্যুতে (তাই পরে আমেরিকার আফগানিস্তান দখলেও) নিরাপত্তা পরিষদে সকলেই একই পক্ষে মানে আল-কায়েদাবিরোধী দিকে ভোট দিয়েছিল। কেবল ইরাক দখলের আগে ফ্রান্স-জর্মানি এর বিরোধিতা করেছিল কিন্তু বছর খানেক পরে এরাও ইরাক-আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়ে অংশ নিয়েছিল।
    ২। পরে ওয়ার অন টেরর এর এক সংস্কার রূপই হল আরব স্প্রিং। লিবিয়া-সিরিয়ার ঘটনাগুলো বাইরে রাখলে রাশিয়া কখনও আরব স্প্রিং-কে সমালোচনা করেছে জানা যায় না। তাহলে এখন আরব স্প্রিং এর কথা তুলে খোঁচা মারা নেতি দেখানো রাশিয়া – এটা তো নতুন ঘটনা। তাই রাশিয়া আসলেই কী বুঝাতে চাইছে? তারা কী আরব স্প্রিং এর বিরুদ্ধে ছিল? নাকি এখন হাসিনা সরকারের পক্ষে লিপ সার্ভিস এসেছে – তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
    ৩। আবার এখন রাশিয়ার আরব স্প্রিং এর ভয় দেখানো এতে কার্যত সরকার কী খুশি হয়েছে? না তাও নয়! পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এতে খুশি হয়েছেন তা বলতে-দেখাতে পারেন নাই। কারণ, মোমেন-কে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়েছে সেটা এই বলে যে এখন আর বাংলাদেশে আরব স্প্রিং এর সম্ভাবনা নাই। তার মানে আসলে সরকারকে দেখাতেই হয়েছে যে সে রাশিয়ার আরব স্প্রিং ভয় ছড়ানোর বিরুদ্ধে!!! তাহলে রাশিয়ার কথিত এই অবস্থান নেয়া – এটা কার পক্ষে গেছে??? মানে কেন মোমেনকে বলতে হয়েছে আরব স্প্রিং এর ভয় নাই???? এটাই হল হাসিনা সরকারের স্ববিরোধ! 
    ৪। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট যে মোমেনের “আরব স্প্রিং বাংলাদেশে আসবে না” এই কথাটা বলার কোনই মানে হয় নাই! কারণ, ইতোমধ্যে USAID ফান্ডেড আরব স্প্রিং এর ইয়ুথ প্রোগ্রামগুলোকে সরকারি (এনজিও ফান্ড হিসাবে) অনুমোদন দিয়েছে বলেই তো এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে। তাহলে  মোমেনের “আরব স্প্রিং বাংলাদেশে আসবে না” কথাটার কোনই মানে কী থাকল; পুরাটাই অপ্রাসঙ্গিক!!!

    এর মানে রাশিয়ার “আরব স্প্রিং’ নাম বলে রাশিয়ার যা কিছু খোচাখুচি তা অপ্রাসঙ্গিক, অর্থহীন। মানে এটা কীন সিরিয়াস বক্তব্য-প্রতিক্রিয়া নয়! বাংলায় বললে, এগুলোকেই আমরা খামোখা বলি!!!    জমে নাই এমন অকেজো প্রপাগান্ডা মাত্র! এজন্য কী মুখপাত্র মারিয়া জাকারভা নিজে এই কথিত বিবৃতি দেন নাই!!!

    আবার আরব স্প্রিংয়ের অনেক ফজিলত আছে! যেমন ২০১৩ সালে পাকিস্তানের ইমরানের উত্থান এমনই এক পাকিস্তানি আরব স্প্রিং থেকে।


    শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে এক “আরব স্প্রিং” বানানোর আগ্রহ ছিল আমেরিকার, কিন্তু হয় নাইঃ

    আর একটা তথ্য দেই। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে এক “আরব স্প্রিং” বানানোর আগ্রহ ছিল আমেরিকার, কিন্তু হয় নাই। দেখেন এখানে। অন্য স্বার্থের কাছে হেরে যায়, সফল হতে পারে নাই! সেই ২০১৩ সালের প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক রিপোর্টের শিরোনাম ছিলঃ

    শাহবাগে বাংলা বসন্ত

    এমন অনেক লেখা এখনও পাবেন। আর ভাষ্যগুলো খেয়াল করেন।   কথিত শাহবাগী আন্দোলনের ইমরান এইচ সরকার, তিনিও আসলে ছিলেন President at Youth for Peace & Democracy, Bangladesh (YPD)এই [YOUTH PROGRAM] মানে আরব স্প্রিংয়ের সাথে জড়িত নেতা। তাকে আমেরিকানেরা পুশ করে শাহবাগে পাঠিয়েছিল। প্রথম আলো এনিয়ে দুটা ফিচারও ছেপেছিল।

    ইমরান এইচ সরকার

     

     

     

    কিন্তু পরে রাজীব বা থাবা বাবা খুন হয়ে গেলে ইমরান সহ সকলেই নিরাপত্তা পেতে উন্মুখ হয়ে উঠে আর সরকারের কোলে গিয়ে উঠেছিল। মানে  আমেরিকান এই ইয়ুথ প্রোগ্রামের দিকটা আর সামনে আসতে পারে নাই। সোজা কথার শুরুর দিকে আমেরিকা চেয়েছিল শাহবাগ আন্দোলনকে মিসরের আরব স্প্রিংয়ের মত করে গড়ে দেয়া যায় কিনা……। যেটা শুরুতেই হেরে গেছিল, ফলে পারে নাই।

     

    … আপডেটঃ   ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩,  রাত ৯ঃ ৩০
    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২০ ডিসেম্বর ২০২৩,  সকাল ০৭ঃ ১০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ
    বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    গৌতম দাস
    ২৬ নভেম্বর ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-59d

     

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian…”

    বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অন্তত একটা মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া,  গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ এক উলটা হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। এটা হল, কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির আমল বা একালের বিজেপির মোদির আমল মিলিয়ে গত সতেরো বছর ধরে অনুসরণ করে চলা ভারতের মিডিয়াগুলোর নীতির বিরুদ্ধ বা বিপরীত অবস্থান। বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতায় যেই আসুক ভারতের মিডিয়া এর কোন ভালমন্দ দেখতে পাবে না। তবে কেবল যে ঘটনায় ভারতের স্বার্থ আছে সেটাই সহি – এই হল বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মিডিয়াগুলোর অবস্থান!
    আবার যেমন,  কোন পত্রিকায় অনেক রকমের লেখাই ছাপা হয় – নিউজ রিপোর্ট, ভিউজ-মতামত, সত্য-মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা ফিচার  অথবা এমনকি উপ-সম্পাদকীয় ইত্যাদি সবই ছাপা হয়। কিন্তু পত্রিকায় যেটা সম্পাদকীয় বা এডিটরিয়াল [editorial] লেখা ছাপা হয় সেটাই একমাত্র পত্রিকার মালিক, সম্পাদক বা সম্পাদকীয় গ্রুপ বা বোর্ডের সকলের স্পষ্ট নিজস্ব  অবস্থান বা রাজনৈতিক বক্তব্য। এটা পত্রিকার পরিচালনাকারীদের নিজস্ব অবস্থান এবং নিজ দায় নিয়ে বলা কথা!  তা হলেও বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতা কেমন কী চলছে সেখানে এনিয়ে ভারতের প্রিন্ট- মিডিয়াগুলোর কোন সম্পাদকীয় মন্তব্য কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না! তবে বাংলাদেশে যেটা ভারতের স্বার্থ সেটাই সহি ধরে নিয়ে প্রিন্ট-মিডিয়ার অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়!

    এদিকটাই আরেক ভাষায় বললে, গত পনেরো বছরের বেশি হবে কোন ভারতীয় পত্রিকা বাংলাদেশের মানুষের হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে কথা বলেছে – এমন রেকর্ড নাই। এমনিতেই,  যদিও ১৯৪৭ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন তবে বিভক্ত ভারতের জন্মের আগে থেকে এখনও পর্যন্ত “হিউম্যান রাইট ও নাগরিক মৌলিক অধিকার” কখনই ভারতীয় রাজনীতিতে ইস্যু ছিল না। উচ্চারিত হয় নাই; এমনকি তা ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও উচ্চারিত নয়। কারণ, সেই ১৮১৫ সাল থেকেই ভারতে রাষ্ট্র-রাজনীতি বলতে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বুঝা হয়ে এসেছে। আর এতে বলাই বাহুল্য এখানে জাতি মানে একমাত্র সেটা উগ্র হিন্দু-বোধের এক হিন্দুত্ববাদ। অধিকার বা নাগরিক ধারণার যেখানে বালাই নাই! সারকথায়, ভারতে রাজনীতি বলতেই সেটা হল – জাতিবাদ এবং তা এক উগ্র-জাতিবাদ; যা এর বাইরের সব এথনিক-জাতিকে অস্বীকার, তাঁদের উপর চাপায় দেয়া মার্জিনালাইজ বা কোনঠাসা করে রেখে অ-হিন্দু বিশেষ করে মুসলমান নাগরিক এর উপর সামাজিক, কালচারাল ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করে রাখার রাজনীতি।
    হিন্দুত্ববাদ মানে যেখানে অধিকার বা নাগরিক ধারণা নাই; কাজ করে না। হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদের এক হিন্দুত্ববাদ ও বোধ সেখানে সব। আর এর বাইরে সবাই কে তারা মেরে, পিটিয়ে অবাধে নির্মুল করবে; এক আধিপত্যের জগত কায়েম করবে করতে হবে এই হল যার সারকথা। এমনকি পড়শি বা অন্যরাষ্ট্র তাঁদেরও যেন নিজ স্বার্থ বলে কিছু নাই। পড়শিসহ অন্য সকল (ছোট) রাষ্ট্রকেই যেন ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থকেই  নিজস্বার্থের উপর জায়গা দিতে হবে, তুলে রাখতে হবে। এমনকি খেলাধুলাতেও ভারতের কোন হেরে যাবার দুঃখে ভিন-রাষ্ট্রকেও দুখী হতে হবে, দুঃখবোধ দেখাতে বা প্রকাশ করতে হবে! এটা হিটলারকেও ছাড়িয়ে যাওয়া এমনই এক চরম উগ্র-জাতিবাদ!

    ফলে এসব কারণে, ভারতের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে যা কিছুই জানি না দেখি তা দেখলেও সেখানে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকার ধরণের কোন ধারণাই ভারতের রাজনীতিতে বা সামাজিক কালচারে নাই।

    ভারত ভিন-রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠার বিরোধীঃ
    কিন্তু এই প্রথম ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের অবস্থান জানিয়ে সম্পাদকীয়তে বলছে, “হাসিনাকে থামাতে হবে। কারণ তিনি কর্তৃত্ববাদী; বিরোধীশুন্য করতে-দেখতে চান। আর এটা নাকি ভারতেরও স্বার্থবিরোধী ও উদ্বিগ্ন হওয়ার মত হাসিনার এমন এই কর্তৃত্ববাদী স্বভাব!”। এই কথাগুলো তুলে এনেছি,  টাইমস অব ইন্ডিয়া-তে তাঁদের  নয়া অবস্থান জানিয়ে যে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে তার শিরোনাম থেকে। সেটা হল, ” Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” । আমাদের মানবজমিন এর অনুবাদ রিপোর্ট ছেপেছে।

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian
    streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” –

    সবচেয়ে মজার কথা শুরুতেই বুকফুলিয়ে টাইমস বলছে, “টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল টিম যা সিনিয়র জার্নালিস্টদের নিয়ে গঠিত তারা নিজেদের মধ্যে নাকি বিস্তর তর্ক-বিতর্ক শেষে একালের খবরাদি সম্পর্কে নিজেদের মতামত-অবস্থান নিয়ে থাকে [Times of India’s Edit Page team comprises senior journalists with wide-ranging interests who debate and opine on the news and issues of the day] । তাহলে, মানে কী দাঁড়ালো?

    গত ১৯৪৭ সালের আগের কথা বাদই রাখলাম। একালে মানে ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধীর আততায়ীর হাতে মৃত্যু হয়েছে ১৯৯১ সালে। অনেকের মনে হতে পারে একালে ভারত উগ্র হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠেছে বোধহয় বিজেপির মোদীর হাতে। না এটা মিথ্যা। বরং এর আগেই রাজীব গান্ধীর হাত ধরেই একালে মুসলমান এথনিক ক্লিঞ্জিং যেটাকে বলে বা “মুসলমান-নির্মুল” নীতি- এর শুরুটা হয়েছে ১৯৮৯ সালে। সেসময়ে এটা হয়েছিল কাশ্মীরে। সেখানে ১৯৪৭ থেকে যতই অস্থিতিশীলতা বা বিরোধ-সমস্যা থাকলেও রাজনীতিতে কোন সশস্ত্রতার ধারা নয় বরং  সেখানকার রাজনীতি ছিল চলে আসা নির্বাচনকেন্দ্রীক এক রাজনীতি। প্রকাশ্য এক গণ বা মাঠের রাজনীতি! রাজীব গান্ধী ১৯৮৯ সালের রাজ্য নির্বাচনে   কারচুপির করে জিতবার সিদ্ধান্ত  ও নীতি নিয়েছিলেন। সেটা এই অজুহাতে যে সেবার ১৯৮৯ এর নির্বাচনে ওমন কারচুপি না করলে নাকি বেশিরভাগ আসনে অ-কংগ্রেসি কাশ্মীরি মুসলমান সেখানে জিতে যাবেন। আর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফারুক আবদুল্লাহর পরামর্শে ও তাঁকে সাথে নিয়ে। ফারুক আবদুল্লাহও ঠিক কংগ্রেসি নন তবে তাঁর বাপের আমল থেকে তাঁদের দল প্রো-কংগ্রেসী!

    আর এরপরে বাবরি মসজিদ আক্রমণ থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সালে ভারতে বাজপেয়ীর বিজেপির কোয়ালিশন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ বিজেপি-আরএসএসের উত্থান ঘটে। ইতোমধ্যে নাইন-ইলেভেন মানে (২০০১ সালের ওয়ার অন টেরর) মানে আমেরিকা-ইন্ডিয়ার “জঙ্গী-মারার নামে” এলায়েন্স মানে এশিয়ায় হিন্দুত্ববাদের এক রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল প্য়রথমে। কিন্তু  অচিরেই সেখান থেকেও আবার সরে গিয়ে সেটা আমেরিকার হয়ে ভারতে চীন ঠেকানোর অজুহাতে ভারতকে ঠিকা দেওয়া; মানে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – যেটা এভাবে এখন বাংলাদেশ ১৭ বছর পার করেছে। স্বভাবতই এর স্বপক্ষে পুরা সময় জুড়েই ভারতের সমগ্র মিডিয়া ইসলাম কোপানোর বয়ান তুলে মশগুল থেকেছে।
    আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় মিডিয়ার এটিচ্যুড  সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছে মোদির গত দশ বছরে। এমনিতেই কোভিডের কারণ ভারতের মিডিয়া নিজে চলতে পারে নাই, ঠিকমত বেতন দিতে পারে না। অতএব পত্রিকা চালানোর খরচ মিটাতে মোদির হয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডার হাতিয়ার হয়ে উঠো – সব জায়েজ! আর তাতে ভারতের ‘র’-এর বা গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট – ভারতে যারা ছাপে তাঁদের শিখন্ডি মিডিয়া হয়ে উঠো! এই ছিল সেসময়ের মূলনীতি! তাঁদের সে এক মহা কসরত, কার উপর দিয়ে কে যাবে! যার ফলশ্রুতিতে ফাইনালি দাড়ায় মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী – এরা হয়ে উঠেন ‘র’-এর হয়ে শ্রেষ্ঠ প্রপাগান্ডিস্ট! যারা র-এর চাহিদা মত রিপোর্ট লিখতে ওস্তাদ! আগ্রহিরা এবিষয়ে আমার পুরানো লেখা পড়ে নিতে পারেন।  আমরা ভারত টাইমস অব ইন্ডিয়াকে এভাবেই চিনতাম!

     

    কিন্তু এখন এটা কী হলঃ
    কিন্তু হায়!! এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলছে? মোদিকে হাসিনা থেকে সাবধান করে ইডিটরিয়াল লিখছে??? গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল কম করে বললেও গত পন্বরো বছরের একেবারে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত! কেন?
    এটা বুঝা কঠিন না যে ২০০৬-৭ সাল থেকে আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া অবাস্থান ছিল যে – যেভাবে পারো বাংলাদেশকে ভারতের পক্ষে লুটে নেও! সব জায়েজ আছে!  বাংলাদেশের উপর দিয়ে আসামের করিডোর থেকে শুরু করে সবকিছু বিনা পয়সায় খাবলে তুলে নিয়ে খাওয়া, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার কিংবা সব নদীর পানি, বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করা, সীমান্তে সমানে বাংলাদেশি হত্যা ইত্যাদি যাকিছু ভারতের স্বার্থের পক্ষে যায় বলে তারা মনে করেছে তাই ভারতের মিডিয়া সঠিক ও জায়েজ মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট লিখে গেছে! সাথে ছিল জঙ্গী আবিস্কার আর জামায়াত কোপানোর নামে ইসলাম কোপানো মুসলমানবিদ্বেষে ভরপুর এক মহোৎসব চালিয়ে গেছে ভারতের মিডিয়া। বাংলাদেশের  প্রতিটা নির্বাচনে ভোটবিহীন তামাসা চলেছে – অথচ ভারতের একটা মিডিয়া এগিয়ে আসে নাই, টু শব্দটাও করে নাই! তখন তারা কোথাও হাসিনার কর্তৃত্ববাদ দেখে নাই; রাতের ভোট হয়েছে তারা জানে নাই! সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের সফর। বিএনপি ও জামায়াত-কে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে; আর এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধি দল বানাতে হবে। এই ব্যববস্থাপনার কারিগর ছিলেন সুজাতা সিং যা এরশাদের সাথে মিটিয়ের পরেই খোদ এরশাদ-ই তা মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মজার কথা কোন ভারতীয় মিডিয়া এনিয়ে কোন রিপোর্ট করে নাই। কারণ তাঁদের নীতি ছিল দুনিয়াতে ন্যায়-অন্যায়, সাংবাদিকতা-অসাংবাদিকতা, সঠিক-মিথ্যা বলে কিছু নাই। যাই ভারতের স্বার্থে তাই জায়েজ এই ছিল তাঁদের নীতি; তাই পুরাটাই মিথ্যা ও অন্যায় হলেও সেই অন্যায়ের পক্ষেই ভারতের মিডিয়াকে থাকতে হবে…!  এই ছিল গত পনেরো বছরের (দু-একটা ব্যতিক্রম বাদে) ভারতীয় সাংবাদিকতা! যা এখনও বর্তমান!!!
    কিন্তু তাহলে এর ভিতরে – এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলে বুঝছে???

