Tag: পরাশক্তি

  • স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
    গৌতম দাস
    ০৭ জুন, ২০১৬

    স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

    তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

    গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

    একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

    ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

    ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

    আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

    এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

    এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

    যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

    সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

    ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

    ‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

    তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

    কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

     

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]

  • চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী প্রভাবিত হবে

    দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক
    চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী এতে প্রভাবিত হবে

    গৌতম দাস
    ১৭ জানুয়ারী, ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-zk

     

    এআইআইবি [AIIB], চীনের বিশ্ব ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত নাম। সংক্ষেপ ভাঙলে চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের পুরা নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি শুধু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য ব্যাংকই নয়, বলা হয়ে থাকে এআইআইবি জাপান-আমেরিকার নেতৃত্বে  ১৯৬৬ ডিসেম্বরে গড়ে উঠা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও [ADB] প্রতিদ্বন্দ্বী। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর রয়টার্স চীনা অর্থমন্ত্রীর বরাতে চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছে, ২০১৬ সালের মধ্য জানুয়ারিতে নতুন ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। এছাড়া ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্স এক রিপোর্টে আরও কিছু অগ্রগতির খবর জানিয়েছে। যেমন- আগেই সাব্যস্ত ছিল এই ব্যাংক ১০০ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত ক্যাপিটাল নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। আর এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ওই ১০০ বিলিয়ন ডলারের ২০ শতাংশ পরিশোধ করবেন, যা পরিশোধিত হওয়ার পথে। এছাড়া ১৭ উদ্যোক্তা সদস্য রাষ্ট্র মোট শেয়ারের মূল্যের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করে ফেলায় এই ব্যাংক (এখানে এখন থেকে ব্যাংক বলতে এআইআইবি বুঝতে হবে) আর নেহাত এক আইডিয়া বা কল্পনা নয়, এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই আমেরিকা এই ব্যাংকের জন্ম নেয়ার বিরুদ্ধে যা যা বাধা দেয়া সম্ভব এর সবই করেছে। শুরুর দিকে তা কিছুটা কাজও করেছিল। এশিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অথবা আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের সম্পর্ক রেখে চলে এমন রাষ্ট্রগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ইত্যাদির ওপর আমেরিকার এ কূটনৈতিক চাপ ভালোই কাজ করেছিল। যদিও এসব রাষ্ট্র নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে বুঝেছিল আমেরিকার মুখ চেয়ে এই ব্যাংক উদ্যোগের বিরুদ্ধে নিরাসক্ত ভাব নেয়া, দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখানোটা নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে। তাই প্রথম বাঁধভাঙার ঘটনাটা ঘটে ইউরোপের নেতা রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি- এ তিনের তরফ থেকে; এরপর এশিয়া আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখেনি।নে নেতৃত্ব কথাটার অর্থ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার কোন রাষ্ট্র। স্বভাবতই এর ফলে গঠন ও পরিচালনে সে রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসে গেছে যে, এই ব্যাংকের অপারেশন বা কার্যকারিতা শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে এ মাসেই, ১৬-১৮ জানুয়ারি। এই উপলক্ষে আমাদের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত ইতোমধ্যেই চীন রওয়ানা দিয়েছেন।


    দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্কঃ

    ওদিকে নতুন এক ইস্যু “দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক” – কয়েক বছর ধরে আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করে সব প্রসঙ্গের মধ্যেই বিঁধতে দেখা যাচ্ছে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর হল সমুদ্রপথে চীনে পৌছানোর একমাত্র প্রবেশদ্বার। আসলে এই সাগর কেবল চীনের দক্ষিণে নয় বরং পূর্ব অবধিও বিস্তৃত। পূর্বের অংশকে আলাদা করে পূর্ব চীন সাগর বলা হয় যদিও কিন্তু সাগরের দক্ষিণ অংশ আর পূর্ব অংশ এ দুইয়ের মাঝে কোনো দেয়াল বা বিচ্ছেদ নেই। আর চীনের প্রবেশদ্বারের একেবারে মুখ এলাকা হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর অংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশপাশে পড়শি রাষ্ট্রের ভিড়ভাট্টা দক্ষিণ দিকে বেশি। তাই দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কটা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক নামেই পরিচিত। এই দক্ষিণ-পূর্ব কোণটা ছাড়া চীনের সীমান্তের বাকি সব দিক দিয়েই স্থলাবদ্ধ,ল্যান্ড লকড।
    কিন্তু নতুন এক ইস্যু আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করতে শুরু করে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর- সমুদ্রপথে চীনের একমাত্র প্রবেশ দ্বার। চীন বাকি তিনদিকেই স্থলাবদ্ধ, ল্যান্ড লকড।

    আজ চীন যেমন অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার বিভিন্ন বিবেচনার দিক থেকে আমেরিকার তুলনায় ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি ১৮৮০ সালেই আমেরিকান অর্থনীতি সাইজের দিক থেকে তৎকালীন টপ কলোনি মাস্টার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব বিবেচনাতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকা উঠে যায়। সেকালে উত্থানের যুগে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রের সমুদ্রপথের প্রবেশে আশপাশের সব সমুদ্র অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে এ ঘটনার সঙ্গে এর নিরাপত্তার প্রশ্নটাই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে বাধাহীন, ভয়হীন “নীল পানি বা Blue Water” এলাকায় বয়ে যাওয়ার চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা রাষ্ট্র যে কোনোভাবে হোক নিশ্চিত করাকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে। আজ চীনের প্রবেশপথ দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের অবস্থানও সে রকম। সে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবাধ নৌবাণিজ্য জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে সেনসিটিভ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ দক্ষিণ চীন সাগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক দ্বীপের মালিকানা দখলে নিতে ও রাখতে মারমুখী হয়ে উঠেছে। আর তা থেকে সামরিক-কূটনৈতিক টেনশন মারাত্মক। জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ইত্যাদির সঙ্গে ছোট-বড় দ্বীপ মালিকানা বিরোধ সবার সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে আমেরিকা বিরোধে বিরোধী রাষ্ট্রকে তাল দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ শব্দটা হয়ে উঠেছে দ্বীপ মালিকানা বিরোধের প্রতীক। চীনা নেতৃত্বের এআইআইবি উদ্যোগে যোগ দিতে অন্তত অংশগ্রহণে দ্বিধা করার ক্ষেত্রে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ বিষয়টি অনেকের কাছেই তাই একটা ইস্যু।

    আমেরিকান এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে অনুষঙ্গ হিসেবে ওই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সমুদ্র-চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া জাহাজের বাধাহীন, ভয়হীন ‘ব্লু-ওয়াটার’ নেভিগেশন এলাকা পাবার চাহিদা  ও নির্ভয়ে জাহাজ চলাচলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ কারণে  দুনিয়াতে অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া যেকোন রাষ্ট্র এ বিষয়টাকে যে কোনোভাবে হোক নিজের জন্য নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে।
    আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ফিলিপাইন- দ্বীপ মালিকানা বিরোধে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ এ রাষ্ট্রের কাছে একটা ইস্যু। উদ্যোক্তা সদস্য হওয়ার স্বাক্ষর সে করেছে; কিন্তু বাকি আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করতে এ ব্যাংক উদ্যোগে সদস্য হিসেবে ভাগে পাওয়া শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতে এত দিন সে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। যে চীনের সঙ্গে দ্বীপ মালিকানা নিয়ে তার বিরোধ তুঙ্গে যাচ্ছে, সেই চীনের উদ্যোগেই এআইআইবি ব্যাংকে যোগদান শেয়ার মালিকানা ও সদস্য হওয়া কি ঠিক হচ্ছে- এ ছিল ফিলিপাইনের দ্বিধার সুনির্দিষ্ট বিষয়।
    ফিলিপাইনের জন্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর শেষদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫। আমেরিকান অর্থনৈতিক বা গ্লোবাল পুঁজিবাজারবিষয়ক ম্যাগাজিন বস্নুমবার্গ ৩০ ডিসেম্বর জানিয়েছে, ফিলিপাইন সরকার পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিজের ভাগের ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কেনার অর্থ ৫ বছরে যা পরিশোধযোগ্য তার অর্থ জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৩০ ডিসেম্বর এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ফাইলে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ফিলিপাইনের জন্য সিদ্ধান্তটি কেন এবং কত কঠিন তা বোঝা যায় পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এর সপক্ষে যেসব বিবেচনা অর্থসচিব তুলে ধরেছেন তা থেকে। ফিলিপিনো অর্থসচিব বলছেন, ‘সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপস্থিত বহু রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্বব্যাংক, এডিবি) ভূমিকার দিক থেকে এআইআইবি এক সহায়ক ও পরিপূরক এবং এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্রতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে এ প্রতিষ্ঠান আস্থা রাখার মতো এবং আমাদের সে আস্থা আছে।’ বোঝা যাচ্ছে, ফিলিপাইনের ঋণ চাহিদা প্রবল আর তা পূরণে এক ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সে এআইআইবিকে দেখে থাকে।
    একজন চীনা মুখপাত্রকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সদস্যদের সবার অংশগ্রহণে লেখা ওর গঠনপ্রণালিতে যেভাবে লেখা আছে এআইআইবি নিজের অপারেশনের সময় সেটা অনুসরণ করেই ফিলিপাইন লোন পাবে কিনা তা নির্ধারিত হবে, অন্য কিছু নয়।
    মনে হচ্ছে, চীনের দিক থেকে এআইআইবির বিষয়াদিতে বাইরের কোনো বিবেচনা নয়, ব্যাংকের নিজস্ব গঠনপ্রণালি ও রুল অনুসরণ করে চলতে চায় চীন। এখন দেখা যাক, বাস্তবে চীন সেটা কতটা কীভাবে করে।

     

    দুইঃ কাপলান ও দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক
    দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে আগেই বলেছি, কোনো রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে থাকলে ওর সমুদ্রপথে প্রবেশদ্বার সেনসেটিভ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক ইস্যু হয়ে যায় সেটা। এর মূল কারণ, সমুদ্রপথে জ্বালানি তেলসহ কাঁচামালের আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি নিরাপদ ও অবাধ রাখতে হয়। বাণিজ্য-নিরাপত্তার স্বার্থ বলে এটা সামরিক স্বার্থও। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, এই সামরিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ অন্যের দান, দয়াদাক্ষিণ্য, আইনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে রাখতে কোনো রাষ্ট্রই পারে না।
    মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেমন লজিক র‌্যাশনালিটি বা আইনের দ্বারা ন্যায্য বলে সাব্যস্ত  হওয়ার অপেক্ষায় ছেড়ে দিয়ে রাখা যায় না, কেউ রাখতে পারে না চীনের কাছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর একক রুস্তমি করতে চাওয়া ঠিক তেমনি। এই ব্যাপারটাকে প্রতীকীভাবে ধরে এক নতুন শব্দ চালু হয়েছে ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’।
    সাধারণত সাগর-উপসাগর বলতে আমাদের কল্পনা হলো, যার অন্তত একটা দিক, সাধারণত তীর বা উপকূলের উল্টো দিক অসীম আর অবারিত। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকেই চীনের নানা পড়শি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড।
    আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের অধীনে জন্ম নেওয়া সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের রেওয়াজ অনুসারে রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা টানা ও মানা হয়ে থাকে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকের প্রায় সব পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সমুদ্রসীমা বা জেগে ওঠা দ্বীপের মালিকানাগত বিরোধ হাজির হয়েছে ও চলছে কয়েক বছর ধরে। পূর্ব চীন সাগরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মালিকানা নিয়েও জাপানের সঙ্গে বিরোধ-বিতর্ক আছে; গত বছর যা তুঙ্গে উঠেছিল।
    এখন সার করে বললে চীনের জন্য ইস্যুটা হলো, লজিক আইনের ঊর্ধ্বে, নৌ-বাণিজ্য জাহাজের অবাধ চলাচলের স্বার্থ। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, রেওয়াজ, সালিস ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিরোধ মীমাংসার পথও একটা বাস্তবতা। চীনের জন্য এই দুই সত্য সংঘাতময়, বিরোধাত্মক। ফলে চীনকে দেখাতে হচ্ছে কতটা সৃজনশীল হয়ে সে এই দুই সত্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত বিরোধ মীমাংসার ফর্মুলা হাজির করতে সক্ষম হয়। চীনের নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জটি এখানেই।
    আমেরিকায় থিংক-ট্যাংক বা চিন্তার দোকানের শেষ নেই। আমেরিকা দুনিয়ায় রুস্তমি করে চলেছে মূলত এদেরই বদৌলতে। এই দুনিয়ার তেমনই এক শেঠ রবার্ট ডি কাপলান। নামের শেষ অংশ দিয়েই বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনে। ২০১৪ সালের মার্চে তার লেখা একটা বই প্রকাশিত হয়েছে : এশিয়ার ফুটন্ত কড়াই : দক্ষিণ চীন সাগর ও শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরের দিন শেষ।
    ওই বইয়ে তিনি চীনের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে চীনের সপক্ষে এক শক্ত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যার শিরোনাম, “বেইজিংয়ের ক্যারেবিয়ান লজিক”।
    কাপলান প্রথমত আমেরিকার উত্থান ইতিহাসে গিয়েছেন। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আজ চীন যেমন প্রায় সব বিবেচনায় আমেরিকাকে ক্রমে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে ১৮৮০ সালে আমেরিকান অর্থনীতি আকারের দিক থেকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ের মধ্যে সব বিবেচনায় ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার ওপরে আমেরিকা উঠে যায়। এই উত্থান পর্যায়ে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রে সমুদ্রপথের প্রবেশের ক্ষেত্রে লাগোয়া প্রতিটা সমুদ্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
    সেকালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুরাষ্ট্র ছিল ইউরোপ; যাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমেরিকাকে পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসতে হয়েছে।
    সমুদ্রপথে মেক্সিকো উপসাগরসহ বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে যেন ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রের অবাধ আনাগোনা না থাকে, ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে দূরে রেখে তা কেবল যেন আমেরিকার জন্য অবারিত থাকে- ১৮৮০ থেকে প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এই নীতি অনুসরণ করেছেন।
    কাপলান আমেরিকান সেই নীতির রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, আমেরিকা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উত্থিত হওয়ার দিন ছিল সেগুলো- ফলে আমেরিকা বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান নৌ-অঞ্চলে নিজের জন্য ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’ নীতি অনুসরণ করেছিল। সেকালে তা ন্যায্যতা পেলে আজ দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যা করছে, তা কেন পাবে না?
    কাপলানের এই লজিকের পক্ষে এক বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল গত বছর। দক্ষিণের মতোই পূর্ব-চীন সাগরের দ্বীপ মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ আছে। আমেরিকা গত বছর এই বিরোধকে ধারালো করতে জাপানকে তাতিয়ে তুলছিল। একপর্যায়ে এটা চরমে যায়।
    এই দেখে ওয়াল স্ট্রিট কারবারিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, শঙ্কিত ও বিরক্ত হয়ে ওঠে। পরের সপ্তাহের লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার কাভার স্টোরিতে তা উঠে আসে। ওখানে দুটো পয়েন্ট ছিল : চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে, কেউ এমন পরাশক্তি হলে ব্লু-ওয়াটার ধরনের ইস্যুতে তার পেশি দেখানো স্বাভাবিক এবং এটা আমাদের নিচু গুরুত্বে দেখা উচিত। কারণ, আমরাও এমন করেছিলাম। এর চেয়েও বড় কথা, ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দুনিয়াব্যাপী মহামন্দার ভেতর আমরা এখনো আছি। এ সময়ে চীনের মতো রাইজিং ইকোনমি না থাকলে আমাদের অবস্থা আরও করুণ হতো। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিবাদের খাতা খোলার চেষ্টা অর্থহীন ও আত্মঘাতী। এরপর থেকে এই ইস্যুতে জাপান লো-প্রফাইলে চলে যায়। যদিও পুব চীন সাগরের অপর অংশ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুটা এখনো জীবন্ত, বিশেষ করে ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের দিক থেকে।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর ০৩ জানুয়ারী সংখ্যায়, দৈনিক নয়াদিগন্তের ০৪ জানুয়ারী সংখ্যায় এবং সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৯ জানুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সেগুলোকে আবার একসাথে এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

  • তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা : রাশিয়া পশ্চিমের নজর চায়

    তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা
    রাশিয়া পশ্চিমের জোটে অন্তর্ভুক্তি, অবরোধ তুলে নেয়া ইত্যাদিতে নজর চায়

    গৌতম দাস ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-iw

     

    সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে সেই কবে পঁচিশ বছর আগে। শুধু তাই নয় ভেঙ্গে রাশিয়া নামে এমন এক ক্ষুদ্র আকার নিয়েছে যে সেই রাশিয়া এখন সব গাইগুই ছেড়ে পুঁজিতান্ত্রিক মুল ধারা বা গ্লোবাল অর্ডারের অংশ। সোভিয়েত ধারার অর্থনীতি বলতে কিছুই ওর ভিতর অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু সোভিয়েত ভক্ত পুরান কমিউনিষ্টদের মাথা ঠেকিয়ে ভক্তি দিবার জায়গার অভাব হয় নাই। তারা এখনও প্রবল ভক্তি সহকারে একালের মাফিয়া রাষ্ট্র পুতিনের রাশিয়াকে পুরান সোভিয়েৎ ইউনিয়নের জায়গায় বসিয়ে ভক্তি সেবা দেয়। মাফিয়া রাশিয়ার হয়ে প্রপাগান্ডায় মেতে উঠে। এটা সত্যিই এক আশ্চর্যের বিষয়। প্রেমের আবেগের সামনে জ্ঞান বুদ্ধি বিবেচনার যে আজও অচল সেটাই বরং আবার প্রমাণিত।
    আজকের দুনিয়ার আইএস বা ইসলামী স্টেট ইস্যুটা দিনকে দিন বিশ্ব-রাজনীতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। ব্যাপারটি অনেকটা ‘কুইনাইন সারাবে কে’ অবস্থার মত। ম্যালেরিয়া তাড়ানোর জন্য রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। এতে কুইনাইনে ম্যালেরিয়া তাড়ানো গিয়েছিল কিনা, সেকথা চাপা পড়ে গিয়ে এর চেয়েও বড় ঘটনা হয়ে গিয়েছিল নতুন রোগ – কুইনাইন এ নতুন রোগ ডেকে এনেছে। তা থেকে আবার আরও অনেক নতুন নতুন রোগের বিস্তার ঘটেছে। এই অবস্থা। এভাবে সর্বশেষ জটিল ঘটনাটি হল, তুরস্কের বোমারু এফ-১৬ বিমান এক রাশিয়ান বোমারু এসইউ-৩০ বিমানকে গোলা মেরে ভূপাতিত করেছে। আগেই বলেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের চোখে রাশিয়াই এখন সেই তাদের চোখে পুরান সহানুভূতি পাবার রাষ্ট্র হিসেবে সে জায়গা নিয়েছে। সিরিয়াতে সেই রাশিয়ার বিমান হামলা শুরু হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে। প্রথম এক সপ্তাহ টানা বোমাবাজি করে এরপর থেকে থেমে থেমে যেন গড়ে দিনে একটা করে এবং বেছে বেছে জায়গায় বোমা ফেলা, যেখানে ফেললে তা আসাদের রাষ্ট্র যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে সুবিধা পায়- এভাবে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়ার নতুন যুদ্ধবিমান খুয়ানোর ঘটনাটা ২৪ নভেম্বরের। ওই দিন তুরস্কের বোমারু বিমান রাশিয়ান এক বোমারু বিমানকে গোলা মারার ঘটনাটা ঘটে। এ ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া কার কী ধরনের, কে কী বলেছে এর একটা সঙ্কলন রিপোর্ট তৈরি করেছে আল জাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক। সেই রিপোর্ট অনুসরণ করে এখানে কথা এগোব।

    তবে এর আগে কেন তুরস্ক রাশিয়ান বোমারু বিমান ভূপাতিত করল সেদিকে কিছু আলোকপাত করা যাক। বিষয়টা নিয়ে এর স্বপক্ষে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর রাশিয়ান প্রপাান্ডা থাকলেও সিরিয়া-তুরস্কের সীমান্তে হামলা হওয়া ওই অঞ্চলের কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্যের দিকে মনোযোগ দেব। যে অঞ্চলে তুরস্ক-রাশিয়ান বোমারু বিমানে হামলা হয়েছে, অথবা বলা যায় সিরিয়ার যে অঞ্চলে রাশিয়া বিমান হামলা করতে গিয়েছিল সেটা সিরিয়া-তুরস্কের একেবারে সীমান্ত অঞ্চল। সিরিয়ার দিক থেকে তা লাটকিয়া প্রদেশ আর তুরস্কের দিক থেকে সেটা হাতায়ে প্রদেশ- এই হলো দুই প্রদেশের সীমান্ত সেটা। শুধু তাই না, ওই অঞ্চলের বসবাসকারীরা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা টানার বহু ঐতিহাসিক যুগ আগে থেকেই সিরিয়ার ‘সিরিয়ান টার্কম্যান’ বা অরিজিনাল টার্কি বংশোদ্ভূত তবে সিরিয়ায় বসবাসরত বলে সিরিয়ান। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যেহেতু আজকের সিরিয়া বলে কোনো আলাদা রাষ্ট্র ছিল না; বরং আজকের সিরিয়া, ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যই তুরস্কের শাসনাধীন একই অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সীমানা অঞ্চল ছিল। ফলে আজকের সিরিয়ান তুর্কিরা তুরস্কের মূল তুর্কি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার একই অংশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সুলতানের পরাজয়ের পর ওই সাম্রাজ্য ব্রিটিশ-ফরাসিরা গোপন চুক্তির কারণে ভাগাভাগিতে সিরিয়া বলে আলাদা রাষ্ট্র সীমানা টানার সময় লাটকিয়া অঞ্চল নতুন রাষ্ট্র সিরিয়ার ভাগে চলে যায়। এ হলো পুরনো ঐতিহাসিক দিক। আর একালের সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই তথ্য হলো- এক. সিরিয়ান আরব স্প্রিং বা সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই সিরিয়ান টার্কম্যানরা আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে লিপ্ত হয়েছিল এবং এখনও আছে। আর রক্ত এবং আত্মীয়তা সূত্রে তুরস্ক থেকে সব ধরনের সাহায্যপ্রাপ্তিও সেই থেকে তারা পেয়ে আসছে। তুরস্কের সরকারের দিক থেকে সরকারও নিজ টার্ক-জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক সূত্রে সিরিয়ান টার্কম্যানদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা নিজের সমাজের দা্বি । তথ্য দুই. এটা আমাদের প্রসঙ্গের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লাটকীয়া অঞ্চল সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই আইএস অথবা পরবর্তীতে যারা আইএস হয়ে হাজির হচ্ছে তাদের কোনো তৎপরতা বা প্রভাব এখানে নেই, তাদের অনাগ্রহের এলাকা বা মুক্ত এলাকা।
    কিন্তু রাশিয়ান বিমান ধ্বংস হওয়ার পর রাশিয়ান বয়ানে সুনির্দিষ্ট করে কেন রাশিয়ার বিমান লাটকিয়ায় গিয়েছিল, তা কোথাও উল্লেখ করে নাই, করতে চায় না। শুধু সামগ্রিকভাবে দাবি করে চলছে যে, পুরো সিরিয়াতে তারা আইএসের ওপর বোমাবাজি করতেই গিয়েছিল। অথচ মাঠের তথ্য হলো, লাটকিয়া প্রদেশ টার্কি বংশোদ্ভূত সিরিয়ানদের সশস্ত্র প্রতিরোধ তৎপরতা সিরিয়া-তুরস্কের এক ধরনের ঘরোয়া মামলা, যার মধ্যে আইএস নেই, স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কিছু নেই। অতএব রাশিয়া লাটকিয়াতে আইএস মারতে গিয়েছিল- এ বয়ান অচল; কারও হজম হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে রাশিয়া ওখানে আইএস মারার উসিলায় আসাদ সরকারকে সামরিক সুবিধা দিতে আর সিরিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ হাসিলে আসাদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ান টার্কম্যানদের উচ্ছেদ করতে গিয়েছিল। এ কাজ করতে যাওয়ার আগে রাশিয়া স্পষ্টত যেদিকটা আমলে নেয়নি তা হল, লাটকিয়ার বাসিন্দাদের রক্ষা করার স্বার্থ তুরস্ক সরকারেরও আছে। রক্ত ও আত্মীয়তা সূত্রে সিরিয়ায় থেকে যাওয়া টার্কদের রক্ষা করতে নিজ জনগণের কাছে তুরস্ক সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
    তাহলে সার কথা দাঁড়াচ্ছে, লাটকিয়া আসলে সিরিয়া ও তুরস্কের পারস্পরিক স্বার্থে সরাসরি সংঘাতের এক ইস্যু। সিরিয়ায় সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ সংঘাতের শুরু থেকেই লাটকিয়ার বাসিন্দাদের তুরস্ক সব সময় সিরিয়ান বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা করে গেছে। একালে রাশিয়া আইএস মারার উসিলায় তুরস্ক-সিরিয়ার স্বার্থ সংঘাতের ইস্যুতে নিজের হাত ঢুকালে তুরস্ক একইভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াবে এবং তা-ই দাঁড়িয়েছে। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করছিল আল জাজিরা টিভি। তুরস্কের নিজের এই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণকেই ওখানে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে স্বভাবতই তুরস্কের এ স্বার্থের কথা তিনি পটভূমি হিসেবে বলছিলেন। রাশিয়ান বিমান ভুপাতিত করে দেয়ার পক্ষে আইনি বা কূটনৈতিক যুক্তি হিসেবে নয়। হামলার পক্ষে তুরস্কের আইনি যুক্তি হল- রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশসীমা ভঙ্গ করে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং তুরস্ক বিমান বাহিনীর পাঁচ মিনিটে ১০ বার ওয়ার্নিং রেডিও মেসেজ দেয়ার পরও রাশিয়ানরা তা উপেক্ষা করেছে। তুরস্ক ওই মেসেজের অডিও মিডিয়ায় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আল জাজিরায় প্রচারিত মেসেজে শোনা যাচ্ছে ওই সাবধান বাণী। সেই সঙ্গে রাশিয়ান ওই বিমানের দুই পাইলটের বেঁচে যাওয়া একজন পাইলটের দাবিও আল জাজিরা আমাদের দেখিয়েছে। ওখানে তিনি দাবি করছেন, তুরস্ক থেকে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হয়নি।
    অবস্থাদৃষ্টে সবমিলিয়ে বললে, বয়ানের ন্যায্যতা ও গাথুনির দিক থেকে রাশিয়া পিছিয়ে পড়েছে। রাশিয়া নিজ বয়ানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।

    বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতিক্রিয়া যেটা রয়টার্স থেকে আল জাজিরা টুকে এনেছে; ওখানে দেখা যাচ্ছে, পুতিনের ভাষ্যটা যেন হার স্বীকার করা হারু পার্টির ভাষ্য। যেমন- পুতিন দাবি করছেন, বিমানটা বোমার গোলা খাওয়ার পর ওর ভাঙা অবশেষ সীমান্তে সিরিয়ার দিকে চার কিলো ভেতরে পড়েছে। অতএব আমরা সিরিয়ান সীমার ভেতরেই ছিলাম, তুরস্কের সীমানায় ঢুকিনি। – এগুলো খুবই হাস্যকর যুক্তি। কোন মীমাংসায় আসা যায় না এমন দাবি, তবে মুখ রক্ষায় কাজে লাগে এমন যুক্তিও। সাধারণত যে কোনো বোমারু বিমান এক মিনিটে কমপক্ষে ১০-১৫ কিলোমিটার পার হয়ে যায়, এছাড়া টার্কিশ আকাশ সীমায় গুলি খেয়েও কোনো বিমানের পড়ার মাটি সিরিয়া হতেও পারে। সুনির্দিষ্টভাবে এক্ষেত্রে তুরস্কও দাবি করছে, রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং ১৭ সেকেন্ড ধরে ছিল। কাজেই সিরিয়া-তুরস্কের এসব সেকেন্ড-মিনিট দিয়ে মিডিয়া বয়ান কারও নিজের পক্ষে প্রমাণ হিসাবে কাজে আসবে না। বরং যে প্রশ্নে রাশিয়ানরা চুপচাপ তা হল, লাটকিয়া আইএসবিহীন অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ান বিমান ওখানে কেন গিয়েছিল! সেখানে আমাদের জবাব খুঁজতে হবে। যুদ্ধবিমান গোলা খাওয়ার পরে পুতিন অভিমানের ভাষায় বলছেন, “বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।” এছাড়াও বলছেন, “তারা (মানে তুরস্ক) কি ন্যাটোকে আইএসের পক্ষে খেদমতে লাগাতে চায়?” পুতিনের এ দুই বয়ানের পিঠে আগাম ধরে নেয়া আছে যে, রাশিয়ান পাইলটরা যেন আইএস মারতে ওখানে গিয়েছিল আর সেই যোদ্ধা রাশিয়ার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অথচ রাশিয়ান পাইলটরা ওখানে কোনো আইএস মারতে গিয়েছিল, তাই তো প্রতিষ্ঠিত নয়। পুতিন আমাদের ধরে নিতে বলছেন, সিরিয়ার যে কোনো জায়গায় রাশিয়ান বিমানের যাওয়া মানেই তা শুধু আইএসের ওপর বোমা মারতে যাওয়া। অথচ রাশিয়ার ভালোভাবেই জানা থাকার কথা যে, লাটকিয়ায় সিরিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ আর তুরস্ক রাষ্ট্রের স্বার্থ সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে আইএসবিহীন ওই অঞ্চলে রাশিয়া যাওয়ার অর্থই হল আসাদের পক্ষে ভারসাম্য আনতে সরাসরি তুরস্কের বিপক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। অতএব তুরস্কের গুলি খেয়ে বিমান হারানোর রিস্ক রাশিয়া তো আগে থেকেই জেনেশুনে নিজেই নিয়েছে। এছাড়া যেদিন রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত হয় সেদিনই রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের কথা ছিল, যা ঐদিনের ঘটনা প্রেক্ষিতে পরে বাতিল করা হয়। ফলে কোনো বিশেষ কারণে রাশিয়াকে যদি লাটকিয়ায় বোমারু বিমান নিয়ে যেতেই হয়, তবে তা নিয়ে ওই সম্ভাব্য সভায় তুরস্কের সাথে মুখোমুখি বসে আগেই রাশিয়ার সিদ্ধান্ত সমন্বয় করে নেয়া যেত। অথচ রাশিয়া যেন ধরেই নিয়েছিল, আইএস মারার নাম করে রাশিয়া আসাদের পক্ষে মাঠের পরিস্থিতি এনে দেবে আর কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না!
    এ বিষয়ে ওবামার বক্তব্যের ভেতর একটা বাক্য আছে। ওবামা বলছেন, লাটকিয়ায় রাশিয়ানরা ‘মডারেটবিরোধী’ (মানে আইএস বাদে অন্য মধ্যপন্থী আসাদবিরোধীরা) বিরুদ্ধে অ্যাকশনে চলে গেছে। অর্থাৎ ওবামাও তার বক্তব্যে পুতিনকে বকা দিয়ে কথা বলেছেন।
    সেকালের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধী আমেরিকা ও ইউরোপের মিলিত যুদ্ধজোট হল ন্যাটো বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন,যার জন্ম ১৯৪৯ সালে। আর তুরস্ক ওর সদস্যপদ পায় বা নেয় ১৯৫২ সালে।
    ফলে রাশিয়ান বিমানের ভূপাতিত হওয়ার পর এ ইস্যুতে সাধারণভাবে সব ন্যাটো সদস্যই তুরস্কের পক্ষে দাঁড়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের কারণে বাধ্য। তাই দেখা যায়, হামলার পরের বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমবাক্যেই তুরস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু পরের বাক্যে তুরস্ক ও রাশিয়ার দুই রাষ্ট্রের প্রতি আবেদন রেখেছেন যেন সামরিক টেনশন আর না বাড়ানোর ব্যাপারে দুই পক্ষ সংযত থাকে। অর্থাৎ ইঙ্গিতটা হলো, বাকি ন্যাটো সদস্যরা তুরস্কের পক্ষে দাঁড়ালেও ন্যাটোর কোনো সদস্য বিষয়টা নিয়ে আরও কোনো উত্তেজনা, কোনো সামরিক সংঘাতের দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে না। তারা বরং মূল শত্রু আইএসের ব্যাপারে সবাই একজোট হয়ে অ্যাক্ট করতেই চাচ্ছে।
    এ ব্যাপারে সিরিয়ান সরকারের বিবৃতি স্বভাবতই রাশিয়ার পক্ষে। তবে রাশিয়ার পক্ষে এক আইনি যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করেছে সিরিয়া। রাশিয়ার বিমান ভূপাতিত করায় তুরস্কের এ কাজকে “অ্যাক্ট অব এগ্রেশন” বলে চিহ্নিত করেছে সিরিয়া। এটা জাতিসংঘের আইনি ভাষা। অর্থ “আইন লঙ্ঘন কর হামলা করা”।
    তাই তুরস্ক সরকারের বিবৃতিতে সিরিয়ান অভিযোগের পাল্টা জবাব দেয়া হয়েছে। বলেছে, “তুরস্কের তৎপরতা (বিমান ভূপাতিত করা) অন্যের ভূমিতে বেআইনি প্রবেশ করে হামলাকারী হওয়ার মতো কাজ নয়”। এই হল, তোলা অভিযোগ আর এর বিরুদ্ধে কাটান দেওয়ার কেচাল। এসবের বাইরে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এসব পাল্টাপাল্টির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা। কারণ তাঁর রাষ্ট্রস্বার্থ আইএস বিরোধী জোটে রাশিয়ান অন্তর্ভুক্তি দেখতে চাওয়ার তাগিদ আছে। তিনি বলছেন, (রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে) সামরিক উত্তেজনা আর যেন না ঘটে, সেদিকে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আইএস দমনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
    জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিক্রিয়া এবং ওবামার প্রতিক্রিয়ার প্রথম অংশ এভাবে সবারই প্রতিক্রিয়ার সাধারণ দিক হল, সবাই জোর দিচ্ছেন রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আর না বাড়ানো এবং আইএসবিরোধী জোটে সবাইকে সামিল করা।
    সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নিট ক্ষতিটা হলো রাশিয়ার। রাশিয়ান এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান একেবারেই নতুন হাইটেক বিমান- এমন যুদ্ধবিমান রাশিয়াকে খোয়াতে হল। অথবা বলা যায়, আইএসবিরোধী পশ্চিমা জোটে অন্তর্ভুক্তি পেতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমা অবরোধের মধ্যে থাকা রাশিয়াকে যে মূল্য দিতে হল তা বোধহয় বেশ বেশি। তবু এটা রাশিয়াকে পশ্চিমের সাথে জোটে ঢুকিয়ে দেয়ার পক্ষে তা এক কদম আগাম পদক্ষেপ। রাশিয়ার কাছে এটা যথেষ্ট দামি। তবে মাঝখান থেকে রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বিনিময় অচল হয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধবিমান হারিয়ে রাশিয়া তুরস্কের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। পুতিনের রাগ, ক্ষোভ তো কারও কারও ওপর পড়ে তবেই না প্রশমিত হতে হবে! তবে লাটকিয়ায় পুতিনের বেকুবি থেকে তিনি কী কোনো শিক্ষা নেবেন? দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

