Tag: রাষ্ট্র

  • দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া, চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে 

    দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া,
    চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে

    গৌতম দাস
    ১৫ নভেম্বর ২০২২  রাত ০০ঃ১৫

    https://wp.me/p1sCvy-4k2

        কয়েক ঘন্টা আগের ছবিঃ US President Joe Biden, left, arrives with Chinese President Xi Jinping for a meeting on the sidelines of the G20 summit meeting, November 14, 2022, in Bali, Indonesia [Alex Brandon/AP Photo]

    আগে কিছু বিষয়ের সংজ্ঞা দিতে দিতে আজকের কথা শুরু করব। পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে West – এসব শব্দ বলতে একালে বুঝতে হবে সারা ইউরোপ ও সাথে আমেরিকাও। সাধারণত, কালচারাল অর্থে অবশ্য এনিয়ে আরেকটা শব্দও আছে – ‘পাশ্চাত্য’। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতা বলতে যেমন ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’ শব্দটা এভাবে, ব্যবহার করে অনেকে। ঠিক পশ্চিম এর বিপরীত শব্দ পূব তেমন, পূর্ব বা এশিয়ান কালচার বা সংস্কৃতি বুঝাতে অরিয়েন্টাল [oriental] বা বাংলায় ‘প্রাচ্য’ সভ্যতা বলার চল আছে। মানে পশ্চিম বা ইউরোপের বিপরীতে পুব-কে প্রাচ্য বা এশিয়া বলে বুঝানো।
    ওদিকে ভৌগলিকভাবে আটল্যান্টিক মহাসাগর ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে অবস্থিত  হয়ে থেকে এদেরকে দুই পাড়ে বিভক্ত করে রেখেছে। এমনভাবেও অনেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। এই অর্থে তাই ট্রান্স-আটল্যান্টিক মানেও পশ্চিম; যার অর্থ হল ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে আটলান্টিক মহাসাগরটা যেন অবস্থিত নাই বরং তারা লাগোয়া বা পাশাপাশি – এই কল্পনাতে তৈরি শব্দটা হল ট্রান্স-আটল্যান্টিক [trans-atlantic]। তাই ইউরোপ আর আমেরিকাকে অন্তত এথনিক কালচারাল অর্থে তারা এক, এভাবে একসাথে বুঝাতে অনেকে “আটল্যান্টিক” শব্দ দিয়ে সেটা বলে বুঝাতে চায় অনেকে। যেমন, সামরিক জোট ন্যাটো [NATO] এর ভিতরের ক্যাপিটাল  ‘A’ এই অক্ষরটা আটল্যান্টিক বুঝাতে ব্যবহার হয়। মানে ন্যাটো হল ইউরোপ আর আমেরিকার মিলিত সামরিক জোট; তাই এটা এক আটল্যান্টিক জোট। আবার ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ বলে অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়; যেমন এ’নামে এক থিঙ্ক ট্যাংক আছে। আবার একইভাবে, সারা দুনিয়ার জন্য নির্ধারক ও সবচেয়ে বিখ্যাত হিটলারবিরোধী ১৯৪১ সালের হবু জোটের পক্ষে প্রথম যে চুক্তি হল সেটার নাম আটল্যান্টিক চার্টার ট্রিটি বা ইংরাজিতে Atlantic charter Treaty । যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে বিরোধী এলাইড ফোর্স বা ‘পক্ষ শক্তি’ নামে জোট গড়ে তোলার লক্ষ্যের পিছনের ভিত্তি, এমন এক প্রধান চুক্তি। এটাই ছিল হিটলারের ‘এক্সিস ফোর্স’ নামে জোটের বিরোধী জোট।

    আবার আমেরিকান ভুমির মূল এথনিক  জনগোষ্ঠি অর্থে  জাতি [নেশন], এই অর্থে বিচার করে বললে, এখনকার আমেরিকা এটা ইউরোপের কোন এথনিক জনগোষ্ঠিরই জন্মভুমি ছিল না। বরং ১৬০৭ সাল থেকে বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ ইত্যাদি কলোনিদখলদারেরা তাদের জন্মভূমি ইউরোপ থেকে গিয়ে আমেরিকাকে কলোনিদখল করে নিজেদের ভুমি হিসাবে দাবি করে সেখানেই থেকে যাওয়া ও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়েছিল। আর এতে সেখানকার মূল আদিবাসিদের উতখাত বা তাদের আরো গহীন বনে চলে যেতে ঠেলে বাধ্য করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই ওসব আদিবাসিদেরকে পশ্চিমারা নাম দিয়েছিল “রেড ইন্ডিয়ান” বা  তাদেরকে এই নামে ডাকা চালু হয়েছিল। সেই থেকে ইউরোপের বা পশ্চিমা দেশান্তরি বা মাইগ্রেন্টরা [migrants], এরাই যেন আমেরিকার মূল বাসিন্দা এমন হয়ে বসবাস শুরু করেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকা কার্যত ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের শহর হয়ে যায়। একইভাবে ঠিক যেমন অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড অথবা কানাডা এই দেশগুলো ইউরোপীয়দের হাতে কলোনিদখলের পরে এখন এরা মাইগ্রেট করা ইউরোপীয়দেরই শহর -যেন নিজস্ব দেশ- এমন হয়ে গেছে।

    কেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে এত পুরানা কথাঃ
    কেন একালের প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে ব্যাখ্যা করতে এত সব পুরানা কথাকে তুলে আনছি; এর কারণ হল ২০২১ সালে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হলে পড়ে সে নীতি-পলিসি নিয়ে তিনি এসেছিলেন সেটা আসলে এক আটল্যান্টিক ফর্মুলা। যার আরেক নাম ‘সাদা ককেশীয় শাসন’ চালু রাখার স্বার্থ।
    তাই বর্তমানের প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, বাইডেনের আমলে তিনি কার্যত যে ‘পশ্চিম’ এর সংজ্ঞার উপর নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন যেটা হল প্রধানত -হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট -, অথবা সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি এক ততপরতা। আর মূলত এসব পরিচয় খাড়া করার উদ্দেশ্য একটাই তা হল, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান যা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে যা, ১৯৪৫ সালের পর থেকে গত ৭৭ বছর ধরে রাজ [rule] করে এসেছে ও এখন ক্লান্ত হয়ে শেষ প্রান্তে ঠেকেছে – এই উত্থিত চীনা অর্থনৈতিক উত্থান-আগমনকে আর যতদিন সম্ভব ঠেকিয়ে দেয়া, অন্তত দেরি করিয়ে দেয়া সম্ভব – এরই এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
    তাই একালে পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে west শব্দের এক বিশেষ অর্থ হয়েছে যে যারা গত প্রায় ছয়শ ধরে দুনিয়াকে কলোনিদখল করে শাসন করে আসছিল আর সুনির্দিষ্ট করে ১৯৪৫ সাল থেকে  আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল ; যার প্রথম ও সবচেয়ে ইতিবাচক এক নয়া পদক্ষেপ ছিল  চলে আসা পুরানা সাড়ে তিনশ বছরের কলোনিদখল ব্যবস্থাকে আমেরিকা তুলে দিয়েছিল – এরাই সেই থেকে নয়া ‘পশ্চিমা ব্যবস্থা’।

    তবে একালে বাইডেন যে নয়া নীতি-পলিসি সাথে যোগ করেন এই ততপরতার পরিচয় হল এটা এখন ‘সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি’ পুনর্বার খাঁড়া করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ এর) সাথে গাটছাড়া বেধে সারা পশ্চিমাদের ‘ইউক্রেনের যুদ্ধে’ সারা দুনিয়াকে নামানো। তাদের অনুমান ছিল ইউক্রেনকে প্রক্সি বা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তারা পশ্চিমারাই ইউক্রেনের পিছনে থেকে পুতিনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে রাশিয়াকে ধংস করতে সক্ষম হবে। এছাড়াও তাদের সহ-অনুমান ছিল যে এতে রাশিয়ার সমর্থনে একসময় নিশ্চয় চীন রাশিয়াকে ‘সামরিক সমর্থন’ করে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এভাবেই তারা চীনকেও এই যুদ্ধে জড়িয়ে চীনা অর্থনৈতিক উত্থানকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারবে। যার ফলাফল হতে পারে, তাদের গত ছয়শ বছরের সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটির শাসন আরো অন্তত শ বছর চালিয়ে যেতে পারবে! এই ছিল আশা।

    কী করে বুঝব তিনি পরাজয় স্বীকার করছেন, তোওবা পড়া শুরু করেছেনঃ
    বাইডেনের শাসনের প্রথম দুবছরে মাপার আরেক সহজ উপায় হল আমেরিকান মিড-টার্ম ইলেকশন; যা গত সপ্তাহে ৮ নভেম্বর এই নির্বাচন হয়ে গেল। তবে বাইডেন এটাকে নিজ পরাজয় ঢাকার উপায় হিসাবে ব্যবহার করতে নেমে গেছেন, নভেম্বরের শুরু থেকেই। যদিও এমনিতেই যেকোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তার শাসনের মিড-টার্মে মানে চারবছর শাসনের দুবছর পুর্তিতে আগের দুবছরে গৃহিত নীতি-পলিসির রিভিউ বা পুনঃমুল্যায়নের সুযোগ নিয়ে থাকেন।  সেটা বাইডেনের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হয়ে যাচ্ছে একেবারে উলটা গান। মানে চীনবিরোধী একে পিষেমারার নীতির বিপরীতে একেবারে উলটা সহযোগিতামূলক সহ-অবস্থান; মানে পরস্পরকে বিকাশ-বৃদ্ধিতে জায়গা করে দেয়া; এরই প্রাইমারি আলাপ করতে যাচ্ছেন বাইডেন।    কিভাবে?

    এর পরের সপ্তাহ মানে আগামিকাল থেকে, ১৫-১৬ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে এবারের G20 সম্মেলন মানে, ১৭তম জি২০ [G20 Countries] বার্ষিক স্মমেলন অনুষ্ঠান শুরু হবে।  আর এই সম্মেলন উপলক্ষ্যে এরই আড়ালে মানে এই সম্মেলনের  সাইড লাইনে বসে বাইডেন সরাসরি চীনা প্রসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাথে বৈঠকে বসবেন তা ঠিক করেছেন। এই পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল জর্মান চ্যান্সেলার ওলাফ শলৎজ [Olaf Scholz] এর গত পাঁচ নভেম্বর ২০২২ এর চীন সফর থেকে; যেখানে তিনি বলেছিলেন তিনি G7 group দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসাবে প্রেসিডেন্ট শি এর সাথে কথা বলতে গিয়েছেন। কিন্তু G7 এর পক্ষ থেকে জর্মানিই কেন?  এর জবাব হবে সম্ভবত জর্মানিই হল G7 গ্রুপের একমাত্র দেশ যে তার আগের চ্যান্সেলার মার্কেল এর কৃতিত্ব হিসাবে ইউরোপের বাকি সবার আগে চীনবিরোধী না হয়ে উলটা চীনকে জর্মানির অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে ইন্ডাস্টিয়াল সহযোগিতা সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আর পরে সেটাই গত দুবছর ধরে বাইডেনের সাদা শাসন বাচিয়ে রাখার নীতি-পলিসির কারণে ভেঙ্গে পড়ার দশায়।  এখানে বলে রাখি যে, G7 বলতে Canada, France, Germany, Italy, Japan, UK, and US এসব রাষ্ট্রগুলোর জোট বুঝানো হয়।

    আমার এর আগের লেখায় শিরোনাম করেছিলাম – “মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু”। সেখানে পশ্চিমের তিনটা রেফারেন্সের কথা উল্লেখ করেছিলাম; যার একটা ছিল জর্মান চ্যান্সেলার শলৎজ এর চীন সফর। রয়টার্সের রিপোর্ট  প্রথম আলোতে অনুবাদ করে ছাপা রিপোর্টে শলৎজের এই সফরে আকাঙ্খা প্রসঙ্গে; যার শিরোনাম হল – ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে চাপ দিতে চীনকে পাশে চায় জার্মানি।
    দ্বিতীয় রেফারেন্স দিয়ে লিখেছিলাম বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর মন্তব্য যেটাতেও রয়টার্সের শিরোনাম হল, ব্লিঙ্কেন বলেন “চীনের সাথে সমন্বয়ে এক তালে [need to align] থাকাটা জরুরি এসম্পর্কে  G7 group পরিস্কার” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China]। অর্থাৎ বিগত দুবছরের অনুসরণ করা বাইডেনের নীতি-পলিসি  এখন ময়লার বাক্সে ফেলে বাইডেন-ব্লিঙ্কেন আপোষের জন্য তৈরি হচ্ছেন। অথচ এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দুবছর ধরে দেয়া চীনকে একঘরে করার আকাঙ্খায় দেয়া বক্তব্যের বিপরীত।
    তৃতীয় রেফারেন্স দিয়েছিলাম, এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]। অর্থাৎ সবমিলিয়ে এক পরিস্কার আপোষের বার্তা যে জি৭ গ্রুপ নামে “সাদা শাসন ওয়ালারা” তাদের চীনবিরোধিতা ত্যাগ করে আপোষের জন্য রেডি। তবু এত সত্য কথা বলা তাদের জন্য একটু অস্বস্তিকর। তাই যেন একটু আড়াল নেয়া যে এই আপোষের পথে তারা বাড়ছেন যেহেতু এক গ্লোবাল মহামন্দা (recession) আসন্ন সেই বিবেচনায়!
    তাই চতুর্থ রেফারেন্স হিসাবে বলেছিলাম যে,  বলেছিলাম যে “আল জাজিরা এবার এই প্রথম পশ্চিম থেকে
    তারা দুরত্ব রচনা করতে চাইছে। তাদের এ’প্রসঙ্গে  রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে …as inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!”।

    বাইডেন-শি বৈঠক, জি২০ গ্রুপের ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠকের উসিলায় সাইড লাইনেঃ
    এখন জি২০ গ্রুপের আসন্ন ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠক উপলক্ষ্যে বাইডেন আরো খোলাখুলিভাবে চীনের সাথে আপোষের কথা আগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।  যেমন, সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে বললেন বাইডেন – প্রথম আলো।  এই খবরটা অরিজিনালি এএফপি এর যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে। কিন্তু ঠিক কী প্রসঙ্গকে মাথায় রেখে বাইডেনের এমন অল্প আগের শত্রুর প্রতি এমন মধুর পিঠে হাত বুলানো ভাষণ?
    সেটা আমরা জানতে পারি রয়টার্সের আরেক রিপোর্ট থেকে। সেখানে শিরোনাম হল – “চীন-আমেরিকাঃ আসন্ন শি-বাইডেন বৈঠকের আগেই সবার চোখ “রেড লাইন” এর উপরে” [China-U.S. ‘red lines’ in focus ahead of expected Xi-Biden meet] ।  এখন এখানে  -রেড লাইন- সেটা আবার কী?
    আসলে তাদের আলোচনা অনেক দুর-ই আগিয়ে গেছে। আগে বাইডেন বলত চীন নাকি গ্লোবাল অর্ডারের আইন শৃঙ্খলা রীতিনীতি কিছু মানে না। না, বাইডেন এখন সেখান থেকে সরে গিয়েছেন। আর বাইডেনের নয়া অবস্থান হল, শি-বাইডেন এরা উভয়েই পরস্পরের কাছে বলে নিবেন কোথায় কতদুর অপর পক্ষ যেতে পারবে বা পারবে না, কথা তুলতে পারবে না ইত্যাদি – যেটা বিপক্ষের জন্য সেনসেটিভ। যেমন যদি ধরি তাইওয়ান ইস্যু। চীন বলবে, এক চীন নীতি মানতে হবে। যেটা আমেরিকা, ভারত সহ প্রায় সব দেশই ফরমালি মানে কারণ, তাদের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক  এর উপরে দাড়িয়েই অনেক আগেই স্থাপন হয়ে আছে। আর সেখানে তাদের চীনকে দেয়া স্বীকৃতি মতে তাইওয়ান চীনের অংশ বলে তারা মনে করে। কাজেই এখন তাইওয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে চীনকে বিরক্ত বা খোচাখুচি করা এসব বন্ধ করতে হবে। যার মানে তাইওয়ান নিয়ে ইচ্ছামত খোচাখুচি করা নতুন ইঙ্গিত দেয়া এইটা  – রেড লাইন এলাকা। তাই, রেড লাইন তালিকায় সেটা উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ অযথা একাজে খোচাখুচিতে সময় নষ্ট না করে পরস্পর উভয়ের গঠনমূলক কাজে ব্যায় করবে।   তবে কী কী রেড লাইন তালিকায় উঠবে মূলত তা নিয়ে আপোষ আলোচনায় সেটা সাব্যস্ত হবে মনে হচ্ছে!!

    তাহলে বুঝা যাচ্ছে চীন-আমেরিকা আপোষ আলোচনা আগিয়ে নিবার জন্য অনেক প্রস্তুতি ও ফর্মুলা নিয়ে কাজ আগিয়ে রেখেছে। হা ঠিক তাই।  তবে “ভুল বুঝাবুঝি” সরানো বা সরিয়ে ফেলা একথা  বা এই keyword ধরেই যে আপোষটা হবে তা প্রায় স্পষ্ট। যেমন বাইডেন একাই বলেন নাই যে  “সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি” রয়েছে। পালটা এমনকি চীনও একই কথা বলেছে।  যেমন চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আমেরিকার উচিত হবে চীনের সাথে এক্সঙ্গে কাজ করা যাতে ভুল বুঝাবুঝি ও ভুল বিচার-মুল্যায়ন এড়ানো যায়।
    চীনা মুখপাত্র আরো বলেন, “চীন আমেরিকার সাথে শান্তিপুর্ণ সহ-অবস্থান বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও তাইওয়ান প্রশ্ন আসলে চীনাস্বার্থের কেন্দ্রে এটা মনে রাখতে হবে”।

    The United States should work together with China to avoid misunderstandings and misjudgments, a Chinese foreign ministry spokesman said on Thursday, when asked about reports of the meeting. For his part, U.S. President Joe Biden said on Wednesday he was not willing to make any fundamental concessions when he meets with counterpart Xi Jinping.
    China is committed to realize peaceful co-existence with the United States, but the Taiwan question is at the core of its interests, the spokesman, Zhao Lijian, said at a regular briefing in Beijing.

    আসলে, বাইডেন ও তাঁর ইউরোপীয় বন্ধুরা “সাদাবাদি” হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে গিয়ে উলটা নিজেরাই এখন এমন ছেড়াবেড়া অবস্থায় পড়েছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার পুতিনকে মানানোর জন্য তাদের হাতে এখন একটাই শেষ অস্ত্র। তা হল,  চীনকে ছাড় দিয়ে হলেও  কিছুটা পক্ষে টানা। যাতে সেই চীনকে দিয়ে ক্ষুব্ধ পুতিনকে তারা ঠান্ডা করতে সক্ষম হতে পারে। যা দিয়ে একটা নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক যেন গড়ে তোলা যায়।  এব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, পুতিন অবশ্যই চীনের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করতেও পারে। কিন্তু সেটা আগামি জানুয়ারির ১৫ তারিখের পরেই। যেন -৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ইউরোপ বসবাসের জন্য কেমন স্থান সেটা দিয়ে তাদেকে শিক্ষা দেয়া যাতে আর কখনও পরিণতি না বুঝে কেউ এদিকে যেন পা না বাড়ায়!!

    তাহলে শি-বাইডেন  এর হবু বৈঠকের উপর আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচনের কী কোন প্রভাব নাইঃ
    অবশ্যই আছে। এখন পরররযন্ত প্রকাশিত ফল অনুযায়ী বাইদেনের ডেমোক্রাট দল কংগ্রেস বা সংসদে হেরে গেছে। মানে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে সিনেট বা সংসদের উচ্চকক্ষে শেষ পর্যন্ত নিজ ডেমোক্রাট দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০-৪৯) এভাবে  ফিরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও একটা আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয় নাই এখনও। তবু সেই আসনের ফলাফল যেদিকেই যাক সিনেটে ডেমোক্রাটেরা সংখ্যাগরিষ্ঠায় থেকে যাবে। এই খবরটা শোনার পরে বাইডেনের প্রতিক্রিয়া যা ছিল সেখানেই বাইডেনের সব মনোভাব লুকিয়ে আছে। তিনি বলেছেন তিনি শক্তিশালী বাইডেন বলে অনুভব করছেন।   দেখেন মিডিয়া রিপোর্ট।
    প্রেসিডেন্ট বাইডেন রবিবার বলেন, মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্রাট দলের আশা করা হয় নাই [unexpected] এমন জয়ে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে বৈঠকে তাকে এক শক্তিশালী হয়ে বসতে [stronger position] সাহায্য করবে [US President Joe Biden said Sunday that the Democrats’ unexpected midterm election successes sent him into crunch talks with China’s Xi Jinping in a stronger position. আর ওদিকে প্রায় একই ভাষ্য নিয়ে ব্লুমবার্গের (Bloomberg) রিপোর্টে শিরোনাম হল, Biden Says Senate Victory Gives Him ‘Stronger’ Hand with Xi।  মানে টা হলে এই সিনেটে বিজয় নাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আলোচনায় বসতেন ঠিকই কিন্তু নিজের মনে প্রশ্ন থাকত যে তিনি তো আমেরিকান সংসদের উচ্চ বা নিম্নকক্ষের সমর্থহীন এক প্রেসিডেন্ট। ফলে ছোট মনে হত নিজেকে।  আর সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনের সংসদের কোন কক্ষেই যে তিনি বিজয়ী হতে পারছেন না এটা তিনি মেনেই নিয়েছিলেন।

    তাহলে কীসের ভিত্তিতে বাইডেনের দল গোহারা হারতে যাচ্ছেন এই জল্পনা গড়ে উঠেছিল? এর জবাব দিয়ে এক বিশেষণ রিপোর্ট করেছে রয়টার্স যার বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে প্রথম আলোতে। যার সারকথা হল, এই সমস্যাটা তৈরি করেছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প-ই। মধ্যবিত্ত ভোটারের ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব বা তার রাজনীতি ও কাজ পছন্দ করেন না। তাই যেসব প্রার্থী ট্রাম্পের বেছে নেয়া বা দেয়া বলে ভোটারেরা জেনেছেন তারাই প্রার্থীরাই আসলে হেরে গেছেন। অর্থাৎ রিপাবলিকান দলের পক্ষে জনস্রোত থাকলেও (যেটা বাইডেনও মেনে নিয়েছিলেন আমরা দেখতে পাচ্ছি) ব্যক্তি ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব সবকিছু উলটে দিয়েছেন। এর মানে হল আগামি ২০২৪ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান নমিনেশন পাবার ক্ষেত্রে এঘটনা এক শক্ত রেফারেন্স হয়ে বাদা হয়ে সামনে উঠে আসবে। যার অর্থ হল, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বা বাইডেন কেউ না, বরং  নয়া কোন প্রার্থিরই সম্ভবত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে দেখব আমরা। আর সেই সাথে সাদাবাদিদের আন্দোলন হতে পারে বলে যে আশঙ্কা আমেরিকায় উঠেছিল তা এখন অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে যাবে। সারকথায়, আমেরিকান মধ্যবিত্তের পছন্দই ট্রাম্পের উত্থান বা সাদাবাদি সুপ্রিমিস্টদের উত্থান ঠেকায় দেবার ক্ষমতা রাখে, সেই ইঙ্গিত-ই আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি!!

    শেষ কথাঃ  স্থানীয় বা বাংলাদেশ প্রসঙ্গ;  বাইডেন-শি এর আপোষ আলাপ আর তা থেকে  ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আসা মোটেও আর অসম্ভব নয়। সেটাই ফুটে উঠছে। আবার আমেরিকার মিড-টার্মের ফলাফল যা এসেছে তা আর যাই হোক এথেকে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রভাবিত হবার কোন সম্ভাবনাই নাই। সরকারবিরোধী আন্দোলন থেমে যাওয়ারও কোন সম্ভাবনা নাই। মানবাধিকার প্রশ্নে, যেমন গুম খুন অপহরণ বা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর থেমে যাওয়া বা পথ পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনাই নাই।   বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেলে সরকারের এই যুদ্ধের আড়ালে নিজের সরকার পরিচালনার ব্যার্থতা আড়ালের যে চেষ্টা আছে তা আরো উন্মোচিত হয়ে পড়তে পারে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী এখন শুরু হবে

     

    মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু

    গৌতম দাস
    ০৯ নভেম্বর ২০২২  মধ্যরাত ০১ঃ০০

    https://wp.me/p1sCvy-4iM

     

                                                                                    Russia news: Rattled Putin warns US ‘entering Ukraine

     

    মঙ্গলবার, আট নভেম্বর ২০২২। আমেরিকার ৮ নভেম্বর শুরু হবে আজ আমাদের মধ্যরাত থেকে। এরপরেই আমেরিকায় শুরু হবে তাদের মধ্যবর্তি নির্বাচন মানে, মিডটার্ম ইলেকশনের ভোটাভুটি। যদিও মিডটার্ম বলতে তা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চারবছরের মেয়াদের এতে প্রথম দুবছর বা মধ্যমেয়াদ[midterm] তিনি পার করলেন, এটাই বুঝায়। এই অর্থে তাই মিড [mid] বা মধ্য। কিন্তু এদিন যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটা হল আসলে ৪৩৫ আসনের কংগ্রেস (আমেরিকান সংসদ) এর সব আসনেরই নির্বাচন। শুধু তাই না এটা একই সাথে আমেরিকান সিনেট বা উচ্চকক্ষেরও নির্বাচনও বটে। তবে সেখানে মোট ১০০ আসনের সিনেটের কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হবে; মোটা দাগের হিসাবে এবার মাত্র ৩৫ আসনে নির্বাচন হবে।

    এখন এই ভোটের ফলাফল কেমন হতে পারেঃ
    ফলাফল নিয়ে আগাম-অনুমানি পোল-সার্ভে, তা বহু আগে থেকেই অনেকগুলোই পরিচালিত হয়ে আসছে। সেই নির্বাচনি সার্ভে থেকে প্রকাশিত অনুমিত-ফলাফল বলছে বাইডেনের ডেমোক্রাট দল গোহারা হেরে যাবে। অর্থাৎ কংগ্রেস ও সিনেট দুই কক্ষেই বাইডেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে।  আর এমন পরিণতি, তা মূলত বাইডেনের অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের কারণে; অন্যভাবে বললে আমেরিকান মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবনমান বা লিভিং স্টান্ডার্ডকে বাইডেন নিচে থেকে আরো নিচে নিয়ে ফেলেছেন সেকারণে। তবে এটা ছাড়াও দ্বিতীয় কারণ আছে যে, আমেরিকান ডলারের মান বা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে ফেডারল রিজার্ভের চেয়ারম্যান, তাঁর একশনে সুদের হার টানা ছয়বার লাগাতর বাড়িয়েও এতে লাগাম টানা যায় নাই। বরং সবমিলিয়ে আগামি বছর (২০২৩) একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা [recession] একেবারেই আসন্ন – ওয়ার্ডব্যাংক এনিয়ে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সরব!  ওদিকে আগে ট্রাম্পের শেষ আমলে তাঁর খামোখা জাতিবাদি জিদের বশে আরোপিত চীনা পণ্যের উপর যে বাড়তি শুল্ক (২৫% – ৬৬%)  আরোপ করা হয়েছিল বাইডেনও সেটা পলিসিই চালু রেখেছিলেন। আর এরই কার্যকর ধাক্কার ফল আসতে শুরু করেছিল বাইডেনের ক্ষমতার প্রথম ছয়মাস থেকেই লাগাতরভাবে।

    হাউজহোল্ড এপ্লায়েন্স [household appliance] – একথার মানে, আমেরিকান মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে কেনা যায় এমন – ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, কুকার-ওভান বা মাইক্রোওভান ধরণের পণ্য। যেগুলো, মূলত চীন থেকে আমেরিকায় আমদানিকৃত পণ্য হয়ে থাকে। আর এসবের উপরেই ট্রাম্প আমলে মূলত এই বাড়তি শুল্ক লাগু করা হয়েছিল। আর তা থেকে বাইডেন প্রশাসনের ততপরতা শুরু হতেই বিমুখ হয়ে যায় আমেরিকান সব-ধরণের মধ্যবিত্ত। অথচ ভোটের বাজারে যারা ভোট দিতে আসেন তাদের এক বড় অংশই মানে ‘কার্যকর’ ভোটার হল এই মধ্যবিত্তই। কারণ অনেকবছর থেকেই আমেরিকান নির্বাচনি ট্রেন্ড হল, অন্যশ্রেণী থেকে ভোট দিতে আসা লোকের সংখ্যা আরো অনেক কম হয়ে থাকে।

    ইন্ডিপেন্ডেন্ট  বা স্বাধীন প্রভাবমুক্ত এনালিস্টদের অনুমান বাইডেনের ডেমোক্রাট দল এবার রেকর্ড তৈরি করে হারবে। তাই সিনেট বা কংগ্রেস এদুই কক্ষের কোথাও তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকবে না। যার সোজা ফলাফল হবে বাইডেন অবশ্যই তার মেয়াদের বাকি দুবছরই বিনাবাধায় প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন; কোন প্রভাব পড়বে না। এমনকি আগের মতই প্রেসিডেন্টে হিসাবে তাঁর নির্বাহি ক্ষমতাবলে যেকোন আইনও জারি করে যেতে পারবেন। কিন্তু যেখানে বিলে অংশত বা পুরাটাই অর্থবিল থাকবে মানে যেসব আইনের মধ্যে কোন অর্থবরাদ্দ সংক্রান্ত অংশ আছে সেসব ক্ষেত্রে আইন পাস করতে চাইলে তা আগে ঐ অংশের জন্য  সিনেট এবং কংগ্রেস এদুই জায়গা থেকেই তা পাস করিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ সেগুলো আর পাস হতে হলে এখন রিপাবলিকানদের ইচ্ছা মুখাপেক্ষি হতে হবে বাইডেনকে। ফলে পাস না হবার সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন চাইলেই ইউক্রেন যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কিকে (তার সীমাহীন আকাঙ্খা মিটাতে) দেয়া বাইডেনের অর্থবরাদ্দ এবার রুদ্ধ হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

    অর্থাৎ অন্যদিক থেকে বললে, এতে ইউক্রেন যুদ্ধ এবার বন্ধ হবার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে। অর্থাৎ ইউক্রেনে অর্থ ঢেলে বাইডেনের এই যুদ্ধ চাঙ্গা রাখার যুগের এবার একটা পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। এভাবে সবদিক থেকেই সব ফ্যাক্টরগুলো এই অভিমুখেই সচল হচ্ছে।  যদিও এমনিতেই একদিকে যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের নিজস্ব অর্থনীতিক ততপরতা স্থবির অবস্থায় ফলে সেজন্য ঘাটতির মুখ্য অর্থ সরবরাহগুলো করতে হচ্ছে বাইডেনকে; অন্যদিকে যুদ্ধের ব্যয়বহণ ও বিশেষ বিশেষ অস্ত্র সরবরাহ – সেটাও বাইডেনকেই করতে হচ্ছে। কিন্তু তবু তাতে প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকির মুখের হা বন্ধ বা চাহিদা কম হচ্ছে না, উলটে তিনি প্রকাশ্যে বাইডেনের উপর সমালোচনা ঝাড়ছেন । তাই এনিয়ে প্রায় প্রকাশ্যে এসে পড়া বাইডেনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি।


    কেন বাইডেনের কাছে মিডটার্ম বা ৮ নভেম্বর গুরুত্বপুর্ণঃ
    প্রেসিডেন্ট বুশের শেষ জমানায় এবং  ওবামা জমানা (২০০৯-২০১৬) থেকেই আমেরিকার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যে দুনিয়ায় পালাবদল আসন্ন; অর্থাৎ গ্লোবাল নেতৃত্ব ক্রমশ  আমেরিকার হাত ছাড়া হয়ে চীনের হাতে যেতে নিয়েছে। ওবামার যুগে এনিয়ে তাঁর প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে বলা যায় অনেকটা “বড়-ভাইয়ের চাঁদা তোলার” মত। ওবামা বারবার চীনের কাছে দাবি করে নানান ব্যবসায়িক সুবিধা  বা ছাড় আদায় করে গেছিলেন। চীনও তা দিয়ে গেছিল, কো সংঘাত তখনই মুখোমুখি না করে এড়াতে পারলে নিজের জন্য ভাল হবে বিবেচনা থেকে। আর এদিকে, এশিয়ান পিভোট [Pivot to Asia] বলে হাল্কা চুলকানির মত একটা কিছু চীনবিরোধীদের জোট খাড়া করতে যা কল্পনা করেছিলেন তা বাস্তবে কোন পা ফেলতেই পারে নাই। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগ শুরু হয়। তিনিও প্রথম বছরটা (২০১৭) ওবামার চাঁদা তোলার মতই ‘হপ্তা’ আদায়ের পথেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে সরাসরি চীনবিরোধী তবে  তা আসলে এক আমেরিকান জাতিবাদি-অর্থনীতি কায়েম করতে এক পরিকল্পনা করেছেন মনে করে আদতে একটা ফ্যান্টাসি করেছিলেন। সেটারই এক পরিণতি ছিল যে আমেরিকায় চীনাপণ্যের উপর শাস্তিমূলক আমদানি শুল্ক বসানো। যেটা কার্যত লাগু হয়েছিল, সরকার-প্রশাসনের উপর নয়; বরং নাগরিক মধ্যবিত্ত অংশকেই ঐ বাড়তি শুল্ক যোগাতে হয়েছিল। যেটার প্রতিক্রিয়া পরিণতি এখন বাইডেন দেখবে।
    তবু এতে মূল সংকটটা এখানে নয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যদিয়ে  সুনির্দিষ্ট করে ১৯৮০ সাল থেকেই এক “গ্লোবালাইজেশন” – মানে এক পরিকল্পিত গ্লোবাল প্রডাকশন ও সাথে, এক্সচেঞ্জ [exchange] এরই গ্লোবাল বাজার বিনিময় ব্যবস্থা শুরু বা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হল,  “গ্লোবালাইজেশন” শব্দটা অনেকে অনেক অর্থে ব্যবহার করে থাকে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অর্থটার বাইরেও। সেটা সমস্যা হত না; কিন্তু তাদের সেই “গ্লোবালাইজেশন” ধারণাটা নেগেটিভ। তবে ১৯৮০ সালের পর থেকে খুবই দ্রুত গ্লোবাল প্রডাকশন, এক্সচেঞ্জ বাজার ব্যবস্থা খাড়া হতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশে এর প্রকাশটা কী ছিল এভাবে প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় আমাদের গার্মেন্টস (RMG) কারখানার দ্রুত বিস্তার লাভঃ “মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট” ইত্যাদিতে এটাই ছিল সেই গ্লোবাল ফেনোমেনার লোকাল প্রকাশ। তবে মূলত আমাদের সমাজের কোন অংশই পলিটিক্যালি এর তাতপর্য আমরা বুঝি নাই;  আমাদের সমাজের যারা অর্থনীতি-রাজনীতি বুঝার দিক থেকে ওস্তাদ-হাফেজ বলে  নিজেদের ইমেজ তৈরি করেছে সেই প্রগতিবাদি বামপন্থিরাও আসলে কিছুই বুঝে নাই। তাই ছিল তাদের চোখবন্ধ বিরোধিতা – নিপাত যাক!!  তবু তাদের অবস্থান ছিল “গ্লোবালাইজেশন” এক নেতিবাচক ফেনোমেনা; তাতে “গ্লোবালাইজেশন” জিনিষটাই মূলত কী তারা না বুঝলেও; তবে তাদের মত করে যেটুক আধাখেচড়া বুঝা তা ছিল খুবই নেগেটিভ। সম্ভবত এটাই কারণ কেন এখনও সমাজে “গ্লোবালাইজেশন” এর বুঝ  বলতে নেগেটিভ কিছু বুঝা হয়। যেটা কার্যত কিছুই না বুঝে ফেলে রেখে দেয়া।

