Tag: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

  • কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    গৌতম দাস

    ০৭ জুন ২০২১, ২০:০৭, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3zY

    Modi Vs Mamota in the light of Center Vs State conflict

    নেহরুভিয়ান বা নেহেরু স্টাইলের ভারত গড়তে গিয়ে এটা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন করে ভারত-রাষ্ট্রের এসব গুপ্ত-হস্তক্ষেপ ব্যবস্থাদি এখন আবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কলকাতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২ মে, মানে এক মাসেরও আগে এবং তাতে তৃণমূল কংগ্রেস দলের মমতা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছেন। মানে আবার মমতা ব্যানার্জি সরকার গড়বেন এবং গড়েছেনও। অথচ এই নির্বাচনে প্রচণ্ড মিথ্যা আশ্বাস জড়ো করে ফেলা হয়েছিল যে, মোদীর বিজেপি বিজয়ী হচ্ছেই; এই প্রপাগান্ডা এখন আত্মঘাতী অবস্থায়। তাই বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মানসিক জোর ধরে রাখার জন্য, মিথ্যা উচ্ছ্বাস জীবিত রাখতে গিয়ে প্রতি পদে পদে এখন “কেন্দ্র বনাম রাজ্য” – এভাবে মোদী-মমতা মুখোমুখি সংঘাত জোরদার করে তুলতে চাইছেন মোদী।

    ভারতের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতঃ
    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ভারতের জন্মের সমান বয়সী এক মারাত্মক ক্ষত। এটা মূলত নেহেরু-স্টাইলে চিন্তার পরিণতি।  এই চিন্তার মূল বৈশিষ্ট হল, কলোনিদখলদার বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও (তাদের শাসনের প্রধান রাজ/রানীর প্রতিনিধিকে ভাইসরয় বলা হত)  নেহেরু নিজেকে এক “ভাইসরয়-ই” মনে করতেন।  যা তাঁর কাজ ও ততপরতার মধ্যে বিশেষত খোদ ভারত-রাষ্ট্র কাঠামোটাই এর সবচেয়ে বড় স্পষ্ট প্রমাণ।  অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পরের ভারতের জনগণের সাথে নেহেরু নিজের সম্পর্কটা কী এই প্রশ্নে নিজেকে এক কলোনিদখলদারের মত করেই ভবেবে নিয়ে দেখেছেন।  অর্থাৎ “জনপ্রতিনিধি” শব্দ ও এই মৌলিক ধারণাটাই তিনি আমল করতে চান নাই। ফলে একটা “রিপাবলিক” রাষ্ট্রের মূলকথাটাই তাঁর কখনই জানা হয়ে উঠে নাই। বিপরীতে তার ত্রুটিপুর্ণ চিন্তার মৌলিক দিকটা হল, হবু ভারত-রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা কথিত এক কেন্দ্রের নামে ও এর হাতে কুক্ষিগত করা যায় কী করে সেদিকে সচেষ্ট থেকেই কলোনি-উত্তর ভারতের জন্ম দিয়েছেন; কনষ্টিটিউশন লিখিয়েছেন। এটাকেই আমরা নেহেরুভিয়ান চিন্তা বা নেহেরু-স্টাইলে চিন্তা বলছি। যাকে প্রতীকীভাবে সময়ে নেহেরুর “ভাইসরয়”-চিন্তাও বলেছি।
    কাজেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত – এটা আসলে ভারতের রাষ্ট্রগঠনের জন্মগত এক মারাত্মক ত্রুটি। ফলে এককথায় (ফেডারল এক ভারত করে)  এর পুনর্জন্ম বা ভেঙ্গে-গড়া যার একমাত্র সমাধান।  কিন্তু ভারত-রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলে সেটা আবার পুনঃর্গঠনের মুরোদ যদি ভারতের রাজনীতিবিদ-ইন্টেলেজেন্সিয়ার থাকে (যার আলামত এখন পর্যন্ত নাই) তবেই এ’থেকে ভারত মুক্ত হতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। নইলে আস্তে আস্তে এটা ব্ল্যাক-হোলের গর্তে হারিয়ে যাবার মত এক ঘটনা হবে। মানে এককালের যুগশ্লোভিয়া, চেকোশ্লোভিয়া অথবা খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন বলে রাষ্ট্র থাকলেও তাদের ভেঙ্গে যাওয়া বা আজ নাই হয়ে যাবার মত আরেক ঘটনা হবে এটা। কথিত একটা কেন্দ্রের নামে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইলে পরিণতি এটাই তো হবার কথা!

    এ অবস্থায় আরেকটু ভেঙ্গে বললে ভারত-রাষ্ট্রে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ, এই জিনিসটা কী আসলে? যদিও এই প্রশ্নটাই এখন মোদীর কারণে সর্বত্র সরব হয়ে উঠেছে। এখন যেটা মোদী-মমতা বলা হচ্ছে এটাই কয়েক বছর আগে উঠেছিল রাজ্য-দিল্লিতে, মোদী-কেজরিলাল নামে।  আর তা এবার কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও ক্রমে ছড়াচ্ছে। সবাই কান-খাড়া করে উঠতে চাইছে।

    ফেডারেল মানে কী বুঝবঃ
    ফেডারেল [Federal] শব্দটা ইংরেজি। এর একটা বাংলা অনেকে করে থাকেন ‘যুক্তরাষ্ট্রীয়’ বলে। যেমন অনেকে লিখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইংরাজি United States of America (USA) এর বাংলা হিসাবে।  ফেডারেল রাষ্ট্র ধারণাটা যদি রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমিত থাকে তাহলে হয়ত এমন বাংলা দিয়ে চলতে পারে হয়ত। যদিও এটা ভাল বাংলা নয়। কারণ ফেডারেল শব্দের সাধারণ অর্থ হল, স্বাধীন ও সমতুল্যদের মধ্যে এবং তাদের নিয়ে গড়া এক  এসোসিয়েশন। যেমন স্বাধীন ফুটবল ক্লাবগুলোকে নিয়ে গড়া এক ফুটবলের ফেডারেল এসোসিয়েশন বা ফেডারেশন। অথবা স্বাধীন গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক ফেডারেশন। অথবা সবধরনের স্বাধীন ট্রেডের  এসোসিয়েশনগুলোরও আবার এক ফেডারেশন। লক্ষ্য করেন, এখানে কিন্তু ফেডারেশন বা ফেডারেল ধারণার ব্যবহার কোনো রাষ্ট্র-বিষয়ক ব্যাপারে নয়। তাই ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় শব্দটা এখানে কোনোভাবেই যুতসই তো নয়ই; সোজা কথা তা খাটবে না, অচল। তাই এ লেখায় ফেডারেল শব্দের কোনো বাংলা না করেই তা সরাসরি ব্যবহার করব।

    আর ফেডারল শব্দটা আমাদের মানুষের কাছে তাদের নজর ও নাগালে এসেছিল অন্তত দুবার। প্রথমবার ১৯২৮ সালে যখন মুসলিম লীর নেতা জিন্নাহ নেহেরুকে আগামি ভারত (যেটা এখন ভারত ও পাকিস্তান হয়ে গেছে)  স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যগুলোর একটা ফেডারল ভারত করা হোক বলে প্রস্তাব করেছিলেন। আর স্বভাবতই আমরা উপরে দেখেছি নেহেরু-স্টাইল ছিল ঠিক এর উলটা, তাই তা প্রত্যাখ্যাত বা পত্রপাঠ বিদায় হয়েছিল। আর দ্বিতীয়বার আমরা শুনেছিলাম ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বদলে খন্দকার মোস্তাক পাকিস্তানের সঙ্গে এক কন-ফেডারেশন গড়তে চেয়েছিলেন বা সে লক্ষ্যে কিছু চেষ্টা করেছিলেন।

    তাহলে এখন কেবল রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো ধারণা হিসেবে যদি বলি, এটা একটা ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ বলতে যেমন বললাম, আমেরিকা একটা ফেডারেল রাষ্ট্র, তাহলে কী বুঝব?

    সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, এটা ৫০টা স্বাধীন ও সমতুল্য স্টেটের সমর্থনে গঠিত একটা ফেডারেল রাষ্ট্র অবশ্যই; তবে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগেই সেগুলো স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং আছে বলে তাদের নিয়ে গঠিত এই বিশেষ ধরনের এসোসিয়েশন বা রাষ্ট্রটাকে ফেডারেল রাষ্ট্র বলা হচ্ছে।

    তাহলে এখন এক সম্পূরক প্রশ্ন তোলা যাক। তাই, ভারতও কী একটা ফেডারেল রাষ্ট্র? কারণ ভারতেও তো বর্তমানে ২৮টা ছোট-বড় রাজ্য আছে বা নিয়ে গঠিত?

    না, একেবারেই তা নয়। ভারত কোনো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; যদিও কেন নয় তা যথেষ্ট না জেনে বুঝেই অনেকে পত্রিকা রিপোর্টে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের বিরোধের ইস্যু হলেই তাকে ‘ফেডারেল’ সমস্যা বলে যেচে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি জাহির করতে চায় অনেক রিপোর্টার। মানে শব্দটা তারা শুনেছে যেন সেটা বুঝাতে চায়। কিন্তু কথাটা সবচেয়ে বেখেয়ালে বলে ফেললেও ভারত কোনোভাবেই ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ নয়। আর মূলকথাটা হল, একটা রাষ্ট্রের ভিতরে  অনেকগুলো প্রদেশ বা রাজ্য থাকা মানেই সেটা একটা ফেডারল রাষ্ট্র – এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন ও বাজে কথা।

    কিন্তু কেন? ফেডারল বুঝতে এত কঠোর সীমারেখা টানছি কেন?
    ফেডারল কথাটা আমরা বুঝতে পারি আমেরিকার জন্মের ইতিহাস দিয়ে এবং সম্ভবত তাতে সবটা সহজে বোঝা যাবে। খুব অল্প কথায় বললে আজকের “ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র” এটা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্ম নিয়েছিল। আজ পর্যন্ত এটাই দুনিয়াতে ফেডারল রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ।  আর এর আগের (১৭৭৬ সালের আগের) কলোনিয়াল আমেরিকা [American colonies] বলতে তা ব্রিটিশসহ ইউরোপের বহু রাষ্ট্রেরই  কলোনিদখল ব্যবসায়ী কোম্পানির মালিকানাধীন ছোট ছোট কলোনি বা দখলকৃত ভূমি হিসেবে ছিল। আর ঐ দখলকৃত ভূমিগুলো আবার ব্রিটিশসহ নানান ইউরোপীয় দখলদাররা নিজ নিজ দেশ থেকে ‘বিনা পয়সায় জমি দেয়া হবে, শুরুর বিনিয়োগ দেয়া হবে’ ইত্যাদি নানা প্রলোভনের কথা বলে গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দাদের মাইগ্রেট করে জাহাজে ভরে ভরে এককালে আমেরিকায় এনেছিল।

    এসব গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দারাই জমি পাওয়ার লোভে মাইগ্রেট করে আমেরিকায় এসেছিল।  এরপর এরাই স্থানীয় আদি বা নেটিভ বাসিন্দাদেরকে (‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলে এরা ডাকত যাদের) খেদিয়ে দিয়েছিল, কখনো মেরে ফেলা হয়েছিল অথবা আরো গহিন বন জঙ্গলে পালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এভাবেই সাদা চামড়ার কলোনি মালিকরা সাদা ইউরোপীয় গরীব মাইগ্রেন্টদের এনে বসতি স্থাপনে বিভিন্ন ছোট শহর বা রাজের আমেরিকা কলোনি স্থাপন সম্পন্ন করেছিল। এই প্রথম পর্বের পরে মালিকরা এরপর সেখানে নিয়ে আসে আফ্রিকানদেরকে ‘কালো দাস’ নামে, একইভাবে মাইগ্রেট করিয়ে। তফাত খালি এরা পায়ে শিকল পরানো দাস হিসেবে এসেছিল এবং তা আফ্রিকা থেকে। আর এই দাসদেরকেই পরিচালনা করত সাদা মাইগ্রেন্টরা তবে সাদা মালিকদের পক্ষ থেকে। আর রাশিয়ান সোভিয়েত শ্রমশিবিরের চেয়েও ভয়াবহভাবে শিকলে বাঁধা দাসশ্রমিক হিসেবে। তবু যতই দিন গেছে, আর কালো মানুষেরা যত “পোষ” মেনেছে, ততই শিকল আলগা করে দিয়েছে শাসকেরা।

    ওদিকে ব্রিটিশরা ভারতে কলোনি দখল ও শাসন শুরু করেছিল – আমেরিকার কলোনিমুক্ত বা স্বাধীন হওয়ার মাত্র কুড়ি বছর আগেই। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের পায়ে শিকল না দিলেও কলোনির হুকুম ও বাধ্যবাধকতার ভেতরে রেখেছিল যা আমাদের প্রায়ই অসহ্য হয়ে উঠলে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটত। কিন্তু আমেরিকার বেলায় নানান শহর ও রাজ্যের সাদা মাইগ্রেন্টরাই এক সময় তাদেরই মাস্টার বা সাদা মালিকদের শাসনের বিরুদ্ধে শুধু বিদ্রোহ নয় একবারে বিপ্লব – মানে পাল্টা ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এটাই আমেরিকান কলোনিতে ‘নয়া আমেরিকান বিপ্লব’ [American Revolution] নামে পরিচিত, যার সময়কাল ১৭৭৬ সালের আশপাশের সময়। সোজা কথা, ব্রিটেনে বসে কলোনি ব্যবসায়ী মালিকরা আমেরিকায় তাদের নানা শহর বা রাজ্যের কলোনিগুলো সাদা ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের দিয়ে পরিচালনা করবে, এই সুযোগেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে। এরপর স্বাধীন সেসব শহর ও কোথাও পুরা রাজ্যটাই স্বাধীন হয়ে যায়। এবং এবার তারা একত্রে হওয়ার জন্য সম্মিলিত হয়ে বসেছিল; যেটাকে তারা আমেরিকা মহাদেশীয় সম্মেলন (আমেরিকান কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস ১৭৭৫) নামে ডাকে। Continental-Congress  বসা ছিল খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। এরপর পরের বছর ১৭৭৬ সালে এক ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্রে তারা সম্মিলিতভাবে গঠিত হয় ও এর স্বাধীনতার ঘোষণা [Declaration of Independence (1776)] দেয়।

    ফেডারল ধারণা বুঝবার জন্য এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও লক্ষণীয় যে, এখানে শহর বা রাজ্যগুলো আগে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত হয়েছিল। এরপরে  এই স্বাধীন রাজ্যগুলো একটা রাষ্ট্রে ফেডারেটেড [Federated] ভাবে একত্র হতে এসেছিল। এটাই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্মের ঘোষণা দেয়া আজকের ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র ও এর বৈশিষ্ট্য। তবে আজকের ৫০ রাজ্যের আমেরিকা যা আমরা দেখছি তা অবশ্য শুরুতে এমন ছিল না। শুরুতে মাত্র ১৩টা স্বাধীন রাজ্য কনফেডারেশনে এ ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে সম্মতি দিয়েছিল। কেন? কারণ সদ্য স্বাধীন কলোনিমুক্ত রাজ্যগুলোর  সবার মনে ভয় ছিল নতুন এই ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে গিয়ে আবার আগের মত কোনো রাজ্য আরেক রাজ্যের ওপর কলোনির মতো আচরণ শুরু করে কি না – সেটাই সবাই আগে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। তাই দ্বিধা ও দেরি। যেমন শুরুতে ফেডারল আমেরিকার কোন একক কারেন্সি বা ডলার মুদ্রা ছিল না। এমনকি এক রাজ্যের মুদ্রা আরেক রাজ্যে চলত না। প্রত্যেক রাজ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের আলাদা আলাদা ছাপানো কারেন্সি ছিল। প্রথম স রাজ্যীর সব ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা কো-অর্ডিনেশনের জন্য ফেডারল রিজার্ভ ব্যাংক (একালের তুলনীয় আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক ) গঠন করা হয়েছিল এই ১৯১৩ সালে।  এরপর ১৯১৫ সালে প্রথম ফেড-এর ইস্যুকৃত বাজারে আসে। তাই তা কেবল ৫,১০ আর ২০ ডলারের। তাই ধীরে ধীরে যত আস্থা এসেছে ততই ফেডারল আইনকানুন কী তৈরি হচ্ছে সেগুলো এবং গঠনতন্ত্র কী রাখা হচ্ছে, কাঠামো কী ইত্যাদি দেখে আর কিছুটা প্র্যাকটিসে নিশ্চিত হওয়ার পরে ১৩ রাজ্য থেকে সেটা আজ ৫০ রাজ্যের আমেরিকা উঠে এসেছে। কাজেই ফেডারল ধারণার গোড়ার ধারণা হল, আগে নিজে স্বাধীন থাকা পরে ফেডারল বা এক ফেডারেশনের ছাতার নিচে আসা। নইলে বের হয়ে যেন যেতে পারে – এমন সুযোগ ও বের হয়ে যাবার রাস্তা খুলে রাখা থাকা চাই।

    নেহেরুর কেন্দ্র-রাজ্যের ভারতঃ
    তাহলে এখন আসেন ১৯৪৭ সালে, নেহরুর গঠিত ভারত সেও তো এমন ২৮-২৯টা রাজ্যে এবং এরা কি প্রত্যেকে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত রাজ্য ছিল? না, একেবারেই নয়। বরং কথিত ভারত বলে একটা বিরাট ভূখণ্ড ছিল বলে ধরে নেয়া হয়েছিল আর যেটাই ব্রিটিশ শেষ ভাইসরয় (রানীর প্রতিনিধি) মাউন্টব্যাটেন নেহরুর হাতে ১৫ আগষ্ট তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো কোন কোন ভূখণ্ড? এক কথায় বললে, কেবল যেগুলোর প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে তৈরি ও পরিচালিত হত। অর্থাৎ তিন প্রেসিডেন্সি (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বাই) ও প্রায় ১৮টা প্রদেশ। আর এর বাইরে ছোটবড় মিলিয়ে ৫৫০ এরও বেশি করদ রাজার রাজ্য ছিল। কিন্তু এগুলো নেহরুকে হস্তান্তরের প্রশ্নই ছিল না।

    কারণ এগুলো ছিল ব্রিটিশ শাসনক্ষমতার অধীনস্থ এবং শর্ত সাপেক্ষ মানে, রাজারা বৃটিশ শাসনক্ষমতার সাথে তাদের আদায়কৃত রাজস্বের একাংশ শেয়ার করতেন। কাজেই ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেলে ওসব করদ রাজ্য তখন থেকে আবার ফিরে স্বাধীন রাজার রাজ্য হয়ে যায়। আর তাতে, নেহরুর কাছে করদ রাজ্যগুলোকে আর হস্তান্তরের কোনো আইনি অধিকার ব্রিটিশ শাসকের ছিল না।

    কাজেই নেহরু যে দুশ্চিন্তায় ‘পাগল’ ছিলেন তা হল, প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ ও পুরানা করদ রাজ – এদের সবগুলোকে পিটিয়ে জবরদস্তি করে হলেও, সেনাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও – কথিত এক ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া যায় কী করে! এই হলো জন্মের সময়কালের নেহরুর ভারত। সে কারণে নেহরুর নিজের ভারতের রাজ্যগুলোর জনগণের প্রতি অ্যাটিচ্যুড যেন ভারত কলোনিমুক্ত হলেও তিনি তখনও এক কলোনি ভাইসরয়! যেন নিজেই রাজা বা রানী অথবা প্রধান রাজ-প্রতিনিধি।

    অর্থাৎ উল্টা করে বললে ২৮-২৯ টা রাজ্যে এরা যতই স্বাধীন ততই তা নেহরুর মাথা ব্যথার কারণ। সার কথায়, আমেরিকার মত স্বাধীন রাজ্যগুলো স্বেচ্ছায় যুক্ত হচ্ছে, এমন কোনো ভারত-রাষ্ট্রে তারা সংযুক্ত হয়নি। আর আসলে যে কনসেপ্টটা কাজ করেছে সেখানে যে, মাউন্টব্যাটেন নেহরুকে ভারত বলে কিছু একটা দিয়ে গেছেন; অতএব সে কারণেই ভারতের রাজ্যগুলো স্বাধীন নয়, এমনকি পুরানা করদ রাজ্যগুলোও স্বাধীন নয়  – জবরদস্তিতে করার এই অনুমানটাই বাস্তবায়ন করেছেন নেহরু। আর সেকালে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে এভাবে। এই রাষ্ট্র তাই নিজেই নিজেকে কখনো অন্তত কনষ্টিটিউশনে  “ফেডারেল” বলে ব্যাখ্যা করতে বা তুলে ধরতে যায় নাই। তাহলে ভারত কী? এই হলো ভুতুড়ে ভারত ও তার জন্ম!

    এখন এই ভূতুড়ে ভারতটা কে? অনেক সময় মনে হবে এটা বোধহয় ‘উত্তর প্রদেশ’ রাজ্য। কেন? কারণ এর এলাহাবাদ শহরে নেহরুরা বাস করতেন। তার বাবা মতিলাল নেহেরু ওকালতি প্র্যাকটিস করতে কাছের বড় শহর হিসেবে (কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ তিনি) এলাহাবাদে এসেছিলেন।

    [ইলাহাবাদের শহরের সব পুরানা চিহ্ন শেষ করে দিলেও এখনও এটা বড় শহর। যদিও এর নাম বদলে “প্রয়াগরাজ” [Prayagraj] রাখা হয়েছে মোদীর দলের হাতে ২০১৮ সালে।  কিন্তু এখনও উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সর্বোচ্চ কোর্ট, হাইকোর্টটা  “এলাহাবাদ হাইকোর্ট” নামেই ইলাহাবাদ শহরে থেকেই গেছে।]

    এখন তাহলে এই উত্তর প্রদেশ নামক এই রাজ্য কী ভারতের বাকি সব রাজ্যের ওপর শাসনকর্তৃত্বের কর্তা? কিন্তু সে ক্ষেত্রেও এই শাসনের ভিত্তি কী, ক্ষমতার উৎস কী,  সে প্রশ্ন থাকবে। যার উত্তর কেউ জানে না। তাই এটা ভূতুড়ে! তাহলে কি এটা সেই ইঙ্গিত যে, উত্তরপ্রদেশ মানে এক আর্য-শাসন বুঝতে হবে? তাহলে আর সেটা সবাই মানলেও বাংলা বা দ্রাবিড়ীয়রা তা মানতে বাধ্য কেন?

    এসব প্রশ্নের কোনো দিনই কোনো সমাধান হয়নি। উল্টা উত্তর প্রদেশ বা হিন্দিবেল্ট কেন্দ্রিক ভূতুড়ে এক ক্ষমতা, এরই নাম হয়ে গেছে “কেন্দ্র”। কনস্টিটিউশনেই আবার কখনো একে ‘ইউনিয়ন’ বলা হয়েছে বটে বিশেষত জুডিশিয়ারি অংশে। কিন্তু এটা কাদের ইউনিয়ন? ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার আগে কি তারা স্বাধীন ছিল?  নাকি ভারত বলে এক ভাববাচক আগাম ভুতুড়ে ধারণাই ছিল মাত্র? তাহলে কারা এক জায়গায় জড়ো বা ইউনিয়নে যুক্ত হচ্ছে? এসবের কোনো জবাব কোথাও নেই। বরং আগেই বলেছি সারা ভূখণ্ডকে ভারত নামের মধ্যে ধরে রাখবেন কী করে, কিসের আঠা লাগিয়ে, এটা ছিল বরং নেহরুর দুশ্চিন্তা। এই ‘আঠা’টারই হল হিন্দুত্ব। যদিও নেহরু ও গান্ধী বুদ্ধিমান, তাই তারা এ কথাটা প্রকাশ্যে কোথায় লিখে বলতে চাননি। আর সে কারণেই সম্ভবত এই কথিত কেন্দ্র এই ভারত, সেটা কথিত ‘সেকুলার’ কি না তাও নেহরু ও গান্ধী রা কোথাও লিখে রাখেননি। ইন্দিরা গান্ধী কেবল ১৯৭৬ সালে এসে “বাংলাদেশের কারণে” তা লিখিয়েছিলেন।

    তবে ভারত মানে উত্তর প্রদেশ কিংবা আর্য-শাসন এসব চিন্তা যে নেহেরুর মাথায় কাজ করত এটা অমূলক নয়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৬২ সালের কিছু ঘটনা। সেটা হল, সারা ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা ও অফিসিয়াল ভাষা করতে হবে বলে এক সিদ্ধান্ত নেহেরুর সরকার বাস্তবায়ন করতে গেছিলেন।  নেহেরুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রথম প্রতিবাদ বিক্ষোভ বলা হয় এটাকে যা দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য থেকে শুরু হয়েছিল। এবং প্রধানত তামিলনারু থেকে। দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য বলা হয়, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গনা, কর্ণাটক, তামিলনারু, কেরালা – এদেরকে। এর দুবছর পরেই নেহেরু মারা যান। আর তিনি বেচে থাকতেই এবং পরের প্রধানমন্ত্রী এই ইস্যুতে আপোষ করে মিটিয়ে নেন।   আর সেই থেকে ভারতে রাষ্ট্রভাষা বলেই কিছু নাই (এটাই সুপ্রীমকোর্টেরও রায়) তবে অফিসিয়াল ভাষা আছে যদিও সেখানে হিন্দির পাশাপাশি ইংরাজিও যুক্ত করে নেয়া হয়। আসলে এটাই ছিল কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা।  কিন্তু এখান থেকে এটা পরিস্কার যে কেন্দ্র মানে “আর্য-শাসন” (যেখান থেকে হিন্দি-প্রীতি) ধরণের ধারণায় নেহেরু ভুগতেন।  অনেকে মনে করেন নেহেরুর জীবনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা  ও চ্যালেঞ্জ ঘটেছিল প্রায় একই সময়ে ১৯৬২ সালে।  প্রথমটা আর্যশাসন সংক্রান্ত সারাভারত হিন্দিভাষা চালু করতে গিয়ে ধাক্কা খাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ।  আর এই দুই ঘটনার শোকেই তিনি ব্রেনস্ট্রোক করেছিলেন বলে অনেকের বিশ্বাস আর এই ধারণা যে এতে তিনি এই প্রথম নিজের উপর আস্থা হারিয়েছিলেন। আর এর দুবছরের মধ্যে তিনি মারা যান।

    আমরা তাহলে এখন আরো ফোকাসে আসি। সেটা হলো, নেহরুর ভারত তাহলে ফেডারেল দূরে থাক, এটা বরং “কেন্দ্র” নামে ভূতুড়ে ক্ষমতার অধীনস্থতায় থাকা সব রাজ্যগুলোতে, যেখানে মূলকথাটা হল, বহুবিধ জায়গা ও সুযোগ রেখে দেয়া যাতে কেন্দ্র রাজ্যের ওপর চাইলেই হস্তক্ষেপ করতেই পারে। রাজ্যের  সর্ববিধ শাসন প্রশাসনকে ওভাররুল করে  “কেন্দ্র” নামে এক কর্তৃত্বের অধীনে সব তুলে নিতে পারে।

    যেমন গভর্নর ব্যবস্থা, এটা করাই হয়েছে যেন যেকোনো সময় “কেন্দ্র” রাজ্যসরকারকে বাতিল করে এর পরিচালনা নিজের হাতে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতি খারাপ – এই বলে গভর্নর রিপোর্ট দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই আসলে গভর্নর মূলত কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপের হাতিয়ার। একইভাবে বাজেট বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতিরোধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রের একক নিয়ন্ত্রণে, মানে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় রাখা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার-অপব্যবহার করে [যেমন মমতার] রাজ্য সরকারের উপর প্রধানমন্ত্রীর [মোদীর] হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। আসলে এভাবেই হস্তক্ষেপের মেকানিজম যেন তথাকথিত ভূতুড়ে কেন্দ্রের হাতে থাকে এমন সুযোগ রেখেই সেকালে কনস্টিটিউশন লেখা হয়েছিল; যাতে নেহরু নিজ হাতে সব নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারেন।