    কথা আরও আছেঃ
    টাইমসের রিপোর্টের ছন্দ-মিলানো প্রথম বাক্যটাই রীতিমত শায়েরি! বলছে, বাংলাদেশ ৭ জানুয়ারি যাচ্ছে নির্বাচনে [POLL]; কিন্তু বিরোধীরা যাচ্ছে সাজাপ্রাপ্ত আসামী হিশাবে জেলে[JAIL] । ইংরাজিতে পোল আর জেলের অলংকার মিলিয়েছে। আর এর চেয়েও মারাত্মক হল কোন ভারতীয় মিডিয়ার সম্ভবত এই প্রথম জামা‍য়াতে ইসলামী এই রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ। লিখছে, [one big party stays banned.]; মানে জামায়াত নিষিদ্ধ করে দেয়া রায় বলবত রাখাকে এক ভারতীয় মিডিয়া ইউজুয়াল বদ-দোয়া দেওয়ার বদলে সহমর্মিতা জানিয়ে রিপোর্ট করছে!  যার ইঙ্গিতটা হল, এটা মতপ্রকাশের অধিকার, কনষ্টিটিউশনের সীমার মধ্যে থেকে রাজনৈতিক  দল খুলার ও জমায়েতের অধিকারকে জবরদস্তিতে কেড়ে নেওয়া, কোনঠাসা করা – মানে এককথায় রাজনীতিক ও দৈহিক নিপীড়ন করা হয়েছে এই রাজনৈতিক দলকে। তাই রিপোর্টটা একারণে জামায়াত-কে এই প্রথম ভিকটিম হিশাবে দেখছে ও দেখাচ্ছে!!! তাহলে এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া!!!  অথচ একালের এই ভারতই অন্তত গত ১৭ বছর ধরে লাগাতরভাবে জামায়াতের একাত্তর সালের ভুমিকার বিরোধিতার আড়ালে ইসলাম-মুসলমান রিলেটেড সবকিছুর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ চালিয়ে গেছে; শত্রুতা চালিয়ে গেছে। জামায়াত জঙ্গী-সংগঠন বলে প্রচার চালিয়ে নিজেদের সব অনৈতিক ততপরতাকে জায়েজ করতে গিয়েছে!
    একইভাবে বিএনপির পক্ষেও সহানুভুতিশীল হয়ে রিপোর্ট করেছে; যা অবিশ্বাস্য! বলেছে বিএনপির ১৩৯ জন নেতাকে সাজা শুনিয়ে দিয়েছে; তারা যেন নির্বাচন থেকে দূরে থাকে এর ব্যবস্থা করেছে!  এমনকি হাসিনার নিজে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন মানে কোন কেয়ার-টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যে আইনটা ছিল সেটা হাসিনারই বাতিলের জন্যও এই প্রথম হাসিনাকেই দায়ী করলো এক ইন্ডিয়ান মিডিয়া!! মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া, বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত এই দাবির প্রতি (তবে পরোক্ষে) সমর্থন জানিয়ে দিল!!!  আর এভাবে বিএনপির রাস্তার আন্দোলনকে জায়েজ করে দিয়ে এই মিডিয়া লিখেছে BNP is just doing street theatre when demanding restoration of the caretaker system.। যা নিয়ে একটা ভারতীয় মিডিয়াকে আমাদের বলার আছে একটাই – এটা আন-ইউজুয়াল! আমরা ভারতের মিডিয়ায় এটা দেখতে অনভ্যস্ত ছিলাম!

    “one big party stays banned.
    The top court upheld a previous ban
    on Jamaat-e-Islami – Bangladesh’s
    largest Islamist party – from contesting elections.”

    এতদুর পর্যন্ত যা দেখলাম তাতে এটা পরিস্কার ভাবে বুঝা গেছে যে টাইমসের এটা এক বড় ধরণের অবস্থানের পরিবর্তন। এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান সেই টাইমস অব ইন্ডিয়া এখন বাংলাদেশের শাসক শক্তি অথরিটিটিয়ান – মানে বাংলাদেশের শাসক কত খারাপ তা দাবি করে দেখানোর প্রতিষ্ঠান – হয়ে উঠতে চাইছে! তাহলে এই পরিবর্তনের কারণ কী? আবার যেখানে এটা ভারতের অন্য আর কোন মিডিয়ার মধ্যে এমন পরিবর্তন এখনও দেখা যায় নাই!
    এককথায় বললে, ভারতের মিডিয়া এখনও একালেও এমন নুন্যতম পলিটিক্যাল এথিক্স মেনে কেনে চলার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে নাই। যেমন আগে এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান; বুঝাই যেত সেটারও মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থ; কোন আদর্শিক অবস্থান তা ছিল না! তাহলে এখনকার এই পরিবর্তনও  অনুমান করি কোন আদর্শিক অবস্থান নয়! যার সোজা মানে বিক্রেতা-মিডিয়ার ক্রেতা-গ্রাহক সম্ভবত এখন বদলে গিয়েছে! আগে ছিল ক্রেতা ভারত সরকারের এক প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে  সার্ভিস দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। আর তাহলে এখন?

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার সার্ভিস ক্রেতা এখন কেঃ
    তাহলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  এখন এই অবস্থান বদল হওয়াতে এখনও কী মোদি সরকারই আছে? তা মনে হচ্ছে না। যদিও এটা সত্য যে জয়শঙ্করের অফিস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসুক কিংবা না – সেব্যাপারে তার খুব কিছু করণীয় আছে তা মনে করা না। যদিও তাই বলে কিছু লিপ-সার্ভিস বা কিছু রুটিন সম্পর্ক অবশ্যই আগের মত ভালই বহাল আছে।  তবুও বাংলাদেশের সরকার কর্তৃত্ববাদী কী না সেটা  টাইমসের এই দ্দেখে ফেলার সাথে কখনই মোদির রাজনীতির কোন সম্পর্ক নাই। কাজেই টাইমস অব ইন্ডিয়ার নয়া অবস্থানের পৃষ্টপোষক-অর্থদাতা অন্তত বিজেপি-মোদি নন। তাহলে কে হতে পারে?

    এর তালাশে আমরা এখন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই সম্পাদকীয়ের বাকি অংশে ফোকাস করব। যদিও কোন সম্পাদকীয় ছোট লেখাই হয় আর টাইমসের এই সম্পাদকীয়ও ছোট পাঁচশ- অক্ষরের নিচে। তাহলে এই শেষের অংশে কী আছে?

    সম্পাদকীয়ের শেষ অংশ ‘মারাত্মক’ কী আছেঃ
    সংক্ষিপ্তভাবে মারাত্মক সেই কথা হলঃ উপরে আমরা দেখেছি, টাইমস অভিযোগ হাসিনা সরকার অথরিটি-টেরিয়ান যে নিজেকে বিরোধিশুন্য দেখতে চায় মানে তার রাজনৈতিক সকল বিরোধী শক্তিকে সমাজ থেকে নির্মুল করতে ও দেখতে চায় ক্ষমতাসীনেরা। এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন বিরোধীশুন্য কথা টার অর্থ-তাতপর্য কী? কারণ, যেকোন ক্ষমতাসীনরা দাবি করতেই পারে যে বিরোধী দল আমাদের চাপ সহ্য করে মাঠের রাজনীতিতে টিকে থাকতে না পারলে আমরা কী করতে পারি – এমন বয়ান দিতেই পারে। কিন্তু এমন বয়ান কী জায়েজ? নাকি এটা ইনোসেন্ট বা নিঃস্পাপ বয়ান যে ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না?

    না অবশ্যই না। এই বয়ান জায়েজ নয়! এর সোজা সহজ উদাহরণ হল, ক্ষমতাসীন যদি নির্বাচনে কৌশলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বিরোধীদলের জন্য সুবিধাজনক নয় – এভাবে করে সাজায়? মানে হল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দল নিরেপেক্ষ করে না সাজায়? মানে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কান্নি মেরে থাকা পুলিশ ও প্রশাসন হয়ে হাজির হয়?
    এখন এই ব্যাপারটাই হয়েছে কীনা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – ক্ষমতাসীনদের কিছু বয়ান এর দিকে তাকাতে হবে। যেমন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকারের এক প্রিয় শ্লোগান হচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আর অন্যদিকে জামাত-বিএনপি এর বিপক্ষের! এতদুর শুনে কেউ মনে করতে পারে এর মধ্যে খারাপ কী আছে?  অথচ এটাই হল, সরকারের দিক থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া ম্যাসেজ যে তোমরা এখন বিরোধীদের সাথে সবকিছুতে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পার, এটা জায়েজ আছে! কারণ তারা সবাই তো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি! আমি সরকার সেটা বলে দিয়েছি! সুতরাং এটাই তোমাদের প্রটেকশন ভাষ্য! যেমন খেয়াল করে দেখেন বাংলাদেশের একজন অভিনেতা সম্প্রতি ক্রিকেটে ভারতীয়দের হারে খুশি হওয়া যাবে না – যারা খুশি হয় তারা  মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বলে ব্যাখ্যা খাড়া করছে! আর এমন বয়ান এটারই চরমতম রূপ হল, আমাদের রাষ্ট্রটাকে গুম-খুনের  রাষ্ট্র হিশাবে হাজির করা – এটাই হয়ে যাবে আর যার সাফাই হবে যারা “মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি!” বলে সরকার প্রচার করবে তাঁদের কোনই রাজনৈতিক নাগরিক অধিকার তো নাই-ই!  তাই তাদেরকে গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সব তো করাই যায়! এবং যাবে!!!

    তাহলে সারকথাটা হল, আমি ক্ষমতায় আর আমার রাজনৈতিক-বিরোধিদের যদি আমি আমার মতই সমান রাজনৈতিক, নাগরিক অধিকার না দিয়ে (নানা উসিলায়)  দাবায় রাখতে পারি তাহলে সেটাই পরিণতিতে ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের মত নির্বাচনই হবে! শুধু তাই না, সেটা এবার এই রাজনীতিক মাঠশুন্যতা – এটাই কাশ্মীরের মত রাজনীতি আর তখন নির্বাচন-কেন্দ্রিক থাকবে না। সশস্ত্রতার রাজনীতির পথে পা বাড়াতে চাইবে!

    ঠিক এদিকটা খেয়াল রেখে তাই টাইমস তার সম্পাদকীয়ের শেষের দিকে বলছেঃ “But what raises eyebrows and concerns is the vacuum previously occupied by the opposition. Marginalising mainstream opposition parties is an invitation to radical elements in Bangladeshi politics”।
    মানে হল, বিরোধীদলদেরকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশ ইত্যাদি সবকিছু থেকে তাঁদের বঞ্চিত করে দেওয়া – মানে এক শুন্যতা বা ভ্যাকুয়াম তৈরি করা – এর সোজা মানে হল, সশস্ত্র রেডিক্যাল রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা হয়ে উঠতে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া বা ঠেলে দেওয়া।

    এরপরে আরো দুইটা প্যারা আছে। এর প্রথমটায় বলছেঃ
    “Then there is the US factor. Washington is clearly concerned about charges of authoritarianism against Hasina and is viewing Bangladesh as part of its larger strategic tussle with China.”
    মানে হল বলছেঃ “এর সাথে আছে আমেরিকা ফ্যাক্টর। যারা তাই হাসিনার এভাবে কর্তৃত্ববাদী উত্থানে উদ্বিগ্ন বিশেষ করে এর সাথে চীন-আমেরিকার যে কৌশলগত টানা-হেচড়া আছে সেদিক থেকে দেখলে”।  অর্থাৎ টাইমস ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা অনুমান করি যে এর অর্থ হবেঃ কর্তৃত্ববাদী হাসিনার থেকে যাওয়া মানে তাতে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়বে!


    আর টাইমস অন ইন্ডিয়ার লেখার শেষ বা সিদ্ধান্ত বাক্য টা হল এভাবেঃ

    “Unless the opposition is given the space it should have, radical elements will create space they don’t currently have. That’s terrible news for India. A radicalised Bangladeshi establishment can bring Pakistan back into play. New Delhi should tell Hasina to change tack, in its, and her, interest.”

    অর্থ হলঃ “হাসিনা যদি তার রাজনৈতিক বিরোধীদেরকে রাজনীতিক-বিরোধীতা করার জায়গা না দেন (অর্থাৎ জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশের অধিকার ইত্যাদি সবকিছু থেকে বঞ্চিত করে দেয়) তবে রেডিক্যাল বা সশস্ত্র রাজনীতিক ধারা ঐ স্থানটা দখল করবে যাদের জায়গা এখনও বাংলাদেশে তেমন নাই! আর এটাই ভারতের জন্য খুবই ভয়ঙ্কর সংবাদ হবে!”।

    এরপরের বাক্যের অর্থ এটা একেবারেই কোন ভারতীয় লেখকের হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা। এছাড়া তারা কখনই কোন রেফারেন্সে-ছাড়াই পাকিস্তানকে না জড়িয়ে বা গালি না দিয়ে থাকতে পারে না। সেই পটভুমিতে পরের বাক্যটা হলঃ একটা রেডিক্যাল (সশস্ত্র) বাংলাদেশ এটা পাকিস্তানকে মাঠে ফিরে ডেকে আনতে পারে! (অর্থাৎ এরমধ্যে পাকিস্তান কোথা থেকে এল কেউ জানে না) “তাই নয়াদিল্লির উচিত হবে হাসিনাকে সামলানো তাকে স্বার্থ-অভিমুখ বদলাতে বাধ্য করা!”।

    এই শেষের বাক্যটাও একই মিথ্যা হামবড়া তবে মুরোদহীন ভারতকে জাগানোর বা এর এখনও হাসিনাকে নিয়ন্ত্রণের যেন ক্ষমতা আছে এই ভাব নিয়ে বলা কথা! কারণ, ভারত যেন একটা বিরাট ক্ষমতাবান কুতুব  এই ভাব না ধরলে ভারতীয় সাংবাদিকের কলমের আগায় যেন কালি আসে না !  অথচ এতদিন হাসিনা যতটুকু চীনের সাথে সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা কায়েম করেছে তা কী ভারত ঠেকাতে পেরেছে? কাজেই হাসিনার যা সক্ষমতা সেটার সবই যেন ভারতের দেয়া এমন ভুয়া দাবির দরকার কী??? আর ভারত যা চায় এর বাইরেও হাসিনার নিজস্ব স্বার্থ বলে অনেক কিছু আছে এবং তা থাকাই স্বাভাবিক! তাতে হাসিনার স্বার্থের কোন ন্যায্যতা থাকুক আর নাই থাকুক!


    তাহলে টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ঘটলঃ

    টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ও এর তাতপর্য কী, এনিয়ে কিছুটা উপরে দাবি করে বলেছি যে, এই বদল বিজেপির মোদির আগ্রহে ঘটে নাই। কারণ টাইমসের বদলি অবস্থান কোনভাবেই সেটা মোদির রাজনীতি নয় যে মোদি হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকারের পক্ষে কথা বলবেন বা টাইমস-কে বলতে বলবেন বা অর্থ দিবেন!
    আর টাইমস মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া কোন অর্থপ্রাপ্তি ছাড়াই এমন সম্পাদকীয় লিখার কারণ নাই! তাহলে?

    খুব সম্ভবত এটা কোন আমেরিকান উদ্যোগ! এমন অনুমান করাটা আশা করি ভুল হবে না!  যা সাধারণত কোন থিঙ্ক-ট্যাংক বা এনজিও এর মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর এটা বাইডেনের মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার বা স্যাংশনের পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ, মানে সাথে যায়!
    তবে মূলকথাটা হল, হাসিনা যদি এবারও ২০১৪, ২০১৮ এর মত একই পথে বিজয়ী হতে পারে তবে টাইমস অব ইন্ডিয়ার মুখ দিয়ে প্রকাশিত এই আশঙ্কা সত্যি হবার সম্ভাবনা!

     

    আপডেটঃ  ২৬ নভেম্বর  ২০২৩,  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৪০
    সর্বশেষ আপডেটঃ ২৭ নভেম্বর  ২০২৩,  রাত ১২ঃ ৪৭

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

    কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়
    গৌতম দাস
    ১০ নভেম্বর ২০২৩  ২১ঃ ৫৮ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-57i

               দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায় – স্টিফেন ইবেলি বলেন, রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ভারতে ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

    আবার শুরু হয়েছে। সেই পুরানা বানানো গল্প –  ভারত নাকি আমেরিকার সাথে দেন-দরবার করে হাসিনাকে বাঁচাবে। ফিরে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখবে ইত্যাদি! মানে সেই পুরানা “আনন্দবাজারি” ও  “অগ্নি রায়” আর তাঁদের ঢাকার সহযোগী – মার্কা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। আর তা শুনে কিছু না বুঝে হাহাকার করে উঠা লোকের সংখ্যাও কম নয় যারাই মূলত – ভারত আবার হাসিনাকে বোধহয় ক্ষমতায় রেখে দিল – এই প্রপাগান্ডাকে পরোক্ষে আয়ু দিচ্ছেন। আর তাতে মিথ্যা প্রপাগান্ডার অপ-সাংবাদিকতা করে হিট বাড়ানোর অসৎ ততপরতার জয়জয়কার শুরু হয়েছে। এবার একাজের লিড হল, বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ। তিনি নেমেছেন যে নিজে ভারতীয় আর ভারতীয় বলেই যেন এক আরএসএসের কর্মির মত আচরণ করে আসছেন তিনি। আর তাত এই আচরণের পিছনে আছে আরেক পরিচয়।

    কলকাতার আরএসএস এর এককালের (২০১৬) দায়ীত্বে থাকা নেতা তথাগত রায় এখানে দেখেন তার পরিচয়,
    এরই চ্যালা-শিষ্য ছিলেন এই শুভজ্যোতি ঘোষ! 
    তথাগতের আমলে (সে সময়
    জঙ্গীবাদের নামে যা খুশি লিখতে-করতে-চালাতে পারত এরা), তাতেই এই শুভজ্যোতির উত্থান!

    শুভজ্যোতি ঘোষ, তিনিই এবার প্রপাগান্ডা লিড-নেতা! বাংলা বিবিসি-তে তিনি সত্য-মিথ্যায় মিশানো এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করেছেন। আর তা থেকেই প্রধান প্রপাগান্ডাটা শুরু হয়েছে। আর এটাই বাংলাদেশে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ ইত্যাদি এরা বিবিসির নাম না নিয়েই ঐ মেটারিয়াল দিয়ে সুত্রবিহীন স্ব স্ব রিপোর্ট করেছে।  যদিও গতদিনটা শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এরও এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট দিয়ে। সেটা এখানে দেখতে পাবেন।

    মিথা প্রপাগান্ডার শিরোনাম কীঃ
    গতকাল ১০ নভেম্বর ছিল আভ্যন্তরীণ রুটিন ঘটনা হিশাবে ভারত-মার্কিন সংলাপের দিন। আর সে উপলক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তাঁদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে সাথে নিয়ে আগের দিনই ভারত সফরে পৌছে গেছিলেন। বলাই বাহুল্য এতে বাংলাদেশের কোনই সংশ্লিষ্টতা নাই; থাকার কোন কারণও নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই ইন্ডিয়ার হাসিনাকে দেয়া মিথ্যা মিডিয়া প্রপাগান্ডা সার্ভিস যে এই সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে! কেউ কেউ সাবধানী খাড়া মিথ্যা বলতে ভয় পেয়েছে।  যেমন কালের কন্ঠ লিখেছে  “ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ : উঠতে পারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও” ।  আবার প্রথম আলো তো খুবই সাহসী মিথ্যাবাজ। তাই সে বুক ফুলিয়ে শিরোনাম করেছে,দিল্লিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।  কিন্তু প্রকাশ করার পর বুঝেছে এত হারাম কাজ দুনিয়া সহ্য করবে না। রাত দশটার মধ্যেই ঢাকার মানুষ চোরামি জেনে গেছে। মানে প্রথম আলো – এরা এত নিচে নেমেছে যে প্রথম প্রপাগান্ডা নিউজটা গায়েব করে দিয়েছে। লক্ষ্য করবেন এর রেফারেন্স লিঙ্কটা প্রিয়.কম এর। এই ওয়েবে কারো অনেকের প্রকাশিত লেখাই অটো কপি করে রাখা থাকে। তাই আমি সেখান থেকে লিঙ্ক দিয়েছে। এছাড়া ফেসবুকে যারা স্ন্যাপ কপি করে স্টাটাস দিয়েছিল ততক্ষণাত তাঁদের স্টাটাসে প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্টটা এখনও লটকানো আছে।
    তাই এবার শিরোনাম সহ সবই বদল। বলা যায় এবার দিল্লির সৌমের বরাতে প্রথম আলোর একেবারে ভাল মানুষী এবং পুরা উলটা শিরোনাম – যুক্তরাষ্ট্রকে বলল ভারত নির্বাচন কীভাবে হবে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ।

    তাহলে শুভজ্যোতি কী করেছিলঃ
    শুভজ্যোতি একদিকে প্রায় তেরশ অক্ষরের প্রপাগান্ডা রিপোর্ট-টা করছেন, শিরোনামে কায়দা করে উস্কানি দিয়ে লিখছেন দিল্লিতে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে!!!  অপরদিকে লেখা সেই রিপোর্টের একেবারে শেষে ভারতীয় মুখখপাত্র অরিন্দম বাগচির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, “বাগচি বলেছেন, আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”। 

    “বাংলাদেশের নির্বাচন একান্তভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব
    নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”, -জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র। সেই সঙ্গেই তিনি যোগ
    করেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। ঘনিষ্ঠ মিত্র ও পার্টনার
    হিসেবে আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মর্যাদা দিই।”

    যার সোজা মানে হল, শুভজ্যোতির পুরা রিপোর্বটের বক্তব্যটাই ভুয়া প্রপাগান্ডা! কারণ, অরিন্দম বাগচির কথা সত্য হলে শুভজ্যোতির কথা যে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় – এটা মিথ্যা।  অদ্ভুত, এরপরেও এমন রিপোর্ট আবার বিবিসি বাংলায় ছাপা হয়েছে সাংবাদিকতা বলে!!!!

    ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেনঃ
    সকাল থেকেই বাংলাদেশে প্রপাগান্ডা শুরু যেখান থেকে যে ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেন! প্রপাগান্ডিস্ট কালবেলার কথাই ধরেন, তার এই রিপোর্ট দেখেন।  এরা পিটার হাসকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সকাল থেকেই এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার খারাপ  প্রভাব পড়েছে! কারণ পিটার হাস দিল্লি চলে গেছেন!

    তো – তাতে কী হবে? না, তাঁদের থামার সময় নাই। পিটার হাস ইন্ডিয়া গেছে মানেই যেন ফিরে এসে তিনি হাসিনা কে নির্বাচিত ঘোষণা করে দিবেন! তাই কান্নাকাটি???
    তাঁদের কে বলি – এখন থামেন, একটু শ্বাস নেন ভাল করে; এবার শুনেন!

    প্রথম কথা হল, আজ সন্ধ্যা সাতটায় সমকালে ছাপানো ছবি-সহ নিউজ বলছে, দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়। এখন বুঝেন প্রপাগান্ডার হাত-পা, ডালপালা কতদুর বিস্তৃত!

    দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

                                                                                     এটাই বিবিসির প্রপাগান্ডা রিপোর্ট 

     

     


    এমনকি হাস যদি ইন্ডিয়া যেতেন তবুও কিছুই মানে হত না কেনঃ

    কারণ, আজ দশ নভেম্বর দিল্লিতে ভারত-মার্কিন ২+২ সভা শুরু হবে আর তাই সেখানে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন আগের দিনই এসেছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও হাস যদি যেতেন তিনি মূলত বড় জোর ব্লিঙ্কেনের সাথেই দেখা করতে যেতেন। তবু কোনভাবেই পিটার হাস ভারত-মার্কিন ২+২ সভার কেউ হতেন না। কারণ তিনি এর কেউ নন।

    আর তাতেও কী কী ‘সত্য না’ থেকেই যেতঃ
    ১। পিটার হাস ২+২ সংলাপ-সভার কেউ নন, হবেনও না। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মাত্র!
    ২। এখানে ২+২ সংলাপ মানে আসলে কী? তা হল, ভারত-মার্কিন দুপক্ষেরই দুই পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে ভারতেরও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ( তাই, ২+২) – একসাথে ডাকা নিয়মিত সভা – এমন সভার কাঠামোর নাম হল  ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে; যা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এর উদ্দেশ্যে ছিল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করা কার্যত যা, ভারতকে আমেরিকান অস্ত্র বিক্রি এবং কী কী শর্তে বিক্রি সেসব নিয়ে আলোচনা। কারণ রাশিয়ার কী কী অস্ত্র ভারত কিনলে আমেরিকা অস্ত্র ভারত পাবে না সে তর্ক আছে। আর দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সামরিক রিসোর্স ও স্টোর-গুদাম শেয়ার করতে পারে কিনা যা পরে পূরণ করে দেয়া হবে এধরণের এক আলাপের সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয়েছিল।  সুতরাং বলাই বাহুল্য, এই সংলাপে বাংলাদেশে কোন ইস্যুই না। এটাই আমাদের জন্য মূল কথা।  একারণেই বলছি পিটার হাস  ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের কেউই নন।
    ৩। মনে রাখতে হবে ২০১৮ সাল মানে সেটা ট্রাম্পের আমল। আর এবার বাইডেনের আমলেই এই সভাতেও এবার যুক্ত করা হয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক ইস্যু। যা আসলে এশিয়ায় চীন ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করতে পারে কিনা, কতটুকু? এনিয়ে তাঁদের আলোচনা। অর্থাৎ, এখানে এটাতেও বাংলাদেশ কোন ইস্যু-ই না!

    মূল কিছু কথা হাতে গুনে মনে রাখতে হবেঃ
    এক. এশিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতকে নিয়ে আমেরিকা আর যৌথ কিছুই করবে না। যেটা ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটেছিল। সে সময় এক্ষেত্রে আমেরিকান লক্ষ্য ছিল ভারতকে চীন ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করার ঠিকা দেয়া। সেই ঠিকা দেয়া-নেয়া এখন ওভার! মানে শেষ বা ইতিটানা হয়েছে। যার প্রাথমিক কাজটা করে রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালেই। তিনি এই ঠিকার বিনিময়ের বস্তুগত সুবিধায় ভারতকে আমেরিকায় (কম বা না-শুল্কে) ১৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সুবিধা বাতিল করেছিলেন।  আর পুরা এসাইনমেন্ট-ঠিকা অবলুপ্তি ঘটিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। তবে এসাইনমেন্ট বা ঠিকা দেওয়াটাও যেমন আনুষ্ঠানিক ভাবে দেয়া যায় না (এসব কাজ পাবলিকলি করা হয় না) সম্ভব ছিল না; সেকারণে এই ঠিকা বাতিল টাও আনুষ্ঠানিকভাবে করার কিছু নাই। যদিও এতে ঠিক কি ঘটেছে সেটা আমরা জেনেওবুঝে নিতে পারি বাস্তবতা দেখে। এর আগে আমার পুরানা লেখায় বিরোধী কংগ্রেস নেতা শশী থারুর লেখা থেকে – এই ঠিকা দেওয়ার –  রেফারেন্স আছে আমি দেখিয়েছিলাম! আলী রিয়াজেরাও এটা স্বীকার করতে চায় নাই!

    তবুও এর স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, বাইডেনের নয়া নীতি-পলিসিগুলো যদি খেয়াল রাখি। যেমন বার্মা এক্ট, বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখার আগ্রহ কিংবা আন্দামান নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনা (ও আমেরিকান খায়েসও বলতে পারি) ইত্যাদি এসবের দিকে যদি নজর রাখি। এসব কোন ইস্যুতেই ভারত আমেরিকার খায়েসের সাথে চলতে পারবে না – ভারতেরও ঘোষিত নীতি-পলিসি এর বিরোধী। তাই এখানে এসে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক – এই কবি এখানে নীরব থাকবে। ভারত আমেরিকান খায়েস-কে আপন করে নিতে পারবে না শুধু না বরং ভারতের অবস্থান এর চরমতম-বিরোধী! এমনকি ২০২৪ সালে যদি মোদির পরাজয়ে রাহুল বা অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রেও আমেরিকান খায়েস সম্ভবত পূরণ হবে না! এককথায়, আমেরিকান খায়েস – এই ইস্যুটার ভাগ্য অনিশ্চিত!
    সুতরাই এককথায়, বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা থাকবে এই প্রশ্নে আমেরিকান অবস্থান আর কখনও ভারতের সাথে শেয়ার করে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকা আর গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ সেটা হবে আমেরিকার একক সিদ্ধান্ত।

    দুই.
    কিন্তু তাই বলে কী এশিয়ায় চীনবিরোধী অবস্থান, স্বার্থ ততপরতা প্রশ্নে ভারত-আমেরিকা  কমন স্বার্থেও কোন সম্পর্ক বা এক সাথে কমন স্ট্রাটেজিতে কাজ সব নাই হয়ে যাবে? অবশ্যই না। এটা থেকেই যাবে কারণ এটা আলাদা ইস্যু। এমনকি বাংলাদেশে হাসিনার সাথে চীন কী সম্পর্ক রচনা করছে তা নিয়েও ভারত-মার্কিন আলাপ হতে পারে কিন্তু সেটা হবে – বাংলাদেশের ক্ষমতায় কোন সরকার থাকবে সেই প্রশ্ন বাদ দিয়ে –  যেটা একান্তই আমেরিকার একক বিষয় হয়েই থেকে যাবে!
    আমাদের সমস্যা হল, কেন ভারত হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকছে সেটা আমরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের সংঘাত ও প্রেক্ষিত থেকে দেখা বুঝা করি। যেন এর বাইরে অন্য কোন কারণ থাকতেই পারে না। ব্যাপারটা যেন হিন্দু-মুসলমানের পুরানা বিরোধই! আমি সবাইকে অনুরোধ করব একটু অন্যদিক থেকেও দেখেন! প্লিজ!! 

     তিন.  তবে এক্ষেত্রে মানে ভারত-মার্কিন সংলাপে কিছুটা  গোলমাল পাকিয়ে ফেলতে পারেন ডোনাল্ড ল্যু (সবাই নয়)। তিনিই এবার   ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের মধ্যে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বা আইপিএস (IPS) ঢুকিয়ে ফেলার মূল কারিগর। বাইডেনের ইলেকশনী প্রচার স্ট্রাটেজি সাজানোর সময় থেকেই নির্ধারিত ল্যু-এর এই অবস্থান ও পদ। কিন্তু সরি ল্যু! সো ফার তার সাকসেস প্রায় জিরো!  পাকিস্তানে আর সর্বশেষ হাসিনার বাংলাদেশে ল্যু-এর আইপিএস স্ট্রাটেজির এর অর্জন শুন্যই বলা যায়। তবে এবার তিনি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আর খুব বেশি এটা আগাবে এমন সম্ভাবনা কম!

    চার. ভারত চাইবে এই আলাপের ছায়ায় এক ফাঁকে চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি-টা আবার পাওয়া যায় কিনা! সেদিকটা উস্কে তুলতে; আবার যদি লাইগ্যা যায় – আর কী!  একদম আগের মতই না হলেও ভিন্ন মোড়কে অথবা কিছু অংশের কাজ!
    কিন্তু না। আমেরিকা এদিকে ভারতকে আবার এই ইস্যুতে ছাড় বা ঠিকা দিবার জায়গা এবং পরিকল্পনা কোনটাই নাই। আর তা থেকেই আলোচনায় ভারত বিরোধাত্মক ইস্যুগুলোকে সামনে তুলতে শুরু করে ফেলতে পারে। তাহলে, ভারত-আমেরিকার এবারের সংলাপ মোদির শেষ জমানা খারাপ পরিণতি ফলাফলের দিকে রওনা দিবে!

    পাঁচ. অথচ বিবিসি লিখেছে, “বৈঠকে দুই দেশের চারজন মন্ত্রী মিলে সার্বিকভাবে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ডোনাল্ড লু নাকি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। আসলে দোনাল্ড ল্যু এর বরাতে যা যা বিবিসিতে শুভজ্যোতি লিখেছেন এর সবটাই মিথ্যা প্রপাগান্ডা! তাই কোন রেফারেন্স এখানে নাই যে ল্যু এসব কথা কোথায় বলেছেন???

    এসব কথা থেকে পরিস্কার যে বিবিসির এই কথিত রিপোর্ট একেবারেই ভুঁয়া। ঘরে বসে ইচ্ছামত বানানো! ভারত-মার্কিন সংলাপে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে কোন আলোচনা এমনিতেই হওয়ার সুযোগ নাই। কারণ, ১। তা সংলাপ কাঠামোর মধ্যে পরে না। ২। এসময়ে ভারত বা  বাংলাদেশের কারো ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েই আলোচনা তোলাটাই ভারতের জন্য রিস্কি। কারণ, তাতে ভারতের নিজের ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা উঠে যেতে পারে।‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ ইস্যুটাই মোদির জন্য সেনসেটিভ। সেই খবর যার নাই তিনি বিবিসির এই মনগড়া রিপোর্ট লিখতে গেছেন বলেই এই সমস্যা।

    তাহলে কী দাঁড়ালোঃ
    ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ নিয়ে আজ বাংলাদেশ প্রসঙ্গের নামে যা কিছু হয়েছে এর কোন বিশ্বাসযোগ্যতাই নাই। বিশেষ করে বিবিসি এনিয়ে অপরাধী-সাংবাদিকতা করেছে।
    কিছুক্ষণ আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার বয়ানে মানবজমিনে যা ছাপা হয়েছে সেটার উপর বিশ্বাস মানবজমিনও রাখে নাই; এমন না রেখেই মানবজমিন এই রিপোর্ট ছেপেছে।
    আবার ভারত-মার্কিন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার আবার বক্তব্য কেন? তিনি কিভাবে এটা দিতে পারেন? উনি কে এখানে? দুই পররাষ্ট্র-মন্ত্রীর যৌথ বক্তব্যের পরে তিনি কে?? কী তার প্রটোকল????
    ভারতের চেষ্যেটা হল, গায়ের কাপড় খুলে গেলেও ন্নযাংটা হয়েও যদি  হাসিনার ক্ষমতাকে যেকোন উপায়ে কিছু প্রাণ পাইয়ে দেয়া যায় কীনা – এরই এক মিথ্যা প্রাণান্তকর প্রয়াস!
    ভারতের এই খামোখা প্রচেষ্টা উলটা হাসিনা ও লীগের বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনাই বেশি! মানুষ বিরক্তবোধ করবে, যে এত মিথ্যা বলার কী দরকার!  মিথ্যা কারো সঙ্গি হয় না!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ১১ নভেম্বর  ২০২৩,   দুপুর ০১ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • চন্দন নন্দী-রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!

    ওরা ইসলামি দল খুঁজেছে!
    চন্দন নন্দী, রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!
    গৌতম দাস

    ১৫ অক্টোবর ২০২৩    বিকেল ১৭ঃ ২৩

    https://wp.me/p1sCvy-55l

              কুমিল্লায় হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে অবস্থান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের

     

    এবার ২০২৩ সালের দুর্গাপুজা আগামি সাতদিনের মধ্যেই শুরু হবে। মানে পুজা শুরু বা সপ্তমী হবে সম্ভবত ২১ অক্টোবর শনিবার। কিন্তু ইতোমধ্যেই সেই চন্দন নন্দী বা “কংগ্রেসি ‘র’” কানেকটেড লেখক – তিনি এবার ‘র’ এর হয়ে, গত ২০২১ সালের দুর্গাপুজার সময়ে ঘটা ঘটনার (বসা মুর্তির কোলের উপর কোরান শরীফ রেখে আসা) মত করে আবার খুব সম্ভবত সেই কুমিল্লা থেকেই দাঙ্গা ও উত্তেজনা তৈরি করে এর দায় বিএনপি বা কোন ইসলামি দলের উপর চাপানোর প্রচেষ্টা নিয়েছে।  গত পরশু ১৩ অক্টোবর তিনি লিখেছেন, “কুমিল্লা শহরে নাকি হেফাজতে ইসলামিরা শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পরে কুমিল্লার হিন্দু মাইনরিটির আক্রমণ করেছে ও ধাওয়া দিয়েছে”।

    …another crowd of Islamists belong to the Hefazat-e-Islam,
    after offering Friday prayers, chased and attacked members
    of the minority Hindu community in Comilla district…

    অথচ বাংলাদেশের যেসব মিডিয়া ঘটনাটা কাভার করেছে তাতে উল্লেখিত বর্ণনায় ফ্যাক্টস হল,  এটা কুমিল্লা আওয়ামি লীগ বনাম রানা দাসগুপ্তের সংগঠন (হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ, HBCUC) – এদুই সংগঠনের মধ্যকার গত কয়েকদিনের ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক; আর তা থেকে কুমিল্লা শহরে গত শুক্রবার তাঁদের দুই মিছিল মুখোমুখি হয়ে গেলে শ্লোগান-পাল্টা শ্লোগানের পরে হাতাহাতিতে ‘ঐক্য পরিষদের’ চারজনের মাথা ফেটে যাবার মত আহত হয়েছে। অর্থাৎ সারকথায় ঘটনা আসলে আপন ঘরে ঘরের বিবাদ! মানে কোন ইসলামি সংশ্লিষ্টতা দূরে থাক কোন ইসলামি গন্ধও নাই! বরং এতা হল, আওয়ামি লীগের সাথে ভারতের তল্পীবাহক এক বাংলাদেশী হিন্দু সংগঠনের ‘ঐক্য পরিষদের’ বিবাদ। অথচ চন্দন নন্দী ঘটনাটার মধ্যে হেফাজতে ইসলামকে আবিস্কার করেছেন। বাংলাদেশের আজকের পত্রিকা, প্রথম আলো, সমকাল, যুগান্তর,  মানবজমিন, ডেইলি স্টার ইত্যাদি মিডিয়ায় এমনকি চন্দন নন্দীর প্রিয়  বিডিনিউজ২৪ অথবা ‘অসাম্প্রদায়িক’ দেশ রূপান্তর, প্রো-ইন্ডিয়ান কালের কন্ঠ এমন প্রত্যেকটা পত্রিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে বিবাদটা  আওয়ামী যুবলীগ ও রানা দাসগুপ্তের ঐক্য পরিষদের মধ্যে।  মানে হেফাজত-সহ কোন ইসলামি সংগঠন এর সাথে -পাঁচেই নাই। কোন ছায়াও নাই!  অথচ চন্দন নন্দী চারদিকে একাই কেবল ইসলামি দল দেখতে পেয়েছেন। কারণ, খোদ রানা দাসগুপ্তও কোন ইসলামি দলকে নয়, খোদ সরকারকে দায়ী করে শাহবাগে বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছেন, “কুমিল্লায় স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারীরা এই হামলা চালিয়েছেন” ।  প্রথম আলোর সোহরাব হাসানও এবার ছাত্রলীগ-যুবলীগের টার্গেট সংখ্যালঘুরা শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয় লিখেছে।
    অথচ, চন্দন নন্দীর লেখায় দাবি, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু মেরেছে। মানে হল, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু দেখলেই যেন খাবলিয়ে ছিঁড়ে খেতে তেড়ে আসছে নরেন্দ্র মোদির বজরং দলের গুন্ডাদের মত – এমন কাল্পনিক এক ছবি এঁকে নিজ গল্পগাথার কথা বলে গেছেন চন্দন নন্দী। লিখেছেন, …after offering Friday prayers, chased and attacked members of the minority Hindu community in Comilla district। মানে মিথ্যা কাল্পনিক বয়ানেরও একটা সীমা থাকে নন্দী সেটাও মানতে চান নাই। এখন এটা কী ‘র’ এর মরিয়া কোন  পুজা-এজেন্ডা নাকি অর্থের পাহাড় প্রমাণ চাপের কারণে ঘটেছে – তা জানা যায় নাই!
    আবার তিনি বাংলাদেশের সকল মিডিয়ায় প্রকাশিত বয়ান যেখানে বলা হয়েছে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের – সেটাও তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন আর আবার বলছেন আমাদের মিডিয়া নাকি ঢাকাঢাকি করে ভিন্ন লেবেল লাগিয়ে রিপোর্ট লিখেছে –  The Bangladeshi media labelled the attackers as men belonging to the Juba League and the Chhatra League.”। মানে হল নন্দীর দাবি,  বাংলাদেশের সকল মিডিয়াই নাকি মিথ্যা করে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের বলেছে বা চিহ্নিত (labelled) করা হয়েছে। অর্থাৎ চন্দন নন্দী-ই হলেন একমাত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির!  তিনি কোন এক গায়েবী চোখে দেখেছেন???

