Tag: রাষ্ট্র

  • মোদি মুসলমান ‘নির্মূলের’ উস্কানি তুলছেন

    মোদি মুসলমান ‘নির্মূলের’ উস্কানি তুলছেন

    গৌতম দাস

    ০৩ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3S5

     

    সাধুবেশে মুসলমান গণহত্যা-নির্মুলের প্রধান উস্কানিদাতা

    Is India Headed for an Anti-Muslim Genocide?

    প্রশাসনিকভাবে ‘হরিদ্বার’ যদিও একটি জেলা শহর মাত্র, কিন্তু এটা ভারতে হিন্দুদের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান [pilgrimage]। বয়স্ক হিন্দু নারী-পুরুষের কাছে সাধারণত এক আগ্রহ ও আকাঙ্খার নাম হরিদ্বার যে, যদি তিনি একবার তীর্থের উদ্দেশ্যে হরিদ্বার ঘুরে আসতে পারতেন!  তীর্থ মানে হল পূণ্যসঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে কোন “পবিত্র স্থান”  ভ্রমণ। পবিত্র স্থান মানে সেসব জায়গাকে হিন্দু ধর্মীয় মিথিক্যাল ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান মানা হয়েছে। সাধারণত দেখা যায় বেশিরভাগ এমন তীর্থস্থানগুলো ভারতের উত্তরপ্রদেশেরও সর্ব-উত্তরে (ভারতের দিক থেকে উত্তর-পুর্ব কোণে) প্রায় নেপাল সীমান্তের কাছে।
    গত ২০০০ সালের আগে এই হরিদ্বার ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের অংশ। কিন্তু গত নভেম্বর ২০০০ সালে উত্তরপ্রদেশের সর্ব-উত্তর অংশকে প্রশাসনিকভাবে উত্তরাখন্ড [Uttarakhand] নামে আলাদা আরেক রাজ্য বলে এর জন্মের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। তাই হরিদ্বার এখন নবগঠিত উত্তরাখন্ড রাজ্যের ১৩ জেলার একটা। তবুও উত্তরাখন্ড ভারতের ছোট ছোট রাজ্যের কাতারেই রয়ে যায়। কারণ একটা তুলনা করলে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার (রাজ্য সরকার যে নির্বাচিত সংসদের হাতে গঠিত ও জবাবদিহিতা করে থেকে) ২৯৪ আসনের চেয়ে উত্তরাখন্ডে বিধানসভা মাত্র ৭০ আসনের , আবার কেন্দ্রীয় সংসদের আসন নিয়ে যদি তুলনা করি তবে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের তুলনায় উত্তরাখন্ডের আসন মাত্র পাঁচটা। তবে এটা একটা জনসংখ্যাগত ধারণা পাওয়ার জন্য তুলনা মাত্র।

    ওদিকে উত্তরপ্রদেশ মানে কুখ্যাত যোগী আদিত্যনাথ যার (বিজেপি) মুখ্যমন্ত্রী; যিনি জনপ্রতিনিধির পরিচয়ের চেয়ে কট্টর ধর্মীয় জবরদস্তির এক শাসক হিসেবে বেশি নাম কামিয়েছেন। পুরানা সেই উত্তরপ্রদেশের এক জেলা হরিদ্বার তীর্থক্ষেত্র হিসেবে নামডাকের আরেক কারণ, এটা হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত। ফলে দু’টি নদী যমুনা ও গঙ্গা নদীর প্রবাহের শুরু, হিমালয়ের গা-চুইয়ে আসা বরফগলা পানির উৎস, এখান থেকেই। এই নদীর পানিতে স্নান, এর স্বর্গীয় প্রভাব ফেলার ক্ষমতা আছে – এই মিথ [Myth, মুখে মুখে প্রচলিত বহুপুরানো কোন ধারণা] সেখানে প্রচলিত। এ’কারণে এখানে গঙ্গাকে শুধু গঙ্গা না বলে আগে পবিত্র শব্দ বসিয়ে মানে ‘পবিত্র গঙ্গা’ লেখা বা উচ্চারণ এর রেওয়াজ। যদিও বর্তমানে সারা হরিদ্বারের মানুষের বসবাসের প্রধান সঙ্কটের নাম পানি। খাবার পানি বা চাষাবাদের পানি দু’টিরই সঙ্কট এখানে। নদী দূষিত আর পানি প্রাপ্যতা কমে গিয়ে শহর এলাকাগুলোয় হাহাকার উঠেছে।

    উত্তরাখন্ডের ভেতরেই হরিদ্বার আর  এই হরিদ্বার থেকে মাত্র কুড়ি কিমির বাস-দূরত্বের মধ্যেই আবার আরেক তীর্থের শহর ঋষিকেশ। ঋষিকেশ যোগ [Yoga] (পপুলারলি যা এটা ‘যোগব্যায়াম’ বলে পরিচিত) ও ধ্যান বা মেডিটেশন – একে বুঝবার জানবার শহর।  এ’ছাড়া আরেক মিথিক্যাল গঙ্গাস্নানের ভুমিঘাট হল “কুম্ভমেলা” সেটাও এখানেই এই হরিদ্বারে। যা ১২ বছর পরপর আয়োজন করা রীতি আর এসময়ে গঙ্গাস্নানে খাস পুণ্য মিলবে- এ্মন বিশ্বাসে বা লোভে এবার (২০২১) সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর নিজের উদ্যোগে করোনার প্রকোপের মধ্যেও এ’মেলার আয়োজন চালু রেখেছিলেন। আর তাতে করোনাভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভে ভারতের প্রশাসন ও অর্থনীতি ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। না ভাইরাসে আক্রান্তদের ভাগ্যে  হাসপাতালের বেড অথবা শ্বাস সহজের অক্সিজেন মিলেছে কিংবা মারা যাবার পর সৎকার – কোনোটাই ঠিকমত কপালে জুটেনি কুম্ভমেলায় অংশগ্রহণকারীদের-সহ উত্তরপ্রদেশ ও ভারতের প্রায় সব শহরের বাসিন্দাদের। মোদি সরকারের সেকেন্ডম্যান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যন্ত দল বেঁধে গায়ে গা লাগিয়ে কথিত পুণ্যস্নানের লোভ সামলাতে পারেননি। এমন পুণ্যস্নানের পরে সৎকারবিহীন মৃত্যু যাদের হয়েছে তা নিয়ে খুব কিছু বলাও আসলে অস্বস্তিকর!

    অর্থাৎ সাধারণভাবে মূলত ধর্মীয় ভিজিটর বা ট্যুরিস্টের শহর হরিদ্বার আর এটাই এর অর্থনৈতিক ভিত্তি। আর কমবেশি সারা উত্তরাখন্ডই এমন। যার পিছনের অর্থ হল – বড়লোক ট্যুরিস্ট নয়, পুণ্য আদায়ের লোভে বা বলা যায় স্পিরিচুয়াল চাহিদা মিটাতে নিম্ন আয়ের যারা এরাই এই শহরের প্রধান ভিজিটর। আর এ’ফ্যাক্টরের কারণে উত্তরপ্রদেশের যেকোনো নতুন স্থাপনা বা অবকাঠামো বা কারখানা উতপাদন তা আর এই ঘিঞ্জি তীর্থস্থানগুলোতে নির্মাণ করা নয়; বরং এদেরকে পাশ কাটিয়ে অন্য শহরে স্থাপিত হতে শুরু করেছিল। আর ততই এসব তীর্থস্থানের শহুরগুলো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের নাম নিয়েছে। আর একপর্যায়ে নবগঠিত উত্তরাখন্ড হল আসলে তেমনই ওসব পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর সমাহার। মানে পিছিয়ে পড়া শহরহুলোকে নিয়ে গঠিত নতুন রাজ্য। এবার কড়া সত্যটা বলি, এরই পরিণতি হল, উত্তরাখন্ড তাই সাধু-সাধ্বীদের [সাধু শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ সাধ্বী] দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শহর। স্বভাবতই তাই বিজেপি-আরএসএসের বহু নামি-বেনামি অঙ্গসংগঠনের সক্রিয় তৎপরতার প্রধান শহর এটা। আর এসব ধর্মীয় নেতার প্রধান কাজ রাজনীতিবিদ ও রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকাশ্যে দায়-দায়িত্বহীন উস্কানি ও হুঙ্কার তুলে কথা বলা। আমাদের আজকের প্রসঙ্গ এটাই!

    দুই মাস আগে আমার এক লেখায় ত্রিপুরার মুসলমানদের উপর নিপীড়নে করুণ মার্জিনাল অবস্থা লক্ষ্য করে  বলেছিলাম, মোদি এখন সব হারানো মুসাফির, পাবলিক রেটিং যার তলানিতে। তাই সে এসব অপরাধমূলক নিপীড়নের রাস্তা ধরেছে। আর   এসব কিছু নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনাতেও খুব দূরে যাওয়া জরুরি নয়। কারণ যেসব রাজ্যে মোদির ভরাডুবির সম্ভাবনা বলে বিজেপি নিজেই  মনে করে তা বুঝার সবচেয়ে সহজ ফর্মুলা হল যে, যেসব রাজ্যে মুসলমান কোপানোর বিজেপি ততপরতা ও হুমকি যত বেশি বুঝতে হবে, বিজেপি মনে করে তাদের অবস্থা বা পাবলিক রেটিং ওখানে খুবই খারাপ। মোদির কাছে তাই, সমাজে মুসলমান হত্যার উন্মাদনা তোলাটাই ওসব কনষ্টিটুয়েন্সিতে হিন্দু-ভোটারদেরকে দলবেধে বিজেপি বাক্সে নিয়ে আসার শেষ ভরসা বা অবলম্বন। তাতে সরাসরি মুসলমান হত্যার উন্মাদনা আওড়ানো তা যতই মারাত্মকভাবে কনস্টিটিউশন বা নির্বাচন কমিশনের আইন লঙ্ঘন হোক না কেন, মোদি-অমিত তাতে পিছপা নন! বরং বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন!

    এসব বিচারে হরিদ্বার – এ তীর্থের শহর মানে পুণ্যলোভীদের খেদমত ও বিশ্বাস আরো শক্ত করা ও আশ্বাস দেয়ার উসিলায় সর্বজ্ঞানী, ধর্মজ্ঞানী ভাবধরে মিথিক্যাল গল্প ছড়িয়ে যারা পেটের ভাত জোগাড় করে এমন ‘পাণ্ডাদের’ শহর এটা। অরিজিনাল ‘পান্ডা’ শব্দের অর্থ,  ধর্মীয় টুরিস্টদের ধর্মীয় ক্রিয়া-কর্মাদি পালন ও সম্পন্ন করার কাজে যারা ভিজিটরদের থেকে নেয়া ফি-এর বিনিময়ে সহায়তা দেয়। এই বিশেষ মানসিক স্থিতি ও পরিবেশটা কেমন তা বুঝানোর জন্য এই লেখার শুরু থেকেই প্রায় ৩০০ অক্ষর ব্যয় করলাম। এ’ছাড়া নতুন বছর, এই ২০২২ সালে মোদির জন্য নির্ধারক উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজের নির্বাচন, তা অনুষ্ঠিত হবে এই ফেব্রুয়ারি-মার্চে।

    অতএব বলাবাহুল্য মোদির বিজেপির কাছে  তাই হরিদ্বারের কথিত সাধু-সাধ্বীর  কদর এখন তুঙ্গে। এদের ভাড়া করে নিয়ে হুঙ্কারের বক্তৃতা দেয়ানোর স্টাইলটা হল, তারা সরাসরি মুসলমানদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অপমান করে তাদের – মেরে ফেলবে, কেটে ফেলবে, পিষে ফেলবে – এথনিক ক্লিনজিং করে মুসলমান মুছে দেবে- এসব কথা বলবে তারা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে। আর এদের দিয়ে বলানোতে মোদি আশা করেন, বিরোধীরা যেন আপত্তি না তুলে এই ভেবে যে, ওরা ‘ধর্মীয় লোক’ কত কিছুই না বলে। অথবা এরা, আধুনিক রাষ্ট্র কনস্টিটিউশন না বুঝে বলেছে এই ভেবে বিরোধীরা এটা উপেক্ষা করুক। আবার বিরোধীরা এ নিয়ে আপত্তি তুললে সেটা থেকে পরে পাওয়া সামাজিক হৈচৈ বিজেপির নির্বাচনী ইচ্ছা- হিন্দুভোটের পোলারাইজেশন সেটা করে দিক, এটাই মোদি-বিজেপির প্রধান খায়েস। আর সর্বোপরি পুলিশ যেন কোনো অভিযোগ না নেয় বা মামলাকে নিরুৎসাহিত করে এটাই অমিত শাহের এবারের ‘পবিত্র’ নির্বাচনী দায়িত্ব। এরই মধ্যে এক পুলিশ অফিসার সেসব জ্ঞান পাবলিককে বিতরণ করে দিয়েছে মিডিয়ায়। অথচ কাহিনী হল, এবার ক্রিকেটে পাকিস্তানকে সমর্থন-উচ্ছ্বাস দেখানোতে এক ভারতীয় কাশ্মিরি তরুণের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসদমন আইনে চার্জ এনেছে পুলিশ।

    হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর আয়োজনঃ
    এবারের ঘটনার শুরু যেভাবে, গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে “ধর্মসংসদ” নামে সংগঠন এক আয়োজন করেছিল যার মূল আয়োজক ছিলেন এক বিতর্কিত কথিত ধর্মগুরু যতি নরসিংহানন্দ সরস্বতী। এদের নাম এমন বাহারিই হয়ে থাকে। “সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন হিন্দু রক্ষা সেনার প্রবোধানন্দ গিরি, বিজেপির মহিলা মোর্চার নেত্রী উদিতা ত্যাগী এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়। ভাইরাল একটি ক্লিপে দেখা যায়, প্রবোধানন্দ গিরি বলছেন, ‘মিয়ানমারের মতো আমাদের পুলিশ, সেনা, রাজনীতিবিদ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সব মানুষকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এবার ‘সাফাই [ক্লিনজিং] অভিযান’ চালাতে হবে।” এই ভাষ্যটা আনন্দবাজারের। এখানে সাফাই মানে ‘ক্লিনজিং বা ‘নির্মূল’ করা বুঝতে হবে। ভারতের দেয়া বাংলাভাষী বয়ান থেকে সরাসরি তা বুঝবার জন্য আনন্দবাজারের ভাষ্যটা এখানে এনেছি।
    তবে আম-পাঠকদের জন্য একটা সাবধান-বার্তা জানিয়ে রাখি। হরিদ্বারের ওসব ধর্মীয় নেতার সরাসরি সেসব বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। বলাহুল্য, তা লোমহর্ষক, একটা মানুষ কী করে গোষ্ঠী-ধরে অপর মানুষদের খুন করার আহ্বান জানাতে পারে? কিন্তু  তবু সাবধান আমরাও ওই ভিডিওর ব্যাপক প্রচার করে হিন্দুদের ‘অপর’ বলে তাদেরকেও খুন হতে  খুনাখুনির উসকানি দিতে পারি না। সেটা আইনি চোখেও পালটা আমাদের ‘অপরাধ’ হবে। তাদের মতোই দায়দায়িত্বহীন কাজ হবে। এমন প্রত্যেক ইউটিউব ভিডিওর শুরুতে সেকথা স্পষ্ট বলা আছে; পাবেন। পড়ে নিতে পারেন। তারা অপরাধী মানুষ ও দায়দায়িত্বহীন হলে আমরা যারা ধর্ম-নির্বিশেষে এমন মুসলমান হত্যার ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই, তারাও তাদের মতোই অপরাধী ও দায়দায়িত্বহীন হয়ে যেতে পারি না।

    এই অপরাধের শাস্তি কী?
    গত ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার এক মৌলিক ফারাক এখানেই। দুনিয়াতে কোনো দু’টা জনগোষ্ঠী স্বার্থ-সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়লে অন্যকে ‘অপরজ্ঞান’ করে তাদের ‘গুষ্ঠি-সহ নির্মূলের’ কথা, উগ্র ঘৃণা ছড়ানোর কথা আমরা শুনে থাকি। অপরকে কোনো একটা শব্দ দিয়ে ব্যঙ্গ বা তুচ্ছ করে কথা বলা যেমন, পাকিস্তানিদের”পাকি” বলা বা হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলা ইত্যাদি; ভদ্র বা আইনি ভাষায় এটাকে বলে ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর শুরুর প্রথমদিকের  উস্কানি তুলে কথা বলা। যেটা এরপর গণহত্যার পথে যাবার আগাম-ধ্বনি!

    এটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার গংয়ের প্রধান অপরাধ যিনি ঠিক এই কথিত সাধু-সাধ্বীদের মতই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর উসকানি, কিল দেম [kill them]– এই আহ্বানে প্রধানত ইহুদিদের আর সাথে অন্য যেকোনো বিরোধীদের হত্যা করেছিলেন। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াতে সেই প্রথম – আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসঙ্ঘ, মানবাধিকার সনদ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে নানান সংগঠন গড়ে উঠে এবং এখান থেকেই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর অপরাধে ‘সর্বোচ্চ শাস্তির’ সুপারিশ করা হয়। সেকালের জার্মানির ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে হিটলারের বন্ধুদের বিচার হয়েছিল। পরে এই আইনের আরো ভুলত্রুটি সংশোধন করে নতুন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট অ্যাক্ট ২০০১’ [ICC act 2001] গৃহীত হয়েছে। যেখানেও এই অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাগার। প্রতিটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশনে একইভাবে একাজকে এমন অপরাধ বলে গণ্য করে রাখার কথা।

    এথনিক ক্লিনজিং কথাটাঃ
    দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। তবে নামটা আইনি ও ভদ্রভাষায় হাজির করা হয়েছে বলে অনেকের কাছে অস্পষ্ট লাগতে পারে। এথনিক [ethnic] এই শব্দকে খাস বাংলায় এটাকে বলি আমরা ‘জাতি’।  তবে এটা ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে যাকে জাতি বা জনগোষ্ঠি  বলে বুঝানো হয় সেই অর্থে। আর ক্লিনজিং [cleansing], এটা বলে বুঝানো হয় কোন জনগোষ্ঠির প্রতিটা সদস্যকে খুন করার কল্পনা বা হুমকি-মূলক ততপরতা। গত ১৯৭১ সালের সময় এটাই আরেক শব্দে বর্ননা করা খুব চালু ছিল যেমন বলা হত “পোড়া মাটির” নীতি। সম্ভবত সেখানে ব্যাখ্যার কল্পনাটা হল, একটা জনগোষ্ঠির যেখানে বসবাস সেই ভুখন্ডের সবকিছুকে আগুন লাগিয়ে পুরিয়ে দেয়া, এভাবে নির্মুল করা। অর্থাৎ যেখানে অবশেষ কেবল যা বাচে [residue] তা হল পোড়ামাটি-টা এই কল্পনা। আর বাংলা ভাষায় ক্লিনজিং শব্দ বাংলায় সবচেয়ে পরিচিত শব্দ হল ‘নির্মুল’। যেমন খেয়াল করেন,  শাহরিয়ার কবিরে সংগঠন “ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিটি” – এই নামের মধ্যে নির্মুল শব্দটা্কে। এখানে মজার তামাসা হল, শাহবাগে বসে একদিকে তারা “ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের” মত জামায়াতের (কার্যত বুঝাতে চায় ইসলাম ধর্মের নিকুচি) বিচার চেয়েছে। অথচ এই বিচার যারা চাচ্ছে তেমন এক সংগঠনের নামই আবার নির্মুল কমিটি! মানে  ক্লিনজিং করতে চাওয়াদের কমিটি।
    সারা দুনিয়ায় এখন “গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমে” সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। মানে কোন জাতি বা জনগোষ্ঠিকে নির্মুল বা মুছে ফেলার চেষ্টা ও কাজ। এটাই বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ মানা হয়! তাই কাউকে “নির্মুল” করে দিবার অথবা মুছে ফেলে দিবার জন্য পাবলিকের মাঝে উস্কানি তোলা বা ক্লিনজিং – এক কঠিনতম অপরাধ। মোদী সেই অপরাধী এবং সেটা করতেও বেপরোয়া!

    কিন্তু ভারতে এনিয়ে এখনো আমরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে, সুয়োমোটো[Suo Moto] মানে  কোন অভিযোগকারীর অপেক্ষায় না থেকে বিচারক নিজেই ঘটনা আমলে নিয়ে মামলার প্রক্রিয়া শুরু করা্; এর  কোনো খবর নেই। এটা “জনস্বার্থ সমুন্নত রাখতে মামলাও” [Public Interest Litigation (PIL)] এর মতনও। তাও করা হয় নাই। আর ভারতীয় নির্বাচন  কমিশন? তাদের নাম নিলে আমাদেরকেই যেন উলটা তওবা পড়তে হবে !  চলতি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে উত্তরাখন্ড ও উত্তরপ্রদেশ এ’দুই রাজ্যেই বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনা করতে আসা এই কমিশনেরই দায়িত্ব। কাজেই সবচেয়ে সম্মুখসারির উপযুক্ত  অথরিটি হল এই কমিশন!  কিন্তু তারাও মনে হচ্ছে, তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আর মোদি সরকারের কথা আর কী বলব? প্রধান বেনিফিশিয়ারি হিসাবে বরং এঘটনায় ন্যায্যত মোদির সরকারের বিরুদ্ধেই মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু না, অমিত শাহ উল্টা নিশ্চিত করছেন কথিত ‘সাধুদের’ যেন কেউ স্পর্শ না করে।

    ‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন?
    সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল, হরিদ্বারে এই ‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন? কেন গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর এই আয়োজন! আমরা জানি না ঠিক কিসের প্রতিবাদে তাদের এই হুঙ্কার? কোথাও কি মুসলমানরা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনায় আপত্তি বা বাধা দিয়েছিল? না, এমন কোনো রেফারেন্স কথিত সাধুরাও দেয়নি। অর্থাৎ এ থেকে পরিষ্কার, এর উদ্দেশ্য একটাই – দুই মাস পরে নির্বাচন। আর তাতে সব হিন্দুভোট যেন বিজেপি বাক্সে যায় এই অনুমানে যতটা ব্যাপকভাবে পারা যায় এক মুসলমান ঘৃণা তীব্রতর করে হিন্দু-জোশ তোলা। আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছ হুমকি গালাগালি দিয়ে হিন্দু-জোশ তোলার সমতুল্য এফেক্ট আর কী কিছু হতে পারে?

    আবার এদের এই কথিত ‘ধর্ম-সংসদ’ শব্দটাই দেখুন। সংসদ শব্দটা দোজাহান-বাচক কোনো শব্দ নয়। শব্দটা কেবল বৈষয়িক দুনিয়া-কেন্দ্রিক। কারণ সংসদ মানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একত্রে শলাপরামর্শের জন্য বসার নির্দিষ্ট স্থান। আর জনপ্রতিনিধি শব্দটা আমাদের এই বস্তুগত দুনিয়ার, কেবল এই জাহানের শব্দ। আমরা আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তাকে আমাদের প্রতিনিধিরূপে নির্বাচন করি না। আমাদের সম্পর্ক তা নয় বলেই সব ধর্মতত্ত্ব সেই সাক্ষ্য দেয়। কাজেই এই ধর্ম-সংসদ কী জিনিস? সোনার পাথরের বাটি- এরকম? যদি আবার ভুল শব্দে তারা ‘ধর্মের ক্ষমতা’ বুঝাতে চেয়ে থাকেন তো তবে এভাবে বর্ণনা করার অথরিটি তাদের কে দিয়েছে? দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই তাদের এই অথরিটি দিতে পারে না।

    তা হলে এরা কারা? এরা হলো ধর্মীয় গুণ্ডা যাদের মোদির দল ভাড়া করেছেন এই আসন্ন নির্বাচনী মৌসুমে।

    তবে এতই ঘৃণ্য অপরাধীদের সম্পর্কে খুবই সীমিত দুই একটা ভারতীয় মিডিয়া রিপোর্ট করেছে। টিভি-মাধ্যমের মধ্যে করেছে এনডিটিভি, টেক্সট রিপোর্ট ও সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিস্তারিত ও ডিটেইল রিপোর্ট করেছে বরাবরের মতো ‘ওয়াইর’ (WIRE) এই ওয়েব পত্রিকাটা। এ ছাড়া সবার আগে রিপোর্ট করেছে কুয়িন্ট (QUINT), দা প্রিন্ট করেছে এদের সবার থেকে নিয়ে, তা হলেও করেছে। এছাড়া বিজেপি সমর্থক এসব আখড়াগুলো কেমন এর বর্ণনা দিয়েছে এরা।  অবশ্য যেসব মিডিয়া কিছুই বলে নাই, তাদের মুখ বন্ধ করতেও তো অর্থ লেগেছে!
    বাংলাদেশে আমরা কত গভীর বিপদে আছে এর ভাল প্রমাণ হল কোন প্রগতিবাদী টু শব্দ করছে না। কোন একটা ছোট বিবৃতিও নাই; যেন মোদি যেহেতু ভারতের নেতা অতএব তিনিই হলেন “প্রগতিবাদের নেতা”। যেখানে এমনকি পাকিস্তানের ইমরান সরকার এই ঘটনার সিরিয়াসনেস বুঝাতে পাকিস্তানের ভারতীয় হাইকমিশনকে ডেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা এটাকে “ফ্যাসিজমের জন্মদাতা বাবা হওয়া” [beget fascism] বলে চিহ্নিত করেছে।  কারণ আগেই প্রতিবাদী সচেতনতার লিড না নিলে আমরা তিনদেশের সাধারণ মানুষ এই ফ্যাসিজমের উন্মাদনায় এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যেতে পারি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ০১ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “মোদি নির্মূলের হুমকি দিয়ে হলেও জিততে চান”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    গৌতম দাস

    ২৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3RC

     

         The Impact of the U.S. President on Economic Sanctions

      An exterior view of the building of US Department of the Treasury is seen on March 27, 2020 in Washington, DC. – US Treasury Secretary Steven Mnuchin on Friday pledged to quickly send cash to Americans as part of the a massive $2.2 trillion relief package aimed at rescuing the coronavirus-battered economy. (Photo by Olivier DOULIERY / AFP) (Photo by OLIVIER DOULIERY/AFP via Getty Images)

     

    চার দিকে মার্কিন  অবরোধ ছাড়া বাংলাদেশে এখন যেন কোনো আলোচনার বিষয় নাই। গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেন প্রশাসন এক স্যাংশন বা অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকাটা প্রকাশ করার পরে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়ে আছে বাংলাদেশে। তালিকায় ভুক্ত অন্য দেশগুলো হল – উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীন, বেলারুশ, শ্রীলঙ্কা ও মেক্সিকো। এখানে আমেরিকার দিক থেকে এই অবরোধ আরোপের কারণ কী? সে কারণ বলা হয়েছে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’ …“gross violations of human rights,”…। তবে বাংলাদেশসহ এই সাত দেশের যেসব সরকারি কর্মকর্তার ওপর অবরোধ আরোপ হয়েছে তারা মোট ১২ জন [designated 12 government officials ]। অথচ এই ১২ জনের মধ্যে একা বাংলাদেশেরই ছয়জন। যারা একই প্রতিষ্ঠানের র‍্যাব [RAB] থেকে। মানে আগের মহাপরিচালক বেনজির ও এখনকার বর্তমান মহাপরিচালক এবং সাথে এখনকার চলতি অতিরিক্ত মহাপরিচালক সাথে আরো সাবেক তিন অতিরিক্ত মহাপরিচালক – এভাবে মোট ছয়জন। [ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মূল নিষেধাজ্ঞার প্রেস রিলিজে এই ছয়জনের নাম দেয়া আছে।] তাই  সম্ভবত বলা যায়  বড় চাপ অথবা ‘বড় থাবা’তে যে আমেরিকা  বাংলাদেশকে ধরেছে তা অনুমান করা যায়। এখান থেকেই বাংলাদেশের সর্বত্র চা দোকান থেকে আলিশান ড্রয়িংরুম বা ক্ষমতার করিডোরগুলোতে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়েছে  এই মার্কিন অবরোধ।

    কিন্তু এই অবস্থার কারণেই আবার বাংলাদেশের বাইরে অবরোধের প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে, কিভাবে পড়ছে সেদিকটা প্রায় নজর শূন্য হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের। অথচ সেটাও বাংলাদেশের দিক থেকে দুনিয়ার পরিবর্তন বুঝার জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেও। তবু প্রথমেই বলে নেই, এখানে ‘বাংলাদেশের বাইরে’ বলতে শুধু অবরোধ তালিকায় থাকা উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীনসহ ছয় দেশের কথা বুঝাচ্ছি না। এর বাইরেরও দেশ যারা আছে, যাদের নাম তালিকায় থাকার কথা কিন্তু শেষবেলায় এসে আমেরিকা যার নাম তালিকায় রাখেনি। যেমন, এমন অন্যতম দেশ হল, ভারত।

    এই ২০০১ সাল শুরু হয়েছিল, এটা ধরে নিয়ে যে ভারত  তখন থেকে আমেরিকার ঘোরতর স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হয়ে গেছে। আসলে এক ভয়ঙ্কর ইসলামবিদ্বেষ [islamophobia] এক ফোবিয়া যা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয় কারণ তা ধর্মের বিরুদ্ধে অন্য এক ধর্মের এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর হিটলারি তৎপরতা। অথচ  এটাই আবার ভারত ও আমেরিকার কমন চরম অনৈতিক ও নির্মুলের [ক্লিনজিং-এর] স্বার্থ। এমন দগদগে স্বার্থই তাদের গত শতকের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যে সব পুরনো বিবাদ ছিল তার সব ভুলে কাছাকাছি ও নতুন বন্ধু হতে উৎসাহিত করেছিল।

    অন্যভাবে বললে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর”পলিসিতে বড় সমর্থক হিসেবে এশিয়ায় ভারতকে পেতে ভারত-আমেরিকা কমন ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তারা নতুন বন্ধুত্ব শুরু করেছিল। আর এটা এমনই পরস্পরের পিঠ চুলকে দেয়া বন্ধুত্ব যে, মনে করা হত তাদের পরস্পরের এই ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’-এর বন্ধুত্ব – এটা সহসাই নষ্ট হচ্ছে না; হবে না বা ভাঙবে না।

    অনেকের মনে হতে পারে কেন আমি এটাকে ভারত-আমেরিকার  – “ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তাদের নতুন বন্ধুত্ব শুরু” বলছি? একটা ছোট ঘরোয়া উদাহরণ দিব। বিভিন্ন দেশের মাইগ্রেন্ট হতে চাওয়াদের নিয়ে নিজ দেশে নাগরিকত্ব দিচ্ছে এমন দেশগুলোর মধ্যে  কানাডা অন্যতম।  আর বাংলাদেশের অনেক বাসিন্দা এমন সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও অন্যতম। তাতে বাংলাদেশ থেকে  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে এমন নাগরিকত্ব নেয়া শেষ করেও ফিরে দেশেই থেকে গেছে অথবা কানাডায় বসবাস শুরু করেছে। সম্প্রতি গত সপ্তাহে কানাডা আবার আরো চার লাখের মত নতুন মাইগ্রেন্ট নিবে বলে ঘোষণা করেছে। এমন প্রেক্ষিতেই আমাদের এই স্টোরি।
    এনিয়ে দুই উচ্চ-শিক্ষিত হিন্দু নারীর কথোপকথন যারা  বহু পুরানা কানাডায় নাগরিকত্ব নেয়া বাংলাদেশি মাইগ্রেন্ট। তারা আক্ষেপ করে বলছেন, নয়া এই আরো মাইগ্রেন্ট নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে, তাদের দৃষ্টিতে কানাডা আর তাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত স্থান থাকবে না। কেন, এমন অনুমান? কারণ এতে কানাডিয়ান বাংলাদেশিদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যাবে। আর তাদের অনুমানে ধরে রাখা আছেই যে  মুসলমান মাত্রই তারা “পশ্চাতপদ, আনকুথ, আনকালচার্ড” ইত্যাদি। ওরা সেই কথা চিন্তা করে এই কথা বলছেন। মানে বৃটিশ আমল থেকেই  “প্রগতিশীলতা নামে” যা তাদের মনের গভীরে প্রোথিত তা আসলে এক এথনিক ঘৃণা, এক ক্লিনজিংয়ের আকাঙ্খা, এক “হিটলারি মনোরোগ”। সেসবই এখানে নব-পরিসরে প্রকাশিত হয়েছে।
    এই কথোপকথনের পরে আরো কিছু শেষ অংশটা এখন কী ও কেমন হতে পারে সেই ছবিটা এঁকে দেয়া যাক। সেটাও কম ভয়ঙ্কর নয়। ইসলামোফোবিয়া-সহ যেকোন ফোবিয়া [phobia] বা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ আসলে কিন্তু খুবই ছোঁয়াচে। মানে কী? মানে হল তা শ্রোতার মনেও পালটা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে পারে।  যেমন ইসলামোফোবিয়ার কমন অনুষঙ্গ বা সাথে বড় হওয়া ভাবনা হল মুসলমান নির্মুল বা ক্লিনজিংয়ের প্রবল আকাঙ্খা। কিন্তু তাতে কী সমস্যা? সমস্যাটা হল, এতে ইসলামোফোবিক দিকটা টের পেলে মুসলমানদের মনেও প্রথম প্রতিক্রিয়াটা হয় আত্মরক্ষা।  মানে, মনে আত্মরক্ষার চিন্তা আসা। যা সবচেয়ে কমন ও স্বাভাবিক!  কিন্তু এই আত্মরক্ষার উপায় বা পথ হিসাবে সে এরপর যা বেছে নেয় সেটাও আরেকটা তবে অন্যভাবে বলা আমরা-তোমরা। যেটা হল আমার ধর্মটাই শ্রেষ্ঠ।  যেটা পরিণতিতে এমন এক দুনিয়ার কল্পনা হিসাবে হাজির হয় যে দুনিয়াটাতে মুসলমান ছাড়া আর কেউ নাই। অর্থাৎ আত্মরক্ষার  বেস্ট মানে যেন এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করা যেখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ না থাকে।  তাহলে এখানে সারকথাটা হল, যেকোন ফোবিয়া মাত্রই অন্যান্য অসংখ্য ফোবিয়ার জন্ম দেয়া। যেগুলো সমান মাত্রায় বিপদজনক।
    ইংরাজি এথনিক [ethnic] মানে বাংলায় আমরা একেও ‘জাতি’ বলি।  এছাড়াও ইংরাজিতে আরেক জাতি [race] আছে। বাংলায় একেও আমরা জাতি বলি। দুটার ফারাক হল, রেস মানে রক্ত বা জিন [gene] -গত বায়োলজিক্যাল ফারাক। এই অর্থে জাতিগত  মানুষে-মানুষে ফারাক বুঝায়। যুগ যুগ ধরে  নানান ধর্ম, কালচার, ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদির ভিত্তিতে  জনগোষ্ঠিগত সামাজিক ফারাক হতে দেখা যায় এটাই এথনিক-জাতিগত ফারাক।

    এখন কোন একটা রেস অথবা এথনিক জাতি যদি “অপর” জাতির উপর ঘৃণা-বিদ্বেষে চরমে উঠায় বা ‘ফোবিক’ হয়ে যায় এটাই “হিটলারি ফেনোমেনা”।   সবচেয়ে বড় কথা এক ফোবিয়া বাকি সকলের মধ্যে একই নতুন নতুন ফোবিয়ার জন্ম দেয়, ডেকে আনে।  এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, হিটলারের “ইহুদি-ফোবিক” হয়ে যাওয়া।  আবার পরিণতিতে এথেকে ছোঁয়াচে ঘটনায় এবার ইহুদিদের মধ্যে জায়োনিস্ট আইডিয়ার ব্যাপক উদ্ভব ও জনপ্রিয়তা। জায়োনিজম তাই দুনিয়ার বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠিকে প্রবলতম ঘৃণা-বিদ্বেষ করে থাকে, এমন চরম ফোবিক এক ফেনোমেনা হয়ে গেছে। সে নিজেকে বাদে বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠি্র উপর আক্রমণ ও নির্মুলের আকাঙ্খাকে স্বাভাবিক মনে করে;  অর্থাৎ যেকোন “অপর” এর উপর তাদের নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস নাই, সব উঠে গেছে।

    কিন্তু এমন সব গাঢ় অনুমানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে বাইডেনের অবরোধের তালিকা প্রকাশ। ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’- এই ভিত্তিতে সেই তালিকা; তবে বেছে বেছে ‘কিছু দেশের’ ওপর বাইডেন প্রশাসনের অবরোধের পদক্ষেপ নিতে তাদের দেশের নাম তালিকায় রেখেছেন। বেছে বেছে কিছু দেশ বললাম এজন্য যেমন দেখেন, বাইডেন নিজের ঘোষিত নীতি ভারতের বেলায় প্রয়োগ করার মুরোদ দেখাতে পারেননি। কিভাবে সেটা?