    তবে একটা সিরিয়াস কারণ হল কমিউনিস্টরা যারা অর্থনীতি খুবই ভাল বুঝেন বলে মনে করেন, ক্যাপিটালিজমের সারপ্লাস ভ্যালু (surplus value) চুরি হয়ে যাওয়া  যেহেতু তারা বুঝেন বলে মনে করেন; যেটা তাদের শোষণ তত্বের ভিত্তি। ফলে তাদের ধারণা তারা অর্থনীতির বুঝ তাদের একচেটিয়া ও সবচেয়ে ভাল বুঝের লোক তারা। কিন্তু দুঃখের কথা হল, কার্যত ও প্রকৃত অর্থে (in reality) তারা আসলে এক জাতিবাদি-অর্থনীতির বুঝের অনুসারি। যার মৌলিক বৈশিষ্ট হল নিজ রাষ্ট্রসীমার বাইরে কোন পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য একতা ব্যবস্থা থাকা তাদের অনুমানে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়। কারণ,  নিজ কামাবো, নিজেই সবকিছু উতপাদন করব আর নিজেই খাবো বা ভোক্তা হব – তাই নিজ মুদ্রায় যতদুর বিনিময় বাণিজ্য হয় এর বাইরে যেমন কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আর দরকার কী? এই হল তাদের কোর ভাবনা! অর্থাৎ এরা মনে করে কার্ল মার্কসও যেন এক্সচেঞ্জ (exchange) প্রসঙ্গটা নিয়ে যত কথা খরচ করেছেন তা যেন কেবল একটা রাষ্ট্রের ভিতরের ব্যাপার। যেটা যেন আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোন পণ্য বিনিময় নয়। যদিও মার্কস শুধু পণ্য বিনিময় নয়,  বিনিময় বলতে  তিনি মানুষে মানুষের সবকিছুর বিনিময় বুঝাতে যে এক্সচেঞ্জ বিষয়টা নিয়ে এত পাতা খরচ করেছেন এই অর্থে যেন মার্কসের এক্সচেঞ্জ ধারণা যেন এটা একটা রাষ্ট্র বা জাতিসীমায় কাজ করে এমন একটা ধারণা!! তাই কী? আসলে ব্যবহারিক কমিউনিজমে সবচেয়ে অগুরুত্বপুর্ণ ধারনা হয়ে আছে এই  “এক্সচেঞ্জ”  ধারনা। আর জাতিবাদি-অর্থনীতির বুঝে মাত্রই সেই জায়গা যেখানে “এক্সচেঞ্জ”  ধারণাটার প্রায় গুরুত্ব নাই বললেই চলে।
    সম্ভবত একারণেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক গ্লোবাল বানিজ্য ব্যবস্থা যেটা দাঁড়িয়ে আছে তা কমিউনিস্টদের চোখে “নিপাত যাক” প্রতিষ্ঠান। আসলে না জানার সুবিধা অনেক!!! কোন প্রতিষ্ঠান সীমাবদ্ধতা বা কারও দিকে কান্নি মেরে থাকাটা আপনার চোখে বা বুঝে পরিস্কার থাকার মানেই এমন নয় যে আপনি ঐ প্রতিষ্ঠান নিপাত যাক বলতে পারেন। অথবা এমন বলাটা আপনার স্বার্থের পক্ষে যাবেই!!
    কাজেই গ্লোবালাইজেশন মানে গ্লোবালি পণ্যসহ সবকিছুর বিনিময়-বাণিজ্যের কল্পনা – সেটা মূলত স্তালিনসহ সব ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তায় একেবারেই অনুপস্থিত; এবং বলাই বাহুল্য এটাই স্বাভাবিক।  এই কারণেই সম্ভবত  গ্লোবাইলাইজেশন সম্পর্কে তাদের বুঝ নেতিবাচক ও অস্পষ্ট। অথচ দুনিয়া এখন শেয়ার্ড ভ্যালু এডেড (shared value added) প্রডাক্ট এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব দেশ তো বটেই সকলের তা ভোক্তা ও ব্যবহারকারি হবেন উতপাদন এমনই গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে উঠছে। চীনের নেতৃত্বে  RCEP (Regional Comprehensive Economic Partnership, RCEP)  যা মূলত আশিয়ান ও চীনের উদ্যোগে তেমনই এক নয়া জোট। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয়  ফেনোমেনা হল,  এই জোটে অষ্ট্রেলিয়া ও জাপানও এর অংশীদার পার্টনার হয়ে ঢুকে গেছে। অথচ এরা তো আমেরিকান ইন্দো-প্যাসেফিক বা কোয়াডের (QUAD) সদস্য।  যাই হোক, আমাদের মূল প্রসঙ্গে মনোযোগী হই।
    তাই এসব আসলেই বিস্ময়কর যে কেবল রাষ্ট্রসীমার মধ্যে কার্যকর থাকা কোন অর্থনৈতিক ধারণা-চিন্তা এমন চিন্তা কী একটা  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বা গ্লোবালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-বিনিময় ব্যবস্থাকে কী ব্যাখ্যা করতে পারে? কিভাবে?

    গ্লোবালাইজেশন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পঃ
    আশির দশকে গ্লোবালাইজেশন চালু হয়েছিল মূলত আমেরিকান উদ্যোগে। অথচ সেই আমেরিকার এক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই এবার ২০১৮ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি আমেরিকাকে ফিরে এক জাতিবাদি-অর্থনীতিতে নিয়ে যাবেন। বলা যায় তার মূল উদ্দেশ্য চীনের হাতে গ্লোবাল নেতৃত্বে হারানোর বদলে যেন  – তাইলে যুদ্ধেই যাব না যেন এমন এক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প।  তবে চীনের কাছে হার এড়ানোর এই ফ্যান্টাসি – এক জাতিবাদি-অর্থনীতির দিকে চলে যাবার হুঙ্কার এটা কেবল আমরা ট্রাম্পের বেলায়ই দেখিনি। প্রেসিডেন্ট বাইডেন এর মধ্যে তা আছে, কিন্তু অন্যভাবে।  যেমন ট্রাম্প শুধু অর্থনৈতিক অর্থেই জাতিবাদি হতে যান তাই নন। তিনি রাজনৈতিক অর্থেই জাতিবাদি হতে চান। এটাই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white Supremist] (সাদাবাদি, ককেশীয় উগ্র জাতিবাদি আরেক হিটলারিজম) মুভমেন্ট।  বাইডেন প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি। এর আগেই আমেরিকান প্রথা্তমোতাবেক – জয়েন্ট কংগ্রেস  (সিনেট ও কংগ্রেসের একসাথে) জয়েন্ট সেশন সম্মেলন হয় ৬ জানুয়ারি ২০২১। আর এদিনই ঐ “মুভমেন্টের” সমথর্কেরা মিছিল করে গিয়ে বাইডেনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পক্ষে সংহতি জানিয়ে ঐ কংগ্রেস হলই সারাটা দখল করে বসেছিলেন, আমরা দেখেছিলেচিলাম মিডিয়ায়। সাদাবাদিদের মূল কথা হল, বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই তাদের সব দুঃখের কারণ। এভাবে চামড়ার কথা তোলা মানে, আরেক এথনিক জনগোষ্ঠিকে ঘৃণা করা; ঘৃণা ছড়ানো নিচা দেখানো আর নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবা ইত্যাদি এসবই হিটলারিজম – এথনিক ঘৃণা ছড়ানো চরমতম ক্ষতিকর এক জাতবাদ। তাদের ভাষ্য হল, বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই পশ্চিমাদেশে ছড়িয়ে পড়ে সাদাদের কাজ চাকরি ছোট ব্যবসারইত্যাদির সব সুযোগ সুবিধা সব খেয়ে ফেলছে। এই বয়ান ভিত্তিহীন যদিও। কারণ সাদারা আমাদের কলোনি দখল ও লুটেরা শাসন করেছিল। অনেক পরে সেই সুত্রেই কেবল সস্তা শ্রমিকের লোভে ব্যবসা ভাল চলার সময় সাদারা বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেদের তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছিল।  কাজেই এখন তাদের অর্থনীতি খারাপ বলে,   তাই বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই সাদাদের দেশ থেকে বের করে দিতে হবে এটা কোন সাফাই হল না!! হতে পারে না।। অর্থাৎ চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় আজ ক্রমশ আমেরিকার অর্থনীতিতে সারপ্লাস সঞ্চয় (যা ফিরে পন্য-পুজির বিনিয়োগ ক্ষমতা হয়ে এতদিন হাজির হয়ে আসছিল ) আগের তুলনায় তা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই খারাপ সময়ে বহু পেশা বা কাজকে ঢেলে সাজানোর দরকার পড়ছে; এটাই এসব শ্রেণীর জন্য চীনবিরোধী হয়ে উঠা। আর আজ ব্যাপারটাকে তাদের নেতারা দেখে যে,  গত প্রায় ছয়শ বছর ধরে এই সাদা ককেশীরাই দুনিয়াকে কলোনি দখল ও শেষে আমেরিকান নেতৃত্বে শাসন ও শাসক হয়ে থেকেছে। কিন্তু আজ আর সেটা আর বজায় রাখতে পারছে না। কারণ, আজকের চীনা উত্থানের প্রথম অর্থ- তাতপর্য হল সেই সাদা সাম্রাজ্যের পতন।  এজন্যই তারা  হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট  মুভমেন্ট শুরু করেছিল   ট্রাম্প-কে মাথায় উপরে  উঠিয়ে রেখে যদিও সেটা  ট্রাম্পের অধীনেই এক এলায়েন্স গড়ে নিয়ে।

    মজার কথাটা হল, বাইডেনও আসলে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট  মুভমেন্ট – এর মধ্যেই সমাধান দেখেন। যদিও ট্রাম্পের থেকে তার অনেক জায়গায় তফাত আছে। যেমন ট্রাম্প জাতিবাদি-অর্থনীতির দিকে এক অলীক চিন্তা নিয়ে এক ফ্যান্টাসি করতে চান। কিন্তু এখানে বাইডেনের চিন্তাটা হল, চীনের উত্থান ঠেকাতে সারা ইউরোপকে সাথে জোট গড়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ানো। সেখানে ঐ ঐক্যবদ্ধতা হতে হবে আসলে সাদাবাদের ভিত্তিতে; ছয়শ বছর ধরে চলে আসা দুনিয়াকে যে সাদা ককেশীরাই এতদিন শাসন করে আসছে, ফলে তাকে এখন হারতে না দেয়া। দরকার হলে চীন-রাশিয়াকে একঘরে করে নিজেদের এক আলাদা জগত নির্মাণ করতেও তারা রাজি; এবং তা গ্লোবাল অর্থনীতির একটা ভগ্নাংশ হলেও সাদাদের নেতৃত্বে বাকি যারা আসে কেবল তাদের নিয়ে এক ভগ্ন-গ্লোবাল অর্থনীতি করে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হবে। মূলত ক্ষমতায় আসার আগে  থেকেই এটাই বাইডেনের মূল পরিকল্পনা।
    এই লক্ষ্যে তার হাতিয়ার রাষ্ট্র বা বলি হয়ে যাওয়ার মত রাষ্ট্রটাই হল ইউক্রেন। শুরুটা হবে ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্ধুক রেখে রাশিয়াকে একঘরে করার উদ্যোগ নিয়ে। আর এতে চীন রাশিয়ার সমর্থনে এসে দাড়ালেই বাইডেন নিজ পরিকল্পনা মাফিক আগিয়ে যেতে পারবেন; এই ছিল অনুমান। কিন্তু হায়, বাইডেনের শাসনের আরো দুবছর বাকি থাকতেই, প্রথম দুবছরের মধ্যেই বাইডেন এখন হার স্বীকার করে পিছু হতে যেন উদ্যত তা দেখা যাচ্ছে। আলামত হল, বাইডেন পিছু হটতে একেবারে রেডি হচ্ছেন।

    ইতোমধ্যেই জর্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শুলৎজ [Olaf Scholz] এর চীনা সফর ছিল এর বড় ইঙ্গিত। তিনি এমাসেই ৪ নভেম্বর গত শুক্রবার চীনে গেছিলেন আর তার দাবি তিনি জি৭ ব্লক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছেন। জি৭ (G7 Group) যা আসলে এক পশ্চিমা এককালের ধনীরাষ্ট্র জোট যা জাপানকে সাথে নিয়ে থাকলেও কার্যত তা এখন সাদা ককেশীয় জোট হয়ে গেছে। চ্যান্সেলরের  সার-প্রস্তাব হল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা। আর সেকাজে তিনি চান চীন একটু রাশিয়া থেকে দুরত্ব- নিরেপেক্ষতা তৈরি করুক যাতে জি৭ – চীনের মাধ্যমে (পাগলা ও ক্ষিপ্ত পুতিনকে ঠান্ডা করতে) একসাথে কাজ করতে পারে। যদিও রয়টার্স লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি যদিও তাদের দুজনের সাক্ষাতে প্রতিউত্তরে – রাশিয়ার কোন সমালোচনা করেন নাই; অথবা রাশিয়ান সেনা প্রত্যাহার নিয়েও কোন মন্তব্য করেন নাই [……though he refrained from criticising Russia or calling on Moscow to withdraw its troops.]। তার মানে শুলৎজ এর এটা ছিল মিডিয়া প্রপাগান্ডা নিবার জন্য কাভারেজ।

    এখানে এনিয়ে এক এক করে  দুইটা রয়টার্সের নিউজ আগ্রহিরা দেখে নিতে পারেন।  একই সাথে এনিয়ে বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর ঘোষণা নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টও সাথে পাবেন। তিনি বলছেন যার খবরের শিরোনামঃ “জি৭ এখন পরিস্কার যে চীনের সাথে তাদের সমন্বয়-সমঝোতা করতে হবে এটা বুঝে গেছে” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China। 

    মজার কথা হল এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দেয়া চীনকে একঘরে করার বক্তব্যের বিপরীত।  শুধু তাই না ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইতোমধ্যে আমেরিকা ইউক্রেন সরকারকে পরামর্শমূলক বার্তা পাঠিয়েছে। এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]।

    ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে করুণ অবস্থান নেয়া মিডিয়া হল আজ-জাজিরা। আল-জাজিরা ২০০৫ সালে জন্মের সময় থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে একে ফলো করি। এটা অকল্পনীয় যে সে এই যুদ্ধে এক আমেরিকান পাপেট মিডিয়া হয়ে যাবে। যেমন রয়টার্স সেও তো এক পশ্চিমের সংবাদ সংস্থাই, তাই না। অথচ নিরপেক্ষ এবং জার্নালিজম বলতে যা হওয়া উচিত সেটাই রয়টার্স হয়ে থেকেছে। কিন্তু আলজাজিরার অবস্থা খুবই দুঃখজনক  ও করুণ। সেই আলজাজিরা এবার ইউক্রেন যুদ্ধকে রিপোর্ট করতে গিয়ে যেন ত্যার কাজ হল আমেরিকা বা পশ্চিমের করার ঠিকা পেয়েছে। যেন আল-জাজিরা এক ঠিকাদারের নাই যে আর “জার্নালিজম” করে না। অথচ এই প্রথম তারা পশ্চিম থেকে দুরত্ব তৈরি করতে চাইছে। তাদের রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে As inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!

    কেন আগামি শীতে কীঃ
    আপাতত বাইডেনের সব পরিকল্পনা ফেল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে নিয়েছে। সেটা যে কারণে তা হল সারা ইউরোপই আসলে জ্বালানির প্রশ্নে মারাত্মকভাবে রাশিয়ান তেল-গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। বলা যায় ইউরোপ আসলে কার্যত রাশিয়ান জ্বালানির নির্ভর এক অর্থব্যবস্থা। এমন সবচেয়ে প্রভাবশালী ও কঠিন সত্যিটাই  আসলে বাইডেন এতদিন অস্বীকার করেছেন, তারমত করে নেয়া সাদা শ্রষ্ঠত্ববাদি কেন্দ্রিক এক পরিকল্পনায়। তিনি ভেবেছিলেন আমেরিকার ইউরোপের সাথে সাদা ককেশীয় ঐক্য আর সমস্বার্থ দিয়েই তিনি ইউরোপের  জ্বালানির নির্ভরতা-সহ সব বাধা পার হয়ে যেতে পারবেন। অথচ এটা ছিল চরমতম আবেগী কথা। হয়ত আবেগী বলেই তা ককেশীয় জাতিবাদি সুরসুরিতে  তারা জেগে উঠতে চাইছে সেটা জ্ঞাত থাকা ইউরোপকেও বাইডেনের মিথ্যা পরিকল্পনার পক্ষে থাকতে আগ্রহি করেও তুলেছিল। আর এই অবাস্তব দগদ্গে জাতিগত-আবেগেই পশ্চিমের মৃত্য ও পতনের কারণ হবে সম্ভবত!

    তাহলে বাইডেনের পশ্চাদ অপসারণ, পুতিনকে রাজি করানো কী সম্ভব হবে?
    তাতক্ষণিক জবাব হল, অবশ্যই না। পুতিন রাজি হবেন না। কিন্তু কতদিন ও কেন?

    পুতিন মোটা দাগে বললে,  জানুয়ারির ১৫ তারিখের আগে কিছুই থামাবেন না। কেন?

    সাধারণত ইউরোপের ক্ষেত্র গড় হিসাবে বললে, ১৫ ডিসেম্বর-১৫ জানুয়ারিতে অঞ্চলের তাপমাত্রা চরমে উঠে, সেটা মাইনাস ৪০ ডিগ্রির দিকেও চলে যায়। কাজেই বলাই বাহুল্য জ্বালানিহীন ঘর গরম রাখার ব্যবস্থাহীন ঘরবাড়ি  – এই ইউরোপের ইউরোপিয়ানেরা দেশ ছাড়বেন। বিশেষত কিয়েভবাসীরা [Kiev] তাদের দেশঘর ছেড়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে ছুটবে। তখন পুতিন ইউরোপকে  এক পরীক্ষায় ফেলে দিতে চান। এটা দেখাতে যে তারা কেউই আসলে ইউক্রেনকে পছন্দই করেন না। তাই এই শীতে তারা মাইগ্রেট করতে ইউরোপের পড়শি বাকি দেশে ঢুকতে চাইলেও পারবেন না। প্রথমত তারা মাইগ্রেসনের জন্য উপযুক্ত ভিসা অনুমতি অন্তত সীমিত করে দিবে। ইতোমধ্যেই যা শুরু হয়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যেই কিয়েভ-কে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলা হয়েছে। কারণ, রাশিয়ান বোমায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র  (৩০%) অচল হয়ে অন্ধকার হয়ে গেছে। ইউক্রেনের বাইরের ইউরোপ যে ইউক্রেনের সাথে নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে অভিনয় করে গেছে –  এই করুণ দৃশ্য সবার সামনে উন্মোচন করে না দিয়ে পুতিন যুদ্ধ থামাতে চান না। যদিও যুদ্ধ তিনি থামাবেন অবশ্যই তবে এর পরে।

    ওদিকে জাপানসহ  জি৭ গোষ্ঠি  চীনের কাছে আবেদনে যে যুক্তি তুলে ধরেছে তা হল, গ্লোবাল মহামন্দা ধেয়ে আসছে। যেটা অনেক আগে থেকেই বিশ্বব্যাংকের ফোরকাস্ট যে ২০২৩ সাল মহামন্দার বছর হবে। বহু দেশেরই খাদ্য যোগাড়ের অবস্থাই থাকবে না। আর ইতোমধ্যে ৯% এর আশেপাশে উঠে যাওয়া মুদ্রাস্ফীতি সহসাই কমছে না। বরং আসন্ন মহামন্দাটাই হয়ত  মুদ্রাস্ফীতি কমার একমাত্র উপায় হয়ে হাজির হবে!! কাজেই তা ঠেকাতে বা প্রভাব কমাতে, চীনসহ রাষ্ট্রগুলো একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিবার আবেদন করতে চাইছেন তারা।

    কথা সত্য অবশ্যই। তবে আসলে এই উছিলাতেই বাইডেন তাঁর ব্যর্থতার দায় আড়াল ও হাল্কা  করার সুযোগ নিতে চান। কারণ গত ছয় মাস ধরেই তো এটা সবার জানাই যাচ্ছিল যে এসব বিপদ দুনিয়াতে আসন্ন; তাহলে এখন এত দেরিতে একশন কেন? কারণ ৮ নভেম্বর মিডটার্ম! মিডটার্মের নির্বাচনে মানে এর ফলাফলে যেন বাইডেনের ব্যর্থতা যেন নয়া চাপ না হয়ে যায় – এই ছিল বাইডেনের সংকীর্ণ বিবেচনা।  কাজেই আটই নভেম্বরের পর থেকে বাইডেন এখন পুরাপুরি রিভিউ এর মুডে মানে গত দুবছর যে সব পলিসির মুডে ছিলেন সেসবেরই পুনঃ মুল্যায়ন  চলে যাবেন তিনি, বা ইতোমধ্যেই গেছেন। এসব কারণের ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এতিম হয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • পাকিস্তান সেনাবাহিনী জনগণের মুখোমুখি 

    পাকিস্তান সেনাবাহিনী জনগণের মুখোমুখি

    গৌতম দাস

    ০৭ নভেম্বর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4hH

     

              COAS General Bajwa approached US after taking authorisation from PM Shahbaz Sharif

    [সারকথাঃ  একটা মনার্কি (monarchy) বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে যেকোন রিপাবলিক রাষ্ট্র; এর ক্ষমতার একমাত্র উতস হল জনগণ। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা-আকাঙ্খাই হল রাষ্ট্রক্ষমতার উতস! তাই, এমন রাষ্ট্র মাত্রই ওর যেকোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আর সাথে এর নির্বাহি ক্ষমতার প্রশাসন বা বিচার বিভাগ বা সেনা প্রতিষ্ঠান সকলেই তাদের সকল নির্বাহী ক্ষমতা অবশ্যই সেই গণক্ষমতার অধীন। এই বিচারে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকেও জনগণের ক্ষমতার অধীনস্ততা মানতেই হবে। জনগণের কাছে,  গণক্ষমতার কাছে জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততায় থেকে কাজ করতেই হবে। কিন্তু বর্তমান পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেনাকর্তারা যেন মনে করতে চান যে তাদের কোন সদস্য বা জেনারেলের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সিভিল আদালতে মামলা করা যাবে না।
    এটা সত্যি যে সেনাসদস্যরা দেশ সুরক্ষা করার কাজে (যেমন কোন বিদেশি মানুষ খুনের মত) কোন অপরাধ করে বসলে যেটা সিভিল আইন আদালতের চোখে  ক্রিমিনাল অপরাধ হলেও এর জন্য তাদের কোন সদস্যের বিচার সিভিল আদালতে হবে না। এধরণের পেশাগত অপরাধের ক্ষেত্রে মনে করা হয় এমন বিষয়াদি সেনাদের “নিজস্ব কোর্ট মার্শাল” এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আইন-অপরাধগত দিক পরীক্ষা করে দেখা হবে।  কিন্তু সাবধান এর মানে এই নয় যে সেনাসদস্যদের যেকোন অপরাধ দেশের প্রচলিত আইন-আদালতের উর্ধে ।  কোন সেনাসদস্য যদি কোন সিভিলিয়ান যেমন কোন রাজনীতিবিদকে খুন করে সেক্ষেত্রে কী তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ সিভিল প্রসাশন ও বিচার বিভাগের কাছে চাওয়া যাবে না! তাদের জন্য কী পুলিশ আদালত সব মাফ – এসব সিভিল প্রতিষ্ঠানগুলো সেনা সদস্যদের কোন সিভিল নাগরিকের বিরুদ্ধে করা অপরাধ আমল করতে পারবে না? সেনারা কী সবধরণের আইন-আদালতের উর্ধে???? এটা হতে পারে না।
    বর্তমান সেনাপ্রধান ও সেনাগোয়েন্দা (ISI) প্রধান নিজেদেরকে এমন সবকিছুর উর্ধে গণ্য করে ধমকিয়ে চলতে চাইছেন। এটা অগ্রহণযোগ্য; তারা কোন স্বয়ম্ভু ক্ষমতার অধিকারী নন। তারা এক মুহুর্তের জন্যও ভুলে যেতে পারেন না যে  রাষ্ট্র এর ক্ষমতার একমাত্র উতস জনগণ।  ফলে শেষ বিচারে কোন না কোন জনপ্রতিনিধি বা জনপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততায় থেকে কাজ করতেই হবে। জেনারেলদের এমন অনুমান যে তারা গণক্ষমতার উর্ধে, এই অনুমানে আচরণ – আর সেখান থেকেই সব সংকট এবং তা এক গভীর সংকট পাকিস্তানের আকাশে অন্ধকার হয়ে নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে। ]

    ঘটনা সংক্ষেপ হলঃ
    পাকিস্তানের অন্যতম রাজনৈতিক দল ইমরান খানের পিটিআই দলের এক রাজনৈতিক কর্মসুচীতে মিছিলের উপরে আততায়ীর বড় রাইফেলসহ গোলাগুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে।  এতে অন্তত একজন কর্মী নিহত হয়েছে সাথে সাতজন আহত। আর মুল লক্ষ্যবস্তু ছিল খোদ ইমরান খান। তাঁর উপর ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তাঁর পায়ে লেগেছে। তাও লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কারণ এক পিটিআই কর্মী সময়মত পিস্তলের উপর থাবা দিয়ে ওর অভিমুখ বদলে দিয়েছিল – এর ভিডিও এখন দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে। এদিকে এটা রুটিন যে  প্রত্যেক গোলাগুলি ও খুনের ক্রিমিনাল ঘটনা পরবর্তিতে যে মামলা হয় (FIR)  তাতে ক্ষতিগ্রস্থ ও ভিকটিমেরা তাদের সন্দেহ যাদের উপর তাদের নাম উল্লেখ করে থাকে।  আততায়ীর এই জানের উপর হামলা থেকে বেচে যাওয়া ইমরান খান তিনজনকে মূল সন্দেহভাজন বলে চিহ্নিত করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এই বন্দুক হামলার পেছনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফয়সাল দায়ী” ।  এটা যেকোন মামলায় সাধারণ প্রাকটিস যে ভিকটিমদের দেয়া সন্দেহভাজনদের নাম এফআইআরে লেখা হয়। আর এফআইআর মানেই প্রমাণিত অপরাধী নয়। ভিকটিমের সন্দেহ মাত্র। যা পরে ইনভেস্টিগেশনে পরিস্কার হবে ও এনিয়ে পরে বিচার শুরু হবে। অথচ সেনাপ্রধান ও সেনাগোয়েন্দা (ISI) প্রধান প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে  নানান ন্যাস্টি চাপ সৃষ্ট করে যাচ্ছেন যেন ঐ  এফআইআর গৃহিত না হয়। যেন সেনাবাহিনী সবকিছুর উর্ধে – তারা পাবলিকের জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততাতেও নয়। রাষ্ট্র সরকার প্রশাসন কিছুই তাদের উপরে কার্যকর নয়।  এই মনোভাব একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
    উলটা করে বললে যেন সেনাসদস্যরা কেবল নিজেরা নিজেদের পরিচালিত কোর্ট মার্শালের অধীনে আর কোর্ট মার্শাল হয়ত সেনা প্রধানের অধীনে হলেও খোদ সেনাপ্রধান যেন নিজে আর কোন জনপ্রতিনিধির অধীনে নয়!!!
    প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে এই প্রথম পাকিস্তানের আম-পাবলিক সেনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলে গেছে। এখানে এই টুইটারে দেখা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ পাবলিক কিভাবে এক পাকিস্তানি ট্যাংকের উপরে উঠে তাঁর ক্ষোভপ্রকাশ করছে। বলাই বাহুল্য এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইমেজ কোথায় নেমেছে সেই খারাপ ইঙ্গিতও ফুটে উঠেছে। অথচ সেনাকর্তাদের মধ্যে এই গণবিচ্ছিন্নতার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন এর কোন প্রমাণ দেখা যায় নাই!

