Tag: ভারত

  • ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    গৌতম দাস

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3IU

     

              AUKUS : security pact leaves Australia exposed

    [সার-সংক্ষেপঃ আমেরিকা এশিয়ায় এবার এক নতুন জোট খুলেছে। এটা সামরিক জোট নাম AUKUS। অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – এই তিন দেশের ইংরাজি নামের আদ্যক্ষর দিয়ে, ত্রিদেশীয় এই নয়াজোটের নাম ঠিক করা হয়েছে।  এটা যতটা না সামরিক জোট তার চেয়ে বেশি অষ্ট্রেলিয়াকে চীনের মুখে ফেলে দিয়ে আমেরিকা-বৃটেনের ওর ঘাড়ে চড়ে পিছনে দুরে বসে থেকে পরমাণূ অস্ত্রের ব্যবসা করে নেয়া। এছাড়া আবার এটা এমনই অষ্ট্রেলিয়া যার ভৌগলিক অবস্থান চীনের হাতের নাগালেই আর তার চেয়েও বেশি বিপদের হল অষ্ট্রেলিয়ার ইকনমি দাঁড়িয়ে আছে চীনে রপ্তানি করতে পারার উপরে। তবে গত ২০১১ সাল থেকে আমেরিকার এটা চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে খামোখা লড়বার তৃতীয় উদ্যোগ।  আগের ‘পিভোট এশিয়া’ আর ‘কোভিড’ এর ব্যর্থতার পরে এটা আরেক নয়া উদ্যোগ। এটাও ব্যর্থ হবে, কারণ এশিয়ার চীনের সাথে সীমান্তবিরোধ যাদের আছে তারাই যুদ্ধ চায় না, সমাধান মনে করে না। কাজেই চীনের সাথে সীমান্তবিরোধের কথা তুলে এর আড়ালে আমেরিকান যেকোন স্বার্থ আদায় করা অসম্ভব। এর উপর তা যদি যুদ্ধ-কেন্দ্রিক আমেরিকান বুদ্ধি হয় তবে এর কোনই ভবিষ্যত নাই।
    এবার সরাসরি যদি প্রশ্নটা করা হয় এই জোট মানে অর্থনৈতিকভাবে, এটা ৫০-৯০ বিলিয়ন ডলারের এক ঋণশোধের দায় যা একা অষ্ট্রেলিয়ার উপর চাপিয়ে  দেওয়া হল। তাহলে এই অর্থনৈতিক দায়ের রিটার্ণটা কোথা থেকে আসবে? সেপ্রশ্ন এখনও উহ্য থেকে গেছে। এছাড়াও উলটা এই জোট নুন্যতম ফাংশনাল হলেই চীনে যতটুকু রপ্তানি বাজার অষ্ট্রেলিয়ার এখনও যা আছে সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে বা অন্য কেউ তা দখলে নিবে। এতে অষ্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি আরো দ্বিগুণ চাপে পড়বে। তখন অষ্টেলিয়াকে উদ্ধার করবে কে? কেউ জানে না। অর্থাৎ মাটিতে পা রেখে এসব দায় অষ্ট্রেলিয়া প্রধানমন্ত্রী মাথায় নিয়েছে মনে হয় না।
    অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধ বা প্রভাব সামরিক সক্ষমতা দিয়ে জিতে যাওয়া বা টপকে গিয়ে সমাধান করা যায় না। এছাড়া পারমাণবিক টেকনোলজি মানবজগত থেকে প্রত্যাহার করে ফেলার যুগে নতুন করে এশিয়ায় পারমাণবিক সাবমেরিন দিয়ে যুদ্ধ সাজানোর প্রচেষ্টা একেবারেই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন। একদিন এজন্য বাইডেন আর বরিস কাঠগড়ায় উঠবেন, অবশ্যই! ]

    _

    মূল লেখা শুরু এখান থেকেঃ

    ইংরেজি ওভারল্যাপ [overlap] মানে একজনের কোলে আরেকজন। মানে যেমন একটা জোটে থাকা অবস্থায় সেখানেই আরেকটা আরো কিছু অন্যদের সাথে জোট খুলে বসাটা হবে ওভারল্যাপিং জোট। হ্যাঁ, ঠিক তাই ঘটিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এশিয়ায় আগের কোয়াড জোটের বাইরে আরেকটা ত্রিদেশীয় জোট খুলেছেন। আর এই ঘটনাটা আমাদের দিক থেকে দেখলে,  এতদিনে এনিয়ে আগ্রহীরা যখন জানল, কোয়াড জোট মানে কী ও কারা এরা। এ ছাড়া সবাই যখন ভাবছিল তারা এশিয়ার গ্লোবাল মেরুকরণ বুঝতে শুরু করেছে। ওদিকে আমেরিকা যখন আমাদের বাংলাদেশকে কোয়াডে ঢুকানোর জন্য চাপাচাপি করছিল এরই মাঝে ঠিক এমন সময় আরেক ফ্যাসাদ হাজির হয়েছে। বাইডেন নতুন আরেক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন গত বুধবার ১৫ সেপ্টেম্বর যার বিস্তারিত ঘোষণা এবং তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া দেয়া এখনো শেষ হয়নি। এরপর বিস্তারিত তথ্য আর বুঝাবুঝি শেষে তাৎপর্য বর্ণনা পশ্চিমেই এখনো তেমন শুরুই হয়নি। এমনই প্রাথমিক অবস্থায় এখন আমরা।

     AUKUS বা এইউকেইউএসঃ
    AUKUS এই হলো নয়া জোটের নাম। যে নামটা ভেঙে ভেঙে লিখলে হয় A-UK-US; মানে হল অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – হল সেই ত্রিদেশীয় এক নয়াজোট। সবচেয়ে বড় কথা, জন্ম-ঘোষণার শুরু থেকেই এরা পরিষ্কার যে, এটা সামরিক জোট।  মানে যেমন অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইন্ডিয়া আর আমেরিকা – এই চার দেশীয় ‘কোয়াড’ নামের জোটের মত – এবার নতুনটা সামরিক নাকি বাণিজ্যিক জোট এ নিয়ে কোনো তর্কই নেই। কোয়াড নাকি কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক কোনোটাই নয়, এমন না  না করতে করতে এখন বলে এটা এক স্ট্র্যাটেজিক জোট। এসব ধানাই-পানাইয়ে এই নয়া জোটের বেলায় নাই। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিনে সমৃদ্ধ করতে  নয়াজোটের বাকি দু’দেশ বৃটেন-আমেরিকা  ভুমিকা নিবে; এমন করে যাত্রা শুরু করার এক জোট হবে এটা; এমনটাই তাদের আপাতত বলতে শোনা যাচ্ছে। তবে তাও আবার ডিজেলে চলা ও ধোঁয়া ছাড়া সাবমেরিন নয়, এটা নাকি একেবারে পরমাণু অস্ত্র ও জ্বালানিতে চালানো এমন সমৃদ্ধ সাবমেরিন বহর হবে। অর্থাৎ এটা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন (n-sub) হতে যাচ্ছে যেটা আবার নিউক্লিয়ার বোমা বিবার অপশন থাকলেও আপাতত তেমন কোন বোমা থাকবে না অষ্টেলিয়া জানিয়েছে।   SSBN বা নিউক্লিয়ার ব্যালেস্টিক অস্ত্র বহণকারি গোত্রের।

    ইতোমধ্যেই পশ্চিমা এক্সপার্টেরা অল্প ক’জন যারা এই জোট নিয়ে মুখ খুলেছেন তারা বলা শুরু করেছেন যে এতে এশিয়াতে এখন আগের অন্যান্য জোট উদ্যোগগুলো মিলিয়ে যাবে আর এই নয়া জোটকে কেন্দ্র করে এশিয়ামুখী পশ্চিমা দেশেরও ব্যাপক মেরুকরণ শুরু হবে; যদিও যারাই ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাতে লক্ষণ তেমন নয়।

    এর প্রথম তাৎপর্য হল, যে ওভারল্যাপিং-এর কথা বলছিলাম, আগের কোয়াড যা এখনো বেঁচে আছে বলে জানি, তা থাকা সত্বেও পুরান কোয়াডের দুই সদস্য অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা এই নয়া সামরিক জোট খুলেছে দেখা যাচ্ছে তবে সাথে ব্রিটেনকে নিয়ে। তাতে এখন বাকি দু’জন কোয়াড সদস্যের কী হবে?

    কৌতুকের কথা হলো, কোয়াড এমন এক জোট যার সদস্য দেশের চার প্রধান কখনো একসাথে মুখোমুখি মিটিংয়ে বসেননি। কেবল এই গত মার্চ ২০২১ তে একবারই বসেছিলেন অন-লাইনে, মানে ভার্চুয়ালি। তবে এবার  আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মানে এ’মাসেই  আমেরিকায় হোয়াইট হাউজে প্রথম মুখোমুখি কোয়াড রাষ্ট্রপ্রধানরা বসতে যাচ্ছেন। এই মিটিংয়ের সেই অভাব সম্ভবত পূরণ হতে যাচ্ছে। তবে সেটা কারো কারো জন্য শেষ মিটিংও হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন সেখানে বৃটেনসহ তাদের গড়া নয়া জোটে যোগ দিতে কোয়াডের বাকি দু’দেশকে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দেবেন। তবে জাপানের কনস্টিটিউশনে ও ১৯৬০ সালের আমেরিকার সাথে করা এক সিকিউরিটি চুক্তি অনুসারে জাপানের পারমাণবিক তৎপরতায় যুক্ত হতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে বলে সম্ভবত জাপান এমন জোটের সদস্য হতে বাধা পাবে। তাহলে আর ভারতের বেলায় কী হবে?

    ভারত কী করবে?
    কিন্তু আগেই এ নিয়ে আমাদের বোঝাবুঝির কাজ কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে এক রাশিয়ান মিডিয়া স্পুটনিক [SPUTNIK] । স্পুটনিকের সে নিউজের শিরোনামটাই অনেক সাংঘাতিক। শিরোনাম হল – “ভারতের জন্য বার্তা? নয়া জোটের ঘোষণায় কোয়াডের অস্তিত্ব আর আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে” [Message for India? AUKUS Announcement Sparks Debate About Relevance of Quad, Reliability of US]।  কিন্তু স্পুটনিক কেন এমন শিরোনাম করল? কারণ, স্পুটনিক লিখেছে এই নয়া জোটের খবর ভারতের বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোড়ন ও তর্ক তুলেছে। তারা ভালোভাবে নেননি। কিন্তু এত তর্ক উঠছে কেন?

    কারণ তাঁরা সবাই ভারতের মনের আসল ইচ্ছাটা আগে থেকেই জানেন। আর তা হল, যতই মুচড়ামুচড়ি করুক, শেষে ভারত কারো সামরিক জোটে কখনো যাবে না। তাই তারা বলছেন, এই  “অনিচ্ছুক” [New Delhi’s “reluctance”] ভারতের খবর তো বাইডেনের আমেরিকার অজানা নয়। তাহলে বাইডেনের এই নয়া জোটের ঘোষণার অর্থ তাঁরা করছেন এভাবে যে, বাইডেন তাহলে ভারতকে ছেড়ে অন্যান্য সম্ভাব্যদের নিয়ে এশিয়ায় অন্য কিছু খুঁজতে নেমে গেলেন। তবে, স্পুটনিক এখানেই না থেমে আরেক ধাপ এগিয়েছে। ভারতের এক সাবেক নেভি অফিসার শেষাদ্রি ভাসান [Seshadri Vasan] যিনি এখন চেন্নাইভিত্তিক এক থিংকট্যাংক [Chennai Centre for China Studies (C3S)] পরিচালনা করেন, তার সাথে এ নিয়ে কথা বলে তাঁর বয়ান সংগ্রহ করেছে। শেষাদ্রি স্পুটনিককে বলছেন, “ভারত বারবার জানিয়েছে, সে কোয়াডকে কোনো সামরিক জোট হিসাবে দেখে না, বড় জোর এক নিরাপত্তা স্বার্থবিষয়ক গ্রুপ হিসাবে ভারত দেখতে চায়”। এছাড়া তিনি বর্ণনা করে বলেছেন যে যেমন “তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কোনো সামরিক সঙ্ঘাত দেখা দিলে ভারত সেক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে কোনোরকম সামরিকভাবে জড়িত হতে অনিচ্ছুক” […also shown its reluctance to get militarily involved on the side of the US in case there is any conflict in the Taiwan Strait or the South China Sea for that matter]। তাই তাঁর ধারণা আমেরিকা নিশ্চয় (ভারতকে ছাড়া) অন্য আগ্রহী পার্টনার খুঁজছিল।

    আসলে সত্যিকারভাবে বললে, ‘ভারতের অবস্থান সবসময়ই ছিল এমন যে “মাংসের ঝোল খাবো কিন্তু মাংস খাবো না” ধরণের। অর্থাৎ নিরাপত্তাবিষয়ক গ্রুপ- জোটে থাকব কিন্তু ‘সামরিক অ্যালায়েন্স’ এমন জোটে থাকব না। তাহলে নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো গ্রুপের জোটেই বা ভারতের থাকার দরকারটা কী? আবার বাস্তবে  তাহলে কোয়াডের অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ায় ভারতের অংশ নেয়ারইবা দরকার কী? এর অর্থই বা কী? এটা কি সামরিক তৎপরতায় যোগ দেয়া হয়ে যায়নি?

    এমনকি সাউথ চায়না সি-কেন্দ্রিক কোয়াড জোট যে এলাকার সমুদ্রসীমা বিতর্ককে উসিলা করে গড়ে তোলা হয়েছে সেটা ভারতের কোনো সীমান্ত বা ভুমির কাছাকাছিও নয়, কোনো স্বার্থও নাই সেখানে। সেই কোয়াড জোটে তাহলে ভারত যোগ দিতে দৌড়াল কেন? আসলে কোয়াডকে একটা চীনবিরোধী জোট দেখেই ভারত ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু ওদিকে এবার ‘শুধু ঝোল খাবার পণ’ করে রাখাতে এখন ভারতের মনে যা ছিল-আছে তা বাইরে উদাম হয়ে বের হয়ে আসছে।

    তবে শেষাদ্রি আরেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারত কোয়াডে থাকবে না। তাই তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াড ত্রিদেশীয় নয়া জোটে বিলীন হচ্ছে তাহলে ভারত সেখানে থাকতে পারছেই না। তবে তিনি কথাটা ঘুরিয়ে বলেছেন, “কোয়াড আগামীতেও হয়তো নিজেকে দরকারি করে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। কারণ নতুন ত্রিদেশীয় জোট তো প্রতিরক্ষাভিত্তিক”। অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াডই ত্রিদেশীয় জোটে রূপ নিতে যাচ্ছে।

    তবে ঐ একই স্পুটনিক রিপোর্টে  আরেক প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বয়ান এসেছে যার নাম অনিল ত্রিগুণায়াত [Anil Trigunayat]। এছাড়া এমনকি বর্তমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করসহ আরো অনেকের উদ্ধৃতি তুলে এনেছে স্পুটনিক। তবে তাদের সবার মূল কথাটা হল আসলে ভারতের কোয়াড  জোটে থাকতে পারছে না বলে তা নিয়ে নিজেদেরকে দেয়া “সান্ত্বনা”। ভারতের ‘মন খারাপের কিছু নেই’ ধরনের বা ‘হতাশ হবার কিছু নেই’ এরকম [I don’t think New Delhi needs to feel threatened or disenchanted…… ]। যেমন একজন বলছেন, এখন থেকে ভারতের আলাদা আলাদা করে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত।

    ওই সাবেক রাষ্ট্রদূত কথা বলতে গিয়ে তিনি যেসব সংগঠনে ভারতের কদর আছে বলে গৌরব করে তা জানিয়েছেন যেমন ব্রিকস [BRICS] এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান আর এসসিও [SCO] (সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন) এর কথা। কিন্তু এখানে ব্যাপার হল ভারত যে এক অকর্মণ্য “বেচারা” তাই প্রমাণ হল। কারণ, এদুটো প্রতিষ্ঠানই আসলে চীনা উদ্যোগের জোট যেখানে চীনের মূলত প্রধান পার্টনার হলো রাশিয়া। আর ভারতকে চীন দয়া করে রেখেছে, নিজের উদারতায়; প্রতিদ্বন্দ্বি বা শত্রু হিসাবে দেখলে জোটে নিত না।  একটা ফেয়ার এপ্রোচ বা ন্যায্যতাবোধে নেয়া চীনের এই সিদ্ধান্ত, যে লম্বাদুর পর্যন্ত চিন্তা করতে সক্ষমতা ও সাহস রাখে। এর সোজা অর্থ হল, রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুণায়াত এরই কথা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ায় ভারতের ভাত নেই, পাত্তাই নাই। তারা নিজেকে নিয়ে আছে। আর ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার তালে আছে কেবল। এর বাইরে ভারতের কোথাও পাত্তা নাই। তাই অন্য জায়গা ভারতের গুরুত্বের কথা বলতে গেলে যতটুকু যা আছে তা নয়া নেতা চীনেরই উদ্যোগের ভিতরের কথাই উল্লেখ করতে হচ্ছে। যে চীনকে আবার আপাতত দেখা যাচ্ছে, ভারত শত্রু মনে করছে। কিন্তু চীন ব্যাপারটাকে দেখছে এক অবজেকটিভ ফেনোমেনা আকারে। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে গেলে সেই দুনিয়াতে নেতা থাকবে চীন আর চীনের পিছনে উঠে আসতে পারে ইন্ডিয়া (যদি সে অপ্রয়োজনীয় মুসলমান ঘৃণা চিরদিনের জন্য ত্যাগ করে সরে আসে, এই অঞ্চলকে শান্তি দেয়, অর্থনীতিতে মন দেয়)।  আর চীনের দিক থেকে, চীন আগেভাগেই ভারতের সব সম্ভাবনাগুলোকে নিজের ইচ্ছায় নাকচ করতে পারে না। এই অসততা উলটা চীনকেই একসময় ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অবজেকটিভ ফেনোমেনাকে রুখে দেয়া যায় না। রুখে দিবার চিন্তা করে বোকা-হিংসুক আর গর্দভেরা। বুদ্ধিমানেরা সাগরে ঘুর্ণিঝড় দেখা দিলে ওর সাথে লড়তে যায় না, খাপ খাইয়ে নেয়া আর কম ক্ষতি কিসে হবে সেই পথে ঝড়ের সামনে যায়।

    তবু বহুবার লিখেছি ভারতের ন্যাচারাল ফ্রেন্ড মানে বিষয়-আশয় বা অর্থনৈতিক স্বার্থবিষয়ক কমন ও প্রধান পার্টনার হবে চীন। এটাই অবজেকটিভ নিয়তি।  (অবজেকটিভ [objective] বলতে যেটা কোন কর্তা-মানুষ ঠিক করে নাই। ন্যাচারাল ভাবে হয়েছে। যেটাকে আমরা অনেক সময় বলি আল্লায় ঠিক করেছে।) আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে ‘মুই কি হনু রে’ অবস্থা করে এই নিয়তি থেকে দূরে ঠেলে সরিয়ে রাখা নিশ্চিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে; সেটা এই শতক মানে গত বিশ বছর ধরে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই ফলাফল আমেরিকা আ ভারতের জন্য শুণ্য। তবু, ভারত আমেরিকান আকাঙ্খা মোতাবেক নিজেকে সেই বাক্সে ঢুকিয়েছে। ভেবেছে, সে পরাশক্তি হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বা জয়শঙ্কর ইত্যাদি এরা “কথিত পরাশক্তি হয়ে যাবার” এই মিথ্যা কল্পনা ইলিউশন মায়ায় ভারতের মিডিয়াকে (প্রতীকীভাবে দৈনিক দাহিন্দু এর সুহাসিনী হায়দারের কথা ভাবা যায়) প্রভাবিত করে চলেছিল দশক ধরে। কিন্তু এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সব ন্যাংটা হয়ে যায়। এই ভারত তার নাগরিককে করোনায় বেড দূরে থাক অক্সিজেন দিতে পারে নাই। মরলে সৎকার বা সাধারণ মাটি দিবার ব্যবস্থাটুকুও করতে পারে নাই, ব্রীজের উপরে নিয়ে বা নদীতে নিয়ে ফেলে দিয়ে নুন্যতম মানুষের মর্যাদা নষ্ট ও অপমান করেছে। তাই সুহাসিনী আর তাকে দেখানো পরাশক্তির স্বপ্ন তিনি বইতে রাজী হয় নাই। সে উলটা এখন ঐ মিথ্যা স্বপ্নকে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন করে থাকে। তবু কারো কারো হুশজ্ঞান কখনই হয় না। যেমন দ্যাপ্রিন্টের ফরেন ডেক্সের নয়নিমা বসু [NAYANIMA BASU]।  তালেবানদের কাবুল  দখলের আগে তাকে ভারতীয় সামরিক বিমানে এমবেডেড জার্নালিজম করতে আফগানিস্তানে নেয়া হয়েছিল। সে এখন  তালেবান ইস্যুতে মোদী সরকারের পারফরমেন্সের পক্ষে প্রধান ভক্ত-প্রচারক; একেবারে – ফ্লায়িং হাই মানে আকাশে উড়ছেন অবস্থা!। অথচ খোদ জয়শঙ্করই এখনই বুঝে গেছে কত ধানে বড় জোর কত চাল হয়। সে ইতোমধ্যেই জানান দিচ্ছে ভারত কোন যুদ্ধে-টুদ্ধে নাই। জয়শঙ্কর এখন গ্লোবালাইজেশন ও গ্লোবাল বাণিজ্যের ভক্ত। বলছেন, সব দেশই একালে একসাথে (বাণিজ্য নিয়ে) কাজ করতে বাধ্য [……  globalisation. It reflects the compulsions of countries to work together. ]।  কিন্তু নয়নিমাদেরকে কে এসব বুঝাবে।

    এটাই গত বিশবছর ধরে চলে আসছে। প্রণব বা মোদি কারো আমলেই ভিন্ন কিছু হয়নি। বুশ-ওবামা আমলে এই ব্যক্তিত্বরা ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান রফতানির বাজার সুবিধা ভারতকে দিয়েছিলেন আর তাতেই এটা আমেরিকান বিদেশনীতির অঙ্গ অংশ হয়ে গেছিল। আর তাতেই জাতিবাদী ভারত কেঁচো হয়ে, চীনের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপরের জন্য ভারতীয় শের হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেই সেসব রপ্তানি সুবিধা বাতিল করে দিলেও ভারত আর আমেরিকার হাত ছাড়তে পারেনি। অথচ এখন দাবি করছে তারা আমেরিকার সাথে সামরিক জোটে যাবে না! এ জন্যই এটাকে মাংস খাব না কিন্তু ঝোল খাবার লোভ বলেছি। ফলে এখনো আমরা আসলেই জানি না যে যদি বাইডেন ১৬ না হোক ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সুবিধা ভারতকে এখন দেন সেক্ষেত্রে ভারত কি বাইডেনের সামরিক জোটে যাবে না বলতে পারবে? আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই হল পরাশক্তি ভাবধরা ভারতের নিজ সম্পর্কে  বিবেচনাবোধ!

    বুদ্ধিমানরা জানে একসাথে সব দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে যাওয়া যায় না। কারণ এটা কার্যকর পদ্ধতি নয় আর, তা সফল করাও যায় না। প্রত্যেকবারে নতুন জেগে থিতু হয়ে উঠা প্রধান দ্বন্দ্বটারই কেবল মীমাংসা করে করে আগাতে হয়; যেমন এখনকার মূল দ্বন্দ্ব চীন-আমেরিকার। ফলে ভারতের দিক থেকে তা মোকাবিলার এটিচুড হতে হবে চীন-ভারত এক দিকে বনাম আমেরিকা, এভাবে দ্বন্দ্বের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানো। এরপর তা সমাধান হয়ে গেলে বা এই দ্বন্দ্ব-নিরসন বা বিনাশ হয়ে গেলে তখন আবার মুখ্য দ্বন্দ্ব হিসেবে তা চীন-ভারত দ্বন্দ্ব হতে পারে। ততদিনে ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ অন্যকে বলার মতো করে বাড়িয়ে নেয়া যাবে আর তা দরকারও; যদিও এমনটা অর্জনের আগে দুটা আরো অভ্যন্তরীণ সংস্কার ভারতকে করতেই হবে। এক. হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করে দেশের সবাই নাগরিক ও সমান অধিকারের – এমন এই পরিচয়ে নাগরিক অধিকারভিত্তিক এক নয়া ভারতরাষ্ট্র তাকে গড়ে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয়টা প্রথমটারই অনুষঙ্গ। তা হল নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা সমুলে ত্যাগ করা। ফলে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতিবাদ বাদ দিতে হবে। এমনকি নাদান অবুঝ ট্রাম্পের মত অর্থনৈতিক জাতিবাদও বাদ দিতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে আমরা সবাই এক গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেনের যুগে একেবারে ঢুকে গেছি। আর এটা ‘ওয়ান ওয়ে’।

    এই ‘পুলসিরাত’ পার হতে পারলে ভারত পরে সবকিছু হতে পারবে। নইলে ‘কিছুই নয়’। এর আগে আগামি ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে নতুন যারাই কোয়ালিশনে ক্ষমতায় আসুক তারা সম্ভবত চীনের অর্থনৈতিক পার্টনার হওয়ার পথ ধরবে। আর তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত আরো দ্রুত সক্ষম হওয়ার পথ ধরবে। কিন্তু তবু আমেরিকার থেকেই ভারত সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। কারণ ভারতের পারসেপশন হল তার সম্ভাব্য প্রধান শত্রু চীন। তাই ভারত চীনের থেকে অনেক কিছু কিনলেও অস্ত্র কিনতে পারে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা চীনের সাথে সম্পর্ক ক্ষতি করবে না।  কাজেই ভারতে এমনটা ঘটার সম্ভাবনার দিকে এখন পরিস্থিতি যাবে বলে অনুমান করছে অনেকে। আর সেক্ষেত্রে আপাতত ভারতকে কোয়াড থেকে বের করে দিলেও আমেরিকার সাথে মোদীর ঘনিষ্ঠতা থেকে যেতেই আমরা দেখব। আমেরিকার ভারতকে দরকারের চেয়ে মোদীর ভারতের আমেরিকাকে বেশি দরকার, পারসেপশন এমনই নানান কারণে। তবে বর্তমান হিন্দুত্ববাদের ভারতের নেতৃত্বের উপর আমেরিকারও তেমন আস্থা নেই।  অর্থাৎ চাইলে ভারতের জন্য বিকল্প পথ  আছে, এটার রেকর্ড  থাকল এতে!

    ‘আটলান্টিক’ আওয়াজটা আবার বেশি উঠছেঃ
    আটলান্টিক [Atlantic] এক মহাসাগরের নাম, যা মূলত আমেরিকাকে ইউরোপ থেকে আলাদা করেছে মনে করে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সেদিকে তাল রেখে ‘আটলান্টিক’ অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনই প্রতীক বা ইঙ্গিত অর্থে ‘আটলান্টিক-এর একটা মানে হল – যা কিছু আমেরিকা ও ব্রিটেন (ইউরোপ) মিলে অন্যদের বিরুদ্ধে তাই ‘আটলান্টিক’। এখন এখানে আলোচ্য ইস্যুতে, আমেরিকা ও ব্রিটেন দু’দেশ মিলে অস্ট্রেলিয়াকে জাপটে ধরে তাকে এশিয়ায় সামরিক কেন্দ্র বানাতে চাচ্ছে। তাও আবার পরমাণুকেন্দ্রিক সামরিকতা। ফলে এটাও যেন এক আটলান্টিক সামরিকতা! এই হল আমেরিকার এই নয়াজোটের তাতপর্য।

    কিন্তু বাইডেন বেখবর হয়ে আবার  নিজেকে পুরানা  স্টাইলে প্রভাবশালী  ক্ষমতাবান  ‘বীর’ সাজতে চাইছে।  কারণ মূলত দুনিয়াতে ইতোমধ্যে সামরিক অস্ত্রে পরমাণু টেকনোলজির ব্যবহার বন্ধ করা, নাহলে নুন্যতম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাই নানান রিজিওনাল চুক্তি করছে। এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যেমন জ্বালানি ও বিদ্যুতের উৎস হিসেবে পরমাণু টেকের ব্যবহার কমানোর দিকে সারা দুনিয়া ঝুঁকে পড়েছে, জনমতও সেদিকে। অথচ এমনকালেই বাইডেন-বাবাজি পরমাণু-সাবমেরিন (SSBN) দিয়ে কী করে এশিয়ার যুদ্ধের নাট্যমঞ্চ সাজাতে আসে? সে কেমন কথিত এই আটলান্টিক শক্তি?

    এ পেছনের মুল কারণ সম্ভবত এটাই যে কথিত এই আটলান্টিক শক্তির উদ্যোগ আসলে অন্যের ঘাড়ে মানে ও অষ্ট্রেলিয়ার উপর দিয়ে যাবে। বাইডেনের “আটলান্টিক শক্তি” এশিয়াতে আসছে একারণে যে, এর যুদ্ধের নাট্যশালা থেকে আমেরিকা-বৃটেন থেকে অনেক দূরে? তাই কী? আপাতত বাইডেনদের তাই মনে হচ্ছে বটে কিন্তু তাই কি? না। অচিরেই বাইডেন এর বিরোধিতা সামলাতে হয়রান হয়ে যাবেন!

    ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কেন?
    এই ত্রিদেশীয় সামরিক চুক্তি ও জোট খুলে বসাতে ইউরোপের দ্বিতীয় শক্তি ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে। কেন? এর কারণও সাবমেরিন। যে সাবমেরিনভিত্তিক জোটের কথা আমরা এখন শুনছি – আমেরিকা-ব্রিটেনের  আর সাথে আলাপ আলোচনার কালে সমান্তরালে তবে অনেক আগে থেকে অস্ট্রেলিয়া ফ্রান্সের সাথেও তাদের থেকে সাবমেরিন কিনবে বলে আলোচনা প্রায় সমাপ্ত করে এনেছিল। ত্রিদেশীয় চুক্তিতে যেটা  আছে তাতে আগামি ১৮ মাসের মধ্যে কয়েকটা নয়া পরমাণু-সাবমেরিন আমেরিকা-ব্রিটেন বানিয়ে দিবে। আর এজন্যই ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়েছে, এটাই ওর মুলকথা। কিন্তু বেশি বুদ্ধিমান বলে অষ্ট্রেলিয়া আসলে সে ভীষণ বোকা আর লোভী। তার স্বপ্ন যে সে ঐ অঞ্চল সাম্রাজ্য খুলে বসবে আর আমেরিকা-বৃটেন তাকে দূরে বসে সহায়তা দিবে আর লভ্যাংশ গুণবে। এই লোভীর খবরই নাই যে  “সাম্রাজ্যরূপে দোকান” খুলে বসার দিন ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেছে। দুনিয়াতে কেউ কারো আর  এখন সাম্রাজ্য খুলা বাস্তবতা নাই, সব দোকান বন্ধ। অটোমান, জার কিংবা বৃটিশ বা ফরাসী ইত্যাদি সব কলোনি সাম্রাজ্য একালে নাজায়েজ, আর এটাই জাতিসংঘের জন্মভিত্তি।  যদি সাম্রাজ্য ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেখতে চান তো দুনিয়াকে ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়ায় ফিরাতে হবে। পারবেন?

    তাহলে এযুগে কী সম্ভব? অর্থনৈতিক শক্তি জোট হওয়া সম্ভব। চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প যেমন এমন জোট সহজে সম্ভব। এমনকি বিনিয়োগের মুরোদে দেখাতে পারলে বাইডেনও পালটা আরেক কোন মহাপ্রকল্প জোট খাড়া করতে পারেন। [যদিও বাইডেনের সক্ষমতায় ঐ বিনিয়োগের মুরোদটাই অনিশ্চিত]। তো অষ্ট্রেলিয়া নিজ কোন মুরোদ দেখিয়ে ঐ অঞ্চলে সবার উপরের এক ‘সাম্রাজ্য’ নেতা হবেন?  বিপুল কোন বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে তাঁর? নাকি লেটেস্ট পরমাণু-সাবমেরিন? এই অসারবস্তু চিন্তাটা বুঝবার মত কেউ কী অষ্টেলিয়ায় নাই? অবিশ্বাস্য! ঘটনা আরো আছে।

    কিন্তু ফরাসিদের হারিয়ে কথিত আটলান্টিক জোটের আমেরিকা ও ব্রিটেন কোন কারণে এগিয়ে গেল? কারণ বাইডেনও তো খুবই বুদ্ধিমান। তার এখন নিজেকে বাঁচাতে অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে চান, অর্থাৎ নিজরাষ্ট্রের দায় ও পরিচালন ব্যয় কমানোই মুল লক্ষ্য। তাই অষ্ট্রেলিয়ার এই দিবাস্বপ্ন জানলেও পরমাণু-সাবমেরিন বেচাই তার একমাত্র লক্ষ্য। অষ্ট্রেলিয়া বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে আমেরিকার পাশাপাশি ফ্রান্সের কাছ থেকে বিকল্প হিসাবে রেডিমেড তৈরি থাকা সাবমেরিন কিনবার সম্ভাবনা যাচাই করেছিলেন। যার মুল্য ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন (ভারতীয় ঐ নেভি অফিসারের মতে)। আর এখানেই দাও মারেন বাইডেন আর আরেক চাপাবাজ প্রধানমন্ত্রী বরিস। তারা অষ্টেলিয়াকে বুঝান যে এটা তারা অষ্টেলিয়াকে নতুন বানিয়ে দিলে অনেক কম খরচে হবে। আর এতেই ফরাসী ম্যাঁক্রোর কাস্টমার ছুটে যায়। বলা যায় বাইডেন লোভ দেখিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছেন বলে ফ্রান্স মনে করে।

    ফলে মুলকথা আমেরিকা-বৃটেন অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের কোলে তুলে নিতে সক্ষম হয়। আর এতে ক্ষুব্ধ ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া হয় দেখার মত। ফ্রান্সের ক্ষুব্ধ কূটনৈতিক মন্তব্য- ওরা ‘পিঠে ছুরি মেরেছে’ [“It’s a stab in the back. We had established a trusting relationship with Australia, and this trust was betrayed,” ],  মানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইউরোপীয় মিডিয়া বলছে এটা ৫০ বিলিয়নের বেশি ইউরোর ডিল […France-slams-australia-us-e50b-submarine-deal…]। ভারতের ঐ থিঙ্কট্যাংক বলেছে এতা ৯০ বিলিয়ন ডলারের ডিল [Australia’s decision to scrap its $90 billion nuclear submarine contract with France’s Naval Group ]।
    আর ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রোর এমন প্রতিক্রিয়া বলছে এটা আসলে যতটা সামরিক জোটের ঘটনা বলে দেখানো হচ্ছে এটা এর চেয়েও বেশী অস্ত্র ব্যাবসায়িক। 

    তাই ঘটনার আসল দিক অন্যখানে।  ফ্রান্সের এই প্রতিক্রিয়া থেকে পরিষ্কার যে, এটা নেহাত সামরিক জোটের মামলা নয়। কারণ এটা আসলে যুদ্ধজোট নয়, ৯০ বিলিয়ন ডলারের এক বিনিয়োগ ও লাভালাভের প্রকল্প! তাই তো নাকি? এটা অর্থনৈতিক লাভালাভেরই জোট। অন্য দেশকে লুটে যে অর্থনৈতিক লাভালাভ হবে, এরও ভাগাভাগি করে খাওয়ার জোট। ভারতীয় নেভি অফিসারও এই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। অতএব ফরাসিদের তাড়িয়ে এটা তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সে প্রকল্প নিয়ে নিয়েছে এর ঝগড়া। সেটা হোক! কিন্তু কথা হল, এটা এখন কী ধরনের আটলান্টিক জোট হল? ফরাসিরা নিশ্চয় ভেসে আসেনি, ভেসে যাবেও না! তবে অবিলম্বে এখানে ন্যাটোকে ভেঙে নতুন পরিস্থিতির উপযোগী করে সাজানোর ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। আটলান্টিক শব্দটা বেশি উঠে আসার কারণ এসবেরই পেছনে লুকানো। ওদিকে ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রো অষ্টেলিয়া ও আমেরিকা থেকে রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ ব্যাপারটা খুব সহজে মিটছে না।

    চীনের প্রতিক্রিয়া:
    নতুন AUKUS জোট, দক্ষিণ চীনসাগর ঘিরে এশিয়ায় এই আরেকটা সামরিক জোট হচ্ছে, এতে চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হবে তা স্বাভাবিক। তবু চীনের প্রতিক্রিয়া অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, চীন এক শব্দের এক ছোট মন্তব্য করেছে – ‘ইরেসপন্সিবল’ মানে দায়িত্বজ্ঞানহীন [‘Aukus’  security pact irresponsible]। খুবই গভীর অর্থবোধক মন্তব্য সন্দেহ নেই। কেন?

