Tag: GOUTAM DAS

  • এখন ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার মানে কী?

    এখন ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার মানে কী?
    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩    রাত ০৭ঃ ৫৮
    https://wp.me/p1sCvy-507

    Civil Rights Movement Concept Pro Vector

    আমরা আজকাল অনেকে “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” নিয়ে মানে, এসব শব্দ ব্যবহার করে কথা বলছেন বা বক্তৃতা করছেন – দেখছি আমরা। শাহবাগে বসে মিটিং-বক্তৃতা করছেন তারা – এসব খুবই কমন দৃশ্যাবলী ইদানিং আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানে এখন আর এসব কোন নয়া জিনিষ না। আসলে হাসিনার ১৫ বছরের শাসন আমলে ভোট দেয়া জিনিষটার আর বালাই নাই; সব উঠে গেছে বলে – এজন্যই “ভোটাধিকার” শব্দটা আমরা কোন কোন কর্ণার থেকে উঠছে – এমনই মোটামুটি অনুমান করছি।

    এখানে ‘ভোটাধিকার’ বলতে ‘ভোট দেওয়ার অধিকার’ – আমার ধারণা, শব্দের ব্যবহারকারীরা এটাই বুঝাতে চেয়েছেন। আর এতে মনে পড়ল ‘অধিকার’ শব্দটাও আমাদের রাজনৈতিক সাহিত্যে অত প্রচলিত কোন শব্দটা নয়। যতটা ধরা যাক, ‘প্রগতিশীল’ শব্দটা – এটা যতটা প্রচলিত। প্রগতিশীল শব্দটা বরং ‘একটা রাজনৈতিক ধারার” মধ্যে অনবরতই ব্যবহার হয় এমন শব্দ। সে প্রসঙ্গে আসব।

    ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা মানে কী ও কেনঃ
    এখন “ভোট” বা “ভোট দেয়া” -এই ভোট ব্যাপারটা কী আসলে? আমরা কে কবে থেকে ভোট ব্যাপারটা শুনেছি অর্থে কিছু জানি বা জেনেছি? আমার কথা দিয়েই শুরু করলে বলতে হয়, তখন আমি সম্ভবত আট বছর বয়সের আর আমার মা আর দাদি ভোট দিতে গেছিলেন পাড়ারই আরেক কোণের এক স্কুলে, এটুকু মনে করতে পারি। কারণ কিছু গোলযোগ হয়েছিল আর মা-দাদি সেটা বাসায় ফিরে এসে বিশাল আসর জমিয়ে তা বর্ণনা করেছিল আর আমরা ছোটরা আশেপাশের কৌতুহলী ঘোরাঘুরিতে যতটুকু বুঝেছিলাম আর তা আবার এখনও যতটুকু মনে আছে সেই বর্ণনা; এছাড়া তখনকার আধো আধো ধারণায় জেনেছিলাম মানে, একটা নাম শুনেছিলাম ফাতেমা জিন্নাহ। আমার মা-দাদি তাঁকেই ভোট দিয়ে এসেছিলেন। পরে একালে বইপত্র-নেট ঘেটে নিশ্চিত হয়েছি সেটা ছিল পাকিস্তানের জেনারেল আয়ুব খানের প্রথম নির্বাচন ১৯৬৪-৬৫, তবে সেটাও পরোক্ষ নির্বাচন – মানে ইলেকটোরাল কলেজ নির্বাচন যা আমাদের দেশি-ভাষায় (৮০,০০০ ডেলিগেটের) বেসিক ডেমোক্রাসির নির্বাচন। আর সে নির্বাচনেই বিরোধী রাজনৈতিক দলের দিক থেকে সম্মিলিত প্রার্থী ছিলেন ফাতেমা জিন্নাহ। মানে যিনি হলেন সম্পর্কে – পাকিস্তান জন্মের নায়ক, মূল ব্যক্তিত্ব মোহম্মদ আলী জিন্নাহ এর ছোট বোন।
    বাংলাদেশ মানে সেকালের পুর্ব-পাকিস্তানের ইতিহাস ধরে এভাবে আরো পিছনে গেলে যে নির্বাচন পাই তা হল ১৯৫৪ সালে, পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। আরো পিছনে গেলে বৃটিশ-ভারতে ১৯৩৭ ও  ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন। মানে আমরা কলোনি-দখলদারের অধীনে থাকলেও প্রাদেশিক (রাজ্য বা প্রদেশ ওয়ারী) স্তরে নির্বাচন এর সুযোগ ঘটেছিল।  অথবা অন্যভাবে বললে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা – এই মূল ক্ষমতাটাকে বাদ দিয়ে নিচের বড় জোর প্রাদেশিক সরকারগুলো পর্যন্ত ভোট-নির্বাচনের এক সীমিত ব্যবস্থা চালু হয়েছিল – সেটার কথাই বলছি। তাও এটুকু পেতেই অনেক কাঠখড় লেগেছিল মানে ১৮৫৭ সালের একটা সিপাই বিদ্রোহ লেগেছিল। আর তাতে হাজার হাজার সিপাই ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ লেগেছিল। যদি আমরা ১৭৫৭ সালের কলোনি-দখলদারদের হাতে নবাব সিরাজদৌল্লার পতনের বছরকে মনে রাখি তবে এর প্রথম ১০০ বছরে কোন ভোট-নির্বাচন কী জিনিষ আমরা অখন্ড ভারতের কেউই জানতামই না। আমাদের জানার সুযোগ হয় নাই। তবে সেই প্রথম একশ বছর এক বাণিজ্যিক (বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া) কোম্পানির দখলে থাকা যে বৃটিশ- ভারত তা পেরিয়ে, ১৮৫৮ সালের বৃটিশ-ভারত যখন কোম্পাস্নি শাসন ছেড়ে সরাসরি বৃটিশ সরকারের শাসনের অধীনে চলে যায় এরপরেই ক্রমশ ধীরে ধীরে পরিবর্তনের এক পর্যায়ে  “রাজনীতি” শব্দটার সঙ্গে আমরা প্রথম পরিচিত হতে থাকি। এখানে সরাসরি একটা অনুসিদ্ধান্ত টেনে দেয়া যায় যে, সবার আগে একটা সমাজ-ভুখন্ডের বাসিন্দাদেরকে “রাজনীতি”  শব্দটার সাথে পরিচিত হতে হয়। আর এরপরেই কেবল ক্রমশ ভোট-নির্বাচন ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক শব্দ ও ধারণার সাথে সেই সমাজ পরিচিত হতে পারে , আগে নয়। যেমন ১৮৮৫ সালে বৃটিশ-ভারত সরকার প্রথম কোন ভারতীয় রাজনৈতিক দল খুলার অনুমতি দিয়েছিল। মানে ১৮৫৮ সাল থেকে সরাসরি ইংল্যান্ডের বৃটিশ সরকারের অধীনে ভারত শাসিত হতে শুরু করার পরে – এবং এরপরেও আরো ২৮ বছর পরে নেটিভ ভারতীয়রা নিজের রাজনৈতিক দল খুলার অনুমতি পেয়েছিল। আর মাঝের এই ২৮ বছরে আমরা আরো কিছু ছাড় পেয়েছিলাম যেমন, পাড়ার ক্লাব, সংঘ, দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা সাধারণভাবে যেকোন ধরণের সামাজিক প্রতিষ্ঠান (রাজনৈতিক দল বাদে) খুলবার অনুমতি দেয়া শুরু করেছিল বৃটিশ শাসকেরা।

    আর বলাই বাহুল্য “রাজনীতি” এই শব্দটার ফলে অনুষঙ্গী হিশাবে ভোট-নির্বাচন শব্দ ও ধারণাটা আমরা পেয়েছিলাম। আর তা পেয়েছিলাম, ইংল্যান্ডে বৃটিশ শাসন ব্যবস্থাটা কেমন তা জেনে-দেখে, মানে আমাদের মধ্যে একেবারেই এলিট, সমাজের উপরের মাখন অংশ যারা ইংল্যান্ডে ঘুরবার সুযোগ ও ব্যয়নির্বাহের সক্ষমতা রাখতেন তারাই সরার আগে শিখেছিলেন যে, “রাজনীতি” রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভোট-নির্বাচন ইত্যাদি মিলিয়ে ব্যাপারটা কী ও কেমন। কেন এমন বলছি? আর এত নিশ্চিত ভাবে বলছি কী করে?

    আমাদের মোগল শাসনামলে রাজনীতি, পাবলিক-জনগণ বা ভোট ইত্যাদি শব্দ ও ধারণা ছিল না, কেনঃ 
    রাজার রাজ্য বা সম্রাটের সাম্রাজ্য বলতে কী বুঝব? কেমন শাসন ব্যবস্থা এটা? এনিয়ে আরও মুখ্য প্রশ্ন মানে, আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন!  কথাটা হল, রাজা-বাদশা বা সম্রাটকে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে? 
    এককথায় উত্তর হল, আমরা বৃটিশ দখল ও শাসনের অধীনে যাবার আগে আমরা ছিলাম মোগল শাসনে। মানে যা ছিল একটা মনার্কি [monerchy] বা রাজতন্ত্র মানে, যেটাকে আমরা রাজা, বাদশা, সম্রাট, খলিফা, আমীর ইত্যাদি যে নামেই ডাকি এমন রাজার রাজ্য বা সম্রাটের সাম্রাজ্য – সেটা ছিল এমনই এক “রাজতান্ত্রিক” শাসন ব্যবস্থা।
    এখানে একটা কথা পরিস্কার রাখার সুযোগ নিতে চাই। দুনিয়াতে কোন-না-কোন শাসন ব্যবস্থা হাজির থাকা শুরু করা মোটামুটিভাবে মানুষের সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের শুরু থেকেই। মানে যেমন শুরুতে গোত্রভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা থেকেই যদি ধারাবাহিকভাবে বলি তাহলে ওর পর থেকে পরে ব্যক্তিবোধ এই ধারণার উদয় (তবে শুরুতে অসচেতন উদয় হলেও পরে সেটা অনেক সচেতন উদয়) হবার পর থেকে ক্রমশ ব্যক্তিভিত্তিক শাসন শুরু হয়েছিল।  অবশ্য এর শুরুটা ছিল সাধারণত ছোটখাট রাজার রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা দিয়ে। এভাবে একটা না একটা ধরণের শাসন ব্যবস্থা আমরা তখন থেকেই সবকালের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাব। কিন্তু কোন একটা শাসন ব্যবস্থা থাকা মানেই তা রাষ্ট্র নয় মানে,  একে “রাষ্ট্র গড়ে শাসন ব্যবস্থা” কায়েম হিশাবে গণ্য করা ভুল হবে। কারণ রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এর আগে সমাজে পাবলিক-জনগণ ধারণা হাজির থাকতেই হবে, যা রাজার সমাজে গরহাজির, মানে থাকে না।   সারকথায়, সমাজে একটা শাসন ব্যবস্থা থাকা মানেই সেখানে তখনও তা এক রাষ্ট্র ছিল – এভাবে এই অনুমান ভুল ও ভিত্তিহীন!  আসলে “শাসন ব্যবস্থা” মানে হল একটা শাসকের রুল [rule বা শাসন] ও রুলার[ruler বা শাসক] থাকা।   কিন্তু কোন রাজতান্ত্রিকতা [monerchy] শাসন ব্যবস্থা হলেও তা রাষ্ট্র ব্যবস্থা নয়। কাজেই শাসন ব্যবস্থা মানেই তা রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা তা মোটেও নয়। আর কোন শাসন ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র-শাসন ব্যবস্থা হতে হলে সেখানে পাবলিক (public বা জনগণ) ধারণাটা থাকতে হবে। আর এরই পিছনের রুট ধারণা হল “রাজনীতি” ( politics বা পলিটিক্স) এই শব্দ ও ধারণাটাই সমাজে আবির্ভাব ও চালু থাকতে হবে। মানে রাজনীতি ধারণাটা সমাজে পরিচিত থাকলে তবেই সেখানে “পাবলিক” ধারণাটাও পাওয়া যাবে; এর আগে নয়।

    লক্ষ্য করবেন কোন রাজা, বাদশা আমীর খলিফার দেশে তাই তারা শাসক কিন্তু সেখানে ‘রাজনীতি’ বলে শব্দ নাই। তাই পাবলিক বলেও কোন শব্দ-ধারণা নাই। যে কারণে মোগল শাসনের ভারতেও ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি এসব শব্দ-ধারনাগুলো শব্দ নাই। মধ্যপ্রাচ্যের কোন বাদশা-আমীরের দেশে ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি নাই –  মানুষ আছে, বাসিন্দারা আছে কিন্তু পাবলিক নাই; তাই কোন রাজনৈতিক দলও নাই।

    মনার্কি আর রিপাবলিক শাসনব্যবস্থার তুলনা ও ফারাকঃ
    ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি এসব শব্দ নাই তা না হয় বুঝলাম কিন্তু  একটা মনার্কি (রাজতন্ত্র) আর রিপাবলিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে মূল ফারাকটা কী?
    আগে বলে নেই আমি উপরে যে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলে যা লিখেছে সেটা বলতে আসলে “রিপাবলিক রাষ্ট্রে শাসন ব্যবস্থা” বুঝিয়েছিল।
    এই বাক্যে লক্ষ্য করবেন re-public মানে পাবলিক ধারণাটা পরোক্ষে এনেছি আর সাথে আছে “শাসন ব্যবস্থা” শব্দটা। বহু পুরান কাল মানে, ধরেন যীশুর জন্মের আগে থেকেই সে আমলেরও আগে থেকেই একটা না একটা ‘শাসন ব্যবস্থা’ [রুল বা রুলার] আমরা দেখতে পাব। কিন্তু “পাবলিকের শাসন ব্যবস্থা” সেই প্রথম সমাজ দেখেছিল তখন। তাই এটাকে রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা নামে আলাদা বৈশিষ্টে ডাকা হয়।

    তাহলে কোন একটা শাসন ব্যবস্থা সেটা একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলে নিশ্চিত বুঝবার উপায় কী?
    কেউ রিপাবলিক কিনা তা বুঝবার সহজ উপায় হল একে রাজতান্ত্রিক বা মনার্কি ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে বুঝতে হবে। তবেই ভাল ভাবে বুঝা যাবে।
    একটা রাজতন্ত্রে থাকে রাজা আর প্রজা (বা বাসিন্দা)। লক্ষণীয় যে যেকোন রাজার প্রজা মানে কিন্তু “পাবলিক” নয়। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রজাই স্বাধীন ব্যক্তি নয়। কারণ, প্রজা মানেই তো সাবঅর্ডিনেট [sub-ordinate] বা অধীনস্ত;  অথবা টেনেন্ট [tenant] বা যে শাসককে খাজনা দেওয়ার বিনিময়ে চাষাবাদের রাইট পায়; তাই সে রাজার অধস্তন। এছাড়া আরেক মূলকথা হল, রাজার সমান বা মতনই আরেক ব্যক্তি তো কোনভাবেই সে নয়ই।  বরং  রাজা-সম্রাট এরা হল শাসক আর, প্রজা হল রাজার অধস্তন ও শাসিত। অধীনস্ত কেউ মানেই সে স্বাধীন  ব্যক্তি নয়, স্বাধীন অস্তিত্ব তার নাই;  freedom, free – ধারণাগুলো তার জন্য নয়। বরং রাজার ইচ্ছাই প্রজার ইচ্ছা।
    বিপরীতে রিপাবলিকেও শাসক-শাসিত থাকলেও  – মৌলিক ফারাক হল, শাসনের ক্ষমতায়। শাসককে শাসন করার ক্ষমতা কে দিয়েছে? এই হল ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন। যেটা উপরে কিছুটা বলেছি।
    এই প্রশ্নের জবাবে রাজা মাত্রই নিরুত্তর থাকবে। জবাব দিতে পারবে না। আর নয়ত শেষে হয়ত বলে ফেলবে যে, গায়ের জোরে তিনি নিজেই  বা তাঁর পুর্বপুরুষ একসময় ক্ষমতা নিয়েছিল আর এরপর থেকে এটা ডায়নেস্টি [dynasty] মানে,  রাজার সন্তান বলে সেই রাজার মৃত্যুর পরের রাজা। অথবা আরেকটু বুদ্ধিমান কোন রাজা হলে সে দাবি করবে গড বা ভগবান তাকে ক্ষমতা দিয়েছেন – এই অর্থে তা গড় গিফটেড। আর এই মিথ্যার স্বপক্ষে স্বাক্ষ্য দিতে সে কোন পুরোহিত বা পাদ্রী ধরণের কাউকে হাজির করবে।
    সারকথায় যে শাসক নিজ ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে এর সদুত্তর, ব্যাখ্যা করতে পারে না সেই রাজা-সম্রাট।

    আর এর বিপরীতে রিপাবলিকে ক্ষেত্রে এমন রাষ্ট্র মাত্রই সে বলতে পারবে আমার ক্ষমতার উৎস আমার ভুখন্ডের বাসিন্দা জনগণ বা পাবলিক। তারা আমাকে তাদের জনপ্রতিনিধি মেনেছে, নির্বাচিত করেছে; কিছু সুনির্দিষ্ট কথার উপর ভিত্তি করে ম্যান্ডেট দিয়েছে।    তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর (যেমন পাঁচ বছর) যাকে সম্মতি দিয়ে মানে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে আমিই সেই জনগণের শাসক এবং আমি তাদের সেই ম্যান্ডেট প্রাপ্ত প্রতিনিধি হিশাবে ক্ষমতার প্রধান নির্বাহী; তা প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী। অতএব আমার ক্ষমতার উৎস জনগণ। কথাগুলো আইডিয়ালি [ideally]  মানে কী হওয়া উচিত সেই অর্থে বললাম।
    আর বাস্তবের শাসক আমরা হয়ত কোথাও হাসিনা সরকারকে দেখব; সে অন্যকথা। কিন্তু অবু একটা মজার কথা হল হাসিনা অনেক চোখ উল্টানো মিছা কথা বললেও তিনি কখনও এটা বলেন  না যে তার বাবা তাঁকে শাসন ক্ষমতা দিয়ে গেছে – একটা ডায়নেস্টিক রাজতন্ত্রে যেমন হয়। অর্থাৎ এজায়গাটাই তিনি মেনে নিচ্ছেন যে শাসন ক্ষমতার উৎস জনগণ হওয়া উচিত বা হতে হবে। রাজার সন্তান রাজা এমন রাজতান্ত্রিক শাসন অন্তত তাঁর টা নয়। কিন্তু কেবল একটা জায়গায় তিনি  মিছা কথা বলতেছেন যে জনগণ তাকে জনপ্রতিনিধি বানায়েছে, তাঁর দলকে ভোট দিয়েছে – সে “রাতের ভোট” করে নাই ইত্যাদি; এগুলোই তিনি চোখ উলটানো মিছাকথা বলতেছেন।

    তাই এখানে জনপ্রতিনিধি বা নির্বাচিত পাবলিক রিপ্রেজেন্টেটিভ খুবই গুরুত্বপুর্ণ ধারণা। আর এখানে আরেকটা সাবধানতা দরকার আছে। অনেকের মনে হতে পারে, জনপ্রতিনিধি বলতে সমাজের এলিটদের থেকে এলিটদের দ্বারা বেছে নেওয়া ব্যক্তিকে এমন জনপ্রতিনিধি বলে চালিয়ে দিলেই তো হয়; বিশেষ করে কোন ‘জ্ঞানী’ কিন্তু অনির্বাচিত ব্যক্তিকে!  সরি এটা অগ্রহণযোগ্য। এটা মারাত্মক ভুল। যেমন ব্যবহারিকভাবে কল্পনা করা যাক, ধরেন এটা হল কেবল ঢাকার তাও আবার গুলশান-বারিধারার এলিট লোকেরা, তারা তাদের মধ্য থেকে এমন যাকে ভোট না, হুদাই বেছে নিবেন – প্রধানমন্ত্রী ঠিক করবেন তাহলেই তো হয় – এমনই এক ধারণা। কিন্তু না , সরি। এটা ভুল। এটা এলিটের বেছে নেয়া কেউ হলে হবে না।  কারণ,  এর সঙ্গে “পাবলিক” বা ‘রিপাবলিক’ ধারণার কোন সম্পর্ক নাই। পাবলিক আর একমুঠো এলিট কখনও এককথা নয়। এছাড়া, ওপেন অবাধ নির্বাচনে তাকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হতে হবে।
    রিপাবলিকে পাবলিক এই ধারণা আর পাবলিকের ক্ষমতা তাই এই সেন্ট্রাল ধারণা।  সেটা একেবারেই আম-আদমিকে-সহ সকল নাগরিককে আমল করে আর সবচেয়ে মারজিনালাইজড ব্যক্তিকেও তিনি কী বলেন তা শুনতে হবে, শোনা নিশ্চিত করতেই হবে। এই পাবলিক বা জনগণ ধারণা – এখান থেকেই যেমন, জন-প্রশাসন [public admin] মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য [public health], জন-পরিবহণ (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট), জনস্বার্থ (পাবলিক ইন্টারেস্ট) ইত্যাদি ধারণাগুলো। যেমন “জনস্বার্থে” আদালতে রীট করা সম্ভব যেটাকে পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (PIL) বলা হয়। জনস্বার্থ রক্ষার্থে কোন ব্যক্তির জমি অধীগ্রহণ বা একোয়ার [acquire] করে তাকে বাজার দরে দাম শোধ করে দিয়ে ঐ ভুমিতে যেকোন পাবলিক অবকাঠামো (রাস্তা, ব্রিজ, স্টেশন ইত্যাদি) যেকোন কিছু গড়ে তোলা সম্ভব। এটাই প্রতীকীভাবে সাধারণ ইচ্ছা বা কমন ইন্টারেস্ট।

    তাহলে এর সারকথাটা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাটা বুঝতে গেলে তা কখনই বুঝা পুর্ণ হবে না যদি না তা এর আগের শাসন ব্যবস্থা-  মানে, আমরা কোন রাজতন্ত্রের শাসনের সাথে তুলনা করে একে না বুঝি। বিশেষ করে একালে্র প্রজন্ম যারা আমরা কোন রাজা-সম্রাটের শাসন দেখি নাই। আবার এমনও হতে পারে নাটক-সিনেমায় কোন কোন সম্রাটের শাসনের কিছু একটা দেখে তাঁর ভাল লেগে যায়। অর্থাৎ এরা কোন মনার্কি শাসন ব্যবস্থা দেখেই নাই। এমনকি এরপরের কলোনিদখল ওয়ালাদের শাসন সেটাও দেখে নাই। তা সত্বেও! কিন্তু  কেবল বড়জোর হয়ত ভোটে দেয়া দেখেছে। আবার রাজনীতি বলে কী জানি একটা আছে দেখেছে। আর ধরে নিয়েছে ওমন একটা সম্রাটের শাসন ফিরিয়ে আনলে সমস্যা কী???  তাদের জন্য কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে বুঝাবুঝি এবং পাবলিক  – এই ধারণাটাকে বুঝা  কেন গুরুত্বপুর্ণ তা উপলব্দি করা খুবই জরুরি এবং তা করতে হবে রিপাবলিক ধারণা বা স্বাধীন ব্যক্তি ও তার অধিকারের ধারণার আলোকে।  তবে  এমন তরুনেরা আবার ভেবেও দেখতে পারেনযে  একটা রাতের ভোটের সরকারই আপনার কাছে অসহ্য লাগছে, প্রতিবাদ করছেন! তাহলে একটা মনার্কি সহ্য করবেন কী করে???

    এবার ইতিহাসের সময়কালের দিক থেকে কথা বলি, দুনিয়াতে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে এর বিপরীতে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাটা এসেছিল। তবে এটা ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা। আর আমেরিকার অভিজ্ঞতাটা  আরেকটু আলাদা। কমন আমেরিকান তারাও  তাদের কলোনি শাসক যারা তাদের মত সাদা ককেশিয় হলেও মূলত বৃটিশ কলোনি মাস্টারদের বিরুদ্ধে তাদেরকে লড়তে হয়েছিল সশস্ত্রভাবে আর তাতেই ১৭৭৬ সালে বিজয়ী হয়ে তবেই তাঁরা তাদের স্বাধীন রিপাবলিক গড়েছিল। আর তাদের অভিজ্ঞতার বাইরে এশিয়ার আরেক কোনের আমরা, আমাদের মত দেশগুলো কলোনিদখলদার শাসকদের কাছ থেকেই প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে জেনেছিল। তবে সেক্ষেত্রে এটাকে রিপাবলিক রাষ্ট্র এই নামের চেয়ে একে নেশন স্টেট বা এক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা হিশাবে তাঁরা জেনেছিল। তবে এটাকেই অনেকে আধুনিক রাষ্ট্র বলেও চিনে থাকে।
    এখন থেকে আমি বেশি বিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে মূলকথাগুলো বলে এলেখা শেষ করতে চাইব। লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে তাই; তবে পরে লেখা আরো বিস্তার করব কেমন সাড়া পাওয়া যায় সেই সাপেক্ষে!

    ইউরোপে প্রথম রিপাবলিক প্রতিষ্ঠাঃ
    সময়কাল হিশাবে বললে ইংল্যান্ডের ক্রমওয়েলের বিপ্লব [Cromwellian revolution] যেটাকে ইংলিশ সিভিল ওয়ার (১৬৪২-৫১) বলা হয়; তা সংগঠিত হয়েছিল রাজাকে উতখাত করে একটা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিশাবে। যদিও ক্ষমতাদখল সম্পন্ন হলেও একটা থিতু ব্যবস্থা হয়ে তা টিকতে পারে নাই; ফেল করেছিল।  সাধারণভাবে সারা ইউরোপের রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার সবগুলো প্রথম প্রচেষ্টার মত এটাও ফেল করেছিল। মানে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করেই টিকাতে বা থিতু হতে পারে নাই। রাজতন্ত্র আবার ফিরে এসেছিল। ফরাসী দেশে এসেছিল ১৭৮৯ সালের বিপ্লবের পরে। আর আগেই বলেছি আমেরিকার ক্ষেত্রে সেটা ১৭৭৬ সালে। যদিও ইউরোপ জুড়ে, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার চিন্তা তা দানা বাধা, পোক্ত হওয়ার সামাজিক তর্কাতর্কি মোটাদাগে সেটা ১৬০০ সালের পর থেকেই শুরু হয়েছিল। আর একটা নোক্তা দিয়ে রাখি (বিস্তারে যাব না এখন) যেটাকে আমরা কলোনিদখল বলে চিনি মানে যেটা আসলে সেকালের মত কোম্পানি বানিয়ে জাহাজ ( যুদ্ধজাহাজ ও দেশ দখলের উপযোগী) কিনে এরপর  কলোনিদখল ব্যবসায় নেমে যাওয়া – সেটাও শুরু হবারও কাল। প্রথম এমন দখল অভিযান ছিল ১৬০৭ সালে, আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia]। কিন্তু কেন  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার আলাপের মধ্যে এসব কথা কেন তুললাম?

    কারণ, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা নিশ্চয় খুবই ভাল কাজ একটা, অন্তত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধ বিবেচনায়। কিন্তু ওর সবচেয়ে কালো দিকটা হল নিজে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই করছে ঠিকই কিন্তু বিপরীতে আমাদের মত দেশগুলোকে একই সাথে জাহাজ কোম্পানি খুলে কলোনিদখল শুরু করেছে। এটাই ছিল সেকালের ইংল্যান্ডের প্রধান ও সবচেয়ে প্রফিটেবল ব্যবসা। কথাটা আরো সোজা করে বললে, ইউরোপের এমন আসন্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল কলোনিদখল ব্যবসা – একথাটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। তবু এভাবেই পশ্চিমাদেশে প্রথম রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল। পরে অখন্ড ভারত কলোনিদখল হয়ে গেলে রাজা রামমোহন রায় এর গুরুত্ব প্রথম আমল করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

    কিন্তু পরাজয়ের একটা কালো দাগঃ
    রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা কথাটা যত মহান কিছু মনে হয় এর প্রথম রূপটা তেমন মহান থাকে নাই। মানে হিন্দু দেবতা শিব গড়তে গিয়ে কারিগর বানর বানিয়ে ফেলা যেন!  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা ধারণার ব্যবহারিক রূপ হয়ে গেছিল  – আমরা একটা জাতি এমন একটা নেশন স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কাজ যেন তা। অথচ আমরা কেউ কোন এথনিক জাতি কিনা সেটা তো রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল না। কেন এমন হয়েছিল সেসব বিস্তারে এখন যাব না; তা আরেকটা পরের ভার্সানে বা বিস্তারিত লিখব। এই পরিণতির সারকথাটা হল রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা মানে হয়ে যায় জাতিরাষ্ট্র। মানে বাঘ হয়ে যায় বিড়াল!! তবে আমার এই কথার স্বপক্ষে এখন কেবল একটা ক্লু বা কিছু চিহ্ন দিয়ে যাব। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এর নাম অনেকেই শুনেছেন; যাকে শিক্ষকদের শিক্ষক বলেন অনেকে।  যত প্রগতিবাদী কুতুব আছেন – রেহমান সোবহান , আনিসুজ্জামান থেকে  যারা ১৯৮০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে ছিলেন এই অর্থে যারা কমবয়েসী কিন্তু একালে বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলেন এমন সকলেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে যার প্রভাবে গড়ে উঠেছেন। আর আহমদ ছফা যাকে নিয়ে যদ্যাপি আমার গুরু রচনা করেছেন। তবে আমার নিজের কানে শোনা আশির দশকে প্রগতিশীল জগত তাঁকে একজন মুসলিম লীগার বলে তুচ্ছ করতেন।  সেই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক সবসময় নেশন স্টেট বলতেন, তার রচনা পড়ে দেখতে পারেন। যা অবশ্যই ঠিক কোন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা তো নয়ই!
    আসলে আমার কথা সেদিকেও নয় তাই সেদিকে আর এখন যাব না। আমি আসলে নজরে আনতে চাচ্ছি যে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এর সেটা জাতিরাষ্ট্র ধারণা মানে,  সেটা কোন জাতীয়তাবাদ বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ধারণা কিন্তু নয় কিন্তু তা আমাদের মনে রাখতে হবে। কেন?

    জাতিরাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র এদুইয়ের ফারাক কীঃ
     অনেকেরই ধারণা জাতিরাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র  হয়ত একই কথা। চাইকি অনেকে মনে করতে পারেন  – জাতীয়তাবাদ শব্দ এটা তো অগ্রসর মানে প্রগেসিভ ধারণা!!! তাই এটা আরো ভাল!! কিন্তু  কারা এরা?
    বলাই বাহুল্য এই প্রগেসিভ [Progressive] এরাই মূলত প্রগতিশীল! যাদেরকে আরেকভাবে কমিউনিস্টদের লিবারেল ভার্সান বা আগমনি গান গাওয়া ছোটভাই মনে করা যেতে পারে।  তবে জাতিরাষ্ট্র ধারণাটা কেন বদলে গিয়ে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হলে গেছিল সে বিস্তারে এখন যাব না। কেবল বলব এটা প্রগতিবাদী চিন্তার দৌরাত্ম বা দুর্দশা! পাঠক নিজেও খুঁজে দেখতে পারেন।

    তবে কথা এখন অন্যদিক থেকে শুরু করব। উপরে বলেছি কবে ইউরোপের সকল রাষ্ট্র রিপাবলিক রাষ্ট্র হতে চেয়ে বাস্তবে তা জাতিরাষ্ট্র হয়ে গেছিল? আর এভাবে জাতিরাষ্ট্র -কেই যেন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা একই বলে মনে করা শুরু করেছিল? কিন্তু এরও তো একটা শেষ আছে। অর্থাৎ কখন সারা পশ্চিম ইউরোপ জাতিরাষ্ট্র গড়া শেষ বা একাজকে ফুলস্টপ বলে দিয়েছিল??  এর জবাবঃ  সেটা কে বলা যায় ১৯৪৫ সালের পরে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৫০ সালে ইউরোপের ৪৭টা রাষ্ট্রের এক সম্মেলন ডেকেছিল। সেটার নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ [Council of Europe – CoE].। আগ্রহীরা বিশেষ করে আইনের ছাত্রেরা এটা নিয়ে ঘাটাঘাটিতে গভীরে যেতে পারেন!  তবে সাবধান এর সাথে ইইউ [EU] বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই, একই নয়। সেই সম্মেলন থেকেই ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্র নিজেদের জাতিরাষ্ট্র এই জাতি-ভিত্তি থেকে সরে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রকে নয়া এক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র করে গড়ে নিয়েছিল। আর তা কার্যকর হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। কিন্তু তামাশার কথা হল যখন ইউরোপ অতিষ্ঠ হয়ে ওদের জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে ছুড়ে ফেলে দিল আর সেসময়েই তাদের সেই ছুড়ে ফেলে দেয়া  ধারণাকেই আমরা কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। অথচ আমরা কলোনি-মুক্ত হয়ে নিজেদেরকেই সেই জাতিরাষ্ট্র  হিশাবে গড়তে গর্তে ঢুকে গেছিলাম – যে গাড্ডার মধ্যে আমরা এখনও আছি। কোন ধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র শ্রেষ্ঠ নাকি উগ্র হিন্দুত্ববাদ-ই আনপ্যারালাল সবার উপরে এর তান্ডবকালে আছি আমরা

    প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়ঃ 
    কেন আধুনিকতার মধ্যে প্রগতিশীলতার কোন স্থান নাই, সম্পর্কিত চিন্তাই নয় – এনিয়ে কালকে আরেকুটা লেখা আলাদা করে দিবে। তাই এখানে সেদিকে যাচ্ছি না। কেবল সিদ্ধান্তটা ব্যবহার করব।
    তাই স্পষ্ট করে বললে, প্রগতিবাদিরা ঠিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার আগ্রহ নয়।  এদের কী করে চেনা যাবে?  একেবারেই সোজা। যারা রাষ্ট্র কী বা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা কী তা বুঝতে বা বুঝাতে একেবারেই আগ্রহী নয় – এরাই প্রগতিশীল।   এরা সম্পর্কটাও ধরতে পারে মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা এদের আরেক প্রিয় কিন্তু অর্থহীন শব্দ ও ধারণা আছে সেকুলার। তামাসাটা হল, এটা রিপাবলিক  এই মুখ্য লক্ষ্যের ধারণাই বুঝল না, নিজে এর আমল-যোগ্য হল না । অথচ অবুঝ-নাবুঝ সেকুলার আর  জাতিয়তাবাদ শব্দের জপ শুরু করে দিল।
    কেন এমন হয়ে গেল তারা? কারণ এরা মূলত প্রথমে ছিল হিন্দু জাতিবাদের সমর্থক যারা সত্তর দশকে এসে নিজের হিন্দুত্ব আড়াল করতে সেকুলার আর জাতিয়তাবাদ নিয়ে এসেছিল। এরা ক্লাসিক সেকুলারিজমের (১৬৪৮) কেউ নয়, এরা উপরে পালক লাগানো সেকুলার। এদেরকে চিনবার সবচেয়ে সহজ উপায় হল, এরা মনে করে কনষ্টিটিউশনে সেকুলার শব্দটা লিখে সেকুলার হতে হয়। যেটা কার্যত মুসলমান বিদ্বেষ। কথ্য ভাষায় বললে মুসলমান কোপানোর স্পৃহা! আর পরে এদেরই আড়াল ভাঙ্গা রূপ্টাই হচ্ছে মোদির বিজেপি – উগ্র হিন্দুত্ববাদ। বাংলাদেশে এটাই প্রগতিশীলতা! যা ইউরোপের প্রগতিশীলতা থেকে অল্প ফারাকের হয়ত!

    কথা আরো আছেঃ

    কমিউনিস্ট চিন্তা বা তাদের ভোকাবুলারিতে
    অধিকার [right] বলে কোন ধারণা নাই।

    যারা এখন ভোটাধিকার বা বাক-স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছেন এদের অনেকেই নিজেকে পরিচয় করাচ্ছেন যে ” আমি প্রগতিশীল লেখক” এই বলে!  আগে বলেছি প্রগতিশীলতা কমিউনিস্টদের সাথে সম্পর্কিত ছোট বা ভাইরাভাই!
    তামাসার কথা হল এরা একালে অধিকার নিয়েও কথা বলছে।  যেমন “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” এসবের কথা বলছেন। কিন্তু একেবারে পরিস্কার করে দেই, কমিউনিস্ট চিন্তা বা তাদের ভোকাবুলারিতে অধিকার [right] বলে কোন ধারণা নাই। “স্বাধীনতা” [freedom] বলে ধারণাও নাই।  এসব শব্দ ও ধারণা রিপাবলিক ধারণার অনুষঙ্গি ধারনা। সমাজে ব্যক্তিবোধ এর উত্থানের পরে এ’থেকেই অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি ধারণা উঠে এসেছে। তবে পাঁড় কমিউনিস্ট বা রিয়েল প্রগতিশীল যারা এরা বুঝেন ব্যক্তিবোধ এর উত্থান –  এটাও তাদের শব্দ-ধারণা নয়।  আসলে কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল রাষ্ট্র ধারণা হল রাষ্ট্র মানে  শ্রেণীর রাষ্ট্র। আর তারা কেবল শ্রমিক শ্রেণীর এক একনায়ক রাষ্ট্র গড়ার সৈনিক। যার সোজা মানে তাদের চোখের বাকি সব শ্রেণী (যাদেরকে বুর্জোয়া খেতাব দিয়ে) তারা এদেরকে গুম, খুন, উঠায় নিয়ে যাওয়া, গায়েব অপহরণ, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং সবকিছু করাই জায়েজ। [চীনে এখনও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রীরও  ভাগ্যে এমনটা একালেও হচ্ছে আর হওয়াটা এই চিন্তারই পরিণতি।]
    এজন্য অনেক বুদ্ধিমান কমিউনিস্ট নিরন্তর এক বিরাট দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেন এই বলে যে, একজন কমিউনিস্ট হিশাবে তিনি ১৯৭১ সালের এপ্রিলের রাষ্ট্রঘোষণায় থাকা তিন নীতি – সাম্য, ইনসাফ আর মানবিক মর্যাদা –  এটা সমর্থন করবেন কী করে? শ্রেণীর রাষ্ট্রবোধের কোন কমিউনিস্ট তো একাজ করতে পারে না।  শেষে এরা নিজের বিরুদ্ধে নিজেই চাতুরি করে তিন নীতিও ফেরি  হয়ে হাজির হয়ে থাকেন। অথচ এদের মন পড়ে থাকে তিন নীতির বিরোধিতায়!!

    আসলে মূল কথাটা হল গ্লোবাল পরিসরে ১৯৪৫ সালের পরে (আমাদের এদিকে) ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন ও দুই রাষ্ট্র হয়ে যাবার পর থেকে আগের  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ধারণাটাকে প্রথম জবেহ করেছিল কমিউনিস্টেরা, তাদের শ্রেণীর রাষ্ট্র-বোধ দিয়ে। এখানে একটা কথা মনে করিয়ে দেই তাহলে সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। খেয়াল করবেন ১৯৪৭ সালের পর থেকে কমিউনিস্ট জোয়ার উঠেছিল – বিশেষ করে ১৯৫৩ সাল থেকে –  যারাই  অধিকার, স্বাধীনতা, ভোট বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা তখনও বলত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চোখে এদের সকলকে তারা বলত ডানপন্থী বা রাইটিস্ট।  মানে তারা হল তারা নিজেদের বামপন্থি মনে করে তাই এই সাপেক্ষে এরা ডানপন্থী। তাই রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা বা স্বাধীনতা, অধিকারের কথা যারা বলে এরাই ডানপন্থি। আর বলাই বাহুল্য  বামপন্থী চোখে এরা নিচা চিন্তার মানুষ।  অতএব ডানপন্থিরা হল প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল।  এমনকি একালে বিডিনিউজ২৪, এরা “অধিকার” এই মানবাধিকার সংগঠনের আদিলুর রহমানের নাম লিখার আগে বিশেষণ যোগ করে তারা লিখেছে ডানপন্থি  আদিলুর রহমান শুভ্র। কারণ সম্ভবত মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা লোক তো প্রগতিশীলদের চোখে ডানপন্থী-ই!!!

