Tag: ভারত

  • ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ

    ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
    প্রথম পর্ব

    গৌতম দাস

    ২৫ মার্চ ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3n4

    সাতচল্লিশের দেশভাগ মানে যখন নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল আর সেকথার সোজা মানে হল এমন রাষ্ট্রজন্ম হওয়াতে বৃটিশ জমিদারি ব্যবস্থাটাই উচ্ছেদ হয়ে যায়।  আর এথেকেই সারা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রজারা জমির ভোগদখল (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) লাভ করে। ফলে বাস্তবত পুর্ববঙ্গ আলাদা নিজেই (এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ অর্থে)  এক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে আগের জমিদারদের হাতে জমিদারী থাকার কাগজপত্র থেকে গেলেও কার্যত তারা সব জমিই হারিয়ে ফেলেছিল। মূল কারণ, এবার  জমিদারেরা আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেউ নয়। মুসলীম লীগ এর ক্ষমতায়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই এটা জমিদারী-উচ্ছেদের এক বিপ্লব ছিল।  যদিও আইনিভাবে এই জমিদারি উচ্ছেদ হয় পরে ১৯৫১ সালের ১৬ মে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950 এই আইনে, পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে তা পাশ হওয়াতে। সবচেয়ে মনে রাখার মত ঘটনাটা হল এই বিপ্লব ঘটেছিল তথাকথিত কোন কমিউনিস্ট পার্টির হাতে নয়। বরং যাকে প্রগতিবাদীরা উঠতে বসতে “সাম্প্রদায়িক দল বলে গালাগালি করে”, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল বলে নিন্দা ও তুচ্ছ করে  সেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। তবে মুল কথা আজকের বাংলাদেশের সারা ভুখন্ডের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে (ততকালীন প্রজারা যারা আমাদের দাদা নানা বা পুর্বপুরুষ) জমির মালিক হয়েছিল যারা যে যেই জমি প্রজা হিসাবে চাষাবাদ করত সেই জমির খাজনা নতুন পাকিস্তান সরকারকে পরিশোধ করা সাপেক্ষে সেই সেই জমির মালিক এবং ভোগ-দখল ও উত্তরাধিকারিকে হস্তান্তরকারি মালিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঐ ১৯৫১ সালের আইন এখন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ গণ্য করা হয়।

    কিন্তু বিরাট ট্রাজেডিটা হল, এভাবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জমি পেয়েছিল কিন্তু কেউ অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি, গ্রুপ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম যে সঠিক হয়েছিল অন্তত জমিদারি উচ্ছেদের ফলে যে তারা বাসিন্দারা জমির মালিক হয়েছিল এই কারণে অথবা, এই কৃষি-বিপ্লবের তাতপর্যকে স্মরণ করে – এমন সাফাই-বয়ানের ভিত্তিতে কোন ইতিহাস, কেউ লেখে নাই। স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রচনা করে নাই। এর বদলে স্কুলে পড়ানো হয়েছে প্রগতিশীলতা, জমিদারদের বয়ানে লেখা  ইতিহাস ইত্যাদির যা কলকাতায় পড়ানো হত সেই ইতিহাস বই। 

    উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ;  মানে কলোনি ‘বৃটিশ-ইন্ডিয়া’ ত্যাগ করে চলে যাবার সময় বৃটিশ শাসকদের এই কলোনিকে ভারত ও পাকিস্তান এ’দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এঘটনাই সাধারণ্যের মুখের ভাষায় ‘দেশভাগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের জর্মানের পক্ষশক্তি,  কিন্তু যুদ্ধে তারা উভয়ে (সাথে মুসোলিনি-সহ)) মিলে হয় পরাজিত শক্তি। আর ঐ  পরাজয়ের পর জাপানের ফাইনাল সারেন্ডারের দিন ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫। তাই এঘটনার সাথে মিল রেখে, এর দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭, এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস বা ক্ষমতা হস্তান্তর দিবস হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।

    দেশভাগ কী খারাপ কাজ, নেতি ঘটনাঃ
    দেশভাগ মানে সেটা একদিক থেকে বিচারে বৃটিশ “ভাইসরয়” এর ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাওয়াও বটে। ইংরাজিতে ব্যবহৃত Viceroy বা Vice-roy শব্দটা ফরাসি “vice-king” থেকে এসেছে। কিন্তু ভাইস-রয় আমাদের প্রেক্ষিতে অর্থ কি?
    ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম প্রায় একশ বছর (১৭৫৭-১৮৫৮) আমরা ছিলাম “বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির” দখল-শাসনে। আর পরে ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট, থেকে ঐ দখল-শাসন শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৃটিশ রাজসরকারের শাসনের অধীনে চলে যায়। শেষের সেই শাসন ছিল আরও প্রায় নব্বই বছরের, ১৯৪৭ এর আগষ্ট পর্যন্ত। আর ঐ বৃটিশ-শাসকপক্ষের সর্বোচ্চপদ বা রাজা/রানীর মুখ্য প্রতিনিধির পদকে বলা হত “ভাইসরয়”। কথাটা আসলে ভাইস-রয় (রয়েল শব্দকে ছোট করে নেয়া অংশ হল ‘রয়’ সম্ভবত সেজন্য; অথবা অনেকে মনে করেন ফরাসি ভাষায় আরওআই (roi) – এই ‘রয়’ মানে রাজা;  সেখান থেকে) অথবা বাংলা করে বললে, ভাইসরয় মানে রাজা/রানীর প্রতিনিধি। ভারতের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটন। তিনি চেয়েছিলেন নতুন দুই স্বাধীনদেশেরই ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। তাই একই দিনে অনুষ্ঠান না করে একদিন আগে ১৪ আগষ্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয়েছিল। আর পরদিন ১৫ আগষ্ট ভারতে তা করা হয়েছিল।
    এরপর ভারত ও পাকিস্তান নামে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দুইদেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকেও প্রচলিত জনপ্রিয় ডাকনাম হিসাবে ‘দেশভাগ’ বলে ডাকার চল শুরুও হয়। অনেক সময় একাদেমিকভাষাতেও “দেশভাগ’ শব্দটা ব্যবহার হতে দেখা যায়। যদিও এর সাথে এক অনুষঙ্গ অনুমানও থাকতে দেখা যায়।  অল্পকিছু  ব্যতিক্রমে সেই অনুমানটা হল, “দেশভাগ” জিনিষটা একটা খুবই নেগেটিভ ঘটনা বা খারাপ কাজ। মানে দেশভাগ শব্দ ব্যবহারকারি বক্তা যেন বলতে চান যে দেশভাগ হওয়াটা ভাল হয় নাই, না হলে ভাল হত। ফলে যাদের কারণে দেশভাগ হয়েছে তারা যেন খারাপ লোক। এদিকটা আমরা এখানে পরখ করে দেখব আসলে তা  সত্য কিনা বা কতটা সত্য।

    কিন্তু দেশভাগ ঘটনাটা কেন ঘটল আর ঘটনাটা খারাপ বা নেতিনাচক ঘটনা কিনা সে আলাপে একটু পরে যাব। এর আগে, দেশভাগ খারাপ – একথার মানে কী? এটা বলে ঠিক কী বুঝাতে চায়? ব্যাপারটা কী এরকম যে এই দেশভাগ কেউ চায় নাই, চাওয়ার পক্ষে কেউ ছিল না, এমন? কিন্তু না, এটা তো হতেই পারে না!  কারণ চাহানেওয়ালা পক্ষ কেউ যদি নাই থাকে তবে দেশভাগ বা বৃটিশ-ইন্ডিয়া ভাগ হল কেন? তাই ভাগ যেহেতু হয়েছে অতএব চেয়েছে এমন জনগোষ্ঠিও অবশ্যই ছিল এবং তারা উপেক্ষিত হবার মত অল্প জনসংখ্যার তা মনে হবারও কোন কারণই নাই। তাহলে এরা কারা? এখান থেকেই আমরা কথা শুরু করব।

    কথাটা উলটা করে বললে, কারা মনে করেন দেশভাগ ইতিবাচক এবং কী নির্ণায়ক-বৈশিষ্ট দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা বা চিনা যাবে? অনেকের মনে অনুমান হতে পারে অন্তত যারা নবগঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন নিশ্চয় তারা সকলে দেশভাগ হওয়াকে সঠিক ও আপন ভাবতেন! না খুবই সরি। এই অনুমানও ভিত্তিহীন, অন্তত পুরা না আংশিক সত্য। যদিও একেবারে জন্মের পরপরই পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে দেশভাগ আপন ঘটনা ছিল অবশ্যই। তবে, এটা পুর্ব পাকিস্তানে যতটা না পশ্চিম পাকিস্তানে তার চেয়ে শতগুণই  আপন মনে করা হয়েছিল।  পশ্চিম পাকিস্তানের যারা বাসিন্দা হলেন তারা ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হওয়াটাকে নিজেদের জন্য একটা বড় অর্জন বলে মনে করে এসেছে, এখনও করে। যে কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাইরে যারা আমরা, এই আমরা যাই মনে করি না কেন ঐ পাকিস্তানের ভিতরে সর্বত্র আজও তাদের পাকিস্তান রাষ্ট্রলাভের প্রতীক হয়ে আছেন জিন্নাহ। এবং তা অবিতর্কিত “জাতির পিতা” পরিচয়ে; তিনি পাকিস্তানের সকল দলের রাজনীতিতে ও দলের কাছে এক অবিতর্কিত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পুর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপারটা একবারেই ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে ধাপে ধাপে আসছি।

    পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের জমির মালিকানা ধরণ একেবারেই ভিন্ন ছিলঃ
    এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। পুর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশভাগ ব্যাপারটা নিয়ে অনুভব-অনুভুতির প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেও একটা বড় ভিন্নতা ছিল। যে ভিন্নতার মূল কারণ হল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থার দিক থেকে পুব ও পশ্চিমের অবস্থা একই ছিল না। দুশ বছরের বৃটিশ শাসনামল জুড়েই পুর্ববঙ্গ (মানে আসলে এখনকার পশ্চিমবঙ্গসহ সারা-বঙ্গও) ছিল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা্র দিক থেকে বৃটিশ শাসনের প্রবর্তিত “জমিদারি” মালিকানা ব্যবস্থা । যার আবার  বেশিরভাগ জমিদার মালিকেরা ছিল হিন্দু। মানে মুসলমান জমিদার কিছু ছিল বটে;  কিন্তু সেটা যেন ব্যতিক্রম। যেমন এভাবে বলা যায় জমিদারদের নিজেদের ‘কমন স্বার্থ’ কী হবে তা নির্ধারণে মুসলমান জমিদারদের কখনও কোন ভুমিকা বা বক্তব্য ছিল এমন জানা যায় না। আর এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুমি মালিকানা ব্যবস্থাটা ছিল ট্রাডিশনাল;  যেটা মোগল আমল থেকে চলে আসছিল। যেটার মূল বৈশিষ্ট হল,  মোগল শাসক অথবা তার প্রতিনিধিকে আপন  ভোগদখলে থাকা জমির খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আপনিই জমির মালিক। আর মালিক বলতে, খাজনাদাতার নামেই জমির টাইটেল জারি হত। তাতে কোথাও কোথাও বিশাল বিশাল জোতদার যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘জাঠ’ এথনিক গোষ্ঠি বলা হয়, এদের দখলি জমির পরিমাণ আকাশ ছোয়া। যেমন পাকিস্তানের ৬৪% জমি ৫% জোতদারের মালিকানায়, এমন ইউটিউব বর্ণনা দেখতে পারেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম জমির সিলিং [ceiling, জমির মালিকানা থাকার পরিমাণ]  বেধে দেয়া হয়েছিল। আয়ুবের হাত ধরে ১৯৫৯ সালে সেখানে আরোপিত সিলিং দেয়া হয়েছিল সেচ সুবিধার জমির বেলায় ৫০০ একর আর না থাকলে ১০০০ একর পর্যন্ত জমির মালিকানা বৈধ। এর মানে এই সিলিং আরোপের আগে কেমন জোতদারি ছিল তা অনুমেয়। সারকথায় জমির মালিকানার প্রশ্নে  এসবই ছিল পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক। তবে জমিদারি ব্যবস্থা থাকা আর না থাকা ছিল এক বড় রাজনৈতিক ফারাকের কারণ। তবে আমাদের এখানকার আলোচনার জন্য মুল কথা পুর্ব পাকিস্তানে জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থা।

    কাদের কাছে দেশভাগ কাম্য ছিলঃ
    আমরা কথা বলছিলাম, দেশভাগকে ইতিবাচক বা কাম্য – এভাবে দেখার লোক কারা ছিল তা নিয়ে। সারা ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দু জনসংখ্যা সেকালে সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। যেমন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পর্যন্ত সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫%।  তাই সব মিলিয়ে এসবের কারণে বৃটিশ আমলে – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকি কেবল পুর্ববঙ্গকে বিচারে নিলে হিসাবে মুসলমানেরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলেও এখানেও সেই একই – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পুর্ববঙ্গেও বজায় ছিল। এর পিছনের আরও কারণ  – যেভাবে বৃটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্থান ঘটেছিল, সেদিকে তাকাতে হবে।

    তত্বগত কথা হল,আধুনিককালের যেকোন রাজধানী মানেই যেখানে তুলনায় তা অন্যান্য প্রদেশ বা জেলাগুলো রাজধানীর চেয়ে অবকাঠামোর দিক থেকে হয় কম উন্নত বা পিছিয়ে পড়া। তাই পিছিয়ে পড়া এলাকার রাজধানীমুখি হওয়া খুবই কমন ঝোঁক। গ্রামে জমি থেকে উতখাত হওয়া লোকেরা রাজধানীতে কাজ-পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা নিতে ও ভাগ্য-অন্বেষণে রাজধানীতেই এসে ভীড় করে থাকে। ফলাফলে রাজধানী এক নতুন ধরণের মিশ্র জনগোষ্ঠির নতুন (আধুনিক) ভাষা্র শহর হয়ে উঠে। কিন্তু কলকাতা সেদিক থেকে বেশ ব্য্যতিক্রম। কলকাতা বৃটিশ সংস্পর্শে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা প্রথম প্রহরের ঘটনা এমন রাজধানী কলকাতা বলে সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আবার এর বাইরে আরেক দিক হল, কলিকাতার সাথে বাকি ভারত তো বটেই এমনকি বাকি বঙ্গের সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও অবিকশিত। এমনটা বজায় থাকার কারণে কেবল মূলত স্থানীয় বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসক শ্রেণীই এখানে রাজধানীতে প্রভাব-আধিপত্য জমিয়ে বসার সুযোগটা নিয়েছিল। কিন্তু এরাই বা কারা?

    সারা বাংলা সমাজের প্রধান উতপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষিকাজ আর পরে (১৭৯৩ থেকে) ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা জমিদারি বলে, জমিদার হিন্দুরাই বৃটিশ-কলোনি ক্ষমতার কোলে বসে ও ঔরসে কলকাতার শাসক শ্রেণী হয়েছিল। আর সেখান থেকেই কলকাতা মানে তা হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায় ভারত মানে সবসময় বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথার [cast system] শাসনটাই যেন আবার “জমিদার হিন্দু” এই নতুন নামে ও জমিদার-প্রজা সম্পর্কের ঢংয়ে চেপে বসেছিল। যদিও আবার এর ভিতরেও আরেক ভাগাভাগি বজায় থাকতে দেখা যেত। প্রজা বলতে সারা বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধরণেরই প্রজা থাকলেও তাঁদের মধ্যে আরেক বড় ভাগাভাগি ছিল। সেটা কেমন বা কেন?

    প্রজাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকলেও হিন্দু প্রজারা জমিদার হিন্দুদের সাথে ‘কালচারাল নৈকট্য’ অনুভব করত। মানে জমিদারদের কালচারাল হেজিমনি বা আধিপত্য আছে তা হিন্দু-প্রজাদেরও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে অনুভব করত। ফলে তাদেরও মুসলমান প্রজাদের উপর (অর্থনৈতিক স্টাটাসে সমগোত্রীয় হলেও) আধিপত্য আছে –  জমিদারদের এই কালচারাল ক্ষমতার শেয়ার হোল্ডার তাঁরাও এবং তাঁরা সম্বন্ধযুক্ত বলে অনুভব করত। তারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় উপরের বলে স্থান ও বিবেচনা নিজেরা মনে করত এবং তা দাবি ও চর্চা করত। জমিদারের বৈঠকখানায় আগত হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজাদের তুলনায় আলাদা ভাল ট্রিটমেন্ট পেত বলে এমন অনুভবের পিছনে এটা একটা কারণ মনে করা যায়। যেমন মুলমান-প্রজাদের মাটিতে বসানোর বন্দোবস্তের বদলে হিন্দুপ্রজাদের আলাদা শতরঞ্জিপাতা আসন, মুসলমান প্রজাদের দেয়া সস্তা নারকেলের মালার হুকার বদলে পিতলের হুকা,ভাল তামাক ইত্যাদি পেত। অর্থাৎ জাতপ্রথার প্রবল বলবত থাকার প্রভাব ও অজুহাতে মুসলমান প্রজাদের সামাজিক মর্যাদা-অবস্থান হিন্দু নমশুদ্র বা চর্মকারেরও চেয়েও অন্তত আরেক ধাপ নিচে বিবেচনা করা হত।
    আর এভাবেই কেবল জমিদার হিন্দুর দাপট ও পরিচয়ে সে একমাত্র শাসক ও শ্রেণীর আধিপত্য, এই ধারণা বলবত রেখেছিল। যদিও   কলকাতার জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মূল ইংরাজি বই “Bengal Divided” [Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947] , যার অনুবাদ বইয়ের নাম  “বাঙলা ভাগ হল”,সেখানে এদেরকেই “বাংলার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ বা এলিট” বলে তিনি চিনিয়েছেন। এপ্রসঙ্গে লেখা আমার ক্রিটিক এখানে পাবেন।

    কেন কলকাতা ব্যতিক্রম কী অর্থেঃ
    কিন্তু কেন কলকাতা ব্যতিক্রম হতে পেরেছিল? এর আরেকটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এখানে জমিদার হিন্দু যাদেরে বলছি ইংরাজী [race] রেস এবং [ethnic] এথনিক এই দুই অর্থেই জাতি বুঝলে এই জমিদার এরা কোন ‘জাতি’? এর জবাব হল, জমিদারি ব্যবস্থা চালু হওয়াতে যে শাসক-ক্ষমতা সে ক্ষমতার বলে এরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে এক নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছিল ও পরিচয় দিত। কথাটাকে ‘তারা বাঙালি ছিল’ এতটুকু না বলে, এভাবে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলার কারণ আছে। পুব-পশ্চিম বঙ্গ এবং এই সারা ভুখন্ডের হিন্দু ও মুসলমান মিলে যে সারা বঙ্গ অঞ্চল, তারা সকলে মিলেই যে ‘বাঙালি রেস’, সারা দুনিয়া বাঙালি বলতে এদেরকেই চিনে, তাই একথাটাতে অস্বীকার করার কিছু নাই। তাই তো হবারই কথা।

    কিন্তু কলোনি-ক্ষমতা্র ঔরসে উত্থিত কলকাতা, জমিদারের কলকাতা সেটা মেনে উত্থিত হয় নাই। প্রথমত,আগেই বলেছি কলকাতা – সমাজের ক্লাসিক্যাল ডেভেলবমেন্ট যেমন কোন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও পরিণতির অর্থে যেমন বলা হয় – ‘একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা সারপ্লাস যেখানে সঞ্চিত হয় এমন নদীতীরের কোন গঞ্জ বা শহর অর্থে কলকাতা কোন শহর নয়, ছিল না। যে অর্থে কলকাতা কলোনি প্রভাব ও সংস্পর্শের বাইরে গড়ে উঠা অর্থে ভারতেরই কোন শহর নয়। যেমন মোগল আমলেই  মানে প্রাচীন ভারত কলোনি মাস্টারের হাতে পড়বার আগেই – হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি বড় মোগল শহর হিসাবে হাজির ছিল। কিন্তু কলকাতা তা ছিল না। মানে  কোন কলোনিদখলকারির ছোঁয়া লাগার ছাড়াই, সুনির্দিষ্ট করে বৃটিশেরা ভারতদখলের আগে থেকেই ভারতে অনেক বড় শহরের জন্ম হয়ে গেলেও কলকাতা সে তালিকার কেউ নয় বা তালিকায় ছিল না। তাই হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি মোগল আমলেই বড় শহর, এগুলোকেই স্বাভাবিক পরিণতির শহর বলছি। আর বিপরীতে  কলকাতা এসবের বাইরে ছিল বৃটিশের হাতে গড়ে উঠা শহর। অর্থাৎ যেমন আফ্রিকায় কলোনিদখলের ফেনোমেনা। ওখানে কলোনিদখলের আগে আফ্রিকায় নিজ শহর বলতে যা বুঝায় এমন কিছু কোন আফ্রিকান দেশে ছিল না। বরং প্রায় সবদেশের বেলায় তারা কলোনি মাস্টারের হাত ধরে আফ্রিকানেরা প্রথম শহর কি তা  গড়েছিল ও চিনেছিল। আমাদের কলকাতার বেলায় তার অনেকটাই সত্য।

    এই সুবিধাটাই কলকাতার জমিদার হিন্দুরা নিয়েছিল। এই শহরের স্থানীয় শাসক শ্রেণী হিসাবে নতুন উত্থিতরা হল এই জমিদারেরা । যেটাকে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের (জমিদারি আইন ) ফলাফল বলা যায়। এছাড়াও এতে দুটা জিনিষ এই জমিদার হিন্দুরা নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল। তা হল, একটা হিন্দুস্বার্থের চোখে কারা বাঙালি? আর কারা নয়? আর বাংলা ভাষা কোনটা বলতে কোনটা বুঝাবে? এদুটাই তারা একক হাতে ও সংকীর্ণ স্বার্থের চোখে  নির্ধারণ করে নিয়েছিল।

    না একথা বলা বাতুলতা হবে যে বৃটিশেরা আসার আগে অতীতে বাংলার কোন কোণে ভাষা কী কী কতদুর বিকশিত হয়েছিল সেটা কেমন, আর্কিলজি বা প্রাচীন ইতিহাসে কী পাওয়া গেছে অথবা চাই কী চর্যাপদ কী ইত্যাদি। না, আমি এসবের কথা  এখানে তুলছি না, তোলা হচ্ছে না। বরং আগেই বলেছি জমিদার হিন্দু শাসকেরা এরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার আগে বাংলায় কি ছিল সেটা যাই থাক সেটা এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আসলে তাদের কলকাতায় তাঁরা মূলত বাঙালি কারা এর এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল, তাতে বৃটিশেরা আসার আগে আমরা কী, কেমন ছিলাম বলে যে যাই বুঝি না কেন। আর এখান থেকে জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে নির্ধারিত ও নির্মাণ হয়েছিল এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা যে, বাঙালি কারা, বাংলাভাষা কোনটা। আর এদেরই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল –  “মুসলমানেরা বাঙালিই নয়”। এটাই কলোনি-কলকাতার বাঙালির সংজ্ঞার মৌলিক দিক। আর সংস্কৃত ঘেঁষা করে আর সংস্কৃত-ব্যকরণ-সম্মত করে (সাথে ইংরেজ পাদ্রী ধর্মপ্ররচারকদের স্বার্থে ও তাদের হাতে) যে বাংলা গদ্যভাষা খাঁড়া করা হয়েছিল তা নিয়ে এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আপত্তি ছিল।

    —–“মুসলমানেরা বাঙালিই নয়” – কথাটা কী সত্য? —-

    আধুনিক শব্দটা অদ্ভুত, এটা সবচেয়ে ভাল অপ-ব্যবহার হয় কাউকে আধুনিক নয় বলে দাবি করে খালি একবার কোন ফতোয়া দিয়ে দেয়া। এরপর অতএব সে নিশ্চয় “পশ্চাতপদ” [মুসলমানেরা পশ্চাতপদ], এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি করা যাতে বিপরীতে, বক্তা নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে প্রমাণ করতে ও তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে যায়। এসব বদ-মতলবের বাইরে বর্ণনা অর্থে “আধুনিক ভাষা” বলে একটা ধারণা-শব্দ ব্যবহার করব। বলাই বাহুল্য এটা রেনেসাঁর পরিণতি অর্থে যে আধুনিক ধারণা,  সে অর্থেও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

    আইডিয়েল [ideal] চোখে যখন আমাদের ভুখন্ডের সকল অংশের, সকল জেলা বা অঞ্চলের প্রতিনিধি সকলকে রাজধানিতে হাজির রেখে কমবেশি সকলের প্রভাব ও মিশ্রণে একটা ভাষা উত্থিত করার চেষ্টা করা হয় সেটাকে আধুনিক বাংলা ভাষা। তবে এর সাথে  আরেকটা বড় ফ্যাক্টর অর্থনৈতিক বিকাশ; মানে  কিভাবে ও তখন পর্যন্ত কতদুর সেটা বিকশিত ছিল বা হবার সুযগ ছিল – সেটাই। যে অর্থে শহর বা নগর মানে  হাঁটুরে গঞ্জের চেয়েও উপরে আরো বড় ‘গঞ্জ’ মানে accumulation of Capital  বা উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের কেন্দ্র যেটা বা যেখানে এটা ঘটে বা হয়ে উঠে সেটাই শহর বা নগর। এটাই বুর্জোয়া [bourgeois] সিভিল সোসাইটি জন্মাবার বৈষয়িক পুর্বশর্ত। (বুর্জোয়া শব্দটা এখানে গালি বা নেতিবাচক অর্থ করা ভুল হবে।) যা এরপর নগর রাষ্ট্র, রিপাবলিক ইত্যাদির হওয়ার দিকে রওনা দিতে পারে যদি না তা বিদেশি কলোনিদখলদারদের হস্তক্ষেপের খপ্পরে না পড়ে।
    এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এই পিঙ্ক কালারে লেখা অংশটা এটা আমিই বাক্য সাজিয়ে লিখেছে অবশ্যই।  কিন্তু এর আইডিয়াটা আমি পেয়েছি আমার – কার্ল মার্কসের জার্মান ভাবাদর্শ (পার্ট ওয়ান) – পাঠ থেকে। অর্থাৎ পাঠ ও এখানে উপস্থাপন এর সব দায় আমার কিন্তু মূল আইডিয়াটা অবশ্যই ওস্তাদের। যার কাছে যা নিয়েছি সে ঋণ আগে স্বীকার করে নেয়া ভাল। কেউ আমার একথায় একমত না হলে ক্ষতি নাই, আমি আমারটা স্বীকার করে রাখলাম।  আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের চোখে ও বিচারে – ‘শহর বা নগর’ মানে আসলে কী তা বুঝবার ক্ষেত্রে এটা মার্কসের দুর্দান্ত অবদান, বেস্ট জায়গা হচ্ছে এটা। 

    তবে এখানে আলোচনায় এটাকে আধুনিক বলার সুত্র এটাই যে সারা বাংলাদেশের সব জেলা অঞ্চলকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে বসবাস শুরু করানোটা চাট্টিখানি কথা নয় যে এটা চাইলেই করা যায় এমন নয়। যেমন এখনকার ঢাকাকে বলা যায় তুলনামূলক পারফেক্ট রাজধানী। কারণ অন্তত ১৯৮২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের (উপজেলা) সাথেই এর যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই ভাল বলে সব অঞ্চলের লোক এখন ঢাকায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় একাদেমিক ও কালচারাল পাড়াগুলোর অলিগলি পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে লোকেদের একসেস বা যাতাযাত আছে; পৌছাতে পারে। ফলে সব আঞ্চলিক ভাষারই ঢাকায় প্রবেশ ও পৌছানো এখন অনেক সহজ। ফলে ঢাকায় বাংলা ভাষা বলে যেটা ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে তাকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভাষার হাতের কাছে আছে। এখন যেকোন অঞ্চলের ভাষার বা কোন একটা অঞ্চলের শব্দে এর ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা যত প্রবল  বা তা যত ‘কমিউনিকেটিং’ (এক্সপ্রেসিভ অর্থে) সেই ভাষা বা শব্দ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে তত বেশী। অন্য সকলে  সেই ভিন-আঞ্চলিক শব্দও এখানে আপন করে নিবার সম্ভাবনা তত বেশি। এমন এই আদর্শ সুযোগটা ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশে ছিলই না। এরপর ইকোনমিক বা কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে আস্তে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে আজ  এই জায়গায় এসেছে। এখানে একালের ঢাকার প্রসঙ্গ আনলাম তুলনা করে জমিদার আমলের একেবারে শুরুর দিকের কলকাতাকে পরিচয় পরিয়ে দিবার জন্য।

    যেমন এখন বলব,  আর ঠিক এর উল্টাটা ঘটেছিল কলকাতায় মোটাদাগে সেই ১৮০০ সালের আশেপাশের সময় থেকেই। সেসময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পুরাটাই যেন এমন প্রিমিটিভ স্তরে ছিল যে ফলে অব্যবস্থার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জমিদার হিন্দু শ্রেণী যাকে ইচ্ছা তাকে বাঙালি বলা থেকে বাদ দিয়েছে, মুসলমানেরা বাঙালি নয় বলতে পেরেছিল আর বাঙালি জাত ও ভাষা যেকোনটাকে তা জমিদারের নিজের একক ইচ্ছা ও খেয়ালে হস্তক্ষেপ ও নির্ধারণ করে নিতে পেরেছিল।

    সারকথায় যার পরিণতিতে, এটাকে আমরা বলতে পারি বাংলার সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশকে শাসক জমিদার-হিন্দু “মুসলমানেরা বাঙালি নয়” বলে তাদেরকে জমিদার-হিন্দুর মার্জিনালাইড প্রজা [যার অবস্থান হিন্দু-প্রজারও নিচে] মাত্র করে (চাপানো ব্যাখ্যায়) ফেলে রাখার সুযোগ নিয়েছিল।

    মানুষের রেস (race বা জাতি) পরিচয় বিষয়টা ডিএনএ সংশ্লিষ্ট যাকে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের সম্পর্ক বলি’ সেই সম্পর্কিত ও জাত। তুলনায় ধর্মীয় পরিচয় যেটা এথনলজিক্যাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে যুগ যুগে তৈরি ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়। কারোরই রেসিয়াল পরিচয় কেউ বদলানো যায় না পারে না, তবে তুলনায় ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়গুলোর খুবই স্বল্প কিছু অংশ বদলে যেতে পারে। কাজেই (রেসিয়াল ও এথনিক) জাত পরিচয়ে যে বাঙালি সে আবার মুসলমান ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের কারণে রেসিয়াল বাঙালি থেকেও মুসলমান মানে বাঙালি-মুসলমান অবশ্যই হতে পারে। অবিভক্ত বাংলায় এর পুরা বাঙালি জনগোষ্ঠির এই অর্ধেক  ছিল মুসলমান-বাঙালি আর আবার পুর্ব বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। অথচ এদেরই কোনঠাসা করতে ও আধিপত্যের ছড়ি ঘুরাতে ও দাবিয়ে রাখতে, জমিদার-হিন্দুরা তাদেরকে বাঙালি রেসের (race) অংশ মানতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু কী এসে যায় যেখানে কোন রেস পরিচয় যা আসলে মূলত বদলানো বা অস্বীকারেরই অযোগ্য! সেই জবাব তারা জমিদার হিন্দু বা এইচিন্তার উত্তরসুরিদের পরবর্তিতে দিয়েছিল। পুর্ববঙ্গ বা একালে বাংলাদেশে এরাই ১৯৭১ এক সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই মুসলমানেরা  নিজেদের “বাঙালি” এবং একই সাথে মুসলমান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, ব্যাপকভাবে নাড়া ফেলে দিয়ে। কারণ মা আর সন্তানের প্রথম কথোপকথন কোন ভাষায় শুরু হবে সেটা যেমন বদলানো যায় না – সেটা জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়েই থাকে – এটা তেমনই, বদলানো যায় না। কলোনি-জমিদার আমল থেকেই মুসলমানদেরকে বাঙালি বলতে অস্বীকৃতি যতটা তীব্র হয়েছিল ১৯৭১ সালে এটাই ততোধিক বেগে – মুসলমানেরাই সেই প্রকৃত বাঙালি যারা ভাষার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে তা প্রমাণ করে ছেড়েছিল। ফলে তারা রেসিয়াল ও এথনোলজিক্যালি বাঙালি কীনা এই স্বীকৃতি কারও থেকে চায় না্‌ কারও থেকে নিবার দরকার ফুরিয়ে গেছিল। তা রক্ত দিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল।

    কিন্তু তবু, একালে আরএসএসের উত্থান, গায়ের জোর খাটিয়ে সব ইচ্ছামত করে ফেলবে এমন এক জবরদস্তির হিন্দুত্বের বা হিন্দুত্ববাদের নয়া উত্থানের যুগ। তেমনই সময়কালে এবছর ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মশতবার্ষিকী। তাই নিচে এদিকে ‘হিন্দু সংহতি’ বলে আরএসএসের এক অঙ্গসংগঠন এর ততপরতাকে দেখেন, উপরে বলা আমার কথাগুলোর মিল পাবেন।  যারা গত অন্তত চার বছর ধরে প্রকাশ্যে জনসভা করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাম ধরে উস্কানি তৈরি করে চলেছে। ফেসবুক পেজে তাঁদের ভারচুয়াল উপস্থিতি দিয়ে তারা এবার সেপ্টেম্বরের ২০২০ এর শেষে বাংলাদেশিদের কাছে পৌছে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল। তাঁদের শ্লোগান ও বক্তব্য ছিল এমন যেন তা সেই কলোনিযুগে জমিদার হিন্দুর বয়ানেরই পুনঃআবির্ভাব। বক্তব্য গুলো এমনঃ
    ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হ‌ওয়ার পরে এই পশ্চিমবঙ্গ হল বাঙ্গালী হিন্দুর ন্যাচারাল হোমল্যান্ড। অর্থাৎ এই মাটির মালিক হল হিন্দু বাঙ্গালীরা। তাই পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সম্পদের উপরে অধিকার সর্বপ্রথমে হিন্দু বাঙ্গালীর। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হিন্দু বাঙ্গালীর”।
    “বাংলাদেশী ভাষা পৃথক করো, সনাতনী বাংলা রক্ষা করো।
    বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়?”

                                                                                         হিন্দু সংহতি ফেসবুক

    আরএসএস-এর  অঙ্গসংগঠন “হিন্দু সংহতি”  নামে এই সামাজিক সংগঠন, উপরে এই সংগঠনেরই ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে। তাদের এসব কথার জবাব একটাই, যে পুর্ববঙ্গ বা একালে মুসলমান অধ্যুসিত বাংলাদেশ একে,  কলকাতার জমিদার হিন্দুরা কোন কালেই তারাও “বাঙালি” এই স্বীকৃতি দেয় নাই; আমরা তা চাইও না, অপেক্ষাও করে নাই। বরং আমরা তাদের কেয়ার করি নাই কখনও, এখনও করি না। আমরাই আমাদের রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে যে বাংলাদেশ নিজেই এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা তো বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এর থেকে বাইরে এবং তাদের চোখে অছ্যুত (untouchable)। আর আমরাও কী কলকাতার স্বীকৃতি কখনই চেয়েছি? বরং আমরা নিজেই প্রজা-বাঙালির বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছি। [যদিও শাহবাগের কিছু  কবি-সাহিত্যিক এখনও প্রবল আছে এরা নিজেদের লেখা কবিতা বা সাহিত্য হয়েছে কিনা তা নিজেরা নিজেকে মুল্যায়ন করতেও অক্ষম তাই উত্থানরহিত। এদের অযোগ্যতা ক্ষমাহীন যখন দেখি এরা কলকাতার পদতলে নিজেদের সঁপে দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে চায় যে তাদের সাহিত্য হয়েছে কিনা; এরা এমনই সেলফ-লেস বা মর্যাদা বোধহীন স্টুপিড।] অতএব বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে আরএসএস এর কোন প্রকল্প যা আছে আমরা একে কেয়ার করি না, পাত্তা দেই না। বরং পরামর্শ থাকবে দূরে থাকেন। দাদাগিরি করতে এসেন না। চাইলে হিন্দুগিরি করেন কিন্তু কেবল কলকাতার ভিতরে সীমাবদ্ধ থেকে, যদি কলকাতার তা সহ্য হয়। এদিকে আমরা নিজেকে নিয়ে খুবই ভাল আছি। পুর্ববঙ্গকে মর্ডানিটি শিখাতে এসেন – এটা আপনাদের কাজ বা আপনারা এই যোগ্যতা নিজের জন্য রেখে দেন, প্লিজ। আর ভারতীয় হিসাবে  কলকাতার সমস্ত দায় এবং আবর্জনা সবই তো কলকাতারই! আমাদের তাতে ভাগীদারি বা দাবি নাই। ডিজ-ওনড এন্ড ফুলস্টপ!

    ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বা ভিকটিমহুডঃ
    সব ক্রিয়ারই নাকি প্রতিক্রিয়া থাকে, থেকে যায়। তবে আসলে কথাটা হল ফোলানো বেলুন টিপাটিপির মত! ফোলানো বেগুনের কোন  একদিকটা চাপ দিয়ে ধরলে তাতে প্রতিক্রিয়ায় অন্যদিকটা বেশি ফুলে যাবে। প্রতিক্রিয়া ঘটতে অনেক সময় হয়ত তা ‘ফেবারেবল’ সুযোগের অপেক্ষা করেন। আপনি কাউকে যেমন ট্রিট করবেন, নিচা দেখাবেন কী পায়ের নিচে পিষবেন, অপমানে কোনঠাসা বা মার্জিনালাইজ করবেন তার পুরাটা না হলেও এরই বড় কিছু প্রতিক্রিয়া এরপরে আপনার উপর পালটা আসবেই। সেটা চিন্তা করে তাই এর মুখোমুখি হতে আগেই তৈরি থাকতে পারেন! আপনি হয়ত তখন নাকিকান্না করবেন, কী ভিকটিম হিসাবে পুরান সেই দাপুটে জমিদারের ছাতার নিচের আপনি এবার নিজেকে ভিকটিম হিসাবে ভিকটিমহুড দেখিয়ে তুলে ধরে দেখিয়ে উলটা সহানুভুতি তৈরির চেষ্টা করবেন, এমনটাই সাধারণত দেখা যায়। ঠিক এই জিনিষটাই যেন ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পরে। কারণ পাকিস্তান মানে তার পুর্ব-পাকিস্তান অংশে মানে, আগের পুর্ব-বঙ্গে স্থানীয় শাসক যে জমিদার-হিন্দু ছিল, পরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে বলাই বাহুল্য এবার আগের ঐ জমিদার হিন্দুদেরই এতদিনের আয়েস ও লালিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য যুগের অবসান ঘটেছিল, অন্তত পুর্ববঙ্গে বা পুর্ব-পাকিস্তানে। আরও এতে বিশাল রাজনৈতিক এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পুর্ববঙ্গীয় বাসিন্দাকে উল্টপালট প্রভাবিত করেছিল। তবে পরিবর্তন মূলত সবই পুর্ববঙ্গে। দেশভাগে পুর্ববঙ্গে যখন জমিদার-হিন্দু শাসন ক্ষমতা ও আধিপত্য হারিয়েছিল তখনও বাংলার অপর অংশ পশ্চিমবাংলায় তাঁদের আধিপত্য কিন্তু আগেরর মতই অটুট ছিল। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে জমিদার-হিন্দু ও তার মাখনের স্বাদ চাখনা প্রজা-হিন্দু এবার পুর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এটাই তাদের সেই দুঃখে হু হু করে উঠা মনে দেশভাগ – আর অভিশাপ, শাপান্ত! অর্থাৎ সেটা আর শুধু জমিদার-হিন্দু বা এলিট হিন্দুরাই নয় বরং জমিদারেরই আদরের ব্যাপক প্রজা-হিন্দুরাও এথেকে বাদ পরে নাই। আর তা মূলত এতদিন  প্রজা-হিন্দুরা যারা জমিদার-হিন্দুর সাথে “কালচারাল নৈকট্য” অনুভব করে  মুসলমান-প্রজার উপরের স্তরের জাতবিভাগের অবস্থান দাবি করে সেই অজুহাতে মুসলমান প্রজার উপর আধিপত্যের স্বাদ নিত, সব সুবিধা নিয়ে এসেছিল সেসব – বলা যায় এবার কাফফারা হিসারে সেই অপকর্ম যেন সুদে-আসলে উসুল হয়ে এসেছিল।

    যেকোন ফোর্স মাইগ্রেশন অবশ্যই খারাপ, কখনই তা কাম্য নয়। কিন্তু পুর্ববঙ্গের প্রজা-হিন্দুরা সাময়িক “কালচারাল নৈকট্য” এর আধিপত্যের মজা খেতে গিয়ে লং-টার্মে নিজেদের জন্য নিজেকেই এর ভিকটিমে পরিণত করেছিল।  এরপর  আজও যে ৮-১০% হিন্দু বাংলাদেশ অবশিষ্ট আছে তারা সেই থেকে নিজের দুঃস্থ অবস্থা এই ভিকটিমহুডকে বিক্রি করে যতটা প্রভাব তৈরি করা যায় এর উপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। এই বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞ এসবেরই মূল বা ফোকাস দল হল সিপিবি। আর এরপরে ন্যাপ, আওয়ামি লীগ থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সকল প্রগতিশীল – এরা এখনও সেই হেরে যাওয়া ঝান্ডা আকড়ে আছে!!!  সত্যি এক দুর্দান্ত অপচয় বটে!!! যাদের সাহসও নাই যে তারা গত দু’শ বছরের বেশি জমিদার-হিন্দুর অসম্পুর্ণ সন্তুষ্টির এক আকাঙ্খা  -ভটক তে হুয়ে আকাঙ্খা – তারা কেন বয়ে বেড়াচ্ছে, কী করে আসছে তা উল্টে-পাল্টে দেখে! এটাই এখন এক তীব্র ইসলামোফোব ঘৃণা ও বিদ্বেষ!!!

