Tag: রাষ্ট্র

  • মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    গৌতম দাস

    ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3nc

    মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী / ডিফেন্স ফোর্স নামে ক্লাবের প্রধান মিন অং লাইং

    গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমার মানে, বার্মা-দেশ আবার দেশী-বিদেশী খবরের শিরোনামে উঠেছে। যদিও রয়টার্স বা বিবিসি বলছে ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে মিয়ানমারে নাকি একটা ক্যু হয়েছে। আসলেই কী তাই? না, ঠিক তা নয়। আপাত চোখে একটা ক্যু মনে হলেও। কারণ আগে থেকে কোথাও যদি একটা রিপাবলিক বা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র গঠন [constitute] হয়ে থাকে একমাত্র এরপরেই না প্রশ্ন উঠে ঐ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কোন সামরিক ক্ষমতাদখল বা ক্যু করেছে কিনা! যেটা রাষ্ট্রই নয় বরং  একটা সামরিক ক্লাব তার বেলায় এটাকে ক্যু বলা না বলায় কী এসে যায়? তাই নয় কী? তাহলে পশ্চিমারা সবাই একে ‘ক্যু’ বলছে কেন?
    এটা বলছে কারণ আমেরিকা-ইউরোপের বা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভাষ্য এটা।  এককথায়, কারণ এই রাষ্ট্রগুলো গত ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে থেকে দাবি করে আসছিল যে বার্মায় নুন্যতম হিউম্যান রাইট নেই, অনবরত এর চরম লঙ্ঘন হচ্ছে। কথা সত্যও বটে। ফলে আমেরিকা তো বটেই সেসময় জাতিসংঘ থেকেও অবরোধ জারি করা ছিল। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।  কিন্তু ২০০৭-১০ এই সময়কালে সব উলটে যায়। টেবিলের নিচে ডিল হয়। হিউম্যান রাইট  বিক্রি হয়ে যায় যা আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিমারা সব সময় করে আসছে।  কারো হিউম্যান রাইট  রেকর্ড খারাপ থাকলে এর বিনিময়ে পশ্চিমারা সওদা করে  নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থ হাসিল করে নিয়ে থাকে। এই ডিলেরই বাইরের প্রকাশ্য চিহ্ন হল নতুন করে লিখিত বার্মার কনষ্টিটিউশন-২০০৮। যেখানে বার্মা সামরিক ক্লাবের ক্ষমতাটা আগের মতই ক্লাবের হাতে থেকে যায় তবে সাথে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ বা ‘ফুটানি কা ডিব্বা’ লটকে দেয়া হয়। সেটা হল,  অং সান সুচির [Aung San Suu Kyi] একটা সিভিলিয়ান ফেস। এতেই ভাব ধরা হয়েছিল যে বার্মা যেনবা একটা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। অথচ ক্ষমতাটা ছিল আগের মতই বার্মার “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে এক সামরিক ক্লাবের হাতে।
    আসলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল,  হিউম্যান রাইট বিষয়ক অভিযোগ আগে যা ছিল তা পশ্চিমের সবাই দলবেধে বেচে দিয়েছিল, মানে মিটিয়ে নিয়েছিল জেনারেলদের সাথে মিলে দেনা-পাওনায়। আর বিনিময়ে বার্মার জেনারেলদের থেকে বাগিয়ে  ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ নিয়েছিল।  আর এটা শুধু অভিযোগ সব চেপে যাওয়া নয়, উলটা সার্টিফিকেট দিয়েছিল যে এরপর থেকে নাকি কথিত “গণতন্ত্রের পথে সংস্কার” হতে শুরু করেছে!   এই “গণতন্ত্র” শব্দটা অদ্ভুত। বিয়ে করে নাই; অথচ বাচ্চা পয়দা হয়েছে দাবি করার মত।  তাই কনষ্টিটিউশন-২০০৮ এটাই তো প্রমাণ যে  বার্মা একটা সামরিক ক্লাব মাত্র, আর ঐ ক্লাবের গঠনতন্ত্রই হল কনষ্টিটিউশন-২০০৮। মোটকথা ব্যতিক্রমহীনভাবে সারা পশ্চিম বার্মার জেনারেলদের থেকে ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ পেয়ে চেপে গিয়েছিল।  আর এই ডিলটাই ঘটাতে প্রাইমারি দুতায়ালিটা ঘটিয়ে দিয়েছিল ভারত, ফলে সেও কিছু ভাগ পেয়েছিল।  আর চীনের কথা আর কী বলব! সে বরং হিউম্যান রাইটের ঢং না করে বরং সোজা সাপ্টা ঘুষ দেয়া আর কাজ নেয়ার লাইনে ছিল। তাই , যেটা বার্মার উপর আশির দশক থেকে জাতিসংঘের আরোপিত অবরোধ সে আমল থেকে চীন সেটার একাই ফয়দা লুটেছিল। কারণ বার্মার পড়শি বলে একমাত্র চীনের মাধ্যমেই না-দেখার ভান করে বার্মা বাইরের দুনিয়ার সাথে সক্ষম রেখে চলতে পারছিল। তাই এটা ছিল চীনের পড়ে পাওয়া সুবিধা।
    তাহলে এখন কী হয়েছে? জেনারেলেরাও কেন ক্যু বলাতে আপত্তি করছে না? মিয়ানমারের জেনারেলরা এই উছিলায় চাইছে তাদের আর ক্লাব নয়, রাষ্ট্রই মনে করা হোক এবং এটাই তাদেরও ভাষ্য। তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? সমস্যা হল, মিয়ানমার একটা দেশ অবশ্যই। কিন্তু এটা জন্ম থেকে কখনোই রাষ্ট্র নয় মানে – মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা মানে এর আগের কলোনি দখলদার জাপান অথবা ব্রিটিশদের থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই এটাকে খতিয়ে না দেখে  অভ্যাসে রাষ্ট্র মনে করা হয়েছিল। আর পাঁচটা কলোনিমুক্ত হওয়া স্বাধীন রাষ্ট্র ভেবে।  নেহেরুর ভারত বা জিন্নাহ’র পাকিস্তান অর্থেও বার্মা কখনও রাষ্ট্র হতে পারে নাই। যেমন অন্তত একটা ছোট্ট কথা দিয়ে বলা যায়।
    খুবই অল্প কথায় বললে, প্রশ্নটা ক্ষমতার, মানে রাষ্ট্রক্ষমতার।  যেমন, শাসন-ক্ষমতাধর যেকোন শাসককে বলতে পারতে হয়, কে তাঁকে ক্ষমতা দিয়েছে। মোটা দাগে এখানে দুধরণের জবাব দেখতে পাওয়া যায়। এক. যারা ক্ষমতার উৎসের জবাব দিতে পারে না, হদিস দিতে পারে না; যাদের বেলায় ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে রাজার সন্তান রাজা এমন হয়। অথবা এদের আদি রাজার ক্ষমতার হদিস না দিতে পেরে দাবি করেন যে ক্ষমতা ‘ঐশ্বরিকভাবে’ পেয়েছে।
    আর দুই. যারা হিম্মত রাখে ও ব্যবহারিকভাবে মেনে নেয় যে ‘ক্ষমতা জনগণের’। সে-ই জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এই দ্বিতীয় ধারার বেলায় কেবল এরাই দাবি করতে পারে, তাদের রাষ্ট্র আছে আর সেই দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা একটা রাষ্ট্রগঠন করেছেন, ফলে এরপর একটা সরকার গঠনও করেছে। এই দ্বিতীয় ধারাকেই বলা যায় এটা এক রিপাবলিক বা জনগণের প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। কাজেই রিপাবলিক বাদে আর কোনো দেশেরই ক্ষমতার উতসের হদিস থাকে না, উত্তরাধিকারী রাজা-সম্রাটের সন্তানেরা রাজা-সম্রাট হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও বড়জোর সমাজের কিছু এলিট মিলে তাদের পছন্দের কাউকে শাসক বানিয়ে রাখে। ফলে কোথাও শাসক থাকা মানে তা ‘দেশ’ অবশ্যই; কিন্তু শাসক থাকা মানেই তা ‘রাষ্ট্র’ নয়। আবার যদিও  দুনিয়াতে যা দেখা গেছে, এই অর্থে ইতিহাসে ১৬৫০ সালের আগে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে কিছু ছিল না।
    তবে নিজ ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে তা পরিষ্কারভাবে বলতে পারা বা না-পারা- এটাকেই আমরা কোনো ‘দেশ’কে ‘রাষ্ট্র’ বলেও মানা না মানার মূল নির্ণায়ক বলতে পারি।

    কিছু ব্যতিক্রম, ‘নগর-রাষ্ট্র’
    তবে ব্যতিক্রম হিসেবে ক্ষণকালের জন্য আমরা কোথাও নগর-রাষ্ট্র ধারণা লক্ষ করি। যেমন যিশুর জন্মের ৭৫৩ বছর আগে [753 BC] ‘প্রাচীন রোমে’ রাজতন্ত্রের পত্তন হয়েছিল। পরে (প্রায় আড়াইশ’ বছর পরে) সেখানে নগর-রাষ্ট্রের ধারণার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল, সেটাও যিশুর জন্মের ৫০৯ বছর আগে [509 BC]। এটাই প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রিপাবলিক। পরে সেটাও ভেঙে যায় যিশুর জন্মের মাত্র ২৭ বছর আগে [27 BC]। তাতে এবার ফিরে আবার রাজতন্ত্র বা মোনার্কি মানে, রোমান এম্পায়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তা টিকেছিল যিশুর জন্মের ৪৭৬ বছর পরে [476 AD] পর্যন্ত। এ সময়েরই মাঝামাঝি রোমে প্রভাব বেড়ে যাওয়া খ্রিষ্টধর্ম সামলাতে না পেরে শেষে ৩১৩ সালে সম্রাট কনস্টান্টিন নিজেই রোমকে ‘খ্রিষ্টান রোম’ বলে ঘোষণা করেন। তখনই তিনিসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক সদলে খ্রিশ্চান ধর্মগ্রহণ করেছিলেন।

    কলোনিদখল হয়ে যাওয়ার মধ্যেও ভালোমন্দ আছেঃ
    অনেকে বলে থাকেন, দেশ যদি কলোনি দখলে যায়ই তবে জাপানের কলোনি হওয়ার চেয়ে ব্রিটিশ কলোনি হওয়া ভাল। এমন কেন বলেন?
    ব্রিটিশেরা ‘পশ্চিমা’ বলে এশিয়ান জাপানের চেয়ে তারা ভাল, ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। আগে দেখেছি, রোম ‘নগর-রাষ্ট্রও’ টিকে নাই। শেষে তা রোম সাম্রাজ্যের ভেতরে হারিয়ে যায়; যে সাম্রাজ্য আবার ৪৭৬ সালের [476 AD] মধ্যে নিজেও বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু পরে “হলি রোমান এম্পায়ার” নামে, ৮০০ সাল থেকে রাজা শার্লেমেন [Charlemagne] (ফরাসি উচ্চারণে শাআলে-মেঁ) নতুন করে “হলি রোমান এম্পায়ার” [Frankish king Charlemagne as Roman emperor by Pope Leo III on Christmas Day in the year 800] নামে এক  সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটান। তবে আগের রোমান সাম্রাজ্যের সাথে নয়া হলি রোমান এম্পায়ারের কোনো সম্পর্ক নেই, কেবল নামের কিছু মিল ছাড়া। আর এখনকার জার্মানি-ফ্রান্সের মাঝের ফ্রাঙ্ক [Frank] ভূখণ্ডকে কেন্দ্র রেখে এর বিস্তার শুরু হয়েছিল। মোটা দাগে, এই সাম্রাজ্যই (৮০০-১৮০৬) সময়কাল জুড়ে জারি ছিল আর এখনকার ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রেরই পূর্বের-শাসক ছিল। যদিও শেষের ৩০০ বছর বিশেষত ১৬৪৮ সাল থেকেই এটা নামকাওয়াস্তে সাম্রাজ্য হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তা আলাদা আলাদা ছোট সাম্রাজ্য হয়ে প্রত্যেকে নিজেদের  সীমানাও ভাগ করে নিয়েছিল। আর সেগুলোই একালে রিপাবলিক রাষ্ট্ররূপ [তবে জাতি-রাষ্ট্র] হয়ে নিয়েছিল যা এখনকার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্দেশ করে।
    এভাবে এক পর্যায়ে ১৬৫০ সালের ব্রিটেনে ক্রমওয়েলের বিপ্লবকেই (Cromwell revolution) ধরা হয়, প্রথম রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার বিজয়। তবে এরপরে সাম্রাজ্যগুলোর ভেতরেই এদের শাসন-কাঠামো কী হবে তা নিয়েও রাষ্ট্র-ধারণার ক্রম-রূপান্তর ঘটেছিল; যেখানে মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলির ভাবনাঃ
    সারকথায় সেটা হল যেমন, নাগরিক হল উপাদান বা কনস্টিটুয়েন্ট। আর এই কনস্টিটুয়েন্টদেরকে নিয়ে রাষ্ট্র কনস্টিটিউট বা গঠন করা – [যেখান থেকে কনষ্টিটিউশন বা Constitution] ধারণাটা। আর এসব ধারণার উপর রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠিত। এখানে পাবলিক বা নাগরিকই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস – এই ধারণা আস্তে ধীরে সমাজগুলোতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এর সাথে সাথে তাই রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিনিধিত্ব ধারণাও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এটাই জন-প্রতিনিধিত্বের ধারণা; কালক্রমে যা মাঠে ময়দানের ভাষায় ভোট বা নির্বাচন। এখান থেকে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত আরো শব্দ যেমন – জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, জনপরিবহন অথবা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (জনস্বার্থে মামলা)। আবার এখান থেকেই মাও সেতুংয়ের চীনের ভাষায় তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম  – পিপলস ব্যাংক, সেনাবাহিনীর নাম – পিপলস আর্মি ইত্যাদি। সার কথাটা হল, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ; রাষ্ট্রপরিচালনায় সব ক্ষমতার উৎস জনগণ – এটাই মূল ভিত্তি। এই ধারণাকে মূল ও কেন্দ্রীয় ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ধারণার বিস্তার ঘটেছে। তাই না কোন রাজা, না সম্রাট, না কোন রাজ-উত্তরাধিকারী বা না সমাজের এলিটদের বেছে নেয়া কেউ প্রমুখ – এরা কেউই ক্ষমতার উৎস নন। রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস একমাত্র জনগণ। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি – নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই একমাত্র জনগণের হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন। এটাই রিপাবলিক (গণপ্রজাতন্ত্রী) রাষ্ট্র ধারণাটার সারকথা।
    কিন্তু রাষ্ট্র ধারণার এদিকটা এশিয়ায় এভাবে এত বিকশিত হয়নি। একটা মোনার্কি মানে সেখান থেকে ছোট রাজা থেকে বড় সম্রাটের সাম্রাজ্য আর সেখান থেকে  কলোনি দখলদার মালিকের সাম্রাজ্য হয়ে ওঠার পরে দেখা গেছে, এদের বিকাশের এখানেই সমাপ্তি।  এরা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত বিকশিত হতে পারে নাই।  যেমন এশিয়ান অরিজিন জাপান, এর সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি বা চর্চা করি। সে মূলত পূর্ব এশিয়ার (ততকালে অবিভক্ত) একই কোরিয়া ও চীনের আংশিক কলোনি দখলদার এক সাম্রাজ্য ছিল যা নিজে বৃটিশদের মত কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। কেবলমাত্র এক সম্রাটের সাম্রাজ্য (তবে কলোনিদখলদার) ছিল। এবং সেকালের বার্মার কিছু নেতা অথবা পশ্চিমবাংলার সাবেক কংগ্রেসি নেতা সুভাষ বোস – এদের মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারত এই কলোনিকে জাপান নিজের প্রভাবাধীনে কিছু অংশ বা পারলে পুরাটাই পুণঃদখলি কলোনি করে নেয়ার চেষ্টা করেছিল এমনই আরেক কলোনি মাস্টার ছিল সেই জাপান।

    জাপান নিজেকে রিপাবলিক রাষ্ট্র মনে করে কিনা এখনও অস্পষ্টঃ
    কিন্তু জাপান সম্পর্কে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরেক দিক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের ভাগাভাগিতে জাপান হিটলারের জার্মানির পক্ষে আর আমেরিকা-সোভিয়েত-ব্রিটিশ মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানির হিটলারের সাথে জাপানও হেরে যায়। কিন্তু আমেরিকা আর সব  ‘হারুপার্টির’ মত জাপানকেও ত্রাণ এবং অবকাঠামো ও শিল্প পুনর্বাসনের অর্থ-বিনিয়োগ দিয়েছিল। এতে জাপান পুণর্গঠিত হয়ে উঠেছিল তবে কেবল সামরিক দিকে আমেরিকার অধীনস্ত থেকে পুনর্গঠিত এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জাপান গঠন করা হয়েছিল। এই নতুন জাপান নিজেকে এবার আর কোন সম্রাটের সাম্রাজ্য ফিরে দাবি না করলেও নয়া রাষ্ট্র দাবি করেছিল। কিন্তু সেটাও রিপাবলিক কি না তা জানা যায় না। এছাড়া জাপানে রাজনীতি বলে কিছু আছে কি না, চিন্তায় ও চর্চায় রাজনৈতিকতা [Polity] আছে কিনা, তাও জানা যায় না। জাপানের ফরমাল নাম “ইউনিয়ন অব জাপান”। অর্থাৎ কোথাও এটা যে ‘রিপাবলিক’ সে কথা বলা হয়নি।
    ওদিকে জাপানে রাজনৈতিক চিন্তা ও চর্চার দিক সবসময়ই খুবই দুর্বল। রাজনৈতিক ধারণা বলতে এখানে বড় জোর একটা জাতিরাষ্ট্র বা দেশপ্রেম – এই পর্যন্তই, যেন এর কোন রাজনৈতিকতা নাই বা সেবুঝে না। বিশেষত জাপানের কলোনি দখলের পক্ষে নিজ কোন সাফাই দেয়ার যেন প্রয়োজন – অনুভব ছিল আমরা দেখি না। যেন তারা বুঝাতে চায় তাদের গায়ের জোর ছিল তাই দখল করেছিল – এধরনের, যেটা বলা বাহুল্য ব্রিটিশদের মত নয়।
    কারণ এসবের বিপরীতে ব্রিটিশদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ে ধারণা ছিল। শুধু তাই না কলোনিদখল করা দেশ বৃটিশ-ইন্ডিয়াতে যেমন- রামমোহন রায়,  (কমিউনিস্টরা যাকে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে) তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও কমতির শেষ নেই কথা সত্য। তবু একটা রাজনৈতিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ব্রিটিশেরা তাঁকে এবং অন্য নেটিভদের দিতে পেরেছিল ও দিয়েছিল। অবশ্য তা মূলত নেশন-স্টেট ধরনের জাতিবাদী, দেশপ্রেম টাইপের আবেগী ধারণা। এটা মূলত জাতিরাষ্ট্র অর্থে রিপাবলিক ধারণা হলেও তা পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র মনে করা হত। এ ক্ষেত্রে রামমোহনে চিন্তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা রাজনৈতিকতা সেখানে ছিল আমরা দেখি। এককথায় জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস ও কেন্দ্র এতটুকু চিন্তার রাজনৈতিকতা ব্রিটিশ কলোনি থেকে পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু জাপানের কলোনি হলে এটুকু কেন কোন রাজনৈতিকতা পাওয়ার সুযোগ ছিল না, নাই। এর একেবারে গোড়ার কারণ জাপান আসলে ছিল এক সম্রাটের সাম্রাজ্য; মানে সেকালে তা ছিল এক রাজতান্ত্রিক জাপান। তবে যদিও তা মার্শাল তেজো ধরণের সামরিক নেতা নির্ভর। এদিকে বলাই বাহুল্য রাজতন্ত্রে “রাজনীতি” বলে কোন ধারণা থাকে না। তাই, শাসনের ক্ষমতা কক্তৃত্ব একমাত্র জনগণের এই ধারণা সমাজে না থাকলে সেখানে রাজনীতি শব্দ ও ধারণার উদ্ভব ঘটে না। থাকতেই পারে না। ফলে কোন ধরণের রাজনৈতিকতাও। তাই নেতা সুভাষ বোস বা বার্মার তরুণদের জাপানি আর্মি যত যাই কিছুই শিখিয়ে থাকুক বা ট্রেনিং দেক তার চিন্তায় রাজনীতি বা রাষ্ট্র ধারণার লেশ মাত্র ছিল না। থাকার কথাও না।

    জাপানে কোন ধরণের রাজনৈতিকতার ধারণা না থাকা, এদিকটাই জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত মিয়ানমার শাসকদের ভিন্ন করে তুলেছে বলে অনুমান করা যায়। সেকারণেই বার্মা কেন রাষ্ট্রই নয়, কোনো রিপাবলিক নয়, এর কারণ আমরা এখানে খুঁজলে পাবো।

    তবে মিয়ানমার কেন ব্রিটিশ শাসনবিরোধিতা করতে জাপানের কাছে গিয়েছিল, এর পেছনে আবার সবচেয়ে বড় কারণ মনে করা হয় দুটা। ব্রিটিশরা বার্মা দখল করেছিল ১৮২৪ সালে, ছেড়ে গিয়েছিল ১৯৪৮ সালে। কিন্তু এই ১২৪ বছরের মাত্র শেষ ১১ বছর (১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৮) বাদে বাকি সবটা সময় বার্মাকে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ারই একটা প্রদেশ রূপে ঘোষণা করে বৃটিশেরা শাসন করেছিল। আর ভারতীয় ও ব্রিটিশদের উপর এটাই বার্মিজদের প্রধান ক্ষোভের কারণ। সেটাই বা কীভাবে?
    বার্মাকে এমন প্রদেশ হিসেবে গণ্য করে শাসন করাতে বার্মার ক্ষমতায় সবার উপরে ব্রিটিশরা থাকলেও মূলত ভারতীয় সিভিল সার্ভিস অফিসারদের অধীনে বার্মা নিজেকে দেখতে পেত। এর ফলে আরো ঘটনা হল বার্মার শহর-গঞ্জে ভারতীয়রা বার্মায় ব্যবসায় ও চাকরিতে প্রধান ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। যেমন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসগুলো মনে করা যেতে পারে যেখানে বার্মার নাম এই কারণেই বারবার এসেছে। ফলে ভারতীয়রা হয়ে যায় বার্মার সাধারণ মানুষের চোখে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও লুটেরা; যার উপরে কলোনি মালিক ব্রিটিশের ওপর বার্মিজ ঘৃণা তো আছেই।
    ফলে বার্মিজ তরুণদের কাছে জাপানের শাসকেরা হাতছানি তৈরি করতে পেরেছিল। এতে বার্মিজদের পালটা প্রতিক্রিয়া হয় যে, তারা জাপানি সাহায্য নিয়ে হলেও দেশ থেকে ভারতীয় ও ব্রিটিশদের তাড়াবে। এমনকি ভারতীয়দের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ১৯৪৮ থেকে ’৬০ সাল পর্যন্ত আরো তীব্র হয়েছিল তাদের সমূলে ভারত ফেরত পাঠাতে। তবে তরুণদের জাপানি-প্রীতি বাড়ার আরেক বড় কারণ হল, ১৯৪১ সালে বিশ্বযুদ্ধের ভিতর জাপান থাইল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল। আর বার্মার প্রতিবেশী হল থাইল্যান্ড। রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটির তরুণ, সু চির বাবা অং সান ও তাঁর বন্ধুরা প্রায়ই ব্রিটিশদের নির্যাতন বা খোঁজাখুঁজি এড়াতে পালিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিতেন। আর সেখানেই জাপানি আর্মির সাথে তাদের প্রথম মোলাকাত ঘটেছিল। সেখানেই সাব্যস্ত হয় যে, জাপানিরা তাদের সামরিক ট্রেনিং দিবে। অং সান গোপনে দেশে ফিরে নিজ বন্ধুদের সংগঠিত করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এরাই হয় ট্রেনার যা গড়ে তুলেছিল বার্মিজ ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি [Burmese Independent Army, BIA] নামের সেনাবাহিনী। পরের বছর ১৯৪২ সালে জাপানিরা বার্মা আক্রমণ করলে এই বাহিনীর তরুণ সেনারা জাপানিদের পক্ষে পদাতিক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এতে জাপানিরা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করে ফেলে। আর এতে বার্মায় গড়ে উঠা জাপানি প্রশাসনে অংশ নিয়েছিলেন অং সান ও তার বন্ধুরা।

    আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না, কেন?
    কিন্তু নির্ধারক ভূমিকাটা ঘটেছিল আরেকটু অন্যখানে। জাপানিরা অং সানের ৩০ জন বিশেষ বন্ধুদের একটা দলকে বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল বিআইএ গঠনের সময়। এদের গল্প-বীরত্বই আজও বার্মার আর্মির পুঁজি। সাথে আবার একই সাথে বার্মা কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব হিসাবে গড়ে উঠবার পিছনের কাহিনী। মনে রাখতে হবে জাপান তাঁদের যতকিছুরই ট্রেনিং দেক তাতে রাজনৈতিক ট্রেনিং বা রাষ্ট্র-বিষয়ক কোন ট্রেনিং বা ধারণা তাদেরকে দেয় নাই। কারণ খোদ জাপানেই তো রাজনীতি বলে কিছু ছিল না। স্মরণ করেন, আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না। কারণ রাজতন্ত্রে এসব ধারণা বা শব্দ থাকে না। যে কারণে এখনকার সৌদি আরবেও রাজনীতি শব্দটা নাই। রাজনীতি শব্দ বা ধারণা থাকার পুর্বশর্ত হল যখন রাজতন্ত্রের বিপরীতে “জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস” – এধারণা প্রতিষ্ঠিত থাকে।

    পরবর্তিতে মাত্র তিন বছরের মধ্যে জাপানিদের ব্রিটিশদের কাছে হার স্বীকার করতে হয়েছিল। মূল কারণ ১৯৪৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপান-জার্মান অক্ষশক্তির হার হয়েছিল। ফলে বার্মার ক্ষমতা আবার সেই ব্রিটিশদের হাতে ফিরে চলে যায়। আর তা থেকেই পরে ১৯৪৮ সালে অং সানের (তিনি ১৯৪৭ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন)বন্ধুরা ক্ষমতা নেন, বিশেষত ঐ ‘প্রমিন্যান্ট’ ৩০ জন।

    বিশেষ ত্রিশজনের পরিণতিঃ
    কিন্তু বার্মার শাসনে দুর্যোগের দিন শুরু হয় এখান থেকেই। মূলত এই ৩০ জন ভাগ হয়ে গেছিলেন মূলত কারা মূল সিভিলিয়ান রাজনীতিবিদ বা প্রশাসক হবেন আর কারা মূল আর্মি অফিসার হবেন – এভাবে। কিন্তু এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়- এ দুই দলের কারা শ্রেষ্ঠ অথবা কাদের ভূমিকা নির্ধারক, এসব নিয়ে। আসলে পেছনের ঘটনাটা আরেকটু ভিন্ন। জাপানি ট্রেনিংয়ে কখনোই রাজনৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। একই কারণে রাষ্ট্রক্ষমতার ও রাষ্ট্রগঠন সংক্রান্ত ধারণা দেয়া হয়নি। কারণ এসব বিষয়ে জাপানিরা নিজেদেরই ধারণা ছিল না। বরং উলটা, তাঁদের ধারণা বলতে সবই ছিল ক্ষমতার ধারণা; তাও আবার যেখানে ক্ষমতা মানে কেবল সামরিকতা। কিন্তু ক্ষমতার অর্থ তো দুইটা; সামরিক ক্ষমতা ও সাফাই বয়ান এর(নেরেটিভের) ক্ষমতা। রাষ্ট্রধারণা, জনগণ ক্ষমতার উৎস কেন বা জনপ্রতিনিধির ধারণা ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো ধারণাই এদের ছিল না। এর উপর আবার বার্মা [রেস ও এথনিক অর্থে] প্রধান ৯টি জাতে বিভক্ত যাদের অন্তত তিনটি গোষ্ঠী ব্রিটিশ আমলেই স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করত। কিন্তু স্বাধীন বার্মার জেনারেলরা প্রথমেই তা কেড়ে নিয়েছিলেন। এখন এসব জাতিগোষ্ঠীকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে এ নিয়েও লাগে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এসব জটিলতার সমাধান হবে একমাত্র বল প্রয়োগে তা মনে করে, অং সানের আরেক বন্ধু নেউইন যিনি সামরিক জেনারেল ছিলেন, ১৯৬২ সালে সামরিক বলে ক্ষমতা দখল করার ঘোষণা দেন। অর্থাৎ সিভিল রাজনীতিক বনাম আর্মির ভাগ হয়ে থাকায় একে অপরকে অযোগ্য ব্যাপারটা বুঝে না মনে করা – এরই ভাব ও পরিণতিতে। সেই থেকে দেশের ক্ষমতা আর কখনোই সিভিল রাজনীতিকের হাতে আসেনি। আবার রাষ্ট্র রাজনীতি এই শব্দগুলোই বা কী, রাষ্ট্রগঠন কী জিনিষ তা জীবনেও আর জেনারেলেরা সহ বার্মিজ সমাজের জানা হয় নাই। ঐ “ত্রিশজন বীরের” গর্ব ও আবেগের নিচে সব চাপা পড়ে আটকে যায়। অথচ ঐ ত্রিশজনই ট্রেনিংয়ে রাষ্ট্র রাজনীতি ধারণাগুলোই কখনও শুনে নাই।

    তাহলে ২০০৮ সালে কনষ্টিটিউশন লেখার অর্থ তাতপর্য কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ‘মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র’ নয় বলে। কেন? মিয়ানমার অবশ্যই একটা ‘দেশ’। কিন্তু এই দেশের মালিক যেন একটা ‘ক্লাব’ এবং এটা একটা সামরিক ক্লাব।
    একটু বড় সেসব পিছনের গল্প। বার্মা একটা দেশ ওর শাসক আছে কিন্তু তা রাষ্ট্র নয়, মানে জনগণের রাষ্ট্র নয়।  অনবরত যে মূলত বার্মিজ বা বুদ্ধিষ্টদের বাদে অন্যান্য সব জাতিগোষ্ঠির উপর হত্যা নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য বার্মার উপর পশ্চিমা দেশের তো বটেই জাতিসংঘেরও অবরোপ করা ছিল সেই আশির দশক থেকে। অর্থাৎ বার্মা ছিল একঘরে। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রিও নিষেধ ছিল। কিন্তু চীনের সাথে সীমান্ত আছে বলে অনেকটা চোরাচালানের ছলে বা বেনামে ব্যাপক পণ্যবিনিময় চলত। এটাই তার একমাত্র সীমান্তের বাইরে যাবার উপায় ছিল। চীনের সাথে এই সম্পর্ক আবার চীনের যখন ডাবল ডিজিট উত্থান সে যুগে বার্মার সাথেও বেড়ে উঠেছিল।

    সে সময়টা ছিল গ্লোবাল অর্থনীতিতে ২০০৮ সালের মন্দা আসার আগের বছর পর্যন্ত সময়কাল। তাই অর্থনীতি ভাল চলাতে কোন দেশের মাটির নিচের গ্যাস-তেল কে আগে কিনে নিতে বুকিং দিয়ে রাখতে পারে  এর প্রতিযোগিতা ছিল। আমাদের এদিকে চীন ও ভারতের মধ্যে। সেই সুত্রে বার্মার একটা খনির গ্যাস ভারত বুকিং দিতে কথা শুরু করেছিল। কিন্তু শর্ত ছিল  হুইলচার্জ দিয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে এই গ্যাস নেয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশ এই অনুমতি দিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করাতে ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতায় চীন ঐ গ্যাস কিনে ফেলার ডিল করে ফেলে। মূলত এরপর থেকে ভারত নতুন এক আইডিয়া নিয়ে একদিকে বার্মা অন্যদিকে মূলত আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সাথে মধ্যস্থতার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। ভারতের মূল পয়েন্ট ছিল অবরোধের সুফল অন্য সবাই বাদ যাচ্ছে, আর একচেটিয়া তা কেবল চীন খাচ্ছে। সুচি তখনও হাউজ এরেস্টে ছিল। তাই নামকা ওয়াস্তে হলেও যদি দেখানো যায় যে বার্মা একটা রাজনৈতিক সংস্কার শুরু করেছে আর তাতে যে মূল ক্ষমতা তা আগের মতই বাহিনীর হাতে রেখে দিয়েও তাঁদেরই অধীনে কেবল সুচিকে কিছু ক্ষমতা দিয়ে তারা “গণতন্ত্র কায়েম” করেছে বলে যদি পশ্চিম সার্টিফিকেট দেয় তবে এই উসিলায় বার্মার সব অবরোধই পশ্চিম ও জাতিসংঘ তুলে নিতে পারে। এবার তখন আর একা চীন না, ভারত ও পশ্চিমারাও বিনিয়োগ পণ্য-পুজি বার্মার বাজারে রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ নিতে পারে। তবে এমন এই রফাতেও জেনারেলদের কথিত লোকদেখানো সংস্কার (যেটা রাষ্ট্র সংস্কার নয় মোটেও) করে নির্বাচন দিতেই ২০১০ সাল লেগে গিয়েছিল। আর তখনই কি কি ক্ষমতা জেনারেলেরা সুচিকে দিতে চায় এর হিসাব লিখে রাখতেই কথিত ‘কনষ্টিটিউশন সংস্কার’ করা হয়েছিল। ফলে এই সংস্কারে যে আজকের দশায় পড়বে তা সবাই জানলেও সবাই তা এড়িয়ে বার্মার বাজারে ঢুকতে ঝাপিয়ে পরেছিল। যেমন, বার্মায় মোবাইল ব্যবহারকারি ছিল মাত্র কয়েক পার্সেন্ট, সেটা এখন ৯২% । এভাবে যে যা পেরেছে খাবলে নিয়েছে এতদিন। ওদিকে ২০১০ সালের নির্বাচন এই কনষ্টিটিউশন ২০০৮ এর অধীনেই হয়েছিল। সুচি তখন মুক্ত কিন্তু বুঝাবুঝি অনুসারে নির্বাচনে অংশ নেয় নাই। আর আর্মি একাই অংশ নিয়েছে বেনামে, নিজেরাই একটা দল (ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলবমেন্ট পার্টি, USDP) খুলে নিয়েছিল। এভাবেই ক্ষমতায় ছিল। আর পরের ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি অংশ নিয়ে প্রধান নির্বাচিত দল হয়। কিন্তু তবু বাহিনী সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় নাই। কারণ কনষ্টিটিউশনে লেখা আছে সংসদের নিম্ন কক্ষে চার ভাগের এক ভাগ আসন ৪৪০/১১০, আর উচ্চকক্ষের ৩৩% আসন “ডিফেন্স সার্ভিস”কে দিতে হবে।  যেটা আবার সার্ভিস প্রধান ঠিক করে দিবেন কোন অফিসার সংসদ সদস্য হবে। এতেও শেষ হয় নাই। স্বরাষ্ট্র,প্রতিরক্ষা, সীমান্তরক্ষীসহ পাঁচ মন্ত্রীত্ব সেনাবাহিনীকে দিতে হবে আর সার্ভিস প্রধান এই নিয়োগ দিবে। আর সবার উপরে “ডিফেন্স সার্ভিস” প্রধানের থাকবে সবকিছুর উপর এক ভেটো ক্ষমতা।

    অর্থাৎ “ডিফেন্স সার্ভিস” এরাই আসলে বার্মা দেশের (সরি, রাষ্ট্র বলতে পারছি না) মূল মালিক, এটা এখানে বুঝা গেল। নাহলে ডিফেন্স চীফ কি করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দিবেন!

    বার্মার কনস্টিটিউশনে ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ কারা ও কীভাবেঃ
    মিয়ানমারে এখন তৃতীয় কনস্টিটিউশন চলছে। এর সর্বশেষটা রচিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।
    কনস্টিটিউশন ২০০৮ [এখানে পিডিএফ কপি পাবেন] এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, এই কনস্টিটিউশনের শুরুতে তৃতীয় পাতায় দ্বিতীয় প্যারাতে যে অনুচ্ছেদ, এর শিরোনাম ‘বেসিক প্রিন্সিপল’ [Basic Principles of the Union, p.3]। এর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে (এ থেকে এফ) এভাবে সাতটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। আর এর সর্বশেষ এফ বা সপ্তম উদ্দেশ্যই হলো, হাজার কথার এককথা। সপ্তম উদ্দেশ্য হল, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা” [Enabling Defence Services to be able to participate in the National Political leadership role of the State]।

    বলেছিলাম বার্মা রাষ্ট্র্র নয় একটা দেশ মাত্র। বলেছিলাম, রাজতন্ত্রিক দেশ দেশের ক্ষমতার উৎস জানাতে ব্যর্থ হবেই। অপরদিকে, রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়লে বলা সম্ভব, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ। সেটা যাই হোক, নির্বাচিতের বেলায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা হবেন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট। আর তার অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে। নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অধীনে থাকবে সামরিক বাহিনীসহ সব প্রতিষ্ঠান। এই হলো রিপাবলিক ক্ষমতার কাঠামোগত বিন্যাস। অথচ কনস্টিটিউশনের সপ্তম উদ্দেশ্য বলছে, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের “জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা”। অর্থাৎ এই বাক্য অর্থহীন ও স্ববিরোধী। “ডিফেন্স সার্ভিসের সদস্যরা” দেশের ‘রাজনৈতিক নেতা’ হয় কী করে?  আর এটাই নাকি ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনের উদ্দেশ্য?  কিভাবে?