    তাহলে এই লেখার সারকথাটা কী? সারকথাটা হল – যারা ‘ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা শব্দ ব্যবহার করতে চান তারা অবশ্যই তা করেন যত বেশি পারেন, অবশ্যই বক্তৃতা করেন। সেটা কড়ারই সময় এটা। কিন্তু যদি এটাই আপনার এখনকার রাজনীতিক অবস্থা হয়ে থাকেন তবে আর আপনি আর প্রগতিশীল নন। থাকেন না। একথাটা ভাল করে বুঝে নেন। আর যদি প্রগতিশীল থাকতেই চান,  ইউ আর ওপেন – তবে সেক্ষেত্রে আর  ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার বন্ধ করেন।

    আসলে একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা যদি বুঝে থাকেন তবে প্রগতিশীলতার হাত ছাড়তে হবে আপনাকে। কারণ, প্রগতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য ধারণা হল শ্রেণীর রাষ্ট্র । আর সেটা কেমন তা তো আপনারা বানিয়েই দেখিয়েছেন। গত পনেরো বছরে বাংলাদেশ যে গুম-খুন অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে হাজির হয়েছে সেটাই তো প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থনে গড়ে উঠা  শ্রেণীর রাষ্ট্র – এক মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর রাষ্ট্র – চেতনার রাষ্ট্র!  বাংলাদেশের বাকি অ-মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীকে গুম, খন, অপহরণ এর জন্য পারফেক্ট এক রাষ্ট্র – হয়ে আছে সেই থেকে। আর এটাই কী প্রগতিশীলতার সমর্থনে হাসিনার বর্তমান রাষ্ট্র-টা নয়?
    এজন্যই কী ২০১৪ বা ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে আমরা কোন  “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে সমাবেশ বক্তৃতা দেখি নাই…??????

    শেষ কথাঃ
    আমাদের কোন জাতিবাদ নয়, অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র এর পক্ষে দাড়াতে হবে। এটাই হবে আমরা সবাই নাগরিক এই একমাত্র পরিচয় – যেখানে আপনি আর কোন জাতিবাদের সমর্থক নন; অথবা কোন পাহাড়ি জুম্মু জাতিবাদ কিনা তাও  আর নন। সব ফেলে এই ভুখন্ডের সকলেই এক পরিচয় তারা সকলেই নাগরিক। শুধু তাই না। এর চেয়েও বড় কথা  নাগরিক অধিকার এর দিক থেকে সকলের তারা সমান। কেউ সংখ্যাগরিষ্ট বলে সে একটু বেশি অধিকারের বা সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য যাতে সে ফেলো নাগরিক এর উপর করতে পারবেন না – এমন বৈষম্যহীন ফলে সমান অধিকারের রাষ্ট্র হতে হবে সেটাকে। সেকুলার বলে কোন ধান্দাবাজিতে হিন্দুত্ববাদ বা এর আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা এখানে নিষেধ। এই সুযোগে ভারতের দালালিও নিষেধ।  রাষ্ট্র প্রসঙ্গে  ইত্যাদি এসব খুটিনাটি দিক নিয়ে আমাদের বিস্তর চিন্তা করতে হবে।

    এটা গণতন্ত্র শব্দটাও নয়। এটা অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের কাজ।  প্রশ্ন করতে পারেন করে দেখেন, ১৭৭৬ সাথে আমেরিকায় রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার (এক ফেডারল রিপাবলিক আমেরিকা রাষ্ট্র সেটা) পরে আরো পনেরো বছর পার হয়ে গেছিল। এরপরে আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে ফাস্ট এমেন্ডমেন্ট  এর মাধ্যমে কেন অধিকারের প্রসঙ্গগুলো আনা হলো? সেসব নিয়ে চিন্তা করে দেখেন।  আগেই কেন ছিল না? কার্যত সেই থেকে রিপাবলিক মানে যে তথাকথিত গণতন্ত্র নয় তা অন্তত পরিস্কার হয়ে গেছিল। কাজের রিপাবলিক ধারণাতে মনোযোগ দেন, গণতন্ত্র এই বিদ্ঘুটে ধারণাটা্র সাথে একে মাখায় ফেলবেন না, প্লিজ!

    এমন রাষ্ট্র যেখানে নাগরিক অধিকার বা মানবাধিকারের প্রশ্নে নাগরিকেরা সকলে সমান। এটাই হল আমরা যে যে ধরণের রাজনীতিই  অনুসরণ-চর্চা করিনা কেন সকলে এই রাষ্ট্রে সমান অধিকারের এবং আমরা প্রত্যেকের কাজেই  তাঁর যে অপর তারও আমার সমান অধিকার স্বীকার করে নেওয়া ও  প্রতিশ্রুতিবদ্ধতায় আসলে  সকলে আমরা সকলের কাছে আবদ্হধ থাকব এমন হতে হবে। এটাই আমাদের আমাদের কমন পয়েন্ট, তাতে আমাদের রাজনীতি ভিন্ন হলেও! অর্থাৎ মুসলমানদের মানবাধিকার নাই, মুসলমানে তো জঙ্গি – এসব ইতরোচিত ভাষ্যকে আমাদের পিছনে ফেলে সামনে আগাতে হবে!!! কারণ, জঙ্গি মানে অপরাধী কেউ হতেই পারে। এর জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় অনুসরণে যা হবে তা হতেই পারে। কিন্তু তা বলে রাষ্ট্র বা আদালতের চোখে তার মানবাধিকার নাই এটা মিথ্যা। আর এটাই মুসলমানবিদ্বেষ! এখান থেকে বের হতে হবে আমাদেরকে! আমাদের কমন পয়েন্ট আমরা সকলেই নাগরিক, সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক!  আমরা অপরের সমান অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে এক রাষ্ট্রগঠন করতে সক্ষম হলে অনেক মেজর সমস্যা থেকে সবপক্ষই মুক্তি পাব!!!

    আপডেটঃ  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; রাত ০৮ঃ ২৮
    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩; ভোর ০৬ঃ ৩৮

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…

    দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…
    গৌতম দাস
    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Zu

     

     

                         President Biden Holds a Press Conference

     

     

    শিরোনামটাই কত সুন্দর! “দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ……!”
    মানে ভারত ছেড়ে ভিয়েতনামে পালিয়ে -এরপর বাইডেন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন! সেখানে হোটেলে পৌচ্ছে যেন দশ মিনিট ভাল করে শ্বাস নিয়ে এরপরে সাংবাদিক ডেকে নিয়ে আসা হয় বাইডেনের সামনে! তাইতেই বাইডেন জানান ভারতে মোদি তাঁকে কথা বলতে দেন নাই। [কনফারেন্সের ভিডিও ক্লিপ এখানে – 4:04 থেকে মোদির প্রসঙ্গ] মানে  যেন একদম যাকে বলে চোকিং [choking] – একেবারে টুঁটি চেপে শ্বাসকষ্ট উঠিয়ে দিয়ে ছেড়েছেন!  হয়ত এতে প্রমাণ হয়েছে বাইডেন না, একেবারেই না! বরং, মোদি-ই বাইডেনের চেয়ে  বেশি পাওয়ার ফুল অন্ততঃঃ নিজ দেশে!!! ব্যাপারটা এরকমই কিছু একটা হয়ে মিডিয়ায় হাজির হয়েছে।

    আসলে হয়ত, মোদি যার নাম তামাসা না করে তিনি কী কোন কাজ করতে পারেন না? বোধহয় না! হলোও তাই!  এটা এখন পরিস্কার যে মোদি তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে জি২০ সম্মেলন চলার ফাঁকে সাইড লাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। যেটা খুবই স্বাভাবিক! কিন্তু যেটা মারাত্মক অস্বাভাবিক তা হল যে ঐ দ্বিপাক্ষিক সভার পরে – না যৌথভাবে, না মোদি নিজে একা অথবা বাইডেনকে – কোন সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেন নাই। আর এটাকে, মোদি তাঁর সাফল্য মনে করতে পারেন! তবে এটাই পারফেক্ট স্বৈরশাসকের আচরণ! কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বা এর শাসকের আচরণ না!  যারা পাবলিক শব্দের অর্থ বুঝে নাই তারাই প্রধানমন্ত্রী; এরই চিহ্ন এসব! অথচ পাবলিক শব্দ না বুঝলে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের অর্থ তিনি কী বুঝেন? বুঝতে পারবেন?

    কোন দুই সরকার প্রধান নিজেদের মধ্যে কোন বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলন করেন, করতে হয়। এই রেওয়াজ তাঁরা মানেন এজন্য যে তাঁরা কী আলাপ করেছেন এর একটা সারাংশ অন্তত – নিজ নিজ ‘পাবলিক’ বা জনগণকে জানানো তাদের দায়িত্ব আর এটা জনগণের দিক থেকেও সেটা জানা তাদের মৌলিক অধিকার! আর সেই ‘পাবলিক বা জন-অধিকার’ পূরণ করতেই বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়ে থাকে। কারণ, একমাত্র সাংবাদিকেরাই পেশাদারি ভাবে ঐ বক্তব্য জনগণের কাছে নিয়ে যাবেন। এই অর্থে এখানে সাংবাদিক মানেই জন আকাঙ্খার এক ধরণের প্রতিনিধি। কাজেই মিডিয়া মানে কেবল মিডিয়ার মালিক আর মিডিয়ার শান-সৈকতের সাথে মিডিয়ার আয়ের হিসাবের বড়াই মাত্র নয়!  পাবলিক ধারণাটাকে সার্ভ করা বা সেবা দেওয়াটাই মিডিয়ার প্রধান কাজ!  তবে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য না জানলে এসবের কিছুই বুঝা যাবে না। আর তখনই মনে হবে সাংবাদিক সম্মেলন করা না -করা প্রধানমন্ত্রীর বাপের ইচ্ছা অথবা এসবই প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল ও তাঁরই একক এক্তিয়ারের এলাকা যেন! কিন্তু কে কাকে বুঝাবে যে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য কী??? 

    তবে ঘটনা্টা মোদিকে বাইডেনের ভারত ত্যাগ করার ২৪ ঘন্টার  মধ্যে ভীষণ বিপদ আর বিব্রতকর অবস্থায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কারণ, ভিয়েতনামে পৌছেই বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলন করার কারণে সবকিছুই দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।  প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা লিখছেন, 

    “বাইডেনের সফরে সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল মোদি-বাইডেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর সে দেশের প্রথা অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে। যেকোনো দেশের নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করা যুক্তরাষ্ট্রের রীতি। সেই রীতি মেনেই গত জুন মাসে মোদির সফরের সময় হোয়াইট হাউস কাভার করা সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও সংক্ষিপ্ত, তবু সেই সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভারতীয় গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু সমাজের অবস্থান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়েছিল। গত ৯ বছরে মোদির শাসনামলে সেটাই ছিল প্রথম ঘটনা। দেশে-বিদেশে কোথাও তাঁকে প্রশ্ন করার যে অধিকার কাউকে দেননি, সেই প্রথম তা দিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সেটাই ছিল সফরের শর্ত।
    সেই শর্তের কথাই এবার যুক্তরাষ্ট্র মনে করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর কোনো রকম প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখোমুখি হতে মোদি রাজি হননি। ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রশ্নোত্তর পর্ব বা সংবাদ সম্মেলন—কোনোটাই করা হবে না। এমনকি প্রেসিডেন্ট বাইডেন আলাদাভাবেও কোনো সংবাদ সম্মেলন করতে পারবেন না। সিএনএন তা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রচার করেছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে না হলেও বাইডেন ভিয়েতনাম গিয়ে সফররত সাংবাদিকদের সেই অধিকার দেবেন”।

    আসলে বেচারা মোদি! তারও যে কী কষ্ট আর ঝামেলায় দিন কাটছে সেট মোদি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না!!!  তিনি গত একমাস ধরে হরিয়ানায় মুসলমান কোপানোর এক জরুরী কাজে, এসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত আছেন, সামনে নির্বাচন। হরিয়ানার গুরগাঁও এর নুহ [Haryana’s Nuh] এলাকাটা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী যোগী সেখান থেকে মুসলমান নিশ্চিন্ন করার “বুলডোজার পলিসি” নিয়েছেন বলা হচ্ছে। তা যেন কম কম দেখা যায় এজন্য এখানে প্রগতির পত্রিকাত দিক থেকে থেকে দেখেন, হরিয়ানায় মুসলমান অঞ্চলে এবার উচ্ছেদের হুমকি। এখন আপনারাই বলেন যে, অন্তত এই অবস্থায় সাংবাদিক কেউ যদি মোদিকে জিজ্ঞাসা করে বসে যে হরিয়ানার নুহ এলাকায় কী হচ্ছে? তখন মোদি কী বলতেন?? তখন হিন্দুত্ববাদকে এমন দেশি-বিদেশির সামনে পরা ইজ্জত কে বাঁচাতো? কাজেই এটা তো ‘হিন্দুত্ববাদের জাতীয় স্বার্থ’, প্রগতিবাদের স্বার্থ; তাই না? কাজেই কীসের সাংবাদিকতা আর পাবলিক? ফেলায় রাখেন সব!

    আর বাইডেন হাতের কাছে বা পাশে মোদিকে – সাংবাদিকের সামনে পেলে কী করতেন এর এক সহজ ভাষ্য বা চিত্রকল্প আমরা পাই ভিয়েতনাম থেকে। সেখানে মানে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পৌছে বাইডেন বলেছেন, “‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব আরও জোরদার কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যা আমি সব সময় করে থাকি, এবারও তা–ই করেছি। শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তুলতে মানবাধিকারকে সম্মান করা, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকা যে গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরেছি”। অর্থাৎ খুবই ভদ্রভাবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মোদি কেমন “দায়ীত্ববান জনপ্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রী”!
    কথাগুলো যত মোলায়েমভাবে বলা তাতে এর প্রতিটা শব্দ দিয়েই বাইডেন আসলে মোদিকে ছিড়ে ফালা-ফালা করে দিয়েছেন! মানে বাইডেনের পলিসি তো এখন আসলে সবার জন্যই এক।  আর সংক্ষেপে তা হল – মানবাধিকার রক্ষা করে চলেন, নাগরিক বৈষম্য করা ত্যাগ করেন নাহলে উনি স্যাংশন দিবেন।  বাইডেনের এই ওষুধ হাসিনার জন্য যা  তা এখন শক্তিমান ভারতের মোদির জন্যও তাই! এতে হাসিনা-মোদি সাক্ষাত হলে তারা একই নিঃস্পেষক বাইডেনকে বদ-দোয়া দিতে পারেন কিংবা নিজেরা পারস্পরিক সহমর্মিতায় গলা জড়াজড়ি করে কাঁদতে পারেন! কিন্তু বাইডেনের হাত থেকে তাঁরা কেউই ছাড় পাচ্ছেন না; কারণ, তাঁরা দুজনই বাইডেনের বন্দী যেন!

    ঘটনা হল অনেক কিন্তু তা্মাসা তবু আমাদের পিছু ছাড়ছে না! তাহলে হাসিনা-মোদি এরা দুজনেই যদি এভাবে একই বাইডেনের বন্দিশালার বন্দি হয়ে থাকেন তাহলে হাসিনার বন্দীমুক্তির সুপারিশ মোদী বয়ে নিয়ে বাইডেনের কাছে যাবেন – এই যে গল্প গত কমপক্ষে দুমাস ধরে এই সৌম বন্দোপাধ্যায়,  প্রথম আলো আর ওদিকে অগ্নি রায় আর ডয়েচ ভেলে, ডেইলি স্টার চালিয়ে গেল, তার কী হবে???? যেমন গত ১৮ জুন মোদির আমেরিকা সফরের চারদিন আগে সৌম্য প্রথম আলোতে লিখেছিলেন বাইডেন-মোদি বৈঠক, মোদির আলোচনায় থাকছে বাংলাদেশ । আর এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ডাহা মিথ্যাগুলো প্রথম আলোর সাথে মিলে প্রপাগান্ডা করা।  মানে এতদিন মোদির গোয়েন্দা বিভাগের ফান্ডের অধীনে থেকে এসব প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এবার সৌম্য লিখে গেছেন আর প্রথম আলো তা ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু এবার? এবার আর মোদির খিদমতের ফান্ড এর অধীনে না। এবার বাইডেন-রাহুলের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে মোদির আকাম ফাঁস করে দেয়া। তাই এবারে সৌম্যের লেখা ও প্রথম আলোর ছাপা বক্তব্যের শিরোনামঃ দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ভারত নিয়ে যা বললেন বাইডেন। মানে মোদিকে কবর দিয়ে সৌম্য আর প্রথম আলো এখন বাইডেন-রাহুল গান্ধী ক্যাম্পে গিয়ে উঠলেন! এতে ওদিকে, মাঝখান থেকে মোদি-হাসিনা দুজনেই ক্ষতিগ্রস্থ – তাতে কেউ কারও হয়ে একই বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবে বা মিথ্যা আশ্বাস পরস্পরকে দিবে সে মূরোদ আর কারো নাই!! কারণ, মোদির সুপারিশের ভান্ড ফুটা হয়ে, সব মিথ্যা উদাম হয়ে পড়েছে!!! এটাই তো হওয়ার কথা,  আর কত? আর তাই হয়েছে!!

    এনিয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্টই ভারতের মিডিয়ায় যা ছাপা হয়েছে, তা। যেমন ইন্ডিয়া  টুডে যেটা মূলত প্রো-মোদি সেটাও কংগ্রেসের জয়রাম রমেশের এক টুইট বা এক্স বার্তাকে উদ্ধৃত করে রিপোর্ট করেছেঃ “Na karunga, na karne dunga…’: Congress mocks PM over Biden’s speech in Vietnam”। মানে  মোদির হয়ে যেন জয়্রাম রমেশ বলছেন যে,  “মোদি নিজেও প্রেসের সাথে কথা বলবেন , না বাইডেনকেও বলতে দিবেন”।
    এই রিপোর্টাই বাংলা করে আমাদের TBS ছেপেছে। শিরোনামঃ ভিয়েতনাম গিয়ে বাইডেন জানালেন, নরেন্দ্র মোদিকে মানবাধিকার ও মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলেছেন। এক কথায় বললে, প্রায় পনেরো বছর ধরে প্রেস এড়িয়ে চলা মোদি এবার একেবারে বাইডেনের হাতে ধরা খেয়ে গেলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রেসের সাথে সম্পর্ক-মুলাকাত-বাতচিত থাকবে না এটা ছোট-বড় যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ইমেজের জন্য, তিনি কেমন শাসক তা বুঝবার জন্য – একটা সবচেয়ে কালো দাগ অবশ্যই! সেটাই মোদির গায়ে লেগে গেছে!

    একইভাবে কলকাতা থেকে কলকাতা টিভি-ও মোদির বিরুদ্ধে কড়া এক রিপোর্ট লিখে বলেছেঃ “……ভিয়েতনামে গিয়ে বৈঠকের বিষয় নিয়ে হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট”, যে লেখার শিরোনাম হলঃ মোদিকে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেছি: বাইডেন। এই রিপোর্টটা আসলে সাজানো হয়েছে – যত কড়াভাবে সম্পাদক মোদিকে বধ করতে পারবেন ততই পাবলিকের দৃষ্টি আকর্ষণ তথা কাভারেজ ভাল হবে মিডিয়ার – এই সুত্রে!

    তাহলে, মোদির শাসনের সমস্ত সঞ্চয় ইতি-ইমেজ সব কালো কালিতে ঢেকে গেছে – যেটার দেশের ভিতরে প্রভাব হয়ত ইজ্জত একটু ‘কম ডুবে যাবে’ ধরণের কিন্তু দেশের বাইরে মোদির ইজ্জত একেবারেই ম্লান হয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা মুল্যবোধের নুন্যতম চর্চা আছে এমন যেকোন দেশে। আর আমাদের দেশে মোদি ও হাসিনার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হল, মোদি হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ করে দিবে এই বকোয়াজ সেটা আর এখন লীগের কর্মি বাহিনীও বিশ্বাস করবে না। তারা শকড হয়ে যাবে! – সেটাই এখন এতই উদাম হয়ে গেল!

    বাইডেনের কাছে যে মোদির নিজের বেইল নাই সে করবে হাসিনার জন্য সুপারিশ? কিভাবে?

     

    আপডেটঃ   ২০২৩;

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    ।

     

     

     

     

     

     

     

     

  • ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি

    ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি
    গৌতম দাস
    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩   ১৯ঃ ৪৭ সন্ধ্যা
    https://wp.me/p1sCvy-4XV

     

           ‘চীনের উত্থান : উদ্বিগ্ন প্রতিবেশী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

    শাহরিয়ার কবীর এবার একেবারে ধরা খেয়ে গেছেন। এটা টু মাচ[too much] হয়ে গেছে; তিনি সীমা ছাড়িয়েছেন। এছাড়া, আরেকটু বারাবাড়ি করলে এবার হয়ত দেখব তাকে উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।হয়ত দেখব তিনি নিজেই লিখে দাবি করছেন যে তিনি বোবা হয়ে গেছেন!!! হা ব্যাপারটা আসলেই এতই সিরিয়াস!!
    বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন কী করে পার হবে, হাসিনা সরকার টিকে যেতে পারবেন কীনা এটা একটা অনিশ্চয়তা যা কেউই কী দাঁড়াবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারে; তাতে আপনি যে-পক্ষেরই লোক হন। তবে আপনি আত্মবি্শ্বাস দেখাতে পারেন, প্রপাগান্ডা করতে পারেন বা এমন পক্ষ-বিপক্ষ অনেক কিছুই! কিন্তু অন্তত পরবর্তি ছয়-সাত মাসের পরেই একমাত্র নিশ্চিত জানা যাবে যে ঠিক কী ঘটল। এর আগে দুপক্ষই প্রাণপণ নিজের পক্ষে চেষ্টা করে যাবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতি্তের কোন আন্দাজ ছাড়াই এমন সময়ে শাহরিয়ার ভারতের এক দালালির ঠিকাদারি নিয়ে এসেছেন। সেটা হল হাসিনা যেন চীন-ঘনিষ্ট না হন – ভারতকে ফেলে চীনা ঘোরতর সহযোগিতা নিতে না যান ইত্যাদি এমন সেসব প্রপাগান্ডা!
    এটা কে না জানে যে হাসিনা এই সংকটে নিজে যেকোনভাবে ক্ষমতায় টিকে যাবার চেষ্টা করবেন।  তাতে চীনের কোলে না কার কোলে উঠে এটা পার হবেন সেটা তো সেকেন্ডারি বিবেচনা!  প্রাইমারি বিবেচনা হল, সংকট পার হওয়া!  অথচ মামার বাড়ীর আবদারের মত ভারত বলছে  যে না তুমি চীনের কোলে উঠতে পারবা না!!!  আর শাহরিয়ারকে লাগিয়েছে ঠিকা দিয়ে এনিয়ে প্রপাগান্দা করতে! সব বিচারেই এটা অর্থহীন!  কারণ হাসিনার এক নম্বর বিবেচনা হল, ক্ষমতায় টিকে যাওয়া। আগেও তাকে টিকতে হবে। টিকে গেলে এরপরে যে হয়ত ভারতের জন্য কিছু করতেও পারে। অথচ ভারতের পোলাপানি আবদার হল যে না, হাসিনাকে সবার আগে ভারতের স্বার্থ মানতে হবে, বুঝতে হবে??? কোন সুস্থ মানুষ এভাবে চিন্তা করে না! আর এই অসুস্থ আর অবাস্তব চিন্তাটাকে বাংলাদেশে ফেরি করার ঠিকা নিয়ে এসেছে শাহরিয়ার কবীর! যেন ভারতের এই ঠিকা টা না পেলে বা নিলে আগামি বছর সে না খেয়ে থাকবে যেন এমন মরণপণ অবস্থ দশা তার!  যেন এক রেলওয়ে কুলি যে লাগেজটা বহন অযোগ্য কিনা তা বুঝবার অবস্থা নাই; বাসায় অভাব এত বেশি!!

    বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ানদের এক প্রকাশ্যে মহড়া হয়েছে গতকাল। এরা সরকারের ঘরে উঠে বসে থাকা লোকজন এবং এরা সরকারের ঘরে বসেই সরকারের বিরোধীতা করতে চাইছেন।
    এরা সরকারের ঘরেই বসে থাকা লোক এবং বাংলাদেশিই; কিন্তু প্রো-ইন্ডিয়ান এলিমেন্ট। ভারতের বাংলাদেশ নীতি দেখভাল করার ঠিকাদার বলা যায় সম্ভবত এদেরকে!
    গতকাল, এক পুস্তক প্রকাশনী বা “মোড়ক উন্মোচন” অনুষ্ঠান হয়েছে – পত্রিকার ভাষায় বললে, “মঙ্গলবার বিকালে প্রেস ক্লাবে “চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি” শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান” হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর (মানিক) রচিত এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় মূখ্য আলোচকের বক্তব্য দেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির”।

    বইয়ের নাম এর মধ্যে “উদ্বিগ্ন” শব্দটা আছে – আর সেই উদ্বিগ্ন প্রতিবেশিটা হচ্ছে বাংলাদেশ নয়, সেটা আসলে ভারত। কিন্তু সে তার সেই উদ্বিগ্নতা – এটা সে চালিয়ে দিতে চায় বাংলাদেশের নামে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বর্তমান হাসিনা সরকারের নামে।

    শাহরিয়ারের সারকথা হল – চীন খারাপঃ
    কিন্তু কেন খারাপ?
    ১। শাহরিয়ার বলেছেন,  … “এই বইয়ে  (চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি) প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে কীভাবে চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান রেখেছে। তখন স্লোগান ছিলো হিন্দি-চীনি ভাই ভাই। সেই সৌহার্দ্য থেকে কীভাবে সংঘাতে পৌঁছল…”।

    উপরে কথিত, চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান – এই তথ্য ভুল।  অন্তত গত ২০২২ ডিসেম্বরে কলকাতার প্রাক্তন সাংবাদিক ও গোয়েন্দার সংস্থার লোক সুখরঞ্জন দাসগুপ্তের এক লেখা ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় শিরোনামঃ চীন-ভারত সম্পর্ক কোন পথে। সেই লেখার ভাষ্য শাহরিয়ারের এই তথ্য সাপোর্ট করে না।

    আর খুবই অল্পকথায় বলতে ঘটনাটা আসলে, ১৯৬০ সালে  চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ট করতে নেহেরু চৌএনলাইকে কলকাতায় এনেছিলেন। আর সেখানকার শ্লোগান ছিল হিন্দি-চীনি ভাই ভাই অথবা নেহেরুর পঞ্চশীলা নীতি ইত্যাদি। তাই এটা না চীন (১৯৪৯) না ভারত (১৯৪৭) এমন কারো স্বাধীনতায় কারো অবদানের ঘটনাই নয়।   আর সেটা আবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (1953 to 1961) আইসেনহাওয়ারের আমল। যিনি বিখ্যাত বা কুখ্যাত – সিআইএ পাঠিয়ে দেশ দখল- এর কারণে। তিনি নেহেরুকে পটিয়ে তিব্বতের দালাইলামাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদেরকে মাও-বিরোধী ততপরতায় সহায়তা দিতে সি আইএ পাঠিয়েছিলেন ভারতের মাধ্যমে – যারা ভারতে থেকে এই ততপরতা করবে। কিন্তু মাও এর সরকার এসব টের পেয়ে যখন সামরিকভাবে ধাওয়া দেন তখন সিআইএ দালাইলামাকে সাথে নিয়ে তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে পর্যন্ত তুলে দিয়ে গেছিল। কিন্তু  তাদের ভারতে প্রবেশ,  সেটা ভারতের হিমাচল প্রদেশ দিয়ে নয় যেখানে এখন দালাইলামা আশ্রিত। সিআইএ অনেক ঘুর পথে আসামের দিশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল। আর চীনারা সেই ধাওয়া করতে এসেই তারা পুরা আসাম দখল করেছিল আর একমাস একদিন পরে নিজেরাই তা ছেড়ে দিয়ে চীনে ফিরে যায়।
    কাজেই শাহরিয়ারের উচিত একটু কষ্ট করা নেট ঘেটে দেখা সস্তা ভারতীয় যা মনে চায় লিখাগুলোর ফাঁদে না পরা!

    ২।  শাহরিয়ার ঐ সভায় বলেছেন, “…এদিকে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে চীন কাউকে সাহায্য করেনি। তাই চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে”।
    এখানে হঠাত করে চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব – এর কথা বললেন কেন? বললেন কারণ “শাহরিয়ার ভারতের স্বার্থপন্থী” হয়ে এবার উলটা হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছেন। আর তা বলছেন যেন ভারতের মুখপাত্র হয়ে যে, হাসিনা আপনি – “চীন ও ভারত দুদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন – এটা বাংলাদেশের জন্য বিপদ আনবে। তাই হাসিনা,  সেটা না করে আপনি কেবল ভারতের সাথে লেগে থাকেন”। ভারতের এমন খায়েসটা ভারত শাহরিয়ারকে দিয়ে অভিযোগের আকারে তুলিয়েছে।

    এতা বলাই বাহুল্য আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে হাসিনা ভীষণ আমেরিকান চাপে আছেন। কোনভাবে একটা নির্বাচন হয়েছে আর তিনি আবার জিতেছেন – এটা ঘোষণা দিতে পারলে এরপর বাকিটা মানে আমেরিকান পরের চাপ ডিঙিয়ে টিকে থাকার ব্যপারে চীন তাকে সাহায্য করবে – এমন একটা ঝাপসা বয়ান বাজারে চালু আছে।
    এটা আদৌ সত্য কিনা তেমন ডকুমেন্ট অর্থে তা কেউ দেখেছে জানা যায় না। কিন্তু মোদির ভারত এই ঝাপসা বয়ানের ভিত্তিতেই হাসিনা বিরোধিতা শুরু করেছে বা প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। আর এটাই এসব কথা ঢাকায় চালু হবার পিছনের কারণ।  আর এসব প্রপাগান্ডাই বাংলাদেশে চীন-হাসিনা বিশেষ সম্পর্কের রহস্য হয়ে ঝাপসা বয়ান হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।  শাহরিয়ারের এই বক্তৃতা সেই (ঝাপসা বয়ান ছড়ানোর) ততপরতারই একটা অংশ! তবে মোদি এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে এর কারণেই, বাংলাদেশকে ব্রিকসে উঠতে দেয় নাই – মনে করা সম্ভবত ভুল হবে না!। যদিও মুখে মুখে বা প্রকাশ্যে হাসিনা-মোদির মধ্যে এখনও অনেক ভাব – সেটাও জারি আছে। হাসিনা জি২০ এর সভায় যাচ্ছেন। অতএব সারকথায় ভারতের চোখে চীন খারাপ – একথাটাই এখানে শাহরিয়ার বলছেন। অথচ শাহরিয়ারের এই ততপরতাই বলে দিচ্ছে ঝাপসা বয়ান ভাষ্যটা ভারতের। যেটা শাহরিয়ার ফেরি করতে এনেছেন।

    ৩। শাহরিয়ার আরো বলছেন, চীনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে শ্রীলঙ্কা, এর আগে একইভাবে পাকিস্তানও ঋণের ফাঁদে পড়েছিল। অথবা আরও সার করে অন্য জায়গায় বলেছেন, “চীন ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার আগে ভাবতে হবে”।
    শাহরিয়ারের প্রথম মন্তব্য ঋণের ফাঁদে প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বেলায় সত্যি নয়। পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রশ্নে চীনের ঋণ তৃতীয় বড় ঋণ। তা এনিয়ে আর কথা বাড়াবো না। তবে পরের কথা যেটা বলেছেন এটাই সঠিক আর এটাই মুখ্য সুত্র যে “ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা” । তবে আমি কেবল ‘ভূরাজনৈতিক’ এই আধো-বোলের আন্দাজি শব্দটা ফেলে দিব। বদলে “গ্লোবাল ইকনমি” বলব।  আর পরের আধিপত্য শব্দটা ফেলতে বলব না তবে অর্থ আরো খুলবার জন্য সাথে প্রভাব বিস্তার শব্দটা লাগিয়ে নিতে বলব। আর কথাটাকে এবার সাজিয়ে বলব – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ঋণ দেয়া ঠিক তা নয় বরং, এটা সারা দুনিয়াকে ব্যাপক অবকাঠামো ঋণ দিবার মুরোদ – এটা এসে গেলে একটা দেশ এটা দিয়েই এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়ে উঠে – এভাবে বলব।
    যেমন ধরেন ভারত একই চীনের পথে হাটে না কেন? কারণ ভারতের অর্থনীতির সেই মুরোদ নাই, এখনও হয় নাই। আবার তাহলে এর আগে আমেরিকা কী করেছিল? হা ঠিক আজ চীন যা করে নেতা হতে চাইছে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকা ঠিক সেকাজ করেই গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। এমনকি মোদির ক্ষমতার প্রথম পাঁচ বছরে ভারতেও চীনা ঋণ কত অথবা এমনকি মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালিন গুজরাতে চীনা ঋণ কত ছিল – সেসব তথ্য মোদি লুকিয়ে রেখেছে কেন? পারলে তা বের করেন!!!!
    ভারত চীনা প্রভাবের বিরোধী হতেই পারে। কিন্তু তা বলে শাহরিয়ার চীনা ঋণ খারাপ বা অনৈতিক ধরণের বাজে কথা – এসব তার না করাই ভাল!
    মনে রাখবেন হাসিনা যে সর্বক্ষণ উন্নয়নের গল্প শুনাচ্ছে এই ‘উন্নয়ন’ আর (চীনের দেয়া) অবকাঠামো ‘ঋণ’ – এদুটা একই কথা – দুদিক থেকে দেখে বলা। হাসিনা চীনা-ঋণ না পেলে বা নিলে কী করত???  ভারতের ঋণ নিত? ভারতের সে মুরোদ আছে????? একারণে, শাহরিয়ারের এসব কথা ফালতু কথা!!! আজাইরা ভারতকে চীনের উপরে – যেন বিশাল মুরোদের এমন গল্প ছড়াতে এসেছেন। অথচ এসব অর্থহীন!!!

    ৪। শাহরিয়ার আরো বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের ব্যবহৃত সব বুলেট চীনের: শাহরিয়ার কবির”। শাহরিয়ারের  এসব শুরশুরি উস্কানে আবেগ আওয়ামি লীগারেরাও খাবে না; প্রগতিবাদীরাও না। শাহরিয়ারের এটা হয়েছে আসলে পোপের চেয়েও বেশি খ্রীশ্চান হতে চাওয়া যেন! অনেক দেশেরই স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রু-মিত্র অনেক রকম ছিল, থাকে। ছিল বলছে মানে হল সেটা ধরে আজীবন বসে থাকা অবাস্তব চিন্তা। যেমন ধরেন ভিয়েতনামের (স্বাধীনতার যুদ্ধে) চেয়ে বড় আমেরিকান নিষ্পেষণ খুব কম দেশের ইতিহাসে আছে। এজেন্ট অরেঞ্জ (Agent Orange) শব্দটা গুগলে যেকেউ সার্চ দেন দেখেন কী বের হয়, কী এটা! এই কেমিক্যাল উড়োজাহাজ থেকে ছিটিয়ে ভিয়েতনামের গভীর বনজঙ্গল সব সাফ করা হয়েছিল যাতে বিদ্রোহিরা বনে লুকাতে না পারে; কারণ এই কেমিক্যাল toxic, plant-killing chemical (herbicide)।
    কিন্তু মানুষের জীবনের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ, যেদিকটা সকলেই উপেক্ষা ক্করেছিল। ভিয়েতনামিজদেরকে আমেরিকা মানুষ মনে করে নাই! এতই তীব্র ছিল তাদের নিজ স্বার্থবোধ। কারণ এটা মানুষের জীবনে cancer, congenital (birth) disorders and life-threatening health complications. নিয়ে আসে। আজও ভিয়েতনামের কোন দম্পতি জানে না যে তাদের বাচ্চা জন্ম নিতে গেলে কেমন বিকলাঙ্গ হবে – হাত স্বাভাবিক কিন্তু হঠাত করে কবজি থেকে  বা কনুই এর পর থেকে তা আর নাই, একইভাবে পা নাই – সারকথায় ডিফেক্টিভ বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে এখনও যার কোন প্রতিকার নাই।  কিন্তু এই ভিয়েতনামেরই আজ সবচেয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক ভাল আমেরিকার সাথে; অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য!  এখন এর মানে কী ভিয়েৎনামিজরা খুব খারাপ!
    শাহরিয়ার  আপনি ভারতের স্বার্থে দালালির ঠিকাদারিতে বাংলাদেশের মানুষকে আবেগ-ইমোশনাল করে শুড়শুড়ি তুলার চেষ্টা করছেন? এখন বলেন কোনটা খারাপ? ভারতের কাছে আবার বেচবেন?  বাংলাদেশের  মানুষের আবেগ চটকাচ্ছেন কেন???

    ৫। শাহরিয়ারদের এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ফ্লপই হবে। ভারতের অর্থের অপচয়ই হবে। কারণ শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতার ঠিক নাই।
    এটা বলাই বাহুল্য যে যারা বাংলাদেশে এখন হাসিনাবিরোধী তারা শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ নয়। আর এমনিতেও বাংলাদেশের আম-মানুষ তারা খোদ শাহরিয়ার এন্ড গং এমন যেকারো বিরোধী সেই শাহবাগের দিন গুলো থেকেই। তাহলে শাহরিয়ারের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ কারা? যারা হাসিনার পক্ষের হাসিনার দলীয় লোক এরা? অথবা যারা ঠিক দলের নয় তবে লীগের সুবিধাভোগী? এরা?

    এরা শাহরিয়ারের কোন কথাতেই কান দিবে না তাতে তা যতই খোদ ভারতের স্বার্থকে প্রগতিবাদী জামা পড়িয়ে হাজির করলেও। এর মূল কারণ, এরা কেউই  ভারত ছেড়ে চীনের কোলে (হাসিনার) উঠাকে খারাপ ভাববে কেন? কোন কারণ নাই। এটা সারভাইবাল বা মরিয়া আত্মরক্ষার পর্যায়! এছাড়া এটা খারাপ ভাবার মধ্যে তো তাদের কোন স্বার্থই নাই!!! বরং হাসিনা টিকে গেলেই তাদের স্বার্থ!
    এছাড়া হাসিনার নেক নজরে যে আছে, পড়েছে একবার – সেই আবার এখন হাসিনাবিরোধীতা দেখাবে????? কেন? বরং হাসিনা এযাত্রায় টিকে গেলে তারা খুশি হবে। আর সেটা চীনের হাত ধরে কিনা তাতে তাদের কী এসে যায়? – সেটা কী তাদের জন্য কোন আপত্তি হবার কিছু????
    সারকথায় শাহরিয়ার গংদের পক্ষে এখন দাঁড়াবার কেউ নাই।তাদের বয়ান শুনবার মত কোন সামাজিক গ্রুপই এখন আমাদের সমাজে নাই।  এটা তো ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাইয়ের যুগ  একেবারেই নয়! যে প্রগতি-ওয়ালারা ঝাপিয়ে পড়বে!   আসলে শাহরিয়ার গংয়েরা সবাই   তারা এমন এক ভারতীয় ইচ্ছা-স্বার্থ ফেরি করার ঠিকা নিয়ে আসছেন যেটা এখন বাংলাদেশের কেউ খাবে না। আর বেশি বারাবাড়ি করলে হাসিনার উপর দিয়ে কথা বললে এরা নিজেরাই কেউ তাদেরকে ‘উপড়ে ফেলে দিবে’ – এমন রিস্ক নিচ্ছেন তারা।

    আর এটাই এক শাহরিয়ার কবীর আর ঐ বই লেখক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) ছাড়া ওখানে আর যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা কেউই  – হাসিনা চীনা-ঘনিষ্ট হয়েছেন বা আরো হতে পারেন – এনিয়ে কোন অভিযোগ করে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। বরং সকলেই ভারসাম্য রেখে কথা বলেছেন। সারকথায় হাসিনাকে চটাতে চাচ্ছেন না -চটে যাক এমন কথা কেউ বলছেন না – যার সোজা মানে তারা সবার আগে হাসিনাকেই ছুয়ে থাকতে চান, আনুগত্য ঠিক রাখতে চান – এটা পরিস্কার রেখেছেন!!!

    ওখানে আর যারা বক্তৃতা দিয়েছেন তারা হলেন, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার ইত্যাদি কেউই ভারসাম্য না রেখে কথা বলেন নাই।  যেমন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার। তিনি বলেন, চীন নিজের শক্তিতে উত্থান করেছে। চীনকে আমরা উপেক্ষা করতে পারবো না, তাই তাদের জানতে হবে। চীন যে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে- এতে সংঘাত অনিবার্য। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এই সংঘাত এড়াতে সচেষ্ট হতে হবে।

    এখন সবশেষে একটা কথা মনে করিয়ে দিব। কথিত হাসিনা-চীন আশ্বাস সেটা যদি সত্যিও ধরে নেই, তবুও এই সহায়তা পাওয়া তো শর্তযুক্ত। সে শর্ত বা বাস্তবতা বা যদির কথাটা হল,  যে হাসিনা সরকার চীনের সহায়তা পাবার পুর্বশর্ত  পুরণে নিজেকে কোনমতে করা একটা নির্বাচন দেখিয়ে নিজেকে বিজয়ী করতে পারতে হবে আগে। তবেই না এসব জল্পনা-কল্পনা!  কাজেই মোদির ভারত বা শাহরিয়ারের দালালির ঠিকাদারিতে  কি বললে এটা নিয়ে আমাদেরও এতে মনোযোগী হবার মত কিছুই নাই।  তবে এই লেখায় যা করা হল, তা হল, শাহরিয়ার গং যে মোদির ঝাপসা বয়ান টার উপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সেটাই খুলে দেখিয়ে দেয়া!! এতটুকুই!

