Tag: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

  • ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
    গৌতম দাস
    ২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
    প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


    Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
    কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


    জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
    যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
    কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
    আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
    বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

    এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
    আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
    সব শেষ।

    আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
    আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

    দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

    আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
    সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

  • ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

    ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

    গৌতম দাস

    ৩০ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

    ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলে জানা গেল সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যাওয়ার পক্ষে হয়েছে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটের ফলাফলে ত্যাগের পক্ষ জয়ী হয়েছে শতকরা ৫২-৪৮ অনুপাতে। এতে গণভোট-উত্তর পরিস্থিতি যা হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল তা একের পর এক ঘটা শুরু হয়েছে। ফলাফলের নেতিবাচক গ্লোবাল প্রভাব পড়েছে সর্বব্যাপী। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে তা সংশ্লিষ্টরা মানছেন। গতকাল  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদকে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের “পোশাক খাত চ্যালেঞ্জের মুখে” পড়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যে প্রতি বৃটিশ পাউন্ড গণভোটের আগের তুলনায় দশ টাকা করে মূল্য হারিয়েছে। পরিস্থিতি আরো কতটা খারাপের দিকে যাবে তা নিয়ে অনুমান চলছে।
    এ নিয়ে গভীরে প্রবেশের আগে কিছু ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। যেমন- ব্রিটেনের ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া মানে কী? ব্যাপারটা কী, বিভিন্ন রাষ্ট্র যেমন নানান কিসিমের রাষ্ট্রজোটে অন্তর্ভুক্ত হয় যার কোনটা অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক বা সামরিক ইত্যাদি সে রকম কোনো রাষ্ট্র-জোট ত্যাগ করা? অথবা ধরা যাক,  জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় জোট প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের তা ছেড়ে যাওয়া সেরকম?  অথবা  বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিল্যাটারাল) ক্যাটাগরির আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কে ওর কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ছেড়ে যাওয়া, এ ধরনের? অথবা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন ধরা যাক, আমাদের সার্ক জোট ছেড়ে গেলে কী হবে তেমন একটা কিছু? এরকম নানা ধরনের রাষ্ট্রজোটের উদাহরণ আর না বাড়িয়ে এবার উত্তরের দিকে যাওয়া যাক। প্রথমত কোনো সদস্য রাষ্ট্রের জোট ত্যাগ করার উদাহরণ খুব একটা নেই, তুলনায় জোটের অকার্যকর হয়ে পড়ার উদাহরণ পাওয়া যাবে। তবে আলোচনা সেদিকে নিব না। তাহলে আমরা এখানে কথা বলছি – ইইউ ধরণের বিশেষ রাষ্ট্রজোটের।
    ব্রিটেনসহ ধরলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছিল মোট ২৮ সদস্য-রাষ্ট্রের। এখন এই ইইউ ধরনের রাষ্ট্রজোটের সাথে অন্য আর সব ধরনের রাষ্ট্রজোটের একটা প্রধান ফারাক আমরা এখন টানব। তা হল, ইইউ ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রজোটের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্র একেকটা সার্বভৌম ইউনিট, এটা বজায় রেখে বা মেনে নেয়ার পরই এসব রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক রাষ্ট্র নিয়ে জোট অথবা জাতিসঙ্ঘের মতো প্রায় সব (বর্তমানে ১৯৩ সদস্যের) রাষ্ট্রের রাষ্ট্রজোট হবার পরও জাতিসংঘ নিজে এর যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্বধারী কোনো সুপার স্টেট নয়। যেমন বাংলাদেশ সম্পর্কে যেকোনো ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, জাতিসঙ্ঘ অথবা এর অধীনস্থ কোনো প্রতিষ্ঠান বা কমিটির নয়। জাতিসঙ্ঘ কি সার্বভৌম – এই ধারণার উপরে জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান? যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপরে কী জাতিসংঘ সার্বভৌম ক্ষমতা, এখতিয়ার রাখে? এককথায় জবাব মোটেও না। প্রশ্নই আসে না। প্রত্যেক সদস্য-রাষ্ট্রই কেবল সার্বভৌম যার উপর কেউ নাই, আর কোন মাতব্বর নাই।  ফলে জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্ত মানার ব্যাপারটি কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটে কী এই অর্থে যে, ওই সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে জাতিসঙ্ঘের সব সদস্যের সম্মতিতে অনুমোদিত হয়েছে শুধু সেজন্য? না সেজন্য নয়। বরং ওই আইনের অনুরূপ করে লেখা একটা আইন (যেটা রেটিফিকেশন বলে পরিচিত) আমরা আমাদের সংসদে পাস করিয়ে নিয়েছি সেজন্য। সারকথায় জাতিসঙ্ঘের কোনো আইন বা কনভেনশন ইত্যাদি আমরা মানি এ জন্য যে, সেটার অনুরূপ এক আইন আমাদের নিজের সংসদ পাস করে নিয়েছে, তাই। নিজের আইন তো নিজে মানবই। জাতিসঙ্ঘ কখনোই এমন কোনো তৎপরতা দেখায় না বা এমন কোনো রেওয়াজ নেই, যা থেকে আমরা অর্থ করতে পারি যে সে আমাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে অথবা আমাদের রাষ্ট্রের ওপরে অবস্থিত এক চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কর্তৃপক্ষ হল জাতিসঙ্ঘ। বরং রাষ্ট্রই সার্বভৌমত্বের শেষ কথা। এর ওপর কাউকে রাখা হয়নি। এভাবে দুনিয়ার যেকোনো রাষ্ট্রজোট তার আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অটুট রেখেই নানান রাষ্ট্রজোটের অংশ হয়।

    কিন্তু এই ধারণার একমাত্র ব্যতিক্রম বা ব্যতিক্রম হওয়ার উদ্যোগ হল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কী অর্থে? যেহেতু ইইউ গড়ার লক্ষ্য হল সদস্যরাষ্ট্রগুলো একটা লম্বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিন প্রত্যেকের আলাদা রাষ্ট্ররূপ বিলুপ্ত করে সবাই মিলে একক এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে এখনই সেই প্রক্রিয়ার পুরোটা সম্পন্ন হয়ে যায়নি। তাই ইইউ এখনই কোনো সার্বভৌম অস্তিত্ব নয়। তবে ইইউর কিছু কিছু ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক হয়েছে। এই অর্থে ওসব জায়গায় ইইউ নিজের সদস্যরাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম কর্তৃপক্ষ।  যেমন ইইউর ফোরামে গৃহীত প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রে কাজের দৈনিক শ্রমঘণ্টা  কত হবে- এ বিষয়ক ইইউ ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য এখনই বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট এখানে ইইউর ভূমিকা সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সুপার স্টেট ধরনের। আর এটাই প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র তার নিজ নিজ সংসদে আগে অনুমোদন দিয়েছে যে ঐসব ক্ষেত্রে ইইউ এর সিদ্ধান্ত সদস্য-রাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম, তাই এটা বৈধ। সারকথায় রাষ্ট্রজোটের নানা ধরনের মধ্যে একমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন হল আলাদা ধরণের কারণ এটা হবু সুপার স্টেট। এক সুপার ষ্টেট হবার লক্ষ্যে সে আগাচ্ছে তাই।
    ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণ সিদ্ধান্ত জানাল যে ব্রিটেন ইইউর মধ্যে নিজ রাষ্ট্র একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিলীন করার যে সিদ্ধান্ত সে আগে নিয়েছিল (ব্রিটেন ১৯৭৩ সালে ইইউতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল) সে সিদ্ধান্ত বদল করে তারা এবার নিজের ব্রিটেন রাষ্ট্রই অটুট রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
    ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটেনের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রক্ষণশীল টোরি আর লিবারেল লেবার- এরা কেউই ইইউ ত্যাগের পক্ষে নয়, বরং ইইউর সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষে বলে দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রচারও করেছিল। ফলে আর অন্য ছোট দল হিসেবে যারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ও প্রচার চালিয়েছিল, তেমন এক দল হলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি)। গণভোটের ফলাফল ত্যাগের পক্ষে যাওয়ার পর মিডিয়া এই পার্টির সেক্রেটারিকে প্রশ্ন রেখেছিল- কেন তারা জিতলেন বলে মনে করেন? তিনি বললেন, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা জনগণ নিজেরাই নিতে চাই, তাই। এটা অবশ্যই সঠিক জবাব নয়। একই ভাবে আর এক নেতা তিনি “না-ভোট প্রচারক” কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক। নাম (Michael Gove) বা মাইকেল গভ। কিন্তু তিনি আসলে আবার মাইকেল ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল টোরি পার্টির এমপি। তিনি তার ওয়েব সাইটে তাঁর নাভোটের পক্ষে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে তিনিও UKIP দলের মত বললেন। এককথায় বললে, যেসব নেতারা ইইউ-ত্যাগের পক্ষে কাজ করেছেন, এরা মূলত সাধারণ মানুষের নানান ক্ষোভ অসন্তোষকে সস্তা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী সুরসুরি দিয়ে আরও বড় করে কাজে লাগিয়েছেন। যেমন মাইকেল লিখছেন, তার আপত্তি্র পয়েন্ট হল তাঁর “রাষ্ট্র বৃটেনের ভাগ্য অন্য জাতেই রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদের ঠিক করছেন “decided by politicians from other nations”। এটা খুবই বাজে ও ফালতু যুক্তি। এক রংপুরের রাজনীতিবিদ যদি বলে, বাংলাদেশের বাজেট দিচ্ছেন এক (ভিন্ন জেলা অর্থে ভিনজাতের) সিলোটি নেতা … এটা বললে যেমন বুঝতে হবে এগুলো মাথায় শয়তান ভর করা লোকের সস্তা সুরসুরি মার্কা কথা – ঠিক তেমনি। আমরা নানা জেলার মানুষ মিলিয়েই বাংলাদেশ গঠন করেছি। ফলে কেউ যদি সংসদে সিলেটি হয়ে রংপুরের ভাগ্য নির্ধারণ করে তবে কোথাও আবার রংপুরিয়াও সিলটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ইইউ তে বৃটিশ না হয়েও ধরা যাক সে জর্মন, যাদের সিদ্ধান্ত বৃটেনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে, বৃটিশের সিদ্ধান্তও অন্য কোথাও জর্মনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে। সুতরাং এটা কোন পয়েন্টই না। পরিস্কার দগদগে উগ্র জাতিবাদি বিদ্বেষ, রেসিজম। যদি ইইউ ভাইস ভারসা ভাবে জর্মনী বা অন্য জাতি রাষ্ট্রের উপর বৃটিশ (ইইউ এমপি বা MEP )র সিদ্ধান্ত কার্যকর না হত তাহলে এসব কথা বলার সুযোগ থাকত। এছাড়া সবার উপরে বৃটেন কী স্ব-ইচ্ছায় ১৯৭৩ সালে ইইউ তে যোগ দেয় নাই? স্ব-ইচ্ছায় যোগ দেয়ার মানে কী  এটা না যে অ-বৃটিশেরও মতামত মাতব্বরি শুনতে ইউ তে যোগ দিতে যাওয়া হচ্ছে?  অতএব এসব ফালতু জাত-বিদ্বেষী বক্তব্যকে যদি জবাব হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হয়, তবে মানতে হবে এত দিন বেআইনি বা অবৈধভাবে ব্রিটেনবাসীকে বঞ্চিত করে, তাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইইউ সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, যেন সেটার অবসান ঘটালেন তারা গণভোটে ভোট দিয়ে। কিন্তু না তা তো নয়। আইনে যা লেখা আছে তা মেনেই সেই ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হওয়া এক ক্রমপ্রক্রিয়ায় ব্রিটেন ইইউর ভেতরে বিলুপ্ত হওয়ার লক্ষ্যে ও সেজন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। ইইউ তো কোন জবরদস্তি প্রক্রিয়া তো ছিল না।
    আবার সেই ইইউ প্রক্রিয়া যেহেতু এখনো শেষ বা সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি, ফলে ২০০৭ সালের লিসবন চুক্তি, যার আরেক নাম ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি, যেটা তার আগের করা ইইউ বিষয়ক সব চুক্তির আপডেটেড বা সর্বশেষ রূপ, এর আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রক্রিয়া থেকে এখনও যেকোনো সদস্যের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ বৈধভাবেই ছিল। যেটার সুযোগ নিতেই ব্রিটেনের জনগণ তাদের আগের সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ নিয়েছে এই গণভোট করে। এটাও বৈধ। ফলে ১৯৭৩ সালে ইইউতে ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত এবং এই গণভোটে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুটোই আইনি দিক থেকে বৈধ সিদ্ধান্ত। তাহলে আসলে এখন কী ঘটেছে? আর কেন সেটা ঘটল?

    সাধারণ নির্বাচন বা গণভোট মানে ঐ একবারই যখন সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণের পর্যায়ে নেমে আসে। কার তুলনায়? সরকার গঠন হয়ে গেলে যে সংকীর্ণ গোষ্ঠি এবার সরকারের নীতি-সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের ক্ষমতার তুলনায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে বা গ্লোবাল কাপিটালিজমে অনেক প্রভাবশালী অর্থনীতি আছে। এরাসহ সব আধুনিক রাষ্ট্রেই পুঁজি ব্যবসায়ী, শিল্পকারখানা বা ট্রেডার ব্যাংকার সমাজের এ অংশটিই তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে। নির্বাচন একবার হয়ে গেলে পরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত এসময়গুলোতে রাষ্ট্র কার্যত থাকে এই গোষ্ঠির প্রভাবে। মূলত এসব সময়গুলোতে নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ জনগণ ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিল। যেমন ২০০৮ সাল থেকে চলে আসা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এখনো গ্লোবাল অর্থনীতিতে কাটেনি। আর ওই মন্দা আসলে ডেকে এনে ছিল যেন এক প্রতিযোগিতা! কীসের? ঐ মহামন্দায় দেইলিয়া হয়ে পড়া কোম্পানী পুঁজির কারবারিদের দায়দেনা ও ক্ষতি জনগণ বা রাষ্ট্রের কাঁধে কেমন লটকিয়ে দেয়া যায় এরই প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ঢেলে সব ব্যক্তি কর্পোরেট কোম্পানীর দায়দেনা ও ক্ষতি মিটানো হয়েছিল। এরপর আবার শুরু হল (austerity) অস্টারিটি মানে অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন। অর্থাৎ রাষ্ট্র তখন আর সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিবে আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ধরনের সামাজিক বেনিফিটে কাটছাঁট করবে, যার সবচেয়ে আর সব দিক থেকে চাপটা এসে পড়বে কেবল শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সমাজের নিচের কম আয়ের জনগণের ওপর। এর ওপর আবার বিগত ২০০১ সাল থেকেই –  ‘ইসলামি জঙ্গি’ মারতে গিয়ে লম্বা শেষ নাই এমন যুদ্ধে আটকে গিয়েছে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। এর অর্থনৈতিক দায় বইতে পশ্চিমা রাশ্ট্রগুলোর অসমর্থ হওয়া ছিল সব কিছুর  প্রধান ফ্যাক্টর।  ঐ যুদ্ধের ঘটনার লেজে লেজে যেখান থেকে আবার দুনিয়াতে রিফিউজি বা উদ্বাস্তু সমস্যা খাড়া হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ইউরোপেরই নিচের মানুষদের চেয়েও কম বেতনে রিফিউজিরা খারাপ দুস্থদশায় বলে কাজ করতে রাজি – ফলে এরাই প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রমজীবীদের বাজারে হাজির হতে চাইছে। ফলে ইউ যেটাকে যুদ্ধের রিফুইজি ঠেলে ফেলতে পারে না, জাতিসংঘ উদ্বাস্তু কমিশনে কমিটমেন্ট ইত্যাদির কারণে রফুইজি নিচ্ছে বা প্রতিদানে অর্থের সংস্থান করেদিচ্ছে। এগুলো প্রতিটার ক্ষেত্রে  ইউরোপেরই নিচের মানুষদের স্বার্থ আর তাদের শাসকদের স্বার্থ পরস্পুর মুখোমুখি। ফলে শ্রমজীবিদের চোখে ইইউ এক ভিলেন। ফলে সব কিছুকে উল্টে ফেলে দেয়ার অছিলা খুঁজছিল ইউরোপেরই নিচা আয়ের জনগণ। কারণ স্ব স্ব রাষ্ট্রে এসব সিদ্ধান্ত ও কাজ করা হচ্ছিল ইইউর আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, ইইউ এর ওমুক আইনের বাধা আছে অথবা যেমন- ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের রুল আছে তাই অস্টারিটি করতে হচ্ছে অথবা ইইউর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাই উদ্বাস্তু নিতে হবে- এভাবে ইইউকে দেখিয়ে সামনে রেখে নিজের রাষ্ট্র এগুলো করছিল। ফলে স্বভাবতই জনগণ সেই ইইউ নামে ভুতুড়ে ক্ষমতাকেই উপড়ে ফেলার পক্ষে চলে যায়। অর্থাৎ সমাজে এসব অসন্তোষ বাড়ছিল। এই অসন্তোষ নিরসন বা আমলে নেয়ার নামে ক্যামেরন ভেবেছিলেন ইইউতে থাকা না থাকাকে গণভোটে দিলে আবার ইইউতে থাকাই জিতবে। ফলে গণক্ষোভ প্রশমিত করার রাস্তা তার নাগালেই আছে। তাই আগবাড়িয়ে ২০১৩ সালে তিনি গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ দিকে সমাজের ওপরের অংশ এবং দুই প্রধান দল ধরেও নিয়েছিল, গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ জিততেই পারে না। এটা তাদের কাছে অসম্ভব কল্পনা মনে হয়েছিল। কিন্তু যত গণভোটের নির্ধারিত দিন এগিয়ে আসতে থাকে ততই গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে পরিচালনের রাষ্ট্রনেতা, বিভিন্ন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান নেতারা ততই ইইউ ত্যাগ করে গেলে কী বিপর্যয় ঘটবে, একের পর এক এর ভয়াবহতা উল্লেখ করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়া হয় আরো নেতিবাচক। বিবিসি যে আটটা কারণ তুলে ধরেছে, তার এক নম্বর কারণ হিসেবে “ব্রেক্সিটের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবে উল্টো ফলকে” । ব্রিটিশ সাধারণ ভোটাররা ব্যাপারটিকে তাদেরকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়া হিসেবে দেখেছিল। ফলে চাপের ভেতরে তাদের দিশেহারা অবস্থা। এর ওপর আবার সর্বক্ষণ হবু সুপার স্টেট ইইউর দোহাই দেয়াতে এই ভুতুড়ে আড়ালি ক্ষমতাকেই মাস জনগণ সবার আগে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা মনে করা যেতে পারে।
    ব্রিটেনের ভাষায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি) হলো এক ‘ডানপন্থী’ পার্টি। এরা এই গণভোটকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিটানোর মহাসুযোগ পাওয়া গেছে হিসেবে নিয়েছিল। এভাবে তারা জনগণকে মিথ্যা আওয়াজ তুলেছে যেন উগ্র জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুললে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সব সঙ্কট দূর হয়ে যাবে। ইসলামি জঙ্গি মারার নামে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যে সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তোলা হয়েছে, তা আপনাআপনিই মিটে যাবে, এই মিথ্যা স্লোগান দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংস্কৃতি মূল্যবোধ সবার চেয়ে ভালো এই উগ্র প্রচার করেছে। ফলে বৃটিশরা  নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে মূল সমস্যা থেকে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণের দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হয়েছিল। এসব কিছুর নিট ফলাফল হলো গণভোটের ইইউর ত্যাগের সিদ্ধান্তের জয় লাভ।

    ইইউ ত্যাগের পক্ষের প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসন ও অন্য প্রবক্তারা জানেন, যে তারা মিথ্যা প্রলোভনে ত্যাগের পক্ষকে জিতিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসনকে মিথ্যা বলার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বরিস জনসনের ছবিসহ ঐ সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল ব্রেক্সিটের প্রবক্তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।   অথচ সবাই জানত ইইউ-ত্যাগের পক্ষে জিতলেও গরিব শ্রমজীবীর মূল ক্ষোভ অসন্তোষ এতে কাটবে না। তাই নিউইয়র্ক টাইমস গত ২৬ জুন আর এক রিপোর্টে বলছে ইইউ-ত্যাগ ভোটের জিতার পরে অনেক নেতা উলটা প্যাডেল মেরে ভাগতেছে কারণ জিতলে তারা কী করবে এনিয়ে তাদের কোন অর্থনৈতিক পরকল্পনা ছিল না।  প্রতিদিন ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড নাকি ইইউকে দিতে হত খামোখা বলে বরিস জনসনরা প্রচার চালিয়েছিল। এখন স্বীকার করছে ওটা ভুল ছিল।  তাই তারা এখন ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যত দেরিতে শুরু করা যায়, এর পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যেমন ইইউ ত্যাগের আইনগত পদ্ধতি হলো কোনো সদস্যরাষ্ট্র নিজ রাষ্ট্রের আইন বা কনস্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা পালনের মুখোমুখি হয়ে পড়লে (যেমন- বৃটেন এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য) সে ইইউ ছেড়ে যাওয়ার জন্য সবার আগে ইইউকে নোটিশ দেবে। এটাই সর্বশেষ লিসবন ইইউ চুক্তির আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইইউ ত্যাগ করতে চাওয়া দেশের ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। অর্থাৎ বৃটেনে গণভোট হয়ে ফলাফল চলে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ এখনো বৃটেনের কাছ থেকে ত্যাগের ইচ্ছার কথা জানে না। আর এই ইচ্ছা জানানোর এখতিয়ার বা জানানোর পার্টি হল, যে ত্যাগ করতে চায়। সে হিসেবে কেবল ব্রিটেন। তাই সাবেক মেয়র বরিস জনসন আর্টিকেল ৫০ স্মরণ করিয়ে বলছেন, এটা তাদের এখতিয়ার এবং তারা আগামী অক্টোবরের আগে ইইউকে আনুষ্ঠানিক নোটিফাই করতে চিঠিই দেবেন না। ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে আর্টিকেল ৫০-কে সক্রিয় করে জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করলে এর পরের কমপক্ষে দুই বছরের আগে এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শেষ হবে না। ফলে যারা ইইউ-ত্যাগ পক্ষকে জিতিয়েছেন, সেই প্রবক্তারা তাই যদ্দুর সম্ভব আগামীতে নিজেদের সম্ভাব্য ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নিতে চান। বিপরীতে যে ছয় রাষ্ট্র ১৯৫১ সালে ইইউর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল সেই মূল ছয় রাষ্ট্র- জর্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লেদারল্যান্ডস, ইতালি ও লুক্সেমবার্গ- এদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিলিত হয়ে এক যৌথ আহ্বান রেখেছেন ব্রিটেনের প্রতি। দাবি করেছেন ইতোমধ্যেই গণভোটের ফলাফল গ্লোবাল বাজারের আনাচে-কানাচে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মার্কেটে উথাল পাথাল ঘটা শুরু হয়েছে। ফলে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করতে ব্রিটেন যেন দ্রুত শুরু করে, যাতে ব্রিটেন বাদে ইইউ (২৭ সদস্যরাষ্ট্র) নিজেদের আরো কোনো বিপর্যয়ের হাতে না পড়ে এর বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে পারে।
    এখন দেখার বিষয়, এই বিচ্ছেদ কি সহজেই ঘটতে পারবে, নাকি আরো গ্লোবাল বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে দুনিয়ার সবাইকে- এটাই এখন দেখার বিষয়!
    দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের এখানেই শেষ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখার প্রথম পর্ব যার শিরোনাম ছিল, “ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু” ঐ লেখা বিগত ১৯ জুন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় আগে ছাপা হয়েছিল। আর চলতি শেশাহ পর্বের লেখাটা আগে ২৬ জুন ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তে ছাপা হয়েছিল। দুটো লেখায় আবার নানান সংযোজন ও সম্পাদনার পর এখানে ছাপা হল।

  • তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো

    তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো
    গৌতম দাস
    ২২ জানুয়ারি ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-zG

    ব্যাপারটা শেষ বিচারে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে বিক্রির প্রতিযোগিতা। চলতি মাসের ১৪ তারিখে রয়টার্সের বরাতে দৈনিক ‘বণিকবার্তা’ বলছে, ১৫০ ডলার ব্যারেলের তেল এখন দাম কমতে কমতে প্রায় ৩০ ডলারেরও নিচে নেমে গেছে। বিগত শেষ ২ বছর থেকে এ কমতি দশা। বিশেষ করে বিগত প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্রমে একটানা বাড়তিতে ২০০৮ সাল থেকে যে তেলের দাম ১৫০ ডলার উঠেছিল প্রথমে পরে সেই দাম নামতে নামতে ৭০ ডলারে থিতু হয়েছিল। কিন্তু গত ৬ মাস থেকে এটাই আবার নামতে নামতে এখন এ ২৭ ডলারে নেমে যাওয়ার দশা। প্রায় ১ বছরের কিছু আগে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্সের এক নিউজ রিপোর্ট শঙ্কা ব্যক্ত করেছিল যে, তেলের দাম ২০ ডলারে পৌছাতে পারে। মনে হচ্ছে, ঘটনা সেই দিকে যাচ্ছে। আল-জাজিরার টক শো “ইনসাইড স্টোরি”তে তেলের দাম ১০ ডলারে নেমে যেতে পারে কিনা তা নিয়ে আলোচনা তুলেছিল গত সপ্তাহে।

    তেলের দাম এত উঠাপড়ার সাধারণ কারণ কি আছে
    মোটা দাগে বললে, একেক পর্যায়ে তেলের দাম ওঠা বা পড়ার কারণ একেক ধরনের। তাই সাধারণীকরণ না করে প্রতি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণের দিক থেকে তা বুঝতে হবে। যেমন, যে ১৩ বছর ধরে বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে দাম উঠতির কথা বলছিলাম এর প্রধান কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি। ব্যাপারটা মূলত চীনকে ঘিরে। চীনের মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। তাঁর মৃত্যুর আগের শেষ ৬ বছরের সময়কালে পশ্চিমের সঙ্গে (মূলত আমেরিকার সঙ্গে) চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বড় ধরনের রদবদল ঘটায় নতুন করে তা সাজানো হয়েছিল। যার সারকথা হলো, চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি নেবে, চীনে ব্যাপকভাবে বিদেশি পুঁজি আসতে দেবে। অবকাঠামো নির্মাণ খাতে এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ খাতেও। এককথায় গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের দুনিয়ার ভেতর কমিউনিস্ট চীন পুরোপুরি প্রবেশ করবে। অন্যভাষায় বললে, কমিউনিস্ট চীন নিজে এক ব্যাপক পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তরে যাবে এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় পুঁজি চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে আসতে দেবে। এরই মৌলিক নীতিগত রফাদফা সম্পন্ন হওয়ার কাল ছিল ঐ শেষ ছয় বছর। বিস্তারিত রফাদফার খুঁটিনাটি শেষ করে চীনের নিজের অভ্যন্তরীণ আইনকানুন নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন নিয়্মে সাজাতে সাজাতে সময় লেগে যায় প্রায় ১৫ বছর, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এটাকে প্রস্তুতিমূলক বা পিকআপ নেয়ার আগের সময় বলা যেতে পারে। পরের ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছরকে বলা হয় রাইজিং ইকোনমির বা উদীয়মান অর্থনীতির চীন। এই এক নতুন টার্ম, যেটা উন্নত পশ্চিম আর আন্ডার ডেভেলপড (অনুন্নত) তৃতীয় বিশ্ব এই দুই শব্দের বাইরে; নতুন এক শব্দ। মূলত চীনের একেবারে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর প্রভাবে আর যে চার অর্থনীতি – ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা উঠে দাঁড়িয়েছিল মোট এ পাঁচ অর্থনীতিকে বোঝাতেই এই নতুন টার্ম রাইজিং ইকোনমি।

    তাহলে কথা দাঁড়াল, তেলের দাম দিয়ে গ্লোবাল অর্থনীতির মতিগতি বুঝতে সেকালে তেলের দাম বৃদ্ধির এক অন্যতম কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি – এটা বুঝতে হবে। এমনটা ঘটার বড় কারণ ছিল ১৯৯০-২০১০ এ ২০ বছরে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ডাবল ডিজিটের জিডিপিতে, যেটা খুবই মূল্যবান লক্ষণ মানা হয় এবং কোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সচরাচর তা দেখা যায় না এমন। বলার অপেক্ষা রাখে না, চীনা অর্থনীতির এ প্রবৃদ্ধির সে সময়ের আর এক লক্ষণ ছিল, ক্রমবর্ধমানভাবে চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা। এ বেড়ে চলা চীনের চলতি যে জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছিল শুধু সেজন্য নয়, বরং পরের কমপক্ষে ২০ বছরের পরিকল্পনায় চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরবরাহের প্রবাহ যেন একই ধরনের থাকে, এজন্য বিভিন্ন দেশের প্রমাণিত রিজার্ভের তেল খনিতে আগাম বুকিং বা ক্রয়চুক্তি করেছিল চীন। অর্থাৎ সার কথা হলো, চীনের অর্থনীতিতে তেলের চাহিদা – এ ক্ষুধার খবর বাজারে রটে থাকাতে তেলের বাজারে বিপুল বিনিয়োগকারীর আনাগোনায় দাম ১৫০ ডলারে উঠেছিল। অতএব ওই সময়ের তেলের উচ্চমূল্য রাইজিং ইকোনমিগুলোর উচ্চ চাহিদার নির্দেশক ছিল।

    এখানে মনে রাখা ভাল চীনের অর্থনীতির ওই ক্রমবর্ধমান উচ্চ চাহিদার প্রভাবে গ্লোবাল অর্থনীতিও বৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল ও নাড়াচাড়া পড়েছিল। বিশেষ করে তেল বিক্রির দেশ এবং বাকি রাইজিং ইকোনমির দেশের অর্থনীতিও চাঙা হয়েছিল। তেল বিক্রির দেশ, যেমন রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আলজিরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, দুবাই এদের সবারই বাজেটের বড় বা মূল আয়ের উৎস হল তেল বিক্রি থেকে আয়। কোনো কোনো এমন দেশের ৯০ থেকে ১০০ ভাগ বিদেশি মুদ্রা আয় বা রাজস্ব আয় হল তেল বিক্রি থেকে আসা অর্থ। ফলে চীনের তেলের চাহিদা বৃদ্ধি মানে এসব তেল বিক্রি করা দেশের অর্থনীতি চাঙা করে রাখা। অর্থাৎ একটা চেইন ইফেক্ট বা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতার এক লম্বা শিকলের মতো অর্থনীতি ওখানে ওই পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল। তবে একেক দেশের তেল উতপাদন বা তোলার বিনিয়োগ ইত্যাদির খরচে ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় হলো এ হিসাবে দেখা গেছে, তেল রাজস্বের ওপর নিজের বাজেট নির্ভরশীল বলে মোটামুটি ৯০ থেকে ১০৫ ডলার – তেলের দাম ঐ জোনের মধ্যে বা উপরে থাকলে তা প্রায় সব তেল বিক্রি করে চলা দেশের অর্থনীতি চাঙাভাবে থাকে। রাষ্ট্র হাত খুলে বাজেট তৈরি ও খরচ করতে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রগুলোর সবার বেলায় তেল-রাজস্ব ঠিক মত না এলে ঠিক বাজেট ছাঁটতে হবে এমনটা নয়। বিশেষ করে সৌদি আরব। যদিও এবারই প্রথম এবারের ঘোষিত সৌদি বাজেট ঘাটতি বাজেট বলে দেখানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, সৌদি অর্থনীতি প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা হাফ বিলিয়ন ডলার আয় কম হচ্ছে এই অর্থে সে ঘাটতিতে আছে। আইএমএফের এক অনুমিত হিসাব মতে, গালফ রাষ্ট্রগুলো এ বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় হারাবে। একা সৌদি আরব ইতোমধ্যে গত একবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৬৪৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে বলে সৌদি মনিটারি এজেন্সীর বরাতে আলজাজিরা জানাচ্ছে। 

    অন্যদিকে আর একটা খবর আমাদের এ দিকের মিডিয়ায় নজরেই আসে নি। সেই খবরটা হলো, আমেরিকা এখন তেল রফতানিকারক দেশ। অনেকে অবশ্য হতে পারে আগে খেয়াল করেননি অথবা নিশ্চিত ছিলেন না যে আমেরিকা কি তেল রফতানিকারক দেশ ছিল নাকি! জবাব হচ্ছে হ্যাঁ, আগে ছিল না। তবে কথাটা ভেঙে বলতে হবে- ছিল না মানে কী? রফতানি করার মতো তেল ছিল না নাকি, তেল ছিল কিন্তু আইন করে রোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল? হ্যাঁ, দ্বিতীয়টা। অর্থাৎ আমেরিকার রফতানি করার মতো তেল থাকা সত্ত্বেও আইন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল, যাতে রফতানি করা না যায়। এমনকি আমেরিকার যেসব স্টেট বা রাজ্য তেল তুলে বেচার ব্যবসায় জড়িত ও তেল বেচা আয়ের উপর রাজ্য বাজেট বড়ভাবে নির্ভরশীল এমন রাজ্যগুলোর রাজস্ব আয় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে, যেমন আলাস্কা, নর্থ ডাকোটা, টেক্সাস, ওকলাহামা, লুসিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যগুলো।

    কবে থেকে এবং কেন?
    কারণের বিস্তারে যাওয়া যাবে না এখন, সে অন্য প্রসঙ্গ হয়ে যাবে তাই। তবে সংক্ষেপে বললে, তৃতীয় আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ, আরব জাতীয়তাবাদী হয়ে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় ও শেষবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ হয়েছিল।ঐ যুদ্ধে আরবেরা খুব খারাপভাবে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু এতে এর চেয়ে বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে এরপর সবাই আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা ফেলে নিজ নিজ রাষ্ট্রবাদী-জাতীয়তাবাদ আঁকড়ে ধরেছিল; সেই থেকে আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা আর কেউ বইতে রাজি হয় নাই। যেমন আরব জাতীয়তাবাদী জামাল নাসেরের মিসর এর পর থেকে হয়ে যায় মিসরীয় জাতীয়তাবাদে। এখানে বলে রাখা ভালো, বাক্যগুলোকে এভাবে লেখা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু  এটা “আরব জাতীয়তাবাদ” হারানোর কোন শোক থেকে একেবারেই নয়। বরং কথাগুলোকে আরব জোটবদ্ধতা হারানোর শোক হিসেবে দেখা যেতে পারে। সেভাবেই লেখা। আরব জোটবদ্ধ যেটা ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এখনও খুবই জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু সেসময়ে যুদ্ধে হেরে আরবদের দিক থেকে রাগের মাথায় একটা খুব বাজে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত “তেল অবরোধ” নামে পরিচিত। শুনতেও খুব ভাল, জাতীয়তাবাদী জোশে উঠে দাড়ানোর মত। ব্যাপারটা হল জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ আরবেরা সে সময়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল পশ্চিমকে আর তেল বেচবে না। এই ছিল সিদ্ধান্তের সারকথা। মনে করা হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চিমকে খুব বড় বিপদে ফেলা যাবে। কারণ পশ্চিমা সভ্যতা ও এর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ফসিল ফুয়েল বা মাটির নিচের জ্বালানির ওপরে। দুনিয়াতে যে জ্বালানির বিরাট এক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের দেশে ও দখলে । ফলে পশ্চিমারা বিরাট অসুবিধায় পড়বে। কথা সত্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য এক সত্যও আছে। রিলেশনাল, মানে পশ্চিমের সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকার দিকটা কেউ ভালো করে দেখেনি। তেল না বেচলে ক্রেতার কী দশা হবে, কী অসুবিধায় পড়বে এটা যত বেশি নজর করা হয়েছিল, এর কণামাত্র নজর দেয়া হয়নি এতে বিক্রেতার কী দশা হবে। এতে ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যেন তেল বিক্রি করা বিক্রেতার একটা ঐচ্ছিক ব্যাপার খেয়াল বা শখ। তেল বিক্রি যেন বিক্রেতার দিক থেকেও গভীর প্রয়োজনের বিষয় নয়। অথচ ব্যাপারটা ছিল ঠিক এর উল্টো।  প্রতিটি আরব রাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশেষ করে বাজেটের রাজস্ব আয়ের (৯০-১০০%) একমাত্র উৎস ছিল ফসিল ফুয়েল বিক্রি। ফলে তেল বিক্রি না করলে পশ্চিমা শক্তি বিশাল বিপদে পড়বে সন্দেহ নেই; কিন্তু তেল বিক্রেতা আরব দেশগুলোর অর্থনীতি চলবে কীভাবে? এ দিকটাতে কোন গুরুত্বই দেয়া হয়নি। অতএব বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্তের ফলাফল শেষ বিচারে আত্মঘাতী হিসেবে হাজির হয়েছিল। আরব জাতীয়তাবাদ থেকে মিসরীয় জাতীয়তাবাদ অথবা সিরীয় জাতীয়তাবাদ হয়ে যাওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলোও কাজ করেছিল। শেষ বিচারে তেল অবরোধ হয়ে ওঠে আরবদের জন্যই বুমেরাং, কাউন্টার প্রোডাকটিভ। এ ছাড়া যুদ্ধ কোন ব্যয়-বিনিয়োগ প্রকল্প নয়, বরং আয়বিহীন বা রিটার্ণ না আসা এক বিনিয়োগ। ফলে  একদিক থেকে দেখলে যুদ্ধ মানে একটি রাষ্ট্রের আয়বিহীন এক ব্যয়ে জড়িয়ে পড়া। আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে সব আরব রাষ্ট্রের দশা ছিল তাই। ফলে যখন তেল বিক্রির আরব রাষ্ট্রগুলোর দরকার আরও আয় যাতে যুদ্ধ মানে ওই আয়বিহীন একটি ব্যয়ে ভারসাম্য ফেরে। অথচ তাঁরা পদক্ষেপ নিয়েছিল প্রয়োজনের উলটা – তেল অবরোধ। ফলে তেল অবরোধ সিদ্ধান্ত না টেকার পেছনে এটাও বড় একটা কারণ।
    তবু “তেল অবরোধ” নামে তৎপরতাটাই, তা সে যত কম দিন কার্যকর থাকুক তা পশ্চিমকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিল। এরই প্রমাণ হলো আমেরিকার থেকে তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন। পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে আমেরিকা তেলে উদ্বৃত্ত হোক আর না হোক, আমেরিকান তেল কোনো ব্যবসায়ী রফতানি করতে পারবে না বলে আইন পাস হয়েছিল। আইনটা পাসের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, “আমেরিকার নিজের মজুদ তেল সংরক্ষণের (মানে আমেরিকান নিজের তেল একমাত্র শেষ হতে হবে কেবল নিজেরা ভোগ করে, বিক্রি করে নয়) জন্য রফতানিকে নিরুৎসাহিত করতে এই বিল আনা দরকার”, তাই। ‘সংরক্ষণের’ এ কথা থেকে বোঝা যায় তাদের ভয়ের মাত্রা সম্পর্কে।

    চল্লিশ বছর এতদিনে পরে এখন সেই আইন সংশোধন করে নেয়া হলো। অর্থাৎ এখন থেকে আমেরিকান তেল রফতানি করা যাবে। লন্ডন ইকোনমিস্ট ১৮ ডিসেম্বর বলছে, মূলত রিপাবলিকানদের উৎসাহ ও তাদেরই আনা বিল এবং তেল ব্যবসায়ী লবি যারা গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছিল এদেরই মিলিত আগ্রহে বিলটা আসে। আর ডেমোক্র্যাটরা যারা সংখ্যালঘু, এখন তারা অন্য একটি কিছু পাওয়ার আসায় সেই বিনিময়ে আনা এই আইনকে পাস হতে সম্মতি দিয়েছে। সব মিলিয়ে আইনটি পাস হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫। প্রায় এক মাস আগে। এই অর্থে এটা কোনো একটা দলের একক প্রচেষ্টা আর অন্যটার বাধা দেয়া নয়, বরং বাই-পার্টিজান বা আমেরিকান দুই পার্টি মিলে নেয়া যৌথ সিদ্ধান্ত। আমেরিকান পুঁজিবাজারবিষয়ক মুখ্য পত্রিকা ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মন্তব্য করে লিখেছে, চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার পরে ‘এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক’ এবং ‘এতে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ের মুখে পড়ে আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটবদল’ প্রতিফলিত। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা গেল চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার ঘটনাটা। কিন্তু ‘তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ে’ ঘটা ঘটনাটা কী? মানে ঠিক এখনই কেন তেল রফতানির অবরোধ তুলে নেয়া?