    আবার এ হস্তক্ষেপগুলো আগাম কোন লিখে রাখা ‘রুল বুক’ (বা চাইলে তা সংসদে পাশ করে নিয়ে রাখা) মেনে চলা হোক, তা সেভাবে রাখাই হয়নি। বরং রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তি বা সাবজেকটিভ ইচ্ছার উপর। কাজেই রাজ্যকে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিইচ্ছার অধীন হতে হবে রাজ্যকে, সোজা কথায় ‘তেল মারতে হবে’। এমনিতেই রুল বুক বা প্রশাসনের বিজনেস রুল বুকের অধীনে না থাকা কোনো ক্ষমতা মানেই তা ভয়াবহ  এক দানবীয় হতে বাধ্য। কারণ কোন “রুলবুকের” অধীনে লিখিত এই না থাকার মানেই হলো চরম অরাজকতা। কারণ  কেউ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেই তার ক্ষমতার প্রয়োগের  ব্যাপারটাকে  তার ব্যক্তিখেয়ালের হাতে কোনোভাবেই ছেড়ে দেয়াই যায় না। রুল বুকের স্ট্যান্ডিং গাইডলাইন অবশ্যই থাকতে হবে। অথচ তা নেই, রাখা হয়েছে সাবজেক্টটিভলি বা অবাধ ব্যক্তি খেয়ালে।

    মোদী-মমতা বা কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদঃ
    এবারের রাজ্য নির্বাচনে দলের হারার পর মোদীর আচরণ ও তৎপরতা বলছে তিনি মমতার সাথে সঙ্ঘাতেই থাকতে চান। অনেকটা যেন তিনি বলতে চান, নেহেরু মহাশয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে এসব অবাধ হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুবিধা দিয়ে গেছেন।  ফলে কংগ্রেস তাকে কিছু বলতে পারবে না। কাজেই তিনি সেসব সুবিধা বিজেপি দলের স্বার্থে ব্যবহার করবেন না কেন?   যেমন সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় পরবর্তি পরিস্থতিকে তদারকির উছিলা করে মোদী মমতার সাথে এক মিটিংয়ে বসতে চান বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু মোদীর ইচ্ছা সেখানে তিনি রাজ্য বিরোধীদলের নেতা হিসেবে তার দলের লোককেও উপস্থিত রাখবেন এবং এতে সম্ভবত দলীয় কর্মীদের দেখাবেন যে কলকাতার বিরোধী নেতাও অনেক ক্ষমতা রাখেন। এখন এই প্রসঙ্গে মমতার দাবি, মোদী এই ব্যাপারটা একা ঠিক করতে পারেন না যে, রাজ্য থেকে সচিব ও প্রশাসনিক স্টাফসহ সাথে আর কোন কোন জনপ্রতিনিধি তাদের দুজনের সভায় উপস্থিত থাকবেন। আর এসব বিধি বা কনস্টিটিউশনে নেই বলে দাবি করেছেন মমতা।

    এমনিতেই এটা দৃষ্টিকটু যে প্রধানমন্ত্রী ব্যুরোক্র্যাট আর মুখ্যমন্ত্রীর মতো জনপ্রতিনিধিকে একই প্রটোকলে ট্রিট করছেন। এর উপর সবখানেই মোদীর এটা প্রদর্শনের ইচ্ছা যে, মুখ্যমন্ত্রী যেন প্রধানমন্ত্রীর এক অধীনস্থ প্রশাসনিক স্টাফ! এমনিতেই নেহরু কথিত কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুযোগ রেখে দিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক সাজিয়ে গেছেন। কারণ তার অযথা ভয় থেকে অযাচিত ক্ষমতার চর্চা যে রাজ্য যদি কেন্দ্রের কথা না শুনে; তাই সবসময় রাজ্যকে দাবড়ে রাখার সব মেকানিজম, দ্বৈত ক্ষমতাকর্তৃত্ব-ব্যবস্থা- এসবই হবে এর হাতিয়ার। এর উপর মোদী নিজেই মমতাকে একটা শিক্ষা দিয়ে অধীনস্থতায় আসতে বাধ্য করতে চাচ্ছেন। তাই সব মিলিয়ে এটা ভয়াবহ।

    এখন মমতা ওই সভায় রাজ্যের প্রধান সচিবকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছা করেই সম্ভবত কেবল মোদীর সাথে সাক্ষাৎ করেই, কোনো মিটিং না করেই ফিরে চলে আসেন। শুধু তাই নয়, নিজ রাজ্যের মুখ্যসচিবকেও সাথে নিয়ে  মোদীর মিটিং বর্জন করে চলে আসেন।

    স্বভাবতই এটা মোদির জন্য অপমানবোধের। তিনি মুখ্যসচিবকে শোকজ করেন এবং দিল্লিতে এসে রিপোর্ট করতে বলেন। কিন্তু মুখ্যসচিব এর জবাবে লিখেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে মানে কথা শুনেই মোদীর ওই সভায় থাকতে পারেন নাই। অর্থাৎ তিনি যেন বলছেন, আমিও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী অবশ্যই। কিন্তু আমার বর্তমান রিপোর্টিং জনপ্রতিনিধি হলেন মুখ্যমন্ত্রী; প্রধানমন্ত্রী নন। কাজেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকেই তাকে ফলো করতে হয়েছে। অর্থাৎ এটাও আসলে এক দ্বৈত ক্ষমতা ব্যবস্থার পরিণতি এবং তা ব্যুরোক্র্যাসিতে।

    এতে যে নতুন জিনিষটা সামনে এসেছে তা হল, এতদিন মনে করা হত কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদের ইস্যুটা বোধহয় কেবল রাজনৈতিক। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের কেবল এতে সংশ্লিষ্ট হবেন বা সাফার করবেন। কিন্তু না। এবার প্রমাণ হল যে বুরোক্রাসির সব অফিসারেরাও (ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের ) এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট হবেনই এবং তাদেরকে পক্ষও নিতে হবেই। আসলে এভাবে একসময় সারা ভারতই অনুভব করবে যে সকলের সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে আছে এই ইস্যুতে। দেখা যাচ্ছে বুরোক্রাসিও এখন এই তর্কে পক্ষ নিচ্ছেন। যদিও এখনও অনেকেই রাষ্ট্রগঠন ব্যাপারটা বুঝেন না বলে ভেবেছেন ভারতের এই দুঃখ বোধহয় বুরোক্রাসির সীমাবদ্ধতা। শ্যাম সরণ একজন অবসরে যাওয়া ক্যাডার কূটনীতিক ও সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তাঁর ভাবনায় এই সংঘাতের পলিটিক্যাল ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাটা দেখতে চান নাই  বা তার চোখেই পরে নাই হয়ত। তাই তিনি এটাকে বুরোক্রাসির রিফর্ম করেই রাজনৈতিক চিন্তা বা রাষ্ট্রগঠন-বিষয়ক রাজনীতিবিদদের চিন্তার ঘাটতির  সমাধান করে ফেলবেন ভেবেছেন। যা একটা ফলস অনুমান।

    এমনিতেই সবখানে জাতিবাদ বিশেষ করে জাতিগত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের তোড়ে ভারত ডুবছে। এর ওপর তাদের আরেক ভ্যানিটি হল, ভারতের ব্যুরোক্র্যাসি নাকি ‘স্টিলের তৈরি’, [Anarchy, dents Sardar Patel’s IAS steel frame’ ] তাই এটা এতই শক্ত। আর এর ক্রেডিট হল নাকি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের যিনি এর প্রণেতা, মন্ত্রী। প্যাটেল, তিনি মহাত্মা গান্ধীর মতই এক গুজরাটি লোক ও বাসিন্দা। তাই মোদী গুজরাটে তার রেকর্ড উঁচু (৫৯৭ ফুট) এক স্ট্যাচু বানিয়ে নিজেই আরো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর সেই প্যাটেল হলেন আবার নেহরুর সব আকাম বা জবরদস্তি ঘটানো যে কোনো কাজের ডানহাত। যেমন ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে করদ রাজাদের ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করার নেতা তিনি ছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে।

    এখন বাস্তবে এই স্টিলের ব্যুরোক্র্যাসির যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা চর্চার দিক থেকে মূলত এক দ্বৈত শাসনব্যবস্থা আর সেটাই ভেঙে পড়তে যাচ্ছে তা বুঝতে পারা বা বিপদ অনুভব করার কেউ আছেন এমন দেখা যাচ্ছে না।

    কাজেই এভাবে চললে মোদীর টার্ম শেষ হতে হতে ২০২৪ সাল নাগাদ নেহরুর ছাপ মারা এই ভারত মানে, এই নেহরুভিয়ান ভারতরাষ্ট্র তার জন্মদুর্বলতায় ক্রমেই আরো কয়েক ধাপ ভাঙনের দিকেই এগিয়ে যাবে। এর সোজা প্রকাশ আমরা দেখতে পাবো পরবর্তীতে কথিত কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে। আমরা হয়ত দেখব, কোনো সর্বভারতীয় দল যেমন কংগ্রেস বা বিজেপি – এরা আর কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারছে না।  আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশনই একমাত্র ভরসা হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনাই বড় হবে।

    এটাই রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস। এমনিতে রাষ্ট্র ভেঙে পড়া মানেই তা খারাপ, তা কিন্তু নয়। কারণ গড়তে গেলে তো আগে তা ভাঙতেই হবে। কিন্তু এটাই বিরাট বিপদের হবে যখন ভাঙার পরে গড়বেন কিভাবে, কী গড়তে চান, এ নিয়ে আপনি একেবারেই অপ্রস্তুত ও পরিকল্পনাহীন! সারা ভারতের দশা আবার এটাই বলে মনে হয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ৫ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “নেহরুভিয়ান এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ বাইডেনের গাজা কারেকশন

    বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ
    বাইডেনের গাজা কারেকশন ও প্রায়োরিটির প্রেক্ষিতে

    গৌতম দাস

    ২৬ মে ২০২১, ২১:৪৮  বুধবার

    https://wp.me/p1sCvy-3yF

    US President Joe Biden speaks with Representative Rashida Taib (D-Mich), and Representative Debbie Dingell (D-Mich)(R), as he arrives at Detroit, Metropolitan Wayne County Airport in Detroit, Michigan on May 18, 2021. (AFP)

    বাংলাদেশ কী ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে? এটা এখন বাংলাদেশে সর্বত্র আলোচনার বিষয়। আলোচনা যেভাবে হচ্ছে, তাকে খারাপ সংবাদই বলতে হয়। আর  বিষয়ের ঠিক এদিকটাই  আমল করতে সরকার মারাত্মক ভুল করছে।

    বাংলাদেশে এই ইস্যুতে প্রথম নিউজ করে ‘শেয়ার বিজ’ এই ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ পত্রিকা। এটি তাদের ক্রেডিট অবশ্যই। কিন্তু একইসাথে ডিসক্রেডিটও। কেন? কারণ এ ইস্যুটায় প্রধান খবর জড়িয়ে আছে মুখ্যত দুটি আলাদা বাক্য। এক, নতুন পাসপোর্টে “এক্সসেপ্ট ইসরাইল” শব্দ দুটা লেখা নাই। আর দ্বিতীয় বাক্যটা হল, নতুন ই-পাসপোর্টে লেখা রয়েছে “দিস ই-পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড”।  মানে যার বাংলা করলে হয় – এই ই-পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ”।
    এখন এনিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা যেটা তারা সাথে ছেপেছে সেখানে আছে, “… তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আমরা পাসপোর্টে এক্সসেপ্ট ইসরাইল শব্দ দুটি তুলে দিচ্ছি”। এভাবে ব্যাখ্যা ছাপাটা বিভ্রান্তিকর কাজ হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য তো হয়ইনি। কারণ এখন ‘এক্সসেপ্ট ইসরাইল’ শব্দ দুটি বাদ দেয়াতে অবশিষ্ট বাক্যটা হয়ে গেছে ‘এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ – অথচ এটা নিয়ে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করে মন্ত্রীকে সচেতন করে দেয়া যে সেক্ষেত্রে – এখন কথা রয়ে গেছে তাহলে এভাবে যে, “এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ” –  মন্ত্রী কী তাই বুঝাতে চেয়েছেন? এই কথাটাতে মন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানা দরকার ছিল। কিন্তু শেয়ার বিজ বা অন্য কোনো মিডিয়ার দিক থেকে এই প্রশ্নটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে করা হয়নি। আসলে সাংবাদিকেরাই যেন চেয়েছে যে মন্ত্রীরা যেমন দাবি করছেন যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দ তুলে নিয়েছেন। ব্যাপারটা তা নয়। কথা ঠিক যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দই তুলে নিয়েছে। কিন্তু তাতে বাকি বাক্যের অর্থ একই থাকে নাই।    একথা বলতেই হচ্ছে যে এতে থেকে যাওয়া বাকি শব্দ যে  – “এই ই-পাসপোর্ট সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ কথাটার সোজা মানে হয়ে গিয়েছে যে বাংলাদেশীদের জন্য ইসরাইল ভ্রমণও বৈধ। অথচ এটাই হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক বক্তব্য।

    আরো টু দা পয়েন্টে বললে এখন মানে হয়েছে, বাংলাদেশের ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত আছে, না নেই – সেটা যাই থাক – আমাদের পাশপোর্টে ইসরাইল ভ্রমণও আমাদের জন্য বৈধ হতে পারে।  এ কথাটাই আমাদের পাসপোর্ট এখন বলছে।

    অতএব,  ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দ দুটা এখন নেই – তাতে আসলে কী হয়েছে, তা বুঝতে হবে। এখন স্পষ্ট করে বলা হয়ে গেছে যে আমাদের পাসপোর্ট ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’- এটাই মুখ্য স্টেটমেন্ট। সব দেশ ভ্রমণ বৈধ হওয়ার অর্থ হল ইসরাইল সফরও বৈধ। তাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন মুখে যতই ব্যাখ্যা দেন না কেন যে – ‘এই পরিবর্তনে ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পরিবর্তনের কিছু নেই’ অথবা ‘আমরা তো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিই না’ – তাতে কিছুই হেরফের হবে না। এর মূল কারণ, মোমেনের এই বাড়তি ব্যাখ্যার ‘আইনি ভিত্তি নেই’ বা এটা সরকারের ‘আইনি অবস্থান’ নয়।  কারণ, ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’– এটাই পাসপোর্টে লেখাগুলো অনুসারে পাশপোর্ট অফিসের আইনগত অবস্থান।

    কেন এমন হলোঃ
    এখন আসি, কেন এমন হল বা সরকার এমন সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেল? সেটা নিয়ে কথা বলার আগে আরেকটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। পাসপোর্টে পরিবর্তনের এই প্রস্তাব সরকারের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তির কাছে যে-ই নিয়ে এসেছেন আর তা যতই লোভনীয় করে লাভালাভ দেখিয়ে তিনি পেশ করে থাকেন না কেন এটা সরকারের জন্য নীতিনির্ধারকদের নেয়া এক আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হয়েছে। বরং সরকারের উচিত ছিল দুনিয়ার কোন কর্নার থেকে এই প্রস্তাব-উদ্যোগটা উঠেছে বা এসেছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে খোঁজ নেয়া, আর সে সম্পর্কে আগে এর পুরা পটভুমিটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়া। সরকার খুব সম্ভবত যথেষ্টভাবে ওই কাজটা না করে ‘এমন দুই শব্দ’ তুলে দিলে সরকারের কী কী লাভালাভ হবে – এর মধ্যেই বুঁদ হয়ে থেকে সিদ্ধান্তটা নিতে গেছে। সব বিপর্যয় ঘটেছে সেখান থেকে।

    বলা হচ্ছে আমাদের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছয় মাস আগে। হা মোটা মুটি ব্যাপারটা তাই। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা সেই আগের পরিস্থিতিটাও এখন আর বজায় নাই। অনেক কিছুই এখন বদলে গেছে। বিশেষ করে সদ্য ১১ দিনের গাজায় ইসরাইলি হামলাকে কেন্দ্র করে।

    ঘটনাটা তাই শেষের দিক থেকে যদি বলি, এটা এক গভীর গোপন পরিকল্পনা যা রচিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে আর তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে বুদ্ধি করে। আসলে এই পুরো বিষয়টাই নেতানিয়াহুর উদ্যোগে করা এক জায়নিস্ট পরিকল্পনা।

    এখানে ইহুদিবাদী বা জায়নিস্ট [Zionist] শব্দের অর্থ যা বুঝতে হবে তা হল ১. জায়নিস্ট রাষ্ট্র মানে এটা কেবল ইহুদিদের জন্য একক ও  বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্র, ২. সেখানে অন্য কেউ যদি নাগরিক থাকেও সে ইহুদিদের সাথে সমান অধিকারের নাগরিক নয়। ৩. এই জায়নিস্ট রাষ্ট্রের কোন ইহুদি সদস্য যদি অন্য নাগরিকের জায়গা-জমি সম্পত্তি দখল করে সেক্ষেত্রে জায়নিস্ট রাষ্ট্র সেটাকে শুধু বৈধ মনেই করবে তাই নয়; উলটা ঐ দখলদারদেরকে সব ধরণের সহায়তা দিবে। ৪. এমনকি জায়নিস্ট রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে ঐ দখলদারদের রক্ষা করবে। আর একাজকে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার বলে চালিয়ে দিতে চাইবে। ৫. যেহেতু তারা হিটলারের নৃশংসতার ভিক্টিম অতএব কেবল তাদের বেলায় এসব কিছু করা জায়েজ আছে।  ভিক্টিমহুড – এই বোধের জন্য এই মনকষ্টের জন্য এখন উলটা তাদের এই হিটলারবাদি আচরণ দুনিয়াকেই সহ্য করে নিতে হবে।  ৬. আর সর্বশেষটা হল, যদি আপনি জায়নিস্ট রাষ্ট্রের এসব কাজ ও ততপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন তাহলে এই রাষ্ট্র উলটা আপনার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলবে যে  আপনি এন্টি-সেমেটিক। আপনি ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন! এর আবার মানে কী আর সেটা কী করে? মানে হল, সেমেটিক=ইহুদি, এই সমীকরণ অনুসারে আপনি ইহুদিদেরকে ইহুদি বলে নিচা দেখিয়েছেন, ঘৃণা করেছেন ছড়িয়েছেন, তুচ্ছ করে দেখিয়েছেন ঠিক যেমন এসব করে জর্মানির হিটলার সেদেশের ইহুদি নাগরিকদেরকে বিভিন্ন নির্যাতন ও পুড়িয়ে মেরে ফেলার আগে করেছিল। তাই তাঁরা এখন জায়নিস্ট (হিটলারের কপি) হবেন বলে আবদার।  সবমিলিয়ে এই হল জায়নিস্ট আচরণ ও তাদের সচেতন মনোবৈকল্য চর্চা।

    আগে যেকথা বলছিলাম নেতানিয়াহু  তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজি করানোর কাজটা করে নিয়েছিলেন ট্রাম্পের জামাই কুজনারের [ Jared Corey Kushner]  তিনিও সেমেটিক=ইহুদি তবে আমেরিকান] মাধ্যমে ট্রাম্পকে কব্জা করে। এদিকে আরবদের দিক থেকে একাজে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন দুই প্রধান হলেন দুবাই ও সৌদির দুই প্রভাবশালী যুবরাজ। আনুষ্ঠানিকভাবে এই অসৎ পরিকল্পনাটার নাম হল ‘আব্রাহাম চুক্তি’ [আব্রাহাম একর্ড বা The Abraham Accords । এটি অবয়ব পায় হোয়াইট হাউজে বসে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু আর সাথে দুবাইয়ের ও বাহারাইনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী- এই চারজনের এক চুক্তি স্বাক্ষরে। এটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।
    অনেকের মনে হতে পারে এসব কী সত্যি নাকি আমার “মনে হয়” টাইপের কিছু? যেহেতু আমি হয়ত ইহুদি দেখতে পারি না সেজন্য? তাই কী? কারণ কঠিন সত্যি অনেক সময় বিশ্বাস হতে চায় না।

    আজকাল আবার অনেকে আছেন যারা নিজেরাই মনে মনে মানেন সে তার তত জানাশুনা নাই কিন্তু আবার সেজন্য কেমনে ফস করে   জিজ্ঞাসা করে যে একথা যে সত্যি এর প্রমাণ কী? এমন সবার জন্য কাজটা সহজ আর স্বাধীন করে দেই। The Abraham Accords 2020 – এই কথা কয়টা এখান থেকে কপি করে গুগলে গিয়ে পেস্ট করে সার্চ দেন। এতটুকুই যথেষ্ট হবে। এবার যা ফল পাবেন তা হল – না হলেও ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ দিনের  শ’খানেকবিভিন্ন দেশের ইংরাজি দৈনিকের এই চুক্তি করা বিষয়ক খবরের লিঙ্ক। আর এরই ভিতর একটা লিঙ্ক পাবেন আমেরিকান সরকারি দলিল।  এর শিরোনাম হবে The Abraham Accords Declaration আর চিনবেন কী করে যে এটা আমেরিকার? দেখবেন লিঙ্কে লেখা আছে  state.gov – এই কথা কয়টা। আর এটাই অরিজিনাল চুক্তির কপিটা। ওখানেই সাথে পিডিএফ কপিও নামিতে নিতে পারবেন।
    আবুধাবি থেকে প্রকাশিত একটা দৈনিক দ্যা ন্যাশনাল, এদের করা ঐদিনের একটা রিপোর্ট হল যে কে কে উপস্থিত ছিল [ Who attended the Abraham Accord signing] । আবার আমেরিকার বোস্টনভিত্তিক দ্যা আটল্যান্টিক[The Atlantic] এর সম্পাদক  পরের দিন ১৬ সেপ্টেম্বর নিজেই এক আর্টিকেল লিখেছিলেন এই চুক্তিতে কার লাভ কার ক্ষতি বিষয়ে শিরোনাম দিয়েছিলেন – Iran and the Palestinians Lose Out in the Abraham Accords.। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, এটা কোন শান্তি চুক্তিওও হয় নাই। কারণ দুবাই বা বাহারাইন কখনই ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ করে নাই। আবার তিনি বলছেন, এর পিছনে সৌদি আরব আছে এর বড় প্রমাণ হল বাহারাইনের উপস্থিতি। বলেছেন সৌদি যুবরাজ, Bin Salman, without whom these Gulf states, Bahrain in particular, would not dare make such a bold and public move,…।

    আসলে এই চুক্তিকে আব্রাহাম চুক্তি বলার উদেশ্য হল মনোথিওজমের জনক আব্রাহামের নামে নিয়ে একটা জাঁকজমক আবহ তৈরি করা।  অথচ এর আসল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদেরকেই কোণঠাসা ও উপেক্ষা করে জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা এক হয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধেই একসাথে কাজ করা। ফলে এটাকেই তারা “আব্রাহাম চুক্তি” বলে চালাতে চেয়েছেন। এছাড়া যদিও এখানে স্বাক্ষরকারিদের মধ্যে আমেরিকা মানে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আছেন কিন্তু তিনি আসলে ঠিক কোন পক্ষ নন;  বড় জোড় মধ্যস্থতাকারি। অথচ সেখানেও জোড়াতালি দেয়া হয়েছে। কারণ আসল সংঘাত জায়নিস্টেরা তৈরি করে রেখেছে তো প্যালেস্টাইনিদের সাথে। অথচ প্যালেস্টাইনিরা এই চুক্তির কোন পক্ষই নয়।

    তবে ছয় মাস আগের পরিস্থিতি এখন নেইঃ
    ২০২০ সালের আমেরিকান নির্বাচনের দুমাস আগে করা ঐ চুক্তি এখন ট্রাম্প পেরিয়ে বাইডেনের আমলে পৌঁছেছে। কিন্তু বাইডেন এত দিন এই চুক্তিতে যে যালেস্টাইনিদের উপর চাপ সৃষ্টি ও বঞ্চিত করা হয়ে আছে সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফেলে রেখেছিলেন। এর বাস্তব অর্থ হয়েছিল যে বাইডেনও যেন ট্রাম্পের অনুসারি।

    কিন্তু এবারের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বাইডেনের চোখ খুলেছে; তিনি  ইতোমধ্যেই তাঁর কাজের প্রায়োরিটি বদল নিয়েছেন। এখন তিনি ওই চুক্তির কারণে যেসব ক্ষতি হয়ে গেছে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে ওইসবের ক্ষত সারাতে উঠে পড়ে লেগেছেন। সে কাজেরই এক প্রধান অংশ ছিল এবারের গাজায় ইসরাইলি হামলায় ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করা। তাছাড়া আমেরিকার আগের প্রতিশ্রুত যেসব ত্রাণ ও পুনর্বাসনের তহবিল আমেরিকা গাজায় দিত, যার পুরোটাই ট্রাম্প বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেসব আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন বাইডেন। আর মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কগুলো যা ট্রাম্পের কথিত আব্রাহাম চুক্তির কারণে এলোমেলো হয়ে গেছিল – সেগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার জন্য সেক্রেটারি অব স্টেট বিল্কেনের এক লম্বা সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

    আর বাইডেনের এই নতুন অবস্থানে আসা বা আমেরিকাকে হুঁশে ফিরিয়ে আনার কাজটি মূলত কারা করলেন? এনিয়ে বিবিসি বাংলাতে এক বিশেষ করা হয়েছে যার শিরোনাম, “ইসরায়েল ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমেরিকায় ডেমোক্র্যাট শিবিরে গভীর পরিবর্তন“। তাতে বলা হচ্ছে, এরা হলেন ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে নতুন যারা তুলনামূলক তাদের ভাষায় ‘প্রগ্রেসিভ’ (আমেরিকান অর্থে প্রগ্রেসিভ যারা রক্ষণশীলের উল্টা, আমাদের মতো দেশের অর্থে প্রগেসিভ মানে কমিউনিস্ট তারা নন)। বিবিসির উপরে উল্লেখিত এই রিপোর্টের ভাষায়,……

    “কিন্তু কংগ্রেসের ভেতর দিনকে দিন বৈচিত্র্য আসছে, আর সেই সাথে ইসরায়েলের প্রশ্নে আমেরিকার প্রচলিত নীতি চাপের মধ্যে পড়েছে।
    জরিপ সংস্থা পিউ ফাউন্ডেশন স্টাডি বলছে ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেটে নির্বাচিত সদস্যদের ২৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক, এশীয় এবং আদি আমেরিকান বংশোদ্ভূত । এটি একটি রেকর্ড। বিশ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ১৯৪৫ সালে ছিল মাত্র ১ শতাংশ”।

    এরা আসলে বাকি ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বেশি প্রো-অ্যাকটিভ। আর এদের প্রতিনিধি বলতে তিন নারীর কথা বেশি সামনে এসেছে।  বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর ভাষায়, “এরাই সেই প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রাটস যারা বাইডেনকে গত প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জিততে শুধু সাহায্য করেছিল তাই না, বাইডেন নমিনেশনও পেয়েছিলেন এদের শক্ত  সমর্থনের জন্য …progressive Democrats, a group that helped Biden win the Democratic nomination and the presidency……]।

    বিবিসি লিখেছে, কংগ্রেসে তরুণ, প্রগতিশীল কয়েকজন সদস্যের একটি জোট – যেটি স্কোয়াড নামে পরিচিতি পেয়েছে -, তার মধ্যে রয়েছেন মিশিগান থেকে নির্বাচিত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব এবং মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর।]

    এদের একজনের সাথে বাইডেন-কমলা বিমানে উঠার আগে টারম্যাকে আন্তরিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলাপ করছেন, এমন একটা ছবি অনেক জায়গায় ঘুরছে।

    মূল কথাটা হল, এনিয়ে রয়টার্সের একমাত্র এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২১ মে। সেখানে বহু প্রসঙ্গে ডিটেইলড বর্ণনা আছে। যার শিরোনাম হলো, গাজা কনফ্লিক্ট ফোর্সেস রিঅর্ডারিং অব বাইডেন’স পলিসি প্রায়োরিটিস প্রশ্নে ব্যাখ্যা [Analysis: Gaza conflict forces reordering of Biden’s policy priorities]। এককথায় বললে, বাইডেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর শয়তানি পরিকল্পনার ‘আব্রাহাম একর্ড’ ভেঙে আমেরিকাকে বের করে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন।

    কিন্তু এর সাথে আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুর কী সম্পর্ক?
    হ্যাঁ, সেটাই সবচেয়ে মজার। আব্রাহাম একর্ড ২০২০ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরের পরে ঐ সময় এর বাস্তবায়নের দায় পড়ে মূলত দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) উপর। এই চুক্তিতে দৃশ্যত সৌদি আরব নেই। কিন্তু পশ্চাদ-পটভূমিতে সর্বত্র আছে। এনিয়ে আটল্যান্টিকের আরেক রিপোর্ট Why the UAE Made Peace With Israel দেখা যেতে পারে। এছাড়া ঐ চুক্তিস্বক্ষরের সময় আরও পাইপলাইনে ছিল (আছে বলতে পারছি না) আরো দুই দেশ ওমান, সুদান ইত্যাদি।