    চন্দন নন্দী ও ‘র’ এর এই ডেসপারেট বা মরিয়া হয়ে মিথ্যা বলা – এটাই
    আমাদের শঙ্কিত করে যে তারা এবারের দুর্গাপুজার সময়ে এরা আমাদেরকে
    শান্তিতে থাকতে দিবে না, এমন কোন পরিকল্পনা করেছে কিনা!
    তাই ইতোমধ্যেই কোন একটা ইসলামি সংগঠনের নাম হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে!

    চন্দন নন্দীর এমন ভয়ংকর দানব  হয়ে উঠার পিছনে আমাদের প্রগতিশীলদের দায় আছেঃ
    চন্দন নন্দী; ভেবেছিলাম একে নিয়ে আর লিখব না, বোধহয় লিখতে হবে না! কিন্তু না। যে এবার একবারে ভারতের গোয়েন্দা-অন্তর্ঘাতমূলক কাজ ও এমন সংস্থা [RAW] এর সাথে সরাসরি জড়িয়েছে। আসলে  যে জীবনে কখনও এমন জড়িয়েছে সে তা আর জীবনেও ছাড়তে পারে না। এই কথাটাই এখন আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে ভারতের চন্দন নন্দীর বাবা – তিনি ছিলেন মানে তিনি সাবেক ‘র’ এর কর্মকর্তা এজেন্ট। কিন্তু সেসব মোদি ২০১৪ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগের ঘটনা। তাই তিনি ‘কংগ্রেসি র’। পরে মোদির জমানায় এসে এরাই হয়ে গেছিলেন মোদির ‘র’ এর  ঢেলে সাজানো নয়া কর্তাদের সহকারী!  কাজেই সেই সুত্রে বাবার ‘র’ কলিগ, জুনিয়র বা কলিগের ছেলে ইত্যাদিদের সুত্রে চন্দন নন্দীও ‘কংগ্রেসি র’। আর এরাই এখন তার গুজব বা আধাসত্য বয়ান বা খবরের উৎস। আর একারণে, অনেক আগে লিখেছিলাম চন্দন নন্দী ‘কংগ্রেসি র’। এমনিতেই ১৯৬৮-৭০ সালের দিকে জন্ম নেয়া ‘র’  এর উত্থান, বিকাশ সবই কংগ্রেসের হাতে আর সেই সুত্রে, ‘কংগ্রেসি র’ মানে প্রায় ঘরের ছেলের অবস্থা ইত্যাদি । যা প্রায় ২০১৩ সালের শেষ পর্যন্ত কমবেশি প্রবল বহাল ছিল।  এছাড়া ‘কংগ্রেসি র’ এই নামকরণ আবার লক্ষ্য করেছি  চন্দনের মত কিন্তু ঢাকার বাসিন্দা এমন ‘কংগ্রেসি র’ যারা আছেন; যারা, বলাই বাহুল্য আওয়ামি জমানায় বহাল তবিয়তে থাকছেন, তারাই নিজেরা নিজেদের পরিচয় দেয় এভাবেই – ‘কংগ্রেসি র’ বলে, তা শুনেছি। এছাড়াও এমনকি এসব সুত্রে ঢাকার অনেক সরকারি অফিসও চন্দনের আধাসত্য বক্তব্যের স্কুপ সোর্স হওয়া বিচিত্র নয়, বরং স্বাভাবিক হয়ে গেছে!

    এবছর চন্দন নন্দীকে নিয়ে লিখেছিলাম আমিই প্রথম যখন তিনি বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় একটা লেখা ছাপেন  গত ২ সেপ্টেম্বর, যা হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই বিব্রত করেছিল। ফলে বিডিনিউজ২৪ ওয়েব পত্রিকাটা বন্ধ হয়ে গেছিল, যা সম্প্রতি আবার খুলেছে। এরপরে লক্ষ্যণীয় যে চন্দন তাঁর লেখার প্রসঙ্গ / বিষয় বদল করে মানে কার দিক থেকে লিখবে সেই এটিচ্যুডে বদল ঘটিয়েছেন। চন্দনের সাধারণ ঝোঁক হল, ‘র’ এর ঘরের তথ্য বাইরে প্রকাশ করে দিয়ে ক্রেডিট নেয়া। আর নন্দীর এমন করার পিছনের সাইকোলজিটা হল – চন্দনের বাবার সাথে চন্দনের বনিবনার অভাব। আবার এর পিছনে ঘটনা হল, চন্দন পশ্চিমে উচ্চশিক্ষা শেষ না করে ভারতে ফেরত আসা, টাইমস অব ইন্ডিয়ায় চাকরিরও সমাপ্তি ইত্যাদি এসব নিয়ে সম্ভবত ‘র’ এর এজেন্ট বাবার সাথে তার ব্যাপক ও গভীর মনোমালিন্য।  বর্তমানে সে কোথাও কোন চাকরিতে নাই। কিন্তু খেপ মারতে হয় ফ্রি-ল্যান্সার নামে আর পুরানা ‘র’ এর যোগাযোগ-গুলো ব্যবহার করে…।
    তাই এবার প্রথম বিডিনিউজে সে লেখা ছাপিয়েছিল  হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই জন্য বিব্রতকর হবে এমন বয়ান ছাপিয়ে। চিন্তা না করে কাজে ওস্তাদ চন্দন নন্দী এখানেও ভেবে দেখে কাজ করেব নাই যে এর পরিণতি কী হবে! তাই ঘরের ভিতর খারাপ প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক! সম্ভবত সেকারণে, আমরা দেখলাম পরের লেখা থেকে নন্দী এটিচ্যুড বদলে ফেলেছেন। তিনি হয়ে উঠেন আর হাসিনা-মোদি নয় এবার কেবলমাত্র হাসিনার বিরুদ্ধের সত্য-আধাসত্য প্রপাগান্ডা করা। যেগুলো অবশ্যই জার্নালিজমের বিচারে অপ-জার্নালিজম!
    সেই থেকে  চন্দন হয়ে যায় হাসিনা বা তাঁর ছেলে বা সরকার সম্পর্কে আধাসত্য বা কোন বিশ্বাসযোগ্য সোর্স ছাড়া গায়েবি সোর্সের নামে ছড়ানো্র এক প্রপাগান্ডা লেখক। এছাড়া তিনি তার লেখার জন্য ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চলের এক ইংরাজি ওয়েব সাইট NorthEast News কে আপাত স্থায়ীভাবে বেছে নি্য়েতে দেখেছিলাম আমরা। কেন এমন?
    ভারতের নর্থ-ইস্ট মানে আসাম-সহ  সাথে ছোট ছোট পাহাড়ি গোত্রভিত্তিক (ট্রাইবাল) মোট সাত রাজ্য। কিন্তু এগুলো ভারতের অবিরাম মাথাব্যাথ্যা যে এরা কে কখন না জানি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করে বসে। এই ভয় থেকেই এই এলাকায় ভারতের গোয়েন্দা ও ‘র’ ততপরতা ব্যাপক, অনেক বেশি। অনুমান করা হয় সেই সুত্রে সারা নর্থ-ইস্টের প্রায় সব ইংলিশ-ওয়েব পত্রিকা যা আছে তা  প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে ‘র’ এর ততপরতায় নিয়ন্ত্রিত। মূলকারণ, এসব মিডিয়া নিজে চলার আয় নিজে করতে পারে না। আর সেই সুত্রে ‘র’ এর অর্থ বা ভর্তুকিই তাঁদের একমাত্র সহায়! একারণে, সারা নর্থ-ইস্ট থেকে নাগাল্যান্ড হয়ে বার্মা – মানে একেবারে থাইল্যান্ড সীমান্ত পর্যন্ত সব ইংরাজি ওয়েব সাইটগুলো এই একই দশায়!  ফলে নন্দীর এবং সময়ে এমন একেকটা ওয়েব পত্রিকায় সুবীর ভৌমিকের আবির্ভাব একারণেই ঘটতে দেখেছি আমরা। আর  এমনই এক NorthEast News এ এবার নন্দীর আবির্ভাব ঘটেছিল।
    এদিকে উপরে বলেছি, হাসিনা বিরোধী এবারের প্রপাগান্ডা হাজির করাতে এখনকার বাংলাদেশে মাস-লেবেলে এমনকি বিদেশের বাংলাদেশিদের কাছেও নন্দী ক্রমশঃ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল। আমি ২০১৫ সাল থেকে নন্দীকে ফলো করি। আমার পুরানা লেখায় সেকারণে “নন্দী কে” তা লিখতে সহজ করে ধারাবাহিক বর্ণনা দিয়েছিলাম।  আর এই লেখা এখনও আমার সাইটে  প্রতিদিন কমপক্ষে পঞ্চাশজন বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নক করে থাকে, দেখতে পাই! অনুমান করি তাঁদের মূল বিষয় আসলে চন্দন নন্দী কে? এই কৌতুহল!

    সবচেয়ে খারাপ কাজ করেছে আমাদের প্রগতিশীল মহল! ফ্যাক্ট চেকিং-এর নামে একজন চন্দন নন্দীকে নাকচ করতে গেছেন। তাও সেটাও আবার (ইসরায়েল-ইন্ডিয়া কানেকটেড) সোয়েব চৌধুরীর আরেক প্রপাগান্ডা পত্রিকা দ্যা ব্লিটজ [The BLITZ] এর রেফারেন্স দিয়ে; মানে ভর করে!! মানে ব্লিটজ যেন এক নুন্যতম বিশ্বাসযোগ্য পত্রিকা এটা ধরে নেয়া হয়েছে সেখানে। মানে, গত শতকে বাংলাদেশের ইনকিলাব পত্রিকা থেকে উত্থিত সোয়েব চৌধুরি সম্পর্কে একালে যাদের কোন ধারণা নাই্‌ তাদেরই এক ছেলেখেলা হয়ে গেছে কাজটা! এককথায় বলা যায় যে ব্লিটজের কোন  পাঠক বিশ্বাসযোগ্যতা নাই, অথচ তার কাঁধে মাথা রেখে আরেক বিশ্বাসযোগ্যতা-হীন চন্দন নন্দীকে নাকচ করার কিছু কী আছে? না থাকতে পারে? এমন চন্দন নন্দীর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলা – দুটাই বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে!
    এদিকে অন্যান্য প্রগতিশীলদেরকে দেখা গেছে এই ফ্যাক্ট চেককে আপহোল্ড বা আপন করে  নিয়ে দেখেছেন কেউ!  আবার চন্দন নন্দী সম্প্রতিকালে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন আমেরিকা থেকে প্রচারিত কনক সারোয়ার এর ভিডিও ক্লিপে। এই সাক্ষাতকারকেও একই সাথে প্রগতিশীলদের অনেকেই প্রশংসা করেছেন, আপন করেছেন। এই সাক্ষাতকারের শুরুতে [০২ঃ ২৪ মিনিটে] চন্দন নন্দীর উপস্থিতিতে কনক চন্দনকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে চন্দনের বাবা  যে ‘র’ এর কর্মকর্তা অফিসার ছিলেন ও বাংলাদেশে পোস্টেড ছিলেন, তা কনক আমাদের জানিয়েছেন!  ]
    এদিকে প্রগতিশীলতার কাহিনীর শেষ নাই! সিপিডি এর মালিক  ডঃ রেহমান সোবহান আর সাথে ডঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মিলে এরা গত ২০০৭ সালে ভারতের আসামকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর দেওয়ার পক্ষে প্রপাগান্ডা করবেন, এই ঠিকা পেয়েছিলেন। এমনকি যারা তাঁর বিরোধিতা করছেন তাদেরকে তিনি অশিক্ষিতও বলেছিলেন। সেই রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের এবারের ঠিকা সম্ভবত রানা দাসগুপ্তের সংগঠন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ এর পরামর্শক হওয়া যাতে এই সংগঠন আওয়ামি লীগকে ছদ্ম তুলাধুনা করে আবহাওয়া তৈরি করে বিএনপির কাঁধে রানা দাসগুপ্তকে সওয়ার করানী! এরা গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা সরকার হিন্দুদের জন্য কিছু করেন নাই, অবস্থা নাকি আরো খারাপ হয়েছে বলে হাসিনাকে উঠতে বসতে গালাগালি শুরু করেছেন – উদ্দেশ্য বিএনপির কোলে উঠা বা রানা দাসগুপ্তকে তুলে দেওয়া!
    এই সকল প্রগতিশীল মহল এখন কুমিল্লার ঘটনায় কী করবেন? এটা তো প্রকাশ্য যে সেখানকার আওয়ামি এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনের বাহার “মদবিহীন পুজা” করতে আহবান করেছেন। আর সেটার বিরোধিতা করার উসিলায় রানা দাসগুপ্ত মাঠে নেমেছেন। সকল রিয়েল উত্তেজনার শুরু সেখান থেকে। আর কথা তো সত্য যে কলকাতায় পুজার সময় মদের বার বা বেচাবিক্রি বন্ধ রাখা হয়, কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা ঠিক রাখার সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে তাই। বাহার এমপি সেটার রেফারেন্স টেনেছেন!  অথচ চন্দন নন্দী এবার ‘র’ এর এজেন্ডা নিয়ে নেমে রানা দাসগুপ্ত দেরকে নাকি হেফাজত ইসলামি বা মুসলমানেরা আক্রমণ করেছে বলে মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছেন!। ইতোমধ্যেই প্রগতিশীলদের আদরণীয় হয়ে উঠে চন্দন নন্দীর ধারণা তিনি এবার সেই প্রগতির ইমেজ বিক্রি আর এর ক্যাশ ছিটিয়ে  – মুসলমানেরা হিন্দুদের আক্রমণ করেছে –  বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ফ্রেমে আওয়ামি বনাম রানা দাসগুপ্তের ঝগড়াকে লুকিয়ে তা ঢেলে সাজিয়ে- এটা হিন্দুদের উপর মুসলমানদের হামলা বলে চালিয়ে দিবেন! সেটা আবার এখন কিছু কাজের অগ্রগতি দেখাতে শুরু করেছে।

    যেমন ডেইলি স্টার ইতোমধ্যেই রানা দাসগুপ্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পাঠককেও নিতে উস্কানি তুলেছে। তাই এনিয়ে তাঁদের রিপোর্টে এমপি বাহারের   ‘এটা শুধু আমার কথা নয়, দিল্লি থেকেও এটা বলেছে।’ বলে উপ-শিরোনাম করেছে। সম্পাদক মাহফুজ আনাম এতদিন নিজে ‘র’ বা ভারতের দালালির লোক বলে পরিচিত হয়ে যাওয়াকে অসুবিধা নাই মনে করলেও তাঁর নিজের আওয়ামি লীগের সাথে সম্পর্ক নাই – সেতা প্রমাণ করে রাখতে নিজ আওয়ামি বিরোধিতাকে খুব সিরিয়াসলি নিতে দেখছি আমরা। তাই এর আগে ওবায়দুল কাদেরের আমরাও আছি দিল্লি­ও আছে, বক্তব্যের সমালোচনা করে উল্টা নিজেই এক কলাম লিখে ফেলেছেন। আর মাহফুজ সাহেব এখন কুমিল্লার আওয়ামি এমপি বাহারের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছেন। মানে এই এমপিকে নিচা করেছেন বা ভিলেন করে এঁক্কে দিয়েছে! এতে সার মানে দাঁড়িয়েছে যে রানা দাসগুপ্তকে সাপোর্ট করা মানেই তো চন্দন নন্দীকে সাপোর্ট করা! অর্থাৎ এখানে পরোক্ষে কায়দা করে ‘র’ এর পক্ষে দাঁড়িয়েছে ডেইলি স্টার।

    তাহলে রানা দাসগুপ্ত গত পনেরো বছর ধরে আওয়ামি মাখন লুটে এখন আওয়ামি-বিরোধী ঝান্ডা দেখানো কেনঃ
    হা এটাই ঘটনা কেন্দ্র! অল্পকথায় বললে, হাসিনার আওয়ামি লীগের ক্ষমতার অবস্থা ভাল নয়! কখন কী হয়ে যায় ঠিক নাই। এই হল এদের মূল উপলব্দি! সবচেয়ে সাড়ে সর্বনাশ হল, সেই আওয়ামি লীগ ছাড়া মোদির ভারত বাংলাদেশে বিএনপি বা আর অন্য কোন দলের দিকে এতদিন ফিরেও তাকায়ও নাই! তাই এ’বস্থায় বিএনপির কোলে উঠতে রানা দাসগুপ্তসহ মোদির ভারতের আগ্রহটাই মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে! আর তা থেকেই – সেটারই মরিয়া দশা দেখছি আমরা! রানা দাসগুপ্ত  চরম বেচাইন হয়ে উঠেছেন!  এরই গ্রাউন্ড সাজাতে সম্ভবত রানা দাসগুপ্ত মোদির ভারতের হয়ে প্রক্সি-যোদ্ধা বা এডভান্স পার্টি হয়ে উঠতে চাইছেন! যাতে বিএনপি এখন মোদির এডভান্স পার্টি রানা দাসগুপ্তের দিকে একট কোল দেয়! সেকারণেই রানা চরম আওয়ামি-বিরোধীতা শো করছে্ন – যা জরুরত সে জাদা – সেটা তো অবশ্যই!
    এটাই আমরা দেখছি।  আর এটা দেখে ততধিক জ্বলে উঠছে আওয়ামি লীগ মানে যুবলীগ-ছাত্রলীগ! আর মহড়াস্থল কুমিল্লা কারণ ২০২১ সালে ভারত এখানে সফল হয়েছিল! কোরান শরীফ রাখা ইকবাল কে?  সেটা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ভিডিও ক্লিপের প্রমাণ দাখিল করার পরও ইকবালের পিছনে কে তা আর হাজির না করে আওয়ামি লীগ বরং উলটা ভারতকে বাঁচিয়ে  দিয়ে সেই সুবিধায় নিজ ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে ভারত সহায়তা দিয়ে যাক – এভাবে ক্যাশ করতে কাজ করে গেছিল! এনিয়ে এখন হয়ত আপশোষ করছে! আর ইকবাল?
    ১৬ মাসের সাজা দেয়া ইকবাল এখন বেকসুর খালাসের পরে লাপাত্তা করে দিয়েছে সরকার!  আর ওদিকে রানা দাসগুপ্ত এখন বিরাট বিপ্লবী – এক বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে এখন ইকবাল খুঁজে ফিরছেন, তাঁর আরো শাস্তি দিতে চেয়ে উলটা সরকারের বিরুদ্ধেই তিনি সোচ্চার! বেচারা হাসিনা সরকার!!!
    আবার ওদিকে খেয়াল করেন, মোদির এডভান্স পার্টি বলতে সেটা কিন্তু ঠিক রানা দাসগুপ্ত নন। বরং মোদি-আরএসএস বেটার প্রতিনিধিত্বের পার্টি হল গোবিন্দ প্রামানিক এরটা। তাহলে রানা কেন এখন গুরুত্বপাবে? এনিয়ে প্রামানিককে রানাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তবু রানা দাসগুপ্তই এখন মোদির এক নম্বর আদরের দল কারণ, যেমন ধরেন রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের মত লোকদের পক্ষে সরাসরি আরএসএস এর গোবিন্দ প্রামানিক হল একটু অস্বস্তিকর, এর চেয়ে রানা দাসগুপ্ত এই গংদেরকে একটু আড়াল দেয়! তাই এই আয়োজন! নিঃসন্দেহে পরিকল্পিত আয়োজনই চলছে!