    দুইঃ

    বিশ্বযুদ্ধ কোন ছেলেখেলা নয়!
    রাষ্ট্র মাত্রই ওর পরিচালনার মধ্যে নিজের পক্ষে প্রপাগান্ডা করা একটা কাজ। কিন্তু সে প্রপাগান্ডা আপনি বিশ্বাস করে বসবেন কিনা,ঐ প্রপাগান্ডাকে সত্যি মনে করে নিজের চিন্তা সে আলোকে মানে নিজেকেও সাজাবেন কী না এর দায়দায়িত্ব সম্পুর্ণ আপনার নিজের। কানাডায় রেজিষ্টার্ড অফিস নিয়ে বসা রাশিয়ার এক প্রপাগান্ডা ওয়েব সাইট আছে, “গ্লোবাল রিসার্চ” নামে। রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের বরাতে বা বরাত উল্লেখ করা ছাড়াই বিভিন্ন খবর ওখানে ছাপা হয়। অর্থাৎ বুঝা যায় রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্স ডাটা ও রিপোর্টে ঐ গ্লোবাল রিসার্চের কর্তাদের একসেস বা প্রবেশাধিকার আছে। তা খারাপ কী! ওয়েষ্টার্ণ সুত্রর বরাতের বাইরে এই উছিলায় আমরা কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা ওখান থেকে পেতে পারি। কিন্তু সেসব তথ্য নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের অবশ্যই সাবধান হতে হবে, ‘ইন-বিটুইন দা লাইন’ নিজের মত করে পাঠ নিতে হবে কারণ ওসব তথ্যের সাথে আবার রাশিয়ান প্রপাগান্ডা-স্বার্থও মিশান আছে। ফলে টুইষ্ট আছে। সেদিকে খেয়াল রেখে তা বাদ রেখে বেছে পড়তে হবে। ঐ সাইটের টার্গেট পাঠক আপনিও হতে পারেন যদি দেশে দেশে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রগতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের একজন খাতক হিসাবে আপনি নিজেকে এখনও মনে করেন। আর সেই সাথে যদি মনে করেন রাশিয়ান রাষ্ট্রের স্বার্থই আপনার স্বার্থ,মানে রাশিয়ান রাষ্ট্রের বৈদেশিক স্বার্থ-ব্যাগেজ বইবার দায় আপনি নিয়েছেন।
    তো ঐ সাইটের অনেক প্রপাগান্ডা ইস্যু ও মেটেরিয়ালের মধ্যে একটা হল “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” এমন একটা দামামা বছরের পর বছর ধরে বাজিয়ে চলা। প্রায়ই বাংলাদেশে দেখা যায় অনেক পুরান কমিউনিষ্ট পুরান অভ্যাসে বাছবিচারহীনভাবে ঐ দামামা বাজানোতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তেমনই এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২৬ নভেম্বর দৈনিক মানবজমিনে – “মুখোমুখি তুরস্ক-রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী আসন্ন?” – এই শিরোনামে।
    দুনিয়াতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন দিন হতে পারে না – এমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে না কেন; হলে আমেরিকার পতন হবে ফলে এমনটা দেখতে চাওয়ার একটা প্রবল কামনা রাশিয়ার আছে। এবং সেটাও হয়ত তেমন দোষেরও কিছু নয় যতক্ষণ না এটা যুক্তিবুদ্ধি বিচারহীন ম্যানিয়াক হয়ে না চাওয়া হয়, প্রপাগান্ডার ঘ্যানর ঘ্যানর করে ফেলা না হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য রাশিয়ার বিশেষত পুতিনের রাশিয়ার সে সমস্যা প্রবল। ১৯৯১ সালের আগে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন (আজকের রাশিয়ার পুর্বসুরি) আমেরিকার সাথে পরাশক্তিগত টক্কর দিত রাশিয়ার আর সেই যৌবন নাই। অথচ আমেরিকা অটুট আছে শুধু না, ইতোমধ্যে এক মেরুর দুনিয়া ভোগ করার সুবিধা নিয়েছে। এটা যেন রাশিয়ার কিছুতেই আর সহ্য হয় না। যদিও আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াও আর টিকছে না। সেই নেতৃত্বে বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলা একালে ক্রমশ ভাঙছে এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তা ঘটাবার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোন ভুমিকা নাই; এটা রাশিয়ার হাতে নাই – না এটা ঘটাতে, না এটা ত্বরান্বিত করতে। বরং সবচেয়ে বড় নির্ধারক ভুমিকা আছে চীনের, তবে সেটাও অবজেকটিভ। অর্থাৎ এটা চীনা নেতাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রসুত নয় বরং চীনের বৈষয়িক অর্থনৈতিক অর্জন উন্নতির কারণে পরোক্ষে পড়ে পাওয়া লাভ। এটা ঠিক আমেরিকার দুনিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্দেশ্যেই করা চীনের ততপরতা নয় বরং নিজের অর্থনৈতিক উত্থানের পক্ষে কাজ করে যাওয়া চীনের কারনে যেটা পরোক্ষ অর্থে – আমেরিকার দুরবস্থা এবং বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলার নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও নতুন অর্ডার জন্ম আসন্ন হয়ে উঠা। এই পালাবদলটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে ষ্টাডি, আগাম অনুমান করা বলতে পারা ইত্যাদির জন্য বারদিকে বিস্তর গবেষণা পড়ালেখা চলছে। গত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ সংখ্যায় লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এবিষয়ে এক রিপোর্ট ছেপেছে। ওর সারকথা হল, দুনিয়াতে একালের পালাবদল পরিবর্তন বিষয়টার কিছুটা সমতুল্য পুরান ঘটনা হল ১৩৫ বছর আগের। সেটা হল, ১৮৮০ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আমেরিকান অর্থনীতি যখন দিনকে দিন ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। আর দুনিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য ১৯১৩ সালের দিক আর পাউন্ড-স্টার্লিংয়ে না ঘটে বরং এর চেইয়ে বেশি আমেরিকান ডলারে হওয়া শুরু করেছিল। ইকোনমিষ্টের উদ্দেশ্য হল, সেকালের ঘটনাবলি পাঠ করে সেখান থেকে একালে কোন আগাম অনুমান করা যায় কীনা! কতটা করা যায় ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে জিনিষটা সুনির্দিষ্টভাবে নিজের মত ঠিক করা লম্বা পা ফেলে আগাচ্ছে এবং যার উপর রাশিয়ার কোন হাত নাই তা নিয়ে প্রপাগান্ডা করা যে – “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” বলে দামামা বাজানো যে কোন সময় বুমেরাং হতে পারে। বিশেষ করে আজকের রাশিয়ান অর্থনীতি হল, মাটির নিচের তেল-গ্যাস সম্পদ বিক্রি করে জমিদারি ফিউডাল দশায় যেন ফিরে যাওয়া অর্থনীতি, যার কোন শিল্প-ইন্ডাষ্টি ভিত্তি নাই। একালে রাশিয়ার যা আছে তুলনায় সেটা উন্নত শিল্প ভিত্তির ইউরোপের কোন রাষ্ট্র দূরে থাক, দক্ষিণ কোরিয়া লেবেলেরও নয়। সার কথায় রাশিয়ার পরাশক্তি ষ্টাটাস খুবই নড়বড়ে, কোন শক্ত শিল্প অর্থনৈতিক ভিতের উপর তা দাঁড়ানো নয় বরং তেল-গ্যাস বেচা অর্থনীতি। ফলে খুব সহজেই ৪০ ডলারে নেমে যাওয়া তেলের কারণে আর এর উপরে পশ্চিমা দেশের অবরোধে রাশিয়ার অর্থনীতি আরও চরম দুর্দশায় পড়েছে, পশ্চিম এঅবস্থায় রাশিয়াকে ফেলতে পেরেছে। সারকথায় আমেরিকান অর্থনীতি দুর্বল হয়ে তার বিশ্ব-অর্থনৈতিক অর্ডারে নিজের নেতৃত্বের স্থান থেকে চ্যুত হওয়াটা বাস্তবে চীন বা অন্যান্য রাষ্ট্রের রাইজিং অর্থনৈতিক অর্জনের মধ্য দিয়ে ঘটাবার, বাস্তবে করে দেখানোর মত কাজ। এটা প্রপাগান্ডা চালিয়ে অর্জন করার মত কাজ নয়। এছাড়া শকুনের বদ-দোয়ার কারণে বেশি বেশি করে গরু মরে ভাগাড়ে আসে না। এটা তো জানা পুরান প্রবাদের কথা। ফলে বদ-দোয়া দিয়ে, কামনা করে, প্রতিহিংসা দিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে দুর্বল করা যাবে না। হবে না।
    এছাড়া বারবার যে কথা বলি, কোল্ড ওয়ার (১৯৫০-৯০) কালের চল্লিশ বছরে একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবার সম্ভাবনা যত বেশি ছিল সে তুলনায় এখন বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা ঠিক এর উলটা, অর্থাৎ আরও কম। এর মূল কারণ সেকালে বিবদমান পক্ষ রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাবের লেনদেন বিনিময় তেমন কিছু ছিলনা বললেই চলে। দুটা দুই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন লেনদেনহীন অর্থনীতি ছিল। সে তুলনায় আজ রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাসহ সবাই একই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ; পরস্পর পরস্পরের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাব ইত্যাদির লেনদেনে আষ্টেপৃষ্ঠে সংশ্লিষ্ট ও একে অন্যের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে চীনের বোমায় আমেরিকা ধবংস হয়ে গেলে সেটাতে চীনেরই ক্ষতি হয় এবং তা আমেরিকার বোমার বেলায়ও ভাইস ভারসা। অতএব একটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটে যাবার সম্ভাবনা এখন আগের মানে কোল্ড ওয়ার সময়ের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম। অবশ্য এর অর্থ আবার এমন নয় যে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতেই পারে না। ঠিক এই জিনিষটাই প্রতিফলিত হয়েছে এই সপ্তাহে তুরস্কের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় রাশিয়ান বোমারু বিমান ভুপাতিত হবার পরের পরিস্থিতি। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের বাধ্যবাধকতায় বাকী সদস্য সারা পশ্চিমাদেশ তুরস্কের পক্ষে দাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু সাথে যোগ করা এক নিঃশ্বাসে বলা তাদের পরের বাক্যই হল – তুরস্ক ও রাশিয়া যেন আর উত্তেজনা না বাড়ার দিকে খেয়াল রাখে; এছাড়া আইএসের বিরুদ্ধে সকলের সমন্বয় গড়ে তোলা এখনকার করণীয়। ওদিকে মানবজমিনের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, যেসব বিশ্লেষণ মেনে সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয় ছড়াচ্ছে তা সবই রাশিয়ান উৎসের বয়ান। যা এমনকি পারমানবিক যুদ্ধ বাধাবার ইঙ্গিত হুমকিতে ভরপুর। আসলে এটা রাশিয়ার এক নতুন যুদ্ধবিমান হারিয়ে এবার ইজ্জত ইমেজ রক্ষার ততপরতা মাত্র।
    আর আমরা? অনেক তো হল, এবার আমাদের পরিপক্ক হওয়া দরকার। একালে রাশিয়ান বেকুবি, রাষ্ট্রের মাফিয়াগিরি আর রাশিয়ান স্বার্থের প্রপাগান্ডা দূরে রেখে নিজ হুশ জ্ঞানে বাস্তবতা বুঝা ও ব্যাখ্যা করতে পারার তাকত অর্জন দরকার। আমাদের সে তৌফিক হোক এই কামনায় -।

     

    [লেখাটা আর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ২৮ নভেম্বর সংখ্যায় এবং শেষের অংশ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৩ ডিসেম্বর সংখ্যায় এর আগে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা নতুন করে আরও সংযোজন ও এডিট করে সর্বশেষ এডিটেড ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

     

  • ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী

    ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী
    গৌতম দাস
    ২৩ নভেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-d1

    বাংলাদেশে যোগ দেয়া শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিকাব) সাথে এক মতবিনিময়-বিষয়ক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে দৈনিক মানবজমিনে এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে পরের দিন, গত ১৩ নভেম্বর। মানবজমিন লিখেছে, “ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে” বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা।
    রাষ্ট্রদূতের এই বাক্যের কথা আপাতভাবে খুবই সাদামাটা মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে তা নয়। ওই বাক্যে গুরুত্বপুর্ণ শব্দ হলো, সমান বা সমান সম্পর্ক। অর্থাৎ তিনি চীন ও ভারতের সাথে শুধু সম্পর্ক রক্ষা নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন ‘সমান সম্পর্ক’ রাখার কথা। আর সমান সম্পর্ক রাখাটা হবে ‘বেশি সুফলের’, সে কথা তিনি বলছেন। কেন? সেটাই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদলের কালে
    এই শতকে দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদল চলছে। আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার কথা আগেই শুনা গিয়েছিল এখন বাস্তবে ফলতে শুরু করেছে। কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তিগত অবস্থান পায় বা দেখাতে পারে, যখন এর আগেই  অর্থনীতি শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে দেশটির অর্থনীতি প্রথম দুই বা বড়জোর তিন রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গিয়ে থাকে। বলা যায়, দুনিয়ায় অর্থনীতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানের ওপর ভর করে কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অর্থনীতিগত অবস্থানের দিক থেকে চীন আমেরিকাকে কয়েক বছর ধরে ছাড়িয়েই যাচ্ছে বলেই আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় আর এক ঘটনা হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ পশ্চিম থেকে পুব দিকে এশিয়ামুখী হয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় অর্থনৈতিক তৎপরতার মোকাম বা ভারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এশিয়া। এসবের মিলিত ফলাফলে এশিয়ায় আরো দুটো ইস্যু তৈরি হয়েছে। একটা আমাদের সাউথ এশিয়া অঞ্চলের ধরাধরি আর অন্যটা সাউথ চায়না সি বা চীনের প্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের উত্তেজনা। এমন উত্তেজনার মূল কারণ বিশ্বে আমেরিকার পরাশক্তিগত প্রভাব কমে যাওয়া টের পেয়ে আমেরিকা নিজেই এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজের সামরিক ক্ষমতাজাত সার্ভিস বিক্রির চেষ্টা করছে। সে এই বলে  এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যে, চীনের নব উত্থান ও এর কোনো সম্ভাব্য খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচতে তোমাদের সামরিক সহযোগিতা দরকার হবে। এই বরকন্দাজ হতে সার্ভিস দিতে চাই আমি। বিনিময়ে তোমরা আমার সাথে এক টিপিপি (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আমাকে ব্যবসায় দিবে। সাউথ চায়না সিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার তৈরি করা দ্বন্দ্ব ও টেনশন ছড়ানোর বৈশিষ্টটা এ রকম।
    আর অন্য দ্বিতীয় বিষয়টা হল, আমাদের অঞ্চলে মানে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেরটা আর একটু অন্য রকম। বাড়তি আরো কিছু বৈশিষ্টের কারণে। সেটা হলো, আমেরিকা ভারতকে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে বা পাশে আছে ধরনের ধারণা তৈরি করে  ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব উসকে দিতে চাইছে। এটা করার সুযোগ নিতে পারছে কারণ ভারত ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বন্দ্বের ইস্যু আছে। আর তা মূলত অসম সামরিক সক্ষমতার কারণে। ভারতের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি – যেটা আমেরিকা বিক্রি ও সরবরাহ দিবার উছিলায় সে ভারতের ঘনিষ্টতা চাইছে। আবার ভারতও সম্ভাব্য সামরিক বিরোধের কথা ভেবে আমেরিকাকে অস্ত্রের উৎস এবং বিরোধে অন্তত মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা নিতে পারে – এমন দরকার অনুভব করছে। এছাড়া ১৯৬২ সালের অভিজ্ঞতা ভারতের ভাল নয়। এসব মিলিয়ে সারকথায় চীন নিয়ে ভারতের ভীতি ও সন্দেহ আছে, আর আমেরিকা সেটাকেই ভালোমতো ব্যবহার ও উসকে দিয়ে রাখতে চায়। আবার চীন-ভারতের সম্পর্ক সবটাই বিরোধাত্মকতা নয়। বরং আর বিপরীত দিকে ভারত-চীনের পারস্পরিক ব্যবসায়িক সহযোগিতার প্রয়োজন এবং স্কোপ আছে। এবং সে সুযোগ পরস্পর নিচ্ছে। বাণিজ্য-ব্যবসায়ের দিক থেকে উভয়ের উভয়কে দরকার। কিন্তু আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আর এক দিক আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা যেটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। BRICS ও AIIB ধরণের উদ্যোগের আবির্ভাব এর প্রমাণ। পুরানা অর্ডারটাকে ভেঙে আমেরিকার কর্তৃত্বের বাইরে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করাতে ভারত ও চীনের একসাথে কাজ করা উভয়ের ভবিষ্যতের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকটা খেয়াল করে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের দিকগুলো উদোম করে উসকানি দিয়ে প্রধান ও মুখ্য করে তোলার নীতি নিয়েছে। এসবের মিলিত প্রভাব ও ফলাফলে এশিয়া, বিশেষত আমাদের অঞ্চলে মূল তিন শক্তি আমেরিকা, ভারত ও চীন – এশিয়ায় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে, টানাহিঁচড়া করছে, এশিয়ার বাদবাকি প্রত্যেকটা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার প্রবল চেষ্টা করছে। এ অঞ্চলের প্রতিটা দেশের রাজনীতিতে এই তিন শক্তির প্রভাব তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রবল। অন্য দিকে প্রতিটা দেশের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী মুল দু-তিনটা রাজনৈতিক দল থাকে, সম্পর্কের দিক থেকে এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও এটাই স্বাভাবিক। তবু অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব বিদেশী তিন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের আলোকে সাজানো হয়ে যায়, জড়িয়ে যায়। যা হওয়া উচিত নয়। কারণ যার যার নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে এমন অবস্থা মারাত্মক আত্মঘাতী।
    আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের স্বার্থের লড়াই, পারস্পরিক শত্রুতা ইত্যাদি প্রত্যেকেই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে করছে, লড়ছে; এগুলো করারই কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল একটা বিষয় বাদে তা হবার কথা। তা হলো, আমেরিকার নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা ভেঙে নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করানো – এ বিষয়টায় চীন ও ভারতের কোর স্বার্থ একই।
    কিন্তু এতে আমাদের কী? এটা কী শুধুই আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই যেখানে আমরা দর্শকমাত্র যার কিছুই আসে যায় না? না একেবারেই তা নয়। এটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখা পরাশক্তিগত লড়াইয়ের মত নয়। আমাদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে। এটাতে আমাদের মতো গরিব রাষ্ট্রসহ সবারই এখানে গভীর ও এক  কমন স্বার্থ আছে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের চলতি বিশ্বব্যবস্থা যেটা আমেরিকার মত মোড়ল ও তার সাগরেদদের দিকে কান্নি মেরে সাজানো ও দাঁড়ানো ব্যবস্থা বলে যেটাকে আমরা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করি – এরই তো ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অল্প বিস্তর ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। এটা পুরা ভেঙ্গে নতুন আসন্ন ব্যবস্থাটায় আমাদের জন্য কতটুকু কী রিলিফ দিবে তা তো কেউ এমনি দিবে না, আর তা বুঝে নিবার ব্যাপার ও কাজ আছে। সেজন্য আমাদের প্রথম কাজ হল, পরিবর্তনের অভিমুখ রবং কোথায় কী পরিবর্তন হতে পারে কতটুকু তা ঠিকমত বুঝে পদক্ষেপ নেয়া, নিজের অবস্থান নেয়া, দল জোট পাকানো ইত্যাদি। ফলে চীন ও ভারতসহ এই ইস্যুতে যারাই নতুন গ্লোবাল অর্ডার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিনিময়ব্যবস্থা দাঁড় করানোর পক্ষে থাকবে তাদের পক্ষে থাকা আমাদের কাজ। এই ইস্যু বাদে অন্য সব বিষয়ে আমেরিকা, ভারত ও চীনের লড়াই আসলে তাদের নিজ নিজ একান্ত স্বার্থে নিজের লড়াই। আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ তাতে নেই। অতএব সাবধান, এসব ধরনের লড়াইয়ে এই তিন শক্তির কোনো একটার পক্ষ নেয়া আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য বিপজ্জনক। বিশেষত এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার কোলে ঢুকে অপর দুই অথবা কোনো একটার পক্ষে দাঁড়ানো আরো বিপজ্জনক। যেমন, চীনের কোলে বসে চীন-ভারতের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীনের পক্ষ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। অথবা ঠিক একই কাজ কিন্তু উল্টা ভাইস ভারসা – ভারতের পক্ষে জোটবদ্ধ হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ভারত অথবা চীন কোনো একটার পক্ষ নিয়ে নিজের স্বার্থে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বা খেলার চেষ্টা – এটা অতিবুদ্ধিমানের গলায় দড়ির অবস্থাই তৈরি করবে।
    এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী দেশ হলো শ্রীলঙ্কা। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে আমরা খুঁজছি রাষ্ট্রদূতের ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ ঠিক কী হতে পারে বা হওয়া উচিত।