    চীন-আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতাই মূল দ্বন্দ্ব বা বিরোধ; মানে গ্লোবাল সিস্টেমের নেতৃত্ব হল বিরোধের কেন্দ্র। যা মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা কেন্দ্রিক- আর সেই নেতৃত্বের অবস্থান থেকে আমেরিকা ক্রমেই ঢলে পড়ছে; বিপরীতে চীন উঠে আসছে। এই হলো বাস্তবতা। তার একটা বড় প্রকাশ হল, ইন্ডেপেন্ডেন্ট স্টাডি রিপোর্টগুলো থেকে পাওয়া –BBC REPORT অথবা  REUTERS  বলছে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে  খুবই খেয়াল করে লক্ষ্য করার ব্যাপারটা হল, এখানে অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছে, কোনো সামরিক সক্ষমতা নয়, কোনো রাজনৈতিক চিন্তার বিরোধ বা সক্ষমতাও নয়। অর্থাৎ এটা একেবারেই অবজেকটিভ সক্ষমতা, সাবজেকটিভ একেবারেই নয়। এর মানে হল, আমেরিকা এই যুদ্ধ করে এই যুদ্ধে জয়লাভ করলেও তাতে চীনের চেয়ে আমেরিকা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সমান হতে পারবে না।

    অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুদ্ধে অর্জনের বিষয়ই নয়। তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সাথে এক অস্ট্রেলিয়াকে – এভাবে নিয়ে তারা যুদ্ধজোট সাজাচ্ছে কেন? যুদ্ধে জিতলে অস্ট্রেলিয়াও কি চীনের সমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবে? কোনই সম্ভাবনা নাই। এছাড়া এটা কলোনিদখলের যুগ আর নয় যে অষ্ট্রেলিয়া বাইডেনের সহায়তা কোন দেশকে দখল করে তার সম্পদ বৈধ বলে নিজের দাবি করতে পারবে। অথবা যারা সাবমেরিন সাপ্লাই দিয়েছে তাদেরকে চুরি লুটের কোন ভাগ দিতে পারবে।

    এছাড়া আরো মারাত্মক দিক হল,  এই সামরিক জোট চুক্তিটা করা হল আবার একটা পরমাণু-যুদ্ধের হুমকি তৈরি করে। এটার সাফাই ন্যায্যতা কী? এবার এমনকি যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া বিজয়ী হলেও কি সে নিজ অষ্ট্রেলিয় বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে? তারা পরমাণুর রেডিয়েশনের মধ্যে বেঁচে থাকবে কী করে? যারা চুক্তিটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত এই শাসক রাজনৈতিক নেতারা তাদের বাঁচাবেন কী করে? এবার আমেরিকা-ব্রিটেনের কি এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়াকে ঠে্লে দেওয়ায় ওসব নাগরিকদের প্রতি তাদের কোনো দায় নেই?

    কেউ  নিজেকে “মানুষ” বলে দাবি করলে, তাঁর ন্যূনতম দায়িত্বজ্ঞান বোধ থাকলে এমন সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারে না; যেখানে পরমাণু শক্তির বাণিজ্যিক বা সামরিক সর্ববিধ ব্যবহার বন্ধ করা, ন্যূনপক্ষে একেবারে কমানো – এটাই এখনকার মুখ্য গ্লোবাল ট্রেন্ড এবং প্রবল গ্লোবাল জনমতও বটে।

    চীনের সাথে কোন দেশের বিরোধ করার, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধিতা করার জন্য পশ্চিমের বহুবিধ জেনুইন বিষয় আছে। আর তা দোষের কিছুওও নয়। তাই সেগুলো নিয়ে সদর্পে লড়া তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক ফোরামে বাধা দেয়া দরকারও সম্ভবত যাতে চীন তা অন্তত অনেকটাই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কেবল ব্যাপারটাকে ডায়লগের মধ্যে রাখতে পারতে হবে। তা অবশ্যই আমেরিকা করতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এই বাধা দেয়া আমেরিকার AUKUS জোট করবে পারমাণবিকভাবে? এরা হিটলারের চেয়েও ঘৃণিত ব্যক্তিত্ব হবে!  তাও আবার একটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধে? এতে এমনকি পশ্চিম বা আটলান্টিকের বাসিন্দাদেরকেও দায় নিতে হবে! তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে ঠেকানোর দায়িত্ব তাদেরও আছে। এই ইস্যুতে আজীবন তাদের জবাবদিহিতা করতে হবে।

    এশিয়ায় বাংলাদেশসহ আমরা কেউ অবশ্যই কোনো অর্থনৈতিক জোটের বাইরে অন্য কোনো সামরিক বা যুদ্ধজোটে যুক্ত হতে পারি না। কমবেশী আমাদের সবার মনোভাব যুদ্ধজোট বিরোধী। ওবামার ‘এশিয়া পিভোট নীতি’ ফেল করেছিল একারণেই। পরের কোয়াডও প্রায় ফেলের পথে একই কারণে। সাউথ চায়না সি-এর আশপাশের (অস্ট্রেলিয়া জাপান ছাড়া) যেমন আসিয়ানভুক্ত কোনো দেশ এসব কোন উদ্যোগ না জোটে অংশ নেয়নি। অর্থাৎ যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিরোধ আছে এমন কোনো দেশ আমেরিকার কোন জোটে কখনো অংশ নেয়নি, আশ্রয় নেয় নাই। অর্থাৎ তারা ন্যায্যভাবে তাদের চীনের সাথে বিরোধের অবশ্যই মীমাংসা চায়; কিন্তু আমেরিকার কোলে চড়ে নয়, কিংবা আমেরিকার পাতা কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দিয়ে নয়।  একারণের আমেরিকান সব উদ্যোগ মূলত ফেল করছে একের পর এক। আমেরিকার এই ব্যর্থতাই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, ঐ অঞ্চলের কেউ ওখানে কোনো যুদ্ধজোট গড়ার দরকার মনে করে না?  এর পরেও আমেরিকা ছাড়েনি। এবার পারমাণবিক  যুদ্ধের দামামা নিয়ে ব্যবসা করতে এগিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে আবার এশিয়ার জন্য এক মহাদুর্যোগ সামনে! এটাও আমাদেরকে অবশ্যই পার হতেই হবে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৮ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ভারত নয়, আমেরিকার ত্রিদেশীয় সামরিক জোট “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলো কী নিজেই নিজেকে মৃত ঘোষণা করতে চাইছে?

    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১০.৫৬ সকাল
    প্রথম আলো চরমতম বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমাদের জানামতে এর অফিস কাওরানবাজারেই ছিল। কিন্তু গত দুমাসের রিপোর্টিং মান, ধরণ ও ততপরতায় তাতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মনে হচ্ছে এটা বোধহয় কোন ভারতীয় পত্রিকা। যার অফিস ভারতের কোন শহরে!
    এমনিতেই ভারতীয় পত্রিকায় জার্নালিজম থাকে না। থাকে জাতিবাদ-দেশপ্রেমিকতা। মানে খবর যেভাবে পেশ করলে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি দেশপ্রেম প্রকাশ পাবে সেটাই করতে হবে। তাতে নিউজ মিথ্যা হলেও অসুবিধা নাই। অর্থাৎ জার্নালিজমের নীতি ও সততা এর গাইডলাইন নয়, বড়জোর সেকেন্ডারি। অর্থাৎ দেশপ্রেমের নামে খাড়া মিথ্যা প্রপাগান্ডাও জায়েজ। আর কথিত এই দেশপ্রেমের নিচে যদি কিছু জায়গা ত্থাকে তো সেখানে জার্নালিজমকে ফেলে রাখা যেতে পারে। এককথায় কথিত তাদের ‘ন্যাশনাল ইন্টারে্স্টটের’ সাংবাদিকতা। ফলে এরপর আর খবরের সত্য-মিথ্যা জাহান্নামে!
    কথা এখানেই শেষ না। দল বিজেপি যেহেতু এখন ক্ষমতায়। তাই মোদীর
    আরএসএস –বিজেপির রাজনীতি এবং স্বার্থটাই ভারত দেশপ্রেমের মাপকাঠি এবং তাদের কথা-ই ভারতের ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’। তাই শেষে এটাই প্রথম আলোরও খবর প্রকাশের গাইড লাইন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ প্রথম আলোর খবরের সোর্স বলা হচ্ছে ভারতে প্রকাশিত কোন পত্রিকার খবর।
    আগেও বলেছিলাম “ডেস্ক নিউজের” নামে প্রথম আলোতে আরেক চাতুরি চলে। তা হল, খবরের উতস-এর পরোয়া না করে অনুবাদের নামে যা ইচ্ছা তাই রিপোর্ট করা। যেন ‘অনুবাদক’ বলে আরেক ক্যাটাগরির কর্মী প্রথম আলো নিয়োগ দিয়েছে বা দেখতে পাওয়া যাবে। যারা সাংবাদিকতার সব দায় কর্তব্যের উর্ধে। খবরের উৎসে কোন কথা বা শব্দ থাক আর নাই থাক তিনি যেকোন শব্দ খবরের মধ্যে ঢুকাতে পারেন, বেপরোয়া। কারণ ওটা নাকি ‘ডেস্ক নিউজ’। ফলে যেন খবরের সত্যতার দায় প্রথম আলোর নাই।
    এর উপর আবার গতমাস থেকে এখন শুরু হয়েছে ‘বান-তালে’ (শব্দ উলটে নিয়ে পড়তে হবে) জার্নালিজম’। মানে যারা কা=বু=লে ক্ষমতা দখল করেছে। তাদের নিয়ে ভারতের জার্নালিজম। খবরের সোর্স না থাকলেও বানিয়ে এই নতুন শাসকদের বিরুদ্ধে লিখতে হবে ও সেটাই জার্নালিজম বলে মানতে হবে। নয়া শাসক আসাতে ভারতের স্বার্থের ক্ষতি হয়েছে। তাই এই ইস্যুতে ভারতের জার্নানিজম বাপ-মা হারা বেপরোয়া হয়ে গেছে। বেঁচে আছে কেবল কথিত ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের সাংবাদিকতা, তাই দেশপ্রেমের ভারে, উৎস না থাকলেও যা খুশি লিখে দিবার স্বাধীনতা।
    আর এতে প্রথম আলো হয়েছে আরো স্বাধীন বেপরোয়া। ভারতের যেকোন মিডিয়ায় প্রকাশিত এসব প্রপাগান্ডা গারবেজকে প্রথম আলো তার প্রকাশিত নিজ খবরের সোর্স বলে দাবি করছে। পেগাসাস এই ইসরায়েলি আড়িপাতা সফটওয়ার মোদী কিনেছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে, আর বিরোধী রাজনীতিক এমনকি নিজ সরকারের সচিব ইত্যাদির উপর তিনি তা ব্যবহার করে আসছেন। এটা নিয়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে মামলা চলছে। সংসদে হৈ চৈ চলছে। অথচ এখনও না সরকার বা সফটওয়ার কোম্পানী (এনএসও) স্বীকার করেছে যে মোদী এই সফটওয়ার কিনেছে। আদালতে দেওয়া সরকারের এফিডেফিট ইতোমধ্যে দুবার বদলিয়েছে। এমনকি কিনে নাই সেটাও বলছে না। পিছলে বেড়াচ্ছে। অথচ এনিয়ে যে রিপোর্ট প্রথম আলো ২৪ জুলাই ছেপেছে তা আসলে কোম্পানী এনএসও এর পক্ষের এক সাফাই। সেজন্য শিরোনাম হল এই আড়িপাতা সফটওয়ারের কারণে নাকি “লাখ লাখ মানুষ রাতে ভালো ঘুমাতে পারে”।
    এএনআই – এটা নিজেকে ভারতের এক প্রাইভেট নিউজ এজেন্সী বলে দাবি করে। বস্তুত এটা ফেক নিউজের একটা আড়ত। ইইউ এর এক গবেষণাালব্দ ফল থেকে পাওয়া অভিযোগ এটা। (EU DisinfoLab report) গুগল সার্চ দিয়ে আগ্রহিরা খুজে নিতে পারেন। আর এই কথিত এজেন্সীর উপরে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের হয়ে যেসব ফেক নিউজ করার দরকার হয় তা করে দেওয়ার বা হালাল করে দেওয়াই এই এজেন্সীর কাজ। অথচ এই এএনআই এর নিউজকেই উৎস মেনে পিআলো তা ছেপে চলেছে।
    যেটা গত পরশু একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে সেটা হল, একটা কথিত নিউজ;
    এতে উল্লেখিত খবরের সোর্সগুলো এরকমঃ
    ১। ……বলে সরকারি সংস্থাগুলো মনে করছে
    ২।…… বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে।
    ৩……… বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
    ৪।……… বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,
    ৫। ……… পাকিস্তানের নাম জড়িয়ে পড়ার কথা শোনা যায়।
    ৬।………… পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রচার রয়েছে।

    ৭।………… ঢাকার বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী

    ৭৫০ অক্ষরের এই কথিত নিউজে খবরের সোর্স এই সাতভাবে বলা আছে। এটা কী জার্নালিজম? তাও প্রথম আলোর?
    প্রথম আলো এভাবে নিজেকে নিচা করে নামিয়ে কথিত খবর ছাপছে কেন?
    অর্থ সংকট? পাকিস্তান আমাদের কারও অপছন্দের দেশ হতেও পারে। কিন্তু সেজন্য এর বিরুদ্ধে এমন প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে নিজের অর্থ সংকট মিটাতে হবে? ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ বা নয়াদিল্লির অর্থ নিয়ে? তাই কী?
    এমন গারবেজ অসততার জিনিষগুলো প্রথম আলোতে ছাপার আগে এই পত্রিকার সম্পাদকের আত্মহত্যা করাই অনেক সম্মানের হত!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.” –Josep Borrell, ইইউর ফরেন পলিসি চিফ, the European Union’s top diplomat;

     

    গত ৩১ আগষ্টের দুদিন আগেই শেষ পর্যন্ত আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গুটিয়ে চলেই গেল; আর তা পক্ষ-বিপক্ষের সবাইকে অবাক করে। বিশেষ করে পক্ষের লোকেরা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, আমেরিকারও দিন শেষ হয় তাহলে! এবার এতে সবাই বুঝে গিয়েছিল এটা শুধু আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকার গুটিয়ে চলে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নয়। এটা শুরু। এটা শুধু আমেরিকার আগফানিস্তান ছেড়ে যাওয়া নয়, এটা গত কমপক্ষে ৫০০ বছরে ধরে অন্যের দেশে গিয়ে সে দেশ দখল, লুটপাট, ক্ষমতার রুস্তমি দেখানো আর সভ্যতা শেখানোর যে ভণ্ডামি চলেছিল, এখন থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটারই গোটানো, বন্ধ বা সমাপ্তির ইঙ্গিত করছে এটা। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের দিন শেষ – মানে পশ্চিমের নেতৃত্বের দিনও শেষ! এটাই হল সেই অবিশ্বাসের ঘটনা যা এখানে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে!

    “রাষ্ট্র আর রাজনীতি” সাধারণত আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্র আর রাজনীতির দেশীয় দিকের চেয়ে বৈদেশিক বা গ্লোবাল দিকটা এ লেখায় অনেকসময় ভারী থাকে বলে অনেকে আমাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুর লেখক বলে মনে করে; যদিও আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ রাষ্ট্র আর রাজনীতিই।

    গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাব’ নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন আমি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে লিখছি। আসলে তখন থেকেই মূলত যে কথা বলতে চেষ্টা করেছি তা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ায় প্রথম একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হতে সুযোগ পেয়েছিল, আমেরিকা যার প্রথম নেতা। যদিও এই সিস্টেমে কে নেতৃত্ব দেবে তা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে সেসময়ের যে দেশ শীর্ষে থাকে তার ওপর। আবার যতই এই শীর্ষ অবস্থান ঢলে পড়ার দিকে যেতে থাকবে ততই তার নেতাগিরির দিনও শেষ হবে। আবার ওই ঢলে পড়া শীর্ষ অবস্থান বিপরীতে ক্রমেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে, যার দখলে যাবে, সেই-ই নতুন গ্লোবাল নেতার আসন নেবে। তবে সাবধান, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির ব্যাপারটা সামরিক ক্ষমতার বলে অর্জনের বিষয়ই নয়। আমার লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলও নয়। বরং জানা যে, এই পালাবদলের কালে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অথবা নতুন কী কী ফ্যাক্টরের আবির্ভাব হয়ে থাকবে, এসব।

    ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ কথাগুলোই আমি বলে আসছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষের পুরনো চিন্তার ফ্রেম তাকে আমার কথাগুলো বুঝতে বাধা দিয়ে গেছে। বিশেষত যেমন এক প্রধান বাধা হল কমিউনিস্ট চিন্তার ফ্রেমে ফেলে আমার কথা বুঝতে চাওয়া। দুই. যারা আবার নিজেদের কমিউনিস্ট ফ্রেমের বাইরের চিন্তার লোক মনে করেন তারাও আমার কথা মানতে চাননি। কারণ আমি বারবার দেখিয়েছি, এখনকার পালাবদলে আমেরিকার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ওদিকে তাদের আমেরিকা-প্রীতি বা শক্ত আস্থা ততই দুর্বল হলেও তারা আমার কথা অস্বীকার করে থেকেছে। যদিও সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হয়েছে এক প্রপাগান্ডা যে, আমি ‘চীনের পক্ষের লোক’; অতএব এ কারণে নাকি আমি আমেরিকাবিরোধী। আমি যতই বলি, আমি অবজেকটিভ দর্শক-পূর্বাভাসদাতা মাত্র। তারা মানেনি। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডা যে, আমারটা নাকি চীনা ভাষ্য।

    অথচ একমাত্র আমিই গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার ইতিহাসটা প্রসঙ্গ করে সবার সামনে এনেছি। এভাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব ব্যবস্থা, আবার এই নেতৃত্বের পালাবদলের প্রসঙ্গটাও এনেছি। ইতিহাসে এ ঘটনাটা প্রথমে ঘটেছে আমেরিকার নেতৃত্বেই। ফলে অকৃপণভাবে বাস্তবের সেই আমেরিকান গৌরবের কথাই আমাকে সতভাবে তুলে ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশি সেই ইতিহাসের আমেরিকান গৌরবের কথা আর কেউ তুলে আনেনি, তাদের এটা অজানা থাকার কারণে। কলোনিয়াল কারণে আমরা ইউরোপিয়ান-ব্রিটিশ ইতিহাস পড়ে ও ফলো করে অভ্যস্ত, আমাদের একাডেমিগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচিও তাতেই ভারাক্রান্ত। যেমন অনেক কমিউনিস্টকে দেখেছি, যারা এখনও মনে করেন গ্লোবাল নেতা বা  এক নম্বর পরাশক্তি হল নাকি ব্রিটিশ রাষ্ট্র, আমেরিকা নয়।

    যাই হোক, আমার দিক থেকে সেটা ছিল গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমটা (ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাসহ) তৈরির পেছনে আমেরিকান অবদানটাকে তুলে এনে ওর জন্ম ইতিহাসের দিকটা দেখানো। কিন্তু সেটা আমেরিকান-প্রীতি দেখানো জন্য অবশ্যই নয়। ইতিহাসের ফ্যাক্টস বলার জন্য বলতেই হয়েছিল। আবার উল্টো দিকে পালাবদলে চীনের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা-সহ বড় অযোগ্যতাগুলো কী – এর তালিকা আমিই সবার আগে ও বিস্তারে লিখেছি। কারণ মূল বিষয়টা আমেরিকা বা চীন এর কোনটাই একেবারেই না। ব্যাপারটা হল – আমাদের সময়কালকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারছি কি না! এটাই মূল বিষয়। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ এখানে আবার কথা তুলেছি কেন?

    ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এর সাক্ষাৎকারঃ
    বাইডেনের আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে পালানো দেখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস [Ben Wallace ]  দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের পরে এই প্রথম  সবদায় আমেরিকা ঘাড়ে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন।  অথচ ওয়ার অন টেররের শয়তানির প্রথম যুগে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে এক নিশ্বাসে যার নাম উচ্চারণ হত তিনি হলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার! মিঃ ওয়ালেস কী এখন এই মিথ্যাবাদী [সাদ্দামের ইরাকের কাছে weapon of mass destruction (WMD) আছে এই মিথ্যা কথা ] প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর দায় নিতে চাচ্ছেন না।  ঐ  সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ওয়ালেস  বলেছেন, তিনি “আমেরিকাকে আর কোনো পরাশক্তি মনে করেন না” [It is certainly not a global force, it’s just a big power,]। কেন? আসলে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিল ব্রিটিশ ‘স্পেকটেটর’ নামে ম্যাগাজিন। সেটি নিয়ে লন্ডন ‘গার্ডিয়ান’ পরে এক রিপোর্ট করেছে। মূল সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গ্লোবাল রঙ্গমঞ্চে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানটা ব্রিটিশ শক্তিরও সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে কি”? [whether the exit from Afghanistan demonstrated the limits of British power on the world stage] মন্ত্রী এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমে স্বীকার করে নেন যে, ‘ব্রিটেন স্পষ্টতই একটি পরাশক্তি নয়”। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মনোযোগ দিয়ে চেপে ধরেন। ওয়ালেস বলেন, ‘যে দেশ বা শক্তি যেকোনো একটা কিছু করব বলার পরে আর সেটি করবেই বলে আঁকড়ে থাকার মুরোদ রাখে না সে আসলে পরাশক্তিই নয়।’
    কিন্তু এত কঠিন করে আমেরিকাকে নিচু দেখানো কথা মন্ত্রী বললেন কেন?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪২ সাল থেকে ওই যুদ্ধসহ গ্লোবাল নেতৃত্বই আমেরিকার হাতে চলে গিয়েছিল। আমেরিকা-পরাশক্তি হওয়ার দিকে যাত্রা তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগের টানা ৩০০ বছর সারা দুনিয়া ছিল ইউরোপের কলোনি; ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্রের অধীনে কলোনি দখলে চলে যাওয়া দেশ। আর এই পাঁচের মধ্যে ব্রিটিশ-ফরাসি ছিল সেরা – যে দুয়ের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা সবার সেরা। আর বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপকে স্বেচ্ছায় কলোনি শাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

    তবু বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাশক্তি  আমেরিকার আড়ালে থেকে তারই ছোট পার্টনার হিসেবে অন্তত ব্রিটিশ-ফরাসি ভাব ধরে চলেছে। কিংবা ন্যাটো-জোটের সদস্য হিসেবে থাকার কারণে তারাও পরাশক্তি ভান করার সুযোগ পেয়ে এসেছে। করে গেছে। অথচ এসব কমন বাহিনী (যেমন- ন্যাটো) অথবা জার্মানি, জাপানে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যারাক গড়ে সেখানে আমেরিকান সেনাবাহিনী পেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এসবের খরচের বেশির ভাগ এখনো একা আমেরিকা বহন করে আসছে। খুব সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পরে এখন আমেরিকা এসব খরচ বইতে অপারগতা দেখাবে, ফলে ইউরোপের যে ক্ষমতার জৌলুস সেসব কিছুতে এখন টান পড়বে।

    ইইউর ফরেন পলিসি চিফঃ
    তাই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি ও নিরাপত্তা পলিসি ইস্যুতে প্রধান প্রতিনিধি জোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বাইডেনের দুর্বল পরিকল্পনায় আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর সারা মহাদেশজুড়ে এ নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এটা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বিরাট পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে খেলা বদলে দেয়ার মতো এক ঘটনা। “ইইউ’র এখন ‘আপন স্বার্থ বুঝে নিতে সক্ষম হতে নিজেই এগিয়ে আসা ও সক্ষম হওয়া উচিত, বিশেষত যখন আমেরিকা আর সংশ্লিষ্ট থাকতেই চাচ্ছে না” [The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.]”।

    But after Biden’s ill-planned exit from Afghanistan, criticism exploded across the continent. “It’s a failure of the Western world and it’s a game-changer for international relations,” said Josep Borrell, the European Union’s top diplomat. “The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.”

    আর ওদিকে বাইডেন সম্ভবত ভাবছেন, ‘গত ৭৫ বছর ধরে তোমরা কেউ খরচের দেও নাই। কাজেই যেখানে আমেরিকার একার পক্ষেই আর খরচ বইবার ক্ষমতা নেই সেখানে তোমাদের সাথে কথা বলে আমার কী লাভ?’
    কথাগুলো সত্য বটে! কিন্তু ট্রাম্প যখন আগে একইভাবে ও ভঙ্গিতে ইইউ এবং ন্যাটো পর্যায়ে কথা বলেছিলেন; আর ট্রাম্পের আমল থেকেই ইতালি-জার্মানি ও পরে ফরাসিদের উদ্যোগে সারা ইইউ-ই চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছিল। আর তাতে ইইউ-চীনের কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট [EU – China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষর শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাইডেন শপথ নেয়ার পরই ইইউ’র সাথে ট্রাম্প সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন – একথা বলে অভিযোগ তুলে এরপর দাবি করেছিলেন, তিনি ২০০১ সালের আগের আমেরিকা-ইইউ পারস্পরিক সম্পর্কের সবকিছুই তিনি আবার গড়বেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন? আর ইইউ এই প্রতিশ্রুতিতে এতই আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিল যে, চীনের সাথে তাবত চুক্তি ও কথাবার্তা সবকিছু [(CAI) চুক্তিসহ] সেই মুহুর্ত থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল ; তারা এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল চীনকে! এখন সেসবের তাহলে কী হবে?

    অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, ইইউ-আমেরিকা  সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা কত নিচে নেমে গেছে। আসলে মূল ঘটনা হল  – বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একাই। ব্রিটেন বা ন্যাটোকেও সাথে নেননি, একবার জিজ্ঞাসাও করে নাই। কেবল প্রত্যাহারের শেষদিন, ৩১ আগস্টের কদিন আগে জি-৭ পর্যায়ে একটা নামকাওয়াস্তে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। যেখানে ইউরোপের কোন সদস্যের কারো কোনো অনুরোধ-পরামর্শ বাইডেন একেবারেই আমল করেননি।

    এক কথায় বললে, কার্যত দু’দিন আগেই আমেরিকা সব ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার পর সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ নেমে আসে এবং সর্বগ্রাসী এক ‘লস্ট’ [LOST] মানে সব হারানো অনুভব তাদের সবাইকে একেবারে ‘খেয়ে ফেলেছিল’। ফলে এসব চরম হতাশামূলক বক্তব্য-মন্তব্য সেসবেরই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস কত চেষ্টা করেছিলেন,এসময়ে তার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সফরকে বিরাট হাইলাইট করবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পরাজয়সম প্রত্যাহার সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল, আর তাতে গ্লোবাল মিডিয়া থেকেই এই সফর আউট হয়ে গেছে। গ্লোবালি বাহাদুরি করে বেড়ানো আমেরিকা এমন হতাশায় হারিয়ে যেতে পারে এটা এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

    সবার নিচে খারাপ অবস্থায় ইন্ডিয়াঃ
    “অবশেষে সব দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানার অবসান। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ঘোমটা সরিয়ে গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবানের মুখোমুখি হলেন রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল এবং ভারতের ‘উইশ লিস্ট’ বা ইচ্ছা তালিকা তিনি পেশ করলেন। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ সরিয়ে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রচারও করল। সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হলো। ‘আগামী দিনে এই গতিপথের চরিত্র কী হবে, এখনই অনুমান করা কঠিন”।

    উপরের প্যারাটা – না এটা কোন অ-ভারতীয়ের লেখা নয়। বরং, বাংলাদেশী প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর পাঠানো রিপোর্ট এটা। যিনি সব সময় ভারতীয় উগ্র দেশপ্রেমের রঙে লেখা লেখা পাঠিয়ে থাকেন। অথচ এই লেখায় তিনি মোদির ভারতের দেউলিয়া হয়ে পড়া “আফগান নীতি” থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে, এরপর লিখেছেন। তার সব চেয়ে কড়া সমালোচনার বাক্য ওই “সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হল” [ভারতকে নীতি বদলাতে বাধ্য করল তালেবান]।

    সৌম্য এমন করে কেন লিখেছেন? কারণ আট বছরে পা দেয়া মোদি সরকারের পাকিস্তান-আফগানিস্তান নীতি হল – মুসলমানবিদ্বেষ; একে ততই চরমে নাও আর মুসলমান ঘৃণা ছড়াও যত বেশি সম্ভব। কারণ এতে ততই হিন্দুত্ববাদ ফলবতী হয়ে ভোটবাক্স ভরাবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ভারত-রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও সে্টা সেকেন্ডারি ও তুচ্ছ। কারণ সহজে ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই মোক্ষ!

    এখান থেকেই সাজানো মোদি-নীতি নাকি হল, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা ব্যক্তি বলে ভারত সরকার যাদেরকে ঘোষণা করেছে তাদের সাথে কোনো কথা বা যোগাযোগ করা যাবে না”।  কিন্তু এই নীতিই মোদির গলায় এখন ফাঁস হয়েছে। মোদী সরকার এতদিন এই নীতির কারণে, তালেবানের সাথে কোনো ফরমাল ডায়ালগ করতে পারছিল না। কারণ তারা আগেই তালেবানকে “সন্ত্রাসবাদী” বলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সেই ২০১৪ সালে সুষমা স্বরাজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

    কিন্তু গত আগস্টের শুরুতে বা তারও আগের দু-একবার তাই ভারত কাতারে তালেবানের সাথে কথা বলার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা কখনো স্বীকার করেনি। ফলে ডায়ালগের বড় কোনো কার্যকর ফল ভারত পায়নি। আবার গত ১৫ আগস্ট তালেবানদের কাবুল দখলের পর এয়ারপোর্ট পার হতে গিয়ে আটকেপড়া ভারতীয়রা বুঝে যায়, ভারতে‘মোদিকে ফোন করে কান্নাকাটি করেও কোনই লাভ হচ্ছে না। এর চেয়ে কাছের তালেবান কমান্ডারই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসল ভরসা।’ তা ইতোমধ্যে  আমরা কলকাতার বাঙালি তমালের ভাইরাল হওয়া বয়ানে দেখেছি। কাজেই এখানেও প্রমাণিত যে, ইসলামবিদ্বেষ বা তালেবান-ঘৃণা ভারতেরই নিজস্বার্থের বিরোধী। কাজেই চরম নিরুপায় হয়ে আর নিজের পায়ে দেয়া নিজের বেড়ি ভেঙে এবার কাতারে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল তালেবান নেতা শের মোহাম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাইয়ের সাথে বৈঠক করেছেন, প্রকাশ্যেই। তবে যে উসিলায় বৈঠক করেছেন তা ঝুটা। কারণ ঐ রিপোর্টার লিখেছেন, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে…’, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাজানো হয়ে আছে এভাবে যে  এর পাঁচ ভেটো সদস্যের যেকোনো এক সদস্য যদি ভেটো দেয় তো ওই যেকোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা না-ভেটো ভোটই সভার সবকিছু উলটে দিবার জন্য যথেষ্ট। সোজা কথা, চার ভেটো সদস্য একদিকে ভোট দিয়েও  বিপক্ষে এক না-ভোট কে উল্টাতে পারবে না। এমনকি তাতে মোট ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য কোন প্রস্তাবের পক্ষে আর এক ভেটো-সদস্য বিপক্ষে থাকলেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হবে না। এটাই তো ‘ভেটো’র অর্থ। অথচ লেখা হয়েছে ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে’, অর্থাৎ যেন পাঁচ ভেটো সদস্যের তিন সদস্য পক্ষে আর দুই সদস্য বিপক্ষে থাকলেই প্রস্তাব পাস করা যায়; যেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রস্তাব পাস হয়। আসলে এ কথাটাই ভিত্তিহীন। কাজেই দীপক মিত্তাল নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা ভারতের কোনো দাবিনামা নিয়ে তালেবান নেতার সাথে দেখা করতে যাননি। দেখা করেছেন, ভারতের নিজের এক কামনা-নামা নিয়ে।

    তবে জেনে না জেনে ওই রিপোর্টার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থ একেবারেই আলাদা। তাই আমেরিকা তালেবানের সাথে ডিল করেছে এবং চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। অথচ ভারতের সামনে কোনো দিশা নেই। আসলে ভারতই এখনো তালেবানদের সাথে সম্পর্ক করবে কি না, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

    আর ভারতের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রধান কারণ ইসলামবিদ্বেষ ও গভীর মুসলমান- ঘৃণা। কারণ এ দু’টাকে মোদি ও তার দল, হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট জোগাড়ের চাবি বলে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সহসাই এখান থেকে সরে আসতে পারবে না, তা চায় না।

    যদিও মুখে বলছে তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপে তার আপত্তি, কারণ এরা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবতা হল – তালেবান মূল লিডারের তিন ডেপুটি আছেন যার একজন হাক্কানি গ্রুপের প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। আর ভারত দাবি করছে যে, তাকে মানে ওই গ্রুপকেই বাদ দিতে হবে! অর্থাৎ ভারত নিজেকে তালেবানদের কাছে নিজেকে এতই ওজনদার মনে করে?
    আসলে ঘটনাটা উল্টো। ভারত তালেবানদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে কোনো গ্রুপ-কে বাদ দেয়ার কথা তালেবানদেরও ভাবতেই হবে না।

    তালেবানের নিজের সমস্যাঃ
    ‘তালেবানের নিজের সমস্যা অন্যখানে এবং সেটা হল, আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান কেউ থাকল নাকি ১০ জনের কোন কমিটি ক্ষমতায় থাকল তা একেবারে নয়। মূল কারণ, এগুলো তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে, কেমন হবে সেনিয়ে প্রশ্ন। এমন সরকার গঠিত হলে সেটা  সাময়িক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে তা তো এক-দু’বছর ক্ষমতায় থাকতেই পারে – তাতে কোনটা একা প্রেসিডেন্ট  কেউ অথবা একটা কমিটি যাই হোক। মূল সমস্যাটা হল – এরপর স্থায়ী সরকার যেটা হবে সেটা কেমন হবে ব- এটা আগে বলতে পারতে হবে!

    এ পর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে, শাসনক্ষমতা হয় মূলত দু-ধরণের, হয় রাজতন্ত্রের না হয় রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)। সাধারণত রাজতন্ত্রগুলো তাকে শাসনক্ষমতা কে দিয়েছে তা বলতে পারবে না, এমন ধরনের হয়। যেমন কোন আমিরের আমিরাত তেমনই এক শাসনক্ষমতা যা আসলে এক ‘রাজতন্ত্র’, যদিও শব্দটা ব্যবহার করেনি। তবু এটা রাজতন্ত্র বা মনার্কিই। এমনকি সমাজের কিছু এলিট যেমন ধরুন গুলশান-বারিধারার বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে ঠিক করা এক শাসনক্ষমতা বা সরকার – এরাও কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে তা বলতে পারবে না বা ফলে চায় না।

    আসলে কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে বা দিবে- এই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে থাকতে হবে। নিজেকেই নিজে দিতে পারতে হবে। এর জবাব যার কাছে নেই, দিতে চায় না; এর মানে হবে এটা রাজতন্ত্র অথবা একটা এলিট গ্রুপ এদের রাজতন্ত্র।

    তবে এই প্রশ্নটারই আরেকভাবে জবাব দেয়া যেতে পারে। তা হল, শাসন ক্ষমতায় ঐ দেশে পাবলিক বা জনগণের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে পাবলিকের সম্পর্ক কী হবে কিভাবে হবে? পাবলিক কি ভোট দিতে পারবে? ভোটের ব্যবস্থা কি আদৌ  ঐদেশে থাকবে? (কারণ, রাজার দেশে ভোট দেয়া থাকে না।) এসব প্রশ্নের জবাব থাকতেই হবে।

    নিজেকেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের দেশে রাতের ভোটের সরকার হলে আমরা এতে আপত্তি দেখাই কেন? সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে, ইচ্ছামতো গুম-খুন করা হলে আপত্তি করি কেন?