    নতুন ধরনের এক তেলের উৎস একালে চালু হয়েছে- শেল অয়েল। চালু হয়েছে কথাটা টেকনোলজির দিক থেকে বলা- নতুন এক টেকনোলজি চালু হওয়াতে শক্ত শ্লেট থেকে তেল উৎপাদন করা যাচ্ছে। শ্লেট-পেন্সিলে লেখার শ্লেটের মতো দেখতে, স্তরের ওপর স্তর পড়া শক্ত মাটির শ্লেট  – মাটির নিচে এর ওপর উচ্চ চাপ ও তাপের পানি পাঠিয়ে তা থেকে উত্থিত তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করার টেকনোলজি ব্যবহার করে এই তেল উৎপাদন করা হয়। সম্ভবত এটাও আরেক ধরনের জীবাশ্ম, তবে এটা থেকে তেল বের করার কার্যকর টেকনোলজি ছিল না বলে এর ব্যবহার আগে ছিল না। এখন এই টেকনোলজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি ও খরচ পোষায় মনে করাতে শেল অয়েলের ব্যবসায় একটা উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা চলছে। এভাবে তেল বের করার এই টেকনোলজিটাকে বলা হয় ফ্রেকিং। তাই অনেকে এটাকে ফ্রেকিং অয়েলও বলে। অথবা শ্লেট জাতীয় উপাদান বা কাঁচামাল থেকে এই তেল বের করা হয় বলে একে শেল অয়েলও বলা হয়। এ ছাড়া এই টেকনোলজিতে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয় বলে এবং এর প্রক্রিয়ায় প্রচুর অব্যবহৃত তাপ উদ্ভব হয়, যেখানে দুনিয়ার তাপমাত্রা কমানোটাই এখন ইস্যু সেখানে পরিবেশগত দিক থেকে এটা পরিবেশ বিনষ্ট আরো বাড়িয়ে তোলে এমন এই টেকনোলজি। ফলে অনেকে একে নোংরা তেল বা ডার্টি অয়েল নামেও ডাকে। মাটির নিচে  মজুদ শ্লেটের এর দিক থেকে বড় বা শীর্ষে থাকা দেশ হল আমেরিকা, জর্ডান, কানাডা ইত্যাদি। বলা হচ্ছে, আমেরিকান মজুদের পরিমাণ এত বেশি যে, তা দিয়ে আমেরিকান জ্বালানি চাহিদা মেটানো তো বটেই এমনকি তা মিটিয়েও আমেরিকা শেল অয়েল রফতানি করতে পারে। তাই, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকায় এই শেল অয়েল উৎপাদনের জোয়ার উঠেছে। ফলে গত তিন বছর ধরে এই জোয়ার ওঠাতে আমেরিকান মিডিয়ায় শেল অয়েলের বিরুদ্ধে নেগেটিভ দিক যেগুলো আছে তা খুব কমই ছাপা হচ্ছে। এই টেকনোলজির আরেক বড় নেগেটিভ দিক হল এই টেকনোলজি ব্যবহারের তুলনামূলক খরচ মানে তেল বের করা বা তেল তুলার খরচ অনেক বেশি। বলা হয়েছিল বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের বেশি হলে বেশ আয়েশে এই ব্যবসা করা যায়। সারকথায় তরল জীবাশ্ম তেল উৎপাদনের চেয়ে এর খরচ বেশি। সেটা যাই হোক, আমেরিকার এই শেল অয়েল বা ফ্রেকিং অয়েল উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে বলেই এই তেল উৎপাদনকারীদের লবি চাপ ইত্যাদিতে পরে এখন চল্লিশ বছর পরে আমেরিকা থেকে তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হল।

    আর ঠিক এখানেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জীবাশ্ম তরল তেল উৎপাদকদের (মূলত মধ্যপ্রাচ্যের) এক কার্টেল-জোট হল ওপেক (OPEC)। ওপেকের সাথে পশ্চিমের স্বার্থবিরোধ অনেক পুরনো। আমেরিকান রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া উপলক্ষে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট গত মাসে ১৮ ডিসেম্বর এক রিপোর্ট বের করেছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা অনুবাদ করলে হয় এরকম : “যুগ যুগ ধরে ‘বাজার’ শব্দটা বিশ্বব্যাপী তেলবাণিজ্যে এক আনফিট শব্দ হয়ে আছে। তেল উৎপাদনকারীদের আন্তর্জাতিক কার্টেল ওপেক শুধু তেলের বাজারে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করেছেই শুধু নয়, নিজের জন্য নানা মাত্রার সফলতাও বের করে নিয়ে গেছে।” এই বাক্য থেকে ওপেকের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধের তীব্রতা টের পাওয়া যায়। সারা দুনিয়ায় যে তেল উৎপাদন হয় এর এক-তৃতীয়াংশ করে ওপেক সদস্যরা সবাই মিলে। আর ওপেকে উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশের কিছু বেশি একাই উৎপাদন করে সৌদি আরব- এটা প্রতিদিন মোটামুটি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল, যেখানে এখন দুনিয়ায় দৈনিক মোট উৎপাদন ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। ফলে ওপেকের কোনো সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। ফলে তেলের বাজারে আমেরিকার শেল অয়েল নিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে সৌদি আরব লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কাজে সে সহজেই ওপেককে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে নিতে পেরেছে। এখানে শেল অয়েলকে ঠেকানোর সৌদি কৌশল হল- শেল অয়েলের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি, সেটাকে কাজে লাগানো। এ কারণে এক দিকে সৌদি আরব ক্রমান্বয়ে তেলের দাম ফেলে দিচ্ছে। আবার একই সাথে ওপেকে জোটবদ্ধ হয়ে উৎপাদন না কমিয়ে (তেলের দাম বেড়ে যাবে বলে) বরং বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে তেলের দাম ফেলে দিয়ে ২০০৩ সালের সমান ২৭ ডলারে নামিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে হটানোর মতো ফল এতে পেয়েছে। যেমন ব্রিটিশ বিপিসহ বহু তেল কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী ছাঁটাই করেছে, নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে, নতুন করে রিগ বসানোর যত পরিকল্পনা তেল তোলা কোম্পানিগুলোর ছিল, সব স্থগিত হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি সৌদি আরবের কম হয়নি। বলা হয়, প্রতিদিন নাকি সৌদি আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানে হাফ বিলিয়ন ডলার কম হচ্ছে। আইএমএফ হিসাব করে বলছে, এ বছরে মধ্যপ্রাচ্য মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হারাবে। আইএমএফ সৌদি আরবকে সাবধান করেছে এভাবে সীমাহীন তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিপদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে।

    সৌদিদের এই লড়াইয়ে জেতার কৌশল সহজ। তারা মনে করে, দীর্ঘ দিন ২০ ডলার বা কম দামে তেল বিক্রি করে লোকসান সহ্য করার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে দেউলিয়া বানানোর পরেই সে বাজারের লাগাম টেনে ধরবে, উৎপাদন কমিয়ে তেলের দাম বাড়াবে। এ ব্যাপারে সৌদিদের অনুমিত সময়কাল এক বছর। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বা সৌদিরা দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে। এ বছরের জুন মাসের পর থেকে এসব ব্যাপারে আলামত ফুটতে শুরু করবে সৌদি আরবের বিশ্বাস। এ কাজে তার প্রধান টার্গেট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রথমত আমেরিকান শেল অয়েল। আর এর পরের টার্গেট আবার বাজারে ফিরে আসা ইরান। দেখা যাক কার নার্ভ কত শক্ত, কে কতক্ষণ টেকে!

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ১৭ জানুয়ারি.২০১৬ সংখ্যায়  এবং ১৬ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল।]

  • নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন

    নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন
    গৌতম দাস

    ০৯ এপ্রিল ২০১৫

    https://wp.me/p1sCvy-9Y

    আগামী দিনের ইতিহাসে ১২ মার্চ ২০১৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে সম্ভবত বিবেচিত হবে। ঘটনাটার শুরু, গত বছরের অক্টোবরে চীনের সাংহাইয়ে চীন কর্তৃক প্রস্তাবিত Asian Infrastructure Investment Bank (সংক্ষেপে AIIB), এর উদ্যোক্তা সদস্য হতে আগ্রহী দেশগুলোর আহূত এক সম্মেলন থেকে এই ব্যাংকের কার্যক্রমের হাজিরা ঘোষণা করেছিল। AIIB কার্যকর হলে তা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখতে শুরু করবে। ওই সম্মেলন থেকে উদ্যোক্তা পত্র বা Memorandum of Understanding (MOU)-এ স্বাক্ষর করা শুরু হয়েছিল। উদ্যোক্তা সদস্য কারা কারা হতে চায় সেই সম্মতি জানানোর খাতা তখন থেকে খোলা হয়েছিল। উদ্যোক্তা স্বাক্ষরদান বন্ধ হওয়ার শেষ দিন ৩১ মার্চ ২০১৫। উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় ১৩ মার্চ ২০১৫ হঠাৎ করে ব্রিটেন ওই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়ার ওপর মাতবরি, আধিপত্য প্রভাব জারি রাখার উদ্দেশ্যে মাতবর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় আলোচনার জন্য ‘জি৭’ বা গ্রুপ সেভেন নামে একটি সংগঠন আছে। গ্রুপ সেভেন অন্তর্ভুক্ত সাত রাষ্ট্রের সবাই তবে আলাদা আলাদা করে AIIB-এর ঘোষণার সময় ঘটনাটিকে বাঁকা চোখে দেখেছিল। এখন ‘জি৭’-এর ব্রিটেন একমাত্র রাষ্ট্র যে দলছুট হয়ে বিপরীত ক্যাম্পে যোগদানের সিদ্ধান্ত জানাল। ওদিকে ব্রিটেনের এ সিদ্ধান্তে আমেরিকা সবচেয়ে অখুশি ও অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। জবাবে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে আমেরিকার সঙ্গে আমাদের অবস্থান নিয়ে কথা হয়েছে।’ আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় ‘এটা সারপ্রাইজ সিদ্ধান্ত’। বোঝাই যাচ্ছে, AIIB-এর উত্থান বা আবির্ভাব কোনো সাধারণ ব্যাংক আবির্ভাবের মতো ফেনোমেনা নয়। এটি ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েই ফাংশনাল হতে যাচ্ছে, ফলে স্বভাবতই তা হবে এ দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের ভেতর দিয়ে ওই যুদ্ধের পর থেকে (১৯৪৪) ইউরোপকেন্দ্রিক কলোনি শাসনের যুগের সমাপ্তি টেনে অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন করে পশ্চিমা শাসন দুনিয়াতে কায়েম হয়েছিল। এর সবচেয়ে তাৎপর্যময় দিকটি ছিল, আমেরিকা নিজের আধিপত্যের নতুন কাল শুরু করেছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে – আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসংঘ আর ডবিস্নউটিও এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। এ চার প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুইটি গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য, তৃতীয়টি গ্লোবাল রাজনৈতিক (পরাশক্তিগত) ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য আর চতুর্থটি গ্লোবাল পণ্য রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য। এভাবেই দুনিয়াতে নিজের অধীনস্থ নিজেদের দিকে কান্নি মারা এক গ্লোবাল আধিপত্য ব্যবস্থা কায়েম ও যাত্রা শুরু করা হয়েছিল। গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দুনিয়ায় আধিপত্য করার এ ফেনোমেনা এর আগের ৩০০ বছরের কলোনি যুগেও দেখা যায়নি। কলোনি যুগ সেটা পারেনি। যেমন আইএমএফের প্রধান ভূমিকা বা ম্যান্ডেট হলো, আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা চালু রাখা। সে কাজে মুখ্য প্রয়োজনীয় হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিনিময় মুদ্রা। আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে আয়ব্যয়ের ঘাটতিতে পড়া সদস্য কোনো রাষ্ট্রকে ধার দিয়ে ঘাটতি পূরণ – এ দুই মূল কাজের মাধ্যমে গ্লোবাল মুদ্রা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ করে আইএমএফ সে ভূমিকা বাস্তবায়ন করে থাকে। মানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের সঙ্গে আর তিনটি প্রধান মুদ্রার তুল্য বিনিময় হার নির্ধারণ করে, এরপর বাকি সব সদস্য রাষ্ট্রের মুদ্রার বিনিময় হার সেই নিরিখে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করে থাকে। এটা বলা বাহুল্য যে, এ প্রাতিষ্ঠানিকতা একচেটিয়া আমেরিকা বা এর মুদ্রা ডলারের অধীনে নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো গরিব বা ছোট অর্থনীতির দেশের ওপর আধিপত্য কায়েম করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ অস্বস্তি সত্ত্বেও এর ভেতর দিয়ে পড়ে পাওয়া সুবিধার দিকটি হলো, আমেরিকার দিকে কান্নি মারা হলেও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা, যেটাকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বলছি তা দুনিয়ায় সেই থেকে চালু হয়ে আছে। চলতি এ গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি যুগের মুদ্রা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও মান নির্ধারণের লক্ষ্যে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম ঘটেনি। এমনকি কোনো কলোনি মাস্টার যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রাষ্ট্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কিছু ছিল না। আর মুদ্রার মান বা হার নির্ধারণ নিয়ন্ত্রণও কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করত না। ব্যাংক অব ইংল্যাল্ডকে মাত্র ১৯৪৬ সালে সরকার অধিগ্রহণ করে ব্রিটেনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের দায়িত্বে হাজির করে। দেশের ব্যাংক ব্যবসা ও স্থানীয় মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ সেন্ট্রাল ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নিতে হবে – এ ধারণাটি ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সমসাময়িক ঘটনা। কারণ আইএমএফ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমেই নিজের উপস্থিতি, কর্তৃত্ব তৎপরতা ও কার্যকারিতা কায়েম করে থাকে। সে সময় এসবের কোন বালাই ছিল না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ছিল খুবই সীমিত পর্যায়ে। ফলে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হতো কোনো প্রাইভেট ব্যাংকে নয়, যেমন হত রথশিল্ড-পরিবার ধরনের পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে; বাবা রথশিল্ড আর তার তিন ছেলে ইউরোপের চার শহরে বসে পরস্পরের যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে বিনিময় হার নির্ধারণ করে দিতেন। এভাবেই এক মুদ্রা বিনিময় হার ও মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফলে সীমিত পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ব্যবস্থা সে সময় চালু ছিল। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় কথা হলো, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মুদ্রা বিনিময় হারের এই ব্যবস্থার প্রতি বাজারের আস্থাহীনতার কারণে ভেঙে পড়েছিল চিরদিনের জন্য। পরে শেষমেশে এ প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে ১৯১৪ থেকে ১৯৪৪ এই ৩০ বছর কোনো আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা বলে কিছু ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। এরপর এমন দুর্দশায় পৌঁছানো ইউরোপ বারবার অনুরোধ করে একেবারে হাতে-পায়ে ধরার অবস্থায় পৌঁছে, আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় (আইএমএফ) আমেরিকান ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সূচনা হয়। আমেরিকার হাতে-পায়ে ধরা আর ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো – এসবের মূল কারণ একটাই। তা হলো ১৯১৪ সাল থেকেই যুদ্ধে জড়িয়ে ইউরোপের প্রতিটি রাষ্ট্র যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় আয়ব্যয়ের মারাত্মক অসামঞ্জস্য ঘাটতির মুখোমুখি হয়। পরিণতিতে প্রত্যেকেই জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েও অন্য দেশের মুদ্রার তুলনায় নিজ মুদ্রার একটি স্থিতিশীল মান বা হার ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতে সে সময়ের একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। তাই ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা মেনে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো, ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা সাজানো ছাড়া কারও উপায় ছিল না। আইএমএফের জন্ম হয় এভাবেই। সে থেকে ডলারকেন্দ্রিক অন্য মুদ্রার হার নির্ণয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্যের খাতায় ডলার হিসাবের মুদ্রা হয়ে পড়া ও অন্যান্য মুদ্রার হার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করে আসছিল আইএমএফ। সংক্ষেপে এ হলো ডলারের উত্থান ও শাসন কাহিনী। কিন্তু ১০ বছরে ক্রমেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সে কাহিনীতে নয়া ওলটপালট আসন্ন হওয়ার আলামত দেখা দিতে শুরু করেছে।

    শুরু করেছিলাম ইতিহাসের কথা তুলে। সে আগামী দিনের ইতিহাস মানে কোন ইতিহাসে- ‘গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক’ অর্থনৈতিক ইতিহাসে। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা বা অর্ডার শৃঙ্খলের ওপর এবার চীনের নতুন করে নতুন প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়ার প্রভাব  – এটা  শুধু গ্লোবাল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এ প্রভাব পড়বে ও ধীরে ধীরে বাড়বে- দুনিয়ার পরাশক্তিগত ভারসাম্যে, গ্লোবাল রাজনীতিতে, স্ট্র্যাটেজিক ও সামরিক ইত্যাদি সব গ্লোবাল ফেনোমেনাকে তা প্রভাবিত করবে। চলতি একুশ শতকের প্রথম দশক (২০০১-২০১০) গ্লোবাল পরাশক্তিগত পরিস্থিতিতে দুইটি নতুন ইঙ্গিত হাজির হতে দেখা দিয়েছিল। প্রথমটি গ্লোবাল রাজনৈতিক ফেনোমেনা আকারে। দুনিয়ায় পশ্চিমের ক্ষমতা আধিপত্যের শাসনকে চ্যালেঞ্জকারী ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে সামনে আনা বা তুলে ধরার নতুন রাজনৈতিক ফেনোমেনা। গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের এ নয়া প্রভাব আর এর পাল্টা পশ্চিমের ‘ওয়ার অন টেরর’ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, পরিণতিতে আগামীতে দুনিয়া দেখতে কেমন হবে তা এখনও ফয়সালা হয়নি। তা আদৌ হবে কিনা, নাকি কে হেরে যাবে তা এখনও অমীমাংসিত অসমাপ্ত। তবে ছড়িয়ে পড়া বা বিস্তৃতির দিক থেকে বললে গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব ভালোই ছড়িয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকা বাদে সব মহাদেশকেই তা স্পর্শ করে ফেলেছে বলা যায়। এছাড়া ওদিকে ঐ দশকের দ্বিতীয় ফেনোমেনাটা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের উত্থান। আর এর প্রভাবে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভূমিকা নড়বড়ে হয়ে নতুন এক পরাশক্তিগত ভারসাম্য আসন্ন হওয়ার ইঙ্গিত। এর রাজনৈতিক ইঙ্গিতগুলো অনুভূত হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই; কিন্তু আমেরিকার সরকারি গবেষণা, স্টাডি এবং প্রাপ্ত নিউমেরিক্যাল ডাটা প্রজেকশন থেকে প্রথম নতুন চিত্র স্পষ্ট হয় ২০০৭-৮ সাল থেকে। অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজির প্রবাহ পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী হতে শুরু করেছে- এ তথ্যগত স্বীকৃতি তখনকার প্রকাশিত রিপোর্ট থেকেই প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, পুঁজির এ প্রবাহের ধরন কেবল একমুখী অর্থাৎ ভবিষ্যতে আবার কোনোদিন এর বিপরীতমুখী হওয়ার সম্ভাবনা নেই- এটাও সেই গবেষণালব্ধ ফলে প্রকাশিত হয়। এ গবেষণা হয়েছিল আমেরিকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের’ অধীনে এবং ২০০৮ সালে জনসমক্ষে প্রকাশিত রিপোর্টে। এমনিতেই এমন পরিসংখ্যানগত গবেষণা রিপোর্ট প্রতি চার বছর অন্তর প্রকাশিত হওয়া এক চলমান ঘটনা। তবে ২০০৮ সালের রিপোর্ট ছিল স্বভাবতই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওই রিপোর্টকে বলা যেতে পারে, গ্লোবাল অর্থনীতি ও পরাশক্তিগত পরিস্থতিতে আসন্ন নতুন করে সাজানো ভারসাম্যের ইঙ্গিত। এসব ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান কী হতে যাচ্ছে সেসব জানা ও জানানো। কিন্তু বাস্তবে সে জায়গায় চীন পৌঁছাবে কী করে আর তাতে উপস্থিত মাতবররা কে কি ভূমিকা নেবেন এসবের বাস্তব রূপ আকার দিতে যাচ্ছে AIIB-এর আবির্ভাব। কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের চীন যে এমন কিছু করতে যাচ্ছে তা অনেক আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। যেমন- নিজ বাণিজ্যের উদ্বৃত্তের অর্থ নিয়ে চীন চুপচাপ পুরনো কান্নি মারা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক যেমন আছে, তেমনি রেখে এতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুনিয়াতে নিজের নতুন প্রভাব যোগ করার চেষ্টা করা – এটাকে চীন সঠিক মনে করেনি। তাই এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটিং রাইট ইত্যাদিতে সংস্কারের দাবি করেছিল। প্রতিষ্ঠান দুইটি ২০০৯ সালের বার্ষিক সম্মেলন থেকেই এ ব্যাপারে নিজের সম্মতির কথা জানান দিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতে সাড়া দেয়নি। প্রতিষ্ঠান দুটোর সংস্কার প্রস্তাবের ফাইল সেই থেকে আমেরিকান কংগ্রেসে পড়ে আছে। ফলে ২০০৯ সাল থেকেই চীন বিকল্প উদ্যোগ নেয়ার পথে চলতে শুরু করে। আর এতে বিশেষত রাশিয়ার প্রবল আগ্রহে BRICS ব্যাংক নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ শুরু হয়। রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকাকে নিয়ে রাশিয়াতে প্রথম ব্রিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সে থেকে প্রতিবছর ব্রিক সম্মেলন হওয়া সত্ত্বেও ইন্ডিয়ার নড়বড়ে হাফ-হার্টেড ভূমিকার জন্য ব্রিক কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে এখনও অনেক দূরে থেকে যায়। এ অবস্থা দেখে চীন আর এক বিকল্প উদ্যোগে আগানো শুরু করে। মাত্র ২০১৩ সালে AIIB-এর ঘোষণা দিয়েই পরের বছর ২০১৪ সালে AIIB এর উদ্যোক্তা সম্মেলন ডেকে বসে চীন। ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের চেয়েও AIIB-এর উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনেক গতিশীল। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ব্রিটেনের এতে যোগদানের সিদ্ধান্ত বিরাট সাড়া ফেলতে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া অক্টোবরের AIIB-এর উদ্যোক্তা সম্মেলনে প্রায় যোগ দিয়েই ফেলেছিল; কিন্তু ওবামার কড়া হুমকি ও লবিংয়ের কারণে এরা শেষে থমকে যায়। এবার ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের প্রভাবে ওবামার বাধা পেরিয়ে দেশ দুইটি এবার সম্ভবত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। এ বছরের শেষ থেকে উদ্যোক্তারা AIIB-কে কার্যকর করে ফেলতে চান। AIIB-এর উত্থান ৭০ বছরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর ওলটপালট ঘটনা হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে।

    দুইঃ

    চীনের বিশ্বব্যাংক, এবার “উন্নয়ন” এর অর্থ কি বদলে যাবে
    আগের পর্বে বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং একে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনের নেতৃত্বে AIIB ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে বলেছিলাম। AIIB ব্যাংক গড়ার লক্ষ্যে চীনের সাংহাইয়ে প্রথম উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়েছিল গত বছর ২৬ অক্টোবর। ওই সম্মেলনে এশিয়ার বাইরের কোনো রাষ্ট্র যোগ দিতে আসেনি। AIIB প্রসঙ্গে আগের লেখাতে ফোকাস করেছিলাম ১২ মার্চ, আচমকা ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে। এবারের ফোকাস অন্যদিকে। AIIB-তে বিশ্বব্যাংকের মতোই শুধু কোনো রাষ্ট্রই এর সদস্য হতে পারে, কোনো প্রাইভেট কোম্পানি বা ব্যক্তি নয়। আর সম্মেলনের দিনেই কে কে উদ্যোক্তা হতে চায় এমন রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি স্বাক্ষর বইয়ে সই করেছিল এশিয়ার ২০টি রাষ্ট্র। এরপর সে স্বাক্ষর খাতা খুলে রাখা হয় পরবর্তী পাঁচ মাস, ৩১ মার্চ পর্যন্ত। মঙ্গলবার শেষ দিন গত হয়েছে। এর মানে কি এখন আর কেউ সদস্য হতে আবেদন জানাতে পারবে না? না ঠিক তা নয়। ৩১ মার্চের পরের আবেদনে কেউ সাধারণ সদস্য হতে পারবে, কিন্তু আর উদ্যোক্তা সদস্য হতে পারবে না। যেমন- বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল, স্বাক্ষর করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সদস্যদের একজন। তাতে বাংলাদেশের বাড়তি কী লাভ হতে পারে? লাভ হল। এখন শুধু উদ্যোক্তা সদস্যরাই বসে আগামী বছর থেকে কাজে নেমে যেতে চাওয়া AIIB ব্যাংকের ম্যান্ডেট অর্থাৎ এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেল লিখবে। আর একটু সোজা কথায়, কে কত শেয়ার মালিকানা নেবে, পরিচালনায় কে কোন পদপদবি নেবে-পাবে, দায় নেবে, পরিচালনার নীতি, সদস্যপদের চাঁদা ধার্যের নীতি, ঋণ দেয়ার নীতি ইত্যাদিসহ পরিচালনার সব বিষয়ে নির্ধারণ করতে পরস্পরের সঙ্গে নিগোসিয়েশনের টেবিলে বসবে, নিজ নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে, নীতি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। যারা ৩১ মার্চের পর সদস্যপদের আবেদন করবে তারা আর এই টেবিলে বসার সুযোগ পাবে না। এ হলো ফারাক। তবে একথা থেকে বোঝাই যাচ্ছে, ওই টেবিলে বসাটাই আবার শেষ কথা নয়, নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা, আরও স্পষ্ট করে বললে মূলত কী পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের অর্থনীতি আমার রাষ্ট্রের আছে এবং তা কতটা দীর্ঘ লাগাতার- এসবই ঠিক করে দেবে নেগোসিয়েশন টেবিলে আমার গলার স্বরের ওজন কেমন হবে। তবে আবার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার মতো ইস্যুগুলো নেগোসিয়েশনের মতো বিষয় নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের নিজের দক্ষ ও স্বচ্ছ হয়ে টিকে থাকা না থাকার বিষয়। তাই এসব বাস্তবে বেস্ট যা করা সম্ভব তাতে সবার ঐকমত্যই ঘটবে তা আশা করা যেতে পারে। আর কিছু প্রসঙ্গে সিরিয়াস বিতর্ক দেখা দেবেই, তা বলা বাহুল্য।

    যেমন ‘উন্নয়ন’ বা ইংরেজিতে ‘ডেভেলপমেন্ট’ শব্দের কথাই ধরা যাক। অনেকে আমরা হয়তো খেয়াল করেছি অথবা না, তবে এটা বুঝি এ শব্দটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে চলে এমন এক শব্দ। এ শব্দের বিশেষ অর্থ ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে নতুন বিশেষ অর্থে কয়েন করে নেয়া হয়। বিশেষ কিছু বোঝানোর শব্দ হয়ে যায় এটা। এ শব্দ আর এর ভাবের প্রভাবে আমাদের রাজনীতির ভোকাবুলারিও বদলে গেছে। যেমন বলা হয়, আমরা ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ করি বা করব। এমন ভাবের বাক্য ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্ব্বার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত চালু এবং সরকার বা বিরোধী সবাই ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, অহরহ ব্যবহার করি। ভোটার, জনগণের কাছেও এর অর্থ আছে, নিজের মতো করে বুঝে, কমিউনিকেটেডও হয়, পৌঁছায়। ভোটার-জনগণও কিছু একটা বোঝে। তাহলে এমন প্রশ্ন তুললাম কেন যে, AIIB ব্যাংক গঠনের নেগোসিয়েশনের কালে উন্নয়ন শব্দটা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিতে পারে? সে প্রসঙ্গ হলো এ পর্বের রচনার ফোকাস। কিন্তু সরাসরি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং কিছু বিষয় ধারণা পরিষ্কার করার ভেতর দিয়ে যাব। যেমন- AIIB ব্যাংক কী? এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলতে হচ্ছে এটা বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হতে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও সেই সূত্রে আইএমএফ এরা কেমন প্রতিষ্ঠান, কী করে, কেমনে করে ইত্যাদি সম্পর্কে সোজা ভাষায় কিছু ধারণা দেয়া ছাড়া AIIB ব্যাংক নিয়ে কোনো ধারণা স্পষ্ট করা যাচ্ছে না। তাই এবারের সেকেন্ডারি প্রসঙ্গ হলো এ দুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সংক্ষেপে একটা ধারণা দেয়া।

    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বাস্তবিক কার্যকারিতার দিক থেকে এর তাৎপর্য বলা হয়, এটা যেন আমেরিকা রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির বর্ধিত হাত ধরনের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো প্র্যাকটিক্যাল অর্থে বলা কথা, আইনি নয় বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যান্ডেট বা এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেলে সরাসরি এমন কথা লেখা নেই। কিন্তু আমরা সবাই জানি, টের পাই যে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর যে কোনো সিদ্ধান্তের ওপর আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রবল শুধু নয়, একচেটিয়া।

    আইএমএফের বেলায়, এরকমটা সম্ভব করে তোলা হয়েছিল সদস্যপদ লাভের নিয়ম বা শর্ত যেভাবে আরোপ করা হয়েছে সেখান থেকে। প্রত্যেক রাষ্ট্রকে তার অর্থনীতির সাইজের অনুপাতে নির্ধারিত-ধার্য সদস্য চাঁদা দিয়ে তবেই সদস্যপদ পেতে হয়। যেহেতু এটি ঠিক ব্যাংক নয়, সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ধার্য বিভিন্ন পরিমাণ চাঁদা একাট্টা করে তৈরি একটি ফান্ডমাত্র, ফলে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা শেয়ার যার বেশি পরিচালনা সিদ্ধান্তে তার বক্তব্যের মূল্য তত বেশি। এ কায়দায় আইএমএফের ওপর আমেরিকান প্রভাব বেশি নিঃসন্দেহে; কিন্তু সেটা কায়েম করা হয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি আমেরিকার, ফলে সদস্য পদে প্রবেশের চাঁদা তার সবচেয়ে বড়, এই কায়দা করে। তবে এভাবে সংগৃহীত আইএমএফের ফান্ড ঠিক বাণিজ্য বিনিয়োগের পুঁজি হিসেবে বা মুনাফা লাভের উদ্দেশে খাটানো হবে এমন ফান্ড নয়। এ ফান্ড ব্যবহার করা হয় শুধু কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ব্যয়ে ঘাটতি থেকে গেলে। সেক্ষেত্রে ওই বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য এ ফান্ড থেকে শর্তসাপেক্ষে তাকে ঋণ দেয়া হয়। তবে মাত্র ০.৭৫% সুদে, অর্থাৎ ওই ঋণ সুদে খাটানোর জন্য বা মুনাফা কামানোর জন্য নয় বরং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় তুলতে সার্ভিস চার্জ হিসেবে নেয়া হয়। তাই এত স্বল্প পরিমাণ। এটাই আমাদের মতো এলডিসি বা স্বল্পোন্নত (অর্থনীতির) দেশের বেলায় দেয়া কনসেশনাল আইএমএফ ঋণ সুবিধা। আর মধ্যম আয়ের দেশ হলে সার্ভিস চার্জের ওপর কিছু মুনাফাও ধার্য হবে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে ধার দেয়ার পূর্বশর্ত হলো, সদস্য দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে আইএমএফের ফর্দ অনুসারে সংস্কার আনতে হবে। এমন এক চুক্তিতে রাজি হতে হবে, আর তা মনিটরিং ও সঠিক পালন সাপেক্ষে কিস্তিতে ধাপে ধাপে ঋণের অর্থ ছাড় করা হবে। এ হলো আইএমএফের একটি প্রধান দায়িত্ব- ম্যান্ডেট বা ঘোষিত উদ্দেশ্য। আইএমএফের দ্বিতীয় করণীয় বা ম্যান্ডেট হলো, প্রত্যেক রাষ্ট্রের মুদ্রার মান-হার অন্য মুদ্রার তুলনায় কত তা প্রতিদিন সকালে প্রকাশ করা। এখানে অন্য মুদ্রা মানে, সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক লেনদেন হয় এমন চারটি মুদ্রা- ডলার, ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েন। এ চারের গড় করে প্রতিদিন তা ডলারে প্রকাশ করা হয়। আইএমএফের ভাষায় আর তার খাতাপত্রে প্রতিদিনের এ গড় মূল্যের নাম SDR, এমনকি প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের আইএমএফ অ্যাকাউন্টের অবস্থা কি, এর হিসাবকিতাব করা ও রাখা হয় SDR মূল্যে। এ অর্থে বলা হয়, আইএমএফের নিজস্ব মুদ্রার নাম SDR. আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের SDR-এর দাম লটকানো থাকে। যেমন ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে এক USD = 0.724763 SDR। আগেই বলেছি, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দাতা বা খাতক সদস্য শুধু কোনো রাষ্ট্রই হতে পারে। কারণ এর লক্ষ্য রাষ্ট্র মানে রাষ্ট্রের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এভাবেই আমেরিকার দুনিয়ার অর্থব্যবস্থার ওপর প্রভাব, কর্তৃত্ব আইএমএফের মাধ্যমে রাখার অবস্থা তৈরি হয়। তবে একটি সুবিধার দিকও আছে, কোনো রাষ্ট্র বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি বাধিয়ে না ফেললে আইএমএফের কাছে বন্ধক বা শর্তের বন্ধনে পড়ার দরকার হয় না।

    এবার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তির আয়োজন প্রসঙ্গে। কোনো কোনো ব্যাংকের নামের মধ্যে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’, ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘রিকনস্ট্রাকশন’ ইত্যাদি থাকতে দেখা যায়। নামের মধ্যে কামের অর্থাৎ ওই ব্যাংক কী ধরনের ব্যাংক, এর চিহ্ন ধারণ থাকে, ইতিহাসও লুকিয়ে থাকে। যেমন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘ইউরোপিয়ান ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আবার বিশ্বব্যাংকের পুরো নাম IBRD, ভেঙে বললে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আমাদের রাজনীতি ও সমাজে ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন শব্দটা আমাদের এদিকে সত্তর দশক থেকে আমদানি ঘটেছিল, পরিচিত হতে শুরু করেছিল। পশ্চিমা দেশেও এ শব্দটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পরিচিতি পেতে শুরু করে। যত জায়গাতেই ডেভেলপমেন্ট শব্দের ব্যবহার দেখা যাক না কেন ওই শব্দ আসলে অর্থ করে, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। অর্থাৎ ডেভেলপমেন্ট মানেই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বুঝলে তবে ডেভেলপমেন্ট শব্দের অর্থের তালাশ মিলবে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কথাটা সংক্ষিপ্তি পেয়েছে শুধু “ডেভেলপমেন্ট” বা ‘উন্নয়ন’ উচ্চারণ করে। কিন্তু ইনফ্রাস্ট্রাকচার মানে আবার কী? বাংলায় এর প্রতিশব্দ আমরা করে নিয়েছি ‘অবকাঠামো’। প্রতিশব্দ জানলেও তবু প্রশ্ন থেকে গেল, অবকাঠামো মানে আবার কী, কার অবকাঠামো, কী সূত্রে – এসব বুঝতে আমাদের যেতে হবে ক্যাপিটাল বা ‘পুঁজি’ ধারণায়। কারণ এসব শব্দ পুঁজি ধারণার চোখে দেখা এবং দেখে তৈরি হওয়া সংশ্লিষ্ট আরও ধারণা এবং ডেরিভেটিভ বা অনুসৃত শব্দ। অর্থাৎ পুঁজি এ ফেনোমেনার চোখ দিয়ে না দেখলে তা থেকে অনুসৃত শব্দগুলোর অর্থ খুলবে না। অবকাঠামো ঋণ বলতে ফিজিক্যাল (রাস্তাঘাট, ব্রিজ ইত্যাদি খাতে) ও হিউম্যান (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে) এ দুই ধরনের অবকাঠামো খাতেই ঋণ বুঝায়। অবকাঠামো বলার বা এ শব্দে চেনানোর কারণ এগুলো ঠিক বাণিজ্যিক তৎপরতা হিসেবে দেখে দেয়া ঋণ নয়। ঋণ ব্যবসার বাজারের তৎপরতায় টার্মোনোলজি হিসেবে যা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তা বোঝাতে অবকাঠামো ঋণ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কোনো ঋণ বাণিজ্যিক কিনা, তা বোঝার মূল নির্ণায়ক সুদের হার। বিশ্বব্যাংকের অবকাঠামো ঋণের সুদ ০.৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ শতাংশের নিচে। এটা ঠিক ঋণের অর্থের ওপর সুদ নয় বরং ঋণ দিবার বিষয়টা পরিকল্পনা, প্রজেক্ট নেয়া, তা বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যে অফিস পালতে হয় সেই অফিস পালা-পরিচালনার খরচ। ব্যাংকের ভাষায় এটাকে সুদ না বলে সার্ভিস চার্জ বলে। এতক্ষণ সব শুনে তো বিশ্বব্যাংকের সবই ভালো মনে হচ্ছে। তাহলে বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো ঋণ দেয় কেন? কী ঠেকা তার? এককথায় বললে, গ্লোবাল পুঁজিবাজারে (আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট, সিঙ্গাপুর বা দুবাই থেকে মূলত পরিচালিত) আমরা যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরও বড় বাণিজ্যিক বিনিয়োগের খাতক হই। যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে, বৈদেশিক ঋণ চাহিদা যত বাড়বে, আমরা ততই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের চোখে আকর্ষণীয় বাজার হয়ে ধরা দেব। অবকাঠামো খাতে ঋণ দিয়ে বিশ্বব্যাংক মূলত আমাদের অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজিবাজারের থেকে বাণিজ্যিক পুঁজি পাওয়ার চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। এটাই তার মূল কাজ, ম্যান্ডেট। কিন্তু অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয় বলে সে ব্যাপারটিকে এদিক থেকে হাজির করে বলবে সে ‘দারিদ্র্যদূরীকরণ’ করছে। তবে কথা ঠিক বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উপযুক্ত খাতক হয়ে যাওয়ার পড়ে পাওয়া (এটা টার্গেট নয় এই অর্থে) এবার পাওয়া বৈদেশিক ঋণের অবকাঠামোর খাতে ব্যয়, ফলে নতুন কাজ সৃষ্টির শর্ত তৈরি। এভাবে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা এমনভাবে সাজানো এক সিস্টেম যার কারণে এর বিভিন্ন শর্তের ফেরে পড়ে আমাদের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর পরাশক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।