    একটা কথা লিখতে চেয়েছিলাম বাদ পড়ে গেছে। আগামি এক বছরের মধ্যে এটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি-তে কেউ না, কোন ফ্যাক্টর না। এটা ২০০৭ সালের আগে বাংলাদেশের কাছে যেমন ভারত ছিল, এটা সেই ভারত হয়ে যাবে। এর মূল কারণ, এখনো আমেরিকা ঘোষণা না দিয়ে যেটা করে যাচ্ছে তা হল – চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিতে ভেট-উপহার হিশাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। বাইডেনের আমেরিকা সেই অবস্থানের ফাইনাল বদল বা সমাপ্তি টেনে দিলেও সেটা তিনি এখনও পাবলিক ঘোষণা দিয়ে করেন নাই।  অন্য আরেকটা ফ্যাক্টস হল, হাসিনা এখনও ক্ষমতায়। একারণে, মোদি  মিথ্যা ভাব ধরার সুযোগ নিতে পারছেন যেন ভারত এখনও আমেরিকার দেয়া খবরদারিটাই ব্যবহার করছে; সেটা তার যেন অটুট আছে। অথবা মোদির ভারত যা বাংলাদেশে করে মাতবরি দেখায় তা আমেরিকা অনুমোদিত অথবা মোদির ভারত চাইলেই সে আমেরিকার কাছে হাসিনার পক্ষ হয়ে সুপারিশ করতে পারে ইত্যাদি। অথচ  এসবই ভুয়া ভিত্তিহীন। আমেরিকা যা কিছু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে  ২০০৭ সালে ভারতকে দিয়েছিল  সেসবই প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু হাসিনা এখনও ক্ষমতায় আছে বলে মোদি এই মিথ্যা ভাব ও অভিনয়টা এখনও করে যেতে পারছে। একারণেই অগ্নি রায়েরা মিথ্যা কথা বলে করে খেয়ে যেতে পারছে।

    আগামি এক বছরের মধ্যে এই জিনিষটাই এই মিথ্যা ভাব ধরা – এটাই উন্মুক্ত হয়ে যাবে যে বাংলাদেশের উপরে ভারত কেউ না। আর আমেরিকাও এমন কোন কর্তৃত্ব বাংলাদেশের উপর খাটাতে ভারতকে দেয় নাই; ফিরিয়ে নিয়েছে। এসবই স্পষ্ট উদাম হয়ে যাবে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠান শেষ ফলাফলও প্রকাশ হয়ে যায় – এর পর থেকে।  ভারত কেউ না হয়ে যাবে। বাংলাদেশের উপর প্রভাব থাকবে কেবল আমেরিকা ও চীনের। একা ভারত, সে না আমেরিকা না চীনের ঘনিষ্ট থাকবে বা হবে। তবে ভারতের উপর আমেরিকান চাপ বাড়ার সম্ভাবনা (একেবারে বাংলাদেশের মত না হলেও ভারতের উপর আমেরিকার সাব-অর্ডিনেট হওয়ার চাপ বাড়বে) আর সে পরিস্থিতিতে ভারত হয়ত চীনের কোলে উঠতে চাইতে পারে।   ঘটনা যে দিকে গিয়েই থিতু হোক না কেন ভারত বাংলাদেশ কেউ না হয়ে যাবে ক্রমশ!! এই সম্ভাবনা এখন আমরা ক্রমশ উন্মুক্ত হতে দেখছি!

     

     

    আপডেটেডঃ   ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩;  রাত ০২ঃ ১৯ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি

    বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি
    গৌতম দাস
    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4WN

                                                                                         Caught in a cleft stick

    [রাজশাহী অঞ্চলের কিছু বিশেষ এক্সপ্রেশন-শব্দাবলী আছে – “মামু, কাকে লেড়েছো? সে খবর লিয়েছো?”
    খুবই কমিউনিকেটিং একটা আঞ্চলিক পদবাচ্য বটে! মানে হল, যা যথেষ্ট বুঝো নাই তা নিয়ে কথা বলতে গেছো কেন? এমনই কিছু অর্থ বিতে পারে এই ভাষ্য!
    চন্দন নন্দীর লেখার দশা হয়েছে তাই। তিনি এক অনিয়মিত সাংবাদিক, যার একটা লেখা আমাদের বিডিনিউজ২৪ মিডিয়া ছাপানোর পরে সবই ব্লক করে রাখা আছে। আজকের লেখা সেই প্রসঙ্গের ভাল-মন্দ দিক নিয়ে।
    বিডিনিউজ সরকার বা ভারতের ঘনিষ্ট বলে এমন এক পরিচিতি কারো কারো চোখে থাকা সত্বেও – এটা বিডিনিউজের দ্বিতীয়বার ব্লকড হওয়া, প্রথমটা ২০১৮ সালের। কেউ কোন একটা লেখা নিয়ে আসলেই সেটা বিডিনিউজ ছেপে দিবে তা হওয়ার কথা না। যেকোন লেখাই লেখা ছাপবার অনেক দায়দায়ীত্ব আছে। সেসব পূরণ ও পালন হচ্ছে কীনা সেসব দেখাও যেকোন দায়ীত্বশীল মিডিয়ার কাজ।  আবার কোন মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া – এটাও খুব ভাল লক্ষণ না। ভাল সামাজিক প্রাকটিস নয়! তবে বাংলাদেশে আমরা এখন এমনই খারাপ অবস্থায় যে কোন নীতি-পলিসি বা তত্বকথা শুনার সময় নাই কারো। সবাই ক্ষমতা কেন্দ্রিক চিন্তা  ও ততপরতায় ব্যস্ত! এই অবস্থায়, চন্দন নন্দীর লেখা আলোচনার প্রসঙ্গ!]

    গত কয়েকদিন ধরে অনেক বিদেশী পত্রিকা, যার একটা বড় অংশই ভারতের মিডিয়া, তারা যা কিছুই লিখছে তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু থাকছে। ফলে চরম উন্মুখ উৎকন্ঠায় থাকা এখনকার বাংলাদেশের মানুষ সবকিছুর উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তাদের কান খাড়া সবদিকে! তাই মুহুর্তেই সব ব্যক্তি জানাজানি সামাজিক হয়ে যাচ্ছে। এমন লেখাগুলো  যাদের মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমসে মুজিব মাশাল [Mujib Mashal] নামের একজন যার লেখার শিরোনাম “নীরবে ধ্বংস করা হচ্ছে একটি গণতন্ত্রকে, বাংলাদেশে কাঠগড়ায় মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ [Quietly Crushing a Democracy: Millions on Trial in Bangladesh]”। যেটা আবার আমাদের মানবজমিন অনুবাদ করে ছেপেছে (লেখকের মুজিব মাশাল নামের বাংলা বানান আমি মানবজমিন -এরটাই অনুসরণ করেছি)।
    এই মুজিব সাহেবের লেখার প্রসঙ্গ তেমন কিছুই নতুন না, আমাদের আদালত পাড়ারই ঘটনা যা আমরা ফাঁসি ফাঁসি, ফাঁসি চাই এর সেকাল থেকে এপর্যন্ত  সব দেখছি, সহ্য করে চলছি। তবে এখন নতুন কেবল এতটুকুই যে এই মুজিব সাহেব এবার এদিকে চোখ ফিরিয়েছেন। কাজেই এনিয়ে আমাদের মন্তব্য একটাই যেটা উনি নিজে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন যে উনি এখন কেন, কী মনে করে এদিকে ফিরলেন!  তার সব প্রশ্নের জবাব ওখানেই আছে!!  আর আমরা ভিকটিম এর বেশি কী বলতে পারে!! শুনেছি ভিক্ষার চালের গুনাগুণ নিয়ে আলোচনা চলে না। অতএব আমাদের এমন সময়ে আমাদের নিয়ে, মনোযোগ ফিরানো সবাইকেই স্বাগত!

    সাথে আরও আছে; মানে আছে ভারতীয় এক চন্দন নন্দীর লেখা। এ’লাইনে পুরানা লোক; ২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশ নিয়ে এখনকার মত বেশ ততপরতা দেখিয়েছিলেন। অনেকের মনে হত, তিনি ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের সাথে কানেকটেড লোক তবে, পুরানা কংগ্রেসি কোণায় পরে থাকা ধারার। আর সবচেয়ে বড় কথা সাংবাদিকতার চেয়ে পাগলামি করেন বেশি। আর তাঁর পাগলামিটাই অপ-সাংবাদিকতা হয়ে যায়।  তার এবারের লেখার শিরোনামঃ বিভক্ত দুপথের মাথায় আটকে যাওয়া [Caught in a cleft stick]। ঐ লেখার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে এই লেখা আগে বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। [যে ভার্সানটা আমার হাতে তা নর্থ-ইস্টের এক ওয়েব-সাইট থেকে নেয়া। আর বলে রাখি ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন ওয়েব-সাইট মানে এরা কম-বেশি গোয়েন্দা ফান্ডেড।] এই সাইটে লেখাটার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে লেখাটা আমাদের বিডিনিউজে প্রকাশিত হবার দুঘন্টা পরেই নাকি বিডিনিউজের বাংলা ও ইংরাজি ওয়েব সাইট এটা আর বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শকেরা কেউ দেখতে পারছে না, ব্লক করে দেয়া হয়েছে।  কথা কতদুর সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে ভারত থেকে নয়,এমন, অন্য-বিদেশ থেকে অন্তত ইংরাজি বিডিনিউজ তারা দেখতে পাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

    [This article by Chandan Nandy first appeared in Bangladesh’s premier news portal www.bdnews24.com earlier this morning. In less than two hours after the article’s publication, both the English and Bengali websites of bdnews24.com was blocked for viewers/readers in Bangladesh as well as India]

    তবে এটা বাংলাদেশে মানে আমাদের বিটিআরসি [BTRC] থেকে ব্লক করে দেয়া অসম্ভব নয়। বরং দেয়াটাই আমার কাছে স্বাভাবিক পরিণতি মনে হয়!

    চন্দন নন্দীর আরেক দিক থেকে পরিচয়ঃ
    বাংলাদেশে এটা প্রতিষ্ঠিত যে গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেবার একটা নিশিভোট বা রাতের ভোট হয়েছিল। মজার কথা হল এনিয়ে চন্দন নন্দীর স্টেক কী? এই পাগলের হাল কী? মানে ঐ নির্বাচন নিয়ে এর ততপরতা বা বয়ান কী ছিল?  কারণ, আজকের মত ২০১৭ সাল থেকেই সে বাংলাদেশ নিয়ে সক্রিয় ছিল, কোন একটা  পত্রিকা [মালয়েশিয়া থেকে প্রকাশিত সাউথ এশিয়া মনিটর নামে। southasianmonitor.com] এর সাথে সম্পর্কিত থেকে। পত্রিকাটা এখন খোলা দেখালেও সাইটটা আপডেট হয়না এভাবে খোলা আছে।
    কিন্তু যেটা এখন  গুরুত্বপুর্ণ তা হল, ২০১৮ আলের নির্বাচন হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর। আর এর পরের দিন চন্দন নন্দী নিজের টুইট একাউন্ট থেকে একটা টুইট করেছিলেন ৩১ডিসেম্বর ২০১৮, যেটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তার সে টুইট একাউন্ট এখন খোলা যায় না। কিন্তু সংগ্রহ করে রেখে দেয়া একটা স্ন্যাপ সর্ট এখানে দিচ্ছি। ছবিতেই যা কথা বলার বলে তাই কোন বর্ণনা দিলাম না।

    কেন চন্দন নন্দীর লেখা বা বিডিনিউজ ব্লকডঃ
    এককথায় বললে, চন্দন নন্দীর লেখা জার্নালিজম হয় নাই। মানে এর নুন্যতম নীতি অনুসরণ করে নাই। এই লেখাটা শুধু ভুয়া নয় বরং প্রমানিত মনে করা যায় এমন কোন সোর্সের উল্লেখ তিনি করতে পারেন নাই, অথচ যা খুশি লিখে গেছেন; সে কারণে।

    এখন পালটা অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কিছুদিন আগে আনন্দবাজারের অগ্নি রায় এর লেখা ও পরে যা ডয়েচ ভেলে তে ছাপিয়ে এরপরে তা প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল – সেই লেখা ও ততপরতাগুলোও তো জার্নালিজম ছিল না। তাহলে তাদের বেলায় আমাদের সরকার ‘কোন ব্লক করা’ বা কোন বাধাই দেয় নাই কেন?  এককথায়, এনিয়ে অনুমান করা জবাব হল, অগ্নি-আলো-স্টার এভাবে – এই গোষ্ঠির ততপরতাটা ছিল সরকারের পক্ষে যায় এমন প্রপাগান্ডা, আর বুঝাই যাচ্ছিল যে এটা দুদেশেরই সরকারের “জানাশুনা” লোকের মাধ্যমে ঘটানো কাজ। কিন্তু সেই মিথা প্রপাগান্ডা বাংলাদেশের সরকারি দলের কর্মিদের মনোবল বাড়াবে – এই মশলা আছে মনে করেছিল বলেই সম্ভবত তা চলতে দেয়া হয়েছিল – এটাই সম্ভাব্য কারণ বলে অনুমান!

    অথচ বিপরীতে চন্দন নন্দী – সবকিছুতেই তিনি একা, একাই সব। এমনিতেই সব সময় তার ভিতর একটা ঝোঁক দেখা যায় যে “তিনি সাহসী – সাহসী জার্নালিজম করেন” – এই আত্মম্ভরিতা বা নিজের সম্পর্কে অতি আত্মবিশ্বাসী ও মিথ্যা উচু ধারণা পোষণ করে লিখে থাকেন। সম্ভবত এই ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ অথচ ভিত্তিহীন সাহস দেখাতে গিয়ে  তিনি আলোচ্য লেখাটা লিখেছেন বাংলাদেশ সরকারকেই অভিযুক্ত করে অথচ কোন প্রমাণ দেন নাই! এটা গোয়ার মানুষের অতি সাহসী বোকামি বলা হয় সম্ভবত! যেমন তার পুরা লেখাটাই দাঁড়িয়ে আছে,   “senior Awami League sources” এই অস্পষ্ট ও অর্থহীন “সুত্র” এর বরাতে!  আওয়ামি লীগের সরকারের বিরুদ্ধে ভুয়া এক “আওয়ামি বরাতে” – যা খুশি তাই বলে দিবেন – এটা তো এক আত্মহত্যা-প্রবণ গাধামি!!   প্রায় প্রতি প্যারার শুরুতে তিনি এই অর্থহীন কথিত এই একই সোর্সের বরাতে  যা খুশি লিখে গেছেন; বেপরোয়াভাবে। অতএব এমন কান্ডগুলোতে তার না জানার কোন কারণ নাই যে এটা নুন্যতম কোন নীতি মেনে সাংবাদিকতা নয়। এটা কোন সাংবাদিক রিপোর্টই নয়।

    তার বোকা সাহসের আরো নমুনা আছেঃ
    প্রথমত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে লিখতে এসেছেন ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ কোলে বসে; তারা যে অংশেরই হোক! অর্থাৎ তাঁর কোন লেখাই সাংবাদিকতা হবেই না!  কিন্তু তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, যেহেতু এ’লেখা হাসিনার মোদির ভারতকে ফেলে কথিত চীনের কোলের উঠে যাওয়ার গল্প – তাই তিনি বীরবেশে সব বাধা পার হয়ে যেতে পারবেন!  অথচ তিনি কোন যুক্তি বোধবুদ্ধি তে কাজ করতে পারেন না,  আবার এটা তিনি খেয়াল করেন না। তিনি চীনবিরোধী ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী হতে চেয়ে হাসিনাকেই অভিযুক্ত করছেন। তার মানে এলেখার টার্গেট পাঠক ভারতীয়রা। কারণ,  একটা কথিত “ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী” মনকে টার্গেট করে লেখা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির কোন অংশ পছন্দ করার কোন কারণ নাই। তিনি আওয়ামি লীগের সুবিধাভোগী হলেও না। এমনকি বাংলাদেশের হিন্দুরাও ভয় ও দ্বিধা করবে!

    তাহলে এই লেখা সরাসরি বাংলাদেশেই ছাপতে চাওয়ার এত মরিয়া আগ্রহ কেন??? এত অর্থ একটাই তা হল, আমি একটা ভারতীয় এক বেপরোয়া হিন্দু-মন দিয়ে বাঙ্গলাদেশ তো বটেই সারা দুনিয়াকে দেখতে চান! শুধু তাই না আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান আপনি বাংলাদেশের মাথায় চাপায় দিতে চান! এমনকি এটা এতই বেপরোয়া যে তা আওয়ামি লীগ তো বটেই হাসিনাকেও বাধ্য করতে চান!   এটাই এক অন্ধ ও বোকার গাধামি সাহস!

    চন্দন নন্দী নিজেকে এতই অযোগ্য ভাবে তুলে ধরেছেন যে তিনি মনে করেন বা ধরেই নিয়েছেন যে  বাংলাদেশের কোন স্বার্থ নাই, এনিয়ে কোন স্বার্থবোধও নাই; শুধু তাই না। খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনারও ক্ষমতায় টিকে থাকবারও যেন কোন স্বার্থ নাই!  কেবল ভারতের স্বার্থই আছে আর সেটাই সহি। আর তাই, বাকি আমাদের সকলকে ভারতের পক্ষে তাও সেটা আবার মুরোদহীন এক ভারত – এর পক্ষে জয়গান করতে হবে, সেটা করাই আমাদের কাজ! সহজ ভাষায় বললে এটা এক স্টুপিডিটি; আর তা এমনই স্টুপিডিটি  যা কোন সুস্থ মানুষ করে না!

    তবে চন্দন নন্দীর এমন তিনটা স্টুপিডিটি আছেঃ

    প্রথম স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    সম্ভবত গাধাও একটা পর্যায়ের পর আর গাধামি করে না। কিন্তু চন্দন নন্দী তাতে থামতেও রাজি না, এমনই তার স্টুপিডিটির লেভেল! তার লেখায় নিচের এই বাক্যটা আছে সেখান থেকে উঠিয়েছিঃ

    “However, the only concession that the Awami League government
    is likely to make is to partially reduce the level of repression on
    opposition party leaders, cadres and supporters.”

    নন্দী বলছে, আওয়ামি লীগ এবার একটাই কনসেশন বা ছাড় দিতে পারবে সেটা হল level of repression। এইটায় একটু ছাড় দিতে পারবে। মানে এবার বিরোধীদেরকে গুম, খুন অপহরণ একটু কম করে করবে। মজা না। আমাদের তো একথা শুনে হাততালি দেয়া উচিত। আর চন্দন নন্দীর নামে জয়ধ্বনি!! তাই না??
    কিন্তু ঘটনা হল উলটা? হাসিনা সরকারের এতে প্রচন্ড ক্ষেপে উঠাই স্বাভাবিক। কেন???
    কারণ, এই বক্তব্য দিয়ে নন্দী স্বীকার করে ফেলেছেন যে এর আগে হাসিনার দল বিনা concession এর হেভি level of repression তাহলে আওয়ামি লীগ করেছিল। আর সে তুলনায় এবার কম করবে – এটাই তো নন্দীর ভাষ্য???
    এটা স্টুপিড চন্দন নন্দী খেয়াল নাই। তিনি খেয়াল করছেন না। কিন্তু হাসিনা সরকারকে অবশ্যই এই স্বীকারোক্তি অপসারণ করতেই হবে! কারণ, সে তো স্টুপিড নন্দী না; হওয়ার কোন সুযোগও নাই। তাই স্বভাবতই সে নন্দী-ভৃঙ্গী সবাইকে সাথে বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে!!!
    এখন তামসাটা হল, এতে নন্দীও বেজায় খুশি হয়েছে। কারণ, “কোন লেখা নিষিদ্ধ হওয়া মানেই তা নিশ্চয় খুব দামি লেখা????” আর এই দামি লেখাটা প্রসব করেছে নন্দী!  আর তাতে নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারছি গাধা কত প্রকার ও কী কী!!!!

    দ্বিতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এবার দেখি পরেরটা।  তার লেখায় পরের আরেক বাক্য হল এরকমঃ

    This time around, there are few reports of “disappearance” of opposition party cadres.

    এবারও তিনি আরো বড় গাধা হয়ে আমাদেরকে আশ্বস্ত করছেন যে এবার বিরোধীদেরকে গুম বা অপহরণ কম হচ্ছে বা হবে।  চন্দন নন্দী হিউম্যান রাইট হিশাবে “অপহরণ” শব্দের  অর্থ তাতপর্য কোন্দিনই বুঝেন নাই তাই বুঝা যাচ্ছে। ঠিক যেমন আমাদের দিপু মনি তিনি ২০১৩ সালে তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জেনেভায় জাতিসংঘের  (UPR) সভায় খোলাখুলি বলেছিলেন বাংলাদেশের আইনে  গুম বা অপহরণ (disappearance) বলতে কোন অপরাধের কথা নাই। অতএব বাংলাদেশে কোন disappearance নাই! এতে যে যা বুঝছেন বুঝে নেন! আর এখানে চন্দন নন্দী দেখা যাচ্ছে আরেক কাঠি সরেস! তিনি সরকারের হয়ে আশ্বস্ত করছেন এবার disappearance হবে তবে কম হবে!!!
    অথচ ঘটনা হল, একটা disappearance এর ঘটনা যদি ICC তে প্রমাণ করা যায় তো হুকুমের আসামি হিশাবে প্রধান নির্দেশদাতার সর্বোচ্চ শাস্তি হয়ে যাবে! আমি নিশ্চিত এসব দিক এই চন্দন নন্দী কখনও খবর নেন নাই। তাই অবলীলায় বলে যেতে পারছেন এবার disappearance কম হবে। মানে যেন এবছরের ধানের ফলনের হিসাব দিচ্ছেন!!!
    তাই এক্ষেত্রেও হাসিনা সরকারকে অবশ্যই নিজ স্বার্থে নিজে স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া পথ ছিল না!!!

    তৃতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এলেখায় তিনি, কোন রাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে  সেটা যে কোন ধরণের চাপবিহীন ও বিশ্বাসযোগ্য হতেই হয় এবং তা উল্লেখ করা লাগে নাই নইলে কে জনপ্রতিনিধি হল?  আর জনপ্রতিনিধিত্বই যদি ফেয়ার ভাবে না হয় তো ওটা তো কোন রিপাবলিকই না – গণপ্রতিনিধির রাষ্ট্র না, সমাজের কোটারি গ্রুপের ক্ষমতা হল সেটা এটাই তো ফ্যাসিবাদ হয়েছে বা হবে। অথচ এলেখায় চন্দন নন্দী সব সময় বলে গেছেন, নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার একটা রিলেটিভ ধারণা মাত্র। হাসিনাও  নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার করতে পারেন। সেটা পিটার হাসের মাত্রায়  ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন না হলেও চলবে। এটা সোজাসুজি একটা শয়তানি। একেবারে যেকোন ধর্মতত্বে শয়তানের যে বর্ণনা আছে সেই দানব এই চন্দন নন্দী। তিনি ভারতের নির্বাচনে গইয়ে তার এই শয়তানি তত্ব ফেরি করে না কেন?  আগে তিনি সেটা করে আসেন এরপর ………।
    তাই এসব শয়তানি বক্তব্য দেয়া তা বলার কোন মানে হয় না। অথচ তিনি কী বলেছেন দে৪খেনঃ

    the Western bloc, including the US, seek to play a role “far stronger than India”
    in shaping the road for a relatively free and fair elections in Bangladesh.

    অর্থাৎ তিনি সুজাতা সিং এর ২০১৩ সালের হস্তক্ষেপটাকে জায়েজ করতে সেটা এবারের পিটার হাসের ভুমিকার সাথে তুলনা করে দিলেন। আর কৌশলে দাবি করলেন এটা একটা relatively free and fair elections – মানে তুলনামূলক ঘটনা মাত্র বলে দেখাতে চাইলেন। মানে এটা মাত্রাজ্ঞানের ব্যবপার যা একেক জনের একেক রকম হয় =- সেই মাত্রাজ্ঞান।   এটা যেন “far stronger than India” মাত্র এতটুকুই।
    তামাসার দিকটা হল, এই দানব নন্দীর একটা সাধারণ নির্বাচনকে খুবই হাল্কা ব্যাপার হিশাবে দেখা আর সেটা নেহাতই ফ্রি-ফেয়ার  এর মাত্রজ্ঞান এর ব্যাপার বলে চালানোর চেষ্টা এটা হাসিনাও হজম করতে চান নাই। এরই বহিঃপ্রকাশ হল আপন স্বার্থে নিজে কোন স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে সরকার!

    হাসিনার পাঁচমন্ত্রীতে ভারতের কথিত আপত্তি প্রসঙ্গঃ
    প্রসঙ্গটা সবার আগে তুলে ছিলেন সুবীর ভৌমিক যে হাসিনার পাঁচমন্ত্রী নাকি পাকিস্তানপন্থী! তিনি নামও উল্লেখ করেছিলেন সেবার। কিন্তু অর্থহীন একটা বিষয়কে ঘটনা বানানো মনে হবে যেকোন সিরিয়াস পাঠকের কাছে। অন্তত দুটা কারণে এক. বিভিন্ন দেশের সরকারে মন্ত্রীদের মধ্যে সিরিয়াস গ্রুপিং চলে আর তা একেবারে মতাদর্শিক লেভেলে। কোল্ডওয়ারের আমলে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভায় মোরার্জি দেশাই – এসব আসলে সেকালে সোভিয়েত নাকি আমেরিকান এভাবে পন্থী পরিচয়ের আড়ালে দ্বিবিভাগে বা গ্রুপিং চলত। তবে অবশ্যই তা আন্ডার কারেন্ট। মানে মূল স্রোত বা মেন স্ট্রিম বা মূল ধারাতেই বভক্তি না অবশ্যই না। মানে ইন্দিরার ক্ষমতাকে মেনে নিয়েই এরপর দুই ধারার মত।  এমনকি আমাদের ৭১ যুদ্ধের সময়েও ইন্দিরার আমেরিকান ধারার মন্ত্রীরা বিরোধিতা করেছে। তো এই অর্থে কোন মন্ত্রীসভার ভিতরে গ্রুপিং এর কথা জানা যায়।
    কিন্তু হাসিনার মন্ত্রীসভার মধ্যে গ্রুপিং? এটা যে না বাংলাদেশ  না হাসিনা কাউকেই চিনেনা কেবল – মন্ত্রীসভায় গ্রুপিং থাকে – এই তত্বীয় ধারণা যা খুশি বলে এদের কথার নুন্যতম গুরুত্বও নাই। তাই এর আমলও নাই।  আসলে দলের ভিতর দুই মতামত নিয়ে আপোষে ফ্রি-ভাবে তর্ক-বিতর্কের সুযোগ থাকলে এরপরে মন্ত্রীসভা পর্যন্ত তা কল্পনা করা যেতে পারে। কাজেই সুবীরের এই কথিত গ্রুপিং এর ধারণা তুলে তিনি হয়ত অন্য কিছু বলতে চেয়েছেন তাই যেকোন সুস্থ মানুষ মনে করেছে। কারণ নিজ মন্ত্রীত্ব থাকলে বেচে গেলে সেটা মন্ত্রীর বাপের নাম দশা  সেখানে এই মন্ত্রীরা আবার গ্রুপিং করবে। গ্রুপিং শুনলেই তো গুষ্ঠিশুদ্ধ বের করে দেয়া সহ যেকোন শাস্তি খাবে যেকোন ব্যক্তি মন্ত্রী!  কাজেই পাঁচমন্ত্রীর গল্প – এটা বানানো গল্পই!
    আর দ্বিয়=তীয় কারণটা হল, হিন্দুত্ববাদী ভারতের পাকিস্তান ম্যানিয়া বাংলায় যাকে চুলকানি বলে। মুসলমান বা পাকিস্তান নিয়ে হিন্দুত্বের চুলকানি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই! বট্ম লাইনটা হল আমাদের যেকোন কারো ভিনদেশে আত্মীয় স্বজন থাকতেই পারে। সালমান এফ রহমানের অনেক কাছের আত্মীয়ই পাকিস্তানের – তা হলেই পারে। সেজন্য তিনি পাকিস্তানপন্থী – এটা মূলত রেসিজম! সালমান রহমান খারাপ ব্যবসায়ী হতে পারেন, লোন ডিফল্টার হতে পারেন, ইত্যাদি মেলা অভিযোগ থাকতেই পারে  কিন্তু সেজন্য তার বিরুদ্ধে করা কোন রেসিস্ট মন্তব্য জায়েজ হয়ে যাবে না! কিন্তু ভারতীয় হিন্দু-মন এতে অভ্যস্ত, এটাই দুঃখের ব্যাপার!
    আর মোমেন যখন যাকিছু বলেছেন ধরে নিতে হবে তাতে প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে। কে কোন পন্থী সেটা বাসায় বউয়ের কাছে রেখে এসে তবেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রীত্ব করা সম্ভব। এটা যারা জানে না তারা এখনও মায়ের গর্ভে আছেন! বিকশিত প্রস্ফুটিত হন নাই। আমরা কয়জন কজানি বা মনে রেখেছি যে মোমেনের আগে হাসিনার সব পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নাম কাওয়াস্তে – লো প্রফাইল। তাঁর অফিসই তখন প্রায় সবক্কিছু নিজে সরাসরি তদারকি করত। অবজারভেশন বলে,  মোমেন দায়ীত্ব নিবার পরই তাঁর অফিস অনেক কিছুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে আলাদা কাউকে নির্দেশ দিয়ে করান। ভারতের যারা মোমেনের বিরুদ্ধে  বা কথিত গ্রুপিং ধরণের যা মনে চায় বলছেন তারা অন্যকিছু মিন করছেন সম্ভবত!  বাংলাদেশের কেউই বিশ্বাস করবে না যে মোমেন কোন স্বাধীনপন্থা বা গ্রুপিংয়ে চলেন! আসলে এসব কথা যারা বলছেন তারা গত ১৫ বছরের সরকার কেমন কী তার ঝোঁক কিছুই অবজার্ভ না করেই বরং ভিন্ন কিছু বলতে চেয়ে এমন ভুয়া কথা ছড়াচ্ছেন!  আবার এসব কথার মানে এমনও না যে হাসিনা সরকার বা মোমেন এর কাজ ততপরতা খুবই জন আদৃত! এরা সবাই নির্দোষ! অথবা নিঃস্পাপ ধরণের ইমেজের অথবা এমন ব্যক্তিত্বের।

    চন্দন নন্দীর এলেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখাঃ
    চন্দন নন্দীর এই লেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখা।  ভারতের নিজ মুখের খাদ্য “বাংলাদেশ” একে চীন ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যেন – এমন অনুভব এর উপর দাঁড়িয়ে এটা লেখা হয়েছে। আমি বার বার বলেছি হিন্দুত্ববাদের মত একটা উগ্র জাতিবাদী দেশের হিন্দু-মন এরা দ্বিন-দুনিয়া বুঝতে অক্ষম।  এদের সাংবাদিকতাও এমন দোষে দুষ্ট একপেষে হবে।  আগে ভারতের জাতিবাদ ছিল মুসলমান বা পাকিস্তানকে চরম শত্রু জ্ঞান করে দারাকনো। সেজায়গায় এখন বসেছে চীন। ভারতের সব নিয়ে গেল চীন। এর বাইরে দুনিয়ায় আর কোন ঘটনা -ফেনোমেনা আছে কিনা তা এরা জানে না। জানতেও চায় না।
    একবাক্যে একটা কথা বলে শেষ করব। বাইডেনের আমেরিকার নয়া নীতি-পলিসির কারণে মোদির ভারতের উপর তাদের চাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।  এটা এমনই যে তা যদি খুবই খারাপ অবস্থায় পৌছায় – এশিয়ায় বাইডেনের সাথে ভারত নীতি সরাসরি বিপরীতমুখী হয়ে দাড়ায় সেক্ষেত্রে ঐ সামলাতে না পেরে খোদ ভারতই চীনের কোলে গিয়ে উঠতে পারে। খোদ মোদি-জয়শঙ্করের বিবৃতির অর্থ এমন – আর তা প্রকাশিত হয়ে আছে। এবিষয়ে কী চন্দন নন্দীরা অবগত????
    যারা আরো গভীরে যেতে চান, ভারতের NDTV তে ছাপানো এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন গত ১১ আগষ্ট যা ছাপা হয়েছিল। আর পরেরদিন বাংলাদেশ তা অনুবাদ করে মানবজমিন ছেপেছিল বাংলায়।
    যে ভারত নিয়মিত চীনকে অভিযুক্ত করে অন্যের ভুমি দখল করেছে বলে সে কেন আচমকা ফিলিপাইন-চীনের সীমানাবিরোধে তাদেরকে শান্তিপুর্ণ সমাধান বা “Resolve Peacefully,”  বলে হাঁক পাড়ছে??? এটা তো অন্তত ২০১৭  কোয়াডে [QUAD]  বা আমেরিকার আনা সাউথ চায়না সি – বিতর্কে ভারতীয় অবস্থান ফেলে পালানো মানে এসবের জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত ভারতের অনুসরণ করা ভারতীয় অবস্থানের বিপরীত! সেটা কেন হল??
    কাজেই কে কখন চীনের কোলে গিয়ে উঠতে চায়, কেন চায় কী দশায় সে বুঝে শুনে এসব উগ্র জাতিব্বাদ দেখানো উচিত চন্দন নন্দীদের। নাদান মানুষে ভরে উঠছে দুনিয়া!!!


    সর্বশেষ আপডেটঃ  ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩  সকালঃ ০৭ঃ ৪৫


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • গ্লোবাল অর্ডার কী

    গ্লোবাল অর্ডার কী
    গৌতম দাস
    ৩০ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SG

     

                      Locking China Out of the Global Order Could Backfire

    এবারের ব্রিকস এটা ১৫তম সম্মেলন; মানে হল এটা ২০০৯ সালে প্রথম তার জন্ম সম্মেলন করে যাত্রা শুরু করেছিল। গত ২৪ আগষ্ট এর ১৫তম সম্মেলন দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ হল। কিন্তু এই প্রথম এই সম্মেলন দুনিয়াটাকে ঝাঁকি দিয়েছে – এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি। আর ততধিক বেশি করে পশ্চিমা দুনিয়া (ইউরোপ-আমেরিকা) প্রকাশ্যে নিশ্চুপ কিন্তু তাদের সবগুলো ইন্দ্রিয়ই খাঁড়া; কি জানি হচ্ছে সেদিকে কান খাড়া। এর আগে কোন বিষয় নিয়েই এত করে সবার এন্টেনা খাঁড়া করতে তাদের দেখা যায় নাই। অন্যদিকে আবার, এমনকি আমাদের মত দেশ থেকে যারা গত ২০-২২ বছরের সময়কালে আমেরিকাসহ পশ্চিনা দেশে গিয়ে থাকবার রেসিডেন্স পারমিট যোগাড় করে নিয়েছে এরাও (মানে ব্ল্যাক-ব্রাউনেরা) সাদাদের সাথে মিলে এই প্রথম তাদের সব ইন্দ্রিয় খাড়া করেছে। অথচ এরা দুচার বছর আগেও যেমন ধরেন ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে প্রবল তর্ক করেছে যেন তারা পুর্ণমাত্রায় পশ্চিমা অরিজিনের নাগরিক হয়ে গেছে ফলে তাদের  স্বার্থও পশ্চিমারাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে এলাইনড, এক লাইনে। তাই তাদের স্বপ্ন-কামনার আমেরিকা বা পশ্চিম কত মহান, কত স্টেবল কত সম্ভাবনাময় আর তা তাদের স্বপ্ন-কল্পনা পূরণের জন্য পারফেক্ট!  ফলে চীন-রাশিয়া বা জাতিসংঘের ভাষার গ্লোবাল সাউথ [global south] – এরা তাদের স্বপ্নকল্পনা পুরণের পথে বাধা হয়ে জামা টেনে ধরছে যেন – এই মনোভাব দেখছিলাম আমরা। এরাও কানখাড়া! এমন পরিস্থিতিতে এই পটভুমিটা মাথায় রেখে এবার যদি ব্রিকস এর ১৫তম সম্মেলনের দিকে তাকাই তাহলে বলতে হয়, এবারের সম্মেলন সারা দুনিয়াকে এমন এক মজার জায়গায় নিয়ে ফেলে দিয়েছে; আর যেন বলছে এখন নতুন করে হাটা শিক্ষা কর!! আগের জানাশুনায় আর চলবে না, কাজ হবে না। তাই নতুন করে আগে হাঁটতে শিখে নে তাড়াতাড়ি!  বলতে চাচ্ছি, গত প্রায় আশি বছরের  আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেটায় ফাটল ধরেছে। আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!

    ব্রিকস জন্ম নিয়েছিল সেই ২০০৯ সালে, কিন্তু কেন কী পরিস্থিতিতে কি দরকারে এর জন্ম তা বাংলাদেশের একাদেমিক বা মিডিয়া জগত এখনও বেখবর আছে। এর মূল কারণ, ব্রিকস জিনিষটা কী অথবা কেন সেটাই এখনও পুরাপুরিই স্পষ্ট হয় নাই আমাদের দেশের ‘জানার’ জগতে।  বিশেষ করে এই সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের বাংলা মিডিয়াগুলোর রিপোর্ট দেখলে তা বুঝা যায়। তবে ইংরাজি মিডিয়া গুলো একটু ব্যতিক্রম। কারণ ইংরাজি রিপোর্ট এর সুবিধা হল কপি-পেস্ট বা অনুবাদ করে তারা কোনভাবে চালিয়ে দিতে পারেন। যদিও তাতেও তাদের দুর্বলতাও অপ্রকাশ্য নয়)। কারণ, সবচেয়ে মুখ্য প্রশ্ন, কেউ জানেই না বলতে পারছে না বাংলাদেশ কেন ব্রিকস থেকে বাদ??? গত ২৪ আগষ্ট (ব্রিকস সম্মেলনের শেষ দিন) পর্যন্ত সব রিপোর্টের এই এক দশায়। এমনকি ২৪ আগষ্ট রাত বারোটা মানে ২৫ আগষ্ট তারিখের শুরুতে যাদের হুশ হয়েছে জেনেছে তারাও ঘটনা বুঝে উঠে এরপর সেই ভিত্তিতে রিপোর্টে হাজির করতে গিয়ে কেউই ২৫ আগষ্ট সন্ধ্যার আগে পারে নাই। বিশেষ করে সে খবরটা কোথায় আছে, আবার তা পেলেও কী এঙ্গেলে তা দেখতে হবে এটাই তাদেরকে বেশি ভুগিয়েছে। কারণ রয়টার্স কী-কোথায় এটা তাদের অজানা নয় – হলেও সুনির্দিষ্ট হওয়া সহজ ছিল না।  তাতে  এরপরেও দেখা যায় কোন কোন মিডিয়া হাল ছেড়ে দিয়েছে। তাই তারা ২৫ তারিখে আর ব্রিকস নিয়ে হাজিরই হয় নাই। এরা যে হাল ছেড়ে দিয়েছে তা বুঝা যায় তারা এবার ব্রিকস নিয়ে মহা মাতবর তাদের কূটনীতিক সেকশন কে ক্ষমা দিয়ে দিয়েছে। আর  ২৫ তারিখ থেকে তাদের অর্থনীতি সেকশন থেকে ব্রিকস ইস্যুতে কিছু খবর ছেপেছে। এজন্যই বাংলাদেশে সবার রিপোর্টই তাই কমবেশি হালকার উপর ঝাপসায় মারা ধরণের বক্তব্য জুড়ে দেয়া।

    আমরা নতুন কোন কিছু দেখলে বা একে চিনতে চেষ্টা করলে বা কাউকে চিনাতে গিয়ে, – ঐ নতুনের সাথে কিছু তুলনীয় এমন কিছুর সাথে তুলনা করেই  নয়া ধারণাটা পরিচিত করাতে যাই। তাতে  যতটা সমতুল্য যতটা কাছের সদৃশ্য এমন কিছু পাওয়া যায় যা আবার ইতোমধ্যেই সমাজে অনেক পরিচিত থাকে; তবেই নতুন কাউকে এর পরিচয় দেয়া সহজ হয়। মুলকথা একমাত্র কাছাকাছিও  জানা কিছুর সাথে তুলনা করেই নয়া বিষয়কে মানুষ পরিচিত করাি আমরা।
    কিন্তু ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করে?  আর এর কাছাকাছি ঘটনা ফেনোমেনাই বা কী – তাই তো আমাদের অনেকের জানা নাই! মূলস্মস্যাটা ছিল আসলে এখানে!

    ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করেঃ
    আমি আগে বহুবার বলেছি ব্রিকস যা হতে যায় করতে চায় সেই উদ্দেশ্য হল – আমেরিকার নেতৃত্বে যে গ্লোবাল অর্ডারটা কায়েম আছে এখনও (যেটাকে বেশির ভাগই  আমরা ভুল করে একে আমেরিকান “পরাশক্তি” বলে বুঝি বা ডাকি) এই গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান থাকে বা আছে।
    ঠিক যেমন একটা দেশ-রাষ্ট্রে  ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে এটা তেমনই। আসলে  (গ্লোবাল অর্ডারের জায়গায়) “লোকাল অর্ডার” বললে সেটাই দেশ বা রাষ্ট্র ধারণা হয়ে যায়।  কারণ, রাষ্ট্র মানে সেটা নিজের বা স্থানীয় এই অর্থে রাষ্ট্রকে গ্লোবাল অর্ডারের সাথে তুলনায় লোকাল অর্ডার বলেছি। আর অর্ডার মানে মূলত নিয়ম-শৃঙ্খলায়  সাজানো বা বিন্যাস্ত করা।  তাই লোকাল অর্ডার বলতে বুঝা যেতে পারে নিজস্ব রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা  মানে, বুঝতে হবে তা একটা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে।  তবে লোকাল বলাটা অবশ্যই গ্লোবাল এই ধারণার সাপেক্ষে, এটাও মনে রাখতে হবে। কারণ লোকাল শব্দটা নানান অর্থের ব্যবহার হতে পারে। আর অর্ডার [order], এই অর্ডার বলতে অনেক সময় নির্দেশ বা হুকুম দেয়া অর্থ হলেও এখানে অর্ডার কথাটার মানে নিয়ম-আইন-শৃঙ্খলাময় একটা  সিস্টেম [system] যা বাংলায় ব্যবস্থা। যে অর্থে পুলিশ-কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলা হয়।
    ঠিক সেরকম ১৯৪৫ সাল থেকে দুনিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল অর্ডার (সেবারই প্রথম) চালু হয়েছিল যেন, তা এক ‘গ্লোবাল রাষ্ট্র ব্যবস্থা’। আর এটাকেই “গ্লোবাল অর্ডার” বলছি। তবে শুধু আমি না, বুঝমান একাদেমিকেদের দেয়া ভাষা এটা; ফলে তাদের থেকে নেয়া এই শব্দ ও এর ব্যবহার। আবার রাষ্ট্রে যেমন অনেক ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে  যেমন সংসদ, নির্বাহি বিভাগ (মানে প্রধানমন্ত্রীর অফিস; আর যার অন্তর্গত থাকে এডমিনিস্ট্রেশন, অর্থ বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি মন্ত্রণালয়-বিভাগ ) আর বিচার বিভাগ ইত্যাদিতে একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় তেমন, গ্লোবাল অর্ডার এর বেলায় সেটাও কিছু “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এমন গ্লোবাল রাজনৌতিক প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক । মূলত এইদুটো দিয়েই ১৯৪৫ সালে গ্লোবাল অর্ডার খাঁড়া করা; তা  যাত্রা শুরু হয়েছিল । তবে এগুলোকে “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” এর জায়গায় যেমন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর বেলায় এগুলো মাল্টিলেটারাল বডিও [multilateral body] বলা হয়। কারণ,  এখানে  মাল্টিলেটারাল বলতে তা ‘বহুরাষ্ট্রীয়’ ফলে তা  ‘বহুপক্ষীয়’ এমন বুঝানো হয়। তবে মাল্টিলেটারাল বলতে আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল,  বহু-বাহুবিশিষ্ট। পরবর্তিতে জাতিসংঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ছাড়াও ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO) অথবা একালে পরিবেশ প্রসঙ্গে [ UNEP], হিউম্যান রাইট [UNHRC] ইত্যাদি নানান মুখ্য গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে নেয়া হয়েছে। আর এমন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়েই সমন্বয় করেই একটা “গ্লোবাল অর্ডার”  বা বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয়ে আছে।  তবে সাবধান আমি গ্লোবাল অর্ডার [Global order] বলেছি কোন জিও [Geo-Order] বলি নাই। এমনকি জিও-পলিটিক্স [Geo-politics] -ও বলি নাই। একালে মানুষ যখন একটা কিছুকে বুঝতে পারে না বা ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন এটাকে বলে জিও-পলিটিক্স  বা ভূরাজনীতি। তাই কেউ যখন বলবে, “সবই ভুরাজনীতির খেলা” এর মানে হল, বক্তা বুঝতে পারছেন না এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করে বলবেন!! এটাই বুঝতে হবে!! যার মানে হল –  যা “আমি যা জানি না, বুঝি না” সেটাই ভুরাজনীতি।

    কিন্তু আমরা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ ধারণাটা – সেটা বহুল প্রচলিতভাবে জানি নাই কেন?
    মূল কারণ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা; যার আদিগুরু সেকালের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫) সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট, প্রধান কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ স্তালিন। যিনি পরে মারা যান ১৯৫৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। ঐ যুদ্ধে ১৯৪২ সাল থেকে হিটলারের অক্ষশক্তি [Axis powers] বিরোধি মিত্রশক্তি [Allied powers] – এভাবে যুদ্ধের দু-পক্ষ; আর হিটলারবিরোধী মিত্রপক্ষের মূল নেতা ছিলেন রুজভেল্ট।  তিনিই মিত্রশক্তি নামে জোটবদ্ধতার প্রথম উদ্যোক্তা, মিত্রশক্তির সকলের হয়ে যুদ্ধের মূল মোটা খরচগুলোর একা বহনকারি দেশ, সারা পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা সেকালের সারা দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তি কিন্তু সকলেই এরা যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে গিয়ে অর্থ সঙ্কটে দেঊলিয়া অবস্থায় – এঅবস্থায় এদের সকলকেই নিজ অধীনে আনার বা  ঐ যুদ্ধে বিজয়ী হলে শেষে তারা সকলেই কলোনি দখল ত্যাগ করতবে এই শর্তে বাধ্য করে রুজভেল্ট এদের সবার সাথে চুক্তি করেছিল। এভাবে  বাগে আনা ইত্যাদির মূল কারিগর হলে আমেরিকার নেতা রুজভেল্ট। তাই এই যুদ্ধে রুজভেল্টের প্রধান নেতা হিশাবে উত্থান এভাবেই, এসব কারণেই।
    পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী এদের দেশ সেটা আর এরা, যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে বাধ্য হয়ে রুজভেল্টকে নেতা মেনে নিয়েছিল তা বুঝা গেলেও সোভিয়েত ইউনিয়নও কেন এর ভিতরে একইভাবে ঢুকে গেছিল?  কারণ, হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া স্তালিন যিনি দেখতেছেন হিটলারবিরোধী একটা জোট হচ্ছে আর আবার সেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মুখ্য খরচগুলো বইবেন – কাজেই  হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে এত ভাল সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন নাই। তিনিও তাই রুজভেল্টের নেতৃত্বের মিত্রশক্তিতে যোগ দিতে দেরি করেন নাই। আসলে, মূল পলিটিক্যাল চুক্তি মানে যুদ্ধ শেষে আমরা একটা জাতিসংঘ গড়ব – এই চুক্তিতেই ভিত্তিমূলক সবকথা লেখা ছিল যা ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যা এখন ইতিহাসে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা”
    এমনকি যুদ্ধ শেষে দেশগুলোর পুনর্গঠনের অর্থও ঋণ হিশাবে দিয়েছিল আমেরিকা। বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে এই প্রতিষ্ঠানে মুখ্য ততপরতা ছিল ইউরোপের পুনঃর্গঠন। আর বিশ্বব্যাংক[WB] যার পুরা নাম হল ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনষ্ট্রাকশন এন্ড ডেভলবমেন্ট [International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)] –  এই নামের মধ্যে রিকনষ্ট্রাকশন [বা বাংলায়] পুনর্গঠন এই শব্দটাই বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও শুরুর কর্মের ইতিহাস এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ, বিশ্বব্যাংক যেখন আমাদের মত দেশে দেশে অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে ঋণ দেয় – সেই কাজটা তো পুনর্গঠন নয়। মানে অবকাঠামো (কোন ব্রিজ বা রাস্তা অথবা কারখানা) আগে  ছিল যুদ্ধে বা কোন কারণে ভেঙ্গে গেছে এমন নয়, বরং এই প্রথম বারের মত গঠন। তা সত্বেও বিশ্বব্যাংক-কে তার জন্মের দাগ পুনর্গঠন বা রিকনষ্টাকশন শব্দটা নামের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছে।
    স্তালিন কত রুজভেল্টের ঘনিষ্ট ছিলেন, ১৯৪২-৪৫ এই তিন বছর তা বুঝার একটা ভাল উপায় হল, এই তিন বছরে যত দেশ রুজভেল্ট ভ্রমন করেছেন সেখানে তার দুই বগলে সঙ্গে থাকতেন দুই নেতা স্তালিন আর চার্চিল (সেকালের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী)। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই যুদ্ধে রুজভেল্টের  এমন নির্ধারক অবদান যতটা কম পারা যায় এমনভাবে সোভিয়েত ইতিহাসে ছাটাই করে দেয়া হয়। যাতে মনে হয়, স্তালিনের একক কারিশমাতেই তিনি হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েতকে বাঁচিয়েছেন। [আমাদের মত দেশগুলোর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা কেবল লিখিত সোভিয়েত-রুশ ইতিহাসই, সহি বলে পড়ে থাকেন। আমার বহু সিনিয়র (কমিউনিস্ট)-কে এমন ইতিহাসই বলতে শুনেছি।  এছাড়া তাদের আরেকটা রুল হল,   যা কিছু লাল বইয়ে তাই তাদের জন্য সহি (খাঁটি সত্য) ও শ্রেণীর ইতিহাস। আর লালবইয়ের বাইরের সব “বুর্জোয়া” বা “সাম্রাজ্যবাদের” ইতিহাস – মানে মিথ্যা এই বিবেচনা।]

    পরবর্তিতে বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইতিহাসের এভাবে সাফল্যের ব্যাখ্যাটাই জোরদার হয়ে দাড়ায় ও আরেক সাফাই দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুজভেল্ট মারা যান ১৯৪৫ সালের আগষ্টে। আর ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে নয়া প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার এর আমেরিকা সেটা এবার আর আগের মত “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান” গড়া অথবা গ্লোবাল জনগণের জন্য কাজ ও ইমেজ গড়ার যে আমেরিকা সেটা  বদলে হয়ে যায় এক লুটেরা স্বার্থের আমেরিকা। যা শুরু হয়েছিল সিআইএ দল পাঠিয়ে ইরান দখল দিয়ে। তখন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে খেতাব দেয় বা ডাকা শুরু করেছিল।  অথচ আজ দুনিয়ার খুব কম কমিউনিস্টই বলতে পারবে কবে থেকে কমিউনিস্ট চোখে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ হয়েছে? বরং প্রায় শতভাগই সম্ভবত বলবে জন্ম থেকে!!! ্ওযডী সেটা আবার কার জন্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন নাকি আমেরিকা!!! সে আরেক ঝামেলা!!!   আর এই সুযোগেই সোভিয়েত ইতিহাস থেকে বিশ্বযুদ্ধের নির্ধারক আমেরিকা বা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকেই মুছে ফেলার সুযোগ পোক্ত হয়ে নিয়েছিল!

    আবার একটু পিছনে যাই, ওদিকে (১৯৪২-৪৫ এই সময়কালে) মিত্রশক্তির নেতা রুজভেল্টের দেয়া সুবিধা স্তালিন নিতে গিয়ে  আমেরিকার প্রস্তাবিত গ্লোবাল অর্ডার গড়ার পরিকল্পনায় সামিল হতে স্তালিন বাধ্য হয়েছিলেন, তা বলা যায়। সেই সাথে ১৯৪৪ সালের দিকে রুজভেল্ট প্রথম তার জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ার ধারণা স্তালিনসহ সেকালের প্রধান মিত্রদের কাছে হাজির করেছিলেন। ভেটো সদস্যপদ রাখার ব্যবস্থা চালু করে স্তালিনের মূল সব আপত্তি সামলিয়েছিলেন রুজভেল্ট। এরপরে এবার স্তালিনকে ঘনিষ্টভাবে পেয়ে নিজ “গ্লোবাল অর্ডার” গড়ার স্বপ্ন-পরিকল্পনায় স্তালিনকে সামিল করে নিয়েছিলেন।  এতে স্তালিন একসাথে রুজভেল্টের সাথে মিলে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ গড়তে রাজি তো হয়েছিলেনই।  জাতিসংঘ গড়ে গড়ে উঠতে পেরেছিল। এমনকি গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে ১৯৪৪ সালে এর যে জন্মসভা বসেছিল তাতে প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। সেই প্রতিনিধি ২২দিন ব্যাপী লাগাতর চলা জন্মসভায় হাজির থাকলেও এরপর প্রত্যেক রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ করা সাপেক্ষে সদস্যপদ গ্রহণের প্রসঙ্গ আসা ও সময় থেকে সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত হয়ে যায়। সেই থেকে গ্লোবাল অর্ডার তৈরির উদ্যোগের সাথে কার্যত স্তালিন থেকেও না-থাকা হয়ে যায় – জাতিসংঘ গড়তে হ্যা কিন্তু  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে না – এভাবে। কিন্তু এনিয়ে সোভিয়েত পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে  কোন আপত্তি অথবা উচ্চবাচ্য কিছু শুনে নাই।  কেন স্তালিন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক না গড়ে ফিরে এলেন – এনিয়ে কোন আর্টিকেল লেখা বা এটা আমেরিকানদের খারাপ কাজ এমন কোন বক্তব্য আনা এমন কোনকিছুই করা বা বলা হইয়েছে জানা যায় না। এমনকি ১৯৫৩ সালে প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে আইসেনহাওয়ার – তিনি আমেরিকার ভোল বা ইমেজ বদলানো ততপরতা শুরু করেছিলেন যেটা থেকে সোভিয়েত প্রতিক্রিয়া হল যে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে কোন ভাল-মন্দ মুল্যায়ন বা নাম নেয়া ইত্যাদি সোভিয়েত সরকারের দিক থেকে হয়েছে, নেতারা কখনও করেছেন এমন কিছু জানা যায় না।
    সব মিলিয়ে এসবে রুজভেল্ট-স্তালিন মিলে যে অভিমুখ একটা গ্লোবাল অর্ডার চালু করার যতটুকু একসাথে করার যাচ্ছিল বা পরিকল্পনা ছিল তা ১৯৫৩ সালের পরে শুকিয়ে মারা যায়, কোন চিহ্নই থাকে নাই। পরের সোভিয়েত নেতৃত্ব নিকিতা ক্রুশ্চেভ থেকে ব্রেজনেভ বা গর্বাচেভ পর্যন্ত কেউ কখনও নির্দিষ্ট করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিয়ে কিছু বলেছেন জানা যায় না। তবে আমেরিকা ওটা “পুঁজিবাদী সমাজ বা ব্যবস্থা” ফলে যেন তা তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য ও পাপকাজ এমন অনুমান থেকে কথা বলা, খারাপ চোখে দেখানো এটা বজায় ছিল সব সময়েই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমালোচনা জানা যায় না।

    কিন্তু কেন এমন ছিল?  আর এর চেয়ে বড় কথা যে সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোকে (মোট প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র) আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য করে না  নেওয়াতে বা তারা না হওয়াতেই কী আমেরিকান নেতৃত্বে পশ্চিম  এরা কী একটা গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করতে ব্যার্থ হয়েছিল বা থমকে দাড়িয়ে গেছিল? সোজা জবাব হল, একেবারেই না।  বরং গ্লোবাল অর্ডার  নিজের মত করে বিকশি হয়েছে আর এখন অনেক ডালপালা গজিয়ে আরো বিস্তৃত হয়েছে। তবে অবশ্যই এই বিকাশ আদর্শ নয়, দোষত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা ও খামতিও প্রচুর। কিন্তু সাফল্যও ফেলনা নয়।
    কিন্তু মজার কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯১) গেলে তা থেকে আলাদা হওয়া ১৫ রাষ্ট্র আর এই সোভিয়েতের প্রভাবাধীন বা বাফার রাষ্ট্র হিশাবে যেমন পোল্যান্ড, রোমালিয়া ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র ছিল যারা সকলে ঐ ১৯৯২ সালেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল। এখন ছোটখাট পাঁচটা দেশ বাদে দুনিয়ার সকলেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য। মানে ১৯৩ রাষ্ট্রের জাতিসংঘের বিপ্রীতে আইএমএফ সদস্য ১৮৮, তাই।  এখনকার দুনিয়া গ্লোবাল অর্ডার বানানোর দিক থেকে অনেকটাই অগ্রসর হয়ে গেছে। তবে আগেই বলেছি অবশ্যই দোষত্রুটি প্রচুর। সেসব সংস্কার করে যেতেই হবে প্রত্যেক কালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতটা একে এলাও করে।

    কিন্তু আমাদের মত দেশের বেলায়, তারা ১৯৯১ সালের আগের সোভিয়েত অনুসারি কমিউনিস্ট হয়েই থেকে গেছেন। এরা নিজেদের জন্য আর আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে তাদের প্রভাবের কারণে এরা না নিজেরা কিছু জেনেছে না কাউকে জানতে দিয়েছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ঠিক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান। কারণ, তাদের আপত্তি এক জায়গাতেই যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উতপাদন না হওয়া – মানে তাদের সমাজতন্ত্র না হওয়া মানেই এগুলো পাপের ফসল তাই অগ্রহণযোগ্য!!! এই হলো তাদের মূলকথা।
    এতে তাদের আপত্তিটা দাড়িয়েছে এমন যদি কোন আওয়ামীলীগ নেতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়  যে বিএনপি কে নিয়ে তোমাদের আপত্তিটা ঠিক কী? আর তাতে যদি লীগ নেতা জবাব দেয় যে ওরা আওয়ামীলীগ নয় এবং  ওরা আওয়ামীলীগ করে না – তাহলে এটা যেমন জবাব হবে এটা তাই!!

    তো সে যাই হোক তাদের আপত্তি তাদের সাথে থাকুক সেটা কোনই সমস্যা নয়।
    কিন্তু তাদের প্রভাব আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডারটা কী এসম্পর্কে বেখবর করে রেখে দিয়েছে। এদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে এক অর্ডারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা তো বহাল হয়ে এর বয়স  প্রায় আশি বছর হয়ে গেছে। আর ওদিকে রাইজিং চীন যে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্ব নিতে উঠে চলেছে (যদিও আরো সময় লাগবে)। ফলে নেতৃত্বের পালাবদলটাই আসন্ন হয়ে উঠেছে আর তাতে চীনা নেতৃত্বের  নতুন গ্লোবাল (যা আপাতত কেবল) অর্থনৈতিক অর্ডারটা কেমন হতে পারে – এটা নিয়ে লড়াই ঝগড়ায় তা কোথায় গিয়ে থিতু হবে – এরই সময়কাল চলছে। এখন। একথা শুনে মনে করার কারণ নাই যে এটা কেবল চীন-আমেরিকার লড়াই। তা একেবারেই নয়।
    বরং উভয় পক্ষই বাংলাদেশকে নিজের যেদিকে সুবিধা মনে হয় সেদিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইবে,চাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোন্দিকে যাব বা এই তানাতানি কিভাবে সামলাবো এর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা কী তাই তো বুঝিনাই!! গ্লোবাল শুধু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক যে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এটাও তো বুঝি নাই!! কমিউনিস্ট জ্ঞানিদের তো আরো ধারণা নাই। তাহলে? বাংলাদেশের একাদিমিক জগত বা সুনির্দিষ্ট করে আই আর বা অর্থনীতি কেউই তৈরি নয় – প্রয়োজনটাই বুঝে সারতে পারে নাই অবস্থা!!!!
    তাদের আল টপকা কথা হল, হাসিনা চাইলে ব্রিকসে যোগ দিতে পারে!!! যেন বিরাট এক জ্ঞানের কথা বলেছে!!

    আমরা নিজের জন্য কী করতে পারিঃ
    এদিকে গ্লোবাল পালাবদলে এতদিনের আমেরিকান নেতৃত্বের অবস্থানে চীন উঠে আসতে চলেছে। অথচ কমিউনিস্টেরা ১৯৪৫ সালে দুনিয়ায় কী গুরুত্বপুর্ণ বদলে এসেছে তা খেয়াল করে নাই। শুধু তাই না, দেশের একাদেমিক জগতকেও এটা খেয়াল করা বা বুঝার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নেতি ধারণাই দিয়েছে।  তাই  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান ও কেন, তা নিজেও জানে নাই, অন্যদেরও জানা হয় নাই। তাহলে এখন যখন প্রায় আশি বছর পরে আমেরিকান নেতৃত্বের বিকল্প হিশাবে চীনের নেতৃত্বের ব্রিকস খাড়া হতে চলেছে আর এরই প্রথম অর্থপুর্ণ কিছু পদক্ষেপ চীন নিয়ে ফেলেছে তখন এই ঘটনা-ফেনোমেনা নিয়ে আমাদের একাদেমিক বা কমিউনিস্টেরা কীভাবে আর কথা বলবে, যেটা সে আগে খেয়ালই করে নাই, প্রস্তুতি নেয় নাই?
    এজন্যই বলেছি আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেখানটায় ফাটল ধরেছে। তা আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!
    ফলে কী কী ও কেমন ধরণের বদল আসন্ন তাতে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী কী হতে পারে সেসব বুঝাবুঝির তরিকা জানতে হবে, পদ্ধতি জানতে হবে – দেখার নতুন অভ্যাস চর্চা লাগবে ইত্যাদি…। তবে সাবধান এটা ১৯৪৫ সালের মত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বদল যেমন ঘটেছিল এবার আগে থেকেই পরিস্কার যে এটা কেবল চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতিক এক অর্ডার আসতে পারে মাত্র।  ফলে ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কমে যাবে হয়ত কিন্তু নাই হবে না।  আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে যাচ্ছে না। আবার রাজনী আর  অর্থনৈতিক গ্লোবাল নেতৃত্ব যদি আলাদা হয় তবে কেমন ফিট করবে্‌, কার্যকরভাবে চলতে পারবে কিনা সেটা এক বিরাট প্রশ্ন যার জবাব অজানা!
    সবচেয়ে বড়কথা এই পালাবদল যদি আপোষে না হয়ে যুদ্ধ লেগে যায় বা এড়াতে না পারে মানে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ফয়সালার দিকে চলে যায় তাহলে কী হবে! আর এতে সব পক্ষের জন্যই তা মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে সন্দেহ নাই।  এর একটা চিহ্নের কথা বলা যায়। তা হল, আগামি বছর শুরুতে যদি ইউক্রেন যুদ্ধ না থামে তবে সেটা হবে খুবই খারাপ চিহ্ন। কেননা এর মানে হবে আমেরিকার আগামি নির্বাচন যেটা ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়ার কথা সেটাও যুদ্ধের মধ্যেই হবে??
    আর সেসব নিয়ে বুঝাবুঝি আর তাতে গ্লোবাল স্বার্থের ঝগড়াগুলোর মাঝে নিজ-রাষ্ট্রের ভালমন্দ বুঝবার জন্য আমরা কতটুকু যোগ্য হয়ে উঠব? যতটুকু পুরান কমিউনিস্ট প্রভাবের মধ্যে আমরা যে যেমন থেকে যাব তারা তক্তি গভীর অবুঝ থেকে যাব। এর বিকল্প হল, একটা ফ্যাক্টসকে আদর্শগত পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করা বা ব্যখ্যা করা বা ব্যাখ্যা দেয়া ত্যাগ করতে হবে।  সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে ঐ আদর্শগত বুঝাবুঝিতে খামতি আছে। সেই খামতি পূরণ করে বরং সামলানো – নিজের চিন্তাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।   একথাটাই আরেকভাবে বললে, আমি কমিউনিস্ট তাই কমিউনিস্ট-চিন্তা-ফ্রেমে ফেলেই আমাকে যেকোন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে হবে – এই জিদ ত্যাগ করতে হবে।

    আপডেটেডঃ    আগষ্ট  ২০২৩; 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী

    ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী
    গৌতম দাস
    ২৭ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SM

     

                  BRICS new six Members

    ব্রিকস সম্মেলনের শেষদিনের সিদ্ধান্ত হল, নয়া ছয় দেশকে [সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও আর্জেন্টিনা], তারা এই প্রথম তাদের জোটকে সম্প্রসারিত করে নয়া সদস্য করতে চাইলো। কিন্তু বাংলাদেশ? এত ঢাকঢোল পিটানো বাংলাদেশ যে এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব হাজির রেখেছিল সেই-ই  বাদ হয়ে গেছে; সে এই ছয় রাষ্ট্রের মধ্যে জায়গা পায় নাই! কিন্তু ঠিক কেন? ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত! আমার আগের লেখায় শিরোনাম ছিল “মোদির আনা শর্ত ও পরিণতিতে বাংলাদেশ ব্রিকসে নাই’। কিন্তু ঠিক কীভাবে তা কার্যকর হয়েছিল তা বুঝতে একটু গভীরে যেয়ে এবার কথা বলব।
    ইতোমধ্যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা সুবীর ভৌমিক, সেও গতকাল (২৫ আগষ্ট) আবার বাংলাদেশকে নিয়ে এক লেখা দিয়েছে; যার শিরোনাম India, US narrow differences over Bangladesh ahead of elections]। । কিন্তু সুবীরের এই অবস্থান চারদিন আগের আনন্দবাজারের অগ্নি রায় বা দেবদীপ এদের অবস্থান থেকে একেবারে উলটা দিকে। তা একেবারে ভুতের মুখে রামনামের মত!  সুবীর লিখেছে,  বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ইস্যুতে “সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে” দেখা আমেরিকান অবস্থান যে এদেশে একটা অবাধ ও সুস্থ নির্বাচনই হতে হবে – এই বিষয়ে অনেক আলাপ আলোচনার পরে ভারত আমেরিকার অবস্থানের পক্ষে সায় দিয়েছে […India has agreed to the US stand of putting “absolute priority” on a free and fair parliamentary election due in January 2024.] সত্যিকরে বললে, এটা আবার অগ্নি রায় বা দেবদীপ পুরোহিত-দের প্রপাগান্ডার উলটা আরেক প্রপাগান্ডা নিঃসন্দেহে। কিন্তু অগ্নিদের মতই সুবীরও কোন প্রমাণ বা কোন সোর্স উল্লেখ করা ছাড়াই আরেক চাপাবাজি বক্তব্য। ফলে এ’বক্তব্যের কোনই মুল্য নাই। তবে এটা নিঃসন্দেহে সত্যিকথা যে ভারতীয় কারও – সে মোদি-ই হোক বা যেই কেউ  – এদের কারও আর বাংলাদেশে কোন বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নাই।  আমরা এখন বড় জোড় তাদের কথা শুনব – আর পাশে আবর্জনার ড্রামে তা ফেলে রাখব; কারণ আমরা তাদের কাউকেই বিশ্বাস করি না।

    আমার আগের লেখায় বলেছিলাম রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে যে ভারতের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাদ পড়েছে।  গত ২৩ আগষ্ট রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ব্রিকসের সম্প্রসারণ শেষ মুহুর্ত এসে ব্রিকসের আভ্যন্তরীণ বিভক্তির মুখে আটকে গেছে; BRICS expansion faces eleventh hour hurdle as divisions persist। এটা হল,  ব্রিকসের ভিতরের খবর বের করে এনে তাদের লিখা। বলেছে ভারতের মোদি-ই  নিজেই শেষ মুহুর্তে নয়া দুই শর্ত  শেষে হাজির করেছে ।

    ঐ রিপোর্ট বলেছে ইলেভেন্থ আওয়ারে মানে শেষ মুহুর্তে ভারত নয়া সদস্য নেয়া হবে কী ভিত্তিতে মানে কী শর্তে এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য পেশ করেছিল। শুধু তাই না একথাগুলো লেখা হয়েছিল “LAST-MINUTE SPOILER” এই নামের রয়টার্সের লেখার এক উপ-শিরোনামের নিচে। যার  অর্থ হল, শেষ মুহুর্তে যিনি সব ভন্ডুল [SPOILER] করে দেন। আর বলাই বাহুল্য সেই SPOILER হলেন ভারতে প্রধানমন্ত্রী মোদি।

    ঐ রিপোর্ট লিখেছিলঃ
    “but the source said it had been delayed after
    Indian Prime Minister Narendra Modi
    introduced new admission criteria.”

    কিন্তু কী ছিল সেই নয়া দুই শর্ত?
    “The BRICS country official said that admission criteria
    India’s Modi proposed included requiring members
    not be the target of international sanctions,
    ruling out potential candidates Iran and Venezuela.
    Modi was also pushing for a minimum per capital GDP requirement”

    কথাগুলো সোজা করে বাংলায় বললে, হবু ব্রিকস সদস্য হতে হলে – এরা কেউ আমেরিকান স্যাংশনের খাওয়া দেশ হতে পারবে না। তিনি অবশ্য আমেরিকা শব্দটা লুকিয়ে সে জায়গায় আন্তর্জাতিক লিখেছিলেন। আর দ্বিতীয় শর্তটা হল, ঐ হবু সদস্য দেশের অর্থনীতিতে  ওর নুন্যতম অর্জিত জিডিপি থাকতে হবে।

    এখন আমরা দেখব ব্রিকসের সদস্যপদ লাভে মোদির প্রথম শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    মোদির একথার কোন মানেই হয় না যে হবু সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ হতে পারবে না। কারণ, স্যাংশন বা আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ মানে কী? মানে আমেরিকার যথেচ্ছারে স্যাংশন চাপানো যেটা ঐ দেশের ডলারে বাণিজ্য এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। কিন্তু আমেরিকা এমন স্যাংশন দেয়ার কে? কী তার অথরিটি? এটা লুকাছাপার কিছু নাই যে এবারের বাইডেন প্রশাসন ইচ্ছামত যার উপরে আরোপের ইচ্ছা এভাবে স্যাংশন আরোপ করে গিয়েছেন। কারণ, আমেরিকান ডলার আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা হওয়াতে যে পড়ে পাওয়া সুবিধা আমেরিকার হাতে তাতে যেকোন দেশ যেন ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কেনা-বেচা না করতে পারে এই বাধা দিবার সুযোগ আমেরিকার হাতে আছে। আর আমেরিকা তার এই সুযোগ এর অপব্যবহার করবে না – এটাই আশা করা হয়েছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম-সভায়।  কিন্তু তা ছিল ভদ্রলোকি চুক্তির মত ঠিক আইনি বাধা নয়; আর সে অনুমানটাকেই আমেরিকা অমান্য করে চলেছে।  “পরে পাওয়া” সুবিধাটাই খেয়ে চলেছে।
    আর ওদিকে, ব্রিকস তৈরি হয়েছে যেসব রাষ্ট্র নিয়ে বা হবু সদস্যদের নিয়ে হতে চাচ্ছে তারা আমেরিকার এই অত্যাচার, যথেচ্ছাচারে অতিষ্ট হয়েছে বলেই তো নয়া ব্রিকস এর সদস্য হতে এসেছে। কাজেই আমেরিকান স্যাংশন কারো উপর  আরোপিত হলে সেই দেশকে আবার সদস্যপদ না দেয়ার মানে হল যেন, আমেরিকান ইচ্ছায় ব্রিকসের সদস্যপদ দেয়া। মানে ব্রিকস চালাবে যেন আমেরিকা – এমন অবস্থা তৈরি করা!  মানে কার্যত ব্রিকস-কে আমেরিকার খামখেয়ালি ইচ্ছার অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান করে ফেলা।  আর এভাবেই ভারত যদি ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত করতে চায় তাহলে আর এদের ব্রিকস গড়ার দরকার কী?
    অথবা আরেকটা দিক আছে! তাহলে, চীনের মুদ্রা ইউয়ান ভিত্তিতে যদি ব্রিকস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তাহলে চীনও কী আমেরিকার মতই যেকোন ব্রিকস সদস্য দেশের উপর চীনা খামখেয়ালি রুস্তমি শুরু করতে পারবে?   আর ভারত সেটা মান্য করে চলবে? মোদি তার মানে এটাই চাইছেন???? তাই কি??? মোদি সাব কী বলেন!!! 

    আর তামাসার কথা যে, ভারত কী নিশ্চিত যে ইউয়ান-ভিত্তিক ব্রিকস এরপর ভারতের উপরেই চীন সেই প্রথম  (ইউয়ান) স্যাংশনটা আরোপ করবে না? কাজেই “স্যাংশন খাওয়া দেশ সদস্যপদ পাবে না” এই শর্ত তো ভারতের জন্যই সবচেয়ে বড় আত্মঘাতি হয়ে উঠতে পারে!!!  তাহলে ভারতের এই  গদগদ হওয়া “আমেরিকা তোষণ” এর মানে কী? এমন আত্মভোলা ছাগলামির মানে কী?

    আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভারত  ” আমেরিকান স্যাংশন খাওয়া দেশকে” – সদস্যপদ দিয়ে ঐ দেশের সাথে আমেরিকান  ক্যাচাল-সংঘাতের দায়গুলো ব্রিকসে আনতে চাচ্ছে না, এড়াতে চাইছে মানে এই প্রশ্নে আমেরিকার বিরাগভাজন হতে চাচ্ছে না। কিন্তু সেটা হলেও এভাবে আমেরিকার খামখেয়ালিপনা আমল করে এর ভিত্তিতে একটা  ব্রিকস খাড়া করা কী সম্ভব, নাকি এটা বাস্তব? বা এর কোন দরকার আছে? যেমন ধরেন এখনই সবচেয়ে বড় স্যাংশন খাওয়া দেশ হল খোদ পুতিনের রাশিয়া। তাহলে মোদির প্রস্তাবিত শর্ত অনুসারে তো রাশিয়াকেই ব্রিকসের সদস্যপদ থেকে বাদ দিতে হয়! অথবা ধরা যাক, কোন কারণে ভারতের উপরেই কোন আমেরিকান স্যংশন যদি আরোপিত হয় তাহলে কী ভারত সরল বালকের মত নিজেই ব্রিকসের বাইরে গিয়ে বসবে? তাতে রাজি থাকবে তো??? একথার মানে হল, যে আপনার বাসায়  আপনি নিজে ঢুকতে পারবেন কিনা সেটা আর কেউ না একেবারে কোন বাইরের লোক বা পড়শি তার খামখেয়ালি ইচ্ছার কথা আপনি মেনে চলবেন? আর তা মেনেই আপনি আপনার নিজের বাসায় ঢুকবেন, ঢুকতে হবে? অথচ সেটাই মোদির ভারত প্রস্তাব করছে? এটা এবসার্ড[absurd] অর্থহীন; আজীব ও অবাস্তব ঘটনা! ভারতের এটা এক আজীব আমেরিকা প্রীতি! যেটার কারণে ভারত খোদ নিজেই আমেরিকার কাছে নিজের অস্তিত্ব নিজেই বিলীন করতে হতে পারে তা জেনেও ভারত তা করতে এক পায়ে খাড়া!!!!  তাই কী?  এটা মানে হয় না এমনই এবসার্ড অবিশ্বাস্য ঘটনা!  যা বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারত নিজেই অমান্য করবে!

    মূল কথাটা খেয়াল রাখতে হবে। ব্রিকসের সকল রাষ্ট্র যদি নাও চায়, তাহলেও ডলারের পাশাপাশি ডলারের বিকল্প কারেন্সি-ভিত্তিক (ধরা যাক চীনা ইউয়ান) ব্রিকস নামের আরেক অর্থনৈতিক  গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করার চেষ্টা করার অর্থ হল ডলারের একছত্র অধীপতি থাকাকে টেনে নিচে নামানো। তাই ব্রিকস খাড়া করব এই মজা লুটতে এলাম  অথচ আমেরিকা বা তার ডলারের সাথে প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না, এড়ায় চলতে পারব, চ্যালেঞ্জ করব না এই অনুমান ভিত্তিহীন এবং তা অর্থহীনও!! বোকার স্বর্গে বসবাস! মানে হল, মোদির ভারতের দশা হয়েছে সে  আমেরিকা ডাকলেই যদি তার বাসায় গিয়া ভারতকে পাশে  শুইতেই হয়, সঙ্গ দিতেই হয় –  তাহলে আর ঐ ভারতের আবার ব্রিকস নামের নয়া বিয়ে করতে যুক্ত হতে এসেছে কেন, দরকার কী?

    আসলেই মোদি এক আজব লোক!!!  সত্যি মোদি সাব পারেও বটে!!!
    [একটা ঘোষণাঃ উপরে যে গ্লোবাল অর্ডার কথা বা ধারণাটা  উল্লেখ করেছি – এটা খুবই ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্ট।  তাই এনিয়ে আলাদা করে একটা লেখা প্রায় রেডি আছে, ‘ফাইনাল টাচ’ দিয়ে একদিন পরেই পোস্ট করব।]

    মোদির দ্বিতীয় শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    এছাড়া  দ্বিতীয় শর্তও প্রায় একই রকমের অর্থহীন! মূল কারণ হল, ব্রিকস যদি পুরানা আইএমএফের বিকল্প প্রতিষ্ঠান হয়ে গড়ে উঠতেই চায় তাহলে হবু সদস্যদেশের নুন্যতম জিডিপি থাকতে হবে এমন শর্ত এর অর্থ কী? আমার দেশের নুন্যতম জিডিপি কেন উল্লেখযোগ্য কোন জিডিপি নাই বলেই তো আমি সদস্য হতে এসেছি, নাকি তামসা করতে? আর মূলকথায়, আইএমএফের জন্মের সময় কী সে এমন শর্ত দিয়ে নয়া সদস্য নিয়েছিল? দেয় নাই তো? তাহলে এখনই বা কেন এটা মোদির প্রস্তাব??  মোদির কনসালটেন্টেরা কি তাহলে গাধা-গরু, পড়াশুনায় ফাঁকি দেয়া ছাত্র যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্টাডি করে নাই? নাকি মাদী ব্রিকস-কে বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব বানাতে চাইছে? কিন্তু তেমন ক্লাব হিশাবে জি৭ – গ্রুপ  প্রথম বড়লোক রাষ্ট্রের ক্লাব তো আছেই – মোদি সেখানে না গিয়ে ব্রিকসে এসেছে কেন?

    ন্যায্যতার প্রশ্ন ফান্ডামেন্টাল, তাই সবার আগে এই প্রশ্ন তুলতেই হবেঃ
    অর্থনীতিতে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোকে অন্তত সুযোগের দিক থেকে সাম্য – সবাই সমান সুযোগ পেয়েছে – এতটুকুই যদি না করতে পারে তাহলে নয়া ব্রিকস খাড়া করার দরকার কী? এর সাফাই ন্যায্যতা কী? আমেরিকা্র খামখেয়ালি মত একালে আর কাকে কোন কোন দেশকে এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে দুনিয়া?  এমন সুবিধা ব্রিকসের চীন বা চীনের মত অন্য কোন ব্রিকস সদস্যের হাতে যেন না থাকে, না উঠে সেজন্যই তো ব্রিকস এর প্রয়োজনীয়তা! নাকি??  ব্রিকস তখনই তো কেবল নুন্যতম ইনসাফের প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করতে পারবে; নাকি? আর আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি মোদির ভারতের মত যারাই বে-ইনসাফিতে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে সে অনেক সুবিধা খেতে পারবে মনে করছে – এরা নিজেরাই আগামিতে সেই গর্তে পড়বেই! এটাই ইনসাফের মহিমা! 

    তাহলে কী দাঁড়ালো, এটাই কী আগামি ব্রিকসের মাতবর সদস্য হিশাবে মোদির ভারতেরআমেরিকার মত এক খামখেয়ালি ক্ষমতার হাতা হয়ে উঠার খায়েসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?  ্মানে বগলে ইট নিয়ে মুখে শেখ ফরিদ!!! আসলে এটাই তো বৃটিশ কলোলিদখলদারেরা চলে গেলে বা এর অবসান হলেও সেই বৃটিশ দখলদারের স্বভাব নিজে পেতে চাওয়া “নেহেরুর ভারত” হওয়ার পুরানা খায়েস!!!

    বাহা রে নন্দ! বাহ রে মোদি! তোর খায়েসের বলিহারি!! মোদি আসলেই পারে! এই দুনিয়ায় অসাম্যের নিয়ম-আইন কানুন যেখানে সমান থেকে উন্মুক্ত করার দাবি উঠছে, এই মোদি সেখানে যে নিজেকে অবলীলায় এর ভায়োলেটর (violator) অমান্যকারি এক দানব হিসাবেই পরিচিত করতে চাচ্ছে!

    যাহোক উপরে আমরা মোদির  হবু সদস্যদের সদস্যপদ লাভের শর্ত নিয়ে মোদির প্রস্তাবের পর্যালোচনা করলাম, দেখলাম। কিন্তু ফাইনালি ব্রিকস কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  মানে কলোনিদখলদারি মনের মোদির ভারত নয়া শর্ত  জুড়ার যে প্রস্তাবই আনুক না কেন, শেষে ব্রিকসের এই সম্মেলন এবিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  নয়া সদস্যপদ লাভের কীশর্ত ঠিক করেছিল?