    পাকিস্তান পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র – এটাও নেহেরু-গান্ধীর ভারতের মতই আরেক নেশন স্টেট যার সারকথা হল, ব্যাপক নাগরিক বৈষম্য। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে এই চরম অসাম্য চর্চা হতে দেখা যায়।  যার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান জাতি-রাষ্ট্র উপড়ে ফেলা আর এর বদলে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়ে পুণর্গঠন। রামমোহন রায়ের (১৮১৫ সালের ব্রাহ্ম-সমাজ এর নেশন-বোধ) এই আদি পাপ বা আদি ভুল থেকে বেরিয়ে আসা।  যদিও রাষ্ট্রগঠনের এসব দিক নিয়ে সচেতনতা এখনও রাজনীতিতে এমনকি একাদেমিক পাড়াতেই নাই, কোথাও নাই।  এবং বিশেষত এই না থাকার আসল কারণ  “ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তার” ক্ষতিকর আধিপত্য। বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত (কারণ এরপর নিজেই মারা যায়) কমিউনিস্ট আধিপত্য। যারা আজও রাষ্ট্রগঠনের এদিক নিয়ে আলোচনা বা বুঝাবুঝি করতে অযোগ্য। কারণ তারা এসব আলোচনাকে “বুর্জোয়া” বা “ডানপন্থি” বলে দেখিয়ে এসেছিল। সেসব এক অবুঝ ও নাদানদের  দুর্দশা হয়ে আছে এখনও।  আর মূলত “শ্রেণী রাষ্ট্রের” বা রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের কথা জোর দিয়ে তুলতে গিয়ে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মৌলিক দিক – নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠার  কাজটাই তুচ্ছজ্ঞানে বাদ দিয়ে গেছে। কেবল রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের বুঝের খোদ রাষ্ট্রচিন্তা বলতেই তা এক দানবীয় স্বৈর এমনকি কখনও অবলীলায় এক ফাসিজমের ধারণায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টরা জনপ্রতিনিধিত্ব বা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন ধারনাটাো কখনও গ্রহণ করে নাই বরং তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয়-জ্ঞান করে ফেলে দিয়েছে ও হারিয়ে ফেলেছে।  বাস্তবে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে এরাই আজ অচল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

    এভাবে এরপর কী হতে হবে সে আলাপে আপাতত ছেদ দিয়ে একটু পিছনে ফিরা যাক। আসলে ১৯৪৭ এর দেশভাগ বলে যা পরিচিত, এতে পুর্ববঙ্গের জমিদারি ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়াতে তার ফেলে আসা জমিদারি বা জমি সেটা তো তখন আরেক রাষ্ট্র বা ওর অংশ হয়ে গেছে। সারকথায় যার উপর পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতেরও আর কোন owning বা কর্তৃত্ব বা এক্তিয়ারই নাই হয়ে গেছিল। ইতোমধ্যে কালক্রমে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালের পুরানা জমিদারি আইন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন) বাতিল করে ১৯৫১ সালের ১৬ মে নতুন প্রজাস্বত্ব আইন (ল্যান্ড একুজেশন এন্ড টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫০) পাশ হয়ে যায়। সেই ‘জমিদার উচ্ছেদ আইন’ এখনও বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ হয়ে আছে। আর এতে জমিদারির শেষ ক্ষমতাটুকু অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা বাতিল ও চিরসমাপ্তি লাভ করেছিল। আর এরই ফলাফলে পুর্ববঙ্গে আগে যারা প্রজা বা ভাগচাষী ছিল তারা তখন থেকে সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আগের চাষাবাদের জমিরই মালিক বলে আইনি স্বীকৃতি পায়, তাঁদের নামেই টাইটেল জারি হয়। ১৭৯৩ সালের জমিদারি ব্যবস্থা চালুর আগে যে টাইটেল প্রজাদের নামেই ছিল। আর এই আইনটা তৈরির সময় যে সাধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করে তৈরি বা মেনে করা হয় তা হল, (এখনও বাংলাদেশের জমি অধিগ্রহণ আইন আছে এটা সেটাই) জমি অধিগ্রহণ আইন  অনুসারে পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে, পুর্ব-পাকিস্তান সরকার যেকোন জমি “অধিগ্রহণ করা হল” বলে ঘোষণা দিতে পারে। সেই আইন দিয়েই প্রথমে সারা পুর্ব-পাকিস্তানের সব জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড একুজেশন) করে নেয়া হল বলে ঘোষণা জারি করা হয়। আর এর ফলে আগের সব জমিদারি মানে, জমিদারের মালিকানা টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবার যে প্রজা যে জমি চাষাবাদ করত এবার সেই প্রজাই ঐ জমির জন্য সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে তাকেই মানে তার নামেই জমির নয়া মালিকানা টাইটেল জারি করে দেয়া হয়েছিল। আর এই হল আজকের বাংলাদেশের সকল ভুমি মালিক যাদের পুর্বপুরুষের জমির টাইটেল কেড়ে নিয়ে বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে জমিদার নামে নতুন একটা শ্রেণীর কাছে তাঁদের জমি নতুন টাইটেল করে দেয়া হয়েছিল, দুশবছর পরে হলেও এই জবরদস্তির অবসান ঘটেছিল। পুর্ব পাকিস্তানের ‘প্রজারা’ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমির মালিকানা টাইটেল ফেরত পেয়েছিল তখন থেকে। সোজা কথায় পাকিস্তানের জন্ম মানে পুর্ব-পাকিস্তানের আগের প্রজাদের এবার নিজের নামে জমি ফিরে পাওয়া। অন্তত এই একটা কারণে পুর্ব্বঙ্গের সকল প্রজারা পাকিস্তান আন্দোলনের সুবিধাভোগী বেনিফিশারি বলে পাকিস্তান কায়েমকে অন করা উচিত!   অতএব সারা পুর্ববঙ্গের প্রজা-কৃষকেরা (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে এখান থেকেই ডাইরেক্ট বেনিফিশারি হয়ে যায়, কারণ তারা জমি পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তান কায়েমের সরাসরি বেনিফিসিয়ারী ফলে নিট সমর্থক হওয়ার কথা! কিন্তু না! যদিও এই অবস্থাটা পরবর্তিতে দুএক বছরের মধ্যে একই রকম আর থাকে নাই। কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত ও উলটে যায়। এবার পয়সা হাতে পেয়ে কৃষকেরা নিজ সন্তানকে যতই শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছিল ততই তারা মাথা কামিয়ে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট হতে পথ ধরেছিল। এটাই নাকি আধুনিকতা!!! কেউ যা উল্টে-পাল্টে চেক করে দেখে নাই – সেই পুরানা জমিদার-হিন্দুর স্বার্থবয়ানের চোখে লেখা মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদির চক্করে পড়ে গেছিল তা আজও তারা টের পায় নাই যে ভুলটা কোথায় হয়েছিল!!!  জমিদার-হিন্দুর মূল বয়ান হল ধর্মই সব নষ্টের গোড়া। তবে সাবধান!  এখানে ধর্ম মানে কেবল ইসলাম বা মুসলমানদের কারণেই তার জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। একারণে ১৯৪৫ সালের পরে জমিদার ও অনুসারিরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। তাই মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদি  আধুনিকতার ধারণাগুলোকে তারা ইসলাম-উচ্ছেদের প্রকল্পের দিক থেকে ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছিল।  অতৃপ্ত আত্মা নাকি মারাত্মক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়। জমিদারি-হারানোর অতৃপ্ত আত্মার তাই হয়েছিল।  তাই তামাসাটা দেখেন, সে নিজে কিন্তু নিজধর্ম পালন করেও আধুনিক-প্রগতিশীল হয়ে আছে!  কেন?  [দ্বিতীয় পর্বে দেখেন আগামী কাল শুক্রবার]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    সর্বশেষ এডিট আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩ ভোর-রাত  দুইটা চল্লিশ

    [সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল এই পত্রিকা গ্রুপেরই এক ভগ্নি, আরেক ত্রৈমাসিক সাময়িকী পত্রিকাও আছে।  কিন্তু মূলত সেটা প্রিন্টেড পত্রিকা, যার  সাথে কেবল এক ই-পেপার ভার্সান আছে।  এই লেখাটা ঐ ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার গত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২০  সংখ্যায়, “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাতপর্য ও  অতঃপর ……” এই নামে ছাপা হয়েছিল।  তা প্রায় পাঁচ হাজার অক্ষরের অনেক বড় লেখা  ছিল। সেই লেখাটাকে এবার আবার এডিট করে আরো সংযোজন-বিয়োজন করে তিনপর্বে তা  এবার নতুন নামে  নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।

    ওদিকে ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার  ই-পেপার পাঠক ফেন্ডলি নয়।  তাই আগের লেখাটার এক পিডিএফ ভার্সান এখানে পেতে পারেন। নামিয়ে নিতে হবে। ]

  • হাত ধুয়ে ফেলাটা মাইলামের পক্ষেও যাবে না

     হাত ধুয়ে ফেলাটা মাইলামের পক্ষেও যাবে না

    গৌতম দাস

    ২২ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ss

    Ambassador William B Milam, wilson center

    উইলিয়াম ব্রায়ান্ট মাইলাম, একজন আমেরিকান ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট।  আনুষ্ঠানিক অবসর নিয়েছেন জুলাই ২০০১ সালে। তবে এরপরও মাঝে মধ্যে ছোট ছোট এসাইনমেন্টে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধীনে স্বল্প সময়ের খুবই অস্থায়ী রাষ্ট্রদূত বা বিশেষ দূত ধরনের চুক্তিতে নিয়োগ নিয়েছেন। তবে এখন সেসবও ছেড়ে পুরোপুরিভাবে ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো বা সিনিয়র পলিসি স্কলার।  তিনি এককালে বাংলাদেশে ও পাকিস্তানে আমেরিকান এম্বাসাডার ছিলেন। তবে বাংলাদেশে তাঁর আরো বিশেষ পরিচয় আছে। প্রশাসনে বৈধভাবেই লবি করার দেশ আমেরিকা; সেখানে আমেরিকান প্রশাসনে বাংলাদেশের রাজনীতিকদের নানান স্বার্থ নিয়ে যারা কোনো লবি করতে চান বা করেছেন, তাদের চোখে মাইলাম একজন ভাল প্রভাবশালী ওজনদার ব্যক্তিত্ব, যিনি পলিটিক্যাল ক্লায়েন্টকে ‘অনেক দূর’ পৌঁছে দিতে পারেন। অনুমান করা হয়, তার এমন পরিচয় তৈরি হয়ে যাওয়ার পেছনে দুটা মূল ঘটনা আছে।

    কথিত ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ যুগের শুরুর কালেঃ
    এরশাদ যুগের পরে গত ১৯৯১ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক “নবজন্মের কাল” বলে খামোখা উচ্ছ্বাস দেখানোর চেষ্টা করতে অনেককে দেখা যায়। সেটা এমন এক অর্থে যেন তা ছিল এরশাদের পতনের পরের কথিত ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ যুগের শুরু। বলা বাহুল্য, এটি অতি-আবেগি বাস্তবতাশূন্য ও নিজেকে খামোখা বড় দেখানো এক দাবি মাত্র। আসলে এটার সাথে বুদ্ধি-বিবেচনাহীন আরেক প্রবল আবেগ ঐ সময় কাজ করত যাতে বলা হয়ে থাকে যে, এতে “স্বৈরাচার পতন ঘটিয়ে” নির্বাচিত সরকারের যুগের পথের সূচনা হয়েছিল। এখানে ‘স্বৈরাচার পতন’ বলে গলা কাঁপানো হয়েছে, অথচ আমাদের কনস্টিটিউশন আগেরটাই আছে, বরং সেই থেকে একে ক্রমশঃ আরো এমন ‘দানব’ করে নেয়া হয়েছে যে, একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করার মুরোদও এর নেই। এ ছাড়া আবার চলতি সরকার মনে করছে, বাংলাদেশে বিশ্বাসযোগ্য কোনো নির্বাচন আয়োজন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ না; তা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়। বরং মুজিব হত্যার বিচার ও বাংলাদেশের ৫০ বছরপূর্তিতে তার নাম উজ্জ্বল করে সর্বত্র তা লিখে দিলে এটাই হবে “দেশ ও জনগণের জন্য” বড় অর্জন। নিশ্চয় আজকের এই বাংলাদেশকে দেখার পর পুরনো সেসব উচ্ছ্বাস জ্ঞাপনকারী লোকজনের এখনো কিছু লজ্জা জীবিত থাকলে তাতে তারা নিজেকেই আসলে মূল্যায়ন কিভাবে করেন তা আমরা দেখতে চাইতে পারি।

    উইলিয়াম বি মাইলাম – তিনি বাংলাদেশের ঐ  ‘এরশাদ থেকে নির্বাচিত সরকার’ কথিত এই রাজনৈতিক ট্রানজিশনের কালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন আগস্ট ১৯৯০ থেকে অক্টোবর ১৯৯৩ পর্যন্ত, এই হলো প্রথম ঘটনাটা। এ ছাড়াও তার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ের পয়েন্ট আছে। সেটা হল, তাঁর রাষ্ট্রদূতের এসাইনমেন্টেরই আগে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট আরেক এসাইনমেন্টে ছিলেন তিনি।

    প্যারিস ক্লাবঃ
    যাদের জন্ম ১৯৮৫ সালের পরে তারা টার্মটা একাডেমিক পড়াশোনায় অতীতের ঘটনা-ফেনোমেনা হিসাবে শুনে থাকবেন হয়ত; তবে এই ‘সেকাল’ তাঁরা দেখেননি। এমন সেই শব্দটা হল, ‘প্যারিস ক্লাব’ [Paris Club]। জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশ প্রতি বছরের রাষ্ট্রীয় বাজেট নিজেই নিজ-রাজস্ব সংগ্রহ করে বাজেট-প্রণয়ন করতে পারতাম না। কারণ রাষ্ট্র-সরকারের রাজস্ব ও অন্যান্য আয় ছিল খুবই কম, ফলে এডিপি [এনুয়াল ডেভেলবমেন্ট প্রোগ্রাম]) বা উন্নয়ন বা বিনিয়োগ ব্যয়ও ছোট রাখতে হত। আবার যত কম উন্নয়ন ব্যয় ততই পরের বছর আরো কম রাজস্ব আয় – এমনই এক চক্রের মধ্যে ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়া ঘটছিল আমাদের। এমন চক্রে পড়ে যাবার পিছনে  একেবারে মূল কারণ হল, অবকাঠামো খাতে ব্যয়-বিনিয়ো্গের অক্ষমতা; সেটা বাইরে থেকে বা দেশের ভিতর থেকে সংগ্রহ করে আনা বা জোগাড়ের অক্ষমতা। তবে কলোনি আমল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্বৃত্ব পাচার বা লুট হয়ে যাবার ধারা ত সবসময় ছিলই; যেটা আসলে সব কারণের উতস। সবমিলিয়ে  আমাদের রাজস্ব সংগ্রহ আর জনগণের ট্যাক্স দেয়ার ক্ষমতাও এতই কম ছিল যে এর থেকে সরকার চালানোর খরচ ও ব্যয়নির্বাহের দায় মানে যা প্রয়োজন আর পকেটে যা আছে – এদুইয়ের মধ্যে ঘাটতি ও ভারসাম্যহীনতাতেই আমাদের দিন যেত। এ ছাড়া সরকারের প্রশাসনিক অদক্ষতায় অপচয়ও ছিল সীমাহীন; তাই সেটাও আরেক বাধা। আবার স্বাধীনতার পর কলকারখানার ব্যাপক সরকারিকরণ তাতে সে কারখানা উতপাদন চালু থাকুক আর নাই, লাভ হোক আর নাই হোক কিছু এসে যায় নাই ফারাক নাই – কিন্তু প্রতিবছর এর বেতন-ভাতা, দুর্নীতি ও অপচয় যোগানোর দায়, এই ব্যয়ের অর্থযোগাড় বাজেটকে অসম্ভব করে তুলছিল। ফলে বাস্তবত প্রথমে কিছু বিদেশী অনুদান আর পরে বিদেশি অবকাঠামো ঋণ-বিনিয়োগ প্রাপ্তি ছিল আমাদের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটানোর একমাত্র উপায়।

    “কমিউনিস্ট গোঁয়ার্তুমির”  খেসারত কী দিয়ে বাংলাদেশে তা শেষ হয়েছিলঃ
    কিন্তু এখানে খুব স্বল্প পরিসরে থেকে একটা কথা বলে নেই। বিদেশী ঋণ ও অনুদানে বাজেট তৈরির এই যে বিশেষ রকম ও বাস্তবতা, এটাই শেখ মুজিবের শাসনের সাড়ে তিন বছর আর তাঁর মৃত্যুর পরের বাংলাদেশের প্রধান ফারাক। সেটা কেমন?  আগেরটা মানে একাত্তরের স্বাধীনতার পর থেকেই বিদেশী অনুদান ও ঋণ নিব না বলে বুঝি-না-বুঝি এক “কমিউনিস্ট গোঁয়ার্তুমি” করে চলা এটাই ছিল তাজউদ্দীনের অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট। এতেই অর্থনীতি ‘ডুবছিল’ আর একসময়ে দেখা গিয়েছিল ১৯৭৪ সালের জুলাইয়ের দুর্ভিক্ষ। কোন ফরেন রিজার্ভ নাই। আর এখান থেকেই ক্ষুব্ধ মুজিবের সব কিছু নিজ একক কর্তৃত্বে নেয়া, তাজউদ্দীনকে বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভা ঢেলে সাজানো আর শেষে ঐ সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠক এটেন্ড করার উসিলায় ওয়াশিংটনে সফর, কিসিঞ্জারের সাথে সাক্ষাৎ, ‘বটমলেস বাস্কেট কেস’ বলে মন্তব্য শোনা এবং বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাওয়ার জন্য বন্দোবস্তের আবেদন ইত্যাদি সেরি তিনি ফিরেছিলেন। কারও উপর ভরসা না করতে পেরে ঐ “সব কিছু নিজ একক কর্তৃত্বে নেয়া” এরই বাইরের দিকটা থেকে দেখানোর নাম ছিল তিনি “বাকশাল গঠন” করেছেন বা তিনি “সমাজতন্ত্রের পথে” রওনা।  আমাদের ক্ষতের দিক আমরা ঢেকে রাখি, এটা দেখানোর কিছু নাই। আর এসব ঢাকাঢাকি করতে গিয়ে কতকিছুই না অর্থহীন কান্ড আমরা করি!  তাই, বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাওয়ার জন্য বন্দোবস্তের আবেদনকেই পরিচিত করিয়ে দিতে হয় “বাকশাল গঠন” বলে।  কিন্তু শেখ মুজিবের দুর্ভাগ্য হল তিনি পপুলার নেতা, যিনি ভুলের জন্য মাফ চেয়ে আবার পাবলিকের সামনে খাঁড়া হতে পারলে আবার তাদের সংগঠিত করে ফেলবার সম্ভাবনা – এমন নেতাদের বেলায় এমন সম্ভাব্য ক্ষমতা সব সময় থেকে যায়। সম্ভবত সে কারণেই বা যেকোন কারণেই হোক বেঁচে থাকতে তিনি আমাদের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের নজর, পরামর্শ ও অনুদান-ঋণ পাওয়া প্রভৃতি দেখে যাবার সুযোগ পান নাই। মুজিবের ঐ আবেদন ও গ্রাউন্ড ওয়ার্কের নড়াচড়া আমরা পরে জিয়ার আমলের শুরু থেকেই পেতে শুরু করেছিলাম।

    তাহলে বাংলাদেশের জন্য ‘প্যারিস ক্লাব’ কী?
    তাহলে এর মধ্যে আবার ‘প্যারিস ক্লাব’ কী? এটা হল, বিদেশি অনুদান-ঋণ দাতাদের এক ইনফরমাল জমায়েত।  প্রতি বছর আমাদের বাজেটের আগে (এখনও রেওয়াজ অনুযায়ী আমাদের বাজেট পেশ করা হয় প্রতিবছর ১২ জুন।) এপ্রিল মাসে কেবল বাংলাদেশের জন্য আমেরিকাসহ পশ্চিমের দাতা দেশগুলোর এক সমন্বয় বৈঠক বসত, প্যারিসে। তাই ‘প্যারিস ক্লাব’ নামকরণ। এরই ব্যাকগ্রাউন্ড কর্তা থাকে স্থানীয়-বিশ্বব্যাংক। সরকারের অনুদান-ঋণ পাওয়ার অনুরোধে পেয়ে যারা অনেক আগে থেকেই সেগুলো বাছাইয়ের কাজ শুরু করে থাকে।  পরে সরকারের সাথেও বসে। আর ফাইনালি যেসব প্রকল্পগুলো নিবার পক্ষে সুপারিশ তৈরি করত যেমন, কী কী প্রজেক্ট সে অনুদানের জন্য বা ঋণের জন্য স্থানীয় বিশ্বব্যাংক অফিস প্রাক-অনুমোদন দিয়েছে সেসবের উপরে যাতে দাতারা ফান্ড দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের আইডিএ (IDA) লোন ও অনুদান পাওয়ার ব্যবস্থাটা কাজ করে এভাবে। আর ঐ প্যারিস বৈঠকে প্রাপ্ত ফান্ড অনুমোদন বা প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করেই পরের জুন মাসে আমাদের বাজেট তৈরি হত। আমাদের আজ যা কিছু অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উন্নতি এর সব সেখান থেকেই। তবে পরবর্তীকালে এরই এক পর্যায়ে এপ্রিলের বৈঠকটা ঢাকাতেই বসা শুরু হয়েছিল। এর মূল কারণ তত দিনে আমরা অনেক স্বাবলম্বী; ফলে লোন ও অনুদানের পরিমাণ কমে এসেছিল।  ফলে দাতাদের জন্যও ফান্ডের প্রতিশ্রুতি দিতে দাতাদেশের তেমন বড় কর্তা না হলেও চলে এমন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল আর এটাই মূল কারণ বলা যেতে পারে। আর সেটাই এখনও চলছে কিন্তু একেবারেই রুটিন, আমরা আরো অনেক স্বাবলম্বী বলে এখন দেখা যাচ্ছে। মধ্য আয়ের দেশের পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার অবস্থায় গেছি বলে গর্ব করতে দেখা যাচ্ছে।  আমরা গরীব ছিলাম বলে বিশ্বব্যাংকের খাতায় আইডিএ  ক্যাটাগরিতে ঋণের যোগ্য আমাদের এমন জায়গা হয়েছিল।  আইডিএ ক্যাটাগরি মানে একেবারেই স্বল্পসুদে মানে ০.৭৫% যা ঠিক সুদ নয় সার্ভিসচার্জ) ঋণ এবং এছাড়া  বিনাসুদে-বিনাফেরতে কিছু অনুদানও পাওয়া যেত। তবে এই জমানায় মধ্য আয়ের দেশ বলে দাবি – এমন করার জন্য বিশেষ কিছু  অনুদান ছাড়া, আগের আইডিএ ঋণ এখন প্রায় সব বন্ধ। আর লোনে সুদের হারও বেড়ে হয়েছে ২-৪ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু সেসবের সাথে আমাদের এখানের প্রসঙ্গ – মাইলামের কী সম্পর্ক?

    ডেপুটি এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইলামঃ
    গত ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হওয়ার আগে, (১৯৮৫-৯০) উইলিয়াম মাইলাম তিনি টানা পাঁচ বছর ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের (১৯৮১-৮৯) ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি, [Deputy Assistant Secretary of State for International Finance and Development.]। মানে যার দায়িত্ব ছিল বিদেশে আমেরিকার  দান-অনুদান দেয়া মানে “ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট” ডিপার্টমেন্ট দেখাশোনা করা। আর এই সূত্রে তিনি বাংলাদেশের জন্য ঐ ‘প্যারিস ক্লাবে’ দাতা আমেরিকার প্রতিনিধি হয়ে হাজির থাকতেন [He represented the United States at the Paris Club]।

    এদিকে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যা কিছু হয়েছে বা আরো হওয়ার সম্ভাবনা, ভাল-মন্দ মিশিয়ে এরই ভিত গড়া হিসেবে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারটা (তাতে বহু বড় বড় ধরণের নেগেটিভ দিক আছে তা সত্ত্বেও) ঘটেছিল ঐ আশির দশকে ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখল থেকে। সেকালে এর আনুষ্ঠানিক নাম ছিল, “স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম” বা [SAP] এবং যা প্রগতিশীলদের কাছে এক “স্যাটায়ারিক্যাল” শব্দও বটে।  বিগত ১৯৮৫ সালের পরের সেসব দিন থেকে মাইলাম বাংলাদেশের সাথে একারণে অনেকভাবে জড়িত হয়ে যান। বিশেষ করে পরে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার আমলে প্রথম তিন বছর মাইলাম এ’দেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বলে নিয়োগ পাওয়ায় সম্ভবত বিএনপির নেতাদের সাথে ব্যক্তি-সম্পর্ক অন্য সবার চেয়ে বেশি হওয়াতে, এমনটা মনে করা হয়। উইলিয়াম বি মাইলামের সাথে বাংলাদেশে পরিচয় ও সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত বয়ান এখানেই শেষ করব আমরা।

    সম্প্রতিকালের উইলিয়াম বি মাইলামঃ
    আগেই বলেছি সেই উইলিয়াম বি মাইলাম এখন ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো। গত মাসের ১৭ ফেব্রুয়ারি মাইলামের এক রচনা-মন্তব্য অনেক মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে। ওর শিরোনাম ‘পলিটিক্যাল হিপোক্রাসি নোজ নো বাউন্ড অর বর্ডারস’ [Political hypocrisy knows no bounds or borders]। নিজ দায়িত্বে এর একটি ভাব-বাংলা করলে দাঁড়ায়, “রাজনৈতিক ভণ্ডামির কোনো সীমা বা সীমান্ত থাকে না”।
    অনেক কিছুই সীমাহীন হতে দেখা যায়। যেমন, অমুক ফ্যানক্লাব অমুকের সীমাহীন সমর্থক; এমন হতেই পারে। কিন্তু মাইলাম বলছেন, শুধু সীমা না। ‘সীমান্তও’ থাকে না। কেন? কারণ তিনি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান আর আমেরিকান কিছু সিনেটরের সাম্প্রতিক আচরণ-বক্তব্যকে তুলনা করছিলেন। তুলনা করছিলেন দুটাই তাঁর চোখে “রাজনৈতিক ভন্ডামি” সমতুল্য উদাহরণ বলে। এবছরের শুরুতে ট্রাম্পের টার্ম শেষের পরে, তাঁকে নিয়ে “সিনেট ইমপিচমেন্ট” বা (দোষী ঠাউরানোর প্রক্রিয়া) শুরু হয়েছিল। আর সেখানে কিছু সিনেটর-পলিটিশিয়ানের তিনি তুলনা করছিলেন। মাইলাম ঐ রচনায় বলছিলেন, আমেরিকান কোন এক জার্নালে ঢাকার ডেইলি স্টারের একটা খবর কোট করা হয়েছে যেখানে প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছেন বলে লেখা হয়েছিল যে, “আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার জন্য গণতন্ত্রে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অবশ্যই থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের বর্তমান সংসদের বিরোধী দলগুলো উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কাঙ্খিত স্তরে অর্জন করতে পারেনি।’ [……The Daily Star, that I saw the article in which Sheikh Hasina is quoted as saying, “[F]or a democracy, a strong opposition party is a must as we want our democratic trend to continue.” She went on to say, according to the article, “The present opposition parties in Parliament could not attain the confidence and trust of the people at the desired level due to lack of leadership.”]। আমেরিকান সিনেটের কিছু সদস্যের ট্রাম্পের ইম্পিচমেন্টকে বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়ার সময়ে দেয়া বক্তৃতার সাথে হাসিনার এই মন্তব্যকে তুলনা করেছিলেন মাইলাম। আর তাতে এসবকে “সীমা ও সীমানা” অতিক্রম করে যাওয়া দুই ‘ভণ্ডামি’ হিসেবে দেখাচ্ছিলেন মাইলাম।

    আমরা মাইলামের ঐ লেখার আরও ডিটেলের দিকে আর আগাচ্ছি না। তবে মাইলাম তার এ রচনায় যা সিদ্ধান্ত টেনেছেন যেটা তার রচনার শুরুতে শিরোনামের নিচে সারসংক্ষেপ হিসেবে দেয়া আছে, সেটাতে চলে যাবো। কারণ সেটিই আমাদের প্রসঙ্গ। মাইলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র ব্যর্থতায় ডুবে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাই দায়ী যদিও, বিরোধী দলের ওপরও কিছুটা দায় বর্তায়।’  [Awami League and Sheikh Hasina are responsible for the failure of democracy in Bangladesh, but the opposing party also bears some responsibility, writes William Milam]   তাই কী? বাংলাদেশের দুর্দশায় বিদেশি বন্ধুদের কোনো দায় নেই?

    উড্রো-উইলসন সেন্টারের দুই ফেলোঃ
    মাইলামের মত আরেক বাংলাদেশী-অরিজিন স্কলার ড. আলী রিয়াজ; তিনিও ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ থিংকট্যাংকের ফেলো। তবে বর্তমানে রিয়াজ নিয়োগকর্তা বদলে নিয়ে ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’ [The Atlantic Council ] নামে আরেক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। আর গত ১৮ মার্চ থেকে আলী রিয়াজ চার পর্বের এক মতামত-কলাম যৌথ নামে ঢাকার প্রথম আলো পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে। সেই লেখার প্রথমপর্বটাই যার শিরোনাম “ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ” – এটাই যেন একটি সাক্ষ্য দলিল। সেখানে তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, বুশ প্রশাসন একান্তই নিজের সঙ্কীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে কিভাবে ও কেন বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করে ১/১১-এ ক্ষমতা নিয়ে ছিল আর ভারতের হাতে তুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বেচে দিয়েছিল। এনিয়ে তাঁর লেখার কিছু অংশ এখানে নিচের প্যারায় তুলে এনেছি যেটা, প্রেসিডেন্ট বুশের বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ সম্পর্কে আলী রিয়াজের এক সাক্ষ্য-ভাষ্য হিসাবেও অবশ্যই তা পাঠ করা যায়।

    আলী রিয়াজ লিখছেন,
    “নাইন-ইলেভেনের হামলার পর মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনার কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। নিরাপত্তার বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া এবং বুশ প্রশাসনের কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ বিবেচনা থেকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হয় নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতের চোখেই বাংলাদেশকে দেখে এসেছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে, এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়।’

    এ প্যারাটা আসলে শত কথার বদলে মাত্র কয়েকটা কথা। প্রথমত, রিয়াজ সাক্ষ্য দিচ্ছেন তার কথায়,  “আমেরিকা ভারতের স্বার্থের চোখে বাংলাদেশকে দেখেছিল”। কিন্তু কেন? এর জবাব পরের বাক্যে। বলেছেন, “আমেরিকা এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য নিশ্চিত করতে চায়”। মানে শুধু দেখা নয়, আমেরিকা ভারতের আধিপত্যই একেবারে নিশ্চিত করতে চায়। সেটাও বা আবার কেন? কারণ আমেরিকা “পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়”। মানে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে এটা ঠেকাতে আমেরিকা  “চায়না কনটেইনমেন্ট”[China Containment] বা চীন ঠেকানো করতে চায়। যদিও এই অবজেকটিভ ফেনোমেনা আদৌ ঠেকানো যায় না, সেই চেষ্টা করা বৃথা ও অকার্যকর হবে এবং হচ্ছে তা জানা সত্ত্বেও।

    অর্থাৎ আমরা দেখছি আলী রিয়াজ ক্লিয়ার ও ক্যানডিড হয়েই কথা ‘তিনটি’ বলেছেন। যার কোনো দুই রকমের মানে নেই। এর ভেতরে এশিয়ায় চীনের বদলে ভারতীয় আধিপত্য ছেয়ে ফেলা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা – এ স্বীকারোক্তির মধ্যে রিয়াজ কোনো সমস্যা মনে করেছেন বা অন্যায় দেখেছেন, তা মনে হয়নি। স্বাভাবিক হিসাবেই দেখেছেন। অথচ এরপরেও আবার ভারতকেই দায়ী করে বলেছেন, “প্রায় এক দশক ধরে ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে”। যে আমেরিকা ভারতকে দানব বানালো এখন সেই ভারত কেন বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকার  আনলো এর জন্য আমেরিকাকে না ভারতকেই দায়ী করছেন আলী রিয়াজ।

    আমরা তা হলে দুই থিংকট্যাংক ফেলোর বক্তব্য জানলাম। রিয়াজ আমাদের পরিষ্কার সাক্ষ্য দিয়ে জানাচ্ছেন বুশের আমল থেকেই আমেরিকান প্রশাসনগুলোর বাংলাদেশে ঢুকে পড়া ও হস্তক্ষেপগুলো কত গভীরে ছিল। এছাড়া দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়া বলে আসলে কিছু ছিল। ছিল এর আড়ালে বাংলাদেশ দখল করে নেয়া ও ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।

    তা হলে দেখা যাচ্ছে আলী রিয়াজ আমেরিকান সব হস্তক্ষেপ স্বীকার করে নিলেও আজকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশাগুলোর জন্য মানুষের যে সাফোকেশন, শ্বাস নিতে পারছে না দশা এ জন্য মাইলাম আমাদের সরকার আর বিরোধী দলকেই পুরো দায়ে দায়ী করছেন। এভাবে মাইলাম নিজের দেশ আমেরিকার প্রশাসনের হাত ধুয়ে ফেললেন; এটি কী ঠিক হল? না এটা বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হবে? এ নিয়ে তার ব্যাখ্যা দেয়া উচিত। নিজ দল-গোষ্ঠীর কাজের দায় অস্বীকার করা কোনো কাজের কথা নয়। ভুল মনে করলে তা স্বীকারের সৎসাহস দেখানোই আমরা আশা করব। স্টার্টার হিসেবেও এসব খুবই অখাদ্য! একাজ তাঁকেও কোন সুবিধা দিবে না। বরং  মানুষ হিসাবেও তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২০ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “মাইলামের হাত ধুয়ে ফেলা অগ্রহণযোগ্য” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায় এবং তাই এখানে করেছি।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেনের ‘কোয়াড’ ট্রাম্পের চেয়েও বেপথে

    বাইডেনের ‘কোয়াড’ ট্রাম্পের চেয়েও বেপথে

    গৌতম দাস

    ১৫ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3pO

    First Quad summit, ছবিতে পরপর  আমেরিকার বাইডেন, ভারতের মোদী, অষ্ট্রেলিয়ার মরিসন ও জাপানের সুগা

    বাইডেনের কোয়াড [QUAD] মানে ট্রাম্পের বদলে বাইডেন প্রশাসনের আমলে বাইডেন কোয়াডকে কি চোখে দেখবেন বা কি রূপে খাড়া করবেন সেটা ছিল বিশাল কৌতুহলের ব্যাপার। গত ১২ মার্চ বাইডেন প্রশাসন এই প্রথম কোয়াড জোটের চার রাষ্ট্রসদস্য আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর ভারত মিলে এক ভার্চুয়াল বৈঠক মানে অনলাইন সামিটে মিলিত হয়েছিলেন। অনলাইন সামিট হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছিল আমেরিকা হল এই সামিটের হোস্ট। এবং দাবি করা হয়েছিল যে এই প্রথম চার রাষ্ট্রের সরকার / রাষ্ট্র প্রধানেরা একসাথে মিলিত হয়ে কোয়াডের বৈঠক করছেন। বিগত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে এমনকি ২০২০ সালের নির্বাচনের মাসখানেক আগে অক্টোবরেও ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব আর যখন তখন হুমকি দিবার হাতিয়ার হিসাবে কোয়াডকে ব্যবহার করেছিলেন; অর্থাৎ এতে কোয়াডের মানে যেন হয়ে গেছিল এটা একটা সামরিক জোট। যদিও সাধারণভাবে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাইডেনের শপথ নিবার পরে সবাই ধরেই নিয়েছেন যে, সেসব দিনের অবসান ঘটেছে। যদিও এমন মনে করা হয় নাই যে, এখন কোয়াড সদস্যরা কেউ আগ বাড়িয়ে ধরে নিবে, যে কোয়াড মৃত। না তাও নয়। তাহলে ফাইনালি বাস্তবে গত ১২ মার্চের সামিটে কোয়াডকে কী পরিচয়ে সাজাতে চান বলে বাইডেন ধারণা দিলেন?

    আগেই জানা যাচ্ছিল, বাইডেন প্রশাসনের সবচেয়ে সম্ভাব্য অবস্থান হবে ‘কোয়াড’ (এবং সাথে “ইন্দো-প্যাসেফিক” [Indo-Pacific] শব্দটাও) থাকবে কিন্তু এর সামরিক বা নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো অর্থ আর থাকবে না। এমনকি তা প্রকাশ্য টার্গেট করে চীনবিরোধিতা করা হবে না। (হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি মিস জেন সাকি ইতোমধ্যে সাংবাদিকদেরকে পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ‘কোয়াড মিটিংয়ের ফোকাস চীন নয়’ […’It’s not focused on China…’ ]) তাতে মনে হয়েছিল কোয়াড বলতে (সমমনাদের) অর্থনৈতিক স্বার্থজোট ধরণের  এক অবস্থান দাড়াবে এর। যেমন বলা হয়েছিল এবারের এই অনলাইন সামিটের মূল উদ্দেশ্য হলো দুটো – “আমেরিকানদের ভাষায়”, “কোভিড ভ্যাকসিন প্রাপ্যতার ইস্যু […plans to announce financing agreements…for vaccines in India] ও চীনের প্রভাব”। মানে চীনের ক্রমেই বেড়ে চলা সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে ব্যালেন্স করতে তারা কী করতে পারেন [….to balance China’s growing military and economic power.], এ নিয়ে আলোচনা।

    কোয়াড [QUAD] কী?
    কোয়াড [QUAD] মূলত ইংরেজি শব্দ। তবে সাবধান এটা চারদেশের নামের আদ্যক্ষর নয়। বরং সংস্কৃত ঘেঁষা এক বাংলায় এর অর্থ হল ‘চতুষ্টয়’ [quadrilateral]. আর সেখান থেকে সংক্ষেপে QUAD। এর মুল আক্ষরিক অর্থ একসাথে জন্ম নেয়া চারজন, অনেকটা যমজের মত যেখানে একসাথে দু’জনের জন্ম নেয়া বুঝানো হয়। এখানে কোয়াড মানে চীনবিরোধী চার দেশীয় এক জোটের নাম; আর দেশগুলো হল আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। কিন্তু শুরু থেকেই এটা কেমন ধরনের ‘জোট’? মানে এটা স্ট্র্যাটেজিক জোট হলেও তবে কি মূলত সামরিক নাকি অর্থনৈতিক জোট?
    আমাদের অবজারভেশন বলে, কে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে আছেন তার ওপর নির্ভর করে জবাবটা। এমনকি তার মুড কেমন – এর উপরও নির্ভর করবে। যেমন আনুষ্ঠানিক অর্থে কোয়াডের জন্ম এবারের সামিটি দাবি করা হচ্ছে যে, ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরে যে ভয়াবহ সুনামি হয়েছিল ও কোস্টাল সবদেশগুলো থেকে মিলিয়ে প্রায় ২.৩ লাখ লোক মারা গেছিল; সেই ব্যাপক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর থেকেই কোয়াডের আলাপ শুরু হয়েছিল। কিন্তু মূলত এর আনুষ্ঠানিক জন্ম  ২০০৭ সালে জাপানের উৎসাহে। জাপানের খুব ইচ্ছা চীনবিরোধী একটা জোট বানায়, তাই। এর পেছনের চিন্তা অনেকটা এরকম যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) ‘হারুপার্টি’ জাপান, যুদ্ধে হেরে যাওয়ার দুঃখ বুকে চেপে রেখে –  যুদ্ধের পরে বিপরীতে আমেরিকার বিপুল বিনিয়োগ ও পুনর্বাসন ঋণ পাওয়াতে এটাকেই এটাকেই সহজে লজ্জা ভুলে যাওয়ার উপায় হিসেবে নিয়েছিল। আর সেটাকে কাজে লাগিয়ে ‘কাজপাগল’ [workaholic] একটা জনগোষ্ঠী এই নতুন পরিচয় গ্রহণ করে পালিয়ে বেঁচে ছিল জাপান। এতে ফলাফল খারাপ হয়নি। আর তাতে অচিরেই অন্তত অর্থনীতিতে এত বিপুল উন্নতি লাভ করে যে, জাপান তার “আমেরিকা ভাইকে” সাথে করে আরেকটা ‘বিশ্বব্যাংক’ বা “অবকাঠামো উন্নতিতে সমতুল্য এক বিনিয়োগ ব্যাংক” খুলে বসেছিল, ১৯৬৬ সালেই। এরই নাম এডিবি [ADB] বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। আজ দু’দেশ মিলে তারা প্রায় ১৬% করে এর শেয়ারহোল্ডার ও সবচেয়ে বড় দুই মালিক। এভাবে চলছিল ভালোই। কিন্তু চলতি শতকে এসে ক্রমেই দৃশ্যমানভাবে এবং ২০০৯ সাল থেকে চীন – উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র হিসেবে এর উত্থান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটেছিল। অনেকটা যেন, ক্রমেই এর আগমন হচ্ছিল সেটা টের পাচ্ছিল সবাই আর এর প্রতিক্রিয়ায় জাপান সমমনা বন্ধুদের নিয়ে এই ‘কোয়াড’ জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল।
    কিন্তু জাপানের (সাথে আমেরিকারও) ক্যালকুলেশনে বড় একটা ভুল ছিল। সেটা এই যে, চলতি শতক আর কোল্ড ওয়ারের যুগ নয়। ফলে চীনা নবশক্তি উত্থান ঘটেও এতে চীন-আমেরিকার কোন নতুন “কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক” এখানে হবেই না। তাই কোল্ড ওয়ার উঠে যাওয়ার একালে কোয়াড জোটই ঠিকমত কাজ করবে কিনা, এমনকি জোটটা খাড়া করাই খুব কঠিনই হবে। সংক্ষেপে এর কারণ বলতে গেলে – কোল্ড ওয়ারের আমলজুড়ে (১৯৫৩-৯১) কখনোই আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কোন লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্য ছিল না। এটাই ফান্ডামেন্টাল কারণ। ফলে এরা দুরাষ্টড় সহজেই একে-অপরকে নির্মুলভাবে ধ্বংস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত-পরিকল্পনা করতে পারত। কারণ কোন দেয়ানেয়া বাণিজ্য-সম্পর্ক নাই বলে অপরে ধ্বংস হয়ে গেলে তাতে নিজের ক্ষতি নাই মনে করতে পারত।  আমরা যদি ১৯৯২ সালের পরের পরিস্থিতিতে এর সাথে উত্থিত চীনের তুলনা করি বড় ফারাকটা হল, একালে কোয়াডের চার সদস্যই চীনের সাথে ঘোরতরভাবে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্কে জড়িত। এছাড়াও দুনিয়ায় আমরা প্রায় সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় [Global Order] অংশগ্রহণ করে অবিচ্ছেদ্দভাবে পরস্পর সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এখান সবাই চীনের সাথে স্বার্থ লড়াই করে আবার গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কও বজায় রাখে।
    মূলত এ কারণেই চীনবিরোধী স্বার্থ যতই থাক; আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর ভারত – এদের সবার গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার কারণেই বলা যায় ১০ বছর (২০০৭-১৭), কোয়াড জন্মের পরও এটা ততপরতাহীন অকেজো হয়ে ছিল। পরে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের আমলের তাও কেবল প্রথম বছরেই এটাকে আবার চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয়। তাও এর প্রথম সভা তারা করেছিলেন এক সাইড লাইনে বসে। মানে ট্রাম্পসহ নেতারা ফিলিপাইনে এসেছিলেন আসিয়ানের বৈঠকে, এরই সাইড লাইনে বসে সেই মিটিং করা হয়। ঘর পোড়ায় আলু পোড়া দেয়ার মত করে নামেই এক বৈঠক করেছিলেন। ট্রাম্প আবার সেবার ফিলিপাইনে এসেছিলেন, এর আগে তাঁর চীন সফর শেষ করে ফেরার পথে এবং সেবারের সফরে ট্রাম্প চীনের কাছ থেকে বাণিজ্যে বহুবিধ ছাড় পেয়েছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম বছরে তিনি অতটা মারাত্মক জাতিবাদি হয়ে উঠেন নাই, তাই। কিন্তু তাতেও দেখা যায়, সে কারণেই কোয়াড জোটের তৎপরতা চালুর ঘোষণা দিলেও একসাথে একই ভাষায় কোয়াডের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি তারা দিতে পারেনি। চার দেশই মূল বিবৃতিকে কাটছাঁট করে নিজের বক্তব্য ঢুকিয়ে এরপর প্রেসে দিয়েছিল। এর মূল কারণ সবাই কোন না কোনভাবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কে জড়িত ও সুবিধাভোগী ছিল। ফলে সবাই চেয়েছিল, সেই সম্পর্ক অটুট রেখে কোয়াড জোট খাড়া করতে। ফলে বাস্তবে এটা কখনো দাঁড়াতেই পারেনি। তবে সেই  ট্রাম্পেরই কেবল ২০১৮ সালের শেষে চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধ মিটতে ব্যর্থ হলে, মানে এটা ফেল করতে যাচ্ছে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরই কোয়াডের গুরুত্ব আবার বেড়েছিল। এমনকি সামরিক দিকে ঝোঁক যেমন, জোটের সামরিক মহড়া ধরনের বিষয়ের দিকে, এ জোট ঘুরতে উদ্যত হচ্ছিল। আবার ট্রাম্পের গত নির্বাচনে এটা সামরিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে ট্রাম্প কোয়াডের তৎপরতা বাড়িয়ে ছিলেন ২০২০ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত।
    নির্বাচনে বাইডেনের বিজয়ের পরে আমরা বলেছিলাম, বাইডেন প্রশাসনের নীতি হবে কোয়াড ভেঙে দেয়া বা অকেজো করা নয়। তবে এটা অর্থনৈতিকভাবে সমমনাদের স্বার্থজোট এমন পরিচয়ে কেবল সীমাবদ্ধ থাকতে চাইবে। আর তাই অনুমান করা হয়েছিল গত ১২ মার্চের অনলাইন বৈঠকে সস্তায় ভ্যাকসিন উৎপাদনের সুরাহা ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু হয়েছিল, চীনের ক্রমেই বেড়ে চলা সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এই কোয়াড জোট স্তব্ধ-ঠেকাতে পারবে না হয়ত। তবু একে কিছুটা ব্যালেন্স করতে তাদের জোট কী করতে পারে তা নিয়ে কিছু আলোচনা তারা করবেন।
    এছাড়া  বাইডেনের দিক থেকে আরো কিছু সাবধানতাও থাকার কথা। বহু আকাঙ্খিত, ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া ‘চীন-আমেরিকা বাণিজ্যবিরোধ’ এর জট ছুটানো নিয়ে আলোচনায় বসার তারিখ এরই মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে এবং সেটা হবে আগামী সপ্তাহেই ১৮-১৯ মার্চ এবং আমেরিকার আলাস্কা রাজ্যে; আর এ স্থান সম্পর্কে বলা হচ্ছে এটি নাকি চীন ও আমেরিকা রাষ্ট্র থেকে সমদূরত্বে। কিন্তু তাতে কোয়াডের সমস্যা কী? সমস্যা হল ১২ মার্চের কোয়াড সামিট থেকে এমন কোনো চীনবিরোধী ভাষ্য বাইডেন প্রশাসন আনবে না বলেই অনুমান যেটা চীন-আমেরিকার আলাস্কা বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা খুঁজে পাওয়ার আগেই বাইরের কারণে ‘তিতা’ হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, আমেরিকার কাছে কোয়াড জোটের থাকা না থাকার চেয়ে চীন-আমেরিকা বাণিজ্যবিরোধের সমাধান নিয়ে আলোচনা অনেক বেশি গুরুত্বের।

    এবার কোয়াড বৈঠকের ইস্যু কী?
    মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, এ বৈঠকের মূল ইস্যু কী। তবে এ নিয়ে অন্তত দু’টি মতামত বা অনুমান আছে। রয়টার্স এ নিয়ে গত দুই দিনে তিনটি রিপোর্ট ছেপেছে। সেখানে আমেরিকান প্রশাসন পরিষ্কার করে বলছে, সস্তায় করোনা ভ্যাকসিনের যোগাড় ও চীনের প্রভাব ব্যালেন্স করতে সম্ভাব্য করণীয় – এই হল দুই আলোচ্য ইস্যু। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর মনে করেন, “ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিয়নে ফ্রি ও ওপেন সমুদ্র চলাচলও’ এখানে আলোচ্য ইস্যু [ on practical areas of cooperation towards maintaining a free, open and inclusive Indo-Pacific region.”]। এর সাথে তিনি আরও দাবি করেছেন ‘মেরিটাইম সিকিউরিটিও’ [summit would also cover supply chains, emerging and critical technologies, maritime security... ] এখানে আলোচ্য ইস্যু। আবার অস্ট্র্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও ‘রিজিওনাল সিকিউরিটি’ এবং “সভরেন ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্দো-প্যাসিফিক” রাখার কথা এজেন্ডায় আছে বলে উল্লেখ করেছেন [Morrison said the meeting would focus on regional security and climate change…….about our support for a sovereign, independent Indo-Pacific,”]- ভারতের মতই। কিন্তু এ ব্যাপারে সবার চেয়ে জাপান একদম মুখবন্ধ; মানে জাপান যেন ওস্তাদ আমেরিকার সাথেই আছে এবং তা ভারত বা অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বেশি করে। এমন হওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কারণ হতে পারে যেমন, ভারতের হিসাবটা সোজা। বাইডেনের আমেরিকা মোদীর জন্য ট্রাম্পের আমলের মত ‘ইজি-গোয়িং’ নয়। কারণ বাইডেন ঘোষণা দিয়েই এসেছেন যে, মোদীর কাশ্মির দখল আর মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন ও নির্যাতনের অভিযোগ – এসব প্রসঙ্গে তিনি মোদীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিবেন ও কথা বলবেন। তাই এথেকে রেহাই পেতে ভারতের মনষ্কামনা হল, যেন চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্ব জোরদার হয়, শিগগির মিটে না যায়। তা হলে এটা যত জোরদার হবে ততই ঐ দ্বন্দ্বের আড়ালেই চার বছর ভারতের কাটিয়ে দেয়া বা টিকে যাওয়া সহজ হবে। এ জায়গায় এসে মোদী আর বাইডেনের পথ দুটো দুই দিকে চলে গেছে।