    এ ব্যাপারে এত দিন একচেটিয়া কর্তৃত্ব পেয়েছে আমেরিকা। এখন চীনের নেতৃত্বে AIIB বা গ্লোবাল অর্থ ব্যবস্থার পাল্টা প্রতিষ্ঠান হাজির হয়ে যাওয়া মানে আমেরিকার কর্তৃত্বের ভাগে টান পড়া। শুধু তাই নয়, ‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ আমেরিকা যেভাবে নির্ধারণ করে রেখেছে তা বদল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন- উন্নয়ন লোনের পাবার সঙ্গে হিউম্যান রাইট পরিস্থিতি ভাল কি না তা শর্তযুক্ত করে হিউম্যান রাইট নাই এর উসিলায় হস্তক্ষেপ করার সুবিধা এখন আমেরিকার আছে। এখন লোন পাওয়ার বিকল্প উৎস চীন হাজির হয়ে গেলে সেখানে উন্নয়ন শব্দের অর্থ কী দাঁড়াবে? অন্ততপক্ষে চীনের নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে উন্নয়ন শব্দের নতুন অর্থ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সে হিউম্যান রাইট বা পরিবেশকে কি ঋণ বিতরণের সাথে শর্তযুক্ত করবে অথবা করবে না? এটা কী হয়, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

    [এখানে প্রকাশ করা লেখাটা এর আগে বাংলা দৈনিক “আলোকিত বাংলাদেশ” এর উপ-সম্পাদকীয় হিসাবে আমার নামেই ছাপা হয়েছিল। এখানে এক ও দুই পর্ব আকারে তেমন কোন নতুন এডিট না করেই এই ওয়েবে সংরক্ষণের জন্য সংকলিত করে প্রকাশ করা হল।]

  • ইরাকঃ আধুনিক রাষ্ট্র লজিকের আর বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা

    ইরাকঃ আধুনিক রাষ্ট্র লজিকের আর বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা

    গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-7Y

    ০১ আগস্ট ২০১৪।
    চলমান ইরাকের সঙ্কট গত কয়েকমাসে মিডিয়ায় নতুন মাত্রায় শিরোনাম হতে শুরু করেছে প্রথমে ISIL এর আন্দোলন নামে পরে ইরাককে খলিফা রাষ্ট্রের ঘোষণায়। এতে সমস্ত মনোযোগ গিয়ে জড় হয়েছে এই শব্দ দুটোতে – ISIL আর খলিফা রাষ্ট্র। এটা ইরাক রাষ্ট্রের সঙ্কটের এক নতুন মাত্রা। যদিও ইরাক রাষ্ট্রের সঙ্কটকে এখানে ব্যাখ্যা করব মূলত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর থেকে; ইরান বিপ্লবের সাথে ইরাকের ভাগ্য ঘোরতরভাবে সম্পর্কিত। এটা সঙ্কটের অবশ্যই দ্বিতীয় পর্যায়। আর প্রথম পর্যায়ের আর এক সঙ্কটও ছিল যেটাকে ১৯১৯ সালে বৃটিশ-ফরাসী কলোনি মাষ্টারের দেয়া জন্ম সঙ্কট বলা চলে, সেটা কলোনি ভাগবাটোয়ারার স্বার্থে ইরাকের বর্তমান রাষ্ট্র সীমানা যখন টেনে ইরাক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়েছিল। তবে প্রসঙ্গ এখানে দ্বিতীয় পর্যায়ের সঙ্কটের দিকেই, ওর গোড়ার কিছু মৌলিক ইস্যুর দিকে পাঠকের নজর ফিরাব।
    দেশে দেশে বিপ্লবের কথা আমরা অনেক শুনেছি। শুনে আমরা অনেকে আপ্লুতও হই। বিপ্লবী ক্ষমতা্র উত্থান – বলতে প্রচলিতভাবে অনেকে যেমন অনেকে ধরে নেন একটা কমিউনিষ্ট বিপ্লব ঠিক তা নয়। এখানে বিপ্লব বলতে শুধু কমিউনিষ্ট বিপ্লবে তা সীমাবদ্ধ এমন ধরে না নিয়ে বরং ইরানের মত ইসলামি বিপ্লব অথবা যেকোন র্যা ডিক্যাল বিপ্লবী ক্ষমতাকেও ধরে নিয়ে কথা বলব। আবার, মোটা দাগে যেকোন “বিপ্লবী ক্ষমতা” বিষয়টাকে তিনটা পর্বে ভাগ করতে পারি -১) বিপ্লবী ক্ষমতা তৈরি, ২) তা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল আর ৩) পরের এক বড় ধাপ হল সে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু প্রথম দুইটা পর্যায় সম্পর্কে আমরা যতটা অনুসরণ করি ও খবর রাখি “ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার দিকটা” আমাদের কাছে ততটাই অনালোকিত হয়ে দৃষ্টির বাইরে থেকে গেছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই কাজটা নিয়ে এপর্যন্ত কোন রাজনৈতিক তত্ত্ব নাই। তবে কিভাবে বাস্তব ইতিহাসে তা ঘটেছে সেদিকে এখানে আলো ফেলব।

    বিপ্লব কমিউনিষ্ট অথবা ইসলামি হোক, তা এক গ্লোবাল বিপ্লবের ধারণা
    “বিপ্লবী ক্ষমতা” বিষয়টা্র প্রথম দুই পর্ব – বিপ্লবী ক্ষমতা তৈরি ও ক্ষমতা দখল উদ্যোগেরও আগের কাজ, বিপ্লবী তত্ত্ব বা আইডিয়া হাজির করার একটা পর্যায় থাকে। ইডিওলজি (ideology) হিসাবে আইডিয়া (idea) – এদিক থেকে দেখলে যেহেতু এটা আইডিয়া অর্থাৎ চিন্তা বা ভাব ফলে এমনিতেই তা নিজ ভুখন্ড ছাড়িয়ে দুনিয়ায় যেকোন কোণে তা ছড়ানোর যোগ্য। চিন্তা ও চিন্তার প্রভাব রাষ্ট্রীয় সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না; বিশেষত ইডিওলজি যদি নিজেই গ্লোবাল হয় অর্থাৎ গ্লোবালভাবে ঘটবার, ঘটাবার দাবি কর্তব্য সাথে নিয়ে হাঁটে সেক্ষেত্রে ‘আইডিয়া মানেই তা রাষ্ট্রীয় সীমানা ছাড়িয়ে দুনিয়াব্যাপী প্রয়োগ-প্রযোজ্য’ – এই কথাটা আরও পোক্ত হয়ে উঠে। এই বিচারে কমিউনিষ্ট বিপ্লব অথবা ইসলামি বিপ্লবের ধারণা –এগুলো গ্লোবাল বিপ্লবী তত্ত্ব; গ্লোবাল ইডিওলজি; এর প্রয়োগ-প্রযোজ্য এলাকা দুনিয়াব্যাপী – ‘প্যান’ বা নিখিল জুড়ে।
    কিন্তু একটা বিপরীত বাস্তবতা হল, আইডিয়া গ্লোবাল হলেও যে মানুষ বা যারা এই আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য লড়বে তাদেরকে নির্দিষ্ট ভুখন্ড দাঁড়িয়েই লড়তে হয়, এর অন্যথা হবার যো নাই। যেমন কমিউনিষ্ট বিপ্লবের তত্ত্বটা গ্লোবাল, কিন্তু সুনির্দিষ্ট ভুখন্ড রাশিয়াতেই সেটাকে প্রয়োগে বাস্তব সত্য করে তুলতে গিয়েছিলেন লেনিন ও তার সাথীরা। অথচ আগেই বলেছি, যা নিয়ে বিপ্লবীরা লড়বে সেই চিন্তা, ভাব বা আইডিয়া মাত্রই ওর প্রয়োগ প্রযোজ্যতা প্রভাব তখনও গ্লোবালই থেকে গিয়েছিল। আবার, ওদিকে তত্ত্ব গ্লোবাল বলে স্বাভাবিকভাবে এর এনিমি বা শত্রুও তো গ্লোবালই হবে। কেন শত্রুও গ্লোবাল হবে সে কথাটা আবার অন্য আর দিক থেকে আরও বেশি সত্য। যেমন, যতদিন যাচ্ছে জাতীয়, স্থানিক বা লোকাল ক্যাপিটালিজম বলে আর কিছুই থাকছে না, থাকবে না; স্থানীয় অর্থনীতিগুলো ততই পরস্পর আরও ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত ও গভীর থেকে গভীরতরভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম হয়ে উঠছে, আরও উঠবে। লোকাল ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই এই অভিমুখ চোখা হয়ে হাজির ছিল। ফলে এর বিপরীতে ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে নানান ভুখন্ডে প্রতিরোধ যেকোন লোকাল রাষ্ট্রীয় সীমার আন্দোলন লড়াই সংগ্রাম হলেও ওর গ্লোবাল দিক ছিল ও আছে এবং সেটা আর পিছনের শত বছর মত সুপ্ত না থেকে স্পষ্ট মুর্ত হয়ে হাজির হচ্ছে, হবেই। ফলে স্থানীয় ইতিহাস মানেই তা এখন স্পষ্ট গ্লোবাল ইতিহাসের উপাদান হয়ে হাজির হচ্ছে। অন্যভাবে বললে যে কোন স্থানীয় প্রতিরোধ আন্দোলন মাত্রই তাতে গ্লোবাল আকার ধারণ করার উপাদান থাকবে।
    তাহলে সারকথাটা দাড়ালো, আইডিয়া গ্লোবাল তবু স্থানীয় ও সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রে দাঁড়িয়েই সুনির্দিষ্ট ভুখন্ডে প্রকাশিত প্রতিভাত সুনির্দিষ্ট ও আপাত লোকাল কিছু ইস্যুকে কেন্দ্র করেই লড়াই সংগ্রাম শুরু ও সংগঠিত হচ্ছে, হবেই। আর লোকাল এসব আন্দোলনের গ্লোবাল দিক অভিমুখ থাকলেও বাইরে থেকে দেখে তাকে আবার আপাত লোকাল আন্দোলন ও সংগ্রাম মনে হবে। কিন্তু এবার গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রশ্ন – কে এই লড়াইয়ে বাধা হবে? বাধা দেবার শক্তি হবে মূলত লোকাল রাষ্ট্রই। অবশ্যই এমনও হবে, ফোরফ্রন্ট্রে লোকাল রাষ্ট্র থাকবে যদিও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সুত্রে সহজেই সম্পর্কিত থাকা গ্লোবাল পরাশক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধাদানের জন্য স্থানীয় রাষ্ট্রের পক্ষে ভুমিকাও নিবে। অর্থাত মোটের উপর সাক্ষাত বা ইমিডিয়েট শত্রু লোকাল রাষ্ট্র।
    এখন আইডিয়াল বা আদর্শ হত, সারা দুনিয়ায় গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে নানান ভুখন্ডে এবং নানান চেহারার প্রতিরোধ আন্দোলন লড়াইগুলোকে এক কো-অরডিনেশন ধরণের কেন্দ্রের মাধ্যমে যদি পরিচালিত হতে দেখা যেত। কো-অরডিনেশন বা সমন্বয়ের অনুভুত তাগিদ হাজির থাকাটা সবচেয়ে স্বাভাবিক কারণ দেশে দেশে সব প্রতিরোধ লড়াইগুলোর শত্রু কমন – গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। যাহোক আগেই বলে নিয়েছি এটা আইডিয়াল। তাহলে বাস্তবটা কেমন? এব্যাপারে বাস্তব ইতিহাসে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো খুবই খারাপ। শব্দটা “কো-অরডিনেশন ধরণের এক কেন্দ্র” বলেছি, কারণ এশব্দের পিছনের অনুমানটা হল দুনিয়াব্যাপী প্রতিরোধের আন্দোলনগুলো যতটা সম্ভব পরস্পর একে অপরের সহযোগী হয়ে কাজ করতে পারা উচিত – আর তাতে সবাই উপকার পাবে। কিন্তু বাস্তব ইতিহাসে আমরা দেখেছি এটা একটা কো-অরডিনেশন কেন্দ্রের বদলে হাজির হয়েছে যে আগে বিপ্লবী ক্ষমতা দখল করেছে সেই রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থে ও নেতৃত্ত্বে এক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। যেমন লেনিনের রাশিয়া বা মাওয়ের চীন। যার কাজ আর কো-অরডিনেশন থাকেনি, বাস্তবে হয়ে দাড়িয়েছে নিজ রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থে অন্যদের সকলকে ব্যবহার – অন্য দেশ, রাষ্ট্র, দল গোষ্ঠিকে ব্যবহার। এতে বাস্তবে আসলে কি ঘটে সেখানে? বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের পরের রাষ্ট্র একটা মহান কিছু হয়েছে মনে হতে পারে কিন্তু শেষ বিচারে তো সেটা রাষ্ট্রই – আধুনিক রাষ্ট্রেরই কোন একরূপ সেটা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের লজিকও বলবত হবে সেখানে। আর সে লজিকটা হল, রাষ্ট্রের সহজাত বৈশিষ্টমূলক স্বভাব হল সে নিজ রাষ্ট্র সীমার মধ্যকার কেবল নিজ জনগোষ্ঠির স্বার্থকে সবকিছুর উপর প্রাধান্যে রাখে। সেজন্যই সে রাষ্ট্র। ফলে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইডিয়া বাস্তবায়নের বাস্তব উপায় হতে গিয়ে পরিণত হয় নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে ঐ আইডিয়াকে টেলারিং ও খাটো করে নিজ একান্ত স্বার্থের অধীন করে ফেলে। ব্যাপারটা এবার আরও সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলি।
    যেমন কমিউনিষ্টদের বিপ্লবের উদাহরণ হিসাবে সোভিয়েত বিপ্লবকেই যদি ধরি তবে দেখব বিপ্লব ঘটেছিল আসলে কেবল রুশ দেশে, রাশিয়ায়। তাই আসলে ওটা ছিল কেবল রুশ বিপ্লব, অন্তত প্রথম পাঁচ বছর, ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম হবার আগে পর্যন্ত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আসল বিপ্লবটা যেটানে ঘটেছে বিজয়ী নতুন সেই রুশ রাষ্ট্র যেন বাইরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে, টিকে থাকতে ব্যর্থ না হয় সেজন্য কেন্দ্রে কোর হিসাবে রুশ রাষ্ট্রকে রেখে পড়শি দেশগুলোকে যেন ওকে ঘিরে ধরা এক প্রতিরক্ষা বর্মের বলয় হয় সে কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, গঠিত সেই বর্মের নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুশ বিপ্লবে পড়শি-রাষ্ট্রগুলোকে বলি দেবার এই কাজটা আরও সহজ হয়েছে কারণ ১৯২২ সালে যেটাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বলা হল অর্থাৎ যাদের ব্যবহার করা হল এরা আগে থেকেই রুশ সম্রাট জারের রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্ত ছিল। ফলে রুশ সাম্রাজ্যের সীমানাটাই নতুন নামে সোভিয়েত রাষ্ট্রের সীমানা হল। আর এবার কেন্দ্রে থাকল রুশ রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থ – নিজের প্রতিরক্ষা অথবা অন্যভাষায় বললে নিজ বিপ্লব টিকানো। আজকের পুতিনের রুশ ফেডারেশনকে কেন্দ্রে রেখে এমন [রুশসহ মোট] ১৫ রাষ্ট্র (Russia,Ukraine, Belarus, Turkmenistan, Uzbekistan, Tajikistan, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Georgia, Armenia, Azerbaijan, Estonia, Latvia, Lithuania, Moldavia) মিলিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছিল সেসময়। [এরই বিপরীত পথ পরিক্রমাটাই আমরা দেখেছিলাম ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার ১৫ রাষ্ট্রে তার ভাগ হয়ে যাওয়ায় ভিতর।]
    কিন্তু ষ্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়ন খাঁড়া করেও যেন তাতে নিশ্চিত বা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ঐ সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরেও আবার বাফার ষ্টেট এর এক বর্ম গড়ে তোলা হয়েছিল – রুমানিয়া, চেকোশ্লোভিয়া, যুগোশ্লোভিয়া, পোল্যান্ড এমনকি পরে পুর্ব জার্মান এদের নিয়ে। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল, রুশ রাষ্ট্রের প্রথম নিরাপত্তা বর্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন আর এরও উপরে দ্বিতীয় নিরাপত্তা বর্ম হিসাবে এই রাষ্ট্রগুলো ছিল বাফার ষ্টেট বা স্যাটেলাইট ষ্টেট। উদ্দেশ্য একটাই, বিপ্লবের কেন্দ্র রুশ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সুরক্ষা। আর এটা করতে গিয়ে পড়শিরা “দুনিয়ার মজদুর এক হও” নামে শ্লোগানের আড়ালে প্রত্যেকে নিজে বলি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া “বিপ্লব রপ্তানি” বলে আরও একটা কথা আছে। সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনে স্ব স্ব দেশের পার্টিগুলো “দুনিয়ার মজদুর এক হও” নামে ঐ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুরক্ষার পক্ষেই স্থানীয় পার্টি নীতি অনুসরণ করেছিল। তাতে বাস্তবে এর অর্থ দাড়িয়েছিল নিজ জনগোষ্ঠিগত রাষ্ট্রস্বার্থ ভুলে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিদেশ নীতির অন্ধ অনুসরণ করা বললে কম হবে, বলতে হবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিদেশনীতি বাস্তবায়নের বর্ধিত অংশ হওয়া। আর সামগ্রিকভাবে এই ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে গ্লোবাল কমিউনিষ্ট আন্দোলন। [যদিও পরিস্কার থাকার দরকার আছে,একথাগুলো বলতে গিয়ে কেউ যেন মনে না করেন যে, “দুনিয়ার মজদুর এক হও” শ্লোগানটা ভুল ছিল এমন দাবি করা হচ্ছে। না তা নয়। বরং বলা যায়, শ্লোগান বাস্তবায়নের উপায় কৌশলে অপব্যবহার ঘটেছে আর তাতে শ্লোগানের অর্থ বদলে গেছে।] ফলে এখান থেকেই শ্লেষাত্মক মন্তব্য “মস্কোতে বৃষ্টি হলে বাংলাদেশে ছাতা ধরা” এর বাস্তবতা টের পাওয়া যায়। অর্থাৎ মস্কো একান্ত নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থে নিজের রাষ্ট্র ক্ষমতা সুরক্ষা বা বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য পড়শি রাষ্ট্র বা ভিন্ন রাষ্ট্রকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিল। আর একাজে আরও বিশেষ সহায়ক হয়েছিল বিপ্লবের ইডিওলজি আন্তর্জাতিক বা প্যান ধরণের ছিল তাই। অন্যের রাষ্ট্রস্বার্থকে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে বলি দেবার কাজটা আরও সুবিধার ও সহজ হয়েছিল তাতে।
    লেনিনের দেশে ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পরে একটা আভ্যন্তরীণ তর্ক উঠেছিল এক দেশে একটা বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের পরে তাকে একাই টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না। সম্ভব হলে তা কি উপায়ে? এটা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ রাষ্ট্রতত্ত্বের বিতর্ক ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই বিতর্কের কোন সমাধান হয় নাই। তত্ত্বগতভাবে এর কোন সমাধান বের করা হয় নাই। লেনিনের জীবদ্দশায় নয় [রুশ বিপ্লবের পরে লেনিন মাত্র ছয় বছর বেঁচে ছিলেন।] তাঁর মৃত্যুর পরেও আর কখনও নয়। বিপ্লব টিকিয়ে রাখার উপায় হিসাবে সংকীর্ণ কেবল নিজ রুশ রাষ্ট্রস্বার্থে বাস্তবে যা করা হয়েছিল, মনে করা আর বাস্তবে ঘটানো হয়েছিল তা ষ্টালিনের হাতে ও নেতৃত্ত্বে। আর সেটা হল, অন্য সব বিপ্লব সমর্থক রাষ্ট্র আর দেশে দেশে কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোকে রুশ রাষ্ট্র বিপ্লবের স্বার্থে নিজের রাষ্ট্র টিকানোর স্বার্থে ব্যবহার করা। এবং এটাকেই গ্লোবাল কমিউনিষ্ট আন্দোলনের নামে “দুনিয়ার মজদুর এক হও” কথার বাস্তবায়নের পথ বলে তাকে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল।
    আধুনিক রাষ্ট্র ধারণার সহজাত মৌলিক বৈশিষ্ঠের লজিকটা হল, রাষ্ট্র কেবল নিজের, মানে নিজ জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ হাসিলের পক্ষে কাজ করে যাওয়াই ওর একমাত্র কাজ। এখানে নিজ রাষ্ট্র সীমানার বাইরের কোন জনগোষ্ঠি বা স্বার্থ দেখার কাজ নিজ রাষ্ট্রের নয়। বরং সুযোগ পেলে রাষ্ট্র অন্যকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে। ফলে রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থ মানে যে স্বার্থের জন্য সে অন্ধ। আবার অন্যদিকে, কোন রাষ্ট্র নিজ একান্ত স্বার্থের পক্ষে যদি কাজ না করে তবে খোদ নিজ অস্বস্তিত্ত্বই সঙ্কটে পড়ে।
    অন্যদিকে গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক ইডিওলজি রাষ্ট্র সীমানা ছাড়িয়ে প্রযোজ্য এবং প্রয়োগ হতে চায়। সে দাবি করে একই সাথে সে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র এবং অন্য সব রাষ্ট্রের বেলায়ও একই চিন্তার ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে। এটা স্ববিরোধী। কারণ রাষ্ট্রস্বার্থ কখনও কখনও সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থের ভিতরে নিজেরও স্বার্থ ফলে কমন স্বার্থ দেখতে পারে বটে কিন্তু এর মানে এই না যে রাষ্ট্র দুটোর স্বার্থ সবসময় সব ইস্যুতে এক হবেই; কারণ পরক্ষণেই ভিন্ন ইস্যুতে তাদের পরস্পর বিরোধি দেখতে পাওয়া তা হবে সবচেয়ে স্বাভাবিক। এর মুল কারণ গ্লোবাল ইডিওলজি আর রাষ্ট্রস্বার্থ সবসময় হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। আর এক বড় কারণ, রাষ্ট্রস্বার্থগুলো হাজির হয় আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত কমন স্বার্থ – এর উপর ভিত্তি করে। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর সমন্বয় – আবার এটা ঠিক দুটো স্বার্থের সমন্বয় নয় বরং বিশেষ করে গ্লোবাল আইডিয়ার মৌলিক শিক্ষা বা গাইড লাইনের আলোকে রাষ্ট্রস্বার্থগুলোকে ঢেলে সাজানো ও সমন্বয়।
    তাহলে কোন গ্লোবাল ইডিওলজির (কমিউনিজম বা ইসলামের মত যাই হোক) কি কোন ভবিষ্যত নাই? প্রয়োগ যোগ্যতা নাই? না, এখানে আলোচনায় তা বলতে চাওয়া হয়নি। এই রচনায়, প্রয়োগ যোগ্যতা নাই তা বলা হয়নি বরং এটা কিছু মৌলিক প্রায়োগিক সমস্যার দিকে নজর আকর্ষণের চেষ্টা বলা যেতে পারে। আর কে অস্বীকার করতে পারে গ্লোবাল ইডিওলজি ছাড়া মজলুমের মুক্তি অসম্ভব। এছাড়া গ্লোবাল ইডিওলজি নাই তো গাইডিং প্রিন্সিপল নাই একথা কে না মানবে। অর্থাৎ গ্লোবাল ইডিওলজি এক গভীর প্রয়োজনীয় ও মৌলিক জিনিষ। যেকোন আইডিয়া বা চিন্তার দুনিয়াব্যাপী সার্বজনীন অংশটাই দুনিয়ার ভবিষ্যত। তাহলে আধুনিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রস্বার্থ আর ইডিওলজি যদি কখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় তখন এই সংঘাতের সমাধান কি? বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। এমন বাস্তবতা ঘটবেই। ফলে কখনও যদি আমাদের মুখোমুখি হতেই হয় তাহলে অন্তত নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থটাকে গ্লোবাল ইডিওলজির স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া অন্তত আমরা সৎভাবে পরিত্যাগ করতে পারি। দ্বিতীয়ত, কো-অরডিনেশন। অর্থাৎ আইডিয়ার মৌলিক দিকগুলো পরস্পর শেয়ার করা। তবে ঐ আইডিয়া প্রত্যেক ভুখন্ডে আলাদা আলাদা প্রয়োগ কৌশলের পরিচালিত হওয়ার ব্যাপারটা ছেড়ে দেয়া এবং যতদুত সম্ভব পরস্পরের সহযোগী হবার চেষ্টা করা। এভাবে বাস্তব কাজের ভিত্তির দিয়ে ঐক্য পৌছানোর চেষ্টা করা। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের একান্ত সংকীর্ণ স্বার্থ আড়াল করার উপায় হিসাবে ইডিওলজির ভুমিকাকে ব্যবহার করা যাবে না, এই রচনায় এদিকটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আরও কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।
    যেমন ১৯৭৯ সালে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে বসে। অজুহাত হল আফগান কমিউনিষ্ট বারবাক কারমেল নাকি বিপ্লব করেছে, তাই সোভিয়েত আর্মি আফগানিস্তান মার্চ করছে। অথচ আসল ট্রিগার ঘটনা হল সে বছরের শুরুর ইরান বিপ্লব। অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকা মুসলমান পপুলেশনে অধ্যুসিত সেন্ট্রাল বা মধ্য এশিয়ায় [যা তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ] না ইরান বিপ্লবের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবে বিদ্রোহ বিপ্লব দেখা দেয়। তা ঠেকাতে আগাম একশনে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন, [ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার মাঝে] আফগানিস্তান দখল করে উদ্দেশ্য একে বাফার ষ্টেট হিসাবে ব্যবহার করা – সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রের যেটা একান্ত স্বার্থ। কিন্তু সারা দুনিয়ার মস্কো সমর্থক কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো চোখ বন্ধ করে রাশিয়ার সাম্রাজ্য স্বার্থকেই গ্লোবাল কমিউনিষ্টদের স্বার্থ ফলে নিজ স্বার্থ দাবি করে এর সমর্থনে নিজ নিজ দেশ মিছিল সমাবেশ করে। এখানে “সাম্রাজ্য স্বার্থ” শব্দটা সচেতনে ব্যবহার করেছি। কারণ বৃটিশ-ভারত আমলে বৃটিশ সাম্রাজ্য আর জার সাম্রাজ্য ঠিক একইভাবে একইকারণের উভয়েই [Anglo-Afghan War (1878-1880)] আফগানিস্তান দখলের লড়াই করেছিল। ওখানে তখন ট্রিগার ঘটনা ছিল, এর আগে জার সম্রাট সেন্ট্রল এশিয়া অঞ্চল দখল করেছিল আর সেই ভয়ে আফগানিস্তা্নের বাদশা জারের সাথে এক অনাক্রমণ চুক্তি করেছিল। কিন্তু এতে বিপরীতে আবার ভয় পেয়েছিল বৃটিশ-ভারতের বৃটিশ সাম্রাজ্য। তার ভয় সন্দেহ হল যে জারের সাম্রাজ্য আর বৃটিশ সাম্রাজ্যের সীমানার মাঝে এতদিন বাফার রাষ্ট্র হয়ে থাকা আফগানিস্তান না জারকে বৃটিশদের উপর বাড়তি সুবিধা করে দেয়। তাই বৃটিশ সাম্রাজ্য আগাম আফগানিস্তানে হামলা করেছিল। এই প্রসঙ্গে আমরা যেন ভুলে না যাই যে মধ্য এশিয়াসহ জার সাম্রাজ্যের সীমা যতদুর ছিল রুশ বিপ্লব সেই সেই পুরানা সীমা নিয়েই নিজেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পুনর্গঠন করে নিয়েছিল। এই বিচারে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বলা চলে সেই জার সাম্রাজ্যই কিন্তু এবার রুশ কমিউনিষ্ট নেতৃত্ত্বে। মধ্য এশিয়ায় ইরানী বিপ্লবের প্রভাব ঠেকাতে ভয়ে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাই আফগানিস্তান দখল করেছিল। সারকথা, এখানে কমিউনিষ্ট ইডিওলজির ভুমিকা হয়ে গিয়েছিল রুশ রাষ্ট্রের নিজ সংকীর্ণ স্বার্থ আড়াল করার উপায়।
    সমতুলনীয় আর এক ঘটনার উদাহরণ হল, ৬৯-৭১ সালের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চীনা কমিউনিষ্টরা আয়ুব-ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে লড়ুক নেতৃত্ত্ব দেক এটা কমিউনিষ্ট চীন তার একান্ত স্বার্থের সাথে যায় এমন বিষয় মনে করতে পারে নাই। কারণ আজকের চীনের যে উত্থান দেখছি এর সুচনা পর্ব, ততকালে কূটনৈতিক সম্পর্কহীন চীন ও আমেরিকার বিশেষ সম্পর্কের শুরু, সুচনা বা প্রস্তুতি পর্ব ছিল ঐ সময়টা। যেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব ও পরে ইয়াহিয়ার ভুমিকা ছিল চীন-আমেরিকা উভয়েরই ঘনিষ্ট বন্ধু হিসাবে বিশ্বস্ততার সাথে দুতয়ালী করে দেয়া, কথাচালাচালি ঘটিয়ে দেয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ ততদিনে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ডিল ফাইনাল করতে ১৯৭১ সালের ০৯ জুলাই ভোরবেলা দুদিনের জন্য কিসিঞ্জারকে পাকিস্তান ভ্রমণের সময়কালিন গোপনে চীন ভ্রমণ [গোপন এই সফরের কোড নাম ছিল, “মার্কোপোলো”] ও চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাইয়ের সাথে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়া ইত্যাদি। তবে এঘটনার প্রকাশ্য আলামত শুরু হয়েছিল ঠিক তিনমাস আগে ০৭ এপ্রিল ১৯৭১। ঐদিন হঠাত চীনের চেয়ারম্যান মাওসেতুং আমেরিকার এক টেবিল টেনিস খেলোয়ার দলকে চীন ভ্রমণের আমন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেন। দিন তারিখের দিকে দেখলে ঘটনাগুলো খুব দ্রুতই ঘটেছে। আর এর সাত দিন পরে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাই আমেরিকান টেবিল টেনিস দলের সাথে সাক্ষাত অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন, ১৯৪৯ সালের পরে এরাই প্রথম কোন আমেরিকান অতিথি। “আপনারা আমেরিকান জনগণ ও চীনা জনগণের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করলেন”। চৌএন লাইয়ের এর ঘোষণার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন, আগামি বছর তিনি চীন সফরে যাচ্ছেন বলে মিডিয়ায় ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ সারা দুনিয়া জানে এই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নাই। On April 7, 1971, Chinese Chairman Mao Zedong made a decision to invite the United States table tennis team to visit China. On April 14, Premier Zhou Enlai met with the US ping-pong players, the first visiting American guests since 1949. Zhou told the US players: “You open a new historical chapter in the bilateral relations between Chinese people and American people.” এই ডিলের অংশ হিসাবে এখানে তিনটা ঘটনা উল্লেখ করব। (১) চীন ঐ ১৯৭১ সালের অক্টোবর ২৫ তারিখে জাতিসংঘের প্রথম সদস্যপদ পায় যে সদস্যপদ পাওয়া ১৯৪৯ সালে মাও এর চীন বিপ্লবের পর থেকে মূলত আমেরিকার আপত্তিতে আটকে ছিল। আপত্তির মূল কারণ, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠনের সময় থেকে ওর নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা পাঁচ সদস্যের একজন ছিল চায়না। কিন্তু মাত্র চার বছর পর ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লবের পর থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত তাইওয়ান নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্য। অর্থাৎ মূলভুমি মাও এর নয়াচীন জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত দেশই নয় আর চীন বলতে জাতিসংঘের চোখে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা চীন মানে এক ছোট দ্বীপ তাইওয়ান। অর্থাৎ মাও এর চীনের জন্য ১৯৭১ সালের অক্টোবর ২৫ খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ দিন। এদিন থেকে চীন শুধু জাতিসংঘের সদস্যপদই পায় নাই, একেবারে সরাসরি ভেটো ক্ষমতাওয়ালা পাঁচ সদস্যের একজন হয়ে গিয়েছিল, আমেরিকান আপত্তি প্রত্যাহারে। এবং সমান গুরুত্ত্বপুর্ণ, তাইওয়ানের ষ্টাটাস তখন থেকে জাতিসংঘের অস্বীকৃত ভুখন্ড। অর্থাৎ তাইওয়ান নয়াচীনের অঙ্গিভুত ভুখন্ড অংশ – নয়াচীনের এই দাবিকে সরাসরি না হলেও প্রকারন্তরে স্বীকৃতি দেয়া হয় জাতিসংঘ। (২) আর দেরি না করে পরের বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রথম চীন সফরে যান। এরপর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ভীত্তিমূলক নীতিগুলোর খসড়া ও বুঝাপড়াগুলো তৈরি হতে থাকে। মূল বিষয়, চীন নিজেকে আমেরিকার দানব-পুঁজি বাজার প্রতীকিভাবে যা ওয়াল ষ্ট্রিট নামে পরিচিত তার কাছে উন্মুক্ত করে দিবে। বিনিময়ে আমেরিকান বাজার চীনা পণ্যের জন্য উন্মুত্ত হবে ইত্যাদি। এগুলো ঠিকঠাক তৈরি, আলোচনা, দেনদরবার নিগোশিয়েশন ইত্যাদি শেষ হতে ১৯৭৮ সাল লেগে যায়। (৩) আর ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারী থেকে চীন আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে ইতোমধ্যে তৈরি সমস্ত ডিল আনুষ্ঠানিক করে নেয়। আর ঐদিন থেকে তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে আমেরিকা।] ফলে এসব গুরুত্ত্বপুর্ণ কারণে আয়ুব ও ইয়াহিয়া এরা দুজনই চীনের কাছে খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ত্ব ছিল। তাই চীনের স্বার্থের খেদমত করার বিনিময়ে বাংলাদেশের (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) চীনা কমিউনিষ্টদেরকে ৬৯ সালের পর আয়ুব ও ইয়াহিয়া নিজেদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা থেকে বিরত করতে চীনের কমিউনিষ্ট পার্টিকে অনুরোধ রেখেছিল। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করতে ছাত্রদের অংশ বাদ দিলে মূলত শ্রমিকদের সংগঠিত করতে নির্ধারক ভুমিকা ছিল ভাসানীর নেতৃত্ত্বে অধীনস্ত বাংলাদেশ চীনের কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো। আর ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের চীনা কমিউনিষ্টরা নিজ স্বার্থের চেয়ে চীনা রাষ্ট্রস্বার্থকে জেনে অথবা না জেনে প্রাধান্যে রেখেছিল।
    তাহলে সারকথায় বললে, একই আন্তর্জাতিক ইডিওলজির দুই রাষ্ট্র আইডিওলজির মিল আছে এমন হলে একজনের স্বার্থে অপরজনের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সব সময় সেখানে থাকবে। উপরে চীনের উদাহরণ্টা আনলাম এটা দেখানোর জন্য যে দুই রাষ্ট্রস্বার্থ কেমন সরাসরি পরস্পর বিরোধি ১৮০ ডিগ্রি হয়ে যেতে পারে তা বুঝাতে। অতএব এটা আসলে যে কোন আন্তর্জাতিক আইডিওলজির সমস্যা অথবা বলা যায় আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা। অথবা এই দুইয়ের মধ্যকার স্ববিরোধ। আমরা যে রাজনীতিই করি না কেন এই কঠিন বাস্তবতা আমাদের নজরে নিতে হবে, বাস্তব সমাধান খুজতে হবে। কারণ আমাদের আন্তর্জাতিক আইডিয়া বিপ্লবের তত্ত্বও দরকার, আবার রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর মুখোমুখি হওয়া একে অন্যকে ব্যবহার করে ফেলা এগুলো এড়ানোর উপায় জানতেই হবে।

