Tag: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

  • আফগানিস্তানের সম্ভাব্য আগামী

    আফগানিস্তানের সম্ভাব্য  আগামী

    গৌতম দাস

    ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬

     

    চলতি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমান [Wendy Ruth Sherman ] ভারত সফরে এসেছিলেন। দুই দিনের সফরে তিনি প্রকাশ করেননি, তিনি ফেরার সময় আর কোথায় যাবেন; যদিও ধরে নেয়া হয়েছিল তিনি কেবল ভারতে এসেছেন, আর আফগান-তালেবান ইস্যুতে বেদিশা হয়ে থাকা ভারতকে দিশা ও রাস্তা দেখাতে আসছেন। দিশা কতটা দেখাতে পারছেন, সেটা নিয়ে আমরা আজ কিছু কথা বলব। কিন্তু এর চেয়েও, দিশা দিতে এসে শেরমানও বুঝে গেছেন যে, ভারত একটা দেখানো ঘামবড়া আর ফুটানিতে চলতে চায় এমন দেশ। ফলে শেরমান তার ভারত ছাড়ার আগে যখন প্রকাশ পেল তিনি পাকিস্তান হয়ে ফিরবেন (শুধু তা-ই নয়, তিনি আসলে পাকিস্তান সফর শেষে  এরপরে আবার তালেবানদের আফগানিস্তান হয়েও ফিরেছিলেন) তখন সেটা শুনে ভারত তার ভান-ভণিতা আর ভারত যেন খুবই উচ্চবংশীয় – এই মিথ্যা ফুটানি প্রদর্শন তুঙ্গে উঠেছিল। তারা তখন শেরমানকে অভিযুক্ত করেছিল এই বলে যে  তিনি ভারত-পাকিস্তানকে সমান পাল্লায় মাপছেন। মানে বলতে চেয়েছেন, পাকিস্তান ভারতের সমতুল্য নয়, বরং ভারত অনেক শুদ্ধ বা পবিত্র। কাজেই এতে ‘ভারত-পাকিস্তান’ এভাবে মাঝখানে হাইফেন দিয়ে লেখা (হাইফেনেটেড, hyphenated) শুরু হয়ে যাবে। সেটা নাকি ভারতের জন্য ‘অপমানজনক’! এতে শেরমান বুঝে যান তিনি কোনো ভয়ঙ্কর পেটি কালচারাল খপ্পরে পড়েছেন। উপায়ন্ত না পেয়ে তাই তখন তিনিও তেল ঢালা শুধু করেছিলেন। আর যে কথার আড়ালে যেটা বলে পার পেতে চেয়েছিলেন তা হলো – পাকিস্তানের সাথে আমি কোনো গভীর ভালোবাসায় জড়াতে যাচ্ছি না। আমার ‘খুবই সুনির্দিষ্ট আর ছোট্ট একটি কাজ’ [very specific and narrow purpose]আছে; তাই যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো পুরুষ যখন তার এক প্রেমিকার কাছে ধরা পড়ে যায় তার অপর প্রেমিকার খবরসহ – সেই দশায় তিনি। শেরমান নাকি তখন বলেছিলেন, “ভারতের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক সেই লেভেলের কোনো দিন পাকিস্তানের সাথে হবে না। কিন্তু সেটা কেউ ভালো করে না ছাপানোয় ভারত আবার সেটা নিজেই লন্ডন গার্ডিয়ান পত্রিকায় ছাপানোর ‘বন্দোবস্ত’ করেছিল। এ ঘটনা জেনে আমাদের মনে হতে পারে ভারত আসলেই খুবই উচ্চবংশীয় কালচারের দেশ!

    কিন্তু শেরমান পাকিস্তান থেকেও আমেরিকা ফেরেননি। এরপরে গিয়েছিলেন আফগানিস্তানে এবং সরাসরি তালেবানের সাথে একই টেবিলে মুখোমুখি বসে মিটিং করে গেছেন। কিন্তু কেন আফগানিস্তানে আর তালেবানদের সাথে মিটিং? যখন শুধু আমেরিকা কেন, বলতে গেলে কোনো রাষ্ট্রই এখনো যে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠনিক স্বীকৃতি দেয়নি। তবে এ কারণে  ভারতের অসুবিধা হয়নি; কারণ ভারতের হিন্দুত্বপ্রেমী ভোটারদের দৃষ্টি-আগ্রহের ততদিনে এসবের বাইরে চলে গিয়েছিলেন শেরমান। আসলে মোদির নিজের তৈরি যে খাঁচা সেখানে তিনি নিজেকে বন্দী দেখাতে বাধ্য হন যে, তিনি বিদেশী কূটনৈতিক দেখা সাক্ষাৎ সম্পর্কগুলোর মধ্যেও ক্রমেই মুসলমান বা পাকিস্তান কোপানোর একমাত্র নেতা এবং সফল হিন্দুবাদী নেতা তিনি। আর এটা দেখিয়েই তিনি ভোটের বাক্স ভরিয়ে ক্ষমতাসীন আছেন। যদিও কাহিনী হল, নয়নীমা বসু প্রমুখের মত কূটনৈতিক সংবাদদাতাদেরও তবু মোদির হিন্দুত্বপ্রেমি ভোটারকে দেখানোর এসব মিথ্যা ভাব-ভনিতার সেনসিটিভিটির দিকে খেয়াল রেখে তেমন শব্দ বেছে রিপোর্ট লিখতে হয়।

    শেরমানের দেশ আমেরিকা আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি না দেয়া সত্ত্বেও তার আফগান সফর এবং ফ্লাইট-এয়ারপোর্ট ঠিকমতো ন্যূনতম থিতু হয়ে চালু শুরু না হওয়া সত্বেও এক আমেরিকান মন্ত্রী হিসেবে তার আফগানিস্তান গিয়ে সরাসরি তালেবানের সাথে মিটিং – সেটা এক বেশ উল্লেখযোগ্য ঘটনা বৈকি। যখন  এ’ঘটনাটাকে তালেবানদের অনেকে আমেরিকার ওপর তাদের ‘বিজয়’ বলে দেখার আগ্রহ আছে। যা এমনকি আমাদের দেশেও অনেকের।

    এমন আরো কথা হল – তালেবান, ২০ বছর ধরে আমেরিকার হাতে মার্জিনালাইজড বা চাপা পড়ে থাকা জনগোষ্ঠী বলে তাদের মনেও ক্ষোভ কম নয়; বরং এমন হওয়ারই কথা। আর হতেই পারে তারা সেটা প্রকাশ করেছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সংস্পর্শে কখনো আসার কালে, যা মোটেও অসম্ভব নয়; কারণ আমরা দেখেছি ইমরান খান তাদের মুখপাত্র হয়ে যেন আমেরিকাকে একটু বকা দিতে গেয়েছিলেন। সিএনএনের সাথে ইন্টারভিউয়ে বলেছেন, এবারের তালেবান উত্থানের কারণে গত ২০ বছরের আমেরিকান চাপ-নির্যাতন থেকে আফগানরা মুক্তি পেয়েছে। আবার ইমরান একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে, গত ২০ বছর আমেরিকা পাকিস্তানকে ‘ভাড়া করা অস্ত্রের মতো ব্যবহার’ করেছে [US treated Pakistan like a ‘hired gun’ in its fight against Taliban, says Imran Khan]। গত ১৫ আগস্টের পর ইমরানের এধরনের কড়া কথাগুলো আমেরিকার ভালো হজম হয়নি। আবার কথাগুলোতে অনেক খানিকটা সত্যতা তো আছেই। ইমরান নিজের দেশের অভিজ্ঞতা হিসেবে দ্বিতীয় কথাটা বলতে পারতেন হয়ত, কিন্তু তালেবানদের জন্যও তাদের মুখপাত্র ও নেতা হতে চেয়ে আমেরিকাকে দায়ী করে কিছু বলা্র কারণে হয়ত আমেরিকানরা এটাকে “একটু বেশি কথা” হিসেবে দেখেছে। ফলে শেরমান ঐ সফরে ইমরানের সাথে সাক্ষাৎ করেননি; যদিও করবেনই এমন  নির্ধারিত কোন শিডিউল ছিল না।

    এদিকে আরো অন্য কিছু মূল কথা, আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের পর আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের আর পাকিস্তানকে প্রয়োজন নেই বা ফুরিয়েছে –  এখনকার বাস্তবতা কিন্তু এর একেবারেই ধারেকাছেও নয়। বরং উল্টো; আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের পাকিস্তানকে এখন আরো বেশি দরকার তবে ভিন্ন কারণে। লন্ডন ইকোনমিস্ট সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সম্প্রতি এক আর্টিকেল ছেপেছে।  আবার আরও ধারালো আরেক মন্তব্য করেছে [It is too important—and dangerous—to ignore] আবার পাকিস্তানেরও আমেরিকাকে আর তেমন দরকার নেই, পরিস্থিতি সেটাও নয়। আজকের পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকা ছেড়ে অনেক বেশি চীন নির্ভরশীল হলেও এটা কোনো ‘আমেরিকা অপ্রয়োজনীয়’ ধরনের অবস্থা নয়। তাই মাঠের সাধারণ নাগরিকের ভাষায়, কোনো প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকার সাথে বা নিয়ে কথা বলতে যাওয়ার কিছু দিকটা ধরলে এই আমলনামাতে একটা ভুল তো এখানে আছেই। ব্যাপারটাকে সেভাবে দেখতে পারি আমরা।

    এটাকে ভুল বলার অন্য আরো যে বিশেষ কারণ, তা এখন বলব। প্রথমত, এবারের সেনা প্রত্যাহার করার পর বাইডেন প্রশাসনের কারো, মানে শেরমানের এই পাকিস্তান সফর একেবারের ভিন্ন ও নয়া তাৎপর্যের। এটা অবশ্যই আমল করতে হবে। এটা এক নয়া যুগের। কারণ আগের ২০ বছর আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক ছিল এমন যে, আমেরিকার বুশ প্রশাসন আফগানিস্তানে হামলা চালাতে চায় তাই হামলার লঞ্চিং প্যাড হিসেবে আমেরিকার পাকিস্তানকে দরকার ও তাকে আমেরিকা বাধ্য করবে – এই যে “সম্পর্ক” – সেটা এতদিন বজায় থাকলেও সময় এসেছে এবারই প্রথম সেই শর্ত আর নেই। পাকিস্তানও এসব বাধ্যবাধকতা থেকে এখন একেবারে বাইরে ও মুক্ত। আর এই নয়া মুক্ত পরিস্থিতিতে শেরমান পাকিস্তান সফরে এসেছেন। অতএব এই নয়া পরিস্থিতির উপলব্দি – তা থেকেই সব পক্ষের দেখা উচিত। ফলে কথাবার্তা বা নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় এ নিয়ে সব পুরনো রেফারেন্স বাদ দিয়ে বরং নয়া এই পরিস্থিতির মধ্যে নয়া সম্পর্কের কাল হিসেবে কথা বলতে পারতে হয়েছে বা হবে এখন থেকে উভয়পক্ষকে।

    কিন্তু সাবধান, উপরের এসব ঘটনার সাথে আরো কমন কিছু ইস্যু সামনে। সেগুলো  হলঃ
    ১. তালেবান এখনো কোনো সরকার গঠন করতে পারেনি।
    ২. তারা এখনো এক আমিরের আফগানিস্তান নিয়ে আঁকড়ে পড়ে আছে। রাজা আর জনপ্রতিনিধির ফারাক বুঝতে চাইছে না।  ফলে অবলীলায় রাজা বা আমিরের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেতে পারছে। এযুগেও জনপ্রতিনিধি হবার যুগ ফেলে রাজা হতে চাইছে তা স্পষ্ট না। আমিরের দেশে আমিরই দেশের মালিক এখানে কোনো নাগরিক থাকে না, সব হুকুমের বান্দা থাকে। এখানে দেশ গড়ার কিছু থাকে না। আমিরের খেয়াল থাকে। অথচ এক আমিরাতই তাদের লক্ষ্য।

    ৩. সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপদের কথা হল, আমেরিকান ভোয়া [VOA] লিখছে,  জাতিসঙ্ঘসহ সারা পশ্চিম যেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তা হলো- প্রায় ১০ লাখ শিশু না খেয়ে মরার মুখোমুখি, প্রায় ১৮ লাখ দুস্থ মানুষ যারা জাতিসঙ্ঘের মানবিক নানান ধরনের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল প্রভৃতি। এসব মানবিক সাহায্য তালেবান সরকার স্বীকৃত নয় বলে আগের মতো সরবরাহ বজায় রাখতে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের ক্ষুধা এসব কী সমস্যা তা জানার যোগ্য থাকে না।

    Sherman recounted a recent U.N. warning that about 1 million Afghan children were at risk of starvation, that more than 18 million Afghans needed urgent humanitarian assistance, and that deepening drought and the approaching harsh winter were only going to make matters worse.

    পশ্চিম তাই আগেই স্বীকৃতির ইস্যু বাইরে রেখে এড়িয়ে সরাসরি কথা বলতে এসেছে। আমেরিকা, ইইউ এরই মধ্যে স্বীকৃতির প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে  কাবুল সফরে এসে কথা বলেছে। এমনকি সেখানে আবার একটা স্বীকৃত সরকার হতে করণীয় কী সে সম্পর্কে আলোচনা, পরামর্শ তুলেছেন। কিন্তু এটাকে তাদের ঠেকা, তারাই বিপদে পড়েছে – এমন অনুমান নিয়ে ব্যাপারটাকে তালেবানদের দেখা এক বিরাট ভুল ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে যাওয়া হবে।  তার ইঙ্গিত উঠে আসছে।  ফলে আমেরিকা, ইইউ যেটা আগবাড়িয়ে করছে, সেটা হলো নিজেদের দিক থেকে যা করণীয় কর্তব্য ছিল, তা যতদুর পারে আগেই পূরণ করে রাখছে; যাতে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তহীনতায় যদি কিছু শিশু অভুক্ত মারা যায়; যাতে সে আগেই পরিষ্কার রাখতে পারে তাদের দায়ের অংশ ও উদ্যোগ তারা যথেষ্টই নিয়েছিল। তাতে তখন কিন্তু পরিস্কার দেখা যাবে তালেবানদের কারণে পুরোটাই ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাই এমনটা কখনই যেন না হয় যে, দানগ্রহীতার আগ্রহ নেই ফলে দাতা চেষ্টা করেও কিছু করতে পারে নাই। ফলে তখন মানুষ দাতাকে নয় গ্রহিতাকেই প্রধান দায়ী করবে।

    ৪. অতএব দাতারাই ঠেকায় পড়েছে আর তাদের সেই ঠেকে যাওয়া দশাকেই ব্যবহার করে চাপ দিয়ে তালেবানদেরকে তাদের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে হবে এমন অনুমান- এটি খুবই আত্মঘাতী ও বিপজ্জনক এবং দায়দায়িত্বহীন  সিদ্ধান্ত হবে।

    ৫. এরপর যা লিখব সেগুলোই তালেবান ইস্যুর মূল প্রসঙ্গ। নয়া তালেবান এরা কোন স্বীকৃত সরকার নয়। একারণেই এটা কোন থিতু সরকার নয়, এ অনুমান ভুল, ভিত্তিহীন। কারণ আসলে এটা এখনো অস্থিতিশীল মূলত এর অভ্যন্তরীণ (গ্রুপিং-গুলোর) সংহতি খুবই দুর্বল, তাই। কথাটাকে যদি রেডিক্যাল [হাক্কানি] আর তুলনায় লিবারেল [তালেবান]  ধারা হিসেবে বলি, তবে এ দুই ধারার বিরোধ – এটাই প্রধান অ-সংহতি [un-consolidated] চিহ্ন। এখানেই শেষ নয়। তালেবানের ভেতরের এই বিরোধের বাইরেও আবার আরো চরম রেডিক্যাল (আইসিস-কে) ধারা আছে, যার ছাতার নিচে আবার এর সমমনা আরো ছোট ছোট গ্রুপ আছে। এই চরম রেডিক্যাল (আইসিস-কে) [ISIS-K] –  এরা তালেবানদের ‘চরম অসহ্য শত্রু’ জ্ঞান করে।

    ৬. এরই মধ্যে আইসিস-কে গত আগস্টের দুইবার এয়ারপোর্ট হামলার পরে আর শান্ত বসে নাই। তাদের এখনকার টার্গেট মূলত হাজারা ট্রাইব বা এথনিক গোষ্ঠী, যারা শিয়া জনগোষ্ঠী। [The Hazaras are a Persian-speaking ethnic group; bigger other parts are in Iran. They primarily residing in the Hazarajat region in central Afghanistan.] আর মোট আফগান জনসংখ্যার ৯ শতাংশ। আফগানিস্তানের বড় প্রথম তিন জনগোষ্ঠী হল – পশতুন (৪০-৫০ শতাংশ ), তাজিক (২৫ শতাংশ) আর হাজারা (৯ শতাংশ)। ISIS-K এর এই হামলা মূলত নির্মূল করা [Ethnic Cleansing] ধরনের। আপাতত এনিয়ে তাদের ততপরতা “মসজিদে হামলা” টাইপের। অনেকে হাজারা-রা মুসলমান কি না তর্ক সে দিকে নিতে পারেন। এটি ভুল পথ। কারণ, এমন তর্ক ইসলামের ভেতরের। এটা বাইরের গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের জায়গায় বসে দেখলে  বাইরের এই পুরো দুনিয়ার চোখে তারা ব্যাপারটাকে দেখবে কোনো এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা হিসেবে, বসনিয়ায় যা হয়েছে। দুনিয়াতে ১৯৪৫ সালের আগে এমন বহু এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে দেয়া গেছে। কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরে দুনিয়া বদলে গেছে; কারণ এক ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ তৈরি হয়ে আছে। বিশেষত ২০০০ সালের পরে যে গ্লোবাল আইনি-কাঠামো, আদালত ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেছে; তাতে যারাই কোনো এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে যাবে, তো সে যে অজুহাতেই হোক তারা সহি মুসলমান ছিল না বলে অথবা অন্য কিছু, এরা প্রত্যেকেই এখন বিচারের সম্মুখীন হবেই, সর্বোচ্চ সাজা পাবে। যেমন ইতোমধ্যেই বার্মার শাসকেরা রোহিঙ্গা নির্মূল প্রচেষ্টার অভিযোগে।

    এসব হলো আফগানিস্তানের আরেক জগৎ। সেই জটিলতার একটু ইঙ্গিত দিলাম। আর এখানে এবার ভারতের অবস্থা নিয়ে একটি কথা বলে শেষ করব।

    অবশেষে ভারতের মিডিয়া জানাচ্ছে, আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আফগানিস্তানে যেসব দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা আছে এমন দেশগুলোর ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার’ [NSA, National Security Advisor] দায়িত্বে আছেন এমন মর্যাদার মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের নিয়ে এক সম্মেলন আহ্বান করতে যাচ্ছে ভারত। কিন্তু মজার কথা হল, তাতে ভারতের প্রধান দুই মেহমান হল পাকিস্তান ও চীন [Pakistan & China among invitees as India looks……… ]।

    তাহলে এত দিন মোদির হিন্দুত্ববাদ আর ভোটের স্বার্থে যে এ দুই দেশকে ভারতের চরম শত্রু বলে প্রপাগান্ডা চালানো হয়েছিল, এর কী হবে? যে চরমশত্রু দেশ সেই আবার দাওয়াতি-অতিথি হয় কী করে? এই ভারত সরকারের এই স্ববিরোধিতার কোন উত্তর নাই।আলাদা রাষ্ট্র বলে  ভারতের স্বার্থ অবশ্যই চীন বা পাকিস্তানের স্বার্থের বিরোধী এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে ‘চরমশত্রু দেশ’ বলে চীন বা পাকিস্তানকে চিনানো আর প্রতি মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালানো – এই হিন্দুত্ববাদ অগ্রহণযোগ্য ও আত্মঘাতি, তা ভারতের পক্ষেও যায় না – এটাই ভারত প্রমাণ করল!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৩ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তানের আগামী“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতকে আমেরিকান ছেঁকা; অভিমান! না ডিভোর্স!

    ভারতকে আমেরিকান ছেঁকা; অভিমান! না ডিভোর্স!

    গৌতম দাস

     ০৪ অক্টোবর ২০২১, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3K4

     

     

    “U.S.-India Relationship Is the Quad’s Litmus Test”

     

    কেবল আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের ক্ষেত্রেই নয় “ঘটনার ২০ বছর” কথাটা ভারত-আমেরিকার “বিশেষ সম্পর্কের” ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হচ্ছে। সেও বিশেষ সম্পর্কের একটা বড় অংশ জুড়ে দাড়িয়েছিল কোয়াড [QUAD]; যা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত এই চার দেশীয় এক জোট। আমেরিকা-ভারতের গত ২০ বছরের সেই “বিশেষ সম্পর্ক” এবার হেলে পড়েছে মনে হচ্ছে। তাই আপাতত আমেরিকার উপরে ভারতের ক্ষোভ, অভিযোগ আর অভিমানের প্রকাশ দিয়ে বুঝাচ্ছে। বিশেষ করে গত ২৪ সেপ্টেম্বরের পরের ঘটনাবলীতে। কেন?
    আসলে ভারতের খুবই গর্বের ‘কোয়াড’ নিয়ে কথা বলছি। এত দিন কোয়াড এর উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বললে মানে হত যেন আপনি দুনিয়ার কথিত ‘বেস্ট ডেমোক্র্যাটিক” রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আর তাতে আমরা ভাবতাম তারা তারা মিলেই বেষ্ট হয়ে থাকুক আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিয়ে প্রশ্ন জানিয়েছে সেটা আমরা অনেকেই জানি। আর নতুন ঘটনা হল, ভারতের এক প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব উলটা আমেরিকার দিকে আঙুল তুলে বলছে, আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে […there are serious questions about the strength and performance of democracy in the US, highlighted by what happened in January 2021]
    তবে খুব সাবধান! কারণ এটা এতদিনে কেন? কারণ, আমেরিকা কোয়াডকে কেন্দ্র করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ভারত আমেরিকার কাছে (মানে খোদ কোয়াড-ই) এত গুরুত্বের কিছু না। তাই সে ভারতকে ছেড়ে অষ্ট্রেলিয়াকে কাছে টেনে কোয়াডের বদলে নতুন এবং সামরিক এক জোট খুলেছে। আমেরিকার এই “অবজ্ঞা” ও “তুচ্ছজ্ঞান” ভারতের ভিতরে মূল আলোচ্য বিষয়। ভারতের ভিতরের যারা এতদিন আমেরিকান পয়সায় থিঙ্কট্যাংক খুলে আঁতলামি করত আর গল্পে রাজা-উজির মারত তারা এখন ভারতেই কোনঠাসা  আর নাইলে  উলটা গান ধরেছে।  এককথায় এটাকেই বলে প্রেমে ছেঁকা খাওয়া – ভারতকে দেয়া “আমেরিকান ডিচ” (ditch)।  তাতেও শেষ না। ওদিকে,  এখন খোদ লন্ডন ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনে তার আর্টিকেলের শিরোনাম “কোয়াডের কাজটা কী” [What is the point of the Quad]?

    গত ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল হোয়াইট হাউজে কোয়াডের চার নেতার এই প্রথম মুখোমুখি কোন মিটিং করতে বসার দিন। আগের লেখায় বলেছিলাম, এটাই প্রথম মুখোমুখি মিটিং; তবে এটাই শেষ মিটিংও হতে পারে। আর এখন ওই মিটিং শেষে যত দিন যাচ্ছে তাতে  আমেরিকার উপর ভারতের গোসসা আর চেপে রাখা থাকছে না; বরং নানান ক্ষোভ ও অভিমান ততই সামনে আসছে। তবে সম্পর্কটা আপাতত কেউই ভেঙে দিচ্ছে না। যদিও অকার্যকর ফেলে রাখার ঝোঁকটাই বেশি। কেন?

    ছোট্ট জবাব হল, স্বামী সতীন নিয়ে এলে যা হয়! মানে হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু চালিত সাবমেরিনে সজ্জিত করতে ইংল্যান্ডকে সাথে নিয়ে “অকাস” (AUKUS) [ভিন্ন উচ্চারণে অনেকে “আউকাস” বলছে] নামে এক ত্রিদেশীয় নয়া জোট ঘোষণা করেছে; অর্থাৎ  মোট চার সদস্যের কোয়াড অথচ এর দুই সদস্য মিলে আবার বাড়তি যুক্তরাজ্যকে সাথে নিয়ে নতুন আরেক জোট গড়ার ঘোষণা করেছে। আর এবার আগেভাগেই ঘোষণা করে দিয়েছে এটা ‘সামরিক জোট’। এতে যেন আমেরিকার এক প্রকাশ্য ইঙ্গিত যে, আমরা সামরিক সম্পর্কে আসতে ভারতের জন্য অনেক  অপেক্ষা করেছি, আর না। অথবা এটা যেন বাইডেন বলছেন, “এখন তোমরা ভেবে দেখো, এই সামরিক জোটে যুক্ত হবে কি না, না হলে রাস্তা মাপো! আর এ নিয়ে কার্ড শো করো, তোমাদের মনে কী আছে ঝেড়ে কাশো। সেটি দেখতেই তো ২৪ তারিখে মিটিং ডেকেছি- এখানে মুখোমুখি হও!”
    এখানে এই ভাষ্যটা নিঃসন্দেহে  অনুমান-কল্পনা করে লেখা। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটা প্রায় এমনই ঘটেছে। নরেন্দ্র মোদীর হোয়াইট হাউজ রওনা হওয়ার দুই দিন আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা যে প্রেস ব্রিফিং করেন, সেখানেই সুনির্দিষ্ট করে তিনি বলেছিলেন, কোয়াড অথবা মোদির কোয়াড মিটিংয়ে যোগ দিতে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার সাথে ত্রিদেশীয় নয়া জোট অকাসের কোনো সম্পর্ক নেই; [No link between AUKUS and Quad, says India]।  এটা ছিল  ‘দ্য হিন্দু’ এর এনিয়ে ২১ সেপ্টেম্বরে বিস্তারিত এক রিপোর্টের শিরোনাম। লিখেছে, ভারতের পররাষ্ট্র  সচিব বলেছেন, ‘আমরা এই নয়া জোটের কেউ নই। আমাদের চোখে কোয়াডের সাথে এই নয়া জোটের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। অথবা কোয়াডের তৎপরতার উপর এর কোনো প্রভাব বা সম্পর্ক নাই।’

    “We are not party to this alliance. From our perspective, this is neither relevant to the Quad, nor will it have any impact on its functioning,”  – Mr. Shringla told journalists at a briefing on the Prime Minister’s visit.

    কিন্তু শ্রীংলার এসব কথাতে মিডিয়ার কৌতুহল মিটেনি। তাই তারা আরো প্রশ্ন করেন তাহলে মোদীর এই হোয়াইট হাউজ সফর কি নয়া জোটের প্রভাবের নিচে গুরুত্ব হারিয়ে চাপা পড়ে যাবে? অন্য এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, কোয়াড কি এখন থেকে তা হলে ‘নরম-সরম’ ধরনের ইস্যুতে নিজেকে নামিয়ে নেবে? শ্রীংলাকে তাই আবার এ নিয়ে মুখ খুলতেই হয় যদিও তাতে বিপদ আরো বেড়ে যায়, কমেনি।

    if the Mr Modi’s meetings and the Quad summit would be impacted or overshadowed by the big U.S.-Australian defence partnership, Mr. Shringla said the two events were not linked and also denied that the new partnership would mean that the Quad would only deal with “softer issues”

    তিনি বলেন, “নয়াজোট একটি সামরিক জোট। আর কোয়াড আলাদা লক্ষ্য নিয়ে আলাদা কিছু দেশের গ্রুপ। তবে কোয়াডের চার সদস্য দেশ আবার মালাবার এক্সারসাইজ নামে আরেক সমমনাদের কাজের জোট, যারা প্রায়ই মূলত একসাথে যৌথ নৌমহড়ার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু  ‘মালাবার নৌমহড়া গ্রুপের’ সাথে কোয়াডের কোনো সম্পর্ক নেই”- শ্রীংলা বলেন।

    And in the same sentiment Malabar exercises (maritime exercises involving Australia, India, Japan, U.S.) are those that are done between different nations but has nothing to do with Quad,” Mr. Shringla said.

    কিন্তু আমাদের কাছে এটি কৌতুকের যে, এখন ভারত কোনো সামরিক তৎপরতা বা সামরিক জোটের সাথে নেই বলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাচ্ছে; অথচ যতবারই ওসব নৌমহড়া হয়েছে মিডিয়া রিপোর্টে সবসময় তা কোয়াডের নামে হচ্ছে বলেই রিপোর্টেড হয়েছে। কিন্তু ভারতসহ কেউ এর বিরুদ্ধে কোনো সংশোধনী বা আপত্তি করেনি। তাই আগের লেখায় বলেছিলাম এটাই ভারতের “মাংস না খাওয়া নিরামিশাসী থাকতেই চান কিন্তু মাংসের ঝোল খাবার লোভ-শখ ষোল আনা!”।  আর তাই যেন এবার বাইডেন এবার কোয়াডের মিটিং দিয়েছেন একেবারে হোয়াইট হাউজে যেন ভারত প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকার সাথে সামরিক জোট করতে রাজি কিনা তা এবারই খোলাখুলি জানাতে বাধ্য হয়। যেটা এবার ভারত জানাতে বাধ্য হয়েছে যে সে নাই। অর্থাৎ আর আমেরিকার সাথে খাতিরের ভাব, ভান ও ভনিতার দিন নাই, শেষ। তাই, হোয়াইট হাউস এই কোয়াড সভা উপলক্ষ্যে এক ফ্যাক্টশীট প্রকাশ করেছে [Fact Sheet: Quad Leaders’ Summit] স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে, যা তাদের থিঙ্কট্যাংক ব্যক্তিত্বরাই সমালোচনা করে বলছেন, এতে এক কোভিডের টিকা প্রোগ্রাম নিয়েই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা হয়েছে। যা আসলে ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ভারত জাপানের বিনিয়োগ নিয়ে অন্যকে টিকা সরবরাই করবে কী যেখানে ভারতের নিজ জনগোষ্ঠির জন্য প্রয়োজনীয় যা টিকা তা উতপাদনের ক্যাপাসিটিই নাই। আর নাই বলেই শেষে বাস্তবত ভারতকে বিদেশে থেক্লে টিকা আমদানি করে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। তার মানে নতুন করে কোয়াড বেচে আছে দেখাতে চেয়েই কোয়াডের কেবল কোভিড প্রোগ্রামের কথা বলা হয়েছে পুরা সাত পৃষ্ঠা ধরে। যা ইতোমধ্যেই কোয়াডের ব্যর্থ এরিয়া।
    অর্থাৎ কোয়াড যে নাই হয়ে গেছে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে এটাই চারদেশ মিলে পরোক্ষে স্বীকার করে নিয়েছে। আর ঠিক একথাটাই নিউইয়র্ক সিটি কলেজের এক প্রফেসর আমেরিকারই “ফরেন পলিসি’ পত্রিকায় গত জুন মাসে আর্টিকেল লিখে বলেছিলেন। লেখার শিরোনাম ছিল কোয়াড এক মিথ্যা-মায়ার নাম’ [The Quad Is a Delusion]। বলেছিলেন এই জোট “আমেরিকাকে চীনের বিপরীতে কোন বাড়তি সুবিধা এনে দিবে না”।

    ভারতের রাজনীতিকেরা কী জানতেন না, কোয়াড বা আমেরিকা তাদেরকে রক্ষা করবে নাঃ
    অভ্যন্তরীণভাবে ভারতের শাসক-নেতাদের মনে এটা পরিষ্কার না থাকার কারণ নেই যে, কোনো যুদ্ধে জড়ানোর মূল বিপদ হল যে, এটা যুদ্ধের খরচের বোঝা চাপিয়ে নিজ খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো খারাপ করে ফেলা। ফলে পাকিস্তানের ইস্যু ছাড়া কোনো যুদ্ধে না জড়ানোই অন্য সব দেশের মতো ভারতীয় মনের সাধারণ অবস্থান। কিন্তু এ দেশের নাম ভারত যার আরেক নাম হওয়া উচিত ‘ভান ও ভণিতা’র দেশ। ভান-ভনিতা করে চলে এদের জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্ঠের আকার ধারণ করে বসে গেছে। এরা জীবিনের কঠিন বাস্তবতাগুলোকে কখনো প্রকাশ পেতে দেবে না; বরং যা সে নয় তাই সে ‘শো’ করবে, যেটাকে আমরা শো-আপ করা বলি।
    ভারত শো-আপ করা ছাড়া কিছুই করতে পারে না, চলতে পারে না। এটা নেহরু কংগ্রেসের ভারতের প্রথম প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা তথাকথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির (বিদেশের বিনিয়োগ নেয়া যাবে না) পরিণতি; এমন  এক কালচারাল বৈশিষ্ঠ হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ উন্মুখ হয়ে কাজের খোঁজে শহরে-রাজধানীতে এসে থাকে  এটা দুনিয়াতে খুবই কমন ফেনোমেনা। কিন্তু নেহরুর ভারতের ক্ষেত্রে  কাজে নয়া পেশা, কাজের আশায় শহরে ভীড় করেছিল এমন  চার প্রজন্ম পার হয়ে গেলেও নেহেরুর কমিউনিস্ট অর্থনীতি তাদের বস্তিবাস অথবা জীবনমানের নিম্ন ও স্থবির দশায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারে নাই। খারাপ অর্থনীতিতে কাজের অভাবে পড়ে চরম দুঃখ-দুর্দশাগুলোর প্রকাশ মাপক অনেক ধরনের হয়ে থাকে। এর একটি হলো মধ্যবিত্তের উত্থান-পরিবর্তনগুলোকে স্টাডি করে সেটা বোঝার চেষ্টা অনেক পুরনো হলেও ভারতের এই মাপকে ভারতের চার প্রজন্মের খবর এখানে খুবই করুণ। বাংলাদেশের সাথে যদি তুলনা করা হয়,  আমাদের বেলায় আমাদেরকে শুরুই করতে হয়েছিল অনেক দেরিতে অন্যদের (দেশভাগের আগের ভারত আর পরের পশ্চিম পাকিস্তান) পেট ভরার পরে, স্থায়ী সম্পদগুলো সবই তাদের পকেতে থেকে গেছিল, আমাদের শুরু একাত্তরের পরে। তবু এখানে দেখব আমাদের মধ্যবিত্তের ফর্মেশন সবার চেয়ে আলাদা। ভারেতের চেয়ে তো বটেই, একেবারেই আলাদা। আমাদের বেলায়, কোনো প্রথম প্রজন্ম যদি ঢাকায় এসে বাসের হেলপার হয়, তবে পরের প্রজন্মের কর্তা বাস ড্রাইভার হয়ে হাজির হতে দেখা যেতে পারে। আর এখানে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত ও তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, একালে বাস ড্রাইভারের মেয়ে কলেজে পড়ে!  আমাদের এখানে কোন মানুষ বা তার পরিবার যারা গ্রাম থেকে শহরে ধাবমান এরা চার প্রজন্ম ধরে একই স্তরের জীবনমানে আছে দেখা যাবে না – ট্রেন্ড টা এরকম।

    এখন ভারতের বেলায় যেটা ঘটে আসছে তা হল এক লম্বা সময় ধরে একই নিম্নআয়ের জীবনমান ধরে ওর মধ্যেই আটকে থাকতে বাধ্য হলে তখন একটা সময়ে এর কালচারাল প্রভাব হয় মারাত্মক। যেমন – স্বল্প আয়ের পরিবার বলে, এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার রান্নার তেল কিনে একেকবার আধাছটাক করে। তবে তা নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। কিন্তু সে সেটা কী করতে কিনে এটা গুরুত্বপুর্ণ। সে কিনবে পকেটে করে শিশি নিয়ে গিয়ে। কেন? কেউ যখন তা কিনে বাসায় ফিরবে, তা যেন পড়শি পরিবারের কেউ দেখে না ফেলে যে এত অল্প করে তেল কিনে। যার মানে তার অর্থনৈতিক অবস্থার আসল লেভেল কোনটা। কেন এমন হয়?
    কিন্তু  তাঁর পড়শিও কি তার মত একই লেবেলের অর্থনৈতিক জীবনমানের মানুষ নয়? অবশ্যই। আসলে তারা নানা সামাজিক আসরে ওসব পড়শিরা পরস্পর পরস্পরের কাছে ভান-ভণিতায় শো করে গেছে ও যায়। তারা সবাই ভনিতা করে দেখাতে চায় যে তাদের জীবনমান অনেক ভালো বা উঁচু। আর এমন করে দেখানোতে সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘শো-আপ’ হল যখন তারা পরস্পরকে শো-আপ করে এই বলে যে, তাদের জীবন নিয়ে তারা খুবই খুশি, খুব ভালো, সুখে আছে তারা। সে কারণে এই মিথ্যা শো-আপটার সাথে আধাছটাক তেল কিনে আনাটা যায় না, মিলে না বলেই সে পকেটে শিশি ঢুকায়! সব ঢেকেঢুকে ভণিতা করতে চায়। অথচ যেটা সবাই জানে আর যেটা পড়শি সবারই কমন অবস্থা সে্টা নিয়ে আবার একে অপরের কাছ থেকে লুকানোর চেষ্টার কী আছে? কিন্তু এথেকে সম্ভবত গভীর ক্ষতের দিকটা হল, এখন এই যে শো-আপ এটি সম্ভবত মধ্যবিত্তের একটি ‘জাতীয় কালচারে’ পরিণত হয়ে গেছে। ফরমাল স্টাডি করলে আর এরকম অনেক লক্ষণও নিশ্চিয় পাওয়া যাবে! তাই, যেন এই হল ভান-ভনিতার ভারত!  এটাই সম্ভবত ভারতেরই আরেকটা দিক-বৈশিষ্ঠ;  – নেহেরু-ইয়ান ভারতের কমিউনিস্ট ইকোনমির স্থায়ী ছাপ বৈশিষ্ঠ।