    ঘটনার শুরু গত ২০২০ সালে বাইডেন যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা নিশ্চিত করেন। তবে এরও আগেই কিছু আমেরিকান (মুসলমান ও নন-মুসলমান) কংগ্রেস সদস্য কাশ্মিরে ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন আর সর্বোপরি কাশ্মিরের (ভারতের জন্ম থেকেই দেওয়া) স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ক্ষুণ করে জবরদস্তিতে সারা কাশ্মিরই ভারতের মূল ভুখন্ডের অংশ বলে (২০১৯ আগস্টের ৫ তারিখে) মোদি সরকারের সংসদে ঘোষণা – এরপর থেকে ক্রমাগত কাশ্মিরের বাসিন্দাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন চরমে উঠেছিল বলে এসব ঘটনাকে আমলে নিয়ে এর বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব এনেছিল। আর প্রার্থী বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে এই প্রস্তাবের পক্ষে পদক্ষেপ নিবেন বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। আর এটাই বাইডেন-মোদির সংঘাতের সম্পর্কের ঘটনার উৎস। আর এমন ঘোষণা মোদি সরকার ভালোভাবে নেয়নি, বিপদ দেখেছিল। এই ঘোষণা থেকেই মোদির পিছটান ও আমেরিকান সম্পর্ক ছেড়ে পালানোর উপায় বের করা শুরু হয়েছিল। তাই বাইডেন বিজয়ী হওয়ার পর থেকে মোদি সরকারের অঘোষিত টেনশন শুরু হয়ে যায়।

    তবে সেই টেনশন আরো বাস্তব হয়ে উঠতে বাইডেন প্রশাসন শপথ নেয়ার পরেও ১০ মাস সময় লেগে যায়। এবার ১০ ডিসেম্বরে বাইডেন অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছেন। এদিকে ইতোমধ্যে মোদি সরকারের মুসলমানদের ওপর একের পর এক নির্যাতন, নিপীড়নের পাপ আর কেবল কাশ্মিরেই আটকে থাকেনি। ভারতজুড়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া বাইডেনের সাথে বিবাদ বাড়ার আরও ঘটনা ছিল যা যোগ হয়েছে। কোন্ কোন্ দেশের নাগরিককে তার দেশের সরকার নিজ নিজ ধর্মপালনে বাধা দিচ্ছে বা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে তা লক্ষ্যরাখা ও নোট নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক রাষ্ট্রীয় স্বাধীন কমিশন [USCIRF] আছে যার কাজ হল সেসব লঙ্ঘনকারি সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য যে প্রশাসনই আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকে তার কাছে বার্ষিক সুপারিশ রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া। এবারের ২০২১ সালের এমন রিপোর্টে ভারতকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ক্যাটাগরির দেশ [CPC (“country of particular concern,”] হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়ার সুপারিশ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    তাই মোদি সরকারের আশঙ্কা ছিল বাইডেন ট্রাম্প প্রশাসনের মত তার ফেভারেবল সরকার নয়। যে ট্রাম্প প্রশাসন এসব রিপোর্ট উপেক্ষা করে ফেলে রেখে চলেছিল। এছাড়া চলতি ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখ বাইডেন ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ আহবান করেছিল আর এখান থেকে যে এই অবরোধের তালিকা প্রকাশ করা হবে তা আমেরিকার দিক থেকে আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ফলে সেসব কথা ভারত জানা ছিল গত অক্টোবর মাস থেকে, বিশেষ করে নভেম্বরের শুরুতে প্রকাশ্যে  সামিটের দাওয়াতপত্র বিতরণ শুরু হওয়া থেকে।

    আর এখান থেকেই মোদি সরকার আমেরিকার ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টির কৌশল ও পদক্ষেপ নিতে জরুরী বোধ করা শুরু করেছিল। সেই পদক্ষেপ হিসাবে ভারত প্রকাশ্যেই রাশিয়ার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করতে শুরু করে। অনেকে ধারণা করত চীন ও রাশিয়া যেহেতু আমেরিকার বিরুদ্ধে তারা এক-জোট; এই অবস্থা গত ১০ বছরের বেশি ধরে বহাল রেখেছে কাজেই এর বিপরীতে চীন-ভারত প্রকাশ্য বড় শত্রুতায় আছে বলে একে পাশ কাটিয়ে ভারত-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা খুব একটা কার্যকর হবে না।

    আসলে ২০০১ সালে ওয়্যার অন টেরর নীতির কারণে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়েছিল তাতে বলা যায় আমেরিকা ওই প্রথম রাশিয়া থেকে ভারতকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা করে  অনেক দূরে নিয়ে চলে যায়; যার মূল টোপ বা কারণ হল, বুশের আমেরিকা ভারতকে পরমাণু-অস্ত্রবিষয়ক টেকনোলজি ও কাঁচামাল-উপাদান সরবরাহের যেসব আইনি বা কনভেনশনের বাধা (এনপিটি NPT) ছিল তা উপেক্ষা করে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল। স্বভাবতই এর লোভেই ভারত তার এতদিনের জিগার- যে ভারতকে রাশিয়ান অস্ত্রে সজ্জিতকারী এত পুরনো বন্ধু, সেই রাশিয়াকে উপেক্ষা করে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হওয়ার জন্য ছুটে গিয়েছিল।

    ভারতের ‘সরকারি কালচারে’ কোনটাকে তারা ‘সুখ’ বা অর্জন বলে বুঝে এর কিছু বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা এটিচ্যুড-ভঙ্গিমা আছে। যেমন আমেরিকা ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে গত প্রায় ২০ বছর চলেছে কাজেই ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে। এমন অর্থহীন মিথ্যা হামবড়া কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জি করে গেছে আর এখন মোদি করে যাচ্ছেন। তবে কৌওলটা হল এটা সরকার নিজে পাবলিকলি প্রচার না করে, প্রপাগান্ডা সাংবাদিকদের দিয়ে করানো! সে উদ্দশ্যে তারা সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করে এমন  সাংবাদিকদেরকে তা বিশ্বাস করিয়েই ছেড়েছিল। এ ছাড়াও আমেরিকা যেসব ঢংয়ে ভারতকে গুরুত্ব দেয়া প্রকাশ করেছিল সেটা নিশ্চয় ভারতের জন্য খুবই সম্মানের- এই অনুমানটাই সরকারি কালচারে বর্তমান।

    যেমন প্রায়ই আমরা একটা কথা শুনব যে “২+২ ডায়ালগ”। এটা তাদের অনুমান বিচারে খুব উচ্চমার্গের ব্যাপার। এমনকি রিপোর্টের শিরোনামেও এই শব্দগুলো তারা এনেছে। কেন? কারণ এটা আমেরিকা ভারতকে অফার করেছিল। তাহলে নিশ্চয় এটা দামি কিছু না হয়ে যায়ই না……!! এবং এই কালচার চালু করেছিল। অথচ ব্যপারটা স্রেফ আর কিছুই না, আমেরিকার ভারতকে অস্ত্রবিক্রি গছানোর মাত্র কায়দা একটা। সেখানে ‘২+২’ বলতে খাঁড়া মানে, দুদেশেরই পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এভাবে এখানে চারমন্ত্রীর একসাথে বসে অস্ত্র কেনাবেচার লক্ষ্যে কোন মিটিং করা। এটা এতদিন আমেরিকান স্টাইল ছিল, ভারতকে জাতে তোলার। তাই এবার পুতিনের সফরে ভারতও রাশিয়ার সাথে এক ‘২+২ ডায়ালগ’ করেছে। এর এক পরোক্ষে ‘প্রদর্শনী অর্থ’ আছে যে, আমরা আমেরিকা ছাড়াই রাশিয়ার সাথেও এমন গুরুত্বের ডায়ালগ করেছি। আর ভারত সব সময় (ভুয়া এক সুখ) অনুভব করতে চায় যে দুনিয়ার পরাশক্তিদের সাথে ভারতের ‘২+২ ডায়ালগ’ – এসব করা মানে ভারতও এতে পরাশক্তি হয়ে গেছে। এর লক্ষণ এসব!!!

    এছাড়া সাথে আরেকটা মিডিয়া কাভারেজে আমরা দেখতে পাই ওই একই দ্য-প্রিন্ট [the-print] ওয়েবপত্রিকায় যেটা লিখবেন জ্যোতি মালহোত্রা। তার লেখা পড়ে পেইড লেখা মনে হবে। ‘যেমন তেমনই’ লেখাটার শিরোনাম হল Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China। আজিব ঘটনাটা হল, এটাই নাকি “চীনকে (চোখ টাটিয়ে) বলা এক মেসেজ’। মানে অন্য লেখায় নয়নীমা বসুর লেখাটা যদি বিদেশ মন্ত্রণালয় তাকে প্রভাবিত করে লেখানো লেখা বলি তাহলে মালহোত্রার লেখাটা হল একেবারে অর্ডার দিয়ে লেখানো! কিন্তু কেন এটা ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’ বলা হচ্ছে এর ব্যাখ্যা নেই। আর এমন তো নয় যে, রাশিয়া ভারতের সাথে কোনো ডিফাইনিং মোমেন্ট তৈরিতে যেতে চাইছিল!  না; তা তো নয়। বরং ভারতই আমেরিকার সাথে তাকাতে রঙিন চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখার সুযোগ নিচ্ছিল আর এটা ভারতকেই আটকে রেখেছিল রাশিয়ার কাছে ছুটে যাওয়া থেকে। তাহলে ডিফাইনিং মোমেন্টের নাগাল ভারত এতদিন পায়নি নিজের বোকামিতেই…।

    তবে এতে যেটা হয়েছে তা হল, ভারত আমেরিকা থেকে আরো অনেক দূরে চলে গেছে যেখান থেকে ফিরে আবার আমেরিকার কাছে যাওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে গেল। অনিশ্চিতও হয়ে গেল।

    কিন্তু মোদি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ছেড়ে রাশিয়ার সাথে ভারতের পুরান সম্পর্কটা ফিরে জাগাতে এত সিরিয়াস কেন? প্রথমত মোদি তা করতে গেছেন নিজ সরকারের স্বার্থে নয়। বরং মোদির আসন্ন সব নির্বাচনে বিজয়ের স্বার্থে। ভারতের বিরুদ্ধে বাইডেনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মুসলমান দমনের অভিযোগ  বরং মোদিকে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে বেকায়দা অবস্থায় ফেলবে; এই হলো মোদির অনুমান। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ থেকেই মোদির পাবলিক রেটিং এরপর থেকে যারপরনাই খারাপ। আর সেটাকে চাঙ্গা করতে মোদি এখন আরো বেপরোয়াভাবে মুসলমান নির্যাতন শুরু করেছেন, অন্তত ২০২৪ পর্যন্ত করে যাবেন। যেমন, ‘পাবলিক প্লেসে নামাজ পড়া যাবে না। ভোটের আগে ত্রিপুরায় মসজিদে হামলা বা কমিউনিটিতে হামলা করলে অন্য বিরোধীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আগিয়ে আসে নাই। এই ভয়ে যে এতে সেই বিরোধী দল হিন্দু-ভোট হারাবে”। আবার চার দিন আগে উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে তথাকথিত কিছু সাধুদের দিয়ে (নাম তার খুব বাহারি – যতি নরসিংহানন্দ স্বরস্বতী) প্রকাশ্যে জনসভায় ঘোষণায় আহ্বান জানালেন মুসলমানদের হত্যা করার জন্য। অথচ কেউ মামলা করেনি, এই অজুহাতে পুলিশ চুপ করে বসে আছে। তাই কলকাতার মমতার দল তৃণমূলের এক উপস্থিত সদস্য বাদি হয়েছে। তিনি নির্বাচন কমিশনেও নালিশ দিয়েছেন। মোদির দলের মুখ কুলুপ! অর্থাৎ এগুলো হল, আগামী মাসে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে আবার জিতে আসার জন্য মোদির একমাত্র  ও শেষ উপায়।
    তাই এই অবস্থায় মুসলমানের ওপর নির্যাতন বা হত্যার অভিযোগ আবার আমেরিকান মানবাধিকার লঙ্ঘনে বড় হয়ে উঠুক এটা মোদি নিতে পারবেন না। তাই আমেরিকার কাছ থেকেই ভারতের এই পলায়ন। তাতে ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ যাই হোক সেটা সেকেন্ডারি, পরে দেখা যাবে। মোদির মূল স্বার্থ এখন নির্বাচনে বিজয়। নির্বাচনে নিজের দলকে বাঁচানো।

    তাই এই ডিসেম্বর মাসেই বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করতে মোদির ভারত এবার মরিয়া অবস্থায় রাশিয়ার পুতিনের ভারত সফর আয়োজন করেছিল। পুতিনের ভারত সফর ছিল ৬ ডিসেম্বর এবং তা কেবল পাঁচ ঘণ্টার জন্য। কিন্তু আয়োজন, আলোচনার বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের প্রপাগান্ডা ছিল শিখরে।

    ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের দেশীয় মিডিয়ায় কিভাবে হাজির থাকতে চায়, এর কিছু তরিকা দেখতে পাওয়া যায়। দা-প্রিন্টের নয়নীমা বসু বলতে চান যে, ভারত আর শুধু রাশিয়ান অস্ত্রের ক্রেতা নয়। ভারত এখন অস্ত্রবিষয়ে জয়েন্টভেঞ্চারে উৎপাদক। এমনকি অস্ত্রবিষয়ক গবেষণাতেও অংশীদার হতে যাচ্ছে।

    তাহলে সারকথাটা কী?
    সারকথাটা হল, অবরোধের অভিমুখটা এখন থেকে যতই দিন যাবে ভারত ততই আমেরিকা থেকে দূরে চলে যেতে থাকবে। যার একটা পর্যায়ে ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফেরার সব সম্ভাবনা নিঃশেষ ও লুপ্ত হয়ে যাবে। অবস্থা দ্রুতই সেদিকে যাচ্ছে। আর সেটার এখনই যে অবস্থা তাতে বাংলাদেশের উপর আমেরিকান চাপ প্রয়োগ যে হারে বাড়ছে তাতে এথেকে বাংলাদেশকে নুন্যতম রিলিফ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের কোন ভুমিকা রাখার সুযোগ এখনই প্রায় নাই। ফলে আমাদের সরকারকে সহায়তা দিবার ক্ষেত্রে বাকি থাকল কিছু পুরান কমিউনিস্ট রাষ্ট্র যারা মনে করে শ্রেণী স্বার্থের নামে রাষ্ট্রের হাতে নাগরিককে হত্যা কিংবা, গুম-খুন করার সুযোগ তো থাকতেই হবে। সেই সুত্রে,  রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক সেটা আবার কী? অথবা ধরেন, নাগরিক বলে কাউকে সুরক্ষার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে? কেন? এসব তারা মানে না। তাদের রাষ্ট্র ধারণায় এসবের বালাই নাই। আছে কেবল তথাকথিত শ্রেণীস্বার্থের শ্রেণীবোধ – শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা ইত্যাদি। আসলে এগুলো এমন সব শত বছরেরও বেশি পুরান অর্থহীন সব কমিউনিস্ট প্রলাপ!! যা রিভিউয়ের সাহস, নিজেকে সংশোধন ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা একালে কারও মধ্যেই নাই!
    তবুও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আত্মরক্ষার্থে  হাসিনা সরকারের অভিমুখ দিনকে দিন সেরকম ক্যাম্পের দিকেই হবে। আবার এর উল্টাটা যে, আমেরিকান বিরাট কোন স্বার্থ আছে যেমন বঙ্গোপ্সাগরে সপ্তম নৌবহর নোঙর করানোর সুযোগ মিলবে –  এই লোভে সে কোন স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে যেতেও পারে। সেটা হয়ত পারে, হয়ত তা সে করবে হয়ত না। কিন্তু এসব স্বার্থে আমেরিকান কোন পদক্ষেপ নিবার ক্ষেত্রেও আমেরিকান সক্ষমতার মুরোদ নিঃশেষ হবার দিক যাচ্ছে আর সম্ভবত বাইডেনই হতে যাচ্ছেন তাতে শেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। তাও আবার যা করার তা  আগামি বছরের মাঝামাঝির পরে তাও লোপ পেয়ে যাওয়ার অভিমুখে হাটছে!!! বিশেষত আমেরিকান – সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক উত্থানের ধাক্কায় –
    রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ গঠন তা সামলাতে অক্ষম হয়ে যেতে পারে, এমন স্বার্থ সংঘাত বিপুল বেগে বাড়ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “অবরোধ’ ছাড়া কোথাও আলাপ নেই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    অবরোধ আলোচনায়ঃ

    গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    গৌতম দাস

    ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Re

     

    Recent US sanctions On China, Bangladesh

    Bangladesh protests US sanctions against RAB

     

     

    গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেনের আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ বাংলাদেশের বিশেষ প্যারামিলিটারি বাহিনী ‘র‌্যাব [RAB] এর চলতি এবং সাবেক সাত অফিসার ও খোদ প্রতিষ্ঠানটার ওপর অবরোধ বা স্যাংশন [sanction] আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এতে সাবেক র‌্যাব প্রধান ও বর্তমান আইজি পুলিশ বেনজীর আহমেদও আছেন। এদিকে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদেরও আমেরিকান ভিসা বাতিল করে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে দেশের মিডিয়ায় রিপোর্ট এসেছে।

    বাংলাদেশে আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব এখন কোথায় কতটুকু পড়বে অথবা এর প্রতিক্রিয়া কী কী, কতদূর হতে পারে অথবা সরকার টিকে থাকতে কোনো সমস্যায় পড়বে কি না – এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা এখনকার সময়ের প্রধান আলোচনার বিষয়। তবে এটা বলাই বাহুল্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যেকোনো বাহিনীর সদস্যরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে এখন অন্তত এসংক্রান্ত পুরো পরিস্থিতি ও এর অভিমুখ নিশ্চিত ঠাহর করার আগ পর্যন্ত সতর্ক হয়ে থাকতে চাইবেন।
    সবচেয়ে বড় কথা, গত ১৩ বছরে নানা অনিয়ম রেজিমে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সেই ব্যবহারিক রেওয়াজ আবার একটু থমকে দাঁড়াতে চাইবে। “আবার” বললাম এ জন্য, যেমন গত ২০১৯ সালে ক্রসফায়ারে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল  চার শতাধিক [……২০১৮-২০১৯ সালে ৪২৪ জন ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন……। ]। কিন্তু পরের বছর তা কমে এর মাত্র ১০ ভাগে নেমে এসেছিল। কারণ, কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড। অনেকের অনুমিত ব্যাখ্যাটা এরকম যে, বাহিনীতে দলাদলি বা সহমত ভেঙে যাওয়ায় রেকর্ড উল্টো হয়েছে। কাজেই এবার অবরোধের ঘটনাতেও এই শক থেকে এবার ডাটা কী আসে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে কর্মি-জনবলের  মনোবলের ওপর প্রভাব পড়া যে খুবই সম্ভব তা সম্ভবত সরকার আমল করছে। যেমন ১০ তারিখের পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের প্রধান প্রতিক্রিয়া হল একেবারে ‘ডিনাইয়াল’[denial] বা পুরোপুরি অস্বীকার করা। সম্ভত তাদের অনুমান, গুরুত্বপূর্ণ আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে হলে এটাই পথ।

    এই অবরোধের সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এক নির্বাহী আদেশে ইও নং ১৩৮১৮ [Executive Order (E.O.) 13818] হয়েছে এবং বাইডেন প্রশাসনের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা পররাষ্ট্র বিভাগসহ আরো অনেক বিভাগের মিলিত তৎপরতার সার ফলাফলে এই অবরোধ আরোপ ঘটেছে। কিন্তু সবশেষে এর পাবলিক ঘোষণাটা দেয়া হয় ট্রেজারি বিভাগ থেকে। কেন?
    কারণ বিষয়টা মূলত ফাইন্যান্সিয়াল এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বিষয়ক। আরেকটু খুলে বললে দুনিয়ায় যত বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন হয় তার ৮৫ ভাগ বা তারও বেশি হয় আমেরিকান ডলারে; যার সোজা মানে সব লেনদেনের একটা না একটা পর্যায়ে তা হতে হয় ডলারে আর এর পরেই তা কনভার্ট হয়ে নিজ নিজ দেশীয় মুদ্রায়। আর ডলারে হওয়া মানে, কোনো না কোনো স্থানীয় (যেমন ঢাকার) কোন ব্যাংকের আবার কোন এক আমেরিকান ব্যাংকে (ডলারে) যে অ্যাকাউন্ট থাকে এর মাধ্যমে তা হয়েছে। তাই ডলারে লেনদেন মানেই আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমের অংশ হওয়া ও তা ব্যবহার করা। মানে ধরা যাক, বাংলাদেশে স্থানীয় ‘ন্যাশনাল ব্যাংকে’ আমার অ্যাকাউন্ট আছে। এই ব্যাংকের আবার কোনো আমেরিকান ব্যাংকে ডলার-অ্যাকাউন্ট আছে। এতে এখন মূলত আমার হয়ে সেই ডলার-অ্যাকাউন্ট কোনো লেনদেন সম্পন্ন করে দিয়ে থাকে। এখানে যদিও আমার হয়ে আমার দেশী মুদ্রার ব্যাংক অনেক লেনদেন করে দেয় বলে আমরা ডলারে লেনদেন ব্যাপারটা টের পাই না। কিন্তু যখন আমার নামে ‘অবরোধ আরোপ’ করা হবে এর অর্থ, আমার জন্য এই ‘আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে’ ব্যবহার ও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় তখন থেকে।

    তাহলে কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি আমাকে নিষিদ্ধ বা অবরোধ করার তথ্য, জেনে অথবা না জেনে আমার লেনদেনটাও সম্পন্ন করে দেয় তাহলে কী হবে? বলাই বাহুল্য, এতে এই ট্রেজারি বিভাগ সেই আমেরিকান ব্যাংককে কড়া ফাইন করবে। যেমন- ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধে হংকং ব্যাংকের আমেরিকান শাখা এমনই এক নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে এক লেনদেন ঘটিয়ে দিয়েছিল বলে ওই ব্যাংককে ট্রেজারি বিভাগ থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিল।

    আরেকটা কথা, কেন আমেরিকার হাতেই এমন অবরোধ আরোপের ক্ষমতা দেখা যায়? দুনিয়ার অন্য কোনো দেশ বা সে দেশের মুদ্রাও কী এমন অবরোধ আরোপ  করতে পারে না? অবশ্যই করতে পারে। যেমন- চীনও পাল্টা কিছু কিছু আমেরিকান প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর অবরোধ আরোপ করে দেখা যায়। কিন্তু দুইটার ফারাক হল যেহেতু চীনা মুদ্রা ইউয়ানে দুনিয়ায় লেনদেন ডলারের তুলনায় অনেক কম সেকারণ চীনা-অবরোধের প্রভাবও অনেক কম। এ ছাড়াও যাদের লেনদেন চীনের সাথেই কেবল সেখানে কেবল এর কিছু প্রভাব পড়বে।

    ওদিকে, আমেরিকা কী কারণ দেখিয়ে এই অবরোধ আরোপ করেছে? তারা দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের র‌্যাব ও এই প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ওসব ব্যক্তিরা বাংলাদেশে গুরুতরভাবে ‘আইনের শাসন’ ও ‘মানবাধিকার আইন’ ভঙ্গ করেছেন। এখন আমেরিকান প্রশাসনও যদি এমন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে তাহলে কি আমরা অথবা অন্য কোনো দেশ একই ধরনের মানে আমেরিকার ওপর অবরোধ আরোপের পদক্ষেপ নিতে পারব? আর পারলে তা করি না কেন?

    প্রথমে বলে রাখি, এটা তো এখন আশা করি সবার কাছে পরিষ্কার যে, এই অবরোধের শাস্তি দেয়ার সাথে জাতিসংঘ বা অন্য কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নাই। কেবল আমেরিকান প্রশাসনই এটা করেছে। তাই বলা যায়, আইনত বাংলাদেশ বা আমেরিকাবিরোধী অন্য কোনো দেশও এমনইভাবে কোন আমেরিকান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চাইলে এমন পদক্ষেপ নিতে পারবে। কিন্তু সবার আগে ব্যাপারটায় আমেরিকা আমাদের সাথে খুব তুলনীয়ই নয়, সেদিকটায় নজর দিতে হবে। কারণ আমেরিকার বিচারব্যবস্থা এখনো তাদের সমাজে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রাখে, এছাড়া তারা নিজেকেই নিজে সংশোধন করে নেয়ার  এখনো অযোগ্য হয়ে যায় নাই, বরং ক্ষমতাসম্পন্ন; যদিও এর সবই ভাল এমন আদর্শব্যবস্থা নিশ্চয় আমেরিকা নয়। তবে আমাদের দেশের বেলায় এ’ধরনের অভিযোগগুলোর গত ১৩ বছরে কোনো সুরাহা বা প্রতিকার নেই। ফলে এ জায়গায় আমরা আমেরিকার সাথে তুলনীয় নই।

    দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। এখনো পর্যন্ত ডলারের দেশ আমেরিকা বাদে অন্য কোনো দেশ অবরোধ অন্যকোন দেশের উপর আওরোপ করলেও এর কোন শক্ত প্রভাব নাই, এর মূল কারণ কী? মানে অন্য কোনো দেশের অবরোধের তেমন মূল্য নেই। কারণ কিছুটা উপরে বলেছি। বাকিটা হল, অবরোধ মানে, আসলে প্রতিষ্ঠিত কোন দেশের ইকোনমিক ও ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম থেকে কাউকে বের করে দেয়া। অনেকটা একঘরে করে দেয়ার মত। যদিও সেটা আমেরিকান ডলারের অবরোধ হলে তবেই সেই চাপ কার্যকর। কারণ দুনিয়ার ৮৫ ভাগেরও বেশি লেনদেন হয় এই ডলারে। আবার সবকিছুই এত বেশি পরিমাণে ডলার-মুদ্রায় কেন? এমন হওয়ার কারণ, গ্লোবাল বাণিজ্য ও লেনদেন ব্যবস্থাটার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ [IMF] হলেও এটা জন্ম (১৯৪৪) থেকেই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই ভিত্তি করে এটা শুরু বা কার্যকর হয়েছিল। ফলে তাতে ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হয়ে যায়। কিন্তু তা হলেও তখনো মূলত ডলার আসলে একটা দেশের, আমেরিকার স্থানীয় মুদ্রা। অর্থাৎ আমেরিকার নিজের মুদ্রার ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আমরা অন্য দেশের কেউ বাধা দিতে পারি না। আমেরিকার পড়ে-পাওয়া এই বাড়তি  সুবিধা প্রাপ্তির শুরু এখন থেকেই। এটা জানা সত্বেও এমনটাই করতে হয়েছিল।

    তাহলে আমরা ডলারকে সেকালে আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হিসেবেও নিয়েছিলাম কেন?
    কারণ সে সময় এক আমেরিকান ডলার ছাড়া আর কোনো দেশের মুদ্রা – তার অ্যাকাউন্টে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত ছিল না। এর মানে আবার কী? মানে হল, দুনিয়ার যত লোককে ডলারে পেমেন্ট দিতে হবে বা আমেরিকার কাছে পাওনা, এর চেয়ে আমেরিকা যাদের কাছে পাবে মানে তারা ডলারে আমেরিকাকে পেমেন্ট দেবে, এর পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিটাকে বলা হয় (ডলার) সারপ্লাসে আছে। আবার একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট হলো গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেন ব্যবস্থা কোনো মুদ্রায় চালু করতে গেলে ওর জন্য গ্লোবাল বাণিজ্যের সেই মুদ্রাকে সারপ্লাস মুদ্রা হতে হয়। ১৯৪৪-৪৫ সালে একমাত্র মার্কিন ডলার ছিল সারপ্লাস। এ’ছাড়া বাকি ইউরোপের সব মুদ্রা ছিল মুদ্রাস্ফীতির মুদ্রা। মানে, ভল্টে রাখা সোনার চেয়ে নোট ছাপানো মুদ্রা মান-পরিমাণে বেশি। তাই সেকালে ডলার হয়ে যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একমাত্র মুদ্রা।

    “তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর তালিকাতে রেখেও ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। দেখা গেছে, তারা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; আগে যাচাই করেননি”

    কাজেই একা আমেরিকা সেকালে পাওয়া সুবিধার জন্য একালেও যে অবরোধ আরোপের সুবিধা নিচ্ছে তা সেকালের সবল অর্থনীতির কারণে। এই বাড়তি সুবিধা যা পেয়েছিল সেটা ওর পড়ে পাওয়া সুবিধা, যা কেবল কুড়িয়ে পাওয়া নেয়া সুবিধা যেন।

    এজন্য বেনজীর বা ওই সাতজন শুধু আমেরিকাতেই নয় বিদেশে যেকোনো সম্পত্তি কিনতে চাইলে বাধা পাবেন। আবার, তাদের আগে থেকে কোনো সম্পত্তি থেকে থাকলে টেজারি বিভাগ তা এখন বাজেয়াপ্ত করে নেবে। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, এই সাতজনের সংখ্যাটা যেকোনো সময় আমেরিকা আরো বাড়াতে পারে। এনিয়ে আমাদের সরকারি আমলা বা দলীয় নেতারা সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে কাটাবেন, কী জানি কী হয়! যেটা সরকারি কার্যক্রম ততপরতাকে ধীর বা শিথিল করেও দিতে পারে। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার লোক পাওয়ার অভাব দেখা দিতে পারে। সম্ভবত তাই সরকার মনোবল বাড়ানোর দিকে বড় নজর বাড়িয়েছে।

    কোনো এক প্রফেসরের পরামর্শ হল (যাকে মনে হচ্ছে পরামর্শক প্যানেলে নিযুক্তি পেয়েছেন), আমেরিকা যেহেতু লবিতে পরিচালিত এক দেশ; ফলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত নিজের পক্ষে লবি ফার্ম নিয়োগ করা। পরে আমরা এর পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনকে দেখতে পাই। ‘মানবজমিন’ লিখেছে – তিনি বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র সরকারে অনেক জ্ঞানী-গুণী লোক আছেন তাদের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে, সেটি অব্যাহত থাকবে”। অর্থাৎ সরকার যে আমেরিকান কোনো লবি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে সে ভিত্তিতে তৎপর হয়েছে সেটাই তিনি যেন এভাবে আমাদের জানালেন। এর ১২ ঘণ্টার মধ্যে আমরা জানলাম আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ফোন করেছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সুনির্দিষ্ট করে কেউ এর তেমন ব্যাখ্যা করতে পারলেন না; যদিও একটা শীতল প্রভাব অনেকের মধ্যে দেখা গেল যেনবা সরকারের ভাগ্য কী হয় সে উৎকণ্ঠা যেন এখন থেকে কেটে যাচ্ছে যাবে। কিন্তু একই সাথে সবার এটাও অনুমান এটা এত সহজে যায় না। তাহলে?

    যখন কিছুই অফার করার থাকে না, তখন আপোষ চাইলেও কী দিয়ে দেয়া নেয়া হবে?
    এবার এ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। বাস্তব বড় কঠিন। বাস্তবতাকে ঢেকে রেখে লাভ নেই বরং দুদণ্ড আবেগকে বাইরে রেখে বাস্তব চিন্তা করলেই যা জানা যায়। সেই কঠিন বাস্তবতাটা হল, আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের পরে, “না সরকারের খুব কিছু আমেরিকাকে অফার করার আছে, না আমেরিকার খুব কিছু পাওয়ার সুযোগ আছে”। এমন কাঠামোর মধ্যে আছি আমরা দুইপক্ষ। অনেকে খুঁজে পেয়েছে কিংবা মহাসত্য কোনো কিছু দেখিয়ে দিতে পেরেছে মনে করে বলার চেষ্টা করছেন যেমন আমাদের মন্ত্রী মোমেন বলছেন, “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে একাধিক বৈঠক হয়ে থাকে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফোরাম হচ্ছে পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ে পার্টনারশিপ ডায়ালগ। এ ছাড়াও বিভিন্ন বৈঠকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকে। তারা যেসব বিষয়ে জানতে চায় সেটির উত্তর দেয়া হয়” ইত্যাদি।

    কূটনীতি মানে আসল কথা সরিয়ে কথার প্যাঁচাল, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।  এখানে মোমেনের আসল স্বার্থের কথাটা ছিল, “নিষেধাজ্ঞা শিথিলে বাইডেন প্রশাসনের সাথে আলোচনা চায় ঢাকা”। এটা আসলে মুখ্য গিভ অ্যান্ড টেক। আমরা সরাসরি সে জায়গায় যাবো; এতে সময় ও জায়গা বাঁচবে।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? না, একেবারে অসম্ভব। তাহলে হাসিনা সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু যেমন ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হল, সরকারের দেয়ার মত তো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নিবেন।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? একেবারে অসম্ভব। তাহলে সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হলো, সরকারের দেয়ার মতো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নেবেন।

    তবে সেই কথা বলার বাহানাতে সরকারের একটা লাভ হয়েছে যে, বাইডেন সরকারের সাথে তারা ‘গুড টার্মে’ আছে, মিথ্যা হলেও এমন একটা ছবি, এটা বাংলাদেশের পাবলিককে দেখানো গেছে।

    কথা হওয়া আর একমত হওয়া এক নয়ঃ
    আর বলা হচ্ছে, মানবাধিকার নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে। কিন্তু একমত হওয়ার সুযোগ কী আছে? অবশ্যই না। কারণ মূল সমস্যা তো মানবাধিকার মানা না মানাতে নয়। মানবাধিকারের প্রশ্ন তো লংটার্মের পালনীয় শর্ত দিয়ে সবসময় মিটিয়ে নেয়া হয়েছে। গত ২০১৩ সাল থেকে ইউপিআরের [UPR] নামে জাতিসংঘের কর্মসুচি বসলে সেখান থেকে সময় বাড়িয়েই সমস্য দূরে ঠেলা কী চলছে না? আর যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান- বয়ান হল, “বাংলাদেশের গুম-নিয়ে কোনো আইন বা করণীয় নেই। তাই বাংলাদেশে কোনো গুম নাই”।  মহা অদ্ভুত এই যুক্তি!!! আসলে এই সরকার পাবলিক রেটিংয়ের ভিত্তিতেতা নিয়ে মাথা না ঘামানো সরকার বলে আর এভাবে সুদীর্ঘ  ১৩ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরে এর যা ভিত্তি দাড়িয়েছে তাতে এর পক্ষে কোন ধরণের মানবাধিকার রক্ষার কমিটমেন্ট দেয়া অর্থহীন, সেই কমিটন্টে আস্থা রাখাও অর্থহীন!

    যদিও প্রকৃত সমস্যা আরো অনেক গভীরে। আমেরিকা আসলে যা চাচ্ছে হাসিনার বাংলাদেশ তা দিলে তা ধারণ-যোগ্যতা বা পাত্র তো আমেরিকার কাছে নেই। যেমন- আস্থা পাওয়া যায় বাংলাদেশের টিকা পাওয়ার সুরাহা প্রশ্নে চীনা-বিকল্প বলে কী আমেরিকার কোন মুরোদে আছে? যেখানে দুনিয়ার কোথাও আমেরিকা কোনদেশের টিকাপ্রাপ্তির সমাধান করে দিয়েছে – আমেরিকার কাছে এমন কোনো দেশের নাম আছে? বরং উল্টো, সে তো জি৭-এর সদস্য হিসাবে তাদের জাতিসঙ্ঘের ‘হু’ [WHO]কে দেয়া কমিটমেন্টের সব টিকাই দেয়নি। অথচ বাংলাদেশের সমাজে এখন যতটুকু দোকান হাটবাজার গঞ্জ যা যতটুকু যে খোলা আছে কারখানা চলছে তা তো এই চীনা টিকার প্রাপ্যতার জোরেই। ফলে এখনো বাংলাদেশের টিকাদাতা-ওস্তাদ বদলানো – আবার টিকা নেই মানেই হবে, সোজা লকআউট। টিকা নাই মানে হবে, অর্থনীতিও নাই; ডুবে যাওয়া।
    যদিও টিকা নেয়া মানে করোনা থেকে একেবারে মুক্তি এমন অবস্থায় দুনিয়া এখনও পৌঁছায়নি, তবু যতটুকু যা ব্যবসা-বাণিজ্য খোলা এবং কার্যকর, তা ঘটতে-চলতে পারছে টিকা দেয়ার জন্যই। আমেরিকার হাতে এনিয়ে চীনের বিকল্প আমাদেরকে কী দেয়ার আছে? বিশেষ করে নয়া ওমিক্রন [Omicron] ভ্যারিয়েন্টের হামলার মুখে? ওদিকে ম্যান্ডেটবিহীন নিশিথ ভোটের সরকার, এটা এখন বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ছাড়া চলতে পারবে না। কারণ এরা পাবলিক রেটিং-এর উপর ভরসা করে চলে না, দাঁড়িয়ে নাই। ফলে উলটা এদের  কর্মীদেরকে “প্রকল্প” মানে অর্থের সংস্থান করে না দিতে পারলে তারা থাকবে কেন?  এখন বলেন,  আমেরিকা কি চীনের মত এই অবকাঠামো ফান্ড জোগাতে সক্ষম? তাহলে কিসের ভরসায় হাসিনার সরকার চীনকে ফেলে ছেড়ে আসবে? কাজেই কোনো ডিলের জায়গাটা কোথায়? ভিত্তিটা কী? বলপ্রয়োগে সরানো ছাড়া সরকারের সরে যাওয়ার জায়গা নেই!

    আবার দেখেন হাসিনার বাংলাদেশ চীন ছেড়ে আসবে কোথায়? কোয়াডে? “অসামরিক” কোয়াড কি সক্রিয়?  মানে ভারত কি এখন আমেরিকান ক্যাম্পে আছে ? সেটা এখন  না ভারত নিশ্চিত বলতে পারবে, না আমেরিকা! এই নড়বড়ে কোয়াডের কোথায় ঢুকবে হাসিনার বাংলাদেশ?