    কী কী নির্ণায়ক মেনে চললে সেটা ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ হবে :
    ০১. আমেরিকা, ভারত ও চীন – কোনো এক রাষ্ট্র অন্য দুইয়ের যে কারো উপর বাড়তি সামরিক স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা পায়, এমন কাজে সহযোগিতা করার বিষয়কে বাংলাদেশের জন্য হারাম জ্ঞান করতে হবে।
    ০২. তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অবশ্যই গভীরে নেয়া যাবে। কেবল কাউকে একচেটিয়া, বিশেষ করে অন্যকে বঞ্চিত করে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক করা বা দেয়া যাবে না।
    ০৩. এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মাপকাঠি হিসেবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের মুখ্য বিষয় অবশ্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ হতে হবে। এদিক থেকে তাকিয়ে কাজ করলেই তখন আর কোনো সিদ্ধান্তকে ‘কারো বিরুদ্ধে কাউকে বাড়তি সুবিধা’ দেয়ার জন্য করা হচ্ছে এমন হবে না। কেউ আঙুল তুলতেও পারব না।
    ০৪. এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার সামরিক স্বার্থকে বাংলাদেশের সাথে করা ওর বাণিজ্যের সম্পর্ক আলাপ ডিলের ভেতর আনা যাবে না। সযত্নে দূরে রাখতে হবে। যেমন গভীর সমুদ্রবন্দর এটা একমাত্র বাণিজ্যিক বিষয়, পারস্পরিক একমাত্র বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয় হিসেবে আসতে হবে। এর ভেতর কোনো ধরনের ইস্যু যেমন, সামরিক বিষয় আনা যাবে না। মিলানো যাবে না, হারাম জ্ঞান করতে হবে। বন্দর প্রজেক্টকে পরবর্তিতে কখনও প্রয়োজনে বা সময়েও সামরিক ব্যবহার করা যাবে না এই সুযোগ আগে থেকেই মুখবন্ধেই ঘোষণা দিয়ে নাকচ করে রাখতে হবে।
    ০৫. তিন রাষ্ট্রের কারো সাথে এমন কোনো সম্পর্কে যাওয়া যাবে না, যেটা দেশের নয় বরং ক্ষমতাসীন নিজ দলকে ক্ষমতা রাখতে সুবিধা পাওয়ার জন্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে – কারণ এর অর্থ হবে, নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেও একই কাজ করতে উসকানি দেয়া ও আগাম নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট দিয়ে রাখা।
    ০৬. এই তিন রাষ্ট্রের যেকোন কারো কাছ থেকেই যেকোনো সামরিক হার্ডওয়ার অবশ্যই কেনা যাবে; কিন্তু কোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, যেটা বিশেষত অন্য দুইয়ের যেকোনো এক অথবা দুটোরই বিরুদ্ধে তৎপরতা মনে হয় এমনটতে জড়ানো যাবে না। যেমন, চীনা সাবমেরিন বা আমেরিকান হার্ডওয়ার বা পুরান নেভি আইটেম কেনা, বা অল্প দামে পাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু এর বদলে অন্য দুই যে কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি বিশেষত যেটা এই তিনের অন্য যেকোন রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তা করা যাবে না।
    ০৭. কোনো “প্রতিহিংসায়” তিনের কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, পথ চলা বা পরিচালিত হওয়া যাবে না। তাতে অতীতে ওই রাষ্ট্র আমাদের নিজ দেশেরই কোনো এক রাজনৈতিক দলের সাথে বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক রক্ষা করে থাকুক না কেন। এর কারণ, আমাদের কোথাও না কোথাও ফুলস্টপ বলতে হবে। কেয়ামত সে কেয়ামত সেটা চলতে দেয়া যাবে না। কারণ প্রতিহিংসার সূত্রে আবার ভবিষ্যতে এই তিনের আর এক রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ ফেবার দেয়া অথবা বঞ্চিত কোনোটাই দিতে করতে শুরু হতে দেয়া যাবে না। যেমন ভারতের এখনকার ভূমিকার জন্য প্রতিহিংসা করা যাবে না। ভারত অথবা চীনকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক সহযোগিতায় জড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

    ওপরের এই সাতটা পয়েন্ট দিয়ে যা বলতে চাচ্ছি তা হল পুরা বিষয়টা বুঝিয়ে বলার সুবিধার জন্য কেবল। এটা অবশ্যই এই সাত পয়েন্টই সব কথা বা শেষ কথা, তা মনে করে নেয়া ভুল হবে।

    ঘটনার ব্যকগ্রাউন্ড শ্রীলঙ্কা
    শ্রীলঙ্কার পরপর দু’বারের বিগত সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজা পাকসে। তার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহকে তাঁর কালে প্রথম বলপ্রয়োগে দমন ও বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপকে সমূলে উৎখাত করে দেয়া হয়েছিল। এ কাজে চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল। জাতিসংঘে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও এসংক্রান্ত চাপ সামলাতে ভূমিকা রেখেছিল দেশটি। ফলে বিদ্রোহ দমন-উত্তর পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার পাকসের সরকারকে চাপ সামলানোর দিক থেকে চীনের খুবই উল্লেখযোগ্য সহযোগিতার ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া আবার ঐ আমলে চীনের বিপুল বিনিয়োগও শ্রীলঙ্কায় এসেছিল। আর সর্বশেষ চীনের দুই সাবমেরিনের বহর তিনি শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করতে দিয়েছিলেন। কী বয়ানে কী সম্পর্কে চীনা সাবমেরিন এসেছিল, তা সাধারণ্যে যথেষ্ট স্পষ্ট জানা না গেলেও ভারতের সরকারের ও মিডিয়ায় এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল প্রবল। কারণ টেনশন কমিয়ে দূরে রাখার জন্য অনেক সময় ‘শুভেচ্ছা সফরেও’ নৌজাহাজ আমেরিকারটা চীনে অথবা চীনেরটা আমেরিকায় যায়। এমনকি আবার ‘যৌথ সামরিক মহড়াও’ হতে দেখা যায়।

    মুক্তামালায় ঘিরে ধরার গল্প
    এছাড়া  এ প্রসঙ্গে আর এক কথা বলা ভালো। বিগত ২০০৫ সালে বুশের আমলে ভারত-আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক শুরু হয়। এমনটা শুরু হওয়ার আগে ভারত সরকারের সামরিক, স্ট্র্যাটেজিক, নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোয় থিংক ট্যাংক বা এমন বিষয়ে গবেষণা খাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভারত সরকারি বিনিয়োগ খুবই কম ছিল। এরই অবসান ঘটেছিল, সামরিকসহ বহুবিধ খাতে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা চুক্তির যুগ ২০০৫ সালে শুরু হলে থিংক ট্যাংক বা গবেষণা খাতেও আমেরিকা সহযোগিতা দেবে এমন চুক্তি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান গড়তে সহযোগিতা দেবে বা আমেরিকান থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলবে, আমেরিকান পিএইচডি স্কলারশীপে বা কাজের খরচ যোগাতে স্কলারশিপে যৌথ গবেষণার কাজ করবে,   ইত্যাদি নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এতে আসল যে ঘটনাটা ঘটে যায় তা হল, আমেরিকান থিংক ট্যাংক-গুলোর বয়ান, দৃষ্টিভঙ্গি এরপর থেকে ভারতীয় ইনটেলেক্টদেরও বয়ান দৃষ্টিভঙ্গি হতে শুরু করে যায়। বিশেষত আমেরিকার চীনবিরোধী বা ক্যাম্পেইনমূলক যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর বয়ান ভারতে ভালোমতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেসব বয়ানগুলোই আবার এদের লেখা কলাম বা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সুত্রে ভারতীয় মিডিয়াতে ছেয়ে ফেলে। যেমন চীন নাকি গভীর সমুদ্রবন্দর বানিয়ে ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অথবা চীন ভারতকে সামরিক দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে। লাফলে ভারতীয় মিডিয়ার কল্যাণে এগুলো অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও পপুলার প্রপাগান্ডা এবং একচেটিয়া বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই প্রপাগান্ডা বয়ানের দুর্বল দিক হল, যেন গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো বিষয়টা সামরিক উদ্দেশ্যেই একমাত্র হয়, এটা ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ বন্দর বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্যই হতেই হয় বাণিজ্য। বাণিজ্য উদ্দেশ্য সাধিত হবার পরে পড়ে পাওয়া সুবিধা হিসাবে সামরিক কাজে এর ব্যবহার এটা অপ্সহনাল ব্যাপার। কখনই মুল উদ্দেশ্য হয় না। কারণ একমাত্র বাণিজ্যিক আয় দিয়েই কোন বন্দর বানানোর কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিপুল খরচ তুলে আনা সম্ভব। সে জন্য বাণিজ্যই একমাত্র ও  মুখ্য উদ্দেশ্য হতে বাধ্য। যদিও এরপর বন্দর মালিক রাষ্ট্রের অভিপ্রায় থাকলে এর দ্বৈত ব্যবহার হিসেবে সামরিক কাজে তা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় কেবল ভারতকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো করা হচ্ছে, তবে তা সত্যের অপলাপ এবং প্রপাগান্ডাই হবে। এ ছাড়া মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বলতে যে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, সেটাও কতটা সত্যি তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
    এপর্যন্ত পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় দুটো গভীর সমুদ্রবন্দর হয়েছে, তাতেই মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বয়ান শুরু হয়। বাংলাদেশের সোনাদিয়া তখনো আলাপে আসেনি।বা এখনও বাস্তবায়নের আলাপ নাই। কিন্তু এই প্রপাগান্ডায় যে ফ্যাক্টসকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয় তা হল, চীনের উত্তরপুর্ব দিক ছাড়া বাকি তিন দিকের ভুখন্ড ল্যান্ড লকড – ভুবেষ্টিত। সমুদ্রে বের হবার পথ নাই। বিশেষ করে চীনের পুরা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পুর্ব দিক পাহাড় পর্বতে অগম্য। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পুর্ব সীমান্ত পুরাপুরিভাবে ল্যান্ড লকড হলেও তা ছুটাবার কিছু সুযোগ আছে। যদিও ওসব দিক দিয়ে কোন সমুদ্রে বের হওয়ার উপায় নেই, কিন্তু চীনের পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব (কুনমিং) অঞ্চলের মানুষকে পুরা চীনের সাথে সমানতালের বিকাশে আনতে চাইলে চীনকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে বন্দর বানিয়ে দিয়ে ওই বন্দর নিজেরও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্রেতা হিসেবে হাজির হলে তা উভয় দেশেরই লাভ হতে পারে। যার মূল কারণ চীনও ওসব বন্দরের ব্যবহারকারি হবে বলে এই অর্থে বিনিয়োগ পরিকল্পনার খরচ তুলে আনা ভায়াবল হয়, তাই। অন্য দিকে চীনেরও ল্যান্ড লকড দশা ঘোচে। অর্থাৎ মুক্তোমালার গল্প থুয়েও আমরা এর ভিন্ন ও আর এক বয়ান পেতে পারি। অর্থাৎ পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ চীনকে দেয় তবে সবারই বাণিজ্যিক লাভ হয়। তাই চীনের ল্যান্ড-লকড দশার দিকে নজর না দিয়ে কেবল ভারতকে ঘিরে ধরার জন্য এই বন্দর নির্মাণ করছে এই বয়ান খুবই নিম্নমানের প্রপাগান্ডা। এখন এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগের উপরে চীনকে সামরিক ব্যবহারের সুযোগ খুলে তখন ভারতের প্রপাগান্ডা অর্থপুর্ণ হতে পারে। আপাতত এবিষয়ে  কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ছায়া চিহ্নও নাই।