    আবার এই ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে আমাদের মতো রাষ্ট্রকাঠামোর সেনাবাহিনী বলে বুঝা ভুল হবে। কারণ মিয়ানমারের বর্তমান কনস্টিটিউশনের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে একে সবার উপরের ক্ষমতার এক প্রতিষ্ঠান বলে যদি ধরে নেন তাহলে এরপর এর পুরোটার অর্থ স্পষ্ট হবে। এ জন্যই বলেছি, মিয়ানমারের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ একটা ক্লাবের মত; তবে সামরিক ক্লাব, যে আবার দেশের মালিক। আর ঠিক এ কারণেই মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্রের নাম নয়, রাষ্ট্র নয়।

    শেষকথাঃ
    বার্মায় পশ্চিমাদের ব্যবসা বাগানোর লোভে লোকদেখানো কারবারের নাম ‘গণতন্ত্র’। মানে কথিত যে বার্মার গণতান্ত্রিক সংস্কার’ এতদিন চলতে তা ফেল করল। এটাই ১ ফেব্রুয়ারির তাতপর্য। এর মানে হল ২০১৫ সালের নির্বাচন ছিল “ডিফেন্স সার্ভিস” ক্ষমতায় নিজের নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে সিভিলিয়ানদেরকে কতদুর ক্ষমতার ভাগ দিতে পারে, এরই পরীক্ষা। “ডিফেন্স সার্ভিস” এখন বলল যে সেই পরীক্ষা অচল, অসম্ভব। কারণ এবার ২০২০ সালের নভেম্বর নির্বাচনে সুচির দল আরও বেশি আসন দখল করেছে, প্রায় ৮৩% ভোট। এতে স্বভাবতই সুচি আরও বেশি ক্ষমতার হকদার হয়ে উঠত। তাই এবারের নতুন সংসদ বসার আগেই সিভিল রাজনীতিকদের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। সুচি গ্রেফতার তো বটেই, দেশের প্রেসিডেন্টও ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি। আর্মি চীফ আরেক সাবেক আর্মি সদস্যকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়েছেন।

    কিন্তু তবু অনেক গণতন্ত্রী বার্মায় সেনাবিরোধী মিছিল সমাবেশ দেখে খুব উতসাহিত হচ্ছেন, আশার আলো দেখছেন। তাদেরকে বার্মার ইতিহাস পড়তে বলব। ঠিক এরকম নির্বাচন অনুষ্ঠান এর আগে ১৯৬০ সালের পর থেকে দুবার ঘটেছিল। দুবারই সিভিলিয়ানেরা প্রবল্ভাবে জিতেছিল। এবং ক্ষমতা পেতে প্রবল সভা সমাবেশ করেছিল। কিন্তু নির্বিচার গুলিতে সবাইকে দমিয়ে ফেলা হয়েছিল আর জীবিতদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখনও রাষ্ট্র-রাজনীতি-ক্ষমতা সম্পর্কে না-বুঝ লোকেদের বেলায় ভিন্ন কিছু হবে না। “গণতন্ত্র” দিয়ে রাষ্ট্রগঠন করা যায় না। বিশেষত যেখানে “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে সামরিক ক্লাব থাকে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “মিয়ানমার একটা সামরিক ক্লাব” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  সাপ্তাহিক  “সাম্প্রতিক দেশকাল”  পত্রিকায় ১৬ ফেব্রুয়ারিতে  মিয়ানমারে কোন সামরিক ক্যু হয়নি” এই শিরোনামে আমারই আরেকটা লেখা ছাপা হয়েছিল।    পরবর্তিতে ঐ দুই লেখাকে একসাথে করে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীনবিরোধী বাইডেন হবেন, ব্যালেন্স তো ইইউর হাতে

    চীনবিরোধী বাইডেন হবেন, ব্যালেন্স তো ইইউর হাতে

    গৌতম দাস

    ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3mQ

     

    EU-China investment agreement raises tensions with US

    দীর্ঘ ৩০ বছরের সার্ভিস-জীবনের এক ভারতীয় ক্যাডার কূটনীতিক, নাম এম কে ভদ্রকুমার, এখন অবসরে আছেন। পূর্ণ রাষ্ট্রদূত ছিলেন সর্বশেষে তুরস্কে ও উজবেকিস্তানে। এ ছাড়া উপ-রাষ্ট্রদূতও ছিলেন অনেক রাষ্ট্রে – পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরানসহ অনেক দেশেই। কিন্তু এসব বিচারে তিনি বিশেষ কেউ নন;  তাঁর বিশেষত্ব অন্যখানে। অনেকে বলতে পারেন, তিনি আন্তর্জাতিক নীতি পলিসি বা অভিমুখগুলো নিয়ে গবেষক ও লেখক। নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে, দুহাতে লেখা এই লোকের তিন-চারটি লেখা দেশে-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এখন ছাপা হয়। তবু এগুলোও তাঁর মূল বিশেষত্ব নয়।
    চলতি শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা ভারতের ওপর মনোযোগ ঢেলে প্রভাব বিস্তারে দেশটাকে নিজ কাজে লাগায়; তার ‘চীন ঠেকানোর’ [China Containment Policy] কাজের ঠিকা ভারতকে দেয়া আর ভারতের একাডেমিক জগতের মাস্টার্স বা হায়ার স্টাডিজের স্কলারশিপ বিতরণ করে লোভ দেখিয়ে আমেরিকান বয়ান মননে ঢুকিয়ে দেয়া, আবার আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা খুলে দেয়া ইত্যাদি শুরু হয়েছিল। ফলে ডিপ্লোম্যাটরা চাকরিতে থাকা অবস্থা থেকেই ওসব বয়ানে অনুরক্ত হতে শুরু করেছিলেন যাতে চাকরি শেষে  অবসরে যাবার পরেও কোনো থিংকট্যাংকে আবারও চাকরি পাওয়া যায়। এসব বিচারে একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ভদ্রকুমার। তিনি অনেকের চেয়েই সক্ষম এবং স্বাধীন গবেষক ও লেখক। তিনি আমেরিকান বয়ান বা তাদের অর্থ দ্বারা প্রভাবিত কোনও থিংকট্যাংকের সাথে যাননি। নিজের স্বাধীন চিন্তা অবস্থান নিয়ে এখনও লিখে চলেছেন। যেমন ভদ্রকুমারই সম্ভবত একমাত্র ভারতীয় যিনি মনে করেন ভারতের যুক্ত থাকা এমন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ স্ট্রাস্টেজিক জোট বা ‘কোয়াড’ জোটের, একদম কোনো ভবিষ্যৎ নাই। ফলে ভারতের এই যুক্ত থাকা ‘খামোখা’ মনে করেন। তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তাঁর নিয়মিত কালেকশনে থাকে প্রচুর তথ্য ও ইন্টেলিজেন্স (রাশিয়ানটা-সহ) যা তিনি নিজের লেখায় ব্যবহার করেন যেটা সম্ভবত তার কূটনীতিক জীবনের ধারাবাহিকতায় প্রাপ্ত প্রবেশ-অধিকারের বদৌলতে।

    ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসনের ক্যাবিনেট সদস্যদের নিয়োগে ‘সিনেটে অনুমোদন’ পাওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। তারা এরপর নতুন প্রশাসনের নীতি-পলিসিগুলো নিয়ে নিজেরা পারস্পরিক সমন্বয় শেষে কাজে নেমে পড়ছেন আস্তে ধীরে। সভা সেমিনারে গিয়ে নতুন প্রশাসনের পলিসি নিয়ে মুখ খোলাও শুরু হয়েছে। সেসব নিয়ে ভদ্রকুমারের একটা বড় রচনা ছাপা হয়েছে হংকংভিত্তিক ‘এশিয়া টাইমস’ পত্রিকায়। সে লেখাকে পটভূমিতে রেখে আজকের প্রসঙ্গ।

    ভদ্রকুমার হদিস দিচ্ছেন আমেরিকায় নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেট) অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন ভারতের মন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে ফোনে কথা বলেছেন। জানা গেল, সে কথা খুবই সংক্ষিপ্ত; মূলত সৌজন্য বিনিময় দিয়ে শুরু করা মাত্র। ফলে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটা জানার চেয়ে এই কথা সম্পর্কে ভারত ও আমেরিকা উভয়েই প্রেসের জন্য নোট (Readout) নিজ নিজ ওয়েবসাইটে কী টাঙিয়েছে, সেটা দেখা দরকার।
    যেমন দেখা যাচ্ছে সেখানে ভারত অর্থহীন ফুলানো শব্দগুলো ব্যবহার করেছে বেশি। মূলত ভারত ওখানে যা বলতে চেয়েছে তা হল –  আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এধরণের রুটিন কথা। কিন্তু ভারত সেটাকে ফুলিয়ে বলেছে, “আমাদের বহুমুখী স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ পোক্ত করতে আর বিস্তার ঘটাতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ” […consolidate and expand the multi-faceted strategic partnership]। আর যে কথা মনে করে সম্ভবত এসব লিখেছে সেটা হল, কেবল আমেরিকার অস্ত্র কেনাকেই ভারত এক ‘স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক’ বলে জ্ঞান করা হয়েছে। কারণ প্রপাগান্ডা যাই থাক, ভারতের সাথে আসলে পুরা ট্রাম্পের আমলে তেমন কোনো সম্পর্কই ছিল না, ভারতের আমেরিকান অস্ত্র কেনা ছাড়া। আর  অস্ত্র কেনাবেচাতে আমেরিকার দিক থেকে বহুবিধ শর্তাবলি থাকে। অস্ত্র কিনতে ভারতের সেসব শর্ত মেনে চলাকেই এখানে মূলত ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ বলা হচ্ছে। যেমন এমনই  অস্ত্র কেনাবেচার একটা সাইড চুক্তি,  ‘ইন্ডিয়া-ইউএস ২+২’ এই শিরোনামে। মানে দুপক্ষ থেকে দুইটা করে মন্ত্রী (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা) যুক্ত থেকে এই চুক্তি তাই ২+২। তাই আবার ভারতের কথিত ‘বহুমুখী’ (মাল্টিফ্যাসেট multi-faceted) শব্দটা অবশ্যই অহেতুক; কিছুই প্রকাশ করে না এমন, কথার কথা। আসলে ভারত বলতে চেয়েছে, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ হবুজোট ও ‘কোয়াড’ জোট নিয়ে আমাদের সম্পর্ক আছে। কিন্তু এখন ভারতের সন্দেহও আছে যে, এই কথাগুলোতে আসলে ট্রাম্পের চীনবিরোধী পলিসি ও কিছু বকোয়াজেরও অংশ ছিল, যা আসলে বাইডেনও মেনে চলবেন কি না, নিজের বলবেন কি না তা নিয়ে ভারত নিশ্চিত নয়; সন্দেহ করে। তাই ভারত নিজের রিড-আউটে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ও ‘কোয়াড’ এই শব্দদুটো ব্যবহারই করে নাই আর বরং তা না করে আরও আবছা এক শব্দ ‘বহুমুখী’ বলে সব ঢাকা দিয়েছে আপাতত।  কারণ ভারতের এই প্রেস বিফিং (রিড-আউটটা) ড্রাফটের সময়ে তখনও সে জানে না, আমেরিকা তাদের রিড আইটে ঠিক কী লিখে রাখবে। তাই আমাদের এই অনুমানটা দেখা যাচ্ছে সঠিক কারণ এখন আমরা আমেরিকা কী লিখে রেখেছে, রা জানি। কিন্তু তামশাটা হল, ভারত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ও ‘কোয়াড’ শব্দ দুটোতে  দ্বিধা রেখে তা আর ব্যবহারে করেনি। অথচ  আমেরিকা বলেছে, মানে ব্যবহারে এনেছে শব্দ দুটো। যদিও  এর অর্থ বদলে দিয়ে। লিখেছে, আমরা ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে আমেরিকার হবু পার্টনার হিসেবে ভারতের ভূমিকায় জোর দেই’ এবং ‘কোয়াডের মাধ্যমেসহ একসাথে কাজ ও সহযোগিতার দিকে গুরুত্ব দেই” [The Secretary underscored India’s role as a preeminent U.S. partner in the Indo-Pacific and the importance of working together to expand regional cooperation, including through the Quad. ]।

    তাহলে ব্যাপারটা কেমন হল? ভারত শব্দ দুটো উল্লেখ করলই না অথচ বাইডেনের আমেরিকা উচ্চারণ করল কেন? কারণ ভারত জানত, ট্রাম্পের সময়ের এশিয়ার এই দুই ইস্যুকে বাইডেন নিজেরও ইস্যু বলে মানবেন না। কিন্তু বাইডেন চোখবন্ধ করে শব্দ দু’টির ব্যবহার হঠাৎ করে বাদ বা একেবারে ফেলে দিবেন না। কিন্তু সাবধান, তার মানে এটা ধরে নেয়াও ভুল যে, ট্রাম্পও এই শব্দ দু’টি নিয়ে বিরাট কিছু করতেন – তা নয়। আসলে ট্রাম্প এটাকে তার আমলের চীনবিরোধী একটা সামরিক ধরনের জোট ভেবেছিলেন যেন। কিন্তু শেষে এটা আসলে তাও না; বরং একটা কথার হুমকি মাত্র – এমন করে রেখেছিলেন। আর তাই বাইডেনও শব্দ দু’টি ব্যবহারে রাখবেন, তবে তা ‘চীনবিরোধী’ এমন অর্থে বলবেন না। এমনকি এটা সামরিক জোট ইঙ্গিত করেও – এমন কোনো অর্থ তো করবেনই না। হয়তো জোটের সদস্যদের পারস্পরিক ইকোনমিক সমঝোতা ধরনের এক অর্থে রেখে দিতেও পারেন যেমনটা আমরা এখন প্রেস ব্রিফিং বা রিড-আউটে দেখছি, সে রকম। এ জন্য বাইডেন প্রশাসন বা ব্লিঙ্কেন শব্দ দু’টি কোনো সিরিয়াস বা অর্থপূর্ণ অর্থে ব্যবহার করছেন না। শুধু উচ্চারণে রেখে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্লিঙ্কেনের লিখিত রিড-আউট নোটে কমন কিছু কূটনৈতিক শব্দ ও কথাও আছে; যেমন- ‘পারস্পরিক কমন উদ্বেগ বা আগ্রহের বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করব – এসবই বাকি কথা হিসেবে সেখানে আছে। সার কথায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উভয়ের প্রথম কথা বিনিময়টায় কথার ফুলঝুড়ি অংশটাই বেশি হয়ে থাকল। অর্থাৎ কাজের কথা খুব বেশি আগাবে না, এরই ইঙ্গিত। এর মানে, সামনে ‘তিতা কথা’ বেশি হবে হয়ত।

    তবে ভদ্রকুমার বলছেন, ব্লিঙ্কেন এশিয়াতে ভারতেরও আগে পূর্ব-এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সাথে কথা বলেছেন এবং ঠিক কাজটা করেছেন [ শিরোনাম দেখেনঃ Blinken strikes the right chords toward India]। যেমন – জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ড এভাবে পর্ব-এশিয়ায় কথা বলেছেন আগে।। যদিও ব্লিঙ্কেন কেবল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বেলাতেই একটা মুক্ত ও অবাধ চলাচলের  ‘ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিয়নের’ কথা উল্লেখ করেছেন। আবার অস্ট্রেলিয়ার বেলায় ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা না তুলে কেবল আমেরিকার সাথে তাদের দু’রাষ্ট্র, তাদের ‘ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স’ ও ‘অটুট বন্ধন’ এসবের প্রশংসা করে কথা বলেছেন।
    এরপরে ভারতের বেলায় এসে ব্লিঙ্কেন নাকি গলার স্বর নিচা করে (‘টোন ডাউন’ রেফারেন্স) ফেলেছেন; ভদ্রকুমারই বলছেন। সাথে যোগ করেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে ভারতকে বাইডেনের আমেরিকার পাশে প্রয়োজন হলেও এই অঞ্চলে সেই ‘আকর্ষণ’ আর শক্ত হচ্ছে না বা দানা বাঁধছে না […To be sure, the US has a great need to keep India on board its “Indo-Pacific” strategy, which is not gaining traction in the region.।

    কিন্তু ভারসাম্য ইইউ-এর হাতেঃ
    ওদিকে এসবের আগেই আমেরিকার সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক আর আগের মত জায়গায় নেই। বিশেষত ট্রাম্পের ‘একলা চলো’, ‘কঠোর চীনবিরোধী হও’ দাবি যেটা ইইউ পছন্দ করে নাই কারণে সেটা আগেই অনেক পরিষ্কার ছিল। এসব ঘটে গিয়েছিল বিশেষত ট্রাম্পের ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার দুই সপ্তাহ আগেই। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের যৌথ অধিবেশনে যখন বাইডেনের বিজয়কে ‘ফর্মাল রায়’ বলে সিল দেয়া হয়, এর পর থেকেই সব জায়গায় বাইডেন প্রশাসনকে যেন (পম্পেও-এর বিষিয়ে দেয়াতে) ইউরোপের বিরূপ মনোভাব সামলাতে হিমশিম খেতে হয়, সে জন্যই যেন পম্পেও আগেই প্রকাশ্যে ইইউকে আহ্বান রেখেছিলেন ইইউকে ‘আমেরিকা না চীন’ এ দুটার একটাকে বেছে নিতে। এরই প্রত্যক্ষ জবাব জানাতে ইইউর ফরেন পলিসি চিফ জোসেফ ব্যারেল পম্পেওর সাথে ঐ বৈঠকের ঘণ্টাখানেক আগেই ঘোষণা করে দেন যে, তারা ‘চীনবিরোধী’ কোনো ‘ট্রান্স-আটল্যান্টিক অ্যালায়েন্স’ মানে আমেরিকা-ইইউ অ্যালায়েন্স গড়ার আহ্বান প্রত্যক্ষভাবেই নাকচ করে দিচ্ছেন। সোজা কথায়, ১৪ জানুয়ারি জোসেফ ব্যারেল জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইইউ আমেরিকার সাথে চীনবিরোধী এমন কোনো জোট করবে না।
    তিনি আরো স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, “চীন-আমেরিকা সঙ্ঘাত শুরু হোক আর তারা তাতে কোনো পক্ষ নিক তা তারা কখনো করবে না। কারণ ইইউ মাল্টিলেটারিজম (বহু ধরনের রাষ্ট্ররূপের পক্ষে) ও পারস্পরিক সহযোগিতার পক্ষে। কথাটা এভাবে বলেছিলেন; কারণ চীন পশ্চিমা ধরনের কথিত ডেমোক্র্যাসির দেশ নয়, সে কথা তুলে পম্পেও ‘চীনবিরোধী ডেমোক্র্যাসিগুলোর জোট বাঁধার’ ঘ্যানঘ্যানে এক আহ্বান করে যাচ্ছিলেন। সেই সাথে একটা খুবই কড়া কথা জোসেফ ব্যারেল বলেছিলেন, ‘সামনে যাই আসুক, আমরা ইইউ আমাদের বুঝ মতোই চলব।’

    ডাভোসে মার্কেলের আরও কড়া অবস্থানঃ

    ঘটনা সেখানেই থেমে গেলে হয়ত এক রকম হত; কিন্তু তা হয়নি। এরপর সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে এবারের জানুয়ারিতে “ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের” [WEF]’ সম্মেলনও এবার স্বাভাবিক সিডিউল মত আয়োজিত হয়েছিল ২৫-২৯ জানুয়ারি, তবে ভার্চুয়ালি। মানে, যার যার দেশে বসে কিন্তু অনলাইনে। সেখানে জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল ‘বোমা টা ফাটান’। ইউরোপীয় ‘পলিটিকো’ [Politico] পত্রিকা বলছে, তিনি ডাভোসে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমি খুবই চাইব, কোনো ধরনের ব্লক তৈরি এড়িয়ে চলতে চাই। আমি কল্পনা করি না যে, আমাদের বলতে হয়, এই যে দেখো এটা হলো আমেরিকা আর ওই দূরেরটা হলো চীন আর এভাবে আমরা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছি। সামনের দিনে এমনটা হতেই হবে- এটা আমার বোঝাবুঝি নয়। এমন হলে অন্য ধরনের সমাজগুলোর (আমাদের মতো নয় বলে) প্রতি অবিচার করা হবে” [“I would very much wish to avoid the building of blocs,” Merkel told the Davos World Economic Forum. “I don’t think it would do justice to many societies if we were to say this is the United States and over there is China and we are grouping around either the one or the other. This is not my understanding of how things ought to be.”] ।
    মার্কেল এখানেই থামেননি। ডাভোসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, তিনিও অনলাইনে উপস্থিত ছিলেন। মার্কেল তার রেফারেন্স তুলে বলেন, চীনা প্রেসিডেন্ট কালকে (আমার সাথে) বক্তৃতা করেছেন। সেখানে তিনি ও আমি একমত হয়েছি যে, আমাদের এক বহু রাষ্ট্রীয় (বহু ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা) ব্যবস্থাই দরকার [Referring to Xi’s speech at the same forum, Merkel said: “The Chinese president spoke yesterday, and he and I agree on that. We see a need for multilateralism.”]। … তবে সেখানে আরেকটা প্রশ্নও ছিল। প্রশ্নটা সম্ভবত আমরা যখন বিভিন্ন সোস্যাল মডেলে বসবাস করি সে সংক্রান্ত। এতে কখন হস্তক্ষেপের শুরু আর কোথায় এর শেষ? আর কখন আমরা এক মৌলিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়াতে পারব যা আমাদেরকে আর বিভক্তিতে ফেলবে না? মার্কেল এতদূর পর্যন্ত বলেছেন [“But there is one question where we are not in immediate agreement. Probably the question of what it means when you have different social models. When does interference begin and where does it end? When do you stand up for elementary values that are indivisible?”] । তিনি একই সাথে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়ে যাওয়া চীন-ইইউ ‘কম্প্রিহেনসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা সিএআই [CAI] চুক্তি নিয়ে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

    এ থেকে এখানে অনুমান করে একটা কথা আগেই বলে দেয়া যেতে পারে যে, আগামীতে বাইডেন প্রশাসন চীন-আমেরিকা হবু-সম্পর্ককে যেখানে নিয়েই থিতু বা শেষ করুক না কেন তা আর দুনিয়াকে (চীন ও আমেরিকা ব্লক) দুই ভাগ করতে পারছে না। কারণ ব্যালেন্স বা ভারসাম্য তৈরির ক্ষমতা এখন ইইউর হাতে। চীন-ইইউ চুক্তিই সেই ব্যালেন্স- মানে ভারসাম্যের উৎস। অর্থাৎ বাণিজ্যযুদ্ধ নয় বরং একটা ‘ওয়ার্কেবল বাণিজ্য সম্পর্ক’ এর মধ্যেই বাইডেনকে বাণিজ্যবিরোধের রফা খুঁজতেই হবে। তা তাদের দুই দেশকেই। কারণ চীনবিরোধী কোনো ইইউ-আমেরিকা জোট পাকানোর সব সম্ভাবনা এখন শেষ।

    ভদ্রকুমার তাই এখন এই পটভূমিতে বলছেন, ব্লিঙ্কেন দায়িত্বভার নেয়ার শুরুতেই প্যারিস, বার্লিন, লন্ডন বা ব্রাসেলস যাদেরই পররাষ্ট্র দফতরের সাথে কথা বলেছেন সেখানে কোথাও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ শব্দটাই তিনি ব্যবহার করেননি, আমেরিকার রিড-আউট তাই বলছে।
    ভদ্রকুমার আরো জানাচ্ছেন, ব্লিঙ্কেন সিনেটে অনুমোদন পাওয়ার তিন দিন পর এসব উল্লেখ করেছিলেন। এরও দুই দিন আগে ২৭ জানুয়ারি ভারত ও আমেরিকা দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়েও টেলিফোনে সৌজন্য বিনিময় হয়েছে। অর্থাৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা সেখানে ছিল না।

    ব্লিঙ্কেনের আফগানিস্তান ও পাকিস্তানেও ফোনঃ
    এ দিকে ভদ্রকুমার আরো জানাচ্ছেন, ঐ দিনই ব্লিঙ্কেন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথেও একইভাবে কথা বলেছেন। সেখানে ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া আধাখেঁচড়া এক কারবার হল, তালেবানদের সাথে যে সমঝোতা ডিল তিনি করেছিলেন, তা ট্রাম্পের শেষ সময় থেকেই অকার্যকর “ঢলে পড়া” শুরু হয়েছিল। বাইডেনকে তাই এখন আবার তালেবানদের সাথে কথা শুরু করতে হবে। আর তাতে আমেরিকার জন্য আবার পাকিস্তান খুবই গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হতেই হবে। তাই ভদ্রকুমার মনে করেন, বাইডেন রেডি হচ্ছেন পাকিস্তানের সাথে আগের মতই ঘনিষ্ঠ পার্টনারের সম্পর্ক করতে। আবার মোদীদি সরকারকে সাবধান করে তিনি লিখেছেন, বাইডেন প্রশাসন যদি এই পর্যায়ে চীনের কোন সহযোগিতা চেয়ে বসে তাতে ভারত যেন অবাক না হয়!

    দুনিয়া আসলেই বদলে যাচ্ছে যা আগে কল্পনাও করা যায়নি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীনবিরোধী হবেন, ব্যালেন্স ইইউর হাতে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা কেমন চীন চেয়েছিল, আর পরিণতি

    আমেরিকা কেমন চীন চেয়েছিল, আর পরিণতি

    গৌতম দাস

    ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3mw

    Is American Century OVER? চীন নিয়ে আমেরিকার স্বপ্নের পরিণতি – ছবি : সংগৃহীত

    জো বাইডেন আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন দিন দশেক আগে। তাঁর ক্যাবিনেটসহ অন্য যেসব স্টাফ নিয়োগ দিয়ে তিনি প্রশাসন গড়তে চান তাদের নিয়োগের পক্ষে আলাদা আলাদা সিনেট অনুমোদন লাভের কাজও এখন শেষের পথে। কিন্তু ইতোমধ্যেই খারাপ উদাহরণ দিয়ে বাইডেন নিজের কাজ শুরু করছেন। কথিত ‘তাইওয়ান হুমকি’ আর বিপরীতে ‘তাইওয়ান রক্ষা’ – এই অজুহাতের আলোকে চীন বোমারু বিমানের আনাগোনার বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ পাঠিয়ে মহড়া – এগুলো এখন সাউথ চায়না সি’তে খামোখা উত্তেজনা তৈরির উপাদান। অথচ বাইডেন ভাল করেই জানেন এবং আমাদেরকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ তাঁর পথ নয়।
    অবস্থাটাকে বলা যায়, ক্ষমতা ছাড়ার আগে ট্রাম্প-পম্পেও যুদ্ধের উসকানি তুলে এর মধ্যে বাইডেনকে ফেলে দিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি মাতেন কি না। এখন তারা দেখছে আমরা সব ভুলে বাইডেন মেতে উঠেছেন। আমরা দেখছি, এতে অনুভূতি-বুদ্ধিসুদ্ধি হারিয়ে নির্বিকার হয়ে যাওয়া- ইংরেজিতে যাকে ‘ক্যালাস’ [callous] বলে, সেভাবেই বাইডেন ক্যালাস হওয়াই পছন্দ করেছেন আর খামোখা উত্তেজনা ছড়ানো তার কাজ বলে মেনে নিয়েছেন।

    পম্পেও-এর চুনা লাগানোঃ
    চুনা লাগানো কথাটা হিন্দিফিল্মের চালু এক ডায়লগ। মানে কাউকে কড়া মেক আপ লাগিয়ে সাজিয়ে ক্যামেরার সামনে ইচ্ছামত নাচানো বা হাজির করা। অনেকটা যেন সেরকম,  যে কাজটা করে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও ক্ষমতা ছাড়ার দশদিন আগে, বাইডেনকে “তাইওয়ান রক্ষার নামে” খামোখা উত্তেজনা ছড়ানোর কাজে নামাতে পেরেছেন সেটা হল, চীনের ‘একচীন’ নীতি। কোন রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে চাইলে একটা পূর্বশর্ত মোতাবেক চুক্তিতে চীন প্রতিশ্রুতি আদায় করিয়ে নেয় যে, ‘একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু এই ‘একচীন নীতি’ কী, কোথা থেকে এলো আর চীনই বা এটা নিয়ে এত সিরিয়াস কেন?

    ঘটনার শুরু অনেক পেছন থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতিতে আমেরিকা নতুন এক গ্লোবাল সিস্টেম খাড়া করতে সক্ষম হয়েছিল, আমেরিকা নিজের নেতৃত্বে। বলা ভাল যে, এর আগে বিশ্বব্যাপী কোনো পণ্য-পুঁজির লেনদেন-বিনিময়, বাণিজ্য করার মত কোনো  অর্গানাইজ সিস্টেম-ব্যবস্থা ছিল না। তবে খুবই সীমিত পর্যায়ে বিনিময় চালানোর উপযোগী আর ঠুনকো একটা ব্যবস্থা ছিল যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই টিকতে না পেরে তছনছ গায়েব হয়ে যায়। আসলে, সেকাল ছিল কলোনি অর্থনীতির যুগ। ফলে বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন তেমন বিকশিত ছিল না, ব্যাপক বিকশিত হওয়ারও সুযোগ ছিল না, চাহিদাও তেমন তৈরি হয়নি। মূল বিনিময়টা হত মূলত কলোনি “মাস্টার আর স্লেভ” মানে “প্রভু ও দাস’ দেশের মধ্যে। দখলদার আর কলোনি হয়ে যাওয়া এমন দুদেশের মধ্যে। আর বলাই বাহুল্য তা একপক্ষীয় ভাবে দখলদার দেশের অনুকুলে ও শর্তে।

    সে কালের দুনিয়া মানে, পাঁচ কলোনি মালিক রাষ্ট্র : মূলত ব্রিটেন ও ফ্রান্স আর এদের সাথে ছোট তরফের স্পেন, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডস। সব মিলিয়ে এদের হাতেই সারা দুনিয়ার সব ভূখণ্ড ভাগ-দখল হয়ে থাকা যার মধ্যে স্পানিশ, পর্তুগিজ এদের কলোনি দখল কেবল ল্যাটিন আমেরিকা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ,  ইস্ট এশিয়ায় নেদারল্যান্ডসের ডাচেরা ক্ষয়িষ্ণু আর বাকি বড় দুনিয়া ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ভাগ দখলে, যেখানে আবার বেশির ভাগই ব্রিটেনের। বিপরীতে, আমেরিকা ব্যতিক্রম। অন্যের দেশকে কলোনি দখলের পরিবর্তে নিজেদেরই ব্রিটিশের কলোনি আরেক আমেরিকান কলোনি হয়ে থাকার খারাপ স্মৃতি ছিল তাদের। তাই ১৭৭৬ সালে আমেরিকান স্বাধীনতার যুদ্ধে সেসব থেকে মুক্ত হওয়ার পরে তাদেরই পঞ্চাশ রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত এক ফেডারল আমেরিকায়, ভিতরের কোন এক রাজ্য যেন অন্যকে কলোনি বা আধিপত্যের সম্পর্কে জড়ানোর সুযোগ না নিতে পারে সবসময় এ নিয়েই তারা তটস্থ থাকত। কেন্দ্রীয় বা ফেডারল আইন নামে কোনকিছু যেন রাজ্যগুলোর প্রত্যেকের আলাদা আগাম সম্মতি না নিয়ে উপর চেপে বসতে না পারে, এই ব্যবস্থাই সেই সময় চালু ছিল। এরপর ধীরে ধীরে রাজ্যগুলো পারস্পরিক আস্থা অর্জন করলে পরে, সেটাই আজকের আমেরিকা এভাবে থিতু হয়েছিল। যে কারণে ১৯১৩ সালের আগে মার্কিন রাজ্যগুলো একটা কমন কারেন্সির অধীনে সবাই আসে নাই। বরং প্রতিটা রাজ্যে যতগুলা স্থানীয় প্রাইভেট ব্যাঙ্ক ততগুলো ধরণের আলাদা নোট শহরে চালু থাকত। এক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের অধীনে সব রাজ্যের থাকা সেটা ছিল অনেক দুরের ব্যাপার ছিল তখন, এভাবে আসেনি বা ছিল না। ১৯১৩ সালেই প্রথম মার্কিন রাজ্যগুলো সকলে একটা কমন কারেন্সিতে এক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অধীনে আসে।

    আবার এরই ভেতরে আমেরিকা তার অর্থনীতি ও সঞ্চিত সম্পদের দিক থেকে  ব্রিটেনকে মানে কলোনিদখলদারদের শিরোমনিকেও ছাড়িয়ে সবার উপরে উঠে গিয়েছিল। অথচ অন্য দখলদারদের মত কারো কলোনি দখল না করেই এটা ছিল আমেরিকার সবচেয়ে  বড় এক অর্জন। আর এমন আবির্ভাবের পেছনে মূল যে জিনিস কাজ করেছিল তা হল, উনিশ শতকের শেষে ১৮৮২ সালের (‘স্ট্রাটফর’ Stratfor -এর রবার্ট কাপলানের মতে) আশপাশের সময় থেকে অর্থনীতি ও সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ বা সারপ্লাসে [surplus] আমেরিকার উত্থান ঘটেছিল। সেই থেকে পরে বিশ শতকের পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধ – এর শেষে ১৯৪৫ আমেরিকা যেটা কায়েম করেছিল তা হল, একটা নতুন গ্লোবাল (নিয়ম শৃঙ্খলা) অর্ডার চালু করা। যার ফলাফল হল ১৯৪৫ সাল থেকে গুছিয়ে বসা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত  – রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘ, গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক ও সিস্টেমের প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি।

    যারা সেকালের উত্থিত্ নয়া ট্রেন্ড, এসব ঘটনা নিয়ে আরেকটু ধারণা পেতে চান তারা ১৯৪১ সালে প্রকাশিত একটু বিস্তারিত এক আর্টিকেল পাঠ করতে পারেন। সে কালের বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের মালিক-সম্পাদক হেনরি লুসের [Henry Robinson Luce (April 3, 1898 – February 28, 1967)] এক আর্টিকেল ‘দ্য আমেরিকান সেঞ্চুরি’ প্রকাশিত হয়েছিল যা ছাপা হয়েছিল টাইমেরই নতুন এক সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সাপ্তাহিক ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনের  ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

    ইন্টারন্যাশনালিস্ট বনাম আইসোলেশনিস্টঃ

    আমেরিকান ইতিহাসে এটা Internationalists বনাম Isolationists ডিবেট নামে পরিচিত। এই তর্কের তুঙ্গ কাল হল ১৯২১-৪১ এই সময় জুড়ে।  তবে ১৮৮২ সালের পর থেকেই আমেরিকান সমাজে অভ্যন্তরীণ এই মহাবিতর্ক ছিল – ইন্টারন্যাশনালিস্ট বনাম আইসোলেশনিস্ট নামে; বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগে-পরে, এর প্রথম ঝাপটা উঠেছিল। এর আগে বলেছি, আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থানের মূল বৈশিষ্ট্য হল, সে কোন কলোনিয়াল শক্তি নয়। তাই সে সাবেক কোনো সম্রাটের সাম্রাজ্য নয়। আর সুপার-পাওয়ার শব্দটার ব্যবহার শুরু সম্ভবত তখন থেকেই; যা এমপায়ার (সাম্রাজ্য) শব্দের বিপরীত হিসাবে আমেরিকায় ব্যবহার শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ তারা বলতে চাইতেন, যারা কলোনি দখলদার এদের সাধারণ ফিচার হল, তারা কোন না কোন সাম্রাজ্য-দেশ আর যাদের অর্থনীতি হল অন্যের দেশ দখলদারি বা কলোনি দখল নির্ভর। কারণ কলোনি দখলদার পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রই ছিল সম্রাটের সাম্রাজ্য থেকে উঠে আসা দেশ। আর এমন রাজতন্ত্রের বিপরীতে আমেরিকা আগে থেকেই এক রিপাবলিক, পাবলিক স্বীকৃত গণক্ষমতা এর ক্ষমতার উৎস এমন রাষ্ট্র। তাই এটা নন-কলোনিয়াল (কাউকে কলোনি করেনি), নন-ইম্পেরিয়াল (রাজতন্ত্রী নয়) কিন্তু সুপারপাওয়ার রাষ্ট্র। তাই সেই আমেরিকাতেই ১৮৮২ সালের কাছাকাছি সময় থেকেই অভ্যন্তরীণ তর্ক ভারী হয়ে উঠতে থাকে যে, আমেরিকার কি অন্যান্য কলোনি মালিক দেশের (তখন সারা দুনিয়াই ইউরোপের পাঁচ কলোনি দখলদার রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ করে নেয়া) সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের গভীরে জড়ানো উচিত কি না। তর্কটা এভাবে উঠার পেছনে মূল কারণ,  কলোনিদখলদারদের সাথে তাঁদের যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার ভয়। যারা উচিত মনে করতেন এদেরকেই বলা হতো ইন্টারন্যাশনালিস্ট। আর যারা অনুচিত মনে করতেন তারা আইসোলেশনিস্ট বা বিচ্ছিন্নরাষ্ট্র-থাকাবাদী।

    এটা কোনো এথিক্যাল তর্ক ছিল না, মানে নৈতিকভাবে উচিত-অনুচিতের তর্ক নয়। তাহলে?
    ইউরোপীয় সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়লে প্রায়ই স্থানীয় প্রাইভেটব্যাংক থেকে ধার করত। কিন্তু কোনো সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হওয়াতে (বিশেষত কোন যুদ্ধের কারণে) এর কারণে তা থেকে প্রথমে স্থানীয় ব্যাংককে ধার শোধ না করার ঘটনার শুরুতে জটিল সব সম্পর্ক-সমীকরণ তৈরি করত। ফলে তা একসময় ক্রমশ পুরা অর্থনীতির জন্য তা সঙ্কট হিসেবে হাজির হত। শুরুর দিকে অনেক সময় ব্যাংকগুলোকে সোনা রিজার্ভে রাখা ছাড়াই রাষ্ট্রের নেয়া-ঋণের সমপরিমাণ টাকা ছাপানোর অনুমতি দিয়ে, রাষ্ট্র ব্যাংকগুলোকে  ম্যানেজ করার চেষ্টা করত। কিন্তু এসব সঙ্কট সেবার একেবারেই মারাত্মক হয়ে উঠে জার্মানির উত্থানে। কারণ সেও কলোনি দখলের প্রতিযোগিতায় নামতে চায়। কিন্তু এখানে এসে এবার এমন সঙ্কট তীব্র হলে ইউরোপীয় সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রগুলো ইউরোপের বাইরের (বিদেশি) আমেরিকান ব্যাংক থেকে ধার পেতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। আর এ থেকেই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ তর্কও সে সময় তুঙ্গে উঠেছিল।
    আইসোলেশনিস্টরা বলতে চাইতেন, জার্মানির উত্থানের ফলে সারা ইউরোপে যুদ্ধ আসন্ন হয়ে গেছে। তাই এসময়ে আমেরিকার কোন ব্যাংক বা ব্যবসায়ী ইউরোপের বিবদমান কোনো একটা পক্ষকে ঋণ দেয়া বা বাকিতে ব্যবসা করা মানে ঐ দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ক্রমশ শত্রু হয়ে পড়া, তা থেকেই ওদের যুদ্ধে আমেরিকাকে জড়িয়ে ফেলা হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যখন এত দিন ইউরোপে রাষ্ট্রগুলোর কলোনি দখলের ঝগড়া-মারামারিটা হত ইউরোপের বাইরের সেই মহাদেশেই। মানে, যাকে এরা দখল করতে চায়, সেই মহাদেশের ভূমিতে। কিন্তু জার্মানির উত্থানের বেলায় প্রথম তা ইউরোপেই ঘরের ভেতরের যুদ্ধ হিসেবে হাজির হয়েছিল, আর এটাই তো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-৮)। বিপরীতে ইন্টারন্যাশনালিস্টরা যুক্তি তুলতেন, আরে এটাই তো বরং ইউরোপের বাজারে ঢুকার ভাল সময় বলে। এসব তর্কাতর্কিতে একপর্যায়ে ইন্টারন্যাশনালিস্টদেরকে “মৃত্যুর সওদাগর” (যুদ্ধ মানে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়া এই সুত্রে) বলে দাগ লাগিয়ে হেয় করার বয়ান হাজির হয়েছিল।

    হেনরি লুস একজন ইন্টারন্যাশনালিস্টঃ
    টাইম ম্যাগাজিনের হেনরি ছিলেন এমনই এক ইন্টারন্যাশনালিস্ট, রিপাবলিকান। তবে সাবধান ইন্টারন্যাশনালিস্ট যারা হতেন তারা বাই-পার্টিজান মানে, মানে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট দুদল থেকেই হতে দেখা যেত। যেন এত বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তিনি ডেমোক্রাট ছিলেন। যাই হোক, তবে  সেসময়ে ইন্টারন্যাশনালিস্ট এদেরই এক লম্বা ও শক্ত পরিকল্পনা ছিল যে, আমেরিকান অর্থনীতিতে যে উদ্বৃত্ত সম্পদ জড়ো হওয়া শুরু হয়েছে আর এর যে ট্রেন্ড, তাতে দুনিয়াকে কলোনি দখলের কবল থেকে বের না করতে পারলে, কলোনি শাসনের অবসান না ঘটাতে পারলে, পরে কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম না হলে আমেরিকা দুনিয়ার কোথাও বিনিয়োগের জায়গা পাবে না, খাতক রাষ্ট্র পাবে না যার সাথে সে বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে পারে। কল্পিত এমন যেই দুনিয়ার নেতা হতে পারবে আমেরিকা! এই কথাটাই গুছিয়ে তুলে ধরেছিলেন হেনরি তাঁর ‘দ্য আমেরিকান সেঞ্চুরি’ নামের ওই দীর্ঘ প্রবন্ধে। বলতে চেয়েছিলেন, এতে সফল হতে পারলেই দুনিয়াতে পরবর্তী শত বছরের নেতা থাকতে পারবে আমেরিকা। তাই প্রবন্ধের নাম ছিল ‘দ্য আমেরিকান সেঞ্চুরি’। আসলে আমেরিকান সমাজের বিতর্ক আলোচনাগুলোকেই তিনি তুলে ধরে এনেছিলেন।

    মোটাদাগে বললে পরে বাস্তবে, এসব বক্তব্যের ভিত্তিতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এগিয়েছিলেন। আর তাতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের মধ্যে ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যেটা মূলত “কলোনি করা নিষিদ্ধ” বা যুদ্ধে হিটলার পরাজিত হলে চার্চিল কলোনিগিরি ছেড়ে দিবেন এরই প্রতিশ্রুতির চুক্তি। হেনরির প্রবন্ধটা প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৪১-এ, আর ওই ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৪ আগস্ট ১৯৪১, অর্থাৎ ছয় মাস পরে।

    আর ঐ বছরেরই শেষে ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে, আটলান্টিক চার্টার এই ড্রাফটটাতেই কিন্তু এবার আগের দু’জনসহ সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিন ও চীনের এক প্রতিনিধি স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। আর এটাকেই জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণা মনে করা হয়। এছাড়া পরের দিন থেকে অন্যান্য দেশও এতে স্বাক্ষরদানের জন্য উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছিল।

    ভেটো সদস্যপদের ধারণা কেন ও কোথা থেকে এলোঃ
    কিন্তু ভেটো ক্ষমতার [Veto Power] সদস্যদের বিশেষ ভেটো অধিকারের ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল গড়া, এটা কেন? ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকেই বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি যোগ দেওয়াতে যুদ্ধ পুরাদমে শুরু হয়েছিল। আর প্রায়শই রুজভেল্টের পাশে পাশে তখন থেকে আরও দুজন নেতাকে দেখা যেত – স্টালিন ও চার্চিল। মূলত জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে রুজভেল্টের প্রাইমারি আইডিয়াটার পক্ষে স্টালিনকে রাজি করাতে চাইতে গেলে তিনি আপত্তি করেন। সেটা হল এরকম যে,, জাতিসঙ্ঘ নামক এই প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভিত্তিতে চালু হয় তাহলে এটা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কখনও সোভিয়েত ইউনিয়নেরই রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়ে বসতে পারে। তখন কী হবে? তখন এরই সমাধান দিতে গিয়ে আর স্তালিনকে আস্থায় নিতে চেয়ে রুজভেল্ট এর সমাধান দেন এভাবে যে, প্রথমে তারা একমত হোক দুনিয়ায় পরাশক্তি বা হবু পরাশক্তি কারা, আছে বা হতে যাচ্ছে। এরপর ঐ পরাশক্তিগুলোর যেকোন এক সদস্য যদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভায় কোনো ইস্যুতে আপত্তি করে তবে জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্তই আর গৃহীত হতে পারবে না- এমন সিস্টেম করা হবে, এটাই ভেটো দেয়া। অর্থাৎ রুজভেল্ট ভেটো আইডিয়া দিয়ে স্টালিনের উৎকণ্ঠার সমাধান টানেন। আর এভাবেই তিনি স্টালিনকে নিজের জাতিসঙ্ঘ আইডিয়ার নৌকায় তোলেন।

    কিন্তু ভেটো সদস্যধারী ওই পাঁচজন কারা ও কেন সাব্যস্ত হয়েছিল? স্টালিনের সোভিয়েত ও রুজভেল্টের আমেরিকা তো ভেটো সদস্য হবেই, জানা কথা ধরতে পারি। আর ব্রিটেন, ফ্রান্স- এরা দুনিয়ায় কলোনিদখল অবসানকে লক্ষ করে বিরাট মিত্র। এবং এরা আটলান্টিক চার্টার চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেলেও তখনো পরাশক্তি; কাজেই তারা এতে অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। এছাড়া তাদেরকে ভেতরে সদস্য করে না নিলে তারা বাইরে গিয়ে বিরোধিতা শুরু করলে হিটলারের জার্মানবিরোধী করে মিত্রপক্ষশক্তির জোট গড়াই হতো না, এই বাস্তবতাও ছিল। কিন্তু তাহলে পঞ্চম ভেটো সদস্য হিসেবে চীনকে নেয়া হয় কী যুক্তিতে? চীন তো তখন অর্থনীতি বা সামরিক অর্থে তেমন কোনো শক্তিই ছিল না। তাহলে?

