Tag: রাষ্ট্র

  • প্রতিক্রিয়াঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকীতে 

    প্রতিক্রিয়াঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকীতে 

    গৌতম দাস

    ০৫ জুলাই ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3CM

     

    Celebrations for CPC’s centenary

    গত পয়লা জুলাই ২০২১, এদিন ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অর্থাৎ পার্টির বয়স এখন ১০০ বছর পার হল। আর এসময়ের মধ্যে এর  অন্তত দুটা বড় সাফল্য হল, পার্টি জন্ম নেয়ার ২৮ বছরের মধ্যেই চীনে বিপ্লব সম্পন্ন ও ক্ষমতা দখল করে আসীন হয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল, চীন ইতোমধ্যেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হওয়ার পথে। গ্লোবাল অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্টাডি রিপোর্টের পূর্বাভাস হল, আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হয়ে উঠতে যাচ্ছে [Chinese economy to overtake US ‘by 2028’ due to Covid…]।

    China will overtake the US to become the world’s largest economy by 2028, five years earlier than previously forecast, a report says.

    নিচে বৃটেনের এক লিডিং গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান কোম্পানি, CEBR ; তাদের এক তুলনামূলক গ্রাফ রিপোর্ট যা বিবিসি ছাপিয়েছে সেখান থেকে নেওয়া।

    US and Chinese economies 2010-2035. Gross domestic product in $US trillions (constant prices). Chart shows Chinese and US economic output over time with China overtaking the US around 2028 .

    এমনিতেই সাফল্য নিয়ে শত বছর পার হওয়া রাজনৈতিক দল হতে পারা খুব কম ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে থাকে। যেমন ১৯১৭ সালে রাশিয়ায়, দুনিয়ার প্রথম কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখলকারী  পার্টি হল লেনিনের (সোভিয়েত) রুশ কমিউনিস্ট পার্টি। কিন্তু ১৯৯১ এর আগস্টে এর সবকিছু শেষ হয়ে যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রই ভেঙে পড়ে, এতে সরকারীভাবে বিলুপ্ত  ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল। এরপরে সেই থেকে এখনও তা রাশিয়াসহ মোট ১৫টি আলাদা রাষ্ট্রে  বিভক্ত হয়ে যায় । এই বিচারে চীনা পার্টির সাফল্য অনেক বেশি অবশ্যই।

    আবার ওদিকে,  কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র বলতে যারা নিজেদের কমিউনিস্ট মনে করে এরা নিজেরা এবং দুনিয়ার বেশির ভাগ তাদের সহমর্মী চিন্তার মানুষেরা মনে করে যে, সেখানে সামাজিক উতপাদনের সমস্ত  “মালিকানা ব্যবস্থা সরকারি” কী না- এটাকেই তাঁরা মূল নির্ধারক মাপকাঠি  মনে করে আর এই ভিত্তিতেই তাঁরা কথা বলে থাকে। কিন্তু বাস্তবত দেখা যায়, ‘মালিকানা ব্যবস্থা সরকারি’ রেখে একটা সচল অর্থনীতি  হাজির রাখতে হিমশিম খাওয়ার পরে তারা এটাকে এক বড় বাধা হিসেবে আগে অনুভব করেছিল, আর তাতে সেটাই প্রথম ভাঙনের সুর বাজছে তারা টের পেয়েছিল । সে কারণে সংস্কারের প্রশ্নটা আমল করা হয়েছিল। সেখান থেকেই তত্ব ও কাজে একটা সংস্কার বা রিফর্ম করে নেয়ার চিন্তা আসে যাতে সংস্কার করে একটা সচল কার্যকর অর্থনীতি লাভ করার পথে যাওয়া যায়। এই প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন কার্যত ‘সংস্কারের পথে’ যাওয়ার সুযোগ নিতে পেরেছিল একেবারেই শেষের দিকে; মানে মাত্র ১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে। বা বলা যায় লিওনিদ ব্রেজনেভের মৃত্যু বা তার শাসনযুগ ১৯৮২ সালে শেষ হওয়ার পর থেকে। কিন্তু বলতে গেলে অচিরেই গর্বাচেভ বড় সংস্কার কিছু শুরু করার আগেই পুরান সোভিয়েত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে ১৯৯১ সালের আগষ্টে  গর্বাচেভকেই নিজের মুখে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘোষণা দিতে হয়েছিল।

    তুলনার চীনা পার্টি ‘সংস্কারের পথে’ নেমে যায় ক্ষমতা দখলের মাত্র ১০ বছরের মধ্যে; ১৯৪৯ সালে ক্ষমতা দখলের পরে ১৯৫৮ সাল থেকে। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে অনেক অনেক আগে; যদিও কৌশলগত কারণে, চীনা নেতা মাও এই সংস্কারকে বাইরে  নাম-পরিচিতি দিয়েছিলেন “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” বলে।  আর এর ব্যাখ্যাটা ছিল এরকম যে  – তাদের পার্টির নেতারা মন-মানসিকতায় বুর্জোয়া হয়ে যাচ্ছেন তাই নেতা বদলের এক উলটপালট বা ঢেলে সাজাচ্ছেন তিনি। অনেক ক্রিটিক বলে থাকেন,  সরাসরি বললে তিনি আসলে করতে চাইছিলেন – চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম আগে, পরে ‘সমাজতন্ত্র’।

    তবে লক্ষ্যণীয় যে এবারের শতবার্ষিকী পালনের বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন [যেভাবে বাংলা বিবিসি রিপোর্ট করেছে সেই ভাষায়],“একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে, এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে,” [ Only socialism can save China, and only socialism with Chinese characteristics can develop China,”]।

    এতে এর মানে দাড়ালো, ১। চীন এখনও মনে করে এটা তাদের পার্টি “সমাজতন্ত্রই” করতেছে। ২। তবে সমাজতন্ত্র বলতে তা অন্যকারো ধারণার সমাজতন্ত্র নয়। তাদের পার্টি যেটাকে “চীনা বৈশিষ্ঠের সমাজতন্ত্র” বলে মনে করে এটা সেই অর্থের  সমাজতন্ত্র। ৩। উপরের দুই সুত্র থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি যে অন্যকারো সমাজতন্ত্র বুঝাবুঝির বিচারে বা মাপকাঠিতে চীনে সমাজতন্ত্র হয় নাই এমন সিদ্ধান্তেও আসতে পারে। যেটা চীন আবার আমল করবে না।

    আমরা আবার চীন ও সোভিয়েত সংস্কারের একটা তুলনামুলক আলোচনায় ফিরে যাই।  সোভিয়েতের তুলনায় চীনারা তাদের সংস্কার  অনেক পরিকল্পিতভাবে করার সুযোগ পেয়েছিল; মানে একটা পরিকল্পনামাফিক আগাতে পেরেছিল।  সেটা আবার এই অর্থেও যে,  সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে যেমন  সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে আগিয়ে যাবার মুহুর্তেই সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাত থেকে ছুটে বের হয়ে গেছিল। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তারা এমনটা হতে দেয় নাই। মানে যাতে না হয়ে যায় সেদিকটা সামলাতে তারা সক্ষম হয়েছিল। যদিও চীনকে একাজে বহু চরাই-উৎরাইয়ের ধাক্কা তাকে কম সামলাতে হয়নি। এভাবে টানা ১০ বছরের মধ্যে নেতৃত্ব ও চিন্তায় বদলের মূলকাজটা শেষ করে মাও সেতুং পার্টির গঠন কাঠামো ও নেতৃত্ব একেবারে ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত ‘সংস্কারি চিন্তায়’ বদলে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।  যার ফসল আজকের চীন!

    এমন চিন্তায় সংস্কার করতে মাওয়ের সফলতা ও ক্ষমতায় টিকে যাওয়ার পেছনে প্রধান সাফল্যের কারণ  সম্ভবত – মাওয়ের উপর পার্টি ও জনগণের আস্থা ঢিলা হওয়ার আগেই তিনি সংস্কারের উদ্যোগ  নিতে এবং তা শুরু ও শেষ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তুলনায় সোভিয়েতের ক্ষেত্রে তারা সংস্কার করতে গেছেন একেবারের তাদের ক্ষমতা যুগের শেষের দিকে যখন  পার্টি ভেঙ্গে পড়ার খুব কাছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংস্কার কাজটা শুরুতেই শুরু না কড়ায় ততদিনে খোদ পার্টি ইতোমধ্যে  বহুবিধ অনাস্থার সংকটে পড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্র বা ভুখন্ড এতদিন সেই ১৯২২ সাল থেকে সোভিয়েত রাষত্রের ভিতরে জুড়ে নেওয়া হচ্ছিল মূলত তারাই তখন বের হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য গর্বাচেভের উপর  প্রবল চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়ে গেছিল।

    তবে চীনের ক্ষেত্রে আরেক বাড়তি সংকট ছিল। চীনের মাও সংস্কার শুরু করলে তাতে  আবার ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন আবার অসন্তুষ্ট হয়ে সৈন্য পাঠিয়ে মাওকে ক্ষমতাচ্যুত করে না ফেলে এবং তা অভ্যন্তরীণ কোনো চীনা নেতার সহযোগিতায়- সেদিকটা নিশ্চিত করতে আগেই সোভিয়েত পার্টির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে নিয়েছিলেন মাও। শুধু তাই নয়। এর কারণ হিসেবে, সোভিয়েত ইউনিয়নই  আমেরিকার মতই “আরেক সাম্রাজ্যবাদ” হয়ে গেছে বলে ব্যাখ্যা ও প্রচার করতে শুরু করেছিলেন তিনি। সোভিয়েত এর আগে সেকালের অন্য  কমিউনিস্ট দেশে [রোমানিয়া (১৯৪৪) ও চেকোশ্লোভাকিয়ায় (১৯৬৮) ] এমন জবর দখলদারি কাজ করেছিল। ঠিক একইভাবে যেমনটা পরে অকমিউনিস্ট  আফগানিস্তানে (১৯৭৯ ডিসেম্বরে) করা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে, মূলত ইরানি বিপ্লবের ভয়ে। এগুলো বুঝতে পারলে বুঝা যাবে মাও সাবধানতা কেন নিয়েছিলেন!

    তবে  “সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” এমন শব্দাবলিতে (এখন সাবেক) সোভিয়েত ইউনিয়নের গায়ে দাগ লাগিয়ে দেওয়ার কারণ হল  – আমেরিকাকে কমিউনিস্টরা “সাম্রাজ্যবাদ” বলে থাকে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নকেও তা বলতে চাইলে এর অসুবিধা হল, অন্তত মালিকানা প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের সবকিছুই রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকায়, যা আমেরিকার মত একেবারেই  নয়। তাই মাওয়ের চীনের চোখে, এই সোভিয়েত ইউনিয়ন হল ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ রাষ্ট্র। আর মাও এই মূল্যায়ন চালু করেছিলেন। এই বয়ান বা নামকরণ – এটা বাংলাদেশের চীনা কমিউনিস্টদের মধ্যে আশির দশকজুড়ে সক্রিয়ভাবে চালু ছিল। নব্বই দশক থেকে এটা ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করতে করতে এখন আর এই ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ মূল্যায়ন করতে কাউকে দেখা যায় না, দেয়াল-লিখনেও না। এর বড় কারণ ১৯৯১ আগষ্ট থেকে সোভিয়েত রাষ্টটাই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছিল।

    আবার চীনের বাইরের দেশে যেমন- বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে, সম্পদ বা উৎপাদন রাষ্ট্রীয় মালিকানাতে আছে বা চলছে কি না  – যদি চলে তবে এটাই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র – এই ‘প্রধান নির্ণায়ক চিহ্ন’ হয়ে আজো থাকতে দেখা যায়।  যদিও এর বাইরেও ব্যতিক্রম অনেক রূপই থাকতে পারে, কিন্তু এটাই প্রধান ধারা। এই ধারার ভেতরে যারা পড়েন তাদের মুখ্য অনুমান যে – রাষ্ট্রীয় মালিকানাই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। তবে একটা ডিসক্লেমার হল, এসবের সঠিক-বেঠিকতা নিয়ে আমি এখানে কথা বলছি না, সেটা আমার বক্তব্যও নয়। এর বাইরে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কাউকে নাকচ করা বা কাউকে সঠিক /বেঠিক বলার কোনোই উদ্দেশ্য এখানে নাই।

    তবে সাধারণভাবে এখন বাংলাদেশে যে প্রধান ধারণা বিরাজ করে বলে আমার অনুমান তা হল, এদের অনুমান বা অবস্থান হল, ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পরে চীন আর কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী দেশ নয়। যদিও মনে রাখতে হবে যে,  চীন আর কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী হোক আর না হোক, চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে চলেছে, এটা আরেক বাস্তবতা। আমি এই বাস্তবতা নিয়েই মূলত লিখছি।

    চীন কিভাবে বদলে আজকের জায়গায় এলোঃ
    পরে ১৯৬৮-৭৭ চীনের এই সময়কালকে বলা যায় চীনের নিজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, জাতিসঙ্ঘের ভেটোক্ষমতাসহ সদস্যপদ ফেরত পাওয়া নিশ্চিত করা আর বিনিময়ে মূলত আমেরিকাসহ বিদেশী পণ্য ও বিনিয়োগ পুঁজির চীনে প্রবেশের ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করতেই ব্যয় হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা তারা পরস্পরকে স্বীকৃতি দান শেষে এর প্রকাশ হিসেবে দুই দেশই অপরের রাজধানীতে অ্যাম্বাসির কার্যক্রম চালু করেছিল। এরপর থেকে চীন হয়ে উঠে আমেরিকার জন্য বিনিয়োগের স্বর্গ। তবে সাবধানতা হিসেবে আমেরিকার কারা আগে চীনে বিনিয়োগ নিয়ে যাবেন এর ক্রাইটেরিয়া হিসেবে, বহু আগে থেকেই যেসব চীনা অরিজিন ব্যবসায়ী আমেরিকায় আসন গেড়ে বাস করছিলেন চীন তাদেরই প্রায়োরিটি দিয়েছিল। কারণ এই বিনিয়োগ নিবার ভালো-মন্দের দিকগুলো বুঝে আইন-কানুন ও রেওয়াজ (গুড প্র্যাকটিস) চূড়ান্ত করার গুরুত্বপুর্ণ দিকের কাজ তখনও বাকি ছিল। এভাবেই চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে ব্যবহারিক আইন-কানুন ও গুড প্র্যাকটিসে হাজির দেখা শেষ করতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেগেছিল। এর পরেই কেবল ২০ বছর ধরে (১৯৯১-২০১০) টানা ভাইব্রেন্ট ডাবল ডিজিটের চীনা অর্থনীতির সূচনা হয়েছিল। অবশ্য শেষের দিকে মানে ২০০৮ সালের গ্লোবাল মহামন্দার কারণে তা কিছুটা ঝুলে গিয়েছিল।

    চীন ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কঃ
    এখানে চীনের সেকালে এসব পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কিছু অবজারভেশন এখানে তুলে আনা যেতে পারে। যেটা বিশ্বব্যাংকের এক সাইট থেকে নেয়া।  যেমন, বিশ্বব্যাংকের সাথে চীনের ব্যবহারিক সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭৮ সালের শুরুতে আভ্যন্তরীন সংস্কার শেষ করার পরে ১৯৮০ সাল থেকে। বিশ্বব্যাংক বলছে চীন তখন সম্পর্ক শুরু করেছিল বিশ্বব্যাংকের আইডিএ [IDA] লোন গ্রহিতা সদস্য হিসাবে। IDA মানে হল International Development Association, যেটা আসলে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে,  বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশের লোন পাবার যোগ্যতা তা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা থাকে; এরই সবচেয়ে নিচের ক্যাটাগরি যা গরীব দেশের জন্য এটাই IDA লোন। এর নিচেও আরেকটা ক্যাটাগরি আছে সেটা হল যারা কোন লোন নিলে তা ফেরত (সুদ বা আসল কোনটাই) দিবার যোগ্যতাও রাখে না  বা তৈরি হয়নাই তাদের ক্যাটাগরি। অর্থাৎ এদেরকে তাই গ্রান্ট বা অনুদান ক্যাটাগরির গ্রাহক বলা হয়। এদেরকে অনুদান দিয়ে অবস্থা একটু ভাল করে পরের ধাপ  IDA এর লোন পাবার যোগ্য করা হয়। IDA, এই ক্যাটাগরিতে  ১.০% এর নিচে (০.৭৫%) সুদসহ আসল খুবই লম্বা প্রায় ৪০ বছর ধরে সময় নিয়ে ফেরত দিবার সুযোগ দেয়া হয়। তবু এটা আসলে সুদ না, বলা যায় বিশ্বব্যাংকের স্থানীয় অফিস চালানোর খরচ তুলে আনা। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে লোন গ্রহিতা হওয়ার শুরু থেকেই এই ক্যাটাগরিতে ছিল। তবে একই সাথে অনুদানও পেয়েছে। সম্ভবত এখনও “সেফটি নেট” কর্মসুচিতে অনুদান এখনও পাশাপাশি চালু আছে।  চীনও IDA, এই ক্যাটাগরি থেকেই ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল। ব্যাংকের ভাষায় IDA হল … fund for the poorest। কিন্তু চীন অচিরেই বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এরপরের ক্যাটাগরি হল – “লোয়ার মিডিয়াম বা মধ্যম আয়ের দেশের” ক্যাটাগরি যেখানে সুদের হার ২% [Lower mid $1,036 and $4,045]। বাংলাদেশে এখন এই ক্যাটাগরিতে। আর চীন ১৯৯৭ সালের এসব অতিক্রম করে চলে যায়। আর ২০০৭ সাল থেকে উলটা ঋণদাতা বা ডোনার দেশ হিসাবে হাজির হয়েছিল। এতে চীনের ১৯৮০ সাল থেকে গড়ে প্রতিবছর জিডিপি বেড়েছিল ১০%  করে। বলাই বাহুল্য এটা খুবই উঁচু পর্যায়ের রাইজিং ইকোনমির দেশের বেলায় ঘটে থাকে। এভাবে ২০০৭ সালের মধ্যে চীন তার জনগোষ্ঠির ৮০ কোটি (বর্তমান জনসংখ্যা ১৪০ কোটি) লোককে প্রভার্টি বা দরিদ্র স্টেজ থেকে উঠিয়ে এনেছিল। উপরের এই তথ্যগুলো এই লিঙ্ক থেকে নেওয়া। আর বিশ্বব্যাংকের সাথে চীনের পার্টনার সম্পর্ক করার ত্রিশ বছরের মধ্যেই ২০১০ সালে চীন বিশ্বব্যাংকের তৃতীয় বড় মালিক হয়ে উঠেছিল। চীনের এর উপরের মালিক হতে আমেরিকা নাকচ করাতেই মূলত চীন নিজে আলাদা বিশ্বব্যাংক-তুল্য ব্যাংক [AIIB] ও BRICS ব্যাংক গড়ার দিকে রওয়া দেয়।

    তবুও এখনো পুরান কমিউনিস্ট ধারার অনেকেই চীনের এই গ্লোবালি রাইজিং অর্থনীতি, এটা ‘কিছুই হয় নাই’ বলে নাকচ করতেই পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে কী ভিত্তিতে তিনি তা বলছেন, তা বুঝার জন্য সেদিকে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। কারণ চীন সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্তের ফারাক হতেই পারে। তবে এই ফারাকগুলো মূলত কী ভিত্তিতে কথা বলছি মানে কোন কাঠিতে মাপছি, এগুলো আসলে সেই মাপকাঠির ফারাক। এটা বুঝলে বা জানতে পারলেও অনেক লাভ।
    এ দিকে দেখা যাচ্ছে এবার বিবিসি জানাচ্ছে, ‘একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে” – চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নাকি শতবার্ষিকী পালনে এমন  বক্তব্য দিয়েছেন।
    যদিও এখনও চীনে এটা সমাজতন্ত্র হয়েছে কিংবা হয়নি- এ নিয়ে কাউকে কাউকে আমরা বিতর্ক করতে দেখতে পারি। কিন্তু তাতে চীনের গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়ার অভিমুখ বদলাচ্ছে না।

    শতবার্ষিকীতে চীনের বাইরের দেশের প্রতিক্রিয়াগুলোঃ
    এবারের এই বার্ষিকী যতটা না চীনের অভ্যন্তরীণ এর চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া বিদেশের এবং তা এমনকি চীনের বন্ধু-শত্রু, অথবা চীনের প্রতি ঈর্ষাধারী কিংবা কৌশলগত কারণে যারা পছন্দ বা উচ্ছ্বাস-প্রকাশকারী নির্বিশেষে সবার মধ্যেই প্রতিক্রিয়া হতে দেখা গেছে।

    এসবের মধ্যে পশ্চিমের মিডিয়া রিপোর্ট আর তাতে প্রকাশিত মন্তব্য ও অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়াগুলো লক্ষণীয়। এসব লেখায় এবারই প্রথম দেখা গেল, চীন যে নিজেকে এখনো কমিউনিস্ট বলে দাবি করে একথা এরা মেনেই নিয়েছে। সেটা এই অর্থে যে এনিয়ে কোন বিরূপতার এবার আমরা দেখি নাই। আর এই ‘কমিউনিস্ট নামে রেখেই’ চীনের উঠে আসা সাফল্য বা চ্যালেঞ্জ পশ্চিমের সাথে চীন বরাবর বা সমান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যা পশ্চিমকে ছাড়িয়েও যেতে পারে, যেন তারা মেনে নিচ্ছে। কোনো প্রশ্ন তোলেনি তারা। এমনকি চলতি একুশ শতকের শুরু থেকে প্রথম ১৫ বছরও আমরা দেখেছিলাম চীন পশ্চিমের সাথে কম্পাটেবল বা তুলনীয় নয় বলে আমেরিকা সরকারি আপত্তি তুলছে। ওবামা আমলেও প্রায়ই এমন দাবি উঠতে দেখেছি আমরা। তাদের দাবি, চীন নিজের ‘মুদ্রার মান’ কমিয়ে রেখে সাফ। যদিও ২০০৮ সালের মন্দায় পরের বছরগুলো অন্তত একদশক জুড়ে জাপান তার ইয়েনের ‘মুদ্রার মান’ কমিয়ে রেখে চলেছিল। এক ডলার সমান ৯২-১০৮ ইয়েন এভাবে ভ্যারি করেছিল।  কিন্তু আমেরিকাকে আপত্তি তুলতে দেখা যায়নি।

    এখানে আমাদের পাঠকের অনেকের কাছে মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ব্যাপারটা পরিষ্কার নয় হয়ত। তাই কিছু সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়ে নিব। যদিও ভারতের জাতিবাদী রাজনীতির চোখে, ডলারের তুলনায় রুপির মান কমে যাওয়া (মানে বেশি রুপী দিতে হওয়া) দেশবিরোধী কাজ বা ঘটনা মনে করা হয়। অর্থাৎ ভারতের সরকার ও জনগণ সবার চোখেই এটা ভারত স্বার্থবিরোধী নেতিবাচক কাজ। কিন্তু এখানে আমরা দেখেছি আমেরিকা চীনকে অভিযুক্ত করছে যে, ইউয়ানের মুদ্রামান চীন ইচ্ছা করে কমিয়ে রেখেছে আর এটা অন্যায় কাজ বলে আমেরিকা দাবি করে যাচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন? আর এর মানে কী তাহলে?

    কারণ এটা গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ। মানে এটা আর তথাকথিত জাতিবাদী উৎপাদন বা জাতিবাদী অর্থনীতির যুগ নয়। অর্থাৎ যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের দিকে তাকিয়ে উৎপাদনের চেয়ে রফতানির জন্য উৎপাদন অর্থনীতিই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক তৎপরতা হয়ে ওঠে – সেটা দেখে বুঝা যায় এটাই গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ। এক কথায়, দেশীয় ভোক্তার জন্য উৎপাদনের তুলনায় রফতানির জন্য উৎপাদন তুলনায় বেশি সুবিধা ও মনোযোগপ্রাপ্ত সেক্টর হয় যখন। আর এ ক্ষেত্রে মুদ্রা মান কম করে রাখা বা আপনাতেই যদি কমে যাওয়া ঘটে কখনো তবে তা রফতানিকারক দেশের জন্য বেশি লাভ ও সুবিধাজনক হয় সাধারণত। কিভাবে?

    মুদ্রা মান কমে যাওয়া মানে যেমন (ধরা যাক) আগে, বাংলাদেশ থেকে এক ডলারে  একটা শার্ট কিনতে পাওয়া যেত এমন হলেও এখন দেড় ডলারে দুইটা পাওয়া যাবে এরকম হয়েছে। স্বভাবতই এখন বিক্রেতা হিসাবে আমরা  কম মূল্য পাব। কিন্তু এতে আবার বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যাবে। কারণ এখন প্রতিদ্বন্দ্বি ভিয়েতনামের ক্রেতারা কম দামের সুবিধা নিতে বাংলাদেশমুখী হবে। এতে বিক্রি বেশি হওয়াতে মুদ্রামান হারানোর লস কাভার হওয়ার পরও আমাদের বেশি লাভ হতে পারে। অর্থাৎ সময়ে নিজ মুদ্রার মান কমা, এটা নিজের জন্যই ইতিবাচক হতে পারে। আর ভারতের চিন্তাটা কুপমন্ডুক ও পুরানা (যখন রফতানির জন্য উৎপাদনের যুগ আসে নাই ) কথিত ‘দেশপ্রেমিক’ চিন্তা।

    ভারতের প্রতিক্রিয়াঃ
    পয়লা জুলাইয়ের ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা জানাচ্ছে এ বিষয়ে। বলছে, “কংগ্রেস বা বিজেপি এই দল দুটার কেউ চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে জন্ম-শতবর্ষ পার করানোতে কোনো শুভেচ্ছাও জানায়নি। তবে এক কমিউনিস্ট দল, সিপিএম জানিয়েছে”। আর কংগ্রেসের এক সিনিয়র নেতা এনিয়ে বলেছেন, “বর্তমান রাজনৈতিক আবহ আমাদের দুই পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের উপযোগী নয়”। আসলে তিনি সম্ভবত বলতে চাইছেন লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনার কথা। গত বছর সেখানে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা চীনাদের হাতে নিহত হয়েছেন। সে ঘটনাটাকে পাশে সরিয়ে রেখে সৌজন্য দেখাতে গেলে তাতে কংগ্রেস বা বিজেপি যেই দেখাতে যাক অপর দল তাতে ‘মাইলেজ’ নিতে অপরের বিরুদ্ধে পাবলিক সেন্টিমেন্ট উসকে সুবিধা নিতে চাইতে যাবে বলে তারা একে অপরের ভয়ে ভীত। তাই তারা দুই-পার্টি কেউ শুভেচ্ছা জানানোর ধারে কাছে যায়নি। যদিও এটা খুব ভাল যুক্তি বা অজুহাত তা মানা যাচ্ছে না। যেমন এক ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে ভারত ৯১% নির্ভরশীল। তা তো ঠিকই তবু চলছেই। আবার ভারতের মোবাইলের বাজারে সবগুলো ব্যান্ডই মূলত কোন না কোন চাইনিজ। তরুণেরা চীনা মোবাইল ব্যবহার ছাড়ার চিন্তা করছে এমনটাই গত দুবছরে কখনই শোনা যায় নাই। আর সামগ্রিকভাবে চীনা পণ্য আমদানি এসময়ে বেড়েছে বই কমে নাই। তাই এই সাফাই দুর্বল অবশ্যই। যদিও শেষ বিচারে এটা যার যার পারশেপশন নিয়ে আর কিছু বলার থাকে না!

    ওদিকে,  সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির চীনা পার্টিকে লিখিত শুভেচ্ছা দেয়ার কথা পত্রিকাটা আমাদের জানাচ্ছে। এই লিখিত শুভেচ্ছাকে বলা যায় – ইয়েচুরি নিজেও কমিউনিস্ট এবং তাদের কমিউনিস্ট পার্টির দিক থেকে এটা আলাপ ও খাতিরমূলক শুভেচ্ছা এটা – তাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “চীন কিভাবে নিজের ভুল চিহ্নিত ও সংশোধন করে তার পলিসিগুলো দাঁড় করিয়েছে গত শতক এর সাক্ষী হয়ে থাকবে”। ‘সিপিএম গুরুত্ব দিয়ে যেতে চায় যে, “মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এক সৃষ্টিশীল বিজ্ঞান। এটা শ্রেষ্ঠ ডগমাবিরোধী। তাই এটাকে কখনো কোনো আগাম সেট করা ফর্মুলা হিসেবে হাজির করা যাবে না”।  আবার তিনি বলছেন, “যদিও এক সৃষ্টিশীল বিজ্ঞান হওয়া সত্বেও এটা সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার সময় বিপ্লবী প্রিন্সিপল ও মুক্তিলাভের উদ্দেশ্য শক্ত করে আকড়ে থাকে”। তিনি লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেন, “সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ডায়লেক্টিক্সের জীবন্ত সারকথা”। এছাড়া ইয়েচুরি,  চীন যেভাবে করোনা মহামারীর সামলিয়েছে এর ভূয়সী প্রশংসা করেন।

    কথাটা এত দীর্ঘ করার মূলকথা হল, সিপিএম চীনের ‘বিস্তারিত সংস্কারের’ (১৯৫৮ সাল থেকে সম্ভবত সবই) সব কিছুকেই অনুমোদন দেয়, তাই ইয়েচুরি জানিয়ে রাখার সুযোগ নিয়েছেন। তবে এই কমিউনিস্টের বিজ্ঞানবাদীতা খুবই দৃষ্টিকটু এবং পুরান কমিউনিস্টের নিচু চিন্তা পদ্ধতির লক্ষণ।

    এর মধ্যে বড় বিপজ্জনক হল, বর্তমান ভারতের পরিস্থিতি হিন্দুত্ববাদী ভোটের জমানার। ভোটের সময় সিপিএম এই কমিউনিস্টেরা হিন্দুত্ববাদের  বিরোধিতার চেয়ে কিভাবে এর সাথে খাপখাইয়ে চললে কিছু ভোট বা ভোট পলিটিক্সে লাভ হবে সেটাই সিপিএম করে থাকে। এমনকি তৃণমূলকে হারাতে সে বিজেপির কোলে উঠে বিজেপি দলকে জিতাতে কাজ করতে দ্বিধা করে না। তাই এখন এমন বক্তব্য তাদের দলের বিরুদ্ধেই যেতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৩ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকী“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে

    কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে
    মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২১, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Ca

    Imageমোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    [সারকথাঃ  “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”
    গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন।  তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে  এই ফাঁপা ডায়লগ চালু  করেছিলেন   “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ  লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত   “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!  
    বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও  নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।
    বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর  এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল।  এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!
    কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।
    কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত।  হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে  – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন  কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।
    আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে।  সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে।  মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে। কেন?
    লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি।  বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!]

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    শুরুর কথাঃ
    আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

    দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

    কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

    আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

    আমেরিকায়  নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

    সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল।  ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল –  কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি  ক্ষুব্ধ  জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে  এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায়  রওনা দিয়েছিল।  কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় –    ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এপ্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর  একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

    কাশ্মির প্রসঙ্গে  শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো  কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

    ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে  [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir]  – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

    ‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন  কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

    আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে,  উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক  কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি  ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী]  বিরাট এক   আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

    আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার  লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট  মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

    আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে!  মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন!  সেরকম? কেন এমন বলছি?

    সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা- এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

    Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

    এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড  ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

    বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না।  পাকিস্তান বা তালেবানদের  আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

    এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

    ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে  ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে  এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল।  নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই।  সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই –  এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

    অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ]  এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস।  এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

    এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে।  অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

    তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার  মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে,  ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

    অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ 
    অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন।  যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন?  কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন।  আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক।      কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

    কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

    অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

    ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

    সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “হিন্দুত্ববাদই কি মোদির প্রধান শত্রু হবে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    গৌতম দাস

    ২৬  জুন ২০২১, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3BI

     

    –

    (গত সংখ্যার পরে শেষ পর্ব, বাইডেন জি৭ ইস্যুতে।)

    কলোনিদখলদারি (মোটামুটি ১৫০০-১৯৪৫) ব্যবসার যুগেই শেষের দিকে ১৮৮০ এর দশকে  আমেরিকা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে বড় অর্থনীতি হিসেবে কলোনি দখলদারদের সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল। তবে এক ঝাপটায় আমেরিকা সাথে  নেতা হয়নি। আর কারও নেতা হওয়া বা দুনিয়াতে অর্থনীতিতে কেউ নেতা হওয়া এসব বিষয়গুলো তখনও শুরুই হয় নাই। মূল কারণ গ্লোবাল পণ্যবিনিময় বাণিজ্য দূরে থাক দুটা কলোনি মালিক দেশের মধ্যে বিস্তর পণ্য বিনিময় বা অর্থনৈতিক নীর্ভরশীলতা বিষয়টাই তখনও সুনিয়াতে হাজির হয় নাই।  তাই সব মিলিয়ে  আমেরিকাকে  আরো প্রায় ৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেটাই  দুই দুটা বিশ্বযুদ্ধের কাল।  মূল কারণ দুনিয়া তখনও মূল একটিভিটি বলতে  কলোনি দখলের রামরাজত্বে মজেছিল, যার অবসান ঘটানো আগে  করে নেওয়ার দরকার ছিল আমেরিকার জন্য।
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তিগুলা যারা দুনিয়ার ওপর একচ্ছত্র খবরদারি চালিয়ে বেড়াত তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই (২০১৪) সবাই এক এক করে দেউলিয়া হয়ে গেছিল, মূলত যুদ্ধের খরচসামলাতে ফেল করাতে। আর এরই সবচেয়ে বড় চিহ্ন হল রথশিল্ড ব্যাংক [Rothschild Bank]  যেটা মূলত এবং একমাত্র সেকালের মুদ্রা কনভার্ট বা বিনিময় করে দিবার ব্যবসায়ে ছিল; এর বন্ধ হয়ে যাওয়া।  কারণ এই ব্যাংকটা কার্যকর ছিল সে সুত্রের ভিত্তিতে তা হল, ব্যাংকের ভল্টে সমতুল্য মানের সোনা রেখে কাগুজে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা তখন ওসব দেশে চালু আছে।  এটা চালু থাকলে ঐ ব্যাংকের কাছে কোন দেশের পণ্য আমদানি / রফতানির হিসাব রাখা মানে ঐদেশে সোনা এসে ঢুকেছে বা বেরিয়ে গেছে কতটা তা জানায় বিশ্বাসযোগ্য উপায়।  কিন্তু যুদ্ধের সময়  সোনাজমা না রেখে মুদ্রা ছাপানোর সস্তা পথে যুদ্ধের খরচ সামলাতে যাওয়াতে এইবার মুদ্রার মানের (অবমূল্যায়ন) ঢলে পড়ে যাওয়ায় রথশিল্ডের ব্যাবসা বন্ধ রাখতে হয়।

    প্রথম আমেরিকান ঋণগ্রহিতা ইউরোপঃ
    ফলে এইবার কলোনিমালিক ইউরোপের দেশগুলোর  কাছে ঋণ পাবার একমাত্র বিকল্প মনে হয় আমেরিকাকে। তবে মূলত এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালের পর থেকে। আর আমেরিকান থেকে বলতে আমেরিকান প্রাইভেট ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রগুলো যেমন বৃটেন সরকার এবং ব্যবসায়ীরাও – এরা  ঋণ পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।  যদিও এনিয়ে আবার আমেরিকায় আভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভক্তি শুরু হয়েছিল যে আদৌও ইউরোপকে  ঋণ দিতে যাওয়া ঠিক কিনা। কারণ এতে ক্রমশ ইউরোপের যুদ্ধে খোদ আমেরিকাই সামিল হয়ে পড়ে যেতে পারে। এটাই সেকালের আমেরিকার  বিচ্ছিন্নপন্থি বনাম আন্তুর্জাতিক-পন্থি বিতর্ক  [America’s isolationist Vs internationalist debate] বলে পরিচিত। এই বিতর্ক ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। যারা এনিয়ে বিস্তারে বুঝতে চান তারা রুজভেল্টের Cash & Carry Law 1939 এবং এবং সাথে এই আইনের আগের সব ভার্সান। আর সবমিলিয়ে – Neutrality Act of 1939, Lend-Lease সহ বহুকিছুর ভিতরে ঢুকতে পারেন বা ঢুকতে হবে।

    ওদিকে ১৯৩২ সালের পর থেকে হিটলারের উত্থান শুরু হয়েছিল। এতে ক্রমশ নেতা হিটলার সাথে মুসোলিনির ইতালি আর মার্শাল তেজো জাপানসহ অন্যদের মিলে গ্রুপ বড় হতে থাকে। কিন্তু এই গ্রুপের ঋণ বা বাজেট সংকটের কথা জানা যায় না।  ফলে একদিকে হিটলার ও তার সঙ্গিদের গ্রুপ  আর অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিরা এভাবে এক পোলারাইজেশন ঘটতে পেরেছিল।  আর মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খরচ বইবার ক্ষেত্রে আমেরিকান সক্ষম অর্থনীতি ও বিপুল উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে্র সক্ষমতার বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি আমেরিকার নেতৃত্বে আসে আর এই অংশই যার সেকালের ডাকনাম এলায়েড ফোর্স বা মিত্রশক্তিই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল।
    কিন্তু  এই যুদ্ধের আসল ফ্যাক্টর যে যুদ্ধে  আমেরিকান সক্ষমতার পোলারাইজেশন এবং তা এমন কেন হয়েছিল ও কিসের ভিত্তিতে; এসব কিছু আমাদেরকে  মানে বৃটিশ-ভারতের আমাদেরকে পরিষ্কার জানতে দেয়া হয়নি। তাই দুটো শক্তি বৃটিশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন – এরা  ঘটনা যেভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিল আমরা খাপছাড়াভাবে তাই জানতাম।
    এরই একটা হল, ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়রা  যেন এদের মত “ভাল মানুষদের” নেতৃত্বে মানে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের নেতৃত্বে তাঁরা বিপরীতে খারাপ মানুষ হিটলার আর তার বন্ধুদেরকে  চার্চিল  পরাজিত করেছিল। এই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প। এছাড়া ওদিকে আরেক ব্যাখ্যা চালু ছিল কলোনি-ভারতের কমিউনিস্টদেরও। এটিও আরেক ভালভালাইয়া; মানে চার দিকে সব খালি ভাল আর ভাল। ভাল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনের হাতে জর্মানির হিটলারের পরাজয় ঘটেছিল। তিনি ভাল লড়েছিলেন বলেই হিটলার পরাজিত হয়েছিলেন। কাজেই সব ক্রেডিট কমিউনিস্টদের, এটাই নাকি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল গল্প।  যেমন এই গল্পের প্রভাব এতই মারাত্মক যে এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কমিউনিস্ট – এখন এনজিও নেতা  মনে করে – পড়তি গ্লোবাল নেতা আমেরিকা নয়, এটা ইউকের বৃটিশেরা। এককথায় বৃটিশেরা আমেরিকার চেয়ে অর্থনীতির শক্তিতে সেরা। যাক, সেসব কথা। তবু  আমরা খুবই সরি, স্টালিন বা চার্চিল  বা তাদের সমর্থকদের একটারও বয়ানের ভিত্তি নাই। কারণ এদের বয়ানে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস – আমাদেরকে  যুদ্ধের পোলারাইজেশনে মুখ্য ফ্যাক্টর কী ছিল তা বলতে পারে না। কেন?

    প্রধান ধারা হিসাবে আমরা  চার্চিলকে দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বুঝতে গেছিলাম আর সেটা এজন্য যে তারাই তো আমাদের কলোনি মালিক।  আর তাই একমাত্র তাদের মাধ্যমেই তো সব তথ্য ও উতস। আমাদের ইউরোপকে চিনি-মানি আর বুঝাবুঝি ঘটেছিল। তারাই আমাদের প্রভু ছিল। ইউরোপের ভাষাগুলোর মধ্যে একমাত্র ইংরেজিই আমাদের এলিটরা বুঝত আর তারা কেবল ব্রিটিশ মিডিয়া পড়ে সেখান থেকে এগুলো অনুবাদ করত। এভাবে গ্লোবাল কাহিনীর যতটুকু বাংলার নাগালে আসত তা দিয়েই কেবল আমরা বিশ্বযুদ্ধ যতটুকু যা বুঝতাম। তাই আমেরিকা বলে কোনো দেশ আছে কি না বা কেমন তারা সেটাই তো তখনও আমরা ঠিকমত বুঝতাম না; অর্থাৎ চার্চিলের চোখ দিয়েই নিরুপায় আমরা  দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ বুঝেছিলাম। তাই আমাদের চোখ এই বীর চার্চিল যে আমেরিকার কাছে দাসখত দিয়েছে সেটা আমাদের চিন্তারও বাইরে ছিল। স্টালিনের সোভিয়েত দেশকেও যে অ্যামেরিকা যুদ্ধের খরচ ধার দিতে পারে এসব আমাদের কমিউনিস্ট মনে চিন্তার অতীত।  স্টালিনসহ বিপ্লবীদের চোখে কলোনি বা উপনিবেশ তো উঠেই নাই। তাই তো সেটা এখনও কমিউনিস্টদের চোখে “নয়া-উপনিবেশবাদ”।  যার মানে কী একমাত্র স্টালিনই জানে…।  যেখানে একালে আমাদের হাসিনাই বাইডেনকে চোখ উলটে তাকাতে পারে এটা সম্ভব (যদিও  হাসিনার ক্ষমতার স্বৈরাচারি বলতে পারেন তবু সে স্বাধীন আর এরপরেও এখনও তাঁর বড় বড় সীমাবদ্ধতা আছে )  – সেখানে দুনিয়াটা এখনও নয়া উপনিবেশের দুনিয়ায় আমরা আছে এই কথার অর্থ কী?

    অথচ হার্ডকোর সত্যটা এই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের মত কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো আর ইউরোপের কারো না কারো কলোনি  হয়ে শাসনে থাকবে কি না- এটাই ফয়সালা করে দিয়েছিল। কঠিন সত্যটা ছিল, চার্চিল আমাদের ত্রাতা বা মুক্তিদাতা ছিলেন না। কলোনি থেকে মুক্তি –  আমাদের আসল মুক্তিদাতা ছিল আমেরিকা, তাতে আমরা যতই তখন বা আজও আমেরিকাকে ঘৃণা বা অপছন্দ করি না কেন। এটাই ফ্যাক্টস।  যদিও তা আমেরিকার নিজ স্বার্থেই ঘটতে পেরেছিল। কীভাবে?

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দুনিয়ার সব কলোনি দখলদার চার্চিলসহ সব কুতুবকে দাসখত দিতে বাধ্য করেছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ে শেষ হলে পরে তাদের সবাইকে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা উঠিয়ে ফেলে দিতেই হবে। কেন? যাতে দুনিয়া কলোনিমুক্ত প্রায় শ দুয়েক স্বাধীন রাষ্ট্রের এক দুনিয়া হয়।  আসলে মূল কথাটা হল, আমাদের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চার্চিলও আসলে আমাদের জন্য ভিলেন ও এনিমি ছিল। কিন্তু হিটলারের মারের মুখে নিজের যুদ্ধের খরচ চালানোর মুরোদ ছিল না বলে সারা ইউরোপ আমেরিকান ঐ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। অতএব যুদ্ধ শেষে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন-আমেরিকায় ১৯৬৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে অসংখ্য দেশের কলোনিমুক্তি ঘটে গিয়েছিল। সর্বশেষটা দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৪ সালে। আর বলাই বাহুল্য ভারত বা পাকিস্তান কলোনিমুক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে।

    অখণ্ড ভারতের দিক থেকে দেখলে বিশ্বযুদ্ধের এটাই ছিল আসল বিশ্ব-ইতিহাস, আমাদের কলোনিমুক্তির ইতিহাস। গ্লোবাল ইতিহাসের দিক থেকে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল ও একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল আমেরিকার হাতে আর তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধশেষে প্রথম “গ্লোবাল অর্থনীতি” বলে কোন কিছুর নেতা হয়েছিল আমেরিকা। আর এই ইতিহাস জানার একমাত্র পথ হল সরাসরি  আমেরিকান হিস্ট্রি পড়া। তবে এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমেরিকা নিজেই সেসব ডকুমেন্ট অনলাইনে দিয়ে রেখেছে। তাই যে কেউ চাইলে আর পড়তে জানলে নিজেই জেনে নিতে পারে।

    এখন এই আমেরিকান নেতৃত্ব মানে কী? এর মানে আর আবছা রেখে লাভ নেই, যা স্টালিন বা চার্চিল আমাদেরকে সেকালে জানতে দেয়নি (কারণ তা নিজেদের অযোগ্যতা বিবেচিত হতে পারে) তা হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেতৃত্বে গঠিত মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে খরচের বড় অংশটি একাই [মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার আর একে ৫১গুণ করলে আজকের ডলার হবে] বহন করেছিল আমেরিকা। মানে ইউরোপ এমনি এমনি আমেরিকান নেতাগিরি মেনে নেয়নি।

    এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আরেক যে ব্যাখ্যা- আমাদের দেশের রাজনীতি ভাল  বুঝে এমন ভাব ধরে থাকা কমিউনিস্টদের মুখ থেকে যা জানি, সেটিও আসলে সোভিয়েত ভাষ্য। আর সেখানেও যুদ্ধের বড় খরচদাতা ঐ এক ও অদ্বিতীয় আমেরিকা হলেও কমিউনিস্টদের ইতিহাস ভাষ্যে সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়ে এসেছে।

    তবে অন্যদিকের ফ্যাক্টস হল, আমেরিকাও দাসখত বা ‘সহযোগিতা’ চুক্তিতে স্তালিন বা চার্চিলকে অপমানজনকভাবে শামিল হতে বাধ্য করেননি। এসব চুক্তিতে অপরপক্ষ হিসেবে প্রথম ও একক স্বাক্ষরদাতা ছিলেন চার্চিল আর সেটার নাম আটলান্টিক চুক্তি, ১৪ আগস্ট ১৯৪১। আর পরে সেই ড্রাফটটাই কিন্তু এবার চার রাষ্ট্র  – ব্রিটেন, আমেরিকা চীন ও সোভিয়েত মিলে আবার স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। তবে এবার ওই চুক্তির নাম দেয়া হয়েছিল “জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণায়” স্বাক্ষর এই নামের আড়ালে। সাথে একই দিনে আরো ২৬ দেশ ঐ একই ডকুমেন্টে প্রতি-স্বাক্ষর করেছিল। এটাই আমেরিকার নেতৃত্বে হিটলারবিরোধী জোটের মুলভিত্তি দলিল। কিন্তু তবু কোথাও “কলোনি শাসন ছেড়ে দিতে চলে যেতে হবে” – এই ভাষায় বা শব্দ কোথাও নেই। তবে  কথাটা ঘুরিয়ে বলা হয়েছে – “যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবে যে ওই ভূখণ্ডের শাসন কিভাবে চলবে; অর্থাৎ কলোনি করা নিষিদ্ধ হলেও তা এই ভাষায় বলা হয়ে আছে।

    এ’প্রসঙ্গকথা এবার গুছিয়ে সম্পর্ক-দেখিয়ে দিয়ে বলে শেষ করা যাক। তা হলে আমেরিকা কিভাবে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল সেটা আমাদের মতো দেশের কোন এলিট বা কুতুবরা কেউ সেকালে বা একালে জানতেন বা টের পেয়েছিল তা মনে হয় না। এর কাহিনী বা ঘটনার দিক এটাই। আর এটাই এখন আমাদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক।

    কারণ গত ১১-১৬ জুন ২০২১ সাল জুড়ে বাইডেন জি-৭ আর ন্যাটোর মিটিংয়ে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি বা হুমকি তুলেছিলেন। অথচ আসল কথাটা এই যুদ্ধের খরচ কে দেবে সেটা নিয়ে অন্তত প্রকাশ্যে কিছুই  বলেননি। আর আমরা উপরে দেখলাম যুদ্ধের খরচই যুদ্ধের হুমকি বা যুদ্ধ যেই করুক এর মুখ্য ও নির্ধারক  বিষয়।  আর এই খরচ  সেকালে ঐ পরিস্থিতিতে একমাত্র বহন করতে সক্ষম ছিল রুজভেল্টের আমেরিকা। তাই ইউরোপ হিটলারের হাতে দখল ও বিলীন হওয়ার বদলে আমেরিকান নেতৃত্বকেই মেনে ওর অধীনে পরিচালিত হওয়াটাকেই বেটার বিকল্প বোধ করেছিল সকলে। তাহলে একালে বাইডেনের স্বপ্ন্বের যুদ্ধ ও এই যুদ্ধের খরচ বইবার মত দাতাটা কে হবে?  এই ভাসুর বা স্বপ্নে দেখা দাতার নাম জানান না দিলে বাইডেনের হুঙ্কারের অর্থ কী?

    কেন আমেরিকার জন্য বিশ্বযুদ্ধ-২ এর নেতা হওয়া এত জরুরি ছিলঃ
    তবে কথা আরেকুটু আছে।  আমেরিকা এমনি ওমনি যুদ্ধে সবার নেতা হতে নিশ্চয় চায় নাই। কিন্তু সেটা কী?  তা হলে? আমেরিকার স্বার্থ শুধু গ্লোবাল নেতা হওয়া ছিল তা নয়, মূলত তার হাতে জমা থাকা বিপুল সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ তখন বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হয়ে উঠেছিল, অথচ ঋণ-খাতক বা গ্রহিতা দেশ আমেরিকা খুজে পাচ্ছিল না।  কারণ দুনিয়া তখন  কলোনিদখল হয়ে থাকা দুনিয়া। আর ১৯০৫ সালের এই হিসাবে দুনিয়ার কলোনি হতে  বাকি আছে এমন ভুমি বা কোন দেশ আর  খালি ছিল না। ফলে এটা ছিল আমেরিকান   স্বার্থ যে সে দুনিয়াকে এক কলোনি দখল বা শাসন মুক্ত এক স্বাধীন দেশের দুনিয়া হিসাবে যেন দেখতে পায়। যাতে স্বাধীন কলোনিমুক্ত দেশগুলো –  এরা সবাই তখন আমেরিকার ঋণের সরাসরি অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে খাতক হতে পারে। যাতে আমেরিকা এসব স্বাধীনমুক্ত দেশকে আমেরিকান ঋণের খাতক হিসেবে পেয়ে যায়।
    কাজেই একালে বাইডেনের ভাবি যুদ্ধের খরচের সংস্থান না করে চীনকে যুদ্ধের হুমকি দেখানো এগুলোকে কী বলা যায়? এর মানে কি আমেরিকা-চীনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ নামে যে বিরোধ প্রকাশ্যে বাজারে হাজির আছে, তা বাইডেন এখন যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান করতে চাইছেন? হ্যাঁ তাই। সে জন্যই এটাকে ছেলেমানুষি চিন্তা বলছি। কারণ এক তো খরচের ব্যাপার আছে; সেটি ছাড়াও চীনের সাথে আমেরিকান বিরোধ মূলত হাতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ না থাকা থেকে উদ্ভূত বিরোধ  – এমন বিরোধকে বাইডেন যুদ্ধে গিয়ে সেটাকে নিজের পক্ষে জিতে আনবেন কী করে?

    যেমন ধরা যাক, যুদ্ধ একটা হল আর আমেরিকা তাতে জিতেও গেল। কিন্তু তার পরে এতে কি আমেরিকার হাতে যথেষ্ট ‘সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ’ না থাকার সঙ্কট, যেটা এখনই প্রকট হয়ে আছেও তা আমেরিকার কেটে যাবে?  আর এই বিপুল সম্পদটা আসবে কোথা থেকে? কিভাবে?

    আসলে তখনো দুনিয়ায় সম্ভাব্য একমাত্র উদ্বৃত্ত সম্পদের উৎস দেশ হয়ে থাকবে এই চীনই। আর সেই চীনের কাছে হাত পেতে আমেরিকা তার জনগণকে খাওয়াবে, দুনিয়া রুল করবে – এমন কল্পনা এবসার্ড বলারও সুযোগ দেখি না। এ জন্য বলেছি, হাতে বিপুল সঞ্চিত সম্পদ থাকা না থাকার সঙ্কট এটাই মূল সংকট – অথচ এই সংকট  কী যুদ্ধে জিতেও কেটে যাওয়ার বিষয়???

    তা হলে অথর্ব ন্যাটোকে সামনে আনা কেন?
    বাইডেন ন্যাটোকে সামনে রেখে হুমকিটা দিয়েছেন। ন্যাটোকে দিয়ে তিনি আর্টিকেল পাঁচ চালু করার সামরিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার হাসির এক কথা হল, চীন-রাশিয়া নাকি পারমাণবিক অস্ত্রে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সমান হয়ে যাচ্ছে। আর  ন্যাটো সেক্রেটারি এটাকে আমেরিকার জন্য হুমকি দেখছেন। আচ্ছা খোদ পারমাণবিক অস্ত্রই যেখানে সবার জন্যই হুমকি, সে্টা  আপনার বন্ধু বা শত্রু   যার হাতেই থাকুক; সেখানে ওরা আমার সমান হয়ে যাচ্ছে কেন  – এটা কী নাকিকান্নাময় যুদ্ধের অজুহাত তোলা নয়!

    কিন্তু  ন্যাটো নিয়ে ঘরের কথাটা হল – সেই ওবামা আমল থেকে, চাক হেগেল [Chuck Hagel] যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (২০১৩-১৫), তখন থেকেই ন্যাটো যে একটি খরচের ডিব্বা, আর সেই খরচের বেশির ভাগ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) কেন আমেরিকা একা বইবে- এসব প্রশ্ন আর অজুহাত তুলে কি চাক হেগেল সেকালেই ইউরোপকে খরচের দায় নেয়না ওথচ বড় কথা বলে – এই বলে অপমান করেনি?   ট্রাম্পও তো একই প্রশ্ন তুলেছিলেন।  ইউরোপকে খরচের দায় নিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একালে ন্যাটো একটি অপ্রয়োজনীয় সংগঠন। আফগানিস্তানের পর ন্যাটোর আর দুনিয়ায় কোনো ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ কমে আসছে তাই – ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমন সব ঘোষণা দেয়নি কি? এমনকি তিনি ইউরোপে (জার্মানিতে) ও জাপানে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এখনো আমেরিকান সৈন্যের সামরিক ব্যারাক মেনটেন করে যাওয়ার খরচ এবার থেকে ইউরোপকে দিতে হবে বলে ট্রাম্প দাবি করেননি?
    তাহলে সেসব প্রশ্নের সদুত্তর কী? উঠে থাকা এসব প্রশ্ন যা ন্যাটোর ভবিষ্যতই এলোমেলো করে রেখেছে সেসব পাশ কাটিয়ে বাইডেন কতদুর কোথায় যেতে পারবেন?  বাইডেনের কাছে এসব খরচের ব্যয়ভার প্রসঙ্গে সমাধান কী আছে? অর্থাৎ খরচ বইবার প্রশ্নে ন্যাটো এখন একটি পর্যদুস্ত সংগঠন হয়ে আছে! অথচ এসব নিয়ে কোনো কথা না বলে, এক দিনের ন্যাটো বৈঠকে গিয়ে চীনকে হুমকি দিয়ে এলেন বাইডেন! এটি কি তামাশা না ছেলেখেলা?

    Bantonglaoatang

    অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতের বিতর্কও আছে গভীরেঃ
    তবে মনে হচ্ছে, ইউরোপের সবাই এখনো বোকা ধামাধরা নেতাদের দেশ হয়ে যায়নি। তাই খোদ সিএনএন খবর দিচ্ছে কানাডা বাদে ইতোমধ্যেই জি-৭ এর বাকি নেতাদের মধ্যে বাইডেনের চীনের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি ও আপত্তি দেখা দিয়েছে। গরম তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি প্রকাশ করেছে ইতালি। এ নিয়ে চীনা ব্যাখ্যা হল, ইতালিই ইইউর প্রথম দেশ যে চীনের বেল্ট-রোডে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে।  উপরের কার্টুনটা আমি নিয়েছি চীনা গ্লোবাল টাইমস ম্যাগাজিনের এক আর্টিকেল থেকে। ঐ আর্টিকেলে কার্টুনের চরিত্রগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে ইটালিকে কুমড়া নাম দেয়া হয়েছে যার আবার “শার্প টাং” মানে কাউকে কিছু বলতে যার মুখে কিছু আটকায় না এমন নির্দয়ভাবে ক্রিটিক্যাল। সেই ইটালি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে,   The grey wolf image shows Italy, the first European country that joined China’s Belt and Road Initiative (BRI), is reluctant to collaborate with the US in suppressing China, commented “sharp-tongued pumpkin.” 

    তবে সামগ্রিকভাবে বললে, চীনের বিরুদ্ধে কামান দাগানো যৌথ বিবৃতি ধরনের কাগজে চীনকে কী ভাষায় কতটা অভিযুক্ত করছে মূলত এই প্রশ্নেই ভিন্নতাগুলো দেখা দিয়েছে। স্বভাবতই সবচেয়ে শক্ত ভাষায় বাইডেন ওই সব ড্রাফট দেখতে চাচ্ছেন। কিন্তু কেউই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় ততটুকুতেই থাকতে চায়। যেমন জাপান টাইমস, যৌথ বিবৃতি ড্রাফট করতে গিয়ে বড় মতভেদের কথা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার প্রসঙ্গে চীনকে কতটা সমালোচনা করা হবে সে বিষয়ে [G7 …….to counter Chinese influence in the world may prove a daunting challenge… ]।

    এ দিকে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, [G-7 Split on Biden’s Anti-China Push]। ইতালি জার্মানি আর ইইউ প্রতিনিধিকে দেখা গেছে, চীনের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে এরা অনিচ্ছুক; বরং সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে থাকতে আগ্রহী। আবার এসব প্রশ্নে কানাডা, ফ্রান্স, ব্রিটেন আর আমেরিকা নিজে এভাবে এরা চারজন আবার চার মাত্রায় চীনের বিরোধিতা করতে চায়। আর জাপান যে কোন দিকে অবস্থান নেবে, তা সে সবচেয়ে অনিশ্চিত।

    “There were some interesting discussions and a little bit of a differentiation of opinion,” said a senior Biden administration official……Italy, Germany, and the European Union appear reluctant to take as tough a stance on China, and instead would rather focus on the “cooperative nature of the relationship.” …… The U.S., Britain, Canada, and France, on the other hand, want to be more “action-oriented” to different degrees. Japan appears to be the most ambivalent of the group.

    সিএনএন লিখছে, এক আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট তাদেরকে জানিয়েছেন, বিশেষ করে ইতালি ও জার্মানি খুবই অস্বস্তিতে ছিল বিবৃতির ভাষা নিয়ে [….US officials said Italy and Germany were uneasy with potential communique language that China might view as provocative. ]। যেন চীন এটিকে কোনোভাবেই উসকানিমূলক হিসেবে না দেখে। চ্যান্সেলর মার্কেল তো বলেই বসেছিলেন যে, চীন আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী বটে কিন্তু আবার অনেক ইস্যুতে আমাদের পার্টনারও তো বটে [Angela Merkel said that “China is our rival in many questions but also our partner in many aspects.” ]। ফরাসি নেতা ম্যাক্রোঁও যোগ করেছেন, জি-৭ কে তো ওই চীনের সাথেই আবার জলবায়ু, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও অন্য অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত থাকলেও একসাথে কাজ করতে হবে। তাই তিনি পরিষ্কার করে রাখার পক্ষে যে, তাদের জি-৭ কখনো চীনবিরোধী কোনো ক্লাব হতে পারে না. “I will be very clear: The G7 is not a club hostile to China,” the French President said।

    সারকথায়, ভেতরে বড় মাত্রায় বাইডেন বিরোধিতা বজায় আছে। তবে সবচেয়ে মজার অবস্থানে ভারত। ভারতের মিডিয়াই ভেতরের বিরোধের খবরগুলো বড় করে সামনে এনেছে। যেমন হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, জি৭ লিডারেরা কত শক্ত করে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এনিয়েই তাদের মধ্যে বড় তর্কবিতর্কটা শুরু হয়েছিল। [The leaders of Group of Seven (G7) debated how strongly they should respond to China’s growing clout around the world and alleged forced labour practices in the Xinjiang region.] আর উইঘুর ইস্যুতে আরো মারাত্মক কথা বলেছে ঐ একই রিপোর্টে, ……there was no immediate consensus on how forcefully they should call out Beijing over the alleged human rights abuses। অর্থাৎ কত জোর দিয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগ তুলবে তা নিয়ে এখনি নেতসাদের মধ্যে ঐক্যমত নাই। কিন্তু কেন এমন লিখল, কারণ, ভারতই চায় না এটা। কারণ সেক্ষেত্রে এখানে কাশ্মীরের প্রসঙ্গ না চলে আসে। এছাড়া চীনের নেজেরই লিক হয়ে যাওয়া রিপোর্ট রেফার করে হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে ঐ চীনা রিপোর্টে “struggle against terrorism, infiltration and separatism.” চীন লিখেছে তারা (উইঘুরের) সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হচ্ছে। মনে হচ্ছে একথাগুলো ভারতের মনে দাগ ফেলেছে।

    এছাড়া আরেক নিরপেক্ষ মিডিয়া ওয়াইর [WIRE]  লিখেছে,  ন্যাটো মিটিংয়ে একসময় এমন উত্তপ্ত ভাষায় বাইডেনের সাথে ইউরোপীয়দের বিতর্ক শুরু হয়েছিল যে কমিউনিকেশন সুইচ অব করে রাখতে হয়েছিল, যাতে বাইরে মিডিয়ার কাছে তা না পৌঁছায়। আবার আরেক ভারতীয় মিডিয়া খবর দিয়েছে, মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিবৃতিতে কিছু অবস্থান প্রসঙ্গে খোদ ভারতেরই অস্বস্তি দেখা দিতেছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির প্রশ্ন ছিল, উইঘুর বা ফোর্সড লেবার ইস্যুতে কতটা চাপ দিয়ে তা বলা হবে, এ নিয়ে বিতর্ক।

     বাংলাদেশের প্রসঙ্গঃ
    এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশেরও বলার আছে। প্রথমত, বাইডেন আমাদেরকে যে পটেনশিয়াল বিপদের মধ্যে হাজির করে ফেলেছেন তা হল, সত্যিই যদি তিনি চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধকে যুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দেন বা টেনে নিয়ে যান, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি হয়ে উঠতে পারে তাদের দুই দেশের যুদ্ধের রণভুমি। এছাড়া অনেকের মনে আশা যে বাংলাদেশে কেমন ধরনের সরকার থাকবে বা কে থাকবে- এ প্রশ্নে বাইডেন তাদেরকে সাহায্য করবে বা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে। যেমন করেছিল ১/১১ এর সময়ে। কিন্তু সে আশায় কী আমরা বাংলাদেশকে চীন-আমেরিকার রণক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চাইতে পারি? এমন আশার কোন মানে হয় না। এরা বাংলাদেশের হত্যাকারী।  ঠিক যেমন ১/১১ পরিণতি হয়েছিল আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  যার ফলে আজ প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেল আমরা ভোগ করছি কিন্তু বের হতে পারি নাই।  আমরা আমেরিকার স্বার্থের ওই যুদ্ধের বলি হতে পারি না। যেমন ভাবে বার্মা নিয়েও তাদের স্বার্থের লড়াইয়ের কোনো অংশ হয়ে যেতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের দেশেও নানা পক্ষ আছে স্বাভাবিক। তাদের সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে আমরা যাই করি আমরা কারো হাতিয়ারে যেন পরিণত না হই। একবার হওয়াতেই আমাদের শিক্ষা হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।  বিশেষত বাংলাদেশকেই না তাদের বার্মা-বিবাদের রণক্ষেত্রে বানিয়ে ফেলি সেটা আমাদের খেয়াল রাখতেই হবে।

    আর উইঘুর বা মানবাধিকার প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবে আমাদের অবস্থানটা হবে সবাইকেই হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স অবস্থানে যেতে হবে। আমরা কি উইঘুরে সত্যি মানবাধিকারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই? নাকি এ নিয়ে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ নিতে চাই, যাতে সেটি আমেরিকার বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়? এ দুয়ের মধ্যে ঠিক কোনটা চায় তা আমেরিকাকে স্পষ্ট করতে হবে।

    কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটঃ
    এবার দাবি করা হচ্ছে, এবারের জি-৭ মিটিং নাকি কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটের লড়াই। আচ্ছা এই জি-৭ এটি কী এককালে জি-৮ করে নেয়া হয়নি? রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে। পরে যদিও ইউক্রেন-ক্রিমিয়া প্রশ্নে এক বিবাদে ২০০৭ সালে আবার রাশিয়াকে বের করে দেয়া হয়েছিল এবং সেই থেকে রাশিয়ার ওপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হয়ে আছে আজও। তা হলে সেসব সময় রাশিয়া যখন ভেতরে ছিল, তখন সবাই জি-৮ এর সবাই ডেমোক্র্যাসির লোক হয়ে গেছিল?  তার মানে রাশিয়া ভিতরে থাকলে জি হল ডেমোক্রেসির উদাহরণ আর তারা বের করে দিলে  রাশিয়াই হয় অটোক্রাসি! হায়রে ডেমোক্র্যাসি!

    আবার  প্রনবল আমানবিকভাবে ইয়েমেন তছনছ করতে সৌদিদেরকে   আমেরিকান সমর্থন এটিও কি ডেমোক্র্যাসির তাণ্ডব অথবা ওদিকে দেখেন, দুই দিন পরে পরে নিয়মিত গাজায় ইসরাইলি হামলা এটাই বা কোন ডেমোক্র্যাসি? আমেরিকার এসব “ডেমোক্র্যাসি-বিক্রির” বক্তব্য আসলে  আমাদে্র  জন্য এক চরম বিরক্তিকর জায়গায় পৌঁছেছে।

    তবে চীনের প্রসঙ্গেও অন্তত দুটো কথা বলার আছে। বিশেষ করে বাইডেনের সমালোচনা করছি বলে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইট ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ও পরে ১৯৪৮ সালের সম্মেলনে উঠলেও এর অগ্রগতি খুবই হতাশজনক। অথচ এরই মধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্বে বদলের সময়কাল আসন্ন। এত দিন কমিউনিস্টদের রাজনীতি ও তাদের দেশ যেভাবেই চলুক, এখনকার প্রশ্ন আলাদা।

    অন্তত গ্লোবাল নেতা হওয়ার স্বার্থে  মানবাধিকার  রক্ষা প্রসঙ্গে চীনের ন্যূনতম একটি অবস্থান গ্রহণ পূর্বশর্ত। নইলে প্রতি পদে এই ইস্যুতে সঙ্ঘাতে গ্লোবাল সব কাজ বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। চীনকেই অযথা বিব্রত হতে হবে প্রায়ই।  চীন নিশ্চিত থাকতে পারে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে ন্যূনতম একটি অবস্থান ছাড়া চীনের নেতা থাকা খুবই কঠিন হবে। ফেলও করতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যুদ্ধের খরচ জরুরি, হিউম্যান রাইটও“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেনকে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ দিবে কে?

    বাইডেনকে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ দিবে কে?

    গৌতম দাস

    ২১ জুন ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3B4

     

    G7 summit Cornwall, UK. – 11-13 June

    জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার শপথ নেয়ার চার মাসের মাথায়  চীনের বিরুদ্ধে জি-৭ জোট (১১-১৩ জুন বৃটেনে G7 summit Cornwall ) আর ন্যাটোকে (১৬ জুন সামিট) দিয়ে আসলে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন।  বিশেষ করে ন্যাটোর জন্ম ম্যান্ডেটের আর্টিকেল ফাইভ এর রেফারেন্স তুলেছেন যা আসলে একেবারেই যুদ্ধ ও আক্রান্ত সংক্রান্ত। মানে ন্যাটোর ৩০ রাষ্ট্রের কেউ আক্রান্ত হলে বাকি সবাই তা নিজের উপর আক্রান্ত মনে করতে বাধ্য।  অথচ দুনিয়াতে কোথাও কোন যুদ্ধের ইঙ্গিত না থাকলেও  প্রথম আগ বাড়িয়ে যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে বাইডেন কথা বলে গেলেন।  এটা চরমভাবে অযাচিত। এটা দায়ীত্বজ্ঞান সম্পন্ন নয় অবশ্যই।  সব চেয়ে ট্র্যাজিক ব্যাপারটা হল,  বৈষয়িক উন্নয়নজনিত চীনের গ্লোবাল প্রভাব বৃদ্ধিকে বাইডেন যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে মোকাবিলা করতে চাইলেন!  এটা কী দুটা সমতুল্য ফেনোমেনা? না ফিট করে? না অর্জনযোগ্য?

    আর  এতে ক্ষুব্ধ চীন বলেছে, “কয়েকটি ছোট দেশের জোট দুনিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করার দিন শেষ” [সেই দিন অনেক আগেই শেষ: জি–৭–কে চীন  – প্রথম আলো]।
    [Before the G7 criticism emerged, China pointedly cautioned G7 leaders that the days when “small” groups of countries decided the fate of the world were long gone.]