    নন্দী আর দাসগুপ্ত গং ওরা এখন হন্যে হয়ে যুতসই  ইসলামি দল খুজছে। যাতে সবমিলিয়ে হেফাজত-সহ ইসলামি দলগুলোর অন্তত কাউকে তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাদেরকে বলির বখড়া বানাতে রানা-নন্দীরা উঠেপড়ে লেগেছে! কিন্তু এবারের পরিকল্পনা আমরা বাস্তব হওয়া ঠেকাতে পারি এবং অবশ্যই ঠেকাতে হবে। সেজন্য আমাদেরকে সচেতন ও সাবধান হতে হবে। কারো সাজানী ফাঁদে বা উস্কানিতে পড়া যাবে না। আর এভাবে তাঁদের অসৎ পরিকল্পনা উন্মোচিত করে দিয়েই একমাত্র আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পারি! রানা-নন্দীদের পরিকল্পনাসহ সব ততপরতার নিন্দা জানাই!

     

     

    আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ১৭
    সর্বশেষ আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ৫০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • প্রগতিশীলতা, এবারেও কী গুম-খুনের রাষ্ট্রের পক্ষে সাফাইদাতা…

    প্রগতিশীলতা, এবারেও কী গুম-খুনের রাষ্ট্রের পক্ষে সাফাইদাতা…
    গৌতম দাস

    ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-53L

               গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কান্না

    প্রগতিশীলেরা [প্রগ্রেসিভ] ভোল বদলে এখন ভোটাধিকার ও কথাবলার স্বাধীনতার দাবিতে নব রূপে উঠে আসার চেষ্টা করছে। বলেছিলাম, প্রগতিশীলতা আর আধুনিকতা এক কথা নয়। সমগোত্রের ধারণা নয়, একই ঘরানার চিন্তা নয়। ফলে প্রগতিশীলতা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র চিন্তারই কেউ না। রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষের কোন চিন্তা ও অবস্থান প্রগতিশীলতা নয়; প্রগতিশীলদের এমন কোন চিন্তা ও অবস্থান নাই। তাই অধিকার, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ইত্যাদি এগুলোর একটাও প্রগতিশীল রাজনীতিই নয়। এমনকি এর আরো একেবারে গোড়ার কথা, ‘নাগরিক’ [citizen] ধারণা বা তা থেকে ‘নাগরিক প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টশন [representation] এর ধারণার সাথে ‘প্রগতিশীলতার’ কোন সম্পর্ক নাই। এককথায় কমিউনিষ্ট-প্রগতিশীল চিন্তায় ‘নাগরিক’ [citizen] বলেই কিছু নাই।

    যদিও প্রগতিশীলেরা বিপদে পড়লে যা তাদের নীতিগত চিন্তা বা অবস্থান নয় তা সত্বেও ওর পক্ষে ভেক ধরে দাঁড়িয়ে যায়; যেমন, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার রাজনীতির পক্ষে যেন সে একটা সৈনিক এভাবে, দাঁড়িয়ে যায়। তবে, চাপাচাপিতে পড়লে জিজ্ঞাসার জবাবে তখন তাঁরা একাজকে তাঁদের  কৌশলগত অবস্থান নেয়া বলেও স্বীকার করে নেয়। এমন এসব কৌশলগত কারণে নেয়ার সময়-সুযোগে তাঁরা নাগরিক, কনষ্টিটিউশন, অধিকার এমনকি “গণতন্ত্র ধারণার” পক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁদের  ভেক ধরে  কথা বলার অবস্থান – সেটা তারা স্বীকার করে নেয়। এমনকি  একারণে, যে নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বলে মনে করে সেও আবার কনষ্টিটিউশন (প্রণয়ন বা রাষ্ট্রগঠন) নিয়ে বকোয়াজি বা বকাবাদ্য করে থাকে। যদিও কোঙ্কমিনিস্টের এমন আচরণ করা অর্থহীন, কোন মানে হয় না।  কারণ, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল মানে তো সে শ্রেণীর রাষ্ট্র এই বুঝের পক্ষের লোক;  মানে সে তো একই সাথে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষের লোক সে হতে পারে না। ঠিক যে কারণে, প্রাকটিসিং কমিউনিস্ট-ব্যারিস্টার বা কমিউনিস্ট এডভোকেট দেখা যায় না। দুটার একটা তাকে ব্যবহারিকভাবে ছেড়ে দিতেই হয়। যেমন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ব্যারিস্টার হয়ত কিন্তু নন-প্রাকটিসিং!  অনেকে অবশ্য ব্যাপারটা না বুঝে বা না উপলব্দি করে কার্যত একটা বাদ দিয়ে দেয়। কমিউনিজমে নাগরিকো নাই, নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের ধারণাও নাই; শ্রেণীর একনায়ক ক্ষমতার ধারণা আছে। অধিকারের ধারণাই যদি না থাকে তো কমিউনিস্ট আদালতে গিয়ে কী করবে??? এটা যে উপলব্দি করে তার আর আদালতে যাবার কোন কারণ থাকে না!   তবু অবশ্য এটা অনেকেই এভাবেই প্রগতিশীলও থেকে যেতে চায়, মনে মনে!  কিন্তু কেন অথবা অন্যভাবে বললে – কেন অধিকার, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ইত্যাদি এগুলো একটাও প্রগতিশীল চিন্তা ও রাজনীতিই নয় বলছি ও বারবার তুলে ধরছি?

    কারণটা অনেক লম্বা, একেবারে হিন্দুত্ববাদ পর্যন্ত! প্রগতিশীলতা [progressive] মানে যার গুরু হল কমিউনিজম; কমিউনিজমকে লিবারেল বা নরম করে হাজির করা ভার্সানই প্রগতিশীলতা। আর সবচেয়ে বড় কথা প্রগতিশীলতা মানে ধর্ম কোপানো যা মূলত ইসলাম কোপানো; এক চরম ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি চিন্তা – যা সে কমিউনিজম থেকে নিয়ে থাকে।  অনেকেই সেকারণে প্রগতিশীল অবস্থান সে কমিউনিজম থেকে নিয়েছে বা পেয়েছে দাবি করে ও সরাসরি এমন সাফাই-ই হাজির করে থাকে। আবার, প্রগতিশীলতার বড় ভাই কমিউনিজম বলেই তো প্রগতিশীলরা  নিজেকে কথিত ডানপন্থিদের [নিজেকে বামপন্থি মনে করলে কেউ সেই সাপেক্ষে অন্যকে বা নিজ বিরোধীদেরকে ডানপন্থি বলা সম্ভব]  চেয়ে উপরে নিজেকে এক অগ্রসর চিন্তা [শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামি] – প্রগ্রেসিভ চিন্তা বলে দাবি করে। এসব কারণে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চিন্তাই প্রগতিশীলদেরও রাষ্ট্রচিন্তা।  তাই প্রগতিশীলদের রাষ্ট্র চিন্তার স্বরূপও হল – এক গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক রাষ্ট্রচিন্তা। যা মূলত এক কমিউনিস্ট রাষ্ট্রচিন্তা।  আবার প্রগতিশীলতার ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি রূপ-বৈশিষ্ঠের কারণে এদের ঘাড়ে চড়েই – প্রগতিশীল সেজে হিন্দুত্ববাদ বাংলাদেশে প্রবেশ ও অবস্থান করতে থাকে।  প্রগতিশীলেরাও সেটা জেনে এবং কেউবা না-জেনে এমন প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। আর এমন হবার পিছনের কারণ, তারা হিন্দু আর হিন্দুত্ববাদ মাখায় ফেলে দুটাকে একই মনে করে। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশের হিন্দু মানেই যেন সে মুসলমানের হাতে ভিকটিম তা স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেয়! এখন প্রগতিশীলেরা আবার তাদের অনুমিত ভিকটিম হিন্দুর পক্ষে দাঁড়ানোটাই প্রগতিশীলতার প্রমাণ  দেখানোর সুযোগ মনে করে থাকে। তাতে, একাজটা হিন্দুত্ববাদকে ডেকে এনে জামাই আদরে আসন গেড়ে বসানো হলো কিনা অথবা হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি করা হলো কিনা সেসব দিকে এরা বেখবর থাকে! অথচ হিন্দুত্ববাদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এক বড় শত্রু! আর এসবের ফলেই প্রগতিশীলতা=হিন্দুত্ববাদ হয়ে দাড়িয়েছে!

    আপনার ধর্ম মেনে চলতে বা পালন করতে অনীহা আছে বা আগ্রহ নাই, এটা হতেই পারে। সেটা একান্তই আপনার আল্লাহ-ভগবানের সাথে আপনার বুঝাবুঝির বা শাস্তি ভোগ করা না করার বোধের মামলা। সেটা নিয়ে কী করবেন, আদৌও কিছু নাও করতে পারেন এমন ইত্যাদি সব একান্তই আপনার! কিন্তু সেজন্য এটা আপনাকে কোন ধর্মবিদ্বেষ বা  চরম ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি ততপরতা করার সার্টিফিকেট দেয় না, তা নয়ও বা হতে পারে না। ধর্ম চর্চা-পালন করতে না চাওয়া আর ধর্মবিদ্বেষ রাখা – এদুইটার মধ্যে আকাশপাতালের  ফারাক। আপনি যেকোন ধরণের ইসলামিজম বা কোন ইসলামি ব্যাখ্যায় রাজনীতি খাড়া করার বিরোধী হতেই পারেন। এমন রাজনীতি আপনার অপছন্দের তা হলেই পারে।  কিন্তু সেজন্য আপনাকে প্রগতিবাদী হতে হবে কেন? বা আপনাতেই আপনি প্রগতিবাদী হয়ে যাবেন না। এমন কোন সম্পর্কই নাই। তাই  বাইনারী [binary] বানাবেন না যে হয় ইসলামি রাজনীতির লোক আর না হলে তো আপনি প্রগতিবাদী! ব্যাপারটা এমন নয় তাই এমন বানাবেন না, ধরে নিবেন না। বাস্তবত এরা বাইনারি নয়,  কারণ এদুইয়ের বাইরে বহুকিছু আছে। আবার নিজ ইসলামবিদ্বেষ আড়াল করতে প্রগতিবাদী সাজা সেটাও একটা অপরাধ!  ইসলামি রাজনীতি না হলে প্রগতিবাদ এমন, দুইটারই বাইরে আপনার জন্য একটা ভাল নুন্যতম অবস্থান হতে পারে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষে দাঁড়ানো!  আর কেবল তখনই আপনার ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশ বা কথাবলার স্বাধীনতা ইত্যাদির দাবিতে শুধু শাহবাগে না শাপলা চত্তরে দাড়ানোটাই গভীর অর্থপুর্ণ হবে। 

     

    প্রগতিশীলতা=হিন্দুতাবাদ বানাবেন না। আবার  যেকোন ইসলামি রাজনীতির বিরোধিতায় প্রগতিশীলতা –  এভাবে (ইসলাম বনাম প্রগতিশীলতা) এদের বাইনারী বানাবেন না। মানে যেন, হয় ইসলামি রাজনীতি না হলে প্রগতিবাদ! কারণ এদুইয়ের বাইরে বহুকিছু আছে। আর নিজ ইসলামবিদ্বেষ আড়াল করতে প্রগতিবাদী সাজাও একটা অপরাধ!  তবে একটা ভাল নুন্যতম অবস্থান হতে পারে ইসলামবিদ্বেষ ও প্রগতিশীলতা দুটাই ত্যাগ করে বুঝে শুনে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষে দাঁড়ানো!  আর কেবল তখনই আপনার ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশ বা কথাবলার স্বাধীনতা ইত্যাদির দাবিতে শুধু শাহবাগে না শাপলা চত্তরে দাড়ানোটাও গভীর অর্থপুর্ণ হবে। 

     

    আবার পরিস্কার করে বলি, পাঠক আঙুলে গুণে গুণে বুঝে নেন। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রচিন্তা আর আধুনিক রিপাবলিক (প্রজাতান্ত্রিক) রাষ্ট্র এক নয়। এদুটা এক ধারণা তো নয়ই বরং আকাশ-পাতাল ফারাক, এদুই রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে। যেমন, এক. কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চিন্তায় কোন নাগরিক রাষ্ট্র ধারণা নাই তা বারবার বলছি বরং এর বদলে আছে শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা।  এক শ্রেণীতে বিভক্ত রাষ্ট্র ধারণা তাদের আছে। তা থাক তাতে অসুবিধা নাই। সমাজে শ্রেণীবিভাগ আছে বলে কেবল একটা কথিত শ্রমিক শ্রেণীই  সব রুস্তমি করবে অন্যকে ইচ্ছামত খুন-অপহরণ- আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব করতে পারবে আর এভাবে বাকি অন্য কোন শ্রেণী মানুষের কোন রাজনৈতিক অধিকার থাকবে না? এটা কী কোন রাজনৈতিক চিন্তা হতে পারে???   কিন্তু এর বিপরীতে রিপাবলিক (প্রজাতান্ত্রিক) রাষ্ট্র এর বেলায় যেখানে বাসিন্দা মাত্রই সবাই নাগরিক এবং সবাই বৈষম্যহীন “সমান অধিকারের নাগরিক” ধারণা আছে । শুধু তাই না, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সেই নাগরিক অধিকার রক্ষা করা এবং সকল নাগরিকের নিরাপত্তা দেয়া।

    তাহলে দাঁড়ালো, কমিউনিস্ট শ্রেণী-রাষ্ট্র এর কাজ হল কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের রাষ্ট্র হয়ে কেবল কথিত এই শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার্থে সব ততপরতাকে সেই-মুখি করা।  এখানে কথিত বললাম এজন্য যে এই শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ জিনিষটা কী? এত পবিত্র এবং যেন আন-টাজেবল মানে ধরাছুয়ার বাইরে – এই শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ মানে কী?  এর মানে আর কিছু না – একছত্র ক্ষমতাধর কমিউনিস্ট পার্টি ও এর অলঙ্ঘণীয় অপার ক্ষমতা! এর সাথে কোন শ্রমিকের কোন সম্পর্ক নাই, বুঝানোও হয় নাই। এটা হল কোন জবাবদিহিতা বা সব প্রশ্নের উর্ধে এক কোটারি ক্ষমতা যা আর বৈ অন্য কিছু না!
    আর এটা বলাই বাহুল্য যে  সাধারণভাবে,  শ্রেণী নির্বিশেষে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা – এমন ধারণা কমিউনিস্ট ডিকশনারীতেই নাই। বরং  প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কেবল ক্ষমতাসীন বা শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষের রাষ্ট্র তারা ঐ সমাজের বাকি সব শ্রেণী – এদের সবাইকে কোপ দিবে, এরা নির্মুল হবে ও নিপীড়িত হবে – এটা তারা প্রকাশ্যেই বলে থাকে; রাষ্ট্রকে এমন রূপ তারা দিতে চায়।  এককথায়, রাষ্ট্রে শ্রেণী নির্বিশেষে বাসিন্দাদের সকলের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা – এই ধারণাটাই কমিউনিস্ট চিন্তায় কোথাও নাই। একারণে, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে কোন ক্ষমতা হাজির হলে তাতে ক্ষমতাসীনেরা অপর সবশ্রেণীকে দমন করার এক একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাবেই তা তৈরি-হাজির হয়ে যায়। হবেই!
    আর এভাবে অপছন্দের অন্য সকল শ্রেণীর মানুষকে  দমন বা একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দেখানো আর কমিউনিস্টদের এর পক্ষে  সাফাই দেয়া – এসব কথার মানে কী?  এর সোজা মানে ও পরিণতি হল, কমিউনিস্ট- প্রগতিশীল রাষ্ট্রচিন্তা বা এর স্বরূপ হল এক গুম-খুন-অপহরণ- আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক রাষ্ট্রে পরিণতি পাওয়া!

    কমিউনিস্টদের শ্রমিকশ্রেণীর ক্ষমতার চোখে সামাজিক অপর শ্রেণী কারা তা কে সাব্যস্ত করেঃ
    কথা আরো আছে। কমিউনিস্টদের শ্রমিকশ্রেণীর ক্ষমতার চোখে সামাজিক অপর শ্রেণী বলতে তারা প্রধানত বা সাধারণভাবে এদেরকে ‘বুর্জোয়া শ্রেণী’ – তারা বলে থাকে। এখন কেউ বুর্জোয়া শ্রেণী কীনা এটা কে সাব্যস্ত করবে????
    কোন আইন-আদালত বিচার বিভাগ এমন কী কেউ? না, একেবারেই না।
    এই সিদ্ধান্ত নিবে পার্টি; মানে, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পার্টি। মানে পার্টির সর্বোচ্চ স্তর পলিটবুরো – এই কমিটি।
    তাহলে এতে কী দাঁড়ালো? দাঁড়ালো যে রাষ্ট্রের কোন বিচার বিভাগ নয়, কোন বিচার প্রক্রিয়াও নয়; ক্ষমতাসীন শাসক (মানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পার্টি) সিদ্ধান্ত নিলেই প্রগতিশীল রাষ্ট্র গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব করতে পারবে!!!! সব জায়েজ!

    তামাসার কথা হল, রাজা-বাদশার আমলেও মানে রাজতন্ত্রেও ক্ষমতাসীন শাসক কাউকে নিজে শাস্তি দেয় না। এমন নিয়ম বা চর্চা সেখানের নয়। তাই কোন ফাঁসির দন্ড মানে সেখানে বিচার করে সেই শাস্তির রায় ঘোষণা করে থাকে বিচার বিভাগের বিচারক বা কাজী!