    ইরান রাষ্ট্রের সঙ্কট অথবা “ইরানি স্বার্থের ইরাক রাষ্ট্র”
    ইরাক সঙ্কট নিয়ে লিখতে বসে এতক্ষণ উপরের লেখা অংশকে কমিউনিষ্টদের প্যাচাল মনে করবেন পাঠকের কেউ হয়ত, লিখলাম কেন অনেকের মনে তা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। লিখলাম এজন্য যে এই সমস্যাটা কেবল সোভিয়েত বা চীনা কমিউনিষ্টদের বেলায় ঘটে বা সত্যি তাই নয়। যেকোন গ্লোবাল আইডিয়ার ক্ষেত্রেও ঘটবে। কারণ মুলত সমস্যাটা যে কোন আন্তর্জাতিক ইডিওলজির সমস্যা অথবা বলা যায় আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা।
    তাই আমরা এখন দেখব কমিউনিষ্ট বিপ্লব না হওয়া সত্ত্বেও ইরান বিপ্লবও একইভাবে নিজরাষ্ট্রের টিকানোর স্বার্থে পড়শিদের ব্যবহার করেছে।
    ইসলামও নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ইডিওলজি। যারা খলিফা ধারণার রাজনীতি ধারণ করেন সেটা আরো ঘোরতর আন্তর্জাতিক বা প্যান ধারণা। ইরানী বিপ্লব যদিও যতটা না আন্তর্জাতিক তার চেয়ে বেশি জাতীয় বৈশিষ্টের। তবু এটা সুনির্দিষ্ট এক ইডিওলজিক্যাল বিপ্লব। আবার তা পশ্চিমের মত অর্থে একটা আধুনিক রাষ্ট্র না হলেও নতুন ধরণের তবুও মোটা দাগে তা মর্ডান রাষ্ট্র বৈশিষ্টেরই। আর ইরান বিপ্লবে কমিউনিষ্টদের সাথে সবচেয়ে বেশি মিলের দিকটা হল, নিজ বিপ্লব রক্ষা করার সমস্যা, বিপ্লব রপ্তানি এবং নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে ইরাক রাষ্ট্রকে বলি দেয়া এসব কিছুই সে ঘটিয়েছে। কিছু উদাহরণ দিব।
    এক) ইরান বিপ্লবের পরেপরেই ১৯৮১-৮৭ প্রতিবছর হ্বজ করতে গিয়ে নিজ বিপ্লবের পক্ষে প্রচার প্রপাগান্ডা করতে আর সৌদি রাষ্ট্র শাসকের নিন্দা করতে এক সংগঠিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়েছিল। কারণ হ্বজ মানে সারা দুনিয়া থেকে মুসলমানেরা সেখানে সমবেত হয়। ইরান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিবছর মক্কা ও মদিনায় মিটিং মিছিল সমাবেশ বয়ান আয়োজন করে আসছিল। এতে সৌদি কর্তৃপক্ষের মনে মক্কা ও মদিনার ধর্মীয় স্থানগুলো তাদের দখল পরিকল্পনা আছে এই সন্দেহ ক্রমশই বাড়ছিল। ১৯৮৬ সালে ইরানী দলবদ্ধ রাষ্ট্রীয় হ্বাজিদের (মোট হ্বাজি দেড় লাখ) প্রায় ১০০ জনকে এক্সপ্লোসিভসহ ইমিগ্রেশনে আটক করা হয়েছিল। এসব নিয়ে পরের বছর হ্বজের সময় যথেষ্ট টেনশন বইতেছিল। দ্বিতীয় দিনে ইরানীদের বিশেষ সমাবেশ সামলাতে গিয়ে সৌদি সরকার তাতে (১৯৮৭ সালে ৩১ জুলাই) সরাসরি গুলি করে, কঠোর হাতে দমন করতে গিয়ে স্পটেই চারশতের উপর হ্বাজি ও সৌদি পুলিশ মারা গিয়েছিল। এই ম্যাসাকারের ঘটনা নিশ্চয় আমাদের অনেকের মনে আছে। এঘটনাতে সৌদি ইসলাম ভাল না ইরানী ইসলাম ভাল অথবা ইরান না সৌদি সরকার কে সঠিক ছিল সে ব্যাপারে বিচারকের ভুমিকায় বসা এখানকার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। এই রচনার উদ্দেশ্যও নয়। ফলে তা উহ্য রেখেও বলা যায় ইরান নিজ বিপ্লব নিজ রাষ্ট্র সুরক্ষার তাগিদে ফলে এর পক্ষে দুনিয়ায় মুসলমানদের মনে জায়গা করে নেবার বাসনায় – তার বিপ্লব ধারণার রপ্তানির বাসনা – থেকেই এটা ঘটিয়েছিল, এটুকু বলা যায়।
    দুই) অন্যদিকে, নিজ বিপ্লবী রাষ্ট্র সুরক্ষা নিরাপদ করতে ইরাকি শিয়াদের তাকে ব্যবহার করতে হবে এই বাসনা যে ইরানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের ছিল তা আজকে দাঁড়িয়ে পরিস্কার বলা যায়। যদিও এই বাসনা প্রকাশ্য নয়, এর বাইরের দিকটা হল তাঁরা নিপীড়িত ইরাকি শিয়াদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে। একথা ঠিক যে সাদ্দামের আমল ইরাকি শিয়াদের অবদমন আর নিপীড়নে কেটেছে। কিন্তু সেই দশার সুযোগে ইরাকি শিয়াদেরকে ইরানী বিপ্লব ও রাষ্ট্র সুরক্ষা করতে ব্যবহার করার কারো আকাঙ্খা ন্যায্য হতে পারেনা। ওদিকে ইরানী বিপ্লবের পর, ১৯৮০-৮৮ এই সময়টা ইরাক-ইরান যুদ্ধে কেটেছে। অথচ আদর্শ হতে পারত সাদ্দামের সাথে ইরানের কোন সমঝোতা চুক্তিতে পৌছানো যাতে ইরাকের মোট পপুলেশনের ৬০-৬৫ ভাগ ইরাকি শিয়ারা ইরাক রাষ্ট্র ক্ষমতায় উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ত্বের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়, অবদমন আর নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়, বিনিময়ে ইরাকের দিক থেকে ইরানী বিপ্লবও নিরাপত্তা সুরক্ষার নিশ্চয়তা পায়। কিন্তু তা ঘটেনি। ইরাক-ইরানের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ অবিশ্বাসই মুখ্য হয়ে উঠে ফলে আট বছর ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলে। আজকের পরিস্থিতি দেখে মনে করার কারণ আছে যে স্বাধীন ইরাকি রাষ্ট্র হিসাবে ইরাকি শিয়ারা ইরাকেই টিকে থাক, ইরাক রাষ্ট্র অটুট থাকুক – এটা নয় বরং ইরানী রাষ্ট্র নিরাপত্তা সুরক্ষার কাজে ইরাকি শিয়াদের ব্যবহার করাই ইরানের লক্ষ্য ছিল।
    আজকের ইরাক রাষ্ট্রের বাস্তবতা এমন জায়গায় পৌছিয়েছে যে, “ইরাকি” অর্থাৎ নিজ ইরাকি রাষ্ট্রের জন্য আকাঙ্খা কারও নাই, ইরাক ভুখন্ডে যারা আছেন তারা আসলে শিয়া, সুন্নি অথবা কুর্দি – ইরাকি কেউ নাই, ইরাকি রাষ্ট্র আকাঙ্খা করে, রাখে বাস্তবায়ন দেখতে চায় এমন আর কেউ নাই। এজন্য বাস্তবত ইরাক রাষ্ট্রটা আসলে কোথাও নাই। সবাই এর সমাধান দেখেছে হয় শিয়া, না হয় সুন্নি অথবা কুর্দি হয়ে। ইরাকি নাগরিকের দিক, ইরাকি হয়ে থেকে সমাধান দেখার কেউ নাই। একমাত্র নাগরিক পরিচয়েরই রাষ্ট্র হতে হয় অর্থাৎ রাষ্ট্রে নাগরিক মাত্রই সকলে সমান মর্যাদার, [মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদ রচনা করে এমন রক্ত, বংশ, গোত্র, গায়ের রং বা অন্য বর্ণবাদিতা, রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, নারী-পুরুষ ধরণের ভাগ, পাহাড়ি-সমতলী ধরণের ভুগোল ভাগ ইত্যাদি যত রকমের ভেদটানা সম্ভব সেসব কিছুর উর্ধে সকলে সমান মর্যাদার নাগরিক] একে অন্যের মর্যাদার নিশ্চয়তাকারি এমন না হলে শিয়ারা যদি শিয়া পরিচয় মুখ্য করে রাষ্ট্র হতে চায় তবে বাকি সবাইও নিজের নিজের পরিচয় ঝান্ডা খাড়া করবে। ইরাকি রাষ্ট্র বলে কিছু খাড়া হবে না। এটাও রাষ্ট্রতত্ত্বের আর এক মৌলিক শিক্ষা।
    তিন) একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমেরিকার সাথে পরমাণু ইস্যুতে ইরানের চরম বিরোধ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বুশের ২০০৩ সালের ইরাক হামলা ও দখলে ইরানের সম্মতি ছিল। আমেরিকার ইরাক দখল ইরানের নিরাপত্তার জন্য এক বড় একটা ঘটনা হবার কথা অথচ অবাক বিষয় এঘটনায় আমেরিকার উপস্থিতি ইরান রাষ্ট্রের দিক থেকে সে কোন হুমকি অনুভব করেনি। তাই সম্মতির প্রশ্ন উঠছে। না হলে ইরানী বিপ্লব যে জন্ম থেকেই যেখানে আমেরিকার সাথে একনাগাড়ে সরব বিরোধ চালিয়ে গেছে তা থাকা সত্ত্বেও সেই আমেরিকা ইরাক দখল করে ইরানের ঘাড়ের উপর এসে বসেছে অথচ ইরানের কোন অস্বস্তি নুন্যপক্ষে কোন আপত্তির বিবৃতিও আমরা দেখি নাই কেন? শুধু তাই না ২০০৬ সাল থেকে সেই যে ইরানের পছন্দের নুরে আল মালিকি প্রধানমন্ত্রী হলেন তা এখনও চলছে। আর বুশ তাকে পরিচিত করিয়েছিলেন “আমাদের লোক” হিশাবে। কারণ মালিকি ছিলেন সেই বিন্দু যেখানে আমেরিকা ও ইরানের কমন স্বার্থ এক হয়েছিল। কিন্তু সেটা ইরাকের নিজের রাষ্ট্রস্বার্থে নয়, বরং ইরান মালিকির ইরাকের ভিতর নিজ রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিরাপত্তা দেখেছিলেন। সাদ্দামের শিয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে সমাধান নিশ্চয় এবার শিয়া প্রাধান্যে সুন্নিদের উপর অত্যাচার নয়, অথবা এবার সুন্নিদের অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা নয়। তাও আবার পরদেশি ইরানের স্বার্থের এক রাষ্ট্র হয়ে। আসলে “ইরানি স্বার্থের ইরাক রাষ্ট্র” এই বাক্যটাই স্ববিরোধী। ভিন রাষ্ট্রের স্বার্থে কেউ আর নিজের রাষ্ট্র থাকে না, থাকতে পারে না। ওদিকে মুকতাদর আল সদর ও অন্য কয়েকজন ইরাকি আয়াতুল্লাহ (যেমন সিসতানি) কখনও কখনও শিয়া পরিচয়ের উপরে উঠে ইরাকি হতে চেয়েছেন। কিন্তু বারবার তারা চুপ করে গেছেন। অন্তত তারা যে গলার ও প্রভাব-ক্ষমতার জোরের দিক থেকে সংখ্যালঘু তা প্রমাণ হয়েছে।
    (চার) গত কয়েক মাসে ISIL বলে যে বিদ্রোহীদের আমরা দেখছি এটা মূলত আলকায়েদা ঝোকের অংশ সাথে পুরানা বাথিষ্ট (সাদ্দামের দলের নাম) আর সুন্নি গোত্র প্রধানদের সমন্বয়ের এক সুন্নি জোট। যেখানে আলকায়েদা অংশের সাথে বাকি অংশের এলায়েন্সের কমন ভিত্তি হল দুটো –বাগদাদ দখল ও ইরাকি রাষ্ট্রকে ইরানি প্রভাব মুক্ত করা। এছাড়া কোন আদর্শগত বড় মিল এখানে নাই বরং অমিল বেশি। এই জোট উত্তর-পশ্চিমের মসুল দখল করে যখন বাগদাদের দিকে ধাবমান তখন মালিকির ইরাকি সেনাবাহিনী প্রতিরোধ না করে আগেই ময়দান ফেলে বাগদাদে পালিয়ে আসে। অবস্থা দেখে অনেকেই প্রথমে একে বাগদাদের সেনাবাহিনীর মনোবলের ঘাটতি মনে করেছিল। কিন্তু একদিন পরে ইরাকের আকাশে দেখা গেল সিরিয়ান এয়ারফো্র্সের বোমা বর্ষণ। অর্থাত সিরিয়ান এয়ারফো্র্সকে ISIL এর উপর বোমাবর্ষনের সুবিধা করে দেবার জন্য মালিকি নিজ সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কিন্তু এই বোমাবর্ষনের উদ্দেশ্য আরও ভয়ঙ্কর। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েও গেছে যে আমেরিকা-ইরান (সাথে বগলদাবা সিরিয়া)[এই অর্থে সিরিয়া থেকে ইরান এই শিয়া জোট] একজোট হয়ে ISIL বা সুন্নি ও আলকায়েদার বিরুদ্ধে লড়াই করা – এটা ঘটানো সম্ভব। এর প্রবল সম্ভাবনা একটা আছে। আর এতে ইরানের প্রবল আগ্রহ আছে। তার মানে সুন্নি জোটের বিরুদ্ধে এটা আমেরিকা-ইরানের কোন কূটনৈতিক ভাবালাপ নয় একেবারে জয়েন্ট মিলিটারি অপারেশন – এমন ভাবনা কল্পনা করা ইরানের জন্য ডালভাত। এই ইঙ্গিত ভয়ঙ্কর। এটা ইরান রাষ্ট্রের জন্ম থেকে আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির বিরোধীতাকে অর্থহীন প্রমাণ করেছে। ইরান নিজ সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকার সাথে সামরিক জোট করে আগানোর নিজ ইচ্ছা প্রকাশ করার মধ্যে কোন অস্বস্তি দেখে নাই। এভাবে ইরাক নামের কোন রাষ্ট্র জাহান্নামে যাক, ইরান [আর সেই সুত্রে আসাদের সিরিয়া রাষ্ট্রও] রাষ্ট্রের স্বার্থ সুপ্রীম। তা যেকোন উপায়ে হাসিল করতে হবে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম! এর কিছুদিন পরে বাগদাদে মালিকির প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড, সেনাবাহিনী, আল সদরের বাহিনী ইত্যাদি মিলে যে সামরিক মহড়া আয়োজন করেছিল সেখান থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এটা ইরাকের বাগদাদ রক্ষা নয়, বরং বাগদাদকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে, সেখানে বসে ইরান রাষ্ট্রের সুরক্ষা প্রতিরক্ষার ফিজিক্যাল মহড়া ও মাসল দেখানো ছিল সেটা। অর্থাৎ এটা প্রকাশ্যেই প্রমাণ করেছে মালিকির ইরাকি রাষ্ট্র এমনই এক অদ্ভুত “রাষ্ট্র” যা সাজানো হয়েছে নিজ নিঃস্বার্থ হয়ে ইরান রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা নিজ করণীয় ও কর্তব্য বলে ঠিক করেছে। সেই সাথে ইরানী সেনাবাহিনী ও গার্ড বাহিনী যে ইতোমধ্যেই বাগদাদে এসে ততপরতা শুরু করেছে এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাগদাদে দুজন ইরানী সেনা অফিসারের মৃত্যুর ঘটনা থেকে। ইরান আনুষ্ঠানিক ভাবে তা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করতেও দ্বিধা করেনি।
    ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তান দখল করে নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে অন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি করেছিল। এবার ইরানের একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থের এক ইরাক সাজিয়ে ইরান আরও বিশাল উদাহরণ তৈরি করল।
    তাহলে বিপ্লব বলতে সেটা রাশিয়ার সোভিয়েত বিপ্লব হোক কি ইরানের ইসলামি বিপ্লব – গোড়ার সমস্যা একই, আধুনিক রাষ্ট্রের লজিক ও বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা।

    [এই রচনা পাঠে পাঠকের প্রতি কিছু পরামর্শঃ] আলোচ্য শিরোনামের লেখাটা চূড়ান্ত কিছু নয়, প্রাথমিক প্রস্তাব। আরও এডিটেড একটা ভার্সান পরে হাজির করার ইচ্ছা রাখি। এখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন বা ইরান সম্পর্কে বেশ কিছু ঐতিহাসিক তথ্য সংযোজিত করা হয়েছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য এমন একেবারেই নয় যেন পাঠকের এথেকে এসব দেশের প্রতি বিরূপ মনোভাব অথবা ঘৃণা তৈরি হোক – তা রাষ্ট্রীয় বা ইডিওলজি যেকোন অর্থে। অথবা এমন নয় যে বাংলাদেশের স্বার্থে এসব দেশের কোন ইতিবাচক অবদান নাই। অথবা এমন নয় যে নতুন আইডিয়া হিসাবে এসব দেশের বিপ্লবের কোন আবেদন এবং আমল করার মত রাষ্ট্র-ধারণায় গুরুত্ত্বপুর্ণ কোন তত্ত্বীয় অবদান, সংযোজন নাই। অথবা এমন নয় যে এসব দেশের রাষ্ট্রনীতির সাথে বাংলাদেশের মানুষের কোন স্বার্থ মিল হবার ভবিষ্যতে কোন সম্ভাবনা নাই। ফলে এমন ধারণা করা সঠিক হবে না। অথবা বাংলাদেশে আমি কোন জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ফেরি করতে চাইছি, কোন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই এখন ভরসা এমন কোন ইঙ্গিত করছি। অথবা নাগরিক ধারণাকে কোন না কোন জাতীয়তাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বা আটকে রেখে ফেরি করছি। এসব অনুমান অমূলক হবে ও লেখকের প্রতি অবিচার করা হবে। এক হিসাবে নানা দেশের এখানে যা কিছু তথ্য সংযোজিত হয়ে আছে সেগুলোকে ঐতিহাসিক অবজেক্টিভ ফ্যাক্ট ও রিয়েলিটি হিসাবে গ্রহণ করলে সুবিচার করা হবে। অর্থাৎ আমাদের পরস্পরের রাষ্ট্রস্বার্থগুলো ওসব জায়গায় কমন থাকতে পারেনি – এর উদাহরণ হিসাবে নিলেই যথাযথ হবে। তবে অবশ্যই আমি জোর দিব একথা বলে যে, আইডিয়ার নামে আড়ালে একে অন্যকে একান্ত স্বার্থে ব্যবহার – একাজে বিরত থাকা এবং ঘোষণা দিয়ে তা পরিত্যাগ করতেই হবে।

  • লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

    লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

    গৌতম দাস

    হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়ার গবেষণা ফেলো হলেন লিসা কার্টিস (Lisa Curtis)। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার আমেরিকান সংবাদদাতা লিসা কার্টিসকে কিছু লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন, যার লিখিত জবাব তিনি দিয়েছেন আর মানবজমিন পত্রিকায় তা গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ ছাপা হয়েছে।

    থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও আমেরিকান বিদেশনীতি
    হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আমেরিকার থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। থিঙ্কট্যাংক মানে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে আগাম চিন্তাভাবনা ও নিজস্ব গবেষণা করে এতে পাওয়া ফলাফল জনসমক্ষে হাজির করা হয়, তা পরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি হবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভুমিকা রাখে। তবে থিঙ্কট্যাংক বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে চলে, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান সে নয়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিশেষত্ত্ব হল, ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগানের প্রভাবে এই প্রো-ইহুদি থিঙ্কট্যাংক জন্ম নেয়। ঘোষিত লক্ষ্য হল, ঘোষণা দিয়ে বলে কয়েই রক্ষণশীলভাবে চিন্তা করা। রক্ষণশীলভাবে ভেবে দেখা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতি কি হতে পারে, হওয়া উচিত। আর হেরিটেজ মনে করে আমেরিকান রাষ্ট্র যেন অবশ্যই বেসরকারি উদ্যোগ ও খাতের মাধ্যমে প্রায় সব কিছু করতে ও পরিচালিত হতে দেয়, রাষ্ট্র দায় কম নেয় এবং সব বিষয়ে রাষ্ট্র যেন সীমিত সংশ্লিষ্টতার ভুমিকায় থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায়, প্রচলিত আমেরিকান মুল্যবোধ আর শক্ত আমেরিকান জাতীয় প্রতিরক্ষাবোধের কথা খেয়াল রাখে।

    কিন্তু ছাপা হওয়া লিসা কার্টিজের এই প্রশ্নোত্তরকে আমাদের এত গুরুত্ব দেবার কি আছে? আমেরিকান সরকারগুলোর নীতিতে কোন থিঙ্কট্যাংকের ভুমিকা ও গুরুত্ব কি তা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সমাজের কোন গ্রুপের কোন নীতি বা অবস্থান সরকারের নীতি হয়ে উঠার আগের ধাপটা হল থিঙ্কট্যাংকের উদ্যোগে করা চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ। তবে আবার এটা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঠিক কোন বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একেবারেই তা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আর থিঙ্কট্যাংকের কাজের ধরণ হল, সিরিয়াস গবেষণা শেষে ফলাফল স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাডেমিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল নেতা, দেশের ও প্রয়োজনে বিদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সকলের সাথে তা শেয়ার করা, আর গোলটেবিল, সেমিনার আলোচনা সভার মাধ্যমে সে নীতি অবস্থানকে যতদুর সম্ভব একটা প্রতিনিধিত্বমুলক করে আকার দিয়ে তোলা। আর সবশেষে সরকারি অফিসের লোকজন চাইকি গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় হলে সর্বোচ্চপদ মন্ত্রণালয়ের সচিব (আমেরিকান হিসাবে আন্ডার সেক্রেটারিকে) সেসব সভায় দাওয়াতে হাজির করে থিঙ্কট্যাংকের অবস্থান চুড়ান্ত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এরপরেও থিঙ্কট্যাংকের নীতি-অবস্থান কোন আমেরিকান সরকার তার নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য না হলেও সাধারণত দেখা যায় থিঙ্কট্যাংকের ঐ অবস্থান আংশিক অথবা পুরাটাই সরকারের নীতি হয়। আর অনেক সময় কোন সরকারের কেউ নিজেই “অনানুষ্ঠানিকভাবে” বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কোন থিঙ্কট্যাংককে কোন একটা বিষয়ে এমন উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

    হাসিনা সরকার টিকে যাবার জন্য কি ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন দায়ী
    লিসা কার্টিজ এই প্রশ্নোত্তরে ৫ জানুয়ারির পরও হাসিনার টিকে যাওয়ার জন্য ভারত, চীন ও রাশিয়ার স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। লিসা কোন আমেরিকান সরকারী পদবীধারী কেউ নন। ফলে তার মুখ দিয়ে এমন সরাসরি অভিযোগ করা মন্তব্য নিয়ে ভারত, চীন বা রাশিয়া সরকারের কারও হেরিটেজের লিসা কার্টিজের অথবা আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের (আমাদের হিসাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কাছে ব্যাখ্যা চাইবার কিছু নাই। আবার লিসার বক্তব্য “আনুষ্ঠানিক” সরকারি না হয়েও আবার আসলে পরোক্ষে সরকারিই। লিসার বক্তব্যকে আমরা আমেরিকান সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রটোকল, কূটনীতির ভাষা, ফরমালিটির নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা মন খুলে কথা বলতে পারলে কি বলতেন তেমন বক্তব্যের এক মহড়া মনে করতে পারি; এবং তা নীতি নির্ধারকদের সবার চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও অন্তত প্রভাবশালী একটা ধারার বক্তব্য হিসাবে দেখতে পারি। ফলে লিসা কার্টিজের বক্তব্যকে আমরা সেখান থেকে দেখে পাঠ করে এটাকে উসিলা করে তা নিয়ে আলোচনার সুত্রে মুল্যায়নে কিছু বলার সুযোগ হিসাবে নিব।
    প্রথমত প্রকৃত তথ্য হিসাবে এক ভারত ছাড়া চীন অথবা রাশিয়া কি আসলেই হাসিনার সরকার টিকে যাবার কারণ, তাদের সমর্থনের উপর কি হাসিনা টিকে গেছে? তা মনে করার কোন কারণ আমরা দেখি না। এমন কোন ফ্যাক্টসের খবর কারও কাছে আছে অথবা বাস্তবে এটা তাই -এর কোন সত্যতা নাই। আমার আগের লেখায় বলেছি, ফ্যাক্টস হল ভারত আমেরিকা চীন রাশিয়া সবাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট (যে যেমনটা দেখতে চায় তেমন) একটা আকার নিয়ে থিতু হয়ে বসুক তা নিজের স্ব স্ব স্বার্থে চায়। আবার এর সমস্যা ও এর জটিলতাগুলোও বুঝে ও মানে। ফলে এথেকে বেরোনোর পথ হিসাবে ভারতের নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ সেটা বর্তমান ভারসাম্যের প্রায় স্থবির অবস্থাটা ভেঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরির নিয়ামক হতে পারে। আমার ঐ লেখাতেও আমি চীনের অবস্থান কোনভাবেই হাসিনার সরকারে টিকে থাকুক এমন তথ্য বা ব্যাখ্যা দেখাই নাই। কারণ ব্যাপারটা অলীক। বরং চীনের এ পর্যন্ত দেয়া রাষ্ট্রদুতের বিবৃতিগুলো, তাদের ফরেন অফিসের মন্তব্য এমন কোন সাক্ষ্য বহণ করে না। আর চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ আসার অপেক্ষায় আছে কথা সত্য তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা আবার গেড়ে বসার পরেও সে এটাকে সঠিক ও উপযুক্ত সময় মনে করতে পারে নাই; অপেক্ষা করছে এক স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকার দেখার জন্য। এর সর্বশেষ প্রমাণ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য। (বিনিয়োগ বোর্ডের অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে) তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন চীনের দিক থেকে এব্যাপারে কোন নড়াচড়া নাই। ফলে লিসা কার্টিজের অভিযোগ আমরা দেখছি ভিত্তিহীন, কোন সারবত্তা নাই।
    তবে লিসা আর এক অভিযোগ তুলেছেন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি প্রসঙ্গে। ঐ প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেয়ে এই দেশটিতে কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করা যাবে সেদিকেই মস্কো ও পেইচিংয়ের মনোযোগ বেশি”। লিসা কার্টিজের এই অভিযোগকে পেটি ঈর্ষাজাত ক্ষোভ হিসাবে আমরা বড়জোর দেখতে পারি। প্রথম কথা চীনা সাবমেরিন বা অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টা ৫ জানুয়ারির বহু আগের ঘটনা; অন্ততপক্ষে ২০১১ সালের ডিল, একালেরই নয়। আর যদিও একথা সত্য যে পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্ত্র সরবরাহের তালিকায় বিলের অঙ্কে এবং পরিমাণে চীনা অস্ত্র আমেরিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। কিন্তু এর কারণ চীনের আমাদের উপর বিশেষ আগ্রহ একথাটা ভিত্তিহীন। অথবা চীন আমাদেরকে মুখ্যত তার অস্ত্রের বাজার হিসাবে দেখে এটা কোন গবেষকের মুখ থেকে শোনা হাস্যকর বললে কম বলা হয়। এই বিদ্যা অথবা মুল্যায়ন এসেসমেন্ট দিয়ে কারও পক্ষে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোন গবেষণাকর্ম করা অসম্ভব। এতে ঘোড়ায়ও হাসবে। একথা বলে লিসা কার্টিজ নিজেকেই তুচ্ছ করেছেন। এর বেশি এনিয়ে আর কি বলব! পরিসংখ্যানের যে কথা বলছিলাম, খুব সম্ভবত অস্ত্রের মুল্য এবং অস্ত্রের উপর আস্থা মানে আমাদের বাজেট ও বাজেট অনুপাতে পাওয়া মান এগুলোই এখানে মুল ফ্যাক্টর। ফলে চীনা অস্ত্র কিনতে আমাদের মানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের চেয়ে বাহিনীর আগ্রহই বেশি ও মুখ্য। আর েব্যাপারে যারা খোঁজ রাখে তাঁরা কে না জানে আমেরিকার যেকোন অস্ত্র বা সরঞ্জামের মুল্য সর্বাধিক, তাতে কোয়ালিটি ও হাইটেক সুবিধা যত উচ্চমানেরই হোক। ফলে আমাদের বাহিনীর সিদ্ধান্ত – এটা প্রাকটিক্যাল, স্বাভাবিক এবং সর্বপরি আমাদের বাজেট বাস্তবতা যে তাঁরা সঠিকভাবেই মুল্যায়ন করতে জানেন এর প্রমাণ। ওদিকে, ভারতের উপর পুরা নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি হাসিনার সরকারের নীতিতে দোষের শেষ নাই, একথা সত্য। কিন্তু এবিষয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজন, বাহিনীর নিজস্ব যুক্তি অবস্থান ও আগ্রহের প্রসঙ্গে গত পাঁচ বছরে হাসিনা যথোপযুক্ত উতসাহ ও সাড়া দেন নাই, প্রাধান্য দেন নাই এমন কথা বলা ও ভাবা ভুল হবে। একথা লুকানো নয় যে হাসিনা সর্বক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল, বহু আন্ডারহ্যান্ড ডিল আন্ডারষ্টান্ডিং ভারতের সাথে তাঁর আছে, বাইরে থেকে দেখে আমরা অনুমান করতে পারি। আবার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থজাত সিদ্ধান্তকে হাসিনা রাজনৈতিক অনুসমর্থন জানায় নি এমন উদাহরণ একেবারে নাই যে তা নয় (যেমন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ ইস্যু)। তাসত্ত্বেও মোটের উপর হাসিনার রেকর্ড ভাল। যেমন ভারতের আপত্তি আর বিরূপ প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ চীনা সাবমেরিন কেনার সামরিক বাহিনীর প্রস্তাবে উদ্যোগে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হন নাই। আমেরিকা এবং ভারতের অখুশি, আপত্তি, চোখ বড় বড় করে তাকানো সত্ত্বেও গত ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে ভাল ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পর্কও বজায় রেখেছেন, সফর বিনিময় অব্যাহত আছে এবং তা গুরুত্বের সাথেই, এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহে সাড়া দিয়ে রেখেছেন। এককথায় বললে চীনের সাথে সম্পর্ককে হাসিনা ভারতের সাথে সম্পর্কের একই ঝুড়িতে রেখে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন নাই, আলাদা আলাদা বক্সে রেখেছেন যাতে কোন ঠোকাঠুকি না লাগে এমন করে বুদ্ধিবিবেচনার সুযোগ করে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এথেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা বা বোকামিরও সুযোগ নাই যে হাসিনার সরকার ভারতের সাথে সাথে চীনেরও সমর্থনের উপর টিকে থাকা এক সরকার।
    এমন সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ না থাকার মুল কারণ (গত মাসের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলি) চীনের বিদেশনীতি এখন পর্যন্ত আমাদের মত দেশে কেমন সরকার বা কে সরকারে থাকবে এধরণের কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগিদারী কর্তৃত্ত্ব না হলে চীনের বিদেশনীতি আগাবে না অথবা আমেরিকার মত চাপ দিয়ে আদায় করার নীতিতে চলে এমন করে তা সাজানো নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আদায় করে চলে এমন নয়। আবার লিসা কার্টিস যেমন এক জবরদস্তিতে আরোপিত ধারনা দেবার চেষ্টা করেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেনবা বাংলাদেশ চীনের কাছে অস্ত্রের লোভনীয় বাজার ফলে খাতক মাত্র। আর চীনও যেনবা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার উপর দাড়িয়েই রাইজিং চীনের অর্থনীতি হয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডাহা ভিত্তিহীন কথা এবং প্রপাগান্ডা। কেউ গবেষক হতে চাইলে তাঁর প্রথম পাঠ হল, অন্তত প্রপাগান্ডা আর তথ্যের ফারাক করে চলতে শেখা। এম্পায়ার আমেরিকার খাসলত দেখতে দেখতে লিসা কার্টিসের হয়ত একপেশে ধারণা হয়ে গেছে যেন আমেরিকা বা পশ্চিমের খাসিলতই চীনের খাসলত হতেই হবে। আগামিতে চীনের খাসলত কি দাঁড়াবে সেটা আগামিই বলতে পারে। কিন্তু এখনই পশ্চিমের খাসলত দিয়ে আগাম চীনের ঘাড়ে তা খামোখা চড়িয়ে আরোপ করে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করার কোন অর্থ হয় না; তবে হয়ত পেটি ঈর্ষাজাত মনের সুখ পাওয়া যেতে পারে। তাহলে হাসিনা তাঁর সমস্ত বেকুবি নীতির দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সামরিক বাহিনীর চীনা অস্ত্র কেনার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে সক্ষম হয়েছে। এটাই বাস্তব। এটা কতটা সামরিক বাহিনীর সাথে দুরত্ব তৈরি করার রিস্ক বা চটানো তিনি সহ্য করতে পারবেন বা পারবেন না সে কথা ক্যালকুলেশন করে রেখে করেছেন অথবা করেন নাই এনিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু বটম অব দা ফ্যাক্ট হল বাস্তবে তিনি এগুলো করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, এর কারণ যাই হোক। আবার লিসা কার্টিজের “চীনের অস্ত্রবিক্রির ধান্দা” এমন কথার প্রেক্ষিতে যদি বলি, আমাদের সামরিক অফিসারদের উপর প্রভাবের দিক থেকে যদি দেখি তবে তাদের ট্রেনিং সেমিনার ভিজিট ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদিতে আমেরিকার প্রভাবের সমতুল্য এর ধারে কাছে আর কোন রাষ্ট্র নাই। এমনকি ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকার হাত মুচড়ানিতে পড়ে আমাদের সেনাবাহিনী এই তো সেদিন ১/১১ এর ক্ষমতা দখল করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে! কিন্তু এজন্য আমি কেন কেউই বলবে না যে সেনা অফিসারদের উপর আমেরিকার প্রবল প্রভাব আছে অতএব আমেরিকার সমর্থনে হাসিনা টিকে আছে এগুলো তার প্রমাণ! অথবা লিসা যেভাবে বলেছেন যে বাংলাদেশে চীন “কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি” করতে পারে সেই তালে আছে – তেমন করে কেউ বলবে না যে, আমেরিকা কেবল আমাদের অফিসারদেরকেই হাত করার তালে আছে। কারণ এতে বক্তার নিজের কান্ডজ্ঞানশুণ্য আর গাভর্তি রাগ ক্ষোভকে প্রমাণ করবে।

    এবার হাসিনার টিকে থাকার ব্যাপারে রাশিয়ার ভুমিকা প্রসঙ্গে আসি। হ্যা, একথা সত্যি যে রাশিয়ার মধ্যে প্রবল অস্থিরতা আছে। যেখানেই কোন সরকারের সাথে আমেরিকার নুন্যতম বিরোধ সংঘাত আছে, রাশিয়া দেখে, সেখানেই ঐ সরকারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে -এমন সরল করে পরিস্থিতি মুল্যায়নের ও অস্থির মতির সিদ্ধান্ত নেবার একটা ঝোঁক রাশিয়ার আছে। এটা শত্রুর শত্রু মানেই আমার বন্ধু –এমন এক সরল তত্ত্ব। অথচ বন্ধুত্বের সম্ভাবনার এই যুক্তির ভিত্তি যথেষ্ট দুর্বল এবং আমাদের অভিজ্ঞতাও এর পক্ষে সায় দেয় না। মুল কারণ প্রতিটা বন্ধুত্ত্বের সম্পর্কের নিজস্ব পজিটিভ ভিত্তি লাগে। আর তাছাড়া একটা শেষ কথা আছে। রাশিয়ার এই ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এটাই তার নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা শেষ কথা নয়, শেষ বিচার্য ব্যাপারটা এমনও নয়। আরও বিবেচনাও আছে। আমেরিকা বা পশ্চিম বিরোধী ও পশ্চিমা বলয়ের বাইরে কোন স্বার্থজোট গড়ার আগ্রহ রাশিয়ার প্রবলভাবেই আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু একা সেকাজ করার মত সক্ষমতা রাশিয়ার নাই, বাস্তবতা নাই এটাও রাশিয়া ভালভাবেই জানে। কারণ রাশিয়ার যতই রাগ ক্ষোভ থাক এটা রাশিয়া-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়, দুনিয়াও নয়, সেদিন গত হয়েছে বহু আগেই এটা সে ভালই হুশ রাখে। বরং রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর জোট (BRICS Bank এর মত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে) এর পক্ষে তেমনি একটা সম্ভাবনা, তাই সে মানে। উতসাহী রাশিয়ার এমন মান্যি করাটা টের পাওয়া যায় যদি আমরা মনে রাখি প্রথম ব্রিকস সম্মেলন ডাকার আয়োজক হয়েছিল রাশিয়াই, ২০০৯ সালে। ওদিকে এব্যাপারে চীন ততোই ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার। কোন হুড়োহুড়ি অস্থিরতা, এখনই সব জবরদস্তিতে করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে এমন অবিবেচক সে নয়, তা দেখায়নি। চলতি গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারটা ভেঙ্গে এরই প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করানো এবং আমেরিকার বদলে নতুন নেতৃত্বে নতুন অর্ডার চালু করার কাজটা সফল করতে যেখানে পরিস্থিতিকে পরিপক্ক করে তুলার কাজটা কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে করা মত কাজ নয়। বরং পরিপক্ক হতে যেখানে যতটুকু সময় ও মনোযোগ লাগবে সেখানে ঠিক ততখানিই দিতে হবে এব্যাপারে সে পরিস্কার। আমরা তাই দেখেছি। এছাড়া ব্যাপারটা পরিপক্ক বা ম্যাচিয়র হওয়াটা আবার ভলিন্টারিলি ও আপন ইচ্ছায় হতে হবে এমন দিকটাও তার নজর এড়ায়নি। যেমন একথা আজ পরিস্কার কেবল ব্রিক ব্যাংকই এখনও ফাংশনাল হতে পারল না ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতার কারণে। একদিকে পুরানো বা চলতি অর্ডারটা থেকে আমেরিকার তরফে বেশি সুবিধা পাবার লোভে পড়েছে ভারত আর অন্যদিকে ততটাই নতুন অর্থনৈতিক অর্ডারটা খাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতের তাই পিছুটান ফলে ব্রিক ব্যাংক বিষয়ে ধীরে চলা – এই হল ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতা। ভারত এখনও তাই মনস্থির করে ব্রিক ফেনোমেনার পক্ষে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু সেজন্য চীনের ভারত নীতিতে আমরা কোন চাপাচাপি দেখিনি।