    মূল ইস্যু তো একখানেও সেই একই – মানবাধিকার! ভারতের মানবাধিকার প্রশ্নে আমেরিকার যেসব অবরোধ আরোপ করার কথা তা বাইডেনের উচ্চারণের আগেই তো ভারত ভেগে গেছে! মোদির ভারত আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিয়েছে। বাইডেন কী হতভম্ভ নয়?  এতে এখন বিশৃঙ্খল ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক বাইডেন সোজা করবেন কী করে? ইমিডিয়েট কোনো পরিকল্পনা কী বাইডেনের কাছে?? মনে হয় না!!

    কূটনীতিতে একটা বড় অংশ থাকে বাকচাতুরি, এজন্য কূটনীতির ভাষাই আলাদা; কিন্তু তাই বলে সাবধান এতে সবটাই চাতুরি তা অবশ্যই নয়।  কিন্তু ব্লিঙ্কেন ভেবেছেন এটা শতভাগ চাপাবাজির খেলা। ডেমোক্র্যাসি সামিটসহ গত ৯ ডিসেম্বর থেকে বাইডেন কোথাও বলেননি যে, এখন থেকে মানবাধিকার – তার সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। একথা বলতে চাইলে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তা প্রকাশ করতে হয় তা করেছেন? কেউ জানে না!

    অথচ বাইডেনের পররষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এখন এশিয়ায় আসিয়ান দেশ সফরে, ইন্দোনেশিয়ার পরে মালয়েশিয়ায় সফর শেষ প্রায়। [যদিও বাকি প্রোগ্রাম গুটিয়ে তিনি ফেরত চলে যাবেন কারণ দলে একজনের করোনা-পজিটিভ ধরা পড়েছে।]  কিন্তু তিনি প্রতিদিন চাপা মারছেন, মানবাধিকার নাকি তাদের সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে!!! ভয়েস অব আমেরিকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে তারা বিদেশনীতিতে মানবাধিকারকে ঢুকিয়ে (ইনফিউজ) নিচ্ছে [……to infuse human rights into its foreign policy…]। কিন্তু এটা ব্লিঙ্কেনের নিজের ভাষ্য নয়, রিপোর্টার নিজে যা বুঝেছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে সেই ভাষ্য।  মানে  এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের নয়, নিজের বক্তব্য বলছেন রিপোর্টার। তবে আরেক জায়গায় বলেছে, আমরা মানবাধিকারকে বিদেশনীতির কেন্দ্রে নিচ্ছি [……We are determined to put human rights at the center of our foreign policy……]। এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের বলা হয়েছে, উপরে কোটেশন চিহ্ন দেয়া আছে!!  এরপরেও এটা মেনে নেওয়ার বিরাট সমস্যা আছে। কারণ এই প্যারাগ্রাফেরই শেষ শব্দগুলো হল,  ……promote accountability for human rights violations and abuses, no matter where they occur । কিন্তু এই ‘নো ম্যাটার হয়ার দে অকার’ কথাগুলো  বিশ্বাস-অযোগ্য। কারণ, ব্লিঙ্কেনের দাবির মানে হল যে ……মানবাধিকার লঙ্ঘন “যেখানেই হোক না কেন” তারা সক্রিয় হবেন – এই কথাটাই তো মিছা! কেন?
    এসব শুনে বা পড়ে মনে হতে পারে যে, বাইডেন-ব্লিঙ্কেন খুবই সিরিয়াস এবং একটা নীতিগত অবস্থান নিয়ে তারা মানবাধিকার বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছেন। ফলে এবার আর তারা  কে কোন দেশ বা কোন ‘কৌশলগত বন্ধু’ তা দেখবেন না। দেখবেন মানবাধিকারের নীতি কে মানেননি; আর তার ওপর তারা কঠোর হবেন।

    তাই কী?
    না, এটাই সর্ব্বৃহৎ চাপাবাজি। কারণ তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর  আমেরিকার অবরোপ আরো  সম্ভাব্য  তালিকাতে রেখেও সেই  ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে সার্টিফিকেট-সহ দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে ‘বক্তৃতা’ দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। যেমন সেখানে  এক রিসার্চ ফেলোর বরাতে বলা হয়েছে…told Al Jazeera the US sanctions show that the Biden administration has made a “significant policy shift” not only over Bangladesh, but in the US foreign policy in general,……। অর্থাৎ এটা নাকি বাইডেনের আমেরিকার পলিসি শিফট ঘটে গেছে।
    তাহলে ভারত তো আমেরিকার অবরোধ আরোপের  সম্ভাব্য  তালিকার দেশ – তবু কেন অবরোধ নাই? কাশ্মীর ইস্যুতে, সারা ভারতে মুসলমান নিপীড়ন ধর্মীয় স্বাধীতায় হস্তক্ষেপ মসজিদ ভেঙ্গে বা আগুন দেয়া পাবলিক নামাজে বাধা দেওয়া ইত্যাদিতে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান  থেকে বাইডেনকে অবরোধ দেয়ার সুপারিশ দেয়া ছিল ; এছাড়া সর্বশেষ ভারতের খৃশ্চানদের উপরেও তাদের চার্চে হামলায় এবার ক্রিসমাস পালন না করার সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে – হিন্দু ছাড়া অন্য কোন ভারতীয় ধর্মপালন করতে পারবে না যেন, এমন অবস্থা দাড়িয়েছে। এই জলন্ত তথ্যগুলো পাশে রেখে যেখানে ভারতের উপর আমেরিকার কোন অবরোধ নাই এটা সত্বেও আমেরিকা  “significant policy shift” করেছে এমন দাবি কিভাবে করা যায়?  অর্থাৎ  এখানে কার্যত
    দেখা গেছে, এরা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; চোখ খুলে আগে বাস্তবে যাচাই করেননি।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “লেনদেনের ‘বস্তুই’ নাই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    বাইডেনের অবরোধঃ
    অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২১   ১৭ঃ১৮ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3R1

       US President Joe Biden’s Summit for Democracy

     

    ঘোর ঘনঘটা। অন্ধকার ছেয়ে আসছে!
    যদিও এই অন্ধকার মানে এটা নয় যে এখন বাইডেন হাতে আলোর প্রদীপ আছে অথবা হাতে প্রদীপ নিয়ে তিনি মঞ্চে আসছেনই! না ব্যাপারটা একেবারেই এবার ২০০৭ সালের মত এত সরল নয়। বরং উল্টা-পালটা বহু কিছুরই সম্ভাবনা। সবচেয়ে বড় কথা এক প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা আর গভীর অনিশ্চয়তা ছেয়ে আসতে যাচ্ছে! সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সে “আমেরিকান অথরিটি” আর নাই। অথচ ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে একমত নাই। যেটুকু গত ৭৫ বছরে তোইরি হয়েছিল তা সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকা অপব্যবহার করাতে সবকিছু এখন অন্ধকারে। সারকথায় পুরান ওস্তাদের অথরিটি দুর্বল এমনকি চ্যালেঞ্জড হয়ে যাচ্ছে অথচ  ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে যেটুকু ঐক্যমত্য ছিল তাই ভেঙ্গে পড়তেছে। ইউক্রেন নিয়ে হুঙ্কার পালটা হুঙ্কার এর প্রমাণ। তবে আমাদের প্রসঙ্গ বাইডেনের অবরোধ আরোপ।

    বাইডেন বাংলাদেশের উপর অবরোধ আরোপ করেছেন। আর এটা ২০০৭ নয়, ২০২১ সাল। যখন আমেরিকার গ্লোবাল কর্তৃত্ব ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে; অর্থাৎ সিংহ এবার আরও বুড়া ও বেশি উত্থান-রহিত হয়ে গেছে। অথচ বাইডেন সেদিকটা আমল না করে উলটা বুড়া সিংহ আমেরিকাকে ওভার স্ট্রেস মানে আরও ভারের বোঝা চাপিয়ে দিলেন এই অবরোধ আরোপ করে। আর তাতে এটা মোটেই অসম্ভব নয় যে এতে বুড়া সিংহের ঘারে সবকিছু হুরমুর করে ভেঙ্গেচুড়ে পড়ল। ফলাফল  আরো এক গভীর নিম্নচাপ!
    উপরে এসব কথার অর্থ আবার কোনমতেই এটা নয় যে এখানে আমাদের সরকার সেফ থাকবে এমন কোন ইঙ্গিত দিচ্ছি। সেটা নয় তবে বহুকিছুই অনিশ্চিত বলছি ফলে স্বভাবতই এর মধ্যে সরকারের টিকে যাওয়াটাও অনিশ্চয়তা থেকে বাইরে থাকবে কী করে! মোট কথা যাদের হাতে যা কিছু নিয়ন্ত্রিত থাকতে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম সেসব সম্ভবত আর তেমন থাকছে না।  ফলে সবার আগে ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে পুরাতন ভারসাম্যটা।

    তবে একটা সারকথা একেবারে আঙুলে গুনে আমরা মনে রাখতে পারি যে, এবারের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” বা সেখান থেকে ঘোষিত অবরোধের নিষেধাজ্ঞার তালিকা প্রকাশের পর থেকে দুনিয়াটা আর আগের মত নাই, আগের জায়গায় তা আর স্থির নাই হয়ে গেছে। যদিও ক্রমশ ঘটনা গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ঘটনায় সেদিকেই যাচ্ছিল। তাতে বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা হল এসবের ‘ফাইনাল এলার্ম’ বাজানো।
    কিন্তু মজার কথাটা হল যদি প্রশ্ন জাগে বাইডেন কী জানতেন যে তিনি একটা “ফাইনাল এলার্ম” বাজিয়ে দিচ্ছেন! এর জবাবটা হবে খুব সম্ভবত না। তিনি বরং আমেরিকান সক্ষমতা আগের মত আছে মনে করে স্বাভাবিক মনে করেই একাজ করেছেন। হয়ত এখন ক্রমশ বুঝতেছেন বা বুঝবেন। এর একটা লক্ষণ হল থিঙ্কট্যাংক ফেলো কুগেলম্যান এর মন্তব্য যেটা প্রথম আলোতে অনুবাদে ছাপা হয়েছে। আর যার শিরোনাম “এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য খারাপও হতে পারে”। অর্থাৎ তিনি আমেরিকার জন্য খারাপ কথাগুলো সবটা উচ্চারণ করলেন না। কেবল কিছু ইঙ্গিত দিলেন।

    দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছেঃ
    আসলে আমাদের বেশির ভাগের অলক্ষ্যেই দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছে।  পোলারাইজেশন বা বাংলায় মেরুকরণ মানে কে কার দলে বা পক্ষে; সেই পক্ষা-পক্ষির ব্যাপারটা বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে যেভাবে সাজানো থেকে কাজ করত তা ভেঙ্গে গেছে। যেমন ভারতের কথাই যদি ধরি, বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগের দিনে,  ভারত আমেরিকার খুবই ঘনিষ্ট একথা মানতে কারও অসুবিধা হত না। এমনকি অকাসের না হোক অন্তত কোয়াডের প্রসঙ্গ উঠলে ভারত অবশ্যই চীনবিরোধী প্রথম সারির আমেরিকা ঘনিষ্ট, তা বলা যেত।  কিন্তু এখন এটা পুরাটাই আবছা অস্পষ্ট!  কিন্তু  এটাকে “বদলে গেছে” না বলে ভেঙ্গে গেছে বললাম কেন? বললাম এজন্য যে ভাঙ্গার পরে এটা এখন কোনদিকে যাবে থিতু হবে সেই নিশ্চয়তা এখানে এখনও নাই। এজন্যই বলছি পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত।

    যেমন এখন দশাটা এমন যে না চাইতেও একটা আপনাআপনি বা অবজেকটিভ পোলারাইজেশন এখানে তৈরি হয়ে আছে। তা হল, কে কে এখন বাইডেনের ‘ডেমোক্রেসি সামিট’ বা কথিত গণতন্ত্রের ছড়ি ঘুরানোর পক্ষে আর কে নয়।  তাতে একেবারেই একা বাইডেন একদিকে এমনকি ইউরোপও সেখানে বাইডেনের সাথে নয়, সম্ভবত এর মধ্যে বিপদ আঁচ করে দূরে থাকতে চাইছে। আর অন্যদিকে, শুধু চীন না, এখনকার গুরুত্বপুর্ণরা হল  রাশিয়া, চীন এবং ভারত ইত্যাদি। হা ভারত!  এবং এই নব সংযোজন ভারত এটা ১৩৫ কোটির দেশ তবে মোদির ভারত।  অথচ গত টানা বিশ বছর ধরে আগে কখনও দেখা যায় নাই এমনভাবে আমেরিকা-ভারত গাঁটছাড়া বেধে চলে আসছিল। সবাই এটাই জানত তারা ঘনিষ্ট বন্ধু – যেহেতু ভারত আমেরিকার চীন ঠেকানো [containment] এর বন্ধু অতএব এই সম্পর্ক এক লম্বা পথ হাটবে; অবশ্যই সহসা ভাঙবে না। এটাই ছিল সবার অনুমান!
    কিন্তু না। সবাইকে হতাশ করে দিয়ে এবার এক পুরান সত্যঃ রাষ্ট্র মানেই তা কেবল একান্তই নিজ নিজ স্বার্থ – সে কথাটাই ভেসে সামনে এলো। সেকথার ভাষ্যটা অনেকে এভাবে ঠাট্টা করে বলছেন, ভারত ‘বাবা’ বদলিয়েছে। আমেরিকার বদলে ভারতের বাবা এখন রাশিয়া। গত সপ্তাহে ৬ ডিসেম্বর রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত সফরে এসেছিলেন। আর সেটাকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রচন্ড হাইপ তুলে প্রপাগান্ডা করেছে [এটা নাকি ডিফাইনিং মোমেন্ট] যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের নজরে পরে এই এলান। স্বভাবতই এর প্রধান টার্গেট শ্রোতা হোক বাইডেনের আমেরিকা এই ছিল ভারতের আকাঙ্খা! আর এসব প্রচন্ড হাইপ তোলা এটাকেই অনেকে ভারতের বাবা বদল বলছেন!

    এমনিতেই বাইডেনের প্রেসিডেন্ট জিতে যাওয়া মোদির জন্য কাম্য ছিল না। তা অপ্রকাশ্য ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন নিজ নির্বাচনের এক ক্যাম্পেইন-করণীয় বানিয়েছিলেন কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুকে। বলেছিলেন তিনি এই ইস্যুতে প্রশ্ন  তুলবেন। তাই মোদির দিক থেকে তার অপছন্দের কিছুই লুকানো ছিল না বা ক্ষমতায় এলে পরে দেখা যাবে – এমন ইস্যু ছিল না। তাই মোদি নিজ অবস্থান ভেবে রেখেছিলেন যে বাইডেনের কাছাকাছি মুখোমুখি না হবার বা এড়িয়ে চলার। আর কামনা করতেন, চীন-আমেরিকার ট্রেড সংঘাত তীব্র হোক যাতে কাস্মীর ইস্যু নিয়ে তিনি এর আড়ালে প্রথম দুয়েক বছর কাটাতে পারেন। কিন্তু এমন কামনা পূরণ করনে-ওয়ালার কাছে ভিত্তি পায় নাই।

    অন্যদিকে আরও জটিল সমস্যা। বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হলে তা বিস্তারে নোট  করা আর তা নিয়ে মামলা সাজানোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক স্বাধীন কমিশন আছে। যারা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে বার্ষিক রিপোর্ট পাঠায়। এর নাম USCIRF (United States Commission on International Religious Freedom)।

    ভারত সম্পর্কে এই প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট খুবই খারাপ। এমন খারাপদেরকে তারা সিপিসি ক্যাটাগরিতে ফেলে চিহ্নিত করে থাকে। “কান্টি অফ পার্টিকুলার কনগার্ণ (CPC) বা “বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ এই ক্যাটাগরিতে। ভারতে মুসলমানদের উপরে নিপীড়ন প্রশ্নে ভারত এখন সিপিসি তালিকার দেশ। গত কয়েকমাসে মোদির সরকারের উপর এবার যুক্ত হয়েছে চার্চেও হামলার অভিযোগ।

    অতএব এ’দুই উদ্বেগের বিচারে বাইডেনের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” এর দিন যত ঘনায়ে আসছিল তাতে বাইডেন এবার ভারতের উপর কোন অবরোধ আরোপ দিতে পারে এই ছিল মোদি সরকারের অনুমান। কারণ ২০২১ সালের সিপিসি রিপোর্টে এটাই সুপারিশ করা ছিল। যেটা ট্রাম্পের আমল থেকেই এমন রিপোর্টগুলো উপেক্ষা করে চলছিল।  আবার মোদির দিক থেকে দেখলে এই ধর্মীয় নিপীড়নই তার শেষ ভরসা। মোদির ধারণা আগামি বছর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে পাবলিক রেটিং খারাপ অবস্থাতেও তার জিতে আসবার একমাত্র উপায়। ফর্মুলা সেই পুরানা; গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীত্বের আমল থেকে গত আট বছরের মোদির প্রধানমন্ত্রীত্ব পর্যন্ত যে – যত মুসলমান নিপীড়ন ততই ভোটার পোলারাইজেশন এবং ততই বেশির ভাগ হিন্দুভোটার মোদির দলের বাক্সে। এই অনুমানে যে মোদি হল বাঘের বাচ্চা যে অন্য ধর্মের লোকেদের দাবড়িয়ে বেড়াতে সক্ষম; “হিন্দুধর্মই শ্রেষ্ঠ যা ধরে রাখার নায়ক মোদি”! কাজেই মোদির পক্ষে মুসলমান কোপানো একটু আপাতত কমানোও অসম্ভব! কাজেই মোদির পক্ষে বাইডেনের অবরোধ নিয়ে ভাববার সুযোগ নাই।

    আবার অবরোধের ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আরো আছে। অন্যের (আমেরিকান) বোমারু বিমান ঠেকানোর মিসাইল রাশিয়ার তৈরি S-400 । কিন্তু এই মিসাইল ক্রয়কারি রাষ্ট্রকে ঠেকাতে বা এক ধরণের অপরাধী বলে চিহ্নিত করার আইন আমেরিকা সাজিয়েছে যার নাম (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act,  CAATSA) ।  অর্থাৎ যে রাশিয়ান এই মিশাইল কিনবে সে আমেরিকার ঘোষিত শত্রু হবে তাই তার উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ করা হবে। ভারতের এমন ক্রয়াদেশের পাবার পরে রাশিয়ান মিসাইল পাঠানো রাশিয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এখনও বাইডেন অবরোধ দিবেন নাকি ভারতকে এই আইন থেকে ছাড় দিবেন এসবের কোনটাই এখনও ঘোষণা করেন নাই। অর্থাৎ সব এখনও বকেয়া বা পেন্ডিং হয়ে পড়ে আছে।

    এবার বাস্তবে কী ঘটেছে? এরই মধ্যে এবার বাইডেনের ডেমোক্রেসি সামিটে ভারত গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় দাওয়াত প্রাপ্ত দল ছিল। কিন্তু ঐ সামিট থেকে যেসব দেশের উপর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে সে তালিকায় ভারত নাই। এককথায় ভারতের উপরে আমেরিকার কোন অবরোধই আরোপ করা হয় নাই।

    আসলে এর মানে, উলটা বাইডেনই মোদির ভারতের হাতে বাঘবন্দি হয়ে গেছেন যেন। কেন এমন হল?

    কারণ মোদির উলটা চাল, তিনি পুতিনকে ভারতে ডেকে এনেছেন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক নানা কথা আর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জয়েন্ট ভেনচার নিয়ে আলাপ করেছেন। আর তাতেই বাইডেনের যেন বলতি বন্ধ!  ভারত এরপরে আর বাইডেনের চীন ঠেকানোর কাজে নাই লাগুক তবু ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার ভারতীয় বাজার যার লোভ দেখিয়ে ভারত সবসময় তার অপনেন্টকে এভাবেই শায়েস্তা করেছে। এটাই আরেকবার প্রমাণ করেছে যে পচাত্তর বছর আগের যে আমেরিকা ছিল, বাইডেনের আমেরিকা সেটা আর নয়। বাইডেনের আমেরিকাই উলটা ভারতের কাছে কেঁচো হয়েছে – নত হয়েছে, অকেজো হয়ে গেছে। অন্তত এখন আমরা এটাই দেখছি!

    তাই বাইডেন ভারতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্টিফিকেট দিয়ে দাওয়াত করেছেন আর যত পেন্ডিং অবরোধ-করার কথা ছিল এর একটাও প্রকাশ করতে পারেন নাই উলটা সবগুলোকে নিজের মুখের মধ্যে আটকে রেখে তা নিজেকেই  গিলে খেতে হয়েছে – এটা কোন আমেরিকা???

    ফলাফল কী? এর নেতি ফলাফলও আছে। আগে হলে আমেরিকান চাপে মোদির ভারত ইসলামবিদ্বেষ কিছুটা আড়াল করে হয়ত সরাসরি ইসলাম কোপানো অন্তত কিছুদিন বন্ধ রাখত।  যেমন বেশিদিন আগের কথা নয়। মোদির ক্ষমতায় আসার পরের বছর (২০১৫) ওবামা ভারত সফরে এসে (সেসময় মুসলমান ও খ্রীশ্চান নিপীড়ন, চার্চে হামলা শুরু হয়েছিল) মোদিকে চাপ দেওয়াতে শেষে মোদি বিজেপির নীতি-রাজনীতি আর তার সরকারের নীতি আলাদা বলে ঘোষণা করেছিলেন। সরকারের নীতি হিসাবে সব ধর্মাবলম্বির ধর্মপালনের স্বাধীনতাকে মোদি স্বীকার করে প্রটেক করার দায় কবুল নিয়েছিলেন। দিল্লির এক চার্চের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়ে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। [আগ্রহিরা এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত জানতে আমার পুরামা ২০১৫ সালের মে মাসের এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন। ওখানে সেকালে চার্চের অনুষ্ঠানে দেয়া মোদির ভাষণটাও সংযোজিত আছে।]  অথচ এবার উলটা, ভারতই বাইডেনকে চ্যালেঞ্জ করে গেল! আমেরিকা কিভাবে ক্রমশ কর্তৃত্ব হারাচ্ছে এর এক জলজ্যান্ত প্রমাণ এটা।

    রাজনাথের কারিগরিঃ
    এদিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের ৫০ বছর স্মরণে এক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে ছিলেন। এতদিন এধরণের অনুষ্ঠানে ভারত বড়জোর দাবি করত যে তারা বাংলাদেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। কিন্তু এবার তিনি দাবি করেন ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে।  আবার দেখা যাচ্ছে, ভারতের এক নামী সম্পাদক- কলামিস্ট লিখেছেন বাংলাদেশে আমেরিকান অবরোধে ভারতের নিশ্চুপ থাকার বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে অনেকেরই অনুমান-কল্পনা হল আবার কী তাহলে  আমেরিকার হাত থেকে প্রটেকশন পেতে বা হুজুর ধরতে মোদী-হাসিনা গভীর সম্পর্ক হতে যাচ্ছে, তাই কী ?
    দিন সবসময় একরকম থাকে না। না, এটা এখন বাস্তবতাতেই অসম্ভব। ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের কথা অবশ্যই আমরা কেউ বলছি না। ফলে কথাটা হচ্ছে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যের। এমন রুটিন সম্পর্কের (আমরা ১৯৭১ সালে এটা সেটা ছিলাম টাইপের) বাইরে অন্য কোনদিকে এখন আর আগাবার সম্ভাবনা নাই। আর এদিকে হাসিনা সরকার কখনও যদি ফেল না করে তাহলে চীনের সাথে তার সম্পর্ক একটুও ঢিলা হবার কোন সম্ভাবনা নাই।
    তবে সরকারের জন্য এখনকার চ্যালেঞ্জ হল – অবরোধ আরোপের ফলে আমলা আর দলীয় কর্মি-নেতাদের যাদের সক্রিয়তা সরকার টিকাতে ম্যাটার করে এদের মনোবল নিঃসন্দেহে চাপ খাবে – সেটা কতদুর সামলাতে পারে তা দেখতে হবে।  অবরোধের পাল্লায় পড়া যাবে না যা “অর্জন” তা সামলাতে হবে – তাদের এই পালাই পালাই মনোভাব ডমিনেট করবে।  সরকারের পাবলিক রেটিং থাকলেই একমাত্র যা দিয়ে এমন চাপ মোকাবিলা সহজেই সম্ভব হত হয়ত।
    আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে!

  • বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    গৌতম দাস

    ১৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3QG

     

       US  Democracy Summit 9-10 Dec 2021

    “Summit for democracy an ‘anti-China ideological clique’”

    গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আয়োজিত “ডেমোক্র্যাসি সামিট” [Democracy Summit] সমাপ্ত হয়েছে। যদিও করোনার কথা ভেবে এটা অন-লাইন বা ভার্চুয়াল সামিট ছিল। রয়টারের তথ্য মতে ১০০ এরও বেশি দেশ এখানে অংশ নিয়েছিল।  বাইডেন একে নাম দিয়েছিল  “ডেমোক্র্যাসি সামিট”। যেটা আসলে কার্যত   স্ট্রাটেজিক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” বা একে বাংলায় বললে এটা হয়ে যায় “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”। কিন্তু কৌশলগত কেন? এর মানে কী? 

    ছলনার কৌশলঃ
    বাইডেনের মূল সংকট হল কোন মানদন্ড ছাড়া তিনি ডেমোক্রাসি শব্দটা এস্তেমাল করতে চান।
    আর এভাবে আমাদের মত অনেক দেশেই আমেরিকা  অবরোধ আরোপ করতে চান এবং বিশেষ করে চীনের উপরে অবরোধ আরোপ না হলেও অন্তত বিব্রত করতে চান। কিন্তু কাজটা তিনি করেছেন বা তার করার পথটা অসৎ। যেমন ঘটনা হল আমাদের মত সেসব দেশ এমনকি চীনেও উপযুক্ত ও স্পষ্ট “জন-প্রতিনিধিত্বশীল” রাষ্ট্র থাকা বা না-থাকার ঘাটতি আছে। কিন্তু আমেরিকা  কোন মানদন্ড কাউকে
    ডেমোক্রাসির রাষ্ট্র  বলে দাওয়াত দিচ্ছেন বা কাউকে বাদ দিচ্ছেন তা প্রতকাশ করে নাই। ফলে সামিটে দাওয়াত দিয়েছে মূলত বাইডেনের আমেরিকার এখনকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতে। এটাই সেই বড় অসততা!  এটা হতে নুন্যতম আমেরিকা বা অন্যকোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থের উর্ধে, তা পরোয়া না করে। এবং ইন্ডিপেন্ডন্ট মানদন্ডে।  আমেরিকা যে তা মেনে করে নাই এর বড় প্রমাণ হল আমেরিকা কোথাও তার মানদন্ড প্রকাশ করে নাই। ফলে এটা অস্বচ্ছ আর তাই অসততা হয়েছে। একারণে সামিটের গায়ে কালি লেগে গেছে।

    আমাদের দেশে ‘কৌশল করা’ শব্দের একটা অর্থ হল ছলনা করা। ফলে কৌশলের সোজা কমন মানুষের বুঝ হল যে কেউ যখন যা বলবে তা করবে না বা করবে আরেকটা – এটাই কৌশল। ঠিক এ’অর্থেই বাইডেনের আমেরিকা এক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” ডেকেছিলেন। এর অর্থ হল আমেরিকা যাকে যাকে “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” মনে করে তারাই এই সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েছিলেন। কিন্তু তবু কথা বা কিন্তু আরও আছে।  আমেরিকার এই মনে করাটা হয়ত আগে আমেরিকা ‘মনে করত’ হলেও হবে না। এখনকার বাইডেন সরকারের নিজ লাভালাভের মানদণ্ড দিয়ে যদি বলেন তা হলেই কেবল সেটা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” বলে মানা হবে। 

    এক কথায় বললে, বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ এতই দেউলিয়া যে, এর ‘ডেমোক্র্যাসি’ ধারণার কোনো সংজ্ঞায় যাওয়ার মুরোদ নেই। তাই দেয়া হয়নি বা কাজ করে না। কোনো ক্রাইটেরিয়াই নেই। কী কী থাকলে ‘ডেমোক্র্যাসি’ মানা হবে তাও জানা যায় না। তারা বলতে পারেন না। যেন এটা কেবল বাইডেন প্রশাসনের স্বার্থের খেয়াল যে, তারা কাকে কাকে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ মনে করবে।

    কেন এটা এমন হয়ে গেলঃ
    এমনিতেই বাইডেনের সমস্যা দাড়িয়েছিল কাকে ডাকবেন আর কাকে না। বা অন্যভাবে বললে, কারা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” তা বলতে না পারলে ডাকবেন কী করে? অথবা কোন রাষ্ট্রকে ডেকে বসা মানে তো হয়ে যাবে বাইডেন তাহলে ঐ রাষ্ট্রকে তাহলে আপনাতেই বাই ডিফল্ট [by default] গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে করছেন। এছাড়া বাইডেনের মনে আরো এক বড় “চোরামি” তো কাজ করছেই যে তিনি চীনকে বিব্রত করবেন কোপাবেন!  

    তাই সব মিলিয়ে খুব সহজ সেই একই পন্থা অনুসরণ করেছেন!। তা হল যেমন, কোনো ঘটনাকে তারা ‘টেররিজম’ বলবেন বা বলেন? এরও কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখনো নেই। কখনো দেয়া হয়নি। এভাবেই চলছে। আর আছে এর বদলে তাদের একটা তালিকা। ওই তালিকায় যেসব রাষ্ট্রের নাম আছে সেটাই তখন থেকে টেরর বা জঙ্গি রাষ্ট্র। এই হল অসততার স্টাইলটা। বুশের আমল থেকে এ ব্যবস্থা চালু আছে আমেরিকায় এবং তা এখনো বহাল করে রাখা আছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘেরও টেরর রাষ্ট্রের কোনো সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া নেই। সেখানেও একই পদ্ধতি। এগুলোকেই বলা যায় ‘মাতবর’ রাষ্ট্রগুলোর বৈষয়িক মানে বিষয়-আশয়ের স্বার্থের ভিত্তিতে ওই তালিকায় নাম ঢুকানো বা বের করা।
    কাজেই এটা পরিষ্কার, বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে বড় মানবাধিকারের দোকানদার ও স্বার্থবাজ আর কেউ নেই। আমাদের ব্যবহারিক অসুবিধা এবং কঠিন সমস্যাটা হল, ক্ষমতাবান প্রধান রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ছাড়া হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ইস্যুতে সেই লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে  কোনো পদক্ষেপ আসার কোনো সুযোগই নেই। একমাত্র এখন এক বিকল্প হল যতটুকু যা সম্ভব তা হল, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনমতের চাপ কোন ইস্যুতে যদি তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের বেলায় এমন গ্লোবাল জনমত তৈরি প্রায় অসম্ভব। তবুও আমাদের লড়তেই হবে, এটা বটম লাইন। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

    থিঙ্কট্যাংক ফেলো এরা কী বলেনঃ
    গত লেখায় আমেরিকান “ফরেন পলিসি” পত্রিকায় মাইকেন কুগেলম্যানের নিয়মিত ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফিং’-এর কথা বলেছিলাম। এটা সাপ্তাহিক ব্রিফিং বা কলামের মত। চলতি এই সপ্তাহে সেই কুগেলম্যানও বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটকে’ ইস্যুতে সম্ভবত সরাসরি সমর্থক হওয়াটার বিপদ বুঝেছেন। তাই তিনি কিছুটা সমালোচক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন। তিনি আগেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটে’ দাওয়াতি কারা হবেন এ নিয়ে কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখানে নেই। তিনি লিখছেন তালিকায় নাম থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে আর এতে এই অনুমান তৈরি হয়েছে যে, বাইডেন প্রশাসন ‘অযোগ্য দাওয়াত-দাতা’ […controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host……]। কুগেলম্যানের ভাষায় ‘আনফিট হোস্ট’ এবং তিনি বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার নিমন্ত্রিত দেশের তালিকা দেখে বোঝা গেছে, এই সামিটে দাওয়াত পাওয়ার যোগ্যতা বা একমাত্র মানদণ্ড ডেমোক্র্যাটিক পারফরম্যান্স ছিল না; এটি প্রমাণিত। মানে, অন্য অনেক কিছু ছিল। কুগেলম্যান এমনকি ব্রিটিশ ফ্রিডম হাউজের র‌্যাংকিংয়ের সাথে তুলনা নিয়ে এসে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বাইডেন কোনো মানদণ্ডই মানেননি, এখানে অনুসরণ করেননি।

    “The Biden administration’s Summit for Democracy, hosted virtually today and Friday, comes at a moment of global democratic backsliding. However, controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host, has accompanied the event. The South Asian invitees prove democratic performance isn’t the sole criterion for a seat at the summit.” – ,

    এবার তিনি সরাসরি লিখেছেন, আসলে এশিয়ার যেসব দেশের নাম তালিকায় রাখলে ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হাসিল হয়’ (বেস্ট সার্ভ ইটস কারেন্ট ইন্টারেস্ট) সেসব দেশের নামই ওখানে রাখা হয়েছে; অর্থাৎ বাইডেনের তালিকার গরমিলের বোঝা এতই ভারী যে, তিনি সোজা এর দায়দায়িত্ব নেননি; ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। উল্টো নিজেই সমালোচকদের দলে ভিড়ে গেছেন।

    থিংকট্যাংক ফেলোঃ
    এখন আরেকজনের নাম করব তিনিও মাইকেল কুগেলম্যানের মতোই থিংকট্যাংক ফেলো- আলী রিয়াজ; তিনি কিন্তু একেবারে ‘ধরাশায়ী’ হয়ে গেছেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছেন থিংকট্যাংকের সিনিয়র বা জুনিয়র ফেলো হওয়ার কাজটা হল – উপস্থিত আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া। এমন ভাবাটা এশিয়ান অরিজিন মানুষের সমস্যা কি না, জানি না। আলী রিয়াজ ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ ইস্যুতে কুগেলম্যানের উল্টো অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন পত্রিকায়  [বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলন আলী রীয়াজের মূল্যায়ন] বিরাট এক সাক্ষাৎকারে বাইডেনের পক্ষে ব্যাপকভাবে সাফাই জোগানোর চেষ্টা করেছেন।

    বলাবাহুল্য, সাফাইটা দাঁড়ায়নি। কারণ, সম্ভবত কতটা উজানে বাওয়া যায় তারও তো কিছু সীমা থাকে! কারণ বাইডেনের রাষ্ট্রস্বার্থের খেয়ালে যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তার স্বপক্ষে সাফাই তিনি কোথা থেকে আনবেন?

    এমনকি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কী? গত ২০০৭ সালে এই একই কথিত ‘গণতন্ত্র’, মানবাধিকার আর দুর্নীতিবিরোধী কথা বলে আমেরিকান গণতন্ত্রী যারা  ‘তাদের’ আগমন ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ছিল এর পরিণতি! এটা কে অস্বীকার করতে পারবে? তা হলে আলী রিয়াজ আজ কোথা থেকে কী আর সাফাই আনবেন? কী সাফাই দেবেন? এরা গণতন্ত্রী???

    তাই বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন আসলে হয়ে গেছে কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন; অর্থাৎ কৌশলগত; মানে যা বলে তা করে না; করে আরেকটি। ছলনা করে। নানান নখরাও করে। কেন? ইংরেজি স্ট্রাটেজিক শব্দটার বাংলা করা হয় কৌশলগত বা কৌশলী। তাই আমরা দেখেছি আলী রিয়াজের মানবজমিনে দেয়া বক্তব্যে তিনি উপায়ন্ত না পেয়ে নিজের ইজ্জত ঢাকতে শেষে এই ‘স্ট্রাটেজিক” শব্দটা এনেছেন। অর্থাৎ তিনি সংজ্ঞাহীনতা বা মানদন্ড না থাকার সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েই যেন বলেছেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে, তা নয়। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এ অঞ্চলে ও অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে, সে দিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। এ কথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই ‘গণতান্ত্রিক দেশ’ বলতে পারব না।’

    “পাকিস্তান এবং ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে সেটি নয়? এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে এবং অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। একথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক দেশ বলতে পারবো না” – আলী রীয়াজের মূল্যায়ন মানবজমিন

    এখানে তিনি পুরো সারেন্ডার করেছেন; অর্থাৎ তার গণতন্ত্র এখন আর বিশেষণ ছাড়া শুধু গণতন্ত্র নয়। এর বিশেষণ এখন ‘কৌশলগত’ এই শব্দটা সামনে জুড়ে দিয়ে। তবুও সাফাই দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করেননি। তাই এবার কৌশলগত শব্দের আমদানি। অথচ কে না জানে যা কৌশলগত তা আর কোনো ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি নয়। এটা একান্তই বাইডেনের আমেরিকার নগদ লাভালাভের স্বার্থ!