    আসলে সে সময়ে রুজভেল্টের মিত্রশক্তির বিপরীতে জার্মানির হিটলারের পক্ষে ছিল দুই প্রমিনেন্ট রাষ্ট্র ইতালির মুসোলিনি আর  সামরিক নেতা মার্শাল তোজোর জাপান, যার দুই-ই ছিল কলোনি দখলদার রাষ্ট্র। জাপান ছিল পুরা কোরিয়া (তখনও দুই কোরিয়া হয় নাই) আর চীনের আংশিক দখলদার। অর্থাৎ  ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে ভেটো সদস্যপদ দিয়ে ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও রুজভেল্ট এশিয়ারই একমাত্র কলোনি দখলদার জাপানকে শায়েস্তা করতেই এর কাউন্টার ওয়েট হিসেবে চীনকে খাড়া করতে চেয়েছিলেন; তাতে চীন আন্ডার ডেভেলপড্ হলেও, পরে গড়ে নেবেন এই আশায়। আসলে সোভিয়েত আর ব্রিটেন ও ফ্রান্স এরা সবাই নিজ নিজ ভেটো সদস্যপদ বুঝে পাওয়ার পর আর চীনের বেলায় তত সিরিয়াস ছিল না। ফলে আপত্তি না করে রুজভেল্টের বাছবিচারের প্রতি সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই চীন হল জাপান দখলমুক্ত।  ওদিকে সারা চীনের জাতীয়তাবাদী নেতা চেয়াংই কাইসেক আর তাকে কেন্দ্র করেই আমেরিকার গড়ে তুলেছিলেন নিজ চীনা-স্বপ্ন, ভেটোসদস্য পদধারী চীন।।

    কিন্তু অচিরেই আমেরিকার স্বপ্ন ভেঙে যায় বা ভেঙে দেন মাও সেতুং। পরের চার বছরের মধ্যেই তিনি ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব কায়েম করে ক্ষমতায় বসেন। তবে একটা খুঁত থেকে যায়। চীনের বিশাল ভূখণ্ডের তুলনায় তাইওয়ান একটা ছোট্ট ভূমি মাত্র। তবে এরপরেও আলাদা দ্বীপ বলে এর কিছু স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব আলাদা। মাওয়ের বিপ্লবে তাইওয়ান তিনি দখল করেননি, আর ওই দ্বীপেই কাইশেক পালিয়ে আশ্রয় নিয়ে বসেন।

    এদিকে ১৯৪৯ সাল মানে হল, বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে; ততদিনে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু (এপ্রিল ১৯৪৫) হয়ে গেছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রু ম্যান নিয়ম অনুসারে সাথে সাথেই প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন। এদিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের দুই সমর্থক- সাগরেদ মূল নেতা সোভিয়েত ও ব্রিটেন এদের জন্য সেকালে এটা দেখানো খুবই জরুরি ছিল যে, ওই বিশ্বযুদ্ধ জয়ে ও জাতিসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠায় দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মানে জাতিসঙ্ঘের জন্ম হয়ে যাওয়াতে যেকোন দু’রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে যুদ্ধ না করেই কথা বলে শান্তি ও মীমাংসা এখন সম্ভব এবং তা সহজ। সেই ফ্যারে পড়ে অতএব, আমেরিকা ও সোভিয়েত পরামর্শ ও চাপে চীনের মাও তখনকার মত আর তাইওয়ান দখল স্থগিত রাখেন। তবে জাতিসঙ্ঘ বা শান্তি, এসব কথার আড়ালে আমেরিকা ও সোভিয়েতের অন্য স্বার্থ ছিল অবশ্যই।  যেকথা এখনও চীনা নেতৃত্ব অভিযোগ তুলে বলে থাকে। চীনের ব্যাখ্যা হল,  আমেরিকা চেয়েছিল তাইওয়ানকে বাঁচিয়ে রাখতে যাতে তার “চীনা-স্বপ্ন” এর সম্ভাবনা কিছুটা হলেও জেগে থাকে। মাওয়ের নয়াচীন নয়, তাইওয়ানকেই সে আসল চীনের প্রতিনিধি বানিয়ে চীনের জন্য বরাদ্দ করা আগের ভেটোক্ষমতাটা আমেরিকা তাইওয়ানের হাতে রেখে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। সম্ভবত মাওয়ের ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হয়ে যায়। এছাড়া ওদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নও চায়নি আরেক কমিউনিস্ট প্রতিদ্বন্দ্বী ভেটোক্ষমতা পেয়ে যাক! এমনটাই চীনের ব্যাখ্যা।

    কিন্তু সেকালে এথেকে মাও সিদ্ধান্ত নেন, যে কোনো রাষ্ট্র নয়াচীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে গেলে ‘একচীন’ নীতি মানতে হবে। মানে চীন মেনে নেয় নাই যে তাইওয়ান চীনা-রাষ্ট্রের অংশ নয়। আসলে কাইশেক “তাইওয়ান মুক্ত” করার জন্য কখনও লড়েছেন ব্যাপারটা তো তা নয়। তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে এটাও কখনও তার দাবি অথবা লড়াই ছিল না। সোজাকথা তাইওয়ান কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা সশস্ত্র লড়াইয়ের ফসল তা একেবারেই নয়। 

    এদিকে, আমেরিকা মাত্র এই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ‘একচীন’ নীতি মেনে প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল। কারণ, মাও তখন ইতোমধ্যেই (১৯৫৮ সালে) সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ধরণের ‘ক্যাপিটালিজম’ তিনি কায়েম করতে চান,(এটাই আজকের চীন)। তাতে চীনে ব্যাপক বিনিয়োগ আর পণ্য নিয়ে ব্যাপক বাজারের সুযোগ যদি আমেরিকা নিতে চায় তবে আগের তাইওয়ানকে দেয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতি প্রত্যাহার করতে হবে। এর বদলে চীনকেই ভেটো সদস্যদের হকদার ও আসল চীনের প্রতিনিধি মেনে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশকে বিক্রি করেই এসব ঘটেছিল। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে চীন ভেটো সদস্যপদ পায় আর তাইওয়ান জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি হারায়। আমেরিকা তখন থেকে (আজও)  তাইওয়ানকে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নিয়ে আছে। এছাড়া সে সময় আমেরিকা  অভ্যন্তরীণভাবে নিজ কূটনীতিকদের করণীয় কী এর গাইডলাইন হিসেবে এক সার্কুলার জারি করেছিল যাতে ‘একচীন’ নীতি ভঙ্গ না করতে করণীয় লেখা ছিল। সেটাই এখন একালের ঘটনা এবং এই লেখার শুরুর ইস্যু।
    এবার পম্পেও ট্রাম্পের ক্ষমতা ছাড়ার আগে সেই সার্কুলারটা প্রত্যাহারের ঘোষণা করে দিয়ে যান। ফলে বাস্তবত অভ্যন্তরীণভাবে কূটনীতিকরা এখন কোনো বাধ্যবাধকতায় নাই, যদিও চীনের সাথে সম্পর্কের বেলায় চীন-আমেরিকা সম্পর্ক চুক্তি বহাল আছে। মানে আমেরিকা একচীন মানে এই প্রতিশ্রুতি বহালই আছে।  সারকথায় আমেরিকার রাষ্ট্রের ভিতরে-বাইরে দুইকথা হয়ে গেছে।  ওদিকে বাইডেনের সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটা হল, “পাছে লোকে কিছু বলে”। ট্রাম্পের দেশপ্রেমিক জাতিবাদের তুলনায় তিনি খাটো – পাবলিক যদি এমন মনে করে!
    বাইডেন খুবই আয়েশে পম্পেও এর প্রত্যাহার আদেশটাকেই তিনি বাতিল ঘোষণা করতে পারতেন। কিন্তু এই সহজ কাজটা তিনি করেননি। সম্ভবত ইমেজের ভয়ে যে এতে তিনি ট্রাম্পের চেয়ে কম দেশপ্রেমিক হয়ে যান কি না! বাইডেন এখানেই থামেন নাই।
    বরং উল্টা তিনিও ট্রাম্পের মতোই নিজেকে দেশপ্রেমিক দেখাতে চেয়েই যেন আরেক ক্যালাস কয়াজ করে বসেন। আমেরিকায় তাইওয়ানের ট্রেড কমিশনারকে (অর্থাৎ কূটনীতিক বা রাজনৈতিক প্রতিনিধি নয়, ট্রেড প্রতিনিধি যেটা চীন অনুমোদন করে, এবং চীনেও তাইওয়ানিজ ট্রেড প্রতিনিধি আছেন) বাইডেন নিজ শপথ অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে বসেন। ট্রেড কমিশনার তাতে উপস্থিতও হন। যেখানে বাইডেনের উচিত ছিল সরকারিভাবে জানান দেয়া যে, তিনি একচীন নীতি মেনেই চলবেন সেখানে তিনি উলটা তাইওয়ানকে দাওয়াত করে বসেন। অনেকে বলতে পারেন, বাইডেনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়োগ সিনেটে অনুমোদন পেয়েছে মাত্র গত পরশু। তাই হয়ত তিনি অপেক্ষা করছিলেন। না এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য না। কারণ, সেক্ষেত্রে তিনি ইনফরম্যাল কিন্তু বিশ্বস্ত চ্যানেলে চীনকে মেসেজ পৌঁছাতে পারতেন। যেটা একালে খুবই প্রচলিত এক কূটনীতিতে খুবই প্রচলিত এক যোগাযোগে উপায়।
    এদিকে এরই ফলাফলে কথিত ‘তাইওয়ান হুমকি’ আর বিপরীতে ‘তাইওয়ান রক্ষা’ – এই অজুহাতের আলোকে চীন বোমারু বিমানের আনাগোনার বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ পাঠিয়ে মহড়া – এগুলো এখন সাউথ চায়না সি’তে খামোখা উত্তেজনা তৈরির উপাদান। যুদ্ধের ইঙ্গিত ছড়িয়ে খেলাধুলা করা খুবই দায়ীত্বজ্ঞানহীন কাজ!

    কাজেই এগুলো চুলকিয়ে ঘা করা অদূরদর্শী আচরণ ছাড়া অন্যকিছু ভাবার সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। তবে কি বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে কড়া সঙ্ঘাতপূর্ণ সম্পর্ক করতে চাইছেন? না, এরও কোনো আলামত তিনি বা হবু ক্যাবিনেটের কেউ দেননি। মানে যা আপনি করতেই চান না, সেটার ইঙ্গিত বাতি জ্বালাচ্ছেন কেবল! অর্থাৎ কেবল বিভ্রান্তি আর বিভ্রান্তি বাড়ানোই যেন বাইডেনের উদ্দেশ্য! ফলে স্বভাবতই এটা খুবই খারাপভাবে শুরু, সন্দেহ নেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ৩০ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীন নিয়ে আমেরিকার স্বপ্নের পরিণতি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকার স্থায়ী ক্ষত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ

    আমেরিকার স্থায়ী ক্ষত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ

    গৌতম দাস

    ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3m1

          ‘We must end this uncivil war’ President Joe Biden, VP Kamala

    আমেরিকার রাজনীতিতে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের” উত্থান এক স্থায়ী ক্ষত, যদিও তা আপাতত ট্রাম্পের বাধাকে পরাজিত করে বাইডেনের শপথের মধ্য দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে ফেলা গেল।  তবে এটাই এখন আমেরিকার রাজনীতিতে মুখ্য ইস্যু হতে থাকবে।  আমেরিকান সমাজের অভ্যন্তরের এই দগদগে ক্ষত যেটা ট্রাম্পের হাত ধরে চারবছর আগে একটু একটু করে বাইরে আসছিল সেটাই এখন উদাম হয়ে পড়েছে। এই ক্ষতের নাম “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা”। সাদা চামড়ার লোকেরাই দুনিয়াতে শ্রেষ্ঠ রেসিয়াল মানুষ। তাই বাকি সব রেসের [race] মানুষকে তাঁদের অধীনে আসতে ও চলতে হবে, শাসিত হতে হবে। আমেরিকা চলবে সাদা আধিপত্যে, অন্যদের বের করে দেওয়াও হতে পারে। ইত্যাদি এসবই হল, রেসিয়াল (বা জাত) শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের কমন বয়ান। হিটলার মনে করতে নীল চোখের জর্মান আরিয়ান জাতি ইউরোপে শ্রেষ্ঠ। তাই ইহুদি-সহ সব রেসের মানুষকে তাঁদের পদানত করতে হবে। মোদী ও তাঁর সঙ্গী ও দল মনে করে দক্ষিণ এশিয়ায় হিন্দুরাই শ্রেষ্ঠ। তাই বাকিরা সবাই ‘নিচা জাত” বা রেসের মানুষ। তাই বাকি সকলকে তাঁদের অধীনে যেতে হবে। এগুলো জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদের কমন বয়ান। সবখানেই দেখা যাবে “শ্রেষ্ঠত্ববাদের” ধারণা। এই শ্রেষ্ঠত্ববাদের সাদা চামড়ার ভার্সান হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট – এই নামে সেটা যে গত চারবছর ধরে রিপাবলিকান পার্টিটাকেই অনেকটা খেয়ে ফেলেছে সেটাই আমেরিকা তো বটেই সারা দুনিয়াও এখন জানল। মূলত জাতিবাদী এই  “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা” চিন্তা হিসাবে খুবই ডেসপারেট,  বিধ্বংসী।  আমেরিকার এই  জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা -সহ সব জাতবাদীরা সেটা মোদী-ভগত এদের আরএসএস হিন্দুত্ববাদ কিংবা স্বয়ং  নাৎসি-স্বস্তিকার হিটলার ইত্যাদি সকলেই কোন হেদায়েতি (পারসুয়েসিভ) ধারা নয় একেবারে কেবল কঠোর বলপ্রয়োগেই বিশ্বাসী হয়ে থাকে। তারা অন্যকে নিজেদের মতাদর্শ বুঝায়ে বলতেও আগ্রহি নয়। বরং মনে করে কেবল বলপ্রয়োগে তা আপনাকে মানতে বাধ্য করানো সহজ, এমন ভাবনার পক্ষের লোক। অবশ্য জাতিবাদী মাত্রই কম-বেশি তাদেরকে মেনে নিতে বলপ্রয়োগে  বাধ্য করার পক্ষের লোকই হয়ে থাকে।

    এখন সামগ্রিক বিবেচনার জায়গা থেকে দেখলে, গ্লোবাল নেতৃত্বের স্থানে আমেরিকার জায়গায় চীনের উত্থানের ধাক্কায় দেখা যাচ্ছে তা সামলাতে না পেরে প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জগত এমন তছনছ হয়ে যাবে তা আগে ভাবা যায় নাই।  যদিও  ইউরোপের নয়া নাৎসি ধরণের ছোট ছোট পকেট-অস্তিত্ব গোপন/বেনামে অনেকদিন থেকেই আছে। আর এরই মতন আমেরিকান সমাজেও হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট নামে ছোট ছোট পকেটও  অনেক দিন থেকেই আছে। তবে যেটা আগে হয়ত তত গোণায় ধরার মত ছিল না। আবার অর্থনীতি ভাল চলার সাথে “মাইগ্রেশন” বা সস্তা বিদেশি-লেবার আমদানি হতে দেয়া আমেরিকান সমাজে বেড়ে যাওয়ারই কথা। আবার খারাপের সময় মাইগ্রেশনকে বিরাট বোঝা মনে করা – এভাবে মাইগ্রেশন ইস্যুটাই অর্থনীতির ভাল-মন্দের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।  আর এই মাইগ্রেশন বাড়া-কমার সাথে আমেরিকায় সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার প্রভাব বাড়া-কমা সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ অর্থনীতি খারাপ চলা মানেই মাইগ্রেটেড শ্রমিককে বোঝা মনে করা লোকের সংখ্যা বেড়ে  যাওয়া; আর এটাই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার আইডিয়াকে পপুলার করার ভাল সময় হয়ে উঠে। সেই হিসাবে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব বা প্রথম স্থান হারিয়ে দ্বিতীয় হয়ে যাওয়ার আলামত দেখা দেওয়াতে এতে আমেরিকান সমাজে এমন একটা ধাক্কা বা বড় নড়াচাড়া আসা অস্বাভাবিক নয় অবশ্যই।
    কিন্তু তাতে এবার সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীতা কী এতদিনের আমেরিকান রাজনীতির রিপাবলিকান ও-ডেমোক্রাট এদুই ধারাকে তিন ধারায় রূপান্তরিত করে দিবে? অথবা  আগের দুই ধারাই থাকবে কিন্তু রিপাবলিকান ধারাটা মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা হয়ে যাবে (!) – এটা এতদিন কেউ কল্পনাও করে নাই। আমেরিকান-রাষ্ট্র এতদিন নিজেকে খুবই [stable] স্থায়ী রাষ্ট্র বলে গর্ব করত; সম্ভবত সেদিন ফুরাচ্ছে। এখন সেটা তিন ধারায় পরিণত হোক অথবা দুই ধারাই কিন্তু  ‘রিপাবলিকান ধারাটা বলতে মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা হয়ে যায় যদি তবে বুঝতে হবে এটা হলে আমেরিকার চীনের কাছে হেরে আর দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিও থাকতে পারাটাও ক্রমশ অনিশ্চিত হওয়ার পথে যাচ্ছে।  অন্যভাবে  সার করে বললে, আমেরিকা-রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ গঠন এতে ভিতর থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।  আর এই ফাঁকে আমেরিকাকে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম অবস্থায় পড়ে বা অন্যেরা না তাকে তৃতীয় অবস্থানে ঠেলে ফেলে দেয়, এই অবস্থা তৈরি হবে। যাতে এই লড়াইয়ে ভারতের বদলে ইউরোপ (ইইউ) হয়ে উঠতে পারে চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ট হিসাবে দ্বিতীয় শক্তি, আর তারও নিচে চলে যেতে পারে আমেরিকা। এককথায় আমেরিকায় সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা উত্থান ও জেঁকে বসার  সোজা মানে হবে আমেরিকার গ্লোবাল অবস্থানকে আরও দুস্থ অসহায় করে পিছিয়ে দেয়া।
    তবে আমেরিকার এমন দুর্দশা ও পতন কত নিচে যাবে তা এই মুহুর্তেই প্রায় পুরাটাই উন্মোচিত হতে হতে গিয়েও শেষে ঠেকে গেল। মূল কারণ, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট আর হল না।  যদিও এখনও তা হতে পারে,  শপথের পরে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আবার এর সম্ভাবনা বাড়বে। সেক্ষেত্রে সেটা হবে কোন “সাবেক” প্রেসিডেন্টের ইমপিচমেন্টের প্রথম উদাহরণ। সেই হবু সিনেট ইমপিচমেন্ট শেষে পর্যন্ত আর হোক আর নাই হোক, আমেরিকান-রাষ্ট্র স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়া এবং আমেরিকান রাষ্ট্র-রাজনীতিতে কালোদাগ ছাপ লেগে যাওয়াটা ঘটেই গেছে।  এটাই আর আমেরিকান রাষ্ট্র আগের মত কমপিটিটিভ থাকবে না। মানে, অন্যান্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সবল থাকার ক্ষমতাটা এখন হারাবেই। কেবল এর মাত্রা কেমন হবে সেটা নির্ণিত হতেই কেবল বাকি আছে।
    সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতি আমেরিকান রাজনৈতিক পাড়ায় কত বড় জায়গা নিবে, দখল ও প্রভাব নিয়ে হাজির হবে এর প্রথম রাউন্ড আমরা দেখে ফেলেছি গত ৬ জানুয়ারি – সাদাবাদিদের আমেরিকার সংসদের রানিং যৌথ অধিবেশনের উপর শরীরি দখল নেয়া – তান্ডব ও নিজেদের আধিপত্য সেদিন কতটা প্রতিষ্ঠা করেছিল তা দেখে। যেমন সেদিনের মোট গ্রেফতারের সংখ্যাটা ছিল মাত্র ৮৩ জন। যার মধ্যে আবার প্রায় অর্ধেক ছিল তাঁদের বাড়ি ফেরার সময় ততক্ষণে (সন্ধ্যার পর থেকে কার্ফু জারি হয়েছিল) সে কার্ফুভঙ্গের অভিযোগে পড়ে গেছে তাই। দিনের বেলায় সংসদে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটানোর জন্য গ্রেফতার হয়নি তারা। অর্থাৎ পুলিশ উদার থেকেছিল এর প্রমাণ এটা। আর  কার্ফুভঙ্গ যা তুলনায় খুবই লঘু অপরাধ। এর সোজা মানে হল, সংসদের ভিতরের হাজার হাজার তান্ডবরত  সাদাবাদি-দেরকে পিঠে হাতবুলিয়েই বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।  আর, ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় যদি ইমপিচ করে শেষে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হত সেক্ষেত্রে সাদাবাদিরা দ্বিতীয়বার তাঁদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে রাস্তায় নামতে প্রস্তুত ছিল।  আর তাহলেই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কতটা রাজনৈতিক প্রভাব সঞ্চয় করেছে আর রিপাবলিকান দলের মধ্যেইবা কতটা প্রধান ধারা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে এরই প্রদর্শনী আর লুকানো থাকত না।
    এর তাহলে সোজা অর্থ হল, আমেরিকান সমাজে রিপাবলিকান ধারাটা মূলত কতটা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা হয়ে গেছেই কেবল সেটা দেখানোটাই আড়ালে রয়ে গেছে। বাইডেন এই ক্ষতটাই লুকিয়ে চলার সুযোগ নিচ্ছে। তাসত্বেও মনে হচ্ছে আগামি ছয়মাসের মধ্যেই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারাটাই মুখ্য বিরোধী-ধারা হয়ে জানান দিতে চেষ্টা করবে। এতে এরা যতটা সফল হবে বাইডেনের আমেরিকা ততই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক নিগোশিয়েশন দ্রুত গুটাতে তাড়াহুড়া শুরু করা সম্ভাবনা বাড়বে। যা হবে অনেকটা সত্যিকার হারার আগেই বাইডেনের হেরে যাওয়া। তা আগামিতে আরও কী পরিণতি হয় দেখতে একটু অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তবে সব কিছুরই ভিত নড়ে গেছে, আগের মত আর কিছুই নাই।

    আপাতত শেষটা ভাল দিয়ে শেষঃ
    তবু আমাদের বলতেই হবে আমাদের সামাজিক প্রবাদ যেমন বলে, ‘শেষটা ভালোভাবে হলেই সবটা ভালোই হয়েছে’। হোয়াইট সুপ্রিমিসিস্ট রিপাবলিকান; আর এদের হুমকিতে আমেরিকার দীর্ঘ প্রায় আড়াই শ’ বছরের রাজনৈতিক সিস্টেমে ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থাটা প্রথমবারের মত হুমকিতে পড়ে ভণ্ডুল হয়ে যেতে লেগেছিল। শেষে অন্তত, যা কিছু হয়েছিল, খচখচে কাঁটাসহ সব কিছু পেছনে ফেলে বাইডেনের আমেরিকা তা আপাতত মাটিচাপা দিতে পেরেছে। বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠান ন্যূনতম কোনো অঘটন ছাড়াই শেষ হতে পেরেছে। যদিও শপথ শেষের  বক্তৃতায় বাইডেন, তিনি আমেরিকায় প্রধান শত্রু হিসাবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের” নাম উল্লেখ করতেই হয়েছে। স্বীকৃতি বাইডেনকে দিতেই হয়েছে।
    কাজেই অন্তত মিডিয়া জগতে এখন আমরা, গ্লোবাল পারস্পেকটিভে বিজনেস আগের মতই আর তা ব্যবহারিক যার যার স্বার্থের দিক থেকে সামনের দুনিয়া কেমন হতে যাচ্ছে, সম্ভাবনা কী কী তৈরি হচ্ছে সেসব দিকে মনোযোগ ফিরাতে পারি। বাংলাদেশের দিক থেকে, আমাদের তিনটি স্তরে তিন দিক থেকে আগামী চার বছরের দুনিয়ায় যখন বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকবেন তখন তা দেখতে কেমন হবে এর ছবিটা জানার ব্যাপারে আমাদের জনগোষ্ঠিগত নিজস্ব স্বার্থ ও আগ্রহ মেলে ধরতে পারি। এর প্রথম স্তরটা হল, গ্লোবাল যা মুখ্যত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় কোন পয়েন্টে গিয়ে শেষে থিতু হচ্ছে এবং কেন এমন হবে সেটা জানাবুঝার চেষ্টা করা। এটা আমাদের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, এই প্রভাব বাইরের হলেও তা আমাদের উপরও পড়বে ও বড় প্রভাব রাখবে। আর দ্বিতীয় স্তরটা হলো জোনাল। অর্থাৎ এশিয়ার নাট্যশালায় যা আমাদের ডানে-বামে চীন ও ভারতের স্ব স্ব স্বার্থাবস্থানের দিকে আমাদেরকে নিয়ে যেতে টানাটানির হবে, সাথে বাইডেন প্রশাসনের যোগ হওয়া প্রভাব তো থাকবেই। আর তা আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, চীন হতে যাচ্ছে ‘নতুন নেতা’। এ ছাড়া তৃতীয় স্তরেরটা হল, সরাসরি বাংলাদেশ-আমেরিকা সম্পর্ক।

    যদিও এই তৃতীয় স্তরেরটা এবার আমাদের কল্পনারও বাইরে চলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। এর মূল কারণ চলতি শতকের শুরু থেকেই ২০ বছর ধরে আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষত বাংলাদেশে এসেছিল ভারতকে ভর করে সাথে নিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজে ভারতকে ‘ঠিকা দিতে’। আগামি এবার বিরাট ফারাকটা হবে এখানেই। কী সেটা?

    আগের আমেরিকার আচরণ ও তৎপরতা দেখে যদিও আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ঠেকানোটাই আমেরিকার একমাত্র স্বার্থ নয়। কিন্তু বেকায়দায় অবস্থাতে পড়ে আমেরিকা এসেছিল যেন চীন ঠেকানো ছাড়া তার আর কোনো স্বার্থ নেই, এমন ভাব ধরে। আমেরিকার অন্য মুখ্য স্বার্থ যা তখনো ছিল এবং এখনো আছে – তা হল বঙ্গোপসাগরে সেভেনথ ফ্লিটকে যদি নোঙর করাতে পারে।  কিন্তু তার মনের কথাটা এতদিন মনেই রয়ে যায়, কারণ এ বিষয়ে ভারত একদম ঘোরতর বিরোধী, নুন্যতম ছাড় দেওয়ার পক্ষপাতি নয়। যদিও চীনের অসহনীয় চাপের মুখে পড়লে আন্দামানে আমেরিকাকে ঘাঁটি গাড়তে দিতে পারে, এমন চিন্তা বাড়ছে, যা একালের নতুন ঘটনা। তবে এতদিন আমেরিকা এই স্বার্থ লুকিয়ে রেখেছিল, যাতে চীন ঠেকানোর ঠিকাগ্রহিতা ভারতের সার্ভিসটা সে পেতে পারে। কিন্তু আজ এটা সবপক্ষের কাছেই পরিষ্কার, আমেরিকার এই চীন ঠেকানো পলিসি অকেজো, কোন কাজে আসেনি, ডিভিডেন্ট, লাভ-মুনাফা দেয়নি। আমেরিকার সব স্বার্থ পানিতে গেছে। চীনের অবজেকটিভ বা বৈষয়িক-অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উত্থান সামরিক উত্থান নয় যে, তাই এটা ঠেকানো অসম্ভব রয়েই গেছে। ফলে ভারতের ‘মুই কী হনু রে’- এই মিথ্যা ঘাড় ফোলানো দেখা ছাড়া  আমেরিকার এতদিনের পলিসি আমেরিকাকে কিছুই দেয় নাই, কোন কাজে লাগেনি। অতএব এবার বাইডেনের আমেরিকার পুনঃরূত্থানের চেষ্টা এই নবউদ্যোগে এশিয়ায় আমেরিকার আগমন যদি ঘটে তা হওয়ার অনেক বেশি সম্ভাবনা থাকবে একান্ত আমেরিকান নিজ স্বার্থ ডমিনেটিং রেখে নিজেকে হাজির করাতে। মানে, এবার আমেরিকা ততটাই ভারতবিরোধী না হলেও কোন রকম গাটছাড়া না বেঁধে আসারই সম্ভাবনা।
    এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাইডেনের আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক বিশেষত, বাণিজ্য সম্পর্ক কোথায় গিয়ে ঠেকে, কিভাবে তা সেখানে পৌঁছাবে; জট খুলবে নাকি, সঙ্ঘাত চরমপথ নিবে ইত্যাদি শুধু তাদের দুই রাষ্ট্রেরই নয়, এটা আমাদের চলতি গ্লোবাল রাষ্ট্রব্যবস্থা, এই অর্ডারে অদল-বদল ঘটিয়ে দেয়ার মত পটেনশিয়াল ক্ষমতা রাখে। বাইডেন প্রশাসনের আমলে কী হতে যাচ্ছে, সেটা আপাতত ততটুকু প্রকাশিত যতটুকু বাইডেন তার স্টাফ-উপদেষ্টা হিসেবে কাদের নিয়োগ দিচ্ছেন, তাদের চিন্তাভাবনা অভিমুখ-দিশা কেমন বা ব্যাকগ্রাউন্ড ও কাজকর্মের অভিজ্ঞতা কেমন, তা দেখে যা অনুমান করা যায়।

    এনিয়ে হংকংভিত্তিক এশিয়া টাইমস পত্রিকা খবর দিচ্ছে, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রেগুলার ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র বলেছেন, চীন আশা করে চার বছর আগে তাঁদের সম্পর্ক যেমন ছিল তেমনটাই ফিরে আসবে এটা তারা আশা করে – ইংরেজি শব্দটা ছিল সম্পর্ক যেন “ব্যাক অন ট্র্যাক” – এমন হয়ে [The Chinese government hopes Sino-United States relations will get back on track after the Biden administration took office ]।
    এদিকে বাইডেনের নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্থনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, তিনি মনে করেন বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাম্পের চীনকে ডিল করার যে ধরন (ওয়ে অব হ্যান্ডলিং)তা তার পছন্দ নয় যদিও তাঁর অনেক শক্ত অ্যাপ্রোচ সঠিক ছিল। এটাকে অনেক কূটনীতিক ব্যাখ্যা করেছেন, শুরুতেই নতুন প্রশাসন চীনের প্রতি ভীষণ উদার অথবা “ট্রাম্পের সবই ভুল ছিল” এমন বলার ইমেজ নিয়ে শুরু করতে চাইছেন না; যদিও এতে এটাও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চীন ইস্যুতে তারা ট্রাম্পের পথে আগাবেন না। [Antony Blinken, the incoming US Secretary of State, said Tuesday that he disagreed with Trump’s way of handling China in several areas, but believed that Trump was right in taking a tough approach to Beijing]।

    ট্রাম্প-পম্পেও এর শেষ প্রতিহিংসার কাঁটা বিছিয়ে যাওয়াঃ
    ওদিকে ট্রাম্পের ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে এক প্রতিহিংসাপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কিছু কাজ করে গেছেন একনিষ্ঠ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও। ওয়াশিংটন পোস্ট এনিয়ে শিরোনাম ব্যবহার করেছে ‘কূটনৈতিক তাণ্ডবলীলা’ বলে [Trump and Pompeo’s campaign of ‘diplomatic vandalism’]। যেমন গত চল্লিশ বছরের আমেরিকার আভ্যন্তরীণ তাইওয়ান নীতি-গাইড লাইন বলে শক্ত পালনীয় এক নীতি ছিল। ট্রাম্প-পম্পেও ক্ষমতা ছাড়ার আগে  প্রতিহিংসায় তা নির্দ্বিধায় ছিড়ে ফেলে দিয়ে গেলেন। এছাড়া এমন আরও আছে।

    গত ১৯৪৯ সালের মাওয়ের চীনা বিপ্লবের পর থেকে চীনের নিরবচ্ছিন্ন অবস্থান হল, ‘এক চায়না পলিসি’ [One China Policy] শক্তভাবে অনুসরণ করে চলা। কথাটার ব্যবহারিক মানে যেখান থেকে উদয় হয়েছিল,  চীনের নেতা মাও  তাঁর ১৯৪৯ সালের বিপ্লবে সারা মূলভুখন্ড দখল করে ফেলেছিলেন। এতে মাওয়ের বাহিনীর এনিমি চীনা ন্যাশন্যালিস্ট চিয়াং কাইশেক তাইওয়ানে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু সময়কাল হিসাবে সেটা ছিল হিটলারকে পরাজিত করা আর জাতিসংঘের জন্ম দেয়া এক যুদ্ধবিরোধী থিতু গ্লোবাল অর্থনীতি গড়বার সময়। তাই এই আবহ-তে আমেরিকান রুজভেল্ট পরবর্তি ট্রুম্যান, সোভিয়েত স্টালিন আর বৃটেনের প্রবল আপত্তি গড়ে উঠেছিল মাওকে আর তাইওয়ান দখলে না যেতে। সেসময় এমন কিছু ঘটলেই দেশটাই ভাগ করে বিবদ্মানদের দুই অংশে আলাদা রাষ্ট্র করার দিকে ঠেলে দিয়ে আপাত সমাধান পাবার ঝোঁক অনেক বেশি ছিল। যেমন কোরিয়া অথবা ভিয়েতনাম এভাবেই শর্টকাটে হাটতে রাষ্ট্র ভাগ করা হয়েছিল। চীন-তাইওয়ানও এমনই এক চিহ্ন।

    তাই সেই থেকে শুরু হয় মাওয়ের চীনের এক চায়না নীতি যে, তাইওয়ান কোনো আলাদা রাষ্ট্র নয়, চীনেরই অংশ। তাই অন্য যেকোনো দেশ নয়াচীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে চাইলে তাকে ‘একচীন পলিসি’ মানতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয় আগে। যে রাষ্ট্র লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয় না চীন তার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কই করে না। এককথায়,  এ প্রসঙ্গে একমত না হলে চীন সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করে না। তাই আমেরিকার ক্ষেত্রেও ১৯৭৯ সালে ১ জানুয়ারি চীন-আমেরিকা প্রথম পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করার সময় আমেরিকাকে তাইওয়ানের হাত ছেড়ে মূল ভূখণ্ড চীনকে জানাতে হয়েছিল যে আমেরিকা একচীন পলিসির প্রতি সম্মতি আছে। ফলে আমেরিকাকে তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতেও হয়েছিল আগে। মানে আমেরিকার সরকারি অবস্থান হল, তাইওয়ান আলাদা কোন রাষ্ট্রই নয়। তবে চীন তাইওয়ানের সাথে যেকোনো রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে, “ট্রেড রিলেশন অফিস” খুলতে আপত্তি করে না। এমনকি চীনের নিজেরই তাইওয়ানের সাথে সেসব সম্পর্কই আছে। আর এই সূত্রে সেই থেকে আমেরিকান ফরেন অফিসে অভ্যন্তরীণভাবে কিছু আইনি সার্কুলার জারি করা আছে যে, আমেরিকান কূটনীতিকরা ‘একচীন পলিসি’ মেনে চলতে কী কী করবেন আর কী কী কখনো করবেন না। কিন্তু পম্পেও গত ১০ জানুয়ারি ২০২১ এক ঘোষণা করেন, তিনি চীনের একচীন নীতি মানার জন্য আমেরিকা স্বেচ্ছায় যেসব শর্ত মানতে অভ্যন্তরীণ সার্কুলার দিয়েছিল, সেসব সার্কুলার তিনি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এটাকে কূটনীতিক বিষয় নিয়ে একধরনের ফাজলামো করাই বলা চলে।

    যেখানে চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করার ক্ষেত্রে এটা ছিল উভয়ের মেনে নেয়া একটা শর্ত। সেখানে এই শর্তপালনের জন্য আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সার্কুলার যেটা ঠিক কোনো চুক্তির অংশ নয় বটে, কিন্তু তা প্রত্যাহারের কথা কেন আসছেন পম্পেও? তবুও সম্পর্ক-চুক্তি মেনে চলার জন্য এতদিন জারি থাকা অভ্যন্তরীণ সার্কুলার বাতিল করে দেয়াটা একটা অকূটনীতিক আচরণ। কারণ পম্পেও সাহস করে অর্থপূর্ণ কিছু করতে চান তাইলে তার এমন ঘোষণা করে দেয়া দরকার ছিল যে, ‘চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক আমরা ছিন্ন করছি”। কিন্তু না। ট্রাম্প-পম্পেও গোষ্ঠির সেই মুরোদ নাই।  তাই ঘুমিয়ে থাকা মানুষকে কষে গালি দেয়া মত এটা – যার শুনতে পাবার সম্ভাবনাই নাই।  এটা অনেকটা ‘গরুর মাংস খাবো না কিন্তু ঝোল খাবো’ বলা ধরণের। অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের মধ্যে সার্কুলার প্রত্যাহার করার মানে, চীনকে উসকানি দেয়া যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, সে কথা মানলাম না। কিন্তু আবার ট্রাম্প-পম্পেওর সেই মুরোদ নেই যে, সে কথা মুখের ওপর চীনকে বলে জানায়। তা হলে এর উদ্দেশ্য কী? এতে পম্পেও কী অর্জন করলেন? অন্যের বাসায় ঢিল মেরে পালিয়ে গেলেন, যাতে বাড়ির মালিক বাইরে এসে বাইডেনকে দেখে মনে করেন তিনিই ঢিলটা মেরেছেন। অথবা অন্য ভাষায় বললে এটা হল, অন্যকে কষ্ট দিয়ে নিজে সুখ পাওয়া। অন্যের আসা যাওয়ার পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখে তার ক্ষতি করার ‘সুখ’ নেয়া।
    এছাড়াও আরও আছে। যেমন এরই আরেক অংশ হল, পম্পেও ওদিনই ঘোষণা দিলেন “বাংলাদেশে আলকায়েদা আছে”। অথচ ট্রাম্প-পম্পেও আর ক্ষমতাতেই থাকবেন না। তা হলে এমন কথা বলে তার কী লাভ হল? কারণ যদি আলকায়েদা থাকেও তাতে বাইডেন কী করবেন তা তো বাইডেনই জানেন। তাহলে পম্পেও এর লাভ হল এই যে, বাইডেন প্রশাসনের সাথে আগেই হাসিনা সরকারের সম্পর্কটা তিতা করে দিয়ে চরমে উঠার দিকে উস্কে দেয়া। আমরা দেখলাম হাসিনা ঠিক ট্রাম্প-পম্পেওকে নয়, আমেরিকার প্রশাসনকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে কড়া বিবৃতি দিয়েছেন। এর রেশ ও প্রভাব এখন শপথ নিয়ে ক্ষমতায় এসে যাওয়া বাইডেন প্রশাসনের উপরও পড়বে। একই ধরণের অভিযোগ তিনি করেছেন ইরানের বেলায়ও, যে “আলকায়েদা আছে”। যাতে বাইডেন ইরান-আমেরিকা নিউক্লিয়ার ছাড় দিবার সমঝোতা চুক্তি সহজেই আবার শুরু করতে না পারেন।  এর আরেক মানে তা হলে পম্পেও চেয়েছেন – তিনি এমন কিছু ঘটিয়ে দিলে এতে তার অনুমান হল, বাইডেনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো যাবে না। তাই এটাই তার ভালো পছন্দ যে, এটাকে এদের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ফেলে দিলে ঝগড়াটা বেশি তিতা হবে। তাই তিনি এটি করেছেন।
    এ তো গেল যেটা চলে গেছে সেই ট্রাম্প প্রশাসনের আলাপ। কিন্তু যেভাবেই হোক ঐ পর্ব এখন মৃত।  আর শকুনের বদ দোয়ায় গরু মরা বেড়ে যায় না।  বরং চার দিকে জল্পনা কল্পনা  এবং বাস্তবতা হল, বাইডেন নিজে সরাসরি কী করতে যাচ্ছেন? ভারতের মত বাংলাদেশেও সরকারের হিউম্যান রাইট চরম ভায়োলেশনের ইস্যুগুলো খুবই শক্তভাবে জোরালো হয়ে উঠতে যাচ্ছে, চারদিকে সেই ইঙ্গিত বেড়েই চলছে।
    এছাড়া অন্য প্রসঙ্গে যেমন চীন প্রসঙ্গে বাইডেনের বিদেশনীতি মূল ধারা যেটা সামনে আসছে তা খবরের শিরোনামের ভাষায় হল, “প্রতিযোগিতা ভালোভাবেই চালাতে হবে কিন্তু (কোনো যুদ্ধের) বিপর্যয় ঘটানো যাবে না” [Competition Without Catastrophe]। এটা নিরস্ত্র লড়াই করে রাখতে হবে। নিজ নিজ স্বার্থের স্ট্রাটেজিক আর কূটনীতিতে লড়াই চালাতে হবে।

    যেমন- শপথের দিন বাইডেন বলছেন, তিনি তার শাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে এমন কিছু করতে চান, যা দেশ-বিদেশে মানুষের কাছে বার্তা দেবে যে আমেরিকা ফিরে এসেছে- ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’! [Joseph Biden has promised a fast and furious agenda in his first 100 days in office in a bid to show the world “America is back” after four erratic and divisive years under the outgoing Donald Trump.]
    বলা হয়ে থাকে, আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে কী কী করে দেখাতে পারেন, তা দেখেই বোঝা যায় তার আমলটা কেমন যাবে। আর এটা প্রথমবারের মতো চালু হয়েছিল আমেরিকার টানা চারবারের  (১৯৩৩-৪৫) প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আমল থেকে। এ বিচারে বলা যায়, বাইডেনের প্রথম ১০০ দিনের আলাপ তোলার শুরু। তবে এটি মূলত অভ্যন্তরীণ ইস্যু আর তাতে অর্জন কী কী করা হয় বা যায় সেই বিষয়। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় হল – বাইডেন কথাটা বলেছেন, ‘এটি করা হবে দুনিয়াকে দেখানোর জন্য’। আবার বলা হচ্ছে দুনিয়া দেখবে যে ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে’। কিন্তু কোথায় চলে গিয়েছিল আমেরিকা, ট্রাম্পের হাত ধরে? আর কোথায়ইবা সে ফিরতে চায়?
    এর জবাব হল, আমেরিকা মূলত যে গত ৭৫ বছর ধরে এক গ্লোবাল সিস্টেমের নেতা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেসব কিছু ভুলে ট্রাম্পের হাত ধরে জাতিবাদী হয়ে যায়। সেখান থেকে সে গ্লোবাল নেতৃত্বে ফিরতে পারুক আর না পারুক; কিন্তু সে গ্লোবাল সিস্টেমে ফিরতে চায়, প্লেয়ার হতে চায়, গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিতে নিজের করণীয় ও ভূমিকা নিতে চায়। এই মেসেজই বাইডেন বারবার দিতে চাইছেন। এর বিপরীতে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ২০ জানুয়ারি জো বাইডেনের কাছে আবেদন করে বলেছেন, চীনের সাথে আমেরিকা যেন যুক্তিবুদ্ধি খাটিয়ে আচরণ (মানে রাগ বা বিদ্বেষে নয়) করে, বিশেষত দ্বিতীয়-বৃহত্তম অর্থনীতির একটা দেশ যেমন আশা করে। আরো আছে। চীন বলছে চার বছর আগে যেমন চীন-আমেরিকা আমরা ছিলাম তেমন জায়গায় (ব্যাক অন ট্র্যাক) ফিরে যেতে।

    মজার কথা হলো, এই শেষ বাক্যে এসে দেখা যাচ্ছে- চীন ও আমেরিকার মন্তব্যের মধ্যে এক বিশাল মিল দেখা যাচ্ছে। এ যেন প্রেমের প্রস্তাবের আগেই দু পক্ষই চাচ্ছে  যে সে প্রত্যাখ্যাত হবেন না, তা আগাম নিশ্চিত হতে।

    অর্থাৎ শপথের দিনের মহড়া দেখে মনে হয়েছে তারা এক রাস্তা ধরেই এগোচ্ছেন হয়ত! যদিও পথে অনেক বাধাও আছে। আর তা কী হয়, দেখার জন্য অন্তত প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত আমাদেরকে অপেক্ষা মনে হচ্ছে লাগবেই। কারণ কাজটা একেবারেই সহজ নয়। দেখা যাক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৩ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “শেষে বাইডেনের শপথ হয়েই গেল” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন

    ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন

    গৌতম দাস

     ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3lO

    ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন – ফাইল ছবি

    ট্রাম্পের চোখে তার বিরোধী কে বা কারা?  কার বিরোধিতা করতে তিনি মাঠে নেমেছিলেন? চীন না বাইডেনের?  ট্রাম্প আমেরিকান সংসদে হামলা-ভাঙচুর, ভেঙে তছনছ করেছেন, কিন্তু কার বিপক্ষে যাবেন বলে? মূলত এনিয়ে তিনিই বিভ্রান্ত! তাই তিনি নিজে এক সিটিং প্রেসিডেন্ট হয়েও সংসদে হামলা করিয়েছেন! আর এতেই আমেরিকান রাষ্ট্রের সক্ষমতা যতটুকু যা ছিল তা নষ্ট করে দেশটিকে আরো কয়েক ধাপ দুস্থ অবস্থায় নিয়ে ফেলে গ্যালেন! পিউ রিসার্চের ফাইন্ডিংস মতে ট্রাম্পের পাবলিক রেটিং এখন ২৯ শতাংশে নেমে গেছে [Donald Trump is leaving the White House with the lowest job approval of his presidency (29%) ]।  এদিকে আমেরিকার এখনকার মারাত্মক অর্থনৈতিক সমস্যা হল মুখ্যত কোভিড ভাইরাস মোকাবেলায় ট্রাম্পের চরম অক্ষমতা-জাত। এক দিকে চার লাখের মত মানুষের ভাইরাসে মৃত্যু, সাথে বেকারত্ব, অর্থনীতিতে ধস প্রভৃতি। যে দিকটা ভেবেই সম্ভবত বাইডেন শপথ নেয়ার আগেই প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘অর্থনীতি রিকভারি পরিকল্পনা” [Biden Seeks $1.9 Trillion for Relief in First Economic Plan] সিনেটে অনুমোদনের জন্য পেশ করতে রেডি করেছেন। সিনেটে বাই-পার্টিজান হয়ে তাই দুই দল একসাথে কেবল ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টে নিয়ে মেতে থাকা নয়, বাইডেনের নতুন ক্যাবিনেট অনুমোদন বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অনুমোদনের মত জরুরি কাজগুলো সম্পন্ন করতেও নিজেদের মধ্যে সময় ভাগাভাগি করে কাজ করার আলাপ-আলোচনা করছেন [Senate to split time ...।]।  এখন অন্তত আগামী এক বছরের মধ্যে এসবের ফলাফল যদি ইতিবাচক হয়ে ফলতে থাকে, তবে মধ্যবিত্ত, স্বল্প আয় ও পেশার মানুষের ট্রাম্প সম্পর্কে তাদের ইতি-মূল্যায়ন থাকলে তাতে বদল আসবে। আর এতে তাদের নিজ হতাশ জীবন পেছনে ফেলে সামনে আগাতে তারা ইতিবাচক দিশা পেতেও পারে!