    করোনা ভ্যাকসিন কোয়াড বৈঠকের প্রধান ইস্যু কেন?
    প্রথমত, যেসব দেশ গবেষণা করে  ল্যাব থেকে ভ্যাকসিন বের করেছে ভারত তাদের অন্তর্গত কেউ নয়। নিজ “ল্যাব থেকে আবিস্কার করা” টিকার দেশ ভারত নয়। তাহলে? এর পরও একটা ‘কিন্তু’ আছে। অনেকটা যেমন,  ডাটাবেজ বা ডিজিটালাইজেশন অথবা ব্রডলি কম্পিউটারাইজেশন করা দুনিয়া এসে যাওয়ায় শিল্পোৎপাদনসহ জীবনযাপন এখন তুলনায় সবখানে এখন সহজ হয়ে গেছে। আর  এ ব্যাপারটা চালু করার নেতা হল আমেরিকা। কিন্তু ল্যাবে মূল আইডিয়া ও পরিকল্পনাটা অর্জন করে নিবার পরে এর বাস্তবায়নে আমেরিকার এতে প্রোগ্রামিং বা কোড বসানোর জন্য যে বিপুল হিউম্যান রিসোর্স লাগবে, তা সাপ্লাইয়ের জন্য নুন্যতমযোগ্য ও একেবারে সস্তা শ্রমদাতা হল ভারত। কারণ কাজের এই অংশটাও করাতে সে আমেরিকায় বসবাসকারী সিটিজেন কেউ হলে ভারতের চেয়ে তার শ্রমমজুরি কয়েক গুণ বেশি গুনতে হবে। অর্থাৎ এটা এড়াতেই সস্তা শ্রমে কাজটা করে নিতেই পুরো শিল্পের বড় শ্রমনিয়োগের অংশটা আউটসোর্সিং করা এবং ভারত থেকে করিয়ে আনা শুরু হয়েছে। ঠিক তেমনই এটাই ঘটতে যাচ্ছে ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে। তা হল ভারত ভ্যাকসিন উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়েছে ও নিবে পশ্চিমাদেশের কোম্পানির থেকে।  এরপর এর বাল্ক প্রডাকশন বা গণ-উৎপাদনে নেমে পড়েছে। এটাই বাইডেন আরো করাতে চায়। এমন উতপাদন সক্ষমতা ভারতের আছে।
    এমনিতেই ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে পুরোই আলাদা এবং সক্রিয় ও তৎপর। ট্রাম্প করোনাকে তেমন রোগই মনে করতেন না। আর বাইডেন তিনি দ্রুত আমেরিকার সবাইকে করোনার ভ্যাকসিনের অধীনে আনতে চান। কারণ যতই দেরি, ততই বিভিন্ন এলাকায় ভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইনের জন্ম [virus stain, মানে ভাইরাসের নানান রকম-ফের] বা উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়বে। তাতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়াও এমনিতেই বলা হচ্ছে যে, ভ্যাকসিন গ্রহিতাদের দুটো ক্লাস তৈরি হয়ে গেছে, গরিব আর বড়লোক বলে। আমেরিকার যে টিকা ব্যবহৃত হচ্ছে তা এখনো আমাদের দেশের চেয়ে অনেক দামি। আর এমন ভ্যাকসিনের ব্যবহার দিয়েই এর শুরু ও বর্তমান। এই ভ্যাকসিন সংরক্ষণও ব্যয়বহুল। তাই আমেরিকা ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বিতরণ আরও ত্বরান্বিত  ও সস্তায় [affordable] করার উদ্যোগ নিতে চান বাইডেন। এ ছাড়া সেটা চায় নিরাপদ টিকা, সবাই যেন পায় আর দাম সীমার মধ্যে যেন থাকে এমন শর্তে। এদিকে আবার আমেরিকারই আরো অন্তত দুটো (নোভাভ্যাক্স ও জনসন অ্যান্ড জনসন Novavax Inc and Johnson & Johnson] ) ভ্যাকসিন আছে যাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনও তেমন শুরুই হয়নি বা অস্পষ্ট। সব মিলিয়ে বাইডেন ভারতকে দিয়েই ভ্যাকসিন উৎপাদন করিয়ে নিতে চান। তাই এই সামিটের সবচেয়ে বড় ‘নগদ’ উদ্দেশ্য হল, ভারতের সাথে ‘প্লানস টু অ্যানাউন্স ফিন্যান্সিয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট’ […..plans to announce financing agreements to support an increase in manufacturing capacity for coronavirus vaccines in India]-এর গ্রাউন্ড তৈরি করে দেয়া। এতে আমেরিকার ওসব কোম্পানির লাইসেন্স নিয়ে ভারতের উৎপাদনে যেতে যে বিনিয়োগ লাগবে, সেটিও আমেরিকা ও জাপান দিতে চায়। সারকথা ভারতকে দিয়ে ব্যাপক ভ্যাকসিন উৎপাদন করিয়ে নেয়া – এটিই কোয়াডের প্রথম আলোচ্য ইস্যু।
    তবে এখানেও একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। আমেরিকার প্রশাসন রয়টার্সকে জানিয়েছে বাইডেনের টার্গেট আমেরিকান জনগণকে ভ্যাকসিন দেয়া আর সাথে অল্প কিছু ভ্যাকসিন, যা ইউএসএইড ফান্ডেড এনজিওদের দেয়ার জন্য আমেরিকা কমিটেড, কেবল ততটুকু। কিন্তু ভারত চেষ্টা করেছে কথাটা ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি’ শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে। ভারতের কাছে এর মানে হল, অন্য দেশে ভ্যাকসিন দেয়া মানে ‘প্রভাব বিস্তার’ করা। তাতে আমাদের মতো দেশগুলোতে চীন যদি ফ্রি সিনোভ্যাক ভ্যাকসিনের অফার দেয়, তবে এর বিরুদ্ধে ভারত লড়বে ওই দেশেই নিজের ভ্যাকসিন বিক্রি করে। আর তা করবে ওদেশের সরকারকে কমিশন দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিজের ভ্যাকসিন বিক্রি করে। এটিই ভারতের ভ্যাকসিন আবিষ্কারক না হয়েও চীনের পাল্টা ভ্যাকসিন লড়াই জারি করা- চীনের বিরুদ্ধে ‘প্রভাব বিস্তার’ করার লড়াই বলে যেটা ভারত বুঝেছে। এই কথিত প্রভাব বিস্তারের লড়াই, এটিই ভারতের চোখে ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি, অন্যের তেলে মাছ ভেজে নেয়া। ভারত এভাবেই তার অন্য কোয়াড বন্ধুদের ভারতে বিনিয়োগ করে চীনের বিরুদ্ধে লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান রেখেছে।

    কিন্তু বাইডেন প্রশাসন এ দিকে তেমন আগ্রহী নয়। যেমন রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়েছে। তিনি বলছেন, ‘আমেরিকা আপাতত নিজের ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্যই কোয়াড নিয়ে তৎপরতায় নেমেছে, এটিই তাদের ফোকাস। কাজেই আমরা ঠিক এ মুহূর্তে অন্যদের সাথে ভ্যাকসিন শেয়ারের প্রসঙ্গে কথা বলছি না।[United States’ focus was foremost on getting vaccines to Americans…….“We will not be talking about sharing vaccines right now,” she said.]।  অর্থাৎ ভারত যতই আমেরিকাকে চীনের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার কৌশল নিতে চাইছে আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটরা ততই আপাতত ব্যাপারটা পাস কাটিয়ে যেতে চাইছেন।

    মিটিংয়ে পরিস্থিতি পল্টি খেয়ে গেছেঃ
    উপরে এখন পর্যন্ত যা লিখেছিলাম এটাই ১২ তারিখে অনলাইন সামিট বৈঠক শুরুর আগের ভাষ্য।  বৈঠক শুর পর আসলে চার সরকার প্রধানের বক্তৃতার মূল সময় লেগেছিল মোট মাত্র ১২ মিনিট (সকাল ৮:৩২ থেকে সকাল ৮:৪৪), আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য তাই বলছে। অর্থাৎ প্রচারিত বক্তৃতায় তেমন কথা নাই। কিন্তু এই প্রথম কোয়াডের চারদেশীয় এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে যেখানে মাত্র পাঁচটা পয়েন্টে সবকথা আনা হয়েছে। আর এই বিবৃতির ভাষ্য ১১ মার্চ পর্যন্ত সরকারি নানান স্টাফেরা মিডিয়ায় যেসব ধারণা দিয়েছেন এর উলটা। বিশেষত স্টাফদের ভাষ্য ছিল চীনবিরোধী ইন্দো-প্যাসিফিক জোট বা ওর নিরাপত্তা স্বার্থের প্রসঙ্গকে খাটো করে, কেবল সস্তায় ভ্যাকসিন নিশ্চিত ও তাও কেবল আমেরিকানদের জন্য – এই ব্যাখ্যার মধ্যে ব্যাপারটার সীমাবদ্ধ রেখে।  কিন্তু যৌথ বিবৃতিতে মুল ফোকাস সারা ইন্দো-প্যাসিফিক [for the global benefit — and strengthen vaccinations to benefit the entire Indo-Pacific.]।  এটা বাইডেনের মূল বক্তৃতা থেকে নেওয়া।
    কিন্তু যৌথ বিবৃতির পাঁচ পয়েন্টের প্রথম পয়েন্টে এসেই এবার বাইডেন এজেন্ডা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কভিড ভ্যাকসিন, ক্লাইমেট চেঞ্জের কথা বলার পরেই বলে বসেন “নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের” [security challenges facing the region summon us with renewed purpose] কথা লেখা হয়েছে।  এখানে নিরাপত্তা মানে ইন্দো-প্যাসেফিকে চীন পিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে – এই হল এর পিছনের বলতে চাওয়া ভাষ্য।  অথচ অনলাইন বৈঠকে বসার আগেরদিন পর্যন্ত মিডিয়া রিপোর্টে আমেরিকার কর্তারা “নিরাপত্তা” নিয়ে কোন কথাই বলেই নাই।
    আবার বিবৃতির দ্বিতীয় পয়েন্টে গিয়ে এটা  পুরাটাই চীনবিরোধী ইন্দো-প্যাসেফিক জোট কেন্দ্রিক। যার সারকথা হল চীনবিরোধী এবং সাউথ চীন সাহরের কথা মাথায় রেখে লেখা। বলতে চায় তারা সমুদ্রপথ উন্মুক্ত ও অবাধ রাখতে চায়, আইনের শাসন চায়, আন্তর্জাতিক আইন মানে, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে এভাবে ইন্দো-প্যাসেফিক ও বাইরেরও হুমকি মোকাবিলা করে। তারা আইনের শাসন মানে, সমুদ্র চলাচলের স্বাধীনতা, ও উপর দিয়ে উড়ে চলাচল এলাও করে, বিরোধের শান্তিপুর্ণ সমাধান করে গণতান্ত্রিক মুল্যবোধ নিয়ে চলে ও অন্যের ভুখন্ডগত সংহতিকে সম্মান করে চলে ইত্যাদি। একেবারে সর্বগুণে গুণান্বিতা। আর বিপরীত চীন কেবল দুষ্ট! এভাবেই বাকি তিনটা পয়েন্টও একই রকম সারকথায় চীনবিরোধিতা। আর তারা সবাই ভাল!
    অর্থাৎ চীনবিরোধিতার ইঙ্গিত বা প্রত্যক্ষভাবে কিছু বলব না বলে আমেরিকান প্রশাসনের কর্তারা যে প্রমিজ বা সাধুতা দেখানোর চেষ্টা করেছিল বৈঠক শুরুর আগে তা অনলাইন বৈঠকের শুরু থেকেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। বাইডেন প্রশাসন সারেন্ডার করেছে। বুঝা যাচ্ছে তা মূলত ভারত ও অষ্ট্রেলিয়ার চাপে।

    এদিকে এসব দেখে ট্রাম্পের আমলের এক জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তরের উপসহাকারি মন্ত্রী লিসা কার্টিস এক মন্তব্য-আর্টিকেন লিখেছেন সিএনএনে। যার সারকথা ও শিরোনাম হল, “বাইডেন যা ফরেন পলিসি দাড় করিয়েছেন তা ট্রাম্পের দেখানো পথেই আর তারই উপরে দাঁড়িয়েই”। তাহলে এখন আগামি সপ্তাহে চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধসহ সব আলোচনা যা শুরু হতে যাচ্ছে তা কী বিঘ্নিত হবে না। মনে হচ্ছে অবশ্যই হবে। সেকথার আগে কোয়াডের এই সভা নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া দেখে নেয়া যাক।

    চীনের প্রতিক্রিয়া কী?
    হ্যাঁ, চীনের প্রতিক্রিয়াও আছে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিন্ন প্রসঙ্গে প্রেসের সাথে কথা বলতে গিয়ে কোয়াডের নাম না ধরে বলেছেন, ‘বহুরাষ্ট্রীয় তৎপরতার নামে ছোট এক সার্কেল গড়া এটি তো আসলে গ্রুপ পলিটিক্স করা।’… ‘বহুরাষ্ট্রীয় তৎপরতার নামে খোদ নিজস্বার্থে কাজ করা এটি তো একপক্ষীয় স্বার্থচিন্তার কারবার। কাজেই বেছে বেছে বহুরাষ্ট্রীয় তৎপরতার আওয়াজ তোলা সঠিক রাস্তা নয়” [“building small circles in the name of multilateralism”, which was “in fact ‘group politics”………. “Multilateralism with one’s own interests taking precedence is still unilateral thinking,” he said. “’Selective multilateralism’ is not the right choice.”]।
    এ ছাড়াও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ের মুখপাত্র সাবধান করে ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, কোয়াডের ‘মিটিং যেন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য সহায়ক হয় এবং এর বিপরীত কিছু না হয় “…… do things that are conducive to regional peace stability and prosperity, rather than the opposite,” ।

    এদিকে ভারত এক আজিব দেশ। সে সাপ হয়ে কামড় দেয় আবার ওঝা হয়েও হাজির হতে চায়। তাই চীনের গ্লোবাল টাইমস কোয়াডকে নিয়ে কার্টুন এঁকেছে। নিচে দেখেন।

    গ্লোবাল টাইমস স্যাটায়ার করে এক লেখা ছাপিয়েছে ভারতকে নিয়ে।

    উপরের ছবিতে লক্ষ্যণীয় যে বাইডেন গাড়ি চালাচ্ছে বটে কিন্তু গাড়ির বাকি তিন যাত্রী তাদের প্রত্যেকের কাছেই একেকটা করে গাড়ির স্টায়েরিং আছে! এটা এমনই গাড়ী। মানে কোয়াড এমনই প্রতিষ্ঠান বা গাড়ী যার মধ্যে চার সদস্যেরই ইচ্ছামত দিকে গাড়ি হাকানোর সুযোগ আছে। তাহলে গাড়ীটা কোনদিকে যাবে? পাঠকেরা বুঝে নেন। আবার ভারত যে একই সাথে গ্লোবাল আগের নেতা আমেরিকা ও এর সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের পালটা নতুন সিস্টেম (আইএমএফ) ব্রিকস [BRICS] এর সক্রিয় সদস্য। যে এই বছরই ব্রিকস সম্মেলনের হোস্ট, মানে সেটা ভারতে অনুষ্ঠিত হবে। তার মানে সেই ভারত তাহলে আমেরিকার পিছনে লেজ ধরে হাটে কী করে?  যার সোজা মানে ভারত আমেরিকার সাথে আছে আবার চীনের সাথেও আছে! কী তামসা! এই স্ববিরোধীতাগুলোকেই দেখিয়েছে কার্টুনটা।

    তাহলে চীন-আমেরিকা বাণিজ্যবিরোধের আলোচনায় কোয়াডের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?
    প্রথম কথা কোয়াড বৈঠকে বাইডেন কোয়াড কে যতই চীনবিরোধী অভিমুখি করে তুলবেন ততই তা তাঁর বিরুদ্ধে যাবে। সারকথায়, যতক্ষণ বাইডেন চীনবিরোধী সক্রিয় বলে কোন কিছু জোটের নেতা হয়ে থাকতে চাইবেন ততই চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধ আলোচানায় চীন আমেরিকাকে কোন ছাড় দিবে না। এককথায় চীন কোয়াডের চার দেশ সবার সাথেই আলাদা করে সুবিধা দিয়ে রফা করতে চাইবে। এবং এটা সম্ভব। সেকারণে, এতদিন এটাই চলে আসতে পেরেছে এভাবেই। আবার লক্ষ্যণীয়, সারা ইউরোপ চীনবিরোধী অবস্থান নিয়ে বাইডেনের পাশে দাড়ায় নাই। আবার RCEP বাণিজ্য জোটের চীনের সাথে গুরুত্বপুর্ণ সদস্য হয়ে আছে জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া। সেটা তো সে উপেক্ষা করতে পারে নাই। যা প্রমাণ করে এরা চীনেরবিরোধী নয়। তাহলে, কোয়াড নিয়ে এত চিৎকার এর প্রয়োজন কোথায়? কাল জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া চীনের থেকে বাণিজ্য সুবিধা পেলে কোয়াড আবার অকেজো করে রাখবে। যেটা এতদিন ছিল। কাজেই বাইডেন এই প্রথম কোয়াডকে রাষ্ট্রপ্রধানদের পর্যায়ের বৈঠকে আনতে পেরেছে আর এই প্রথম এক সম্মিলিত যৌথ বিবৃতি দেওয়াতে পেরেছে? কিন্তু কতদিন এরা একসাথে সক্রিয় থাকবে তা এই চারসদস্যের কেউ জানে না। কাজেই আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ব্রুকিংসের [Brookings Institution] ভারতীয় ডিরেক্টর তানভি মদন যতই জোর দিকে বলুক যে এবারের কোয়াড থাকতেই এসেছে ……a declaration that the Quad is here to stay,”] তাতে কিছুই এসে যায় না; তা কাজ করবে না। আর  যদি করে তাহলে বুঝতে হবে দুনিয়া কোন যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “বাইডেনের ‘কোয়াড’ যুদ্ধে নয়, টিকা বানাবে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জয়শঙ্কর চান চীনের বদলে জাপান! কিন্তু লাভ নাই

    জয়শঙ্কর চান চীনের বদলে জাপান! কিন্তু লাভ নাই

    গৌতম দাস

    ০৮ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3pl

    জয়শঙ্কর বলেছেন, ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’। PPBD

    s-jaishankar-aka-momen-040321-201

    দেখানো উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আগামি ২৬ মার্চ ঢাকায় আসছেন, এটা নিশ্চিত করতেই নাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর গত ৪ মার্চ এক দিনের ঢাকা সফর করে গেলেন। কিন্তু এই সফরের যেসব মিডিয়া কাভারেজ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে বাংলাদেশে বা ভারতে, তা দেখে আমরা পরিষ্কার যে, দুই দেশের মিডিয়াই “উদ্দেশ্যের বিচারে” পুরা বিভ্রান্ত। জয়শঙ্কর ঠিক কেন এসেছিলেন? যেমন – প্রথমত তাঁর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অতিথি হিসেবে মোদীর বাংলাদেশ সফরের কূটনৈতিক ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করা। কিন্তু প্রায় সব মিডিয়া রিপোর্টই এমন যে, এই প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা কোথাও আছে কি না তা খুঁজতে হবে, খালি চোখে পাওয়া যাবে না। এমনই অবস্থা!

    তাহলে ওসব মিডিয়া রিপোর্ট বা শিরোনাম কী নিয়ে? দুই দেশেরই বেশির ভাগ মিডিয়ার শিরোনাম ও রিপোর্টের ফোকাস হল – “সীমান্ত হত্যা”। যেন মোদীর সফর না, ‘সীমান্ত হত্যা’ ছিল আলোচনার মূল এজেন্ডা!  আর সবচেয়ে ভয়ংকর যে কথা বলা হয়েছে সেখানে – বাংলাদেশ আর ভারত নাকি একমত হয়েছে যে, সীমান্তে অপরাধ হচ্ছে তাই হত্যা করতে হচ্ছে। অপরাধ ও হত্যা, একে অপরের কাউন্টার বা রিমেডি! এই প্রসঙ্গে বড় করে জয়শঙ্করের বাণী সামনে এনেছে বিডিনিউজ২৪। জয়শঙ্করের বরাতে তারা লিখছে, “আমি মনে করি, আমরা একমত হয়েছি, যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। কিন্তু আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করতে হবে, সমস্যাটি কেন হচ্ছে এবং আমরা জানি, সমস্যাটি কী। সমস্যা হচ্ছে অপরাধ।… সুতরাং আমাদের মিলিত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন’ সীমান্ত। আমি নিশ্চিত, আমরা যদি এটা করতে পারি, অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন সীমান্ত, তাহলে একসাথে এই সমস্যার সমাধান করতে পারব”।

    বুঝা গেল ‘সীমান্ত হত্যা’ নিয়ে জয়শঙ্কর কথা সাজিয়ে এসেছিলেন ভালই, বলতে চেয়েছেন সীমান্তে অপরাধ হচ্ছে তাই হত্যা করতে হচ্ছে। অনেক মিডিয়া তাই সরাসরি কোট করে লিখেছে “অপরাধ নাই তো মৃত্যুও নাই” [India for ‘No crime, no death’ policy on border, says Jaishankar]  কিন্তু  তাতে সীমান্ত হত্যার “হত্যা” শব্দটা জয়শঙ্কর বেশ চাতুরির সাথে লক্ষণীয়ভাবে বদলে দিয়েছে আর বসিয়ে নিয়েছে “মৃত্যু”। কারণ “হত্যা হচ্ছে” মানে ভারতীয় বিএসএফ হত্যা করছে- এটা স্বীকার করা হয়ে যায়। তাই এবার শব্দ বদলে এক চাতুরী করা। ‘হত্যা’র বদলে ‘মৃত্যু’ শব্দ ব্যবহার করেছেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেছেন, ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’ এটাই নাকি তাদের সীমান্ত-নীতি। মানে না কিল, তো না ডেথ। আর তাতে মানে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশী হতভাগ্য নাগরিক-ব্যক্তিটার কেন সীমান্তে মৃত্যু হয়েছে, কে গুলি করেছে, এটা জয়শঙ্কর জানেন না বা সেটা যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। অথবা সীমান্তে খুন হওয়া বাংলাদেশি নাগরিক-লোকটা যেন নিজেই বিএসএফকে গিয়ে বলেছেন তাকে গুলি করে মেরে ফেলতে!

    কিন্তু এসব ছেঁদো আলাপে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি কী করছিলেন? মি. মোমেন যদি বুঝেই থাকেন যে তিনি জয়শঙ্করের সাথে বাতচিতে বাংলাদেশীদের সীমান্তে হত্যা ঠেকাতে পারবেন না, এ নিয়ে কথা তুলেও সুবিধা করতে পারবেন না, তাহলে এটাকে তিনি তাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ইস্যু করলেন কেন, হতে দিলেন কেন? কেন রাজি হয়েছেন এতে? এর মানে কী? কী আলোচনার ইস্যু হবে সেটাতেও সম্মতি দেয়া না-দেয়ার মুরোদও তিনি হারিয়েছেন?  এটা আলোচনার ইস্যু না করলে আমাদের কী (বাড়তি) ক্ষতি হতো? তিনি কী ব্যাখ্যা করতে পারবেন? এ ছাড়া এখন এর চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন উঠেছে!

    প্রশ্নটা হল  – বাংলাদেশের কোনো নাগরিক অপরাধ যদি করেও থাকে তাহলেই কী তাকে খুন-হত্যা করতে পারেন? করা যায়?  জয়শঙ্করেরা তাকে হত্যা বা খুন করে ফেলবেন? এই হত্যাকে লুকিয়ে একে ‘মৃত্যু’ বলে ডাকতে পারেন? মি. মোমেন আপনি এটাকে ‘মৃত্যু’ বলে ডাকার কে? কেন একে ‘মৃত্যু’ বলতে জয়শঙ্করকে সম্মতি দিয়েছেন? এটা সিরিয়াস লিগ্যাল প্রশ্ন! এর জবাব কী?

    বিডিআর ও বিএসএফ দুটোই পড়শিদেশের সিভিলিয়ান ফোর্সঃ
    বর্ডার গার্ড (সাবেক নাম বিডিআর) ও বিএসএফ এ দুটোই পড়শি দুই দেশে সিভিলিয়ান ফোর্স হিসেবেই গণ্য, অর্থাৎ এটা যার যার দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। মানে সামরিক বাহিনীর মত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। বরং এটা পুলিশের সমতুল্য এক সিভিল প্রশাসন যাদের কাজ অপরাধীকে ধরে আদালতে পেশ করা। আত্মরক্ষার মতো পরিস্থিতি ছাড়া অতিরিক্ত (অ্যাকসেসিভ ফোর্স) বলপ্রয়োগ না করা, হত্যা না করা। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী তাই স্থানীয় থানার মাধ্যমে আসামিকে আদালতে পেশ করতে পারে। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিষয়ক দুই দেশের চুক্তি (যেটা পাকিস্তান আমল থেকেই চালু হয়েছিল আর স্বাধীন বাংলাদেশে সেটাকেই রিনিউ করে নেয়া হয়েছে) করার উদ্দেশ্যই ছিল মূলত দুটা। এক. সীমান্ত অপরাধের ইস্যুগুলোকে যেন সিভিল প্রশাসনের অধীনে রেখে পরিচালনা করা যায়; দুই দেশের নাগরিকের মধ্যে সদ্ভাব থাকে; দুই সীমান্ত রক্ষীবাহিনীই যেন অযথা এবং ‘অতিরিক্ত’ শক্তিপ্রয়োগ না করে। আর দুই. এতে সুবিধা হল, দুই দেশের সেনারা সীমান্ত থেকে বহুদূরে (সম্ভবত ২৫ কিলোমিটারের বাইরে) ব্যারাক গড়ে থাকতে পারে। এতে সীমান্তে টেনশন কমানোর সহায়ক পরিবেশ পাওয়া যায়। সেনাবাহিনীর এনগেজমেন্টের রুল ভিন্ন এবং তা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে। একটা দেশের শত্রুর ব্যাপারে যেভাবে আচরণ করা উচিত সেভাবে। আর এখানে সবার উপরের কথা হল, সামরিক স্ফিয়ারের কোনো খুন বা ছোট-বড় গোলাগুলির ঘটনা কোনো দেশের আদালতে তোলার বিষয়ই নয়, আর তা এখতিয়ারেরও বাইরে। বড় জোর, কোন আভ্যন্তরীণ নিয়মভঙ্গ হলে নিজ নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোর্ট অব এনকোয়ারি হতে পারে; তাও বিশেষ ক্ষেত্রে। তাই দেশের সীমান্ত যদি সেনাবাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মানেই হল, সীমান্ত-সম্পর্কিত অপরাধীরা এক্ষেত্রে আদালত-বিচার ইত্যাদির সুবিধা পাবে না। তা দেয়া যাবে না। এটা এড়াতেই দুদেশে সীমান্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বসানোর চুক্তি।

    এসবের সার কথাটা হল, ভারত-বাংলাদেশ উভয়েই নিজ সেনাবাহিনীকে সীমান্তের ২৫ কিলোমিটার দূরে ব্যারাকে রেখে এবার নিজ নিজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ও পরিচালিত নিজ নিজ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দিয়ে উভয়েই সীমান্ত নিরাপত্তা পরিচালনা করার চুক্তি করা হয়েছিল। যার মানেই, সীমান্তে কোনো “অপরাধ ঘটলে তা গুলি” করে সমাধান করা যাবে না। অপরাধ মানেই, গুলি করে হত্যা বা মৃত্যু নয়। কারণ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনী নয়। তারা অপরাধীকে প্রতিপক্ষ দেশে হস্তান্তর করতে পারে প্রটোকল থাকলে, চাই কী নিজ নিজ দেশের আদালতে পেশ করতে পারে। তাতে রায় সাপেক্ষে আসামিকে শাস্তি পেতে হতে পারে। তবে তা আর সীমান্ত বাহিনীর এখতিয়ারই নয়, সিভিল পুলিশের কাজ। তাহলে মি. মোমেন কিভাবে ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’-জয়শঙ্করের এই সীমান্তনীতিতে সায় দিয়েছেন? এ প্রসঙ্গে, বিডিনিউজের রিপোর্ট দাবি করছে মোমেনকে পাশে নিয়ে জয়শঙ্কর বলেছেন … ‘আমরা একমত হয়েছি’…। তাহলে নিজের হাত পরিষ্কার রাখতে এখন মি. মোমেনের উচিত নিজে থেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া, কেন তিনি একমত?

    এক ধান্দালি শব্দ ‘কানেকটিভিটিঃ’
    দুই দেশেরই মিডিয়ায় দ্বিতীয় গুরুত্বের ফোকাস ছিল ‘কানেকটিভিটি’ [Connectivity]। শব্দটা এবার প্রথম আলো বাংলা করেছে “সংযুক্তি”। সরি, এটা ভাল বাংলা হয় নাই। বিশেষত এই অনুবাদ কনটেক্সট বা প্রেক্ষিত থেকে দূরে চলে গিয়েছে, এতে বিচ্ছিন্ন সম্পর্কহীন হয়ে গেছে। ভাল বাংলা হতে পারত “সংযোগ”। মূলত শব্দটার অর্থ “অবকাঠামোগত সংযোগ”।  কিন্তু এসব বাদ দিয়ে আরেক মূল সমস্যা এখানে দেখা দিয়েছে।

    যেমন, অনেক মিডিয়া রিপোর্টে আবার ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটাই নাই অথবা অর্থহীনভাবে দু-এক শব্দে আছে। যেমন- ভারতের দক্ষিণী- দৈনিক দ্য হিন্দু [thehindu], যা গত দুই জোড়া বছর ধরে মোদীর জাতিবাদের এক বড় প্রবক্তাই শুধু নয়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের খোদ ‘সাফাইদাতা মুখপত্র’ যেন এমন ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে ওর সুহাসিনী হায়দার বা কল্লোল ভট্টাচার্যের লেখা রিপোর্টগুলো। বলাই বাহুল্য, যা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বলার কথা সেই দায়িত্ব অযাচিত হয়ে একটা মিডিয়া পালন করতে পারে না। এটা মারাত্মক দৃষ্টিকটু শুধু নয় এটা সরকারের তোষামোদ। আর যা তোষামোদ করা তা আর ন্যূনতম কোনো স্বাধীন মিডিয়া কি না সে প্রশ্ন উঠবেই। দ্য-হিন্দুর অবস্থা এমনই! সময়ে মনে হয়েছে জার্নালিজমের ভূমিকা ভুলে গিয়ে ‘অতি দেশপ্রেমী-জাতিবাদী হিটলারের’ ভাই দ্য-হিন্দুর ওপর ভর করেছে। আমাদের চলতি সরকার ২০১৯ সালে গঠন হওয়ার পর থেকে ক্রমাগত দ্য-হিন্দু অবলীলায় এ কাজ করে চলছে, যা তার কাজই নয়। কিন্তু তামাসার দিকটা হল, মনে হচ্ছে এবার জয়শঙ্করের সফরে দ্য-হিন্দুকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় ‘বেওয়াফা’ করে ছেড়েছেন, মানে ভাগাড়ে নামিয়ে দিয়েছেন। জয়শঙ্করের কানেকটিভিটি শব্দের গোপন অর্থ তাতপর্য কী তা দ্যা হিন্দু আমাদের কিছুই জানাতে পারে নাই।  দ্য-হিন্দুর রিপোর্টে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটা অকিঞ্চিতকরও অর্থহীন, তবে হাজির আছে মাত্র। অথচ  প্রতিদ্বন্দ্বি মিডিয়া এনডিটিভি [India Keen To Focus On Connectivity With Bangladesh: S Jaishankar] , ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গ্রুপের মিডিয়াতেও [considering involving a third country like Japan in further expanding its connectivity ] তা যথেষ্ট অর্থপূর্ণভাবে রয়েছে।

    এটাকে বলা যায়  জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ ট্যুরঃ
    সত্যিকারভাবে বললে, এটা এখন কমবেশি পরিস্কার যে জয়শঙ্করের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল “চীনের বদলে জাপান”! এ কথার মানে কী? মানে হল, গত ১২ বছরের শুরু থেকেই ঢাকা সরকার সবসময় চীনের একটা হাত ধরে রাখা না হলেও অন্তত একটা আঙুল ছুঁয়ে থাকা্র নীতিতে ছিল আমাদের সরকার, বিশেষত ২০১০ সালে সরকার প্রধানের প্রথম চীন সফরের পর থেকেই। অথচ বিপরীত দিকটা হল, “প্রো-ইন্ডিয়ান” হয়েই কিন্তু এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। আর তাতে সরকারের দিক থেকে ভারতকে এই সাফাই-ব্যাখ্যা দেয়া হত যে (২০১২ সালে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক লোন বাতিলের পর থেকে), বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিপুল ঋণ পাওয়া দরকার। যেটা দিবার মুরোদ ভারতের নাই তাই বড় উৎস হিসেবেই বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের সাথে এত যোগাযোগ শুরু করেছে। এমনকি ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর বাংলাদেশে সফর থেকে বাংলাদেশ প্রথম ২০ বিলিয়ন ডলারের নানান অবকাঠামো ঋণের কমিটমেন্ট পেয়েছিল। সেটা ২০১৯ সালের মধ্যে বরং বাস্তবে বেড়ে ২৬ বিলিয়নে পৌঁছেছিল। এতে যদিও সব প্রকল্পের সব অর্থ খরচ হয়ে যায় নাই, তবে সব অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ হয়ে গেছে ও প্রকল্প চলমান। তাই এমনকি গত বছর আরো প্রায় ৬-১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রকল্প নেয়ার কথা চলছে। সারকথায় বাংলাদেশের চীন-ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণটা ভারতকে মেনে নিয়েই এতদিন চলতে দেখেছি আমরা।

    পালটা টানাপোড়েন শুরুর দিনঃ
    কিন্তু এই চীনকে মেনে নেওয়া সম্পর্কের মধ্যেও ২০১৯ সালের শুরু থেকেই ভারত থেকে বাংলাদেশের আরো দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেটার আগমনবার্তা দেখেছিলাম আমরা – ২০১৮ সালের ২৬ মে মাসে ভারত সফর শেষে হাসিনা দেশে ফিরে ৩১ মে দৃশ্যত তাঁর খুবই হতাশ মন্তব্যে সেই বিখ্যাত উক্তি, “আমি ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে“। একটা ক্ষোভ থেকে এটা বলা হয়েছে অনুমান করা যায়। আর এথেকে এরই প্রতিক্রিয়ার বাস্তবায়নের শুরু ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। সরকথায় এটা ছিল – এটা যতটা ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়ার উদ্যোগ ততটাই যেন চীনের সাথে আগের চেয়েও এবং খোলাখুলি বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়া। য়ার তা থেকে, তিস্তা নদীর নাব্যতা বা ধারণক্ষমতা বাড়ানোর প্রায় বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নেয়া হয়েছিল সেখানে। ইতোমধ্যে আমেরিকায় বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে আমরা লক্ষ করেছি আরো বেশি করে ত্রাতার মতই চীনকে আঁকড়ে ধরাও শুরু হয়েছিল।

    কিন্তু এই সব কিছুকে উলটে দিয়ে দুই সপ্তাহ আগে আমরা আবার শুনছিলাম বিরহের সুর – চীনের হতাশ হয়ে করা কথাবার্তা যে, আমরা আর কখনো জুট বা জুট মিল (পুনর্বাসন) এবং বস্ত্রখাতে বাংলাদেশকে সহযোগিতার কথা তুলব না [Angered, China says will never back Bangladesh jute sector]। যদিও একটা নতুন ও অখ্যাত পত্রিকা [বিজনেসইনসাইডার-বিডি] ছাড়া আর কোথাও এই খবরটা দেখা যায় নাই। অথচ এক মাস আগেও চীনা উদ্যোক্তারা নাকি বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের শীর্ষে ভীড় করেছে তাই যৌথ বিনিয়োগে সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ-চীন বলে রিপোর্ট দেখছিলাম আমরা।

    আবার এর পরপরেই আসে আরও প্রকাশ্য বিরোধের খবর। বিবিসি বাংলার এক রিপোর্টে পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্পের চীনা ঠিকাদারকে বিল পে না-করা নিয়ে সরকারের সাথে এক বড়সড়-বিরোধ আমরা জানতে পারি। ঠিকাদার যখন বিল না পাওয়ার অভিযোগে বিবৃতি দিয়ে কাজ বন্ধ করে এটা খুবই অস্বাভাবিক কিন্তু চরম বিরোধের আভাস দেয়। অভিজ্ঞতা বলে, সাধারণত এটা দেনাপাওনার কিন্তু মারাত্মক বিরোধ।  তখন থেকেই অনুমান বেড়ে চলছিল, এটা আবার চীনের থেকে বাংলাদেশের অনেক দূরে চলে যাবার ইঙ্গিত হয় কি না!  মনে হচ্ছে সেসব অনুমানের সঠিকতাই প্রমাণ করতে যেন জয়শঙ্করের আগমন! এখানেই জয়শঙ্করের এই সফরকে ঠিক মোদীর সফরের আগমনবার্তার বাহক যতটা না, এর চেয়ে বেশি এটা জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ ট্যুর মনে হচ্ছে! কিন্তু ‘কানেকটিভিটি’ এই আজিব শব্দ কেন?

    বাংলাদেশের জন্য এক ক্ষতিকর শব্দ ‘কানেকটিভিটিঃ’
    ভারতের হাতে ব্যবহৃত বহুরূপী শব্দ এই “কানেকটিভিটি”।  একেক সময় ভারত একেক ধান্দায় এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু কমন দিকটা হল এটা বাংলাদেশের জন্য সবক্ষেত্রেই এক মারাত্মক ক্ষতিকর শব্দ হয়েই থেকেছে। মজার কথা হল, গত ২০০৯ সালে এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এই শব্দটা বাংলাদেশে পরিচিত শব্দটা ছিল না। তখন মানে ২০০৯ সাল থেকে সুনির্দিষ্ট করে এই শব্দের অর্থ ছিল – ভারতের পুরা নর্থ-ইস্টকে বাংলাদেশের পশ্চিমে, পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংযোগ করে দেয়া (এটাই কানেকটিভিটি) এবং সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে এবং বিনাপয়সায় গড়ে দেয়া। আর সেটা আকাশ, রেল, সড়ক, মাটির নিচে পাইপ লাইনে, বিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে এবং নদী ও সমুদ্রপথে- সম্ভাব্য প্রায় কিছুই বাদ না রেখে।

    সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হলো, আমাদের মন্ত্রীরাও ‘কানেকটিভিটি’ ‘কানেকটিভিটি’ বলে বেড়াতেন (সবচেয়ে বেশি বলতেন দীপুমনি যখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এমনকি কেউবা (প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা) করিডোর সুবিধায় দেওয়া সার্ভিসের অর্থ বা ভাড়াটাও “চাওয়া লজ্জার” বলে দাবি করেছেন। অথচ ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের সাথে যুক্ত সব কিছুই ছিল চরম একপক্ষীয়ভাবে ভারতের চাহিদাপূরণ এবং তা বাংলাদেশের ক্ষতি ও নিজেদের অসুবিধা করে হলেও। আর এবার  আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত পরশু সফরে এসে আবার জয়শঙ্কর ‘কানেকটিভিটির’ গান! সেই শব্দ আওড়াতে শুরু করেছেন। কেন?

    এবার নতুন কী চানঃ
    এবার জয়শঙ্কর নতুন কিছু চাচ্ছেন কিন্তু যার সাথে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটার আসলে আবার কোনই সম্পর্ক নেই। যেমন ‘প্রথম আলো’ প্রথম দিনই মানে ৪ মার্চেই যে রিপোর্ট করেছে – তাতে সে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটা নতুন কিছু আভাস পাবার মত করে, সে কথাই লিখেছে। যেখানে বাংলাদেশের অন্য মিডিয়ারা কিছু তেমন লিখে নাই বরং উপেক্ষা করে গেছে। হয়ত বুঝে নাই বা টের পায় নাই কিছু বলে।  প্রথম আলো জয়শঙ্করের মুখভাষ্যে লিখেছে, “এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে আমরা একসাথে কাজ করছি না। যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ৫০ বছর পার হয়েছে এবং পরের ২০ বছর কী করা যেতে পারে, আমি বলব সংযুক্তি (‘কানেকটিভিটি’)। আমাকে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী উদ্ধৃত করে বলেছেন যে, সংযুক্তি হচ্ছে উৎপাদনশীলতা। যদি আমরা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি ঠিকমতো করতে পারি, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর খুব কার্যকর। আমরা দুই পক্ষই বিশ্বাস করি, এটি করা সম্ভব”।
    প্রথম আলো আরো লিখেছে, “সংযুক্তি প্রসঙ্গে এস জয়শঙ্কর বলেন, আজকের বৈঠকের বড় একটি সময় তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয়পক্ষকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়েও তারা আলোচনা করেছেন। সম্ভাব্য দেশ হিসেবে জাপানের নাম এসেছে। কারণ, জাপানের সাথে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের সম্পর্ক যথেষ্ট ভাল। বঙ্গোপসাগরে জাপানের সংযুক্তি প্রকল্প রয়েছে। সম্পর্কোন্নয়নে তিনি সংযুক্তিকে বড় লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেন”।

    প্রথম কথা হল, ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের আড়ালে এতদিন ভারত যেভাবে তার নর্থ-ইস্টকে ভারতের বাকি অংশের সাথে কানেক্ট বা যুক্ত করা – এটাই এর মূল অর্থ এবং ভারতের চরমতম একপক্ষীয়ভাবে সুবিধা নেওয়া। এবং এই কানেক্ট করা মানে  সব মাধ্যমে একপক্ষীয় সুবিধায় বিনাপয়সায় জুড়ে নিয়েছে, এর অর্থ সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবারের ‘কানেকটিভিটি’ শব্দ দিয়ে আরও অন্য সুবিধা চাচ্ছে ভারত। তাই এবারের সাথে আগেকার ‘কানেকটিভিটি’ অর্থের কোনো মিল নাই। দ্বিতীয়ত, এর সাথে কথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ জাপানের সম্পর্ক কী? এর ন্যায্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা কী? জাপানকে কেন আনতে হবে? তা জয়শঙ্কর এর কোন ন্যায্যতা বা সাফাই দেখাতেই পারেন নাই।
    আসলে “জাপানের কথা” তাকে আনতেই হবে। আর এটাই ছিল তাঁর এই সফরের মুখ্য কিন্তু পরোক্ষে ও পিছনে রেখে দেয়া উদ্দেশ্য।  কিন্তু দেখা যাচ্ছে, খুব একটা হোমওয়ার্ক  করে এরপর প্রসঙ্গটা তিনি আনেন নাই। পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে, উদ্দেশ্যটা খুব একটা ‘স্বচ্ছ’ না। কিন্তু স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলেও হোমওয়ার্ক করে আসতে কোন অসুবিধা থাকার কথা না।  তবে সারকথা হল, তিনি আমাদেরকে খুবই আন্ডার-এস্টিমেট করেছেন। ভেবেছেন  যথেষ্ট ন্যায্যতা-সাফাই ছাড়া এভাবে ‘তৃতীয় পক্ষ’ বলে জাপানের নাম আনা তাও আবার অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের আড়ালে চাতুরিতে – যেন এটা আমাদের কাছে খুব ইজি-গোয়িং হবে। সরি, এটা তিনি না করলে ভাল করতেন।  কানেকটিভিটির উসিলা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।  তিনি দাবি করছেন, “আজকের বৈঠকের (মানে ৪ মার্চের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনা) বড় একটি সময় তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় পক্ষকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়েও তারা আলোচনা করেছেন। সম্ভাব্য দেশ হিসেবে জাপানের নাম এসেছে”। তবে জয়শঙ্করের এই কথাটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা না যে ঐ দিনই মানে বিমান থেকে তিনি নামার পর মাত্র এক ঘণ্টার আলাপের মধ্যে এই সব আলাপ করেছেন – না এটা মেনে নেয়া গেল না। এরপর আমাদের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর হল,  – তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মন্ত্রী আমাদেরকে আগে-পরে কখনই কিছুই জানালেন না। অথচ জয়শঙ্করের মুখেই প্রথম কথাটা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কী বলতে চান বা বলেছেন জয়শঙ্কর?
    জয়শঙ্কর সম্ভবত  বলতে চান, ‘জাপানের সাথে তার কথা হয়েছে। বাংলাদেশ যেন তার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো-ঋণ চীনের বদলে জাপান থেকে নেয়।’ এ কথাটাই জয়শঙ্কর কীভাবে বলবেন বুঝতে না পেরে এটাও নাকি ‘কানেকটিভিটির’ আলাপ এই সূত্র ধরে বলতে গিয়েছেন। তাহলে জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ মানে হল, চীন বাদ আর এর বদলে জাপানি ঋণ নিতে হবে – এই অনুমান সত্য ধরে নিয়ে এবার কিছু আলাপ করা যাক।

    চীন বাদ আর এর বদলে জাপানি ঋণঃ
    এক কথায়, এটা তুলনীয় বা সুবিধাজনক নয়, তাই অকার্যকর হয়ে পড়বে। আসলে জাপান নিজেও জানে, তার সুদের হার চীনের চেয়ে বেশি। আবার অন্যদিক থেকে, জাপানের সাথে আমাদের দেশের সম্পর্ক সেই জিয়ার আমল থেকেই সব আমলেই ভাল। ওদিকে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় হারের পর থেকে আমেরিকার “ছায়ায় নিচে থেকে চলে বা চলতেই হয়” [যেমন কোন সামরিক বাহিনী না গড়ার শর্তও ছিল, জাপানে আমেরিকান আর্মি ব্যারাক স্থাপন সেই থেকে] বলে রাজনৈতিক দিকের দায়ও সব আমেরিকার। এসব জটিল দিক আছে। আবার যেমন জাপানি পণ্যের বিক্রি বাড়ানো কথা যদি ধরি।  বাংলাদেশে জাপানি গাড়ির চাহিদা বাড়াতে গেলে এখানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ অবকাঠামোর উন্নতি লাগবে। তাহলে এসব বিষয়ে বাংলাদেশে জাপানি প্রজেক্ট নিতে মানে তাতে ঋণ  দিতে জাপানকে আগ্রহী হতে হবে। জাপানের দিক থেকে এর আবার আরেক দিক আছে।  সেটা হল, এসব প্রকল্পগুলোতে জাপানই  ঋণ না দিলে তাতে জাপানি কোম্পানিগুলো সরাসরি কিংবা তাদের শেয়ার কেন কোরিয়ান কনস্ট্রাকশন কোম্পানিগুলো এ দেশে কাজ পাবে কোথা থেকে? কাজেই এসব কিছুই মিলে হল, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানি সম্পর্কের ভিত্তি। এটা বহু আগে থেকেই অনেক গভীর সম্পর্কের। কাজেই এখন জাপানি অবকাঠামো ঋণ নিতে নতুন করে  ভারতের দরকার কী?  ভারতের ভুমিকা শতভাগই আলগা গায়ে পড়া এবং অপ্রয়োজনীয়।  এখানে ভারতের ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন ছাড়া আর কী?
    আবার জয়শঙ্করও নিশ্চয় – ভারতের ক্ষেত্রেই জাপানি ঋণ পাওয়া প্রসঙ্গে এসব প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় জানেন। যেমন – অবকাঠামো খাতে জাপানের চেয়ে চীনা ঋণ ভারতেও বেশি কেন? ভারতে মোদীই সবার আগে চীনকে ভারতে ডেকে আনেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়। কারণ তুলনামূলক বেটার শর্তের বলে তিনি চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হলে পুরানা  ঋণ-গ্রহীতা সম্পর্ক কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বাড়িয়ে তুলেন। একই পর্যায়ে মোদী জাপানি ঋণে আগ্রহী হন নাই কেন?