    ইমরানের রসিক জবাবঃ
    তবে আমেরিকান দাওয়াত মানে গণতন্ত্রের সার্টিফিকেট বেচা বিক্রিটার মধ্যে এক চরম তামাশা ঘটিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি এই দাওয়াতে যেতে অপারগতা (decline) জানিয়েছেন [Pakistan declines US democracy summit invitation]। সাথে বলেছেন, তারা চীন-আমেরিকা এমন দলাদলি বা ব্লক ভাগাভাগিতে পড়তে চান না! [We don’t want to enter bloc politics: PM] বলাই বাহুল্য এ’এক ইমরানের ভাল “স্মার্ট মুভ”।

    যা হোক, মনে হচ্ছে আলী রিয়াজ কুগেলম্যানের কাছে জেনে নিতে পারতেন যে, থিংকট্যাংক ফেলোর চাকরি নেয়া মানেই আমেরিকান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে ‘পক্ষে’ লিখতেই হবে তা নয়। দায় না নিয়েও এবং সাথে সমালোচনা করে বা নিদেনপক্ষে অন্যরা কী সমালোচনা করেছে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেও সেসব উল্লেখ করে কথা বলা সম্ভব।

    তবে আলী রিয়াজের লম্বা সাক্ষাতকারে সমস্যা হয়তো অন্যখানে এবং তা আরো জটিল হয়ে গেছে; মুল কারণ সম্ভবত আলী রিয়াজ অহেতুক কমিউনিস্ট ও নন-কমিউনিস্ট ভাষ্যের বিতর্কে ঢুকে গেছেন। একালে কোনো রাষ্ট্র আর কমিউনিস্ট কি না, এটা কোনো ফ্যাক্টর বা ইস্যুই নয়।  যেমন স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র হতে গেলে তাকে কমিউনিস্ট হতে হবে, তা তো নয়। মোদির হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়ই কমিউনিজম নয় বা এই দোষে দুষ্ট নয়। আবার আজ পুতিনের রাশিয়া নিজেও দাবি করে না যে, সে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এছাড়া একালে ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় সদস্য হয়ে গেছে; কারণ এই সক্রিয় সদস্যপদ না থাকলে রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধা থাকে না। আর না থাকলে মানুষকে কাজ দেয়া খাবারসহ দেয়া এসব রাষ্ট্র চালানোই মুশকিল, একালে প্রায় অসম্ভব। এই মাপকাঠিতে চীন-রাশিয়া সবাই আর কমিউনিস্ট কি না সে প্রশ্ন তোলা এমন কমিউনিস্ট কে আছেন? অন্তত কমিনিস্টদের নিজের এই মাপকাঠি অনুসারে!  আর চীনের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন তো আরো অচল। কারণ আমেরিকা ক্রমশ আরো দুর্বল হচ্ছে এভাবে সব সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তাকে সরিয়ে চীন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা অর্থনীতির নেতার আসনে বসতে যাচ্ছে। কাজেই সে কমিউনিস্ট কি না, এটা নিয়ে আর কী করবেন? অবশ্য অভ্যন্তরীণভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি পুরনো বক্তব্যের সাফাইয়ের ওপরই চলে এবং কমিউনিজম-২ বলে কিছু একটা করার ভাবনা আছে, এ কথা ভাবছে।

    কাজেই আলী রিয়াজ যেমন লিখছেন, “সারা বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি হয়েছে যার একটির প্রতিনিধিত্ব করে যুক্তরাষ্ট্র। অপরটির প্রতিনিধিত্ব করে চীন ও (বলা যায়) রাশিয়া”  – এগুলো একেবারেই ভুয়া কথাবার্তা এবং অচল মুখস্থ কথাবার্তা। একালে এটা আর কোন বুদ্ধিমানের পর্যবেক্ষণ বা মিনিংফুল অবজারভেশন হয়নি। তবে ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’কে কমিউনিজমের বুদ্ধি বা ক্রাইটেরিয়া দিয়ে সাফাই ব্যাখ্যা দেয়া আসলেই বেশ অভিনব। তা হলে চীন যখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা হবে (ইতোমধ্যেই অনেকদুর আগিয়েছে), তখন কথিত ‘আদর্শিক অবস্থান’ জিনিসটা কোথায় থাকবে?

    আসলে আমাদের ভেবে কথা বলতে হবে। পুরনো কমিউনিজম কী শিখিয়েছে তাই শেষ কথা বা সবচেয়ে জ্ঞানের কথা মেনে নেয়াটাই তো ভিত্তিহীন এবং তা অবাস্তব, ননপ্র্যাকটিক্যাল। পুরান কথা আকড়ে ধরা নয়, বরং পর্যালোচনা, নিরন্ত্রর পর্যালোচনাই তো রাস্তা!

    কথা আরো আছে। এই যে গণতন্ত্র শব্দটা আমেরিকা চালু করল মডার্ন রাষ্ট্র সম্পর্কে এটা তো মূল শব্দ বা ধারণা কোনটাও নয়। মূল ধারণামূলক শব্দটা হল ‘রিপাবলিক’ [republic] বা মডার্ন রিপাবলিক। অথচ এই ধারণাটাই ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমেরিকা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে শব্দটি বদলে আনা হল নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’। এর পেছনের মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন  – এ’দুই রাষ্ট্রই তাদের স্ব স্ব  বিপ্লবের পরে নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে এই “রিপাবলিক” শব্দটা রেখেছিল। ইউএসএসআর (USSR) এই নামের মধ্যে ‘আর’ মানে রিপাবলিক। ওদিকে চীনের আনুষ্ঠানিক নাম পিআরসি (PRC) বা পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। অর্থাৎ এখানেও ‘রিপাবলিক’ শব্দ হাজির। তাই আমেরিকার পক্ষে  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো রিপাবলিক নয়, তা বলা সম্ভব হচ্ছিল না; যদিও তাদের ক্ষমতা কাঠামোতে সমস্যা আছে। তাই আবার সেই আমেরিকান কৌশল খাটানো বা স্ট্রাটেজি!

    রিপাবলিক শব্দটি ফেলে দিয়ে প্রমিনেন্ট করা হলো নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’কে। আর তাতে সবচেয়ে জোর দেয়া হল, যা কমিউনিস্ট দেশে নেই বা দুর্বল অপুষ্ট; এর একটা যেমন ভোট বা নির্বাচন। যার মূল এবং মৌলিক ধারণাটা হল জনপ্রতিনিধিত্ব। অথচ আমেরিকান কথিত “গণতন্ত্রের” ধারণায় জনপ্রতিনিধিত্ব ধারণাটার গুরুত্বই নেই।  সামনে আনা হয় না। ভোট মানেই গণতন্ত্র আর এই ভোটের ধারণার নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।  আবার ওদিকে যেমন বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা; অর্থাৎ যেসব শব্দ উচ্চারণ করলে কমিউনিস্টরা বিব্রত হবে সেসব শব্দকে সামনে আনা হয়েছে। এতে গ্লোবাল আইডিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকা মাইলেজ পেয়েছে, সন্দেহ নেই বিশেষ করে কোল্ড ওয়্যারের আমলে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণাগুলো বোঝাবুঝিতে, রাজনীতির বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে। রাজনীতি বা রাষ্ট্র মানে তা নেমে এসেছে ভোটাভুটিতে। এ ছাড়া সবচেয়ে ক্ষতি করেছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণার বিকাশ ঘটতে না দিয়েও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটানো হয়ে গেছে।

    যেমন কেন রিপাবলিক ধারণাটা? এটি যে মনার্কি[monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে রাজতন্ত্রের পেট চিরে একটি নতুন ধারণা বা সমাধান তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে – আমেরিকার এই গণতন্ত্র শব্দটি এনে। যেমন আরো গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল, ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ, এর ইতি ও নেতি দিক, পারসোনাল লিবার্টি, রাইট টু লাইভ, বেঁচে থাকার বা জীবনের অধিকার এমনকি খোদ রাজনীতি বা রাজনৈতিকতা শব্দটার অর্থ কী? এসব কিছুকে আড়ালে ফেলা শুধু নয়, কবরে মাটিচাপা দেয়া হয়ে গেছে। আর সব কিছুকে নামিয়ে আনা হয়েছে ‘গণতন্ত্র’ আর ভোটাভুটিতে। কোল্ড ওয়্যারের যুগের এই আমেরিকা-সোভিয়েত এই ব্লক রাজনীতির ধারণার আড়ালে। অথচ আজো এসব বাজে তর্ক- আমেরিকা-সোভিয়েত ঠাণ্ডা যুদ্ধে কার পক্ষে মাইলেজ আসবে- সেসব নিজ অযোগ্যতাতেই এখন আপনাআপনিই ক্ষয়ে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রশ্নটা আমেরিকা না সোভিয়েত- কে ভালো এর তর্ক একেবারেই নয়। কারণ আমাদের জানতে ও চিনতে হতো ও হবে রাষ্ট্রকে। নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে গড়তে। আমরা আমেরিকা না সোভিয়েত রাষ্ট্রের সমর্থক হব মামলাটা সেটা নিয়ে কখনই নয়।

    তবে আমেরিকার সমালোচনা করা হচ্ছে মানে চীনা বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র আদর্শস্থানীয় তা নিশ্চয়ই  নয়। কমিউনিস্টদেরও বয়স মানে রাষ্ট্র অভিজ্ঞতাও শত বছর হয়ে গেল। লেনিনের প্রথম গনভোটে পরাজিত বা অভিজ্ঞতা সুখকর হয় নাই বলে জন-প্রতিনিধিত্ব ধারণার বাস্তবায়ন নিয়ে আর ভাবা যাবে না এর কোন মানে নাই। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল দিকটা নিয়েও চীনকে ভাবতেই হবে। চীন নিজে আভ্যন্তরীণভাবে আজ ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত আছে থাকছে সেটা হতেই পারে। কিন্তু কাল নাও থাকতে পারে! মানুষের বাস্তবায়নযোগ্য আকাঙ্খায় লাগাম পরিয়ে রাখা যায় না। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল বলেও আলাদা কিছু আছে ;  কিন্তু গ্লোবাল নেতৃত্বের দৃশ্যপটের আস্থা অর্জনও কম জরুরী। এদিকগুলো ছাড়া চীনের কেবল গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়াটা আদৌও কতটা সম্ভব অথবা কতটা সুখকর অভিজ্ঞতা ও সফল বা শান্তিপুর্ণ থাকবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজেই আমাদেরটাও  “আমাদের মত গণতন্ত্র” – এটা মুখরক্ষায় বা সার্বভৌমত্বের অজুহাতে বলা যায় হয়ত কিন্তু অর্থ হয় না।  আর অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব মানুষের ভোগ-সংশ্লিষ্ট ফলে বৈষয়িক বিষয়গুলোকে ১৯৬৬ সালে কোনমতে জোড়াতালিতে জাতিসঙ্ঘের দলিলে কমিউনিস্ট মানবাধিকার বলে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে বটে। কিন্তু সরি, এই পাঁচটার একটাও “রাজনৈতিক” ধারণাই নয় বৈষয়িক-ভোগের ধারণা – যা রাজনৈতিক নয়। ফলে যা “রাজনৈতিক” ধারণা নয় তা “অধিকার” হবে কী করে? সবার আগে “রাজনীতি” শব্দের অর্থ ধরতে পারতে হবে। মানুষ কেবল ভোগী এক মেশিন তো নয়। সে আপাদমস্তক পলিটিক্যাল। এসব কথার অর্থ বুঝতে হবে। এর উপর আবার মানুষের স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা আছে। তাকেও জায়গা করে দিতে হবে।  এসব ছোটখাট বিষয় নয় বরং গভীর দর্শনের বিষয়। মানুষকে অনেক দূর যেতে হবে, আবার অনেক কিছু বাকি! ওদিকে কমিউনিস্ট অর্জনও নিশ্চয় অনেক। কিন্তু সব শেষ নয় অবশ্যই। বহু সংস্কারই বাকি! 

     আমাদের আগের প্রসঙ্গে ফিরি। একালে এসে কে কমিউনিস্ট আর কে মেন-স্ট্রিম এসব কোল্ডওয়ারের ভাগাভাগি কমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নাই-ই। তবু অনেকের জন্য সম্ভবত এটা কষ্টসাধ্য যে, একটা মনার্কি সিস্টেমের বিপরীতে রিপাবলিক-কে বুঝতে হবে এবং তুলনা করে। এছাড়াও এটা না বুঝলে জানা যাবে না যে, রাজতন্ত্রে ব্যক্তি-মানুষ বলে কিছু নেই। ছিল না কেন? ধারণাটাই নেই, তখনও উন্মেষ ঘটে নাই তাই।  আমেরিকা কী করে ‘লিবার্টির’ আমেরিকা হয়ে উঠেছে; আমেরিকান হিস্ট্রি গুরুত্বপুর্ণ সেই ইতিহাসে কমিউনিস্টদের আগ্রহ নেই। আগ্রহ হল, আমেরিকা কী করে ‘গণতন্ত্র’ নামে একটি ধাপ্পাবাজির প্রচারক হয়েছে অথবা এটা দিয়ে সোভিয়েতকে হারিয়েছে, সেখানে।

    ইতিহাসে এক গোত্র বা ট্রাইবাল [tribal] সমাজ পেরিয়ে অনেক পরে ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ হয়েছে তাও আবার রাজতন্ত্রের যুগের শেষপ্রান্তে এসে। তাও তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তির উন্মেষের খবর হয়নি, জানা হয়নি অনেক সমাজে। যেমন যেকারণে আমেরিকা তালেবানদের পশ্চাৎপদ বলে সুযোগ নেয় কিংবা এই সুযোগে ইসলাম পশ্চাৎপদ বলে প্রপাগান্ডা করতে ভালোবাসে। আর এসব বলাবলিকে কাজে লাগাতে চায় এভাবে যে, ওরা পশ্চাৎপদ; কাজেই তালেবানদের এখন আমেরিকান আধিপত্য মেনে নিতে হবে, কায়েমের কাজে লাগতে হবে। অথচ নিজেরা যে কথিত ‘গণতন্ত্রের’ প্রচারে লেগে আছে যেটা স্রেফ ভোটাভুটি আর আমেরিকার তাতে স্বীকৃতি। অথচ এসবের বিপরীতে আমাদের দরকার নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্রধারণার বিকাশ, নিজ রাষ্ট্র গড়ে তোলা। ট্রাইবাল সমাজের অভ্যাস রীতি কেন ব্যক্তি-উন্মেষ হয়ে যাওয়া সমাজে খাটবে না সেটা আগে উপলব্দি করা।

    একালের আমেরিকা আরো ভয়ঙ্কর। একটা উদাহরণ দিব, বাকিটা সবাই বুঝবে। ইটিআইএম- ইস্টার্ন টার্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM)। নাম শুনে অনেকের বুঝতে কষ্ট হতে পারে, তাই চিনিয়ে দেই। এরাই হলো চীনা উইঘুরের সশস্ত্র সংগঠন। এই সংগঠন সম্পর্কে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকের তথ্য-ভাষ্য এখানে।  এই সশস্ত্রতা, এদের এখনকার বসবাস ও তৎপরতা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে।

    বুশের আমল থেকেই এরা টেরর বা সন্ত্রাসের দল হিসেবে আমেরিকান ও ইউএনের লিস্টে তালিকাভুক্ত। কিন্তু তা এখন ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে; কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প তো খুবই বুদ্ধিমান ও ধূর্ত করিৎকর্মা। তিনিই এই ইটিআইএম দলকে নিজ সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন।  অথচ ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান, কিরঘিজস্তান, আমেরিকা ও চীন  [Afghanistan, Kyrgyzstan, the United States, and China] এদের সবার আবেদনে জাতিসংঘ এই সংগঠনকে তালিকাভুক্ত করেছিল। এনিয়ে আমেরিকান ট্রেজারি ডিপার্ট্মেন্টের এই বিবৃতি এখানে।  তাহলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী? খুবই ‘মহৎ’! আর ইটিআইএম এখন কী নিয়ে ব্যস্ত ও কোথায়?

    পাকিস্তানে চীনা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের শেষ নেই। তেমনই এক প্রকল্পের এলাকায় ভেতরের ঘটনা। প্রকল্প কম্পাউন্ডের ভিতরে সেটাও কয়েক মাইল বলে তাদের অভ্যন্তরীণ নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু করা আছে, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার থেকে শ্রমিক বা যেকোনো কর্মী চলাচল করে থাকে। তেমনই এক বাসে বোমা বেঁধে রেখে তা দিয়ে হামলা পরিচালনা করে ইটিআইএম। আর এতে ঐ বাস পাশের নদীর তীরে বা খাদে পড়ে যায়। এতে ১৩ জন চীনা ইঞ্জিনিয়ার মারা যান। আর এ হামলার নায়ক ইটিআইএম এর এক কর্মী।

    ট্রাম্পের তালিকামুক্তি কেন তা আমরা নিশ্চয় বুঝলাম। এখানে এনিয়ে একটা ইন্ডিয়ান রিপোর্ট আছে। কিন্তু খেয়াল করতে হবে; তা হলে এটা কি চীনের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধ লড়বার ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি! কী তামাসা!  না, তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই যে, বাইডেন এসব থেকে দূরে।  অথবা ট্রাম্প একমাত্র গণতন্ত্রী, আর বাইডেন তা নয়!   ট্রাম্প এই তালিকামুক্তি দিয়েছিলেন ক্ষমতা ছাড়ার অল্প আগ দিয়ে। মানে হল, এর পুরো ‘লাভালাভ’ ও পারফরম্যান্স সব ক্রেডিট এবং বাকি অনুমোদন বাইডেনের নামে।

    এরপরে আরো ঘটনা হল,  তালেবানরা গত আগস্টে কাবুলে ক্ষমতা দখলের আগে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তাদের নেতারা এক সাক্ষাৎ করেছিল। ওই মিটিং শেষে তালেবানরা প্রকাশ্যেই মিডিয়াকে জানিয়েছিল, এমন সশস্ত্র গ্রুপগুলো যারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে অন্য দেশে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের আর আশ্রয় দেয়া হবে না”। আমরা অনেকেই জানি এখনকার আফগানিস্তানে আইএস (কে) বা খোরাসান গ্রুপ যারা তালেবানদের চেয়েও আরো রেডিক্যাল ও আলাদা, তাদের কামনা তালেবানরা যেন বিফল ও পরাজিত হয়, তারা অপেক্ষা করছে। এদিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঐ সাক্ষাতের পরে ইটিআইএম (ETIM) এরপর থেকে অবাধে আফগানিস্তানে চলাচল সীমিত করে ফেলে শুধু না তারা ঐ আইএস (কে) এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রটেকশনে থেকে তৎপরতা চালু রেখেছে। এরই এক ততপরতা ছিল পাকিস্তানের ঐ চীনা প্রকল্পে হামলা।
    চীন-আমেরিকার স্বার্থবিরোধ থাকতেই পারে; থাকা খুবই স্বাভাভবিক!। কিন্তু সেই বিরোধে আপার-হ্যান্ড পেতে ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপকে লেলিয়ে দিতে হবে, ব্যবহার করা হবে? এটা কোন গণতন্ত্র?  

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল, বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ – এই বুলির মূল কথা কী?

    যেটা আমেরিকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থ, সেটাই গণতন্ত্র!

    তা হলে বাইডেনের এই ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ কী বস্তু? আলী রিয়াজ আমাদের গণতন্ত্রের ‘দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি’ শিখিয়েছেন। আমরা নিশ্চয় এখন এর মর্মবস্তু বুঝতে পেরেছি। আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থটাই হল আমেরিকান ‘গণতন্ত্রের আদর্শ’।

    তা হলে আমাদের বাংলাদেশের সরকার সে তো অবশ্যই নিপীড়ক; গুম-খুন থেকে পায়ে গুলি, নিশীথ ভোট ইত্যাদি সকল ইস্যুতেই তের বিরুদ্ধে  অভিযোগের এখানে শেষ নেই। আমরা সবাই এসব নিয়েই আছি, নিরন্তর ভুগছি।

    এখন এতে আমেরিকা যদি আগ্রহ নেয় তার মানে যেটা ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ সেটাই গণতন্ত্র!’ চলবে এখানে? এই সূত্র অনুসারে এগিয়ে আসে তা হলে আমাদের এখন খোঁজ নিতেই হয় যে এখানে আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থটা মানে গণতন্ত্রটা ঠিক কী? আর তা এবার কী মুল্যে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’সম্মেলন”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ঃ২৩ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3Qi

     

    The War That Changed The Course of History | The First World War

    ইতিহাস পড়ার অনেক পদ্ধতিই হতে পারে। এর মধ্যে একটা উল্লেখ করা যায় যেমন, কোন বিষয়ের আগে-পরের তুলনা করে বা এদুই সময়ের পার্থক্য জেনে পড়া। এভাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরে – এর মধ্যে পার্থক্য কী দেখা দিয়েছিল? আগে কী কী ছিল, যা পরে পরে আর থাকে নাই – এমনই বিষয়ে কিছু কথা বলব।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালটা হল ১৯১৪-১৮ সাল। সেসময়ের দুনিয়ায় বাণিজ্য ব্যবস্থা কেমন ও তা কতদূর বিকশিত হয়েছিল; এ ছাড়া বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পড়ে এর হাল কী হয়েছিল? মুলত এখানে সেই বাণিজ্যের দিকটা ফোকাস করে আগাবো।  এ’নিয়ে সবার আগের কথাটা হল, ১৯১৪ সালের আগে পর্যন্ত মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের জমানায়  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের কথা যদি বলি, এটা নিজেই তেমন কিছুই বিকশিত ছিল না। কেন? এবং কী দেখে বুঝলাম?

    প্রথমত,  বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতেই এটা সারা ইউরোপের সমস্যা। কথাটা আরেকটু ভেঙ্গে বললে, গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে বুঝাচ্ছি, দুনিয়াজুড়ে ছোট-বড় যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোন বাণিজ্য বা পণ্য লেনদেন বিনিময় কিছু ছিল কী না?  জবাব হল, তেমন কিছু ছিলই না। এই না থাকার প্রধান কারণ প্রথমত ও প্রধানত যা ছিল তা হল যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন ছিল না।  আমরা কিন্তু যোগাযোগ বলতে সবকিছুকে বুঝাই। যেমন পথঘাট মানে আকাশ, সড়ক রেল এবং  সব ধরণের জলপথ। আবার আরেক যোগাযোগ মানে হল, কথা বলা। মানে হল, সরাসরি দেখা করে কথা বলা থেকে টেলিগ্রাফ, ফোন থেকে একালের ইমেল থেকে ফেসবুক ইত্যাদি সব। এছাড়া আরেকটা আগাম কথা বলাই হয় নাই – তা হল ভাষা। পরস্পরকে বুঝা আর বুঝানোর মত কমন ভাষা বা জানা ভাষা থেকে কত দূরে ছিল, এটা এক বড় পয়েন্ট। আবার, আমরা জাস্ট চিন্তা করেন এখন বাংলাদেশে এক যোগাযোগ বলতে – সড়ক, সেতু, রেল, বিমান নৌ ইত্যাদি থেকে টিএন্ডটি বা আইসিটি ইত্যাদি সব মন্ত্রণালয়কেই বুঝাবে।  তাই মূল কথাটা হল, সেকালে এক মহাদেশের সাথে অন্য মহাদেশের কোন ধরণের যোগাযোগই ছিল না। এইটা হল বেজ ফ্যাক্টস। তাহলে যোগাযোগটা কে প্রথম ঘটালো? আর এখানে যে “সেকালে” বলছি এই সেকালে বলতে কোন সময় বা কোন বছর-কালের কথা এটা?

    সরাসরি প্রথম কথাটা আগে বলেও নেই। পরে তা ব্যাখ্যা করে বলি। সেকথাটা হল, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা আসলে মহাদেশের সাথে মহাদেশের যোগাযোগটা সর্বপ্রথম ও একমাত্র ঘটতে পেরেছিল কলোনি দখলদারদের হাতে। যতটুকু যা প্রথমে ঘটেছিল তা তাদের  অন্যদেশ দখল করে তা লুটতে বেরিয়ে পড়া ও সম্পদ লুটে নিজ দেশে ফিরে আসা এই ছিল কাজ বা লক্ষ্য। আর এটা করাই হত একটা কোম্পানি খুলে ব্যবসা হিসাবে। একাজ প্রথম শুরু করেছিল  ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। আর তাদের কলোনি দখলের স্বার্থেই এই নেতি কাজের সুত্রেই তাদেরই প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। সোজাকথা, এর আগের দুনিয়ায় এই লুটেরাদের দাঁড় করানো যোগাযোগ ব্যবস্থাটাও ছিল না।
    কাজেই কলোনি শাসক মানে ব্যবসায়ী  মালিক যিনি মানে আমাদের বেলায় যেমন বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এরা তাদের কলোনি লুটের স্বার্থের যেটুক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়েছিলেন তা খুব খারাপ তা বলা যাবে। কিন্তু সেটুকুও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিস্তারে কাজে লাগে নাই। কেন?
    কারণ,  কলোনি লুটেরা স্বার্থ আর বাণিজ্য স্বার্থ এক জিনিষ নয়। এনিয়ে আরও বিস্তারিত পরে আসছি।

    তাই গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কেন চালু হয় নাই সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে কথা নয়। কারণ, কলোনি লুটের কাজ ও স্বার্থ  এটা বাণিজ্য করতে আসাই নয়। মূলত একারণের যতদিন কলোনি অর্থনীতি টিকে ছিল (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত) ততদিন  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য তেমন বিকশিত কিছু ছিল না। তাতে সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই হোক বা পরে।
    তাই এটা ঠিক বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে নয়। বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য নিজেই ছিল অবিকশিত ও বাধাগ্রস্থ। এই বাধার পেছনের মূল কারণ বলেছি ‘কলোনি ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইউরোপজুড়ে একটা ক্যাপিটালিজম বিকশিত হয়েছিল ঠিকই; আর এর সময়কাল ধরতে পারি মোটামুটি ১৬০৭ -১৯৪৫, এই প্রায় সাড়ে তিনশ বছর। কিন্তু তা  অবশ্যই এক ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’। এটা কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত ক্যাপিটালিজম নয়, এমন কি তা বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করেও অর্জন করা নয়। এটা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে কলোনি দখল করে সেই বেপরোয়া লুটে ইউরোপে এনে জড়ো করা সম্পদ সংগ্রহে হাজির করা এরই এক প্রায় একমুখি এক  ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’।  এজন্য বলছি, আমরা যদি ১৬০৭ সালের পর থেকে বিচার করি মানে যখন থেকে সংগঠিত কলোনি দখল ব্যবসা একেবারে কোম্পানি খুলে তাতে আমাদের বেলায় বৃটেনে বিনিয়োগ ঢেলে অর্থনীতির প্রধান খাত হিসেবে শুরু হয়েছিল তখন থেকে পরের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর এই সময়কালকে কলোনি যুগ বলতে পারি।
    তবু আবার এ’সময়ের শুরুতে ধরে নেওয়া যায় যে, কোয়ালিটি স্টিল ও যুদ্ধজাহাজ তৈরির জ্ঞানবুদ্ধি আবিষ্কার ততদিনে চালু ও সহজপ্রাপ্য হয়ে গেছে। এককথায় ততদিনে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী বিনিয়োগের ব্যবস্থা দাঁড়িয়েও গেছে জাহাজ বহর কিনে চারদিকে কলোনি দখল করতে বেরিয়ে পড়া।

    পরের তিন-সাড়ে তিনশ’ বছর ইউরোপ এইভাবেই কলোনি দখল ব্যবসায় লিপ্ত থেকেই কাটিয়েছিল। তবে তাতে এমন দখলদার কোম্পানিগুলোর পরস্পরের মধ্যে লড়াই প্রতিযোগিতার ফলে কেবল যতটুকু যা পরিবর্তন এসেছিল। যেমন প্রথমত, কোম্পানিগুলোর লড়াই ও প্রতিযোগিতা আর শেষে তা আর কোম্পানিগুলোর মধ্যে না থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে লড়াই ও প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর তাতে একেকটা কলোনি লুটেরা কোম্পানি বা তার নিজ দেশ একেকটা মহাদেশে শক্তিশালী ফোকাস করে নিজেকে গড়ে নিয়েছিল। যেমন প্রথমে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশের সংখ্যা সীমিত হয়ে যায় কেবল ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস এই পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে। তাও আবার তাদের লড়াই ও প্রতিযোগিতায়ও নিজেরা তারা  মহাদেশে ভাগ হয়ে যায়। যেমন, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস কলোনি দখলদার কোম্পানি নিজেদের নিবদ্ধ করে কেবল ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশের মধ্যে। আর এদিকে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ব্রিটিশ আর ফরাসি কলোনি দখলদার কোম্পানিগুলো নিজেদের নিবদ্ধ করেছিল। আর ডাচ কোম্পানি নিজেদের জড়ো করেছিল ইস্ট এশিয়ায় যেমন ফিলিপাইন বা ছোট কোন দ্বীপে।

    এজন্যই বলেছি,  কলোনি দখলদারী যুগ শুরু হবার আগে, মানে মোটামুটি ১৬০৭ সালের আগের দুনিয়ায় দেশ-রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরস্পরকে তেমন চিনত না। অন্য ভাষায় বললে, মূলত যোগাযোগ ছিল না। ফলে বিনিময় বাণিজ্য-সম্পর্ক অনেক দূরের কথা ছিল। ফলে কলোনি দখলদারী শুরু হলে এর মাধ্যমে এই প্রথম তাদের মধ্যে যোগাযোগ ঘটে তবে সেটা এক কলোনি-সম্পর্ক, এটাই তৈরি হয়। এটা ঠিক বাণিজ্য সম্পর্ক একেবারেই নয়। যেমন আজকের দিনের মত (১৯৪৫ সালের পরে) আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে যা বুঝায়, সেটা কখনই তৈরি হয়নি।
    এর পিছনের মূল কারণ বলেছি, সম্পর্কটা যেখানে লুটের সেখানে দেশ-রাষ্ট্রের পরস্পরের মধ্যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক হতে পারে না। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটা এক পক্ষীয়। আর যেটা হল, কলোনিকৃত দেশ থেকে সম্পদ ও পুঁজি-পণ্য পাচার (উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার)। ফলে এটা ঠিক বাণিজ্য না, তবে সম্পদ পাচারের সম্পর্ক।

    কমিউনিস্ট চোখঃ
    এখানে আরো একটা মজার অবজারভেশনের কথা বলা যায়। কোনো কমিউনিস্ট চোখ কখনো বাণিজ্য নিয়ে বুঝাবুঝিতে আগ্রহী নয়। বরং যা নিয়ে সে আগ্রহী তা হল, উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার নিয়ে। তাই আসলে সে নিশ্চিতভাবে বলতেও পারে না যে বাণিজ্য করা কী হারাম, না হালাল বলবে। ব্যবসা বা মুনাফা করা নিয়েও তাদের একই দ্বিধা। তবে মুনাফা নিয়ে সম্ভবত তারা প্রায় নিশ্চিত যে, এটা প্রায় সারপ্লাস চুরি করার মত। তাই এটাকে তাদের চোখে হারাম বা অগ্রহযোগ্য মানতে দেখা যায়। তাই শেষ বিচারে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য জিনিসটা তাদের চোখে অননুমোদিত বা অনাগ্রহের বিষয় হয়ে আজও থেকে গেছে। অথচ দেশ-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য মানেই তো পণ্য বিনিময় লেনদেন এবং সব ধরনের বিনিময় ভাষা, ভাব-ভালোবাসাসহ সবকিছুর বিনিময়ের শুরু এখান থেকেই। আর সর্বোপরি এটাই সবচেয়ে দক্ষ, মানে কম শ্রম খাটিয়ে নানান পণ্য পাবার পথের উপযুক্ত ও একমাত্র উপায়; কিন্তু বাণিজ্য নিয়ে নিশ্চুপ থাকলে এর কোনো সম্ভাবনা নাই। তবে সার কথাটা হল, কলোনি যুগের প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক তাই দুনিয়ায় তেমন বিস্তৃত হতে পারে নাই, মূলত সেটা কলোনি যুগ বা একপক্ষীয় সম্পর্কের কারণে। তবুও একটা খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য চালু ছিল। যদিও তা আবার কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত কার্যকর ছিল। আমরা এখন সেপ্রসঙ্গে যাব।

    কিন্তু কীভাবে তা বোঝা গেল যে “খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য” চালু ছিল? এর ভালো প্রমাণ আছে কী?
    হ্যাঁ আছে। ‘রথশিল্ড ব্যাংক’ [Rothschild bank]। এটা মূলত জার্মানির এক পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ময়োর আমশেল রথশিল্ড (Mayer Amschel Rothschild) যার জীবনকাল (১৭৪৪-১৮১২)। তিনি ইউরোপের অন্তত পাঁচ বড় শহরে তার সন্তানদের দিয়ে ব্যাংকের শাখা খুলে পুরা ব্যবসাটা পরিচালিত করতেন। আর জর্মানিতে নিজে বসে সেগুলোর সমন্বয় করে আসলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন  এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা। মানে ইউরোপের একমাত্র প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা; কিন্তু সীমিত পণ্য-বিনিময় বা সীমিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

    মূল সম্পর্কটা হলো, আসলে মুদ্রা মানেই কোনো না কোনো দেশ-রাষ্ট্রেরই মুদ্রা। দেশের ভেতরে বিনিময় ওই একই মুদ্রার মাধ্যমে ঘটে থাকে, আর তা সহজও; কিন্তু আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় হতে হলে তা কোনো এক দেশীয় মুদ্রায় করা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে সবার আগে আন্তঃরাষ্ট্র মুদ্রাগুলোর মধ্যে ‘বিনিময় যোগ্যতা’ থাকতে হয়। আর বিনিময় যোগ্য হওয়া মানে সবার আগে তাদের ‘বিনিময় হার’ জানতে হয়; বা বলা যায় সাব্যস্ত হতে হয়। যার সোজা মানে হলো, কেউ বিনিময় হার সাব্যস্ত করে দিতেই পারে, কিন্তু তিনি বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থার হতে হবে। তবেই তা কাযর্কর ও এর এই বিনিময় হার অর্থপুর্ণ হবে!