    ঘটনা বিস্তারেঃ
    পাকিস্তানের রাজনীতি আবার চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কার্যত এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্লোবাল চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বের এক  লোকাল তবে নোংরা নাট্যমঞ্চ। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কেলেংকারির ঘটনাটা হল, পাকিস্তান আর্মি যেভাবে মরিয়া হয়ে নিজেকে ন্যাংটা করে মেলে ধরেছে। অনেকে বলেন পাকিস্তানের আর্মি হল, উপরে আল্লাহ’র পরেই যার স্থান। পরিণতিতে এবার এই প্রথম দেখা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ পাকিস্তানি জনগণ নিজ আর্মির গাড়ি ভাংচুর করেছে, লাথি মেরেছে। যা কোনভাবেই কোন ভাল ঘটনা নয়! অর্থাৎ অন্যভাবে বললে, পাকিস্তানের আর্মির উপর  আমেরিকান চাপ ও তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার পক্ষে খেদমতে নামতে গিয়ে জেনারেল বাজওয়া ও অন্য জেনারেলেরা আবার গণবিরোধী অবস্থান  নিয়েছেন। গণ-ইচ্ছাকে পায়ে দলে আমেরিকান ইচ্ছার সাথে শাহবাজ ও জেনারেলদের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া শাসকদের ইচ্ছা মাখিয়ে নিয়ে এক দাগী-আসামির মত দাগী-ক্ষমতা [despotic power] হয়ে জনগণের উপর চড়াও হয়েছে।

    পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকে এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে “সেনাবাহিনী” নামে ডাকার রেওয়াজ নাই। খোদ সরকার বা বিরোধীদল একে স্টাবলিসমেন্ট (প্রতিষ্ঠান) বা ইন্সটিটিউশন বলে ডাকে ও এসব শব্দ ব্যবহার করে মিডিয়ায় সেনাবাহিনী শব্দটা বুঝানো ও লেখা হয়। যেন এটা একটা non-person তবে একটা প্রতিষ্ঠান মাত্র।   এতদিন এভাবেই সেনাবাহিনী ভয় উতপাদন করে চললেও মানুষজন এনিয়ে আর ঘাটাত না। কিন্তু এবার সেই সীমাটাও খোদ জেনারেল বাজওয়া এন্ড গং বিশেষ করে, তাদের সেনাগোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আইএসআই [ISI] নিজেই ভেঙ্গে দিল।

    আমাদের মত দেশে সব সেনাগোয়েন্দা সংস্থা কেন্দ্রিক এক কমন প্রবলেম হল যেখানে প্রতিষ্ঠানটার ঘোষিত কাজ হল রাষ্ট্রকে বাইরের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার পক্ষে কাজ করা আর এজন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, তা বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে তা ব্যবহার করা। মূলকথা এর কাজ বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে ততপরতা। মানে ধরে নেয়া আছে দেশের ভিতরের আপন জনগণ অবশ্যই কোন রাষ্ট্র-শত্রু নয় বরং আভ্যন্তরীণ জনগণ শত্রু হবে কেন?  তা হওয়ার কারণ থাকতে পারে না। তবে দেশের ভিতরে অপরাধী থাকতে পারে যাদেরকে সামলানোর জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে  আভ্যন্তরীণ নানা বাহিনীর পুলিশ প্রশাসন আছেই।
    কিন্তু না এই আদর্শ ধারণা বা কেমন হওয়া উচিত ধারণা আমাদের ম৫ত দেশে থাকে না। দেখা যায় সেনাগোয়েন্দা সংস্থা আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ঢুকে পরে আর আভ্যন্তরীণ সমাজও তার কাজের ক্ষেত্র; এমন মনে করতে শুরু করে থাকে। আর একাজে সাধারণত এই সমস্যাটা তৈরি করে থাকেন ক্ষমতার প্রধান নির্বাহি হিসাবে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট যেই থাকেন তিনি। কারণ তিনি দেশে তাঁর সরকারের রাজনৈতিকবিরোধীকে খোদ দেশেরই বিরোধী যেন এভাবে  তারা  রাষ্ট্রবিরোধী বলে চালিয়ে দিতে চান। এখান থেকেই সব সমস্যার শুরু হয়। সব স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের জন্ম হয় এখান থেকে।  অথচ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক-বিরোধীতা তা কোনভাবেই রাষ্ট্রবিরোধীতা নয়।
    আইএস এর ততপরতার যুগে সেনাগোয়েন্দা সংস্থা বড়জোর আভ্যন্তরীণ সিভিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে নিজ সংগৃহিত তথ্য শেয়ার করতে পারে, ব্রিজ-রিলেশন বা সমন্বয় করতে পারে।  কিন্তু সেই তথ্য সিভিল গোয়েন্দারা কিভাবে সিভিল জবাবদিহিতার সাথে ব্যবহার করবে এটা তাদের হাতেই ছেড়ে রাখতে  হবে। কিন্তু  সেনাগোয়েন্দা সংস্থা এখানে সিভিল নাগরিকদের সমাজেও ততপর থাকতে চায়। আর এখান থেকেই সমস্যা কঠিন ও জটিলতর সমস্যা হয়ে যায় যেটা তো হবেই; এতে প্রশাসনিক কাঠামো আর আইন ও বিধি (বিজনেস রুল) নির্ভর থাকবে না। ব্যক্তিইচ্ছা নির্ভর অপেশাদারিত্বে সব ভরে উঠবে।

    এই কমন সমস্যা আমাদের মত দেশগুলোতে কমবেশি সকল দেশেই বর্তমান। মূল সংকটটা হল, সিভিল প্রশাসনের অধীনের পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার জবাবদিহিতা আলাদা হলেও আইডিয়ালি বা কি এর হওয়া উচিত এই অর্থে বললে, সিভিল জবাবদিহিতার ভিত্তি হল কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক অধিকার রক্ষামুখি হয়ে ততপরতা ও তা মান্য করা এবং এই মান্যতায় এরা চলতে বাধ্য। অথচ সেনাগোয়েন্দা সংস্থার কাঠামো এমন নয়। কারণ তাদের প্রকৃত “ডিল করার সাবজেক্ট” তো আভ্যন্তরীণ জনগণই নয়; বরং দেশের বাইরের শত্রু। তাই উলটা বরং তাদের আভ্যন্তরীণ জনগণকে নিয়ে টানা-হেচড়া করাটাই অপরাধ। এটা তার নো গো [no go] এরিয়া। অথচ এই নো গো এরিয়াতে গিয়েই বারবার সেনাগোয়েন্দা সংস্থা ক্ষমতা অপব্যবহার করে আর হোঁচট খায়।

    পুরান তর্ক রাজনীতিতে সেনাবাহিনীঃ
    এই প্রসঙ্গটাকে অনেকে সামরিক শাসন অবৈধ আর বেসামরিক হলেই তা বৈধ – এমনই এক সামরিক-বেসামরিক তত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করত আমরা দেখেছি। যেমন শেখ মুজিবের বাকশাল ঘোষণা – তিনি নিজেই  আগে প্রধানমন্ত্রী থেকে পরে আপনাতেই এক প্রেসিডেন্ট হওয়াটাকে বৈধ বলা হয়েছিল; কারণ নাকি তিনি সিভিলিয়ান। আর ওদিকে ১৫ আগষ্টের ১৯৭৫ সালের পর থেকে যত সামরিক শাসন কায়েম সব অবৈধ – এই তত্বের জনক ছিল প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান। তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা যাচ্ছে এনিয়ে প্রবক্তাও এখন কম। যদিও রাষ্ট্র নিয়ে সিরিয়াস আলোচনার মুরোদ না থাকাতেই এধরণের নিম্নমানের আলোচনা চালু হয়েছিল। আসলে  রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ কিভাবে বিচার করতে হয় কেমন করে এই বোধের মারাত্মক অভাব। বলা যায় এক শুন্যতা বিরাজ করে এখানে। যেমন কনষ্টুটিউশনে সংশোধনী এনে বাকশাল ঘোষণা করে দেওয়াতে মূল যে অঙ্গ-হানি যা করা হয়েছিল সেটা হল, আগের কনষ্টিটিউশনে দেয়া থাকা নাগরিকের রিট করার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল বাকশাল সংশোধনী ঘোষণাতে। সাথে আদালতেরও মানে বিচারকদেরও নাগরিকের রিট আবেদন শোনার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আর নাগরিকের রিট করার অধিকার না থাকা মানে কার্যত সেটা আর কোন রাষ্ট্রই থাকে না। কারণ তাতে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আগে তা আইনতই আর কার্যকর না থাকা।  যার সোজা মানে ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রগঠন ও কনষ্টিটিউশনের সমাপ্তি টেনে দেওয়া হয়েছিল ঐ বাকশাল সংশোধনী এনে। অথচ বাকশাল –সমর্থকেরা আজও গলাবাজি করে। আর সমস্ত ক্ষোভ গিয়ে উগড়ে দেয় সেনাবাহিনীর উপর। যেন সেনাবাহিনীই বাকশাল কায়েম করেছিল। তবে লক্ষণীয় যে ২০০৭ সালের সেনাশাসনের সুবিধাভোগী বর্তমান সরকার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখন সেনাবাহিনী নিয়ে একেবারে চুপ হয়ে গেছে।

    তাহলে আমাদের মত দেশে সেনাশাসন ঘটার মূল কর্তা কে?
    এককথায় এর উত্তর আমেরিকা; যেটা মূলত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন। ইউজুয়ালি  এবং এখনো আমেরিকা সেনাশাসনের প্রধান পৃষ্টপোষক!  গ্লোবাল রাজনীতিতে সেকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর একালে চীনের বিপরীতে আমাদের মত দেশে প্রভাব-বিস্তারের ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য সহজ পথ এটা। তবে একটা মজার উদাহরণ হল, পাকিস্তানে ১৯৯৯ সালে জেনারেল মোশাররফের ক্ষমতা দখল। সেটাই প্রথম আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাকিস্তানে সেনা ক্ষমতাদখল। যদিও এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য দায়ী ততকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যার আসকারায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সেনা বিভাজনের নীতি-পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঘটেছিল সেই ক্ষমতা দখল। তবে  ২০০১ সালের নাইন ইলেভেনে টুইনটাওয়ার হামলার পরে আমেরিকা আগের মতই সেনাশাসনকে আপন করে নিয়েছিল।

    সেনা প্রতিক্রিয়া অপেশাদারি,  অগ্রহণযোগ্যঃ
    বর্তমানের পরিস্থিতিতে  পিটিআই দলের নেতারা সরাসরি জেনারেলদেরকে অভিযুক্ত করছেন দেখা যাচ্ছে।  কিন্তু এর মানে কী এখন জবাবে জেনারেলদেরকে রাজনীতিকদের উপর প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে উঠতে হবে? তাদেরকে পালটা নিজহাতে শাস্তি দিতে দন্ড নিজ হাতে নিতে হবে?  এটা হতে পারে না। কিন্তু ঠিক এজিনিষটাই ঘটে গেছে।  “এই হামলাকে ইমরান খানের ‘তৎপরতার কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়া’ পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ‘চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ইমরানের লং মার্চ ও জনসমাবেশ ক্ষমতাসীনদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে তাঁর সমর্থকেরা ‘স্টাবলিশমেন্টের’ বিরুদ্ধে ইমরানকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, এদের ষড়যন্ত্রের কারণেই ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। ফলে ইমরান খানের ওপর এই হামলায় তার সমর্থকেরা আরও বিক্ষুব্ধ হবেন”।

    অথচ আইএসআইয়ের প্রধান নাদিম আনজুম, তিনি ইমরানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে অপেশাদারি কাজ করেছেন। এমনিতেই অতীত রেকর্ড বলছে এমন বক্তব্য সবসময় আইএসপিআর [ISPR] এর তরফ থেকে দেয়া হয় না। তাহলে এবার আইএসআই-এর প্রধানকে তা দিতে হল কেন? কোন দায়ীত্ববান মানুষের কাজ এটা হলে পারে না যে তিনি টেনশন বাড়ানো জন্য কোন কাজ করেন! তিনি সরকারি কর্তা অন্তত এটুকু তাঁর মনে রাখা উচিত ছিল।  তবে সবচেয়ে অন্যায় করেছেন তিনি পাবলিকের বোধবু্দ্বিতে আস্থা রাখেন নাই। তিনি কোন রাজনীতিকের সাথে সরাসরি অহেতুক বাকবিতন্ডায় গিয়েছেন। তিনি কোন অন্যায় অপরা্ধ না করে থাকলে তো নিজের উপর আস্থা রাখা উচিত ছিল।
                                                                                          আইএসআইয়ের প্রধান নাদিম আনজুম; তিনি প্রথা ভেঙে ইমরানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

     

    এই প্রতিহিংসা অগ্রহণযোগ্য ও জেনারেলদের অসদাচরণের প্রমাণঃ
    পাকিস্তানের রাজনীতিতে মূল তর্ক মানে এর পিছনে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক লড়াই – তাতে তা চীন-আমেরিকার লড়াই হয়ে আছে। যেমন সেটা হল, সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] এর এবছরের সম্মেলন চীন-রাশিয়া-ভারত এই জোট মেরুকরণ হয়ে যায় যা বলাই বাহুল্য বাইডেনের চলতি ততপরতাগুলোরই প্রতিক্রিয়া। আর এখানেই পাকিস্তান ও ভারত (যারা দুই রাষ্ট্রই SCO এর সদস্য সেই সুত্রে)   দুই রাষ্ট্রই একসাথে ঐ মেরুকরণে সামিল হয়ে যায়।  ফলে এই মেরুকরণকে দুর্বল করতে বাইডেন প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে খাড়া করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে অন্তত ও আপাতত বাইডেন সফলতা দেখতে পাচ্ছে। কারণ, মুসলিম লীগ (নওয়াজ) আর পিপিপি বা ভূট্টোর দল যারা আবার ইমরানের দলের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ এরা, আগে থেকেই আমেরিকান সমর্থনে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার অপ-ততপরতায় লিপ্ত ছিল। সেই এপিসোডে ইমরান খান সরাসরি দক্ষিণ-পুর্বএশিয়ার আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড ল্যু এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নাক-গলানোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুলেই ক্ষমতা ত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ (নওয়াজ) আর ভূটোর দল যারা মূলত উভয়েই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আর নাহলে পেন্ডিং দুর্নীতির মামলার আসামি – অথচ আমেরিকাকে এই দুনীতিবাজ দুই দলকেই সঙ্গ দিয়ে তাদেরকেই বেছে নিতে হয়েছিল নিজস্বার্থ হাসিলের পথে আগাতে হয়েছিল।  সারকথায় আমেরিকাকে অনৈতিকতা সাথে নিয়ে হেটেছে আর সাথে সেনা প্রতিষ্ঠানকেই নিয়েছে নিজের অসৎ উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে। অথচ সেটা এমন এক সময়ে যেখানে সারা পাকিস্তানে ইমরান খান জনস্বার্থের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আসলে বাইডেনের আমেরিকার রাজনীতি এতই দেউলিয়া দশা যে তাকে পাকিস্তানকে প্রভাবিত করতে হচ্ছে খারাপ রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে যাদের পাবলিক রেটিং সর্বনিম্ন!!! সেকারণে, প্রতি মুহুর্তে ক্ষমতাসীনেরা যত ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ বা ততপরতা করছে এর দায়ভার  আমেরিকার উপরও বর্তাচ্ছে। এভাবে চলে পাকিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ কতদুর কী হাসিল হতে পারে???

    ওদিকে সেনা প্রতিষ্ঠান যে অসদাচরণ ও প্রতিহিংসায় জড়িয়েছে এর একটা বড় প্রমাণ হল সিনেটর আজম সোয়াতি [Azam Swati ] এর সাথে জেনারেলদের আচরণ। আজম পিটিআই দলের সিনেটর। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ ও তার ছেলে অর্থপাচার মামলার আসামি ছিলেন। এর বিচার আদালতের শুরু হবার মুহুর্তে তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন। এবং বিরোধীদের অনুমান ও অভিযোগ যে, ক্ষমতায় এসেই তিনি আমাদের দুদকের মত তাদের প্রতিষ্ঠান [FIA] কে প্রভাবিত করে নিজেরা বাপ-ছেলে ঐ মামলা থেকে নিজেদের মুক্ত বা জড়িত নয় বলে এফআইএ এর তরফ থেকে সার্টিফিকেট যোগাড় করে নিয়েছেন।
    ঘটনার শুরু এরপর থেকে এটা নিয়ে!  কারণ, সেনাপ্রধান বাজওয়া শাহবাজ বাপ-বেটার দায়মুক্তিতে তাদের কে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। আর এটা নিয়ে বাকা কথায় টুইটারে স্টাটাস দিয়েছিলেন এই  সিনেটর আজম সোয়াতি। আর এর প্রতিক্রিয়ায় সেনাপ্রধান বাজওয়া প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠেন। তিনি আমাদের দেশের মত সাইবার মামলা দায়ের করান আজমের বিরুদ্ধে, শুধু তাই না। তিনি তাকে গ্রেপ্তার করান যেখানে “নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগও করেছেন সোয়াতি। অথচ মামলা যে তেমন সিরিয়াস কিছু নয় তা বুঝা যায় আদালত আজমকে প্রথমদিনই জামিন দিয়ে দেয়।

    কিন্তু প্রতিহিংসার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইতোমধ্যেই হাজির হয়ে গেছেঃ
    গত ৫ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সিনেটর আজম সোয়াতি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কেন?
    তিনি কয়েকদিন আগে অন্য এক শহরে (কোয়েটা) গেছিলেন সস্ত্রীক। সেখানে এক সরকারি গেস্ট হাউজে ছিলেন।  আজম সোয়াতি জানাচ্ছেন তার স্ত্রীর কাছে  কেউ এক ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে। কেন? আর সেই ক্লিপ হল, তাদের স্বামী-স্ত্রীর অন্তরঙ্গ মুহুর্তের এক ভিডিও। আর এটা হল সেই গেষ্ট হাউজে থাকার রাতের ছবি। কোন দম্পতির রাতের সজ্জার অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি গোপনে রেকর্ড করা – এটা কোন সভ্যতা? কোন বাহাদুরি?

    তাহলে এখন এটা কেমন প্রতিহিংসামূলক আচরণ? এটা কী কোন দায়ীত্ববান ও নুন্যতম সেনসেটিভ ব্যক্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ? জেনারেলেরা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের উর্ধে এক ব্যক্তিত্ব হিসাবে দেখতে চান! তাই সে প্রয়োজনে তারা পাকিস্তানের রাজনীতিকে আর কত নিচে নিবেন!  আর সবমিলিয়ে এতে আমেরিকা নিজ দায় ও সংশ্লিষ্ঠতা থেকে কী দূরে থাকতে পারবে!!!

    ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন তিনি প্রধান বিচারপতিকে লিখবেন এই জুডিশিয়াল এনকোয়ারির জন্য! কিন্তু এটা কী ক্ষমতাবানদের এই অসভ্যতা থেকে পাকিস্তান সমাজকে বের করে আনতে পারবে!!!!


    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    গৌতম দাস
    ২৯ আগষ্ট ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4dT

     

    এক কাল্পনিক আড্ডার আলাপঃ বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা বাক পরিবর্তন নিয়ে যেখানে কথা উঠেছিল।   বক্তা নিজেই প্রশ্নটা জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন ভারতমুখি হয়ে থাকে? মানে তিনি এই প্রশ্নের একটা সাফাই নিজেই দিতে চান তাই নিজেই কথাটা তুলেছেন। আর ভারতমুখি বলতে কেউ বাংলাদেশে থেকে আবার ভারতের স্বার্থকেই নিরন্তর নিজের স্বার্থজ্ঞান করে কথা বলে,এভাবে যে নিজেকে তুলে ধরতে চায় এমন কাল্পনিক একজনকে এখানে ধরে নেয়া হয়েছে।
    সব রাষ্ট্রেরই নিজ একান্ত কিছু স্বার্থ থাকে যা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা হবেই আর এনিয়ে  প্রশ্ন তোলার কিছু নাই। তবে এটা আবার যখন সীমা ক্রশ করে বাড়তে চায় মানে নাগরিক একদেশের কিন্তু আনুগত্য করে বসে অন্যদেশের এবং ভিন্ন দেশস্বার্থের তখন এটা বারবার বাকি সকলের কাছেই খুবই অস্বস্তিকর মনে হবে; এজন্য যে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিক-আনুগত্যের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে।  এটা অমান্য করতে চায় বলেই এই সীমাছাড়ানির কথাটা আসে। যেমন, কোন দুই ব্যক্তি একবার স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাবার পর স্ত্রীর স্বামীর প্রতি বা স্বামীর স্ত্রীর প্রতি এক লয়াল বা আনুগত্যের সম্পর্কের থাকতে বাধ্য। এই বস্তুগত আনুগত্য কোন কারণে যদি কখনও অনুপস্থিত হয়ে যায়, না থাকতে দেখা যায় তবে বুঝতে হবে ঐ সম্পর্ক কার্যত এরা আর স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কিত নয়; বা ভান করছে।  আর বাস্তবে এথেকেই পরকিয়ার মত কঠিন অমীমাংসিত জটিলতাগুলো তৈরি হয়।
    আবার এই ভারতমুখিতার ধরণের ভিতরেও গত বিশবছরে একটা কোয়ালিটিটিভ মানে গুনগত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। যেমন আগে, পাকিস্তান আমলে বা বাংলাদেশের আমলে কিন্তু ১৯৯২ সালের আগে দেখা যেত বাংলাদেশি হিন্দুদের বড় অংশই নিজেদেরকে কমিউনিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিশীল বলে পরিচয় তুলে ধরত। আর এই সাথে সেকালের ভারতের হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ বা যাদের একালের নতুন নাম বিজেপি-আরএসএস – এদের থেকে দূরে থাকত।  অথচ একালে মোদির আমলে বাংলাদেশের হিন্দুরা বিশেষত তরুণেরা মোদিকে তাদের নেতা ও ত্রাতা মনে করে থাকে। এটা এক তাতপর্যপুর্ণ পরিবর্তন সন্দেহ নাই।

    কিন্তু এই পটভুমিতে বক্তা চেষ্টা করছিলেন কেন এমন আনুগত্য সমস্যা তা নিয়ে এর স্বপক্ষে কিছু সাফাই তুলে ধরার। তিনি জানাচ্ছিলেন যে, একটা দেশের কোন কোন জনগোষ্ঠি তো অনেক রকম ভিন্নতায় অনেক কিছু চাইতেই পারে। সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই। তারা তো পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকতে চেয়েছিল। কথা বাস্তব সত্য এবং কথা তাদের মনের কথা সন্দেহ নাই। কিন্তু এই চাওয়া কী সঠিক ছিল? তাদের স্বার্থের পক্ষে ছিল?

    এককথায় বললে, আপাত দৃষ্টিতে সঠিক ও নির্দোষ এবং ইনোসেন্ট  মনে হলেও এটাই ছিল তার আত্মঘাতি চাওয়া। আজপর্যন্ত বাংলাদেশের হিন্দুদের সমস্ত দুর্দশার মুল ও ভুল এই চাওয়া। সবভুলের উতস এটা। যদিও ১৯৪৭ সালের আশেপাশের প্রেক্ষিতের দিক থেকে বললে, ততদিনে এটা বড় ধরণের ভুল অবস্থান।

    কিন্তু কিভাবে এটা বুঝব? তা কী দিয়ে বিচার করব?
    সবশেষে এই হলো এই তর্কের মূল প্রসঙ্গ!

    একঃ এটা যেকোন রাষ্ট্রগঠনের দিক থেকে এক মৌলিক সমস্যা যে সব নাগরিককে একমত হয়ে চাইতে হয় যে তারা কেমন রাষ্ট্র চায়। মানে কিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চায় এনিয়ে একমত থাকতে হয় বা হতেই হয়। তবেই এক মৌলিক বিষয়ের সমাধান পাওয়া যেতে পারে।  আর সেজন্য কেমন কী  ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে চাচ্ছি তা প্রস্তাবের সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন তা সবার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয় – কেবল এমন কিছুই যেন প্রস্তাব করা হয়। আর এতে ব্যর্থ হলে আগামিতে সব বিরোধে ও ব্যর্থতার শুরু হবে এখান থেকে।  ের কিছু সুত্র নির্দেশ করা যেতে পারেঃ –
    ১। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বা দাবিতে কোন কিছু চাওয়া জায়েজ  – এমন মনে করা সবার আগে ত্যাগ করতে হবে।

    ২। এরই আরেক ভার্সান বা মূলসুত্র হল, সমাজের কেউ অন্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ – সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে – এটাই যেকোন রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া বা কার্যকর না থাকার মূল কারণ হয়।
    ৩। তাই এরই উলটা পিঠের মানে ইতিবাচকভাবে বলা কথাটা হল – রাষ্ট্রে হতে হবে বৈষম্যহীন নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র এমন ভিত্তিতে।  মানে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে বেশি ক্ষমতা ও আধিপত্যের অথবা কেউ সংখ্যালঘিষ্ঠের কারণে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের, কেউ পাহাড়ি বলে বা সাঁওতাল বলে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের আইনি এবং সামাজিক চর্চার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতেই হবে ইত্যাদি এগুলো বন্ধ করতেই হবে। তাই মুল কথা, নাগরিক অধিকারেরর দিক থেকে নাগরিক সকলেই সমান – এই ভিত্তিতে। এই সাম্য-নীতি সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান করতে হবে।

    এটাই সংক্ষেপে “নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি” রাষ্ট্র বলা হয়। আরো সংক্ষেপ করতে ‘নাগরিক সাম্য নীতিও’ বলা যেতে পারে।

     

    এখন তাহলে বিচার করা যাক – সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই – এই বক্তব্যকে যারা বাংলাদেশের হিন্দুদের পক্ষের সাফাই মনে করছিল সেটা কী ঠিক ছিল? বাংলাদেশের হিন্দুরা কী নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি মেনে তাদের প্রস্তাব বা চাওয়া তুলে ধরে ছিল? অবশ্যই না। তাই হিন্দুদের সাফাই সঠিক না, তাদের পক্ষে গেছে বা কাজের হয়েছে তাও না, তাদের কাজে লেগেছে তাও না।
    এককথায় বললে, এর মানে, বাংলাদেশের হিন্দুদের পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকার দাবি বা যে বাসনা সেটা আসলে মুসলিম লীগের আত্মরক্ষামূলকভাবে “পাকিস্তান” নামে আলাদা রাষ্ট্র কায়েম করার যে দাবি -তারই হিন্দু ভার্সান।
    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় ঐক্যমত।

    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে যথেষ্ট প্রয়োজনীয় ঐক্যমত। 

    একথা শুনে হিন্দুদের পক্ষের সাফাই যারা দিতে এসেছিল তারা প্রসঙ্গটা কিছুটা বদলে এবার বলে বসল – এজন্যই তো ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বাংলাদেশের (পুর্ববঙ্গের) হিন্দুরা করেছিল।  এতে ঐ আসরে তারা ভেবেছিল নিশ্চয়  এবার বেশ শক্ত পয়েন্ট তুলতে পেরেছে! তাদের পয়েন্টকে আরো শক্ত-পোক্ত করতে তারা এবার  আরো কিছু কথা সাথে জুড়ে দিয়ে বলল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করার চিন্তা তো খুবই বিভেদমূলক ও পশ্চাতপদ চিন্তা! এই বক্তব্য অবশ্য আমাদের তি্নদেশে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা হিসাবে পরিচিত। কিন্তু তা আসলেই কী???  না বাংলাদেশের হিন্দুদের আসলেই  কপালই খারাপ!  কেন?

    এতদিন মনে করা হত, ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ার কাজটা সব খারাপ কাজের গোড়ার খারাপ কাজটা। এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করে থাকেন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা এমন এক মোক্ষম কথা তুলে মুসলিম লীগের মুখ বন্ধ করে দিতে পেরেছিল। আর এদের চোখে একাজটা ভারতের কংগ্রেসের চেয়েও ভাল ভাবে করেছিল  কমিউনিস্ট পার্টি।  কিন্তু ঘটনা আসলে উলটা যা উল্টেপাল্টে  বিচার করে দেখাই হয় নাই। কিভাবে?

    ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা যদি ধরে নেই খুবই খারাপ কাজ এমনকি জঘন্য কাজ তবে মুসলিম লীগ বা পাকিস্তান কায়েম করাই এধরণের প্রথম কাজ নয়।  ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা অখন্ড ভারতে সবার আগে করেছে, সবার আগে তুলেছে এবং এই ভিত্তিতে  নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্র সাজিয়েছে মুসলিম লীগ নয় – কংগ্রেস – যার পুরা নাম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল। কিভাবে?

    ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌল্লাকে পরাজিত করতে পারলেও নানা সমস্যার কারণে ১৭৬২-৬৪ সাল লেগে যায় ক্লাইভের বৃটিশ ইস্ট -ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে দেওয়ানি লাভ করতে বা প্রশাসন নিজের হাতে উঠিয়ে নিতে। পরে ঐ কোম্পানি আবার একই সময়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়াতে আর বৃটিশ রাণীর সহায়তায় কিছুটা উঠে দাড়ানোর পরে কোম্পানির প্রধান কাজ হয়েছিল যেভাবেই হোক তাতক্ষণিক রাজস্ব আদায় বা সংগ্রহ। একারণেই বাংলায় ব্যতিক্রমি জমিদার প্রথা (আগাম নগদ রাজস্ব জমা দিয়ে জমিদারি কেনা আর পরে প্রজার কাজ থেকে বছরান্তে খাজনা আদায় করে নেয়া) চালু হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির সেই প্রধান রাজস্ব আয়ের উতস জমিদারি ব্যবস্থাটা থিতু করতেই ১৮০০ সাল লেগে যায়। আর দেখা গেল, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জমিদারি কিনেছিল হিন্দু জমিদারেরা।  ফলে এরপরেই এই হিন্দু জমিদারদের মাথায় আসে হিন্দু আধিপত্য কায়েম করার।

    মনে রাখতে হবে সেকালে প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বলতে কৃষি তাও আবার সেটা জমিদারি মালিকানায় জমিদার-প্রজা ভিত্তিক সম্পর্কের কৃষি অর্থনীতি। ফলে সবার উপরে বৃটিশ কোম্পানি আর এর নীচে জমিদার হিন্দুর আধিপত্য কায়েমের সমাজ প্রতিষ্ঠা এটাই  বাস্তবে কায়েম হয়েছিল। যদিও পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কলকাতা সারা ভারতের বৃটিশ রাজধানী বলে অন্তত সারা বঙ্গে জমিদার হিন্দুর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম সহজ হয়েছিল।
    কিন্তু তবু এসবই ছিল অর্থনৈতিক বা মাঠের নয়া শ্রেণীর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম। কেন এভাবে বলছি?
    বলতে চাচ্ছি রাজনৈতিক অংশ এটা নয় তা বুঝাতে। নয়া শ্রেণীর  রাজনৈতিক অংশটা তৈরি হয়েছিল আলাদাকরে। তবে অবশ্যই এটা তৈরি হয়েছিল সমকালীন ভাবে। বা বলা যায় অল্প কিছুটা আগে। আর তা ঘটেছিল রাজা রামমোহন রায়ের হাতে তার আত্মীয়সভার আসর থেকে।  রামমোহন এর পরিচয় লম্বা না করে এখানে কমিউনিস্ট ইতিহাসে যেভাবে তাঁকে পরিচয় করানো হয়েছে কেবল সেটুকুই তুলে আনছি।

    আসলে রামমোহন রায়ের হাতে এক নয়া ধর্মের প্রবর্তন ঘটেছিল ১৮১৫ সালে, এটাই ব্রাহ্ম (ব্রাহ্মণ শব্দ বা ধারণার সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই) ধর্ম । ফলে সেই থেকে এখনও যারাই  ব্রাহ্ম ধর্ম বা সমাজ এর অনুসারি এরা সকলেই সেসময় থেকেই পারিবারিকভাবে রামমোহন প্রবর্তিত ব্রাহ্ম অনুসারি। সেটা রবীন্দ্রনাথের দাদামশায় (গ্রান্ডফাদার) দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে এখনও পুরা ঠাকুর পরিবার। আবার এদিকে ১৯৩৫ সালে পুনগঠিত প্রথম ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যপক সুশোভন সরকার তার সারা পরিবারও ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি হয়েছিলেন। আর এই সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে পরিচয় করানো হয়েছে।

    কিন্তু তাঁর এভাবে বলার মধ্যে সমস্যা কী হয়েছে তা হয়ত অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয় নাই। এছাড়া রামমোহন রায়ের কথা কেন তুললাম তা নিয়ে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। আর এর সাথে ধর্মের ভিত্তিতে দল গড়ার প্রসঙ্গে কে প্রথম এটা করেছিল সেকথাই এখন স্ইপষ্ট করে বলব।

    আমাদের এদিকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানে (এই তিনদেশে) কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের কাছে রেনেসাঁ বেশ আদরণীয় শব্দ ও ধারণা। রেনেসাঁ অনেকটা বড় মৌল ধারণা বা উতস ধারণার মত বলে  ধারণাটাকে মনে করেন তাঁরা। যদিও খোদ কার্ল মার্কস রেনেসাঁ  ধারণা দূরে থাক, আধুনিক রাষ্ট্র বা মর্ডার্ন স্টেট (তার ভাষায় ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্র’ ) নিয়েও  তিনি কোন আগ্রহই দেখান নাই। ভাল-মন্দ বড় কিছুই লেখেন নাই।  তাহলে কেন আদরণীয় হল? এর মূল কারণ প্রগতিশীলেরা মনে করেন, রেনেসাঁ ধারণার জপতে থাকলে মানে রেনেসাঁর আড়ালে থাকলে তাতেই অনেক উপকার হবে। তাদের প্রকল্প ধর্ম মানে, ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে খুবই ভাল সাফাই আনা যায় এখান থেকে।

    আর এধারণার নগদ খদ্দের হল জমিদার হিন্দু যারা যেন এই ধারণা কিনে নিবার জন্য অপেক্ষা করছিল।

    এখন প্রথম প্রশ্নে আসা যাক। শব্দাবলীতে বাক্যটাই লক্ষ্য করা যাক, লিখেছি “সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে দেখানো হয়েছে। আবার রামমোহন হচ্ছেন ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক এবং সুশোভনের নিজ ও পরিবার ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি। তাহলে “রেনেসাঁ আর ব্রাহ্ম” এখানে একসাথে উচ্চারিত হচ্ছে কেমন করে? তাহলে জানা যাচ্ছে একমাত্র কমিউনিস্ট সার্টিফায়েড ধর্ম হচ্ছে তাহলে ব্রাহ্ম। যেটা সত্যিই এক আজীব ব্যতিক্রম বটে!

    এনিয়ে সরাসরি কথা বললে, আসলে রামমোহন রায়ই বৃটিশ ভারতে প্রথম জাতিরাষ্ট্র বা মর্ডান রাষ্ট্র ধারণা আনেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে এই কল্পনাটা ছিল-  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র। অর্থাৎ ভারতের সবাইকে আগে আগে ব্রাহ্ম অনুসারি করে নিয়ে এবার –  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র – এমন ভারত ছিল রামমোহনের প্রজেক্ট। সারকথায়, ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের (নেশন স্টেটের) প্রথম ইমাজিনেশনটা আনেন রামমোহন। পরে তার মৃত্যু (১৮৩৩) আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অনুসারিরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে অচল অথর্ব হয়ে পড়লে এবার সেই প্রকল্পটাকে এবার ব্রাহ্মধর্মের বদলে ‘হিন্দুধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র’ – এভাবে বদলে নেয়া হয়। আর এটাই ১৮৮৫ সালে এটাই কংগ্রেস দল নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
    কাজেই দল হিসাবে প্রথম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হল কংগ্রেস।  আর এভাবেই প্রকল্প সুনির্দিষ্ট করে হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে এর বিশবছর পরে ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান ধর্ম-ভিত্তিক আরেক জাতিরাষ্ট্র’ পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য নয়া দল হয় মুসলিম লীগ।
    কাজেই মুসলিম লীগের পাকিস্তান কায়েমের বিরুদ্ধে কথা বলে   বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থান নেয়া কিন্তু আবার নিজেরা হিন্দু ধর্ম-ভিত্তিক ভারতে যুক্ত হওয়ার বাসনা  -এটাই তো আসলে কংগ্রেসি অবস্থান~!!!! ফলে এনিয়ে কোন সাফাই দিতে বা করতে তারা পারে না। এর মানে হয় না।

    তাহলে মূল সমস্যা ও সমাধান ছিল, ধর্মভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা সমূলে ত্যাগ করা। সকলকে নিয়ে “অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রের” প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা প্রস্তাব এর কথা বিবেচনা করা এবং সেভাবে আগানো।
    স্বভাবতই, নইলে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে সারাজীবন ইসকনের মাধ্যমে ‘মোদির দলের ভাড়াটে বাংলাদেশি’ উইংয়ের সদস্য হয়েই কাটাতে হবে।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    গৌতম দাস

    ০১ আগষ্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4bH

     

      Russia, Turkey and Iran have in recent years been holding talks as part of the so-called ‘Astana peace process’ to end more than 11 years of conflict in Syria [File: Reuters]

     

     

    ঠাণ্ডা পানিতে গোসল, মানে “নো হিটার” গোসল; কখন? যখন তাপমাত্রা শূন্যের দিকে ধাবমান বা মাইনাসে চলে গেছে। যেকোন কারও জন্য এটা অবশ্যই একটা বড় রকমের শাস্তি। অথচ তা শুরু হয়ে গেছে!