    আব্রাহাম একর্ড করার মূল লক্ষ্য কী ছিলঃ
    কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রশ্ন হলো, এই আব্রাহাম একর্ড কেন তারা করেছিলেন? কেন পক্ষগুলো এর দরকার অনুভব করেছিল? সেটাই মূল ঘটনার আরেকটা দিক। ওই মূল ঘটনা হলো, ইরান; মানে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি বাস্তবে হাজির হওয়া। আর এর বিরুদ্ধেই জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা মিলে এক হয়ে কাজ করা জোট পাকানো আর একারণেই রিপাবলিকান ট্রাম্প তাতে মদদ নিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য,  ইরানের এই নব উত্থানে ইসরাইল ভীত। আবার জিসিসির বাদশাহ-দেশগুলো মধ্যে সম্ভবত কাতার ছাড়া সব বাদশাহ-রাষ্ট্র ও বিশেষ করে দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) – তারাও ভীত। এখানে ইসরাইলের ভয় হল যে এই (চীনের বলে বলিয়ান) ইরান এখন আরো বড় ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়াবে। হামাস-হিজবুল্লাহ এর সাহায্যে। এছাড়া আমেরিকার সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান আর ফিরে কোন চুক্তিতে বাধা পড়তেও সম্ভবত চাইবে না। এগুলোই ইসরাইলের মাথা খারাপ করে দেয়া তাদের মূল শঙ্কা।

    ওদিকে ইরানের প্রভাব যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে আর তাতে সে মধ্যপ্রাচ্যে কোন বাদশাগিরিই আর রাখবে না – এই অবস্থান নিতে পারে এই হল  জিসিসির [GCC] বাদশা-আমীরদের মূল শঙ্কা। আর চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে গেলে, তাতে আমেরিকান প্রভাবের পতন ঘটবে, আর তাতে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সৌদিদের মুখ্য ভূমিকাটা নিয়ে বসবে ইরান। এটাও তাদের শঙ্কা। একারণে, নেতানিয়াহু জামাই কুজনারের মাধ্যমে শ্বশুর ট্রাম্প (ও তার দল রিপাবলিকানদের) কব্জা করে আমেরিকান মধ্যস্থতায় এই আব্রাহাম একর্ড করে নিয়েছিলেন তারা সকলে মিলে যেন এই চুক্তি একটা তাদের জন্য প্রতিরক্ষা। তা আসলে ইরান-চীনবিরোধী এবং ইরানি উত্থানে ভীত আরব বাদশাহ আর ইসরাইলিদের কমন এনিমি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের জোট। অতএব এই যুবরাজদের চোখে ভরসা হয়ে দেখা দিয়েছিল  ইসরাইল। তাদের ভীত মনের অনুমানে, ইসরাইলই একমাত্র তাদেরকে ইরানের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। এই মনোভাবটা টের পেয়েই নেতানেয়াহু “আব্রাহাম একর্ড” পরিকল্পনা নিয়ে আগানো শুরু করেছিল।

    একারণে আবার আব্রাহাম অ্যাকর্ডের বাস্তবায়ন মানে ইসরাইল দাবি করেছিল  যে তাহলে  যুবরাজ-দ্বয়ের কাজ হল, তারা মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্রগুলো থেকে ইসরাইলকে স্বীকৃতি এনে দিক। আর ওই কাজে যুবরাজের অন্য অনেকের মত পাকিস্তানের (এবং বাংলাদেশও) ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইমরান যেকোনো মূল্যে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে বসে। আর তাতে দুবাই পাল্টা ব্যবস্থায় সমস্ত পাকিস্তানি (মূলত মাইগ্রেন্ট লেবারদেরকে) দুবাই থেকে বের করে দেয় বা প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু করোনা আমল বলেও অনেকে ধরে নেয়, এটা বোধহয় করোনা-পদক্ষেপের কারণে হচ্ছে। যেমন এই রিপোর্টে কারণ কী তা ব্যাখ্যা দেয়া বা উল্লেখ করা হয় নাই। এই প্রসঙ্গে সৌদি আচরণের রিপোর্ট এখানে ।  আর এনিয়ে ভারতের খুশি লক্ষ্য করেন এখানে।মজার কথা হল, বাংলাদেশের নাম ওই সময় দুবাইয়ের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় উঠেনি। এখান থেকেই অনুমান যে আমরা স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধকে পালটে নিয়ে আপাতত – এভাবে পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ পর্যন্ত শব্দগুলো উঠিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য, এটা ভাল সিদ্ধান্ত হয়নি যা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

    তবে এই প্রসঙ্গে এখন সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে পাসপোর্ট ইস্যুতে সব সিদ্ধান্ত স্থগিত করে পুর্বাবস্থায় ফিরে রেখে দেয়া আর পুরো ইস্যুটা যেসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা এক কমিটি করে রিভিউ করতে বসানো। মনে রাখতে হবে এখনকার বাইডেন, তিনিই যেখানে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর অবস্থানে থাকতে চাইছেন না। নিজের প্রায়োরিটি বদলে ফেলার পথে রওনা দিয়েছেন তাহলে অন্ততপক্ষে এই সুযোগে আমরাও আমাদের ভুল সংশোধন করে নিতে পারি।

    এছাড়া আরো দিক আছে। ইতোমধ্যে দুবাইয়ের সাথে চীনের সম্পর্ক কিছু উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। আর এর প্রকাশ হল দুবাই করোনা টিকা ইস্যুতে পুরোপুরি চীনা টিকা-নির্ভর। সম্ভবত এটাতে তাদের কথা বলার পথ খুলেছে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নীতির পক্ষে আমাদের দাড়াতে হবে তা হল, ইরানের পিছনে চীনের সমর্থন আছে বলে এই নতুন ইরান সে আর যাই করুক মধ্যপ্রাচ্যে বাদশাদের রাষ্ট্র-এর ওপর হস্তক্ষেপ করবে, বা-হাত ঢুকাবে, সরকার বদলাবে কী রাষ্ট্রপদ্ধতি বদলে দিবে – এটা একেবারেই কাম্য নয় ও অগ্রহণযোগ্য। এটা হতে পারে না। দুবাই বা সৌদি আরবে আভ্যন্তরীণভাবে সরকারে কে বসবে রা সরকার পদ্ধতি কী হবে তা একমাত্র তার অভ্যন্তরীণ জনগণই নির্ধারণ করবে – এই নীতির বাইরে আমরা কেউ যেতে পারি না। আমরা ওয়ার অন টেররের জুনিয়র বুশ হয়ে যেতে পারি না।

    কাজেই দুবাইয়ের সাথে চীনের কত দূর কী আলাপ হয়েছে আমরা জানি না। তবে দুবাই অন্তত এখন অনেক আশ্বস্ত তাই আমরা লক্ষ্য করছি। কারণ অন্তত  ইসরাইলকে ত্রাতা জ্ঞান করার আগের  দুবাই অনেকটাই এখন শীতল বলে মনে হয়।

    তবে চীনকেও অবশ্যই নীতিগত অবস্থানে শক্ত হতে হবে, আর চীন-ইরান চুক্তি হয়েছে বলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আরেক বিশৃঙ্খলা কাম্য নয়। তা চীনেরও পক্ষে যাবে না। একমাত্র নীতিগত অবস্থান ধরে দাঁড়ানোই চীন দায়িত্ববান গ্লোবাল নেতার ভূমিকায় স্বাগত লাভ করতে পারে।

    সারকথায় আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুতে আরো বড় ক্ষতি হয়ে যাবার আগেই অবিলম্বে সিদ্ধান্ত স্থগিত ও রিভিউয়ের অবস্থানে চলে যাওয়াই কাম্য। এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সারা জীবন আমরা ফিলিস্তিনের পক্ষে থেকে এখন তাদের হাত ন্যূনতম শিথিল করার কোনো অর্থ নেই, এটা হতেই পারে না! আশা করি, আমাদের সরকার  বদলাবার সুযোগটা নিবেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৫ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে    “বাংলাদেশের পাসপোর্ট : প্রেক্ষাপট বাইডেনের প্রায়োরিটি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন

    ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন

    গৌতম দাস

     ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3lO

    ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন – ফাইল ছবি

    ট্রাম্পের চোখে তার বিরোধী কে বা কারা?  কার বিরোধিতা করতে তিনি মাঠে নেমেছিলেন? চীন না বাইডেনের?  ট্রাম্প আমেরিকান সংসদে হামলা-ভাঙচুর, ভেঙে তছনছ করেছেন, কিন্তু কার বিপক্ষে যাবেন বলে? মূলত এনিয়ে তিনিই বিভ্রান্ত! তাই তিনি নিজে এক সিটিং প্রেসিডেন্ট হয়েও সংসদে হামলা করিয়েছেন! আর এতেই আমেরিকান রাষ্ট্রের সক্ষমতা যতটুকু যা ছিল তা নষ্ট করে দেশটিকে আরো কয়েক ধাপ দুস্থ অবস্থায় নিয়ে ফেলে গ্যালেন! পিউ রিসার্চের ফাইন্ডিংস মতে ট্রাম্পের পাবলিক রেটিং এখন ২৯ শতাংশে নেমে গেছে [Donald Trump is leaving the White House with the lowest job approval of his presidency (29%) ]।  এদিকে আমেরিকার এখনকার মারাত্মক অর্থনৈতিক সমস্যা হল মুখ্যত কোভিড ভাইরাস মোকাবেলায় ট্রাম্পের চরম অক্ষমতা-জাত। এক দিকে চার লাখের মত মানুষের ভাইরাসে মৃত্যু, সাথে বেকারত্ব, অর্থনীতিতে ধস প্রভৃতি। যে দিকটা ভেবেই সম্ভবত বাইডেন শপথ নেয়ার আগেই প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘অর্থনীতি রিকভারি পরিকল্পনা” [Biden Seeks $1.9 Trillion for Relief in First Economic Plan] সিনেটে অনুমোদনের জন্য পেশ করতে রেডি করেছেন। সিনেটে বাই-পার্টিজান হয়ে তাই দুই দল একসাথে কেবল ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টে নিয়ে মেতে থাকা নয়, বাইডেনের নতুন ক্যাবিনেট অনুমোদন বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অনুমোদনের মত জরুরি কাজগুলো সম্পন্ন করতেও নিজেদের মধ্যে সময় ভাগাভাগি করে কাজ করার আলাপ-আলোচনা করছেন [Senate to split time ...।]।  এখন অন্তত আগামী এক বছরের মধ্যে এসবের ফলাফল যদি ইতিবাচক হয়ে ফলতে থাকে, তবে মধ্যবিত্ত, স্বল্প আয় ও পেশার মানুষের ট্রাম্প সম্পর্কে তাদের ইতি-মূল্যায়ন থাকলে তাতে বদল আসবে। আর এতে তাদের নিজ হতাশ জীবন পেছনে ফেলে সামনে আগাতে তারা ইতিবাচক দিশা পেতেও পারে!

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার আয়ু আর মাত্র দুই দিন। কিন্তু ক্ষমতার টার্ম শেষ হওয়ার শেষ দুই সপ্তাহ যেন কঠিন থেকে কঠিনতর অসহায়ত্বের দিন হয়ে ট্রাম্পের কেটেছে। প্রতিদিনই নতুন আরেকটা খারাপ কিছু ঘটে চলেছে। এভাবে গত ১৩ জানুয়ারি আমেরিকান সংসদে (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে) তিনি ইমপিচড হয়েছেন [Trump Impeached for Inciting violent Insurrection]। নিজ দলের ১০ জন সদস্যও তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ আইনত তিনি এখন দাগী বা ইমপিচড। আর তার বিরুদ্ধে ‘ইনসাইটিং ভায়োলেন্ট ইনসারেকশন’ [inciting violent insurrection] বলে এবারের ইমপিচমেন্টে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলা হয়েছিল। যার বাংলা হল – প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ‘সহিংস বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা করতে উসকানি’ দিয়েছেন। যদিও এটা আংশিক, মানে ইমপিচমেন্টের পুরো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি এখনো। কারণ আমেরিকান সংসদ আমাদের মত একটা না দুইটা, মানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। অর্থাৎ আমেরিকার আরেক সংসদ আছে যেটাকে ওরা সিনেট বলে। প্রতি রাজ্য থেকে দু’জন নির্বাচিত সিনেটর নিয়ে এই সিনেট গঠিত। তবে আমেরিকান কনস্টিটিউশন অনুসারে, সংসদ সদস্য বা আইনপ্রণেতাদের দুটো কক্ষ (সিনেট ও হাউজ) থেকেই একই বিল অনুমোদন পেলে তবেই এরপর সেটি ‘পালনীয় পূর্ণ আইন’ বলে বিবেচিত হয়। তাই এখন সিনেট থেকেও ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাস হওয়ার অপেক্ষায়; প্রস্তুতি চলছে।

    ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগে কি সিনেটেও ইমপিচমেন্ট শেষ হবে?
    এর একেবারেই সংক্ষিপ্ত জবাব, মনে হয় না। পরিস্থিতি সম্পর্কে এক্সপার্ট এক্সপ্লেনারের ব্যাখ্যা হল, এটা সম্ভব নয়। এক কথায় বললে ট্রাম্প ২০ জানুয়ারি তার টার্ম শেষে হোয়াইট হাউজ ছেড়ে যাওয়ার পরেই কেবল সিনেটে ওই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব উঠবে। এটাই এক্সপার্ট অপিনিয়ন। এর মানে, তাহলে ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট না থাকলেও সিনেটে তাঁকেই ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব কী জীবিত থাকছে? হ্যাঁ, ঠিক তাই, থাকছে। আর এর একটা কারণ হল, সংসদ বা হাউজে উঠা প্রস্তাব ও তা পাস হওয়ার পর তা সিনেটেও পেশ ও পরিণতিতে ভোটাভুটিতে যাই হোক তা সম্পন্ন হতেই হবে। কারণ প্রস্তাব একবার উঠেছে যখন, এর প্রক্রিয়া শেষ হতে হবে। আর দ্বিতীয় কারণ হল, যদি সিনেটেও ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবটা পাস হয়ে যায় তখন এরপরেও আরেক বাধ্যতামূলক কাজ বাকি থাকবে। সেটা হল, সিনেটের প্রস্তাব পাস হওয়া মানে তখন সেটা গৃহীত হয়ে যাওয়া এক আইন। যার সোজা অর্থ, ট্রাম্প দোষী ও অযোগ্য বলে প্রমাণিত। তাই এর সাথে তখন যে প্রশ্নটা উঠবেই যে, তা হলে ট্রাম্প কী এরপরও পাবলিক অফিসে কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য থাকবে? এ বিষয়টির মীমাংসা করতে হবে। কারণ সেটা মীমাংসা করতে আবার কেবল সিনেটেই আরেকটা প্রস্তাব তুলতে হবে। সেটা হলো, ইমপিচড হয়ে যাওয়া ট্রাম্প এরপরে পাবলিক অফিসে কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য কি না – এ প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি করা।
    তবে এখানে আমাদের একটা জিনিস পরিষ্কার রাখা দরকার। ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব হাউজে যখন প্রথম তোলা হয়েছিল, সেখানে তা পাস হওয়ার নিয়ম ছিল, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলেই পাস মনে করা যায় সেখানে। মানে ঐদিন উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ‘সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের’ (৫০%+) পক্ষভোট পেলেই যথেষ্ট। আর তাতে ট্রাম্প হাউজে ইমপিচড হয়েছিলেন ২৩২/১৯৭ ভোটে। কিন্তু এরপর ওই প্রস্তাব সিনেটেও পাস করতে গেলে সেখানে এবার তা হতে হবে দু-তৃতীয়াংশ (৬৭%) ভোটে। কিন্তু আবার এরপরে সিনেটেই অভিযুক্ত ট্রাম্প জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য থাকবেন কি না এ প্রস্তাব ভোটে উঠলে তখন এবার সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় হলেই তা পাস হয়ে যাবে। এভাবেই ইমপিচমেন্টের পুরো প্রক্রিয়াটা কনস্টিটিউশন অনুসারে সম্পন্ন হবে বলে মনে করা হয়।

    এদিকে যদিও নিয়ম অনুসারে হাউজে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব (একে আর্টিক্যাল বলা হয়ে থাকে) পাস হওয়ার পরে এরপর সিনেটে তা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটা কনস্টিটিউশন দিয়েছে হাউজ স্পিকারকে (এখানে ডেমোক্র্যাট স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিকে)। কথা আরো আছে, তিনি কবে তা সিনেটে পাঠাবেন এর বিবেচনার ভার কনস্টিটিউশন স্পিকারের নিজের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্পিকারের আরেকটা বড় কাজ আছে।  ঐ প্রস্তাব হাউজে কী প্রেক্ষিতে পাস হয়েছে, তা সিনেটে গিয়ে সেটা নিয়ে ব্রিফ ও ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য আগেই স্পিকার ৯ জন ম্যানেজার বা এজেন্ট সিলেক্ট করে সিনেটে নাম পাঠিয়ে দিবেন বা দেয়ার কথা। ইমপিচ-প্রস্তাব আলোচনার সময় সিনেট এদের থেকে তা শুনে নিবে। সেই ম্যানেজার নিয়োগের কাজও পেলোসি শেষ করেছেন এরই মধ্যে।

    আবার ইতোমধ্যে সিনেটেরও কিছু ডেভেলপমেন্ট বা নতুন ঘটনা আছে। চলতি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আছে রিপাবলিকানরা আর এর নেতা হলেন ম্যাক-কনেল [Mitchell McConnell Jr.]। কিন্তু ২০ জানুয়ারি থেকে নতুন নির্বাচিত সিনেটে, সেখানে ভোটের স্টাটাস হয়ে যাবে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট সমান সমান ৫০, এরকম। তবে আমেরিকান কনস্টিটিউশনে এরও সমাধান দেয়া আছে। রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট যিনি থাকেন তিনিই পদাধিকারবলে সবসময় সিনেটের প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হলেও তিনি ঐ সিনেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে আসেন কেবল কোন বিশেষ অনুষ্ঠান হলে অথবা সিনেট অধিবেশনে পক্ষে-বিপক্ষে সমসংখ্যক ভোট পড়েছে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে। কারণ কেবল তখনই তিনি সিনেটের ভোটাভুটিতে কোন একটা পক্ষে নিজের ভোটটা প্রদান করে প্রস্তাবে সিদ্ধান্তমূলক ফলাফল এনে দেন। অর্থাৎ এটা বলা যায় যে এবার সিনেটে ডেমোক্রাটদের পক্ষে।  নইলে সাধারণ সময়ে, সিনেট পরিচালনা করে থাকেন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা যিনি থাকেন তিনিই পদাধিকারবলে  এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

    এসবের সোজা মানে এখন সিনেটেও ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পাস হতে গেলে ৬৭টা ভোট লাগবে, অর্থাৎ ন্যূনতম ১৬টি রিপাবলিকান ভোট লাগবে। আর সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসেরও ভোটটা, এমন হতেই হবে। কিন্তু কমলা হ্যারিস শপথ নেবেন বাইডেনের সাথেই আগামি ২০ জানুয়ারি। আর এদিকে চলতি সিনেট যা ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে টার্ম শেষ করবে এতে ডেমোক্র্যাটরা ৫৭/৪৭-এ মাইনোরিটিতে আছে।

    এসব বিবেচনায় আমেরিকান মিডিয়ার দুটো (এপি আর নিউ ইয়র্ক টাইমস) এক্সপ্লেনার রিপোর্ট বলছে, আগামী ১৯ জানুয়ারির আগে পেলোসির ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব সিনেটে পাঠানোর সম্ভাবনা নাই। কারণ তখনই একমাত্র ডেমোক্র্যাটরা সিনেটেও শক্তিশালী হবে। এছাড়া বর্তমান মেজরিটি লিডার রিপাবলিকান ম্যাক-কনেল জানিয়েছেন, ১৯ জানুয়ারির আগে সিনেট বসার কোন শিডিউল এখনো পর্যন্ত নাই। আর ইমপিচমেন্ট প্রসঙ্গে তার অবস্থানটা হল, তিনি ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের পক্ষেই ভোট দিতেন হয়ত কিন্তু তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রস্তাব আনতে চান না। আবার ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত তার সদস্য থাকার শেষ দিন। এথেকে বুঝা যায় যে, এবিষয়ে  এক্সপ্লেনারদের  ব্যাখ্যা কেন ব্লছে যে ২০ তারিখের আগে কিছু হবে না!
    সাথে আরেকটা খবর দিচ্ছে রয়টার্স যে, ক্ষুব্ধ ক্ষ্যাপাটে ট্রাম্পকে সামলাতে তার স্টাফরা পেরেশান দশায়। আর ২০ জানুয়ারি শপথের দিনেই সকালে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ও ওয়াশিংটন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সম্ভবত ফ্লোরিডায়, থাকবেন সেখানেই।

    এবার আসা যাক ট্রাম্প আমেরিকাকে কোথায় নিয়ে এনে ফেললেন তাহলে? এর পরিণতি কী হবে?
    প্রথম কথা, এখনো যে দিকে বেশির ভাগ মিডিয়া বা আলোচক ফোকাস করতে চাইছে না; তা হল ট্রাম্পের সমর্থক কারা, আমেরিকান সমাজের কোন অংশ? এবং কেন? নিশ্চয় আমরা মনে করব না যে ট্রাম্পের সমর্থকরা সব ট্রাম্পের মতোই পাগলাটে অথবা যাদের আচরণের দিশা বুঝা বা কার্যকারণ বের করা সহজ না। রাজনৈতিকভাবে দেখলে ট্রাম্পের সমর্থকরা মূলত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা। বিভিন্ন নামে এদের সংগঠন আছে, ডেরা আছে। এদের সাথে ট্রাম্পের প্রমোটার যারা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ২০১৬ সালে পেশ করেছেন, এমন লোকদের বুঝাপড়া আছে যে, ট্রাম্প সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিদের দাবি ও তাদের চিন্তাগুলো পপুলার করতে সহায়তা করবেন। এছাড়া আবার ট্রাম্পের ভোটার-সাপোর্টার যারা তাদের বড় অংশ হল মূলত স্বল্প আয়ের বা ছোট এন্টারপ্রাইজ, ছোট উদ্যোক্তা অথবা গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের ধাক্কায় চাকরি হারানো নানা ধরনের মানুষের বিরাট অংশ।

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দুনিয়া এখন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এক পালাবদলের জাংশন পয়েন্টে। চীনা উত্থানের এই পর্বে সব দেশের তো বটেই, এমনকি পুরনো গ্লোবাল নেতা আমেরিকার অর্থনীতিতেও এর বড় ছাপ পড়বেই। আগের নেতা হিসেবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ যেসব পেশা বা প্রডাক্টকে সে সহজেই জন্ম ও প্রটেক্ট করতে পারত, সেই ক্ষমতা আমেরিকার কমে যাচ্ছে, কমে নিঃশেষ হওয়ার পথে যাচ্ছে। তবে এসব পেশা উদ্যোক্তাদের জীবনের আর কোনই সম্ভাবনা নেই, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং ব্যাপারটা একটা ঢেলে সাজানো ধরনের কিছু; যা  পুরনোদের একেবারেই বাদ দেয়া নয়। বরং নতুন কিছু করা, কিছুর বেলায় নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার সুযোগ বের করা, কিছুতে  নিজের প্রতিযোগী অবস্থান ধরে রাখতে  নিজে লাভ ছাটাই করে প্রতিযোগিতায় নেমে যাওয়া ইত্যাদি এসব করে পেশা উদ্যোক্তাদের অনেকটাই বাঁচানো সম্ভব। আর সর্বোপরি চীনের সাথে একটা বড় বারগেন করা। যত বেশি পারা যায় (কৃষি বা শিল্পপণ্যের) বাজার ছাড় চীনের থেকে নিয়ে আসা, তেমন রাজনৈতিক নেগোসিয়েশন করার সুযোগ এখনো যা আছে তা ব্যবহার করা। এক কথায় চীনকে গ্লোবাল নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে নিজের পক্ষে বাজার ছাড় যতটা সম্ভব ফিরিয়ে হাতে আনা, ধরে রাখার জন্য দরকষাকষি করা – এই মূলনীতিতে চলা। বাইডেন সম্ভবত সে দিকেই যাচ্ছেন।  কিন্তু এমন অনুমানের ভিত্তি কী? কারণ হংকংভিত্তিক এশিয়ান টাইমসে এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে কুর্ট ক্যাম্পবেল [Kurt Campbell] এই নামের ওবামা আমলের এক সহকারি-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর [assistant secretary of state for East Asian and Pacific affairs] কথা বলা হয়েছে। যদিও তিনি ভুমিকা রাখবেন বাইডেন প্রশাসনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অফিসে, পররাষ্ট্র দফতরে নয়। আর সেটা বাইডেন যাকে  ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার বলে পছন্দ করেছেন সেই জ্যাক সুলেভান [Jake Sullivan] হলেন ক্যাম্পবেলের পলিসি পেপার লেখার সহ-লেখক। তাঁদের যৌথভাবে লেখা ও ফরেন এফেয়ার্সে প্রকাশিত তাঁদের সে লেখার শিরোনাম “Competition Without Catastrophe: How America Can Both Challenge and Coexist With China,” । অনুমান করা হচ্ছে এটাই হবে বাইডেনের চীন-নীতির প্রধান অভিমুখ। লেখার শিরোনামটা বাংলায় বললে তা হবে, কোন বিপর্যয় না ঘটিয়ে প্রতিযোগিতা করাঃ কি করে আমেরিকা চীনকে চ্যালেঞ্জও করবে আবার চীনের সাথে একসাথে টিকে থাকার নীতিতে চলতে পারে”।  এই কথাটাকেই উপরে বলেছিলাম, – “চীনকে গ্লোবাল নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে চীনের থেকে আপোষে নিজের পক্ষে বাজার ছাড় যতটা সম্ভব ফিরিয়ে হাতে আনা, ধরে রাখার জন্য দরকষাকষি করা – এই মূলনীতিতে চলা”।

    যদিও গত চার বছর ট্রাম্প এর উল্টো পথে চলেছেন। ট্রাম্প ও তার প্রমোটার ও অদৃশ্য উপদেষ্টারা ভেবেছেন, এগুলো হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের মত সংগঠন বা তাঁদের চিন্তা দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। আর কথিত আমেরিকান “জাতিকে” চীনের বিরুদ্ধে সংগঠিত করতে পারলেই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এছাড়া যদিও একথা সত্য যে, আমেরিকা এখনো সামরিকভাবে চীনের থেকে ৬-৮ গুণ বড় বা শ্রেষ্ঠ। কাজেই এদের অনুমান, এই কারণে আমেরিকা কেন চীনের কাছে হেরে যাবে বা হার স্বীকার করবে! কিন্তু এদের এমনই চিন্তার ত্রুটির দিকটা হল এরা মনে করে, চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে পাল্টা যেন আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব!