    এর কী কোনই পরিবর্তন নাই?
    অবশ্যই হয়েছে খানিক আর্ধেক, তবে যা একবার কালচারে ঢুকে যায় তা সহসা বের হয় না। ভারতের ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর গান্ধী পরিবারের বাইরে নরসীমা রাও প্রথম ও নতুন প্রধানমন্ত্রী হন। আর তারই অর্থমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। কিন্তু ততদিনে আগের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী  (শ্রীলংকার এলটিটি ইস্যুতে তাদের হাতে খুন হয়েছিলেন তিনি) মৃত্যুর অনেক আগে তিনি জেনে গিয়েছিলেন, দাদামশাই নেহরু গ্রেটেস্ট কমিউনিস্ট আকামটা কী করেছিলেন; কারণ এর আগেই মনমোহন অনেক দিন সেন্ট্রাল  ব্যাংকের গভর্নরসহ ভারত সরকারের নানা অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সব পজিশনের দায়িত্বে তিনি ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীবকে সমস্যার গোড়া বুঝানোর সুযোগ নিয়েছিলেন। যাতে, নেহরুর কথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির কাঠামোটা ফেলে এর সংস্কারই একমাত্র সমাধান এতে তিনি রাজি হন। এরই মধ্যে ১৯৯০ সালে ভারত “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতির মুখে পড়ে যায়। ফলে আইএমএফ লোনের দ্বারস্থ হয়ে মুক্তেতি খুজতে নামতেই হয়। কমিউনিস্ট অর্থনীতির বেকুবিপনা আর অচলতা উদোম হয়ে যায়। এ কারণে পরের বছর নতুন সরকারে  ড. মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হয়ে সংস্কার শুরু করেছিলেন সহজেই, প্রায় বিনা বিতর্কে।
    এদিকে পরবর্তীতে নতুন শতকে, তত দিনে চীনেরও অর্থনীতি ভালভাবেই ডাবল ডিজিট গ্রোথে প্রবেশ করেছে। ফলে “ডেভেলপড” অর্থনীতির উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে “রাইজিং ইকোনমির’ দেশ বলে নয়া টার্ম চালু হয়। দুনিয়ার বড় জনসংখ্যার দেশ হিসেবে চীন (১৩৯ কোটি) সবার উপরে আর তার পেছনে ভারত (১৩৫ কোটি)। এমন জনসংখ্যা বেশির দেশে অর্থনীতি খারাপ থাকলে ওদেশের লোক কম ভোগ করলেও অর্থনীতিটা সাইজে বড় গ্রুপে গিয়ে পড়ে। চীনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটাও  তাই-ই। তবে ততদিনে চীন শুধু জনসংখ্যাতেই বড় নয়; আবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল [যেটা চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস]। চীনের সাথে ভারতের কেবল ফারাকটা ছিল যে, জনসংখ্যাতেও ভারত বড় অবশ্যই তবে চীনের মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ ভারত তখনো নয়। তখনো নয়। এটাই আবার বিশাল ফারাক টেনে দিয়েছে কারণ চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে বলে সেই-ই গ্লোবাল নেতা হতে পারবে। ভারত নয়। সুতরাং বড় জনসংখ্যাই সবকিছু না। কিন্তু পটেনশিয়াল দেশ মাত্র। কিন্তু ওদেশের সরকারের কোনো লোভী বা ওভার-এস্টিমেটেড সিদ্ধান্ত দেশের সব সম্ভাবনা শেষ করে দিতে পারে। তবে সে যাই হোক  ঐ সময়ই এই “রাইজিং ইকোনমি” টার্মটা চালু হলে ব্যাপারটা আমেরিকার নজরে আসে।

    এমনিতেই নাইন-ইলেভেনের হামলার পাল্টা, আফগানিস্তানে আমেরিকার হামলার পক্ষে বিভিন্ন দেশের সমর্থন নিতে গিয়ে ২০০২ সালের মধ্যে কথিত “সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে” ভারত ও আমেরিকা, তাদের মধ্যে আঁতাত হয়ে যায়। ইসলামবিদ্বেষীভাবে কাদের ও কিভাবে সন্ত্রাসী বলবে, তা ঠিক হয়। আর সাথে “রাইজিং ইকোনমি” বিষয়ে ভারতের সাথে কাজ করার গ্রাউন্ড তৈরি করাও শুরু হয়েছিল। এখান থেকেই এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতির দু’টা দেশ চীন ও ভারতকে একসাথে মোকাবেলা করতে না গিয়ে, বরং একটাকে আরেকটার বিরুদ্ধে খাড়া করতে ভারতকে প্রলোভন ও প্রশ্রয়ের পিঠে হাত রাখার পরিকল্পনা করেছিল আমেরিকা। এখান থেকেই ভারতের পিঠে হাত রেখে ‘চীন ঠেকানোর’ পরিকল্পনা ও তৎপরতার শুরু। আর তাতেই তারা লোভী করে তুলেছিল ভারতকে, য়ার এতে ভারতের মাথা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে যায়।

    সাধারণভাবে বললে, একাজটাকে বলে ভারতের ইন্টেলেজেনশিয়ার (একাদেমিক প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা, চিন্তাচর্চায় জড়িত যে জনসংখ্যার অংশ) উপরে চিন্তায় প্রভাব-দখল নেয়া।   একাজটা আমেরিকা করেছিল কিছু আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে, কিন্তু কয়েকভাবে। ভারতে  আমেরিকান ওসব থিংকট্যাংকের এক্সটেন্ডেড শাখা খুলে অথবা প্রতিষ্ঠান বা এনজিও খুলতে ফান্ড দিয়ে এবং এক চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন দিয়ে একাদেমিক পেশায় জড়িত এমন এবং এছাড়াও হায়ার স্টাডিতে আগ্রহীদের তাদের প্রলুব্ধ করে। আর দ্বিতীয়টি হল, স্কলারশিপ বিতরণ। হায়ার স্টাডিজে আকাঙ্খীদের (মাস্টার্স বা পিএইচডি) স্টুডেন্টদের স্কলারশিপ দিয়ে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের অংশ করে নেয়াটা এর লক্ষ্য; যাতে তারা বিশ্বাস করতে ও প্রচারণা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। ( এবারের  হোয়াইট হাউজ কোয়াড মিটিংয়ে বাইডেন আবার এমন এক স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।) এ বিষয়ে প্রথম কথাবার্তা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সাল থেকেই, মনমোহন সিং প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হলে। আর পরে চুক্তি হয়েছিল ২০০৬ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফরকালে।  ভারতে সেই প্রথম থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল। তবে করুণ ব্যাপারটা হল,   সে সময় ভারতের নীতি নির্ধারকেরা ব্যাপারটাকে দেখেছিল এভাবে যে নিজেকে আর থিংকট্যাংক খুলতে পয়সা খরচ করতে হলো না, এমনই সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে। এছাড়া আরও দিকটা হল, আমেরিকার কাছে গুরুত্ব পাওয়ায় নিজে বিরাট কিছু দামি হয়ে গেছে বলে ওভার-এস্টিমেশন;  অর্থাৎ ফিরে  সম্ভবত সেই ভান-ভনিতার দিন এতে আরো জেঁকে বসেছিল মনে করা যেতে পারে।

    আসলে সেকালের ভারতে থিংকট্যাংক বলতে সামরিক বাহিনীই নিজ বাজেট থেকে অর্থ নিয়ে আর সেনা এক্সটেনডেড প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমিতভাবে চালানো কিছু স্টাফ দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান খাড়া করে রেখেছিল। বাজেট স্বল্পতা থাকলে  একটা প্রতিষ্ঠান যেমন হয় তাই। আমেরিকান বয়ান ভারতে প্রবেশ করেছিল এভাবেই এর  সুযোগ নিয়ে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, একটা বয়ানে এসবের সমন্বয়ের নিয়ম স্ট্রাকচার তারা চালু করেছিল তখন থেকে। সেটা সম্ভব হয়েছিল যেসব কারণে যেমন, এরপর থেকে ভারতে থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় কারণ সেটাই ছিল  নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান; কারণ থিংকট্যাংকগুলোর প্রতিটি প্রোগ্রাম এই মন্ত্রণালয়েরই অনুমোদন ও পূর্বানুমতিপ্রাপ্ত। ফলে সমন্বিত। আর থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে তখন দেখা যেওত যেমন সরাসরি সরকারি,  অথবা একমাত্র (ব্যবসায়ীদের দেয়া দাতব্য অনুদানে চলা) ওআরএফ [ORF] আর এবার এসবের সাথে আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা বা ফান্ডে চলে এরা এবং ভারতীয় ব্যক্তিত্ব যারা আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো [fellow] হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এমন যারা আমেরিকায় বা ভারতেই থাকেন। এতে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয় ও আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট (আমেরিকান থিংকট্যাংকসহ) যেটা সমন্বিত অবস্থান একেক সময়ে নেয়, সেটাই সংশ্লিষ্ট সবার উপর কার্যকর হয়, তাই সবার কমন অবস্থানের গাইড লাইন হয়। তবে ট্রাম্প আমলে এসে তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে এসব স্কলারশিপ এবং এনজিও ফান্ড সব বন্ধ বা খুবই সীমিত হয়ে যায়। তবুও আমেরিকা্নর নিজের থিংকট্যাংকঅগুলোর তৎপরতা খুবই সক্রিয় থেকেই গেছিল মূলত মন্ত্রী জয়শঙ্করের কারণে, যাকে আড়ালে ভারতের সবচেয়ে বড় আমেরিকান থিংকট্যাংকের এজেন্ট বলেন অনেকে। ওদিকে আমেরিকান স্বার্থে স্কলারশিপের ভারতে বসে মূল অনুমোদনদাতা ভারতীয় যে মূলত আমেরিকানদের প্রধান লোক সে তখন থেকে ভারত ছেড়ে সিঙ্গাপুরে গিয়ে চাকরি নিয়ে আছেন। তখন থেকে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক তৎপরতা কিছুটা ঝিমিয়ে ছিল। বাইডেন সম্ভবত চাচ্ছেন সেটিকে সবার আগে আবার চালু রাখতে। এই ব্যাপারটা এমন বিস্তৃত বলার পিছনের কারণ এটাই। কোয়াড নাই ঠিক তা হবে না সম্ভবত তবে, গুটিয়ে যাচ্ছে এর সব লক্ষণ এভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু বাইডেনের এখনও দরকার ভারতের চিন্তাশীল কর্তাদের চিন্তার উপর প্রভাব। তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারার সক্ষমতা যাতে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের নিচে তারা চাপা থাকে।

    এই অংশটা এত বিস্তারিত বললাম আর এক এজন্য যে, এবারের মোদীর হোয়াইট হাউজ সফর শেষে অথবা বলা যায়  – এবার কোয়াড-এরই এক সতীন প্রতিষ্ঠান অকাস [AUKUS] খাড়া হওয়াতে, উপেক্ষিত বোধ করা ভারতের ক্ষোভ-অভিমান যা ক্রমেই বের হয়েই চলেছে তাতে মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম আমেরিকান বয়ান ভারতের আবার নীরবে খেতে, মেনে চলতে ভারত কেউ কেউ আপত্তি তুলবে; যেটা আবার হয়ত আর্থিক সুযোগ সুবিধা পেলে চুপ করে যাবে।  অর্থাৎ সেটা যেভাবেই নতুন রূপ নেক না কেন – এটাই হবে আফগানিস্তানে তালেবানে উত্থানের বাইরে আরেক প্রায় ২০ বছরের ঘটনার পরিসমাপ্তি। এর পুরনো ‘সেটিংসের’ এবার ভেঙে পড়ার ঘটনা হবে এটা। এককথায় এটাই ভারত-আমেরিকার এত দিনের থিংকট্যাংক সম্পর্কে  বদল। তা একেবারে ভেঙ্গে যদি নাও পড়ে এতে মোচড় আসার মত তা বদলে যেতে বাধ্য।

    এমন কোথায় কোথায় এখন ভারতের আঘাত লাগবে এর একটি তালিকা (না আমার করা নয়)  পাওয়া যায় – হর্ষ ভি পন্থ [Harsh V. Pant] -এর লেখা থেকে। পন্থ মূলত লন্ডন কিংস কলেজের অধ্যাপক। কিন্তু  ভারতে সক্রিয় সবচেয়ে বড় থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তিনি ডিরেক্টরও।  আর তিনি এবার তাঁর লেখাটা ছাপতে দিয়েছেন আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’-তে।

    ফরেন পলিসি (আমেরিকান এলিটদের পত্রিকা ফরেন অ্যাফেয়ার্স নয়। দু’টিই কাছাকাছি নামের বলে ভুল বোঝা থেকে সতর্ক করতে একথা বলছি। এই পত্রিকার পজিশন আগে যাই থাক না কেন, বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এই পত্রিকাটা এখন বিশেষভাবে বাইডেন-অ্যাসাইন্ড এক পত্রিকা। সাধারণভাবে পত্রিকাটা বাইডেনের অঘোষিত এক পাবলিক মুখপাত্রের মত তার সব পলিসির পক্ষে প্রচার করতে তো দেখাই যায়, এটাই এর অবস্থান। এছাড়াও  বিশেষত আরেকটা দিক হল,  আমেরিকান প্রফেসর কুগেলম্যান [Michael Kugelman]; তিনি আসলে  Deputy Director of the Asia Program  at the Wilson Center] এটা একটা প্রভাবশালী আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক। তাঁকে এখানে হায়ার বা নিয়োগ করা হয়েছে। আর তাঁকে কেন্দ্র করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাইডেনের নীতি-পলিসির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহে [ এশিয়ার দেশগুলোতে বাইডেনের স্বার্ত্থ সংশ্লিষ্ট] চার-পাঁচটি দেশে কী ঘটছে বা বাইডেন কী ঘটাতে যাচ্ছেন তা নিয়ে সরাসরি কুগেলম্যানের (চার-পাঁচ পাতা, ২০০০ অক্ষরের) মন্তব্য এ পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। যার শিরোনাম weekly South Asia Brief। উল্টো করে বললে এতে – কুগেলম্যানের মন্তব্য থেকে বাইডেনের মনোভাবের কিছু হদিস মিলা সম্ভব।
    এই ফরেন পলিসি পত্রিকাতেই হর্ষ পন্থের ভারতের ক্ষোভের তালিকাসমৃদ্ধ লেখাটার [শিরোনামঃ- The U.S.-India Relationship Is the Quad’s Litmus Test ] ছাপা হয়েছে। এই আক্রমণাত্মক শিরোনামের ভাবানুবাদ টা হবে এমন – “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের টিকে যাওয়া এই কোয়াড টিকে কি না তার ভাগ্য পরীক্ষা”। এছাড়া এলেখায় তিনি এশিয়ায় আমেরিকা তার বিদেশনীতি বদলে ফেলেছে বলে আমেরিকাকে অভিযুক্ত করেছেন [……as the United States makes a foreign-policy shift in Asia. ]। এমনকি খুবই কড়াভাবে ভারত-আমেরিকা বিরোধের কথা উল্লেখ করে আবার- এটিকে ‘কনফ্লিক্টিং অব প্রায়োরিটি’ ক্যাটাগরিতে ফেলেছেন। ব্যাপারটা অনেকটা একবার ছেড়ে দিয়েছেন বলে হুমকি ও ভাব করে আবার ধরে রাখছেন – এমন।

    India has a vital role to play in each area, but it also has many unresolved differences with the United States, such as their vaccine supply chain issues, approaches to climate policy, and conflicting priorities regarding Taiwan and Pakistan.

    অর্থাৎ নাম ধরেই বলেছেন, “ভারতের প্রায়োরিটি পাকিস্তান”। প্রথমত তিনি স্বীকার করছেন ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে।  কিন্তু এটা তো  কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – যেখানে আগে পড়ে বলে কিছু নাই।  মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার  পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না।  ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে  “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

    হর্ষ পন্থ স্বীকার করছেন, কোয়াডে ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে।  কিন্তু এটা তো  কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – আগে পড়ে বলে কিছু নাই।  মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার  পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না।  ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে  “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

    পন্থের কথাটি জমেনি বা অর্থ হয়নি। অনেকটা জোর করে মিলিয়ে বলা। আগে-পড়ে বলে কিছু না থাকলেও সেটা দাবি করা। পন্থ কামনা করছেন, আসলে পাকিস্তানের কথা, ঠিক যেভাবে গত প্রায় বিশ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের  অসৎ বয়ান ঠিক রাখার স্বার্থে  ভারতকে তোষামোদ আর পাকিস্তানকে চাপের মধ্যে রেখে গেছে – সেটাই, সেই সুখের দিন ভারত ফেরত চাইতেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল  তালেবান ইস্যু কি কেবল ভারত-পাকিস্তান ইস্যু? তা তো কখনো নয়, কারণ এতে খোদ বাইডেনের আমেরিকার স্বার্থই (এবং সক্ষমতাও) তো সবার চেয়ে বড়। আর বাইডেনকে অন্তত  সেনা ফিরিয়ে নিয়ে আমেরিকার প্রতিদিনের ৩০০ মিলিয়ন ডলার বাঁচাতেই হত। সেটা পরোয়া না করে বাইডেন কেবল ভারতের ইচ্ছার পক্ষে কাজ করবে  এটা আশা করাটাই যে করে তারই সমস্যা! এটা না বুঝার তো কিছু নেই। কিন্তু পন্কেথ বা ভারত এভাবে ভাবে কেন? কেন এমন করছে? এটাই, এই যে সবসময় এই ওভার-এস্টিমেশন, বড় মনে করে — মুই কী হনু রে — যে আমি অনেক দামী এই ফুটা দেমাগ ইত্যাদি – এটাকেই তো ভান-ভনিতার ভারত বলেছি! অতএব, ভারত এখন যত দাম মানে অহেতুক যতই দাম দেখাবে ততই এই দুরত্ব বাড়তে থাকবে যা শেষ পর্যন্ত খুবই খারাপ জায়গায় – উইঘুরের মত, এই আমেরিকাই ঘুরে গিয়ে ভারতের কাশ্মীর ইস্যুতে আচরণ, মানবাধিকার নিয়ে ভীষণ চাপে ফেলতে পারে!  এসব দিক নিয়ে ভারতের ভিতরেই বুদ্ধিমানেরা ইনার আলোচনা শুরু করেছে!

    ক্ষুব্ধ ভারতের চেয়েও বাইডেনের এখনকার বড়  মাথাব্যথা হল চীনের সাথে আপোষে বসাঃ
    এদিকে আমেরিকার চিন্তার জন্য কেবল ভারতের ক্ষোভই ‘একমাত্র’ নয়। এর থেকেও নিঃসন্দেহে  এখনকার বড় বাইডেনের মাথাব্যথা হল চীন। না নতুন করে আমেরিকা-চীনের কোন বিরোধ এটা নয়; বরং তা থেকে ছুটবার আলো এটা। আসলে এটা চীনের সাথে আমেরিকার ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ যেটা ট্রাম্প শুরু করে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তা থেকে সব ধরনের যুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম বা সম্ভাবনা। আর ক্ষমতা ত্যাগের আগে ট্রাম্প বড়াই করে বলে গিয়েছিলেন যে, তার দেখানো পথই বাইডেনকে অনুসরণ করে যেতে হবে। কারণ এমন ‘শক্ত বাঁধন’ তিনি দিয়ে যাচ্ছেন।

    আমরা (অন্তত আমি নিজে) অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, বাইডেনের শপথের পরে বোকা হয়ে এই ইস্যুতে ট্রাম্পকেই অনুসরণের নীতি অনুসরণ করতে গেলেন। আর তাতে চীনের সাথে আলোচনার ‘আলাস্কা বৈঠকে’ই সব শেষে, এমনকি মারামারি লাগার অবস্থা। সেই থেকে বাণিজ্য যুদ্ধ বা আলোচনা একেবারেই বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু বন্ধ থাকলে যা হয়, চীন-আমেরিকা যত ধরনের শত্রুতা সম্ভব তা ক্রমশ ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল।

    গত মাস থেকেই পরিস্কার বাইডেনের অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির চাপের মুখে। এনিয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  আর তিন ডজন ব্যবসায়ী ফেডারেশন কর্তৃক বাইডেনকে লিখিত অনুরোধ যে, চীনের সাথে বাণিজ্য আলাপে চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক সরাতে যেন দ্রুত  চীনের সাথে আলোচনা শুরু করা হয়।এছাড়াও,   মিডটার্ম নির্বাচনে নিজ ডেমোক্র্যাট দল হারবে এই পূর্বাভাস দেখে [এই সব প্রসঙ্গ আমার আগের লেখার বিস্তারিত আছে] বাইডেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ফোনে কথা বলেন। অনেকে বলছেন এতে শি জিনপিং শর্ত দিয়েছেন; অনেকে বলছেন, তিনি আবার বাণিজ্য আলোচনা করতেই চাননি।

    আর বাস্তবে আমরা দেখছি আলোচনা ফের শুরু করার পরিবেশ সৃষ্টির নামে বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে- উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বয়ান ঘুরে যাওয়ার ইঙ্গিত, হংকং বা তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ ঢিলা করা,  হুয়াওয়ে ফোনের সিএফওকে ‘মেঙ’ -কে তিন বছর ধরে কানাডায় আটকে রাখার পরে বন্দিবিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়াসহ  আপোষনামার বা পরিবেশ সৃষ্টির তালিকাটা অনেক লম্বা মনে হচ্ছে।  সব কিছু শুরু হয়েছে। তা হলে হুয়াওয়ের ফাইভ-জি টেকনোলজিতে অবরোধও কি তুলে নেয়া হবে; চীনে পশ্চিমা মাইক্রোচিপস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞাও কি? এটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে? মনে হচ্ছে ন্যাংটা করে ফেলবে বাইডেনকে। কারণ, তার বিপদটা ঘরেই। বাইডেন খারাপ অবস্থা হল  মিডটার্ম  নির্বাচনে ও অর্থনীতিতে!

    মূল্কথাটা হল, প্রেসিডেন্ট শি, আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমেরিকার  দিক থেকে  যা কমানো সম্ভব এমন বাহ্যিক টেনশনগুলো কমানোর মত পদক্ষেপগুলো নিতে বলেছে। বাইডেনও এই সারকথাটাই মিডিয়ায় জানিয়েছে। তাই বলে এর লিস্ট কত বড় বা তাতে কী থাকবে তাকিছু বাইডেন বলেন নাই।

    তবে বাইডেন-শি এর আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির নামে এখনই এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লিস্ট যত লম্বা হবে ততই আমেরিকার উপর ভারতের ক্ষোভ  আরো বাড়বে বলেই অনুমান! কারণ বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই ভীত মোদীর কামনা ছিল চীন-আমেরিকা সম্পর্ক যত তিতা হবে, তা মোদীর জন্য ভালো। কারণ যাতে সেই তিতা সম্পর্কের আড়ালে কমলা হ্যারিসের মুখ দিয়ে তোলা বাইডেনের ভারতের বিরুদ্ধেও মানবাধিকারের খারাপ রেকর্ডটা (কাশ্মিরের স্ট্যাটাস, ভারতজুড়ে মুসলমান নিপীড়ন ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রভৃতি) চাপা পড়ে যায়।

    দুনিয়া আসলেই আর আগের মতো সব সম্পর্কে থাকছে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০২ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কোয়াডে ভারত-আমেরিকা অভিমান!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    গৌতম দাস

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3IU

     

              AUKUS : security pact leaves Australia exposed

    [সার-সংক্ষেপঃ আমেরিকা এশিয়ায় এবার এক নতুন জোট খুলেছে। এটা সামরিক জোট নাম AUKUS। অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – এই তিন দেশের ইংরাজি নামের আদ্যক্ষর দিয়ে, ত্রিদেশীয় এই নয়াজোটের নাম ঠিক করা হয়েছে।  এটা যতটা না সামরিক জোট তার চেয়ে বেশি অষ্ট্রেলিয়াকে চীনের মুখে ফেলে দিয়ে আমেরিকা-বৃটেনের ওর ঘাড়ে চড়ে পিছনে দুরে বসে থেকে পরমাণূ অস্ত্রের ব্যবসা করে নেয়া। এছাড়া আবার এটা এমনই অষ্ট্রেলিয়া যার ভৌগলিক অবস্থান চীনের হাতের নাগালেই আর তার চেয়েও বেশি বিপদের হল অষ্ট্রেলিয়ার ইকনমি দাঁড়িয়ে আছে চীনে রপ্তানি করতে পারার উপরে। তবে গত ২০১১ সাল থেকে আমেরিকার এটা চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে খামোখা লড়বার তৃতীয় উদ্যোগ।  আগের ‘পিভোট এশিয়া’ আর ‘কোভিড’ এর ব্যর্থতার পরে এটা আরেক নয়া উদ্যোগ। এটাও ব্যর্থ হবে, কারণ এশিয়ার চীনের সাথে সীমান্তবিরোধ যাদের আছে তারাই যুদ্ধ চায় না, সমাধান মনে করে না। কাজেই চীনের সাথে সীমান্তবিরোধের কথা তুলে এর আড়ালে আমেরিকান যেকোন স্বার্থ আদায় করা অসম্ভব। এর উপর তা যদি যুদ্ধ-কেন্দ্রিক আমেরিকান বুদ্ধি হয় তবে এর কোনই ভবিষ্যত নাই।
    এবার সরাসরি যদি প্রশ্নটা করা হয় এই জোট মানে অর্থনৈতিকভাবে, এটা ৫০-৯০ বিলিয়ন ডলারের এক ঋণশোধের দায় যা একা অষ্ট্রেলিয়ার উপর চাপিয়ে  দেওয়া হল। তাহলে এই অর্থনৈতিক দায়ের রিটার্ণটা কোথা থেকে আসবে? সেপ্রশ্ন এখনও উহ্য থেকে গেছে। এছাড়াও উলটা এই জোট নুন্যতম ফাংশনাল হলেই চীনে যতটুকু রপ্তানি বাজার অষ্ট্রেলিয়ার এখনও যা আছে সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে বা অন্য কেউ তা দখলে নিবে। এতে অষ্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি আরো দ্বিগুণ চাপে পড়বে। তখন অষ্টেলিয়াকে উদ্ধার করবে কে? কেউ জানে না। অর্থাৎ মাটিতে পা রেখে এসব দায় অষ্ট্রেলিয়া প্রধানমন্ত্রী মাথায় নিয়েছে মনে হয় না।
    অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধ বা প্রভাব সামরিক সক্ষমতা দিয়ে জিতে যাওয়া বা টপকে গিয়ে সমাধান করা যায় না। এছাড়া পারমাণবিক টেকনোলজি মানবজগত থেকে প্রত্যাহার করে ফেলার যুগে নতুন করে এশিয়ায় পারমাণবিক সাবমেরিন দিয়ে যুদ্ধ সাজানোর প্রচেষ্টা একেবারেই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন। একদিন এজন্য বাইডেন আর বরিস কাঠগড়ায় উঠবেন, অবশ্যই! ]

    _

    মূল লেখা শুরু এখান থেকেঃ

    ইংরেজি ওভারল্যাপ [overlap] মানে একজনের কোলে আরেকজন। মানে যেমন একটা জোটে থাকা অবস্থায় সেখানেই আরেকটা আরো কিছু অন্যদের সাথে জোট খুলে বসাটা হবে ওভারল্যাপিং জোট। হ্যাঁ, ঠিক তাই ঘটিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এশিয়ায় আগের কোয়াড জোটের বাইরে আরেকটা ত্রিদেশীয় জোট খুলেছেন। আর এই ঘটনাটা আমাদের দিক থেকে দেখলে,  এতদিনে এনিয়ে আগ্রহীরা যখন জানল, কোয়াড জোট মানে কী ও কারা এরা। এ ছাড়া সবাই যখন ভাবছিল তারা এশিয়ার গ্লোবাল মেরুকরণ বুঝতে শুরু করেছে। ওদিকে আমেরিকা যখন আমাদের বাংলাদেশকে কোয়াডে ঢুকানোর জন্য চাপাচাপি করছিল এরই মাঝে ঠিক এমন সময় আরেক ফ্যাসাদ হাজির হয়েছে। বাইডেন নতুন আরেক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন গত বুধবার ১৫ সেপ্টেম্বর যার বিস্তারিত ঘোষণা এবং তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া দেয়া এখনো শেষ হয়নি। এরপর বিস্তারিত তথ্য আর বুঝাবুঝি শেষে তাৎপর্য বর্ণনা পশ্চিমেই এখনো তেমন শুরুই হয়নি। এমনই প্রাথমিক অবস্থায় এখন আমরা।

     AUKUS বা এইউকেইউএসঃ
    AUKUS এই হলো নয়া জোটের নাম। যে নামটা ভেঙে ভেঙে লিখলে হয় A-UK-US; মানে হল অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – হল সেই ত্রিদেশীয় এক নয়াজোট। সবচেয়ে বড় কথা, জন্ম-ঘোষণার শুরু থেকেই এরা পরিষ্কার যে, এটা সামরিক জোট।  মানে যেমন অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইন্ডিয়া আর আমেরিকা – এই চার দেশীয় ‘কোয়াড’ নামের জোটের মত – এবার নতুনটা সামরিক নাকি বাণিজ্যিক জোট এ নিয়ে কোনো তর্কই নেই। কোয়াড নাকি কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক কোনোটাই নয়, এমন না  না করতে করতে এখন বলে এটা এক স্ট্র্যাটেজিক জোট। এসব ধানাই-পানাইয়ে এই নয়া জোটের বেলায় নাই। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিনে সমৃদ্ধ করতে  নয়াজোটের বাকি দু’দেশ বৃটেন-আমেরিকা  ভুমিকা নিবে; এমন করে যাত্রা শুরু করার এক জোট হবে এটা; এমনটাই তাদের আপাতত বলতে শোনা যাচ্ছে। তবে তাও আবার ডিজেলে চলা ও ধোঁয়া ছাড়া সাবমেরিন নয়, এটা নাকি একেবারে পরমাণু অস্ত্র ও জ্বালানিতে চালানো এমন সমৃদ্ধ সাবমেরিন বহর হবে। অর্থাৎ এটা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন (n-sub) হতে যাচ্ছে যেটা আবার নিউক্লিয়ার বোমা বিবার অপশন থাকলেও আপাতত তেমন কোন বোমা থাকবে না অষ্টেলিয়া জানিয়েছে।   SSBN বা নিউক্লিয়ার ব্যালেস্টিক অস্ত্র বহণকারি গোত্রের।

    ইতোমধ্যেই পশ্চিমা এক্সপার্টেরা অল্প ক’জন যারা এই জোট নিয়ে মুখ খুলেছেন তারা বলা শুরু করেছেন যে এতে এশিয়াতে এখন আগের অন্যান্য জোট উদ্যোগগুলো মিলিয়ে যাবে আর এই নয়া জোটকে কেন্দ্র করে এশিয়ামুখী পশ্চিমা দেশেরও ব্যাপক মেরুকরণ শুরু হবে; যদিও যারাই ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাতে লক্ষণ তেমন নয়।

    এর প্রথম তাৎপর্য হল, যে ওভারল্যাপিং-এর কথা বলছিলাম, আগের কোয়াড যা এখনো বেঁচে আছে বলে জানি, তা থাকা সত্বেও পুরান কোয়াডের দুই সদস্য অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা এই নয়া সামরিক জোট খুলেছে দেখা যাচ্ছে তবে সাথে ব্রিটেনকে নিয়ে। তাতে এখন বাকি দু’জন কোয়াড সদস্যের কী হবে?

    কৌতুকের কথা হলো, কোয়াড এমন এক জোট যার সদস্য দেশের চার প্রধান কখনো একসাথে মুখোমুখি মিটিংয়ে বসেননি। কেবল এই গত মার্চ ২০২১ তে একবারই বসেছিলেন অন-লাইনে, মানে ভার্চুয়ালি। তবে এবার  আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মানে এ’মাসেই  আমেরিকায় হোয়াইট হাউজে প্রথম মুখোমুখি কোয়াড রাষ্ট্রপ্রধানরা বসতে যাচ্ছেন। এই মিটিংয়ের সেই অভাব সম্ভবত পূরণ হতে যাচ্ছে। তবে সেটা কারো কারো জন্য শেষ মিটিংও হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন সেখানে বৃটেনসহ তাদের গড়া নয়া জোটে যোগ দিতে কোয়াডের বাকি দু’দেশকে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দেবেন। তবে জাপানের কনস্টিটিউশনে ও ১৯৬০ সালের আমেরিকার সাথে করা এক সিকিউরিটি চুক্তি অনুসারে জাপানের পারমাণবিক তৎপরতায় যুক্ত হতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে বলে সম্ভবত জাপান এমন জোটের সদস্য হতে বাধা পাবে। তাহলে আর ভারতের বেলায় কী হবে?

    ভারত কী করবে?
    কিন্তু আগেই এ নিয়ে আমাদের বোঝাবুঝির কাজ কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে এক রাশিয়ান মিডিয়া স্পুটনিক [SPUTNIK] । স্পুটনিকের সে নিউজের শিরোনামটাই অনেক সাংঘাতিক। শিরোনাম হল – “ভারতের জন্য বার্তা? নয়া জোটের ঘোষণায় কোয়াডের অস্তিত্ব আর আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে” [Message for India? AUKUS Announcement Sparks Debate About Relevance of Quad, Reliability of US]।  কিন্তু স্পুটনিক কেন এমন শিরোনাম করল? কারণ, স্পুটনিক লিখেছে এই নয়া জোটের খবর ভারতের বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোড়ন ও তর্ক তুলেছে। তারা ভালোভাবে নেননি। কিন্তু এত তর্ক উঠছে কেন?

    কারণ তাঁরা সবাই ভারতের মনের আসল ইচ্ছাটা আগে থেকেই জানেন। আর তা হল, যতই মুচড়ামুচড়ি করুক, শেষে ভারত কারো সামরিক জোটে কখনো যাবে না। তাই তারা বলছেন, এই  “অনিচ্ছুক” [New Delhi’s “reluctance”] ভারতের খবর তো বাইডেনের আমেরিকার অজানা নয়। তাহলে বাইডেনের এই নয়া জোটের ঘোষণার অর্থ তাঁরা করছেন এভাবে যে, বাইডেন তাহলে ভারতকে ছেড়ে অন্যান্য সম্ভাব্যদের নিয়ে এশিয়ায় অন্য কিছু খুঁজতে নেমে গেলেন। তবে, স্পুটনিক এখানেই না থেমে আরেক ধাপ এগিয়েছে। ভারতের এক সাবেক নেভি অফিসার শেষাদ্রি ভাসান [Seshadri Vasan] যিনি এখন চেন্নাইভিত্তিক এক থিংকট্যাংক [Chennai Centre for China Studies (C3S)] পরিচালনা করেন, তার সাথে এ নিয়ে কথা বলে তাঁর বয়ান সংগ্রহ করেছে। শেষাদ্রি স্পুটনিককে বলছেন, “ভারত বারবার জানিয়েছে, সে কোয়াডকে কোনো সামরিক জোট হিসাবে দেখে না, বড় জোর এক নিরাপত্তা স্বার্থবিষয়ক গ্রুপ হিসাবে ভারত দেখতে চায়”। এছাড়া তিনি বর্ণনা করে বলেছেন যে যেমন “তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কোনো সামরিক সঙ্ঘাত দেখা দিলে ভারত সেক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে কোনোরকম সামরিকভাবে জড়িত হতে অনিচ্ছুক” […also shown its reluctance to get militarily involved on the side of the US in case there is any conflict in the Taiwan Strait or the South China Sea for that matter]। তাই তাঁর ধারণা আমেরিকা নিশ্চয় (ভারতকে ছাড়া) অন্য আগ্রহী পার্টনার খুঁজছিল।

    আসলে সত্যিকারভাবে বললে, ‘ভারতের অবস্থান সবসময়ই ছিল এমন যে “মাংসের ঝোল খাবো কিন্তু মাংস খাবো না” ধরণের। অর্থাৎ নিরাপত্তাবিষয়ক গ্রুপ- জোটে থাকব কিন্তু ‘সামরিক অ্যালায়েন্স’ এমন জোটে থাকব না। তাহলে নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো গ্রুপের জোটেই বা ভারতের থাকার দরকারটা কী? আবার বাস্তবে  তাহলে কোয়াডের অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ায় ভারতের অংশ নেয়ারইবা দরকার কী? এর অর্থই বা কী? এটা কি সামরিক তৎপরতায় যোগ দেয়া হয়ে যায়নি?

    এমনকি সাউথ চায়না সি-কেন্দ্রিক কোয়াড জোট যে এলাকার সমুদ্রসীমা বিতর্ককে উসিলা করে গড়ে তোলা হয়েছে সেটা ভারতের কোনো সীমান্ত বা ভুমির কাছাকাছিও নয়, কোনো স্বার্থও নাই সেখানে। সেই কোয়াড জোটে তাহলে ভারত যোগ দিতে দৌড়াল কেন? আসলে কোয়াডকে একটা চীনবিরোধী জোট দেখেই ভারত ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু ওদিকে এবার ‘শুধু ঝোল খাবার পণ’ করে রাখাতে এখন ভারতের মনে যা ছিল-আছে তা বাইরে উদাম হয়ে বের হয়ে আসছে।

    তবে শেষাদ্রি আরেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারত কোয়াডে থাকবে না। তাই তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াড ত্রিদেশীয় নয়া জোটে বিলীন হচ্ছে তাহলে ভারত সেখানে থাকতে পারছেই না। তবে তিনি কথাটা ঘুরিয়ে বলেছেন, “কোয়াড আগামীতেও হয়তো নিজেকে দরকারি করে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। কারণ নতুন ত্রিদেশীয় জোট তো প্রতিরক্ষাভিত্তিক”। অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াডই ত্রিদেশীয় জোটে রূপ নিতে যাচ্ছে।

    তবে ঐ একই স্পুটনিক রিপোর্টে  আরেক প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বয়ান এসেছে যার নাম অনিল ত্রিগুণায়াত [Anil Trigunayat]। এছাড়া এমনকি বর্তমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করসহ আরো অনেকের উদ্ধৃতি তুলে এনেছে স্পুটনিক। তবে তাদের সবার মূল কথাটা হল আসলে ভারতের কোয়াড  জোটে থাকতে পারছে না বলে তা নিয়ে নিজেদেরকে দেয়া “সান্ত্বনা”। ভারতের ‘মন খারাপের কিছু নেই’ ধরনের বা ‘হতাশ হবার কিছু নেই’ এরকম [I don’t think New Delhi needs to feel threatened or disenchanted…… ]। যেমন একজন বলছেন, এখন থেকে ভারতের আলাদা আলাদা করে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত।

    ওই সাবেক রাষ্ট্রদূত কথা বলতে গিয়ে তিনি যেসব সংগঠনে ভারতের কদর আছে বলে গৌরব করে তা জানিয়েছেন যেমন ব্রিকস [BRICS] এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান আর এসসিও [SCO] (সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন) এর কথা। কিন্তু এখানে ব্যাপার হল ভারত যে এক অকর্মণ্য “বেচারা” তাই প্রমাণ হল। কারণ, এদুটো প্রতিষ্ঠানই আসলে চীনা উদ্যোগের জোট যেখানে চীনের মূলত প্রধান পার্টনার হলো রাশিয়া। আর ভারতকে চীন দয়া করে রেখেছে, নিজের উদারতায়; প্রতিদ্বন্দ্বি বা শত্রু হিসাবে দেখলে জোটে নিত না।  একটা ফেয়ার এপ্রোচ বা ন্যায্যতাবোধে নেয়া চীনের এই সিদ্ধান্ত, যে লম্বাদুর পর্যন্ত চিন্তা করতে সক্ষমতা ও সাহস রাখে। এর সোজা অর্থ হল, রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুণায়াত এরই কথা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ায় ভারতের ভাত নেই, পাত্তাই নাই। তারা নিজেকে নিয়ে আছে। আর ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার তালে আছে কেবল। এর বাইরে ভারতের কোথাও পাত্তা নাই। তাই অন্য জায়গা ভারতের গুরুত্বের কথা বলতে গেলে যতটুকু যা আছে তা নয়া নেতা চীনেরই উদ্যোগের ভিতরের কথাই উল্লেখ করতে হচ্ছে। যে চীনকে আবার আপাতত দেখা যাচ্ছে, ভারত শত্রু মনে করছে। কিন্তু চীন ব্যাপারটাকে দেখছে এক অবজেকটিভ ফেনোমেনা আকারে। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে গেলে সেই দুনিয়াতে নেতা থাকবে চীন আর চীনের পিছনে উঠে আসতে পারে ইন্ডিয়া (যদি সে অপ্রয়োজনীয় মুসলমান ঘৃণা চিরদিনের জন্য ত্যাগ করে সরে আসে, এই অঞ্চলকে শান্তি দেয়, অর্থনীতিতে মন দেয়)।  আর চীনের দিক থেকে, চীন আগেভাগেই ভারতের সব সম্ভাবনাগুলোকে নিজের ইচ্ছায় নাকচ করতে পারে না। এই অসততা উলটা চীনকেই একসময় ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অবজেকটিভ ফেনোমেনাকে রুখে দেয়া যায় না। রুখে দিবার চিন্তা করে বোকা-হিংসুক আর গর্দভেরা। বুদ্ধিমানেরা সাগরে ঘুর্ণিঝড় দেখা দিলে ওর সাথে লড়তে যায় না, খাপ খাইয়ে নেয়া আর কম ক্ষতি কিসে হবে সেই পথে ঝড়ের সামনে যায়।

    তবু বহুবার লিখেছি ভারতের ন্যাচারাল ফ্রেন্ড মানে বিষয়-আশয় বা অর্থনৈতিক স্বার্থবিষয়ক কমন ও প্রধান পার্টনার হবে চীন। এটাই অবজেকটিভ নিয়তি।  (অবজেকটিভ [objective] বলতে যেটা কোন কর্তা-মানুষ ঠিক করে নাই। ন্যাচারাল ভাবে হয়েছে। যেটাকে আমরা অনেক সময় বলি আল্লায় ঠিক করেছে।) আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে ‘মুই কি হনু রে’ অবস্থা করে এই নিয়তি থেকে দূরে ঠেলে সরিয়ে রাখা নিশ্চিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে; সেটা এই শতক মানে গত বিশ বছর ধরে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই ফলাফল আমেরিকা আ ভারতের জন্য শুণ্য। তবু, ভারত আমেরিকান আকাঙ্খা মোতাবেক নিজেকে সেই বাক্সে ঢুকিয়েছে। ভেবেছে, সে পরাশক্তি হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বা জয়শঙ্কর ইত্যাদি এরা “কথিত পরাশক্তি হয়ে যাবার” এই মিথ্যা কল্পনা ইলিউশন মায়ায় ভারতের মিডিয়াকে (প্রতীকীভাবে দৈনিক দাহিন্দু এর সুহাসিনী হায়দারের কথা ভাবা যায়) প্রভাবিত করে চলেছিল দশক ধরে। কিন্তু এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সব ন্যাংটা হয়ে যায়। এই ভারত তার নাগরিককে করোনায় বেড দূরে থাক অক্সিজেন দিতে পারে নাই। মরলে সৎকার বা সাধারণ মাটি দিবার ব্যবস্থাটুকুও করতে পারে নাই, ব্রীজের উপরে নিয়ে বা নদীতে নিয়ে ফেলে দিয়ে নুন্যতম মানুষের মর্যাদা নষ্ট ও অপমান করেছে। তাই সুহাসিনী আর তাকে দেখানো পরাশক্তির স্বপ্ন তিনি বইতে রাজী হয় নাই। সে উলটা এখন ঐ মিথ্যা স্বপ্নকে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন করে থাকে। তবু কারো কারো হুশজ্ঞান কখনই হয় না। যেমন দ্যাপ্রিন্টের ফরেন ডেক্সের নয়নিমা বসু [NAYANIMA BASU]।  তালেবানদের কাবুল  দখলের আগে তাকে ভারতীয় সামরিক বিমানে এমবেডেড জার্নালিজম করতে আফগানিস্তানে নেয়া হয়েছিল। সে এখন  তালেবান ইস্যুতে মোদী সরকারের পারফরমেন্সের পক্ষে প্রধান ভক্ত-প্রচারক; একেবারে – ফ্লায়িং হাই মানে আকাশে উড়ছেন অবস্থা!। অথচ খোদ জয়শঙ্করই এখনই বুঝে গেছে কত ধানে বড় জোর কত চাল হয়। সে ইতোমধ্যেই জানান দিচ্ছে ভারত কোন যুদ্ধে-টুদ্ধে নাই। জয়শঙ্কর এখন গ্লোবালাইজেশন ও গ্লোবাল বাণিজ্যের ভক্ত। বলছেন, সব দেশই একালে একসাথে (বাণিজ্য নিয়ে) কাজ করতে বাধ্য [……  globalisation. It reflects the compulsions of countries to work together. ]।  কিন্তু নয়নিমাদেরকে কে এসব বুঝাবে।

    এটাই গত বিশবছর ধরে চলে আসছে। প্রণব বা মোদি কারো আমলেই ভিন্ন কিছু হয়নি। বুশ-ওবামা আমলে এই ব্যক্তিত্বরা ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান রফতানির বাজার সুবিধা ভারতকে দিয়েছিলেন আর তাতেই এটা আমেরিকান বিদেশনীতির অঙ্গ অংশ হয়ে গেছিল। আর তাতেই জাতিবাদী ভারত কেঁচো হয়ে, চীনের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপরের জন্য ভারতীয় শের হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেই সেসব রপ্তানি সুবিধা বাতিল করে দিলেও ভারত আর আমেরিকার হাত ছাড়তে পারেনি। অথচ এখন দাবি করছে তারা আমেরিকার সাথে সামরিক জোটে যাবে না! এ জন্যই এটাকে মাংস খাব না কিন্তু ঝোল খাবার লোভ বলেছি। ফলে এখনো আমরা আসলেই জানি না যে যদি বাইডেন ১৬ না হোক ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সুবিধা ভারতকে এখন দেন সেক্ষেত্রে ভারত কি বাইডেনের সামরিক জোটে যাবে না বলতে পারবে? আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই হল পরাশক্তি ভাবধরা ভারতের নিজ সম্পর্কে  বিবেচনাবোধ!