    সারা ইউরোপেই কমবেশি আগস্ট থেকেই তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির নিচে নামতে শুরু করে আর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে চরমে ওঠে, মানে এটা শূন্য বা মাইনাসে নেমে যায়। আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে যেন রাশিয়া এখন থেকেই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমানো শুরু করেছে। বিশেষ করে জার্মানির অবস্থা ভালো না।

    বিবিসি জার্মানির হ্যানোভার শহর নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে “কোল্ড শাওয়ার [Cold showers ]” শিরোনাম দিয়ে; মানে গোসলখানায় ঠাণ্ডা পানিতে গোসল নিয়ে। রিপোর্টের সারকথা, এখন থেকেই  রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহের অভাবে ইউরোপে জ্বালানি মিতব্যয়িতা শুরু হয়ে গেছে। হ্যানোভার সিটিতে সব পাবলিক গোসলখানায় পানির হিটার বন্ধ করা হয়েছে। রুম হিটার সীমিত করা হয়েছে। এমনকি হাতে করে বয়ে নিয়ে বেড়ানো এসি, হিটার বা রেডিয়েটর ধরণের সবকিছুই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূল কারণ,  ইউরোপে রাশিয়া তার গ্যাস সরবরাহ ইতোমধ্যেই অর্ধেক করে দিয়েছে। সামনে আরো কী করে কেউ জানে না। এদিকে ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইইউর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত রাশিয়ান গ্যাসের অভাবে তারা সবাই গ্যাসের ব্যবহার এবার শীত সিজনে কমপক্ষে ১৫% কম করবে। এসব থেকেই বিবিসির এ রিপোর্ট ‘কোল্ড শাওয়ার’। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপ কি এবার ‘কোল্ড শাওয়ারের’ শাস্তি সহ্য করতে সক্ষম হবে?

    না ব্যাপারটা এমন নয় যে, রাশিয়ার গ্যাস ছাড়া ইউরোপের কোনো বিকল্পই নেই; ঠিক তা নয়, কিন্তু অন্য যেকোনো বিকল্প জ্বালানি পাওয়ার জন্য কোনো চুক্তি করা দিয়ে শুরু করতে হবে। এরপর সবচেয়ে কষ্টকর অংশ হল, সেই জ্বালানি বয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নয়া বিনিয়োগ করে নয়া অবকাঠামো গড়ে সেই জ্বালানি এনে এবার তা ব্যবহার-উপযোগী করে ঘর গরম বা পানি গরমের জায়গায় নিতে সব মিলিয়ে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগাতে হবে। এটাই ইইউ এতদিন বহুভাবে বাইডেনকে বুঝাতে চেয়েছে, পারেনি। তাহলে আগামী ২০২৭ সালের আগে পর্যন্ত তারা চলবে কী করে? নাকি আগামী ডিসেম্বরের (২০২২) আগেই বাইডেনের হাত ছেড়ে ইইউ পুতিনের হার ধরে আপস করে ঘর গরম, পানি গরমের সুখ নিতে মরিয়া হয়ে উঠবে! সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায়!
    বিবিসির ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যটা হল, ‘ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহ যুদ্ধের আগে ছিল মোট চাহিদার অর্ধের বেশি একা রাশিয়ান গ্যাস এখন যা এক-চতুর্থাংশের কম’।

    “Russian gas supplies now account for about a quarter of the nation’s needs, compared with more than half before the war.”

    রাশিয়ার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠাঃ
    দুনিয়ায় অন্য দিকের সব ঘটনাবলিতে রাশিয়া যেন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। পুতিন বিদেশ সফরে বের হয়েছেন, তিনি ইরান সফরে গেছেন। রাশিয়ার ওপর ডলার-ইউরো-ইয়েন ইত্যাদিসহ আরো কয়েকটা মুদ্রার অবরোধে রাশিয়া যেন টুপ করে ভেঙে পড়বে! বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির [Western bloc] এই ছিল প্রবল বিশ্বাস ও আকাঙ্খা যাতে তারা দেখতে পাবে পুতিন সারেন্ডার করে মাফ চাচ্ছে! কিন্তু সরি, তা বাস্তবে ঘটেনি তা তো আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। উল্টো দুনিয়াজুড়ে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই শুধু নয়, এখন বিশ্বব্যাংকই দাবি করছে, গ্লোবাল বাণিজ্য-অর্থনীতিতে মহামন্দা আসন্ন, তা এলো বলে। সাথে নিয়ে আসছে খাদ্যাভাব দুর্যোগে এলেমেলো করে দেয়া মানুষের জীবনযাত্রায় প্রবল ধাক্কা! গ্লোবাল জিডিপি ২.১% এ নেমে যাবে এ বছর আর আগামী বছর ২০২৩ সালে যা আরো নেমে ১.৫% হয়ে যেতে পারে।

    “In a news conference, World Bank President David Malpass said global growth could fall to 2.1% in 2022 and 1.5% in 2023, driving per capita growth close to zero, if downside risks materialized.” – REUTERS

    বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস এক সংবাদ সম্মেলন করে সাবধান করছেন যে, “অনেক দেশই এই ধাক্কা এড়াতে পারবে না”।  তিনি এই সঙ্কটের নামকরণ করেছে ‘মন্দা-মুদ্রাস্ফীতি’ বা ‘স্টাগ-ফ্লেশন’ [stagflation]।

    এদিকে খোদ আমেরিকার প্রথম তিনমাস বা প্রথম কোয়ার্টারের জিডিপিতেই যেখানে টানাটানিতে তা ছিল মাত্র ১.৬%। সেটা দ্বিতীয় কোয়ার্টারে আরো কমে হয়েছে  ১% এরও নিচে, তা ০.৯%। গত পরশু মানে ২৮ জুলাই তা প্রকাশিত হয়েছে। যেটাকে আমেরিকা অর্থনৈতিক মহামন্দা আসা নিশ্চিত হবার লক্ষণ বলে আমেরিকান অর্থনীতি ও বাজার জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ধারণা বলে তা হাজির হয়েছে।

    Real gross domestic product (GDP) decreased at an annual rate of 0.9 percent in the second quarter of 2022, following a decrease of 1.6 percent in the first quarter. The smaller decrease in the second quarter primarily reflected an upturn in exports and a smaller decrease in federal government spending. – BEA.GOV

    কিন্তু তবু বাইডেন নির্বিকার। তিনি ইউক্রেনকে আরো ভারী অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ আর সেই সাথে, ইইউর উপর রাশিয়ান জ্বালানি নেওয়ার চেষ্টা না করতে চাপ দিয়েছেন। আপস না করতে চাপ দেয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনোভাবেই এরা যেন পুতিনের সাথে রফা না করে ফেলে তার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন।

    তাই, এসব চাপ যে, রাশিয়ার উপর কাজ করছে না তা দেখাতেই যেন রাশিয়া গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেকারণে, পুতিন পাল্টা পশ্চিমের অবরোধে যারা কষ্টভোগী তাদেরকে সাথে মিলে নয়া জোট করে উঠে দাঁড়ানো চেষ্টা করছেন – এমনই কিছু লক্ষ্যে পুতিন ইরান সফরে গিয়েছিলেন গত ১৯ জুলাই। আসলে ইরানে এটা ছিল এক ত্রিদেশীয় সামিট। কারণ, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানও একই সাথে একই দিনে ইরান সফরে আসাতে তিন সরকারপ্রধানের এক সামিট মিটিংও অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে। কিন্তু কী ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য বা মতিগতি বা আলোচ্যসূচিইবা কী কী ছিল- তা জানতে [তা বুঝতে বাংলাদেশে খুব সিরিয়াস ডেফিনেশন নয় বরং হালকাভাবে যাদের ‘ইসলামিস্ট আকাঙ্খা’ বলে বুঝা হয়, এমন] তরুণদের ভিতর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যেমন একজন লিখছে, “পুতিনের ইরান সফর এবং বাইডেন কেন সৌদিতে, এই দুটো বিষয় নিয়ে একটা লেখায় দেখতে চাই”।

    এমনিতে কোন “আকাঙ্খাই” দোষের নয়, কেবল যদি খেয়াল রাখা থাকে যে, তা কতটা কল্পনার রঙের বা ইউটোপিয়াতে দেখা হয়েছে আর কতটা তা বাস্তবসম্মত। যেমন মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সরকার একটা গ্লোবাল ইসলামিক স্বার্থের পক্ষে একত্রে  কাজ করবে – এই হল এমনই একটা আকাঙ্খা। এখন এই আকাঙ্খা তা কতটা বাস্তব আর কতটা কল্পনার রঙে দেখা হয়েছে তা কী দিয়ে মাপব? যেকোনো দেশের সরকারকে দেশের বৈষয়িক-অর্থনৈতিক স্বার্থ- এটাকেই সব বিবেচনার শীর্ষে রাখতেই হয়। এ দিকটাই ভারী থাকে; কারণ এগুলো মানুষের বেসিক চাহিদাসংশ্লিষ্ট। আর এর পরে এসে থাকে কোনো চিন্তা-আদর্শ অনুসরণ বা হেদায়েতের কথা।

    প্রথমত, ইরানে ওই তিন সরকার প্রধানের সফর ছিল অনেক উদ্দেশ্য বা ইস্যুতে। তবে প্রত্যেকটা ইস্যুই আবার তিন পক্ষের সবার জন্য নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ছিল দ্বিপক্ষীয়। যেমন তিনপক্ষীয় বড় বা একটাই প্রধান ইস্যু ছিল – সিরিয়া বা আসাদ সরকার প্রসঙ্গ বা বিবিসির ভাষায় “সিরিয়ায় সহিংসতা কমানোর” ইস্যু যেটাকে আরো একদম সুনির্দিষ্ট করে বললে, সিরিয়ান কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপ ওয়াইপিজিকে [YPG] নিয়ে দুটো ভিন্ন মত এই তিন রাষ্ট্রের কথা বলা। এরদোগান চান এদের সামরিকভাবে হামলায় দমন-উতখাত করতে। কিন্তু রাশিয়া-ইরান চায় আলোচনায় সমাধান।

    আসলে এরদোগানের জন্য যেকোনো কুর্দি ন্যাশনালিজমের বা কুর্দি-জাতিরাষ্ট্র চিন্তার দল তা সে ইরাকি কুর্দি কিংবা সিরিয়ান কুর্দি অথবা টার্কিশ কুর্দি যেই হোক, “এই রাজনীতি” তিনি ধ্বংস করে দিতে চান ফিজিক্যালি। কারণ সত্যি সত্যিই এই তিন দেশের কুর্দিদের নিয়ে একটা নতুন কুর্দি জাতিরাষ্ট্র করতে চাওয়া এর ব্যবহারিক মানে হল এই যে,  এটা ‘কুর্দি-জাতিরাষ্ট্রীয় রাজনীতি’। মানে এতে (ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক) এই তিনটি দেশই ভেঙে যাওয়া যা যদি ঘটে তবে এই তিন দেশের কোনো শাসক সরকারই নিজ নিজ দেশের বাকি মানুষের কাছে মুখ দেখানোর লায়েক থাকবে না। যার সোজা মানে তারা আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।

    এ ছাড়া তিন দেশের কুর্দিদের জন্য তাদের নিয়ে  -একটা নয়া জাতিরাষ্ট্রই একমাত্র বা সব সমাধান – এ কথাও তো সত্যি নয়। কারণ তাতে “প্রতিটা কুর্দির রাজনৈতিক অধিকারের প্রসঙ্গটা”  তা সে তারা এখনকার যে রাষ্ট্রেরই বাসিন্দা হোক না কেন এতে, জাতি ধারণার নিচে সব চাপা পড়ে আড়ালে চলে যাবে, যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। অর্থাৎ জাতি-ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইডেনটিটি নির্বিশেষে তারা সকলেই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক  – এভাবে আর দেখা হয় নাই। চাপা পড়ে গিয়েছে। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রে ধারণাটা প্রবল হওয়াতে এর নিচে সবার নাগরিক অধিকার এবং সমান অধিকারের “সাম্য” প্রসঙ্গটা চাপা পরে গিয়েছে। সবমিলিয়ে ফলাফল এই যে বাংলাদেশ বলে রাষ্ট্র কায়েম হয়েছে ঠিকই কিন্তু নাগরিক অধিকার প্রশ্নে বা নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রসঙ্গের দিক থেকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে খামোখা।
    তাই এক নয়া জাতিরাষ্ট্র কায়েম করার রাজনীতি এটা কোন সমাধানই নয়। বরং ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক এই প্রতিটা রাষ্ট্রকেই নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা আর জাতি নির্বিশেষে সেখানকার সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার ভেতরেই আছে সব সমাধান। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বার্নিং অবস্থায় আছেন এরদোগান। কারণ আমেরিকার অবস্থান কুর্দিদের পক্ষে। এটা এরদোগানের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কুর্দিদের অধিকার বা তাদের ভিকটিম হয়ে থাকার প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়া কারো জন্যই অবশ্যই কোন দোষের নয়।  কিন্তু এই সুযোগে তাদের তিনটি রাষ্ট্র ভেঙে এক নয়া কুর্দি জাতিরাষ্ট্র গড়তে সমর্থন দেয়া অপরাধ।

    আসলে রাশিয়া-ইরানকে এরদোগান বলছেন তোমাদের সাহায্য আমার লাগবে না। তুরস্ক একাই ওয়াইপিজিকে দমন করতে পারবে। তবে দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইরানের মতে সফট লাইনে এদের বুঝানো বা পিঠে হাত বুলিয়ে কাজ হবে বলে এরদোগান মনে করেন না। তাহলে এবারের ইরান-আলোচনায় ফলাফল কী হল? ফলাফল এই যে, তবুও তিনপক্ষই অন্তত একমত যে, কুর্দি ইস্যুতে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে।
    ওদিকে ওই আলোচনায় রাশিয়া-ইরানের স্বার্থ ছিল সিরিয়াকে এক স্থিতিশীল রাষ্ট্র আর এর সব ভূখণ্ডই আসাদের নিয়ন্ত্রণে আছে তা দেখাতে চাওয়া। এ ছাড়া সিরিয়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী বা ইসলামী গ্রুপগুলোর তৎপরতা লোপ পেয়ে যাক যাতে সব কিছুর ওপর আসাদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। তাই এই সুযোগে তুরস্ক প্রস্তাব রেখেছে যে, তুরস্ক-সিরিয়ান বর্ডারে, মাঝখানে একটা ৩০ কিলোমিটারের সেফ জোন বা নিরাপত্তা জোন তৈরি করা হোক। এটা তিনি চাইছেন মূলত যাতে দুই দেশের কুর্দিরা অবাধে যাতায়াত আদান-প্রদানে করে চলে ঘোট না পাকাতে পারে!

    যখন আলোচনার বিষয় ড্রোনঃ
    তেহরানে ড্রোন আলোচনার ইস্যু হলেও এটা ছিল কেবল দ্বিপক্ষীয়- মানে রাশিয়া আর ইরানের মধ্যে আলোচনার ইস্যু। এটা এরদোগানের জন্য আলোচনার ইস্যু নয়। কারণ তিনি আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উল্টো ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহকারী। মানে ইউক্রেনের হাতে যে টার্কিশ ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে তা হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ও উপরে। তবে ইউক্রেনের হাতে থাকা সব ড্রোনই টার্কিশ নয়। বড় অংশই বরং আমেরিকার সরবরাহ করা। আর ওদিকে রাশিয়ার সব ড্রোনই ইরান থেকে নেয়া নয়। রাশিয়ার নিজস্বও আছে। যা হোক, এই ইরানিয়ান ড্রোন রাশিয়াকে সরবরাহ নিয়েই রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বিপক্ষীয় আলাপ হয়েছে এবার।

    ইউক্রেনের শস্য রফতানি ইস্যুঃ
    এটাও আরেক দ্বিপক্ষীয় ইস্যু। তবে এবার তা রাশিয়া আর তুরস্কের মধ্যে। যদিও সেটাও আবার সরাসরি রাশিয়া আর তুরস্কের স্বার্থে নয়। কেন?  মূলত বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া এদের মধ্যে আপোষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে তুরস্ক, এমনকি কখনো এরদোগান নিজে উপস্থিত থেকেই তা ঘটিয়েছেন। তাই শস্য ইস্যু যেটা হল আসলে – যুদ্ধের কারণে, ইউক্রেন শস্য রফতানির বড় দেশ হওয়া সত্বেও এ পর্যন্ত ইউক্রেনের সব শস্য রফতানি বন্ধ করে রেখেছিল  নিজ সাইলো গুদামে, যা প্রায় ২২ মিলিয়ন টন। গ্লোবাল বাজারে খাদ্যশস্যের (গম) দাম আকাশচুম্বী হওয়ার অন্তত একটা কারণ এটাকেই মনে করা হয়। তাই জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল (António Guterres ) আর এরদোগান – এরা দু’জন নিজে উপস্থিত থেকে রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে শস্য রফতানিতে রাশিয়ান সহযোগিতা করবে – এমন এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল  [Ukraine, Russia sign grain export deal]। যদিও তা স্বাক্ষরের পরেই ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে এক বোমা পড়ায় রফতানি আশঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাই এরদোগান ইরান সফরের সময়ে এই সুযোগে পুতিনের সাথে কথা বলে রফতানি যেন ঠিকমত বাধাহীন চালু হতে পারে এর আশ্বাস নিয়েছেন পুতিনের কাছ থেকে।

    বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্যে সফরে ইসরাইলের সাথে তাঁর অসৎ ঘনিষ্ঠতাঃ
    গত ১৯৭৯ সালে খোমেনির ইরান বিপ্লবের সংঘটিত হবার পর থেকে আমেরিকা ইরানকে শুধু স্বীকৃতি দেয়নি তাই নয়, ইরানের বিরুদ্ধে নানান স্যাবোটাজ করে গেছে নিয়মিত। অথচ ইরান বিপ্লবের অপরাধ কী? অপরাধ হল এই যে, ১৯৫৩ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ারের অপরাধের বিরুদ্ধে উঠে দাড়িয়েছিল, বিপ্লব করেছিল। আইসেনহাওয়ার সিআইএ পাঠিয়েছিলেন; পপুলার ইরানি সরকারকে ফেলে দেওয়া, ইরানের সব তেলের খনি দখল আর এক পুতুল সরকার হিসেবে শাহ পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো ইত্যাদি যা যা অপরাধ ঘটিয়েছিলেন, এঘটনাগুলোর ২৬ বছর (১৯৫৩-৭৯) পরে এর পরিসমাপ্তি টানা এবং ইরানিদের নিজেদের জন্য নিজেদের দেশ ও সরকার কায়েম করা। এতাই ইরানের অপরাধ!!! এরপর থেকে আমেরিকার সাথে বিল্পবী বা খোমেনির ইরানের সাথে আমেরিকার কখনো ন্যূনতম সম্পর্ক বা স্বীকৃতি বিনিময় ঘটেনি। আমেরিকান ভুল নীতি-পলিসির কারণে  অন্যকিছু ঘটবার সুযোগও ছিল না। কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামা বিড়ালের গলায় এক ঘণ্টা বেঁধেছিলেন ২০১৫ সালে!

    যদিও এই ওবামাই আইএস-এর উত্থানে সহায়তাকারী, পরে আইএসকে দিয়ে গাদ্দাফিকে হত্যাকারী, এরাই বেনগাজীতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ সব আমেরিকান স্টাফের হত্যাকারী; শেষে সিরিয়ার আসাদেরও একই পরিণতি ঘটাতে সিরিয়াতে  গিয়েও তা ব্যর্থ-অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু সেই আইএস এরপর ইরাকে ফিরে গিয়ে নিজ নামে হাজির হয়ে গেলে, তাতে পাল্টা ইরাকের ক্ষমতা তাদের হাতে প্রায় দখলের উপক্রম হয়ে গেলে এবার ওবামা ভীষণ বিপদে পড়ে ধরা খেয়ে যান। কারণ, কথিত ওয়ার অন টেররে যেসব যুদ্ধক্ষেত্র বুশের আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল, ২০১৪ সালেই ওবামা সেসব স্থান থেকে আমেরিকান সৈন্য তুলে ফেলেছেন। ইরাকেরসহ মেজরিটি সংখ্যক [মোট দশ হাজার রেখে বাকি সব ফেরত] আমেরিকান সৈন্য দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কারণ একটাই, সমাপ্তিহীন অন্তহীন যুদ্ধের ব্যয় বইবার  সক্ষমতায় আমেরিকা-রাষ্ট্রের অপারগতা, অযোগ্যতা!!

    অথচ পরের বছরই ইরাকে আইএস হাজির হয়ে গেলে তাদের তাড়াতে গেলে তো আবার প্রয়োজনীয় সৈন্য আমেরিকা থেকে ফেরত আনতে হয়, যা বিরাট খরচের দায়ভার!!কিন্তু আমেরিকার ব্যয়-নির্বাহের মুরোদ নাই। অতএব উপায় না দেখে ওবামা এই প্রথম ইরানের সাথে আপসের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইরাক থেকে ইরান নিজ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আইএস মুক্ত করে দিবে। আর এতে বিনিময়ে আমেরিকা ইরানের উপর নিজের আগে থেকে দেয়া সব স্যাংশন প্রত্যাহার করে নিবে। আর ওদিকে কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা থাকবে যদিও তা দিয়ে অস্ত্র তৈরি না করে আইনি মাত্রায় আটকে রাখবে আর তা জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে নিরীক্ষিত হবে – এই শর্তে এক চুক্তি হয়েছিল। ইরানের সাথে ২০১৫ সাল থেকে যা কার্যকর চুক্তি তার নাম ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ [Joint Comprehensive Plan of Action, JCPOA] ; যাকে অনেকে ইরানের সাথে পি৫+১ চুক্তিও বলে থাকে। কারণ এটা ছিল জাতিসঙ্ঘসহ তার নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও সাথে জার্মানিকেও নিয়ে করা। তাই (পি৫+১) বলা।

    কিন্তু পরবর্তিতে  ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সব উল্টে দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালেও ‘ইরান যথাযথভাবে চুক্তি মেনে চলছে’ বলে ট্রাম্প প্রশাসন রিপোর্ট দেয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সালের ৮ মে এই চুক্তি থেকে “আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে ট্রাম্প ঘোষণা দেন এবং পুরানা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। মূলত ইসরাইলকে ফেভার বা খুশি করতেই তিনি এসব করেছিলেন।

    যদিও সে সময়ে ডেমোক্র্যাটরা এমনকি ইইউও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ও সমালোচনা করেছিল। অথচ এখন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন সেই ট্রাম্পের পথ ধরেছেন। তিনি উসিলা খুঁজছেন কিভাবে পুরানা (JCPOA) বা ‘ইরান ডিল’ চুক্তি ফিরে তাকে না করতে হয়। সম্প্রতি সিনেটে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান মিলে আরো শর্ত চাপিয়ে একটা বিল পাস করিয়েছে যাতে সহজেই নয়া কোনো “ইরান ডিল” স্বাক্ষরিত না হয়। এটা ছিল এক রিপাবলিকান প্রস্তাব অথচ বাইডেনের দল তাতে সমর্থন দিয়েছে। এ ছাড়া বিশেষত এবার জুলাইয়ে বাইডেনের ইসরাইল সফর ও ঘনিষ্ঠতা এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

    এসব মিলিয়ে পুতিনের ইরান সফর নিয়ে করা বিবিসির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, “উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের মাখামাখি যেভাবে বাড়ছে এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে জোট বাঁধছে, সেটা ইরানকে উদ্বিগ্ন করছে। তাদের আশঙ্কা, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের বিপক্ষে নিয়ে যেতে পারে। কাজেই ইরান চেষ্টা করছে, রাশিয়ার সহায়তায় পাল্টা কিছু করা যায় কিনা”।

    এখন একটি সাম-আপ যদি করি তাহলে দেখব, প্রতিটা রাষ্ট্রই বিভিন্ন ইস্যুতে এনগেজ হয়ে থাকলেও; একটা রাষ্ট্র অন্য আরেক রাষ্ট্রের থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে বসে আছে। এগুলোকে একই জায়গায় আনা খুবই কঠিন, কখনো প্রায় অসম্ভব। এর ভেতর আবার দুটো মুসলমান প্রধান দেশ হলেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের স্বার্থ-অবস্থানে বিরাট ভিন্নতা দেখা যাবেই। এটাই স্বাভাবিক। যেমন এখানে ইরান ও তুরস্ক উপরে যে দুটো ইস্যুতে আলাপ করেছি, দেখা যাচ্ছে তারা একই অবস্থান নিতে পারছে না। আসলে কার্যত দেশ দুটো হলেই আর তাদের এক অবস্থান নেয়াটাও সহজ কাজ নয়। এই বাস্তব দিকটা মনে রেখে আমাদের চলতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৩০ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “পুতিন, এরদোগানের ইরান সফর“ এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

     

  • বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    ইউক্রেন-যুদ্ধকে ‘নয়া পর্যায়ে’ ঠেলে দিলেন !
    বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    গৌতম দাস

    ০৯ মে ২০২২, ০০:০৭  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-451

       Biden   seeks $33 billion war chest to support Ukraine

    ইউক্রেনের যুদ্ধ তৃতীয় মাসে পড়েছে, আর এরই মধ্যে এই যুদ্ধ এক নব ও বৃহৎ পর্যায়ে প্রবেশের মুখে মানে, এই যুদ্ধ বাইডেন এখন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বা কমপক্ষে আরো ছয় মাস গড়িয়ে নিতে যাচ্ছেন, তা বুঝা যাচ্ছে। অন্তত বাইডেনের নয়া পরিকল্পনা এটাই। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ-ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে দুটা মিডিয়া রিপোর্টে। মূলত গত এপ্রিলের শুরু থেকেই এই নয়া পরিকল্পনার উদ্ভব যার প্রকাশ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। তবে দুটো মিডিয়া রিপোর্টের শেষেরটা নিয়েই আগে কথা বলা যাক।

    আমেরিকান অভ্যন্তরীণ এক নিউজ নেটওয়ার্ক সিএনবিসি [CNBC] ২৮ এপ্রিল জানাচ্ছে, আমেরিকান কংগ্রেসের কাছে বাইডেন ইউক্রেনে সামরিক (অস্ত্র ইত্যাদি) ও মানবিক সাহায্যের জন্য মোট আরো ৩৩ বিলিয়ন ডলার পেতে অনুমোদন চেয়েছেন [Biden to ask Congress for $33 billion to support Ukraine through September] অর্থাৎ এই রিপোর্টে এটাও পরিষ্কার করে লেখা যে, এই অর্থ দিয়ে তিনি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে চান! আর এর মাত্র তিন বিলিয়ন খরচ হতে পারে মানবিক সাহায্য খাতে। কিন্তু মোট অনুমোদিত অর্থের প্রায় দু-তৃতীয়াংশই মানে, প্রায় ২১ বিলিয়নই আমেরিকা খরচ করবে ইউক্রেনকে সামরিক অস্ত্র সাহায্য জোগাতে। এ ছাড়া আরো প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার বাইডেন খরচ করবেন ইউক্রেনের ভাঙা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে।

    অন্য দিকে এবার আসি মিডিয়া রিপোর্টের প্রথমটায়। এই ইঙ্গিত-প্রমাণটা হল, গত মাসে ২৪ এপ্রিল বাইডেনের দুই মন্ত্রী- প্রতিরক্ষামন্ত্রী (আসলে তারা উপদেষ্টা আমাদের মন্ত্রীর সমতুল্য) লয়েড অস্টিন [Lloyd Austin ] আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken]- এরা দু’জন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে হাজির হয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাথে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। আর তাঁদের কিয়েভে হাজির হওয়াটাও গল্প-উপন্যাসের মত বেশ থ্রিলিং। তুরস্কের মধ্যস্থতার উদ্যোগে  রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে গত মার্চের শেষ সপ্তাহে  দ্বিতীয় ডায়ালগে বসার সময়ে তারা রুশ সৈন্য সমাবেশ কিয়েভ অভিমুখ থেকে ডনবাস অঞ্চলে সরিয়ে নিয়েছিল।  আর এই সুযোগে দিনে পোল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া কূটনীতিকরা  দিনে কিয়েভ এসে দিনেই ফেরত যাওয়া এভাবে  কিয়েভে হাজির হওয়া শুরু করেছিলেন। আর এরই উসিলায় লয়েড অস্টিন আর অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন প্রথমে পাশের দেশ পোল্যান্ডে (পোল্যান্ড ন্যাটো মেম্বার ও এই যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে) সফরে আসেন। আর সেখান থেকে নীরবে অজ্ঞাত সফরে বের হয়ে, ট্রেনে করে কিয়েভে পৌঁছে জেলেনস্কির সাথে দেখা করেন। তবে কিয়েভে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার কিছুটা আমরা বুঝতে পারি এনিয়ে প্রকাশিত ২৫ এপ্রিলের রয়টার্সের রিপোর্ট থেকে যার শিরোনাম ‘ইউক্রেন সফরঃ ব্লিঙ্কেন ও অস্টিন আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসার আর সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি [On Ukraine visit, Blinken, Austin pledge return of U.S. diplomats, more security aid]’। যদিও ওই রিপোর্টে সামরিক সাহায্যের কথা যতটুকু ছিল তার সবগুলোই খুবই কম, কয়েক মিলিয়ন ডলারের মাত্র। আর আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসা বলতে বুঝানো হয়েছে যে গত তিন বছর ধরে কিয়েভে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ছিল না আর অন্যান্য আমেরিকান কূটনীতিকদের যুদ্ধেশুরুর ১৫ দিন আগে পাশের পোল্যান্ডে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট। তাই এখন এই ইস্যুতে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ও কূটনীতিকদের ইউক্রেনে ফিরে আসার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আর সেকথাই ও’দুই  সফররত মন্ত্রী বলছিলেন।

    আসলে বাইডেনের এই ‘নয়া পর্যায়ের’ ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিকল্পনা অনেক বড় আর গভীরের। সিএনবিসির ঐ রিপোর্টে স্পষ্ট করেই লিখছে, ‘আমেরিকান সামরিক নেতারা বলছেন, ইউক্রেনে আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য দুটো। প্রথমটি হলো, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে সজ্জিত করা যাতে তারা ইউক্রেন থেকে রাশিয়ান সেনাদের পুরো বের করে দিয়ে সরাসরি বিজয় আনতে পারে। আর আমেরিকার দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, রাশিয়ার সমগ্র সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়া আর সাথে বাণিজ্যে ও অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওর অর্থনীতিকেও একেবারে ধসিয়ে দেয়া।’

    “U.S. military leaders say their strategic objectives in Ukraine are now two-fold.  The first is to arm Ukrainian forces so that they can secure an outright victory in the war by expelling Russia from Ukraine entirely.  The second is to weaken Russia’s entire power structure over the long-term by tying up its troops in a war of attrition while crippling its economy with sanctions and trade embargoes.”

    তবু আরো সহজে তা বুঝার আরেক উপায় হল অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন – বিশেষত অস্টিনের এই পর্যায়ের এপ্রিল মাসের সব সফরগুলোকে যদি এক সাথে মিলিয়ে দেখি। আমরা শুরু করতে পারি ৮ এপ্রিল অস্টিনের অফিস পেন্টাগনের থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতি থেকে। ওখানে বলা হয়েছে, অস্টিন ১০ এপ্রিল থেকে ইসরাইল, জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার এবং যুক্তরাজ্য সফরে বের হচ্ছেন। কিন্তু এগুলো ছিল সবই কেবল ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সফর তালিকা যার মধ্যে জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার ও যুক্তরাজ্য সফর সবই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার – এগুলো ছিল আসলে প্রথমবারের মত সফর! আর এরপর? এরপর শুরু হয়েছিল নয়া পর্যায়। তারা দু’জন এবার ২৩ এপ্রিল থেকে সফর শুরু করেছিলেন যেখানে ২৩ এপ্রিল তারা এই নয়া সফরে পোল্যান্ড পৌঁছে গেছিলেন। আর সেখান থেকেই পরদিন কিন্তু ট্রেনে অজ্ঞাতযাত্রা হিসাবে ইউক্রেনের কিয়েভে চলে গেছিলেন, যার কথা উপরে বলেছি।

    এর পরই শুরু হয়েছিল আসল সফর। ইউক্রেন সফর শেষে অষ্টিন এবার একা ২৬ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয়বার জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার সফর শুরু করেছিলেন। আর অস্টিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সফর ও উপস্থিতি ছিল মুখ্যত ২৬ এপ্রিল ন্যাটো-ইইউ [NATO-EU Talk] বৈঠকে। সেটা ছিল ৪০ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ইউক্রেন ইস্যুতে এক সভা। আসলে এটাই ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাইডেনের সর্বাত্মক যুদ্ধের ডাক- এরই সভা!

    বাইডেনের এই নয়া পরিকল্পনার চাপ সংশ্লিষ্ট ওই ৪০ দেশে কত প্রচণ্ড হতে পারে তা এখান থেকে সহজেই অনুমেয়।

    খুব সম্ভবত সে কারণেই নতুন করে ইইউর দেশগুলো যেন কোনোভাবেই রাশিয়ার তেল-গ্যাস না কিনতে পারে এজন্য কমিটমেন্ট দেয়ার প্রসঙ্গ এর পরই আবার উঠে আসে; যদিও ওই যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের এক সপ্তাহ পরই এই প্রতিশ্রুতি চাওয়া নিয়ে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে আরো আলাপের আগে গত ২৬ এপ্রিল অস্টিনের উপস্থিতিতে ৪০ দেশের ন্যাটো-ইইউ বৈঠক নিয়ে আরো কিছু কথা বলে নেয়া যাক।

    যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের নিউজের প্রায় সব রিপোর্টের হেড লাইন করা হয়েছে যার ভাষ্য এভাবে যে, “ইউক্রেন বিশ্বাস করে, সে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিততে পারবে”। যেমন- ইইউ জুড়ে উপস্থিত থাকা মিডিয়া ‘পলিটিকো [POLITICO]’ এর শিরোনাম হল – “অস্টিন : আমেরিকা বিশ্বাস করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন ‘যুদ্ধে জিততে পারে” [Austin: U.S. believes Ukraine ‘can win’ war against Russia]।” আবার ‘ইউরোনিউজ [EURONEWS]’ এর হেডলাইন হল, “সবাই বিশ্বাস করে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধে জিততে পারে’ বলেছেন আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে” [‘Everyone believes Ukraine can win the war,’ says US defence secretary at NATO-EU talks ]। অর্থাৎ “সবাই বিশ্বাস করে” অথবা “আমেরিকা বিশ্বাস করে” এই দুটো ভাষ্যই অস্টিন ওই বৈঠকে উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু কেন তিনি এই ‘বিশ্বাসের’ ওপর জোর দিলেন? এটাই মুখ্য!