    তবে বাইডেনের ওই সব কথাবার্তা একেবারেই অপ্রস্তুত থেকে বলা। কারণ ঠিক কোথায় কিভাবে তিনি পৌঁছাতে চান, তাতে আমেরিকার লাভ কী? অথবা বলা যায় সেটি সম্ভব কি না, আমেরিকার সেই মুরোদ এখনো আছে কি না, এসব নিয়ে হোমওয়ার্ক যথেষ্ট করেছেন কি না, এসব প্রশ্নের জবাব বাইডেনের সাথে আছে, তা তার পদক্ষেপের মধ্যে ছাপ বা প্রমাণ নেই।

    যেমন, বাইডেন আজ ন্যাটোর হুমকি দিতেছেন? অথচ তার কী মনে নেই, কেন ওবামা ইরানের সাথে ২০১৫ সালে আপস করেছিলেন? ইরানের উপর ১৯৭৯ সাল থেকে আরোপিত নানা অবরোধ ওবামা তুলে নিয়েছিলেন আর, ‘P5+1’ [ইউরোপের সাথে মিলে আর জাতিসংঘকে সংশ্লিষ্ট রেখে] এর পারমাণবিক চুক্তি করেছিলেন – কেন? কারণ ইরাকে আইএসের নতুন তৎপরতা ও দখলদারি শুরু হলেও তাতে আমেরিকার খরচ বইবার মুরোদ ছিল না বলে সে আবার ইরাকে সৈন্য পাঠাতে পারছিল না। আর ইরাকে আই এস দমনের কাজটাই ইরানি সেনাবাহিনী করে দিবে বলে এর বিনিময়ে তিনি আপস করেছিলেন, পারমানবিক চুক্তি করেছিলেন। ইরানের উপর অবরোধের অবসান করেছিলেন। কাজেই এখন ন্যাটোকে দিয়ে চীন-রাশিয়াকে হুমকি দিবার আগে বাইডেনের উচিত ছিল তিনি  এমন যুদ্ধ হলে এখন এর ব্যয়ভার বইতে সক্ষম কেন ও কিভাবে সেটা আগে দেখানো। এটাই হত সবচেয়ে স্বাভাবিক আর তা না দেখানোতে তাঁর  উপস্থিতিতে ন্যাটোর দেয়া বিবৃতিতে এই হুমকি একটা ফাঁকা হুমকি হিসাবে হাজির হবেই। এসব ফাঁকা বুলি ছেড়ে কী লাভ? আমেরিকা কী মানুষের হাসাহাসির পাত্র হতে পণ করেছে?

    নরম-হালকা ভাষায় বললে এটা চীন-আমেরিকার বাণিজ্য বিরোধ বা বড় জোর বাণিজ্যযুদ্ধ বলা শুরু হয়েছিল, যা চলে আসছে কেবল ট্রাম্প আমল থেকে এ পর্যন্ত। কারণ ওবামা আমল পর্যন্ত এটা বিরোধ বা বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবেও দেখা দিতে দেয়া হয়নি। তবে ওবামা পরপর দুবারই (২০০৯ ও ২০১৩ সালে ) প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর চীন সফরে গেছেন আর চীন তাকে একগাদা বাণিজ্য সুবিধা হাতে ধরিয়ে দিয়েছে আর তা দিয়েই সেটা আর কখনো বিরোধ বা কোনো বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবেও হাজির হয়নি। এমনকি ট্রাম্পের প্রথম বছরেও (২০১৭) তিনি এমনই ভাবে সফরে গিয়ে আরো বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে ফিরেছিলেন। এমনকি সেবছর কোয়াডকে [QUAD] জন্ম দিয়েও সে ঘটনাকে লঘু-বিষয়  করে রেখেছিলেন। একসাথে সদস্যরা সবাই মিলে একটা বিবৃতি দিতে পারেন নাই ও দেন নাই। কিন্তু পরের বছর (২০১৮) থেকে আর ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ টার্মটা ব্যবহার না করে পারেনি। তাহলে এটা কী ব্যক্তি ট্রাম্পের জাতিবাদী ভাব নিয়ে আগানোর সমস্যা, নাকি এটি অনিবার্য ছিল? জবাব হল, এটি অবশ্যই অনিবার্য ছিল। তবে ট্রাম্পের বোকা আমেরিকান জাতিবাদ এ্টাকে সহজ করবে মনে করে করতে গিয়ে ব্যাপারটাকে আরও জটিল করে তুলেছিলেন।

    ১৯৬৯ সাল থেকে নিক্সন-কিসিঞ্জারও জানতেনঃ
    আসলে এটা যে অনিবার্য তা ১৯৭০-৭১ সাল থেকে নিক্সন-কিসিঞ্জারও জানতেন।  আসলে এটা আরো আগে ১৯৬৯ সাল থেকে যখন,  চীন-আমেরিকা  পরস্পরকে স্বীকৃতি না-দেয়া এক দশা-অবস্থা থেকে আজকের এই গভীর সম্পর্ক  পাতানো-পৌছানোর লক্ষ্যে সেকালে  পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের মাধ্যমে  প্রথম চীন-আমেরিকা  উভয়ের কাছে পরস্পরের প্রস্তাব ও মনোভাব পৌছে দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তিতে  তা পেকে উঠলে সেটা হল আমরা যখন  ১৯৭১ সালে রিফুজি হয়ে ভারতে আশ্রয় খুঁজছি সেই একাত্তরের জুলাইয়ে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরের নামে প্রথম গোপনে চীন সফরে গিয়েছিলেন।  তিনিই নিক্সনের সফরের বন্দোবস্ত করে আসেন। ফলে মাওয়ের বিপ্লবের চীন সফরে যাওয়া প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলেন নিক্সন। তিনি ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে চীন সফরে যান। আর সেই থেকে সেকালের বিনিয়োগ-খরায় থাকা চীনে বিনিয়োগ নিয়ে হামলে পড়ার সুযোগ পেয়ে আমেরিকার বিনিয়োগপাড়া ওয়ালস্ট্রিট হয়েছিল সবচেয়ে খুশি।

    কিন্তু সে দিনও ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ সবাই জানতেন এই সুখ সাময়িক। কারণ এতে একদিন চীনই বড় হয়ে এই আমেরিকাকেই চ্যালেঞ্জ জানাবে। কিন্তু সেসব ভুলে বিনিয়োগ গ্রাহক চীনের বিশাল বাজার তাৎক্ষণিকভাবে আমেরিকাকে বিশাল লাভালাভ রিলিফ দেবে, কত কী পাওয়া যাবে – এটিই ছিল মুখ্য বিবেচনা।

    মনে রাখতে হবে, ক্যাপিটালিজমের আদি এবং অনিবার্য স্ববিরোধ হল, সে নিজেই ক্রমেই নিজ বাজার সঙ্কুচিত করবেই। তাতে আবার একসময় নতুন বাজার পাওয়ার সঙ্কটে পুরনো মালিকরা দিশেহারা হবেন আর নতুন উত্থিত মালিক তাকে চ্যালেঞ্জ করবেনই। তাই বলছি, সেই ১৯৭২ সাল থেকেই সবাই জানত আজকের এদিন আসবেই। এমনকি এখনকার ওয়ালস্ট্রিটের লিডার (গোল্ডম্যান স্যাক্সে) সহ বুদ্ধিমানেরা তাই ইতোমধ্যেই আমেরিকান রাষ্ট্র-ভক্তি ছেড়ে চীনা রাষ্ট্রের ভক্ত-পরামর্শক হয়ে গেছেন।

    বাইডেন এবারের জি-৭ মানে ধনী সাত দেশের এক ক্লাবের বৈঠকে যোগ দিতে আয়োজনস্থল ব্রিটেনের কর্নওয়ালে গিয়েছিলেন।  কিন্তু সেকালের জি৭ আর  সত্যিকারভাবে তেমন ধনীদেশ নয়। আজ তাদের চেয়েও ধনীদেশ জি৭ এর বাইরেও আছে। আসলে  জি-৭ হল সেকালের গ্লোবাল নেতা আমেরিকার একক সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপের সাথে সমন্বয় করে নেয়ার লক্ষ্যে এক সভা যাতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকসহ গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক স্বরে পশ্চিমাদেশগুলো যেন কথা বলে বাকি রাষ্ট্রের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারে।

    আমেরিকার কাগুজে ডলার ছাপানো শুরু বা গোল্ড ক্রাইসিস ১৯৬৮ঃ
    আসলে এটা ছিল সেকালের আমেরিকার ইউরোপ তোষণ বা ক্ষুব্ধ ইউরোপকে তেল মারা। কেন? কারণ আমেরিকা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। ব্যাপারটার আনুষ্ঠানিক দিক থেকেই যদি বলি ১৮ মার্চ ১৯৬৮ আমেরিকান কংগ্রেস একটা আইন পাস করেছিল যে ডলার ছাপতে গেলে আগে সম-পরিমাণ সোনা ফেড-এর ভল্টে রিজার্ভ রাখতে হবে [Gold backed currency] এই শর্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। আর এতেই লন্ডনের সোনার বাজারে হাহাকার পড়ে যায়।  অর্থাৎ আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের সময় ডলার Gold backed currency থাকবে। তাই এর ফিক্সড বিনিময়মুল্য ছিল যে এক আউন্স সোনা সমান ৩৫ ইউএস ডলার।   গ্লোবাল বাণিজ্যের এই মৌলিক বুঝাবুঝি  এতে ভেঙ্গে পড়েছিল। আর সত্যিকারভাবে কার্যত বেশি কাগুজে ডলার ছাপানো শুরু করেছিল ১৯৫৬ সাল থেকে যেটা ১৯৬৮ সালে এসে আমেরিকান কংগ্রেস এই অন্যায় কাজের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

    আর তা থেকে ক্ষুব্ধ ইউরোপকে ঠান্ডা করতে আমেরিকা এই প্রথম নিজের নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে তা ইউরোপের সাথে শেয়ার করতে সম্মত হয়ে ১৯৭৩ সালে জি-৭ গ্রুপের জন্ম দিয়েছিল । কারণ কাগুজে ডলার ছাপানোতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে পুণজন্ম দিয়ে ম্যান্ডেট আমার লিখে নেয়া ছাড়া উপায়  ছিল না। কারণ এদের ম্যান্ডেট লেখা হয়েছিল ডলার – Gold backed currency এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। তাই ঐ ১৯৭৩ সাল থেকেই জি৭ এর জন্ম। তবুওও জন্মের পর থেকে এভাবে জি-৭ নামে বসাবসির ব্যাপারটা একেবারেই ইনফরমাল। মানে হল যেমন, বিশ্বব্যাংকের উপরে কোনো ফরমাল মাতব্বরি প্রতিষ্ঠান জি-৭ নয়।

    এভাবে সত্তরের দশক থেকে জি-৭ এর শীর্ষ বৈঠক ব্যবস্থা চলে এলেও এবারই প্রথম চীনকে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের যেন এনিমি করে দেখেই কিছু কথা বলেছে; এমনকি গত ২০১৮ সালের সম্মেলনেও তারা চীন অথবা অন্য কারও নাম উল্লেখ করেনি [Although senior U.S. officials highlighted the references to Beijing, noting that “China wasn’t even explicitly mentioned” in the 2018 G7 communique despite]।

    জি-৭ ফ্যাক্টসশিট -FACT SHEET: President’s WHITE HOUSE
    এবারের জি-৭ বৈঠক উপলক্ষে হোয়াইট হাউজ থেকে এক ফ্যাক্টসশিট বুলেটিন বের হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘বাইডেন চীনের সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতা’ […to discuss strategic competition with China ] প্রসঙ্গে এখানে জি-৭ বৈঠকে নেতাদের সাথে আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ চীনের নাম নিয়েই কথাটা তিনি বলেছেন। আবার দ্বিতীয়ত তিনি চীনকে ঠিক শত্রু দেশ বলেননি; বলেছেন যার সাথে তার “কৌশলগত প্রতিযোগিতা” [strategic competition] আছে, এভাবে মোলায়েম করে বলেছেন। অর্থাৎ এবার স্বীকার করে নিলেন চীনের সাথে আমেরিকার কৌশলগত প্রতিযোগিতার সম্পর্ক আছে। কিন্তু সে কথা এবারই প্রথম বলা হল কেন?
    আগেই বলেছি, ১৯৭২ সাল থেকে চীন তো আমেরিকার কাছে খুবই আদরের দেশ ছিল। কারণ চীন ছিল সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার বড় এক “ঋণ খাতক” দেশ। আর সেই সাথে আমেরিকার হাইটেক পণ্যের আমদানি দেশ। কিন্তু সেই চীনই ২০১০ সালের পর থেকে হয়ে যায় সরাসরি আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধের দেশ আর আমেরিকার গ্লোবাল নেতা থাকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ও চ্যালেঞ্জার। যেখান থেকে আজ চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব আগামীতে আমেরিকা্র থেকে কেড়ে নিতে চায় যে সেই দেশ। তাই এই প্রথম লজ্জার মাথা খেয়ে বাইডেন স্বীকার করেছেন যে, চীন আমেরিকার সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কে আছে। ফলে সরাসরি না হলেও নাম উল্লেখ করে স্বীকার করে নিলেন চীনের কাছে আমেরিকা নেতৃত্ব হারাতে যাচ্ছে, তাই ‘কৌশলগত প্রতিযোগী’।

    এখন প্রশ্ন হলো আমেরিকা প্রতিযোগিতা করার যোগ্য কী? কতটা? জবাব হলো, না একেবারেই  যোগ্য নয়। কারণ আমেরিকা চীনের কাছে হেরে যাবে। ঠিক যেমন এককালে ব্রিটেনও আমেরিকার কাছে হেরে গিয়েছিল। কারণ বিষয়গুলো অবজেকটিভ ফেনোমেনা বা ঘটনা। ক্যাপিটালিজমের কপাল বা পরিণতিই এমন!  যেমন এখন পশ্চিমা একাদেমিকদেরই পুর্বাভাস হল ২০২৮ সালের মধ্যেই চীন আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে গ্লোবালি বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে।

    এককালে আমেরিকায় কলোনি দখলকারী ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা  যেসব গরিব ব্রিটেনবাসীকে বিনা পয়সায় জাহাজ ভরে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে চাষাবাদের জমি ও সিড-মানি [seed money] দেয়ার লোভ দেখিয়ে – পরে ১৭৭৬ সালে ঐ গরিব ও চাষাবাদ করে খাওয়া লোকেরাই কলোনি দখলকারী ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সশস্ত্রভাবে উৎখাত করে নিজেদের আমেরিকাকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিল। এরও পরে ১৮৮২ সালের পর থেকে আমেরিকা ক্যাপিটাল একুমুলেশনের [surplus accumulation] বা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের দিক থেকে ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এথেকেই পরে ১৯৪৫ সালে মহাযুদ্ধ শেষে আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা হয়ে যায়। ঠিক যেন একইভাবে এখনকার পূর্বাভাস হল, ২০২৮ সালে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হয়ে যাচ্ছে। আর এটাই হবে চীনের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে আরও বড় একধাপ আগানো।

    অথচ ক্ষমতায় এসে এখন বাইডেন যে সিদ্ধান্ত নিলেন সেটা এক অবাস্তব স্বপ্ন-কল্পনার দিকে যাত্রা। সে্টা হল, আমেরিকা নাকি আবার দুনিয়াকে শাসন করেই যাবে [……glad America is back]। সে জন্যই গত নির্বাচনের সময় থেকে এবং জিতার পরও এখন তার স্লোগান হল ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’। না এটা আমেরিকার (নেতাগিরিতে) ফেরত আসা নয়, বরং বাইডেন মানে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন, মাত্র। আমেরিকা নয়। এভাবেই বলেছেন সিএনএন বা ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট ফরিদ জাকারিয়া। কারণ তিনিও বিশ্বাস করেন নাই। লিখেছেন, Under Biden, American diplomacy is back. But America isn’t. । অতএব, সোজাসাপ্টা বললে বাইডেন মিথ্যা আশ্বাসের স্লোগান দিচ্ছেন।

    তা হলে তিনি সঠিক কী করতে পারতেন? বাইডেনের নেতৃত্বে আমেরিকা চীনকে নেতা মেনে নিতে প্রস্তুত হয়ে নিজের অবস্থান যতটা সম্ভব ভালো ও উঁচুতে ধরে রাখার চেষ্টা করে যেতেন অর্থাৎ পরিস্থিতিকে অন্তত খামোখা যুদ্ধ-সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দেয়া নয়। কারণ পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার মানে হবে, স্বাভাবিক অবস্থায় যদি আমেরিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার সুযোগ থাকে তবে সেটাকেই নষ্ট বা নড়বড়ে করে ফেলা হয়ে যেতে পারে।

    NATO Secretary General Jens Stoltenberg

    বাইডেনের উপস্থিতিতে ন্যাটো, বুড়া হাড়ে জওয়ানিঃ
    কিন্তু কেন আমরা যুদ্ধের কথা তুলছি? বাইডেন তো কেবল চীনের সাথে “স্ট্রাটেজিক প্রতিযোগিতার” কথা বলেছেন, যুদ্ধের কথা তো বলেননি!

    হ্যাঁ,  জি৭-এর বেলায় এটুকু আপাত-সত্য হলেও বাইডেন আরেক কিছু বড় আকাম করেছেন। যেমন একই নিঃশ্বাসে তিনি প্রায় নাই (ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রায় ঘোষণাই করে দিয়েছিলেন ন্যাটোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে) হতে যাওয়া ন্যাটোর (সেক্রেটারির) সাথে মিটিং করেছেন; জি-৭ এর সভা শেষের এক দিন পরে। আর সেখান থেকেই যুদ্ধের উসকানিমূলক কথা বা হুমকি দিয়েছেন। এমনিতেই এটি ছিল বাইডেনের ‘এক ঢিলে অনেক পাখি মারা’র সফর। কারণ তিনি ব্রাসেলসে গিয়ে ইইউ-আমেরিকার শীর্ষ বৈঠকও করে নিয়েছেন আগের দিন। পরের দিন ন্যাটোতে তিনি হাজির। আসলে একদিকে জি-৭, ন্যাটো বা ইইউর সাথে বৈঠক মানে হলো, মূল টপ সাত-দশ রাষ্ট্রনেতার সাথে তিন ফোরামেই বসা মিটিং। একই লোক অথচ ফোরামগুলো ভিন্ন।
    ফলে জি-৭ এর বৈঠক থেকেই সব কিছুতে আলোচনার মুলইস্যু হল চীন। আবার বাইডেন ন্যাটোতে এলে ন্যাটোর দেয়া বিবৃতি লিখছে যে, ‘চীনের উচ্চাকাঙ্খা  ও চাপানো আচরণ তাদের অ্যালায়েন্সের নিরাপত্তাকে সিস্টেমেটিক চ্যালেঞ্জ (systemic challenges) করছে বিশেষত তাদের আন্তর্জাতিক নিয়ম আইনের প্রতি অনুগত থাকার বিরুদ্ধে” ।
    “China’s stated ambitions and assertive behaviour present systemic challenges to the rules-based international order and to areas relevant to alliance security,” the statement said. ……  “rapidly expanding its nuclear arsenal, with more warheads and a large number of sophisticated, sophisticated delivery systems”, as well as its military cooperation with Russia and its “use of misinformation”.
    এ ছাড়া ন্যাটোর আরো অভিযোগ হল, চীন-রাশিয়া মিলে কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের ঢিবি বানাচ্ছে। অর্থাৎ সার কথায় বাইডেন চীনের সাথে আমেরিকার বিরোধকে সামরিকভাবে লড়ার দিকে ঠেলে দিতে চান এই পরিষ্কার ইঙ্গিত এখানে আছে। আর ন্যাটো এই প্রথম যে অজুহাতে ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোয়াড জোট গড়া হয়েছিল তা এখন বাইডেনের উপস্থিতির সভা থেকে সেটা ন্যাটোরও অজুহাত হয়ে গেল।  কী সেটা?

    বাইডেন ও তাঁর বন্ধুদের rules-based international order, এই কথার মানে কীঃ
    ঘটনা হল, আপনি যদি কারো বাসার প্রধান প্রবেশমুখ কোন অজুহাতে বাধা বা ব্লক খাড়া করতে যান তবে সেটা আপনার আইনি বা বেআইনি যে যুক্তিতেই হোক তাতে ঐ বাড়িওয়ালা আপনার ততপরতাকেই উলটা উৎখাত করবেই।  ভৌগলিকভাবে চীনের কেবল উত্তর-পূর্ব দিকটাই সমুদ্রের দিকে খোলা। বাকি সাড়ে তিন দিকে এটি একেবারেই ল্যান্ডলকড এবং উত্তর ও পশ্চিম দিকটাতো পুরাপুরি  হিমালয়-সহ অন্যান্য পর্বতমালায় ঘেরা। এখন আমেরিকার সিনেটের পেশ করা লিখিত পরিকল্পনায় দেখা গেছে  মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকৌশল্গত পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছিল।

     

    ম্যাপে দেখা যাবে মালাক্কা প্রণালী [Strait of Malacca]  হল আরব সাগর থেকে তেল নিয়ে চীনের সমুদ্র উপকুলে পৌছাবার পথে  এই প্রণালী হল এক চিকন পথ, যাকে প্রণালি বা Strait বলা হয় আর যা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ভুমি দিয়ে দুদিক থেকে ঘিরে ধরা।  এই প্রণালিতে কোন একটা জাহাজ আড়াআড়ি করে ফেলে রাখলেই এই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া যায়। তাই আমেরিকান যুদ্ধকৌশলে খুবই পেয়ারের জায়গা মনে করা হয় মালাক্কা প্রণালীকে।

     

    আবার চীনে সমুদ্রপথের একমাত্র প্রবেশমুখের চার দিকে প্রায় ১০টি দেশের সাথে সামুদ্রিক সীমানা আছে। আর বলাই বাহুল্য তা আন-ডিমার্কেটেড। জাতিসঙ্ঘের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান [UNCLOS, United Nations Convention on Law of Sea ] আছে যারা এসব বিরোধ মীমাংসার সালিস করে দেয়। তবে এটি আমাদের রাষ্ট্রের আদালত বা জুডিশিয়ারি ব্যবস্থা নয়। এটা আসলে আরবিট্রেশন অর্থাৎ যেটাকে আমরা গ্রামের সালিসি বা আপসে মীমাংসা বৈঠক বলি, এটা তাই। যেমন মিল মিশে ভাগবাটোয়ারা করে দেয়া তাই এখানে কে অপরাধী তা খুঁজা বা শাস্তি দিবার ব্যাপার নাই।  যেমন এখানে দুই পক্ষেরই বিচারক নিয়োগ দেয়ার সুযোগও থাকে।

    এখন এই আনক্লসের সালিস আদালতে কেবল চীন-ফিলিপাইনের সমুদ্র সীমানাবিরোধের কেসটাই উঠেছিল। তাতে এই জাপানি বিচারকের ব্যাপারে আপত্তি তুলে, তাকে বদল করে অন্য বিচারক দেয়ার আবেদন করেছিল চীন, যা মানা হয়নি। তাই ক্ষুব্ধ চীন সেই থেকে বিচার কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর এতে ব্যাপারটা আর আপস সালিসি না হয়ে (অর্থাৎ বিচারক বদলে না দিয়ে) রাষ্ট্রের আদালতের ভূমিকাই যেন হয়েছিল। আর সেই রায় দেয়া হয়েছিল ফিলিপাইনের পক্ষে। স্বভাবতই চীন সেই রায় মানেনি। আর সেই থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোয়াড জোট গড়ে আমেরিকান প্রপাগান্ডা শুরু হয় যে, আন্তর্জাতিক আইন না-মানা দেশ হল চীন। আমেরিকা ও বন্ধুদের প্রপাগান্ডার ভাষায় চীন হল, rules-based international order না মানার দেশ আর তারা সকলে হল আইন ও গণতন্ত্র চুইয়ে পড়ার দেশ।  অথচ শুরু থেকেই এটি ছিল গায়ে পড়ে চীনের প্রবেশপথে বাধা তৈরির জন্য আমেরিকার কৌশল যে কথা ওই সিনেট রিপোর্টে লেখা আছে। এই জন্যই বলেছি দুনিয়ার চোখে চীনের পক্ষে যায় কোন আইন থাকুক আর নাই থাকুক নিজের প্রবেশপথ খোলা রাখতে চীন সকল বাধা সবকিছুকে উপড়ে ফেলবেই। একই ঘটনার উদাহরণ আমেরিকার বেলাতেও ঘটেছে। কেন আমেরিকা ক্যারিবিয়ান সাগর নিজ প্রভাবে রেখেছিল সে কাহিনী পড়ে দেখতে পারি। “আমেরিকান ক্যারিবিয়ান লজিক” নামে প্রবন্ধ আগ্রহী পাঠকেরা খুজে দেখতে পারেন।
    চীনের দিক থেকে ঐ মালাক্কা প্রণালী হয়ে চীনের একমাত্র উত্তর-পূর্ব সমুদ্র প্রবেশপথেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের সব জ্বালানি আসে। তাই এই পথ ও এরও বিকল্প নানা পোর্টও চীন খুঁজবে, না থাকলে চীন তা বানিয়ে নিতে চাইবে বিনিয়োগ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। সে কারণে পাকিস্তান, বাংলাদেশ (প্রস্তাবিত), মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কায় গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো্র আগ্রহ চীনের নিজের স্বার্থেই  এই আলোকেই চীন জরুরি মনে করে। অথচ এসব দেশে চীন বন্দর বানাতে গেলে এবার ভারতকে দিয়ে আমেরিকা কান্নার রোল উঠাবে যে, “আমাকে চীন চার দিকে ‘মুক্তামালা’র মতো ঘিরে ফেলল!” এজন্য ভারতে মুক্তমালা বা String Of Pearls’ বলে কান্নার রোল একটা খুবই ফলস তবে মারাত্মক মিথ্যা দেশপ্রেমের জিগির জাগানিয়া (অরিজিনালি আমেরিকান) প্রপাগান্ডা।  এর সোজা মানে চোর উল্টো পুলিশ ডাকে!  যাহোক, এগুলো ছাড়াও এমনকি থাইল্যান্ডের ভূখণ্ড কেটে সুয়েজ খালের মতো আরেকটা মালাক্কা বাইপাস তৈরির আলাপ চলছে চীনের থাইল্যান্ডের সাথে।

    ওবামার পিভোট ফেল করা থেকে কী বাইডেন শিক্ষা নিবেন নাঃ
    ভৌগলিকভাবে আমেরিকা দেশের ভূখণ্ডগত অবস্থান এশিয়াতে নয়। তা হলে ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোয়াডে আমেরিকার এই নেতাগিরি করতে আসা কেন? আমেরিকা বলবে আমার বন্ধুরাষ্ট্রগুলা এখানে আছে তাদের রক্ষা করতে। এই অজুহাতও না হয় মেনে নেয়া যাক।
    এখন প্রেসিডেন্ট ওবামা ছিলেন সেই লোক যিনি এশিয়া পিভোট (PIVOT) পলিসি [ “Pivot to East Asia”] চালু করতে গিয়েছিলেন ২০১১ সালে এবং শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হন। কিন্তু কী ছিল সেটা?
    উপরে যেটা বলেছিলাম চীনের প্রবেশপথের দুই দিকেসহ চার দিকে প্রায় ১০টি দেশ আছে (যাদের বেশির ভাগই আবার আসিয়ান, ASEAN জোটের সদস্য) এবং যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা মীমাংসিত নয়। আমেরিকার সব প্রশাসনের খুবই মন-কামনা যে, সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ এরা সবাই চীনের সাথে সামরিক বিরোধে ঘুড়িয়ে দেক, যুদ্ধে জড়াক। আর তাতে আমেরিকা তাদের সবাইকে নিজের কোলে বা কোনো জোটে তুলে নিয়ে এবার তাদের পক্ষ হয়ে চীনের সাথে বিরোধে আমেরিকা সামরিক নেতা হিসেবে হাজির হোক। এটিই ছিল ওবামার আমেরিকার দিবাস্বপ্ন বা আমেরিকার পিভোট বা ভরকেন্দ্র-ভূমিকা; চীনের বিরুদ্ধে এক আলগা মাতবর হতে চাওয়ার আমেরিকা।
    আলগা বললাম কেন? বললাম এ জন্য যে, বাস্তবে অমন প্রায় ১০ দেশের কেউ আমেরিকার প্ররোচনায় পা দেয়নি। তাদের অবস্থান খুবই বুদ্ধিমানের। সেটি হল, তারা মনে করে, চীনের সাথে সমুদ্রসীমা অমীমাংসিত বলে বিতর্ক আছে সত্য। কিন্তু সে জন্য আমেরিকার সামরিক জোটে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক এবং মূলত অপ্রয়োজনীয়। তারা মনে করে, চীন বিরোধিতার স্বার্থে আমেরিকার কোলে উঠে বসার মানে হয় না। আবার এখনই আমেরিকার কোলে না উঠলে বিশাল ক্ষতি হবে তা তো না। যেমন সমুদ্রবিরোধে চীনের সাথে এখনই আপসে যেতে হবে তাও না। কারণ এখন এটা ফেলে রাখলে চীনের পালটা তাদের দাবির কোনটাই তো তামাদি হয়ে যাবে না। দাবি লোপাট হবে না।
    আবার ওই ১০ দেশের কমবেশি সবার বাণিজ্য স্বার্থের দিক থেকে চীন তাদের কাম্য। কারণ চীন অবকাঠামো-ঋণ দেয়ার যোগ্য এমন উত্থিত দেশ। এ ছাড়া তাদের  কোন কোন পণ্যের চীনে রফতানির বাজার পাওয়াও সম্ভব। কাজেই এসব স্বার্থকে মেরে ফেলাও তো বোকামি। একারণে ওই সব দেশের (এমনকি চীনের বিরুদ্ধে আনক্লসে  জিতে যাওয়া ফিলিপাইনও) কেউ আমেরিকার কোলে ওঠেনি। উল্টো চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সাম্প্রতিককালের ইন্দোনেশিয়া যার সাথে চীনের ঠিক সমুদ্রসীমা বিতর্ক নেই, তবে জেলেদের মাছ ধরার রাইট নিয়ে বিরোধ আছে, সেও এই টিকা পাওয়ার কালে চীনা টিকার টেস্টে অংশগ্রহণ ও টিকা কেনার সম্পর্কে জড়িয়েছে। আর প্রকাশ্যে বলছে, দুটো আলাদা ইস্যু, আমরা আমাদের মাছ ধরার রাইট ছাড়িনি।
    এক কথায় বললে এটা ওবামার পিভোট শুধু পাত্তা না পাওয়া নয়, এশিয়াতেই আমেরিকার পা ফেলার জায়গাও কেউ দিতে বা কোন যুদ্ধে জড়াতে কেউ রাজি না হওয়া। এমনকি নিউজিল্যান্ডও না। তবেঁ অষ্ট্রেলিয়া হা। কারণ সে ফেঁসে গেছে। গত ২০১৬ সালে আমেরিকা অষ্ট্রলিয়ায় এক সামরিক ঘাটি চালু করেছে। বোকারা ভেবেছিল তারা বিরাট আগায় থাকবে। এখন আমেরিকার সাথে বিশেষ বা ঘনিষ্ট সম্পর্কই হয়েছে কাল।
    এই ব্যর্থ পিভোটের পটভুমি যদি বিবেচনায় রাখি তাহলে, এখন ওবামার আমেরিকার এত বড় ব্যর্থতার পরও বাইডেন একই ফর্মুলা নিয়ে আবার েখন এসেছেন কেন? যারা কেউ পিভোটে যোগ দেয়নি তারা কেন আবার ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোভিডে যোগ দেবে সক্রিয় হবে বলে বাইডেনের আশাবাদের ভিত্তি কোথায়? তাহলে কিসের ভরসায় তিনি জি-৭ বা ন্যাটোকে দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিতে ও ঢোল বাজাতে এলেন? আর এটা আমেরিকার কোথায় ফেরত আসা? যুদ্ধের কোন শ্বশানে?
    চীনের সাথে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া বা দেয়া নিয়ে বিরোধ আছে, যাকে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ বলা হচ্ছে। কিন্তু সেটাকে ফয়সালার জন্য বাইডেন এটাকে একমাত্র যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েই সমাধান খুজতে হবে কেন?  আর এতে এশিয়ার দেশগুলো আমেরিকার পক্ষে যুদ্ধে যেতে পোলারাইজড হতে যাবে কেন? ইতোমধ্যেই এটি পরীক্ষিত যে তারা কেউ যাবে না এবং পিভোট প্রকল্প আজ মৃত!

    তা হলে এবার ইউরোপ অনেক সাড়া দিচ্ছে বা দিবে তা বাইডেনের মনে করবেন; সেটা কেন? খুব সম্ভবত এটা এক ‘সাদা’- শ্রেষ্ঠত্ববাদী [white Supremist] শঙ্কা ও তা থেকে ইউরোপের সাথে একাত্মবোধ।  এ ভয়টাই  বাইডেন ইউরোপে বিক্রি করেছেন। কথাটাকে প্রতীকীভাবে অনেক সময় বলা হয়, এশিয়া বা চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে শক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার মানে কী? মানে হল, হয়ত আমরা দেখব, গুলিস্তানের কামানের পাশ দিয়ে সাদা পশ্চিমা তরুণরা ক্লান্ত হলে ফাইল হাতে হেঁটে বেড়াচ্ছে, চাকরি খুঁজছে। ঠিক যেমন এখন আমেরিকার কুইন্সে বা পশ্চিমের কোন শহরের বাঙালি পাড়ায় আমরা ভিড় করি- কখনো চাকরি কখনো স্কলারশিপের লোভে! এ ভয়টাই বাইডেন ইউরোপে বিক্রি করেছেন সম্ভবত। যে চীনের গ্লোবাল নেতা হওয়া মানে  পশ্চিমের তরুণদের ফাইল বগলে করে এশিয়ার রাস্তায় ঘুরে ফেরা। এসব চিত্রকল্পের ইমেজ তুলে ধরলে ইউরোপের নেতাদের ভীতি দ্বিগুণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। হয়ত এভাবেই কিছু বলে তিনি নিজের পেছনে ইউরোপকে জড়ো করেছেন যে, দেখি না চীনের নেতা হয়ে যাওয়াকে ১০ বছর ঠেকিয়ে রাখতে পারি কি না!