    ব্রিকসে নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত কী ঠিক হয়েছেঃ
    সেটা ব্রিকস ঠিক খোলাখুলি আমাদের জানায় নাই। বলা ভাল ব্রিকস আসলে  তা খোলাখুলি না বলার পরোক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বে-ইজ্জতি হতে যায় না, তাই এতে বুঝা গেছে !

    কিন্তু নয়া ছয় সদস্য কারা হবে আর তাতে বাংলাদেশ নাই – এই সিদ্ধান্তের তাতপর্য কী?
    এই তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে পারলেই বুঝা সহজ যে ব্রিকস এর সদস্য হবার ফাইনাল ক্রাইটেরিয়া বা শর্ত এখন কী দাঁড়িয়েছে।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাঁড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন ইরানঃ
    ব্রিকসের  সদস্যপদ লাভের শর্ত কী তা তারা প্রকাশ্যে জানায় নাই। কিন্তু তাদের কার্যকলাপ দেখে বুঝা সম্ভব যে তারা ঠিক কী চেয়েছে এবং হয়েছে বা হচ্ছে।  যেমন কারা এই ছয় রাষ্ট্র এর প্যাটার্ন যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখি ইরান এই রাষ্ট্র সদস্যপদ লাভ করেছে; যেটা একটা বিশেষ প্যাটার্ণ নির্দেশ করে। কী সেটা?  ইরানের অর্থনীতি সেই জন্মের সময় ১৯৭৯ সাল থেকেই আমেরিকার নিয়মিত ও অসংখ্য স্যাংশনে জর্জরিত। মানে ইমাম খোমিনীর বিপ্লবে স্বাধীন ইরান জন্ম থেকেই সে আমেরিকান খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে আছে। কিন্তু সেই ইরান এবার ব্রিকস এর সদস্যপদ পেয়েছে। যার সোজা মানে হল, এতদিন কেবল চীন বুক ফুলিয়ে ইরানের তেল কিনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছিল। আজ ব্রিকস জানিয়ে দিল তারা ইরানের মুখের উপর যে অন্যায় লাগাম টেনে ধরার আমেরিকান খায়েস ছিল যা ইরানের অর্থনৈতিক সব সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করতে রেখেছিল – তা ব্রিকস অন্যায় মনে করছে।  ব্রিকস অন্তত (আমেরিকান স্যাংশন) যে মানতে চাচ্ছে না এটাই পরিস্কার হয়ে গেছে ব্রিকসের এই সিদ্ধান্ত থেকে। মনে রাখতে হবে  এক, খোদ ভারত ট্রাম্পের সময় থেকে ইরানের তেল যেন কেউ না কিনে তা বাস্তবায়নের বাধা হিশাবে যে স্যাংশন-শর্ত দিয়েছিল সেবারই প্রথম- মোদির ভারত তা মেনে নিয়েছিল। ট্রাম্পের জাতিসংঘ প্রতিনিধি Nikki Haley এর সেসময়ের এমন মন্তব্য নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট দেখতে পারেন এখানে।  এমন অন্যায়-বেইনসাফি ভাবে সেকালে ভারতের বিক্রি হয়ে যাওয়াতে  ট্রাম্পের কাছ থেকে ভারত কী গোপন সুবিধা পেয়েছিল আমরা জানি না। তবে এরপর থেকে ভারত আর ইরানি তেল কিনে নাই, সস্তায় দিলে এমনকি নিরাপদে তেল ইরান নিজেই পৌছে দিলেও না করেছিল ভারত। আর মনে রাখতে হবে, এখনও  ব্রিকসের কোন সিদ্ধান্ত নিবার পদ্ধতি হল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেদিকে তা নয়, বরং সর্বসম্মতিতে। এর মানে এবার মোদি সজ্ঞানে মেনে নিলেন যে ভারতও এবার ব্রিকস-এ ইরানের নয়া সদস্যপদ অনুমোদন করছে ভারত। অর্থাৎ ব্রিকসের সদস্যপদ লাভের নয়া শর্ত  যা মোদি আরোপ বা হাজির করতে প্রস্তাব করেছিল তা হাওয়া হয়ে গেছে। মোদি নিজেই  সেকথা আর আঁকড়ে ধরে বসে নাই; বরং নিজেই ফাইনালি আর কার্যকর করতে চায় নাই। কিন্তু কেন? আর তাহলে এসব ভুয়া শর্ত প্রস্তাব করেছিল কেন?

    কারণ, এককথায় মোদির আনা শর্ত ছিল ভুয়া ওজনহীন!  এই শর্ত সে প্রয়োগ হোক তা চায় নাই বরং অন্য কোন উদ্দেশ্য এর ছিল। সেকথায় পরে আসবো।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসরঃ
    নয়া ছয় সদস্য এরা আর কে কে এর অর্থ তাতপর্য খুঁজলে পাই সেখানে আরেকটা প্যাটার্ণ। সেটা হল, আরও তিন রাষ্ট্র – সৌদি আরব, ইউএই আর এমনকি সাথে মিসর। [এখানে UAE বলতে যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ফলে বড় প্রভাবশালী হল দুবাই; তবে রাজধানী হল আবুধাবি]।  এছাড়া  মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন রাষ্ট্রের সাথে ইরানও আছে (উপরের অর্থে নয় আরও অন্য অর্থে) – এটা যদি মনে রাখি তবে এর আরও অন্যান্য অর্থ-তাতপর্য আছে সে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখানে আবার ইরানের উল্লেখ সেটা প্রথম তাতপর্য হিশাবে উপরে যা লিখেছি এরও বাইরের ইরান। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিপ্লবের পর থেকে এতদিন কেউ কাউকে সহ্য করে না এমন প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল ইরান বনাম সৌদি। আর এই দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখার বড় ফ্যাক্টর এই প্রধান শক্তি ও সমর্থক এবং সুবিধাভোগী হয়ে  সুবিধা খেয়ে গেছিল আমেরিকা।  কাজেই এখানে ইরান-সৌদি একসাথে ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ – এই আলাদা বৈশিষ্ঠকে আমল করা চোখে তা দেখতে হবে।  এর পিছনের ঘটনা হল, সম্প্রতি  ইরান-সৌদির পুরানা সেসব বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে এদুই শক্তির হাত মিলিয়েছে; আর এভাবে চলার উদ্যোক্তা-মধ্যস্থতাকারি হল চীন। এতে প্রকাশিত চীনের এই সক্ষমতার কথা পশ্চিমের কেউ অস্বীকার করছে না। বরং চোখ বড় বড় করে ভীত ঈর্ষান্বিত চোখে হলেও তাদেরকেও ইরান-সৌদি ঐক্য, হাত মিলানোকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ-কে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ও বিদ্রোহকে সৌদি দমন থেকে যা এতদিন এক মহা মানবিক সমস্যা তৈরি হয়ে ছিল তা মিটমাটের রাস্তা খুলে দিয়েছে। হুতি ইস্যু ও এর বিবাদ থেকে বের হবার – এই ইস্যু অবসান হতে যাবার সুযোগ আসাতে প্রবল প্রশংসা করতেই হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকলকে।  কারণ কেউই নিজেকে বিবাদ পছন্দ করা মানুষ বলে হাজির করতে পারে না।    আর  ইউএই (UAE) যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ও প্রভাবশালী হল দুবাই – ওর আমীর ও তার বড় সন্তান হল বর্তমানে সৌদি আরবের MBA [প্রিন্স সালমান যিনি কার্যত সৌদি শাসক] এর সবচেয়ে কাছের বড় সমর্থক ও চিন্তা শেয়ার করা বন্ধু। অর্থনৈতিক অর্থে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা দেশগুলোতে আধুনিকতার সংস্কার আনার জন্য এদুই প্রিন্স নিজ উদ্যোগ ও কাজের জন্য যারা গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছেন।  একসাথে করতে একাজে এমনকি সৌদি যেসব কাজ করতে চায় কিন্তু নিজ নামে করতে চায় না তা করে দেয় দুবাই প্রিন্স – এমনটাও দেখা গেছে। বিশেষ করে বর্তমানে সৌদিতে যে অর্থনৈতিক সংস্কার বা ঢেলে সাজানো চলছে তাতে এদুই প্রিন্সের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

    তাহলে সৌদি-দুবাই আর ইরান – এ তিনের মাঝে আবার চীন, এর এক আলাদা বিশেষ তাতপর্য আছে। কী সেটা?
    এটাই নব উত্থিত ব্রিকস  এই বিকল্প ব্যবস্থা কায়েমের পথে চীন প্রথম অর্থপুর্ণ পদক্ষেপ। আগে অনেকবার বলেছি ১৯৪৫ সালে আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল । ইতোমধ্যে প্রায় আশি বছর এটা চলতে পেরেছে, আজও চলছে কিন্তু এখন আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত কমছে এর চেয়ে বহু গুণে চীনের সক্ষমতা বেড়ে সে আমেরিকাকে জিডিপিতে  ছাড়িয়ে এক নম্বর অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে।  দুনিয়ার সবদেশকেই একেবারেই কম বা না সুদে অবকাঠামো বিনিয়োগ যোগানোর সক্ষমতা – এটাই কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়ার একেবারে প্রাথমিক যোগ্যতা। কারণ এমন বিনিয়োগ দানের সক্ষমতা যখন কোন দেশের অর্থনীতির হয়, এটাই দুনিয়ায় বেশির ভাগ দেশের উপর ঐ সক্ষম দেশের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দাড়ায়, দাঁড়াবেই। আমেরিকার বদলে ওর এতদিনের গ্লোবাল নেতৃত্বের জায়গায় চীন উঠে আসতেছে, দখল করতেছে – এভাবেই দিন কে দিন দৃশ্যমান হাজির হয়ে উঠছে।ঙ্কারণ,  গরীব তো বটেই এমনকি মধ্যম আয়ের দেশগুলোও (যেমন আশিয়ান জোটের দেশগুলো) যারা অবকাঠামো ঋণ পেতে ৩% পর্যন্ত সুদ দিতে প্রস্তুত (কারণ, আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা ব্যবস্থাটা মানে বিশ্বব্যাংক এমন সরকারগুলোকে অবকাঠামো ঋণ আর দেয়ই না তবে এসবদেশের প্রাইভেট কোম্পানিকে হলে দিতে রাজি। এই নীতি ফলো করে বিশ্বব্যাংক।) তাই, এদের কাছে চীনা অবকাঠামো ঋণ খুবই কাম্য। ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য চীনের AIIB -এই ব্যাংক তাই মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাছে খুবই আদরণীয়!   আর মনে রাখতে হবে, এখনকার চীনের মত একটা দেশ যখন একবার অর্থনৈতিক সক্ষমতার চরম বৃদ্ধির স্তরে পৌছে [মানে নিজ অর্থনীতি বিপুল সারপ্লাস জমা করতে থাকে বা উদ্বৃত্ব সম্পদে ভরে উঠে ] এমন হয়ে যাবার অর্থ হল এরপরের দশ বছরের মধ্যেই ঐ দেশ সামরিক শক্তি হিশাবে সে হাজির হতে, দৃশ্যমান হতে শুরু করতে পারে।  আর এসব সম্ভাবনা ও সুবিধার কারণে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গায় বসে যাবার সুযোগ পেতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, আর তা কমবেশি খোদ আমেরিকাই মেনে নেওয়া বা রেফার করে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে।
    এটাকে আমি বারবার গ্লোবাল পালাবদল বলছি। আর এটা নিয়ে একদল আছে যাতা এটাকে কথিত ভুরাজনীতিক ঘটনা বলে পরিচয় করাতে চাচ্ছে। এভাবে নিজের অজ্ঞতা ঢাকার কিছু নাই, এটা অপ্রয়োজনীয়। ভূরাজনীতি বা জিও-পলিটিক্স  এই শব্দের মধ্যে যে ভূ [geo- জিও] শব্দটাই তো সঠিক নয়। কারণ এটা গ্লোবাল অর্ডার এরই নেতৃত্বের মধ্যে পালাবদলের ঘটনা।  যেখানে রূট শব্দ ও ধারণাটা হল গ্লোবাল [Global]। যা ভূ [geo- জিও] একেবারেই না। কারণ,  গ্লোবাল আর জিও- একই শব্দ না, এক অর্থও না। তবে গ্লোবাল না বলে অনেক বাংলায় “বিশ্বব্যবস্থা” লিখে; সেটা চলতে পারে।  এটা বোকা বোকা অবুঝ শব্দ  ভূ [geo- জিও]  বলার চেয়ে ভাল!

    নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠছে চীন – এই লক্ষ্যেই চীন পুরানা  গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট করে কেবল গ্লোবাল মুদ্রা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক আইএমএফ আর অবকাঠামো ঋণ দেবার বিশ্বব্যাংক – এই দুই গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের পাল্টা ও বিকল্প সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগ নিতেই এমন এক জোট খাড়া করেছে যাকে আমরা ব্রিকস বলে চিনছি।
    তবে আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য (কিন্তু চীনা নেতৃত্বে) এমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়া সহজ কাজ নয়। এছাড়া গড়ার কাজটা চীনের বেলায় শুরুতে সে কিছু দেশকে সাথে নিয়ে বসে কথা শুরু করেছে।  বৈঠকে বসে শুরু করলেই তা খাড়া হয়ে বা কার্যকর হয়ে যাবে না।  সে পথের প্রধান বাধাথল – এখনকার ব্যবস্থায় আমেরিকান ডলারেই বেশির ভাগ আন্তঃরাষ্টীয় লেনদেনবিনিময় বাণিজ্য  (আমদানি-রপ্তানি) সম্পন্ন হওয়া। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা একেবারেই কমে গেলেও এ’জায়গায় ডলারের উপর ব্যবহার কারি দেশ ও মানুষের পুরানা আস্থা অভ্যাস সহসা বদলে দেয়া যায় না একারণে। ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসন  স্যাংশন দেয়ার অতিব্যবহারের কারণে একটা বড় সংখ্যাক দেশ চাইছে ডলার নির্ভরতার বিকল্প – এমন দেশগুলোর শীর্ষে আছে রাশিয়া। হাসিনার বাংলাদেশও অতি আগ্রহী। কিন্তু আগেই বলেছি এটা ঘরে বসে বিকল্প খাড়া করে দিবার বিষয় নয়। তাতে রাশিয়া বা বাংলাদেশ এর মত দেশগুলো যতই ছটপট করুক! তাহলে ডলার মুদ্রা ভিত্তিক বাণিজ্যের আধিপত্য একে পিছনে ফেলে মানে ডলারে ব্যবসাকে সেকেন্ড অবস্থানে নামিয়ে দিয়ে, পরের সবচেয়ে চালু মুদ্রা ইউয়ান, একে সামনে আনার উপায় কী?

    গত ২০১৫ সালে চীনা ইউয়ান মুদ্রাকে আইএমএফ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিশাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তার আগে এমন আইএমএফ অনুমোদন দেয়া মুদ্রাগুলো হল (শুরুতে মার্কিন ডলার ছাড়াও) বৃটিশ পাউন্ড, জাপানিজ ইয়েন, ইইউ এর ইউরো। আর এসবের সাথে সেবার পঞ্চম কারেন্সি তখন হয়েছিল ইউয়ান[Yuan]। কিন্তু ইউয়ান ইতোমধ্যেই লেনদেনের মুদ্রা হিশাবে ডলার বাদে বাকি মুদ্রাগুলোকে ছাড়িয়েছে।  তাই এব্যাপারে চীনা গবেষণা অনুমান যা পরোক্ষে প্রকাশিত – এর ভাষ্য অনুযায়ী এমন চাবিকাঠিটা হল চীন প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ হিশাবে। তাই সুস্থির চীন আর সাথে অস্থির রাশিয়া উভয়েই মনে করে যে এসব জ্বালানি ক্রয়ের পেমেন্ট যদি ডলারের বদলে ইউয়ানে বদলে দেয়া যায় তাহলে মার্কিন ডলার ডমিনেন্সের উপর এক বড় ধাক্কা দেয়া সম্ভব। আর তাতেই ইউয়ান হয়ে যেতে পারে গ্লোবাল বাণিজ্য-লেনদেনের প্রধান মুদ্রা । মানে গ্লোবাল বাণিজ্য ঘটবার প্রধান মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে ইউয়ান।  যেটা গ্লোবাল বাণিজ্যে  মোটামুটি ৬০% এর বেশি হয়ে কোন মুদ্রা পৌছাতে পারলে তবে এরপর তা ক্রমশ বাড়তে থাকে  – আর তাকে সহসাই নামানো যায় না।  যে পথে এখন ডলার উত্থিত হয়ে আছে! চীনা ইউয়ান উত্থানে এক নম্বর মুদ্রা হয়ে উঠতে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিকল্পিত পথ এটাকেই মনে করা হয় – তাত্বিক ও অর্থনীতিবিদ পর্যায়ের ধারণায়। আর, এপথেই চীন আগাচ্ছে বলে মনে করা হয়। এনিয়ে গত ২০১৫ সালে আমারই অনেক লেখা আছে।

    কাজেই এটা এখন বলাই বাহুল্য যে এই পথে গ্লোবাল বাণিজ্যকে ঠেলে দেবার ক্ষেত্রে সৌদি আরব কেন চীনের কাছে গুরুত্বপুর্ণ ও অন্যতম এক নির্ধারক শক্তি।  ইউএই(UAE) এর তেলবিক্রির সক্ষমতা খুবকিছু না থাকলেও সে সৌদির যেকোন কাজ-উদ্যোগের এক নম্বর সহযোগী-সমর্থক। আর এবার এদের সাথে ইরান,  যে ১৯৭৯ সাল থেকেই জ্বালানি বিক্রি সক্ষমতা থাকা সত্বেও গরীব দেশ হয়ে আছে, ইরানি অসুস্থ বাচ্চার জন্য ওষুধ কিনে দিতে অর্থনীতি অক্ষম হয়ে পড়ে ছিল – সেই ইরান গত ৪৪ বছরে খুব কম সময়েই সে নিজের তেল বিক্রি করতে পেরেছে। এই ইরানও এবার যুক্ত হয়ে গেছে যেটা এর আগে সৌদি-ইরান বিরোধ লাগিয়ে রাখার জন্য ইরান আরো অসহায় হয়ে ছিল। এখন হবে উলটা। এবার ঠিক তেল বিক্রি না তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গ্লোবাল ভুমিকার নায়ক হয়ে উঠবে এই তিন দেশ।  আমরা মনে রাখতে পারি ইরান-চীন ২৫ বছরের বাণিজ্য-বিনিয়োগ চুক্তির কথা। যার সার কথা ইরানের তেলের বিনিময়ে চীনা ঋণ, বিনিয়োগ টেকনোলজি আর চীনা বাজার সবই উন্মুক্ত হবে ইরানের কাছে।   এছাড়া এর আরো সম্ভাবনা – মানে কোন দিকে সম্ভাব্য কী হতে পারে সেদিকে তাকালে পাই তুরস্কের এরদোয়ান-কে। যদিও তিনি শুরুতেই যোগ দিতে অপারগ হবেন। তা হলেও এটা বলাই যায় যে ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য এখন চীনের পক্ষে ও হাতে চলে গেছে।  তাই সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসর কে ব্রিকসের সদস্য করে নেয়া এটা ছিল চীনের  কাছে বিরাট প্রায়োরিটি; অন্তত বাংলাদেশের তুলনায়। যদিও বাংলাদেশ চীনের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ – এখানে ভারতের চেয়েও চীনকে প্রভাবশালী হয়ে উঠতেই হবে! কিন্তু বর্তমান অস্থিরতায় সে হাসিনার টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে দেখে – আর তা বুঝা যায় কেন সে বাংলাদেশের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায়োরিটীতে উপরে রাখলো

     এতদিন মিসর ছিল আমেরিকান সক্ষমতার এক প্রধান হাতা, এক নির্ভরশীল ফ্যাক্টর। এখন কী হবেঃ
    মূলকারণ, ১৯৭৮ সালে আমেরিকান মধ্যস্থতায় ইসরায়েলকে মিসরের সাথে ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল আমেরিকা। আর এর মাধ্যমেই কিসিঞ্জারের মধ্যপ্রাচ্য পলিসির (তেলের উপর খবরদারি সহ) [Kissinger ME policy] এতদিন প্রধান পশ্চিমা-নীতি মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর হয়ে ছিল। আর এর সুযোগেই আমেরিকা ইসরায়েলকে দিয়ে বারবার ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ হাতে পেয়েছে, ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকার হাতের মুঠোয় হয়ে যাওয়ার  চাবি কাঠি হয়ে ছিল এতদিন। আমেরিকার এই বিশেষ প্রভাব ও সক্ষমতাটাই এখন দুর্বল হয়ে শুরু করবে; চীনা প্রভাব এর উপরে জায়গা নিবে। এটাই গ্লোবাল অর্থনৈতিক পালাবদল বা এর আরেকটা প্রকাশের দিক!
    কিন্তু এবার চীনা মধ্যস্ততায়  সৌদি, ইউএই (UAE) এবং ইরানের সাথে মিসরও এসে যাওয়াতে ইসরায়েল – সেও এখন আমেরিকার চেয়েও সরাসরি চীনের সাথে যোগাযোগ করে নিজ নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা খুঁজে নিতে বাধ্য হবে। ইরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমাণাত্মক অবস্থান যদি কমাতে চায় তবে চীনের কাছে যেতে হবে। চীনের মাধ্যমে ইরানের কথা শুনতে হবে।  ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্য মানেই  চীনই সেখানকার একমাত্র কার্যকর শক্তি ও জায়গা  – এমন বলে মেনে নিতে হবে  – যারই মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থ আছে এমন সকলকেই  – ঘটনা ফেনোমেনোর অভিমুখ এখন সেদিকে আগিয়ে গেল। আমেরিকার চেয়ে চীন এখন ইসরায়েলের কাছে নিজ নিরাপত্তার নিশ্চিত করার স্বার্থে অনেক বেশি ওজনদার প্রভাবের দেশ হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এককথায় ইসরায়েল-মিসর সহ সারা মধ্যপ্রাচ্যে চীন এখন আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী ও বড় প্রভাব নিয়ে হাজির হতে থাকবে। আর এসব ততপরতা পিছনের এক  নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক ভিত্তির যোগানদার হয়ে হাজির হবে ব্রিকস ও চীনা নেতৃত্ব।

    তাহলে মোদির দেয়া সদস্যপদ লাভের শর্তের কী পরিণতি হলঃ 
    এক বা্ক্যে  সারকথাটা বললে, মোদির ভারত চেয়েছে হাসিনার বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয়ে যায়। আর সেটাই মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে। এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা! আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো।

    বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয় এটা মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে।
    এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে।
    কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে
    বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি
    যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা!
    আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো। 

     

    কিন্তু আপাতত বাংলাদেশের হাত ছাড়তে কেন চীন এতে রাজি হলঃ
    এর উত্তরটা, প্রশ্নটাকে আরেক ভাবে বুঝে বা পেশ করে দেয়া যাক। ছয়টা দেশ এবার সদস্যপদ লাভ করলো – এর সোজা অর্থ তাহলে এর স্বপক্ষে মোদির ভারতও সমর্থন দিয়েছে নইলে তা সর্বসম্মত হত না – তা পাশও হত না।  আর মোদি এই সমর্থন দিয়েছে – অবশ্যইচীনের সাথে একটা কিছুর বিনিময়ে। আর এটাই বাংলাদেশে সদস্যপদ সওদা [bounty] হয়ে যাওয়া!
    আসলে, চীন বাংলাদেশ বাদে যাদেরকে সদস্যপদ এবার দিতে চায় তাতে মোদির সম্মতি কিনে নিয়েছে। আর এই কেনা-বেচার সওদা হয়েছে বাংলাদেশের সদস্যপদ না পাওয়া। বাংলাদেশ যেন সদস্যপদ না পায় এতে চীনকে রাজি করিয়ে বিনিময়ে মোদি ঐ ছয় রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভে নিজ অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছে। বলা যায় এই হল, চীনের সাথে মোদির ডিল বা গিভ এন্ড টেক!  কাজেই এখানে মোদি এখানে ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত যাই পেশ করুক প্রকৃতপক্ষে সবই ছিল ভুয়া, দেখাইন্না এক বাহানা মাত্র। আর ওদিকে সবকিছু শেষ হয়েছে এই ডিলের মাধ্যমে! কিন্তু মোদি কেন এমন চরম হাসিনাবিরোধি অবস্থান নিল?
    এটা কমবেশি অনেকের  কাছেই পরিস্কার যে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি চীনের সাথে কমিটেড। ২০১৮ এর নির্বাচন যেমনই হোক, কথিত ঐ নির্বাচনের ব্যয় চীন যোগানোর মাধ্যমে এই সম্পর্ক যাত্রা শুরু করেছিল। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর বা চীনা তিস্তা প্রকল্প ইত্যাদি চীনের আগ্রহ যেগুলোতে বিশেষ করে যেগুলো ভারতের আপত্তি বা হাসিনাকে ফুসলিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে এতদিন যেসব প্রজেক্ট ভারত হাসিনাকে নিতেই দেয় নাই। নাকচ বা বন্ধ করে দিয়েছে মূলত সেগুলোতেও তখন থেকেই চীন চেয়েছে হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করানো – এটাই ছিল চীনেরর মূল লক্ষ্য।  আর এগুলো সবকিছুর উপর যেকোন উপায়ে বাধা দেয়া – এটাই গত সাড়ে চার বছর মোদির ভারত চেষ্টা করে গেছে। যেমন, চীনা তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দিকে ১৬ কিমি পর্যন্ত চীনারা কোন কাজ করতে পারবে না বলে ভারত আপত্তি  তুলে রেখেছে।  তিস্তার মত প্রকল্পগুলোতে চীনকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না দেয়ার পিছনে এমন ভারতীয় আপত্তিকে উপেক্ষা করে হাসিনা কাজ করতে পারে নাই। তবে সব প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন এগিয়ে যেতে পারে নাই আর বাধা সৃষ্টি করে রাখার বেশি কিছু ভারত করতে পারে নাই – এই হল এক খামোখা ব্যলেন্সিং পয়েন্ট এমন হয়ে থেকেছে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পনা হল আগামিতে হাসিনা যদি নিজেকে আবার বিজয়ী বলে যেভাবেই হোক ঘোষণা করতে পারে তাহলে এরপরেই ভারতের আপত্তিগুলো পায়ে মারিয়ে চীনের সাথে হাসিনা এগিয়ে যাবে এই ছিল চীনের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি – অনুমিত ধারণাটা এরকম। পশ্চিমা গোয়েন্দা ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট গুলোও এরকম ধারণা দিচ্ছে। অথচ অন্য কোন কিছু দিয়ে হাসিনাকে ফিরাতে মোদি ব্যর্থ হয়ে থাকছিল।  এতে হাসিনার যুক্তি ছিল সে চীনের সাথে এমন ডিল না করলে ক্ষতায় ফিরতে পারবে না – আমেরিকান চাপ ফেরানো অসম্ভব। আর মোদির যুক্তি হাসিনা-চীনের এই ঘনিষ্ঠতা মোদির ভারতের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।  এই ত্রিভুজ সংকট পরিস্থিতিতে না পেরে মোদি হাসিনাকে থামাতে গিয়ে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করেছে – মোদি খোদ চীনের সাথেই ডিল করে বসেছে।
    তাহলে চীনের দিক থেকে – সেই-ইবা কেন মোদির প্রস্তাবে রাজি হল?

    চীনকে দেয়া  মোদির ডিল-প্রস্তাব যে হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে হবে – এতে চীন কেন রাজি হল?
    এখন এটা তো সবাই জানে দেখাই যাচ্ছে যে বাস্তবতা হল,  চীন ও মোদি উভয়েই  বা এরা দুপক্ষই  হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছে। বা বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্যপদ না দিতে তারা এক ঐক্যমত্য কায়েম করেছে।  এর মানে মোদির ডিল-প্রস্তাবে চীন হ্যা দিয়েছে। তাহলে চীন এমন করল কেন? বাস্তবত  চীনের এতে রাজি হয়ে যাওয়া এটাই সব বলে দিচ্ছে যে খুব সম্ভবত চীনের  ক্যালকুলেশন-অনুমান হল, হাসিনা আর আগামিতে ক্ষমতায় থাকতে বা ফিরতে পারছে না। তাই, মোদির ডিল-প্রস্তাব চীনের মেনে নিয়ে হাসিনাকে ছেড়ে দেয়া আর বিনিময়ে বাজি ছয় রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দেওয়া প্রশ্নে মোদির ভারতকে দিয়ে সমর্থন দেওয়ানো – এই ডিল গ্রহণই চীনের জন্য সহি বেটার ডিল এবং সবচেয়ে লাভজনক!

    অর্থাৎ মোদি যা চেয়েছিল তা পেয়ে নিয়ে বাসায় গেছে। চীনও যেটা বেশি লাভজনক তাই পেয়ে নিয়ে ফিরে গেছে। মাঝখানে হাসিনা এদুইয়ের বেচা-বিক্রির ডিলের মধ্যে পরে সবই হারিয়েছে।
    এছাড়া চীনের দিক থেকে দেখলে  তার ইউয়ানকে ডলারের স্থান নেওয়ার  পক্ষে  কাজ শুরু করার  স্বার্থ মানে এর পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যকে কাজে লাগানো এটা অনেক বেশি অর্থপুর্ণ। ও বড় প্রায়োরিটি। সেটাই সে পেয়ে গেছে।

    শেষ করব তাহলে ইথিওপিয়া আর আর্জেন্টিনা কেন সদস্যপদ পেলো এর তাতপর্যঃ
    ইথিওপিয়া সম্পর্কে  বাইরের বিশেষ করে এশিয়ার মানুষের ধারণা খুবই কম। সৌভাগ্যবশত আমার প্রায় তিন বছর ওর রাজধানী আদ্দিস আবাবা-তে বসবাসের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই কিছু কথা বলব।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট একঃ
    বাইরের দুনিয়া থেকে বা অন্য মহাদেশ থেকে আফ্রিকার প্রবেশের গেটওয়ে মূলত তিনটা। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বিমানের রূটগুলো লক্ষ করলে বুঝা যায়। আপনাকে সবার আগে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়াতে ঢুকতে হবে।  এসব ফ্লাইট নিতে হবে। পরে যে আফ্রিকান দেশে যেতে চান  সেদেশের ফ্লাইট বদলে নিতে হবে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়া থেকে। মানে এই তিন দেশই হয়ে উঠেছে আফ্রিকার যেখানে যেতে চান এরই হাব বা প্রথম মোকাম দেশ।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট দুইঃ
    আফ্রিকা থেকে কলোনি দখল উঠে গেছে এশিয়ার পরেপরেই – ১৯৬০-৮০ এই সময়ের মধ্যে  ব্যাতিক্রম কেবল সাউথ আফ্রিকা ১৯৯৪।  আর একেবারেই ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া যে কখনও কলোনিদখলও হয় নাই। শুধু তাই না, পুরা দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় ইথিওপিয়া রাজা হাইলে সেলাসি শাসিত দেশ ছিল। রাজা ক্ষমতায় ছিল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। যতক্ষণ তা এক সোভিয়েত কমিউনিস্ট সমথিত  সামরিক ক্যু ঘটেছিল হাইলে মেঙ্গাস্তু [Mengistu Haile Mariam] -র হাতে। আরও পরে ১৯৯১ সালে চীনাস্ইটালে গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার মত আরেক কমিউনিস্ট গ্রুপ এখন ক্ষমতায়। আর সেনাবাহিনী হল ঐ গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা।
    সারা আফ্রিকার আর বড় পিছনে পড়ে অক্ষমতা হল, নুন্যতম পুজি বিকশিত বা শহরায়ন ঘটবার আগেই কলোনিদখল হয়ে যাওয়া। কথাটা অন্যভাবে বললে, সারা আফ্রিকার মানুষ আগে শহর কী জিনিষ তা দেখেনি। কলোনি মাস্টারেরা দখলের পর তারাই শহর গড়েছিল – মানে এসব মাস্টারের হাত ধরেই আফ্রিকার মানুষ শহর কী তা চিনেছিল। তুলনায় ভারতে বৃটিশেরা দখল নিবার আগেই আমাদের অন্তত তিনটা বড় বড় সমৃদ্ধ শহর (লক্ষ্ণৌ, হায়দ্রাবাদ আর দিল্লি) গড়ে উঠে গিয়েছিল।  আর এসব শহরের শহুরে পোষাক-ই হলো পাঞ্জাবি, এজন্য এটা কোন ধর্মের পোষাক নয়। শহরের প্রতীকী পোষাক বলে তা এখনও ভারতের সামাজিক অনুষ্ঠানে বা বিয়ের মুখ্য পোষাক!
    আফ্রিকার এই মারাত্ম পিছনে পড়ে থাকা এটা এতই মারাত্মক যে কলোনি শাসকেরা ফিরে গেলে সাধারণ ট্রেডিং  মুদিখানা বা পষাকের মত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ট্রেডিং – এটা শুরু করার মত মধ্যবিত্ত আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই গড়ে উঠে নাই। আর এজায়গাটাই দখল করে আছে বৃটিশদের হাত ধরে আফ্রিকার মাইগ্রটেড ভারতীয় শ্রমিক পরিবারেরা। অথচ এই কমন চিত্রের একমাত্র ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া।
    একালে অবকাঠামো পুঁজি ও সাথে FDI বা বিদেশি কারখানা পুঁজিও চীনের চীনের কারণে পাওয়া সহজ হয়েছে বলে এমন পুঁজি কাজে লাগানোর সক্ষমতা ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বেশি। একারণের চীনের চোখে এক গুরুত্বপুর্ন গন্তব্য হল ইথিওপিয়া! মানে এটাও আফ্রিকায় চীনেরই বড় স্বার্থের দেশ যাকে চীন ব্রিকস এর সদস্য করে নিল!

    সবশেষে আর্জেন্টিনাঃ
    গত কমপক্ষে সাত বছর ধরে লাগাতর আর্জেন্টিনা অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। যার মুদ্রাস্ফীতি ১০০% এর বেশি আর ৪০% এর বেশি লোক দারিদ্র সীমার নিচে চলে গেছে। এঅবস্থায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা  আর্জেন্টিনার কেস ব্রিকসে নিয়ে আসে, বিশেষ করে চীনের নজর ও বিবেচনায়।  ভেনেজুয়েলা যেমন সেবার চীনের কাছে কিউবান সুপারিশ  পেয়েছিল।  তেমনই আর্জেন্টিনাওপক্ষে পাওয়া শক্ত সুপারিশের কারণে চীনের নজরে আসায় এর পরিণতিতে র্আজেন্টিনাও এবার ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করে যায়। আর এতে চীনের আরেক বড় লাভ হয় নিজের পক্ষে ব্রাজিলের সমর্থন ও আস্থা আরো পোক্ত হল।

    তাহলে এককথায় বললে ছয় নয়া সদস্যই অনুমোদন পেয়েছে মূলত চীনের আগ্রহ ও সমর্থনের কারণে।  কারণ,  মোদি যতই ভাব দেখাক ব্রিকস বলতে এর মূল সক্ষমতা তো চীনের।  একমাত্র চীনেরই আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বা অন্যধরণের পুঁজি ঋণ দিবার সামর্থ আছে। তাতে ব্রিকস এর উদ্যোক্তা সদস্য আরো চার রাষ্ট্র হলেও এরা হল ডেকোরেশন!  বাস্তবত কার্যত চীনই মূল চালিকাশক্তি। তাতে ভারতের মোদি যতই ভাব দেখাক! বাংলাদেশকে ব্রিকসের বাইরে রাখুক!
    এরই রিফ্লেকশন ঘটতে বা ছাপ পড়তে দেখেছি আমরা এবারের নয়া সদস্যপদ বিতরণে!

    আপডেটেডঃ  ২৮  আগষ্ট  ২০২৩; রাত ২ঃ ১৩
    সর্বশেষ  আপডেটেডঃ  ২৯ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ১১ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিএনপির আত্মহননের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’

    বিএনপির নিজেকে খতমের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’
    গৌতম দাস
    ২২ আগষ্ট ২০২৩  মধ্যরাত  ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Q3

     

     

                                     Fundamentalism

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায় এর “দাগী অপরাধী” ততপরতা শেষ হচ্ছে না বা থামছেই না। বরং  সেটা এতই ক্ষমতাধর যে একদিনের মধ্যে বিএনপি সেক্রেটারি মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর-কে একেবারে মৌলবাদবিরোধি করে ছেড়েছে! যত্তবড় মৌলবাদবিরোধি সিপিবি কেন কোন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল কেউ এতদিন হতে পারে নাই!  নিশ্চয় এতে প্রগতিশীল ও সাহিত্য-সাংস্কৃতি জগতের যারা এতদিন আওয়ামি লীগ ওবস্থা ভাল না বুঝে ছুড়ে ফেলে বিএনপিকে প্রগতিশীল বানানোর কাজে লেগে পড়েছিল তারা তাদের পড়ে পাওয়া সাফল্য দেখে ব্যাপক খুশি হয়ে উঠেছেন!
    দেখা যাচ্ছে, এতে সর্বশেষ যোগ দিয়েছে দক্ষিণ-ভারতের দ্যা হিন্দু মিডিয়া গ্রুপের এক নয়া প্রপাগান্ডা-ময় ফ্রি পত্রিকা যার নাম “ফ্রটলাইন” [Frontline]।  মূল মিথ্যা কথাটা ছিল, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নাকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমেরিকার কাছে এক ‘কূটনৈতিক নোট’ বা “বার্তা” পাঠানো হয়েছে। যেটা পুরাটাই মিথ্যা।  কোন প্রমাণ ছাড়াই এধরণের মিথ্যা প্রপাগান্ডার দাবি প্রথমে ভারতের একটা বা দেড়-টা মিডিয়া থেকে ছড়ানো হয়েছে। মূল অপরাধী আনন্দবাজার-অগ্নি রায়দের আর, সেই কথিত মিথ্যা বার্তা-কে একটু ঘুড়িয়ে-ফিরিয়ে কিন্তু একইভাবে কোন প্রমাণ বা খবরের উৎস কে তা না জানিয়ে পরে তা প্রচার করেছে ডয়েচ ভেলে। তবে এটা নয়াদিল্লির ডয়েচ ভেলে। আর পরে প্রথম আলো-স্টার এই ডয়েচ ভেলের মিথ্যা রিপোর্টের বরাতে সেই চোথা-কপিটাই ছেপেছিল। একাজটাও সমান অপরাধের এজন্য যে  এরা তো দেখতেই পাচ্ছিলেন ডয়েচ ভেলের লেখাটা কোন “নিউজ” না। এটা এক “দাগী [despotic] ততপরতা” কারণ এতে তথ্যের কোন উৎস জানানো হয় নাই। তাই এটা কোন  “নিউজ” হয় নাই বরং একথা গুলো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালইয়ের কে ও কবে বলেছে এর কোন প্রমাণ সাথে না দিয়েই উলটে  আনা হয়েছে – এক গায়েবী “কূটনৈতিক নোট” এর দাবি। এই অপরাধী কাজ তো জার্নালিজমের লোক ও চোখ হিশাবে প্রথম আলো-স্টারের বুঝতে না পারার কোনই কারণ নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই অপরাধী কাজে তারাও সামিল হয়েছে।

    তবে ফ্রন্টলাইন অথবা ডয়েচ ভেলে বা প্রথম আলো-স্টার  এরা সকলেওই ভেসে গিয়ে এক লোভে। লোভটা হল, বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা যে রাজনৈতিক গুমোট অবস্থা তাতে সবচেয়ে “পাবলিক নজরদারিতে আছে ইন্ডিয়ান সরকার; মানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়া। এখন মিডিয়া বাণিজ্যিক চোখে দেখলে, এটাই বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান মিডিয়ার চোখে এটা সবচেয়ে লোভনীয় – নিজ নিজ মিডিয়া রিচ [media reach] বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ। যার সোজা মানে যত বেশি ভিউ ততই অর্থলাভ। এছাড়াও এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার রাজনৈতিক লাভালাভ উঠবে ভারত ও বাংলাদেশের চলতি সরকারের ঘরে। তাই তাদের থেকেই আরেক অঙ্কের অর্থ পাবার সম্ভাবনা। আর বলাই বাহুল্য এতে বড় ফান্ডটা হওয়ার কথা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মিডিয়া ফান্ড। এসব চিন্তা থেকেই মনি-কাঞ্চনের চকচকে লোভে এসব মিডিয়ার চোখে; তাতে এই কথিত “ভারতীয় বার্তা” অসত্য বা বাপ-মার হদিস হলেই বা কী? চকচকে লোভের কাছে এই হদিস-হীনতা মামুলি!!!
    এর একটা প্রমাণ দেয়া যাক।

    “দ্যা হিন্দু” মিডিয়া গ্রুপের আরেক সাবসিডিয়ারি বা সহায়ক কোম্পানি তবে, প্রপাগান্ডা পত্রিকা হল ফ্রন্টলাইন। কেন এমন বিশেষণ লাগিয়ে বলছি? কারণ, মূল ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা এই ইংলিশ ডেইলি এখন আগে অর্থ পরিশোধ পে [pay] করলে তবেই পড়তে দিবে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া তাদেরই আরেক ব্যবসা বিষয়ক বা শেয়ার মার্কেট মুখ্য করা আরেক পত্রিকা বিজনেস লাইন আরো আগেই পে [pay] পত্রিকা করা হয়েছে। তাতে বলাই বাহুল্য পাঠক কমে গেছে। তাই সমান্তরালে “ফ্রটলাইন” কে সামনে আনা হয়েছে যেটা ওপেন মানে পয়সা লাগবে না। ফ্রন্টলাইন পত্রিকা থেকে উপরের ছবিটা নেয়া হয়েছে বাংলাদেশের ২১ আগষ্ট সকাল পোনে আটটায়।  আর এতে তখনও দেখা যাচ্ছে “ফ্রটলাইন”  খবরের প্রধান হেড লাইন হল আগের দিনের মানে, ২০ আগষ্ট সকাল নয়টায় ছাপানো বা হোস্ট করা বাসি ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা স্টোরিটা। অথচ আজকাল নেট বা ওয়েব পত্রিকার যুগের কোন মিডিয়ায়  মুখ্য হেড লাইন নিউজের জায়গায় কোন খবরকে কী ২৪ ঘন্টা লটকায়ে থাকে? না রাখা উচিত, না বাস্তব সম্মত?? প্রশ্নই আসে না। তাহলে ফ্রন্টলাইন কেন রেখেছে? কারণ, এই প্রপাগান্ডা মিছা খবরটা “পয়সার মাল”। এটা এখনও পত্রিকার রিচ বাড়াবে বা বাড়ছে বলে ম্যানেজমেন্টের বুঝ! পাঠক টানবে, আনাগোনা হবে সেটাই তাদের অন্যসব আজকের টাটকা নিউজের চেয়েও সর্বোচ্চ হিট দিবে! সেই বিবেচনায় এই ২৪ ঘন্টা পুরানা চোথা-কপিটা টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। এ’থেকে অবশ্য এটা কেমন মান ও পাঠক আদরের পত্রিকা তা ঠাহর করা যাচ্ছে, সেটাই উদাম হয়েছে। যদিও সারকথাটা হল, এখানে মিডিয়া বা জার্নালিজম বলে কিছু নাই, সবটাই ব্যবসা আর অর্থের লোভই মুখ্য!!!