    বুদ্ধিমানরা জানে একসাথে সব দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে যাওয়া যায় না। কারণ এটা কার্যকর পদ্ধতি নয় আর, তা সফল করাও যায় না। প্রত্যেকবারে নতুন জেগে থিতু হয়ে উঠা প্রধান দ্বন্দ্বটারই কেবল মীমাংসা করে করে আগাতে হয়; যেমন এখনকার মূল দ্বন্দ্ব চীন-আমেরিকার। ফলে ভারতের দিক থেকে তা মোকাবিলার এটিচুড হতে হবে চীন-ভারত এক দিকে বনাম আমেরিকা, এভাবে দ্বন্দ্বের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানো। এরপর তা সমাধান হয়ে গেলে বা এই দ্বন্দ্ব-নিরসন বা বিনাশ হয়ে গেলে তখন আবার মুখ্য দ্বন্দ্ব হিসেবে তা চীন-ভারত দ্বন্দ্ব হতে পারে। ততদিনে ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ অন্যকে বলার মতো করে বাড়িয়ে নেয়া যাবে আর তা দরকারও; যদিও এমনটা অর্জনের আগে দুটা আরো অভ্যন্তরীণ সংস্কার ভারতকে করতেই হবে। এক. হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করে দেশের সবাই নাগরিক ও সমান অধিকারের – এমন এই পরিচয়ে নাগরিক অধিকারভিত্তিক এক নয়া ভারতরাষ্ট্র তাকে গড়ে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয়টা প্রথমটারই অনুষঙ্গ। তা হল নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা সমুলে ত্যাগ করা। ফলে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতিবাদ বাদ দিতে হবে। এমনকি নাদান অবুঝ ট্রাম্পের মত অর্থনৈতিক জাতিবাদও বাদ দিতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে আমরা সবাই এক গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেনের যুগে একেবারে ঢুকে গেছি। আর এটা ‘ওয়ান ওয়ে’।

    এই ‘পুলসিরাত’ পার হতে পারলে ভারত পরে সবকিছু হতে পারবে। নইলে ‘কিছুই নয়’। এর আগে আগামি ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে নতুন যারাই কোয়ালিশনে ক্ষমতায় আসুক তারা সম্ভবত চীনের অর্থনৈতিক পার্টনার হওয়ার পথ ধরবে। আর তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত আরো দ্রুত সক্ষম হওয়ার পথ ধরবে। কিন্তু তবু আমেরিকার থেকেই ভারত সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। কারণ ভারতের পারসেপশন হল তার সম্ভাব্য প্রধান শত্রু চীন। তাই ভারত চীনের থেকে অনেক কিছু কিনলেও অস্ত্র কিনতে পারে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা চীনের সাথে সম্পর্ক ক্ষতি করবে না।  কাজেই ভারতে এমনটা ঘটার সম্ভাবনার দিকে এখন পরিস্থিতি যাবে বলে অনুমান করছে অনেকে। আর সেক্ষেত্রে আপাতত ভারতকে কোয়াড থেকে বের করে দিলেও আমেরিকার সাথে মোদীর ঘনিষ্ঠতা থেকে যেতেই আমরা দেখব। আমেরিকার ভারতকে দরকারের চেয়ে মোদীর ভারতের আমেরিকাকে বেশি দরকার, পারসেপশন এমনই নানান কারণে। তবে বর্তমান হিন্দুত্ববাদের ভারতের নেতৃত্বের উপর আমেরিকারও তেমন আস্থা নেই।  অর্থাৎ চাইলে ভারতের জন্য বিকল্প পথ  আছে, এটার রেকর্ড  থাকল এতে!

    ‘আটলান্টিক’ আওয়াজটা আবার বেশি উঠছেঃ
    আটলান্টিক [Atlantic] এক মহাসাগরের নাম, যা মূলত আমেরিকাকে ইউরোপ থেকে আলাদা করেছে মনে করে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সেদিকে তাল রেখে ‘আটলান্টিক’ অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনই প্রতীক বা ইঙ্গিত অর্থে ‘আটলান্টিক-এর একটা মানে হল – যা কিছু আমেরিকা ও ব্রিটেন (ইউরোপ) মিলে অন্যদের বিরুদ্ধে তাই ‘আটলান্টিক’। এখন এখানে আলোচ্য ইস্যুতে, আমেরিকা ও ব্রিটেন দু’দেশ মিলে অস্ট্রেলিয়াকে জাপটে ধরে তাকে এশিয়ায় সামরিক কেন্দ্র বানাতে চাচ্ছে। তাও আবার পরমাণুকেন্দ্রিক সামরিকতা। ফলে এটাও যেন এক আটলান্টিক সামরিকতা! এই হল আমেরিকার এই নয়াজোটের তাতপর্য।

    কিন্তু বাইডেন বেখবর হয়ে আবার  নিজেকে পুরানা  স্টাইলে প্রভাবশালী  ক্ষমতাবান  ‘বীর’ সাজতে চাইছে।  কারণ মূলত দুনিয়াতে ইতোমধ্যে সামরিক অস্ত্রে পরমাণু টেকনোলজির ব্যবহার বন্ধ করা, নাহলে নুন্যতম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাই নানান রিজিওনাল চুক্তি করছে। এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যেমন জ্বালানি ও বিদ্যুতের উৎস হিসেবে পরমাণু টেকের ব্যবহার কমানোর দিকে সারা দুনিয়া ঝুঁকে পড়েছে, জনমতও সেদিকে। অথচ এমনকালেই বাইডেন-বাবাজি পরমাণু-সাবমেরিন (SSBN) দিয়ে কী করে এশিয়ার যুদ্ধের নাট্যমঞ্চ সাজাতে আসে? সে কেমন কথিত এই আটলান্টিক শক্তি?

    এ পেছনের মুল কারণ সম্ভবত এটাই যে কথিত এই আটলান্টিক শক্তির উদ্যোগ আসলে অন্যের ঘাড়ে মানে ও অষ্ট্রেলিয়ার উপর দিয়ে যাবে। বাইডেনের “আটলান্টিক শক্তি” এশিয়াতে আসছে একারণে যে, এর যুদ্ধের নাট্যশালা থেকে আমেরিকা-বৃটেন থেকে অনেক দূরে? তাই কী? আপাতত বাইডেনদের তাই মনে হচ্ছে বটে কিন্তু তাই কি? না। অচিরেই বাইডেন এর বিরোধিতা সামলাতে হয়রান হয়ে যাবেন!

    ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কেন?
    এই ত্রিদেশীয় সামরিক চুক্তি ও জোট খুলে বসাতে ইউরোপের দ্বিতীয় শক্তি ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে। কেন? এর কারণও সাবমেরিন। যে সাবমেরিনভিত্তিক জোটের কথা আমরা এখন শুনছি – আমেরিকা-ব্রিটেনের  আর সাথে আলাপ আলোচনার কালে সমান্তরালে তবে অনেক আগে থেকে অস্ট্রেলিয়া ফ্রান্সের সাথেও তাদের থেকে সাবমেরিন কিনবে বলে আলোচনা প্রায় সমাপ্ত করে এনেছিল। ত্রিদেশীয় চুক্তিতে যেটা  আছে তাতে আগামি ১৮ মাসের মধ্যে কয়েকটা নয়া পরমাণু-সাবমেরিন আমেরিকা-ব্রিটেন বানিয়ে দিবে। আর এজন্যই ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়েছে, এটাই ওর মুলকথা। কিন্তু বেশি বুদ্ধিমান বলে অষ্ট্রেলিয়া আসলে সে ভীষণ বোকা আর লোভী। তার স্বপ্ন যে সে ঐ অঞ্চল সাম্রাজ্য খুলে বসবে আর আমেরিকা-বৃটেন তাকে দূরে বসে সহায়তা দিবে আর লভ্যাংশ গুণবে। এই লোভীর খবরই নাই যে  “সাম্রাজ্যরূপে দোকান” খুলে বসার দিন ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেছে। দুনিয়াতে কেউ কারো আর  এখন সাম্রাজ্য খুলা বাস্তবতা নাই, সব দোকান বন্ধ। অটোমান, জার কিংবা বৃটিশ বা ফরাসী ইত্যাদি সব কলোনি সাম্রাজ্য একালে নাজায়েজ, আর এটাই জাতিসংঘের জন্মভিত্তি।  যদি সাম্রাজ্য ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেখতে চান তো দুনিয়াকে ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়ায় ফিরাতে হবে। পারবেন?

    তাহলে এযুগে কী সম্ভব? অর্থনৈতিক শক্তি জোট হওয়া সম্ভব। চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প যেমন এমন জোট সহজে সম্ভব। এমনকি বিনিয়োগের মুরোদে দেখাতে পারলে বাইডেনও পালটা আরেক কোন মহাপ্রকল্প জোট খাড়া করতে পারেন। [যদিও বাইডেনের সক্ষমতায় ঐ বিনিয়োগের মুরোদটাই অনিশ্চিত]। তো অষ্ট্রেলিয়া নিজ কোন মুরোদ দেখিয়ে ঐ অঞ্চলে সবার উপরের এক ‘সাম্রাজ্য’ নেতা হবেন?  বিপুল কোন বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে তাঁর? নাকি লেটেস্ট পরমাণু-সাবমেরিন? এই অসারবস্তু চিন্তাটা বুঝবার মত কেউ কী অষ্টেলিয়ায় নাই? অবিশ্বাস্য! ঘটনা আরো আছে।

    কিন্তু ফরাসিদের হারিয়ে কথিত আটলান্টিক জোটের আমেরিকা ও ব্রিটেন কোন কারণে এগিয়ে গেল? কারণ বাইডেনও তো খুবই বুদ্ধিমান। তার এখন নিজেকে বাঁচাতে অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে চান, অর্থাৎ নিজরাষ্ট্রের দায় ও পরিচালন ব্যয় কমানোই মুল লক্ষ্য। তাই অষ্ট্রেলিয়ার এই দিবাস্বপ্ন জানলেও পরমাণু-সাবমেরিন বেচাই তার একমাত্র লক্ষ্য। অষ্ট্রেলিয়া বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে আমেরিকার পাশাপাশি ফ্রান্সের কাছ থেকে বিকল্প হিসাবে রেডিমেড তৈরি থাকা সাবমেরিন কিনবার সম্ভাবনা যাচাই করেছিলেন। যার মুল্য ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন (ভারতীয় ঐ নেভি অফিসারের মতে)। আর এখানেই দাও মারেন বাইডেন আর আরেক চাপাবাজ প্রধানমন্ত্রী বরিস। তারা অষ্টেলিয়াকে বুঝান যে এটা তারা অষ্টেলিয়াকে নতুন বানিয়ে দিলে অনেক কম খরচে হবে। আর এতেই ফরাসী ম্যাঁক্রোর কাস্টমার ছুটে যায়। বলা যায় বাইডেন লোভ দেখিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছেন বলে ফ্রান্স মনে করে।

    ফলে মুলকথা আমেরিকা-বৃটেন অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের কোলে তুলে নিতে সক্ষম হয়। আর এতে ক্ষুব্ধ ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া হয় দেখার মত। ফ্রান্সের ক্ষুব্ধ কূটনৈতিক মন্তব্য- ওরা ‘পিঠে ছুরি মেরেছে’ [“It’s a stab in the back. We had established a trusting relationship with Australia, and this trust was betrayed,” ],  মানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইউরোপীয় মিডিয়া বলছে এটা ৫০ বিলিয়নের বেশি ইউরোর ডিল […France-slams-australia-us-e50b-submarine-deal…]। ভারতের ঐ থিঙ্কট্যাংক বলেছে এতা ৯০ বিলিয়ন ডলারের ডিল [Australia’s decision to scrap its $90 billion nuclear submarine contract with France’s Naval Group ]।
    আর ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রোর এমন প্রতিক্রিয়া বলছে এটা আসলে যতটা সামরিক জোটের ঘটনা বলে দেখানো হচ্ছে এটা এর চেয়েও বেশী অস্ত্র ব্যাবসায়িক। 

    তাই ঘটনার আসল দিক অন্যখানে।  ফ্রান্সের এই প্রতিক্রিয়া থেকে পরিষ্কার যে, এটা নেহাত সামরিক জোটের মামলা নয়। কারণ এটা আসলে যুদ্ধজোট নয়, ৯০ বিলিয়ন ডলারের এক বিনিয়োগ ও লাভালাভের প্রকল্প! তাই তো নাকি? এটা অর্থনৈতিক লাভালাভেরই জোট। অন্য দেশকে লুটে যে অর্থনৈতিক লাভালাভ হবে, এরও ভাগাভাগি করে খাওয়ার জোট। ভারতীয় নেভি অফিসারও এই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। অতএব ফরাসিদের তাড়িয়ে এটা তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সে প্রকল্প নিয়ে নিয়েছে এর ঝগড়া। সেটা হোক! কিন্তু কথা হল, এটা এখন কী ধরনের আটলান্টিক জোট হল? ফরাসিরা নিশ্চয় ভেসে আসেনি, ভেসে যাবেও না! তবে অবিলম্বে এখানে ন্যাটোকে ভেঙে নতুন পরিস্থিতির উপযোগী করে সাজানোর ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। আটলান্টিক শব্দটা বেশি উঠে আসার কারণ এসবেরই পেছনে লুকানো। ওদিকে ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রো অষ্টেলিয়া ও আমেরিকা থেকে রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ ব্যাপারটা খুব সহজে মিটছে না।

    চীনের প্রতিক্রিয়া:
    নতুন AUKUS জোট, দক্ষিণ চীনসাগর ঘিরে এশিয়ায় এই আরেকটা সামরিক জোট হচ্ছে, এতে চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হবে তা স্বাভাবিক। তবু চীনের প্রতিক্রিয়া অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, চীন এক শব্দের এক ছোট মন্তব্য করেছে – ‘ইরেসপন্সিবল’ মানে দায়িত্বজ্ঞানহীন [‘Aukus’  security pact irresponsible]। খুবই গভীর অর্থবোধক মন্তব্য সন্দেহ নেই। কেন?

    চীন-আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতাই মূল দ্বন্দ্ব বা বিরোধ; মানে গ্লোবাল সিস্টেমের নেতৃত্ব হল বিরোধের কেন্দ্র। যা মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা কেন্দ্রিক- আর সেই নেতৃত্বের অবস্থান থেকে আমেরিকা ক্রমেই ঢলে পড়ছে; বিপরীতে চীন উঠে আসছে। এই হলো বাস্তবতা। তার একটা বড় প্রকাশ হল, ইন্ডেপেন্ডেন্ট স্টাডি রিপোর্টগুলো থেকে পাওয়া –BBC REPORT অথবা  REUTERS  বলছে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে  খুবই খেয়াল করে লক্ষ্য করার ব্যাপারটা হল, এখানে অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছে, কোনো সামরিক সক্ষমতা নয়, কোনো রাজনৈতিক চিন্তার বিরোধ বা সক্ষমতাও নয়। অর্থাৎ এটা একেবারেই অবজেকটিভ সক্ষমতা, সাবজেকটিভ একেবারেই নয়। এর মানে হল, আমেরিকা এই যুদ্ধ করে এই যুদ্ধে জয়লাভ করলেও তাতে চীনের চেয়ে আমেরিকা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সমান হতে পারবে না।

    অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুদ্ধে অর্জনের বিষয়ই নয়। তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সাথে এক অস্ট্রেলিয়াকে – এভাবে নিয়ে তারা যুদ্ধজোট সাজাচ্ছে কেন? যুদ্ধে জিতলে অস্ট্রেলিয়াও কি চীনের সমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবে? কোনই সম্ভাবনা নাই। এছাড়া এটা কলোনিদখলের যুগ আর নয় যে অষ্ট্রেলিয়া বাইডেনের সহায়তা কোন দেশকে দখল করে তার সম্পদ বৈধ বলে নিজের দাবি করতে পারবে। অথবা যারা সাবমেরিন সাপ্লাই দিয়েছে তাদেরকে চুরি লুটের কোন ভাগ দিতে পারবে।

    এছাড়া আরো মারাত্মক দিক হল,  এই সামরিক জোট চুক্তিটা করা হল আবার একটা পরমাণু-যুদ্ধের হুমকি তৈরি করে। এটার সাফাই ন্যায্যতা কী? এবার এমনকি যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া বিজয়ী হলেও কি সে নিজ অষ্ট্রেলিয় বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে? তারা পরমাণুর রেডিয়েশনের মধ্যে বেঁচে থাকবে কী করে? যারা চুক্তিটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত এই শাসক রাজনৈতিক নেতারা তাদের বাঁচাবেন কী করে? এবার আমেরিকা-ব্রিটেনের কি এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়াকে ঠে্লে দেওয়ায় ওসব নাগরিকদের প্রতি তাদের কোনো দায় নেই?

    কেউ  নিজেকে “মানুষ” বলে দাবি করলে, তাঁর ন্যূনতম দায়িত্বজ্ঞান বোধ থাকলে এমন সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারে না; যেখানে পরমাণু শক্তির বাণিজ্যিক বা সামরিক সর্ববিধ ব্যবহার বন্ধ করা, ন্যূনপক্ষে একেবারে কমানো – এটাই এখনকার মুখ্য গ্লোবাল ট্রেন্ড এবং প্রবল গ্লোবাল জনমতও বটে।

    চীনের সাথে কোন দেশের বিরোধ করার, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধিতা করার জন্য পশ্চিমের বহুবিধ জেনুইন বিষয় আছে। আর তা দোষের কিছুওও নয়। তাই সেগুলো নিয়ে সদর্পে লড়া তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক ফোরামে বাধা দেয়া দরকারও সম্ভবত যাতে চীন তা অন্তত অনেকটাই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কেবল ব্যাপারটাকে ডায়লগের মধ্যে রাখতে পারতে হবে। তা অবশ্যই আমেরিকা করতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এই বাধা দেয়া আমেরিকার AUKUS জোট করবে পারমাণবিকভাবে? এরা হিটলারের চেয়েও ঘৃণিত ব্যক্তিত্ব হবে!  তাও আবার একটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধে? এতে এমনকি পশ্চিম বা আটলান্টিকের বাসিন্দাদেরকেও দায় নিতে হবে! তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে ঠেকানোর দায়িত্ব তাদেরও আছে। এই ইস্যুতে আজীবন তাদের জবাবদিহিতা করতে হবে।

    এশিয়ায় বাংলাদেশসহ আমরা কেউ অবশ্যই কোনো অর্থনৈতিক জোটের বাইরে অন্য কোনো সামরিক বা যুদ্ধজোটে যুক্ত হতে পারি না। কমবেশী আমাদের সবার মনোভাব যুদ্ধজোট বিরোধী। ওবামার ‘এশিয়া পিভোট নীতি’ ফেল করেছিল একারণেই। পরের কোয়াডও প্রায় ফেলের পথে একই কারণে। সাউথ চায়না সি-এর আশপাশের (অস্ট্রেলিয়া জাপান ছাড়া) যেমন আসিয়ানভুক্ত কোনো দেশ এসব কোন উদ্যোগ না জোটে অংশ নেয়নি। অর্থাৎ যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিরোধ আছে এমন কোনো দেশ আমেরিকার কোন জোটে কখনো অংশ নেয়নি, আশ্রয় নেয় নাই। অর্থাৎ তারা ন্যায্যভাবে তাদের চীনের সাথে বিরোধের অবশ্যই মীমাংসা চায়; কিন্তু আমেরিকার কোলে চড়ে নয়, কিংবা আমেরিকার পাতা কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দিয়ে নয়।  একারণের আমেরিকান সব উদ্যোগ মূলত ফেল করছে একের পর এক। আমেরিকার এই ব্যর্থতাই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, ঐ অঞ্চলের কেউ ওখানে কোনো যুদ্ধজোট গড়ার দরকার মনে করে না?  এর পরেও আমেরিকা ছাড়েনি। এবার পারমাণবিক  যুদ্ধের দামামা নিয়ে ব্যবসা করতে এগিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে আবার এশিয়ার জন্য এক মহাদুর্যোগ সামনে! এটাও আমাদেরকে অবশ্যই পার হতেই হবে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৮ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ভারত নয়, আমেরিকার ত্রিদেশীয় সামরিক জোট “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ট্রাম্পের জাতিবাদ ফেল, কিন্তু ঘায়েল বাইডেন

    ট্রাম্পের জাতিবাদ ফেল, কিন্তু ঘায়েল বাইডেন

    গৌতম দাস

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    Biden caught up under TRUMP’s wrong decision; Trade War US and China

    [সার-সংক্ষেপঃ ট্রাম্পের স্বদেশীপনার জাতিবাদ প্রবলভাবে এখন পরাজিত ফলাফল নিয়ে হাজির হয়েছে। পরিণতিতে হাজির হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি; আর তাতে নাভিশ্বাস উঠেছে আমেরিকান ভোটারদের। তাই, আগামি মিডটার্ম নির্বাচনে বাইডেনের হারের পুর্বাভাস আসা শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের জাতিবাদী আকামের সাথে গলা মিলিয়েছিলেন বাইডেন। তাই ট্রাম্পের সস্তা এবং পরাজিত জাতিবাদের সব দায় এখন বাইডেনের কান্ধে। ওদিকে বাইডেনের উপর ব্যবসায়ী সমিতিদের চাপ। তারা সদলে চীনাপণ্যের উপর বাড়তি আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার করা আর চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় শুরু করার দাবি তাদের। দুদেশের এক্সপার্টরাও উদ্বিগ্ন এই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কীভাবে ফিরে আনা যায়! কারণ এই ব্যর্থতা চীনকেও ক্ষতিগ্রস্থ করে ফেলতে পারে। ]

    _

    বাইডেনের পাবলিক রেটিং বা জনপ্রিয়তা ঢলে পড়েছে। গত জুনে ছিল ৫৪ শতাংশ আর তা থেকে কমছিল প্রতি মাসেই। আগস্টের শেষ দিকে তার প্রতি জনগণের আস্থা ৪৭ শতাংশেরও […By Tuesday, Biden’s average approval rating had fallen to 47%, the lowest so far in his presidency.] নিচে নেমে গেছিল। পরে আমেরিকান মিডিয়া এনপিআর বলছে, এটা আরো নিচে ৪৩%। এতে প্রধান কারণ ছিল আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসা, এর ওপর আবার অনেকে এটাকে ‘অগোছালো ভাবে পালিয়ে আসায়’ আমেরিকার মত পরাশক্তির ইজ্জতে লেগেছে বলে মনে করে।  আর আমেরিকার ইজ্জত নষ্ট করেছেন বাইডেন এই হল অজুহাত। যদিও আমেরিকান এই কথিত ইজ্জত এমনিতেই ক্রমাগত মিলিয়ে যাচ্ছিল এবং তা বহু আগে থেকেই। কিন্তু যারা একালে আমেরিকা প্রবাসী হয়েছেন তারাসহ পুরনো নাগরিক আমেরিকানদের অনেকেই আমেরিকার গর্ব ও ভ্যানিটি এতদিন উপভোগ করতেন। তারা কিছুতেই এই ঢলে পড়াটা দেখিয়ে দিলেও মানতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু এবার সবটা মিলে আর না মেনে উপায় নাই কারোই।

    কিন্তু কারণ?
    কারণ কেবল আফগানিস্তান নয়, আরো বড় অন্য কারণ আছে। মাঝে সাময়িক আফগান-ইস্যুটা গরম হয়ে বসাতে যেটাকে সবাই ভুলে গিয়েছিল – সেটা হল, ট্রাম্প আমলে তুঙ্গে তোলা চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ, যা বাইডেন আমলেও ধারাবাহিকতায় বহমান রয়েছে এবং এই বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাকি সব ধরনের টেনশন আর রেষারেষি্র ভিত্তি এটা!

    চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মানে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসন এটা শুরু করেছিলেন এক আমেরিকান জাতিবাদ দিয়ে। হ্যাঁ, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর কথা বলছি। যা সেই থেকে ট্রাম্পের এক না-বুঝ ও অবুঝ অবস্থান। এটা শুনতে অনেকের কাছে অবাস্তব ঠেকলেও ট্রাম্প এটাই করেছিলেন। আর সেটাই এখনকার আমেরিকার সবচেয়ে বড় সংকটের নাম! কোন্ আমেরিকায়? যে আমেরিকা গত আশির দশকে থেকে দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য বা গ্লোবালাইজেশনের নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে বাধ্য করেছিল, সেই আমেরিকায়!

    দুনিয়ায় আমাদের এদিকটায় এশিয়ায় মানুষে্ররা আবার কিছু পরিস্কার বুঝুক বা আধা অথবা না বুঝুক, ‘জাতিবাদ’ খুবই পপুলার। এরা অন্যকে বা অন্যের ‘জাতিবাদ’ খারাপ বললেও নিজের আরেকটা বা নিজধর্মীয় জাতিবাদই সবচেয়ে ভালো পথ বলে মনে করে থাকে। এমনকি কমিউনিস্টরাও কলাম লিখে [“নানা জাতিগোষ্ঠীর আফগানদের আগে ‘আফগান’ হতে হবে”] তালেবানদের আফগান-জাতিবাদী হতে পরামর্শ দিচ্ছেন। ব্যাপারটা এমনই কৌতুকের!

    এর ওপর আছে, এই জাতিবাদীরা কখনো “রাজনৈতিক জাতিবাদী” হয় তো, কখনো “অর্থনৈতিক জাতিবাদী” হয়। ‘রাজনৈতিক জাতিবাদী’ মানে যেমন হিন্দু বা মুসলমান জাতিবাদ, যারা একে অপরের জাতিবাদ করাকে খারাপ কাজ মনে করে কিন্তু নিজ জাতিবাদ ‘সহি’ মনে করে। আর সুনির্দিষ্ট করে অর্থনৈতিক জাতিবাদী মানে যারা যেকোনো বিদেশী পণ্য আমদানি করাকে নিজ দেশকে ভালোবাসায় ঘাটতি মনে করে। এখানে কৌতুক হল, এটাই আসলে কমিউনিস্টদের গর্ভ থেকে বের হয়েছে। অর্থাৎ সব কমিউনিস্টই আসলে মুখে প্রকাশ্যে জাতিবাদি।  আবার অন্য দেশে রফতানি করে চকচকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লোভও এরা ছাড়তেই পারে না। নমুনা হিসাবে যে আদর্শ লোভী সম্ভবত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি। যেমন, আরএসএসের এক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ যে ভারতে চীনাপণ্য বর্জনের হাঁক দেয়; কিন্তু চীনাপণ্য আমদানি ভারতে তাতে না কমে আরো বেড়েছে।

    বাস্তবতা হল, গত আশির দশক থেকে আমেরিকা সব দেশকেই গ্লোবালাইজেশনে যুক্ত হতে বাধ্য করে ফেলেছিল। যেমন ‘এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন’ বা ‘ইপিজেড’ [EPZ] অথবা ‘রফতানির জন্য উৎপাদন’ এই শব্দগুলো আজ গ্রামের অনেক টিনএজ মেয়েটাও জেনে গেছে। কারণ সে জানে গার্মেন্টে কাজ পাওয়া যায় এভাবে বা এর কারণে। সার কথায়, আমাদের এশিয়ান সমাজে তাই অনেক আগে থেকেই জাতিবাদ ও দেশপ্রেম বলে একটা ভুয়া-বুঝ চালু আছে। আবার অন্য দিকে সেই গার্মেন্টের মত রফতানি পণ্যের কারখানাতেই সবাই কাজ পেতে প্রচণ্ড ‘আগ্রাসী’।

    বড় কৌতুকটা হল, ২০১৭ সালে আমেরিকায় ক্ষমতায় আসা ট্রাম্পও একই জাতিবাদ- দেশপ্রেম এই ভুয়া বুঝেরই আরেক স্লোগান “আমেরিকা ফার্স্ট” চালু করেছিলেন। অথচ কনসেপ্ট হিসাবে  “আমেরিকা ফার্স্ট” আর “গ্লোবাল রফতানিবাণিজ্য”  ততপরতা হিসাবে একেবারেই পরস্পরবিরোধী।

    এমনকি এ দুটোর মধ্যে কোনটা বেশি ভাল এমন বোকা বা না-বুঝাদের তুলনাও যারা অনেক পড়াশোনা জানা এক্সপার্ট তারাও করেন। বলে রাখি বর্তমান সরকার হিসাবে ‘কালো দাগি’; ফলে অগ্রহণযোগ্য কিন্তু সরকার সম্প্রতি চীনের নেতৃত্বে আরসিইপি [RCEP] বাণিজ্য জোটে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আবেদন করেছে এবং এটা এক সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত। এটাই সস্তা জাতিবাদ ফেলে আগিয়ে যাওয়া অবশ্যই। এই জোটে যোগ দিতে হলে অন্য দেশের পণ্যের আমদানির উপর শুল্ক ধার্যে সর্বোচ্চ আট শতাংশের কাছাকাছিও যাওয়া যাবে না। মানে, বিদেশী পণ্যে শুল্ক আরোপকে সরকার চালাতে বার্ষিক রাজস্ব আয়ের আর বড় উৎস গণ্য করা যাবে না। ফলে মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং; আবার জিতলে কিন্তু একেবারে গাজী! এমনকি যেমন জাপান ও অস্ট্রেলিয়া হল এরা দাবি করে যেতারা নাকি প্রচন্ড চীনবিরোধী এবং  কোয়াডের সদস্য। অথচ তারা প্রথমেই আরসিইপি জোটের সদস্য হয়ে নিয়েছে; তা হতে এরা মরিয়া হয়েছিল যে, এই লোভ সামলাতে পারেনি। মানে আরসিইপি-এর লোভে কোয়াডের প্রতি ‘ঈমান’ রাখতে পারেনি। অর্থাৎ এরা নিজেরাই জাতিবাদ-দেশপ্রেম এই ভুয়া স্লোগানটা কিন্তু মানেনি।

    তামাশা হল, এটাই ছিল ট্রাম্পের নতুন রাজনৈতিক স্লোগান। কিন্তু বাইডেনের পাবলিক রেটিংয়ের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এখানে কেন এলাম? হ্যাঁ, এবার সেই সংযোগটা দেখাব।

    ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই “এই জাতিবাদ” দেখিয়ে আমেরিকান পাবলিককে মোদির মত সস্তা সুড়সুড়িতে নাচিয়ে চীনের সাথে বাণিজ্যিক দরকষাকষি বা বারগেইন [bargain] করতে গিয়েছিলেন। সাধারণভাবে বললে বারগেইন  কোনো অন্যায় বা সমস্যা নয়। এটা অবশ্যই একটা ফেয়ার বা ইনসাফের সীমার মধ্যে থাকা। কারণ এটা পরস্পর নিজের নিজের লাভালাভ এক্সপ্লোর করে দেখে  যে – কার, কী, কোথায় সুবিধা-অসুবিধা এর খোঁজাখুঁজি করে বাজিয়ে দেখে থাকে। এটা গভীর দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের সন্ধানে থাকা; কিন্তু কোনোভাবেই এটা ঠিক ‘যুদ্ধ’ নয়। বড়জোর বাণিজ্য প্রতিযোগিতা অর্থে লড়াই। কিন্তু ট্রাম্প এই বাণিজ্য লড়াইয়ের প্রথমপর্ব বাৎচিত শেষ করে একেবারে চুক্তি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এরপরে আর কখনোই আগাতে পারেননি। ফলে পুরো বাণিজ্য সম্পর্ক সেই থেকে ঢলে পড়েছিল। এরপর জোশে আরো দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে চীন থেকে আমদানি পণ্যের ওপর বাড়তি ২৫ শতাংশ করে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে দেন। এতে বুদ্ধিমানেরা চুপ হয়ে যায় আর গর্দভেরা হাততালি দিয়ে উঠেছিল। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি তার টার্ম শেষের আগে এমন ব্যবস্থা করে যাবেন যাতে পরের অন্য কোনো নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তার জাতিপ্রেম নীতি থেকে সরতে না পারেন। এরপরে তিনি আরো আগ বাড়িয়ে সরাসরি বাইডেনের নাম ধরে বলেছিলেন, আমি চলে গেলে পরের টার্মে চীনারা ডেমোক্র্যাট বাইডেনের সাথে চুক্তি করতে পারবেন এই কূটচিন্তাতেই তারা আমার সাথে চুক্তি করলেন না। এমন অনুমাননির্ভর এক দাবিও করেছিলেন। এতে আরো হাততালি পাওয়া গিয়েছিল যে হ্যাঁ, এবার আমেরিকায় এক খাঁটি দেশপ্রেমিক পাওয়া গেছে।

    শুরুতে ঘটনা ছিলও তাই। এমনিতে পপুলার ইমেজের ভাষায় বললে, ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন তো উদার; যার বিপরীতে ট্রাম্প আগ্রাসী আনকুথ মানে এক ‘গাঁইয়া’, অসভ্য। কিন্তু বাইডেনের প্রেসিডেন্টের শপথের পরে দেখা গেল তিনি কথা মিষ্টি করে বললেও তার মুখ্য নীতি-পলিসি সবই আসলে ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া নীতিরই কুড়িয়ে নেয়া অনুসরণ। এ দেখে আমেরিকানরা হয় ভেবেছিল যে, ট্রাম্প আসলেই কত জাতিপ্রেমী ও দূরদর্শী!

    কিন্তু না, চার দিকে হা-হুতাশ উঠে গেছে এবার। আমেরিকার মানুষ বিশেষত, মিডল ক্লাস একেবারেই নাভিশ্বাস ও আশাহত হয়ে পড়েছে। কিন্তু তা বাইডেনের জন্য এতবড় সমস্যা কেন? কারণ, বাইডেনের চার বছর মেয়াদের দু’বছর শেষ অর্থাৎ অর্ধেক সময়কাল পার হলে পরের বছর নভেম্বরে এক নির্বাচন হবে যাকে ‘মিডটার্ম নির্বাচন’ বলে। এতে হাউজের ৪৩৫ আসনের পুরোটাই আর সিনেটের তিন ভাগের এক ভাগ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে অনেক স্টাডি সার্ভে বা জনমত জরিপ সংগ্রহ ও তার ফলাফল আসা শুরু হয়েছে গত মাস থেকে। এর সার সংক্ষেপটা, এশিয়ান পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পত্রিকা ও হংকংভিত্তিক পত্রিকা এশিয়া টাইমসের রিপোর্ট মতে – রিপাবলিকান ও ক্ষুব্ধ নিরপেক্ষ ভোটাররাই ইতোমধ্যে ৭০% হয়ে গেছে, যারা এবার ডেমোক্র্যাট বাইডেনের পার্টির বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।

    “Republicans and independents together comprise more than 70% of the American voting public, and their view of US economic conditions plunged to new record lows in August as inflation ground higher. That’s already provoked a revolt in the Democratic Party against White House spending plans, and sets the stage for a Republican landslide in the 2022 Congressional elections.”