    তাহলে জয়শঙ্কর জাপানকে চীন উপরে উঠিয়ে সে নাম প্রস্তাব করছেন কেন? কারণ, জয়শঙ্করের মনের এক বাসনা হল, এটা ভারতের চীনবিরোধী রাজনৈতিক ক্লাব (জোট) গড়ার স্বার্থ বা খায়েশ; তাই ধরেই নিলাম কোনো কথিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের আলাপ’ এটা। কিন্তু ভারতের (সাথে জাপানেরও) হাত ধরলেই কি বাইডেন – তিনি বাংলাদেশের সরকারকে কোলে উঠিয়ে জায়গা দিবেন? তাই কী!
    তাহলে বাইডেনের কাছে, যে কাশ্মিরের হিউম্যান রাইটস ইস্যু কিংবা মুসলমান নির্যাতনের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের কালো রিপোর্ট মোদীর নামে আছে যা বলাই বাহুল্য অসংখ্য কাঁটাযুক্ত, তার কী হবে? হিউম্যান রাইট নিয়ে একই অবস্থা আমাদেরও! এগুলো পাড় হবে কী করে?
    তাহলে ব্যাপারটা শুধু চীনের চেয়ে জাপানের একটু না হয় সুদের হার বেশি, তা নয় অথবা ঋণ চীনের চেয়ে কতটা বেশি দিতে পারবে সে বিষয় থাকলেও ততটুকুই নয়। আরও বড় দিক আছে।  কিন্তু এগুলোর চেয়ে বড় বিষয় হলো বাইডেনের ‘গায়ে কাঁটার’ জন্য ওর কোলে ওঠার সুযোগই নাই, এর কী হবে?

    তবে  সব কিছুর উপরে জয়শঙ্করের কথার বিরাট এক বিপদের ইঙ্গিত আছে।  কথাটা হল, “……বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি ঠিকমতো করতে পারি, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর খুব কার্যকর……”।

    এই কথার মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি মানে কানেকটিভিটি – এই অংশটাই ধরা যাক; এর মানে কী?  ভৌগলিকভাবে বললে এটা অর্থহীন কথা।  কারণ, সারা ভারতের সাথে তার নর্থ-ইস্ট ভালভাবে কানেকটেড নয়। কারণ মাঝখানে বাংলাদেশ আছে। কাজেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে কানেকটিভিটির কিছু নাই। বাংলাদেশ ভারত ছাড়াই, ভারত পেরিয়ে যাওয়া ছাড়াই আমরা বাইরের দুনিয়ার সাথে কানেকটেড; এবং তা এক নেপাল ও ভুটান ছাড়া। যা ভারত আমাদের দেয় নাই। এখাস্ন থেকে এটা কী যথেষ্ট না ভারতের কানেকটিভিটি বলে কী বুঝাতে চায়? এটা চরমভাবে সব সুবিধা এক পক্ষীয়ভাবে ভারতের নিয়ে নেয়া ছাড়া অন্য কোন অর্থ নাই।  তাহলে আগামি বিশ বছর “সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত” হতে দেখার জন্য অপেক্ষা করার কী আছে? বাংলাদেশের গত বারো বছর কী উদাহরণ হিসাবে যথেষ্ট নয়? বার বার রেললাইনে মাথা দিয়ে নতুন করে আর কী বুঝব যে মাথা কাটা যায় কিনা?  তাহলে জয়শঙ্করের “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আবার কানেকটিভিটি” কথাটার এবারের মানে কী ভারতের ভিতর দিয়ে বিদেশের সাথে সম্পর্ক করা? যার ঠোটকাটা মানে হল বাংলাদেশের ভারতেরই এক ভেসেল স্টেট হওয়া?  আর একদম খাড়া সোজা অর্থ হল, ভারতেরই একটা রাজ্য বনে যাওয়া?  যেটা আমাদের হতে বাকি আছে?

    জয়শঙ্কর ‘বঙ্গোপসাগরের’ কথা তুলেছেনঃ
    জয়শঙ্কর সেই সাথে “বঙ্গোপসাগরের” কথা তুলেছেন। সাথে ভারতের আগামি ২০ বছরের স্বপ্ন! এর আবার মানে কী? বহুদিন থেকেই জানা যায়, আমেরিকান নেভির বঙ্গোপসাগরে সেভেন্থ ফ্লিট এর স্থায়ী মোতায়েনের একটা খায়েশ আছে – এর সংশ্লিষ্ট কিছু কী হবে? ভারত কী বাংলাদেশকে বগলে রেখে আমেরিকাকে দূরে রাখার বাসনা করছে; এভাবে কী ভারত নিজেই মাতবর হওয়ার খায়েশ পুরা করবে?  আর তাতে আমরা হব দুধ ভাত অথবা গুটি? কিন্তু আমরা আগেই জানি এসব যত সম্ভাব্য চিত্রই আঁকা হোক না কেন সব চিত্রই একপক্ষীয়ই , সেটা এককভাবে কেবল ভারতের স্বার্থেই সাজানো হবে। গত বারো-চৌদ্দ বছরের য়ামাদের অভিজ্ঞতা বলে ভারতের “কানেকটিভিটি” শব্দের বাস্তব অর্থ ও পরিণতি এর বাইরে যায় নাই। আর কেউ কেউ ‘ক্ষমতায় থাকা গিয়েছে’ এই এক ব্যক্তিস্বার্থের বিনিময়েই ভারত সমর্থন হাসিল করেছে। আর সেখান থেকেই কী ভারত সাহসী হয়ে উঠে এবার আবার আরও ২০ বছরের গল্প-প্রস্তাব ফেরি করতে এসেছে!  এখনও সেসব যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।

    চার শিফটের কাজঃ
    একটু তামাশা নেয়া যাক, আলোচনা অনেক সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। জাগোনিউজ আর বাংলা ট্রিবিউন লিখছে, “ড. জয়শঙ্কর জানান, করোনাভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে ভারতের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সেখানে শিল্প কারখানাগুলোয় আগে যেখানে তিন শিফটে কাজ হতো, এখন সেখানে চার শিফটে কাজ হয়”। আল্লাহ’র দুনিয়ায় একেকটা দিন মাত্র ২৪ ঘন্টার। এর মধ্যে কারখানার শিফট করা যায় মাত্র তিনটা, আট ঘন্টা করে। তাহলে এর ভিতরে চারটা শিফট তারা কীভাবে সম্ভব করতেছে! প্রো-ইন্ডিয়ান চামচামিতেও কী কিছু লাগাম থাকা উচিত না তাই না?  দালালি আসলেই মহান ও ক্রিয়েটিভ!

    তাই আপাতত ইমিডিয়েট বাস্তবতায় ফিরে আসি। আবার যদি ধরা যাক কোনো জাদুবলে বাংলাদেশ বাইডেনের আমেরিকার কোলে উঠেই গেল? কিন্তু বর্তমান সরকার কী নিজে আমেরিকাকে আস্থায় নিতে পারবেন? কাজেই এটা শেষে আবার কিছু দিন-বছর ভারতের উদ্যোগে ফেরে আমাদের নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরানো ঘটনা হবে?  বড় বিপদই আসতেছে! যদিও মনে হচ্ছে আপাতত অপরিষ্কার অংশগুলো পরিষ্কার দেখতে আমাদের আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৬ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীনের জায়গায় জাপান হলেও দুঃখ যাবে না” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    গৌতম দাস

    ০১ মার্চ ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3oJ

    ক্ষমতার ভারসাম্য বিন্দু চীন-ভারত নয়, নেপালকেই ঠিক করতে হবে © by Hiroko Oshima/Michael Tsang

    –
    নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি (খাড়গা প্রসাদ ওলি, Khadga Prasad Sharma Oli, ) এখন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হয়েও সম্ভবত আগামী মাসের মধ্যে আর ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না। নেপালের পার্লামেন্টের আয়ুকাল আরো প্রায় দুবছর বাকি থাকা সত্ত্বেও গত ২০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী ওলি সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী এপ্রিল-মে মাসে নতুন নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছিলেন। সেই থেকে তিনি নিজেই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী থেকে নিজেকে  অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তিকালীন প্রধানমন্ত্রী করে নিয়েছিলেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিও অনুমোদন দিয়েছিল, যার মূল কারণ অনুমান করা যায় যে রাষ্ট্রপতিও নিজ দলীয় ভগ্নাংশের। কিন্তু তাতে কিছু ‘সংক্ষুব্ধ’ ব্যক্তি ও দলের প্রতিনিধিরা সুপ্রিম কোর্টে নালিশ দিয়েছিলেন। এমন মোট ১৩টি মামলার নিষ্পত্তি করে প্রায় দুমাস পরে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ কোর্ট তার রায় দিয়েছে । সে রায় হল, প্রধানমন্ত্রী ওলির “সংসদ ভেঙে দেয়া ছিল কনষ্টিটিউশন লঙ্ঘন” [……house dissolution as an unconstitutional act,]। এছাড়াও তাই, আগামি ১৩ ওয়ার্কিং ডে-এর মধ্যে সংসদ পুনরুজ্জীবিত করে আবার চালু বা বসাতে হবে।
    এতে এখন এই নতুন পরিস্থিতিতে ওলিকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ মানে – সংসদে তাঁর ইমপিচমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। কারণ ওলির মিলিত কমিউনিস্ট দল আগেই তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে দলের সভাপতির পদ থেকে তাঁকে অপসারিত করে রেখেছে। সে জায়গায় দলের নতুন কো-সভাপতি মাধব কুমার নেপাল (মাধব আগে অ্লির দলের সেক্রেটারি ছিলেন)।  “দলের সেন্ট্রাল কমিটিতে ৪৪৬ জন সদস্যের মধ্যে ৩১৫ জনই মাধবের পক্ষে” ভোট দেন”।
    এখন সংসদ নতুন করে বসলে প্রথম ইস্যু প্রধানমন্ত্রী ওলিকে অনাস্থা ভোট সামলাতে হবে। যেখানে তাঁর হেরে যাবার সম্ভাবনাও খুবই বেশি। আর এই ব্যাপারটা ফয়সালা হবার পরই দলের অপর অংশের নেতা (প্রাক্তন মাওবাদী) পুস্প কমল দাহাল প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কিনা তা নির্ভর করছে। এদিকে গত নির্বাচনে (২০১৭ ডিসেম্বর) (অলি ও দাহাল) তাঁদের  দুই  নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি এক হয়ে লড়েছিল ; তবে একদলে মিশে যাবার প্রক্রিয়াও শুরু করে। ঐ নির্বাচনে নেপালের ২৭৫ আসনের সংসদে তারা পেয়েছিল ১৭৩ আসন। দলে অলিকে সভাপতি পদ থেকে অপসারণের পরে এখন দলে দাহাল-মাধব এর যৌথ প্রভাব দলের মধ্যে কতটা এরই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, কার্যত নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গেলেও আইনিভাবে সংসদে এটা এখনও একটাই দল হয়ে আছে।  এই পরিস্থিতিতে চীন ও ভারত উভয়েই নেপালের রাজনীতিতে প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

    গ্লোবাল নেতৃত্ব কী জিনিষঃ
    “গ্লোবাল নেতৃত্ব”- এই বিষয়টি এমনিতেই দুনিয়াতে সবসময় হাজির ছিল এমন ফেনোমেনা নয়; ফলে সেই ‘গ্লোবাল” নেতৃত্বের মধ্যে আবার একালে কোনো ‘পালাবদল’ আসা – এটাও বারবার ঘটে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও, ‘গ্লোবাল’ বলে বা ‘দুনিয়াজুড়ে’ কোনো একক বা দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক প্রভাব বলে কিছু ছিল না। তাও রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রভাব এ দুটোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রভাব সবসময় আগে আসে। আর তাকে ফলো করে রাজনৈতিক প্রভাবও হাজির হয়ে থাকে।
    যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) আগে দুনিয়াতে ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ বলে কিছু ছিল না। যদিও কলোনি দখল করতে চায় এমন ছোট-বড় মাতবর গোটা পাঁচেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র তখনও ছিল যাদের মধ্যে শেষবিচারে প্রধান দুই কলোনিদখলদার ছিল বৃটিশ ও ফরাসি রাষ্ট্র। আর আমরা তখন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি হিসাবে ছিলাম, প্রায় ২০০ বছর। কিন্তু তবুও সে সময়ের ব্রিটিশরা গ্লোবাল নেতা বা লিডার কিনা এমন কিছু বলার কোন চলই ছিল না।
    তবে এমন কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক-রাষ্ট্রের ধারণার এরপর দুনিয়া থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে, যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৪১ সাল থেকে অবসান ও বিলুপ্তি ঘটেছিল। এটাই ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিতর দিয়ে ঘটেছিল। অর্থাৎ ‘দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর কেউ কাউকে অধীনস্থ ও কলোনি দখল করে আর রাখতে পারবে না”। এই “অবৈধ গণ্য” করার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র-সংঘের [United Nations] জন্ম। মানে, কলোনি অধীনস্থতার সম্পর্ক দুনিয়া থেকে লোপ পাবে – এই নীতিগত দিক তৈরি হয়েছিল তখন। আর তাতেই বিশ্বযুদ্ধে এই ভিত্তিতে পক্ষ-বিপক্ষ দুটো রাষ্ট্রজোট তৈরি হয়েছিল। কলোনি দখল অবৈধ – এ নীতির ভিত্তিতে যারা পক্ষজোট (এদেরকে সেকালে মিত্রশক্তি বলা হত), তারাই আমেরিকার নেতৃত্বে লড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিল। আর তা থেকেই আমেরিকা নিজেকে “গ্লোবাল নেতৃত্বের” আসনে বসাতে সমর্থ হয়েছিল।
    তবে বিশ্বযুদ্ধে বিজয়লাভের সাথে আমেরিকার হাতে গ্লোবাল নেতৃত্ব এসে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল – আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা। যদিও সেই বিনিয়োগের সুযোগ হাতে পেতে আগে আমেরিকাকে আরো দুটো বড় খরচের দায় নিতে হয়েছিল। এক. নিজ পক্ষজোটের সবাইকে যুদ্ধের খরচ বা ব্যয়ভার জোগানো; আর দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের পর, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ-বিপক্ষ সব রাষ্ট্রকেই ত্রাণ, পুনর্বাসন ও ভেঙে যাওয়া অবকাঠামোগুলো আবার গড়ে দেয়া ইত্যাদিতে নতুন বিনিয়োগ-ঋণ দেয়া। এটাই ১৯৪৪ সালে জন্মের পরে বিশ্বব্যাংকের কাজের প্রধান ক্ষেত্র হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এসব খরচ আমেরিকা কিভাবে ফেরত পাবে কিংবা তা ফেরত নাও পেতে পারে এমন সম্ভবনা থাকলেও, এদিকটা অনিশ্চিত ও উহ্য রেখেই আমেরিকা এই বিপুল খরচ শুরু করতে হয়েছিল; যা পরে কমবেশি উসুল হয় অবশ্য। কিন্তু তাতেই আমেরিকার ‘সবচেয়ে বড় পাওনা’ দুনিয়ার গ্লোবাল নেতৃত্ব নিজের হাতে চলে আসা। আর সেই থেকে দুনিয়ায় ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ ধারণাটাও প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।
    আরেক দিক থেকে দেখলে, গ্লোবাল নেতৃত্ব কথাটার তাৎপর্য কী? একেবারে ‘রূট’ মানে গোড়ার দিকে তাকিয়ে বললে এটা সোজাসাপ্টা এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আর ক্যাপিটালিজম মাত্রই এর ভেতরে গ্লোবাল হয়ে উঠার স্বভাবটা সবসময় সুপ্ত থাকে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যা ব্যাপ্তি লাভ করে ছেয়ে বসে। এতে ছোট ছোট পকেট বা ছোট-বড় আঞ্চলিক ক্যাপিটালিজমের উদ্যোগ ও ফেনোমেনাগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে পড়ে; যা পরবর্তিতে এক গ্লোবাল ক্যালিটালিজমের রূপ ধারণ করে বিকশিত হয়ে উঠতে চায়।

    এ কারণে ‘কলোনি শাসন অবৈধ’ হয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জয়লাভ কথাটার ব্যবহারিক মানে হয়ে যায়, যুদ্ধ শেষে কলোনিমুক্ত শ-দেড়েকের বেশি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় আমেরিকার বিনিয়োগ-ক্রেতা। এমন হবার পিছনে আরও বড় ফ্যাক্টর ছিল। যেমন, এসব রাষ্ট্র স্বাধীন-মুক্ত হলেও এতদিন কলোনিদখল লুটেরাদের অধীনে থাকায় উদ্বৃত্ত-সম্পদ সব কলোনি মালিকের দেশ লুটে নিয়ে যাওয়ায় এরা স্বাধীনরাষ্ট্র হবার পরেও অর্থনৈতিকভাবে এরা একেবারে ফোকলা। এ’অবস্থা থেকে আবার বেঁচে সক্রিয় হয়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রধান প্রয়োজন ছিল বাইরের বিনিয়োগ-ঋণ, যেটা হতে পারে লুট হয়ে যাওয়া সারপ্লাসের সবচেয়ে ভাল এভেলএবল বিকল্প। এরই স্টোর ও সাপ্লায়ার হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আমেরিকা। কাজেই প্রথমবারের গ্লোবাল নেতৃত্বে ‘আমেরিকা’ কথাটার তাৎপর্য হয়ে উঠেছিল এই যে, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর আমেরিকান নেতৃত্ব গ্লোবাল সিস্টেম থেকে বিনিয়োগের পুঁজি-পণ্য নেয়া্র এক নতুন সম্পর্কে জড়ানো। তবু আরও কিছু কথা পরিষ্কার রাখা ভাল। কলোনি-উত্তরকালে আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের সাথে আমাদের মত দেশের গভীরভাবে পণ্য-পুঁজি বিনিময় সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া – এ সম্পর্কটাও আগেকার কলোনি দখল হয়ে থাকা সম্পর্কের চেয়ে অবশ্যই তুলনায় ভাল কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে তা হলেও এটাও অসম; এক অসম বিনিময় সম্পর্ক। কিন্তু অবশ্যই তুলনামূলক অর্থে নতুন সম্পর্কটা বেশি ভাল, কলোনিসম্পর্কের চেয়ে ভাল; ‘মন্দের মধ্যে ভাল’ অর্থে।

    সমাজতন্ত্রী বনাম গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমঃ
    কিন্তু সমস্যা দেয়া দিয়েছিল অন্যখানে। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে এবার আমরা কি ‘কথিত সমাজতন্ত্রী’ হবো নাকি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ হবো? মানে পরেরটা অসম বিনিময় সম্পর্ক হলেও তুলনামূলক ভাল বলে এই অসম বিনিময় সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারব এমন সুযোগ হাজির হয়েছিল। সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ্টাই হয়ে পড়েছিল পরের দীর্ঘ চার দশকের ‘সমাজতন্ত্রী’ হওয়া না হওয়ার দ্বন্দ্ব। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর চীন ষাটের দশক থেকেই ক্রমশ ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজম’ – এভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাথে যুক্ত হওয়ার পথ নেয়ায় আমাদের মত সব রাষ্ট্রের জন্য পথ বেছে নেয়া সহজ হয়ে যায়। ফাইনালি আমরা সবাই এখন আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ – আমরা এটা পছন্দ করি আর নাই করি। আর এটা অসম বিনিময় সম্পর্কের হওয়া সত্ত্বেও ‘মন্দের ভাল’ বলে, এভেলএবল পথ বলে। অর্থাৎ কলোনি-উত্তরকালে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক সিস্টেমের অংশ হয়ে উঠার পথটাই অন্তত আপাতত টিকে যায়, প্রধান ধারা হয়ে যায়।
    তবে ইন্টারেস্টিং দিকটা হচ্ছে, সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থার রাষ্ট্রগুলো ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকাই ছিল না। তারা নিজ গুণ বা দোষেই ভেঙে পড়ে অকার্যকর হয়ে গেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত একমাত্র যা করলে সবারই টিকে থাকা সম্ভব হবে, অর্থাৎ সারভাইবাল কোন রকমে নিশ্চিত করা ছিল সবার কাছে সবার উপরে একেবারেই মুখ্যবিষয়। এছাড়াও আর সবার চেয়ে বড় কথা – সমাজতন্ত্রীদের বড় বড় খামতির দিক তো ছিলই। যেমন – গ্লোবাল বাণিজ্য বা দুনিয়াজুড়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা লেনদেন বিনিময় ব্যবস্থা হাজির থাকা আদৌ এসেনশিয়াল কি না এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে মৌলিকভাবে এখনো একেবারেই বেখবর হয়ে আছে সমাজতন্ত্রীরা। ইস্যুটাই কানে ঢুকে নাই এখনও এমন অবস্থা!

    গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলঃ
    এদিকে এই শতকে এসে প্রায় সত্তর বছর চলার পরে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে  এবং ঢলেও পড়ছে। তাই গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল আসন্ন এই বাস্তবতা প্রায় সবাই মেনে নিয়েছে।  কিন্তু কেন আমেরিকা ঢলে পড়ল? আগামী ঐতিহাসিকরা সম্ভবত মূলত এর দুটো কারণ উল্লেখ করবেন। এক. আফগানিস্তানঃ  এই রাষ্ট্র আমেরিকার সাথে যে তুলনায় অযোগ্য ও অবিকশিত একথা তুচ্ছভাবে  বলতে পারেন অনেকেই। কিন্তু আমেরিকার এই ঢলে পড়া বা পতন ঘটানোর অন্যতম ‘হিরো’ তবু এই আফগানিস্তান। সে একটাই কাজ করেছে। তা হল, আমেরিকাকে সে এমনই ‘নেভার এন্ডিং’ এক অনন্তযুদ্ধে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে নিয়ে গেছে যে এখান থেকে বের হবার পথ নাই ফেলে পালানো ছাড়া। আর তাই ঘটেছে। শুধু তাই না ওদিকে এতে, যুদ্ধের নিজখরচ জোগানোর সামর্থ্য গ্লোবাল নেতা আমেরিকার অর্থনীতির আর নাই। মনে রাখতে হবে, ২০০৮ সালের যেটা ‘গ্লোবাল মহামন্দা’ বলে জানি আমরা, যেটা দেখা দিয়েছিল ১৯৩০ সালের প্রথমটার পরে দ্বিতীয় বড় মহামন্দা বা রিসেশন [global recession]। ২০০৮ সালের মহামন্দার মূল কারণ কিন্তু যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে ফেল করা আমেরিকান অর্থনীতি। শেষে ওবামা প্রশাসনের ১০ হাজার বাদে (২০১১-১৪) সব সেনা ( অন্যান্য দেশেরসহ ন্যাটোর সেনাও) ফিরিয়ে আনার প্রধান কারণ এই ফেইল্ড অর্থনীতি। অথচ এই যুদ্ধে গিয়ে বলার মত কোন কথিত “লক্ষ্য” অর্জনও করতে পারে নাই।
    এছাড়া আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, পাশাপাশি চীনের উত্থান; ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজমের’ চীন – এর কাছে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারানো।

    গ্লোবাল নেতা মানে কোন সামরিক সক্ষমতার ধারণা নয়ঃ
    একটা বড় ভুল ধারণা আবার ভেঙ্গে দেই। অনেকের মানে সাধারণ মানুষসহ অনেক আমেরিকান দ্বিজ্ঞজদেরও ভুল ধারণাটা হল, “গ্লোবাল নেতৃত্ব” মানে বুঝি সামরিক শক্তির সক্ষমতা। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে গেলে প্রধান শর্ত হল বিপুল পরিমাণে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ব বা সারপ্লাস জেনারেট করার স্তরে নিজ অর্থনীতিকে পৌছানো আর তাতে ঐ উদ্বৃত্ব মানে অন্যদেশে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষমতা নিজ হাতে আসা। এতে অন্য সবদেশের প্রায় সবকিছুকে প্রভাবিত করার বিপুল ক্ষমতাধারী হয়ে উঠা – এটাই গ্লোবাল নেতৃত্ব।  বলা বাহুল্য এর ফলে এটা নিজ দেশকেও সামরিক, রাজনৈতিক দিক থেকেও প্রভাবশালী করে গড়ে তোলা ও উঠার কারণ হয়ে যায়। অর্থাৎ গ্লোবাল নেতৃত্ব-এর স্তরে পৌছানোটা একটা বৈষয়িকভাবে হয়ে উঠার বিষয় যা রাজনৈতিক নয় বা সামরিকও নয়।  যেমন, আমেরিকার এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সামরিক সক্ষমতার ধারক। কিন্তু তা দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানোতে আমেরিকা যোগ্য না।

    চীনের নেতা হিসাবে উত্থান, এটাকেই ‘গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল’ বলা হচ্ছে। নেপালসহ আমাদের মতো রাষ্ট্র বিশেষত যাদের দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতকে সাথে নিয়ে বসবাস, তাদের জন্য এই ‘পালাবদল’ এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

    চীনের সাথে ভারতের নাম কেন?
    আবার চীনের সাথে ভারতের নাম নেওয়ার মানে এই নয় যে ভারতও অর্থনীতিতে কিছু একটা হয়েছে, তা নয়। ভারত এখনও বিপুল সারপ্লাস জেনারেট করা বলতে যা বুঝায় তেমন কোন আলামতের দেশই নয়। বরং বিনিয়োগ-ঋণ গ্রহীতা দেশ। সেই বিচারে বাংলাদেশ  লেবার রপ্তানি আর গার্মেন্ট বেঁচে ওর থেকে অর্থনীতিতে (এত চুরি আর পাচারের পরও) ভাল অবস্থায়। তাহলে ভারতের এমন শো-আপের পিছনের মুল কারণ কী? সেটা হল, বুশ প্রশাসনের শেষে আর ওবামা প্রশাসনের শুরুর সময়ে এক আমেরিকান সরকারি স্টাডি থেকে আমেরিকা নিশ্চিত হয়ে গেছিল যে “চীন আসছেই”। কিন্তু একটা শয়তানি উদ্যোগ তারা নিয়েছিল – ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” [China Containment] কাজে ঠিকা দিয়ে নামানো। যদিও এখন সবাই মানে তা কোনই ফল দেয় নাই; আমেরিকার ভারত চীনের উত্থানকে ঠেকাতে পারে নাই। কারণ তা যায় না বলে বাস্তবেও তা এখন প্রমাণিত। তাই গত ট্রাম্পের আমলেই আমেরিকার ভারতকে দেয়া আগের সব সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে ভারতের – “আমিও প্রভাব বিস্তার করতে পারি”, বা এশিয়ায়  আমারও “প্রভাবাধীন এলাকা” আছে ধরণের মুই কী হনুরে – এই ফলস ক্লেইম ও স্বপ্নের জামা পড়ে ভারত সেই থেকে এখনও ঘুরে বেড়ায়।

    এ’পরিস্থিতি ঠিক কী প্রকৃতির, অভিমুখ কী, সম্ভাবনা কী, নেতিবাচক দিক কী ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা খুবই জরুরি। যারা এর ঠিকঠাক বোঝাবুঝি-মূল্যায়নে সফল হবেন ও এক্ট করতে পারবেন, কেবল তারাই টিকে যাবেন। আর বাকিরা এ পালাবদলের সাথে সাথে টিকতে না পেরে এর ধাক্কায় হারিয়ে যা্বার সম্ভাবনায় থাকবে। আবার এ পরিস্থিতিতে চীন নিজেই নিজের যোগ্যতা বা ঘাটতি অথবা ইতি ও নেতি দিক সবটা বোঝে- এ্টাও সবটা সত্যি নয়। সবচেয়ে বড় কথা চীন বড়জোর কেবল গ্লোবাল অর্থনৈতিক দিকের (রাজনৈতিক দিকের নয়) নেতা হতে পারে। আর ঠিক ততটাই আমেরিকার তুল্য বিচারে গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতা হওয়া – এক্ষেত্রে চীন এখনো অযোগ্য। চীনের বিরাট দুর্বলতা হল, ‘মাস পাবলিক’ মানে আম-জনগণের সাথে উপস্থিত চীনা-রাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনও একেবারেই কোন ‘রাজনৈতিক সম্পর্ক’ নয়। কারণ, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চোখে – মানুষ মানে, এখনো অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান ইত্যাদি বৈষয়িক চাহিদার একটা ‘ডিব্বা’ মাত্র। যেন মানুষ মানেই এক বৈষয়িকতা, বিষয়সম্পদের চাহিদা মাত্র। আর এই ধারণার কারণে  তাদের কাছে “রাজনৈতিকতা (Polity), স্পিরিচুয়ালিটি” – এগুলো অনেক অনেক দূরের এবং অজানা জিনিস। কাজেই এই চীন দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিবে কিভাবে? যদিও গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা সে নিশ্চিত হচ্ছেই!

    সুনির্দিষ্ট করে নেপালঃ
    একটু পেছনে ফিরি ও সুনির্দিষ্ট করি নেপালকে ঘিরে। নেপাল নিয়ে অনেক হিস্টোরিয়ান গর্ব করে থাকেন যে, নেপাল কখন কলোনি শাসনে যায়নি। এ ক্ষেত্রে সমতুল্যভাবে আমরা বলতে পারি, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতেও সাথে ৫৫০টারও বেশি ‘করদরাজ্য’ (প্রিন্সলি স্টেট বা Princely states)  ছিল যারা পালনীয় কিছু শর্তসাপেক্ষে ‘স্বাধীন’ রাজা ছিল বলে দাবি করত। নেপালও প্রায় সে রকম আসলে এক রাজার প্রিন্সলি স্টেট। ঠিক যেমন বৃটিশ আমলে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ছিলেন। আর ঐ ধরনের করদ-চুক্তিতে যা থাকত তা হল, রাজা যা খাজনা-রাজস্ব সংগ্রহ করবেন এর একটা অংশ ব্রিটিশদের দিয়ে যেতে হবে রেগুলার। আর ব্রিটিশরা ছাড়া অন্য কোনো বিদেশী শক্তির সাথে সম্পর্ক বা যোগাযোগ করতে পারবে না; এমনকি বাণিজ্যিক সম্পর্কও স্থাপন করতে পারবে না। বাইরে থেকে অস্ত্রও কিনতে পারবে না। তবে তাদের প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে নয় রাজার নিজের হাতে রেখে পরিচালিত করতে পারবে; তবে ব্রিটিশদের থেকে রাজারা নিজ প্রশাসক স্টাফদের জন্য ট্রেনিং বা এধরণের অন্যান্য সহায়তা পেতে পারবে। কাজেই এই ‘করদ’ সম্পর্ককে কখনও “কলোনি হয় নাই” বলে কথার ফুলঝুরি সাজানো অমূলক ও অপ্রয়োজনীয়।
    নেপালের ক্ষেত্রে আরও যা ‘বিশেষ ছিল’ তা হল, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় তারা বৃটিশ শাসকদের সহায়তায় পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। বিনিময়ও পেয়েছিল ভালই। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নেপালি গোর্খা সৈন্য দিয়ে সহায়তা করায় বাড়তি কিছু ছাড় পেয়েছিল। যেমন ভূমি ছাড় (মাধেসি অঞ্চল ফিরে পাওয়া), বাইরের দেশ থেকে অস্ত্র কেনা ইত্যাদিসহ ১৯১৫ সালের সুগৌলি চুক্তি,  ১৯৬০ সালের চুক্তিতে “তরাই অঞ্চল” ফেরত পাওয়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করায় আরো ছাড় দেয়ায় সর্বশেষ ১৯২৩ সালের চুক্তি। তবে ঐ ১৯২৩ সালে চুক্তিতে লেখা ছিল যে, এটা ১৯৫০ সালে আবার রিভিউ হবে। আর তত দিনে স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবার নেপালের সাথে আগের চুক্তির আদলেই ১৯৫০ সালের চুক্তি করেছিলেন। সেটারই মূল কথা হল, ভারতের অর্থনীতি ও ব্যবসার অধীনে থেকে একটা নেপালি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। যেমন ভারতের অনুমতি ছাড়া এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ছাড়া নেপালের বিদ্যুৎ বিদেশে (যেমন বাংলাদেশে) নেপাল বিক্রি করতে পারবে না। আর নেহরু এ ধরনের চুক্তির ড্রাফটটা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আমলের ১৯২৩ সালের চুক্তি থেকে। এটাই হল ‘কলোনিমুক্ত নেপাল’ এমন ফলস গর্বের নমুনা। তাই স্বভাবতই নিজেদের প্রটেকশনের জন্য নেপালের রাজশাসকেরা এই নেহরু বা ভারত-অনুরক্ত এক নেপালি রাজতন্ত্র গড়তে খুবই আগ্রহী হয়ে থেকেছিলেন। আর এটাই ছিল নেপালে ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হওয়া মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের মূল কারণ। আর যেখানে অন্যান্যের সাথে ঐ আন্দোলনের প্রধান দুই দাবি ছিল – রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নেপালকে ‘রিপাবলিক’ ঘোষণা আর এই ১৯৫০ সালের চুক্তি বাতিল (রিভিউ) করতে হবে।
    যদিও ঐ আন্দোলন শেষে অন্যান্য দলের সাথে মিলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছিল। আর এই ক্ষমতা দখলের মধ্যে ২০০৭ সালেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন সম্পন্ন হয়েছিল। পরে রাজতন্ত্র উতখাতের স্বপক্ষে আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন হয়েছিল নেপালের প্রথম কনস্টুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরে। সেই অ্যাসেম্বলিতে ২০০৯ সালে। আর রিপাবলিক নেপালের কনস্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি এবং প্রকাশ্যে বিরোধিতা ও অসহযোগিতা শুরু করেছিল ভারত। এমনকি ল্যান্ডলকড যে নেপাল ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া কিছু আমদানি করতে পারে না, অখুশি ভারত এরপর দীর্ঘ ছয় মাস ভারতের ওপর দিয়ে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অবরোধ করে রেখেছিল। নেপালে ব্যবহার্য রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ সব ধরনের জ্বালানি ভারত সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও তা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর এতেই সারা নেপালের সব শ্রেণীর মানুষই নিজ নিজ স্বার্থে ও কারণে প্রবলভাবে অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে উঠেছিল। কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে আকৃষ্ট হওয়ার চেয়েও নিজ নিজ বৈষয়িক ও সারভাইভালের স্বার্থেই তারা হয়েছিল। যেটা এখনও মনমজ্জায় প্রবেশ করে যাবার মত যে এখনও তা প্রবল!

    নেপালের রাজনীতিতে চীনের প্রবেশঃ
    চীন নেপালের রাজনৈতিক আসরে এই প্রথম প্রবেশ করেছিল তখনই, এই ২০১৫ সালে। কারণ ল্যান্ডলকড নেপালের জনগণ নিজ দেশের বাইরে যেতে ভারতের ভূমি পেরিয়ে বাইরে বের হবার বিকল্প খুঁজছিল। ভারত নেপালের এক উত্তর দিক বাদে বাকি সবদিকজুড়েই।

    আর পুরো উত্তরাংশজুড়ে চীন-সীমান্ত হলেও তা আরো পাহাড়ি উচ্চতায় এবং দুর্গম বলে কখনো একে তেমন বিকল্প বলে ভাবা হয়নি। কিন্তু একালে চীনা উত্থানের যুগে চীনা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় হেভি-ডিউটির রেলযোগাযোগ যুক্ত হয়েছে যেটা সমুদ্রবন্দরের সাথেও যুক্ত এমন উন্নত। কিন্তু নেপাল সীমান্তের সবচেয়ে কাছাকাছি চীনের এমন রেলপথটাও নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে দিয়ে চলে গেছে। এতে প্রমাণ হয় নেপালকে নিয়ে চীনের আগ্রহ কেমন কোন সূদুরে ছিল! তবে চীন সম্প্রতি এই ১০০ কিলোমিটার রেলপথ এক্সটেন্ড করে নেপালকে বহির্বিশ্বের সাথে কানেক্ট করে দিয়েছে। যেটা নেপালের কাছে বিরাট কিছু, এক অতুলনীয় বিকল্প।

    কিন্তু সারা নেপাল অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে ফুঁসে উঠার সেই কালেই নেপালে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার শর্ত ওলির কমিউনিস্ট পার্টির টার্ম আসে আর এতে দলের পক্ষে ওলি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসেন। আর তাতে, এন্টি-ইন্ডিয়ান সেই পপুলার সেন্টিমেন্ট  ভাসা নেপালকে জনগণের পক্ষে সফল ব্যবহার করেন ওলি, একজন মাস পপুলার লিডারের যা করা উচিত সেভাবে। মূলত ওলি বা তার দল সবসময়ই নামকাওয়াস্তেই শুধু কমিউনিস্ট ছিলেন, কাজে নয়। যেমন রাজতন্ত্রী নেপালের যুগে নেপালে রাজনৈতিক দল বলতে সবাই  রাজতন্ত্রকে মেনে চলা রাজনৈতিক দল।  যে রাজতন্ত্র মেনে চলে সে কেমন কমিউনিস্ট তা তো বুঝাই যায়। এরাই রাজ-সরকারের মন্ত্রী থাকার লোভে রাজার মন জুগিয়ে চলা দল হয়ে কাজ করত। এমন প্রথম চামচা ছিল নেপালি কংগ্রেস দল, আর পরেরটা হল ওলির কমিউনিস্ট দল (CPN (UML))। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওলি পপুলিজম বোঝেন বলেই সেসব পিছনে ফেলে ২০১৫ সালে পপুলার নেতা হয়ে যান। তিনি মাওবাদী দলের নেতা পুষ্প কমল দাহালের (মাওবাদী সশস্ত্র দল হয়ে থাকার সময় তাঁর নিকনেম ছিল ‘প্রচণ্ড’) চেয়েও পাবলিকলি পপুলার। তাই সবমিলিয়ে  ইতোমধ্যে ভারত যতই নেপালের চোখে অনিষ্টকারী হয়ে উঠেছিল, চীনা সরকারের সাথে দুই কমিউনিস্ট দলেরই ঘনিষ্ঠতা ও ওয়ার্কিং রিলেশন ততই ঘন হতে থাকে। এমনকি ট্রাডিশনাল নেপাল কংগ্রেস দলও তখন ভারত থেকে দূরত্ব মেনটেন করত। এ দিকে নেপালের ২০১৭ সালের নভেম্বরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবে চীনা নেতারা পরামর্শ দিয়েছিলেন ওলি [সিপিএন-ইউএমএল ] ও দাহালের [সিপিএন (মাওয়িস্ট সেন্টার)] এ’দুই কমিউনিস্ট পার্টিকে একদল হয়ে নির্বাচন করতে। তাতে ঐ নির্বাচনী ফলাফল খারাপ হয়নি। তারা প্রায় দু-তৃতীয়াংশ আসন (১৭৩ / ২৭৫) লাভ করে তাতে ভারত বা নেপালি কংগ্রেসকে আরো ক্ষুদ্র বানিয়ে ফেলেছিল।

    মূল সমস্যার গোড়া ওলি নিজেইঃ
    কিন্তু সমস্যার গোড়াটা ছিল অন্যখানে। প্রথমত, মাওবাদী দাহালের নিজদলের আজন্ম দুর্বলতা বা খারাপ কপাল হল – এক. ২০০৯ সালের নির্বাচন ছাড়া আর কখনোই পপুলার ভোটের বেলায় দাহালের দল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। সবসময় তৃতীয় স্থানে থেকে গেছে। অথচ ভারতের চরম বিরোধিতা অসহযোগিতা সত্ত্বেও  ওলির দল, নেপালি কংগ্রেস ও নিজ দলকে একসাথে রেখে দাহাল পরিস্থিতি মোকাবেলার অর্থে মুখ্য ভূমিকাটা পালন করে গেছিল। দাহাল দল বা রাজনীতির জন্য খুবই ভাল সংগঠক, বিশেষত বভন্ন মতবিরোধের মধ্যেও একসাথে কাজ করে লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে।  কিন্তু পাবলিক ইমোশন হ্যান্ডলিংয়ে ঠিক ততটাই যেন তেমন নন। দ্বিতীয়ত, ওলি ব্যক্তিত্ব হিসেবে একজন ফিউডাল লর্ডের মত। তার কাছে দল মানেই, তিনিই এতে একমাত্র ইচ্ছাদাতা, হুকুমদাতা। কিন্তু তার বড় গুণ হল, পপুলার মাস ইমোশন হ্যান্ডলিং ভালো বুঝেন ও পারেন।

    সব মিলিয়ে এখন ২০১৭ নির্বাচনের পরের দুই বছরের মধ্যে যা দাঁড়ালো তা হল, ওলি আরো দুর্দমনীয়, একক নিজ হুকুমে চলা, কোনো ফোরামের সিদ্ধান্ত বা কারো কথা না শুনে চলা ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। ওদিকে কমিউনিস্ট দুই দল মিলেমিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন বলে ওলির পক্ষের দলের সবার সাথে মিলে মিলিত দলের কমিটি গড়তে দাহাল খুবই সফল ব্যক্তিত্ব, কিন্তু ওলির দলের লোকেরাই ওলির প্রশ্নে দাহালের সাথে দাঁড়িয়ে যায়। আগে ওলির সাথে যারা ছিলেন যেমন মাধব চন্দ্র নেপাল, ঝালা নাথ কানাল বা বামদেব গৌতম সহ সবাই থাকলেও তারা এখন দাহালের পক্ষে। তাঁদের দাবি তাঁরা ওলির একগুয়েমি ও ক্ষমতা ক্কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে লড়ছেন [… They were protesting PM Oli’s monopoly in the party and government]  আর এটাই একপর্যায়ে ওলিকেই দল থেকে বহিষ্কার করে দেওয়ার অবস্থায় চলে যায়। এই বহিষ্কার ঘটেছে মাত্র তিন মাস আগে, অর্থাৎ ওলির সাথে মিলিত দলের সবার বিরোধ প্রকাশ পাওয়ারও প্রায় দু’বছর পরে।

    চীনের অতি আগ্রহঃ
    কিন্তু তাহলে, কেন এত সময় লাগল? এটাই চীনের অনুরোধের ‘ঢেঁকি গেলা’; চীনের অতিরিক্ত জড়িয়ে যাওয়া যা অযাচিত পর্যায়ের। গত ২০১৭-৮ সালের দুই কমিউনিস্ট দলে ঐক্য করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় থেকে চীন ক্রমশ একেবারেই লাগামছাড়া ভাবে নেপালের রাজনীতির হাত ঢুকাতেই থাকে।

    মাওয়ের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ”?
    যার সোজা অর্থ চীনা কমিউনিস্টরা যেমন কোল্ডওয়ারের যুগে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে থাকা চীনা কমিউনিস্ট দলের সাথে অধীনস্ত নির্দেশগ্রহিতা আচরণ ও সম্পর্ক স্থাপন করে চলত যেন সেই যুগ আবার ফিরে এসেছে। একই অবস্থা ছিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বেলাতেও। তারা আমাদের মত দেশে অর্থ ও তত্বের যোগানদার হলেও মুখ্য সবকিছুতে হাত ঢুকিয়ে বসে থাকত। আসলে আমাদের মত দেশের নেতারাই সেটা চাইত। অথচ আলাদা রাষ্ট্র মানেই আলাদা আলাদা একান্ত স্বার্থ।  নেপালের রাষ্ট্রস্বার্থ  কখনও চীনা রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। তেই পারবে না, পারে না।তাতে দুদেশেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতাসীন হলেও কোন হেরফের হয় না। হ কারণ রাষ্ট্র মানেই কেবল নিজ ভুখন্ডের বাসিন্দাদের স্বার্থ দেখা ও সবার উপরে জায়গা দেয়া। এগুলো রাষ্ট্র সম্পর্কে খুবই নুন্যতম ও বেসিক ধারণা। আদর্শের কথা তুলে রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতাকে আড়ালে ফেলা যাবে না।  কাজেই নেপাল ও চীনের দুই কমিউনিস্ট পার্টি কখনই কেউ কারও কথা শুনে অনুগত হয়ে চলতে পারে না।  এমন সম্পর্ক যদি চালু করা হয় তবে এর অর্থ হয়ে যাবে নেপাল আর আলাদা রাষ্ট্র নয়, চীনেরই এক্সটেন্ডেড কোন প্রদেশ মাত্র। কমিউনিস্টদের এমন অযাচিত ভয়ঙ্কর চর্চা সোভিয়েত পতনের পর আপনাতেই হারিয়ে গেছিল। চীন কেন সেই হারানো অভ্যাস আবার ডেস্পারেট হয়ে সামনে আনছে আমরা জানি না। কিন্তু এটা মারাত্মক বিপদজনক এবং চীনের জন্যও আত্মঘাতি। এটাকেই তো মাও “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” বলতেন! নয় কি?

     এতে বড় ভুলের এক নম্বরটা হল, একধরনের ‘কমিউনিস্ট ভাই ভাই’ অযথাই খুঁজে বের করে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়া ও রাখার চেষ্টা সুপ্ত আছে এতে। এটার ফল চীন ও নেপাল দুরাষ্ট্রের জন্যই আত্মঘাতি হতে বাধ্য। এটার প্রকট প্রকাশ আমরা দেখেছি নেপালে চীনা রাষ্ট্রদুত Hou Yanqi এর অবাধ ততপরতায়।  এছাড়া সাথে দেখা যায়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের উপমন্ত্রী গুও ইয়াজহু (Guo Yezhou) কে। প্রায়ই তাঁর কাঠমান্ডু সফরে, দুই কমিউনিস্ট অংশকে ধরে রাখতে। নিঃসন্দেহে এগুলো নেতি-ইমেজের কেলেঙ্কারি ছাড়া এ’দুই দেশকে আর কিছুই দিবে না।
    অথচ ‘চীন’ বলে যাকে আমরা দেখছি সে হল হবু গ্লোবাল নেতা যার স্বার্থ অনেক জটিল ও আলাদা। তাই ‘নট নেসেসারিলি’ নেপালের কোনো দল বা নেপালরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে মিলবেই অথবা মিল থাকাটা জরুরি। আর শেষ বিচারে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিটি দেশের মধ্যে ভারত ও চীনের যে প্রবল স্বার্থ- লড়াই তাতে এ দু’জনের যাকেই আমাদের বেশি ভালো লাগুক না কেন শেষ বিচারে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখতেই হত। এবং যেকোন পরিস্থিতিতে হতেই হবে। কিন্তু এটা থাকেনি। এতে এখন যদি নেপালি কংগ্রেস দল আমেরিকা বা ভারতের নেতাদেরকে নেপালে নিয়ে এসে দলীয় সভা শুরু করে তাহলে সেটাকে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা কি বলে বাধা দিবেন?