    ঠিক যেমন মুদ্রা মানেই আসলে আস্থা, বিশ্বাস। যেমন আমাকে কেউ একটা ১০০ টাকার নোট দিলে, যদি আমি নিশ্চিত হই সেই নোটটা এরপরে অন্যকে দিলেও অনায়াসে এটাকে ১০০ টাকার নোট বলে সে গ্রহণ করবে- তবেই আমি তা নিব। ঠিক যেমন যদি রটে যায় যে একশ টাকার নোট ব্যাপক নকল হচ্ছে, তাহলে ব্যাংক থেকে আসা নয়া নোটও বাজারের কেউ আর নিতে চাইবে না বা দ্বিধা করবে।

    সেকালে ইউরোপের এই আস্থাভাজন বিশ্বস্ত লোকটাই হয়ে উঠেছিলেন আমশেল রথশিল্ড। প্রতিদিন সকালে তিনি ওই দিনের ইউরোপের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার টানিয়ে দিতেন। কিন্তু সেটা কী কাজে লাগত? কেউ ধরা যাক জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে এসে কোনো পণ্য কিনে তার দেশে গিয়ে বিক্রির ব্যবসায়ী। তাহলে তিনি বিনিময় হার জেনে সেই পণ্যের পাউন্ডে দামের তুল্য পরিমাণ জার্মান মার্ক পরিশোধ করে কিনতে পারতেন। তবে রথশিল্ড ব্যাংকের কারণে একমাত্র বিনিময় হার জানা থাকাতেই এই বিনিময় সহজেই সম্ভব হত।

    কিন্তু রথশিল্ড নিজে জানতেন কীভাবে যে আজকের বিনিময় হার কী রাখতে হবে? তার পদ্ধতি ছিল সোজা। সেকালে যেকোন দেশের মুদ্রা বলতে যে পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপা হবে তা ছাপার আগে সমমান পরিমাণ সোনা ভল্টে জমা রাখা হত। যাতে সত্যি সত্যিও নোটের বাহক চাইলে সমপরিমাণ আসল সোনা তাকে দিয়ে দেয়া যায়।  কথা আরো আছে। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক বলতে ধারণাটা আসে ১৯৪৫ সালের পর থেকে।  ফলে ব্যাংক ব্যবসা করত একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানী। ব্যবসায়ীরা সরকারকে কখনও বাজার ব্যবস্থায় ঢুকতে দেয় নাই বা দেওয়ার সাফাই খুজে পায় নাই।  এসবই শুরু হয়েছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু বিশেষ করে প্রত্যেক সদস্য দেশে একটা করে কেন্দ্রীয় ব্যংক থাকার প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে।  যেমন ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড” এক প্রাইভেট ব্যাংক ছিল। একে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রিয় ব্যাংক করতেই সরকার এই প্রথম এই ব্যাংককেওধিগ্রহণ বা মালিকানা নিয়ে নিয়েছিল। এর আগে সরকারের অনুমতি নিয়েই ওই ব্যাংক মুদ্রা ছাপাত। ফলে চাহিবামাত্র সোনা ফিরিয়ে দিবার দায় ছিল ঐ ব্যাংকের। এজন্য ঐ মুদ্রাব্যবস্থাকে বলা হত, “গোল্ড ব্যাকড মানি”। অর্থাৎ যে ব্যাংক কাগুজে নোট বা মুদ্রা ছাপাবে সেইই কোন মুদ্রার হোল্ডার বা ধারক মালিক তিনি সোনা ফেরত চাইলে তাঁকে তা দিতে বাধ্য থাকত।
    যেকথা বলছিলাম, মুদ্রা গোলড় ব্যাকড মুদ্রা হত বলে দেশের সোনার প্রবেশ বা বের হয়ে যাওয়া এর একাউন্টিং ভিত্তিক ছিল এই মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ ব্যবস্থা।  তাই   প্রতিদিন সকালে তিনি খবর নিতেন গত দিনে ধরা যাক পাউন্ডে মোট কেনার চেয়ে বিক্রি কত কম/বেশি হয়েছে। বিক্রি বেশি হওয়ার অর্থ হলো, তাহলে অন্য দেশের বেশি সোনা ইংল্যান্ডে এসে ঢুকেছে। তাই এটা পরদিন সমান করতে গেলে  যার অর্থ বিক্রি কমাতে হবে। বিক্রি কমানো মানে অন্যদেশের কম সোনা এসে ইংল্যান্ডে আগের দিনের চেয়ে কম ঢুকা। অর্থাৎ এটাই ছিল তার পরদিন হার সমান করার উপায়। এখন কতটা কমাবেন বা বাড়াবেন এটা অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্ধারণ করে নিতেন। আর তাঁর পাঁচ ছেলের কাজ ছিল ওসব দেশের মুদ্রার হার নিয়ে একই খবরা খবর পিতার সঙ্গে দেয়া-নেয়া করা। এভাবে একটা আস্থা-বিশ্বাসের ওপর মানে রথশিল্ডের ভরসায় সীমিত আকারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সেকালে চালু ছিল।

    কিন্তু ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পর থেকে এই ব্যবস্থাটাও আর টিকে থাকতে পারেনি। যদিও পেছনের মূলকারণ যুদ্ধ-বিশৃঙ্খলা ঠিক তা নয়। মূল কারণ, মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ যুদ্ধে খরচ যোগাতে বা মিটাতে গিয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করেছিল। যে কারণে, নিজ দেশেই সোনা ভল্টে রেখে সমপরিমাণ নোট ছাপানোর রেওয়াজ বজায় থাকেনি, মানে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ বলে য়াসলে কিছু বজায় না থাকা শুরু হয়েছিল।  পরিণতিতে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো মুদ্রা বিনিময় হার নির্ণয়ের রথশিল্ডের ব্যবস্থাটাও আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে অকেজো হয়ে গেছিল। আমরা মনে রাখতে পারি  মুদ্রাস্ফোত শব্দটার খাস মানে হল  সোনা আগাম ভল্টে না রেখে মুদ্রা ছাপানো। যুদ্ধের খরচ মিটাতে ইউরোপের সব মাতবর দেশই এভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে ছিল। এরই ফাইনাল প্রতিক্রিয়া হল আমেরিকার। ১৯৩৩ সালের ২০ জানুয়ারি এফডিআর [Franklin Delano Roosevelt ] বা  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রথমবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। শপথের পরেই তার প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ডলারের মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো। তার যুক্তি ছিল সারা ইউরোপ ঘটিয়েছে তাই তাদের সাথে সমান করতে তার এই সিদ্ধান্ত।  তিনি আগের এক আউন্স সোনার দাম ছিল ২৫ মার্কিন ডলার। তা বাড়িয়ে তিনি করেন ৩৫ ডলার। পরে ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার সমও গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা চালু ছিল আর ১ আউন্স সোনা ৩৫ ডলারের এই রেটই বজায় ছিল।  দুনিয়ায় গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় আসলে ১৯৫৮ সালে যা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থাকে পুণঃজন্ম দেয়া হয় ১৯৭৩ সালে। সে প্রসঙ্গ আলাদা, তাই এখানেই ইতি।
    ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্দ্ধধে যে রথশিল্ডের ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও এটা আর কখনো ফিরে কার্যকর হতে পারেনি। বরং কলোনি ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ায় আর ইউরোপের প্রবল অনুরোধে আমেরিকার নেতৃত্বে রথশিল্ডের কাজটিই আরও ব্যাপকভাবে করতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান গড়ে নেওয়া হয় ব্রেটেনহুড সম্মেলনে ১৯৪৪ সালে। দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের শুরু হয় তখন থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে কেন্দ্র করে।

    লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর  ০২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে প্রিন্টে   “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরের ফারাক”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

     চীন-ভারত সংঘাতে

    বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

    গৌতম দাস

    ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3PL

    _

    [সার-সংক্ষেপঃ   চীন-ভারত সামরিক সংঘাত আসন্ন কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কার পক্ষ নিবে? চীন না ভারতের পক্ষে? নাকি নিজেরই একটা পক্ষে? সম্প্রতিকালে এসব নিয়ে ‘অনুমিত’ দৃশ্যকল্প এঁকে নিয়ে এর আলাপ তুঙ্গে নিয়েছে মূলত ভারত। আর তাতে ভারতের মন রক্ষার্থে সাথে তাল দেয়া শুরু করেছে আমেরিকাও। এনিয়ে এদিক সেদিক, কার মনে কী আছে তা নামে-বেনামে এমন প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। আমেরিকা যদিও ভাব ধরেছে যে সে ভারতকে সাপোর্ট করতে নাকি এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করে নাই। আমেরিকা বরং নাকি “ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশ দেখা” ছেড়ে দিতে বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা নিজের এক পররাষ্ট্র ডেস্ক সাজিয়েছে যেখান  থেকে এখন বাংলাদেশ ইস্যু দেখাশুনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে – এসব চাপাবাজি-মূলক বক্তব্য এক সাক্ষাতকারে প্রকাশ করেছে। অথচ ফরেন পলিসি পত্রিকার এই আর্টিকেল উলটা সাক্ষ্য দেয় যে খাসিলত বদলায় নাই, বদলাবেও না।
    কিন্তু এসময়ে হঠাত চীন-ভারত সংঘাতের কথা উঠছে কেন? এটা আমেরিকা বা ভারত স্পষ্ট উচ্চারণ না করে এড়িয়ে যাচ্ছে যদিও তা করা হচ্ছে “যেন সংঘাত আসন্ন” এমনটা (given) ধরে নিয়ে। তবে ভারত পরোক্ষে এক আর্টিকেল ছাপিয়ে তা বলেছে। সেখানেও আগাম (given) ধরে নেয়া ঘটনাটা হল ভারত তো জীবনেও তিস্তার পানি দিবে না ফলে এক চীনা তিস্তা প্রকল্প যেহেতু বাংলাদেশ ভাবছে; তা ভাববেই স্বাভাবিক। সেটা হলে এর উলটা প্রভাবে ভারত কী কী হারাবে তা নিয়ে এক এজেন্সি রিপোর্ট ছাপিয়েছিল আমেরিকার ভোয়া বাংলায় মতিউর রহমান চৌধুরী। যেখানে ভারতের পক্ষে এক “ছায়া-ব্যক্তিত্ব”  অংশ নিয়েছিল। যেখানে বেপরোয়া ভয়াবহ সব কথা লেখা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশকে ভারতের সাথে চুক্তি করতে হবে যাতে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে সামরিক যান চলাচল করতে পারে। যেমন লিখেছে – “… বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করা, যে চুক্তিবলে সংঘর্ষের সময় সামরিক, বেসামরিক এবং ট্রাফিক ক্যারি করা যাবে”। মানে এক ন্যাংটা খোকার মামা বাড়ির আলাপ আর কাকে বলে!!!
    এমন এসব এজেন্সী ততপরতায় বাংলাদেশ ভরে গেছে। ডেইলি স্টার এমন  আরেক রিপোর্ট এখানে। এক পুরানা এজেন্ট সিপিডি (CPD) এবার ভারতের আরআইএস (RIS) নামের এক ছুপা থিঙ্কট্যাংকের সাথে যৌথ সেমিনার করেছে ঢাকায়।  ছুপা এজন্য যে এরা একদিকে দাবি করছে তারা স্বাধীন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান। অথচ এর পরিচালনা পরিষদ বা গভর্ণিং বডিতে দেখা যাচ্ছে  ভারত সরকারের পাঁচ মন্ত্রণালয়ের সচিব (পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি) এবং সাথে আর এছাড়াও আরএসএস নেতা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ডিরেকটরেই পরিপুর্ণ।  আর এমন RIS এই প্রতিষ্ঠানের সাথে CPD যৌথভাবে বাংলাদেশের ৫০ বছর পালন করেছে ঢাকায়! কী করে?? সিপিডির রেহমান সোবহান ভারতকে করিডোর দেওয়ার পক্ষের এজেন্সীর হয়ে ২০০৭ সাল থেকে সোচ্চার এবং বিরোধীতাকারীদের মুর্খ ও অশিক্ষিত বলেছিলেন তিনি। আবার এখন   ভারতের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছু লোক অতি উতসাহে আলোড়ন তোলার চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু তা অনাগ্রহে গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বরেই আটকে থেকে যাচ্ছে।

    আসলে সিপিডি  এমনই ভারত অনুগত যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা উঠায় কিন্তু সারা ভারতে গত আট বছর ধরে একটা প্রবল হিন্দুত্ববাদের যোয়াড় বইতেছে আর ভারতের এই বন্ধু হওয়া সত্বেও বাইডেন এই প্রসঙ্গে কথা তোলা ছাড়ে নাই। অথচ আমাদের সেকুলার রেহমান সোবহান সাহেব মুখে কুলুপ দিয়েছেন; কি জানি মহাজন রাগ করে নাকি!!  এমন যতই আনুগত্য [subordination] বা অধীনস্ততা দেখাক এথেকে ভারত কোন কিছু অর্জন করতে পারবে না।

    তবু নিশ্চিত বলা যায় যত  প্রচেষ্টাই নেয়া হোক, চীন-ভারতের কোন কল্পিত যুদ্ধে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না। এর কোন সুযোগই আর নাই। বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ তো নিবেই না এডিশনালি সাথে বাংলাদেশের নিজের সার্বভৌম বুঝের কোন অবস্থানও থাকতে পারে।  এমনকি তা হাসিনার নেতৃত্বের বাংলাদেশেও না।  মনে রাখা যেতে পারে, কোন শর্তে বা চাপে ফেলেও বাংলাদেশকে কোনদিকে নেওয়ার দিন শেষ, সেই পরিস্থিতিটাই লুপ্ত  হয়ে গেছে। এটা ভারত যত তাড়াতাড়ি  বুঝবে ততই সেটা ভারতের জন্য মঙ্গল হবে। তবে এর আগে নানা গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বর অথবা বহু চাটুকার বা এজেন্টদের ততপরতা  আমরা চলতে দেখব অবশ্যই। আর হাইকমিশনকেও আমাদের মিডিয়া কিনার জন্য আরো বহুদিন ফান্ড ঢেলে যেতে দেখব। ]

    DON’T LOOK AT BANGLADESH WITH INDIAN PRISM : USA MEDIA

     

     

    ‘ফরেন পলিসি’ (Foreign Policy Magazine), ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আমেরিকান পত্রিকা; দীর্ঘ দিন ধরে এটা মূলত ডিপ্লোমেসি ও রাজনীতিক ইস্যু নিয়ে চর্চার এক ম্যাগাজিন। আর বলাবাহুল্য, এ’কাজ তারা আমেরিকান স্বার্থের দিক থেকে তাকিয়ে করে থাকে। আর বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে এই ম্যাগাজিনের অনুসৃত লাইন যাই থাক, চলতি বছর থেকে এটা এখন বাইডেনের বড় ‘একটিভ সাপোর্টিং’ পত্রিকা; বিশেষ করে সাউথ এশিয়ার জন্য আর তা কাভার করার দিক থেকে। মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] ‘উড্রো উইলসন সেন্টার’ [Wilson Center] এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ডেপুটি প্রোগাম ডিরেক্টর ও সিনিয়র ফেলো। তিনি এখন ফরেন পলিসি পত্রিকায় নিয়মিত এক সাপ্তাহিক ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’ লেখার তত্ত্বাবধান ও প্রকাশ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত যেটা আসলে বাইডেনের সাউথ এশিয়া নীতির ছাপে ও পক্ষে এই অঞ্চলের বার্নিং ইস্যুগুলোতে তাদের অবস্থান মেলে ধরে। আর তাতে এ অঞ্চলের খুঁটিনাটি ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের মনোভাব সম্পর্কেও কিছু  আঁচ পাওয়া যায়। এছাড়া অনেক সময় এ’অঞ্চলের মিডিয়াগুলো কী লিখেছে তার ছোটখাটো রিভিউও দেখতে পাওয়া যায় এই ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’। অর্থাৎ বাইডেনের পক্ষেরই যেন এটি একটা আলাদা ভার্সন কিন্তু যারা বাইডেন প্রশাসনের সাথে অ-সরকারিভাবে ও ইনফরমালি যুক্ত।

    বুড়া সিংহ আমেরিকাঃ
    এদিকে চলতি শতক থেকে প্রায়ই আমেরিকান প্রশাসনকে অনেকে ‘বুড়া সিংহ’ বলে থাকে। টানা পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা দুনিয়াকে ভালো-মন্দ যাই হোক একভাবে দাবড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু তার সেসব বহু সক্ষমতাই আজ গত হয়েছে; সোজা নাই হয়ে গেছে; বিগত যৌবন হয়ে গেছে। ফলে যেন এটা এখনো সিংহ বটে তবে চামড়া ঢলে পড়া বুড়া সিংহ হয়ে গেছে।

    গত ১৯৪৫ সালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে একটা ভাল ‘জংশনের বছর’ বলা যায়। এই জংশন হল, এক দিকে  বিশ্বযুদ্ধে দুনিয়ায় ভেঙে পড়া পুরনো অসংলগ্ন [discrete] রাজনৈতিক অর্ডার মানে যেটুকু রাজনৈতিক সিস্টেম ছিল তা ভেঙ্গে, পরে ওর অবশিষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো ক্রমেই সে ত্যাগ করছে আর অন্যদিকে নতুন এক অর্ডারে এক সুষম সংগঠিত ও গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে দুনিয়া পুনর্গঠিত করে  নিজে চলতে শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। নতুন সেই গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে এর  গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার বা এই নয়াবিধি ‘ব্যবস্থা’ শুরু হচ্ছে মূলত জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্রে রেখে [এটাই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ড্রিম]  এবং অন্তত তিনটা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে। এই বিগত অর্ডারটাকে যদি বলি কলোনি যুগ বা কলোনি ক্যাপিটালিজমের কাল তবে, নতুন যা সেসময়ে গড়ে উঠছে তা আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম।  যদিও সোভিয়েত কমিউনিজম, যা তখন ইতোমধ্যে ২৮ বছর বয়স্ক, সে এটা সরাসরি স্বীকার করতে চায়নি। কেবল জাতিসঙ্ঘ গঠনের সময়ে নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক থাকে তা বুঝে নিয়ে বাকি ব্যাপারে  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তালে তাল দিয়ে গেছে। অর্থাৎ   আমেরিকা যা করে করুক, পরোক্ষে এভাবে মেনে নিয়েছিল। আর অন্য দিকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যাপক কোন বাণিজ্য যেটা ১৯৪৫ এর আগের দুনিয়ায় যা কোনদিন ছিল না  তা এবার পূরণে এক বিশাল গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করতে বা তার নিয়ন্ত্রক বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এদের জন্ম দেয়া হোক;  আর  তা আমেরিকা গড়ে তুলুক এটাই ইউরোপ মনেপ্রাণে চেয়ে ও সাপোর্ট করে গেছিল। তাই আমেরিকা এভাবে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু করে নিতে পেরেছিল।
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের টানা ২২ দিনের জন্মসভার হোটেলে বসবাসে সোভিয়েত ইউনিয়নও আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থেকেছিল; অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেলে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চাঁদা দিয়ে সদস্যপদ নেয় নাই বা নিতে আসে নাই। আবার কোনো বাধাও দেয়নি। কেন কী হয়েছিল, কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন সিদ্ধান্ত তা প্রকাশ্যে, স্টালিন তখনো জীবিত ও ক্ষমতাসীন- তা সত্ত্বেও কোথাও তিনি তা জানাননি। লিখিত কিচ্ছু নেই। তবে আমেরিকা তার নয়া গ্লোবাল অর্ডার নিয়ে  ঠিকই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে টানা পঁচাত্তর বছর পরে আমেরিকা এখন এক বুড়া সিংহ যার যৌবন কেটেছে ‘রুস্তমি’ করে। যখন সে কোন কিছু চেয়েছে জানলেই তখন অনেক কিছু হয়ে যেত। সেসব দিন আর নাই। এর বড় কারণ এখন আমেরিকা কাউকে দুর্নীতির  অজুহাতে ধরে অনুগত করতে বেকায়দায় ফেললে এটাই সুযোগ হয়ে উঠে – এই সুযোগে চীন বিপুল অনকাঠামো নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকই একমাত্র ও একচেটিয়া বিকল্পহীন সেসব দিন আর নাই। ওদিকে ইতোমধ্যে আমেরিকান আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দিবে সেই সক্ষমতাও শুকিয়ে আসে।

    চলতি শতক বা দুই হাজার সাল থেকে আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে ঢলে পড়ছে তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। বিশেষ করে আফগানিস্তানে ফলহীন যুদ্ধে একতরফা অর্থ ঢালার পর থেকে আরো মারাত্মকভাবে। আর এর বিপরীতে চীনের উত্থান এবং সমৃদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন সেই নেতৃত্বের জায়গা নিতে উঠে আসা, সেটাও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।
    মজার কথা হলো, ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) পর্যন্ত যত প্রেসিডেন্ট তারা কেউ স্বীকার করেননি যে, চীন উঠে আসছে, আমেরিকা বুড়া সিংহ হচ্ছে। এই বাস্তব সত্য স্বীকার না করাটাই যেন আমেরিকান সব প্রশাসনের অফিসিয়াল অবস্থান। একমাত্র কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায় জিবিগনিউ ব্রেজনিস্কি যিনি চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে প্রথম (১৯৭৮) পারস্পরিক স্বীকৃতির রূপ দিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন, তার বেলায়। যখন তিনি ছিলেন (১৯৭৭-৮১) প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA)। তিনি খোলাখুলি চীনা উত্থান প্রসঙ্গে নিজের বইয়ে লিখেছেন। এমনকি ওবামাও আমেরিকান নেতৃত্ব আরো বজায় থাকবে কি না এ নিয়ে সেকালেই যেসব প্রশ্ন উঠে গেছিল তা তিনি মানেন না দেখাতে উলটা দাবি করে বেড়াতেন যে, আমেরিকাই আরো বহুদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে থেকে যাবে।

    কিন্তু কেন এখানে চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা আমেরিকান বুড়া সিংহ হয়ে যাওয়ার স্বীকার-অস্বীকার নিয়ে কথা তুলছি?
    কারণ উপরে উল্লিখিত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে এবারের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’ কুগেলম্যানের সাথে যৌথভাবে লেখা একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। ওতে সহলেখকের নাম আনু আনোয়ার [Anu Anwar], জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির যিনি পিএইচডি প্রার্থী। আর ঐ লেখার শিরোনাম হল “আমেরিকার বাংলাদেশকে নিয়ে বাজি ধরা উচিত” [America Should Bet on Bangladesh]। আর উল্লেখ্য যে এ’লেখায় চীনের চেয়ে আমেরিকা অক্ষম হয়ে পড়েছে এর স্বীকারোক্তি করা হয়েছে। সেসব প্রসঙ্গে ঢুকব এখন।

     কিন্তু লেখার প্রসঙ্গ কেন এমন?
    গত মাসে, মানে নভেম্বরের মাঝমাঝি এক আমেরিকান ডেপুটি সহকারী মন্ত্রী (সাউথ এশিয়া) কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কোনো এক বহুরাষ্ট্রীয় সভায় যোগ দিতে। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি ডেইলি স্টারকে এক সাক্ষাৎকার দেন যার প্রসঙ্গ হল – তিনি দাবি করেন, আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ আলাদা গুরুত্ব লাভ করেছে, যে কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এখন থেকে আর ভারতের সাথে একই ডেস্ক থেকে দেখাশোনা করা হবে না। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশকে আর ‘ভারতের চোখ দিয়ে’  দেখা আমেরিকা  বন্ধ করেছে। তাই কুগেলম্যান ও আনু আনোয়ারের যৌথ লেখাটা হল, সেই বক্তব্যের গুরুত্ব আরো বিস্তারিত একটা সাফাইয়ে তুলে ধরা।
    ওই যৌথ লেখা নিয়ে কোন সেন্সিবল বাংলাদেশের যে প্রতিক্রিয়া হবে সবার আগে তা শিরোনাম আকারে বলে রাখি। বাস্তবে ফরেন পলিসির এই আর্টিকেল ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকার দেখার অভ্যাস ত্যাগ করা দূরে থাক, বরং আরো পোক্তভাবে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থের চোখ দিয়েই বাংলাদেশকে দেখেছে। মানে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থ বাংলাদেশ কতটা দেখবে অথবা না, সেই আলোচনাই ওখানে করা হয়েছে।

    আগাম অনুমান  
    কোন লেখা শুরু করার আগে লেখকের কিছু আগাম অনুমান সেখানে থেকে থাকে। সেই অনুমানটা আমরা এখানে দেখব। যেমন আনুদের লেখাটা সে অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা এখানে আমরা পাব। আনু লিখছেন, “ভবিষ্যতের কোনো সঙ্কটে বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নিতে হয় অথবা  কোনো নিজস্ব ভূমিকায় হাজির হয়, তা সামরিক অথবা কূটনীতিক যাই হোক না কেন, তাহলে তা এঅঞ্চল বিপদে পড়ার মত ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে [If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region. অর্থাৎ মূলকথা বাংলাদেশের নিজের ভুমিকা নেওয়াটাই ভারতের জন্য হবে মারাত্মক – এটাই তিনি বলতে চাইছেন।

    “If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region.”

    এখানে একটি কথা বলে রাখি। এ লেখাটায় জিও-পলিটিক্যাল [geopolitical] এই অস্বচ্ছ শব্দটা যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে একেবারে বিরক্তির পর্যায়ে।  এমনিতেই যারা ‘জিও-পলিটিক্স’ শব্দ ব্যবহার করেন তাদের ওপর ভীষণ বিরক্তি লাগে। মনে হয় এসব মানুষের যখন কোনো কিছু বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতা টের দেয়, তখন এরা সোজা সেখানে জিও-পলিটিক্স শব্দটা ব্যবহার করে পার পেতে চায়। ফলে এক অর্থহীনতা তৈরি করে। অথচ তারা কোথাও কোন রাষ্ট্রের (কূটনৈতিক) সিদ্ধান্তগুলো বা ততপরতার কারণে যখন  তার স্থানীয় পড়শি রাষ্ট্রের উপরে এর প্রভাব পড়া শুধু নয়, তাতে শুধু আঞ্চলিকও নয় একেবারে গ্লোবাল পর্যায়েও প্রভাব পড়ে – এরা সেই গ্লোবাল প্রভাব কথাটাকে বুঝতে বুঝাতে না পেরে সম্ভবত সেটাকে “জিও-পলিটিক্স” বলে চালাতে চেয়ে থাকে।
    এর পেছনের মূল কারণ দুনিয়ায় ক্রমেই গ্লোবাল হয়ে ওঠা অর্থনীতি। এতে সব কিছুই এখন গ্লোবাল; মানে কোনো কিছুই আর স্থানীয় থাকছে না যেহেতু বাণিজ্য এখন গ্লোব-জুড়ে মানে গ্লোবাল হয়ে উঠেছে; ফলে পণ্য-বিনিময়ও গ্লোবাল রূপ নিয়েছে। তাই একটি ভূগোলে (জিও) কিছু একটা ঘটলে এর প্রভাব-পরিণতি স্থানীয় থাকছে না, বরং স্বতঃই তা গ্লোবাল হয়ে উঠছে।

    ঠিক আছে, তাহলে লেখক এখন কী নিয়ে উদ্বিগ্ন? বাংলাদেশের সামর্থ্যবান হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন?  সেটাই বা কেন? কারণ প্রধান প্রশ্ন, তা হলে এর মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? বাংলাদেশ সামর্থবান হলে যদি ভারতের ক্ষতি হয়ে যায় তার মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? এবং কোথায়?

    আসলে এখানে আমেরিকার সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই। স্বার্থটা মূলত ভারতের আর এটিই আমেরিকার উদ্বেগের কারণ। এই হলো আমেরিকার ধরে নেয়া অনুমান বা নিজের স্বার্থসংক্রান্ত বুঝ। মানে আবার বোঝা যাচ্ছে তা হলে, আমেরিকার বাংলাদেশের জন্যও কোনো উদ্বেগ নেই।

    নিজের নয়, কিন্তু ভারতের স্বার্থ নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন কেন? জবাব হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে যা কিছু ভারতীয় স্বার্থ, এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

    তাহলে দাঁড়াল যে, এই আর্টিকেলটা বাংলাদেশ নিয়ে মনে হলেও আসলে এটা ভারতের স্বার্থরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমেরিকার পক্ষে লেখা এক আর্টিকেল। তার মানে, সেই একই পুরান কথাটাই হল যে, এখানেও আসলে আমেরিকার ভারতীয় প্রিজমের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছে – সেই পুরনো অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। সেই ২০০৭ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকার পুরনো কায়দাটাই।
    তা হলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ‘বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নেয় মানে নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়,…তো খারাপ ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে’  – এর মধ্যে সারকথাটা হল, বাংলাদেশ যদি চীনের পক্ষ নেয় বা আরও নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় – এসব ক্ষেত্রে এক উদ্বিগ্ন আমেরিকাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    অথচ কথাটা একেবারেই সোজা।  চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ইস্যুতে এমন দুটোর মধ্যে বাংলাদেশ ঠিক কী করবে তা যাই করুক সেটা তো বাংলাদেশের একান্ত সিদ্ধান্ত এবং স্বভাবতই বাংলাদেশ চাইবে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিজের কাছে রেখে দিতে। এমনিতেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সঠিক অবস্থান হবে কোন দুপক্ষের বিবাদে কোনই পক্ষ না নেয়া; এ বিষয়ে তাদের উভয় থেকে দূরে থাকা।

    আর এখানে আবার আমেরিকা চাচ্ছে আমরা যেন ভারতের পক্ষে থাকি, যেটা অ্যাবসার্ড ও অলীক। আর সেটা কোন ভারত বা কোন আমেরিকা? যে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে?  আহা রে কিউট বাবুটা! সত্যি এ এক অদ্ভুত আবদার!

    এ ছাড়া এই প্রসঙ্গে আরেকটা মজার দৃশ্যপট পরীক্ষা করা যাক। আসলেই কি চীন-ভারত কোনো সঙ্ঘাতে খোদ আমেরিকাই ভারতের পক্ষে দাঁড়াবে? যুদ্ধ করবে? সত্যি?  এটা তো সুখে কান্না চলে আসার মত বেবি!  আচ্ছা, দুই বছর আগে লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত সঙ্ঘাতে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়েছিল (যখনিকার ভারতীয় সৈন্যদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বা কান্নার দৃশ্যের ভিডিও নেটে প্রায়ই প্রকাশিত হতে দেখি আমরা), সেই উত্তেজনার সময়েও কি আমেরিকা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল? প্রশ্নই আসে না। আমেরিকা আসেনি। এমনকি আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে কোন সান্ত্বনাবাণী দানের কথাও আমরা জানি না। তাহলে? আমেরিকা আসলে কার পক্ষে? আর আমরা কোন পক্ষ নিব তা নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন হওয়া কী সাজে???  টু উ উ মাচ!

    এ নিয়ে ইদানীংকালের প্রশাসন, বাইডেন প্রশাসনের দুর্গতি আরো ভয়াবহ। একালের এই আমেরিকা এখন সব ব্যাপারে আসলে লিম্ব মানে ঝুলে থাকে, কোনো পরিস্থিতিতে কোন  দিকে নড়ে না। যেমন আমেরিকান (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) বা CAATSA আইনে কেউ রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইল কিনলে সেই রাষ্ট্রের উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হবে। সে বিচারে এমন মিসাইল কেনায় ভারতের উপরে অবরোধ আরোপ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা কী স্টাটাস অবস্থায় আছে কেউ ঠিক জানে না- ব্যাপারটা ‘লিম্ব’ হয়ে ঝুলে আছে।
    আবার ওদিকে তাইওয়ান নিয়ে অযথা খোঁচাখুঁচি ব্যাপারটা আবারো একেবারে ছেচড়ামোর পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। “এক চীননীতি” [One china policy] মানে হল তাইওয়ান আলাদা দেশ নয়;  বরং একই চীনা ভূখণ্ডের অংশ – এটা কোন রাষ্ট্র না মানলে সে রাষ্ট্রের সাথে চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করে না। সেই বিচারে ১৯৭১-৭৭ সাল পর্যন্ত নানান ইস্যুতে দীর্ঘ আপস আলোচনার পরে আমেরিকার এক চীননীতি মেনে নিয়েই চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে।
    এভাবেই দীর্ঘ পথ চলার পরে  ট্রাম্পের আমলে এসে তিনিই প্রথম এক চীননীতি মানি-মানি না টাইপের লিম্ব তৈরি  করেন। । শেষে এবছর গত  অক্টোবর মাসে এসে চীন তাইওয়ান ইস্যুতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলে বাইডেন এবার তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলেভানিকে দ্রুত চীনের সাথে বৈঠকে বসেই সোজা ১৯৭৮ সালের এক চীননীতিটাই বাইডেনের আমেরিকা এখনো বজায় রেখেছে বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন। এভাবে চীনের সব ক্ষোভ মিটিয়ে দিলেন। কিন্তু আবার গত দুই সপ্তাহ ধরে পুরানা চুলকানি! বাইডেন তার ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ এবার তাইওয়ানকেও রাষ্ট্র হিসেবে দাওয়াত করেছেন।  অথচ তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য নয় ঐ ১৯৭১ সাল থেকে। যখন থেকে সেটা কেড়ে নিয়ে মাওয়ের চীনকে আসল চীন বলে ভেটোসহ ঐ সদস্যের হকদার বলে মানা হয়েছিল। তাই মূল চীনাভুখন্ডের একচীন নীতি জাতিসংঘের চোখেও ভ্যালিড। এটা স্রেফ কোন গোয়ার্তুমি নয়। )  তাই আবার খামোখা টেনশন! অর্থাৎ এ কালের  বুড়া সিংহ  আমেরিকা  যে মুরোদ হারাচ্ছে তার আরেক প্রমাণ হল এসব ছেচরামো। এরই আরেক প্রকাশ হল, সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার ঝুলে থাকতে সবচেয়ে ভালো পারে!

    বাংলাদেশ কেন চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার দিকে ঝুঁকেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে আনু নিজেই বলছেন, “চীনের অল্প সময়ের ভেতর বিপুল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানো বা জোগাড়ের ক্ষমতা এবং তাও আবার তুলনামূলক অল্প কিছু শর্তে। যেটা নয়াদিল্লি তো বটেই ওয়াশিংটনেরও কম্ম নয়, তাদের এমন মুরোদ নেই” [Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.]”।

    “Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.”

    আমার মনে হয়, লেখক আনু আনোয়ারের  এত খোলাখুলিভাবে চীনের চেয়ে আমেরিকার অক্ষমতার কথা এই কঠিন সত্যকে প্রকাশ করা, কোনো আমেরিকান লেখায় আগে আসেনি। এ্ইটা বুড়া সিংহের নিজেকে বুড়া হিসাবে  এক আপন স্বীকারোক্তি!

    তবু লেখক এখানেই থামেননি। পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকাকে আবার তার যৌবন কালের মতো নয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে [By funnelling more investments into Bangladesh……]। কারণ একথাটা অবাস্তব তিনি জানেন। কিন্তু এটা বলা ছাড়া তার লেখাটাই দাড়ায় না, অর্থহীন হয়ে দাড়ায়।  সবাই জানে, আমেরিকার সে ‘ব্যবসা’ মানে যোগ্যতা চলে গেছে বহু বছর আগেই। তবু ‘গপ্প ফলিয়ে বেড়ানো’ আমেরিকা ত্যাগ করেনি। গত জি-৭’ বৈঠকে সবাইকে সাথে নিয়ে তারা নতুন উদ্যোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ আনবেন, যেটা নাকি আবার চীনা বেল্ট-রোডেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। কিন্তু এসবই গল্প যা এখন পর্যন্ত কোনো রকমের বাস্তব প্রকল্প হিসেবে শোনা যায়নি। তাই শেষে আনু নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘চীনের মতো দ্রুত আর বিশাল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানোর মুরোদ আমেরিকার নেই”।

    তাই সারকথায় ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের এই আর্টিকেলটা লেখা অথবা বাংলাদেশের আলাদা ডেস্কের কথা বলে লোভ দেখানো  – এসবই আসলে লিপ সার্ভিস বা কথার কথা। সিংহ বুড়া হয়ে গেলে তারা আর কী করে?  তবু তাদেরকে এসব চাপাবাজি করে যেতেই হয়। তাই এসব করেই চীনের বিরুদ্ধে “ভারত নাকি পরাশক্তি” একথা বলেই পরিচয় করিয়ে দিতে হয় আমেরিকাকে।

    খামোখা কূটনৈতিক শোডাউনঃ
    গত মাসের শেষ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদিকে আরেক চাপাবাজি চলবে, একই কারণে। মানে ফরেন পলিসির আর্টিকেলের সাথে ঢাকায় ভারতের কূটনৈতিক নড়াচড়া সম্পর্কিত ঘটনা ততপরতার কথা বলছি। যেমন, দোরাইস্বামীর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ, বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধনের ৭ ডিসেম্বরে ঢাকা সফর  –  আর এসবই আগামী ১৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে।

    “বাংলাদেশ ভারতের সৃষ্টি, ভারতেরই ফসল, কাজেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে যায় কী করে” – ভারত যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করে তখন অলক্ষ্যে এ খামোখা বয়ানটাই তার কূটনীতিকরা তাই মনে মনে আওড়াতে থাকেন। অতএব চীন-ভারতের কোনো সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ তো ভারতেরই, ভারতের প্রভাব বলয়ের জবাইযোগ্য এক নধর খাসি যেন!  কাজেই বাংলাদেশ আর যাবে কোথায়! এই দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় স্বার্থগুলো এসব বয়ানেরই জপ করতে থাকবে।

    কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, মানে কোন রিটার্ন কী আসবে? না, আসবে না। বরং ফলাফল একদম হবে শূন্য। এমনকি বর্তমান  হাসিনার বাংলাদেশও ভারতের পক্ষে যাবে না, মুভ করার সে সুযোগটুকুও নেই। বাস্তবতা এমনই। কিন্তু তাই বলে সে বাস্তবতার কথা আবার সরকারের দিক থেকে ভারতের কাছে মুখে উচ্চারণও করা হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফর উপলক্ষে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিডিয়াকে বলছেন, “আমি ঢাকায় থাকলে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে”। কাজেই কী পরিমাণ প্রাণহীনভাবে এ’দুই সপ্তাহ কাটবে, এখান থেকে অনুমেয়; অর্থাৎ কেবল মুখেই বলা হবে না যে, বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে নেই। আর কার্যত এটা ভারতেরও পরিস্কার করেই অজানা নয়। তা হলে ভারত চীনের কাছে তার ‘হবু ও কথিত’ শিলিগুড়ি করিডোর অথবা সাত রাজ্য হারানোর কথা যে লেখক আনু তুলেছেন, তার কী হবে?