    তাতে ডেমোক্র্যাট দলের সমর্থকদের ভেতরেই বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে, ফলে রিপাবলিকানরা একচেটিয়া জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। কিন্তু পাবলিক ঠিক কী দেখে এত ক্ষিপ্ত হয়ে গেল? এটা হল মুদ্রাস্ফীতি [inflation]। ওখানে বলা হয়েছে, গত সাত মাসে ‘ইউএস কনজুমার প্রাইজ সাডেনলি জাম্পড ৫% + ইয়ার-টু-ইয়ার; দ্যা থ্রেটস আর রিয়াল’ [US consumer prices suddenly jumped 5%-plus year-on-year, the threats were real.]।

    এদিকে মুদ্রাস্ফীতিতে একটা খুবই কমন যে ফেনোমেনা তা হল , এতে কেউ সন্তুষ্ট নয়। কারণ এতে বেতনও বাড়বে, ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়বে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ মিডিয়া সিএনবিসি লিখছে, মজুরি মাসপ্রতি লাফ দিয়ে বেড়েছে ১.৩% যা বছরে বেড়েছে ১০.৩%, হারে [wages jump 1.3% for the month and 10.3% on the year.]। আর সিএনবিসির ঐ খবরের শিরোনাম, ‘এ শার্প রাইজ ইন ওয়েজেস ইজ কন্ট্রিবিউটিং টু ওরিজ ওভার ইনফ্লেশন’ [A sharp rise in wages is contributing to worries over inflation]। মানে ‘লাফিয়ে বেড়ে চলা মজুরি মুদ্রাস্ফীতির ওপরে আরো উদ্বেগ বাড়িয়েছে’।

    এদিকে ভোক্তাদের ক্ষুব্ধ মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা স্টাডি শুরু হয়েছে। আর তাতে প্রকাশিত ফলাফল বলছে, বাড়ি বা গাড়ির ভাড়া সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। আগের ভাড়াটের চেয়ে ১৭% বাড়ির ভাড়া বেড়েছে [renters signing a new lease paid an average of 17% more than the previous tenant]। ২০% পর্যন্ত বেড়েছে পুরনো গাড়ির দাম। ভোক্তামূল্য সূচক যা গড়ে বছরে ২% বৃদ্ধির মধ্যে থাকত তা এখন ১২% এর উপরে উঠে গেছে [just 2% for rent of primary residence as of July, compared with more than 12%, ]। গবেষণা স্টাডি নিয়ে প্রত্যেকটা মিডিয়া রিপোর্ট এরকমই।

    কিন্তু কেন এমন মুদ্রাস্ফীতি, পেছনের কারণ কী?
    এ নিয়ে এশিয়ান টাইম্সের ১০ সেপ্টেম্বরে রিপোর্টের শিরোনাম, ‘এটা তো মুদ্রাস্ফীতি নয়রে বোকা’, বাইডেন বিদ্রোহের মুখোমুখি [‘It’s the inflation, stupid’ – Biden faces revolt]। আর ভিতরে এবার কারণ বর্ণনা করে লিখেছে, “গত বিশ বছর ধরে চীনাপণ্য আমদানি করে আমেরিকা নিজ ভোক্তার জন্য তৈরি করা বহু ভোগ্যপণ্যের দাম কমিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু গত ২০২০ সাল থেকে চীন থেকে আমেরিকার আমদানি করা পণ্যের মূল্য (বাড়তি শুল্ক আরোপ করে) বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে”।

    For twenty years, US imports from China helped reduce the cost of finished goods in the United States, but US import prices from China began rising in 2020.

    গত ৭ আগস্ট এশিয়ান টাইমস আরেক রিপোর্টে বলেছিল, ‘ট্রাম্পের আমলে চীনা পণ্যের ওপর তার বাড়তি শুল্ক আরোপ আমেরিকায় রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতির কারণ ঘটিয়েছে যেটা আবার এখন আগামী ২০২২ সালের মিডটার্ম নির্বাচনে বাইডেনের দলের জেতার সম্ভাবনাকে হুমকিতে ফেলেছে।’ এ কারণে এই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ইউএস বিজনেস পুশ বাইডেন ফর অ্যা চায়না ট্রেড ডিল’ [US business pushes Biden for a China trade deal]। কেন?

    ভেতরের খবরের সারকথাটা হল, “আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে যা কখনো আগে ঘটেনি তা হলো আমেরিকার পুরো ব্যবসায়ী মহল- আমেরিকার ৩০টির বেশি ব্যবসায়ী সমিতি  [Never before in US political history has the whole of the American business community—more than thirty major business organizations] (রয়টার্সের হিসাবে ৩৬টিরও বেশি), এরা এক জোটে ও এক স্বরে গত ৫ আগস্ট বাইডেন প্রশাসনের কাছে চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনা আবার শুরু করা এবং চীনা পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ বাতিলের দাবি জানিয়েছে”।

    বিবিসি বলছে, ‘২০১৯ সালের মে পর্যন্ত ট্রাম্প শুল্ক বাড়াতে বাড়াতে তা ২৫% পর্যন্ত করেছিলেন।’ তবে সিএনএন বলেছে, কোনো কোনো পণ্যে এটা আসলে ৬৬% পর্যন্ত [The US still has tariffs on 66% of Chinese exports]।

    ট্রাম্পের স্বদেশীপনার ঠেলায় বাইডেন ‘নিহত’ হতে যাচ্ছেন!
    হ্যাঁ ঠিক তাই। এটাই হল ট্রাম্পের জাতিবাদী স্বদেশীপনার পরিণতি। তবে আত্মঘাতী এই আকামটা ট্রাম্প করেছিলেন নিজ আমলে। কিন্তু এর ফলাফল পরিণতি আসতে সময় লেগেছিল। আর বোকা বাইডেন, ট্রাম্পের চীনা বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্কহার পলিসি যেমন ছিল তা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্কহার বাড়ানোর খারাপ প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি যখন দেখা দেয়া শুরু করে তখন সেটা বাইডেনের আমল বলে এবার তিনি তাতে ‘কাটা পড়ছেন’। তার দলের আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে ফল খারাপ করবেন বলে পূর্বাভাস বেরিয়েছে।

    কিন্তু কেন এমন খারাপ ফলাফল-প্রতিক্রিয়া হল? এর পেছনের কারণ কী?
    অল্প কথায় বললে মূল বিষয়টা এখানে ‘ন্যূনতম মজুরি’ [minimum wages]। পশ্চিমা বা অগ্রসর ইকোনমির দেশে সাধারণ জীবনযাত্রার ব্যয় আমাদের মত দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে, ফলে সে মোতাবেক তাদের মজুরিও বেশি রাখতে হত। এর মানে পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বেশি হত তাতে। এমনকি, পশ্চিমের তুলনায় এশিয়ায় (এমনকি চীনেরও) ‘ন্যূনতম মজুরি’ কম। আবার আমাদের মত দেশের ন্যূনতম মজুরি চীনের চেয়েও কম। ফলে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পশ্চিমের চেয়ে অনেক কম রাখা যায়, রাখা সম্ভব।

    তাই পাশ্চাত্য আমাদের এশিয়ান উতপাদিত ভোগ্যপণ্য (আমদানি করে) তা তাদের শ্রমজীবীদের ব্যবহার করতে দিয়ে তাদের দেশের নিজ ন্যূনতম মজুরি-ই কম (যা প্রকারান্তরে নিজ উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কম রাখতে পারবে) রাখার একটা কৌশল বের করেছে। যেমন, আমাদের মত দেশ থেকে তাদের মজুর বা ওয়ার্কিং ক্লাসের ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ানো। যেমন গার্মেন্টস যা উতপাদনে শ্রমঘন ও কম জটিল টেকনোলজি এতে জড়িত। তাই এমন পণ্য আমাদের দেশ থেকে আনলে পশ্চিম তার শ্রমিককে দেয় মজুরিতে (পোশাকের মূল্য অংশটা) আরো ছাটাই বা কম দিলেও চলবে। আর এতে সামগ্রিক ন্যূনতম মজুরি কম রাখতে পারবে। এ জন্যই ‘পশ্চিম’ আমাদের দেশ থেকে গার্মেন্টস আমদানি করে থাকে। আর যদিও ভাব করে যে, আমাদেরই যেন দয়া করছে!

    ঠিক একইভাবে পশ্চিমের ভোগ্যপণ্যে আরেকটা শব্দ ব্যবহার করা হয় ‘ডিউরেবল গুডস’ [durable goods]। বাংলায় বললে, যা অনেক দিন ধরে ব্যবহার করলেও টিকে এমন পণ্য। মানে হল, মধ্যবিত্ত ক্রেতা যে পণ্য কিনে আরামে নুন্যতম তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তা ব্যবহার করে থাকে। যেমন একটা ওয়াশিং মেশিন বা কাপড় ধোয়ার মেশিন।

    চীনে তৈরি এমন ‘ডিউরেবল গুডস’ এতে আমেরিকান মধ্যবিত্ত বা ওয়ার্কিং ক্লাসের কাছে খুবই কাম্য। কারণ এটা আমেরিকায় তৈরি করা হলে দাম বেশি পড়ত যা হয়ত তার নাগালের বাইরে চলে যেত; যার সোজা মানে এসব ভোগ্যপণ্য আমেরিকায় তৈরি হলে এর বাড়তি মূল্যের যোগাতে হত বলে সে কারণে আমেরিকার ন্যূনতম মজুরি অনেক বেশি হয়ে হত।

    এখন চীনা পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করে – ট্রাম্প বা বাইডেন সেই একই অবস্থা তৈরি করেছেন; যদিও ভিন্নভাবে। ট্রাম্প এসব ‘ডিউরেবল গুডস’-এর ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করে ভেবেছেন, এতে চীনা পণ্য আমেরিকায় ঢুকে পড়া ঠেকিয়ে দেবেন। আর এতে চীন খুবই চাপে পড়বে। কিন্তু প্রতিক্রিয়া আসতে সময় লেগে যাওয়ায় তিনি ‘বেঁচে গেছেন’। ফল হয়েছে উল্টো, আমেরিকা উল্টো চাপে পড়েছে- আর তা বাইডেনের সময়ে।

    বাড়তি শুল্ক আরোপের এই বুদ্ধি অনেক পুরানা। এটা কখনই ফলদায়ক হয় নাই। কারণ, বাড়তি শুল্কটা চীন আমেরিকায় ওয়াশিং মেশিন রপ্তানি  করেছে বলে এতে আরোপিত বাড়তি শল্ক কিন্তু চীনকে দিতে হয় না। চীনের বিক্তি কম বা আমদানি কিমি. হতে পারে অতটুকুই ওর শাস্তি। আর ঐ বাড়তিশুল্ক কিন্তু যোগাতে হয় গরীব ক্রেতাকে। ফলে এতে তার নাভিশ্বাস উঠে। আবার সরকার তাদের অবস্থার কোন সুহাল করতে গেলে এটাসি শেষে মুদ্রাস্ফীতির জন্ম দেয়।

    কিন্তু ফলটা কেন এমন হলো? কারণ ট্রাম্প বা বাইডেন হিসাব করেননি যে তারা এশিয়ান দেশ থেকে সস্তা ভোগ্যপণ্য আমদানি করেই নিজ দেশে ন্যূনতম মজুরি কম করে রাখতে পারেন। আর নিজ উৎপাদিত পণ্যমূল্য প্রতিযোগিতামূলক ও কম রাখার এটাই একমাত্র চাবিকাঠি। অর্থাৎ পাশ্চাত্য এশিয়ার ওপর পুরোটাই নির্ভরশীল আর এই নির্ভরশীলতা স্থায়ী।

    এক কথায় এটাই গ্লোবাল বাণিজ্য, লেনদেন বিনিময় ধেয়ে আসা বা ক্রমবৃদ্ধির পেছনের মূল কারণ।

    এ কারণে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ, বাড়তি শুল্ক আরোপ, জাতিবাদ-দেশপ্রেম এবং আমেরিকা ফার্স্ট ইত্যাদি সব ফেল করে যাচ্ছে। তাই ট্রাম্পের সব বয়ানই আসলে ভুয়া, মৃত ও অকার্যকর! গ্লোবাল বাণিজ্যের বিপরীত প্রতিপাদ্য বলে, (অর্থনৈতিক ধরনের) জাতিবাদ এক মিথ্যা স্লোগান!

    খুব সম্ভবত ঠিক এ কারণেই বাইডেন এই সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ (বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এটা দ্বিতীয়) করে নিয়েছেন [Biden and China’s Xi speak by phone for first time since February]।

    এ ছাড়া ইতোমধ্যে ক্লিনটনের আমলের আমেরিকান এক প্রাক্তন ট্রেজারি সেক্রেটারি প্রফেসর লরেন্স সুমারস [Lawrence Summers] বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের এক প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীর সাথে [former finance minister, Lou Jiwei] এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন [China, US share inflation risks that will not go away soon, their former top finance officials agree]। তিনি সেখানে মন্তব্য করেছেন, তিনি ‘আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন’ [……I do have considerable concerns about inflation…… ]।

    এখন তাহলে, ডেমোক্রাট-রিপাবলিকান নির্বিশেষে আমেরিকা কি ‘আরেকবার বলিলেই খাইব’ দশায় যে, চীন-আমেরিকা বাণিজ্য আলোচনা অচিরেই বসবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১১ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কিভাবে ট্রাম্পের ‘স্বদেশীপনা’য় বাইডেন আহত “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা কী নিজ-ভুল রিভিউয়ের সাহসী হবে!

    আমেরিকা কী নিজ-ভুল রিভিউয়ের সাহসী হবে!

    গৌতম দাস

    ৩০ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    Biden sticks to Aug 31st deadline for Afghanistan exit; 

     

    এটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে, বাইডেনের আমেরিকা এবার আফগানিস্তান ছাড়তে মন বেঁধে ফেলেছে যদিও যাদের জানার তাদের জানা ছিল যে, বাইডেনের হাতে এদেশ ছেড়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো বিকল্প শুধু না, ফেলে পালিয়ে যাবার এক বিরাট সুযোগ। আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যাই হন, ২০০৫ সালের পর থেকে সবাই জেনে গিয়েছিলেন যে, ভুল হয়ে গেছে, পা দেবে গেছে, বিকল্প নেই। সবটাই লস। কিন্তু কিভাবে ফিরে আসবেন, কী করে ফিরে আসবেন এটাই জানা ছিল না। শেষে পাগলা আর গোঁয়াড় যে ট্রাম্প তিনি নির্ধারক সিদ্ধান্তে তালেবানদের সাথে চুক্তি করে ফেলেছিলেন আর বাইডেন খরচ কমানোর এই শেষ সুযোগটা ছাড়তে চাননি।

    সারা দুনিয়াতেই দেখা গেছে রাজার চেয়ে রাজার বন্ধু-পারিষদেরাই সমস্যা। তারা রাজার স্টোর-টাঁকশালে কী আছে এর খবর না রেখে বোলচালের দুর্বুদ্ধি-হামবড়া করে গেছেন। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কথিত উন্নত সাত-রাষ্ট্রের গ্রুপ ‘জি-৭’  [What Is the Group of Seven (G-7)?], এরা সেই বন্ধু-পারিষদ। নিজ মুরোদ নাই, এরা বাইডেনের ঘাড়ে চড়তে গেছিলেন। তারা বাইডেনকে ৩১ আগস্টের পরেও আফগানিস্তানে থাকার ‘বুদ্ধি’ বের করতে বলেছিলেন। কিন্তু বাইডেন এসব ‘বাজে পরামর্শ’ ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। কারও কারও মতে বাইডেন জি৭-এর সাথে ভাল করে আলাপ না করেই এককভাবে তালেবানদের সাথে সমঝোতা চুক্তি ফাইনাল করেছেন [US abruptly withdrew from Afghanistan and left a mess behind]।   লক্ষণীয়, পশ্চিমের একমাত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সূত্রে বাইডেন ছাড়া এর বাইরে পশ্চিম বা ইউরোপের আর কারো সাথে তালেবানদের কোনো আলাপ-সম্পর্ক, কথা বা চুক্তি হয়নি। ইউরোপ বরং এটাকে সুবিধা হিসেবে নিয়েছে যে তালেবান-ইউরোপ কোনো চুক্তি নেই ফলে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ দায়দায়িত্বও নাই। আর এই সুযোগে ইউরোপ বাইডেনের ঘাড়ে চড়তে চাওয়া!

    দুনিয়ার কোনো রাজাই চিরকাল রাজা থাকেননি। গ্লোবাল নেতা আমেরিকাও অনন্তকাল নেতা থাকবেন না। এটা বুঝতে না পারা তো কোন ব্যাপার নয় যদি গভীর ‘আমেরিকা প্রেম-আবেগ’ কোন বাধা না হয়।
    আঙ্কেল আমেরিকার সঙ্কট অর্থের টানাটানি। সেটা অস্বাভাবিক অবশ্য নয়। আফগানিস্তান ছেড়ে গিয়ে অর্থ সাশ্রয় করা ছোটখাটো অর্থ না। মূলত এ জন্যই তিনি এই এক সিদ্ধান্তে ফোকাসড। বক্তৃতা দিয়ে সোজা বলছেন- ‘কোনো অনুশোচনা নাই [: ‘I Do Not Regret My Decision’ To Withdraw ]”। কারণ খরচ কমিয়ে সরকার-দেশ কিছু বাঁচাতে পারলে বাপের নাম! পেন্টাগনের জেনারেলেরাও ৩১ আগস্টের পরে আফগানিস্তানে আরো কিছু দিন থেকে যাবার আবদার না করে বরং বাইডেনকে বিরাট সাপোর্ট দিয়েছেন [Biden sticking to Aug. 31 Afghan pullout ]। খরচের পরিমাণও বিশাল! আফগানিস্তানে আমেরিকার প্রতিদিনের গড়ে খরচ বলা হচ্ছে, প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার এবং তা টানা ২০ বছর ধরে। ৩০০ মিলিয়ন ডলার মানে কত? এর একটা ধারণা দেয়া যাক। এরশাদ পরবর্তি  নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশে যে নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা শুরু হয়েছিল তখন প্রতিটা সরকার কামনা করত, প্রতি বছর (এখানে দিন নয়, বছরের কথা বলা হচ্ছে) প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে (তিন বছরে এক বিলিয়ন) আইএমএফ লোন পেলে সরকার চালানোটা আরামের হয়; আমদানি ব্যয় মিটাতে টানাটানিতে চলতে হয় না।

    House Democrats and Republicans held news conferences and pushed for the Biden administration to extend the withdrawal of troops in Afghanistan past the Aug. 31 extension deadline, citing the need for a slow exit in order to not escalate the current situation with the Taliban.CreditCredit…Sarabeth Maney/The New York Times   কংগ্রেসের দুই দলই বাইডেন কে সেনা প্রত্যাহারের তারিখ পিছাতে চাপ দিয়েছিল।

    কেউ প্রভাবশালী গ্লোবাল নেতা অথবা দেশ  –  এই কথাটার পেছনের আসল অর্থ হল যে, ঐ দেশের অর্থনীতিতে ঐকালে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় সর্বাধিক। আমেরিকা এমন নেতা হিসেবে টানা পঁচাত্তর বছর ধরে দুনিয়ায় মাতব্বরি চা্লালিয়ে যেতে পেরেছে। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতা নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই কোনো রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি হওয়া ও থাকার মূল চাবিকাঠি। কারণ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই একবার হাতে এলে তখন সামরিক সক্ষমতা অর্জন হাতের মুঠোর জিনিস, মাত্র কয়েক বছরের ব্যাপার হয়ে যায়।

    এই কথাটাই অনেকে সহজে মানতে বা বুঝতে চায় না। আপনি আমি আমেরিকা বা ব্রিটেনের ভক্ত হতেই পারি, কেউ কেউ শেষ জীবনে সেখানে সেটেলড হবার কথাও সামর্থ্য থাকলে ভাবতে পারি। মানে নিজ ব্যক্তিস্বার্থ ওর মধ্যে দেখতেই পারি। কিন্তু তাই বলে কেউ যখন কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার উত্থানের সাথে ওর গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা পতন সম্পর্কিত এটা সে দেখতে পাচ্ছে, অথবা নির্দেশ করে দেখায়- কিন্তু তা বলে এর মানে, সে আমেরিকাবিরোধী বা সে চীনভক্ত তা বুঝায় না। তাই এমন ট্যাগ লাগিয়ে বুঝাবুঝির চেষ্টা অর্থহীন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতা তো ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস আনার কর্তা নন!

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্সে’ আত্মোপলব্দিঃ
    তবে আফগানিস্তানে সর্বশেষ ক্ষমতায় পরিবর্তন এবার অনেককেই ‘ন্যাংটা’ করে দিয়েছে; অনেক মিথ্যা স্বীকার করিয়ে ছাড়ছে। আত্মসমালোচনা বা রিভিউ যা আমেরিকা বহু দিন দেখেনি তা এবার কেঁপে কেঁপে বাইরে বের হয়ে আসছে। এমনই এক রচনা প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে। মূলত এটা এক দ্বিমাসিক ম্যাগাজিন। যদিও এশিয়াকে প্রভাবিত করার প্রবল প্রতিযোগিতার একালে পশ্চিম আর মাতবর-ভাব নিয়ে বসে না থেকে মাঠে নামতে হচ্ছে। তাই একালে দ্বিমাসিক হয়ে তাতে আটকে থাকতে পারছে না। অতএব দ্বিমাসিকের বাইরে, এখন প্রতিদিন অনলাইনে বাড়তি এটা ডেইলি ব্রিফিং পাঠাচ্ছে তারা। মানে পুরানা কাস্টমার হিসেবে প্রতিদিন একটা আর্টিকেল ফ্রি পড়তে পাচ্ছি। বলাই বাহুল্য, এটা এক এলিট পত্রিকা। প্রায় ১০০ বছরের পুরানা, ১৯২২ সালে এটা প্রথম প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভাল একটা গুণ হল – প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গুরুত্ব তারা সবচেয়ে ভাল বুঝে। থিংকট্যাংক নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তারা  দাতব্য  (নন-প্রফিট বা এনজিও) প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুলে চালিয়ে থাকে।  আর এর মাধ্যমে একটা নীতি-পলিসির পক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক জনমত তৈরির প্রক্রিয়া সমাজে জারি রাখে। জনমত তৈরির এই স্টাইলটা এতই কার্যকর যে একালে বুড়া বয়সে পুতিনের রাশিয়াতেও এমন নীতি-গবেষণার থিঙ্কট্যাংক   প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তেমনই আমেরিকান এক প্রতিষ্ঠান হল “কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর  CFR)। এরাই ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনের প্রকাশক। দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে যারা বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের আমলে মন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেট অথবা ডিফেন্স) বা এর ডেপুটি ছিলেন তারাই আমেরিকার ফরেন পলিসি বিষয়ে এখানে লিখে থাকেন। এখানে এখন যার লেখার কথা তুলব তিনি – বেন রোডস [Ben Rhodes]। ওবামা আমলে ওই প্রশাসনে তিনি ডেপুটি-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন।

    তার লেখার ছোট শিরোনাম তিনি দিয়েছেন- ‘ওরা আর আমরা’ [Them and Us]।’ আর “কী করে আমেরিকা নিজ-শত্রুর হাতে তারই ফরেন পলিসি হাইজ্যাক হতে দিয়েছে” [How America Lets Its Enemies Hijack Its Foreign Policy] – এই ছিল ওর বড় শিরোনাম। এরপর তিনি লিখতে শুরু করেছেন এভাবে, “নাইন-ইলেভেন বা টুইন-টাওয়ার হামলার ঘটনার চেয়ে বেশি একুশ শতকের আর কোনো ঘটনা আমেরিকাকে এত আকার দেয়নি ও এর ভুমিকা ঠিক করে দেয়নি। কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী যুগে (মানে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত- ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় আমেরিকাই একক পরাশক্তি ভেবে) আমাদের মধ্যে যে সন্তুষ্টি ভাব তৈরি হয়েছিল এই আক্রমণ তাকে একেবারেই ফুটা করে দিয়ে যায়। সাথে আমাদের মধ্যে ‘আমেরিকার নেতৃত্বের এক গ্লোবালাইজেশনের বিজয়ের ভেতর দিয়েই ইতিহাস শেষ হবে’ বলে যে মিথ্যা ধারণা তৈরি হয়েছিল এটা তাও ভেঙে তছনছ করে দিয়ে গেছে”।

    তিনি বলে চলেছেন, ” ‘ওয়ার অন টেরর’ বলতে আমেরিকার সরকারের কাজের ধরণ, মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি এমনকি মানুষের প্রতিদিনের জীবনে যেমন – ভ্রমণ, ব্যাংকের কাজ বা আইডেনটিটি-সংশ্লিষ্ট যেকোনো ইস্যুতে সবার জীবন একেবারেই বদলে গিয়েছিল। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিপাইন, সোমালিয়া, ইয়েমেনসহ অনেক রাষ্ট্রের উপর আমেরিকা সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছিল। বিভিন্ন দেশের সাথে ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের উপরে টেররিজম সবক্ষেত্রে এক মুখ্য ইস্যু হয়ে থেকেছিল। আসলে ‘৯/১১’-এর পরে প্রেসিডেন্ট বুশ আমেরিকান পরিচয়কে সংহত করে নয়া প্রজন্মের লড়াইকে সামরিক নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এই যুগের লড়াই ফ্যাসিজম ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াই হিসাবে চলবে”।

    অর্থাৎ বেন রোডস এখানে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকার একক পরাশক্তি ভাব ও অহংকার এসেছিল যা ভেঙে চূরমার করে দেয় ৯/১১-এর হামলা। পরিণতিতে বুশ ক্ষোভে ফ্যাসিজম ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা তুলে বিভিন্ন দেশে সামরিক হস্তক্ষেপে সরকার দখল (বাংলাদেশের ‘১/১১’-এর ক্ষমতা দখল যেমন) এর চল শুরু করেছিল। আর তাতে যাকে খুশি ক্ষমতায় আনা এবং ইচ্ছামত সরকার বদলে দেয়ার মত উন্মত্ততায় কাজে তারা নেমে পড়েছিলেন।

    তাই এবার স্বীকার করে বলছেন, “গ্লোবাল ওই যুদ্ধকে ঠেকানো দুঃসাধ্য ছিল হয়ত; তবে তা আমেরিকার জন্য অনাকাঙ্খিত সব পরিণতি ডেকে এনেছিল। আমেরিকা সরকার শিগগিরই তার ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে সার্ভিলেন্স, ডিটেনশন ও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছিল। আলকায়েদা উৎখাতে লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ”।

    ‘‘সামরিক হস্তক্ষেপে সরকার বদলানোর ‘রেজিম চেঞ্জ’- এটা দেশে ও বিদেশে আমেরিকান গণতন্ত্রের কী হাল করছে সেটা খেয়াল করেনি। যেসব বিজয় অর্জনের কথা প্রেসিডেন্ট বুশ অর্জিত হবে বলে দাবি করে গেছেন যা রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মিডিয়া নিরন্তর প্রচার করেছে, তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তাতে নিজ সরকারের ওপর আমেরিকার আস্থা নষ্ট করে আর তাতে নতুন করে অভ্যন্তরীণ অজুহাত খুঁজতে থেকেছে।’’

    বেন রোডসের এরপরের লেখা অংশটা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। বেন রোডস এবার ট্রাম্পের মতো চরিত্রের উত্থান কেন আমেরিকায় ঘটেছে এর একটা ব্যাখ্যায় গিয়ে বলছেন, “৯/১১ পরবর্তী-যুগের আমেরিকা যে  যুদ্ধবাজ ন্যাশনালিজম [Jingoistic nationalism ] দেখেছিল তা আসলে মূলত মানুষের মনের এক অজানা শঙ্কা আর বিদেশভীতির ককটেল থেকে তৈরি – যা ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে এই প্রেসিডেন্টের জন্ম দিয়েছিল। ট্রাম্প আসলে বাকচাতুরিতে দেশের ভিতর শত্রুর ইঙ্গিত করে তাদের উপর দায় চাপিয়ে গেছেন”।

    বেন রোডস-এর এই শেষাংশটা তাদের দেশের দুই দলের কামড়াকামড়ি দোষ চাপিয়ে কেটে পড়া – তাই এতে জড়ানো আমাদের কোনো কাজ নাই। তবে এরপর রোডস বাইডেনের পক্ষে ঢোল পিটিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, এইবার নাকি বাইডেন “আফগানিস্তান থেকে গুটিয়ে সমস্ত শক্তি চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করবেন, দুনিয়ায় আমেরিকার হাজির থাকার লক্ষ্য দুনিয়াকে দেখাবেন”।

    সরি বেন রোডস! আমরা একটুও নড়লাম না, আপনি আমাদের ন্যূনতম আকৃষ্ট করতে পারেননি এসব বলে। এখানে বেন রোডসের দেয়া ২০ বছরের যুদ্ধের খতিয়ানে তিনি বলেছেন, মোট খরচ (দুই ট্রিলিয়ন নয়) নাকি সাত ট্রিলিয়ন ডলার। আর আফগানিস্তান ও ইরাকে মৃত মোট  সেনা সার্ভিস মেম্বার বলছেন (দুই হাজার নয়) সাত হাজার। তবে তারা এই খরচ বেশি আর কম যাই দেখাক তাতে এতে বাইডেন সরকারের আয় বাড়বে না, কিছু খরচ কমবে। এটাই মূল কথা।

    তা ছাড়া, বিয়ে শেষ হয়ে যাবার পরে ব্যান্ড পার্টির মধুর সুরও কারোই ভালো লাগবে না। যেমন ধরেন আফগানিস্তান এবং এরপরে পরেই ইরাক থেকে আমেরিকা ও ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহারের পর সেন্ট্রাল এশিয়া, ইরান, মধ্যপ্রাচ্যসহ (সাউথ চায়না সি এলাকা আর ভারত বাদে) বাইডেনের আমেরিকা ক্রমশ বাকি এশিয়ায় আর কোথাও নাই হয়ে যাবে। আর সাউথ চায়না সি-তে ওর চারপাশ তো ওবামার আমলেই তার ‘পিভোট এশিয়া’ পলিসি ফেল করার পর থেকে ওখানে কিছুই আর জাগেনি। আগ্রহিরা তাদের ব্লকের ম্যাগাজিন ডিপ্লোম্যাটের কিছু রিপোর্ট যেমন [The Pivot to Asia Was Obama’s Biggest Mistake] দেখে নিতে পারেন।]   সবমিলিয়ে গত পঁচাত্তর বছর  এশিয়াতেও আমেরিকার রুস্তমি চলেছিল কিন্তু এখনকার মত কখনো এভাবে এশিয়া থেকে উৎখাত হয়নি।

    কেন আফগানিস্তান থেকে ফিরলেও আমেরিকান শক্তির রকমফের হবে নাঃ

    মূল যে কথাটা, তা হল, আফগানিস্তান থেকে বাইডেন ফিরে গেলে আমেরিকান অর্থনীতিতে সারপ্লাস অ্যাকুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বেড়ে যাবার কোনো ঘটনা তো সেটা নয়, তাই সেটা ঘটার কারণ নাই। ফলে এতে আমেরিকার চীনের সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রশ্নে আমেরিকার প্রতিযোগী হয়ে ওঠার বাড়তি কোনো কারণ নেই,  কারণ ঘটনাই তা নয় তাই। আসলে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি কখনো ডুববে না বলে গর্ব করা হত, যে ব্রিটিশরা গর্ব করত, তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কোথায় মুখ লুকালো? কোথায় সেই উইন্সটন চার্চিল? এরপরের একচ্ছত্র বিজয়ী আমেরিকার সামনে কেন আর তারা কখনো আসেনি? কারণ সবকিছু ফিরে আসে না!  একালে  ব্লোয়ারকে কেন বুশের ছোট-তরফের মিথ্যাবাদী গুণ্ডা-রংবাজই হতে হয়? কারণ একালে এই দালাল-ভাড়ামো ভুমিকাই তার জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই ১৯৪১ সালের আগষ্টের আটল্যান্টিক চার্টার চুক্তিতে!

    সব যুদ্ধবাজি জিঙ্গোইজমের দায় বুশের নয়, পরের ওবামা-হিলারিও দায়ীঃ
    আবার আমরা লক্ষ করেছি, লেখার শেষে বেন রোডস নিজ-পরিচয় দিয়েই বলেছেন তিনি ওবামার দুই টার্মেই ডেপুটি মন্ত্রী ছিলেন। অথচ তার মন্ত্রীত্বের সরকারের আমলে, মানে  ওবামা-হিলারির আমেরিকা যেসব দেশে গিয়ে আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপে সে দেশের সরকার ফেলানোর হিসাব দিয়েছেন – সেগুলোও আগের বুশের আমলে দায় বলে চাপিয়েছেন। যেমন ইরাকের সাদ্দামের সরকার ফেল্মলানোর দায় বুশের অবশ্যই কিন্তু এরপরের – লিবিয়ার গাদ্দাফি, সিরিয়ার আসাদ (ব্যর্থ) ইত্যাদি এসব অন্যায় তো বুশের দায় নয়। এটা তো ‘ভিজা বেড়াল’ ওবামা-হিলারির ‘মহান’ কাজ। তাদের অতি আত্মবিশ্বাসের কারণে বেনগাজির আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ সব স্টাফ নিহত হয়েছেন। যাদেরকে দিয়ে গাদ্দাফিকে মারা হয়েছে তারাই একাজ করেছে।  আর এ নিয়ে সিনেটে-কংগ্রেসে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন হিলারি। আর এই হত্যাকান্ড ঘটাবার পর থেকেই এরা নতুন নামে ‘আইএসের’ উত্থান ঘটেছিল। এই উত্থানে ওবামা-হিলারির দায় আছে। সবকিছু বুশের উপর চাপিয়ে ডেমোক্র্যাটরা হাত ধুয়ে ফেলতে চাইলে কী হবে? ওয়ার অন টেররে ২০ বছরে আমেরিকার দুই পার্টির কারো অবদান কি কম?

    তবে এ’দুই পার্টির সবচেয়ে বড় অপরাধ হল – আমেরিকার চোখে দুনিয়ার মুসলমান মানেই তারা আমেরিকার সম্ভাব্য এনিমি – এই মনোভাবে সেই থেকে তারা পরিচালিত হতে শুরু করেছে।  অথচ এই অ্যাটিচুড নেয়া, আমেরিকান কনস্টিটিউশন ও আইনেরই বরখেলাপ। টুইন টাওয়ারে হামলা চালায় যারা এমন মোট ১৯ জনের ১৫ জন সৌদি, দু’জন দুবাই, একজন লেবানন ও একজন মিসরের ছিল। অর্থাৎ কেউ আফগানি নয়। তাহলে টুইন টাওয়ারে হামলার অজুহাতে সারা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করা কেন?   অথচ আইনি অপরাধের চোখে দেখলে যারা হামলাকারি ও সংশ্লিষ্ট তারাই তো কেবল অপরাধী।  এমনকি, আমেরিকা চাইলে এদের যারা বা যেসব গ্রুপ জড়িত কেবল তাদের পুরোটাকেই উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আমেরিকার ছিল; কিন্তু তা না করে একটা সর্বাত্মক ও লাগাতার যুদ্ধ যাওয়া কেন? মুসলমানেই সবাই হামলাকারি এই মনোভাবের ভিত্তি কী? এই প্রশ্ন উঠেছিল সেকালেই এবং আমেরিকার ভিতর থেকেই। এর জবাব দেয়া হয়নি, কারণ তাদের কাছে জবাব ছিল না। আর উদ্দেশ্য খারাপ ছিল।

    আবার টুইন টাওয়ারে হামলাকারীরা মুসলমান তাই মুসলমানমাত্রই ‘আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকুরিটি’ তাদের ধরে এনে শাস্তি দেয়া বা সন্দেহ করা, রিমান্ডে এনে টর্চার করা ও রেনডিশন [rendition] কেন? এটা তো আমেরিকান কনস্টিটিউশন ও আইনেরই বরখেলাপ। এছাড়া এই চিন্তা গোত্রবাদী, সঙ্কীর্ণ ট্রাইবাল চিন্তা। আমেরিকান রাষ্ট্রেরই এই কাজের এখতিয়ার নেই। হামলাকারিরা মুসলমান বলে সারা দুনিয়ার মুসলমানেরা এতে অপরাধী – এটা হতে পারে না।  এটা কোনো চুরির জন্য চোরের বাপ-মাকে ধরে এনে শাস্তি দেয়ার মত।

    RENDITION: (especially in the US) the practice of sending a foreign criminal or terrorist suspect covertly to be interrogated in a country with less rigorous regulations for the humane treatment of prisoners.

    এখানেই শেষ নয়। এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে গেছে। আপনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, আপনার মুসলমান-মুক্ত আমেরিকা কায়েম করতে চাওয়ার পথে নেমে যাওয়া মানে, আপনি উসকালেন যেন এখন মুসলমানরা পাল্টা পশ্চিমা বা আমেরিকান-ছাড়া নিজেদের দুনিয়া কায়েমের রাস্তায় যায়। এখন এতে আপনি অবশ্যই দেখাতে পারবেন যে, মুসলমানেরা কত খারাপ, তাদের চিন্তা সঙ্কীর্ণ, তারাই কারো সাথে থাকতে পারে না, চায় না, ইনক্লুসিভ না ইত্যাদি বহু কিছু! কিন্তু দুনিয়া তো আগেই ভাগ করে ফেলেছেন! এর কী হবে? মুসলমানেরা নতুন আফগানিস্তানে আমেরিকানদের নেবে না, দেখতে চায় না –  এমন একটা দুনিয়া এখন তাদের কল্পনায় হাজির হয়েছে। অনেকে হয়ত স্বপ্ন দেখছে আমেরিকান ছাড়া এক বাংলাদেশ গড়বে! এখন এর কী সমাধা করবেন?

    জানি, আমেরিকান-মুক্ত নতুন আফগানিস্তান কিংবা বাংলাদেশ-এসব একেবারেই অবাস্তব এবং এটা তাদের চরম রাগ-ক্ষোভের প্রকাশ! অত্যাচার, নির্যাতন অপমান ‘রেনডিশন’ … ইত্যাদি ! কিন্তু  এসব কি সহজে মুছে যাবে…। কী দিয়ে মুঝবেন? পরাশক্তির বড়াই? বেন রোডস, আপনি নিজেই বলছেন, লাদেন নয়, তাকে গ্রেফতার  ছাড়িয়ে বুশ ও তার বন্ধুদের ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে ইত্যাদি…।

    তাহলে আবার মিথ্যা আশ্বাসের কথা কেন বলছেন? কেন বলছেন, বাইডেন আমেরিকাকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বি করে আবার যোগ্য করে হাজির করতে পারবেন? সমস্যা তো চীনের সাথে প্রতিযোগিতা নয়। এটা কোন বড় সমস্যা নয়।  আসল সমস্যা দুনিয়ার দ্বিবিভাগ – আমেরিকান ছাড়া মুসলমানের দুনিয়ার কল্পনা হাজির হয়ে গেছে, এর সমাধান কী? মুরোদ দেখান। সবার আগে নিজেদের এসব অপ-ততপরতা এবং এক্ট আবার ফিরে চেক করেন, পুনঃমূল্যায়ন করেন। কোথায় ভুল হয়েছে, উপলব্ধি ও স্বীকার করেন সবার আগে। এসব ছোট ছোট কিন্তু পাওয়ারফুল পদক্ষেপ ছাড়া মুসলমান বা ইসলাম ইস্যু আমেরিকার পিছু ছাড়বে না। আপনি ভান করতে পারেন যে, আফগানিস্তান বা ইরাক ছেড়ে এসেছেন মানে সব পাপ ধুয়ে গেছে। না, তা একবিন্ধু ধুয়ে যায় নাই, যাবে না। অন্তত অপরাধী মন নিজেই নিজেকে তাড়া করে ফিরবে!   ইতোমধ্যে পশ্চিম বা আমেরিকার বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতক’ শব্দটা অনেক কর্নার থেকে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়েছে। তা নিশ্চয় আমেরিকার জন্য ভালো কিছু নয়!