    তাহলে রিপাবলিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে তাহলে কথাগুলোর মানে কী দাঁড়ালো?
    ১। কোন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে সামগ্রিক যে ক্ষমতা তা কয়েকটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান খাড়া করে তাদের মধ্যে ভাগ করে রাখা থাকে।
    ২। এর মধ্যে প্রধান ক্ষমতা যেটা সেটা আমরা চলতি কথায় বলি ক্ষমতাসীন শাসক-ক্ষমতা।  (মানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পার্টি, তাদের ভাষায় যেটা শাসক শ্রেণী) । এখন বই বা তত্বের ভাষায় আমরা এটাকে বলি রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চ। যেকারণে, কোন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি বলতে আমাদের বুঝতে হবে এটা নির্বাহী ক্ষমতা।

    এই নির্বাহী ক্ষমতা জিনিষটা কী?
    আগে বলেছি রাষ্ট্রের সামগ্রিক ক্ষমতাটা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করে রাখা থাকে। যেমন,  পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ, সরকার (নির্বাহী) ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নানা বিভাগের হাতে।  যাদের মধ্যে আবার ক্ষমতাটা ভাগ করে রাখা থাকলেও একটা ব্যাপারে কোন ভাগাভাগি নাই। সেটা হল, ক্ষমতা এদের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতেই নানা রূপ বা ধরণে আছে ও থাকে। কিন্তু ক্ষমতার প্রয়োগ এর ক্ষমতা আছে কেবল সরকার বা নির্বাহী বিভাগের হাতে। এজন্য এটা নির্বাহী ক্ষমতা বা প্রয়োগযোগ্য ক্ষমতার রূপ! এজন্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী (বা প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার হলে রাষ্ট্রপতি ) বলতে আমাদের বুঝতে হবে এটা নির্বাহী ক্ষমতা। তাঁর হাতেই একমাত্র ক্ষমতার প্রয়োগ এর ক্ষমতাটা রাখা থাকে। এখানেই ক্ষমতার প্রয়োগ মানে ক্ষমতার বাস্তবায়ন, ইংরাজিতে এক্সিকিউশন [execution]। আর সেখান থেকেই এটা এক্সিকিউটিভ পাওয়ার বা নির্বাহী ক্ষমতা – এমন নাম। মনে রাখতে হতে ক্ষমতার প্রয়োগ এর ক্ষমতাটা কেবল এই নির্বাহী বিভাগের হাতে  রাখা হয়েছে জেনেশুনেই। না হলে রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে সেটা আর একটা থাকবে না; সব বিভাগে ভাগ হয়ে যাবে যার মানে হবে রাষ্ট্র ততগুলো টুকরা হয়ে যাবে!

    তাহলে এখন সোজা প্রশ্নঃ  প্রধানমন্ত্রী কী বিচার বিভাগ দেখে, মানে তাঁর হুকুম-নির্দেশে বিচার চলে? না, অবশ্যই না। কিন্তু বিচারক কোন শাস্তির রায় দিয়েই তার কাজ-দায়িত্ব শেষ করে থাকে। এরপরে ঐ রায়ের বাস্তবায়ন এর দায়ীত্ব প্রধানমন্ত্রীর। মানে তার নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের; যা এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ডিআইজি(প্রিজন) আর তা থেকে জেলার এভাবে তা বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। এককথায়, শাস্তির বাস্তবায়ন বিচার বিভাগের দায়ীত্ব নয়। এটা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব।
    আবার পার্লামেন্ট বা এর সদস্যরা ( এখানে আগে থেকেই গঠিত ও লেখা হয়ে থাকা এক কনষ্টিটিউশন আছে, ধরে নিয়েছি) কনষ্টিটিউশনের সীমার মধ্যে নয়া সব আইন তৈরি করে থাকে – এটাই পার্লামেন্টের আইন বানানো বা প্রনয়নের ক্ষমতা – এবং এটাও রাষ্ট্র-ক্ষমতার আরেক রূপ, অবশ্যই। কিন্তু আইন প্রনয়নের পরে এর প্রয়োগ-এক্সিকিউশন? না এই ক্ষমতা প্রয়োগের-ক্ষমতা সংসদের হাতে নাই, রাখা হয় নাই। যেমন সংসদের তৈরি কোন আইন তৈরি হয়ে যাবার পরে কোন নাগরিক তা ভঙ্গ করলে তো সে অপরাধী। কিন্তু সংসদ তাকে ধরে আনবে না বা এরপরে বিচারও করবে না। সেসব ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর, মানে একমাত্র নির্বাহী বিভাগের অধীনের কোন মন্ত্রণালয়ের – আলোচ্য ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের!  এই হল নির্বাহী-এক্সিকিউটিভ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্টগত দিক!
    দুঃখের কথা হল, ককিউনিস্ট চিন্তা বা এর সাগরেদ প্রগতিশীল চিন্তায় ক্ষমতার এসব ভাগাভাগির ধারণাই নাই। শুধু তাই না, এমন ভাগাভাগিকেই ভুয়া মনে করা হয়। এর বদলে তাদের শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি মানে, ক্ষমতাসীন পার্টিই সব কিছু! কিসের আবার বিচার বিভাগ বা বিচার আচার?   পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওমুকে বুর্জোয়া তো সে বুর্জোয়া (যেমন যুদ্ধাপরাধী?) । এখন পার্টি বলে দিয়েছে তাই, তাকে ফাঁসি দিয়ে দেও।  কিংবা  গুম-খুন-অপহরণ-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি যা খুশি লাগে করে ফেলাও!! শ্রেণির রাষ্ট্রে সব জায়েজ! কোন বিচার লাগবে না!

    তবুও মূলকথাটা যেন ভুলে না যাই বা না হারিয়ে যায় যে, নির্বাহী ক্ষমতাকে থেকে বিচার বিভাগ আলাদা রাখতেই হবে – এই ইস্যুটা। মানে হল প্রধানমন্ত্রীর গোপন বা প্রকাশ্যে ইঙ্গিত বা নির্দেশে যেন কোন বিচার ও রায় না হয়। এই সেপারেশন অব পাওয়ার –  এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য এক মুখ্য বৈশিষ্ট; বিশেষ করে যখন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রকে বুঝতে যাব। কারণ কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের কাছে বিচার বিভাগ বলেই কার্যকর তেমন কিছু নাই, রাখা হয় নাই। মানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তার শ্রেণীর রাষ্ট্রের কাছে এর বালাই-ই নাই। পার্টিই নির্বাহী ক্ষমতা আর পার্টিই বিচার বিভাগ – তাই একাই সে সব মানে, বিচারও শেষ করে দিয়েছে মনে করা হয়। মানে রায় ও সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়। যেটা পার্টির সিদ্ধান্ত সেটাই রায় – এই হল এর মূল জায়গাটা। কেবল একালের চীনে কিছু পেটি ইস্যু আদালত-বিচারকের হাতে ছেড়ে দেয়া শুরু হয়েছে। যেমন শহর ও আবাসিক এলাকায় পরিবেশ দুষণ (কয়লা বিদ্যুৎ বা এমন কিছু) ইস্যু। এসব ক্ষেত্রে আদালত অভিযোগ শুনে রায় নিতে পারবে, পার্টির নির্দেশের সীমার মধ্যে থেকে। যেটা আগে পার্টিই সিদ্ধান্ত দিয়ে সমাধান করত। কিন্তু সেই চীনেই আবার একালেও আমরা দেখছি কেউ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিংবা চীনা আন্তর্জাতিক বড় ব্যবসায়ী জ্যাক মা হলেও রক্ষা নাই!  কমিউনিস্ট ক্ষমতাসীন শ্রেণী আপনাকে একালেও কোন আয়নাঘরে আটকে রেখেই চলেছে! কোন বিকার নাই, পরিবর্তন নাই!  কেবল পার্টি যেভাবে চায় তেমন এক স্বীকারোক্তি দিলে সম্ভবত এরপর ছেড়ে দিবে! তাই আয়নাঘরে রেখেছে। না হলে তো খুন করে রেখে দিতে পারত!! এভাবে বুঝতে হবে!  আর এই আত্ম-স্বীকারোক্তি দেয়া যে আমি নিজেই অপরাধী – এটা সেই ১৯২৪-৩৩ সালের মধ্যে স্টালিনের হাতে তিনি ছাড়া বাকি সব পলিটবুরোর সদস্যদের হত্যা করার সময় থেকে এই একই রেওয়াজ চলে আসছে।  যার সোজা অর্থ কোন ধরণের বিচার প্রক্রিয়ায় [legal process] মানে আইন ও সেই আইনের ভিত্তিতে অভিযোগ এনে বিচার – এসবের উপর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের কখন আস্থা ছিল না, নাই। সেজন্যই এমন প্রতিষ্ঠান গড়তে তারা কখনও যায় নাই। তাদের শ্রেণীবোধ এর উপর আস্থা রাখে না!  অতএব আয়নাঘর – গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির উপর ভরসা!!!

    এবার সারাংশে বলিঃ কমিউনিস্ট চিন্তায়, রাষ্ট্রে শ্রেণী নির্বিশেষে বাসিন্দাদের সকলের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা – এই রাজনৈতিক অধিকার এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের রাজনৈতিক অধিকার এসব ধারণাই কমিউনিস্ট চিন্তায় কোথাও নাই। তথাকথিত শ্রেণীর রাষ্ট্র বুঝ আর  এই বুঝ দিয়ে এটাকে মাখায় ফেলা শুধু না শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের রাজনৈতিক অধিকার ধারনা এটা কমিউনিস্টদের মাথার উপর দিয়ে গেছে; ভিতরে ঢুকে নাই।  অথচ তারাও একটা রাষ্ট্র ধারণা করতে গেছে তাদের দরকারে!!  এখানে বলে রাখা যেতে পারে যে এর সমাধান হত এভাবে যে, পার্টির শ্রেণীবুঝ আছে থাক তা দিয়ে যে ক্ষমতাকেও বুঝুক অসুবিধা নাই।  ক্ষমতা শ্রেণীবুঝ দিয়েই বুঝা হোক কোন অসুবিধা নাই। এই ক্ষমতার অধীনেই সকল নাগরিকের মানে সকল শ্রেণীর মানুষের নুন্যতম কিছু রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা আর তাদের নিরাপত্তা সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিতে অসুবিধা কী? মানে রাজনৈতিক অধিকার (আবার এটাকে অন্য-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান বলে বুঝ দিয়ে মানুষকে কেবল বৈষয়িক মানুষ কল্পনা করার দরকার নাই। ) কারণ, আমি রাজনৈতিক মানুষের কথা বলছি!  এটা হলে কী পার্টির ক্ষমতা নাগরিকেরা কেড়ে নিত? তাহলে এখনও নিতে পারত!! এই হল শ্রেণীবোধের বুঝের সাথে রাজনৈতিক অধিকার – এই রাজনৈতিকতা [polity] এর ধারণাটাকে ধরতে পারে নাই।  মাখায় ফেলা হয়েছে!  

    এটা সত্যি  যে রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব থেকে মানে, আগে সোভিয়েত গড়ে – পরে তা দিয়ে ক্ষমতা দখল সম্পন্ন করে তোলা অবশ্যই এক আলাদা ধরণের রাষ্ট্রের ব্যবহারিক ধারণা এটা। কিন্তু এটা প্রশংসা করতে গিয়ে যেন এটা এক নয়া কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সেজন্য এর ভিতরের শ্রেণী নির্বিশেষে নাগরিক বা বাসিন্দা  সকলের রাজনৈতিক অধিকার আর লাগবে না – এমন একটা ভুল অনুমান তারা করেছিল, যাদের মধ্যে খোদ লেনিনও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আরেকটা চিহ্ন আছে যে লেনিনকেও রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ধারণা যথেষ্ট কামড় বা বিব্রত করেছিল – তাঁর মনে খচখচ প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল – সেটা অনুমান করা যায়!  মানে সোভিয়েত গড়া যে “রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ধারণার” কর্তব্য-কাজের  কোন বিকল্প  হাসিল করা ফেলা নয় – তা লেনিনও সম্ভবত মানতেন; এর প্রমাণ আছে।

    বিপ্লবটা রাশিয়াতে হলেও পরে, পুরানা পরাজিত জার সাম্রাজ্যের পুরা কলোনি ভূখন্ডগুলোকে রাশিয়ার সাথে জুড়ে নিয়ে লেনিন-স্টালিন ১৯২২ সালে  যে সোভিয়েত ইউনিয়ন বানিয়েছিলেন ওর ফরমাল নামের দিক লক্ষ্য করা যাক। ওর পুরা নাম বা আনুষ্ঠানিক নাম ইউনাইটেড সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিক [USSR]। এই নামের মধ্যে ইংরাজি ‘R’ এটাই রিপাবলিক শব্দের প্রতীক। এর মানে লেনিন সাহেব রিপাবলিক শব্দটা ত্যাগ করা সহি মনে করতে পারেন নাই, তাই সাথে রেখেছিলেন। কিন্তু রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার মুলকথা তো পাবলিক বা জনগণ ধারণা। মানে  শ্রেণী নির্বিশেষে নাগরিক বা বাসিন্দা  সকলের রাজনৈতিক অধিকার এই ধারণা!!  কিন্তু  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার এই বাকী পর্যায়টা মানে ততদুর আর লেনিন আমল করতে পারেন নাই বা  করতে চান নাই ও করেনও নাই। উলটা শ্রেণীর রাষ্ট্র বুঝের ধারণা দিয়ে সব মাখায় ফেলেছেন, শ্রেণী নির্বিশেষে নাগরিক বা বাসিন্দা সকলেরই রাজনৈতিক অধিকার এই ধারণা তিনি আমল উপলব্দি করতে একেবারেই ফেল করেছেন। এর উপর শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র ধারণার পক্ষে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় ব্লান্ডার করেছেন! যেটা আজ পরিস্কার!  অথচ এটাই তো গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর এর রাষ্ট্র ধারণা!   এটাই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চিন্তার আদি ক্ষত-খামতি আর অযোগ্যতা হয়ে থেকে গেছে।

    আর একারণের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তায় ভর করা যে কোন রাষ্ট্র মাত্রই তা এক গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক আখড়ায়, এক ফ্যাসিজমে পরিণত হয়েছে।  

    এককথায় বললে, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তায় ভর করা যে কোন রাষ্ট্র মাত্রই তা এক গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক আখড়া, এই ফ্যাসিজমে পরিণত হয়েছে।

    এবার বাংলাদেশের গত ১৫ বছর হাসিনার ক্ষমতার সাফাই বয়ানটা কী ও কে দিয়েছিলঃ
    ক্ষমতা বা রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে আমরা ফিজিক্যাল ক্ষমতা বা গায়ের জোর ধরণের বলপ্রয়োগ যেটা সেটাকেই বুঝি। নিঃসন্দেহে এটাই ক্ষমতা যা দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হল, ক্ষমতায় থিতু হতে চাইলে এটা কী যথেষ্ট?
    এক শব্দে জবাব হল না, এটা যথেষ্ট নয়। আরও কিছু লাগবে। আর সেটা হল, দখল নেয়া এই ক্ষমতার স্বপক্ষে একটা শক্ত বয়ান মানে এই ক্ষমতার পক্ষে একটা জাস্টিফিকেশন  ও ন্যায্যতাও তুলে এর সাথে হাজির করতেই হবে। আর সেটাও আরেক ক্ষমতা অবশ্যই; যদিও তা ফিজিক্যাল নয়। এটাকে আমরা বলতে পারি, ক্ষমতার সাফাই বয়ান এর ক্ষমতার দিক। এই সাফাই বয়ান আর ফিজিক্যাল – ক্ষমতা – এমন এই দুইটা ক্ষমতাকেই হাজির থাকতে হবে তবেই সেটা এক থিতু ক্ষমতা হবে। নইলে না! কী হবে তাহলে?
    শুধু ফিজিক্যাল ক্ষমতা আছে যে ক্ষমতার সেটা ক্রমশ ফেল করে যাবে, পরাজিত ও ক্ষমতাচ্যুত হবে। এজন্য ক্ষমতার সাফাই বয়ান এর দিকটাকেই ফিজিক্যাল ক্ষমতার সমান গুরুত্বপুর্ণ মানা হয়।
    আ তা না হয় বুঝা গেল। কিন্তু হাসিনার গত ১৫ বছরের ক্ষমতার প্রসঙ্গে ক্ষমতার সাফাই বয়ান সেটা কী ছিল আর তা কে দিয়েছিল?

    গত ২০০৮ সাল জুন ১১ থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে আর সেই বাংলাদেশের প্রকাশ্য দেখা যাওয়া বাইরের অর্থে ক্ষমতাটা দেয়া হচ্ছে হাসিনাকে। এই দিনই সেকালের তত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাহী ক্ষমতায় (মানে আদালত থেকে জামিনে নয়) হাসিনা প্যারোলে মুক্তি নিয়ে তিনি আমেরিকা সফরে যান; অলিখিত উদ্দেশ্য স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে আগামি ক্ষমতা-করণীয় এর বোঝাপড়া ফাইনাল করা। এই বিচারে ২০০৯ সালে হাসিনার ক্ষমতারোহণ এটাই ছিল ক্ষমতার ফিজিক্যাল দিকটা, বলতে পারি।

    তাহলে বয়ানট কী আর তা কে দিয়েছিল?
    এই বয়ান সরবরাহ করেছিল কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল মুখগুলো। কী সেটা?
    যেমন, “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি” এই ধারণাটা হাজির করা। – এটা আসলে কী?
    ” এটাই আসলে কমিউনিস্টদের শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা দিয়ে হাসিনার ক্ষমতার পক্ষে সাফাই বয়ান তৈরি করে সরবরাহ করার প্রগতিশীলতা! কীভাবে?
    কমিউনিস্ট রাষ্ট্রচিন্তায় শ্রমিক শ্রেণীই ক্ষমতাসীন থাকে আর বাকি সব শ্রেণীর উপর সে যেকোন আধিপত্যসহ যথেচ্ছাচা্ররে দমন করে দাবিয়ে রাখে – আর একাজের জন্য কমিউনিস্ট ক্ষমতাসীনেরা গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব কিছু করার এক শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা হাজির ও চর্চা করে থাকে! এমনকি একালের চীনকে দেখেন তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী জ্যাক মা যেই হন, রাষ্ট্র আপনাকে আয়নাঘরে রাখতেই পারে! কোন সমস্যা নাই।  তবে ২০০৯ সালের বাংলাদেশে, এখানে কমিউনিস্টদের সাফাইটা হল, যে শ্রেণী ক্ষমতায় থাকে সে অপর সকল শ্রেণির সাথেই এমন  নিপীড়নমূলক ট্রিটমেন্ট বা নিপীড়ন করতেই পারে – এই দাবি। কারণ, এটা নাকি ক্ষমতাসীনের একক ইচ্ছা যা সে যেকারও সাথে করতে পারে। পার্টির ইচ্ছাই চুড়ান্ত, কোন বিচার প্রক্রিয়ার কথা ভুলে যান।
    কিন্তু  বাংলাদেশে ক্ষেত্রে একই ব্যাখ্যা প্রয়োগ করতে গেলে তা কিভাবে করা যাবে? কারণ,  হাসিনা তো নিজেকেও শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা বলে দাবি করে না?

    এখানেই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার কারিশমা! এজন্য তারা এই নয়া শব্দগুচ্ছ হাজির করে রেখেছে – “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি বা “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শ্রেণীশক্তি” – বলে। যেটা কমিউনিস্টদের শ্রমিক শ্রেণী শব্দগুলো বদলে সেই জায়গায় বসিয়ে দিবে, হাসিনার ক্ষমতার স্বপক্ষে সাফাই তৈরি করতে।   বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের সরবরাহ করা সেই গুছানো বয়ানটা ভেঙ্গে বললে তা হল,  ২০০৯ সাল থেকে বিজয়ী হাসিনা সরকার এরাই তো ১৯৭১ সালের বিজয়ী শক্তি সেই আওয়ামি লীগ মানে ২০০৯ সাল থেকে বিজয়ী হাসিনা সরকারই হল “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শ্রেণীর” ক্ষমতাসীন সরকার। কাজেই এই শ্রেণী তো তার বিরোধী সকল রাজনীতিক ব্যক্তি ও দলকে তাদের সকলকে – রাজনৈতিক অধিকার শুণ্য- করে রাখবে।  এদের উপর  গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব জায়েজ করবে! এসব গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি – এটাই তো (প্রগতিশীল)ফ্যাসিজম হয়ে হাজির হবে!!! 