    গত ৮ জানুয়ারি রয়টার্স একটা ইন-ডেপথ নিউজ করেছে; যার শিরোনাম হল – ‘ট্রাম্পের ফ্যানরা সহিংসতার নিন্দা করে কিন্তু তাই বলে ট্রাম্প এজন্য দায়ী তা আবার মনে করে না [Trump’s fans condemn violence, but they aren’t about to blame him]।’ গত ৬ জানুয়ারি আমেরিকান সংসদে হামলার পর রয়টার্স দেখানোর চেষ্টা করেছে যে ট্রাম্পের ভোটার সমর্থক কারা? কেমন পেশার লোকজন আর সংসদে হামলা নিয়ে তাদের ক্ষোভ বা বক্তব্য কী? দেখিয়েছে, এরা ছোট শপে, রেস্টুরেন্টে বা সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি করে। তাদের দাবির সারকথা হিসেবে রয়টার্স বলছে, তারা কেউই এখনোও ট্রাম্পকে ত্যাগ করতে চায় না। বরং তাঁদের ধারণা ট্রাম্প হল তাদের আর্থিক অবস্থা-পরিস্থিতির পক্ষের প্রবক্তা, তুলে ধরার লোক। কিন্তু তাই বলে তারা সংসদে ভায়োলেন্স বা সহিংসতার দায় নিতে চায় না। ট্রাম্পের উপরেও দিতে চায় না। কারণ এতে আইন ভাঙ্গার দায় আছে। যা তাঁদের শ্রেণীর লোকেরা অবশ্যই জড়িত নয়। মূলত কর্মজীবি তারা ঐদিন সংসদে হামলা করতে  সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সাথে সঙ্গী হয় নাই।

    যদিও বলছি, গত চার বছর ট্রাম্প চলেছেন উল্টো বা ভুলনীতি নিয়ে। নিজের ক্ষ্যাপাটে নীতিতে। একটা উদাহরণ এখানে টানলে বাস্তবতাটা আরও স্পষ্ট বুঝা যাবে। যেমন ট্রাম্প এতদিন সাধারণভাবে আমেরিকায় উপস্থিত চীনা কোম্পানির উপর বা বিরুদ্ধে  খড়গহস্ত হওয়ার নীতিতে চলেছিলেন। চীনা কোম্পানিমাত্রই, বিশেষ করে টেলিফোন কিংবা ইলেকট্রনিকস সম্পর্কিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আমেরিকা থেকে তথ্য পাচার করছে অথবা এরা চীনা সামরিক বাহিনীর সাথে জড়িত ভাড়াটে অথবা বাহিনীর হয়ে তথ্য পাচার করছে, – ইত্যাদি এগুলাই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কমন অভিযোগ বা উছিলা। কিন্তু কোনোটার বেলাতেই তিনি কোনো প্রমাণ সাথে হাজির করেননি। নেহায়তই কখনো কোনো চীনা লোকের বিরুদ্ধে আদালতে যা ক্ষুদ্র বা পেটি মামলা দেয়া হয়েছে প্রপাগান্ডার সুবিধার জন্য, তাও বেশির ভাগই আদালতেও টিকাতে পারেননি। কিন্তু জাতিবাদী বা বিদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা যা ট্রাম্পের এক বিশেষ অস্ত্র যা সাদা সুপ্রিমিস্টদের জন্য খোরাক ও ভুয়া সুসংবাদ – এসব ঠিকই এই পেটি অভিযোগগুলো ব্যবহার করে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেয়া হয়েছে। যেমন টিকটক সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়েও একইভাবে তিলকে তাল বানানো হয়েছে; অতথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। আবার যতই আমেরিকা গত নভেম্বরের নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছিল, সেখানে ভোট পেতে পাবলিককে প্রভাবিত করতে ততই তিনি এসব প্রপাগান্ডা চরমে তুলছিলেন। এতে শেষের দিকে তিনি আরেক নতুন নীতি হাজির করলেন। যেমন – চীনা টেক জায়েন্ট কোম্পানি – টাইটানস [Titans], আলিবাবা [Alibaba], টেনসেন্ট [Tencent], বাইদু [Baidu] ছাড়াও আরো ৯ বড় জায়ান্ট চীনা কোম্পানির নামের একটা লিস্টর বানিয়ে ট্রাম্প এবার দাবি করলেন, এগুলো চীনা সেনাবাহিনীর সাথে জড়িত কোম্পানি। এরপর সরকারি নির্দেশ জারি করলেন যে, এসব কোম্পানির সাথে আমেরিকানরা বিনিয়োগ-ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখতে পারবে না।

    কোনো দেশ গ্লোবাল পাওয়ার হতে গেলে বা গ্লোবাল পাওয়ারের লক্ষণ হিসেবে কী থাকতে হবে এই প্রশ্নের জবাবে দুনিয়াতে মানা হয় যে ঐ দেশটা হাইটেকে কত এগিয়ে আছে, কত তার দখল এবং সর্বোপরি হাইটেকে তার মোট বিনিয়োগ কী পরিমাণ ইত্যাদি এগুলোই হল সেই বিচারের লক্ষণ।
    সম্প্রতি হংকংভিত্তিক এশিয়ান টাইমস এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীনের টেক কোম্পানি টাইটান নিয়ে। লিখেছে “ট্রাম্প চায়না টেক জায়েন্ট কোম্পানি টাইটানস-কে সাদা পতাকা দেখিয়েছে” [Trump waves white flag at China’s tech titans]।’ এখন কেন? অথচ নভেম্বর নির্বাচনের আগের ট্রাম্পের প্রপাগান্ডায় তো মনে হচ্ছিল এই তথ্য পাচার বা বিদেশি সেনা প্রসঙ্গ [যেটা জাতিবাদি রাজনীতিতে কথিত দেশপ্রেমি পাবলিককে ক্ষেপিয়ে তুলার খুবই সহজ অস্ত্র মানা হয়] তুলে তারা না চীনের সাথে যুদ্ধি না বাধিয়ে দেয়! তাহলে এখন কেন ট্রাম্প সুর বদলিয়ে নিচ্ছেন? গত নভেম্বরেরই তো নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নির্বাহী নির্দেশ জারি করেছিলেন চীনা টেক কোম্পানির বিরুদ্ধে। অথচ আজ এর উল্টো করছেন। কেন?

    কারণ ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তের পর ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্সের মতো আরো গ্লোবাল মিডিয়া এ সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। ওয়ালস্ট্রিট কী লিখেছিল তা এখানে জানা যাচ্ছে ।  আলিবাবা বাইদু নিউ ইয়র্কে রেজিস্টার্ড কোম্পানি, টেনসেন্ট হংকংভিত্তিক। এই তিন কোম্পানির মোট বিনিয়োগ হলো ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা অস্ট্রেলিয়ার ইকোনমির চেয়েও বড়। ট্রাম্পের কী সে খবর আছে?
    অর্থাৎ আসলে ওরা বলতে চেয়েছে, আমেরিকার পক্ষে এমন পাল্টা ট্রিলিয়ন ডলারের টেক কোম্পানি জন্ম দেয়ার সক্ষমতার দিন পেরিয়ে গেছে। কাজেই ওসব কোম্পানির সাথে আমেরিকার ব্যবসায়িক সম্পর্কও যদি ভেঙে দেয়া হয়, তবে আমেরিকা ততই আরো এই টেকনোলজিতে “কেউ না” হয়ে যাবে। যেমন এদিকে মোবাইল ফোনের ৫জি টেকনোলজিতে চীন এরই মধ্যে লিড নিয়ে ফেলেছে। আর আমেরিকাই কেউ না হয়ে গেছে।  যেখানে আমেরিকা কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে চলতি শতকের শুরু থেকেই ফোন টেকনোলজি থেকে ছিটকে পড়ে আমেরিকা  ‘কেউ না’ হয় গেছে। আর ইউরোপ কেবল কোন মতে ৫জিতে ছোট তরফের কোম্পানি হয়ে আছে।

    সারকথায় কোন গ্লোবাল নেতার মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা ঢলে পড়লে  তখন থেকে আর এর সবাইকে শাসানো কিংবা ডমিনেট করার ক্ষমতা কোথাও থেকে যোগাড় করতে পারে না। সাধারণভাবে আমেরিকা ও বিশেষ করে ট্রাম্পের আমেরিকা এখন এমন লুজার হয়ে গেছে।  তাই এই অবস্থায় ট্রাম্পের মত জাতিবাদী নেতারা  তখন আর আমেরিকা ফার্স্ট বা জাতিবাদী স্লোগান বা সাদা সুপ্রিমিস্ট জজবা তুলে কিছুই ঠেকাতে পারবে না। চেয়ে চেয়ে কেবল নিজের হার আর দুর্দশাই দেখার দিকেই এরা ক্রমশঃ যাচ্ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৬ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ট্রাম্পের শত্রু কে, চীন না বাইডেন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    গৌতম দাস

     ১১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬,  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3kW

     

    TRUMP’s MENTAL STAGE

    আপনি যখন অন্যকে শারীরিকভাবে কষ্ট দিয়ে সুখ অনুভব করবেন তখন বুঝতে হবে আপনি মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে প্রবেশ করে ফেলেছেন। উপরের চারটা ছবির মধ্যে কম-বেশি সেসবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে প্রথমটায়। কারণ এই অসুস্থতার সাথে মুখভঙ্গি বদলের সম্পর্ক আছে। ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা নিয়ে আমেরিকায় বিশেষত সাইকিয়াট্রিস্ট মহলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকেই বিস্তর আলোচনা হয়ে এসেছে। এমন সাইক্যাট্রিক রিপোর্ট ও এমন আলোচনার অজস্র রিপোর্ট ওয়েব সাইট পাওয়া যাবে।
    এদিকে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা প্রবলভাবে ঢলে পড়ছে, প্রভাব হারাচ্ছে আর তা নিয়ে অজস্র রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে।  বিশেষ করে ট্রাম্পের আমলে সাথে চলতি করোনাকালে এই ভাইরাসের প্রভাব প্রতিক্রিয়া ম্যানেজমেন্ট ও মোকারিলা প্রশ্নে ট্রাম্পের আমেরিকা পরাজিত হয়েছে বলা যায়। জনসংখ্যার  ৬.৬% আক্রান্ত হয়েছে যা হয়ত তুলনায় খুব বেশি নয় কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ (৩.৭২ লাখ) ছুঁয়ে ফেলার দিকে যেটা ট্রাম্পের পারফরমেন্সের দশা মাপার ক্ষেত্রে এক বড় ইন্ডিকেটর।  আর ঠিক এক দিকটাকে স্টাডির মধ্যে নিয়ে একটা স্টাডি রিপোর্ট বলছে অর্থনীতিতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের এক নম্বরে যাওয়ার কথা যেটা আগে বলা হয়েছিল যে এটা ২০৩৫ সালের দিকে ঘটবে সেটা এখন বলা হচ্ছে কোভিড মোকাবিলায় লড়াইয়ে ট্রাম্প আমেরিকাকে হারিয়ে পিছনে ফেলে দিবার কারণে সেটা এখন ২০২৮ সালের মধ্যে ঘটে যাবে।
    এসবেরই প্রভাবে এখন ১২.৮ মিলিয়ন (১.২৮ কোটি) বেকারের ট্রাম্পের আমেরিকায় অর্থনৈতিক সংকটের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট্রদের প্রভাব। অর্থাৎ সাদা মানুষেরাই শ্রেষ্ট, আমেরিকা হল মূলত সাদাদের, এখানে অন্যান্য কালারের মানুষেরা এসে সাদা মানুষদের দুঃখ দুর্দশা সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সাদাদের  শ্রেষ্ঠত্ব ‘রি-ক্লেম’ করে ফেরত নিতে হবে। যার আসল মানে হল সাদা সুপ্রিমিস্টদের চরম উগ্র বর্ণবাদী হতে হবে। চারবছর আগে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান আসলে ছিল এই সাদাবাদীদেরই রাজনৈতিক উত্থানের প্রথম বড় প্রকাশ। আর এই সাদা রাজনীতির পাবলিক ফিগার স্টিভ ব্যানন  (Stephen K. Bannon), তাঁকে ট্রাম্পের ‘হোয়াইট হাউজের চীফ স্ট্রাটেজিস্ট’ হিসাবে  নিয়োগ দেয়া ছিল ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। কিন্তু এই রাজনীতির একটা লিগাল সমস্যা আছে। আমেরিকার কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের পক্ষে প্রচারক [preach] হলে তাঁর এর বিরুদ্ধে মামলা খাবার বা ইমপিচ হবার সম্ভাবনা আছে। তাই ট্রাম্প একটা দুরত্ব রেখে এদের সমর্থন করে থাকে। ব্যাননকেও এক পর্যায়ে উপদেষ্টা পদ থেকে খারিজ করে দেন তিনি।  কিন্তু এবার ০৬ জানুয়ারি ২০২১-তে?

    এদিকে অবশেষে জানা গেল প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন ও তার ক্যাম্পের সমর্থকেরা আমাদের জানাচ্ছেন, আমেরিকায় টেরোরিস্ট কারা! কথিত ট্রাম্প সমর্থক যারা ক্যাপিটোল হিলের আমেরিকান কংগ্রেসের ভিতরে প্রবেশ করে ৬ জানুয়ারি তান্ডব ভাঙচুর চালাতে ঢুকেছিল বাইডেন নিজমুখে বলছেন, তারা ‘টেরোরিস্ট’। কিন্তু এতেও পরিস্কার হয়নাই বা লুকিয়ে ফেলা হয়েছে  এঁদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়ের দিক।  তবে আটই জানুয়ারির পর থেকে মিডিয়ায়  প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়ে গেছে এদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়। অর্থাৎ বাইডেনের বা অনেক আমেরিকান “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” যারা সংসদে হামলাকারিদেরকে “টেররিস্ট” বলে নামকরণ করছেন এরা আসলে হামলাকারিদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই মূল পরিচয়, এই মারাত্মক রেসিজম ও ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় – এসবই আড়াল করে রেখেছিলেন, গুরুত্ব দেন নাই। সেসবগুলো এখন প্রকাশ্যে সামনে এসে গেছে।  এদিকে  ফেসবুক ও টুইটার কর্তৃপক্ষ এখন প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে এদের সচিত্র ততপরতা, কী কী গ্রুপের সদস্য হয়ে তারা ঐদিন দলবদ্ধ হয়ে ততপর ছিল এর বিবরণ দিয়েছে। আর সেই সাথে ওসব সোশাল মিডিয়া বলছে তারা ট্রাম্পের একাউন্ট চিরদিনের মত মুছে দিয়েছে। যেখানে মূল অভিযোগ তারা জানিয়েছে ট্রাম্প ও তার এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী সমর্থকেরা ফেসবুক ও টুইটার প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে মানুষ হত্যা ও ঘৃণা-হিংসা ছড়ানোর কাজে নেমে গেছিল।

    সবশেষে পরিস্থিতি এখন পুরাটাই  বাইডেনের পক্ষে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরাটাই আমেরিকার সংসদের (কংগ্রেসের উভয়কক্ষের) হাতে চলে গিয়েছে। এটা ট্রাম্পের জন্য আরও বিপদজনক হয়ে উঠেছে কারণ ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকানদের বড় অংশটাই এখন কোন্টাকির সিনেটর ম্যাক-কনেলের [Mitchell McConnell ] নেতৃত্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এবং  তিনি তার গ্রুপ নিয়ে সম্ভবত  আগামি সোমবারে ডেমোক্রাটদের আনা ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের (অনাস্থা ও অযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা) প্রস্তাব যেটা তুলতে যাচ্ছে তা সমর্থন করে বসতে পারেন।

    বিপদজনক দেউলিয়া ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পঃ
    যেকোনো ব্যবসামাত্রই তাতে উত্থান-পতন আছে, থাকবে। এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমনকি এই সূত্রে কারও ব্যবসা ফেল করাতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু তাই বলে দেউলিয়া হলেই ঐ ব্যবসায়ীর মানসিক রোগ বা অস্থিরতাও দেখা দিবেই তা কিন্তু নয় যদিও কারো বেলায় এটা হতেও পারে। আবার তেমন কিছু নাও হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা কিছু হয়েছে কিনা চেক করার দরকার আছে। দেউলিয়া [Bankrupt]  হলে ঐ ব্যবসায়ী সাথে আবার কোন মানসিক রোগগ্রস্ত হয়েছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। নইলে কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট নিজেই সংসদে হামলার জন্য দাঙ্গাবাজ রেসিস্টদের এনে উক্সানি দিতে পারে?  আমেরিকান কংগ্রেসে তা হামলাভাঙচুর পর্যন্ত ঘটাতে পারে, কিছু লোক বেঘোরে মারা পড়তে পারে!  তাই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করার সময় বয়ে যাচ্ছে, যদিও এই আওয়াজ আগেও উঠেছিল।
    সেই ২০১৬ সালে প্রার্থী হওয়ার আগেই, ট্রাম্পের মানসিক স্থিতি চেক করে নেয়া দরকার ছিল, সেটা আজ স্পিকারসহ আমেরিকা রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হাড়ে হাড়ে বুঝছেন।  ট্রাম্পের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে কোন কোন অনুসন্ধানী ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট মতে, ওয়াশিংটন পোস্ট জানাচ্ছে,  ট্রাম্প ১১ বার নিজেকে দেউলিয়া ব্যবসা কোম্পানি হিসেবে রেজিস্টার্ড হয়েছিলেন।

    কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘দেউলিয়া’ হওয়া মানে কীঃ
    কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজেকে ‘দেউলিয়া’ ঘোষণা করিয়ে নেয়া মানে কী? আমেরিকান বিজনেস ল’ অনুসারে কোম্পানির মালিকেরা নিজেরাই নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করাতে পারেন, তবে আদালতের মাধ্যমে। সাধারণত এটা কোম্পানি মালিক ও ম্যানেজমেন্টের ঘোষিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘটে থাকে। অনেকের মনে হতে পারে, মালিক নিজেই কেন ঘোষণা করবেন, নিজেকে কি কেউ পাগল বলেন বা বলবেন?
    হ্যাঁ বলবেন, ও বলে থাকতে পারেন। কারণ, নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়ার জন্য আদালতে ঐ কোম্পানিকেই আবেদন করতে হয় আর তাতে আদালতের অনুমোদন পেতে হয়। কিন্তু কখন ও কেন? যখন সাধারণত দেখা যায় কোনো কোম্পানির আয় ও অর্জিত সম্পদের মোট মূল্যের চেয়ে ওই কোম্পানিকেই পরিশোধ করতে হবে, সম্ভাব্য এমন দায়-দেনার পরিমাণ ছাড়িয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।
    কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হয় বা হতে পারে? সাধারণত দেখা যায় কোম্পানিটা ধরা যাক সেটা ওষুধের মত পণ্য উৎপাদনকারী এবং বাজারে খুবই সুনাম-ওয়ালা কোম্পানি। কিন্তু ওর যেকোন একটা পপুলার ওষুধ-পণ্যের গুণে ত্রুটি ধরা পড়েছে যা উৎপাদনকালীন বা মুল ফর্মুলাতেই মারাত্মক ত্রুটিজনিত এক ভুল। আর তাতে হয়ত ঐ ওষুধ ব্যবহার করে কয়েক লাখ লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে বা অঙ্গ হারিয়েছে অথবা এদের মধ্যে প্রায় শ’খানেক লোক মারাও গেছেন। এমন হলে ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা করা শুরু করেছে হয়ত। হয়ত দু-একটা মামলার অবস্থা থেকে বোঝাও যাচ্ছে, এসব মামলায় কোম্পানির বিরুদ্ধে আদালতে শাস্তির রায় হয়েই যাবে আর শাস্তির পরিমাণও অনেক বড়, হয়ত মাথাপিছু কয়েক কোটি টাকার উপরে দিতে হবে একেকজন ভুক্তভোগীকে।
    এই পরিস্থিতিতে তখন ঐ কোম্পানি নিজ ক্ষতি ও দায় কমাতে বা বেঁচে যেতে আদালতে নিজ উদ্যোগেই আবেদন করে যে, তার কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়া হোক। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সব ভুক্তভোগীর সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ দিতে গেলে এর দায় কোম্পানি অ্যাসেট বা মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। এখন এতে আদালত ঠিক কী করবেন? আদালত এই আবেদনে সন্তুষ্টি থাকলে এবার আদালত কোনো এসেট নির্ণয় ও মূল্যায়ন কোম্পানিকে ঐ ওষুধ কোম্পানির খরচে নিয়োগ দিয়ে ঐ দাবির যথার্থতা যাচাই করবেন। যদি ওই নির্ণয় কোম্পানির রিপোর্টও মালিকদের আবেদনের সাথে মিলে যায় তখন সাধারণত আদালত রায় দেন যে, পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানির যতটুকু সম্পদ বর্তমানে আছে সেই অনুপাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের অর্থ কম করে দিয়ে যেন সব দায় মিটিয়ে দেইয়া হয়। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ দানের ব্যাপারটা অসীম না থাকতে দিয়ে সম্পদ যা আছে সে অনুসারি সীমিত বা আনুপাতিক করে দেয়া হয় এতে। এরপর আদালত ঐ ক্ষতিপূরণ ভাগ করে দেয়া সাপেক্ষে ঐ ওষুধ কোম্পানিকে দেউলিয়া  ও দায় পরিশোধের পরে বিলুপ্ত ঘোষণা করে দিতে পারে। তাই সারকথায় কোন কোম্পানি তার বিভিন্ন ধরনের পাওনাদারদের দাবি যদি মেটাতে ব্যর্থ হয়, সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে সে নিজেকে আদালতের কাছে দেউলিয়া প্রমাণ করিয়ে আদালতের মুখ দিয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়, যাতে পাওনাদার থেকে বেঁচে যাওয়া যায়।
    ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত হাউজিং ডেভেলপমেন্টের ব্যবসায়ী। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ২০১৬ সালের এক ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট বলছে, তিনি কমপক্ষে ১১ বার এমন দেউলিয়া ঘোষণা করিয়েছেন নিজেকে।
    এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো কোম্পানির মূল মালিকের বহু স্বপ্নের বাস্তবতা হয়ে থাকে তাঁর নিজের ঐ কোম্পানি। ফলে কোম্পানিকে বাজারে দেউলিয়া হয়ে যেতে দেখলে সেটা কারো কারো বেলায় এক মানসিক আঘাত হয়ে হাজির হতেও পারে। একারণে দেখা যায়, মালিক আর নুন্যতম স্বাভাবিক মানুষ নাই, মানসিক বিকারগ্রস্থ ব্যক্তি হয়ে গেছেন। এতে হয়ত দেখা যায় সামাজিক সাধারণ মূল্যবোধ দ্বারা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বা সামাজিক দায়বোধ বা জবাবদিহিতা ইতাদির প্রতি আর তাঁর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। আসলে সম্ভাব্য এমনই মানসিক অসুস্থতায় পৌঁছেছেন ট্রাম্প। এদের মনোবিকার হয় এমন যে এখন তো তার কোম্পানিটাই আর নাই। কাজেই তিনি আর এখন সমাজের মুল্যবোধ মেনে কী করবেন?  ফলে সবকিছুই মিথ্যা এমন হতাশা ও নৈরাশ্যের জগতে চলে যান তিনি। এর ফলে ঐ অবস্থায় নিজেকে সুস্থভাবে পরিচালিত করার মত অবস্থায় ঐ মালিক আর থাকেন না। এই  অস্বাভাবিকতা যেকোনো মাত্রার মানসিক স্থিতিশীলতা, অস্থিরতা হয়ে হাজির হতে পারে।
    এখন এমন অবস্থায় আরও বাড়তি দিকটা হল,  মানসিক-অসুস্থ মানুষ নিজের সমাজ, পরিবারে থাকলে সেটা এক জিনিস; কিন্তু যদি রাষ্ট্রীয়-সরকারি পদ, তিনি প্রধান নির্বাহী, প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন? সেটা অবশ্যই মারাত্মক। কারণ সেটা তো সারা দেশের মানুষের প্রতিদিনের স্বার্থের ব্যাপার। তাই নির্বাহী পদে নমিনেশন পেপার পেশ করার আগেই শর্ত হিসেবে তার মানসিক স্থিরতা (মেডিক্যাল স্টান্ডার্ড মতে) পরীক্ষা করে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনা মানে, সম্ভবত শত কোটি নাগরিক ভাগ্য নিয়ে যাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন দেউলিয়া ব্যবসায়ীর মানসিক অস্থিরতার রিস্ক ঐ দেশের জনগণ নিতে পারে না।
    ঠিক এই অবস্থাটা আজ আমেরিকান পাবলিক অনুধাবন করছে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল গত ৬ জানুয়ারি?

    WASHINGTON, DC – JANUARY 06: Thousands of Donald Trump supporters storm the United States Capitol building following a “Stop the Steal” rally on January 06, 2021 in Washington, DC. The protesters stormed the historic building, breaking windows and clashing with police. Trump supporters had gathered in the nation’s capital today to protest the ratification of President-elect Joe Biden’s Electoral College victory over President Trump in the 2020 election. (Photo by Spencer Platt/Getty Images)

    কী ছিল গত ৬ জানুয়ারি?
    আমেরিকার কনস্টিটিউশনের বহু কিছু দু’রকম মানে হয়ে যেতে পারে এমন বাক্য যতটা সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে রচনা করার উপর জোর দিয়ে রচিত হয়েছে। যেমন নির্বাচন কবে হবে, সেটাও বলা থাকে ওমুক বছরের ওমুক মাসের প্রথম মঙ্গলবারে – এভাবে। অর্থাৎ সব কিছুই আগাম ও ফিক্সড। রাষ্ট্রের কোন নির্বাহির বিবেচনা মতে নির্বাচনের দিন ঠিক করার সুযোগ রাখাই হয় নাই।  সবার বিবেচনাবোধ এক বা সমান হয়না; মানুষে মানুষের মধ্যে এনিয়ে ফারাক হতে পারে; তাই কথা এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে তা  হওয়ার সুযোগই রাখা হয়নি। এভাবেই গত বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ৩ নভেম্বর আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে  আবার নির্বাচনের পরে কত দিনের মধ্যে রাজ্যগুলোর ফলাফল তারা কে কোথায় পৌঁছে দেবেন তাও বলে রাখা আছে। এই পদ্ধতিতে এবং আনুষ্ঠনিকতার দিক থেকে এক গুরুত্বের দিন হল ৬ জানুয়ারি। কারণ, ঐদিন আমেরিকার দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেস বা সংসদের উভয়কক্ষ এক যৌথ অধিবেশনে মিলিত হবে। আমেরিকায় আমাদের সংসদের মত আছে ‘প্রতিনিধি পরিষদ’ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং আরেক দ্বিতীয় কক্ষ আছে ‘সিনেট’। ঐদিন এরা উভয়েই ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিল জেলায় অবস্থিত প্রতিনিধি পরিষদের নির্ধারিত হলঘরে একসাথে অধিবেশনে বসবেন। আর ঐ যৌথ সভায় সভাপতিত্ব করবেন রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার পাশে বসবেন হাউজ স্পিকার। এই হিসাব মতে,  ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ৬ জানুয়ারি সভাপতির আসন নিয়েছিলেন। আর সাথে পাশে বসেছিলেন পরপর চারবারের ও এবারেরও স্পিকার (ডেমোক্র্যাট) ন্যান্সি পেলোসি [Nancy Pelosi ]।
    ওদিকে নির্বাচনের ফলাফল কিভাবে চূড়ান্ত হবে কে করবেন, আর তাতে বিতর্ক বা আপত্তি থাকলে তা কী করে নিষ্পত্তি হবে এরও সবই আগাম বলে দেয়া আছে। প্রত্যেক রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের কাজ ও পরিচালনা সেখানেই শেষ করা হয়। কারণ কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বা অফিস আমেরিকায় রাখা হয়নি। তাই ৫০ রাজ্যের আমেরিকার প্রত্যেক রাজ্যে একজন সেক্রেটারি থাকেন যিনি ঐ স্টেটের (সরকারের নয়) ‘সেক্রেটারি অব স্টেট’; আর যার প্রধান কাজ হল তিনি প্রধান নির্বাচন অফিশিয়াল এবং এটা নির্বাচিত একটা পদ; তিনিই ভোটের ফলাফল চূড়ান্ত করেন, কারও আপত্তি থাকলে তাও নিষ্পত্তি করেন। আপত্তিকারী এতে সন্তুষ্ট না হলে তিনি স্থানীয় জেলা জজ থেকে শুরু করে ফেডারেল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারেন। আর এরপরে সেই চুড়ান্ত ফলাফল তিনি ঐ যৌথ অধিবেশন কক্ষের সভাপতির (রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট) অফিসে পৌছানোর ব্যবস্থা করেন।

    ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনের আগে থেকে ‘বড় পাগলামোতেই’ আছেন। একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এটা কোন ভাল পরিচায়ক নয় অবশ্যই। তিনি নির্বাচনের ফলাফল নিজের বিপক্ষে হলে মেনে নেবেন না, ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না, ইত্যাদি নানাকথা আউড়ে চলেছিলেন নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই। এদিকে বাস্তবে ৩ নভেম্বরের দু’দিন পর থেকেই পরিষ্কার হতে থাকে নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাচ্ছেন। আর ততই ট্রাম্পের পালটা পরিকল্পনার কথাগুলো কানাঘুষা প্রচার হতে থাকে। সবখানেই ট্রাম্প বা তার পক্ষের এজেন্টদের কমন অভিযোগ ছিল – তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। এরই একপর্যায়ে দেখা যায় এসব ফলাফল বিতর্কগুলো সাথে কোন প্রমাণ না দিয়েই তাঁরা কেবল অভিযোগ মাত্র করে গিয়েছেন। তাই সে মামলাগুলো জেলা জজের আদালতেই শেষ হয়ে যায়, মামলা ডিসমিস। ফলে প্রমাণ অভাবে কোন অভিযোগ কখনোই কোন জেলা জজের আদালতে উপরে যেতে পারেনি। কারণ সবখানেই ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল – তাকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। অথচ মূলকথা, সব আদালতেই যা হাজির ছিল না তা হল, সাথে পেশ করা তথ্য প্রমাণ। অন্তত মামলা শুরু করার মত কিছু ন্যূনতম প্রমাণও ছিল না। ফলে  প্রায় সব আদালতই ন্যূনতম প্রমাণ দেখাতে না পারার কারণে মামলা ডিসমিস করে দিয়েছে। শেষে এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই মিডিয়াতে নিজেই স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন যে, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তার মামলাগুলো দায়ের করা বা পৌঁছানোর মত অবস্থায় তিনি নাই বা মেরিট এগুলোর নেই। কিন্তু এরপরেও সবসময় তিনি শেষ কথা হিসেবে মুখস্তের মত বলে চলেন যে, তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে।