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার আয়ু আর মাত্র দুই দিন। কিন্তু ক্ষমতার টার্ম শেষ হওয়ার শেষ দুই সপ্তাহ যেন কঠিন থেকে কঠিনতর অসহায়ত্বের দিন হয়ে ট্রাম্পের কেটেছে। প্রতিদিনই নতুন আরেকটা খারাপ কিছু ঘটে চলেছে। এভাবে গত ১৩ জানুয়ারি আমেরিকান সংসদে (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে) তিনি ইমপিচড হয়েছেন [Trump Impeached for Inciting violent Insurrection]। নিজ দলের ১০ জন সদস্যও তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ আইনত তিনি এখন দাগী বা ইমপিচড। আর তার বিরুদ্ধে ‘ইনসাইটিং ভায়োলেন্ট ইনসারেকশন’ [inciting violent insurrection] বলে এবারের ইমপিচমেন্টে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলা হয়েছিল। যার বাংলা হল – প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ‘সহিংস বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা করতে উসকানি’ দিয়েছেন। যদিও এটা আংশিক, মানে ইমপিচমেন্টের পুরো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি এখনো। কারণ আমেরিকান সংসদ আমাদের মত একটা না দুইটা, মানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। অর্থাৎ আমেরিকার আরেক সংসদ আছে যেটাকে ওরা সিনেট বলে। প্রতি রাজ্য থেকে দু’জন নির্বাচিত সিনেটর নিয়ে এই সিনেট গঠিত। তবে আমেরিকান কনস্টিটিউশন অনুসারে, সংসদ সদস্য বা আইনপ্রণেতাদের দুটো কক্ষ (সিনেট ও হাউজ) থেকেই একই বিল অনুমোদন পেলে তবেই এরপর সেটি ‘পালনীয় পূর্ণ আইন’ বলে বিবেচিত হয়। তাই এখন সিনেট থেকেও ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাস হওয়ার অপেক্ষায়; প্রস্তুতি চলছে।

    ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগে কি সিনেটেও ইমপিচমেন্ট শেষ হবে?
    এর একেবারেই সংক্ষিপ্ত জবাব, মনে হয় না। পরিস্থিতি সম্পর্কে এক্সপার্ট এক্সপ্লেনারের ব্যাখ্যা হল, এটা সম্ভব নয়। এক কথায় বললে ট্রাম্প ২০ জানুয়ারি তার টার্ম শেষে হোয়াইট হাউজ ছেড়ে যাওয়ার পরেই কেবল সিনেটে ওই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব উঠবে। এটাই এক্সপার্ট অপিনিয়ন। এর মানে, তাহলে ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট না থাকলেও সিনেটে তাঁকেই ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব কী জীবিত থাকছে? হ্যাঁ, ঠিক তাই, থাকছে। আর এর একটা কারণ হল, সংসদ বা হাউজে উঠা প্রস্তাব ও তা পাস হওয়ার পর তা সিনেটেও পেশ ও পরিণতিতে ভোটাভুটিতে যাই হোক তা সম্পন্ন হতেই হবে। কারণ প্রস্তাব একবার উঠেছে যখন, এর প্রক্রিয়া শেষ হতে হবে। আর দ্বিতীয় কারণ হল, যদি সিনেটেও ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবটা পাস হয়ে যায় তখন এরপরেও আরেক বাধ্যতামূলক কাজ বাকি থাকবে। সেটা হল, সিনেটের প্রস্তাব পাস হওয়া মানে তখন সেটা গৃহীত হয়ে যাওয়া এক আইন। যার সোজা অর্থ, ট্রাম্প দোষী ও অযোগ্য বলে প্রমাণিত। তাই এর সাথে তখন যে প্রশ্নটা উঠবেই যে, তা হলে ট্রাম্প কী এরপরও পাবলিক অফিসে কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য থাকবে? এ বিষয়টির মীমাংসা করতে হবে। কারণ সেটা মীমাংসা করতে আবার কেবল সিনেটেই আরেকটা প্রস্তাব তুলতে হবে। সেটা হলো, ইমপিচড হয়ে যাওয়া ট্রাম্প এরপরে পাবলিক অফিসে কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য কি না – এ প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি করা।
    তবে এখানে আমাদের একটা জিনিস পরিষ্কার রাখা দরকার। ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব হাউজে যখন প্রথম তোলা হয়েছিল, সেখানে তা পাস হওয়ার নিয়ম ছিল, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলেই পাস মনে করা যায় সেখানে। মানে ঐদিন উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ‘সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের’ (৫০%+) পক্ষভোট পেলেই যথেষ্ট। আর তাতে ট্রাম্প হাউজে ইমপিচড হয়েছিলেন ২৩২/১৯৭ ভোটে। কিন্তু এরপর ওই প্রস্তাব সিনেটেও পাস করতে গেলে সেখানে এবার তা হতে হবে দু-তৃতীয়াংশ (৬৭%) ভোটে। কিন্তু আবার এরপরে সিনেটেই অভিযুক্ত ট্রাম্প জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য থাকবেন কি না এ প্রস্তাব ভোটে উঠলে তখন এবার সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় হলেই তা পাস হয়ে যাবে। এভাবেই ইমপিচমেন্টের পুরো প্রক্রিয়াটা কনস্টিটিউশন অনুসারে সম্পন্ন হবে বলে মনে করা হয়।

    এদিকে যদিও নিয়ম অনুসারে হাউজে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব (একে আর্টিক্যাল বলা হয়ে থাকে) পাস হওয়ার পরে এরপর সিনেটে তা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটা কনস্টিটিউশন দিয়েছে হাউজ স্পিকারকে (এখানে ডেমোক্র্যাট স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিকে)। কথা আরো আছে, তিনি কবে তা সিনেটে পাঠাবেন এর বিবেচনার ভার কনস্টিটিউশন স্পিকারের নিজের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্পিকারের আরেকটা বড় কাজ আছে।  ঐ প্রস্তাব হাউজে কী প্রেক্ষিতে পাস হয়েছে, তা সিনেটে গিয়ে সেটা নিয়ে ব্রিফ ও ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য আগেই স্পিকার ৯ জন ম্যানেজার বা এজেন্ট সিলেক্ট করে সিনেটে নাম পাঠিয়ে দিবেন বা দেয়ার কথা। ইমপিচ-প্রস্তাব আলোচনার সময় সিনেট এদের থেকে তা শুনে নিবে। সেই ম্যানেজার নিয়োগের কাজও পেলোসি শেষ করেছেন এরই মধ্যে।

    আবার ইতোমধ্যে সিনেটেরও কিছু ডেভেলপমেন্ট বা নতুন ঘটনা আছে। চলতি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আছে রিপাবলিকানরা আর এর নেতা হলেন ম্যাক-কনেল [Mitchell McConnell Jr.]। কিন্তু ২০ জানুয়ারি থেকে নতুন নির্বাচিত সিনেটে, সেখানে ভোটের স্টাটাস হয়ে যাবে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট সমান সমান ৫০, এরকম। তবে আমেরিকান কনস্টিটিউশনে এরও সমাধান দেয়া আছে। রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট যিনি থাকেন তিনিই পদাধিকারবলে সবসময় সিনেটের প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হলেও তিনি ঐ সিনেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে আসেন কেবল কোন বিশেষ অনুষ্ঠান হলে অথবা সিনেট অধিবেশনে পক্ষে-বিপক্ষে সমসংখ্যক ভোট পড়েছে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে। কারণ কেবল তখনই তিনি সিনেটের ভোটাভুটিতে কোন একটা পক্ষে নিজের ভোটটা প্রদান করে প্রস্তাবে সিদ্ধান্তমূলক ফলাফল এনে দেন। অর্থাৎ এটা বলা যায় যে এবার সিনেটে ডেমোক্রাটদের পক্ষে।  নইলে সাধারণ সময়ে, সিনেট পরিচালনা করে থাকেন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা যিনি থাকেন তিনিই পদাধিকারবলে  এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

    এসবের সোজা মানে এখন সিনেটেও ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পাস হতে গেলে ৬৭টা ভোট লাগবে, অর্থাৎ ন্যূনতম ১৬টি রিপাবলিকান ভোট লাগবে। আর সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসেরও ভোটটা, এমন হতেই হবে। কিন্তু কমলা হ্যারিস শপথ নেবেন বাইডেনের সাথেই আগামি ২০ জানুয়ারি। আর এদিকে চলতি সিনেট যা ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে টার্ম শেষ করবে এতে ডেমোক্র্যাটরা ৫৭/৪৭-এ মাইনোরিটিতে আছে।

    এসব বিবেচনায় আমেরিকান মিডিয়ার দুটো (এপি আর নিউ ইয়র্ক টাইমস) এক্সপ্লেনার রিপোর্ট বলছে, আগামী ১৯ জানুয়ারির আগে পেলোসির ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব সিনেটে পাঠানোর সম্ভাবনা নাই। কারণ তখনই একমাত্র ডেমোক্র্যাটরা সিনেটেও শক্তিশালী হবে। এছাড়া বর্তমান মেজরিটি লিডার রিপাবলিকান ম্যাক-কনেল জানিয়েছেন, ১৯ জানুয়ারির আগে সিনেট বসার কোন শিডিউল এখনো পর্যন্ত নাই। আর ইমপিচমেন্ট প্রসঙ্গে তার অবস্থানটা হল, তিনি ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের পক্ষেই ভোট দিতেন হয়ত কিন্তু তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রস্তাব আনতে চান না। আবার ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত তার সদস্য থাকার শেষ দিন। এথেকে বুঝা যায় যে, এবিষয়ে  এক্সপ্লেনারদের  ব্যাখ্যা কেন ব্লছে যে ২০ তারিখের আগে কিছু হবে না!
    সাথে আরেকটা খবর দিচ্ছে রয়টার্স যে, ক্ষুব্ধ ক্ষ্যাপাটে ট্রাম্পকে সামলাতে তার স্টাফরা পেরেশান দশায়। আর ২০ জানুয়ারি শপথের দিনেই সকালে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ও ওয়াশিংটন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সম্ভবত ফ্লোরিডায়, থাকবেন সেখানেই।

    এবার আসা যাক ট্রাম্প আমেরিকাকে কোথায় নিয়ে এনে ফেললেন তাহলে? এর পরিণতি কী হবে?
    প্রথম কথা, এখনো যে দিকে বেশির ভাগ মিডিয়া বা আলোচক ফোকাস করতে চাইছে না; তা হল ট্রাম্পের সমর্থক কারা, আমেরিকান সমাজের কোন অংশ? এবং কেন? নিশ্চয় আমরা মনে করব না যে ট্রাম্পের সমর্থকরা সব ট্রাম্পের মতোই পাগলাটে অথবা যাদের আচরণের দিশা বুঝা বা কার্যকারণ বের করা সহজ না। রাজনৈতিকভাবে দেখলে ট্রাম্পের সমর্থকরা মূলত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা। বিভিন্ন নামে এদের সংগঠন আছে, ডেরা আছে। এদের সাথে ট্রাম্পের প্রমোটার যারা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ২০১৬ সালে পেশ করেছেন, এমন লোকদের বুঝাপড়া আছে যে, ট্রাম্প সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিদের দাবি ও তাদের চিন্তাগুলো পপুলার করতে সহায়তা করবেন। এছাড়া আবার ট্রাম্পের ভোটার-সাপোর্টার যারা তাদের বড় অংশ হল মূলত স্বল্প আয়ের বা ছোট এন্টারপ্রাইজ, ছোট উদ্যোক্তা অথবা গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের ধাক্কায় চাকরি হারানো নানা ধরনের মানুষের বিরাট অংশ।

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দুনিয়া এখন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এক পালাবদলের জাংশন পয়েন্টে। চীনা উত্থানের এই পর্বে সব দেশের তো বটেই, এমনকি পুরনো গ্লোবাল নেতা আমেরিকার অর্থনীতিতেও এর বড় ছাপ পড়বেই। আগের নেতা হিসেবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ যেসব পেশা বা প্রডাক্টকে সে সহজেই জন্ম ও প্রটেক্ট করতে পারত, সেই ক্ষমতা আমেরিকার কমে যাচ্ছে, কমে নিঃশেষ হওয়ার পথে যাচ্ছে। তবে এসব পেশা উদ্যোক্তাদের জীবনের আর কোনই সম্ভাবনা নেই, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং ব্যাপারটা একটা ঢেলে সাজানো ধরনের কিছু; যা  পুরনোদের একেবারেই বাদ দেয়া নয়। বরং নতুন কিছু করা, কিছুর বেলায় নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার সুযোগ বের করা, কিছুতে  নিজের প্রতিযোগী অবস্থান ধরে রাখতে  নিজে লাভ ছাটাই করে প্রতিযোগিতায় নেমে যাওয়া ইত্যাদি এসব করে পেশা উদ্যোক্তাদের অনেকটাই বাঁচানো সম্ভব। আর সর্বোপরি চীনের সাথে একটা বড় বারগেন করা। যত বেশি পারা যায় (কৃষি বা শিল্পপণ্যের) বাজার ছাড় চীনের থেকে নিয়ে আসা, তেমন রাজনৈতিক নেগোসিয়েশন করার সুযোগ এখনো যা আছে তা ব্যবহার করা। এক কথায় চীনকে গ্লোবাল নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে নিজের পক্ষে বাজার ছাড় যতটা সম্ভব ফিরিয়ে হাতে আনা, ধরে রাখার জন্য দরকষাকষি করা – এই মূলনীতিতে চলা। বাইডেন সম্ভবত সে দিকেই যাচ্ছেন।  কিন্তু এমন অনুমানের ভিত্তি কী? কারণ হংকংভিত্তিক এশিয়ান টাইমসে এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে কুর্ট ক্যাম্পবেল [Kurt Campbell] এই নামের ওবামা আমলের এক সহকারি-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর [assistant secretary of state for East Asian and Pacific affairs] কথা বলা হয়েছে। যদিও তিনি ভুমিকা রাখবেন বাইডেন প্রশাসনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অফিসে, পররাষ্ট্র দফতরে নয়। আর সেটা বাইডেন যাকে  ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার বলে পছন্দ করেছেন সেই জ্যাক সুলেভান [Jake Sullivan] হলেন ক্যাম্পবেলের পলিসি পেপার লেখার সহ-লেখক। তাঁদের যৌথভাবে লেখা ও ফরেন এফেয়ার্সে প্রকাশিত তাঁদের সে লেখার শিরোনাম “Competition Without Catastrophe: How America Can Both Challenge and Coexist With China,” । অনুমান করা হচ্ছে এটাই হবে বাইডেনের চীন-নীতির প্রধান অভিমুখ। লেখার শিরোনামটা বাংলায় বললে তা হবে, কোন বিপর্যয় না ঘটিয়ে প্রতিযোগিতা করাঃ কি করে আমেরিকা চীনকে চ্যালেঞ্জও করবে আবার চীনের সাথে একসাথে টিকে থাকার নীতিতে চলতে পারে”।  এই কথাটাকেই উপরে বলেছিলাম, – “চীনকে গ্লোবাল নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে চীনের থেকে আপোষে নিজের পক্ষে বাজার ছাড় যতটা সম্ভব ফিরিয়ে হাতে আনা, ধরে রাখার জন্য দরকষাকষি করা – এই মূলনীতিতে চলা”।

    যদিও গত চার বছর ট্রাম্প এর উল্টো পথে চলেছেন। ট্রাম্প ও তার প্রমোটার ও অদৃশ্য উপদেষ্টারা ভেবেছেন, এগুলো হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের মত সংগঠন বা তাঁদের চিন্তা দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। আর কথিত আমেরিকান “জাতিকে” চীনের বিরুদ্ধে সংগঠিত করতে পারলেই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এছাড়া যদিও একথা সত্য যে, আমেরিকা এখনো সামরিকভাবে চীনের থেকে ৬-৮ গুণ বড় বা শ্রেষ্ঠ। কাজেই এদের অনুমান, এই কারণে আমেরিকা কেন চীনের কাছে হেরে যাবে বা হার স্বীকার করবে! কিন্তু এদের এমনই চিন্তার ত্রুটির দিকটা হল এরা মনে করে, চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে পাল্টা যেন আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব!

    গত ৮ জানুয়ারি রয়টার্স একটা ইন-ডেপথ নিউজ করেছে; যার শিরোনাম হল – ‘ট্রাম্পের ফ্যানরা সহিংসতার নিন্দা করে কিন্তু তাই বলে ট্রাম্প এজন্য দায়ী তা আবার মনে করে না [Trump’s fans condemn violence, but they aren’t about to blame him]।’ গত ৬ জানুয়ারি আমেরিকান সংসদে হামলার পর রয়টার্স দেখানোর চেষ্টা করেছে যে ট্রাম্পের ভোটার সমর্থক কারা? কেমন পেশার লোকজন আর সংসদে হামলা নিয়ে তাদের ক্ষোভ বা বক্তব্য কী? দেখিয়েছে, এরা ছোট শপে, রেস্টুরেন্টে বা সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি করে। তাদের দাবির সারকথা হিসেবে রয়টার্স বলছে, তারা কেউই এখনোও ট্রাম্পকে ত্যাগ করতে চায় না। বরং তাঁদের ধারণা ট্রাম্প হল তাদের আর্থিক অবস্থা-পরিস্থিতির পক্ষের প্রবক্তা, তুলে ধরার লোক। কিন্তু তাই বলে তারা সংসদে ভায়োলেন্স বা সহিংসতার দায় নিতে চায় না। ট্রাম্পের উপরেও দিতে চায় না। কারণ এতে আইন ভাঙ্গার দায় আছে। যা তাঁদের শ্রেণীর লোকেরা অবশ্যই জড়িত নয়। মূলত কর্মজীবি তারা ঐদিন সংসদে হামলা করতে  সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সাথে সঙ্গী হয় নাই।

    যদিও বলছি, গত চার বছর ট্রাম্প চলেছেন উল্টো বা ভুলনীতি নিয়ে। নিজের ক্ষ্যাপাটে নীতিতে। একটা উদাহরণ এখানে টানলে বাস্তবতাটা আরও স্পষ্ট বুঝা যাবে। যেমন ট্রাম্প এতদিন সাধারণভাবে আমেরিকায় উপস্থিত চীনা কোম্পানির উপর বা বিরুদ্ধে  খড়গহস্ত হওয়ার নীতিতে চলেছিলেন। চীনা কোম্পানিমাত্রই, বিশেষ করে টেলিফোন কিংবা ইলেকট্রনিকস সম্পর্কিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আমেরিকা থেকে তথ্য পাচার করছে অথবা এরা চীনা সামরিক বাহিনীর সাথে জড়িত ভাড়াটে অথবা বাহিনীর হয়ে তথ্য পাচার করছে, – ইত্যাদি এগুলাই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কমন অভিযোগ বা উছিলা। কিন্তু কোনোটার বেলাতেই তিনি কোনো প্রমাণ সাথে হাজির করেননি। নেহায়তই কখনো কোনো চীনা লোকের বিরুদ্ধে আদালতে যা ক্ষুদ্র বা পেটি মামলা দেয়া হয়েছে প্রপাগান্ডার সুবিধার জন্য, তাও বেশির ভাগই আদালতেও টিকাতে পারেননি। কিন্তু জাতিবাদী বা বিদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা যা ট্রাম্পের এক বিশেষ অস্ত্র যা সাদা সুপ্রিমিস্টদের জন্য খোরাক ও ভুয়া সুসংবাদ – এসব ঠিকই এই পেটি অভিযোগগুলো ব্যবহার করে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেয়া হয়েছে। যেমন টিকটক সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়েও একইভাবে তিলকে তাল বানানো হয়েছে; অতথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। আবার যতই আমেরিকা গত নভেম্বরের নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছিল, সেখানে ভোট পেতে পাবলিককে প্রভাবিত করতে ততই তিনি এসব প্রপাগান্ডা চরমে তুলছিলেন। এতে শেষের দিকে তিনি আরেক নতুন নীতি হাজির করলেন। যেমন – চীনা টেক জায়েন্ট কোম্পানি – টাইটানস [Titans], আলিবাবা [Alibaba], টেনসেন্ট [Tencent], বাইদু [Baidu] ছাড়াও আরো ৯ বড় জায়ান্ট চীনা কোম্পানির নামের একটা লিস্টর বানিয়ে ট্রাম্প এবার দাবি করলেন, এগুলো চীনা সেনাবাহিনীর সাথে জড়িত কোম্পানি। এরপর সরকারি নির্দেশ জারি করলেন যে, এসব কোম্পানির সাথে আমেরিকানরা বিনিয়োগ-ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখতে পারবে না।

    কোনো দেশ গ্লোবাল পাওয়ার হতে গেলে বা গ্লোবাল পাওয়ারের লক্ষণ হিসেবে কী থাকতে হবে এই প্রশ্নের জবাবে দুনিয়াতে মানা হয় যে ঐ দেশটা হাইটেকে কত এগিয়ে আছে, কত তার দখল এবং সর্বোপরি হাইটেকে তার মোট বিনিয়োগ কী পরিমাণ ইত্যাদি এগুলোই হল সেই বিচারের লক্ষণ।
    সম্প্রতি হংকংভিত্তিক এশিয়ান টাইমস এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীনের টেক কোম্পানি টাইটান নিয়ে। লিখেছে “ট্রাম্প চায়না টেক জায়েন্ট কোম্পানি টাইটানস-কে সাদা পতাকা দেখিয়েছে” [Trump waves white flag at China’s tech titans]।’ এখন কেন? অথচ নভেম্বর নির্বাচনের আগের ট্রাম্পের প্রপাগান্ডায় তো মনে হচ্ছিল এই তথ্য পাচার বা বিদেশি সেনা প্রসঙ্গ [যেটা জাতিবাদি রাজনীতিতে কথিত দেশপ্রেমি পাবলিককে ক্ষেপিয়ে তুলার খুবই সহজ অস্ত্র মানা হয়] তুলে তারা না চীনের সাথে যুদ্ধি না বাধিয়ে দেয়! তাহলে এখন কেন ট্রাম্প সুর বদলিয়ে নিচ্ছেন? গত নভেম্বরেরই তো নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নির্বাহী নির্দেশ জারি করেছিলেন চীনা টেক কোম্পানির বিরুদ্ধে। অথচ আজ এর উল্টো করছেন। কেন?

    কারণ ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তের পর ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্সের মতো আরো গ্লোবাল মিডিয়া এ সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। ওয়ালস্ট্রিট কী লিখেছিল তা এখানে জানা যাচ্ছে ।  আলিবাবা বাইদু নিউ ইয়র্কে রেজিস্টার্ড কোম্পানি, টেনসেন্ট হংকংভিত্তিক। এই তিন কোম্পানির মোট বিনিয়োগ হলো ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা অস্ট্রেলিয়ার ইকোনমির চেয়েও বড়। ট্রাম্পের কী সে খবর আছে?
    অর্থাৎ আসলে ওরা বলতে চেয়েছে, আমেরিকার পক্ষে এমন পাল্টা ট্রিলিয়ন ডলারের টেক কোম্পানি জন্ম দেয়ার সক্ষমতার দিন পেরিয়ে গেছে। কাজেই ওসব কোম্পানির সাথে আমেরিকার ব্যবসায়িক সম্পর্কও যদি ভেঙে দেয়া হয়, তবে আমেরিকা ততই আরো এই টেকনোলজিতে “কেউ না” হয়ে যাবে। যেমন এদিকে মোবাইল ফোনের ৫জি টেকনোলজিতে চীন এরই মধ্যে লিড নিয়ে ফেলেছে। আর আমেরিকাই কেউ না হয়ে গেছে।  যেখানে আমেরিকা কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে চলতি শতকের শুরু থেকেই ফোন টেকনোলজি থেকে ছিটকে পড়ে আমেরিকা  ‘কেউ না’ হয় গেছে। আর ইউরোপ কেবল কোন মতে ৫জিতে ছোট তরফের কোম্পানি হয়ে আছে।

    সারকথায় কোন গ্লোবাল নেতার মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা ঢলে পড়লে  তখন থেকে আর এর সবাইকে শাসানো কিংবা ডমিনেট করার ক্ষমতা কোথাও থেকে যোগাড় করতে পারে না। সাধারণভাবে আমেরিকা ও বিশেষ করে ট্রাম্পের আমেরিকা এখন এমন লুজার হয়ে গেছে।  তাই এই অবস্থায় ট্রাম্পের মত জাতিবাদী নেতারা  তখন আর আমেরিকা ফার্স্ট বা জাতিবাদী স্লোগান বা সাদা সুপ্রিমিস্ট জজবা তুলে কিছুই ঠেকাতে পারবে না। চেয়ে চেয়ে কেবল নিজের হার আর দুর্দশাই দেখার দিকেই এরা ক্রমশঃ যাচ্ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৬ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ট্রাম্পের শত্রু কে, চীন না বাইডেন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    গৌতম দাস

     ১১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬,  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3kW

     

    TRUMP’s MENTAL STAGE

    আপনি যখন অন্যকে শারীরিকভাবে কষ্ট দিয়ে সুখ অনুভব করবেন তখন বুঝতে হবে আপনি মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে প্রবেশ করে ফেলেছেন। উপরের চারটা ছবির মধ্যে কম-বেশি সেসবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে প্রথমটায়। কারণ এই অসুস্থতার সাথে মুখভঙ্গি বদলের সম্পর্ক আছে। ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা নিয়ে আমেরিকায় বিশেষত সাইকিয়াট্রিস্ট মহলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকেই বিস্তর আলোচনা হয়ে এসেছে। এমন সাইক্যাট্রিক রিপোর্ট ও এমন আলোচনার অজস্র রিপোর্ট ওয়েব সাইট পাওয়া যাবে।
    এদিকে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা প্রবলভাবে ঢলে পড়ছে, প্রভাব হারাচ্ছে আর তা নিয়ে অজস্র রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে।  বিশেষ করে ট্রাম্পের আমলে সাথে চলতি করোনাকালে এই ভাইরাসের প্রভাব প্রতিক্রিয়া ম্যানেজমেন্ট ও মোকারিলা প্রশ্নে ট্রাম্পের আমেরিকা পরাজিত হয়েছে বলা যায়। জনসংখ্যার  ৬.৬% আক্রান্ত হয়েছে যা হয়ত তুলনায় খুব বেশি নয় কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ (৩.৭২ লাখ) ছুঁয়ে ফেলার দিকে যেটা ট্রাম্পের পারফরমেন্সের দশা মাপার ক্ষেত্রে এক বড় ইন্ডিকেটর।  আর ঠিক এক দিকটাকে স্টাডির মধ্যে নিয়ে একটা স্টাডি রিপোর্ট বলছে অর্থনীতিতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের এক নম্বরে যাওয়ার কথা যেটা আগে বলা হয়েছিল যে এটা ২০৩৫ সালের দিকে ঘটবে সেটা এখন বলা হচ্ছে কোভিড মোকাবিলায় লড়াইয়ে ট্রাম্প আমেরিকাকে হারিয়ে পিছনে ফেলে দিবার কারণে সেটা এখন ২০২৮ সালের মধ্যে ঘটে যাবে।
    এসবেরই প্রভাবে এখন ১২.৮ মিলিয়ন (১.২৮ কোটি) বেকারের ট্রাম্পের আমেরিকায় অর্থনৈতিক সংকটের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট্রদের প্রভাব। অর্থাৎ সাদা মানুষেরাই শ্রেষ্ট, আমেরিকা হল মূলত সাদাদের, এখানে অন্যান্য কালারের মানুষেরা এসে সাদা মানুষদের দুঃখ দুর্দশা সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সাদাদের  শ্রেষ্ঠত্ব ‘রি-ক্লেম’ করে ফেরত নিতে হবে। যার আসল মানে হল সাদা সুপ্রিমিস্টদের চরম উগ্র বর্ণবাদী হতে হবে। চারবছর আগে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান আসলে ছিল এই সাদাবাদীদেরই রাজনৈতিক উত্থানের প্রথম বড় প্রকাশ। আর এই সাদা রাজনীতির পাবলিক ফিগার স্টিভ ব্যানন  (Stephen K. Bannon), তাঁকে ট্রাম্পের ‘হোয়াইট হাউজের চীফ স্ট্রাটেজিস্ট’ হিসাবে  নিয়োগ দেয়া ছিল ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। কিন্তু এই রাজনীতির একটা লিগাল সমস্যা আছে। আমেরিকার কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের পক্ষে প্রচারক [preach] হলে তাঁর এর বিরুদ্ধে মামলা খাবার বা ইমপিচ হবার সম্ভাবনা আছে। তাই ট্রাম্প একটা দুরত্ব রেখে এদের সমর্থন করে থাকে। ব্যাননকেও এক পর্যায়ে উপদেষ্টা পদ থেকে খারিজ করে দেন তিনি।  কিন্তু এবার ০৬ জানুয়ারি ২০২১-তে?

    এদিকে অবশেষে জানা গেল প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন ও তার ক্যাম্পের সমর্থকেরা আমাদের জানাচ্ছেন, আমেরিকায় টেরোরিস্ট কারা! কথিত ট্রাম্প সমর্থক যারা ক্যাপিটোল হিলের আমেরিকান কংগ্রেসের ভিতরে প্রবেশ করে ৬ জানুয়ারি তান্ডব ভাঙচুর চালাতে ঢুকেছিল বাইডেন নিজমুখে বলছেন, তারা ‘টেরোরিস্ট’। কিন্তু এতেও পরিস্কার হয়নাই বা লুকিয়ে ফেলা হয়েছে  এঁদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়ের দিক।  তবে আটই জানুয়ারির পর থেকে মিডিয়ায়  প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়ে গেছে এদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়। অর্থাৎ বাইডেনের বা অনেক আমেরিকান “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” যারা সংসদে হামলাকারিদেরকে “টেররিস্ট” বলে নামকরণ করছেন এরা আসলে হামলাকারিদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই মূল পরিচয়, এই মারাত্মক রেসিজম ও ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় – এসবই আড়াল করে রেখেছিলেন, গুরুত্ব দেন নাই। সেসবগুলো এখন প্রকাশ্যে সামনে এসে গেছে।  এদিকে  ফেসবুক ও টুইটার কর্তৃপক্ষ এখন প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে এদের সচিত্র ততপরতা, কী কী গ্রুপের সদস্য হয়ে তারা ঐদিন দলবদ্ধ হয়ে ততপর ছিল এর বিবরণ দিয়েছে। আর সেই সাথে ওসব সোশাল মিডিয়া বলছে তারা ট্রাম্পের একাউন্ট চিরদিনের মত মুছে দিয়েছে। যেখানে মূল অভিযোগ তারা জানিয়েছে ট্রাম্প ও তার এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী সমর্থকেরা ফেসবুক ও টুইটার প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে মানুষ হত্যা ও ঘৃণা-হিংসা ছড়ানোর কাজে নেমে গেছিল।

    সবশেষে পরিস্থিতি এখন পুরাটাই  বাইডেনের পক্ষে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরাটাই আমেরিকার সংসদের (কংগ্রেসের উভয়কক্ষের) হাতে চলে গিয়েছে। এটা ট্রাম্পের জন্য আরও বিপদজনক হয়ে উঠেছে কারণ ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকানদের বড় অংশটাই এখন কোন্টাকির সিনেটর ম্যাক-কনেলের [Mitchell McConnell ] নেতৃত্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এবং  তিনি তার গ্রুপ নিয়ে সম্ভবত  আগামি সোমবারে ডেমোক্রাটদের আনা ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের (অনাস্থা ও অযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা) প্রস্তাব যেটা তুলতে যাচ্ছে তা সমর্থন করে বসতে পারেন।

    বিপদজনক দেউলিয়া ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পঃ
    যেকোনো ব্যবসামাত্রই তাতে উত্থান-পতন আছে, থাকবে। এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমনকি এই সূত্রে কারও ব্যবসা ফেল করাতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু তাই বলে দেউলিয়া হলেই ঐ ব্যবসায়ীর মানসিক রোগ বা অস্থিরতাও দেখা দিবেই তা কিন্তু নয় যদিও কারো বেলায় এটা হতেও পারে। আবার তেমন কিছু নাও হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা কিছু হয়েছে কিনা চেক করার দরকার আছে। দেউলিয়া [Bankrupt]  হলে ঐ ব্যবসায়ী সাথে আবার কোন মানসিক রোগগ্রস্ত হয়েছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। নইলে কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট নিজেই সংসদে হামলার জন্য দাঙ্গাবাজ রেসিস্টদের এনে উক্সানি দিতে পারে?  আমেরিকান কংগ্রেসে তা হামলাভাঙচুর পর্যন্ত ঘটাতে পারে, কিছু লোক বেঘোরে মারা পড়তে পারে!  তাই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করার সময় বয়ে যাচ্ছে, যদিও এই আওয়াজ আগেও উঠেছিল।
    সেই ২০১৬ সালে প্রার্থী হওয়ার আগেই, ট্রাম্পের মানসিক স্থিতি চেক করে নেয়া দরকার ছিল, সেটা আজ স্পিকারসহ আমেরিকা রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হাড়ে হাড়ে বুঝছেন।  ট্রাম্পের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে কোন কোন অনুসন্ধানী ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট মতে, ওয়াশিংটন পোস্ট জানাচ্ছে,  ট্রাম্প ১১ বার নিজেকে দেউলিয়া ব্যবসা কোম্পানি হিসেবে রেজিস্টার্ড হয়েছিলেন।

    কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘দেউলিয়া’ হওয়া মানে কীঃ
    কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজেকে ‘দেউলিয়া’ ঘোষণা করিয়ে নেয়া মানে কী? আমেরিকান বিজনেস ল’ অনুসারে কোম্পানির মালিকেরা নিজেরাই নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করাতে পারেন, তবে আদালতের মাধ্যমে। সাধারণত এটা কোম্পানি মালিক ও ম্যানেজমেন্টের ঘোষিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘটে থাকে। অনেকের মনে হতে পারে, মালিক নিজেই কেন ঘোষণা করবেন, নিজেকে কি কেউ পাগল বলেন বা বলবেন?
    হ্যাঁ বলবেন, ও বলে থাকতে পারেন। কারণ, নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়ার জন্য আদালতে ঐ কোম্পানিকেই আবেদন করতে হয় আর তাতে আদালতের অনুমোদন পেতে হয়। কিন্তু কখন ও কেন? যখন সাধারণত দেখা যায় কোনো কোম্পানির আয় ও অর্জিত সম্পদের মোট মূল্যের চেয়ে ওই কোম্পানিকেই পরিশোধ করতে হবে, সম্ভাব্য এমন দায়-দেনার পরিমাণ ছাড়িয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।
    কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হয় বা হতে পারে? সাধারণত দেখা যায় কোম্পানিটা ধরা যাক সেটা ওষুধের মত পণ্য উৎপাদনকারী এবং বাজারে খুবই সুনাম-ওয়ালা কোম্পানি। কিন্তু ওর যেকোন একটা পপুলার ওষুধ-পণ্যের গুণে ত্রুটি ধরা পড়েছে যা উৎপাদনকালীন বা মুল ফর্মুলাতেই মারাত্মক ত্রুটিজনিত এক ভুল। আর তাতে হয়ত ঐ ওষুধ ব্যবহার করে কয়েক লাখ লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে বা অঙ্গ হারিয়েছে অথবা এদের মধ্যে প্রায় শ’খানেক লোক মারাও গেছেন। এমন হলে ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা করা শুরু করেছে হয়ত। হয়ত দু-একটা মামলার অবস্থা থেকে বোঝাও যাচ্ছে, এসব মামলায় কোম্পানির বিরুদ্ধে আদালতে শাস্তির রায় হয়েই যাবে আর শাস্তির পরিমাণও অনেক বড়, হয়ত মাথাপিছু কয়েক কোটি টাকার উপরে দিতে হবে একেকজন ভুক্তভোগীকে।
    এই পরিস্থিতিতে তখন ঐ কোম্পানি নিজ ক্ষতি ও দায় কমাতে বা বেঁচে যেতে আদালতে নিজ উদ্যোগেই আবেদন করে যে, তার কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়া হোক। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সব ভুক্তভোগীর সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ দিতে গেলে এর দায় কোম্পানি অ্যাসেট বা মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। এখন এতে আদালত ঠিক কী করবেন? আদালত এই আবেদনে সন্তুষ্টি থাকলে এবার আদালত কোনো এসেট নির্ণয় ও মূল্যায়ন কোম্পানিকে ঐ ওষুধ কোম্পানির খরচে নিয়োগ দিয়ে ঐ দাবির যথার্থতা যাচাই করবেন। যদি ওই নির্ণয় কোম্পানির রিপোর্টও মালিকদের আবেদনের সাথে মিলে যায় তখন সাধারণত আদালত রায় দেন যে, পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানির যতটুকু সম্পদ বর্তমানে আছে সেই অনুপাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের অর্থ কম করে দিয়ে যেন সব দায় মিটিয়ে দেইয়া হয়। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ দানের ব্যাপারটা অসীম না থাকতে দিয়ে সম্পদ যা আছে সে অনুসারি সীমিত বা আনুপাতিক করে দেয়া হয় এতে। এরপর আদালত ঐ ক্ষতিপূরণ ভাগ করে দেয়া সাপেক্ষে ঐ ওষুধ কোম্পানিকে দেউলিয়া  ও দায় পরিশোধের পরে বিলুপ্ত ঘোষণা করে দিতে পারে। তাই সারকথায় কোন কোম্পানি তার বিভিন্ন ধরনের পাওনাদারদের দাবি যদি মেটাতে ব্যর্থ হয়, সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে সে নিজেকে আদালতের কাছে দেউলিয়া প্রমাণ করিয়ে আদালতের মুখ দিয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়, যাতে পাওনাদার থেকে বেঁচে যাওয়া যায়।
    ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত হাউজিং ডেভেলপমেন্টের ব্যবসায়ী। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ২০১৬ সালের এক ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট বলছে, তিনি কমপক্ষে ১১ বার এমন দেউলিয়া ঘোষণা করিয়েছেন নিজেকে।
    এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো কোম্পানির মূল মালিকের বহু স্বপ্নের বাস্তবতা হয়ে থাকে তাঁর নিজের ঐ কোম্পানি। ফলে কোম্পানিকে বাজারে দেউলিয়া হয়ে যেতে দেখলে সেটা কারো কারো বেলায় এক মানসিক আঘাত হয়ে হাজির হতেও পারে। একারণে দেখা যায়, মালিক আর নুন্যতম স্বাভাবিক মানুষ নাই, মানসিক বিকারগ্রস্থ ব্যক্তি হয়ে গেছেন। এতে হয়ত দেখা যায় সামাজিক সাধারণ মূল্যবোধ দ্বারা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বা সামাজিক দায়বোধ বা জবাবদিহিতা ইতাদির প্রতি আর তাঁর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। আসলে সম্ভাব্য এমনই মানসিক অসুস্থতায় পৌঁছেছেন ট্রাম্প। এদের মনোবিকার হয় এমন যে এখন তো তার কোম্পানিটাই আর নাই। কাজেই তিনি আর এখন সমাজের মুল্যবোধ মেনে কী করবেন?  ফলে সবকিছুই মিথ্যা এমন হতাশা ও নৈরাশ্যের জগতে চলে যান তিনি। এর ফলে ঐ অবস্থায় নিজেকে সুস্থভাবে পরিচালিত করার মত অবস্থায় ঐ মালিক আর থাকেন না। এই  অস্বাভাবিকতা যেকোনো মাত্রার মানসিক স্থিতিশীলতা, অস্থিরতা হয়ে হাজির হতে পারে।
    এখন এমন অবস্থায় আরও বাড়তি দিকটা হল,  মানসিক-অসুস্থ মানুষ নিজের সমাজ, পরিবারে থাকলে সেটা এক জিনিস; কিন্তু যদি রাষ্ট্রীয়-সরকারি পদ, তিনি প্রধান নির্বাহী, প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন? সেটা অবশ্যই মারাত্মক। কারণ সেটা তো সারা দেশের মানুষের প্রতিদিনের স্বার্থের ব্যাপার। তাই নির্বাহী পদে নমিনেশন পেপার পেশ করার আগেই শর্ত হিসেবে তার মানসিক স্থিরতা (মেডিক্যাল স্টান্ডার্ড মতে) পরীক্ষা করে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনা মানে, সম্ভবত শত কোটি নাগরিক ভাগ্য নিয়ে যাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন দেউলিয়া ব্যবসায়ীর মানসিক অস্থিরতার রিস্ক ঐ দেশের জনগণ নিতে পারে না।
    ঠিক এই অবস্থাটা আজ আমেরিকান পাবলিক অনুধাবন করছে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল গত ৬ জানুয়ারি?