    আর আরেক বড় সমস্যা হল, নিজেকে  রিপাবলিক রাষ্ট্র ও সরকার বলে নিজেকে ঘোষণা না করলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব। তাতে ‘ইসলামী রিপাবলিক’ ঘোষণা দিলেও ওসুবিধা হবার কথা না।  ইরান বহাল তবিয়তে এক ইসলামি রিপাবলিক যে জাতিসঙ্ঘের সদস্যও।  এটা না হলে, ক্রমশ উঠে যাওয়া অজস্র প্রশ্নের ঠেলায় বিভেদ শুরু হবে। যারা আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে তালেবানদেরকে চীন-রাশিয়াসহ  যারা স্ট্রং সমর্থন জানিয়ে আসছে, তারাও দুর্বল হয়ে যাবে একপর্যায়ে।

    আসলে ব্যাপারটা হল,  আ্মরা যেমন ইচ্ছা তেমন শাসনক্ষমতার রাষ্ট্র ও সরকার গড়তে পারি না। এর আরেক মূল কারণ, একালের গ্লোবাল বাণিজ্য। আপনার দেশকে গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়া সদস্য হতে হবে। না হয়ে দেশ চালানো একালে খুবই কঠিন। অনেকটা অবরোধে পড়ে থাকা ইরানের তেল আছে; কিন্তু তা অন্যদেশে বেচে আরেক অন্য দেশ থেকে অন্য পণ্য কিনতে পারবে না – এ ধরনের সমস্যা হবে; যেটা মারাত্মক। এটা অনেকটা গ্রামে আপনাকে একঘরে করে ফেলে রেখে দেয়ার মতো হবে। আপনার দেশের মাটির নিচে বহু কিন্তু হবু  মুল্যবান সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আপনি তা কাউকে বেচতে পারেন না, তখন আর সেটা সম্পদ নয়। ওটা আর মুল্যবান নয়।

    তবে এরপরেও যদি এতে আপনার কোনো সমস্যা না হয়, সহ্য হয়, তবে ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে কিছুই কিনতে বেচতে পারবেন না যার সোজা মানে, গ্লোবাল পণ্যবিনিময় মানে মুদ্রাব্যবস্থায় আপনি সদস্য না হয়েই থাকতে চাওয়ার পথ বেছে নিলেন। একবার করে দেখতে পারেন, জীবন যাপনের কষ্টটা জানা থাকা খারাপ না, খারাপ কেন হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৪ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান নিয়ে সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    গৌতম দাস

    ২৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬

    AFTER   AFGANISTAN,THE  PAX  AMERICA  IS  OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    PAX AMERICA IS OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    সব ভেঙে গেছে, ভেঙে পড়ছে। খসে খসে পড়ছে, এক এক করে! আমেরিকান ক্ষমতার সাজানো বাগান। আর লুকানো যাচ্ছে না। শুধু আমার কথা নয় এটা। দেখা যাচ্ছে যারা এতদিন শুধু আমেরিকান সমর্থক না আমেরিকা তাদের জীবন, ভরণপোষণ, পেশা ইত্যাদিতে ডেইলি-লাইফের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এমন ব্যক্তিরাও এখন আমেরিকার সাথে নিজের দুরত্ব তৈরি করছে। এরাও আমেরিকার কোন দায় আর নিতে চাইছে না। দুনিয়া এখন এমন নতুন চেহারায় পৌছেছে।
    কোনো  পরাশক্তি এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেখা যায়নি। এটা ওর জন্য বিশাল সঙ্কটের একটা যুগে প্রবেশ। এর গভীর সংকটের বড় লক্ষণ ও প্রধান  প্রমাণ হল যখন, এই দেশের অভ্যন্তরীণ সব বিরোধ-মতান্তর খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়। আমেরিকান সমাজে অসংখ্য বিভক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আরেক বড় লক্ষণ হাজির হয়েছে, সবার গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়া। তাই এখন আফগান-রিলেটেড প্রায় সবাই হতাশায় হাত-পা ছুড়ছে। কে যে কাকে গালাগাল করছে তার কোনো তাল-ঠিকানা নেই। অনেক সময় রাগে ক্ষোভে বা গভীর হতাশায় অথবা নিজেদের আর ভবিষ্যৎ নেই দেখে ফেললে – বড় মানুষও শিশুদের মতো আচরণ শুরু করে; নিজের বাবা-মাকেই গালাগালি শুরু করে; এটা তেমন অবস্থা যেন! কিন্তু  কোন ঘটনাটা এমন এত বড় প্রভাব ফেলতে পারল? আফগানিস্তানে তালেবান ২.০ এর উত্থান ঘটেছে! এরই প্রতিক্রিয়া এগুলো!

    প্রতীকীভাবে কিছু ব্যক্তিত্বের প্রতিক্রিয়া এখানে জড়ো করব।  রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশ (২০০১-০৯) থেকে শুরু করি। তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে মিথ্যা অভিযোগে হানাদার দখলদারি ঘটানোর প্রধান নায়ক। এবার তিনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে বকাবকি শুরু করছিলেন গত মাস (জুলাই) থেকেই যে বকাবকিটা ১৫ আগস্টের ( আমেরিকান কাবুলের পতনের দিন ) পরে আবার শুরু করেছেন। বুশের অবস্থান হল, তিনি আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের একেবারেই বিপক্ষে। তিনি আফগানিস্তান ছাড়তে চান না। বেচারা! কেন? কী যুক্তি তার? তিনি গত মাসে ১৪ জুলাইয়ে জার্মান ডয়েচে ভেলে’কে বলেছেন, সেনা প্রত্যাহার এক ‘ভুল কাজ’ [George W. Bush: Afghanistan troop withdrawal ‘a mistake‘]। তিনি আরো বলেন, ‘আফগান নারী ও মেয়েদের বর্ণনাতীত কষ্টের কথা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন” [I’m afraid Afghan women and girls are going to suffer unspeakable harm,” Bush said.(২০ জুলাই)]।’ আচ্ছা, তার মানে কি তিনি আফগান নারীদের দুর্দশামুক্তির নায়ক হতেই আফগানিস্তান দখল করেছিলেন? তাই কী?   না, তা কেউ বলছে না, তিনিও তা দাবি করছেন না। তা হলে, এমন ভুয়া উদ্বিগ্ন কেন তিনি?

    পিছনের বিশাল কারণটা হল, আফগানিস্তানে ও ইরাকে জাতিসঙ্ঘের চোখেই আমেরিকা হানাদার ও দখলদার বাহিনী, আর এই কাজের প্রধান নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ও কর্তা তিনি নিজেই। বুশের এই একচুয়াল লিগ্যাল স্ট্যাটাস লজ্জাজনক, এটা তিনি জানেন। একবার জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান তা পাবলিকলি উচ্চারণ করেছিলেন। তাই বুশ জানেন, বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে আমেরিকান সমাজে এখন প্রশ্ন উঠবে যে আমেরিকার তাহলে লাভ হলো কী? ২০ বছরে মার খেয়ে? দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে? এবং সবাই প্রেসিডেন্ট বুশের বিরুদ্ধে আঙুল তুলবে? তাই অন্য কারো তাকে বিব্রত করে ফেলার আগেই তার ভান হল, নারীর জন্য ‘প্রাণ কান্দা’। এজন্যই তার মুখরক্ষার বয়ান-দর্শন এখন একটাই, ‘নারীর-দুর্দশামুক্তি’। ভাবখানা এমন যেন নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারেন নাই। তা রক্ষা করতে বুশ বা আমেরিকা আফগানিস্তান দখলে এসে ২০ বছর কাটিয়ে গেল! কী তামশা!

    আমেরিকার এক পপুলার মিডিয়া হল ‘এনপিআর’ [NPR, National Public Radio] রেডিও। এরই ওয়েবসাইট লিখছে, আমেরিকা নাকি ‘আফগানিস্তানে গণতন্ত্র এনে দিতে গিয়েছিল []। তবে এটা করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত খোদ আমেরিকাতেই গণতন্ত্রের অভাব ঘটিয়ে ফেলেছিল, [The U.S. involvement in Afghanistan is a story of democracy and its shortcomings. ]।’ এদেখি বিরাট এক আঁতলামো! ইদানীং আমেরিকান মিডিয়ার এমন লেখা দেখে মনে হয় তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে, তাই কথার আর সেই ওজন থাকছে না। কখন কী বলে ঠিক থাকছে না।

    এ ছাড়া এ কথাটাও সত্য নয়। যেমন, বুশ দুই টার্মে ক্ষমতায় ছিলেন। প্রথম টার্মে যদি ধরে নেই পাবলিক জোশে তিনি আফগানদের কড়া শাস্তি দেয়ার জন্য বোমা ফেলতে গিয়েছিলেন, মানে নাইন-ইলেভেনে টুইনটাওয়ারে হামলার শাস্তি দিচ্ছিলেন। কিন্তু এরপরে কী? প্রশ্ন উঠবে, তাহলে এর পরও যুদ্ধ চালু রাখতে ভোটাররা তাকে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত করলেন কেন? এর দায় তো তখন অবশ্যই (লোভী) ভোটারদেরও নয় কি?  আসলে এসব ভোটারেরা কখনই দায়িত্ব নিতে চায়নি, বুশ বা তাদের প্রেসিডেন্ট কী করে বিদেশ থেকে দেশে টাকা আনছেন? আর বুশের পদক্ষেপ তাদের পক্ষে যাচ্ছে বলে তারা মেপেছিলেন ও আর উৎসাহ দিতে বুশকে আবার নির্বাচিত করে দিয়েছিলেন তাদের ওসব বৈষয়িক লাভ দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তাদের বিচারে আমেরিকান সমাজে “কাজ-কাম” আর ‘মানি সার্কুলেশন’ বাড়া দেখেই তো তারা সিদ্ধান্তে গিয়েছিলেন… “কাজেই বুশকেই আবার জিতিয়ে দাও”। তাতে আফগানিস্তানে কী হচ্ছে তাতে ভোটারদের কী – এভাবেই  তারা জিতিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধে আমেরিকান জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিকে জড়ানোর কারণে এই মানি সার্কুলেশন বৃদ্ধি পেয়েছিল- যেটা ছিল এক জবরদস্তি বৃদ্ধি। আর যুদ্ধ তো ঠিক কোনো ব্যবসা বা বাণিজ্য নয়। তাই যুদ্ধ শেষে কিছু রিটার্ন এলে আসতেও পারে, এই রিটার্ণের উপর ভরসা করে কেউ যুদ্ধে যেতে পারে না।
    যুদ্ধ দেশকে বিশেষ কোনো সুবিধা (অ-মানিটারি সুবিধা) কখনো কখনো এনে দিতে পারে। যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সবার উপরে সাবধান থাকতে হয়, কারণ, কোনো যুদ্ধের খরচ যেন দেশের বইবার সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি দাবি না করে বসে। সে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ করেও টিকে গিয়েছিল। আমেরিকা ইউরোপ (এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ) ও  এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন
    আমেরিকার উপর একই গ্লোবাল কর্তৃত্ব সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান-ইরাকের যুদ্ধের ব্যয় ছিল লাগামছাড়া আর বিপুল খরচের তুলনায় রিটার্ন এমন বড় কিছু নয়। ততদিনে যুদ্ধের সাত বছর পেরোতেই বেহিসাবি খরচের ভারে শুধু ‘আমেরিকান ইকোনমি’ নয় এর নেতৃত্বে ও সাথে থাকা ইউরোপসহ সারা গ্লোবাল ইকোনমিও মহামন্দার (২০০৮) কবলে পড়ে যায়। এভাবে এঘটনাই আমেরিকান কর্পোরেট হাউজ, ব্যবসাদার ও ভোটার সবপক্ষেরই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিয়েছিল। কারণ, গ্লোবাল মন্দার মধ্যে আর আফগান-ইরাক যুদ্ধও তো এক সাথে দুনিয়াতে কখনো চলতে পারেনি।

    এরপরের ওবামা দু-টার্ম বা পরে ট্রাম্প- দু’জনেই তাদের কালের যুদ্ধের উল্টা এরা – যুদ্ধের খরচ কমানোর নায়ক সাজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখকর খুব কিছু হয়নি। তবে দায়ীত্ব ও  বিবেচনাহীনভাবে যুদ্ধের দায় ফেলে পালিয়ে যাবেন – এই সস্তা শর্টকাট বেকুবির পথ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি তালেবানদের সাথে আমেরিকানদের চুক্তিও সম্পন্ন করেছিলেন একা ট্রাম্প নিজেই। ফলে তালেবান-চুক্তি করার মূল দায়ভার এককভাবে ট্রাম্পের। কিন্তু বাইডেন তা বাস্তবায়নে গেছেন বলে সব দায় এখন তিনি বাইডেনের ওপর চাপাচ্ছেন। এটাই বড় তামাশার।

    আবার বাইডেন আসলে  তালেবানদের ক্ষমতায় এনে নিজের সেনা-প্রত্যাহার নিশ্চিত করবেন এমন বাস্তবায়ক প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছেন।  যদিও এই দায় নেয়া যে খুবই রিস্কি তা তাঁরও অজানা ছিল না। কিন্তু তবু তিনি রাজি হয়েছিলেন; কারণ সেনা প্রত্যাহার তার সরকারের পরিচালনা খরচ কমাবে, এই ছিল লোভ। কারণ, আফগানিস্তানে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩০ কোটি ডলারের বেশি – । এখনকার আমেরিকা মানে অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব, সেই প্রাচুর্যের আমেরিকা আজ আর নেই। কিন্তু তার অর্থ দরকার। কারণ, এদিকে অর্থের সংস্থান ও সোর্সের খবর না রেখে বাইডেন  সারা ইউরোপ আর জাপানের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন [বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)] যে, চীনের পাল্টা ব্যাপক বিনিয়োগ সক্ষমতা, পাল্টা বেল্ট-রোড খাড়া করার সক্ষমতা হাজির করবেনই। এখন আফগান ফ্রন্ট থেকে সেনা প্রত্যাহার যদি বাইডেনকে কিছু খরচ সেভ করাতে সে অর্থই বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস হয়ে দেখায় – যদিও শেষে এসবই  সুখের গল্প হয়েই থেকে যাবে! সে সম্ভাবনাই প্রবল!

    কিন্তু এর আগেই (বাইডেনের উপর দিয়ে) ট্রাম্প দান মারার চেষ্টা করেছেন। তিনিও আগামী নির্বাচনের হিসাব মোতাবেক এখন উল্টা বাইডেনের ওপর নিজেরই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সব দায় চাপিয়ে নিজে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। তাই বলা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্টরা মাত্রই আসলে দায়দায়িত্ব নিতে না চাওয়া অপরচুনিস্ট, সুবিধাবাদী। তাই শেষে সব ভার বাইডেনের উপর। যেমন,  বাইডেন ইতোমধ্যেই তালেবান ক্ষমতা দখল নিয়ে নেয়ায় নৈতিক দিক থেকে ঘায়েল হয়ে গেছেন; আমেরিকানদের মানসিক-নৈতিক দিক দুর্বল করে ফেলেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের একগুঁয়ে নীতিটাই বাইডেন চুপেচাপে অনুসরণ করে যেতে চেয়েছিলেন। চীনা পণ্যের আমেরিকায় আমদানিতে বাধা দিতে ট্রাম্প ওসব পণ্যের উপর বাড়তি ২৫ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করেছিলেন। সেটা সযত্নে চালু রেখেছেন বাইডেন। আর সেটাই এখন বাইডেনের উপরই শাস্তি হিসেবে আসা শুরু করেছে। ঐ ট্যাক্স আরোপ বাইডেন আগে বদল করতে যাননি, ‘কম দেশপ্রেমী’ হতে চাননি বলে হয়ত। কিন্তু সেটাই বাইডেনকে আমেরিকার আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ দিতে উদ্যত হচ্ছে বলে খবর চাউর হয়েছে। একই কায়দায় এটাও ট্রাম্পের আরেক ফায়দা।

    তালেবান-ক্ষমতারকালে বাইডেনের ভারতঃ
    ওদিকে বাইডেনের তালেবান উত্থান পলিসি ভারতের জন্য একেবারেই অসহ্য হয়ে উঠেছে। ভারত আর নিতে পারছে না কিন্তু পালানোর পথ নাই। আর সবচেয়ে অসহ্য হয়েছে  মূলত, পাকিস্তানের কাছে ভারতের নৈতিক পরাজয়। পাকিস্তানকে আর ‘জঙ্গি দেশ’ প্রচার করে ভারতের সুবিধা হচ্ছে না, জমছে না। (যদিও ভারত তাতে ক্ষান্ত দেয় নাই।) গত ২০ বছর ধরে প্রপাগান্ডায়  – যেন পাকিস্তানই আফগানিস্তানের মা-বাপ; সব ইসলামী রাজনীতিক বা সশস্ত্র ধারার উৎস। এই ছিল ভারতের মুখ্য প্রপাগান্ডা বয়ান।  গত ২০ বছর আমেরিকার ওয়ার-অন-টেরর যেন আফগানিস্তানের তালেবানসহ অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপের  বিরুদ্ধে ছিল না, যেন আমেরিকার যুদ্ধ চলছিল (জঙ্গি) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আমেরিকা যেন  পাকিস্তানি ইসলামী জঙ্গি থেকে ভারতকে মুক্ত করতে লড়ছিল। বিশেষ করে এত দিনের আফগানিস্তান যেন ছিল এক নারীমুক্তির ঘাঁটি  – এমন এক বিরাট কারখানা। আর এখন যা হয়েছে তা যেন, তালেবানদের আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল নয় –  বরং “পাকিস্তানের কারণেই” এই নারীমুক্তির কারখানা -টা এখন যেন বন্ধ হয়ে যাবে। আফগান নারীরা বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে  আমেরিকান স্কলারশিপে পড়তে গিয়েছে।  ফ্যাক্টস হল, কাবুলে আমেরিকান পুতুল গণি সরকার পালানোর কারণে এখন  এসব নারীদের পড়াশুনা  অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। কিছু না হলেও তা একটা সাময়িক ধাক্কা খাবে।  কিন্তু  আমেরিকান প্রশাসন সতর্ক ব্যবস্থা নিলে কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। মূল কারণ, পড়াশুনার কেন্দ্রটা  আফগানের বাইরে আর, সেসব দেশেই স্কলারশীপের অর্থ পাঠাতে কোন সমস্যা নাই। তবে উদ্বিগ্নতা থাকবে আর নতুন করে ছাত্রীরা এই সুযোগ পাবে না, এটা অনিশ্চিত। কিন্তু ভারত ইতোমধ্যেই প্রচার চালিয়েছে যে  তা তালেবানদের দ্বারা নয়, পাকিস্তানের কারণে যেন বন্ধ হয়ে যাবে। এই ক্যাম্পেইন এতদিন কানে কানে বলার মতো করে চালিয়েছিল ভারত। বিশেষ করে ইউরোপের স্কানডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা বেশি  করে ঢাকায় আমাদের কানে পর্যন্ত পৌছিয়েছে।

    ভারত এই ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার কাজ হাতে নিয়েছিল আরেক কারণে। রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাকে সাথে নিয়ে তালেবানের ওপর শক্ত গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমের মধ্যে তাদেরকে আসতে বাধ্য করার জন্য ত্রয়কা গঠন [দেখুন ট্রয়কা নিয়ে  আমার আগের লেখায়] করেছিল যাতে এই তিন দেশের বিরল কমন ও শক্ত অবস্থান তালেবানদের দেখানো এবং মানতে চাপ দেয়া যে তাদের কমন অবস্থান ও বক্তব্য আবার নিরাপত্তা পরিষদেরই প্রস্তাব। এর বাইরের কারো বা কোনো প্রস্তাব নয়। আর এ কাজ বাস্তবায়ন করতেই তারা পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল, যার নয়া নাম দিয়েছিল ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতেই ভারতের সব পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডা পানি হয়ে গিয়েছিল। এসবেরই প্রতিশোধ হিসেবে ভারত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আফগান নারীদের মধ্যে প্রপাগান্ডা চালিয়েছে যে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ পাকিস্তান। পাকিস্তানই তালেবানদের পরিচালক। অতএব আফগান নারীরা যেন পাকিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসঙ্ঘে “পিটিশন” লিখে আবেদন জানায়। অথচ বাস্তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুনিয়ার কোনো সরকারের এমন কোনো অভিযোগই নাই। জাতিসঙ্ঘসহ কোনো ফোরামেই এমন কিছু নাই। কিন্তু ভারত ইউরোপের ক্যাম্পাসগুলোতে আফগান নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন পিটিশন স্বাক্ষর ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছেই।

    গতকালের আনন্দবাজার পত্রিকা এক মজার খবর দিয়েছে, ভারতীয় অ্যাম্বাসির সর্বশেষ দেড় শ’ জনের যে দলটা কাবুল থেকে ফেরত এসেছেন তারা ফিরে এসেছেন তালেবানের দেয়া সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহায়তায়। ঘটনা হল, তারা দেশে নিরাপদে ফিরতে চান বলে স্থানীয় তালেবান কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করলে কমান্ডার ভারতীয় অ্যাম্বাসির ২২টি গাড়ির কনভয়-বহর পাহারা দিয়ে এয়ারপোর্টে নিরাপদে পৌঁছে দেন। আনন্দবাজার লিজেই লিখছে, “সকলকে তাজ্জব করে ভারতীয় দূতাবাসের ১৫০ কর্মীকে বিমানবন্দরের পৌঁছে দিল ওই তালিবান বাহিনীই”। যার মানে ভারতের নিজের ছড়ানো তালেবানদের নেগেটিভ ইমেজ তারা নিজেরাই পরিস্কার করে তবেই ভারতে ফিরে আসতে পেরেছে।

    ‘কাউন্টার হিরো’ ব্রহ্ম চেলানিঃ
     ব্রহ্ম চেলানি (Brahma Chellaney) একজন ভারতীয়; তিনি অনেক বাংলাদেশীর মতই আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো। তিনি দিল্লিতে বসে আমেরিকান ফান্ডে এক এনজিও / থিংকট্যাংক চালান, নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ  [Centre for Policy Research ]। তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate]  কলাম লেখেন আর সে লেখা বাংলাদেশের ‘প্রো-আমেরিকান’ পত্রিকাগুলো অনুবাদ করে ছাপে। কিন্তু তিনি বাইডেনের তালেবানদের সাথে রফা-ডিল করা  নিয়ে ক্ষিপ্ত এবং পরে  তালেবানরা নিজ মুরোদে আফগানিস্তানে  ক্ষমতা দখল করলে, এরপর তিনি একেবারে ক্ষেপে আগুন হয়ে যান। এতে তিনি এমনই হতাশ আর ক্ষুব্ধ হয়ে গেছেন, যাকে বলে ‘রাগে অন্ধ’। এর আগে তিনি কখনও  আমেরিকার উপরে এমন পরিপুর্ণ হতাশ হয়ে পড়েন নাই, অন্তত আমরা দেখিনি। যেমন তার একেবারে ভেঙ্গে পড়া বুঝা যাবে যদি দেখি  তার এবারের লেখার শিরোনাম – ‘কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বনেতৃত্বের অবসান হলো’ [Pax Americana Died in Kabul]। এটাই এর প্রমাণ। এই লেখার শুরুতে তার কথা মনে করেই লিখছিলাম।

     

  • বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3GN

     

    Xinjiang – China’s Uighur Problem

     

    এতদিন কথিত যে জঙ্গীপনা আমেরিকার চক্ষুশুল ছিল এখন প্রেসিডেন্ট  বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী নিজেই সেই “জঙ্গীনেতা” হতে চলেছেন? এই প্রশ্নটা ক্রমে ধেয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প বা ইকোনমিক তৎপরতার প্রতি আমেরিকা-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোখ দিয়ে তাকানো – এই দেখা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু  কোন ঈর্ষা বা অন্তর্ঘাতমূলক চোখ?  না, এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। শুধু তাই নয় এটা আত্মঘাতীও। মানে বোকা বোকা চোখমুখের কিছু স্টুপিড চিন্তা ছাড়া আর কীইবা বলা যায়! তবে প্রতিহিংসাপরায়ন মানসিক অসুস্থ মানুষ তো আত্মঘাতিই! অপরের যাত্রাভঙ্গ করে যেখানে যারা সুখ, অন্যকে কষ্ট দেওয়ার ভিতরের মিথ্যা-সুখ পেতে চায় আর হয়রান হয়!
    বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প থাকলেই এর উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে অন্তর্ঘাতমূলক [sabotage] হামলা করা বা এমন হামলাকে সমর্থন করা [Chinese Projects in Pakistan Prove Tempting Targets for Terrorist Groups………]  – এসবই আমেরিকা ও ভারতের চীন মোকাবিলার কৌশল ও ততপরতা হয়ে উঠছে।  অথচ এটা যেকোন বিচারেই অগ্রহণযোগ্য। এমনকি তা এদুই দেশের স্টান্ডার্ডেও অগ্রহণযোগ্য।  বলাই বাহুল্য এসব আসলে দেউলিয়াত্বের লক্ষণ, নিজ দেশ-রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সক্ষমতা যখন নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে বলে শাসকেরা অনুভব করে তখন এমন বেদিশ হবার লক্ষণ এগুলো!  সম্ভবত এটাই এর সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা!

    বুদ্ধিমানরা পড়শির উন্নতি দেখে ঈর্ষার পথে যাওয়ার আত্মঘাতী ভুলের দিকটা আগেই দেখে ফেলতে পারেন। তাই তারা এপথ পছন্দ করবেন না। এর চেয়ে পড়শির ঐ ‘উন্নতির’ সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খুঁজে পেলে তা থেকে নিজের জন্য কোনো রাস্তা বের করতে পারেন কি না সেই চোখে তারা ঘটনাকে দেখে থাকেন। নয়তো পড়শির তৎপরতা দেখে সেখান থেকে আগ্রহ পেয়ে নিজেই পাশে তেমনই কিছু খাড়া করেন। এসবই হল গুরুত্বপুর্ণ পজিটিভ চোখ খুলে ঘটনার দিকে তাকানো ও বুঝার পথ।
    তবে আরেক বিকল্পও আছে, স্বভাবতই তা নেতি ও ঈর্ষার পথ। পড়শির উন্নতির বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে প্রপাগান্ডা শুরু করা আর তাতে এক রংচঙ্গা দুনিয়া বানানো আর সেটা দেখিয়ে প্রতারণা ইত্যাদি। কিন্তু এই প্রপাগান্ডা করে বেনিফিট মানে এর লক্ষ্য কী?

    সবচেয়ে বড় কথা, খোদ নিজের বেনিফিট কী? ঈর্ষায় ডুবে থাকা মনে এর খবর থাকে না। বরং বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আমেরিকাই এমন প্রপাগান্ডা ভারতকে গিলিয়েছে। একপর্যায়ে দেখা যায়, ভারত তা মিথ্যা জেনেও বিশ্বাস করেছে। অথচ উদ্দেশ্য কী, বেনিফিট কী তবু সে খবর ভারত নেয়নি; যদিও এসব ক্ষেত্রে আমেরিকার নিজ উদ্দেশ্য নিজের কাছে স্পষ্টই থাকে যে, সে ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, চীন-ভারতের গঠনমূলক বা পরস্পর নির্ভরশীল কোন সম্পর্ক যেন না খাড়ায় যায়। কারণ এমন হতে না দেয়াটাই আমেরিকার স্পষ্ট স্বার্থ। বিশেষত এশিয়ায় দু’টি বড় অর্থনীতি চীন-ভারত যেন আমেরিকার স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজেরাই পারস্পরিক সহযোগিতার কোন আসর না বসিয়ে ফেলে।

    ভারত-আমেরিকা এমন সম্পর্ক বানানো নিয়েও হয়ত বাইরে থেকে খুব কিছু বলার নেই। কারণ সিদ্ধান্ত মানেই তো তা যার যার নিজের। এছাড়াও আর কারণ, গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের এই কালে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার দুনিয়া। যে যেখানে স্বার্থ ঠিক বা ভুলভাবে বুঝবে সে দায় শেষবিচারে তারই। আর এটা তার নিজেই চয়েজ – তাতো বটেই।  তবু ঈর্ষার আরেক চরম অবস্থার পথ ও পর্যায় আছেঃ স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। প্রতিদ্বন্দ্বীর স্থাপনা, সম্পত্তি অথবা ব্যক্তির ওপর হামলা আর ধ্বংসাত্মক কাজে নেমে যাবার ভূমিকা নেয়া।  বাইডেন বগলে ভারতকে নিয়ে সে পথের চয়েজে যাবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন!

    প্রথম কথা ও এককথায় বললে, এই পথ আত্মঘাতী। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে হতাশায় এসব কাজে জড়িয়ে  নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান ও সফল মনে হতে পারে। কিন্তু এটা ভুল। বাস্তবত এটা হল, প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই যদি সবার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ-তৎপরতায় জড়িয়ে যায় এতে সবারই ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। যেন শহরের সবাই সবার বিরুদ্ধে ছিনতাইকারী-লুটেরা হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা করছে, এমনটা কল্পনা করা যায় বড় জোর বাস্তবে  তা হতে পারে না।
    যদি সাময়িক লাভের চোখে না-ই দেখি, তবে জীবন মানেই কিন্তু এক ইতিবাচক লক্ষ্যের জীবনই বুঝায়। তবে যে আসলে নিজ জীবন-তৎপরতার কোনো ভবিষ্যৎ দেখে না, হতাশ, সেই অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা, আত্মঘাতী দিকটা দেখতে পায় না। বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের ‘জঙ্গিনেতা’র মত হতে চলেছেন?

    The Karakoram Highway, also known as the China-Pakistan Friendship Highway, is part of China’s Belt and Road Initiative. Image: AFP Forum

    পাকিস্তানের সিপিইসিঃ
    ‘সিপিইসি’ প্রকল্পে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ আর কোন সীমায় থাকতে পারছে না। চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর বা সংক্ষেপে ‘সিপিইসি’[CPEC] , এটা হল পাকিস্তানে চীনের এক সর্ববৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্প যেখানে মোট ৬২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে। এর শুরু হয়েছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান জলসীমায় গোয়াদরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে নেয়া থেকে। এরপরে বন্দরের সাথে যুক্ত ডাঙ্গা ভূখণ্ডে পাকিস্তানের চার প্রদেশকেই উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বুকচিরে যাওয়া হাইওয়ে, এটি পাকিস্তানের উত্তরের সীমান্ত শেষ হয়ে পরে চীনের জিনজিয়াং (উইঘুর) প্রদেশের কাশগড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধে হেরে যাওয়া হিটলারের জার্মানি বা ইতালিসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপকে পুনর্গঠনে (রিকনস্ট্রাকশন ও ডেভেলপমেন্ট) আমেরিকা এক বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়েছিল যা “মার্শাল প্ল্যান” নামে পরিচিত ছিল। অনেকে একালের সিপিইসি প্রকল্পকে পাকিস্তানে নেয়া চীনের ‘মার্শাল প্ল্যান’ বলেও তুলনা করে থাকে।

    তবে এ তো গেল ইতিবাচক চোখে দেখে বর্ণনা। আমেরিকা বা ভারতের স্বার্থ দেখা যারা নিজেদের কাজ মনে করবে বা এ জন্য নিয়োজিত তাদের এর চেয়ে ভিন্ন চোখে দেখাই স্বাভাবিক, অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে দেখবে সেটা তো ঠিকই আছে। কিন্তু তাই বলে ‘সিপিইসি’ শব্দ বা ধারণাটা কোথাও দেখা পাওয়া মাত্রই ঈর্ষায় জ্বলে উঠতে হবে, এটা সুস্থ লক্ষণ নয়। অথচ এটা কি অপ্রয়োজনীয় নয়? কিন্তু এরপরেও এমন ভয়াবহ কিছুর দিকে পরিস্থিতিকে কেউ কেউ জেনে না জেনে টানছে।

    ‘সিপিইসি’ যদিও চীনা ঋণ-বিনিয়োগে নেয়া পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প এবং এতে ওনারশিপ, লাভালাভ ও দায়সংশ্লিষ্টতা অনুভবে রাখার জন্য সে দেশের চার প্রাদেশিক সংসদেও আলাদা আলাদা করে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। তবু এই প্রকল্প পাকিস্তানের মতই প্রায় সমান ব্যবহারকারী এবং সুবিধাভোগী হল চীনও। অর্থাৎ চীন কেবল বিনিয়োগকারী নয়। সিপিইসি-এর হাইওয়ে চার প্রদেশের ওপর দিয়েই গিয়ে চীনে প্রবেশ করেছে। ফলে চীনেরসহ পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক ভূখণ্ড থেকেই রওনা দিয়ে নিজ উতপাদিত অথবা আমদানিকৃত কাচামাল –  এমন সকল আমদানি-রফতানির পণ্য নিয়ে গভীর বন্দরে আসা যাওয়া করা সবচেয়ে সহজ। তাই সবাই এর বেনিফিসিয়ারি।

    কথাটা আরো ভালো বুঝা যাবে যদি চীনের ভূগোল মনে রাখি। চীন আসলে সাড়ে তিন দিক থেকে পাহাড়ে ঘেরা ল্যান্ডলকড এক ভূখণ্ড যার কেবল মাত্র পুব দিকেরও আবার একাংশ খোলা। এর মধ্যে পশ্চিম দিক আবার হিমালয় পর্বতমালার মতো পাহাড়ে ঘেরা যেখানে চাইলেও উচ্চতা আর দুর্গমতার কারণে যোগাযোগের রেল বা সড়ক নির্মাণ খুবই কঠিন।

    সেই আশির দশক থেকে  চীন আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ নিয়েই আজকের জায়গায় এসেছে, কোন সন্দেহ নাই। আমেরিকাকে বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে চীনের অর্থনীতি আজকের জায়গায় আসতে রওনা দিয়েছিল বলা যায় সেই ১৯৭৮ সাল থেকে। পরের ৩০ বছরে ক্রমে লাগাতার ডাবল-ডিজিটের পথে উন্নতি করে সেই চীন আজকের যে চীন হয়েছে সে আসলে এখন আবার খোদ আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, গ্লোবাল নেতার জায়গা নিতে চায়। তাই সেই সময়কালটাকে (১৯৭৮-২০১০) আমেরিকার দিক থেকে বলা যায়, এক দিকে বিপুল বিনিয়োগের বাজার পাওয়ার সুযোগ, সুখ ও লোভ অন্য দিকে চীনের উন্নতিতে চীন আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে এই টেনশন – এমন এক মিশ্র অনুভব নিয়ে পার করতে হয়েছে।

    The Strait of Malacca

    তাই শেষের দিকে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীতা খোলাখুলি হয়ে ওঠেছিল। ওতএব  এই  “উন্নত- চীনের” দুর্বলতা খুঁজে সেটাকে চেপে ধরে রাখার উপায় বের করতে গিয়েছিল ওয়াশিংটন। পেয়েছিল এক ‘মালাক্কা প্রণালী’ [Strait of Malacca]। এটা হল সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পথের এক রূট। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আনা চীনের অনিবার্য প্রয়োজন। কিন্তু তা চীনা বন্দরে নিতে গেলে এই মালাক্কা প্রণালী পার হয়েই যেতে হবে। সেই সমুদ্রপথে মালাক্কা প্রণালী হল সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর আগে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার ভূখণ্ডের মাঝখান দিয়ে গেছে এমন আধা কিলোমিটার চওড়া চিকন এক জলপথ বা প্রণালী। সমুদ্রপথে এই প্রণালীতে কয়েকটা জাহাজ আড়াআড়ি ফেলে রেখে চীনকে এই পথে চলাচলে বাধা তৈরি করা যায় ও সম্ভব, এই হল আমেরিকান পরিকল্পনা। এমন সামরিক পরিকল্পনা যে নিস্তরঙ্গ পানিতে আমেরিকাই সবার আগে এঁটেছে, সেটা আমেরিকার বিরুদ্ধে কোন কাল্পনিক অভিযোগ একেবারেই নয়।

    আমেরিকার সরকার-প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটা ভাল (বা কারো দিক থেকে খারাপ) রাজনীতি-চর্চা ও রেওয়াজ হল যে, আমেরিকান সরকার তার নীতি-পলিসির বহুকিছুই বা পুরোটাই গোপন রেখে দিতে পারে – দিয়ে থাকে ও দেয়। কিন্তু যে ইস্যুটা আমেরিকান সিনেট-সংসদে একবার যাচাই বা নিরীক্ষার জন্য উঠে আসা বা এসে যায় সেই ইস্যু সংশ্লিষ্ট সব তথ্য পাবলিকলি ওপেন করে দেয়া হয় বা হয়ে যায়। এমনকি তা (রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা না হলে) লাইভ টেলিকাস্টে সিনেটের ঐ ডেস্ক থেকে সরাসরি দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তেও প্রচারিত হতে পারে, সম্ভব। ২০০৮ সালের এমনই এক সিনেট-শুনানিতে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, চীনকে বাধা দেয়ার জন্য আমেরিকাই প্রথম ‘মালাক্কা প্রণালী’ নিয়ে স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা করেছিল আর তাতে ভারতকে কাছে টেনে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহারের তথ্য আছে।