    অথচ পালাবদলের এই কালে যখন আরও সতর্কতা ও দুরত্ব রক্ষার অনুশীলনের দরকার ছিল।  তা বজায় রাখলে চাইলে নেপালকে চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে একটা সম-দূরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। তবেই একমাত্র নেপালের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এখান থেকেই আসে নিজ দেশের দলগুলো চীন, ভারত বা আমেরিকা এই তিন দেশের একেকটার প্রতিনিধি বা দালাল হয়ে খাড়িয়ে যেন না যায় এব্যাপারে সকল দলের সতর্কতা। এটা হতেই পারে না, এ্মনটা বন্ধ করতে হবে। দেশের দলমাত্রই সবাইকে একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের রক্ষকই হতে হবে। যদি এসব কথা উপেক্ষা করা হয় পরিণতি হবে নিজ রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পরা।

    অথচ গত দুই বছরে যতবারই অলির বিরুদ্ধে তার দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে গেছে চীন বারবার ভেতরে হাত ঢুকিয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে দেয় নাই। এটা টু মাচ, সীমা পার হয়ে গেছে। বিশেষত যেখনে ওদিকে ওলি ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী র এর প্রধানকেই প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়ে নেপালে এনেছিলেন। বুঝা যাচ্ছিল তিনি ভারতের সমর্থনে ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছিলেন।

    যদিও এক কম্বোডিয়া ছাড়া কোথায় চীন এমন করেনি। তাই দাহালের উচিত ছিল এর সমস্যার দিকটা খোলাখুলি বুঝিয়েই চীনকে নিবৃত্ত রাখা এবং এ কাজে তার অসফল হওয়ার কোন স্কোপ নাই। আবার চীনের অনুমান যে, ওলিকে বহিষ্কার করে দিলে তিনি নেপাল কংগ্রেস ও ভারতের সাথে মিলে পাল্টা সরকার গঠনসহ বিরাট কিছু করে ফেলতে পারেন- এ অনুমানও এত দিনে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। আর তা যদি হয়েই যায় তবে সেটাও নেপালের রাজনীতিকদেরই নিজেদের মোকাবিলা করতে হবে।  চীন-ভারত নয়, আগে নেপালকে নিজে বাঁচতে হবে। অন্তত একালের তিন বিদেশ রাষ্ট্র চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে দূরে এক “সম্পর্কের ভারসাম্য বিন্দু” অবশ্যই তৈরি ও মেইনটেন করে চলতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীন-ভারত নয়, নেপালের নিজে বাঁচা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  আমার নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভুখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদীর আপোষ
    গৌতম দাস
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    “India has no military capability to alter the situation”

    – Indian Gen. Panag

    [সার-সংক্ষেপঃ লাদাখ, ভারতের উত্তর-পুর্বে চীন-ভারত সীমান্তের নাম। গত ২০২০, মে মাস থেকে এই সীমান্তে চীন ও ভারত মুখোমুখি সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে বসেছিল। আর  ১৯৯১-৯৪ সালের সময়গুলোতে ভারত-চীন সীমান্ত আলোচনায় আপোষে চীন যেসব ভুখন্ড ভারতের অনুকূলে ছেড়ে দিয়েছিল, যা ভারতের (LAC) এলএসিতে পাওয়া ভুখন্ড মনে করা হয়, সেসব ভূখন্ড চীন মে মাসের ঐ সময়ে ফিরে দখল করে নিয়ে বসে গিয়েছিল।

    এই নিয়ে এক সামরিক সংঘাতে ১৫ জুন ২০২০ তারিখে ২০জন ভারতীয় সেনা নিহতও হয়েছিল। কিন্তু তা সত্বেও মোদি সেসময় সংসদে ও রেডিও বক্তৃতায় বলেছিলেন, “... neither has anyone entered Indian territory, nor is anyone present in Indian territory currently, and nor is any Indian post captured”। আসলে চীন গতবছর মে মাসের শুরু থেকেই ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া ভুখন্ডগুলোই পুনর্দখল করে বসেছিল। কিন্তু একথা সত্যি হওয়া সত্বেও ২০জন ভারতীয় সেনা হত্যা হওয়ার পরও মোদি অমন বিবৃতি দিয়েছিলেন। কেন?

    এর জবাব এখন পরিস্কার জানা যাচ্ছে। আসলে ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া LAC-এ পাওয়া ভূখন্ডগুলোই পুনরায় দখল কথার মানে হল এর আগের ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখা। এখন ভারত-চীন আলোচনায় ভারত ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখাকেই ভারতও তাঁদের স্থায়ী সীমান্তরেখা বলে মেনে নিয়েছে। উভয়পক্ষ এই ভিত্তিতেই সীমান্তে সেনা সমাবেশ ভেঙ্গে দিতে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে এর দুই পাড়ে নতুন সীমান্ত বরাবর সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে এবং ধাপে ধাপে সেটির বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    সে অনুযায়ী, প্রথম পর্ব ছিল ‘প্যাংগং সো (Pangong Tso) লেকের দুই পাড় থেকে সেনা ও স্থাপনা প্রত্যাহার। গত ১১-১৯ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত মতই এই প্রত্যাহার কোনো ব্যত্যয় ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আর ভারতের এই সীমান্তেরই এক সাবেক জিওসি লে জে পরাগ; এই ব্যাপারটাকে দেখে বলেছেন, … the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation….it is “good for the long term peace” ।

    সোজা বাংলায়, আমাদের সামরিক মুরোদ নাই তাই চীনের দাবি মোতাবেক ১৯৫৯ সালের সীমান্ত আমরা মেনে নিয়েছি। এটা দীর্ঘস্থায়ী শাস্তির জন্য ভালই হয়েছে”। কিন্তু কেন ভারতকে এমন পাওয়া-ভুখন্ড ফিরে ত্যাগ করতে বা হারাতে হচ্ছে?]

    Ladakh Stand-Off: India & China, Pangong Tso withdrawal done

    একদম বেড়াছেড়া!

    পথ চলতে চলতে পথিক কখন কোথায় নিজের জামাকাপড় খুইয়ে এসেছে সে হুশই নাই! যখন খেয়াল হল তখন এক বেড়াছেড়া অবস্থা! কেন? কারণ এখন লজ্জা ঢাকে কী দিয়ে সে এক কঠিন সমস্যা। আরেকদিকে, কৌতূহলী আশেপাশের মানুষকে কিভাবে কেন এসব হল তার ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না। কাজেই, এ এক বেড়াছেড়া অবস্থা বটে!

    বেড়াছেড়া শব্দটা কথ্য ভাষায় প্রচলিত শব্দ; তাই অনেকে একে ইনফরমাল শব্দ বলবেন হয়ত। তবু ‘বেড়াছেড়া’ শব্দটা আসলে খুবই এক্সপ্রেসিভ মানে, যা ঘটেছে তাকে এক শব্দে ফুটিয়ে তুলতে এক উপযুক্ত-প্রকাশক শব্দ। ইন্ডিয়া, মানে ভারতের মোদি সরকারের আজ এমনই বেড়াছেড়া দশা।

    কেন? কী হয়েছে??

    এবারে মোদির কাপড় খুলে নেয়ার অবস্থার শুরু বলা যায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে। লাদাখ – ভারতের ভাষায় তার উত্তরপূর্ব কোণের ভারত-চীন সীমান্ত যেখানে দুই দেশের সৈন্য মুখোমুখি হয়ে বসে আছে গত ২০২০ সালের মে মাস থেকে। ভারত (মিডিয়াও) এটাকে এক ‘অচলাবস্থা’ (standoff) বলে বর্ণনা করে এলেও চীনের কাছে ব্যাপারটা এমন অচল নয়। কারণ পরিস্থিতি ক্রমশ তার পক্ষেই এগিয়ে চলেছে। যেন – এবার ঘুঘু ধরা পড়েছে, অপেক্ষা কেবল তাকে কাচিয়ে উপরে তুলে পাকড়াও করার অবস্থা। এবং তাই হতে যাচ্ছে আসলে।

    কারণ অবশেষে মোদি চীনের কাছে ‘ভূখণ্ড হারিয়েছে’ স্বীকার করে নেয়ার পর উভয়পক্ষই যার যার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত শুধু না, তা বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ও শেষ করে ফেলেছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি। কথাটার মানে হল, চীন-ভারতের সীমান্তের যত জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করা হয়ে আছে/ছিল তার একেকটা এলাকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এরই প্রথম এলাকা ‘প্যাংগং সো’ নামে লেকের দুই পাড় থেকে প্রত্যাহার, যা গত দশ দিনে শেষ হয়ে গেছে। এখন পরের পর্বের প্রত্যাহার নিয়ে ফোর্স পর্যায়ে কথা বলা ও বাস্তবায়ন শুরু হবে।

    সেনা প্রত্যাহার কোথায় গিয়ে থামবে, নতুন কোন সীমান্তেঃ
    কিন্তু মূল প্রশ্ন : উভয়পক্ষ সৈন্য প্রত্যাহার করবে না হয় বোঝা গেল কিন্তু প্রত্যাহার করে কোথায় গিয়ে থামবে? অর্থাৎ কোনটাকে এখন নতুন সীমান্ত বলে উভয়পক্ষ মেনে চলবে? কারণ সব ফাটাফাটি সংঘাত বা মূল বিতর্কের উৎসই তো ছিল সেটাই!

    না, নতুন সীমান্তরেখাও এখন আর অমীমাংসিত নয়। লক্ষ করা যায়, চীন পা-ফেলে থাকে সাধারণত অনেক ক্যালকুলেশন করে। আসলে গত বছরের ৫ মে এর শুরু থেকেই চীন নিজের সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছিল ১৯৫৯ সালের এলএসি [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা মেনে।

    যদিও কী মেনে চীন একাজ করছে তা কখনো প্রকাশ্যে বলেনি। কিন্তু “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায়” ফিরে যেতে বলে চলেছিল ভারতের সাথে সব মিটিংয়েই। আর এখনকার সমঝোতাও হচ্ছে সেই ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মোদির ভারতের মেনে নিতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে। কাজেই উভয়পক্ষের সৈন্য ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখার’ দুই পাড়ে যার যার দেশের সংলগ্ন অংশে গিয়ে বসবে। আর সেটাই হবে নতুন সীমান্তরেখা।

    এটাই সৈন্য প্রত্যাহারের ভিত্তি বলে মেনে নিতে মোদি রাজি হয়েছেন। যদিও মোদীর জন্য এখন এটাই বিরাট সমস্যা আর ইজ্জতের ব্যাপার যে পাবলিকের কাছে তিনি এই ‘ভূমি হারানোর আপস ও বিনিময়ের কথা কিভাবে বলবেন!

    পাঠক যারা কম সময় দিতে চান, কম বিস্তারে পড়তে তারা নিচের ছোট প্যারার অংশটুকু বাদ দিয়ে সরাসরি পরের প্যারায় চলে যেতে পারেন।

    ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কী?
    একটা বড় তথ্য দিয়ে রাখি। ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কথাটা মূলত চীনের প্রস্তাবিত একটা সীমান্ত ধারণা। কিন্তু তা উভয়পক্ষের সম্মতিতে আঁকা কোনো ম্যাপ – ঠিক তা নয়। এটা ১৯৫৯ সালে চৌ এনলাই ও নেহেরুর এ’দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার চিঠি চালাচালির ঘটনা যেখানে চৌ নেহেরুকে “ম্যাকমোহন লাইন” [McMahon line] মেনে সীমান্ত টানার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

    “ম্যাকমোহন লাইন” প্রসঙ্গে বেশি বিস্তারে যাব না। কমকথায় বললে,  এই লাইন টেনে ঝগড়া মিটাবার চেষ্টাটা ১৯১৪ সালের, তিব্বতকে নিয়ে। হ্যাঁ, তিব্বতকে নিয়ে।  কিন্তু তিব্বতের দুর্ভাগ্য হল, তিব্বত স্বাধীন নাকি চীনের অধীনে স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ এই নিয়ে বিতর্ক মাও-এর আগের চীনা-জাতিবাদী শাসক চিয়াং কাইশেকের আমলের। যদিও ভারতের দিক থেকে অনেকে সময় ধারণা দিবার চেষ্টা করা হয় যে কমিউনিস্ট মাও খারাপ ও এগ্রেসিভ বলে তিব্বত নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন তিনি, ফলে দালাই লামাকে নিয়েও।

    অথচ ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ম্যাকমোহন লাইন এর প্রমাণ। এটা ১৯১৪ সালের জুলাইয়ে ঘটনা যখন তিব্বত প্রদেশের সাথে এর সীমান্ত সংলগ্ন বৃটিশ-ইন্ডিয়ার কমন সীমান্ত ম্যাপ কী হলে উভয় পক্ষ তা মেনে নিবে সে আলোচনা চলছিল, এটাই সেকালের দশ মাস ধরে চলা সিমলা কনফারেন্স চুক্তি [Simla Accord] নামেও পরিচিত।

    ম্যাকমোহন ছিলেন বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সেনা অফিসার ও পরে বৃটিশ-ইন্ডিয়া সরকারের বিদেশমন্ত্রী এবং সে হিসেবে তিনি ঐ সীমান্ত আলোচনার প্রধান নেগোশিয়েটর। তাই তার নামেই ম্যাকমোহন লাইন বলে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ঠিক হয়েছিল। তিব্বত প্রদেশের প্রতিনিধিসহ কেন্দ্রের চিয়াং কাইশেক সরকারের প্রতিনিধিও উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু শেষে কাইশেক সরকারের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে তাঁদের চোখে তিব্বত তো মূলচীনের-ই প্রদেশ। কাজেই তিব্বত কিভাবে স্বাক্ষরদাতা পার্টি হয় এই ছিল তাঁদের আপত্তি।

    অর্থাৎ তাঁদের আপত্তি ঠিক বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে নয়। তিব্বত স্বাধীন দেশ/ প্রদেশ কিনা সেই বিতর্ক। তাই পরবর্তিতে চীন মাওয়ের বিপ্লবের অধীনে কমিউনিস্ট চীন হয়ে গেলে কমিউনিস্ট চীনের অফিসিয়াল অবস্থান হয়ে যায় এটি যে, তিব্বত চীনের প্রদেশ আর ম্যাকমোহন লাইনই ভারতের সাথে সীমান্তরেখা। কিন্তু ততদিনে আবার নেহেরুর ইন্ডিয়া সেটা গ্রহণ করতে চায়নি। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে চীন আরও ভুখন্ড দখল করেছিল। যেটা পরে অবশ্য ছেড়েও দেয়। এরপর থেকেই [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা কথাটার উৎপত্তি হয়।

    ঐ চিঠি চালাচালিতে বর্ণনামূলক অর্থে কথা বলার সময় কারও দখলে থাকা ভুমি বুঝাতে চীন এই [LAC] ব্যবহার করেছিল। যেটা অবশ্যই উভয়পক্ষের সম্মতিতে গৃহিত কোনো কমন ম্যাপের স্টাটাস নয়।  তাই টেকনিক্যালি ভারত কখনই ১৯৫৯ সালের কোনো সীমান্ত বুঝাতে [LAC] শব্দটা ব্যবহার করতে চায় না। তবে চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল সুসময় বলা যায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল।

    ১৯৯১ সালে নরসীমা রাও-এর প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি পেং ভারত সফরে এসেছিলেন। আর তাতে উভয়পক্ষের সম্মতিতে [LAC] কোনটা হবে এনিয়ে বিস্তর আলোচনা ও রফার শুরু হয়েছিল। এতে নরসীমার ফিরতি চীন সফর ঘটেছিল ১৯৯৩ সালে এবং  সেই সফরকালে উভয়পক্ষ [LAC] এর দুই পাড়ে শান্তি বজায় রাখার লক্ষে এক সীমান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আর তখন থেকেই ভারতও অফিসিয়ালি [LAC] কথাটা মেনে নিয়েছিল ও ব্যবহার শুরু করেছিল। আর সেই থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বহুবার তাঁদের বিভিন্ন সীমান্তে  নতুন করে সম্মতিতে সীমান্তরেখা টানা হয়েছিল যেগুলো ঐ বছরের [LAC] যেমন, [LAC 1994] এভাবে বলার চল শুরু হয়েছিল।

    সারকথায়, ১৯৯১ সাল থেকে এবারের বলা [LAC] এর বাড়তি অর্থ হল তখন থেকে [LAC] মানে উভয়পক্ষের সম্মতি নিয়ে আঁকা সীমান্তরেখা। কিন্তু এত সম্মতির পরেও আবার ২০২০ সালে কেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ?

    এর একমাত্র কারণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট সংসদে অমিত শাহের সারা কাশ্মীরই (পাকিস্তান ও চীনা অধিকৃত অংশসহ) ভারতের অংশ দাবি করা। অর্থাৎ এখানে আসলে মোদি-অমিতের সরকার দাবি করে ফেললেন যে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত যত কিছু সীমান্ত সমঝোতা ও চুক্তি হয়েছিল তা তারা মানেন না। এবং এই না মানা একপক্ষীয় ভাবে। আর একপক্ষীয়ভাবে কোনো চুক্তি বাতিল করে দেয়া মানে উভয়পক্ষ বসে কোনো আলোচনায় থেকে নয় – যেটি কূটনীতিতে খুবই অশিষ্ট [rogue] আচরণ গণ্য করা হয়, তাই ঘটানো হয়েছিল।]

    কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের ভাল সম্পর্কের সময়ে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে সীমান্ত নিয়ে আপস আলোচনায় ফলাফলের ভিত্তিতে সে সময়ে প্রতি বছরই উভয়ের সম্মতিতে চীন নিজের দাবিকৃত অংশ থেকে বেশ কিছু ভূখণ্ড ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। এ থেকেই এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর জন্ম। তাহলে এখন ১৯৫৯ সালকেই আবার ফিরে নতুন করে সব সীমানার ভিত্তি মেনে নিয়ে এখনকার মোদির আপসনামার অর্থ কী?

    অর্থ হচ্ছে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে আপোস আলোচনায় যা কিছু ভূখণ্ড ভারত পেয়েছিল তা আর ভারতের হাতে থাকল না। ভারত এই ভূখণ্ডের দাবিই যেন ছেড়ে দিল। সেটা ভারতের অনিচ্ছাকৃত হলেও মোদি-অমিতের “পুরা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড”, সংসদে এই দাবি করাতে এমন অর্থই তৈরি হয়ে গেছিল।

    এর সোজা মানে হল মোদীর এখন ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মেনে আপোস করাতে ভারত চীনের কাছে বড় ভূখণ্ড হারাচ্ছে সেটা স্বীকার করে নিল। শুধু তাই না, এর আরেক বিশেষত্ব আছে।

    আগে মীমাংসিত ছিল এমন ভূখণ্ড এবার আবার চীনকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে গেল। কিন্তু কেন? এমন তো আগে কখনো হয়নি! মোদি কি যেকোনোভাবে একটা সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে আসার স্বার্থে পাগল হয়ে এমনটি করছে? একেবারেই যে তা নয় সেটা বলা মুশকিল। কারণ এই করোনাকালের আগে থেকেই মোদির ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। তাই এই সময় সেনা প্রত্যাহার, খরচ কমানো এবং সাথে টেনশনও কমানো ইত্যাদি মোদীর জন্য এক বিরাট চাহিদা তো বটেই। সেকারণে এই আপোস মীমাংসা মানে সেনা প্রত্যাহার বা [disengagement] এটির মূল শর্ত হলে মোদি তাতেও রাজি।

    পাঠকের কাছে ব্যাপারটা আমাদের ভাষ্যে না বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের মিডিয়ায় ছাপা হওয়া এক সাবেক কমান্ডার লে. জেনারেল পানাগের [Lt Gen HS Panag (Retd)] বয়ানে তুলে ধরব। তিনি পরপর দু’বার রাষ্ট্রীয় মেডেলপ্রাপ্ত সেনা অফিসার।

    লে. জে. পানাগ বলছেন, ‘… এই সৈন্য প্রত্যাহার ঘটছে একেবারে ঠিক চীনের দাবিকৃত ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে। কারণ এ পরিস্থিতিকে ভিন্ন কোনো বিকল্প আকার দেয়ার মতো সামরিক যোগ্যতা ভারতের নাই।’

    তিনি আরো বলেন, তবুও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য এটাই ভালো  [……” that the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation. However, he said, it is “good for the long term peace”………”The plan, he presumed, will include acceptance of McMohan Line in Northeast with some give and take between New Delhi and Beijing, as per the 1959 proposal.”]।

    কিন্তু এই জেনারেল যে কথা কোনো রাখঢাক না করে গড়গড়ে বলে গেলেন মোদির সে সক্ষমতা নাই। কারণ লাদাখ বা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মোদির নেয়া সব পদক্ষেপেই সততার অভাব ছিল। মোদীর অসততা হল, তিনি নিজ ভোটবাক্স ভরাতে সীমান্তে তিনি বীর, বীরত্ব দেখাচ্ছেন তিনি, হিন্দুত্বের বিজয় আনছেন তিনি ইত্যাদি ভুয়া বয়ানের সুরসুরি তুলতে এসব করেছেন।

    তিনি কাশ্মীর দখল করেছেন। পুরা কাশ্মীর ভারতের মধ্যে এনেছেন তাই তিনি ও তার দল হিন্দুত্বের বীর। এসব জাতশ্রেষ্ঠত্বের জজবা উন্মত্ত জোশ, আধা সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি এনেছেন যেকোনো অ-হিন্দুর বিরুদ্ধে। যার সবকিছুর উদ্দেশ্য ভোটবাক্সকে হিন্দুর-ভোটবাক্স এই জোয়ার তুলে।

    আবার এই মিথ্যা বীরত্বের দাবি করতে গিয়ে যেমন – ভারত-চীন প্রত্যক্ষ সেনা সংঘাতে ভারত যখন ২০ জন সৈন্য হারিয়েছিল তার পরে মোদি সর্বদলীয় বৈঠকে দাঁড়িয়ে এবং ‘মন কি বাত’ নামের রেডিও প্রোগ্রামে বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, ‘চীন ভারতের কোনো ভূখণ্ড দখল করে নাই, কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেনি’ ইত্যাদি। তার সোজা অর্থ হলো, ভারতের সৈন্যরাই চীনে অনুপ্রবেশ করে মার খেয়ে মরেছে। অথচ আসলে মোদীর ওই বিবৃতিতে স্বীকার করে নেয়া হয় যে, চীনা দাবিকৃত ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখাই’ তাদের উভয়ের প্রকৃত সীমান্ত। যদিও মোদি কখনোই তার ওই কথার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সংসদে আলোচনাও তুলতে দেননি।

    কাজেই  এখনকার ‘সেনা প্রত্যাহার’ নিয়ে মোদির বড় সমস্যা হল, তার সংসদ বা নাগরিকের কাছে তিনি কিভাবে খুলে বলবেন যে তার উগ্র জাতিবাদী হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতি আর হুঙ্কার আসলে সব অচল আর ভুয়া! ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ার বিনিময়ে তিনি চীনা সৈন্যদের ঠাণ্ডা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু সেজন্য তিনি বাৎচিত শুরু করছেন আরেক শঠতার আশ্রয়ে।

    এক. তিনি যে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে বিনিময়-সওদা করছেন- এ কথা একেবারে লুকিয়ে ফেলেছেন।

    দুই. এই বিষয়ে পাবলিকের সামনে কথা শুরু করছেন চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে – এখান থেকে। যেন এটা দু’পক্ষেরই সেনা প্রত্যাহার নয়, যেন শুধুই চীনা সৈন্য প্রত্যাহার হচ্ছে। অর্থাৎ যেন চীনা সেনারা ভারতে এসেছিল, এখন পালিয়ে গেল। এটাই যেন এক বিরাট সুখবর আর মোদী সরকারের বিজয়- এমন ভাব দেখাচ্ছেন। অন্তত দুটো মিডিয়া দ্যা হিন্দু আর দ্যা প্রিন্ট এ কাজে মোদির ইজ্জত বাচানোর মত করে এমন ভাষ্য লাগাতার তৈরি করে যাচ্ছে।

    অথচ সত্যিকার ব্যাপারটা হল, ভারতীয় সেনারা ‘পিছিয়ে’ ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায় ফিরে গেল আর চীনা সৈন্য প্রত্যাহার নয় বরং ওই ছেড়ে যাওয়া ভূখণ্ডের দখল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

    মোদীর ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টায় আরেক মন্ত্রী ভিকে সিংঃ
    মোদি তাই ‘চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে’ এমনই কাছাকাছি কিছু একটা ব্যাখ্যায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথকে দিয়ে সংসদে বিবৃতি পড়ে শোনান, ঐ ১১ জানুয়ারি যেদিন ভারতীয় সেনা ইতোমধ্যেই মাঠে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে দিয়েছিল সেদিন। তবু এতকিছুর পরেও আগেই আরেক বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছিল। সে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল মোদীর আরেক মন্ত্রী ভিকে সিং।

    তিনি আসলে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান, এক ফোর-স্টার জেনারেল। সম্ভবত মোদি তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিথ্যা অ্যাডভ্যান্স ঢোল পিটানোর – ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে মোদি আপোস করছেন এদিকটা লুকিয়ে কথা শুরু করার জন্য। তিনিই প্রথম বলতে নামেন যে এই সেনা প্রত্যাহার এটাই নাকি মোদীর বিজয়। কিভাবে?

    তিনি গত ৭ জানুয়ারি ভারতের দক্ষিণে তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে সফরে গিয়ে জনগণকে ব্যাপারটা ‘সহজ করে বুঝিয়ে বলার’ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এতে তিনি হিতে বিপরীত করে ফেলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কগুলো কত সহজ ফলে অন্যের দেশে অনুপ্রবেশ ঘটানো -এগুলো কোনো ব্যাপার না। এই ধারণা তৈরি করতে গিয়ে বলে বসেন যে ভারত কতবার যে চীনা ভূখণ্ডে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে এর শেষ নেই।

    আরো এক কাঠি ওপরে গিয়ে বলেছেন, “চীনারাও অনুপ্রবেশ করেছে তবে আমাদের চেয়ে কম। চীনারা ১০ বার করলে আমরা ৫০ বার করেছি”   [“Let me assure you, if China has transgressed 10 times, we must have done it at least 50 times,”।

    বলাই বাহুল্য, এরপর এটাই সমালোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এমনকি এ নিয়ে চীনে চীনা সরকারি মুখপাত্রকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কয়েক শব্দে এক মন্তব্য করেন যে, “সত্যি কথা সবসময় অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়ে।”

    আসলে ভিকে সিং সেখানে আরেক ভুয়া দাবি করে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়াকে আড়াল করতে গিয়েছিলেন। তিনি তাই মনে করায় দিয়ে বলার ছলে বলেন, চীনা পণ্য বর্জন প্রোগ্রাম নিয়েছিল বিজেপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। আর সরকার চীনা বিভিন্ন অ্যাপ-প্রোগ্রাম ভারতে নিষিদ্ধ করেছিল, ভারতে বাণিজ্যে বা টেন্ডারে অংশ নেয়া বন্ধ করেছিল। আর তাতেই নাকি চীনারা চাপে পড়েছিল তাই তারা সেনা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে।

    কিন্তু তার এই দাবিও আসলে ভুয়া। কারণ পরিসংখ্যান বলছে যে, বরং চীন থেকে কাঁচামাল বা তৈরি পণ্যের আমদানি বেড়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ এক দাবি ভিকে সিং শুরুতেই করেছিলেন সেখানে। তিনি বলে বসেন, চীনের সাথে অফিসিয়াল সীমান্তরেখা বলে কোনোকিছু কখনও আঁকাই হয় নাই; [……”  official border with China has never been demarcated.“।

    তার মানে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি পেং ১৯৯১ সালে ভারতে আসেন নাই, নরসীমা রাও-ও ১৯৯৩ সালে পাল্টা চীন সফরে যান নাই। অতএব ১৯৯১-১৯৯৩ এই সময়কালের মধ্যে [LAC] নিয়ে চীন-ভারত উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথমবারের মত কোনো সমঝোতা হয় নাই?

    আসলে এটা তিনি বলছেন কারণ মোদি নিজেই এই “অস্বীকারের” [১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে] ফাঁদে পড়েছেন। তাই ইতিহাস উল্টাতে ভিকে সিং সারা ভারতকে সেই ফাঁদে ফেলতে চাইছেন। ওদিকে, কংগ্রেস গত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে এন্থনী অভিযোগ করে বলেন, লাদাখের এই সেনা প্রত্যাহার আসলে চীনের কাছে সারেন্ডার “Disengagement in Ladakh is surrender to China,” ছাড়া কিছুই না।

    যা হোক, এই সেনা প্রত্যাহার মনে হচ্ছে সফলতার দিকেই যাবে, তাতে ভারতকে যে শর্তই পালন করতে হোক না কেন। তবে ঘটনা আরো কিছু আছে।

    আসলে এখন মোদির এত দ্রুত আপোস করে ফেলার পেছনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মোদি আশা করতেন, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য বিরোধটা যদি সামরিক দিকে গড়ায় তাহলে তিনিও এর আড়ালে, ভারতের চীনের সাথে বিরোধকে সামরিক দিকে ঠেলে দেয়ার সুযোগ নিতে পারবেন। কিন্তু তা হয়নি, মোদির কপাল খারাপ!

    কিন্তু রেকর্ড বলছে, ট্রাম্প তার চার বছরে পরিস্থিতি কখনোই সামরিক দিকে যেতে দেননি। যদিও অনেক গরম কথা, হুঙ্কার দিয়েছেন। আর ওই চার বছরে তিনি মোদিকেও বাকচাতুরি ছাড়া কোনো ফেভারই দেননি। কিন্তু উল্টা ভারতে অস্ত্রবিক্রির সুবিধা নিয়েছেন। সেটা যাই হোক শেষে বাইডেন এসে যাওয়াতে এসব দিকে মোদির সরকার এখন একেবারেই হতাশ। কেবল অপেক্ষা করছেন বাইডেনের সাথে প্রথম মোলাকাতে কী আলামত দেখেন তা জানতে। পছন্দ না হলে এবং বিশেষ করে মানবাধিকারের চাপ খেলে জয়শঙ্করের তৈরি আরেকটা অবস্থান আছে সে দিকে যাবেন। সেটা হলো তিনি বলবেন, এখন থেকে চীন-আমেরিকার বিরোধে ভারত আর কোনো দিকে নেই, গ্যালারির দর্শকমাত্র হয়ে থাকবে। যেন অনেকটা ঘরে খাবার নাই বলে উপোস রাখছি এমন বলে বেড়ানো হবে সেটা আর কী।

    সবশেষে, চীন গত বছর সীমান্তে সেনা সমাবেশের শুরু থেকেই আগে ভারতকে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ানো মানে, এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর মাধ্যমে যেসব ভূমি ফেরত দিয়েছিল তা আবার কেড়ে নিতে এগিয়েছিল কেন?

    স্বল্পকথায় বললে, ব্যাপারটা ২০১৯ সালে মোদির “পুরা কাশ্মিরই ভারতের”- সংসদে এই দাবি করার খেসারত। সংসদে ৩৭০ ধারা বাতিল করার পরে অমিত শাহ একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কাশ্মিরের তিন অংশ- ভারত ও পাকিস্তানের দখলের অংশ এবং চীনের দখলে থাকা অংশ- এই পুরো কাশ্মিরই ভারতের ভূখণ্ড। এই ঘোষণাতেই সবকিছুর ট্রিগার টিপে দেয়া হয়েছিল।

    আজ মোদি সরকার “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা” মেনে নিতে বাধ্য হলেন। দুনিয়ার সব উগ্র জাতিবাদীর পতনের মত এই হিন্দুত্ব জাতিবাদ এখানেও হেরে গেল।

    চীন বলতে চাইল, ভারত আপোস আলোচনায় সীমান্তবিরোধ মিটানোর মত কোনো পার্টনারই নয়, যোগ্য নয় তাই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “সেনা প্রত্যাহারে গিয়ে মোদির যে দশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    গৌতম দাস

    ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3nc

    মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী / ডিফেন্স ফোর্স নামে ক্লাবের প্রধান মিন অং লাইং

    গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমার মানে, বার্মা-দেশ আবার দেশী-বিদেশী খবরের শিরোনামে উঠেছে। যদিও রয়টার্স বা বিবিসি বলছে ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে মিয়ানমারে নাকি একটা ক্যু হয়েছে। আসলেই কী তাই? না, ঠিক তা নয়। আপাত চোখে একটা ক্যু মনে হলেও। কারণ আগে থেকে কোথাও যদি একটা রিপাবলিক বা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র গঠন [constitute] হয়ে থাকে একমাত্র এরপরেই না প্রশ্ন উঠে ঐ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কোন সামরিক ক্ষমতাদখল বা ক্যু করেছে কিনা! যেটা রাষ্ট্রই নয় বরং  একটা সামরিক ক্লাব তার বেলায় এটাকে ক্যু বলা না বলায় কী এসে যায়? তাই নয় কী? তাহলে পশ্চিমারা সবাই একে ‘ক্যু’ বলছে কেন?
    এটা বলছে কারণ আমেরিকা-ইউরোপের বা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভাষ্য এটা।  এককথায়, কারণ এই রাষ্ট্রগুলো গত ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে থেকে দাবি করে আসছিল যে বার্মায় নুন্যতম হিউম্যান রাইট নেই, অনবরত এর চরম লঙ্ঘন হচ্ছে। কথা সত্যও বটে। ফলে আমেরিকা তো বটেই সেসময় জাতিসংঘ থেকেও অবরোধ জারি করা ছিল। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।  কিন্তু ২০০৭-১০ এই সময়কালে সব উলটে যায়। টেবিলের নিচে ডিল হয়। হিউম্যান রাইট  বিক্রি হয়ে যায় যা আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিমারা সব সময় করে আসছে।  কারো হিউম্যান রাইট  রেকর্ড খারাপ থাকলে এর বিনিময়ে পশ্চিমারা সওদা করে  নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থ হাসিল করে নিয়ে থাকে। এই ডিলেরই বাইরের প্রকাশ্য চিহ্ন হল নতুন করে লিখিত বার্মার কনষ্টিটিউশন-২০০৮। যেখানে বার্মা সামরিক ক্লাবের ক্ষমতাটা আগের মতই ক্লাবের হাতে থেকে যায় তবে সাথে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ বা ‘ফুটানি কা ডিব্বা’ লটকে দেয়া হয়। সেটা হল,  অং সান সুচির [Aung San Suu Kyi] একটা সিভিলিয়ান ফেস। এতেই ভাব ধরা হয়েছিল যে বার্মা যেনবা একটা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। অথচ ক্ষমতাটা ছিল আগের মতই বার্মার “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে এক সামরিক ক্লাবের হাতে।
    আসলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল,  হিউম্যান রাইট বিষয়ক অভিযোগ আগে যা ছিল তা পশ্চিমের সবাই দলবেধে বেচে দিয়েছিল, মানে মিটিয়ে নিয়েছিল জেনারেলদের সাথে মিলে দেনা-পাওনায়। আর বিনিময়ে বার্মার জেনারেলদের থেকে বাগিয়ে  ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ নিয়েছিল।  আর এটা শুধু অভিযোগ সব চেপে যাওয়া নয়, উলটা সার্টিফিকেট দিয়েছিল যে এরপর থেকে নাকি কথিত “গণতন্ত্রের পথে সংস্কার” হতে শুরু করেছে!   এই “গণতন্ত্র” শব্দটা অদ্ভুত। বিয়ে করে নাই; অথচ বাচ্চা পয়দা হয়েছে দাবি করার মত।  তাই কনষ্টিটিউশন-২০০৮ এটাই তো প্রমাণ যে  বার্মা একটা সামরিক ক্লাব মাত্র, আর ঐ ক্লাবের গঠনতন্ত্রই হল কনষ্টিটিউশন-২০০৮। মোটকথা ব্যতিক্রমহীনভাবে সারা পশ্চিম বার্মার জেনারেলদের থেকে ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ পেয়ে চেপে গিয়েছিল।  আর এই ডিলটাই ঘটাতে প্রাইমারি দুতায়ালিটা ঘটিয়ে দিয়েছিল ভারত, ফলে সেও কিছু ভাগ পেয়েছিল।  আর চীনের কথা আর কী বলব! সে বরং হিউম্যান রাইটের ঢং না করে বরং সোজা সাপ্টা ঘুষ দেয়া আর কাজ নেয়ার লাইনে ছিল। তাই , যেটা বার্মার উপর আশির দশক থেকে জাতিসংঘের আরোপিত অবরোধ সে আমল থেকে চীন সেটার একাই ফয়দা লুটেছিল। কারণ বার্মার পড়শি বলে একমাত্র চীনের মাধ্যমেই না-দেখার ভান করে বার্মা বাইরের দুনিয়ার সাথে সক্ষম রেখে চলতে পারছিল। তাই এটা ছিল চীনের পড়ে পাওয়া সুবিধা।
    তাহলে এখন কী হয়েছে? জেনারেলেরাও কেন ক্যু বলাতে আপত্তি করছে না? মিয়ানমারের জেনারেলরা এই উছিলায় চাইছে তাদের আর ক্লাব নয়, রাষ্ট্রই মনে করা হোক এবং এটাই তাদেরও ভাষ্য। তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? সমস্যা হল, মিয়ানমার একটা দেশ অবশ্যই। কিন্তু এটা জন্ম থেকে কখনোই রাষ্ট্র নয় মানে – মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা মানে এর আগের কলোনি দখলদার জাপান অথবা ব্রিটিশদের থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই এটাকে খতিয়ে না দেখে  অভ্যাসে রাষ্ট্র মনে করা হয়েছিল। আর পাঁচটা কলোনিমুক্ত হওয়া স্বাধীন রাষ্ট্র ভেবে।  নেহেরুর ভারত বা জিন্নাহ’র পাকিস্তান অর্থেও বার্মা কখনও রাষ্ট্র হতে পারে নাই। যেমন অন্তত একটা ছোট্ট কথা দিয়ে বলা যায়।
    খুবই অল্প কথায় বললে, প্রশ্নটা ক্ষমতার, মানে রাষ্ট্রক্ষমতার।  যেমন, শাসন-ক্ষমতাধর যেকোন শাসককে বলতে পারতে হয়, কে তাঁকে ক্ষমতা দিয়েছে। মোটা দাগে এখানে দুধরণের জবাব দেখতে পাওয়া যায়। এক. যারা ক্ষমতার উৎসের জবাব দিতে পারে না, হদিস দিতে পারে না; যাদের বেলায় ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে রাজার সন্তান রাজা এমন হয়। অথবা এদের আদি রাজার ক্ষমতার হদিস না দিতে পেরে দাবি করেন যে ক্ষমতা ‘ঐশ্বরিকভাবে’ পেয়েছে।
    আর দুই. যারা হিম্মত রাখে ও ব্যবহারিকভাবে মেনে নেয় যে ‘ক্ষমতা জনগণের’। সে-ই জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এই দ্বিতীয় ধারার বেলায় কেবল এরাই দাবি করতে পারে, তাদের রাষ্ট্র আছে আর সেই দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা একটা রাষ্ট্রগঠন করেছেন, ফলে এরপর একটা সরকার গঠনও করেছে। এই দ্বিতীয় ধারাকেই বলা যায় এটা এক রিপাবলিক বা জনগণের প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। কাজেই রিপাবলিক বাদে আর কোনো দেশেরই ক্ষমতার উতসের হদিস থাকে না, উত্তরাধিকারী রাজা-সম্রাটের সন্তানেরা রাজা-সম্রাট হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও বড়জোর সমাজের কিছু এলিট মিলে তাদের পছন্দের কাউকে শাসক বানিয়ে রাখে। ফলে কোথাও শাসক থাকা মানে তা ‘দেশ’ অবশ্যই; কিন্তু শাসক থাকা মানেই তা ‘রাষ্ট্র’ নয়। আবার যদিও  দুনিয়াতে যা দেখা গেছে, এই অর্থে ইতিহাসে ১৬৫০ সালের আগে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে কিছু ছিল না।
    তবে নিজ ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে তা পরিষ্কারভাবে বলতে পারা বা না-পারা- এটাকেই আমরা কোনো ‘দেশ’কে ‘রাষ্ট্র’ বলেও মানা না মানার মূল নির্ণায়ক বলতে পারি।

    কিছু ব্যতিক্রম, ‘নগর-রাষ্ট্র’
    তবে ব্যতিক্রম হিসেবে ক্ষণকালের জন্য আমরা কোথাও নগর-রাষ্ট্র ধারণা লক্ষ করি। যেমন যিশুর জন্মের ৭৫৩ বছর আগে [753 BC] ‘প্রাচীন রোমে’ রাজতন্ত্রের পত্তন হয়েছিল। পরে (প্রায় আড়াইশ’ বছর পরে) সেখানে নগর-রাষ্ট্রের ধারণার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল, সেটাও যিশুর জন্মের ৫০৯ বছর আগে [509 BC]। এটাই প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রিপাবলিক। পরে সেটাও ভেঙে যায় যিশুর জন্মের মাত্র ২৭ বছর আগে [27 BC]। তাতে এবার ফিরে আবার রাজতন্ত্র বা মোনার্কি মানে, রোমান এম্পায়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তা টিকেছিল যিশুর জন্মের ৪৭৬ বছর পরে [476 AD] পর্যন্ত। এ সময়েরই মাঝামাঝি রোমে প্রভাব বেড়ে যাওয়া খ্রিষ্টধর্ম সামলাতে না পেরে শেষে ৩১৩ সালে সম্রাট কনস্টান্টিন নিজেই রোমকে ‘খ্রিষ্টান রোম’ বলে ঘোষণা করেন। তখনই তিনিসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক সদলে খ্রিশ্চান ধর্মগ্রহণ করেছিলেন।

    কলোনিদখল হয়ে যাওয়ার মধ্যেও ভালোমন্দ আছেঃ
    অনেকে বলে থাকেন, দেশ যদি কলোনি দখলে যায়ই তবে জাপানের কলোনি হওয়ার চেয়ে ব্রিটিশ কলোনি হওয়া ভাল। এমন কেন বলেন?
    ব্রিটিশেরা ‘পশ্চিমা’ বলে এশিয়ান জাপানের চেয়ে তারা ভাল, ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। আগে দেখেছি, রোম ‘নগর-রাষ্ট্রও’ টিকে নাই। শেষে তা রোম সাম্রাজ্যের ভেতরে হারিয়ে যায়; যে সাম্রাজ্য আবার ৪৭৬ সালের [476 AD] মধ্যে নিজেও বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু পরে “হলি রোমান এম্পায়ার” নামে, ৮০০ সাল থেকে রাজা শার্লেমেন [Charlemagne] (ফরাসি উচ্চারণে শাআলে-মেঁ) নতুন করে “হলি রোমান এম্পায়ার” [Frankish king Charlemagne as Roman emperor by Pope Leo III on Christmas Day in the year 800] নামে এক  সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটান। তবে আগের রোমান সাম্রাজ্যের সাথে নয়া হলি রোমান এম্পায়ারের কোনো সম্পর্ক নেই, কেবল নামের কিছু মিল ছাড়া। আর এখনকার জার্মানি-ফ্রান্সের মাঝের ফ্রাঙ্ক [Frank] ভূখণ্ডকে কেন্দ্র রেখে এর বিস্তার শুরু হয়েছিল। মোটা দাগে, এই সাম্রাজ্যই (৮০০-১৮০৬) সময়কাল জুড়ে জারি ছিল আর এখনকার ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রেরই পূর্বের-শাসক ছিল। যদিও শেষের ৩০০ বছর বিশেষত ১৬৪৮ সাল থেকেই এটা নামকাওয়াস্তে সাম্রাজ্য হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তা আলাদা আলাদা ছোট সাম্রাজ্য হয়ে প্রত্যেকে নিজেদের  সীমানাও ভাগ করে নিয়েছিল। আর সেগুলোই একালে রিপাবলিক রাষ্ট্ররূপ [তবে জাতি-রাষ্ট্র] হয়ে নিয়েছিল যা এখনকার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্দেশ করে।
    এভাবে এক পর্যায়ে ১৬৫০ সালের ব্রিটেনে ক্রমওয়েলের বিপ্লবকেই (Cromwell revolution) ধরা হয়, প্রথম রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার বিজয়। তবে এরপরে সাম্রাজ্যগুলোর ভেতরেই এদের শাসন-কাঠামো কী হবে তা নিয়েও রাষ্ট্র-ধারণার ক্রম-রূপান্তর ঘটেছিল; যেখানে মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলির ভাবনাঃ
    সারকথায় সেটা হল যেমন, নাগরিক হল উপাদান বা কনস্টিটুয়েন্ট। আর এই কনস্টিটুয়েন্টদেরকে নিয়ে রাষ্ট্র কনস্টিটিউট বা গঠন করা – [যেখান থেকে কনষ্টিটিউশন বা Constitution] ধারণাটা। আর এসব ধারণার উপর রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠিত। এখানে পাবলিক বা নাগরিকই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস – এই ধারণা আস্তে ধীরে সমাজগুলোতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এর সাথে সাথে তাই রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিনিধিত্ব ধারণাও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এটাই জন-প্রতিনিধিত্বের ধারণা; কালক্রমে যা মাঠে ময়দানের ভাষায় ভোট বা নির্বাচন। এখান থেকে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত আরো শব্দ যেমন – জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, জনপরিবহন অথবা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (জনস্বার্থে মামলা)। আবার এখান থেকেই মাও সেতুংয়ের চীনের ভাষায় তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম  – পিপলস ব্যাংক, সেনাবাহিনীর নাম – পিপলস আর্মি ইত্যাদি। সার কথাটা হল, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ; রাষ্ট্রপরিচালনায় সব ক্ষমতার উৎস জনগণ – এটাই মূল ভিত্তি। এই ধারণাকে মূল ও কেন্দ্রীয় ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ধারণার বিস্তার ঘটেছে। তাই না কোন রাজা, না সম্রাট, না কোন রাজ-উত্তরাধিকারী বা না সমাজের এলিটদের বেছে নেয়া কেউ প্রমুখ – এরা কেউই ক্ষমতার উৎস নন। রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস একমাত্র জনগণ। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি – নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই একমাত্র জনগণের হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন। এটাই রিপাবলিক (গণপ্রজাতন্ত্রী) রাষ্ট্র ধারণাটার সারকথা।
    কিন্তু রাষ্ট্র ধারণার এদিকটা এশিয়ায় এভাবে এত বিকশিত হয়নি। একটা মোনার্কি মানে সেখান থেকে ছোট রাজা থেকে বড় সম্রাটের সাম্রাজ্য আর সেখান থেকে  কলোনি দখলদার মালিকের সাম্রাজ্য হয়ে ওঠার পরে দেখা গেছে, এদের বিকাশের এখানেই সমাপ্তি।  এরা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত বিকশিত হতে পারে নাই।  যেমন এশিয়ান অরিজিন জাপান, এর সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি বা চর্চা করি। সে মূলত পূর্ব এশিয়ার (ততকালে অবিভক্ত) একই কোরিয়া ও চীনের আংশিক কলোনি দখলদার এক সাম্রাজ্য ছিল যা নিজে বৃটিশদের মত কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। কেবলমাত্র এক সম্রাটের সাম্রাজ্য (তবে কলোনিদখলদার) ছিল। এবং সেকালের বার্মার কিছু নেতা অথবা পশ্চিমবাংলার সাবেক কংগ্রেসি নেতা সুভাষ বোস – এদের মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারত এই কলোনিকে জাপান নিজের প্রভাবাধীনে কিছু অংশ বা পারলে পুরাটাই পুণঃদখলি কলোনি করে নেয়ার চেষ্টা করেছিল এমনই আরেক কলোনি মাস্টার ছিল সেই জাপান।