    তাই এসবের বিপরীতে, ট্রাম্পের এক বড় পরিকল্পনার দিন ছিল গত ৬ জানুয়ারি। কিন্তু ৬ জানুয়ারি আমেরিকার নির্বাচনি ফলাফলের দিক থেকে অবশ্যই একটি আনুষ্ঠানিকতার পর্ব কেবল। বিশেষ করে, আমেরিকায় কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন রাখা হয়নি বলে এর বিকল্প কিছু বলে যেন রাজ্য পর্যায়ে চূড়ান্ত ফলাফলগুলোর যোগফল চূড়ান্তভাবে কে ঘোষণা করবেন এরই এক আনুষ্ঠানিকতার দিন কংগ্রেসে ঐ যৌথ অধিবেশন এটা। তাই পরিষ্কার করেই কনষ্টিটিউশনে  বলা আছে যে, যৌথসভার সভাপতি ভাইস প্রেসিডেন্টের ঐদিনের কাজ কী কী। মূলত তা দুটো। রাজ্যের পাঠানো ফলাফলের বাক্স যা তার অফিসে পাঠানো হয়েছিল তা উন্মোচন করা এবং তা গণনার জন্য নির্ধারিত স্টাফদের নির্দেশ দেয়া; আর তা হবে যৌথসভার (সংসদ ও সিনেটের) সদস্যদের সম্মুখে। সেখানে ভোট গণনার কাজ শেষ হলে উপস্থিত যৌথ সদস্যদের প্রস্তাব-ভোটে চূড়ান্ত ফলাফল যা সেখানে পাওয়া যাবে তা ঘোষণা করা হবে।

    ট্রাম্পের কনষ্টিটিউশন পাঠঃ
    এখন ট্রাম্পের বা তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য উপদেষ্টাদের দেখা যায়, উটকো কিছু ব্যাখ্যা তারা হাজির করে গেছে। আর দেউলিয়া ব্যবসায়ী মনের ট্রাম্প নিজে বুদ্ধি বলে তাঁর উপদেষ্টাদের এসব আজগুবি পাঠ বিশ্বাস করেছিলেন।  যেমন ট্রাম্প তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে সুনির্দিষ্ট কিছু করণীয় ও নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা তিনি প্রকাশ্যেও বলেছেন।
    এখন কথা হল, ট্রাম্প কি যা তার খুশি তা করতে পেন্সকে নির্দেশ দিতে পারেন? নাকি যা যা করার এখতিয়ার পেন্সকে কনস্টিটিউশন দিয়েছে কেবল সেগুলোর মধ্যে থাকা সাপেক্ষে নির্দেশই দিতে পারেন? এখানে ট্রাম্পের ধারণা তিনি যেকোন কিছু নির্দেশ দিতে পারেন। অথচ তা তিনি পারেনই না। তবু তিনি পেন্সকে (নির্দেশ) বলেছিলেন, তিনি যেন যোগফল পাওয়ার পর ঘোষণা করেন, এই ফলাফল তিনি মানছেন না বা অনুমোদন করছেন না। কিন্তু কার্যত সময়ে দেখা গেল মাইক পেন্স ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে বসেছেন। অধিবেশন শুরুর আগে তিনি এক বিবৃতি পাঠ করেন।

    “It is my considered judgment that my oath to support and defend the Constitution constrains me from claiming unilateral authority to determine which electoral votes should be counted and which should not,” Pence said in a letter to Congress.  বাংলা করে বললে, “আমার বিচার বিবেচনায়, আমার শপথের সময় দেয়া কনষ্টিটিউশন রক্ষা ও সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোন ইলেকটোরাল কাউন্ট হবে কোনটা হবে না এই সিদ্ধান্ত নিবার একক কোন কর্তৃত্ব আমাকে দেয় নাই”।

    অর্থাৎ তিনি ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে কাজ করতে পারছেন না, এটাই তিনি জানিয়ে দেন।  আর এখান থেকে শুরু হয় ট্রাম্প-পেন্স এর ডিপারেচার।  অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, মানসিক অসুস্থতা কেবল ট্রাম্পের, এখনো তার ভাইস প্রেসিডেন্টকে এটা তেমন স্পর্শ করেনি। তাই যৌথ অধিবেশন শুরুর মুহূর্তে পেন্স এক লিখিত ঘোষণায় জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের অনুরোধ রাখতে পারছেন না। কেবল কনস্টিটিউশন যা তাকে করার এখতিয়ার দিয়েছে এর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এবার হতাশ হয়ে এক টুইট করেছিলেন, “পেন্স সাহসী নন। তার সাহসের অভাব আছে, তাই তিনি পারলেন না” [“didn’t have the courage to do what should have been done.”]। অথচ ফলাফল নিয়ে আপত্তি তুলবার জায়গা তো ঐ অধিবেশনই নয়। সেটার জায়গা যার যার রাজ্য নির্বাচন অফিসে বা আদালতে।
    ইতোমধ্যে ঐ অধিবেশকে নিয়ে অনেক নাটকীয়তা করা হয়। সবশেষে ওই যৌথসভা থেকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করে বলা হয়, বাইডেন বিজয়ী বলে তারা ‘সার্টিফাই’ করছেন [Biden’s election victory certified after chaos at US Capitol leaves four people dead]। তবে এর আগে অনেক নাটকীয়তা হয়েছে। ট্রাম্প তার সমর্থকদের দিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামার ব্যবস্থা করেছিলেন সংসদের ভেতরে মূল হলসহ বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে ভাঙচুর করা হয়েছিল। (যদিও পরে পুলিশ জানাচ্ছে যে তারা হামলাকারিদের দখলে থাকা অস্ত্র ও বোমার এক বিরাট মজুদ আটক করেছে। ) অবশ্য এর আগেই পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডরা সব নির্বাচিত সদস্যকে প্রত্যেকের মুখে একেবারে গ্যাস মাস্ক পরিয়ে সংসদ বিল্ডিংয়ের ভেতরেই গোপন কুঠিতে তাদের নিরাপদ গোপন স্থানে রেখে এসেছিলেন। এদের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ট্রাম্প অসুস্থ বা তেমন কিছু হলেই তঁকেই  প্রেসিডেন্ট পদে বসতে হতে পারে, তাই প্রেসিডেন্টের মাপের এই নিরাপত্তা অবস্থা। এছাড়া ঐ সংসদকেই কার্যত আমেরিকান রাষ্ট্রের অন্যতম বাস্তব রাষ্ট্ররূপ মনে করা হয়। তাই মূলত পুলিশের আধিপত্যেই ওই দিনটা দাঙ্গাহাঙ্গামাকারিদেরসহ সংসদে সবার কেটেছে। পুলিশ আধিপত্য করে গেছে দাঙ্গাবাজদের পরাস্ত ও নিয়ন্ত্রণ করেছে।

    তবে মিডিয়াসহ ট্রাম্পের মধ্যে যে ধারণাটা কাজ করতে দেখা গেছে তা হল,  যেন ঐ যৌথ অধিবেশন চাইলেই তাঁদের ভোটাভুটিতেই বা অধিবেশনের সভাপতি পেন্স চাইলেই যাখুশি ফলাফল যেমন ইচ্ছা ঘোষণা করতে পারেন। এরা একটা এমন আশা নিয়ে বসে থেকেছেন, রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু বটমঅব দা  ফ্যাক্টস হল, একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাবলিক সেখানে সরাসরি ভোট দেয়ার পর সেই ফলাফলের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু ঘোষণা করার ক্ষমতা কি পরে ঐ যৌথ অধিবেশনের কারো থাকতে পারে? কনস্টিটিউশন কি এমন এখতিয়ার পেন্স বা ওই হাউজকে চাইলেও দিতে পারে? এর সোজা জবাব হল, দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশনই এটা পারেই না। এমনকি আমেরিকান কনস্টিটিউশন না পড়েই বলা যায়, এটা তাঁদের কনস্টিটিউশনেও থাকতে পারে না। কারণ সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে জনগণের ম্যান্ডেটের বিরোধিতা; ওই ম্যান্ডেটকে উল্টে দিতে পারে কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টিকে এমন এখতিয়ার কনস্টিটিউশন দিতেই পারে না।  পাবলিকের দেয়া ভোট-ম্যান্ডেট এটা সুপ্রীম নাকি ঐ যৌথ অধিবেশন বা ওর সদস্যরা? অবশ্যই পাবলিকের ম্যান্ডেটই চুড়ান্ত। কারণ পাবলিকের ভোটের এই ম্যান্ডেট সুপ্রিম, এর ওপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দেয়া যায়, কারেক্ট করা যায় এমন বিন্ধুমাত্র ক্ষমতা ঐ যৌথ অধিবেশনকে বা কাউকেই দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশন দিতেই পারে না। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দিবার ক্ষমতা হিসাবে মাইক পেন্স কেউ না? উনি নাথিং! তিনি কেউ নন, তিনি এমন এক্তিয়ার বিহীনও।

    এখন আবার ফিরেএকটা সামআপ হিসাবে বলা যায়, আসলে আমেরিকার এই সমস্যাটা কি ব্যক্তি- ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা-জাত? না তা অবশ্যই নয়। সমস্যাটা মূলত রাজনৈতিক। অর্থাৎ পলিটিকো-অর্থনৈতিক। আর সেটা জাগিয়ে তুলেছে চীনের অর্থনৈতিক  উত্থান, এই অবজেকটিভ ফেনোমেনা। চীন নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক  হবু নেতা হতে চলেছে, আমেরিকাকে সরিয়ে। ফলে এর আঘাতে আমেরিকান সমাজ-রাজনীতি টালমাটাল হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডামাথায় এর প্রতি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেরাই এলোমেলো বিভক্ত হয়ে পড়ছে মূলত ভুল অনুমান, ভুল পাঠ এর কারণে। তবে অর্থনৈতিক সঙ্কট সবসময়ই এরকম হাজারো রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরিও করে থাকে। একমাত্র পোক্ত নেতৃত্ব এটা মোকাবিলা করতে পারে। কারণ, যা হবেই তাকে যতটা কমক্ষতিতে পারে এভাবে স্বাগত জানিয়ে এই রূপান্তরকে কম অস্থিরতায় পার করে দিতে পারে – এটাই হতে হবে তাঁদের মূলসুত্র।

    ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টঃ
    এখন আগামি সোমবার থেকে নতুন ইস্যু ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট। ডেমোক্রাটেরা এই প্রস্তাব তুলতে যাচ্ছে।  অনেকে আশা করছেন এখানে বিভক্ত রিপাবলিকানদের অনেকে তাকে সাপোর্ট করবে। এটা কিছু একটা ফলাফল আসবে হয়ত তা খুব তাতপর্যপুর্ণ কিছু নয় কারণ আর মাত্র নয় দিন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট আছেন।  তাহলে এই ইমপিচমেনট কেন? সেটার আসল কারণ ট্রাম্পকে চাপে রাখা যাতে তিনি “ইরানের উপর হামলার নির্দেশ” জাতীয় কিছু মানসিক ভারসাম্যহীন কাজ না করে বসেন তা থেকে বিরত বা চাপে রাখতে। যেমন স্পিকার ন্যান্সি ইতোমধ্যে আমেরিকান আর্মির টপ কয়েকজন জেনারেলের সাথে কথা বলে তার উদ্বেগ জানিয়েছেন, মতবিনিময় করেছেন এসব নিয়ে।

    তাহলে দিনশেষে মানে আগামিতে কী হতে যাচ্ছে?  এককথায় বললে, চীনের উত্থানের চাপের মুখে আমেরিকার নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা গত ৬ জানুয়ারির ঘটনায় বেশ কয়েকধাপ নিচে নামিয়ে দিবে। এর মূল কারণ ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেল  যে আসন্ন ‘আমেরিকান সঙ্কট” মোকাবলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব সকলের মধ্যে সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত নাই। তাঁদের মারাত্মকভাবে বিভক্তিরই প্রকাশ গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী। এম্নকি রিপাবলিকান দলই পুরা বিভক্ত।  সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত থাকত তাহলে ট্রাম্পের জাতিবাদ যার আরেক নাম সাদা সুপ্রিমিস্ট – এই চিন্তা মাইনর কিছু হয়ে থাকত।  এটা হল সেই লক্ষণ যে আমেরিকার বিভক্তি সহসাই মিটছে না।  অর্থাৎ আমেরিকা অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরো দুর্বলই হচ্ছে। তবে তা হয়ত তাতক্ষণিক নয়।, কিন্তু ধীরে ধীরে। যদিও বাইডেনের প্রথম বছরের মধ্যেই আমেরিকানেরা ট্রাম্পের বিরোধী হয়ে যাবে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করবে ট্রাম্প তাঁদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। যদিও সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারা ভাল রকমই থেকে যাবে! ঠিক যেমন ট্রাম্প তো আগেই জানতেন তিনি ছয় তারিখেই হেরে যাবেন সব শেষ হয়ে যাবে। তবু তিনি এই নষ্টামিটা করলেন কেন?  কারণ সাদা সুপ্রিমিস্টরা মনে করে রিপাবলিকান পার্টির উপর তারা পুরা কব্জা কাজ (এখন সব রিপাবলিকান সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারার নয়) করতে হলে, তাদেরটাই প্রধান ধারা হিসাবে ছেয়ে বসতে চাইলে সেকাজের পক্ষে বিনিয়োগ এটা।  যদিও যৌথ কংগ্রেস অধিবেশনে দাঙ্গা হাঙ্গামাটা একটা নৈরাজ্যমূলক কাজ হিসাবেই দেশে-বিদেশে দেখা শুরু হয়ে গেছে। ফলে তাঁদের উদ্দেশ্য একেবারেই কাজ করবে না। উলটা তারাই সমাজে কোনঠাসা হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি! বিশেষত ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র ট্রাম্প ও সাদা সুপ্রিমিস্টদের নিন্দা করেছে, এমনকী ভারতের মোদীও দিনশেষ দেখে এই নিন্দাকারিদের দলে!

    নির্বোধের খুশি!

    ভারতীয় পতাকা দোলানোর গর্বঃ
    সাদা সুপ্রিমিস্ট যারা হয় তারা তো নয়ই কিন্তু তাঁদের নেতা-পরিচালকেরা সুস্থ মাথায় চিন্তা করতে পারে এর অভাব সবসময় লক্ষ্য করা যায়। অন্য ভাষায় বললে নুন্যতম যুক্তিবুদ্ধির সামঞ্জস্যপুর্ণ “বয়ান-ভাষ্য” কখনই তাঁদের থাকে না, দাঁড় করাতে পারে না। অথচ বয়ান ছাড়া কেউ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হতে পারবে না। যেমন নিউজিল্যান্ডের ৫০ জনের মত মুসলমান হত্যার এক সাদা সুপ্রিমিস্ট ব্রেনটন (Brenton Harrison Tarrant) এর কান্ডটা আমাদের নিশ্চয় মনে আছে। ওর বয়ান হল, নিউজিল্যান্ডে মুসলমানেরা বাইরের লোক, তারা সাদা নয় ইত্যাদি, অতএব হত্যা……। আচ্ছা সে নিজেও কী নিউজিল্যান্ডে “বাইরের লোক” নয়।  কোন সাদা চামড়ার কেউ নিউজ্যল্যান্ডের আদি লোক নয়।  তাঁদের পুর্বপুরুষেরা সকলেই ইউরোপের আর মূলত বৃটেনের।  তাও একেবারেই গরীব, সহায় সম্পদহীন খেটে খাওয়া, জেল খাটা অংশ। কারণ মূল মিডল ও লোয়ার মিডল ক্লাস অংশটা আগেই আমেরিকা চলে গেছিল।  তাহলে এই বিদেশি, বাইরের লোক, দখলদার এসব শব্দের ভিত্তি কৈ?

    ক্যাপিটোল হিলে ৬ জানুয়ারির আয়োজকই ছিল সাদা সুপ্রিমিস্টরা। অথচ সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছে এক ভারতীয় অরিজিন বাসিন্দা।কলকাতার আনন্দবাজারের অনুসন্ধানি দাবি  যে তিনি ভিনসেন্ট জেভিয়ার। লিখেছে, “কট্টর ট্রাম্প সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা বছর চুয়ান্নর ভিনসেন্ট যে তাঁর কৃতকর্মে অনুতপ্ত নন, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি”।  এছাড়াও লিখেছে, “কাল সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত  ভিনসেন্ট জেভিয়ার নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বললেন, ‘‘ভারতকে অসম্মান করাটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি আসলে আমেরিকাতেও যে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য আছে, সেটা বোঝাতে চেয়েছিলাম। দেখাতে চেয়েছিলাম, রিপাবলিকান পার্টি একেবারেই বর্ণবিদ্বেষী নয়।’’
    এসব কথা বলে না ঐ কথিত ভিনসেন্ট না আনন্দবাজার নিজেদের মনভাব অভিপ্রায় ঢাকতে পেরেছে। ৬ জানুয়ারি নিয়ে  আনন্দবাজার দুটা রিপোর্ট করেছে। কিন্তু দুটাতেই সহানুভুতির জায়গায় দাঁড়িয়ে লেখা।  কেন, কীসে এই সহানুভুতি?  ভারতের মিডিয়া ও রাজনীতিবিদের এটিচুড হল, ট্রাম্পই তাঁদের ফেবারেট লোক ছিল, বাইডেন নয়। কারণ হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন ভারতকে ছেড়াবেড়া করে দিবেন। তাঁদের মোদীসহ হিন্দুত্ববাদ দুনিয়াজুড়েই নিন্দার বিষয় হয়ে উঠবে তাতে। কাজেই ট্রাম্পই তাঁদের পছন্দের নেতা যে ভারতের মুসলমানকে পিটিয়ে মারলে বা কাশ্মীরে আগুন ছড়িয়ে দিলেও মোদীকে কিছুই বলবেন না। অতএব ৬ জানুয়ারি যদি লাইগা যায়, চাইকি ট্রাম্প যদি আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে আবার ফিরে আসতে পারেন তাহলে তো লাভই লাভ! এই জায়গায় এসে কথিত ভিনসেন্ট আর আনন্দবাজার দুজনের অবস্থান এক জায়গায়। কিন্তু সেজন্য ভারতীয় পতাকা বইবার দরকার কী?
    এইখানে এসে ভিনসেন্ট ধরা খেয়ে গিয়েছেন। তিনি মূলত হিন্দুত্ববাদের লোক এবং জাতিবাদী তাই আমেরিকান ভোটার হয়েও ভারতীয় পতাকা ছাড়া হাটেন না।  তিনি বাদামি, হোয়াইট নন।  তাই তিনিই কিন্তু সাদা সুপ্রিমিস্টদের একদম আসল টার্গেট। কিন্তু মোদী-ট্রাম্প প্রেম তাঁকে  ঐ জমায়েতে নিয়ে গিয়েছে। আবার সাদা সুপ্রিমিস্টদের জমায়েতে গিয়ে তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, সাদা সুপ্রিমিস্টদের ভিতরে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য খুজেছেন! কি তামসা!তারা বর্ণবাদী নয় বলে সাফাই দিয়েছেন।  মানুষের আসলেই বড় অদ্ভুত প্রাণী!  আর ওদিকে আনন্দবাজার আরো তামাশার। তাঁদের হেডলাইন হল, “তাণ্ডবে তেরঙ্গা উড়িয়েও অবিচল“। মানে হোক না “তান্ডবে” কিন্তু তেরঙ্গা ভারতীয় পতাকা তো তুলেছে! তাই এটা নাকি গৌরবের!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৯ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “আগে প্রেসিডেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করুন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    গৌতম দাস

    ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Qz

    _

    চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

    বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

    কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

    আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

    এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

    বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

    এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
    তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

    দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

    না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

    নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

    নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

    এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

    কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

    নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

    ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

    শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

    মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

    তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

    আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

    গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

    আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

    তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

    স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

    তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

    ‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

    গৌতম দাস

    ৩০ জুন ২০১৮, ০০:০১

    https://wp.me/p1sCvy-2sr

     

    থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!

    কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।

    যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে  থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.

    এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে  আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।

    আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
    ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।

    এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
    ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

    সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল।  “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে”  দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।

    সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল,  ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও  বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে।  তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন  হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
    ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে  নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে  ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ  এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।

    চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।

    মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন,  ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।

    মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের  নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট।  তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”।  এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
    এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।

    তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো  মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
    তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা।  সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

    তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে।  আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]।  ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।

    এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।

    আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।

    ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।

    সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই  ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে?  তিনি লিখেছেন,

    Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারতের ‘প্রিয়তম’ বদল

    ভারতের ‘প্রিয়তম’ বদল

    গৌতম দাস

    ২৯ মার্চ ২০১৮,  বৃহষ্পতিবার   ০০:০৩
    updated 30 Mar 2018, 16:13

    https://wp.me/p1sCvy-2qT

     

    আশির দশকের শুরুতে গ্লোবালাইজেশনের মূল প্রবক্তা ও নেতা ছিল আমেরিকা। সে আমাদেরকে নিরন্তর চাপ দিত  আমাদের বাজারকে তাদের জন্য উদাম করে দেওয়ার জন্য। সেই আমেরিকা  নিজেই এখন উলটা অবস্থান নিয়েছে।  ট্রাম্পের আমেরিকা প্রটেকশনিস্ট (protectionist)। এখন কেবল নিজ বাজার রক্ষণশীলতা নিয়ে ব্যস্ত। শিল্পের দুই গুরুত্বপুর্ণ উপাদান স্টিল ও এল্যুমিনিয়াম। আমেরিকায় অন্য দেশের কোন  স্টিল ও এল্যুমিনিয়াম পণ্য প্রবেশ বা আমদানি করতে চাইলে এখন এর উপর অতিরিক্ত সোজা ২৫% শুল্ক দিতে হবে। ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের অনুমান ভিনদেশের এই দুই পণ্য আমেরিকান পণ্য বিক্রিতে বাধা দিচ্ছে বা আমেরিকান শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে।  এই ভিনদেশীয় পণ্যের ভিনদেশ বলতে মূলত চীনা পণ্য। এবং সেই সাথে অনেক ভারতীয় পণ্যও আছে। আমেরিকার নিজের বাণিজ্যস্বার্থ দেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সরকারি কর্তা হলেন U.S. Trade Representative (USTR)। তাঁর ভারতের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল,  আমেরিকায় রপ্তানিতে ভারত তার পণ্যমুল্যে ভর্তুকি দেয় আর এভাবে আমেরিকার চেয়ে ভারতের পণ্যমুল্য সস্তা পড়ে, এতে ভারতের পণ্যমূল্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিয়ে হাজির হয়, ভারতীয় পণ্যের বাজার বড় হয় আর আমেরিকান শ্রমিক কাজ হারায়। এই হল তার দাবি। তাই তিনি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় (WTO) অভিযোগ দায়ের করেছেন।

    এই বিষয়টা নিয়ে এক রিপোর্ট লিখেছে ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা। ঐ রিপোর্টের শুরুর বাক্যটা এরকমঃ “The United States said Wednesday it was taking action at the World Trade Organization against Indian export subsidies as Washington’s intensifying trade offensive moved to encompass two of Asia’s largest economies. এতে শেষের শব্দ কয়টা বেশ তাতপর্যপুর্ণ। লিখেছে encompass two of Asia’s largest economies. মানে “এশিয়ার দুটা সবচেয়ে বড় অর্থনীতিকে ঘিরে এদের বিরুদ্ধে (আমেরিকান) পদক্ষেপ “।  অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্থ ভারত একা নিজের কথা বলছে না। চীনকে সাথে জড়িয়ে নিয়ে দল ভারি করে ‘এশিয়া সেন্টিমেন্ট’ তুলে কথাটা বলার চেষ্টা করছে। অথচ কমপক্ষে  গত তিন বছর ধরে লাগাতর ভারতের মিডিয়া চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে গিয়েছে। চীনের জন্মই যেন ভারতের ক্ষতি করার জন্য এমন আজন্ম শত্রুতার বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে সেই প্রচার চলেছে। আমেরিকার “চীন ঠেকানো” বিদেশনীতির এক নম্বর বাহকের ভুমিকা পালন করে গেছে ভারত। তাহলে হঠাত এই হার্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে কেন?

    গত ২৩ মার্চ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক শিরোনামও এমন আরও এক কাঠি চড়া।  ওই দিনের পত্রিকা শিরোনাম করেছে, ‘চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ, কাঁপছে বিশ্ব অর্থনীতি’। লক্ষ্যণীয় এখানে শিরোনামের বাক্যে ‘ভারত’ শব্দটাই নাই। আছে মূলত তিনটি শব্দ – চীন, আমেরিকা আর বিশ্ব অর্থনীতি। অর্থাৎ প্রকারান্তরে আনন্দবাজার স্বীকার করছে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘কাঁপানোর’ ঘটনা ঘটতে গেলে চীন-আমেরিকাই যথেষ্ট, ভারত এখনো ঘটনা হয়ে উঠতে পারেনি। যদিও পটেনশিয়াল অর্থে ভারতের সম্ভাবনা আছে, জ্বলে উঠার মত বারুদ আছে; কিন্তু পরিপক্ক হয়ে উঠেনি। বরং উল্টো তা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে তাতে সব সম্ভাবনা নষ্টও হতে পারে। কিন্তু এখানে ঘটনাটা আসলে কী? বাণিজ্যযুদ্ধ নাকি সত্যিকার যুদ্ধ?

    ঘটনার আসল নাম যদিও ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’; কিন্তু আনন্দবাজার বারবার একে এ’থেকে পরিস্থিতি আসল যুদ্ধে চলে যাবে কি-না, সে ইঙ্গিত করে কথা বলেছে। যেমন লিখেছে – “বিশ্ব অর্থনীতির দুই মহাশক্তির এই যুদ্ধে তাই কাঁপুনি বাজার ও করপোরেট দুনিয়ায়। হবে না-ইবা কেন? ২০৩৬ সাল পর্যন্ত সাত হাজার বোয়িং বিমানের বরাত দিয়েছে তো শুধু চীনা সংস্থাই। পুরোদস্তুর যুদ্ধ বাধলে, তাই প্রভাব সর্বগ্রাসী হওয়ারই সম্ভাবনা। …কিন্তু তাতে কি যুদ্ধ আটকাবে? উত্তর ট্রাম্প ছাড়া আর একজনই জানেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং”।

    এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট, আনন্দবাজার চীন আর আমেরিকাকেই কেবল ‘মহাশক্তি’ বলছে, নিজ ভারতকে বলছে না। আর আনন্দবাজার সম্ভবত বলতে চাইছে, মোদি পোল বদলে আমেরিকাকে ছেড়ে চীনের পক্ষপুটে আগেই চলে গেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সত্যিকার যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় সেকথা ভেবে, এর আগেই!

    ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ দেখে এক কথায় বললে, ভারত আসলে ভীষণ ভয় পেয়েছে, পাওয়ার কথাই। কারণ মুই কী হনু রে ভারতের যা কিছু সম্ভাবনা তা ট্রাম্পের ঘোষণার এক ঝটকায় শুণ্যে ঝুলবার দশায় পৌছে গিয়েছে। চলতি শতকের শুরু থেকেই ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্টদের প্রশাসনগুলো “চীন ঠেকাও” নীতির কারণে ভারতকে কাছে টানতে, সব সময় তোয়াজ আর নানান বাড়তি সুবিধা দিয়ে গিয়েছিল। আর সেসব সুবিধা খেতে খেতে ভারত ধরে নিয়েছিল এভাবেই বুঝি আরামেই দিন কাটবে। যেন এই তোয়াজ আর ঘুষের সুবিধাদির বাইরে আর কোন বাস্তব দুনিয়া নাই। এই অর্থে ভারতের ঝটকা লেগেছে, ভয় পেয়েছে। সেই ঝটকাতে একেবারে বাস্তবতায় এসে গেছে।  আসলে ভর্তুকি দিয়ে রপ্তানিতে WTO নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও,  ভারতকে “বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র” হিসাবে ঘোষণা করে দিয়ে আমেরিকা ভারতকে নিজ দেশে (ভর্তুকির) রপ্তানি করতে দিত। যদিও ঐ শর্তে বলা ছিল ভারতের মাথা পিছু আয় এক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলে এই বিশেষ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। গত ২০১৫ সালে WTO জানিয়েছিল যে ভারত সে শর্ত পূরণ করে ফেলেছে। কিন্তু দেখেও না দেখায়, আদরের ভারতের জন্য আমেরিকায় রপ্তানি সুবিধা আগের মতই জারি ছিল। সেটাই এখন হঠাত একবারে অতিরিক্ত শুল্কারোপের মুখোমুখি হল। ফলে বাস্তবে এই রপ্তানি বন্ধ হতে হবে।

    ভারত নিজেই পালটা WTO তে অভিযোগ করতে যাবে কেউ কেউ বলছে যদিও তারা সকলে পরিস্কার জানে এটা WTO তে বিচারে উঠামাত্র অভিযোগের রায় আমেরিকার পক্ষে  হয়ে যাবে। তবুও এবার তেলানোর ঢঙ একটা চালু আছে।  মিনমিনে গলায় বলা হচ্ছে আমাদের রপ্তানি তো খুবই কম, আমেরিকার মোট ইস্পাত ও এলুমিনিয়ামের মাত্র দু পার্সেন্ট। মানে তাদেরকে কোন এক অজুহাতে  যেন বিশেষ ছাড় আবার দেয়া হয়, সে চেষ্টাও আছে। যদিও সে সম্ভাবনা প্রায় নাই বললেই চলে।  ট্রাম্পের আগানোর নীতিটা হল, আগের আমেরিকান প্রশাসনগুলোর আমলে যেখানে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের উপরে রাজনৈতিক কারণে সুবিধা দেয়া জারি রাখা হয়েছিল। সেখানে  ট্রাম্প এবার বাণিজ্য স্বার্থকে ফিরে আবার সবার উপরে স্থানে এনে রেখেছে। ফলে ট্রাম্প এবার আর কোন নীতি পরিবর্তন না করলে ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থই সবখানে সবার উপরে স্থান নিয়ে থাকবে, এটা বলে দেয়া যায়। তবে এটা ঠিক যেমন ভারতের সাথে আমেরিকার যেসব বিশেষ খায়খাতির বাড়তি সুবিধা দেয়া ছিল আগের রেওয়াজ অনুসারে সেগুলো সব বাতিল হয়ে গেছে সে কথা কোথাও ঘোষণা দিয়ে বলা হবে না। কিন্তু বাণিজ্যস্বার্থ প্রায়রিটিতে সবার উপরে এক নম্বরে হাজির থাকবে – এই নীতিতে পরিচালিত হবে। তবে এর মানেই ভারত-আমেরিকা সব বিশেষ সম্পর্ক বাতিল নয়, তবে অকেজো হয়ে যাবে। ভারত এই গভীর দিকটা দেখতে পেয়ে গেছে।  একারণে এই ঝটকায় সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সটান চীনের দিকে  ঝুঁকে গেছে। যদিও মন থেকে দুরাশা ক্ষীণ আলো হয়ত সব চলে যায় নাই, এই আশার বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে।

    যেমন ভারতের বাণিজ্য সচিব রীতা তিওতিয়া রিপোর্টারদের বলছেন, “আমেরিকা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এই বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। কিন্তু ভারত তো আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার ফলে আমরা নিশ্চয় আমেরিকার নিরাপত্তা হুমকি নই”।  [India’s commerce secretary Rita Teaotia told reporters last week: “The tariffs have been imposed on security grounds and some of the key trading partners have been excluded from that. “On the basis of India’s strategic partnership with the United States, we are certainly not a security threat to the United States, and an exemption for India on the same grounds should also be available.”]

    আসলে কে যে কখন “নিরাপত্তার হুমকির” অজুহাত তুলে কথা বলে কিন্তু ভিন্ন কী বুঝায়, তা বুঝা মুসকিল। সেটা অবশ্য ভারতের বাণিজ্য সচিবের না জানা থাকার কথা না। আমরা জেনে আসছি দেখছি, “ভারতের নিরাপত্তার জন্য” নিয়মিত আমাদের বর্ডারে বিএসএফের হ্যাপী কিলিং চলছে। যদিও কোন কথিত জঙ্গীও কোন দিন কোন সীমান্তে ধরা পড়ল না বা গুলি খেল না।  ফলে নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতই কী বলতে ঠিক কী বুঝায় “এটা বুঝা মুশকিল”। তবে রীতা কোন অজুহাতে আবার বিশেষ সুবিধা চাইছেন তাতে ভারতকে আমেরিকার ভুয়া টেররিজমের বরকন্দাজ হতে হলেও যে তার বিশেষ আপত্তি নাই – তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সমস্যা হল, ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছে টেররিজম আর আমেরিকার প্রধান হুমকি নয়। মানে আমেরিকা আর বরকন্দাজ কিনবে না।

    ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’
    শুরুতে যেকথা বলছিলাম একদা গ্লোবালাইজেশনের মূল প্রবক্তা ও নেতা আমেরিকা নিজেই এখন উলটা –  ট্রাম্পের আমেরিকা প্রটেকশনিস্ট। এই বাণিজ্যযুদ্ধ মানে কী, কেন? বাণিজ্যযুদ্ধ মানে হল কোনো দেশের নিজ বাজারে অন্যের পণ্য প্রবেশে বাধা দিতে অনেক সময় বিশাল অতিরিক্ত আমদানিশুল্ক আরোপ করে দেয়া হয়, যাতে ঐ পণ্যের আমদানিমূল্য স্থানীয় উৎপাদকদের মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এ থেকে দু’টি রাষ্ট্র একে অপরের পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত আমদানিশুল্ক আরোপের ক্ষতিকর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে যেতে পারে। তবে পাঠকের জন্য একটা সাবধানবাণী হল, দ্রুত জাতিবাদী হয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, ভুল হবে। কারণ বিষয়টা এমন সরল নয় যে, ‘জাতিবাদী বোধে নিজ বাজার সংরক্ষণ’ সবার কাম্য হওয়া উচিত, আর এতেই সব সমস্যার সমাধান হবে। ব্যাপারটা তা নয়।

    যদিও আমাদের অনেকের ধারণা হতে পারে, ‘বাজার সংরক্ষণ’ করলেই সমাধান হয়। সবচেয়ে পুরনো বুদ্ধিটা হল, ‘বাজার সংরক্ষণ’। ‘বাজার সংরক্ষণ’ মানে হল দেশে নিজেরা যা কিছু ভোগ করব, তা সব নিজেরাই বানাব; অন্য দেশকে এখানে মাল বেচতে দেবো না। এই হল এর সারকথা। কথাটা শুনতে খুব ভালো লাগে, জাতিবাদী রক্ত শরীরের ভেতরে বয়ে যাচ্ছে বা দেশপ্রেমিক ভাবের গরম লাগছে টের পাওয়া যায়; কিন্তু এই ভাবনাটি একেবারেই অবাস্তব। কারণ আমাদের বটম লাইন মানে যার নিচে যেতে পারব না তা হল, অন্য দেশকে নিজ দেশে পণ্য রফতানি করতে না দেয়ার অর্থ বুঝতে হবে! এর সোজা মানে এতে নিজেও অন্য কোনো দেশে রফতানি করতে না পারা। কারণ, আমি কাউকে আমার দেশে আমদানি করতে না দিলে সেও তার দেশে আমাকে রফতানি করতে দেবে না। অর্থাৎ একারণে তাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা হল, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য-বিনিময়ের আমদানি-রফতানি চালিয়ে যাওয়া। আর এটি শখ নয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রই এটি করতে বাধ্য। কারণ, অন্তত আমাদের শিল্পের কাঁচামাল ও মেশিনপত্র ইত্যাদি তো আমদানি করতে হবেই। আর সেগুলোই অন্য রাষ্ট্রের রফতানি পণ্য। একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যায়- আসলে আমাদের জন্য ‘বাজার সংরক্ষণ’ বলতে এর অর্থ ও পরিণাম কী- এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হবে গার্মেন্ট রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়া। অনেকটা আশির দশকের আগের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফিরে যাওয়ার মত। আমরা নিজ বাজার সংরক্ষণ করে কাউকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি করতে না দিলে সেসব রাষ্ট্রও নিজ দেশে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি করতে দেবে না। সেটাই স্বাভাবিক।

    তবে একালে  ‘গ্লোবালাইজেশন’ শব্দটার বিপরীত হিসাবে ‘বাজার সংরক্ষণের’ কথাটা এসেছে । গ্লোবালাইজেশনের মূলনেতা আমেরিকা নিজেই এখন ট্রাম্পের আমলে এসে ‘বাজার সংরক্ষণবাদী’ হতে চাচ্ছে। এই গ্লোবালাইজেশনের দুনিয়ার বয়স বেশি নয়, ত্রিশের বেশি বা চল্লিশের কম বছর। বইয়ের ভাষায় আইডিয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন মানে হল, কোনো পণ্য সবচেয়ে দক্ষ (কম শ্রমে) আর ভালো মানের যারা বানাতে পারবে (ফলে কম দামে) সেসব রাষ্ট্র হবে ঐসব পণ্যের রফতানিকারণ,  আর বাদ বাকি সব রাষ্ট্র এদের পণ্য কিনবে।

    এতে সবাইকেই কোন না কোন পণ্য উৎপাদনে দক্ষ ওস্তাদ হতে হবে আর সেই ওস্তাদি দেখিয়ে  গ্লোবাল বাজার নিজ নিজ শেয়ার বাড়িয়ে দখলে নিতে হবে। এতে সবার সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে – অদক্ষতা, খারাপ মানের পণ্যের দায় থেকে সবাই মুক্তি পাবে। আর নিজেও কোনো না কোনো পণ্য উৎপাদনের উচু দক্ষতার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মানে পৌঁছাতে পারবে। সবাইকেই কোনো না কোনো কিছুর মাথা হতে পারতে হবে। হাতির মাথা হতে না পারলে অন্তত মুরগির মাথা হতে হবে। তেমন মাথা হতে পারতে হবে। তবে আগেই বলেছি, এটা আইডিয়াল কথা। কারণ, বাস্তব সব রাষ্ট্রের অন্যের উপর চাপ সৃষ্টি বা প্রভাব সৃষ্টির ক্ষমতা বা ক্ষমতা দেখানোর ক্ষমতা সমান নয়। বাস্তব দুনিয়াটা আইডিয়ালও নয়। জিএসপির নামে আমেরিকা আমাদেরকে তার বাজারে প্রবেশে আটকে রাখতে পারে, অথচ আমরা কোনো আমেরিকান পণ্যের আমাদের দেশে প্রবেশের বাধা দিতে পারি না। এটা বাস্তবতা। ফলে ঠিক বাজার নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা পরিস্থিতি বাজারকে নিজের নিজের পক্ষে নিয়ে যায়। এবার তত্ত্ব কথা শেষে বাস্তব অবস্থায় যাই।

    ট্রাম্প গত ২২ মার্চ, ইস্পাত (২৫% হারে) ও অ্যালুমিনিয়াম (১০% হারে) এই দুই চীনা পণ্যের ওপর  মোট ষাট বিলিয়ন ডলার বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করার ঘোষণা দেন। তিনি ট্যারিফ ছাড়াও আর দু’টি, মোট তিনটি শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কথা বলেন। দ্বিতীয়টা হল আমেরিকায় ‘চীনা কোম্পানির ওপর বিনিয়োগসীমা’ আরোপ করা আর তৃতীয়টা হল, ডব্লিউটিওতে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার নালিশি মামলা করা। এর পাল্টা চীনা প্রতিক্রিয়ায় হয় অবশ্য খুবই কড়া ও খারাপ। আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন “কেউ কঠোর হলে আমরাও কঠোর হয়েই খেলব”।

    তবে প্রথম কথা হল, ভাবা হয় বটে কিন্তু ‘বাড়তি ট্যারিফ আরোপ’ খুব সুবিধার জিনিস না। কারণ শেষ বিচারে এখন আমেরিকান ভোক্তাদেরকেই এই বাড়তি ট্যারিফের অর্থ অপ্রয়োজনে শোধ করতে হবে। ভোক্তাদেরকে ঐ দুই পণ্য ব্যবহার করতে অতিরিক্ত যাট বিলিয়ন ডলার গুনতে হবে। এতে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজার এলোমেলো ও ছোট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এ নিয়ে আমেরিকায় এ পর্যন্ত যতগুলো স্টাডি রিপোর্ট বের হয়েছে কোনোটাই ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলেনি। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট বলছে, সম্ভবত চীন আমেরিকান কৃষিপণ্যের ওপর বিশেষ করে আমেরিকান সয়াবিনের ওপর পাল্টা প্রতিশোধের ট্যারিফ আরোপ করবে। ফলে ইকোনমিস্ট মনে করে ‘চীনের পাল্টাব্যবস্থার কারণে বরং বাজার পরিস্থিতি আরো খারাপ জায়গায় চলে যেতে পারে। এভাবে ‘পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ এটাই বাণিজ্যযুদ্ধের ক্ষতিকারক লজিক’। [What would make matters much worse is Chinese retaliation. ] তবে ট্রাম্পের ঘোষণায়, বাজারে কাঁপাকাঁপি সত্যি সত্যি লেগেছে। দুনিয়াজুড়ে স্টক শেয়ারবাজার উথালপাতাল হয়ে গেছে। বাজার শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা দেখে কিছু নিশ্চয়তা না দেখলে যা থিতু হবে না।

    কিন্তু মজার বিষয় নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইকোনমিস্টসহ থিংকট্যাংকগুলোর ভাষ্য যা প্রকাশিত হয়েছে তাতে কোথাও এই বাণিজ্যযুদ্ধ প্রকৃত যুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে এমন ইঙ্গিত এখনো দেয়া হয়নি কোথাও। তা সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়ার ভাষ্যগুলোতে তারা যেন এই লড়াই বহুদূর যাবে, চাই কী আমেরিকান গ্লোবাল আধিপত্য যেন এই যুদ্ধের মধ্যে শেষ হবে এই জায়গা থেকে পরিস্থিতিকে দেখতে চাইছে। অন্তত মোদী  সরকার ও ভারতীয় মিডিয়া যেন নিশ্চিত হয়ে গেছে ট্রাম্পের আমেরিকা থেকে তাদের কিছু আর পাওয়ার নেই। অথচ আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, এই ট্রাম্পের  নির্বাচনের জয়লাভের পর থেকে মোদী ও বিজেপির কর্মীরা আক্ষরিকভাবেই ট্রাম্পকে পূজা করেছে। কারণ, ট্রাম্প ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলমান ব্যাসিং দিয়ে তার প্রেসিডেন্টশিপ শুরু করেছিল। অথচ এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, অনানুষ্ঠানিকভাবে (মানে কোনো ঘোষণা না দিয়ে) এবং বাস্তবত ভারত -আমেরিকার সম্পর্ক আপাতত শেষ।
    এক কথায় বললে ভারত মেরু বদল করে ফেলেছে। আমেরিকা-ভরসার ভারত এখন চীনা বন্ধুত্বপ্রেমী ভারত হয়ে উঠতে চাইছে।

    মূল কারণ, ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা করেছে তেমনি তিনি দাবি করেছেন যে ভারত আমেরিকায় তার রফতানি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। যাতে সে আমেরিকার নিজের পণ্যের চেয়ে নিজ পণ্য সস্তা হয় বলে বাজার পায়। এই অভিযোগে ট্রাম্প ডব্লিউটিও তে ফরমাল নালিশ করেছেন। ইতোমধ্যে আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থ দেখার প্রতিনিধি (USTR), রবার্ট লাইটহাইজার কংগ্রেসের শুনানিতে বলেছেন, তিনি আশঙ্কা করেন যে ভারত সম্ভবত পাল্টা (ট্যারিফ বসানো ধরনের) প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।

    তাই অনেক আগে থেকেওই মোদী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন।  গত মাসে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের নতুন পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে চীন সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই নতুন এই পরিবর্তনের সূত্রপাত। হিন্দুস্তান টাইমস শিরোনামে বলেছে, এটা এক “low-key visit”  বা চুপচাপ সফর। এই ‘চুপচাপের’ অর্থ বুঝা যাবে যদি আমরা মনে রাখি যে গত চার বছর ধরে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” খেদমতে লেগে থাকা ভারত চীনের বিরুদ্ধে সব সময় এই না সেই করে ফেলবে বলে এক উগ্র-জাতিবাদী মিডিয়া হম্বিতম্বি জারি রাখত। সেই হইচইয়ের বিপরীতে গোখলের এই সফর আসলেই ‘চুপচাপ’ সফর। আর ওই সফরের শেষে বহু কিছু পরিবর্তন হয়ে যায়। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষ এক সক্রিয় ‘ডায়লগ মেকানিজম’ খাড়া করার জন্য কাজ করবে। তারা উভয়পক্ষ তাদের যেসব অবস্থান ভিন্নতাগুলো আছে সেগুলোকে খুবই “সংবেদনশীলতার সাথে ও পারস্পরিক সম্মানের দিকে খেয়াল রেখে ঐকমত্যের অবস্থান গড়ে তোলার জন্য কাজ করবে”। এ ব্যাপারে হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্য হল, শেষের এই কথাগুলো বলা হয়েছে, মালদ্বীপ নিয়ে চীন-ভারতের অবস্থানের ভিন্নতার দিকে তাকিয়ে। লিখেছে [Wang told the Indian foreign secretary in an apparent reference to a host of sensitive issues between India and China, including the current political crisis in the Maldives.]

    তার মানে, ভারতের সাথে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের মোকাবেলাটা ভারত ‘চীনের সাথে মিলে বা কাছে থেকে’ করতে চায়।  ভারত-চীন সম্পর্কের এমন নতুন সুবাতাস বইতেছে। এই মূল ম্যাসেজ ভারত আর লুকোছাপা না করে চার দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ ধরনের আরো অনেক যা অগ্রগতি হয়েছে সেগুলো নিয়েও কথা বলা যায়; কিন্তু সেগুলোর একটা বললেই এখানে বাকি সবকিছু বলা হয়ে যাবে। যেমন, লাগাতার গত তিন বছর ধরে মোদি ও তার উপদেষ্টা দোভাল মিলে আমেরিকাকে খুশি করতে চীনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে, নিজ জঙ্গণকে উগ্র জাতীবাদীতায় তাতিয়ে গিয়েছে। আর  সেকাজে চীনকে কঠিন-সময় উপহার দিতে সবচেয়ে ভাল হাতিয়ার হিসাবে  তিব্বতের দালাইলামাকে নিয়ে প্রতি বছরে কয়েকটা করে অনুষ্ঠান করে গিয়েছিল। আর ভারতের মন্ত্রী আমলারা সব সময় ঘনিষ্ঠভাবে তাতে সম্পৃক্ত থেকেছে। বলা ভালো, এমন কোনো অনুষ্ঠান করা বাদ রাখেনি যাতে চীন খুবই অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু তাতে এবার এক বিরাট ছেদ পড়েছে। মোদি সরকার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।

    ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখছে, বিজয় গোখলের চীন সফরে যাওয়ার আগের দিন মোদীর ক্যাবিনেট সচিব পি এন সিনহাকে গোখলে এক নোট পাঠিয়েছিলেন। চার দিন পরে সেই নোটের ভিত্তিতে  সিনহা এক গোপন সার্কুলার ছাড়েন যাতে তিনি অ্যাড্রেস করেছিলেন – ‘সিনিয়র লিডারেরা’ ও ‘সরকারি ফাংশনারিজ’ বলে। সেখানে নির্দেশ দেয়া হয় আপনারা কেউ দালাইলামার কোন তৎপরতার সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক রাখবেন না, অংশ নিবেন না, এটা ‘কাম্য নয়’। এই পরামর্শ মেনে চলবেন।

    অর্থাৎ মোদি সরকার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। বুঝা গেল ভারত আগের আমেরিকার মন জোগানোর মতো করে এখন চীনেরও মন জোগানোর চেষ্টায় রত হয়েছে। আসলে ভারত এখন জেনে গেছে চীন কী সে সেনসেটিভ! আর চীনের সেনসিটিভিটি নিয়ে ভারত আসলেই সিরিয়াস মনোযোগী!

    ওদিকে সুবীর ভৌমিক ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দিয়ে খেতে চাইছেন। তিনি লিখছেন, “ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের প্রয়োজন ভারতের বিশাল বাজারের। তবে চীন যদি তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে চায়, তবে তা দিল্লিকে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা দেবে”।

    সুবীর আরও জানাচ্ছেন, “বিরোধী কংগ্রেস দলীয় আইনপ্রণেতা ও ভারতীয় পার্লামেন্টারি স্থায়ী কমিটির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান শশী থারুর বলেছেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা উভয় দেশকেই ভারতের দিকে ধাবিত করবে”।  অর্থাৎ কংগ্রেসের শশীথারুরও অনুমান, চীন এখন নানান বাণিজ্য সুবিধার ডালি নিয়ে ভারতের দিকে আসবে। মোদি সম্ভাব্য সেসব সুবিধা খেতেই দালাইলামাকে বলিতে চড়িয়ে দিয়েছেন, মনে হচ্ছে!

    সর্বশেষ আরও আছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রী এখন ভারত সফরে। ভারতে চীনের রপ্তানি ৬০ বিলিয়ন ডলারের আর ভারতের চীনে রপ্তানি মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। তাদের মূল আলোচ্য বিষয় বাণিজ্য ঘাটতি। চীনা বাণিজ্য মন্ত্রী Zhong Shan নিজেই বলছেন, এই বাণিজ্য ঘাটতি ফেলে রাখা যাবে না, এড্রেস করতে হবে। [Trade deficit with India unsustainable, needs to be addressed: China]। ফলে ভারত থেকে মূলত কৃষিপণ্য যেমন রাইসরিষা, তেলবীজ, বাসমতি বা নন-বাসমতি চাল ও চিনি রপ্তানি বিষয়ে কথা চলছে। ব্যাপারটা আমাদের মনযোগ দিয়ে বুঝবার দরকার আছে। ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতিও বিরাট। ফলে এই যুক্তিগুলো আমাদের কাজে লাগতে পারে।

    তবে সারকথা হল, ভারতের প্রিয়তম কে হবে ! ভারত আপাতত সে জায়গা উঠিয়ে নিয়ে এসেছে চীনকে – তা পরিস্কার ভাবে বলে যায়। এর ছাপ প্রভাব বাংলাদেশে কী পড়বে তা বুঝবার আছে। কিন্তু আগে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাবের অর্থ ও দাবি যেটা ছিল যে,   বাংলাদেশ চীনা বিনিয়োগ নিতে পারবে না ও বেল্ট-রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে না  – এর হাল এখন কী হবে? এখনও পর্যন্ত এটা যা ছিল তাই, ভিন্নতার কোন তথ্য নাই। খুব সম্ভবত চীন-ভারত নতুন মাত্রার সম্পর্কের পরেও এটা “এর বাইরের ইস্যু” হিসাবেই  আগের মত অবস্থায় থেকে যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ মার্চ ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে পোল বদল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

    গৌতম দাস
    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার

    https://wp.me/p1sCvy-2qc

    ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন ও উল্লেখযোগ্য বাঁক নেয়া শুরু হয়েছে। একালে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধ বা স্বার্থসংঘাতের ধরন ও প্রকাশ কিছুটা নতুন। কারণ, এখন বিরোধ বা সংঘাত হয় ইস্যুভিত্তিক; মানে একেক ইস্যুতে একেক রকম। অর্থাৎ এক ইস্যুতে চরম বিরোধে সামরিক সংঘাত পর্যন্ত লাগার অবস্থা, অথচ একই সময়ে আরেক ইস্যুতে গলাগলি সহযোগিতা অথবা আধা সহযোগিতা, কিংবা নিউট্রাল অথবা সুপ্ত বিরোধে আগানো ইত্যাদি নানা রূপ এখন দেখা যায়। অবশ্য এর কোনো কোনোটা দীর্ঘ সময় বা স্থায়ীভাবে মুখ্য বিরোধের বিষয় হয়ে থাকে।

    ভারতের পিঠে হাত রেখে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment) পলিসি, একটা ভিত্তি প্রস্তুত করা অর্থে শুরু হয়েছিল মোটা দাগে ২০০৫ সাল থেকে বুশের আমলে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার দুই টার্মের সময়ে সেটা আরো পোক্ত হয়েছিল, অ্যাকশনে গিয়েছিল। আর সেটাই ট্রাম্পের আমলে এঁটে বসা পলিসি হিসেবে এখনো আছে, তবে প্রশাসনের রুটিন গাইডলাইনের মত। মানে অতিরিক্ত বা নতুন কোনো মাত্রা তাতে যোগ হয়নি। তবে ট্রাম্পের অর্থনীতি্তের বৈশিষ্টে – বাজারে কাজ সৃষ্টি, হাতছাড়া হওয়া কাজ ফেরানো অথবা  ‘আমেরিকা ফাস্ট’ ধরনের যেসব কথিত ‘দেশী জোশের’ (অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন) কর্মসূচি আছে তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক। বিশেষ করে আইটি খাতে ভারত বাজার ও চাকরি হারিয়েছে; কিন্তু তা নিয়ে ট্রাম্প কোনো দয়ামায়া দেখাননি, বিকল্প কিছু দিয়ে ক্ষতিপুরণ করেননি । এমনিতেই আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিকে ভারতের দিক থেকে দেখা হয়েছিল এভাবে যে, এর আসল ঠেকা আমেরিকানদের। ফলে আমেরিকা ‘ভালো দাম ধরে দিলে’ তবেই ভারত এতে খেদমত করতে রাজি। ফলে ব্যাপারটা যেন এমন যে – আমেরিকা হল তোয়াজকারি কাজদাতা আর ভারত এক্সিকিউটর বা বাস্তবায়ক। ‘উপযুক্ত মূল্য দাও তো কাজ করে দেবো’ ধরণের এক সম্পর্ক। তবে আবার ভারতের অনুভূতি হল, আমেরিকাকে তার দরকার, গভীরভাবে দরকার। এটা তার অন্তরের অনুভব; অন্তত দু’টি প্রসঙ্গে। এক. আমেরিকা হলো ভারতের জন্য পারফেক্ট অস্ত্রের সরবরাহকারী বা উৎস। কারণ, ভারতের দৃষ্টিতে তার নিজের সমস্যা হচ্ছে, কখনো যদি কোনো সামরিক বিরোধে তাকে জড়াতে হয় তবে সম্ভাব্য সেই যুদ্ধের বিপক্ষ হিসেবে চীনকে দেখতে পায় সে। পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়ে ভারত দেখে চীনকে; কারণ, পাকিস্তান বিষয়টা ভারত নিজেই ম্যানেজ করতে পারবে বলে মনে করে। ওদিকে আবার চীন-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে আমদানি-রপ্তানি হয় মোট প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে ৯০ শতাংশই চীনা রফতানি। এছাড়াও ভারতে চীনা বিনিয়োগ আছে। কিন্তু তাই বলে, ভারতে চীনা অস্ত্র আমদানি এক অসম্ভব কল্পনা। আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হল, যে পাড়ায় আপনি থাকেন সেখানে সম্ভাব্য বিরোধের বিষয় থাকলে আপনি আগেই পাড়ার প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সালিস বৈঠকের সাধারণত মধ্যস্থতাকারী যে হয় তাঁর সাথে আগাম যোগাযোগ রাখা দরকার মনে করেন। ভারতের কাছে আমেরিকার গভীর প্রয়োজন মূলত এখানেই।

    সম্প্রতি সম্ভবত ভারত মত ও নীতি বদলিয়েছে বা বদলাচ্ছে। মানে, আমেরিকা যেসব সুযোগ সুবিধা ভারতকে দেয়ার জন্য কমিটেড, যেসব বাড়তি বা ফাও সুবিধা ভারত পায়, সে বিষয়টি ভারত নতুন করে সম্ভবত মূল্যায়ন করেছে। অনুমান হলো, ভারত চেষ্টা করলে আরো বেশি মূল্য আদায় করতে পারে। ফলে সে আমেরিকার উদ্দেশ্যে নাক উঁচা করেছে।