    গল্পের বিকল্প ও বুদ্ধিমান হওয়া
    তবু ভারতের মনে সন্দেহ আছে এটা বাস্তবতা। এই আলোকে ভারত বুদ্ধিমানভাবে ইতিবাচক হতে পারে। যেমন এসব বন্দর ব্যবহারের চুক্তি যেন অ-সামরিক থেকে যায় এই স্বার্থকে লবি বা পারশু করা। বিশেষত ভারতও ওসব বন্দর ব্যবহারকারি হয়ে নাম লিখানো সবচেয়ে ভাল। সেক্ষেত্রে ঐ বন্দর “কেবল বাণিজ্যিক কাজেই” ব্যবহারকারি সকলে ব্যবহার করবে একথা মুখবন্ধ ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া সহজ। যেমন  বাংলাদেশের বেলায় তো এটাই সহজ পথ।
    বিশেষ করে যেমন, বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর যদি হয়, তবে বাস্তবতই এর ব্যবহারকারী হবে চীন ও ভারত উভয়েই। কারণ এরা উভয়েই – চীনের বেলায় ওর দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশ (কুনমিং) এবং ভারতের বেলায় ওর পুরা সাতভাই পূর্ব দিক ল্যান্ড লকড। কারণ এখানেও আবার বন্দরের ব্যবহারকারী বেশি হবে বলে বন্দর বানানোর বিনিয়োগ খরচ তুলে আনার সম্ভাব্যতা সম্ভাব্য এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো এবং কম সময়ে ঘটবে। আর সে জন্য এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশকে আগেই ঘোষণা করে বলতে হবে এবং বলা সম্ভব যে বিদেশীদের এই বন্দরের সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ যে বন্দরের সম্ভাব্য ব্যবহারকারী চীন ও ভারত উভয়েই, সেখানে একমাত্র আগেই নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে তবেই এই প্রকল্প নেয়ার পথে আগানো সম্ভব।

    যা-ই হোক, আমাদের শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে ফিরে যাই।  শ্রীলঙ্কার হাম্বনটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর এমনিতেই অনেক আগে থেকেই ‘মুক্তামালায় ঘিরে ধরার’ প্রপাগান্ডার শিকার। এর ওপর আবার শ্রীলঙ্কায় চীনা সাবমেরিন আসাটা, বোঝা যায় এটা যথেষ্ট সেনসিটিভিটি বা সতর্কতার সাথে করা হয়নি, তা আজ বলাই বাহুল্য। এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচনে রাজাপাকসেকে সরাতে ভারতের বিশেষ হস্তক্ষেপ তৎপরতার অভিযোগ পাকসে ক্যাম্প থেকে উঠেছিল। শ্রীলঙ্কায় পরপর দু’বার নির্বাচন ঘটিয়ে পাকসের বিপরীত ক্যাম্প ‘চীনের সে বাড়তি প্রভাব’ দূর করেছে। আপাতত নতুন সরকার থিতু হয়েছে। সেসবের বিস্তারে এখানে না গিয়েও বলা যায়, রাজা পাকসের অতিরিক্ত চীনের দিকে ঢুকে যাওয়ার অভিযোগ কমবেশি সত্য। এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেই শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত সম্ভবত বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সাথে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে।’
    আবার সমান সম্পর্ক বলতে এক ধরণের ভারসাম্যমূলক এক সম্পর্কের কথা তিনি বলছেন। কিন্তু এখানে সমান মানে ‘সমান দূরে’ ঠিক তা নয়। আবার ভারসাম্য বলতেও লাঠির এক দিকে চীনকে, অন্য দিকে ভারতকে বেঁধে কাঁধে নেয়ার ভারসাম্য ঠিক তাও নয়। বরং ওপরে যে সাতটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছি সে আলোকে এটা বোঝা যেতে পারে। যার সারকথা হলো, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাকে ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব অবিশ্বাস ও সন্দেহের ভেতরে, ওর অংশ হওয়া যাবে না। এটা ভুল হবে। এই অর্থে এটা সমান সম্পর্ক বা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক।

    সতর্কতা
    এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, এ কালের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সম্পর্ক সব সময় বিশেষ। েই অর্থে যে, তা কোনভাবেই আর আগের দিনের (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার আগের) মত নয়। কোনোভাবেই তা রাশিয়া-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের কালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা যাবে না, গেলে ভুল হবে। স্পষ্টতই কারণ এখানে চীন-ভারতের দ্বন্দ্বের কথা যেমন বলা হচ্ছে ঠিক, তেমনই সেই চীনের সাথেই আবার মোদি সরকারের আমলে ভারতের ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, কাজ চলছে। চীন-ভারত উভয় পক্ষের বাণিজ্যের বাজার ৭০ বিলিয়ন ডলারের কম নয়। এ দিকগুলো মনে রেখে ভারত-চীন সম্পর্ক বুঝতে হবে।

    অস্থির উথালপাথাল সময়ে বুদ্ধিমান প্রুডেন্ট হওয়াই একমাত্র ভরসা।

    [এই লেখাটার আগের ভার্সান দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটা আরও পরিবর্তন, সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল]

  • আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

    আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

    গৌতম দাস
    ২৩ আগস্ট ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bb

    ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক উদ্যোক্তাদের এবছরের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাস ২০১৫ জুলাইয়ের ৯ ও ১০ তারিখে রাশিয়ার উফা শহরে। আমেরিকার নেতৃত্বে চলতি গ্লোবাল অর্থনীতি বা বিশ্বব্যাপী সক্রিয় পুঁজিতান্ত্রিক গ্লোবাল ব্যবস্থার ওপর ব্রিকস সদস্য অর্থে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানোর ও পালটা নেতৃত্ব কায়েমের লক্ষ্যে পাঁচ ‘রাইজিং ইকোনমি’র উদ্যোগে গঠিত সংগঠনের নাম ব্রিকস। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা এভাবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর থেকে এ নামকরণ। কিন্তু এর লক্ষ্য অনুসারে এপর্যন্ত কাজে তেমন অগ্রগতি ঘটেনি; বরং প্রয়োজনীয় মাত্রার সক্রিয়তার অভাবে বিরাট গ্যাপ আছে সত্য; কিন্তু জন্মের (২০০৯) পর থেকে ব্রিকস প্রতি বছর নিয়মিত তাদের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন করে যাচ্ছে। ব্রিকস এবার সাত বছরে পড়ল। সে তুলনায় চীনের নেতৃত্বে পালটা বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) উদ্যোগ আইডিয়া হাজির করার পরে মাত্র ২ বছরেই প্রায় কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাজির হয়ে গেছে। আগামী বছর থেকে এ ব্যাংক পুরোদমে অপারেশনাল হয়ে যাবে। এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান।
    বলা যায়, ৭ বছর ধরে ব্রিকস নিয়ে চীনের নানান চেষ্টা চরিত্রের পরও অগ্রগতি কাঙ্খিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর কারণে চীন হঠাৎ ব্রিকসের বাইরের বন্ধুদের সামনে আলাদা করে এআইআইবি ব্যাংক গড়ার প্রস্তাব হাজির করেছিল; এবং ২ বছর শেষ হওয়ার আগেই বাস্তবায়নের দিকে চলে যায়। ব্রিকস নিয়ে নানা বাধা তৈরি ও ওজর-আপত্তি তুলে ব্যাংকটিকে কার্যকর করার কাজ ধীরগতি করার পেছনে ভারতের অবদান বেশি। এর পিছনে ভারতের নীতি নির্ধারক দ্বিধা ও থিঙ্ক-ট্যাংক জাতীয় পরামর্শকদের ভুল পরামর্শ ও বিভ্রান্তি এবং সর্বপরি ভারতের নিজের সম্পর্কে অতি-মুল্যায়ন এবং আমেরিকান-পো ধরার চেষ্টা, আমেরিকান প্রভাব ইত্যাদি দায়ী। এ প্রসঙ্গে দুইটি প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা করব। এক. ভারতের ওজর-আপত্তির অজুহাতগুলো কী ধরনের এবং কেন? ভারত কেন ব্রিকসের প্রশ্নে ওজর-আপত্তির পথে হাঁটছে কিংবা ব্যাংকটিকে এখনও নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ও সঠিক মনে করছে না- এসব নিয়ে আলোচনা করা। কথাগুলো ব্রিকস বাস্তবায়নের পথের সমস্যা শিরোনাম দিয়েও আলোচনা করা। দুই. এআইআইবি ব্যাংক অপারেশনাল করার জন্য গঠন কাঠামো, আর্টিকেল অনুমোদন সম্পন্ন হয়ে গেছে; অর্থাৎ এআইআইবি ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার ব্যাংক হিসেবে চালু করার পর্যায়ে চলে যাওয়ার পরও এবারের ব্রিকস সম্মেলন আরেক অবকাঠামো ব্যাংক, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে এনডিবি (NDB) চালু করার সিদ্ধান্ত নিল কেন? অর্থাৎ একসাথে দুদুটো অবকাঠামো ব্যাংক উদ্যোগ কেন?

    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থার ৭০ বছর
    দুনিয়ায় পুঁজিতন্ত্রের বয়স প্রায় ৫০০ বছর। এ সময়ের মধ্যেই এর উত্থান, আন্তঃসম্পর্কিতভাবে দুনিয়াব্যাপী বিস্তার এবং পুঁজির অন্তর্নিহিত লজিক অনুযায়ী বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বর্তমানে এটা গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ৫০০ বছরের মধ্যে চলতি শেষ পর্যায়ের মাত্র ৭০ বছর বাদ দিলে বাকি আগের পুরো সময়টাতে (১৯৪৪ সালের আগের প্রায় ৪৩০ বছর কাল পর্যন্ত) ব্যাংক বা টাকার ব্যবসার উত্থান ও বিকাশ ঘটেছে তথাকথিত প্রাইভেট সেক্টরে, রাষ্ট্রের মালিকানার বাইরে। অর্থাৎ জন্মের শুরু থেকে ক্যাপিটালিজম কলোনি যুগের বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা সহায়তা ছাড়া চলতে সক্ষম হয়েছিল। ক্যাপিটালিজমের কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে প্রথম দুইটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বা মাল্টিল্যাটারাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। এটাই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রথম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বা বলা যায়, আমেরিকার নেতৃত্বে রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ। আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়া, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা। যদিও এর মূল উদ্দেশ্য বা তাগিদ ছিল দুনিয়াব্যাপী সবার জন্য এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কায়েম করা। যে কোনো বাণিজ্য বিনিময় ঘটার পূর্বশর্ত হলো সকল রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা চালু থাকা এবং ওই মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে ঐ আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা হাজির থাকা। ফলে আন্তর্জাতিক এক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম চাওয়া মানেই সেটা আসলে আগে এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা কায়েম করার কাজ হাতে নেয়া। তৎকালে বাণিজ্যের দিক থেকে একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে তার জাতীয় মুদ্রা ডলারকে একইসঙ্গে সব রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। দুনিয়ায় এ প্রথম সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম করে।

    পুরানার বিশ্বব্যবস্থার গর্ভে নতুন ব্যবস্থার আগমন
    মোটা দাগে বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্কের বিচারে তিনটি পর্যায় আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রথমত, মধ্যযুগ থেকে ১৯৪৪ সালের আগ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই আজকের তুলনায় হয়তো সীমিতভাবে বিকশিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এটাকে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের” হাতে বিকশিত বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থাও বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সাল থেকে চলতি সাল পর্যন্ত আমেরিকান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে কায়েম করে গড়ে তোলা (সেকালে) নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা- পণ্য গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলা যায়। আমেরিকান প্রভাবের এই ব্যবস্থাটা যেটা এখনও চলতি তবে পড়তি অবস্থা, তা এখন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। আর তৃতীয়ত, মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকে আমেরিকান নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জায়গায় চীনের নেতৃত্বে পুরনো ব্যবস্থাটার পুনর্গঠন করে নেয়ার উদ্যোগ – আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো নতুন ধরনের পালটা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব। চলতি সময়টায় একটা গেম চেঞ্জিংয়ের কাল পার হচ্ছি আমরা। একালে এতে ভারতের গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে, পুরনো নেতা আমেরিকা কিংবা হবু নেতা চীন- উভয়ের কাছেই। গুরুত্বটা হলো, ভারত আমেরিকার কোলে বসে পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন ঠেকিয়ে আরও কিছু দিন চলতি ব্যবস্থার আয়ু বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা হতে পারে, একে আরও যতদিন আয়ু দেয়া যায় আমেরিকার প্রভাব তত বেশি দিন বাড়ে। আর এর বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে সুবিধা শুষে নেয়ার কাজে লাগা। তবে মনে রাখতে হবে, এ কম্ম সাময়িক লাভালাভের জন্য এবং এটা নিজের আগামীর বিরুদ্ধে কুড়াল মারাও হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এর বিপরীত পথ হচ্ছে, চীনের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত নিজের জন্য নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়তে ত্বরান্বিত হয়ে কাজে লেগে পড়তে পারে। তবে উভয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারতের এমন গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ভারতের বিশাল জনসংখ্যা। অর্থনীতির দৃষ্টির ভাষায় বলতে হবে, যত জনসংখ্যা তত জোড়া মুখ এবং হাত; এবং ততই বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং শ্রম।
    এটা এখন নির্ধারিত যে, চীন ও ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গন্তব্য এক সূত্রে বাঁধা হয়ে গেছে- এখানে তারা উভয়ে ন্যাচারাল অ্যালায়েন্সের অ্যালাই। পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা খাড়া করতে পারার মধ্যেই তাদের আগামী নির্ভরশীল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার ভেতরে চীন কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে জায়গা ছেড়ে দেবে তা সবটা ভারতের দাবি জানিয়ে আদায় করার বিষয় নয়। নতুন ব্যবস্থায় ভারত চীনের কাছে কী কী দাবি করবে সেসবের সঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও অর্জিত সক্ষমতার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে হবে।