    আমেরিকা গ্লোবাল নেতা আর না থাকলে কী? সেই আমেরিকার এর পরেও দুনিয়াকে বহুকিছু দেবার যোগ্যতা থাকবে। এখনো লন্ডন বা প্যারিস বহু মানুষকে সেটেলমেন্টের শহর হিসেবে আকৃষ্ট করে। ফলে এসব কোনো বড় ফ্যাক্টর নয়। কিন্তু মানুষের দ্বিবিভাগ! আমেরিকা-মুক্ত মুসলমান অথবা মুসলমান-মুক্ত আমেরিকা? এটা মানুষের জন্য কোনো ভালো বার্তা নয়! আপনি শাহরুখ খান হলেও বা এক সাধারণ এশিয়ান মুসলমান হলেও আপনাকে পশ্চিমা বা আমেরিকান ইমিগ্রেশনে অপমানজনকভাবে আটকে থাকতে হতে পারে। আফগানিস্তান বা ইরাক বাইডেন ছেড়ে গেলেও এসব বিভক্তির শেষ হবে না!

    অথচ এই বিভক্তি দূর করা, চীনের ওপর প্রতিযোগিতায় বাইডেনের বিজয়ী হওয়ার চেয়েও অনেক বড় ও গুরুত্বপুর্ণ কাজ!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৮ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কানে কি পানি ঢুকেছে? মনে হচ্ছে!“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    গৌতম দাস

    ২৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬

    AFTER   AFGANISTAN,THE  PAX  AMERICA  IS  OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    PAX AMERICA IS OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    সব ভেঙে গেছে, ভেঙে পড়ছে। খসে খসে পড়ছে, এক এক করে! আমেরিকান ক্ষমতার সাজানো বাগান। আর লুকানো যাচ্ছে না। শুধু আমার কথা নয় এটা। দেখা যাচ্ছে যারা এতদিন শুধু আমেরিকান সমর্থক না আমেরিকা তাদের জীবন, ভরণপোষণ, পেশা ইত্যাদিতে ডেইলি-লাইফের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এমন ব্যক্তিরাও এখন আমেরিকার সাথে নিজের দুরত্ব তৈরি করছে। এরাও আমেরিকার কোন দায় আর নিতে চাইছে না। দুনিয়া এখন এমন নতুন চেহারায় পৌছেছে।
    কোনো  পরাশক্তি এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেখা যায়নি। এটা ওর জন্য বিশাল সঙ্কটের একটা যুগে প্রবেশ। এর গভীর সংকটের বড় লক্ষণ ও প্রধান  প্রমাণ হল যখন, এই দেশের অভ্যন্তরীণ সব বিরোধ-মতান্তর খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়। আমেরিকান সমাজে অসংখ্য বিভক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আরেক বড় লক্ষণ হাজির হয়েছে, সবার গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়া। তাই এখন আফগান-রিলেটেড প্রায় সবাই হতাশায় হাত-পা ছুড়ছে। কে যে কাকে গালাগাল করছে তার কোনো তাল-ঠিকানা নেই। অনেক সময় রাগে ক্ষোভে বা গভীর হতাশায় অথবা নিজেদের আর ভবিষ্যৎ নেই দেখে ফেললে – বড় মানুষও শিশুদের মতো আচরণ শুরু করে; নিজের বাবা-মাকেই গালাগালি শুরু করে; এটা তেমন অবস্থা যেন! কিন্তু  কোন ঘটনাটা এমন এত বড় প্রভাব ফেলতে পারল? আফগানিস্তানে তালেবান ২.০ এর উত্থান ঘটেছে! এরই প্রতিক্রিয়া এগুলো!

    প্রতীকীভাবে কিছু ব্যক্তিত্বের প্রতিক্রিয়া এখানে জড়ো করব।  রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশ (২০০১-০৯) থেকে শুরু করি। তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে মিথ্যা অভিযোগে হানাদার দখলদারি ঘটানোর প্রধান নায়ক। এবার তিনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে বকাবকি শুরু করছিলেন গত মাস (জুলাই) থেকেই যে বকাবকিটা ১৫ আগস্টের ( আমেরিকান কাবুলের পতনের দিন ) পরে আবার শুরু করেছেন। বুশের অবস্থান হল, তিনি আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের একেবারেই বিপক্ষে। তিনি আফগানিস্তান ছাড়তে চান না। বেচারা! কেন? কী যুক্তি তার? তিনি গত মাসে ১৪ জুলাইয়ে জার্মান ডয়েচে ভেলে’কে বলেছেন, সেনা প্রত্যাহার এক ‘ভুল কাজ’ [George W. Bush: Afghanistan troop withdrawal ‘a mistake‘]। তিনি আরো বলেন, ‘আফগান নারী ও মেয়েদের বর্ণনাতীত কষ্টের কথা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন” [I’m afraid Afghan women and girls are going to suffer unspeakable harm,” Bush said.(২০ জুলাই)]।’ আচ্ছা, তার মানে কি তিনি আফগান নারীদের দুর্দশামুক্তির নায়ক হতেই আফগানিস্তান দখল করেছিলেন? তাই কী?   না, তা কেউ বলছে না, তিনিও তা দাবি করছেন না। তা হলে, এমন ভুয়া উদ্বিগ্ন কেন তিনি?

    পিছনের বিশাল কারণটা হল, আফগানিস্তানে ও ইরাকে জাতিসঙ্ঘের চোখেই আমেরিকা হানাদার ও দখলদার বাহিনী, আর এই কাজের প্রধান নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ও কর্তা তিনি নিজেই। বুশের এই একচুয়াল লিগ্যাল স্ট্যাটাস লজ্জাজনক, এটা তিনি জানেন। একবার জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান তা পাবলিকলি উচ্চারণ করেছিলেন। তাই বুশ জানেন, বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে আমেরিকান সমাজে এখন প্রশ্ন উঠবে যে আমেরিকার তাহলে লাভ হলো কী? ২০ বছরে মার খেয়ে? দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে? এবং সবাই প্রেসিডেন্ট বুশের বিরুদ্ধে আঙুল তুলবে? তাই অন্য কারো তাকে বিব্রত করে ফেলার আগেই তার ভান হল, নারীর জন্য ‘প্রাণ কান্দা’। এজন্যই তার মুখরক্ষার বয়ান-দর্শন এখন একটাই, ‘নারীর-দুর্দশামুক্তি’। ভাবখানা এমন যেন নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারেন নাই। তা রক্ষা করতে বুশ বা আমেরিকা আফগানিস্তান দখলে এসে ২০ বছর কাটিয়ে গেল! কী তামশা!

    আমেরিকার এক পপুলার মিডিয়া হল ‘এনপিআর’ [NPR, National Public Radio] রেডিও। এরই ওয়েবসাইট লিখছে, আমেরিকা নাকি ‘আফগানিস্তানে গণতন্ত্র এনে দিতে গিয়েছিল []। তবে এটা করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত খোদ আমেরিকাতেই গণতন্ত্রের অভাব ঘটিয়ে ফেলেছিল, [The U.S. involvement in Afghanistan is a story of democracy and its shortcomings. ]।’ এদেখি বিরাট এক আঁতলামো! ইদানীং আমেরিকান মিডিয়ার এমন লেখা দেখে মনে হয় তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে, তাই কথার আর সেই ওজন থাকছে না। কখন কী বলে ঠিক থাকছে না।

    এ ছাড়া এ কথাটাও সত্য নয়। যেমন, বুশ দুই টার্মে ক্ষমতায় ছিলেন। প্রথম টার্মে যদি ধরে নেই পাবলিক জোশে তিনি আফগানদের কড়া শাস্তি দেয়ার জন্য বোমা ফেলতে গিয়েছিলেন, মানে নাইন-ইলেভেনে টুইনটাওয়ারে হামলার শাস্তি দিচ্ছিলেন। কিন্তু এরপরে কী? প্রশ্ন উঠবে, তাহলে এর পরও যুদ্ধ চালু রাখতে ভোটাররা তাকে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত করলেন কেন? এর দায় তো তখন অবশ্যই (লোভী) ভোটারদেরও নয় কি?  আসলে এসব ভোটারেরা কখনই দায়িত্ব নিতে চায়নি, বুশ বা তাদের প্রেসিডেন্ট কী করে বিদেশ থেকে দেশে টাকা আনছেন? আর বুশের পদক্ষেপ তাদের পক্ষে যাচ্ছে বলে তারা মেপেছিলেন ও আর উৎসাহ দিতে বুশকে আবার নির্বাচিত করে দিয়েছিলেন তাদের ওসব বৈষয়িক লাভ দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তাদের বিচারে আমেরিকান সমাজে “কাজ-কাম” আর ‘মানি সার্কুলেশন’ বাড়া দেখেই তো তারা সিদ্ধান্তে গিয়েছিলেন… “কাজেই বুশকেই আবার জিতিয়ে দাও”। তাতে আফগানিস্তানে কী হচ্ছে তাতে ভোটারদের কী – এভাবেই  তারা জিতিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধে আমেরিকান জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিকে জড়ানোর কারণে এই মানি সার্কুলেশন বৃদ্ধি পেয়েছিল- যেটা ছিল এক জবরদস্তি বৃদ্ধি। আর যুদ্ধ তো ঠিক কোনো ব্যবসা বা বাণিজ্য নয়। তাই যুদ্ধ শেষে কিছু রিটার্ন এলে আসতেও পারে, এই রিটার্ণের উপর ভরসা করে কেউ যুদ্ধে যেতে পারে না।
    যুদ্ধ দেশকে বিশেষ কোনো সুবিধা (অ-মানিটারি সুবিধা) কখনো কখনো এনে দিতে পারে। যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সবার উপরে সাবধান থাকতে হয়, কারণ, কোনো যুদ্ধের খরচ যেন দেশের বইবার সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি দাবি না করে বসে। সে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ করেও টিকে গিয়েছিল। আমেরিকা ইউরোপ (এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ) ও  এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন
    আমেরিকার উপর একই গ্লোবাল কর্তৃত্ব সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান-ইরাকের যুদ্ধের ব্যয় ছিল লাগামছাড়া আর বিপুল খরচের তুলনায় রিটার্ন এমন বড় কিছু নয়। ততদিনে যুদ্ধের সাত বছর পেরোতেই বেহিসাবি খরচের ভারে শুধু ‘আমেরিকান ইকোনমি’ নয় এর নেতৃত্বে ও সাথে থাকা ইউরোপসহ সারা গ্লোবাল ইকোনমিও মহামন্দার (২০০৮) কবলে পড়ে যায়। এভাবে এঘটনাই আমেরিকান কর্পোরেট হাউজ, ব্যবসাদার ও ভোটার সবপক্ষেরই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিয়েছিল। কারণ, গ্লোবাল মন্দার মধ্যে আর আফগান-ইরাক যুদ্ধও তো এক সাথে দুনিয়াতে কখনো চলতে পারেনি।

    এরপরের ওবামা দু-টার্ম বা পরে ট্রাম্প- দু’জনেই তাদের কালের যুদ্ধের উল্টা এরা – যুদ্ধের খরচ কমানোর নায়ক সাজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখকর খুব কিছু হয়নি। তবে দায়ীত্ব ও  বিবেচনাহীনভাবে যুদ্ধের দায় ফেলে পালিয়ে যাবেন – এই সস্তা শর্টকাট বেকুবির পথ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি তালেবানদের সাথে আমেরিকানদের চুক্তিও সম্পন্ন করেছিলেন একা ট্রাম্প নিজেই। ফলে তালেবান-চুক্তি করার মূল দায়ভার এককভাবে ট্রাম্পের। কিন্তু বাইডেন তা বাস্তবায়নে গেছেন বলে সব দায় এখন তিনি বাইডেনের ওপর চাপাচ্ছেন। এটাই বড় তামাশার।

    আবার বাইডেন আসলে  তালেবানদের ক্ষমতায় এনে নিজের সেনা-প্রত্যাহার নিশ্চিত করবেন এমন বাস্তবায়ক প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছেন।  যদিও এই দায় নেয়া যে খুবই রিস্কি তা তাঁরও অজানা ছিল না। কিন্তু তবু তিনি রাজি হয়েছিলেন; কারণ সেনা প্রত্যাহার তার সরকারের পরিচালনা খরচ কমাবে, এই ছিল লোভ। কারণ, আফগানিস্তানে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩০ কোটি ডলারের বেশি – । এখনকার আমেরিকা মানে অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব, সেই প্রাচুর্যের আমেরিকা আজ আর নেই। কিন্তু তার অর্থ দরকার। কারণ, এদিকে অর্থের সংস্থান ও সোর্সের খবর না রেখে বাইডেন  সারা ইউরোপ আর জাপানের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন [বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)] যে, চীনের পাল্টা ব্যাপক বিনিয়োগ সক্ষমতা, পাল্টা বেল্ট-রোড খাড়া করার সক্ষমতা হাজির করবেনই। এখন আফগান ফ্রন্ট থেকে সেনা প্রত্যাহার যদি বাইডেনকে কিছু খরচ সেভ করাতে সে অর্থই বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস হয়ে দেখায় – যদিও শেষে এসবই  সুখের গল্প হয়েই থেকে যাবে! সে সম্ভাবনাই প্রবল!

    কিন্তু এর আগেই (বাইডেনের উপর দিয়ে) ট্রাম্প দান মারার চেষ্টা করেছেন। তিনিও আগামী নির্বাচনের হিসাব মোতাবেক এখন উল্টা বাইডেনের ওপর নিজেরই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সব দায় চাপিয়ে নিজে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। তাই বলা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্টরা মাত্রই আসলে দায়দায়িত্ব নিতে না চাওয়া অপরচুনিস্ট, সুবিধাবাদী। তাই শেষে সব ভার বাইডেনের উপর। যেমন,  বাইডেন ইতোমধ্যেই তালেবান ক্ষমতা দখল নিয়ে নেয়ায় নৈতিক দিক থেকে ঘায়েল হয়ে গেছেন; আমেরিকানদের মানসিক-নৈতিক দিক দুর্বল করে ফেলেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের একগুঁয়ে নীতিটাই বাইডেন চুপেচাপে অনুসরণ করে যেতে চেয়েছিলেন। চীনা পণ্যের আমেরিকায় আমদানিতে বাধা দিতে ট্রাম্প ওসব পণ্যের উপর বাড়তি ২৫ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করেছিলেন। সেটা সযত্নে চালু রেখেছেন বাইডেন। আর সেটাই এখন বাইডেনের উপরই শাস্তি হিসেবে আসা শুরু করেছে। ঐ ট্যাক্স আরোপ বাইডেন আগে বদল করতে যাননি, ‘কম দেশপ্রেমী’ হতে চাননি বলে হয়ত। কিন্তু সেটাই বাইডেনকে আমেরিকার আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ দিতে উদ্যত হচ্ছে বলে খবর চাউর হয়েছে। একই কায়দায় এটাও ট্রাম্পের আরেক ফায়দা।

    তালেবান-ক্ষমতারকালে বাইডেনের ভারতঃ
    ওদিকে বাইডেনের তালেবান উত্থান পলিসি ভারতের জন্য একেবারেই অসহ্য হয়ে উঠেছে। ভারত আর নিতে পারছে না কিন্তু পালানোর পথ নাই। আর সবচেয়ে অসহ্য হয়েছে  মূলত, পাকিস্তানের কাছে ভারতের নৈতিক পরাজয়। পাকিস্তানকে আর ‘জঙ্গি দেশ’ প্রচার করে ভারতের সুবিধা হচ্ছে না, জমছে না। (যদিও ভারত তাতে ক্ষান্ত দেয় নাই।) গত ২০ বছর ধরে প্রপাগান্ডায়  – যেন পাকিস্তানই আফগানিস্তানের মা-বাপ; সব ইসলামী রাজনীতিক বা সশস্ত্র ধারার উৎস। এই ছিল ভারতের মুখ্য প্রপাগান্ডা বয়ান।  গত ২০ বছর আমেরিকার ওয়ার-অন-টেরর যেন আফগানিস্তানের তালেবানসহ অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপের  বিরুদ্ধে ছিল না, যেন আমেরিকার যুদ্ধ চলছিল (জঙ্গি) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আমেরিকা যেন  পাকিস্তানি ইসলামী জঙ্গি থেকে ভারতকে মুক্ত করতে লড়ছিল। বিশেষ করে এত দিনের আফগানিস্তান যেন ছিল এক নারীমুক্তির ঘাঁটি  – এমন এক বিরাট কারখানা। আর এখন যা হয়েছে তা যেন, তালেবানদের আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল নয় –  বরং “পাকিস্তানের কারণেই” এই নারীমুক্তির কারখানা -টা এখন যেন বন্ধ হয়ে যাবে। আফগান নারীরা বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে  আমেরিকান স্কলারশিপে পড়তে গিয়েছে।  ফ্যাক্টস হল, কাবুলে আমেরিকান পুতুল গণি সরকার পালানোর কারণে এখন  এসব নারীদের পড়াশুনা  অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। কিছু না হলেও তা একটা সাময়িক ধাক্কা খাবে।  কিন্তু  আমেরিকান প্রশাসন সতর্ক ব্যবস্থা নিলে কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। মূল কারণ, পড়াশুনার কেন্দ্রটা  আফগানের বাইরে আর, সেসব দেশেই স্কলারশীপের অর্থ পাঠাতে কোন সমস্যা নাই। তবে উদ্বিগ্নতা থাকবে আর নতুন করে ছাত্রীরা এই সুযোগ পাবে না, এটা অনিশ্চিত। কিন্তু ভারত ইতোমধ্যেই প্রচার চালিয়েছে যে  তা তালেবানদের দ্বারা নয়, পাকিস্তানের কারণে যেন বন্ধ হয়ে যাবে। এই ক্যাম্পেইন এতদিন কানে কানে বলার মতো করে চালিয়েছিল ভারত। বিশেষ করে ইউরোপের স্কানডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা বেশি  করে ঢাকায় আমাদের কানে পর্যন্ত পৌছিয়েছে।

    ভারত এই ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার কাজ হাতে নিয়েছিল আরেক কারণে। রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাকে সাথে নিয়ে তালেবানের ওপর শক্ত গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমের মধ্যে তাদেরকে আসতে বাধ্য করার জন্য ত্রয়কা গঠন [দেখুন ট্রয়কা নিয়ে  আমার আগের লেখায়] করেছিল যাতে এই তিন দেশের বিরল কমন ও শক্ত অবস্থান তালেবানদের দেখানো এবং মানতে চাপ দেয়া যে তাদের কমন অবস্থান ও বক্তব্য আবার নিরাপত্তা পরিষদেরই প্রস্তাব। এর বাইরের কারো বা কোনো প্রস্তাব নয়। আর এ কাজ বাস্তবায়ন করতেই তারা পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল, যার নয়া নাম দিয়েছিল ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতেই ভারতের সব পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডা পানি হয়ে গিয়েছিল। এসবেরই প্রতিশোধ হিসেবে ভারত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আফগান নারীদের মধ্যে প্রপাগান্ডা চালিয়েছে যে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ পাকিস্তান। পাকিস্তানই তালেবানদের পরিচালক। অতএব আফগান নারীরা যেন পাকিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসঙ্ঘে “পিটিশন” লিখে আবেদন জানায়। অথচ বাস্তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুনিয়ার কোনো সরকারের এমন কোনো অভিযোগই নাই। জাতিসঙ্ঘসহ কোনো ফোরামেই এমন কিছু নাই। কিন্তু ভারত ইউরোপের ক্যাম্পাসগুলোতে আফগান নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন পিটিশন স্বাক্ষর ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছেই।

    গতকালের আনন্দবাজার পত্রিকা এক মজার খবর দিয়েছে, ভারতীয় অ্যাম্বাসির সর্বশেষ দেড় শ’ জনের যে দলটা কাবুল থেকে ফেরত এসেছেন তারা ফিরে এসেছেন তালেবানের দেয়া সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহায়তায়। ঘটনা হল, তারা দেশে নিরাপদে ফিরতে চান বলে স্থানীয় তালেবান কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করলে কমান্ডার ভারতীয় অ্যাম্বাসির ২২টি গাড়ির কনভয়-বহর পাহারা দিয়ে এয়ারপোর্টে নিরাপদে পৌঁছে দেন। আনন্দবাজার লিজেই লিখছে, “সকলকে তাজ্জব করে ভারতীয় দূতাবাসের ১৫০ কর্মীকে বিমানবন্দরের পৌঁছে দিল ওই তালিবান বাহিনীই”। যার মানে ভারতের নিজের ছড়ানো তালেবানদের নেগেটিভ ইমেজ তারা নিজেরাই পরিস্কার করে তবেই ভারতে ফিরে আসতে পেরেছে।

    ‘কাউন্টার হিরো’ ব্রহ্ম চেলানিঃ
     ব্রহ্ম চেলানি (Brahma Chellaney) একজন ভারতীয়; তিনি অনেক বাংলাদেশীর মতই আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো। তিনি দিল্লিতে বসে আমেরিকান ফান্ডে এক এনজিও / থিংকট্যাংক চালান, নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ  [Centre for Policy Research ]। তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate]  কলাম লেখেন আর সে লেখা বাংলাদেশের ‘প্রো-আমেরিকান’ পত্রিকাগুলো অনুবাদ করে ছাপে। কিন্তু তিনি বাইডেনের তালেবানদের সাথে রফা-ডিল করা  নিয়ে ক্ষিপ্ত এবং পরে  তালেবানরা নিজ মুরোদে আফগানিস্তানে  ক্ষমতা দখল করলে, এরপর তিনি একেবারে ক্ষেপে আগুন হয়ে যান। এতে তিনি এমনই হতাশ আর ক্ষুব্ধ হয়ে গেছেন, যাকে বলে ‘রাগে অন্ধ’। এর আগে তিনি কখনও  আমেরিকার উপরে এমন পরিপুর্ণ হতাশ হয়ে পড়েন নাই, অন্তত আমরা দেখিনি। যেমন তার একেবারে ভেঙ্গে পড়া বুঝা যাবে যদি দেখি  তার এবারের লেখার শিরোনাম – ‘কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বনেতৃত্বের অবসান হলো’ [Pax Americana Died in Kabul]। এটাই এর প্রমাণ। এই লেখার শুরুতে তার কথা মনে করেই লিখছিলাম।

     

  • বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3GN

     

    Xinjiang – China’s Uighur Problem

     

    এতদিন কথিত যে জঙ্গীপনা আমেরিকার চক্ষুশুল ছিল এখন প্রেসিডেন্ট  বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী নিজেই সেই “জঙ্গীনেতা” হতে চলেছেন? এই প্রশ্নটা ক্রমে ধেয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প বা ইকোনমিক তৎপরতার প্রতি আমেরিকা-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোখ দিয়ে তাকানো – এই দেখা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু  কোন ঈর্ষা বা অন্তর্ঘাতমূলক চোখ?  না, এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। শুধু তাই নয় এটা আত্মঘাতীও। মানে বোকা বোকা চোখমুখের কিছু স্টুপিড চিন্তা ছাড়া আর কীইবা বলা যায়! তবে প্রতিহিংসাপরায়ন মানসিক অসুস্থ মানুষ তো আত্মঘাতিই! অপরের যাত্রাভঙ্গ করে যেখানে যারা সুখ, অন্যকে কষ্ট দেওয়ার ভিতরের মিথ্যা-সুখ পেতে চায় আর হয়রান হয়!
    বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প থাকলেই এর উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে অন্তর্ঘাতমূলক [sabotage] হামলা করা বা এমন হামলাকে সমর্থন করা [Chinese Projects in Pakistan Prove Tempting Targets for Terrorist Groups………]  – এসবই আমেরিকা ও ভারতের চীন মোকাবিলার কৌশল ও ততপরতা হয়ে উঠছে।  অথচ এটা যেকোন বিচারেই অগ্রহণযোগ্য। এমনকি তা এদুই দেশের স্টান্ডার্ডেও অগ্রহণযোগ্য।  বলাই বাহুল্য এসব আসলে দেউলিয়াত্বের লক্ষণ, নিজ দেশ-রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সক্ষমতা যখন নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে বলে শাসকেরা অনুভব করে তখন এমন বেদিশ হবার লক্ষণ এগুলো!  সম্ভবত এটাই এর সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা!

    বুদ্ধিমানরা পড়শির উন্নতি দেখে ঈর্ষার পথে যাওয়ার আত্মঘাতী ভুলের দিকটা আগেই দেখে ফেলতে পারেন। তাই তারা এপথ পছন্দ করবেন না। এর চেয়ে পড়শির ঐ ‘উন্নতির’ সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খুঁজে পেলে তা থেকে নিজের জন্য কোনো রাস্তা বের করতে পারেন কি না সেই চোখে তারা ঘটনাকে দেখে থাকেন। নয়তো পড়শির তৎপরতা দেখে সেখান থেকে আগ্রহ পেয়ে নিজেই পাশে তেমনই কিছু খাড়া করেন। এসবই হল গুরুত্বপুর্ণ পজিটিভ চোখ খুলে ঘটনার দিকে তাকানো ও বুঝার পথ।
    তবে আরেক বিকল্পও আছে, স্বভাবতই তা নেতি ও ঈর্ষার পথ। পড়শির উন্নতির বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে প্রপাগান্ডা শুরু করা আর তাতে এক রংচঙ্গা দুনিয়া বানানো আর সেটা দেখিয়ে প্রতারণা ইত্যাদি। কিন্তু এই প্রপাগান্ডা করে বেনিফিট মানে এর লক্ষ্য কী?

    সবচেয়ে বড় কথা, খোদ নিজের বেনিফিট কী? ঈর্ষায় ডুবে থাকা মনে এর খবর থাকে না। বরং বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আমেরিকাই এমন প্রপাগান্ডা ভারতকে গিলিয়েছে। একপর্যায়ে দেখা যায়, ভারত তা মিথ্যা জেনেও বিশ্বাস করেছে। অথচ উদ্দেশ্য কী, বেনিফিট কী তবু সে খবর ভারত নেয়নি; যদিও এসব ক্ষেত্রে আমেরিকার নিজ উদ্দেশ্য নিজের কাছে স্পষ্টই থাকে যে, সে ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, চীন-ভারতের গঠনমূলক বা পরস্পর নির্ভরশীল কোন সম্পর্ক যেন না খাড়ায় যায়। কারণ এমন হতে না দেয়াটাই আমেরিকার স্পষ্ট স্বার্থ। বিশেষত এশিয়ায় দু’টি বড় অর্থনীতি চীন-ভারত যেন আমেরিকার স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজেরাই পারস্পরিক সহযোগিতার কোন আসর না বসিয়ে ফেলে।

    ভারত-আমেরিকা এমন সম্পর্ক বানানো নিয়েও হয়ত বাইরে থেকে খুব কিছু বলার নেই। কারণ সিদ্ধান্ত মানেই তো তা যার যার নিজের। এছাড়াও আর কারণ, গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের এই কালে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার দুনিয়া। যে যেখানে স্বার্থ ঠিক বা ভুলভাবে বুঝবে সে দায় শেষবিচারে তারই। আর এটা তার নিজেই চয়েজ – তাতো বটেই।  তবু ঈর্ষার আরেক চরম অবস্থার পথ ও পর্যায় আছেঃ স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। প্রতিদ্বন্দ্বীর স্থাপনা, সম্পত্তি অথবা ব্যক্তির ওপর হামলা আর ধ্বংসাত্মক কাজে নেমে যাবার ভূমিকা নেয়া।  বাইডেন বগলে ভারতকে নিয়ে সে পথের চয়েজে যাবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন!

    প্রথম কথা ও এককথায় বললে, এই পথ আত্মঘাতী। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে হতাশায় এসব কাজে জড়িয়ে  নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান ও সফল মনে হতে পারে। কিন্তু এটা ভুল। বাস্তবত এটা হল, প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই যদি সবার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ-তৎপরতায় জড়িয়ে যায় এতে সবারই ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। যেন শহরের সবাই সবার বিরুদ্ধে ছিনতাইকারী-লুটেরা হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা করছে, এমনটা কল্পনা করা যায় বড় জোর বাস্তবে  তা হতে পারে না।
    যদি সাময়িক লাভের চোখে না-ই দেখি, তবে জীবন মানেই কিন্তু এক ইতিবাচক লক্ষ্যের জীবনই বুঝায়। তবে যে আসলে নিজ জীবন-তৎপরতার কোনো ভবিষ্যৎ দেখে না, হতাশ, সেই অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা, আত্মঘাতী দিকটা দেখতে পায় না। বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের ‘জঙ্গিনেতা’র মত হতে চলেছেন?

    The Karakoram Highway, also known as the China-Pakistan Friendship Highway, is part of China’s Belt and Road Initiative. Image: AFP Forum

    পাকিস্তানের সিপিইসিঃ
    ‘সিপিইসি’ প্রকল্পে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ আর কোন সীমায় থাকতে পারছে না। চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর বা সংক্ষেপে ‘সিপিইসি’[CPEC] , এটা হল পাকিস্তানে চীনের এক সর্ববৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্প যেখানে মোট ৬২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে। এর শুরু হয়েছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান জলসীমায় গোয়াদরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে নেয়া থেকে। এরপরে বন্দরের সাথে যুক্ত ডাঙ্গা ভূখণ্ডে পাকিস্তানের চার প্রদেশকেই উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বুকচিরে যাওয়া হাইওয়ে, এটি পাকিস্তানের উত্তরের সীমান্ত শেষ হয়ে পরে চীনের জিনজিয়াং (উইঘুর) প্রদেশের কাশগড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধে হেরে যাওয়া হিটলারের জার্মানি বা ইতালিসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপকে পুনর্গঠনে (রিকনস্ট্রাকশন ও ডেভেলপমেন্ট) আমেরিকা এক বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়েছিল যা “মার্শাল প্ল্যান” নামে পরিচিত ছিল। অনেকে একালের সিপিইসি প্রকল্পকে পাকিস্তানে নেয়া চীনের ‘মার্শাল প্ল্যান’ বলেও তুলনা করে থাকে।

    তবে এ তো গেল ইতিবাচক চোখে দেখে বর্ণনা। আমেরিকা বা ভারতের স্বার্থ দেখা যারা নিজেদের কাজ মনে করবে বা এ জন্য নিয়োজিত তাদের এর চেয়ে ভিন্ন চোখে দেখাই স্বাভাবিক, অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে দেখবে সেটা তো ঠিকই আছে। কিন্তু তাই বলে ‘সিপিইসি’ শব্দ বা ধারণাটা কোথাও দেখা পাওয়া মাত্রই ঈর্ষায় জ্বলে উঠতে হবে, এটা সুস্থ লক্ষণ নয়। অথচ এটা কি অপ্রয়োজনীয় নয়? কিন্তু এরপরেও এমন ভয়াবহ কিছুর দিকে পরিস্থিতিকে কেউ কেউ জেনে না জেনে টানছে।

    ‘সিপিইসি’ যদিও চীনা ঋণ-বিনিয়োগে নেয়া পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প এবং এতে ওনারশিপ, লাভালাভ ও দায়সংশ্লিষ্টতা অনুভবে রাখার জন্য সে দেশের চার প্রাদেশিক সংসদেও আলাদা আলাদা করে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। তবু এই প্রকল্প পাকিস্তানের মতই প্রায় সমান ব্যবহারকারী এবং সুবিধাভোগী হল চীনও। অর্থাৎ চীন কেবল বিনিয়োগকারী নয়। সিপিইসি-এর হাইওয়ে চার প্রদেশের ওপর দিয়েই গিয়ে চীনে প্রবেশ করেছে। ফলে চীনেরসহ পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক ভূখণ্ড থেকেই রওনা দিয়ে নিজ উতপাদিত অথবা আমদানিকৃত কাচামাল –  এমন সকল আমদানি-রফতানির পণ্য নিয়ে গভীর বন্দরে আসা যাওয়া করা সবচেয়ে সহজ। তাই সবাই এর বেনিফিসিয়ারি।

    কথাটা আরো ভালো বুঝা যাবে যদি চীনের ভূগোল মনে রাখি। চীন আসলে সাড়ে তিন দিক থেকে পাহাড়ে ঘেরা ল্যান্ডলকড এক ভূখণ্ড যার কেবল মাত্র পুব দিকেরও আবার একাংশ খোলা। এর মধ্যে পশ্চিম দিক আবার হিমালয় পর্বতমালার মতো পাহাড়ে ঘেরা যেখানে চাইলেও উচ্চতা আর দুর্গমতার কারণে যোগাযোগের রেল বা সড়ক নির্মাণ খুবই কঠিন।

    সেই আশির দশক থেকে  চীন আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ নিয়েই আজকের জায়গায় এসেছে, কোন সন্দেহ নাই। আমেরিকাকে বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে চীনের অর্থনীতি আজকের জায়গায় আসতে রওনা দিয়েছিল বলা যায় সেই ১৯৭৮ সাল থেকে। পরের ৩০ বছরে ক্রমে লাগাতার ডাবল-ডিজিটের পথে উন্নতি করে সেই চীন আজকের যে চীন হয়েছে সে আসলে এখন আবার খোদ আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, গ্লোবাল নেতার জায়গা নিতে চায়। তাই সেই সময়কালটাকে (১৯৭৮-২০১০) আমেরিকার দিক থেকে বলা যায়, এক দিকে বিপুল বিনিয়োগের বাজার পাওয়ার সুযোগ, সুখ ও লোভ অন্য দিকে চীনের উন্নতিতে চীন আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে এই টেনশন – এমন এক মিশ্র অনুভব নিয়ে পার করতে হয়েছে।

    The Strait of Malacca

    তাই শেষের দিকে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীতা খোলাখুলি হয়ে ওঠেছিল। ওতএব  এই  “উন্নত- চীনের” দুর্বলতা খুঁজে সেটাকে চেপে ধরে রাখার উপায় বের করতে গিয়েছিল ওয়াশিংটন। পেয়েছিল এক ‘মালাক্কা প্রণালী’ [Strait of Malacca]। এটা হল সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পথের এক রূট। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আনা চীনের অনিবার্য প্রয়োজন। কিন্তু তা চীনা বন্দরে নিতে গেলে এই মালাক্কা প্রণালী পার হয়েই যেতে হবে। সেই সমুদ্রপথে মালাক্কা প্রণালী হল সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর আগে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার ভূখণ্ডের মাঝখান দিয়ে গেছে এমন আধা কিলোমিটার চওড়া চিকন এক জলপথ বা প্রণালী। সমুদ্রপথে এই প্রণালীতে কয়েকটা জাহাজ আড়াআড়ি ফেলে রেখে চীনকে এই পথে চলাচলে বাধা তৈরি করা যায় ও সম্ভব, এই হল আমেরিকান পরিকল্পনা। এমন সামরিক পরিকল্পনা যে নিস্তরঙ্গ পানিতে আমেরিকাই সবার আগে এঁটেছে, সেটা আমেরিকার বিরুদ্ধে কোন কাল্পনিক অভিযোগ একেবারেই নয়।

    আমেরিকার সরকার-প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটা ভাল (বা কারো দিক থেকে খারাপ) রাজনীতি-চর্চা ও রেওয়াজ হল যে, আমেরিকান সরকার তার নীতি-পলিসির বহুকিছুই বা পুরোটাই গোপন রেখে দিতে পারে – দিয়ে থাকে ও দেয়। কিন্তু যে ইস্যুটা আমেরিকান সিনেট-সংসদে একবার যাচাই বা নিরীক্ষার জন্য উঠে আসা বা এসে যায় সেই ইস্যু সংশ্লিষ্ট সব তথ্য পাবলিকলি ওপেন করে দেয়া হয় বা হয়ে যায়। এমনকি তা (রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা না হলে) লাইভ টেলিকাস্টে সিনেটের ঐ ডেস্ক থেকে সরাসরি দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তেও প্রচারিত হতে পারে, সম্ভব। ২০০৮ সালের এমনই এক সিনেট-শুনানিতে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, চীনকে বাধা দেয়ার জন্য আমেরিকাই প্রথম ‘মালাক্কা প্রণালী’ নিয়ে স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা করেছিল আর তাতে ভারতকে কাছে টেনে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহারের তথ্য আছে।


    এখন মালাক্কা প্রণালীর কথা এখানে আনলাম এজন্য যে, ঐ প্রণালীকেন্দ্রিক আমেরিকান যুদ্ধ কৌশলেরই পালটা চীনের জবাব এবং একটা পদক্ষেপ হল  চীনের পাকিস্তানের সাথে সিপিইসি প্রকল্প নেয়া। কারণ চীন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না যে, তাকে আমেরিকা ঘিরে ধরছে, ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। তাই চীন গোয়াদর বন্দর নির্মাণে আগ্রহী হয়েছিল। তবে চীনের ভুখন্ড থেকে সমুদ্রে প্রবেশের প্রধান ফটক পূর্ব দিকের বন্দরগুলো ফেলে ঠিক উল্টো দিকে চীনের পশ্চিমের সীমান্তকে সরাসরি গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত করতেই সিপিইসি প্রকল্প নিয়েছিল। গত ২০১৩ সালে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল আর যা ২০১৫ সালেই চীন ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পের চুক্তি সই করা হয়। চীনের এই পশ্চিম সীমান্তই দুর্গম জিনজিয়াং (উইঘুর Xinjiang Uyghur Autonomous Region) প্রদেশ, যার কাশগড় পর্যন্ত সিপিইসি যোগাযোগ প্রকল্প  বিস্তৃত।


    সিপিইসি প্রকল্পে ‘
    জঙ্গি’ হামলাঃ
    খবরটা খুব সিম্পল। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে [পুরান নাম North-West Frontier Province] একটা বাসে বিস্ফোরণ-হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জনই চীনের প্রকৌশলী, যারা একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করছিলেন। সিপিইসি প্রকল্পের বড় বড় অংশই হল নানা বিদ্যুৎ প্রকল্প। আর ‘প্রকল্প’ বলতে এটা আসলে চার প্রদেশে বিভিন্ন ইপিজেড ফ্যাসিলিটি যেমন- গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, বিভিন্ন শোধনাগার ইত্যাদির সুবিধা স্থাপনা গড়ে তোলা যাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়ে আসে আর ওই হাইওয়ে ও বন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রফতানির তৎপরতা জমে ওঠে।

    কিন্তু সাবধান! এখানে বাসে হামলা বলতে কোন শহরে টাউন সার্ভিস বাসে হামলা নয়। এটা কয়েক কিলোমিটার জুড়ে এক প্রকল্প এলাকার ভেতরেই প্রকল্পের নিজেদের বাস ব্যবস্থা- বিদেশী প্রকৌশলী টেকনিক্যাল লোক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা প্ল্যান্টের শ্রমিকদের কাজে আনা-নেয়ার বাস। এই বাসের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাগুলো ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান আর তাতে বাস নদীর তীরে খাদে ফেলে দেয়া হয়েছে।

    Rescue workers and onlookers gather around a wreck after a bus plunged into a ravine following a bomb explosion, which killed 12 people including 9 Chinese workers, in Kohistan district of Khyber Pakhtunkhwa province on July 14, 2021. (Photo by STRINGER / AFP)

    এশিয়া টাইমসে পাকিস্তানের সাকিলের রিপোর্টঃ
    এফএম সাকিল [FM Shakil] হংকং থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়া টাইমসে’ নিয়মিত লেখেন। আমেরিকান স্বার্থের পারস্পেকটিভ থেকেই তিনি সাধারণত লিখে থাকেন। যেমন – এবারেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন তিনি, “ইমরান সিপিইসি বিস্ফোরণ ইস্যুতে চীনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন” । আসলে ব্যাপারটা হল, চীন স্বভাবতই এই চীনা নাগরিক হত্যায় খুবই কড়া মনোভাব নিয়েছে। চীনা তদন্তকারী স্টাফ গ্রহণে পাকিস্তান রাজি হয়েছে এবং চীন ঘটনায় ‘কেস সলভ করে’ জড়িতদের কড়া শাস্তি দিতে চীন-পাকিস্তান একসাথে কাজ করবে জানিয়েছে [China sends expert criminal investigators to Pakistan, urges severe punishment for perpetrators……]। এফএম সাকিল আরো লিখছেন, ‘পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে প্রথম থেকেই ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ইটিআইএম) নোংরা কাজ বলে বর্ণনা করছিলেন” [Pakistani officials have since indicated it was the dirty work of the East Turkestan Islamic Movement (ETIM), ……]।’ তা এখন বিরাট ঘটনা হিসেবে হাজির হয়ে গেছে।
    অবস্থা সামলাতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কড়া কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন- সিপিইসি প্রকল্প পরিচালিত হয় সিপিইসিএ [CPEC-A] নামে এক সরকারি অথরিটি বা কর্তৃপক্ষের অধীনে। গত দুবছর ধরে [ending the military’s de facto two-year control…] এই অথরিটির চেয়ারম্যান ছিলেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া। অনুমান করা হয়, প্রকল্পের নিরাপত্তার দিকে গুরুত্ব দেয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার গত সপ্তাহে ইমরান এক স্বনামধন্য এক ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর  যিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও যার বড় প্রকল্পের ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা আছে, নিজের মালিকানাধীন ও সরকারি প্রজেক্ট ম্যানেজ অভিজ্ঞতা রাখেন – সেই খালেদ মনসুরকে “প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী” [SAPM] হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি প্রধানমন্ত্রীকে সিপিইসি প্রকল্প প্রসঙ্গে সহায়তা করবেন। আর এই নিয়োগের পরপরই জেনারেল বাজওয়া নিজেই সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিয়েছেন। তাই পাকিস্তানের রেওয়াজ অনুসারে, সংশ্লিষ্টদের অনুমান যে অচিরেই ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন। আর লেখক সাকিল প্রধানমন্ত্রী ইমরানের এই ব্যাপারটাকেই ক্ষুব্ধ চীনকে তার ঠাণ্ডা করার প্রয়াস বলে দেখেছেন। তবে ঘটনা আরো আছে।

    US President Donald Trump (L) listens to US Secretary of State Mike Pompeo during a Cabinet Meeting at the White House in Washington,DC. -(Photo by Brendan Smialowski / AFP)

    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টঃ
    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ETIM বা ইটিআইএম); কারা এরা? ভয়েজ অব আমেরিকা জানাচ্ছে, [US Removes Anti-China Militant Group From Terror List] ২০০৩ সাল থেকে ইটিআইএম চীনা উইঘুর সশস্ত্র সংগঠন যারা আমেরিকার জঙ্গি সংগঠনের তালিকায় ছিল [Washington listed ETIM as terrorist group in 2003. ]। মানে? এটা আগে ছিল এখন নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, তিনিই এক সকালে ETIM এর নাম আমেরিকার অফিশিয়াল “জঙ্গি সংগঠনের তালিকা” থেকে কেটে দেন। ৭ নভেম্বর ২০২০ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল। এর আগের দিন তিনি এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেন?