    চিত্রকল্পগুলো একেবারেই অবাস্তব তাও অবশ্য নয়।  যেমন ইতোমধ্যেই পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফান্ডের সংকট আর হাহাকার ওদিকে বিপরীতে পালটা চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ পবার সম্ভাবনা এখন বাড়তি বা রাইজিং।

    বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)
    বাইডেন জি-৭ বৈঠকে শুধু চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি তুলেছেন তাই নয়, সাথে আরেক চালচুলাহীন কর্মসূচি চালুর ঘোষণা করেছেন। সেটার কথা বিনা তুলনায় বললে বুঝতে কষ্ট হবে। বলতে হবে এটা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগের [BRI] বিকল্প এক বাইডেন জোটের কর্মসূচি। এর নাম দেয়া হয়েছে- ‘বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)’। প্রথম তিনটি শব্দ ইংরেজি ‘B’ দিয়ে বলে B3 আর পরে ওয়ার্ল্ডের W। এ কারণে সংক্ষিপ্ত B3W। এক কথায় বললে,  বেল্ট-রোড ধরণের বিনিয়োগ অবকাঠামো গড়ার খাতের ঋণ বিতরণের উদ্যোগ, তবে এর ঋণের পরিমাণ বিশাল হতে হয়। কিন্তু B3W এর কি   বিশাল পরিমাণের ঋণ বিতরণের মুরোদ আছে?
    আমেরিকার এই দিন শেষের বেলায়? এখানে আমেরিকান বিনিয়োগ বলতে বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্মকালে যা চাঁদা / বিনিয়োগ আমেরিকা দিয়েছিল। একালে সেসব বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ আবার নতুন করেও হবে মনে হয় না। তবেঁ ইউএসএইডের [USAID] মত সরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে দ্বিপাক্ষিক বিতরণের অর্থ কমা-বাড়ার তাতপর্য তেমন নয় এর স্বল্প পরিমাণের কারণে।  আবার তুলনায় চীনের এমন এনজিও বা ইউএসএইড টাইপের উন্নয়ন এর চিন্তায় এখনও প্রবেশই করে নাই।  নট নেসেসারিলি আমেরিকার মতন (সামাজিক অবকাঠামোর ) উন্নয়নের শ্লোগান চীনকেও নিতে হবে। ফলে এখানে চীনের সাথে তুলনার সুযোগ এখনও নাই।  তবে B3W  প্রসঙ্গে  বাইডেন আশাবাদ রেখেছেন ব্যবসায়ীদের তারা মটিভেট করে এখানে বিনিয়োগে আনবেন!  বাণিজ্যিক বিনিয়োগকে (যার কাছে সুদ লোভনীয় হতেই হবে)  অবকাঠামো বিনিয়োগে (এর অর্থ প্রায় বিনা সুদে) নিয়ে আসাই কঠিন। তবু যেটুকু সম্ভব হয়েছিল তা জন্মের সময়ই, এককালে।  কিন্তু এমনিতেই  বেল্ট-রোডের বিনিয়োগ পরিমাণের দিক থেকে এত বড় যে তা বিশ্বব্যাংকই এর সাথে তুলনীয় নয়। তাই এটা কল্পকাহিনী হয়ে হাজির হবার সম্তুভাবনাই বেশি। তাই বাইডেনের পরামর্শকদের উচিত হবে সম্ভবত, বিশ্বব্যাংকের জন্য ফান্ড তুলতে ওর জন্মের সময় ওয়াল স্টিট পাড়ায় মিটিংয়ের পর মিটিং করে বাণিজ্যিক বিনিয়োগ কোম্পানিকে কি কী লোভ দেখিয়ে বুঝিয়ে রাজি করতে  কী কষ্ট করতে হয়েছিল তা স্মরণ করা।
    এবার এই প্রসঙ্গে চীন কিভাবে বেল্ট-রোডের ফান্ড যোগাড় করেছিল? চীন একালে বিপুল সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ। সেই সরকারি ফান্ডটাই পরে কোথায় কোথায় লাগানো যায় সেই বুদ্ধি করতেই প্রসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মাথায় কেউ বুদ্ধি দিয়েছিল বলেই তিনি ২০১৩ সাল থেকে বেল্ট-রোডের জন্ম দিয়েছিলেন। এখন একটা হল অনিশ্চিত আর ফকিরি চাঁদা তোলা এক ফান্ডমাত্র – সে কী করে চীনা সরকারি বিপুল সারপ্লাসের সাথে প্রতিযোগিতা করবে? আমেরিকার হাতে বিপুল সারপ্লাস সম্পদ সঞ্চিত হচ্ছে, সেই আমেরিকা কবেই মরে গেছে। সেই বুড়া বাঘকে এখন নয়া চাবুক দিয়ে চাবকালেই কি সে বাঘ তরুণ হয়ে চীনের সমতুল্য বা প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে? না সম্ভব? এগুলো কি স্বপ্ন কল্পনার গল্প দিয়ে পূরণ হওয়ার মতো কাজ? আর ওদিকে এমনিতেই অবকাঠামো বিনিয়োগে জাপানি ঋণের সুদের হার সবার চেয়ে বেশি ফলে এখানেও তা কমপিটিটিভ হওয়া মুশকিল!

    আবার মনে করিয়ে দেই। বেল্ট-রোডের বেলায় আমেরিকা বগলে ইন্ডিয়াকে নিয়ে প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল এটি নাকি ঋণগ্রহিতা
    রাষ্ট্রকে ঋণগ্রস্ত করে দিয়ে সে দেশের সম্পদের মালিকানা চীনের নিয়ে নেয়ার ব্যবসা। তা হলে এখন বাইডেন B3W করতে চাচ্ছেন কেন? একই ঋণব্যবসা করতে? এর জবাব কী দেবেন বাইডেন?

    আরেকটা লেটেস্ট তথ্য হল, এদিকে আফ্রিকায় চীনা এমন বিনিয়োগ নিয়ে যারা এতদিন প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল তাদের আজকাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এক নয়া সার্ভে রিপোর্টে যা ছাপা হয়েছে জাপানি ফান্ডেড মিডিয়া ডিপ্লোম্যাটে আফ্রিকায় চীনা সাকসেস নিয়ে গবেষণা রিপোর্ট বের হয়েছে। সেখানে শিরোনামে সারকথাটা হল, New research shows Chinese loans provide a significant boost ।

    শেষ কথা হল, বাস্তব বিনিয়োগ আর গল্প আসলে এক কথা নয়। ‘ট্যাকার মুরোদ’ থাকা লাগে চাচা!

    [অসমাপ্ত, বাকি কথা পরের আরেক শেষ পর্বে]
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “বাইডেনের ন্যাটো-যুদ্ধের খরচ দেবে কে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলোর এমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা বুঝবার তরিকা

    প্রথম আলোর এমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা বুঝবার তরিকা

    গৌতম দাস

    ১৯ মে ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3y8

    সোমবার ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে বৈঠকে টিকা নিয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ছবি: পিআইডি

     

    “গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার” – এই শিরোনামে আমি আমার গত লেখায় – “এম্পায়ার” [empire] বলে একটা ধারণা এনেছিলাম। পাঠকের বুঝাবুঝিতে তা ছুতে কতদুর পেরেছি জানি না। তবে ধারণাটা গুরুত্বপুর্ণ। বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকে আমি আমার প্রায় সব লেখাতেই “গ্লোবাল নেতা” বলে একটা ধারণা ব্যবহার করেছি। তা বুঝাতে কখনও “গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা” বা কখনও “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা” বলে শব্দ ব্যবহার করেছি। “গ্লোবাল এম্পায়ার” ধারণাটা সেই সংশ্লিষ্ট তবে আরেক অফসুট ধারণা।

    নিউইয়র্ক থেকে পাঠানো প্রথম আলো গত পরশু একটা রিপোর্ট ছেপেছে শিরোনাম, “টিকা কূটনীতিতে পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র”। আসেন একটু সে খবর পাঠ করতেও শিখি।

    রিপোর্ট শুরুতেই কয়েকটা বাক্য লিখেছে, “টিকায় সহযোগিতার মাধ্যমে রাশিয়া ও চীন আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে টিকা সরবরাহ নিয়ে মার্কিন সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফলে কূটনৈতিক মহলে হতাশা বিরাজ করছে।
    ৪৮টির বেশি দেশ টিকা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি আবেদন জানিয়েছে। বাইডেন প্রশাসন কীভাবে টিকা সরবরাহ করবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি”।

    আসলে এটাই সাত কথার এক কথা যে আমেরিকা আর “গ্লোবাল এম্পায়ার” নাই, ঢলে পড়ছে। মূলত সেকারণেই কারও টিকার চাহিদা মিটানোতে দান-অনুদান দেয়া দূরে থাক একটা সেন্টাল ম্যানেজমেন্টে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর টিকা পাবার ব্যবস্থা করার মুরোদও বাইডেনের নাই, তাই তিনি লেস বা নট ইন্টারেস্টেড।  এখন উলটা করে বললে, এই সেন্টাল ম্যানেজমেন্টে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর টিকা পাবার ব্যবস্থা করার মুরোদ যার থাকে সেই ঐকালের ‘গ্লোবাল এম্পায়ার’। অর্থাৎ মূলত এক গ্লোবাল বাণিজ্য (বাণিজ্য মানেই সেই সুত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, স্ট্রাটেজিক সবকিছু) ব্যবস্থাপনার যিনি নেতা তারই বেনোভোলেন্ট (গরীব প্রজা দেখেশুনে রাখার মত) বা লিল্লাহ-দাতব্য কাজ এগুলো। এটাকেই আমি বলেছি, ইতিবাচক এম্পায়ার ভুমিকা।

    আরেকটা উদাহরণ দেই। গত পরশু ঢাকার আমেরিকান রাষ্টদুত আমাদের প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুতে অ্যামেরিকার যা বার্ষিক চাঁদাদান করার কথা সেই প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের ফরেন মিনিস্ট্রির ফেসবুক পেজ থেকে জানা যাচ্ছে রাষ্ট্রদুত মিলার জানিয়েছেন্‌, “He also informed that the US Government is exploring the possibilities to produce US vaccines in Bangladeshi pharmaceutical companies”.

    নিঃসন্দেহে খুবই ক্যালকুলেটিভ কথাবার্তা। মানে আমেরিকান প্রাইভেট টিকা উতপাদক কোম্পানির সাথে ্কথা বলে দেখবেন, বাংলাদেশে টিকা উতপাদন নিয়ে কথা বলায় দেয়া যায় কিনা। আবার আসলে ঠিক সেটাও না বরং এর সম্ভাবনা যাচাই করে দেখবেন তিনি।

    যদিও এখানে বলে রাখা ভাল আমেরিকান টিকা – এদের দাম ২০ থেকে ৩৩ ডলারের মধ্যে। আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা (-১৫) থেকে (-৮০) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। যেখানে গরিব গোত্রের টিকাগুলোর প্রায় সবই ৪ ডলারের নিচে আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। ফলে যেখানে নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা বিচারে বাংলাদেশে টিকা বিতরণ করতে হবে বিনা পয়সায় সেখানে ৪ ডলারের উপর প্রতিটা ডলারের মুল্যের পীড়ন সইতে সরকারের অবস্থা খারাপ হবে তা বলাই বাহুল্য। আর ঐ তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণ যখন দেশের তাপমাত্রা এখন ৪০ ডিগ্রী ছুতে চায় তখন ঐ টিকা বহন করে গ্রাম-মফস্বলে ঘুরে বেড়ানো এটা প্রায় অবাস্তব।

    তবু এটাকে একটা বিরাট সম্ভাবনা যেন এই ভাব ধরে মিলারের ঐদুই কথা নিয়ে প্রথম আলো একটা রিপোর্ট করেছে, “যুক্তরাষ্ট্রের টিকা নিয়ে ‘দু–এক দিনের মধ্যে’ জবাব আসছে”। অর্থাত যেন এই এলো বলে আর চিন্তা নাই। অথচ টিকা আসবে না, কথা আগানো সম্ভব কিনা সেই খবর আসবে।

    গত প্রায় ১৫ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমেরিকান ফরেন পলিসির এজেন্ট অবস্থান নিয়ে চলতে চাইছে প্রথম আলো।  এখন কেউ এমন নিতে চাইলে আর আমাদের কী করার আছে। ফলে টিকা ইস্যুতে প্রথম আলোর এমন অবস্থান হয়ত অসংগত না, হবেই। কিন্তু নিশ্চয় জবরদস্তিতে আমেরিকাকে একটা বিকল্প উতস বলে চালায় দেয়া এটা কোন কাজের কথা নয়। যা সম্ভব নয়, অবাস্তব এবং আমেরিকাও ইঙ্গিত দিচ্ছে না আগ্রহী নয় তা নিয়ে আগাম আশাবাদ তৈরি করা কী ঠিক! এই বিবেচনাবোধের অভাব লক্ষ্য করছি যেন এখানে আমরা।

    এখন কথা আসলে আরেকটু আগায়ে যেতে পারি আমরা।
    প্রথম আলোর নিউইয়র্কের রিপোর্টারের সিদ্ধান্ত হল, “আমেরিকা টিকা কূটনীতিতেই পিছিয়ে” পড়েছে। মানে আর  তারা এম্পায়ার নাই। লিখেছে, “শুধু বাংলাদেশই না আরো প্রায় ৪৮ টা রাষ্ট্রের অবস্থা এরকম যাদের আমেরিকা হতাশ করেছে”।  বলেছে, যেখানে “রাশিয়া ও চীন আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে”।

    এই কথাগুলো বুঝবার জন্য যথেষ্ট যদি আপনি মানে করতে জানেন। এগুলোই আসলে গ্লোবাল এম্পায়ার ভুমিকা কী তা নিয়ে কথা বলা। এদিকে যেমন আমরা আমেরিকার গ্লোবাল অযোগ্যতা অপারগতা তৈরি হতে ও হেরে যেতে দেখছি। আর  পালটা চীন যে (এটা কেবল টিকা উতপাদনের ক্ষেত্রে) রাশিয়াকে সাথে নিয়ে গ্লোবাল এম্পায়ার ভুমিকায় তৈরি হওয়া গ্যাপটা পূরণ করতে ধেয়ে আসছে, নিজেকে তৈরি করে নিয়ে – এই হল গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল।

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল মানেই তাই গ্লোবাল এম্পায়ারের ভুমিকাতেও পালাবদল ঘটে যাওয়া। একদিকে ক্রমশ অপারগ আমেরিকা আর অন্যদিকে উত্থিত ও তৈরি চীন, এই ফেনোমেনা।

    এখানে প্রথম আলো চীন না আমেরিকা কাকে পছন্দ করে এটা সেই বিষয়ই না একেবারেই। বরং যে যোগ্য মুরোদ আছে সেই উঠে আসতেছে, এটাই অবজেকটিভ ঘটনা।

    অর্থাৎ প্রথম আলো আমেরিকান এজেন্সি নিবে কেন কারণ সে তাকে ভালবাসে। অর্থাৎ বুদ্ধি খাটিয়ে বুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত না এটা। একটা অবজেকটিভ ফেনমেনাকে আমল করে নেয়া নয়।কর্তা হিসাবে তার ভাল লেগেছে তাই।

    এমনকি নিউইয়র্কের ইর্বাহীম চৌধুরি যা বুঝে খবরটা দিয়েছেন। পরিস্কার করে বলছেন যে আমেরিকা “টিকা কূটনীতিতেই” নাই। এই টিকা কূটনীতি এটা যদিও ভুল শব্দ। কিন্তু এরই আসল অর্থ হল, গ্লোবাল এম্পায়রের ভুমিকা পালন করে যাওয়ার মুরোদ। ইর্বাহীম বাস্তবতা দেখে যে রায় দিচ্ছে  প্রথম আলোই সেই রিপোর্ট ছেপে দিচ্ছে কিন্তু নিজেই এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে পারছে না। এই হল প্রথম আলোর বুঝার মুরোদের সমস্যা বা শর্টেজ। এজন্যই আমেরিকা সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত ভালবাসা দিয়ে, বুদ্ধি-চিন্তার যেখানে ভুমিকা নাই।
    অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়ার বুঝলে অনেক কিছু বুঝা সহজ হয়ে যায়।

    আর এখানেই পরিস্কার কেন চীনা টিকা আমাদের গন্তব্য হয়ে যাচ্ছে।  আমাদের দেশে টিকা উতপাদনের ব্যবস্থা করে দেয়া চীনের জন্য  সেটা বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি সহ সব অর্থেই – এই ভুমিকা নেওয়ার জন্য সে তৈরি। এজন্য চীন আসন্ন গ্লোবাল এম্পায়ার!

  • মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    গৌতম দাস

    ০৪ মে ২০২১, ০০:০৩ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3we

     

    ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল যার মধ্যে আবার দুই রাজ্য হল আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ, যারা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব আর পশ্চিম সীমানাজুড়ে। এর মানে হল গত পুরা মে মাসে আমাদের হিন্দুত্বের প্রবল প্রপাগান্ডার ভেতরে বসবাস করতে হয়েছিল। তবে এই নির্বাচন শেষে গণনা ও সব ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, পাঁচ রাজ্যের একই সাথে ২ মে সকাল থেকে। যা এখন প্রায় সব রাজ্যে রাজ্যের পুর্ণফল প্রকাশিত।
    আর  গতকাল ২মে দুপুর তিনটা নাগাদ পরিস্কার হয়ে যায় যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতাসীন তৃণমুল কংগ্রেস দল মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে এককভাবে দুশ-এর বেশি আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরতেছে।  সর্বশেষ সোমবার রাত সাড়ে সাতটায়, তৃণমূল ২১৩ আর বিজেপি ৭৭ আসন এভাবে আনন্দবাজার ফলাফল দেখাচ্ছে। এদিকে মমতার নিজের নন্দীগ্রাম আসনে তিনি হেরেছেন বলা হচ্ছে। যা তিনি আপাতত মেনে নিয়েছেন তবে আপত্তিসহ এবং তিনি সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত যাবেন সে হুশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে মমতা আজ সন্ধ্যায়  বলছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আগামি বুধবার শপথ নেবেন। রাজ্যের প্রাদেশিক সংসদ মানে বিধানসভায় বিজয়ী সদস্য না হলেও ছয় মাস পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা যায় অস্থায়ীভিত্তিতে। আর যেখানে ঐ ছয়মাসের মধ্যে কোন আসন খালি হলে (মানে  দলের কাউকে পদত্যাগ করিয়ে খালি করে নিয়ে) সেই উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এলেই স্থায়ী ও রেগুলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়।
    ওদিকে ৩মে বিকাল পাঁচটায় খবর ছিল, মমতা সাংবাদিক বক্তৃতায় জানিয়েছেন মোট বিজয়ী আসন হতে যাচ্ছে সম্ভবত ২২১। মানে এমন আসন সংখ্যা বা এর কাছাকাছি দেখতে চাওয়া মমতার অনুমান।

    এই ফলাফলের তাতপর্যঃ
    আমাদের সাধারণ মন্তব্য এককথায় বললে সেটা হবেঃ  সারা ভারত না হোক, এটা হল – অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় এবং আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্বকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাবলিক প্রত্যাখ্যান।  কিন্তু কেন এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেছে, যা হওয়াই স্বাভাবিক। কলকাতার আনন্দবাজার এমনই একটা ভারতীয় বিশ্লেষণ তুলে এনেছে দেখা যাচ্ছে  যা ঠিক তার নিজের নয় তবে সংগৃহীত। নিচে সেটাই এখানে হবহু তুলে  দিচ্ছিঃ
    তৃণমুল দলের “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের [এখন পর্যন্ত যা প্রায় ৪৮%] হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে। বিজেপি যখন রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচার চালাচ্ছে, মমতা তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করে ফেলেছেন বলেই বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তা না হলে এই জয় এবং ভোট শতাংশ তৃণমূলের ঝুলিতে আসা সম্ভব নয় বলেই তাঁদের ধারণা। কারণ, তৃণমূলের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট শতাংশপ্রাপ্তি এ বারই”।

    এখানে বিশ্লেষক বলতে যারা বুথফেরত ভোটারদের সাথে কথা বলে একটা জরিপকাজ সমাপ্ত করে থাকেন আর সেই ফলাফলের বিশ্লেষণ হাজির করেন – এনিয়ে তারা পেশাদার কাজ করেন। উপরে তাদের সারকথা হল, মমতার দল কেবল তার রেগুলার সমর্থক ভোটারদেরই ভোট পান নাই। সেটা ছাপিয়েও তিনি অবশ্যই যারা বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের ভোটার এদের অনেকেরও ভোট পেয়েছেন।  কেন পেলেন আর কেন তারা এমন কথা বলছেন কিসের ভিত্তিতে? কারণ তাদের ভিত্তি হল, এমনটা হয়েছে বলেই মমতার দল  এত ভোট (এখনই এটা প্রায় ৪৮% যা গণনার শেষপর্যন্ত ৫০% এর কাছে যাবে বলে অনুমান ) ও আসন পেয়েছেন।

    অনেকে জানেন শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই  মোট মুসলমান ভোটার প্রায় ২৭-২৮% হয়ে থাকে। আর এর মধ্যের আবার  বড় অংশটাই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে তৃণমুল একাই পেয়ে আসছে। তাহলে  মমতার দলের বাক্সে এখনকার সম্ভাব্য  মোট ৫০% ভোটপ্রাপ্তি হতে যাচ্ছে একথার  মানে হল –  মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের ভোট ছাড়াও প্রায় সব ধর্মের সমান সংখ্যক সমর্থক ভোটারদের ভোটও মমতার দল যোগাড় করতে এবার সক্ষম হয়েছে।  আর এতেই  মমতা ও তার দল হল পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম নির্বিশেষে সেই প্রতীক যারা একটা কমন ধারা, তৃণমুল দলে ভিতর “যাদের ইচ্ছা” সমবেত হয়ে – এমন একটা “মেজরিটি ম্যান্ডেট” তৈরি করেছে। আর মমতা হলেন যে ম্যান্ডেটের বাহক নেতা। তাহলে কী কারণে মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের বাইরের ভোটারদেরও টানতে পারলেন?

    অন্যদিকে আরও প্রশ্ন, তাহলে তৃণমুলের নিজে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঠিক কাদেরকে  প্রত্যাখান করলেন? আর কীইবা এই বিজয়ের তাতপর্য?

    ঠিক অখন্ড ভারত না,  আজকের রাজনৈতিক ইন্ডিয়া, এই রাষ্ট্র ২৮ রাজ্যের সমাহার।  কালচারাল দিক থেকে বললে ভারতের মেজরিটি বা ৮০ ভাগ নাগরিক সনাতন ধর্ম অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু তবুও কোন একক “দেবতার” (মানে সবাই একই দেবতার) অনুসারি-পুজারি তারা নয়। বরং রাজ্য-ভিত্তিতে দেখা যায় তাদের  একেক আঞ্চলের আলাদা ‘প্রধান দেবতার পুজার” প্রচলন আছে। এমনকি সেই দেবতার পুজা উতসবকে ঘিরেই আলাদা আলাদা বার্ষিক প্রধান ধর্মীয় উতসব ঐ রাজ্যে পালিত হয়।  অর্থাৎ কলকাতার মত সব রাজ্যে বা সবার প্রধান উতসব ‘দুর্গাপুজা” নয়। কিন্তু এটার সুবিধা-অসুবিধা কী? এটা নিয়ে কথা বলছি কেন?
    কারণ আর কারোই তেমন কোন অসুবিধা না হলেও,  আরএসএস- বিজেপির এতে বিরাট অসুবিধা। কেন? কারণ এরা  যারা রাজনৈতিক এক “হিন্দুত্ব নির্মাণ” করতে চায়, এজেন্ডা নিয়েছে  এবং “হিন্দুত্বের এক জাতিরাষ্ট্র” খাড়া করা ইমাজিন করে; এই নামে ভারতীয়দের সকলকে বাধতে চায় তাদের এমন ২৭ রকম রাজ্য বা  হিন্দুত্ব হলে চলে না।

    তাদের দরকার একটাই রকমের হিন্দুত্ব, প্রাকটিস। তাই আরএসএস- বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি ও ব্যাখ্যা হল, ভারতের উত্তরের ওপারে (কথিত আছে ইউরোপ বা জার্মান এরিয়ান থেকে আসা ধারা) সেখান থেকে এসেছে সেই এরিয়ান রেস যা ভারতের আর্য প্রজাতি বলে দাবি করে তারা। আর এমন দাবি করলে সুবিধা হল তাতে সবাই একই উৎসের বলে এই অজুহাতে সকলকে এক সুতায় বাধা যায়, সহজেই। যদিও এই ভারতেই আবার মোট তেত্রিশ কোটি দেবতার বয়ানও বিদ্যমান। আর বড় কঠিন বাস্তবতা হল,  আলাদা আলাদা রাজ্যে প্রধান উতসবের ভিন্নতা – এসবই  আরএসএস- বিজেপি র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পক্ষে মানে কোন একক হিন্দুত্ব তৈরির পক্ষে সায় দেয় না।  যেখানে এমনকি কালচারালি ভাষার ভিন্নতায় প্রত্যেক রাজ্য ভিন্ন। সেটা তো বটেই এছাড়া আবার যেমন কালচারাল  গান-নাচের বৈশিষ্ঠে তা  মৌলিকভাবেই আলাদা আলাদা ঘরানার। একেবারে বাদ্যযন্ত্রগুলোই আলাদা, রাগ আলাদা স্ব স্ব বৈশিষ্ঠের মহিমায় মহিমান্বিত। যা স্বভাবতই  কোন রাজ্য পরশি কারও তারা অস্বীকার বা অভারল্যাপ হওয়া বা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সেনসেটিভ।  এককথায় তারা আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ঠে ভরপুর এবং সেদিক থেকেই আলাদা। আর তাতে অন্তত কম করে হলেও মূল তিনটা ভাগে যা ভাগ করা যায়।

    কিন্তু  অন্যদের উপরে উত্তরভারত কেন্দ্রিক আর্য চিন্তাচর্চার জীবন ধারার প্রভাব  প্রাচীনকালে অখন্ড ভারতের আমল থেকে এই উত্তরের  অগ্রযাত্রা ছেয়ে বসলেও ভারতেরই   দুঅঞ্চলে বা জায়গায় প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। যে প্রতিরোধ সে আর পাড় হতে পারে নাই। এক হল দাক্ষিণার্তে [Decan] “দ্রাবিড়ীয়” [Dravidian] প্রতিরোধ আর এদিকে তাদেরই আরেক ধারার মারাঠা-বিহার পেরিয়ে আরো পুবে “বাংলার” প্রবেশমুখে প্রতিরোধ। এি প্রতিরোধ টিকে যাওয়া তাদের আগে থেকে চলে আসা  ভিন্নতার রূপবৈশিষ্ঠের ছাপটাই তাই প্রবল্ভাবে এখনও গান-নাচের ক্লাসিকাল চর্চাতেও স্পষ্ট। ভাষা তো আছেই। কিন্তু এসব ন্যাচারাল হিস্টোরিক্যাল অমিল-বেমিলগুলোকেই আরএসএস- বিজেপি  জবরদস্তিতে অস্বীকার করে এক দাবি করতে চায়, এক বলে দেখাতে চায়। আসলে চায় কথিত এক আর্য-চিন্তা (যা আসলে আরএসএস- বিজেপি এর) এরই আধিপত্য।

    দুনিয়ার সব (ভিতরে ভিতরে বা বাইরেও) জাতিবাদী বা জাতি-রাষ্ট্রবাদীরাই এই একই ভুল করে। এমন পথেই যায়। তারা সবাইকে এক ভাষায় কথা বলাতে চায়, নয়ত একই কালচারে বা একই ধর্মে বা একই দেবতায়। তাদের একেবারেই ভিত্তিহীন কিন্তু তবু দৃঢ় বিশ্বাস এভাবেই মানুষকে নাকি কেবল এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায় – এক জাতি-রাষ্ট্রে। অথচ দেখা যায় এর বিপরীতে আমেরিকার বয়স আড়াইশ বছর আর সে জাতি-রাষ্টর  নয়।  বরং এটাই এক প্রথম ও সবল এক ফেডারল রাষ্ট্র। যা পঞ্চাশটা বড় বড় সাইজের রাষ্ট্রের ভিন্নতার সমাহার। কাজেই আগের সব জাতি-রাষ্ট্র পরিশেষে যেমন ফেল করেছে ভেঙ্গে গিয়েছে ; আরএসএস- বিজেপি র একই আর্য-হিন্দুত্বে (রামকে প্রতীক করে) এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এটাও প্রত্যাখ্যাত হবে। প্রায় কাছাকাছি সমস্যা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের। যখন ১৯৯২ সালে ভেঙ্গে ১৫ টুকরা হল তাতে বুঝা গেল কী জবরদস্তি না চলেছিল। যেমন একটা জবরদস্তি হল, সবাইকে রুশ ভাষা শিখানো।

    এমনিতেই বেশীরভাগ  দেশি-বিদেশি মানুষ আরএসএস- বিজেপির  এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এমন প্রজেক্টের কথা জানে না, ধরতেই পারে না।  বিজেপি তাদের চোখে এক আম রাজনৈতিক দলই মনে হয় তাদের কাছে। কলকাতায় কংগ্রেস বা নানা ধরণের বাম যখন একে একে ভেসে গেছে আর একই সাথে আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনায় প্রবল অর্থ ও রিসোর্স খরচ করে হিন্দুত্বের রাজনীতি সব ছেয়ে ফেলতে সে যখন মরিয়া – এমন সব রাজনীতিকেই এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিনে রুখে দিয়েছেন একা মমতা।  কেন একা মমতা বলছি? কারণ মমতার বিশ্বস্ত কমরেডদেরকে যখন বিজেপি প্রলোভন দেখিয়ে কেড়ে নিয়ে গেছে ফলে তৃণমুল – সেই দল মানে আক্ষরিক অর্থেই একা মমতা হয়ে গেছে।  একটা তথ্য দেখেন অনেক অর্থ তাতপর্য বুঝা যাবে তাতে। এই নির্বাচনে এবার একা মোদী এক মাসেই ২২ বার এসে জনসভা করেছেন।  মানে প্রায় প্রতিদিন একটার কিছু কম। এথেকে বুঝা যায় কলকাতার এই নির্বাচন মোদী ওতার দলের কাছে কী! সেই নির্বাচনে মমতা এদের সবাইকে পরাজিত করে দিয়েছেন।
    কিন্তু প্রশ্ন হল, মমতা তাহলে তিনি হারালেন কাকে? তিনি হারিয়েছেন উতখাত ও প্রত্যাখান করেছেন – মূলত আরএসএস- বিজেপিকে সাথে তাদের যে হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা আছে সেটাকেও। যেটা গত সাত বছরে ক্রমশ ধেয়ে আসছিল, ছেয়ে বসছিল। কোথাও তেমন কোন শক্ত প্রতিরোধ কেউ তৈরি করতে পারে নাই।  এমনকি দ্রাবিড়িয় এলাকায় অন্তত কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি থাকার চেষ্টা করে গেছিল। এজন্যই এটা শ্রেফ একটা তৃণমুল দলের না, একজন মমতার বিজয় নয়। এটা ভারত রাষ্ট্রকে হিন্দুত্বের নামে হিটলারের মত এক তান্ডবের হাত থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করা।

    যারা মমতার তিন তারিখে বিকেলের কালিঘাটে তার বাড়ির পাশের সাংবাদিক সম্মেলন দেখেছেন (ফেসবুকে ক্লিপে দেখেছি আমি) তারা খেয়াল করবেন মমতাও এবিষয়ে সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই বিজয় ভারতের জনগণকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কী থেকে? এক উদগ্র হিন্দুত্ব, এক হিন্দুত্বের রাষ্ট্র, সবাই একই এক  টাইট  ইউনিফর্ম-এ – এমনই কিন্তু নতুন করে আরেক নীলচোখের আরিয়ান উগ্র জাতিবাদ, আরেক জার্মান হিটলারের উত্থান হতে চাচ্ছে যেন ! – এসব কিছু থেকে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, মমতা তাই এই জনগণকে বারবার সালাম আর থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলেন। বিপরীতে মমতা বলতে চাচ্ছিলেন সবাইকে একই রকম হিন্দু [আরএসএস- বিজেপির হিন্দু] হতে হবে কেন?

    অথচ ভিন্নতার ঐক্যের হিন্দু হলে অসুবিধা কী? সবাইকে ইউনিফর্ম হিন্দু হতে হবে কেন?  আর জবরদস্তি কেন? এছাড়া হিন্দু ছাড়াও তো অন্যধর্মের নাগরিক আছে, অনেক হিন্দু আরএসএস- বিজেপির হিন্দু নাও হতে চাইতে পারেন, এমনকি কোন রাজনৈতিক হিন্দু হতেই নাও চাইতে পারেন! তারা কোথায় যাবে? অথচ সকলকে নিয়েই এক রাজনৈতিক সাম্যে –  এমন বৈচিত্রগুলোর ঐক্যের এক ভারতীয় নাগরিক হলে হতে চাইলে পারবে না কেন?

    রাজনৈতিক সাম্য মানে নাগরিক হিসাবে সবাই সমান, সম অধিকারে সমান। ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, গায়ের রং, সমতলি-পাহাড়ি সব ধরণের পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিক্কারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে হবে রাষ্ট্রকে। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের বিপরীতে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। সব ভিন্নতাগুলোর ঐক্য গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি।

    এদিকে কোভিড সমস্যা মোকাবিলা করতে গয়ে মোদী প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা, এই পটভুমিতে ভারতকে নতুন দিশা আর ঐক্যের পথ দেখানোর সুযোগ ……

    এসব দিকগুলাই হল, তৃণমুলের টানা তৃতীয় বা এবারের বিজয়ের গভীর তাতপর্য।

    গৌতম দাস
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ০৪ মে ২০২১

  • বাইডেন আফগানিস্তান ছাড়ছেন না দুনিয়াকে শাসন

    বাইডেন আফগানিস্তান ছাড়ছেন না দুনিয়াকে শাসন

    গৌতম দাস

    ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3uR

    America’s Slow-Motion Failure in Afghanistan – FOREIGN AFFAIRS

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন হল, হিটলারের উত্থান ও দমনের পর থেকে রেসিয়াল [race or racial] জাতের গর্ব দেখানো, কাউকে রেসিয়ালি অন্যের সাথে তুলনা করা, উঁচা-নিচা দেখানো ইত্যাদি সবই মারাত্মক অপরাধ-কাজ বলে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তবু  ছোট গ্রুপের চর্চায় ফাঁকে-ফোকড়ে এখনো এসব বিষয় উঠে আসতে ও থাকতে দেখা যায়। যদিও  লিখিত অক্ষরে বা প্রকাশ্যে তা আর চর্চা তেমন করা হয় না, তবে প্রমাণ না থুয়ে কানে কানে চর্চাই পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বেশকিছু ব্যতিক্রম, আইন-নিয়ম ভাঙ্গা ট্রাম্পের গত চার বছরের প্রশাসনের আমলে আমরা খোদ আমেরিকাতেই ঘটতেও দেখেছি । সেটাই প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রশাসন যা যতটা সম্ভব প্রকাশ্যে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” ও রেসিয়াল বা বর্ণবাদী  রাজনৈতিক ধারাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গেছে। সেটি অনেক কাছ থেকেই আমরা দেখেছি। বিশেষ করে ৬ জানুয়ারি ২০২১ যা JAN6 capitol hill riot  নামে পরিচিত সেদিনের অপতরতা-ঘটনা ইতিহাসে লেখা হয়ে গেছে ও থাকবে। কিন্তু সেসব সাদা-কালো অথবা জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদের কথা এখানে এখন কেন? মূল কথা হল, জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা ব্যাপারটা কেন খারাপ ও অন্যায়-অপরাধ সে সবই এখন গ্লোবজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের এই সময় যারা হেরে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন তাদের কারো কারো মধ্যে ওই হার স্বীকার না করে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা” আঁকড়ে ধরে আবার উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা ও বৃথা চেষ্টা করার ঝোঁক বর্তমান থাকতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটাও তো প্রবল বেড়েছিল ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ কয়েক মাসে যা শেষ হয়ে এখন বাইডেনের ক্ষমতায় আসা তিন মাস পার হওয়ার পর ক্রমে বাইডেনের পাকাপোক্ত হয়ে বসার সাথে সাথে ওসব সাদা-বাদী ঝোঁক তো আপাতত শীতল হয়ে গেছে বা যাচ্ছিল! তাহলে আবার হঠাৎ পুরান অভিযোগ কেন?