    এখন মালাক্কা প্রণালীর কথা এখানে আনলাম এজন্য যে, ঐ প্রণালীকেন্দ্রিক আমেরিকান যুদ্ধ কৌশলেরই পালটা চীনের জবাব এবং একটা পদক্ষেপ হল  চীনের পাকিস্তানের সাথে সিপিইসি প্রকল্প নেয়া। কারণ চীন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না যে, তাকে আমেরিকা ঘিরে ধরছে, ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। তাই চীন গোয়াদর বন্দর নির্মাণে আগ্রহী হয়েছিল। তবে চীনের ভুখন্ড থেকে সমুদ্রে প্রবেশের প্রধান ফটক পূর্ব দিকের বন্দরগুলো ফেলে ঠিক উল্টো দিকে চীনের পশ্চিমের সীমান্তকে সরাসরি গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত করতেই সিপিইসি প্রকল্প নিয়েছিল। গত ২০১৩ সালে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল আর যা ২০১৫ সালেই চীন ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পের চুক্তি সই করা হয়। চীনের এই পশ্চিম সীমান্তই দুর্গম জিনজিয়াং (উইঘুর Xinjiang Uyghur Autonomous Region) প্রদেশ, যার কাশগড় পর্যন্ত সিপিইসি যোগাযোগ প্রকল্প  বিস্তৃত।


    সিপিইসি প্রকল্পে ‘
    জঙ্গি’ হামলাঃ
    খবরটা খুব সিম্পল। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে [পুরান নাম North-West Frontier Province] একটা বাসে বিস্ফোরণ-হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জনই চীনের প্রকৌশলী, যারা একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করছিলেন। সিপিইসি প্রকল্পের বড় বড় অংশই হল নানা বিদ্যুৎ প্রকল্প। আর ‘প্রকল্প’ বলতে এটা আসলে চার প্রদেশে বিভিন্ন ইপিজেড ফ্যাসিলিটি যেমন- গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, বিভিন্ন শোধনাগার ইত্যাদির সুবিধা স্থাপনা গড়ে তোলা যাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়ে আসে আর ওই হাইওয়ে ও বন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রফতানির তৎপরতা জমে ওঠে।

    কিন্তু সাবধান! এখানে বাসে হামলা বলতে কোন শহরে টাউন সার্ভিস বাসে হামলা নয়। এটা কয়েক কিলোমিটার জুড়ে এক প্রকল্প এলাকার ভেতরেই প্রকল্পের নিজেদের বাস ব্যবস্থা- বিদেশী প্রকৌশলী টেকনিক্যাল লোক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা প্ল্যান্টের শ্রমিকদের কাজে আনা-নেয়ার বাস। এই বাসের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাগুলো ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান আর তাতে বাস নদীর তীরে খাদে ফেলে দেয়া হয়েছে।

    Rescue workers and onlookers gather around a wreck after a bus plunged into a ravine following a bomb explosion, which killed 12 people including 9 Chinese workers, in Kohistan district of Khyber Pakhtunkhwa province on July 14, 2021. (Photo by STRINGER / AFP)

    এশিয়া টাইমসে পাকিস্তানের সাকিলের রিপোর্টঃ
    এফএম সাকিল [FM Shakil] হংকং থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়া টাইমসে’ নিয়মিত লেখেন। আমেরিকান স্বার্থের পারস্পেকটিভ থেকেই তিনি সাধারণত লিখে থাকেন। যেমন – এবারেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন তিনি, “ইমরান সিপিইসি বিস্ফোরণ ইস্যুতে চীনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন” । আসলে ব্যাপারটা হল, চীন স্বভাবতই এই চীনা নাগরিক হত্যায় খুবই কড়া মনোভাব নিয়েছে। চীনা তদন্তকারী স্টাফ গ্রহণে পাকিস্তান রাজি হয়েছে এবং চীন ঘটনায় ‘কেস সলভ করে’ জড়িতদের কড়া শাস্তি দিতে চীন-পাকিস্তান একসাথে কাজ করবে জানিয়েছে [China sends expert criminal investigators to Pakistan, urges severe punishment for perpetrators……]। এফএম সাকিল আরো লিখছেন, ‘পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে প্রথম থেকেই ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ইটিআইএম) নোংরা কাজ বলে বর্ণনা করছিলেন” [Pakistani officials have since indicated it was the dirty work of the East Turkestan Islamic Movement (ETIM), ……]।’ তা এখন বিরাট ঘটনা হিসেবে হাজির হয়ে গেছে।
    অবস্থা সামলাতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কড়া কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন- সিপিইসি প্রকল্প পরিচালিত হয় সিপিইসিএ [CPEC-A] নামে এক সরকারি অথরিটি বা কর্তৃপক্ষের অধীনে। গত দুবছর ধরে [ending the military’s de facto two-year control…] এই অথরিটির চেয়ারম্যান ছিলেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া। অনুমান করা হয়, প্রকল্পের নিরাপত্তার দিকে গুরুত্ব দেয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার গত সপ্তাহে ইমরান এক স্বনামধন্য এক ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর  যিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও যার বড় প্রকল্পের ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা আছে, নিজের মালিকানাধীন ও সরকারি প্রজেক্ট ম্যানেজ অভিজ্ঞতা রাখেন – সেই খালেদ মনসুরকে “প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী” [SAPM] হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি প্রধানমন্ত্রীকে সিপিইসি প্রকল্প প্রসঙ্গে সহায়তা করবেন। আর এই নিয়োগের পরপরই জেনারেল বাজওয়া নিজেই সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিয়েছেন। তাই পাকিস্তানের রেওয়াজ অনুসারে, সংশ্লিষ্টদের অনুমান যে অচিরেই ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন। আর লেখক সাকিল প্রধানমন্ত্রী ইমরানের এই ব্যাপারটাকেই ক্ষুব্ধ চীনকে তার ঠাণ্ডা করার প্রয়াস বলে দেখেছেন। তবে ঘটনা আরো আছে।

    US President Donald Trump (L) listens to US Secretary of State Mike Pompeo during a Cabinet Meeting at the White House in Washington,DC. -(Photo by Brendan Smialowski / AFP)

    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টঃ
    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ETIM বা ইটিআইএম); কারা এরা? ভয়েজ অব আমেরিকা জানাচ্ছে, [US Removes Anti-China Militant Group From Terror List] ২০০৩ সাল থেকে ইটিআইএম চীনা উইঘুর সশস্ত্র সংগঠন যারা আমেরিকার জঙ্গি সংগঠনের তালিকায় ছিল [Washington listed ETIM as terrorist group in 2003. ]। মানে? এটা আগে ছিল এখন নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, তিনিই এক সকালে ETIM এর নাম আমেরিকার অফিশিয়াল “জঙ্গি সংগঠনের তালিকা” থেকে কেটে দেন। ৭ নভেম্বর ২০২০ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল। এর আগের দিন তিনি এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেন?

    ট্রাম্পের অনেক বদনাম, ‘ভদ্রলোকেরা’ তাকে দেখতে পারেন না। তিনি গাড়োল গাঁইয়া ধরনের মানুষ এবং সর্বোপরি তিনি জাতিবাদী; সে জন্যই নাকি? এটা শতভাগ মিছা কথা। এমনিতেই ডেমোক্র্যাটরা মোমের পালিশ করা মুখ নিয়ে ঘোরেন বা থাকেন; তাদের মনের কথা সহজে পড়া যায় না। এর বিপরীতে গোঁয়ার ট্রাম্প সবার সামনে ও চোখেই উন্মুক্ত ব্যক্তিত্ব। তাই তার বদনাম বেশি। তার বিপরীতে বাইডেন ‘ছুপা’। চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের জাতিবাদী লড়াই, চীনাপণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের লড়াই   – এক কথায় ‘ট্রেড ওয়ারের’ বা বাণিজ্যযুদ্ধের কথা সবাই জানে। অথচ বাইডেন এখন ট্রাম্পের সেই নীতিই বাইডেন এখন অনুসরণ করে চলেন।

    ট্রাম্প সেই প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধের ভেতর প্রথম এক “ইতর পদক্ষেপ” এনেছিলেন। সেটাই হল, চীনকে তিনি দেখতে পারেন না, শত্রু মনে করেন – সেই চীনের বিরুদ্ধেই ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলার ব্যবস্থা করেন তিনি। তিনি “অসতভাবে” এই খেলা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কীভাবে?

    এতে বিপর্যয় কী ঘটে গিয়েছিল?
    চীনের সাথে ট্রাম্পের আমেরিকার  স্বার্থবিরোধ আছে, স্বাভাবিক! কিন্তু চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে কী সেই (রাজনৈতিক) স্বার্থের ভিত্তিতে ট্রাম্প ঠিক করবেন যে উইঘুরের ইটিআইএম [ETIM]  এই সশস্ত্র গ্রুপটাকে জঙ্গি বলবেন কী বলবেন না, জঙ্গী তালিকায় রাখবেন কিংবা বের করবেন?  তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও সন্দেহবশত আমেরিকা তাকে টর্চার করলে এবার চীন কি তার পক্ষে কোনো মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? অর্থাৎ কারও মানবাধিকার লঙ্ঘণ হয়েছে – একথা আমেরিকা বলবে কিনা তা নির্ভর করবে সেটা আমেরিকার শত্রুর বিরুদ্ধে যাবে কীনা; যদি যায় তাহলে আমেরিকা মানবাধিকার লঙ্ঘণ বলে হৈ চৈ তুলবে? এটা কী কোন রাস্ট্রের মানবাধিকার বোধ হতে পারে? নাকি এটা মানবাধিকার বেচা-বিক্রি এটা?

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেনঃ
    উইঘুরের ETIM কে আমেরিকা ১৮ বছর ধরে নিজের জঙ্গী সংগঠন তালিকায় রেখেও ট্রাম্প চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধে ব্যবহারের জন্য এটা আর জঙ্গী নয় বলে রায় দিয়েছিলেন।  আর এই অনৈতিক সিদ্ধান্তই পরে বাইডেন পরে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসাবে নিয়ে আসেন, কারণ ট্রাম্প মাত্র পরে আড়াই মাস ক্ষমতায় ছিলেন।
    আমেরিকা ইসলামী সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি তালিকা’ বানায়। জাতিসঙ্ঘেরও এমন নিজের আলাদা একটা ‘জঙ্গি’ তালিকা আছে। তবে জন্ম থেকেই তালিকার সমস্যা হলো, টেররিজম বা জঙ্গি কাজের সংজ্ঞা কী ও কোনটা- তা আজও না পশ্চিমা কোনো দেশের কাছে, না জাতিসঙ্ঘের কাছে আছে। তবু এ নিয়ে কাজ করার মত একটা ঐকমত্য তাদের মধ্যে দেখা যেত সেকালে। যেমন  – চীন বা রাশিয়ার চোখে যারা জঙ্গি তারা পশ্চিমা অন্যান্য দেশ বা ইউএন এদের চোখেও জঙ্গি বলে তালিকায় উঠতে বড় কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। অন্যভাবে বললে, চীন বা রাশিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশের মত নয়, বরং পরিষ্কার আলাদা। তাদের স্বার্থও অনেক জায়গায় অনেক আলাদা হলেও চীন বা রাশিয়ার তালিকায় থাকা জঙ্গিদের আমেরিকা নিজ বাণিজ্য স্বার্থে নিজেদের তালিকার বাইরে রাখবেন এমন চল – এই জুয়াচুরি তখন চালু ছিল না।

    এ কারণে উইঘুর ETIM সংগঠন ২০০৩ সাল থেকেই আমেরিকার ও জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় কোনো  নড়াচড়া ছাড়াই বজায় ছিল। পম্পেও যেই নামটাই তালিকাচ্যুত করেছিলেন আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থে, অনৈতিকভাবে।
    ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে তার বাণিজ্য লড়াইয়ের উপাদান হিসেবে কার নাম জঙ্গি তালিকায় ঢুকাবেন বা বের করবেন এমন কাজ একেবারে প্রত্যক্ষভাবেই ক্ষমতার অপব্যবহার। আর এমনটা শুরু করেন প্রথমে তিনিই। তবে সেটা গত ৭ নভেম্বর মানে ট্রাম্পের ক্ষমতা ত্যাগের মাত্র আড়াই মাস আগে। তাই ট্রাম্প এর ব্যবহারকারী হতে সময় পাননি। পরে এর প্রধান অপব্যবহারকারী প্রেসিডেন্ট হন বাইডেন।

    আরেকটা টেকনিক্যাল ও রেওয়াজের সমস্যা ছিল।
    এমনিতেই ব্যাপারটাকে আগে টেকনিক্যাল প্রবলেম মনে করা হত। যেমন – ধরা যাক বেলুচ কোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক গ্রুপ। এই সংগঠনের ওপর নির্যাতন করে ধরা যাক, পাকিস্তান মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে – এমন অভিযোগ আনতে আমরা পাকিস্তানের বাইরের কোনো মানবাধিকার সংগঠনকে দেখিনি। বিশেষত পাকিস্তানের তালিকায় যদি ওরা সশস্ত্র ও নিষিদ্ধ সংগঠন হয়। ফলে এতদিনের রেওয়াজ ছিল, কোন গ্রুপ সশস্ত্র হলে আর মানবাধিকার গ্রুপ তার পক্ষে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করত না।   এড়িয়ে যেত। সোজা কথা কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের সমর্থিত কোনো সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষে কেউ মানবাধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত না। বাইডেন সেই রেওয়াজ ভেঙেছেন এবং ভেঙেছেন রাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থে, চীনের সাথে পেরে উঠতে!

    অর্থাৎ আগে ভারতের আসামের উলফাকে বাংলাদেশ যদি অস্ত্র আনতে সহায়তা দিত তাহলে আর বাংলাদেশের কোন মানবাধিকার গ্রুপ  উলফার মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে দাড়াত না।  এড়িয়ে যেত। ট্রাম্প- পম্পেও-বাইডেন এই রেওয়াজ ভেঙ্গেছে শুধু না। কার মানবাধিকার রক্ষা বলে তারা আওয়াজ তুলবে তা নির্ভর করবে সেই ইস্যুটা তুলে আমেরিকার বাণিজ্যিক লড়াইয়ে ফয়দা আছে কিনা!  যার সোজা মানে কারও মানবাধিকার আসলেই লঙ্ঘণ হয়েছে কি না তাতে কিছুই এসে যায় না!

    কেউ স্রেফ মুসলমান বলে কারণে আমেরিকা রাষ্ট্রের সন্দেহের শিকার হতে পারে।সন্দেহবশত, তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া বা কমপক্ষে রিমান্ড সহ্য করতে হওয়া কিংবা  রেনডিশন [rendition] (অন্য দেশে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে টর্চারে কথা বের করা) ইত্যাদি অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়েছে, এমন উদাহরণ হয়ত কম নয়। [দেখুন ওবামার রেনডিশন প্রগ্রাম প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ।]

    এখন ট্রাম্প ও বাইডেন তাদের চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে তারা সেই রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে ঠিক করবেন উইঘুরের ETIM জঙ্গি কি জঙ্গি নয়? তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও, সন্দেহবশত তাকে টর্চার করা হলে চীন কি তার পক্ষে মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? বাইডেন এই অনৈতিকতা চালু করেছে!

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেন!
    তাই আগে ট্রাম্প ‘রায়’ দিলেন উইঘুর ETIM-এরা আর চীনের জঙ্গি সংগঠন নয়। আর বাইডেন এসে এরপর যোগ করলেন – চীন উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে।
    অথচ বাইডেনকে মনে রাখতে হবে মানবাধিকার নিজ বাণিজ্যস্বার্থের হাতিয়ার বা টুলস নয়। এটা অপব্যবহার! হেনরি কিসিঞ্জার বাইডেনদের এই সস্তা বাণিজ্য-বুদ্ধিতে ‘মানবাধিকার’ বুঝতে বলেননি।

    শুধু তাই নয়। পম্পেও চাতুরিতে ETIM-এর নাম জঙ্গী তালিকা থেকে বাদ দিলেও তখনও জাতিসংঘের তালিকায় এটা তখনও আগের মতনই জঙ্গী সংগঠন। ফলে সেটা রক্ষার দায় তখনও আছে। একারণের চীন এই প্রসঙ্গটা তুলে তার আপত্তি জানিয়েছিল কিন্তু সেকথা শুনে নাই।

    আরো বিপজ্জনক ব্যক্তিত্ব
    তাও বাইডেন এখানে আটকে সীমাবদ্ধ থাকলেও চলত। বিদেশে চীনা প্রকল্প মানেই সেখানে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ চালাতে হবে; বা উইঘুর ETIM-কে দিয়ে সে কাজ করাতে হবে – বাইডেন এখন এমন জায়গায় চলে যাচ্ছেন! এটা কি কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ? না কোনো মানবাধিকার রক্ষা? অথবা এটা কোনো ‘জঙ্গিবাদ’? বাইডেন কি নিজেই ভারতকে বগলে নিয়ে এই নয়া ‘জঙ্গিবাদের’ নেতা হতে চলেছেন না?

    কেন ভারতের নাম?
    বাংলাদেশের চীনা প্রকল্প মানে অন্তর্ঘাত, চীনা প্রকৌশলীর অপমৃত্যু! কিংবা ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার!  “সর্ষের মধ্যে ভূত আছে কি না, দেখতে হবে” – বলে বাংলাদেশের সেতুমন্ত্রীর মন্তব্য।’ এসব কিসের আলামত? এটা কী কোনো বাণিজ্যযুদ্ধ না প্রতিযোগিতা? এর মানে বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন ‘কোন ধরনের নেতা’ হতে চলেছেন?

    ETIM-কে মানুষ খুন করতে উৎসাহ বা পথ করতে দেয়া কি একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে মানায়? নাকি এটা দেউলিয়াত্বের লক্ষণ!

    [ উইঘুরে চীনের দায়দায়ীত্বও কম নয়। সেটা সে পালন করেছে তা বলা যাবে না। নুন্যতম প্লুরাজিম বা একাধিক মত অবস্থানের পাশাপাশি থাকার কোন সুযোগ চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এখনও নাই। এটা সবসমস্যার গোড়ার সমস্যা এটা। এমনকি এটাই যেকোন সমাধান না পাবার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। তবে সে প্রসঙ্গ নিয়ে আলা্দা করে লিখতে হবে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৫ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী হলেন?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    গৌতম দাস

    ০৯ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

     

    India Not Invited to Extended Troika Meeting on Afghanistan

     

    তালেবানবিরোধী  প্রচারণা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে।  ফলে তাদের সতর্ক ও বুদ্ধিমান হয়ে পা-ফেলা দরকার। এদিকে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি কখনো কখনো বেশি শক্তি দেখাতে চায়। আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council], এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো-রা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চেয়েও বুদ্ধিমান দেখাতে চাচ্ছেন নিজেদের। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে হিমশিম খেয়ে, কী বলবেন এখন, কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা হাতড়ে অসহায় অবস্থায় মুখ বন্ধ হয়ে আসার দশায় তারা। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা এখন আমেরিকাকে সাধুপুরুষ আর মহাভদ্রলোক সাজিয়ে এরপর চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান এমনকি ভারতকেও অভিযুক্ত করে নিজ মান বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। বলার চেষ্টা করছেন এসব দেশের স্বার্থের কারণেই নাকি তালেবানেরা আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফিরে আসার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক হয় নাই। এমনকি এর স্বপক্ষে কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেও সে নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই  এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  অতএব,  আটলান্টিক কাউন্সিল – এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব পুরান প্রপাগান্ডায় খ্যান্ত দেয়া, ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  দেখাই যাচ্ছে, রাশিয়ার উদ্যোগে চীনও পাশে দাড়িয়েছে। বাইডেনও যোগ দিয়েছেন। কাজেই নতুন ও ইতিবাচক চোখে  এসব কনসালটেন্টদের সামনে তাকানো উচিত।  বাইডেনের চেয়ে বুদ্ধিমানের ভান করা অপ্রয়োজনীয়।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক করেছে এমন কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেই নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই সেটা এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  কাজেই আটলান্টিক কাউন্সিল, এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  আবার ওদিকে ফ্যাক্টস হল, তালেবানদের আইডিয়া মর্ডান না হতেই পারে। কিন্তু সেটা তো তাদের প্রতি বিদ্বেষ জাগিয়ে তা কোন সমাধান নয়, এটা তো প্রমাণিত। একমাত্র ডায়লগ চালিয়ে গেলে, এনগেজমেন্ট এটাই পথ।  আর মূলত দরকার আফগানি স্টাবিলাইজিং ফোর্স। যেটা অবশ্যই পুতুল সরকারের কেউ নয়। এটা আপন ভাগ্যন্বেষণের লোক।  তুলনায় তালেবানদের নিয়ে যত আপত্তি আমরা মিডিয়ায় দেখি তবু তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

    ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে আমেরিকা তালেবানবিরোধী পুতুল সরকার বসিয়ে যা খুশি তাই করার সুযোগ নিয়ে চলেছিল। অথচ এই কনসালট্যান্ট ফেলো এরাই এখন প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কেন আফগানিস্তানে এমন রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি, যেখানে তালেবানের বিকল্প শক্তি তৈরি হয়, কেন তালেবানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকল?” এখন এই প্রশ্ন তাদেরকেই আমরা জিজ্ঞাসা করব। তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। তাই তারা বুদ্ধিমানের মত আগে নিজেই প্রশ্ন তুলে জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন, কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। এরাই আবার পাকিস্তানকে দায়ী করছেন যে পাকিস্তান হল তালেবানের “আশ্রয়দাতা”। যেন সে জন্য আজকের আফগানিস্তানে তালেবানরা ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ ঘটনা হল আফগানিস্তান বা তালেবানরা কেউই পাকিস্তানের শত্রু বা বিরোধী ছিল না, স্বাভাবিক পড়শি ছিল। আমেরিকানরাই জবরদস্তিতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে, আমেরিকার আফগান-শত্রুতাকে যেন পাকিস্তানও নিজের শত্রু জ্ঞান করে। আর যাতে আমেরিকা পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে সেখান থেকে উড়ে গিয়ে আফগানিস্তানে বোমা ফেলে আসতে পারে। অথচ সেই আমেরিকাই (ইন্ডিয়াকে বগলে নিয়ে ) উল্টো পাকিস্তানকে “জঙ্গি আশ্রয়দাতা” দেশ বলে প্রপাগান্ডা করে গেছে।  অথচ কার্যত এভাবে পাকিস্তান তো আমেরিকান হুকুমে চলে যাওয়া এক দেশ হয়েই ছিল। তাহলে এই পাকিস্তান আবার আমেরিকানদের শত্রু তালেবানদের নিজ দেশেই আমেরিকানদের পাশাপাশি আশ্রয় দেয় কেমন করে!

    আবার একালে আফগানিস্তান সব খোয়ানো আমেরিকার সেই আফগানিস্তানকে ফেলে পালানোর ইচ্ছা বহুদিনের, সেই ওবামা আমল থেকে। এ কারণে তারাই সে সময় চীনকেও আফগানিস্তানে সংশ্লিষ্ট হতে বলেছিল। গ্লোবাল নেতা হতে চাওয়া চীনেরও কিছু কিছু দায়-দায়িত্ব  নেয়া শুরু করুক এই উদ্দেশ্যে আমেরিকা তার কিছু ভার হাল্কা করতে চেয়েছিল, ফলে চীন তালেবানদের সাথে কথা বলুক মূলত এ লক্ষ্যে।  ফলাফলে  এক থার্ড পার্টি দেশ কাতারে  – তালেবানরা যেন অবাধে যেতে-আসতে ও যে কারো সাথে মিটিং করতে পারে; এ ব্যবস্থা ওবামা আমলেই ২০১৫ সাল থেকে চালু করা হয়েছিল। অরিজিনালি ‘সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন’ বা এসসিও জোট গঠন করার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এটিই। যে কারণে সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশ আর চীন ও রাশিয়াকে নিয়েই গঠন করা হয়েছিল এসসিও। অথচ আজ আমেরিকান ফেলোরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন যেন চীন-রাশিয়া নিজ স্বার্থেই তালেবানদের ফেরত আনছে। আর ওদিকে বিবিসি খবর দিচ্ছে কাতারের আলোচনা আরো পুরানা ২০১৩ সালের উদ্যোগ।

    আবার ওবামার পরে ট্রাম্প আরো জব্বর উদ্যোগী যেন পারলে এখনই আফগানিস্তানকে ফেলে নিজ সেনাদের নিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু তিনিই তো সেনা প্রত্যাহারের আলোচনা আফগান পুতুল সরকারের সাথে করেননি; বরং সরাসরি কেবল তালেবানদের সাথেই কথা বলেছিলেন, ‘ডিল’ করেছিলেন। সেনা প্রত্যাহারের শেষ দিন কী হবে, তাও পর্যন্ত ঠিক করেছিলেন; যা বাইডেন ক্ষমতায় এসে পুনঃঅনুমোদন দিয়ে সেটি ‘তারও চুক্তি’ বলে স্বীকৃতি দেন। অথচ ট্রাম্প তালেবানদের সাথে কিসের বিনিময়ে কী ডিল করে গেছেন, সেটা প্রকাশ্য নয়। তালেবানরা নিজ উদ্যোগে ক্ষমতা দখল করুক আর এতে ট্রাম্পই অনুমোদন দেয়ার বিনিময়ে- এ শর্তেই আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার বাধাহীন করে দিয়ে যাননি, তা আমরা কি নিশ্চিত? সে জন্যই কি থিংকট্যাংক ফেলোরা আমেরিকা বাদে বাকি সবাইকে আগাম দায়ী করা শুরু করেছেন যেন তাদের জন্যই তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে এসে যেতে পারে বলে – প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। মানে তারা কলসালট্যান্ট এই পরিচয় ধুলায় লুটিয়ে একেকজন ‘প্রপাগান্ডিস্ট’ পরিচয় নিতে চাইছেন! অথচ কী চুক্তি হয়েছে অন্তত ইনফরমালি কিছু তাদের অজানা থাকার কথা নয়!

    রাশিয়ার পুতিনের ট্রয়কাঃ
    অরিজিনালি ট্রয়কা (troika) শব্দের আক্ষরিক অর্থ সেকালের রাশিয়ান তিন ঘোড়ায় টানা গাড়ি; অর্থাৎ তিন শক্তির সমন্বয়ে কোনো একশন। আর এখন এখানে  শক্তি বলতে এরা হল রাশিয়ার পুতিনের উদ্যোগের তিন শক্তি   – রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন। হ্যাঁ, অবশ্যই তারা পরস্পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হলেও এরা আফগান-তালেবান ইস্যুতে একসাথে কাজ করতে নেমেছে। আর একাজে মানে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যেন আফগানিস্তানে কোনো বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা বা সশস্ত্র তৎপরতার ঢল নেমে না আসে, অতীতে যেমন আফগানিস্তানে অনেকবারই ঘটেছে। সেটা ঠেকানোর কাজ।  কিন্তু সেটাই বা ট্রয়কা চাচ্ছে কেন?

    খুবই সংক্ষেপে বললে, সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিবদমান পক্ষ ও স্বার্থগুলো একত্রিত হয়ে একটি রাজনৈতিক নেগোশিয়েশনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি থিতু সমাজ, একটি ফাংশনাল সরকার আর ন্যূনতম আইনশৃঙ্খলা স্থাপন করতে যেন সক্ষম হয়, সে কাজে সহায়তা করা এই ট্রয়কার উদ্দেশ্য।

    গত ২০১৮ সালের শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তালেবানদের সাথে কথা বলার, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেনা প্রত্যাহার। কারণ তার সরকারের অর্থ আফগানিস্তানে ঢালার অপচয় চলছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল ছাড়াই। তাই তিনি এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট  – জালমে খলিলজাদেকে [Zalmay Mamozy Khalilzad, an Afghan-American diplomat]  সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে তাঁর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি তালেবানদের প্রধান আলোচক বা নেগোশিয়েটর মোল্লা আবদুল গনি বারাদরের সাথে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার নিয়ে কথা শুরু করতে পারেন। আর মূলত প্রথম থেকেই তালেবানদের শর্তানুসারে আফগান পুতুল সরকারের কোনো প্রতিনিধিই তাদের দুপক্ষের কোনো সভাতেই না রাখার নিয়ম চলে আসছে। কারণ এতাই তালেবানদের শর্ত ছিল। শেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে একটি চুক্তিতে তারা পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিল আমেরিকার নির্বাচনের বছর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখে; যদিও এর বাস্তবায়নের মূল উদ্যোগের মাঠের কাজ গড়িয়ে যায় পরের বছরে। অর্থাৎ তত দিনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিয়ে নিয়েছেন।

    কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরে অনেক স্থানে বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় তালেবানদের সশস্ত্র তৎপরতা। এ ঘটনায় তাই উদ্বিগ্ন হয়ে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল পুতিনের রাশিয়া। কেন? সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়ান স্বার্থ কী?

    ২০০৮ সালে সেকালের জি-৮ গ্রুপ থেকে রাশিয়াকে বের করে দেয়ার পর (আবার তা জি-৭ হয়ে যায়) রাশিয়া-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই নিচে নেমে গিয়েছিল। তা কখনোই ভালো হয়নি। কিন্তু আফগানিস্তানের যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা আজো রুশ স্বার্থের জন্য অনেক কিছু যায়-আসে, তাই গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই রাশিয়ার স্বার্থ। এসব দেশ অতীতে জার সাম্রাজ্যের অধীনে দখলে গিয়ে প্রথম রাশিয়ান শাসিত  অঞ্চল হতে শুরু করেছিল।  ফলে সেই থেকে পরে (১৯১৭-১৯৯১) কমিউনিস্ট আমলেও শুরু থেকেই এই সেনট্রাল এশিয়া কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে যায়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে সেন্ওটাল এশিয়ান দেশগুলো আলাদা আলাদা দেশ হয়ে যায় তবুও তা বড় পাহারাদার বা রাশিয়ান বলয়ের দেশ হয়েই থেকে যায়। আসলে এখনও পর্যন্ত আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর ভিতর কোন র‍্যাডিক্যাল ইসলামী সমাজ-রাজনীতির চিন্তার প্রভাবে যেন সেন্ট্রাল এশিয়ায় সাজানো রুশ ভারসাম্য নষ্ট না হয়ে যায়, এ দিকে পরের রাশিয়ার সব শাসকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল, এখনো আছে। এটাই কোর রুশ স্বার্থ।

    এমনকি যেমন। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে খোমানির ইরান বিপ্লবের পরে এর প্রভাবে না সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন-বিপ্লবের ছাপ পড়ে যায় বা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে; এই ভয়ে ভীত হয়েই ছয় মাসের মধ্যে ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরেই আগাম আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ কার্যত আফগানিস্তান হল ইরান থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে [The region consists of the former Soviet republics of Kazakhstan, Uzbekistan, Tajikistan, Kyrgyzstan, and Turkmenistan.] বেশির ভাগ জায়গায় আলাদা করার এক ভুখন্ড ও দেয়াল। তাই সেই ইরান বিপ্লবের পর শুরু হয়ে আফগানিস্তান আজো এক হট স্পট ও আন্তর্জাতিক ইস্যু।

    এ কারণে রাশিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক যতই নিচে থাকুক না কেন, পুতিনের রাশিয়া আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ও স্বার্থে রাশিয়াকে অনেক কিছু করতেই হয়। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমেরিকা ও চীনকে সাথে নিয়ে ট্রয়কা গড়ে নিয়েছেন পুতিন। সেই পুরনো উদ্দেশ্য, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোন রেডিক্যাল ইসলামি চিন্তার ছাপ বা আঁচ যেন মধ্য এশিয়ার দেশে না পড়ে যায়। এদিকে চীন এখন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল নেতা হওয়ার দাবিদার। ফলে তারও দায়-স্বার্থ আছে। ফলে রাশিয়া ঢাকলে তাকেও অংশ নিতেই হয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান, ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে চীনের খোদ সীমান্তই আছে।

    তাহলে মুলকথা, এই ট্রয়কায় চীন ও রাশিয়া এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা শত্রুতা থাকলেও মিলের ভিত্তিটা ঠিক কী? কেন?
    এই ভিত্তিটাই হল, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার, যার কেন্দ্রে আছে জাতিসঙ্ঘ। ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্র রেখে তৈরি করা হয়েছিল, সেটাই এর ভিত্তি। কেন?
    এই জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা  – যেটা গত ৭৫ বছর ধরে ফাংশনাল হয়ে আছে, এটি নিয়ে অজস্র অভিযোগ এবং এর নানান খুঁত ও ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তা সত্ত্বেও এটাই দুনিয়াতে একমাত্র গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার কায়েম করা এক সিস্টেম। আর এটা না থাকার মানে ১৯৪৫ সালের আগের সময়ে ফিরে যাওয়া, যখন যুদ্ধ করারও কোনো নিয়মনীতি মানার বালাই নেই; আইনকানুন  বা প্রটেকশন নাই।  চাইলে যেকোনো জনগোষ্ঠীকে ‘নির্মূল’ করে দেয়াও ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। জর্মানিতে হিটলারের হাতে ইহুদি নিধন ও নির্মুলের চেষ্টা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। রেসিজমও কার্যত বৈধ ছিল মানে কোনো বাধা ছিল না – যা খুশি, জোর যার রাজ্য তার এবং সর্বোপরি কাউকে কোন ভুখন্ড দখল নেয়া বা কলোনি করে রাখাও ন্যায্য ছিল।  শুধু তাই না  কলোনিদখল করে রাখা এটাই সেকালের  প্রধান ফেনোমেনা ও প্রচলিত ঘটনা ছিল। সারা অখন্ড ভারত বৃটিশ কলোনি হয়ে ছিল।   কাজেই সেই পরিস্থিতির বিপরীতে  জাতিসংঘ – এটাই সবেধন নীলমনি, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের ভারকেন্দ্র। আর এটি দাঁড়িয়ে আছে যে ভিত্তি-অবস্থানের  উপর তা হল, কোনো ভূখণ্ডের নাগরিক বাসিন্দারা হল আসল ক্ষমতার উৎস;  তারাই একমাত্র নির্ধারক যে কোনো ভূখণ্ড কার দ্বারা শাসিত হবে। ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণ এই নির্ধারণের একমাত্র হকদার – এ ভিত্তিতে। তাই এটা মূলত অন্য কারো দেশ দখল বা কলোনি করে নেয়ার বিরুদ্ধে এক রক্ষাকবজ। যেকারণে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর  নেহেরুর ভারতের সাথে যুক্ত করে দিয়ে গেছে, এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ একথা বলবার হকদার একমাত্র কাশ্মীরের জনগণ, কোন রাজা নয়।  আর সেখান থেকেই, এই আইনিভিত্তি – পরোক্ষেও রাজা-বাদশাহদের কোন ভুখন্ডের শাসন ক্ষমতাকেও বৈধতা দেয় না। তবে একটা ছাড় আছে যে, আগে থেকে চলে আসা কোনো রাজতন্ত্র বা বাদশাহতন্ত্রকে জাতিসঙ্ঘ অবৈধ বলতে চায় না, যতক্ষণ না ওর অভ্যন্তরীণ জনগণ সংগঠিত হয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ চায় বা দাবি করে। অর্থাৎ জাতিসংঘের ফর্মুলা হল গণভোটে চলে যাওয়া ও সে রায়ের ভিত্তিতে দাবির ফয়সালা করা।

    ঠিক এ কারণে ট্রয়কার কাজের ভিত্তি জাতিসঙ্ঘ ও একে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার-টা। আর ২০১৯ সালের মার্চ থেকে এই ট্রয়কা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন মিটিং করে আসছে, আর সেখানে জাতিসঙ্ঘের পাশ হওয়া বিভিন্ন প্রস্তাবকে ভিত্তি করেছে এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিকেই সংশ্লিষ্ট করেছে। আর তাই সেখানে ৩০ নভেম্বর ২০২০ এক রেজ্যুলেশনের তিন নম্বর সিদ্ধান্ত হল এরকমঃ [কথাগুলো ট্রয়কার এক বিবৃতি থেকে নেয়া]

    3. As stated in the UNSC resolution 2513 (2020), we do not support the restoration of the Islamic Emirate and we call on the Government of the Islamic Republic and the High Council for National Reconciliation to engage openly with their Taliban counterparts regarding a negotiated settlement.