    ট্রাম্পের অনেক বদনাম, ‘ভদ্রলোকেরা’ তাকে দেখতে পারেন না। তিনি গাড়োল গাঁইয়া ধরনের মানুষ এবং সর্বোপরি তিনি জাতিবাদী; সে জন্যই নাকি? এটা শতভাগ মিছা কথা। এমনিতেই ডেমোক্র্যাটরা মোমের পালিশ করা মুখ নিয়ে ঘোরেন বা থাকেন; তাদের মনের কথা সহজে পড়া যায় না। এর বিপরীতে গোঁয়ার ট্রাম্প সবার সামনে ও চোখেই উন্মুক্ত ব্যক্তিত্ব। তাই তার বদনাম বেশি। তার বিপরীতে বাইডেন ‘ছুপা’। চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের জাতিবাদী লড়াই, চীনাপণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের লড়াই   – এক কথায় ‘ট্রেড ওয়ারের’ বা বাণিজ্যযুদ্ধের কথা সবাই জানে। অথচ বাইডেন এখন ট্রাম্পের সেই নীতিই বাইডেন এখন অনুসরণ করে চলেন।

    ট্রাম্প সেই প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধের ভেতর প্রথম এক “ইতর পদক্ষেপ” এনেছিলেন। সেটাই হল, চীনকে তিনি দেখতে পারেন না, শত্রু মনে করেন – সেই চীনের বিরুদ্ধেই ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলার ব্যবস্থা করেন তিনি। তিনি “অসতভাবে” এই খেলা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কীভাবে?

    এতে বিপর্যয় কী ঘটে গিয়েছিল?
    চীনের সাথে ট্রাম্পের আমেরিকার  স্বার্থবিরোধ আছে, স্বাভাবিক! কিন্তু চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে কী সেই (রাজনৈতিক) স্বার্থের ভিত্তিতে ট্রাম্প ঠিক করবেন যে উইঘুরের ইটিআইএম [ETIM]  এই সশস্ত্র গ্রুপটাকে জঙ্গি বলবেন কী বলবেন না, জঙ্গী তালিকায় রাখবেন কিংবা বের করবেন?  তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও সন্দেহবশত আমেরিকা তাকে টর্চার করলে এবার চীন কি তার পক্ষে কোনো মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? অর্থাৎ কারও মানবাধিকার লঙ্ঘণ হয়েছে – একথা আমেরিকা বলবে কিনা তা নির্ভর করবে সেটা আমেরিকার শত্রুর বিরুদ্ধে যাবে কীনা; যদি যায় তাহলে আমেরিকা মানবাধিকার লঙ্ঘণ বলে হৈ চৈ তুলবে? এটা কী কোন রাস্ট্রের মানবাধিকার বোধ হতে পারে? নাকি এটা মানবাধিকার বেচা-বিক্রি এটা?

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেনঃ
    উইঘুরের ETIM কে আমেরিকা ১৮ বছর ধরে নিজের জঙ্গী সংগঠন তালিকায় রেখেও ট্রাম্প চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধে ব্যবহারের জন্য এটা আর জঙ্গী নয় বলে রায় দিয়েছিলেন।  আর এই অনৈতিক সিদ্ধান্তই পরে বাইডেন পরে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসাবে নিয়ে আসেন, কারণ ট্রাম্প মাত্র পরে আড়াই মাস ক্ষমতায় ছিলেন।
    আমেরিকা ইসলামী সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি তালিকা’ বানায়। জাতিসঙ্ঘেরও এমন নিজের আলাদা একটা ‘জঙ্গি’ তালিকা আছে। তবে জন্ম থেকেই তালিকার সমস্যা হলো, টেররিজম বা জঙ্গি কাজের সংজ্ঞা কী ও কোনটা- তা আজও না পশ্চিমা কোনো দেশের কাছে, না জাতিসঙ্ঘের কাছে আছে। তবু এ নিয়ে কাজ করার মত একটা ঐকমত্য তাদের মধ্যে দেখা যেত সেকালে। যেমন  – চীন বা রাশিয়ার চোখে যারা জঙ্গি তারা পশ্চিমা অন্যান্য দেশ বা ইউএন এদের চোখেও জঙ্গি বলে তালিকায় উঠতে বড় কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। অন্যভাবে বললে, চীন বা রাশিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশের মত নয়, বরং পরিষ্কার আলাদা। তাদের স্বার্থও অনেক জায়গায় অনেক আলাদা হলেও চীন বা রাশিয়ার তালিকায় থাকা জঙ্গিদের আমেরিকা নিজ বাণিজ্য স্বার্থে নিজেদের তালিকার বাইরে রাখবেন এমন চল – এই জুয়াচুরি তখন চালু ছিল না।

    এ কারণে উইঘুর ETIM সংগঠন ২০০৩ সাল থেকেই আমেরিকার ও জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় কোনো  নড়াচড়া ছাড়াই বজায় ছিল। পম্পেও যেই নামটাই তালিকাচ্যুত করেছিলেন আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থে, অনৈতিকভাবে।
    ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে তার বাণিজ্য লড়াইয়ের উপাদান হিসেবে কার নাম জঙ্গি তালিকায় ঢুকাবেন বা বের করবেন এমন কাজ একেবারে প্রত্যক্ষভাবেই ক্ষমতার অপব্যবহার। আর এমনটা শুরু করেন প্রথমে তিনিই। তবে সেটা গত ৭ নভেম্বর মানে ট্রাম্পের ক্ষমতা ত্যাগের মাত্র আড়াই মাস আগে। তাই ট্রাম্প এর ব্যবহারকারী হতে সময় পাননি। পরে এর প্রধান অপব্যবহারকারী প্রেসিডেন্ট হন বাইডেন।

    আরেকটা টেকনিক্যাল ও রেওয়াজের সমস্যা ছিল।
    এমনিতেই ব্যাপারটাকে আগে টেকনিক্যাল প্রবলেম মনে করা হত। যেমন – ধরা যাক বেলুচ কোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক গ্রুপ। এই সংগঠনের ওপর নির্যাতন করে ধরা যাক, পাকিস্তান মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে – এমন অভিযোগ আনতে আমরা পাকিস্তানের বাইরের কোনো মানবাধিকার সংগঠনকে দেখিনি। বিশেষত পাকিস্তানের তালিকায় যদি ওরা সশস্ত্র ও নিষিদ্ধ সংগঠন হয়। ফলে এতদিনের রেওয়াজ ছিল, কোন গ্রুপ সশস্ত্র হলে আর মানবাধিকার গ্রুপ তার পক্ষে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করত না।   এড়িয়ে যেত। সোজা কথা কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের সমর্থিত কোনো সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষে কেউ মানবাধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত না। বাইডেন সেই রেওয়াজ ভেঙেছেন এবং ভেঙেছেন রাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থে, চীনের সাথে পেরে উঠতে!

    অর্থাৎ আগে ভারতের আসামের উলফাকে বাংলাদেশ যদি অস্ত্র আনতে সহায়তা দিত তাহলে আর বাংলাদেশের কোন মানবাধিকার গ্রুপ  উলফার মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে দাড়াত না।  এড়িয়ে যেত। ট্রাম্প- পম্পেও-বাইডেন এই রেওয়াজ ভেঙ্গেছে শুধু না। কার মানবাধিকার রক্ষা বলে তারা আওয়াজ তুলবে তা নির্ভর করবে সেই ইস্যুটা তুলে আমেরিকার বাণিজ্যিক লড়াইয়ে ফয়দা আছে কিনা!  যার সোজা মানে কারও মানবাধিকার আসলেই লঙ্ঘণ হয়েছে কি না তাতে কিছুই এসে যায় না!

    কেউ স্রেফ মুসলমান বলে কারণে আমেরিকা রাষ্ট্রের সন্দেহের শিকার হতে পারে।সন্দেহবশত, তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া বা কমপক্ষে রিমান্ড সহ্য করতে হওয়া কিংবা  রেনডিশন [rendition] (অন্য দেশে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে টর্চারে কথা বের করা) ইত্যাদি অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়েছে, এমন উদাহরণ হয়ত কম নয়। [দেখুন ওবামার রেনডিশন প্রগ্রাম প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ।]

    এখন ট্রাম্প ও বাইডেন তাদের চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে তারা সেই রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে ঠিক করবেন উইঘুরের ETIM জঙ্গি কি জঙ্গি নয়? তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও, সন্দেহবশত তাকে টর্চার করা হলে চীন কি তার পক্ষে মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? বাইডেন এই অনৈতিকতা চালু করেছে!

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেন!
    তাই আগে ট্রাম্প ‘রায়’ দিলেন উইঘুর ETIM-এরা আর চীনের জঙ্গি সংগঠন নয়। আর বাইডেন এসে এরপর যোগ করলেন – চীন উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে।
    অথচ বাইডেনকে মনে রাখতে হবে মানবাধিকার নিজ বাণিজ্যস্বার্থের হাতিয়ার বা টুলস নয়। এটা অপব্যবহার! হেনরি কিসিঞ্জার বাইডেনদের এই সস্তা বাণিজ্য-বুদ্ধিতে ‘মানবাধিকার’ বুঝতে বলেননি।

    শুধু তাই নয়। পম্পেও চাতুরিতে ETIM-এর নাম জঙ্গী তালিকা থেকে বাদ দিলেও তখনও জাতিসংঘের তালিকায় এটা তখনও আগের মতনই জঙ্গী সংগঠন। ফলে সেটা রক্ষার দায় তখনও আছে। একারণের চীন এই প্রসঙ্গটা তুলে তার আপত্তি জানিয়েছিল কিন্তু সেকথা শুনে নাই।

    আরো বিপজ্জনক ব্যক্তিত্ব
    তাও বাইডেন এখানে আটকে সীমাবদ্ধ থাকলেও চলত। বিদেশে চীনা প্রকল্প মানেই সেখানে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ চালাতে হবে; বা উইঘুর ETIM-কে দিয়ে সে কাজ করাতে হবে – বাইডেন এখন এমন জায়গায় চলে যাচ্ছেন! এটা কি কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ? না কোনো মানবাধিকার রক্ষা? অথবা এটা কোনো ‘জঙ্গিবাদ’? বাইডেন কি নিজেই ভারতকে বগলে নিয়ে এই নয়া ‘জঙ্গিবাদের’ নেতা হতে চলেছেন না?

    কেন ভারতের নাম?
    বাংলাদেশের চীনা প্রকল্প মানে অন্তর্ঘাত, চীনা প্রকৌশলীর অপমৃত্যু! কিংবা ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার!  “সর্ষের মধ্যে ভূত আছে কি না, দেখতে হবে” – বলে বাংলাদেশের সেতুমন্ত্রীর মন্তব্য।’ এসব কিসের আলামত? এটা কী কোনো বাণিজ্যযুদ্ধ না প্রতিযোগিতা? এর মানে বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন ‘কোন ধরনের নেতা’ হতে চলেছেন?

    ETIM-কে মানুষ খুন করতে উৎসাহ বা পথ করতে দেয়া কি একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে মানায়? নাকি এটা দেউলিয়াত্বের লক্ষণ!

    [ উইঘুরে চীনের দায়দায়ীত্বও কম নয়। সেটা সে পালন করেছে তা বলা যাবে না। নুন্যতম প্লুরাজিম বা একাধিক মত অবস্থানের পাশাপাশি থাকার কোন সুযোগ চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এখনও নাই। এটা সবসমস্যার গোড়ার সমস্যা এটা। এমনকি এটাই যেকোন সমাধান না পাবার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। তবে সে প্রসঙ্গ নিয়ে আলা্দা করে লিখতে হবে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৫ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী হলেন?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    গৌতম দাস

    ০৯ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

     

    India Not Invited to Extended Troika Meeting on Afghanistan

     

    তালেবানবিরোধী  প্রচারণা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে।  ফলে তাদের সতর্ক ও বুদ্ধিমান হয়ে পা-ফেলা দরকার। এদিকে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি কখনো কখনো বেশি শক্তি দেখাতে চায়। আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council], এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো-রা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চেয়েও বুদ্ধিমান দেখাতে চাচ্ছেন নিজেদের। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে হিমশিম খেয়ে, কী বলবেন এখন, কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা হাতড়ে অসহায় অবস্থায় মুখ বন্ধ হয়ে আসার দশায় তারা। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা এখন আমেরিকাকে সাধুপুরুষ আর মহাভদ্রলোক সাজিয়ে এরপর চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান এমনকি ভারতকেও অভিযুক্ত করে নিজ মান বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। বলার চেষ্টা করছেন এসব দেশের স্বার্থের কারণেই নাকি তালেবানেরা আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফিরে আসার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক হয় নাই। এমনকি এর স্বপক্ষে কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেও সে নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই  এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  অতএব,  আটলান্টিক কাউন্সিল – এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব পুরান প্রপাগান্ডায় খ্যান্ত দেয়া, ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  দেখাই যাচ্ছে, রাশিয়ার উদ্যোগে চীনও পাশে দাড়িয়েছে। বাইডেনও যোগ দিয়েছেন। কাজেই নতুন ও ইতিবাচক চোখে  এসব কনসালটেন্টদের সামনে তাকানো উচিত।  বাইডেনের চেয়ে বুদ্ধিমানের ভান করা অপ্রয়োজনীয়।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক করেছে এমন কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেই নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই সেটা এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  কাজেই আটলান্টিক কাউন্সিল, এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  আবার ওদিকে ফ্যাক্টস হল, তালেবানদের আইডিয়া মর্ডান না হতেই পারে। কিন্তু সেটা তো তাদের প্রতি বিদ্বেষ জাগিয়ে তা কোন সমাধান নয়, এটা তো প্রমাণিত। একমাত্র ডায়লগ চালিয়ে গেলে, এনগেজমেন্ট এটাই পথ।  আর মূলত দরকার আফগানি স্টাবিলাইজিং ফোর্স। যেটা অবশ্যই পুতুল সরকারের কেউ নয়। এটা আপন ভাগ্যন্বেষণের লোক।  তুলনায় তালেবানদের নিয়ে যত আপত্তি আমরা মিডিয়ায় দেখি তবু তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

    ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে আমেরিকা তালেবানবিরোধী পুতুল সরকার বসিয়ে যা খুশি তাই করার সুযোগ নিয়ে চলেছিল। অথচ এই কনসালট্যান্ট ফেলো এরাই এখন প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কেন আফগানিস্তানে এমন রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি, যেখানে তালেবানের বিকল্প শক্তি তৈরি হয়, কেন তালেবানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকল?” এখন এই প্রশ্ন তাদেরকেই আমরা জিজ্ঞাসা করব। তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। তাই তারা বুদ্ধিমানের মত আগে নিজেই প্রশ্ন তুলে জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন, কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। এরাই আবার পাকিস্তানকে দায়ী করছেন যে পাকিস্তান হল তালেবানের “আশ্রয়দাতা”। যেন সে জন্য আজকের আফগানিস্তানে তালেবানরা ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ ঘটনা হল আফগানিস্তান বা তালেবানরা কেউই পাকিস্তানের শত্রু বা বিরোধী ছিল না, স্বাভাবিক পড়শি ছিল। আমেরিকানরাই জবরদস্তিতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে, আমেরিকার আফগান-শত্রুতাকে যেন পাকিস্তানও নিজের শত্রু জ্ঞান করে। আর যাতে আমেরিকা পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে সেখান থেকে উড়ে গিয়ে আফগানিস্তানে বোমা ফেলে আসতে পারে। অথচ সেই আমেরিকাই (ইন্ডিয়াকে বগলে নিয়ে ) উল্টো পাকিস্তানকে “জঙ্গি আশ্রয়দাতা” দেশ বলে প্রপাগান্ডা করে গেছে।  অথচ কার্যত এভাবে পাকিস্তান তো আমেরিকান হুকুমে চলে যাওয়া এক দেশ হয়েই ছিল। তাহলে এই পাকিস্তান আবার আমেরিকানদের শত্রু তালেবানদের নিজ দেশেই আমেরিকানদের পাশাপাশি আশ্রয় দেয় কেমন করে!

    আবার একালে আফগানিস্তান সব খোয়ানো আমেরিকার সেই আফগানিস্তানকে ফেলে পালানোর ইচ্ছা বহুদিনের, সেই ওবামা আমল থেকে। এ কারণে তারাই সে সময় চীনকেও আফগানিস্তানে সংশ্লিষ্ট হতে বলেছিল। গ্লোবাল নেতা হতে চাওয়া চীনেরও কিছু কিছু দায়-দায়িত্ব  নেয়া শুরু করুক এই উদ্দেশ্যে আমেরিকা তার কিছু ভার হাল্কা করতে চেয়েছিল, ফলে চীন তালেবানদের সাথে কথা বলুক মূলত এ লক্ষ্যে।  ফলাফলে  এক থার্ড পার্টি দেশ কাতারে  – তালেবানরা যেন অবাধে যেতে-আসতে ও যে কারো সাথে মিটিং করতে পারে; এ ব্যবস্থা ওবামা আমলেই ২০১৫ সাল থেকে চালু করা হয়েছিল। অরিজিনালি ‘সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন’ বা এসসিও জোট গঠন করার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এটিই। যে কারণে সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশ আর চীন ও রাশিয়াকে নিয়েই গঠন করা হয়েছিল এসসিও। অথচ আজ আমেরিকান ফেলোরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন যেন চীন-রাশিয়া নিজ স্বার্থেই তালেবানদের ফেরত আনছে। আর ওদিকে বিবিসি খবর দিচ্ছে কাতারের আলোচনা আরো পুরানা ২০১৩ সালের উদ্যোগ।

    আবার ওবামার পরে ট্রাম্প আরো জব্বর উদ্যোগী যেন পারলে এখনই আফগানিস্তানকে ফেলে নিজ সেনাদের নিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু তিনিই তো সেনা প্রত্যাহারের আলোচনা আফগান পুতুল সরকারের সাথে করেননি; বরং সরাসরি কেবল তালেবানদের সাথেই কথা বলেছিলেন, ‘ডিল’ করেছিলেন। সেনা প্রত্যাহারের শেষ দিন কী হবে, তাও পর্যন্ত ঠিক করেছিলেন; যা বাইডেন ক্ষমতায় এসে পুনঃঅনুমোদন দিয়ে সেটি ‘তারও চুক্তি’ বলে স্বীকৃতি দেন। অথচ ট্রাম্প তালেবানদের সাথে কিসের বিনিময়ে কী ডিল করে গেছেন, সেটা প্রকাশ্য নয়। তালেবানরা নিজ উদ্যোগে ক্ষমতা দখল করুক আর এতে ট্রাম্পই অনুমোদন দেয়ার বিনিময়ে- এ শর্তেই আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার বাধাহীন করে দিয়ে যাননি, তা আমরা কি নিশ্চিত? সে জন্যই কি থিংকট্যাংক ফেলোরা আমেরিকা বাদে বাকি সবাইকে আগাম দায়ী করা শুরু করেছেন যেন তাদের জন্যই তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে এসে যেতে পারে বলে – প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। মানে তারা কলসালট্যান্ট এই পরিচয় ধুলায় লুটিয়ে একেকজন ‘প্রপাগান্ডিস্ট’ পরিচয় নিতে চাইছেন! অথচ কী চুক্তি হয়েছে অন্তত ইনফরমালি কিছু তাদের অজানা থাকার কথা নয়!

    রাশিয়ার পুতিনের ট্রয়কাঃ
    অরিজিনালি ট্রয়কা (troika) শব্দের আক্ষরিক অর্থ সেকালের রাশিয়ান তিন ঘোড়ায় টানা গাড়ি; অর্থাৎ তিন শক্তির সমন্বয়ে কোনো একশন। আর এখন এখানে  শক্তি বলতে এরা হল রাশিয়ার পুতিনের উদ্যোগের তিন শক্তি   – রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন। হ্যাঁ, অবশ্যই তারা পরস্পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হলেও এরা আফগান-তালেবান ইস্যুতে একসাথে কাজ করতে নেমেছে। আর একাজে মানে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যেন আফগানিস্তানে কোনো বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা বা সশস্ত্র তৎপরতার ঢল নেমে না আসে, অতীতে যেমন আফগানিস্তানে অনেকবারই ঘটেছে। সেটা ঠেকানোর কাজ।  কিন্তু সেটাই বা ট্রয়কা চাচ্ছে কেন?

    খুবই সংক্ষেপে বললে, সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিবদমান পক্ষ ও স্বার্থগুলো একত্রিত হয়ে একটি রাজনৈতিক নেগোশিয়েশনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি থিতু সমাজ, একটি ফাংশনাল সরকার আর ন্যূনতম আইনশৃঙ্খলা স্থাপন করতে যেন সক্ষম হয়, সে কাজে সহায়তা করা এই ট্রয়কার উদ্দেশ্য।

    গত ২০১৮ সালের শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তালেবানদের সাথে কথা বলার, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেনা প্রত্যাহার। কারণ তার সরকারের অর্থ আফগানিস্তানে ঢালার অপচয় চলছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল ছাড়াই। তাই তিনি এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট  – জালমে খলিলজাদেকে [Zalmay Mamozy Khalilzad, an Afghan-American diplomat]  সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে তাঁর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি তালেবানদের প্রধান আলোচক বা নেগোশিয়েটর মোল্লা আবদুল গনি বারাদরের সাথে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার নিয়ে কথা শুরু করতে পারেন। আর মূলত প্রথম থেকেই তালেবানদের শর্তানুসারে আফগান পুতুল সরকারের কোনো প্রতিনিধিই তাদের দুপক্ষের কোনো সভাতেই না রাখার নিয়ম চলে আসছে। কারণ এতাই তালেবানদের শর্ত ছিল। শেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে একটি চুক্তিতে তারা পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিল আমেরিকার নির্বাচনের বছর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখে; যদিও এর বাস্তবায়নের মূল উদ্যোগের মাঠের কাজ গড়িয়ে যায় পরের বছরে। অর্থাৎ তত দিনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিয়ে নিয়েছেন।

    কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরে অনেক স্থানে বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় তালেবানদের সশস্ত্র তৎপরতা। এ ঘটনায় তাই উদ্বিগ্ন হয়ে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল পুতিনের রাশিয়া। কেন? সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়ান স্বার্থ কী?

    ২০০৮ সালে সেকালের জি-৮ গ্রুপ থেকে রাশিয়াকে বের করে দেয়ার পর (আবার তা জি-৭ হয়ে যায়) রাশিয়া-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই নিচে নেমে গিয়েছিল। তা কখনোই ভালো হয়নি। কিন্তু আফগানিস্তানের যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা আজো রুশ স্বার্থের জন্য অনেক কিছু যায়-আসে, তাই গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই রাশিয়ার স্বার্থ। এসব দেশ অতীতে জার সাম্রাজ্যের অধীনে দখলে গিয়ে প্রথম রাশিয়ান শাসিত  অঞ্চল হতে শুরু করেছিল।  ফলে সেই থেকে পরে (১৯১৭-১৯৯১) কমিউনিস্ট আমলেও শুরু থেকেই এই সেনট্রাল এশিয়া কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে যায়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে সেন্ওটাল এশিয়ান দেশগুলো আলাদা আলাদা দেশ হয়ে যায় তবুও তা বড় পাহারাদার বা রাশিয়ান বলয়ের দেশ হয়েই থেকে যায়। আসলে এখনও পর্যন্ত আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর ভিতর কোন র‍্যাডিক্যাল ইসলামী সমাজ-রাজনীতির চিন্তার প্রভাবে যেন সেন্ট্রাল এশিয়ায় সাজানো রুশ ভারসাম্য নষ্ট না হয়ে যায়, এ দিকে পরের রাশিয়ার সব শাসকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল, এখনো আছে। এটাই কোর রুশ স্বার্থ।

    এমনকি যেমন। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে খোমানির ইরান বিপ্লবের পরে এর প্রভাবে না সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন-বিপ্লবের ছাপ পড়ে যায় বা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে; এই ভয়ে ভীত হয়েই ছয় মাসের মধ্যে ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরেই আগাম আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ কার্যত আফগানিস্তান হল ইরান থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে [The region consists of the former Soviet republics of Kazakhstan, Uzbekistan, Tajikistan, Kyrgyzstan, and Turkmenistan.] বেশির ভাগ জায়গায় আলাদা করার এক ভুখন্ড ও দেয়াল। তাই সেই ইরান বিপ্লবের পর শুরু হয়ে আফগানিস্তান আজো এক হট স্পট ও আন্তর্জাতিক ইস্যু।

    এ কারণে রাশিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক যতই নিচে থাকুক না কেন, পুতিনের রাশিয়া আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ও স্বার্থে রাশিয়াকে অনেক কিছু করতেই হয়। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমেরিকা ও চীনকে সাথে নিয়ে ট্রয়কা গড়ে নিয়েছেন পুতিন। সেই পুরনো উদ্দেশ্য, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোন রেডিক্যাল ইসলামি চিন্তার ছাপ বা আঁচ যেন মধ্য এশিয়ার দেশে না পড়ে যায়। এদিকে চীন এখন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল নেতা হওয়ার দাবিদার। ফলে তারও দায়-স্বার্থ আছে। ফলে রাশিয়া ঢাকলে তাকেও অংশ নিতেই হয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান, ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে চীনের খোদ সীমান্তই আছে।

    তাহলে মুলকথা, এই ট্রয়কায় চীন ও রাশিয়া এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা শত্রুতা থাকলেও মিলের ভিত্তিটা ঠিক কী? কেন?
    এই ভিত্তিটাই হল, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার, যার কেন্দ্রে আছে জাতিসঙ্ঘ। ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্র রেখে তৈরি করা হয়েছিল, সেটাই এর ভিত্তি। কেন?
    এই জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা  – যেটা গত ৭৫ বছর ধরে ফাংশনাল হয়ে আছে, এটি নিয়ে অজস্র অভিযোগ এবং এর নানান খুঁত ও ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তা সত্ত্বেও এটাই দুনিয়াতে একমাত্র গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার কায়েম করা এক সিস্টেম। আর এটা না থাকার মানে ১৯৪৫ সালের আগের সময়ে ফিরে যাওয়া, যখন যুদ্ধ করারও কোনো নিয়মনীতি মানার বালাই নেই; আইনকানুন  বা প্রটেকশন নাই।  চাইলে যেকোনো জনগোষ্ঠীকে ‘নির্মূল’ করে দেয়াও ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। জর্মানিতে হিটলারের হাতে ইহুদি নিধন ও নির্মুলের চেষ্টা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। রেসিজমও কার্যত বৈধ ছিল মানে কোনো বাধা ছিল না – যা খুশি, জোর যার রাজ্য তার এবং সর্বোপরি কাউকে কোন ভুখন্ড দখল নেয়া বা কলোনি করে রাখাও ন্যায্য ছিল।  শুধু তাই না  কলোনিদখল করে রাখা এটাই সেকালের  প্রধান ফেনোমেনা ও প্রচলিত ঘটনা ছিল। সারা অখন্ড ভারত বৃটিশ কলোনি হয়ে ছিল।   কাজেই সেই পরিস্থিতির বিপরীতে  জাতিসংঘ – এটাই সবেধন নীলমনি, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের ভারকেন্দ্র। আর এটি দাঁড়িয়ে আছে যে ভিত্তি-অবস্থানের  উপর তা হল, কোনো ভূখণ্ডের নাগরিক বাসিন্দারা হল আসল ক্ষমতার উৎস;  তারাই একমাত্র নির্ধারক যে কোনো ভূখণ্ড কার দ্বারা শাসিত হবে। ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণ এই নির্ধারণের একমাত্র হকদার – এ ভিত্তিতে। তাই এটা মূলত অন্য কারো দেশ দখল বা কলোনি করে নেয়ার বিরুদ্ধে এক রক্ষাকবজ। যেকারণে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর  নেহেরুর ভারতের সাথে যুক্ত করে দিয়ে গেছে, এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ একথা বলবার হকদার একমাত্র কাশ্মীরের জনগণ, কোন রাজা নয়।  আর সেখান থেকেই, এই আইনিভিত্তি – পরোক্ষেও রাজা-বাদশাহদের কোন ভুখন্ডের শাসন ক্ষমতাকেও বৈধতা দেয় না। তবে একটা ছাড় আছে যে, আগে থেকে চলে আসা কোনো রাজতন্ত্র বা বাদশাহতন্ত্রকে জাতিসঙ্ঘ অবৈধ বলতে চায় না, যতক্ষণ না ওর অভ্যন্তরীণ জনগণ সংগঠিত হয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ চায় বা দাবি করে। অর্থাৎ জাতিসংঘের ফর্মুলা হল গণভোটে চলে যাওয়া ও সে রায়ের ভিত্তিতে দাবির ফয়সালা করা।

    ঠিক এ কারণে ট্রয়কার কাজের ভিত্তি জাতিসঙ্ঘ ও একে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার-টা। আর ২০১৯ সালের মার্চ থেকে এই ট্রয়কা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন মিটিং করে আসছে, আর সেখানে জাতিসঙ্ঘের পাশ হওয়া বিভিন্ন প্রস্তাবকে ভিত্তি করেছে এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিকেই সংশ্লিষ্ট করেছে। আর তাই সেখানে ৩০ নভেম্বর ২০২০ এক রেজ্যুলেশনের তিন নম্বর সিদ্ধান্ত হল এরকমঃ [কথাগুলো ট্রয়কার এক বিবৃতি থেকে নেয়া]

    3. As stated in the UNSC resolution 2513 (2020), we do not support the restoration of the Islamic Emirate and we call on the Government of the Islamic Republic and the High Council for National Reconciliation to engage openly with their Taliban counterparts regarding a negotiated settlement.

    অর্থাৎ, ট্রয়কা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) ২০২০ সালের এক সিদ্ধান্ত অনু- সমর্থন করছে। আর যেখানে বলা হয়েছে, তারা ‘তালেবানদের ইসলামিক আমিরাতকে পুনঃস্থাপন সমর্থন করছে না”। বরং আহ্বান রাখছে যেন আফগানিস্তানের বিবদমান সব পক্ষকে সাথে নিয়ে সবাই সংশ্লিষ্ট হয়ে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছায় এবং বিবাদের একটি শান্তিপূর্ণ সুরাহা যেন হয় এবং তা করতে উতসাহ ও সহায়তা দিতে চায়।

    এসব প্রস্তাবকে কিভাবে দেখব ও বুঝব?
    প্রথমত শুরুতে যেমন বলেছি আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো যারা সব দোষ তালেবানের বলে তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন, অথচ এরা জানেন একটি  ট্রয়কা-উদ্যোগ কাজ করছে ফাংশনাল; যেখানে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন এই তিন শক্তি সক্রিয়। অথচ এরা তালেবানদের এক  শত্রুজ্ঞান করে আগাম কোন ক্যাম্পেইন করতে বসেনি। কেবল ডায়লগে সবাইকে নিয়ে বসে একটি পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট করে নিতে বলছে, সাহায্য করতে চাইছে। অথচ এই থিংকট্যাংক ফেলোরা তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় আগাম নেমে গেছেন, যা আসলে ভারতের অবস্থান! এমনকি এ্টা আমেরিকার অবস্থানও নয়। উপরের ট্রয়কার বিবৃতিটা আমেরিকান সরকারি ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া যার শিরোনাম – Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan.।

    এখন অনেকে মনে করতে পারেন যে এই সেট হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটা আপনি পছন্দ করেন না, তা হতেই পারে। জাতিসঙ্ঘ এর একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থা দাঁড় করানোই শেষ কথা নয়। বরং কেবল শুরু যাকে অনেক পথ হাঁটতে হবে, বদলাতে হবে, অন্য অনেক ‘অপরকে’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ডায়লগ করতে হবে। যেমন ধরা যাক, আপনি এক ইসলামিস্ট অথবা কোনো কমিউনিস্ট, যিনি গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটাকে পছন্দ করেন না বা এটা আপনার ফেভারে বলে দেখেন না। সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

    আসলে এ ব্যাপারটা অনেকটা আগে থেকে গড়ে থাকা একটি শহরের মত, যেখানে ওই শহরের ভেতরে বাসিন্দাদের বসবাস ও থাকা বা চলাচল ইত্যাদির জন্য সেখানে প্রচলিত নিয়মকানুন আইন কনভেনশন সবই আছে। ধরা যাক, আপনি এখন বাইরে থেকে এসে ওই শহরেই বাস করতে চাইছেন। কিন্তু আপনার দাবি ওদের সব নিয়ম আইনের কিছুই আপনি মানেন না; কারণ এগুলো তৈরির সময় আপনার মতামত নেয়াই হয়নি। এখন – এমন কথা বলে যদি ওই শহরে ঢুকতে যান এতে ফলাফল হতে পারে এই যে, ওরা উল্টো আপনাকেই আউটকাস্ট, কী বাইরের লোক বা গোঁয়ার, গাঁইয়া অভব্য আনকুথ কিংবা ধরেন জঙ্গি বলেই বের করে দিতে পারে। আইনের শাসন না মানা লোক বলে ‘অমার্জিত’ ট্যাগ দিয়ে আপনাকে একা করে দিতে পারে; আর এমন ইমেজের কারণে হয়তো আপনি আর কারও কোনো সহানুভুতি বা আপনার কী হয়েছে, তা শুনানোর মত কাউকেই পেলেন না- এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রাখার দশায় পড়ে যেতে পারেন।

    তা হলে এদেরকে মোকাবেলার উপায় কী?  আছে। একারণে ঐ শহরে ঢুকতে গেলে আপনাকে পরিকল্পনা-কৌশল নিয়ে এগোতে হবে। তাই সম্ভবত এর চেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রথমত আপনি তাদের নিয়ম মানেন বলে প্রবেশাধিকার তো নিয়ে নিবেন আগে। এরপর ওদের নিয়ম মেনেও চলেন। আর এবার কেউ আপনার পাল্টা নিয়মটা যা আপনি চালু করতে চান, সেটা কেন বেশি ভালো সেটা দেখান ও এই প্রচার চালান আশপাশে। ওই শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটে নিজের ভালো চিন্তাগুলো তুলে ধরার চেষ্টাও করতে পারেন। এরপর সময়ে আপনার দলে ভারী বুঝলে এবার তখন ঐ শহরের পুরানা সব নিয়ম বদলানোর চেষ্টা বা উদ্যোগ নেন।

    অর্থাৎ এর মূল কথাটা হল – খেলার পুরনো নিয়ম বদলাতে চাইলে দূরে গ্যালারিতে বসে থেকে তা বদলাতে পারা যাবে না। উল্টো আপনাকেই এরা উপড়ে তুলে ফেলে দিতে পারে। এর চেয়ে বরং খেলায় অংশ নিয়ে খেলতে খেলতেই এমন পুরনো নিয়ম বদলাতে চেষ্টা করতে পারেন। এর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই পথ না ধরলে কী হবে?

    সেটা একটি উদাহরণে বলা যাক। গত ৩০ জুলাই আমাদের স্থানীয় প্রথম আলো দৈনিকের খবরের শিরোনাম – “ফজলের ‘কৌতুক’ চিরতরে স্তব্ধ করল তালেবান”। ফজল, তিনি আফগান পুতুল সরকারের এক পুলিশ অফিসার ফজল মোহাম্মদ। তিনি অনলাইনে হাস্যরসাত্মক নানান ভিডিও পোস্ট করার জন্য আফগানদের কাছে তার পুলিশ পরিচয়ের চেয়ে ‘কৌতুক অভিনেতা’ বলে বেশি পরিচিত। কিন্তু তালেবানরা নাকি প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি বাড়ি ফেরার পর তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করে। এ ক্ষেত্রে হত্যার কথা শুরুতে অস্বীকার করলেও পরের সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তার পরই তাকে হত্যার কথা স্বীকার করে তালেবান। এ হলো খবরটার সারকথা। তবে অবশ্য আফগানিস্তানে অনেক সময় এসব হত্যা প্রকাশ্যেও ঘটে থাকে।

    এখানে তালেবানদের জন্য খবরটার  সবচেয়ে খারাপ দিকটা  হল, এটা তার ইমেজ ধ্বংস করেছে। সেটা তালেবানেরা আইনের শাসন মানে না আর জঙ্গি ট্যাগ লাগানো ধরণের ইমেজ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অবশ্যই। তাই খবরটা যতটা সত্যি তাতে তালেবানদের এমন স্টাইলের তৎপরতা আত্মঘাতী!