    ভারতের দ্বিধামুখে বা দুমুখে খেলার আর এক প্রতীকী উদাহরণ
    ভারতের দ্বিমুখি ঝোঁকের প্রতীকী ও আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত ‘সাংহাই কর্পোরেশন’ উদ্যোগ। “সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন” (Shanghai Cooperation Organization (SCO) – ১৯৯৬ সালে শুরু হবার সময় মনে হয়েছিল এটা সম্ভবত এক সামরিক বা ষ্ট্রাটেজিক জোট হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ এটা মূলত এক অর্থনৈতিক জোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সে কারণে এখনও আমেরিকান মিডিয়া থিঙ্কট্যাংক (কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন) এটাকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট – ন্যাটোর মত এর পাল্টা সমান্তরাল এক সামরিক জোট, “চীনের ন্যাটো” বলে চিত্রিত করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা চীন ও রাশিয়া, সাথে নেয়া হয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশ, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, and Uzbekistan। জন্মের শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালে SCO এক বিবৃতি দিয়েছিল এই বলে যে কবে “আমেরিকান সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল এশিয়া অঞ্চল থেকে গুটিয়ে চলে যাবে এর তারিখ তারা জানতে চায়”। তবে ঐ বিবৃতিতে আমেরিকাকে চলে যেতে হবে ঠিক এমন দাবী তারা করেনি কেবল তারিখ জানতে চেয়েছে আর আমেরিকার যে যাওয়া দরকার এতে এই তাদের আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ক্রমশ এই জোট একালে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে আফগানিস্তান ২০১৪ পরবর্তি পরিস্থিতিতে। ২০১৪ পরবর্তি মানে আমেরিকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে এবছর ২০১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সৈন্য (ন্যাটোও) প্রত্যাহার করবেই। এটা তিন বছর আগেই নির্ধারিত ও সিধান্ত হিসাবে ঘোষিত। মূলত খরচ যোগাতে অসমর্থ অর্থনৈতিক অপারগতা -আমেরিকান নিজস্ব এই সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণা। যদিও ২০১৫ সাল থেকে কি হবে, কেবল ট্রেনিং এর নামে (১০ হাজার রাখার ইচ্ছা আমেরিকার) কতজন সৈন্য থাকবে এবিষয়ে কোন নতুন চুক্তি কারজাই করেন নি। আফগানিস্থানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে চলতি মাসে কিন্তু ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, প্রক্রিয়াধীন। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন নতুন আয়োজনে কিছু আমেরিকান সৈন্য রাখার চুক্তি কেমন হবে বা আদৌও হবে কি না। বাস্তব এই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে SCO ভাবনা-চিন্তা করছে এবছরের শেষে ন্যাটো ও আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে তারা সামরিক নয় বরং এক ব্যাপক বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রবেশ করতে চায় আফগানিস্তানে। SCO তে অবজারভার ষ্টেটাসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর উপস্থিতিতে গত কয়েক বছর তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারত এই পাঁচ রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত SCO এর অবজারভার সদস্য, পুর্ণ সদস্য নয়। তবে প্রতি বছরের SCO সম্মেলনে তারা গুরুত্ব দিয়ে অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়ে থাকে। গত বছর ২০১৩ সেপ্টেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমন খুরশিদ কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত SCO সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং ভারত পুর্ণ সদস্য হতে চায় সে ইচ্ছা ব্যক্ত করে এসেছেন। (দেখুন, India aspires to become full SCO member) কিন্তু একই সাথে তার স্ববিরোধীতা বা পিছুটানও ব্যক্ত করেছেন ঐ রিপোর্টে। বলেছেন, We are not sure of a timeline অর্থাৎ সময়সীমা বা কবের মধ্যে হব জানি না। এককথায় ব্যাপারটা হল, পুরানা গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণ হিসাবে আমরা দেখছি পালটা উদ্যোগগুলো একটা যেমন “ব্রিকস ফেনোমেনা” ঠিক তেমনই আর এক উদ্যোগ হল এই SCO গঠন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, “ব্রিকস ফেনোমেনা” এই উদ্যোগের মতই SCO গঠন উদ্যোগেও ভারতের ভুমিকা দোলাচালে, আছি আবার নাই এমন দোদুল্যমান নন-কমিটেড। কিন্তু ধীরস্থির চীন বরাবরের মতই; ভারতের চিন্তা ও ভুমিকা সে জানে কিন্তু সেজন্য চীন ভারতকে তাড়া লাগায় নি, কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি, নিজে কায়দা কৌশল করে চাপ বা শর্ত তৈরি করেনি ভারতের উপর। বরং ছেড়ে দিয়ে রেখেছে ভারতের ভলিন্টারি ও আপন ইচ্ছার উপর। পরিস্থিতি পরিপক্ক হতে যতটা সময় লাগছে, দিচ্ছে। আবার আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিকঃ চীন বা রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের নৌকা ভাসানো মানে ব্যাপারটা যে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অথবা তাদেরকে একঘরে করা তা যে নয় এটা চীন সযত্নে খেয়াল রাখতে চায়। সকলকে মনে করায় রাখতে চাই। রাশিয়ার মত তাই চীন ব্যাপারটাকে প্রতিহিংসায় রি রি করে উঠার বিষয় মনে করে না, কারণ আসলে তো ব্যাপারটা পশ্চিমের উপরে প্রতিশোধ নেয়ারও নয়। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ইউরোপের কলোনী মালিক (বৃটিশ, ফরাসী, স্প্যানিস, ডাচ, পর্তুগীজ ইত্যাদি) যাদের সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কখনই অস্ত যাবে না বলে বড়াই শোনা যেত একদিকে তা ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল আর অন্যদিকে এর বদলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের সুচনা হয়েছিল কিন্তু আমেরিকা ব্যাপারটাকে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রতিশোধ হিসাবে ঘুর্ণাক্ষরেও দেখেনি, ইউরোপকে একঘরে করা হিসাবেই দেখেনি। কারণ আমেরিকা মানে তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (১৯৩৩-৪৫ পরপর চারবারের প্রেসিডেন্ট) এটা পরিস্কার ছিলেন যে এই পালাবদলের অর্থ প্রতিশোধ বা একঘরে করার মত তা একেবারেই নয়। বরং তাঁর নেতৃত্ত্বে এটা আরও সকলের সাথে ইউরোপকেও সাথে নিয়েই নতুন এক গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার সুচনা করার কাজ। ব্যাপারটা রুজভেল্টের দয়া বা উদারতার চোখে দেখার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা ও ঘটনাবলির বাস্তব অর্থও এটাই। এমনকি নীতিগতভাবে ষ্টালিনের রাশিয়াকেও কোন নীতিগত কারণে (যেমন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র বলে) বা কোন প্রিযুডিস বা আগাম অনুমানে ধরে তার নেতৃত্বে আসন্ন নতুন গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের বাইরে রাশিয়াকে রাখার কথা তিনি ভাবেননি। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় টানা ২২ দিনের ব্রেটনহুড সম্মেলনে রাশিয়া উপ্সথিত ছিল। এনিয়ে বিস্তার করে অন্য কোথাও লিখতে হবে। এবারের পালাবদলেও ব্যাপারটাও তাই, এখানে সাদৃশ্য আছে। এখনকার প্রসঙ্গের জন্য সারকথা এতটুকুই যে রাশিয়ার ইতিউতি উঁকি মারা বা অস্থিরতায় থাকলেও অন্তত চীনকে বাদ দিয়ে এককভাবে হাসিনাকে চোখবন্ধ সমর্থন দিয়ে রাশিয়া এগিয়ে যাবে এই অনুমান ভিত্তিহীন। হাসিনার সাথে ৫ জানুয়ারির পরের পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাশিয়ান বিবৃতিতেও এমন কিছু নাই যেটা একই প্রসঙ্গে আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে নাই। ফলে রাশিয়াকেও জড়িয়ে লিসা কার্টিসের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অনুমানের।

    হাসিনাকে দানব বানানোর তিন দেশীয় সমর্থনের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোন সূত্র থেকে
    একটা কথা বলে রাখা ভাল, লিসা কার্টিসের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোথা থেকে? একেবারেই কি তা সুত্রহীন? না, সুত্র সম্ভবত একটা আছে। সেই সুত্র ভারত নিজে। একটা হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন বা কানকথা ভারত ছড়িয়েছে। ধীরস্থির চীনের বিপরীতে অস্থির প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে যেমন রাশিয়া ঠিক তেমনই আর এক প্রান্ত হল ভারত, হাত নিশপিশ করা ভারত। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে তার সুখের হানিমুন ভেঙ্গে যাওয়াতে এই হাত নিশপিশ, পারলে আমেরিকাকে এখনই একটা শিক্ষা দিয়ে দেয় এমন ভাব। উপরে বলেছি, এতদিন ভারত আমেরিকার লোভের ফাঁদে পড়ে কেবল নিজের জন্য পুরানো বা চলতি অর্ডা্রটা ও এর সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিগত ভারসাম্যটাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকলে আমেরিকার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাবে এই বেকুবি লোভে ও আশায় ব্রিক ব্যাংকের উদ্যোগকে ধীরে চল নীতিতে আটকে রেখেছিল। আজ আমেরিকার সাথে বিরোধে হঠাত স্বপ্নভঙ্গ হওয়াতে সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছে। মিথ্যা ভয় ছড়িয়েছে, প্রপাগান্ডায় মেতেছে যে ভারত, চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে উঠতেছে ফলে এবার আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়া হবে। যদিও এই বাস্তবতা পরিপক্ক হতে এখনও ঢেড় সময় লাগবে এবং ব্যাপারটা মোটেও ঠিক শিক্ষা দেবার বা প্রতিশোধ নেবার মত নয়। কিন্তু সার কথা সেটা অন্তত একদুই কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবার মত তো নয়ই। আর সেকাজটাও তো খোদ ভারতই ধীরে চল নীতিতে ফেলে রেখেছে, দোদুল্যমান ও লোভী হয়ে মনোযোগ দেয়নি। এটা সে ভাল করেই জানে। এবং এখনও মনস্থির কিনা আমাদের জানা নাই। ফলে কানকথা ছড়িয়ে শত্রু আমেরিকার যদি কিছু ক্ষতি করা যায়, ভয় দেখিয়ে কিছু বাগে আনা যায় – তো তাতেই মনের সুখ ভারতের। আর এই কান কথা ছড়ানোর প্রপাগান্ডা মেশিনের দায়িত্ত্ব দিয়েছে বা নিয়েছে হাসিনা সরকার। মন্ত্রী হবার পর, ভারত সফর করা (১৮-২২ জানুয়ারী, ২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রী হলেন তোফায়েল আহমেদ। ভারত সফর থেকে ফিরে ঢাকায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেই এই কানকথাগুলো ছড়িয়েছেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই লিসা কার্টিজের – ভারত, চীন রাশিয়া – এই তিন “অক্ষশক্তিকে” হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখার খলনায়ক হিসাবে প্রপাগান্ডা। এটাকে ভারতের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লিসা কার্টিসের প্রপাগান্ডার কৌশল বলা যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ দিকটা হল, প্রপাগান্ডার লড়াই করা – এই কাজ কোন গবেষকের হতে পারে না। লিসা এখানে গবেষক মর্যাদা থেকে পতিত স্খলিত হয়েছেন।

    সত্য লুকানো
    লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। একথা বলে লিসা সত্য লুকালেন। বেশিদিন আগে নয় ২০০৭ সালে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল বৈঠকে “দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ভারতের চোখে নিজের নিরাপত্তা ইস্যুটাকে দেখবে” বিষয়টা সাব্যস্ত হয়েছিল সেসময়ের আন্ডার সেক্রেটারী অব ষ্টেট (২০০৫ – ৮) নিকোলাস বার্ণসের উপস্থিতিতে। নিকোলাস বার্নসকে বলা হয় ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকান নতুন ও বিশেষ সম্পর্কের (বিশেষ করে পারমানবিক টেকনোলজি, অন্য অস্ত্র ভারতকে সরবরাহ এবং নিরাপত্তা চুক্তির প্রধান নিগোশিয়েটর) কারিগর। আমেরিকা নিজের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে কি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক রাখেনি, সারাজীবন আমাদের মত দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ঠিক করার যাতাকাঠিটা কি ভারতে হাতে ব্যবহার করতে ধার দেয়নি? এসবই ২০০৭-৮ সালের ঘটনা, আমাদের তা ভুলে যাবার কোন কারণ নাই, লিসারও নয়।
    অর্থাৎ চীনের রাইজিং ইকোনমি তথা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে দাড়াবার বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে টেনে তার মন পাবার জন্য আমেরিকা কেবল “ভারতের প্রেসক্রিপসনের” নয়, বাচ্চা যা চায় তা সব পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর তাতে বাংলাদেশের জন্য এমন দানব ভারতের আবির্ভাব ঘটিয়েছে যে তার একক স্বার্থে গড়া যেন এক কলোনি বাংলাদেশ সরকার হাজির করেছে ২০০৯ সাল থেকেই। আজ খোদ ভারত ও হাসিনা সরকার লিসার আমেরিকাকে কলা দেখিয়েছে, তুচ্ছ করছে – এতে এখন বেয়ারা বাচ্চা কথা শুনে না বলে লিসার গোস্যা করার কি আছে? এমনটাই কি হবার সম্ভাবনা সবসময় ছিল না অথবা কথা নয়।
    তবে এটা ঠিক সর্বশেষ গত তিন বছর ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে মুখোমুখি সংঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে লিসার কথা কেবল এখন অর্থে সঠিক যে “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাচন-মরণ এমন নির্ধারক ভারত ফ্যাক্টর হয়ে উঠল কবে থেকে? তা কি আমেরিকার প্ররোচনাতেই হয় নাই?
    যদি মানবজমিনের অনুবাদের কিছু বাদ পরে না যেয়ে থাকে তবে দেখা যাচ্ছে লিসা বলছেন “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। অর্থাৎ বাক্যটা আমেরিকা “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর কখনও নির্ভর করে নি অথবা করে না” – এমন নয়। লিসা সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যেন প্রছন্নে ধরে নিয়ে বলতে চাইছেন – “আগে করত এখন করছে না”। তো সেক্ষেত্রে “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর” আগে নির্ভর করা আর এখন না করা সবকিছুর দায়ভার কাফফারা সবই তো আমেরিকারই।
    এছাড়া এখন লিসা আবিস্কার করে বলছেন, “মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। খুবই ভাল কথা, সত্যি কথা। কিন্তু সত্যি কথাটা অনুভব করতে আমেরিকা বড্ড দেরি করে ফেলেছে। এর দায় এবং দুর্ভোগ দুটার জন্য আমেরিকার তৈরি হওয়াটাই লিসার কপাল! নয় কি? আমেরিকান নীতির দায় খেসারত তো আমেরিকারই। এতে বাংলাদেশে আমাদের দুর্দশার কথা তাকে আর নতুন করে কিইবা বলার আছে এখানে!
    তবে লিসা এখন হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। মানবজমিন জানাচ্ছে, “লিসা বলেন, “যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে”। “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না,এটা সত্য”। অর্থাৎ লিসা হাসিনা সরকারকে এখন চিহ্নিত করছেন, “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” সরকার বলে। বিগত ৫ বছর অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারির ইলেকশনের আগে পর্যন্ত কি এটা ভিন্ন কিছু ছিল? লিসা বাক্যের মধ্যে অর্থের একটা ফাঁক রেখে দিতে চেয়েছেন, পরিস্কার করেননি। বাংলাদেশের আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটা ২০০৯ সাল থেকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই,আমাদের কাছে কোন কিছুই নতুন ঠেকে নাই। তাহলে কি লিসা এতদিন খবর নেন নাই, রাখেন নাই? না, আসলে ব্যাপারটা তা না। পুরা প্রশ্নোত্তরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে লিসার বক্তব্যে ছত্রে ছত্রে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতির উপর হতাশা ফুটে বের হয়ে আছে। এটা আসলে নিজ কর্মফলের উপর নিজেরই হতাশা। সেই হতাশা থেকে এখন “দায়ী কে” বলে নিজের দিকে না তাকিয়ে বাইরের শত্রু খোজার চেষ্টা আছে। যেমন যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, “লিসা কার্টিস বলেন,শেখ হাসিনা সরকারকে চীন,রাশিয়া ও ভারতের এই নিঃশর্ত সমর্থন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে”। অর্থাৎ তিনি দোষী খুজে পেয়েছেন, ভারত চীন ও রাশিয়াকে। এই তিন রাষ্ট্রের তাদের স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে। কেন তিনি এভাবে বাইরের শত্রু খুজছেন?

    আমেরিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান
    লিসার দরকার থাপ্পড় খাবার পরও আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিকে একটা ইতিবাচক ভাবাদর্শগত টোপড় পড়িয়ে আড়াল টানা। যেটাকে বলে আমেরিকান নীতির পক্ষে ইডিওলজিক্যাল ন্যায্যতা জোগাড় করা। লিসার দিক থেকে তিনি জানেন, আমেরিকান নীতির সততা প্রমাণ করতে চাইলে আসলে আগে দরকার বিপরীতে ভিলেন ক্যারেকটার চিহ্নিত ও চিত্রিত করা। ভিলেনকে যত নোংরাভাবে আঁকা তিনি আঁকতে পারবেন আপনাআপনি নায়ক আমেরিকা বা ওর নীতির সততা ততোই উজ্জ্বল হবে। সিনেমার মত এই হল তাঁর ফর্মুলা।
    লিসার সম্ভাব্য বা হবু প্রমাণিতব্য বিষয় হল এতদিনের আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যেন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার ততপরতাই এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভিতর দিয়ে এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” খপ্পরে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করার ততপরতা। এখানে তাঁর ফোকাস শব্দ গণতন্ত্র। আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে হাজির করা।
    এই প্রসঙ্গে তিনি চিন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির ‘নোংরা’ বা ভিলেন ভুমিকার পিছনের কারণ সম্পর্কে বলছেন। মানবজমিন লিখছে, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যত ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক বিষয়ে লিসা বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন শেখ হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়াবে- এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা, এই দেশ দু’টির নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার কিংবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব কমই উদ্বিগ্ন”। এটা লিসার দেয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা তথ্য সন্দেহ নাই । চিন ও রাশিয়ার “নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই”। তাই তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না, দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন তারা কায়েম করল। এবং তা আবিস্কার করে লিসা আশ্চর্য হন নাই। লিসার এই যুক্তির পাটাতনটা আমেরিকা-রাশিয়ার ঠান্ডা-যুদ্ধের সময়কালের। যখন আমেরিকা রাশিয়ার ‘গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ভিত্তি নাই, ফলে বুঝল না’ বলে প্রপাগান্ডা করত আর বিপরীতে নিজে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন প্রমাণ করতে আমাদের মত সবদেশেই মার্শাল ল’ এর দানব শাসনের সরকার কায়েম করত। পুরা ঠান্ডা যুদ্ধের কালেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের মত সব দেশগুলো চলেছে আমেরিকান সমর্থিত সামরিক শাসনে। এটা বেশ মজার যে লিসা কার্টিজ সেই ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি একালে সবাই যেখানে একই গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রে সম্পর্কিত সেকালে আবার হাজির করছেন। সেসব বাজে ফালতু কথা থাকুক। আমরা বরং প্রশ্ন করি, যে কোন রাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে মুল পরিচালক নির্ধারক ফোকাস কোনটা? আরেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নাকি নিজের পরাশক্তিগত অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অথবা ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ হাসিল করা? এটা লুকিয়ে লাভ নাই যে প্রশ্নাতীতভাবে এর জবাব দ্বিতীয়টা। এবং এটা ঠান্ডাযুদ্ধের সেকাল এবং একাল যেটাই হোক সবকালেই অর্থাৎ সবসময় এটা সত্য। তবে হ্যা এটা কাঁচা সত্য অর্থাৎ কূটনৈতিক ভাষায় এই সত্য এই লক্ষ্য বা ফোকাসের কথা সরাসরি বলা হয় না, বলা যাবে না। বলা হবে মোড়ক, রেঠরিক বা বাকচাতুরি দিয়ে। যেমন ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, কিংবা ‘গণতন্ত্র মহান’ এসব বাকচাতুরির ভাষায়। বেশিদিন আগের নয়, ‘সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ তো আমরা সেদিনও বাংলাদেশে দেখেছি।
    তাহলে দাড়ালো এই যে বাংলাদেশের জন্য লিসার আমেরিকা গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আর চীন বা রাশিয়ার নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই বলে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না – এই তত্ত্বের বেইল নাই। এটা ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি। কিন্তু তবু লিসার তত্ত্বে আর একটা জিনিষ কিছুতেই বেড় পায় নাই মানে চওড়ায় আটাইতে পারে নাই। লিসার এই তত্ত্ব ভারতের বেলায় খাটাতে গিয়ে তিনি বিপদ টের পেয়েছেন। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নরা ভারতকে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” পরাকাষ্ঠা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলে ফেলে থাকে। ফলে চীন বা রাশিয়ার মত ‘নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই’ বলে সব সমস্যাকে এসেন্সিয়াল করার লিসার বিগতযৌবনা যুক্তি বা তত্ত্বটা এখানে খাটছে না। তাই এবার নতুন পাঞ্চ, নতুন টুইষ্ট বা প্যাঁচ। মানবজমিন লিখছে, “লিসা কার্টিস বলেন, ভারতে যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ গতিশীল এবং দেশটি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে থাকে, কিন্তু নিজ দেশের গণ্ডির বাইরে গণতন্ত্র উত্তরণে নয়া দিল্লিকে কখনও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি”।
    আগে বলেছি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চাওয়া না চাওয়াটা এমনকি কোনটাকে গনতন্ত্র করা হচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়া হবে এর সবটাই নির্ভর করে ভারতসহ যেকোন বিদেশীদের বিদেশনীতিতে কোনটা তাদের নিজেদের আপন স্বার্থে যায় এর উপর। অর্থাৎ সুপ্রিম হল, ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন স্বার্থ। কেউই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য নিজের রাষ্ট্রে দোকান খুলে নাই। বাংলাদেশের জনগণও তা করতে কাউকে দিতেও পারে না। প্রশ্নও উঠে না। য়ার ২০০৯ সালে কি আমেরিকা ভারতের হাত দিয়ে আমাদেরকে হাসিনার মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন উপহার দেয়নি? আসলে লিসা এই প্রশ্নোত্তর লিখার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, লিসা কার্টিজ একজন কূটনৈতিক নন বরং গবেষক, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। গবেষক হিসাবে তাঁর কাজ কোন বিদেশনীতিকে ক্রিটিক্যাল ও এনালাইটিক্যাল চোখে অর্থাৎ বিশ্লেষক হিসাবে ঘটনাবলিকে দেখার বিরাট সুযোগ তার ছিল এবং আছে। বিদেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বাস্তবের মুখোমুখিতে পড়লে ওর সমস্যাগুলো কি, কি চেহারা নিয়ে তা দাড়ায় তা নিয়ে বিশ্লেষক অন্তর্দৃষ্টি হাজির করা হত পারত তার আসল ভুমিকা। সম্ভবত একাজে তাঁর ঘাটতি খামতি ঢাকতেই তিনি গবেষকের বদলে স্বচ্ছন্দে তিনি যেন কূটনৈতিক – এই ভুমিকায় নেমে পড়েছেন।

    আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক
    মানবজমিনের প্রশ্নোত্তরের রিপোর্টিংয়ের শুরুতে বলেছে, “গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্বার গণআন্দোলনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে। গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না”। একথাগুলো লিসা কার্টিজের প্রশ্নোত্তরে বলা তার নিজেরই কথা কি না আমরা পরিস্কার হতে পারিনি। হতে পারে তা লিসা কার্টিজের লেখা জবাবের কোন অংশ পড়ে মানবজমিন রিপোর্টারের মনে যে ছাপ তৈরি হয়েছে সেই সুত্রে লেখা। যাই হোক সেটা, এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত একবছরের বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথাই যদি বলি যখন গণবিক্ষোভ আন্দোলনের তোড়ে এক পর্যায়ে ঢাকা ঢাকার বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল সেসময় এর প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি। চলমান ঐ গণআন্দোলন যতই মাত্রা লাভ করছিল আমেরিকাসহ বাংলাদেশের পশ্চিমা কূটনীতিকরা ততোই একে ‘সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করছিল বললে কম বলা হবে। বলতে হবে অভিযুক্ত করেছে একতরফা ভাবে। আর তথাকথিত ‘অহিংস’ প্রতিবাদের কথা নসিহত করছিল আমাদের। কিন্তু এই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে হাসিনা সরকারের রাস্তায় প্রতিবাদ “বিক্ষোভ দেখা মাত্রই আর্মড গাড়িতে চড়ে সরাসরি গুলি” এই মারাত্মক মোকাবিলার ধরণ সম্পর্কে কোন কার্যকর নোটিশ তারা করেছে এমন প্রমাণ তারা রাখে নাই। অর্থাৎ সরকারের সরাসরি গুলি এটা সহিংসতা নয়, নৃশংসতা নয়। যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সেটা সহিংসতা করা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্যের পিছনে এমন নীতিটাই আমরা দেখেছি।
    অর্থাৎ দেখা গেছে আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে হাসিনা এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে তবে সততার সাথে তা বলতে হত, করতে হত। উলটা জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংসতা’ বলে লেবেল লাগিয়ে পালটা প্রচারণায় তাদের নামার কথা নয়। কিন্তু তারা সেটাই করেছে। নিজেদের স্ববিরোধী নীতিটারই বাইরে সরব প্রকাশ ঘটিয়েছে। কূটনীতিকদের কথা সে জগতে থাক। লিসা কার্টিজ বা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গে সেদিকে আর না যাই। কূটনীতিকদের কথা বাদ রেখে এনিয়ে খোদ লিসার আর এক লেখা (৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগে লেখা) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু সারকথা বলা যাক। লেখার শিরোনাম, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াঃ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে রাখা। এখানে দেখুন। [Combating Islamism in South Asia: Keeping Bangladesh on the Democratic Path] এই লেখা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে স্পনসর করা লিসা কার্টিজের কাজ। ওর সারাংশ দেয়া আছে রিপোর্টের শুরুতে সেখান থেকে একটা বাক্য, “While the threat from terrorism had diminished to some extent under the government of Prime Minister Sheikh Hasina, the recent execution of an Islamist politician and the sentencing to death of other opposition leaders accused of war crimes during Bangladesh’s war of independence in 1971 have unleashed furor among Islamists.”। অর্থাৎ লিসা দাবি করছেন হাসিনা সরকারের অধীনকালে নাকি সন্ত্রাসবাদের বিপদ কিছুটা কমেছে। কিন্তু লিসা কিভাবে বুঝলেন যে বিপদ কমেছে। তাঁর বুঝাবুঝির নির্ণায়ক, মানে কি দেখে তিনি বুঝলেন? আমরা জানি না। কিন্তু এক নিশ্বাসে একই বাক্যের পরের অংশে বলছেন, “একজন ইসলামিষ্ট রাজনীতিকের ফাঁসি দেয়া হয়েছে”। অর্থাৎ লিসা সরাসরি বলছেন না তবে তার নির্ণায়ক কি সেটা তিনি ইঙ্গিতে বলছেন।
    কিন্তু কোন ‘ইসলামি রাজনীতিকের’ ফাঁসির সাথে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কি? হাসিনা কি তাঁকে ফাঁসি দিয়েছেন “সন্ত্রাসবাদের” জন্য? আমেরিকা “সন্ত্রাসবাদ” মনে করে তেমন কোন ততপরতার জন্য এই ফাঁসি দেয়া? লিসা সেটা খোলসা করে না বরং ইঙ্গিতে ধরে নিতে বলেছেন। চিন্তার এই ফাঁকি ও অসততাটা লক্ষণীয়। আবার তিনি বলছেন ফাঁসিটা “‘৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত হিসাবে তবে এটা ইসলামিষ্টদের বিক্ষুব্ধ করেছে”।
    তিনি যদি বুঝাতে চেয়ে থাকতেন, ৭১ সালের একটা কৃত যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি এটা তাহলে এটা কোনই সমস্যার হত না। যদিও সেক্ষেত্রে সেই অপরাধী ইসলামিষ্ট কিংবা ইসলামিষ্ট নয় তাতে কিছুই এসে যাবার কথা নয় কারণ এটা গৌণ দিক। মুখ্য দিক হবার কথা তিনি যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তিনি এই ফাঁসির ঘটনাকে সম্পর্কিত করছেন ১) হাসিনাকে “সন্ত্রাসবাদের হুমকি” কমানোর নায়িকা হিসাবে। (২) ফাঁসির কারণে যারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরকে বিক্ষোভকে “ইসলামিষ্টদের বিক্ষোভ” হিসাবে চিহ্নিত করে।
    একটা কথা লিসাসহ এমনভাবে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে পরিস্কার করে বলতে হবে। ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ কি একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ? যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার? আমাদের মনে রাখতে হবে, আলকয়েদা বা তা সংশ্লিষ্ট দল বা গ্রুপের ততপরতা অথবা আলকায়েদার মত ততপরতাকে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে।

    যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার
    কোন প্রশ্ন না রেখে ধরে নিচ্ছি আমেরিকায় সংজ্ঞায় যেটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয় সেটাই সন্ত্রাসবাদ। আদালতে কোন অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়ে গেলে তা থেকে বুঝার উপায় কি যে ঐ অপরাধ সন্ত্রাসবাদের অপরাধ ছিল কি না? তার আগে একটা কথা পরিস্কার করে নেই। অপরাধটা যদি কোন “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” করেন (লিসা কার্টিস Islamist politician বলে এক শব্দ ব্যবহার করেছেন) তাহলেই কি সেটাকে সন্ত্রাসবাদের অপরাধ বলে বুঝব? না তা অবশ্যই বুঝা যাবে না, বুঝা ঠিকও হবে না। কারণ মূল বিষয় হল, দেশের কোন আইনে অভিযোগটা দায়ের করা হয়েছে এটাই সবকিছুর নির্ধারক। এটাই এবিষয়ে সব তর্কের অবসানের মুখ্য উপায়। ফলে অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে “যুদ্ধাপরাধ আইনে” (আমাদের মূল ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ যা সংশোধিত হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার তার সর্বশেষ সংশোধনীসহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। আর অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে আমাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (আমাদের মূল সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে তা সহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র সন্ত্রাসবাদের অপরাধ করেছেন, অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। এই কথা থেকে পরিস্কার যে, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ কোনভাবেই নয়। এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচা্র তাও কোনমতেই নয়। যেসব জামাতের নেতাদের বিচার চলছে বা ফাঁসি হয়ে গেছে এরা কেউই “সন্ত্রাসবাদের অপরাধে” এখনও বিচারের কাঠগড়ায় অথবা বিচার শেষে রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত বা ফাঁসিপ্রাপ্ত তা একেবারেই নয়। মুল কারণ তাদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ – এই আইনে। এরপর আশা করি জামাতের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধাপরাধের (আসলে সঠিক আইনী ভাষায় ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’) বিচার বা শাস্তিকে কেউ “সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে” বিচার হচ্ছে বলে বুঝবেন না, ভুল করবেন না, মিথ্যা ছড়াবেন না। এমনকি জামাতের কোন নেতাকে (লিসা কার্টিসের মত করে) কেউ Islamist politician বলে মনে করেন কিংবা না করেন তাতে কোন ফারাক পড়বে না।
    এখান লিসা কার্টিসের চিন্তার ফাঁকিটা গ্রেফতার করা যায়। এরপরেও জবরদস্তিতে লিসা কার্টিজ যদি মনে করেন, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধটাও একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ। তাতেও আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু লিসা কার্টিজসহ যারা এভাবে মনে করবেন তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তাহলে আমেরিকা নিজেই ঐ “সন্ত্রাসবাদের” অংশ। আজ ৭১ সালের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলেন অথবা “সন্ত্রাসবাদ” বলেন যে নামেই লিসা কার্টিজ ডাকেন এর দায়ভার আমেরিকারও। কারণ তখন আমেরিকান অবস্থান মুসলিম লীগ বা জামাতে ইসলামসহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকের পক্ষে ছিল, সমর্থন ছিল।
    ধরে নিচ্ছি আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নের এসব বিপদ টের পেয়ে এবার হয়ত লিসা কার্টিজ জোর দিবেন তাঁর ব্যবহৃত “ইসলামিষ্ট” শব্দটার উপর। অর্থাৎ ইসলামিষ্ট রাজনীতি মানেই “সন্ত্রাসবাদ”, ফলে সন্ত্রাসবাদের বিপদ দেখতে পাওয়া। লিসাদের জেনে অথবা না জেনে অথবা চিন্তায় ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভুত দেখে বেড়ানোটাও আরও মারাত্মক বিপদের। কারণ জামাত ইসলামি ইসলামি রাজনীতি করে তাতে সন্দেহ নাই। এই অর্থে লিসা যদি “ইসলামিষ্ট” শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই বিচারটা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের আইনে কোন এন্টি-টেরর ল জাতীয় কোন “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” নয়। ফলে আমেরিকার “সন্ত্রাসবাদ” খুজে ফেরা চোখে লিসা কার্টিজ বড়জোর একজন আমেরিকান নাশনালিষ্ট নাগরিক, কোন মতেই কোন গবেষক নন। এছাড়া আমরা আরও বুঝব লিসাও হাসিনার বাকচাতুরির ফাঁদে পড়েছেন। এই ফাঁসি কোন এন্টি-টেরর এক্টে হচ্ছে কি না – এই সহজ দিকটা খেয়াল করার মত বুদ্ধি তিনি দেখাতে পারেন নাই। যদি লিসা দেখতেন, জানতেন তবেই সেটা খুব সহজেই আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী ঘটনা তিনি বলতে পারতেন ও সে ঘটনাকে তাঁর ‘ইসলামিষ্টের বিচার’ কথার কোন অর্থ হত।
    হুশ হারানো বুদ্ধি বিবেচনার এই স্ববিরোধ লিসা কার্টিজের একার নয়। আমেরিকাসহ প্রায় সব পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও একই অবস্থা। ইসলামিষ্ট কথাটাকে তারা জবরদস্তি তাদের সংজ্ঞার সন্ত্রাসবাদ বলে ইঙ্গিত মেরে প্রচ্ছন্নে বুঝাতে চান। এভাবে তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া তারা নিজেরাই গুলিয়ে ফেলেন। অথবা ইচ্ছা করে করে রাখেন। কিন্তু বটম লাইন হল, জামাত আওয়ামি লীগের মতই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটুশনাল আইনী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাদের উভয় দলের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা পাড়ায় আওয়ামি লীগের মতই জামাতও চাপাতি ধরণের সন্ত্রাস করে। কিন্তু চাপাতির সন্ত্রাস করলেও যেমন আওয়ামি লীগ সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের কোন রাজনৈতিক দল নয় ঠিক তেমনি জামাতও আওয়ামি লীগের মতই কোন সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের রাজনৈতিক দল নয়। এমনকি একথা ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মওলানা মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তার ও দলের ক্ষেত্রেও সমান সত্য ও প্রযোজ্য।

    যদিও সমস্যাটা কেবল লিসা কার্টিজের নয়, কেবল পশ্চিমা কূটনৈতিকদেরও নয়। এমনকি আমাদের অনেকেই ইসলামি রাজনীতি অপছন্দ করি বলে এই জবরদস্তি জেনে অথবা না জেনে করি। সে যাক, পশ্চিমা কূটনৈতিকরা মনে করতেই পারেন তারা তাদের সন্ত্রাসবাদের লড়াই করবেন আর সেকাজে বাংলাদেশে একটা “গণতান্ত্রিক” মেকানিজম ও প্রক্রিয়া চালু রেখে বা দেখতে চেয়ে তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করবেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার আগে তাদের মনে খোলা হতে হবে। “ইসলামিষ্ট” শব্দটা শুনে কোন আগাম ধারণার বশবর্তি হয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার কিছু নাই। অন্তত আইডিয়ালি বললে একাজে তারা কোন ব্রান্ডের “ইসলামিষ্টদেরকেও” না পাবার কোন কারণ নাই। কারণ শুনে ইসলামিষ্ট লাগলেও মর্ডান রাষ্ট্রের মত এক লিবারেল রাষ্ট্রই তাদের কল্পনা – এটুকু আছে কিনা সেটাই তো মূল বিবেচ্য হওয়ার কথা।
    তাহলে, মুল সমস্যাটা পশ্চিমা মনের। এই স্ববিরোধের কারণে তাই একদিকে লিসা কার্টিজ হাসিনা সরকারকে সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ে খামোখা সার্টিফিকেট দেন আবার অভিযোগ করেন হাসিনার বাংলাদেশ এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে।

    একটা সতর্কবাণী দিয়ে শেষ করি। এতক্ষণ কথাগুলো বলেছি, বাইরের মানুষ আমাদেরকে কি করে দেখে সেদিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজটা আমাদের। এবং একান্তই আমাদের। একমাত্র আমাদেরকেই তা বাস্তব করে তুলতে হবে। সেকাজে আন্দোলন সংগ্রামই আমাদের পথ। লিসা কার্টিস সহ বাইরের কেউ আমরা কি করি জানতে আগ্রহ থাকতে পারে। তাতে তাদের দেখার স্ববিরোধীতাটা কোথায় তা তারা ঠিক জানুক আর নাই জানুক, আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আশা করি সেদিকটা আমলে রেখে আমরা লেখাটা পাঠ করব।

    SHORT LINK:

  • বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩), তৃতীয় কিস্তি

    তৃতীয় কিস্তি
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৩)

    চীনের বাংলাদেশ নীতি ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের ভুমিকা