    ব্রিকসঃ একের ভিতর দুই কাজের ভুমিকায়
    একই ব্রিকস উদ্যোগের মধ্যে আসলে দুইটা পালটা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ আছে – একটি আইএমএফের সমতুল্য পাল্টা প্রতিষ্ঠান, অন্যটি বিশ্বব্যাংকের। ভারতের মূল যে প্রস্তাবের কারণে ব্রিকস অগ্রগতি আটকে বাধাগ্রস্ত বা শ্লথ হয়ে আছে তা হল, এখানে পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের সকলের সমান পরিমাণ বিনিয়োগ নিয়েই শুধু প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অসম সক্ষমতার বাস্তবতায় থাকলেও কাউকে বেশি বিনিয়োগ করতে দিয়ে প্রতিষ্ঠান খাড়া করা যাবে না। ভারতের এ ওজর-আপত্তিতে পড়ে পরিশেষে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য অবকাঠামো ব্যাংক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে NDB (এনডিবি) কার্যকর হতে যাচ্ছে পাঁচ সদস্যের প্রত্যেকের সমান ১০ বিলিয়ন করে মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে। অনেকের মনে হতে পারে, সদস্যদের সমান বিনিয়োগ থাকাই সঠিক। কিন্তু আসলে এমন চিন্তা অহেতুক ও অর্থহীন। ঈর্ষাকাতর সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা বলা যেতে পারে। এগুলো দিয়ে কারও প্রভাবশালী উত্থান আসন্ন হলে তা ঠেকিয়ে রাখা যায় না। যেমন আজ চীনের উত্থান কি আমেরিকা ঠেকিয়ে রাখতে পারছে, না রাখা সম্ভব হয়েছে। ভারতের অর্থনীতি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ওই ১০ বিলিয়ন ডলার কাউকে না দিয়ে নিজ নিজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করলেই তো পারত। তা না করে NDB প্রতিষ্ঠানের নামে তা জড়ো করার কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার একটি কমন স্বার্থ ওই পাঁচ রাষ্ট্রের সবার আছে। সেটা হল, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরনো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে বা বাইরে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানো। এখন ‘বিনিয়োগে সবার সমান ভাগ থাকতে হবে’ এই নীতি মানতে গেলে নতুন অর্জিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র থেকে যাবেই। অবকাঠামো ব্যাংক হিসাবে এই পুঁজি খুবই অল্প। আর এমন থেকে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এর হওয়া সম্ভব নয়। অথচ সেটাই ছিল নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গড়ার প্রধান তাগিদ।
    যেমন বিশ্বব্যাংকের বর্তমানে মোট বিনিয়োগ সক্ষমতা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, এডিবির ১৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর তুলনায় “সবার সমান বিনিয়োগ হতে হবে” এ জেদাজেদিতে সবার ১০ বিলিয়ন ডলার করে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ব্রিকসের এনডিবি ব্যাংক কতটা প্রভাবশালী হবে বলাই বাহুল্য এবং তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এছাড়া মূলকথা, ভারত অন্য রাষ্ট্রকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দাতা এখনও নয়, বরং নিজেই গ্রহীতার দেশ। ফলে এ পর্যায়ে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ তত্ত্ব ও অবস্থানের সারার্থ হচ্ছে, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে নামিয়ে সবার সমান বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান গড়া। মানে এনডিবি ব্যাংককে বামন করে রাখা। ফলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী কিছুই এটা হতে না দেয়া।

    ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থানঃ এক ভুয়া ও অর্থহীন তত্ত্ব
    ওদিকে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থান যে ভুয়া ও অর্থহীন এর আর এক বড় প্রমাণ হলো ব্রিকস উদ্যোগের অপর কম্পোনেন্ট, যেটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে তৎপরতা বলেছি সেদিকে তাকালে। [এখনও এটা পুরা আকার নেয় নাই ফলে নাম এখনও নাই। ব্রিকস উদ্যোগের ভিতরে আপাতত ভ্রুন প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গাঠনিক পর্যায়ে আছে বাড়ছে যার আপাত নাম “নয়া আইএমএফ” মনে করে নেয়া যেতে পারে।] ব্রিকসের ‘সমান বিনিয়োগের’ এনডিবি ব্যাংক ছাড়াও হবু “নয়া আইএমএফ” এর জন্য আর একটি ফান্ড তৈরি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্যে কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে তার নিজের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি পরিস্থিতিতে তা মেটাতে সহায়তা করা। এত দিন দুনিয়ায় এ ধরনের সহায়তা বিতরণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল আইএমএফ। ব্রিকস উদ্যোগে এমন ফান্ড মোট ১০০ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এক্ষেত্রে সদস্যরা চাঁদা দেবে অসমভাবে। চীন একাই ৪১ বিলিয়ন, সাউথ আফ্রিকা সবচেয়ে কম মাত্র ৫ বিলিয়ন আর ভারতসহ বাকি তিন সদস্য রাষ্ট্র প্রত্যেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার করে- এভাবে মোট ১০০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই ফান্ড সংগ্রহের বেলায় তা অসম রাখার ন্যায্যতা কী? কেন এখানেও ভারত চীনের সমান অবদান চাঁদা দিচ্ছে না? অর্থাৎ ভারত এখানে নিজেরই ‘সমান মালিকানা তত্ত্বের’ পক্ষে নিজেই দাঁড়াচ্ছে না কেন?
    নীতি কথার মানে হল, যে অবস্থানটা সবখানে ইউনিফর্মভাবে প্রয়োগ করা হবে। দেখা যাচ্ছে ভারতের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি অবস্থান নাই, ফলে প্রয়োগে ইউনিফর্মিটি নাই। এই অবস্থা কে বলা যায় ভারতের সিরিয়াসনেসের ঘাটতি আছে, ঘাটতিজাত সমস্যা আছে। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা এটা বুদ্ধিমানের অবস্থান মনে করে। কারণ এটা অজান্তে দোদুল্যমানতা নয়। জেনেশুনে দোদুল্যমান থাকা। ব্রিকসের ভিতরেই থাকা ছেড়ে না যাওয়া। কারণ একমাত্র এভাবে সে ব্রিকস উদ্যোগকে আটকে শ্লথ করে রাখতে পারে। আর এই সার্ভিসটা আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে লাগে বলে আমেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিতর সেখান থেকে বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা আদায় করা। ভারতের এই দ্বৈত ঝোঁকের কারণেই চীন হঠাত করে নিজের ঝুলি থেকে আচমকা ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) এর প্রস্তাব হাজির করে ২০১৪ সালে আর আগামি বছর ২০১৬ থেকে কার্যকর করে ফেলতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা হয়েছে এমনভাবে যে চীন একাই প্রস্তাব করেছে আর ইউরোপসহ [এবং বলা বাহুল্য ভারতও] সকলে ঐ প্রস্তাবের পিছনে পিছনে ছুটেছে হা বলার জন্য। অর্থাৎ এটা প্রমানিত হয়েছে যে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা ও প্রস্তাব করার ব্যাপারে চীন যেভাবে আগাতে চায় তা ঠেকানোর ক্ষমতা ভারত কেন ইউরোপেরও নাই। নাই এজন্য যে বিষয়টা চীনা নেতৃত্বের কোন খামখেয়ালিপনার ইচ্ছা নয়, বিষয়টা হল এক অবজেকটিভ বাস্তবতা – চীনের অর্জিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

    ভারতের সিদ্ধান্তের অর্থ তাতপর্য
    আর ভারতের দিক থেকে দেখলে এটা তার শর্ট সাইটনেস, সংকীর্ণ দৃষ্টি অর্থাৎ আপাত নগদ লাভের দিকে প্রলুব্ধ হয়ে চলা, আর সেই সাথে নিজের আগামি লংটার্ম স্বার্থের পায়ে কুড়াল মারা। চীনের সাথে ইতিবাচক নয়, আগামির এলাই নয়, ঈর্ষাবাচক প্রতিযোগিতার চোখে পরিস্থিতিকে দেখা। অথচ বাস্তব ফ্যাকটস হলো, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা হল ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ওপর দাঁড়ানো এক অর্থনীতি। এটা এখন দুনিয়ার সর্বোচ্চ। সেজন্য চীন যে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে এর প্রতি ঈর্ষামূলক অবস্থান নেয়া অর্থহীন, কারণ বিষয়টা ঈর্ষা করা নয়। বরং প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেয়াটাই উপযুক্ত পথ, ঈর্ষা নয়। এছাড়া নিজের ওপর আস্থা রাখা উচিত যে, কালক্রমে ভারত রাষ্ট্রের যেটুক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হচ্ছে, হয়েছে; কিন্তু তা অর্জনের পরও আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো ফোরামে সমতুল্য গুরুত্ব ও জায়গা যদি অন্যরা তাকে না দেয় তবে পালটা আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান, ব্রিকস বা AIIB হাজির হবে- ভারত তৈরি করবেই। সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হলে অন্যেরা কেউ চাইলেই ভারতকে বঞ্চিত রাখতে পারবে না। কাজেই ঈর্ষা, সন্দেহ এগুলো কোনো পথ বা কাজের কথা নয়। তবে সংকীর্ণ দৃষ্টির ভারতের নীতিনির্ধারকদের ধারণা যেহেতু নিজের ন্যাচারাল ভবিষ্যতের পথে চীনের সঙ্গে নতুন উদ্যোগে শামিল হতে ঢিলেঢালা, গড়িমসি দেখালে আমেরিকার দিকে ঝুঁকার ভয় দেখিয়ে চীনকে চাপে রাখার সুযোগ আছে, তাই সেটা নেয়া উচিত। এর অর্থ নিজের যেটুকু গুরুত্ব মূল্য পাওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি যেন সে পেতে পারে এমন আবদারে তা পাওয়ার জন্য অযথা ঝুলাঝুলি করা। এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে তা ভারতের জন্য আত্মঘাতী ফল বয়ে আনতে পারে। ব্রিকস উদ্যোগ এত দিন কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি ভারতের এসব ওজর-আপত্তির কারণে।
    ভারত-চীনের সামরিক স্বার্থ বিষয়ক টেনশন আছে এটা বাস্তবতা। এর বড় কারণ মার্ক করা বা চিহ্নিত করা হয় নাই এমন বিস্তৃর্ণ কমন রাষ্ট্র সীমান্ত তাদের আছে। বিগত ১৯৬২ সালে চীনের কাছে যুদ্ধে হেরে যাবার খারাপবোধ, ট্রমা আছে। এছাড়া চলতি সময়ে অসম সামরিক সক্ষমতার বাস্তবতা এখানে আছে। এরপরেও এগুলোই একমাত্র বাস্তবতা নয়। কারণ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে আবার উলটা চীনের থেকে সহযোগিতা পাবার (অবকাঠামো ঋণ, আমদানি ব্যবসার বাজার পণ্য ও কাঁচামাল) নেবার স্বার্থ ভারতের আছে। অথচ সবকিছু মিলিয়ে দেখলে অন্তত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অহেতুক চীনভীতি ছড়ানোর চেষ্টা ভারতের মানায় না, কারণ এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ। যেমন ব্রিকস উদ্যোগের NDB ব্যাংক গড়ার ক্ষেত্রে ভারত শর্ত দেয় প্রথম ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট ভারতের হতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এভাবে শর্ত রাখা হয়েছে যে, রোটেশনে চীনের সুযোগ আসবে সবার শেষে, মানে ২০ বছর পর। ফলে আগামী দুই দশক চীন এই এনডিবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই চীনভীতি অহেতুক। তবু চীন তাতেই রাজি হয়েছে। আর ভারতের প্রস্তাবিত ও মনোনীত ব্যক্তি কে ভি কামাথ এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সাথে চীনের আরও কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা-ও জানা যাচ্ছে।
    ব্রিকস উদ্যোগের মূল আইডিয়ার মধ্যে চীন বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়াকে আপাতত ব্রিকসের ভেতরে সীমিতভাবে এবং ব্রিকসের বাইরেও পূর্ণভাবে- দুই জায়গাতেই বাস্তবায়ন করার পথে রওনা হয়েছে। দৃশ্যত তাই দেখা যাচ্ছে। ব্রিকসের ভেতরের অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এনডিবি ব্যাংক। আর এউদ্যোগের বাইরের আরও পূর্ণভাবে ব্যাপক পরিসরে অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক। ভারতের খায়েশ ও চীনের প্রতি অর্থহীন সন্দেহ অনুসরণ করে ব্রিকসকে সে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে বামন রাখতে চায়। অথচ ব্রিকস উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হল, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পালটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে গ্লোবাল অর্থনীতির ওপর আমেরিকার বদলে নিজেদের নতুন কর্তৃত্ব লাভ করা। অর্থাৎ এ দুই অবস্থান স্ববিরোধী। আর ভারত এই স্ববিরোধী অবস্থানের উদ্গাতা। এ স্ববিরোধিতা কাটতে পারে একমাত্র, ভারত যদি ব্রিকস উদ্যোগের সাফল্যের ভেতর নিজেকে গ্লোবাল নতুন কর্তৃত্বে চীনের সঙ্গে বড় অংশীদারিত্বে নিজেকে দেখতে চায় তবে, তা সম্ভব একমাত্র চীনের বড় ভূমিকা এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই।
    এখান থেকে ভারতের জন্য শিক্ষা হল,
    ১। বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী একটা অবকাঠামো ব্যাংক গড়ার উদ্যোগ যেটা শেষে AIIB নামে বাস্তবায়িত হল – শেষ পর্যন্ত এমন ঘটনাগুলো ঠেকানোর ক্ষমতা ভারতের নাই, সম্ভব হয় নাই। কারণ এটা সম্ভব নয়। ঠেকানোর চেষ্টাটাও আসলে ভারতের স্বার্থে যায় নাই। ২। গত সাত বছর ধরে এটা ঠেকিয়ে রেখে কি ভারতের লাভ হয়েছিল না কি এখন AIIB হাজির হওয়াতে ভারতের স্বার্থ বেশি আছে তাতে? AIIB ব্যাংক আগে বাস্তবায়িত হলে কি ভারতের জন্য তা বেশি ভাল হত না! আবার চীনের সাথে পক্ষে সক্রিয় থাকলে ব্রিকস উদ্যোগের অধীনেই AIIB ব্যাংক হাজির হত। তাতে বর্তমানের চেয়েও AIIB এর উপর ভারত ব্রিকসের মাধ্যমে বেশি কর্তৃত্ব লাভ করতে পারত। সেটা সে এখন হারাল। তাহলে ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় এতদিন কার পক্ষে কাজ করল? কি লাভ করল? এসব নিয়ে তার অবিলম্বে মুল্যায়নে বসা উচিত।