    অর্থাৎ, ট্রয়কা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) ২০২০ সালের এক সিদ্ধান্ত অনু- সমর্থন করছে। আর যেখানে বলা হয়েছে, তারা ‘তালেবানদের ইসলামিক আমিরাতকে পুনঃস্থাপন সমর্থন করছে না”। বরং আহ্বান রাখছে যেন আফগানিস্তানের বিবদমান সব পক্ষকে সাথে নিয়ে সবাই সংশ্লিষ্ট হয়ে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছায় এবং বিবাদের একটি শান্তিপূর্ণ সুরাহা যেন হয় এবং তা করতে উতসাহ ও সহায়তা দিতে চায়।

    এসব প্রস্তাবকে কিভাবে দেখব ও বুঝব?
    প্রথমত শুরুতে যেমন বলেছি আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো যারা সব দোষ তালেবানের বলে তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন, অথচ এরা জানেন একটি  ট্রয়কা-উদ্যোগ কাজ করছে ফাংশনাল; যেখানে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন এই তিন শক্তি সক্রিয়। অথচ এরা তালেবানদের এক  শত্রুজ্ঞান করে আগাম কোন ক্যাম্পেইন করতে বসেনি। কেবল ডায়লগে সবাইকে নিয়ে বসে একটি পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট করে নিতে বলছে, সাহায্য করতে চাইছে। অথচ এই থিংকট্যাংক ফেলোরা তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় আগাম নেমে গেছেন, যা আসলে ভারতের অবস্থান! এমনকি এ্টা আমেরিকার অবস্থানও নয়। উপরের ট্রয়কার বিবৃতিটা আমেরিকান সরকারি ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া যার শিরোনাম – Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan.।

    এখন অনেকে মনে করতে পারেন যে এই সেট হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটা আপনি পছন্দ করেন না, তা হতেই পারে। জাতিসঙ্ঘ এর একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থা দাঁড় করানোই শেষ কথা নয়। বরং কেবল শুরু যাকে অনেক পথ হাঁটতে হবে, বদলাতে হবে, অন্য অনেক ‘অপরকে’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ডায়লগ করতে হবে। যেমন ধরা যাক, আপনি এক ইসলামিস্ট অথবা কোনো কমিউনিস্ট, যিনি গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটাকে পছন্দ করেন না বা এটা আপনার ফেভারে বলে দেখেন না। সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

    আসলে এ ব্যাপারটা অনেকটা আগে থেকে গড়ে থাকা একটি শহরের মত, যেখানে ওই শহরের ভেতরে বাসিন্দাদের বসবাস ও থাকা বা চলাচল ইত্যাদির জন্য সেখানে প্রচলিত নিয়মকানুন আইন কনভেনশন সবই আছে। ধরা যাক, আপনি এখন বাইরে থেকে এসে ওই শহরেই বাস করতে চাইছেন। কিন্তু আপনার দাবি ওদের সব নিয়ম আইনের কিছুই আপনি মানেন না; কারণ এগুলো তৈরির সময় আপনার মতামত নেয়াই হয়নি। এখন – এমন কথা বলে যদি ওই শহরে ঢুকতে যান এতে ফলাফল হতে পারে এই যে, ওরা উল্টো আপনাকেই আউটকাস্ট, কী বাইরের লোক বা গোঁয়ার, গাঁইয়া অভব্য আনকুথ কিংবা ধরেন জঙ্গি বলেই বের করে দিতে পারে। আইনের শাসন না মানা লোক বলে ‘অমার্জিত’ ট্যাগ দিয়ে আপনাকে একা করে দিতে পারে; আর এমন ইমেজের কারণে হয়তো আপনি আর কারও কোনো সহানুভুতি বা আপনার কী হয়েছে, তা শুনানোর মত কাউকেই পেলেন না- এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রাখার দশায় পড়ে যেতে পারেন।

    তা হলে এদেরকে মোকাবেলার উপায় কী?  আছে। একারণে ঐ শহরে ঢুকতে গেলে আপনাকে পরিকল্পনা-কৌশল নিয়ে এগোতে হবে। তাই সম্ভবত এর চেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রথমত আপনি তাদের নিয়ম মানেন বলে প্রবেশাধিকার তো নিয়ে নিবেন আগে। এরপর ওদের নিয়ম মেনেও চলেন। আর এবার কেউ আপনার পাল্টা নিয়মটা যা আপনি চালু করতে চান, সেটা কেন বেশি ভালো সেটা দেখান ও এই প্রচার চালান আশপাশে। ওই শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটে নিজের ভালো চিন্তাগুলো তুলে ধরার চেষ্টাও করতে পারেন। এরপর সময়ে আপনার দলে ভারী বুঝলে এবার তখন ঐ শহরের পুরানা সব নিয়ম বদলানোর চেষ্টা বা উদ্যোগ নেন।

    অর্থাৎ এর মূল কথাটা হল – খেলার পুরনো নিয়ম বদলাতে চাইলে দূরে গ্যালারিতে বসে থেকে তা বদলাতে পারা যাবে না। উল্টো আপনাকেই এরা উপড়ে তুলে ফেলে দিতে পারে। এর চেয়ে বরং খেলায় অংশ নিয়ে খেলতে খেলতেই এমন পুরনো নিয়ম বদলাতে চেষ্টা করতে পারেন। এর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই পথ না ধরলে কী হবে?

    সেটা একটি উদাহরণে বলা যাক। গত ৩০ জুলাই আমাদের স্থানীয় প্রথম আলো দৈনিকের খবরের শিরোনাম – “ফজলের ‘কৌতুক’ চিরতরে স্তব্ধ করল তালেবান”। ফজল, তিনি আফগান পুতুল সরকারের এক পুলিশ অফিসার ফজল মোহাম্মদ। তিনি অনলাইনে হাস্যরসাত্মক নানান ভিডিও পোস্ট করার জন্য আফগানদের কাছে তার পুলিশ পরিচয়ের চেয়ে ‘কৌতুক অভিনেতা’ বলে বেশি পরিচিত। কিন্তু তালেবানরা নাকি প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি বাড়ি ফেরার পর তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করে। এ ক্ষেত্রে হত্যার কথা শুরুতে অস্বীকার করলেও পরের সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তার পরই তাকে হত্যার কথা স্বীকার করে তালেবান। এ হলো খবরটার সারকথা। তবে অবশ্য আফগানিস্তানে অনেক সময় এসব হত্যা প্রকাশ্যেও ঘটে থাকে।

    এখানে তালেবানদের জন্য খবরটার  সবচেয়ে খারাপ দিকটা  হল, এটা তার ইমেজ ধ্বংস করেছে। সেটা তালেবানেরা আইনের শাসন মানে না আর জঙ্গি ট্যাগ লাগানো ধরণের ইমেজ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অবশ্যই। তাই খবরটা যতটা সত্যি তাতে তালেবানদের এমন স্টাইলের তৎপরতা আত্মঘাতী!

    কোনো যুদ্ধের মাঠে আপনি বা আপনার শত্রু খুন হয়ে যাওয়ার একটা আলাদা অর্থ হয়। সামরিক ইস্যুতে এর ক্রিমিনাল আইনে মামলা হয় না। তবে এর বিপরীতে তুলনামূলক শান্ত এক জনসমাজে আপনি ঘর থেকে কোনো জেনুইন অপরাধীকেও যদি উঠিয়ে এনে জনসমক্ষে মেরে ফেলেন এর ফল হবে উল্টো। আপনি অপরাধী হবেন। এছাড়া নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ, ওই সময়ে অসহায় যে মানুষটা খুন হচ্ছে, তা যারা দেশে-বিদেশের লোক দেখবে  এরা প্রায় সকলে নিজেকে আবিষ্কার করবে ঐ খুন হওয়া নিরস্ত্র লোকটার ভিতরে। ফলে খুন হয়ে লোকটার প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর এটাই আপনার জন্য বিরাট নেতি-ইমেজ তৈরির উপাদান হয়ে উঠবে। বলাই বাহুল্য এই ইমেজের জন্য এবার আপনিই হেরে যাবেন।  আপনি নৃশংস খুনি, কিংবা আপনার ধর্মটাই খারাপ এমন বয়ান উঠে আসতে পারে। তা হলে করণীয়?

    এমন ঘটনা যুদ্ধের মাঠের খুনোখুনি কিনা সেটা এক বড় প্রশ্ন। যদি তা হয় বুঝাতে চান, তবে আগে যুদ্ধ ঘোষণা করে নেয়া হয়েছে সে প্রমাণ হাজির দেখান।  নইলে অপর বিপরীত পথ হল,  কাউকে (সে অপরাধী হলেও) হত্যা করার আগে তার বিচার হতে হবে। এখন বিচার মানে কিন্তু অনেক কিছু। যার শুরু সেই কনস্টিটিউশন থেকে। এরপর রাষ্ট্র সরকার আইন, বিচারব্যবস্থা সেটআপ ইত্যাদি অনেক কিছু। মানে আসলে সবার আগে ক্ষমতা দখল করে নিতে হবে। এরপর আবার অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে এবং স্থায়ী ও আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আদালত থাকতে হবে। আর গ্রেফতারকারীই পরে বিচারক এবং তিনিই আবার শাস্তি বাস্তবায়নকারী, তিনি এমন হতে পারবে না। মানে পুলিশিং আর বিচারক একই লোক হতে পারবে না। নইলে তো যে কেউ যে কাউকে অপরাধী বলে মেরে ফেলার অরাজকতা শুরু হয়ে যাবে। আর এখানেই দেশে-বিদেশে আপনার ইমেজ আপনার রাজনৈতিক চিন্তা কেমন, আপনি দায়িত্বশীল ক্ষমতাবান মানুষ কি না – এসব বহু প্রশ্ন ভর করবে। বলাবাহুল্য, আপনি জঙ্গি, আপনি অমানবিক গুণের বা আপনি নৃশংস, কাজেই আপনার ধর্মটাই খারাপ- এই ইমেজ দাঁড় করানোর জন্য একদল লোক অবশ্যই হাজির থাকবে। অর্থাৎ আপনি নিজেই ২০০১ সালের মতো নিজেকে উপড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়ার পক্ষে কাজ করতে পারেন না।  এমন বোকামির অর্থ হয় না।  কাজেই আপনার  দায়ীত্বশীল ও গঠনমূলক ইমেজ অবশ্যই খুবই জরুরি।

    সারকথায় একালের দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলে একটা কিছু আছে, একে অবজ্ঞা করবেন না। একে মানুন আর না-ই মানুন, একে আগে বুঝুন। এরপর এগোনোর পদক্ষেপ কৌশল ঠিক করেন। নইলে বেঘোরে মার খেয়ে উলটা আপনিই হারিয়ে যাবেন।  এরা আপনাকেই উপড়ে ফেলে দিবে!

    আফগানিস্তান নিয়ে এত হইচইয়ের কারণ কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ট্রয়কার গঠন দিয়ে। পরে এই ট্রয়কা নিজেকে প্রথমে নিজেকে বর্ধিত করে, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আর তাতেই ঘটে প্রথম বিস্ফোরণ। কেন?

    প্রথমত, পাকিস্তান হল ল্যান্ডলকড আফগানিস্তান ভূখণ্ডের এক প্রবেশদ্বার, যা সমুদ্রের পর  পাকিস্তানের পেরিয়ে এরপর সহজেই প্রবেশ করা যায়। আমেরিকা এজন্য আফগানিস্তানে হামলা চালানোর আগে পাকিস্তানকে হাত করে, বাধ্য করে, ঘাঁটি বানিয়েই নিয়েছিল। অতএব, আফগানিস্তানে ব্যবহারিক যেকোনো পদক্ষেপের আগে ট্রয়কাকে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে নেয়া জরুরি ছিল। কাজেই রাশিয়া নিজে উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে কথা বলে সসম্মানে তাকে ট্রয়কার বাড়তি সদস্যের ভূমিকায় জুড়ে  নিয়েছিল।

    কিন্তু রাশিয়া আমেরিকা বা চীনের ত্রয়কার এসব ব্যবহারিক সমস্যার দিকটি ভারতের বুঝার বা আমল করার মত অবস্থান নিলে ভারতের চলে না। এমনকি মনে মনে মানলেও তা স্বীকার করা অসম্ভব। কারণ? ও পাকিস্তান- এটা তো একটা জঙ্গি রাষ্ট্র, ‘তালেবানদের মদদ দেয়া রাষ্ট্র’ ইত্যাদি গত ২০ বছর ধরে ভারত তার দেশের ভিওতরে বাইরে  প্রপাগান্ডা করে এসেছে।  নিজের সেই কথা তো এখন ভারত টিকাতে পারছে না। মানে এখন প্রশ্ন হল, পাকিস্তান যদি জঙ্গি রাষ্ট্রই হয়, তা হলে তো সে রাশিয়া, আমেরিকা বা চীনের পাশাপাশি একই মর্যাদার আসনে বসতে পারে না। আর বাস্তবে যদি বসতে দেখা যায় তার মানে পাকিস্তান জঙ্গি রাষ্ট্রই নয়, দায়িত্ববান রাষ্ট্র। তাই যদি রাশিয়া পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতকেও ট্রয়কায়  সাথে নিত, তাতে  হয়ত ভারতের কিছুটা মুখরক্ষা হত।   মানে ভারত নিজেই এখন আগের ইসলামবিদ্বেষী নিজের ছড়ানো ঘৃণার মধ্যেই নিজেই আটকে গেছে!

    ওদিকে রাশিয়া আবার পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভিতরে নিয়ে ট্রয়কাকেই পরে ট্রয়কা-প্লাস [troika+] নাম দিয়ে নিয়েছে, ফলে তাতে ভারতের জ্বলুনি আরো বেড়েছে। কিন্তু এই ঘটনা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির আর বাইরে খুবই কম প্রচারিত ঘটনা বলে এত দিন ভারত এই লজ্জা লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। যদিও তাদের মিডিয়া গত মার্চ ২০২১ থেকেই জানত যে ভারতকে বাদ দিয়ে ট্রয়কার মিটিং চলছে [ India not part of Russian meet on Afghanistan]।  কিন্তু এখন, গ্লোবাল মিডিয়ায় আফগানিস্তানে কী হচ্ছে এটা এক শীর্ষ ইস্যু। তাই মিডিয়া জুড়ে  আগাম ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে,  আগামি ১১ আগস্ট হবে ট্রয়কা+ এর পরের মিটিং। আর সাধারণত এসব মিটিং  এতদিন হয়েছে রাশিয়ায় না হলে কাতারে। কারণ কাতার ২০১৫ সাল থেকে আফগান-তালেবান ইস্যুতে নিরপেক্ষ হোস্ট। তাই সেও ট্রয়কার মিটিংয়েও প্রতিনিধি পাঠায়; সাথে ওই মিটিংয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ইরান ও তুরস্ককেও নেয়া হয়েছে। এতে এখন ভারতের মিডিয়াও আর দেশপ্রেমের জোশে মোদি-জয়শঙ্করকে জবাব দাবি করে  পার পাচ্ছে না।  একেবারে সবারই ইজ্জতের সওয়াল হয়ে গেছে।  কারণ এখন ভারতের চেয়ে  (কথিত জঙ্গী) পাকিস্তান রাষ্ট্র এখন গ্রহণযোগ্য আর দায়ীত্বশীল রাষ্ট্র হিসাবে  আমেরিকা, রাশিয়া বা চীনের সাথে সমান মর্যাদার টেবিলে বসেছে কথা বলছে। এটা ভারতে বসে দেখা যায় না! এমনই কঠিন জলুনি!   আর এসব কথা বাংলাদেশেও  ভারত প্রভাবিত মিডিয়ায় বড় করে আসায় বাংলাদেশেও ভারতের এই বেইজ্জতির খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

    রাশিয়া ভারতকে এমন বিমুখ ও বেইজ্জতিতে ফেলল কেন?
    রাশিয়ার সমস্যা ভিন্ন! রাশিয়া মনে করে এই আগস্টের শেষে সেনা প্রত্যাহারের পরে বর্তমান আফগান পুতুল সরকারের আর ক্ষমতায় থাকা ঠিক নয়। ,[However, the Russian side appears opposed to the continuation of the Ghani government and favours an interim set-up ……]   বরং অন্তর্বর্তীকালীন ও সবার প্রতিনিধিত্বমূলক এক সরকারের থাকা উচিত, যার কাজ হবে সবাইকে নিয়ে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো। আর এর বিপরীতে ভারতের অবস্থান হলো, বর্তমান পুতুল সরকারে হাত দেয়া যাবে না” [While India has backed the government of President Ashraf Ghani…।]।’ আরো আগিয়ে ভারত বলছে, গায়ের জোরে পুতুল সরকারকে বদলালে ভারত মানবে না। যেন ভারত না মানলে বিরাট কিছু যায়-আসবে!

    কথা হল, প্রথমত ক্ষমতা তো মুরোদেই মানে গায়ের জোরেই বদলাতে হয়, বদলায়। যদিও এ্টাই শেষ নয়। এরপর ক্ষমতা নিজের কাছে রেখে কিন্তু  সব পক্ষকে নিয়ে প্রপার সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন গড়তে তো অসুবিধা নেই।
    আর তালেবানদের ক্ষমতা দখল না করতে কেউ স্পষ্ট করে তো কিছু বলেনি। ত্রয়কাও কোন আগাম আপত্তি প্রকাশ করে নাই। এমনকি ব্রিটেন আগাম জানিয়েই দিয়েছে, সে স্বীকৃতি মানে কাজ করতে রেডি। কাজেই তালেবানরা ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়ার পর তখন ত্রয়কার কথা শুনে তাদের কনসার্ণ গুলো আমল করে চলতে অসুবিধা হবার কথা না! যেমন তারা সব পক্ষীয় সরকার ইত্যাদির করতে গেলে অসুবিধা কী?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৭ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়ার ত্রয়কা ভারতের বুকে শেল মেরেছে“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  •  “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

     “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

    গৌতম দাস

    ০২ আগষ্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    FP.COM   A security officer walks past a mural showing U.S. Special Representative for Afghanistan Reconciliation Zalmay Khalilzad and Taliban co-founder Mullah Abdul Ghani Baradar in Kabul on July 31, 2020. WAKIL KOHSAR/AFP VIA GETTY IMAGES

     

    [সার-স্ংক্ষেপঃ   লেখার শিরোনাম “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে” – এটা মূলত এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুতের দেয়া শিরোনাম, সেখান থেকে নেওয়া।  তিনি আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদুত,  বিবেক কাতজু [Vivek Katju]। হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হওয়া তাঁর লেখা  এক কলামের শিরোনাম ছিল – India is losing out in Afghanistan ।  অর্থাৎ এই সাবেক কূটনীতিক মোদী-জয়শঙ্করের ভারতের এক করুণ পরিণতি দেখছেন।  তাঁর পুরা লেখাটাই মোদী-জয়শঙ্করের কঠোর সমালোচনা করে লেখা।
    ঠিক তেমনই আরেকজন হলেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলো তাকে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি বলে পরিচয় করায়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি মোদী-জয়শঙ্কর থেকে নিজেকে দুরত্ব তৈরি করে তাদের দায় না নিয়ে এক রচনা লিখে বলেছেন –  “আফগানিস্তান হতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কূটনৈতিক দক্ষতার কষ্টিপাথর”। অথচ প্রথম আলো তার এই দায় না নেয়া লেখাটা ছেপেছে সৌম্যর ‘মতামত কলাম” হিসাবে।  অর্থাৎ সৌম্য প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি সে হিসাবে নয়।
    মুলকথাটা হল, তালেবান ইস্যুতে মোদীর নীতি-পলিসিতে বড় গলদ দেখছেন ভারতের কূটনীতিক, একাদেমিক বা মিডিয়াকর্মিরা – তাঁরা মোদী-জয়শঙ্করদের থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করে কথা বলা শুরু করেছেন। তবুও মোদী-জয়শঙ্কর হুশিয়ারি দিচ্ছেন।  জয়শঙ্কর ২৯ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় বলেছেন, আফগানিস্তানে বলপ্রয়োগের সরকার ক্ষমতা দখল করলে (মানে তালেবানেরা ক্ষমতা দখল করলে) ভারত তা মেনে নিবে না [We would never accept any outcome which is decided by force”]। মানে স্বীকৃতি দিবে না। যদিও ভারতের স্বীকৃতির অপেক্ষায় তালিবানরা রয়েছে এমন কথা জানা যায় না। তবে ভারত সফরে আসা আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তার কথাও ভারতের কাছাকাছি মনে হলেও, কিন্তু এক বড় ফারাকের। তিনি বলছেন সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তালেবানদের অসুবিধা হবে। তিনি একটা শব্দ ব্যবহার করেছে “pariah” [Afghanistan to become ‘pariah state’ if Taliban seizes power: US] যার সমতুল্য বাংলা মানে হল অছ্যুত বা একঘরে হয়ে থাকা।  দেখা যাচ্ছে আমেরিকা যেখানে হুমকি নয়, অবজেকটিভলি তালেবান্দের উদ্দেশ্যে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছেন  মুরোদহীন ভারত সেখানে হুঙ্কার দিয়ে বলছে – ভারত মেনে নিবে না। ]

     

    এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়িঃ
    আফগানিস্তানকে ঘিরে এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি চরমে উঠেছে। গ্লোবাল পাওয়ারগুলোর সবাই তো বটেই,  এমনকি মুরোদ না থাকলেও যারা আকাঙ্খী, তারাও এতে শামিল হতে চাইছে। কারণ একটাই তালেবান ইস্যু গরম হয়ে উঠছে। মানে আমেরিকার বন্ধুরা যারা গত বিশ বছর ধরে আমেরিকার পক্ষে থেকে কাবুলের পুতুল সরকারের থেকে নানান “প্রজেক্ট” বাগিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের জন্য এখন দুঃখের দিন, হাহাকারদের দিন। বিশেষ করে ভারত তার তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আটকে গেছে সেই দুঃখে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দিয়ে যাচ্ছে – যে তালেবান সরকার টিকবে না।  এতো গেল একটা দিক। অন্যদিকটা  আরেকটু ভেঙে বললে, গত ২০ বছর হিতাহিত ভুলে আমেরিকার এই আফগানিস্তানে চালানো আক্রমণ ও দখলদারির দিন এবারের মত শেষ হবে। কিন্তু শেষ ‘কাফফারা’ দিতে হবে আরো অনেক; এবার সে ‘কাফফারা’ দেওয়ার  এক নয়া জমানায় সম্ভবত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

    SPUTNIKNEWS

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা যা আজকাল অস্বীকার-কারীরাও পরোক্ষে স্বীকার না করে পারছে না যে, আমেরিকার বদলে এর জায়গায় চীনের উঠে বসার কথা বা লক্ষণ-ইঙ্গিতও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আমেরিকার জন্য এই শাস্তি ডেকে নেওয়ার কারণও মূলত আফগানিস্তান। কারণ আসলে এই যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়েই, এতদিন সামলে চলা আমেরিকার অর্থনীতি, ২০০৭ সাল থেকেই বেসামাল হয়ে যায়। এই খরচ বেহিসাবি কারণ এই যুদ্ধ অন্তহীন এবং  এতে লোভ ও চরম অপরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখানে খরচের কোনো রিটার্ন আপাতত আর আসার সম্ভাবনা নাই, এর কিছুই ফেরত আসবে না। সেটা ক্রমান্বয়ে নিশ্চিত হয়ে যাওয়াতে ২০০৮ সাল থেকেই গ্লোবাল মহামন্দা নেমে এসেছিল। আর তাতেই প্রথম সুবিধাটা যায় চীনের ঘরে যে তখন নিজ অর্থনীতির কেবল ডাবল ডিজিট জিডিপির ২০ বছরে পৌঁছাতে যাচ্ছিল। তাই আমেরিকার বদলে সে জায়গায় চীন – এই সুবিধা চীনের জন্য প্রথম উন্মুক্ত হয়েছে আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার পরের পিছু হটা থেকে।

    তাই ২০১৪ সালেই আমেরিকাকে প্রথম বড় সেনা প্রত্যাহার ঘটাতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান  অর্থমন্ত্রী বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের  খরচ জোগানোর অপারগতায় শেষ টাইমলাইন ছিল সেটা। তাই প্রথম সেই প্রধান সেনা প্রত্যাহার (আমেরিকাসহ ‘ন্যাটো’ ও তার বন্ধুদের সেনা) যা শুরু হয়েছিল তা এবার ২০২১ সালে বাদবাকি সমূলে প্রত্যাহার শেষ হতে প্রতিশ্রুত হয়েছে, যার টার্গেট আগস্টের শেষে। অর্থাৎ এ মাসের মধ্যেই।

    এতে  আফগানিস্তানে এতদিন আমেরিকার যা অর্থসম্পদ ক্ষতি হয়েছে তা তো হয়েছেই; কিন্তু সেটাই শেষ নয়। বরং আরেক  বিরাট সম্ভাব্য ওলটপালট সামনে অপেক্ষায়। আর তাতে আমেরিকার এর চেয়েও বড় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকছে। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলে যে নতুন  ভারসাম্য আসন্ন, অন্তত এশিয়ার ভারসাম্য এখান থেকেই পুনর্লিখিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

    ওদিকে এনিয়ে ভারতের অবস্থান আরও নাজুক, একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। তাই যদিও আপাতত মোদীর ভারত আমেরিকাকে জাপটে ধরেই থাকছে বটে; তবে পারলে বাইডেনের চেয়ে – ভারতের হিউম্যান রাইট নিয়ে প্রশ্ন না তোলা – ট্রাম্পের মত প্রেসিডেন্টই মোদীর ভারতের কাম্য।  কিন্তু এসব কিছুই ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। এরপরে সেই নির্বাচনে বিজেপি ফিরে জিততে না পারলে সেই ভারত পথ বদলে চীনের বন্ধু হয়ে যাবার পথে যাওয়াটাও অসম্ভব নয়। বিশেষত ইতোমধ্যেই ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন আওয়াজ ইতোমধ্যেই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং তাতে তালেবানদের ক্ষমতায় ফিরে চলে আসার সম্ভবনা ভারতকে একেবারে অস্থির বেচাইন করে দিয়েছে।
    কারণ মূল সে ঘটনা হল তালেবান  – মানে ১৯৯৬ থেকে আমেরিকার ২০০১ সালে দখলের আগে পর্যন্ত যারা কাবুলের সরকারের ক্ষমতায় ছিল, সেই তালেবানরা। নিঃসন্দেহে সেই আর এই – তালেবানের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা এবার আকাশ-পাতাল ফারাক দেখব বলে আশা করতে পারি।  তবুও তালেবানরা এবার “আগের মত একই তালেবান কি না” (ভারত যেমনটা আগেই প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে) – তবু সেটা বড় ফ্যাক্টর নয়।
    কারণ মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালে আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের হামলার পর পাল্টা আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করেছিল পরের মাসে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। আর এরপরই  জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটোক্ষমতাসহ মোট ১৫ আসনের  সকলে সর্বসম্মতিক্রমে ১৪ নভেম্বর ২০০১, তালেবান শাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা প্রস্তাব ও ভোট দিয়েছিল।  মানে গ্লোবাল রাজনীতিতে রুলিং শাসকেরা সেসময় একেবারেই সদলে  তালেবানের বিরুদ্ধে চলে গেছিল।  অথচ  তুলনায় আজকের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন।  এখন একই পরিষদে আমেরিকান কোনো প্রস্তাব নিয়ে যদি ভোটাভুটি হয় তবে এর বিপক্ষে  অন্তত দু’টা (চীন ও রাশিয়া) ভেটো পড়বে আর বিভক্তি ভোট তো হয়ে যাবেই। অর্থাৎ কোন প্রস্তাব পাসই হবে না। এটাই অনেক বড় ফ্যাক্টর।

    উপরে যে গ্লোবাল পালাবদলের কথা তুলেছি, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুর উপর এরই মধ্যে ছাপ পরে গেছে পুরোদস্তুর। যেমন – গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে ইতোমধ্যেই “আমেরিকা বনাম চীন” এমন দুটো পক্ষের মধ্যে অন্য দেশগুলো কে কোন দিকে সেই পক্ষ-বিপক্ষ প্রতিদিনই আমরা আরো চোখা হয়ে উঠতে দেখছি। গ্লোবাল পালাবদলে ‘আমেরিকা বনাম চীন’ এই পক্ষ-বিপক্ষের ছাপটাই আফগানিস্তানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই মেরুকরণে পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে পেছনে কাজ করছে। যেমন- কে কে আমেরিকার ফেলে যাওয়া পুতুল সরকারের পক্ষে আর কে কে তালেবানের (শর্ত সাপেক্ষে) প্রতি সহানুভূতিশীল – এই দুই ভাগেই প্রতিফলিত হচ্ছে প্রথমটা আমেরিকার পক্ষে আর পরেরটা ‘চীনের পক্ষ’। এদিকটাই এখন প্রধান ফ্যাক্টর।

    তবে আফগানিস্তানের এখনকার সব ঘটনার শুরু যে ২০০১ সালের আমেরিকান হামলা থেকে সেই আমেরিকার এখন প্রধান টার্গেট ও স্বার্থ হল – আফগানিস্তানে আমেরিকার সব অর্থব্যয় এবার বন্ধের ব্যবস্থা করা যা ড্রেনে পড়ছে; আর, এরপর আমেরিকান টার্গেট সেই আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে যাওয়া। তাই, এরপরে তালেবান আক্রমণের মুখে কাবুলের সরকার টিকে থাকতে পারবে কি না সেটা আমেরিকার কাছে সেকেন্ডারি, তার পারলে ভালো  – এরকম। যদিও আমেরিকা তা মুখে স্বীকার করছে না, ভাবে বলছে। ওদিকে আমেরিকার আরেক কোর-স্বার্থ হল, সেনা প্রত্যাহারের পরে, আল-কায়েদার মত গ্লোবাল সশস্ত্র ইসলামি গ্রুপগুলো যেন আফগানিস্তানে্র আশ্রয়ে থেকে অপারেট না করে। আর এটাই তালেবানদের সাথে ট্রাম্প ও বাইডেনের মুখ্য ডিলিং পয়েন্ট, যা অপ্রকাশ্য রাখা আছে। যদিও তালেবানেরা সেই আশ্বাসও দিয়েছে [The Taliban has also assured the US that it would not allow global terrorist groups to operate from Afghanistan.] বলে জানা যাচ্ছে।

    তিনটা আলাদা মিটিং কিন্তু প্রায় সমান্তরালেঃ
    আমেরিকান সেনা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের সময় তেমন আর বেশি নাই, মাত্র আগস্ট মাসটাই। তাই আমরা অস্থির কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেখছি যার মধ্য থেকে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের তিনটা মিটিংয়ের কথা এখানে তুলে ধরব।

    এক.
    সময়ের হিসাবে ধরলে তিন মিটিংয়ের সবশেষেরটা হল ২৮ জুলাইয়ে, ৯ সদস্যের তালেবান প্রতিনিধিদের চীন সফর ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ওয়াং ই-এর [Wang Yi] সাথে বৈঠক।

    আফগান তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার [Mullah Abdul Ghani Baradar] বুধবার চীন সফরে গেছেন, আর সেখানে পৌঁছেই উত্তরাঞ্চলীয় তিয়ানজিং শহরে তিনি বৈঠক করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে।

    বলা যায় ভারত ও সমমনা যারা এতদিন আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের হাতে গত বিশ বছর মাখন খেয়ে গেছে, তাদের জন্য চীন-তালেবান এই বৈঠক এক মহাজুলুনি তৈরি করেছে। সেই ঈর্ষা আর জলুনি কত তীব্র তা দেখা যাচ্ছে বিবিসি বাংলার নিচের এই রিপোর্টে।

    চীন-আফগানিস্তান: ঘনিষ্ঠ হচ্ছে কমিউনিস্ট চীন ও সুন্নী তালেবান, তৈরি হচ্ছে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

    এতে তালেবানদের দিক থেকে এই প্রথম আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের ‘কাউন্টার ওজন’ প্রকাশ করা মানে পাল্টা-পাল্লায় বাটখারার ভার দেখানো হল। আর তাতে চীনের পেছনে রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলো আর (হবু ছয় দেশীয় জোট দেখানোর কারণে) সম্ভবত বাংলাদেশও – তাদের সবাই যে আছে সেই অনুমান ছড়িয়ে দেয়া হল। এরই পাল্টা হিসেবে আমেরিকার বগলে এক ভারত ছাড়া আর কেউ আপাতত দৃশ্যমান নয়। আমেরিকা-ভারতের বিপরীতে তালেবানের এই বাটখারার ভার দেখানো তাৎপর্যময় অবশ্যই। এটা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু মন্তব্যে। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং বলেছেন, তালেবানরা ‘এখন আফগানিস্তানে এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি” [“Wang Yi pointed out, the Afghan Taliban is a crucial military and political force in Afghanistan,” ]।’ আবার রয়টার্স রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীন বলছে, তালেবানদের কাছে চাওয়ার আছে যে, তারা আফগানিস্তানের শান্তি প্রতিষ্ঠায় মিলমিশ ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক!’ [China told a visiting Taliban delegation on Wednesday it expected the insurgent group to play an important role in ending Afghanistan’s war and rebuilding the country,] এই কথায় ভারতসহ সমমনাদের জলুনি উঠলেও বলার কিছু নাই। কারণ চীনের একথা সবচেয়ে ইতিবাচক এক স্টেমমেন্ট।
    এছাড়া আরেক তাতপর্যপুর্ণ দিক আছে। চীনের উইঘুরে (মানে জিনজিয়াং প্রদেশ যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা) ‘পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামী আন্দোলন’ [East Turkestan Islamic Movement বা সংক্ষেপে ETIM] নামে সশস্ত্র সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে বা রুখতে তালেবানরা চীনকে সাহায্য করবে – চীন এই আশাবাদ রেখেছে। ঐ মিটিং শেষে তালেবান মুখপাত্র মোহাম্মদ নাঈম জানিয়েছেন, ‘তারা চীনকে আশ্বস্ত করেছেন, আফগান-ভূমি চীনের বিরুদ্ধে কাউকে ব্যবহার করতে তারা দেবেন না [“(The) delegation assured China that they will not allow anyone to use Afghan soil against China,” Naeem said. ]।’ তালেবানদের আরেক মিডিয়া মুখপাত্র সুহেল শাহীন অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, চীন আফগানিস্তানের অবকাঠামো পুনর্গঠনের ‘welcome friend’  বা ‘স্বাগত-বন্ধু’;  [Taliban spokesman Suhail Shaheen says the group welcomes Chinese investments in reconstruction and would guarantee the safety of investors and workers]।
    সার কথায়, তালেবানেরা সশস্ত্র এবং অ-দায়িত্বশীল এক রাজনৈতিক শক্তি বলে পশ্চিমে ও বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে যে প্রচার আছে বা খারাপ ইমেজ করে রাখা আছে, একালে সেসব কাটানো ও লঘু করার দিক থেকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এই বৈঠক তালেবানদের অনেক সুবিধা দেবে, ইমেজ বাড়াবে।

    দুই.
    আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony J Blinken] ২৭-২৮ জুলাই ভারত সফর করে গেলেন। এক কথায় বললে এটা ছিল আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যু পরিস্থিতিতে বেদিশা ও একা হয়ে পড়া ভারতকে আশ্বাস দিয়ে পিঠ-চাপড়ে দেয়ার সফর।
    প্রথমত, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদী তাঁর অভ্যন্তরীণ জনগণ, কূটনীতিক, একাডেমিশিয়ান ও মিডিয়াকর্মীদের কাছেই আস্থা একেবারে হারিয়েছেন। তারা লেখা শুরু করে দিয়েছেন, “আফগান প্রশ্নে দিল্লি বন্ধুহীন“। অথবা এখানে দেখেন,  Indian experts are wondering why New Delhi has been sidelined in Afghanistan. ।  আর উল্টা পাকিস্তানের ভেতরে আমেরিকা ও রাশিয়া নিজ নিজ স্বার্থের আশ্রয় খুঁজছে। ওদিকে পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার চীন তো আছেই। জয়েন্ট স্টেটমেন্ট দেখেন এখানে  [Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan]।    মনে করা হচ্ছে, ভারতকে বাইরে রেখে মূলত এই ফ্যাক্টসগুলো মিডিয়ায় প্রচার হয়ে পড়াতে মোদি ভীত হয়ে যান। বিজেপির ধারণা, মোদীর ভারতকে ছাড়িয়ে  পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আগামী যেকোনো ভোটে মোদীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। আর সেটা কাউন্টার করতেই ব্লিঙ্কেনকে এনে যেন দেখিয়ে মোদী সবাইকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন। তবে এর ফল তেমন সুখকর হয়নি।

    এর অনেক কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হল, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার স্বার্থের অনেক মিল থাকলেও কিন্তু অমিল-ভিন্নমতও কম নয়। যেমন – ব্লিঙ্কেনের ফিরে যাওয়ার আগে ভারতে মিডিয়ায় সামনে এসেছিলেন তিনি। ততক্ষণে চীন-তালেবান মিটিংয়ের রিপোর্ট মিডিয়ায় এসে গেছে। তাই, তালেবানের চীন সফরের সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে এর জবাব দিতে গিয়ে ব্লিঙ্কেন প্রকারান্তরে চীনের প্রশংসা করে বসেন।

    Asked about the Taliban visit, U.S. Secretary of State Antony Blinken said in New Delhi that it was a “positive thing” if Beijing was promoting a peaceful resolution to the war and “some kind of (Afghan) government … that’s truly representative and inclusive.”