    গৌতম দাস

    ১৮ এপ্রিল ২০১৪

    http://wp.me/p1sCvy-5E

    বাংলাদেশে বসে চীন প্রসঙ্গে প্রায় সব আলোচনায় সবচেয়ে যেটা সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, লেখক ও পাঠক উভয়েই প্রসঙ্গে প্রবেশ ও পাঠ শুরু করে এটা ধরে নিয়ে যে চীন একটা ‘কমিউনিষ্ট’ বা ‘সমাজতন্ত্রী’ রাষ্ট্র। কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র বলতে প্রচলিতভাবে কমিউনিষ্ট বা সমাজতন্ত্র শব্দটা সম্পর্কে যে পপুলার বুঝ আছে এর উপর দাঁড়ানো ধারণাটাকে বুঝিয়েছি। আর সেই সাথে, কমিউনিষ্ট চোখে দেখা অর্থাৎ ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক রাজনীতির যুগে আশির দশক পর্যন্ত দুনিয়াকে যেমন বলে মনে করা হত, যে চোখে দেখা ও ব্যাখ্যা করা হত সেই বুঝ দিয়ে চীনকে বুঝা বা ব্যাখ্যা করার অভ্যাস – এই সবটাকে বুঝিয়েছি। কিন্তু ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার কারণে পুরানা সেই চিন্তার ফ্রেম ও অভ্যাস যার উপর দাঁড়ানো ছিল সেই বাস্তবতাই আমুল বদলে গেছে, দুনিয়ার অজস্র পরিবর্তন এসেছে। আবার আমূল পরিবর্তন শুধু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে দুনিয়ায় ঘটেছে তাই নয়। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে পড়ার অন্তত ১৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের আর এক ঘটনা ছিল সেটা। ১৯৭১ সালের পর থেকে ক্রমশ চীন-আমেরিকার সম্পর্কের বাস্তব প্রেক্ষিতটাই যখন বহু কিছুকে আমুলে পরিবর্তিত করে দিয়ে গেছে। খুব কম মানুষই বিশেষ করে ‘কমিউনিষ্ট’ মহলে এই গুরুত্বপুর্ণ বদল নজর আমলে এসেছে। অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার ঘটনাটা ঘটলে বা না ঘটলেও এর থেকে স্বধীন ভাবে ঘটেছিল সেই ঘটনা। এসবের দিকে বেশিরভাগ লেখক ও পাঠকের কোন নজর হুশ সেখানে থাকেনি। সেসব বিস্তারে এখানে না যেয়ে বিষয়টাকে এককথায় বললে, এখন চীন আমেরিকা উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত একক অর্থনীতিতে গভীরভাবে সম্পর্কিত দুটা রাষ্ট্র। এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়লে অথবা না পড়লেও এটা একইভাবে সত্য – এই বাস্তব দিকটায় নজরে আনতে চায় না কেউ। বরং আশির দশকের ধারণা ও ব্যাখ্যা দিয়েই দুনিয়ার ঘটনাবলিকে এখনও ব্যাখ্যা ও বুঝবার কসরত করতে দেখা যায়। এমনকি সর্বশেষ গত ২৫ বছরের রাইজিং চীনের পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে মৌলিক তথ্য সংগ্রহের ও তাতে নজর দেবার বিষয়ে সবাই পিছিয়ে। অথচ পুরান কায়দায় বাস্তবতাহীন দৃষ্টিভঙ্গির ও অকেজো তত্ত্ব ও ব্যাখ্যার বিপরীতে একেবারে গোড়ার কথাটা হলো, চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত হবার ভিত গাড়া ঘটেছিল সেই সত্তরের দশকের শুরু থেকে। আবার রাষ্ট্র দুটার সম্পর্কিত হওয়া মানে আর তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরোধ নাই তা একেবারেই নয়। আগে অনুমান করা হত রাশিয়া-আমেরিকা অথবা চীন-আমেরিকা ব্যাপারটা “সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিতন্ত্র” ধরণের বিরোধ, যেটা ইডিওলজিক্যাল। সেই অনুমান মিথ্যা নয়। কিন্তু এব্যাপারে এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্টটা আমাদের চোখের আড়ালে থেকে গেছে। তা হল, বিরোধটা ইডিওলজিক্যাল কি না এরচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হলো তখন চীন-আমেরিকা (অথবা রাশিয়া-আমেরিকা) এমন দুই রাষ্ট্র ছিল নিজেদের মধ্যে কোন লেনদেন বাণিজ্যের সম্পর্কহীন এবং প্যারালাল, ফলে দুই আলাদা অর্থনীতির। আর সত্তরের দশকের পর থেকে চীন-আমেরিকা (এবং রাশিয়ার বেলায় তা ১৯৯১ সালের পর থেকে) ক্রমশ হয়ে পড়েছে সবাই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম অধীনস্ত। উভয়েই একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে থাকলেও সেই সাথে তাদের মধ্যে ভালরকমের স্বার্থগত বিরোধ প্রতিদ্বন্দ্বিতাও তাতে আছে। কিন্তু হাতে গুণে মনে রাখতে হবে সেটা আর ‘পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র’ ধরনের ইডিওলজিক্যাল নয়। আবার আগের মতই কিন্তু নতুন রূপে পরাশক্তিগত বিরোধ আছে তাদের মধ্যে শুধু তাই না, তা বাড়ছে কিন্তু কোনভাবেই তার ভিত্তি আগের মত ইডিওলজিক্যাল নয়। এটা “রাইজিং ইকোনমির” চীন বা রাশিয়া।

    “রাইজিং ইকোনমির” চীন অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা
    লেখার শুরুতে নতুন পাঁচ পরাশক্তির উত্থানের কথা তুলেছিলাম। এই পাঁচের – ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকা – মধ্যে আবার সবাই “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে একদর হলেও এক মোটা দাগে চীন অন্য চারটার চেয়ে ভিন্ন, আলাদা গুরুত্ত্ব বিবেচনা রাখে। রাইজিং ইকোনমি মানে যার জিডিপি ভাল, দুই ডিজিটের দিকে তরতর করে আগাচ্ছে, প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ যেখানে ছুটে যাচ্ছে, গ্লোবাল বাজার শেয়ার যার বাড়ছে ইত্যাদি। কিন্তু ভিতরে হাত দিয়ে দেখলে বুঝা যাবে, এক চীন ছাড়া আর চার রাষ্ট্রের কারও অর্থনীতির ভিত্তি ম্যানুফাকচারিং বা ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশন নয়। অবস্থাটা হলো, ঐ চার রাষ্ট্রের অর্থনীতিও চীনের মতই বিদেশি বিনিয়োগ হজম করছে কিন্তু তা মূলত মাটির নিচের সম্পদ (তেল, কয়লা, মিনারেল ইত্যাদি) তুলে আনা আর তা বিদেশে রপ্তানী বিক্রি করতে। এরপর তা বেচে-খেয়ে শেষ। ইন্ডাষ্টি বলে নতুন কোন অর্থনীতির চক্র শুরু সেখান থেকে আবার হয় নাই। যদিও বৈদেশিক রিজার্ভ আনার তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে তা এদের সবার শক্ত হচ্ছে, উদ্বৃত্বের অর্থনীতি বলেও তা আপাতত হাজির হচ্ছে। কিন্তু ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের কোন ভিত্তি এর নাই। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের রাষ্ট্রের মাটির নিচের সম্পদের অন্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির কারণে বিপুল চাহিদা তৈরি করে আছে, বাজার আছে, বিক্রি হচ্ছে, তবেই সেগুলো ‘সম্পদ’ বলে বিবেচিত হচ্ছে। নইলে তা মাটির নিচের আবর্জনা বৈ কিছু নয়। রাশিয়ার কথাই ধরা যাক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০০৭-৮ সাল পর্যন্ত ১৭০ ডলার ব্যারেল ছিল। এরপর মহামন্দা দেখা দিলেও এখনও তা ১০০ ডলারের আশেপাশে, এর নিচে যায় নাই। ফলে রাশিয়ান উদ্বৃত্ত্ব অর্থনীতি বলে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। আভ্যন্তরীণ বাজারমুখি ইন্ডাষ্টিয়াল ভিত্তি একটা ওর আছে ঠিকই কিন্তু উতপাদন দক্ষতা, মান ও ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা চরমে ফলে তা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানীযোগ্য নয়; একারণে রাশিয়ার ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ভিত্তি কোরিয়ারও সমতুল্য নয়। ফলে রপ্তানী দূরে থাক তা টিকে থাকার জন্য ধুকছে। এসবের বিপরীতে চীনের ভিত্তি একই সাথে ইন্ডাষ্টিয়াল প্রডাকশনের এবং তা রপ্তানীর আর নিজ ব্যাপক জনসংখ্যার গুণে নিজের আভ্যন্তরীণ বিশাল ভোক্তা বাজারের উপর দাঁড়ানো। তাহলে মুল কথা হল, রাইজিং অর্থনীতির চীন অন্য চার রাইজিং অর্থনীতির চেয়ে বিশেষ। আবার অন্য দিক থেকে, এখন সারা দুনিয়া জুড়েই প্রায় রাইজিং অর্থনীতিরসহ সব রাষ্ট্রই একই এবং একটাই – এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে ও পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল। এই কথাটা মনে রেখে ঘটনাবলির দিকে তাকানো, মাঠের তথ্য সংগ্রহ ও এর ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হতে হবে আমাদের। এর ভিতরেই এবার পরাশক্তিগত পাশ ফেরা অদলবদল নতুন কি ঘটছে তাই এই লেখার প্রসঙ্গ। ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব করলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রপ্তানী বাজারমুখি দখলের প্রতিযোগিতায় বড় প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়ার হয়ে চীন প্রায় পঁচিশ বছর কাটিয়েছে। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রীয় ঋণে চীনের কাছে ঋণী। এক আমেরিকায় চীন রাষ্ট্র তিন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের (ক্রয় করা আমেরিকান সরকারি বন্ড, অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি) মালিক।
    কিন্তু যেটা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় তা হল, (১) এখন পর্যন্ত চীনের এই প্রচেষ্টা পশ্চিমের এম্পেরিয়াল কায়দায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজার দখলের মত নয়। এম্পেরিয়াল কায়দা মানে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক সামরিক শক্তি বা যাতাকাঠি ব্যবহার করে, প্রভাব বিস্তার করে জবরদস্তি খাটিয়ে সস্তায় কাচামাল সংগ্রহ ও সেই দেশে নিজের জন্য পণ্যবাজার দখল করে আগানো। বৃহত্তর অর্থে, দুনিয়ায় আগের মতই পরাশক্তিগত এম্পেরিয়াল কায়দাই চালু আছে। কিন্তু এর ভিতরেই চীন একটু আলাদা তুলনামূলকভাবে, কোন পলিটিক্যাল যাতাকাঠি ব্যবহার না করেই এক ধরনের প্রতিযোগিতাপুর্ণ “ভাল ডিল” দিয়ে ব্যবসা বাগানোর যে সুযোগ আছে তাকেই ব্যবহার করে এগিয়ে চলছে চীন। এতটুকু তুলনামূলক অর্থে এটা ভিন্ন। এককথায় বললে অন্য রাষ্ট্রের সরকারে কে থাকবে, কাকে উঠিয়ে ফেলে দিতে হবে -একাজে ‘পলিটিক্যাল লিভারেজ’ ব্যবহার করে নিজের অর্থনীতি আগিয়ে নেয়ার নীতি এখন পর্যন্ত চীনের নয়। এখনও পর্যন্ত তাই আমাদের মত ভিন দেশে চিনের স্বার্থের প্রকৃতি রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক। এই নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে চীন আগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। (২) দুনিয়ায় চলমান গ্লোবাল দ্বন্দ্ব বিরোধে তা কোন ধরনের সামরিক ঝগড়া বিরোধের দিকে মোড় নিলে সেখানে আর নিজেকে জড়িত না করা। বড় জোর কূটনৈতিক পর্যায় পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা। এটা রাইজিং চিনের আর এক লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট। চীনের এই নীতিতে ব্যতিক্রম আছে তা হল, নিজ রাষ্ট্রের ভুখন্ডগত স্বার্থের (তাইওয়ান ইস্যু সহ) বিষয় হলে তবেই সামরিক দিকও সেখানে একটা অপশন। এককথায় বললে পলিটিক্যাল খবরদারী ও সামরিক ষ্টেক বা ভাগীদার হিসাবে নিজেকে না জড়িয়ে কেবল ব্যবসা, নিজের অর্থনীতি এগিয়ে নেয়া – এই হল এখন পর্যন্ত চীনা বৈশিষ্ট। এথেকে এমন বুঝা বা দাবী করা ভুল হবে যে এই নীতি চীন আগামিতে সবসময় বজায় রাখবে। তবে এখন পর্যন্ত এটা চিনের আগাবার লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট – এদিকটা যেন আমাদের নজর না এড়ায়।
    উপরের যে দুটো গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় আমলে আনলাম, গত ২০০৯ সালের পর থেকে ওর প্রথম বিষয়টায় চীন আরও কিছু পালক লাগিয়েছে। এককথায় বললে তা হল, পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে পুব বা এশিয়ামুখি হয়ে অর্থনীতিকে আগানো। এশিয়ামুখি মানে? এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্র করে কোন এম্পেরিয়াল কায়দার মত করে ব্যবসা ও অর্থনীতি? না অবশ্যই তা নয়। কারণ, (১),পলিটিক্যাল খবরদারী বা লিভারেজ ছাড়াই প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা এই নীতি এখনও অটুট। (২) চীন এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে এক পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে উঠার অর্থনীতি দাঁড় করাতে চায়। লো টেকনোলজি এবং শ্রমঘন গার্মেন্টসের আমাদের মত পিছিয়ে থাকা দেশের রপ্তানী শিল্পের ক্রেতা হতে চায় সে নিজে। আর এর ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ মূল মেশিনারিজ, কাপড়ের মেশিনারি ও কাচামাল তৈরি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ ইত্যাদি আমাদের দেশের অবকাঠামোগত খাতগুলোতে সব বিষয়ে বড় বিনিয়োগ চীন এগিয়ে আসবে, প্রবেশ করবে। অর্থাৎ এশিয়ার পিছিয়ে থাকা দেশগুলো যে যা রপ্তানী করতে সক্ষম এমন পণ্যগুলোর ক্রেতা হবে সে নিজে, নিজের বাজারে তাদের প্রবেশ সহজ করবে আর তুলনায় হাইটেক কারখানা বা অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগে সে এগিয়ে প্রবেশ করবে। এভাবে লেনদেন বিনিময়ের এক নতুন যুগের এশিয়া গড়তে চায় চীন। এভাবেই এশিয়ায় পরস্পর নির্ভরশীল ও একসাথে বেড়ে ঊঠার এক এশিয়া ভারকেন্দ্রের অর্থনীতির সুচনা করতে চায় চীন। এই ইচ্ছা ও পরিকল্পনা সম্ভব হবার বা তা যে কাজ করবে এর কারণ বা পিছনে মুল শর্ত উপস্থিত আছে। ইতোমধ্যেই চীনের শ্রমমুল্য পিছিয়ে পড়া এশিয়ার দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। ফলে আমরা সেসব রপ্তানী পণ্যের ক্রেতা হবে চীন যেসব সে নিজে উতপাদন করতে চাইলে চীনের শ্রমমুল্য বেশি বলে তা তাদের পোষাবে না। এসবেরই সারকথা হলো, চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে আসার জন্য আমাদের পলিটিক্যাল ষ্টাবলিটির অপেক্ষায় আছে। একথাগুলো মাথায় রেখে এই প্রসঙ্গে ২০১২ সালের অক্টোবরে ডেইলি ষ্টার পত্রিকায় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের এক সাক্ষাতকার ও একই প্রসঙ্গে পত্রিকার নিজস্ব একটা রিপোর্ট এর লিঙ্ক দেখা যেতে পারে। উপরে বাংলাদেশের প্রতি চীনা নীতির এপ্রোচ বা পেশ হওয়া প্রসঙ্গে যে ছবি এঁকেছি ডেইলি ষ্টারের এই দুই লিঙ্ক থেকে এর স্বপক্ষে কিছু যুক্তি প্রমাণ পাওয়া যাবে।

    আমেরিকা বিদেশনীতি ও সেই সুত্রে ভারতের বিদেশনীতি ক্রিয়ার চীনের প্রতিক্রিয়া
    উপরে যেদিকের কথা দিয়ে শুরু করেছি তা, অবশ্যই চীনের প্রতিক্রিয়া। মানে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া। কোন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া? লেখার শুরুতে বলা পরাশক্তিগত ওলটপালট আসন্ন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ও ভারতের ক্রিয়ার বিরুদ্ধে। কথা শুরু করেছিলাম ২০০৭ সালের আমেরিকার বিদেশ নীতির বৈশিষ্ট – এই ক্রিয়া থেকে। শুরুতে ভারতের পিঠে হাত রাখার জন্য আমেরিকান ক্রিয়ার কথা বলেছিলাম। আজকের একই পুঁজিতন্ত্রে গাথা দুনিয়ায় প্রত্যেক রাষ্ট্রের বিদেশনীতি মতিগতি আগের যে কোন সময়ের চেয়ে একেবারেই উদোম হয়ে চলে। ফলে আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতিতে কি আছে কি বদল এসেছে তা আর কোন গোপন বিষয় নয়। বিপরীতে চীনা প্রতিক্রিয়া এবং নীতিও। পরাশক্তিগত পালাবদলের পুরা সার্ভে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর গত ২০০৯ সালে ওবামা চীন সফরে গিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য শুরুতে মিডিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে হম্বিতম্বি দামামা ছিল। কিন্তু যখন ওবামা ফিরলেন তখন মিডিয়া জুড়ে কেবল অর্থনীতির নানান ক্ষেত্রে চীন-আমেরিকা সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি আর সেই সাথে ওবামার ব্যাগে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার খবর। সাধারণ্যে আমরা চীন-ভারত ব্যবসায় খবর খুব কম রাখি, বিরোধ দ্বন্দ্বের খবরই ছেয়ে থাকে উপরে। চীন-ভারতের ব্যবসা বা বাজারের আকার ছিল ২০০২ সালে ৫ বিলিয়ন ডলার, আর ২০১১ সালে তা বেড়ে দাড়ায় প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ আমেরিকা ও সেই সূত্রে ভারতের চীন নীতি পরাশক্তিগত পাস-ফেরার ইঙ্গিতে যতই মারমুখি সামরিক হয়ে উঠতে চেষ্টা করেছে এর বিরুদ্ধে চীনা প্রতিক্রিয়া ততই এদের প্রতি ব্যবসায়িক ও সহযোগিতামূলক, গরম ক্রিয়াকে ঠান্ডা করতে ঠান্ডা পানি ছিটানোর প্রতিক্রিয়া। বড়ভাই আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় ভারত ২০০৭ সাল থেকেই নিজেকে পরাশক্তি ভাবা শুরু করে। অপ্রয়োজনীয় মাসল দেখানোর ভিতর দিয়েই সব সমস্যা বিরোধের মীমাংসা হবে এমন ভাবা শুরু করেছিল। “এই চীন আসছে” ধরণের খবরে ভারতের মিডিয়াগুলো মুখর হয়ে থাকত। এমনিতেই সবাই জানে ভারতের মিডিয়া বা থিঙ্কটাংকগুলোও স্বীকার করে যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ ভারতীয় বাহিনীর মনে একটা ট্রমাটিক অবস্থা তৈরি করে দিয়ে গেছে। যদিও সেই থেকে চীন-ভারতের বাস্তব বিরোধ মূলত অরুণাচল প্রদেশের সীমানা নিয়ে, মূলত এই এক ইস্যুতে। সর্বশেষ গত বছর ২০১৩ এর শেষে, সীমান্ত বিষয়ক সেই সন্দেহের গোড়া উতখাত করেছে চীন। প্রথমে গত ২০১৩ সালের মে মাসে চীনা প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেছিলেন আর এর পাঁচ মাস পরে পালটা সফরে অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর চীন সফরে, সেখানেই চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ মিটানো বিষয়ে Border Defence Cooperation Agreement (BDCA) নামের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীন-ভারত সহযোগিতা সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তি সুদুরপ্রসারি ইঙ্গিতময়। এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের যুগ খুলেছে। আর এটা ঠিক ততটাই ভারতের যুদ্ধংদেহী বাজপাখি নীতির অনুসারিদের এবং সারা পশ্চিমা মিত্রসহ আমেরিকার জন্য চপেটাঘাত।
    এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম আমেরিকার সার্ভ রিপোর্টের কথা। আমেরিকা নিজের একক পরাশক্তিগত ভুমিকার পতন আসন্ন রিপোর্টের এই ইঙ্গিতে দিশেহারা হয়ে এশিয়ার রাইজিং চীন-ভারত দুই ইকোনমির মধ্যে পরস্পর লাগালাগি যত তীব্র করে রাখতে পারবে ততদিন নিজের সম্ভাবনা তার আশা জীবিত থাকবে অনুমান করে আমেরিকা নিজের এশিয়া-নীতি রচনা করেছিল। ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে দাবড়ানো –এভাবে সাজাতে মনস্ত করেছিল। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান চীন-ভারতের মাঝখানে বলে সর্বশেষ ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশকে নিজের ষ্ট্রাটেজিক গুরুত্বে আমল করতে শুরু করতে ততপর হয়েছিল। স্বভাবতই চীন-ভারতের এই সীমান্ত চুক্তি সেসব পরিকল্পনার আগুনে পানির ছিটা দেবার মত। এরই কিছুটা ঝলক পাওয়া যাবে foreignpolicy জার্ণালের এই রিপোর্টে। [দেখুন,India-China Border Agreement: Much Ado about Nothing]। এর শিরোনামটাই অদ্ভুত অর্থপুর্ণ, সব বলে দেওয়া। Much Ado about Nothing – এই বাক্যাবলী আসলে সেক্সপিয়ারের এক কমেডি নাটকের শিরোনাম। দুলাইনে বললে ওর কাহিনীটা হলো, এক রাজ-সৈনিকের রাজকন্যার সাথে প্রেম। ক্লোডিয়া নামে ঐ সৈনিকের এই প্রেমে বন্ধুবেশি তার শত্রু ডন জন সবরকমভাবে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সৈনিক ও রাজকন্যার মিলন ও বিয়ে হওয়া ঠেকাতে পারে নাই। বিয়ে মিলন হয়েছিল। আশা করি পাঠক বুঝতে পারছেন কেন শিরোনামটা বহু অর্থবোধক।
    সে যাই হোক, ভারত ও চীন উভয় পক্ষও পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে এই চুক্তিকে “landmark legal document” অথবা “strategic benchmark” বলে উল্লেখ করেছে। চুক্তির সারকথা হল, উভয়ে ভূমিতে যে যেখানে দখল অবস্থানে আছে তা অমীমাংসিত অবস্থায় রেখেও পরস্পর মুখোমুখি হয়ে গেলে একটাও গুলি না ছুড়ে পরস্পরের প্রতি সৌজন্য দেখিয়ে পরিস্থিতি যেন কোন ধরনের সশস্ত্র বিরোধের দিকে না যায় তা নিশ্চিত করবে – এভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

    চীন কি আসলেই ভারতকে মুক্তার মালার মত ঘিরে ফেলার পরিকল্পনায়
    তবে শুধু সীমান্ত চুক্তিই নয়, চীন-ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠতার দিক থেকে নতুন মোড় ফেরার উপাদানও মনমোহনের ঐসফরে অন্য আর চুক্তির ফলে তৈরি হয়েছে। এটা আমেরিকার জন্য চপেটাঘাতের অনুভুতি আরও তীব্র হয়েছে।
    গত ২০০৭ সালের দিকে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহের বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট দুটা গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রকল্প ছিল, (১) মাঝখানে প্রায় ৪৩ কিমি বার্মা পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে পুর্ব চীনের কুয়েমিন প্রদেশ পর্যন্ত যোগাযোগের রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প আর (২) বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প। দুটো প্রকল্পই নিজস্ব বিনিয়োগে করে দেবার ব্যাপারে চীন আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া ও থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এই আগ্রহকে ব্যাখ্যা করেছিল চীন নাকি ভারতকে মুক্তার মালার মত চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে, এমন ভীতি ছড়িয়েছিল। অর্থাৎ চিনের বিদেশনীতির লক্ষ্য ও ফোকাস অর্থনীতি নয় বরং ভারতকে ঘিরে ধরার মত সামরিক-ষ্ট্রাটেজিক। কিন্তু এভাবে ব্যাখ্যা করে ভীতি ছড়িয়ে যা আড়াল করে ফেলা হয়েছিল তা হল এই প্রকল্প দুটার প্রতি আগ্রহ চিনের নিজেরই অর্থনীতি বা অবকাঠামোগত স্বার্থ। ম্যাপের দিকে তাকালে আমরা দেখব চিনের কেবলমাত্র পুর্বদিকে সমুদ্রের সীমানা আছে, প্রায় পুরা পুবদিক (পুব চীন সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত) নৌপথের জন্য খোলা, এটাই চিনের একমাত্র নৌ গেটওয়ে। বাকি তিন (পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ) দিক ল্যান্ডবর্ডারে আবদ্ধ – নৌ পথে বাইরে বের হবার সুযোগ নাই। চীনের সব অঞ্চলে সুষম সুযোগ সৃষ্টির জন্য বিশেষ করে দক্ষিণ দিকে (kunming Province) ও পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলোকে কাছাকাছি নৌপথের যোগাযোগের আওতায় নিয়ে আসা – এটা প্রধানত চীনের নিজের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থ। এর উপায় হিসাবে চীন তার দক্ষিণ ও পশ্চিম দুটা দিক থেকেই কাছাকাছি কোথাও গভীর সমুদ্রবন্দরের কথা চিন্তা করে। এর একটা পাকিস্তানের বেলুচিস্থানের গোয়াদার (Gwadar port) আর অন্যটা বাংলাদেশের মহেশখালির সোনাদিয়ায়। প্রথমটা চিনের পশ্চিম দিক (Xinjiang and Tibet Province) আর দ্বিতীয়টা দক্ষিণ দিকের (kunming Province) প্রদেশগুলোকে নৌপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছের হয়। গোয়াদার পোর্ট চীনা বিনিয়োগে এবং চীনা কোম্পানীর হাতে ২০০৭ সালে কনস্ট্রাকশন শেষ হয়েছে, কিন্তু পোর্টকে কেন্দ্র করে আশেপাশে রপ্তানীর জন্য উতপাদন এলাকা গড়ে তোলা আর পোর্ট অপারেশনের দায়িত্ত্ব দিয়ে চুক্তি হয় সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটির সাথে। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনকভাবে তা চালাতে না পারার কারণে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই চুক্তির দায়দেনাসহ নতুন হস্তান্তরের চুক্তি হয় এক চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানীর সাথে। সেই থেকে গোয়াদার পোর্ট চীনা সরকারি অপারেটর কোম্পানির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এখন অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে গোয়াদার পোর্ট থেকে সবার চেয়ে বেশি লাভবান হবে চীনের অর্থনীতি। না সেটা পোর্ট পরিচালনা থেকে ব্যবসায় মুনাফা করার কারণে নয়। মুনাফা অবশ্যই হবে তবে আসল অর্থনৈতিক লাভের তুলনায় এটা নস্যি। চীন আরব দেশগুলো থেকে বছরের তার মোট চাহিদার ৬০% তেল কিনে। এই তেল আরব সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর মানে ভারত-শ্রীলঙ্কা ঘুরে, এরপর আরও দক্ষিণে নেমে, ডানে ইন্দোনেশিয়া বায়ে মালয়েশিয়ার মাঝের চিকণ মালাক্কা প্রণালি নৌপথ ধরে সিঙ্গাপুর পেরিয়ে একেবারে বায়ে মোড় নিলে তবেই দক্ষিণ চীন সাগরে মানে চীনের বন্দরে পৌছাবে। আর ভুখন্ডগত দেখলে এটা পুরাপুরি চিনের পশ্চিম অঞ্চল থেকে চিনের পুবে ভ্রমণ। কিন্তু গোয়াদার পোর্ট মূলত আরব সাগরের মুখে (এককালে তা ওমানের অধীনস্ত এলাকা ছিল। বেশিদিন নয় গত ১৯৫৮ সালে ওমানের কাছ থেকে তিন মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।) ফলে নৌপথে মধ্যপ্রাচ্যের তেল আরব সাগর থেকে বের হবার মুখেই গোয়াদার পোর্টে নামিয়ে তা পাকিস্তানের কারাকোরাম হাইওয়ে সড়ক ধরলে উত্তর-পশ্চিম দিকে (Xinjiang and Tibet Province) অঞ্চলগুলো যাওয়া সবচেয়ে সহজ, কম খরচে ও কম সময়ে। এটাই চীনের অর্থনৈতিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক বিরাট লাভ। এজন্য ভবিষ্যতে পাইপ লাইন স্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে গোয়াদার হয়ে সরাসরি তেল কেনা ও পাইপলাইনে পরিবহণ করে নেবার পরিকল্পনা চীনের আছে।
    তার মানে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে বিনিয়োগে যাওয়া সবার উপরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট গুরুত্বপুর্ণ। এটা ছাড়াও তুলনায় গৌণ স্বার্থ হলেও বিষয়টাকে সামরিক অর্থে ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে অবশ্যই চীনের সেই সুবিধাও আছে সন্দেহ নাই। তবে এটা বাড়তি পরে পাওয়া সুবিধা। বাড়তি পরে পাবার সুবিধা নিয়ে অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যেকার প্রতিযোগিতা সবসময় থাকে এবং চলছে। যেমন, আগেই বলেছি আইনীভাবে গোয়াদার পোর্টের অবস্থান পাকিস্তানের নৌসীমান্তের ভিতর অন্তর্ভুক্ত হলেও ঐ সীমান্ত ডাঙ্গার দিক থেকে একই সঙ্গে তা পাশের ইরানের সাথে পাকিস্তানেরও সীমান্ত। আর ঠিক ইরানী ঐ সীমান্তে আর একটি নৌবন্দর তৈরি হয়েছে প্রায় সমকালীন সময়। ইরানের ঐ নৌবন্দরের নাম চাহ-বাহার (Port of Chabahar), প্রশাসনিকভাবে এটা ইরানের সিসতান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। আর এই পোর্ট তৈরির অর্ধেক বিনিয়োগ করেছে ভারত সরকার এবং এই পোর্ট মূলত ভারত ব্যবহার করে ইরানের ভিতর দিয়ে সড়ক পথে আফগানিস্তানে ভারতীয় পণ্য আনা-নেয়ার জন্য। ফলে স্বভাবতই ভারতের অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ ঐ চাহ-বাহার পোর্টের কারণে এসেছে। তাহলে সামরিক ষ্ট্রাটেজিক দিক থেকে দেখলে ঐ পোর্টের কারণে যেন ভারতও পাকিস্তানকে (ফলে ভারতের চীনে প্রবেশেরও) ঘিরে টুটি চেপে ধরেছে (মুক্তামালার মত) এমন অর্থও করা সম্ভব। কিন্তু তুলনায় এই ধরনের অর্থ করে মিডিয়া প্রচারণা আমরা দেখিনা। আসলে পরাশক্তিগত পারস্পরিক অর্থনৈতিক ছাড়াও সামরিক ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের প্রতিযোগিতা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু কোনটাকে ভয়ভীতির বিষয় বলে আভ্যন্তরীণভাবে নিজের নাগরিক বা অনেক সময় আঞ্চলিক শ্রোতাকে লক্ষ্য করে প্রপাগান্ডা করবে সেটাই গুরুত্বপুর্ণ দিক। আর এর ভিতর দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের বিদেশনীতির একটা প্রকাশ আমরা দেখি। আমার কথা আরও স্পষ্ট হবে, বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে ভারতের আগের অবস্থান আর এখনকার অবস্থান লক্ষ্য করলে।

    বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর গড়তে চীনা আগ্রহঃ
    এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ আগ্রহের মুল কারণ চীনের কুনমিং প্রদেশের যোগাযোগ সহজ করা এই অর্থনৈতিক স্বার্থ। কিন্তু ভারত এই ব্যাপারটাতে নিজের পুবের রাজ্যগুলোর সাথে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে বিরাট লাভজনক ও প্রয়োজনীয় মনে করলেও তা চীনের উদ্যোগ আগ্রহের, ফলে ষ্ট্রাটেজিক সামরিক দিক বিবেচনা থেকে ২০০৭ সালে থেকেই প্রবল সন্দেহের চোখে তা দেখতে থাকে। সে সন্দেহ মিডিয়ায় প্রকাশ করতে থাকে। শুধু তাই না, যতদুর সম্ভব বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে তাকে বিরত বা অনাগ্রহী রাখার চেষ্টা করে। বার্মাকেও প্রভাবিত করেছিল একই অবস্থান নিতে। বার্মা ভারতের দ্বারা প্রভাবিতও হয়েছিল। কারণ বার্মার জন্য সেসময়টা ছিল দীর্ঘ কয়েকযুগ আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবরোধে একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেখতে পাবার সময়। সুযোগটা এসেছিল ভারতের মধ্যস্থতায়। কারণ ভারতের মাধ্যমে পশ্চিমের সাথে রফা করে অবরোধ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছিল তখন সেখানে। ফলে সেদিকে তাকিয়ে ভারতের প্রভাবে বার্মাও চীনা প্রকল্পে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল। আর এই ঘটনায় তখন চীন প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ মজার। দুরদর্শী তো বটেই। চীনের পররাষ্ট্র অফিস বলেছিল, যেদিন বার্মিজ জনগণ আগ্রহ বোধ করবে সেদিনের জন্য এই প্রকল্প-প্রস্তাব আপাতত তুলে রাখা হল।