    একমাত্র কমন শব্দের শিরোনাম – উইথড্রলঃ
    গত ১৩ এপ্রিল সারা পশ্চিমা মিডিয়ার মূল শিরোনামে একমাত্র শব্দ ছিল, উইথড্রল [Withdrawal] বা সেনা প্রত্যাহার। অর্থাত কমন শিরোনামটা প্রায় এরকম যে,  “বাইডেনকে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে আসতে হবে” [Biden to Complete Full Afghanistan Withdrawal by Sept. 11]।’ লন্ডন ইকোনমিস্ট  প্রিন্টেড পত্রিকায় অনেক রিপোর্টের শিরোনাম পরবর্তিতে অনলাইন ভার্সানে বদলে দেয়া হয়ে থাকে, তবে দুটা শিরোনামের রেফারেন্সই থাকে। আর প্রিন্টেডের শিরোনামটা খুবই ছোট রাখা হয়। ওর এক অনলাইন শিরোনাম করেছে, বাইডেন আফগান যুদ্ধে তার দুর্বল বন্ধু ফেলে পালিয়ে আসছেন”, [Joe Biden gives up on the war in Afghanistan, leaving a weak ally]। আর সাথে আরেকটা ছোট শিরোনামও আছে, সেটি বলছে, “চিরদিনের জন্য যুদ্ধ শেষ করে” [Ending the forever war]।  কিন্তু এমন করে কথাটা লিখছে কেন? কারণ, এই ছোট অংশটাই বাইডেনের উচ্চারিত কোট-আনকোট কয়েকটা হুবহু শব্দ।

    কিন্তু, এর মানে কি আমেরিকা আর কখনো যুদ্ধে যাবে না? তাই কি বুঝাচ্ছে? কিন্তু এর আগে ট্রাম্পও তার ক্ষমতায় আসার প্রথম বছর (২০১৭) থেকেই তো প্রায় একই সেনা প্রত্যাহারের কথা বলে আসছিল। সেটা বাস্তবায়ন হলে এতদিনে ট্রাম্পেরই তো  সব ফেলে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসার কথা! কিন্তু তখন তো ইকোনমিস্ট এমন শিরোনাম করেনি? এবার করছে কেন? তার মানে কী ট্রাম্পকে পাগল ভেবেছিল, সিরিয়াসলি নেয় নাই? এখন তাই তো মনে হচ্ছে! আবার এমন কি কেবল ইকোনমিস্ট পত্রিকাই শিরোনাম ও রিপোর্টে করছে? না তা একেবারেই না। আমেরিকা-ইউরোপ মিলিয়ে সারা পশ্চিমের সব লিডিং পত্রিকার টোনই প্রায় একই, এই ইকোনমিস্টের মতনই।

    যেমন আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’ শিরোনাম করেছে, বাইডেনের “আফগানিস্তান ছেড়ে আসা কি বিপথগামিতা না অনেক আগেরই বকেয়া?’ [Is Leaving Afghanistan Misguided or Overdue?] তখন ওয়াশিংটন পোস্ট আবার আরো কড়াভাষায় লিখছে, “আমেরিকান-মিথ্যা-গর্বের এক কবরে পরিণত হয়েছে আফগানিস্তান” [“Afghanistan became the graveyard of American hubris“]। ওদিকে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, “আমেরিকা আফগান সেনা প্রত্যাহারের পরে কী করে দূর থেকে আবার কোনো যুদ্ধ করার পরিকল্পনা আঁটতে পারবে” [How the U.S. Plans to Fight From Afar After Troops Exit Afghanistan“]।  মানে বলতে চাচ্ছে এরপরে আফগান ছেড়ে দূরে বসে আমেরিকা হয়ত ড্রোন ছুড়ে কিভাবে আফগান সামলাবে কী করে?

    এছাড়া আরেকটা দিক হল, পশ্চিমা  প্রত্যেকটা মিডিয়ায় গত দু-তিন দিনের মধ্যে এই একই প্রত্যাহার ইস্যুতে আট-দশটা পর্যন্ত আর্টিকেল ইতোমধ্যে ছাপা হয়েছে। আর বলাই বাহুল্য, প্রতিটা লেখাতেই  যে সুর তা হল – পশ্চিমা মন ভারাক্রান্ত, হতাশ, তাদের সব হারিয়ে গেছে এমন সুর ও টোনে লেখা। এব্যাপারে সবার চেয়ে আগিয়ে সম্ভবত লন্ডন ইকোনমিস্ট। ইংরাজি এক্সোডাস [EXODUS]  যার আক্ষরিক অর্থ দেশান্তরি হওয়া বা, ছেড়ে পালানো। আর, ইহুদী ধর্মতত্বীয় ভাষ্য অনুসারে অশুভ মনে করে টের পেয়ে সটকে পড়া। এমনিতেই ইহুদী ধর্মতত্বীয় গল্পের ভাষ্যগুলো মিথ-গল্পে ঠাসা। তাদের সৃষ্টিতত্ব বিষয়ক মিথিক্যাল [Myth-ical] গল্প সব এই দেশান্তর বা ইক্সোডাস ধরণের। তার ৪১ নম্বর গল্পটা যিশুর পিতা জোসেফের মিসরের এক ফারাওয়ের স্বপ্নের অর্থ ব্যাখ্যা করা বিষয়ক যার সফলতাতে জোসেফ দাসজীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিল। সাপ্তাহিক তার এর রিপোর্টের শিরোনাম করেছে “Exodus, chapter 41 – Can Joe Biden get America out of the Middle East”।

    এখন সোজা মূল পয়েন্টে এসে বললে, কথা হল – সারা পশ্চিমের মনে ভয় ঢুকেছে, হতাশা পেয়ে বসেছে যে, আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে (মে-সেপ্টেম্বর ২০২১ এর মধ্যে ) ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত এটা কী কোন আরো বৃহত্তর (পরাজয় বা কোন দেশান্তরি) ঘটনার ইঙ্গিত! সৃষ্টিতত্ব বা Genesis! কোন এক্সোডাস বা দেশান্তরির মত ইঙ্গিত? যে এটা আসলে গত প্রায় পাঁচশ বছর সাদা চামড়া বা সুপ্রিমিস্টদের দুনিয়ার উপর তাদের যে শাসন (মানে কলোনি ও লুন্ঠন) চালিয়ে এসেছে এবার এরই সমাপ্তির ইঙ্গিত? তাই  আমেরিকা এই আফগানিস্তান প্রত্যাহার কেবল আফগানিস্তানই না, সারা দুনিয়া থেকে আমেরিকানদের মানে কেবল আমেরিকানদেরই না এটা আসলে সাদা পশ্চিমা শাসকদের সারা দুনিয়া থেকেই পাততাড়ি গুটানোর ইঙ্গিত? তারা কী দুনিয়ায় আর কোথাও শাসনে ফিরতে পারবে না সেই ইঙ্গিত?  এই আশঙ্কার পটভুমিতে ইকোনমিস্ট যেমন আরেকটা রিপোর্টে ধর্মতত্বীয় ইঙ্গিত ঢুকিয়ে বলছে – এক্সোডাস, সৃষ্টিতত্ব ৪১; বাইডেন কী ধবংস হয়ে যাবার আগেই মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে বের হয়ে পালাতে পারবে?

    সুতরাং, এক কথায় বললে, এটা শুধু আমেরিকার আফগান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়া নয়, এটা আসলে যেন বাইডেনের আমেরিকার সারা দুনিয়া থেকেই আমেরিকান সেনা ও নেতৃত্ব প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা। আর এমনই আশঙ্কায় – অনুভবে ও সুরে আর্টিকেলগুলো পশ্চিমা মিডিয়ায় লেখা হয়েছে। আর এখানকার এমন মনোভাবটার সঠিক প্রকাশকে ফুটিয়ে তুলতে গেলে বলতে হবে, দুনিয়াতে একদিন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব, সাদা শাসন, সাদাদের গর্ব, সাদারাই মরদ এ টাইপের যেসব বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছিল – ঠিক তারই উল্টা ঘটনাই যেন এটা। তাই সাদা-বাদের এই  শোক – যখন তারা বুঝে গেছে বাইডেন কথাটা কেবল আফগানকে লক্ষ্য করে বললেও এর উপলক্ষ্য যেন আসলে এর অর্থ সবারই কানেই কু-স্বরে বেজে উঠেছে যে বাইডেন বলছেন, “আমেরিকা আর কখনো কোনো যুদ্ধেই যাবে না” [Ending the forever war]। যেন আমেরিকার ও গোটা পশ্চিমের  “দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে”।

    আমেরিকান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টঃ গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০
    উপরের এতক্ষণ সেসব কথাগুলো বলেছি এর অনেকাংশই ইহুদি-খ্রীশ্চান ধর্মতত্বীয় মিথে যা সব আছে সেসবেরই ছায়ায় বসে লেখা। তাই এবার বস্তুগত বা বৈষয়িক ও আধুনিক ভাষায় যেসব শাস্ত্র আছে তার ভিত্তিতে কিছু কথা লিখা যাক। আমেরিকাকে আমেরিকার মতন করে এবং আন্তরিকভাবে না বুঝলে এটা বলা বা লেখা যাবে না।  আমেরিকা রাষ্ট্রের রেওয়াজ হল শুধু ঠিক চার বছর পরপর একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে দেয়া না।  সেই সাথে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে নতুন এক “ইনটেলিজেন্স রিপোর্টও” তুলে দেওয়া। ইন্টেলিজেন্স শব্দের বাংলা আমরা করি ‘গোয়েন্দা’। আর যা গোয়েন্দাদের বিষয় তা যেন আর একাদেমিক বিষয় না, গবেষণা-স্টাডি আর নয় – এই হল আমাদের গোয়েন্দা শব্দের সাথেকার বুঝাবুঝি। কিন্তু আমেরিকান  এই রিপোর্টের মুল ফরমাল নাম GLOBAL TRENDS।  যেমন এবারের রিপোর্টের নাম ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০। এই গবেষণা  রিপোর্টিংয়ের কাজটা নিয়মিত প্রতি চারবছর পরপর করে থাকে “আমেরিকান National Intelligence Council (NIC).- Office of the Director of  National Intelligence, এই অফিস।

    বিশেষ করে আমেরিকা চীনের কাছে গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাচ্ছে গত ২০০৪ সালে এই অনুমান-ইঙ্গিত চাউর হবার পর থেকে গত ২০০৮ সালে এই অফিস থেকে প্রথম যে অফিসিয়াল রিপোর্ট বের হয়েছিল যার নাম ছিল “গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০২৫”। অর্থাৎ ২০২৫ সালে দুনিয়ায় গ্লোবাল লিডারশীপ বা রাষ্ট্রগুলোর পরাশক্তিগত বিন্যাস দেখতে কেমন লাগবে।  যেখানে ফাইন্ডিংস বা প্রাপ্ত ফলাফলে প্রথম স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল যে চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গা নিতে অবশ্যম্ভাবী ভাবে আসছেই এবং তা আর কোনদিন উলটা পথে যাবে না। মানে আমেরিকাসহ পশ্চিম চিরদিনের মত এশিয়ার কাছে নেতৃত্ব হারাচ্ছেই। আর মনে রাখতে হবে, তা বলছে, আমেরিকারই এক সরকারি সার্ভে রিপোর্ট। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের চতুর্থ রিপোর্ট হল, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০।

    এখন যারা এই খবরের বিস্তারে যেতে চান, তাঁরা মূল রিপোর্টটা এখানে পাবেন পিডিএফে, না্মিয়ে নিতে পারেন। আর আসলে, এটাই আমেরিকানদের বিউটি যে তাদের এই রিপোর্ট  কখনই কোন গোপন রিপোর্ট নয়, সকলেই কপি নিতে পারে।  আর যারা প্রথম আলোতে এক আধা বুঝা রিপোর্ট হলেও মোটামুটি কাজ চলবে বলে মনে করেন তারা এখানে গিয়ে এই রিপোর্টটা পড়তে পারেন।

    ঝোঁক আকারে দুনিয়াতে কলোনি দখল শুরু বলা হয় ১৫ শতাব্দীতে (১৪০০-১৪৯৯)। আর মোটামুটি ১৬০৫ সাল থেকেই একদম কোম্পানি খুলে কলোনিদখল করার ব্যবসায় নেমে পড়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, এই ছিল সেকালের বৃটেনের প্রধান ও বড় ব্যবসা ধারা।  আর এটাকেই সাদাদের শাসনের যুগ, সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা সাদারা ফিটেস্ট ইত্যাদি নাম দিয়ে নানা সাফাই তত্ত্ব চালু হয়েছিল। তাহলে বাইডেনের এই আফগান ঘোষণা, এটাই কি সেই সাদা যুগের অবসান বলে পশ্চিমা মনে কু-ডেকে উঠেছে! সে কারণেই সাদা মনের আহাজারি এগুলো? তাই কী?

    পশ্চিমাশক্তি বলতে রেসিয়াল প্রতীক আকারে বললে,অনেক সময় তারা নিজেরাই বলে যে তারা হোয়াইট ককেশিয়ান। বিপরীতে নতুন ও আসন্ন গ্লোবাল নেতা হিসেবে এবং রেস বা প্রজাতি পরিচয়ে দেখলে চীনারা সম্ভবত মঙ্গোলয়েড প্রজাতি-ভাগের। যদিও এই ২১ শতাব্দীতে এসে জাত্যাভিমান, জাতগর্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি সব ধরনের জাতবাদিতা এমনকি ধর্মীয় জাতবাদিতা, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা ইত্যাদি সবই ভয়ঙ্কর রকমভাবে সবার জন্যই প্রবল ক্ষতিকারক হবে। এই মেসেজ যারা আমল করবেন তা তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। আর যারা আমল করবেন না, বুঝমান নন তাদেরকে বলেও লাভ নেই। তবে সম্ভবত এককালে সাদাদের “সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট” ধরনের আর্গুমেন্ট আমাদের আর কাউকে মুখোমুখি দেখতে হবে না!  আশা করি! তবু, আমরা কি পারব এই নতুন সময়কে সামলাতে! কোনো আরেক জাত বা ধর্ম শ্রেষ্ঠত্ব সামলাতে? তবে এবারও মঙ্গোলয়েডদের সাথে আরেক অর্থে পূর্ব-ইউরোপীয় (রাশিয়ান বা অন্যরা) অর্থে আরেক ধরণের সাদা ককেশিয়ানও থাকবে। এ ছাড়া সাথে থাকবে ব্যাপক বাদামি এশিয়ান আর আফ্রিকানও। অর্থাৎ প্রথম সাদা-বাদের একক উত্থানের তুলনায় এবার অনেক সম্মিলিত, মিশ্রিত জনগোষ্ঠী উত্থিত হবার সুযোগ পাবে ও নিবে – যারা মিশ্রিত ব্যাপক রেঞ্জের জনগোষ্ঠী জড়িত ও সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ পাবে। আশা করব সাথে আবার কোনো ‘ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের’ নামে কোনো কিছুর উত্থান ঘটবে না, আমাদের সেই হেদায়েত নিজ থেকেই জেগে উঠুক সে কামনা করি! তবে আজ যেমন উচ্চশিক্ষার জন্য, উচ্চ-ট্রেনিং ওরিয়েন্টেশনের জন্য আমরা পশ্চিমামুখী হই এটাও নিশ্চয় দিক বদলাবে। সেই ঝোঁকটাই তবে এবার সেটার অভিমুখ হতে পারে পশ্চিম থেকে এশিয়ামুখী, এমন দেখতে পাওয়াটা আর অসম্ভব থাকবে না সম্ভবত!  

    এবার কথাগুলো অন্য দিক থেকে বলিঃ
    জো বাইডেনের শপথ নেয়ার দিন থেকে হিসাব করলে তার প্রশাসন বা সরকারের আয়ু আগামী ২০ এপ্রিলে মাত্র তিন মাস পূর্ণ হবে। গত ২০ জানুয়ারিতে শপথ গ্রহণের পর থেকে দুনিয়ার সব কোণে তিনি আশা জাগিয়ে চলছিলেন। কিসের আশা? একটাই মূল বক্তব্য যে আমেরিকাকে তিনিই আবার ২০০১ সালের আগের (নাইন-ইলেভেনে টুইন টাওয়ার হামলার আগের) অবস্থায় নিয়ে যাবেন যে আমেরিকা ছিল গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতা, যা ছিল গত টানা প্রায় ৭৫ বছরের।

    এমনকি, বাইডেনের এই আশা জাগানি  ছিল বাঘের মুখ থেকে ইউরোপ – এই বন্ধু-পার্টনারকে ছিনিয়ে আনার মতও। মানে? ইউরোপ আমেরিকার বন্ধু-পার্টনার গত ৭৫ বছর ধরে। যখন সেই ইউরোপ, অন্তত ৩০০ বছর (১৬৫০) আগে, সেই কলোনিযুগের নেতা ইউরোপ যখন – আমেরিকা না, ইউরোপই ছিল প্রধান শক্তি। হ্যাঁ, কলোনি মাস্টার ইউরোপ, ব্রিটিশ-ফ্রান্সের ইউরোপ ছিল প্রধান শক্তি। কিন্তু কপালের ফেরে পড়ে শেষে হিটলারের হাতে সর্বস্ব, সম্পদ ও ভূমি (নিজ ভূখণ্ডসহ কলোনিতে পাওয়া ভূমিও) হারানোর দশায় পড়ে যায় ব্রিটিশ-ফ্রান্স সহ ইউরোপের এসব শক্তি, বিশেষ করে গত শতকের ত্রিশের দশকের পর থেকে ক্রমে। বিগত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ঐ সময়ে অবস্থা এতই খারাপ জায়গায় পৌঁছায় যে তাদের জন্য একটাই অপশন খোলা ছিল; তা হল – আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা মেনে নেয়া, দুই. তার নেতৃত্বে ও তারই অর্থ ব্যয়ে হিটলারের অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা আর তৃতীয়ত, ওই যুদ্ধে বিজয়ের পরে সব দখলি কলোনি ত্যাগ করে প্রাক্তন কলোনিগুলোকে স্বাধীন-মুক্ত করে দিয়ে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ, স্প্যানিস ইত্যাদি কলোনিশক্তিগুলোর সবারই নিজ নিজ দেশে ফিরে চলে যাওয়া। আমেরিকার কথা মেনে একমাত্র এই পথে গেলে তবেই সে ক্ষেত্রে কেবল কলোনি-মাস্টাররা তারা কেবল অন্তত নিজ ভিটামাটি-দেশ রক্ষা করতে পারে, আবার চাই কি আমেরিকান দান-সাহায্য-বিনিয়োগের সহায়তায় আবার অর্থনৈতিকভাবে তাদের রাষ্ট্র উঠে দাঁড়াতেও পারে। আর তাই-ই হয়েছিল। আর সেই থেকেই ইউরোপ অনেকটা আমেরিকার ছোট-পত্নীর মত এমন মর্যাদা পেয়ে আসছে।

    এতে আমেরিকাও ইউরোপকে আপন পাশেই রেখে আসছে, নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেছে বটে, তবু ইউরোপকে ছোট-পার্টনারের মর্যাদা দিয়েছে। গত ৭৫ বছরের আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব মানে সবসময় ইউরোপকে ছোট-পার্টনারের মর্যাদায় রাখা। আর সাথে এতদিন যত যুদ্ধের খরচ, যেমন ইউরোপে বা জাপানের কোন ব্যারাক চালানোর সব ব্যয় ও ন্যাটো পরিচালনার ব্যয়ভার সব কিছুর লায়ন-শেয়ার একা আমেরিকা বহন করে এসেছে। এনজিওও দান-অনুদান কিংবা অবকাঠামো বিনিয়োগ ইত্যাদির  নব্বই ভাগ ব্যয় যোগান দিয়ে আসছে আমেরিকা।  যদিও আমেরিকার ঢলে পড়া অবস্থায় ওবামার সেকেন্ড টার্মের সময় থেকে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ে ইউরোপ কেন কোনো ব্যয়ের দায় নেয় না – আমেরিকা ইউরোপের এই অযোগ্যতার কথা তুলে খোঁচা দেয়া শুরু করেছিল। আর চরম ও বিরাট ব্যতিক্রম ঘটে যায় ট্রাম্পের চার বছরে। ট্রাম্প নিজেকে জাতিবাদী-আমেরিকা বলে ঘোষণা দিয়ে নেয়াতে (মানে সে আর গ্লোবাল নেতা থাকতে চায় না) ইউরোপ বুঝে যায়, আমেরিকার কাছে ইউরোপ আর সেই ছোট-পত্নীর মর্যাদাতেও থাকছে না।

    দিন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। এরই প্রকাশ ঘটে যায় আরসিইপিতে [RCEP] (এটা সাধারণ বাণিজ্যজোট নয়, চীনের নেতৃত্বে এক ভ্যালু-এডিশন শেয়ারড প্রডাকশনের এক নয়া উতপাদন ব্যবস্থা)। চীন এই ব্যবস্থাটা করেছিল মূলত আসিয়ান-দেশ কেন্দ্রিক, সাথে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দ: কোরিয়া ইত্যাদি যারা কেউই এর বাইরে থাকতে চায় না তাই তাতে তাদের মধ্যেই আবার কেউ কেউ যতই কোয়াড [QUAD] জোটেরও সদস্য হোক না কেন! আর পরবর্তিতে এই আরসিইপি জোটের সাথে ইইউ মিলিয়ে Comprehensive Agreement on Investment (CAI) গড়ে তুলেছিল; শেষ সময়ে। মানে? মানে হল, সে সময়টা হল গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। কারণ, চীন চাইছিল বাইডেন পরের মাসে, ২০ জানুয়ারি শপথ নেয়ার আগেই ইইউর সাথে সিএআই (CAI) চুক্তিটা সম্পন্ন করে ফেলা। কারণ বাইডেনের মূল পরিকল্পনা ছিল আবার ইইউকে আমেরিকার নেতৃত্ব ও আস্থায় ফিরিয়ে আনা। শুধু তাই নয়, চীনের বিরুদ্ধে ইইউর সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। চীনের হিউম্যান রাইটের খামতির কথা তুলে প্রবল চাপ সৃষ্টি করা যাতে চীন তাদের সম্মিলিত চাপের কাছে হার মানে। তাই, এর বিপরীত দিকে, পাল্টা  আমেরিকাকে বাইরে  রেখে  চীন ইইউর সাথে আগেই (CAI) চুক্তি করে ফেলতে পেরেছিল বটে।

    কিন্তু চীনা জিনজিয়াংয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগের আঙুল তুলে আমেরিকাও ঠিকই ইইউকে সাথে নিয়ে একসাথে হিউম্যান রাইটের অভিযোগ তুলতে সক্ষম হয়ে যায়। যদিও পুরা জিনিসটাতে পশ্চিম আর   তাতে চীনকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করার লক্ষ্যের জায়গায় থাকেনি, বরং চীনের দিকে আঙুল তুলে বাণিজ্য সুবিধা চীনের থেকে বাগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই নেংটাভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ এখন পর্যন্ত চীনের বিরুদ্ধে পশ্চিম কী চায়?  তারা কী চীনকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে তুলতে চায়, নাকি চীনের নির্মুল চায় তা স্পষ্ট করে না বললেও তারা যেন চীনের উতখাত ও নির্মুল চায় তাই মানে হয়ে আছে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম নিজেই দুনিয়াকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে গড়ে তোলার পক্ষের শক্তি কিনা এই প্রমাণ নাই। হলে তো অন্তত তাদের তোলা অভিযোগ সত্য কিনা এর জন্য নিরপেক্ষ ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ইত্যাদির দিকে আলোচনা আগাত……এমন কোন আলোচনাই শুরু হয়নি! অর্থাৎ তারা হিউম্যান রাইট এর লোক না, তারা চীনের কাছ থেকে পালটা সুবিধা নিয়ে হিউম্যান রাইটের সওদা করতে চায়! তবে বাঘের মুখ থেকে বন্ধু-পার্টনারকে ছিনিয়ে আনার কথা যেটা বলছিলাম যে বাইডেন ইইউকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি ট্রাম্পের উল্টা পথে যাবেন, ২০০১ সালের আগের আমেরিকান অবস্থানে যাবেন – এই লোভ দেখিয়ে ইউরোপকে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন।

    কিন্তু না, সেটাও এখন তলানিতে আর সব কিছু ওদিকে ভেঙে পড়েছে! কেন?

    কারণ, বাইডেনের আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথাটা সারা ইউরোপে সাদা পশ্চিমা শক্তিরই কানে দুনিয়া থেকে সাদা-শাসনের দিন ও সুযোগের চিরসমাপ্তি হিসেবে পশ্চিমা মনে অনুরণিত হয়েছে। আফগান সেনা-প্রত্যাহার মানে গোটা পশ্চিমা শক্তিরই দুনিয়া থেকেই শাসনের পাততাড়ি গুটানো হিসেবে কানে বেজেছে!

    এদিকে দিনকে দিন গত চার বছর ট্রাম্প যেসব অবস্থান নিয়ে কট্টর চীনবিরোধী তবে জাতবাদী, সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ডানাও মেলেছিলেন সে সবের সাথে বাইডেনের নীতিগত পার্থক্য কমে প্রায় শুণ্য হয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার সঙ্গীরা এই কথাটাই বলে গেছিলেন যে ট্রাম্পের নীতির বিরোধী কোনো অবস্থান যেন বাইডেন না নিতে পারেন এবং বাইডেন ট্রাম্পবিরোধী হতেই পারবেন না। বাস্তবত, ব্যাপারটা সে দিকেই ক্রমশ যাচ্ছে !

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “কাকে ছাড়ছেন বাইডেন, আফগানদের না দুনিয়া শাসন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    গৌতম দাস

    ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০ঃ০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3uj

    বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পার করেছে। আর এ’বছরেরই ২০ জানুয়ারি মানে মাত্র দুমাস আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার শপথ নিয়েছেন। আমরা অনেকেই দেখার জন্য উদ্গ্রীব ও আগ্রহি ছিলাম যে ট্রাম্পের পাগলামি-উত্তর বাইডেন নতুন কী রাজনীতি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে এর কী প্রভাব পরে ইত্যাদি। অপেক্ষার পালা একটু দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মন-সংযোগ একটু ঢিলা পড়ে গিয়েছিল হয়ত আর এই ফাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত বা ঘটনার প্রকাশ ঘটে গিয়েছে। এই বিচারে গত ২৬ মার্চ মোদীর মত আরএসএসের ক্যাডার তিনি বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির প্রধান অতিথি হয়েছেন বলে নয়, এর চেয়েও বড় তাতপর্যপুর্ণ ছিল মোদীর এই সফর। যেটা বাইডেনের ২০ জানুয়ারিতে শপথের সময় কেন ২০ ফেব্রুয়ারিতেও আগাম বুঝা যায় নাই যে পরের মাসে ২৬ মার্চ এত তাতপর্যপুর্ণ হয়ে যাবে। যেমন এখন হয়ত আমাদের মনে পড়বে,  আমরা মনে করতে পারি, এবার ২৬ মার্চের প্রধান অতিথি কে হবেন ভারতের কসাই মোদী না তুরস্কের এরদোয়ান, এই আলাপ উঠতেও আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু বরং মার্চ মাস শুরু হবার পর ক্রমশই মোদীরই প্রধান অতিথি হওয়া ক্রমশ এক বিরাট গুরুত্ব নিয়ে হাজির হতে শুরু করেছিল। কেন?

    নতুন করে গ্লোবাল পোলারাইজেশনঃ আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুতগতিতে এটা আগাচ্ছে। আর বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের আমল পর্যন্ত আমরা কোয়াড (চীনবিরোধী চার রাষ্ট্রীয় জোট- আমেরিকা-ইন্ডিয়া-অষ্ট্রেলিয়া-জাপান) আর  সাউথ চায়না সি কেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাটেজি (উদ্যোগ) – এদুটার কথা জোরেশোরে শুনে আসছিলাম। ফলে “কোয়াড” ও “ইন্দো-প্যাসিফিক” কেন্দ্রিক পোলারাইজেশনই আগামিতে প্রধান হবে ও বাড়বে এমনটা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। এই ইঙ্গিত এখন পরিস্কার। বাইডেনের শপথ নেয়ার দুমাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বহু উলট-পালট হতে শুরু করেছে। আর এরই মাঝে বাইডেনের নিজের ফরেন পলিসির প্রায়োরিটি এর নিজের নতুন বৈশিষ্টগুলো নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসা মাত্র পালটা প্রতিক্রিয়াও শুরু এবং তা থেকেই নতুন করে নতুন পোলারাইজেশন এবং তা ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া আবার  এককথায় মেরুকরণ যা ভাবা হয়েছিল বাইডেলের আমলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইচ্ছা আকাঙ্খার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেমন, কোয়াড থেকে ভারতকে বেরিয়ে যেতে হবে – এটা ধরে নিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই আগানো শুরু করে দিয়েছে।

     এবার পোলারাইজেশনের রঙ্গমঞ্চ বঙ্গোপসাগরঃ আগের অনুমিত সাউথ চায়না সি,যেটা সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশমুখ, ঠিক সেটা এখানে আর মূল রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার থাকছে না। নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। এর উপর আবার এতে ভারত, বাংলাদেশ বা মায়ানমারের – এভাবে বঙ্গোপসাগর এই তিনদেশের  মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে ফোকাস।  অন্তত আমেরিকান ফোকাস। কেন এমনটা ঘুরে গেল?

    দুটা কারণে এই পরিবর্তন। পরপর বলে যাব। তবে পাঠক চাইলে নিজের মত আগেপিছে করেও পড়তে ও বুঝতে পারেন।

    প্রথমটাঃ  এখানে পরপর দুটা ট্রিগার টিপা হয়েছে। প্রথম ট্রিগার টানার ঘটনাটাই প্রথমে রেখে বলছি। এশিয়ায় আমেরিকা নতুন রূপে হাজির হয়েছে, এটাই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের হানিমুনের সমাপ্তি ঘোষণার ট্রিগার হতে যাচ্ছে। চীনবিরোধী আমেরিকা-ভারত এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক পুরানা, তৈরি শুরু ২০০৪ সালে। অবশ্য এরও আগেই বিজেপির বাজপেয়ির আমলে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নৌকায় ভারত নিজ কিছু শর্ত দিয়েছিল যে তাদের আতঙ্কবাদের (মানে পাকিস্তানকে টেরর-কান্ট্রি ধরে নিয়ে সেই চোখে দেখতে হবে) উঠে গিয়েছিল। পরে ভারতের ২০০৪ সালের মে মাসে মনমোহন সিংয়ের প্রথম টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্ব শুরু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের মার্চে বুশ প্রথম ভারত সফরে আসেন। আর তাতে যুগান্তকারি ঘটনা ছিল প্রথম আমেরিকান অস্ত্র এমনকি পারমানবিক কাঁচামালও ভারতকে বিক্রি এবং ভারতকে চীনবিরোধী করে (বয়ান মুখে তুলে দেয়াসহ) আকার-প্রকার দেয়া সবই এই সফর থেকে শুরু হয়েছিল। এরই ফরমা্ল নাম ছিল চায়না কনটেইনমেন্ট মানে চীন ঠেকানোর কাজটা ভারতকে ঠিকা দেওয়া।
    আমেরিকার এতে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইজিং ভারতকেও চীনেরবিরুদ্ধে ব্যবহার। কিন্তু মুদ্রার এপিঠের উল্টোদিক মানে তাতে আমেরিকান উলটা আরেক ফরেন পলিসিও ছিল, যেটা তখন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেটা হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ীভাবে নোঙর করার ইচ্ছা। যেটাকে ভারত জেনে সবসময়ই দেখে এসেছে গরীবের একতলা বাডির পাশেই বড়লোকের সাততলা বাড়ি বানানো আর ভারতের ঘরের ভিতরে কী ঘটছে সেদিকে নজরদারির চোখ ফেলা। আমেরিকা তার এই লুকিয়ে ফেলে রাখা জিনিষটা এতদিন লুকিয়ে রেখেই চীনবিরোধী নানাকিসিমের “ভারত-আমেরিকান সহযোগিতা” বলে ভারতকে দিয়ে কাজ করিয়ে চলছিল। সেটাই এবার স্থগিত, একাবারেই শুকিয়ে যাবে।

    কারণ, বাইডেনের আমলে তিনি এখন চায়না কনটেনমেন্টের চেয়েও বঙ্গোপসাগরে পড়শি সকলের ঘরে নজরদারি ফেলা – এটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ মনে করে আগানো শুরু করেছে। মানে এতদিন এশিয়ায় ভারতের পড়শিদেশগুলোতে (বা ভারতের কথিত নিজ-প্রভাবাধীন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর) সবখানে চীন ঢুকে পড়তেছে বলে অনবরত খামোখা ভারতের ন্যাগিং দেখছিলাম আমরা। যার ভিতর আমেরিকা ভারতকে আরো তাল দিত, আর বলত চীন ভারতকে নাকি মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন? সেখানে এখন চীন-ভারতের কথিত প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাইডেনের আমেরিকা নিজেও এক প্রার্থী হিসাবে মঞ্চে হাজির হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এনিয়ে হাতের কাছে ভাল ইঙ্গিত-প্রমাণ হল, আলী রীয়াজের প্রস্তাব বাংলাদেশ যেন আমেরিকার সাথে মিলে “বঙ্গোপসাগরকে হাব” বানায় অথবা “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”……।

    আমেরিকান এমন অবস্থান থেকেই আসলে ট্রিগার পয়েন্ট হল বাইডেনের আমেরিকার “বঙ্গোপসাগরের খায়েস” প্রকাশ হয়ে পড়া। কিন্ত এথেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় তাতে এরচেয়েও বড় ট্রিগার টিপতে প্রস্তুত এখন ভারত। কি সেটা?

    দ্বিতীয়টাঃ আগেই বলেছি আমেরিকার এতদিন লুকিয়ে রাখা এই খায়েস যেকোন সময়ের জন্যই ছিল ভারত-আমেরিকার মাঝে চরমতম শত্রুতা শুরু করার সুপ্ত পয়েন্ট। ভারত এতই কঠোরভাবে সবসময় আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে ছিল ও আছে। ভারতের এত শত্রুতা-জ্ঞানবোধ চীনের বিরুদ্ধেও সম্ভবত নাই। ভারতের সব সরকারই এবং ইল্টেলেক্টরাও মনে করে এসেছে এটা ভারতের জন্য এতই ক্ষতিকর যে আমেরিকা এতে ভারতের সব উত্থান সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিবে। তাই বাইডেন যতটা না ট্রিগার টেনেছেন এর চেয়েও প্রকাশ্যে ট্রিগার ইতোমধ্যেই ছোড়া শুরু করে দিয়েছে ভারত। এরই একটা পর্ব ছিল ২৬ মার্চ মোদীর বাংলাদেশ সফর। সেটা কী রকম?