    কারণ রাশিয়া যে, আমেরিকার সাথে টক্কর দেয়া পরাশক্তি ছিল বা আছে আর ইউক্রেন যে ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টা খণ্ডের এখন একটা খণ্ড-দেশ; আর সেই দেশ ইউক্রেন এখন রাশিয়াকে যুদ্ধে হারিয়ে দিবে – কথাটা না হাসির বিষয় হয়ে যায় তা আগাম ভেবেই মনে হচ্ছে, এখানে বিশ্বাসের উপর  জোর দেয়া হয়েছে। তবে মুখ্য বিষয়টা এখান থেকেই অনুমেয় যে, ইউক্রেনের রাশিয়াকে যুদ্ধে হারাতে গেলে আমেরিকা ও ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করে প্রায় ঢেকে ফেলতে হবে – এমন অবস্থায় যেতে হবে যা আদৌ কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন তো আছেই!

    তার মানে আমরা এখন অন্তত ৪০টা দেশ সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকবে – এমন এক “যুদ্ধ” প্রসঙ্গে কথা বলছি। এমন যুদ্ধের কথা শুনলেও  এদিকে অনেকে ভাবতে পারেন, আমার দেশ তো এই যুদ্ধের কেউ নয়, ফলে আমরা দূরে বসে খেলা দেখার মত যুদ্ধ উপভোগ করব। কিন্তু না; এই অনুমান দুনিয়ার সব দেশের বেলাতেই মিথ্যা হয়ে যাবে। মূল কারণ আমাদের বড় যুদ্ধের সবচেয়ে কমন ধারণা বলতে আমাদের মনে আসবে (১৯৩৯-৪৫) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ত। তাও আবার বয়স্ক লোকদেরই এনিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। সমস্যা হল, সে সময়কালের জমানায় গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে; যেটা এখন উল্টা। মানে এখন সব দেশই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে এক গ্লোবাল বাণিজ্যে পরস্পরের অর্থনীতি সরাসরি, সবার সাথে সবার অর্থনীতিই সংযুক্ত হয়ে গেছে। তাই এযুগে কোন ঘটনাই আর লোকাল বা এমনকি আঞ্চলিক বলে আর কিছু অবশিষ্ট নাই। ফলে এক দেশে কোনো পণ্যের অভাব হলে দুনিয়াতে ওই পণ্যের প্রধান উৎস দেশগুলোতে প্রথমে আর পরে দুনিয়ার সব দেশেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পরতে দেখা যায়। তাই পুরনো কোনো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়েই এবারের যুদ্ধের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। যেমন, কেবল তিনটি পণ্যকে যদি আলোচনায় আনি –  জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম – যা উৎপাদনের  একালে বড়  উৎস হল রাশিয়া ও ইউক্রেন (কেবল গম আর ভোজ্যতেলের বেলায়) উভয়েই। এ তিনটি পণ্যের মূল্যে গ্লোবালি ইতোমধ্যে আগুন লেগেছে; এরই মধ্যে যার মূল্য দ্বিগুণ বা এরও বেশি হওয়ার পথে। ফলে যারা চাল না, গম তাদের প্রধান খাদ্য যেমন পাকিস্তান বা ভারতের উত্তর অংশ, এরা বিশাল সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। শুধু খাদ্যের দ্বিগুণ মুল্যবৃদ্ধির কারণেই দুনিয়াব্যাপী এক বিপর্যয় আমাদের সকলের দিকে নব পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হবার আগেই ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। এথেকে আন্দাজ করা যেতে পারে গ্লোবাল অর্থনীতির হাল কী হবে অথবা কী পরিমাণ লোক অনাহারে বা খাদ্য কিনতে না পেরে মারা যাবে।
    এখন বাইডেন কি এসব সম্ভাব্য গ্লোবাল মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাগুলোকে আমল করেছেন? সম্ভাব্য জবাব হল, তিনি এসব আমল করলে এই নয়া যুদ্ধের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা – তারা সারা পশ্চিমের সবাই এখন ইউক্রেনের ঘাড়ে চড়ে নিজেদের স্বার্থের যুদ্ধটা সেরে ফেলতে চাইছেন! কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই যুদ্ধে কি কোন একটা পক্ষ নিজেকে বিজয়ী বলে দাবি করতে পারবে? সবচেয়ে বড় কথা – বাইডেন কী  মাত্র “৩৩ বিলিয়ন ডলারের’ মধ্যে এই নয়া যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন? এটা কি  আদৌও পারা সম্ভব?  আমেরিকা পরাশক্তির ইজ্জত হারিয়ে সদ্য – বহু কষ্টে ২০ বছরের আফগানিস্তান যুদ্ধ যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হত মানে, সেই অর্থ সব ড্রেনেজ হত –  কোনমতে ইজ্জত ভুলে হলেও তা শেষ করতে পেরেছিল, সেটা কি এই বাইডেনের হাতেই ঘটে নাই? সেই বাইডেন কী করে আবার এবার ইউক্রেনের কাঁধে সওয়ার হয়ে যুদ্ধে নামতে সবাইকে উত্তেজিত করতে নামেন কী করে!!!! এটা আক্ষরিক অর্থেই ‘ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন’ বটে!

    এই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিজ ব্যক্তি ইমেজ বাঁচাতে অথবা দলের ইমেজ বাঁচাতে বহুবার নিজ দেশকে যুদ্ধে নিয়ে গেছেন এমন রেকর্ড আছে। এমনকি বাইডেনের মত ডেমোক্রাট, কথিত “লিবারেল ভদ্রলোক ইমেজের” ক্লিনটনেরও মনিকা লিউনেস্কি কেলেঙ্কারি মামলা থেকে মনোযোগ সরাতে ইরাকের সাদ্দামের উপর বিমান হামলা – বোমা মেরেছিলেন তিনি। তাহলে এখন বাইডেনও কি আগামি নভেম্বর মিড-টার্ম নির্বাচন যেটাতে তার দল প্রেসিডেন্টের পারফরমেন্সের জন্য শোচনীয়ভাবে হারবে বলেই সার্ভে রিপোর্ট এরই মধ্যে প্রকাশিত, সেই নির্বাচনে বিজ খারাপ ইমেজ কমাতে বা ঢাকতে মানে প্রভাব ফেলতেই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ জোগাড় করতে গেছেন??  মানে ঐ অর্থ খরচ করতে তা আগামী নভেম্বর কেন, আরো অনেক নভেম্বর পেরিয়ে যেতে পারে – ঘটনা কি এভাবে আমেরিকার হাতছুট হয়ে যাওয়ার দিকে আরেকবার যাচ্ছে?

    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখিঃ
    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখি, বাইডেনের এ’যুদ্ধকে নয়া পর্যায়ে নেয়ার পরিকল্পনা বোঝা যাচ্ছে এপ্রিলের শুরু থেকেই। অথচ তুরস্কের উদ্যোগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির লক্ষ্যে ডায়লগ অনেক দূর এগিয়ে গেছিল। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ডায়লগ ঘটে যাওয়া মানে  এই যুদ্ধ একটা সমাপ্তির কাছাকাছি চলে যাওয়া এমন আশা দু’পক্ষের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল। যেমন প্রথম আলোর এক অনুবাদ রিপোর্টে যা ৩০ মার্চ প্রকাশিত, এর শিরোনাম ছিল, “ইস্তাম্বুল সংলাপ কি ইউক্রেন যুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।” মানে বলতে চেয়েছে এই যুদ্ধ কী সমাপ্তির দিকে চলে যাচ্ছে!!  আবার ২৯ মে বিবিসির রিপোর্ট থেকে নেয়া অনুবাদ রিপোর্টের শিরোনাম, “ইউক্রেনের যে প্রস্তাবে নমনীয় হলো রাশিয়া”। ভিতরের একটা বাক্য ছিল এরকমঃ এক মাসের বেশি সময় ধরা চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের দিকে এটাই সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। মস্কোর এই নমনীয় অবস্থানের পেছনে রয়েছে ইউক্রেনের প্রস্তাব”। অর্থাৎ যুদ্ধ যে সমাপ্তির দিকে তা এখানে একেবারে স্পষ্ট। এমনকি ৫ এপ্রিল রুশ বার্তা সংস্থা তাসের খবর অনুবাদ করে প্রথম আলো লিখছে, “লিখিত সমঝোতা হলেই পুতিন-জেলেনস্কি আলোচনা সম্ভবঃ পেসকভ”।

    অথচ বাইডেন প্রায় সমাপ্তি ও আপোষের দিকে চলে যাওয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে ঐ ৫ এপ্রিলের মধ্যেই নব পর্যায়ের আরেক বৃহৎ পরিসরে ৪০টা দেশের যুদ্ধের হিসাবে ঠেলে দিলেন। সোজা কথায় যা আগে কখনও করেন নাই এবার তাই করলেন – তাঁর পরিকল্পনা এবার একেবারে এর উল্টো। তিনি এপ্রিলের শুরু থেকে নয়া উদ্যোগে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছেন। তাই ১০ এপ্রিল থেকেই সেই বার্তা নিয়ে অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন ইউরোপ যুদ্ধের ডঙ্কা বাজিয়ে নেমে পড়েছেন! আর ২৬ এপ্রিলের মধ্যে ৪০ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সবাইকে ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে শামিল করে ফেলেছেন। চাপের মুখে ইউরোপ রাজিও হয়েছে।

    কিছু কথা মনে করিয়ে দেইঃ
    গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করেছিল। এর একদিন পরে জেলেনেস্কির হতাশা যে তারা একাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তেছেন পাশে আমেরিকাসহ ইউরোপের কোন দেশ নাই। অর্থাৎ তিনি প্রতারিত হয়েছেন তাই বলতে চেয়েছিলেন। এর পরোক্ষ জবাবে বাইডেন বলেছিলেন আমেরিকা রাশিয়া বিরুদ্ধে ইউক্রেন বা অন্য কোন দেশের মাটিতে যুদ্ধে লড়বে না। কারণ তার যুদ্ধের অস্ত্র ছিল আসলে রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে তুলে বিনা-অস্ত্রের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া।  একই যুক্তিতে এপর্যন্ত তিনি ন্যাটোর মাধ্যমে ইয়ক্রেনে কোন অস্ত্র সরবরাহ করেন নাই। যেটা সম্প্রতিকালে শুরু হয়েছে।
    তাহলে এখন ইউক্রেনে বা ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনকে অস্ত্র করতে চলে তিনি আগের সব প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে ফেললেন!!! আর তাতে এবারের সকল ততপরতাড় জন্য দায় তিনি নিজের মাথায় নিতেও বেপরোয়া হয়ে গেছেন। একারণের বলছি বাইডেন নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে নিজ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলেন। সারা দুনিয়াকে একটা অনন্ত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিলেন!!  আর ভাবছেন ৩৩ বিলিয়ন ডলারে তিনি ইউক্রেন-কে দিয়ে রাশিয়া জয় করাবেনই……। এই বাইডেন এখন সারা দুনিয়ার জন্য বিপদজনক ও দায়ীত্বজ্ঞানহীন হওয়ার পথে চলে গেছেন। তাই বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে চলেছেন!!

    ‘কিন্তু’ বিরাট বিরাট সব কিন্তুঃ
    ২৬ এপ্রিলের ন্যাটো-ইইউ এর ৪০ দেশের সভায় রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানি একেবারে বন্ধ অথবা ইইউ দেশের নিজ জ্বালানির সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনাই তোলা হয়নি। কিন্তু এরপর থেকে কানাঘুষা অথবা “চরম বিদ্রোহী” বা অসহ্য মনে করা দেশগুলো প্রকাশ্যে রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারবে না বলে প্রেসকে জানিয়ে দেয়। যেমন ইতালি, হাঙ্গেরি বা অস্ট্রিয়া এসব দেশের এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আর জার্মানি যে সবচেয়ে বেশি রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানিতে নির্ভরশীল (প্রায় ৪২ শতাংশ); যদি সে আজ এক কথা বললে পরের দিনই নিশ্চিত থাকা যায়, সে একটা উল্টো কথা বলবে। হয়তো বলে ফেলল, আমদানি বন্ধসহ অনেক কিছু করবে, কিন্তু পরের দিন বলবে ‘যদি সব দেশ রাজি থাকে তবেঅই জর্মানি সেটা করবে। আমরা যদি এসব স্ববিরোধী রিপোর্টের একটা সারাংশ করি তবে দেখব ৩ মে এর দুটো রিপোর্টই যথেষ্ট – পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি আঁচ করার জন্য। যেমন ৩মে এর  বিবিসির রিপোর্ট লিখেছে,  ইইউর মধ্যে এই প্রশ্নে বিভক্তি দেখা দিয়েছে [EU divided over how to step away from Russian energy]। ইংরেজি শিরোনামের অনুবাদ, ‘রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সরে আসা হবে কবে এই প্রশ্নে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত।’ সার কথায় এর জবাবে একদল বলছে, ২০২৭ সালের পর থেকে। প্রো-আমেরিকান অন্য গ্রুপ বলছে, চলতি বছর শেষ থেকে। আবার জার্মানি বলছে এখনই তো একেবারেই সম্ভব না। এদিকে প্রথম আলোরও ঐদিনের বাংলা  শিরোনাম – “রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিভক্তি”।

    কিন্তু একই দিন মানে ৩ মে এর নিউ ইয়র্ক টাইমস একেবারে সরাসরি ভাণ্ড ফুটা করে দিয়েছে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন লাগিয়ে এর শিরোনাম – ‘ইউরোপ কি রাশিয়ান তেল আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেয়ার পথেঃ এরপরে কী?’ [Europe Is About to Ban Russian Oil: What’s Next?]। আসলে ভেতরে খবর এর একেবারে উল্টা; অর্থাৎ কোন প্রশ্ন নয়, একেবারে জবাব!!! কী সেটা?

    এক্সপার্টদের জবানে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে- ১. এক্সপার্টরা বলেছেন রাশিয়ার সাথে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করা সম্ভব। ২. কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন; এ ছাড়া এ উদ্যোগ নিতে গেলে সরবরাহের অভাব ও বাড়তি মূল্যের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। ৩. আর তাতে আমরা এমন একটি অবস্থার মুখোমুখি হতে পারি যে, যেখানে ভোক্তারা এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়ছে সেই তাদেরই আমরা নয়া বাড়তি বোঝার শাস্তির মধ্যেই ফেলে দিতে পারি। আর এতে শেষ ফলাফল হবে, মানুষ করোনার দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়া অর্থনীতির সঙ্কোচন থেকে উত্তরণের যে লড়াই চালাচ্ছিল, তা শেষে লাইনচ্যুত হয়ে সব মাথায় ভেঙে পড়তে পারে।’

    “Analysts say it will be possible to sever Europe’s oil ties to Russia, but the effort will take time and may lead to shortages and higher prices for gasoline, diesel, jet fuel and other products — a situation that could penalize consumers already struggling with inflation and, ultimately, derail the economic recovery from the pandemic.”

    আর এই তিন পয়েন্টের সারাংশ কথাটা হল, আমরা বাইডেনের বাঁশির পেছনে হেঁটে একটা সম্মিলিত ধ্বংসের পথে যাচ্ছি!!! কেন?

    কেন ইইউ বাইডেনের আঁচল ধরে হাটছেঃ
    সবশেষে একটা অনুমিত ধারণার কথা বলে বিদায় নিব। নতুন করে ইউক্রেন যুদ্ধে হাওয়া দেয়া, অস্ত্র পাঠানোর ঘটনায় বাইডেনের স্বার্থ না হয়  উপরে ব্যাখ্যা করলাম কিন্তু ইউরোপ মানে সারা ইইউ কেন বাইডেনের পিছনে??? ইইউ-এর নেতা দেশগুলোই বলছে রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই তারা চলতে পারবে না, অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত এমন থাকতেই হবে এই কথা তারা নিজেরাই বলছে। তাহলে  আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অষ্টিন যখন ২৬ এপ্রিল, ৪০ রাষ্ট্রের ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে বসেন তখন সেখানে ইইউ চুপ করে থাকল কেন??? অথচ আবার মিটিং শেষে বাইরে এসে এবার আবার তারা সোচ্চার তারা রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই চলতে পারবে না – বলা হচ্ছে এনিয়ে তারা বিভক্ত?? কেন এমন??
    এরই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা একটাই দেখতে পাই, সেকথাটাই বলব এখন!
    ইউক্রেনের যুদ্ধ আসলে এক হিসাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব আসন্ন পালাবদলে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রক্সি যুদ্ধ।  গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনা উত্থান এই অনিবার্য এবং অবজেকটিভ ঘটনাটাকে জবরদস্তিতে তবু বাইডেন যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টায় নেমেছে। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু যে ঘটনাটা পর্দার পিছনে সেদিকে একটু আলো ফেলি।
    গত প্রায় পাঁচশ বছর এভাবে অথবা সেভাবে দুনিয়া শাসন-আধিপত্য করে আসছে সাদা ককেশিয়ান এথনিক জনগোষ্ঠি –  এবং একারণে তাদের কালচারাল আধিপত্যও শাসন করছে আমাদের সভ্যতা শিখানো সরকার বদল সবই করছে। মূলত কলোনি দখল করে তারা টিকেছিল, এই সময়কালের বেশিরভাগ সময়টা। আজ তা চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ এই প্রথম এশিয়ার চীন গ্লোবাল ম্নেতা হবার পথে। যার সোজা অর্থ এই প্রথম এটা সাদা শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে।  আমাদের চেয়ে এই এথনিক সাদা গোষ্ঠি এদিকটা অনেক বেশি খেয়াল রেখেছে। এই সাদা শ্রেষ্ঠতত্ববাদ – যেটার রাজনৈতিক উপস্থিতির একালের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ডোনাল্ড ট্রাম্প; এটা যতটা না তার রিপাবলিক দল তার চেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষক তিনি নিজে। এরা তাই চীনা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসায় আপত্তি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার। আসলে সারা পশ্চিম জুড়ে চীনা উত্থান ইউরোপ-সহ সারা পশ্চিমা দেশ ও কালচারের মধ্যে একটা আতঙ্ক হিসাবে ছড়িয়ে গেছে, হাজির হয়েছে।
    বাইডেন কী সেই চীনা ভয় আতঙ্ক মনে করিয়ে দিয়ে বার বার ইইউ-কে নিজের নেতৃত্বের অধীনে  নিচ্ছে??
    কিন্তু সারা পশ্চিম চাইলেও তো চীনা উত্থান ঠেকাতে সক্ষম হবে না। কারণ, – যা অবজেকটিভ যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত ঘটনা – তা ঠেকানো সাবজেকটিভ কাজ নয়; কর্তা মানুষের সেখানে কোন ভুমিকা থাকে না। মানুষ চাইলেই ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্প ঠেকায় দিতে পারে না।  যেমন বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সাম্রাজ্য আমেরিকান উত্থান ঠেকাতে পারে নাই, নিজেই ডুবে গেছে! আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা হয়েছে ১৯৪৫ সাল থেকে। অবজেকটিভ ঘটনা  যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত – এটা কোন দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ইস্যুও না। তাই কারও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তা ঠেকানোও যাবে না। এটা অবজেকটিভ সক্ষমতা অর্থাৎ, এক অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইস্যু। ঠিক যে সক্ষমতার জোরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হয়েছিল আমেরিকা!! প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর  তাঁর পিছনে ছিল সেকালেই  –  সারা ওয়াল স্ট্রিট, এই অর্থনীতিক পাওয়ার সেন্টার!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৭ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • জয়শঙ্করের সফর

    জয়শঙ্করের সফর
    গৌতম দাস
    ২৮ এপ্রিল ২০২২

    সম্ভবত এই প্রথম জয়শঙ্করের সফরকে প্রথম আলো – এর পক্ষে থেকে দেখতে পারবে না!
    দুনিয়া আসলেই বড় অদ্ভুত যায়গা! অথচ যেটা গুণে গুণে চারদিন আগেও  হয়ত পারত।

     জয়শঙ্করের সফরের উদ্দেশ্য কী? হাসিনা-মোদি কী বাইডেনকে তাদের সম্মিলিত আবেদন দিয়ে উল্টা চাপ দিতে চাইছেন?? হাসিনা-মোদি কী বাইডেনকে তাদের সম্মিলিত আবেদন দিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন?? আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু ফলাফল হবে সম্ভবত তাঁরা দুজনেই ফেল করবেন!

    কিন্তু কেন চাপ দিবেন, কী নিয়ে?
    যদি সব ঠিকঠাক থাকে, দুই প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বলতে চাইবেন তাঁদের উপর বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার – এদুই খড়্গ এর প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। শুধু এতটুকুই না, প্রচ্ছন্ন বা অস্পষ্ট হুমকিও থাকতে পারে যে অন্যথায় তাঁরা রাশিয়ার কোলে গিয়ে উঠে বসতেও পারে। তবে ততদুর যাক না-যাক এমন হুমকি দিতে পারে!

    জয়শঙ্করের সফরে একান্ত বিষয়ক সব আলাপের কারণ, ব্যক্তিগত ভাবে (অন্যের মুখে) ভারত যা বলছে হাসিনা যা শুনেছে এটাই ‘মোদির ভারতের’ সব ঠিকঠাক অবস্থান কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া খুবই জরুরি; তাই!
    যেমন মোদির বুঝ হতে পারে তাঁরা একসাথে চাপ দিবে এতদুর ঠিক আছে। তবে শেষে ভারত সত্যিই আমেরিকার হাত ছেড়েই দিব – এখনই তা সিদ্ধান্ত নেয় নাই বা এতদুর যাবে না। বা হুমকি-ইঙ্গিতও দিবে না। এমন হতে পারে। তাই আগাম ভারতের মনের কথা বুঝে নেওয়াটা খুবই জরুরি হাসিনার জন্য। পথে নামার আগেই এসব বিষয় ব্যক্তিগতভাবে পরিস্কার হতেই হবে, বুদ্ধিমান হতে হলে!
    আর যদি হাসিনা অন-বোর্ড হয়েছে এজন্য যে মোদি তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেই যে আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা পর্যন্ত মোদি যেতে রাজি – এমনটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিক একান্ত আলাপে জয়শঙ্করকে নিশ্চিত করতে হবে যে হা, মোদির ভারত বাইডেনকে ছেড়ে আসা পর্যন্ত চিন্তা করেছে!
    আসলে উপরের পুরা ঘটনাটা একটা পশ্চাদ পটভুমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তা হল, মোদি-বাইডেন সম্পর্কের সর্বশেষ অবস্থা। ক্রমশ এটা এখন এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে বাইডেনের পক্ষে মোদির উপর নিজ দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার- এদুই খড়্গ ব্যবহার ত্যাগ করা একেবারেই সম্ভব না। অন্তত কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘণ – এটা তো বাইডেনের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। এছাড়া এখন ভারতের বেলায় এটা ছাড় দিলে বাইডেনের ইমান উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন এই সন্দেহ তৈরি হবে। কারণ এই একই অস্ত্র রাশিয়ার পুতিন সহ চীন ও সবার উপরেই প্রয়োগ ব্যবহার বাইডেনকে করে যেতে হবে। সেটা ইউনিফর্ম থাকবে না তাহলে! তাই ভারতের বেলায় বাইডেন যতটুকু খাতির করতে পারে তা হল এখনই তিনটা অবরোধ আরোপ করার সুপারিশ বাইডেনের অফিসে পেন্ডিং – তা আরো বড়জোর কয়েক মাস পেন্ডিং ফেলে রাখা। কিন্তু কোনভাবেই তা বাতিল বা ভারতকে বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দেয়া জাতীয় কথা উচ্চারণই বাইডেন করতে পারবেন না।
    ওদিকে মোদির সমস্যা হল, কমপক্ষে আগামি ২০২৪ সালে নিজের পুনঃনির্বাচন পর্যন্ত সব নির্বাচনে মোদিকে মুসলমান কোপানো-হত্যার কথা সরাসরি বলে চলতেই হবে – এই নীতিতে তাকে দল ও রাজনীতি পরিচালিত করতেই হবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ বলে ক্ষুব্ধ হিন্দু -ভোটারদের নিজের বাক্সে আনার জন্য এটাই মোদির হাতের শেষ অস্ত্র। কাজেই বাইডেনের মানবাধিকার বা অবরোধের ভয় আমল করার অবস্থায় নুন্যতম ভাবে বাইডেনকে ছাড় দিবার অবস্থায় মোদি নাই। বরং বাইডেনের এই মানবাধিকারের হুমকি উল্টা ভারতে দেশের ভিতরের – সুপ্রীম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনার বা আমলাদেরকে মোদির বিরুদ্ধে সাহসী করে তুলতে পারে। ইতোমধ্যে সাবেক শত আমলা-সচিব মোদির বিরুদ্ধে নাগরিক-বৈষম্য ও মুসলমান হত্যা ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছে [ঘৃণা আর বিদ্বেষের আবহে আমরা ভীত! মোদীকে খোলা চিঠি প্রাক্তন আমলাদের]। যেটা মোদির জন্য খুবই এলার্মিং!
    তাহলে সারকথা – মোদি আর বাইডেন কেউ কাউকে এতটুকু জায়গা ছাড় দিয়ে আপাতত বিবাদের সমাধান করবে সেই সুযোগ দুপক্ষের কারও হাতে নাই।
    এই অবস্থায় মোদি যদি (একা নয় সাথে হাসিনার প্রতিনিধি ও সুপারিশ সাথে নিয়ে ) বাইডেনের মুখোমুখি হয় তবে এখানেও ভারত-আমেরিকা যে কেউ কাউকে সম্পর্ক ছেড়ে যাবার চরম কথাটা উচ্চারণ এখনও করে নাই বা করছে না সেটাই প্রকাশ্য হয়ে গিয়ে বিপদ ডেকে আনতে পারে – কোন হাতছুট মুহুর্তে!

    বটম লাইন হল, কোন আগামি পরিস্থিতিতেই হাসিনার সংকট কাটছে না। বরং ভারত-বাংলাদেশের যৌথ মুভ সংকটকে আরো বাড়িয়ে তা “এখনই” ডেকে আনার অবস্থায় ফেলতে পারে! বাংলাদেশের ব্যাপারে বাইডেনের সিদ্ধান্তই ডমিনেট করার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। এছাড়া সেক্ষেত্রে, বাইডেনের বগলে ভারত না থাকার সম্ভাবনাও বেড়ে গেল!

    পুনশ্চঃ- আলী রীয়াজের আজকের লেখার শিরোনামটা বেশ অদ্ভুত! “বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবে ভারত?”।
    আচ্ছা আলী রিয়াজের কাছে তাঁর জাতীয় স্বার্থ কোনটা? আমেরিকার স্বার্থ না বাংলাদেশের স্বার্থ? আমি এনিয়ে পুরাই কনফিউজড বিভ্রান্ত! আমাদেরকে এভাবে বিপদে না ফেলে, এসব শব্দ তাই লেখকদের এড়িয়ে চলাই ভাল!!!

    অন্তত গত চৌদ্দ বছর ধরে যেখানে আমেরিকান স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ হয়ে আছে তখন তিনি “বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব” ভারত করলে কেন বিস্মিত হচ্ছেন? আমি বুঝি নাই!  কে যে কখন কার পক্ষে!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    ভারতই ‘ঋণের ফাঁদে’? তা ফেলল কোন ‘চীন’!

    গৌতম দাস

    ২৩ এপ্রিল ২০২২, ২০:৫৫

    https://wp.me/p1sCvy-439

     

    কেন শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বলে ভারতের আমলারা মোদিকে সাবধান করলেন?

    –
    প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর দুই ডজন সচিব নিয়ে চার ঘন্টা ধরে এক মিটিং করেছেন। বিষয় হল, ভারতের নাকি শ্রীলঙ্কার মত অর্থনৈতিক অবস্থা হতে পারে বলে তার সচিবেরা মোদিকে সাবধান করেছেন। খবরটা করেছে ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই [PTI]। যা ছাপিয়েছে অনেক মিডিয়াই। এমনই  এনডিটিভি-এর খবরটা এখানে দেয়া হল [States’ Freebies Flagged To PM With Lanka-Like Crisis Warning: Report]।
    কথা হল, একালে চীন নাকি খারাপ খারাপ ঋণ গছিয়ে সবার অর্থনীতিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলে চলছে – একথা, এতদিন বলে প্রপাগান্ডার রাজা ভারত  চলছিল। সর্বশেষ এমনকি বাংলাদেশেও নাকি এর শিকার বলে কেউ কেউ নিউজ বা ইউটিউব ক্লিপ তৈরি করে প্রচার করছিল।। আজ, তাহলে এত সাবধানী খোদ সেই ভারতকেই আবার “ঋণের ফাঁদে” ফেলল কে? এটা তো একেবারে নিজের ফাঁদে নিজেই পড়া!   এতো দেখা যাচ্ছে এটা হল – মিথ্যা করে, বাঘ আসছে বাঘ আসছে বলে গ্রামবাসীকে উত্যক্ত করা রাখাল বালকের ঘটনা। আর এনিয়েই এবারের প্রসঙ্গ।

    শ্রীলঙ্কা গত কয়েক মাস ধরে হেডলাইনে, কারণ তার দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ প্রায় শূন্য, কোনো বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে প্রায় নাই। অবস্থা এতই করুণ যে, যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন স্কুল-কলেজের স্টুডেন্টদের লিখার কাগজ যা শ্রীলঙ্কা আমদানি করে চলে তা এখন কেনার মত বৈদেশিক মুদ্রাও তার হাতে নাই। ফলে স্কুল-কলেজে পড়াশুনা লাটে উঠেছে। এছাড়া আমদানি করা খাদ্যের বেলায় সমস্যা আরো ভয়াবহ। সব মিলিয়ে এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে।

    আর এই সুযোগেই কিছু প্রো-আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট মাঠে নেমে পড়েছে। তারা এটাকে চীনবিরোধী ক্যাম্পেইনের এক সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। এমনকি বাংলাদেশ নিয়েও – আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট যারা চীন বিরোধিতা করে থাকে তারাও কিছু আর্টিকেল বা ইউটিউব কনটেন্ট ছড়ানো শুরু করে দিয়েছে যেখানে কোনো ফ্যাক্টস ফিগারের বালাই ছাড়াই তারা বলছে যে বাংলাদেশেও নাকি শ্রীলঙ্কা হবে? আপনি হাসিনা সরকারের-বিরোধী তাতে তো কোণ সমস্যা নাই। কিন্তু তাই বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে  জিতবেন?? কতদুর যাবেন? এভাবে জেতা যাবে না। কিন্তু এটাই চলছে। যদিও এখানে এই লেখার গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এসব প্রপাগান্ডিস্টদের কবল থেকে প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা, যদিও তা ঠিক তাদের বিরোধিতা করে নয়। কারণ পক্ষ-বিপক্ষে প্রপাগান্ডা, যারা এ নিয়ে বাঁচতে চায়, কিছু কামাই করে চলতে চায় তারা তা করবেই। তাহলে ‘প্রসঙ্গটাকে বাস্তবে আনা’ বলতে ঠিক কী করতে চাই?

    গত কয়েক বছর ধরে যারা এই ক্যাম্পেইন ‘মাস্টার’, তারা যে ভাষ্যের ওপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করেছে তাদের একটা বড় অংশ হল বলা যায় যারা একেবারে  যেকোন ঋণ-গ্রহণের বিরোধি। এককথায় এরা নিজেদের প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশ এক ধারা বলে নিজেকে ভাবে। এরা মুল প্রপাগান্ডিস্ট নয়, তবে এদের ভাষ্য-অবস্থান চীনবিরোধী আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্ট্দেরকে সহায়তা যোগায় যেহেতু এদের বয়ান মুল প্রপাগান্ডিস্ট্দের সহায়তা করে।  এই মূল প্রপাগান্ডিস্টদের  মানে হল, কিছু প্রপাগান্ডা বক্তব্য যেমন, “চীন ফাঁদে ফেলে কোনো দেশকে অতিরিক্ত ঋণ গছিয়ে দিয়ে থাকে। তাই এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে”। তাই এই প্রপাগান্ডাকে তারা শিরোনামে বলে থাকে – ‘ডেট ট্রাপ’ [debt trap] বা ‘ঋণের ফাঁদ’ বলে। যেন চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে এক নম্বর বা সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এসব ছেচরামি করেই!!! এই হল এদের প্রপাগান্ডা বা চীনকে নিচা দেখানোর এক করুণ কায়দা!!  এতে ভাবনাটা অনেকটা ছেলে ধরার গল্পের মত যে, এশিয়ার দেশগুলো – এই তোরা আর বাইরে যাস না, চীনের ‘ঋণের ফাঁদ’-এ পড়বি!!!! তাই, তোরা ভারত-আমেরিকা ছুয়ে থাক!!
    আচ্ছা, কোন দেশকে অতিরিক্ত ঋণ দিয়ে ডুবিয়ে চীনের মত দেশের কী লাভ? এটা কী আসলেই কোন লাভ? শেষ বিচারে যখন কোন দেশ ঋণের সমস্যায় পরে যায় তাতে ক্ষমতাসীন সরকারের ইমেজ ক্ষুব্ধ পাবলিকের সামনে কোনভাবে কী আর কোন কাজে লাগে? পক্ষে যায় না যেতে পারে??