    বলেন, এই ‘সফরটা ইতিবাচক’। চীন যদি যুদ্ধাবস্থায় এক শান্তিপূর্ণ প্রস্তাব ও আফগানিস্তানে কোনো ধরনের সরকারের কথা বলে যা সত্যিই সবাইকে নিয়ে এবং প্রতিনিধিত্বমূলক তবে তা তো ইতিবাচক”। এখন ব্লিঙ্কেনের পক্ষ থেকে চীনের এই পরোক্ষ প্রশংসা তো মোদীর জন্য হজম করা খুবই মুশকিল। এই হল, আমেরিকা ও ভারতের স্বার্থের বেমিল। ওদিকে ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীর সবচেয়ে বড় অনাস্থা হলো – আফগানিস্তানে যার যার স্বার্থ আছে সে মোতাবেক সংশ্লিষ্ট এমন সবাই ইতোমধ্যে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তালেবানদের সাথে কয়েকবার বৈঠক এবং আলোচনা, বুঝাবুঝি বা সমঝোতা করে নিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইরান মূলত কেউ বাকি নেই এদিক দিয়ে। অথচ ভারত এই পথেই নেই। এটাতে মূলত ভারতের আভ্যন্তরীণ ইন্টেলেজেন্সিয়া  তারা অসন্তুষ্ট ও হতাশ। ভারত কেবল গোপনে একবার তালেবানদের সাথে দেখা করেছে যা আবার প্রকাশ্যে অস্বীকার করে থাকে। আর পাকিস্তান তালেবানদের নাকি ভারতের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করছে বা উসকাচ্ছে বলে ডাহা মিথ্যা এমন প্রপাগান্ডায় ভারত লিপ্ত হয়ে গেছে। অতীতে তালেবানরা কী কী খারাপ কাজ করেছে এর বর্ণনা দিয়ে ভারত এখন প্রচার শুরু করেছে। অথচ ভারতের এক মিডিয়া-মুঘল দা-প্রিন্ট পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্তা লিখেছেন ……

    “Like them or not, Taliban are a reality. India can deal with them if BJP resets its politics…”

    অর্থাৎ তিনি উলটা বিজেপি-আরএসএস কে তালেবান-বাস্তবতা মানতে বলেই থামেন নাই। উলটা পরামর্শ রেখে বলেছেন, মোদীর খোদ নিজেদের রাজনীতিই বদলে নিতে। আসলে একেবারেই কোন সঠিক পলিসিতে মোদীর ভারত নাই বলেই ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীদের প্রধান অনাস্থা। এছাড়া আরো ভেতরের খবর হল, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মুডে আছে।  খবরটা দিয়েছেন আফগানিস্তানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদুত বিবেক কাতজু। লিখেছেন,

    Indian policymakers had looked at the Afghan scene dispassionately especially after the US began talking to the Taliban in Doha in 2018. What is strange is that even after the US-Taliban deal in February 2020, Indian strategists, instead of making up for lost time, continued to ignore emerging realities.
    Stranger still, Kabul-based senior political personalities, who have recently interacted with the Indian leadership, say that India continues to have a “wait and watch” approach. What they are leaving unsaid is that India has become a bystander in Afghanistan, not knowing which way to turn.
    Some analysts are railing against countries which are engaging the Taliban. They believe that these countries will pay a price for not understanding the true nature of the group.

    অর্থাৎ ভারত কোন প্রস্তুতিই নেয়নি তাই নয়। শেষের বাক্যটা বলছে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে।  তাই আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত কোনোই প্রস্তুতি নেয়নি। কারণ ভারতের ধারণা- তালেবানরা পরাজিত হবে, হারিয়ে যাবে। আর বর্তমান সরকারই থাকবে যা আসলে অনিশ্চিত জেনেও ভারত আমেরিকার ভরসায় বসে থাকতেই চায়। কিন্তু সে দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরেই সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে আমেরিকার চাওয়া আর ভারতের চাওয়াও তো এক নয়।

    তবে ব্লিঙ্কেনের এবারের সফর শেষের পর থেকে, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া হুমকি ও আক্রমণ শুরু করেছে। দিল্লি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নতুন মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে বলিয়েছে, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে জানাচ্ছে যে, সারা কাশ্মিরই ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মির ভারতেরই ভূমি – যেটা নাকি পাকিস্তানের দখল করে থাকা। তাই পাকিস্তান-কাশ্মিরের কিছু অংশের ওপর দিয়ে চীন-পাকিস্তানের করিডোর [CPEC] নির্মাণ করা হয়েছে সেটা ‘তথাকথিত’  করিড়োর সহ সব অবৈধ দখল ছেড়ে যেন পাকিস্তান চলে যায় সেই কড়া আহ্বান রেখেছে ভারত [“We call upon Pakistan to vacate all Indian areas under its illegal occupation,” ]।

    একই সাথে তালেবানদের চীনে গিয়ে মিটিং করার বিরুদ্ধে ভারত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে [India Thursday also reacted against Taliban leaders visiting China and meeting the country’s leaders there]। আর সবশেষে, ‘আফগানিস্তানে গায়ের জোরে কোনো সরকার কায়েমের বিরুদ্ধে’ মানে, তালেবানদের কাবুলের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে [“Unilateral imposition of will by any party will not be democratic…..] ভারতের আপত্তির কথা জানিয়েছে। তবে এসব হুঙ্কার মোদীর ভারত মূলত তার অভ্যন্তরীণ জনমত যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনুমান, তাকে ফিরানোর লক্ষ্যের বলা হয়েছে বলে দেখেছেন অনেকে। কিন্তু আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিবেক কাটজু; তিনি খুবই কড়াভাবে মোদি-জয়শঙ্করের নীতি পলিসিকে তুলোধোনা করে হিন্দুস্তান টাইমসে কলাম লিখেছেন।

    তিন.
    এটা হল – গত ২৫ জুলাইয়ে চীন-আমেরিকার নিজস্ব সম্পর্ক প্রসঙ্গে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক। বাইডেন জানুয়ারিতে মার্কিন ক্ষমতায় শপথ নেয়ার পরে মার্চের ১৮-১৯ তারিখে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দু’পক্ষের প্রতিনিধির বৈঠক হয়েছিল যা খুবই তিক্ততা দিয়ে শেষ হয়েছিল। এবারের মিটিংটাকে এক দিক থেকে এরই পরবর্তি ও পাল্টা সফর বলে মনে করছেন অনেকে [Why Tianjin? And what’s in store in China for US envoy Wendy Sherman?]। বিশেষত আগের মিটিংটা হয়েছিল আমেরিকার রাজধানীর বাইরে দেশের উত্তরের আলাস্কা শহরে। আর এবারের আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সাথে বৈঠকটা দেয়া হয়েছিল বেজিংয়ের বাইরে তিয়ানজিং শহরে যেটা আসলে চীনা-আফগান সীমান্তের এক শহর।
    এবারের এই মিটিংয়ের সার কথা ছিল, নিজেদের মধ্যে যত মনোমালিন্যই থাকুক যুদ্ধ তারা কেউ চায় না- এ কথাটা প্রকাশ করে রাখা। যেমন- এই মিটিংয়ের পরে আমেরিকা মিডিয়াকে জানিয়েছে, তাদের সম্পর্ক খুবই ‘টাফ কম্পিটিশনের’[stiff competition]। তবে একই নিঃশ্বাসে তারা জানিয়েছে যে, ‘আমেরিকা চীনের সাথে যুদ্ধ-সঙ্ঘাত চায় না’ [Price said that in her meeting with Wang, Sherman vowed “stiff competition” with China but also stressed that the US “[did] not seek conflict” with Beijing.] এবং আমেরিকা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতেই থাকবে। এর পাল্টা চীন বলেছে, ‘তিনটা জিনিস দেখতে চাই আমরা।’ [three demands with the second-ranking US diplomat: the United States must not challenge or seek to subvert China’s model of governance; it must not interfere in China’s development; and it must not violate China’s sovereignty or harm its territorial integrity.] আমেরিকা আমাদের মডেলের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা বলবে না; চীনা পথের উন্নতি নিয়ে তারা কোনো কথা বলবে না। আর হংকং ও তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। ফলে আমেরিকা যেন চীনের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে, এ নিয়ে মন্তব্য করতে না আসে। তবে উভয়পক্ষই পারস্পরিক ডায়ালগ চালিয়ে যেতে চায় বলে জানায়। এক কথায়, না চাইতে কোনো যুদ্ধের শঙ্কা যেন কোনো পক্ষের মনে কাজ না করে তা আগেই মিটিয়ে রাখার মেসেজ তারা আদান-প্রদান করে রাখল।

                                        ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের  মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি

    কেন এমনটা হল?
    এর কিছুটা হদিস আমরা পাই ভারতের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মনের চরম ক্ষোভ উপচিয়ে প্রকাশ করা বিবৃতি থেকে। এরপর এ নিয়ে ভারতের সামরিক ইন্টেলিজেন্সিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকে। যেমন পারভিন শাওনি [@PravinSawhney] নামে এক সাবেক মেজর যিনি একটা ‘ডিফেন্স ম্যাগাজিন’ চালান ও এর সম্পাদক। তিনি টুইট করে লিখেছেন ‘মোদি একেকটা অর্থহীন মন্তব্য করে  যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার দিকে ভারতকে নিয়ে যাচছে – যা তিনি কখনো জিততেই পারবেন না, আর এই যুদ্ধ তো এড়ানোযোগ্য!’ [With each mindless remark, India is heading towards war – which it cannot win & is avoidable. ] এ ছাড়াও লিখছেন, এটা ‘মোদির দুর্ভাগ্য যে, তার টপ সামরিক জেনারেল রাওয়াত; অগ্রসর সামরিক ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই!’ [Modi’s misfortune is have Rawat as the top military officer who knows nothing about advances in warfare!]

    শেষ দুটা পয়েন্টঃ
    আর একমাস পরে আফগানিস্তানে তালেবানদেরকে আমরা কোন ভুমিকায় দেখব? এর সম্ভাব্য দুটা অবস্থান হতে পারে। গত ২০ বছর ধরে তালিবানেরা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে যা থেকে কী করা যাবে আর কীনা – এসম্পর্কে তারা অনেক ওয়াকেবহাল অবস্থায় এখন তা আমরা অনুমান করতে পারি।।

    আমরা পছন্দ করি আর নাই করি এপর্যন্ত দুনিয়া যে জায়গা পর্যন্ত পথ-পরিক্রম করে এসেছে তাতে গ্লোবাল রাজনীতির কিছু ভ্যালুজ তারা তৈরি ও প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা বলছি না সেগুলা সব আদর্শ অথবা দুনিয়ার সকল জনগোষ্ঠিরই স্বার্থ ও কালচারকে তা প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তালেবানেরা যদি আউট-রাইট সেগুলোর বিরোধিতা করে নিজেদের সব ভ্যালুজ নিয়ে চলতে চায় বা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে এটা আগের মতই ব্যর্থ হবে তা বলাই বাহুল্য। এটা হল কো খেলার নিয়ম বদলানোর মত সমস্যা। আপনি গ্যালারিতে বসে থেকে খেলার নিয়ম বদলাতে পারবেন না। বরং প্রথমত তাদের নিয়মেই খেলতে নামতেই হবে। এরপর খেলতে খেলতে খেলার নিয়ম বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে।

    কাজেই একটা পথ হল তালিবানেরা দুনিয়ায় উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতির নিয়ম – পুরান খেলার নিয়ম মেনেই খেলতে নেমে পড়া। এতে সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হবে দায়ীত্বশীল রাষ্ট্রের আচরণ করা। বড়জোর এর সাথে নিজেদের যেসব ভ্যালুজ আছে কোথাও কোথাও এর প্রদর্শনে নেমে পড়া। তবে  আগে ইমেজ তৈরি এদিকটা খেয়াল রাখতে হবে।
    আর যেকথা মনে রাখতেই হবে তা হল,  যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের সরকারি নানান বাহিনীই কেবল থাকবে। কিন্তু  একই সাথে ঐ দেশ আবার পাশাপাশি কোন সশস্ত্র গ্রুপকেও অপারেট করতে দিতে পারে না।  এক ঘরে দুই পীর হয় না। অথরিটি একজনই বা একটাই হয়।  তবে সাবধান এসব কিছু শুরু হতে পারে আগে দেশে একটা বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল করে নিবার পরেই। কারণ ক্ষমতা দখলের পরেই কেবল একটা কনষ্টিটিউশন আর ওর নানান নিয়ম, আইন-কানুন  তৈরি হতে পারে। এটাই হতে পারে দায়ীত্বশীল পথ। এবার এই পথের সফলতার সম্ভাবনা প্রচুর। প্রধান কারণ  এবার গ্লোবাল রাজনৈতিক শক্তির একটা সফল অংশ তালিবানের পক্ষে আছে।

    অন্যদিকে আরেকটা পথ হল, আগের (১৯৯৬-২০০১) বারের মত করে মাঠে নেমে পড়া। যারা গ্লোবাল ইসলামি রাজনীতির সমর্থক তাদের দৃষ্টিতে  হয়ত এটাই সম্ভবত সঠিক পথ। হতে পারে।  তবে এই পথটা আগের বারের মত আপাতত ব্যর্থ হবে, ছিটকে পড়বে। টিকতে পারবে না। এখন যে যেটা পথ পছন্দ করে সে তো সেই দিকটাকেই সহি পথ বলবে!
    তবু মুলকথাটা হল, আসলে আমরা যে যেই রাজনীতিই কোন দেশে করতে চাই না কেন –  একেবারেই নতুন বা পুরানা ধারা – এসব কিছুর বাইরে  মূল ফ্যাক্টর হল উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতিতে ও শক্তিতে যারা ক্ষমতাবান থাকে তারা আপনাকে কী চোখে দেখবে! আমরা এটা উপেক্ষা করতে পারি না!
    তবু, তালিবানেরা শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নিবে সেটা দেখার অপেক্ষা করতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩১ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “তালেবান ইস্যু ও তিন মিটিং“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপালে প্রধানমন্ত্রীর অলি-যুগ সমাপ্ত

    নেপালে প্রধানমন্ত্রীর অলি-যুগ সমাপ্ত

    গৌতম দাস

    ২৬ জুলাই ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    NC President Deuba meets with UML Chair Oliকে পি অলি ও শের বাহাদুর দিউবা। ছবি সংগৃহীত

    নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ অলি [Khadga Prasad Sharma Oli] বা কে পি অলি  এখন থেকে ‘সাবেক’ প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে  বৈধ-অবৈধ সব ধরণের পথে  নিজের প্রধানমন্ত্রীত্ব ধরে রাখতে চেষ্টা করেও তিনি এবার একেবারে ব্যর্থ হলেন।  গত ২০১৮ সালের প্রথম নেপালি পার্লামেন্টের নির্বাচনে তিনি  এবারের ক্ষমতায় এসেছিলেন।  কিন্তু এবার তার ক্ষমতা চলে গেল সংসদের সিদ্ধান্ত বা তার নিজের পদত্যাগ ইত্যাদি এসবের কোনো কারণে নয়।  তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েই বসে ছিলেন। গত ১২ জুলাই ২০২১, নেপালি সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে তিনি পদচ্যুত হয়েছেন। আর সেই সাথে আদালত নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবাকে গত ১৩ জুলাই বিকাল ৫টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিতে বলেছিলেন। দিউবা শপথ নিয়েছেন। এতে দেড়-দুই বছর ধরে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা নেপাল ও এর সরকার, নেপালি রাজনৈতিক দলগুলো অলির বিরুদ্ধে নানান অসন্তোষ ও অভিযোগ এসব কিছুর অবসান ঘটল। এ সময়ে বারবার অলির বিরুদ্ধে নিজ দল ও বিরোধীদের অভিযোগ ও অসন্তোষ জেগে উঠলেও তিনি বরং যেকোনো উপায়ে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলেও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করে গেছেন। এ সময়ে তিনি  দু-দু’বার ‘সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে’ বলে প্রেসিডেন্টকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন। কিন্তু দু’বারই আদালত এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে দিয়েছেন। তাই আদালতের রায়ে অবৈধ ও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাওয়া অলি এখন রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে। আর এই প্রথম দিউবা সরকার আগামী নির্বাচনের (২০২৩) আগে টানা দেড় বছর আইনগতভাবেই স্থিতিশীল ক্ষমতায় শাসন চালাতে পারবেন বলে নেপালের রাজনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা আশা দেখছেন। কিন্তু কেন এমন হল? ২০১৮ সালে দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে টু-থার্ড মেজরিটিতে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু এখন নেপালি কংগ্রেসই কিছু কমিউনিস্টের সমর্থনে সরকার গড়তে সক্ষম হল কেন?

    এক নেপালি দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্টে শ্যাম শ্রেষ্ঠ নামে এক কমেন্টেটর যিনি বাম রাজনীতির পরিবর্তনগুলোর দিকে চোখ রাখেন তিনি কে পি অলি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে লিখেছেন, ” ২০১৮ সালের নির্বাচনের রায়ে যে ঐতিহাসিক সুযোগ তাদের হাতে এসেছিল, অলি ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার করে তাকে হেলায় হারিয়ে ফেললেন। কারণ অলি এক দাম্ভিক, অর্থহীন একগুঁয়ে আর ইগো বা অহংবোধে আচ্ছন্নব্যক্তিত্ব [“Oli squandered a historic opportunity handed to him by the people because of his arrogance, stubbornness and ego,” । বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্ট শক্ত অবজারভেশন এবং সম্ভবত তা সবচেয়ে সঠিক!

    গত ১৯৯৬ সালের আগে থেকেই অলির পুরনো রাজনৈতিক দল এক ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ বলে পরিচিত। এর নাম কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনাইটেড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, UML)।  আমাদের সিপিবির মত দল হলেও কিন্তু এটা আবার নেপালের সেকালের পরিবেশে মূলত সংসদীয় ভোটে দাঁড়ানো দল। তাও নেপালে রাজতন্ত্রের আমলের (২০০৮ সালের আগের ২৪০ বছরের রাজতন্ত্র) এমন ভোটে দাঁড়ানো দলগুলো হতো রাজার দিকে মুখ চাওয়া দল; যদি রাজা তার দলকে সরকার গঠন করতে ডাকেন বা মন্ত্রিসভায় নেন তবে, সেটা হত তাদের সাফল্য; অর্থাৎ নেপাল তখন নাগরিকের হাতে ক্ষমতার রাষ্ট্র নয়, রাজার মালিকানাধীন এক রাজতান্ত্রিক নেপাল। তাই তাতে ওই সব দলের নামে কমিউনিস্ট শব্দ থাকুক কিংবা কংগ্রেস দল হোক কী-ই-বা আর আসে-যায়। আসা-যাওয়ার কোনো কারণ নেই, এমনই ঠুটা দল ছিল সেগুলো।

    কিন্তু সেকালে নেপালের রাজার সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক-ভারসাম্য এমন থাকলেও তাতে ব্যাপক ফাটল ধরে ও পরিবর্তনের সূচনা করেছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে। কারণ ঐ বছর থেকে আরেক কমিউনিস্ট দল যারা ‘মাওবাদী’ নামেই বেশি পরিচিত; আনুষ্ঠানিক নাম তাদের যাই হোক না কেন, তাদের নাম নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) বা কখনো এদের নাম ছিল নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী-কেন্দ্র)। একে অনেক নাম নিতে হয়েছিল, কারণ কোনো ছোট গ্রুপ মূল দলের ভেতর অঙ্গীভূত হলেই নামের একটু পরিবর্তন করা হয়েছে, এমন।

    এভাবে মূলত মাওবাদীরাই নেপালের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন বা ভারসাম্যে পরিবর্তন এনেছিল। অথচ অন্য সবাই যেখানে আইনি রাজনৈতিক দল, মাওবাদীরা ছিল জন্ম থেকেই সশস্ত্র দল। শুধু তা-ই নয়, এরাই ১৯৯৬ সালে জন্ম নিয়ে দাবি তুলে ছিল যে, নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করে একটি রিপাবলিক মানে “গণপ্রজাতান্ত্রিক নেপাল রাষ্ট্র” কায়েম করতে হবে। এই লক্ষ্য তারা শেষে ২০০৮ সালের জুনে অর্জন করেছিল। তাদের সব রাজনৈতিক দল মিলে জোট এক গণঅভ্যুত্থানে রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।  তারা নেপালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে আর এতে একটি রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতান্ত্রিক নেপাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পথ খুলে যায়। তবে এরই মধ্যে রাজার আমলের পুরনো দলগুলোর সাথে মাওবাদীসহ সবাই ২০০৬ সাল থেকেই আইনি (প্রকাশ্য গণ-আন্দোলনের দল) দল হিসেবে নিজেদের যৌথ অবস্থান প্রকাশ করে নিয়েছিল। এর ভেতর দিয়েই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল-ও ক্রমেই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন।

    কিন্তু তবু একটা ট্র্যাজিডি নেপালের রাজনীতিকে সবসময় অস্থির করে রেখেছে। তা হল আজ পর্যন্ত নেপালের রাষ্ট্র গড়ার কাজে যতটুকু অর্জন বা অগ্রগতি হয়েছে, এতে সবচেয়ে বড় অবদান মাওবাদীদের হলেও এই দলের নির্বাচনী ভাগ্য খুবই খারাপ। নেপালে ২০০৮ ও ২০১৩ সালে দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হয়েছিল। কারণ, প্রথমবার ভারতের প্ররোচনায় ও প্রভাব হস্তক্ষেপে পড়ে প্রতিনিধি সভা নির্ধারিত সময়ে কনস্টিটিউশন প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই নেপালি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তারা দ্বিতীয়বার কনস্টিটিউশন প্রণয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ (২০১৩) পেয়েছিলেন। পরে ২০১৫ সালে কনস্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও গৃহীত হওয়ার ঘোষণা দেয়ায় ভারত প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। পরে ২০১৮ সালেই নেপালের নতুন রিপাবলিকে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এসব নির্বাচনে কখনোই মাওবাদী দল একা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ মানে পঞ্চাশ ভাগের বেশি আসন দখল করতে পারেনি। অথচ নেপাল এত দূর আসতে যত দেশী-বিদেশী বাধা নেপাল পার হয়েছে, তাতে দাহালের ভূমিকা সবার ওপরে, বিশেষ করে অন্য দলগুলোকে সাথে নিয়ে সঙ্কট মোকাবেলার মূল অর্গানাইজার হিসেবে দাহালই ভূমিকা রেখেছেন।

    যেমন রাজা উৎখাতের পরে ২০০৮ সালের প্রথম নির্বাচনে মাওবাদীরা জিতে ২৯.২৩ শতাংশ আসন, যদিও এটা মূল তিনটি দলের মধ্যে একক সর্বোচ্চ। অন্য দুই দল নেপালি কংগ্রেস পেয়েছিল ২১.১৪ শতাংশ আর অলির দল পেয়েছিল ২০.৩৩ শতাংশ; অর্থাৎ মোট ৬০০ আসনের (সেটা প্রতিনিধি সভা ছিল তাই মোট আসন ৬০০) মধ্যে টপ তিনটা দলের আসনসংখ্যা হিসাবে ফল যথাক্রমে মাওবাদী ২০০,  নেপালি কংগ্রেস ১১০ ও অলির দল ১০৩।

    অর্থাৎ নেপালের রাজনীতিতে ২০০৮ সাল থেকেই ভোটের ফলের এই ‘ত্রিভঙ্গ অবস্থা’ মানে, তিন দলের তিন ভাগে বিভক্ত ভোট, কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (বা ৫০% এর বেশি আসন) পায় না  – এ্টা ২০০৮ সাল থেকে আজো একই অবস্থা বজায় থেকেছে; যদিও ২০১৩ সালের দ্বিতীয়বারের কনস্টিটিউশন সভার প্রতিনিধি নির্বাচনে সেবার নেপালের ভোটাররা মাওবাদীদের ওপর শুধু না, সামগ্রিক রাজনীতির ওপর প্রচণ্ড আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। এর প্রতিফলনে ফল হয়েছিল নেপাল কংগ্রেস ১৯৬, অলির দল ১৭৫ আর মাওবাদী হয়ে যায় মাত্র ৮০ আসন।

    নেপালি কংগ্রেস মানে হল ট্র্যাডিশিনাল ও বয়স্কদের দল; তুলনায় মাওবাদীরা তরুণ ও বিপ্লবীদের সমর্থক ভোটারদের দল; এভাবে হয়তো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ভারতের প্ররোচনায় প্রথমবারের প্রতিনিধি সভা নির্ধারিত সময়ে কনস্টিটিউশন প্রণয়নে ব্যর্থ হওয়ায় মানে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়ার পরও নিজ রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ে নিতে ব্যর্থতা দেখে তারা প্রচণ্ড হতাশ হয়ে যায় তরুণেরা এরই প্রতিফলন ছিল ২০১৩ সালে ফল। কিন্তু তিন দলের কেউই যে একাই পঞ্চাশ ভাগের বেশি আসন পার হতে পারেনি, সেই ধারা ২০০৮ সালের মতো এখনো বজায় আছে।
    তবে সেবার অন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক ছিল। তা হলো দাহালের উদ্যোগে ২০১৩ সালে এই তিন দল শপথ নেয় যে, একটা কনস্টিটিউশন প্রণয়নের কাজ শেষ করা অবধি তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে; ভারতের দিকে তাকাবেও না; যোগাযোগ সম্পর্ক করবে না। এর ফলেই ভারতকে চরমভাবে পরাস্ত করে এই তিন দল (যারা একত্রে ৭৫ ভাগ আসনধারী) ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়। এটা ছিল ভারতকে পালটা জবাব দেয়া বা প্রকাশ্য বিরোধিতা ও উপেক্ষা। কারণ নেপালের এই কনস্টিটিউশন প্রণয়ন কেমন হবে তা নিয়ে ভারত দাবি, শর্ত বা চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে ভারতের সাথে নেপালের সমতলী সীমান্ত এলাকার ‘মাধোসি ও তরাই অঞ্চলের’ মুখপাত্র সাজতে চাইছিল ভারত।

    কিন্তু নেপালের কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা ভারত ঠেকাতে না পেরে শেষে ল্যান্ডলকড নেপালে যেখানে বাইরের পণ্য প্রবেশ করতে গেলে ভারতের অনুমতি ও সহযোগিতা লাগে- এরই ফিজিক্যাল বাধা তৈরি করে ভারত। তারা স্থলবন্দর বন্ধ করে দেয়। ফলে জ্বালানি তেল বা রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ যা ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে সরবরাহ করতে চুক্তিবদ্ধ ছিল, সেসবের যেকোনো পণ্যবাহী ট্রাক অবরোধ করে রাখে ভারত।

    এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়ায় নেপালের রাজনীতিক সমাজে এক ব্যাপক পোলারাইজেশন ঘটে গিয়েছিল। দল নির্বিশেষে নেপালের নাগরিকমাত্রই ভারতবিরোধী হয়ে ওঠে। এমনকি নেপালি কংগ্রেসও যাকে সবচেয়ে ভারতঘেঁষা মনে করা হয়, সেও। বাস্তবে কথাটা এমন হয়ে যায় যে, কারো বাসায় রান্না হয়নি মূলত ভারতের কারণে। কারণ ভারতীয় গ্যাস বন্ধ। যেখানে নারীদের দুর্দশা সবার উপরে। কারণ পরিবেশ রক্ষার চাপে থেকে পাহাড়ের পাতা বা কাঠ টোকানি জ্বালানিতে রান্না তাদের বহু আগেই ত্যাগ করতে হয়েছিল। আর তারা অভ্যস্ত হয়েছিল ভারতীয় সিলিন্ডার গ্যাসে। অথচ তখনকার ভারতীয় অবরোধের দিনে চাইলেই আবার সে কাঠ টোকানি আর চুলার দিনে ফেরত যাওয়া খুবই কঠিন প্রায় অসম্ভব।

    এ দিকে সে সময় কনস্টিটিউশন চালুর পরে নেপালে তিন দলীয় বোঝাবুঝি অনুসারে, সরকার গড়ার পালা এসেছিল অলির দলের। তিনি ক্ষমতায় এসেই ভারতবিরোধী প্রবল সেন্টিমেন্ট সফল ব্যবহারকারী হয়ে ওঠেন আর এতে নিজের দলের সাংগঠনিক ভিত্তি বাড়িয়ে নেন। এই একটা ক্ষেত্রে অলি আনপ্যারালাল এ তিনি পাবলিক সেন্টিমেন্ট তৈরি বা সেতা কাজে লাগানো ভাল পারেন। তাই সেসময়  হয়ে ওঠেন ভারতবিরোধী জনতার কণ্ঠস্বর। আর তিন দলই সিদ্ধান্ত নেয় এই প্রথম চীনের সাথে নেপালের যোগাযোগ সম্পর্কের। কারণ অন্তত জ্বালানিসহ পণ্য আমদানির বিকল্প উৎস নেপালের লাগবেই।

    এভাবে ছয় মাস টানা অবরোধের পরে ভারত, ওদিকে চীনের আগমন মানে যোগাযোগ সম্পর্কে টের পেয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু তত দিনে চীন নেপালে প্রবেশ সম্পন্ন করে ফেলেছিল। তখন থেকেই এক নতুন নেপাল : এখান থেকেই নেপাল একেবারেই বদলে যায়; যাকে বলা যায় নেপালের একেবারেই ভারতের হাতের বাইরে চলে যাওয়া। আর বিপরীতে চীনের প্রভাব দ্রুত বেড়েই চলে, অথচ ভারত নিজের পায়ে কুড়াল না মারলে এমন হতো না।  আর এতে চীন শুধু পণ্য সাপ্লাইয়ের বিকল্প প্রধান উৎসই নয়। এমনকি বিভিন্ন অবকাঠামোর বিনিয়োগদাতা অবশ্যই। চীনের নিজের সড়ক হাইওয়ে বা হাইস্পিড ট্রেন লাইনের সাথে (কাঠমান্ডু পর্যন্ত) প্রায় শত কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ ও নতুন রেল পেতে দিয়ে নেপালকেও চীনের নিজের অবকাঠামোর সুবিধার হাত বাড়িয়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়।

    তত দিনে চীন নেপালের ক্ষমতাসীন ও বাইরের দুই কমিউনিস্টদের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। তাই কনস্টিটিউশন চালু হওয়ার পরের ২০১৮ সালের প্রথম  সংসদীয় নির্বাচন লড়তে দুই কমিউনিস্ট দল একদল হয়ে গিয়ে লড়ুক,  তাদেরকে এ’পরামর্শ দিয়েছিল চীন। আপাত সেই ফল হয় সকলের জন্য যাকে বলে “বলতি বন্ধ” মানে বিরোধী সকলেই আর নিজের কোন সম্ভাবনা নাই যেন তা ধরে নিয়েছিল। যৌথ দু’দল দু-তৃতীয়াংশ আসনে ঐ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। দল দুটো এক হওয়ার প্রক্রিয়ার শুরু ঘোষণা দিয়ে (আইনগতভাবে একদল না হয়েই) ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ফলে আইনত ওটা নির্বাচনী জোটের বিজয় ছিল। দাহাল ও অলির দল দুটোর [UML-CPN] বছর খানেকের মধ্যে এক দল হয়ে যায়। ততদিনে তাদের সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কেপি অলি আগের মতই নতুন সরকারেরও প্রধানমন্ত্রীই থেকে যান। তবে কথা ছিল পুরানা দুই অংশের প্রধানেরা একজন দলীয় সভাপতি হলে অন্যজন প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু অলি সেটা কখনোই বাস্তবায়ন করতে রাজি হননি, নানা অজুহাতে।

    এ ব্যাপারে অলির ট্র্যাক রেকর্ড খুবই খারাপ। তিনি কারো সাথে চলা, ক্ষমতা শেয়ার করা, সিদ্ধান্ত শেয়ার ইত্যাদি এসব কোনো কিছু করতেই অভ্যস্ত বা আগ্রহী নন। তাই বিরোধ বাড়তে থাকে। তবে এসবের জন্য অলিই যে মুখ্যত দায়ী এর এক বিরাট প্রমাণ আছে।  দুইদল এক হয়ে চলতে শুরু করায় দেখা গেল যারা অলির অংশের অলি ছাড়া অন্যান্য নেতা ছিল তাঁরা খুবই সহজে অপর অংশ মানে দাহালের অনুসারিদের সাথে মিলে দাহালের সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলে। আসলে এরা যখন অলির সাথে এক দলে ছিল তখন থেকে এরা অলির একচেটিয়া নেতাগিরিতে চরম বিক্ষুব্ধ ছিল। একারণে মাধব কুমার নেপাল, ঝালানাথ খানাল, বামদেব গৌতম, নারায়ন কাজি শ্রেষ্ঠ প্রমুখ নেতারা (এরা দুই পক্ষের নেতা হলেও) এখন মিলে মিশে দাহালের অনুসারি হয়ে আছেন। আর বিপরীতে অলি এখন একা। অথচ যেমন এই মাধব কুমার নেপাল ছিলেন অলির অংশে দলের ১৫ বছরের সাধারণ সম্পাদক, দুবছরের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু অলির স্বভাব হল তার একার সিদ্ধান্ত সবাইকে মানতে বাধ্য করা। ফলে কোন দলীয় ফোরাম, সেখানে আলোচনা ইত্যাদি যেন তার অভিধানে নাই।

    কিন্তু  একদিকে দলের ভিতর সংঘাত যতই বাড়ছিল ততই চীনের পরামর্শও জোরদার হচ্ছিল  যেন কোনো সঙ্ঘাত বা বিরোধ না করতে। এজন্য দাহালেরা দুবার অলিওকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সবাবার উদ্যোগ  নিয়েও পিছিয়ে এসেছিলেন। আসলে চীন উদ্বিগ্ন ছিল অলি দলে একঘরে হয়ে দল ভেঙ্গে গেলে কী হবে কেবল সেদিকে।  অথচ কেউই যে তার সাথে দল করতে  বা দলে থাকতে পারবে বা এদিকটাকে খাটো করে দেখছিল।  অর্থাৎ শুরু থেকেই এটাই ছিল বিরাট সমস্যা। ফলে বড় জোড় দুই দল মিলে একটা জোট করতে পারত হয়ত যেটা অবস্থা বুঝে যারা একদল হতে চায় তারা অবস্থা ভাল বুঝলে যেন তা হতে পারে এজন্য অপেক্ষা করতে পারত।

    খুব সম্ভবত চীনের অনুমিত কমিউনিস্ট পার্টি বলতে  নিজের অভিজ্ঞতা, আর সেটা দিয়ে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিকে চাওয়া থাকতে পারে। তাই এখন যা হল, সেটা চীনের পরামর্শে ২০১৮ সালের বিজয়ের পরে শুরু হওয়া বিরোধটাকে টেনে আজ প্রায় তৃতীয় বছরে টেনে শেষ করা হল। তবে এত লম্বা টানাটানি যে অর্থহীন ছিল তা হয়তো চীন এখন স্বীকার করবে। আর তা ছাড়া নেপালে দুই কমিউনিস্ট দলের এক না হতে পারার বিরোধে চীনের সংশ্লিষ্টতা (চীনের দলের লোক এসে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে অথবা চীনা রাষ্ট্রদুত নেপালের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে খারাপ দেখায় এমন দীর্ঘ সময় বৈঠক করেছে কারণ, প্রেসিডেন্ট অলির দলের অনুসারি, এসব ঘটছিল) বিরাট দৃষ্টিকটুভাবে হাজির হতে শুরু করেছিল, যা চীনের পক্ষে যায়নি।

    সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী অলি নিজ দলকে (তত দিনে তা এক দল) অমান্য করেই বেপরোয়া হয়ে এককভাবে ক্ষমতায় ছিলেন,  [His unilateral style of running] । কিন্তু একা সব সিদ্ধান্তে চলা ব্যক্তিত্ব অলির সাথে থাকা তার দলের লোকজন তত দিনে তাকে ছেড়ে দাহালের পক্ষে চলে যায়। একপর্যায়ে অলি নিজের ক্ষমতার বিপদ বুঝে এবার এতদিনের প্রবল ভারতবিরোধী অলি ভারতের দ্বারস্থ হন। ভারতের ‘র’-এর প্রধানকে প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে দাওয়াত করে এনে সারা দিন মিটিং করেন। উদ্দেশ্য ছিল, নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে নতুন সরকার গড়া। কিন্তু তত দিনে কংগ্রেস দলের ভেতরেও উপদল থাকায় তা তত জমে ওঠেনি। বরং কমিউনিস্টদের যে অংশ নেপালি কংগ্রেসকে সমর্থন করবে, তাদের সাথেই তারা সরকার গঠন করবে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। কিন্তু বহু সংসদ সদস্য কেনাবেচা, এমনকি  অধ্যাদেশ জারি করে কনস্টিটিউশন বদলে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রাখার চেষ্টা- এসব কিছুর শেষে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট অলির এসব তৎপরতাকে অবৈধ বলে ঘোষণা দেয়ার পর এবার নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবা গত ১৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পথ খুলে যায় এবং তিনি এখন নেপালের প্রধানমন্ত্রী।

    অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কে পি অলির রাজনৈতিক জীবন এরপর আর কোন গুরুত্ব কিছু থাকবে না। এদিকে জোর করে রাজনৈতিক ঐক্য হবে না; টিকবে না। তাতে সেটা আপনার জন্য যত দরকারিই অনুভব হোক না কেন! নেপালে কমিউনিস্ট দলদুটোর ঐক্যে থাকার পক্ষে চীনের অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে ফেলা যে অপ্রয়োজনীয় ছিল, অনুমান করি চীন তা এখন অনুভব করবে ও শিক্ষা নেবে। দুনিয়ায় কারো জন্য কোন কিছু ঠেকে থাকে না। অলির জন্যও নয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৪ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “নেপালে প্রধানমন্ত্রী অলির যুগ শেষ“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    গৌতম দাস

    ১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3E6

    …a bilateral meeting in the Uzbek capital of Tashkent on the sideline. PICTURE SOURCE

    [সার সংক্ষেপঃ  দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে এক “ও-সার্কেল” তৈরি করে এবার সম্ভবত ঘিরে বসতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে চীন। আর একাজে পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে চীন সবচেয়ে কাছে পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে।  আর এর প্রতিক্রিয়ায়, গ্লোবাল  সম্ভাব্য ঘটনার কেন্দ্র ‘সাউথ চায়না সি’ নয়, বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠার সম্ভাবনা বেড়ে গেল!   এতে আমাদের আঙিনা কী যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠবে?  সেটা যাই হোক, ঘটনা যুদ্ধের দিকে যদি যায়ও সেই সম্ভাব্য যুদ্ধ হতে পারে  – ১। যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে কারো পলায়ন, ২। বলল যুদ্ধ করবে কিন্তু পৌছে গেল সবচেয়ে বড় এক আপোষে এমন হতে পারে ৩। অথবা বোকার মত যুদ্ধ কী তা বুঝাবুঝির আগেই সত্যিকার যুদ্ধ লাগিয়ে ফেলল। ৪। যুদ্ধের প্রশ্নে বাইডেন নিজেকে  ট্রাম্পের চেয়েও  যেন  নাদান প্রমাণ করতেই চাইছে।  হয়ত সেকারণেই  জাপান বাইডেনকে  ভুলপাঠ করেই পা ফেলছে। এভাবেই “বোকার যুদ্ধটা” অপ্রস্তুতে হঠাত শুরু হয়ে যেতেও পারে।
    আমার এই কথাগুলো বুঝবার সবচেয়ে ভাল তুল্য আর প্রতীকী ইঙ্গিত হল  – টিকা! মানে আগামি মাসের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নুন্যতম দুই কোটি টিকার সংগ্রহ পেতে যাচ্ছে সেদিকে তাকালেই বুঝা যাবে!]