    ঘটনা শুরু হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের’ বার্ষিক সভায়। এ সভা মূলত অর্থনীতিতে গ্লোবালাইজেশনের ইস্যুতে সুবিধা-অসুবিধা বা বাধা নিয়ে এক ধরনের সমন্বয় সভা। ফলে এর মূল ফোকাস হল, গ্লোবালাইজেশন। ওদিকে, গত বছর ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে শপথ নেয়ার সময় থেকেই অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের ধারণায় তথাকথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী নীতির কথা বলতে শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের শুরুর দিকের এর সপক্ষে যে মূল নেতা ছিল সেই আমেরিকা এখন ট্রাম্পের আমলে এসে পারুক আর না-ই পারুক ‘উগ্র’ জাতিবাদী এবং নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী নীতির স্লোগান তুলেছিল। প্রতিবার এই ফোরামের সভা হয় জানুয়ারির শেষে, মানে গত বছরও তা হয়েছিল ট্রাম্পের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারির পরে; তবে তা হলেও ট্রাম্প গতবার এই সভায় নিজে যোগ দেননি। ফলে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ সারা ইউরোপ শান দিয়ে বসে ছিল ট্রাম্পকে ‘ধোলাই দিতে’, কিন্তু পারেনি। একটা জাতিবাদী ভিত্তিক গ্লোবাল অর্থনীতিকে গ্লোবালাইজেশনে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। কিন্তু একই গ্লোবে বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিগুলোকে একবার একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীলভাবে গড়ে তুলে এবং বাজার শেয়ারের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে সাজিয়ে দিয়ে ফেললে (যাকে আমরা গ্লোবালাইজেশন বলি) তাতে এভাবে ঢুকে যাওয়ার পরে তাকে ফিরিয়ে আবার আগের জায়গায় আনা কঠিন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। আমেরিকার উদ্যোগে সাড়া দিয়েই ইউরোপ একসাথে গ্লোবালাইজেশনের পথে এসেছিল। কারণ, গ্লোবালাইজেশনে একসাথেই যেতে হয়, একসাথে করার বিষয় এটা। এখন একা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী ও সংরক্ষণবাদী নীতি আওড়ানোর ফলে চীন ও ইউরোপের ক্ষোভ বেশি; এমনকি ভারতেরও। তাই এবারই প্রথম ট্রাম্পকে পাওয়ার পর তাকে কঠোর সমালোচনার সামনে পড়তে হয়। আর এবার মোদি সেখানে ছিলেন প্রথম বক্তা। তিনি নাম না ধরে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির কঠিন সমালোচনা করেছেন। [“Instead of globalization, the power of protectionism is putting its head up,” ] জলবায়ু-পরিবেশ ইস্যু থেকে দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যও আমেরিকার সমালোচনা করেন তিনি। এমনকি প্রটেকশনিজম (সংরক্ষণবাদ) ‘সন্ত্রাসবাদের মতোই ভয়ঙ্কর’ (as dangerous as terrorism) বলে এক বাণী দেন তিনি। আনন্দবাজার লিখেছে,  “ট্রাম্পের আমলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে ধাক্কা খাচ্ছে ভারত-সহ একাধিক দেশ”। এরপরে এমনকি টিট ফর টেট হিসাবে বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করার কথা, এভাবে ট্রাম্পও পালটা পাটকেল মারার কথা ভাবছে বলে ভারতের আর এক টিভি, এনডিটিভি জানাচ্ছে।  

    ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, এটা মূলত দুনিয়ার প্রভাবশালী সরকার এবং ব্যবসায় প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের মিলে এক ‘প্রাইভেট-পাবলিক জমায়েত’। ফলে সব দেশের সরকারপ্রধান প্রতিবার নিজে এ ফোরামে যান না। তবে কেউ নিজেকে ব্যবসাবান্ধব বা ব্যবসা-উপযোগী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটা একটা ভাল ফোরাম মনে করা হয়। এ বিচারে গতবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম গিয়েছিলেন। অনেকটা আমেরিকার কাছাকাছি গ্লোবাল লিডার হয়েছে চীন, যেন সেটা জানান দিতে। আর এবার মোদি গেলেন ভারত নেতা হয়েছে; না হলেও অনেক দূর এগিয়েছে, এটা জানাতে। কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠা এক ঘটনা হল, ভারতের ‘গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে দাঁড়ানো ও আমেরিকার সমালোচনাকে’ চীনের পররাষ্ট্র বিভাগের রেগুলার ব্রিফিংয়ে প্রকাশ্যে ও  সরাসরি প্রশংসা করা হয়। এমনকি চীনা পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের প্রথম পেজে মোদির ছবিসহ এ প্রসঙ্গে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ এ ইস্যুতে আমেরিকা হলো পুরনো নেতা; কিন্তু সূর্যের মতো ক্রমেই ডুবে যাওয়া বিরাট শক্তি। এর বিপরীতে চীন নতুন নেতা, ভারতও উদীয়মান। এ বিচারে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ভারতের অভিন্ন অবস্থান আকাঙ্খিত, এমনই হওয়ার কথা অন্তত ইকোনমিক ইস্যুতে। কিন্তু তা না হয়ে ভারত দুই নৌকায় পা দিয়ে গাছের আর তলার দুই দিকে খামচা দিয়ে খাচ্ছে; যেন দুনিয়ার কোনো কিছুতে তার দায় নেই। আবার ন্যূনতম ন্যায়নীতি বইবার মতো কাঁধই তার তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ তার কাছে এতই তুচ্ছ যে, তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে সে বেপরোয়া, কোনো কিছুতে যার কমিটমেন্ট নেই। আর ওদিকে চীন খামাখা ধর্মবিরোধিতা করে বেড়াচ্ছে আর মানুষের ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাকেই চীন আমল করার যোগ্য হয়নি বলে, আমাদের ধারণা দিচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক মুল্যবোধের বিষয়ে  গ্লোবাল অর্জনগুলো রক্ষার ও তা বয়ে নিবার জন্য অন্তত মুখে সমর্থন করার যোগ্য, দুনিয়ার আগামী সম্ভাব্য নেতৃত্ব এরা কেউ নয়। এমনই এক অবস্থায় সমগ্র দুনিয়া যেন ঝুলে আছে বা জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে।

    এ দিকে আরেক ঘটনা হল – অস্থির সময়ে ‘পাগলা’ ট্রাম্পের আড়ালে আমেরিকার ড্রাইভিং সিটে ক্রমেই সাবেক আর সিটিং জেনারেলরা সংগঠিত হয়ে উঠছেন। ‘পাগলা’ ট্রাম্পকে সামনে রেখে কোর আমেরিকান স্বার্থ ধরে রাখা আর নানাভাবে দুনিয়ার নেতৃত্বে আমেরিকার টিকে থাকা এবং একে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। বুড়া ঘোড়াকে চাবকে আবার খাড়া করার চেষ্টা বলা যায় এটাকে। তেমনি এক ঘটনার ক্ষেত্র হল, থাইল্যান্ড। অর্থনৈতিক দিক থেকে থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে অগ্রসর এবং এর সেনাবাহিনী আমেরিকার হাতে তৈরি। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আমেরিকার সাথে উঠাবসা করে জন্ম নেয়া। স্থানীয় থাই এলিটদের পছন্দের গন্তব্য ইউরোপের কোনো শহর নয়, আমেরিকা। রাজধানী ব্যাঙ্কক, এর কালচারাল মডেল হচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু ওয়াশিংটনের আজকের দুরবস্থা দেখে সেই ব্যাঙ্কক আজ মুখ ফিরিয়েছে, তাদের সম্পর্ক ঢলে পড়া ও স্থবির হয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি ব্যাঙ্ককের সামরিক শাসনের ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছিল আমেরিকা, এটাও কারণ। সেই স্থবিরতা ঘুচাতে বহুদিন পরে আমেরিকান মেরিনের জয়েন্ট চিফ জেনারেল ডানফোর্ড ব্যাংকক হাজির হয়েছেন। উদ্দেশ্য, পুরনো সামরিক সম্পর্কসহ রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও চাঙ্গা করা। কিন্তু তিনি প্বরথমেই কথা শুরু করেছেন এভাবে বলে, ‘আমেরিকা কোনো পড়তি শক্তি নয়’ (not a declining power)। অর্থাৎ জেনারেলের মনে আসলে ভয় ঢুকেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। তবে বাস্তবতায় কে না ভয় পায়? ওবামাও ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ড সফরের সময় পাবলিক মিটিংয়ে বলেছিলেন, ‘দুনিয়াকে আমেরিকাই আরো বহুদিন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে, চিন্তার কিছু নেই।’

    আর এক ঘটনা হল, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ভারত সফর করে গেলেন। যখন ট্র্রাম্পের আমেরিকা ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি (এটা আমেরিকা-ইরান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নয়, বরং পি৫+১; অর্থাৎ এর সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্য ও জার্মানি মিলে একত্রে করা চুক্তি, Nuclear Deal) বাতিল করে আবার কঠোর অবরোধ আরোপ করতে চাইছে। সেটা মূলত ইসরাইল ও সৌদি আরবের চাপ ও লবিতে। এর সারকথায় বলে দেখা যাচ্ছে, চীন ঠেকানো ইস্যুতে আমেরিকার দেয়া সুবিধা সব আদায় করে নিলেও ভারত ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনুসরণ করতে পারছে না। অবশ্য ইরান আবার চীনের সাথেও বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তবে তাতে ভারত অথবা ইরান এদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়তে কারো কোন সমস্যা নেই। এর প্রধান কারণ হলো পাকিস্তানের বিকল্প হিসেবে, ইরান হয়ে আফগানিস্তান ঢোকার নতুন এক সড়ক-ট্রানজিট রুট তৈরি করেছে ওই জোট। আনুষ্ঠানিকভাবে এটা ভারত, পাকিস্তানসহ সাত রাষ্ট্রীয় ‘আশগাবাত চুক্তি’ নামে পরিচিত; আর আশগাবাত বা আশাকাবাদ (Ashgabat)  তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী এবং তা ইরানি সমুদ্রসীমায় চাবাহার নতুন পোর্টকে কেন্দ্র করে গড় উঠেছে। ফলে স্বভাবতই ইরান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট হাব’ হবে। বলা বাহুল্য এটা আমেরিকার জন্য অস্বস্তিকর।

    এম ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তার ভাষায়, এটা ভারতের আমেরিকান নীতিকে অমান্য ও উপেক্ষা করা। শুধু এটুকুই নয়, ভারতের তৃতীয় তেল সরবরাহকারী দেশ এখন ইরান। এ ছাড়া পুতিনের রাশিয়ার এক কোম্পানি ইরান থেকে ইন্ডিয়া পর্যন্ত  এক গ্যাস পাইপলাইনের প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে। সব মিলিয়ে আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারত নতুন ‘অরবিট’ তৈরি করছে ও যোগ দিচ্ছে। তবে আমেরিকার জন্য ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক’ বিষয় এখানে আর একটা আছে; তা হলো- রাশিয়া, ইরান ও ইন্ডিয়া এরা মিলে তৈরি সব প্রকল্পে পরস্পরের দেনা-পাওনার মুদ্রা হিসাবে তা আমেরিকান ডলারে না করে নিজস্ব মুদ্রায় করবে। বলা বাহুল্য, এটা হবে আমেরিকার জন্য বিরাট ‘বড় ঘুষি’ খাওয়া।

    আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ নীতিতে ভারতের আবদার মেটাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়েছে – এটাই হল মূল কথা। কিন্তু এ দিকে যত দিন যাচ্ছে, নানান ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থজোট যত তৈরি হচ্ছে তাতে আমেরিকার বা ভারতের স্বার্থ বেশির ভাগ সময় একই লাইনে মিলছে না বা থাকছে না। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ, আমেরিকান স্বার্থের মুখোমুখি বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যু। আমেরিকা মিয়ানমার সরকারকে জেনোসাইডের জন্য ধমকাচ্ছে আর ভারত মিয়ানমারের জেনোসাইডের পক্ষে সাফাই বয়ান দিচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারতের ও আমেরিকান স্বার্থ এক জায়গায় থাকছে না।

    তবে এ কথা ঠিক, ভারতের ও আমেরিকার স্বার্থবিরোধ প্রকট হয়ে হাজির করার পেছনে কিছু অংশের অবদান ভারত;  আমেরিকার কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করার জন্য। এর অর্থ, এখানে আমেরিকানদের ঠেকা বেশি, তাই সেই সুযোগে ভারত বেশি মূল্য আদায় করতে চাইছে। আর বাকি অংশ আমেরিকা বা ভারত না চাইলেও সেসব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ বিরোধী হয়ে উঠে আসছে, সেটা মৌলিকভাবেই পরস্পরবিরোধী। এই স্বার্থবিরোধ কি তাহলে কোন চূড়ায় বা চরমে পৌঁছেছে? বিশেষ করে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলছেন, ‘টেররিজম নয়; আমাদের প্রধান হুমকি চীন ও রাশিয়া’। ফলে ভারত-আমেরিকান ‘সহযোগিতা’র বেলায় যে অভিন্ন জায়গা বের করা হয়েছিল তা কি এখন বন্ধ বা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে? তাহলে আমাদের কি মুক্তি মিলবে? এ দিকে সতর্ক চোখ রাখতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

    জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

    গৌতম দাস
    ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:২৩

    https://wp.me/p1sCvy-2pc

    গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ অর্থাৎ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ থেকে এক ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে স্বীকৃতি দেয়ার সময় হয়েছে।’ কিন্তু কেন তিনি এমন বললেন? এখনইবা বললেন কেন? এছাড়া, ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে দুনিয়ার কোথায় কোথায় কী কী ইস্যুতে এর ইতি অথবা নেতি প্রভাব পড়বে? আর তাতে আমরা বাংলাদেশীরা কোথায় কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবো? সবচেয়ে বড় কথা ন্যায়-অন্যায়ের আলোকে এতে অন্যায়টা কী করছেন ট্রাম্প? এবিষয়গুলো নিয়ে বুঝাবুঝি করতে হবে আমাদের।

    ওদিকে আর এক প্রশ্ন আমাদের মনে জাগা স্বাভাবিক যে ইসরাইলের জন্মের (১৪ মে ১৯৪৮) প্রায় ৭০ বছর পরে এসে এখন ট্রাম্পকে কেন স্বীকৃতির ঘোষণা দিতে হচ্ছে কোনটা ইসরাইলের রাজধানী? কারণ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুসারে, জেরুসালেম একটা অকুপায়েড বা অবৈধ দখলি এলাকা। অথবা আরও বলা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকেই জেরুজালেম কোন রাষ্ট্রের অংশ হবে সেই বিচারে এটা অমীমাংসিত এলাকা, ফলে কারও না।  জাতিসংঘের আইনি ভাষায় “corpus separatum”। যার অর্থ, জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন। তাই আইনত এটা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে থাকা এলাকা । ১৯৪৭ সালের জাতিসঙ্ঘের ১৮১ নম্বর রেজুলেশন অনুসারে জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন (corpus separatum — a separate entity under international jurisdiction)। এই রেজুলেশন বা গৃহিত প্রস্তাব অনুসারে – ওর PART III অংশে,  ‘City of Jerusalem’ শিরোনামের অধীনে উপশিরোনাম হল – A. SPECIAL REGIME।
    সেখানে লেখা আছে,
    “The City of Jerusalem shall be established as a corpus separatum under a special international regime and shall be administered by the United Nations. The Trusteeship Council shall be designated to discharge the responsibilities of the Administering Authority on behalf of the United Nations.” ….  দেখুন A. SPECIAL REGIME, City of Jerusalem, PART III.

    এ ছাড়া পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে, বিশেষ করে যেটাকে পূর্ব জেরুসালেম বলা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেঃ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেম পুরো অংশ (ঐ যুদ্ধের আগে পর্যন্ত সেটা জর্ডানের অংশ ছিল) দখল করে নেয়। তাই এ নিয়ে পরে জাতিসঙ্ঘের পাস করা প্রস্তাব হল, এটা দখল করা এলাকা। ইসরাইল তার সংসদে পুরো জেরুসালেমকে নিজের রাষ্ট্রের অংশ-ভূমি বলে দেখিয়েছে। এর বিরুদ্ধেই জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশনটা হয়েছিল। কারণ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইসরাইল তাঁর সংসদ, প্রেসিডেন্ট হাউজ, প্রধানমন্ত্রীর অফিসসহ বহু কিছু জেরুসালেমে বানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে  জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ছিল – জাতিসংঘের ঐ রেজুলেশন, নম্বর ৪৭৮, ২০ আগষ্ট ১৯৮০।   ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ঐ সিদ্ধান্তে, বিদেশী সব মিশন বা অ্যাম্বাসির অফিস  জেরুসালেমের বাইরে নিতে সব সদস্য রাষ্ট্রকে বলা হয়।

    1. Decides not to recognize the “basic law” and
      such other actions by Israel that, as a result of this law,
      seek to alter the character and status of Jerusalem and
      calls upon:
      (a) All Member States to accept this decision;
      (b) Those States that have established diplomatic
      missions at Jerusalem to withdraw such missions from
      the Holy City;

    এখানে “বেসিক ল” মানে হল ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে, ঐ “বেসিক ল” বলে পুরা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখল করা এলাকা বলে জায়েজ করা হয়েছে। তাই জাতিসংঘ গৃহিত ঐ প্রস্তাবে “বেসিক ল” এর ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় নাই বলা হচ্ছে। তাই 5(b) অনুচ্ছেদে, সকল সদস্য রাষ্ট্রকে জেরুজালেমে কেউ ইতোমধ্যে অফিস খুলে থেকে থাকলে তা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

    বাস্তবে তাই এই কারণেই ইসরাইলে অন্য সব রাষ্ট্রের অ্যাম্বাসি জেরুসালেম থেকে ৬৫ কিমি দূরে তেল আবিবে স্থাপিত। অর্থাৎ আমেরিকাসহ কোনো রাষ্ট্রই ইসরাইলের দখলি এলাকায় নিজের অফিস খুলে নিজেকে বিতর্কিত করতে চায়নি।

    এবার সর্বশেষে,  ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রস্তাব আনা হয়েছিল। স্বভাবতই ভেটোদানের ক্ষমতাবান সদস্য হিসেবে আমেরিকার সেই প্রস্তাবকে ভেটো দিয়ে স্থগিত করে দেয়। ওই ভেটো দেয়ার আগে জাতিসঙ্ঘে আমেরিকান স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি নিম্রতা হ্যালির (হা, তিনি মাইগ্রেটেড ভারতীয় শিখ পরিবারের সন্তান, শিখ অরিজিন আমেরিকান ও রিপাবলিকান) দেয়া বক্তৃতায় বলেন, “সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা নিজের অ্যাম্বাসি কোথায় বানাবে, আদৌ বানাবে কিনা তা নিজে ঠিক করবে। ফলে যারা প্রস্তাব এনেছিল তারা আমেরিকাকে অপমান করতেই এই প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করেছিল”। নিকির এই মন্তব্য শুনে পাঠকেরা অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন যে, হ্যাঁ, তাই তো আমেরিকান সাবভৌমত্বের কথা তো ঠিক মনে হচ্ছে। না বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। কারণ জেরুসালেম হলো অন্যের ভূমি, যা ইসরাইলের দখল করা। কারো কোনো দখলি ভূমিতে অ্যাম্বাসি খোলার অধিকার আমেরিকা বা ইসরাইলেরও নেই। আরো বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হলো ওটা দখলি ভূমি, corpus separatum। অর্থাৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ইসরাইল ও আমেরিকার এমন বহু সিদ্ধান্ত আছে। সিএনএনকে দেয়া ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিকির সাক্ষাতকার দেখুন, কিছু নমুনা পাবেন এই ক্লিপে। সে জাতিসংঘের কোন রেজুলেশন যে আছে তা লুকিয়ে কথা বলে যাচ্ছে।  তাহলে মূলকথা হলো জর্ডান-ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে নিয়ে তা নিজের (‘বেসিক ল’) বলে দাবি করে সেখানে ইসরাইল তার রাজধানী গড়েছে। আর ওদিকে এবার কথা ঘুরিয়ে বলছে, ইসরাইলের রাজধানী কোথায় হবে এটা ঠিক করার অধিকার ইসরাইলের সার্বভৌম অধিকার। হ্যাঁ, অবশ্যই তার অধিকার যদি সেটা কোনো দখলি জমিতে না হয়।

    ঠিক একই মিথ্যা যুক্তিতে জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশন অমান্য করে, ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় একটি আইন পাস হয়েছিল। তার নাম ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’, এই পিডিএফ লিঙ্ক থেকে আগ্রহিরা তা নামিয়ে নিতে পারেন। এই আইন আমেরিকান সিনেট ও সংসদে ১৯৯৫ সালে পাস হয়ে ও পরে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হয়েছিল। ওই আইনের সেকশন দুইয়ের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে জেরুসালেমের দুই অংশ এক হয়ে যায়।’ [(6) In 1967, the city of Jerusalem was reunited during the conflict known as the Six Day War.]

    কিন্তু কীভাবে এটা ঘটেছিল? দুই অংশ নিজেরাই হেঁটে হেঁটে দুই বোনের মিলনের মত? নাকি যুদ্ধে মানুষ মেরে, খেদিয়ে দখল করে নেয়াতে? এ কথা সেখানে বলা নেই। এই আইনটি হল (মূল কথায় বললে), আমেরিকা যেন ১৯৯৯ সালের ৩১ মের মধ্যে ইসরাইলে তাদের অ্যাম্বাসি তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নেয় সেজন্য আমেরিকার নির্বাহী রাষ্ট্রপতিকে আইনগত বাধ্যবাধকতায় আনার জন্য প্রণীত আইন এটা। তবে একটি ছাড় আছে সেখানে যে, প্রেসিডেন্ট এটা করতে ব্যর্থ হতে পারবেন কেবল এক শর্তে; যদি তিনি আগাম কংগ্রেসকে জানান যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণে তিনি এটা নির্ধারিত সময়ে করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর এভাবে তিনি ছয় মাস ছয় করে বার বার সময় বাড়িয়ে চলতেই থাকতে পারবেন। গত ১৯৯৫ সালে বিল ক্লিনটনের আমলে এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ক্লিনটনের পরের ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকান উভয় প্রেসিডেন্টই ওই আইনের সেকশন সাত-এর ‘প্রেসিডেন্টের ওয়েভার’ বা ছাড় [SEC. 7. PRESIDENTIAL WAIVER.] এর সুবিধা নিয়ে ওই আইন বাস্তবায়ন না করে ছাড় ছয় মাস করে করে বাড়িয়েই চলে আসছেন। এবার ট্রাম্প বলছেন তিনি ছাড় না নিয়ে আইনটা সরাসরি বাস্তবায়ন করবেন, এই হল ঘটনা।

    ১৯৪৮ সালে ইসরাইল জন্মের সময় থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল তার স্বপক্ষে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। সেটা ইসরায়েলের কাছে একেবারে “না হলে নয় এর মতো প্রয়োজনীয়” ছিল, ফলে কঠিন বিষয়। কিন্তু তা সফল হয়েছিল আমেরিকার সমর্থনে। সেই থেকে আমেরিকান জনমত নিজের পক্ষে রাখা হয়ে আছে ইসরাইলের ধ্যানজ্ঞান। ট্রাম্পের তাই নিজে কেন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন এর স্বপক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছেন এভাবে যে, আগের প্রেসিডেন্টরা সবাই নির্বাচনের সময় ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন, তাই তিনি হচ্ছেন সেই সাচ্চা বীর যে এটা বাস্তবায়ন করছেন।

    স্বভাবতই ট্রাম্পের এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া হয়েছে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে। জাতিসঙ্ঘের ভেতরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে, নিরাপত্তা কাউন্সিলের আমেরিকাবিরোধী প্রস্তাবে আমেরিকা ভেটো দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারলেও এরপর প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শোচনীয়ভাবে আমেরিকা হেরে যায়। আমেরিকার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে মানা- এটা ‘null and void’ বলে বাতিল করে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে ভোটাভুটি নেয়া হয়। তোলা এই প্রস্তাবের পক্ষে ১২৮ রাষ্ট্র ভোট দিয়ে প্রস্তাবকে জিতিয়ে দেয়। ওদিকে মাত্র ০৯ রাষ্ট্র বিপক্ষে আর ৩৫ রাষ্ট্র বিরত থেকে ভোটদান সম্পন্ন করেছিল। [The United Nations has voted by a huge majority to declare a unilateral US recognition of Jerusalem as Israel’s capital “null and void”.]