    ওদিকে কথিত ‘কূটনৈতিক “বার্তার” কারণে অবস্থা এমন হয়েছে যে এই গল্পের কোন সত্যতা নাই সেই গল্প নিয়ে লীগ-বিএনপি রাজনৈতিক নেতারা বিবৃতি দেয়া শুরু করেছে। বলছে, “যদি ভারত এমন বক্তব্য” দিয়ে থাকে অথবা “যদি এমন ভারতীয় বার্তা” মানে কূটনীতিক নোট বলে কিছুর অস্বিত্ব থেকে থাকে – এভাবে “যদির কথা” তুলে যার যার মনের খায়েস বা বাকযুদ্ধ চালানো হয়েছিল গতকাল সারাদিন।
    এভাবে যদির উপর দাঁড়িয়ে কথা বলাটা চরম বোকামি শুধু না বরং বেইজ্জতি হবার সম্ভাবনা!  কারণ, এখন যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবার  সোজা বিবৃতি দিয়ে বা সাংবাদিক ডেকে জানায় যে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত আমেরিকাকে কথিত কোন বার্তাই পাঠায় নাই – তখন কী হবে!!!  সেটা হবে অনেকটা এরকম যে সমাজে কেউ কাউকে যদি বলে [যেটা বাস্তবে কেউ করে না] আপনি আমাকে যদি গালি দিয়ে থাকেন তবে আমি আপনাকে জুতা দিয়ে মারব। আরে বাবা আমি গালি দিয়েছি কিনা সেটা তো আগে নিশ্চিত হবে আপনাকে, নাকি? যদি গালি না দিয়ে থাকেন তখন তো নিজেকেই লজ্জা পেতে হবে!  এছাড়া এসবের মধ্যে কূটনীতিক রীতিনীতি শিষ্টাচার এর ব্যাপার আছে। তাই সেটা হবে কোন ঘটনা বাস্তবে ঘটার আগেই “যদি তা ঘটত” এমন কাল্পনিক ধরে নিয়ে মারামারি শুরু করে দেয়া।  স্বভাবতই এতে মানুষ সবার আগে “যদি দিয়ে কথা বলা” লোকটাই মূল উস্কানিদাতা বলে সাব্যস্ত করবে!  কারণ,  “যদি দিয়ে কথা বলা” মানে পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া শুরু করা।  অথচ সেটাই ঘটেছে।
    এব্যাপারে অন্তত কিছু শোভন এবং কূটনীতিক (কোন বাংলাদেশি) এক খসড়া বক্তব্য হতে পারত যদি বলত – “এ দেশের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বিদেশি শক্তি কথা বলতে পারে না, অশ্রদ্ধা করতে পারে না – এটা সবার মনে রাখা উচিত”।  “জনগণের ইচ্ছা” এটাই আমাদের সার্বভৌমত্ব,  জনপ্রতিনিধিদেরকে দেয়া ম্যান্ডেট। কাজেই, কোন বিদেশি  শক্তির আমাদের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার নুন্যতম সুযোগ নাই। এমন যে কোন ততপরতাকে আমারা প্রতিরোধ করতে বাধ্য। তাই কোন বিদেশি শক্তির এমন ততপরতা হবে খুবই দুঃখজনক ঘটনা।  আমরা আশা করব সকলেই এব্যাপারে নিজেকে সংযত করে নিবেন!

    কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপি আরো এক ধাপঃ
    যেমন বিএনপি “যদি দিয়ে কথা বলে” থেমে গেল তাও একটা মানে হত। কিন্তু মির্জা ফকরুল এরপর যেন একেবারে যেন  নিজে নিজেকেই বিব্রত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আরও আগ বাড়িয়ে বলেছেন,  ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”।


    মির্জা ফকরুল এর এই বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    তাহলে মির্জা এত দ্রুত এমন “মৌলবাদ-বিরোধী” বক্তব্য কেনঃ
    মূল কথাটা হল, মির্জা নিজেই আল-টপকা  “মৌলবাদ-বিরোধী”বা পক্ষ বলে তর্কটা নিয়ে গেছে।  অথচ কোন মৌলবাদ-তর্ক তো হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে ইস্যু ছিল না!
    যদিও গত ২০১৫ সাল থেকেই বিএনপির মধ্যকার এক বেহুশ আর পোলাপানি চিন্তা দেখা দিয়েছিল যে,  প্রগতিবাদিদের মত মৌলবাদ-বিরোধি বক্তব্য দিতে পারলে দল ভারত ও পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে – যেন আওয়ামি সমতুল্য হবে দল!  মানে এরা সেই থেকে বেমালুম অসতর্কতায়  নিজ “মুসলমান জাতিবাদি” কোর সমর্থক গোষ্ঠিরই বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়ে চলেছে। কিন্তু কেন? কারণ, বিএনপির অস্থির কথিত তরুণ নেতাদের অপুষ্ট বুঝের বোকা-অনুমান হল ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। আওয়ামি লীগকে দেখেই তাদের এই সর্টকাট অনুমান!  অথচ মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের উপর ভারতের কর্ত্ত্বত্ব ও প্রভাব ভারতের নিজ মুরোদে সৃষ্ট হয় নাই। আসে নাই। এটা এককালে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল তাই। কিন্তু এখন বাইডেন প্রশাসন ভারতের সাথে সেই বিশেষ [চীন ঠেকানোর ঠিকাদারির দায় থেকে ভারতকে মুক্ত করে দিয়েছে]। শুধু তাই না, এরপর বাংলাদেশের উপর পুরানা ভারতীয় প্রভাব ভেঙ্গে দিয়ে বাইডেন নয়া সম্পর্ক গড়তে নয়া পলিসি-অবস্থান নিয়েছে। যেটা শুধু বাংলাদেশের উপর ভারতের মাতব্বরি উপড়ে ফেলাই নয়,  ভারত-আমেরিকার পুরানা সম্পর্কে-কেও বদলে নিবে!  এবার গত জুনে ২২-২৪ মোদির বাইডেন সফর তাই  সেই সফর ছিল মূলত সামরিক ক্রেতা-বিক্রেতার সাক্ষাত-সফর। যা মূলত ভারতে (যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন বানানোর কারখানা বসানোতে) আমেরিকার বিনিয়োগ সংক্রান্ত…। এর সাথে রাজনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক কোন ইস্যু নাই, আলোচনার এজেন্ডা বা তালিকায় তা ছিল না।

    কিন্তু লেটেস্ট ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়টা – এসব পরিস্কার জানা সত্বেও মোদি-হাসিনা ভান করতে চায় যে যেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আগের মতই আছে। ফলে মোদিও যেন আমেরিকার কাছে হাসিনার সুপারিশকারিই এখনও আছে। এই ভান এর উপর ভিত্তি করে গত দুদিনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা চলছে, আওয়ামি কর্মিদের মনোবল বাড়াতে! আর তাতেই এক সিপিবি কর্মি যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে বসে গেছে অবস্থা!! রাজনীতির খোঁজ-খবর বা অভিমুখ না জেনে না রেখে রাজনীতি করা যায় না। মির্জা ফকরুল-সহ তাদের নীতিনির্ধারকদের ভুল-অনুমান হল, এভাবে মৌলবাদের কথা তুললে নিশ্চয় আমেরিকা বা পিটার হাস খুব সন্তুষ্ট হবে আবার ওদিকে মৌলবাদবিরোধি গলা চড়ালে মোদির হিন্দুত্ববাদও বেজায় খুশি হবে। অথচ ওরা খবর নেয় নাই সেকালে নব্বইয়ের দশকে মৌলবাদ বলতে এর প্রধান পৃষ্টপোষক বলতে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আমেরিকাকেই বুঝাত – এতে তাদের সেই বয়ান হল,  “মৌলবাদ উত্থান” ঘটার জন্য প্রধান অভিযুক্ত আমেরিকা!
    মির্জা ফকরুলের মুখ দিয়ে বের হওয়া যে বয়ান হাজির হয়েছে এটা চলতে থাকলে ক্রমশ এটা এমন নয়া বাস্তবতায় পৌছাবে সেটা হল  বাংলাদেশের “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার সমর্থকদের দল হিশাবে বিএনপি তার স্থান হারাবে।  আর তাতে ভিন্ন এক নয়া দল গঠিত হয়ে এর উপর ভর করে নয়া এক ‘মুসলিম জাতিবাদি’ কনষ্টিটুয়েন্সির দল হাজির হতেও পারে। যা বলাই বাহুল্য বর্তমান বিএনপিকে শুকিয়ে ফেলবে।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    তবে ভারত যে মিথ্যা “কূটনীতিক বার্তার” কথা তুলে আওয়ামী কর্মিদের হতাশা ভেঙ্গে মন চাঙ্গা করতে চেষ্টা করেছে সেটা এখন কমবেশি পরিস্কারঃ
    আর এতে ভারতীয়  “সাফাই ভাষ্য” চরমভাবে দুর্বল।  তারা বলছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে হাসিনা ফিরে ক্ষমতায় না থাকলে ভারতের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে – এটাই কথিত সেই ভারতীয় বার্তা। এখন একবার ভেবে দেখেন, দুনিয়ার কোন নির্বাচন কমিশন অথবা আদালতের কাছে এটা তো বলাই যায় না যে আমি ওমুককে বিজয়ী দেখতে চাই। অথবা (আদালতের কাছে) ওমুকের ফাঁসির রায় চাই। একথা বলার মানে হয় না। কারণ এটাই তো নিশিভোট! কোন নির্বাচন ফলাফল কেমন হতে হবে তা আগাম দাবি করে বলার মানে হল সেটা আর নির্বাচনই নয়। অথবা শাহবাগের মত দাবি – আগাম ফাঁসির রায়ই হতে হবে বয়ে রায় চাই একথা বলার মানে হল সেটা আর বিচার নয় বা আদালতের রায় নয়। এছাড়া ভিন্ন একটা দেশ, বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনাকেই বিজয়ী দেখতে চাই এটা কী বলা যায়? মানে হয়? নাকি এসব কথা  জনসমক্ষে প্রচার হয়ে যাবার পর আমেরিকার পক্ষে ইচ্ছা থাকলেই কী এসবের বাস্তবায়ন বা মেনে নিতে পারবে???

    সারকথায় এটা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা দিবার মত কোন “ভারতীয় বার্তাই” হয় নাই – কোন কূটনীতিক বার্তা হওয়া দূরে থাক!   এটা “শাহবাগী ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই” – এর চেয়েও ন্যাংটা উলঙ্গ এক বর্বর ভাষ্য! যেমন, আমরা কী বলতে পারি যে আমরা ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চাই; এটাই বাংলাদেশের স্বার্থ!!!!!
    এধরনের বাচালদের কাজ কামে আমেরিকার জড়িত হবার নুন্যতম সম্ভাবনা নাই। বাইডেনের আমেরিকা অন্য নানান ইস্যু পদক্ষেপে ভুল করতে পারে, অন্যায় করতে পারে। কিন্তু তারা বোকা নয়।  তাহলে এসব কথিত ভারতীয় বার্তার একমাত্র লক্ষ্য হল, ভেঙ্গে পড়া আওয়ামি কর্মিদের চাঙ্গা করারই এক অকেজো চেষ্টা মাত্র!

    আপডেটেডঃ    ২২ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৭ঃ ৩৫
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  ২৩ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ২৫

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা 

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা
    গৌতম দাস
    ২০ আগষ্ট ২০২৩   মধ্যরাত ১২ঃ ৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-4Ox

     

            হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে

     

    ঘটনা বড়ই অদ্ভুত! ভারত বাংলাদেশ বা হাসিনা সরকারকে নিয়ে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের বার্তা”  এমন কোন বার্তার অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা এর কোন খবর নাই। আনন্দবাজার, ডয়েচ ভেলে, প্রথম আলো অথবা  ওবায়দুল কাদের (সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী) এমন কারো কাছেই এমন খবরের নিশ্চয়তা নাই; কেউই নিশ্চিত করেন নাই বা এমন খবরের রেফারেন্স কী তা বলেন নাই। অথচ গতকাল থেকে এখনও কথিত এই ভারতীয় বার্তা নিয়ে প্রায় সব পক্ষই কথা বলে চলেছে। “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছুর অস্বিত্ব কী? তা না বলে  যারা এনিয়ে কথা বলছেন তারা অন্যায় করছেন।  এভাবে “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছু থাকলে তার কথা এই…... এভাবে শর্ত সাপেক্ষে নিজের কথা বলছেন। অথচ এভাবে কথা চলতে পারে না, মানে হয় না। খুব সম্ভব কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের এক সরকারী ভাষ্য এখন আসন্ন যেখানে তারা বলবেন –  না তো এমন কোন ভাষ্য তো আমরা দেই নাই!!!!!
    অথচ এবার আনন্দবাজারের সাথে একইভাবে খবরের উৎস কী সেটা উল্লেখ না করে গায়েবী লিউজ ছেপেছে ডয়েজ ভেলে।  আর এই মিথ্যা গায়েবী খবর প্রথম আলো ডয়েচ ভেলের বরাতে ছেপেছে।  দাবি করেছে “কূটনৈতিক নোটে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তা ভারত এবং অ্যামেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না”। কিন্তু কোথায় ভারত এমন  কূটনৈতিক নোটে জানিয়েছে এর কোন হদিস নাই। মানে এরাও প্রথম আলো, স্টার, আনন্দবাজার এর মত একই দলে যোগ দিল। এতে বলাই বাহুল্য ডয়েচ ভেলে কেও মূল্য চুকাতে হতে পারে।   যেন সকলে এরা হাই স্টেকে জুয়ারি জুয়া খেলতে নেমেছে সাংবাদিকতা নামে!!!!

    আনন্দবাজারের অগ্নি রায় যা শুরু করেছিলেনঃ
    প্রথম কথা হল আজকের আনন্দবাজারে অগ্নি রায়ের লেখাটা এটা কোন সাংবাদিকতা-ই নয়। এটা আসলেই এক বাজারি লেখা যার পায়ে কেবল ঘুঙ্ঘুরটাই নাই!  একটা মনগড়া  আর কোন রেফারেন্স ছাড়া কিছু  রচিত বাক্যের গল্প বলা যায় একে বড় জোর। যেমন এই বানানো গল্পটা মোট ৪৪৪ শব্দের। কিন্তু তাতেই এর ভিতর অগ্নি রায় চার বার  “সুত্র বলছে” ব্যবহার করেছেন। মানে সোজাসাপ্টা এটা গায়েবী কথাবার্তা যার বাপ-মা নাই।  আর এধরণের চাপাবাজি শব্দ আর মিথ্যা কথাই সেখানে আছে। তবে আনন্দবাজারি লেখায় “সুত্র” মানে তা ইংরাজি সোর্স [source] এর বাংলা করেছে তারা এভাবে। আর এভাবে কথিত “সুত্র” এর কথা বলে আনন্দবাজার সাংবাদিকতায় খবরের সোর্স বলার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে চায়। এটাই অসৎ জার্নালিজম!   জার্নালিজমে নুন্যতম ফেয়ার [fair] বা সৎ জার্নালিজমের প্রধান ও নুন্যতম শর্ত হল খবরের সোর্স উল্লেখ করতেই হয়; পাঠক-কে জানাতেই হয়। অথচ এই ৪৪৪ অক্ষরের গল্পটার মধ্যে কোন উপযুক্ত সোর্সের কথা উল্লেখ নাই। অথচ সমানে যা খুশি তাই দাবি করে চলা হয়েছে। অথচ আনন্দবাজার প্রবর্তিত সেই অস্তিত্বহীন কথিত “ভারতীয় বার্তা” প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আর মির্জা ফকরুল পর্যন্ত কথা বলে ফেলেছেন!!
    তবে আরো সব প্রসঙ্গে ঢুকবার আগেই পাঠককে মনে করিয়ে দেই। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের এবার এখন একেবারে ঘুম নাই অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেকথা ভারতের ভাষাতেই বললে, ভিসানীতি ধরণের স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হলে সেটাতে নাকি ভারতের স্বার্থ খুন্ন হবে। এটা আবদি বা সুবীর ভৌমিক আমাদেরকে খোলাখুলিই জানিয়েছে।  যার মানে হল, হাসিনাকে ভোট কারচুপি বা রাতের ভোট করতে দিলেই একমাত্র ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হবে।  যার সারকথাটা হল, নির্বাচন এর নামে যা হবে হোক কিন্তু শেষে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে নাহলে নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। এমনকি তাদের বিদেশ মন্ত্রণালোয়ের মুখপাত্রও অরিন্দম বাগচি আমাদেরকে কনষ্টিটিউশন মাফিক মানে হাসিনার মাপে চলতে হেদায়েত করেছে।

    এখন এসবের সারকথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভারতের মিডিয়ায় লেখা হচ্ছে। এবং খুব সম্ভবত এটা চলতি বছরের দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস এর চেষ্টা।  যার প্রথমটা তোলা হয়েছিল মোদির আমেরিকা বা বাইডেন সফরের কালে (২১-২৪ জুন ২০২৩), আগে ও পরের সময়ে। কিন্তু এসব মিথ্যা হাইপ তোলার দায় দায়িত্ব না নিয়ে ও অস্বীকার করে ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ২ জুলাই জানায়ছিলেন একেবারে উলটা কথা – যে ভারত নাকি “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে”।  [এপ্রসঙ্গে আমার সেসময়ের লেখা – “জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!” – লেখাটার লিঙ্ক এখানে]।  তার মানে অগ্নি রায়দের মত মিথ্যা প্রপাগান্ডা লেখকদের পরিণতি মাত্র গত মাসেই আমরা দেখেছি; যখন জয়শঙ্কর এসবের কোন দায়দায়িত্বই নেন নাই। অথচ তাসত্বেও  আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে।

    তবে খুব সম্ভবত এবারের পটভুমি হল আগামি মাসে [৯-১০ সেপ্টেম্বর] অনুষ্ঠিতব্য ভারতে G20 নেতাদের সম্মেলন। নিচে সংক্ষেপে G20 জিনিষটা কী তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যাদের হাতে সময় কম তারা এটা পার হয়ে এরপরের প্যারাতেও চলে গিয়ে সেখান থেকে পড়া শুরু করতে পারেন। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের চেয়েও বেশি। ফলে সে পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য বিনিয়োগ গ্রহিতা। তাই এবারের সম্মেলন সেখানে।

    G20 নেতাদের সম্মেলন কীঃ
    দুনিয়াতে যেসব রাষ্ট্রের জিডিপি সবার চেয়ে উপরের দিকে এমন টপ ২০টারাষ্ট্রের  কমন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এক জোট হল এই G20। প্রতিবছর নানান দেশে এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটা গড়ে উঠার ইতিহাস হল, এক কথায়, এটা মূলত ওয়াল স্ট্রিট [wall Street]  নিউইয়র্ক,  এর আগ্রহ ও আবেদনে গঠিত ও সৃষ্ট।  ওয়াল স্ট্রিট এক প্রতীকী নাম বা শব্দ যার অর্থ এটা বিরাট বিরাট পুঁজি (ঋণ দেয়া) বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান। এর এতই বড় প্রতিষ্ঠান যা কমিউনিস্টদের কল্পনাতেই নাই। নাই কারণ, এবিষয়ে তাদের প্রধান গুরু জোসেফ স্তালিনেরও কোন ধারনা ছিল না। কিন্তু তামাসাটা হল,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান যুদ্ধের খরচ যোগানদার ও নেতা ছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। রুজভেল্টের অর্থনৈতিক-সহ সবধরণের সহযোগিতাতেই স্তালিন তার সোভিয়েত ইউনিয়নকে হিটলারের জার্মানির হাতে আক্রান্ত ও পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে আসল কথাটা হল, রুজভেল্টের পিছনে ছিল এই ওয়াল স্ট্রিট -ই। ওয়াল স্ট্রিট এর বৃহত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে করিতকর্মা ও দক্ষ কর্মিরাই ছিল রুজভেল্টের মন্ত্রী, প্রশাসক, পরামর্শদাতা, বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রধান ইত্যাদি সবকিছুতে...। আর স্তালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে, মারা যাবার আগে তিনি জানতেন যে ওয়াল স্ট্রিট  কী জিনিষ এমন প্রমাণ কেউ দেখে নাই।  সম্ভবত একারণেই, পরবর্তিতে স্তালিনের অনুসারি কমিউনিস্টদের কল্পনায় সবচেয়ে বড় পুঁজির কারবারী  হল, বহুজাতিক কোম্পানি [MNC: Multi National Corp.] বা কর্পোরেট হাউজগুলো। আর আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা অনুসরণ করে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের। যেখানে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের চোখেও ওয়াল স্ট্রিট বলেই কিছু নাই। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের তো খবরই নাই।
    এই MNC দেরই বাপ হল ওয়াল স্ট্রিট। সেটা এই অর্থে যে MNC গুলোকেই  বড় বড় পরিমাণ পুঁজি ঋণ বা বিনিয়োগ হিশাবে দেয় ওয়াল স্ট্রিট; মানে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো।  তাই ওয়াল স্ট্রিট শব্দের আলোচ্য প্রসঙ্গে মানে হল যাদেরকে বিনিয়োগ পুঁজির বাজারকে বাড়াতে সব সময় নয়া বাজারের খোঁজে বেরাতে হয়। এজন্য এরা প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা অর্থনীতিগুলোকে তারা চাপ দিয়ে বেড়াতে হয়।  ওয়াল স্ট্রিট এর আবেদন ও দাবি হল, তোমরা  G20 দেশগুলো বছরে একবার করে নিজেদের মধ্যে বসে সমন্বয় বাড়াও, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী তা নিয়ে আলাপ করে বড় ২০ দেশ কোঅর্ডিনেটশন বাড়াও। কারণ, একমাত্র তাহলেই ওয়াল স্ট্রিট এর বাজার বাড়বে; মানে এতে তোমাদের অর্থনীতিও বাড়বে দ্রুত।  এই হল সংক্ষেপে G20।

    কিন্তু মোদির ছেঁচড়ামো গেল না। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের বেশি হয়ে গেছে বলে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থনীতি যেন হয়ে গেছে  তা একেবারেই নয়। তবে ওয়াল স্টিটের চোখে ভারত পটেনশিয়াল রাইজিং বলে সে  বড় জোর সম্ভাব্য পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ ঋণ গ্রহিতা। এতটুকুই। আর মোদিকে এই সম্ভাবনাটাকেই বাস্তব করে দেখাতে পারতে হবে, ভারতের অর্থনীতিকে  বাস্তব গতি দিতে পারতে হবে। মানে ভারত জি-২০ সম্মেলন করেছে বলেই ভারতের অর্থনীতি তেমন উচা হয়ে গেছে তা একেবারেই নয়। কিন্তু মোদির ছেচরামি হল, তাকে ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উচা করার আগেই এর ফায়দা নিতে হবে – এই লাইনে রওনা দিয়েছে। আর সেই সাথে ভাব করতে হবে ভারত যেন পরাশক্তি। তবে এই ভাব-ভাষ্যটাই মোদি আভ্যন্তরীণ ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করে ভোট তুলতে চায়।  আর এরই সাথে হাসিনার বাংলাদেশ জি-২০ দেশগুলোর ধারেকাছেরও কেউ না হওয়া সত্বেও মোদি হাসিনার বাংলাদেশ তার অধস্থন  হাতা-ল্যাসপেন্সার এই অপমান করার বিনিময়ে হাসিনাকে  জি-২০ এর দাওয়াত করে এনে দেখাতে চায়। তার নিজ দেশে দেখাতে চায় যে মোদির ভারতেরও অধস্থন এক  হাতা-ল্যাসপেন্সার দেশ-সরকার আছে!!! এটাই মোদির ছেচরামি!!! অথচ কার্যত অনাহুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমরা ঐ সভায় কী সম্মান পাবো সেখানে??  বড়লোক বন্ধুর বিয়েতে যেতে পেরেছি তা অনেক গরীর বন্ধু এক বিরাট অর্জন বা জাতে উঠা বলে মনে করতে পারে, এটা সেরকমই কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি!!!

    সেটা কী দাঁড়াবে তা দেখা যাবে। এর আগে অনেক কিছুই ঘটবে। তবে এনিয়ে আপাতত আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ফলস এক ঢেউ তুলতে চাইছে।   যেমন শিরোনাম থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করা যাক। অগ্নি রায় বলছে “হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে”। এখানে সবারটা কে কে? একা মোদির ভারত ছাড়া তো কেউ নাই। আমেরিকাই তো ভারতের সাথেই নাই। অগ্ন রায় যেটা এককালে ছিল যেন সেটা এখনও আছে এই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে একথা বলছেন। মানে ২০০৭ সালের যে আমেরিকা বাংলাদেশে হাসিনাকে বসিয়ে সেই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল – সেই আমেরিকা তো এখনকার আমেরিকা নয়। দেখাই যাচ্ছে হাসিনা সরকারই বলতেছে, আমেরিকা তাকে উতখাত করতে চায়। সর্বশেষ ১৬ আগষ্ট সরকার বলছে, আমাকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী, লিঙ্ক দেখেন। অথচ অগ্নি রায় গল্প ফেঁদেছে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে নাকি সেটা আমেরিকারও ক্ষতি?? মানে সোজাসাপ্টা একটা আরেকটার বিপরীত কথা!
    এরপরে স্টোরির শুরুতে অগ্নি রায়ের প্রথম বাক্য “বাংলাদেশে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে তা ভারত এবং আমেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না বলে মনে করে নয়াদিল্লি”। যেটা নিয়ে আমরা উপরে দেখলাম এটা এক ভারতের ছাড়া আর কোন দেশের স্বার্থ নয়।  এরপর পরের বাক্যঃ

    “কূটনৈতিক সূত্রের খবর, একাধিক স্তরের বৈঠকে নয়াদিল্লি
    এ কথা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসনকে।
    সূত্রের খবর— বাংলাদেশের
    আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ভারত যে খুশি নয়,
    ওয়াশিংটনকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তাও”।

    এটা অগ্নি রায়ের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী মন্তব্য।  গত জুনেই মোদির আমেরিকা সফরে এটা ফকফকা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাইডেনের সাথে মোদির, বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথাই হয় নাই। এছাড়া পরে জয়শঙ্কর উলটা ক্রেডিট নিয়েছে এই বলে যে প্রতিবেশি দেশে ভারত কম জড়াচ্ছে। তাহলে এসব সুত্রের খবর বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা কেন??  ফ্যাক্টস হল, ত এনিয়ে ওয়াশিংটনকে ভারত কিছুই জানায় নাই। কারণ বাংলাদেশকে নিয়ে একই স্বার্থের পাটাতনে ভারত-আমেরিকা আর নাই।   ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার এশিয়াকে দেখার দিন শেষ হয়েছে। বাইডেনের আমেরিকা এখন এশিয়াকে দেখতে চায় ভারতকে ছাড়াই। বরং ভারতের স্বার্থবিরোধি অবস্থান নিয়ে।  আর তা শুধু আগামিতে মোদিকে হারিয়ে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোটকেই ২০২৪ সালের ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া  এতটুকুই নয়। আরো আছে!  কী সেটা?

    বাইডেনের আমেরিকার নয়া এশিয়া নীতি-পলিসি সেখানে কেবল রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর ভারত নয়, সেই ভারত এমন হবে যে হবে যে হবে সম্ভাব্য সারা দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার পদচারণা করতে চাইছে সেই আমেরিকাকেই সমর্থন করবে, এমন এক অধস্তন অনুসারী ভারতকেই আমেরিকা দেখবার আকাঙ্খা করছে। আরো আছে – আর তা শুরু বাইডেনের বার্মা পলিসি-ই নয়; মানে বাইডেন যেমন আগামি বার্মা দেখতে চায় সেটাকেই ভারত সমর্থ করবে মানে, ওর বিরোধিতার বদলে বরং অ্যামেরিকান স্বার্থের ভিতরেই ভারত নিজের স্বার্থ খুজে নিচ্ছে বা খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এমন হতে হবে – শুধু তাও নয়।  এটা হল, সপ্তম নৌবহর কেবল বঙ্গোপসাগরে নয় আন্দামানেও হাজির থাকতে চায়।

    ঠিক যেমন বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, 
    ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে নানা খেলা চলছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই এলাকাটাকে
    নিয়ে নানা ধরনের খেলার একটা চক্রান্ত। যেহেতু আমি জানি
    , আমি বুঝি যে কীভাবে আমাকে ক্ষমতা থেকে
    সরাবে। তাদের কিছু কেনা গোলাম আছে
    , পদলেহনকারী আছে, তাদের বসিয়ে এই জায়গাটাকে নিয়ে খেলবে।
    সেটাই হচ্ছে প্রচেষ্টা। সেটা আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি”।

    কিন্তু হাসিনার এসব বক্তব্যের কারণে কিছুই বদলাবে না। যেমন, ২০০৬ সালের শেষে যদি ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে,  আজ সরকার যেমন বক্তব্য রাখছে, তখনকার  বিএনপি যদি একই রকম বক্তব্য দিত তাতে ওয়ান-ইলেভেন ঘটা বা কিছুই ঘটা আটকাতো না। তখনও ভারত মহাসয়াগরের কথার মত অন্য কথাও তো ছিল। যেমন যদি বিএনপির দিক থেকে  বলা হত এভাবে  যে,  আমাদের বদলে আমেরিকা আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবে ……ইত্যাদি! তাতে কী কিছু ওয়ান-ইলেভেন ঘটা আটকাতো? মোটেও না।
    এসরের মূল ইস্যুটা হল জনপ্রতিনিধিদের গণবিচ্ছিন্নতা।   এমনকি আজ গণ বিচ্ছিন্নতার দিক থেকে আজকের  হাসিনা সরকারের সেকালের বিএনপির চেয়ে বেশি গণবিচ্ছিন্ন। সেটা এই অর্থে যদি অন্তত একটা ফ্যক্টর বিবেচনা করি যে আমাদের মত দেশে জনপ্রতিনিধিদের অন্তত কিছুটা ভয় বা লজ্জা থাকে যে দিন শেষে আমাকে আবার জনগণের কাছেই ভোট চাইতে যেতে হবে। কিন্তু সেটা এখন থাকত হয়ে গেছে।  গত ১৫ বছর ধরে  সরকার প্রশাসন আমলা পুলিশ এমনকি যেকোন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি তা একেবারে আওয়ামি মাঠকর্মীটারও আর সেসবের পরোয়া করা বালাই নাই। কারণ, সেটাও ম্যানেজ করার মেকানিজম মাঠকর্মী-নেতাদের হাতে পর্যন্ত এসে গেছে। জনপ্রতিনিধিদেরকে ভোট চাইতে আর পাবলিকের কাছে যেতে হয় না – এটাই সে মেকানিজম।  কাজেই  এখন ক্ষমতাসীনদে্রা এখন আম-জনতাকে সব ধরণের পরোয়ার বাইরে বা উর্ধে উঠে গেছেন। এরই উলটা দিকটার নামই হল এক  “জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা” যা জন্ম দিয়েছে এক গণবিচ্ছিন্নতার দল ও সরকার ব্যবস্থার রাজনীতি।  তাই আগেই বলা যায় এসব “ভারত মহাসাগরের গল্প” বলে এবারও আরো কিছুই ফিরানো যাবে না।

    সারাংশটা হল্‌  এখন কেন আমাদের মত দেশে কেন কিছু “ফিরানো” যায় না – এর আসল কারণ পাওয়া যাবে একজন জনপ্রতিনিধির আবার গণবিচ্ছিন্নতা কী? এটা তো স্ববিরোধি কথা!!! হা এই স্ববিরোধের আরেক নাম নিশিভোট!  এথেকে সে কেন গণবিচ্ছিন্ন এর অর্থ  কিছুটা হলেও বুঝা যাবে।  আবার, মূলত  এখনকার বাংলাদেশের রাজনীতির এই – গণবিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট – এর কারণেই এখন গণ-অভ্যুত্থানের কথা বকোয়াজ, ফাকা-আওয়াজে উলটা বরং তা জুতসই “ভারতের দালালি” করার বক্তব্য হয়ে থাকবে।  যেটা অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানের কথার আড়ালে তা করছেন।  আর এতেই কার্যত তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ জাতীয় কথা ও শব্দাবলী এসবই মুখ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়,  দাঁড়াবেই! সেটা আমরা পছন্দ করি বা নাই করি!

    ভারত জামাতে ইসলামি বলে কী বুঝাতে চায়ঃ
    আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় তাদের এই ৪৪৪ শব্দের লেখায় প্রথম ১১৫ শব্দের পরের ১৮০ শব্দ কেবল ব্যয় করেছে জামাতে ইসলাম বলে এক শব্দ আর ধারণা নিয়ে। এনিয়ে সবার আগে পাঠককে একটা সাবধান করে দেই। ঐ লেখায় “জামাতে ইসলাম” লেখা হলেও এশব্দ শুধু রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম  বুঝান হয় নাই। এটা একটা দলের নাম করার আড়ালে একটা প্রতীকী শব্দ হিশাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এশব্দ দিয়ে বুঝতে হবে বাংলাদেশে ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – এর কথা বুঝানো হয়েছে।   এভাবে জামাতে ইসলাম বলে সব জিঘাংসা বিদ্বেষ উগড়ে দেওয়ার শুরু ২০০৮ সাল থেকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে যারাই গেছেন সকলেই  জামাতে ইসলাম এদুটো শব্দ দিয়ে গত ১৫ বছর ধরে  জিঘাংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে কথা বলে গেছেন।  ভারতও সেটাই রপ্ত করে কথা বলছে। এটা হল ভারতের কাছে অনেকটা ১৯৪৭ সালের আগের জমিদারি শাসনে শাসিত পুর্ববঙ্গে ফিরে যাবার (মৃত) আকাঙ্খার মত। এটাই জামাতে ইসলাম শব্দে এর বিরুদ্ধাচারণ।
    কথাটা স্পষ্ট হবে, যদি উত্তর খুঁজি যে ভারত বা  আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় এরা জামাতে ইসলাম শব্দগুলো বলে কীসের বিরোধিতা করছে? অথবা আরো স্পষ্ট করে তারা এর বদলে কী দেখতে চাইছে?

    এরা সকলেই [এবং এমনকি খুব সম্ভবত বাংলাদেশের এখনকার বেশির ভাগ হিন্দু-সহ প্রগতিশীলেরা ] এদের কাছে যে আদর্শ বাংলাদেশ কাম্য সেটা হল ১৯৪৭ সালের আগের জমিদার হিন্দুর আধিপত্যের যে পুর্ববঙ্গ – সেটাই, সেখানে যদি ফেরত যাওয়া যেত। ভেঙ্গে বললে সেটা হল কোন নাগরিক সাম্য নয়, আইনের চোখের ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য নয় বরং জমিদার হিন্দু আধিপত্য করবে আর ইসলাম-মুসলমানের কোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – সেটাকে অবশ্যই দমানো হবে শুধু না এদের সকলকে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স মেনে নিতে হবে।
    এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে কী কী মেনে নিতে হবে? সেই তালিকার নাম সেটা অন্য শব্দে বললে তা হল – মুসলমানদেরকে অসাম্প্রদায়িক-  হয়ে থাকতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের বেলায় নয়, এখনকার সারা ভারতের – মানে কেবল মোদির ভারতের না বা হিন্দুত্ববাদের ভারতের নয় – সারা ভারতের বেশীর ভাগ হিন্দু নাগরিকের আকাঙ্খা। এমন এক ভারত রাষ্ট্রই এদের কল্পনা।  আসলে যেকোন থিওলজি-তে দাঁড়িয়ে কল্পনায় যে কোন মর্ডার্ণ রাষ্ট্রের অনুমান এমন হয় ও হবেই।  আসলে যেকোন এথনিক বৈশিষ্ট ভিত্তিক আধিপত্যের কল্পনা এটা দিয়ে জাতিরাষ্ট্র কায়েম হবে হয়ত কিন্তু তা রিপাবলিক রাষ্ট্র হবে না যেটা ‘নাগরিক সাম্য’ অথবা “ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য” এটা হবে না।
    এককথায় বললে, ভারতের হিন্দুত্ববাদ (সাথে একালের ওয়ার অন টেরর) এটাই কিন্তু বাংলাদেশে  -ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ  জোরেসোরে ঘটিয়েছে।  এটা হল হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ।  অথচ তামাসাটা হল, হিন্দুত্ববাদের ভারত বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়ে যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ সেটাকেই “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী নামে বিরোধিতা করছে!
    আর ঐ যে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স এর চিহ্ন ও নমুনা হিশাবে মুসলমানদেরকে “অসাম্প্রদায়িক” হয়ে থাকতে বলার দাবি ও বয়ান এটাই সবচেয়ে বেশি করে বয়ে বাংলাদেশের নিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ ফেরত মুসলমানেরা
    ।  কারণ কলকাতায় থাকার সময়ে এসব মুসলমানেরা অসাম্প্রদায়িক থাকবে এই শর্তেই তো শিক্ষিত হতে সুযোগ পেয়েছিল।    অথচ বাংলাদেশে ফিরে এরাই প্রগতিবাদের নামে হয়ে গেল হিন্দুত্ববাদের (জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স ধারণার) ক্যারিয়ার।
    তবে এত শব্দ থাকতে বাংলাদেশের চেতনাবাদী বা “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি” কেন ইসলাম কোপাতে “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী শব্দটা বেছে নিল?  এর কারণ হল, “জামাতে ইসলাম” নামে ডেকে কাউকে কোপানো এর  পরে এমন নৃশংসতার পক্ষে কোন সাফাই হাজির করা ওদের জন্য খুবই জরুরি।  আর ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে সেই সাফাই বয়ানটা হল, যে এটা সাধারণ ভাবে “বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশকে” কোপানোর নৃশংসতা করা নয়; বরং এটা যেনবা  ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামের অপরাধের বিরোধিতা করা হচ্ছে। 

    কঠিন সত্যিটা হল,   বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক যেকোন প্রকাশকে কোপানোর নৃশংসতা করা – এটা তো রেসিজম। ঘোরতর এক Racism; এক নির্মুল আকাঙ্খা।  এক এথনিক[ethnic] জাত-ধর্ম বিদ্বেষ – ইসলামবিদ্বেষ! এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] বা অন্যের জাত-ধর্ম নির্মুলের ভয়াবহ আকাঙ্খা!!   অথচ এটাই প্রগতিশীলতা বলে চালানোর চেষ্টা  চলছে।

    তাহলে আনন্দবাজার কেন এখানে জামাতে ইসলাম শব্দ দিয়ে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ নিল?
    কারণ, সে আমেরিকাকে ভয় দেখাতে চায় যে হাসিনা আগামিতে ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে ইসলামিজম ছেয়ে যাবে। কাজেই হাসিনাই ক্ষমতায় থাক! এই হল তাদের ছদ্ম-পরিচয়ে থেকে বলা সাজেশন!