    গরীব অর্থনীতির দেশ “ঋণ না নিয়ে” চলে না কেনঃ
    আমরা পছন্দ করি বা না-করি ফ্যাক্টস হল, আমাদের মত দেশে নতুন কাজ সৃষ্টি করতে গেলে যে নয়া বিনিয়োগ লাগে তা যোগানোর মুরোদ আমাদের অর্থনীতির নাই। কাজ সৃষ্টির প্রয়োজনটা আমাদের না বুঝার কিছু নাই যে কোন নির্বাচিত সরকার অন্যতম কাজ হচ্ছে কর্মক্ষম জনগণের জন্য কাজ সৃষ্টি করা। কিন্তু তাই বলে কাজ সৃষ্টি করতে গেলে তো অর্থনীতিতে যে নয়া বিনিয়োগ লাগবেই তা দেশের অর্থনীতিতে থাকবে না কেন? বিনিয়োগ অন্য কোথাও থেকে আনতে হবে, অন্য দেশ দিবে ইত্যাদি  – এই ব্যাপারগুলো কী স্বাভাবিক? জবাব হল, না একেবারেই তা স্বাভাবিক নয়। বরং একেবারেই তা উল্টা। অর্থাৎ প্রত্যেক দেশের অর্থনীতিই তার দেশের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ যা আসলে “অর্থনীতিতে পুরানা সঞ্চিত সম্পদ” তা আসলে নিজেই উতপন্ন ও জমা-সঞ্চয় করতে সক্ষম থাকে। তাহলে প্রশ্ন হল আমাদের মত দেশের তা নাই কেন? কেন বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনতে হয়? এমনকি তা দুই ধরণের বিনিয়োগই – অবকাঠামোতে (infrastructure) বিনিয়োগ আর ব্যবসা-কারখানায় বিনিয়োগ (FDI) –  যা অন্যদেশ থেকে আনতে হয়। তা বিদেশ থেকেই আনতে হয়, কেন?

    প্রগতিবাদি-কমিউনিস্টদের একাংশের মধ্যে এমন মনোভাব আছে যে ঋণ নেয়া হারাম!! কেন?
    এর জবাব আমরা সবাই জানি কিন্তু খেয়াল করি নাই। মূল কারণ ইউরোপের হাতে আমাদের কলোনি দখল হয়ে যাওয়া। আমরা বৃটিশদের হাতে কলোনি দখল হয়ে গেছিলাম বলে তাঁরা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ব সব সম্পদ লুটে তা পাচার করে তাঁরা নিজ দেশে নিয়ে গেছিল, দুশ বছর ধরে লাগাতর। আজও আমাদের দেশের বিনিয়োগের অর্থ সংকটের মুল কারণ এটাই।  এতে আমাদের দেশ পরবর্তিতে এক চরম বিনিয়োগ পুঁজি সংকটে পড়েছিল বিশেষত ১৯৪৭ সালে বৃটিশ কলোনি দখলের অবসান হয়ে যাওয়া সত্বেও। এখান থেকেই এরপর থেকে আমরা চাই বা না চাই বিদেশ থেকে বিনিয়োগ পুঁজি নিতে আমরা বাধ্য হয়ে যাই।
    কিন্তু তাতেও নতুন সমস্যা বাধে বা তৈরি করে আমাদেরই কিছু  (প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট) লোকের মাথায় “পুঁজি জিনিষটাই খারাপ” – এই ধারণা “মাথায় গেথে বসে” থাকায়। এদেরকেই আমরা প্রগতিবাদি-কমিউনিস্ট বলেই চিনি। পুঁজি নাড়াচাড়া করা, পুঁজির ততপরতায় জড়ানো, ব্যবসা করা ইত্যাদি কাজকে ধর্মে পাপের যে ধারণা সে চোখে যেন পাপ মনে করে বা পাপের চোখে দেখে থাকে।  অথচ ব্যবসা করা মানে তো পুঁজির ততপরতা তাই এটা পাপ ও হারাম ধরণের কাজ যেন!
    অথচ দেশে অর্থনৈতিক ততপরতা না চললে মানুষ খাবে কী? না কাজ পাবে না খাবার কিনতে পেতে পারে। যদিও এর একটাই জবাব তাদের কাছে আছে যে একমাত্র তাদের কথিত এক সমাজতন্ত্র চিন্তা যার সারার্থ তাদের কাছে – কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় উতপাদন চলতে দেয়া হবে!! এটাই একমাত্র “সহি’ অর্থনৈতিক ততপরতা। যেন এটাই তাদের ধর্ম অনুসারে একমাত্র সহি ততপরতা। এর উদাহরণ হাতের কাছেই পাবেন। বাংলাদেশের প্রথম সাড়ে তিন বছরের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিনের নেতৃত্বের অর্থনীতি অথবা ভারতে নেহেরু নেতৃত্বে কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যা ১৯৯০ সালে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ার আগে পর্যন্ত থামে নাই বা কোন সংস্কার-বদল ঘটে নাই। চরমতম “ব্যালেন্স অপব পেমেন্টের” ঘাটতিতে [মানে বৈদেশিক রিজার্ভের ঘাটতি থেকে ভাঁড়ার শুণ্যে করার দিকে যাত্রা] পরে শেষে এটা বিশ্বব্যাংকের চরণে হামলে পড়েছিল, ঐ ১৯৯০ সালে! বাংলাদেশেও তাই হয়েছিল। অন্যভাষায় এটাকে আমরা প্রচলিতভাবে বলি “চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ”। যার প্রধান এবং কমন ফেনোমেনা হচ্ছে – বৈদেশিক রিজার্ভ শুণ্য হয়ে পড়া। তাই কোন খাদ্য আমদানিরও মুরোদ না থাকা। আজকের শ্রীলঙ্কাতেও সেটাই ঘটেছে। আর তাতে আমাদের দেশে তখন হতাশ শেখ মুজিব তাজউদ্দিনকে ফেলে পাশে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি কিসিঞ্জারের সাথে কথা বলেন আর বিশ্বব্যাংকেও তদবীর করে আসেন ঐ চুয়াত্তরেই সেপ্টেম্বরের শেষে। কিন্তু সেই সাহায্য ও নীতিগত সংস্কারের সুবিধা বাংলাদেশে শুরু হবার আগেই তিনি পরের বছর (১৯৭৫) খুন হয়ে গেছিলেন। মোটামুটি ছিয়াত্তর সালের শুরু থেকেই প্রথম আমরা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও ফান্ড পাওয়া শুরু করেছিলাম।
    তাই মূলকথাটা হল, চোরে আপনার বাসার সব থালাবাসনও চুরি করে নিয়ে গিয়েছে বলে চোরের উপর রাগ করে বা “পাপমুক্ত থাকতে” কিংবা জিদ পুরা করতে আপনি আর মাটির সানকি থালাও না কিনে মাটিতে ভাত রেখে খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন না। এটা এথিকস পালন করার কোন কায়দাও না। বরং এটা সোজাসাপ্টা স্টুপিডিটি; অক্ষমের বাস্তববোধহীনতা!!!  তাহলে ঠিক কী বলতে চাচ্ছি?

    বলতে চাচ্ছি যে ইউরোপ বা পশ্চিম যারাই আমাদের সম্পদ লুটে চুরি করে নিয়ে গেছে তারাই একালে (১৯৪৫ সালের পর থেকে) যেন সেই সম্পদের কিয়দংশ  ফেরত দিতে চায়, যেটাকে তারা ঋণ বলছে! আর এরই অর্গানাইজেশনাল রূপ পদ্ধতির একটা সিস্টেমের নাম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক।  সোজা করে বললে এরা বিনা-সুদের অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে নামমাত্র সুদের (০.৭৫% বা, ১% পার্সেন্টের নিচে) ঋণ (যা আবার লম্বা ৪০ বছর ধরে পরিশোধযোগ্য)। আর এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অন্যদিকে প্রাইভেট কোম্পানির গ্লোবাল পুঁজি বাজার সর্বোচ্চ ৮% সুদে  বিভিন্ন ঋণ পাবার দিবার সুযোগ এসব প্রতিষ্ঠান করে থাকে।  তবে সাবধান প্রপাগান্ডায় পরা যাবে না। বিশ্বব্যাংকের কোন ঋণেই ৪% এর বেশি সুদ হয় না। আর প্রাইভেট কিন্তু গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সুদের হার সর্বোচ্চ ৮%  যা আমাদের মত দেশের জন্য দেখা গেছে ৬% এর বেশি নয়। তবে এটা একটা কাফফারা অবশ্যই। সেই সাথে আরো আছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্বভাবতই আমেরিকা বা পশ্চিমের স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে চলা সংগঠন; তা মিথ্যা নয়। তাই এর জ্বালা ও আমাদের স্বার্থহানি ঘটা বা সময়ে বড় প্রতিবাদ না করতে পারার মনকষ্ট আমাদের মত দেশের সেখানে আছে। যদিও সে কষ্টেরও একটা শেষ যেন আছে। যেমন এখনকার বাংলাদেশের ইচ্ছা (ক্ষমতাসীনদের)  অনুসারে কোন ঋণ কিভাবে নিবে অথবা একেবারেই নিবে না কিনা অথবা দেয়া শর্ত কবুল করবে বা না করবে ইত্যাদি আমরা বাছাই করার সামর্থে পৌছেছি। এছাড়া এমন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানও এখন একের অধিক হয়ে গেছে। কিন্তু কমিউনিস্ট গোয়ার্তুমি ছেড়ে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের কাছে এটা এথিক্যাল প্রশ্ন বা অবস্থানের ইস্যুই নয় যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ভাল না মন্দ। বরং এটা মন্দের ভাল, কিছুই না থাকার চেয়ে। আসলে এটা একটা খারাপ বাস্তবতাতে সেখান থেকে উঠে আসতে আমাদের বুদ্ধিমান কোন কম্প্রোমাইজ ও সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই আমাদেরকে বের  আজ হয়ে আসতে পারার অবস্থায় পৌছাতে হয়েছে।  তাই কোন পুঁজির ততপরতা খারাপ কিনা, ব্যবসা হারাম কিনা ইত্যাদি বিবেচনা করে – সারকথায় বিদেশি পুঁজি নেওয়া যাবে না এমন অলীক ভাবনা – এটা সবসময় আসলে অর্থহীন প্রলাপ। কিন্তু এই প্রলাপ বয়ানের উপর ভর করেই  আমেরিকান ও ইন্ডিয়ান প্রপাগান্ডিস্টেরা একালে রাজত্ব জমিয়েছে আর  চীনের তথাকথিত ঋণের ফাঁদের গল্প আমাদের শুনিয়েছে।  যেন কমিউনিস্টরা এবার বলতে চায় বলেছিলাম না বিদেশি ঋণ খারাপ জিনিষ!! আর ওদিকে প্রপাগান্ডিস্টেরা বলতে চায় যেন চীনা ঋণ হলে তা খারাপ আর আমেরিকান বা ইন্ডিয়ান ঋণ  আমাদেরকে দিলে অথবা  এ’দুই দেশ নিজের জন্য গ্লোবাল বাজার থেকে নিলে সেগুলো ভাল ও হালাল!!!  অবশ্য একটু পরেই আমরা দেখব খোদ আমেরিকা বা ভারত রাষ্ট্র নিজেরা নিজেদের বেলায় বৈদেশিক ঋণ কিভাবে নিয়েছে!

    চীনা ঋণের ফাঁদের প্রপাগান্ডা বয়ানের যুগেঃ
    বাস্তবে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর গড়া নিয়ে চীনের ঋণ নেয়ার এত কথা প্রথম প্রচারে এসেছিল। সেই বন্দর প্রকল্প পরে কার্যত শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে আর কোনো বোঝা হয়েই দাঁড়ায় নায়। কারণ, পরের প্রো-ইন্ডিয়ান সরকারের আমলেই  ঐ সরকার চীনের সাথে কথা বললে চীন এক সহজ সমাধান করেছিল। তা হল, পুরো প্রকল্পটাকে এক চীনা প্রাইভেট কোম্পানি কিনে নিয়েছিল, তাতে চীনের ঋণ পরিশোধের দায়ও ওই পোর্ট ক্রেতা নয়া কোম্পানির, তাতে শ্রীলঙ্কা সরকারকে কোনো ঋণের দায় আর বইতে হবে না, পরিশোধ করতে হবে না। চীনা সরকার এই ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিল। ফলে শ্রীলঙ্কা সরকারের কোন অর্থনৈতিক দায় আর ছিল না। ফলে এই পোর্ট প্রকল্প থেকে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে চাপ ফেলা জাতীয় কোনো প্রভাবের আর বালাই থাকেনি। অর্থাৎ পোর্ট প্রপার্টিটাই আর সরকারের থাকেনি। বরং যেকোন প্রকল্পের মোট মূল্যের প্রায় ২৫-৩০ ভাগ মালিকানা হোস্ট দেশের এমনিতেই পেয়ে যায় কোনো বিনিয়োগ করা ছাড়াই। কারণ প্রকল্পকে দেয়া জমি বা অবকাঠামো দেয়ারও একটা মূল্য ধরা থাকে বলে সরকার কোনো অর্থ খরচ না করেই তেমন প্রকল্পে ২৫-৩০ ভাগ মালিকানার ভাগ পেয়ে যায়। ফলে চীনা ওই প্রাইভেট কোম্পানি এখন হাম্বানটোটা পোর্টের বাকি অংশ, প্রায় ৭০ ভাগের মালিক। কিন্তু সেই থেকে তবু প্রপাগান্ডা আর কখনো বন্ধ হয়নি – আর তা থেকে ‘হাম্বানটোটা’ আর ‘চীনের ঋণের ফাঁদ’ এ দুই শব্দ থেকে যায় জব্বর প্রপাগান্ডা শব্দ হয়ে।

    তাহলে এই লেখা থেকে আমরা ঠিক কী করব? কী জানব?
    এসব প্রপাগান্ডার সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তিমূলক দিক যেটা তা হল, এই প্রপাগান্ডা বলতেই পারে না যে কোন দেশ কী পরিমাণ ঋণ নিলে তা ‘ঋণের ফাঁদ’ হয়ে যায়? (এক কথায় কোন দেশের জন্য কত দূর ঋণ নেয়া সেফ [safe]? তা কি আগাম জানা যায়? তা মাপার কি কোনো স্টান্ডার্ড আছে?) নাকি চীনা বা বিদেশী ঋণ মাত্রই ‘ঋণের ফাঁদ’? প্রপাগান্ডিস্টরা এটা কোনদিন পরিষ্কার করে বলে না, উহ্য রেখে পাশ কাটিয়ে থাকে? অর্থাৎ কোন দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান কী ও সেফ ঋণ নেওয়ার স্টান্ডার্ড কী তা হাজির না করেই এরা দাবি করতে থাকে চীনা ঋণ নেয়া একটা ফাঁদ! এই হলো এসব প্রপাগান্ডার কৌশল। এমনকি আমেরিকান প্রশাসন যে প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল এমন একটা রিপোর্ট হল এখানে।   এই রিপোর্টেও এ দুই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, পাশ কাটিয়েছে। তাদের ছাপানো কোনো প্রপাগান্ডা আর্টিকেলেও এ নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। বরং এটা আমেরিকান চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক অবস্থানের পক্ষে সাফাই বক্তব্য। যা ঠিক ঋণ নেয়া প্রসঙ্গে অর্থনীতি-নির্ভর ব্যাখ্যা নয়।
    এমনকি পরবর্তিতে এসব প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এক ডাচ কনসাল্টেন্টের রিপোর্ট ওই দাবি নাকচ করে আর্টিকেল ছেপেছিল যদিও সেখানেও ঋণ নেয়ার স্টান্ডার্ড কী, কত দূর ঋণ নেয়া সেফ আর আলোচ্য দেশের পরিসংখ্যান গত ফ্যাক্টস কী তা নিয়ে কোনো আলাপ করা হয়নি সেখানে। এতে সবার বক্তব্যই হয়ে গেছে শেষ বিচারে এক আন্দাজি কথাবার্তা বা সরাসরি প্রপাগান্ডা অথবা এসব প্রসঙ্গ থেকে দূরে অন্য প্রসঙ্গের বক্তব্য। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য ও প্রসঙ্গ হলঃ কোন দেশ নিজ অর্থনীতিতে কী পরিমাণের বেশি বিদেশী ঋণ নিয়ে ফেললে তা রিস্কি হওয়া শুরু হতে পারে, এ নিয়ে একটা গবেষণা স্টাডির ফলাফল পাঠকের সাথে সহজ ভাষায় আলাপ করা, শেয়ার করা।

    এনিয়ে বিশ্বব্যাংকের স্টাডি রিপোর্টের ফাইন্ডিংস কী বলেঃ
    সৌভাগ্যবশত এটা কোন খামখেয়ালি কথা নয়; গবেষণা, অবজারভেশন আর স্টাডি থেকে বাস্তবে পাওয়া রেজাল্ট। এই গবেষণাটা করেছিল বিশ্বব্যাংক এবং তা টানা ১৯৮০-২০০৮ এই ২৮ বছরের ডাটা নিয়ে। আর তা ১০১টা দেশের অর্থনৈতিক ডাটা নিয়ে যাদের মধ্যে গরিব ও ধনী উভয় ধরনের দেশই ছিল।
    কোন দেশের রাষ্ট্রীয় ঋণ পরিমাপ করার এক প্রচলিত পদ্ধতি হল তা ওই দেশের জিডিপির কত অংশ বা অনুপাতে কত তা জেনে নিয়ে প্রকাশ করা। অর্থাৎ ওই দেশের নেয়া মোট ঋণ, মোট জিডিপির কত অংশ সে অনুপাত সংখ্যা দিয়ে। যেমন যদি বলা হয় একটা দেশের ঋণ ৭৭%। তাহলে এ কথার মানে ওই দেশের জিডিপির ৭৭% – এই অঙ্কই হল ও দেশের নেয়া মোট বিদেশি ঋণ। আসলে এটাই ও দেশের ঋণ-বনাম-জিডিপির অনুপাত। যদিও বিভিন্ন দেশের মোট ঋণ সংক্রান্ত ডাটা পড়তে গিয়ে সাবধান! মোট ঋণ বললে রাষ্ট্র আভ্যন্তরীণ ভাবে নিজ কারেন্সিতে যে লোন নিয়েছে সেটাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে তাতে। তাই পরিস্কার করে বলতে ও বুঝতে হবে যে আমরা কোন দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রায় নেয়া ঋণ আমাদের আলোচ্য বিষয়।

    এই হিসাবে এই গবেষণায় পাওয়া ফাইন্ডিংস হল, কোনো দেশের নেয়া রাষ্ট্রীয় ঋণ ঐ দেশের জিডিপির ৭৭% বেশি হলে বা ছাড়িয়ে গেলে তা বিপদ জোনে প্রবেশ করেছে মনে করা হবে। তবে এই হিসাব সব্দেশের বেলার জন্য নয়। এতা কেবল অগ্রসর অর্থনীতির দেশের (যেমন জি৭ গ্রুপের দেশ [G7 countries]) বেলায় যারা পুরনো ও বড় অর্থনীতির দেশ বলে অনেক ঘাত সইবার সক্ষমতা থাকে।

    আর এর পরের ক্যাটাগরির মানে যাদেরকে উদীয়মান [Rising Economy] অর্থনীতি (যেমন জি২০ গ্রুপের দেশ) বলে, এদের ক্ষেত্রে টিপিং পয়েন্ট [Tipping point] বা বিপজ্জনক জোনে প্রবেশ ধরা হয় বা ঋণ-জিডিপি অনুপাত হল তাদের ৬৪% এর বেশি তা ছাড়িয়ে গেলে।

    এই হলো, বিশ্বব্যাংকের ওই গবেষণা ফলাফল থেকে পাওয়া ফলাফল। তাই তখন থেকে এটাই বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে মানা হয়। এই বক্তব্যগুলো পাওয়া গেছে ‘টিপিং পয়েন্ট খোঁজা কখন রাষ্ট্রের নেয়া ঋণ খারাপ ঋণে পরিণত হবে’[Finding The Tipping Point — When Sovereign Debt Turns Bad] এই শিরোনামে পাওয়া গবেষণা ফলাফল থেকে, যা বিশ্বব্যাংকের লাইব্রেরিতে রক্ষিত। আর ‘টিপিং পয়েন্ট’ বলতে সহ্য সীমা বা ভেঙে পড়ার আগের বিন্দু বুঝা যেতে পারে।

    তাহলে আমরা এখন আন্দাজে মন গড়া কথা বলে, যাকে দেখতে পারি না তার বিরুদ্ধে কথা বলা প্রপাগান্ডা থেকে চাইলেই বের হয়ে আসতে পারি। কারণ অন্তত বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড বলে একটা কিছু আমাদের হাতে আছে। কোনো স্টান্ডার্ড মানে কোনো ধরনের মাপকাঠি যেটা ছাড়াই চীনবিরোধী প্রো-আমেরিকান বা প্রো-ইন্ডিয়ান হয়ে ইচ্ছামতো খামখেয়ালি প্রপাগান্ডা থেকে আমরা এখন চাইলে বের হয়ে আসতে পারি।

    সাথে অন্য একটা কথাঃ  যদিও বিশ্বব্যাংকের ঐ রিপোর্টে দুধরণের দেশের ক্যাটাগরির কথাই বলা আছে। তবু অনেক মিডিয়া রিপোর্টে আরেকটা বা গরিব দেশের ক্যাটাগরির কথা বলতে দেখা যায় যাদের বেলায় নেয়া বিদেশী ঋণ নিজ জিডিপির ৪০% এর বেশি হলে সেটাকে “টিপিং পয়েন্ট” বলে দাবি করা হয়েছে। এই হিসাবেও বাংলাদেশে (যতগুলো উৎস থেকে দেখা যায় এর সবটাই) এখনো ৩১% এর নিচে আছে ; কোন কোন দাবিতে এটা ১৫% বলে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করেছেন অনেক মিডিয়া রিপোর্টে।। আর বাংলাদেশের মোট ঋণের মাত্র ৬.৮১% হলো চীনের ঋণ আর সবচেয়ে বড় দাতাটা হলো বিশ্বব্যাংকের; সেটা ৩৮%।

    According to the World Bank and the International Monetary Fund (IMF), that a country will cross the danger mark if its external debts exceed 40 percent of GDP ensures that Bangladesh is in the “safe zone,” as its total foreign loan is less than 15 percent of its GDP.

    কাজেই এটা পরিষ্কার আমরা দেখছি যে, তবুও চীনবিরোধী একটা প্রপাগান্ডার নহর এখনও বয়ে যাচ্ছে।

    টিপিং পয়েন্ট নিয়ে কিছু মজার তথ্যঃ
    বিশ্বব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, জি৭ ভুক্ত বড় অর্থনীতির আমেরিকার বেলায় তার ঋণের টিপিং পয়েন্ট হয় ৭৭%। কিন্তু সেই ১৯৪৬ সালেই মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যখন আমেরিকা একচ্ছত্র গ্লোবাল নেতা হিসেবে উঠে এসেছিল তখনই খোদ আমেরিকার টিপিং পয়েন্ট ছিল ১০৬% যার সোজা মানে এটা ৭৭% চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তা সত্বেও আমেরিকা সেকালে গ্লোবাল নেতাই ছিল এবং অন্য সব দেশকে ঋণ দেয়ার মূল উৎস ছিল এবং তা সরাসরি দ্বিপক্ষীয়ভাবে অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে গেছিল।
    তবে এছাড়া আরো বড় ঘটনাটা হল, পরে আমেরিকার এই ঋণ-বনাম-জিডিপি অনুপাত কমতে থাকে। শেষ ১৯৭৪ সালের মধ্যে এটা নেমে মাত্র ২৩% হয়ে যায়।

    তাহলে এখন কত?
    পরে ১৯৮০ সাল থেকে আমেরিকার এই অনুপাত বা রিয়েল টিপিং পয়েন্ট আবার বাড়তে থাকে; ২০০৭ সালের গ্লোবাল মহামন্দার সময় আরো বাড়ে। আর ২০০৯ সাল থেকে এটা ৭৭% এর বেশি ছাপিয়ে তা বাড়তে শুরু করেছিল যেটা এখনো বৃদ্ধির দিকে। ২০২০ সালের সেকেন্ড কোয়ার্টারে এটা সর্বোচ্চ ১৩৫.৯% ( যদিও সারা বছরের গড় ১৩৪%) হয়ে আছে।
    এর মানে সারকথাটা হল,  বিশ্বব্যাংকের টিপিং পয়েন্টই শেষ কথা নয়; একটা স্টান্ডার্ড মাত্র। ফলে এটা ছাপিয়ে গেলেই সব ভেঙে পড়বেই এমনটা সত্যি নয়, তবে হতে পারে। আর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বড় অর্থনীতি হয়ে থাকার কারণে এসব দেশের ঘাত সহ্য ক্ষমতা বেশি, অভিজ্ঞতায় তাই দেখা গেছে।

    কোন দেশ সর্বোচ্চ অনুপাতেঃ
    ২০২০ সালের হিসাবে এমন দেশ হল ভেনিজুয়েলা। তার অনুপাত ছিল ৩০৪%। আমরা সবাই কমবেশি ভেনিজুয়েলার অবস্থা জানি। তার উপর আমেরিকান তেল অবরোধ দেয়া আছে সুদীর্ঘ সময় ধরে। ফলে সুনির্দিষ্ট কিছু দেশেই সে একমাত্র তেল বিক্রি করতে পারে এবং তা ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রাতেই কেবল। আর তেল বিক্রি করে যেটুকু বিদেশী মুদ্রা আয় করতে পারে। সে কারণে ভেনিজুয়েলার অনুপাত বা টিপিং পয়েন্ট অমন উঁচু। তুলনায় সেকেন্ড সর্বোচ্চ অনুপাত ছিল জাপান ২০৪%। আর আমেরিকা ছিল ষষ্ঠ প্লেসে, ১৩৪%। তাহলে বিশ্বব্যাংকের স্টান্ডার্ড ৭৭% এখানে কার্যত অকেজো! কিছুই ভেঙ্গে পড়েনি বা ট্রিপ করে যায় নাই!!

    তাহলে প্রপাগান্ডিস্ট মোড়ল ভারতের কী অবস্থাঃ
    এশিয়ার সব দেশই ‘চীনা ঋণের ফাঁদে’ পড়ে ডুবে গেল – এই হল ভারতের প্রবল প্রপাগান্ডার মুলকথা। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় আবার আমেরিকার থেকেও ভারতের গলা বেশি উঁচু। তাহলে এই প্রসঙ্গে ভারতের নিজের কী অবস্থা? সে খবর নিতে হয়। ব্লুমবার্গ [bloomberg] আমেরিকার ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ মিডিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম। সে ভারতের কুয়িন্ট [QUINT] নিউজের সাথে খবর শেয়ার করে ও ভারতে খবর ছাপে। তাদেরই এক রিপোর্ট বলছে, ভারতের ঋণ বনাম জিডিপি অনুপাত ২০২১ সালে ৮৭.৮%। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাজেট ২০২২ রাষ্ট্রের ঋণ নামিয়ে আনতে হলে একটি শক্ত অর্থনৈতিক উন্নতি দেখাতে হবে [Budget 2022: Bringing Public Debt Down Requires A Strong Groth Path]।’ আর তাহলেই নাকি আগামী বছর এই অনুপাত কমে ৮৭.৪% হতে পারে। অর্থাৎ ভারতকে যদি রাইজিং অর্থনীতির দেশ গণ্য করি, তাহলেও ওর বিশ্বব্যাংক স্টান্ডার্ড অনুপাত হয় ৬৪%। অথচ এই  আইডিয়াল টিপিং পয়েন্ট বা  স্টান্ডার্ড থেকে  রিয়েল টিপিং পয়েন্ট ৮৭% , তা অনেক দূরের ফিগার অবশ্যই। তাহলে কোন সুখে ভারত সব দেশের বিরুদ্ধে লেগে সেখানে ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ খুঁজে ফেরে?

    তাহলে ভারতের শেষ অবস্থাটা কীঃ
    গত ৪ এপ্রিল ভারতের অনেক পত্রিকাতেই একটা নিউজ ছাপা হয়েছে। তা হলো, অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে মোদি তার দু’ডজন সিনিয়র সচিব বা কর্কমর্তাদের নিয়ে লম্বা ৪ ঘণ্টার এক মিটিং করেছেন। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, ‘বুরোক্রাটেরা মোদিকে লাল পতাকা দেখিয়েছেন এই বলে যে, শ্রীলঙ্কার মতো ক্রাইসিস ভারতেও দেখা দিতে পারে।’ তারা আসলে বলতে চাইছেন ভারতেরঅনেক রাজ্যে যেভাবে নয়া প্রকল্প নেয়া হচ্ছে তা ভাল হচ্ছে না। এতে বৈদেশিক অর্থের সঙ্কটে পড়বে ভারত। হিন্দুস্থান টাইমস এ নিয়ে একটি ভিডিও ক্লিপও বানিয়েছে। আর এতে ভারতে হইচই পড়া অবস্থা যে, তাহলে কি খোদ ভারতই এখন শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে? এর সাথে এক অসমর্থিত খবরও আছে। তা বলছে, সম্প্রতি মোদিকে বাইডেন যে ফোন করেছিলেন, রাশিয়া থেকে ভারত যেন তেল আর না কিনে এই ইস্যুতে, সেখানে ভারত বাইডেনের কথায় আসলে রাজি হয়েছে। কারণ, বাইডেন মোদিকে শ্রীলঙ্কা ধরনের অর্থনৈতিক ক্রাইসিস সামলাতে ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট দিতে কবুল করেছেন। ভারতের ৬১৪ বিলিয়ন বৈদেশিক ঋণ শোধে কিস্তি দেরিতে ফেরত দিতে ও সুদ কমাবার আবেদন করেছেন মোদি। এখন একথা কতটা সত্য তা জানা যাবে যদি আমরা দেখি যে ভারত আর রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে না!!
    এবার তাহলে ভারতকেও কোন চায়না ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারল!! এটা সত্যি এক তামাসার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে!
    তাহলে দাঁড়াল এই যে কার প্রপাগান্ডা কখন যে কাকে খায়? এখন প্রধান প্রশ্ন হল, তাহলে, ভারতকে ঋণের ফাঁদে ফেলল কে সে চীন?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারতকেই ঋণের ফাঁদে ফেলল কে! “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রিজুডিস বা অযোগ্যতায় ডুবে গেছে পাকিস্তানের বিচারকরা

    প্রিজুডিস বা অযোগ্যতায় ডুবে গেছে পাকিস্তানের বিচারকরা

    গৌতম দাস

    ১৮ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-42L

    –

    প্রিজুডিস [prejudice] মানে হল আগাম প্রভাবিত হয়ে থাকা। বিচারকদের বেলায়, কোন আসামি সম্পর্কে এজলাসে আনীত যেসব ডকুমেন্ট তাঁর নজরে আনা হবে আর বাদি-বিবাদি পক্ষ যেসব আর্গুমেন্ট দিবেন ইত্যাদি এসবের ভিত্তিতেই কেবল বিচারক আসামি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিবেন। এটাই আদর্শ ও স্বাভাবিক। সেটা না করে ধরা যাক আসামি দেখতে খুব সুন্দর ও আকর্ষণীয় কিংবা ইনোসেন্ট ফেসের বলে বিচারকের বিচার শুরুর আগেই যদি মনে হতে থাকে যে আসামি নির্দোষ তবে বিচারকের এই আচরন-মনোভাব এটাকে প্রিযুডিস বলে। অর্থাৎ বিচার শুরুর আগেই তিনি বিচার-বহির্ভুতভাবে কোন ধারণায় আচ্ছন্ন বা প্রভাবিত হয়ে গেছেন।  কোন বিচারকের বেলায় প্রিযুডিস হয়ে যাওয়া তাঁর জন্য মারাত্মক অপরাধ ও অযোগ্যতা।  এমন ‘ডিস-কোয়ালিফিকেশন’  বা যোগ্যতায় ত্রুটির কারণে তার বিচার করার এক্তিয়ারই কেড়ে নেয়া যেতে পারে। তাই এটাকে প্রি মানে আগাম; আর “যুডিস” মানে নিশ্চিত না হয়ে অনুমানে বিচার করে ফেলার ঘটনা হিসাবে দেখা হয়। আমরা এখানে দেখব পাকিস্তানের উচ্চ-আদালতের বিচারকেরা কিছু বিশেষ মামলায় একালে কী প্রি-যুডিস হয়ে গেছেন!!  ,

    শেষে পাকিস্তানে এখন কী দাঁড়াল? একটা বাংলা প্রবাদ আছে “ভিক্ষার চালের আবার কাঁড়া আর আকাঁড়া’। মানে, ভিক্ষা করে পাওয়া চালের গুণ বিচার অনর্থক। কাঁড়া মানে সযত্নে ছাঁটা, তুষ নেই, খুদ-কুঁড়া বা ভাঙা নেই। আর এরই ইংরেজি ভাষ্য হল – ‘বেগারস ক্যান নট বি চুজারস’ [“beggars can not be choosers”]। আক্ষরিক বাংলায় বললে ‘ভিক্ষুকের বাছাবাছির ক্ষমতা থাকতে নেই বা থাকে না’।
    আমেরিকার সাথে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পাকিস্তানের যে বর্তমান বিতর্ক সেটা নিয়ে চলতি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ প্রসঙ্গ ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু এনিয়ে নিজের মনের কথা বলতে গিয়ে সারা পাকিস্তানবাসীকেই তিনি ভিক্ষুক গণ্য করেছেন। শাহবাজ বলতে চেয়েছিলেন ইমরানের আমেরিকার সাথে বাদানুবাদে যাওয়া ঠিক না কারণ পাকিস্তান একটা গরীব দেশ। ফলে ভিক্ষুক পাকিস্তানের কোন বাছবিচারের ক্ষমতা থাকতে নাই। শাহবাজের এই মন্তব্যের প্রবল বিরোধিতা করে এগিয়ে আসেন ইমরান খান। আর তাতে আরেক দফা শাহবাজ নিজের বক্তব্যের সাফাই দিতে গিয়ে আরো অপমান ডেকে এনে তিনি বলেন, “……আমাদেরকে আমাদের মানুষকে খাওয়াতে হয়, আমাদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হয় তাই আমরা এমন ওদের সাথে লড়তে যেতে পারি না। তাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে পারি না”।  “……আমরা আর কারাই বা…। আমরা সেই দেশ যাদের নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করতেই দিন যাচ্ছে…”। সারকথায় এভাবেই শাহবাজ আমেরিকান হস্তক্ষেপ-মূলক হুমকি ও বক্তব্যের বিরুদ্ধে ইমরানকে  প্রতিবাদ না করতে বা আমেরিকার সাথে লাগতে না যেতে উপদেশ দিয়েছেন।  শাহবাজ বলছেন, আমরা গরীব ভিক্ষুকের মত, আমাদের আমেরিকার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠানো ঠিক না। আসলে এসব কথা বলে তিনি নিজের আমেরিকার দালালির পক্ষে পোক্ত সাফাই দিতে গেছিলেন।

    “We have to feed our nation […] we have to send our children to school, we can’t fight with someone, can’t raise slogans against others,” he was quoted as saying by ARY News. “Who are we, we are the country which is fighting for its survival.”
    Defending his previous remarks, Shahbaz Sharif said that.