    কোনো যুদ্ধের মাঠে আপনি বা আপনার শত্রু খুন হয়ে যাওয়ার একটা আলাদা অর্থ হয়। সামরিক ইস্যুতে এর ক্রিমিনাল আইনে মামলা হয় না। তবে এর বিপরীতে তুলনামূলক শান্ত এক জনসমাজে আপনি ঘর থেকে কোনো জেনুইন অপরাধীকেও যদি উঠিয়ে এনে জনসমক্ষে মেরে ফেলেন এর ফল হবে উল্টো। আপনি অপরাধী হবেন। এছাড়া নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ, ওই সময়ে অসহায় যে মানুষটা খুন হচ্ছে, তা যারা দেশে-বিদেশের লোক দেখবে  এরা প্রায় সকলে নিজেকে আবিষ্কার করবে ঐ খুন হওয়া নিরস্ত্র লোকটার ভিতরে। ফলে খুন হয়ে লোকটার প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর এটাই আপনার জন্য বিরাট নেতি-ইমেজ তৈরির উপাদান হয়ে উঠবে। বলাই বাহুল্য এই ইমেজের জন্য এবার আপনিই হেরে যাবেন।  আপনি নৃশংস খুনি, কিংবা আপনার ধর্মটাই খারাপ এমন বয়ান উঠে আসতে পারে। তা হলে করণীয়?

    এমন ঘটনা যুদ্ধের মাঠের খুনোখুনি কিনা সেটা এক বড় প্রশ্ন। যদি তা হয় বুঝাতে চান, তবে আগে যুদ্ধ ঘোষণা করে নেয়া হয়েছে সে প্রমাণ হাজির দেখান।  নইলে অপর বিপরীত পথ হল,  কাউকে (সে অপরাধী হলেও) হত্যা করার আগে তার বিচার হতে হবে। এখন বিচার মানে কিন্তু অনেক কিছু। যার শুরু সেই কনস্টিটিউশন থেকে। এরপর রাষ্ট্র সরকার আইন, বিচারব্যবস্থা সেটআপ ইত্যাদি অনেক কিছু। মানে আসলে সবার আগে ক্ষমতা দখল করে নিতে হবে। এরপর আবার অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে এবং স্থায়ী ও আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আদালত থাকতে হবে। আর গ্রেফতারকারীই পরে বিচারক এবং তিনিই আবার শাস্তি বাস্তবায়নকারী, তিনি এমন হতে পারবে না। মানে পুলিশিং আর বিচারক একই লোক হতে পারবে না। নইলে তো যে কেউ যে কাউকে অপরাধী বলে মেরে ফেলার অরাজকতা শুরু হয়ে যাবে। আর এখানেই দেশে-বিদেশে আপনার ইমেজ আপনার রাজনৈতিক চিন্তা কেমন, আপনি দায়িত্বশীল ক্ষমতাবান মানুষ কি না – এসব বহু প্রশ্ন ভর করবে। বলাবাহুল্য, আপনি জঙ্গি, আপনি অমানবিক গুণের বা আপনি নৃশংস, কাজেই আপনার ধর্মটাই খারাপ- এই ইমেজ দাঁড় করানোর জন্য একদল লোক অবশ্যই হাজির থাকবে। অর্থাৎ আপনি নিজেই ২০০১ সালের মতো নিজেকে উপড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়ার পক্ষে কাজ করতে পারেন না।  এমন বোকামির অর্থ হয় না।  কাজেই আপনার  দায়ীত্বশীল ও গঠনমূলক ইমেজ অবশ্যই খুবই জরুরি।

    সারকথায় একালের দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলে একটা কিছু আছে, একে অবজ্ঞা করবেন না। একে মানুন আর না-ই মানুন, একে আগে বুঝুন। এরপর এগোনোর পদক্ষেপ কৌশল ঠিক করেন। নইলে বেঘোরে মার খেয়ে উলটা আপনিই হারিয়ে যাবেন।  এরা আপনাকেই উপড়ে ফেলে দিবে!

    আফগানিস্তান নিয়ে এত হইচইয়ের কারণ কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ট্রয়কার গঠন দিয়ে। পরে এই ট্রয়কা নিজেকে প্রথমে নিজেকে বর্ধিত করে, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আর তাতেই ঘটে প্রথম বিস্ফোরণ। কেন?

    প্রথমত, পাকিস্তান হল ল্যান্ডলকড আফগানিস্তান ভূখণ্ডের এক প্রবেশদ্বার, যা সমুদ্রের পর  পাকিস্তানের পেরিয়ে এরপর সহজেই প্রবেশ করা যায়। আমেরিকা এজন্য আফগানিস্তানে হামলা চালানোর আগে পাকিস্তানকে হাত করে, বাধ্য করে, ঘাঁটি বানিয়েই নিয়েছিল। অতএব, আফগানিস্তানে ব্যবহারিক যেকোনো পদক্ষেপের আগে ট্রয়কাকে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে নেয়া জরুরি ছিল। কাজেই রাশিয়া নিজে উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে কথা বলে সসম্মানে তাকে ট্রয়কার বাড়তি সদস্যের ভূমিকায় জুড়ে  নিয়েছিল।

    কিন্তু রাশিয়া আমেরিকা বা চীনের ত্রয়কার এসব ব্যবহারিক সমস্যার দিকটি ভারতের বুঝার বা আমল করার মত অবস্থান নিলে ভারতের চলে না। এমনকি মনে মনে মানলেও তা স্বীকার করা অসম্ভব। কারণ? ও পাকিস্তান- এটা তো একটা জঙ্গি রাষ্ট্র, ‘তালেবানদের মদদ দেয়া রাষ্ট্র’ ইত্যাদি গত ২০ বছর ধরে ভারত তার দেশের ভিওতরে বাইরে  প্রপাগান্ডা করে এসেছে।  নিজের সেই কথা তো এখন ভারত টিকাতে পারছে না। মানে এখন প্রশ্ন হল, পাকিস্তান যদি জঙ্গি রাষ্ট্রই হয়, তা হলে তো সে রাশিয়া, আমেরিকা বা চীনের পাশাপাশি একই মর্যাদার আসনে বসতে পারে না। আর বাস্তবে যদি বসতে দেখা যায় তার মানে পাকিস্তান জঙ্গি রাষ্ট্রই নয়, দায়িত্ববান রাষ্ট্র। তাই যদি রাশিয়া পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতকেও ট্রয়কায়  সাথে নিত, তাতে  হয়ত ভারতের কিছুটা মুখরক্ষা হত।   মানে ভারত নিজেই এখন আগের ইসলামবিদ্বেষী নিজের ছড়ানো ঘৃণার মধ্যেই নিজেই আটকে গেছে!

    ওদিকে রাশিয়া আবার পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভিতরে নিয়ে ট্রয়কাকেই পরে ট্রয়কা-প্লাস [troika+] নাম দিয়ে নিয়েছে, ফলে তাতে ভারতের জ্বলুনি আরো বেড়েছে। কিন্তু এই ঘটনা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির আর বাইরে খুবই কম প্রচারিত ঘটনা বলে এত দিন ভারত এই লজ্জা লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। যদিও তাদের মিডিয়া গত মার্চ ২০২১ থেকেই জানত যে ভারতকে বাদ দিয়ে ট্রয়কার মিটিং চলছে [ India not part of Russian meet on Afghanistan]।  কিন্তু এখন, গ্লোবাল মিডিয়ায় আফগানিস্তানে কী হচ্ছে এটা এক শীর্ষ ইস্যু। তাই মিডিয়া জুড়ে  আগাম ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে,  আগামি ১১ আগস্ট হবে ট্রয়কা+ এর পরের মিটিং। আর সাধারণত এসব মিটিং  এতদিন হয়েছে রাশিয়ায় না হলে কাতারে। কারণ কাতার ২০১৫ সাল থেকে আফগান-তালেবান ইস্যুতে নিরপেক্ষ হোস্ট। তাই সেও ট্রয়কার মিটিংয়েও প্রতিনিধি পাঠায়; সাথে ওই মিটিংয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ইরান ও তুরস্ককেও নেয়া হয়েছে। এতে এখন ভারতের মিডিয়াও আর দেশপ্রেমের জোশে মোদি-জয়শঙ্করকে জবাব দাবি করে  পার পাচ্ছে না।  একেবারে সবারই ইজ্জতের সওয়াল হয়ে গেছে।  কারণ এখন ভারতের চেয়ে  (কথিত জঙ্গী) পাকিস্তান রাষ্ট্র এখন গ্রহণযোগ্য আর দায়ীত্বশীল রাষ্ট্র হিসাবে  আমেরিকা, রাশিয়া বা চীনের সাথে সমান মর্যাদার টেবিলে বসেছে কথা বলছে। এটা ভারতে বসে দেখা যায় না! এমনই কঠিন জলুনি!   আর এসব কথা বাংলাদেশেও  ভারত প্রভাবিত মিডিয়ায় বড় করে আসায় বাংলাদেশেও ভারতের এই বেইজ্জতির খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

    রাশিয়া ভারতকে এমন বিমুখ ও বেইজ্জতিতে ফেলল কেন?
    রাশিয়ার সমস্যা ভিন্ন! রাশিয়া মনে করে এই আগস্টের শেষে সেনা প্রত্যাহারের পরে বর্তমান আফগান পুতুল সরকারের আর ক্ষমতায় থাকা ঠিক নয়। ,[However, the Russian side appears opposed to the continuation of the Ghani government and favours an interim set-up ……]   বরং অন্তর্বর্তীকালীন ও সবার প্রতিনিধিত্বমূলক এক সরকারের থাকা উচিত, যার কাজ হবে সবাইকে নিয়ে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো। আর এর বিপরীতে ভারতের অবস্থান হলো, বর্তমান পুতুল সরকারে হাত দেয়া যাবে না” [While India has backed the government of President Ashraf Ghani…।]।’ আরো আগিয়ে ভারত বলছে, গায়ের জোরে পুতুল সরকারকে বদলালে ভারত মানবে না। যেন ভারত না মানলে বিরাট কিছু যায়-আসবে!

    কথা হল, প্রথমত ক্ষমতা তো মুরোদেই মানে গায়ের জোরেই বদলাতে হয়, বদলায়। যদিও এ্টাই শেষ নয়। এরপর ক্ষমতা নিজের কাছে রেখে কিন্তু  সব পক্ষকে নিয়ে প্রপার সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন গড়তে তো অসুবিধা নেই।
    আর তালেবানদের ক্ষমতা দখল না করতে কেউ স্পষ্ট করে তো কিছু বলেনি। ত্রয়কাও কোন আগাম আপত্তি প্রকাশ করে নাই। এমনকি ব্রিটেন আগাম জানিয়েই দিয়েছে, সে স্বীকৃতি মানে কাজ করতে রেডি। কাজেই তালেবানরা ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়ার পর তখন ত্রয়কার কথা শুনে তাদের কনসার্ণ গুলো আমল করে চলতে অসুবিধা হবার কথা না! যেমন তারা সব পক্ষীয় সরকার ইত্যাদির করতে গেলে অসুবিধা কী?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৭ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়ার ত্রয়কা ভারতের বুকে শেল মেরেছে“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  •  “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

     “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

    গৌতম দাস

    ০২ আগষ্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    FP.COM   A security officer walks past a mural showing U.S. Special Representative for Afghanistan Reconciliation Zalmay Khalilzad and Taliban co-founder Mullah Abdul Ghani Baradar in Kabul on July 31, 2020. WAKIL KOHSAR/AFP VIA GETTY IMAGES

     

    [সার-স্ংক্ষেপঃ   লেখার শিরোনাম “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে” – এটা মূলত এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুতের দেয়া শিরোনাম, সেখান থেকে নেওয়া।  তিনি আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদুত,  বিবেক কাতজু [Vivek Katju]। হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হওয়া তাঁর লেখা  এক কলামের শিরোনাম ছিল – India is losing out in Afghanistan ।  অর্থাৎ এই সাবেক কূটনীতিক মোদী-জয়শঙ্করের ভারতের এক করুণ পরিণতি দেখছেন।  তাঁর পুরা লেখাটাই মোদী-জয়শঙ্করের কঠোর সমালোচনা করে লেখা।
    ঠিক তেমনই আরেকজন হলেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলো তাকে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি বলে পরিচয় করায়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি মোদী-জয়শঙ্কর থেকে নিজেকে দুরত্ব তৈরি করে তাদের দায় না নিয়ে এক রচনা লিখে বলেছেন –  “আফগানিস্তান হতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কূটনৈতিক দক্ষতার কষ্টিপাথর”। অথচ প্রথম আলো তার এই দায় না নেয়া লেখাটা ছেপেছে সৌম্যর ‘মতামত কলাম” হিসাবে।  অর্থাৎ সৌম্য প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি সে হিসাবে নয়।
    মুলকথাটা হল, তালেবান ইস্যুতে মোদীর নীতি-পলিসিতে বড় গলদ দেখছেন ভারতের কূটনীতিক, একাদেমিক বা মিডিয়াকর্মিরা – তাঁরা মোদী-জয়শঙ্করদের থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করে কথা বলা শুরু করেছেন। তবুও মোদী-জয়শঙ্কর হুশিয়ারি দিচ্ছেন।  জয়শঙ্কর ২৯ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় বলেছেন, আফগানিস্তানে বলপ্রয়োগের সরকার ক্ষমতা দখল করলে (মানে তালেবানেরা ক্ষমতা দখল করলে) ভারত তা মেনে নিবে না [We would never accept any outcome which is decided by force”]। মানে স্বীকৃতি দিবে না। যদিও ভারতের স্বীকৃতির অপেক্ষায় তালিবানরা রয়েছে এমন কথা জানা যায় না। তবে ভারত সফরে আসা আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তার কথাও ভারতের কাছাকাছি মনে হলেও, কিন্তু এক বড় ফারাকের। তিনি বলছেন সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তালেবানদের অসুবিধা হবে। তিনি একটা শব্দ ব্যবহার করেছে “pariah” [Afghanistan to become ‘pariah state’ if Taliban seizes power: US] যার সমতুল্য বাংলা মানে হল অছ্যুত বা একঘরে হয়ে থাকা।  দেখা যাচ্ছে আমেরিকা যেখানে হুমকি নয়, অবজেকটিভলি তালেবান্দের উদ্দেশ্যে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছেন  মুরোদহীন ভারত সেখানে হুঙ্কার দিয়ে বলছে – ভারত মেনে নিবে না। ]

     

    এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়িঃ
    আফগানিস্তানকে ঘিরে এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি চরমে উঠেছে। গ্লোবাল পাওয়ারগুলোর সবাই তো বটেই,  এমনকি মুরোদ না থাকলেও যারা আকাঙ্খী, তারাও এতে শামিল হতে চাইছে। কারণ একটাই তালেবান ইস্যু গরম হয়ে উঠছে। মানে আমেরিকার বন্ধুরা যারা গত বিশ বছর ধরে আমেরিকার পক্ষে থেকে কাবুলের পুতুল সরকারের থেকে নানান “প্রজেক্ট” বাগিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের জন্য এখন দুঃখের দিন, হাহাকারদের দিন। বিশেষ করে ভারত তার তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আটকে গেছে সেই দুঃখে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দিয়ে যাচ্ছে – যে তালেবান সরকার টিকবে না।  এতো গেল একটা দিক। অন্যদিকটা  আরেকটু ভেঙে বললে, গত ২০ বছর হিতাহিত ভুলে আমেরিকার এই আফগানিস্তানে চালানো আক্রমণ ও দখলদারির দিন এবারের মত শেষ হবে। কিন্তু শেষ ‘কাফফারা’ দিতে হবে আরো অনেক; এবার সে ‘কাফফারা’ দেওয়ার  এক নয়া জমানায় সম্ভবত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

    SPUTNIKNEWS

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা যা আজকাল অস্বীকার-কারীরাও পরোক্ষে স্বীকার না করে পারছে না যে, আমেরিকার বদলে এর জায়গায় চীনের উঠে বসার কথা বা লক্ষণ-ইঙ্গিতও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আমেরিকার জন্য এই শাস্তি ডেকে নেওয়ার কারণও মূলত আফগানিস্তান। কারণ আসলে এই যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়েই, এতদিন সামলে চলা আমেরিকার অর্থনীতি, ২০০৭ সাল থেকেই বেসামাল হয়ে যায়। এই খরচ বেহিসাবি কারণ এই যুদ্ধ অন্তহীন এবং  এতে লোভ ও চরম অপরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখানে খরচের কোনো রিটার্ন আপাতত আর আসার সম্ভাবনা নাই, এর কিছুই ফেরত আসবে না। সেটা ক্রমান্বয়ে নিশ্চিত হয়ে যাওয়াতে ২০০৮ সাল থেকেই গ্লোবাল মহামন্দা নেমে এসেছিল। আর তাতেই প্রথম সুবিধাটা যায় চীনের ঘরে যে তখন নিজ অর্থনীতির কেবল ডাবল ডিজিট জিডিপির ২০ বছরে পৌঁছাতে যাচ্ছিল। তাই আমেরিকার বদলে সে জায়গায় চীন – এই সুবিধা চীনের জন্য প্রথম উন্মুক্ত হয়েছে আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার পরের পিছু হটা থেকে।

    তাই ২০১৪ সালেই আমেরিকাকে প্রথম বড় সেনা প্রত্যাহার ঘটাতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান  অর্থমন্ত্রী বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের  খরচ জোগানোর অপারগতায় শেষ টাইমলাইন ছিল সেটা। তাই প্রথম সেই প্রধান সেনা প্রত্যাহার (আমেরিকাসহ ‘ন্যাটো’ ও তার বন্ধুদের সেনা) যা শুরু হয়েছিল তা এবার ২০২১ সালে বাদবাকি সমূলে প্রত্যাহার শেষ হতে প্রতিশ্রুত হয়েছে, যার টার্গেট আগস্টের শেষে। অর্থাৎ এ মাসের মধ্যেই।

    এতে  আফগানিস্তানে এতদিন আমেরিকার যা অর্থসম্পদ ক্ষতি হয়েছে তা তো হয়েছেই; কিন্তু সেটাই শেষ নয়। বরং আরেক  বিরাট সম্ভাব্য ওলটপালট সামনে অপেক্ষায়। আর তাতে আমেরিকার এর চেয়েও বড় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকছে। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলে যে নতুন  ভারসাম্য আসন্ন, অন্তত এশিয়ার ভারসাম্য এখান থেকেই পুনর্লিখিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

    ওদিকে এনিয়ে ভারতের অবস্থান আরও নাজুক, একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। তাই যদিও আপাতত মোদীর ভারত আমেরিকাকে জাপটে ধরেই থাকছে বটে; তবে পারলে বাইডেনের চেয়ে – ভারতের হিউম্যান রাইট নিয়ে প্রশ্ন না তোলা – ট্রাম্পের মত প্রেসিডেন্টই মোদীর ভারতের কাম্য।  কিন্তু এসব কিছুই ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। এরপরে সেই নির্বাচনে বিজেপি ফিরে জিততে না পারলে সেই ভারত পথ বদলে চীনের বন্ধু হয়ে যাবার পথে যাওয়াটাও অসম্ভব নয়। বিশেষত ইতোমধ্যেই ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন আওয়াজ ইতোমধ্যেই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং তাতে তালেবানদের ক্ষমতায় ফিরে চলে আসার সম্ভবনা ভারতকে একেবারে অস্থির বেচাইন করে দিয়েছে।
    কারণ মূল সে ঘটনা হল তালেবান  – মানে ১৯৯৬ থেকে আমেরিকার ২০০১ সালে দখলের আগে পর্যন্ত যারা কাবুলের সরকারের ক্ষমতায় ছিল, সেই তালেবানরা। নিঃসন্দেহে সেই আর এই – তালেবানের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা এবার আকাশ-পাতাল ফারাক দেখব বলে আশা করতে পারি।  তবুও তালেবানরা এবার “আগের মত একই তালেবান কি না” (ভারত যেমনটা আগেই প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে) – তবু সেটা বড় ফ্যাক্টর নয়।
    কারণ মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালে আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের হামলার পর পাল্টা আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করেছিল পরের মাসে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। আর এরপরই  জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটোক্ষমতাসহ মোট ১৫ আসনের  সকলে সর্বসম্মতিক্রমে ১৪ নভেম্বর ২০০১, তালেবান শাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা প্রস্তাব ও ভোট দিয়েছিল।  মানে গ্লোবাল রাজনীতিতে রুলিং শাসকেরা সেসময় একেবারেই সদলে  তালেবানের বিরুদ্ধে চলে গেছিল।  অথচ  তুলনায় আজকের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন।  এখন একই পরিষদে আমেরিকান কোনো প্রস্তাব নিয়ে যদি ভোটাভুটি হয় তবে এর বিপক্ষে  অন্তত দু’টা (চীন ও রাশিয়া) ভেটো পড়বে আর বিভক্তি ভোট তো হয়ে যাবেই। অর্থাৎ কোন প্রস্তাব পাসই হবে না। এটাই অনেক বড় ফ্যাক্টর।

    উপরে যে গ্লোবাল পালাবদলের কথা তুলেছি, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুর উপর এরই মধ্যে ছাপ পরে গেছে পুরোদস্তুর। যেমন – গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে ইতোমধ্যেই “আমেরিকা বনাম চীন” এমন দুটো পক্ষের মধ্যে অন্য দেশগুলো কে কোন দিকে সেই পক্ষ-বিপক্ষ প্রতিদিনই আমরা আরো চোখা হয়ে উঠতে দেখছি। গ্লোবাল পালাবদলে ‘আমেরিকা বনাম চীন’ এই পক্ষ-বিপক্ষের ছাপটাই আফগানিস্তানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই মেরুকরণে পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে পেছনে কাজ করছে। যেমন- কে কে আমেরিকার ফেলে যাওয়া পুতুল সরকারের পক্ষে আর কে কে তালেবানের (শর্ত সাপেক্ষে) প্রতি সহানুভূতিশীল – এই দুই ভাগেই প্রতিফলিত হচ্ছে প্রথমটা আমেরিকার পক্ষে আর পরেরটা ‘চীনের পক্ষ’। এদিকটাই এখন প্রধান ফ্যাক্টর।

    তবে আফগানিস্তানের এখনকার সব ঘটনার শুরু যে ২০০১ সালের আমেরিকান হামলা থেকে সেই আমেরিকার এখন প্রধান টার্গেট ও স্বার্থ হল – আফগানিস্তানে আমেরিকার সব অর্থব্যয় এবার বন্ধের ব্যবস্থা করা যা ড্রেনে পড়ছে; আর, এরপর আমেরিকান টার্গেট সেই আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে যাওয়া। তাই, এরপরে তালেবান আক্রমণের মুখে কাবুলের সরকার টিকে থাকতে পারবে কি না সেটা আমেরিকার কাছে সেকেন্ডারি, তার পারলে ভালো  – এরকম। যদিও আমেরিকা তা মুখে স্বীকার করছে না, ভাবে বলছে। ওদিকে আমেরিকার আরেক কোর-স্বার্থ হল, সেনা প্রত্যাহারের পরে, আল-কায়েদার মত গ্লোবাল সশস্ত্র ইসলামি গ্রুপগুলো যেন আফগানিস্তানে্র আশ্রয়ে থেকে অপারেট না করে। আর এটাই তালেবানদের সাথে ট্রাম্প ও বাইডেনের মুখ্য ডিলিং পয়েন্ট, যা অপ্রকাশ্য রাখা আছে। যদিও তালেবানেরা সেই আশ্বাসও দিয়েছে [The Taliban has also assured the US that it would not allow global terrorist groups to operate from Afghanistan.] বলে জানা যাচ্ছে।

    তিনটা আলাদা মিটিং কিন্তু প্রায় সমান্তরালেঃ
    আমেরিকান সেনা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের সময় তেমন আর বেশি নাই, মাত্র আগস্ট মাসটাই। তাই আমরা অস্থির কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেখছি যার মধ্য থেকে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের তিনটা মিটিংয়ের কথা এখানে তুলে ধরব।

    এক.
    সময়ের হিসাবে ধরলে তিন মিটিংয়ের সবশেষেরটা হল ২৮ জুলাইয়ে, ৯ সদস্যের তালেবান প্রতিনিধিদের চীন সফর ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ওয়াং ই-এর [Wang Yi] সাথে বৈঠক।

    আফগান তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার [Mullah Abdul Ghani Baradar] বুধবার চীন সফরে গেছেন, আর সেখানে পৌঁছেই উত্তরাঞ্চলীয় তিয়ানজিং শহরে তিনি বৈঠক করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে।

    বলা যায় ভারত ও সমমনা যারা এতদিন আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের হাতে গত বিশ বছর মাখন খেয়ে গেছে, তাদের জন্য চীন-তালেবান এই বৈঠক এক মহাজুলুনি তৈরি করেছে। সেই ঈর্ষা আর জলুনি কত তীব্র তা দেখা যাচ্ছে বিবিসি বাংলার নিচের এই রিপোর্টে।

    চীন-আফগানিস্তান: ঘনিষ্ঠ হচ্ছে কমিউনিস্ট চীন ও সুন্নী তালেবান, তৈরি হচ্ছে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

    এতে তালেবানদের দিক থেকে এই প্রথম আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের ‘কাউন্টার ওজন’ প্রকাশ করা মানে পাল্টা-পাল্লায় বাটখারার ভার দেখানো হল। আর তাতে চীনের পেছনে রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলো আর (হবু ছয় দেশীয় জোট দেখানোর কারণে) সম্ভবত বাংলাদেশও – তাদের সবাই যে আছে সেই অনুমান ছড়িয়ে দেয়া হল। এরই পাল্টা হিসেবে আমেরিকার বগলে এক ভারত ছাড়া আর কেউ আপাতত দৃশ্যমান নয়। আমেরিকা-ভারতের বিপরীতে তালেবানের এই বাটখারার ভার দেখানো তাৎপর্যময় অবশ্যই। এটা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু মন্তব্যে। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং বলেছেন, তালেবানরা ‘এখন আফগানিস্তানে এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি” [“Wang Yi pointed out, the Afghan Taliban is a crucial military and political force in Afghanistan,” ]।’ আবার রয়টার্স রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীন বলছে, তালেবানদের কাছে চাওয়ার আছে যে, তারা আফগানিস্তানের শান্তি প্রতিষ্ঠায় মিলমিশ ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক!’ [China told a visiting Taliban delegation on Wednesday it expected the insurgent group to play an important role in ending Afghanistan’s war and rebuilding the country,] এই কথায় ভারতসহ সমমনাদের জলুনি উঠলেও বলার কিছু নাই। কারণ চীনের একথা সবচেয়ে ইতিবাচক এক স্টেমমেন্ট।
    এছাড়া আরেক তাতপর্যপুর্ণ দিক আছে। চীনের উইঘুরে (মানে জিনজিয়াং প্রদেশ যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা) ‘পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামী আন্দোলন’ [East Turkestan Islamic Movement বা সংক্ষেপে ETIM] নামে সশস্ত্র সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে বা রুখতে তালেবানরা চীনকে সাহায্য করবে – চীন এই আশাবাদ রেখেছে। ঐ মিটিং শেষে তালেবান মুখপাত্র মোহাম্মদ নাঈম জানিয়েছেন, ‘তারা চীনকে আশ্বস্ত করেছেন, আফগান-ভূমি চীনের বিরুদ্ধে কাউকে ব্যবহার করতে তারা দেবেন না [“(The) delegation assured China that they will not allow anyone to use Afghan soil against China,” Naeem said. ]।’ তালেবানদের আরেক মিডিয়া মুখপাত্র সুহেল শাহীন অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, চীন আফগানিস্তানের অবকাঠামো পুনর্গঠনের ‘welcome friend’  বা ‘স্বাগত-বন্ধু’;  [Taliban spokesman Suhail Shaheen says the group welcomes Chinese investments in reconstruction and would guarantee the safety of investors and workers]।
    সার কথায়, তালেবানেরা সশস্ত্র এবং অ-দায়িত্বশীল এক রাজনৈতিক শক্তি বলে পশ্চিমে ও বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে যে প্রচার আছে বা খারাপ ইমেজ করে রাখা আছে, একালে সেসব কাটানো ও লঘু করার দিক থেকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এই বৈঠক তালেবানদের অনেক সুবিধা দেবে, ইমেজ বাড়াবে।

    দুই.
    আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony J Blinken] ২৭-২৮ জুলাই ভারত সফর করে গেলেন। এক কথায় বললে এটা ছিল আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যু পরিস্থিতিতে বেদিশা ও একা হয়ে পড়া ভারতকে আশ্বাস দিয়ে পিঠ-চাপড়ে দেয়ার সফর।
    প্রথমত, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদী তাঁর অভ্যন্তরীণ জনগণ, কূটনীতিক, একাডেমিশিয়ান ও মিডিয়াকর্মীদের কাছেই আস্থা একেবারে হারিয়েছেন। তারা লেখা শুরু করে দিয়েছেন, “আফগান প্রশ্নে দিল্লি বন্ধুহীন“। অথবা এখানে দেখেন,  Indian experts are wondering why New Delhi has been sidelined in Afghanistan. ।  আর উল্টা পাকিস্তানের ভেতরে আমেরিকা ও রাশিয়া নিজ নিজ স্বার্থের আশ্রয় খুঁজছে। ওদিকে পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার চীন তো আছেই। জয়েন্ট স্টেটমেন্ট দেখেন এখানে  [Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan]।    মনে করা হচ্ছে, ভারতকে বাইরে রেখে মূলত এই ফ্যাক্টসগুলো মিডিয়ায় প্রচার হয়ে পড়াতে মোদি ভীত হয়ে যান। বিজেপির ধারণা, মোদীর ভারতকে ছাড়িয়ে  পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আগামী যেকোনো ভোটে মোদীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। আর সেটা কাউন্টার করতেই ব্লিঙ্কেনকে এনে যেন দেখিয়ে মোদী সবাইকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন। তবে এর ফল তেমন সুখকর হয়নি।

    এর অনেক কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হল, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার স্বার্থের অনেক মিল থাকলেও কিন্তু অমিল-ভিন্নমতও কম নয়। যেমন – ব্লিঙ্কেনের ফিরে যাওয়ার আগে ভারতে মিডিয়ায় সামনে এসেছিলেন তিনি। ততক্ষণে চীন-তালেবান মিটিংয়ের রিপোর্ট মিডিয়ায় এসে গেছে। তাই, তালেবানের চীন সফরের সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে এর জবাব দিতে গিয়ে ব্লিঙ্কেন প্রকারান্তরে চীনের প্রশংসা করে বসেন।

    Asked about the Taliban visit, U.S. Secretary of State Antony Blinken said in New Delhi that it was a “positive thing” if Beijing was promoting a peaceful resolution to the war and “some kind of (Afghan) government … that’s truly representative and inclusive.”

    বলেন, এই ‘সফরটা ইতিবাচক’। চীন যদি যুদ্ধাবস্থায় এক শান্তিপূর্ণ প্রস্তাব ও আফগানিস্তানে কোনো ধরনের সরকারের কথা বলে যা সত্যিই সবাইকে নিয়ে এবং প্রতিনিধিত্বমূলক তবে তা তো ইতিবাচক”। এখন ব্লিঙ্কেনের পক্ষ থেকে চীনের এই পরোক্ষ প্রশংসা তো মোদীর জন্য হজম করা খুবই মুশকিল। এই হল, আমেরিকা ও ভারতের স্বার্থের বেমিল। ওদিকে ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীর সবচেয়ে বড় অনাস্থা হলো – আফগানিস্তানে যার যার স্বার্থ আছে সে মোতাবেক সংশ্লিষ্ট এমন সবাই ইতোমধ্যে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তালেবানদের সাথে কয়েকবার বৈঠক এবং আলোচনা, বুঝাবুঝি বা সমঝোতা করে নিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইরান মূলত কেউ বাকি নেই এদিক দিয়ে। অথচ ভারত এই পথেই নেই। এটাতে মূলত ভারতের আভ্যন্তরীণ ইন্টেলেজেন্সিয়া  তারা অসন্তুষ্ট ও হতাশ। ভারত কেবল গোপনে একবার তালেবানদের সাথে দেখা করেছে যা আবার প্রকাশ্যে অস্বীকার করে থাকে। আর পাকিস্তান তালেবানদের নাকি ভারতের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করছে বা উসকাচ্ছে বলে ডাহা মিথ্যা এমন প্রপাগান্ডায় ভারত লিপ্ত হয়ে গেছে। অতীতে তালেবানরা কী কী খারাপ কাজ করেছে এর বর্ণনা দিয়ে ভারত এখন প্রচার শুরু করেছে। অথচ ভারতের এক মিডিয়া-মুঘল দা-প্রিন্ট পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্তা লিখেছেন ……

    “Like them or not, Taliban are a reality. India can deal with them if BJP resets its politics…”

    অর্থাৎ তিনি উলটা বিজেপি-আরএসএস কে তালেবান-বাস্তবতা মানতে বলেই থামেন নাই। উলটা পরামর্শ রেখে বলেছেন, মোদীর খোদ নিজেদের রাজনীতিই বদলে নিতে। আসলে একেবারেই কোন সঠিক পলিসিতে মোদীর ভারত নাই বলেই ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীদের প্রধান অনাস্থা। এছাড়া আরো ভেতরের খবর হল, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মুডে আছে।  খবরটা দিয়েছেন আফগানিস্তানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদুত বিবেক কাতজু। লিখেছেন,

    Indian policymakers had looked at the Afghan scene dispassionately especially after the US began talking to the Taliban in Doha in 2018. What is strange is that even after the US-Taliban deal in February 2020, Indian strategists, instead of making up for lost time, continued to ignore emerging realities.
    Stranger still, Kabul-based senior political personalities, who have recently interacted with the Indian leadership, say that India continues to have a “wait and watch” approach. What they are leaving unsaid is that India has become a bystander in Afghanistan, not knowing which way to turn.
    Some analysts are railing against countries which are engaging the Taliban. They believe that these countries will pay a price for not understanding the true nature of the group.

    অর্থাৎ ভারত কোন প্রস্তুতিই নেয়নি তাই নয়। শেষের বাক্যটা বলছে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে।  তাই আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত কোনোই প্রস্তুতি নেয়নি। কারণ ভারতের ধারণা- তালেবানরা পরাজিত হবে, হারিয়ে যাবে। আর বর্তমান সরকারই থাকবে যা আসলে অনিশ্চিত জেনেও ভারত আমেরিকার ভরসায় বসে থাকতেই চায়। কিন্তু সে দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরেই সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে আমেরিকার চাওয়া আর ভারতের চাওয়াও তো এক নয়।

    তবে ব্লিঙ্কেনের এবারের সফর শেষের পর থেকে, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া হুমকি ও আক্রমণ শুরু করেছে। দিল্লি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নতুন মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে বলিয়েছে, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে জানাচ্ছে যে, সারা কাশ্মিরই ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মির ভারতেরই ভূমি – যেটা নাকি পাকিস্তানের দখল করে থাকা। তাই পাকিস্তান-কাশ্মিরের কিছু অংশের ওপর দিয়ে চীন-পাকিস্তানের করিডোর [CPEC] নির্মাণ করা হয়েছে সেটা ‘তথাকথিত’  করিড়োর সহ সব অবৈধ দখল ছেড়ে যেন পাকিস্তান চলে যায় সেই কড়া আহ্বান রেখেছে ভারত [“We call upon Pakistan to vacate all Indian areas under its illegal occupation,” ]।

    একই সাথে তালেবানদের চীনে গিয়ে মিটিং করার বিরুদ্ধে ভারত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে [India Thursday also reacted against Taliban leaders visiting China and meeting the country’s leaders there]। আর সবশেষে, ‘আফগানিস্তানে গায়ের জোরে কোনো সরকার কায়েমের বিরুদ্ধে’ মানে, তালেবানদের কাবুলের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে [“Unilateral imposition of will by any party will not be democratic…..] ভারতের আপত্তির কথা জানিয়েছে। তবে এসব হুঙ্কার মোদীর ভারত মূলত তার অভ্যন্তরীণ জনমত যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনুমান, তাকে ফিরানোর লক্ষ্যের বলা হয়েছে বলে দেখেছেন অনেকে। কিন্তু আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিবেক কাটজু; তিনি খুবই কড়াভাবে মোদি-জয়শঙ্করের নীতি পলিসিকে তুলোধোনা করে হিন্দুস্তান টাইমসে কলাম লিখেছেন।

    তিন.
    এটা হল – গত ২৫ জুলাইয়ে চীন-আমেরিকার নিজস্ব সম্পর্ক প্রসঙ্গে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক। বাইডেন জানুয়ারিতে মার্কিন ক্ষমতায় শপথ নেয়ার পরে মার্চের ১৮-১৯ তারিখে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দু’পক্ষের প্রতিনিধির বৈঠক হয়েছিল যা খুবই তিক্ততা দিয়ে শেষ হয়েছিল। এবারের মিটিংটাকে এক দিক থেকে এরই পরবর্তি ও পাল্টা সফর বলে মনে করছেন অনেকে [Why Tianjin? And what’s in store in China for US envoy Wendy Sherman?]। বিশেষত আগের মিটিংটা হয়েছিল আমেরিকার রাজধানীর বাইরে দেশের উত্তরের আলাস্কা শহরে। আর এবারের আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সাথে বৈঠকটা দেয়া হয়েছিল বেজিংয়ের বাইরে তিয়ানজিং শহরে যেটা আসলে চীনা-আফগান সীমান্তের এক শহর।
    এবারের এই মিটিংয়ের সার কথা ছিল, নিজেদের মধ্যে যত মনোমালিন্যই থাকুক যুদ্ধ তারা কেউ চায় না- এ কথাটা প্রকাশ করে রাখা। যেমন- এই মিটিংয়ের পরে আমেরিকা মিডিয়াকে জানিয়েছে, তাদের সম্পর্ক খুবই ‘টাফ কম্পিটিশনের’[stiff competition]। তবে একই নিঃশ্বাসে তারা জানিয়েছে যে, ‘আমেরিকা চীনের সাথে যুদ্ধ-সঙ্ঘাত চায় না’ [Price said that in her meeting with Wang, Sherman vowed “stiff competition” with China but also stressed that the US “[did] not seek conflict” with Beijing.] এবং আমেরিকা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতেই থাকবে। এর পাল্টা চীন বলেছে, ‘তিনটা জিনিস দেখতে চাই আমরা।’ [three demands with the second-ranking US diplomat: the United States must not challenge or seek to subvert China’s model of governance; it must not interfere in China’s development; and it must not violate China’s sovereignty or harm its territorial integrity.] আমেরিকা আমাদের মডেলের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা বলবে না; চীনা পথের উন্নতি নিয়ে তারা কোনো কথা বলবে না। আর হংকং ও তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। ফলে আমেরিকা যেন চীনের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে, এ নিয়ে মন্তব্য করতে না আসে। তবে উভয়পক্ষই পারস্পরিক ডায়ালগ চালিয়ে যেতে চায় বলে জানায়। এক কথায়, না চাইতে কোনো যুদ্ধের শঙ্কা যেন কোনো পক্ষের মনে কাজ না করে তা আগেই মিটিয়ে রাখার মেসেজ তারা আদান-প্রদান করে রাখল।

                                        ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের  মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি

    কেন এমনটা হল?
    এর কিছুটা হদিস আমরা পাই ভারতের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মনের চরম ক্ষোভ উপচিয়ে প্রকাশ করা বিবৃতি থেকে। এরপর এ নিয়ে ভারতের সামরিক ইন্টেলিজেন্সিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকে। যেমন পারভিন শাওনি [@PravinSawhney] নামে এক সাবেক মেজর যিনি একটা ‘ডিফেন্স ম্যাগাজিন’ চালান ও এর সম্পাদক। তিনি টুইট করে লিখেছেন ‘মোদি একেকটা অর্থহীন মন্তব্য করে  যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার দিকে ভারতকে নিয়ে যাচছে – যা তিনি কখনো জিততেই পারবেন না, আর এই যুদ্ধ তো এড়ানোযোগ্য!’ [With each mindless remark, India is heading towards war – which it cannot win & is avoidable. ] এ ছাড়াও লিখছেন, এটা ‘মোদির দুর্ভাগ্য যে, তার টপ সামরিক জেনারেল রাওয়াত; অগ্রসর সামরিক ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই!’ [Modi’s misfortune is have Rawat as the top military officer who knows nothing about advances in warfare!]