    কমন এনিমির বিরুদ্ধে এক হওয়াঃ  অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি যে  এতদিনের ভারত-আমেরিকার চীনবিরোধী যে গভীর আত্মীয়তা চলেছিল এর দিন শেষ হয়েছে। আমেরিকাই এখন ভারতের প্রধান এনিমি। এদিকে আমরাও অনেকবার দেখেছি ও বলে এসেছি যে, আমাদের সরকার গত চৌদ্দবছরের চড়াই-উত্রাইয়ে  সবচেয়ে কম আস্থা রেখে এসেছে আমেরিকার উপর; তা সে ওবামা,  ট্রাম্প বা বাইডেন যারই আমেরিকা হোক। এমনকি সরকারের আয়ু বাড়ানো প্রস্তাব বা আলী রীয়াজের প্রস্তাব যতই লোভনীয়ভাবে হাজির করা হোক না কেন এথেকে দূরে থাকলেই তা সরকারের আয়ুর স্বার্থে যাবে বলে আমাদের সরকার মনে করে এসেছে।  এই সুত্রেই  এবার মাঠে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের এক কমন এনিমির আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রশ্নে ঘনিষ্ট হওয়া ও পরস্পরকে রক্ষায় সহায়তা করার এক বাস্তবতা হাজির হয়েছে, মনে হচ্ছে। প্রায় ঠিক যেমনটা এর আগে সুজাতা সিংয়ের সফর থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন ওর প্রাক্কালে যেটা হয়েছিল। অনুমান করা যায় গত ২৬ মার্চ ছিল এই গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গে তাদের সিরিয়াস আলোচনার এক ভাল সময়। এটাই স্বাভাবিক।

    তাহলে বাইডেন কী বোকা মানুষ, তিনি কেন বঙ্গোপসাগর সেভেন্থ-ফ্লিট মোতায়েনের আকাঙ্খার ইঙ্গিত এসময় হাজির করতে এলেন? না; অবশ্যই তিনি বোকা নন। মূল কারণ ইতোমধ্যেই  আমেরিকা ভারতকে কোয়াড থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে এর সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। যেমন ব্যাপারটা দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষ্য হল, US Will ‘Expel’ India From Quad।   আবার ভারত নিজেই নিজেকে কোয়াড থেকে বের করে নিতে যাচ্ছে তা আসন্ন  – এটা ভারত-আমেরিকা দুপক্ষের কাছেই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কিভাবে?

    দুই ইস্যু এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইটঃ
    এস-৪০০ এটা রাশিয়ার তৈরি এক এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম যা আমেরিকার এফ-৩৫ এর মত যত বোমারু বিমান আছে সেসবের ‘যম’ মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার ভাষায়, “এস-৪০০ এর কাছাকাছি স্থানে এফ-৩৫ চালানো অনুচিত”। কারণ, তা ঐ বোমারু বিমানকে নামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এনিয়ে আমেরিকার মূল নীতি অবস্থানটা হল আরো কঠিন। তা হল, একই দেশের হাতে একসঙ্গে এস-৪০০ আর এফ-৩৫ এর মত কোন বোমারু বিমান থাকতে পারবে না। তাই সোজা সিদ্ধান্ত যে দেশ এস-৪০০ কিনবে আমেরিকা তার উপর বাছবিচার ছাড়াই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কেবল পাগলা ট্রাম্পের কথা। কিন্তু এখন সবাই পরিস্কার যে এটা বাইপার্টিজান – খোদ পেন্টাগনের অবস্থান। তাই যে এস-৪০০  কেনাটা শুরু হয়েছিল তুরস্ককে দিয়ে তা এখন পাকিস্তান, ভারতসহ যারা যারা এমন যে কেউ কিনবে ভেবেছে, তারা সবাই আবার সাথে ভেবেছিল যে কেবল তার বেলায় অনুরোধ করলে আমেরিকান প্রশাসন বিশেষ ছাড় দিবে – কিন্তু এখন সবাই বুঝে গেছে, এটা সবার ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
    শুধু তাই না, ব্যাপারটা আরো এগিয়ে কঠিন হয়েছে ভারতের বেলায়। এপ্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক শক্ত ও আগাম নির্ধারিত। এতদিন  ভারত মনে করে এসেছিল ভারতকে আমেরিকারই নিজ স্বার্থে দরকার আর ভারতও রাইজিং। ফলে আমেরিকা যদি বিশেষ ছাড় না দেয় তবে ভারত আমেরিকাকেই ত্যাগ করে হলেও এস-৪০০ কিনে নিজের সামরিক বহর সাজাবেই। এই প্রসঙ্গে সর্বশেষে দেনদরবার হয়ে গেল গত ১৯ মার্চ থেকে তিনদিনের বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ভারত সফরে [Russian Arms Sale Clouds U.S.-India Ties]। এতে দুপক্ষই কড়া শেষকথা শুনে বুঝে যায় কোন পক্ষই সরতে পারছে না।
    ওদিকে ইতোমধ্যে বহু আগে মানে নির্বাচনে প্রচারণার সময় থেকেই বাইডেন পরিস্কার করে উল্লেখ করে আসছেন কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের উপর হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ইস্যুতে তিনি ক্ষমতাসীন হলে সরব অবস্থান নিবেন।  কিন্তু এদুটাই মোদীর ভারতের নির্বাচনে হিন্দু মেরুকরণ করে তাদের ভোট বিজেপি-বাক্সে তোলার গুরুত্বপুর্ণ কৌশল যা তিনি কোনভাবেই ত্যাগ করতে চান না বা পারবেন না। অতএব এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইট – এদুই বড় সংঘাতের ইস্যুতে আমেরিকা-ভারত বিচ্ছেদের ঘোষণা এখন  যেকোন সময়ের ব্যাপার।

    ইতোমধ্যেই প্রথম প্রকাশঃ বার্মা
    গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল বার্মার সামরিক বাহিনী দিবস। মায়ানমার যা কার্যত সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন এক রাষ্ট্র সেখানে এই দিবসের তাতপর্য আমরা অনুমান করতে পারি। এক রিপোর্ট বলছে, বার্মায় ৪২ বিদেশি মিশন আছে যাদের এমবেসিতে “মিলিটারি এটাসে” পদ আছে আর তাতে কেউ আসীন হয়ে বার্মায়  উপস্থিত  আছেন। এদের মধ্যে আটজন এটাসে [attaché] ঐ প্যারেড অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।  জাপানি নিক্কি পত্রিকা বলছে ঐ দেশগুলো হল, Russia, China, India, Pakistan, Bangladesh, Vietnam, Laos and Thailand ।  মানে ঐ আট রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গুরুত্বপুর্ণ এক রাষ্ট্র। এর মানে  যে ভারত  তার কোয়াডের সব বন্ধুদের  ত্যাগ করেছে যা পক্ষ বদল করেছে বলা যায়, আর এভাবে প্রকাশ্যে তার মিলিটারি এটাচে হিসাবে একজন ঐ প্যারেডে যোগ দিয়েছিল। এমনকি  বাংলাদেশও রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমান তাসত্বেও “ব্যবহারিক কারণে”, [pragmatic attitude]ভারত-চীন-রাশিয়াকে অনুসরণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা এতে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অতিথি ছিলেন রাশিয়ার ডেপুটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন।
    মূলকথা,বাইডেন তার নিজের পলিসি-স্বার্থগুলো খুলে বসাতে এবার নতুন করে এক ব্যাপক গ্লোবাল পোলারাইজেশন এর বাস্তবতা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এই আট দেশের মিলিটারি এটাসে দের একসাথে অংশগ্রহণ এটা যেন বাইডেনের বিপরীতে চীন-রাশিয়া পক্ষ দেখাতে চেয়েছে যে তাদের পক্ষে কে কে আছে। আসলে ভারত পক্ষ বদলিয়েছে এটাই পুরা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর যেন বাইডেনকে দেখানো যে তোমার পক্ষের ভারত আর তোমার সাথে নাই।

    কে কোন পক্ষে থাকছেঃ
    জিনজিয়াং-উইঘুরে মানবাধিকার ভায়োলেশন ইস্যুতে বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সাথে পেয়েছিল। একসাথে তারা এই ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে আবার বড় ক্ষত ও বাইডেনের দুর্বলতার দিকটা সব সময় আছে যে, উইঘুরে মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে চীনবরোধী জোট পাকায়ে চীনের থেকে বৈষয়িক সুবিধা হাসিল করা এতদিন পশ্চিমের মূল উদ্দেশ্য  হয়ে এসেছে।  সোজা কথায়,  পশ্চিম এখন পর্যন্ত সবসময় এভাবে মানবাধিকার ইস্যু তুলেছে কিন্তু শেষে তা বিক্রি করেই খেয়েছে। কাজেই পশ্চিম এই নৈতিকতার সংকট খুবই মারাত্মক থেকেছে। যেমন বার্মার ২০০৮ সালের গঠিত কনস্টিটিউশনে  আর্মি রাজনীতিতে অংশ নিবে সহ সব নির্বাহী ক্ষমতার ভাগীদার থাকবে  – সেকথা লেখাই আছে। আর সেসব কথা থাকা সত্বেও কি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জেনারেলদের প্রশংসা করে গো এহেড অনুমোদন দেয় নাই, জেনারেলেরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু কল বলে সার্টিফিকেট দেয় নাই? তাহলে আজ প্রতিদিন বার্মায় প্রতিবাদকারিরা হত্যার শিকার হলে এখন সহানুভুতির নাকিকান্নার উদ্দেশ্য কী? ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা খেদানো যখন চলছিল তখন আমেরিকা চীন-ভারতের সাথেও গলা মিলিয়ে কথিত আরসা আক্রমনের গল্প ফেঁদেছিল যেটা ছিল বার্মার জেনারেলদের হল্প আর সেটাই আমেরিকানেরা আমাদের কাছে সাফাই দিয়েছিল যে আরসার কথিত আক্রমণের কারণেই নাকি পাল্টা রোহিঙ্গা খেদানোর শুরু।
    সোজা কথায় মানবাধিকারের ইস্যু বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে সুবিধা আদায় – এদিকটাই প্রধান পশ্চিমা স্বার্থ, সেটাই অনেকদিন থেকেই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।  ফলে বাইডেনের যে মেরুকরণ দাড়াচ্ছে চীন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে – এই বাইডেন জোট এখনও বড় বড়  নৈতিকতা সংকটে আছে এবং থাকবে।

    ফলে বাইডেনের জোট -কোন নৈতিক বা নীতি-পলিসিগত ভিত্তির সমস্যায় আছে  ও এমন ইমেজ সংকটে হাজির হয়েছে। আর এমন মিস-ফায়ার হওয়াতে এর সুযোগ নিয়ে পালটা চীন-রাশিয়ার জোটে আর তাতে (কোয়াড ভেঙ্গে) ভারতের যোগ দেয়া আর তাতে হবু বাংলাদেশ বা বার্মার যোগদান – এটাই বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নতুন রঙ্গমঞ্চ।

    সবমিলিয়ে বাইডেন যা করলেন তাতে তার পক্ষীয় জোটের নৈতিক বা গ্লোবাল কমন পলিসিগত শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর প্রশ্নে তিনি মারাত্মক খাটো হয়ে হাজির হলেন। শুধু তাই না, আবার একই সাথে তারা দুপক্ষজোটের সামরিক ঝোঁকগুলোকে তিনি জেনে অথবা না-জেনে উসকিয়ে দিলেন যা খুবই অবিবেচক অবশ্যই!

    সর্বশেষ জন কেরিঃ
    জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে বাইডেনের বিশেষ দুত। তিনি আগামি ৯ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন। সম্ভবত আগামি ২২ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যে ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এর দাওয়াত দিতে। আর সেখানে কী সাইড লাইনে আলী রীয়াজ যেভাবে বলেছিলেন “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা  আর অর্থনৈতিক করিডরের একটি ‘হাবে’ পরিণত করার আলাপ প্রস্তাব – সেটাই কী সেরে নেয়া হবে? মনে হচ্ছে সেটাই এজেন্ডা। যদি তাই হয় তাহলে একদিকে বাংলাদেশ নিয়ে মানবাধিকার অবণতির রিপোর্ট আর এদিকে এমন বঙ্গোপসাগর এজেন্ডা – ঠিক এটাই বাইডেনের জোটের সংকট, এই চরম নৈতিক সংকটের কারণের তার জোট ও তিনি ঠুঠো আর ধান্দাবাজ বলেই মানুষ দেখবে!
    বাইডেনকে একটা বেছে নিতে হবে – বঙ্গোপসাগর না হলে মানবাধিকার!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ

    ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
    প্রথম পর্ব

    গৌতম দাস

    ২৫ মার্চ ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3n4

    সাতচল্লিশের দেশভাগ মানে যখন নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল আর সেকথার সোজা মানে হল এমন রাষ্ট্রজন্ম হওয়াতে বৃটিশ জমিদারি ব্যবস্থাটাই উচ্ছেদ হয়ে যায়।  আর এথেকেই সারা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রজারা জমির ভোগদখল (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) লাভ করে। ফলে বাস্তবত পুর্ববঙ্গ আলাদা নিজেই (এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ অর্থে)  এক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে আগের জমিদারদের হাতে জমিদারী থাকার কাগজপত্র থেকে গেলেও কার্যত তারা সব জমিই হারিয়ে ফেলেছিল। মূল কারণ, এবার  জমিদারেরা আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেউ নয়। মুসলীম লীগ এর ক্ষমতায়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই এটা জমিদারী-উচ্ছেদের এক বিপ্লব ছিল।  যদিও আইনিভাবে এই জমিদারি উচ্ছেদ হয় পরে ১৯৫১ সালের ১৬ মে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950 এই আইনে, পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে তা পাশ হওয়াতে। সবচেয়ে মনে রাখার মত ঘটনাটা হল এই বিপ্লব ঘটেছিল তথাকথিত কোন কমিউনিস্ট পার্টির হাতে নয়। বরং যাকে প্রগতিবাদীরা উঠতে বসতে “সাম্প্রদায়িক দল বলে গালাগালি করে”, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল বলে নিন্দা ও তুচ্ছ করে  সেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। তবে মুল কথা আজকের বাংলাদেশের সারা ভুখন্ডের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে (ততকালীন প্রজারা যারা আমাদের দাদা নানা বা পুর্বপুরুষ) জমির মালিক হয়েছিল যারা যে যেই জমি প্রজা হিসাবে চাষাবাদ করত সেই জমির খাজনা নতুন পাকিস্তান সরকারকে পরিশোধ করা সাপেক্ষে সেই সেই জমির মালিক এবং ভোগ-দখল ও উত্তরাধিকারিকে হস্তান্তরকারি মালিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঐ ১৯৫১ সালের আইন এখন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ গণ্য করা হয়।

    কিন্তু বিরাট ট্রাজেডিটা হল, এভাবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জমি পেয়েছিল কিন্তু কেউ অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি, গ্রুপ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম যে সঠিক হয়েছিল অন্তত জমিদারি উচ্ছেদের ফলে যে তারা বাসিন্দারা জমির মালিক হয়েছিল এই কারণে অথবা, এই কৃষি-বিপ্লবের তাতপর্যকে স্মরণ করে – এমন সাফাই-বয়ানের ভিত্তিতে কোন ইতিহাস, কেউ লেখে নাই। স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রচনা করে নাই। এর বদলে স্কুলে পড়ানো হয়েছে প্রগতিশীলতা, জমিদারদের বয়ানে লেখা  ইতিহাস ইত্যাদির যা কলকাতায় পড়ানো হত সেই ইতিহাস বই। 

    উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ;  মানে কলোনি ‘বৃটিশ-ইন্ডিয়া’ ত্যাগ করে চলে যাবার সময় বৃটিশ শাসকদের এই কলোনিকে ভারত ও পাকিস্তান এ’দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এঘটনাই সাধারণ্যের মুখের ভাষায় ‘দেশভাগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের জর্মানের পক্ষশক্তি,  কিন্তু যুদ্ধে তারা উভয়ে (সাথে মুসোলিনি-সহ)) মিলে হয় পরাজিত শক্তি। আর ঐ  পরাজয়ের পর জাপানের ফাইনাল সারেন্ডারের দিন ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫। তাই এঘটনার সাথে মিল রেখে, এর দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭, এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস বা ক্ষমতা হস্তান্তর দিবস হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।

    দেশভাগ কী খারাপ কাজ, নেতি ঘটনাঃ
    দেশভাগ মানে সেটা একদিক থেকে বিচারে বৃটিশ “ভাইসরয়” এর ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাওয়াও বটে। ইংরাজিতে ব্যবহৃত Viceroy বা Vice-roy শব্দটা ফরাসি “vice-king” থেকে এসেছে। কিন্তু ভাইস-রয় আমাদের প্রেক্ষিতে অর্থ কি?
    ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম প্রায় একশ বছর (১৭৫৭-১৮৫৮) আমরা ছিলাম “বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির” দখল-শাসনে। আর পরে ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট, থেকে ঐ দখল-শাসন শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৃটিশ রাজসরকারের শাসনের অধীনে চলে যায়। শেষের সেই শাসন ছিল আরও প্রায় নব্বই বছরের, ১৯৪৭ এর আগষ্ট পর্যন্ত। আর ঐ বৃটিশ-শাসকপক্ষের সর্বোচ্চপদ বা রাজা/রানীর মুখ্য প্রতিনিধির পদকে বলা হত “ভাইসরয়”। কথাটা আসলে ভাইস-রয় (রয়েল শব্দকে ছোট করে নেয়া অংশ হল ‘রয়’ সম্ভবত সেজন্য; অথবা অনেকে মনে করেন ফরাসি ভাষায় আরওআই (roi) – এই ‘রয়’ মানে রাজা;  সেখান থেকে) অথবা বাংলা করে বললে, ভাইসরয় মানে রাজা/রানীর প্রতিনিধি। ভারতের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটন। তিনি চেয়েছিলেন নতুন দুই স্বাধীনদেশেরই ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। তাই একই দিনে অনুষ্ঠান না করে একদিন আগে ১৪ আগষ্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয়েছিল। আর পরদিন ১৫ আগষ্ট ভারতে তা করা হয়েছিল।
    এরপর ভারত ও পাকিস্তান নামে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দুইদেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকেও প্রচলিত জনপ্রিয় ডাকনাম হিসাবে ‘দেশভাগ’ বলে ডাকার চল শুরুও হয়। অনেক সময় একাদেমিকভাষাতেও “দেশভাগ’ শব্দটা ব্যবহার হতে দেখা যায়। যদিও এর সাথে এক অনুষঙ্গ অনুমানও থাকতে দেখা যায়।  অল্পকিছু  ব্যতিক্রমে সেই অনুমানটা হল, “দেশভাগ” জিনিষটা একটা খুবই নেগেটিভ ঘটনা বা খারাপ কাজ। মানে দেশভাগ শব্দ ব্যবহারকারি বক্তা যেন বলতে চান যে দেশভাগ হওয়াটা ভাল হয় নাই, না হলে ভাল হত। ফলে যাদের কারণে দেশভাগ হয়েছে তারা যেন খারাপ লোক। এদিকটা আমরা এখানে পরখ করে দেখব আসলে তা  সত্য কিনা বা কতটা সত্য।

    কিন্তু দেশভাগ ঘটনাটা কেন ঘটল আর ঘটনাটা খারাপ বা নেতিনাচক ঘটনা কিনা সে আলাপে একটু পরে যাব। এর আগে, দেশভাগ খারাপ – একথার মানে কী? এটা বলে ঠিক কী বুঝাতে চায়? ব্যাপারটা কী এরকম যে এই দেশভাগ কেউ চায় নাই, চাওয়ার পক্ষে কেউ ছিল না, এমন? কিন্তু না, এটা তো হতেই পারে না!  কারণ চাহানেওয়ালা পক্ষ কেউ যদি নাই থাকে তবে দেশভাগ বা বৃটিশ-ইন্ডিয়া ভাগ হল কেন? তাই ভাগ যেহেতু হয়েছে অতএব চেয়েছে এমন জনগোষ্ঠিও অবশ্যই ছিল এবং তারা উপেক্ষিত হবার মত অল্প জনসংখ্যার তা মনে হবারও কোন কারণই নাই। তাহলে এরা কারা? এখান থেকেই আমরা কথা শুরু করব।

    কথাটা উলটা করে বললে, কারা মনে করেন দেশভাগ ইতিবাচক এবং কী নির্ণায়ক-বৈশিষ্ট দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা বা চিনা যাবে? অনেকের মনে অনুমান হতে পারে অন্তত যারা নবগঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন নিশ্চয় তারা সকলে দেশভাগ হওয়াকে সঠিক ও আপন ভাবতেন! না খুবই সরি। এই অনুমানও ভিত্তিহীন, অন্তত পুরা না আংশিক সত্য। যদিও একেবারে জন্মের পরপরই পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে দেশভাগ আপন ঘটনা ছিল অবশ্যই। তবে, এটা পুর্ব পাকিস্তানে যতটা না পশ্চিম পাকিস্তানে তার চেয়ে শতগুণই  আপন মনে করা হয়েছিল।  পশ্চিম পাকিস্তানের যারা বাসিন্দা হলেন তারা ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হওয়াটাকে নিজেদের জন্য একটা বড় অর্জন বলে মনে করে এসেছে, এখনও করে। যে কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাইরে যারা আমরা, এই আমরা যাই মনে করি না কেন ঐ পাকিস্তানের ভিতরে সর্বত্র আজও তাদের পাকিস্তান রাষ্ট্রলাভের প্রতীক হয়ে আছেন জিন্নাহ। এবং তা অবিতর্কিত “জাতির পিতা” পরিচয়ে; তিনি পাকিস্তানের সকল দলের রাজনীতিতে ও দলের কাছে এক অবিতর্কিত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পুর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপারটা একবারেই ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে ধাপে ধাপে আসছি।

    পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের জমির মালিকানা ধরণ একেবারেই ভিন্ন ছিলঃ
    এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। পুর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশভাগ ব্যাপারটা নিয়ে অনুভব-অনুভুতির প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেও একটা বড় ভিন্নতা ছিল। যে ভিন্নতার মূল কারণ হল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থার দিক থেকে পুব ও পশ্চিমের অবস্থা একই ছিল না। দুশ বছরের বৃটিশ শাসনামল জুড়েই পুর্ববঙ্গ (মানে আসলে এখনকার পশ্চিমবঙ্গসহ সারা-বঙ্গও) ছিল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা্র দিক থেকে বৃটিশ শাসনের প্রবর্তিত “জমিদারি” মালিকানা ব্যবস্থা । যার আবার  বেশিরভাগ জমিদার মালিকেরা ছিল হিন্দু। মানে মুসলমান জমিদার কিছু ছিল বটে;  কিন্তু সেটা যেন ব্যতিক্রম। যেমন এভাবে বলা যায় জমিদারদের নিজেদের ‘কমন স্বার্থ’ কী হবে তা নির্ধারণে মুসলমান জমিদারদের কখনও কোন ভুমিকা বা বক্তব্য ছিল এমন জানা যায় না। আর এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুমি মালিকানা ব্যবস্থাটা ছিল ট্রাডিশনাল;  যেটা মোগল আমল থেকে চলে আসছিল। যেটার মূল বৈশিষ্ট হল,  মোগল শাসক অথবা তার প্রতিনিধিকে আপন  ভোগদখলে থাকা জমির খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আপনিই জমির মালিক। আর মালিক বলতে, খাজনাদাতার নামেই জমির টাইটেল জারি হত। তাতে কোথাও কোথাও বিশাল বিশাল জোতদার যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘জাঠ’ এথনিক গোষ্ঠি বলা হয়, এদের দখলি জমির পরিমাণ আকাশ ছোয়া। যেমন পাকিস্তানের ৬৪% জমি ৫% জোতদারের মালিকানায়, এমন ইউটিউব বর্ণনা দেখতে পারেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম জমির সিলিং [ceiling, জমির মালিকানা থাকার পরিমাণ]  বেধে দেয়া হয়েছিল। আয়ুবের হাত ধরে ১৯৫৯ সালে সেখানে আরোপিত সিলিং দেয়া হয়েছিল সেচ সুবিধার জমির বেলায় ৫০০ একর আর না থাকলে ১০০০ একর পর্যন্ত জমির মালিকানা বৈধ। এর মানে এই সিলিং আরোপের আগে কেমন জোতদারি ছিল তা অনুমেয়। সারকথায় জমির মালিকানার প্রশ্নে  এসবই ছিল পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক। তবে জমিদারি ব্যবস্থা থাকা আর না থাকা ছিল এক বড় রাজনৈতিক ফারাকের কারণ। তবে আমাদের এখানকার আলোচনার জন্য মুল কথা পুর্ব পাকিস্তানে জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থা।

    কাদের কাছে দেশভাগ কাম্য ছিলঃ
    আমরা কথা বলছিলাম, দেশভাগকে ইতিবাচক বা কাম্য – এভাবে দেখার লোক কারা ছিল তা নিয়ে। সারা ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দু জনসংখ্যা সেকালে সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। যেমন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পর্যন্ত সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫%।  তাই সব মিলিয়ে এসবের কারণে বৃটিশ আমলে – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকি কেবল পুর্ববঙ্গকে বিচারে নিলে হিসাবে মুসলমানেরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলেও এখানেও সেই একই – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পুর্ববঙ্গেও বজায় ছিল। এর পিছনের আরও কারণ  – যেভাবে বৃটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্থান ঘটেছিল, সেদিকে তাকাতে হবে।

    তত্বগত কথা হল,আধুনিককালের যেকোন রাজধানী মানেই যেখানে তুলনায় তা অন্যান্য প্রদেশ বা জেলাগুলো রাজধানীর চেয়ে অবকাঠামোর দিক থেকে হয় কম উন্নত বা পিছিয়ে পড়া। তাই পিছিয়ে পড়া এলাকার রাজধানীমুখি হওয়া খুবই কমন ঝোঁক। গ্রামে জমি থেকে উতখাত হওয়া লোকেরা রাজধানীতে কাজ-পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা নিতে ও ভাগ্য-অন্বেষণে রাজধানীতেই এসে ভীড় করে থাকে। ফলাফলে রাজধানী এক নতুন ধরণের মিশ্র জনগোষ্ঠির নতুন (আধুনিক) ভাষা্র শহর হয়ে উঠে। কিন্তু কলকাতা সেদিক থেকে বেশ ব্য্যতিক্রম। কলকাতা বৃটিশ সংস্পর্শে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা প্রথম প্রহরের ঘটনা এমন রাজধানী কলকাতা বলে সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আবার এর বাইরে আরেক দিক হল, কলিকাতার সাথে বাকি ভারত তো বটেই এমনকি বাকি বঙ্গের সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও অবিকশিত। এমনটা বজায় থাকার কারণে কেবল মূলত স্থানীয় বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসক শ্রেণীই এখানে রাজধানীতে প্রভাব-আধিপত্য জমিয়ে বসার সুযোগটা নিয়েছিল। কিন্তু এরাই বা কারা?

    সারা বাংলা সমাজের প্রধান উতপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষিকাজ আর পরে (১৭৯৩ থেকে) ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা জমিদারি বলে, জমিদার হিন্দুরাই বৃটিশ-কলোনি ক্ষমতার কোলে বসে ও ঔরসে কলকাতার শাসক শ্রেণী হয়েছিল। আর সেখান থেকেই কলকাতা মানে তা হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায় ভারত মানে সবসময় বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথার [cast system] শাসনটাই যেন আবার “জমিদার হিন্দু” এই নতুন নামে ও জমিদার-প্রজা সম্পর্কের ঢংয়ে চেপে বসেছিল। যদিও আবার এর ভিতরেও আরেক ভাগাভাগি বজায় থাকতে দেখা যেত। প্রজা বলতে সারা বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধরণেরই প্রজা থাকলেও তাঁদের মধ্যে আরেক বড় ভাগাভাগি ছিল। সেটা কেমন বা কেন?

    প্রজাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকলেও হিন্দু প্রজারা জমিদার হিন্দুদের সাথে ‘কালচারাল নৈকট্য’ অনুভব করত। মানে জমিদারদের কালচারাল হেজিমনি বা আধিপত্য আছে তা হিন্দু-প্রজাদেরও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে অনুভব করত। ফলে তাদেরও মুসলমান প্রজাদের উপর (অর্থনৈতিক স্টাটাসে সমগোত্রীয় হলেও) আধিপত্য আছে –  জমিদারদের এই কালচারাল ক্ষমতার শেয়ার হোল্ডার তাঁরাও এবং তাঁরা সম্বন্ধযুক্ত বলে অনুভব করত। তারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় উপরের বলে স্থান ও বিবেচনা নিজেরা মনে করত এবং তা দাবি ও চর্চা করত। জমিদারের বৈঠকখানায় আগত হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজাদের তুলনায় আলাদা ভাল ট্রিটমেন্ট পেত বলে এমন অনুভবের পিছনে এটা একটা কারণ মনে করা যায়। যেমন মুলমান-প্রজাদের মাটিতে বসানোর বন্দোবস্তের বদলে হিন্দুপ্রজাদের আলাদা শতরঞ্জিপাতা আসন, মুসলমান প্রজাদের দেয়া সস্তা নারকেলের মালার হুকার বদলে পিতলের হুকা,ভাল তামাক ইত্যাদি পেত। অর্থাৎ জাতপ্রথার প্রবল বলবত থাকার প্রভাব ও অজুহাতে মুসলমান প্রজাদের সামাজিক মর্যাদা-অবস্থান হিন্দু নমশুদ্র বা চর্মকারেরও চেয়েও অন্তত আরেক ধাপ নিচে বিবেচনা করা হত।
    আর এভাবেই কেবল জমিদার হিন্দুর দাপট ও পরিচয়ে সে একমাত্র শাসক ও শ্রেণীর আধিপত্য, এই ধারণা বলবত রেখেছিল। যদিও   কলকাতার জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মূল ইংরাজি বই “Bengal Divided” [Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947] , যার অনুবাদ বইয়ের নাম  “বাঙলা ভাগ হল”,সেখানে এদেরকেই “বাংলার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ বা এলিট” বলে তিনি চিনিয়েছেন। এপ্রসঙ্গে লেখা আমার ক্রিটিক এখানে পাবেন।

    কেন কলকাতা ব্যতিক্রম কী অর্থেঃ
    কিন্তু কেন কলকাতা ব্যতিক্রম হতে পেরেছিল? এর আরেকটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এখানে জমিদার হিন্দু যাদেরে বলছি ইংরাজী [race] রেস এবং [ethnic] এথনিক এই দুই অর্থেই জাতি বুঝলে এই জমিদার এরা কোন ‘জাতি’? এর জবাব হল, জমিদারি ব্যবস্থা চালু হওয়াতে যে শাসক-ক্ষমতা সে ক্ষমতার বলে এরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে এক নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছিল ও পরিচয় দিত। কথাটাকে ‘তারা বাঙালি ছিল’ এতটুকু না বলে, এভাবে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলার কারণ আছে। পুব-পশ্চিম বঙ্গ এবং এই সারা ভুখন্ডের হিন্দু ও মুসলমান মিলে যে সারা বঙ্গ অঞ্চল, তারা সকলে মিলেই যে ‘বাঙালি রেস’, সারা দুনিয়া বাঙালি বলতে এদেরকেই চিনে, তাই একথাটাতে অস্বীকার করার কিছু নাই। তাই তো হবারই কথা।

    কিন্তু কলোনি-ক্ষমতা্র ঔরসে উত্থিত কলকাতা, জমিদারের কলকাতা সেটা মেনে উত্থিত হয় নাই। প্রথমত,আগেই বলেছি কলকাতা – সমাজের ক্লাসিক্যাল ডেভেলবমেন্ট যেমন কোন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও পরিণতির অর্থে যেমন বলা হয় – ‘একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা সারপ্লাস যেখানে সঞ্চিত হয় এমন নদীতীরের কোন গঞ্জ বা শহর অর্থে কলকাতা কোন শহর নয়, ছিল না। যে অর্থে কলকাতা কলোনি প্রভাব ও সংস্পর্শের বাইরে গড়ে উঠা অর্থে ভারতেরই কোন শহর নয়। যেমন মোগল আমলেই  মানে প্রাচীন ভারত কলোনি মাস্টারের হাতে পড়বার আগেই – হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি বড় মোগল শহর হিসাবে হাজির ছিল। কিন্তু কলকাতা তা ছিল না। মানে  কোন কলোনিদখলকারির ছোঁয়া লাগার ছাড়াই, সুনির্দিষ্ট করে বৃটিশেরা ভারতদখলের আগে থেকেই ভারতে অনেক বড় শহরের জন্ম হয়ে গেলেও কলকাতা সে তালিকার কেউ নয় বা তালিকায় ছিল না। তাই হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি মোগল আমলেই বড় শহর, এগুলোকেই স্বাভাবিক পরিণতির শহর বলছি। আর বিপরীতে  কলকাতা এসবের বাইরে ছিল বৃটিশের হাতে গড়ে উঠা শহর। অর্থাৎ যেমন আফ্রিকায় কলোনিদখলের ফেনোমেনা। ওখানে কলোনিদখলের আগে আফ্রিকায় নিজ শহর বলতে যা বুঝায় এমন কিছু কোন আফ্রিকান দেশে ছিল না। বরং প্রায় সবদেশের বেলায় তারা কলোনি মাস্টারের হাত ধরে আফ্রিকানেরা প্রথম শহর কি তা  গড়েছিল ও চিনেছিল। আমাদের কলকাতার বেলায় তার অনেকটাই সত্য।

    এই সুবিধাটাই কলকাতার জমিদার হিন্দুরা নিয়েছিল। এই শহরের স্থানীয় শাসক শ্রেণী হিসাবে নতুন উত্থিতরা হল এই জমিদারেরা । যেটাকে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের (জমিদারি আইন ) ফলাফল বলা যায়। এছাড়াও এতে দুটা জিনিষ এই জমিদার হিন্দুরা নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল। তা হল, একটা হিন্দুস্বার্থের চোখে কারা বাঙালি? আর কারা নয়? আর বাংলা ভাষা কোনটা বলতে কোনটা বুঝাবে? এদুটাই তারা একক হাতে ও সংকীর্ণ স্বার্থের চোখে  নির্ধারণ করে নিয়েছিল।