    কম করে হলেও গত ৪০ বছরে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা যা প্রধানত নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন) আর ভুট্টোর বংশধরদের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) – এ দুই পার্টি ও তাদের সহযোগী ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী আরো কিছু ছোট দল – এরাই পাকিস্তানকে বিদেশী বিশেষত আমেরিকার খেয়াল ও ইচ্ছার লীলাভুমি করে রেখেছে। এর সাথে যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনী। আর এদের প্রত্যেকের বক্তব্য হচ্ছে, আমরা তো ভিক্ষুক! আমরা গরিব। তাই আমেরিকা আমাদের তো এমন করবেই! আমাদের কিছু বলার নাই , কিছু বাছবিচারের ক্ষমতা নাই। কাজেই ক্ষমতাধর আমেরিকা পাকিস্তানকে যেভাবে রাখছে, যা দিচ্ছে, আমাদের সাথে যা করছে এটা মেনে নাও! এতদিন ধরে এমন কথাগুলোই উচ্চারিত হয়ে আসছিল; তবে এদের সবার মনে মনে। আর এখন, আরেক ক্রাইসিসে পড়ে মনের কথাটাই প্রকাশ্যে উচ্চারণে নিয়ে এসেছে শাহবাজ শরিফ, যিনি মাত্র দু’দিন হল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছেন। শাহবাজ শরিফের নিজ বড়ভাই নওয়াজ শরিফ বর্তমানে বড় দুর্নীতির দায়ে ও বিচারে জেল-জরিমানায় ডুবে আছেন; সাথে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হয়ে গেছেন। তাই ছোট ভাই শাহবাজ এখন দল পিএমএল-এনের প্রধান নেতা। শাহবাজ নিজেও বর্তমানেই দুর্নীতি মামলার আসামি; আর বর্তমানে তার মামলার চার্জ গঠনের শুনানি চলছে!

    বিপরীতে, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (ইনসাফের জন্য আন্দোলন) বা সংক্ষেপে পিটিআই দলের মুলনেতা ইমরান খান। তার রাজনৈতিক জীবন ও দলের শুরু থেকেই – পাকিস্তান ভিক্ষুক ফলে আমেরিকান খেয়াল-অত্যাচার মেনে নাও – এধরণের বয়ান ইমরান মানতে অস্বীকার করেন। বিশেষ করে ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে যে দলীয় মেনিফেস্টো তিনি প্রকাশ করেন তাতে সরাসরি আমেরিকান ‘ওয়ার অন টেরর’ পলিসিকেই তিনি চ্যালেঞ্জ করেন এবং আমেরিকার এই নীতিতে পাকিস্তানের কত মানুষ বলি হয়ে গেছে আর কত কোটি টাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে এ নিয়ে কিছু পরিসংখ্যানও প্রচার করা শুরু করেছিলেন। গত ২০১৩ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ইমরানের দল এই “নয়া বয়ানের” উপর দাঁড়িয়ে অংশ নিয়েছিল।

    এভাবে একসময় ২০১৮ সালের নির্বাচনও এসে যায়। ততদিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমলে এসে তিনি আগের প্রতিশ্রুতি দেয়া আমেরিকান অর্থ সাহায্য পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে না দেয়া আর ট্রাম্প উল্টা ভারতের প্ররোচনায় টেররিজমের জন্য পাকিস্তান ও তার সেনাবাহিনীকে দায়ী করাতে, সেবার প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর দূরত্ব এক উল্লেখযোগ্য বিভেদ হিসেবে হাজির হয়েছিল। আর এ’থেকে, পাকিস্তানের এতদিনের পুরানা দুই রাজনৈতিক দলের কোনো একটা আর সাথে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আমেরিকা – এই ত্রিপক্ষীয় যে শক্তি পাকিস্তানকে এতদিন ছিঁড়ে খেয়ে আসছিল, ‘ভিক্ষুক তত্ব’ জারি রেখে আসছিল; আর এই সুযোগে দুর্নীতিতে বান ডেকে এনেছিল – এই গোষ্ঠীতন্ত্রে এক ব্যাপক ভাঙন তৈরি হয়; অসংগঠিত হয়ে পড়ে তারা। এই ভাঙনকে ব্যবহার করে, শক্তি-ভারসাম্যের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই ২০১৮ সালের নির্বাচনে ইমরান নিজ দলকে ক্ষমতাসীন করতে সমর্থ হন। ফলে কার্যত এই প্রথম ইমরান তাদের ‘ভিক্ষুক তত্বকে’ চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। মানে, আমেরিকা ভিক্ষা-দাতা (পাকিস্তানে যা খুশি করার ভিক্ষাদাতা) আর পাকিস্তান গ্রহীতা-ভিক্ষুক; ফলে সব মেনে নেবে – এই সম্পর্ক মানতে অস্বীকার করে চলতে থাকেন।

    অবশ্য কিছু দিনের মধ্যেই ট্রাম্প বুঝে যান যে, ইমরানের পাকিস্তানকে আমেরিকা নিজের স্বার্থেই দরকার। কারণ আফগানিস্তানে আমেরিকার তখন প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ; এভাবে সম্পদ ড্রেনে ফেলা চলছিল যা বন্ধ ও ছাঁটাই করতে ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাই আবার তিনি ট্রাম্পের সাথে কাজের সম্পর্ক মানে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।

    অবশ্য সেকালে কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম্প বুঝে যান, আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ ছেড়ে উঠে আসতে গেলে নিজ স্বার্থেই ঐ ইমরানের পাকিস্তানকে আমেরিকা নিজেরই দরকার। কারণ আফগানিস্তানে তখন আমেরিকার প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হয়ে যাচ্ছে, এভাবে আমেরিকার সম্পদ ড্রেনে ফেলা তাকে বন্ধ করতে হবে। ফলে এই ড্রেনেজ বন্ধ করতে ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাই আবার ট্রাম্প পাকিস্তানের সাথে এক কাজের সম্পর্ক মানে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারে পাকিস্তানের সাহায্য চাইতে এগিয়ে আসেন।

    কিন্তু পুরান খাসলত অনুসারে ট্রাম্প ধরে নেন তারা ইমরানের পাকিস্তানকেও – ভিক্ষুক বলে – আগের মতো যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারবেন। তাই তারা ইমরান সরকারকে প্রস্তাব দেন, ‘আফগানিস্তানে যে প্রাতিষ্ঠানিকতার ওপর ভর করে তারা আফগানিস্তানকে পরিচালনা করতেন এখন সেটার আদলে তেমন একটা সামরিক-ঘাটি [military base] তারা পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা করতে চান। আর এই আবেদনে পাকিস্তান কোন কিছু না দিলেও যেন আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা করার একটা বেজ স্টেশন আমেরিকাকে করতে দেয়।’ কিন্তু ইমরান সব প্রস্তাবই নাকচ করে দেন।

    এ নিয়ে এখন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পাকিস্তান সেনা-আইএসপিআরের [ISPR] ডিজি মেজর জেনারেল বাবর ইফতেকার খামোখা অস্বীকার করতে চাইছেন [“And in reality, they did not even ask for bases and there was no mention of it on any level.”] যেটাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছেলেমানুষি ছাড়া আর কী-ই-বা বলা যায়! তারা ধরে নিয়েছে যে, লুকাতে চাইলেই তারা একালে ইন্টারনেটের যুগে সবকিছু লুকাতে পারবে। অথচ ২০২১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহ আর পরে জুনের প্রথম সপ্তাহে- এই দুই সপ্তাহজুড়ে অনলাইন নিউজ খুললেই, এখনই সব বেরিয়ে পড়বে, কিছুই লুকানো যাবে না।  আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী জ্যাক সুলেভানের [Jake Sullivan] ৩৬ পৃষ্ঠার প্রেস ব্রিফিং (৭ জুন ২০২১) তো পাবলিক ডকুমেন্ট যা এখনও হোয়াইট হাউজের ব্রিফিং সাইটে লটকানো আছে। জাপানি ডিপ্লোম্যাট [Don’t Expect Pakistan to Host US Military Bases] বা পাকিস্তানের ডন (কয়েকটা রিপোর্ট) পত্রিকা সেকালে এর রিপোর্টগুলো জ্বলজ্বল করছে।   এমনকি এ নিয়ে সিআইএ চিফের এক সিনেট শুনানিতে [CIA chief told drone bases won’t be hosted] পাকিস্তানে তার গোপন ভিজিট ও আমেরিকা ড্রোনের জন্য পাকিস্তানে বেইজ স্টেশন পাচ্ছে না; এ নিয়ে দেয়া বক্তব্যও পাওয়া যাবে। অথচ ঐ আইএসপিআরের ডিজি জেনারেল বাবর কী লুকাতে চাইলেন? তিনি দাবি করেছেন, আমেরিকা ঘাঁটি বানানোর প্রস্তাব নিয়ে আসেইনি [“And in reality, they did not even ask for bases and there was no mention of it on any level.”]। এই আইএসপিআর এরা কী কৌশল নিয়ে কাজ করে কথা বলে?? সব অর্থহীন, চোখ উলটানো মিথ্যার বেসাতি!!  এটা কার কাজে লাগে??? আমেরিকান বাজে ততপরতাকে আড়াল করা কী পাকিস্তান সেনাদের কাজ???

    এতে আসলে দাড়িয়েছে এখন এই যে ইমরান যে, পাকিস্তানজুড়ে আমেরিকান হস্তক্ষেপের কথা ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই আমেরিকার সাথে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেন নেই, ছিল না – এটা প্রমাণে সেনারা হাত-পা ধুয়ে নেমে পড়েছে। আর ফল হয়েছে উল্টা। পাক সেনাবাহিনী এর আগে এমন বেচাইন হতে কেউ দেখেনি।

    বরং এতে তাদেরকে বলা যায়, আমেরিকা ও পাক-সেনাবাহিনীর ‘আন্ডারহ্যান্ড সম্পর্ক’ বিশেষ করে যা এখন রাজনীতিবিদ ইমরান এই সম্পর্ককে অনুমোদন না দিয়ে বরং খোলাখুলি পাবলিকের সামনে এর বিচার দেয়াতে এখন পাকিস্তান সেনাদের টনক নড়েছে। আর তা থেকেই তারা তওবা পড়ে বের হয়ে আসতে চাইছে যেন। আর এটা এমনই ছ্যাঁকা খাওয়া যে সেনাপ্রধান বাজওয়া এখন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ভালো মানুষ হয়ে যেতে চান, যিনি অনেক বদনাম কামিয়েছেন। তাই এখন আগামী ঠিক ২৯ নভেম্বরেই এ বছরে তিনি অবসরে চলে যাবেন, কোনো এক্সটেনশন দিলেও নাকি নেবেন না- তা আগ বাড়িয়ে ওই জেনারেল বাবরকে দিয়ে রটিয়ে দিয়ে পার পেতে চাইছেন। তার মানে হলো- ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? না আমি কলা খাই নাই, দেখিই নাই এবং আমি আর জীবনে কলা খাবো না’ দশা!

    “Let me put this to rest. The chief of army staff is neither seeking an extension nor will he accept an extension. No matter what, he will be retiring on the 29th of November 2022.”  – says Maj Gen Babar

    তাতে এখন সারকথা দাঁড়াল যে, ইমরান এদেরকে এই ছ্যাঁচা দেয়াতে এই কুচক্রী ত্রিশক্তি – এদেরকে একেবারে এই প্রথম ইমরান ল্যাংটা করে ছেড়েছেন। সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, ইমরান এই ত্রিশক্তির কুচক্রীপনা বিশেষত, আমেরিকান তৎপরতা একেবারে উদাম করে দিয়েছেন। আজ পাকিস্তানের গৃহবধূরাও নিজ বাচ্চাদের সাথে নিয়ে রাতে রাস্তায় প্রতিবাদে শামিল।
    ইমরানকে সরিয়ে দেওয়ার পর তাঁর এত জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছে ছবি : রয়টার্স

    এমনিতেই ইমরানের সবচেয়ে বড় সমর্থক গোষ্ঠী হল এক ব্যাপক সংখ্যক সব বয়সের নারী। কয়েকটা সোস্যাল মিডিয়া স্ট্যাটাসে দেখা যাচ্ছে, এই নারী-পুরুষেরা ইমরানের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এর সাথে কিছু ইন্টারভিউও দেখা গেল; তারা শামিল হয়েছে [clip]। অর্থাৎ ওই তিন কুচক্রী শক্তি যারা এতদিন রাজত্ব করে গেছে ‘ভিক্ষুক তত্ব” দিয়ে, এরা যে একদিন পাকিস্তানের গৃহবধূদের হাতে নাকানি-চুবানি খাবেন, তাদের অকাম সব উদাম হয়ে যাবে তা তারা কখনো অনুমানই করেননি মনে হচ্ছে। কিন্তু এটাই পাকিস্তানে এখন হচ্ছে এবং তা বাস্তব। সম্ভবত সে কারণে সেনাবাহিনী সবার আগে সব ছেড়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে। জেনারেল বাবরের প্রেসের সামনে নিজে যেচে সেসব প্রসঙ্গ তুলে কথা বলা তাই প্রমাণ করে। আসলে শাহবাজের “ভিক্ষুক তত্ব”- এই ত্রিশক্তি মানে সেনা-আমেরিকাসহ পুরোনো রাজনীতিবিদ সবাইকেই পাবলিকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে! এটাই ইমরানের এক বিরাট রাজনৈতিক সাফল্য।

    এমনকি এনিয়ে সাম্প্রতিকালের আমেরিকান প্রতিক্রিয়াও দেখার মতো। ঘটনাটা হলো, পেন্টাগন মানে, আমেরিকান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা দেখাশোনা যাদের কাজ, সেই ডিপার্টমেন্ট পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি গত ১৩ এপ্রিল এক প্রেস ব্রিফিং ডেকে বসেন। উদ্দেশ্য ইমরানের দল সারা পাকিস্তানের সব বড় শহর যেভাবে তোলপাড় করে আমেরিকার হস্তক্ষেপ করে বিরোধী দল লেলিয়ে দেয়ার কাহিনী উন্মোচন করে দিয়েছে তাতে ব্যাপকভাবে ইমেজ হারানো আমেরিকা তা পুনরুদ্ধার করা, কমপক্ষে বলা যে, আমরা এত খারাপ না – যেন সে জন্যই এই প্রেস ব্রিফিং। ইমরানের অভিযোগের জবাবে এটুকু তিনি বলতে এসেছিলেন যে, ইমরানের অভিযোগ সত্যি নয়। অবশ্য এটা একই কথা; যেটা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি অনুমোদিত যে কড়া প্রতিবাদ (ডিমারসে demarche) চিঠি সেটা ইমরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট পৌঁছে দেয়ার পরও [Pakistan Sends US Demarche Over Alleged Political Meddling] তারা এভাবেই অস্বীকার করেছিল।

    কিন্তু জন কিরবির একটা বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “ঐ অঞ্চলে পাকিস্তান (আমাদের জন্য) এক নির্ধারক ভুমিকা পালন করেছিল। আমরা পাকিস্তান ও পাকিস্তানের জনগণের এই ভুমিকা স্বীকার করি। সেটা এমন ছিল যে [আমাদের সাহায্য করতে গিয়ে] পাকিস্তানিরা যে, নিজ দেশের ভেতরেই টেররিস্ট আক্রমণের শিকার হয়েছেন সেটাও আমরা স্বীকার করি।’ ফলে সেখান থেকে আমাদের একটা স্বার্থ-শেয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান সেনাদের সাথে আমাদের সেনাদের একটা ভাল (healthy) সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।’ অর্থাৎ যেন বলতে চাইলেন, বিশ্বাস করেন ভাই – আমরা ঐ “তিন কুচক্রী শক্তি” হিসেবে পাকিস্তান সেনাদের কোনো খারাপ পথে নেইনি।

    এছাড়া আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তারা দূরেও “কোনো আমেরিকান সেনার ভুমিকা দেখেন না”। এ কথা বলেই তিনি সাথে সাথে জিহবায় কামড় দিয়ে বলেন, ‘ভাই, আমাকে আবার পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলে ফেলার দিকে টেনে নিয়েন না, মাফ চাই”!

    সার কথায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর আমেরিকা প্রশাসন, তাদের গোমর পাকিস্তানি জনগণের সামনে ইমরান নিয়ে যাওয়াতেই এসব ঘটছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সবাই এখন নিজের গা-হাতপা ধুয়ে ফেলতে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

    ওদিকে সেনা আইএসপিআরের ডিজি জেনারেল বাবর সেনাপ্রধান বাজওয়ার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে গিয়ে ফেঁসেছেন। তিনি দাবি করছেন, আমেরিকার বিরুদ্ধে পাঠানো পাকিস্তানের কড়া প্রতিবাদ-পত্রে ‘কনস্পিরেসি’ শব্দটা ছিল না [Conspiracy not mentioned’, demarche was given on ‘interference’…]। কিন্তু তাতে কী এসে গেছে? দুদেশের  ফরমাল কূটনৈতিক কথাবার্তায় অনেক শব্দই থাকে না কারণ তা কূটনীতিতে অনুমোদিত ভাষা নয়। কিন্তু এরপর আবার নিজেই বলছেন, আমেরিকাকে দেয়া আমাদের প্রতিবাদলিপি (demarche) যেটা গেছে সেখানে মূল কথাটা ছিল মূলত ‘আমেরিকার অকূটনীতি-সুলভ শব্দ ব্যবহারের বিরুদ্ধে যে শব্দগুলো পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সমান”।
    তাহলে এটা আমেরিকান ‘কনস্পিরেসি’ হতে বাকি থাকল কী? তবুও ‘কনস্পিরেসি’ শব্দটা পাকিস্তান ব্যবহার করেনি ইচ্ছা করেই এ জন্য যে, তাতে পাকিস্তানেরও ‘অকূটনীতি-সুলভ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়ে যেত।
    তাহলে যেটা আসল কথা এটা নিয়ে পাকিস্তান সেনাদের এখন কথা বলার কী আছে? তারা কি আমেরিকাকে সার্ভিস দিতে চাচ্ছে, আমেরিকান কনসার্নটা তারা নিজেই হাজির করতে চাইছে? কিন্তু কেন?  এটা কি পাকিস্তান সেনাদের কাজ? তাদের আনুগত্যের জায়গাটা কোথায়? আমেরিকান প্রশাসন, ওরাই কী সেনাদের বাপ-মা? তাহলে দেখা যাচ্ছে  ভিক্ষুক তত্বের বিরুদ্ধে আসলে ইমরান দেশের স্বার্থরক্ষার প্রশ্ন আর আমেরিকান হস্তক্ষেপ ইস্যুটাকে পাকিস্তানের সাধারণ্যে একেবারে গৃহবধূর পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে সঠিক পদক্ষেপ ও কাজটাই করেছেন! এখন মনে হচ্ছে পেন্টাগনের জন কিরবি আর পাক সেনাবাহিনী একটা ভালো শিক্ষাই পেয়েছে এ থেকে!

    পাকিস্তানের বিচার বিভাগঃ
    আসলে ঐ গণবিরোধী তিন কুচক্রী শক্তির ‘ভিখারি তত্ব’, এই বয়ান এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাবটা হল, এটা মূলত সারা পাকিস্তানকেই সব সেক্টরে মেরুদণ্ড ভাঙা করে রেখে দিয়েছিল। সেটাই এখন বোঝা যাচ্ছে। এ থেকে এমনকি আদালতও বাইরেনয়। মানে, তারাও প্রভাবিত হয়নি, তা বলা যাচ্ছে না। এমনকি গত ৯ এপ্রিল দিন-শেষের রাতদুপুরে যেদিন সংসদে ইমরানের ওপর অনাস্থা ভোট পাশ হয়েছিল; সে দিনের আদালতের ভূমিকা মারাত্মক রকমের প্রশ্নবিদ্ধ এবং তারাও যে ভিখারি তত্বে  আপ্লুত ও প্রভাবিত হয়ে ওই তিন কুচক্রীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এই ইঙ্গিত ও প্রমাণ থেকে গেছে। সারকথায় আমেরিকা বা পাক-সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করতে যেন বিচারকদের ভিখারি মন সায় দেয়নি। অথচ ইমরান বা তার দলের আদালতের নির্দেশ অমান্য করা, এমন কোনো অভিপ্রায়ই যে ছিল না এটা এখন প্রমাণিত।

    ঘটনা হল, ৭ এপ্রিল সন্ধ্যাসাড়ে সাতটায় আদালতে বসে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, সংসদ যা  আগে ভেঙে দিয়েছিল ইমরানের সরকার তা পুনর্বার জাগিয়ে অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। আর সুনির্দিষ্ট করে বলেছিল ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় পুনরায় সংসদ বসিয়ে অনাস্থা ভোট নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতেই হবে। আর এতে ইমরান সরকার ও স্পিকার ঠিক সে মোতাবেক সবকিছুই করেছিল। আর ঐ রায়ে অবশ্যই এমনটা বলা ছিল না যে, কতক্ষণের মধ্যে এই অনাস্থা প্রস্তাবে পাস করতে হবে। কারণ এটা বলা বেকুবি হত এবং সেটা বলা অবশ্যই বিচারকদের এখতিয়ার-বহির্ভুতও হত।

    এদিকে এটা পরিষ্কার হয়ে পড়ছিল যে, আদালতের রায়ে ইমরান অসন্তুষ্ট ও হতাশ হলেও তিনি রায় মেনে নিয়েছেন। ফলে এমন আচরণ ইঙ্গিত তিনি দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি আগের রাতে (৮ এপ্রিল) ছিল ইমরানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেষ পাবলিক বক্তৃতা। তিনি সেখানে পরোক্ষে বলেই দেন যে, কাল থেকে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী থাকছেন না।

    কিন্তু ওই তিন-কুচক্রী-শক্তি তবু আস্থা রাখতে পারেনি। যেন তারা তাদের স্বভাব দিয়ে ইমরানকে ব্যাখ্যা করতে গেছে। কিন্তু এরা যা খুশি করুক তাতে আদালতেরই এতে প্রভাবিত হয়ে পড়ার তো কোন কারণ নাই, থাকতেই পারে না। অথচ তাই ঘটেছিল! সুপ্রিম কোর্ট (যেটা সারা পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত) আর ইসলামাবাদ হাইকোর্ট (পাঞ্জাব প্রদেশের সর্বোচ্চ আদালত) এ দুটোই রাত ১২টার আশপাশের সময় আগাম আদালত খুলে বসে গেছিল। কেন? কেন তারাীকাজ করেছিল এর কোন সদুত্তর দেননি?

    এটা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও  প্রধান বিচারপতির জন্য চরমতম লজ্জার। এতে বিচারকরা যে আর নিরপেক্ষ নন এই দাগ লেগে গেছে তাঁদের গায়ে। প্রধান বিচারপতি একটা রায় দিয়েছেন ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় যে, সংসদকে আবার বসে অনাস্থা প্রস্তাবের সুরাহা করতে হবে। আর এনিয়ে সমাজের কোনো কর্নারে তো অমান্য করার ইঙ্গিত নেই। আর সেটা থাকার কোনো কারণ ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা রায়ে সংসদ ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় বসার কথা বলা আছে আর ঠিক তাই-ই ঘটেছে। এখন কতক্ষণে অনাস্থা প্রস্তাবের সুরাহা হবে এর কোন সময়সীমা বাস্তবত আদালতের দেয়া সাজে না, বিচারকরা তাই, অনুমান করি, সঠিকভাবেই তা দেননি। আর তা দেয়ারও তার সুযোগ ছিল না। তবুও সে দিন প্রায় মধ্য রাতেও সংসদ চলমান। কাজেই ওই সংসদ কিভাবে শেষ হয় অন্তত সে দিন রাত ১২টা পর্যন্ত তো তাকে সময় দিতেই হবে এবং সারা বিচারক গোষ্ঠীকে এ জন্য অপেক্ষা করতেই হত। সবচেয়ে বড় কথা, দুনিয়ার কোন বিচারকই  কোন অনুমান করে নিতে পারে না একটা অপরাধ হবেই!!!
    যেকারণে “হবু অপরাধী” বলে কোন ধারণা বিচারকের ডিকশনারি থাকতে পারে না। পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট পুর্ব-অনুমানে ধরে নিতে পারেই না (এটাই প্রিযুডিস)  যে, ইমরান বা তার দল “বিচারের রায় অমান্য করবেই”। কোন বিচার অপরাধ ঘটার পরেই একমাত্র শুরু হতে পারে। ঘটতে পারে অনুমানে বিচারক অপেক্ষা করতে পারে না।  অমান্য করেছে কিনা সেটা দেখার পরেই কোনো আদালত তার কাজ শুরু করতে পারে। এর আগে একেবারেই নয়। কারণ সেটা অবশ্যই প্রিজুডিস হবে। অথচ তাকে কেন আগাম রাত ১২টায় আদালত খুলে বসতে হল? আদালত আজও এর কোন ব্যাখ্যা দেয় নাই। কেন???

    এর মানে বিচারকদেরকেও কি বিরোধী জোট এবং আমেরিকা ও সেনাবাহিনীকে খুশি করতে হবে – এই ভিক্ষুকের স্বভাব পেয়ে বসেছিল? ধরা যাক আগের রাত ১২টাতেও সংসদ অনাস্থার সুরাহা করেনি এবং পরদিন সকালে আবার সংসদ বসেছে ইত্যাদি যেটাই হোক সেটা ঘটতে দেখার পরেই তো বিচারকেরা পরদিন বসে ব্যবস্থা নিতে পারতেন? অর্থাৎ তিনি আগাম ইমরান ও তার দল সম্পর্কে এক চরম মিথ্যা ধারণা ও এক আগাম ধারণা যে, ইমরানের দল ‘রায় ভায়োলেটর’ বলে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছিলেন- কেন? এমন আগাম অনুমান, একেই আদালতের ভাষায় বলে প্রিজুডিস – মানে বিচারপ্রার্থী সম্পর্কে পক্ষ-বিপক্ষ শোনা আদালতের এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই বিচারপ্রার্থী সম্পর্কে বিচারকের নেতি ধারণা পোষণ করা। আর এ জন্যই প্রিজুডিস যেকোনো বিচারকের জন্য সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা! যার সোজা মানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি-সহ পাঁচ বিচারক প্রিজুডিস রোগে আক্রান্ত।  এর অর্থ তারা অযোগ্য প্রমাণিত!!!

    যেমন আজো বাস্তবতা হল, ওই ৯ এপ্রিলের পরে ১০ এপ্রিল থেকে আজ পর্যন্ত কেন সুপ্রিম আদালত আর এই ইস্যুটাকে আর আদালতে তোলেনি? এর মানে কী? এর সোজা অর্থ, সংসদেই শেষে ঐ রাতেই অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং ইমরান ও তার দলের কেউ এতে কোনো বাধা সৃষ্টি করেইনি। এটাই ফ্যাক্টস! এর অর্থ আদালতের আগাম শঙ্কা প্রকাশ পুরাটাই অমূলক তা প্রমাণিত। আর যে আদালত আগাম শঙ্কা প্রকাশ করে সেটা আর আদালতই নয়। থাকে না। আদালত তো আইনশৃঙ্খলাবাহিনী একেবারেই নয়। তাই কোন আগাম অনুমানে সিদ্ধান্ত নেয়া তার কাজ নয়, হতে পারে না। অপরাধ ঘটার পরেই  কেবল বিচার শুরু হতে পারে। তাহলে এখন প্রশ্ন ইমরান ও তার দল কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার আগেই তাদের সন্দেহের খাতায় বিচারকরা ফেলেছিলেন? কেন? এটাতে তো বিচারকরাই বড় অপরাধী। অপরাধ করতে পারে মনে করে আদালত খুলে বসে থাকা বিচারক তারা! এই কি তাহলে তাদের পরিচয়?

    আর সোজা অর্থ এই বিচারক গোষ্ঠী আসলে ভিখারি তত্বে নিজেরা আপ্লুত ও খুবই খারাপভাবে প্রভাবিত!!! নিজ বিচারকাজ বা নিজ দায়দায়িত্ব কী সেসব কিছু ভুলে তারা আমেরিকা বা সেনাবাহিনীকে খেদমত করতে নিজ মর্যাদা বিসর্জন দিয়েছে এমন বিচারপতি তারা। এক কথায় তারা অযোগ্য ডিস-কোয়ালিফায়েড বিচারপতি।

    এখন উল্টা দিকে আসি। তাহলে ইমরান ও তার দল সংসদকে অত রাত পর্যন্ত নিয়ে গেছেন কেন? বিচারকদের অবিচারকসুলভ টেনশন বাড়িয়েছেন কেন?
    প্রথমত কারো টেনশন বাড়ানো তাদের উদ্দেশ্য মনে হয়নি। তাদের মূল অবস্থান হল, বিরোধী জোট যে আমেরিকান পাপেট (ইমরানের ভাষায় ইম্পোর্টেড বা আমদানিকৃত সরকার) সেটা তুলে ধরা। সে কারণে তারা কৌশল নিয়েছিল রাত ১১টার পরে তাদের পিটিআই দলের স্পিকার পদত্যাগ করবেন আর সংসদ সদস্যরা পরে অনাস্থার ভোট শুরু হলে সংসদ ত্যাগ করবেন। অর্থাৎ এক. ইমরানের দলের স্পিকার অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি কার্যক্রম পরিচালনাই করবেন না। কিন্তু তা বলে সংসদের কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি না করে বরং বিরোধী জোটের পছন্দের এক স্পিকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে পদত্যাগ করে চলে যাবেন। যা কোনো যুক্তিতেই কোনো বাধা দেয়া হবে না। আবার ইমরানের দলের বাকি এমপিরা, এরাও অনাস্থা প্রস্তাবের কার্যক্রমের সময় সংসদে উপস্থিত থাকবেন না। এটা তো তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। তারা এটা নিতেই পারেন। আর সে্টি অবশ্যই অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে কোনো বাধা সৃষ্টি কোনোভাবেই নয়। তা-ই হয়েছিল। অর্থাৎ ভোটাভুটির সময় সংসদে কেবল বিরোধী জোটের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
    এক কথায়, আসলে “ইম্পোর্টেড” সরকার গঠনের সময় এর সাথে কোনো সংসর্গ ইমরান রাখতে চাননি। এটাই তাদের কৌশল ছিল আর সেটাই তারা বাস্তবায়ন করেছেন এবং তা সংসদে ভোটাভুটি কার্যক্রমে কোন বাধা না দিয়েই। সবচেয়ে বড় কথা, ইমরান বা তার দল সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে সারা দিন কোথাও বাধাসৃষ্টিমূলক কোনো কাজ করেননি এবং ইমরানের দল পরিকল্পিতভাবেই ৯ এপ্রিলের দিনটা শেষ হওয়ার আগেই সংসদ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল। তাই এটা কোনো যুক্তিতেই আদালতের উদ্বেগের কোনো ঘটনাই নয়। বরং আদালত অন্যের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আগাম ও মিথ্যা অনুমান করে আদালত খুলে বসে থেকেই সবচেয়ে বড় অপরাধটা করেছেন। এখান থেকেই সিদ্ধান্ত যে, আদালত আসলে আত্মসম্মান খোয়ানো বায়াসড [biased], প্রিজুডিস (ঘটনা ঘটার আগেই ওর বিচার করা, পক্ষ নিয়ে ফেলা) হয়ে গেছেন! তাই এরা আদালতে বসারই যোগ্যতা হারিয়েছেন।

    এখান থেকে আরো বড় প্রশ্ন উঠে আসে। তা হল, আমেরিকার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ- সুপ্রিম আদালতের এই পয়েন্টটাকে আমলে না নিয়ে এটা ছাড়াই সংসদ ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে রায় দেয়া – এটাও তো আসলে ছিল বিচারকদের পক্ষপাতিত্ব ও প্রিজুুডিস চোখে ঘটনাকে দেখা ও বিচার করা, যা এক বিরাট অবিচারের নজির!!! তা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায়!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “প্রিজুডিসে ভুগছেন পাকিস্তানের বিচারকরা? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    গৌতম দাস

    ১১ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-42k

     

        The Indian-American underachiever

    ইউক্রেন ইস্যুতে পরাজয়ের পরে বাইডেন প্রশাসনের শেষ কামড় যেন শুরু হয়েছে। সে্টা অনুমান করেই আগে লিখেছিলাম, বাইডেন এখন দক্ষিণ এশিয়ায় চাপ বাড়াবেন। তাকে ফল দেখাতে হবেই! বাংলাদেশ এই চাপের মধ্যে পড়বে। তা কেবল বাংলাদেশ নয়, আমাদের এই সারা অঞ্চলে প্রবলভাবে এই চাপের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আসন্ন আরেক প্রধান টার্গেট এখন ভারত। “ভারতকে পক্ষে আনতেই হবে”, এরই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে আমেরিকা। কিন্তু এই চাপ কি কাজ করবে, না ভারতই হাতছুট হয়ে যাবে?