    তাসখন্দ থেকে ঘটনা শুরু হচ্ছে কেনঃ
    মধ্য এশিয়ায় দেশ উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ। এই তাসখন্দে গত ১৫-১৬ জুলাই এক বিশাল সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সম্মেলনের নেপথ্যে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সামনে তাসখন্দ; যারা চেয়েছিল এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরিবর্তনকে সামনে রেখে একটা আঞ্চলিক সম্মেলন। ‘মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া : আঞ্চলিক যোগাযোগ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন গত বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে, এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আর বাংলাদেশ, ভারত, রাশিয়া ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আর ইইউ প্রতিনিধি মিলিয়ে [According to EURACTIV, the EU foreign affairs chief Josep Borrell will lead a strong delegation.] প্রায় ৪০ দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়ে ছিলেন। আমেরিকার নিচু লেভেলের প্রতিনিধিও এতে উপস্থিত ছিলেন [US representatives at a lower level]। কিন্তু মিটিংয়ের আসল গুরুত্ব অন্তত আমাদের দিক থেকে তা সরে যায় অন্য দিকে –  তাসখন্দ-এর মূল বৈঠক ফেলে ওর সাইডলাইন বৈঠকে।

    কিন্তু  মূল বৈঠক নয়, সাইড লাইনের আলাপই যেন মুখ্যঃ
    কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে দেশের মিডিয়ায় যা হেডলাইন সে দিক তাকিয়ে যদি বলি তা হল – ঐ সম্মেলনের সাইড লাইনে ছিল আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে একই দিনে বৈঠকের খবর। যেমন কেউ শিরোনাম করেছেন,  “একই দিনে ভারত-চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে মোমেন”।
    সাইড লাইনের আলাপই মুখ্য – এমন হওয়ার পেছনে অন্য কারণও ছিল। যেমন, কয়েক দিন ধরে দেশে আরেকটা খবর খুব আলোচ্য হয়ে উঠেছিল। বাংলা ভয়েজ অফ আমেরিকায় ছাপানো এক রিপোর্ট  – “বিকল্প সার্ক গঠন করতে উৎসাহী চীন” অথবা টাইমস অব ইন্ডিয়ার তাদের ঈর্ষায় চোখ টাটানো ও আক্ষেপ করা নিউজ : “চীনা-সাউথ এশিয়ান টিকা কূটনীতির জোটের পরে চীন এখন  দারিদ্র্য দূরীকরণের ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ আনতে চায় [After vaxplomacy in Indian neighborhood, China now brings in development Centre]”। উপরের এ’দুই রিপোর্টে এরা আকার-ইঙ্গিতে বলেছে যে, চীনের নেতৃত্বে ভারতকে বাদ রেখে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানকে নিয়ে এ’জোট [এক ছয় দেশীয় জোট] হতে যাচ্ছে, যাকে কেউ এটাকে চীনের “উন্নয়ন সেন্টার” গঠন করা বলছেন।

    কোন বাণিজ্য জোট সফল হবার কিছু সুত্রঃ 
    এমনিতে বিভিন্ন সময় দুনিয়াতে নানান আঞ্চলিক জোট গঠন হতে আমরা দেখে থাকি। সেসবের মধ্যে বাস্তবে খুবই সক্রিয় ও সচল হতে দেখা যায় অল্প কিছু উদ্যোগকেই; বিশেষ করে যেখানে কিছু গঠন-শর্ত মেনে চলা হয়। যেমন জোটে একটা বড় অর্থনীতির দেশ, সাথে অন্যান্যদেরকে যার একটা ভালই বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা থাকে – অন্তত এমন একটা দেশ থাকতে হয়। আর আগাম মেনে নিতে হয় যে,  সদস্য দেশগুলো এ’জোটে যোগ দিবে তখনই, যখন ছোট-বড় সদস্য  প্রত্যেকেরই বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটি খেয়াল রেখে তা সাজানো হবে। আর এমনটা বাস্তব করতে পারার কমন ফর্মুলা হল – বড় অর্থনীতির দেশ বলতে ধরা যাক চীন, যার অন্যকে শেয়ার দেয়ার মতো নিজের বড় বাজার (জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি) আছে আর সাথে আছে অন্যকে বিপুল বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা; অবকাঠামো আর ‘ডাইরেক্ট বিদেশী [FDI] শিল্প বিনিয়োগ’- দু’টাই। ফলে শুরুতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছোট অর্থনীতির সদস্য দেশগুলো মুখ্যত চীনে রফতানির সুযোগ পাবে, সাথে চীনা বিনিয়োগও পাবে। এতে পরের দিকে ক্রমেই হাই-এন্ড বা হাইটেকের পণ্য চীন থেকে আমদানি আর লো-এন্ড বা লো-টেক পণ্য চীনে রফতানি এই ভিত্তিতে ওই জোটের মধ্যে খুবই সক্রিয় একটি উভয়মুখী বাণিজ্য চালু হতে দেখা যেতে পারে।

    এসব পরিকল্পনামাফিক চললে, মূলকথা- সবারই এতে কিছু লাভের দিক থাকতে হবে, যে দিকটা গুরুত্বপুর্ণভাবে খেয়াল রাখতে হবে; মানে সুযোগ পেলে অল্পতেই অন্যের বিরুদ্ধে ‘লোভী’ হয়ে ওঠা যাবে না; লং টার্ম ভাবতে হবে। চীনারা এটাকেই “উইন-উইন” সিচুয়েশন বলে বুঝায়ে থাকে। আর তা হলেই এটা মূলত এক গ্লোবাল বাণিজ্যের আঞ্চলিক রূপ বা ভার্সন হয়ে উঠতে পারে। ফলে এখানে অন্যকে বাজার যেমন ছাড়তে হবে, তেমনি আবার অন্যের বাজারে ঢোকার সুযোগও নেয়া যাবে। এককথায় সবাইকেই নিজ নিজ বাজার অন্যের সাথে শেয়ার করতে রেডি থাকতে হবে। তাই নিয়মিত নিজেদের মধ্যে  প্রচুর কথা বলতে হবে, বলার ব্যবস্থা রাখতে হবে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতার নানান টেকনিক্যাল কমিটি ও উপযুক্ত প্রফেশনাল লোকজন থাকতে হবে, যাতে সদস্য-দেশ দুইয়ের পরস্পরের সংঘাতপুর্ণ স্বার্থ উদয় হলে এর  সুবিধা-অসুবিধার সমাধান করে দেয়ার রাস্তা বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কোনোভাবে কোথাও একপক্ষীয় লাভের কথা ভেবে থাকলে এমন জোট দাঁড়াবেই না। আর বলাবাহুল্য, “জাতিবাদী রক্ষণশীল” অর্থনীতির কোনো দেশ এর সদস্য থাকতে পারবে না।  মনে রাখতে হবে  জাতিবাদী অর্থনীতি আর (আঞ্চলিক বা গ্লোবাল) বাণিজ্য জোটের ধারণা পরস্পরবিরোধী।  মানে “আমার দেশ যা যা পণ্য ভোগ-ব্যবহার করে এমন সব ভোগ্যপণ্য আমি নিজেই উৎপাদন করে নিব” অথবা “বিদেশী পণ্য হারাম” ধরনের জাতবাদী চিন্তা এখানে মনের গোপনে পুষে রাখাও নিষিদ্ধ। বরং বাজার দিব আর বাজার নিব এটাই হবে এর নীতি।

    গ্লোবাল বা আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে জাতিবাদি অর্থনীতি অচলঃ
    ভারত অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী এমন পুরনো চিন্তার এক কট্টর জাতিবাদী দেশ। জাতিবাদ মানে যেমন হিন্দুত্ববাদ দিয়ে রাজনীতি করা খুব  আরামের।  এতে মানুষের সেন্টিমেন্ট আবেগকে কচলিয়ে উন্মত্ত করে তার ভোটটা নিজের বাক্সে ঢুকানো যায় বলে  জাতিবাদ ক্ষতিকর তা বুঝলেও কেউ ছাড়তে চায় না। হিন্দুত্ববাদ ধরনের সব  ধর্মীয় জাতিবাদের এত ছড়াছড়ি একারণে।  আসলে একারণেই  সব জাতিবাদী চিন্তাই বলতে চায়, “আমি কোনো বাণিজ্য জোটে বিশ্বাসী নই”। কিন্তু আবার ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারও বেশ বড় (১৩০ কোটির), তাই ভারত নিজের এই ১৩০ কোটির বাজারের লোভ দেখিয়ে সে কোন বাণিজ্য জোটের ভিতর দামি ও আকর্ষণীয় সদস্য হয়ে ঢুকতে চেয়ে থাকে। আর ভেতরে ঢুকে সে চেষ্টা করতে থাকে কেবল অন্যদের থেকে বাজার সুবিধা নিয়ে চলবে – এই হল ভারতের আদিম খাসলত। এ’কারণে ভারত যে জোটে থাকে সে জোট ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হবেই। এর বিপরীতে এখনকার চীন বিকশিত বলে এর অন্যকে দেয়ার মতো সুবিধা ও সক্ষমতা বেশি।  কিন্তু সাবধান, এটাকে চীন ভাল আর ভারত খারাপ  বলে চালায় দেয়া বিরাট ভুল হবে।  এমনকি  চীনের উদারতা বলে বুঝাও ভুল হবে, বরং এটা চীনের অর্থনীতির শক্তি ও সক্ষমতা  এখন হয়েছে তাই সে দিতে পারে – এভাবে অবজেকটিভ ভাবে বুঝতে হবে। কালকে চীন এমন নাও থাকতে পারে। চীন মানেই সে ভাল দেশ – এটা খুবই ভিত্তিহীন ও ভুল পদ্ধতির চিন্তা।  চীনের অর্থনীতির উত্থানটা এখন এই লেভেলে উঠেছে যে ওর পক্ষে এখন অন্য পার্টনারদের দিকেও তাকালেই সেটাই হবে চীনের সমৃদ্ধির সঠিক পথ। তাই সে অবলীলায় আমাদের মত দেশকে বাজার ছাড় দিতে পারে, বিনিয়োগও দিতে পারে।

    এছাড়া আরেক নতুন আইডিয়া, ভ্যালু-অ্যাডিশন শেয়ার প্রডাক্টও – মানে জোটের সব সদস্যই একটা পণ্য উতপাদনে কিছু না কিছু শ্রম জোগাবে – এমন শেয়ার করা ভ্যালু বা শ্রমে উৎপাদিত পণ্য- এমন উৎপাদন সম্পর্কও চালু করতে চীন সক্ষম। আর চীনের সে অফারের সুবিধা নিয়ে সবাই বাজারে প্রবেশ করতে চাইলে তাতে চীনসহ সবারই লাভ বলে তা দিতে আগ্রহী হয়। RECP  সে ধরণের এক জোট।

    টাইমস অব ইন্ডিয়া তার রিপোর্টে – চীনের বর্তমান এই  ছয়-দেশীয় জোট বা ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ গঠনের ব্যাপারটাকে  মুখস্তের মত পাল্টা  – ‘ভারতের সবই ভাল বা আমরাই শ্রেষ্ঠ বা আমরা বিরাট কিছু’- টাইপের মন্তব্য ঢুকিয়েছে তাদের রিপোর্টে। যেমন সে লিখেছে “এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য [to challenge ‘Indian dominance’ in the region] আছে”। চীন সেটা নষ্ট করতেই এ’কাজে এসেছে। এ’ছাড়া আরো বলেছে, ভারত এই ছয় দেশের সবার সাথে আগে থেকেই ‘টপ উন্নয়ন পার্টনার হয়েই আছে’ [However, India remains top development partner for Bangladesh, Bhutan, Nepal and Sri Lanka and has extended grants and soft loans for various projects……] ফলে ভারত তাদেরকে ‘বিপুল অনুদান’ তো বটেই সাথে অবকাঠামো ‘সফট লোনও’ নাকি দিয়ে থাকে।  তা থাক। আসলে এরা এমনই স্বপ্নের পোলাও খাওয়া লোক, এরা খেতে থাকুক অসুবিধা কী!

    কিন্তু বাস্তবত ভারতের না নিজ বাজার ছাড় দেয়ার সক্ষমতা আছে, না পার্টনারদেরকে অবকাঠামো ঋণ বা বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা। বরং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারত আমেরিকার কোলে চড়ে বসে ওয়্যার অন টেররের উছিলায় আর সর্বোপরি, আমেরিকার ‘চায়না ঠেকানো’ ঠিকা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। কব্জায় নিয়েছে। আমেরিকা  ১/১১ এ আমাদেরকে দখলে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল, তাই। এটা ভারতের নিজের কোন ক্রেডিট নয়, তার অর্থনীতির কোন উন্নতি বা সক্ষমতা বেড়ে যাবার কারণে ভারত আমাদেরকে এমন কব্জায় নিতে পারে নাই। আর এই সুযোগে সে বিনা পয়সায় বাংলাদেশ থেকে সমস্ত করিডোর  সুবিধা নিয়ে তা ভোগ করা শুরু করেছে। ‘সমস্ত করিডোর’ বলতে মাটির নিচে পাইপ লাইনে, মাটির উপরে সড়কপথে, আকাশে ও পানিপথ ও বন্দরে, সব কিছুতে এবং তা বিনা পয়সায়। এই হলো বাস্তবতা।

    তবে এবারের এক কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’য়ে সে যে কী পরিমাণে অক্ষম ও উদাম, তা  একেবারে উন্মোচিত হয়ে গেছে। নিজ মানুষদের সবার জন্য টিকা উৎপাদন ক্ষমতাই যার নাই, বা টিকা কিনবার অর্থের সংস্থান ক্ষমতা নেই, সে বাংলাদেশেসহ সারা দক্ষিণ এশিয়ায় টিকা সরবরাহকারী টিকা কূটনীতিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আর নিজের  সক্ষম দাবি করে এসেছে। আর এখন খোদ আমেরিকার কাছে ভিক্ষার  হাত পেতেছে।  গত দুমাসেই জয়শঙ্করের প্রায় সপ্তাহবাপী আমেরিকার সফর থেকে নিট লাভালাভ হল – ভিক্ষা অনুদানে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের ফ্রি টিকা ও স্বাস্থ্য উপকরণ লাভ করেছে ভারত।

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার বাংলাদেশবিরোধী রিপোর্ট নিয়মিত লিখে চলেছেন এর রিপোর্টার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি নাকি ওই পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর, এটা তার দাবি। যদিও তার লেখার কোয়ালিটি তা বলে না। যা হোক, এর আগে তখনো  বেক্সিমকো কোম্পানির প্ররোচনা প্রলোভনে পা দিয়ে ভারতে উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কেনার কমিশনের লোভ  সরকারকে দেখানো শুরু হয়নি – কিন্তু সেসময় আমরা চীনা টিকার তৃতীয় পর্যায়ের টেস্টে অংশগ্রহণের অফার পেয়েছি আর ঐ টেস্ট সফল হলে যার বিনিময়ে আমরা নিজেরাও টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স পাবো। সে সময় এই দীপাঞ্জন লিখেছিলেন ‘চীন বাংলাদেশকে গিনিপিগ বানাতে চায় বলে ওই টিকা নিয়ে আসছে [China in a startling move plans to use the population of Bangladesh as ‘guinea pigs’ to conduct Phase III trials of its Covid vaccine.]।’ অথচ এর কোন প্রমাণ বা কেন তিনি গিনিপিগ বলছেন এর কোন সাফাই দেন নাই। আসলে  টিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম দুই পর্যায় হল ওর আসল পরীক্ষা। ঐ দু’টা পার হওয়ার পরই মাস পাবলিকের উপর র‌্যানডম ব্যবহার বা গ্রহণকারীদের ওপর এর প্রয়োগ প্রতিক্রিয়া জানার ও প্রয়োজনীয় কারেকশনের জন্য তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার স্তরে যাওয়া হয়। অর্থাৎ তথ্য-প্রমাণ কিছু না হাজির করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করাই দীপাঞ্জনদের ‘যোগ্যতা’, যেটা জার্নালিজমই নয়। অথচ তারা সে কাজই করে চলেছেন।

    তবুও চীন ঠিক কী করতে চায় তা অনেক অস্পষ্টঃ
    গত এপ্রিলে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশ– বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তান আর সাথে চীনসহ মোট ছয়টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই প্রথম এই জোট গঠনের ধারণাটি তুলে ধরেন।
    From REUTERS news:
    – China hosts video-conference with 5 South Asian nations
    – India was invited to meet, China says, but didn’t attend
    – India-China tensions high over Himalayan border dispute

    এটা সেই সময়, বিশেষ করে ভারত যখন টাকা নিয়েও আমাদের দেশের পাওনা টিকা দেয়া বন্ধ করে দিল আর অতিকষ্টে হাসিনা সরকার ফিরে চীনকে আমাদের টিকা সরবরাহের উৎস হতে রাজি করাতে পেরেছিল তখনই চীন এই জোটের ধারণাটা হাজির করেছিল। বলেছিল, চীন দক্ষিণ এশিয়ায় একটি কমন টিকা স্টোরেজ গঠন করতে চায়, যেখান থেকে এ অঞ্চলে সবাই টিকা সংগ্রহ করতে পারবে। তাই আরো এগিয়ে পরে গত এপ্রিলে একে জোটের ধারণা দেয় চীন। এখন সেই ধারণাকে আরেকটু বিস্তার করে বলা হয়েছে, ‘চায়না-সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিজ প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন অ্যান্ড কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ (China-South Asian Countries Poverty Alleviation and Co-operative Development Center) তারা গড়তে চায়।

    কিন্তু এই নামের মধ্যেই – এখানে তিনটি শব্দ আছে – প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ আর, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার;  আর এই তিন শব্দ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটার যে বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত করেছে; তাতে এটা আর যে কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই-ই এটা বলছে। যদিও মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলা-ভোয়া-তে প্রথম বাক্যে লিখেছেন এভাবে, “অবিকল সার্ক নয়। তবে এর আদলে ‘বিকল্প সার্ক’ গঠন করতে যাচ্ছে চীন। এতে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থাকবে”। তাঁর এসব কথার সাথে চীনের কথার বা প্রতিষ্ঠানটার নামেরই মিল নাই।

    কারণ ওই তিন শব্দের মাঝের “কো-অপারেটিভ” শব্দটা যদি ধরি  – এটা এক আদি কমিউনিস্টদের শব্দ; তবে চীন এটা কমিউনিস্ট হিসাবে আনে নাই। এনেছে সম্ভবত ‘সদস্যদের সবার’ বা চীনের একার স্বার্থের এই সংগঠন নয়, এটা সকলের, সবাই সহযোগিতায় বুঝাতে কো-অপারেটিভ বা সমবায়িক শব্দটা এনেছে। কিন্তু এটি খুবই অপ্রয়োজনীয়। ঠিক যে কারণে কিছু রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোটের নামে সাথে দুনিয়ার কোথাও কো-অপারেটিভ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, হয় না।  বিভিন্ন  স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানেই যেখানে সবাই সমান মর্যাদার, সে কারণে এখানে আর কো-অপারেটিভ  – খুবই বেমানান ও অপ্রয়োজনীয় শব্দ।

    ওদিকে বাকি যে দুই শব্দ “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” (দারিদ্র্য দূরীকরণ) ও “ডেভেলপমেন্ট সেন্টার” – এ দুই শব্দ নিজেই পরিষ্কার বলছে এরা  উন্নয়নবাচক বা সম্পর্কিত ধারণা। কিন্তু “উন্নয়ন” মানে কী?

    উন্নয়ন বা ইংরেজিতে ডেভেলপমেন্ট – এগুলো আমেরিকার দিক থেকে চালু করা, যেন প্রায় প্যাটেন্ট করা শব্দ। আমেরিকার হাতেই এই কনসেপ্টের জন্ম এবং এর ব্যবহার শুরু ও এখনো চালু রয়েছে। আমেরিকার হাতে নাহয় বুঝলাম; কিন্তু কবে থেকে? যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অথবা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের দুনিয়া শুরুর আগে “উন্নয়ন” বলে কোনো শব্দ ও ধারণা ছিল না। মানে তা অন্য অর্থে ব্যবহৃত হত, আমেরিকার দেয়া অর্থে নয়।

    আসলে ডেভেলপমেন্ট – এই পুরো পরিভাষার আসল অর্থ হল  বা পুরা শব্দটা হল – ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। বাংলায়, অবকাঠামো উন্নয়ন। এখন এটা অনেক বড় শব্দ বলে সংক্ষেপে শুধু ‘উন্নয়ন’ বলা শুরু করেছিল আমেরিকা। তা হলে এর আসল ও গুরুত্বের শব্দটা হল – অবকাঠামো, ফলে সেখান থেকেই অবকাঠামোর উন্নতি। কিন্তু তাহলে আবার,  ‘অবকাঠামো’ মানেই বা কী?

    এখন আমরা এবার অন্যদিক থেকে আগাই।  এদিকে, ‘বিনিয়োগ’ মানে পুঁজি বিনিয়োগ কথাটা ক্যাপিটালিজমের ধারণার সমান পুরনো। কারখানা বা ব্যবসা শুরু করতে গেলে অর্থ বা পুঁজি বিনিয়োগ লাগবেই। তবে ১৯৪৪ সালে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান দুটা জন্মের সময়ে বিনিয়োগ ধারণা ও শব্দটাকেই দুই ভাগ করে নেয়া হয়েছিল। একটি প্রি-বিনিয়োগ আর অন্যটি সাধারণ (যেমন- আগে বলতাম সেই) বিনিয়োগ। প্রি-বিনিয়োগ মানে বোঝাই যাচ্ছে, মূল বিনিয়োগেরও আগেই আরেক ধরণের বিনিয়োগ এটা। মানে কারখানা বা ব্যবসায় মূল বিনিয়োগ শুরু করার আগে ‘বিনিয়োগ পরিবেশ’ সৃষ্টির জন্য আরেকটা ধরণের বিনিয়োগ করা এটা। যেমন, যেখানে কারখানা-বিনিয়োগ এসে বসবে সেই দেশ-স্থান-শহরের ভূখণ্ডটার জলাভুমি থেকে শুরুর নানার কাজ – মাটি ফেলা বা ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সুব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, এয়ারপোর্ট, বন্দর পর্যন্ত এবার সাথে, দক্ষ প্রশাসন ইত্যাদি যদি সেখানে না থাকে, তবে বিনিয়োগকারী সেখানে আসবে না। পুঁজি সেখান থেকে চলে যাবে। তাই যে ভূখন্ডের প্রধানমন্ত্রী/মেয়র বুদ্ধিমান শাসক তিনি কিন্তু এসব ব্যবস্থা আগেই করে ফেলেছেন।  কারণ, বিনিয়োগ না আসলে মানে নতুন নতুন কাজ সৃষ্টি না হলে দেশের লোক না খেয়ে মরবে। এটা তো বুদ্ধিমান  শাসক হতে দিতে পারেন না। এজন্য এগুলো প্রি-বিনিয়োগ বলছি আর এটা অবকাঠামো তৈরিতে বলে যেটাকে  এজন্য অবকাঠামো-বিনিয়োগ বলে। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ মূল কথা হল, অবকাঠামো-বিনিয়োগে সুদের হার সবচেয়ে কম, প্রায় ‘নাই’ করে রাখতে হবে, যাতে পরে কারখানা বিনিয়োগের ফলে উতপাদিত পণ্যের উপরে মানে এই মূল বিনিয়োগের উতপাদিত ফিনিস প্রোডাক্টের মুল্যের উপর  এর চাপ-প্রভাব খুবই কম হয়। ফিনিসড প্রডাক্টের বিক্রি মূল্য যেন কম থাকে।

    তাহলে  অবকাঠামো-বিনিয়োগের পুঁজি্র সুদ হার কম  রাখতেই হয়। এমন – এটারই বিলিয়ন ডলার ধার দেয়ারই  উপযুক্ত সংগঠন হল বিশ্বব্যাংক। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া বিশ্বব্যাংক, এই নামটা এটা সংক্ষিপ্ত করে নেয়া নাম। মূল নাম IBRD (International Bank for Reconstruction & Development ); ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্র্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট  – এর উদ্দেশ্য কম সুদে বা ‘না’ সুদে অবকাঠামো গড়তে লোন দেয়া যাতে এরপর সহজেই ঐ দেশে স্থানীয় বা বিদেশি বাণিজ্যিক (কারখানা) বিনিয়োগ এসে হাজির হতে পারে।

    আবার, অবকাঠামো বিনিয়োগও দুই ধরনের হয় – ফিজিক্যাল ও হিউম্যান।  ফিজিক্যাল মানে বস্তুগত অবকাঠামো। যেমন উপরে যেটা বলেছি মানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট সুব্যবস্থা প্রভৃতি। অন্যটা হল – হিউম্যান বা শ্রমের অবকাঠামো। সাধারণত কারখানা খুললে যেন ভালো এডুকেটেড স্কিলড লেবার বা নন-এডুকেটেড স্বাস্থ্যবান শ্রমিক পাওয়া যায়। তাই সাধারণত শিক্ষা আর ন্যূনতম স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে এভাবে দুই খাতে অবকাঠামো ব্যয়টা মূলত করা হয়। দুনিয়াতে ১৯৪৪ সালের আগে এই “অবকাঠামো উন্নয়ন” বলে কোনো ধারণাই ছিল না; অর্থাৎ কলোনি আমলে “অবকাঠামো” বলতে কোন ধারণা কাজ করত না। আর একালে অবকাঠামো বলে যাকিছু করা হয়েছে এর ভালো-মন্দসহ যা কিছু দুনিয়াতে হয়েছে, এর (ইতি- বা নেতি-) দায় সবটাই গ্লোবাল নেতা আমেরিকার।

    তবে এখন দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতার পালাবদলের এই কালে চীন কি কেবল আমেরিকাকে কপি করবে? নাকি আমেরিকার উন্নয়নের চেয়ে খারাপ কিছু অবশ্যই না, বেটার কিছু কনসেপ্ট  নতুন আনবে? অথবা আগেরগুলোর  সাথে আরও সংশোধিত নতুন কিছু আসবে?’ এটাই আমরা নিশ্চিত হতে চাই। চীন কি যথেষ্ট চিন্তা করে “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” বা ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, শব্দগুলো ব্যবহার করেছে? আমরা জানি না।

    আরো বড় প্রশ্নঃ
    তাহলে চীনের নতুন এই ছয় রাষ্ট্রীয় ‘ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’- আমরা এখন অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে, এটা মতিউর রহমান চৌধুরী যেভাবে কল্পনা করেছেন… ‘অবিকল সার্ক নয়, তবে এর আদলে বিকল্প সার্ক’- এ কথাটি ভিত্তিহীন। কারণ আমাদের বাস্তবের সার্ক ধরনের সংগঠন তো আসলে তা এক রাষ্ট্রজোট-ই।  মানে কোনো অবকাঠামো-দাতা প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্বব্যাংক সেটা, তা নয়। বিশ্বব্যাংক তো কোনো রাষ্ট্রজোট নয়। তা হলে সমস্যা ঠিক কোথায়? খুব সম্ভবত সমস্যাটি চীনের নীতিনির্ধারকদের মাথায়; সেখানে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বা ইচ্ছা করেই রেখে দেয়া হয়েছে।  অর্থাৎ এখনই স্পষ্ট করতে তারা চাচ্ছে না; সময় হয় নাই। ফলে আপাতত ব্যাপারটা তাই দেখতে অনেকটা বাঘের মত হায়েনা চাওয়া ধরণের হয়ে আছে!

    তবুও চীনারা কী আসলে এশিয়ায় কোয়াডের মত কিছু চাচ্ছে? যেটা বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী? প্রথমত, সেটা বুঝাতে  হলে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ধরণের শব্দের ব্যবহার চীনকে আগে ত্যাগ করতে হবে।  তবে আমরা সবাই আগেই নিশ্চিত থাকতে পারি, সবার ওপরে কোয়াডের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কিছু পেতে চাইলে তা প্রকাশ হয়ে গেলেই এই পাঁচ রাষ্ট্র সাথে সাথে ভেগে যাবে। কারণ তেমন জোট মানেই এটা সামরিক চরিত্রের দিকে টার্ন নেবে। আর এ মুহূর্তে আমেরিকা-চীনসহ কারোই যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ জাগা বা জাগানোর কথা না; যদি না বাইডেন জেনে বা না জেনে কোনো বোকামি করেন।

    আবার চীন যদি আসলেই একটি বিকল্প সার্ক টাইপের জোট চায়, তবে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এসব শব্দ ফেলে দিতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত বা অমুক রাষ্ট্রকে নেয়া যাবে না- এটি বলাই যাবে না। এমনকি দাওয়াতপত্রও ভারতকে পাঠাতে হবে। যদিও উপরের রিপোর্টে আমরা দেখেছে ভারত ইনভাইটেড ছিল। কিন্তু নিজেই সাড়া দেয় নাই। আবার ভারত এলেও চীনের তাতে লাভ, আবার না হলেও আরেক ধরণের লাভ। কাজেই আগাম কে আসতে পারবে না, এভাবে কথা বলার কোনোই প্রয়োজন নাই, তা শোভনও না। তবে চীনের উপর দাওয়াত না করার দায় হবু গ্লোবাল নেতা হিসাবে নেয়া ভাল উদাহরণ নয়।

    শেষে তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু কথাঃ
    জাপান বার্ষিক ডিফেন্স রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে আর তাতে জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী [Deputy Prime Minister Taro Aso]  বলে ফেলেছেন যে “জাপানের আমেরিকার সাথে মিলে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে যাওয়া উচিত”।  বলাই বাহুল্য এটা উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পরে তিনি পালটা ব্যাখ্যা দিয়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে চেয়েছেন। কিন্তু মূলকথা, আমেরিকা বা জাপান সকলেই এক চীন নীতি মেনে নিয়েই  চীনের সাথে সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। ফলে ডায়লগের বাইরে “পাশে দাঁড়ানো” টাইপের কথা বলা তাদের কথা নয় এটা মারাত্মকভাবে গ্লোবাল স্থিতি ভেঙ্গে ফেলবে। চীনেরও বলপ্রয়োগ ভিন্ন অন্য সবকিছুতে তাইওয়ান ইস্যু সমাধানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত। এখন কে এসব শুরু করেছে জাপানের মন্ত্রীরা নাকি বাইডেনের আগ্রহে  সেটা যাই হোক, সারকথাটা হল যেখানে যুদ্ধের উস্কানি সবার সামলে চলা উচিত সেখানে উস্কানি তোলা হচ্ছে।
    শেষে একটা রেফারেন্স দিয়ে শেষ করব।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবাই জানেন পক্ষ দুইটা ছিল হিটলার-মুসোলিনি-জাপানের তেজো ও তাদের বন্ধুরা একদিকে। অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপের বাকি সবাই। যুদ্ধে আমেরিকার মিত্র বাহিনীর বিজয়ের পরে দুপক্ষের বহুদেশেই খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ দেয়া দিয়েছিল। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা ছিল মুসোলিনির ইটালিতে। কিন্তু পক্ষ-বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক  একমাত্র সক্ষম আমেরিকা সকলকেই সাহায্য এবং পুনর্বাসন দিয়েছিল। ইটালিবাসিও আগে থেকেই লাজলজ্জা ভুলে প্রকাশ্যে সাহায্য কামনা জানিয়েছিল।

    যুদ্ধের সোজা অর্থ হল, সম্পদ ও রিসোর্সের সরাসরি ধবংস ও অপচয়। আবার খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ মানে মানুষ আর মানুষের মর্যাদায় থাকে না! তাই যুদ্ধ শেষে যার সামর্থ থাকে সেই বাকি সবাইকে পক্ষবিভেদ ভুলে সকলকেই খাওয়ায় আবার পুনর্বাসনের অর্থ যোগানোর সক্ষমতাও দেখায়।  কাজেই একালেও দায়দায়িত্ব ভুলে যুদ্ধের পক্ষে পরিস্থিতিকে ঠেলে দোয়ার আগে আমাদের এসব পুরান কথা স্মরণ থাকবেনা কেন?