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের দিগগজেরা আর কথিত ‘পরাশক্তি’ ভারত কী করে নিজেদের রক্ষা করবে, তা তো তাদেরই বিষয়। সাধারণভাবে বললে, এটা তাদের জবরদস্তিতে তোলা ইস্যুতে  খানিক এক ভীষণ উত্তেজনা মাত্র। আর বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কোন মানুষ এর ভেতরে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এটা মৃত এক ভারতীয় উদ্বেগ যাকে চাবুক মেরে জাগানোর চেষ্টা দেখছি আমরা। এমনকি যার শেখ হাসিনা সরকারের কাছেও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সত্য নয়।

    তবুও ঢাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লি-ঢাকা কত কাছাকাছি, কত নিকটাত্মীয় ও বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবাধীন তা প্রদর্শনের এ ধরনের কিছু ইমেজ ফাঁপা ডেকোরেটেড উত্তেজনা তৈরি করা হতে দেখব অবশ্যই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    গৌতম দাস

    ২২ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    –

    Nehru was way ahead of his time. Seeing him through a 20/20 lens is wrong

    ভারতের শ্যাম সরণ [Shyam Saran], একজন কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাট। গত ১৯৭০ সাল থেকে ভারতের ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে তিনি ২০০৪-০৬ সালে এই সময়কালে মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদ ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন। পরে সে পদ থেকে ফরমাল অবসর নিলেও এরপর সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভারত সরকারের বা সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও নানান দায়িত্বে কাজ করে গেছেন। বহু ধরনের কাজে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বা বেসরকারি ও বিদেশে অনেক কিছুর সাথে এখনো সক্রিয় তিনি। দেশী-বিদেশী থিংকট্যাংকের কাজের সাথেও তিনি জড়িত। একেবারে সক্রিয় এখন সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ [CPR] এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে। এছাড়া প্রায়ই তাঁর লেখা কলাম বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত।

    সম্প্রতি তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু সম্পর্কে উঁচু মূল্যায়নমূলক এক কলাম লিখেছেন। ভারত সরকারের ফরেন সার্ভিস ক্যাডারে যারা যোগ দেন তাদের সবারই এক স্বপ্ন-খায়েশ থাকতে দেখা যায় যে, তিনি ফরেন সচিব হওয়ার পরেই অবসর নেবেন। যদিও টেকনিক্যাল ঝামেলায় সচিব পদটা খালি নেই এমন হয়ে দাড়াতে পারে কারো বেলায়; অবসরে যাওয়ার সময় এসে গেলে অনেকের ভাগ্যে তা হয় না। এমনকি আরেকটু এগিয়ে অনেকের জ্বলজ্বলে খায়েশ মনে পুষে রাখে যে, সার্ভিস লাইফে যদি ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সাথে লাইন-ঘাট, সম্পর্ক, পারফরম্যান্স দেখিয়ে মন পাওয়া ইত্যাদি ঘটে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কারণ তাহলে তিনি চাকরি থেকে অবসরের পরে কপালও খুলে গেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন।

    যেমন কংগ্রেসের সালমান খুরশিদ এমন এক কূটনীতিক ছিলেন যিনি এখন কংগ্রেস দলের সাবেক মন্ত্রী এবং এখন কংগ্রেস দলের এক রাজনৈতিক নেতা হিসাবেও পরিচিত। আর বিজেপির মোদির ক্ষেত্রেও তাঁর বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করও তেমনদের একজন। তখন মোদি কেবল প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ২০১৪ সালে। কোন আমেরিকান সরকার-প্রশাসনকে ছুঁতে বা পৌঁছাতে গেলে সবচেয়ে ভাল উপায়টা কী? তারাই বা ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করে থাকেন? বিষয়গুলো ব্যক্তিগত মত করে জানা জরুরি। মোদির সেসব প্রয়োজন মিটাবার মত করে ২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসার পর থেকে এরই প্রধান হাতিয়ার হয়ে আছেন জয়শঙ্কর, ঘটনা চক্রে যিনি তখন আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।  ঘটনাচক্রে  মোদির তাঁকেই পছন্দ হয়েছিল।  আবার মোদিও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু নিশ্চিত নন যে, আমেরিকার কাছে কী চাইতে হয়, কী পাওয়া যায়; কিভাবে তা চাইতে হয় আবার কী চাওয়া ঠিক নয়, ইত্যাদি। আবার যেখানে মোদি আমেরিকার খাতায় ওসময়ের  কিছু দিন আগে পর্যন্ত গুজরাটে দাঙ্গা লাগিয়ে মুসলমান হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ তালিকায় থাকলেও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। আবার আমেরিকারও মোদির সাথে বিশেষ সম্পর্ক করা দরকার। কাজেই জয়শঙ্কর হয়ে যান মোদি আর আমেরিকা এ’দু’পক্ষের মনোভাব আগাম বুঝাবার ব্যক্তি ও দু’জনা দু’জনের বিশেষ দুত।  তাই সেসময় জয়শঙ্কর অবসরে চলে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে হঠাৎ মোদি সেসময়ের উপস্থিত ফরেন সচিব সুজাতা সিংকে  সরিয়ে দিয়ে জয়শঙ্করকেই সচিব পদে নিয়ে নেন। আর এরপরে ২০১৯ সালে মোদি দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জিতে এলে ততদিনে জয়শঙ্করেরও  সচিব থেকেও অবসরে যাবার সময় তখন। কিন্তু আবার ভাগ্যের শিকা ছিড়েছিল।  তখন হঠাৎ মোদির আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মারা যাওয়াতে মোদি এবার জয়শঙ্করকে  মন্ত্রীও করে নিয়েছিলেন।

    কিন্তু সচিব হওয়ার এসব লালিত স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে একটা মূল ফ্যাক্টর থেকে যায় তা হল ‘বহনকারী’; মানে একটা রাজনৈতিক দল লাগে। কারণ তিনি তো আমলা ফলে একটা  রাজনৈতিক দলই কেবল তাকে রাজনৈতিক পদ দিতে পারে ও বসাতে পারে। শ্যাম সরণের ক্ষেত্রে এই দলটার নাম হল কংগ্রেস। অর্থাৎ ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ শেষের দিকে যত সামান্যই হোক পক্ষে একটা রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেতেই হয়। সচিব বা বিশেষ করে মন্ত্রী পর্যায়ে পৌঁছাতে গেলে রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট পাওয়া নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে যায়।

    এই বিচারে শ্যাম সরণকে দিনশেষে কেউ কংগ্রেসের লোক বলে ফেলবে অবশ্যই। তবে এর বাইরেও ভারতে আরেকটা রেওয়াজ আছে যা এখন হয়ে উঠেছে আরেকটা বিষয়ের প্রশ্ন। তা হল  – জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ। এটাও প্রায় ফরেন মিনিস্টারের মতোই আরেক পদ। কারণ উপদেষ্টা ঠিক মন্ত্রী না হলেও মন্ত্রীর সম-মর্যাদার পদ। কোনো সাবেক ফরেন সচিব অবসর নেয়ার পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নিযুক্তি পেয়েছেন এমন হতে পারে ও হয়েছে। তাই এটাকেও এসব সাবেক আমলারা জীবনের বিরাজ ক্রেডিট ও অর্জন গণ্য করে। তা করুক কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এই উপদেষ্টা পদে সাবেক গোয়েন্দা বিভাগের আমলারাও নিয়োগ পেতে পারেন এবং পেয়ে থাকেন। যেমন বর্তমান মোদির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সাবেক “ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর” (আইবি) সর্বোচ্চপদ ডিরেক্টর ছিলেন। কিন্তু সমস্যা হল – ফরেন সার্ভিস আর ইন্টেলিজেন্স বুরো এরা উভয় উভয়কে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে বসার জন্য অনুপযুক্ত বা কম যোগ্য মনে করে রেষারেষির কারণে। তাই কনুই-গুঁতা মারামারি চলে নিরন্তর। যেমনটা এখন জয়শঙ্কর আর দোভালের মধ্যে চলে আর মোদিকে সবসময় তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তা সামাল দিতে হয়।

    এখানে একটা বাড়তি তথ্য দিয়ে রাখি, আশাকরি অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিনিষটা কী? আবার এটার সর্বোচ্চ উপরে কোন মন্ত্রী নয়, তবে এক উপদেষ্টা কেন? প্রশ্নদুটার জবাব একই। এটাই আসলে ‘র’ [RAW] এর আসল মন্ত্রণালয়-ঘটিত ডিপার্টমেন্ট এর নাম।  অন্যভাবে বললে ‘র’ – এটা ভারতের বাইরে ভিন্নদেশে গিয়ে নাশকতার কাজ করে বেড়ানোর প্রতিষ্ঠান; এটাকে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হবে – এই প্রশ্নের সমাধান হিসাবে এটা  জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার অধীনে; যেখানে আবার তিনি উপদেষ্টা, ঠিক মন্ত্রী নন। কেন?
    কারণ ‘র’ এর পরিচালনার জন্য দরকার ছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাইরেক্ট একসেস, রাত-বিরাতেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি পৌছে যাওয়ার সুবিধা। বিদেশে কাউকে খুন করার সিদ্ধান্ত দেয়া ও এর দায় নেয়া কোন ছোট সিদ্ধান্ত নয়।  অথচ অন্য সবের মত এই প্রতিষ্ঠানকেও আর পাঁচটা কোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অধীনে রাখলে ডাইরেক্ট একসেস বন্ধ হয়ে যাবে। আর ঐ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরই আগে সবকিছু বিবেচনা করে দেখা একটা এক্তিয়ার ও তাতে সময়ব্যয় করতে দিতেই হবে। এরপরে দরকার হলে প্রধানমন্ত্রী।  এই কালক্ষেপণ বন্ধ করতেই ‘র’ মূলত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনেই একটা বিভাগ করে রাখা হয়েছে। আর ওর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়মিত পরামর্শদান ও তথ্যে আপডেট রাখার কাজটা করেন ঐ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বাইরে থেকে বুঝবার সুযোগ নাই যে  এই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা – উনার কাজকর্ম  ‘র’ কে নিয়ে যারা, কাকে মারবে ধরবে, খুনোখুনি ধবংস বিনাশ কাকে করবে ইত্যাদি এসব নিয়ে। এবং ভারতের নিয়ম অনুযায়ী, এই পদে সাবেক ফরেন সচিব অথবা সাবেক ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো চীফ এমন দুদিক থেকেই আসতে পারে। [এই ব্যাপারগুলো পাবলিকলি আরো  জানার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে ২০০৭ সালে ভারতে প্রকাশিত “কাও বয়েস” বা [The Kaoboys of R&AW] এই বই থেকে।]  যেমন  শিবশঙ্কর মেনন তিনি সাবেক ফরেন সচিব থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আর এপর্যন্ত  কেবল পাঁচজন মানে পাঁচবার নয়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগে বদল এসেছে।  এ’হল, ভারতের আমলা থেকে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হবার গল্প।

    যেটা বলতে চাচ্ছি তা হল – ফরেন সার্ভিসের ব্যক্তিত্বরা সার্ভিসের শেষের দিকে পছন্দের দলের দিকে লীন হয়ে যেতে থাকেন আর অবসরের পরে তো ওই দলের লোকই হয়ে যান। সেই বিচারে শ্যাম সরণের ভাগ্যে জুটেছিল কংগ্রেস দল। সে কারণেই বা সেই থেকে কি নেহরু সম্পর্কে তার এত উচ্ছ্বাসের মূল্যায়ন? আমরা তা খেয়াল করে দেখব, বিচার করব।

    নেহেরুকে নিয়ে শ্যাম সরণের লেখাঃ
    গত ১৭ নভেম্বরে ভারতের দ্যা প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় শ্যাম সরণের প্রায় ১২০০ অক্ষরের কলামের দ্বিতীয় প্যারাতেই তিনি এক সমালোচনামূলক মন্তব্য লিখে বলছেন, “নেহরুর নেতৃত্বে ভুলত্রুটি ছিল, যার কিছু আবার দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক পরিণতি রেখে গেছে। তার কাশ্মির ইস্যু নাড়াচাড়ার মধ্যে ত্রুটি দেখি, ঠিক যেমন আমি তার ১৯৬২ সাল চীনের ভারতে অনুপ্রবেশকে ভুলপাঠ করার দোষ দেখি” [“There were flaws in his leadership, some of which left enduring and negative consequences. I would fault his handling of the Kashmir issue, just as I would his misreading of Chinese intentions in 1962.” ]।

    সারা জীবন আমলা হিসাবে কাটানো কাউকে শেষে কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক ব্যক্তিত্ব বলে অনুমান করে নেয়াটা ভুল হবে। তা সত্ত্বেও নেহরুর মত ‘পরম’ নেতার ভুলত্রুটি  আছে সেটা বলা – সেটা সম্ভবত এই প্রথম আমরা উচ্চারিত হতে দেখলাম। তা সু-রেওয়াজের ধারা হতে উঠতেও পারে হয়ত আগামিতে; যেটা ভারতে এখন নেই বা আমরা দেখি না। তবে শ্যাম সরণ সম্ভবত আদর্শ বা খাঁটি কোন চোখে নয়, প্র্যাকটিক্যাল চোখে দেখে বিচার করতে অনুরোধ রেখেছেন।

    কিন্তু এরপরেও আবার শ্যাম সরণ ডিপ্লোম্যাটের মত এখানে এসে পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন। এছাড়া আবার এই সুযোগে না বলার সুযোগ নিয়েছেন যে, কাশ্মির ইস্যু অথবা ১৯৬২ সালের চীনের আসাম দখল ইস্যুতে নেহরুর ত্রুটিটা ঠিক কী ও কোথায়? বরং এবার তিনি নেহরুকে প্রশংসায় ছেয়ে ফেলেছেন, আগের যে কারো চেয়ে এগিয়ে। আর তা করতে গিয়ে তিনি আর পাঁচটা ‘হিন্দু জাতিবাদীই’ হয়ে থাকার মধ্যে আটকে গেছেন। কোন ধরনের ব্যতিক্রম হতেও চেষ্টা করেননি। সবচেয়ে মজার কথা, তিনি নিজে “হিন্দু জাতিবাদী” অবস্থান নিচ্ছেন আর ‘জাতিবাদের’ পক্ষে কথা বলছেন সেদিকে খেয়াল নাই অথচ একই সাথে অভিযোগ করছেন সাতচল্লিশ সালে “ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ” হয়েছে [The country had been partitioned on the basis of religion…… ]। নেহেরু-গান্ধি যদি এক ‘হিন্দু জাতিবাদের ভারত’ বানাতে লেগে পড়েন এই এক্টটাই তো দেশভাগের পক্ষে তাদের শুরু করা প্রথম কাজ!  তাই নয় কী? এর মানে হল – নিজের অবস্থান যে, একটা ‘হিন্দু জাতিবাদের’ সেটা খেয়াল করার পরিপক্কতা তার এখনও হয়নি অথচ ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ’ কেন হল তা নিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। আসলে ব্যাপারটা হল – নেহরু-গান্ধী যদি ভারতকে একটা হিন্দু জাতিবাদী ভারত হিসাবেই গড়তে শুরু করে দেন (যা তারা বাস্তবে করেও ছিলেন) তাহলে এর সোজা মানে হল – তারাই তো তাহলে মুসলমানদেরও একটা মুসলমান জাতিবাদী পাকিস্তান গড়ে নিতে ঠেলে দিয়েছেন – তাই নয় কি? এটা বুঝতে কারো কষ্ট হলে বুঝতে হবে, সেটা হচ্ছে তাঁর হিন্দুত্বের  প্রতি গভীর ভালোবাসার আর মুসলমান বা ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও ফোবিয়ার কারণে। এসবই পুরা এর পেছনের কারণ।

    এরপর তিনি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার সময় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৫০ করদ রাজ্যের কথা তুলেছেন। মানে  যাদেরকে হবু ভারতে কেমনে জোর করে ঢুকিয়ে নিতে সেকাজে নেহরুর প্রশংসা করে নিতে চান এই সুযোগে। সরি এটা কোন প্রশংসনীয় কাজ ছিল না যে তাদেরকে নেহরু সামরিক শক্তি দেখিয়ে নেহরুর ভারতে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিলেন। অথচ তিনি এটাকে নেহরুর সাফল্য হিসেবে দেখছেন। অথচ এটাই ছিল ব্যর্থতা; কারণ, তিনি গায়ের জোরে কাজটা করেছেন; যা না করেও হয়ত এটা করা যেত।

    যেমন কোন স্বাধীন মানুষকে যদি চয়েজ দেয়া হয় যে, তিনি এক রাজার শাসনাধীনে থাকতে চাইবেন নাকি পাবলিকের প্রতিনিধিত্বের শাসনের অধীনে যেটা রিপাবলিক না জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র, এমন চান? করদ রাজ্যের সমাধান আসলে ছিল এ দুই চয়েজের প্রশ্ন। কাজেই নেহরুকে ওই সব করদ রাজ্যের বাসিন্দাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হত যে, তারা কী চায়। কিন্তু নেহরু তা করেননি। তিনি গিয়েছেন করদ রাজ্যের রাজার কাছে। আসলে নেহরু বাসিন্দা নাগরিকদের কাছে নয়, তিনি গেছেন রাজার হুকুমের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে। আর এটাকেই তিনি সহজে কাম সারা ভেবেছিলেন।  এটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এর মানে, তিনি তো রিপাবলিক ধারণাই বুঝেননি। তাই এর শক্তিও বুঝেননি। স্বাধীন মানুষ নিজের স্বাধীন চয়েজ প্রকাশের সুযোগ পেলে জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র-এর পক্ষে থাকবে। কিন্তু নেহেরুর ভিতরে এসব বোধ কাজ করে নাই। কেবল এক হিন্দু জাতিবাদ বুঝের অন্ধকারে তিনি সব হারিয়ে ফেলিয়েছেন।

    আর সবচেয়ে বড় কথা, কাশ্মির সমস্যার মূল কথা বা মূল সমস্যাটাই তো এটাই। কারণ, প্রথমত কাশ্মিরও একটা বড় করদ রাজ্য অথচ এর সমাধানে তিনি কিছুই করতে পারেননি। করতে গেছেন হিন্দু রাজাকে পক্ষে টেনে সহজ সমাধান, যেহেতু বাসিন্দারা বড় সংখ্যায় মুসলমান তাই। একারণে, বাসিন্দাদের মতামতের কাছে যাননি। তাই এতে উল্টা তা এমন জটিল করেছেন যে, আজো ভারত-পাকিস্তান সব সঙ্ঘাতের প্রধান ইস্যু এটাই। অর্থাৎ শ্যাম  সরণের করদ রাজ্য ইস্যুর সমাধান নিয়ে নেহরু প্রশংসা করতে গেছেন যা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা ‘খামোখা’ আর স্রেফ চাটুকারিতা! এই বয়সে (৭৫) এটা তাকে মানায় নাই বলাই বাহুল্য।

    শ্যাম সরণের জন্ম ১৯৪৬ সালে। পরের ২৪ বছরের মধ্যে  তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ১৯৭০ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে ফেলেছেন। মানে, মোটামুটি ১৯৬৬ সাল থেকেই ধরা যায় তিনি যথেষ্ট ‘ডাগর’ হয়ে গিয়েছিলেন। লক্ষণীয় ওটাই ছিল সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের দুনিয়া। অথচ আর পাঁচজন সেকালের গ্র্যাজুয়েট বা রাজনীতিকের মত তিনিও খবর রাখেননি যে, দুনিয়ার জন্য “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের” মুখ্য অর্থ ও তাৎপর্যটা কী? আর ১৯৪৫ সাল মানে, বিশ্বযুদ্ধ শেষের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে প্রধান ফারাকটা কী ও কেন?

    কিন্তু সে কথা আমরা কী দেখে বুঝলাম? কারণ, তিনি লিখছেন, “যুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শান্তি স্থাপনের কিন্তু তা না হয়ে দুনিয়া দুই ইডিওলজির দুই সামরিক ব্লকে ভাগ হয়ে গিয়েছিল [The post-war world was already moving from the promise of enduring peace to a prolonged confrontation between two powerful ideological and military blocs, with the constant threat of a nuclear holocaust.]। তিনি আসলে সোভিয়েত ও আমেরিকা এভাবে দুই ব্লকে ভাগের কথা বলছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন বা কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ব্লকে ভাগাভাগি এসেছিল একমাত্র ১৯৫৩ সালের পরের ঘটনা হিসেবে। এমনকি তাও ইমিডিয়েট পরে নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার শপথ নিয়েছিলেন ২০ জানুয়ারি ১৯৫৩। আর এরপর প্রেসিডেন্ট তাঁর নীতি বিশেষ করে সামরিকনীতি যেখানে আসলে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়াদি এসেছিল; আর তা বাইরে প্রকাশ্যে আসতে আসতে দুই বছর লেগেছিল। য়ার সবচেয়ে বড় কথা এগুলো তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাৎপর্য নয় বরং যুদ্ধ শেষের দশবছর পরের ঘটনা। যা প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার (১৯৫৩-৬১)-এর দুনিয়াকে একেবারেই উলটা এক নতুন গতিপথ যার সাথে বিশ্বযুদ্ধের নেতা রুজভেল্টের (১৯৩৩-৪৫) কাজ ও তৎপরতার কোনোই সম্পর্ক নেই বরং উলটা ততপরতা এগুলা। যার মানে শ্যাম সরণও নেহরুর মতই রুজভেল্ট বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই স্টাডি অথবা ন্যূনপক্ষে আমেরিকান ইতিহাস পাঠ ইত্যাদি ঘটনার দিকে যানই-নি। কাজেই তিনি নেহরুর মূল্যায়নকারী হবেন কিভাবে? আর ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে ফারাকটা কী ও কেন তা কিভাবে বুঝবেন?

    অতএব তিনিও যে মুখস্থ কথার এক গতানুগতিক চাপাবাজ তাও প্রমাণ করছেন এখানে। আবার যেমন লেখার শেষের দিকে তিনি  “সেকুলারিজমে” নিষ্ঠাবান এক  মহাভক্ত হিসেবে নিজেকে হাজির করেছেন।

    ভারত সম্পর্কে লিখছেন, “একটা বহু ধর্মীয়, বহু কালচারের রাষ্ট্র ভারত সেকুলার রাষ্ট্র না হলে আর কী হতে পারে [A multi-cultural and multi-religious country could not be anything but a secular State ……]?  অথচ  ঘটনা হল, শ্যাম সরণ সেকুলার শব্দটা জানছেন, শিখেছেন কবে থেকে? তিনি কি জানেন ১৯৭৬ সালের আগে সেকুলার শব্দটা ভারতের কনস্টিটিউশনে কখনো ছিল না! আসলে ১৯৭৬ সালেই প্রথম সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনের আরেকটা নীতি হিসেবে নয়া সংশোধনী জারি করে তা ঢুকানো হয়েছে এবং তা খামোখাই এবং নিজেদের হিন্দুজাতি চিন্তা লুকাবার জন্য। আর তাতে তাই কেবল একটাই লাভ হয়েছিল যে, এটা দিয়ে নিজেদের হিন্দুত্ব প্রীতি ও হিন্দু-জাতিবাদ প্রীতিকে লুকিয়ে এর উপরে সেকুলার জামা টাঙানো গিয়েছিল তখন থেকেই। এই আর কী! আর সেকুলারিজমকে যারা নীতি হিসেবে দেখতে ও বুঝতে চায় তারা অবশ্যই ভণ্ড ও মুসলমানবিদ্বেষী। আমার রাষ্ট্রনীতি সেকুলারিজম এমন কথা লিখে কনুষ্ষ্টিউশনে সেটে দিয়ে বাস্তবায়ন করার বিষয়ই নয়। এমনকি কোথাও না লিখে রেখেও সৎভাবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব।  তাই  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এরা এসবের কোনো পাঠ-পড়াশোনা ও ফ্যাক্টস যাচাইসহ কোনো হোমওয়ার্কই করেননি।

    করণীয় সেকুলারিজম নয়; মূল করণীয় মানুষ জাতি নয় নাগরিক এই বোধে এবার  নাগরিক অধিকারে সাম্য মানে বৈষম্যহীন করা – এর বাস্তবায়ন – এটাই সব কাজের কাজ।  অথচ তারা কোন একটা জাতির কথা মানে “ধর্মীয় জাতির” কথা আনবেই আর এরপর জাতি-রাষ্ট্রের গড়ার দিকে হাটা দিবে।  অথচ সকলেই জানে এই জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট মাত্রই তা নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করবেই।  ফলে সে আবার কিসের সেকুলার নীতি করবে?  আর নেশন স্টেট মাত্রয়ই সেখানে আর না নাগরিক ধারণা  না নাগরিক অধিকার ধারণা কোনটাই থাকে না। সব আবছা করে ফেলা যায় সহজেই জাতি আর দেশপ্রেমের জোশে।
    কথা আরও আছে। নেশন-স্টেট যারা আদি চর্চাকারী (১৬৫০-১৯৫০) তারা সবাই ইউরোপের কলোনি দখলদার রাষ্ট্র ছিল। সারা দুনিয়ায় কলোনি দখল করে বেড়ানো তাদের প্রধান ব্যবসা, প্রধান পেশা এবং প্রধান রাষ্ট্রনীতি ছিল, এই টানা ৫০০ বছর ধরে।  ফলে তারা নাগরিক অধিকার বা মূল নাগরিক ধারণা কী বুঝবেবা বুঝেছিল? ফলে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতার কী আর বাস্তবায়ন করবে? অথচ আমরা তা পড়িনি, খোঁজ খেয়াল  রাখিনি।

    এজন্যই এসবের বিপরীতে মূল প্রশ্নটা আসলে ‘নাগরিক সাম্য’ কায়েম। মানে, সবার সমান নাগরিক অধিকার থাকতেই হবে। সেকুলার বলে দুনিয়াতে কিছু থাকলে এর একটাই ইতিবাচক অর্থ, সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ এটা কোনো জাতিরাষ্ট্র মানে নেশন-স্টেটে অর্জন একেবারেই সম্ভব নয়। যেমন বাঙালি জাতিবাদ পাহাড়িদের সমান নাগরিক গণ্য করবে না। করেনি। এমনকি পাহাড়িদের জুম্ম-জাতিবাদ সেটাও তাদের বাইরের কাউকে তার সমান গণ্য করবে না। হিন্দু নেশন-স্টেট মুসলমানকে সমান নাগরিক অধিকারের গণ্য করবে না, প্র্যাকটিস করবে না। একই অবস্থা হবে মুসলমান নেশন-স্টেটে হিন্দু নাগরিকের।
    এসবই একেবারে গোড়ার মূল সমস্যা; এগুলোই চিন্তার গভীর ত্রুটি । হিন্দুত্ববাদ আড়াল করা যার লক্ষ্য সেই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধি দিয়ে এসব কোনো সমাধান নয় বা কিছুই আড়াল কেমন করে করবে!  বরং মুসলমানবিদ্বেষের উৎস লুকানো হয়ে আছে এটাই!

    শ্যাম সরণ বলছেন, একালের ভারত নাকি “ভারত রাষ্ট্রের সেকুলার থেকে দূরে চলে যাওয়ার কুৎসিত পরিণতি” [We see the ugly consequences of the State departing from the secular norm.]।  মানে হল, তবু এসব লোকগুলো পড়াশুনা না করে, বাস্তবে কি হচ্ছে তা না দেখে কথা বলবে।   খুব ভালো কথা। তাহলে গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেস ও তার একালের প্রতিনিধি ও নেতা রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ‘সফট হিন্দুত্ব’ চাচ্ছে কেন আর মোদির সাথে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে কেন? তাহলে আসলে সারা ভারতজুড়ে  প্রধান রাজনৈতিক ধারা এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ। হিন্দুত্ব মানে এই হিন্দু-জাতিবাদ এটাই কি নেহরু-গান্ধীর ভারত নয়? এর আরও  সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – মোদি বা বিজেপি কি ঘোষণা দিয়ে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ চর্চা করতে গিয়ে কোন সমস্যা হচ্ছে?  কোনো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা কোনো নির্বাচন কমিশনের আইনে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, হচ্ছে? কোথাও হয়নি। কারণ এটাই তো নেহরু-গান্ধীর ভারত ও ভারতের কনস্টিটিউশন, তাই নয় কি? মোদি তো তাদের কনস্টিটিউশন বা ভারতকে কোনো বদল করে নেননি! কাজেই আর কী প্রমাণ লাগবে? ফলে,  এনিয়ে একে তাকে দায়ী বা অভিযোগ করার সুযোগ কই?

    তাহলে এভাবে নিজের সাথে প্রতারণার দরকার কী? শ্যামসরণ এভাবেই মোদির আগের কংগ্রেসের প্রতারণাপূর্ণ হিন্দু-জাতিবাদ করে যেতে চান, এটাই ফারাক দেখাতে চান, তাই কী?  এতে কী ফারাক হবে? অথচ পরে অপর অংশ মানে মোদিকে তিনি বলছেন, ওরা ধর্মান্ধ বা বাইগট-ধারা [small-minded, vulgar and bigoted version]।  অর্থাৎ নিজেকে আড়াল করার নখরা এরা তবু করবেই! অথচ মোদি-আরএসএস এরা বরং তুলনায় ‘ভালো’; কারণ তারা খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদী। তারা কংগ্রেস, নেহরু বা শ্যাম সরণের মত নিজের হিন্দুত্ববাদ লুকায় না, অর্থহীন সেকুলার জামা গায়ে দেয় না! শ্যাম সরণের চোখ এই নেহরুই তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব!! এটাকে এক বোকা চাটুকারিতা ছাড়া আর কী বলা যায়?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২০ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “শ্যাম সরণের নেহরুপ্রীতি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আফগানিস্তান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা উদ্যোগ

    আফগানিস্তান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা উদ্যোগ

    গৌতম দাস

    ১৫ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3NQ

     

    A Taliban fighter stands guard as women wait in line during a World Food Programme food distribution in Kabul on November 6, 2021. (Photo by Hector RETAMAL / AFP)

    Afghans attempting to withdraw money from a bank in Kabul, Afghanistan, where lost income and cash shortages are worsening severe food insecurity, September 21, 2021. © 2021 Haroon Sabawoon/Anadolu Agency via Getty Images

    সবার আগের প্রসঙ্গঃ
    আফগানিস্তানে এক দুর্ভিক্ষ আসন্ন আর সেইসাথে সেখানকার পাহাড়ি-শীত জেঁকে বসল বলে। এর চেয়েও বড় কথা আফগান অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। এমনিতেই আফগানিস্তানে ২০ বছরের দখলি শাসন অবসানের পরে একটা নিজ রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। এর উপর তাতে কার্যকর একটা অর্থনৈতিক সিস্টেম আবার খাড়া ও চালু রাখা খুবই কঠিন কাজ। বিশেষত যখন ঐ দেশের অর্থনীতিতে  বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থাটাই অকার্যকর হয়ে আছে। বলা যায় আফগানিস্তান এখনো ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থার’ সাথে একই বোঝাবুঝিতে নেই, ন্যূনতম কার্যকর রাজনৈতিক সহমত তৈরি নাই বা হচ্ছে না। ফলে বাস্তবত আফগানিস্তান বাইরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম ও গ্লোবাল মুদ্রাব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত নয়, বিচ্ছিন্ন। ফলে আফগান অর্থনৈতিক কাঠামোটাই নড়বড়ে, নিজে নিজে কোনো মতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। দুর্ভিক্ষাবস্থার মূল সঙ্কট এখানেই।

    এদিকে পাকিস্তানের ‘ডন’ একটি খুবই খারাপ খবর ছেপেছে। জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হকের বরাতে পত্রিকাটি লিখেছে, তা অনুবাদ করে লিখছি : ফারহান বলছেন, “মানবিক সাহায্য বিতরণ নিয়ে কাজ করা আমাদের সহকর্মীরা সতর্ক করে জানাচ্ছে যে, আফগানিস্তানের প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ লোক যারা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি (৫৫ শতাংশ), তারা অতি জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসঙ্কট ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে চলতি নভেম্বর ২০২১ থেকে মার্চ ২০২২ এই সময়কালটায়” [“Our humanitarian colleagues warn that nearly 23 million people — or 55 per cent of the Afghan population — are estimated to be in crisis or experiencing emergency levels of food insecurity between November 2021 and March 2022,” Mr. Haq said.]।

    বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে, ১৯৭৪ সালের দিকে যাদের বয়স তখনই ১০ বছর বা এর বেশি ছিল তাদের স্মৃতিতে আবছা বা স্পষ্ট থাকার কথা যে, দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পরে খাদ্যসঙ্কট, দুর্ভিক্ষ আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অকার্যকর হয়ে পড়া বা থাকা ওদেশের মানুষের জন্য কেমন অসহায় অবস্থায় এক চরম সঙ্কট-বিপর্যয় তৈরি করেছে! আজ বাংলাদেশে নিজেরা জীবনমানের দিক থেকে যে উঁচু জায়গাতেই থাকি পুরনো সেই স্মৃতি আমাদের জানান দেয় আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ এখন কী অমানবিক দুর্দশায়! চার দিকে খাদ্যের জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা – মিডিয়ায় শুধু পুরুষ লাইন না, নারীদের লাইনও বলে দেয় তাদের অসহায় অবস্থার কথা!

    এদিকে আমেরিকান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মূলত মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করে। গত ১১ নভেম্বর তার রিপোর্টের শিরোনাম ‘আফগানিস্তান দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি’ [Afghanistan Facing Famine]। মানুষকে দুর্ভিক্ষের মুখে ফেলা ও রাখা চেয়ে বড় মানবাধিকার ও মর্যাদার সঙ্কট আর কি-ই-বা হতে পারে? তাদের রিপোর্টের সারাংশ করে লিখেছে, ‘জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, আমেরিকার উচিত যা কিছু বাধানিষেধ বা অর্থনীতিক অবরোধ বা পলিসি তারা আফগানিস্তানে আরোপ করতে চায়, তা অবশ্যই যেন বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে শিথিল করে নেয়” [UN, World Bank, US Should Adjust Sanctions, Economic Policies]।’
    পরের প্রথম বাক্যেই লিখছে, ‘দাতা দেশ, জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আফগানিস্তানের ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঠেকাতে জরুরিভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তা গড়িয়ে সর্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ অবস্থা না তৈরি করে – আজ (১১ নভেম্বর) হিউম্যান রাইট ওয়াচ এ কথা বলেছে।”।
    Donor countries, the United Nations, and international financial institutions should urgently address Afghanistan’s collapsed economy and broken banking system to prevent widespread famine, Human Rights Watch said today.