    না একথা বলা বাতুলতা হবে যে বৃটিশেরা আসার আগে অতীতে বাংলার কোন কোণে ভাষা কী কী কতদুর বিকশিত হয়েছিল সেটা কেমন, আর্কিলজি বা প্রাচীন ইতিহাসে কী পাওয়া গেছে অথবা চাই কী চর্যাপদ কী ইত্যাদি। না, আমি এসবের কথা  এখানে তুলছি না, তোলা হচ্ছে না। বরং আগেই বলেছি জমিদার হিন্দু শাসকেরা এরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার আগে বাংলায় কি ছিল সেটা যাই থাক সেটা এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আসলে তাদের কলকাতায় তাঁরা মূলত বাঙালি কারা এর এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল, তাতে বৃটিশেরা আসার আগে আমরা কী, কেমন ছিলাম বলে যে যাই বুঝি না কেন। আর এখান থেকে জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে নির্ধারিত ও নির্মাণ হয়েছিল এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা যে, বাঙালি কারা, বাংলাভাষা কোনটা। আর এদেরই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল –  “মুসলমানেরা বাঙালিই নয়”। এটাই কলোনি-কলকাতার বাঙালির সংজ্ঞার মৌলিক দিক। আর সংস্কৃত ঘেঁষা করে আর সংস্কৃত-ব্যকরণ-সম্মত করে (সাথে ইংরেজ পাদ্রী ধর্মপ্ররচারকদের স্বার্থে ও তাদের হাতে) যে বাংলা গদ্যভাষা খাঁড়া করা হয়েছিল তা নিয়ে এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আপত্তি ছিল।

    —–“মুসলমানেরা বাঙালিই নয়” – কথাটা কী সত্য? —-

    আধুনিক শব্দটা অদ্ভুত, এটা সবচেয়ে ভাল অপ-ব্যবহার হয় কাউকে আধুনিক নয় বলে দাবি করে খালি একবার কোন ফতোয়া দিয়ে দেয়া। এরপর অতএব সে নিশ্চয় “পশ্চাতপদ” [মুসলমানেরা পশ্চাতপদ], এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি করা যাতে বিপরীতে, বক্তা নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে প্রমাণ করতে ও তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে যায়। এসব বদ-মতলবের বাইরে বর্ণনা অর্থে “আধুনিক ভাষা” বলে একটা ধারণা-শব্দ ব্যবহার করব। বলাই বাহুল্য এটা রেনেসাঁর পরিণতি অর্থে যে আধুনিক ধারণা,  সে অর্থেও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

    আইডিয়েল [ideal] চোখে যখন আমাদের ভুখন্ডের সকল অংশের, সকল জেলা বা অঞ্চলের প্রতিনিধি সকলকে রাজধানিতে হাজির রেখে কমবেশি সকলের প্রভাব ও মিশ্রণে একটা ভাষা উত্থিত করার চেষ্টা করা হয় সেটাকে আধুনিক বাংলা ভাষা। তবে এর সাথে  আরেকটা বড় ফ্যাক্টর অর্থনৈতিক বিকাশ; মানে  কিভাবে ও তখন পর্যন্ত কতদুর সেটা বিকশিত ছিল বা হবার সুযগ ছিল – সেটাই। যে অর্থে শহর বা নগর মানে  হাঁটুরে গঞ্জের চেয়েও উপরে আরো বড় ‘গঞ্জ’ মানে accumulation of Capital  বা উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের কেন্দ্র যেটা বা যেখানে এটা ঘটে বা হয়ে উঠে সেটাই শহর বা নগর। এটাই বুর্জোয়া [bourgeois] সিভিল সোসাইটি জন্মাবার বৈষয়িক পুর্বশর্ত। (বুর্জোয়া শব্দটা এখানে গালি বা নেতিবাচক অর্থ করা ভুল হবে।) যা এরপর নগর রাষ্ট্র, রিপাবলিক ইত্যাদির হওয়ার দিকে রওনা দিতে পারে যদি না তা বিদেশি কলোনিদখলদারদের হস্তক্ষেপের খপ্পরে না পড়ে।
    এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এই পিঙ্ক কালারে লেখা অংশটা এটা আমিই বাক্য সাজিয়ে লিখেছে অবশ্যই।  কিন্তু এর আইডিয়াটা আমি পেয়েছি আমার – কার্ল মার্কসের জার্মান ভাবাদর্শ (পার্ট ওয়ান) – পাঠ থেকে। অর্থাৎ পাঠ ও এখানে উপস্থাপন এর সব দায় আমার কিন্তু মূল আইডিয়াটা অবশ্যই ওস্তাদের। যার কাছে যা নিয়েছি সে ঋণ আগে স্বীকার করে নেয়া ভাল। কেউ আমার একথায় একমত না হলে ক্ষতি নাই, আমি আমারটা স্বীকার করে রাখলাম।  আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের চোখে ও বিচারে – ‘শহর বা নগর’ মানে আসলে কী তা বুঝবার ক্ষেত্রে এটা মার্কসের দুর্দান্ত অবদান, বেস্ট জায়গা হচ্ছে এটা। 

    তবে এখানে আলোচনায় এটাকে আধুনিক বলার সুত্র এটাই যে সারা বাংলাদেশের সব জেলা অঞ্চলকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে বসবাস শুরু করানোটা চাট্টিখানি কথা নয় যে এটা চাইলেই করা যায় এমন নয়। যেমন এখনকার ঢাকাকে বলা যায় তুলনামূলক পারফেক্ট রাজধানী। কারণ অন্তত ১৯৮২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের (উপজেলা) সাথেই এর যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই ভাল বলে সব অঞ্চলের লোক এখন ঢাকায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় একাদেমিক ও কালচারাল পাড়াগুলোর অলিগলি পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে লোকেদের একসেস বা যাতাযাত আছে; পৌছাতে পারে। ফলে সব আঞ্চলিক ভাষারই ঢাকায় প্রবেশ ও পৌছানো এখন অনেক সহজ। ফলে ঢাকায় বাংলা ভাষা বলে যেটা ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে তাকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভাষার হাতের কাছে আছে। এখন যেকোন অঞ্চলের ভাষার বা কোন একটা অঞ্চলের শব্দে এর ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা যত প্রবল  বা তা যত ‘কমিউনিকেটিং’ (এক্সপ্রেসিভ অর্থে) সেই ভাষা বা শব্দ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে তত বেশী। অন্য সকলে  সেই ভিন-আঞ্চলিক শব্দও এখানে আপন করে নিবার সম্ভাবনা তত বেশি। এমন এই আদর্শ সুযোগটা ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশে ছিলই না। এরপর ইকোনমিক বা কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে আস্তে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে আজ  এই জায়গায় এসেছে। এখানে একালের ঢাকার প্রসঙ্গ আনলাম তুলনা করে জমিদার আমলের একেবারে শুরুর দিকের কলকাতাকে পরিচয় পরিয়ে দিবার জন্য।

    যেমন এখন বলব,  আর ঠিক এর উল্টাটা ঘটেছিল কলকাতায় মোটাদাগে সেই ১৮০০ সালের আশেপাশের সময় থেকেই। সেসময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পুরাটাই যেন এমন প্রিমিটিভ স্তরে ছিল যে ফলে অব্যবস্থার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জমিদার হিন্দু শ্রেণী যাকে ইচ্ছা তাকে বাঙালি বলা থেকে বাদ দিয়েছে, মুসলমানেরা বাঙালি নয় বলতে পেরেছিল আর বাঙালি জাত ও ভাষা যেকোনটাকে তা জমিদারের নিজের একক ইচ্ছা ও খেয়ালে হস্তক্ষেপ ও নির্ধারণ করে নিতে পেরেছিল।

    সারকথায় যার পরিণতিতে, এটাকে আমরা বলতে পারি বাংলার সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশকে শাসক জমিদার-হিন্দু “মুসলমানেরা বাঙালি নয়” বলে তাদেরকে জমিদার-হিন্দুর মার্জিনালাইড প্রজা [যার অবস্থান হিন্দু-প্রজারও নিচে] মাত্র করে (চাপানো ব্যাখ্যায়) ফেলে রাখার সুযোগ নিয়েছিল।

    মানুষের রেস (race বা জাতি) পরিচয় বিষয়টা ডিএনএ সংশ্লিষ্ট যাকে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের সম্পর্ক বলি’ সেই সম্পর্কিত ও জাত। তুলনায় ধর্মীয় পরিচয় যেটা এথনলজিক্যাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে যুগ যুগে তৈরি ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়। কারোরই রেসিয়াল পরিচয় কেউ বদলানো যায় না পারে না, তবে তুলনায় ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়গুলোর খুবই স্বল্প কিছু অংশ বদলে যেতে পারে। কাজেই (রেসিয়াল ও এথনিক) জাত পরিচয়ে যে বাঙালি সে আবার মুসলমান ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের কারণে রেসিয়াল বাঙালি থেকেও মুসলমান মানে বাঙালি-মুসলমান অবশ্যই হতে পারে। অবিভক্ত বাংলায় এর পুরা বাঙালি জনগোষ্ঠির এই অর্ধেক  ছিল মুসলমান-বাঙালি আর আবার পুর্ব বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। অথচ এদেরই কোনঠাসা করতে ও আধিপত্যের ছড়ি ঘুরাতে ও দাবিয়ে রাখতে, জমিদার-হিন্দুরা তাদেরকে বাঙালি রেসের (race) অংশ মানতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু কী এসে যায় যেখানে কোন রেস পরিচয় যা আসলে মূলত বদলানো বা অস্বীকারেরই অযোগ্য! সেই জবাব তারা জমিদার হিন্দু বা এইচিন্তার উত্তরসুরিদের পরবর্তিতে দিয়েছিল। পুর্ববঙ্গ বা একালে বাংলাদেশে এরাই ১৯৭১ এক সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই মুসলমানেরা  নিজেদের “বাঙালি” এবং একই সাথে মুসলমান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, ব্যাপকভাবে নাড়া ফেলে দিয়ে। কারণ মা আর সন্তানের প্রথম কথোপকথন কোন ভাষায় শুরু হবে সেটা যেমন বদলানো যায় না – সেটা জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়েই থাকে – এটা তেমনই, বদলানো যায় না। কলোনি-জমিদার আমল থেকেই মুসলমানদেরকে বাঙালি বলতে অস্বীকৃতি যতটা তীব্র হয়েছিল ১৯৭১ সালে এটাই ততোধিক বেগে – মুসলমানেরাই সেই প্রকৃত বাঙালি যারা ভাষার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে তা প্রমাণ করে ছেড়েছিল। ফলে তারা রেসিয়াল ও এথনোলজিক্যালি বাঙালি কীনা এই স্বীকৃতি কারও থেকে চায় না্‌ কারও থেকে নিবার দরকার ফুরিয়ে গেছিল। তা রক্ত দিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল।

    কিন্তু তবু, একালে আরএসএসের উত্থান, গায়ের জোর খাটিয়ে সব ইচ্ছামত করে ফেলবে এমন এক জবরদস্তির হিন্দুত্বের বা হিন্দুত্ববাদের নয়া উত্থানের যুগ। তেমনই সময়কালে এবছর ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মশতবার্ষিকী। তাই নিচে এদিকে ‘হিন্দু সংহতি’ বলে আরএসএসের এক অঙ্গসংগঠন এর ততপরতাকে দেখেন, উপরে বলা আমার কথাগুলোর মিল পাবেন।  যারা গত অন্তত চার বছর ধরে প্রকাশ্যে জনসভা করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাম ধরে উস্কানি তৈরি করে চলেছে। ফেসবুক পেজে তাঁদের ভারচুয়াল উপস্থিতি দিয়ে তারা এবার সেপ্টেম্বরের ২০২০ এর শেষে বাংলাদেশিদের কাছে পৌছে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল। তাঁদের শ্লোগান ও বক্তব্য ছিল এমন যেন তা সেই কলোনিযুগে জমিদার হিন্দুর বয়ানেরই পুনঃআবির্ভাব। বক্তব্য গুলো এমনঃ
    ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হ‌ওয়ার পরে এই পশ্চিমবঙ্গ হল বাঙ্গালী হিন্দুর ন্যাচারাল হোমল্যান্ড। অর্থাৎ এই মাটির মালিক হল হিন্দু বাঙ্গালীরা। তাই পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সম্পদের উপরে অধিকার সর্বপ্রথমে হিন্দু বাঙ্গালীর। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হিন্দু বাঙ্গালীর”।
    “বাংলাদেশী ভাষা পৃথক করো, সনাতনী বাংলা রক্ষা করো।
    বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়?”

                                                                                         হিন্দু সংহতি ফেসবুক

    আরএসএস-এর  অঙ্গসংগঠন “হিন্দু সংহতি”  নামে এই সামাজিক সংগঠন, উপরে এই সংগঠনেরই ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে। তাদের এসব কথার জবাব একটাই, যে পুর্ববঙ্গ বা একালে মুসলমান অধ্যুসিত বাংলাদেশ একে,  কলকাতার জমিদার হিন্দুরা কোন কালেই তারাও “বাঙালি” এই স্বীকৃতি দেয় নাই; আমরা তা চাইও না, অপেক্ষাও করে নাই। বরং আমরা তাদের কেয়ার করি নাই কখনও, এখনও করি না। আমরাই আমাদের রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে যে বাংলাদেশ নিজেই এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা তো বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এর থেকে বাইরে এবং তাদের চোখে অছ্যুত (untouchable)। আর আমরাও কী কলকাতার স্বীকৃতি কখনই চেয়েছি? বরং আমরা নিজেই প্রজা-বাঙালির বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছি। [যদিও শাহবাগের কিছু  কবি-সাহিত্যিক এখনও প্রবল আছে এরা নিজেদের লেখা কবিতা বা সাহিত্য হয়েছে কিনা তা নিজেরা নিজেকে মুল্যায়ন করতেও অক্ষম তাই উত্থানরহিত। এদের অযোগ্যতা ক্ষমাহীন যখন দেখি এরা কলকাতার পদতলে নিজেদের সঁপে দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে চায় যে তাদের সাহিত্য হয়েছে কিনা; এরা এমনই সেলফ-লেস বা মর্যাদা বোধহীন স্টুপিড।] অতএব বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে আরএসএস এর কোন প্রকল্প যা আছে আমরা একে কেয়ার করি না, পাত্তা দেই না। বরং পরামর্শ থাকবে দূরে থাকেন। দাদাগিরি করতে এসেন না। চাইলে হিন্দুগিরি করেন কিন্তু কেবল কলকাতার ভিতরে সীমাবদ্ধ থেকে, যদি কলকাতার তা সহ্য হয়। এদিকে আমরা নিজেকে নিয়ে খুবই ভাল আছি। পুর্ববঙ্গকে মর্ডানিটি শিখাতে এসেন – এটা আপনাদের কাজ বা আপনারা এই যোগ্যতা নিজের জন্য রেখে দেন, প্লিজ। আর ভারতীয় হিসাবে  কলকাতার সমস্ত দায় এবং আবর্জনা সবই তো কলকাতারই! আমাদের তাতে ভাগীদারি বা দাবি নাই। ডিজ-ওনড এন্ড ফুলস্টপ!

    ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বা ভিকটিমহুডঃ
    সব ক্রিয়ারই নাকি প্রতিক্রিয়া থাকে, থেকে যায়। তবে আসলে কথাটা হল ফোলানো বেলুন টিপাটিপির মত! ফোলানো বেগুনের কোন  একদিকটা চাপ দিয়ে ধরলে তাতে প্রতিক্রিয়ায় অন্যদিকটা বেশি ফুলে যাবে। প্রতিক্রিয়া ঘটতে অনেক সময় হয়ত তা ‘ফেবারেবল’ সুযোগের অপেক্ষা করেন। আপনি কাউকে যেমন ট্রিট করবেন, নিচা দেখাবেন কী পায়ের নিচে পিষবেন, অপমানে কোনঠাসা বা মার্জিনালাইজ করবেন তার পুরাটা না হলেও এরই বড় কিছু প্রতিক্রিয়া এরপরে আপনার উপর পালটা আসবেই। সেটা চিন্তা করে তাই এর মুখোমুখি হতে আগেই তৈরি থাকতে পারেন! আপনি হয়ত তখন নাকিকান্না করবেন, কী ভিকটিম হিসাবে পুরান সেই দাপুটে জমিদারের ছাতার নিচের আপনি এবার নিজেকে ভিকটিম হিসাবে ভিকটিমহুড দেখিয়ে তুলে ধরে দেখিয়ে উলটা সহানুভুতি তৈরির চেষ্টা করবেন, এমনটাই সাধারণত দেখা যায়। ঠিক এই জিনিষটাই যেন ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পরে। কারণ পাকিস্তান মানে তার পুর্ব-পাকিস্তান অংশে মানে, আগের পুর্ব-বঙ্গে স্থানীয় শাসক যে জমিদার-হিন্দু ছিল, পরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে বলাই বাহুল্য এবার আগের ঐ জমিদার হিন্দুদেরই এতদিনের আয়েস ও লালিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য যুগের অবসান ঘটেছিল, অন্তত পুর্ববঙ্গে বা পুর্ব-পাকিস্তানে। আরও এতে বিশাল রাজনৈতিক এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পুর্ববঙ্গীয় বাসিন্দাকে উল্টপালট প্রভাবিত করেছিল। তবে পরিবর্তন মূলত সবই পুর্ববঙ্গে। দেশভাগে পুর্ববঙ্গে যখন জমিদার-হিন্দু শাসন ক্ষমতা ও আধিপত্য হারিয়েছিল তখনও বাংলার অপর অংশ পশ্চিমবাংলায় তাঁদের আধিপত্য কিন্তু আগেরর মতই অটুট ছিল। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে জমিদার-হিন্দু ও তার মাখনের স্বাদ চাখনা প্রজা-হিন্দু এবার পুর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এটাই তাদের সেই দুঃখে হু হু করে উঠা মনে দেশভাগ – আর অভিশাপ, শাপান্ত! অর্থাৎ সেটা আর শুধু জমিদার-হিন্দু বা এলিট হিন্দুরাই নয় বরং জমিদারেরই আদরের ব্যাপক প্রজা-হিন্দুরাও এথেকে বাদ পরে নাই। আর তা মূলত এতদিন  প্রজা-হিন্দুরা যারা জমিদার-হিন্দুর সাথে “কালচারাল নৈকট্য” অনুভব করে  মুসলমান-প্রজার উপরের স্তরের জাতবিভাগের অবস্থান দাবি করে সেই অজুহাতে মুসলমান প্রজার উপর আধিপত্যের স্বাদ নিত, সব সুবিধা নিয়ে এসেছিল সেসব – বলা যায় এবার কাফফারা হিসারে সেই অপকর্ম যেন সুদে-আসলে উসুল হয়ে এসেছিল।

    যেকোন ফোর্স মাইগ্রেশন অবশ্যই খারাপ, কখনই তা কাম্য নয়। কিন্তু পুর্ববঙ্গের প্রজা-হিন্দুরা সাময়িক “কালচারাল নৈকট্য” এর আধিপত্যের মজা খেতে গিয়ে লং-টার্মে নিজেদের জন্য নিজেকেই এর ভিকটিমে পরিণত করেছিল।  এরপর  আজও যে ৮-১০% হিন্দু বাংলাদেশ অবশিষ্ট আছে তারা সেই থেকে নিজের দুঃস্থ অবস্থা এই ভিকটিমহুডকে বিক্রি করে যতটা প্রভাব তৈরি করা যায় এর উপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। এই বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞ এসবেরই মূল বা ফোকাস দল হল সিপিবি। আর এরপরে ন্যাপ, আওয়ামি লীগ থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সকল প্রগতিশীল – এরা এখনও সেই হেরে যাওয়া ঝান্ডা আকড়ে আছে!!!  সত্যি এক দুর্দান্ত অপচয় বটে!!! যাদের সাহসও নাই যে তারা গত দু’শ বছরের বেশি জমিদার-হিন্দুর অসম্পুর্ণ সন্তুষ্টির এক আকাঙ্খা  -ভটক তে হুয়ে আকাঙ্খা – তারা কেন বয়ে বেড়াচ্ছে, কী করে আসছে তা উল্টে-পাল্টে দেখে! এটাই এখন এক তীব্র ইসলামোফোব ঘৃণা ও বিদ্বেষ!!!

    পাকিস্তান পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র – এটাও নেহেরু-গান্ধীর ভারতের মতই আরেক নেশন স্টেট যার সারকথা হল, ব্যাপক নাগরিক বৈষম্য। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে এই চরম অসাম্য চর্চা হতে দেখা যায়।  যার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান জাতি-রাষ্ট্র উপড়ে ফেলা আর এর বদলে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়ে পুণর্গঠন। রামমোহন রায়ের (১৮১৫ সালের ব্রাহ্ম-সমাজ এর নেশন-বোধ) এই আদি পাপ বা আদি ভুল থেকে বেরিয়ে আসা।  যদিও রাষ্ট্রগঠনের এসব দিক নিয়ে সচেতনতা এখনও রাজনীতিতে এমনকি একাদেমিক পাড়াতেই নাই, কোথাও নাই।  এবং বিশেষত এই না থাকার আসল কারণ  “ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তার” ক্ষতিকর আধিপত্য। বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত (কারণ এরপর নিজেই মারা যায়) কমিউনিস্ট আধিপত্য। যারা আজও রাষ্ট্রগঠনের এদিক নিয়ে আলোচনা বা বুঝাবুঝি করতে অযোগ্য। কারণ তারা এসব আলোচনাকে “বুর্জোয়া” বা “ডানপন্থি” বলে দেখিয়ে এসেছিল। সেসব এক অবুঝ ও নাদানদের  দুর্দশা হয়ে আছে এখনও।  আর মূলত “শ্রেণী রাষ্ট্রের” বা রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের কথা জোর দিয়ে তুলতে গিয়ে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মৌলিক দিক – নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠার  কাজটাই তুচ্ছজ্ঞানে বাদ দিয়ে গেছে। কেবল রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের বুঝের খোদ রাষ্ট্রচিন্তা বলতেই তা এক দানবীয় স্বৈর এমনকি কখনও অবলীলায় এক ফাসিজমের ধারণায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টরা জনপ্রতিনিধিত্ব বা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন ধারনাটাো কখনও গ্রহণ করে নাই বরং তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয়-জ্ঞান করে ফেলে দিয়েছে ও হারিয়ে ফেলেছে।  বাস্তবে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে এরাই আজ অচল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

    এভাবে এরপর কী হতে হবে সে আলাপে আপাতত ছেদ দিয়ে একটু পিছনে ফিরা যাক। আসলে ১৯৪৭ এর দেশভাগ বলে যা পরিচিত, এতে পুর্ববঙ্গের জমিদারি ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়াতে তার ফেলে আসা জমিদারি বা জমি সেটা তো তখন আরেক রাষ্ট্র বা ওর অংশ হয়ে গেছে। সারকথায় যার উপর পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতেরও আর কোন owning বা কর্তৃত্ব বা এক্তিয়ারই নাই হয়ে গেছিল। ইতোমধ্যে কালক্রমে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালের পুরানা জমিদারি আইন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন) বাতিল করে ১৯৫১ সালের ১৬ মে নতুন প্রজাস্বত্ব আইন (ল্যান্ড একুজেশন এন্ড টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫০) পাশ হয়ে যায়। সেই ‘জমিদার উচ্ছেদ আইন’ এখনও বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ হয়ে আছে। আর এতে জমিদারির শেষ ক্ষমতাটুকু অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা বাতিল ও চিরসমাপ্তি লাভ করেছিল। আর এরই ফলাফলে পুর্ববঙ্গে আগে যারা প্রজা বা ভাগচাষী ছিল তারা তখন থেকে সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আগের চাষাবাদের জমিরই মালিক বলে আইনি স্বীকৃতি পায়, তাঁদের নামেই টাইটেল জারি হয়। ১৭৯৩ সালের জমিদারি ব্যবস্থা চালুর আগে যে টাইটেল প্রজাদের নামেই ছিল। আর এই আইনটা তৈরির সময় যে সাধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করে তৈরি বা মেনে করা হয় তা হল, (এখনও বাংলাদেশের জমি অধিগ্রহণ আইন আছে এটা সেটাই) জমি অধিগ্রহণ আইন  অনুসারে পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে, পুর্ব-পাকিস্তান সরকার যেকোন জমি “অধিগ্রহণ করা হল” বলে ঘোষণা দিতে পারে। সেই আইন দিয়েই প্রথমে সারা পুর্ব-পাকিস্তানের সব জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড একুজেশন) করে নেয়া হল বলে ঘোষণা জারি করা হয়। আর এর ফলে আগের সব জমিদারি মানে, জমিদারের মালিকানা টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবার যে প্রজা যে জমি চাষাবাদ করত এবার সেই প্রজাই ঐ জমির জন্য সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে তাকেই মানে তার নামেই জমির নয়া মালিকানা টাইটেল জারি করে দেয়া হয়েছিল। আর এই হল আজকের বাংলাদেশের সকল ভুমি মালিক যাদের পুর্বপুরুষের জমির টাইটেল কেড়ে নিয়ে বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে জমিদার নামে নতুন একটা শ্রেণীর কাছে তাঁদের জমি নতুন টাইটেল করে দেয়া হয়েছিল, দুশবছর পরে হলেও এই জবরদস্তির অবসান ঘটেছিল। পুর্ব পাকিস্তানের ‘প্রজারা’ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমির মালিকানা টাইটেল ফেরত পেয়েছিল তখন থেকে। সোজা কথায় পাকিস্তানের জন্ম মানে পুর্ব-পাকিস্তানের আগের প্রজাদের এবার নিজের নামে জমি ফিরে পাওয়া। অন্তত এই একটা কারণে পুর্ব্বঙ্গের সকল প্রজারা পাকিস্তান আন্দোলনের সুবিধাভোগী বেনিফিশারি বলে পাকিস্তান কায়েমকে অন করা উচিত!   অতএব সারা পুর্ববঙ্গের প্রজা-কৃষকেরা (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে এখান থেকেই ডাইরেক্ট বেনিফিশারি হয়ে যায়, কারণ তারা জমি পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তান কায়েমের সরাসরি বেনিফিসিয়ারী ফলে নিট সমর্থক হওয়ার কথা! কিন্তু না! যদিও এই অবস্থাটা পরবর্তিতে দুএক বছরের মধ্যে একই রকম আর থাকে নাই। কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত ও উলটে যায়। এবার পয়সা হাতে পেয়ে কৃষকেরা নিজ সন্তানকে যতই শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছিল ততই তারা মাথা কামিয়ে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট হতে পথ ধরেছিল। এটাই নাকি আধুনিকতা!!! কেউ যা উল্টে-পাল্টে চেক করে দেখে নাই – সেই পুরানা জমিদার-হিন্দুর স্বার্থবয়ানের চোখে লেখা মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদির চক্করে পড়ে গেছিল তা আজও তারা টের পায় নাই যে ভুলটা কোথায় হয়েছিল!!!  জমিদার-হিন্দুর মূল বয়ান হল ধর্মই সব নষ্টের গোড়া। তবে সাবধান!  এখানে ধর্ম মানে কেবল ইসলাম বা মুসলমানদের কারণেই তার জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। একারণে ১৯৪৫ সালের পরে জমিদার ও অনুসারিরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। তাই মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদি  আধুনিকতার ধারণাগুলোকে তারা ইসলাম-উচ্ছেদের প্রকল্পের দিক থেকে ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছিল।  অতৃপ্ত আত্মা নাকি মারাত্মক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়। জমিদারি-হারানোর অতৃপ্ত আত্মার তাই হয়েছিল।  তাই তামাসাটা দেখেন, সে নিজে কিন্তু নিজধর্ম পালন করেও আধুনিক-প্রগতিশীল হয়ে আছে!  কেন?  [দ্বিতীয় পর্বে দেখেন আগামী কাল শুক্রবার]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    সর্বশেষ এডিট আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩ ভোর-রাত  দুইটা চল্লিশ

    [সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল এই পত্রিকা গ্রুপেরই এক ভগ্নি, আরেক ত্রৈমাসিক সাময়িকী পত্রিকাও আছে।  কিন্তু মূলত সেটা প্রিন্টেড পত্রিকা, যার  সাথে কেবল এক ই-পেপার ভার্সান আছে।  এই লেখাটা ঐ ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার গত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২০  সংখ্যায়, “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাতপর্য ও  অতঃপর ……” এই নামে ছাপা হয়েছিল।  তা প্রায় পাঁচ হাজার অক্ষরের অনেক বড় লেখা  ছিল। সেই লেখাটাকে এবার আবার এডিট করে আরো সংযোজন-বিয়োজন করে তিনপর্বে তা  এবার নতুন নামে  নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।

    ওদিকে ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার  ই-পেপার পাঠক ফেন্ডলি নয়।  তাই আগের লেখাটার এক পিডিএফ ভার্সান এখানে পেতে পারেন। নামিয়ে নিতে হবে। ]

  • সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    গৌতম দাস

    ০১ মার্চ ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3oJ

    ক্ষমতার ভারসাম্য বিন্দু চীন-ভারত নয়, নেপালকেই ঠিক করতে হবে © by Hiroko Oshima/Michael Tsang

    –
    নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি (খাড়গা প্রসাদ ওলি, Khadga Prasad Sharma Oli, ) এখন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হয়েও সম্ভবত আগামী মাসের মধ্যে আর ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না। নেপালের পার্লামেন্টের আয়ুকাল আরো প্রায় দুবছর বাকি থাকা সত্ত্বেও গত ২০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী ওলি সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী এপ্রিল-মে মাসে নতুন নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছিলেন। সেই থেকে তিনি নিজেই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী থেকে নিজেকে  অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তিকালীন প্রধানমন্ত্রী করে নিয়েছিলেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিও অনুমোদন দিয়েছিল, যার মূল কারণ অনুমান করা যায় যে রাষ্ট্রপতিও নিজ দলীয় ভগ্নাংশের। কিন্তু তাতে কিছু ‘সংক্ষুব্ধ’ ব্যক্তি ও দলের প্রতিনিধিরা সুপ্রিম কোর্টে নালিশ দিয়েছিলেন। এমন মোট ১৩টি মামলার নিষ্পত্তি করে প্রায় দুমাস পরে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ কোর্ট তার রায় দিয়েছে । সে রায় হল, প্রধানমন্ত্রী ওলির “সংসদ ভেঙে দেয়া ছিল কনষ্টিটিউশন লঙ্ঘন” [……house dissolution as an unconstitutional act,]। এছাড়াও তাই, আগামি ১৩ ওয়ার্কিং ডে-এর মধ্যে সংসদ পুনরুজ্জীবিত করে আবার চালু বা বসাতে হবে।
    এতে এখন এই নতুন পরিস্থিতিতে ওলিকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ মানে – সংসদে তাঁর ইমপিচমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। কারণ ওলির মিলিত কমিউনিস্ট দল আগেই তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে দলের সভাপতির পদ থেকে তাঁকে অপসারিত করে রেখেছে। সে জায়গায় দলের নতুন কো-সভাপতি মাধব কুমার নেপাল (মাধব আগে অ্লির দলের সেক্রেটারি ছিলেন)।  “দলের সেন্ট্রাল কমিটিতে ৪৪৬ জন সদস্যের মধ্যে ৩১৫ জনই মাধবের পক্ষে” ভোট দেন”।
    এখন সংসদ নতুন করে বসলে প্রথম ইস্যু প্রধানমন্ত্রী ওলিকে অনাস্থা ভোট সামলাতে হবে। যেখানে তাঁর হেরে যাবার সম্ভাবনাও খুবই বেশি। আর এই ব্যাপারটা ফয়সালা হবার পরই দলের অপর অংশের নেতা (প্রাক্তন মাওবাদী) পুস্প কমল দাহাল প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কিনা তা নির্ভর করছে। এদিকে গত নির্বাচনে (২০১৭ ডিসেম্বর) (অলি ও দাহাল) তাঁদের  দুই  নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি এক হয়ে লড়েছিল ; তবে একদলে মিশে যাবার প্রক্রিয়াও শুরু করে। ঐ নির্বাচনে নেপালের ২৭৫ আসনের সংসদে তারা পেয়েছিল ১৭৩ আসন। দলে অলিকে সভাপতি পদ থেকে অপসারণের পরে এখন দলে দাহাল-মাধব এর যৌথ প্রভাব দলের মধ্যে কতটা এরই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, কার্যত নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গেলেও আইনিভাবে সংসদে এটা এখনও একটাই দল হয়ে আছে।  এই পরিস্থিতিতে চীন ও ভারত উভয়েই নেপালের রাজনীতিতে প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

    গ্লোবাল নেতৃত্ব কী জিনিষঃ
    “গ্লোবাল নেতৃত্ব”- এই বিষয়টি এমনিতেই দুনিয়াতে সবসময় হাজির ছিল এমন ফেনোমেনা নয়; ফলে সেই ‘গ্লোবাল” নেতৃত্বের মধ্যে আবার একালে কোনো ‘পালাবদল’ আসা – এটাও বারবার ঘটে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও, ‘গ্লোবাল’ বলে বা ‘দুনিয়াজুড়ে’ কোনো একক বা দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক প্রভাব বলে কিছু ছিল না। তাও রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রভাব এ দুটোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রভাব সবসময় আগে আসে। আর তাকে ফলো করে রাজনৈতিক প্রভাবও হাজির হয়ে থাকে।
    যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) আগে দুনিয়াতে ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ বলে কিছু ছিল না। যদিও কলোনি দখল করতে চায় এমন ছোট-বড় মাতবর গোটা পাঁচেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র তখনও ছিল যাদের মধ্যে শেষবিচারে প্রধান দুই কলোনিদখলদার ছিল বৃটিশ ও ফরাসি রাষ্ট্র। আর আমরা তখন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি হিসাবে ছিলাম, প্রায় ২০০ বছর। কিন্তু তবুও সে সময়ের ব্রিটিশরা গ্লোবাল নেতা বা লিডার কিনা এমন কিছু বলার কোন চলই ছিল না।
    তবে এমন কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক-রাষ্ট্রের ধারণার এরপর দুনিয়া থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে, যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৪১ সাল থেকে অবসান ও বিলুপ্তি ঘটেছিল। এটাই ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিতর দিয়ে ঘটেছিল। অর্থাৎ ‘দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর কেউ কাউকে অধীনস্থ ও কলোনি দখল করে আর রাখতে পারবে না”। এই “অবৈধ গণ্য” করার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র-সংঘের [United Nations] জন্ম। মানে, কলোনি অধীনস্থতার সম্পর্ক দুনিয়া থেকে লোপ পাবে – এই নীতিগত দিক তৈরি হয়েছিল তখন। আর তাতেই বিশ্বযুদ্ধে এই ভিত্তিতে পক্ষ-বিপক্ষ দুটো রাষ্ট্রজোট তৈরি হয়েছিল। কলোনি দখল অবৈধ – এ নীতির ভিত্তিতে যারা পক্ষজোট (এদেরকে সেকালে মিত্রশক্তি বলা হত), তারাই আমেরিকার নেতৃত্বে লড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিল। আর তা থেকেই আমেরিকা নিজেকে “গ্লোবাল নেতৃত্বের” আসনে বসাতে সমর্থ হয়েছিল।
    তবে বিশ্বযুদ্ধে বিজয়লাভের সাথে আমেরিকার হাতে গ্লোবাল নেতৃত্ব এসে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল – আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা। যদিও সেই বিনিয়োগের সুযোগ হাতে পেতে আগে আমেরিকাকে আরো দুটো বড় খরচের দায় নিতে হয়েছিল। এক. নিজ পক্ষজোটের সবাইকে যুদ্ধের খরচ বা ব্যয়ভার জোগানো; আর দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের পর, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ-বিপক্ষ সব রাষ্ট্রকেই ত্রাণ, পুনর্বাসন ও ভেঙে যাওয়া অবকাঠামোগুলো আবার গড়ে দেয়া ইত্যাদিতে নতুন বিনিয়োগ-ঋণ দেয়া। এটাই ১৯৪৪ সালে জন্মের পরে বিশ্বব্যাংকের কাজের প্রধান ক্ষেত্র হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এসব খরচ আমেরিকা কিভাবে ফেরত পাবে কিংবা তা ফেরত নাও পেতে পারে এমন সম্ভবনা থাকলেও, এদিকটা অনিশ্চিত ও উহ্য রেখেই আমেরিকা এই বিপুল খরচ শুরু করতে হয়েছিল; যা পরে কমবেশি উসুল হয় অবশ্য। কিন্তু তাতেই আমেরিকার ‘সবচেয়ে বড় পাওনা’ দুনিয়ার গ্লোবাল নেতৃত্ব নিজের হাতে চলে আসা। আর সেই থেকে দুনিয়ায় ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ ধারণাটাও প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।
    আরেক দিক থেকে দেখলে, গ্লোবাল নেতৃত্ব কথাটার তাৎপর্য কী? একেবারে ‘রূট’ মানে গোড়ার দিকে তাকিয়ে বললে এটা সোজাসাপ্টা এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আর ক্যাপিটালিজম মাত্রই এর ভেতরে গ্লোবাল হয়ে উঠার স্বভাবটা সবসময় সুপ্ত থাকে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যা ব্যাপ্তি লাভ করে ছেয়ে বসে। এতে ছোট ছোট পকেট বা ছোট-বড় আঞ্চলিক ক্যাপিটালিজমের উদ্যোগ ও ফেনোমেনাগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে পড়ে; যা পরবর্তিতে এক গ্লোবাল ক্যালিটালিজমের রূপ ধারণ করে বিকশিত হয়ে উঠতে চায়।