    জাপান নিজেকে রিপাবলিক রাষ্ট্র মনে করে কিনা এখনও অস্পষ্টঃ
    কিন্তু জাপান সম্পর্কে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরেক দিক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের ভাগাভাগিতে জাপান হিটলারের জার্মানির পক্ষে আর আমেরিকা-সোভিয়েত-ব্রিটিশ মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানির হিটলারের সাথে জাপানও হেরে যায়। কিন্তু আমেরিকা আর সব  ‘হারুপার্টির’ মত জাপানকেও ত্রাণ এবং অবকাঠামো ও শিল্প পুনর্বাসনের অর্থ-বিনিয়োগ দিয়েছিল। এতে জাপান পুণর্গঠিত হয়ে উঠেছিল তবে কেবল সামরিক দিকে আমেরিকার অধীনস্ত থেকে পুনর্গঠিত এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জাপান গঠন করা হয়েছিল। এই নতুন জাপান নিজেকে এবার আর কোন সম্রাটের সাম্রাজ্য ফিরে দাবি না করলেও নয়া রাষ্ট্র দাবি করেছিল। কিন্তু সেটাও রিপাবলিক কি না তা জানা যায় না। এছাড়া জাপানে রাজনীতি বলে কিছু আছে কি না, চিন্তায় ও চর্চায় রাজনৈতিকতা [Polity] আছে কিনা, তাও জানা যায় না। জাপানের ফরমাল নাম “ইউনিয়ন অব জাপান”। অর্থাৎ কোথাও এটা যে ‘রিপাবলিক’ সে কথা বলা হয়নি।
    ওদিকে জাপানে রাজনৈতিক চিন্তা ও চর্চার দিক সবসময়ই খুবই দুর্বল। রাজনৈতিক ধারণা বলতে এখানে বড় জোর একটা জাতিরাষ্ট্র বা দেশপ্রেম – এই পর্যন্তই, যেন এর কোন রাজনৈতিকতা নাই বা সেবুঝে না। বিশেষত জাপানের কলোনি দখলের পক্ষে নিজ কোন সাফাই দেয়ার যেন প্রয়োজন – অনুভব ছিল আমরা দেখি না। যেন তারা বুঝাতে চায় তাদের গায়ের জোর ছিল তাই দখল করেছিল – এধরনের, যেটা বলা বাহুল্য ব্রিটিশদের মত নয়।
    কারণ এসবের বিপরীতে ব্রিটিশদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ে ধারণা ছিল। শুধু তাই না কলোনিদখল করা দেশ বৃটিশ-ইন্ডিয়াতে যেমন- রামমোহন রায়,  (কমিউনিস্টরা যাকে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে) তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও কমতির শেষ নেই কথা সত্য। তবু একটা রাজনৈতিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ব্রিটিশেরা তাঁকে এবং অন্য নেটিভদের দিতে পেরেছিল ও দিয়েছিল। অবশ্য তা মূলত নেশন-স্টেট ধরনের জাতিবাদী, দেশপ্রেম টাইপের আবেগী ধারণা। এটা মূলত জাতিরাষ্ট্র অর্থে রিপাবলিক ধারণা হলেও তা পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র মনে করা হত। এ ক্ষেত্রে রামমোহনে চিন্তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা রাজনৈতিকতা সেখানে ছিল আমরা দেখি। এককথায় জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস ও কেন্দ্র এতটুকু চিন্তার রাজনৈতিকতা ব্রিটিশ কলোনি থেকে পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু জাপানের কলোনি হলে এটুকু কেন কোন রাজনৈতিকতা পাওয়ার সুযোগ ছিল না, নাই। এর একেবারে গোড়ার কারণ জাপান আসলে ছিল এক সম্রাটের সাম্রাজ্য; মানে সেকালে তা ছিল এক রাজতান্ত্রিক জাপান। তবে যদিও তা মার্শাল তেজো ধরণের সামরিক নেতা নির্ভর। এদিকে বলাই বাহুল্য রাজতন্ত্রে “রাজনীতি” বলে কোন ধারণা থাকে না। তাই, শাসনের ক্ষমতা কক্তৃত্ব একমাত্র জনগণের এই ধারণা সমাজে না থাকলে সেখানে রাজনীতি শব্দ ও ধারণার উদ্ভব ঘটে না। থাকতেই পারে না। ফলে কোন ধরণের রাজনৈতিকতাও। তাই নেতা সুভাষ বোস বা বার্মার তরুণদের জাপানি আর্মি যত যাই কিছুই শিখিয়ে থাকুক বা ট্রেনিং দেক তার চিন্তায় রাজনীতি বা রাষ্ট্র ধারণার লেশ মাত্র ছিল না। থাকার কথাও না।

    জাপানে কোন ধরণের রাজনৈতিকতার ধারণা না থাকা, এদিকটাই জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত মিয়ানমার শাসকদের ভিন্ন করে তুলেছে বলে অনুমান করা যায়। সেকারণেই বার্মা কেন রাষ্ট্রই নয়, কোনো রিপাবলিক নয়, এর কারণ আমরা এখানে খুঁজলে পাবো।

    তবে মিয়ানমার কেন ব্রিটিশ শাসনবিরোধিতা করতে জাপানের কাছে গিয়েছিল, এর পেছনে আবার সবচেয়ে বড় কারণ মনে করা হয় দুটা। ব্রিটিশরা বার্মা দখল করেছিল ১৮২৪ সালে, ছেড়ে গিয়েছিল ১৯৪৮ সালে। কিন্তু এই ১২৪ বছরের মাত্র শেষ ১১ বছর (১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৮) বাদে বাকি সবটা সময় বার্মাকে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ারই একটা প্রদেশ রূপে ঘোষণা করে বৃটিশেরা শাসন করেছিল। আর ভারতীয় ও ব্রিটিশদের উপর এটাই বার্মিজদের প্রধান ক্ষোভের কারণ। সেটাই বা কীভাবে?
    বার্মাকে এমন প্রদেশ হিসেবে গণ্য করে শাসন করাতে বার্মার ক্ষমতায় সবার উপরে ব্রিটিশরা থাকলেও মূলত ভারতীয় সিভিল সার্ভিস অফিসারদের অধীনে বার্মা নিজেকে দেখতে পেত। এর ফলে আরো ঘটনা হল বার্মার শহর-গঞ্জে ভারতীয়রা বার্মায় ব্যবসায় ও চাকরিতে প্রধান ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। যেমন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসগুলো মনে করা যেতে পারে যেখানে বার্মার নাম এই কারণেই বারবার এসেছে। ফলে ভারতীয়রা হয়ে যায় বার্মার সাধারণ মানুষের চোখে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও লুটেরা; যার উপরে কলোনি মালিক ব্রিটিশের ওপর বার্মিজ ঘৃণা তো আছেই।
    ফলে বার্মিজ তরুণদের কাছে জাপানের শাসকেরা হাতছানি তৈরি করতে পেরেছিল। এতে বার্মিজদের পালটা প্রতিক্রিয়া হয় যে, তারা জাপানি সাহায্য নিয়ে হলেও দেশ থেকে ভারতীয় ও ব্রিটিশদের তাড়াবে। এমনকি ভারতীয়দের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ১৯৪৮ থেকে ’৬০ সাল পর্যন্ত আরো তীব্র হয়েছিল তাদের সমূলে ভারত ফেরত পাঠাতে। তবে তরুণদের জাপানি-প্রীতি বাড়ার আরেক বড় কারণ হল, ১৯৪১ সালে বিশ্বযুদ্ধের ভিতর জাপান থাইল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল। আর বার্মার প্রতিবেশী হল থাইল্যান্ড। রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটির তরুণ, সু চির বাবা অং সান ও তাঁর বন্ধুরা প্রায়ই ব্রিটিশদের নির্যাতন বা খোঁজাখুঁজি এড়াতে পালিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিতেন। আর সেখানেই জাপানি আর্মির সাথে তাদের প্রথম মোলাকাত ঘটেছিল। সেখানেই সাব্যস্ত হয় যে, জাপানিরা তাদের সামরিক ট্রেনিং দিবে। অং সান গোপনে দেশে ফিরে নিজ বন্ধুদের সংগঠিত করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এরাই হয় ট্রেনার যা গড়ে তুলেছিল বার্মিজ ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি [Burmese Independent Army, BIA] নামের সেনাবাহিনী। পরের বছর ১৯৪২ সালে জাপানিরা বার্মা আক্রমণ করলে এই বাহিনীর তরুণ সেনারা জাপানিদের পক্ষে পদাতিক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এতে জাপানিরা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করে ফেলে। আর এতে বার্মায় গড়ে উঠা জাপানি প্রশাসনে অংশ নিয়েছিলেন অং সান ও তার বন্ধুরা।

    আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না, কেন?
    কিন্তু নির্ধারক ভূমিকাটা ঘটেছিল আরেকটু অন্যখানে। জাপানিরা অং সানের ৩০ জন বিশেষ বন্ধুদের একটা দলকে বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল বিআইএ গঠনের সময়। এদের গল্প-বীরত্বই আজও বার্মার আর্মির পুঁজি। সাথে আবার একই সাথে বার্মা কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব হিসাবে গড়ে উঠবার পিছনের কাহিনী। মনে রাখতে হবে জাপান তাঁদের যতকিছুরই ট্রেনিং দেক তাতে রাজনৈতিক ট্রেনিং বা রাষ্ট্র-বিষয়ক কোন ট্রেনিং বা ধারণা তাদেরকে দেয় নাই। কারণ খোদ জাপানেই তো রাজনীতি বলে কিছু ছিল না। স্মরণ করেন, আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না। কারণ রাজতন্ত্রে এসব ধারণা বা শব্দ থাকে না। যে কারণে এখনকার সৌদি আরবেও রাজনীতি শব্দটা নাই। রাজনীতি শব্দ বা ধারণা থাকার পুর্বশর্ত হল যখন রাজতন্ত্রের বিপরীতে “জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস” – এধারণা প্রতিষ্ঠিত থাকে।

    পরবর্তিতে মাত্র তিন বছরের মধ্যে জাপানিদের ব্রিটিশদের কাছে হার স্বীকার করতে হয়েছিল। মূল কারণ ১৯৪৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপান-জার্মান অক্ষশক্তির হার হয়েছিল। ফলে বার্মার ক্ষমতা আবার সেই ব্রিটিশদের হাতে ফিরে চলে যায়। আর তা থেকেই পরে ১৯৪৮ সালে অং সানের (তিনি ১৯৪৭ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন)বন্ধুরা ক্ষমতা নেন, বিশেষত ঐ ‘প্রমিন্যান্ট’ ৩০ জন।

    বিশেষ ত্রিশজনের পরিণতিঃ
    কিন্তু বার্মার শাসনে দুর্যোগের দিন শুরু হয় এখান থেকেই। মূলত এই ৩০ জন ভাগ হয়ে গেছিলেন মূলত কারা মূল সিভিলিয়ান রাজনীতিবিদ বা প্রশাসক হবেন আর কারা মূল আর্মি অফিসার হবেন – এভাবে। কিন্তু এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়- এ দুই দলের কারা শ্রেষ্ঠ অথবা কাদের ভূমিকা নির্ধারক, এসব নিয়ে। আসলে পেছনের ঘটনাটা আরেকটু ভিন্ন। জাপানি ট্রেনিংয়ে কখনোই রাজনৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। একই কারণে রাষ্ট্রক্ষমতার ও রাষ্ট্রগঠন সংক্রান্ত ধারণা দেয়া হয়নি। কারণ এসব বিষয়ে জাপানিরা নিজেদেরই ধারণা ছিল না। বরং উলটা, তাঁদের ধারণা বলতে সবই ছিল ক্ষমতার ধারণা; তাও আবার যেখানে ক্ষমতা মানে কেবল সামরিকতা। কিন্তু ক্ষমতার অর্থ তো দুইটা; সামরিক ক্ষমতা ও সাফাই বয়ান এর(নেরেটিভের) ক্ষমতা। রাষ্ট্রধারণা, জনগণ ক্ষমতার উৎস কেন বা জনপ্রতিনিধির ধারণা ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো ধারণাই এদের ছিল না। এর উপর আবার বার্মা [রেস ও এথনিক অর্থে] প্রধান ৯টি জাতে বিভক্ত যাদের অন্তত তিনটি গোষ্ঠী ব্রিটিশ আমলেই স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করত। কিন্তু স্বাধীন বার্মার জেনারেলরা প্রথমেই তা কেড়ে নিয়েছিলেন। এখন এসব জাতিগোষ্ঠীকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে এ নিয়েও লাগে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এসব জটিলতার সমাধান হবে একমাত্র বল প্রয়োগে তা মনে করে, অং সানের আরেক বন্ধু নেউইন যিনি সামরিক জেনারেল ছিলেন, ১৯৬২ সালে সামরিক বলে ক্ষমতা দখল করার ঘোষণা দেন। অর্থাৎ সিভিল রাজনীতিক বনাম আর্মির ভাগ হয়ে থাকায় একে অপরকে অযোগ্য ব্যাপারটা বুঝে না মনে করা – এরই ভাব ও পরিণতিতে। সেই থেকে দেশের ক্ষমতা আর কখনোই সিভিল রাজনীতিকের হাতে আসেনি। আবার রাষ্ট্র রাজনীতি এই শব্দগুলোই বা কী, রাষ্ট্রগঠন কী জিনিষ তা জীবনেও আর জেনারেলেরা সহ বার্মিজ সমাজের জানা হয় নাই। ঐ “ত্রিশজন বীরের” গর্ব ও আবেগের নিচে সব চাপা পড়ে আটকে যায়। অথচ ঐ ত্রিশজনই ট্রেনিংয়ে রাষ্ট্র রাজনীতি ধারণাগুলোই কখনও শুনে নাই।

    তাহলে ২০০৮ সালে কনষ্টিটিউশন লেখার অর্থ তাতপর্য কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ‘মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র’ নয় বলে। কেন? মিয়ানমার অবশ্যই একটা ‘দেশ’। কিন্তু এই দেশের মালিক যেন একটা ‘ক্লাব’ এবং এটা একটা সামরিক ক্লাব।
    একটু বড় সেসব পিছনের গল্প। বার্মা একটা দেশ ওর শাসক আছে কিন্তু তা রাষ্ট্র নয়, মানে জনগণের রাষ্ট্র নয়।  অনবরত যে মূলত বার্মিজ বা বুদ্ধিষ্টদের বাদে অন্যান্য সব জাতিগোষ্ঠির উপর হত্যা নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য বার্মার উপর পশ্চিমা দেশের তো বটেই জাতিসংঘেরও অবরোপ করা ছিল সেই আশির দশক থেকে। অর্থাৎ বার্মা ছিল একঘরে। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রিও নিষেধ ছিল। কিন্তু চীনের সাথে সীমান্ত আছে বলে অনেকটা চোরাচালানের ছলে বা বেনামে ব্যাপক পণ্যবিনিময় চলত। এটাই তার একমাত্র সীমান্তের বাইরে যাবার উপায় ছিল। চীনের সাথে এই সম্পর্ক আবার চীনের যখন ডাবল ডিজিট উত্থান সে যুগে বার্মার সাথেও বেড়ে উঠেছিল।

    সে সময়টা ছিল গ্লোবাল অর্থনীতিতে ২০০৮ সালের মন্দা আসার আগের বছর পর্যন্ত সময়কাল। তাই অর্থনীতি ভাল চলাতে কোন দেশের মাটির নিচের গ্যাস-তেল কে আগে কিনে নিতে বুকিং দিয়ে রাখতে পারে  এর প্রতিযোগিতা ছিল। আমাদের এদিকে চীন ও ভারতের মধ্যে। সেই সুত্রে বার্মার একটা খনির গ্যাস ভারত বুকিং দিতে কথা শুরু করেছিল। কিন্তু শর্ত ছিল  হুইলচার্জ দিয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে এই গ্যাস নেয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশ এই অনুমতি দিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করাতে ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতায় চীন ঐ গ্যাস কিনে ফেলার ডিল করে ফেলে। মূলত এরপর থেকে ভারত নতুন এক আইডিয়া নিয়ে একদিকে বার্মা অন্যদিকে মূলত আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সাথে মধ্যস্থতার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। ভারতের মূল পয়েন্ট ছিল অবরোধের সুফল অন্য সবাই বাদ যাচ্ছে, আর একচেটিয়া তা কেবল চীন খাচ্ছে। সুচি তখনও হাউজ এরেস্টে ছিল। তাই নামকা ওয়াস্তে হলেও যদি দেখানো যায় যে বার্মা একটা রাজনৈতিক সংস্কার শুরু করেছে আর তাতে যে মূল ক্ষমতা তা আগের মতই বাহিনীর হাতে রেখে দিয়েও তাঁদেরই অধীনে কেবল সুচিকে কিছু ক্ষমতা দিয়ে তারা “গণতন্ত্র কায়েম” করেছে বলে যদি পশ্চিম সার্টিফিকেট দেয় তবে এই উসিলায় বার্মার সব অবরোধই পশ্চিম ও জাতিসংঘ তুলে নিতে পারে। এবার তখন আর একা চীন না, ভারত ও পশ্চিমারাও বিনিয়োগ পণ্য-পুজি বার্মার বাজারে রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ নিতে পারে। তবে এমন এই রফাতেও জেনারেলদের কথিত লোকদেখানো সংস্কার (যেটা রাষ্ট্র সংস্কার নয় মোটেও) করে নির্বাচন দিতেই ২০১০ সাল লেগে গিয়েছিল। আর তখনই কি কি ক্ষমতা জেনারেলেরা সুচিকে দিতে চায় এর হিসাব লিখে রাখতেই কথিত ‘কনষ্টিটিউশন সংস্কার’ করা হয়েছিল। ফলে এই সংস্কারে যে আজকের দশায় পড়বে তা সবাই জানলেও সবাই তা এড়িয়ে বার্মার বাজারে ঢুকতে ঝাপিয়ে পরেছিল। যেমন, বার্মায় মোবাইল ব্যবহারকারি ছিল মাত্র কয়েক পার্সেন্ট, সেটা এখন ৯২% । এভাবে যে যা পেরেছে খাবলে নিয়েছে এতদিন। ওদিকে ২০১০ সালের নির্বাচন এই কনষ্টিটিউশন ২০০৮ এর অধীনেই হয়েছিল। সুচি তখন মুক্ত কিন্তু বুঝাবুঝি অনুসারে নির্বাচনে অংশ নেয় নাই। আর আর্মি একাই অংশ নিয়েছে বেনামে, নিজেরাই একটা দল (ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলবমেন্ট পার্টি, USDP) খুলে নিয়েছিল। এভাবেই ক্ষমতায় ছিল। আর পরের ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি অংশ নিয়ে প্রধান নির্বাচিত দল হয়। কিন্তু তবু বাহিনী সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় নাই। কারণ কনষ্টিটিউশনে লেখা আছে সংসদের নিম্ন কক্ষে চার ভাগের এক ভাগ আসন ৪৪০/১১০, আর উচ্চকক্ষের ৩৩% আসন “ডিফেন্স সার্ভিস”কে দিতে হবে।  যেটা আবার সার্ভিস প্রধান ঠিক করে দিবেন কোন অফিসার সংসদ সদস্য হবে। এতেও শেষ হয় নাই। স্বরাষ্ট্র,প্রতিরক্ষা, সীমান্তরক্ষীসহ পাঁচ মন্ত্রীত্ব সেনাবাহিনীকে দিতে হবে আর সার্ভিস প্রধান এই নিয়োগ দিবে। আর সবার উপরে “ডিফেন্স সার্ভিস” প্রধানের থাকবে সবকিছুর উপর এক ভেটো ক্ষমতা।

    অর্থাৎ “ডিফেন্স সার্ভিস” এরাই আসলে বার্মা দেশের (সরি, রাষ্ট্র বলতে পারছি না) মূল মালিক, এটা এখানে বুঝা গেল। নাহলে ডিফেন্স চীফ কি করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দিবেন!

    বার্মার কনস্টিটিউশনে ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ কারা ও কীভাবেঃ
    মিয়ানমারে এখন তৃতীয় কনস্টিটিউশন চলছে। এর সর্বশেষটা রচিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।
    কনস্টিটিউশন ২০০৮ [এখানে পিডিএফ কপি পাবেন] এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, এই কনস্টিটিউশনের শুরুতে তৃতীয় পাতায় দ্বিতীয় প্যারাতে যে অনুচ্ছেদ, এর শিরোনাম ‘বেসিক প্রিন্সিপল’ [Basic Principles of the Union, p.3]। এর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে (এ থেকে এফ) এভাবে সাতটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। আর এর সর্বশেষ এফ বা সপ্তম উদ্দেশ্যই হলো, হাজার কথার এককথা। সপ্তম উদ্দেশ্য হল, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা” [Enabling Defence Services to be able to participate in the National Political leadership role of the State]।

    বলেছিলাম বার্মা রাষ্ট্র্র নয় একটা দেশ মাত্র। বলেছিলাম, রাজতন্ত্রিক দেশ দেশের ক্ষমতার উৎস জানাতে ব্যর্থ হবেই। অপরদিকে, রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়লে বলা সম্ভব, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ। সেটা যাই হোক, নির্বাচিতের বেলায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা হবেন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট। আর তার অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে। নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অধীনে থাকবে সামরিক বাহিনীসহ সব প্রতিষ্ঠান। এই হলো রিপাবলিক ক্ষমতার কাঠামোগত বিন্যাস। অথচ কনস্টিটিউশনের সপ্তম উদ্দেশ্য বলছে, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের “জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা”। অর্থাৎ এই বাক্য অর্থহীন ও স্ববিরোধী। “ডিফেন্স সার্ভিসের সদস্যরা” দেশের ‘রাজনৈতিক নেতা’ হয় কী করে?  আর এটাই নাকি ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনের উদ্দেশ্য?  কিভাবে?

    আবার এই ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে আমাদের মতো রাষ্ট্রকাঠামোর সেনাবাহিনী বলে বুঝা ভুল হবে। কারণ মিয়ানমারের বর্তমান কনস্টিটিউশনের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে একে সবার উপরের ক্ষমতার এক প্রতিষ্ঠান বলে যদি ধরে নেন তাহলে এরপর এর পুরোটার অর্থ স্পষ্ট হবে। এ জন্যই বলেছি, মিয়ানমারের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ একটা ক্লাবের মত; তবে সামরিক ক্লাব, যে আবার দেশের মালিক। আর ঠিক এ কারণেই মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্রের নাম নয়, রাষ্ট্র নয়।

    শেষকথাঃ
    বার্মায় পশ্চিমাদের ব্যবসা বাগানোর লোভে লোকদেখানো কারবারের নাম ‘গণতন্ত্র’। মানে কথিত যে বার্মার গণতান্ত্রিক সংস্কার’ এতদিন চলতে তা ফেল করল। এটাই ১ ফেব্রুয়ারির তাতপর্য। এর মানে হল ২০১৫ সালের নির্বাচন ছিল “ডিফেন্স সার্ভিস” ক্ষমতায় নিজের নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে সিভিলিয়ানদেরকে কতদুর ক্ষমতার ভাগ দিতে পারে, এরই পরীক্ষা। “ডিফেন্স সার্ভিস” এখন বলল যে সেই পরীক্ষা অচল, অসম্ভব। কারণ এবার ২০২০ সালের নভেম্বর নির্বাচনে সুচির দল আরও বেশি আসন দখল করেছে, প্রায় ৮৩% ভোট। এতে স্বভাবতই সুচি আরও বেশি ক্ষমতার হকদার হয়ে উঠত। তাই এবারের নতুন সংসদ বসার আগেই সিভিল রাজনীতিকদের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। সুচি গ্রেফতার তো বটেই, দেশের প্রেসিডেন্টও ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি। আর্মি চীফ আরেক সাবেক আর্মি সদস্যকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়েছেন।

    কিন্তু তবু অনেক গণতন্ত্রী বার্মায় সেনাবিরোধী মিছিল সমাবেশ দেখে খুব উতসাহিত হচ্ছেন, আশার আলো দেখছেন। তাদেরকে বার্মার ইতিহাস পড়তে বলব। ঠিক এরকম নির্বাচন অনুষ্ঠান এর আগে ১৯৬০ সালের পর থেকে দুবার ঘটেছিল। দুবারই সিভিলিয়ানেরা প্রবল্ভাবে জিতেছিল। এবং ক্ষমতা পেতে প্রবল সভা সমাবেশ করেছিল। কিন্তু নির্বিচার গুলিতে সবাইকে দমিয়ে ফেলা হয়েছিল আর জীবিতদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখনও রাষ্ট্র-রাজনীতি-ক্ষমতা সম্পর্কে না-বুঝ লোকেদের বেলায় ভিন্ন কিছু হবে না। “গণতন্ত্র” দিয়ে রাষ্ট্রগঠন করা যায় না। বিশেষত যেখানে “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে সামরিক ক্লাব থাকে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “মিয়ানমার একটা সামরিক ক্লাব” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  সাপ্তাহিক  “সাম্প্রতিক দেশকাল”  পত্রিকায় ১৬ ফেব্রুয়ারিতে  মিয়ানমারে কোন সামরিক ক্যু হয়নি” এই শিরোনামে আমারই আরেকটা লেখা ছাপা হয়েছিল।    পরবর্তিতে ঐ দুই লেখাকে একসাথে করে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইইউ-চীন চুক্তি, শপথের আগেই বাইডেনের পরাজয়

    ইইউ-চীন চুক্তি, শপথের আগেই বাইডেনের পরাজয়

    গৌতম দাস

     ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3kf

    CN-EU in a videoconference on CAI DEAL, 30 DEC 2020

    দুনিয়া নতুন বছর ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে এসে পড়েছে। তার মানে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারি আরো ঘনিয়ে এল। প্রায় সব কিছু ঠিক মতই আগাচ্ছে, তেমন কোন বাধা দেখা যাচ্ছে না। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমে খাঁচার ভেতরে প্রবেশ করে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছেন যেন। কিন্তু তবু একটা ভাগাভাগির লাইন আমেরিকান সমাজ ও মিডিয়ায় টানা হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই; যা সম্ভবত আর মুছবে না কোনো দিন। তা হল তথাকথিত আমেরিকান জাতিবাদিতা। অলীক জাতিবাদিতার পক্ষে-বিপক্ষের একটা ভাগাভাগির দাগ থেকেই যাবে।

    [শেষের কথাটা আগে বলাঃ গেল সব গেল! বাইডেন শপথ নিবার আগেই বাইডেনের আমেরিকার বিরাট কিছু হারিয়ে গেল। বিষয়টা হল আগামি দিনে চীনের সাথে ইইউ, (২৭ রাষ্ট্রের এই ইউরোপীয় ব্লক), এর মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ কীভাবে হবে-চলবে (বিশেষত চীনের আভ্যন্তরীণ বাজার ইইউ-এর জন্য কীভাবে খুলে দেয়া হবে) এর মৌলিক নীতিমালা বিষয়ক চুক্তি্র – CAI  ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই), আলোচনায় সমাপ্তিটানা হল, একটা ভার্চুয়াল মিটিংয়ে করে। আমার এই এক বাক্যও পুরা ব্যাপারটার গুরুত্ব পাঠককে বুঝাতে খাটো হতে পারে। তাই এই বিবেচনায় পরের আরেক বাক্য লিখছি। গ্লোবাল ব্যবসা বিনিয়োগের  নিউইয়র্কভিত্তিক অন্যতম গ্লোবাল মিডিয়া  ব্লুমবার্গ (Bloomberg) গত মাসে ২২ ডিসেম্বর জানিয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে ইইউ চীনের সাথে এই চুক্তি এখনি না করে, ধীরে চলে [European Union came under mounting pressure to slow down its push for a major investment deal with China,……]। কারণ, বাইডেন চেয়েছিলেন, তিনি শপথ নিবার পরে তখন ইইউ আর আমেরিকা যৌথভাবে একটা পক্ষ হয়ে, অপর পক্ষ চীনের সাথে দরকষাকষিতে বসলে চীনকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করা যেত; এমন একটা লোভ বাইডেন দেখিয়েছিলেন। এব্যাপারে বাইডেনের হবু নিরাপত্তা উপদেষ্টা Jake Sullivan, এর টুইট দেখতে পারেন [He urged “early consultation with our European partners on our common concerns about China’s economic practices.”]। কিন্তু ইতোমধ্যেই বড় ধরণে ইইউ এর আমেরিকা-বিতৃষ্ণা ঘটে যাবার জন্য একা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই যথেষ্ট হয়েছিল। এতে আমেরিকা-বিতৃষ্ণা এমন পর্যায়ে পৌছিয়েছে যে বাইডেনের কোন বাধা-অনুরোধ এখানে কাজ করে নাই।  ফলে এখন আমেরিকান পাবলিক বুঝবে হয়ত আমেরিকা ফার্স্ট” এর  জাতিবাদ নীতির ট্রাম্প আমেরিকার কী কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। চীন-ইইউ এই বিশেষ  ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ চুক্তি যার আনুষ্ঠানিক নাম CAI বা ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই), তা গত ৩০ ডিসেম্বর সম্পন্ন করে ফেলেছে। উপরের ছবিটা সেই চুক্তি সম্পন্ন করার ব্যক্তিত্বদের ছবিই। এনিয়ে বিস্তারিত এই লেখার শেষ অংশে করা হয়েছে।
    তবু এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনার মূল তাতপর্যটা কী তা এখানেই বলে রাখি। কলোনিযুগ শেষ হলে ১৯৪০ এর দশক থেকে ইউরোপীয় মাতবর কলোনিদখলের মাস্টারেরা সব হারিয়ে শেষে আমেরিকার ক্ষমতার দাপটের অধীনে এর আঁচল ধরে হেটে  এপর্যন্ত কোনমতে টিকে আসছিল। অবশ্য ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে অনেক নতুন কিছু করার-হবার খায়েস জমাও হয়েছে। তাই এখন যা হল সেটা এই যে চীন এসে সহজেই প্রথমত ইউরোপকে আমেরিকার অধীনতার আঁচল ধরে চলা থেকে মুক্ত করে দিল। আর এর কৃতজ্ঞতায় ইইউ অবশ্যই নিজেকে ধন্যবোধ করছে ও করবে। কিন্তু তা কখনই এবার চীনের সাথেও সম্পর্কটাও আগের আমেরিকা-ইইউ এর মত  অধীনতার আঁচল ধরে চলা হবে না। কেন? চীন কী কোন মহান শক্তি? “মেরা ভারত মহান” এর মতই,  চীনও মহান, সেজন্য? না একেবারেই না। প্রশ্নটাই মহান হওয়া না হওয়ার না।  প্রশ্নটা সময়ের, অগ্রবর্তি এক সময়ের। গত ৭৫ বছরের আমেরিকান নেতৃত্বের দুনিয়াতে অনেক কিছুই ঘটেছে কিন্তু কোথায় কলোনি দখল, কলোনি শাসন বা সম্পর্ক আর ফিরে আসে নাই। আসবে না। নতুন সময়ে পুরানা সম্পর্ক ফিরে আসে না, আসতে পারে না – আগের সুযোগগুলো সব নষ্ট হয়ে যায়, তাই।  কিন্তু চিন্তা করলে দেখব, টের পাব এটা “আমেরিকান মহান” কিনা বা মহান ছিল বলেই কলোনি আর ফিরে আসে নাই তা একেবারেই নয়।  তবু কারণ একটাই, “নতুন সময়”।  নতুন সময়ে ‘পুরান ঘটনা’ ঘটতে পারে না। ঘটবার পরিস্থিতিই একই থাকে না বলে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন সময়ে পুরান ঘটনাগুলো আবার সংঘটিত হতেই পারে না, তাই।  অতএব চীন-ইইউ এর সম্পর্ক আগের ‘আমেরিকা-ইইউ এর মত  অধীনতার আঁচল ধরে চলা’ হয়েই গড়ে উঠবেই না। ]

    আগেই একে ‘তথাকথিত’ বলে দিলাম, আর সেই সাথে ট্রাম্পের চালু করা এই জাতিবাদিতা অলীক বা কাল্পনিক- তা আগেই বললাম এ জন্য যে, আমেরিকা রাষ্ট্র  ৭৫ বছর আগে একবার গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, অর্থাৎ এক গ্লোবাল পণ্য বিনিময়বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশে সবাইকে সুযোগ এনে দিয়েছিল, সব রাষ্ট্রকে জড়তা ভেঙে তাতে শামিল করেছিল, সে রাস্তায় সবাইকে নামিয়ে গ্লোবাল আইন নিয়মকানুন তৈরি করে ফেলেছিল, দুনিয়ার বাণিজ্য বিনিময়ের অভিমুখ নির্ধারণ করে গ্লোবাল পণ্য-পুঁজির বিনিময় বা বাণিজ্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু  সেই আমেরিকা এখন বুড়া বয়সে উলটা জাতিবাদি সংরক্ষণবাদিতা দিয়ে, নিজ বাজারে অন্যের ঢোকা বন্ধ করে, চীন ও ইইউর সাথে ট্যারিফ আরোপের যুদ্ধ লাগিয়ে গ্লোবাল বাণিজ্য অসম্ভব করে তুলবে, এটা কি কেউ ভেবেছিল? এটা কীভাবে ঘটল?
    তামাসার দিকটা হল, জাতিবাদী অর্থনীতি, আত্মনির্ভর অর্থনীতি, সংরক্ষণবাদিতা অথবা নিজে আমদানিও করব না রফতানিও করব না এমন চিন্তা – এটা দুনিয়ায় একসময় একমাত্র টিকে ছিল সেসব দেশে ও সে সবকালে (১৬০৭-১৯৪৫) যখন ইউরোপের ওসব চিন্তার নেতা ও রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক তৎপরতা বলতে ছিল অন্য দেশকে কলোনি দখল করা আর সেখান থেকে লুট ও শোষণে সম্পদ উঠিয়ে আনা; এমন রূপের কলোনি-দখলদার রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকা তো কখনো এমন দখলদার রাষ্ট্র বা তেমন অর্থনৈতিক দেশ ছিল না। এছাড়া ১৯৪৪ সালে ব্রেটনউড বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক) দুনিয়ায় চালু হয়ে যাওয়ার পর সেটা হওয়া শুধু আমেরিকার জন্য নয়, ইউরোপসহ যে কারো জন্যই আরো অসম্ভব হয়ে গেছিল।
    সে কারণে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধরনের জাতিবাদিতা মানে, পণ্য-পুঁজি আমদানিও করব না, রফতানিও করব না। এ ধরনের বাণিজ্যবিরোধী ধরনের স্বপ্ন আকাক্ষা তো আসলে কলোনি আমলের চিন্তা। যা বর্তমান বাস্তবতার দুনিয়াটাতে আর নাই।
    তাই ট্রাম্পের জাতিবাদিতা হল, চীনকে একঘরে করে বা চীনকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক বাকি রাষ্ট্রকে নিয়ে আগের মতোই আমেরিকান নেতৃত্বের (চীন বাদে) গ্লোবাল বাণিজ্যের সমাজ কায়েমের এক অলীক প্রচেষ্টা যেটা শতভাগই বাস্তবায়ন-অযোগ্য। তবে মানতে হবে জাতিবাদে প্রপাগান্ডা মূল্য অনেক ও সুড়সুড়ি তোলার ক্ষমতাও অপরিসীম। এ ছাড়া, এথেকে নিজ দেশে জাতবাদী এক মিথ্যা ঐক্য ধারণা- অথবা ‘আমরাই শ্রেষ্ঠ’ ধারণার জন্ম দেয়া যায় খুব সহজেই। কেবল এখানে এসে মোদী ও ট্রাম্প নীতিতে এক ছিলেন।
    তবে মোদীরটা প্রায় খোলাখুলি নিজের সাথেই অসততা বা প্রতারণা। যেমন, লাদাখ সীমান্তে চীনের সাথে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে চীনা পণ্য বর্জনের ডাক এখনো দেয়া আছে, প্রপাগান্ডা ও পণ্য আমদানিবিরোধিতার পক্ষে ক্যাম্পেইনও চলছে। কিন্তু বাস্তবে যেটা হচ্ছে তা হল, আগের চেয়ে চীনা পণ্য ভারতে আমদানি কমা দূরে থাক, এখন তা (গত অক্টোবর থেকে) ৩০% বেশি আমদানি হচ্ছে। এছাড়া মোদীর মনবাসনা ও মনের গোপন নীতি হল,  আপনার নিজদেশ কাউকে দেশের বাজারে ঢুকতে দেবে না। এর মানে, অন্যেরা রফতানি করতে পারবে না কিন্তু আপনিই কেবল ওসব দেশে পাল্টা রফতানি করতে চান – এই নীতি। বিদেশি মুদ্রা খুবই লোভনীয় জিনিষ গণ্য করা। এটাই অলীক জাতিবাদিতা, যার কায়েম-বাস্তবায়ন অসম্ভব।
    আর এ দিকে মোদীর বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার বাস্তবতা হল, এখানে আমেরিকান বাণিজ্যস্বার্থ দুই ভাগে বিভক্ত; দুটা ক্যাম্প তৈরি হয়ে গেছে। স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজগুলো মনে করে, তাঁরা স্বপ্ন-কল্পনায় দ্যাখে যে চীনের আসন্ন গ্লোবাল প্রভাবক-আধিপত্যের কারণে নিজ এন্টারপ্রাইজগুলো নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। তাই ট্রাম্পের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিই তাদের আত্মরক্ষার উপায়। কিন্তু এটা ‘মনে মনে পোলাও খাওয়া’র মত। কারণ তাঁদের ভয়ের অনুমানটা ঠিকঠিক যাচাই করে দেখা হয়নি, তাই পরীক্ষিত নয়। বাস্তবে ওসব স্বপ্ন-কল্পনা সত্য না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। আর এসবের বিপরীতে, চীনের আসন্ন গ্লোবাল প্রভাবে এক ধাক্কা আমেরিকার স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজগুলোর উপর আসবে অবশ্যই, শুরুওও হয়েছে অবশ্যই। কিন্তু তাতে এগুলো সব বিনাশ বা বন্ধ হয়ে যাবে এটি সত্য নয়। বরং এই ধাক্কায় ঢেলে সাজানো আসন্ন হবে অবশ্যই। তাতে কোনো ধরনের স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ বন্ধ হয়ে যাবে আবার নতুন ধরনের কিছু স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ জন্মানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে। আর গ্লোবাল নেতৃত্বের বদলকালে কিছু  কোলেটারাল ড্যামেজও হবে অবশ্যই। তাই ব্যাপারটাকে বিদেশীর বিরুদ্ধে দেশীর সংরক্ষণবাদী বিষয়ের চোখে দেখবার বিষয় নয়। বরং নতুন অর্থনৈতিক নেতা আসন্ন হবে বলে তার সাথে নিজেকে খাপ-খাইয়ে নিয়ে টিকানোর জন্য ঢেলে সাজানো, খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য কিছু পরিবর্তন – এসব তো করতেই হবে। এড়ানো যাবে না। তবু জাতিবাদী প্রপাগান্ডায় সফল সুড়সুড়িতে অলীক শত্রুর বিরুদ্ধে জাতিঐক্যের গানই  অনেক সফলতা পাবে, অন্তত প্রথম কয়েক বছরে।
    এর বিপরীতে আমেরিকায় যারা বড় এন্টারপ্রাইজ, যারা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান মানে গ্লোবাল রফতানি বাণিজ্যভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; এরা বাইডেনের আমলকে স্বাগত জানাবেন। কারণ এতোমধ্যেই যা ঘোষিত বাইডেনের নির্ধারিত নীতি তা হল, ট্রাম্পের জাতিবাদিতায় আমেরিকার অনেক ক্ষতি হয়েছে; তাই আমাদের যত দ্রুততায় আগের সময়ের গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক এবং পারলে যতটা সম্ভব গ্লোবাল নেতা থাকার নীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। এটাকে বাইডেনের পরামর্শকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাট দলের পুরনো বা ক্লাসিক নীতি অথবা ওবামার নীতিতে ফিরে যাওয়া ও কন্টিনিউ করাই বাইডেনের সাধারণ নীতি হবে এবং এই বার্তাটাই সে চীনকে দিতে চায় বলে যতটা সম্ভব ওবামার আমলের যত পুরনো লোক (উপদেষ্টা, সচিব) আছেন তাদের দিয়েই বাইডেনের স্টাফ মূলত সাজানো হচ্ছে। আর তারা যেহেতু আগে চীনের সাথে কাজ করেছেন, পূর্ব-পরিচয় অভিজ্ঞতা আছে ফলে তা আমেরিকার ওপর চীনা আস্থা (ট্রাম্পের কারণে যেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে) ফিরানোর একটা আলাদা মাইলেজ হতে পারে। অর্থাৎ বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা গ্লোবাল বাণিজ্যের ট্রাকেই ফিরে যাবে; কথিত জাতিবাদিতায় নয়। তাই সবখানেই সেটা পুনরুদ্ধার করাই বাইডেনের মৌলিক নীতি হবে।

    কিন্তু বাইডেনের আমেরিকা ওবামা আমলের নীতিতে কতটা ফিরতে পারবে?
    সেটা এক বিরাট প্রশ্ন, অবশ্যই। পুরনো জায়গায় ওবামার লেভেলে আবার ফিরতে না পারার শঙ্কাও ক্রমে বাড়ছে। ব্যাপারটা বুঝতে সবার আগে প্রশ্ন করা যাক, আসলে ‘ফিরতে পারা’ মানে কী?
    সংক্ষেপে বললে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে ১৯৪২ সাল থেকে। সুনির্দিষ্ট সে যা করেছিল তা হল, ঐ বিশ্বযুদ্ধের মূল নির্ধারক নেতৃত্ব নেয়া, হিটলারবিরোধী অক্ষশক্তি জোট গড়া; তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নকেও শামিল করা, ওই বিশ্বযুদ্ধে নিজেদের বিজয় ঘটানো, যুদ্ধের মেজর খরচ হিসেবে পক্ষের সব রাষ্ট্রকে আমেরিকা কোনো চুক্তি ছাড়াই অর্থ জুগিয়ে চলেছিল, যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বাদে সবাইকেই আবার যুদ্ধ-পুনর্বাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য, নতুন করে এবং এবার জাপান-জার্মানি-ইটালিসহ সারা ইউরোপকে নতুন বিনিয়োগ দেয়া। আর সেই সাথে ইউরোপ যেন এবার কমিউনিস্টদের দ্বারা দখল না হয়ে যায় তাই জার্মানি ও জাপানে স্থায়ীভাবে সামরিক ব্যারাকে আমেরিকান সৈন্য রেখে দেয়া। আর এসব কিছুর খরচ আমেরিকা একা বহন করা। আর আমেরিকা কখনোই এই নিরাপত্তাদানের খরচ ইউরোপের কাছে চায়নি। এরই বিনিময়ে আমেরিকা ইউরোপের মন পেয়েছিল। আর সেই থেকে আমেরিকা পায় নিজে গ্লোবাল (অর্থনীতি তো বটেই) পলিটিক্যাল একচ্ছত্র লিডারের স্বীকৃতি। তা দিয়েছিল অ-কমিউনিস্ট সারা ইউরোপ। এছাড়া বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা পক্ষজোটের অন্যান্য রাষ্ট্রে যা কিছু খরচ বা বিনিয়োগ  করেছিল কিস্তিতে হলেও তারা সেসব খরচের অর্থ ফিরিয়ে দিয়েছিল। আর অবকাঠামো ঋণও তারা স্বল্প সুদসহ ফেরত দিয়েছিল কিস্তিতে। তবে সামরিক ব্যয় যেমন ইউরোপে সব আমেরিকান-ব্যারাক রাখার খরচ বা সামরিক জোট ন্যাটো পরিচালনার খরচের কমপক্ষে নব্বই ভাগ একা আমেরিকা বহন করে এসেছে, এ পর্যন্ত। কিন্তু এবার ট্রাম্প এসে কেবল ট্রাম্পই এইবার ইউরোপের কাছে সামরিক ব্যারাক রাখার খরচ চেয়েছিলেন। এর চেয়েও ‘শকিং’ ব্যাপারটা হল, ট্রাম্প নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল বাণিজ্যের নেতা অবস্থান ছেড়ে সরে গিয়েছিলেন। ট্রাম্পের শপথ নেওয়ার শুরুর ঐ বছর (২০১৭) গ্লোবাল ইকোনমিক ফোরামে ব্যক্তি তিনি অংশ নেয়নি। আর পরে যেখানেই অংশ নিয়েছেন (যেমন জি৭ বা জি২০) সেখানে জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে চলতে চেয়ে কথা বলে গেছে্ন। ফলে সবখানে তাল কেটে যাওয়া কথা। এসব মিলিয়ে গত ৭৫ বছরের যে আমেরিকা গ্লোবাল নেতার পরিচয় পেয়েছিল তা ট্রাম্প তার শেষ চার বছরে সদম্ভেই সব মুছে ফেলেছিলেন।
    আর ঠিক সে কারণেই, আসন্ন বাইডেন প্রশাসনের সাধারণ নীতি হবে আমেরিকাকে যতটা সম্ভব আগের গ্লোবাল নেতার আসনে ফিরিয়ে নেয়া। এ কাজে এবার মূলত তার আগানোর পথ হবে নীতিগত জায়গায় শক্ত করে দাঁড়িয়ে সব কিছুকে ফিরিয়ে আনা। আর এ কাজে সবার উপরে থাকবে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে এক শক্ত আপসহীন অবস্থান। মোদির ভারত এতে ‘সাফার’ করবে অবশ্যই, কিন্তু ভারতকে কষ্ট দিতে হবে, এটা বাইডেনের কোন পলিসি নয়। বরং হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্ত আপসহীন অবস্থান নিলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে আমেরিকা চীনের কাছে পরাজিত হয়ে গেলেও গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে চলে যাবে না এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আমেরিকার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটা আর অনেকদিনই হয়ত ঠেকিয়ে রাখতে পারবে এবং তা সম্ভবত অনেক দীর্ঘ দিন আমেরিকার হাতে থাকবে।  এই হল পিছনের অনুমান। তবে এবার প্রকাশিত এক গবেষণা-স্টাডি রিপোর্ট বলছে, করোনাভাইরাসকে কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে এবং এই ম্যানেজমেন্ট সাকসেসের কারণে ২০৩৫ সালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক নেতৃত্ব চীনের পাওয়ার কথা ছিল। [এ দশকের মধ্যেই চীন হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি: রিপোর্ট] সেটা এখন ২০২৮ সালের মধ্যেই চীন অর্জন করে ফেলবে বলে অনুমিত হচ্ছে। তাই অন্তত গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতার আসন ধরে রাখতে বাইডেন নিজ দেশের হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্ত আপসহীন অবস্থানের কথা বলছেন। তিনি শুধু ভারতের কাশ্মীর নীতিই নয়, ভারতের নাগরিকত্ব আইন এবং মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন ও বৈষম্য নিয়েও উচ্চকিত হবেন বলে জানিয়ে আসছেন। একই অবস্থান নেবেন বাংলাদেশের হিউম্যান রাইট ইস্যুতেও। এ কারণে এসব দেশের নেতৃত্ব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