     

    Pakistan hosts US, China, Russia to discuss Afghanistan

    আফগানিস্তান নিয়ে দুটা গ্লোবাল উদ্যোগঃ
    এ’সপ্তাহে আফগানিস্তান নিয়ে দুটো উদ্যোগ থেকে মিটিং ডাকা হয়েছে। একটার আয়োজক ভারত, অন্যটার পাকিস্তান। এর মধ্যে ভারতেরটাকে বলা যায় ভারত কিভাবে আফগানিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে আর পাকিস্তানেরটা হল, আফগানিস্তান কিভাবে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে স্বীকৃতি যোগাড় করে এক সাথে লেনদেন বিনিময় সম্পর্কে  যুক্ত হতে পারে তা নিয়ে। এটাই প্রকাশ পেয়েছে  কে কোথায় আমন্ত্রিত হয়েছে সেই তালিকায়। যেমন ভারত আফগানিস্তানকে আমন্ত্রণই জানায় নাই, কিন্তু পাকিস্তানের আয়োজনে আফগানিস্তান আমন্ত্রিত।

    এছাড়াও ভারতের তালেবানদের আফগানিস্তান নিয়ে সভা ডাকাতে  এনিয়ে অনেক পাঠক কৌতুহলি হতে পারেন ঠিক প্রথমত যে আমি ঠিক ভারতই বুঝাতে চেয়েছি কি না। কারণ আমরা জানতাম আমেরিকার বসানো পুতুল – গনি সরকারকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া ভারত অন্য কোনো কিছুতে আস্থা রাখে না, এমন ভারতকেই আমরা চিনতাম। হ্যাঁ, তা বটে। কিন্তু ইদানীং তাতে ছোট্ট কিছু মোচড় দেখছি আমরা। তা হলো ভারত হঠাৎ করে জানাল তারা (নাকি আফগানিস্তানকেই দাওয়াত না করে তবে) আফগানিস্তান ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের নিয়ে এক সভা করতে চায়। এমন ইচ্ছা করাটাই অবশ্য ভারতের ‘গনি সরকার’ ছেড়ে অন্য কিছুর তালাশ করার স্পষ্ট লক্ষণ।। তাই ভারতের দিক থেকে এটা বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া যে, ‘গনি সরকারকে’ ফিরিয়ে আনতে আবদার এটি বাস্তবের মাটিতে পা রেখে দাঁড়ানো কোনো পক্ষের জন্য কোনো অপশনই নয়। তাই বলা যায়, ভারত যে আফগান ইস্যুতে এক দিকভ্রান্ত মুসাফির হয়ে গেছে; যে আবার দিশা খুঁজতে এবার পথে নেমে পড়েছে তা আর লুকানো থাকল না।

    Uzbekistan’s Security Council Secretary Victor Makhmudov, Turkmenistan’s Security Council Secretary Charymyrat Amanov, Tajikistan’s Security Council Secretary Nasrullo Rahmatjon Mahmudzoda, Russia’s Security Council Secretary Nikolai Patrushev, India’s National Security Advisor Ajit Doval, Secretary of Iran’s Supreme National Security Council Ali Shamkhani, Kazakhstan’s Chairman of the National Security Committee Karim Massimov, Kyrgyzstan’s Security Council Secretary Marat Imankulov pose before attending the “Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan” in New Delhi, India, November 10, 2021. India’s Ministry of External Affairs/Handout via REUTERS

    আবার আফগানিস্তান ইস্যুতে কিছু করতে বা পেতে চাইলে চীন ও পাকিস্তান যে গুরুত্বপুর্ণ অংশীদার সে কথা আর ভারত অস্বীকার না করে স্বীকার করে নেওয়ার প্রমাণও হাজির রাখল। ভারত পাকিস্তান ও চীনকে তাদের সভায় যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই আমন্ত্রণে সব চেয়ে বেমানান ঘটনাটা হল, কোন জিনিষ হঠাত করে শুরু হয় না। প্রথমত গত আগষ্টে তালেবানেরা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এটা যে ভারত মানে না সেটা ভারত সবসময় প্রকাশ করে গেছে। যদিও ব্যাপারটা এমন না যে সারা দুনিয়াতেই তালেবানদের ব্যাপারে সব রাষ্ট্রশক্তি একে গ্রহণ করে নিয়েছে। তবে কোন আপত্তি তোলার চেয়ে কি করে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় সকলেই এই এপ্রোচ নিয়েই আগিয়ে এসেছে। তালেবানেরা কিভাবে সবার স্বীকৃত আফগান শাসক হয়ে উঠতে পারে এটাই ছিল মুখ্য দিক। তাই ভারতের জন্য এই সভা ডাকা নিয়ে সবচেয়ে যা বেমানান তা হল কেউ উজানে বাইতে বাইতে হঠাত যদি ভাটিতে নেমে যায় তেমন অবস্থা।  ভারত প্রতিটা ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের জন্য পাকিস্তানকে উঠতে বসতে দায়ী ও খারাপ ভাষা প্রয়োগ করে এসেছে।  কথা একটাই বলে এসেছে “পাকিস্তান সব সন্ত্রাসবাদ ঘটাচ্ছে”। এ’অবস্থায় হঠাত করে সেই তালেবানের আফগানিস্তান নিয়ে সম্মেলন ডাকা আর তাতে পাকিস্তানকেই দাওয়াত দেয়া – এটা কেন?  সবচেয়ে বড় কথা এটা কেন ভারত কী মূল্যায়ন বদলিয়েছে? তাই ভিন্নভাবে বাস্তবতা দেখছে? এর জবাব হল, না ভারত তা  মুখে স্বীকার করে কিছু বলছেনা।  তাহলে পাকিস্তান আসবে কেন?  এর জবাব ভারতের আছে নাই। ফলে তাই হয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টার দাওয়াত প্রত্যাখান নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মঈদ ইউসুফ-এর ভারতের আহুত সভায় না যাওয়া এবং সাথে ক্ষুবশ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, কোন শান্তি ভন্ডুলকারি আবার নিজেই শান্তিসভার আহবায়ক হতে পারে না ‘A spoiler can’t be a peacemaker’। শুধু তাই না তিনি ভারতের আহুত সভাকে খামোখা [moot] সভা বলে বলেন তিনি কোন খামোখা সভায় যাচ্ছেন না [not attend an upcoming moot]।  অন্যদিকে চীনেরও ভারতের সভার যোগদান প্রত্যাখানটা তুলনামূলক নরম বা ঠান্ডা ভাষায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিফিংয়ে জানান তারা ঐ সময়ের ব্যস্ততার মধ্যে সময় মিলাতে না পারায় [“scheduling reasons”……”inconvenient” ] যেতে পারছে না তা ভারতকে জানিয়েছে। তবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া এত খারাপ হত না হয়ত যদি ভারত আমেরিকা অথবা খোদ রাশিয়াকে দিয়েই পাকিস্তানকে লবি করাতো।  অর্থাৎ বলা যায় ভারত ঐ পর্যায়ের সিরিয়াস ছিল না।  আবার এমন সিরিয়াস না থাকার পিছনের বড় কারণ খোদ মোদি ও তার হিন্দুত্ববাদ।  কারণ ,মোদি তার শাসনের গত প্রায় আট বছর ধরে নিয়মিত পাকিস্তানকে ব্যবহার করে এসেছে তার নির্বাচনে তার বাক্সে হিন্দুভোট যোগাড়ের অপব্যবহারে। সেই পুরাণ ফর্মুলা যে, পাকিস্তান মানে মুসলমান । তাই পাকিস্তান বা মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াকু হিন্দু-বীর হলেন মোদি অতএব সমস্ত হিন্দুভোট মোদির দলের প্রাপ্য। কিন্তু এতে ভারত তো একটা রাষ্ট্র যার অনেক স্বার্থ আছে পাকিস্তানের সাথে একসাথে একমতে কাজ করার।  কিন্তু না, সেটা সেকেন্ডারি। হিন্দুত্ববাদের ভোট যোগাড়ই মোদীর প্রধান স্বার্থ হয়ে থেকে গেছে। এবং আগামি অন্তত ২০২৪ মে নির্বাচন পর্যন্ত এটাই থাকবে।

    শুধু কি তাই? ভারত কি মনে করে  আফগান ইস্যুতে এই সভা-সম্মেলন করে এবার পথে পেয়ে যাবে? এক কথায় উত্তর, একেবারেই না। কিভাবে তা জানা গেল? ভারতের মিডিয়ারই ভারতের এই  আফগান ইস্যুতে উদ্যোগ থেকে কোনো ফলাফল আসা নিয়ে আস্থায় নেই। যেমন ধরা যাক, দৈনিক প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি লিখছেন এভাবেঃ “পাকিস্তান বেঁকে বসেছে। মুখ ফিরিয়েছে চীনও। এখন আফগানিস্তান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভারতের উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে। তবু ভারত চেষ্টা ছাড়তে রাজি নয়”।  [দেখেন চীন-পাকিস্তানকে ছাড়াই উদ্যোগী ভারত] অর্থাৎ স্পষ্ট করেই   নয়াদিল্লি প্রতিনিধি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ভারতীয় উদ্যোগের উপর তার কোনো আস্থাই নেই।

    কেন ভারতও এমন সম্মেলন করতে গেলঃ
    ভারতের এ উদ্যোগে রয়টার্স বলছে দাওয়াত পেয়েছিল ইরান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান [India, Iran, Russia, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, Turkmenistan and Uzbekistan]। তবে আসলে এখানে ভারতসহ  আট রাষ্ট্রকে দেখা গেলেও এতে মূল গুরুত্ব ইরান ও রাশিয়ার। এ দুটোর মধ্যে আবারও মূল ওজনটা একমাত্র রাশিয়ার; যদিও ভারত এই সম্মেলনের শিরোনাম দিয়েছে এভাবে : ‘দ্যা দিল্লি রিজিওনাল সিকিউরিটি ডায়লগ অন আফগানিস্তান…’ [Delhi Regional Security Dialogue on Afghanistan…… ]।

    কিছু কথা এখানে খুলে বলাই ভাল, বুঝতে সুবিধা হবে তাতে। যেমন গত আগস্ট থেকে আফগানিস্তান ইস্যু ভারতের কেন ‘ঘুম হারাম’ হয়েছে সে কথা কাউকে সে খুলে বলতে পারছে না। প্রধানত ঘুম হারাম ঘটনাটা হল কাশ্মিরকে নিয়ে; অর্থাৎ কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ বা তা হাত ছাড়া হয়ে যায় কি না! কেন?

    কারণ মোদি-অমিত খুবই ভীত এ জন্য যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট তারা একেবারেই গায়ের জোরে কাশ্মির (পুরোটাই মানে, শুধু ভারতের দখলে থাকা অংশ না – পাকিস্তান ও চীনের দখলে থাকা অংশসহ) ভারতের স্বাভাবিক অঙ্গ-ভূখণ্ড বলে সংসদে ঘোষণা করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এখানে “গায়ের জোরে” বললাম অনেক কারণে। প্রথমত, নেহরু জানতেন কাশ্মির ভারতের নয়; তাই তো জাতিসঙ্ঘের কাছে তিনি চিঠি লিখে মতামত চাইলে জাতিসঙ্ঘ গণভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত নিতে ফয়সালা দিয়েছিল। এটাই “নেহরু জানতেন” একথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।  কিন্তু ভারত জাতিসংঘের রায় কখনোই অনুসরণ করেনি। তবে একেবারেই কোনো পদক্ষেপ না নেয়াটা সরাসরি জাতিসংঘ অমান্য করা হয় – সম্ভবত এমন অনুমানে তিনি কিছু “বিশেষ শর্তে” (যেমন  ভারতের মূল ভূখণ্ডের কেউ কাশ্মিরে জমি কিনতে পারবে না ইত্যাদি) কাশ্মিরকে ভারতভুক্ত করে নেন। আর সেসব “বিশেষ শর্ত” সেটাই হল –  ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা। আর গত ২০১৮ সালেও ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিজেপি সমর্থক এক ব্যক্তি মামলা করেছিলেন ৩৭০ ধারা বাতিল করে রায় দিতে; তা এই যুক্তিতে যে সেসময় “ভারতের মূল কনস্টিটিউশন প্রণয়ন কমিটি” ৩৭০ ধারা যুক্ত করেছিলেন একে ‘অস্থায়ী’ বলে উল্লেখ করে। কিন্তু পরবর্তিতে এ নিয়ে আর কোনো কাজ না করেই ওই প্রণয়ন কমিটি তার আয়ু শেষ, তাই ‘বিলীন’ (ডিসল্ভ) বলে ঘোষণা করে দেয়া হয়। অতএব কোর্ট এখন ৩৭০ ধারাকে বাতিল ঘোষণা করুক – এই ছিল আর্জি। কিন্তু কোর্ট রায় দেন, এমন করা যাবে না। কারণ এমনটা করা হলে আইনিভাবে কাশ্মির আর ভারতের অংশ থাকবে না। তাই আদালত ওই রিট আবেদন বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন।
    এর অর্থ ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এক অবৈধ কাজ। কিন্তু যেহেতু কেউ এখনো এ ব্যাপারটা আদালতের দৃষ্টিতে আনেনি, তাই এটা অটুট থেকে যাচ্ছে।
    আবার সুপ্রিম কোর্টের ওই রিট মামলার রায়ে দেখা যাচ্ছে সেখানেও আসলে পরোক্ষে ধরে নিয়ে রায় দেয়া হয়েছে যে, কাশ্মির ভারতের নিজ মূল ভূখণ্ড নয়। তা হলে অমিত শাহের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা এবং কাশ্মিরকে সরাসরি ভারতের নিজভূমি বলে দখল করে নেয়া – এটাও তো অবৈধ। কিন্তু এটাও আদালতের দৃষ্টিতে কেউ আনেনি, তাই এটাও কোন চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে টিকে আছে। এ ছাড়া মোদির জমানায় আদালতের ট্রেন্ড হল, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করতে হয় এমন ইস্যু হলে আদালতের ঐ মামলা এড়িয়ে চলা বা বছরের পর বছর ফেলে রাখা অথবা কোনো একবারের প্রধান বিচারপতি আন্ডারহ্যান্ড ডিলের অভিযোগ মাথায় নিয়েও সরকারের পক্ষে রায় দিয়ে দেয়ার ঘটনা অনেক। এসবই মামলা না হওয়া অথবা আদালতের দ্বারস্ত না হওয়া বা জনস্বার্থের মামলাগুলো করার মত লোক গরহাজিরা পিছনের কারণ মনে করা হয়।
    এভাবেই মোদি-অমিত তাদের রামরাজত্বের হিন্দুত্বের শাসন চালিয়ে যেতে পারবেন মনে করা হয়েছি। কিন্তু না!  উপরে উল্লেখিত এসব ‘গায়ের জোরের’ মতো হঠকারি কাজ – আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পরে থমকে যায় আর মোদি-অমিতও চমকে ওঠেন। কারণ এর সরাসরি প্রভাব  কাশ্মিরে জমানো রামরাজত্বের উপর পড়বেই। এর প্রভাবে আজকের কাশ্মিরে (যেখানে মানুষের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই,  প্এরতিনিধিত্টিবশীল শাসন নাই, এখন রাজ্যের মর্যাদায় নেই,  রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের কোনোই আইনি ব্যবস্থা বা কাঠামোই, [ রাজ্য সরকার] নাই)। একারণে এবার  যদি আবার সশস্ত্র আন্দোলন চাঙ্গা হয়, কি তুঙ্গে ওঠে আর যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মত  পরিস্থিতি এসে যায়; তবে সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাই ফিরে মোদি-অমিতের চরম বিরুদ্ধে চলে যাবে এই বলে যে, “গায়ের জোরে কাশ্মির ভারতের বলে দখল, ৩৭০ ধারা বাতিল’ করতে যাওয়াতেই এই বিপর্যয়! অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদ ব্যাকফায়ার শুরু করবে!
    মূলত একারণেই মোদি-অমিত এখন চান যেই আফগানিস্তানে ক্ষমতায় আসুক সে যেন প্রতিশ্রুতি দেয় যে কাশ্মিরে স্বাধীনতাকামী  কাউকে  আফগান-সহযোগিতা দেওয়া হবে না। মজার কথা হল, মোদি-অমিতের কাছে এই ঘোরতর মাথাব্যথার ইস্যু কাশ্মির অথচ, এনিয়ে বাইডেন প্রশাসন অন্তত কোনো সমর্থনের অবস্থানে নেই; বরং উল্টো ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু আমেরিকার অভিযোগের তালিকায় আছে। কিছু কংগ্রেস সদস্যও এ নিয়ে সোচ্চার।

    রাশিয়া কেনঃ
    তাহলে দেখা যাচ্ছে এখন সব মিলিয়ে ভারতের কাছে একমাত্র ভরসা মুরুব্বি রাশিয়া! কিন্তু সে কেন ভারতকে এই কোল দিতে গেল যাতে ভারত একটি সম্মেলন ডাকতে পারে?
    তালেবানরা এবার গত আগষ্টে  ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাশিয়া মূলত খুবই খুশি। তার অনুমান, এবার দিন তার পক্ষে এসেছে ও যাবে; আর আমেরিকার বিপক্ষে। কিন্তু একই রাশিয়ারই আবার এক প্রবল শঙ্কা; কারণ সে আবার সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয় রাষ্ট্রের  কাছে (এরই চার রাষ্ট্র ভারতের সম্মেলনে যোগ দিয়েছে) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা তাদের হবু আক্রমণ থেকে এই রাষ্ট্রদেরকে সুরক্ষিত রাখবে। আর     একাজে আবার রাশিয়া তালেবানদের ওপর নির্ভর করতে হবে, বিকল্প নাই। ফলে টেনশন আছে।
    এসব কিছু অবশ্যই রাশিয়ার বড় স্বার্থ। কিন্তু এসব ছাড়াও রাশিয়ার আরেক বড় স্বার্থ আছে। যেমন সেটি হল, রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইলের হবু ক্রেতা ভারত; যার একটার দামই আধা বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আরও কাহিনী হল – ভারত এটা কিনলে আমেরিকা ক্ষেপে গিয়ে ভারতের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ বহু ধরনের বাধা আরোপ করবে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে আগেই জানানো হয়ে আছে, বাইডেন ক্ষমতা নিবার পরের মাসেও বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরে তা ভারতকে জানানো হয়ে আছে। তাই ভারত চেষ্টা-তালাশ করছে কোনো ছাড় পাওয়া যায় কি না। কিন্তু ইতোমধ্যেই উদাহরণ হল, একই পথে তুরস্কের বেলায় সে ব্যর্থ হয়ে আছে। এসব কারণে, রাশিয়ার আগ্রহ হল, ভারতকে কিনাতে পারলে তা আমেরিকার উপর একটা বড় চাপ তৈরি হবে।
    তাই এসব মিলিয়ে অনুমান করা যায় রাশিয়ার হবু ক্রেতা ও আগে অন্য অনেক সমরাস্ত্রের এরই মধ্যে ভালো ক্রেতা এই ভারতের ‘মন রক্ষা’ করতে রাশিয়া সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র সাথে নিয়ে ভারতের সম্মেলনে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। তবে সেন্ট্রাল এশিয়ার চার রাষ্ট্র – এদের দিক থেকে দেখলে তাদের নিজস্ব বড় স্বার্থও এটা যে, তারা তালেবানদের ভরসা করেই যেকোনো রেডিক্যাল ইসলাম থেকে সুরক্ষিত থাকতে চায়। এটি তাদের ভাইটাল স্বার্থ!

    তা হলে ইরান কেন?
    ইরান ভারতের সম্মেলনে কেন – এটাও এক মজার প্রশ্ন। তবে জবাবটা সহজেই এভাবে বলা যায় যে, সম্প্রতি আফগানিস্তানে শিয়া মসজিদে হামলা পরপর সম্ভবত তিনবার বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। আর প্রতিবারই দেড় শতাধিকের উপর লোক মারা গেছে। এটা শুধু শিয়া মসজিদে হামলা – এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থেকে দেখাভুল হবে, এটা তা না; এরা ছিল মূলত আফগানি হাজারা শিয়া এথনিক গোষ্ঠি – তাদের উপর হামলা।
    ওরা শিয়া এই সেন্টিমেন্টের ওপর ভর করে এ হামলা করা ও তাতানো হয়েছে। কিন্তু এরা মূলত আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম এথনিক জনগোষ্ঠী। আমাদের মত দেশগুলোর ভূখণ্ডের সীমানা টেনেছে কলোনিয়াল শক্তিগুলো তাদের নিজের একান্ত স্বার্থে। আর এতে একই এথনিক জনগোষ্ঠী কাটা পড়ে সীমানা দুই দেশে বিভক্ত করা হয়ে গেছে।  যেমন আমাদের বেলায় একই বাঙালি অথবা পাঞ্জাবি এথনিক জনগোষ্ঠী যেমন ভারতে থেকে গেছে; যাদের আরেক অংশ বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে আলাদা কাটা পরে আছে। তেমনি আফগান হাজারা জনগোষ্ঠী আরেক বড় অংশ আছে ইরানে। ফলে আফগানিস্তানের অংশ হামলায় বিপদগ্রস্ত হলে ইরানের বড় দুটো সমস্যা। স্বাভাবিকভাবে  ইরানে সেন্টিমেন্ট তৈরি হয় হাজেরা আফগানদেরকে উদ্ধার ও রক্ষার। আবার আরেক বিপদ হলো, ইরান না চাইলেও তারা রিফুজি হিসেবে ইরানে ভিড় করে, করবেই – এটাই স্বাভাবিক। আর ইরান সেই দায় ঠেলে ফেলেও দিতে পারে না।
    কাজেই তালেবানরা যদি হাজারা, এরা শিয়া (ওরা কম মুসলমান বা সহি মুসলমান না ইত্যাদি ধরনের যেসব এথনিক ঘৃণা আফগান পশতুন ডমিনেটেড সমাজে প্রচলিত আছে) এই ধর্মীয়-সামাজিক মনোভাবের আলোকে উপেক্ষায় আইএসের হাতে হামলায় মারা যেতে দেয়, নাগরিক নিরাপত্তা না দিতে পারে তা হলে গত আগস্টে তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইরান সরকারের যে সমর্থন ও ইতিবাচক মনোভাব তালেবানদের প্রতি বজায় আছে তা ইরান চাইলেও আর বজায় রাখতে পারবে না। যেমন আফগানিস্তানের প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ এখনো ইরান করছে; যেখানে এর অর্থ পরিশোধের কী ব্যবস্থা হবে, সেটা এখনো অনিশ্চিত, তা সত্বেও। কারণ, তালেবানদের হাতে কোন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ নাই, ব্যবস্থা নাই।

    অতএব ইরানের ভারতের সম্মেলনে যোগ দেয়া বলতে গেলে তালেবানদের ওপর অপ্রকাশ্য অসন্তুষ্টির পরোক্ষ প্রকাশ বা বলা যায় তা প্রকাশ করার সুযোগ নেয়াঃ যেন তালেবানদেরকে বলা যে, তুমি আফগান হাজেরাদের উপর  আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামিস্টদের যদি আফগানিস্তান থেকে দূরে রাখতে না পারো, তবে ইরানের তোমার বিপরীতে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।’

    তাহলে এখন উলটা করে বলা যাকঃ  এর মানে কি যারা আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামীদের থেকে মুক্ত এক আফগানিস্তান দেখতে চায়; তাদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? ভাবটার একটা আবছা শেড থাকলেও সেটা কখনও নয়, সত্যিকারভাবে নয়। যেমন আইএস ধরনের রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপ – এই হলো অ্যালার্জি বা অগ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি যদি ধরি, তা হলে কি বলা যাবে এমন গ্রুপের বিরোধীদের সম্মেলন ছিল ভারতেরটা? এটি বলা যাবে না। কেন?
    কারণ বাইরে থেকে মনে হতে পারে, হিন্দুত্ববাদী ভারত নিশ্চয় এমন রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপদের বিরোধিতা পছন্দ করবে। কিন্তু না, করবে না। কেন? আর প্রমাণ কী?
    ইদানীং পাকিস্তানের ইমরান খান কী নিয়ে পেরেশান সেটা লক্ষ্য করতে হবে। দুটা ইসলামী গ্রুপ নিয়ে তিনি পেরেশান – TTP (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) আর TLP  (তেহরিক-ই-লাব্বায়েক পাকিস্তান)। আধা সশস্ত্র এরা আবার রাজধানীতে প্রকাশ্যে রেডিক্যাল মিছিল সমাবেশ করে থাকে।  টিএলপির  প্রধান আবার এখন গ্রেফতার হয়ে আছেন। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সমন জারি করে ডেকে অসন্তুষ্ট জানিয়েছেন। কারণ, ২০১৪ সালে পেশোয়ারের এক আর্মি স্কুলে টিটিপির অস্ত্রধারী জঙ্গিরা হামলা চালালে ১৩২ শিশুসহ মোট ১৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এরই বিচার এখনও চলছে।  তাই আদালত প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে সরাসরি আদালতে দেকে নিয়ে এসে ভর্ৎসনা করেছেন।  তাই এবারের ইস্যুতে এদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী আভ্যন্তরীণভাবে অবস্থান জানিয়েছিলেন। কিন্তু  সেনাবাহিনীর ভিন্নমত হল তারা মনে করে এতে জীবন ও সম্পদ ক্ষয় হবে মাত্রাতিরিক্ত। তাই কৌশল হিসেবে এখনই সামরিক পদক্ষেপ বাতিল করা হয়েছে, আর সুযোগের অপেক্ষায়।

    মজার কথা, এ খবর আরো বিস্তারিত ছাপা হয়েছে পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকা। আর যা খুবই কম ঘটে থাকে – আমাদের অবাক করে প্রথম আলো এসব খবর ছেপে দিয়েছে ডন-এর রেফারেন্সে, বিনা দ্বিধায়।

    কিন্তু কেন ‘মজার খবর’ বলছি? ডন-এর খবরে লেখা হয়েছে, সশস্ত্র গ্রুপগুলো ভারতের সাথে সম্পর্কিত।  প্রথম আলোর এই রিপোর্টের শিরোনাম টিএলপির সঙ্গে চুক্তি প্রকাশ হচ্ছে, শক্তি প্রয়োগ চেয়েছিলেন ইমরান, নারাজ সেনাবাহিনী। প্রথম আলো ডন-এর রিপোর্ট থেকে অনুবাদ করে লিখেছে, ”

    প্রথম আলো লিখেছে  “পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি”। 

    “পাকিস্তানের মতে আফগানিস্তানভিত্তিক টিটিপির অন্যতম প্রধান সমর্থক ও অর্থদাতা ভারত।  পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে নিষিদ্ধ গোষ্ঠীটিকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে আসছে দেশটি।’ এ ধরনের পাকিস্তান সরকারের পুরো মনোভাব ও পরিকল্পনাই ওই রিপোর্টে আছে। কিন্তু আমাদের এখানকার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, মোদি-অমিতের কাশ্মির বাঁচাতে তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তর অস্থিতিশীল করতে সশস্ত্র ইসলামী গ্রুপের ওপর নির্ভর করতেও রাজি; অর্থাৎ যে অভিযোগ আগে কেবল বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত অথবা একালে উইঘুর সশস্ত্র গোষ্ঠী (ETIM)-এর কথা উঠছে; এখন তা অনেক দূরে বিস্তৃত। এখানে উল্লেখ্য যে, হাজারাদের ওপর আইএসের যে তিন হামলা, তাতে সর্বশেষটাতে হামলাকারী হিসেবে ধৃত ব্যক্তি উইঘুর জনগোষ্ঠীর লোক। কেন এমন হচ্ছে? কারণ তালেবানরা এই ETIM গ্রুপকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেবে না বলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর থেকে এই উইঘুর গ্রুপ আইএস এর সাথে হাত মিলিয়ে যোগ দিয়েছে, তাই এ ঘটনা।

    বিপরীতে পাকিস্তানের আয়োজিত সম্মেলন কী ও কাদের নিয়েঃ
    এক কথায় জবাব, যদিও এ সম্মেলনের হোস্ট বা আয়োজক হল  পাকিস্তান কিন্তু এটা আসলে ‘ট্রয়কা প্লাস’ [TROIKA+] -এর বৈঠক। [এনিয়ে আমার পুরান লেখা রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে] কোন ‘ট্রয়কা প্লাস’? গত ১৫ আগস্ট তালেবানরা ক্ষমতা নেয়ার আগে রাশিয়ার উদ্যোগে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীনকে এই শক্তিধর তিন দেশীয় গঠন করা হয়েছিল তালেবান-আফগান ইস্যুতে তাদের কমন অবস্থান প্রকাশের জোট, সেটাই ট্রয়কা বা ত্রিদেশীয় জোট। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তালেবানদেরকে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের অধীনে আসতে সাহায্য করা যাতে তারা নয়া আফগানিস্তানকে নিয়ে গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে সহজেই প্রবেশ করতে পারে।
    আসলে নিরাপত্তা পরিষদের আফগান ইস্যুতে পাস হওয়া এক সর্বসম্মত প্রস্তাবকে তাদের গঠনভিত্তি হিসেবে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। পরে পাকিস্তানকে ওই ট্রয়কাতে কোঅপ্ট করে নেয়া হয়; কারণ আফগানিস্তানে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করতে গেলে পাকিস্তানের মাধ্যমে তা করা অর্থপূর্ণ ও সহজ। অন্তত দুটো কারণে – এক. পাকিস্তান এই প্রথম ২০ বছরের আমেরিকার স্বার্থের যুদ্ধের দায় থেকে মুক্ত হয়েছে। তারপরও এখনো আফগানিস্তানে যেকোন অস্থিতিশীলতা ঘটলে তাতে সবচেয়ে বেশি পুরনো দায় ফিরে আসবে পাকিস্তানের উপর, নিজে সেই অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত হবে ও সামরিক-অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হবে পাকিস্তানের। তাই পাকিস্তান না চাইলেও ‘স্থিতিশীল এক আফগান দেখার পক্ষে অবস্থান’ সে নিতে বাধ্য। দুই. আফগানিস্তান কিন্তু এক ল্যান্ডলকড ভূখণ্ড। ফলে পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম একটি তাল মিলিয়ে চলতে আফগানিস্তানও বাধ্য। এবং বাইরের কোন রাষ্ট্রও আফগানিস্তানে কিছু করতে চাইলে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে করলে তা বাস্তবায়ন সহজ ও সম্ভবত সম্ভব।

    অতএব পাকিস্তানকে গ্রুপে নেয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতে ভারতের জন্য তা এটা ততোধিক বিব্রতকর হয়ে যায়; কারণ এতে ভারতের অভ্যন্তরীণ পাবলিকের কাছে হিন্দুত্ববাদীরা যে প্রপাগান্ডা চালাত এই বলে যে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ লালনকারী, তা এখানে উল্টে যায়। কারণ, এখানে পাকিস্তান হইয়ে যায় বাস্তবত – জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সন্ত্রাসবিরোধী সবচেয়ে নির্ভরশীল মিত্র, বিশেষ করে এখনকার সময়ের সবচেয়ে শক্তিধর তিন দেশ ও তাদের জোটের নির্ভরশীল মিত্র।

    এবার সবচেয়ে কঠিন সত্যটা আগে বলে রাখি। তা হলো আফগানিস্তানে তালেবানরা ফেল করলে এর বিকল্প বা অন্য শক্তিটা হল এককথায় আইএস।  মূলত আইএস আর সাথে ওর সমমনা আরো ছোট ছোট নানা, মূলত ‘পড়শিদেশীয়’ গ্রুপ। সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর বাস্তবতা হল, যেকোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রশক্তি তো বটেই, এমনকি এশিয়া অমুসলিম রাষ্ট্রগুলো তো বটেই,  এদের কেউই বা অন্য ইসলামী ধারা কেউই আইএসের সাথে পাশাপাশি পরস্পরকে স্বীকার করে টিকতে বা চলতে পারবে না, তা আইএস তো বটেই কেউই মনে করে না।  অর্থাৎ একা আইএস-এর রাজত্ব কায়েম হব।  ফলে তালেবানরা ফেল করার মানে সবার কাছেই পরিষ্কার।

    তাই তালেবানকেন্দ্রিক এখনকার বাস্তবতা হল, সংশ্লিষ্ট অন্য দেশের এক কমন আকাঙ্ক্ষা যে, তালেবানরা ফেল করা নয় বা আইএস আসা একেবারেই নয়। তাই তালেবানদের ফেল করতে দেয়া যাবে না। এতে সবার ক্ষতি। কিন্তু জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে, তার ভিত্তিতে তালেবানরা আফগানিস্তান শাসক হিসেবে নিজেদের গড়ে নিক। আর সেই আফগানিস্তান যেন পড়শি যেকোনো দেশে সশস্ত্র হামলাকারী কোনো গোষ্ঠীকে আশ্রয়দানকারী ভূখণ্ড না হয়, এটি নিশ্চিত করতে হবে।

     

    এটি বাস্তবায়নে তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
    অনেকে মনে করেন, তালেবানরা ভাবছে যেহেতু আফগানিস্তান যেন রেডিক্যাল ইসলাম বা আইএস টাইপের সশস্ত্র আন্দোলন বা আক্রমণকারীদের আশ্রয়ভূমি না হয় এটা নিশ্চিত করা প্রায় সারা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রস্বার্থ। কাজেই তালেবানরা রাজনৈতিকভাবে কেমন শক্তি (আরেকটি আইএস কি না বা রাজতন্ত্র যেমন এক সালতানাত বা আমিরের দেশ কি না) তা দেখাদেখি ট্রয়কাকে বিবেচনা বন্ধ করতে হবে বা ছাড় দিতে হবে।
    অথবা আফগানিস্তানেও দুর্ভিক্ষ লেগে যেতে পারে এই ভয়ে ট্রয়কাসহ সবাই তালেবানরা যেমন আছে এভাবেই মেনে নিতে বাধ্য হতে হবে।

    তালেবানদের নিজের সম্পর্কে এই অতি-অনুমান যে তারাই হলো দুনিয়াকে স্থিতিশীল রাখার একমাত্র শক্তি – এটিই তালেবানদের সব কিছুকে স্থবির করে রেখেছে।

    ট্রয়কা উদ্যোগ ফেল করলে এর প্রথম শিকার হয়ে যাবে আফগানিস্তানের খাদ্যসঙ্কটে থাকা ৫৫ শতাংশ জনগণ।

    দ্বিতীয়  সত্য হল, ট্রয়কার তালেবানের সাথে কোনো ছাড় দেয়া যদি ঘটেও সেই তালেবান শক্তির শাসনও ফেল করবেই। ফলাফল হবে আইএস ও সমমনাদের উত্থান। সেই আফগানিস্তান হবে আফ্রিকার সোমালিয়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো ভূখণ্ড। সারা দুনিয়ার জন্য এক নো গো [no go] এরিয়া!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৩ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান : ভারত ও পাকিস্তানের উদ্যোগ “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

      ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

    গৌতম দাস

    ০১ নভেম্ববর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3MV

     

    আ.লীগ কি আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাচ্ছে— প্রশ্ন রানা দাশগুপ্তের

    গত বৃহস্পতিবার ২৮ অক্টোবর   চট্টগ্রামে ইসকনের এক জনসমাবেশ হয়েছে। পরদিনের প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে এ সমাবেশের আয়োজকদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে- “বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের নন্দনকানন চত্বরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি আয়োজিত এক সমাবেশ হয়েছে”।

    ‘ইসকন’ [ISCKON] ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড এক হিন্দুধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যা ‘কৃষ্ণনাম চর্চার এক বিশেষ ব্যাখ্যা’ প্রচারের সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তা সত্বেও চলতি শতকে এসে আমেরিকান সংসদে ও সিনেটে ভারত সরকারের পক্ষে আমেরিকান নীতি পলিসিকে প্রভাবিত বা লবি[lobby] করতে ভারত আমেরিকায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির মিলিত এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, ক্রমেই ইসকনও তার অংশ হয়ে যায়। এর নিট ফলাফল হল ইসকন আর নেহায়েতই ধর্মপ্রচারের সংগঠন থাকেনি। এর ফোকাস বদলে রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে যায়।

           চট্টগ্রামে সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার সমাবেশ

    আমেরিকা হল এমন সমাজ যেখানে বহু বছর আগে থেকেই মানুষের জীবনে থিওলজি [theology] মানে ধর্ম বা ধর্মতত্বের আর প্রয়োজন নেই; মানুষের থিওলজিক্যাল নিড বা ধর্ম-বিষয়ক কোন চাহিদা আর নেই – এমন মনে করা, রটিয়ে বা  ঘোষণা করে দেয়া এক সমাজ। এই অনুমান-ধারণাটা যে ভিত্তিহীন এবং যথেষ্ট ভেবেচিন্তা বলা ভাষ্য নয় এরই প্রমাণ হল সেকালের জন্মের শুরুতে ইসকনের টিকে যাওয়া। যেকোন থিওলজির সারকথাটা  হল এটা এক আন্তঃসম্পর্ক বোধ, যা আমাদের ভেতরে এক ‘সম্পর্কিত’ বা  কানেকটেড বোধ জাগিয়ে দেয় বা রাখে। আমার যায় আসে আমাকে টানে, এমন একটা টান-বোধ করা কাজ করে টের পাই। সে আন্তঃসম্পর্ক বলতে তা হতে পারে মানুষে-মানুষে অথবা প্রকৃতির (মানুষ বাদে) সব কিছুর সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্ক বোধ। আর এসব যেকোনো দুইয়ের সম্পর্কের মাঝে থাকে ‘আল্লাহ’ ধরনের এক ধারণা যার মাধ্যমে মধ্যস্থতায় আসলে আমরা সবাই সব কিছুর সাথে কানেকটেড বা সম্পর্কিত বোধ করতে থাকি। এতে মানুষের বেঁচে থাকাটা মিনিংফুল এবং উদ্দেশ্যসম্মত মনে হতে থাকে। কিন্তু মডার্নিটির সস্তা বা দায়দায়িত্বহীন ব্যাখ্যার কারণে নিজেরা থিওলজিক্যাল নিড শূন্য ঘোষণা করে দেয়াতে পশ্চিম নিজের ক্ষতি করে ফেলেছে; অথচ বাস্তবে মানুষমাত্রই কম-বেশি একটি থিওলজিক্যাল চাহিদা থেকেই যায়। আমেরিকান সমাজের থিওলজিক্যাল নিড নাই, দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা এই ধারণা  এতে তৈরি হওয়া যে শুণ্যতা বা গ্যাপটা পূরণ করতেই এশিয়ান থিওলজিগুলোর অনেকেই পশ্চিমে এসে পপুলারিটি পেয়ে যায়। কারণ মানুষ মাত্রই তার থিওলজিক্যাল নিড থাকে থাকবেই। কম অথবা বেশি; জীবনের শুরু থেকেই নয়ত শেষের দিকে, তরুণ জোঁসে নয়ত অবসর জীবনে – এসব খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া বুঝা যায় আরো বহু যূগ থিওলজিক্যাল নিড থাকবে। ফর্ম বা আকারে হয়ত বদল আসবে।  বহুবার দেখা গিয়েছে মানুষ মারাত্মক আত্মঘাতি ভুল করেছে, তাঁর জানা জ্ঞান কোনটাই তাকে সতর্ক বা সাহায্য করে নাই।  পরে আবার থিওলজি থেকে, পড়তে গিয়ে বুঝছে তাকে সাবধান করা হয়েছিল কিন্তু সে বুঝে নাই, মোল্লাদের কারবার বলে তুচ্ছ করে গেছিল। আবার সাথে বলে রাখা ভাল যে তাই বলে জীবনের বস্তুগত দিকটাও উদাসিন, নজর আন্দাজ বা বেখেয়ালি হওয়া বা থাকাটাও সমান বিপদের হবে।
    যা হোক আমেরিকার সমাজের থিওলজিক্যাল গ্যাপ আছে-ছিল বলেই  ইসকন আমেরিকায় হবার  প্রথম দিকে এ সূত্রেই ‘জায়গা’ করে নিতে না পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে ভারতের লবি প্রতিষ্ঠানগুলোর জোটের অংশ হয়ে যাওয়াতে ইসকনের ফোকাস সরে গেছে। এমনকি নেতৃত্বও বদলে যায়, পরিচালন ক্ষমতায় এমন এক ক্যু হয়ে গিয়েছিল। যারা ভারত সরকারের পক্ষে সরাসরি কাজ করতে চায় ইসকন সংগঠনের এই ধারা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। এতে আগের ধর্মপ্রচারের উছিলায় আমেরিকায় জন্মানো এশিয়ান থিওলজির প্রতিষ্ঠানটা এবার হয় ঘোরতর এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষত ভারত সরকারের বর্ধিত হাতের ভুমিকায় তার গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজ করার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ইসকন হল বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে ও কাছে ভারত সরকার ও তার গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়ার বা পৌঁছানোর হাতিয়ার। ইসকন এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিরোধী এক সংগঠন; যদিও পরিকল্পিতভাবেই ইসকনের আগের ধর্মীয় ভাব ও এর বাইরের আদল সবই বজায় রেখে দেয়া হয়েছে। আর ওদিকে এই নয়া ইসকন এখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশে নাশকতা ও অপতৎপরতার সংগঠন ‘র’-এর বর্ধিত হাত হয়ে নিজেকে সাজিয়ে হাজির করতে থাকে।