    কিন্তু এনিয়ে অ্যামেরিকান অবস্থান কীঃ
    এটা বলাই বাহুল্য যেকেউই  ক্ষমতাসীন যখন থাকে তখন সে কখনই  বিরোধি যেকোন “রেডিক্যালিজম” মানে ক্ষমতাসীনকে সশস্ত্রভাবে উতখাত করতে চাওয়া যেকোন শক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর বা নির্মমই হবে।  একারণের সবদেশের কনষ্টিটিউশনেই লেখা থাকে এসব “রেডিক্যালিজম”  করলে ওর শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। তাই  ইসলামি রেডিক্যালিজমের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান থাকা তা কোন নতুন জিনিষ নয় বরং অনস্বীকার্য বা obvious ঘটনা অবস্থান। এছাড়া ওয়ার অন টেরর এর টানা বিশ বছর এর বেশি হয়ে গেল; এখন   আমেরিকার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা-শিক্ষা তো হয়েছেই ধরে নিতে পারি। সম্ভবত সেকারণের আমাদের মত দেশে অ্যামেরিকান নীতি এখন ইসলামি রাজনীতি মানেই এর বিরোধী হতেই হবে ঠিক তা নয়। মানে কোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে ইসলামি রাজনীতি করা যাবে না ঠিক তা নয়। তবে মূল অবস্থানতা হল এই যে, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সব ধর্মের নাগরিকের অধিকার সমান বা সাম্য ধারণার মধ্যে থাকলে  ইসলামি রাজনীতি করতে কোন দলেরই সমস্যা নাই। তবে এর সাথে কথা আরো কিন্তু কথা বা ফারদার ব্যাখ্যা তারা সাথে দিয়ে বা করে থাকে। যেমন তারা সমাজে প্লুরালিজম [Pluralism]  থাকবে মানে হল,  ওদেশে বহু এবং বিরোধি মতামত-রাজনীতি থাকবে এটা মানতে রাজি থাকতে হবে। এছাড়া একথাটাই আরেকভাবে বলা ইনক্লুসিভ [Inclusive] বলে আরেক শব্দের কথা তারা বলে দেয়। যেমন যেকোন রাজনীতি-চিন্তাকে তার সকল বিরোধিতাকারীদেরকেও সাথে পাশাপাশি নিয়ে চল্তে পারতে হবে।  মানে কোন বিরোধি মতামত বক্তব্যকে চাপিয়ে কোনায় ফেলে দেয়া বা কোনঠাসা করে রাখা  – সেটা না করে বরং সবার বক্তব্যই বলতে দিতে হবে, তাতে শেষে কার বক্তব্য ও তা কতটুকু পাবলিক গ্রহণ করবে সেটাই হবে সবকিছুর নির্ধারক। এসবই মোটা দাগে অ্যামেরিকান অবস্থান। মানে সারাংশে বললে, ভারত বা আনন্দবাজারি গোষ্ঠি  ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামি জুজুর ভয় দেখালেই আমেরিকা ভয় পেয়ে পালাবে বা হাসিনাকে ফরে ক্ষমতায় রেখে দিবে আর  এই বাজারি গোষ্ঠি এতে সফল হয়ে যাবে – এগুলা বেকুরি সর্টকার্ট ও ধান্দালি চিন্তা।

    এগুলো আসলে কলকাতার কিছু মফস্বলি চিন্তা।  তাদের দুনিয়া বলতে তা কলকাতার মধ্যেই আবদ্ধ বলে মনে করে – এরা আমেরিকাকে আন্ডার এস্টিমেট করছে খামোখা। এসব তো এমনকি জয়শঙ্করই আমল করবে না,  করার কথা না। মোদি-জয়শঙ্কর বরং  ভারতে বাইডেনের পলিসিকে  কৌশলে পাশ কাটিয়ে কিভাবে মোদিকে আবার ক্ষমতাসীন করবে – এই চিন্তায় নির্ঘুম! নিজ মাথার ঘায়ে তারা নিজেরাই পাগল অবস্থায়! যদিও হাসিনাকে জি-২০ এর সভায় ডেকে আনতে পেরেছে বলে এটা মোদি সরকারের বিরাট কূটনৈতিক  সাফল্য বা মোদি আন্তর্জাতিক জগতে এক বিশাল নেতা এসব কথা ছড়িয়ে ভোটের বাক্সে এর ইতি প্রভাব যেন পড়ে ইত্যাদি এসব কান্ড তো মোদি অবশ্য করবেনই!!  এমনকি বাইডেনও জি২০ এর সভায় আসতেছেন; তাই বাংলাদেশের হাসিনার জন্য মোদিই যেন বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবেন বলে মোদি প্রপাগান্ডাও করবেন। সেটা নিজে বলবেন না অবশ্যই – তবে কয়েকটা মিডিয়ায় এমন জল্পনা-কল্পনা রিপোর্টও করাতে পারেন। যদিও তা অবশ্যই ওখানেই শেষ হবে; মানে সত্যিই মোদি কী বাইদেনের সাথে কথা বলেছিলেন তা নিয়ে আর কোন রিপোর্ট হবে না। ফুলস্টপ!

    হাসিনা জি-২০ মিটিংয়ে গেলেও বাইডেনের সাথে কোন সাইড-লাইন টকঃ
    আমরা এখনও কেউ জানিনা (এছাড়া এখনও সময় আছে) যে হাসিনা শেষে জি-২০ এর সভায় ভারত সফরে নিশ্চিত যাবেন কী না! ধরে নেয়া যাক তিনি যাবেন। যদি যানও তবু হাসিনার সরাসরি বাইডেনের সাথে বা মোদির মধ্যস্ততায় কোন কথা কী হবার সম্ভাবনা আছে? সাইড লাইনে? অনুমান হচ্ছে এর সম্ভাবনা খুবই কম। এর অন্তত একটা কারণ হল, আমেরিকার সাথে বসে কোন আর লাভ বা পরিস্থিতি হাসিনার পক্ষে আগাবে এমন বাস্তবতা সম্ভবত আর নাই। তা এখন ঢাকায় একেবারেই স্পষ্ট!  যেমন সর্বশেষ যে দুজন কংগ্রেস-ম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন তা সরকারের জন্য কোন সুখকর কিছু ছিল না। এই সফরে কংগ্রেস-ম্যানদের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব ছিল এর এক মাপকাঠি। কারণ, মোমেনের জবাব দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে কংগ্রেস-ম্যানদের প্রশ্নগুলো কাম্য বা ওয়েলকামিং  নয়! খাস বাংলায় বললে মোমেন -টেরা উত্তর- দিয়েছিলেন।  এছাড়া অতিথিরা ঢাকার পৌছানোর আগেই মোমেন অনেকবারই বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই আগমন ওয়েলকামিং নয়। তিনি বলে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সরকার আমেরিকার সাথে আর কোন চুক্তিতেই যাবেন না।  অথবা হাসিনার নিজেরই ভারত মহাসাগরে কী ঘটতে যাচ্ছে সংক্রান্ত বক্তব্য থেকে বুঝা যায় তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের কোন আশা আর সম্ভবত দেখেন না।
    কাজেই এই পরিস্থিতিতে তিনি জি-২০ এর সভায় বাইডেন বা অন্য কারও সাথে কথা বলার আগ্রহে আছে – এটা আমাদের জন্য কষ্ট কল্পিত!
    আর এসব খুটিনাটি দিক বা এর ডেভেলবমেন্ট বিবেচনায় রেখে কথা বলা – এটা আনন্দবাজার বা অগ্নি রায়ের মুরোদের মধ্যে তা আছে এমন মনে হয় না। তার আসলে একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো তাও আবার সেটা মফস্বলি বুঝাবুঝির উপর ভর করে করতে যাওয়া …… না এটাকে এখানেই ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমাদের!

    আপডেটেডঃ    ২০ আগষ্ট ২০২৩;  রাত ০১ঃ ৫৩
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • চীনের ‘গায়েব’ কালচার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গ্যাং

    চীনের ‘গায়েব’ কালচার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গ্যাং
    গৌতম দাস

    ২৯ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4LB

     

    Where is China’s foreign minister?

     

    চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী একমাস গায়েব ছিলেন; মানে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলেও মাফ পান নাই। তিনিও ডিসাপিয়ার্ড [dissappeared]  হতে পারেন এবং হয়েছেনও। ‘পার্টি’ যে কাউকে এমন শিকার হতে বাধ্য করতে পারে!!!  কী ‘সুন্দর’ একটা প্রাকটিস তাই না!!! এটা চরম ভীতিকর, অগ্রহণযোগ্য! এটা রাজনীতি হতে পারে না!  সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে সরকার থেকে গত ২৫ জুলাই এরপর জানালো হল যে তিনি সদ্য অপসারিত হয়েছেন। আর সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম চিন গ্যাং [QIN GANG]। উনার সরকারী বায়োডাটা উনার নামের সাথে দেয়া লিঙ্কে বা এখানে পাওয়া যাবে।   চীনা শব্দের সঠিক উচ্চারণ নিয়ে বিতর্ক সবসময় হয়। তারা নিজেরাই দুবার উচ্চারণের স্টাইল বদলিয়েছে এটাও  এর এক কারণ। যেমন মাও সে তুং [ইংরেজি: Mao Zedong ] আর হবে না, মাও জে দং বলতে হবে, এ’হলো এমনই এক বদল। তবে এখানে এখন যে তত্ব ফলো করেছি সেটা হল চীনা শব্দ যেটা ইংরাজি ‘Q’ শব্দ দিয়ে করা হয় এর (ফোনেটিক্যাল) উচ্চারণ করতে হবে চ [ch]। আর এই সুত্রে নামটা চিন গ্যাং [QIN GANG] লিখেছি। যদিও অনেকে ইংলিশ ফোনেটিক বা আক্ষরিক উচ্চারণের নীতি অনুসরণ করলে বলবেন এটা কুইন [QIN]। নাম বা উচ্ছারণের প্রসঙ্গের এখানেই ইতি টানছি।

    এই অপসারণের মাধ্যমে চীনা কমিউনিস্টদের কালচার-চর্চার বিরুদ্ধে যে কঠোর সমালোচনা দুনিয়া জুড়ে চালু বা অগ্রহণযোগ্যতা আছে তাতে এখন আরেকটা বাজে উদাহরণ বা কলঙ্কের মুকুট যোগ হলো। বুঝা গেল এমন কলঙ্কের ঘটনা সহসা বা সহজেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ছেড়ে যাচ্ছে না। চীনা কমিউনিস্টদেরও এথেকে মুক্তি নাই। বদনাম যা হয়েছে  ও দাগ যা লেগেছে তা আরো বয়ে বেড়াতে হবে।

    কেন এটা কলঙ্কঃ
    চিন গ্যাং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন মাত্র সাত মাস আগে। রয়টার্সের এক বিস্তারিত রিপোর্ট চিন গ্যাং এর ঠিকুজি মানে জন্ম ও কর্ম-বৃত্তান্ত সব ছাপিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম – “চীনা চিন গ্যাং এর উল্কাগতিতে উত্থান ও মুহুর্তেই পতন” [China’s Qin Gang had meteoric rise and swift removal]।  সেখানে দেখা যাচ্ছে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে এক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আছে University of International Relations [UIR] এই নামে। বুঝাই যাচ্ছে এটা ‘আই আর’ মানে ‘ইন্টারন্যশনাল রিলেশনস’ বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক; মানে যা কেবল বা মূখ্যত বৈদেশিক বা পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক স্টাডির এক বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়। রয়টার্সের ভাষায়, এটা খুবই প্রেস্টিজিয়াস [prestigious] বা উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়।  চিন গ্যাং সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন করেই সরকারের কুটনীতিক সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে টানা দীর্ঘদিন পররাষ্ট্র বিভাগেই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পোস্টিং পেয়ে চলেছেন। এতে তিনি দুইদুবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হয়েছিলেন, দুবার ওর প্রটোকল অফিসারও। শেষে বৃটেনে চীনা রাষ্ট্রদুত ছিলেন। আর একেবারে শেষে গত ডিসেম্বর ২০২২ সালে মানে এখন থেকে সাতমাস আগে, খোদ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিশাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আর এর ঠিক আগে পর্যন্ত ছিলেন আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদুত।
    বলা হয়েছে ৫৭ বছর বয়স্ক তিনি এপর্যন্ত চীনের সর্বকনিষ্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। আবার কমিউনিস্ট পার্টি রেওয়াজের কারণে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যাওয়াতে পরে আরেক গুরুত্বপুর্ণ পদ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটবুরোর মেম্বার হয়ে যান চিন গ্যাং। যা পার্টির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর সক্রিয় কমিটি।   তাঁর নিয়োগের পর থেকেই মিডিয়ায় বলা শুরু হয়, তিনি বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর নেকনজরে আছেন; তাই  চিন গ্যাং এর এই খাঁড়া উত্থান। প্রেসিডেন্ট শি তুলনায় কমবয়সীদের সুযোগ দিতে চান – এর সুবিধাগুলো কাজে লাগাতে চান তাই নাকি ‘এই উত্থান’। এমনকি অনেক বিশ্লেষক বা বিশেষজ্ঞরাও অনুমান করে বলা শুরু করেছিল যে , চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে শক্ত ও গঠনমূলক স্থিতিশীলতা [to help stabilise relations with the U.S] দেওয়ার জন্যই নাকি প্রেসিডেন্ট শি এর এই  পরিকল্পনা। বিশেষ করে অ্যামেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের সাথে তাঁর প্রথম লম্বা বৈঠকের পরেই এই জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছিল।

    কিন্তু হায়! সব ভুল প্রমাণিত হয়ে গেল। সব মিথ্যা আর সবকিছুই ‘না’ করে দিয়ে, মাত্র সাতমাসের মাথায় সব ভেঙ্গেচুড়ে ছাড়খার হয়ে গেল। গত ২৫ জুনের পর থেকেই চিন গ্যাং “জনসমক্ষে অনুপস্থিত” হতে থাকলেন।  চীনা গায়েব হয়ে যাওয়ার সেই ট্রাডিশন আবার চালু হয়ে গেল।  কেউ তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখতে পেল না। তবে একবার গায়েব ঘটনার কেবল দুসপ্তাহ পরে (১১ জুলাই) তাঁর মন্ত্রণালয় জানালো যে অজানা স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি নাকি তার পুর্ব নির্ধারিত ইন্দোনেশিয়া সফরে যাচ্ছেন না। এতটুকুই।  এরপর?

    এরপর আকাশ থেকে ফেলে দেওয়া। মানে তিনি মোট প্রায় এক মাস গায়েব থাকার পরে,  গত ২৫ জুলাই এর সরকারী ঘোষণায় জানানো হল যে চিন গ্যাং-কে অপসারণ করা হয়েছে। আর এর সাথে জানানো হয়েছিল যে আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই [Wang Yi ] কে আগের জায়গায় মানে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে স্থলাভিসিক্ত করা  হয়েছে। এভাবে চীনের মানে, কমিউনিস্টদের এই কলঙ্ক বাড়ছে তো বাড়ছেই।

    কমিউনিজম আর ইনসাফ কী পরস্পরবিরোধীঃ
    কমিউনিজম আর ন্যায় (বা ইনসাফ) এর ধারণা এদুটো যেন একসাথে চলতেই পারবে না, এরা পরস্পর বিরোধী।  সম্ভবত কমিউনিস্ট পার্টির কাছে তাই। সেই যে লেনিনের [Vladimir Lenin] হাতে দুনিয়াতে প্রথম (১৯১৭) কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটেছিল কিন্তু তা সত্বেও ন্যায়ের ধারণা কমিউনিস্টদের হতে পারল না। সেসময়ই বিপ্লবী লেনিন প্রথম যে হোচট খান তা হল, তারা বলশেভিক বিপ্লবীরা বা তাদের বলশেভিক পার্টি বিপ্লবের প্রথম গণভোটেই ফেল করেছিলেন। আর সেই থেকে পাবলিক ধারণাটার উপরেই কমিউনিস্টদের বিতৃষ্ণা এসে যায়। বলা যায় “পাবলিক” এই কনসেপ্ট এটা সেই থেকে পার্টি ও সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টদের জন্য আর আপন হয় নাই ও ক্রমশ পাবলিক বা জনস্বার্থ ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে থেকে যায়। অবস্থা হয় এমন যেন – “হারামজাদা জনগণ তোরা থাক, আমরা চললাম সুন্দরবন”।  এমনিতে এই সোভিয়েত বিপ্লবের আগে থেকেই,  তাত্বিকভাবে বললে কমিউনিস্ট থিওরিতে কার্যত ‘পাবলিক’ বা জনগণ ধারণাটাই নাই। কথাটা শুনে অনেকের অদ্ভুত লাগতে পারে, অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। মনে হতে পারে আমি মিথ্যা বলছি বা প্রপাগান্ডা করছি। কিন্তু আপনারা কমিউনিস্টেরা নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। কেবল আগেই ধরে নিবেন না যে পাবলিক বা জনগণ ধারণাটা আছে; বিশেষত বিপ্লব বা ক্ষমতাদখলের পরে।  কিন্তু কেন নাই?

    কী জিজ্ঞাসা করবেনঃ
    ছোট্ট উত্তর – জনগণ ধারণাকে কমিউনিস্টেরা ‘শ্রেণী’ বলে এক ধারণা দিয়ে বদলে নিয়েছে কেন, তা জিজ্ঞাসা করবেন। 
    ‘সমাজটা শ্রেণীতে বিভক্ত’
    – এটা কমিউনিস্টদের খুবই কমন কথা। আর খুবই ডিপ রুটেট – মনের গভীরে ঢুকে থাকা তাদের এক ধারণা এটা। এমনকি এটা তাদের গর্ব করার এক ধারণা।   “তাই সবকিছুকে শ্রেণী দিয়ে, শ্রেণীর ভিত্তিতে বিচার করে দেখতে হবে”; এই হল কমিউনিস্টদের দাবি ও অনুমান।  অর্থাৎ কমিউনিস্টেরা বলছে – শ্রেণী নির্বিশেষে –  সাধারণভাবে জনগণ বলে কিছু নাই। বরং আছে কেবল শ্রেণী। কথা বলতে গেলে মানুষকে কোন না কোন শ্রেণীর পক্ষেই কথা বলা হয় বা হয়ে যায়, যাবেই – বলে কমিউনিস্টেরা বিশ্বাস করে। এটাই কমিউনিস্টদের আদি ও মৌলিক বক্তব্য অবস্থান। তা নিশ্চয় কমিউনিস্টেরা অস্বীকার করবেন না।  যেমন পাবলিক ইন্টারেস্ট বা গণমানুষের স্বার্থ, গণস্বার্থ বলে তাই শ্রেণী-বুঝের কমিউনিস্টদের কাছে কিছুই নাই। গণস্বার্থ নয় তাদের আছে শ্রেণী স্বার্থ ধারণা। ঠিক কিনা নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নেন, একান্তে।  যারা সতর্ক কমিউনিস্ট তারা পাবলিক আর শ্রেণী ধারণার ফারাকটা স্বযত্নে মনে রাখেন।

    কিন্তু এই শ্রেণী ধারণার কারণেই এরপরে আর পাবলিক বলে কোন ধারণা কমিউনিস্ট সাহিত্য বা ভোকাবুলারি থেকে বাদ হয়ে যায়। ( এখানে পাবলিক, মাস পাবলিক (mass public), জনগণ বা আম-জনতা ইত্যাদি এসব ধারণাগুলোকে এককথায় পাবলিক বলা হয়েছে)। কেন বলছি? কারণ পাবলিক কথাটার অর্থ শ্রেণী নির্বিশেষে আম-জনতা।  আবার আরো আগিয়ে জনগণ বলতে যদি সিটিজেন বা নাগরিক ধারণাটার দিকে যদি আগাই তাহলে নাগরিক কথাটাও আর কমিউনিস্টদের থাকে না;  আসলে নাইও। কমিউনিস্টরাই উলটে নাগরিক ধারণাটাও তাদের বলে দাবি ছেড়ে দিয়েছে; তাদের কঠোর শ্রেণীবোধ এর কারণে। এককথায় কমিউনিস্ট চিন্তায় শ্রেণী ধারণাটা সব ধারণার আগে বা সেন্ট্রাল করে রাখাতে এই  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা কমিউনিজমে নাই; তারা আর থাকতে পারে নাই এমন হয়ে গেছে। মূলত সোভিয়েত বা রাশিয়ান বিপ্লবের পরেই এমনটা স্পষ্ট করেই হয়ে গিয়েছে।
    যদিও পরে ১৯৪৯ সালের মাওয়ের চীন বিপ্লবের বেলায়ও শ্রেণী ধারণাটা সেন্ট্রাল শুধু না, সম্ভবত আরও কড়াভাবে সেন্ট্রাল বা মুখ্য করা হয়। যেমন মাওবাদীদের ক্ষেত্রে সবধারণার শুরু শ্রেণীদ্বন্দ্ব ধারণা থেকে আর শ্রেণীদ্বন্দ্ব ধারণা দিয়ে। তাই এখানেও বাস্তবত  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা চীনা কমিউনিজমেও নাই।  কিন্তু তবু একটা কিন্তু করে রাখা হয়েছে। ডেকোরেটিভ (decorative) বা অর্নামেন্টাল (ornamental) অর্থে  মানে বাংলায় বললে, কেবল অলংকারে সাজানো অর্থে  পিপলস [peoples] শব্দটার ছড়াছড়ি আছে চীনে।  যদিও এটা ঠিক পাবলিক বা জনস্বার্থ বলতে যা বুঝাই পিপলস এর অর্থ এখানে ঠিক তা নয়। খুব সম্ভবত দুনিয়ায় দ্বিতীয় কমিউনিস্ট বিপ্লব হিশাবে চীনা বিপ্লব; ফলে রাশিয়ান বিপ্লবের অনেক কিছুর দায় বা সাথে মিলিয়ে চীনের নিজের বিপ্লবকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল। তাতে সোভিয়েত শব্দ ও ধারণাটা যেটা রাশিয়ান বিপ্লবের মুখ্য বৈশিষ্ট – যার একচুয়াল অর্থ পাড়া মহল্লা বা এলাকার প্রতিরোধ কমিটি। বাংলাদেশের সাথে তুলনায় আমাদের যেকোন আন্দোলনে যেটা আমরা বলি “সংগ্রাম পরিষদ” – এটাই সেই সোভিয়েত ধারণার বাংলাদেশীকরণ। [এটাই দাদা সিরাজুল আলম খানের এক সুচিন্তিত অবদান]।
    রাশিয়ান বিপ্লবে লেনিন ও সহযোগীদের সমস্যা ছিল এটা কেমন বিপ্লব বলে তারা পরিচয় করাবে? তাদের বহুকাঙ্খিত রাশিয়ান কমিউনিস্ট বিপ্লবকে [তাঁরা ইউরোপে যেমন হয়েছিল রিপাবলিক বিপ্লব মানে রাজা-বাদশার শাসনের বিপরীতে প্রথম জনগণের শাসন বা পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন বলে থাকে] – যেটাকে আবার কমিউনিস্টেরা তাদের চোখে বুর্জোয়া বিপ্লব বলে চিনিয়ে এসেছে – তাই তারা কোনভাবেই রাশিয়ান কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এসব পুরানা শব্দের কোনটাই ব্যবহার করে চিনাতে চায় নাই। আর সত্যি সত্যি রাজধানী ক্রেমলিনের এলাকা এলাকায় প্রতিরোধ কমিটি বা সোভিয়েত গড়ে তুলেই এই বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল বলে এই সোভিয়েত বা প্রতিরোধ কমিটি গড়া ও নাম দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল যেটা থেকে কমিউনিস্ট সাহিত্যে একে সোভিয়েত বিপ্লব বলে চিনানোর।
    কিন্তু এটাই আবার সমস্যা হয়ে যায় চীনের বিপ্লবের বেলায়। কারণ, চীনের ক্ষমতাদখলের ক্ষেত্রে তাদের স্টাইলে কোন প্রতিরোধ কমিটি বা সোভিয়েত গড়ে তা আগিয়ে নিয়ে এটা সম্পন্ন করা হয় নাই। তাই চীনে ‘সোভিয়েত’ শব্দের বিকল্প হিশাবে ‘পিপলস’ শব্দটা চালু করা হয়েছিল। আর মনে রাখতে হবে – এই পিপলস এর অর্থ ঠিক  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা একেবারেই নয়। কেন নয়?  কারণ,  শ্রেণী নির্বিশেষে কোন পাবলিক বা নাগরিক ধারণা কমিনিজমে নাই, শ্রেণী আছে।  আর কমিউনিস্ট পার্টি তো কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার্তে রাষ্ট্র কায়েম করেছে বলে পার্টি মনে করে।

    আর এসব কারণেই,  যেকোন কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখলের পরে সবকিছুর মূলকর্তা হয়ে যায় পার্টি – মানে কেবল  শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ (আম-জনতার স্বার্থ নয়) রক্ষার জন্য ক্ষমতাদখল করেছে যে  পার্টি।  । তাও আবার এই মূলকর্তা বলতে কতদুর বুঝিয়েছি ? আসছি সেখানে, তবে এর আগে কিছু কথা।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে একারণেই নাগরিক সবারই কিছু মৌলিক ও কমন স্বার্থ রক্ষার জন্য বা সবারই মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষার জন্য (রিপাবলিক) রাষ্ট্র গঠন করা হয় – এধারণাটাই কমিউনিজমে নাই, তাদের রাষ্ট্রে নাই।  আছে কেবলমাত্র শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার কথা। সবকিছু তাই সেখানে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের জন্য। এখন এতে আরেক সমস্যা তাহলে হাজির হয় যে তাহলে  কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের রাষ্ট্রে কোনটা শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ তা বুঝা যাবে কী করে? এর জবাব থেকেই পার্টি ধারণাই মুখ্য কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ধারণা হয়ে যায়। কেন? যেটা শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি বলবে, সাব্যস্ত করবে সেটাই কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ বলে বুঝতে হবে।
    আর এভাবে সাব্যস্ত করাতেই কমিউনিস্ট সমাজে এরপর থেকে বিচার, ন্যায়বিচার, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, বিচার প্রক্রিয়া ইত্যাদি যত সম্পর্কিত শব্দ আছে এর সবকিছু নাই ও বাতিল হয়ে যায় অথবা পার্টির হুকুমের অধীনে হয়ে যায়।  কিন্তু ইনসাফ বা ন্যায় জিনিষটাই এমন যাকে স্বাধীন থাকতেই হয় নইলে তা ইনসাফ নয়। বিশেষ করে শাসক-ক্ষমতার অধীনে যে যেতেই পারে না। কারণ সেক্ষেত্রে এটা শাসকের ইচ্ছাই হয়ে যাবে। ইনসাফ-বিচার কখনই শুধু শাসক কেন, কারো অধীনের যেতে পারে না। তাহলে সেটা আর ইনসাফ-বিচার একেবারেই নয়। এটাই প্রিযুডিস।  একারণেই, সেপারেশন অব পাওয়ার না থাকা, প্রিযুডিস (prejudice) হয়ে থাকে বা  কোন আগাম অনুমান মাথায় নিয়ে বিচারক বিচার এজলাসে বসলে সেটা আর বিচার-ইনসাফই নয়, হবে না। অথচ কমিউনিস্ট দেশে খোদ পার্টি মানে শাসন ক্ষমতাও যার হাতে সেই-ই হয়ে আছে কার্যত বিচারকের ভুমিকায়। এজন্যই পার্টিই বিচারক বা রায় দাতা যে কে শ্রমিক শ্রেণী আর কে বুর্জোয়া তা কেবল পার্টিই বলে দিতে পারে!  তাই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর অপরাধ কী? কে তার বিচার করেছে আর কিসের ভিত্তিতে এসবে বিচার সাব্যস্ত হয়েছে এনিয়ে চীনা পার্টি নিরুত্তর। কোন জবাব তারা দিবে না এটাই কমিউনিস্ট কালচার। ক্ষমতা চর্চার কালচার!। সবচেয়ে লোমহর্ষক কালচার!!!  দুঃখের কথা, এটা রিপাবলিক বা মর্ডাণ যুগের রাজনৈতিক মুল্যবোধ চিন্তা ও চর্চা তো নয়ই এটা এরও পিছনের দিনের কোন মনার্কি [ monarchy] রাজতন্ত্র বা  কোন রাজা-বাদশার কালেও যেটুকু বিচার ব্যবস্থা ছিল কমিউনিজম সেটুকুওও নয়। বরং এরও পিছনের পর্যায়ের কোন সমাজের চিন্তা ও চর্চার কাহিনী!!!

    যেকোন মানব সমাজ জন্মানো শুরু হয় ন্যায় বা ইনসাফের ভিত্তি থেকেঃ
    এটা বহু আগেকার প্রতিষ্ঠিত ও ব্যবহারিক সত্য যে যেকোন সমাজ জন্মানো শুরু হয় ন্যায় বা ইনসাফের ভিত্তিমূলক ধারণা থেকে। কথাটা আরও ভালভাবে বুঝবেন যেমন ধরেন কেউ কোন কাজ বা সেই কাজটা করে ঠিক করেছে কিনা এটা সেই সমাজ কী দিয়ে সাব্যস্ত হবে? সমাজ কী দিয়ে কিসের ভিত্তিতে তা সাব্যস্ত করবে? গায়ের জোর নাকি ন্যায় ইনসাফের ধারণায়? – এটা যেকোন সমাজের জন্য খুবই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন!!  অর্থাৎ – ন্যায়বিচার সংক্রান্ত মুল্যবোধ দিয়ে নাকি যার গায়ের জোর যার বেশি সেই সঠিক বলছে ধরে নিতে হবে?  মনে রাখতে হবে ন্যায়বিচার সংক্রান্ত মুল্যবোধ বা ইনসাফের ধারণা এখানেই ধর্মতত্বেরও এক বিরাট প্রভাবক ভুমিকা আছে এবং থাকবেই। কাজেই এসব দিকগুলোকে একটা সংজ্ঞায়িত করা নাই এমন ক্ষমতা দিয়ে – পার্টিক্ষমতা দিয়ে সব রিপ্লেস করে ফেলবেন – এটা কখনও ঘটবে না,চলবে না!  এটাই কমিউনিস্ট ক্ষমতার ফান্ডামেন্টাল ত্রুটি ও অযোগ্যতাই হয়ে আছে ও থাকবে; এই ত্রুটি প্রকাশ করতেই থাকবে।
    তাই আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি যে একটা নুন্যতম বিচার-ইনসাফ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে – এই ইনসাফের ভিত্তিতে দাড়িয়েই কেবল সমাজ শুরু হয় হয়েছে এবং আছে।  না হলে মানুষ এতদিন সকলকেই কেবল সারাদিন ডন-বৈঠক করে জিমে কাটিয়ে গায়ের জোরের চর্চা করত! কারণ অর্থ-সম্পত্তি ও ঘরের মেয়েদের রক্ষা করতে হবে তো!
    এখন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা মানে কী ধরণের বিচার ব্যবস্থা ও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা – সেটা কী কাজী ব্যবস্থা বা রোমের বিচার ব্যবস্থারই আধুনিকায়ন করে নেয়া কোন ব্যবস্থা – এমন যেকোন কিছুই হতে পারে।  মানে বলতে চাচ্ছি মানুষের সমাজ আর এর সাথে একটা না একটা বিচার ব্যবস্থা একেবারে হাতে হাত ধরে হেঁটেচে তবেই কেবল আমাদের সমাজ সভ্যতাগুলো একালে পৌছিয়েছে।

    আবার এর ভিতর একটা বড় তর্ক ছিল যে কেউ অপরাধ করেছে কীনা এটা কে সাব্যস্ত করবে? যে কেউ আঙুল তুললেই হবে? নাকি সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা, শাসক যদি আঙুল তুলে তাহলেই তা কী কেউ অপরাধী সাব্স্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে?  এরাই সদুত্তর ছিল না, বরং একটা  বিচার ব্যবস্থা দাড় করাতে হবে। শুধু তাই না, সেই  বিচারব্যবস্থার উপর শাসকের খবরদারি রোধ করে রাখা হয়েছিল। এটাই ইউরোপের অর্থে সেপারেশন অফ জুডিশিয়ারি তর্ক।

    কিন্তু সরি! কমিউনিস্ট সমাজ বা কমিউনিস্ট আন্ডারস্টান্ডিং ঠিক এরকম এর ধারেকাছেই নয়। যেটা এতক্ষণ বললাম,   এর মূলে আছে একদিকে এর কথিত শ্রেণী ধারণা আর অন্যদিকে পার্টিই সর্বময় ধারণা। আর এতে কোন বিচারবিভাগ নয়, পার্টিই সাব্যস্ত করে দিবে কেউ অপরাধী কিনা!
    এমনিতেই কে কোন শ্রেণীর লোক তা সে নিজে বললে হবে না। পাটি যদি বলে কেউ বুর্জোয়া তো সে বুর্জোয়া। দ্বিতীয়ত, কমিউনিস্ট চিন্তা বলে কয়েই শুরু করে থাকে যে সে নিজে এক একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা। আর এই একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা বলতে তা এমনই যে যাকে সে বুর্জোয়া মনে করবে তার সাথে সে বলে কয়ে বৈষম্য করবে – সমান আইনি সুযোগ বা ন্যায়বিচার তাকে দিবে না। এটাই তার একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা।  প্রথমত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক মাত্রই সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এই ধারণা সেখানে কাজ করে না, নাই। কারণ, কমিউনিজমে নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই।  আছে কেবল শ্রেণী ধারণা; তাও সেটাও একমাত্র পার্টি ঠিক করে দিবে যে কে কোন শ্রেণীর লোক।  তাই নাগরিক অধিকার বলেও কোন ধারণাই নাই। যদিও পাবলিক শব্দের ব্যবহারে যথেচ্ছচার আছে। যেমন আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক যা সাধারণ ভাবে আমাদের সেন্ট্রাল কন্ট্রোলিং ব্যাংক- এর ধারণা।  চীনে এর সমতুল্য ব্যাংকের নাম PBOC। মানে হল পিপলস ব্যাংক অব চায়না।  এমনকি দেশের নাম পিপলস রিপাবলিক অব চায়না [PRC]। সেনাবাহিনীর নাম পিপলস আর্মি ইত্যাদি। 

    আসল সমস্যাটা হল, পার্টি সবক্ষমতার অধিকারী এটা যতটা কনসেপ্টের সমস্যার এর চেয়েও বেশি সমস্যা তা হল, পার্টি কিসের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সে পাবলিককে বলবে না; জনসমক্ষে বলবে না।  বিচারক যেমন রায় লেখার সময় তাকে রায়ের পিছনের সাফাইটা কী বা কোন আইনে দেয়া ক্ষমতা অনুসারে সে ঐ এই রায় দিচ্ছে সেই সাফাই, সেই ব্যাখ্যা লিখিত রায়ের সাথে জুড়ে দিতেই হবে। আর ঐ রায় তো ওপেন। তাই যে কেউ রায় যাচাই করতে পারে। কিন্তু কমিউনিস্টদের বেলায় তা এটা মানে না। অথচ এমনিতেই পার্টি হল শাসক তাই শাসক নিজেই আবার একই সাথে বিচারক হতেই পারে না। কোন প্রধানমন্ত্রী যদি প্রকাশ্যে ও সরাসরি বিচারকের ভুমিকা নেয় – এটা তেমনই এক ঘটনা হবে তাহলে।  অথচ এটা তো কোন এথনিক-কালচারাল সমাজের সাধারণ ন্যায়বোধও অনুমোদন করে না।   কিন্তু কমিউনিস্টদের বেলায় তারা এই “সেপারেশনের” ধারণা দূরে থাক তারা কোনকিছুই মেনে চলে না। তাদের শ্রেণী ধারণা এমই ঘামন্ডি, গোয়াড় একচোখা ও উদ্ধত!! আসলে এটা শুনতে খারাপ লাগলেও এটা মূলত এক বেইনসাফ বা অবিচারের ধারণা।  এর উপর আবার পার্টি কোন আইনে বা কিসের ভিত্তিতে রায় দিচ্ছে সেটাও ত বলবেই না।

    আর জনসমক্ষে পার্টির এই বলতে না পারার যে প্রাকটিস এরই বাইরের প্রকাশটা হল হঠাত করে লোকটার জনসমক্ষ থেকে গায়েব ডিসাপিয়ার্ড [dissappeared] হয়ে যাওয়া বা গায়েব করে দেওয়া। এজন্য হাসিনা আর কমিউনিস্টদের সখ্যতার ভিত্তি এটাই।  কিন্তু একালে আসলে এটা কী চলে? চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেলায়, এই গায়েব রাখার এসময়ে পার্টি তাকে বলপ্রয়োগ করে বাধ্য করেছে একটা স্বীকারোক্তি দিতে যে সেই দোষী বলে পদত্যাগ করছে বা সব মেনে নিচ্ছে। আর এই স্বীকারোক্তি পেলে এবার আবার তার জনসমক্ষে হাজির হওয়া তবে সব ক্ষমতা পদ নাই হয়ে থাকা অথবা পার্টি যা শর্ত দিয়েছে সে অনুযায়ী কিছু একটা তার নাই হয়ে যাওয়া বা থাকা।
    এককথায় জনসমক্ষে কোন ন্যায়ের ধারনা পার্টি চর্চা করে না বা করতে পারে না বলেই এই গায়েবী কালচার!!!

    এখন লেনিনের আমলে মানে, আজ থেকে একশ বছর আগে যা পার হয়ে গেছে যখন এই পার্টি ধারণা ও এর চর্চা শুরু হয়েছিল। এখন  জনসমক্ষে এবং কোন ন্যায়ের ধারণার চর্চা ছাড়া কোন রাষ্ট্র প্রসঙ্গে ধারনা অচল ও অগ্রহণযোগ্যই হবে অবশ্যই। এর উপর আবার চীন যদি আগামিতে আমেরিকার মত না হলেও অন্তত কেবল অর্থনৈতিক অর্থে গ্লোবাল নেতা হতে চায় তাহলে এটা হবে নেতার  গ্লোবাল পাবলিক বা সারা দুনিয়ার চোখে সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য স্বভাব-বৈশিষ্ট! এককথায় বললে, পার্টি-ক্ষমতা এই বিষয়টাকে এর – ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা এক ক্ষমতা – এভাবে হাজির করতেই চায় না।  যা আসলে একটা কোটারি-ক্ষমতা মানে এক অলিগর্কি ক্ষমতা [oligarchy]  করে রেখে দিতে চায়। একারণে, এটা বারবার  কমিউনিস্ট ক্ষমতার ধারনা “এক অন্যায্য ক্ষমতা” – আনজাস্টিফায়েড ক্ষমতা হিসাবেই হাজির হতে থাকবে।  আর এভাবে ক্রমশ চরম ভাঙনের দিকেই যেতে থাকবে; সোভিয়েত ক্ষমতা যেভাবে গিয়েছে।

    জ্যাক মা সমস্যাঃ
    জ্যাক মা রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্র অথবা ক্ষমতা  সংফশ্লিষ্ট কেউ না; তিনি ব্যবসায়ী। নয়া আইডিয়ায় গ্লোবাল মার্কেটিং ব্যবসা এটা। এখন হতেই পারে তিনি অসৎ সুযোগ নিয়ে দেশের নয়ম ভেঙ্গে কোন ব্যবসায়িক ততপরতা করেছেন। কিন্তু তাকেও মাসের পর মাস গায়েব ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রেখে দেয়া হয়েছিল। এর অর্থ আইনিভাবে জ্যাক মা কে নিয়ন্ত্রণ করার কোন মেকানিজম চীনা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নাই। তাই নয় কী? চীনা রাষ্ট্রে এমন প্রকাশ্য আইনি বিচার ব্যবস্থা তাহলে নাই!  তাই কী? তার মানে এই  ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রাখার ব্যবস্থা – এটা তো কোন রাজা-বাদশার সমাজ-শাসন ব্যবস্থাতেও অচল। হয়ত কোন এক গোত্র-সমাজের ব্যবস্থায় তা ছিল!!  এভাবে কিছুদিন পরপর ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রাখার ব্যবস্থা করে হবু গ্লোবাল নেতা চীনের কী ইমেজ বাড়তেছে?  এর অর্থ চীনের রাষ্ট্র একটা নুন্যতম “স্বাধীন বিচার সিস্টেম” দাড় করাতে সবসময়ই অপারগ থেকে যাবে। এতে পার্টি মানে তাদের শ্রেণী-চিন্তায় এটা পারমিশেবল নয়, অ-অনুমোদিত থেকেই যাবে! চীন অন্তত তার চীনের ‘গায়েব’ কালচার দিয়ে কোন গ্লোবাল নেতা হতে পারবে না! তা এখনই বলে দেয়া যায়!