    ভারত কি হুশে ফিরেছে নাকি এখনও দ্বিধান্বিত ও কৌশলী প্রকাশেই আছে
    গত দেড় দুই বছর ধরে এখন ভারতই এই দুই প্রকল্পের ব্যাপারে উল্টা আগ্রহ দেখানো শুরু করেছে। এমনকি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মনমোহনের ঐ সীমান্তচুক্তি বিষয়ক চীন সফরে এক জয়েন্ট ষ্টেটমেন্টে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাতে আরও আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে নতুন এক চুক্তি করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখিত হয়েছে।
    এর মানে দাঁড়াল এতদিন চীনা প্রকল্প-প্রস্তাব নিয়ে তা নাকি মুক্তামালার মত ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনা ষড়যন্ত্র বলে ভারত যে গল্প ছড়িয়েছিল তা ভিত্তিহীন ছিল -এটা ভারত নিজেই স্বাক্ষ্য দিল। তবে মূল বিষয় হল, ভারতের একটা অনাস্থা চীনের উপর ছিল যদিও তা তৈরি করার পিছনে দায়ী খোদ ভারতের আমেরিকান নীতি। বিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে বললে এবিষয়টা হল এই যে পাঁচ রাইজিং ইকোনমির উত্থান এই ফেনোমেনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভুমিকার সমাপ্তি এবং তা উলটপালট ঘটিয়ে দুনিয়ার নতুন পরাশক্তিগত বিন্যাস আসন্ন -একথা লেখার শুরু থেকে বলে আসছি। কিন্তু এটা শুধু পরাশক্তিগত নতুন বিন্যাস নয়, এই ফেনোমেনার মূল তাতপর্য হলো, এটা ১৯৪৪ সাল থেকে তৈরি ও চলে আসা আমেরিকার নেতৃত্ত্বে যে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার চালু হয়েছিল (আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ বা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে) তার আয়ু শেষ হতে চলছে আর এটা প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। চলতি অর্ডারটাকে যদি অতীত বলি তবে দুনিয়ার গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের আগামি আসছে চীন বা রাইজিং অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্ত্বে। এটা চারদিক থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। এবং এটা কোনভাবেই পুরানা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেখেই এর পুনর্গঠন (চীন, রাশিয়া বা ভারতকে আরও বেশি জায়গা ছেড়ে দিয়ে) এভাবে হচ্ছে না। হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমশ ননফাংশনাল বা অকেজো প্রভাবহীন হয়ে পড়া আর চীনের নেতৃত্ত্ব নতুন সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার মধ্যদিয়ে। এটা শুধু আমেরিকা তার সার্ভে রিপোর্টে টের পেয়েছে তাই নয়, ২০০৯ সালে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর বার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল তুরস্কে। সে সভায় ঐ প্রতিষ্ঠান দুটো আসন্ন গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন টের পেয়ে বা ব্যাপারটাকে পরোক্ষে স্বীকৃতি দিয়ে ঐ সম্মেলন আহবান জানিয়েছিল চীনকে। চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ের মুদ্রা হিসাবে (ডলার, পাউন্ড, ইউরো ও ইয়েনের পাশাপাশি) জায়গা দিতে রাজি বলে জানিয়েছিল। কিন্তু এপর্যন্ত চীন সেই পথে সাড়া দেয় নাই। না দেবার পিছনের কারণ হল, (১) চীনের প্রতি এই প্রস্তাবের অর্থ হল আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো যেগুলো আমেরিকার নেতৃত্ত্বে ও নিয়ন্ত্রণে এখন যেমন আছে ওর ভিতরেই চীনকে জায়গা দেয়া কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ অটুট থেকে যাওয়া যা চীনের স্বার্থ নয়। (২) চীনের স্বার্থ এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো এবং ঐ নিয়ন্ত্রণ সম্পুর্ণ ভেঙ্গে (নতুন ম্যান্ডেটে) নতুন ভারসাম্যের প্রতিষ্ঠান দেখতে চাওয়া। (৩) চীনের কাছে এবং বাস্তবত ব্যাপারটা গায়ের জোরের বা চাপ দিয়ে দাবী আদায় করে নেবার বা কারও অনুগ্রহে তা পাবার বিষয় নয়। চীন সেজন্য তার আন্তর্জাতিক বিনিময় বাণিজ্য যত বেশি সম্ভব ইউয়ানের মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়। এবছর ২০১৪ জানুয়ারিতে ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রার তালিকায় সপ্তম স্থান দখল করে। বিশেষ করে হংকং মার্কেটে লেনদেনের ৭৩% এককভাবে সম্পন্ন হয় ইউয়ানে।
    আমরা মনে রাখতে পারি, ১৯৪৪ সালে আইএমএফ গঠনের সময় তা আমেরিকান ডলারের ভিত্তিতে সাজানো ও আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ নেতৃত্ত্ব সম্পন্ন হয়েছিল, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র তা মানতে বাধ্য হবার পিছনে মুল কারণ সেসময় আন্তর্জাতিক লেনদেন বাণিজ্যে ডলারে বিনিময় ছিল সর্বোচ্চ ও একক আধিপত্যে এবং আমেরিকা একমাত্র উদ্বত্ত্ব বাণিজ্য অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল তাই। ফলে আইএমএফে আমেরিকান কর্তৃত্ত্ব ও নেতৃত্ত্ব এসেছিল সামরিক বা পরাশক্তিগত আধিপত্যের কারণে নয়। যদিও প্রতিষ্ঠানগতভাবে পুরানা গ্লোবাল অর্ডার ভেঙ্গে পড়া আর বদলে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রতিস্থাপন যা নতুন গ্লোবাল অর্ডারের জন্ম দিবে তা ঠিক (আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংকের মত) কোন প্রতিষ্টানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে ঘটবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার এই ফেনোমেনা কে BRICS ফেনোমেনা অথবা ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রতি বছরের BRICS সামিট এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চিহ্নিত করা যায়। আর এই সামিট থেকে BRICS ব্যাংক নামে কার্যক্রম যা মূলত বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসাবে ধেয়ে আসছে। আমাদের এখনকার আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক অংশ হিসাবে সারকথাটা হল, চলতি গ্লোবাল পুজিতান্তিক অর্ডারটাকে দুনিয়ার অতীত বললে দুনিয়ার আগামি হল BRICS ফেনোমেনা।
    কিন্তু আমেরিকার দেয়া প্রলোভনে পড়ে BRICS ফেনোমেনাকে মনোযোগে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা সবচেয়ে নেতিবাচক। এককথায় বললে এখন পর্যন্ত কংগ্রেস দলের নেতৃত্ত্বে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা দ্বিধাগ্রস্থ। একদিকে তারা বুঝে স্বীকার করে বলেই মনে হয় যে দুনিয়ার আগামি ফলে শেষ বিচারে ভারতের মূল স্বার্থেরও আগামি হল BRICS ফেনোমেনা এবং একে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করা। কিন্তু আমেরিকার অফার করা সুবিধাদির লোভে অর্থাৎ পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে কেবল নিজের জন্য কিছু সুবিধা নিংড়ে নিতে গিয়ে সে BRICS ফেনোমেনাকে আগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে নিজের ভুমিকা অংশ সম্পন্ন করতে গড়িমসি করে চলেছে। এরই বাইরের প্রকাশ হল, এতদিন খামোখা চীনের সাথে সামরিক সংঘাতের জুজুর ভয় দেখিয়ে আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাধাটাকে নিজের জনগণ ও নিজের দ্বিধাগ্রস্থ ভুয়া নীতির পক্ষে ন্যায্যতা হিসাবে দেখানো। এই হোল তার মারাত্মক দ্বিধার দিক। ওদিকে ভারতের এই দ্বিধার দিকটা, খামোখা চীনের সাথে “আগামির সম্পর্কটাকে” সামরিক সংঘাতপুর্ণভাবে দেখানোর চেষ্টাটা চীনের কাছে পরিস্কার। কিন্তু চীন জানে এবং বাস্তবতই তাই যে BRICS ফেনোমেনাকে এগিয়ে নেয়া এটা জবরদস্তির বিষয় নয়, প্রতিহিংসার বিষয় নয় ভারতের সম্পুর্ণ স্বইচ্ছার বিষয়, নিজের স্বার্থ বিষয়ে হুশে আসার বিষয়। তাই এবিষয়ে চীনা নীতি অবস্থান ধৈর্য ধরার নীতি। এবং চীন তাতে বিজয় লাভ করছে। একদিকে বাংলাদেশ নীতিতে ভারত-আমেরিকার হানিমুনের জায়গায় বিরোধ সংঘাত হাজির হবার কারণে আর ওদিকে চীন-ভারতের সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর আগ বাড়িয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে চায় ভারত। অথচ এই অর্থনৈতিক করিডরের উদ্যোগের কাজটা এতদিন ফেলে রেখেছে ভারতের আমেরিকার সাথে এতদিনের গাটছাড়া বেধে চলার নীতি, পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটা থেকে স্বার্থপরের মত একা নিজের জন্য সুবিধা নিংড়ে নেয়া যাবে বলে অনুমানে চলার নীতি। এছাড়া ভারতের নীতিনির্ধারকেরা কি আসলে কতটা সিনিসিয়ারলি মনস্থির করেছে যে আমেরিকান দেখানো লোভ ছেড়ে গ্লোবাল অর্ডারের আগামির পক্ষে তার নিরলস কাজ করা উচিত? আমরা এখনও নিশ্চিত নই। যতদুর বুঝা যাচ্ছে ভারত এখনও ব্যাপারটাকে আমেরিকাকে শায়েস্তা করার বিষয় হিসাবে দেখছে। হয়ত ভাবছে এভাবে আমেরিকাকে চাপে ফেলতে পারলে ২০০৭ সালের মত আবার আমেরিকার যাতা কাঠি ব্যবহার করার সখ্যতায় আমাদের মত দেশের উপর রুস্তমি চালিয়ে যাওয়া যাবে। ফলে একদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সালমন খুরশিদের সর্বশেষ ডিসেম্বর ২০১৩ তে ওয়াশিংটন সফর থেকে ফিরে জানিয়েছিলেন আমেরিকা যেন ভারতের চোখে দক্ষিণ এশিয়ার নিজের নিরাপত্তা স্বার্থকে দেখে – অর্থাৎ ভেঙ্গে অকেজো হয়ে পড়া এই পুরানা ২০০৭ সালের ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তিটাই আবার ফিরে আসুক সালমন খুরশিদ সে আকাঙ্খার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। অথচ একই সময়ে মনমোহন চীন সফরে গিয়ে Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor গড়ার লক্ষ্যে ঝাপিয়ে পড়তে তাগিদ দিয়ে চীনের সাথে যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা দিচ্ছেন। এই হল ভারতের মারাত্মক স্ববিরোধী বিদেশনীতি।ঘটনার এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি নতুন মন্ত্রী হবার পর তোফায়েল আহমেদ ভারত সফরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তাকেও ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারে প্রবল সোচ্চার হতে দেখেছিলাম আমরা প্রেস মিটিংয়ে। যদিও গুরুত্ত্বপুর্ণ একটা টুইষ্ট ছিল সেখানে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনটা পার হয়েছিল একা ভারত এর পক্ষে আর অন্য পক্ষ সব দেশ, যারা বাংলাদেশে কি হয় তাতে তাদের ষ্টেক বা স্বার্থ আছে বলে অনুভব করে তারা এমন নির্বাচন দেখতে চায়নি এমন পরিস্থিতিতে। অন্যভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বললে ভারত আর আমেরিকার মুখোমুখি অবস্থানের চরম প্রকাশ ঘটেছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও নির্মম। সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ফেল করায় আমাদের চলতি বাজেট ঘাটতি ফলে এডিপিতে কাটছাট আর আগামি জুনের বাজেটেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চলতি সরকার। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাজেটের ঘাটতি পূরণ আর স্থবির বিদেশি বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে যেন চীন বিশাল ত্রাতা হিসাবে এখনই হাজির হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশ যেন পশ্চিমের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে অথবা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য কিছুই যায় আসে না। এমনই ধারণা ছুড়েছিলেন সেদিন তোফায়েল আহমেদ।
    নিজের নয় ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর পুরা ঠেস দিয়ে দাড়ানো হাসিনা সরকার বা এর কোন মন্ত্রী আমাদের এই ধারণা দিতে শুরু করেছিল অর্থনৈতিক সমস্যা মিটানোর জন্য এই তো চীন এসে গেছে। যেন এতদিন পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে বড়ভাই আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা, যাতাকাঠি ধার দেয়া, নিজেকে পরাশক্তি ভাবতে শুরু করা ইত্যাদির লোভ ভারত ত্যাগ করেছে, সেই সুবাদে আমাদের উপর আমেরিকার ধার দেয়া যাতাকাঠি ব্যবহার করে সরকারে কে থাকবে তা নির্ধারণের লোভ ত্যাগ করেছে? যেন ভারত এতদিন দ্বিধা শুণ্য একাগ্র মনে আগামি গ্লোবাল অর্ডারের পক্ষে চীনের সাথে কাজ করেছে। অথচ এটা সোনার পাথরের বাটির মত। কংগ্রেসের ভারত নিজেকে পরাশক্তি ভাবার ভান করে আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখাতে চায়, আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ নীতিতে সাংঘার্ষিক করে, একলাই রাজা ভাব দেখাতে চায়। এই হলো তার স্ববিরোধী নীতি। আমাদের উপর খামোখা রুস্তমি দেখানোর সময় ভুলে যায় ঐ রুস্তমির পিছনের যাতাকাঠিটা নিজের নয়, নিজে সে কোন পরাশক্তি নয়, ওটা আমেরিকার ধার দেয়া। আবার, চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি এবং Bangladesh-China-India- Myanmar economic corridor যদি আজ এতই গুরুত্বপুর্ণ মাইলষ্টোন বলে অনুভুত হবে তাহলে আমেরিকার পাল্লায় পড়ে গত সাত বছরের চীন বিদ্বেষী নীতি – চীন আসতেছে, এই সীমান্ত হামলা দিল বলে আমেরিকার কোলে উঠে পড়া – সম্পর্ককে খামোখা শত্রুতামূলক করে দেখা এসব তাহলে মারাত্মক ভুল পথ ছিল – এটা নিজেই প্রকারন্তরে স্বীকার করছে। এককথায় বললে গত সাত বছর কংগ্রেসের ভারত এক যুদ্ধবাজ মুই কি হনু রে নীতি অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশকেও বিপদের মুখে রেখেছে। কোন হোমওয়ার্ক ছাড়া ভারতের এসব কাজকে পোলাপানি নাদান নীতি বললেও সম্ভবত কম বলা হবে। অথচ আমাদের মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব বানিয়েছেন যে চীনের সঙ্গে ভারতের ইকোনমিক করিডর প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হবার কারণে আর চিন্তা নাই চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সমস্যা সমাধান করে দিচ্ছে। আর মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বেকুব হয়ে এবার আমাদেরকেও বেকুব বানাতে ঐ প্রেস ব্রিফিংয়ে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা যেন আমাদের উদ্ধারকর্তা ঘটনা। একথা ঠিক যে ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে। কিন্তু কঠিন সত্যটা হল ভারতের আমেরিকার কোলে চড়ে বসে থাকা আর চীন প্রসঙ্গে ভয়ভীতি ছড়িয়ে রাখার নীতির কারণেই ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা শুরুই করা যায়নি, এখন হোমওয়ার্ক শুরু হয়েছে মাত্র। যার ফল আসতে কমপক্ষে ১০ বছর পিছনে আমরা।
    আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক চীনের বিদেশ নীতির সারকথাগুলো দাঁড়াচ্ছে, ভারতের বাংলাদেশ নীতির বিপরীতে চীনের নীতির মৌলিক দিকগুলো গত প্রায় দুই দশক ধরে কোন এদিক ওদিক চড়াই উতরাই ছাড়াই একতালের। আর এর সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ ও নতুন বৈশিষ্টের দিক হল, চীনের নীতি কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা রাজনৈতিক খবরদারি পাবার দিকে না তাকিয়ে মুলত অর্থনৈতিক। কোন কাজের চুক্তি পাবার জন্য রাজনৈতিক লিভারেজের উপর ভরসা করে তা পাবার চেষ্টা করা নয়। সরকারে কে থাকবে না থাকবে সে ব্যাপারে কোন মাথা সে ঘামায় না। গত একবছরে চীনা এমবেসি ছয়বার বিবৃতি দিয়েছে। এমন প্রতিটা বিবৃতিতেই এই নীতির প্রতিফলন থেকেছে।
    তবে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে গতবছরের শেষ দিকে জাতিসংঘের কোন ভুমিকা বা মধ্যস্থতায় একটা সমাধান আনা যায় কি না এনিয়ে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে পশ্চিমা কুটনৈতিকদের প্রচেষ্টা ছিল। ঐ প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানটা জাতিসংঘ বলেই ভেটো ক্ষমতাওয়ালা চীনকেও ঐ উদ্যোগে জড়িত ও অন বোর্ড বা নৌকায় তোলার তাগিদবোধ করেছিল পশ্চিম। সেই সুত্রে আমরা চীনকে দেখেছিলাম বিবৃতি দিতে। আবার পশ্চিম একা কোন উদ্যোগ নিলে তা যেন চীনের কাছে নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে সন্দেহজনক বা বিরোধাত্মক বলে মনে না হয় সেটা এড়ানোর কথা ভেবে পশ্চিমা উদ্যোগ নিজেই চীনকে অন বোর্ড করার তাগিদবোধ করেছিল। এছাড়া আরও একটা দিক আছে চীনকে অন বোর্ড করা মানে রাশিয়াকেও অন বোর্ডে পাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া।
    চীন প্রসঙ্গে এখানেই শেষ করছি। পরের চতুর্থ ও শেষ কিস্তি রাশিয়া প্রসঙ্গে।

    পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
    প্রথম কিস্তি
    দ্বিতীয় কিস্তি
    তৃতীয় কিস্তি

  • বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (১), প্রথম কিস্তি

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (১)

    গৌতম দাস

    ০১ এপ্রিল ২০১৪

    https://wp.me/p1sCvy-57

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানান বিদেশি ফ্যাক্টর কাজ করে, এটা আমরা জানি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সহাবস্থান ও আঁতাতের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে এই ফ্যাক্টরগুলো আমাদের রাজনীতিতে কি ভুমিকা নিতে পারে সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে নি। এখানে তার প্রাথমিক কিছু আলোচনা হাজির করছি।

    প্রথম কিস্তিঃ
    দুনিয়া এখন একটাই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়া
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশের ভিতরের ফ্যাক্টরগুলো ছাড়াও বাইরের বিদেশি ফ্যাক্টরগুলো কেন বিরাট ভুমিকা নেবার সুযোগ পাবে এযুগে এনিয়ে প্রশ্ন তোলা যতোটুকু না রাজনৈতিক তার চেয়ে অধিক নৈতিক। অর্থাৎ আমরা নৈতিক জায়গা থেকেই তর্ক তুলে বলি যে কোন বিদেশী শক্তি আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা উচিত না বা করতে পারবে না। সেটা ভাল, কিন্তু বহু আগে থেকেই আমরা এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে বিশ্বব্যাপী লেনদেন, বিনিময় বা বাণিজ্যে ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের ভিতর প্রবেশ করে আছি, যেটা এক বিকল্পহীন বাস্তবতা। অর্থাৎ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আমরা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই বিকল্পহীন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। বা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। কারণ এই ভ্রমণের উলটা পথে পিছন ফিরার কথা চিন্তা করা এখন অকল্পনীয় এবং অবাস্তব। আমরা প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক অবস্থায় যেমন ফিরে যেতে পারি না, ঠিক তেমনি চাইলেই ‘হস্তক্ষেপ’ বন্ধ করতে পারি না। দুনিয়ার কোন দেশই এখন আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এযুগে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অর্থনীতি হয়ে থাকা অবাস্তব ও অসম্ভব।
    আবার, দুনিয়া আগের মতো ‘পুঁজিতান্ত্রিক’ আর ‘সমাজতান্ত্রিক’ শিবিরে আর বিভক্ত নয়। দুনিয়া এখন একটাই, সেটা একটাই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক দুনিয়া। অতএব একে মাথায় রেখেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবার নীতি ও কৌশল ঠিক করতে হবে। দুনিয়ার সকল দেশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকার বাস্তবতা মেনেই বিদেশি রাজনীতি ও স্বার্থের ফ্যাক্টরগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। নিজস্ব স্বার্থ যতটা সম্ভব সুরক্ষা করার রাজনীতিই আমাদের একমাত্র গন্তব্য।

    শেখ হাসিনার পক্ষে ক্ষমতায় থাকা কিম্বা বিরোধীদলের ক্ষমতা আসার সম্ভাবনা অনেকাংশেই এর এই বিবেচনাগুলো আমলে নেবার উপর নির্ভরশীল। ক্ষমতায় থাকবার জন্য কিম্বা ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের নীতি ও কৌশল নির্ণয়ও নির্ভর করে এই ফ্যাক্টরগুলোকে বাস্তবচিতভাবে বিবেচনার ওপর। ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার বাইরের শক্তি কে কিভাবে সেটা করছে তার ওপর রাজনীতিতে তাদের পরিণতি অনেকাংশেই ঠিক হবে। সেটা নিশ্চিত। আবার, জনগণের দিক থেকে এই দুই পক্ষের কোন পক্ষের স্বার্থ রক্ষা প্রধান বিবেচনা হতে পারে না। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের দিকগুলো নির্মোহ ভাবে চিহ্নিত করা, বোঝা ও বিচার করার ওপর আমাদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গাগুলো কোথায় নিহিত সেটা নির্ধারণ করা দরকার। এই লেখাটি সেই আলোকেই লেখা হচ্ছে। এই তিনটি স্বার্থের ক্রম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অনুমান হচ্ছে বিশ্ব ও আঞ্চলিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান স্বার্থ অর্থনৈতিক এবং এর পরে সামরিক। সামরিকতার প্রশ্নকে আমরা গণশক্তি বিকাশের অন্তর্গত বিবেচনা বলে মনে করি। এর বিকাশ ছাড়া বাংলাদেশের মতো এখনকার রাষ্ট্রের পক্ষে জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তে চলবার শক্তি কখনই অর্জন করতে পারবে না।
    অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থেই আলাদা করে রাজনৈতিক স্বার্থের চিন্তা করা দরকার। রাজনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কোনই সন্দেহ নাই। সেই ক্ষেত্রে প্রধান ও প্রাথমিক বিবেচনা হচ্ছে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বিশ্ব সভায় বাংলাদেশের টিকে থাকা। সেই লক্ষ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদ যেভাবে বাংলাদেশের জনগণকে বিভক্ত করছে এবং রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী কায়দায় জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষত ক্রমাগত গভীর করে চলেছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার। তার জন্য জাতিবাদী অথবা ধর্মবাদী আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিপরীতে দরকার গণশক্তি নির্মাণের রাজনীতি। যার মর্ম মচ্ছে নাগরিক চেতনা ও বোধকে শক্তিশালী করা। দল, মত, ধর্ম বা মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষাই এই দিক থেকে এখনকার প্রধান রাজনীতি, কোন প্রকার দলবাজি বা জনগণকে বিভক্ত করে এমন মতাদর্শিক ফেরেববাজিতে পা দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ত্বরান্বিত করা নয়। কিন্তু বিধ্বংসী রাজনীতিতেই আমাদের প্রবল উৎসাহ, নির্মাণের রাজনীতিতে নয়। নানান মতাদর্শিক বিতর্ক আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতে আছে এবং আরও বহুদিন থাকবে। সেগুলোর এটা বা সেটার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র গড়তে হবে এমন জিদ আত্মঘাতি। বরং সে তর্কবিতর্কগুলো চলতে দিয়ে, এই অর্থে এড়িয়ে একটা কমন কনসেনসাসের ভিত্তিতে নাগরিক চেতনা ও বোধে রাষ্ট্র পুনর্গঠন করে নেয়া এখনকার প্রধান কাজ।
    এই বাস্তবতাগুলো মনে রেখে এবং সজ্ঞান ও সচেতন তরুণদের কথা মনে রেখে এই লেখাটি পেশ করা হচ্ছে। যাদের জাগতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করা এবং সম্পদ বন্টনে সুষম ও সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সুযোগ প্রাপ্তিতে সাম্য নিশ্চিত করার ওপর। যেদিক থেকেই বিচার করি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করাই এখনকার কাজ। সেই ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বিরোধ, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলোকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাবার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি অর্জন করা দরকার। বাংলাদেশের এখন যে বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি সেখান থেকে এই ব্যাপারে প্রত্যাশার কিছুই নাই। সে কারণেই বাংলাদেশের সেই সকল তরুণদের কথা মনে রেখে এ লেখা লিখছি যারা দেশের ভেতরের অবস্থা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাস্তবচিত নতুন রাজনীতির জন্ম দিতে আগ্রহী। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনীতির নানান অশুভ পক্ষের টানাপড়েনে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবার বিপরীতে যারা সাঁতার দিতে প্রস্তুত। অসম ও অন্যায্য অবশ্যই, কিন্তু আমরা একই অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই সবাই বসবাস করি, এই ব্যবস্থার মধ্যেই আমাদের নিজেদের জন্য সর্বোচ্চ শক্তিশালী জায়গা করে নিতে হবে। সেটা কেউই আমাদের দয়া করে দেবে না।
    এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের প্রতি আগামি দিনে ভারত, আমেরিকা, চিন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য অবস্থান কী হতে পারে সেটা আগাম আন্দাজ করা আমাদের দরকার। যাতে এব্যাপারে আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে কিছু আগাম ধারণ আমরা করতে পারি। কয়েকটি কিস্তিতে এই লেখাটি লিখছি। এই আন্দাজ যে, তা আমাদের আগামি দিনে সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি জাতীয় অবস্থান নির্ণয়ে সহায়ক হবে বলে আশা করি।

    দিল্লী ও ওয়াশিংটনের বিদেশ নীতিতে নতুন পরাশক্তিগত বিন্যাস
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী দেশগুলো কে কী ভূমিকা পালন করছে সেটা কমবেশী হয়তো আমরা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি, কিন্তু আগামি দিনে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের ভূমিকা কী রূপ নিতে পারে সেটা অনুমান করার চেষ্টা আমাদের এখনি করা দরকার। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে যে ভূমিকাই নিক সবাই ভারতের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল কী দাঁড়ায় সেদিকে এখন সকলেই তাকিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে।
    কেন আসন্ন ভারতীয় নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার জন্য বিদেশি শক্তি সবাই অপেক্ষামান? কারণ আগের যেকোন ভারতীয় নির্বাচনের চেয়ে এবারকার ভারতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক। চলতি বাংলাদেশের সরকার বিগত সরকারেরই ধারাবাহিকতা। তারা ২০০৯ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল। এই সরকারের দুই আমলেই গুমখুন, সন্ত্রাস, ও আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রকট আকার ধারণ করেছে, বিরোধী মত ও চিন্তা ও বিরোধী দলীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনরা কার্যত একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিবাদী আবেগ ও মুক্তিযুদ্ধের দলীয় বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে জাতিবাদী উগ্রতার যে রূপ এই সরকার প্রদর্শন করছে তাকে ফ্যসিবাদ বললে কমই বলা হয়। সংবিধানের পরিবর্তন করে নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ, বিচার বিভাগ ও আইন শৃংখলা প্রতিষ্ঠানের চরম দলীয়করণ ইত্যাদির নানান বৈশিষ্ট্য বিচার করে ফ্যাসিবাদের এই বিশেষ রূপের আরও পরিচ্ছন্ন পর্যালোচনা দরকার। কিন্তু যেটা আশ্চর্যের সেটা হোল এই নিপীড়ক, ফ্যাসিষ্ট এবং ঘোরতর ভাবে গণবিচ্ছিন্ন চেহারা নিয়েও এই সরকার টিকে আছে। টিকে থাকার পিছনে প্রধান কারণ দিল্লীতে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি একক সমর্থন। বাংলাদেশে পরাশক্তির ভূমিকা বা বিদেশী ফ্যাক্টরগুলো আগামি দিনে কী করতে পারে সেই আন্দাজ বর্তমানের এই বাস্তবতা থেকে শুরু করাই সংগত। বাংলাদেশ মূলত দিল্লীর বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অধীনস্থ ও অনুগামি একটি সরকার। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই আগামি দিনে পরাশক্তির ভূমিকা কি হতে পারে আমরা তা আন্দাজ করবার চেষ্টা করতে পারি।
    গত ২০০৯ সালে হাসিনা সরকার আসার পিছনের দুবছরে (২০০৭-৮ সালে) ধরে চলা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ঠিক হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের চরিত্র এমনই হবে। এটা যখন বাস্তবায়িত হচ্ছিল তখন এই ক্ষেত্রে ভারতের এমন বাংলাদেশ নীতির সাথে আমেরিকার অনুমোদন ও সহায়ক সমর্থন ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে দিল্লীর স্বার্থের এক সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল ওয়াশিংটন। আবার সেটা গত তিন বছর হল উলটে গিয়েছে। আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি আর ভারতের বাংলাদেশ নীতির মধ্যে গুরুতর ফারাক ঘটে গেছে। বাংলাদেশ নীতি প্রসঙ্গে ভারতের সাথে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য ঘটেছে এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বও দেখা দিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ভারতের নির্বাচনের ফল বাংলাদেশে কী প্রভাব ফেলবে সেটা ভাবতে হবে।
    আসন্ন ভারতীয় নির্বাচনে কংগ্রেস সরকার তৃতীয়বারের মত নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে এমন সম্ভাবনা একেবারেই নাই বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের রাজনীতির যাঁরা বিশ্লেষক তাঁরা এই বিষয়ে কমবেশী একমত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলো কে কী ভূমিকা নেবে সেটা এই কারণেই ভারতের নির্বাচনের মুখাপেক্ষি হয়ে রয়েছে।
    আগেই বলেছি, ২০০৭-৮ সালে বাংলাদেশ নীতিতে আমেরিকা ও ভারত হাতে হাত মিলিয়ে একই অবস্থান নিয়েছিল। কারণ সেটা ছিল আমেরিকার বিদেশ নীতিতে মৌলিক দুটো ইস্যুতে অবস্থান বদলের সময়কাল। ওবামা প্রেসিডেন্সীর প্রথম টার্ম শুরু হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। এর আগের প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের ওয়ার অন টেররের ব্যর্থ নীতি মার্কিন নীতি নির্ধারকদের একটা অংশের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মার্কিন জনমতের মধ্যেও। সেই বিদেশনীতি থেকে সরে এসে নতুন কি করা যায় তা নিয়ে আমেরিকার জন্য ভাবনার প্রস্তুতিমূলক সময় ছিল সেটা। তখনও হিলারি ক্লিনটনের ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’ পুরাপুরি দানা বাঁধে নি; গণ কূটনীতির (public diplomacy) আলোকে সরকার বিরোধী জনমতকে উসকিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সংস্কারের বুদ্ধি সবে দানা বাঁধছিল। যার ফল আমরা পরবর্তীতে ‘আরব স্প্রিং’ নামে হাজির হতে দেখেছি। অর্থাৎ নতুন “আরব স্প্রিংয়ের” নীতি তখনও স্থির বা থিতু হয় নাই। জুনিয়র বুশের শেষ আমলের এই অন্তর্বর্তী পরিস্থিতিতে, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও ভারতের হাতে হাত মিলানো অবস্থাটা পুরাপুরি বহাল হয়েছিল। এই সময়কালটাতে বাংলাদেশের “১/১১ এর সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের” কেচ্ছা এই বলয় পরিস্থিতির মধ্যেই পাঠ করতে হবে। চিনের উত্থানকে মোকাবিলার জন্য দিল্লী ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিভিন্ন নিরাপত্তা চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ভারত প্রকৃতিগত কারনেই (natural ally) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু এই ধারণাও দুই দেশে জোরে শোরে প্রচারিত হচ্ছিল। তবে দক্ষিণ এশিয়া বা আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে আমেরিকার বিদেশ নীতিতে আমেরিকা ও ভারত হাতে হাত মিলিয়ে চলার নীতি নিতে হবে এমন সিদ্ধান্তের পিছনের তাগিদ হিসাবে দ্বিতীয় আরেকটি ইস্যু ছিল। সেই ইস্যুই আমেরিকার এই গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রভাবক ভুমিকায় পালন করেছে। কী সেই ইস্যু?
    অল্প কথায় বললে, সেটা হল একক পরাশক্তি ও গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার একক এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য ভুমিকায় বদল অনিবার্য ও আসন্ন হয়ে ওঠা। নীতি নির্ধারকের তা দেখতে পাচ্ছিল। এই সংক্রান্ত আমেরিকান সরকারি এক বিস্তারিত সার্ভে রিপোর্টের চুম্বক অংশগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল ২০০৭ সালে। পরিপুর্ণ রিপোর্ট আসে ২০০৮ সালে। [2025_Global_Trends_Final_Report] ঐ রিপোর্টের সারকথা সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়:
    ১. গ্লোবাল পরাশক্তিতে আমেরিকা আর একক ভুমিকায় থাকছে না, পরাশক্তিগত গ্লোবাল ক্ষমতা অন্তত পাঁচভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। আর আমেরিকা বড় জোর ঐ পাঁচের একটা হয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে;
    ২. গ্লোবাল অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহ পশ্চিম থেকে পূবে এশিয়ামুখী হচ্ছে। আর এটা আগামি ভবিষ্যতে কখনও আর উলটা প্রবাহ নিবে না বা পরিগ্রহণ করবে না; ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থায়ী ভারকেন্দ্র হয়ে উঠছে এশিয়া। আগে অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনায়, পশ্চিমে উন্নত বা ডেভলপড অর্থনীতি আর বাকি সবাই উন্নয়নশীল বা ডেভলপিং অর্থনীতি বলে একটা ভাগ করতে দেখা যেত। ঐ রিপোর্টে নতুন একটা বিভাজক শব্দ বা ধারণা চালু করা হয় “রাইজিং ইকোনমি” – নতুন পাঁচ পরাশক্তির বেলায় এই নতুন নাম প্রয়োগ করা হয়। ঘটনাচক্রে ঐ পাঁচ রাইজিং ইকোনমির দুটাই এশিয়ার – চিন ও ভারত। (বাকি তিনটা ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা)। আমেরিকান বিদেশ নীতিতে দ্বিতীয় ইস্যু হাজির হবার পিছনে এই রিপোর্ট সেই পটভুমি, আপাতত সংক্ষেপে এতটুকুই।

    স্বভাবতই রিপোর্টটা পরাশক্তিগত দুনিয়ার এক আসন্ন মোচড়ানির নির্দেশক বা ইঙ্গিত । তাই, আমেরিকার বিদেশনীতিতে দ্বিতীয় বদলটা আসে এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে। ওয়াশিংটন সিদ্ধান্ত নেয় এশিয়ার দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে, পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে (চিন) ঘায়েল করা। লক্ষ্য, তাতে যদি পরাশক্তিগত নিজের অবস্থান কিছু হেরফের ঘটিয়ে অন্য সম্ভাব্য পাঁচের চেয়ে কিছুটা উপরে করা যায়। মনে রাখতে হবে, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার এই তুমুল টালমাটালের যুগে কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তিগত ভুমিকায় হাজির হবার পুর্বশর্ত হচ্ছে সবার আগে অর্থনীতির দিক থেকে পরাশক্তি হওয়া। অর্থাৎ অর্থনীতিতে শীর্ষ ভুমিকার সবলতা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক বড় শেয়ার দখল করে হাজির হওয়া, বৈদেশিক বাণিজ্যে একটা ভালরকম উদ্বৃত্তের অর্থনীতি হওয়া ইত্যাদি। চিনের অর্থনীতিগত উত্থান আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার ঐ সার্ভে রিপোর্টে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন এই পালাবদলের পরিস্কার ইঙ্গিত ফুটে উঠেছিল। এই সূত্রে আমেরিকার নতুন বিদেশনীতির আগ্রহে আমেরিকা-ভারতের সখ্যতার শুরু ২০০৭-৮ সাল থেকে। আর আঞ্চলিক সখ্যতার প্রথম প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে। আমাদের ১/১১ এর সময়ে তা “মাইনাস-টু” ঘটাতে হবে এমন নিয়ত নিয়েই শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই নিয়ত মাঝপথে হঠাৎ করেই হাসিনামুখি হয়ে যায়। হাসিনার হাতে ক্ষমতা দিয়ে কেটে পড়ার দিকে ১/১১ এর ক্ষমতাসীনরা তৎপর হয়ে পড়ে। কিন্তু আগেই বলেছি, সেসময়টা ছিল বুশের ওয়ার অন টেররের নীতির ব্যর্থতা থেকে আমেরিকার সরে আসার সময় কিন্তু এর বদলে নতুন “আরব স্প্রিং” এর নীতি তখনও ঠিক গুছিয়ে থিতু হয় নাই। ফলে ভারতের সাথে আমেরিকার সখ্যতার নীতিটা দাড়িয়েছিল ওয়ার অন টেররের ব্যর্থ নীতির অপসৃয়মান আলোছায়ায়। ফলে সখ্যতা আসলে দাড়িয়েছিল এক তথাকথিত কমন ‘সিকিউরিটি ইন্টারেস্ট’ এর উপর। ওয়ার অন টেররের নীতির বৈশিষ্ট হলঃ ইসলামের কোন রূপের রাজনীতির সাথেই সখ্যতা নয়, বরং ইসলামের সকল প্রকার অভিপ্রকাশ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ, ইসলামকে বিশ্বসভ্যতার খাতা থেকে মুছে দেওয়া। বিপরীতে “আরব স্প্রিং” ধরনের নীতির বৈশিষ্টটা হলঃ বিশেষ ধরনের (“আরব স্প্রিং”) ইসলামি রাজনীতির সাথে সখ্যতা, বাকি সব রূপের ইসলামি রাজনীতির সাথে আগের মতই বিরোধিতা, উৎখাত, দমন, নির্মূল ইত্যাদি। তবে তা অবশ্যই আর যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে “ওয়ার অন টেরর” শ্লোগান না দিয়ে, লো প্রোফাইলে।
    কিন্তু ভারতের দিক থেকে আমেরিকা “ওয়ার অন টেরর” মোডে থাকলেই দিল্লীর – বিশেষত কংগ্রেসের বেশি পছন্দের। ফলে ২০০৭-৮ এর পর থেকে আমেরিকা যতই নতুন “আরব স্প্রিং” এর নীতিতে থিতু হয়েছে, ইসলামকে একাট্টা গণ্য করে এর সকল রূপের বিরুদ্ধে লড়বার নীতি থেকে সরে এসেছে, ততই সেটা ভারতের সাথে সখ্যতার নীতিতে একটা খচখচে কাঁটা হয়ে উঠেছে। তবে আমেরিকা-ভারত সখ্যতার মধ্যের মূল কাঁটা এটা নয়। নতুন আরও বড় কাঁটা পরবর্তীতে হাজির হয়।
    আগে একটা কথা বলে নেয়া ভাল, দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে (চীন) ঘায়েল করা – কথাটা বলা যত সহজ বাস্তবে তা ঘটানো আমেরিকার জন্য এত সরল সিধা ব্যাপার নয়। ঐ রিপোর্টের ইঙ্গিত অনুযায়ী, একালে চীন-আমেরিকার এই পরাশক্তিগত নতুন টেনশন, প্রতিযোগিতা ইত্যাদি ঘটছে ২০০১ সাল পরবর্তী গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পটভুমিতে। এটা কোনভাবেই আর আগের ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ের (১৯৫০-৯০) আমেরিকা-রাশিয়া দুই ব্লকে বিভক্ত দুনিয়ার টেনশন প্রতিযোগিতার মত নয়, কোন অর্থেই। কারণ, ঐ ব্লক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট ছিল, দুই ব্লক মানে দুটা আলাদা অর্থনীতি। আলাদা বলতে, এই দুই অর্থনীতিতে পরস্পরের মধ্যে পণ্য লেনদেন বাণিজ্যসহ কোন প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, ফলে কোন নির্ভরশীলতা সরাসরি প্রায় ছিল না বললেই চলে – এমনই আলাদা। উভয়ের মধ্যে পুঁজির চলাচল, প্রবাহ, কোন বিনিয়োগ সম্পর্ক একেবারেই ছিল না। এমনকি এটা কেবল রাশিয়ার (ততকালীল ইউএসএসআর) মধ্যেও সীমাবদ্ধ তো নয়ই; রাশিয়ান ব্লকের কোন দেশকে (যেমন পোল্যান্ড) আইএমএফ লোন দিতে চাইলেও আমেরিকা তা নাকচ করে দিয়েছিল এমন রেকর্ড আছে। এমনই দুটো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত টিকে ছিল ব্লক রাজনীতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, এটাই ছিল পুরা স্নায়ু যুদ্ধের মৌলিক বৈশিষ্ট। বিপরীতে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়ার সময় থেকেই দুটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ধরনের অবস্থানের যুগের শেষ হয়। এরপর থেকে আজকের গ্লোবাল অর্থনীতি মানে সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল পুঁজির অধীনস্থ ও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত; পরস্পর নানান সম্পর্কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তবে ওর ভিতরেই পরস্পরের স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতা লড়াইয়ে ঝগড়ায় সবাই নিয়োজিত। অর্থাৎ আমেরিকা-রাশিয়ার দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অর্থনীতির টেনশন প্রতিযোগিতার বিপরীতে একালে আমেরিকা-চীনের মধ্যেও ক্রম-উদীয়মান টেনশন প্রতিযোগিতা অবশ্যই আছে কিন্তু এবার এরা দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অর্থনীতির নয় বরং উভয় অর্থনীতি দুনিয়া জোড়া একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ ও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। চীন আর আমেরিকার মধ্যে এমন নতুন সম্পর্কের সুত্রপাত বা খাতা খোলা অনেক পুরানো, সেই ১৯৭১ সাল থেকে এর পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। পরস্পরের কুটনৈতিক, সামরিক ও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের কথা মনে রেখে নানান চুক্তি, আইন-কানুন স্থির করা এবং সেগুলোর সুরক্ষাকবচ ঠিকঠাক করে আমেরিকান নেতৃত্বে পুঁজির প্রবাহ ঢেলে চীনকে সাজানোর একটা লম্বা প্রস্তুতি পর্ব পার করে আসতে হয়েছে। আজকে যে চিন আমরা দেখছি, সেই চিন গড়তে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক সময়ে কেটে যায় ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এরপর আমেরিকান পুঁজিবাজারের প্রতীকি কেন্দ্র ওয়াল ষ্ট্রিট নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে পুঁজির প্রবাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে। এর পরিণতিই আজকের রাইজিং ইকোনমির চিন। দুনিয়াজুড়া একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ হয়ে এক নতুন গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়ে চীন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
    কিন্তু এর ফলে একইসাথে নতুন পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার পরিগঠনের পার্শ্বফল হিসাবে নতুন এক স্ববিরোধী দিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাজির হয়। আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থ আর আমেরিকান ওয়াল ষ্টিটের স্বার্থ আর একতালে না থেকে ক্রমশ সংঘাতমূলক চরিত্র নিয়ে হাজির হতে শুরু করে। যেমন, নিজে ফুলে-ফলে রাইজিং অর্থনীতির হিসাবে চিনের উত্থান এক বিশাল সম্ভাবনা যা আসলে ক্রমশ পুঞ্জীভুত ও আকারে বেড়ে ওঠা গ্লোবাল পুঁজির প্রতীকি কেন্দ্র ওয়াল ষ্ট্রীটের ফুলে ফেঁপে উঠা, বিশ্বপুঁজির নিজেরই সম্ভাবনা, ফলে তা ওয়াল স্ট্রিটের কাছে আদরণীয়। সম্ভাবনা এজন্য যে, পুঁজির আদি ও ইন্টিগ্রাল স্ববিরোধ হল একদিকে মুনাফাসহ ফিরে আসা পুরান বিনিয়োগ এবার আকারে বড় হবার কারণে সবসময় আরও নতুন বড় বিনিয়োগের বাজার আকাঙ্খা ও দাবী করে। কিন্তু বিনিয়োগ বাজারকে সঙ্কুচিত করে ফেলার কারণ সে নিজেই। কারণ বাজার থেকে যতই যে বড় করে মুনাফা তুলে আনে তত পরিমাণই সেটা বাজারের ভোগ/চাহিদা (ফলে নতুন উতপাদন/বিনিয়োগের বাজার) কমিয়ে ফেলে। এই স্ববিরোধে হয়রান হয়ে এটা সে সমাধানের উপায় খুজে সবসময় নতুন আন-এক্সপ্লোরড বাজার (সাধারণত কোন ছোট হয়ে থাকা অর্থনীতির রাষ্ট্রে নতুন করে) যোগাড়ের তালাশে। যদিও সেখানেও আবার সমস্যা হলো, যেহেতু সেটা নিজ রাষ্ট্র নয় ফলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ফলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে নাকি ঐ রাষ্ট্র কোন এক পর্যায়ে বিনিয়োগ মালিকানা তার নিজের জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রীয়করণ করে ফেলে কি না এও এক বিশাল টেনশন। এসব বিচারে আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের চোখে চিন লকলকে লোভে লোভনীয় এক বাজার। তার ক্রম-পুঞ্জিভুত আকার বেড়ে চলা পুঁজির আয়ু, টিকে থাকার সম্ভাবনা। তবে নিজের বিনিয়োগ নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি, আইনকানুন, আন্ডারষ্টাডিং ঠিকঠাক করতে প্রথম বিশ বছর (১৯৭১-৯০) কেটে গিয়েছিল।
    কিন্তু আবার রাইজিং ইকোনমির চিনের এই পরিণতিতে রাষ্ট্র হিসাবে আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্য তা প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিও হয়ে উঠছে। এই দিক থেকে আমেরিকান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রীটের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রবলভাবে পরস্পর বিরোধী। চীন রাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হলে আমেরিকান রাষ্ট্র এতে তার বিপদ দেখে আর ওয়াল ষ্ট্রীট মনে করে এতে তার কিছু আসে যায় না। গ্লোবাল লেনদেন বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করাতে আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৪ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ, ও মুদ্রার মান নির্ণয় (এটাই আইএমএফ প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট) ও বড় পুঁজি বিনিয়োগ বাণিজ্যের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ (এটাই বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের ম্যান্ডেট) ইত্যাদি নিশ্চিত করতেই গড়ে তোলা হয় আইএমএফ- বিশ্বব্যাঙ্কের মত প্রতিষ্ঠান। অথচ আজ ওয়াল ষ্ট্রিটই (তার হয়ে বিশেষ করে ‘গোল্ডম্যান স্যাসে’ কোম্পানী) চীন রাষ্ট্রকে বুদ্ধি পরামর্শ ও তাগিদ দিচ্ছে চিনের নেতৃত্বে নতুন করে আগামি বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক গঠন করে এগিয়ে যেতে।
    কাজেই যেকথা বলছিলাম, আমেরিকার দুনিয়ায় একক পরাশক্তি হয়ে থাকার ভুমিকার জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন পরাশক্তিগুলোর উত্থান ঠেকানো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরোধ মীমাংসা কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের জন্য সরল কাজ নয়। ঠান্ডা যুদ্ধের কালের মত সরল কাজ ও সময় তো এটা নয়ই। তবু সরল নয় বলে ওবামার রাষ্ট্র তো চুপ করে বসে থাকতে পারে না। যতদুর সম্ভব প্রাণপণ চেষ্টা করছে, করবে। তাই, দুই রাইজিং ইকোনমির একটাকে (ভারত) কাছে টেনে পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টাকে চিন ঘায়েল করে দাবড়ানোর চেষ্টা – আমেরিকার বিদেশনীতিতে দ্বিতীয় ইস্যু বা মূল বৈশিষ্ট এটাই। যতোই পুঁজি গ্লোবাল আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে ততোই শক্তির ভারসাম্য ওয়াশিংটন থেকে সরে ওয়াল স্ট্রিটে পুঞ্জিভূত হচ্ছে। নিজের এই আভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি চিনের উত্থান বিরোধিতা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
    বিদেশনীতিতে এই দ্বিতীয় ইস্যু যাত্রা শুরু করে ২০০৭ সালে থেকেই। কিন্তু থিতু হয়ে আরও গোছানো ভার্সনে প্রবলভাবে প্রয়োগে আসা শুরু করে ২০১১ সালের শুরুতে। নতুন এই ভার্সনে এবার ঠিক আগের মত আর চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে পিঠে হাত রেখে আদর বা কোলে তুলে নেয়া নয়। বরং চীন-ভারত দুই রাইজিং ইকোনমির বিরোধ বা দ্বন্দ্বের মাঝে অবস্থান নেয়া যাতে নিজের একটা ভারকেন্দ্র বা ভারসাম্যের ভুমিকা নিশ্চিত করা যায়। আর সেকাজের উপায় বা টুল হিসাবে এশিয়ায় নিজের সামরিক উপস্থিতি ঘটানো ও ব্যবহার করা।