    দুই সপ্তাহ আগে বাইডেনের ইউরোপ সফরের পর থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাইডেন হেরে গেছেন। ইউরোপ বাইডেনের কথা মেনে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারছে না। বাইডেন বিকল্প দিয়েছিলেন যে, আমেরিকা নাকি ইউরোপকে তেল-গ্যাস জ্বালানিদাতা হতে চায়। এতে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া আগেই বিপুল উচ্ছ্বাসে মেতে এটাকে কাভারেজ দিলেও ইউরোপ মানে জার্মান-ফান্স-নেদারল্যান্ডসের ইউরোপ আনমুভড [unmoved] থেকে যায়। মানে, নিজেদের পুরনো অবস্থান যে, রাশিয়ান গ্যাসই তাদের লাগবে, সে অবস্থান বহাল থেকে যায়। অন্তত ২০২৪ সাল পর্যন্ত নাকি তাদের এমন থাকতেই হবে; না হলে তারা বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়বে, এই ছিল তাদের বক্তব্য ও অবস্থান।
    তাহলে, ইউরোপ বাইডেনের কথায় আনমুভড বা “মাতে নাই” পরিস্থিতিতে থেকে যায়। এটাতেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইউক্রেন ইস্যুতে বাইডেন হেরে গেলেন। আর এতে প্রথম ধাক্কাটা হল বাইডেন ইউরোপকে সাথে ধরে রাখতে ফেল করলেন।

    অবরোধের স্ববিরোধঃ
    কেন এমন হল, বাইডেন ইউরোপে কেন হারলেন? এর সোজা জবাব হল, বাইডেনের আমেরিকা তার চাপ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াবাড়িভাবে ব্যবহার করেছেন। কী সেটা? বাইডেন-ই এই ইউক্রেনের যুদ্ধকে তাঁর আবিস্কার “অবরোধ আর মানবাধিকার” এদুই অস্ত্র দিয়ে লড়বার একক পরিকল্পক। তিনি নিজে রাশিয়ার ওপর এক গাদা সিরিজ অবরোধ আরোপ তো করেছেনই। সাথে ইউরোপকেও চাপ দিয়ে বাধ্য করেছেন একইভাবে অবরোধ দিতে। এটাই বাড়াবাড়ি। তাতে এবারই প্রথম ইউরোপ কোনো দেশের ওপর এমন বেপরোয়া হয়ে রেকর্ড পরিমাণ অগুণতি অবরোধ আরোপ করেছে। এ ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে অবিবেচক ও আত্মঘাতী কাজটাও তারা করে ফেলেছে, জাস্ট বাইডেনকে খুশি করতে হবে এই বিবেচনায়। যেন না জানি, তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে না আবার বাইডেন মহাশয় ইউরোপের ওপর অসন্তুষ্ট ও ‘সংহতিতে’ নেই মনে করে বসেন কি না যেন এই ছিল ইউরোপের ভয়। কিন্তু ইউরোপেরও কপাল খারাপ, যেখানে বাঘের ভয় ঠিক সেখানেই যেন গাড়ি খারাপ হওয়ার দশা!

    বাইডেনের চাপে তারা খেয়ালই করেননি যে, রাশিয়ার ওপর দিয়ে তাদের ইউরো মুদ্রার অবরোধে আরোপের অর্থ আসলে কার্যত ইউরোপের নিজের ওপরই অবরোধ দেয়া হয়েছে। কেন?
    এটা শুনতে অনেকের মজা লাগতে পারে যে, ইউরো মুদ্রা এখন মহা ক্ষমতাধর হয়ে গেছে যে, সে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে তাকে কুপোকাত করে দিতে পারে। তাহলে নিশ্চয় ইউরোপের অর্থনীতি অনেক ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে! তাই কি? একটু দাঁড়ান, ধীরে চলেন প্লিজ! কেন?

    ইউরো অবরোধের সোজা মানে হল, আপনি পুতিনের রাশিয়াকে বলছেন যে, এখন থেকে আর আমার ইউরো মুদ্রায় কোনো পণ্য আর বেচা এবং কেনা কোনোটাই করতে পারবেন না। অর্থাৎ ইউরো যাদের মুদ্রা এই ইউরো জোনের বাইরের রাশিয়াসহ সব দেশ তো বটেই এমনকি জোনের ভিতরের সদস্য যেমন জার্মানি সেও রাশিয়ার কাছ থেকে ইউরোতে গ্যাস কিনতে পারবে না। এটাই হয়ে গেছিল এর অর্থ।  যেখানে জার্মান অর্থনীতি্র (চাহিদা ওঠানামা আছে বলে), ৪০-৫৫% রাশিয়ান গ্যাসের ওপর  নির্ভরশীল। অথচ জার্মানিও রাশিয়ান গ্যাস আমদানি করতে পারবে না। অবরোধের মানে হয়ে গেছে তাই। কেন?

    অবরোধের শুরুতে একটা ফাঁকি দিয়েছিল জার্মানির মত ইইউ এর ইউরোপ। তারা বুদ্ধিমান হয়েছে মনে করে কার্যত রাশিয়ান গ্যাস কেনার ওপর অবরোধ অকার্যকর করে রেখেছিল। ভেবেছিল, এভাবে রাশিয়ার ওপর ইউরো অবরোধ দিয়েও রাশিয়ান গ্যাস তারা কিনে-চলতে পারবে। কিন্তু না!

    খোদ পুতিন এতে পানি ঢেলে দিয়েছেন। পুতিন ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যারা আর বন্ধুসুলভ দেশ নয় (মানে যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ দিয়েছে) তারা এখন থেকে রাশিয়ান কোনো কিছু কিনতে চাইলে রাশিয়ার নিজের মুদ্রা রুবলে [ruble] এর মূল্য পরিশোধ করবে। আর এতেই মহাবিপদে পড়ে গেছে ইউরোপ; বিশেষত যারা রাশিয়ান গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাৎক্ষণিক এদেরকে জ্বালানি রেশনিং শুরু করতে হয়েছে। কারণ ইউরোপে বসবাসে নিজ বাস করার ঘর গরম রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে সেই ইউরোপ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়। তাতে আপনি গরিব-ধনী যাই হন। আর এই সমস্যা মোকাবেলার তাদের সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হল, বিপুল জ্বালানি ব্যবহার করে মিউনিসিপালিটির গরম পানির প্রবাহ বাসিন্দাদের বাসগৃহে পৌছানো। এতে প্রত্যেকটা বাসার প্রত্যেক বসবাসের রুমের ভিতরের দেয়াল বেষ্টন করে থাকে এই গরম পানির লাইন। আর তাতেই রুম বসবাসযোগ্য থাকে। তাই গ্যাস ইউরোপের জীবনযাপনে খুবই এসেনশিয়াল। তাহলে এর মানে দাঁড়িয়েছে, যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে নিজেরা পরাশক্তির ভান ও সুখবোধ করছিল আজ সেই ইউরোপ নিজেরাই নিজেদের অস্ত্রের মুখে কাঁপছে!! নাকি হয়তো ঠাণ্ডায় কাঁপছে, আসলে সব একই কথা হয়ে গেছে! মানে নিজ অবরোধ নিজেরই বিরুদ্ধে চলে গেছে।

    এখন অনেকের মনে হতে পারে, রুবলে মূল্য পরিশোধের কথা বলে এটা পুতিনের প্রতিহিংসা। আমেরিকান ইউরোপে প্রপাগান্ডায় পুতিনের যে দানব ছবি এঁকে দিয়েছেন তাতে বেশির ভাগ মানুষ এটাই বিশ্বাস করবে হয়ত! কিন্তু না এটা ফ্যাক্টস নয়। কেন?

    ইউরোপ ভাবতে পারে যে,  তারা ইচ্ছা করলেই কেবল তাদের রাশিয়ান গ্যাস কেনার উপর তাদের অবরোধ অ-প্রযোজ্য করে রাখতে পারে। আর এমন এই ব্যতিক্রম বা বিশেষ ছাড় দিয়ে তারা তো পুতিনকেই ফেবার করছিল। যে পুতিনের গ্যাসটা অন্তত ইউরোপ কিনতেই থাকবে। ফলে বেচাবিক্রিহীন পুতিন-কে নিশ্চয় এটা ফেবার করাই হল!!  সরি,  এই অনুমানটা ডাহা ভুল। কারণ রাশিয়ান গ্যাসের বিনিময়ে ইউরোপ পুতিনের হাতে ইউরো ধরিয়ে যদি দেয়ও তবু এসব ইউরো আসলে অচল মুদ্রা। না, এটা অচল পয়সা বা ফেক নোট গছিয়ে দেয়া নয়। আসল ইউরো তারা দিলেও তা রাশিয়ার কাছে অচল নোটের মতোনই ঠেকেছিল। কেন? কারণ রাশিয়া ঐ ইউরোতে নিজের কোনো কিছু কেনার বেলায় দাম পরিশোধের মুদ্রা হিসাবে তা ব্যবহার করতে পারে না। কারণ, মূলত ইউরোপ তো রাশিয়ার ওপর ইউরো ব্যবহার করে কিছু কেনার ক্ষেত্রেও অবরোধ দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ যেন হাতে একশ টাকার নোট আছে ঠিকই কিন্তু দোকানদার ওই নোট নিতে চাচ্ছে না। সোজা কথায়, রাশিয়ার হাতে পড়লেই যেকোন ইউরো অচল নোট হয়ে যাবে। তাই ইউরো নিয়ে রাশিয়ার কাউকে গ্যাস বিক্রি করার মানে হল তাকে মাগনা গ্যাস দেয়া হয়েছে। কারণ রাশিয়ার হাতে থাকা ইউরো বাজারে কেউ নিবে না। এ কারণেই ইউরোপসহ সবাইকে রুবলে দাম শোধ করে রাশিয়ান পণ্য কিনতে বলা – এটা পুতিনের কোনো প্রতিহিংসাই নয়। এটা আসলে ইউরোপের ইউরো অবরোধ আরোপের-ই স্ববিরোধিতা। তারা খেয়ালই করেনি যে, রাশিয়ান গ্যাস বিক্রির উপর অবরোধ আরোপে তাদের বেলায় ছাড় থাকলেও তাতে রাশিয়ার কোনো লাভই নেই; কারণ তা রাশিয়ার নিজের কোন কেনাকাটাতে  হাতে পাওয়া অই ইউর মুদ্রা ব্যবহারের কোন সুযোগই নাই। তাই।রাশিয়ার দিক থেকে ইউরোতে যেকোনো কেনাবেচার উপরেও কোনো ছাড় বলে বিবেচিত হবে না। হওয়ার সুযোগই নেই।

    দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশঃ
    আর এখান থেকেই দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশের সুযোগ খুলে যায়। রাশিয়ার উপর অবরোধ এখন বহুবিধ। আরোপিত  অবরোধ এখন আমেরিকা, ইউরোপ ছাড়াও আমেরিকার ধন কোয়াড সদস্য (কেবল ভারত ছাড়া) সবারই অবরোধ আরোপিত আছে। এমনিতেই একালে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক বড় উপায় হল তার মাটির নিচের সম্পদ বিক্রি করা। কাজেই এই সম্মিলিত অবরোধ রাশিয়ার উপরে যথেষ্ট ভারী প্রভাব এনেছে। আবার লক্ষণীয় ভারতের জনসংখ্যা ১৩৫ কোটি যার কাছাকাছি হল একমাত্র চীন। ফলে এমন বিশাল জনসংখ্যার ভারতে বিশাল জ্বালানি চাহিদা অনুমেয়। তাই পুতিনও ব্যারেল-প্রতি ৩৫ ডলার সমতুল্য ছাড় দেয়াতে [India Will Continue to Buy Oil From Russia, Sitharaman Says] এই সুযোগে সম্প্রতি ভারত ১৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনে নিয়েছে, রাশিয়া থেকে রুবলে। আর এতে স্বভাবতই এটা আরোপিত সব অবরোধকেই ফাঁকি দেয়া। অতএব আমেরিকার চোখে ভারত “বেয়াড়া এক দুষ্ট ছেলে’ হয়ে উঠেছে। তাই আমেরিকা ভারতকে প্রথমে বুঝিয়ে বলা, পরে কড়া কথা আর হালকা হুমকি দিতে দিতে গত এক মাস পার করে ফেলেছে। এখন এরপর আগামী পরশু ওয়াশিংটনে বসছে দু’পক্ষের এক ক্রুশিয়াল বৈঠকে। এই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক নাম “U.S.-India 2+2 Ministerial meeting: গত চার বছর ধরে এদুই দেশ এমন বৈঠক করে আসছে। তাই এটা চতুর্থ বৈঠক।

     

    কিন্তু কেন ভারতের রাশিয়ান তেল কিনাতে আমেরিকা এতে এত বিপদ গুনছেঃ
    ভারত সস্তা পেয়ে কিছু রাশিয়ান তেল কিনে নেওয়াতে য়ামেরিকার কাছে কেন ব্যাপারটা সিরিয়াস আর তা ঠিক কতটা সিরিয়াস? এর উত্তর পাওয়া খুবই সহজ। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার দেশ হল চীন ১৪০ কোটির বেশি। আর এর পরের বড় জনসংখ্যার দেশ হল ভারত ১৪০ কোটির কম, প্রায় ১৩৮ কোটি। আর এরা দুই রাষ্ট্র যদি একসাথে রাশিয়ান তেল কিনে এবং রুবলে তাহলে এর অর্থ হবে দুনিয়ার মোত জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ ভাগ জনসংখ্যায় রাশিয়ান তেন কিনতে ফিরে গেল। অর্থাৎ এদের মিলিত জনসংখ্যা বা রাশিয়ান তেলের ভোক্তা হয়ে যাওয়া খুবই তাতপর্যপুর্ণ। রাশিয়ান মোট কাস্টমারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আমেরিকান অবরোধের প্রভাব অকার্যকর হয়ে যাবেই। সবচেয়ে বড় কথা এতা কিন্তু চীন-ভারতের কোন আঁতাত নয়। বরং ২০১৪ সালে যখ প্রথম আমেরিকা রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ করেছিল এরই প্রতিক্রিয়ার চীন-রাশিয়া তেল কিনার চুক্তি হয়েছিল। চীনা ইউয়ান মুদ্রায় রাশিয়ান তেলের বিনিময়ে চীনা পণ্যের রাশিয়ার কিনে নেওয়া চালু তখন থেকে।   আর ভারত এখন রাশিয়ান তেল সস্তায় পেয়ে ছারতে চাচ্ছে না এমন কাস্টমার। কাজেই  এদুই বড় রাশিয়ান তেলের ক্রেতা বাইডেনের জন্য বিরাট হুমকি অবশ্যই!! এথেকে অনুমান করা যায় ভারতকে আমেরিকার কোলে ফের পেতে বাইডেন অনেক দূর যেতে রাজি হবেন, সম্ভবত  চাপ প্রয়োগ সর্বোচ্চ করবেন!

    এমনিতে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকারের – কথা যদি বলি তবে শুরু থেকেই বাইডেনের “মানবাধিকার” –  এই অস্ত্র তাক করা ছিল মূলত ভারতের দিকে। না ভারতকে ঠিক কোন বিশেষভাবে ঘায়েল করার জন্য নয়। বরং বাইডেনের দেখানো দরকার এই অস্ত্র তিনি সবার উপরে সমান প্রয়োগ করছেন কোনো বৈষম্য বা কাউকে খাতির ছাড়া। এ ছাড়া এটা বাইডেনের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। বরং ভারতের পাওনা তিনটা অবরোধের সিদ্ধান্ত তৈরি আছে; কিন্তু তিনি কার্যকর না করে ফেলে রেখেছেন। অর্থাৎ বাইডেনের ক্ষমতা নেয়ার পর থেকেই মুলত বাইডেন-ভারত আর এক লাইনে অ্যালাইন করা অবস্থানে নাই, চলছে না এবং এটাই তাদের ফান্ডামেন্টাল বিরোধ। মানে কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে চলতে পারবেন না। কেন?

    যে শাসক নরেন্দ্র মোদি নিজেরই  জনগোষ্ঠীর এক অংশ, মুসলমানদের খুন করার প্রকাশ্যে হিন্দুদেরকে আহবান জানানোর ব্যবস্থা করে দিতে দ্বিধাগ্রস্ত নন – এই মোদিকে চিনতে হবে। কেন মোদি এমন ডেস্পারেট? তার খোঁজ নিলে দেখব, এটাই আসলে তাঁর নির্বাচনে জিতে আসার খুবই কাজের এক কৌশল। সব পথ হারিয়ে এটাই এখন মোদির একমাত্র অবলম্বন। কাজেই মুসলমান নিগৃহীত করা তার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তবেই এই জোশে হিন্দু ভোট তার বাক্সে আসবে। অতএব, এ জায়গায় মোদি বাইডেনের মানবাধিকারের কথায় কোনো ছাড় দিতে পারবেন না। আবার বাইডেনও ভারতকে মানবাধিকারে এমন জলজ্যান্ত লঙ্ঘন উপেক্ষা করতে পারবেন না। কারণ অবরোধ ও মানবাধিকার এদুই এখন তার প্রধান অস্ত্র। তিনি ভারতের উপর এই অস্ত্র প্রয়োগ বাতিল না করে বড়জোর পিছিয়ে যত দিন দেরি করা যায় তা করতে পারেন, এটাই কেবল বাইডেনের হাতে আছে। এভাবেই তিনি এখন পর্যন্ত ভারতকে ধরে রেখেছেন চুড়ান্ত ফাটাফাটিতে যান নাই। যদিও এটাই হয়ে আছে – বাইডেন-ভারত সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা না হওয়ার পথে প্রধান এক বাধা হয়ে থেকে আছে।

    বাধা দুইঃ
    রাশিয়ার ওপরে ভারতের সমরাস্ত্রে নির্ভরশীলতা, সেটা কমপক্ষে ৭০ শতাংশ। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক রিপোর্ট এটাকে ৮৫%  […as high as 85 per cent.] বলেছে। তাই আমেরিকার রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপের পরে সবচেয়ে বড় বিপদ গুনেছে ভারত। প্রধান কারণ সত্যিই ভারতের সাথে কোথাও কারও সাত দিন যুদ্ধ চললে সাপ্লাই ফুরিয়ে যাওয়াতে এরপর ভারত রাশিয়ান সাপ্লাই বিশেষত ছোট-বড় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও স্পেয়ার্স পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যাবে।  ভারত কেন এমন রাশিয়া নির্ভরশীল হল এর অবস্থার পেছনের কারণ দু’টা। এক. রাশিয়ান অস্ত্র তুলনায় আমেরিকান যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে সত্যিই দশগুণ সস্তা। একটা হেলিকপ্টার, এমন ন্যূনতম ভারী অস্ত্রের বেলাতেই এটা সত্য। দুই. রাশিয়া তো আসলে ভারতের কোল্ডওয়ার-কালের মিত্র। ফলে সেকাল থেকে রাশিয়ান অস্ত্রনির্ভর হয়েই ভারত নিজের প্রতিরক্ষা সাজিয়েছিল। সুবিধা ছিল প্রধান ভারতের তখনকার প্রধানশত্রু পাকিস্তান যেমন আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাঁধা। ফলে ভারতেরও রাশিয়ার সাথে বাধা পড়লে এটা দীর্ঘ দিন একই সাপ্লায়ার হয়ে টিকে থাকার বা কাজ করার সম্ভাবনা ভাল মনে করা হয়েছিল। তাই এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক জেনেশুনেই তৈরি। তবে এটাতে প্রথম নড়াচড়া পড়েছিল ২০০১ সালে বুশের আমলে ওয়ার অন টেরর ইস্যুতে ভারত বুশের মিত্র হওয়ার পর থেকে। অর্থাৎ কোল্ডওয়ার উত্তরকালে সেই প্রথম বুশ ভারতকে নিষিদ্ধ পারমাণবিক কাঁচামাল ও টেকনোলজি সরবরাহের লোভ দেখানোতে। সেখান থেকেই ক্রমেই এটা ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর হয়ে পরে চীন ঠেকানোর নাম করে ভারত-আমেরিকা সখ্যের গভীরতা শুরু। আর এতেই আমেরিকা-ঘনিষ্ট ভারতই এখন সবচেয়ে করুণ দশায়। বলা হচ্ছে ‘বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সবচেয়ে চিকন এক দড়ির উপর দিয়ে হাঁটছেন” [Why India is walking a diplomatic tightrope… ]।’ কেন এমন মনে করা?

    তাই ভারতের একেবারে প্রধান শঙ্কা হল, রাশিয়ান অস্ত্রের সাপ্লাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কারণ রাশিয়ার উপর বলতে গেলে আমেরিকার সব বন্ধু অবরোধ আরোপ করেছে। তাই এক কড়া অবরোধের চাপে তাহলে ভারত রাশিয়ান স্পেয়ার্সের সাপ্লাই পাবে কী করে? অর্থ পরিশোধ করবে কী উপায়ে? আর এখান থেকেই আমেরিকান অবরোধ বাইপাস করে রুবলে রাশিয়ার সাথে পণ্য লেনদেনের ব্যবস্থা প্রথম চালু করে ভারত। স্বভাবতই এটাই বাইডেনের সবচেয়ে বড় না-পছন্দ ও ক্ষুব্ধ তিনি। অতএব আমেরিকা হুঙ্কার দিচ্ছে, “রাশিয়ার তেল কেনা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন নয়, তবে ইতিহাস নয়া দিল্লিকে ভুল স্থানে নিয়ে যাবে: হোয়াইট হাউজ”।

    এই অবস্থায় আমেরিকার ডেপুটি নাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার দালিপ সিং, যিনি আসলে বাইডেনের রাশিয়া অবরোধের টেকনিক্যাল প্রণেতা, তিনি ভারত সফরে এসেছিলেন। তিনি উপস্থাপন নরম কিন্তু কড়া ভাষায় ভারতকে সাবধান করেন ভারতকে, রাশিয়ান তেল কিনার বিরুদ্ধে। সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়া সংগে সম্পর্ক গভীর না করতে [urged the country not to enhance ties with Moscow.] র তাতেই মিডিয়া মন্তব্যে এটাকে বিতর্কিত মন্তব্য [created controversy ] বলে ট্যাগ দেয়া হয়েছে। এমনকি শিরোনামে আর কড়া করে বলা হয়েছে NSA who warned India on Russia ties…।

    এমনিতেই আমেরিকার শখের ধন কোয়াডের [QUAD] এটা নিয়ে গর্ব বা হুমকির শেষ নাই এরই ভিতর ভারত বাকি কয়াড সদস্যদের মত রাশিয়ার উপর কোন অবরোধ আরোপ দূরে থাক উলটা পক্ষে যায় এমনভাবে ভোট দিয়েছে।তাই   বাইডেন একবার বলে বসেন কোয়াডের মধ্য একমাত্র ভারতই কাপাকাপি [shaky] বা অগোছাল [The Quad is — with the possible exception of India being somewhat shaky] . আর এতে আরএসএস এর এম নেতা উলটা বলেন আমেরিকাই কাপাকাপি [shaky]। আমেরিকা চীন থেকে শুরু করে আফগান্সতান পর্যন্ত শেকি [It’s Biden’s US that’s shaky, not India — from China to Afghanistan]। শুধু তাই না তিনি আরও আগিয়ে বলেন, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক একটা শেকি ফেজে প্রবেশ করেছে [India-US relations seem to be entering a ‘shaky’ phase]।

    অর্থাত এসব রিপোর্ট নিয়ে  ভারতের মিডিয়া তোলপাড়। যদিও ইউক্রেন ইস্যু হাজির হবার আগে থেকেই ভারত বাইডেনের বিকল্প বা বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করে আসছিল, যাতে মুসলমান দলনের কারণে মোদির ওপর আমেরিকান মানবাধিকার চাপ ভারত এড়াতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার ‘কোলে চলে যাওয়া’র সময় তখন যে ভানটা ভারত তৈরি করেছিল সেটাই এখন একেবারেই সিরিয়াস হয়ে গেছে।

    অবস্থা দেখে মনে হয় ভারতের মনের গহিনের অনুভব সম্ভবত এটাই যে, ভারত আমেরিকার সাথে সখ্য চাইলেও শেষে ভারত তা রক্ষা করে চলতে পারবে না। রাশিয়ার কাছেই ভারতকে যেতেই হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার চীনের সাথে সম্পর্কটা কেমন হবে – এই হল আরেক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আর এটাই   ভারতের বড় দ্বিধা অস্পষ্টতার জায়গা। ফলে আমেরিকা চাপ দিলেই ভারত আরও দিশেহারা বোধ করে। আর নিজ বিপুল জনসংখ্যার বাজারের লোভ দেখিয়ে ক্ষুব্ধ আমেরিকাকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু এবার স্টেক সম্ভবত অনেক উঁচু! তাই কী হবে এই আশঙ্কা জয়শঙ্করেরও! তিনি আবেদনের স্বরে বলছেন, রাশিয়ায় অবরোধের কারণে আমাদের নিরাপত্তার দিকটা (মানে তাদের অস্ত্র পাবার দিকটা)  অস্পষ্ট হয়ে গেল। এদিকটা তাদের বিবেচনা করা দরকার।

    এসবের মধ্যেই ব্যাপক কুটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে। অথচ ভারতের এই “রুবলে দেনদেন” চালুর ব্যাপারে এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর হতে চান বাইডেন। সর্বশেষ এটা নিয়েই মূলত ওয়াশিংটনে ১১ এপ্রিল থেকে ভারত-আমেরিকান বৈঠক, যার গালভরা নাম ‘২+২’। আর এখানেই রাশিয়ান এস-৪০০  ভারতের কিনবার শাস্তি হিসাবেও এক অবরোধ আরোপ পেন্ডিং পড়ে আছে। আর এখানে ২+২-এর মানে হলো, দু’দেশেরই দুই পররাষ্ট্র ও দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একসাথে চারজনের বৈঠক। এর আগে চীনকে দেখাতে যে, ভারত যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে তা ভেবে এমন ২+২ বৈঠক নিয়ে মিডিয়ায় গর্ব ভরে উপচে উঠত আমরা দেখেছি। কিন্তু আজ সেসব ম্লান, সবাই রিয়েল প্রবলেমের সামনে পড়েছে। তাই যেন ভ্যানিটি উপাদানগুলো অনাদরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর এই মিটিংতা আসলে যদিও মূলত আমেরিকান সামরিক অস্ত্র ভারতের কিনা সংক্রান্ত কিন্তু নেপথ্যে ভারত-আমেরিকান সম্পর্কের টানাটানি অসন্তোষটাই সারফেসে বারবার ছাপিয়ে উঠতে চাইবে।

    তবে এটাও ভুলে যাওয়া ভুল হবে যে, জয়শঙ্করের “খুব চিন্তায় আছি” টাইপের যে ইমেজটা তৈরি করেছেন এর আরেক অর্থ ও উদ্দেশ্য আছে। তা হল, ভারতের কেনাকাটার উপর এসব আমেরিকান অবরোধে যেন  আমেরিকা ছাড় পায় সে জন্য আমেরিকার সামনে এক করুণ ইমেজ তৈরি করে রাখা। যদিও ভারত জানে, বাইডেনের এখানে ছাড় দেয়ার সুযোগ বা ইচ্ছার মধ্যে নাই। তবে জয়শঙ্করের মুল বা খাস উদ্দেশ্য হল, ভারতে মোদির মুসলমান কোপানোতে এজন্য এর উপর কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবরোধ যেন আরোপিত না হয়। সে ব্যাপারে বাইডেনকে ঠান্ডা রাখা। কারণ, রাশিয়ান অস্ত্র কিনার শাস্তি হিশাবে অবরোধ খাওয়া যতটা জাতিবাদি গর্বের, মুসলমান কোপানোর জন্য অবরোধ খাওয়া ততটাই বেইজ্জতির হবে!

    তবে ভারতের দিক থেকে আরেক রিয়েল থ্রেটও আছে যেটা ভারতের ভাষায় চীনের সাথে তার সীমান্তবিরোধ। যেটা আর কিছুই না, কলোনি আমল থেকেই অচিহ্নিত হয়ে থাকা সীমানা। যদিও একথা মনে করার কারণ আছে, এটা মূলত উগ্র হিন্দুত্ব এমন জাতিবাদী কল্পনার শাসক মোদি হওয়ার কারণে। যে কারণে এই যে দেখার বা উপস্থাপনের চেষ্টা যে, মোদির হিন্দুত্ব জাতিবাদ সীমান্ত রক্ষায় সবচেয়ে দেশপ্রেমিক! কিন্তু আসলেই কি এই প্রদর্শন খুবই মূল্যবান? সীমান্ত দুই ইঞ্চি জায়গা ছাড় বা দখল পাওয়াটাকে হিন্দুত্বের জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে ভোটের বাক্সে এর ফল ক্যাশ করার চেষ্টা এটা ত ফালতু জাতিবাদেরই থাকে। যেটা প্রাকটিক্যাল নয়, কাজের লাভালাভ নাই।

    বরং ভারতের লম্বা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে কথা বললে এই কথিত সীমান্তবিরোধ তুলনায় তুচ্ছ। আর আমেরিকা তো ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া গ্লোবাল নেতা যার বিপরিতে চীন  সে জায়গা নিতে ক্রমেই উত্থিত নেতা তাহলে বুড়া সিংহ আমেরিকার যে ন্যাচারালি মরণ হবে এটা না বুঝার কিছু নাই। কারণ এর আর ভারতকেও ন্যূনতম বিনিয়োগ বা ঋণ দেয়ার মুরোদও নেই। তাই প্রতীকী অর্থে ক’দিন পরে মরবে যে শক্তি এর সাথে ভারতের গাঁটছড়া বাঁধার অর্থ কী? ভারতের বন্ধু তো হওয়ার কথা ভারতের আগামীদের, তার অতীত নয়। এটা মানতে না পারার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা আসলে মোদির উগ্র হিন্দুত্ব, এই চোখ দিয়ে দেখার সমস্যা।

    ভারত-আমেরিকান নড়বড়ে সম্পর্কঃ
    ইউক্রেনে হার হচ্ছে টের পাওয়ার পরে বাইডেন দক্ষিণ এশিয়ায় জোর দিয়েছেন, মনোযোগ ফোকাস করেছেন। এটা ভারতও সেন্স করেছে। যেমন এক মিডিয়া রিপোর্ট তাই লিখছে, ‘পাকিস্তানের অস্থিরতা, কলম্বোর অর্থনৈতিক ক্রাইসিস, মালদ্বীপে ভারতবিরোধী ক্যাম্পেইন, তালেবানদের ভারতবিরোধিতা ও চীনের প্রভাব বাড়ানোতে ভারতের প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা ভারতের জন্য লংটার্ম রিস্কের ইঙ্গিত।’ [Colombo to Male to Islamabad, India has new headaches as neighbourhood erupts in trouble] অথচ আগে হলে মানে, ভারত আমেরিকার শক্ত কোয়াড বন্ধু হয়ে থাকার কালে এসব অস্থিরতাকে ভারত ইতিবাচকভাবে দেখত, নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নিত। অথচ এখন শঙ্কিত হচ্ছে। আসলে ভারত যদি নিজেকে চীনের সাথে তুলনীয়ই শুধু না, এক পরাশক্তি ভাবতে থাকে তাহলে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক আর ঘনিষ্ঠ না থাকলে চীনের সামনে সেই ভারতের কী হবে এ নিয়ে হাত পা কাঁপাকাঁপি করা থেকেই এমন রিপোর্টই তো লেখা হবে এবং হয়েছেও।

    যা হোক, ভারতের মন এখন আশঙ্কায় পূর্ণ যে আমেরিকা-ভারত সম্পর্কটা কি একেবারে ভেঙে না গেলেও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? নাকি ভেঙ্গেই যাবে? যেমন, রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকান আপত্তি যদি ভারত না শুনে তবে চরম পরিস্থিতিতে খোদ ভারতের উপরই একটা অবরোধ আরোপ হতে পারে আর সেটা খুব দূরের কিছু নয়। আর এটা নিয়েই আসলে ভারতের মূল দুশ্চিন্তা। আর সে ক্ষেত্রে তাহলে এশিয়ায় সুনির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশে কী হবে?

    বাংলাদেশে কোনো হবু আমেরিকান তৎপরতা বা হস্তক্ষেপে ভারত কোথায় কোন দিকে অবস্থান নেবে, থাকবে, তাহলে সে ক্ষেত্রে? একটা সম্ভাবনা ধরা যাক যদি আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক খুবই নিচে চলে গেল; তবু সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেলায় ব্যতিক্রমভাবে তারা একসাথে লিপ্ত আছে, এমন দেখতে পাওয়া অসম্ভব নয়। যদিও এমনটা দেখতে পাবার সম্ভাবনা কম। আবার অন্য একটা কথাও আছে।

    বাংলাদেশে কোনো তৎপরতায় আমরা যদি আমেরিকাকে দেখি, যার বগলে ভারত বাঁধা আছে তবে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বা যেমন ধরা যাক যাদেরকে অনেকে ‘ইসলামিস্ট’ বলে, এদের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক খারাপ। এদের কাছে আমেরিকার কোনো গ্রহণযোগ্যতা দূরে থাক সেক্ষেত্রে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে। তাতে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক যেমন অবস্থাতেই থাকুক না কেন। বলা যায়, এটাই গত ১৪-১৫ বছরে বাংলাদেশে ভারতের অর্জন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোথায়? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]