    ঠিক একইভাবে আরেক শব্দ ও বয়ান হল “চেতনা” বা “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” – একটা পবিত্র ভাব ধরে এই শব্দগুচ্ছও অনেক বেশি করে গত ১৫ বছর শোনা গেছে। শাহবাগ আন্দোলন এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার – এই দাবিরই পিছনের কাহিনী!  কিন্তু কেন যুদ্ধাপরাধ? কারণ,  প্রগতিশীলতার সাফাই বয়ান হল, ১৯৭১ সালের শত্রু মানে “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির” বিরুদ্ধ শক্তি তো এরাই। আর একালে যা আমেরিকার কাছে ওয়ার অন টেরর তাই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির কাছে যারা যুদ্ধাপরাধী শক্তি – মানে এই শক্তিকে কোপাও মানে ইসলাম-মুসলমান কোপাও, ইসলামবিদ্বেষে ছেয়ে ফেলো! আর শুধু বিএনপি না বলে “জামাত-বিএনপি” এভাবে বলো!  আর সবার আগে জঙ্গীবাদ শব্দ লাগিয়ে দেও!  আর এতে বাস্তবত কী হবে? বাস্তবতা হবে যে,   হাসিনার  যেকোন (সংসদীয় বা তারা লিগাল দল হলেও) রাজনৈতিকবিরোধী যে রাজনৈতিক অধিকার চাইবে অথবা– এই দাবি করে কোন কথা বলবে তাকেই সরকার  জঙ্গীত্ব কাজ বলে চিহ্নিত করবে; বা জঙ্গি সাজিয়ে গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব কিছুই করতে পারবে।  – কারণ প্রগতিশীলতার শ্রেণীবোধের রাষ্ট্রে এসব জায়েজ! শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘অপর’ শ্রেণী বলে যে কাউকে হত্যা করা জায়েজ! এর বিচারেরও দরকার নাই!

    শুরুর দিকে এসব বয়ান সবচেয়ে বেশি করে এনেছিল প্রায় সকল কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা বিশেষ করে সিপিবি। মানে মঞ্জুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম [সরকারী দল ও বিরোধী দল উভয়ই মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের শক্তি হবে।], এমএম আকাশ (মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারীরা নিরাপদ নন)  আবেদ খান (আবেদ খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আজ অটুট ও ঐক্যবদ্ধ আছে। ) ইত্যাদি এসব নাম। এখনও এর আরও প্রমাণ পাওয়া যাবে  গুগল সার্চে  মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি ও তাদের একেকজনের নাম দিয়ে খুজলে…। এমনকি দেখলাম গতকালকের বর্তমান রাষ্ট্রপতি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি যেন ক্ষমতায় না আসে: রাষ্ট্রপতি। আর সুলতানা কামাল এই ১২ সেপ্টেম্বরেই বলেছেন যে, “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি দাবি করলে তার পরীক্ষা দিতে হবে : সুলতানা কামাল” ।
    এমনকি  এখনও হাসিনা সরকারকে প্রগতিশীলদের দেয়া সেই জঙ্গীবাদের সাফাই বয়ানই চলছে; যদিও তা অনেক ঢিলা হয়ে গেছে আর এর উপর এখন আমেরিকান নানান স্যাংশন নিষেধাজ্ঞা এসে গেছে…।

    একটা মজার অবজারভেশনঃ
     তবে একটা মজার অবজারভেশন হল, হাসিনার ক্ষমতার প্রথম পাঁচবছর এমন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার সাফাই বয়ান দিয়েই আরামে চলেছিল। আর তা খুবই প্রভাব নিয়ে সরব ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচন ও এর হাল ও প্রক্রিয়া দেখার পর এক বিরাট সংখ্যক কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পিছনে সরে যায়।  যদিও এদের মধ্যে যেসব নেতা  যারা তখন নতুন করে মন্ত্রী হবার ডাক পেয়েছিল কাকাবাবুর [প্রণব মুখার্জি তখন আবার রাষ্ট্রপতি] প্ররোচনা-উদ্যোগে, সেসব বাম-প্রগতিশীলেরা তখন আরো বেশি করে হাসিনার ক্ষমতার সাথে  সামিল হয়ে আরো বেশি করে জঙ্গিবাদ-বিরুদ্ধ বয়ান আউড়ানো শুরু করেছিল।  এদিকে ২০১৮ সালের পরে দেখা গেল সমর্থনে আরো বেশি করে ভাটা পড়েছে। যারা বাম-প্রগতিশীল বলে দলীয় সাইনবোর্ডে ছিল তারা একেবারেই দল-সহই গায়েব বা দূরে চলে গেছিল। যেন হাসিনা সরকারের তারা আর কেউ লাগে না। যদিও তাদের ব্যক্তি অবস্থান আগের মতই থেকে গেছিল। কিন্তু এবার ২০২৩ সালে এসে এরা একেবারেই উল্টা!  সেটা, কে কবে কত আগে শাহবাগ ছেড়েছেন তা বলার প্রতিযোগিতা যেন!!! আবার ওদিকে আরেক রূপ – বুঝা যাচ্ছে তারা অনুমান করছেন হাসিনার দিন শেষ। অতএব সমাজকে কথিত প্রগতিশীল আবহে রাখতে তাহলে বিএনপিকেই প্রগতিশীল করা্র উদ্যোগ নিয়েছে তারা; অন্তত যতটা পারা যায়!

    প্রগতিশীলরা নিকট আগামিতে কোন দিকে যাবেঃ
    ঘটনা হল প্রগতিশীলরা কিন্তু কষ্ট কম করে না, তাদেরও সব সামাজিক রাজনৈতিক ততপরতা সহজও নয়! তাতে তাদের রাজনীতির ধারালো হওয়া সেটা  যতই ভাল-খারাপ যাই হোক!  সমস্যা তাদের একটাই আর তা গোড়ার সমস্যা যে এরা নিজ রাজনৈতিক চিন্তা-অবস্থানের রিভিউ [review]  করা – ঢেলে সাজানো এর দরকার মনে করে না বা ব্যাপারটা বুঝেই না। বেখেয়াল! তবে সেটা করার মুরোদের সমস্যা আছে সত্য কিন্তু সবটা তা নয়! আগ্রহ আর উদ্যোগ থাকলে মুরোদ বা চিন্তার ক্ষমতা – সেটার পথ তারা পেয়ে যেতেন বা বের করতেন!  এমনকি এখনও যদি তারা অন্তত সন্দেহ শুরু করতেন যে প্রগতিবাদ বলে যেটাকে ধ্যানজ্ঞান করে জেনেছেন. এটা আসলে খাটো মানে অগ্রগামি নয়, আর  আধুনিক তো নয়ই! তাই এনলাইটেনমেন্ট বা মডান রিপাবলিক ইত্যাদি এসবের কোনটাই নয়। অথচ এরা তো সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নিজেদের মর্ডান বলেই দাবি করেন, আধুনিকতা মানে নিজেরা আধুনিক সাহিত্য  করে বলে মনে করেন, আর এটা নিজেদের  অবস্থান বলে জানান দিয়ে থাকেন! তাহলে?

    কিন্তু মর্ডানিটি ফেলে “প্রগতিশীল সাহিত্য” সে তো একটা ফেটিস [fetish], অর্থহীনতা ! এসব নিয়ে সক্রিয় থাকলেও তা এতদিনে টের পেতে পেলেন না! তবে একটা কথা; তারা মনে রাখতে পারেন চলতি শতক – এটা একেবারেই এক নয়া শতক। ইতোমধ্যে পরিচিত গত শতকের মেজর সবকিছুই ঢেলে সাজানো শুরু হয়ে গেছে আমরা তা চাই বা না চাই – সেটা গ্লোবাল রাজনীতি বা গ্লোবাল অর্থনীতি সহ সব জগতে। গত শতক থেকে যারাই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা কে আঁকড়ে ধরে ছিলেন আছেন সেটা এই ভেবে যে তারা নাকি সবচেয়ে অগ্রসর প্রগতির চিন্তার সাথেই আছেন –  এবার সবার আগে এরাই অস্তিত্বের সংকটে পড়বেন। এব্যাপারে সবার আগে নিজের পিছিয়ে পড়া, অন্ধকারে হাতড়ানো আবিস্কার করবেন যারা এরাই একেবারে অপ্রস্তুত ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্সিয়া, একদেমিক জগতের লোকেরা!   সোভিয়েত পতন, ওয়ার অন টেরর, ওয়ার অন টেররের বয়ানের পতন – ইসলাম ফেনোমেনা – এমনকি অন্তত অর্থনৈতিকভাবে চীনের উত্থান (এমন চীন যার রাজনৈতিক চোখ নাই) আর ততধিক আমেরিকার অর্থনৈতিকভাবে পতন ইত্যাদি মিলিয়ে  যে নয়া শতক জাহির হতে শুরু করেছে এই  নয়া পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও দিতে পারতে হবে। এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ!  কারণ, সেকাজের জন্য এবার উপযুক্ত চিন্তা ও এর নয়া টুলস ও যোগ্যতা লাগবে।  তবে এসব বৃহত্তর দিক এখানেই থাক, আপাতত আর যাব না! বাংলাদেশের দিকে ফিরে আসি।

    প্রগতিশীলতা আবার নিজেকে গুছাতে শুরু করেছে, যদিও চিন্তা-অবস্থান তাদের পুরানাটাই! তাই, তারা কী আবার নয়া (মানে কোন পোস্ট-হাসিনা) শাসকের বেলাতেও এসব গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির সাফাই সরবরাহ করার ভুমিকায়  আবার নেমে পড়বেন ????? এভাবে (প্রগতিশীল) ফ্যাসিজমকে আর কত দুর টেনে নিয়ে যাবেন? পোস্ট হাসিনা যুগেও মত এবারও কী নতুন করে আরো ১৫ বছরের জন্য প্রগতিশীলতার সাফাই নিয়ে নয়া সরকারের পক্ষেও  গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির রাষ্ট্র হয়ে উঠতে সহায়তা নিয়ে হাজির হবেন????     

    [একটা আবেদনঃ এই লেখা ব্যক্তি হিশাবে কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়। আমি যা বলতে চেয়েছি তা মেনে নিবার কোন প্রয়োজনই নাই। কেবল ঠিকঠাক বুঝলে নিলেই আমি কৃতজ্ঞ হব! এসব প্রসঙ্গ হাজির করার একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে যে নয়া প্রসঙ্গগুলোকে আলাপ-আলোচনায় নিয়ে তোলা।]

     

     

    আপডেটঃ   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩; সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৬
    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০১ অক্টোবর ২০২৩, সকাল ১১ঃ ১৫

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    কানাডায় ‘র’-এর খুনঃ
    মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    গৌতম দাস
    ২৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৯
    https://wp.me/p1sCvy-52J

     

            …Canada row wake-up call on rival India

    কানাডায় নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাসকারি এক শিখ নেতাকে খুন করতে মোদির ভারত রাষ্ট্রের এক অন্তর্ঘাতমুলক খুনাখুনির প্রতিষ্ঠান ‘র’ [RAW] কানাডায় গিয়ে একাজ করে এসেছে। কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ, যিনি নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে মিথ্যা ‘তিনি যেন কূটনীতিক’ এই ছুপা পরিচয় নিয়ে কানাডায় ছিলেন। তিনি এই খুনের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে ইন্টেলিজেন্স তথ্য থেকে ধারণা করা  ও অভিযোগ উঠেছে। তাই তাকে, কানাডা সরকার ‘বহিস্কার’ [‘অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি ঘোষণা’ বা persona non grata] করে দিয়েছে।
    এই ঘটনা নিয়ে খোদ  আমেরিকা থেকেই বহু মিডিয়া রিপোর্ট  প্রকাশিত হয়েই চলেছে। এখনও আসছে। বিশেষ করে শুরুর দিকে রয়টার্সের খবরগুলো আর পরে  নিউ ইর্য়ক টাইমসে এই রিপোর্টটা সারা ফেলেছে। এতে প্রকাশিত ভাষ্য থেকে এর স্টোরির সারাংশটা এরকম যে, আমেরিকা প্রতিদিনই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অসংখ্য বিদেশি দুব্যক্তির কথোপকথনের মধ্যে বা-হাত-ঢুকিয়ে [intercept]  তা শুনে থাকে। কিন্তু এত তথ্যের ভিড়ে এক কথোপকথন (যেটার এক প্রান্তে ছিলেন এখন বহিস্কৃত কানাডায় কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ বলে অনুমান করা হচ্ছে) আমেরিকার হাতে এসে যায়। সেই তথ্যসহ আরো অনেক কিছুই আমেরিকা কানাডা সরকারের সাথে শেয়ার করেছিল। এমনিতেই সাধারণভাবে এদুই রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অনেক কিছুই তারা শেয়ার করে, পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে, যেন একই রাষ্ট্র এর দুই অংশ তারা।
    খুনের ঘটনাটায় ভুক্তভোগীর নাম [Hardeep Singh Nijjar] হরদীপ সিং নির্জ্জার,  যিনি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন এক শিখ রাষ্ট্র কায়েমের  – মানে খালিস্তান আন্দোলনের কর্মী; এই অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের রাজনীতির অনুসারী।
    অনেকের ধারণা হতে পারে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মানেই তা টেররিজম বা একালে জঙ্গীবাদের ক্যাটাগরিতে ফেলে একে নিন্দা করা যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আপনি যদি দাবি তুলেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য আমি রেফারেন্ডাম চাই – আর এটাই আমার দাবী সেক্ষেত্রে নেতিভাবে দেখিয়ে কোন শাসকেরই এথেকে  সুবিধা খাবার সুযোগ থাকে না। কানাডায় বসে শিখ কমিউনিটি এভাবে তাদের দাবি পরিচালিত করছে। যা সম্পুর্ণ আইনিভাবেও বৈধ আন্দোলন!
    হরদীপ সিং তিনি কানাডায় খুন হন চলতি বছরের গত জুন মাসে। এরপর পরেই ব্যাপারটা ভারত-কানাডার মধ্যে সরকারি পর্যায়েই আলোচনা হয়েছিল, তবে তা মিডিয়া থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি সদ্য সমাপ্ত গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত জি২০ এর সম্মেলন চলার কালেই কূটনৈতিক চক্রে কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রের মধ্যে একসাথে এবং সাথে মোদিকে নিয়েও কিন্তু গোপনে আলোচনাও হয়েছিল। (যেটা এখন জানা যাচ্ছে এমন সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তা মিডিয়ায় স্বীকার করছে)। বিশেষ করে ইন্টেলিজেন্স তথ্য শেয়ার করার  আরেক অপ্রকাশ্য গ্রুপ ‘৫ আই’ [5 EYE] – এই গ্রুপ যার নাম বাংলা করলে হয় পাঁচ চোখের গ্রুপ। আর এর সদস্যরা হল, আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। সোভিয়েতের সাথে কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আমলে এটা আমেরিকা, ইউকে এর মধ্যে এক গোপন চুক্তিতে প্রথম এর জন্ম হয়েছিল যার সাথে কালক্রমে অন্য তিন দেশ যুক্ত হয়েছিল। কেবল ২০১০ সালে এমন জোটের তথ্য প্রকাশ্যে এনে উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার জি২০ সম্মেলনে এই জোটও তা গোপনে বিস্তর আলোচনা করলেও  এ’থেকে কোন অগ্রগতি, দিশা বা পরের পদক্ষেপ কী তা বের না হওয়াতে এখন খোলাখুলি একে-অপরের  কূটনীতিক বহিস্কার-সহ, এখন আমেরিকা খোলাখুলি ভারতকে – খুনী কে তা বের করতে – কানাডিয়ান তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য প্রকাশ্যে শক্ত আহবানে এসে ঠেকেছে। যার মানে হল, ভারতকেই এখন ‘র’ এর দিক থেকে যারা যারাই এই খুনের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের জন্য কানাডার হাতে তুলে দিতে হতে হবে – এই হল সারা পশ্চিমের হয়ে ভারতকে আমেরিকান পরামর্শ ও অনুরোধ।  আর আমেরিকান অনুরোধ মানে এখন এটা ক্রমশ ভারতের জন্য বাধ্যবাধকতা হতে থাকবে!  আর বলাই বাহুল্য যে এটা হল আপোষে ব্যাপারটা সবচেয়ে কম আন্দোলিত করে সমাপ্তি টানার প্রস্তাব। এখন মোদি এতে একমত না হলে ক্রমশ ভারতের উপর চাপ বাড়বে এবং অবশ্যই এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদেশের সাথে ভারতের শত্রুতার চরমে যেতে থাকবে – এতে কোনই সন্দেহ নাই।
    আপনি একটা রাষ্ট্র মানে একটা রাষ্ট্রস্বার্থ হলেও অপর এক রাষ্ট্রের ভিতরে ঢুকে গোপনে সেদেশের নাগরিক কাউকে খুন করে আসতে পারেন না। এটা আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনেও ক্রিমিনাল অপরাধ। তাতে ঐ খুন হওয়া ব্যক্তি আপনার কাছে আপনার রাষ্ট্রের যতবড়ই শত্রু বিবেচিত থাক না কেন! এই যে অপর দেশ-ভুমিতে ঢুকে ঐ দেশের নাগরিককে হত্যা এটা সেই অন্যদেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!  এতে আইনি পথ ছিল মানে হতে পারত যে ভারত কানাডা সরকারের কাছে হরদীপ সিং এর নামে ভারতে মামলা আছে তাই তাঁকে ভারত সরকারের হাতে হস্তান্তরের দাবি করা। কিন্তু এখন যা হয়েছে তা হল কানাডার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলার মত এক্ট করে ফেলার কুটনীতিক-সামরিক দিক তো আছেই এছাড়াও হরদীপ সিং কে নিয়ে ভারত কোন বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণের আগেই  মানে ভারতে চোখেও তো  বিচার-প্রমাণ প্রক্রিয়া শেষে প্রমাণিত কোন  অপরাধী নয় তাহলে তাকে আগেই খুন করা হল কেন? মানে ভারত হরদীপ সিং কে কোন বিচার প্রক্রিয়ায় আনতেই চায় না যুদ্ধের এনিমি যেন এমন বিবেচনায় খুন করেছে!!!  অর্থাৎ বলা যায় মোদি সরকার তাঁকে নিয়েই বিচারের পথে না গিয়ে আইন বহির্ভুত [extra judicial] খুন বা কিলিং ঘটিয়েছে !! এটা তো ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি নির্দেশে এক কিলিং!!!! আর না হলে যুদ্ধের এনিমি হিশাবে ট্রিট করেছে – এর দুটোতেই মোদির ভারত অপরাধী!