    WASHINGTON, DC – JANUARY 06: Thousands of Donald Trump supporters storm the United States Capitol building following a “Stop the Steal” rally on January 06, 2021 in Washington, DC. The protesters stormed the historic building, breaking windows and clashing with police. Trump supporters had gathered in the nation’s capital today to protest the ratification of President-elect Joe Biden’s Electoral College victory over President Trump in the 2020 election. (Photo by Spencer Platt/Getty Images)

    কী ছিল গত ৬ জানুয়ারি?
    আমেরিকার কনস্টিটিউশনের বহু কিছু দু’রকম মানে হয়ে যেতে পারে এমন বাক্য যতটা সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে রচনা করার উপর জোর দিয়ে রচিত হয়েছে। যেমন নির্বাচন কবে হবে, সেটাও বলা থাকে ওমুক বছরের ওমুক মাসের প্রথম মঙ্গলবারে – এভাবে। অর্থাৎ সব কিছুই আগাম ও ফিক্সড। রাষ্ট্রের কোন নির্বাহির বিবেচনা মতে নির্বাচনের দিন ঠিক করার সুযোগ রাখাই হয় নাই।  সবার বিবেচনাবোধ এক বা সমান হয়না; মানুষে মানুষের মধ্যে এনিয়ে ফারাক হতে পারে; তাই কথা এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে তা  হওয়ার সুযোগই রাখা হয়নি। এভাবেই গত বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ৩ নভেম্বর আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে  আবার নির্বাচনের পরে কত দিনের মধ্যে রাজ্যগুলোর ফলাফল তারা কে কোথায় পৌঁছে দেবেন তাও বলে রাখা আছে। এই পদ্ধতিতে এবং আনুষ্ঠনিকতার দিক থেকে এক গুরুত্বের দিন হল ৬ জানুয়ারি। কারণ, ঐদিন আমেরিকার দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেস বা সংসদের উভয়কক্ষ এক যৌথ অধিবেশনে মিলিত হবে। আমেরিকায় আমাদের সংসদের মত আছে ‘প্রতিনিধি পরিষদ’ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং আরেক দ্বিতীয় কক্ষ আছে ‘সিনেট’। ঐদিন এরা উভয়েই ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিল জেলায় অবস্থিত প্রতিনিধি পরিষদের নির্ধারিত হলঘরে একসাথে অধিবেশনে বসবেন। আর ঐ যৌথ সভায় সভাপতিত্ব করবেন রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার পাশে বসবেন হাউজ স্পিকার। এই হিসাব মতে,  ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ৬ জানুয়ারি সভাপতির আসন নিয়েছিলেন। আর সাথে পাশে বসেছিলেন পরপর চারবারের ও এবারেরও স্পিকার (ডেমোক্র্যাট) ন্যান্সি পেলোসি [Nancy Pelosi ]।
    ওদিকে নির্বাচনের ফলাফল কিভাবে চূড়ান্ত হবে কে করবেন, আর তাতে বিতর্ক বা আপত্তি থাকলে তা কী করে নিষ্পত্তি হবে এরও সবই আগাম বলে দেয়া আছে। প্রত্যেক রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের কাজ ও পরিচালনা সেখানেই শেষ করা হয়। কারণ কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বা অফিস আমেরিকায় রাখা হয়নি। তাই ৫০ রাজ্যের আমেরিকার প্রত্যেক রাজ্যে একজন সেক্রেটারি থাকেন যিনি ঐ স্টেটের (সরকারের নয়) ‘সেক্রেটারি অব স্টেট’; আর যার প্রধান কাজ হল তিনি প্রধান নির্বাচন অফিশিয়াল এবং এটা নির্বাচিত একটা পদ; তিনিই ভোটের ফলাফল চূড়ান্ত করেন, কারও আপত্তি থাকলে তাও নিষ্পত্তি করেন। আপত্তিকারী এতে সন্তুষ্ট না হলে তিনি স্থানীয় জেলা জজ থেকে শুরু করে ফেডারেল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারেন। আর এরপরে সেই চুড়ান্ত ফলাফল তিনি ঐ যৌথ অধিবেশন কক্ষের সভাপতির (রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট) অফিসে পৌছানোর ব্যবস্থা করেন।

    ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনের আগে থেকে ‘বড় পাগলামোতেই’ আছেন। একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এটা কোন ভাল পরিচায়ক নয় অবশ্যই। তিনি নির্বাচনের ফলাফল নিজের বিপক্ষে হলে মেনে নেবেন না, ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না, ইত্যাদি নানাকথা আউড়ে চলেছিলেন নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই। এদিকে বাস্তবে ৩ নভেম্বরের দু’দিন পর থেকেই পরিষ্কার হতে থাকে নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাচ্ছেন। আর ততই ট্রাম্পের পালটা পরিকল্পনার কথাগুলো কানাঘুষা প্রচার হতে থাকে। সবখানেই ট্রাম্প বা তার পক্ষের এজেন্টদের কমন অভিযোগ ছিল – তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। এরই একপর্যায়ে দেখা যায় এসব ফলাফল বিতর্কগুলো সাথে কোন প্রমাণ না দিয়েই তাঁরা কেবল অভিযোগ মাত্র করে গিয়েছেন। তাই সে মামলাগুলো জেলা জজের আদালতেই শেষ হয়ে যায়, মামলা ডিসমিস। ফলে প্রমাণ অভাবে কোন অভিযোগ কখনোই কোন জেলা জজের আদালতে উপরে যেতে পারেনি। কারণ সবখানেই ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল – তাকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। অথচ মূলকথা, সব আদালতেই যা হাজির ছিল না তা হল, সাথে পেশ করা তথ্য প্রমাণ। অন্তত মামলা শুরু করার মত কিছু ন্যূনতম প্রমাণও ছিল না। ফলে  প্রায় সব আদালতই ন্যূনতম প্রমাণ দেখাতে না পারার কারণে মামলা ডিসমিস করে দিয়েছে। শেষে এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই মিডিয়াতে নিজেই স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন যে, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তার মামলাগুলো দায়ের করা বা পৌঁছানোর মত অবস্থায় তিনি নাই বা মেরিট এগুলোর নেই। কিন্তু এরপরেও সবসময় তিনি শেষ কথা হিসেবে মুখস্তের মত বলে চলেন যে, তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে।

    তাই এসবের বিপরীতে, ট্রাম্পের এক বড় পরিকল্পনার দিন ছিল গত ৬ জানুয়ারি। কিন্তু ৬ জানুয়ারি আমেরিকার নির্বাচনি ফলাফলের দিক থেকে অবশ্যই একটি আনুষ্ঠানিকতার পর্ব কেবল। বিশেষ করে, আমেরিকায় কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন রাখা হয়নি বলে এর বিকল্প কিছু বলে যেন রাজ্য পর্যায়ে চূড়ান্ত ফলাফলগুলোর যোগফল চূড়ান্তভাবে কে ঘোষণা করবেন এরই এক আনুষ্ঠানিকতার দিন কংগ্রেসে ঐ যৌথ অধিবেশন এটা। তাই পরিষ্কার করেই কনষ্টিটিউশনে  বলা আছে যে, যৌথসভার সভাপতি ভাইস প্রেসিডেন্টের ঐদিনের কাজ কী কী। মূলত তা দুটো। রাজ্যের পাঠানো ফলাফলের বাক্স যা তার অফিসে পাঠানো হয়েছিল তা উন্মোচন করা এবং তা গণনার জন্য নির্ধারিত স্টাফদের নির্দেশ দেয়া; আর তা হবে যৌথসভার (সংসদ ও সিনেটের) সদস্যদের সম্মুখে। সেখানে ভোট গণনার কাজ শেষ হলে উপস্থিত যৌথ সদস্যদের প্রস্তাব-ভোটে চূড়ান্ত ফলাফল যা সেখানে পাওয়া যাবে তা ঘোষণা করা হবে।

    ট্রাম্পের কনষ্টিটিউশন পাঠঃ
    এখন ট্রাম্পের বা তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য উপদেষ্টাদের দেখা যায়, উটকো কিছু ব্যাখ্যা তারা হাজির করে গেছে। আর দেউলিয়া ব্যবসায়ী মনের ট্রাম্প নিজে বুদ্ধি বলে তাঁর উপদেষ্টাদের এসব আজগুবি পাঠ বিশ্বাস করেছিলেন।  যেমন ট্রাম্প তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে সুনির্দিষ্ট কিছু করণীয় ও নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা তিনি প্রকাশ্যেও বলেছেন।
    এখন কথা হল, ট্রাম্প কি যা তার খুশি তা করতে পেন্সকে নির্দেশ দিতে পারেন? নাকি যা যা করার এখতিয়ার পেন্সকে কনস্টিটিউশন দিয়েছে কেবল সেগুলোর মধ্যে থাকা সাপেক্ষে নির্দেশই দিতে পারেন? এখানে ট্রাম্পের ধারণা তিনি যেকোন কিছু নির্দেশ দিতে পারেন। অথচ তা তিনি পারেনই না। তবু তিনি পেন্সকে (নির্দেশ) বলেছিলেন, তিনি যেন যোগফল পাওয়ার পর ঘোষণা করেন, এই ফলাফল তিনি মানছেন না বা অনুমোদন করছেন না। কিন্তু কার্যত সময়ে দেখা গেল মাইক পেন্স ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে বসেছেন। অধিবেশন শুরুর আগে তিনি এক বিবৃতি পাঠ করেন।

    “It is my considered judgment that my oath to support and defend the Constitution constrains me from claiming unilateral authority to determine which electoral votes should be counted and which should not,” Pence said in a letter to Congress.  বাংলা করে বললে, “আমার বিচার বিবেচনায়, আমার শপথের সময় দেয়া কনষ্টিটিউশন রক্ষা ও সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোন ইলেকটোরাল কাউন্ট হবে কোনটা হবে না এই সিদ্ধান্ত নিবার একক কোন কর্তৃত্ব আমাকে দেয় নাই”।

    অর্থাৎ তিনি ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে কাজ করতে পারছেন না, এটাই তিনি জানিয়ে দেন।  আর এখান থেকে শুরু হয় ট্রাম্প-পেন্স এর ডিপারেচার।  অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, মানসিক অসুস্থতা কেবল ট্রাম্পের, এখনো তার ভাইস প্রেসিডেন্টকে এটা তেমন স্পর্শ করেনি। তাই যৌথ অধিবেশন শুরুর মুহূর্তে পেন্স এক লিখিত ঘোষণায় জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের অনুরোধ রাখতে পারছেন না। কেবল কনস্টিটিউশন যা তাকে করার এখতিয়ার দিয়েছে এর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এবার হতাশ হয়ে এক টুইট করেছিলেন, “পেন্স সাহসী নন। তার সাহসের অভাব আছে, তাই তিনি পারলেন না” [“didn’t have the courage to do what should have been done.”]। অথচ ফলাফল নিয়ে আপত্তি তুলবার জায়গা তো ঐ অধিবেশনই নয়। সেটার জায়গা যার যার রাজ্য নির্বাচন অফিসে বা আদালতে।
    ইতোমধ্যে ঐ অধিবেশকে নিয়ে অনেক নাটকীয়তা করা হয়। সবশেষে ওই যৌথসভা থেকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করে বলা হয়, বাইডেন বিজয়ী বলে তারা ‘সার্টিফাই’ করছেন [Biden’s election victory certified after chaos at US Capitol leaves four people dead]। তবে এর আগে অনেক নাটকীয়তা হয়েছে। ট্রাম্প তার সমর্থকদের দিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামার ব্যবস্থা করেছিলেন সংসদের ভেতরে মূল হলসহ বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে ভাঙচুর করা হয়েছিল। (যদিও পরে পুলিশ জানাচ্ছে যে তারা হামলাকারিদের দখলে থাকা অস্ত্র ও বোমার এক বিরাট মজুদ আটক করেছে। ) অবশ্য এর আগেই পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডরা সব নির্বাচিত সদস্যকে প্রত্যেকের মুখে একেবারে গ্যাস মাস্ক পরিয়ে সংসদ বিল্ডিংয়ের ভেতরেই গোপন কুঠিতে তাদের নিরাপদ গোপন স্থানে রেখে এসেছিলেন। এদের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ট্রাম্প অসুস্থ বা তেমন কিছু হলেই তঁকেই  প্রেসিডেন্ট পদে বসতে হতে পারে, তাই প্রেসিডেন্টের মাপের এই নিরাপত্তা অবস্থা। এছাড়া ঐ সংসদকেই কার্যত আমেরিকান রাষ্ট্রের অন্যতম বাস্তব রাষ্ট্ররূপ মনে করা হয়। তাই মূলত পুলিশের আধিপত্যেই ওই দিনটা দাঙ্গাহাঙ্গামাকারিদেরসহ সংসদে সবার কেটেছে। পুলিশ আধিপত্য করে গেছে দাঙ্গাবাজদের পরাস্ত ও নিয়ন্ত্রণ করেছে।

    তবে মিডিয়াসহ ট্রাম্পের মধ্যে যে ধারণাটা কাজ করতে দেখা গেছে তা হল,  যেন ঐ যৌথ অধিবেশন চাইলেই তাঁদের ভোটাভুটিতেই বা অধিবেশনের সভাপতি পেন্স চাইলেই যাখুশি ফলাফল যেমন ইচ্ছা ঘোষণা করতে পারেন। এরা একটা এমন আশা নিয়ে বসে থেকেছেন, রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু বটমঅব দা  ফ্যাক্টস হল, একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাবলিক সেখানে সরাসরি ভোট দেয়ার পর সেই ফলাফলের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু ঘোষণা করার ক্ষমতা কি পরে ঐ যৌথ অধিবেশনের কারো থাকতে পারে? কনস্টিটিউশন কি এমন এখতিয়ার পেন্স বা ওই হাউজকে চাইলেও দিতে পারে? এর সোজা জবাব হল, দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশনই এটা পারেই না। এমনকি আমেরিকান কনস্টিটিউশন না পড়েই বলা যায়, এটা তাঁদের কনস্টিটিউশনেও থাকতে পারে না। কারণ সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে জনগণের ম্যান্ডেটের বিরোধিতা; ওই ম্যান্ডেটকে উল্টে দিতে পারে কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টিকে এমন এখতিয়ার কনস্টিটিউশন দিতেই পারে না।  পাবলিকের দেয়া ভোট-ম্যান্ডেট এটা সুপ্রীম নাকি ঐ যৌথ অধিবেশন বা ওর সদস্যরা? অবশ্যই পাবলিকের ম্যান্ডেটই চুড়ান্ত। কারণ পাবলিকের ভোটের এই ম্যান্ডেট সুপ্রিম, এর ওপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দেয়া যায়, কারেক্ট করা যায় এমন বিন্ধুমাত্র ক্ষমতা ঐ যৌথ অধিবেশনকে বা কাউকেই দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশন দিতেই পারে না। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দিবার ক্ষমতা হিসাবে মাইক পেন্স কেউ না? উনি নাথিং! তিনি কেউ নন, তিনি এমন এক্তিয়ার বিহীনও।

    এখন আবার ফিরেএকটা সামআপ হিসাবে বলা যায়, আসলে আমেরিকার এই সমস্যাটা কি ব্যক্তি- ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা-জাত? না তা অবশ্যই নয়। সমস্যাটা মূলত রাজনৈতিক। অর্থাৎ পলিটিকো-অর্থনৈতিক। আর সেটা জাগিয়ে তুলেছে চীনের অর্থনৈতিক  উত্থান, এই অবজেকটিভ ফেনোমেনা। চীন নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক  হবু নেতা হতে চলেছে, আমেরিকাকে সরিয়ে। ফলে এর আঘাতে আমেরিকান সমাজ-রাজনীতি টালমাটাল হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডামাথায় এর প্রতি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেরাই এলোমেলো বিভক্ত হয়ে পড়ছে মূলত ভুল অনুমান, ভুল পাঠ এর কারণে। তবে অর্থনৈতিক সঙ্কট সবসময়ই এরকম হাজারো রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরিও করে থাকে। একমাত্র পোক্ত নেতৃত্ব এটা মোকাবিলা করতে পারে। কারণ, যা হবেই তাকে যতটা কমক্ষতিতে পারে এভাবে স্বাগত জানিয়ে এই রূপান্তরকে কম অস্থিরতায় পার করে দিতে পারে – এটাই হতে হবে তাঁদের মূলসুত্র।

    ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টঃ
    এখন আগামি সোমবার থেকে নতুন ইস্যু ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট। ডেমোক্রাটেরা এই প্রস্তাব তুলতে যাচ্ছে।  অনেকে আশা করছেন এখানে বিভক্ত রিপাবলিকানদের অনেকে তাকে সাপোর্ট করবে। এটা কিছু একটা ফলাফল আসবে হয়ত তা খুব তাতপর্যপুর্ণ কিছু নয় কারণ আর মাত্র নয় দিন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট আছেন।  তাহলে এই ইমপিচমেনট কেন? সেটার আসল কারণ ট্রাম্পকে চাপে রাখা যাতে তিনি “ইরানের উপর হামলার নির্দেশ” জাতীয় কিছু মানসিক ভারসাম্যহীন কাজ না করে বসেন তা থেকে বিরত বা চাপে রাখতে। যেমন স্পিকার ন্যান্সি ইতোমধ্যে আমেরিকান আর্মির টপ কয়েকজন জেনারেলের সাথে কথা বলে তার উদ্বেগ জানিয়েছেন, মতবিনিময় করেছেন এসব নিয়ে।

    তাহলে দিনশেষে মানে আগামিতে কী হতে যাচ্ছে?  এককথায় বললে, চীনের উত্থানের চাপের মুখে আমেরিকার নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা গত ৬ জানুয়ারির ঘটনায় বেশ কয়েকধাপ নিচে নামিয়ে দিবে। এর মূল কারণ ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেল  যে আসন্ন ‘আমেরিকান সঙ্কট” মোকাবলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব সকলের মধ্যে সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত নাই। তাঁদের মারাত্মকভাবে বিভক্তিরই প্রকাশ গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী। এম্নকি রিপাবলিকান দলই পুরা বিভক্ত।  সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত থাকত তাহলে ট্রাম্পের জাতিবাদ যার আরেক নাম সাদা সুপ্রিমিস্ট – এই চিন্তা মাইনর কিছু হয়ে থাকত।  এটা হল সেই লক্ষণ যে আমেরিকার বিভক্তি সহসাই মিটছে না।  অর্থাৎ আমেরিকা অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরো দুর্বলই হচ্ছে। তবে তা হয়ত তাতক্ষণিক নয়।, কিন্তু ধীরে ধীরে। যদিও বাইডেনের প্রথম বছরের মধ্যেই আমেরিকানেরা ট্রাম্পের বিরোধী হয়ে যাবে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করবে ট্রাম্প তাঁদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। যদিও সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারা ভাল রকমই থেকে যাবে! ঠিক যেমন ট্রাম্প তো আগেই জানতেন তিনি ছয় তারিখেই হেরে যাবেন সব শেষ হয়ে যাবে। তবু তিনি এই নষ্টামিটা করলেন কেন?  কারণ সাদা সুপ্রিমিস্টরা মনে করে রিপাবলিকান পার্টির উপর তারা পুরা কব্জা কাজ (এখন সব রিপাবলিকান সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারার নয়) করতে হলে, তাদেরটাই প্রধান ধারা হিসাবে ছেয়ে বসতে চাইলে সেকাজের পক্ষে বিনিয়োগ এটা।  যদিও যৌথ কংগ্রেস অধিবেশনে দাঙ্গা হাঙ্গামাটা একটা নৈরাজ্যমূলক কাজ হিসাবেই দেশে-বিদেশে দেখা শুরু হয়ে গেছে। ফলে তাঁদের উদ্দেশ্য একেবারেই কাজ করবে না। উলটা তারাই সমাজে কোনঠাসা হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি! বিশেষত ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র ট্রাম্প ও সাদা সুপ্রিমিস্টদের নিন্দা করেছে, এমনকী ভারতের মোদীও দিনশেষ দেখে এই নিন্দাকারিদের দলে!

    নির্বোধের খুশি!

    ভারতীয় পতাকা দোলানোর গর্বঃ
    সাদা সুপ্রিমিস্ট যারা হয় তারা তো নয়ই কিন্তু তাঁদের নেতা-পরিচালকেরা সুস্থ মাথায় চিন্তা করতে পারে এর অভাব সবসময় লক্ষ্য করা যায়। অন্য ভাষায় বললে নুন্যতম যুক্তিবুদ্ধির সামঞ্জস্যপুর্ণ “বয়ান-ভাষ্য” কখনই তাঁদের থাকে না, দাঁড় করাতে পারে না। অথচ বয়ান ছাড়া কেউ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হতে পারবে না। যেমন নিউজিল্যান্ডের ৫০ জনের মত মুসলমান হত্যার এক সাদা সুপ্রিমিস্ট ব্রেনটন (Brenton Harrison Tarrant) এর কান্ডটা আমাদের নিশ্চয় মনে আছে। ওর বয়ান হল, নিউজিল্যান্ডে মুসলমানেরা বাইরের লোক, তারা সাদা নয় ইত্যাদি, অতএব হত্যা……। আচ্ছা সে নিজেও কী নিউজিল্যান্ডে “বাইরের লোক” নয়।  কোন সাদা চামড়ার কেউ নিউজ্যল্যান্ডের আদি লোক নয়।  তাঁদের পুর্বপুরুষেরা সকলেই ইউরোপের আর মূলত বৃটেনের।  তাও একেবারেই গরীব, সহায় সম্পদহীন খেটে খাওয়া, জেল খাটা অংশ। কারণ মূল মিডল ও লোয়ার মিডল ক্লাস অংশটা আগেই আমেরিকা চলে গেছিল।  তাহলে এই বিদেশি, বাইরের লোক, দখলদার এসব শব্দের ভিত্তি কৈ?

    ক্যাপিটোল হিলে ৬ জানুয়ারির আয়োজকই ছিল সাদা সুপ্রিমিস্টরা। অথচ সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছে এক ভারতীয় অরিজিন বাসিন্দা।কলকাতার আনন্দবাজারের অনুসন্ধানি দাবি  যে তিনি ভিনসেন্ট জেভিয়ার। লিখেছে, “কট্টর ট্রাম্প সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা বছর চুয়ান্নর ভিনসেন্ট যে তাঁর কৃতকর্মে অনুতপ্ত নন, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি”।  এছাড়াও লিখেছে, “কাল সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত  ভিনসেন্ট জেভিয়ার নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বললেন, ‘‘ভারতকে অসম্মান করাটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি আসলে আমেরিকাতেও যে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য আছে, সেটা বোঝাতে চেয়েছিলাম। দেখাতে চেয়েছিলাম, রিপাবলিকান পার্টি একেবারেই বর্ণবিদ্বেষী নয়।’’
    এসব কথা বলে না ঐ কথিত ভিনসেন্ট না আনন্দবাজার নিজেদের মনভাব অভিপ্রায় ঢাকতে পেরেছে। ৬ জানুয়ারি নিয়ে  আনন্দবাজার দুটা রিপোর্ট করেছে। কিন্তু দুটাতেই সহানুভুতির জায়গায় দাঁড়িয়ে লেখা।  কেন, কীসে এই সহানুভুতি?  ভারতের মিডিয়া ও রাজনীতিবিদের এটিচুড হল, ট্রাম্পই তাঁদের ফেবারেট লোক ছিল, বাইডেন নয়। কারণ হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন ভারতকে ছেড়াবেড়া করে দিবেন। তাঁদের মোদীসহ হিন্দুত্ববাদ দুনিয়াজুড়েই নিন্দার বিষয় হয়ে উঠবে তাতে। কাজেই ট্রাম্পই তাঁদের পছন্দের নেতা যে ভারতের মুসলমানকে পিটিয়ে মারলে বা কাশ্মীরে আগুন ছড়িয়ে দিলেও মোদীকে কিছুই বলবেন না। অতএব ৬ জানুয়ারি যদি লাইগা যায়, চাইকি ট্রাম্প যদি আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে আবার ফিরে আসতে পারেন তাহলে তো লাভই লাভ! এই জায়গায় এসে কথিত ভিনসেন্ট আর আনন্দবাজার দুজনের অবস্থান এক জায়গায়। কিন্তু সেজন্য ভারতীয় পতাকা বইবার দরকার কী?
    এইখানে এসে ভিনসেন্ট ধরা খেয়ে গিয়েছেন। তিনি মূলত হিন্দুত্ববাদের লোক এবং জাতিবাদী তাই আমেরিকান ভোটার হয়েও ভারতীয় পতাকা ছাড়া হাটেন না।  তিনি বাদামি, হোয়াইট নন।  তাই তিনিই কিন্তু সাদা সুপ্রিমিস্টদের একদম আসল টার্গেট। কিন্তু মোদী-ট্রাম্প প্রেম তাঁকে  ঐ জমায়েতে নিয়ে গিয়েছে। আবার সাদা সুপ্রিমিস্টদের জমায়েতে গিয়ে তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, সাদা সুপ্রিমিস্টদের ভিতরে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য খুজেছেন! কি তামসা!তারা বর্ণবাদী নয় বলে সাফাই দিয়েছেন।  মানুষের আসলেই বড় অদ্ভুত প্রাণী!  আর ওদিকে আনন্দবাজার আরো তামাশার। তাঁদের হেডলাইন হল, “তাণ্ডবে তেরঙ্গা উড়িয়েও অবিচল“। মানে হোক না “তান্ডবে” কিন্তু তেরঙ্গা ভারতীয় পতাকা তো তুলেছে! তাই এটা নাকি গৌরবের!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৯ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “আগে প্রেসিডেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করুন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • ইইউ-চীন চুক্তি, শপথের আগেই বাইডেনের পরাজয়

    ইইউ-চীন চুক্তি, শপথের আগেই বাইডেনের পরাজয়

    গৌতম দাস

     ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3kf

    CN-EU in a videoconference on CAI DEAL, 30 DEC 2020

    দুনিয়া নতুন বছর ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে এসে পড়েছে। তার মানে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারি আরো ঘনিয়ে এল। প্রায় সব কিছু ঠিক মতই আগাচ্ছে, তেমন কোন বাধা দেখা যাচ্ছে না। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমে খাঁচার ভেতরে প্রবেশ করে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছেন যেন। কিন্তু তবু একটা ভাগাভাগির লাইন আমেরিকান সমাজ ও মিডিয়ায় টানা হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই; যা সম্ভবত আর মুছবে না কোনো দিন। তা হল তথাকথিত আমেরিকান জাতিবাদিতা। অলীক জাতিবাদিতার পক্ষে-বিপক্ষের একটা ভাগাভাগির দাগ থেকেই যাবে।

    [শেষের কথাটা আগে বলাঃ গেল সব গেল! বাইডেন শপথ নিবার আগেই বাইডেনের আমেরিকার বিরাট কিছু হারিয়ে গেল। বিষয়টা হল আগামি দিনে চীনের সাথে ইইউ, (২৭ রাষ্ট্রের এই ইউরোপীয় ব্লক), এর মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ কীভাবে হবে-চলবে (বিশেষত চীনের আভ্যন্তরীণ বাজার ইইউ-এর জন্য কীভাবে খুলে দেয়া হবে) এর মৌলিক নীতিমালা বিষয়ক চুক্তি্র – CAI  ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই), আলোচনায় সমাপ্তিটানা হল, একটা ভার্চুয়াল মিটিংয়ে করে। আমার এই এক বাক্যও পুরা ব্যাপারটার গুরুত্ব পাঠককে বুঝাতে খাটো হতে পারে। তাই এই বিবেচনায় পরের আরেক বাক্য লিখছি। গ্লোবাল ব্যবসা বিনিয়োগের  নিউইয়র্কভিত্তিক অন্যতম গ্লোবাল মিডিয়া  ব্লুমবার্গ (Bloomberg) গত মাসে ২২ ডিসেম্বর জানিয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে ইইউ চীনের সাথে এই চুক্তি এখনি না করে, ধীরে চলে [European Union came under mounting pressure to slow down its push for a major investment deal with China,……]। কারণ, বাইডেন চেয়েছিলেন, তিনি শপথ নিবার পরে তখন ইইউ আর আমেরিকা যৌথভাবে একটা পক্ষ হয়ে, অপর পক্ষ চীনের সাথে দরকষাকষিতে বসলে চীনকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করা যেত; এমন একটা লোভ বাইডেন দেখিয়েছিলেন। এব্যাপারে বাইডেনের হবু নিরাপত্তা উপদেষ্টা Jake Sullivan, এর টুইট দেখতে পারেন [He urged “early consultation with our European partners on our common concerns about China’s economic practices.”]। কিন্তু ইতোমধ্যেই বড় ধরণে ইইউ এর আমেরিকা-বিতৃষ্ণা ঘটে যাবার জন্য একা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই যথেষ্ট হয়েছিল। এতে আমেরিকা-বিতৃষ্ণা এমন পর্যায়ে পৌছিয়েছে যে বাইডেনের কোন বাধা-অনুরোধ এখানে কাজ করে নাই।  ফলে এখন আমেরিকান পাবলিক বুঝবে হয়ত আমেরিকা ফার্স্ট” এর  জাতিবাদ নীতির ট্রাম্প আমেরিকার কী কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। চীন-ইইউ এই বিশেষ  ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ চুক্তি যার আনুষ্ঠানিক নাম CAI বা ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই), তা গত ৩০ ডিসেম্বর সম্পন্ন করে ফেলেছে। উপরের ছবিটা সেই চুক্তি সম্পন্ন করার ব্যক্তিত্বদের ছবিই। এনিয়ে বিস্তারিত এই লেখার শেষ অংশে করা হয়েছে।
    তবু এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনার মূল তাতপর্যটা কী তা এখানেই বলে রাখি। কলোনিযুগ শেষ হলে ১৯৪০ এর দশক থেকে ইউরোপীয় মাতবর কলোনিদখলের মাস্টারেরা সব হারিয়ে শেষে আমেরিকার ক্ষমতার দাপটের অধীনে এর আঁচল ধরে হেটে  এপর্যন্ত কোনমতে টিকে আসছিল। অবশ্য ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে অনেক নতুন কিছু করার-হবার খায়েস জমাও হয়েছে। তাই এখন যা হল সেটা এই যে চীন এসে সহজেই প্রথমত ইউরোপকে আমেরিকার অধীনতার আঁচল ধরে চলা থেকে মুক্ত করে দিল। আর এর কৃতজ্ঞতায় ইইউ অবশ্যই নিজেকে ধন্যবোধ করছে ও করবে। কিন্তু তা কখনই এবার চীনের সাথেও সম্পর্কটাও আগের আমেরিকা-ইইউ এর মত  অধীনতার আঁচল ধরে চলা হবে না। কেন? চীন কী কোন মহান শক্তি? “মেরা ভারত মহান” এর মতই,  চীনও মহান, সেজন্য? না একেবারেই না। প্রশ্নটাই মহান হওয়া না হওয়ার না।  প্রশ্নটা সময়ের, অগ্রবর্তি এক সময়ের। গত ৭৫ বছরের আমেরিকান নেতৃত্বের দুনিয়াতে অনেক কিছুই ঘটেছে কিন্তু কোথায় কলোনি দখল, কলোনি শাসন বা সম্পর্ক আর ফিরে আসে নাই। আসবে না। নতুন সময়ে পুরানা সম্পর্ক ফিরে আসে না, আসতে পারে না – আগের সুযোগগুলো সব নষ্ট হয়ে যায়, তাই।  কিন্তু চিন্তা করলে দেখব, টের পাব এটা “আমেরিকান মহান” কিনা বা মহান ছিল বলেই কলোনি আর ফিরে আসে নাই তা একেবারেই নয়।  তবু কারণ একটাই, “নতুন সময়”।  নতুন সময়ে ‘পুরান ঘটনা’ ঘটতে পারে না। ঘটবার পরিস্থিতিই একই থাকে না বলে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন সময়ে পুরান ঘটনাগুলো আবার সংঘটিত হতেই পারে না, তাই।  অতএব চীন-ইইউ এর সম্পর্ক আগের ‘আমেরিকা-ইইউ এর মত  অধীনতার আঁচল ধরে চলা’ হয়েই গড়ে উঠবেই না। ]

    আগেই একে ‘তথাকথিত’ বলে দিলাম, আর সেই সাথে ট্রাম্পের চালু করা এই জাতিবাদিতা অলীক বা কাল্পনিক- তা আগেই বললাম এ জন্য যে, আমেরিকা রাষ্ট্র  ৭৫ বছর আগে একবার গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, অর্থাৎ এক গ্লোবাল পণ্য বিনিময়বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশে সবাইকে সুযোগ এনে দিয়েছিল, সব রাষ্ট্রকে জড়তা ভেঙে তাতে শামিল করেছিল, সে রাস্তায় সবাইকে নামিয়ে গ্লোবাল আইন নিয়মকানুন তৈরি করে ফেলেছিল, দুনিয়ার বাণিজ্য বিনিময়ের অভিমুখ নির্ধারণ করে গ্লোবাল পণ্য-পুঁজির বিনিময় বা বাণিজ্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু  সেই আমেরিকা এখন বুড়া বয়সে উলটা জাতিবাদি সংরক্ষণবাদিতা দিয়ে, নিজ বাজারে অন্যের ঢোকা বন্ধ করে, চীন ও ইইউর সাথে ট্যারিফ আরোপের যুদ্ধ লাগিয়ে গ্লোবাল বাণিজ্য অসম্ভব করে তুলবে, এটা কি কেউ ভেবেছিল? এটা কীভাবে ঘটল?
    তামাসার দিকটা হল, জাতিবাদী অর্থনীতি, আত্মনির্ভর অর্থনীতি, সংরক্ষণবাদিতা অথবা নিজে আমদানিও করব না রফতানিও করব না এমন চিন্তা – এটা দুনিয়ায় একসময় একমাত্র টিকে ছিল সেসব দেশে ও সে সবকালে (১৬০৭-১৯৪৫) যখন ইউরোপের ওসব চিন্তার নেতা ও রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক তৎপরতা বলতে ছিল অন্য দেশকে কলোনি দখল করা আর সেখান থেকে লুট ও শোষণে সম্পদ উঠিয়ে আনা; এমন রূপের কলোনি-দখলদার রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকা তো কখনো এমন দখলদার রাষ্ট্র বা তেমন অর্থনৈতিক দেশ ছিল না। এছাড়া ১৯৪৪ সালে ব্রেটনউড বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক) দুনিয়ায় চালু হয়ে যাওয়ার পর সেটা হওয়া শুধু আমেরিকার জন্য নয়, ইউরোপসহ যে কারো জন্যই আরো অসম্ভব হয়ে গেছিল।
    সে কারণে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধরনের জাতিবাদিতা মানে, পণ্য-পুঁজি আমদানিও করব না, রফতানিও করব না। এ ধরনের বাণিজ্যবিরোধী ধরনের স্বপ্ন আকাক্ষা তো আসলে কলোনি আমলের চিন্তা। যা বর্তমান বাস্তবতার দুনিয়াটাতে আর নাই।
    তাই ট্রাম্পের জাতিবাদিতা হল, চীনকে একঘরে করে বা চীনকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক বাকি রাষ্ট্রকে নিয়ে আগের মতোই আমেরিকান নেতৃত্বের (চীন বাদে) গ্লোবাল বাণিজ্যের সমাজ কায়েমের এক অলীক প্রচেষ্টা যেটা শতভাগই বাস্তবায়ন-অযোগ্য। তবে মানতে হবে জাতিবাদে প্রপাগান্ডা মূল্য অনেক ও সুড়সুড়ি তোলার ক্ষমতাও অপরিসীম। এ ছাড়া, এথেকে নিজ দেশে জাতবাদী এক মিথ্যা ঐক্য ধারণা- অথবা ‘আমরাই শ্রেষ্ঠ’ ধারণার জন্ম দেয়া যায় খুব সহজেই। কেবল এখানে এসে মোদী ও ট্রাম্প নীতিতে এক ছিলেন।
    তবে মোদীরটা প্রায় খোলাখুলি নিজের সাথেই অসততা বা প্রতারণা। যেমন, লাদাখ সীমান্তে চীনের সাথে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে চীনা পণ্য বর্জনের ডাক এখনো দেয়া আছে, প্রপাগান্ডা ও পণ্য আমদানিবিরোধিতার পক্ষে ক্যাম্পেইনও চলছে। কিন্তু বাস্তবে যেটা হচ্ছে তা হল, আগের চেয়ে চীনা পণ্য ভারতে আমদানি কমা দূরে থাক, এখন তা (গত অক্টোবর থেকে) ৩০% বেশি আমদানি হচ্ছে। এছাড়া মোদীর মনবাসনা ও মনের গোপন নীতি হল,  আপনার নিজদেশ কাউকে দেশের বাজারে ঢুকতে দেবে না। এর মানে, অন্যেরা রফতানি করতে পারবে না কিন্তু আপনিই কেবল ওসব দেশে পাল্টা রফতানি করতে চান – এই নীতি। বিদেশি মুদ্রা খুবই লোভনীয় জিনিষ গণ্য করা। এটাই অলীক জাতিবাদিতা, যার কায়েম-বাস্তবায়ন অসম্ভব।
    আর এ দিকে মোদীর বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার বাস্তবতা হল, এখানে আমেরিকান বাণিজ্যস্বার্থ দুই ভাগে বিভক্ত; দুটা ক্যাম্প তৈরি হয়ে গেছে। স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজগুলো মনে করে, তাঁরা স্বপ্ন-কল্পনায় দ্যাখে যে চীনের আসন্ন গ্লোবাল প্রভাবক-আধিপত্যের কারণে নিজ এন্টারপ্রাইজগুলো নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। তাই ট্রাম্পের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিই তাদের আত্মরক্ষার উপায়। কিন্তু এটা ‘মনে মনে পোলাও খাওয়া’র মত। কারণ তাঁদের ভয়ের অনুমানটা ঠিকঠিক যাচাই করে দেখা হয়নি, তাই পরীক্ষিত নয়। বাস্তবে ওসব স্বপ্ন-কল্পনা সত্য না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। আর এসবের বিপরীতে, চীনের আসন্ন গ্লোবাল প্রভাবে এক ধাক্কা আমেরিকার স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজগুলোর উপর আসবে অবশ্যই, শুরুওও হয়েছে অবশ্যই। কিন্তু তাতে এগুলো সব বিনাশ বা বন্ধ হয়ে যাবে এটি সত্য নয়। বরং এই ধাক্কায় ঢেলে সাজানো আসন্ন হবে অবশ্যই। তাতে কোনো ধরনের স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ বন্ধ হয়ে যাবে আবার নতুন ধরনের কিছু স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ জন্মানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে। আর গ্লোবাল নেতৃত্বের বদলকালে কিছু  কোলেটারাল ড্যামেজও হবে অবশ্যই। তাই ব্যাপারটাকে বিদেশীর বিরুদ্ধে দেশীর সংরক্ষণবাদী বিষয়ের চোখে দেখবার বিষয় নয়। বরং নতুন অর্থনৈতিক নেতা আসন্ন হবে বলে তার সাথে নিজেকে খাপ-খাইয়ে নিয়ে টিকানোর জন্য ঢেলে সাজানো, খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য কিছু পরিবর্তন – এসব তো করতেই হবে। এড়ানো যাবে না। তবু জাতিবাদী প্রপাগান্ডায় সফল সুড়সুড়িতে অলীক শত্রুর বিরুদ্ধে জাতিঐক্যের গানই  অনেক সফলতা পাবে, অন্তত প্রথম কয়েক বছরে।
    এর বিপরীতে আমেরিকায় যারা বড় এন্টারপ্রাইজ, যারা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান মানে গ্লোবাল রফতানি বাণিজ্যভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; এরা বাইডেনের আমলকে স্বাগত জানাবেন। কারণ এতোমধ্যেই যা ঘোষিত বাইডেনের নির্ধারিত নীতি তা হল, ট্রাম্পের জাতিবাদিতায় আমেরিকার অনেক ক্ষতি হয়েছে; তাই আমাদের যত দ্রুততায় আগের সময়ের গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক এবং পারলে যতটা সম্ভব গ্লোবাল নেতা থাকার নীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। এটাকে বাইডেনের পরামর্শকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাট দলের পুরনো বা ক্লাসিক নীতি অথবা ওবামার নীতিতে ফিরে যাওয়া ও কন্টিনিউ করাই বাইডেনের সাধারণ নীতি হবে এবং এই বার্তাটাই সে চীনকে দিতে চায় বলে যতটা সম্ভব ওবামার আমলের যত পুরনো লোক (উপদেষ্টা, সচিব) আছেন তাদের দিয়েই বাইডেনের স্টাফ মূলত সাজানো হচ্ছে। আর তারা যেহেতু আগে চীনের সাথে কাজ করেছেন, পূর্ব-পরিচয় অভিজ্ঞতা আছে ফলে তা আমেরিকার ওপর চীনা আস্থা (ট্রাম্পের কারণে যেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে) ফিরানোর একটা আলাদা মাইলেজ হতে পারে। অর্থাৎ বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা গ্লোবাল বাণিজ্যের ট্রাকেই ফিরে যাবে; কথিত জাতিবাদিতায় নয়। তাই সবখানেই সেটা পুনরুদ্ধার করাই বাইডেনের মৌলিক নীতি হবে।