    এ কারণে ‘কলোনি শাসন অবৈধ’ হয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জয়লাভ কথাটার ব্যবহারিক মানে হয়ে যায়, যুদ্ধ শেষে কলোনিমুক্ত শ-দেড়েকের বেশি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় আমেরিকার বিনিয়োগ-ক্রেতা। এমন হবার পিছনে আরও বড় ফ্যাক্টর ছিল। যেমন, এসব রাষ্ট্র স্বাধীন-মুক্ত হলেও এতদিন কলোনিদখল লুটেরাদের অধীনে থাকায় উদ্বৃত্ত-সম্পদ সব কলোনি মালিকের দেশ লুটে নিয়ে যাওয়ায় এরা স্বাধীনরাষ্ট্র হবার পরেও অর্থনৈতিকভাবে এরা একেবারে ফোকলা। এ’অবস্থা থেকে আবার বেঁচে সক্রিয় হয়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রধান প্রয়োজন ছিল বাইরের বিনিয়োগ-ঋণ, যেটা হতে পারে লুট হয়ে যাওয়া সারপ্লাসের সবচেয়ে ভাল এভেলএবল বিকল্প। এরই স্টোর ও সাপ্লায়ার হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আমেরিকা। কাজেই প্রথমবারের গ্লোবাল নেতৃত্বে ‘আমেরিকা’ কথাটার তাৎপর্য হয়ে উঠেছিল এই যে, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর আমেরিকান নেতৃত্ব গ্লোবাল সিস্টেম থেকে বিনিয়োগের পুঁজি-পণ্য নেয়া্র এক নতুন সম্পর্কে জড়ানো। তবু আরও কিছু কথা পরিষ্কার রাখা ভাল। কলোনি-উত্তরকালে আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের সাথে আমাদের মত দেশের গভীরভাবে পণ্য-পুঁজি বিনিময় সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া – এ সম্পর্কটাও আগেকার কলোনি দখল হয়ে থাকা সম্পর্কের চেয়ে অবশ্যই তুলনায় ভাল কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে তা হলেও এটাও অসম; এক অসম বিনিময় সম্পর্ক। কিন্তু অবশ্যই তুলনামূলক অর্থে নতুন সম্পর্কটা বেশি ভাল, কলোনিসম্পর্কের চেয়ে ভাল; ‘মন্দের মধ্যে ভাল’ অর্থে।

    সমাজতন্ত্রী বনাম গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমঃ
    কিন্তু সমস্যা দেয়া দিয়েছিল অন্যখানে। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে এবার আমরা কি ‘কথিত সমাজতন্ত্রী’ হবো নাকি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ হবো? মানে পরেরটা অসম বিনিময় সম্পর্ক হলেও তুলনামূলক ভাল বলে এই অসম বিনিময় সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারব এমন সুযোগ হাজির হয়েছিল। সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ্টাই হয়ে পড়েছিল পরের দীর্ঘ চার দশকের ‘সমাজতন্ত্রী’ হওয়া না হওয়ার দ্বন্দ্ব। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর চীন ষাটের দশক থেকেই ক্রমশ ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজম’ – এভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাথে যুক্ত হওয়ার পথ নেয়ায় আমাদের মত সব রাষ্ট্রের জন্য পথ বেছে নেয়া সহজ হয়ে যায়। ফাইনালি আমরা সবাই এখন আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ – আমরা এটা পছন্দ করি আর নাই করি। আর এটা অসম বিনিময় সম্পর্কের হওয়া সত্ত্বেও ‘মন্দের ভাল’ বলে, এভেলএবল পথ বলে। অর্থাৎ কলোনি-উত্তরকালে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক সিস্টেমের অংশ হয়ে উঠার পথটাই অন্তত আপাতত টিকে যায়, প্রধান ধারা হয়ে যায়।
    তবে ইন্টারেস্টিং দিকটা হচ্ছে, সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থার রাষ্ট্রগুলো ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকাই ছিল না। তারা নিজ গুণ বা দোষেই ভেঙে পড়ে অকার্যকর হয়ে গেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত একমাত্র যা করলে সবারই টিকে থাকা সম্ভব হবে, অর্থাৎ সারভাইবাল কোন রকমে নিশ্চিত করা ছিল সবার কাছে সবার উপরে একেবারেই মুখ্যবিষয়। এছাড়াও আর সবার চেয়ে বড় কথা – সমাজতন্ত্রীদের বড় বড় খামতির দিক তো ছিলই। যেমন – গ্লোবাল বাণিজ্য বা দুনিয়াজুড়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা লেনদেন বিনিময় ব্যবস্থা হাজির থাকা আদৌ এসেনশিয়াল কি না এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে মৌলিকভাবে এখনো একেবারেই বেখবর হয়ে আছে সমাজতন্ত্রীরা। ইস্যুটাই কানে ঢুকে নাই এখনও এমন অবস্থা!

    গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলঃ
    এদিকে এই শতকে এসে প্রায় সত্তর বছর চলার পরে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে  এবং ঢলেও পড়ছে। তাই গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল আসন্ন এই বাস্তবতা প্রায় সবাই মেনে নিয়েছে।  কিন্তু কেন আমেরিকা ঢলে পড়ল? আগামী ঐতিহাসিকরা সম্ভবত মূলত এর দুটো কারণ উল্লেখ করবেন। এক. আফগানিস্তানঃ  এই রাষ্ট্র আমেরিকার সাথে যে তুলনায় অযোগ্য ও অবিকশিত একথা তুচ্ছভাবে  বলতে পারেন অনেকেই। কিন্তু আমেরিকার এই ঢলে পড়া বা পতন ঘটানোর অন্যতম ‘হিরো’ তবু এই আফগানিস্তান। সে একটাই কাজ করেছে। তা হল, আমেরিকাকে সে এমনই ‘নেভার এন্ডিং’ এক অনন্তযুদ্ধে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে নিয়ে গেছে যে এখান থেকে বের হবার পথ নাই ফেলে পালানো ছাড়া। আর তাই ঘটেছে। শুধু তাই না ওদিকে এতে, যুদ্ধের নিজখরচ জোগানোর সামর্থ্য গ্লোবাল নেতা আমেরিকার অর্থনীতির আর নাই। মনে রাখতে হবে, ২০০৮ সালের যেটা ‘গ্লোবাল মহামন্দা’ বলে জানি আমরা, যেটা দেখা দিয়েছিল ১৯৩০ সালের প্রথমটার পরে দ্বিতীয় বড় মহামন্দা বা রিসেশন [global recession]। ২০০৮ সালের মহামন্দার মূল কারণ কিন্তু যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে ফেল করা আমেরিকান অর্থনীতি। শেষে ওবামা প্রশাসনের ১০ হাজার বাদে (২০১১-১৪) সব সেনা ( অন্যান্য দেশেরসহ ন্যাটোর সেনাও) ফিরিয়ে আনার প্রধান কারণ এই ফেইল্ড অর্থনীতি। অথচ এই যুদ্ধে গিয়ে বলার মত কোন কথিত “লক্ষ্য” অর্জনও করতে পারে নাই।
    এছাড়া আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, পাশাপাশি চীনের উত্থান; ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজমের’ চীন – এর কাছে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারানো।

    গ্লোবাল নেতা মানে কোন সামরিক সক্ষমতার ধারণা নয়ঃ
    একটা বড় ভুল ধারণা আবার ভেঙ্গে দেই। অনেকের মানে সাধারণ মানুষসহ অনেক আমেরিকান দ্বিজ্ঞজদেরও ভুল ধারণাটা হল, “গ্লোবাল নেতৃত্ব” মানে বুঝি সামরিক শক্তির সক্ষমতা। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে গেলে প্রধান শর্ত হল বিপুল পরিমাণে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ব বা সারপ্লাস জেনারেট করার স্তরে নিজ অর্থনীতিকে পৌছানো আর তাতে ঐ উদ্বৃত্ব মানে অন্যদেশে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষমতা নিজ হাতে আসা। এতে অন্য সবদেশের প্রায় সবকিছুকে প্রভাবিত করার বিপুল ক্ষমতাধারী হয়ে উঠা – এটাই গ্লোবাল নেতৃত্ব।  বলা বাহুল্য এর ফলে এটা নিজ দেশকেও সামরিক, রাজনৈতিক দিক থেকেও প্রভাবশালী করে গড়ে তোলা ও উঠার কারণ হয়ে যায়। অর্থাৎ গ্লোবাল নেতৃত্ব-এর স্তরে পৌছানোটা একটা বৈষয়িকভাবে হয়ে উঠার বিষয় যা রাজনৈতিক নয় বা সামরিকও নয়।  যেমন, আমেরিকার এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সামরিক সক্ষমতার ধারক। কিন্তু তা দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানোতে আমেরিকা যোগ্য না।

    চীনের নেতা হিসাবে উত্থান, এটাকেই ‘গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল’ বলা হচ্ছে। নেপালসহ আমাদের মতো রাষ্ট্র বিশেষত যাদের দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতকে সাথে নিয়ে বসবাস, তাদের জন্য এই ‘পালাবদল’ এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

    চীনের সাথে ভারতের নাম কেন?
    আবার চীনের সাথে ভারতের নাম নেওয়ার মানে এই নয় যে ভারতও অর্থনীতিতে কিছু একটা হয়েছে, তা নয়। ভারত এখনও বিপুল সারপ্লাস জেনারেট করা বলতে যা বুঝায় তেমন কোন আলামতের দেশই নয়। বরং বিনিয়োগ-ঋণ গ্রহীতা দেশ। সেই বিচারে বাংলাদেশ  লেবার রপ্তানি আর গার্মেন্ট বেঁচে ওর থেকে অর্থনীতিতে (এত চুরি আর পাচারের পরও) ভাল অবস্থায়। তাহলে ভারতের এমন শো-আপের পিছনের মুল কারণ কী? সেটা হল, বুশ প্রশাসনের শেষে আর ওবামা প্রশাসনের শুরুর সময়ে এক আমেরিকান সরকারি স্টাডি থেকে আমেরিকা নিশ্চিত হয়ে গেছিল যে “চীন আসছেই”। কিন্তু একটা শয়তানি উদ্যোগ তারা নিয়েছিল – ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” [China Containment] কাজে ঠিকা দিয়ে নামানো। যদিও এখন সবাই মানে তা কোনই ফল দেয় নাই; আমেরিকার ভারত চীনের উত্থানকে ঠেকাতে পারে নাই। কারণ তা যায় না বলে বাস্তবেও তা এখন প্রমাণিত। তাই গত ট্রাম্পের আমলেই আমেরিকার ভারতকে দেয়া আগের সব সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে ভারতের – “আমিও প্রভাব বিস্তার করতে পারি”, বা এশিয়ায়  আমারও “প্রভাবাধীন এলাকা” আছে ধরণের মুই কী হনুরে – এই ফলস ক্লেইম ও স্বপ্নের জামা পড়ে ভারত সেই থেকে এখনও ঘুরে বেড়ায়।

    এ’পরিস্থিতি ঠিক কী প্রকৃতির, অভিমুখ কী, সম্ভাবনা কী, নেতিবাচক দিক কী ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা খুবই জরুরি। যারা এর ঠিকঠাক বোঝাবুঝি-মূল্যায়নে সফল হবেন ও এক্ট করতে পারবেন, কেবল তারাই টিকে যাবেন। আর বাকিরা এ পালাবদলের সাথে সাথে টিকতে না পেরে এর ধাক্কায় হারিয়ে যা্বার সম্ভাবনায় থাকবে। আবার এ পরিস্থিতিতে চীন নিজেই নিজের যোগ্যতা বা ঘাটতি অথবা ইতি ও নেতি দিক সবটা বোঝে- এ্টাও সবটা সত্যি নয়। সবচেয়ে বড় কথা চীন বড়জোর কেবল গ্লোবাল অর্থনৈতিক দিকের (রাজনৈতিক দিকের নয়) নেতা হতে পারে। আর ঠিক ততটাই আমেরিকার তুল্য বিচারে গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতা হওয়া – এক্ষেত্রে চীন এখনো অযোগ্য। চীনের বিরাট দুর্বলতা হল, ‘মাস পাবলিক’ মানে আম-জনগণের সাথে উপস্থিত চীনা-রাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনও একেবারেই কোন ‘রাজনৈতিক সম্পর্ক’ নয়। কারণ, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চোখে – মানুষ মানে, এখনো অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান ইত্যাদি বৈষয়িক চাহিদার একটা ‘ডিব্বা’ মাত্র। যেন মানুষ মানেই এক বৈষয়িকতা, বিষয়সম্পদের চাহিদা মাত্র। আর এই ধারণার কারণে  তাদের কাছে “রাজনৈতিকতা (Polity), স্পিরিচুয়ালিটি” – এগুলো অনেক অনেক দূরের এবং অজানা জিনিস। কাজেই এই চীন দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিবে কিভাবে? যদিও গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা সে নিশ্চিত হচ্ছেই!

    সুনির্দিষ্ট করে নেপালঃ
    একটু পেছনে ফিরি ও সুনির্দিষ্ট করি নেপালকে ঘিরে। নেপাল নিয়ে অনেক হিস্টোরিয়ান গর্ব করে থাকেন যে, নেপাল কখন কলোনি শাসনে যায়নি। এ ক্ষেত্রে সমতুল্যভাবে আমরা বলতে পারি, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতেও সাথে ৫৫০টারও বেশি ‘করদরাজ্য’ (প্রিন্সলি স্টেট বা Princely states)  ছিল যারা পালনীয় কিছু শর্তসাপেক্ষে ‘স্বাধীন’ রাজা ছিল বলে দাবি করত। নেপালও প্রায় সে রকম আসলে এক রাজার প্রিন্সলি স্টেট। ঠিক যেমন বৃটিশ আমলে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ছিলেন। আর ঐ ধরনের করদ-চুক্তিতে যা থাকত তা হল, রাজা যা খাজনা-রাজস্ব সংগ্রহ করবেন এর একটা অংশ ব্রিটিশদের দিয়ে যেতে হবে রেগুলার। আর ব্রিটিশরা ছাড়া অন্য কোনো বিদেশী শক্তির সাথে সম্পর্ক বা যোগাযোগ করতে পারবে না; এমনকি বাণিজ্যিক সম্পর্কও স্থাপন করতে পারবে না। বাইরে থেকে অস্ত্রও কিনতে পারবে না। তবে তাদের প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে নয় রাজার নিজের হাতে রেখে পরিচালিত করতে পারবে; তবে ব্রিটিশদের থেকে রাজারা নিজ প্রশাসক স্টাফদের জন্য ট্রেনিং বা এধরণের অন্যান্য সহায়তা পেতে পারবে। কাজেই এই ‘করদ’ সম্পর্ককে কখনও “কলোনি হয় নাই” বলে কথার ফুলঝুরি সাজানো অমূলক ও অপ্রয়োজনীয়।
    নেপালের ক্ষেত্রে আরও যা ‘বিশেষ ছিল’ তা হল, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় তারা বৃটিশ শাসকদের সহায়তায় পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। বিনিময়ও পেয়েছিল ভালই। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নেপালি গোর্খা সৈন্য দিয়ে সহায়তা করায় বাড়তি কিছু ছাড় পেয়েছিল। যেমন ভূমি ছাড় (মাধেসি অঞ্চল ফিরে পাওয়া), বাইরের দেশ থেকে অস্ত্র কেনা ইত্যাদিসহ ১৯১৫ সালের সুগৌলি চুক্তি,  ১৯৬০ সালের চুক্তিতে “তরাই অঞ্চল” ফেরত পাওয়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করায় আরো ছাড় দেয়ায় সর্বশেষ ১৯২৩ সালের চুক্তি। তবে ঐ ১৯২৩ সালে চুক্তিতে লেখা ছিল যে, এটা ১৯৫০ সালে আবার রিভিউ হবে। আর তত দিনে স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবার নেপালের সাথে আগের চুক্তির আদলেই ১৯৫০ সালের চুক্তি করেছিলেন। সেটারই মূল কথা হল, ভারতের অর্থনীতি ও ব্যবসার অধীনে থেকে একটা নেপালি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। যেমন ভারতের অনুমতি ছাড়া এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ছাড়া নেপালের বিদ্যুৎ বিদেশে (যেমন বাংলাদেশে) নেপাল বিক্রি করতে পারবে না। আর নেহরু এ ধরনের চুক্তির ড্রাফটটা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আমলের ১৯২৩ সালের চুক্তি থেকে। এটাই হল ‘কলোনিমুক্ত নেপাল’ এমন ফলস গর্বের নমুনা। তাই স্বভাবতই নিজেদের প্রটেকশনের জন্য নেপালের রাজশাসকেরা এই নেহরু বা ভারত-অনুরক্ত এক নেপালি রাজতন্ত্র গড়তে খুবই আগ্রহী হয়ে থেকেছিলেন। আর এটাই ছিল নেপালে ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হওয়া মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের মূল কারণ। আর যেখানে অন্যান্যের সাথে ঐ আন্দোলনের প্রধান দুই দাবি ছিল – রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নেপালকে ‘রিপাবলিক’ ঘোষণা আর এই ১৯৫০ সালের চুক্তি বাতিল (রিভিউ) করতে হবে।
    যদিও ঐ আন্দোলন শেষে অন্যান্য দলের সাথে মিলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছিল। আর এই ক্ষমতা দখলের মধ্যে ২০০৭ সালেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন সম্পন্ন হয়েছিল। পরে রাজতন্ত্র উতখাতের স্বপক্ষে আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন হয়েছিল নেপালের প্রথম কনস্টুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরে। সেই অ্যাসেম্বলিতে ২০০৯ সালে। আর রিপাবলিক নেপালের কনস্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি এবং প্রকাশ্যে বিরোধিতা ও অসহযোগিতা শুরু করেছিল ভারত। এমনকি ল্যান্ডলকড যে নেপাল ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া কিছু আমদানি করতে পারে না, অখুশি ভারত এরপর দীর্ঘ ছয় মাস ভারতের ওপর দিয়ে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অবরোধ করে রেখেছিল। নেপালে ব্যবহার্য রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ সব ধরনের জ্বালানি ভারত সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও তা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর এতেই সারা নেপালের সব শ্রেণীর মানুষই নিজ নিজ স্বার্থে ও কারণে প্রবলভাবে অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে উঠেছিল। কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে আকৃষ্ট হওয়ার চেয়েও নিজ নিজ বৈষয়িক ও সারভাইভালের স্বার্থেই তারা হয়েছিল। যেটা এখনও মনমজ্জায় প্রবেশ করে যাবার মত যে এখনও তা প্রবল!

    নেপালের রাজনীতিতে চীনের প্রবেশঃ
    চীন নেপালের রাজনৈতিক আসরে এই প্রথম প্রবেশ করেছিল তখনই, এই ২০১৫ সালে। কারণ ল্যান্ডলকড নেপালের জনগণ নিজ দেশের বাইরে যেতে ভারতের ভূমি পেরিয়ে বাইরে বের হবার বিকল্প খুঁজছিল। ভারত নেপালের এক উত্তর দিক বাদে বাকি সবদিকজুড়েই।

    আর পুরো উত্তরাংশজুড়ে চীন-সীমান্ত হলেও তা আরো পাহাড়ি উচ্চতায় এবং দুর্গম বলে কখনো একে তেমন বিকল্প বলে ভাবা হয়নি। কিন্তু একালে চীনা উত্থানের যুগে চীনা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় হেভি-ডিউটির রেলযোগাযোগ যুক্ত হয়েছে যেটা সমুদ্রবন্দরের সাথেও যুক্ত এমন উন্নত। কিন্তু নেপাল সীমান্তের সবচেয়ে কাছাকাছি চীনের এমন রেলপথটাও নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে দিয়ে চলে গেছে। এতে প্রমাণ হয় নেপালকে নিয়ে চীনের আগ্রহ কেমন কোন সূদুরে ছিল! তবে চীন সম্প্রতি এই ১০০ কিলোমিটার রেলপথ এক্সটেন্ড করে নেপালকে বহির্বিশ্বের সাথে কানেক্ট করে দিয়েছে। যেটা নেপালের কাছে বিরাট কিছু, এক অতুলনীয় বিকল্প।

    কিন্তু সারা নেপাল অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে ফুঁসে উঠার সেই কালেই নেপালে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার শর্ত ওলির কমিউনিস্ট পার্টির টার্ম আসে আর এতে দলের পক্ষে ওলি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসেন। আর তাতে, এন্টি-ইন্ডিয়ান সেই পপুলার সেন্টিমেন্ট  ভাসা নেপালকে জনগণের পক্ষে সফল ব্যবহার করেন ওলি, একজন মাস পপুলার লিডারের যা করা উচিত সেভাবে। মূলত ওলি বা তার দল সবসময়ই নামকাওয়াস্তেই শুধু কমিউনিস্ট ছিলেন, কাজে নয়। যেমন রাজতন্ত্রী নেপালের যুগে নেপালে রাজনৈতিক দল বলতে সবাই  রাজতন্ত্রকে মেনে চলা রাজনৈতিক দল।  যে রাজতন্ত্র মেনে চলে সে কেমন কমিউনিস্ট তা তো বুঝাই যায়। এরাই রাজ-সরকারের মন্ত্রী থাকার লোভে রাজার মন জুগিয়ে চলা দল হয়ে কাজ করত। এমন প্রথম চামচা ছিল নেপালি কংগ্রেস দল, আর পরেরটা হল ওলির কমিউনিস্ট দল (CPN (UML))। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওলি পপুলিজম বোঝেন বলেই সেসব পিছনে ফেলে ২০১৫ সালে পপুলার নেতা হয়ে যান। তিনি মাওবাদী দলের নেতা পুষ্প কমল দাহালের (মাওবাদী সশস্ত্র দল হয়ে থাকার সময় তাঁর নিকনেম ছিল ‘প্রচণ্ড’) চেয়েও পাবলিকলি পপুলার। তাই সবমিলিয়ে  ইতোমধ্যে ভারত যতই নেপালের চোখে অনিষ্টকারী হয়ে উঠেছিল, চীনা সরকারের সাথে দুই কমিউনিস্ট দলেরই ঘনিষ্ঠতা ও ওয়ার্কিং রিলেশন ততই ঘন হতে থাকে। এমনকি ট্রাডিশনাল নেপাল কংগ্রেস দলও তখন ভারত থেকে দূরত্ব মেনটেন করত। এ দিকে নেপালের ২০১৭ সালের নভেম্বরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবে চীনা নেতারা পরামর্শ দিয়েছিলেন ওলি [সিপিএন-ইউএমএল ] ও দাহালের [সিপিএন (মাওয়িস্ট সেন্টার)] এ’দুই কমিউনিস্ট পার্টিকে একদল হয়ে নির্বাচন করতে। তাতে ঐ নির্বাচনী ফলাফল খারাপ হয়নি। তারা প্রায় দু-তৃতীয়াংশ আসন (১৭৩ / ২৭৫) লাভ করে তাতে ভারত বা নেপালি কংগ্রেসকে আরো ক্ষুদ্র বানিয়ে ফেলেছিল।

    মূল সমস্যার গোড়া ওলি নিজেইঃ
    কিন্তু সমস্যার গোড়াটা ছিল অন্যখানে। প্রথমত, মাওবাদী দাহালের নিজদলের আজন্ম দুর্বলতা বা খারাপ কপাল হল – এক. ২০০৯ সালের নির্বাচন ছাড়া আর কখনোই পপুলার ভোটের বেলায় দাহালের দল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। সবসময় তৃতীয় স্থানে থেকে গেছে। অথচ ভারতের চরম বিরোধিতা অসহযোগিতা সত্ত্বেও  ওলির দল, নেপালি কংগ্রেস ও নিজ দলকে একসাথে রেখে দাহাল পরিস্থিতি মোকাবেলার অর্থে মুখ্য ভূমিকাটা পালন করে গেছিল। দাহাল দল বা রাজনীতির জন্য খুবই ভাল সংগঠক, বিশেষত বভন্ন মতবিরোধের মধ্যেও একসাথে কাজ করে লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে।  কিন্তু পাবলিক ইমোশন হ্যান্ডলিংয়ে ঠিক ততটাই যেন তেমন নন। দ্বিতীয়ত, ওলি ব্যক্তিত্ব হিসেবে একজন ফিউডাল লর্ডের মত। তার কাছে দল মানেই, তিনিই এতে একমাত্র ইচ্ছাদাতা, হুকুমদাতা। কিন্তু তার বড় গুণ হল, পপুলার মাস ইমোশন হ্যান্ডলিং ভালো বুঝেন ও পারেন।

    সব মিলিয়ে এখন ২০১৭ নির্বাচনের পরের দুই বছরের মধ্যে যা দাঁড়ালো তা হল, ওলি আরো দুর্দমনীয়, একক নিজ হুকুমে চলা, কোনো ফোরামের সিদ্ধান্ত বা কারো কথা না শুনে চলা ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। ওদিকে কমিউনিস্ট দুই দল মিলেমিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন বলে ওলির পক্ষের দলের সবার সাথে মিলে মিলিত দলের কমিটি গড়তে দাহাল খুবই সফল ব্যক্তিত্ব, কিন্তু ওলির দলের লোকেরাই ওলির প্রশ্নে দাহালের সাথে দাঁড়িয়ে যায়। আগে ওলির সাথে যারা ছিলেন যেমন মাধব চন্দ্র নেপাল, ঝালা নাথ কানাল বা বামদেব গৌতম সহ সবাই থাকলেও তারা এখন দাহালের পক্ষে। তাঁদের দাবি তাঁরা ওলির একগুয়েমি ও ক্ষমতা ক্কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে লড়ছেন [… They were protesting PM Oli’s monopoly in the party and government]  আর এটাই একপর্যায়ে ওলিকেই দল থেকে বহিষ্কার করে দেওয়ার অবস্থায় চলে যায়। এই বহিষ্কার ঘটেছে মাত্র তিন মাস আগে, অর্থাৎ ওলির সাথে মিলিত দলের সবার বিরোধ প্রকাশ পাওয়ারও প্রায় দু’বছর পরে।

    চীনের অতি আগ্রহঃ
    কিন্তু তাহলে, কেন এত সময় লাগল? এটাই চীনের অনুরোধের ‘ঢেঁকি গেলা’; চীনের অতিরিক্ত জড়িয়ে যাওয়া যা অযাচিত পর্যায়ের। গত ২০১৭-৮ সালের দুই কমিউনিস্ট দলে ঐক্য করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় থেকে চীন ক্রমশ একেবারেই লাগামছাড়া ভাবে নেপালের রাজনীতির হাত ঢুকাতেই থাকে।

    মাওয়ের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ”?
    যার সোজা অর্থ চীনা কমিউনিস্টরা যেমন কোল্ডওয়ারের যুগে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে থাকা চীনা কমিউনিস্ট দলের সাথে অধীনস্ত নির্দেশগ্রহিতা আচরণ ও সম্পর্ক স্থাপন করে চলত যেন সেই যুগ আবার ফিরে এসেছে। একই অবস্থা ছিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বেলাতেও। তারা আমাদের মত দেশে অর্থ ও তত্বের যোগানদার হলেও মুখ্য সবকিছুতে হাত ঢুকিয়ে বসে থাকত। আসলে আমাদের মত দেশের নেতারাই সেটা চাইত। অথচ আলাদা রাষ্ট্র মানেই আলাদা আলাদা একান্ত স্বার্থ।  নেপালের রাষ্ট্রস্বার্থ  কখনও চীনা রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। তেই পারবে না, পারে না।তাতে দুদেশেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতাসীন হলেও কোন হেরফের হয় না। হ কারণ রাষ্ট্র মানেই কেবল নিজ ভুখন্ডের বাসিন্দাদের স্বার্থ দেখা ও সবার উপরে জায়গা দেয়া। এগুলো রাষ্ট্র সম্পর্কে খুবই নুন্যতম ও বেসিক ধারণা। আদর্শের কথা তুলে রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতাকে আড়ালে ফেলা যাবে না।  কাজেই নেপাল ও চীনের দুই কমিউনিস্ট পার্টি কখনই কেউ কারও কথা শুনে অনুগত হয়ে চলতে পারে না।  এমন সম্পর্ক যদি চালু করা হয় তবে এর অর্থ হয়ে যাবে নেপাল আর আলাদা রাষ্ট্র নয়, চীনেরই এক্সটেন্ডেড কোন প্রদেশ মাত্র। কমিউনিস্টদের এমন অযাচিত ভয়ঙ্কর চর্চা সোভিয়েত পতনের পর আপনাতেই হারিয়ে গেছিল। চীন কেন সেই হারানো অভ্যাস আবার ডেস্পারেট হয়ে সামনে আনছে আমরা জানি না। কিন্তু এটা মারাত্মক বিপদজনক এবং চীনের জন্যও আত্মঘাতি। এটাকেই তো মাও “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” বলতেন! নয় কি?

     এতে বড় ভুলের এক নম্বরটা হল, একধরনের ‘কমিউনিস্ট ভাই ভাই’ অযথাই খুঁজে বের করে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়া ও রাখার চেষ্টা সুপ্ত আছে এতে। এটার ফল চীন ও নেপাল দুরাষ্ট্রের জন্যই আত্মঘাতি হতে বাধ্য। এটার প্রকট প্রকাশ আমরা দেখেছি নেপালে চীনা রাষ্ট্রদুত Hou Yanqi এর অবাধ ততপরতায়।  এছাড়া সাথে দেখা যায়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের উপমন্ত্রী গুও ইয়াজহু (Guo Yezhou) কে। প্রায়ই তাঁর কাঠমান্ডু সফরে, দুই কমিউনিস্ট অংশকে ধরে রাখতে। নিঃসন্দেহে এগুলো নেতি-ইমেজের কেলেঙ্কারি ছাড়া এ’দুই দেশকে আর কিছুই দিবে না।
    অথচ ‘চীন’ বলে যাকে আমরা দেখছি সে হল হবু গ্লোবাল নেতা যার স্বার্থ অনেক জটিল ও আলাদা। তাই ‘নট নেসেসারিলি’ নেপালের কোনো দল বা নেপালরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে মিলবেই অথবা মিল থাকাটা জরুরি। আর শেষ বিচারে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিটি দেশের মধ্যে ভারত ও চীনের যে প্রবল স্বার্থ- লড়াই তাতে এ দু’জনের যাকেই আমাদের বেশি ভালো লাগুক না কেন শেষ বিচারে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখতেই হত। এবং যেকোন পরিস্থিতিতে হতেই হবে। কিন্তু এটা থাকেনি। এতে এখন যদি নেপালি কংগ্রেস দল আমেরিকা বা ভারতের নেতাদেরকে নেপালে নিয়ে এসে দলীয় সভা শুরু করে তাহলে সেটাকে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা কি বলে বাধা দিবেন?

    অথচ পালাবদলের এই কালে যখন আরও সতর্কতা ও দুরত্ব রক্ষার অনুশীলনের দরকার ছিল।  তা বজায় রাখলে চাইলে নেপালকে চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে একটা সম-দূরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। তবেই একমাত্র নেপালের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এখান থেকেই আসে নিজ দেশের দলগুলো চীন, ভারত বা আমেরিকা এই তিন দেশের একেকটার প্রতিনিধি বা দালাল হয়ে খাড়িয়ে যেন না যায় এব্যাপারে সকল দলের সতর্কতা। এটা হতেই পারে না, এ্মনটা বন্ধ করতে হবে। দেশের দলমাত্রই সবাইকে একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের রক্ষকই হতে হবে। যদি এসব কথা উপেক্ষা করা হয় পরিণতি হবে নিজ রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পরা।

    অথচ গত দুই বছরে যতবারই অলির বিরুদ্ধে তার দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে গেছে চীন বারবার ভেতরে হাত ঢুকিয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে দেয় নাই। এটা টু মাচ, সীমা পার হয়ে গেছে। বিশেষত যেখনে ওদিকে ওলি ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী র এর প্রধানকেই প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়ে নেপালে এনেছিলেন। বুঝা যাচ্ছিল তিনি ভারতের সমর্থনে ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছিলেন।

    যদিও এক কম্বোডিয়া ছাড়া কোথায় চীন এমন করেনি। তাই দাহালের উচিত ছিল এর সমস্যার দিকটা খোলাখুলি বুঝিয়েই চীনকে নিবৃত্ত রাখা এবং এ কাজে তার অসফল হওয়ার কোন স্কোপ নাই। আবার চীনের অনুমান যে, ওলিকে বহিষ্কার করে দিলে তিনি নেপাল কংগ্রেস ও ভারতের সাথে মিলে পাল্টা সরকার গঠনসহ বিরাট কিছু করে ফেলতে পারেন- এ অনুমানও এত দিনে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। আর তা যদি হয়েই যায় তবে সেটাও নেপালের রাজনীতিকদেরই নিজেদের মোকাবিলা করতে হবে।  চীন-ভারত নয়, আগে নেপালকে নিজে বাঁচতে হবে। অন্তত একালের তিন বিদেশ রাষ্ট্র চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে দূরে এক “সম্পর্কের ভারসাম্য বিন্দু” অবশ্যই তৈরি ও মেইনটেন করে চলতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীন-ভারত নয়, নেপালের নিজে বাঁচা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  আমার নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]