    এখানে নিউ ইয়র্ক টাইমস ব্যতিক্রমি আমেরিকান মিডিয়া হিসাবে একটা সততার কাজ করেছে। তাঁর এক বিশেষ রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত জেরুজালেম নিয়ে জাতিসংঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করেছে” [Trump’s Move Departs From U.N. Resolutions on Jerusalem]। এই রিপোর্টের তাতপর্য হল, সমস্ত আমেরিকান মিডিয়া এবং প্রশাসন যখন জেরুজালেম যে দখলি এলাকা সেকথা লুকিয়ে যাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের রেজুলেশনের অস্তিত্ব লুকিয়ে কথা বলে যাছে; সেখানে ট্রাম্পের ঘোষণার পরের দিন নিউ ইয়র্ক টাইমস  ০৭ ডিসেম্বরে এসে সরাসরি এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এখানে আমেরিকা জাতিসংঘের মোট নয়টা রেজুলেশন (UN Resolution UN Resolution 1073 Sep 1996, UN Resolution 1322 Oct 2000, UN Resolution 1397 Mar 2002, UN Resolution 181, UN Resolution 2334 Dec 2016, UN Resolution 242 Nov. 1967, UN Resolution 252 May 1968, UN Resolution 465 Mar 1980, UN Resolution 478 Aug 1980, UN Resolution 672 Oct 1990,) ভঙ্গ করেছে এর একটা তালিকা করে দেয়া হয়েছে।

    ওদিকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে, তাঁর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পক্ষে ইউরোপের বন্ধুদের মন পাওয়ার চেষ্টায় সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন সফরে বের হয়ে একেবারে খালি হাতে ফিরে আসেন। কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্র ট্রাম্পকে সমর্থন করতে রাজি হয়নি। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও কোনো সমর্থক রাষ্ট্র পাওয়া যায়নি। সারাক্ষণ ইরান-ভীতিতে থাকা সৌদি আরব ও তার বন্ধুরা ইসরাইলকে বাস্তবে কাছের ও নিজের মনে করলেও, সৌদি আরব বা তার বন্ধুরা কেউই এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ায়নি। বরং সৌদি আরবও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘নিন্দা করে গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের এই দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছিল সাধারণ পরিষদের ভোটেও। বলা যায় সারা দুনিয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেয়ে প্রস্তাব নিয়েছে।  নিকি হ্যালির মতো রিপাবলিকান জন বোল্টনও বুশের আমলে (২০০৫-৬) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। যে কোন ভোটাভুটিতে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে আমেরিকার পক্ষে রাখার ও পক্ষে ভোট নেয়ার আবিষ্কারক তিনি। এবার নিকি হ্যালিও সেই জন বোল্টনের পুরনো পথে নেমেছেন। তবে এবার এর বিশেষত্ব হল, এটা খুবই ন্যাংটা। কারণ তিনি প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন যেটা বোল্টন কখনো করেননি। অথচ নিকি বলেছেন, ভোট না দিলে এইড বন্ধ হয়ে যাবে, দেখে নেবো ইত্যাদি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি, উল্টো আমেরিকার ইজ্জত গেছে। নিকি আসলে ভুলে গেছেন এটা আর সেই আমেরিকার রুস্তমির দিন নয়, তা শেষ। তাই এক ইসরাইল ছাড়া আমেরিকার পক্ষে বাস্তবে ন্যূনতম গুরুত্ব দেবার মতো কোনো রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি।

    ট্রাম্পের ইউরোপের সমর্থন না পাওয়ার মূল কারণ কী? আমেরিকা জাতিসংঘ রেজুলেশন অমান্য করে  ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’ আইন করেছে।  বলা যায় সেটা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পুর্ব জেরুজালেমকে অবৈধ ও গায়ের জোরে জমিদখলকে স্বীকৃতি দিয়ে এর উপর দাঁড়িয়ে বানানো। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান জাতিসঙ্ঘের রেকর্ড অনুসরণ করে নেয়া  অবস্থান। শুধু তাই না এটা যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তাও ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক পত্র দিয়ে জানিয়েছে বহু আগেই ।  সে মোতাবেক, ১৯৯৯ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক রেজুলেশন হলো যে জেরুসালেম corpus separatum।

    এছাড়া এদিকে ইউরোপের বিবেচনায় এখন ট্রাম্পের এই প্রস্তাব কোনো জরুরি অথবা রাজনৈতিক লাভালাভের ইস্যু ছিল না। এ ছাড়া, বেশির ভাগ ইউরোপীয় বন্ধুরা বলছেন, তারা মনে করছে এতে আমেরিকার ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে, যেটা হবে এক কাউন্টার প্রডাকটিভ কাজ। আসলে বেশির ভাগ রাষ্ট্রই “দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়ে ফেলা” ভুল হবে এই যুক্তিকেই বেশি সামনে আনছেন। কারণ এই অবস্থানটা আসলে ‘জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী কিনা’ এই বিতর্কে কোনো অবস্থান না নিয়ে থাকার অবস্থান। এ ছাড়াও এতে জেরুসালেম ইস্যুটা আলোচনা নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরসিত হোক, এই আকাঙ্খার অবস্থানে থাকা যায়। তবে সার কথা, আমেরিকা এখন পুরাপুরি একঘরে হয়ে গেছে, সেটা আনন্দবাজারেরও নজরে এসেছে।

    তাহলে ট্রাম্প এমন অবস্থান তিনি নিজেকে নিয়ে গেলেন কেন? যেখানে এমনকি এটাও এখন জানা যাচ্ছে যে, এই সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্পের মতামতদানের বৈঠকে প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্রসহ সব উপদেষ্টারা সবাই তাকে না করেছিলেন। তিনি কারও কথা শোনেননি। এ অবস্থার একটি ব্যাখ্যা বা উত্তর দিয়েছে, আমেরিকার শতবর্ষী পুরনো এক গবেষণা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান – ব্রুকিংস (Brookings)। তাদের এক রিপোর্ট এর শিরোনাম হল, মূলত খ্রিষ্টান ইভানজেলিকদের খুশি করতে বা তাদের বিজয়ী করতে ট্রাম্প এটা করেছেন। [Trump’s Jerusalem decision is a victory for Evangelical politics] কথাটা ব্যাখ্যা করতে ‘খ্রিষ্টান-জায়নিস্ট’ বলে একটা টার্ম এনেছে ব্রুকিংস। [লিখেছে, in particular the views of Christian Zionists, who believe that the return of the Jews to the Holy Land is in accordance with God’s will, and biblical prophecy.] এছাড়া, এ প্রসঙ্গে তারা বেশ কিছু জনমত সার্ভেও করেছে, যার হদিস আছে ওদের রিপোর্টে সেখানে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

    ট্রাম্পের আমেরিকা কী আসলে সন্ত্রাস-দমন চায়?
    সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ট্রাম্পের এই ‘ইসরাইলি’ সিদ্ধান্ত – বলতে গেলে আসলে সারা পশ্চিমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১৭ বছর ধরে পশ্চিমের নাম্বার ওয়ান গ্লোবাল কর্মসূচি হল, ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাস-দমন। কাউকে সন্ত্রাসী মনে হলে পশ্চিম তাকে অস্তিত্বহীন করে দিতেও দ্বিধাহীন থাকে। এদিকে এটা বুঝতে কাউকে গবেষকও হতে হয় না যে, পশ্চিম যাকে ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বলছে এই ফেনোমেনা আসলে এই বেইনসাফির প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। যেখানে হয়ত কাম্য ধরণের প্রতিক্রিয়া এটা নয়। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া  হাজির হবার পিছনে সবচেয়ে বড় এক কারণ হল, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, ভূমি দখল, অবাধ্য ইসরাইল- ফলে ফিলিস্তিদের প্রতি বে-ইনসাফ, উদাসীন্য, তাদের দীর্ঘ মানবেতর জীবনে ফেলে রাখা ইতাদি। তাই এই ‘গ্লোবাল টেররিজম’ ফেনোমেনার একমাত্র ও আল্টিমেট জবাব ও করণীয় হল, মজলুমের পক্ষে সবলে দাঁড়ানো ও ইনসাফ দেয়া। অথচ ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন উল্টো। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সারা দুনিয়াতে মানুষ বে-ইনসাফিতে তাদের অসহায়বোধ আরও চরমে উঠছে। উল্টা বললে, তাহলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত, এটা কি গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্মসূচি নয়? ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্তা কি তাহলে ট্রাম্প হতে চাচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাব ট্রাম্পকে দিতে হবে, আজ অথবা কাল।

    অন্যের জমি দখলের ও একাজের পক্ষে সাফাইদানে ওস্তাদ ইসরায়েল
    ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের ফলে আমরা বেশ কিছু প্রো-ইসরাইলি ভাষ্য ও ভাষ্যদাতাদের চিনতে পেরেছি। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো বোস্টনের ‘দা আটল্যান্টিক’, মাসিক এই ম্যাগাজিন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি। কেন তা নিয়ে এক আর্টিকেল ছেপেছে তারা, শিরোনাম- ‘অবশেষে এই প্রেসিডেন্টকে পাওয়া গেল যে ইসরাইলকে লজিক্যালি দেখেছে’। [Finally, a President Who Looks at Jerusalem Logically]। তারা ট্রাম্পের কাজের মধ্যে এই প্রথম যুক্তি খুঁজে পেয়েছে, কী আর করা!

    এছাড়া, আর সবচেয়ে ভয় পাওয়া এক আর্টিকেল দেখা গেছে হংকং থেকে প্রকাশিত অনলাইন ‘এশিয়া টাইমসে’। পশ্চিমের বাইরে এশিয়ায় দু’টি ব্যাপক কাভারেজের উঠতি পত্রিকার একটা হলো এটা। এর কলামিস্ট হলেন ডেভিড পি গোল্ডম্যান যিনি  SPENGLER ছদ্মনামে লেখেন। অথচ তার লেখা কলামের শিরোনাম হলো, ‘অমর্যাদা করে মুখ ঠেসে ধরা : মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ’ (Humiliation – the only path to peace for the Middle East)।

    ডেভিডের যুক্তি খুব সহজ। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে বিরোধের ফয়সালাকেই দুনিয়ার সব বিতর্ক বিবাদের সঠিক ও ন্যায্য ফয়সালা মনে করেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা হল, ‘হারু পার্টি আরবরা হেরেও ইসরাইলের কাছে হার স্বীকার করে না এমন নাছোড়বান্দা’। তাই তিনি এবার নতুন ওষুধের প্রেসক্রপশন হিসেবে বলছেন, “যুদ্ধে পরাস্তের পরে আরেক ধাপ হল ওদেরকে মানে হারু পার্টিকে মুখ মাটিতে ঠেসে ধরার মতো চরম অমর্যাদার অবস্থায় ফেলে দিতে হবে, তাহলে এবার তাঁরা হার মানবে। আর ঝামেলা করবে না। দেখেন না জাপানে কী হয়েছিল! দুটি আণবিক বোমা মেরে দেয়াতে মাটিতে ওদের মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। তাই চুপ মেরে গেছে…।” এই হল ডেভিড পি গোল্ডম্যান। ‘এখন আমরা সুজনেরা বুঝে ফেলেন কী বলতে চাইলেন ডেভিড। ডেভিড আমাদেরকে যেটা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হল – দুনিয়ায় ন্যায়-অন্যায়, ন্যায্য-অন্যায্য, মানে ইনসাফের ধারণা এগুলো খামোখা, কিছু না। ফলে কেউ যুদ্ধে হারলে বুঝতে হবে সে অন্যায়কারী, অন্যায্য। অর্থাৎ যার গায়ের জোর বেশি সেই সঠিক ও ন্যায্য।

    এটাই জায়নিস্ট বুঝ। তা আমরা আগেও দেখেছি। যে অন্যের জমিতে তারা ইসরাইল রাষ্ট্র গড়েছে তা তাদের হল কী করে, কিসের ভিত্তিতে? এটা বুঝাতে এরা সবসময় ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার কথা আনে’ আমরা দেখেছি। যেহেতু গায়ের জোরে তারা অন্যের ভূমি দখল করেছে, ফলে তা ন্যায্য। এই তত্ত্বই তারা কপচাতে থাকে। ফলে সেটাই সঠিক ও ন্যায্য। হিটলারের হাতে নির্মম মার খেয়ে এরা ইনসাফের ওপর আস্থাহীন বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তবু ইনসাফ ফিরে আসবেই। আমাদের তা লাগবে। ইনসাফ কায়েম করতেই হবে। সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে ইনসাফের ওপর। ইনসাফের ওপর সমাজের আয়ু, শ্রীবৃদ্ধি ও টিকে থাকা নির্ভর করে। যদিও আবার সাময়িক বে-ইনসাফিও দেখা দিতে পারে। তবে তারও একমাত্র সমাধান ও স্থিতিশীলতা আনার জাদুকাঠি হল ইনসাফ কায়েম। আমেরিকার পরাশক্তি অবস্থান একটু ঢিলা হতে শুরু করলে ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার’ তত্ত্ব আর ইসরাইলকে বাঁচাতে পারবে না; তারা তা আর কপচাবেও না। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জেরুসালেম : একমাত্র সমাধান ইনসাফ’, শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

    কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

    গৌতম দাস
    ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
    https://wp.me/p1sCvy-2lz

    বার্মার রোহিঙ্গার পর এবার কম্বোডিয়া। তবে এবার গ্লোবাল রাজনীতির প্রসঙ্গে সেদিক থেকে কথা বলা হচ্ছে, গ্লোবাল অর্থনীতি নয়। সচরাচর চীন মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শীর্ষ উঠার কথা তুলে বলে থাকি। কিন্তু এবার নয়, সেটা যেন পাঠকের মনোযোগ ফস্কে না যায়, নজরে থাকে সেটা আশা করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা দুনিয়ায় গ্লোবাল রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ক্রমশ নিজ সক্ষমতা দেখিয়ে দুনিয়াকে নিজের একক নেতৃত্বে নিয়েছিল। সেটা এখনও আছে, যদিও সময়ে এখন একটা ভাটার টান অনুভুত হওয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমানভাবে ঢিলা হতে শুরু হয়েছে অনেক আগেই, তুলনায় যদিও গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন একেবারেই নয়। এই পরিস্থিতিতে পাঠকের নজর টানব সত্তরের দশকের  কমিউনিস্ট বিপ্লবের ছোট দেশ কম্বোডিয়ার দিকে।

    রাষ্ট্রের নাম কম্বোডিয়া, রাজধানী যার নম পেন। থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামের পড়শি এই রাষ্ট্রের দেড় কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ সবাই খেমার (Khmer) নামে এক এথনিক জনগোষ্ঠীর, তাদের ভাষার নামও খেমার। দেশের সাইজ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বড়, এর জনগোষ্ঠি মূলত বৌদ্ধ-ধর্মীয়। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এক রাজতন্ত্রে শাসিত ছিল খেমাররা। কিন্তু এরপর নানা হাত ঘুরে কলোনি দখলের যুগে এসে শেষে, ফরাসি কলোনি রাজ্যে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৫৩ সালে, কিন্তু থিতু হতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৪৫-৭৫) সাথে ভাগ্য ক্রমশ বাধা পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলে, কম্বোডিয়ান চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি খেমাররুজ (ফরাসি ভাষায় রুজ মানে লাল। অর্থাৎ কমিউনিস্ট লাল খেমার বা Khmer Rouge) নেতা পলপট কম্বোডিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তার কুখ্যাত শাসনের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) এই দল শ্রেণী-শত্রু হত্যা নৃশংসতার উদাহরণ হয়ে যায়; বলা হয় ঐ সময়কালে গ্রামে মালিকানা উচ্ছেদের নামে এরা ২০ লাখ লোককে গণহত্যা করেছিল।

    প্রতিক্রিয়ায় এরপর অনেক ক্যু, পালটা ক্যু শেষ করে সেসব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে সব বিবদমান পক্ষগুলোকে নিয়ে ‘প্যারিস শান্তিচুক্তিতে’ এক রাজনৈতিক আপোষনামা তৈরি হয়েছিল; এরও আরো পরে, কম্বোডিয়া থিতু হতে হতে ১৯৯৭ সাল লেগে যায়। আর সেসব প্রক্রিয়ারই আর এক অংশ, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘খেমাররুজের গণহত্যার’ বিচার এখনও চলছে। সেই থেকে সাজিয়ে রাখা মৃত মানুষের সাদা সাদা মাথায় খুলি হয়ে যায় কম্বোডিয়ার ব্যঙ্গপ্রতীক। তবে এই কম্বোডিয়া এখন এক কনষ্টিটিউশনাল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; অর্থাৎ এর নামকাওয়াস্তে রাজতন্ত্র বা এক রাজা আছে ঠিকই, তবে সব কিছুই জনগণ নির্বাচিত, এক কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক এটা। আর ১৯৮৫ সাল থেকে নানা কায়দা করে এর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন হুন সেন। একালে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়া ও এর শ্রম। চীনের বিপুল বিনিয়োগের এক গন্তব্য এখন কম্বোডিয়া। চলতি বছরেও টার্গেট দুই বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড এর পড়শি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-গঠনের দিক থেকে প্রায় একইরকম বলে ব্যাংককের মত ট্যুরিজমের আয় কম্বোডিয়ার এক বড় আয়ের খাত হয়ে উঠছে ক্রমেই। আর সমুদ্র সীমান্তে (অফসোরে) তেল গ্যাস পাওয়ায় তা অর্থনীতিতে এক বিশাল খাত হয়ে উঠছে। এই হল পুরনো দিক থেকে কম্বোডিয়ার বর্ণনা-পরিচিতি, এবার চলতি লেটেস্ট দিক থেকে আর এক পর্ব শুরু করা যাক।

    আগামী বছর ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় আবার সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। আবার বলছি কারণ গত ২০১৩ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে তা শেষ হয়েছিল। স্বল্প ভোটে বিরোধী দল (কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি, CNRP) হেরেছিল এভাবে দেখিয়ে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। আর চলতি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দলকে (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, CPP) বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে ‘বিরোধীদের সংসদ বয়কট’ – আমাদের পরিচিত এই ফেনোমেনায় কম্বোডিয়ার বিরোধী দল বেশির ভাগ সময়টা সংসদের বাইরে কাটায়। ওদিকে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন, গুম, খুন করা, ইংরাজী দৈনিক পত্রিকা বন্ধ, রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এগুলো খুবই কমন। কিন্তু ওদিকে সরকারের সংসদে পাশ করা বড় অদ্ভুত কিছু আইন চালু আছে। যেমন একটা হল কুখ্যাত ‘কটূক্তি আইন’ (ডিফেমেশন ল), যা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদ ধারক কারও সমালোচনা করলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া সম্ভব। এরকম অদ্ভুত আরো কিছু আইন প্রচলিত আছে সেখানে। যেমন – সরকারের আইনি অধিকার আছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সামান্য অজুহাতে নিষিদ্ধ করে দেয়ার। এই আইনে বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান তিনি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন – এই অজুহাতে তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। এর পরে ফেব্রুয়ারি থেকে যিনি দলের নেতা হয়ে আসেন তিনিও গত কয়েক মাস থেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ জেলে আছেন। আর উচ্চ আদালত এর পুরো বিচার শেষ নাই বটে, কিন্তু তা না করেই গত ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর জামিনের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উলটা ডিটেনশন দিয়ে রেখেছে।

    ঐ রায়ের বিচারক খিম পন তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় এই নেতা কেম সোখাকে ডিটেনশন দেয়া হল, নতুন ক্রাইম ঠেকাতে আর যাতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আদালত গ্যারান্টি দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে’ সেজন্য।  [The detention of Kem Sokha is to prevent new crimes and that the court can  guarantee public order, JUDGE KHIM PONN]  কম্বোডিয়ায় আরেকটা মজার আইন আছে। তা হল, রাজনৈতিক দলের প্রধানের নামে যদি আদালতে কোন ক্রিমিনাল অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয় ও তা বিচারের শেষে আদালতের রায়ে যদি সাজা হয়, তবে এরপর পুরা ঐ দলকেই সরকার ‘বিলুপ্ত’ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার প্রধান বিরোধী দলের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে।  প্রধান বিরোধী দল CNRP এর সর্বশেষ অবস্থা হল, এই দলের আগের প্রধান যে ছিলেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সাজা হয়ে গেছে, তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন। আর দলের চলতি প্রধান ডিটেনশনে আছেন। অভিযোগ হল সেই ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকান সরকারি লোকের সাথে  তিনি কথা বলছেন এমন এক ভিডিও দেখিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। আর গত ৬ অক্টোবর, তাই এইবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতে  বিরোধী দলকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করার আবেদন করেছিলেন। আর তাতে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রায় দেন। ঐ রায়ের ফলে সেই সাথে ওই দলের ১১৮ জন সিনিয়র সদস্য ও রাজনীতিক নিষিদ্ধ হবেন এবং গত চার বছরে  যে ৪৮৯টি কমিউন (স্থানীয়) নির্বাচনে CNRP দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাও সবাই পদ হারাবেন। ওদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের ৫৫টি আসনই হারাবেন।

    এই অবস্থায় তাহলে আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে ছলেবলে কৌশলে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হল, এর অর্থ তাৎপর্য না বোঝার কিছু নেই। আমাদের দেশের বিনা নির্বাচনে বিজয়ের মতো কিছু একটা সেখানে এখন হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নাই। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে এই বিরোধীরা হুন সেনকে বহু পেরেসান করেছিল। এবার তাই তিনি কোনো রিস্ক রাখলেন না। আর ওই ৫৫টি আসন এখন (আমাদের এরশাদের মত) খুচরা বিরোধী দলগুলো যারা সবাই মিলে গত নির্বাচনে মোট ভোটের মাত্র ৭ শতাংশ পেয়েছিল এদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। এসব ছোট দলের সদস্যদের মধ্যে তাই হুটোপুটি শুরু হয়েছে পদ-পদবি ও সুবিধাদি নেবার জন্য। আরো আছে। একই অভিযোগ এনে এখন আরো সম্ভাব্য ১০০ জন্য বিরোধী প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করে রাখার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

    সাবেক খেমাররুজ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে, একনাগাড়ে প্রায় ৩৩ বছর। সম্প্রতি তার দেশে এক বয়ান,  ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ এ কথা কয়টাক এক বিরাট ইস্যু বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এক পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ আরো এক যুগ তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।

    তাহলে এখন থেকে যা বোঝার বুঝে নেন। কিন্তু কোথাকার এক কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ইতিহাস নিয়ে আমি কেন আপনাদের শুনাতে এলাম? বাংলাদেশের সরকার আর বিরোধী দল আর ওদিকে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বলার জন্য কী? না একেবারেই নয়। এই অনুমান ভুল। বরং আসল উদ্দেশ্য এতক্ষণ উপরে কোথাও লেখাই হয়নি। কী সেটা?
    কম্বোডিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক দশা পরিস্থিতি নিয়ে ইষ্ট এশিয়ার মিডিয়াগুলোর অনেকেই নানা আর্টিকেল ছেপেছে। এমনি একটা হল, হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। ‘মর্নিং পোস্টে’ একটি কলাম ছাপা হয়েছে, লেখক এডোয়ার্ড মরটন।

    তিনি বলছেন, “হুন সেন চীনের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে নেমেছেন। কিন্তু হুন সেনের এই হিসাব ‘যা নয় তাই বাড়িয়ে ধরা’ অনুমান বলে প্রমাণিত হবে।” কিছু বিশ্লেষক, কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জার্নালিস্টদের বক্তব্যের রেফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এসব মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হুন সেনের আরেক মন্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, ‘আগামী বছরের নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমাদের স্বীকৃতি জোগাড়ের প্রয়োজন হবে না।’ কিন্তু তবু এটাও আমার এই লেখার ফোকাস নয়। তবে এবার লিখছি ফোকাসটা কোথায় এবং তা কী? যা খুবই বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

    আলজাজিরা টিভি গত ১৭ নভেম্বর কম্বোডিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের টকশোর মতো অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’ প্রচার করেছে। সেখানে তিন অতিথি ছিলেন ০১. মু সোচুয়া – তিনি সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিরোধী দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পলাতক হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ০২, ভিকটর গাও – চায়না ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক। তিনি আসলে আবার ‘চায়না এনার্জি সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের’ চেয়ারম্যান। তার আরেক পরিচয় হল, তিনি বিখ্যাত চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের অনুবাদক হিসাবে কাজ করেছেন। আর ০৩. হোসেক লি ম্যাকিয়ামা – তিনি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক। এই তিন প্যানেল বক্তার মধ্যে চীনা একাডেমিক মি: গাও – এর বক্তব্য আমার প্রসঙ্গ।

    গাও তার পালা এলে তিনি স্পষ্ট করে হুন সেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। হুন সেনের সরকার, তার গৃহীত পদক্ষেপ সব সমর্থন করলেন। এটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জেনারেলদের পক্ষেও এত স্পষ্ট করে পাবলিক মিডিয়ায় চীন কথা বলেনি। ১৯৭০-এর দশকে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক পাকা হয়, আর সে সময়ে নিজেরা যার যার স্বার্থ বুঝাবুঝি, পারস্পরিক স্বীকৃতি বা দেনাপাওনাগুলো ঠিকঠাক হয়েছিল ১৯৭১-৭৮ সালের মধ্যে। আমেরিকান বিনিয়োগে চীনে এক ক্যাপিটালিজম জগত প্রবেশ করবে আর, এক নতুন অর্থনৈতিক পথে চীন যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকেই চীন নিজের জন্য আর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর ফলে ক্রমশ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সক্ষমতা ক্রমশ বেড়ে চললেও এর প্রভাবে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নাক গলানোর বা গ্লোবাল প্রভাবের ভাগিদারি ভাগ পাওয়ার সুযোগ হাতে পেলেও চীন তাতে জড়িত হবে না। না এটা চীনের কোনো ভালো মানুষি নয়। বরং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকান যে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়ে আছে এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ভাগিদারি এই খাতে চীন নিজেকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অথবা প্রভাবের শেয়ার নিতেও সে যাবে না। বরং চীন যদি এতে পুরো ছাড় আমেরিকাকে দিয়ে দিলে, দুনিয়ার সব কোনা থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বিষয়াদির ভাগিদারি কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিনা বাধায় পেতে সহজ হবে। ফলে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক অ-সাংঘর্ষিকভাবে বিকশিত হতে পারবে। চীন চেয়েছিল গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো ভাগ আমেরিকার কাছে সে চাচ্ছে না। অথবা চীন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই বার্তা আমেরিকাকে  জানানো। আর সে কারণে সবার আগে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের উত্থান পর্বকে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। যেটা  আসলে সহজে চীন বাস্তবে অর্জন করেছিল।

    যেমন – ২০১৪ সালে আমাদের নির্বাচন ইস্যুতে দেখা গিয়েছিল কোন রাজনৈতিক স্টেক বা কেমনভাবে নির্বাচন হতে হবে তা নিয়ে কোনো বক্তব্য চীনের ছিল না। কিন্তু সরকারে যেই থাক বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় চীনের যা স্বার্থ যা সে চায় তা নিয়ে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সে পশ্চিমা অবস্থানের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে তা নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে ভাগিদার সাজতে না চাওয়া চীনের এই নীতি অবশ্যই বেশ লম্বা সময়ের জন্য, তবুও তা আবার এক অর্থে সাময়িক। যেমন, যত দিন চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হচ্ছে  ততদিন একই সাথে গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে হাত বাড়াতে চীন যাবে না। তবে এর পরে অবশ্যই যাবে। এরই সোজা অর্থ সম্ভবত এবার রাজনৈতিক ইস্যুতেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন দুনিয়ায় হাজির হতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

    কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হুন সেনের পক্ষ দাঁড়িয়েছে শুধু তাই নয়, হুন সেন একটি ন্যূনতম ভাবে ফেয়ার নির্বাচিত সরকার হয়ে থাক সেটার দরকার নেই – এ কথায় এতদূর গিয়ে প্রবক্তা হয়েছে। মি. গাও বলেছেন. কম্বোডিয়ায় একটা ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে যদি পুরনো অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে এসে পড়ে’ তাই এর দরকার নেই। আর এতে অর্থ সম্পদও নষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’ (তিনি তথাকথিত বা সোকল্ড শব্দটা ব্যবহার করেছেন) বাস্তবায়নকে দেখার অনেক ধরন আছে। অর্থাৎ হুন সেন বিরোধীদের মেরে ধরে গুম নির্যাতন করে, জবরদস্তি যদি নিজেকে ভুয়া নির্বাচিত হিসেবে দেখায় তবুও সেটা চীনের স্টাইলের নির্বাচন (গণতন্ত্রকে দেখার নানা পথ আছে) মনে করে এবং ‘স্থিতিশীলতার স্বার্থে’, ‘সম্পদ নষ্ট না করার স্বার্থে’ হুন সেনকেই নির্বাচিত মানতে হবে। চীনের নিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রে নাগরিকের কোনো রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার, মানবিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন- এগুলোকে সে নিজ করণীয় বলে মনে করে না। নিজে করেওনি। বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জন এগুলোই করণীয়। অর্থাৎ মানুষ বৈষয়িক বিষয়াদির ভোগকারি মাত্র। তার কোন স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, করণীয়, দায়দায়িত্ব এসব কিছু নাই- এই হলো চীনা কল্পনায় দেখা মানুষ। মানুষ সম্পর্কে এই অনুমানের উপরে দাঁড়ানো আছে চীনের নেতৃত্ব।

    তাহলে কী দাঁড়াল? চীন কী এখন থেকে আমেরিকার সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রভাব এর ভাগিদার বা পুরা কতৃত্ব নেয়ার জন্য এখন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুরু করবে? যার বাইরের দিকটা দেখে লাগবে কম্বোডিয়ায় মতই, কোনো বিরোধী দল সেখানে নেই অথবা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা থাকার দরকার আছে কিনা এই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের লড়াই? নাকি কম্বোডিয়ার মত কিছু দেশের বেলায় (সব দেশের বেলায় নয়) চীন একক রাজনৈতিক প্রভাব হাসিলের জন্য এখন থেকে আমেরিকার সাথে লড়বে? এই দুইয়ের মধ্যে সেটা যেটাই হোক, চীন গোহারা হারবে সেটা আগেই বলে দেয়া যায়। কারণ মডার্নিটি পরবর্তী দুনিয়া ১৯৪৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইট চার্টার পর্যন্ত গিয়েছে। ওর অনেক খামতি আছে। কিন্তু তাই বলে সেটা ওর পেছনের সময়ে ফিরে যেতে পারে না। দুনিয়া এমনকি সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট বুঝে আবার ফিরে যেতে পারে না।

    অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন যতই এগিয়ে যাক, চীনের রাজনৈতিক বুঝাবুঝিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। তবুও, আচ্ছা এটাই কী চীনের সদ্য সমাপ্ত দলীয় কংগ্রেসে উল্লেখিত ‘মডার্ন সমাজতন্ত্রের’ ব্যাখ্যা; আর এজন্য শি জিনপিংকে মাওয়ের সমতুল্য নেতা বলে দাঁড় করানো শুরু? সেটা যাই হোক, চীনের এই পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে যাওয়ার ইঙ্গিত!

    সর্বশেষঃ
     রয়টার্স এজেন্সির খবর,  ১৭ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার বিফ্রিংয়ে প্রশ্নের উত্তরে জানায়, কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরোধী দল ও নেতাদের নির্মুল ও শুন্য করা প্রসঙ্গে চীন বলছে, এটা “কম্বোডিয়ার নিজস্ব কায়দার উন্নয়নের রাস্তা অনুসরণ” করা বলে চীন মনে করে। [Cambodia in pursuing its own development path……)
    আর এর পাল্টা আমেরিকা বলছিল, আমেরিকা নির্বাচন সম্পর্কিত সব ফান্ড প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ [“concrete steps”] নিতে যাচ্ছে।  এর প্রতিক্রিয়ার হুন সেন গতকাল ১৯ নভেম্বর বলেছেন, তিনি  সমস্ত আমেরিকান এইড প্রত্যাহার করে নিতে স্বাগত জানায়। [“Hun Sen … welcomes and encourages the U.S. to cut all aid.”]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com   

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]