    কিন্তু বাইডেনের আমেরিকা ওবামা আমলের নীতিতে কতটা ফিরতে পারবে?
    সেটা এক বিরাট প্রশ্ন, অবশ্যই। পুরনো জায়গায় ওবামার লেভেলে আবার ফিরতে না পারার শঙ্কাও ক্রমে বাড়ছে। ব্যাপারটা বুঝতে সবার আগে প্রশ্ন করা যাক, আসলে ‘ফিরতে পারা’ মানে কী?
    সংক্ষেপে বললে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে ১৯৪২ সাল থেকে। সুনির্দিষ্ট সে যা করেছিল তা হল, ঐ বিশ্বযুদ্ধের মূল নির্ধারক নেতৃত্ব নেয়া, হিটলারবিরোধী অক্ষশক্তি জোট গড়া; তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নকেও শামিল করা, ওই বিশ্বযুদ্ধে নিজেদের বিজয় ঘটানো, যুদ্ধের মেজর খরচ হিসেবে পক্ষের সব রাষ্ট্রকে আমেরিকা কোনো চুক্তি ছাড়াই অর্থ জুগিয়ে চলেছিল, যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বাদে সবাইকেই আবার যুদ্ধ-পুনর্বাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য, নতুন করে এবং এবার জাপান-জার্মানি-ইটালিসহ সারা ইউরোপকে নতুন বিনিয়োগ দেয়া। আর সেই সাথে ইউরোপ যেন এবার কমিউনিস্টদের দ্বারা দখল না হয়ে যায় তাই জার্মানি ও জাপানে স্থায়ীভাবে সামরিক ব্যারাকে আমেরিকান সৈন্য রেখে দেয়া। আর এসব কিছুর খরচ আমেরিকা একা বহন করা। আর আমেরিকা কখনোই এই নিরাপত্তাদানের খরচ ইউরোপের কাছে চায়নি। এরই বিনিময়ে আমেরিকা ইউরোপের মন পেয়েছিল। আর সেই থেকে আমেরিকা পায় নিজে গ্লোবাল (অর্থনীতি তো বটেই) পলিটিক্যাল একচ্ছত্র লিডারের স্বীকৃতি। তা দিয়েছিল অ-কমিউনিস্ট সারা ইউরোপ। এছাড়া বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা পক্ষজোটের অন্যান্য রাষ্ট্রে যা কিছু খরচ বা বিনিয়োগ  করেছিল কিস্তিতে হলেও তারা সেসব খরচের অর্থ ফিরিয়ে দিয়েছিল। আর অবকাঠামো ঋণও তারা স্বল্প সুদসহ ফেরত দিয়েছিল কিস্তিতে। তবে সামরিক ব্যয় যেমন ইউরোপে সব আমেরিকান-ব্যারাক রাখার খরচ বা সামরিক জোট ন্যাটো পরিচালনার খরচের কমপক্ষে নব্বই ভাগ একা আমেরিকা বহন করে এসেছে, এ পর্যন্ত। কিন্তু এবার ট্রাম্প এসে কেবল ট্রাম্পই এইবার ইউরোপের কাছে সামরিক ব্যারাক রাখার খরচ চেয়েছিলেন। এর চেয়েও ‘শকিং’ ব্যাপারটা হল, ট্রাম্প নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল বাণিজ্যের নেতা অবস্থান ছেড়ে সরে গিয়েছিলেন। ট্রাম্পের শপথ নেওয়ার শুরুর ঐ বছর (২০১৭) গ্লোবাল ইকোনমিক ফোরামে ব্যক্তি তিনি অংশ নেয়নি। আর পরে যেখানেই অংশ নিয়েছেন (যেমন জি৭ বা জি২০) সেখানে জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে চলতে চেয়ে কথা বলে গেছে্ন। ফলে সবখানে তাল কেটে যাওয়া কথা। এসব মিলিয়ে গত ৭৫ বছরের যে আমেরিকা গ্লোবাল নেতার পরিচয় পেয়েছিল তা ট্রাম্প তার শেষ চার বছরে সদম্ভেই সব মুছে ফেলেছিলেন।
    আর ঠিক সে কারণেই, আসন্ন বাইডেন প্রশাসনের সাধারণ নীতি হবে আমেরিকাকে যতটা সম্ভব আগের গ্লোবাল নেতার আসনে ফিরিয়ে নেয়া। এ কাজে এবার মূলত তার আগানোর পথ হবে নীতিগত জায়গায় শক্ত করে দাঁড়িয়ে সব কিছুকে ফিরিয়ে আনা। আর এ কাজে সবার উপরে থাকবে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে এক শক্ত আপসহীন অবস্থান। মোদির ভারত এতে ‘সাফার’ করবে অবশ্যই, কিন্তু ভারতকে কষ্ট দিতে হবে, এটা বাইডেনের কোন পলিসি নয়। বরং হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্ত আপসহীন অবস্থান নিলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে আমেরিকা চীনের কাছে পরাজিত হয়ে গেলেও গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে চলে যাবে না এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আমেরিকার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটা আর অনেকদিনই হয়ত ঠেকিয়ে রাখতে পারবে এবং তা সম্ভবত অনেক দীর্ঘ দিন আমেরিকার হাতে থাকবে।  এই হল পিছনের অনুমান। তবে এবার প্রকাশিত এক গবেষণা-স্টাডি রিপোর্ট বলছে, করোনাভাইরাসকে কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে এবং এই ম্যানেজমেন্ট সাকসেসের কারণে ২০৩৫ সালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক নেতৃত্ব চীনের পাওয়ার কথা ছিল। [এ দশকের মধ্যেই চীন হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি: রিপোর্ট] সেটা এখন ২০২৮ সালের মধ্যেই চীন অর্জন করে ফেলবে বলে অনুমিত হচ্ছে। তাই অন্তত গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতার আসন ধরে রাখতে বাইডেন নিজ দেশের হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্ত আপসহীন অবস্থানের কথা বলছেন। তিনি শুধু ভারতের কাশ্মীর নীতিই নয়, ভারতের নাগরিকত্ব আইন এবং মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন ও বৈষম্য নিয়েও উচ্চকিত হবেন বলে জানিয়ে আসছেন। একই অবস্থান নেবেন বাংলাদেশের হিউম্যান রাইট ইস্যুতেও। এ কারণে এসব দেশের নেতৃত্ব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

    ভারতের দিবাস্বপ্নঃ
    এ দিকে গত ২৪ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসে এমন এক প্রো-ভারতীয় রিপোর্ট ছাপা হয়েছে যাকে বলা চলে, বাইডেনের নীতির চাপের কথা ভেবে ভারতীয় মিডিয়া ও রাজনীতিতে যে দম বন্ধ অবস্থা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভান করে হলেও যেন তাদের সাময়িক নিঃশ্বাস নিতে দিতেই এই রিপোর্ট লেখা হয়েছে। তাই যেন এটা এক দিবাস্বপ্নের আকাঙ্খায় লেখা রিপোর্ট।
    ঐ রিপোর্টের শিরোনাম, ‘বাইডেন হিউম্যান রাইট ইস্যুতে জোর দিলেও আমেরিকা-ভারত সম্পর্ককেও বিস্তারে নেবেন’ [Biden Is Expected to Expand U.S.-India Relations While Stressing Human Rights]। এই শিরোনামটা নিজেই এক হার-স্বীকার করা সান্ত্বনামূলক শিরোনাম। কারণ হিউম্যান রাইট ইস্যুর ব্যাপক ‘খামতিতে থাকা’ মোদী বাইডেনের সাথে আলাপে গেলে বলাই বাহুল্য, প্রতিটা পদেই সমালোচিত হবেন আর এই সমালোচনার ভয় ও মনমরা অনৈতিক অবস্থানের ছাপ সবার ওপর সব ইস্যুতেও থাকবে। তাই বাইডেনের পক্ষেও সম্পর্ক কোনো দিকে এগিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া এমন দুই নেতার বৈঠকে যদি একজনের চোখে অপরজন খাটো হয়ে থাকেন ওবে ঐ পরিস্থিতিতে আলোচনাই আগাবে না। শুধু তা নয়, সেটি একটি বেইজ্জতির কাণ্ড হয়ে যেকোনো সময় হাজির হয়ে যেতে পারে এই ভয় ঢুকবে ভারতের সবার মনে। আর এই ভয়েই সম্ভবত মোদী বাইডেনের সামনে মুলাকাতে আসতেই চাইবেন না। তাই, মোদী সাক্ষাতের কোন মিটিং এড়িয়ে চলতে চাইবেন, এটাই হওয়ার কথা।
    তবে ওই রিপোর্ট এসব প্রশ্নের মীমাংসা না করতে পেরে শেষে অস্বাভাবিকভাবে (বাইডেন ডেমোক্রাট  অথচ) এবার রিপাবলিক থিংকট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের কিছু মন্তব্য নিয়ে এসেছে, নিজেদের মনোবল বাড়াতে। যেমন কার্নেগি ইন্ডিয়ার অ্যাশলে [Ashley J. Tellis], ট্রাম্পের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান বিগান [Stephen Biegun] বা থিংকট্যাঙ্ক ব্যক্তিত্ব রিচার্ড ফনটেইন [Richard Fontaine,]- এদের কথা উদ্ধৃতিতে আনা হয়েছে। কিন্তু মজার কথা হল, কোথাও পরিষ্কার বলা নেই তারা এসব কথা কবে বলেছেন? নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে, না পরে? তা স্পষ্ট নয়। আবার কোথাও যদি বলা থাকে তবে সেটা অবশ্যই গত নভেম্বরের   নির্বাচিনের আগের যখন নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষের প্রপাগান্ডা হিসাবে অনেক কথা বলা হয়েছিল, সেসব কথা। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা কি বাইডেন জিতার পরে তার সম্ভাব্য নীতি সম্পর্কে কথা বলছেন? অবশ্যই তা নয় অথবা তারা সেটাও নিশ্চিত করেননি। এমনকি ঐ রিপোর্টের এক জায়গায় দাবি করা হয়েছে, বাইডেন নাকি এশিয়ায় চীনের ক্ষমতার ভারসাম্য হিসেবে কোয়াড জোট নিয়েও আগাবেনই [As relations between New Delhi and Beijing soured, India strengthened its commitment to a multilateral partnership with the United States, India, Japan and Australia — known as the Quadrilateral Security Dialogue, or Quad.] অথচ এসব কথা তো নভেম্বর নির্বাচনের আগে বলা কথা।

    কাজেই বলা বাহুল্য এমন জবরদস্তি অনুমানের ভিত্তি নেই। কারণ বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে অনেক রাষ্ট্রের সাথে নীতি বা পলিসিগত জোট বা ঐকমত্য করবেন হয়ত। কিন্তু কোয়াড তো সামরিক জোট আর তা এক আলাদা প্রতিষ্ঠান। কোনো দেশের অন্য দেশের সাথে পলিসিগত মিলের ভিত্তি খুঁজে পেয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়া আর সামরিক জোটে তৎপর ও যুক্ত হওয়া – এ দুটো কোনোভাবেই আমরা এক বলে চালিয়ে দিতে পারি না। অথচ এমন উদ্ভট দাবি এখানে করা হয়েছে চাতুরির সাথে। শেষে রেফারেন্স টানা হয়েছে ভারতের ট্রাম্প অনুসারী এক আমেরিকান থিংকট্যাঙ্কের প্রধান, ব্রহ্ম চেলানির। চেলানির দাবি একেবারে হুমকির মতন। নিউইয়র্ক টাওইমসে দাবি করা হয়েছে  চেলানি নাকি বলেছেন, বাইডেন যদি চীনের প্রতি নরম অবস্থানে কথা বলেন তবে তা ভারতকে ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ করতে ঠেলে দিবে [“If he’s seen as pursuing a softer approach with China, it will make New Delhi have second thoughts about a soft alliance,” said Brahma Chellaney, a professor of strategic studies at the Center for Policy ]। তবে এটা বিরাট হুমকি দেয়ার মতো কথা। কিন্তু ভারত ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ করে কোথায় যাবে? ভারতের কাছে আমেরিকার কাছে যাওয়া ছাড়া আর কে বিকল্প আছে? আসলে ভারতের জন্য একটাই আমেরিকান বিকল্প আছে; সেটা হল, এবার উল্টা আরো বেশি করে চীনের ঘনিষ্ঠ হয়ে কোলে উঠে যাওয়া! এ ছাড়া ভারতের জন্য আমেরিকার বিকল্প আর কই?
    তবে আবার সবশেষ ঐ রিপোর্টে স্বীকার করে নিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমেরিকার কিছু অ্যাক্টিভিস্ট বরং দাবি করেছেন বাইডেন যেন ভারতের সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেয় ভারতের হিউম্যান রাইটের ব্যাপারে সতর্ক না হলে সেই ভারত হবে আমেরিকার জন্য ভীষণ বিপদের” [Some activists in the United States want the Biden administration to go even further and warn Indian officials that discontent over some of its current policies could imperil how strong a partner India might be for the United States. …… “Human rights first is equally important,” said Simran Noor, the chairwoman of South Asian Americans Leading Together, an advocacy group in the United States. ]। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে এই রিপোর্ট শেষবিচারে ভারতের জন্য সান্ত্বনামূলক কিছু বাক্যও তুলে ধরতে পারেনি।

    চীন-ইইউ CAI  চুক্তি করে ফেলাঃ বাইডেন শপথ নিবার আগেই যা হারালেন
    এদিকে গত ৩০ডিসেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন মিলে বিশাল তাতপর্যপুর্ণ এক ভার্চুয়াল ভিডিও শীর্ষ বৈঠক সম্পন্ন করেছে। এটা হল, চীনের সাথে ইইউর মূলত বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবিষয়ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক চুক্তি। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই) বা CAI  ।
    এতে সার কথাটা হলো, ট্রাম্প প্রশাসন তার চার বছরে যেভাবে ইইউকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তা বাইডেন এসে মেরামত করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন বলে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন, তা আর এখন কার্যকর হওয়ার সুযোগ থাকল না। এর আগেই চীন-ইইউর এই চুক্তি আমেরিকাকে চিরদিনের জন্য পাশে ও বহু পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল।
    এই ফাইনাল আলোচনায় ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন (উপরের ছবিতে ঘড়ির কাটার অর্ডারে) চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, ইইউ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মিশেল [Charles Michel],  ইইউর দুই প্রধান নেতা রাষ্ট্র জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল আর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো; আর এদের সাথে ছিলেন ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট উর্সুলা [Ursula von der Leyen]। অর্থাৎ পক্ষ হিসাবে চীন ও ইইউ এই দুই পক্ষ।  কিন্তু কেন বাইডেনের অনুরোধ ফেলে ইইউ নেতারা এই চুক্তিতে গেলেন এনিয়ে অপ্রকাশ্যে বিস্তর মনকষাকষি নেপথ্য আলাপ হয়েছে। যার প্রায় সবটাই আমরা পেতে পারি হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমস ওয়েব পত্রিকায়। সেখানে গত ৩১ ডিসেম্বর সংখ্যায় রিপোর্টার ডিভিড হাট [DAVID HUTT] এর লেখা এক বিস্তারিত প্রায় দশ পৃষ্ঠার রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম হল, ইইউ-চীনের ডিল বাইডেনের টিমকে হয়ত আরও অনেক অপশন দিতে পারত [EU-China deal may give Biden’s team more options]। অর্থাৎ আমেরিকার পক্ষ থেকে দেখা ও করা এই শিরোনাম। আমেরিকান চোখে তাঁরা আমেরিকা-ইইউ এর সম্পর্ককে ট্রান্স-আটলান্টিক [transatlantic relationship] সম্পর্ক বলতে ভালবাসে। ভৌগলিকভাবে তারা আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের ভুমি বলে। সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা সেখানে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেনকে  ট্রান্স-আটলান্টিসিস্ট বলে খোচা দিয়ে লিখেছে- President-elect Joe Biden is considered to be an Atlanticist। কিন্তু এশিয়ান টাইমসের  ডেভিড হাট অত দূর থেকে কথা বলেন নাই। তিনি সরাসরি ইইউ কে প্রতারনাকারিই [gazumped, যার বাংলা হল,  বাড়িবিক্রির বিক্রেতার সাথে দরদাম সব ঠিক হবার পর ফাইনাল পেমেন্টের আগে তিনি এবার বাড়ির বর্ধিত দাম হেঁকে গোঁ-ধরে বসা – একে যে  প্রতারণার ঘটনা বলে মনে করা হয়]  বলেছেন। কারণ , তিনি বলছেন নভেম্বর নির্বাচনের আগের মাসে অক্টোবর ২০২০ তে ট্রাম্পের উদ্যোগে ইইউ-আমেরিকা এই বৈঠক বসেছিল চীনের বিরুদ্ধে তারা কী কমন অবস্থান নিতে পারে সেই বিষয়ে।  ডেভিড হাট ইইউ এর ফরেন পলিসি প্রধান যোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন তিনি চীনবিরোধী ইইউ-আমেরিকা বৈঠকের প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু তি এখন এমন উলটে গেলেন কেন? এটাকেই তিনি প্রতারণা বলছেন।  ডেভিড হাট আরও খবর দিচ্ছেন ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাথিউ [Matthew Pottinger] এর উদ্ধৃতি টেনে বলছেন “ইইউ এর এই আচরণে আমরা আমেরিকার উভয় দল এই ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত ও হতবাক”[Leaders in both US political parties and across the US government are perplexed and stunned that the EU is moving towards a new investment treaty right on the eve of a new US administration.”]।
    এইবার পালটা ইইউ এর দিক থেকে জবাব বক্তব্যও তুলে ধরেছেন ইইউ এর ট্রেড কমিশনারকে উদ্ধৃত করে ডেভিড হাট লিখছেন, কমিশনার বলেছেন CAI  চুক্তিতে স্বাক্ষর করে আমরা এখন আমেরিকার সমান হলাম” [CAI deal as a “leveling up” with the US on trade terms relating to China]। কেন একথা? কারণ ইউরোপ অনেক আগে থেকেই ট্রাম্পের উপর ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ তিনি চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধ করে গেছেন। কিন্তু তা থেকে বের হতে ট্রাম্প যে সমঝোতা আলোচনা করেছিলেন সেখানে তিনি ইইউ-কে জানিয়ে তা করেন নাই। যদিও ঐ আলোচনা প্রথমপর্বই কেবল শেষ হয়েছিল এমনকি ঐ অংশ পর্যন্ত  চুক্তিও সম্পন্ন করা হয়েছিল, তবে এর পরে আলোচনা আর আগায় নাই। সব ভেঙ্গে পড়েছিল। ইইউ এর ট্রেড কমিশনার সেই উপেক্ষারই রেফারেন্স তুলে বলছেন এইবার আমরা আমেরিকার সমান হলাম।  এরকম ইইউ-আমেরিকার অনেক অভিযোগ-পাল্ট অভিযোগের কথা আছে ডেভিডের এই রিপোর্টে।
    কিন্তু এসব কিছুকে পিছনে ফেলে সত্য এখন একটাই, ইইউ-চীন চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলেছে এবং দুপক্ষই এতে ভীষণ সন্তুষ্ট। এরই এক প্রকাশ হল, স্বাক্ষর শেষে ইইউ এর পক্ষ থেকে চীনের প্রশংসাসূচক একটা শব্দই বহু কথাই বলে দিয়েছে। তা হল, ইইউ এই চুক্তিকে চীনের দিক থেকে করা ‘অতুলনীয় এক প্রতিশ্রুতি’  [unprecedented commitment] বলে মনে করছে যা চীনে ইইউর বাণিজ্যকে নিশ্চয়তা ও আগাম বোঝা সম্ভব – এমন সব আস্থা দিবে [provide commercial certainty and predictability, with wide access for an array of European companies to the hitherto heavily restricted Chinese market.]। আসলে এই চুক্তি চীনের সম্পর্কে পশ্চিমাদেশে যেসব বদ্ধমুল ধারণা ছিল যেমন চীনে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো পণ্যে মূল্য বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত হয় না, সরকারি হস্তক্ষেপে নির্ধারিত হয়। অথবা শিল্প অথবা কৃষি পণ্যে সখানেই কত ভর্তুকি দেয়া হয় তা গোপন রাখা হয় [regulate China’s state-owned enterprises and transparency on subsidies.] কিন্তু এই চুক্তির পরে ইইউ নেতারা খুশি যে এখন এসব তথ্য সবই তারা সহজেই জানতে পারবেন।

    সবশেষে দাড়ালো কী?
    এতদিন চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবে এটা জানা ছিল কিন্তু এর পথে বাধাগুলো কো করে সামলাবে বা অপসারণ করবে তা স্পষ্ট ছিল না। এই চুক্তি বলে দিচ্ছে চীন কী করে তা করতে যাচ্ছে। আর এটা সম্পন্ন করতে চীনের একটা সাধারণ ফর্মুলাও অনুসরণ করতে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, সবাইকে আলাদা আলাদা ডিল কর বা সামলাও। ইইউ-চীন চুক্তিটা দেখিয়ে দিল ট্রাম্প এবং এমনকি বাইডেনও  কতটা নাদান। ভুয়া জাতিবাদ আর ভুয়া আমেরিকা ফাস্ট সমুলে ত্যাগ করে আমেরিকার উচিত ছিল ইইউ-কে সাথে রেখে একটা পক্ষ হয়ে এরপর চীনের সাথে ডিল করতে বসা। অথচ ট্রাম্প চার বছর চলল ঠিক এর উলটা অবস্থান নিয়ে, ‘একলা চল’। আবার বাইডেন ক্ষমতায় আসবার আগে থেকেই এই দুর্বল জায়গাটা নিয়ে কাজ করা পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল যে কী করে এই খামতি মোকাবিলা করবে। এমনকি ডেমোক্রাট দল হিসাবেও ইইউ এর সাথে কথা আগিয়ে রাখা দরকার ছিল। এখন যা হল তাতে এটা প্রমাণিত যে বাইডেনের টিমের বাস্তবতা সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই; দুর্বলতা বা সবলতার কোন দিক সম্পর্কেই নাই। ওদিকে এর আগে চীন  RCEP এর বাণিজ্য চুক্তি করেছে। তাতে পুরা এশিয়ার যত মাতবর আছে – জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া অষ্ট্রলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর সাউথ চায়না সি-এর আশাপকাশের কেউ বাকি নাই। অর্থাৎ এদেরকে ডিল করেছে আমেরিকা বা ইইউ এর বাইরে রেখে আলাদা করে।  এখন বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিলে তাকেও চীন বঞ্চিত করবে না। কিন্তুঞ্জোট পাকাতে দিবে না। দরকষাকষির ক্ষমতাও ছেটে দেওয়া হয়ে গেছে। আমেরিকা যে গ্লোবাল নেতার মত ইইউ ও RCEP এর সদস্য দেশগুলোকেও নিজের সাথে রেখে এইবার চীনের সাথে বসবে বা ডিল করবে – সেই বাস্তবতাটাই চীন ভেঙ্গে দিয়ে আসছে ও ফাইনালি দিলও। অর্থাৎ চীনের গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে বাধা দিবার কোন জোট বা কোন রাষ্ট্রের অবস্থানের আর সুযোগ থাকল না। এখন সবার স্বার্থই চীনের সমৃদ্ধির মধ্যে, চীন দুর্বল হলে নয়।  অতএব আমরা বলতে পারি এটাই পারফেক্ট পরিস্থিতি চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হবার পথের।

    ভারত কোথায়?
    কিছু একটা কথা বাদ পড়ে গেল। কী সেটা? ভারত কোথায়? সে কী পেল, তার অবস্থান কই? ভারতই আসলে সমুলে বাদ পড়ে গেল, একেবারে ওয়াইপ আউট, মুছে গেল। একমাত্র পথ খোলা থাকল, লজ্জার মাথা খেয়ে কম্প্রোমাইজ; মাফ চেয়ে চীনের অনুগ্রহ লাভের পথ পাওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০২ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ভারতের দিবাস্বপ্ন আর ইইউ-চীন চুক্তি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা

    ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা

    গৌতম দাস

    ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3jP

    India’s Prime Minister Narendra Modi addresses party workers during the celebrations after the victory in Bihar assembly election BJP headquarters on November 11, 2020 in New Delhi, India. (Photo by Mayank Makhija/NurPhoto)

    ইভিএম মেশিন বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে বিতর্ক শুধু বাংলাদেশে না, ভারতেও খুবই ব্যাপক। আর ভারতে এর ব্যবহার প্রায় শতভাগ আসনে, মানে ভারতের নির্বাচন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি ইভিএম নির্ভরশীল। এই মেশিনের বিরুদ্ধের ব্যাপক অভিযোগগুলো আসলে ওর প্রোগ্রামিংকে বাইরে থেকে ম্যানিপুলেট করে কারচুপি করার সুযোগ নেওয়ার জন্য।  এসব অভিযোগগুলোর মধ্যে  গত ২০১৯ সালের মে মাসের কেন্দ্রের নির্বাচনের ফলাফল থেকে সর্বশেষ এই বছর গত অক্টোবর মাসে বিহারের রাজ্যনির্বাচন পর্যন্ত প্রায় ভারতের সব নির্বাচনেই মেশিন কারচুপির অভিযোগ অনেক জোরদার হয়ে উঠেছে।
    বিশেষত ২০১৯ সালের নির্বাচনে যা সেসময় অনুষ্ঠিত হয়েছিল সাত পর্বে। এর শেষ পর্বের নির্বাচনের আগের দিন অমিত শাহ আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। হিমালয়ের এক হিন্দু তীর্থস্থানে মোদী ধ্যানে বসেছিলেন, শেষ নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের আগে। সেটা শেষ করে এসেছেন- এই অজুহাতে মোদী ঐ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও সৌজন্যমূলক কিছু কথা ছাড়া আর কিছুই বলেননি। পুরো অনুষ্ঠানে অমিত শাহ একাই কথা বলেছিলেন। অমিতের কথার মূল ফোকাস ছিল কত আসনে বিজেপি জিতবে, এর আগাম অনুমান দেয়া। তিনি দাবি করেছিলেন, মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি একাই তিনশ-এর বেশি আসন পাবে। হয়েছিলও তাই, পেয়েছিল ৩০৩ আসন; যেটা গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়ে আবার ৩৬ আসন বেশি। বিজেপি জোট হিসাবে পরের ২০১৯ সালে মোট পেয়েছিল ৩৫৩ আসন। আর এখান থেকেই কারচুপি বা সফটওয়ার প্রোগ্রাম ম্যানিপুলেশন করার অনুমান জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায় যা এখন ক্রমশ বাড়ছে। সে সময় মূলত দুটি কারণে অভিযোগ, সন্দেহ জোরদার হয়েছিল, এক. অমিত শাহের মোট আসনের প্রেডিকশন বা অনুমিত প্রাপ্ত আসন সংখ্যা আর ২০১৪ সালের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে বিজয়ী হওয়া, যেটা অস্বাভাবিক ঠেকেছিল। কারণ, ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় আগের কংগ্রেস সরকারের সময় অর্থনীতির দশা প্রবল খারাপ হওয়াতে তরুণেরা ব্যাপক চাকরি হারা হচ্ছিল। আর সেই হতাশায় আর সেটা মোদী এড্রেস করাতে তারা মোদীর উপর আশায় বুক বাঁধতে ঝুকেছিল। তাই মোদী বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু পরে ২০১৯ সালের সময় ফেলে আসা পাঁচ বছরের মোদী শাসনে ইতোমধ্যে আরো তিতা হয়ে গেছিল। কারণ ভারতের অর্থনীতি ডুবেছিল এবার অনেক বেশি; যা আবার মোদীর দীর্ঘদিনের পরিসংখ্যান লুকানোর প্রবল চেষ্টার পরেও তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল। আর এই পতন মূলত শুরু হয়েছিল মোদীর ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাঁচশ ও এক হাজার রুপির নোট হঠাৎ বাতিল ঘোষণার ধাক্কায়। ভারতের অর্থনীতির বড় অংশটাই হল ইনফরমাল অর্থনীতি। অর্থাৎ মূল কারখানা উতপাদনের “কাজ সৃষ্টি” নয়। বরং সীমিত কিছু এমন মুল কাজ সৃষ্টির ফলে এবার তাকে সহায়তা করতে যেয়ে আধপেটে খাওয়া কিছু শ্রমিক-ফেরিওয়ালার (বা কারখানা শ্রমিকদের জন্য ভাত রেধে দেয়া বুয়ার কাজ টাইপের) জন্য যে কাজ সৃষ্টি হয় – এটাই ইনফরমাল অর্থনীতি বা কাজ সৃষ্টি।  আর এই অংশের উপরেই নোট বাতিলের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি পড়াতে তাও তখন একেবারে গুটিয়ে যাওয়া; এটা ঘটেছিল মারাত্মকভাবে। তাই পরের ২০১৯ নির্বাচনে বিজেপির আসন কমে হেরে যেত অথবা কম মার্জিনে বিজেপি জিতলে হয়ত এসব সামঞ্জস্তপুর্ণ হত, কিন্তু হয়েছিল এর উল্টা। উল্টা আসন বেড়ে গেছিল। সন্দেহ-অবিশ্বাসের শুরু সেই থেকে।

    একজন রবি কান্তের দুঃখ ও হতাশাঃ
    একজন রবি কান্তের দুঃখ ও হতাশার শুরু এখান থেকেই। কিন্তু এই রবি কান্ত [Ravi Kant] আসলে কে?
    রবি কান্ত ভারতের একজন কলামিস্ট, জার্নালিস্টও বলা যায়। তার লেখার মূল আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি। আর মূলত ভারতের বাইরের পত্রিকায় তিনি লেখেন যদিও তাঁর নিজেরই ভাষ্যমতে তিনি টেকনোলজি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা সাইবার-সিকিউরিটি নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন। এই লেখায় তাঁর এবারের উদ্বেগ এই সাইবার সিকিউরিটির প্রশ্নে।

    এদিকে “এশিয়ান টাইমস” [Asian Times] হংকং থেকে প্রকাশিত ওয়েব ভিত্তিক একটা দৈনিক; সাম্প্রতিককালে যার আরেকটা সিস্টার কনসার্ন আরেক ওয়েবভিত্তিক দৈনিক প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়েছে – ‘এশিয়ান টাইমস ফাইন্যান্সিয়াল’ নামে। রবি কান্ত ভারতের মিডিয়ায় বিশেষত ভারতের “ইকোনমিক টাইমস” ধরনের অর্থনীতিভিত্তিক পত্রিকায়ও বেশি সময়ে লিখে থাকেন। তিনি এশিয়ান টাইমসেও একটা আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে তার লেখার বিষয় “ভারত-রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে” [Systematic collapse of the world’s largest democracy] বলে তাঁর হতাশা আর দুঃখ!

    ‘ভেঙে পড়ছে’ মানে কী অর্থে?
    একটা রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে ও দীর্ঘস্থায়ী হয় স্থায়ী ও সুগঠিত কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কারণে। সে হিসেবে, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ আর সংসদীয় (জনপ্রতিনিধিদের) ক্ষমতা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠাকীকরণ রূপে হাজির হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বলে মানা হয়। যেখানে বিভিন্ন মতামতকে জায়গা করে দিয়ে একটা সমন্বিত ব্যবস্থা ও আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে একে অভ্যাস ও চর্চাকে সবল করা ও নিয়মিত রেওয়াজে নিয়ে যাওয়া হয় ইত্যাদি।

    গায়ের জোর খাটানোর অথবা কখনো চাতুরীর সুযোগ পেয়ে বা বের করে আপনি যখন রাজনৈতিক বিরোধীদের দাবড়িয়ে কোণঠাসা করে রাখবেন আর সেটিই মূলধারার প্রাকটিস বানিয়ে ফেলবেন – এটাই হল এর উল্টা কাজ। গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এবার দুর্বল ও অসংগঠিতভাবেই বেড়ে উঠবে। এতে দুর্বল ও অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত ও খুবই সাময়িক আপনার বিরাট বিজয় এনে দিচ্ছে মনে হলেও নিশ্চিত থাকতে পারেন, অচিরেই আপনি আপনার রাষ্ট্রকে ক্রমেই ভেঙে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন; সেদিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং যাবেনই। সেটা তখন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে যাবে যে, আপনার রাষ্ট্রটা কখন ভেঙে পড়বে! অকেজো হয়ে যাবে!  আবার যেমন ধরেন ক্ষমতাসীন আপনারই সংসদীয় বিরোধী দলের নেতা – তাঁকে আপনি খুন করানোর সুযোগ পেলেন। আর সেটা আপনি না, অন্য কেউ তার নিজের স্বার্থে বাস্তবায়ন করে ফেলবে জেনে তাতে আপনি বেজায় খুশি হয়েছেন। এখন আপনি কী করবেন?  ক্ষমতাসীন আপনি মনে করলেন আমি তো হত্যাকান্ড করছিনা তাই  অন্যের হাতে  বিরোধীনেতার মৃত্যুর সুবিধা পেতে ও নিতে অসুবিধা কী? না, আপনি বিরাট ভুল করবেন। তাই এটা উলটা বিরাট অসুবিধা তৈরি করবে। এমনিতেই ক্ষমতাসীন সরকারে আপনি বলে বিরোধীনেতার নিরাপত্তা দেওয়ার দায় সরাসরি মূলত আপনার। তবু সেটা যদি বাদও রাখি তবে আপনি এতে নিজের  ও রাষ্ট্রের যে ক্ষতিটা করবেন তা হল, এখানে এরপর থেকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধিরা পরস্পর পরস্পরকে খুন করার রেওয়াজ চালু করে ফেলবে, আর সেটার শুরুও আপনিই করলেন। ফলে এখন প্রতি মুহুর্তে বিরোধীদের হাতে নিজে খুন হয়ে যেতে পারেন সে আশঙ্কায় বসবাস করতে থাকেন। আর এর ব্যাপক মানেটা হবে যে – ক্ষমতায় থাকার সময়সীমা শেষে আইনমাফিক পরবর্তি নির্বাচিত ক্ষমতাসীনের হাতে নিরুপদ্রব ক্ষমতা-হস্তান্তরের রেওয়াজ চালু হতে আপনি আর দিলেন না। ফলে আপনার বেলাতেও তা হবার নিশ্চয়তা নষ্ট করে দিলেন। এগুলো কাজেরই নিট ফলাফল  দুর্বল ও অসংগঠিতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাড়া করা। ফলে ধীরে ধীরে এই রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার দিকেই যাবে।
    এসব দিক থেকে দেখে বিবেচনা করে তাই রবি কান্তের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর অনুষঙ্গ হিসেবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও – এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। আর এ নিয়েই তার যত আশঙ্কা ও যেটা তাঁর হতাশার মূল প্রসঙ্গ!

    তাঁর লেখার শুরুতে প্রথম-অর্ধে তিনি ভারতের “গণতন্ত্র” কত মহান, তা নিয়ে প্রায় অর্ধেক জায়গাই ব্যবহার করে ফেলেছেন। যেমন তাঁর লেখার মূল শিরোনাম দিয়েছেন, ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসিকে সিস্টেমেটিকভাবে ভেঙে ফেলা” হচ্ছে। এখানে যদিও আমরা বড় খারাপ চিহ্ন হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, কেউ যখন “গণতন্ত্র” এই শব্দ ও ধারণা দিয়ে কোন রাষ্ট্ ও ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করে বা তুলে ধরে তবে এই মানে হল, ঐ লেখক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে বা  রাষ্ট্রের গঠন প্রকৃতি-বৈশিষ্ট প্রসঙ্গে জানাশুনা তার জানাশুনা খুবই কম ও দুর্বল। আর ঠিক সেকারণে,  অনেক পাঠক এই ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসি’ ধরনের ফাঁকা ও খামোখা প্রশংসা শুনেই বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারেন এবং সেটাই উচিত সম্ভবত। কারণ শব্দটা বাগাড়ম্বর ধরনের। এমনিতেই, শুধু ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দ ব্যবহার করে কেউ ফাঁপা গর্ব করা কথা বললে সেটা বাকচাতুরীতে প্রতারণা ও ফাঁকির আয়োজন হচ্ছে বলে সন্দেহ হতে শুরু হয়। কারণ একটা দেশে নির্বাচন হলেই সেখানে ডেমোক্রাসির জয়জয়কার চলছে বলা বা মনে করা ভিত্তিহীন ও তা চাতুরি। ফলে সেখান থেকে অসততার ইঙ্গিতের শুরু। এটা এক বাগাড়ম্বর আর প্রপাগান্ডা। অথচ ওর ভিতরে খুঁজে দেখলে হয়ত, মানে পাওয়া যাবে যে, সবচেয়ে জঘন্য নাগরিক বৈষম্যের রাষ্ট্র হয়ত সেটাই; অথচ সেদিকটার খবর নাই।  আবার কেউ যখন মহান বা শ্রেষ্ঠত্ব ধরণের শব্দ ব্যবহার করে নিজের রাষ্ট্র সম্পর্কে কথা বলে যেমন “মেরা ভারত মহান হ্যায়” – তাহলে বুঝতে হবে তিনি যে বর্ণবাদী এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে বিশাল ক্ষতিকর চিন্তার ধারক তা তিনি নিজেই বুঝেন না। এমনই ডাম্ব বা ভোতা চিন্তার লোক তিনি।  এ ছাড়াও ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দ ব্যবহার করে যারা নিজেকে প্রকাশ করতে ভালোবাসেন এদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সবল অভিযোগ হল, রাষ্ট্রের আসল গুণ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এদের ন্যূনতম জ্ঞান ও ধারণা নাই বা থাকে না। কারণ রাষ্ট্রের মুখ্য গুণ-বৈশিষ্ট্য সংশ্লিষ্ট অরিজিনাল শব্দ ও ধারণাটা “গণতন্ত্র” নয় বরং শব্দটা হল  “রিপাবলিক” রাষ্ট্র।
    এর প্রমাণ একমাত্র রাজা-বাদশাদের রাজতান্ত্রিক দেশ ছাড়া, বাকি প্রায় সব রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নামের মধ্যে কমন যে শব্দটা সবাই বয়ে বেড়ায়, তা হল ‘রিপাবলিক’। তাতে সেই রাষ্ট্র কমিউনিস্ট কী ইসলামিস্ট কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র যাই হোক না কেন! এসব রাষ্ট্র যখন প্রথম কায়েম হয়েছিল – এমন সবখানেই নামের মধ্যে রিপাবলিক শব্দ থাকতে দেখা যায়, এটা এমনই কমন। তাহলে এই ডেমোক্রেসি শব্দটার উদয় হল কোথা থেকে?
    আসলে ডেমোক্রেসি শব্দটার পেছনে বড় সক্রিয়তা ছিল আমেরিকার – তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে বেকায়দায় ফেলার আমেরিকার “দরকারি” স্বার্থে। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নও নিজেকেও জন্ম থেকেই এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র মনে করে ও দাবি করে এবং শব্দটা তার রাষ্ট্রের নামের  মধ্যেই জন্ম থেকে দেয়া হয়েছিল। ওর পুরা নাম ছিল ইউএসএসআর এবং এই ‘আর’ মানে হল রিপাবলিক। কিন্তু কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম থেকেই ওপেন সার্বজনীন অবাধ নির্বাচন অথবা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন (জনপ্রতিনিধি নির্বাচন) বলতে কিছুই ছিল না। রাখা হয় নাই। জন্মের পর দেওয়া গণভোটের ফলাফল বিপ্লবের পক্ষে তা আসাতে ঐ ফ্লাফল আর কোনদিন সরকারি স্বীকৃতির আলো দেখে নাই। আর নির্ধাচন ধারণাটাই উঠে যায়। আর সেটাকেই পুঁজি করে একে নেতিবাচক হাইলাইট করতে আমেরিকার গণতন্ত্র শব্দটাকে সামনে আনা যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের মতোই এক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করতে পারে; কিন্তু এখানে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ নেই – মানে নির্বাচন নাই; দেখ! অর্থাৎ আমেরিকার দাবি হল রাষ্ট্রের নামে রিপাবলিক শব্দ থাকলেও এদের রাষ্ট্রে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ নাই।
    এ কারণে, জেনে না জেনে ভারত মুল কনসেপ্ট রিপাবলিক বা রিপ্রেজেন্টেশন ইত্যাদি ধারণা থুয়ে “গণতন্ত্রঃ শব্দটা দিয়ে সব ঢেকে ফেলা আর এইশব্দটাকে  পপুলার করার দিকে যাওয়ার শুরু। আর তা থেকে ভারত  ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্রাসির’ দেশ বলে গর্ব করা – এটা হচ্ছে ভারতে নাগরিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয় কি না, এটা নাগরিক নির্বিশেষে সকলে সমান মর্যাদা ও অধিকারের রিপাবলিক কি না এসব দিক বাদ দেয় ও অগুরুত্বপূর্ণ মনে করে ফেলে দেওয়া। আর ভারতে কেবল একটা নির্বাচন হয় কি না এটাই একমাত্র বিবেচ্য করাই হচ্ছে এই ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসি’ বলার না-বুঝ বা অবুঝদের বলাবলি। অথচ স্বাধীন ভারত জন্ম থেকে তো বটেই, এমনকি অখণ্ড ভারতের রাষ্ট্রবিষয়ক চিন্তার প্রথম উন্মেষের সময় (১৮১৫) থেকেই রাষ্ট্র বলতে বুঝা হয়েছিল কেবল এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাকেই। অর্থাৎ শুধু জাতি-রাষ্ট্র নয়, বরং এখানে ‘জাতি’ বলতে মনে করা হয়েছে একটা ধর্মীয় জাতি, একটা হিন্দু-জাতির রাষ্ট্র – এভাবে । ফলে এরপর এই রাষ্ট্রের নাগরিকের তো আর সার্বজনীনভাবে এবং সমান নাগরিক-অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ থাকেনি। বরং এটা বৈষম্যমূলকই হবে, এবং তা হয়েছিল এবং আজও হয়েই আছে। এক কথায়, ভারত জন্ম থেকেই সম-নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। কারণ হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা রাষ্ট্র মানে, তা আর নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হবার সুযোগ নাই। এ কারণে সেই হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাকেই আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে সেকালে হবু পাকিস্তানকেও যেন ঠেলে দেয়া হয়েছিল আরেক ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র হতে; বাধ্য করা হয়েছিল। আর একারণের আমার আবেদন থাকবে গণতন্ত্র শব্দটার ব্যবহার এড়িয়ে চলা। এটা পাবলিকের বা গণ-ক্ষমতার রাষ্ট্র, রিপাবলিক রাষ্ট্র বা জনপ[রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র ইত্যাদি শব্দ ও ধারণা ব্যহার করা যেতে পারে।

    অথচ এই চরম বৈষম্যমূলক অসম-নাগরিকের এই রাষ্ট্রেও যেহেতু নিয়মিত নির্বাচন হয় কাজের এটা দুনিয়ার ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ বলে মিথ্যা ঢোল পেটানোর সুযোগ নেয়া চলছেই সেই থেকে। আরএসএস বা বিজেপির মত দল ভারতে চালু করে ফেলা যাচ্ছে সহজেই, বিনা বাধায়। ভারতের কনস্টিটিউশন, আদালত অথবা নির্বাচন কমিশনের কোনো আইনি বাধা ছাড়াই গুজরাটের মুসলমান গণহত্যাকারি মোদীর মত লোক দল খুলছেন, প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। অথচ কেউ মুসলমান নাগরিক হলে তাকে রাস্তায় ফেলে মাটিতে শুইয়ে বুকের খাঁচার ওপর লাফ দিয়ে উঠে তাকে নির্যাতন-জবরদস্তিতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলাতে চেষ্টা করছে বিজেপি-আরএসএস। এই হল ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ ভারত।

    তবু এত সমালোচনার পরও –  আমরা এখানে এখন রবি কান্তের দুনিয়ার ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ রাষ্ট্র বলে করা অন্ধ প্রশংসাকে পাশ কাটিয়ে যাবো, মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করার খাতিরে। রবির মূল অভিযোগ হল, কোনো রাষ্ট্র মুখ্য যেসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত প্রতিষ্ঠানের উপরে ও কারণে টিকে থাকে, যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি; ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর পাবলিক বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, শেষ হয়ে গেছে (বলেছেন, ডেথ অব ইন্ডিয়াস ক্রেডিবল ইনস্টিটিউশন্স, The death of India’s credible institutions)। কেন?