    অন্তর্ঘাতমুলক [subversive] মানে কীঃ
    ভারতের বিদেশে গোয়েন্দাগিরি ও অপততপরতার সংগঠন হল ‘র’ [RAW]। এসব অপততপরতাকে বাংলায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা বলাই সঠিক! যদিও অনেকে এটাকে স্যাবোটাজ [sabotage] শব্দে ব্যাপারটাকে ধরতে চেষ্টা করেন।
    অন্তর্ঘাত শব্দটা ডিকশনারী মানে দেখলেই বুঝা যায় এটা কত ভয়ঙ্কর। এর ডিকশনারি মানে হল, ভিতরে থেকে বসবাস করেও গোপনে কারো ক্ষতি করা। এখানে ভিতরে বলতে যাকে খুন করবে বা ক্ষতি করবে তার দেশে কিংবা খোদ তাঁর বাড়িতেই মেহমান হয়েও এবং বন্ধু সেজে এমন খুন বা ক্ষতি করবে। অর্থাৎ শব্দটা নিজ থেকেই এক ক্ষতিকর শব্দ। এর উপর আছে এর বিশ্বাসঘাতক দিকটা।  এখানেই শেষ না, আরো আছে। সব মিলিয়ে সেটা মানে, মানুষের এমন কাজ হল চরম অনৈতিক ও অসৎ[immoral] কাজ। তাহলে  এটা তো এমনিতেই অধঃপতিত এক ধারণা  তবু, মানুষের সমাজেই তো এমন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের প্রতিষ্ঠান যেমন ‘র’-কে লুকিয়ে থাকতে/আছে পাওয়া যায়!!! হ্যা একথা সত্য তবে কেবল একটা জায়গায় অন্তর্ঘাত ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকও পাওয়া যায়। সেখানে আসছি পরে, এর আগে…।

    এর মূল ইংরাজি  শব্দটা হল সাবভারসিভ [subversive] যারই সংস্কৃত ঘেঁষা এক বাংলা করা হয় অন্তর্ঘাতমুলক; বা এমন কাজ বা ততপরতা। সাবভারসিভ এর আক্ষরিক মানে হল ‘উপড়ে ফেলা’ [overthrow something]।  আর এই উপড়ে ফেলার অর্থ সরকার উপড়ে ফেলা, ব্যক্তিকে উপড়ে ফেলা মানে খুন করা এবং তার বাসায় গিয়ে খুন করা সহ কোন সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠানকেই দমন করা, দাবড়ে দেয়া ইত্যাদি। ভারতের ‘র’ হল তেমনই এক সাবভারসিভ প্রতিষ্ঠান।
    সবচেয়ে বড়কথা যে কোন রাষ্ট্রের আইনের বিচারে ও চোখে সাবভারসিভ কাজটা সবসময়ই ‘অবৈধ’। তাতে এটাও সম্ভব যে, সাবভারসিভ কাজ মানেই প্রো-একটিভ মানে নিজেই আগাম “আইন নিজের হাতে তুলে” নিয়ে – উপড়ে ফেলার খুন জখম বলতে যা যা বুঝায় এর সবই করে আসা। আর মনে রাখতে হবে,  ‘র’ ভারতের হলেও সেই  ভারতেরই আইনেও ভিনদেশের কোন  ‘র’  সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ও এর ততপরতাও চলে তবে সেটাও অবৈধ। শুধু তাই না, ভিনদেশে গিয়ে ‘র’ এর মত প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা সে দেশের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!!  একারণে, ধরা যাক বাংলাদেশে কোন ‘র’ এর এজেন্ট এসে প্রকাশ্যে বলতেই পারবে না যে সে ‘র’ এর এজেন্ট। কারণ, ‘র’ সাবভারসিভ কাজের প্রতিষ্ঠান বলেই তা এক অবৈধ প্রতিষ্ঠান।  আপনি ‘র’ – এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এই পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের (বা যেকোন দেশের) ভিসা পাবার প্রশ্নই আসে না!  আর এই অনৈতিক ও অসৎ সংগঠন বলেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে আপনার অফিস বা বাসার ড্রয়িং রুমে প্রবেশ-বসবাস অনুমতি পাবে না!

    কোথায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকঃ
    উপরের পুরা প্যারাগ্রাফটাই অন্তর্ঘাত শব্দটার নেতি ও বিশ্বাসঘাতক দিকটা উন্মোচন করা হয়েছে এর প্রতিটা বাক্যে। তাহলে অন্তর্ঘাত কাজের এর পক্ষে এর সমর্থক কারা? কারা হয় এমন সমর্থক?

    এককথায় এর জবাব উগ্র জাতিবাদি চিন্তার লোকেরা!
    লক্ষ্য করলে দেখা যাবে উগ্র জাতিবাদি চিন্তা বা রাজনীতির যেখানে রমরমা বা ইতিহাসের যেসব যুগে তা রমারমা ছিল সেসব কালে উগ্র জাতিবাদি চিন্তার পাশে বসে থাকতে আমরা পেয়েছিলাম সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ও প্রতিষ্ঠানকে। ১৯৫০ সালের আগের সাড়ে তিনশ বছর ছিল পশ্চিমাদেশে বিশেষত ইউরোপ ছিল জাতিরাষ্ট্র বা উগ্র জাতিবাদি চিন্তার যুগ। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নানান কারণে এর অনেক কিছুই একেবারেই বদলে যায়। সবচেয়ে বড় কারণ, খোদ ইউরোপই জাতিরাষ্ট্র ধারণার রাষ্ট্র চর্চা বন্ধ করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়েছিল। এছাড়া আরও  পরে কোল্ড ওয়ারের আমলে তা কিছুটা দেখা দিলেও তা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতই থেকে যায়। এককথায় এর মূলকারণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু ও এর বিস্তার। কারণ, রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সাথে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতাও চালাবে আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও চালাবে এটা কঠিন। মানে এদুটো একসাথে চালানো খুবই মুশকিল। যেমন ইতোমধ্যেই কানাডা-ভারত আবার কানাডা-ইউকে যে বাণিজ্য আলোচনা চলছিল তা এখন পিছনে পরে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।    তাই যেমন,  সোভিয়েত ব্লক আর পশ্চিমাদেশ এদের মধ্যে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ছিল না, সম্ভবও ছিল। একারণে এদের – পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পর অন্তর্ঘাত্মূলক ততপরতা  চলতে পেরেছিল কোল্ড ওয়ার আমলে। তাই পশ্চিমাদেশে এটা কমে গেলেও এশিয়ায় বিশেষত ভারতে তা ব্যতিক্রম। দুটা কারণে। এক .  ভারতে এটা হিন্দুত্ববাদ এই উগ্রজাতিবাদে আচ্ছন্ন এক জাতিরাষ্ট্র। আর দ্বিতীয় কারণ, জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তান রেষারেষি সম্পর্ক। যদিও সাধারণভাবে সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত প্রতিষ্ঠান অনেক রাষ্ট্রই সক্ষম থাকে। কিন্তু  তা করে না, কেবল গোয়েন্দা ততপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ সে সক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখে। আর ভারত-পাকিস্তান এদের মধ্যেই এর ব্যাপক ব্যবহার – এটাই গুরুত্বপুর্ণ জায়গা। এর উপর এসব প্রতিষ্ঠানের অন্য দেশে গিয়ে অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ঘটানোর পরে দেখা যাবে কেবলমাত্র উগ্র জাতিবাদি দেশেই দেখা যাবে যে শাসক একাজকে গৌরবের বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বা ওদেশের মিডিয়া প্রকাশ্যে এটা গৌরবের কাজ বলছে।

    তাই উগ্র জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদ- হিন্দুত্ববাদী ভারত আর এই ভারতের প্রতিষ্ঠান র-এর কোন ততপরতা পাকিস্তানে ঘটিয়ে এলে তা ভারতের মিডিয়া প্রকাশ্যে তাতে উতযাপনের বিষয় হিশাবে তুলে ধরে থাকে।
    কানাডায় হরদীপ সিং-কে খুন করা আসার প্রেক্ষিতে কলকাতার আনন্দবাজার ঠিক একাজটাই করেছে।

    কলকাতার আনন্দবাজারের র-এর অন্তর্ঘাতি ততপরতার পক্ষে প্রকাশ্য উতযাপনঃ
    উপরে বলেছি, অনেক রাষ্ট্রেরই  সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত সক্ষম প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন ততপরতায় তারা যায় না বা এনিয়ে কথিত দেশপ্রেমি উতযাপন তারা করে না। সম্ভবত কাজটার মধ্যে অনৈতিক, অসততার দিক আছে তা খেয়াল রাখে বলে। কিন্তু মফস্বলী কলকাতার কাছে এই খারাপ দিকটার কথা খেয়াল রেখে বা ভেবে এথেকে দূরে থাকার মত কোন ক্রিটিক্যাল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে নাই। এর উপর ক্ষমতায় যখন মোদি তখন সে আরেক হিন্দুত্ববাদী রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলের র-এরও আবার বিশেষ অন্তর্ঘাত-বাহিনী (‘টিম জে’) বানিয়ে কী করে পাকিস্তানে অপ-ততপরতা চালিয়ে এসেছিল সেই কথিত গর্বের কাহিনী এখন ছেপেছে আনন্দবাজার। অন্তর্ঘাত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজটা যেন খুবই গর্বের তা একালেও এই পত্রিকা পাঠকের মনে এখন হরদীপ হত্যার সময় যাতে জনমত কানাডার হত্যাকে গৌরবের মনে করে সে উস্কানি তুলতেই আনন্দবাজারের এই উদ্যোগ। এর শিরোনামেই ব্যাপারটা খুবই গৌরবের এমন উস্কানি তুলতে লেখা হয়েছে – “পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে শত্রু নিধন, খলিস্তানিদের ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর গোপন তাস ছিল ‘টিম জে’ “। এই ‘টিম জে’ হল র-এর ভিতরেই আরেক বিশেষ বাহিনী যা রাজীব গান্ধী তৈরি করিয়েছিলেন। মনে রাখতে পারি ইন্দিরা গান্ধী খুন হয়েছিলেন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে শিখদের কাছে পবিত্র “স্বর্ণমন্দিরে হামলা ও তছনছ করে সেখানে আশ্রয় নেয়া সকল আন্দোলনকারীদেরকে হয় হত্যা করেছিল বা বের করে গ্রেফতার করেছিলেন। আর স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশনের বদলা নিতেই ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর তারা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। রাজীব গান্ধীও প্রায় একইভাবে শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে খুন হয়ে গেছিলেন। এমনকি খোদ দিল্লিতেই ইন্দিরার হত্যা হয়ে যাবার কয়েকদিন পরে শিখ-জাতির বাসিন্দা পেলেই তাদের উপর কংগ্রেসিরা এথনিক ক্লিনজিং করেছিল!

    সাধারণভাবে বললে, ভারতে বারবার বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যা হাজির হচ্ছে জন্মের সময়ে ভারত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রগঠনে কিছু মারাত্মক ত্রুটির কারণে। নেহেরুর রাজনৈতিক চিন্তার বৈশিষ্ট হল ১। এটা কলোনিশাসক মডেল। জবরদস্তিতে ঘাড়ে চড়তে হবে আর শুষে নিতে থাকতে হবে  তাতে সেটা আভ্যন্তরীণভাবে কেন্দ্রিভুত ক্ষমতার নামে অথবা পড়শির উপরে চড়াও ধরণের হলেও একই ফর্মুলা। ২। ভারতের রাজ্যগুলোর উপরে একমাত্র তথাকথিত কেন্দ্রের কড়া নিয়ন্ত্রণেই ভারতকে এক রাখা সম্ভব। এটা নেহেরু বিশ্বাস করতেন। আর এরই প্রতিফলন তিনি ঘটিয়ে রেখেছেন যা এখনও বর্তমান ভারত রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে।   আর একারণেই পালটা প্রতিক্রিয়ায় সব সময় কোন না কোন রাজ্যে ভারত ভেঙ্গে রাজ্যগুলোর আলাদা হবার উপক্রম!! উল্টোদিক থেকে পড়লে অন্যভাষায় বললে, এটাই বিচ্ছিন্নতাবাদ। আর তা ঠেকাতে উগ্র জাতিবাদী প্রপাগান্ডা যে বিচ্ছিন্নতাবাদ মানেই অপরাধ! সোজা ভাষায় বললে, নেহেরুর কাছে শাসন বলতে কলোনিশাসক যেভাবে ভারতকে অধীনস্ত রেখে শাসন করেছিল, সেটাই মডেল। এর বাইরে ১৭৭৬ সাল থেকে স্বাধীন আমেরিকা যে ফেডারল বলে আরেক রাষ্ট্র ধারনার হাজির ও সবচেয়ে স্টেবল-থিতু ধারণা বলে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে এটা তিনি বেখবর। বরং বৃটিশেরা চলে গেলেও তিনি নেহেরুই যেন তখনও বৃটিশ রানীর ভাইসরয় এই মনে করে তিনি ভারত রাষ্ট্র কাঠামো ও শাসন সাজিয়েছেন।
    আবার এর সাথে ছিল উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী ও এর কথিত অর্থহীন দেশপ্রেম!!! আর সেটাই তবে আরো উগ্র উপস্থাপনায় একালে মোদির আমলে তা হয়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদী শাসনের প্রধান হাতিয়ার। আর তা থেকেই কথিত হিন্দুত্বের দেশপ্রেম এর আবেগ তুলে ভোটের বাক্স ভরা। তাই শিখ কমিউনিটির উপর যে নিরবিচ্ছিন্ন নিপীড়ন এটাকেই মিথ্যা করে ইতিবাচকভাবে হাজির করতে উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেম ছড়িয়ে দেয়া উস্কে তোলা – একাজটাই করেছে আনন্দবাজার। তাতে আরেক দেশে গিয়ে গোপন ও গুপ্ত হত্যা করে আসা যে আন্তর্জাতিক অপরাধ এমন কোন বোধ তাদের নাই। অথচ ভারতে  ২০০৮ সালে পাকিস্তানের ২৬/১১ মুম্বাই হামলা সেই একই ঘটনার উলটা পিঠ। মানে একই জিনিষ ভারত করলে তা দেশপ্রেম ও বীরত্ব; কিন্তু পাকিস্তান করলে সেটা অন্যায় আর মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ দিয়ে একে প্রতিবাদ ও বিচার করে দেখাতে হবে!!! এই হলো উগ্র জাতিবাদের মূলনীতি।  সেটা অনুসরণ করেই আনন্দবাজার বলতে চাচ্ছে কানাডায় গিয়ে হরদীপ সিং-কে হত্যা এই অন্তর্ঘাতি ততপরতা এটা ভারতীয় দেশপ্রেম এবং এটা যেন বৈধ এবং ভারতীয় দেশপ্রেম ও বীরত্বের নজির! জনমনে এই উগ্র হিন্দুত্বের জাতিবাদ এবং এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেছে আনন্দবাজার যাতে তারা কানাডায় গিয়ে হত্যা করাটাকে অন্যায়-অবৈধ না একেবারে উলটা দেশপ্রেমের বীরত্ব হিশাবে দেখে!

    মফস্বলি আনন্দবাজারের বেকুবিটা হল, তারা ভেবেছে সারা দুনিয়াটাই যেন মুসলমানের পাকিস্তান তাই মুসলমানদেরকে তো যা খুশি শাস্তি দেয়া যায় এই হলো অনুমান! তাই পাকিস্তানে ভারতের র-এর ‘টিম জে’ যেটা করতে পেরেছে সেটা যেন সে কানাডাতেও করতে পারবে!! এটা যেন কোন ব্যাপারই না!!! এই হলো তাদের হিন্দুত্ববাদের গাধামি! তারা বুঝেই নাই যে কানাডার গায়ে হাত মানে এটা অলিখিতভাবে আমেরিকার [সাদা ককেশীয়] গায়ে হাত তোলার সামিল! এর উপর কানাডা আমেরিকার সাথে জি৭ জোটের সদস্য! শুধু তাই নয় কানাডা ন্যাটোর সদস্য এবং ইন্টেলিজেন্স শেয়ার গ্রুপ ফাইব আই [Five EYE]  এর সদস্যও বটে! তাই মোদি যদি আমেরিকান “সহযোগিতার প্রস্তাবে” রাজি না হন তবে এই বিরোধ ক্রমশ চরমে না উঠে উপায় থাকবে না।

    ওদিকে মোদি হরদীপ সিং হত্যার পথে পা বাড়িয়েছেন আরেক কারণে! শুধু ভারত দেশের বাইরের হিসাবের কথাটা হল, পশ্চিমাদের চীন-ঠেকানোর কাজে ভারত গুরুত্বপুর্ণ পিলার ও বন্ধু তাই সেই ভারত এক্ষেত্রে কানাডায় গিয়ে খুন করেও পার পেয়ে যাবে; এছাড়া এতটুকুই না। মোদি আসন্ন আগামি নির্বাচনে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে শায়েস্তার পদক্ষেপ নিয়ে বীরত্ব আর গর্ব প্রকাশ করে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জজবা উঠাবে -ভোটারদের আবেগী করেও তুলবে যাতে এর প্রভাব মোদি-বিজেপির ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়!  কাজেই আমেরিকার দাবি যে “কানাডার সাথে  তদন্তে ভারতকে সহযোগিতা” এই আহবান – মোদির এতে সায় দেয়া এটা প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব একটা ঘটনা হয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি! আর সেক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিমের কাছে ভারত যতই চীন-ঠেকানোর দেয়াল- এই গুরুত্বের দেশ হোক না কেন মোদির ভারতকে পশ্চিম এক্ষেত্রে তারা পাচ্ছে না!!! সে সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি!

    আবার অন্যদিকে; আগামি বছরের শুরুতেই এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন, তাতে কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম; যা কানাডায় খুনের ঘটনার বহু আগে থেকেই একটিভ হয়ে ছিল। মোদির হিন্দুত্ববাদের এক ব্যবহারিক রূপ হল মুসলমানের উপর চরমতম বৈষম্য ও পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখার নানান বেআইনি পদক্ষেপ নেয়া – অন্যদিকে ভয় আর প্রলোভন দেখিয়ে  বিচার বিভাগকেই নিস্ক্রিয় রাখা, বদলি বা ডিপার্টমেন্ট বদল পর্যন্ত ঘটিয়ে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনকে স্থবির রাখা -সহ সবকিছু করে মোদি এক রামরাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন। আর এসব করেই আবার বাড়তি হিশাবে মুসলমান ঘৃণা বা শিখদের প্রতি ঘৃণা উস্কে তা বিক্রি মানে, এভাবে ভোটের বাক্স ভরার নীতিতেই মোদি গত দশবছর ধরে ক্ষমতায় টিকে আছে।
    কিন্তু এখন মোদির সেসব পরিকল্পনা ও ছকের কী হবে, কী প্রভাব পড়বে সেসবও দেখার বিষয়!  আসন্ন নির্বাচনের সময়ে, কানাডায় অন্তর্ঘাত কাজ যে যুদ্ধ ঘোষণার সমান কাজ তা হলেও – সেটা করা মোদির ঠিক আছে এমন জোশ তুলে আনা  – এটামোদির বিজেপি করতে যাবে আর টিকাতে পারবে?  আবার মোদি যদি পেরে যায় তাহলে এই মোদিকে বাইডেনের নেতৃত্বের পশ্চিম কী বোকার মত দাঁড়িয়ে দেখবে??? এসবই হয়ে উঠবেই আগামির ঘটনাবলীতে মুখ্য নির্ধারক সব প্রশ্ন!!!

    সর্বশেষঃ একটু আগে প্রথম আলো জানাচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পালটা কানাডাকে অপরাধীদের আশ্রয় দিবার অভিযোগ করেছেন। এর অর্থ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমের সাথে কোন আপোষের পথ বের করার পথে মোদির ভারত হাটবে না, যাচ্ছে না।

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; দুপুর ০১ঃ ৪৫
    সর্বশেষ আপডেটঃ  

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com