    ভারতের দিবাস্বপ্নঃ
    এ দিকে গত ২৪ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসে এমন এক প্রো-ভারতীয় রিপোর্ট ছাপা হয়েছে যাকে বলা চলে, বাইডেনের নীতির চাপের কথা ভেবে ভারতীয় মিডিয়া ও রাজনীতিতে যে দম বন্ধ অবস্থা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভান করে হলেও যেন তাদের সাময়িক নিঃশ্বাস নিতে দিতেই এই রিপোর্ট লেখা হয়েছে। তাই যেন এটা এক দিবাস্বপ্নের আকাঙ্খায় লেখা রিপোর্ট।
    ঐ রিপোর্টের শিরোনাম, ‘বাইডেন হিউম্যান রাইট ইস্যুতে জোর দিলেও আমেরিকা-ভারত সম্পর্ককেও বিস্তারে নেবেন’ [Biden Is Expected to Expand U.S.-India Relations While Stressing Human Rights]। এই শিরোনামটা নিজেই এক হার-স্বীকার করা সান্ত্বনামূলক শিরোনাম। কারণ হিউম্যান রাইট ইস্যুর ব্যাপক ‘খামতিতে থাকা’ মোদী বাইডেনের সাথে আলাপে গেলে বলাই বাহুল্য, প্রতিটা পদেই সমালোচিত হবেন আর এই সমালোচনার ভয় ও মনমরা অনৈতিক অবস্থানের ছাপ সবার ওপর সব ইস্যুতেও থাকবে। তাই বাইডেনের পক্ষেও সম্পর্ক কোনো দিকে এগিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া এমন দুই নেতার বৈঠকে যদি একজনের চোখে অপরজন খাটো হয়ে থাকেন ওবে ঐ পরিস্থিতিতে আলোচনাই আগাবে না। শুধু তা নয়, সেটি একটি বেইজ্জতির কাণ্ড হয়ে যেকোনো সময় হাজির হয়ে যেতে পারে এই ভয় ঢুকবে ভারতের সবার মনে। আর এই ভয়েই সম্ভবত মোদী বাইডেনের সামনে মুলাকাতে আসতেই চাইবেন না। তাই, মোদী সাক্ষাতের কোন মিটিং এড়িয়ে চলতে চাইবেন, এটাই হওয়ার কথা।
    তবে ওই রিপোর্ট এসব প্রশ্নের মীমাংসা না করতে পেরে শেষে অস্বাভাবিকভাবে (বাইডেন ডেমোক্রাট  অথচ) এবার রিপাবলিক থিংকট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের কিছু মন্তব্য নিয়ে এসেছে, নিজেদের মনোবল বাড়াতে। যেমন কার্নেগি ইন্ডিয়ার অ্যাশলে [Ashley J. Tellis], ট্রাম্পের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান বিগান [Stephen Biegun] বা থিংকট্যাঙ্ক ব্যক্তিত্ব রিচার্ড ফনটেইন [Richard Fontaine,]- এদের কথা উদ্ধৃতিতে আনা হয়েছে। কিন্তু মজার কথা হল, কোথাও পরিষ্কার বলা নেই তারা এসব কথা কবে বলেছেন? নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে, না পরে? তা স্পষ্ট নয়। আবার কোথাও যদি বলা থাকে তবে সেটা অবশ্যই গত নভেম্বরের   নির্বাচিনের আগের যখন নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষের প্রপাগান্ডা হিসাবে অনেক কথা বলা হয়েছিল, সেসব কথা। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা কি বাইডেন জিতার পরে তার সম্ভাব্য নীতি সম্পর্কে কথা বলছেন? অবশ্যই তা নয় অথবা তারা সেটাও নিশ্চিত করেননি। এমনকি ঐ রিপোর্টের এক জায়গায় দাবি করা হয়েছে, বাইডেন নাকি এশিয়ায় চীনের ক্ষমতার ভারসাম্য হিসেবে কোয়াড জোট নিয়েও আগাবেনই [As relations between New Delhi and Beijing soured, India strengthened its commitment to a multilateral partnership with the United States, India, Japan and Australia — known as the Quadrilateral Security Dialogue, or Quad.] অথচ এসব কথা তো নভেম্বর নির্বাচনের আগে বলা কথা।

    কাজেই বলা বাহুল্য এমন জবরদস্তি অনুমানের ভিত্তি নেই। কারণ বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে অনেক রাষ্ট্রের সাথে নীতি বা পলিসিগত জোট বা ঐকমত্য করবেন হয়ত। কিন্তু কোয়াড তো সামরিক জোট আর তা এক আলাদা প্রতিষ্ঠান। কোনো দেশের অন্য দেশের সাথে পলিসিগত মিলের ভিত্তি খুঁজে পেয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়া আর সামরিক জোটে তৎপর ও যুক্ত হওয়া – এ দুটো কোনোভাবেই আমরা এক বলে চালিয়ে দিতে পারি না। অথচ এমন উদ্ভট দাবি এখানে করা হয়েছে চাতুরির সাথে। শেষে রেফারেন্স টানা হয়েছে ভারতের ট্রাম্প অনুসারী এক আমেরিকান থিংকট্যাঙ্কের প্রধান, ব্রহ্ম চেলানির। চেলানির দাবি একেবারে হুমকির মতন। নিউইয়র্ক টাওইমসে দাবি করা হয়েছে  চেলানি নাকি বলেছেন, বাইডেন যদি চীনের প্রতি নরম অবস্থানে কথা বলেন তবে তা ভারতকে ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ করতে ঠেলে দিবে [“If he’s seen as pursuing a softer approach with China, it will make New Delhi have second thoughts about a soft alliance,” said Brahma Chellaney, a professor of strategic studies at the Center for Policy ]। তবে এটা বিরাট হুমকি দেয়ার মতো কথা। কিন্তু ভারত ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ করে কোথায় যাবে? ভারতের কাছে আমেরিকার কাছে যাওয়া ছাড়া আর কে বিকল্প আছে? আসলে ভারতের জন্য একটাই আমেরিকান বিকল্প আছে; সেটা হল, এবার উল্টা আরো বেশি করে চীনের ঘনিষ্ঠ হয়ে কোলে উঠে যাওয়া! এ ছাড়া ভারতের জন্য আমেরিকার বিকল্প আর কই?
    তবে আবার সবশেষ ঐ রিপোর্টে স্বীকার করে নিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমেরিকার কিছু অ্যাক্টিভিস্ট বরং দাবি করেছেন বাইডেন যেন ভারতের সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেয় ভারতের হিউম্যান রাইটের ব্যাপারে সতর্ক না হলে সেই ভারত হবে আমেরিকার জন্য ভীষণ বিপদের” [Some activists in the United States want the Biden administration to go even further and warn Indian officials that discontent over some of its current policies could imperil how strong a partner India might be for the United States. …… “Human rights first is equally important,” said Simran Noor, the chairwoman of South Asian Americans Leading Together, an advocacy group in the United States. ]। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে এই রিপোর্ট শেষবিচারে ভারতের জন্য সান্ত্বনামূলক কিছু বাক্যও তুলে ধরতে পারেনি।

    চীন-ইইউ CAI  চুক্তি করে ফেলাঃ বাইডেন শপথ নিবার আগেই যা হারালেন
    এদিকে গত ৩০ডিসেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন মিলে বিশাল তাতপর্যপুর্ণ এক ভার্চুয়াল ভিডিও শীর্ষ বৈঠক সম্পন্ন করেছে। এটা হল, চীনের সাথে ইইউর মূলত বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবিষয়ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক চুক্তি। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই) বা CAI  ।
    এতে সার কথাটা হলো, ট্রাম্প প্রশাসন তার চার বছরে যেভাবে ইইউকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তা বাইডেন এসে মেরামত করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন বলে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন, তা আর এখন কার্যকর হওয়ার সুযোগ থাকল না। এর আগেই চীন-ইইউর এই চুক্তি আমেরিকাকে চিরদিনের জন্য পাশে ও বহু পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল।
    এই ফাইনাল আলোচনায় ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন (উপরের ছবিতে ঘড়ির কাটার অর্ডারে) চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, ইইউ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মিশেল [Charles Michel],  ইইউর দুই প্রধান নেতা রাষ্ট্র জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল আর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো; আর এদের সাথে ছিলেন ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট উর্সুলা [Ursula von der Leyen]। অর্থাৎ পক্ষ হিসাবে চীন ও ইইউ এই দুই পক্ষ।  কিন্তু কেন বাইডেনের অনুরোধ ফেলে ইইউ নেতারা এই চুক্তিতে গেলেন এনিয়ে অপ্রকাশ্যে বিস্তর মনকষাকষি নেপথ্য আলাপ হয়েছে। যার প্রায় সবটাই আমরা পেতে পারি হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমস ওয়েব পত্রিকায়। সেখানে গত ৩১ ডিসেম্বর সংখ্যায় রিপোর্টার ডিভিড হাট [DAVID HUTT] এর লেখা এক বিস্তারিত প্রায় দশ পৃষ্ঠার রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম হল, ইইউ-চীনের ডিল বাইডেনের টিমকে হয়ত আরও অনেক অপশন দিতে পারত [EU-China deal may give Biden’s team more options]। অর্থাৎ আমেরিকার পক্ষ থেকে দেখা ও করা এই শিরোনাম। আমেরিকান চোখে তাঁরা আমেরিকা-ইইউ এর সম্পর্ককে ট্রান্স-আটলান্টিক [transatlantic relationship] সম্পর্ক বলতে ভালবাসে। ভৌগলিকভাবে তারা আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের ভুমি বলে। সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা সেখানে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেনকে  ট্রান্স-আটলান্টিসিস্ট বলে খোচা দিয়ে লিখেছে- President-elect Joe Biden is considered to be an Atlanticist। কিন্তু এশিয়ান টাইমসের  ডেভিড হাট অত দূর থেকে কথা বলেন নাই। তিনি সরাসরি ইইউ কে প্রতারনাকারিই [gazumped, যার বাংলা হল,  বাড়িবিক্রির বিক্রেতার সাথে দরদাম সব ঠিক হবার পর ফাইনাল পেমেন্টের আগে তিনি এবার বাড়ির বর্ধিত দাম হেঁকে গোঁ-ধরে বসা – একে যে  প্রতারণার ঘটনা বলে মনে করা হয়]  বলেছেন। কারণ , তিনি বলছেন নভেম্বর নির্বাচনের আগের মাসে অক্টোবর ২০২০ তে ট্রাম্পের উদ্যোগে ইইউ-আমেরিকা এই বৈঠক বসেছিল চীনের বিরুদ্ধে তারা কী কমন অবস্থান নিতে পারে সেই বিষয়ে।  ডেভিড হাট ইইউ এর ফরেন পলিসি প্রধান যোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন তিনি চীনবিরোধী ইইউ-আমেরিকা বৈঠকের প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু তি এখন এমন উলটে গেলেন কেন? এটাকেই তিনি প্রতারণা বলছেন।  ডেভিড হাট আরও খবর দিচ্ছেন ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাথিউ [Matthew Pottinger] এর উদ্ধৃতি টেনে বলছেন “ইইউ এর এই আচরণে আমরা আমেরিকার উভয় দল এই ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত ও হতবাক”[Leaders in both US political parties and across the US government are perplexed and stunned that the EU is moving towards a new investment treaty right on the eve of a new US administration.”]।
    এইবার পালটা ইইউ এর দিক থেকে জবাব বক্তব্যও তুলে ধরেছেন ইইউ এর ট্রেড কমিশনারকে উদ্ধৃত করে ডেভিড হাট লিখছেন, কমিশনার বলেছেন CAI  চুক্তিতে স্বাক্ষর করে আমরা এখন আমেরিকার সমান হলাম” [CAI deal as a “leveling up” with the US on trade terms relating to China]। কেন একথা? কারণ ইউরোপ অনেক আগে থেকেই ট্রাম্পের উপর ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ তিনি চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধ করে গেছেন। কিন্তু তা থেকে বের হতে ট্রাম্প যে সমঝোতা আলোচনা করেছিলেন সেখানে তিনি ইইউ-কে জানিয়ে তা করেন নাই। যদিও ঐ আলোচনা প্রথমপর্বই কেবল শেষ হয়েছিল এমনকি ঐ অংশ পর্যন্ত  চুক্তিও সম্পন্ন করা হয়েছিল, তবে এর পরে আলোচনা আর আগায় নাই। সব ভেঙ্গে পড়েছিল। ইইউ এর ট্রেড কমিশনার সেই উপেক্ষারই রেফারেন্স তুলে বলছেন এইবার আমরা আমেরিকার সমান হলাম।  এরকম ইইউ-আমেরিকার অনেক অভিযোগ-পাল্ট অভিযোগের কথা আছে ডেভিডের এই রিপোর্টে।
    কিন্তু এসব কিছুকে পিছনে ফেলে সত্য এখন একটাই, ইইউ-চীন চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলেছে এবং দুপক্ষই এতে ভীষণ সন্তুষ্ট। এরই এক প্রকাশ হল, স্বাক্ষর শেষে ইইউ এর পক্ষ থেকে চীনের প্রশংসাসূচক একটা শব্দই বহু কথাই বলে দিয়েছে। তা হল, ইইউ এই চুক্তিকে চীনের দিক থেকে করা ‘অতুলনীয় এক প্রতিশ্রুতি’  [unprecedented commitment] বলে মনে করছে যা চীনে ইইউর বাণিজ্যকে নিশ্চয়তা ও আগাম বোঝা সম্ভব – এমন সব আস্থা দিবে [provide commercial certainty and predictability, with wide access for an array of European companies to the hitherto heavily restricted Chinese market.]। আসলে এই চুক্তি চীনের সম্পর্কে পশ্চিমাদেশে যেসব বদ্ধমুল ধারণা ছিল যেমন চীনে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো পণ্যে মূল্য বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত হয় না, সরকারি হস্তক্ষেপে নির্ধারিত হয়। অথবা শিল্প অথবা কৃষি পণ্যে সখানেই কত ভর্তুকি দেয়া হয় তা গোপন রাখা হয় [regulate China’s state-owned enterprises and transparency on subsidies.] কিন্তু এই চুক্তির পরে ইইউ নেতারা খুশি যে এখন এসব তথ্য সবই তারা সহজেই জানতে পারবেন।

    সবশেষে দাড়ালো কী?
    এতদিন চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবে এটা জানা ছিল কিন্তু এর পথে বাধাগুলো কো করে সামলাবে বা অপসারণ করবে তা স্পষ্ট ছিল না। এই চুক্তি বলে দিচ্ছে চীন কী করে তা করতে যাচ্ছে। আর এটা সম্পন্ন করতে চীনের একটা সাধারণ ফর্মুলাও অনুসরণ করতে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, সবাইকে আলাদা আলাদা ডিল কর বা সামলাও। ইইউ-চীন চুক্তিটা দেখিয়ে দিল ট্রাম্প এবং এমনকি বাইডেনও  কতটা নাদান। ভুয়া জাতিবাদ আর ভুয়া আমেরিকা ফাস্ট সমুলে ত্যাগ করে আমেরিকার উচিত ছিল ইইউ-কে সাথে রেখে একটা পক্ষ হয়ে এরপর চীনের সাথে ডিল করতে বসা। অথচ ট্রাম্প চার বছর চলল ঠিক এর উলটা অবস্থান নিয়ে, ‘একলা চল’। আবার বাইডেন ক্ষমতায় আসবার আগে থেকেই এই দুর্বল জায়গাটা নিয়ে কাজ করা পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল যে কী করে এই খামতি মোকাবিলা করবে। এমনকি ডেমোক্রাট দল হিসাবেও ইইউ এর সাথে কথা আগিয়ে রাখা দরকার ছিল। এখন যা হল তাতে এটা প্রমাণিত যে বাইডেনের টিমের বাস্তবতা সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই; দুর্বলতা বা সবলতার কোন দিক সম্পর্কেই নাই। ওদিকে এর আগে চীন  RCEP এর বাণিজ্য চুক্তি করেছে। তাতে পুরা এশিয়ার যত মাতবর আছে – জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া অষ্ট্রলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর সাউথ চায়না সি-এর আশাপকাশের কেউ বাকি নাই। অর্থাৎ এদেরকে ডিল করেছে আমেরিকা বা ইইউ এর বাইরে রেখে আলাদা করে।  এখন বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিলে তাকেও চীন বঞ্চিত করবে না। কিন্তুঞ্জোট পাকাতে দিবে না। দরকষাকষির ক্ষমতাও ছেটে দেওয়া হয়ে গেছে। আমেরিকা যে গ্লোবাল নেতার মত ইইউ ও RCEP এর সদস্য দেশগুলোকেও নিজের সাথে রেখে এইবার চীনের সাথে বসবে বা ডিল করবে – সেই বাস্তবতাটাই চীন ভেঙ্গে দিয়ে আসছে ও ফাইনালি দিলও। অর্থাৎ চীনের গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে বাধা দিবার কোন জোট বা কোন রাষ্ট্রের অবস্থানের আর সুযোগ থাকল না। এখন সবার স্বার্থই চীনের সমৃদ্ধির মধ্যে, চীন দুর্বল হলে নয়।  অতএব আমরা বলতে পারি এটাই পারফেক্ট পরিস্থিতি চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হবার পথের।

    ভারত কোথায়?
    কিছু একটা কথা বাদ পড়ে গেল। কী সেটা? ভারত কোথায়? সে কী পেল, তার অবস্থান কই? ভারতই আসলে সমুলে বাদ পড়ে গেল, একেবারে ওয়াইপ আউট, মুছে গেল। একমাত্র পথ খোলা থাকল, লজ্জার মাথা খেয়ে কম্প্রোমাইজ; মাফ চেয়ে চীনের অনুগ্রহ লাভের পথ পাওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০২ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ভারতের দিবাস্বপ্ন আর ইইউ-চীন চুক্তি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা

    ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা

    গৌতম দাস

    ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3jP

    India’s Prime Minister Narendra Modi addresses party workers during the celebrations after the victory in Bihar assembly election BJP headquarters on November 11, 2020 in New Delhi, India. (Photo by Mayank Makhija/NurPhoto)

    ইভিএম মেশিন বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে বিতর্ক শুধু বাংলাদেশে না, ভারতেও খুবই ব্যাপক। আর ভারতে এর ব্যবহার প্রায় শতভাগ আসনে, মানে ভারতের নির্বাচন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি ইভিএম নির্ভরশীল। এই মেশিনের বিরুদ্ধের ব্যাপক অভিযোগগুলো আসলে ওর প্রোগ্রামিংকে বাইরে থেকে ম্যানিপুলেট করে কারচুপি করার সুযোগ নেওয়ার জন্য।  এসব অভিযোগগুলোর মধ্যে  গত ২০১৯ সালের মে মাসের কেন্দ্রের নির্বাচনের ফলাফল থেকে সর্বশেষ এই বছর গত অক্টোবর মাসে বিহারের রাজ্যনির্বাচন পর্যন্ত প্রায় ভারতের সব নির্বাচনেই মেশিন কারচুপির অভিযোগ অনেক জোরদার হয়ে উঠেছে।
    বিশেষত ২০১৯ সালের নির্বাচনে যা সেসময় অনুষ্ঠিত হয়েছিল সাত পর্বে। এর শেষ পর্বের নির্বাচনের আগের দিন অমিত শাহ আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। হিমালয়ের এক হিন্দু তীর্থস্থানে মোদী ধ্যানে বসেছিলেন, শেষ নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের আগে। সেটা শেষ করে এসেছেন- এই অজুহাতে মোদী ঐ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও সৌজন্যমূলক কিছু কথা ছাড়া আর কিছুই বলেননি। পুরো অনুষ্ঠানে অমিত শাহ একাই কথা বলেছিলেন। অমিতের কথার মূল ফোকাস ছিল কত আসনে বিজেপি জিতবে, এর আগাম অনুমান দেয়া। তিনি দাবি করেছিলেন, মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি একাই তিনশ-এর বেশি আসন পাবে। হয়েছিলও তাই, পেয়েছিল ৩০৩ আসন; যেটা গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়ে আবার ৩৬ আসন বেশি। বিজেপি জোট হিসাবে পরের ২০১৯ সালে মোট পেয়েছিল ৩৫৩ আসন। আর এখান থেকেই কারচুপি বা সফটওয়ার প্রোগ্রাম ম্যানিপুলেশন করার অনুমান জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায় যা এখন ক্রমশ বাড়ছে। সে সময় মূলত দুটি কারণে অভিযোগ, সন্দেহ জোরদার হয়েছিল, এক. অমিত শাহের মোট আসনের প্রেডিকশন বা অনুমিত প্রাপ্ত আসন সংখ্যা আর ২০১৪ সালের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে বিজয়ী হওয়া, যেটা অস্বাভাবিক ঠেকেছিল। কারণ, ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় আগের কংগ্রেস সরকারের সময় অর্থনীতির দশা প্রবল খারাপ হওয়াতে তরুণেরা ব্যাপক চাকরি হারা হচ্ছিল। আর সেই হতাশায় আর সেটা মোদী এড্রেস করাতে তারা মোদীর উপর আশায় বুক বাঁধতে ঝুকেছিল। তাই মোদী বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু পরে ২০১৯ সালের সময় ফেলে আসা পাঁচ বছরের মোদী শাসনে ইতোমধ্যে আরো তিতা হয়ে গেছিল। কারণ ভারতের অর্থনীতি ডুবেছিল এবার অনেক বেশি; যা আবার মোদীর দীর্ঘদিনের পরিসংখ্যান লুকানোর প্রবল চেষ্টার পরেও তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল। আর এই পতন মূলত শুরু হয়েছিল মোদীর ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাঁচশ ও এক হাজার রুপির নোট হঠাৎ বাতিল ঘোষণার ধাক্কায়। ভারতের অর্থনীতির বড় অংশটাই হল ইনফরমাল অর্থনীতি। অর্থাৎ মূল কারখানা উতপাদনের “কাজ সৃষ্টি” নয়। বরং সীমিত কিছু এমন মুল কাজ সৃষ্টির ফলে এবার তাকে সহায়তা করতে যেয়ে আধপেটে খাওয়া কিছু শ্রমিক-ফেরিওয়ালার (বা কারখানা শ্রমিকদের জন্য ভাত রেধে দেয়া বুয়ার কাজ টাইপের) জন্য যে কাজ সৃষ্টি হয় – এটাই ইনফরমাল অর্থনীতি বা কাজ সৃষ্টি।  আর এই অংশের উপরেই নোট বাতিলের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি পড়াতে তাও তখন একেবারে গুটিয়ে যাওয়া; এটা ঘটেছিল মারাত্মকভাবে। তাই পরের ২০১৯ নির্বাচনে বিজেপির আসন কমে হেরে যেত অথবা কম মার্জিনে বিজেপি জিতলে হয়ত এসব সামঞ্জস্তপুর্ণ হত, কিন্তু হয়েছিল এর উল্টা। উল্টা আসন বেড়ে গেছিল। সন্দেহ-অবিশ্বাসের শুরু সেই থেকে।

    একজন রবি কান্তের দুঃখ ও হতাশাঃ
    একজন রবি কান্তের দুঃখ ও হতাশার শুরু এখান থেকেই। কিন্তু এই রবি কান্ত [Ravi Kant] আসলে কে?
    রবি কান্ত ভারতের একজন কলামিস্ট, জার্নালিস্টও বলা যায়। তার লেখার মূল আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি। আর মূলত ভারতের বাইরের পত্রিকায় তিনি লেখেন যদিও তাঁর নিজেরই ভাষ্যমতে তিনি টেকনোলজি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা সাইবার-সিকিউরিটি নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন। এই লেখায় তাঁর এবারের উদ্বেগ এই সাইবার সিকিউরিটির প্রশ্নে।

    এদিকে “এশিয়ান টাইমস” [Asian Times] হংকং থেকে প্রকাশিত ওয়েব ভিত্তিক একটা দৈনিক; সাম্প্রতিককালে যার আরেকটা সিস্টার কনসার্ন আরেক ওয়েবভিত্তিক দৈনিক প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়েছে – ‘এশিয়ান টাইমস ফাইন্যান্সিয়াল’ নামে। রবি কান্ত ভারতের মিডিয়ায় বিশেষত ভারতের “ইকোনমিক টাইমস” ধরনের অর্থনীতিভিত্তিক পত্রিকায়ও বেশি সময়ে লিখে থাকেন। তিনি এশিয়ান টাইমসেও একটা আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে তার লেখার বিষয় “ভারত-রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে” [Systematic collapse of the world’s largest democracy] বলে তাঁর হতাশা আর দুঃখ!

    ‘ভেঙে পড়ছে’ মানে কী অর্থে?
    একটা রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে ও দীর্ঘস্থায়ী হয় স্থায়ী ও সুগঠিত কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কারণে। সে হিসেবে, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ আর সংসদীয় (জনপ্রতিনিধিদের) ক্ষমতা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠাকীকরণ রূপে হাজির হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বলে মানা হয়। যেখানে বিভিন্ন মতামতকে জায়গা করে দিয়ে একটা সমন্বিত ব্যবস্থা ও আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে একে অভ্যাস ও চর্চাকে সবল করা ও নিয়মিত রেওয়াজে নিয়ে যাওয়া হয় ইত্যাদি।

    গায়ের জোর খাটানোর অথবা কখনো চাতুরীর সুযোগ পেয়ে বা বের করে আপনি যখন রাজনৈতিক বিরোধীদের দাবড়িয়ে কোণঠাসা করে রাখবেন আর সেটিই মূলধারার প্রাকটিস বানিয়ে ফেলবেন – এটাই হল এর উল্টা কাজ। গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এবার দুর্বল ও অসংগঠিতভাবেই বেড়ে উঠবে। এতে দুর্বল ও অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত ও খুবই সাময়িক আপনার বিরাট বিজয় এনে দিচ্ছে মনে হলেও নিশ্চিত থাকতে পারেন, অচিরেই আপনি আপনার রাষ্ট্রকে ক্রমেই ভেঙে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন; সেদিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং যাবেনই। সেটা তখন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে যাবে যে, আপনার রাষ্ট্রটা কখন ভেঙে পড়বে! অকেজো হয়ে যাবে!  আবার যেমন ধরেন ক্ষমতাসীন আপনারই সংসদীয় বিরোধী দলের নেতা – তাঁকে আপনি খুন করানোর সুযোগ পেলেন। আর সেটা আপনি না, অন্য কেউ তার নিজের স্বার্থে বাস্তবায়ন করে ফেলবে জেনে তাতে আপনি বেজায় খুশি হয়েছেন। এখন আপনি কী করবেন?  ক্ষমতাসীন আপনি মনে করলেন আমি তো হত্যাকান্ড করছিনা তাই  অন্যের হাতে  বিরোধীনেতার মৃত্যুর সুবিধা পেতে ও নিতে অসুবিধা কী? না, আপনি বিরাট ভুল করবেন। তাই এটা উলটা বিরাট অসুবিধা তৈরি করবে। এমনিতেই ক্ষমতাসীন সরকারে আপনি বলে বিরোধীনেতার নিরাপত্তা দেওয়ার দায় সরাসরি মূলত আপনার। তবু সেটা যদি বাদও রাখি তবে আপনি এতে নিজের  ও রাষ্ট্রের যে ক্ষতিটা করবেন তা হল, এখানে এরপর থেকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধিরা পরস্পর পরস্পরকে খুন করার রেওয়াজ চালু করে ফেলবে, আর সেটার শুরুও আপনিই করলেন। ফলে এখন প্রতি মুহুর্তে বিরোধীদের হাতে নিজে খুন হয়ে যেতে পারেন সে আশঙ্কায় বসবাস করতে থাকেন। আর এর ব্যাপক মানেটা হবে যে – ক্ষমতায় থাকার সময়সীমা শেষে আইনমাফিক পরবর্তি নির্বাচিত ক্ষমতাসীনের হাতে নিরুপদ্রব ক্ষমতা-হস্তান্তরের রেওয়াজ চালু হতে আপনি আর দিলেন না। ফলে আপনার বেলাতেও তা হবার নিশ্চয়তা নষ্ট করে দিলেন। এগুলো কাজেরই নিট ফলাফল  দুর্বল ও অসংগঠিতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাড়া করা। ফলে ধীরে ধীরে এই রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার দিকেই যাবে।
    এসব দিক থেকে দেখে বিবেচনা করে তাই রবি কান্তের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর অনুষঙ্গ হিসেবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও – এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। আর এ নিয়েই তার যত আশঙ্কা ও যেটা তাঁর হতাশার মূল প্রসঙ্গ!

    তাঁর লেখার শুরুতে প্রথম-অর্ধে তিনি ভারতের “গণতন্ত্র” কত মহান, তা নিয়ে প্রায় অর্ধেক জায়গাই ব্যবহার করে ফেলেছেন। যেমন তাঁর লেখার মূল শিরোনাম দিয়েছেন, ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসিকে সিস্টেমেটিকভাবে ভেঙে ফেলা” হচ্ছে। এখানে যদিও আমরা বড় খারাপ চিহ্ন হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, কেউ যখন “গণতন্ত্র” এই শব্দ ও ধারণা দিয়ে কোন রাষ্ট্ ও ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করে বা তুলে ধরে তবে এই মানে হল, ঐ লেখক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে বা  রাষ্ট্রের গঠন প্রকৃতি-বৈশিষ্ট প্রসঙ্গে জানাশুনা তার জানাশুনা খুবই কম ও দুর্বল। আর ঠিক সেকারণে,  অনেক পাঠক এই ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসি’ ধরনের ফাঁকা ও খামোখা প্রশংসা শুনেই বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারেন এবং সেটাই উচিত সম্ভবত। কারণ শব্দটা বাগাড়ম্বর ধরনের। এমনিতেই, শুধু ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দ ব্যবহার করে কেউ ফাঁপা গর্ব করা কথা বললে সেটা বাকচাতুরীতে প্রতারণা ও ফাঁকির আয়োজন হচ্ছে বলে সন্দেহ হতে শুরু হয়। কারণ একটা দেশে নির্বাচন হলেই সেখানে ডেমোক্রাসির জয়জয়কার চলছে বলা বা মনে করা ভিত্তিহীন ও তা চাতুরি। ফলে সেখান থেকে অসততার ইঙ্গিতের শুরু। এটা এক বাগাড়ম্বর আর প্রপাগান্ডা। অথচ ওর ভিতরে খুঁজে দেখলে হয়ত, মানে পাওয়া যাবে যে, সবচেয়ে জঘন্য নাগরিক বৈষম্যের রাষ্ট্র হয়ত সেটাই; অথচ সেদিকটার খবর নাই।  আবার কেউ যখন মহান বা শ্রেষ্ঠত্ব ধরণের শব্দ ব্যবহার করে নিজের রাষ্ট্র সম্পর্কে কথা বলে যেমন “মেরা ভারত মহান হ্যায়” – তাহলে বুঝতে হবে তিনি যে বর্ণবাদী এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে বিশাল ক্ষতিকর চিন্তার ধারক তা তিনি নিজেই বুঝেন না। এমনই ডাম্ব বা ভোতা চিন্তার লোক তিনি।  এ ছাড়াও ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দ ব্যবহার করে যারা নিজেকে প্রকাশ করতে ভালোবাসেন এদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সবল অভিযোগ হল, রাষ্ট্রের আসল গুণ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এদের ন্যূনতম জ্ঞান ও ধারণা নাই বা থাকে না। কারণ রাষ্ট্রের মুখ্য গুণ-বৈশিষ্ট্য সংশ্লিষ্ট অরিজিনাল শব্দ ও ধারণাটা “গণতন্ত্র” নয় বরং শব্দটা হল  “রিপাবলিক” রাষ্ট্র।
    এর প্রমাণ একমাত্র রাজা-বাদশাদের রাজতান্ত্রিক দেশ ছাড়া, বাকি প্রায় সব রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নামের মধ্যে কমন যে শব্দটা সবাই বয়ে বেড়ায়, তা হল ‘রিপাবলিক’। তাতে সেই রাষ্ট্র কমিউনিস্ট কী ইসলামিস্ট কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র যাই হোক না কেন! এসব রাষ্ট্র যখন প্রথম কায়েম হয়েছিল – এমন সবখানেই নামের মধ্যে রিপাবলিক শব্দ থাকতে দেখা যায়, এটা এমনই কমন। তাহলে এই ডেমোক্রেসি শব্দটার উদয় হল কোথা থেকে?
    আসলে ডেমোক্রেসি শব্দটার পেছনে বড় সক্রিয়তা ছিল আমেরিকার – তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে বেকায়দায় ফেলার আমেরিকার “দরকারি” স্বার্থে। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নও নিজেকেও জন্ম থেকেই এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র মনে করে ও দাবি করে এবং শব্দটা তার রাষ্ট্রের নামের  মধ্যেই জন্ম থেকে দেয়া হয়েছিল। ওর পুরা নাম ছিল ইউএসএসআর এবং এই ‘আর’ মানে হল রিপাবলিক। কিন্তু কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম থেকেই ওপেন সার্বজনীন অবাধ নির্বাচন অথবা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন (জনপ্রতিনিধি নির্বাচন) বলতে কিছুই ছিল না। রাখা হয় নাই। জন্মের পর দেওয়া গণভোটের ফলাফল বিপ্লবের পক্ষে তা আসাতে ঐ ফ্লাফল আর কোনদিন সরকারি স্বীকৃতির আলো দেখে নাই। আর নির্ধাচন ধারণাটাই উঠে যায়। আর সেটাকেই পুঁজি করে একে নেতিবাচক হাইলাইট করতে আমেরিকার গণতন্ত্র শব্দটাকে সামনে আনা যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের মতোই এক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করতে পারে; কিন্তু এখানে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ নেই – মানে নির্বাচন নাই; দেখ! অর্থাৎ আমেরিকার দাবি হল রাষ্ট্রের নামে রিপাবলিক শব্দ থাকলেও এদের রাষ্ট্রে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ নাই।
    এ কারণে, জেনে না জেনে ভারত মুল কনসেপ্ট রিপাবলিক বা রিপ্রেজেন্টেশন ইত্যাদি ধারণা থুয়ে “গণতন্ত্রঃ শব্দটা দিয়ে সব ঢেকে ফেলা আর এইশব্দটাকে  পপুলার করার দিকে যাওয়ার শুরু। আর তা থেকে ভারত  ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্রাসির’ দেশ বলে গর্ব করা – এটা হচ্ছে ভারতে নাগরিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয় কি না, এটা নাগরিক নির্বিশেষে সকলে সমান মর্যাদা ও অধিকারের রিপাবলিক কি না এসব দিক বাদ দেয় ও অগুরুত্বপূর্ণ মনে করে ফেলে দেওয়া। আর ভারতে কেবল একটা নির্বাচন হয় কি না এটাই একমাত্র বিবেচ্য করাই হচ্ছে এই ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসি’ বলার না-বুঝ বা অবুঝদের বলাবলি। অথচ স্বাধীন ভারত জন্ম থেকে তো বটেই, এমনকি অখণ্ড ভারতের রাষ্ট্রবিষয়ক চিন্তার প্রথম উন্মেষের সময় (১৮১৫) থেকেই রাষ্ট্র বলতে বুঝা হয়েছিল কেবল এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাকেই। অর্থাৎ শুধু জাতি-রাষ্ট্র নয়, বরং এখানে ‘জাতি’ বলতে মনে করা হয়েছে একটা ধর্মীয় জাতি, একটা হিন্দু-জাতির রাষ্ট্র – এভাবে । ফলে এরপর এই রাষ্ট্রের নাগরিকের তো আর সার্বজনীনভাবে এবং সমান নাগরিক-অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ থাকেনি। বরং এটা বৈষম্যমূলকই হবে, এবং তা হয়েছিল এবং আজও হয়েই আছে। এক কথায়, ভারত জন্ম থেকেই সম-নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। কারণ হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা রাষ্ট্র মানে, তা আর নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হবার সুযোগ নাই। এ কারণে সেই হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাকেই আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে সেকালে হবু পাকিস্তানকেও যেন ঠেলে দেয়া হয়েছিল আরেক ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র হতে; বাধ্য করা হয়েছিল। আর একারণের আমার আবেদন থাকবে গণতন্ত্র শব্দটার ব্যবহার এড়িয়ে চলা। এটা পাবলিকের বা গণ-ক্ষমতার রাষ্ট্র, রিপাবলিক রাষ্ট্র বা জনপ[রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র ইত্যাদি শব্দ ও ধারণা ব্যহার করা যেতে পারে।

    অথচ এই চরম বৈষম্যমূলক অসম-নাগরিকের এই রাষ্ট্রেও যেহেতু নিয়মিত নির্বাচন হয় কাজের এটা দুনিয়ার ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ বলে মিথ্যা ঢোল পেটানোর সুযোগ নেয়া চলছেই সেই থেকে। আরএসএস বা বিজেপির মত দল ভারতে চালু করে ফেলা যাচ্ছে সহজেই, বিনা বাধায়। ভারতের কনস্টিটিউশন, আদালত অথবা নির্বাচন কমিশনের কোনো আইনি বাধা ছাড়াই গুজরাটের মুসলমান গণহত্যাকারি মোদীর মত লোক দল খুলছেন, প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। অথচ কেউ মুসলমান নাগরিক হলে তাকে রাস্তায় ফেলে মাটিতে শুইয়ে বুকের খাঁচার ওপর লাফ দিয়ে উঠে তাকে নির্যাতন-জবরদস্তিতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলাতে চেষ্টা করছে বিজেপি-আরএসএস। এই হল ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ ভারত।

    তবু এত সমালোচনার পরও –  আমরা এখানে এখন রবি কান্তের দুনিয়ার ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ রাষ্ট্র বলে করা অন্ধ প্রশংসাকে পাশ কাটিয়ে যাবো, মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করার খাতিরে। রবির মূল অভিযোগ হল, কোনো রাষ্ট্র মুখ্য যেসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত প্রতিষ্ঠানের উপরে ও কারণে টিকে থাকে, যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি; ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর পাবলিক বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, শেষ হয়ে গেছে (বলেছেন, ডেথ অব ইন্ডিয়াস ক্রেডিবল ইনস্টিটিউশন্স, The death of India’s credible institutions)। কেন?

    ইভিএম রেজিমঃ
    ভারত এখন ইভিএম রেজিম এর যুগে এসে পড়েছে।  ভারতে নির্বাচন কমিশনের শতভাগ ভোট নেয়ার পদ্ধতি ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনভিত্তিক। এই মেশিন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ অনেক দিনের, বিশেষ করে মোদী সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেশি করে এই সন্দেহ-অভিযোগ আরো সুনির্দিষ্ট। তাই আগামীতে হঠাৎ কোন একদিন যদি গত ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সাধারণ নির্বাচনে মোদী ইভিএম মেশিন ম্যানিপুলেট করে ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে প্রমাণ সামনে হাজির হয়ে যায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

    আগামীতে হঠাৎ কোনো একদিন যদি গত ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সাধারণ নির্বাচনে মোদি ইভিএম মেশিন ম্যানিপুলেট করে ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে প্রমাণ সামনে হাজির হয়ে যায়, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

    ‘মোদির নির্বাচনী সফলতার গোপন দিক’ এই উপ-শিরোনামে রবি কান্ত লিখছেন, “সাম্প্রতিককালে নির্বাচন কমিশন ও ইভিএমের বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ কমিশন কেবল ভিত্তিহীন বলেই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। কোন আমল করেন নাই, পদক্ষেপ নেয়নি”। এতে সর্বশেষ বিহারের নির্বাচনে (অনুষ্ঠিত হয় গত অক্টোবর শেষে, যার ফলাফল আসে ১০ নভেম্বর) কমিশনের ওপর মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কমিশন আর নিরপেক্ষ কোন প্রতিষ্ঠান কিনা সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এই নির্বাচনে বিজেপি ও তার জোট ছাড়া প্রায় সবাই ব্যাপক ভোটবাক্স কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। এখানে আগে ক্ষমতাসীন ছিল মুখ্যমন্ত্রী নীতিশের স্থানীয় বা আঞ্চলিক ‘জনতা দল’ তবে এর সাথে বিজেপির জোট মিলে তারা বিহারে ক্ষমতায় ছিল। আর এবার কারচুপির অভিযোগ নিয়ে নীতিশের দলের জোট জিতেছে বলে দেখানো হয়েছে এভাবে যে, নীতিশের দলে হারের ঢল নেমেছে কিন্তু একা বিজেপি এবার ঐ আসন হারের চেয়েও একাই বেশি সংখ্যক আসন পেয়েছে। তাই জোট হিসেবে নীতিশ  আবার মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছেন। এদেখে এবার রবি কান্ত প্রশ্ন তুলেছেন, নীতিশের দল ভোট না পেয়ে গোহারা হারলে সেই ভোট কিভাবে একই জোটসঙ্গী কেবল বিজেপি একাই ততোধিক আসন পেয়ে যায়? [If the people of Bihar were openly opposing Nitish, then why would they vote for his coalition partner the Bharatiya Janata Party (BJP), which would again make him the chief minister? ]

    তাই রবি কান্ত ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে বলছেন, “ভোটিং মেশিনের সবচেয়ে অস্বচ্ছ অংশটা হল ওর সফটওয়্যার যা টেকনিক্যাল, জটিল ও প্রায়ই যাচাই পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ নেই”।  কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে উপায় বের হয়।  কারণ এরপরেও এর স্বচ্ছতা নিয়ে বহু কিছু করার আছে যা ভারতের নির্বাচন কমিশনের [এখন থেকে  একে শুধু ‘কমিশন’ লিখব]। আসলে প্রত্যেকটা সফটওয়্যার মানে, ওর সোর্স কোড থাকবেই। আর সোর্স কোডে কে কে ঢুকেছে, হাত ঢুকিয়েছে (এর অটো রেকর্ড থেকে যায় তাই) [… source-code audit reports] তা দিয়ে জানা যাবে কে কে এ মেশিনে হাত ঢুকিয়েছে। এ কারণে রবি এক তুলনা টেনে বলছেন, “উন্নত দেশে নির্বাচনী মেশিনের সফটওয়্যারের সোর্স কোড কে কে হাতিয়েছে, মানে  একসেস নিয়েছে এর নিরপেক্ষ বিশ্বাসযোগ্য একটা অডিট করা হয় কোন থার্ড পার্টিকে দিয়ে। আর সেই ইন্সপেকশন করিয়ে এরপর ঐ থার্ড পার্টি তাঁদের ইস্যু করা যে  রিপোর্ট ইস্যু করে থাকে সেই রিপোর্টটাই  এবার কমিশনের সাইটের প্রথম পাতায় লটকে দেয়া থাকে। এর সোজা মানে হল, পাবলিক কেউ না চাইতেই কমিশন নিজেই দায়িত্ব অনুভব করে নিজের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রমাণ প্রকাশ্যে হাজির করে রেখেছে। আর ঠিক একাজটাই ভারতের কমিশন করতে দায়ীত্ব অনুভব করে নাই। এরা এমনই স্বঘোষিত অসৎ!

    রবি কান্তের তাই দাবি, “ভারতের ইভিএম প্রচণ্ড মাত্রায় এক অস্বচ্ছ ব্যবস্থা” [Indian electronic voting system is highly opaque]। এ কারণে ‘এখানে এসব অডিট রিপোর্টের কোনো হদিসই নেই, পাবলিককে কোনো তথ্যও দেয়া হয় না’- এটা চলতে পারে না। ভারতের নির্বাচন কমিশন এটা করতেই পারে না।

    সুপ্রিম কোর্টে একটা মামলার পরিণতিঃ
    “সম্প্রতি এ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটা মামলা হয়েছিল যে, এসব ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য কোনো থার্ড পার্টিকে দিয়ে ইন্সপেকশনের ব্যবস্থা করানো ও সেই রিপোর্ট প্রকাশ না করাতে কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করা হচ্ছে – এই হল মূল অভিযোগ কারণ এতে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। আর এটা না করাতেই ইচ্ছামত নির্বাচনী ফলাফল বের করার সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে”।

    রবি বলছেন, “অথচ এত শক্ত যুক্তি তুলে ধরার পরও সুপ্রিম কোর্ট ঐ আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। আর এরপর, নির্বাচন কমিশনের  উপর “করণীয় বলে” কোনো আদেশ না দিয়েই বরং উল্টা ঐ মামলার আবেদনকারীকে আবার নির্বাচন কমিশনের কাছে ফিরে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীকে কোর্ট পরামর্শ দিয়েছিল, কমিশনকে নিরপেক্ষ অডিট করানোর আর ফলাফল পাবলিক করতে যেন তিনি (মামলার আবেদনকারী) কমিশনের কাছে আবেদন করেন। সারকথায়, কোর্ট বাদীকেই ফিরিয়ে দিয়েছে এই বলে যে, বাদি যেন কমিশনের কাছে আবার আবেদন জানায়। আর এতে কমিশনের ব্যবস্থা নিলে আর তা থেকে নতুন যে ফলাফল প্রকাশিত হবে এর তিন সপ্তাহের পরে আবেদনকারী চাইলে আবার আদালতে এসে কোনো আবেদন করতে পারবে”। তাই এবার রবি কান্ত পিনপয়েন্ট করে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু সেই থেকে বাদি কমিশনে আবেদন করলেও ‘আজ পর্যন্ত কমিশনই এ নিয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে”।

    এখানে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি কেমন লোক, কেমন ব্যক্তিত্বের – এরকিছু আলামত নিয়ে কথা বলা যাক। তিনি শরদ অরবিন্দ ববদে (Sharad Arvind Bobde)। যার আপন বাবা চাচারা হাইকোর্টের উকিল বা এটর্নি জেনারেল ছিলেন; মানে তারা ল প্রফেশনের এক ফ্যামিলি। তবু শরদ ববদে-এর আচরণ  খুবই অস্বচ্ছ। মানুষের অনেক কিছুরই শখ বা প্রচন্ড আগ্রহ বা স্বপ্ন থাকতেই পারে। তবু একজন জাস্টিসের আচার আচরণ আপোষের জীবন হতে পারে না।  তাঁর শখ হল, বিশেষ ধরণের মটর সাইকেল চালানো বা চালিয়ে দেখা। এমনিতেই বিচারকেরা কী ধরণের সামাজিক জমায়েতে যাবেন বা যাবেন না – আর কোন সংসর্গ এড়িয়ে চলবেন এর গাইড লাইন আছে। অথচ তিনি এক বিজেপি এমপির এমনই এক বিশেষ মটর সাইকেল চড়ে শখ মিটানোর জন্য তার মটর সাইকেল চেয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে শহরে চড়ে বেড়িয়েছেন।  শুধু তাই না। এরপর এই প্রসঙ্গে জনস্বার্থের দিক থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে আদালত ও জনগণকে সচেতনতা বাড়াতে যিনি কাজ করে যান স্বেচ্ছায় এবং নিজ খরচে মামলা করে থাকেন এমন সুপ্রীম কোর্টের এক উকিল হলেন প্রশান্ত ভূষণ। তিনি এনিয়ে আপত্তিকর পয়েন্টগুলো তুলে এক আর্টিকেল লিখলে তার বিরুদ্ধে চীফ জাস্টিস ববদে আদালত অবমাননার মামলা করে দেন।   আর ঐ মামলায় রায়ে তিনি তাঁকে এক রুপীর টোকেন ফাইন করে রায় দিয়ে দেন। যাতে তার উকিলি সার্টিফিকেট প্রশ্ন বা বাতিলের মুখে পড়ে যায়। যদিও তিনি এখন কোনমতে ঐ ফাইন-শাস্তির আদেশের বিরুদ্ধে একটা আপিল করে শাস্তির কার্যকারিতা সাময়িক স্থগিত করাতে পেরে টিকে আছেন। এ’থেকে এখন পাঠকেরা যা বুঝার বুঝে নেন!