    শুধু তা-ই নয়, এতে অবস্থা এখন এমনই যে, একালের আরএসএস-মোদির যুগে বাংলাদেশের ইসকনের তৎপরতায় বাংলাদেশের হিন্দুরা যেন কালচারালি আর বাঙালি হিন্দু নয়; তারা যেন আরএসএসের যে উত্তর প্রদেশের হিন্দু ব্যাখ্যা আছে – তার অনুসারী করে নেয়ার এক প্রোগ্রাম। এটাই ইসকনের প্রধান কর্মসূচি এবং তা নিশ্চিত করাই এর কাজ। যেমন বাঙালি হিন্দুকে উত্তর প্রদেশের হিন্দুর স্টাইলে নিরামিশাষী হতে শেখাচ্ছে তারা, ইসকন মার্কা কৃষ্ণভক্ত হওয়ার নামে। অথচ এথনোলজিক্যাল [ethnological] জাতির বিচারে এটা  প্রতিষ্ঠিত যে  বাঙালির খাদ্যাভ্যাস হল সে আমিষ-ভোজী। আর সেখান থেকেই প্রবাদ তারা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সেও হিন্দু অবশ্যই কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত এথনিক প্রজাতি্তে এক নয়। মানে এরা নিরামিষের লোক নয়। সোজা কথায় এথনোলজির বিচারে আমরা বাঙালি হিন্দু, উত্তর প্রদেশের আর্য অনুসারী হিন্দু নই। এই পুরান কাহিনী হিসাবে আর্যদের ভারত দখল অভিযানে দুটো অংশে গিয়ে তাদের অভিযান আর আগে বাড়তে পারে নাও, মূলত প্রাকৃতিক গাহাড় বা নদীর কারণে। এক হল ভারতের দক্ষিণে যেখান থেকে ভারতের দাক্ষিণার্ত-এর শুরু ধরা হয় – অন্ধ্র-হায়দ্রাবাদের কিছু অংশ থেকে দক্ষিণের পুরাটাই। আর এদিকে ভারতের পুবদিকে মারাঠা-বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্তবেশের পরে পরেই। ভাষার স্টাইল, খাদ্যাভাস, দেবদেবীর ভিন্নতা এমন কী আর্টকালচার গানের সুর-রাগ, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি অনেক কিছুতেই এথনিক ভিন্নতাগুলো বেঁচে যায় টিকে যায়।
    অথচ বাংলাদেশে ইসকন এসেছে পুরো উল্টা-পাল্টা হয়ে, আরএসএস-হিন্দুর প্রতিনিধি হয়ে।  তারা বাংলাদেশে এসেছে হিন্দু বাঙালি  সবাইকে আরএসএস বর্ণিত হিন্দু সাজাতে। পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে মমতা (হিন্দু-মুসলমান) বাঙালি বনাম আরএসএসের হিন্দু এই প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের জয় নিজের পক্ষে এনে মোদিকে ঠেকিয়েছিল।
    আর এসব কারণের বাংলাদেশে ইসকন আবার এদিকে, হিন্দু বাঙালিকে বাইরে থেকে দেখে চেনার উপায় চিহ্ন হিসেবে গলায় ‘কাঠের মালা’ পরাচ্ছে। অথচ ফ্যাক্টস হল, গলায় কাঠের মালা মূলত যারা নদীয়ার গৌড় বা বৈষ্ণব অনুসারী তাদের রেওয়াজ; এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাঙালি হিন্দু মাত্রই সবাই নদীয়ার শ্রীচৈতন্যের অনুসারী বা বৈষ্ণব নয়। অর্থাৎ বাঙালি হিন্দু মাত্রই গলায় কাঠের মালা পরা তাদের রেওয়াজ নয়। অথচ ইসকনের আরএসএসের হিন্দু হল, তারা এটিকে এক ইউনিফর্ম ধারণায় (গলায় কাঠের মালা) সাজিয়ে নিতে চায়। তাই হিন্দু বাঙালি মাত্রই ইউনিফর্মের মতো সবাইকে কাঠের মালা পরার রেওয়াজে নিতে চায়; অর্থাৎ পুরোটাই রাজনৈতিক ও ভিন দেশের অসৎ রাজনৈতিক স্বার্থ তারা চাপিয়ে রাজত্ব করতে চায়। মূলত এর মূল উদ্দেশ্য হল আরএসএসের উত্তর প্রদেশকেন্দ্রিক যে হিন্দুত্ববাদী ব্যাখ্যা আছে, বাংলাদেশের হিন্দুদেরও বলপ্রয়োগ করে হলেও এর অংশ করে নেয়া – তাও খাঁটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

    কাজেই আরেক অর্থে বাংলাদেশে ইসকন হয়ে উঠেছে ‘র’-এর “ফুট সোলজার”; মোদি সরকারের ‘বাংলাদেশ দখল নীতি’ বাস্তবায়নের ভয়ঙ্কর হাতিয়ার। স্বাধীন দেশে এটা বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের কাছ থেকে ‘আশা’ করা যায় না। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক মোদির নীতির বাস্তবায়ক হতে পারেন না। কারো প্রভাবহীন নয় ও স্বাধীন থাকতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারও এসব দিকে কোন নাগরিককে কোন ছাড় দিতে পারে না; উলটা সরকারকে এসব দমন করতেই হবে। এটা তার কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়ীত্ব ও মুখ্য কাজ।  এটা রাষ্ট্রস্বার্থের গুরুতর প্রশ্ন।

    এসবের পটভুমিতে এটা হতবাক করার বিষয় যে, গত ২৮ অক্টোবর সেই ইসকন চট্টগ্রামে জনসমাবেশ ডেকেছে আর তাতে যোগ দিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে লেগেছে প্রতিযোগিতা যে, কে বেশি ইসকনের সুনজর ও অনুগ্রহ লাভ করবে! এর প্রতীকী অর্থও খুবই বিপদের ও লজ্জাজনক! অর্থাৎ কে বেশি ভারতের অনুগ্রহ লাভ করবে? আর তাতে আওয়ামী লীগ যদি ১৩ বছরের শাসন চালাতে পারে তবে বিএনপির ভাগ্যেও নিশ্চয় এর কাছাকাছিই কিছু একটা হবে! এমন অনুমান, তাই কি? ওদিকে মিডিয়া রিপোর্টের এনিয়ে ইঙ্গিতে উপস্থাপনটাই মারাত্মক। লিখেছে, ‘সমাবেশে চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ, নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি নগর বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন”। কিন্তু মজার কথা হল, ওখানে বিএনপির কেবল একটি নেতার নাম আছে। অথচ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ছোট নেতাটার নামও সেখানে দেয়া আছে। আর ভোরের কাগজ লিখেছে, “নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা: শাহাদাত হোসেন” সেখানে বক্তৃতা করেন।

    ‘সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, এটা ষড়যন্ত্র’
    গুগল সার্চে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে দেখা যায় “সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: “ এমন বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি রেফারড হয়েছেন আইনমন্ত্রী। আর ভারতের কিছু মিডিয়ায় দেখা গেছে একই বক্তব্য দিয়েছেন বলে কোট করা হয়েছে খোদ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এমনকি গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৃত্যু ও ধর্ষণের নানা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।’ অর্থাৎ সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা মানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে দাবি। অথচ এরপরও চট্টগ্রামের সমাবেশের নাম হল – ‘সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে’ এই সমাবেশ। কেউ সরছেনা; প্রচলিত শব্দ ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ কথাটা দিয়েই সব জায়গায় কুমিল্লার ঘটনাকে বর্ণনা করা হচ্ছে। অথচ ইকবাল হোসেন গং তারা এখনো রিমান্ডে আর তাদের পেছনে কে আছে? নিয়োগ বা অ্যাসাইনমেন্ট দাতা কারা? ‘র’ না ‘ইসকন’ না থার্ড কেউ? এখনো তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এই অংশটা ঢেকে দেয়ার প্রপাগান্ডা চলছেই! ইকবাল হোসেনেই যেন সবশেষ খোঁজাখুজি শেষ ধরা হয়, এর পিছনে আর কেউ নাই; ভারতীয় মিডিয়ায় এমন  আকাঙ্খাই প্রবল!

    এদিকে চট্টগ্রামে ইসকনের সমাবেশে প্রধান গুরুত্ব পায় দু’জন হিন্দু-ব্যক্তিত্বের বক্তব্য। এর প্রথমজন রানা দাসগুপ্ত, তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তাদের দেয়া ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দের বর্ণনা অনুযায়ী কি খোদ রানা দাসগুপ্তের সংগঠনের নামটাই তাদের কথিত ‘সাম্প্রদায়িক’ নয় কি? আর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের নাম ডঃ অনুপম সেন।

    আবার লক্ষণীয়, ওই সমাবেশে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ। সময়ে মনে হয়েছে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিকল্প এবার পেয়ে গেছে। যেন এবার তারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে। রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। কেউ কেউ এই দ্বিতীয় বাক্যটাকেই মিডিয়ায় শিরোনাম করেছে। কিন্তু রানা দাসগুপ্তের বক্তব্য স্ববিরোধী।
    রানা দাসগুপ্তই কড়া অভিযোগগুলো তুলেছেন। এমনকি এটাও বলেছেন, ভোরের কাগজ লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগ ক্রমেই ১৯৪৮ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে চলে যাচ্ছে”।  এর জবাব আওয়ামি লীগ কী দেয় আমরা দেখব।  তবে এটা বহু পুরনো দিন থেকেই মুসলিম লীগ নিয়ে হিন্দু নেতাদের অভিযোগের শেষ নেই। এসব অভিযোগ, রাগ বা ক্ষোভের আদি উৎস হল – ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কেন করা হল।  কারণ এতে পুর্ববঙ্গেও   হিন্দু জমিদারদের যে পলিটিক্যাল, কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য ছিল তা এক নিমিষেই নাই হয়ে  গিয়েছিল। তাই একালে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় তারা এখন কী চায় আর যদি তারা মনে্র কথা খুলে বলতে রাজি হয় তাহলে সম্ভবত এর জবাব আসবে তারা সেই পুরানা আধিপত্যটাই ফেরত চায়। এমনকি একালের প্রজন্ম যারা তারাও ঘুরেফিরে একালের ভারত না হলেও কলকাতাকে যেভাবে দেখে জানে তেমন একটা পলিটিক্যাল যদি নাও হয় তবে অন্তত একই কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য দেখতে চাইবে। কিন্তু খুবই দুঃখিত এটা এবসার্ড, এক অবাস্তব কল্পনা!   আবার আমরা খেয়াল করলে জানব  যদিও খোদ শেখ মুজিবও এর নিন্দা করেননি বা নিজে মুসলিম লীগার ছিলেন বলে কখনো অস্বীকার করেননি। এমনকি হাসিনা শেখ মুজিবের আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন তাকে মুসলিম লীগার হিসেবেই বর্ণনা বজায় রেখে এবং কোনো রাখঢাক না করেই। কিন্তু “মুসলীম লীগ” শব্দটা হিন্দু নেতাদের কাছে একটা গভীর পাপের নাম।

    অথচ ভারতের কংগ্রেস যেমন এক হিন্দু-জাতিবাদী দল; সমতুল্যভাবে (পূর্ব) পাকিস্তানে মুসলিম লীগ মুসলমান-জাতিবাদী দল।  বাংলাদেশের হিন্দু নেতারা কংগ্রেসের চোখ দিয়ে কংগ্রেস যেমন মুসলিম লীগকে তার মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বি-শত্রু  দল হিসেবে দেখে, সেভাবে ঐ চোখেই তারা দেখে গেছে। অথচ কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি কোনো সর্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড নয়, কারণ এটা তো হিন্দু-জাতিবাদী চোখ। বরং কোন সর্বজনীন, কোন সুনিদ্দিষ্ট পরিচয়হীন দৃষ্টিভঙ্গীর এক অবিভক্ত ভারতের কল্পনা করতে না পারার অযোগ্যতা আর ব্যর্থতা থেকেই তো তিনদেশে বিভক্ত হয়েও তো আমরা আজও মূল প্রশ্ন সমাধান করতে পারি নাই, হাতড়ে মরতেছি। য়ার এমনিতেই  পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ভারতের ওই দৃষ্টিভঙ্গি কখনো গ্রহণ করেনি, করার কথাও না। কারণ মূল ত্রুটি ওটা হিন্দু-জাতিবাদী বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী।  অথচ রানা দাসগুপ্তরা অযথা এই পণ্ডশ্রম করে গেছেন। এখানেও করেছেন। কংগ্রেস বা একালের বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদীর চোখ দিয়ে তারা আগের পূর্ব পাকিস্তান বা এখনকার বাংলাদেশকে দেখতে হবে এবং সাজানোর দাবি করতে হবে এই অদ্ভুত কল্পনা তারা করে গেছেন।  হিন্দু-জাতিবাদী ভারত বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী  ভারত এটাই এখনও তাদের চোখে সেকুলার রাষ্ট্রের মডেল। তাদের কল্পনা শুধু না দাবিও যে বাংলাদেশকে তাদের কল্পনা মত হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী “কথিত সেকুলার রাষ্ট্র” করে গড়ে দিতে হবে।  নইলে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেবে।
    অবশ্য এখানে আরেক  সূক্ষ্ম দিক আছে। লক্ষণীয়, আসলে রানা দাসগুপ্ত কিন্তু “মুসলিম লীগ” বলেনইনি। বলেছেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। দুটার অর্থ একেবারেই উলটা। অর্থাৎ যেটা আওয়ামী লীগেরই আগের নাম বা প্রথম জন্মকালীন নাম সেটাসি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মানে আজকের হাসিনা আওয়ামি লীগের  আগে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামেই জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন। সবচেয়ে বড় কথা তারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ ত্যাগ করে বেড়িয়ে এসেই নতুন এইদল খুলেছিলেন।  তা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাওয়া বলতে তিনি আজকের হাসিনা আওয়ামী লীগের জন্ম হওয়াটাই দোষ বলছেন যেন। এককথায় মুসলিম লীগের উলটা এবং শত্রুদল হল আওয়ামী মুসলিম লীগ। তাহলে রানা দাসগুপ্ত এতে আপত্তির দেখছেন কী বা তার বিশেষ অভিযোগটা কী? আসলে  পুরোটাই ভুয়া।  রানা দাসগুপ্ত কি তাহলে ভাসানী-শামসুল হকের ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের গায়ে হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের চোখে তাকিয়ে দাগ লাগিয়ে দিতে চাইছেন? নাকি কিছু ভেবেচিন্তে বলেননি?

    আসলে ব্যাপারটা হলো, কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের প্রবক্তা ও কায়েমকারী হয় তা হলে এই দলের বা সমর্থকের কি আর মুসলিম লীগকে বিরোধিতা বা নিন্দা করার সুযোগ থাকে?  কেন? কারণ কংগ্রেসই কি মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের জনক নয়? সেটা আবার কীভাবে? তাদের হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়তে বেপরোয়া হওয়াটাই কি অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়তে ঠেলে দেওয়া, বাধ্য করা ও উৎসাহ দেয়া নয়? অর্থাৎ হিন্দু-জাতিবাদী দল খাড়া করে একটা  কংগ্রেস দলের জন্মই কী সমস্ত বিপর্যয় ডেকে আনার মূল প্রতিষ্ঠান ছিল না বা ঘটনা নয়? ভারতকে কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র করে আকার দিতে চায়, তবে এটাই কি প্রকারান্তরে মুসলমানদের ঠেলে দেয়া নয় যে, মুসলমানেরা তোমরা শুনে রাখ – ভারত বা কংগ্রেসে তোমাদের জায়গা নেই তাই তোমরা একটি পাল্টা মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়ে নাও? নইলে আমাদের তৈরি ভারত বা কংগ্রেসে আমাদের আধিপত্য ও অধীনতা মেনে চেপে গিয়ে কোনার চিপায় পড়ে থাকতে পারো। কাজেই এই অবস্থায় অতএব – হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রধারী কংগ্রেসের মুসলিম লীগকে কোনো সমালোচনা বা আপত্তির জায়গা কই? করলে সেটা তো তাদের নিজেরই সমালোচনা হবে!

    আবার দেখেন,  মনে হচ্ছে সূর্য সেনদের রাজনীতি রানা দাসগুপ্ত এখনো করে যাচ্ছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা ১৯০০ সালের পরেও আগের শতবছরের (১৮০০-১৯০০) রামরাজত্ব  তাদের পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রভাব কলকাতাকে কেন্দ্র করে ধরে রাখতে চান। আবার এ-ও আবদার যে, ততদিনে ব্রিটিশদের প্রায় দেড়শ বছরের সব অবকাঠামোগত ব্যয় সব কলকাতাতেই হোক, থেকে যাক। কিন্তু ব্রিটিশরা তা মানেনি, সম্ভব ছিল না। তারা বাংলাকে ভাগ করে ঢাকাকে রাজধানী করে আলাদা নতুন অবকাঠামো গড়তে ব্যয় করতে চেয়েছিল। কেন? মূল কারণ ততদিনে আসাম চা উৎপাদন যোগ্যতার জন্য তৈরি ও সম্পন্ন হয়ে গেছিল। অথচ চা বিক্রি, বিতরণের জন্য সেই চা চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যেতে ঢাকা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে ছোট জাহাজে তুলে তা চট্টগ্রাম বন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিবার কোনো অবকাঠামোই ছিল না। না আসাম থেকে ঢাকা হয়ে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত। এ’কারণে ঢাকাকে রাজধানী করে আসাম ও পূর্ববঙ্গকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ করা হয়েছিল ১৯০৫ সালে। এটাই ‘বঙ্গভঙ্গ’।  মানে  ঢাকাকে কেন্দ্র করে আরেক বাংলা প্রদেশ বানানো।  আর এটাই সহ্য হয়নি কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের, চ্যালেঞ্জ বোধ করেছিলেন যে, ঢাকা তো তাহলে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে যাবে তাতে। সক্ষমতাতেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ এখানে বাণিজ্যিক দিক এখানে ভারী – চায়ের সাথে পাটও আছে; আর বিস্তীর্ণ ধানের জমিতো আছেই। যার উপর আসামের লোভ ছিল। কারণ পুর্ববঙ্গ এব্যাপারে আসামের চেয়ে এগিয়ে ও দক্ষ। এসব ছাড়াও আরো দিক আছে। পূর্ববঙ্গে জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা বেশি, সংখ্যাগরিষ্ট; ফলে কলকাতার ম একচেটিয়া কুক্ষিগত প্রভাব  হিন্দু জমিদারেরা ঢাকায় সামাজিক সাপোর্ট সমর্থনে  জমাতে নাও পারতে পারেন। এসবই ছিল হিন্দু জমিদারদের মূল ভীতি। আর এসব স্বার্থে তারা নতুন প্রদেশ করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। এবং এনিয়ে তারা এত মরণপণ সিরিয়াস হন যে যে জমিদারেরা একশ বছরে বৃটিশদের সমর্থন ও ঔরসে  জমিদারি কামাইলেন অবিভক্ত বাংলার একছত্র নেতা হলেন যেই বৃটিশদের বদৌলতে সেই বৃটিশদের তারা অস্ত্র হাতে বিরোধীতার করতে লোক নিয়োগ ও সন্ত্রাসী দল গড়ে  শাসকদের বিরোধিতা করেছিলেন। তা হলে সূর্য সেনরা ছিল মূলত হিন্দু জমিদারদের স্বার্থে কাজ করেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামের লোক হয়েও সূর্য সেনরা নিজ পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধী। কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের লেঠেল। আর তারা জমিদার স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো লোক হলেন। পূর্ববঙ্গের বা, বাংলাদেশের কেউ হতে পারেন না। বরং সরাসরি কলকাতার হিন্দু জমিদারের পক্ষের লোক। কাজেই পূর্ববঙ্গের চোখে তারা কোনো বীর নন,  না হতেই পারেন না।  বরং পূর্ববঙ্গের বা ঢাকার স্বার্থের বিরোধী।  মানে চট্টগ্রামের লোক হয়ে ঢাকার কথা ভুলে মাড়িয়ে কলকাতার পক্ষে অস্ত্র হাতে মাকালীর নাম নিয়ে দাড়িয়ে গেলেন। কাজেই আপনারা নাকি কথিত স্বদেশী এটা কাদের আন্দোলন? কোন স্বদেশ? কলকাতার এবং হিন্দু জমিদারদের জন্য স্বদেশী!  কিন্তু দেখা যাচ্ছে এটা তো পূর্ববঙ্গের কোন স্বার্থই নয়। অথচ জবরদস্তিতে কলকাতা বা কংগ্রেসের স্বার্থটা বারবার আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এখনও।

    দেখা যাচ্ছে, এখনো কংগ্রেসের স্বার্থ ও অবস্থানের চিন্তাটাই রানাদের মাথায় সবসময় ভর ও ডমিনেট করে এবং গাইড করে থাকে। ফলাফলে হিন্দু জমিদার স্বার্থ তাদের চোখে হয়ে যায় কথিত অসাম্প্রদায়িক আর কেউ এর বিরোধিতা করলেই হয় ‘সাম্প্রদায়িকতা’। এই মুখস্থ কথা আর কত দিন?

    একালে কিছু হলেই আরেক বক্তব্য হল রাষ্ট্রধর্ম বলে ইসলামের বিরোধিতা। আচ্ছা,  আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালতে কোনো হিন্দু নাগরিক কী মামলায় হেরে গেছে এজন্য যে, আদালত তাকে এক মুসলমান নাগরিকের মতই সমতুল্য ও  সমান অধিকারের সাথে সমান অধিকারের ট্রিটেড হননি বলে এবং শুধু তাই না  সেটা ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়ার কারণে এবং এমনটা চালু হবার পর থেকে? এমন রেকর্ড কোথাও আছে কি?

    অর্থাৎ আদালত  অধিকার ও ট্রিটমেন্টে এর দিক থেকে কখনও নাগরিক বৈষম্য করে নাই, কোনো অসাম্য হয়নি। তবে ডেকোরেটেড পিস হিসেবে  রাষ্ট্রধর্ম শব্দগুলো অবশ্যই আছে। যা না থাকলে ভাল হত। অর্থাৎ এটা একটি জেদ-ক্ষোভের  সিম্বল। ফলে একটু ভেদের সিম্বলও অবশ্যই। কিন্তু তা-ই-বা কেন থাকবে? কারণ ইন্দিরা গান্ধী প্রগতিশীলতার নামে, অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত এক অর্থহীন ‘সেকুলার’ শব্দ ও ধারণা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এবং বুঝা যাচ্ছিল কারণ তখন তিনি  একাত্তরের শেষের দিকে সম্ভবত অক্টোবরে পাঁচবার আমাদেরকে স্বীকৃতির অনুরোধের ফাইল ঘুরাচ্ছিলেন।  পরে আমাদেরকে পরোক্ষে জানানো হয় এটা না মানলে আমাদের অনেক ভোগান্তি হবে।  ফলে এতে আবার সেই ইসলামবিদ্বেষ ফোবিয়া হিন্দু-জাতিবোধের চিন্তা ও  ডোমিনেন্স যা ভারতে গড়ে উঠেছে তাই আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এটাই তো ইসলামবিদ্বেষ। যেন তাজউদ্দিন সাহেব যত নিজেকে ইন্দিরা গান্ধীর সামনে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় করান না কেন, ইন্দিরা ভুলতেই পারছিলেন না যে তাজুদ্দিন তো আসলে মুসলমান!  তাই তিনি যেন “সেকুলার” সাবধানতার জোরাজুরি্তে তাজুদ্দিনকে বলতে চাচ্ছিলেন তাজউদ্দিন তুমি মুসলমান নও, তুমি সেকুলার……।
    আবার সেকুলার মানে কী তা তো তিনি ইন্দিরা বা আজকের রাজনৈতিক ভারত জানে  এর প্রমাণ তাদের রচিত কনষ্টিটিউশনে আজও নাই। তাদের ধারণা একটা হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তা ভিত্তিক রাষ্ট্রে কোন সমস্যাই নাই। কেবল “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” একথা ঢুকিয়ে দিলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়!
    অথচ বাংলাদেশে আমরা তো সবাই হিন্দুও নই। আমরা সেসময় ছিলাম রাজনৈতিকভাবে “বাঙালি জাতিবাদী”। ফলে ফেলে আসা জমিদার আধিপত্যের ইমেজ আমাদের ক্ষুব্ধ আশংকিত করবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের নতুন বাংলাদেশ বলে কী হচ্ছে এনিয়ে সন্দেহ করবে। জনমনের মনে আবার  সাতচল্ভেলিশের আগের জমিদারি অত্যাচারের ছবি ভেসে  উঠবে  চালু হবে।  এসব ভেবেও   আমাদেরকে সব মেনে নিতে হয়েছিল। (এনিয়ে বিস্তারিত আরো অন্য অনেক বইয়ে আছে। এখানে সেদিক আর টানছিনা।
    আবার মজার গোলমেলে ফ্যাক্টস হল, ১৯৪৭ সালে ভারতকে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র (নেশন-স্টেট) বানালেও নেহরু-গান্ধী কখনোই ভারতের কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলার’ শব্দটা রাখেননি; বরং আমাদের ওপর ১৯৭১ সালে জবরদস্তি করার বহু পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৬ সালে এবার ভারতের কনস্টিটিউশনের ৪২তম সংশোধনী হিসেবে ‘সেকুলার’ শব্দটা অন্তর্ভুক্ত করেন। [ সংশোধনীর প্রথম পাতাতেই  STATEMENT OF OBJECTS AND REASONS এই শিরোনামের অধীনে তৃতীয় পয়েন্টে]। এই লিঙ্কে গিয়ে দেখুন। আর সেই থেকে অনেকের ভুল অনুমান হল, যেকোন রাষ্ট্রে এমনকি তা  হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত রাষ্ট্র হলেও এতে  আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল  ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দ থাকলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়। ফলে এভাবেই ইন্দিরা গান্ধী আগে আমাদের দেশে এমন নীতি ঘোষণা করতে বাধ্য করেওছেন ১৯৭১ সালে পরে ১৯৭৬ সালের ভারতেও তাই করেছেন। এসব এমনই রাষ্ট্রচিন্তায় নাজুক  অবস্থা, দুরবস্তা। আসলে  নিশ্চয় আমাদের কনস্টিটিউশনেও  এই সকুলারিজম এই শব্দ থাকতে পারলেই এদিয়ে তারা মুসলমানদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন আর তারা তাদের হিন্দুত্ববোধ বুদ্ধিকে সেকুলার বলে চালাতে পারবেন, রাষ্ট্রে ছেয়ে রাখতে পারবেন এতটুকুই তাদের লক্ষ্য।  অথচ যারা সেকুলার শব্দ কোথাও না লিখে কায়েম করা যায়। মূলকথা সবাই নাগরিক আর নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র হতে হয়ে যেখানে সবাই একমাত্র পরিচয় নাগরিক হতে হয় ও সমান অধিকারের নাগরিক  – এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে হয়।  এতে কে কী হিন্দু না মুসলমান না পাহাড়ি এটা এখন যা আছে তাই থাকি কিন্তু কনষ্টিটিউশন এই পরিচয় সামনে অধিকারে কোন কমবেশি বা ভাগাভাগি করে না। সবাই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে মুসলমানের দেশে সেকুলার লিখে রেখে ইসলামবিদ্বেষ জারি রাখার যে সন্দেহ আমাদের দেশের মুসলমান নাগরিকদের মনে ভাসে, সন্দেহ জাগে তা তো অমূলক নয়।
    এভাবেই আরেক সন্দেহযুক্ত শব্দ হল “অসাম্প্রদায়িক”। এটা ডিকশোনারিতেই নাই। হিন্দু জাতিবাদের সৃষ্টি এই অদ্ভুত শব্দ।  এটাও হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের বোধবুদ্ধিতে খাড়া করা শব্দ যা দিয়ে যেকোন অ-হিন্দুর উপর চাপ সৃষ্টি বা তাকে, কোনঠাসা করার হাতিয়ার হয়। য়ার তারা আরামে অসাম্প্রদায়িক এই শব্দের আড়ালে হিন্দু-জাতিবাদিতা বা হিন্দুত্ববাদ এর আধিপত্য কায়েম করে নিতে পারে। আবার এই আকামকে তারা সেকুলার বলেও সার্টিফাই বা সাফাই দিতে পারে। অথচ  নতুন বাংলাদেশ তো অন্তত ইন্দিরাদের হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই নয়। এ্টা ছিল মুজিবের “বাঙালি নেশন স্টেট”; ভারতের মতো ‘হিন্দু নেশন স্টেট’ও কোনোভাবেই নয়। ফলে ভারতকে কপি করতে হবে কেন আর তা ফিট করবে কেন? ফলে সেই থেকে রানা দাসগুপ্তরা তাদের ‘কল্পিত দুঃখে’ আমাদেরও মাথা খাচ্ছেন।
    ওদিকে ১৯৭১-৭২ সালের এই সেকুলারিজম চাপিয়ে দেয়ার বিরোধিতা সহজ বা সময়ের সাথে মানানসই ছিল না বা হতো না। এজন্য এমনকি শেখ মুজিবও দেশে ফেরত আসার পর পরিস্থিতি বুঝে তখনই তা বিরোধিতা করতে যাননি। তাই পঞ্চম সংশোধনী লেখার সময় সেই প্রথম আর পরে অষ্টম সংশোধনী লেখার সময় আমাদের হাতে সুযোগ এসেছিল। ফলে সেকুলারিজম উঠিয়ে ফেলে দিলেও ঐ জায়গা ফাকা ফেলে রাখতে চায় নাই। এছাড়া রাগ-জিদও ছিল। তাই সেই জিদ উসুল করা হয়েছিল।  যদিও ‘সেকুলারিজম’ বা ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ইত্যাদি যে অসৎ শব্দ, খারাপ উদ্দেশ্যের শব্দ সেটা চিনতে আমাদের আমজনতার কোন অসুবিধা হয় নাই।
    যেমন এই রাগ-জেদের দিকটা ভালো বোঝা যায় যখন পঞ্চম সংশোধনীতে সেকুলারিজম ফেলে দিয়ে লেখা হয়েছিল “আল্লার উপর অগাধ বিশ্বাস”। এটা তো লিখে কায়েমের কিছু না। কিন্তু দেয়া হয়েছিল অনেকটা হুশিয়ারি বা পাল্টাপাল্টি হিসাবে। অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে, ভারতের এক হিন্দু নেশন স্টেট রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত ‘সেকুলার’ শব্দটা বাংলাদেশে তোমরা চালু করতে চেয়েছো অযথাই, খারাপ উদ্দেশ্যে। কারণ বাংলাদেশ তো হিন্দু নেশন স্টেট কখনোই নয়। কাজেই ইসলাম বা মুসলমানদের কন্ট্রোল করা আবদ্ধ রাখা জাতীয় কোনো শব্দ ইসলামবিদ্বেষ ও ফোবিয়া থেকে জন্ম নেয়া বুদ্ধি। আর এর প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দিতেই ১৯৮৮ সালে আরো পোক্ত হবে ভেবে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করে দেয়া – এমন মনে করা যায়। অথচ এর কোনো ব্যবহারিক বা লিগ্যাল ইমপ্লিকেশন নেই, কারো কারো জন্য হয়ত কিছুটা অস্বস্তি ছাড়া। আর এটাই মুসলমান হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড গংদের ওপর শাস্তির মত বা প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দেয়া।

    তবে আমার ধারণা একদিন পুর্ণ ও স্বাধীন জনগোষ্ঠির ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে নতুন কনষ্ঠিটিউশনে আমরা কোন বিভেদ চিহ্ন রাখব না।  জেদাজেদি করারও কিছু থাকবে না। সব মাফ করে দিয়ে পুরানা ভুলে জনগোষ্ঠি হিসাবে আমরা হয়ে দাড়াতে পারব। বৈষম্যহীন এক  সম-নাগরিক অধিকারের সমাজে আমরা জীবন গড়ব।

    উপরেও রানা দাসগুপ্ত বা অনুপম সেনদের চিন্তায় যে ফোবিয়ার কথা বলেছি এসব কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো সম্ভবত তারা এখন কী বলছেন তা যদি দেখি। ইসকনের ওই সভায় সারকথায় তারা বলছেন, তাঁরা বাহাত্তরে ফিরে যেতে চান। অথচ খোদ শেখ হাসিনাই তো ১৫তম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম আর সেকুলারিজম দুটোই রেখে  দিয়েছেন। যা এখনও লেটেস্ট ভাষ্য।  অথচ কায়দা করে রানা দাসগুপ্ত বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। অর্থাৎ কথার কোন তাল-ঠিকানা নাই।

    আসলে এসব কায়দা করে লাভ নেই। কিন্তু তারা এখন এসব কথা তুলছেন কেন? আমাদের দুই রাজনৈতিক দলই এখন ভারতের আনুগত্য লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এবং দেখা যাচ্ছে তা আবার সরাসরি ভারতের কাছেও না, তার ‘র’-এর কাছেও না। একেবারে ‘র’-এর হ্যান্ডলার ইসকনের কাছে হাত পেতেছে আর তা দেখে রানা দাসগুপ্তদের নিজেকে অনেক পাওয়ারফুল মনে হচ্ছে? তাই তো?  কিন্তু আর কত? ২০০ বছর হয়ে গেল এই মুসলমানদের দাবড়ে রাখতে হবে নাইলে নাকি মাথা চাড়া দিবে – এমন এই দাবড়ানোর চিন্তা এটাই তো ফ্যাসিজম, হিটলারি চিন্তা।  আপনার এই দাবড়ানির চিন্তার জন্যই তো আপনাকে বিশ্বাস করবে না কেউ, কোন আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে না। এটা এমনই ক্ষতিকর চিন্তা তা একবারও ভেবে দেখেন নাই। এজন্য হিন্দুত্ববাদি বা হিন্দুজাতিবাদ চিন্তাকে আমাদের এদিকের হিটলারিজম বলা হয়! এমন চিন্তার জন্যই আজ আমরা তিন দেশই বিচ্ছিন্ন, ধুঁকছি। হাতড়াচ্ছি।  খারাপ চিন্তাই প্রতিহিংসায় অন্য খারাপ চিন্তাকে ডেকে আনে। মানুষ নিজেই নিজের শত্রুর স্বভাব বৈশিষ্ট তৈরি করে।

    আসুন হিংসা পাশে ফেলে রাখি। আর আপনাদের চোখে ধর্মই যদি সব সমস্যার উৎস হয়ে থাকে তবে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজের কথা তো শুনেছেন। অবিভক্ত ভারতে রাষ্ট্র ধারণার গোড়া যেখান থেকে, সেই ১৮১৫ সালের রামমোহন রায় তাঁর আত্মীয় সভা আর যিনি আবার বেঙ্গল রেনেসাঁর নাকি আদিগুরু কমিউনিস্টরা দাবি করে, তা হলে তিনি রেঁনেসার আদিগুরু হয়ে নতুন করে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ চালু করেছিলেন কেন? করেন কী করে? রেনেসাঁর আদিগুরুর সাথে ধর্ম? কেমন মিলাবেন? এতো দুধ আর লেবুর চেয়েও খারাপ মিশ্রণ! হবে? তাই নয় কী এবং কেন?  আপনাদের উচিত হবে এর কারণ খুঁজে দেখা। ব্রাহ্মসমাজ জন্মের কারণ ধরতে পারলে বুঝে যাবেন, ধর্ম (আসলে ইসলাম ধর্ম) নিয়ে আপনাদের অনুমান কতটা ভিত্তিহীন, অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা!

    অথচ খুবই সহজ এসবের সমাধান। আমাদের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। বদলে তা অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র হতে হবে যেখানে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে হিন্দু বা মুসলমান (বা জুম্ম জাতি) জাতি পরিচয় নিয়ে লড়ার কিছু থাকবে না। তখন দেখবেন, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক ধরনের শব্দের আড়াল আর দরকার নেই, লাগছে না।

    শেষ কথা
    এত সেকুলারপ্রিয় আপনারা যারা সেকুলার ভারতের কনস্টিটিউশনকে আদর্শ মনে করেন,  তাহলে ভারতের এই কনস্টিটিউশনই আরএসএসের মোদিকে রাজত্ব করতে জায়গা করে দেয় কেমন করে? সেই প্রশ্ন করুন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনও বিজেপি দলকে অনুমোদন রেজিষ্ট্রেশন দিয়েছে কী করে? সহ্য করে কী করে? এতে কোনো সেকুলারিজমের সমস্যা দেখে না! কী অদ্ভুত? সহ-বাস! হিন্দুত্ববাদ আর সেকুলারিজম সহ-বাস করে কেমন করে? তাহলে কেবল মুসলমান-বাদ দেখলেই এবার ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ হাতে দৌড়ে আসেন কেন?

    এছাড়া  বাংলাদেশের হিন্দুনেতাকেই দেখি এই মোদির সাথে দেখা করে এসে বলশালী অনুভব করেন। আবার দেশে ফিরেই সেকুলার বাংলাদেশ নাই, কিংবা রাষ্ট্রধর্ম আছে বলে কান্নাকাটি করেন। কিভাবে করেন এগুলো? তা হলে আপনারা ঠিক কী চান? বাহাত্তরের কনস্টিটিউশন নামের আড়ালে মোদির ভারতের আধিপত্য ও অধীনস্থতা কায়েম? এসবের জন্য আপনারা বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার হতে পারেন না। পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা না বাড়ালে স্বল্প কিছু পরিবর্তনও কাজ করার কোন কারণ নাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩০ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ইসকনের মন পেতে প্রতিযোগিতা “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]