    শেষ দুটা পয়েন্টঃ
    আর একমাস পরে আফগানিস্তানে তালেবানদেরকে আমরা কোন ভুমিকায় দেখব? এর সম্ভাব্য দুটা অবস্থান হতে পারে। গত ২০ বছর ধরে তালিবানেরা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে যা থেকে কী করা যাবে আর কীনা – এসম্পর্কে তারা অনেক ওয়াকেবহাল অবস্থায় এখন তা আমরা অনুমান করতে পারি।।

    আমরা পছন্দ করি আর নাই করি এপর্যন্ত দুনিয়া যে জায়গা পর্যন্ত পথ-পরিক্রম করে এসেছে তাতে গ্লোবাল রাজনীতির কিছু ভ্যালুজ তারা তৈরি ও প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা বলছি না সেগুলা সব আদর্শ অথবা দুনিয়ার সকল জনগোষ্ঠিরই স্বার্থ ও কালচারকে তা প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তালেবানেরা যদি আউট-রাইট সেগুলোর বিরোধিতা করে নিজেদের সব ভ্যালুজ নিয়ে চলতে চায় বা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে এটা আগের মতই ব্যর্থ হবে তা বলাই বাহুল্য। এটা হল কো খেলার নিয়ম বদলানোর মত সমস্যা। আপনি গ্যালারিতে বসে থেকে খেলার নিয়ম বদলাতে পারবেন না। বরং প্রথমত তাদের নিয়মেই খেলতে নামতেই হবে। এরপর খেলতে খেলতে খেলার নিয়ম বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে।

    কাজেই একটা পথ হল তালিবানেরা দুনিয়ায় উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতির নিয়ম – পুরান খেলার নিয়ম মেনেই খেলতে নেমে পড়া। এতে সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হবে দায়ীত্বশীল রাষ্ট্রের আচরণ করা। বড়জোর এর সাথে নিজেদের যেসব ভ্যালুজ আছে কোথাও কোথাও এর প্রদর্শনে নেমে পড়া। তবে  আগে ইমেজ তৈরি এদিকটা খেয়াল রাখতে হবে।
    আর যেকথা মনে রাখতেই হবে তা হল,  যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের সরকারি নানান বাহিনীই কেবল থাকবে। কিন্তু  একই সাথে ঐ দেশ আবার পাশাপাশি কোন সশস্ত্র গ্রুপকেও অপারেট করতে দিতে পারে না।  এক ঘরে দুই পীর হয় না। অথরিটি একজনই বা একটাই হয়।  তবে সাবধান এসব কিছু শুরু হতে পারে আগে দেশে একটা বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল করে নিবার পরেই। কারণ ক্ষমতা দখলের পরেই কেবল একটা কনষ্টিটিউশন আর ওর নানান নিয়ম, আইন-কানুন  তৈরি হতে পারে। এটাই হতে পারে দায়ীত্বশীল পথ। এবার এই পথের সফলতার সম্ভাবনা প্রচুর। প্রধান কারণ  এবার গ্লোবাল রাজনৈতিক শক্তির একটা সফল অংশ তালিবানের পক্ষে আছে।

    অন্যদিকে আরেকটা পথ হল, আগের (১৯৯৬-২০০১) বারের মত করে মাঠে নেমে পড়া। যারা গ্লোবাল ইসলামি রাজনীতির সমর্থক তাদের দৃষ্টিতে  হয়ত এটাই সম্ভবত সঠিক পথ। হতে পারে।  তবে এই পথটা আগের বারের মত আপাতত ব্যর্থ হবে, ছিটকে পড়বে। টিকতে পারবে না। এখন যে যেটা পথ পছন্দ করে সে তো সেই দিকটাকেই সহি পথ বলবে!
    তবু মুলকথাটা হল, আসলে আমরা যে যেই রাজনীতিই কোন দেশে করতে চাই না কেন –  একেবারেই নতুন বা পুরানা ধারা – এসব কিছুর বাইরে  মূল ফ্যাক্টর হল উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতিতে ও শক্তিতে যারা ক্ষমতাবান থাকে তারা আপনাকে কী চোখে দেখবে! আমরা এটা উপেক্ষা করতে পারি না!
    তবু, তালিবানেরা শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নিবে সেটা দেখার অপেক্ষা করতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩১ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “তালেবান ইস্যু ও তিন মিটিং“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    গৌতম দাস

    ১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3E6

    …a bilateral meeting in the Uzbek capital of Tashkent on the sideline. PICTURE SOURCE

    [সার সংক্ষেপঃ  দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে এক “ও-সার্কেল” তৈরি করে এবার সম্ভবত ঘিরে বসতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে চীন। আর একাজে পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে চীন সবচেয়ে কাছে পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে।  আর এর প্রতিক্রিয়ায়, গ্লোবাল  সম্ভাব্য ঘটনার কেন্দ্র ‘সাউথ চায়না সি’ নয়, বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠার সম্ভাবনা বেড়ে গেল!   এতে আমাদের আঙিনা কী যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠবে?  সেটা যাই হোক, ঘটনা যুদ্ধের দিকে যদি যায়ও সেই সম্ভাব্য যুদ্ধ হতে পারে  – ১। যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে কারো পলায়ন, ২। বলল যুদ্ধ করবে কিন্তু পৌছে গেল সবচেয়ে বড় এক আপোষে এমন হতে পারে ৩। অথবা বোকার মত যুদ্ধ কী তা বুঝাবুঝির আগেই সত্যিকার যুদ্ধ লাগিয়ে ফেলল। ৪। যুদ্ধের প্রশ্নে বাইডেন নিজেকে  ট্রাম্পের চেয়েও  যেন  নাদান প্রমাণ করতেই চাইছে।  হয়ত সেকারণেই  জাপান বাইডেনকে  ভুলপাঠ করেই পা ফেলছে। এভাবেই “বোকার যুদ্ধটা” অপ্রস্তুতে হঠাত শুরু হয়ে যেতেও পারে।
    আমার এই কথাগুলো বুঝবার সবচেয়ে ভাল তুল্য আর প্রতীকী ইঙ্গিত হল  – টিকা! মানে আগামি মাসের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নুন্যতম দুই কোটি টিকার সংগ্রহ পেতে যাচ্ছে সেদিকে তাকালেই বুঝা যাবে!]

    তাসখন্দ থেকে ঘটনা শুরু হচ্ছে কেনঃ
    মধ্য এশিয়ায় দেশ উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ। এই তাসখন্দে গত ১৫-১৬ জুলাই এক বিশাল সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সম্মেলনের নেপথ্যে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সামনে তাসখন্দ; যারা চেয়েছিল এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরিবর্তনকে সামনে রেখে একটা আঞ্চলিক সম্মেলন। ‘মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া : আঞ্চলিক যোগাযোগ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন গত বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে, এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আর বাংলাদেশ, ভারত, রাশিয়া ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আর ইইউ প্রতিনিধি মিলিয়ে [According to EURACTIV, the EU foreign affairs chief Josep Borrell will lead a strong delegation.] প্রায় ৪০ দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়ে ছিলেন। আমেরিকার নিচু লেভেলের প্রতিনিধিও এতে উপস্থিত ছিলেন [US representatives at a lower level]। কিন্তু মিটিংয়ের আসল গুরুত্ব অন্তত আমাদের দিক থেকে তা সরে যায় অন্য দিকে –  তাসখন্দ-এর মূল বৈঠক ফেলে ওর সাইডলাইন বৈঠকে।

    কিন্তু  মূল বৈঠক নয়, সাইড লাইনের আলাপই যেন মুখ্যঃ
    কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে দেশের মিডিয়ায় যা হেডলাইন সে দিক তাকিয়ে যদি বলি তা হল – ঐ সম্মেলনের সাইড লাইনে ছিল আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে একই দিনে বৈঠকের খবর। যেমন কেউ শিরোনাম করেছেন,  “একই দিনে ভারত-চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে মোমেন”।
    সাইড লাইনের আলাপই মুখ্য – এমন হওয়ার পেছনে অন্য কারণও ছিল। যেমন, কয়েক দিন ধরে দেশে আরেকটা খবর খুব আলোচ্য হয়ে উঠেছিল। বাংলা ভয়েজ অফ আমেরিকায় ছাপানো এক রিপোর্ট  – “বিকল্প সার্ক গঠন করতে উৎসাহী চীন” অথবা টাইমস অব ইন্ডিয়ার তাদের ঈর্ষায় চোখ টাটানো ও আক্ষেপ করা নিউজ : “চীনা-সাউথ এশিয়ান টিকা কূটনীতির জোটের পরে চীন এখন  দারিদ্র্য দূরীকরণের ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ আনতে চায় [After vaxplomacy in Indian neighborhood, China now brings in development Centre]”। উপরের এ’দুই রিপোর্টে এরা আকার-ইঙ্গিতে বলেছে যে, চীনের নেতৃত্বে ভারতকে বাদ রেখে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানকে নিয়ে এ’জোট [এক ছয় দেশীয় জোট] হতে যাচ্ছে, যাকে কেউ এটাকে চীনের “উন্নয়ন সেন্টার” গঠন করা বলছেন।

    কোন বাণিজ্য জোট সফল হবার কিছু সুত্রঃ 
    এমনিতে বিভিন্ন সময় দুনিয়াতে নানান আঞ্চলিক জোট গঠন হতে আমরা দেখে থাকি। সেসবের মধ্যে বাস্তবে খুবই সক্রিয় ও সচল হতে দেখা যায় অল্প কিছু উদ্যোগকেই; বিশেষ করে যেখানে কিছু গঠন-শর্ত মেনে চলা হয়। যেমন জোটে একটা বড় অর্থনীতির দেশ, সাথে অন্যান্যদেরকে যার একটা ভালই বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা থাকে – অন্তত এমন একটা দেশ থাকতে হয়। আর আগাম মেনে নিতে হয় যে,  সদস্য দেশগুলো এ’জোটে যোগ দিবে তখনই, যখন ছোট-বড় সদস্য  প্রত্যেকেরই বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটি খেয়াল রেখে তা সাজানো হবে। আর এমনটা বাস্তব করতে পারার কমন ফর্মুলা হল – বড় অর্থনীতির দেশ বলতে ধরা যাক চীন, যার অন্যকে শেয়ার দেয়ার মতো নিজের বড় বাজার (জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি) আছে আর সাথে আছে অন্যকে বিপুল বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা; অবকাঠামো আর ‘ডাইরেক্ট বিদেশী [FDI] শিল্প বিনিয়োগ’- দু’টাই। ফলে শুরুতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছোট অর্থনীতির সদস্য দেশগুলো মুখ্যত চীনে রফতানির সুযোগ পাবে, সাথে চীনা বিনিয়োগও পাবে। এতে পরের দিকে ক্রমেই হাই-এন্ড বা হাইটেকের পণ্য চীন থেকে আমদানি আর লো-এন্ড বা লো-টেক পণ্য চীনে রফতানি এই ভিত্তিতে ওই জোটের মধ্যে খুবই সক্রিয় একটি উভয়মুখী বাণিজ্য চালু হতে দেখা যেতে পারে।

    এসব পরিকল্পনামাফিক চললে, মূলকথা- সবারই এতে কিছু লাভের দিক থাকতে হবে, যে দিকটা গুরুত্বপুর্ণভাবে খেয়াল রাখতে হবে; মানে সুযোগ পেলে অল্পতেই অন্যের বিরুদ্ধে ‘লোভী’ হয়ে ওঠা যাবে না; লং টার্ম ভাবতে হবে। চীনারা এটাকেই “উইন-উইন” সিচুয়েশন বলে বুঝায়ে থাকে। আর তা হলেই এটা মূলত এক গ্লোবাল বাণিজ্যের আঞ্চলিক রূপ বা ভার্সন হয়ে উঠতে পারে। ফলে এখানে অন্যকে বাজার যেমন ছাড়তে হবে, তেমনি আবার অন্যের বাজারে ঢোকার সুযোগও নেয়া যাবে। এককথায় সবাইকেই নিজ নিজ বাজার অন্যের সাথে শেয়ার করতে রেডি থাকতে হবে। তাই নিয়মিত নিজেদের মধ্যে  প্রচুর কথা বলতে হবে, বলার ব্যবস্থা রাখতে হবে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতার নানান টেকনিক্যাল কমিটি ও উপযুক্ত প্রফেশনাল লোকজন থাকতে হবে, যাতে সদস্য-দেশ দুইয়ের পরস্পরের সংঘাতপুর্ণ স্বার্থ উদয় হলে এর  সুবিধা-অসুবিধার সমাধান করে দেয়ার রাস্তা বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কোনোভাবে কোথাও একপক্ষীয় লাভের কথা ভেবে থাকলে এমন জোট দাঁড়াবেই না। আর বলাবাহুল্য, “জাতিবাদী রক্ষণশীল” অর্থনীতির কোনো দেশ এর সদস্য থাকতে পারবে না।  মনে রাখতে হবে  জাতিবাদী অর্থনীতি আর (আঞ্চলিক বা গ্লোবাল) বাণিজ্য জোটের ধারণা পরস্পরবিরোধী।  মানে “আমার দেশ যা যা পণ্য ভোগ-ব্যবহার করে এমন সব ভোগ্যপণ্য আমি নিজেই উৎপাদন করে নিব” অথবা “বিদেশী পণ্য হারাম” ধরনের জাতবাদী চিন্তা এখানে মনের গোপনে পুষে রাখাও নিষিদ্ধ। বরং বাজার দিব আর বাজার নিব এটাই হবে এর নীতি।

    গ্লোবাল বা আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে জাতিবাদি অর্থনীতি অচলঃ
    ভারত অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী এমন পুরনো চিন্তার এক কট্টর জাতিবাদী দেশ। জাতিবাদ মানে যেমন হিন্দুত্ববাদ দিয়ে রাজনীতি করা খুব  আরামের।  এতে মানুষের সেন্টিমেন্ট আবেগকে কচলিয়ে উন্মত্ত করে তার ভোটটা নিজের বাক্সে ঢুকানো যায় বলে  জাতিবাদ ক্ষতিকর তা বুঝলেও কেউ ছাড়তে চায় না। হিন্দুত্ববাদ ধরনের সব  ধর্মীয় জাতিবাদের এত ছড়াছড়ি একারণে।  আসলে একারণেই  সব জাতিবাদী চিন্তাই বলতে চায়, “আমি কোনো বাণিজ্য জোটে বিশ্বাসী নই”। কিন্তু আবার ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারও বেশ বড় (১৩০ কোটির), তাই ভারত নিজের এই ১৩০ কোটির বাজারের লোভ দেখিয়ে সে কোন বাণিজ্য জোটের ভিতর দামি ও আকর্ষণীয় সদস্য হয়ে ঢুকতে চেয়ে থাকে। আর ভেতরে ঢুকে সে চেষ্টা করতে থাকে কেবল অন্যদের থেকে বাজার সুবিধা নিয়ে চলবে – এই হল ভারতের আদিম খাসলত। এ’কারণে ভারত যে জোটে থাকে সে জোট ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হবেই। এর বিপরীতে এখনকার চীন বিকশিত বলে এর অন্যকে দেয়ার মতো সুবিধা ও সক্ষমতা বেশি।  কিন্তু সাবধান, এটাকে চীন ভাল আর ভারত খারাপ  বলে চালায় দেয়া বিরাট ভুল হবে।  এমনকি  চীনের উদারতা বলে বুঝাও ভুল হবে, বরং এটা চীনের অর্থনীতির শক্তি ও সক্ষমতা  এখন হয়েছে তাই সে দিতে পারে – এভাবে অবজেকটিভ ভাবে বুঝতে হবে। কালকে চীন এমন নাও থাকতে পারে। চীন মানেই সে ভাল দেশ – এটা খুবই ভিত্তিহীন ও ভুল পদ্ধতির চিন্তা।  চীনের অর্থনীতির উত্থানটা এখন এই লেভেলে উঠেছে যে ওর পক্ষে এখন অন্য পার্টনারদের দিকেও তাকালেই সেটাই হবে চীনের সমৃদ্ধির সঠিক পথ। তাই সে অবলীলায় আমাদের মত দেশকে বাজার ছাড় দিতে পারে, বিনিয়োগও দিতে পারে।

    এছাড়া আরেক নতুন আইডিয়া, ভ্যালু-অ্যাডিশন শেয়ার প্রডাক্টও – মানে জোটের সব সদস্যই একটা পণ্য উতপাদনে কিছু না কিছু শ্রম জোগাবে – এমন শেয়ার করা ভ্যালু বা শ্রমে উৎপাদিত পণ্য- এমন উৎপাদন সম্পর্কও চালু করতে চীন সক্ষম। আর চীনের সে অফারের সুবিধা নিয়ে সবাই বাজারে প্রবেশ করতে চাইলে তাতে চীনসহ সবারই লাভ বলে তা দিতে আগ্রহী হয়। RECP  সে ধরণের এক জোট।

    টাইমস অব ইন্ডিয়া তার রিপোর্টে – চীনের বর্তমান এই  ছয়-দেশীয় জোট বা ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ গঠনের ব্যাপারটাকে  মুখস্তের মত পাল্টা  – ‘ভারতের সবই ভাল বা আমরাই শ্রেষ্ঠ বা আমরা বিরাট কিছু’- টাইপের মন্তব্য ঢুকিয়েছে তাদের রিপোর্টে। যেমন সে লিখেছে “এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য [to challenge ‘Indian dominance’ in the region] আছে”। চীন সেটা নষ্ট করতেই এ’কাজে এসেছে। এ’ছাড়া আরো বলেছে, ভারত এই ছয় দেশের সবার সাথে আগে থেকেই ‘টপ উন্নয়ন পার্টনার হয়েই আছে’ [However, India remains top development partner for Bangladesh, Bhutan, Nepal and Sri Lanka and has extended grants and soft loans for various projects……] ফলে ভারত তাদেরকে ‘বিপুল অনুদান’ তো বটেই সাথে অবকাঠামো ‘সফট লোনও’ নাকি দিয়ে থাকে।  তা থাক। আসলে এরা এমনই স্বপ্নের পোলাও খাওয়া লোক, এরা খেতে থাকুক অসুবিধা কী!

    কিন্তু বাস্তবত ভারতের না নিজ বাজার ছাড় দেয়ার সক্ষমতা আছে, না পার্টনারদেরকে অবকাঠামো ঋণ বা বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা। বরং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারত আমেরিকার কোলে চড়ে বসে ওয়্যার অন টেররের উছিলায় আর সর্বোপরি, আমেরিকার ‘চায়না ঠেকানো’ ঠিকা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। কব্জায় নিয়েছে। আমেরিকা  ১/১১ এ আমাদেরকে দখলে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল, তাই। এটা ভারতের নিজের কোন ক্রেডিট নয়, তার অর্থনীতির কোন উন্নতি বা সক্ষমতা বেড়ে যাবার কারণে ভারত আমাদেরকে এমন কব্জায় নিতে পারে নাই। আর এই সুযোগে সে বিনা পয়সায় বাংলাদেশ থেকে সমস্ত করিডোর  সুবিধা নিয়ে তা ভোগ করা শুরু করেছে। ‘সমস্ত করিডোর’ বলতে মাটির নিচে পাইপ লাইনে, মাটির উপরে সড়কপথে, আকাশে ও পানিপথ ও বন্দরে, সব কিছুতে এবং তা বিনা পয়সায়। এই হলো বাস্তবতা।

    তবে এবারের এক কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’য়ে সে যে কী পরিমাণে অক্ষম ও উদাম, তা  একেবারে উন্মোচিত হয়ে গেছে। নিজ মানুষদের সবার জন্য টিকা উৎপাদন ক্ষমতাই যার নাই, বা টিকা কিনবার অর্থের সংস্থান ক্ষমতা নেই, সে বাংলাদেশেসহ সারা দক্ষিণ এশিয়ায় টিকা সরবরাহকারী টিকা কূটনীতিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আর নিজের  সক্ষম দাবি করে এসেছে। আর এখন খোদ আমেরিকার কাছে ভিক্ষার  হাত পেতেছে।  গত দুমাসেই জয়শঙ্করের প্রায় সপ্তাহবাপী আমেরিকার সফর থেকে নিট লাভালাভ হল – ভিক্ষা অনুদানে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের ফ্রি টিকা ও স্বাস্থ্য উপকরণ লাভ করেছে ভারত।

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার বাংলাদেশবিরোধী রিপোর্ট নিয়মিত লিখে চলেছেন এর রিপোর্টার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি নাকি ওই পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর, এটা তার দাবি। যদিও তার লেখার কোয়ালিটি তা বলে না। যা হোক, এর আগে তখনো  বেক্সিমকো কোম্পানির প্ররোচনা প্রলোভনে পা দিয়ে ভারতে উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কেনার কমিশনের লোভ  সরকারকে দেখানো শুরু হয়নি – কিন্তু সেসময় আমরা চীনা টিকার তৃতীয় পর্যায়ের টেস্টে অংশগ্রহণের অফার পেয়েছি আর ঐ টেস্ট সফল হলে যার বিনিময়ে আমরা নিজেরাও টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স পাবো। সে সময় এই দীপাঞ্জন লিখেছিলেন ‘চীন বাংলাদেশকে গিনিপিগ বানাতে চায় বলে ওই টিকা নিয়ে আসছে [China in a startling move plans to use the population of Bangladesh as ‘guinea pigs’ to conduct Phase III trials of its Covid vaccine.]।’ অথচ এর কোন প্রমাণ বা কেন তিনি গিনিপিগ বলছেন এর কোন সাফাই দেন নাই। আসলে  টিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম দুই পর্যায় হল ওর আসল পরীক্ষা। ঐ দু’টা পার হওয়ার পরই মাস পাবলিকের উপর র‌্যানডম ব্যবহার বা গ্রহণকারীদের ওপর এর প্রয়োগ প্রতিক্রিয়া জানার ও প্রয়োজনীয় কারেকশনের জন্য তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার স্তরে যাওয়া হয়। অর্থাৎ তথ্য-প্রমাণ কিছু না হাজির করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করাই দীপাঞ্জনদের ‘যোগ্যতা’, যেটা জার্নালিজমই নয়। অথচ তারা সে কাজই করে চলেছেন।

    তবুও চীন ঠিক কী করতে চায় তা অনেক অস্পষ্টঃ
    গত এপ্রিলে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশ– বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তান আর সাথে চীনসহ মোট ছয়টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই প্রথম এই জোট গঠনের ধারণাটি তুলে ধরেন।
    From REUTERS news:
    – China hosts video-conference with 5 South Asian nations
    – India was invited to meet, China says, but didn’t attend
    – India-China tensions high over Himalayan border dispute

    এটা সেই সময়, বিশেষ করে ভারত যখন টাকা নিয়েও আমাদের দেশের পাওনা টিকা দেয়া বন্ধ করে দিল আর অতিকষ্টে হাসিনা সরকার ফিরে চীনকে আমাদের টিকা সরবরাহের উৎস হতে রাজি করাতে পেরেছিল তখনই চীন এই জোটের ধারণাটা হাজির করেছিল। বলেছিল, চীন দক্ষিণ এশিয়ায় একটি কমন টিকা স্টোরেজ গঠন করতে চায়, যেখান থেকে এ অঞ্চলে সবাই টিকা সংগ্রহ করতে পারবে। তাই আরো এগিয়ে পরে গত এপ্রিলে একে জোটের ধারণা দেয় চীন। এখন সেই ধারণাকে আরেকটু বিস্তার করে বলা হয়েছে, ‘চায়না-সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিজ প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন অ্যান্ড কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ (China-South Asian Countries Poverty Alleviation and Co-operative Development Center) তারা গড়তে চায়।

    কিন্তু এই নামের মধ্যেই – এখানে তিনটি শব্দ আছে – প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ আর, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার;  আর এই তিন শব্দ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটার যে বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত করেছে; তাতে এটা আর যে কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই-ই এটা বলছে। যদিও মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলা-ভোয়া-তে প্রথম বাক্যে লিখেছেন এভাবে, “অবিকল সার্ক নয়। তবে এর আদলে ‘বিকল্প সার্ক’ গঠন করতে যাচ্ছে চীন। এতে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থাকবে”। তাঁর এসব কথার সাথে চীনের কথার বা প্রতিষ্ঠানটার নামেরই মিল নাই।

    কারণ ওই তিন শব্দের মাঝের “কো-অপারেটিভ” শব্দটা যদি ধরি  – এটা এক আদি কমিউনিস্টদের শব্দ; তবে চীন এটা কমিউনিস্ট হিসাবে আনে নাই। এনেছে সম্ভবত ‘সদস্যদের সবার’ বা চীনের একার স্বার্থের এই সংগঠন নয়, এটা সকলের, সবাই সহযোগিতায় বুঝাতে কো-অপারেটিভ বা সমবায়িক শব্দটা এনেছে। কিন্তু এটি খুবই অপ্রয়োজনীয়। ঠিক যে কারণে কিছু রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোটের নামে সাথে দুনিয়ার কোথাও কো-অপারেটিভ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, হয় না।  বিভিন্ন  স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানেই যেখানে সবাই সমান মর্যাদার, সে কারণে এখানে আর কো-অপারেটিভ  – খুবই বেমানান ও অপ্রয়োজনীয় শব্দ।

    ওদিকে বাকি যে দুই শব্দ “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” (দারিদ্র্য দূরীকরণ) ও “ডেভেলপমেন্ট সেন্টার” – এ দুই শব্দ নিজেই পরিষ্কার বলছে এরা  উন্নয়নবাচক বা সম্পর্কিত ধারণা। কিন্তু “উন্নয়ন” মানে কী?

    উন্নয়ন বা ইংরেজিতে ডেভেলপমেন্ট – এগুলো আমেরিকার দিক থেকে চালু করা, যেন প্রায় প্যাটেন্ট করা শব্দ। আমেরিকার হাতেই এই কনসেপ্টের জন্ম এবং এর ব্যবহার শুরু ও এখনো চালু রয়েছে। আমেরিকার হাতে নাহয় বুঝলাম; কিন্তু কবে থেকে? যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অথবা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের দুনিয়া শুরুর আগে “উন্নয়ন” বলে কোনো শব্দ ও ধারণা ছিল না। মানে তা অন্য অর্থে ব্যবহৃত হত, আমেরিকার দেয়া অর্থে নয়।

    আসলে ডেভেলপমেন্ট – এই পুরো পরিভাষার আসল অর্থ হল  বা পুরা শব্দটা হল – ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। বাংলায়, অবকাঠামো উন্নয়ন। এখন এটা অনেক বড় শব্দ বলে সংক্ষেপে শুধু ‘উন্নয়ন’ বলা শুরু করেছিল আমেরিকা। তা হলে এর আসল ও গুরুত্বের শব্দটা হল – অবকাঠামো, ফলে সেখান থেকেই অবকাঠামোর উন্নতি। কিন্তু তাহলে আবার,  ‘অবকাঠামো’ মানেই বা কী?

    এখন আমরা এবার অন্যদিক থেকে আগাই।  এদিকে, ‘বিনিয়োগ’ মানে পুঁজি বিনিয়োগ কথাটা ক্যাপিটালিজমের ধারণার সমান পুরনো। কারখানা বা ব্যবসা শুরু করতে গেলে অর্থ বা পুঁজি বিনিয়োগ লাগবেই। তবে ১৯৪৪ সালে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান দুটা জন্মের সময়ে বিনিয়োগ ধারণা ও শব্দটাকেই দুই ভাগ করে নেয়া হয়েছিল। একটি প্রি-বিনিয়োগ আর অন্যটি সাধারণ (যেমন- আগে বলতাম সেই) বিনিয়োগ। প্রি-বিনিয়োগ মানে বোঝাই যাচ্ছে, মূল বিনিয়োগেরও আগেই আরেক ধরণের বিনিয়োগ এটা। মানে কারখানা বা ব্যবসায় মূল বিনিয়োগ শুরু করার আগে ‘বিনিয়োগ পরিবেশ’ সৃষ্টির জন্য আরেকটা ধরণের বিনিয়োগ করা এটা। যেমন, যেখানে কারখানা-বিনিয়োগ এসে বসবে সেই দেশ-স্থান-শহরের ভূখণ্ডটার জলাভুমি থেকে শুরুর নানার কাজ – মাটি ফেলা বা ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সুব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, এয়ারপোর্ট, বন্দর পর্যন্ত এবার সাথে, দক্ষ প্রশাসন ইত্যাদি যদি সেখানে না থাকে, তবে বিনিয়োগকারী সেখানে আসবে না। পুঁজি সেখান থেকে চলে যাবে। তাই যে ভূখন্ডের প্রধানমন্ত্রী/মেয়র বুদ্ধিমান শাসক তিনি কিন্তু এসব ব্যবস্থা আগেই করে ফেলেছেন।  কারণ, বিনিয়োগ না আসলে মানে নতুন নতুন কাজ সৃষ্টি না হলে দেশের লোক না খেয়ে মরবে। এটা তো বুদ্ধিমান  শাসক হতে দিতে পারেন না। এজন্য এগুলো প্রি-বিনিয়োগ বলছি আর এটা অবকাঠামো তৈরিতে বলে যেটাকে  এজন্য অবকাঠামো-বিনিয়োগ বলে। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ মূল কথা হল, অবকাঠামো-বিনিয়োগে সুদের হার সবচেয়ে কম, প্রায় ‘নাই’ করে রাখতে হবে, যাতে পরে কারখানা বিনিয়োগের ফলে উতপাদিত পণ্যের উপরে মানে এই মূল বিনিয়োগের উতপাদিত ফিনিস প্রোডাক্টের মুল্যের উপর  এর চাপ-প্রভাব খুবই কম হয়। ফিনিসড প্রডাক্টের বিক্রি মূল্য যেন কম থাকে।

    তাহলে  অবকাঠামো-বিনিয়োগের পুঁজি্র সুদ হার কম  রাখতেই হয়। এমন – এটারই বিলিয়ন ডলার ধার দেয়ারই  উপযুক্ত সংগঠন হল বিশ্বব্যাংক। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া বিশ্বব্যাংক, এই নামটা এটা সংক্ষিপ্ত করে নেয়া নাম। মূল নাম IBRD (International Bank for Reconstruction & Development ); ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্র্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট  – এর উদ্দেশ্য কম সুদে বা ‘না’ সুদে অবকাঠামো গড়তে লোন দেয়া যাতে এরপর সহজেই ঐ দেশে স্থানীয় বা বিদেশি বাণিজ্যিক (কারখানা) বিনিয়োগ এসে হাজির হতে পারে।

    আবার, অবকাঠামো বিনিয়োগও দুই ধরনের হয় – ফিজিক্যাল ও হিউম্যান।  ফিজিক্যাল মানে বস্তুগত অবকাঠামো। যেমন উপরে যেটা বলেছি মানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট সুব্যবস্থা প্রভৃতি। অন্যটা হল – হিউম্যান বা শ্রমের অবকাঠামো। সাধারণত কারখানা খুললে যেন ভালো এডুকেটেড স্কিলড লেবার বা নন-এডুকেটেড স্বাস্থ্যবান শ্রমিক পাওয়া যায়। তাই সাধারণত শিক্ষা আর ন্যূনতম স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে এভাবে দুই খাতে অবকাঠামো ব্যয়টা মূলত করা হয়। দুনিয়াতে ১৯৪৪ সালের আগে এই “অবকাঠামো উন্নয়ন” বলে কোনো ধারণাই ছিল না; অর্থাৎ কলোনি আমলে “অবকাঠামো” বলতে কোন ধারণা কাজ করত না। আর একালে অবকাঠামো বলে যাকিছু করা হয়েছে এর ভালো-মন্দসহ যা কিছু দুনিয়াতে হয়েছে, এর (ইতি- বা নেতি-) দায় সবটাই গ্লোবাল নেতা আমেরিকার।

    তবে এখন দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতার পালাবদলের এই কালে চীন কি কেবল আমেরিকাকে কপি করবে? নাকি আমেরিকার উন্নয়নের চেয়ে খারাপ কিছু অবশ্যই না, বেটার কিছু কনসেপ্ট  নতুন আনবে? অথবা আগেরগুলোর  সাথে আরও সংশোধিত নতুন কিছু আসবে?’ এটাই আমরা নিশ্চিত হতে চাই। চীন কি যথেষ্ট চিন্তা করে “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” বা ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, শব্দগুলো ব্যবহার করেছে? আমরা জানি না।

    আরো বড় প্রশ্নঃ
    তাহলে চীনের নতুন এই ছয় রাষ্ট্রীয় ‘ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’- আমরা এখন অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে, এটা মতিউর রহমান চৌধুরী যেভাবে কল্পনা করেছেন… ‘অবিকল সার্ক নয়, তবে এর আদলে বিকল্প সার্ক’- এ কথাটি ভিত্তিহীন। কারণ আমাদের বাস্তবের সার্ক ধরনের সংগঠন তো আসলে তা এক রাষ্ট্রজোট-ই।  মানে কোনো অবকাঠামো-দাতা প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্বব্যাংক সেটা, তা নয়। বিশ্বব্যাংক তো কোনো রাষ্ট্রজোট নয়। তা হলে সমস্যা ঠিক কোথায়? খুব সম্ভবত সমস্যাটি চীনের নীতিনির্ধারকদের মাথায়; সেখানে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বা ইচ্ছা করেই রেখে দেয়া হয়েছে।  অর্থাৎ এখনই স্পষ্ট করতে তারা চাচ্ছে না; সময় হয় নাই। ফলে আপাতত ব্যাপারটা তাই দেখতে অনেকটা বাঘের মত হায়েনা চাওয়া ধরণের হয়ে আছে!

    তবুও চীনারা কী আসলে এশিয়ায় কোয়াডের মত কিছু চাচ্ছে? যেটা বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী? প্রথমত, সেটা বুঝাতে  হলে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ধরণের শব্দের ব্যবহার চীনকে আগে ত্যাগ করতে হবে।  তবে আমরা সবাই আগেই নিশ্চিত থাকতে পারি, সবার ওপরে কোয়াডের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কিছু পেতে চাইলে তা প্রকাশ হয়ে গেলেই এই পাঁচ রাষ্ট্র সাথে সাথে ভেগে যাবে। কারণ তেমন জোট মানেই এটা সামরিক চরিত্রের দিকে টার্ন নেবে। আর এ মুহূর্তে আমেরিকা-চীনসহ কারোই যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ জাগা বা জাগানোর কথা না; যদি না বাইডেন জেনে বা না জেনে কোনো বোকামি করেন।

    আবার চীন যদি আসলেই একটি বিকল্প সার্ক টাইপের জোট চায়, তবে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এসব শব্দ ফেলে দিতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত বা অমুক রাষ্ট্রকে নেয়া যাবে না- এটি বলাই যাবে না। এমনকি দাওয়াতপত্রও ভারতকে পাঠাতে হবে। যদিও উপরের রিপোর্টে আমরা দেখেছে ভারত ইনভাইটেড ছিল। কিন্তু নিজেই সাড়া দেয় নাই। আবার ভারত এলেও চীনের তাতে লাভ, আবার না হলেও আরেক ধরণের লাভ। কাজেই আগাম কে আসতে পারবে না, এভাবে কথা বলার কোনোই প্রয়োজন নাই, তা শোভনও না। তবে চীনের উপর দাওয়াত না করার দায় হবু গ্লোবাল নেতা হিসাবে নেয়া ভাল উদাহরণ নয়।

    শেষে তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু কথাঃ
    জাপান বার্ষিক ডিফেন্স রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে আর তাতে জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী [Deputy Prime Minister Taro Aso]  বলে ফেলেছেন যে “জাপানের আমেরিকার সাথে মিলে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে যাওয়া উচিত”।  বলাই বাহুল্য এটা উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পরে তিনি পালটা ব্যাখ্যা দিয়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে চেয়েছেন। কিন্তু মূলকথা, আমেরিকা বা জাপান সকলেই এক চীন নীতি মেনে নিয়েই  চীনের সাথে সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। ফলে ডায়লগের বাইরে “পাশে দাঁড়ানো” টাইপের কথা বলা তাদের কথা নয় এটা মারাত্মকভাবে গ্লোবাল স্থিতি ভেঙ্গে ফেলবে। চীনেরও বলপ্রয়োগ ভিন্ন অন্য সবকিছুতে তাইওয়ান ইস্যু সমাধানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত। এখন কে এসব শুরু করেছে জাপানের মন্ত্রীরা নাকি বাইডেনের আগ্রহে  সেটা যাই হোক, সারকথাটা হল যেখানে যুদ্ধের উস্কানি সবার সামলে চলা উচিত সেখানে উস্কানি তোলা হচ্ছে।
    শেষে একটা রেফারেন্স দিয়ে শেষ করব।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবাই জানেন পক্ষ দুইটা ছিল হিটলার-মুসোলিনি-জাপানের তেজো ও তাদের বন্ধুরা একদিকে। অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপের বাকি সবাই। যুদ্ধে আমেরিকার মিত্র বাহিনীর বিজয়ের পরে দুপক্ষের বহুদেশেই খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ দেয়া দিয়েছিল। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা ছিল মুসোলিনির ইটালিতে। কিন্তু পক্ষ-বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক  একমাত্র সক্ষম আমেরিকা সকলকেই সাহায্য এবং পুনর্বাসন দিয়েছিল। ইটালিবাসিও আগে থেকেই লাজলজ্জা ভুলে প্রকাশ্যে সাহায্য কামনা জানিয়েছিল।

    যুদ্ধের সোজা অর্থ হল, সম্পদ ও রিসোর্সের সরাসরি ধবংস ও অপচয়। আবার খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ মানে মানুষ আর মানুষের মর্যাদায় থাকে না! তাই যুদ্ধ শেষে যার সামর্থ থাকে সেই বাকি সবাইকে পক্ষবিভেদ ভুলে সকলকেই খাওয়ায় আবার পুনর্বাসনের অর্থ যোগানোর সক্ষমতাও দেখায়।  কাজেই একালেও দায়দায়িত্ব ভুলে যুদ্ধের পক্ষে পরিস্থিতিকে ঠেলে দোয়ার আগে আমাদের এসব পুরান কথা স্মরণ থাকবেনা কেন?

    আপাতত এখানেই ইতি টানছি। তবে চীনকে অবশ্যই ভেবে পরিষ্কার করে বলতে পারতেই হবে যে, সে স্পষ্ট করে কী চায়? আর এবারের তাসখন্দ  সাক্ষাতে চীন বাংলাদেশকে এক বড় স্তরের আস্থায় নিয়ে রেখেছে দেখা যাচ্ছে, এটা তাৎপর্যপূর্ণ। এই সাক্ষাতটাকে আগামি দিনে দেখা হবে একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে।  তবে সেটা চীন-বাংলাদেশের সম্পর্কের দিকের চেয়েও বড় কিছু। আগামি দিনে বাংলাদেশে যা যা ঘটবে  সেসবের প্রেক্ষিতে এটাকে টার্নিং পয়েন্ট বলে দেখা হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “চীন দক্ষিণ এশিয়ায় কী চায়“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]