    এ দিকে আরেক ঘটনা হল, গত প্রায় তিন-চার বছর ধরে বিশেষ করে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের একমাত্র এক কমিশনার অশোক লাভাসা তিনি বাকি কমিশনারের সাথে দ্বিমত পোষণ করে প্রায় সব সিদ্ধান্তে “নোট অব ডিসেন্ট” দিয়ে নিজের আপত্তির রেকর্ড রেখে যাচ্ছিলেন। ইস্যুটা ছিল, ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদী-শাহের বিরুদ্ধে উঠা নানান নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কমপ্লেন যার বেশির ভাগের উপর বাকি কমিশনাররা মোদি-শাহকে ক্লিনচিট দিলেও লাভাসা তাদের এসব কাজের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে চলছিলেন, উপনির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা। আর এতেই ক্ষুব্দ মোদী সরকার লাভাসার স্ত্রীর যিনি সরকারি স্টেট ব্যাংকের কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে ভারতের সিবিআই (আমাদের দুদকের মত তবে অনেক বড় ক্ষমতার ও সিরিয়াস ভার্সান বলা চলে) লাগিয়ে হেনস্তা করতে থাকেন। এছাড়া আয়কর বিভাগ তাকে নোটিশ পাঠিয়ে নাস্তানাবুদ করে চলেছেন। এখন এ বছর জানা যাচ্ছে শেষে  নিজেকে বাঁচাতে নির্বাচন কমিশনার লাভাসা এবার কমিশন ছেড়ে অন্য সমতুল্য সরকারি পোস্টে ট্রান্সফার নিয়েছেন। মানে আর বাঁশ বলে কিছুই থাকল না, নাই; তাই বাসুরিয়া বলেও আর কেউ থাকল না!

    আর এখান থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, আগামী বছর (সম্ভবত এপ্রিলে) পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে কারচুপি হবে এবং মোদীর বিজেপি জিতেছে এমন ফলাফলই প্রকাশিত হবে। কারণ এই অবস্থায় একই কারচুপির কায়দায় এরপর আগামী বছরের সম্ভবত এপ্রিলে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে যদি মোদী রাজ্য সরকারে নিজ দলকে বিজয়ী দেখান তাতে অবাক হওয়ার কিছু কি থাকবে?

    দেখা যাচ্ছে, রবি কান্তের ভারত, যেটা ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসির’- এমন ফুটা গর্ব যা-ই থাক সেই গৌরবের ভারত নিয়ে তিনি এখন কী করবেন সে এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে উঠে আসছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “রবি কান্তের হতাশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল

    মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল

    গৌতম দাস

    ২১ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3iQ

    নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বৈঠক

    [আগের কথা সবার আগে। যারা এই ভার্চুয়াল বৈঠককে হাসিনা আবার ভারতের কোলেই উঠতে যাচ্ছে কিনা অথবা, উঠল কিনা সেটা বুঝতে চোখ-কান খাড়া করেছেন, তাঁদের বলে রাখি পরিস্থিতি আবার সেদিক কোন পক্ষ থেকেই নিবার জন্য এই বৈঠক ছিল না। সে অর্থে এটা বলা যায় রুটিন। এখন বাস্তবতাটাই আর তেমন নাই, ফেবারেবলও নয় তা দুপক্ষই মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় ঘটে যাওয়া  পরিবর্তন। বাইডেনের জিতে আসাটাই এসব পরিবর্তনের মূল কারণ। বাইডেন উত্থান ফেস করতে হাসিনার জন্য কাজে লাগবে – ভারত এখন তেমন কোন শক্তিই নয়। বরং, চীনই কিছু কাজে আসতে পারে, তুলনামূলক অর্থে এক বেটার সম্ভাবনা। এই হল সেই নির্ধারক রিডিং। যা সবকিছুকে বদলে দিয়েছে এমন, এক ড্রাইভিং ফোর্স!  দুই, এটা খুব সহসাই আর পুনরায় ভারতমুখি সেদিকে যাচ্ছেই না। তিন, ঘটনা-পরিস্থিতি সম্ভবত আর কোনদিনই ২০১৮ সালের আগের মত হবে না, যাবে না। “ও দিন গুজর গয়া! ফুলষ্টপ! ]

    গত ১৭ ডিসেম্বর মোদি-হাসিনা দুই প্রধানমন্ত্রীর এক ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে; মানে কার্যত যার যার দেশের অফিস রুমে বসেই ঐ বৈঠকটা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা পরস্পর কথা বলেছেন। যদিও দু’দেশের পাবলিক টিভিতে এই অনুষ্ঠান যেভাবে ও যতটুকু আমাদের সামনে আনা হয়েছে তাতে পুরাটাই কাঠপুতলির শো-এর মত খুবই আড়ষ্ট আর যান্ত্রিক মনে হয়েছে। এদিকে ভার্চুয়াল হলেও তা ‘শীর্ষ বৈঠক’ বা সামিট যখন বলা হচ্ছে তখন দু’পক্ষেরই চাওয়া-পাওয়াও অবশ্যই ছিল অন্তত ‘কিছু’।

    বাংলাদেশের দিক থেকে বললে, ভারতের প্রতি আমাদের সরকারি অবস্থান ও সময়টা যাচ্ছে এখন ভারতের জন্য খুব ‘করুণ’ এবং ‘দুঃসময়ের’ বলা যায়। এমন অভিমুখের শুরু ২০১৮ সালের শুরুর দিক থেকেই; আমাদের সরকারেরও ‘মন-বাঁধা’ সে সময় থেকেই। আর এর স্পষ্টতা অ্যাকশনে প্রকাশ পেতে থাকে ২০১৮ ডিসেম্বরের “নৈশ-ভোটের” সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই। কথাটা এভাবে বলা যায়, শেখ হাসিনা চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চলতি সরকারের আমলের শুরু থেকেই কখনো পিছপা হননি। সেই ২০১০ সাল থেকেই তিনি লেগে আছেন, চীন সফর করে যাচ্ছেন। সফর বিনিময়ও হচ্ছে। তবে সম্পর্কের মাত্রার দিক বিচারে প্রধানমন্ত্রী এগিয়েছেন ততটুকু যতটুকু ভারত এলাও করেছে অথবা ভারতের কড়া আপত্তি পেরিয়ে তিনি ‘ছাড়’ আনতে পার পেয়েছেন। সেটাই তিনি এবার গত ২০১৯ জানুয়ারির শুরু থেকেই অবাধে করা শুরু করে গেছেন যেন; যতটুকু বাস্তব কাজকর্ম দেখে অনুমান করা যায়- এই অর্থে বলা যায়, বর্তমান সরকার যা কিছু ভারতকে দেয়ার ব্যাপারে সরকারি কমিটমেন্ট দিয়ে রেখেছিলেন কেবল তাই শেষ করা হচ্ছে, কিন্তু নতুন কমিটমেন্টে তেমন আগ্রহ নেই। অবস্থাদৃষ্টে ব্যাপারটা এমনই মনে হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনার ফোকাস আসলে এদিকটায় নয়, বরং উল্টা দিকে। ব্যাপারটা বাজারে আসছে বরং এভাবে যে, সরকার কতটা গভীরভাবে চীন-ঘনিষ্ঠ এর খোলাখুলি বহি:প্রকাশ থেকে। এথেকেই এবার অর্থ তৈরি হচ্ছে যে তাহলে সরকার প্রধান আর আগের মত ততটা ভারত ঘনিষ্ঠ থাকতে চাইছেন না। তবে এ ছাড়াও আরেকটা বিবেচনা সম্ভবত তিনি আমলে নিচ্ছেন। আমরা জানি, মুজিব খুন হয়ে যাওয়ার পরে একসময় শেখ হাসিনা নিরাপত্তার তাগিদে প্রায় পাঁচ বছর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে কৃতজ্ঞতা বা আগামীর দিক বিবেচনা যেমন মানুষের মধ্যে কাজ করে তেমন কিছু একটা হয়তো আছে বলে মনে হয়েছে। ফলে একধরনের সফটনেস এখনো থাকলেও সেটা অবশ্য কোনোভাবেই ২০০৯ সালের মত আর নয়। সেই পাতার পাঠ পার হয়ে গেছে, আর ফিরে পাবার সুযোগও নাই। তবু সর্বোপরি আমাদের পরিষ্কার থাকা ভাল যে, প্রতিবেশী ভারতের সাথে একটা স্বাভাবিক বা রুটিন সম্পর্ক তো থাকবেই যেটা নিয়ে আলোচনার তেমন কিছু নাই। ভারতের সাথে বাড়তি বা “বিশেষ সম্পর্কটা” আর থাকবে কি না- এটাই কেবল আলোচনার।

    সম্পর্ক ঢলে পরছে, নতুন এক বাস্তবতার অনুভবঃ
    তবে আমাদের সবাইকেই মানতে হবে এবারের  ‘ভার্চুয়াল বৈঠকে’ একটা নতুন ব্যাপার উঠে এসেছে। তা হল, এবারের কয়েক ঘন্টার আনুষ্ঠানিকতায় একটা নতুন অনুভব সব সময় বজায় থেকেছে যে, ভারত বাংলাদেশের মন পাওয়ার চেষ্টা করছে (দ্য প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা নিজেই এটা স্বীকার করে বলেছেন, ভারত তার “দেমাগ” বা ওভারউয়েনিং ইনফ্লুয়েন্স খুইয়েছে’ [replaced India’s overweening influence in the region] )- যেটা এবার সব ঘটনার সারফেসে হাজির হচ্ছিল। যদিও এই অঞ্চলে ভারতের নাকি প্রভাব ছিল বলে যে গল্প দেয়া হচ্ছে তা শত্ভাগ ভিত্তিহীন। চীন ঠেকানোর মজুরি হিসাবে আমেরিকার দেয়া উপহার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – এই এটা ছাড়া এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বলতে কোনদিনই কিছু ছিল না।  তবে নেহেরুর কিছু স্বপ্ন-কল্পনায় পোলাও-কোরমা খাওয়ার গল্প ছিল আমরা শুনেছিলাম যে, বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও যেনবা নেহেরু সাব’কে কল্পিত ভাইস-রয় বা রাণীর প্রতিনিধিত্ব দিয়ে গেছিলেন। কল্পনায় নেহেরু এমন ভাব ধরে চলতেন অবশ্যই। আর তা থেকে নেহেরুর মধ্যে কলোনি-দখলদার এটিটুড এর যাত্রা! কাজেই এশিয়ার ভারতের প্রভাব বলতে এক মিছা স্বপ্ন-প্রভাব কথাটাই আমরা অনেকবার শুনেছি। নিজ বা অন্যদেশে প্রচুর বিনিয়োগের ক্ষমতা এটাই কোন রাষ্ট্রকে অন্যদেশের উপর প্রভাব-ধারী রাষ্ট্র হিসাবে হাজির করে। আর ঠিক এই  বিনিয়োগ সক্ষমতা জিনিষটাই ভারতের কোনদিন ছিল না, হয় নাই।

    ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ থেকে আশা করার আমাদের তেমন কিছু ছিল নাঃ
    এসব দিক বিচারে ভার্চুয়াল বৈঠক থেকে বাংলাদেশের বিরাট কিছু পাওয়ার আশা হাসিনার ছিল তা মনে হয় না। কেবল স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পুর্তিতে ও তা পালনে ভারতের সাথে একটা অনুষ্ঠান করে আনুগত্য-প্রতিদান জানানো। আর আনুষ্ঠানিকভাবে যেটাকে সাত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা বলা হয়েছে এরই একটা হল, “নয়া দিল্লি জাদুঘরের সাথে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সহযোগিতা”- এ নিয়ে একটা সমঝোতা স্মারকে হাসিনার আগ্রহ থাকতে পারে। এমন এক ব্যবহারিক কাজের প্রতি সম্ভবত সরকারের যা আগ্রহ ছিল। সেটার আর বিস্তারিত দিক হল, মহাত্মা গান্ধীর সমান্তরালে শেখ মুজিবকে নিয়ে এসে একটা ‘জাদুঘর শো’-এর আয়োজনের ব্যাপার আছে এখানে তাই। এ ধরনের কিছু ছাড়া ছাড়া বিষয় ছাড়া ঢাকা বা হাসিনার পক্ষ থেকে খুব কিছু আশা ছিল তা মনে হয়নি। বাকিগুলো সবই সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ডেকোরেশন পিস।
    তবে স্পষ্ট করেই আমরা সবাই নিশ্চিত থাকতে পারি, তিস্তার পানিতে আমাদের দেশের ভাগ বুঝিয়ে দেয়ার কোনো ইচ্ছা-পরিকল্পনা ভারতের কোনো দিন ছিল না, আজও নাই, আগামীতেও হয়তো হবে না যদিনা আমরা তাদের বাধ্য করার মেকানিজম বের করতে পারি।

    বিপরীতে দিশা-হারানো ভারতঃ
    এর বিপরীতে ভারতের অবস্থা ছিল বেদিশা, অপ্রস্তুত। তারা হয়ত বুঝছেন, না-বুঝার কারণ নাই বলে যে, এ’আমলে এসে বাংলাদেশ ক্রমশ তাদের ‘হাতের বাইরে’ চলে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে এবং যাবেই। যেমন মিডিয়ার কথা যদি ধরি, ভারতের নিজের মিডিয়াগুলো একমত হতে পারেনি – কেন এই ভার্চুয়াল বৈঠক হচ্ছে। বরং অনেককেই মন্তব্য করতে দেখা গেছে যে, তারা লিখেছেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের শীর্ষপর্যায়ের সাথে বাংলাদেশের তেমন যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ নেই। অন্ততপক্ষে সেটা তো ভেঙেছে, এটাই নাকি ‘অনেক অর্জন’। এমন প্রায় একই অবস্থা বাংলাদেশেরই এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের। বুঝা যাচ্ছে তিনি ঢাকার এমবেসির ভালই প্রভাবাধীনে উটে বসেছেন। তাই যেন তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন কথা যে তাঁর কথার তালমিল  না থাকলেও জোর করে হলেও ভারতের স্বার্থের পক্ষে তাঁকে কথা বলতেই হবে। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভাল হতেই হবে; এমনকি ভাল না হলেও ভাল বলতেই হবে। এমনই করুণার দশা তাঁর। বিবিসিকে তিনি বলছেন, “,……পানি বণ্টন, সীমান্ত প্রাণহানি, রোহিঙ্গা সংকট এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলার মতো বিষয় আলোচনায় উঠতে পারে……তবে সেটা হোক বা না হোক, নানা ইস্যুতে দুই দেশের সমঝোতা স্বাক্ষর, বৈঠক ইতিবাচকভাবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন। তিনি আরও বলছেন,

    “যে সমঝোতাগুলো স্বাক্ষরের কথা বলা হচ্ছে, আপাত: দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর যে বিষয়গুলো রয়েছে, তার তুলনায় এগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে আমরা যে ট্রেন্ড দেখেছি,সেটা হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। সেটা কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ”।

    অথচ ঘটনা হল উলটা। ভারতের সাথে আমাদের অধীনস্ততার সম্পর্ক সেটা তো “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ” না হলেই তো বরং ভাল! তাই নয় কি? বাস্তবতা হল, ভারত-বাংলাদেশের কথিত “ভাল সম্পর্কের” তাল কেটে গেছে অনেক আগেই। বড় কথা হাসিনা আর সেটা নিয়ে আমলও করছেন না। এখন সবকিছু চলছে “দেখন শোভা” আকারে। এই হল বাস্তবতা।
    ওদিকে দ্য হিন্দু লিখেছে, “অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট এই ভার্চুয়াল বৈঠকের ফোকাস” [Modi-Hasina summit to highlight infrastructure, connectivity projects]। এরাও আসলে দিবাস্বপ্নে আছেন। কারণ বাস্তবে এনিয়ে তেমন কোন উচ্চবাচ্যই হয়নি। আর আসলে এটা ছিল আসামকে রেলওয়ে করিডোর আরো পোক্তভাবে দেয়ারই একটা প্রকাশ, যেটা প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনারই আগের কমিটমেন্ট এখন বাস্তবে পূরণ করে দেয়া। ভারতের বাকিরা, মানে সরকার ও মিডিয়া- এরা যেমন বাড়িয়ে বলা ছাড়া কোন ছাড়া কোনকথাই বলতেই পারেন না, তেমনি কিছু একটা যার যার মন-মত বলেছেন।
    যেমন আরেকদল অন্ধের হাতি দেখার মত বলছেন, মোদীর ভারতের ‘পড়শির গুরুত্ব’  নাকি সর্বাগ্রে বা (Neighbor First) – এই বলে নাকি মোদীর এক নীতি আছে, আর এর উপরেই নাকি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে। এসব শিরোনাম করেছেন অনেকে যেমন, দ্য প্রিন্ট [The Print], ওয়াইর [WIRE], ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস [Indian Express] বা থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] এর মতন যারা তারা শিরোনাম করেছে, “নেইবার ফাস্ট” কথার মিথ্যা বাকচাতুরী থেকে। অথচ মোদীর এই নীতির ব্যবহারিক কার্যকারিতা কোথায় আছে আর সেটা  কী তা তারা কেউ বলতে পারবেন না। এমনকি এটাও তারা দেখতে পান না যে, তাদের “মহান ভারত” সামান্য কয়েক মাসের জন্য কয়েক টন পেঁয়াজের বাড়তি শুল্কের লোভও ছাড়তে পারে না; আগে থেকে বলতেও পারে না ঠিক কী করতে চায় পেঁয়াজ নিয়ে; বাংলাদেশের সাথে এনিয়ে একটা নিয়ম বা কমিটমেন্টেও আসতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের দিকে দেখেন, যে আসামের জন্য বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের আসামে তেল পাইপলাইন, গ্যাস পৌঁছে দেয়া, বিদ্যুতের করিডোর, সড়ক, নৌ-করিডোর, বিনা পয়সায় বাংলাদেশের তিন বন্দর আসামে ব্যবহার করা হবে এবং প্রায়োরিটিসহ ইত্যাদি। অথচ সেই আসামই আবার ‘মুসলমান খেদাও’ এর আন্দোলন করবে, এনআরসি করবে! কিন্তু এরা সকলে মুখে বলবে সবই নাকি ‘পড়শি আগে’ বলে মোদীর নাকি এক নীতি আছে সে অনুযায়ী চলছে। আসলে তামাশার আর শেষ নেই! তারা কি কেবল তামাশাই ভালোবাসেন?
    আর এ ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে দ্যা প্রিন্ট বলে এক ওয়েব মিডিয়া। এখন করোনাকালে ভারতে মিডিয়ায় কর্মীদের বেতন দেয়াই কঠিন হয়ে গেছে। তাই যেন এই মিডিয়া এবার সরকারি মুখপাত্র সেজেছে। এছাড়া, সাথে পেজ বিক্রি বা সরকারি (গোয়েন্দা) প্রপাগান্ডার খেপ মারার কাজে লেগে পড়েছেন। ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ প্রসঙ্গে এরা কমপক্ষে তিনটা রিপোর্ট করেছেন। এর মধ্যে একটা মারাত্মক ভুল এবং না বুঝা তথ্য দিয়ে লিখেছেন জ্যোতি মালহোত্রা [Jyoti Malhotra]।
    সাধারণভাবে বললে, ভারতীয় মিডিয়া-কর্মীদের আত্ম-জিজ্ঞাসাও নাই। কোনো যাচাই বা জিজ্ঞাসাই নেই যে ভারত কী কোন গ্লোবাল অর্থনৈতিক শক্তি? তা কিভাবে বা কবে থেকে? আসলেই কী ব্যাপারটা সত্যি – এই যাচাইয়ের সাহস নাই। বরং উলটা তাদের ধারণা এটা যেন দাবি করার ব্যাপার। তারা জোরসে দাবি করলে বা ভাব ধরলে যেন তারা তা হয়েই যাবে! অথচ স্বাধীনভাবে যাচাই করলে বা সামান্য একটু চোখ-কান খুলে রাখলেই তাদের না বোঝার কোনো কারণ নাই যে, ভারত নিজেই অবকাঠামো ঋণ-গ্রহণকারী দেশ, এখনো। এই গণ্ডিই পার হয় নাই ভারত। আর সবচেয়ে বড় পরিমাণ এমন ঋণ তারা এখনো পেয়ে চলেছে চীন থেকে। অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়া ভাব করতে চায় উলটা – যেন ভারত বাংলাদেশের বিরাট ঋণদাতা। ব্যাপারটা যে কারও বুঝতে পারার সহজ উপায়টা হল, বাংলাদেশে ভারতের কোন প্রকল্প – এর মূল্যের দিকে নজর ফেলা। কারণ, দশটাকার হলেও সেটা প্রকল্প আর দশ বিলিয়ন ডলারের হলেও সেটা প্রকল্প। এমনিতেই গত ১০ বছরে ভারতের এমন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এর (কমিটমেন্ট দেয়া) দশভাগ অর্থও এখনো ছাড় করা হয়নি। ভারত-প্রিয় প্রথম আলো লিখছে, “তিন দফায় ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণচুক্তির মধ্যে এখন পর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি ডলার”।  এছাড়াও এসব ভারতীয় ঋণের মুখ্য শর্ত হল, প্রায় সমস্ত পণ্য ও সেবা (মানে শ্রমিকও) ৮৫% ভারত থেকেই কিনতে হবে। মানে দাদা “…খেয়ে এসেছেন না গিয়ে খাবেন” তত্বের একদম খাঁসা প্রয়োগ।  মূলত একারণের ঋণের অর্থছাড়েও অগ্রগতি নাই। ফলে ভারতের সবদিকেই লাভ আর লাভ! এছাড়াও ভারতের এমন প্রকল্পে দেখা যাবে, প্রকল্পের মোট মূল্য ভারত হিসাব করে থাকে হাজার ডলারে। অথচ চীনের কথা বাদই দিলাম পশ্চিমাদেশের সবচেয়ে কম সামর্থের রাষ্ট্রটাও মিলিয়ন ডলারে ছাড়া দাতা বা ঋণ-প্রকল্পের কোন মূল্য হিসাব করে না। মানে হল, ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু যদি নিজ ভান্ডারিয়া উপজেলায় পানির ট্যাপকল বসানোতে ভারতের ৫ কোটি টাকা ব্যয়কে “বাংলাদেশে ভারতীয় প্রকল্প” বলেন,  সেটা তো যার আত্ম-লজ্জাবোধ নাই তাকে ঠেকানো যাবে না। শুধু তাই না এজন্য মঞ্জু সাহেব তিনি নিজে যদি হাইকমিশনারকে সাথে নিয়ে ভান্ডারিয়া ভ্রমণ করেন, তাতে এনিয়ে কিছু বলতে আমাদেরই লজ্জা লাগবে।

    এক জ্যোতি মালহোত্রাঃ
    দ্যা প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় বাংলাদেশের পদ্মা ব্রিজ তৈরি সম্পন্ন করার প্রসঙ্গ তুলেছেন। কথা সত্য, পদ্মা ব্রিজ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে প্রথম দিকে দুর্নীতির অভিযোগ (অনেক পরে বিশ্ববাংক নিজেই ঢাকা সরকারের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ কানাডার আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।) তারা তুলেছিল। আর সেই তোলার পর থেকে শেষে পদ্মা প্রকল্পই বাতিল হয়ে গেলে সে সময় ভারত নিজেই আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ এখন পর্যন্ত এনিয়ে ভারত আর পরে কখনো কথা এগোয়নি। কিন্তু জ্যোতি মালহোত্রা নিজে থেকেই তাদের রাজনীতিবিদ ও সরকারের প্রতি এমন গাধামির কমিটমেন্ট করা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু তা করেছেন সাথে কিছু ভুয়া তথ্যসহ। জ্যোতি তাঁর লেখায় শিরোনাম করেছেন, ‘ভারত না, চীন বাংলাদেশে ব্রিজ বানিয়েছে; কিন্তু মোদী সরকার মনে করছে সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” [China, not India, builds a bridge in Bangladesh, but Modi govt believes all is not lost yet”]। মালহোত্রার ধারণা ও ভাবটা হল তিনি এমন শিরোনাম করে বিরাট এক “বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞানের কথা” বলেছেন।
    এখানে ‘ব্রিজ’ বলতে তিনি পদ্মা ব্রিজ বুঝিয়েছেন। কিন্তু সত্যটা হল, চীনা অর্থে বাংলাদেশ পদ্মায় মূল ব্রিজটা বানায়নি। বরং এই মূল অংশের পুরোটাই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থ। অবশ্য এর নির্মাণ ঠিকাদার চীনা এক কোম্পানি China Railway Major Bridge Engineering Group Co, Ltd (MBEC)। কিন্তু সাবধান। তারা এই মূল ব্রিজের কেবল ঠিকাদার, কোনো অর্থদাতা নয়। আমরা আশা করব ও ধরে নিচ্ছি যে ভারতের বাকি মিডিয়াকর্মীরা ঠিকাদার আর ঋণদাতার ফারাক নিজে বুঝতে পারেন, এমন যোগ্যতা তাঁদের আছে। এছাড়া মূল ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ি চলার ব্যবস্থা থাকলেও  এর নিচ তলায় আলাদা করে কেবল রেল প্রকল্পের (রেললাইন পাতা) কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই অংশের কাজটার জন্য বাড়তি প্রায় ২.৬৭ বিলিয়ন ডলার চীনা ঋণ নেয়া হয়েছে [$2.67b loan deal signed with China]। কিন্তু রেলওয়ের ঠিকাদারও আবার ওই মূল ব্রিজ বানানোর ঠিকাদারই। কাজেই জ্যোতির বক্তব্য সঠিক নয়।
    আবার লক্ষণীয় এই যে, ভারতকে চীনের সাথে তুলনা করা আরেক আহাম্মকি। যদিও সবসময় ভারতের সাংবাদিকেরা সব সময় এটাই করে থাকে। যেমন এনিয়ে শিরোনামে “সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” জ্যোতির  এমন কথার অর্থ কী? তিনি কী মোদীকে অভিযোগ করে বলছেন, ভারত আমাদেরকে চীনের মত ব্রিজ বানায়ে দেয় না কেন? বা এখনও দিতে পারে? এর মানে ব্যাপারটা কী এতই সহজ যে, মোদী সরকার চাইলে এখনো বাংলাদেশের উপর চীনের মতোই প্রভাব বিস্তার ঘটাতে পারে। অথচ জ্যোতি কথাটা বলছেন কোনো রকম স্টাডি বা পড়ালেখা না করে। প্রভাব-বিস্তারের সক্ষমতা ভারতের কেন নাই তা নিয়ে কোন বুঝাবুঝি না জড়ো করেই। এটাই ভারতীয় সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
    আবার, এই ‘প্রভাব বিস্তার’ কথার মানে কী? পড়শি রাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে যেনতেন একটা চুক্তি করিয়ে নেয়া? ভারত-নেপাল অথবা ভারত-ভুটান চুক্তির মত? অথচ কথাটা হল, বড় অর্থনীতির যে রাষ্ট্র চলতি সময়ে সারপ্লাস একুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়  সবাইকে ছাড়িয়ে বেশি করে চলেছে, সেই আসল প্রভাবশালী রাষ্ট্র। এখনকার ভারত এমন কোন রাষ্ট্র নয়। এটা না হলে সে কখনো দুনিয়ায় প্রধান প্রভাব-বিস্তারি এবং গ্লোবাল অর্থনীতির নেতারাষ্ট্র হতে পারবে না; হবে না। টানা গত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা এসব শর্ত পূরণ করে তবেই নেতা হয়ে টিকে ছিল। এটা জোর খাটিয়ে নেপাল বা ভুটানের উপর নেহরুর নয়া কলোনিশাসক হওয়ার চেষ্টা নয়। সে জন্য পড়াশুনা না করলে ‘প্রভাব বিস্তার’ কথাটার অর্থ বোঝা যাবে না। এরই পরিণতি হল, ভারতে একেকটা নেহরুর জন্ম ও তার ‘কলোনি শাসক’ হওয়ার চিন্তা। যে নেহরুরা মনে করেন দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে একমাত্র সম্পর্ক হল, একটা আরেকটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে সেটাকে অধীনস্থ করা বা কলোনি বানানো। তুরস্কের নিউজ-এজেন্সি টিআরটি ভারতকে এই ‘কলোনি বুঝ’ ত্যাগ করতে পরামর্শ দিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভারত কী এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় সারপ্লাস একুমুলেশনের রাষ্ট্র? একেবারেই না, মোটেও নয়। এটা জানা ভারতের মিডিয়া বা নেতাদের জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। আর ভারতের সাংবাদিকেরা এর ভাব ধরলে বা ভান করলে এই অর্জনটা হয়ে যাবে না, হওয়া যাওয়ার অইথ এ যায় নয়। তাহলে?

    এ ছাড়া আরো এক বড় অসঙ্গতি হলো, এ যুগে (হিন্দু) জাতিবাদী রাষ্ট্র হয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কারণ (হিন্দু) জাতিবাদ মানেই হলো, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও এর জাতপ্রথায় সক্রিয় থাকা এক সমাজ। কারণ এটা দুনিয়ার চরম বৈষম্যের প্রকাশ। তাই এই সামাজিক রীতি বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য রাষ্ট্রের সাথে স্ববিরোধী সংঘাতপূর্ণ ধারণা। এ ছাড়া জাতিবাদী চিন্তার বড় অনুষঙ্গ হলো, জাতিরাষ্ট্র বা কথিত ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের’ ধারণা। জাতীয় স্বার্থ যে অনুসরণ করে তার পক্ষে সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। কারণ সাংবাদিকতায় ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়াতে হবেই। কথিত জাতির (রাষ্ট্রের) স্বার্থকে প্রধান বিবেচ্য বলে গণ্য করে ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়ানো না-ও হতে পারে। সাংবাদিকতা ক্যাডার সার্ভিসের চাকরি নয়। অথচ ভারতে সবচেয়ে বড় করে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের সাংবাদিকতা’ করেন দ্য প্রিন্টের সম্পাদকসহ ওই মিডিয়ার সবাই। খবরের সত্য-মিথ্যা নয়, দেশপ্রেমের নামে মালহোত্রাসহ সবাই সাংবাদিকতা করছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদ যেটাকে জাতির স্বার্থ মনে করবে সেটি প্রকৃত রাষ্ট্রস্বার্থ নাও হতে পারে। কারণ এটা তো আসলে একটা কূপমণ্ডূক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি। সেটিকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে সাংবাদিকরা মানতে বাধ্য হতেই পারেন না।

    জ্যোতি মালহোত্রা আরেক কী কারণে আমাদের ডেইলি স্টারের সম্পাদককে খুব পছন্দ করেছেন মনে হচ্ছে। তিনি এই সম্পাদকের সাক্ষাৎকার (যেটা আসলে সাক্ষাতকার না বলে অনধিকার ও অত্যাচার বলা ভাল) নিয়েছেন। আমরা এর একটাই কারণ অনুমান করতে পারি, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাহফুজ আনাম বাংলাদেশে আমেরিকার হস্তক্ষেপের পক্ষের সক্রিয় প্রবক্তা ছিলেন। হয়ত সেই সূত্রে। এছাড়া আনাম সাহেব পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর কাজ সমাপ্তির দিনে এবার তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এক দেবীর আসনে বসিয়ে গত ১১ ডিসেম্বর এক মন্তব্য-কলাম লিখেছিলেন। সেসব কথাগুলোই আবার জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় ‘কোট’ করেছেন। যাই হোক, মাহফুজ আনামকে জ্যোতির প্রশ্নে বা সেই উছিলায় দাবি হল – ভারত বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। কাজেই আমরা ভারতকে ফেলে চীনের প্রভাবে যাচ্ছি কেন বা চীনা ঋণে ঢুকতে যাচ্ছি কেন? জ্যোতি সাক্ষাতকার এমন আগ্রাসী ও অসৌজন্যতাপুর্ণ আদব-হীন প্রশ্নে ভরপুর ছিল। যেন তিনি ভারতের হয়ে আমাদেরকে জবাবদিহিতা চাইতে এসেছেন! সোজা করে বললে, এটা আসলে জ্যোতি মালহোত্রার এক দিকে গাধামি প্রশ্নের উছিলায় করা এক বেয়াদবি। অপর দিকে এটা মারাত্মক অনধিকার চর্চা।

    “১৯৭১ সালে সাহায্য” বলে যে ইঙ্গিত জ্যোতি দিচ্ছেন এর মানে কী? আমরা একাত্তর সালে ঐ কথিত সাহায্য নিয়ে ভারতের কলোনি হয়ে গেছিলাম? জ্যোতি কি তাই দাবি করছেন? তাহলে তো আমাদের অভিযোগ-মুল্যায়ন সঠিক যে, নেহরু আমল থেকেই ভারত আদতে একটা কলোনি দখলদার হতে চাওয়া মনোভাবের ও নীতির রাষ্ট্র। অথচ ভারতকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ নিজে একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র তাই সে কেন কী করবে, এর জবাবদিহিতা কাউকেই দিবে না। সে প্রশ্নই উঠে না। কাজেই জ্যোতির তার অনধিকার আর গাধামি প্রশ্ন করা বন্ধ রাখা উচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা যত ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ বিষ ভিয়েতনামে বিমান থেকে ছিটিয়েছে, এর কোনো তুলনা নেই। যার কারণে এখনো ভিয়েতনামি মা-বাবাদের  বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়। অথচ এখনকার ভিয়েতনাম-আমেরিকা সম্পর্ক সে সময়ের চীন-ভিয়েতনামের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কের চেয়েও ভালো। কাজেই কলোনি মানসিকতা অবিলম্বে ত্যাগ করে ভারতের সাংবাদিকদের বরং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে তাদের উচিত চোখ কান খুলে পড়াশোনা করা।

    তাহলে মোদী কেন ভার্চুয়াল বৈঠকে এসেছিলেন?
    বাস্তবত এটা আর তার অজানা নয় যে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতের মুঠো থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং যাবেই। কিন্তু মোদীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল তিনি সেকথা তাঁর ভোটার কনস্টিটিউয়েন্সির কাছে স্বীকার করতে পারবেন না। কারণ তিনিই তার সরকারের সব বৈদেশিক সম্পর্ককে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনি ইস্যু করে হাজির করেছেন। বলা ভাল মাখায় ফেলেছেন। তিনি এপর্যন্ত  নিয়মিত দাবি করে গেছেন যে তাঁর হিন্দুত্ববাদের চরম দেশপ্রেমের কারণে তার সরকারের বৈদেশিক সম্পর্কগুলোতে তিনি চ্যাম্পিয়ান। অতেওব এখন তার ধরা খাওয়ার সময়। তাই বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক ঢিলা হয়ে গেছে এটা স্বীকার করার সোজা ফল হবে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীদেরকে সাহায্য করা, ফলাফলে তিনি নিজে ভোট হারাবেন। তাই এই ভার্চুয়াল বৈঠক করে তিনি আবার তার ভোটারদের কাছে এটা তুলে ধরে দাবি করবেন যে, না বাংলাদেশ আগের মতোই “ভারতের প্রভাবাধীনে” আছে। তার লাভ এতটুকুই। তবে ভোটে এর প্রভাব মোদীর জন্য অনেক মূল্যবান! সার কথায়, এটা তাই পরস্পরের ‘পিঠ চুলকে দেয়া’র ভার্চুয়াল বৈঠকও বটে!

    তবে “ফুটানির ভাণ্ডটা ফুটা” করে দিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, “…… পানি বণ্টন, সীমান্ত সঙ্ঘাতের মত ইস্যুতে আলোচনা বা সমঝোতা না হলে অন্য এসব ইস্যু ততটা গুরুত্ব বহন করে না” – এমনটাই  মনে করছেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো: তৌহিদ হোসেন।’

    ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রাঃ
    জ্যোতি লেখা আর্টিকেল দেখে মনে হবে মোদী যেন তাকে বাংলাদেশে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার করার জন্য ভাড়া করেছেন। জ্যোতিকে যেন দেখাতেই হবে বাংলাদেশের ভারতের তথা মোদী সরকারের প্রভাব কমে নাই মোদী এখনও ফাইট করে যাচ্ছেন। তাতে কূট, ধুর্তামি বা মিথ্যা বলে হলেও জ্যোতি তা করতে হবে। জ্যোতি লেখার শিরোনামের একাংশে লেখা ছিল এখনও সব শেষ হয়ে যায় নাই [Still, all is not lost]।  এটা বলে তিনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
    সেটা জ্যোতি তার লেখার ভিতরে বলেছেন এভাবেঃ
    Bangladesh has recently told China to get lost or pay up for the trials of the Chinese Covid vaccine in Bangladesh, while signing an agreement with India’s Serum Institute to buy three crore doses. অর্থা্ৎ তিনি দাবি করছেন – যে চীনা ভেকসিন [SINOVAC বা সাইনোভ্যাক] বাংলাদেশেরও পরীক্ষায় অংশ নেয়া ও শেষে তা পাবার কথা ছিল সেই প্রসঙ্গে – জ্যোতি মালহোত্রার দাবি বাংলাদেশ নাকি চীনকে (বা সাইনোভ্যাক) বলেছে  “হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও”। অথচ ফ্যাক্টস হল জ্যোতি তাঁর এই দাবির পক্ষে কোন প্রমাণ দিতে পারেন নাই। এমনকি কোথায় এমন কথা বলেছে তাও তিনি দেখাতে পারেন নাই।  অর্থাৎ তিনি সরাসরি  মিথা প্রপাগান্ডা করেছেন। তাহলে ব্যাপারটা আসলে কী?

    কথাটা হল, সাইনোভ্যাক একটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানি হলেও চীনা সরকারের কো-অরডিনেশনে বাংলাদেশের ওর ট্রায়ালের শেষ বা তৃতীয় পর্যায়ে সামিল হবার প্রস্তাব পেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এই প্রস্তাবের পক্ষে  সময়ে সাড়া দিতে না পারায় সাইনোভ্যাক অন্য দেশকে ঐ জায়গায় সামিল করে নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে অনেক দেরি করে সাড়া দেওয়াতে এবার ফান্ড যোগাড়ের সমস্যা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ সাইনোভ্যাকের ভ্যাকসিন পাওয়া থেকে বাদ পরে যায়।

    এরপরে শুরু হয়ে যায় কার ভুল বা ব্যর্থতায় বাংলাদেশ বাদ পড়ল এনিয়ে দোষ ঠেলাঠেলি। আর ওদিকে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াও আগ্রহী হয়ে উঠে চীনকে দায়ী বা ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও প্রকারন্তরে বাংলাদেশের দায় ঠেলার জন্য  ভারতের মিডিয়াকে নিজের স্বার্থে ফেবারেবল ভাবতে থাকে।

    রয়টার্স সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গ্লোবাল নিউজ এজেন্সির একটা, কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স এটা বাদে। কারণ, যেকোন ইস্যুতে ভারত সরকারের ভাষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হয় এমন নিউজ তারা তারা যতই সত্য হোক প্রচার করতে পারে না।  তাই এই সাইনোভ্যাক ইস্যুতে ভারত সরকার প্রভাবিত যে নিউজটা বাজারে এসেছে সেখানেও ইন্ডিয়ান রয়টার্স লিখেছেঃ

    Sinovac informed the health ministry in a letter, seen by Reuters, that a delay in approvals in Bangladesh had resulted in funding getting reallocated to trials in other countries.

    ঠিক এই কথাটাই উপরে আমার ব্যাখ্যায়ও আছে। মূল কথা delay in approvals, আমরা সাইনোভ্যাককে অনুমোদন দিতে দেরি করেছি। আর সেই সাথে এতে funding getting reallocated  অর্থাৎ ফান্ড অন্যদেশের নামে স্থানান্তর হয়ে যায়। এদুই কথার সোজা মানে আমাদের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারাই সব ব্যররথতার উৎস।

    কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স-সহ ইন্ডিয়ান ও আমেরিকান বেনার নিউজ এই সুযোগে শিরোনাম বা নিউজ করেছে – Bangladesh will not co-fund Sinovac’s vaccine trial। কেন? 

    অনুমান করা যায় বাংলাদেশ বাদ পরার পর বিকল্প কী আছে জানতে কৌতুহল হবে। এর জবাবে ফান্ড যেহেতু নয়া পরিস্থিতিতে মুল সমস্যা তাই ফান্ড যোগাড়ের কথাই তো সবদিক থেকে আসবে। তাই এবার নিজের মান বাঁচাতে ও দোষ ঠেলতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অজুহাত খাড়া করে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াকে অনেক কথার সাথে বলছেন, “বাংলাদেশ সাইনোভ্যাককে কো-ফান্ড করব না” । এতে ভাবটা এমন যেন  সব প্রস্তাব ভেস্তে গেছে হঠাত করে সাইনোভ্যাকের অর্থ চাওয়াতে। এভাবে খবরটা উপস্থাপন করলে ঐ দুই মিডিয়াই চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডার সুযোগ তারা নিতে পারে ও তারা নিয়েছে। আর এমন ব্যাখ্যা না হোক এমন কথা টুইস্ট করার কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের দায় এড়ানোর কিছু সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু তবু ইন্ডিয়ান রয়টার্সকে স্বীকার করতেই হয়েছে মূল সমস্যা – “বাংলাদেশের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারা”।
    আর এথেকেই ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রা সিদ্ধান্তে গিয়েছেন ভারতের জন্য এখনও সময় আছে [Still, all is not lost]।  আর একেবারেই  বানানো কথা যে বাংলাদেশ নাকি চীনকে বলেছে ,হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও। জ্যোতি তবু রেফারেন্স দিয়েছে  ভারতের এক ছোট ওয়েব মিডিয়া লাইভ-মিন্ট থেকে। সেখানে সরাসরি “told China to get lost or pay“–  এমন কোন শব্দ বা বাক্য নাই।

    তো এখন তাহলে বাংলাদেশে ভারতের জন্য সবকিছু হারায় না – কথাটার জ্যোতি মালহোত্রার বিশেষ অর্থ কী হতে পারে? যে ভারত এখন তাহলে ভারত বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে? তাই কী? এটাই কী জ্যোতি মালহোত্রা মোদীকে ম্যাসেজ দিচ্ছেন?

    আগেই বলেছি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী দেশপ্রেমের মিথ্যা নাটক তাদেরকে বাস্তব থেকে দূরে রাখে। কোন কিছু শিখতেও দেয় না, আগ্রহীও করে নাই। তথ্যের ব্যাপারে তারা গাধা-গরুই থেকে যায়। তথ্য সামনে তাকলেই নিজেই শিখে নেয় না। জ্যোতি মালহোত্রা কী জানেন না ভারতের হয়ে আসা বাংলাদেশকে দুলাখ শিশি কিন্তু কেবল একলাখ মানুষকে দেয়া যাবে এমন ভ্যাকসিনে কী হয়েছে? তিনি নিশ্চয় জানবেন ঐ ভ্যাকসিন ভারতের না, ইউরোপ থেকে প্রতিটা তিন ডলারে কিনে তা তারা বাংলাদেশকে পাঁচ ডলার করে বেচবেন। এই হল ভারতের বাংলাদেশকে কথিত ভ্যাকসিন দানে ভারতের কৃতিত্ব!

    বাস্তবতা হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকার প্যারা বা হেপাও প্রচুর।  চীন হবু নেতা, এছাড়া ফান্ডও যোগাড় করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ। তাই একটা আশা থাকবে তবে বাংলাদেশকে পারসু করতে হবে মানে চীনকে হেদায়েত করতে জানতে হবে যেন সে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ফান্ড যোগাড় বা পাবার ব্যাপারটাতে নজর দেয়। আমাদেরকে সাহায্য করে।  আরেকটা হতে পারে পশ্চিমা দাতব্য ফান্ড – বিল গেটস সহ আর যারা এব্যাপারে দাতব্য ফান্ড যোগাড়ের চেষ্টা করছেন, তাঁদের টা।

    আর জ্যোতি মালহোত্রাকে বুঝতে হবে এই হল বাস্তব দুনিয়া যারা বা যেটা ফান্ডের সম্ভাব্য উৎস। বাংলাদেশের ফান্ড লাগবে মানেই বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বাড়ানোর জন্য দুয়ার খুলেছে তা সত্যি না, বাস্তব নয়। প্লিজ হুশে আসেন! এছাড়া শকুনের বদ-দোয়া বা অভিশাপে সমাজে বেশি বেশি করে গরু মারা যায় না!  যাবে না! কোনদিন তা হবে না!  আপনি বা আমি পছন্দ-অপছন্দ যাই করি কিংবা নাই করি না কেন, তবু চীন গ্লোবান নেতা হবে; চীন সামর্থবান হয়েছে আরও পোক্তভাবে হবে। কারণ এটাই নৈব্যক্তিক (objective reality) বাস্তবতা! কাজেই ঈর্ষা বা হিংসা শেষ করেন, ইতি টানেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “মোদি কী পেতে ‘ভার্চুয়াল বৈঠক” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]