    ফলে এর দুটো প্রকাশ আমরা দেখি। এক. চীনের নৌপ্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত নৌসামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে আমেরিকার তৎপর হওয়া। আসলে এটা চিনের অর্থনীতির লাইফ লাইন; মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানী তেলসহ কাঁচামাল আনা আর নিজের পণ্য বিতরণ ইত্যাদির মুখ্য লাইন। আর দুই. বাংলাদেশকে তার রাজনৈতিক ও সামরিক স্ট্রাটেজির গুরুত্ত্বপুর্ণ গুরুত্বপূর্ণ এক অপারেশনাল কেন্দ্র বানানো। ম্যাপের দিক তাকালে আমরা দেখব বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান চীন-ভারতের মাঝখানে। আগে আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট বা আমাদের হিসাবে যেটা ওদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেখানে বাংলাদেশ ডেস্ক বলে আলাদা কিছু ছিল না; ইন্ডিয়ান ডেস্কেরই অন্তর্গত ছিল বাংলাদেশ। নীতির নতুন পর্যায় বা গুরুত্বের কারণে এবার ২০১১ সাল থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ ডেস্ক খোলা হয়। আর নৌ-উপস্থিতির কারণ ঠিক কোন যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া নয়। বরং চিনের অর্থনৈতিক উত্থানের ফলে পরাশক্তিগত বা ষ্ট্রাটেজিক উৎকণ্ঠার কারনে এশিয়ার ছোট ছোট রাষ্ট্র ভীত হতে পারে এই আগাম অনুমানে ভীতুদের কাছে “অভয়” বিক্রি করা। বিনিময়ে তাদেরকে নিজের বলয়ে আনা, নিজের ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার বানানো। এজন্য আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতিতে নতুন এক বয়ান হাজির হয় “পার্টনারশিপ ডায়লগ”। এই অঞ্চলের সবদেশের সাথে আমেরিকা “পার্টনারশিপ ডায়লগ” নামে চুক্তির জন্য তৎপর হয়ে উঠতে দেখছি আমরা। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই “পার্টনারশিপ ডায়লগ” বিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী। ধরনের দিক থেকে “পার্টনারশিপ ডায়লগ” এর ফোকাস অর্থনৈতিক নয়, বরং ষ্ট্রাটেজিক, অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামরিক।
    ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের নতুন মাত্রা ও যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সাল থেকে। তখন থেকে অস্ত্র, পারমানবিক সরঞ্জাম, সূক্ষ্ম বা প্রিসিশন টেকনোলজি ইত্যাদি পাবার বিষয়ে আমেরিকার সাথে বিবিধ লোভনীয় চুক্তি ও বিশেষ সুবিধা ভারত পেয়ে আসছে । আবার, অন্তত ১৭-১৮ টা বিষয়ে আলোচনা ডায়লগ করার জন্য জয়েন্ট থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জাতীয় কমিটি গঠন ও পরস্পরের সুবিধা অসুবিধা আলাপ আলোচনা করে সহযোগিতার একক নীতি তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। “পার্টনারশিপ ডায়লগ” বিষয়ে আলাপও হয়েছে, কিন্তু ভারত “পার্টনারশিপ ডায়লগ” চুক্তিতে এসেছে বলে স্পষ্ট জানা নাই। অথবা হলেও ওর অগ্রগতি নাই। এর মূল কারণ, আমেরিকার বিদেশ নীতির যে দুই ইস্যু বা বৈশিষ্ট নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম শুরুর চার বছরের মধ্যে ২০১১ সালের পর থেকে এটা আর তেমন স্বাদের নয় বলে ভারতের দিক থেকে অনুভুত হতে শুরু করে। দিল্লির দিক থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রচনায় অস্বস্তির মুল কারণ অনেকগুলো। যেমন,
    এক. ওয়ার অন টেরর থেকে সরে সহনশীল একটা ইসলাম বা আরব স্প্রিং এর দিকে আমেরিকার ঝুঁকে পড়াটা ভারতের কাছে ঠিক আগ্রহের নয়। বুশের হকিশ বা বাজপাখি যুদ্ধবাজ লাইনের ওয়ার অন টেরর ভারতের বেশি পছন্দের।
    দুই. চিনের ভয়ে বড়ভাই আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা, আমাদের মত দেশকে যাতা দেবার কাঠি দিল্লিকে একচ্ছত্র ভাবে ব্যবহার করতে দেওয়া তা খুবই উপভোগ্য ছিল। এই সময় মার্কিন নীতি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় “নিরাপত্তা নীতিতে” দিল্লীর চোখে দেখা নীতিই মার্কিন নীতি। দিল্লির কাছেও তাই এই নীতি লোভনীয় ছিল।

    কিন্তু ২০১১ এর পর থেকে ওয়াশিংটনের দিল্লির হয়ে এই অঞ্চলে নিজের স্বার্থ দেখার নীতি থেকে সরে আসতে শুরু করে। বরং স্বরূপে দক্ষিণ এশিয়ায় হাজির থাকা এবং ওর মধ্য দিয়ে নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক সামরিক এলিমেন্ট চর্চা শুরু করে – এটা দিল্লির জন্য জন্য অস্বস্তির কারণ। বলতে গেলে মিঠা ফল আমেরিকা ক্রমশ তিতা লাগতে শুরু করে ভারতের কাছে। বিরোধ ও অস্বস্তি ফেটেফুটে প্রকাশ হয়ে পড়ার ঘটনাটা ঘটে গতবছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওদিক কূটনৈতিক পর্যায়ে দেবযানী খোবরাগোড় এর ইস্যুতেও। এককথায় বললে দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির একচ্ছত্র আধিপত্য ওয়াশিংটন মেনে নিক দিল্লি সবসময়ই এটা আকাঙ্খা করে। ওয়াশিংটন ভারতের চোখ দিয়ে নিজের স্বার্থ দেখুক, ভারতকে এ অঞ্চলের সর্দার বানাক এমনটাই ভারতের সবচেয়ে পছন্দের। এই সম্পর্কের চর্চা বেশ কিছুকাল চললেও ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা আর সেজায়গায় থাকতে চায়নি বা পারেনি। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে নৌ ফ্লিট নিয়ে উপস্থিত থাকবার আমেরিকান আকাঙ্খাটা প্রকাশ হয়ে পড়ার পর থেকেই দিল্লি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছে। তার নিজের ষ্ট্রাটেজিক ও সামরিক স্বার্থের দিক থেকে একে সংঘাতসংকুল বলে মুল্যায়ন করতে ও সতর্ক হতে শুরু করেছে। সার করে বললে, এই অঞ্চলে চীনের পরাশক্তিগত উত্থান ইস্যুতে একসাথে কাজ করা পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থ নিজে সরাসরি দেখভাল করবে, দিল্লী একে বিপদ হিসাবেই দেখতে শুরু করে। কারণ এর ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এতে দিল্লীর ভাগে টান পড়ে, একটা বড় ধরণের পরিবর্তন এতে অনিবার্য হয়ে ওঠে।

    পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
    প্রথম কিস্তি
    দ্বিতীয় কিস্তি
    তৃতীয় কিস্তি
    চতুর্থ ও শেষ কিস্তি

    [লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল, ২৮ মার্চ ২০১৪।
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত,চিন,রাশিয়া ও আমেরিকা (১)
    গৌতম দাস || Friday 28 March 14 |
    http://chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/268/ ]

  • বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২), দ্বিতীয় কিস্তি

    দ্বিতীয় কিস্তি
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (২)

    ভারতের নির্বাচন ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বদলের সম্ভাবনা

    গৌতম দাস

    https://wp.me/p1sCvy-2g

    ১ এপ্রিল ২০১৪

    ভারতে নতুন নির্বাচন আসন্ন। দুমাস ধরে নয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে তা ফলাফল ঘোষণাসহ শেষ হবে মে মাসের ১৬ তারিখে। এপর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে একের পর এক প্রকাশিত একজিট পোলগুলো বলছে, ৫৪৩ আসনের আইনসভায় (লোকসভা) সরকার গড়তে দরকার ২৭২ আসন। কিন্তু কংগ্রেস ও তার জোট ইউপিএ মিলিয়ে তার ভাগ্যে জুটার সম্ভাবনা মাত্র ৯৮-১০২ আসন, অর্থাৎ ১০০ আশেপাশে, এর বেশি নয়। ফলে ইউপিএ এর সরকার যে হচ্ছে না এখন পর্যন্ত সবগুলো এক্সিট পোলই সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সোজা মানে আমেরিকার সাথে (কংগ্রেস দলসহ) ভারত সরকারের গত সাত বছরের যে সখ্যতা ও সর্বশেষ বিরোধের সম্পর্ক – তা কোনভাবেই আর আগের জায়গায় থাকছে না, এতে পালাবদল আসন্ন। বাংলাদেশে একমাত্র ভারতের সমর্থনের হাসিনার সরকার, এর প্রধান খুটি যা, বাইরের সমর্থনের দিক থেকে তা এই প্রথম ভীষণ নড়বড়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে শুরু করেছে। তাহলে কি বিজেপির নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসছে? না তাও একেবারে নিশ্চিত করতে পারেনি কোন একজিট পোল। সবগুলো একজিট পোলের ফলাফলে দেখা গিয়েছে বিজেপি জোটে ২৩৩ আসনের নিচে থেকেছে এই পর্যন্ত। [এখানে দেখুন,] আবার ১৬ তারিখের পর আসল ফলাফলে কোন কারণে এটাও যদি না হয় তবে ১৯৯৬ সালের দেবগৌড়ের সরকারের মত আঞ্চলিক দলগুলোর জোট ক্ষমতায় আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারতে এক দুর্বল সরকার মানে দুর্বল রাজনৈতিক কর্তৃত্ত্বের সরকার গঠিত হবে সন্দেহ নাই। এসব দিকে নজর রেখে আমেরিকার সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের অঞ্চলের ডেস্কের নিশা দেশাই সপ্তাহ তিনেক আগে বিজেপির মোদির সাথে বিস্তারিত আলাপ করতে এসেছিলেন। (যদিও সফরের প্রকাশ্য মূল এজেন্ডা ছিল ভারতের ট্রেড বিষয়ক বিরোধগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে কথা বলা।) ঘটনা শেষ পর্যন্ত যাই দাঁড়াক, এবার আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যে ভারতের বাংলাদেশ নীতির উপর সুবিধা পাবে, পশ্চিমা স্বার্থের সাথে সমন্বয় করে হাজির হতে সুযোগ পাবে তা বলাই বাহুল্য। অন্ততপক্ষে আমেরিকা ও ভারত উভয়ের বাংলাদেশ নীতি নতুন ভারসাম্য পরিস্থিতি নতুন করে রচিত করার সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। কংগ্রেস সরকারের সাথে মুখোমুখি বিরোধে জড়িয়ে তা যতটা সংঘাতপুর্ণ বা অকেজো হয়ে আছে তা নতুন রাস্তা নিবে। কারণ ভারতের এই নির্বাচনের ফলাফলে যে কোন অ-কংগ্রেসী সরকার গঠিত হলে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে গত তিন-চার বছরে যুক্ত হওয়া নতুন বাস্তবতা, নতুন করে হাজির হওয়া উপাদানগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভারসাম্যে রচিত হবে সন্দেহ নাই। উভয় রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতির কমন ভিত্তি খুজে বের করা ও রচনা হবে। অন্তত কংগ্রেস সরকারের মত “যেকোনভাবেই হোক আমার হাসিনা সরকারকেই চাই” এই জবরদস্তিমূলক অবস্থানে আর থাকছে না। এটা অবস্থাদৃষ্টে পরিস্থিতি যেদিকে বিকশিত ও মোচড় নিচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে এক অনুমান মাত্র। তবে একেবারেই হাওয়াই অনুমান নয়। এই অনুমানের পিছনের একটা বড় কারণ, মোদি এবং এবারের মোদির বিজেপির নীতি (তুলনায় ওল্ড হাগার্ড আদবানির বিজেপি নয়)।

    মোদির বিজেপি কেমন নীতি ক্ষমতা নিয়ে হাজির হতে পারে
    বিজেপি “সেকুলার” নয় অথবা মুসলমান-বিদ্বেষী এই অভিযোগ মোদি এই নির্বাচনে সিরিয়াস আমলে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। মোদি ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন “বল্লভ ভাই প্যাটেলের মত তিনিও সেকুলার”। [দেখুন,] প্যাটেল কে ছিলেন? স্বাধীন ভারতে ১৯৪৭ এর আগষ্টের পর নেহেরুর প্রথম সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন প্যাটেল। এই “প্যাটেলের সেকুলার” কথার অর্থ তাতপর্য কি তা নিয়ে আলাদা কোথাও বিস্তারে আলোচনা করতে হবে। আপাতত সংক্ষেপে – কংগ্রেস ও বিজেপি এবারের নির্বাচনে কমন যে ইস্যুতে বিতর্কে লিপ্ত তা হল, ভারতের অখন্ডতা। সব জনগোষ্ঠীকে এক ভারতে ধরে রাখা এই সুত্রে অখন্ডতা আলাপ। আর এক ‘সেকুলার ভারত” এটা ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য নাকি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। এই হলো অখন্ডতার আলাপের মধ্যে সেকুলার শব্দটা ঢুকে পড়ার সম্পর্ক সুত্র। বুঝাই যাচ্ছে এসব কথাবার্তাগুলো আসলে সমস্যার মুল এড়িয়ে শব্দের ফুলঝরি বা রেঠরিক। যেভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন করে আরও ভাগ টুকরা করে নতুন নতুন রাজ্য গঠনের দাবী বেড়েই চলেছে (এক পশ্চিমবঙ্গকেই আরও দুই তরফে আরও নতুন দুই ভাগে ভাগ করার দাবী আছে) এই ফেনোমেনার মুল তাতপর্য হল, ক্ষুদ্র (উত্তরপুর্ব ভারত) অথবা বড় (দক্ষিণ ভারত) ধরনের জনগোষ্ঠিগুলোকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা। এককথায় বললে এগুলো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতাকে অপ্রতিনিধিত্ত্ব করে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। প্রায়ই “বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন” নাম দিয়ে এগুলোকেই নেতিবাচক লক্ষণ বা ফেনোমেনা বলে এমন বয়ানে চিনানোর চেষ্টা হতে দেখি আমরা। এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথাও তৈরি আছে যার হদিস নাগাল করার জন্য পাবার জন্য এগুলো মূলত ক্ষমতায় উপযুক্ত অংশীদারিত্ত্ব না পাওয়া অথবা শ্রুত হবার জন্য বঞ্চিত জনগোষ্ঠির আর্তনাদ। নিজের উপর এই ফেটিস বা ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার দানবীয় শাসন এরা টের পায় কিন্তু সেক্ষমতাকে ধরতে পারে না, ভাগ পায় না। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় সে অপ্রতিনিধিত্বশীল থেকে যায়। কিন্তু কথার মারপ্যাচে ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্বশীলতার সব সমস্যাগুলোর সমাধান যেনবা সেকুলারিজম – এমন এক ইঙ্গিত দিয়ে সমস্যাকে ঝুলিয়ে বা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায়। ফলে “সেকুলারিজম” বলে বয়ানের আড়ালে বাকচাতুরি রেঠরিকে কংগ্রেস-বিজেপির মিছা লড়াই চলতে থাকে। বিগত ত্রিশ বছরে ধরে একনাগাড়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়ে আসছে কেবল আঞ্চলিক দলের সমর্থনে, কোয়ালিশনে। সাধারণভাবে কোয়ালিশন সরকার মানেই তা খারাপ লক্ষণ তা বলা হচ্ছে না। খেয়াল করতে হবে এটা বিজেপি বা কংগ্রেসের মত তথাকথিত সর্বভারতীয় দলগুলোর পরস্পরের কোয়ালিশন নয়। বরং বিজেপি বা কংগ্রেসের সাথে “আঞ্চলিক দলের” কোয়ালিশন। এটাই ভারতের অখন্ডতা সমস্যার মূল দিক, মৌলিক বিপদ। কংগ্রেস বা বিজেপি নিজেদের সর্বভারতীয় দল দাবী করে আসলেও তাই এর অন্তর্সারশুণ্যতা এখানেই। পুরা দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক দলের প্রভাব একচেটিয়া, একনাগাড়ে এবং বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরের। “আঞ্চলিক দল” এই ফেনোমেনোটার অর্থ তাতপর্য কি? এককথায় বললে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীভুত ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। নেহেরুর ভারত রাষ্ট্র গঠনতান্ত্রিকভাবে ১৯৪৮ সালের শুরু থেকেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত ও কুক্ষিগত করে রাখতে হবে, একমাত্র তাহলেই অখন্ড ভারত রাখা যাবে, বিশাল ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে – এই নীতিতে রাষ্ট্র গঠন করে রাখা হয়েছে। অথচ নানান আঞ্চলিক দলের উত্থান ফেনোমেনো চোখে আঙুল দিয়ে বারবার বলছে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার রাষ্ট্র নয় ফেডারল ধরনের রাষ্ট্রক্ষমতাই এর একমাত্র সমাধান। এই প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নিতে হবে কখনও। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ যেটা – বাইরের পড়শি রাষ্ট্র, “সীমাপাড়-কী আতঙ্কবাদ” এগুলোই নাকি ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সমস্যা তৈরি করছে, এগুলো নাকি বাইরের তৈরি, মুসলমানদের তৈরি ফলে ‘সেকুলারিজম’ এর সমাধান এমন মুলা ঝুলিয়ে মূল সমস্যা ‘ক্ষমতায় অপ্রতিনিধিত্ত্বশীলতা” এদিকটাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে, ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা তৈরির পথ চালু রাখা হয়েছে। আর এব্যাপারে কংগ্রেস ও বিজেপির মৌলিক মিল আছে, যদিও সমাধান প্রশ্নে অবস্থান ভিন্নতা আছে। যেমন, বিজেপি এপর্যন্ত ব্যাখ্যা করে এসেছে এর সমাধান “হিন্দু জাতিয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্য” আর কংগ্রেস দাবী করেছে সেকুলারিজমের ঐক্য এই বয়ানের আড়ালে আর এক ব্রান্ডের হিন্দু জাতিয়তাবাদ। উভয় দলের মিলটা হল কেউই রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতা গঠনের ভিতরেই যে সমস্যা সেদিকটা নিয়ে সরাসরি আলাপ তুলতে সাহস রাখে না। সমস্যাটা নাকি রাষ্ট্রের বাইরে থেকে আসছে এই দাবির ব্যাপারে উভয়ে একমত। এরা অস্বীকার করতে চায় সমস্যা রাষ্ট্রের বাইরে থেকে তৈরি করা, উস্কানি দিবার চেষ্টা থাকতেই পারে থাকবে কিন্তু এটা তখনই ইস্যু হবে, খচখচে কাঁটা হয়ে উঠবে যদি রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা গঠনে সমস্যা থাকে, ক্ষমতা অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকে। পঞ্চাশ রাজ্যের ফেডারল রাষ্ট্র আমেরিকার অখন্ডতাকে কি বাইরের শত্রু রাষ্ট্রের উস্কানি দিয়ে ভেঙ্গে দিবার মত শত্রু রাষ্ট্রের অভাব আছে, না কি কোন কালে ছিল? কিন্তু কখনই আমেরিকা তা অনুভব করে নাই কেন?
    বড় ভুগোল, বড় জনসংখ্যা, ভিতরে অনেক ধরনের আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত বিভক্তি-চিহ্ন এবং বড় অর্থনীতি ইত্যাদি পরিস্থিতিতে ঐ দেশের জন্য একে এক রাষ্ট্রে সংগঠিত করতে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রক্ষমতা গাঠনিক দিক থেকে দেখলে এপর্যন্ত সারা দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভাল রাষ্ট্র অভিজ্ঞতা হলো আমেরিকান রাষ্ট্র, ফেডারল ভিত্তির রাষ্ট্র। ফেডারল ধরণের রাষ্ট্র কথাটা বিস্তার করতে পারলে ভাল হত। প্রসঙ্গ অন্যদিকে চলে যাওয়া এড়াতে সংক্ষেপে কেবল বলব, একে বুঝবার জন্য আইন পরিষদ ( আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদ বা আমাদের সংসদ) থাকার পরও কোন আইন সংসদে পাশ হবার পর তা আবার সিনেটেও পাশ হতে হবে, কারা এই সিনেট গঠন করেছে এদিকটাসহ ফেডারল রাষ্ট্রে ক্ষমতা গঠন নীতির দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। অনেকে তর্ক তুলতে পারেন ভারতে সিনেট নামে না থাকলেও রাজ্যসভা নামে তো কিছু আছে। এর জবাব হল, ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র ভুমিকা ২৭২ জন লোকসভার (সংসদ) সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু ফেডারল আমেরিকা রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল আইনসভা (প্রতিনিধি পরিষদ) কেন্দ্রিক কোন একটা ক্ষমতা-কেন্দ্র নাই, ফলে সেখানে কেন্দ্রীভুতও নয়। তাই ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতাগঠন প্রক্রিয়া ও কাঠামো এক ভুতুড়ে অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাই তৈরি করবে সবসময়, এপর্যন্ত করে এসেছে। ফলে একই মাত্রায় তা বিরোধ সংঘাতে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে পড়ার বিপদ মাথায় নিয়ে ঘুরবে। এর আদি পাপ ১৯৪৭ সালে অখন্ড ভারত গঠন কাঠামোর মধ্যে যেখানে মুল যে বিষয়ে জোর দেয়া হয়ে হয়েছিল তা হলো নির্ভেজাল একছত্র “বলপ্রয়োগ”। আমাদের অনুমান থাকতে পারে যে বৃটিশ ভারত বোধহয় অখন্ড কিছু একটা ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন বৃটিশরা ছেড়ে যায় তখনও ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ৫০০ রাজার রাজ্যকে ইন্টিগ্রেট করে অখন্ড ভারত খাড়া করার বিপদ নেহেরুকে মোকাবিলা করতে হয়। এর মুল নীতি ছিল বলপ্রয়োগ; স্ব-ইচ্ছার ইউনিয়নও নয়, ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বশীলতার প্রশ্ন সেখানে নির্ধারক নয়। নেহেরুর প্রধানমন্ত্রীত্ত্বে গুজরাটি বল্লভ ভাই প্যাটেল ছিলেন ওই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থাৎ বলপ্রয়োগ ঘটাবার কাজটা তাকেই করতে হয়েছিল। একটা উদাহরণ দেই। যেমন, এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ যা হায়দ্রাবাদকে রাজধানী করে পুনগঠিত হয় ১৯৪৭ সালের পরে। কিন্তু কেবল ঐ হায়দ্রাবাদ আসলে ছিল এক রাজার রাজ্য। এই রাজ্যের নিজাম (রাজা) বৃটিশ করদ দেয়া শর্তে স্বাধীন রাজার রাজ্য ছিল। হায়দ্রাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে অখন্ড ভারত বানাতে গিয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে যেতে হয়েছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলকে। বলপ্রয়োগ আর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এই ছিল তর্কের বিষয় – এনিয়ে মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এতকিছু শব্দ থাকতে ‘কমিউনিষ্ট’ কেন? নেহেরুকে যেখানে ‘প্রগতিশীলেরা’ কমিউনিষ্ট না হলেও সমাজতন্ত্রী বলেই চিত্রিত করতে পছন্দ করে দেখা যায়!

    এর সংক্ষিপ্ত জবাব ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বিপ্লবের পর রাষ্ট্র গঠনে লেনিনকে নানান জাতিগোষ্ঠিকে (যেগুলো আসলে ছিল রাশিয়া ও এর পড়শি জার সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা নানাঞ্জনগোষ্ঠি) ঐ রাষ্ট্রে ইন্ট্রিগ্রেশেন যা মুলত ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা তা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। নেহেরুর মন্ত্রী প্যাটেলের মতই লেনিনের মন্ত্রী (রুশ ভাষায় commiserate বা মন্ত্রণালয়ের কমিসার বলা হত) ছিলেন জর্জিয়ান জোসেফ ষ্টালিন। ষ্টালিনীয় নির্মম বলপ্রয়োগ তা ঘটানো হয়েছিল। [যদিও লেনিনের নীতিগত অবস্থান ছিল, জনগোষ্টিগত উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিরোধ সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সমর্থন করতে হবে। কিন্তু এটা নীতিগত। ষ্টালিনের হাতে বাস্তবে প্রয়োগে এটা যা দাড়িয়েছিল এর সাথে লেনিনের নীতির আর কোন সামঞ্জস্য খুজে পাওয়া যায় নাই। বিপ্লব ঘটেছিল কেবল রাশিয়ায়। কিন্তু একছত্র ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে দানবীয় করতে রাশিয়ার তথাকথিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পড়শি পর পড়শি রাষ্ট্র বা অঞ্চল জোড়া দিতে দিতে সীমান্ত বাড়িয়ে সেই রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন নাম ধারণ করে। এই পড়শি জোড়া দেয়া ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত চলেছিল, একই সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে তবে সাইজ সীমান্ত বাড়িয়ে, থামে নাই। সোভিয়েত রাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে ভেঙ্গে ছত্রাখান হয়ে পড়ার পর এবার এতদিন জোর করে দাবিয়ে রাখা জাতিগত প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা ফেটে প্রকাশিত হয়তে শুরু করে। উলটা পথ, আবার ম্যাপ সীমান্ত আঁকা। ষ্টালিনের শখের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার তা ছোট্ট রাশিয়া হয়ে যায়। আলাদা দুই রাষ্ট্র হয়ে ষ্টালিনের জর্জিয়া লেনিনের রাশিয়ার সাথে এখন সীমান্ত যুদ্ধে লিপ্ত। কসোভো, বসনিয়া এবং এমনকি হাল আমলের ইউক্রেন বা ক্রিমিয়া এভাবে প্রতিটা সমস্যার আদি গোড়া একটাই -ভুতুড়ে রাষ্ট্রে “বলপ্রয়োগে ইন্ট্রিগেশন” -জবরদস্তি। আমেরিকা ফেডারেল রাষ্ট্রের জন্ম ১৭৭৬ সালে। কিন্তু কেউই রাষ্ট্রগঠন ইতিহাসের এই গুরুত্বপুর্ণ অভিজ্ঞতাকে আমল করে নাই; না সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভারত।] সেই সুত্রে প্যাটেলকে ‘কমিউনিষ্ট’ বলে গালি দিয়েছিলেন নেহেরু। এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের সেকুলারিজমের বিপরীতে বিজেপির মোদির নির্বাচনী কালার ‘প্যাটেলের সেকুলারিজম’ কথার অর্থ তাতপর্য এখন থেকে পাওয়া যেতে পারে। আকার ইঙ্গিত রেঠরিক বাকচাতুরি যে যতই করুক মুল কথা ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডিয়া বা অখন্ড ভারত ধরে রাখা। কিন্তু কি ভিত্তিতে সেটাই মূল প্রশ্ন। অথচ এটাই ভারত রাষ্ট্রের মাথার উপর সবসময় টিকটিক করা বিখন্ড হয়ে পড়ার বিপদ – এটাই নানান ইঙ্গিতে নানান ছলে ইস্যু হিসাবে এই নির্বাচনে হাজির – বিজেপি ও কংগ্রেস রেঠরিক নানা কথার টোপড়ের আড়ালে এর স্বীকৃতি দিচ্ছে।

    কিন্তু এবারের নির্বাচনের আর একটা দিক, ভারতের মুসলমান ভোটাররা আর একটা ফ্যাক্টর হয়ে হাজির, এই অর্থে যে মুসলমানেরা আর ‘সেকুলার ভারত’ এমন কথার লোভে কংগ্রেস বা কমিউনিষ্টদের কনষ্টিটুয়েন্সি হয়ে থাকতে চাইছে না; এটা পরিস্কার। মোদি ও তার দল ইতোমধ্যে পাবলিক মিটিংয়ে মুসলমানদের কাছে শুধু মাফ চান নাই, শুধু একবারের মত সুযোগ যেন তারা দেয় এই আকুতি জানিয়েছেন। [“apologize to you by bowing our heads” দেখুন,]। পশ্চিমবঙ্গের মমতার মুসলিম কনষ্টিটুয়েন্সী হাসিল করার প্রচেষ্টাও প্রায় একই রকম।

    মোদির নীতি ক্ষমতার সম্ভাব্য ফোকাস
    মোদি বা বিজেপি প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে দিকটা নিয়ে কথা বলব সেটা আলোচনার সুত্রে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, একনাগাড়ে পরপর তিন টার্মের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। সারা ভারতে মূলত ব্যবসায়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি হিসাবে গুজরাতিদের একটা একক পরিচয় আছে। মোদি টাইটেলটাও এর সূচক। যদিও গত কয়েক বছরে তার পরিচয় ছাপিয়ে উঠেছে দাঙ্গায় মুসলমান হত্যার নেতা-লোক হিসাবে। কিন্তু একইসাথে তার গুজরাট মানে রাইজিং ইকোনমির গুজরাট। আর একাজে সে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে জাপান থেকে। তাঁর খাতির, সম্পর্ক বেশির ভাগটাই জাপানের পলিটিক্যাল ও বিজনেস এলিটদের সাথে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সে সরাসরি দাওয়াত দিয়ে গুজরাটে এনে সম্বর্ধনা দিয়েছে। এদিক থেকে যদি দেখি তবে গ্লোবাল পরিসরে তার রাজনীতিবোধটাকে বলা যায়, মুলত বিজনেস ওরিয়েন্টেড পলিটিক্স। শুধু জাপান নয়, একই সাথে চিন, জার্মান, ফ্রান্স, আমেরিকার সাথে মোদির গভীর সম্পর্কের দিকটা বুঝার জন্য এই আর্টিকেলটা মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। আবার, আসামের নির্বাচনী বক্তৃতায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আর চীন সীমান্তে অরুণাচলের নির্বাচনী বক্তৃতায় চীন প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেছেন যা যুদ্ধবাজ বাজপাখী অথবা সাম্প্রদায়িক মনে হলেও তা রেঠরিক হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। কারণ তিনি কিছুই না বললে সমালোচকরা সেটা নিয়েই কথা যাতে না তুলতে পারে তারই ব্যবস্থা হিসাবে দেখার সুযোগ আছে। [দেখুন,]
    আবার আমেরিকার বিদেশনীতি বিষয়ক গুরুত্বপুর্ণ জার্ণাল foreignpolicy তে এক বিশেষ নিবন্ধে [দেখুন Decoding Modi’s Foreign Policy] দেখা যাচ্ছে মোদির নীতির ফোকাসের ব্যাপারটা তাদেরও নজরে এসেছে। বলছে, Despite his roots in a nationalistic, right wing BJP, the highlight of Modi’s foreign policy will likely be economics, and not security. While taking a rhetorical hard line on India’s national interests suits his political ideology, Modi appears to understand that as prime minister he will need to prioritize boosting trade and fixing India’s economy. নিজের দায়িত্বে বাংলায় বললেঃ “এক ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভিতর মোদির শিকড় পোতা থাকলেও তাঁর বিদেশনীতির বৈশিষ্ট হবে খুব সম্ভবত নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি। ভারতের জাতীয় স্বার্থ বিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে খাপখায় এমন হার্ডলাইনের রেঠরিক ঠাটবাট বাকচাতুরি তার আছে। কিন্তু মোদি বুঝে একজন প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে তাকে তাঁর কোন চাহিদাটা প্রধান করতে হবে আর সে প্রাধান্যের বিষয়টা হল, বাণিজ্যকে চাঙ্গা করা, ভারতের অর্থনীতিতে বাধা ও সমস্যাগুলোকে সমাধান করা”।
    এখানেই বর্তমান কংগ্রেস সরকারের অনুসৃত বিদেশনীতির থেকে বিজেপির মোদির বড় নীতিগত পার্থক্য। যদিও মোদির সম্ভাব্য ভারতের জন্য কঠিন কাজটা রয়ে গেছে। সেটা হল, ভারতের সাথে আমেরিকা ও চীনের সম্পর্ককে নিজের স্বার্থের দিক আমলে রেখে একটা ফাইন ব্যালেন্সের উপর দাঁড় করানো। এটা ঠিক আমেরিকা ও চীন এদের একের বিরুদ্ধে অন্যটাকে ব্যবহারও নয়, আবার কোনটাকে বাদ দিয়ে নয়। কংগ্রেসের ভারত যেটা করতে শোচণীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। [অবশ্য আমেরিকার উস্কানি লোভ দেখানিও ছিল।] এটাই এই অঞ্চলের আমাদের সবার জন্য সঠিক এক পদক্ষেপ হবে।
    সংক্ষেপে একটা কথা বলে রাখি। বিজেপির পুরানা রাজনৈতিক লাইন – মুসলমান বিদ্বেষ কেন্দ্রিক হিন্দু জাতিয়তাবাদ – এর প্রতীকী নেতা হয়ে থেকে আছেন আদবানি, সাথে আছেন সুষমা স্বরাজ প্রমুখ। নরেন্দ্র মোদির ব্যবসা বা অর্থনীতি ফোকাসের লাইন এটাই আন্ত-পার্টি সংগ্রাম হিসাবে আদবানিকে পরাজিত করে ‘বিজেপি জিতলে মোদি প্রধানমন্ত্রী হবেন’ হিসাবে হাজির হয়েছে। এটা কেবল ফোকাস বা প্রাইয়োরিটি সরিয়ে আনা। এতটুকুওই বদল। তবু এই বদলটাই তাতপর্যপুর্ণ। বিশেষত বাংলাদেশের দিক থেকে। কারণ এটা কংগ্রেসের মত তথাকথিত নিরাপত্তা বিষয়ক যুদ্ধবাজ লাইনে ফোকাস নয়। তবে কোন কারণে মোদি সরকার গঠন পর্যন্ত পৌছাতে না পারলে বর্তমানে কোনঠাসা আদবানিরা পুরানা ফোকাসের বিজেপি আবার জেগে উঠবে বলে মনে হয়।


    সবমিলিয়ে শেষ কথাটা হলো, ব্যবসায়ী মোদির সরকার যদি গঠন হতে সুযোগ পায় তবে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। বর্তমান কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতির ফোকাসটা হলো, সিকুইরিটি মানে তথাকথিত নিরাপত্তা। এককথায় বললে, এটা আসলে “মুই কি হনু রে” ধরনের পথে আশেপাশের সবাইকে দাবড়ে বেরিয়ে নিজের প্রিভিলেজ সুবিধাটা নিশ্চিত ও হাসিল করতে চাওয়া। বিপরীতে তুলনা করে বললে, মোদির লক্ষ্য ব্যবসা ও অর্থনীতিতে এক রাইজিং ইন্ডিয়া হাজির করা আর সেকাজে দলের পুরান ইমেজ পরিচয় মুসলমান বিদ্বেষী এক বিজেপি এই পরিচয়কে ফিকে করে ফেলা। একমাত্র একাজ করেই সে ভোটারদের মনে এই নতুন বিজেপির পরিচয়কে স্থায়ীত্ব দিতে চায়। পুরানো পরিচয়গুলোকে যেন ছাপিয়ে উঠে রাইজিং ইন্ডিয়ার মোদি ও বিজেপি। এমন এক ইঙ্গিত মোদি হাজির রেখে চলেছেন। সেটা শেষ পর্যন্ত কোথায় কি হয় সেটা অবশ্যই হতে দেখবার বিষয়, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদি তাঁর ইঙ্গিত সত্যি ও অর্থপুর্ণ হয়, সে প্রেক্ষিত মাথায় রেখেই বলেছি সেক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা সখ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় বা তৃতীয় পর্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। তবে আমাদের জন্য মূল কথা হল, ঘটনা যেদিকেই যাক, বটম লাইন হল, সরকার বদলের সাথে বর্তমান ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে বদল আসছেই। তাতে অন্তত বাংলাদেশে ফ্যাসিজমের ভিত আলগা হচ্ছে। বাইরের গুরুত্বপুর্ণ সমর্থন নাই হয়ে যাচ্ছে, এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। “আমার হাসিনা সরকারই চাই” আগামি ভারত সরকারের এমন অবস্থান আর থাকছে না।

    পরবর্তি কিস্তির লেখাগুলোঃ
    প্রথম কিস্তি
    দ্বিতীয় কিস্তি
    তৃতীয় কিস্তি

    [লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল, ২৮ মার্চ ২০১৪।
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত,চিন,রাশিয়া ও আমেরিকা (১)
    গৌতম দাস || Friday 28 March 14 |
    http://chintaa.com/index.php/chinta/showAerticle/268/ ]
    ]