    আপাতত এখানেই ইতি টানছি। তবে চীনকে অবশ্যই ভেবে পরিষ্কার করে বলতে পারতেই হবে যে, সে স্পষ্ট করে কী চায়? আর এবারের তাসখন্দ  সাক্ষাতে চীন বাংলাদেশকে এক বড় স্তরের আস্থায় নিয়ে রেখেছে দেখা যাচ্ছে, এটা তাৎপর্যপূর্ণ। এই সাক্ষাতটাকে আগামি দিনে দেখা হবে একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে।  তবে সেটা চীন-বাংলাদেশের সম্পর্কের দিকের চেয়েও বড় কিছু। আগামি দিনে বাংলাদেশে যা যা ঘটবে  সেসবের প্রেক্ষিতে এটাকে টার্নিং পয়েন্ট বলে দেখা হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “চীন দক্ষিণ এশিয়ায় কী চায়“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোহন ভাগবতের হিন্দুত্বে ঢিলা দিবার ভান

    মোহন ভাগবতের হিন্দুত্বে ঢিলা দিবার ভান

    গৌতম দাস

    ১২ জুলাই ২০২১, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Di

                          মোহন ভাগবত

    RSS chief Mohan Bhagwat calls for uniting Hindu society RSS chief Mohan Bhagwat at Manthan meet

    মোহন ভাগবত হলেন আরএসএসের প্রধান। আরএসএস  হল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গুরু সংগঠন। “রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ” [RSS] নামেরই সংক্ষিপ্ত রূপ হল আরএসএস।  ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির মূল “আইডিয়ার” ধারক মানে আদর্শ দেয়ার সংগঠন হল আরএসএস। তবে তাদের মূল আইডিয়া সাধারণ মানুষের কাছে অনেক ‘তিতা’ লাগতে পারে বা কট্টর মনে হতে পারে। তাই উপরে চিনির প্রলেপ দেয়া এদেরই “নরম” গণ-সংগঠনের নাম বিজেপি।

    আরএসএস-এর বৈশিষ্ট্যঃ
    আরএসএস কেমন বৈশিষ্ট্যের সংগঠন? এটা সামাজিক তবে ধর্মতত্বীয় সংগঠন। হিন্দুত্ববাদ, এই ধর্মীয় আইডিয়া ভারতের সমাজে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এই সংগঠনের জন্ম। কিন্তু আরএসএস জানে, তার একাজে রাজনৈতিক ক্ষমতাও দরকার। তাই নিজের অধীনস্থ এক রাজনৈতিক দল যার নাম ভারতীয় জনতা পার্টি বা সংক্ষেপে বিজেপি, এই নামে একটা দল রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছে। তবে আইনি কারণে প্রকাশ্যে আরএসএস দাবি করতে পারে না যে, বিজেপি তার অঙ্গ-সংগঠন বা অধীনস্থ দল। তাই তারা বলে থাকে যে, কিছু আরএসএস-সদস্যকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিজেপি নামে রাজনৈতিক দল খুলে সেটা আরএসএসের আইডিয়াতে পরিচালিত করতে। তাই এরা নন-আরএসএস এমন যে কাউকেও বিজেপিতে নিতে পারবে। অর্থাৎ আরএসএসের অনেক কাজ বিজেপির জন্য পালনীয় নয়, বিজেপিতে তা ছাড় দেয়া যাবে। বাজপেয়ি বা মোদী এরা সবাই আসলে আরএসএসের “প্রচারক” সদস্য ছিলেন বা আছেন। প্রচারক, মানে দলের ‘ফুল টাইমার’ বা সার্বক্ষণিক কর্মি,  যারা দলীয় ভাতায় চলেন।

    কেন মোহন ভাগবতঃ
    কিন্তু কেন মোহন ভাগবতের নাম তুললাম? সম্প্রতি (৪ জুলাই) তিনি এক সভায় গুরুত্বপুর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। মুসলমান কোপানো যেসব কাজের জন্য মোদী বা বিজেপির কুখ্যাতি বা যেটা তাদের মূল পরিচিতি, ভাগবত ঐ সভার বক্তব্যে  ঠিক তার উল্টা কথা বলেছেন। যেমন মিডিয়াতে তার ঐ বক্তব্য-রিপোর্টের শিরোনাম – যেমন, আনন্দবাজার লিখেছে, “যিনি বলবেন মুসলিমরা ভারতে থাকবেন না, তিনি হিন্দু নন, বললেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত”। আবার ঐ রিপোর্টের ভেতরে কথা, তিনি বলেছেন, “যে বা যারা গো-রক্ষার দোহাই দিয়ে গণরোষ তৈরি করে কাউকে কাউকে আক্রমণ করছেন, তারাও হিন্দুত্বের বিরোধী”। আবার বলেছেন, …“মনে রাখতে হবে ভারতের হিন্দু, মুসলমান একই (ডিএনএ বা DNA) উৎস থেকে এসেছেন”। এ ছাড়াও আছে, …”গরু একটি পবিত্র প্রাণী। কিন্তু গো-রক্ষার কারণে যারা গণরোষ তৈরি করে অন্যকে আক্রমণ করছেন, তারা হিন্দুত্ব থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। আইন আইনের পথেই চলবে”।  অথবা, ‘‘আমরা গণতন্ত্রে বাস করি। এখানে হিন্দু বা মুসলিম, কারওরই প্রাধান্য থাকতে পারে না। এখানে প্রাধান্য পাবে শুধু ভারতীয়রা……”।

    “We are in a democracy. There can’t be a dominance of Hindus or Muslims. There can only be the dominance of Indians.”
    “…cow was a holy animal for Hindus, but those involved in lynching were “going against Hindutva”, according to The Times of India. “Law should take its own course against them without any partiality,”
    “Hindu-Muslim unity is misleading as they are not different, but one,” he said, according to PTI. “DNA of all Indians are same, irrespective of religion”
    …urged muslims not to get “trapped in the cycle of fear” that Islam is in danger in India.

    মোহন ভাগবত লিঞ্চিং [lynching] নিয়ে কথা বলছেনঃ
    মোহন ভাগবত এমনকি লিঞ্চিং বা কথিত গণপিটুনিতে মৃত্যু মানে দলবদ্ধভাবে রাস্তায় মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যার যেসব ঘটনা এতদিন মোদির আমলে ঘটে এসেছে সে সবের দায় অস্বীকার করে পুরা উল্টা কথা বলছেন। অথচ দুইবছর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘‘গণপিটুনি পাশ্চাত্যের ভাবনা। ভারতীয় ঐতিহ্যে এই শব্দ নেই। এর উৎস অন্য একটি ধর্মীয় গ্রন্থ। এই শব্দ ভারতের উপর চাপিয়ে দেবেন না।’’ এভাবে  তখন তিনিই পরোক্ষে এর দায় অস্বীকার করার চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন।
    অথচ এখন বলছেন, “যারা লিঞ্চিংয়ে জড়িত তারা হিন্দুত্ববিরোধী লোক”। অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই গরু রক্ষার রক্ষক সেজেছিলেন। আর এই রক্ষার নামে, গরু হাটে বেচাকেনা, গরু মাংস হিসেবে বিক্রি, দুধের ব্যবসার জন্য গরু পালা কেনাবেচা, ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা ইত্যাদি সবকিছুর বিরুদ্ধে আইন করতে গেছিলেন। প্রথমে আলাদা আলাদা কয়েকটা রাজ্যে আইন করেছিলেন, পরে কেন্দ্র সরকারের হয়ে আইন করেছিলেন। কিন্তু আইন চালুর একপর্যায়ে সুপ্রিমকোর্টের শুনানিতে জাজের প্রশ্নের সদুত্তর না দিতে পেরে শেষে পিছু হটে ‘আপাতত’ স্থগিত বলে ঘোষণা দিয়ে সরে এসেছিলেন সেই গোরক্ষা আইন থেকে। অথচ আজ মোহন ভাগবত সব দায় অস্বীকার করে বলছেন, “লিঞ্চিংয়ে জড়িতরা হিন্দুত্ববিরোধী লোক”। তাহলে কি তিনি বলতে চাইছেন মোদি সরকারটাই হিন্দুত্ববিরোধী? না ঠিক তা নয়। তাই তিনি এবার আরেক গল্প জুড়ে দিয়ে দাবি করছেন, ওসব  নাকি ছিল সব মিথ্যা মামলা! [Though at times, some false cases of lynching have been registered against people, Bhagwat said.]।

    তবে এবার এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। লিঞ্চিংয়ের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে ভাগবত কিন্তু স্বীকার করে ফেলেছেন বা করে নিয়েছেন যে, মোদী ও তাঁর দলই আসলে একটা এমন লিঞ্চিং উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন। কথাটা বলছি এজন্য যে ব্যাপকভাবে এমন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ‘অন ক্যামেরা’ মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও [তাবরেজ আনসারিকে লিঞ্চিংয়ে হত্যা দেখুন “Our Dear Jharkhand Now Known As ‘Lynchistan’ In Country”: Brinda Karat] ঐ মামলায়  মোদী সরকারের এক সংখ্যালঘু মন্ত্রী আছেন; তিনি তাকে দিয়ে এসব ঘটনায় মন্ত্রী হিসেবে এক বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, এমন ঘটনাগুলোর কথা সরকারের জানা নাই, এগুলো সব গুজব”।

    ওদিকে আরো ছিল। যেমন রাস্তায় যেকোনো মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে ‘জয়শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা এবং ক্রমাগত নির্যাতন করা যেমন বুকের খাঁচার ওপর উঠে দাঁড়ানো ইত্যাদি ধরনের অজস্র টর্চার- এসব ভিডিও ক্লিপ আমরা দেখেছি।

    আবার কলকাতার সর্বশেষ আরেক রূপ দেখেছি। জেলা শহরের শিক্ষকরা কলকাতায় অফিসের কাজে এসে, তারা মুসলমান বলে তাই তাঁরা শহরের হোটেলে থাকতে পারবে না, রেস্টুরেন্টে খেতে পারবে না বলে কথিত “পাড়া কমিউনিটির নামে” আপত্তি তুলে তাদের বের করে দেয়া হয়েছে।

    আরো ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ছিল। তাবলিগ মারকাজে যোগ দিতে আসা প্রথমবারের লকডাউনে শহরে আটকা পড়া মুসলমানদের নিয়ে। বিজেপি মিডিয়া সেলের প্রধান এটাকে প্রসঙ্গ করে প্রপাগান্ডা ছড়ায় যে, মুসলমানরা অসভ্য, এরা খেতে জানে না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা জানে না। হাতের আঙুল দিয়ে উঠিয়ে চেটে চেটে এরা খায়”। অর্থাৎ এটা নাকি মুসলমানদের নিচা কালচারের কাজ ও প্রমাণ। এভাবে মুসলমানদের নিয়ে নেতি ‘চিত্র’ একে সেবার এরা ছড়িয়েছিল যে, একারণেই নাকি ভারতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী এই নিচা কালচারের মুসলমানরা। চরম ঘৃণা ছড়িয়ে হিন্দু সমাজকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য ওই সেলে কিছুই করতে বাকি রাখে নাই। অথচ এখন মোহন ভাগবত বলছেন, ভারতের হিন্দু-মুসলমান তারা সব এক। শুধু ‘একই’ না, তাদের ডিএনএ (মানুষের শরীরের মৌলিক কণা বা জিনগত বৈশিষ্ট্য) এরা একই। অর্থাৎ ইংরেজি রেস অর্থে ভারতের হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত বৈশিষ্ট্যও নাকি একেবারেই এক। কী সাঙ্ঘাতিক? একেবারে উল্টা ‘ফতোয়া’!

    এদিকে মোহন ভাগবতের এই বক্তব্য প্রসঙ্গে, ভারতের মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র-প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে দ্য হিন্দু পত্রিকা লিখেছে। পত্রিকাটার নিজস্ব মন্তব্য হল, সমাজের বেশির ভাগেরই ধারণা, বদলে যাওয়া গ্লোবাল রাজনীতিতে আরএসএস তার ইমেজ বদলে খাপ খাইয়ে নিতে এটা করছে বলে মনে করছে [However, most of them saw it as an attempt to reshape the RSS’s image according to changing global politics.]। 

    ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় হায়দ্রাবাদের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফয়জান মুস্তফা [Faizan Mustafa], কলাম লিখেছেন। তার পুরা লেখাটা “সবাই লিবারেল বা উদারনৈতিক হয়ে গেলেই তো হয়” ধরনের; মানে হিন্দুত্বের চাপের মধ্যে থাকা এতদিনের কলকাতার মুসলমানদের অবস্থার মত। যার সার কথা হল, হিন্দুত্বের আধিপত্যটাকেই আপন বলে মেনে নিতে এরা সাজেশন দেন। কারণ, তাহলে বিনিময়ে ওরা হিন্দুত্বের সমাজে থাকতে পারবে –  তাতে ওরা স্কুলে ঢুকতে দিবে, এক বেঞ্চে বসতে দিবে, পাস করে ডিগ্রি পেলে একই অফিসে কলিগ বলে দু-এক্টা চাকরি ছুড়েও দিতে পারে ইত্যাদি। অতএব, এটাকেই মুসলমানেরা নিজেদের ‘লিবারেল’ জীবনযাপন বলে চালিয়ে দেক, এটাই এদের মন বাসনা! যেন বলতে চায় বিরোধ করে আর কতদুর কী হবে!

    আসলে ফয়জান মুস্তফার লেখার শিরোনামটাই এমন অনেক কথা বলে দেয়। যেমন তার লেখার শিরোনাম হল, ‘মোহন ভাগবতের সাম্প্রতিক মন্তব্যটা কি হিন্দুত্ববাদের নরম ধারার ইঙ্গিত?’ [Are Mohan Bhagwat’s recent remarks a sign of moderation in Hindutva?]

    নিঃসন্দেহে এগুলো খুবই হতাশার কথা। কারণ যেখানে খাড়া কথাটা হল – কারো ধর্মীয় মতবাদের নরম বা গরম রূপ বা ধারার কোনোটা নিয়েই আমাদের রাষ্ট্র সাজানো যায় না।  কারণ রাষ্ট্র গঠন বা সাজানোর কাজে কম্প্রোমাইজ বলে করার কিছুই নাই, সুযোগ নাই। কারণ মূল কথা, নাগরিক যেই হোক তারসহ সবার নাগরিক অধিকার সমানই হতে হবে। কোনো উসিলায় কেউ ‘বেশি অধিকারী’ হতে পারে না। যেমন আমরা সংখ্যায় বেশি বা আমার ধর্মটা বেশি ভালো বা আমি সমতলী তাই পাহাড়িদের চেয়ে আমি এগিয়ে অথবা আমি বাঙালি ইত্যাদি কোন অজুহাতেই কারো অধিকার কম কারো বেশি এটা হতে পারবে না।

    কাজেই মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদটাকে এবার নরম করে হাজির করেছেন কিনা – এটা কোন আলাপই হতে পারে না। তাই এটা মুসলমানদেরসহ কারো গ্রহণযোগ্য হবে – সরি, আমরা খুবই সরি; এটা হতেই পারে না। বিশেষ করে নরম অথবা গরম যাই হোক এটা মূলত হিন্দুত্ববাদ এদিকটা নজর করতেই হবে। এই হলো সার কথা। তবে ফয়জন সাহেব হয়ত বাস্তবের সমাজে হিন্দুত্বের প্রবল চাপের মধ্যে টিকে ও বেঁচে থাকতে চেয়ে কৌশলগতভাবে এমন লিখতে গিয়েছেন। কিন্তু তবু মোহন ভাগবতের প্রশংসা করতে যাওয়ার কৌশল নেয়াটা তার ঠিক হয়নি। [The RSS chief deserves appreciation for repeatedly saying that Muslims are equal citizens of this country.] তিনি তাকে স্বাধীনচেতা ও অন্য কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের তুলনায় ভালো বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেজন্যই নাকি মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদের এসব অন্যায়কে অন্যয় বলতে পেরেছেন- এমন মন্তব্য করেছেন। [He speaks his mind and that, too, without any fear of retaliation from the extreme Hindu right. ]

    আসলে ফয়জন মোস্তফা সাহেব এখানে বাস্তবতার চাপে সম্ভবত চরম আর সহনশীল বলে দুটো হিন্দুত্ববাদ আছে এ কথা বলছেন। তবু এভাবে কথা বলাও আসলে কৌশলগতভাবেও ভুল পথ। তবে তিনি প্রশ্ন তুলে একটা শেষ বাক্য লিখেছেন খুবই মারাত্মক।   লিখেছেন, ‘রাজা রামমোহন রায়ের কথিত হিন্দু রেনেসাঁ কি আসলে বেদ ও উপনিষদে আবার ফেরত যাওয়ার তাগিদ ও আহ্বান নয়? Was not Raja Ram Mohan Roy’s Hindu renaissance all about going back to the Vedas and Upanishads? তার লেখার শেষের এই অল্প কটা শব্দের বাক্য কয়টা আসলে তার মনের কথা – যা তিনি বাইরে না এনে পারেননি। এ জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

    কেন এই সময় মোহন ভাগবতের পিছু হটতে চাইলেন?
    নিঃসন্দেহে এটা আরএসএস-বিজেপিরই পিছু হটা; তাতে এটা গরম থেকে নরমে অথবা আগের হিন্দুত্ববাদই তাতেও কিছু যায় আসে না। তবে সেটা এবার লিবারেল করে হাজির করা হয়ত – সেটা যাই হোক না কেন, এটা পিছু হটাই। কিন্তু কেন? আর এখন কেন? এর সম্ভাব্য দু’টি কারণ বলব।

    এক. মোদি সরকারের অবস্থা ভালো নয় বলে সেটা আরএসএস-বিজেপি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এসেছে। এর মূল বিষয় অর্থনৈতিক দুরবস্থা। মনে রাখতে হবে, করোনা এবং দ্বিতীয় ঢেউ অবশ্যই  অর্থনীতির দুরবস্তায় বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু যারা ভারতের অর্থনীতি মনিটর করে আসছেন তারা মানেন, করোনা ফ্যাক্টর হওয়ার বহু আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি দুর্বলতা দেখিয়ে আসছিল। আর সেটাই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার পরও। তবে এবার ফাইনালি মোদী ধরা খেয়েছেন কারণ তিনি উত্তরাখন্ড রাজ্যে কুম্ভমেলায় গঙ্গাস্নানের আয়োজন আর কয়েকটা  রাজ্য নির্বাচনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কারণে  অতিরিক্ত রোগীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা (অক্সিজেন, বেড বা সৎকার ইত্যাদি নিয়ে হাহাকার) ভেঙ্গে পড়ায় সবকিছুতে মোদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। সহসাই আর এই অর্থনীতিতে রিকভারি হচ্ছে না। কারণ এখন  মুখ্যত প্রথম এক বছর যাবে করোনা থেকে রিকভারি করতে; এরপরে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে মনোযোগ দেয়ার সময় আসতে পারে। আর ইতোমধ্যেই সরকারি ফান্ডে অর্থের সঙ্কট চারিদিকে উকি দিচ্ছে। যেমন জ্বালানি তেলের উপর ট্যাক্স বসিয়ে দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সঙ্কটের এটা একটা খুবই খারাপ চিহ্ন। কারণ এটা আত্মঘাতি। কারণ তেলের দাম বাড়ানোর ইমপ্যাক্ট যেকোন উতপাদিত পণ্য ও সেবার উপরে বড় করে পড়ে। এক লিটার ডিজেল বাংলাদেশে ৬৫ টাকা আর ভারতে (বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করে) ৮১ টাকা।

    ইন্ডিয়ান হামবড়ার ফেরত মারঃ
    এছাড়া সব কিছুতে অপ্রয়োজনে মিথ্যা হামবড়া দেখানো ভারতের এক পুরনো স্বভাব। তবে অনেক হামবড়া দেখানোর ক্ষেত্রে বাইরের মানুষ পরে জেনে যায় ওই অংশটা লোক দেখানো ছিল তবে তাতে হয়ত তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু ভারত ‘টিকা কূটনীতির বড় প্লেয়ার’ এই মিথ্যা হামবড়া ভাব এবার ভারতকে একেবারে ফুটা করে ছেড়ে দিয়েছে। খোদ ভারতই এখন সারা দুনিয়া থেকে নিজের জন্য টিকা সংগ্রহে নাকাল হয়ে পড়েছে। কারণ সুপ্রিম কোর্ট একেবারে চেপে ধরেছে এর সত্যিকার অবস্থা জানাতে বলছে। এতেও ভারতের যোগ্য সবার জন্য টিকা দেয়া শেষ করতে ক’বছর লাগবে সেটাই এখনো অনিশ্চিত।
    এর পরে আরো বড় সমস্যা আছে। এখন টিকার বড় অংশ বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে বলে এই টিকার মূল্য (আগে স্থানীয় টিকা ছিল ১৫০ রুপী, এখন তা হাজার রুপীর মত) জোগাড় করতে আর সাধারণভাবে ‘স্বাস্থ্য খাতের’ অর্থ পেতে ভারত এখন লাজলজ্জা ভুলে তৃতীয় বিশ্বের গরীরদেশ সেজেছে।  আসলেই সে গরীব দেশ হয়েও নিজের হামবড়া দেখাচ্ছিল যে সে টিকা কূটনীতিতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী। আর এখন সেসব ফাঁপা ইমেজ ভুলে, পশ্চিমের দাতা অনুদান চক্রের কাছে খোলাখুলি হাত পেতে “লাইনে দাড়িয়ে গেছে”। জয়শঙ্কর আমেরিকার মন পেতে হয়রান সময় পার করছে। এক কথায়, ভারত এখন টিকা পেতে আর হাসপাতালের খরচ চাইতে  এখন দাতব্যের সন্ধানে নেমেছে। তাকে লিল্লাহ-য় এখন এসব পেতেই হবে। কারণ এখন লোকলজ্জার সময় নেই। কেন?
    এক কথায়, যতই ভারত তার নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা পেতে দেরি করবে ততই অর্থনীতি ন্যূনতম স্বাভাবিক হতে তা পিছাতে থাকবে। আর তাতে, ততদিন অর্থনৈতিক রিকভারির প্রসঙ্গে কথা আসতে পারবে না। টিকাদান শেষ না হলে অর্থনীতি, মানে ন্যূনতম অবাধে মানুষের মুভমেন্টই শুরু হবে না। করা যাবে না। আর এর ভেতরে আবার যদি করোনার তৃতীয় কী চতুর্থ ঢেউ হানা দেয় তো সব শেষ। এজন্যই সব দেশের জন্যই টিকাদান সবার আগে শেষ করা একেবারেই মুখ্য কাজ। অথচ মোদীর জন্য একাজটাই এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে।

    এদিকে, ইতোমধ্যে ভারতের জন্য এক মহাবিপর্যয় এবং ইজ্জতের সওয়াল উঠে এসেছে।  যার শুরুটা করেছিল লন্ডনের ফাইনান্সিয়াল টাইমস ম্যাগাজিন। তারা এক বিস্তারিত রিপোর্টে ভারতের অর্থনীতি থেকে দেখিয়ে রিপোর্ট করে যার শিরোনাম হলো,  “India’s Covid calamity exposes weakest link in US-led ‘Quad’ alliance”। মানে হল, ভারতের কোভিড বিপর্যয় (মানে কোভিডের সেকেন্ড ঢেঊয়ে মোদী প্রশাসনের ভেঙ্গে পড়া) আমাদেরকে খুলে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমেরিকান নেতৃত্বের কোয়াডে ভারত একটা দুর্বল শক্তি, একটা মারাত্মক ফুটা (উইক লিঙ্ক)। কোয়াড মানে আমেরিকা, জাপান অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের এক আন্তর্জাতিক জোট।  অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে এই জোটের মধ্যে ভারত দুর্বল বলে সে কম্পটেবল বা বাকি সবার সাথে তুলনীয় দেশ নয়; ফলে সে বাকি সবাইকে ডুবাবে। অর্থাৎ আবার সেই খামোখা হামবড়া দেখানোর পরিণতি।

    আমাদের দিনাজপুরের এক আঞ্চলিক প্রবচন – “দই ফেলে  ভেলটাঙগা!”। মানে, দই এমন একটা জিনিষ যা একবার মাটিতে পরে গেলে তা আর উঠায়ে নেয়া যায় না। তাই দই হাত থেকে পরে গেলে এবার আর নিজের বোকা উলটানো ঠোট দেখায়ে নিজের বেকুবি প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।  কাজেই সাবধান!  মানে আমাদের এই কনটেক্সটেঃ  চাপাবাজি করতে গিয়ে আজ মোদীর এই দশা। তাই সব জিনিষ নিয়ে চাপাবাজি করতে হয় না।

    ভারত টিকার কারখানা বাড়ানোর জন্য আমাদের থেকে আগাম অর্থ নিয়েও শেষে টিকা দেয় নাই। অনেকের কাছে মনে হতে পারে ব্যাপারটা একেবারেই লোকাল আঞ্চলিক। মানে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যেকার রাগারাগি। তাই সবাই ভেবেছিল এই কেলেঙ্কারি ঘরের ভিতরেই থাকবে।  না একেবারেই না। এটা গ্লোবাল। আর এই অভিযোগে ভারত কোয়াড জোটে থাকার অযোগ্য, এখন এই প্রশ্ন উঠে গেছে। কেন?

    বাইডেন ক্ষমতায় এসেই দেড় মাসের মধ্যে প্রথম কোয়াড  মিটিং (অন লাইনে) ডেকে বসেছিলেন ১২ মার্চ ২০২১। উদ্দেশ্য ছিল নিজদেশের জন্য টিকার হাল করা আর সাথে সারা দুনিয়ায় জন্য কিছু টিকার মজুদ যোগাড় হাতে নিয়ে টিকা কুটনীতিতে চীনের মোকাবিলায় নামা যায় কিনা সে সম্ভাবনা যাচাই করা।  কিন্তু সেখানেও মোদীর সেই হামবড়া সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছিল। বাইডেনের ইচ্ছা ছিল না আগেই টিকা বিলি করা নিয়ে এখনই চীনের সাথে মাসল দেখিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ার। তিনি কেবল সম্ভাবনা কী তা জানতে চাচ্ছিলেন আর তার মূল টার্গেট ছিল আমেরিকার জন্য টিকা সংগ্রহ।  কিন্তু ভারত দাবি করতে থাকে যে সে সারা দুনিয়ার জন্য টিকার মজুদ নিয়ে চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাড়াতে পারে। এমন উতপাদন সক্ষমতা তার আছে। কেবল, বিনিয়োগ ক্ষমতা নাই বলে সে পারছে না। আমেরিকা বিনিয়োগে সাহায্য করলে সে টিকা কূটনীতিতে চীনকে দেখিয়ে দিতে পারে।  বাইডেন জাপানকে এসব কথা চিন্তা করেই আগাম কথা বলে এসেছিলেন যে জাপান সেই বিনিয়োগ দিবে। এভাবে ভারতের হামবড়ার চোটে শেষ পর্যন্ত রেজুলেশন দিয়ে মিটিং শেষ করতে হয় যে তারা চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে।

    এখন বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত টিকা না দিবার খবর সবাই জেনে যায়। তাই ফাইনান্সিয়াল টাইমস এখন এঘটনাকে ভারতের আসল মুরোদের উদাহরণ হিসাবে হাজির করেছে। আর বলছে যার প্রতিশ্রুত টিকা দিবার মুরোদ নাই এমনকি নিজদেশের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা উতপাদনেরই মুরোদ নাই – তাকে বাইরে থেকে টিকা সংগ্রহে নামতে হয়েছে – সে কেন ঐ হামবড়া দেখায়ছিল? চীনের সাথে টিকা কূটনীতির প্রতিযোগিতায় নামা দূরে থাক সে তো নিজের টিকাই বানাতে পারে নাই। ভারতের সামগ্রিক টিকা উতপাদন ক্ষমতা ভারতের নিজের জন্যই যথেষ্ট নয়। এর সবসচেয়ে ভাল প্রমাণ হল, ভারত ইতোমধ্যেই টিকা আমদানি শুরু করে দিয়েছে। তাহলে সে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা টিকা কূনীতি এসব বলে আমেরিকার কাছে মিথ্যা হামবড়া  করতে গেছিল কেন।

    আবার ভারতের নিজের স্বাস্থ্য  ব্যবস্থাই যার এত দুর্বল যে এটা ভেঙ্গে পড়েছে – এটা তো একটা চিহ্ন যে, রাষ্ট্র হিসাবে এর সক্ষমতা দক্ষতা কেমন কী কোন স্তরের। কাজেই সে প্রতিযোগিতায় আসবারই তো যোগ্য নয়!

    ভারত টিকে আছে “কঠিন উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেমের” ফুটানি দিয়ে। স্বভাবতই এসব কথা তাদের হজম করা কঠিন। তাই তাদের যুক্তি একটাই যে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ এসে গেল তাই নাহলে চীন-আমেরিকাকে দেখিয়ে দিত।  এটা মিথ্যা কথা, কোন জবাবই নয় এটা। একই কথা বাংলাদেশকে টিকা না দিয়ে আমাদেরকেও দিয়েছিল। কারণ মূল প্রশ্ন হল, ভারতের টিকা উতপাদনের মোট সক্ষমতা যোগ করলেও তা শুধু ভারতের জন্যই যথেষ্ট নয়। কাজেই সে সারা দুনিয়ার জন্য টিকা উতপাদনকারী এই দাবিই তো ভুয়া। টিকা কূটনীতিতে সে নামতে চায় এই কথা তার উচ্চারণই তো হারাম! তাতে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ কোনদিন না আসলেও ভারত এই সমস্যাতে পড়তই!  এছাড়া ভারতের ১৮ বছরের উপরের সবাইকে টিকা দিতে গেলে ভারত কী পাচবছর লাগিয়ে তা নিজে উতপাদন করবে – এমন সুযোগ তো কোভিড দিবেই না! আর এই পাচবছর কী ভারতের অর্থনীতি সচল হলে অপেক্ষা করে বসে থাকবে? তবু ভারতের পালটা যুক্তিগুলো এমনই দেশপ্রেমে ভরা! কাজেই পালটা যুক্তিগুলো এমন খামোখা হামবড়ায় ভরা! এখানে তার কয়েকটা তুলে দিলাম যেমন এক,  দুই,    তিন । এককথায় এগুলো মুখরক্ষামূলক এমন দাবি যে কারও সাহায্য ছাড়াই ভারত চীনের মোকাবিলা করে চলেছে লাদাখে, এরকম। অথচ এই দাবিটাও ভুয়া। কারণ ভারত কম্প্রোমাইজ করেছে চীনের কাছে ভুমি মালিকানা ছেড়ে দিয়ে আর দুই, ভারতের সরকার বা রাজনীতিক আর বাহিনীর লোকেরা নিজেদের মধ্যে স্বীকার করে নিয়েছে যে ভারত সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয় তাই এই আপোষই জায়েজ! কাজেই চাপাবাজিতে হামবড়া করে চলতে চাইলে একসময় না একসময় হাত থেকে দই ফেলে দেওয়ার দেওয়ার বেকুবিতে পড়তেই হবে!

     মোহন ভাগবতের পিছু হটার দ্বিতীয় কারণঃ  এই কারণটা হল, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার ফেরত চলে যাওয়া। ভারতের ওপর এর সোজা প্রভাব হল, এতদিন আমেরিকার আড়ালে থেকে ভারত জঙ্গিবাদ বিরোধিতার নামে ইসলামোফোবিক, ইসলামবিদ্বেষী সব ঘৃণা জাগিয়ে সারা ভারত এবং প্রতিবেশীদের ওপর হিন্দুত্ববাদের ছড়ি ঘুড়িয়ে চলছিল। কিন্তু এখন আমেরিকা নেই (মানে প্রত্যাহার) তো ভারসাম্য নেই, ভেঙে গেছে। সশস্ত্র ইসলামী রাজনৈতিক গ্রুপ প্রায় সবাই এতে মুক্ত হয়ে ভারসাম্য ভেঙে পড়তে শুরু করবে বা ভেঙ্গে গেছে বলে তাদের সবার সাথে এখন আমেরিকা তো নাই,  ভারতকে নিজেই নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য এদের মোকাবেলা করতে হবে। এ কারণে ভারতের কাশ্মির রক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। অথচ গত দু’বছর ধরে কাশ্মিরে কেবল রাজনৈতিক তৎপরতা নয়, সাধারণ অর্থনৈতিক তৎপরতাও স্তব্ধ করে ফেলে রাখা হয়েছিল। মোদির ‘হামবড়া’ ছিল এই যে হিন্দুত্ববাদের জোশ তুলে কাশ্মিরকে দখল করে রাখা সম্ভব ছিল, ভারতের স্বাধীনতার সেকালে। সেটাই সে নাকি এখন করে ভারতের  কাশ্মীর বিজয় (৫ আগষ্ট ২০১৯) ঘটিয়েছিল।

    অথচ এখন উল্টা ভারতীয় কাশ্মির রক্ষা ধরে রাখাটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে শুরু করেছে। কাশ্মিরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরাটাই সশস্ত্রমুখী হয়ে ওঠার সম্ভাবনায় কাপছে! অবস্থা আঁচ করে আমেরিকার পরামর্শে মোদি দ্রুত আপস করার পথ খুঁজছেন কিন্তু তা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কাশ্মীরের আইনি রাজনীতিক যেগুলা ছিল তাদেরকে মোদী এতদিন ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। আজ সবাইওকে তোয়াজ করে ডেকে নিয়ে মোদী নিজ বাসভবনে মিটিং করেছেন। ওদিকে  ওই অঞ্চলের ইরান বা পাকিস্তানের সহযোগিতা এমনকি কিছু পরামর্শ পাওয়ারও পথ রাখেননি মোদী। কারণ যেমন ট্রাম্পকে খুশি করতে গিয়ে অবিবেচক ভারতের ভারত-ইরান সম্পর্ক হাতছাড়া হয়ে ভেঙে গেছে। আর ওদিকে পাকিস্তানবিরোধী অভ্যন্তরীণ হিন্দুত্ববাদী জজবা তুলে হিন্দু মেরুকরণে ভোট সাজতে গিয়েছেন তিনি সবসময়। আর এতে এখন পাকিস্তানের ইমরানের কোন সহযোগিতা পাওয়ার পথও তিনি নিজেই বন্ধ করে রেখে গেছেন। কিন্তু এখন বাইডেনকে খুশি করতে এমন বক্তব্য আপাতত তাকেই দিতেই হচ্ছে।

    অতএব, থুতু ফেলে সেই থুতু গেলা। হিন্দুত্ববাদের নরম ভার্সানকেই মোহন ভাগবতের বাইরে নিয়ে আসা! কিন্তু এতে ভরসা? না একেবারেই অনিশ্চিত সেটা! কেন?

    কারণ আগামি বছরের শুরুতেই তিনটা গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচন উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব আর উত্তরাখন্ড। এর মধ্যে  উত্তর প্রদেশ সবচেয়ে বড় রাজ্য ফলে খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু আগের মতই মুসলমান কোপানো ছাড়া কখনই মোদী সেখানে ভয় দেখিয়ে নিজের বাক্স ভরতে পারে নাই। কাজেই এবার আরো না পারার সম্ভাবনা। অতএব আবার সেই  জয় শ্রীরাম বলানো কিংবা ‘ফ্রিজে মাংস রাখার’ অজুহাত ধরণের নির্যাতন বা কুপিয়ে হত্যার দিন আবার ফিরে আসার সম্ভাবনাই প্রবল!

    পঞ্চাশের দশকের ভারতের হিন্দি সিনেমার বিখ্যাত নায়ক দিলীপ কুমার যার আসল নাম ইউসুফ খান; তিনি গত সপ্তাহে বার্ধ্যক্কে  মারা যান। কিন্তু তাকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের সোশাল মিডিয়ায় যে  গালাগালি অপমান এসবই প্রমাণ করে মোহন ভাগবত কিছুই বদলান নাই। বদলাতেই চান এমন কোথাও কোন প্রমাণই এখনও নাই। সবই আসলে আইওয়াশ আর নয়ত চাপাবাজি!

    ভারত আসলে মোহন ভাগবতের খাঁকি হাফপ্যান্টের নিচে চাপা পড়ে গেছে। আর এই খাকি আবার হের হিটলারের ভলিনটিয়ার বাহিনীর সিম্বলিক পোষাক! কাজেই……

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১০ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “মোহন ভাগবত পিছু হটছেন কেন“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]