    ইভিএম রেজিমঃ
    ভারত এখন ইভিএম রেজিম এর যুগে এসে পড়েছে।  ভারতে নির্বাচন কমিশনের শতভাগ ভোট নেয়ার পদ্ধতি ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনভিত্তিক। এই মেশিন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ অনেক দিনের, বিশেষ করে মোদী সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেশি করে এই সন্দেহ-অভিযোগ আরো সুনির্দিষ্ট। তাই আগামীতে হঠাৎ কোন একদিন যদি গত ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সাধারণ নির্বাচনে মোদী ইভিএম মেশিন ম্যানিপুলেট করে ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে প্রমাণ সামনে হাজির হয়ে যায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

    আগামীতে হঠাৎ কোনো একদিন যদি গত ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সাধারণ নির্বাচনে মোদি ইভিএম মেশিন ম্যানিপুলেট করে ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে প্রমাণ সামনে হাজির হয়ে যায়, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

    ‘মোদির নির্বাচনী সফলতার গোপন দিক’ এই উপ-শিরোনামে রবি কান্ত লিখছেন, “সাম্প্রতিককালে নির্বাচন কমিশন ও ইভিএমের বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ কমিশন কেবল ভিত্তিহীন বলেই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। কোন আমল করেন নাই, পদক্ষেপ নেয়নি”। এতে সর্বশেষ বিহারের নির্বাচনে (অনুষ্ঠিত হয় গত অক্টোবর শেষে, যার ফলাফল আসে ১০ নভেম্বর) কমিশনের ওপর মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কমিশন আর নিরপেক্ষ কোন প্রতিষ্ঠান কিনা সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এই নির্বাচনে বিজেপি ও তার জোট ছাড়া প্রায় সবাই ব্যাপক ভোটবাক্স কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। এখানে আগে ক্ষমতাসীন ছিল মুখ্যমন্ত্রী নীতিশের স্থানীয় বা আঞ্চলিক ‘জনতা দল’ তবে এর সাথে বিজেপির জোট মিলে তারা বিহারে ক্ষমতায় ছিল। আর এবার কারচুপির অভিযোগ নিয়ে নীতিশের দলের জোট জিতেছে বলে দেখানো হয়েছে এভাবে যে, নীতিশের দলে হারের ঢল নেমেছে কিন্তু একা বিজেপি এবার ঐ আসন হারের চেয়েও একাই বেশি সংখ্যক আসন পেয়েছে। তাই জোট হিসেবে নীতিশ  আবার মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছেন। এদেখে এবার রবি কান্ত প্রশ্ন তুলেছেন, নীতিশের দল ভোট না পেয়ে গোহারা হারলে সেই ভোট কিভাবে একই জোটসঙ্গী কেবল বিজেপি একাই ততোধিক আসন পেয়ে যায়? [If the people of Bihar were openly opposing Nitish, then why would they vote for his coalition partner the Bharatiya Janata Party (BJP), which would again make him the chief minister? ]

    তাই রবি কান্ত ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে বলছেন, “ভোটিং মেশিনের সবচেয়ে অস্বচ্ছ অংশটা হল ওর সফটওয়্যার যা টেকনিক্যাল, জটিল ও প্রায়ই যাচাই পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ নেই”।  কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে উপায় বের হয়।  কারণ এরপরেও এর স্বচ্ছতা নিয়ে বহু কিছু করার আছে যা ভারতের নির্বাচন কমিশনের [এখন থেকে  একে শুধু ‘কমিশন’ লিখব]। আসলে প্রত্যেকটা সফটওয়্যার মানে, ওর সোর্স কোড থাকবেই। আর সোর্স কোডে কে কে ঢুকেছে, হাত ঢুকিয়েছে (এর অটো রেকর্ড থেকে যায় তাই) [… source-code audit reports] তা দিয়ে জানা যাবে কে কে এ মেশিনে হাত ঢুকিয়েছে। এ কারণে রবি এক তুলনা টেনে বলছেন, “উন্নত দেশে নির্বাচনী মেশিনের সফটওয়্যারের সোর্স কোড কে কে হাতিয়েছে, মানে  একসেস নিয়েছে এর নিরপেক্ষ বিশ্বাসযোগ্য একটা অডিট করা হয় কোন থার্ড পার্টিকে দিয়ে। আর সেই ইন্সপেকশন করিয়ে এরপর ঐ থার্ড পার্টি তাঁদের ইস্যু করা যে  রিপোর্ট ইস্যু করে থাকে সেই রিপোর্টটাই  এবার কমিশনের সাইটের প্রথম পাতায় লটকে দেয়া থাকে। এর সোজা মানে হল, পাবলিক কেউ না চাইতেই কমিশন নিজেই দায়িত্ব অনুভব করে নিজের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রমাণ প্রকাশ্যে হাজির করে রেখেছে। আর ঠিক একাজটাই ভারতের কমিশন করতে দায়ীত্ব অনুভব করে নাই। এরা এমনই স্বঘোষিত অসৎ!

    রবি কান্তের তাই দাবি, “ভারতের ইভিএম প্রচণ্ড মাত্রায় এক অস্বচ্ছ ব্যবস্থা” [Indian electronic voting system is highly opaque]। এ কারণে ‘এখানে এসব অডিট রিপোর্টের কোনো হদিসই নেই, পাবলিককে কোনো তথ্যও দেয়া হয় না’- এটা চলতে পারে না। ভারতের নির্বাচন কমিশন এটা করতেই পারে না।

    সুপ্রিম কোর্টে একটা মামলার পরিণতিঃ
    “সম্প্রতি এ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটা মামলা হয়েছিল যে, এসব ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য কোনো থার্ড পার্টিকে দিয়ে ইন্সপেকশনের ব্যবস্থা করানো ও সেই রিপোর্ট প্রকাশ না করাতে কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করা হচ্ছে – এই হল মূল অভিযোগ কারণ এতে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। আর এটা না করাতেই ইচ্ছামত নির্বাচনী ফলাফল বের করার সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে”।

    রবি বলছেন, “অথচ এত শক্ত যুক্তি তুলে ধরার পরও সুপ্রিম কোর্ট ঐ আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। আর এরপর, নির্বাচন কমিশনের  উপর “করণীয় বলে” কোনো আদেশ না দিয়েই বরং উল্টা ঐ মামলার আবেদনকারীকে আবার নির্বাচন কমিশনের কাছে ফিরে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীকে কোর্ট পরামর্শ দিয়েছিল, কমিশনকে নিরপেক্ষ অডিট করানোর আর ফলাফল পাবলিক করতে যেন তিনি (মামলার আবেদনকারী) কমিশনের কাছে আবেদন করেন। সারকথায়, কোর্ট বাদীকেই ফিরিয়ে দিয়েছে এই বলে যে, বাদি যেন কমিশনের কাছে আবার আবেদন জানায়। আর এতে কমিশনের ব্যবস্থা নিলে আর তা থেকে নতুন যে ফলাফল প্রকাশিত হবে এর তিন সপ্তাহের পরে আবেদনকারী চাইলে আবার আদালতে এসে কোনো আবেদন করতে পারবে”। তাই এবার রবি কান্ত পিনপয়েন্ট করে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু সেই থেকে বাদি কমিশনে আবেদন করলেও ‘আজ পর্যন্ত কমিশনই এ নিয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে”।

    এখানে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি কেমন লোক, কেমন ব্যক্তিত্বের – এরকিছু আলামত নিয়ে কথা বলা যাক। তিনি শরদ অরবিন্দ ববদে (Sharad Arvind Bobde)। যার আপন বাবা চাচারা হাইকোর্টের উকিল বা এটর্নি জেনারেল ছিলেন; মানে তারা ল প্রফেশনের এক ফ্যামিলি। তবু শরদ ববদে-এর আচরণ  খুবই অস্বচ্ছ। মানুষের অনেক কিছুরই শখ বা প্রচন্ড আগ্রহ বা স্বপ্ন থাকতেই পারে। তবু একজন জাস্টিসের আচার আচরণ আপোষের জীবন হতে পারে না।  তাঁর শখ হল, বিশেষ ধরণের মটর সাইকেল চালানো বা চালিয়ে দেখা। এমনিতেই বিচারকেরা কী ধরণের সামাজিক জমায়েতে যাবেন বা যাবেন না – আর কোন সংসর্গ এড়িয়ে চলবেন এর গাইড লাইন আছে। অথচ তিনি এক বিজেপি এমপির এমনই এক বিশেষ মটর সাইকেল চড়ে শখ মিটানোর জন্য তার মটর সাইকেল চেয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে শহরে চড়ে বেড়িয়েছেন।  শুধু তাই না। এরপর এই প্রসঙ্গে জনস্বার্থের দিক থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে আদালত ও জনগণকে সচেতনতা বাড়াতে যিনি কাজ করে যান স্বেচ্ছায় এবং নিজ খরচে মামলা করে থাকেন এমন সুপ্রীম কোর্টের এক উকিল হলেন প্রশান্ত ভূষণ। তিনি এনিয়ে আপত্তিকর পয়েন্টগুলো তুলে এক আর্টিকেল লিখলে তার বিরুদ্ধে চীফ জাস্টিস ববদে আদালত অবমাননার মামলা করে দেন।   আর ঐ মামলায় রায়ে তিনি তাঁকে এক রুপীর টোকেন ফাইন করে রায় দিয়ে দেন। যাতে তার উকিলি সার্টিফিকেট প্রশ্ন বা বাতিলের মুখে পড়ে যায়। যদিও তিনি এখন কোনমতে ঐ ফাইন-শাস্তির আদেশের বিরুদ্ধে একটা আপিল করে শাস্তির কার্যকারিতা সাময়িক স্থগিত করাতে পেরে টিকে আছেন। এ’থেকে এখন পাঠকেরা যা বুঝার বুঝে নেন!

    এ দিকে আরেক ঘটনা হল, গত প্রায় তিন-চার বছর ধরে বিশেষ করে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের একমাত্র এক কমিশনার অশোক লাভাসা তিনি বাকি কমিশনারের সাথে দ্বিমত পোষণ করে প্রায় সব সিদ্ধান্তে “নোট অব ডিসেন্ট” দিয়ে নিজের আপত্তির রেকর্ড রেখে যাচ্ছিলেন। ইস্যুটা ছিল, ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদী-শাহের বিরুদ্ধে উঠা নানান নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কমপ্লেন যার বেশির ভাগের উপর বাকি কমিশনাররা মোদি-শাহকে ক্লিনচিট দিলেও লাভাসা তাদের এসব কাজের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে চলছিলেন, উপনির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা। আর এতেই ক্ষুব্দ মোদী সরকার লাভাসার স্ত্রীর যিনি সরকারি স্টেট ব্যাংকের কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে ভারতের সিবিআই (আমাদের দুদকের মত তবে অনেক বড় ক্ষমতার ও সিরিয়াস ভার্সান বলা চলে) লাগিয়ে হেনস্তা করতে থাকেন। এছাড়া আয়কর বিভাগ তাকে নোটিশ পাঠিয়ে নাস্তানাবুদ করে চলেছেন। এখন এ বছর জানা যাচ্ছে শেষে  নিজেকে বাঁচাতে নির্বাচন কমিশনার লাভাসা এবার কমিশন ছেড়ে অন্য সমতুল্য সরকারি পোস্টে ট্রান্সফার নিয়েছেন। মানে আর বাঁশ বলে কিছুই থাকল না, নাই; তাই বাসুরিয়া বলেও আর কেউ থাকল না!

    আর এখান থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, আগামী বছর (সম্ভবত এপ্রিলে) পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে কারচুপি হবে এবং মোদীর বিজেপি জিতেছে এমন ফলাফলই প্রকাশিত হবে। কারণ এই অবস্থায় একই কারচুপির কায়দায় এরপর আগামী বছরের সম্ভবত এপ্রিলে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে যদি মোদী রাজ্য সরকারে নিজ দলকে বিজয়ী দেখান তাতে অবাক হওয়ার কিছু কি থাকবে?

    দেখা যাচ্ছে, রবি কান্তের ভারত, যেটা ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসির’- এমন ফুটা গর্ব যা-ই থাক সেই গৌরবের ভারত নিয়ে তিনি এখন কী করবেন সে এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে উঠে আসছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “রবি কান্তের হতাশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    গৌতম দাস

    ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gD

    ব্যাপারটা একটু পুরনো। কিন্তু বারবার ফিরে আসে এমন পুরনো রোগ। বীনা সিক্রি [Veena Sikri ] বাংলাদেশে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত। গত ২০০৩-০৬ সময়কালে তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ভারতের প্রায় সকলের সব কিছুতে শো-আপ বা বাড়িয়ে বলা বা দেখানো – এটা এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে তো বটেই সরকারি পর্যায়েও অভ্যাসের মত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে সম্ভবত শো-আপ করাদের শীর্ষ আছেন বীণা। আর বাংলাদেশে তিনি এটা করার আরো সুযোগ নিয়ে থাকেন কারণ তিনি সরকারি আমলা হিসেবে চাকরি শেষ করলেও এখন সাউথ এশিয়ান উইমেন্স নেটওয়ার্কের (South Asia Women’s Network, SWAN)) আহ্বায়ক বলে জানা যায়, এর সুযোগে।

    সিক্রির সেকুলারিজম-বোধঃ
    দেখা যায়, তিনি সবসময় আমাদের যেচে ‘হেদায়েত’ করতে ভালোবাসেন আর ইদানীং তা সবচেয়ে বেশি যা নিয়ে, সেই সাবজেক্ট হচ্ছে  সেকুলারিজম। আবার তাঁর সেকুলারিজম ভাবনাটা ‘বিশেষ’। সেটা যেন উল্টো মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু মুসলমান। তাই যেন বলতে চান, এরা তো একটু খাটো (!), সেটা এখন এঁরা সেকুলার হলে  সমান পক্ষ হতেও পারে!। যদিও এই সাবজেক্ট নিয়ে তাঁর জানা-বুঝা ঠিক বা যথেষ্ট কি না তা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ আছে। এ ছাড়াও অন্য যেসব প্রসঙ্গ তিনি সাধারণত আনেন ও কথা বলেন সেগুলো যেমন – ভারত নাকি পড়শিদের জন্য ‘বড়ভাই’, সে কথাটা আবার উনি নিজমুখেই বলছেন। এমনই ডেস্পারেট এবং যেন  মুল্যবোধের ঘাটতিতে থাকা ও অপ্রয়োজনীয় সংঘাত শো করা মানুষ তিনি। গত ২০১৫ সালে ভারতের এক ওয়েব মিডিয়ায় [livemint] তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন যেটা ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকও পরদিন অনুবাদ করে ছেপেছিল। ওর বাংলা শিরোনাম ছিল- “ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ‘এলডার ব্রাদার’ : বীনা সিক্রি”। আবার ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মুসলমান ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে আটকে গেছে” [Bangladesh is caught between Bengali and Muslim identities: Veena Sikri]। এ ছাড়াও শাহবাগ আন্দোলনের আমলে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলছেন, সেটা নাকি “৭১-এর প্রজন্মের জেগে উঠা ছিল” – ইত্যাদি ধরনের ভারতীয় ব্যাখ্যা যার সার কথা হতে দেখা যায় যেটাকে আমরা প্রচলিত ভাষায় বলি, ইসলাম ‘কোপানো’র সুযোগ নেয়া আর উচ্ছ্বাস দেখানো। তখন প্রশ্নকর্তা অবশ্য শাহবাগের মধ্যে যা দেখেছিলেন সেটা হল এক না- বুঝা অবুঝ চোখে এক “আরব স্প্রিং” বলে একে ভ্রম। অথচ আরব স্প্রিং (নামেও বোঝা যাচ্ছে) সেকালে ঘটেছিল সাধারণত মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রে। আর আমেরিকান এই প্রোগ্রামের লক্ষ্যও ছিল সেটা।  কিন্তু বাংলাদেশের শাহবাগ তো ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত কথিত “সেকুলারদের” আন্দোলন!

    এমনিতেই যারা বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন এঁদের মধ্যে একটা ‘কলোনি দখলদার মাস্টার’ ভাব কমবেশি থাকতে দেখা যায়; যেন তারা ভারত সরকারের ভাইস-রয় বা ‘কলোনি রাজপ্রতিনিধি, আমাদের দেখভাল বা দেখেশুনে রাখতে ও হেদায়েত করতে এসেছেন। ঠিক যে জিনিসটা ১৯৪৭ সালে আগস্টে কলোনিমুক্ত ও স্বাধীন ভারত হয়ে গেলে নেহরুর মধ্যে দেখা গিয়েছিল বা যেত। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তিনি নিজেকে ‘ব্রিটিশ ভাইসরয়’ ভাবতেন যার সবচেয়ে ভাল ও বিস্তারিত প্রমাণ আমরা দেখতে পাই নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষায়। কলোনিদখলি চোখ মনে করে দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌম সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে পারে না। কোন সম্পর্ক হলে তা হতেই হয় দখলদার ও অধস্তনের, এই বিশ্বাস তাঁর প্রখর ছিল। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেহরু যেন ব্রিটিশের উত্তরসূরি; তাই তিনি কলোনি মাস্টারের সেই ভূমিকায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এমন চিন্তার সমস্যার গোড়া হল – নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার মধ্যে; যেখানে দুই রাষ্ট্রের সমমর্যাদার নাগরিক সম্পর্ক বলে কোনো ধারণা বা ইমাজিনেশন থাকে না, কাজ করে না। সব কিছুকেই এরা মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু আর গোলামঅধস্তন বানিয়ে ফেলেন এবং সেভাবে দেখে থাকেন। এর বাইরে ভাবতে পারেন না। অথচ মজার কথা এরাই আসেন আমাদেরকে সেকুলারিজম শিখাতে; আর এতে যদিও আমরা তাঁদের ক্লাস-সেন্স দেখি আর প্রীত হই!।

    বীণা সিক্রির সেকুলারিজম আসলে একজন হিন্দু জাতিরাষ্ট্রবাদীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো বৈ আর কিছু নয়। এটি সবচেয়ে সহজে ধরা পড়ে যখন আমরা দেখি আরএসএস-বিজেপির মতো পাঁড় হিন্দুত্ববাদী দলের মোদী সরকার প্রায় সাত বছর ধরে ভারতে ক্ষমতায়; অথচ বীণা সিক্রির মোদীর বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি বা সমালোচনাই নাই; বরং ভাবটা হল একেবারে সব ঠিকঠাক সুন্দরভাবে চলছে। অথচ “জয় শ্রীরাম” বলানোর জবরদস্তি অত্যাচার নিপীড়নে টেকা দায়, মুসলমান নাগরিকের বুকের খাঁচার ওপর লাফিয়ে উঠছে তাঁরা। কিন্তু বীণা সিক্রির তাতে কোন বিকার আছে আমরা দেখি নাই! তার মানে, সিক্রির সেকুলারিজম ভাবনার ফিল্টারেও আরএসএস বা মোদী পার হতে যেতে পারেন। এর চেয়ে তামাশা আর কী হতে পারে! আবার দেখি – বীনা সিক্রি মোদী-অমিতের ভারতের পড়শি দেশের থেকে কেবল ‘না-মুসলমানদেরই নাগরিকত্ব দেয়া’ হবে এই চরম বৈষম্যমূলক আইন গ্রহণ করেছেন বলে প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন। এমনকি বীণা সিক্রি মোদীর এই আইনের পক্ষে তিনি নিজে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটা ‘ন্যায্য’। এখানে তাকে “বাহ রে সেকুলারিস্ট” ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখি না।

    সিক্রির ভারত ‘এলডার ব্রাদার’ তত্ত্বঃ
    ভারতের বাইরের মানুষ ভারতের বড় ভাই সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে আপত্তি ও নিন্দা জানিয়ে থাকে। অথচ বীণা ভারতের এই অশিষ্ট ও আন-ওয়েলকাম আচরণ এটাকেই ভারতের জন্য গৌরবের বলে মনে করেন বা তুলে ধরে থাকেন।   বীনা সিক্রির এমন বুঝাবুঝির দৌড় দেখে জানা যায়, তার চিন্তা কত স্থুল। আর তিনি মনে করেন, বাকচাতুরি দিয়ে তিনি কথা বলবেন আর এটাকে কূটনৈতিক কথা বলে সবাই তা গ্রহণ করবে বা মেনে নিবে।

    বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জবরদস্তির তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করে আমেরিকা বাংলাদেশকে ক্রমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল; যাতে ভারত যেমন ইচ্ছা আসামসহ নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিটের নামে পুরো একটা করিডোর এবং তা বিনাপয়সায় এবং প্রায়রিটিতে আমাদের দুই বন্দরও প্রায় বিনাপয়সায় ব্যবহার করতে পারে। অবশ্য আসাম নিয়ে ভারতের জন্মের সময় (১৯৪৭) থেকেই নেহরুসহ ভারতের শাসকদের দ্বিধা ছিল যে, আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর মাগনা পেলেও সেটা দরকার কি না, নেয়া ঠিক হবে কি না! এ কথাটা শুনতেই আজব ও অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু কথা সত্য।

    আসামের অসুস্থ দ্বৈততাঃ বাংলাদেশের করিডোর ভোগ করে কিন্তু মুসলমান খেদাও চায়
    ভৌগলিকভাবে, আসামসহ ভারতের পুরা নর্থ-ইস্ট কিন্তু বাকি ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা ল্যান্ডলকড নয় একেবারেই। অন্তত ১৮ কিলোমিটার সংযোগ-ভূমির (চিকেন নেক) দ্বারা এটি সরাসরি ভুমিসংযুক্ত। আবার দেশভাগের সময়ের আগে বা পরে কখনোই নর্থ-ইস্টের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট দরকার বলে ভারত কখনো এমন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা বা আগ্রহই প্রকাশ করেনি। এটাই প্রমাণ করে, ভারত আসামের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট চায় না, অন্তত এই প্রশ্নে তাদের বিরাট দ্বিধা আছে। কেন?

    কথাটা বুঝা খুবই সহজ। আসাম যে যুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে, বাংলাদেশের অগভীর ফিডার বন্দর বা কোন গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা-নেয়ার সুবিধা চাইবে, এরই সাথে সাথে ঠিক একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টের ওপারে আরো উত্তরে আছে চীন। চীনের ঐ ভূখন্ডের বাসিন্দারা তাঁরা পুরোপুরিই ল্যান্ডলকড বলে, তারাও আসামের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে আর একইভাবে অসমীয়দের মত বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া সব করিডোর ফ্যাসিলিটিই পেতে চাইবে। এর সোজা মানে হবে, ভারতকেও আসামের ওপর দিয়ে চীনকে করিডোর সুবিধা পেতে দিতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু এটাই ভারত কখনো চায় না। এতে নাকি ভারতের আসামের ‘পবিত্রতা ও শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে’- এই হল ভারতের প্রকাশ্য যুক্তি।  এটা আসলে নিজ সন্তানকে হাত-পা নুলা করে দিয়ে এবার তাকে দেখিয়ে রাস্তায় বসে ভিক্ষা করানো – এভাবে আয়-ইনকাম করার মত। আসাম ডেভেলপড হয়ে গেলে তা দেখে চীনের সাথে আসামের সীমান্তে লাগোয়া অংশ আসামের উপর দিয়ে করিডোর চেয়ে বসতে পারে তাই, আসামকে নুলা করে রাখতে হবে, এই মনোভাব!
    এ জন্যই আমরা দেখি স্থানীয় (অসমীয়, বোড়ো বা অন্যান্যরা) আসামের বাসিন্দারা কথিত ‘বাঙালিদের বহিষ্কার’ চাইত সেই ১৯৫১ সাল থেকে। কিন্তু কখনো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চায়নি। অথচ আবার ভারতের শাসকরা পিছিয়ে পড়া আসামে (১৯৭২ সালের আগে পুরো নর্থ-ইস্টকে আসাম রাজ্যের অংশ গণ্য করা হত) কখনো অবকাঠামো বিনিয়োগই ঠিকমতো দিতে রাজি হয়নি; সম্পদ নাই বা ঘাটতি বলে এড়িয়ে গেছে। আর তাতে আসামই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবল সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জেগে উঠেছে (এখনও উঠে আছে), তবু ভারত কিছুই করতে রাজি হয়নি, নির্বিকার।
    আমরা নাকি “মাগনা পেলে আলকাতরাও খেতে চাই”- এখন সেই অবস্থা হয়েছে ভারতের। মাগনায় করিডোর পাচ্ছে বলে যেন এখন ভারতের আগ্রহ হয়েছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং হল – বাংলাদেশ বিনাপয়সার পোর্টসহ করিডোর দিচ্ছে; এটা বিজেপির পক্ষ থেকে আসামের বাসিন্দাদের জন্য কোনো উপহার মোদী সরকার এনে দিয়েছে – এটা প্রকাশ্য সত্য হলেও এটা আসামে কোন দলের নির্বাচনী ইস্যু নয়। এখনও এমন মানে বা মনে করা হয়নি। মূল কথা, আসামের এ পাওয়াটা লোপ্রোফাইলে রেখে দিতে চায় ভারত সরকার। কারণ সম্ভবত বাংলাদেশ যে এত বিশাল সুবিধা দিয়েছে এটা বেশি প্রচার করা হলে না বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশ বা মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আন্দোলন বন্ধ (আসামের বাঙালি খেদাও বা এখনকার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে অসমীয় মুসলমানদের খেদানো) করার দাবি বের হতে পারে। এ ছাড়া এর প্রচার বেশি হলে কখন আবার চীন না একই সুবিধা দাবি করে ভারতের কাছে চেয়ে বসে আর বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেয়। এটা অবশ্যই বিরাট এক তামাশা যে, পোর্টসহ করিডোর সুবিধা পাওয়া আসামের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের কোনো দলের নির্বাচনে এটা কোনো ইস্যুই কেউ করতে রাজি না…।

    করিডোর নেয়ার পালটা কী, বাংলাদেশকে কী দিয়ে বুঝ দিবেঃ
    কিন্তু সমস্যা আরেক জায়গায়। আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিলেও ভারতের জন্য এটা কিছু চক্ষুলজ্জার যে, কোন কিছু পাল্টা সুবিধা বাংলাদেশকে না দিয়ে করিডোর নেয়াটা কেমন দেখাবে! তাই এই অস্বস্তিটা কাটাতেই ঠিক করা হয়, বাংলাদেশকে “দুধ-ভাত খেলোয়াড়” বানিয়ে খেলায় নিবে। সেটা কী?
    মরহুম শেখ মুজিব সেই ১৯৭৪ সালে ভারতকে বেরুবাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন, বিনিময়ে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আমাদের ছিটমহলে যাওয়ার করিডোর ভারত দিয়ে দেবে – এই ভূমিবিনিময় চুক্তি হয়েছিল ওই সময়। তাই আমাদের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে শেখ মুজিব আমাদের কর্তব্য করেছিলেন তখনই। কিন্তু ভারত তার দায় কখনো গত ৪১ বছরে পূরণ করেনি। অর্থাৎ এটা আমাদের পাওনা অধিকার হলেও ভারত আটকে রেখেছিল। এ ছাড়া তিস্তার পানি পাওয়াও ছিল আমাদের ভাটির দেশের পাওনা ও অধিকার। আর যা কোনো রাষ্ট্রের পাওনা অধিকার সেটি পেতে আবার নতুন করে ভারতকে কোন কিছু দিয়ে ভারতের সাথে বিনিময় করার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা হবে অনেকটা যেন সেই ঠগের কারবার যে, আমার থেকে ধার নেয়া টাকা ফেরত দেয় না। কিন্তু একবার যে ফেরত দিবার আগ্রহের নামে এবার আমার থেকেই আবার নতুন করে ধার নিয়ে সেই টাকা দিয়েই আমার আগের ধার শোধ করল বলে দাবি করছে; ঠগের বাটপাড়ি যেমন হয়। ভারত সেই ছিটমহল ভূমিবিনিময়ের আইন এবার ৪১ বছর পরে ২০১৫ সালের মে মাসে পার্লামেন্টে পাস করা হয়েছে। আর তিস্তার পানি? সেটাও আমাদের পাওনা হলেও তা আর কখনোই পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

    কিন্তু এই ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে আইন পাস হওয়াটাকে নিয়ে বীণা সিক্রির মন্তব্য সাক্ষাৎকারে দেখেন।  “এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত তার বড় ভাই (বিগ ব্রাদার) পরিচিতি মুছে দক্ষিণ এশিয়ায় জ্যেষ্ঠ ভাই (এলডার ব্রাদার) হিসেবে সম্মান অর্জন করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি” [……By approving implementation of LBA, India has shed its “big brother” tag and acquired an “elder brother” status in South Asia, says Veena Sikri ]। দেখেন কারবার! আসলে টাউটারিতেও তো কিছু সীমা থাকে। সিক্রি সেটাও ছড়িয়ে গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, সিক্রির আরো চাপাবাজি হল, তিনি বলছেন – সংসদে এই আইন পাস করে দিয়ে নাকি মোদী তাঁর “প্রতিবেশী প্রথম” [neighbourhood first] মতবাদ কাজে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন”। এ ছাড়া আরো আছে। সিক্রি বলেছেন, এই আইন পাস হওয়াতে নাকি, “ভারতের জন্য ভূখণ্ডগত জাতীয় ক্ষতি হয়েছে” [for India, it’s a notional loss of territory]।  এটা কলোনিদখলবাজ ইংরেজদের চেয়েও শঠতাপূর্ণ কথা। কারণ এটা ছিল ভূমির বিনিময়ে ভূমি নেয়ার চুক্তি। তাই তথাকথিত কোন আত্মত্যাগের বালাই নাই এবং নয় এটা। এটা কারো জন্যই একপক্ষীয় কোন ভূমি হারানোই নয়। আমরাও সমতুল্য ভূমি হারিয়েছি। অথচ সিক্রি এটা এখানে তুলে ধরছেন ‘ভারতের দয়া’ বলে, “একপক্ষীয় ভূমি হারানো” বলে। ফলে সত্যিই আমরা ঠগের পাল্লায় পড়েছি দেখা যাচ্ছে। এটাই হলো, টিপিকাল ছেচরামো! আমরা নির্বাক!

    এভাবে সর্বশেষ যে মিথ্যা বলা আর চাপাবাজিটা বীনা সিক্রি করেছেন আর আবার এদেশে লেখা ছাপিয়েছেন, সেটা গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, বাংলা-ইংরেজি দুভাবেই ছাপিয়েছিল [তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত]।

    এ ছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে গত ২৯ আগস্ট এক ভার্চুয়াল ওয়েবনিয়ার আলোচনায় তিনি আবার আরো মিথ্যা ও চাপাবাজি করতে গেছেন। এটাই তাঁর তথাকথিত নষ্টা-সেকুলারিজম নিয়ে। এর আয়োজক ছিল Indian Council for International Cooperation নামে কেউ। সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন, “বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন বঙ্গবন্ধুর লিগ্যাসি এবং ওর মধ্যে সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে কিছু বৈশিষ্ট্য আছে – যেগুলো ইন্ডিয়ান কনস্টিটিউশনের সাথে কমন”।   ……….. “ঢাকার ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন আমাদের দুই দেশের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক শুরু করতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে”।

    ইসলাম-কুপানি নষ্টা-সেকুলারিজমঃ
    লক্ষ্য করা যাচ্ছে বীনা সিক্রি ইদানীং সুযোগ পেলেই ‘জ্ঞানী’ লোক হওয়ার আর বাংলাদেশকে সেকুলার হতে জ্ঞান দেয়ার উৎস হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চাইছেন। কিন্তু আমরা সত্যিই খুব দুঃখিত! আমরা মনে করি, তার কনস্টিটিউশন বা সেকুলারিজম বিষয়গুলো নিয়ে নুন্যতম কোন জ্ঞান বা ধারণাই নেই। সাথে কিছু ফ্যাক্টস প্রসঙ্গেও একেবারেই জানা নাই। কিন্তু এজ ইউজুয়াল আন্দাজে বলা ঠিকই আছে। বীণা সিক্রি চাইলে  একেবারেই কান খুলে শুনে রাখতে পারেন, নিচের বাক্যটাঃ

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি আমরা তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোন পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে।

    মানুষ মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত শিখে এবং চাইলে শিখতেও পারে। সিক্রি, আপনার উচিত হবে এ বিষয়ে পড়তে বসা, স্টাডি করা। দুঃখজনক হল – নেহরু, গান্ধীসহ যারা আগের ভারতের নেতা ছিলেন এমনকি ইন্দিরা গান্ধী এরা কেউই উপরে যে প্যারাটা লিখেছি, সে কথাগুলো জানতেন তা মনে হয় না। সে কারণে ভারতের কনস্টিটিউশনেও সেকুলারিজম শব্দটা আগে ছিল না। এরা সবাই সেকুলারিজম কী করলে একমাত্র হয় সে বিষয়ে জানাজানি শেষ না করেই মারা গেছেন। সেটা তাঁদের এজেন্ডাও ছিল না মনে করার কারণ আছে। কারণ কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে জন্মের পর থেকে যে রাষ্ট্রের ধারণা রপ্ত ও বাস্তব করেছে সেটার মূল বৈশিষ্ট হল –  এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র।

    তাই একটা সত্য আগে জেনে রাখুন। সেকুলারিজম লিখে রাখা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের দুই কনস্টিটিউশনে এটি কমন কথা এবং কমন ভিত্তি এবং এই কমন ভিত্তির বলে যে নতুন ধরনের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক কথা বীনা বলেছেন তাও অর্থহীন এবং ভিত্তিহীন – অসত্য ও ভুল।

    ফ্যাক্টসটা হল – বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সময় রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন নীতি লেখা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ১১ বা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১।  এরপরে ১৯৭১ সালের অক্টোবরেও – ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেক এই অনুরোধ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার থেকে তত দিনে তিনবার চাওয়া হলেও ভারত তা দেয়নি। কারণ ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্র বিষয়ক ধারনায় অস্পষ্টতা ছিল। কিন্তু যেটা তাকে তাড়া করছিল তা হল,  ভারত মানে মূলত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ভারত যার জন্মের শত্রু পাকিস্তান যে পাকিস্তানের পুর্ব অংশ যা বাংলাদেশ নামে সাধীন হতে চাইছে কিন্তু সব ছাপিয়ে ইন্দিরাকে যা খোঁচা দিচ্ছে এরা তো নব্বই ভাগই মুসলমান – এই মুসলমানদের স্বাধীন হতে তিনি কেন গাটছাড়া বাধবেন? তাই তিনি একটা নিশ্চয়তা চাচ্ছিলেন, একটা রক্ষাকবচ চাইছিলেন। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সবগুলো পক্ষই এলাইয়েন হয়ে যাবার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে সবাই সক্রিয় হবেনই এটা নির্ধারিত হয়ে গেছিল একাত্তরের আগষ্টেই। যেমন বাস্তবত সুযোগ ছি না নাহলে ইন্দিরাই মন শান্তির জন্য তিনি হয়ত অনুরোধ রাখতেন তোরাও ভারতের মত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে যা। তাই এরই বিকল্প শব্দ যা সম্ভবত তার পরামর্শকেরা তাকে দেয় সেটা হল “সেকুলারিজম”।  কিন্তু একটা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন কী করে সেকুলার গণ্য হয়, কী করে তা নিশ্চিত করতে হয় তা তারা কেউ জানতেন না।  জানতেন না এত কঠিন শব্দ উচ্চারণ করে বলছি এজন্য যে  – এই কাজটা অন্তত “আমরা সেকুলার” অথবা “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” এভাবে  তা কনষ্টিটিশনের প্রতিটা পাতায় লিখে রাখলেও তা হবে না। ফলে ইন্দিরার “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” – লিখে রাখা দেখেই নিশ্চিত বলা যায় যে তাঁরা এটা কেউই জানতেন না। ইন্দিরার ভয় যে বাংলাদেশ না কথিত ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে যায় – এটাই ছিল তাঁর আসল ভয়। কিন্তু তিনি জানেনই না এই ভয় তাড়ানোর পথ কী। তাই পুরা আনাড়ী হয়ে সেকুলারিজম শব্দটা তিনি আকড়ে ধরেন।  এতে তখনকার মত বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারকে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর যে  ড্রাফট বা পরামর্শটা পাঠান যাতে তিনি সররত আছেন জানান  সেখানে – সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতির কথা উল্লেখ করে- এটাই ভিত্তিতে বাংলাদেশ যেন নতুন করে অনুরোধ পাঠায় ইনফরমালি তাই বলা হয়েছিল।

    আরেকটু বলে রাখা ভাল, হিন্দু-ভারত ও প্রগতিধারীরা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়ে গেল কিনা এনিয়ে প্রবল শঙ্কায় থাকে যদিও ভারত নিজেই যে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে জন্ম হয়ে আছে সে খবর তাঁদের নাই। তারা প্রায়ই আপত্তি তুলে পাকিস্তান একটা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়েছিল। কিন্তু কেউই বলতে পারবে না কি দেখে তারা তা বুঝেছিল তাও বলতে পারবে না। কেবল আপাত জ্ঞানীরা দাবি করবে পাকিস্তানের ফরমাল নাম দেখে – সেটা হল ইসলামি রিপাবলিক অফ পাকিস্তান। এই নামের মধ্যে ‘ইসলাম” লেখা থাকার কারণে। কিন্তু শব্দটা আসলে ডেকোরেটিভ বা নেহায়তই সাজানোর জন্য।  পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টমূলক শব্দ হল রিপাবলিক, একমাত্র যা দিয়ে ওর ক্যারেকটর প্রকাশ পায়। এর অর্থ হল, এটা নাগরিকের ভোটে প্রতিনিধিত্বে নির্বাচিত ক্ষমতার রাষ্ট্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা হল, এই নাগরিক হিন্দু এবং মুসলমান দুধরণের যেকেউই হতে পারে। মানে হিন্দু নাগরিকের ভোটটা অর্ধেক বলে গণনা হবে তা নয়। একজন মুসলমান নাগরিকের ভোটের মত সমান হিন্দুর ভোটটাও ঐ এক ভোট বলেই গণনা হবে। যদিও পাকিস্তান রাষ্ট্রে নাগরিক বৈষম্যমূলক কিছুই ছিল না এমন দাবি এখানে করা হচ্ছে না।

    জাতিরাষ্ট্রের ভুল নয়, দরকার বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক রাষ্ট্রঃ
    যাহোক কথা শেষ করতে এখন সংক্ষেপ করব। আসলে বাই ডেফিনেশন রিপাবলিক শব্দের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত যে আরেক অর্থ আছে তা হল এখানে নাগরিক বলতে সবাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক হতেই হবে ধরে নেয়া হয়েছে। তাতে নাগরিকদের মধ্যে  ধর্মীয় বা গায়ের রঙ, বা পাহাড়ি-সমতলি ধরনের ইত্যাদি যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন। আইডিয়েলি এটাই হল রিপাবলিক ধারণা। সেটাকে আরও স্পষ্ট রাখার জন্য “সাম্য নীতির” কথা অনেকে আলাদা করে উল্লেখ করে রাখে অনেক কনষ্টিটিশন। আর যে কনষ্টটিউশন সাম্যনীতি মানবে বলে পাবলিককে প্রতিশ্রুতি দেয় সেটাই (কোন ধর্মবিদ্বেষী নয়) সত্যিকার সেকুলার রাষ্ট্র বলে বিবেচিত হবার জন্য যথেষ্ট। তাই মূলকথা ” নাগরিক সাম্যনীতি মানবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়াই – যথেষ্ট। এরপরে ঐ রাষ্ট্র আর সেকুলার কিনা এটা বোকার প্রশ্ন। ধর্ম কুপানোর বদ-চিন্তার সাথে নষ্টা-সেকুলারিজম এতে বিদায় হতে পারে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র আলাদা করা এটাও আরেক বদ-চিন্তা, মূলত অপ্রয়োজনীয় চিন্তা।

    কিন্তু সাবধান লেখাই যথেষ্ট না। সামাজিক রাজনৈতিক প্রাকটিস বা চর্চায় সেকথাকে বাস্তব করে দেখানো এটা আলাদা কাজ। সেটা আলাদা করে অর্জনের বিষয়। কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার প্রায় দুশ বছর পরেও আমেরিকায় – “ব্লাক লাইফ ম্যাটারস” বলে আন্দোলন করে মানুষে হুশ ফিরাতে হয়।

    যারা সেকুলারিজম জিনিষটাই খায় না মাথায় দেয় বুঝে না তারাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলারিজম লিখে এবার প্রবল্ভাবে ইসলামবিদ্বেষী চর্চায় মেতে উঠে।

    বীণা সিক্রির কথায় ফিরি আবার। এখন সার করলে, এর মানে- ১. সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতি করার শর্তেই নিরুপায় বাংলাদেশকে ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে হয়েছে। ২. তখনও ভারতের কনস্টিটিউশনে এই চার নীতির কোনো শব্দই ছিল না। তা অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে আমাদেরও ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে, নতুন করে ভারতের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে নিবার সময় [THE CONSTITUTION (FORTY-SECOND AMENDMENT) ACT, 1976]। এবং বলা বাহুল্য ভারতের সমাজ রাজনীতিতে যার কোন ইম্প্যাক্ট বা ভুমিকা নাই। কারণ, থাকলে আরএসএস বা মোদী সরকারের জন্ম হবার কথা না। তাই মূলত কাজটা ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতের যারাই এই কথিত ও নষ্টা-সেকুলারিজমের ভক্ত অথবা যারা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার হয় কিভাবে বুঝেন না তাদের সবার চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করে এবং এ অজ্ঞতা চিহ্ন হয়ে থেকে গেছে – সেকুলারিজম লিখে রাখা না রাখা পর্যন্তই এদের জ্ঞান।

    এক দিকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার সময়ে কী কী বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যথেষ্ট ধারণা না রাখা, অন্য দিকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার পরিণতিই হলো আমাদের তিন দেশে (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সব অসাম্যের সবচেয়ে বড় কারণ।  কারও মনের দগদগে ধর্মবিদ্বেষ ও ঘৃণা যেন সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে এজন্য সেকুলারিজম ধারণাটাকেই এর সাফাই-হাতিয়ার করে হয়েছে। নষ্টা-সেকুলারিজমকে – সেভাবে ব্যবহার করা হয়ে এসেছে এত দিন।

    আবার তাজউদ্দিন যা লিখতেই বাধ্য হয়ে থাকেন, বাংলাদেশের মানুষরা সচেতন, তাই তাদের প্রতি এই বিদ্বেষ ও ঘৃণা তারা টের পেয়েছে। তাই তারাও কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলারিজম’ বলে এক শব্দ লিখে রেখে সকল নষ্টামি চিন্তাকে প্রতিরোধ ও শায়েস্তা করতে, কিছুটা রাগে ক্ষোভে পাল্টা – আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস বা রাষ্ট্রধর্ম ধরনের শব্দ বা ধারণা ঢুকিয়ে রেখেছে। যদিও তারা ভালোই জানে, এগুলো লিখে রাখা বা না রাখার সাথে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নড়াচড়া হবে না, হওয়ার কোনোই সম্পর্ক নেই।

    যারা নষ্টা-সেকুলারিজমের শয়তানি থেকে বেরিয়ে শুদ্ধ হতে চান, তারা আরেকটু একটু খোঁজখবর করতে পারেন। রাজা রামমোহন রায় যাকে ভারতের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলরা ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় ‘রেনেসাঁর আদিগুরু’ বলে সবাই জানেন ও মানেন, তিনিই তো ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন, ১৮১৫ সালে। তা হলে এখানে রেনেসাঁর আদিগুরু ধর্ম চালু করেন কেমনে? আর সেই ধর্ম এখানে ইতিবাচক হয় কেমনে?