    কোন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত যুক্ত হতে চায় না চীনঃ
    অনেকের মত আমারও ধারণা ছিল এই যে, গ্লোবাল নেতা হতে চায় চীন তাতে কোন অসুবিধা কী! কিন্তু এর মানে এই না যে আমেরিকার মত চীনকেও কোন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত ঢুকে পড়তে হবে, হতেই হবে; এই অনুমান তো অবশ্যই ভুল।  চীন তেমন হতে চায় না। অন্তত এখনই। কিন্তু টের পাচ্ছি  আমাদের এই ধারণায় ক্রমশ চির ধরাচ্ছে চীন নিজেই।  প্রথমত, কম্বোডিয়া। এটা খুবই এক বাজে উদাহরণ হয়ে উঠে এসেছে।
    টানা গত ৩৮ বছর ধরে হুনসেন ক্ষমতায় আছেন। মানে খেমার রুজদের তান্ডব শ্রেণী শত্রুর নামে নির্বিচারে (পাঁচশ টাকার টংয়ের দোকানিকেও মালিক)  বুর্জোয়া বলে হত্যার কমিউনিজমের শেষ পর্বে ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন। এরপর [1991 Paris Peace Agreements] জাতিসংঘের অধীনে শান্তি চুক্তি এর সুবিধার সব মাখনটাও তিনি খেয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে গেছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে তিনি আরেক ত্রাস হয়ে উঠলেন।
    গত ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় থেকে অনেক প্রত্যক্ষভাবে  লক্ষ্য করছি কম্বোডিয়ার সব বিরোধীদলীয় নেতাদেরকে জেলে রাখা হয়েছে বা বিদেশে আশ্রয়প্রার্থী হতে বাধ্য করা হয়েছে। অথবা নানা উসিলায় দল নিষিদ্ধ বা নানা শর্ত আরোপ করে রাখা হয়েছে। সেসময়ের হংকংয়ের এক মানবাধিকার সম্মেলনে তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। জেনেছিলাম তাদের একদলীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধীদল শুন্য হয়ে থাকার ইতিকথা। এরপরে ২০১৮ সালের আর একবার একদলীয় নির্বাচন; পরে এবার  ২০২৩ সালের একইভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।  কিন্তু পরিস্থতির কোন উন্নতি বা পরিবর্তন নাই।  বরং এবার আরো নিম্নমুখি অবস্থাটা হল, এতদিন হুনসেন তার ছেলেকে সেনাপ্রধান করে রেখেছিলেন। আর এবার এখন তিনি নিজে পদত্যাগ করে ঐ সেনাপ্রধান ছেলেকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাবেন; এর পরিকল্পনাতেই এবারের কথিত নির্বাচনটা হয়েছে। যা আমাদের পরিস্থিতির সাথে বহুলাংশে মিলে! যেটা বুঝে আসে না – কেন চীনকে আরেকটা দেশের একটা খেলনা নির্বাচনে জড়িত হতেই হবে। এত নিচে নেমে চীনের স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে? চীনের এত কী ঠেকা?  চীন কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাথা ঘামায় না – এটা কী এর উদাহরণ আর থাকলো?  আর এভাবেই কম্বোডিয়া যেন চীনের যেন লাগাতর নিজ প্রভাবাধীন করে রাখতেই হবে সেও ব্রত পূরণ করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে – এই বেপরোয়া চীন এটা কেন???
    মূল কথাটা হল,  এতে কোন একটা দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতা সুস্থভাবে গড়ে না উঠে একে বরং মারাত্মক ব্যহত করে দেয়া হচ্ছে। এজায়গায় কম্বোডিয়ার সাথে বাংলাদেশের মিল আছে। এটা খুবই ভয়ংকর টেনডেন্সি। কম্বোডিয়া বা বাংলাদেশের মত দেশগুলো তাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ুক, এসব দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদলের ব্যবস্থা অসুস্থ হয়ে পড়ুক – সেটা কী চীনের কাজ এক্তিয়ার হতে পারে – এটা তো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় বা কাম্যও নয়। তাতে সেটার জন্য দায়ী চীন অথবা আমেরিকা অথবা উভয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা যাই হোক না এটা  গ্সরহণ হ্য করা যায় না। নুন্যতম গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না।  অন্তত এটা চীনের জন্য এক বিরাট আত্মঘাতি কাজ হচ্বেছে ও হবেই; যার অনেকটাই সম্ভবত ঘটা শুরু হয়ে গেছে। মাত্রার দিক থেকে বাংলাদেশের তুলনায় আগানো কম হলেও কম্বোডিয়া ইতমধ্যেই মারাত্মক বিপদজনক জায়গায় চলে গেছে। খুব সম্ভবত চীন অতিরিক্ত রিস্ক নেয়ার পথে হাটা শুরু করে দিয়েছে।
    এটা হবু গ্লোবাল নেতা চীনের জন্য কোন পথ বা পদ্ধতি হতে পারে না। এটা চীনের জন্যই আত্মঘাতি ও নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করার পদক্ষেপ হয়ে দাঁড়াবে, দাঁড়াতে বাধ্য। একটা গ্লোবাল অর্ডার – রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নতির বদলে একে আরও নিম্নগামি করা হবু নেতা চীনের আচরণ হতে পারে না; কাম্যও নয়। আমরা আমাদের দেশকে গুম-খুন আর অপহরণের দেশ করে গড়তে পারি না! কাউকে এলাও করতে পারি না।  সেটা যেই বহিঃশক্তিই – চীন বা আমেরিকা – একাজে দানব সরকারকে সহায়তা করুক!

    জঙ্গীদমনের নামে আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয় ঠিক তেমনই,  শ্রেণী শাসনের নামে চীন এর বাংলাদেশকে  গুম-খুন আর অপহরণের দেশ বা সম্পদপাচার লন্ডারিংয়ের দেশ হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া এটাও গ্রহণযোগ্য নয়।  এসব থেকে তাদের অবশ্যই দূরে থাকতেই হবে। এটা কোন উদাহরণ হতে পারে না।  আগে যেকোন বহিঃশক্তিকে এসব থেকে দূরে যেতে হবে।  এরপরেই আমরা অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, অবকাঠামো ঋণ সহায়তা ইত্যাদি দিকে সবার সাথেই একমাত্র সম্পর্কিত হতে চাইবে।

    এছাড়া নয়া কোন গ্লোবাল নেতা মানেই আমাদের বুঝতে হবে এর শুরুতেই খোদ জাতিসংঘের একটা সংস্কার হতে হবেই। আর তাতে কী এমন হস্তক্ষেপ এটাই নয়া জাতিসংঘের রেওয়াজ হবে???? আমাদের মত দেশগুলো চীনা সমর্থনে  গুম-খুন আর অপহরণের দেশ হয়ে উঠবে??? বুঝাই যাচ্ছে চীন এসব বিষয়ে এখনও নাদান!
    যারা বাংলাদেশকে ইতোমধ্যেই গুম-খুন আর অপহরণের দেশ বা সম্পদপাচার লন্ডারিংয়ের দেশ বানিয়েছে অথবা যারা এতে সমর্থন দিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছে সেসব দলগুলোর সাথে চীনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো আমরা খেয়াল করেছি। দেশে রাতের ভোটে ক্ষমতাসীন হবে আর চীন তাদের এই কথিত ভোটের খরচ যোগানো দেশ হয়ে উঠবে এটা চলতে পারে না, এটা কাম্য নয়। তার মানে –  আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত চীন যুক্ত হতে চায় না – এটা আর সেই চীন নয়। এটাই হতে যাচ্ছে। তাই যথেষ্ট ভেবেচিন্তে এবিষয়ে চীনকে সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ  নিতে হবে। বলাই বাহুল্য এমন পদক্ষেপ এগুলো একেবারেই কাম্য নয়! আর এতে চীনের কোন গ্লোবাল সম্ভাবনা কিছু ঘটবার আগেই সব ভেঙ্গেচুড়ে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য!!!

    এককথায় চীন নিয়েও একালে এখন আমাদের পশ্চিমাদেশের মত উদ্বিগ্নতা বাড়ছেই! যা চীনের জন্য ভাল লক্ষণ নয়!!!

    আপডেটেডঃ    ০৬ আগষ্ট ২০২৩; দুপুর ১১ঃ০২
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • অজ্ঞতায় থেকে কথা বললে নুইসেন্স তৈরি করবে

     

    অজ্ঞতায় থেকে কথা বললে নুইসেন্স তৈরি করবে
    গৌতম দাস
    ২৭ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Kk

     

                    পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে, 

    বামপন্থী নুইসেন্সেঃ
    চলতি নয়া শতকের রাজনৈতিক ঘটনা ফেনোমেনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে চাইলে গত শতক (২০০০ সাল) পর্যন্ত যেসব টুলস বা  ব্যাখ্যার হাতিয়ার আমাদের হাতে এসেছিল তা এই নয়া শতকের একেবারেই কাজে আসবে না; নতুন নতুন মেজর ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে আমরা সক্ষমতা দেখাতে পারব না। বিশেষ করে না-বুঝ বা অবুঝ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামে পরিচিত ধারণাগুলোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সবার আগে সচেতন হতে হবে। এরপর একালে সেসবের পুরাপুরি একটা রিভিউ বা পুনর্মুল্যায়ন আগে করে না নিয়ে সেসব পুরানা ধারণা এই শতকে ব্যবহার করতে গেলে একটা বিপর্যয় আসতে বাধ্য।  আর এ’থেকে  সকলের পরিত্রাণের  একমাত্র উপায় নিজ চিন্তাকে নয়া হাতিয়ারে সাজানো, চিন্তার নয়া যোগ্যতা, নয়া দক্ষতা মানে সক্ষমতায় যোগ্য হয়ে আমাদের উঠতেই হবে; এটাই এথেকে বের হবার একমাত্র  পথ।
    কাজেই উপায় একটাই, নিজ সক্ষমতা সম্পর্কে আগে মুল্যায়ন ও সঠিক মাপামাপি-এস্টিমেট করে নেন – যাদের সক্ষমতা নাই টের পান তারা নিজ দায়িত্বে নিজ খামতি পূরণে রত হন। কিন্তু তবু এই পরিস্থিতিতে  দয়া করে পরিপুর্ণ না জেনে নিশ্চিত না হয়ে কোন সন্দেহ বা ষড়যন্ত্র তত্ব দিয়ে পুরান কথা ও অনুমানগুলোই আবার অবলীলায় ব্যবহার ও বলতে শুরু করলে সেটা শুধু ভুল না, অপরাধ হবে। এছাড়া এমন করলে সেটা একটা বিপর্যয়কর ও বিব্রতকর অবস্থা –  একটা নুইসেন্স তৈরি সে তো হবেই।
    যেমন কেউ মনে করতেই পারে যে সে ন্যাংটা হয়ে মাঝরাস্তা দিয়ে আমি হাঁটবে, এটাই নাকি তাঁর অধিকার! মানে সমাজের জন্য নুইসেন্স তৈরি করাটাই যেন তাঁর অধিকার – এমনটা ভাবলে নগরের বাকি মানুষের আর কী করার থাকবে!!

    বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, “সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু সম্মেলন কক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পুঁজির পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্য: বামপন্থীদের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা হয়েছে”। সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও  ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বক্তা ছিলেন।
    কেউ গত শতকে যা বলতেন সেই একই কথা চলতি শতকেও কোন রিভিউ ছাড়াই আগের মত বলে গেলে একটা বিপর্যয়কর ও বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হবেই। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার প্রায় ত্রিশ বছর পার হয়ে গেল এরপরে যেন কিছুই ঘটে নাই ধরে নিয়ে আমরা পুরান কথা চালায় যেতে পারি না।

    BRICS বলে একটা ধারণা  ও প্রতিষ্ঠান ২০০৯ সাল থেকে মানে গত ১৪ বছর ধরে এসে গেছে। আজকের ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাইডেনের যথেচ্ছভাবে স্যাংশন প্রয়োগের পটভুমিতে ব্রিকস এবার দ্রুত বিকাশের জন্য সচল ও সক্রিয় হতে চেষ্টা করতে শুরু করছে।  এই সময় অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “বর্তমানে কোয়াড ও ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য পদ পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমার কাছে এগুলো আধিপত্যবাধের আরেকটা নতুন রূপ। “এগুলোতে আপনি দেখবেন না শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশকে মুখ্য ভূমিকায় আনতে। বৈদেশিক শক্তি বা আমাদের অঞ্চলের বাইরের ক্ষমতাশালী দেশগুলো কিন্তু এই অঞ্চলে এসে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটা বিভিন্ন সময় নাম বদলাচ্ছে।”  –

    “বর্তমানে কোয়াড ও ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য পদ পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমার কাছে এগুলো আধিপত্যবাধের
    আরেকটা নতুন রূপ
    । “এগুলোতে আপনি দেখবেন না শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশকে মুখ্য ভূমিকায় আনতে। বৈদেশিক শক্তি বা আমাদের অঞ্চলের বাইরের ক্ষমতাশালী
    দেশগুলো কিন্তু এই অঞ্চলে এসে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটা বিভিন্ন সময় নাম বদলাচ্ছে।
    ”  – অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়

    কোন কমিউনিস্ট-বামপন্থীর পক্ষেই এমন না জেনে বলা বক্তব্য দেয়া সম্ভব। ব্রিকস সম্পর্কে কারও না জানা বা কম জানা থাকতেই পারে। কিন্তু তা সত্বেও নিজের অজ্ঞতাকে বুক ফুলিয়ে জানানো এটাকেই ‘বোকার সাহস’ বলে!
    এমনিতেই গত শতকের সমস্যা হল, স্তালিন-সহ পরের বাংলাদেশে পর্যন্ত কোন কমিউনিস্ট এর আর আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জিনিষটা কী  তা জানা হয় নাই। দুইটা বিশ্বযুদ্ধ শেষে গত ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়াতে এই প্রথম একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম ও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম গড়ে উঠেছে। হতেই পারে যে আপনার চোখে এটা ভুল কাজ হয়েছে, ভুল রাস্তায়। তাই আপনি তা পছন্দ করেন নাই, অনুমোদন করেন না। কিন্তু তাতেও আপনি ওসব প্রতিষ্ঠানগুলো কী, ঠিক কী করে থাকে ইত্যাদির কোন বেসিক তথ্য না জেনে অন্ধকারে থেকে মন্তব্য করা কী ঠিক?

    কঠিন সত্যি বা ফ্যাক্টস টা হল, কোন কমিউনিস্টই দুনিয়া যে ১৯৪৫ সালের পরে সেই প্রথম একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম ও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম মানে এর প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এবং দ্বিতীয় পলিটিক্যাল সিস্টেমের জন্য জাতিসংঘ গড় তুলেছে – এদিকটা টের পায় নাই।  স্থানীয়ভাবে একটা দেশ-ভুখন্ডে যেমন রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেচে তেমনই গ্লোবাল পরিসরে (তবে সীমিতভাবে) গ্লোবাল এক রাষ্ট্রব্যবস্থার মতই জাতিসংঘ গড়ে উঠেছিল – যার ভিত্তি হল, কোন ভুখন্ডের বাসিন্দাদের কলোনিদখল করা অবৈধ কাজ। এই ভিত্তিতে জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণায় ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারিতে প্রথম যে চার রাষ্ট্র স্বাক্ষর করেছিল তার একটা হল স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন।  এই ফ্যাক্টস ও এর তাতপর্য কমিউনিস্টেরা বুঝেছে বা জানে  তা নিয়ে সন্দেহ করার জেনুইন কারণ আছে। খোদ স্তালিন কী মনে করতেন এনিয়ে তার কোন লেখা বা উচ্চবাচ্যের কথাও জানা যায় না।
    দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের এই হোটেলে এক সম্মেলনে [Bretton Woods Conference] টানা ২২ দিন ধরে চলা আসর থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নামের দুই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম দাঁড় করানোর জন্য। যাতে দুনিয়াব্যাপী “আন্তঃরাষ্ট্রীয় এক বাণিজ্য” ব্যবস্থা চালু করা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্তালিনের প্রতিনিধি ঐ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠান দ্বয়ের জন্ম ম্যান্ডেট যে কেন কী উদ্দেশ্যে এটা জন্ম দেয়া হচ্ছে, এর এক্তিয়ার কী ইত্যাদি সেসব রচনার পরে সেই সম্মেলন শেষ হয়ে যায়।  এরপরের কাজ ছিল প্রত্যেকটা রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ সাপেক্ষে ওদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ লাভের আবেদন করা ও সদস্যপদ নেয়া। এই অংশে কোন সোভিয়েত প্রতিনিধি আর সেখানে হাজির হন নাই।  সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ অংশ হল এটা। কিন্তু কেন স্তালিন সদস্যপদ নেন নাই, কারণ কী – অথবা  দুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার ধারণা অনুমান কী অথবা আপত্তি কী ইত্যাদি এসব নিয়ে তিনি কোথাও কিছু লিখেছেন জানা যায় না।

    পরবর্তিতে কমিউনিস্ট জগতেও এনিয়ে কোন আলোচনা উচ্চবাচ্য কোথাও শুনা যায় নাই। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত ১৯৮২ সালের প্রশাসনিক সংস্কার চলার সময় সরকারি পাটকলের শ্রমিকেরা চাকরিচ্যুত হলে সেই প্রথম আমাদের কমিউনিস্টেরা এদুই প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে পারে। তারা এদুই প্রতিষ্ঠানের নামে – নিপাত যাক – শ্লোগান দেয়া সেই থেকে চালু হয়। অতটুকুই; তবু এদুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানাশুনা তখনও আর কিছু হয় নাই বা আগায় নাই।
    ওদুই প্রতিষ্ঠানের জন্ম পরবর্তিতে সোভিয়েত ব্লক বলে কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) আমেরিকা বনাম সোভিয়েত – এই ব্লক রাজনীতির কালে সোভিয়েত ব্লকের কোন রাষ্ট্র ওদুই প্রতিষ্ঠানের সসস্যপদ গ্রহণ করে নাই। বা পায় নাই। এটা প্রমাণ করে যে  এর মানে এই ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের মধ্যেও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না।  তবে গুরুত্বপুর্ণ হল, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পরেই ১৯৯২ সালেই ভেঙ্গে তৈরি হওয়া ১৫ রাষ্ট্রের সকলেই ওদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিল।

    এসবই হোল বেস ফ্যাক্টস [Base Facts]। এবার আসি ব্রিকস [BRICS] প্রসঙ্গে। একবাক্যে শেষ করব।  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে উঠেছিল আমেরিকার নেতৃত্বে। এর অর্থ তাতপর্য  করা যেতে পারে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর গঠন ছিল শেয়ার মালিকানার কোন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের মত, যেখানে আমেরিকার এত বেশি শেয়ার যা অন্যেরা মিলিতভাবে চ্যালেঞ্জ উপযোগী নয়।  আর ব্রিকস হল সেই উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান  যার লক্ষ্য হল চীনের নেতৃত্বে এবার নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া।

    কাজেই গত প্রায় আশি বছর ধরে চলা গ্লোবাল অর্ডার হিশাবে নয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাটাকে [এর সীমাবদ্ধতা বা বড়লোক দেশগুলোর দিকে কান্নি মারা বিষয়ক খামতি সহ ] যে বুঝেই উঠতে পারে নাই, জানার [মানার কথা বলি নাই] চেষ্টা করে নাই,  সে একালে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কালে ব্রিকসের উত্থানকে কিভাবে বুঝবে? আবার তেমন জানাবুঝা নাই একারণেই হয়ত এটা বলাও সহজ মনে হতে পারে যে কোন রাষ্ট্রের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ না নিলে যেন ঐ রাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতি নাই!!! সদস্যপদ না নিয়েও যেন দুনিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা যাবে!!! তাই কী??? এরা তাই মনে করে। জানাবুঝা না থাকার এই এক বিরাট সুবিধা; যাখশি বলা যায়। আজকের দুনিয়াতে অন্যকোন দেশের সাথে আমদানি-রপ্তানিতে না জড়িয়ে কী অর্থনীতি টিকানো সম্ভব? মনে হয় না এনিয়ে কেউ ভেবে একথা  বলছে!!!

    আনু মুহম্মদের বক্তব্যঃ
    কিছু কঠিন বাস্তব সত্য হল,  খোদ কার্ল মার্কস বা লেনিন তাদের বইতে কী লিখে গেছেন সেটা নয়। সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র কী সেটা স্তালিন যেটা ব্যবহারিক ভাবে মানে করেছিলেন সেটাই  কমিউনিজম বলে দুনিয়ায় পরিচিত হয়ে আছে। সে বাস্তবতায়, স্তালিন প্রবর্তিত – উতপাদন ব্যবস্থা থেকে ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ করে উতপাদন করলেই “বাড়তি মূল্য ফেরত”-সহ সবকিছু সমাধান – এটাই কমিউনিস্টদের সমাজতন্ত্র।

    কিন্তু এটা কী বাস্তবে ‘বাড়তি মূল্য ফেরত’ করেছিল কিনা এমনকি এই সমাজতন্ত্র নিজে কী ভায়াবল এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা? নিজে টিকে থাকতে পেরেছিল কিনা এটা নিয়ে চিন্তা করতেও রাজি না এই কমিউনিস্টেরা।
    এছাড়া স্তালিনের সমাজতন্ত্র  বাড়তি মূল্য ফেরত দেয়ার সুরাহার ব্যাপারটা ছাড়াও মৌলিক যেসব সমালোচনা মুখোমুখি তা হল – এটাও কী আরেক ক্যাপিটালিজম নয়, এক রাষ্ট্রীয় বা স্টেট ক্যাপিটালিজম! যা ক্যাপিটালিজমের চেয়ে বাইরে নয়। ফলে এতে জমা হওয়া বাড়তি মূল্য সেটাও কী শ্রমিক ফেরত পেয়েছে? পায় নাই, কারণ, পার্টি মালিকানায় চলে গিয়েছে। তাই তা ভোগ করেছে পার্টি এলিট – উপর মহলের নেতা কর্তা ও তাদের পরিবারেরা!
    সবচেয়ে বড় কথা এটা ছিল চরম অদক্ষ উতপাদন ব্যবস্থা – প্রত্যকেটা উতপাদিত পণ্যে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অদক্ষ বাড়তি শ্রমের বোঝা চাপানো। ম্যানেজমেন্ট বলে কোন ধারণা সেখানে কাজ করত না।

    স্তালিনের আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ধারণাঃ
    বাণিজ্য হারাম নাকি হালাল মানে জায়েজ কিনা, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যায়ের কমিউনিস্ট এরাও বলতে পারে না; অস্পষ্ট হয়ে থাকে। কারণ বাণিজ্য করতে গেলে তো মুনাফা করা হয়ে যাবে! মুনাফা করা কী জায়েজ? এটা তো আরো বড় অস্পষ্ট জায়গা! এর উপর আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য? ফলাফলে কমিউনিস্টেরা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারে না।

    ফ্যাক্টস হল, স্তালিন ব্যক্তি-মালিকানাহীন সমাজতন্ত্রী তো বটেই এছাড়াও তিনি যে অর্থনৈতিক (সমাজতন্ত্র) ভাবনার অনুসারী, সেটা মূলত এক উগ্র অর্থনৈতিক-জাতিবাদী ধারণা। সেটা এই অর্থে যে মনে করে আমার দেশের মানুষ যা কিছু ভোগ ব্যবহার করবে তা কেবল দেশেই তৈরি হতে হবে – এমন এক ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট এরা।
    অনেকের কাছে একালেও যথেষ্ট চিন্তাভাবনা না করে মনে হতে পারেন, এটা খারাপ কী!
    এর খারাপটা হল, সবদেশই সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বিশাল বড় ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নয়। এছাড়া, সবদেশ সব ধরণের পণ্য উতপাদ্নই আসম্ভব নয়, এছাড়া সমান দক্ষ নয় সে তো আছেই। দক্ষতার উপর পণ্যমুল্য নির্ভর করে। আমি যে দেশ যে পণ্য উতপাদনে দক্ষ সেটা নিজে ভোগ ও রপ্তানি করে অন্যের ভাল দক্ষ্যতায় তৈরি পণ্য আমদানি – এই নীতি সবচেয়ে কাজের।
    কিন্তু  মোদির মত উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদীরা এক ফলস দেশপ্রেম কপচাবে চীনা টিভি ভাঙছে দেখাবে কিন্তু ভারতের ৭০% চীনা মোবাইল ব্যবহার করবে সস্তা বলে; ভারতের ওষুধ কোম্পানিগুলো ৪০% চীনা কাচামাল ব্যবহার করে ওষুধ বানাবে।

    স্তালিন যে বাণিজ্যবিরোধী ও সমাজতন্ত্রের নামে মূলত এক ‘উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী’ ছিলেন এর প্রমাণ কী? কিসের ভিত্তিতে একথা বলছি? বলছি এজন্য যে সোভিয়েত ব্লকে নিজেদের মধ্যে কোন  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই ছিল না। কেন? সেটা বুঝতে চেয়াষ্টা করেন জেনে যাবেন। সবচেয়ে বড় কথা একটা নিজেদের মত করে  হলেও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোন “আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা” গড়া সম্ভবই নয়। সোভিয়েতে ব্লকের এই তাগিদই ছিল না।

    সোভিয়েত ব্লক ব্যবস্থাটাও টিকতে না পারার এটাই কারণ।
    গত ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে ঐ সোভিয়েন ইউনিয়ন রাষ্ট্রই একেবারে ভেঙ্গে যায়। মানে, বাইরের কারও আক্রমণ ছাড়াই নিজগুনে নিজেকে রক্ষা করতে না পেরে কথিত সোভিয়েত রাষ্ট্র  – এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে অকেজো ও টুকরা হয়ে পরেছিল। তাই ভাঙনের পরে তারা আপোষে ১৫টা দেশে (রাশিয়া-সহ) নিজেরা নিজেকে বিভক্ত করে নিয়েছিল। পরের বছর ১৯৯২ সালের মধ্যেই রাশিয়াসহ ১৫টা রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী, কেমন প্রতিষ্ঠান সেসব না জানা থাকলে যা ইচ্ছা তাই বলে ফেলা, মাইক কাপানো ইত্যাদি তো অবশ্যই সম্ভব। গত ১৯১৬ সালে লেনিন “সাম্রাজ্যবাদ” বইটা লিখেছিলেন। লেখার পরে ক্যাপিটালিজম ইস্যুতে মুখ্য করে লেখা রচনা আর নাই। ১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি মারা যান। ঐ বইয়ে তিনি লগ্নি পুঁজির ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু দুনিয়া কী আজও সেই জায়গায় আছে? লেনিনের দেখা দুনিয়া ছিল কলোনি হয়ে থাকা দুনিয়া। কলোনিদখল অবৈধ ঘোষণা যে হয়েছে, এর উপর ভিত্তি করে জাস্তিসংঘ প্রতিষ্ঠান হয়েছে তা কয়জম=ন কমিউনিস্ট জানে। খোদ স্টালিনই আমল করেন নাই। আর একালের ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল তা আপনার অপছন্দের এবং অনুমোদিত হতে পারে; অবু এর সম্পর্কে এই নয়া দুনিয়া সম্পর্কে আপনার অজ্ঞ থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সুদের হার সম্পর্কেই খবর নেন নাই। অথচ বলে দিলেন এগুলো হল লগ্নি পুজি। মানে পুঁজি খাতায় সুদ খাবার ব্যবস্থা।  অথচ বিশ্বব্যাংকের সুদের হার হলো – বিনাসুদে এবং আসলও ফেরত দিতে হবে না এমন অনুদান এখান থেকে শুরু করে ০.৭৫% মানে ১% এর নীচে সুদে এবং চল্লিশ বছর ধরে আসল ফেরত যার আবার প্রথম দশবছর সুদ আরোপ হবে না – এসব কী লগ্নি পুজি? টাকা খাটিয়ে সুদ খাবার কারবার??? না জেনে আমরা কেন কথা বলব?

    আব্বার তাই বলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী খুবই বাংলাদেশের ফেবারেবল সংগঠন? অবশ্যই না।  কিন্তু ঠিক কোথায় সেটা? এসব জেনে এরপরেই কেবল মুখখোলা উচিত নয় কী?

    আনু মুহম্মদ ঐ সভায় বলেচ্ছেন, পুঁজিবাদের আধিপত্য প্রতিহত করতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিয়ন’ গঠন করতে বামপন্থিদের কাজ করতে হবে। “দক্ষিণ এশিয়ায় যে পুঁজির আধিপত্যের মধ্যে আমরা আছি, সেখান থেকে বের হতে গেলে পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আমাদের একটা ভিশন চিন্তা করা উচিৎ। এই ভিশনটা একমাত্র বামপন্থিরাই ধারণ করতে পারে।”

    পুঁজিবাদের আধিপত্য – এটা কী জিনিষ? এর তো কোন মানুষ-কর্তা নাই দেখা যাচ্ছে। মানে অবজেকটিভ? আবার ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙ্গে যাবার পরে দুনিয়ার কোথাও কী ক্যাপিটালিজম ছাড়া অন্য কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে? বাস্তব সেটা?  আবার চীন যে বহু আগেই স্তালিনের স্টাইলের কথিত সমাজতন্ত্র ছেড়ে দিয়েছে  শুধু তাই না, যে ১৯৩০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি হতে চলেছে এই ফেনোমেনা কে কেমনে ব্যাখ্যা করবো? কথিত পুঁজিবাদ-বিরোধিতা জিনিষটা এক কল্পনা হয়ে থেকে গেছে। বাস্তবতার সাথে যার কোন সম্পর্ক নাই। এই বাস্তবতায় ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিয়ন’ পুঁজিবাদ-বিরোধিতার এজেন্ডা কার? কে সেই ফোর্স? দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশ? এমনকি শুধু বাংলাদেশেও এরা কারা? এমন কে আছে? তাহলে এই যে “দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আমাদের একটা ভিশন চিন্তা” বলা – একটা স্বপ্নে পোলাও খাওয়াও তো এত খারাপ নয়!!!

    বিএনপি এর চেয়ে বেশি কী দেবেঃ
    রাজনীতি বা ক্ষমতা মানেই দেশের তেল-গ্যাস সম্পদ বিদেশিদেরকে দিয়ে দেয়া – এভাবে রাজনীতি ও ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করা এই হাতুড়ে গিরি আর কতদিন? এথেকে বুঝা যায় ‘রিয়েল’ কোন ক্ষমতা পাওয়া বা দখল সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নাই।   বিএনপি কোন বিপ্লবী দল নয়, কিন্তু তাবলে তা কল্পনায় পোলাও খেয়ে চলা বামপন্প্নথী চেয়ে বেতার নয় কী? এই অর্থে যে বিএনপি রিয়েল পাওয়ার নিয়ে ডিল করে থাকে!  আনু মুহম্মদ কী বলতে পারবেন বিএনপির ক্ষমতা পেতে বাধা কী কী অথবা হাসিনার ক্ষমতা ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জ কী কী? বাস্তব ক্ষমতা কী, কী তার সমস্যা ও সম্ভাবনা বামপন্থীদের কখনও জানা হয় নাই।  আবার, ভারতের সাথে বিএনপির  সম্পর্ক কেমন কী? কোন ধারণা আছে? কিছুই ধারণা নাই। । ক্ষমতা বুঝতে গেলে আগে ক্ষমতার লবি সম্পর্কে অন্তত জানা থাকতে হয়। লবি – হোটেলের লবি যে অর্থে। ক্ষমতার করিডোর যেখানে ক্ষমতা ঘুরাফিরা করে – এর ধারণা যে কখনও ক্ষমতায় যায় নাই অন্তত একবার তার কোন ধারণা থাকবে না। আর না জানা থাকার বিরাট সুবিধাটা হল না জেনে সহজে অবলীলায় সব বলে দেয়া যায়।
    আসলে এক “সারপ্লাস ভ্যালু থিওরি” নিয়ে কিছু বুঝ ছাড়া বামপন্থীরা বাস্তবের ক্ষমতা বা রাজনীতি সম্পর্কে আর কী জানে?  এভাবে আর কতদিন?

    আরো কিছু ধারণাঃ
    “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে, তাই খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি: আনু মুহাম্মদ” – এটা বিডিনিউজের রিপোর্টের শিরোনাম। আচ্ছা এই পরাশক্তি মানে কী সোভিয়েত বনাম আমেরিকা? মানে সে জায়গায় রাশিয়া বনাম আমেরিকা?  নাকি চীন বনাম আমেরিকা?
    এছাড়াও এই পরাশক্তি মানে কী সামরিক ক্ষমতা?

    কিন্তু না সরি, এটা এখনকার তো নয়ই, সোভিয়েত আমলেরও বয়ান নয়। সেকালেও “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে” এমন, বলা হত না। কারণ সোভিয়েত বা চীন তো কমিউনিস্টদের ঘরের জিনিষ তাই এভাবে তারা বলত না।  তবে হ্যা পরাশক্তি বলতে  সোভিয়েত বনাম আমেরিকাকে যেটা বুঝানো হত সেখানে পরাশক্তি বলতে সামরিক শক্তিই বুঝা বা বুঝানো হত।

    ১। তবে একালে এসে এটা এখন পরিস্কার যে পরাশক্তি মানে সামরিক শক্তি নয়। বরং পরাশক্তি মানে অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার বা তার সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা বুঝায়।  এখানেই শেষ নয়।  অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার এর ক্ষমতা এটাই বা আমেরিকার হাতে আসে কেন? আমেরিকার সামরিক শক্তির ভয়ে? না, একেবারেই না।  বাংলাদেশের মত দেশের সাথে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতার তুলনা অবান্তর। তাহলে অ্যামেরিকান ক্ষমতাটা কী থেকে এসেছে?  এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতা। আরো স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের মত দেশকে আমেরিকার খুবই কম সুদের বিনিয়োগ পুঁজি (অবকাঠামো ও ডাইরেক্ট বিনিয়োগ দুটাই) যোগান দিবার ক্ষমতা।
    হা আমি উলটা করে বলছি, কমিউনিস্টেরা যা বুঝে এর উলটা। কমিনিস্টদের জানাই নাই যে গত দুশবছরের কলোনি শাসনাধীনে থাকায় তা  আমাদের অর্কেথনীতিকে ব্যপকভাবে পুঁজির অভাবে বুভুক্ষ এক দেশ করে দিয়ে গেছে। পুঁজি নাই তো নয়া কাজ সৃষ্টি নাই। তাতে আপনি পুজিবাদ নাকি কথিত সমাজতন্ত্র যাই করেন। কমিউনিস্টেরা একথাটাই উলটা বুঝছে – তারা বিনিয়োগ নেয়াকে হারাম বুঝেছে।  ভারতের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সমস্যার মুলে হল এই ভুল ধারণা। নেহেরু ১৯৬৪ সালে মারা গেলেও তার পুঁজিবিরোধী ভারতের অর্থনীতি টিকে ছিল ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। যখন এটা নিজ গুনেই ভেঙ্গে পড়ে আইওএমএফের কাছে হাত পেতেছিল ও সংস্কার করেছিল। কমিউনিস্ট উলটা বুঝের মারাত্মক সমস্যাগুলো এটাই। বাংলাদেশে আমরা সংস্কার করে নিয়েছিলাম ১৯৮২ সালেই।  যেকোন আধা বুঝ আরো বেশি স্মস্যা তৈরি করে। আবার ভারতকে পরাশক্তি বানায় দেয়া হয়েছে। কোন যুক্তিতে ভারত পরাশক্তি?
    যেকথা বলছিলাম পরাশক্তি আসলে একটা বিনিয়োগ দেয়া বিশেষত অবকাথামো মানে কম সুদে বিনিয়োগ দিবার ধারণা। আর কোন দেশের অর্থনীতি যখন বিপুল সারপ্লাস জমার মত অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে সেটাই ও পরাশক্তি হয়ে উঠার পুর্বাভাস। যে ক্ষেত্রে চীন এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।      কাজেই “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে” মানে পরাশক্তিগুলোকে তেল–গ্যাস উপ্টৌকন দিলে তবেই ক্ষমতায় যাওয়া যায় এটা আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার গত সত্তর বছর ফেনোমেনা কোথাও ছিল না। এখনও চীন  নাকি আমেরিকাকে তেল-গ্যাসের খনি দিলে তবে ক্ষমতায় যাওয়া যায় এটাও বাস্তবতা নয়। কেবল ২০১৮ সালের পরে কোয়াড বা কে কন দেশের দেশের বলয়ে যাবে এনিয়ে ইন্দো-প্যাসেফক স্তাতেজি বিষয়ক আলাপ উঠেছে। তাও সেটা আবার কোন অ্যামেরিকান প্রেসিদেন্ট এনিয়ে কী অবস্থান নেয় তার উপর নির্ভরশীল। কাজেই আন্দাজি কথা বলা ত্যাগ করাই ভালো।

    ২। এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাঃ
    কথাটা আলোচনার শিরোনামে আছে। কিন্তু ভুরাজনীতি জিনিষটা কী? কেউ এনিয়ে কথা আগায় নাই। এছাড়া এখন একালে মানে আরো ছট করে বলা যায় ২০১০ সালের পরে আগে নয়, এই শব্দটার ব্যবহার চালু হল কেন? কী বুঝাতে চায়? কোন খবর নাই। বরং একটা সহজ নির্ণায়ক দেই । দেখবেন কেউ যদি ভুরাজনীতি শব্দতা ব্যবহার করে তো বুঝবেন যা সে বলছে  তার এনিয়ে জানার মধ্যে কোথাও অস্পষ্টতা আছে। আর এই অস্পষ্টতা ডাকার মোক্ষম শব্দ হল ভুরাজনীতি। শব্দটা কেবল সেই বিষয় নিয়ে কথা বলে যখন কোন দেশের ভৌগলিক অবস্থানই ঐ দেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ করে তোলে কোন বিশেষ কালে। এজন্যি ভূ বা জিও [GEO] শব্দটা। শব্দটা ১৯৪০ দশকে স্বল্প সময়ের জন্য চালু হয়েছিল। পরে যুদ্ধ শেষের গ্লোবাল পরিবর্তনে নয়া সিস্টেমে শব্দটা অপ্রয়োহনীয় হয়ে যায়। প্রতীক চট্টোপাধায় বলছেন, ” ভূ-রাজনীতি এখন জটিল অবস্থায় আছে। সেখানে পুজির স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, নির্দিষ্ট জাতি রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে”। এটা ব্যাপক এক জ্ঞানের কথা বলেছেন মনে হলেও এটা অর্থহীন কিছু কথা।  ভূ-রাজনীতি জিনিষটা কী? কেন তা এখন জটিল এর কোন মা-বাপ নাই। শেষে এলো পুঁজির স্বার্থ। আচ্ছা বলেন তো দুনিয়ায় এখন কোন অর্থনৈতিক ততপরতাটা পুঁজির নয়? কাজেই এসব বকোয়াজি কেন?

    সবশেষ  প্রতীক চট্টোপাধায় দেখা যাচ্ছে অজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে গেলেন। বলছেন, প্রতীক চট্টোপাধায় বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বটি মেকি আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, “গত পরশু হেনরি কিসিঞ্জার চীন ভিজিট করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কোনো ঝামেলা নাই। এগুলো হচ্ছে আইওয়াশ”।

    ৩। যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বঃ
    প্রতীক সাহেবকে সবার আগে বলতে হত যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব এটাকে তিনি কী বলে বুঝেছেন? যেটাকে আবার তিনি ঝামেলা নাই-ও বলছেন?  কিভাবে বুঝলেন? এরপরেই কেবল আমরা শুনতাম কেন এটা তিনি মেকি বলছেন? তিনি তো জানেনই না তাদের দ্বন্দ্ব না হলেও ঝগড়া বিরোধটা কী নিয়ে? এছারা আবার হেনরি কিসিঞ্জার চীন ভিজিট করতে গিয়ে কে কী বলেছে তিনি কী জানেন ফলো করেছেন? কমিউনিস্টদের স্মস্যা হচ্ছে সারপ্লাস ভ্যালু নিয়ে কথা তোলা – এটা ছাড়া ছাড়া বাকি সব প্রসঙ্গই ভুয়া মেকি ইত্যাদি। এজন্য তারা জবরদস্তিতে হলেও যেকোন সমস্যা-জটিলতাকে সারপ্লাস ভ্যালুর সমস্যা বলে রিডিউস করে নাস্মিয়ে দেখাতে ভালো বাসে। একদম গরুর রচনা করে ছাড়ে সবকিছুকে! এভাবে নিজেকে অর্থহীন কথাবলার লোক হিশাবে তুলে ধরেন কেন? মফস্বলের চা দোকানে বসে চাঁদে যাওয়াকে মিছা কথা বলে তুমুল তর্কের মত!

     

     

    আপডেটেডঃ  ২৭  জুলাই ২০২৩; রাত
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com