    প্রগতিশীলদের এক প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী ছিলেন। কারণ তার দাদা দ্বারকানাথ শুধু রামমোহনের অনুসারী ছিলেন না, ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা গেলে তিনিই ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ১৯১১-১৫ সময়কালে ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র ‘তত্ত্ববোধিণী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

    কিন্তু তবু সেকুলারিজম বলি আর নাই বলি, বৈষম্যহীন সার্বজনীন সম-নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র কেন কায়েম হয় নাই আমাদের তিন রাষ্ট্রে – আমাদের সেই আদি-পাপ অন্যখানে – সেকথা এখনও বলা হয় নাই। রামমোহন ভাবতেন ১. রাষ্ট্র মানেই তা নেশন-স্টেট, ২. আর নেশন বা জাতি মানেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি।

    এই বোধটাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক ধারণা বা রিপাবলিক ধারণা বুঝতে না পারা বা পৌছাতে না পারার প্রধান বাধা, মুল কারণ – যেটা রামমোহন রায়ের আদি-পাপ। আমরা তিন রাষ্ট্র যার ভুক্তভোগী সাফারার!

    আর এসব ধারণা মূলত কলোনিবৃটিশ রাজের আমলের জাতি বা জাতিরাষ্ট্র এর ধারণাজাত। কিন্তু হিটলারের উত্থান ভয়াবহতা দেখার পরে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে নিজেদের ভূল সংশোধন অরে নিয়েছিল। আমরা যার খবর জানি না।

    তবু রামমোহন উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমন করেছিলেন সেটা মনে করা ভুল হবে।  আসলে ভারতের সবাইকে ব্রাহ্মধর্মে নিয়ে গিয়ে এরপর সবাইকে নিয়ে এক ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্র গড়তে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন বলেই এই ধর্ম চালু করেছিলেন। তবে তা সফল হয়নি। যদি সফল হত তবুও এটা রাষ্ট্র বিষয়ে ভুল ধারণা ।  আর প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনাকারী এই রামমোহন রায়। তা হলে ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগ গঠন এবং জিন্নাহকে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দায়ে অভিযোগ আনা কিভাবে সঠিক হয়? সর্বোপরি ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস দল সেটা তো এই রামমোহন রায়ের উদ্যোগেরই শেষ পরিণতি।

    তবু একজনের কথা এখানে উল্লেখ করে রাখি যার “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার” ইচ্ছাটা উদ্দেশ্যমূলক। বাকিটা পাঠকেরা আরও খোঁজ করেন। তিনি হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধায়। ১৮৭৯ সালে তাঁর লিখিত এক প্রবন্ধপুস্তক – নাম ছিল ‘সাম্য’। কিন্তু বইটার দ্বিতীয় মুদ্রণের সময় তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন, আর ছাপান নাই। রামমোহন বলা যায় অকালেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। কিন্তু এরপরেও যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না এটা সকলেই বুঝতে পারছিলেন। শেষে ১৮৭২-৭৮ সালের মধ্যে এটা তিন টুকরা ভেঙ্গে যায়। এরপর যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে বলে এটাকে সাফাই হিসাবে ব্যবহার করে হিন্দু প্রকল্প মানে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প করে আগিয়ে যান তাঁদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম। এসবেরই পরিণতি ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস। কিন্তু মুসলমানেরা কেউ একটা হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পকে নিজের মনে করে নিবে সেকথার কোন জবাব দেয় নাই। বরং এদের স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র চিন্তা যে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প চিন্তা তা ক্রমশ লুকিয়ে চলার কৌশল নিয়েছে। সামনের হিন্দু শব্দটা উচ্চারণ এড়িয়ে চলেছে। তবু প্রধান চিন্তার ভুল বা আদি-পাপ হল রাষ্ট্র মানেই ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র এই রাষ্ট্র-বুঝ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২১ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বীনা সিক্রির নষ্ট সেকুলারিজম” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে, ভারতের পরিকল্পিত ফেক নিউজ

    করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে, ভারতের পরিকল্পিত ফেক নিউজ

    গৌতম দাস

     ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3eu

    প্রথম ছবিটা ভারতের scroll.in মিডিয়া ওয়েব সাইট থেকে নেয়া। ভারতের CNN-News18  টিভির অফিসিয়াল টুইটার পেজ থেকে নেয়া স্ক্রিন শর্ট। যেখানে লেখা আছেঃ
    #ImranUnderSeige – Civil War breaks out in Pakistan.
    Clashes between Sindh Police and Pakistan Army.
    Chorus for Imran Khan’s ouster grows.
    Massive explosion in Karachi kills 5
    @Arunima24 reports from New Delhi.

    আর দ্বিতীয় ছবিটাও নেওয়া হয়েছে একই উৎস থেকেঃ তবে এটা পাকিস্তান থেকে পালটা ঠাট্টা করে দেয়া এক টুইট বার্তা। বলা হয়েছেঃ ব্রেকিং নিঊজ। করাচির গুলশান-ই-বাগের এই সাহসী নওজওয়ান পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের এই বিমানটা থামিয়ে দিয়েছে। নাগরিকেরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেমেছে।
    ছবির ক্যাপশন শেষ এখানে।


    জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটা পারস্পরিক টেনশন অস্বস্তি সবচেয়ে ঠান্ডা সময়েও বর্তমান থাকে। কিন্তু এরও কিছু নিয়ম ও সীমার মধ্যে তা থাকে। কিন্তু এবার সেসব সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। গত ২০ অক্টোবরের ঘটনা।  ভারতের লিডিং মিডিয়াগুলো আর সোশাল মিডিয়ায় ভুয়া একাউন্ট থেকে যে ফেক নিউজ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা হল, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাক আর্মি ও সিন্ধ পুলিশের মধ্যে বন্ধুক যুদ্ধ (ফায়ার ফাইটিং) থেকে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, পুলিশের আইজিপিকে অপহরণ করা হয়েছে ইত্যাদি। আমাদের মত যেকোন দেশের মত পাকিস্তানেও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিক সংঘাত হয় অথবা তা থেকে সময়ে অনেক ধরণের উত্তেজনা তৈরি হয়। আর অনেক সময়ই সেসব বিষয় নিয়ে পড়শি ভারত বা পাকিস্তানে চুইয়ে পড়া ধরণের যেটুক কিছু কিছু খবর তারা স্থানীয় মিডিয়া থেকে সংগ্রহ করতে পারে তাই ছাপা হয়। কিন্তু কখনই উৎস দেশের মিডিয়ার চেয়েও পড়শি দেশে ছাপানো তথ্য বেশি বা বানানো ফেক নিউজ হয়না কখনও। কিন্তু এবার করাচীতে – আর্মি-পুলিশ, পরস্পরের ফায়ার ফাইটিং, গৃহযুদ্ধ, আইজিপি অপহরণ ইত্যাদি – ধরণের শব্দ ব্যবহার করে ভারতে এই ফেক নিউজ ছেয়ে ফেলা  হয়েছে। এটা মারাত্মক এবং সীমা ছাড়ানো ঘটনা নজিরবিহীন। সবচেয়ে মারাত্মক হল এই ফেক এমনই যে করাচীতে “গুলশান-ই-বাগ” বলে কোন পারা বা এলাকাই নাই। এটা এমনই অর্গানাইজড মিথ্যা। ঘটনা অনুসন্ধানে এটা ভারতের গোয়েন্দা, মিডিয়া ও সরকারের যোগসাজশে ঘটানো ঘটনা বলে অনুমান করার কারণ আছে যা নওয়াজ শরীফসহ বিরোধীদলীয় জোটের সাথে ভারতের আঁতাতের ইঙ্গিত বহন করে। বিবিসির চোখে এটা সংগঠিত ও “সমন্বিতভাবে” মিথ্যা বলার ঘটনা। কিন্তু কেন?

    পাকিস্তানে কথিত সেনা-পুলিশ সঙ্ঘাতের ফেক নিউজ করে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়া ভারত ছেয়ে ফেলেছে; অনেক সেলিব্রেটি যাদের অ্যাকাউন্ট ভেরিফাইড চিহ্ন লাগানো তারাও সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসব ফেক নিউজ কপি করে ছেয়ে ফেলেছেন। এ অবস্থায় ওই ফেক নিউজ প্রসঙ্গে এর বিরুদ্ধে ‘বিবিসি বাংলা’ ও তুরস্কের ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’ এজেন্সি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আলাদা রিপোর্ট ছেপেছে।

    টিআরটির রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘ভারতীয় মিডিয়া নির্দয়ভাবে গণউন্মাদনা জাগিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কাল্পনিক গৃহযুদ্ধের খবর প্রচার করছে’ [Mass hysteria as Indian media relentlessly covers imaginary war in Pakistan]। আর বিবিসি বাংলার শিরোনামটা হল – “করাচিতে গৃহযুদ্ধের ভুয়া খবর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে মাতামাতি।
    তবে পরবর্তিতে ভারতের এই ফেক নিউজ করা নিয়ে পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন ঠাট্টা তামাশা বা টিটকারি করা হচ্ছে বলে পাকিস্তানেই পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে তেমনি বিবিসিও কোথায় কিভাবে কারা এই নানান ফেক নিউজ তৈরি করেছে
    , আর কিভাবে কারা কারা তা প্রচার করেছে এরই এক লম্বা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছে। এটি মূলত বিবিসিরই নিজের যেটা ফেক নিউজ ধরা বা চেক করার বিভাগ আছে, ‘বিবিসির রিয়েলিটি চেক’ ও ‘বিবিসি মনিটরিং’ নামে, এদেরই মুখ্য তৎপরতা ও সহায়তায় তৈরি করা এক রিপোর্ট। যেমন বিবিসি ঠাট্টা টিটকারি প্রসঙ্গে বলেছে, ‘সিভিলওয়ারকরাচি’, ‘ফেইক নিউজ’ এবং ‘ইন্ডিয়ানমিডিয়া‘ হ্যাশট্যাগে তারা অনেক রঙ্গ রসিকতামূলক পোস্ট এবং মিম শেয়ার করেছে টুইটারে’।

    করাচীতে “গুলশান-ই-বাগ” নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নাই; অথচঃ
    করাচিতে যে নামে কোন পাড়াও নাই, সেখানে “সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে” বলে টুইট করা হয়েছে।  বিবিসি লিখেছে, “প্রথম এই টুইট কে করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। বিবিসি অনেক খোঁজখবর নিয়েও @drapr007 নামের এই টুইটার অ্যাকাউন্টটি কে চালায় সে সম্পর্কে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। (তবে) এই টুইটের এক ঘন্টা পর একই অ্যাকাউন্ট থেকে আরেকটি টুইট করা হয়। এবারের টুইটে ব্রেকিং নিউজ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বলা হয়, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে। যারা করাচী শহর চেনেন, তারা জানেন যে সেখানে গুলশান-ই-বাগ নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নেই। কিন্তু বেশিরভাগ পাঠক তো আর সেটি জানেননা”।

    “…টুইটে ব্রেকিং নিউজ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বলা হয়, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে। যারা করাচী শহর চেনেন,তারা জানেন যে সেখানে গুলশান-ই-বাগ নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নেই”।

    অথচ এই ফেক তৎপরতায় ভারতীয় মিডিয়ায় এমন ব্যক্তিত্বও আছেন যাদের অবস্থান এমন কোন হালকা কিছু নয়, বরং সিরিয়াস ও রাষ্ট্রীয় পদকজয়ী সম্পাদকও আছেন। অথচ এদেরও ফেক নিউজের প্রতি আগ্রহ এখন খুবই তীব্র মনে হচ্ছে, যার কারণ সম্ভবত তারা চীনা সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখে নিজেদের মানে ভারতের ভবিষ্যত নিয়েই হতাশ ও যেন অনিরাপদ বোধ করছে! তাই তারা কোন ধরণের চেক না করে নেয়া ফেক নিউজ প্রচারে অংশ নিয়েছেন, আর নিজেদের পত্রিকার এমন শিরোনাম করেছেন ও ধরা খেয়েছেন। যেমন- বিবিসির এমন তালিকায় আছে “সিএনএন-নিউজএইটিন (CNN-NEWS18), জি নিউজ (ZEE NEWS) ও ইন্ডিয়া টুডে (IndiaTODAY) পর্যন্ত’ – এমন মিডিয়া। অর্থাৎ এরা বিজেপি দলীয় প্রপাগান্ডা করা কোন পেড মিডিয়া বা পারসন নয়, এর বাইরের। এর আগেও ভারতের এই ফেকপ্রীতির দশা দেখে আগে যেটা মনে হত এটা বোধহয় কেবল বিজেপি-আরএসএস এর সমস্যা। (দেখুন বিবিসির রিপোর্টে ভারতের ফেক নিউজ ফ্যাক্টরির ততপরতা নিয়ে )। কিন্তু এখন এটা প্রমাণ করে যে ভারত রাষ্ট্র ও সমাজে কতটা নিচে নেমেছে। আর এই ফেক নিউজ ছড়ানো আসলে ভারতীয় গোয়েন্দা, মিডিয়া ও সরকারের এক যোগসাজশ ততপরতা।
    যেমন – এরা অর্ণব গোস্বামী বা রিপাবলিক টিভিসহ হিন্দি বা মারাঠি ভাষায় প্রচারিত বিজেপি দলীয় মিডিয়া প্রপাগান্ডিস্ট যারা আছেন
    , এদের মত কেউ নয়। যেমন ইন্ডিয়া টুডের সম্পাদক রাজদ্বীপ সরদেশাই; তিনি এটা ছাড়াও আরো অনেক মিডিয়া গ্রুপের সাথে জড়িত সম্পাদক-সমতুল্য নানান পর্যায়ে। তিনি এত খারাপ রেপুটেড কোন লোক নন, বরং ভারতের বিচারে নতুন ধরনের মিডিয়াব্যক্তিত্ব (সে সময় নতুন উদ্যোগ এনডিটিভির সাথেই শুরু থেকেই রাজদ্বীপের উত্থান হয়েছিল ) হিসেবে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত। অথচ তার নিজের পত্রিকার হেডলাইনেও একই রকম ফেক নিউজ। শিরোনামে লিখেছেন, “করাচিতে সিন্ধু-পুলিশ প্রধানকে অপহরণ করা হয়েছে” – এধরণের ফেক রিপোর্ট। বিবিসি সেটারও এক স্ন্যাপ শট তুলে এনে ছাপিয়েছে  প্রকাশিত ঐ রিপোর্টে।তবু আমাদের আজকের লেখার প্রসঙ্গ ঠিক পাকিস্তান নয়; বরং কেন ভারত সরকার ও তার প্রভাবে তার মিডিয়া এমন প্রচারণা চালাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে? এটা কিসের ইঙ্গিত? আর মূলত কেন এই ইঙ্গিত আমাদের জন্যও ভয়ঙ্কর? আমাদের বেলাতেও এটা ঘটতে পারে কেন? এনিয়ে কথা বলব।

    বিরোধী জোট পিডিএম (পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট)
    পাকিস্তানে এক বিরোধী জোট তৈরি হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে। এই জোটের আলাদা নামও দেয়া হয়েছে – পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম)। এর চেয়েও মজার দিকটা হল এই জোটের প্রধান বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে মওলানা ফজলুর রহমানকে। আর খুব দ্রুত চলতি মাসজুড়ে চলছে তাদের সিরিজ জনসভা। তাদের এবারকার জনসভার স্টেজে দেখা যাচ্ছে বয়স্ক মওলানা ফজলুর দুই পাশে জোটের প্রধান দুই দলের দুই তরুণ প্রতিনিধি – মরিয়ম নওয়াজ শরিফ আর বিলওয়াল ভুট্টো।  দুই জেনারেশনের মিলন বা জংশন-মূলক এই চিত্রটা ইতিবাচক মনে করা যেত কিন্তু সমস্যা হল, এসব নিউ জেনারেশনের নেতাদের পিতারা দুর্নীতির দায়ে বিচারে অভিযুক্ত বলে সর্বোচ্চ আদালতের রা কাঁধে নিয়ে এখন জেলের বাসিন্দা; সে কারণেই তারা এখানে। আর এই দুর্নীতির অভিযোগ দু-এক কোটি রুপির নয়, মিলিয়ন ডলার তো বটেই, বিলিয়নেও মাপতে হতে পারে। অনুমান করা হয় তা দুই বিলিয়নের বেশি ডলারের। নওয়াজ শরিফ আরো ‘শ্রেষ্ঠ’। তিনি নাম তুলেছেন মানে তা প্রকাশিত হয়েছে ‘পানামা পেপারস’ নামে পরিচিত এক অর্থপাচার কেলেঙ্কারির ডকুমেন্টে। যেটা ‘অফশোর অ্যাকাউন্টে’ যারা টাকা পাচার করে রেখে দিয়েছেন দুনিয়ার এমন প্রায় দুই লাখ লোকের ডকুমেন্টের তালিকা যা এক ভুলের কারণে ফাঁস হয়ে যায়। আগ্রহীরা লন্ডন গার্ডিয়ানের এর রিপোর্টটা দেখতে পারেন – What are the Panama Papers? A guide to history’s biggest data leak.।  আর এই পানামা পেপারস এর কেলেঙ্কারিতেই পাকিস্তানের দুর্নীতিবিরোধী কোর্ট তাকে দশ বছরে সাজা  ও সাথে ফাইন হিসাবে আরও $10.6 million শোধ করতে নির্দেশ দিয়েছে। এর সাথে “রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ” করে রায় দেয়।

    “The Panama Papers (Spanish: Papeles de Panamá) are 11.5 million leaked documents that detail financial and attorney–client information for more than 214,488 offshore entities. … The documents contain personal financial information about wealthy individuals and public officials that had previously been kept private.”

    মওলানা ফজলুর নেতৃত্বে পিডিএম, এটা নওয়াজ ও ভুট্টোর দলসহ ছোট-বড় ১১ দলের জোট, যা জন্ম নিয়েছে গত সেপ্টেম্বর ২০২০ মাসে আর এ’মাসের ৩ অক্টোবর  মওলানা ফজলুকে এর প্রধান বানিয়েছে। এর প্রথম সমাবেশ ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালায় আর দ্বিতীয়টা ছিল করাচিতে ১৮ অক্টোবর। এখান থেকেই ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার ঘটনা সামনে আসতে থাকে।

    তবে এর আগেও, মানে গত বছর নভেম্বরে একই রকম সমাবেশ করেছিলেন মওলানা ফজলু। নওয়াজ ও ভুট্টোর দল বাইরে দাঁড়িয়ে সেসময় তাঁকে সমর্থন দিচ্ছে জানালেও কেউই তাতে অংশগ্রহণ করেনি। রাজধানীতে তখন সেখানে মওলানা ফজলু জমায়েত নিয়ে ১৩ দিনের অবস্থান করে  বসেছিলেন। কিন্তু কোনো দাবি কিছু আদায় করা ছাড়াই তা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল সে সময়ে। ইমরান খান ২০১৮ সালের আগস্টের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। আর তাতে খাইবার-পাখতুন প্রদেশের এক কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে ফজলু হেরে যান, ইমরানেরই দলের প্রার্থীর কাছে।
    বলা হয়ে থাকে সেই জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ১৯৭৮-৮৮) তাঁর উত্থানের সময় তাঁর সাথে মওলানা ফজলুর প্রভাবশালী উত্থান ঘটেছিল
    ; বিশেষত বিতর্কিত ব্লাসফেমি আইন ও দুর্নীতিবিরোধী ইসলামী আইন ইত্যাদি প্রসঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাব খুবই মুখ্য ছিল বলে। সেই থেকে তিনি ‘প্রভাবশালী ইসলামী নেতা’ হিসেবে রাজনীতি করে এসেছেন। ভোটে দাঁড়িয়েছেন পাখতুন প্রদেশ থেকে। সেই জিয়াউল হকের আমল মানে সেটা মূলত গ্লোবাল ইতিহাসের এক গুরুত্বপুর্ণ টার্নিং পয়েন্ট “সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগান দখল” এরই কালপর্ব পাকিস্তানের সমকালীন শাসন পর্বকাল; যাকে আমেরিকা পেলেপুষে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বড় করেছিল, সোভিয়েত মোকাবিলা করতে। সেই জিয়াউল হক, মওলানা ফজলুর মাধ্যমে অসংখ্য মাদরাসা খুলে তারই মাধ্যমেই পরিচালনা করেছেন।  তাই মাদ্রাসা ফান্ড মওলানা ফজলুর রহমানের প্রভাব ও উত্থানের পিছনে এক বিরাট ফ্যাক্টর হয়ে থেকেছিল মনে করা হয়। এছাড়াও আরও বাড়তি দিকটা হল, তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে সৌদি রাজ-প্রভাব রাখা বা ফেলার এক বড় উপায় হয়ে ওঠেন। অথচ সেই তিনিই ২০১৮ নির্বাচনে নিজ রেগুলার কনস্টিটুয়েন্সি থেকেই পরাজিত হয়ে যান। এই ফলাফল দেখে তিনি অপমানিত। তাই তিনি মেনে নিতে পারেননি। সে কারণে এক বছর না যেতেই তিনি ইমরানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন, এমনটা মনে করা হয়। তবুও মওলানা ফজলুর ২০১৯ এর ঐ একক আন্দোলন আর এবার ২০২০ সালের  নওয়াজ মুসলিম লীগ ও পিপলস পার্টিকে সাথে নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ফারাক আছে।

    এবারে বিরোধীদের আন্দোলনের মূল দাবি কী?
    কম কথায় বললে, তাদের মূল দাবি ২০১৮ নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে অথবা তাদের অভিযোগ আর্মি সেখানে নির্বাচনের পরিবর্তে ‘সিলেকশন’ করেছে; তাই এটা বাতিল করতে হবে।
    ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট [Brookings Institution]
    , বহু পুরানা (১৯১৬) এক আমেরিকান থিংকট্যাংক ও গবেষণা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরই এক গবেষক ফেলো হলেন ড. মাদিহা আফজাল [Madiha Afzal]। মাদিহা পাকিস্তানি অরিজিনের; লাহোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ল-এর গ্র্যাজুয়েট। পরে আমেরিকান ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি; আর পরে আমেরিকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দিন অধ্যাপনার পর তিনি এখন ব্রুকিংসের ফেলো। তিনি নিয়মিত পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় বা ব্রুকিংসের নিজ সাইটেই লিখে থাকেন। সেখানের এক আর্টিকেলে তার বক্তব্য হল, ‘এখনকার আর্মির অনেকেই নওয়াজকে অপছন্দ করে সত্য কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝির নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের ক্ষমতাসীন হওয়াতেও এই আর্মিই তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল বলে অভিযোগ আছে।’ এ ছাড়া একালে নওয়াজের মধ্যে প্রায় খোলাখুলিই প্রো-ইন্ডিয়ান হয়ে ওঠার ঝোঁক প্রবল হয়ে উঠেছে – আমরা দেখছি।

    খুবই কম কথায় বললে  ঘটনাটা হল, ১৯৯১ এর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা দুনিয়ার একক নেতা হয়ে যায়। এতে আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলো তাদের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের চেপে ধরে যে, দুনিয়ার একলাই নেতা এখন আমেরিকা বলে এবার তৃতীয় বিশ্বে আমেরিকাকে সামরিক শাসন জারি বা সমর্থন করা আর চলবে না, তখন থেকে বন্ধ করে দিতে হবে। ক্লিনটন (প্রেসিডেন্ট ১৯৯৩-২০০১) সে সময়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন। আর এখান থেকেই নতুন চক্রে পড়ে নওয়াজ মূলত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে ব্যবসায়ী হিসেবে বেশি সক্রিয় হওয়াতে ভারতের ফাঁদে আটকা পড়েন। ক্লিনটন যেখানে স্বীকার করে নিয়েই শুরু করছেন যে, আমেরিকার ইচ্ছা ও কারণে এত দিন ‘সামরিক শাসন’ এশিয়া চলেছে সেখানে ভারত, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীই পাকিস্তানের সামরিক শাসনের মূল কারণ ও সমস্যা বলে এক ধারণা প্রচার করতে থাকে। এতে ক্লিনটন ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে গেলেও নওয়াজ শরিফ ভারতের এউ লাইনে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর ওপর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এসেছে বলে প্রচার করতে থাকেন। একই সময় ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধ সীমিত হয়ে শেষ হয়েছিল। কিন্তু এবার নওয়াজ এই যুদ্ধের জন্য ভারতের সহযোগী অবস্থান নিয়ে প্রচার ও প্ররোচনা করতে থাকেন যে, ততকালীন আর্মি চীফ জেনারেল মোশাররফের কারণে কারগিল যুদ্ধ ঘটেছে বলে সব দায় আর্মির উপর চাপায় দেন। আর এই দাবি করে তাকে সরাতে এক পরিকল্পনা করেন নওয়াজ। শ্রীলঙ্কা থেকে জেনারেল মোশাররফ দেশে ফিরিতে রওনা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে বহনকারী সেই বাণিজ্যিক প্যাসেঞ্জার বিমান পাকিস্তানের কোথাও নামতে দেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই ফাঁকে নওয়াজ আর্মি চিফ পরিবর্তন করে দেন। এই ঘটনাটা জেনারেল মোশাররফের নিজের দেয়া বর্ণনায় তারই  “লাইন অফ ফায়ার” বইতে বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়।  কিন্তু মোশাররফকে আকাশে ঝুলিয়ে রেখে চিফ পরিবর্তন এই ব্যাপারটার প্রতিক্রিয়া আর্মির ভিতরে ভাল হয় নাই। বিশেষত কারগিল যুদ্ধের জন্য পুরা সেনাদের দায়ী করা আবার আকাশে একটা প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটকে এক-দেড়শ নিরীহ নাগরিককে মৃত্যুর মুখে নিরাপত্তাহীন করে ফেলে রাখা যেটা ফৌজদারি খুনের অপরাধ এর দায়  সেনারা শেয়ার নিতে চায় নাই । তাই এতে উলটা আর্মির মধ্যে নওয়াজবিরোধী ক্ষোভ জেগে উঠাতে আধা ঘণ্টার মধ্যে পালটা ক্ষমতা দখল ও বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রো-মোশাররফ মেজরিটির সেনা গ্রুপ। তারা ঐ প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটের তেল ফুরানোর প্রায় পাঁচ মিনিট আগেই নিরাপদে মোশাররফের ঐ ফ্লাইটকে আবার পাকিস্তানের রাজধানীতেই অবতরণে সক্ষম হয়। মোশাররফ ক্ষমতাসীন হন আর নওয়াজ বন্দী হন। এটাই ১৯৯৯ সালের প্রথম অমেরিকার অনিচ্ছায় পাকিস্তানের সামরিক ক্ষমতা দখল। তাই প্রতিক্রিয়ায়  আমেরিকা মোশাররফের সরকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। এভাবেই চলতে থাকে। পরে ২০০১ সালের ‘নাইন-ইলেভেন’ হামলার পর সেদিনই নিরুপায় আমেরিকার পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল বিবিসি-সিএনএনকে জানায় যে আমেরিকা সেদিন প্রথমেই পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে জানায়। কিন্তু ভারতের পক্ষে সেনাদের বিরুদ্ধে যাবার ঐ ঘটনায় নওয়াজের আসলে স্বার্থ ছিল, ভারতীয়দের সাথে ব্যবসা করা। নওয়াজ  নিজে তিনি তার মূল ইত্তেফাক গ্রুপের মালিক ও ব্যবসায়ী। তিনি ও তাঁর মত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ছিল ভারতের সাথে আরও নতুন ব্যবসায় যুক্ত হতে। সেকাজে তারা চেয়েছিলেন – ভারতীয় পণ্য পাকিস্তানে এনে বিক্রি করে কমিশন খাওয়া্র ব্যবসা করবে। যেমন একটা দিক উল্লেখ করা যায় বাংলাদেশের মত পাকিস্তানেও একই আইনে একই সময় থেকে, ভারতীয় সিনেমা অবিভক্ত পাকিস্তানেই আমদানি নিষিদ্ধ ছিল। নওয়াজ এটা প্রথম খুলে দিয়েছিলেন। আর ভারতীয় সিনেমা প্রডিউসার-মালিকরা নগদ খদ্দের পেয়েছিলেন। আসলে এমন ব্যবসাপাতির বিরুদ্ধে আর্মিই নওয়াজের ক্ষমতার জন্য প্রধান বাধা বলে অনুভব করাতেই পুরো ব্যাপারটা আর রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে থাকেনি। নওয়াজ গংয়ের পেটি ব্যবসায়িক স্বার্থ মুখ্য হয়ে হাজির হওয়াতেই ভারতের তাঁবেদারিটাই মুখ্য হয়ে উঠেছিল; অথচ এই স্বার্থটাই যা পাকিস্তানে সে সময় রাজনীতিবিদ (ব্যবসায়ী) বনাম আর্মি এই ভুয়া নামে হাজির হয়েছিল। তবু পাকিস্তান আর্মি আমেরিকার ইচ্ছা মেনে সেই থেকে আর কখনো ক্ষমতা দখল করতে যায়নি। তবে তা আর না করেও রাজনীতিতে যতটুকু প্রভাব রাখা যায় সে চেষ্টা করে অবশ্যই। বলাবাহুল্য, নওয়াজদের মত রাজনীতিবিদ থাকলে পাকিস্তানে এ সমস্যার কোনো দিন কোনো সমাধান নাই।

    তবে পরিস্থিতিকে ভারতের আধিপত্যে নেয়ার জন্য উপযুক্ত করে সেদিকে ঠেলে দেয়ার জন্য আমেরিকানদের লোভের স্বার্থ মূলত দায়ী। কারণ মূলত আমেরিকার আগ্রহ ভারতের বাণিজ্য, বাজার, অস্ত্র বিক্রি ইত্যাদির ওপর। যেটা ভারত পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলার পর (১৯৭৪) থেকে ভারত-আমেরিকা প্রায় বাণিজ্য সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছিল। তাই ১৯৯৯ সালে ভারত নিজ বাজার বাণিজ্য সুবিধা আমেরিকাকে দেয়ার এক পূর্বশর্ত হিসেবে উল্টো পাকিস্তানের বাজার ভারতকে পাইয়ে দিতে যেন আমেরিকা সাহায্য করে এই শর্ত দিয়েছিল। আর এই ভারত-আমেরিকান স্বার্থের মধ্যে পড়ে পাকিস্তানের নিজভাগ্য হারিয়ে গিয়েছিল। কারণ ভারতের প্ররোচনায় ব্যবসায়ী নওয়াজেরা পাকিস্তান আর্মিকেই নিজ স্বার্থ হাসিলের পথের বাধা হিসাবে উপলব্দি করতে থাকে। আজ সেসব পুরনো পাকিস্তানবিরোধী পরিকল্পনা আবার সামনে আসছে, একটু একটু করে। তার আগে মাদিহার বাকি কথা শেষ করে নেই।

    মাদিহা এবার তার কথা শেষ করতে সরাসরি ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে চলে যান। তার ঐ আর্টিকেলের শিরোনাম হল, পাকিস্তানের ইমরান খান কী নোংরা নির্বাচনে বা না প্রকৃত ম্যান্ডেটে জিতেছেন [Did Pakistan’s Imran Khan win a “dirty” election or a real mandate?] ২০১৮ জুলাই ২৭ তারিখে সেটা ছাপা হয়েছিল, যেখানে ঐ নির্বাচন হয়েছিল ২৫ জুলাই।  মাদিহা ঐ লেখায় বলেন, এখানে ‘অস্বীকার করা কঠিন’ এমন দুটো ফ্যাক্টস আছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর বা অযোগ্যতাটা ছিল মারাত্মক। সারা দিন ভোট প্রদানের সময় কোথাও কোনো বড় অভিযোগ ছিল না, উঠেনি। কিন্তু ভোট গণনার শুরুতে তাতে আরো দেরি হওয়ায় মানুষের সন্দেহ বাড়তে থাকে। অথচ এর কারণ হল কমিশনের সফটওয়ার ফেল করেছিল। এবং এই ফেল করা কমিশনের অযোগ্যতা অবশ্যই। মাদিহার দ্বিতীয় পয়েন্টটা অনেক শক্ত। তিনি বলছেন, বিদেশী পর্যবেক্ষক হিসেবে সেখানে ছিল ইইউর অবজারভা্রের, এক বড় টিম। কিন্তু তাদের রিপোর্ট হল, নির্বাচন মোটা দাগে ‘ইতিবাচক’ হয়েছে।

    এ ছাড়া কিছু প্রসঙ্গ যা মাদিহা আনেননি তা হল, আসলে যেখানে আর্মির প্রভাব কার্যকর ছিল, সেখানে নওয়াজের দলের পুরনো এমপিকে দুর্নীতির দায়ে আদালতের মাধ্যমে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল। এই কাজে পরোক্ষে আর্মির হাত ছিল মনে করা হয়। এ কথা অবজারভাররাও বলেছিল। তবে তারা এটা সরাসরি নির্বাচনের দিনের ঘটনা নয় পুর্ব প্রভাব বলে কম গুরুত্ব দিয়েছিল তারা। এর মূল কারণ, ঐ  জেনারেল জিয়ার আমলের ইসলামী দুর্নীতির আইন। বিচারকদের এটা প্রয়োগ ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আদালতকে যথেচ্ছ অধিকার দেয়া আছে এতে। সেকারণে এক রায়ের শেষে বিচারকের এমন মন্তব্য আছে যে, তিনি মন্তব্যে বলেছেন, আমাদের এমন ক্ষমতা দিলে তো এটা অপব্যবহার হবেই। আর সেটা ব্যবহার করাতেই নওয়াজের দলের বহু প্রার্থী অযোগ্য হয়ে যায়। তবে মূলত কমিশন তাদের সফটওয়ার ফেল করার কারণে ফলাফল দিতে দেরি হয়েছে। আর এ থেকেই প্রচারণার শুরু।

     এবার এপ্রসঙ্গে শেষের মূল যে কথাটা তা হল, বিরোধী দলের এখনকার এই আন্দোলন শুরু হলে পরে কেন ইমরান সরাসরি আলজাজিরাকে বলছেন যে, এই আন্দোলনে নওয়াজ শরিফ “ভারতের খেলা খেলতে নেমেছেন”! [Pakistan’s Khan accuses rival Sharif of “playing India’s game”] প্রথমত এটা কথার কথা কোন অভিযোগ নয় বা কমন রাজনৈতিক দল একে অপরকে যেভাবে ও অর্থে যেমন বলে থাকে সেই সাধারণ অর্থ বলা কোনো কথা নয়। এর সুদূরপ্রসারী অর্থ আছে। কী সেটা?

    দুনিয়ার এই সময়টা এখন পালাবদলের। এটা গ্লোবাল নেতা বা নেতৃত্বের পালাবদল – আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্ব নেয়ার পালাবদল। আমেরিকা জানে, এই পরিবর্তন অনিবার্য। তা জেনেও যত তাতে দেরি করিয়ে দেয়া যায় এই লক্ষ্যে আমেরিকা খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। আর তা থেকেই এখন চারদিকে যাবতীয় নতুন সমস্যা।

    আর এ কাজে আমেরিকার চেয়েও অনুসারী সাগরেদ ভারত আরো কূটাশ্রয়ী হতে চাইছে। তাই ভারত চাইছে, একটা গ্লোবাল পোলারাইজেশনের মধ্যে পাকিস্তানকে ফেলে দিতে। মওলানা ফজলু মানে সৌদি লবি বা প্রভাব। ভারত এটার উপরে আমেরিকা, মাঝে সৌদি আর নিচে ভারত এভাবে চায়না বিরোধী এক পোলারাইজেশন টানতে চাইছে। যেন পাকিস্তানে আমেরিকা-চায়না পোলারাইজেশনটা পাকিস্তানের দলভিত্তিক হয়ে যাক। যেমন ইমরান এক দিকে আর তিনটি দল অন্য দিকে;  ভারত-চীন পোলারাইজেশনের দুই ভাগ এমন হোক। এতে ভারত যেন নওয়াজকে নিজের নৌকায় সামিল করে নিতে পারে। আর নওয়াজকে পুরনো ১৯৯৯ সালের কথা ও অ্যালায়েন্সের কথা, ব্যবসায়িক সুবিধার কথা মনে করিয়ে ভারত সেই সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আর নওয়াজের অবস্থা হল – যিনি দুর্নীতির দায়ে বাকি জীবন জেলে থাকার জন্য শাস্তির রায়প্রাপ্ত; কারণ তাঁর তো দুর্নীতিতে সাজার রায় হয়ে গেছে তাই, তার কাছে পুরা পাকিস্তান ভারতের অধীনে চলে গেলেইবা কী? যদি তাতে নওয়াজ খালাস পেয়ে যাওয়ার উপায় পাওয়া যায়? এ কারণেই ভারতের গৃহযুদ্ধের প্রপাগান্ডা নওয়াজের সাথে ভারতের আঁতাত কত গভীরে চলে গেছে এরই প্রকাশ। ভারত প্রকাশ্যে পাকিস্তান নিয়ে, পাকিস্তানের একটা দলের পক্ষ নিয়ে ফেক নিউজ প্রপাগান্ডা শুরু করেছে – এই ফেনোমেনা এটা গত পচাত্তর বছরের ইতিহাসে কেউ দেখেনি!

    কিন্তু মূল কথা- একটা দেশের জন্য এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের হবে যদি ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা এরা এভাবে চীন বা আমেরিকান এই ভিত্তিতে দেশের দলগুলো একেকটার এজেন্ট হয়ে ভাগ হয়ে যায়। পাকিস্তানের ভাগ্যে সেই বিপদ ঘটতে যাচ্ছে।

    আর এটাই আমাদের জন্যও কী কোনো ইঙ্গিত যে, আমাদের ভাগ্যেও না এমন পরিণতি কোনো ফাঁক-ফুটা দিয়ে এসে যায়!

    সর্বশেষ, ভারতের এক খুবই সিনিয়র সম্পাদক হলেন শেখর গুপ্তা। যিনি ভারতের প্রধান সব পত্রিকার সম্পাদক হওয়া শেষে এখন বয়স্ক হয়ে এখন নিজের দ্যাপ্রিন্ট নামে মিডিয়ার সম্পাদকমন্ডলীর প্রধান। তিনি প্রায়ই ভিডিও ক্লিপ রিপোর্ট করেন। তিনি স্বীকার করেছেন, করাচী নিয়ে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্টিং ভিত্তিহীন মিথ্যা। বিশেষত গৃহযুদ্ধ বা পাকিস্তানি সেনাদের আইজিপির অপহরণ এর খবর প্রসঙ্গে বলছেন ইনি নিজের সোর্সের মাধ্যমে খবর নিয়েছেন ও জেনেছেন এগুলা ফেক। যদিও তিনি কারা তাহলে ফেক একাউন্ট থেকে ফেক এমন টুইট তথ্য ও রিপোর্ট  ছড়ালো, ফেক গৃহযুদ্ধের ছবি  ছড়ালো – এসব নিয়ে কোন টুশব্দ তিনি  করেন নাই। কিন্তু এরপরের রাজদ্বীপ তার ইন্ডিয়া টুডে প্রিন্ট পত্রিকা থেকে অপহরণের শিরোনাম দেয়া ফেক রিপোর্ট এখন সরায় নেন নাই বা দুঃখ প্রকাশ করেন নাই। ইতোমধ্যে ইমরান খান এই ইন্টারভিউয়ে প্রতিজ্ঞা করে জানান, তিনি নওয়াজ শরীফকে যিনি সুপ্রীমকোর্টের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত তাকে বৃটেন থেকে ফেরত আনবেনই। এছাড়াও বলেন যে তিনি ক্ষমতায় থাকেন আর না, এই দুর্নীতিবাজেরা যেন ক্ষমতায় না ফিরতে পারেন এটা নিশ্চিত করবেন। [He said whether he remained in power or not, he would make sure that leaders of the protesting opposition parties never came back to power.]।

    ।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত  ২৪  অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের ফেক নিউজ, করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]