    বিরোধে না জড়ানো বুদ্ধিমান চীন
    তবে মজার দিকটা হল, ভারতের এ স্ববিরোধিতার মুখেও চীন তাকে ত্যাগ করেনি। অথবা ব্রিকস উদ্যোগকে চীন স্থবির বা গুটিয়ে ফেলেনি। বুদ্ধিমান ও ইতিবাচকভাবে ভারতকে নাড়াচাড়া মোকাবিলা করেছে। তবে দেখিয়েছে, চীন একা নিজ উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী মূল অবকাঠামো ব্যাংক গড়তে সমর্থ। তাই মাত্র ২ বছরের মধ্যে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের স্ববিরোধী ও দোদুল্যমানতার কারণে চীন আর ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে রেখে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর করার পথে যায়নি আপাতত। এর অর্থ হলো, ভারতের নির্বুদ্ধিতার জন্য চীন এআইআইবি ব্যাংক আপাতত ব্রিকস উদ্যোগের বাইরে নিয়ে রাখল। স্বভাবতই এতে ভারতের ক্ষতি ছাড়া কোনোই লাভ হয়নি। বরং এভাবে হওয়াতে এআইআইবি ব্যাংকের বাস্তবায়নের উপর চীনের একার বক্তব্যের ওজন সবচেয়ে বেশি। এমনকি ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরের এনডিবি ব্যাংকের উপর নিজের প্রভাবের চেয়ে তা বেশি। ফলে সমান বিনিয়োগের গোঁ ধরে ভারতেরই ক্ষতি হল। যদিও এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট কামাথ বলছেন, এআইআইবি ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এনডিবি ব্যাংক রেখে কাজ করবে।

    এনডিবি ব্যাংক চেয়ারম্যান আরও বলছেন, তারা শুরুতে শুধু পাঁচ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখবে। এটাও কথার কথা। কারণ ব্রিকসের ভিতরে বাস্তবে অবকাঠামো ঋণ পাওয়ার দরকার আছে, প্রথমত ভারত আর ব্রাজিলের। বাকিরা দাতা অথবা ঋণ কাজে লাগানোর উপযোগী অর্থনীতির রাষ্ট্র নয়। এর মানে দাঁড়াল, আপাতত যেন ভারত শুধু নিজের জন্য ব্যবহার করবে এনডিবি ব্যাংককে। অর্থাৎ ভারত কী চাচ্ছে আর তা পেয়ে ভারতের কী লাভ হচ্ছে – এসবের কোনো ঠায়ঠিকানা ভারত মিলাতে দেখাতে পারছে না। তবু নানান ওজর-আপত্তি তুলতে দেখছি আমরা ভারতকে।
    আসলে মূল স্ববিরোধী কঠিন বাস্তবতা হল, ভারত মূলত ঋণগ্রহীতা; কিন্তু সে ঋণদাতার ভূমিকা ও গুরুত্ব পাওয়ার জন্য জিদ ধরেছে।

    [এই লেখাটা এর আগে আগষ্ট ২, ২০১৫ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে ছাপা হয়েছিল। পরে সে লেখাটাই আরও বিস্তার করে এবং সম্পাদনা করে এখানে এখন ছাপা হল।]

  • নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন

    নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন
    গৌতম দাস

    ০৯ এপ্রিল ২০১৫

    https://wp.me/p1sCvy-9Y

    আগামী দিনের ইতিহাসে ১২ মার্চ ২০১৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে সম্ভবত বিবেচিত হবে। ঘটনাটার শুরু, গত বছরের অক্টোবরে চীনের সাংহাইয়ে চীন কর্তৃক প্রস্তাবিত Asian Infrastructure Investment Bank (সংক্ষেপে AIIB), এর উদ্যোক্তা সদস্য হতে আগ্রহী দেশগুলোর আহূত এক সম্মেলন থেকে এই ব্যাংকের কার্যক্রমের হাজিরা ঘোষণা করেছিল। AIIB কার্যকর হলে তা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখতে শুরু করবে। ওই সম্মেলন থেকে উদ্যোক্তা পত্র বা Memorandum of Understanding (MOU)-এ স্বাক্ষর করা শুরু হয়েছিল। উদ্যোক্তা সদস্য কারা কারা হতে চায় সেই সম্মতি জানানোর খাতা তখন থেকে খোলা হয়েছিল। উদ্যোক্তা স্বাক্ষরদান বন্ধ হওয়ার শেষ দিন ৩১ মার্চ ২০১৫। উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় ১৩ মার্চ ২০১৫ হঠাৎ করে ব্রিটেন ওই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়ার ওপর মাতবরি, আধিপত্য প্রভাব জারি রাখার উদ্দেশ্যে মাতবর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় আলোচনার জন্য ‘জি৭’ বা গ্রুপ সেভেন নামে একটি সংগঠন আছে। গ্রুপ সেভেন অন্তর্ভুক্ত সাত রাষ্ট্রের সবাই তবে আলাদা আলাদা করে AIIB-এর ঘোষণার সময় ঘটনাটিকে বাঁকা চোখে দেখেছিল। এখন ‘জি৭’-এর ব্রিটেন একমাত্র রাষ্ট্র যে দলছুট হয়ে বিপরীত ক্যাম্পে যোগদানের সিদ্ধান্ত জানাল। ওদিকে ব্রিটেনের এ সিদ্ধান্তে আমেরিকা সবচেয়ে অখুশি ও অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। জবাবে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে আমেরিকার সঙ্গে আমাদের অবস্থান নিয়ে কথা হয়েছে।’ আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় ‘এটা সারপ্রাইজ সিদ্ধান্ত’। বোঝাই যাচ্ছে, AIIB-এর উত্থান বা আবির্ভাব কোনো সাধারণ ব্যাংক আবির্ভাবের মতো ফেনোমেনা নয়। এটি ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েই ফাংশনাল হতে যাচ্ছে, ফলে স্বভাবতই তা হবে এ দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের ভেতর দিয়ে ওই যুদ্ধের পর থেকে (১৯৪৪) ইউরোপকেন্দ্রিক কলোনি শাসনের যুগের সমাপ্তি টেনে অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন করে পশ্চিমা শাসন দুনিয়াতে কায়েম হয়েছিল। এর সবচেয়ে তাৎপর্যময় দিকটি ছিল, আমেরিকা নিজের আধিপত্যের নতুন কাল শুরু করেছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে – আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসংঘ আর ডবিস্নউটিও এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। এ চার প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুইটি গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য, তৃতীয়টি গ্লোবাল রাজনৈতিক (পরাশক্তিগত) ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য আর চতুর্থটি গ্লোবাল পণ্য রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য। এভাবেই দুনিয়াতে নিজের অধীনস্থ নিজেদের দিকে কান্নি মারা এক গ্লোবাল আধিপত্য ব্যবস্থা কায়েম ও যাত্রা শুরু করা হয়েছিল। গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দুনিয়ায় আধিপত্য করার এ ফেনোমেনা এর আগের ৩০০ বছরের কলোনি যুগেও দেখা যায়নি। কলোনি যুগ সেটা পারেনি। যেমন আইএমএফের প্রধান ভূমিকা বা ম্যান্ডেট হলো, আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা চালু রাখা। সে কাজে মুখ্য প্রয়োজনীয় হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিনিময় মুদ্রা। আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে আয়ব্যয়ের ঘাটতিতে পড়া সদস্য কোনো রাষ্ট্রকে ধার দিয়ে ঘাটতি পূরণ – এ দুই মূল কাজের মাধ্যমে গ্লোবাল মুদ্রা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ করে আইএমএফ সে ভূমিকা বাস্তবায়ন করে থাকে। মানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের সঙ্গে আর তিনটি প্রধান মুদ্রার তুল্য বিনিময় হার নির্ধারণ করে, এরপর বাকি সব সদস্য রাষ্ট্রের মুদ্রার বিনিময় হার সেই নিরিখে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করে থাকে। এটা বলা বাহুল্য যে, এ প্রাতিষ্ঠানিকতা একচেটিয়া আমেরিকা বা এর মুদ্রা ডলারের অধীনে নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো গরিব বা ছোট অর্থনীতির দেশের ওপর আধিপত্য কায়েম করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ অস্বস্তি সত্ত্বেও এর ভেতর দিয়ে পড়ে পাওয়া সুবিধার দিকটি হলো, আমেরিকার দিকে কান্নি মারা হলেও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা, যেটাকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বলছি তা দুনিয়ায় সেই থেকে চালু হয়ে আছে। চলতি এ গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি যুগের মুদ্রা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও মান নির্ধারণের লক্ষ্যে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম ঘটেনি। এমনকি কোনো কলোনি মাস্টার যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রাষ্ট্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কিছু ছিল না। আর মুদ্রার মান বা হার নির্ধারণ নিয়ন্ত্রণও কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করত না। ব্যাংক অব ইংল্যাল্ডকে মাত্র ১৯৪৬ সালে সরকার অধিগ্রহণ করে ব্রিটেনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের দায়িত্বে হাজির করে। দেশের ব্যাংক ব্যবসা ও স্থানীয় মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ সেন্ট্রাল ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নিতে হবে – এ ধারণাটি ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সমসাময়িক ঘটনা। কারণ আইএমএফ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমেই নিজের উপস্থিতি, কর্তৃত্ব তৎপরতা ও কার্যকারিতা কায়েম করে থাকে। সে সময় এসবের কোন বালাই ছিল না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ছিল খুবই সীমিত পর্যায়ে। ফলে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হতো কোনো প্রাইভেট ব্যাংকে নয়, যেমন হত রথশিল্ড-পরিবার ধরনের পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে; বাবা রথশিল্ড আর তার তিন ছেলে ইউরোপের চার শহরে বসে পরস্পরের যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে বিনিময় হার নির্ধারণ করে দিতেন। এভাবেই এক মুদ্রা বিনিময় হার ও মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফলে সীমিত পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ব্যবস্থা সে সময় চালু ছিল। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় কথা হলো, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মুদ্রা বিনিময় হারের এই ব্যবস্থার প্রতি বাজারের আস্থাহীনতার কারণে ভেঙে পড়েছিল চিরদিনের জন্য। পরে শেষমেশে এ প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে ১৯১৪ থেকে ১৯৪৪ এই ৩০ বছর কোনো আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা বলে কিছু ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। এরপর এমন দুর্দশায় পৌঁছানো ইউরোপ বারবার অনুরোধ করে একেবারে হাতে-পায়ে ধরার অবস্থায় পৌঁছে, আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় (আইএমএফ) আমেরিকান ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সূচনা হয়। আমেরিকার হাতে-পায়ে ধরা আর ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো – এসবের মূল কারণ একটাই। তা হলো ১৯১৪ সাল থেকেই যুদ্ধে জড়িয়ে ইউরোপের প্রতিটি রাষ্ট্র যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় আয়ব্যয়ের মারাত্মক অসামঞ্জস্য ঘাটতির মুখোমুখি হয়। পরিণতিতে প্রত্যেকেই জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েও অন্য দেশের মুদ্রার তুলনায় নিজ মুদ্রার একটি স্থিতিশীল মান বা হার ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতে সে সময়ের একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। তাই ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা মেনে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো, ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা সাজানো ছাড়া কারও উপায় ছিল না। আইএমএফের জন্ম হয় এভাবেই। সে থেকে ডলারকেন্দ্রিক অন্য মুদ্রার হার নির্ণয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্যের খাতায় ডলার হিসাবের মুদ্রা হয়ে পড়া ও অন্যান্য মুদ্রার হার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করে আসছিল আইএমএফ। সংক্ষেপে এ হলো ডলারের উত্থান ও শাসন কাহিনী। কিন্তু ১০ বছরে ক্রমেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সে কাহিনীতে নয়া ওলটপালট আসন্ন হওয়ার আলামত দেখা দিতে শুরু করেছে।

    শুরু করেছিলাম ইতিহাসের কথা তুলে। সে আগামী দিনের ইতিহাস মানে কোন ইতিহাসে- ‘গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক’ অর্থনৈতিক ইতিহাসে। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা বা অর্ডার শৃঙ্খলের ওপর এবার চীনের নতুন করে নতুন প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়ার প্রভাব  – এটা  শুধু গ্লোবাল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এ প্রভাব পড়বে ও ধীরে ধীরে বাড়বে- দুনিয়ার পরাশক্তিগত ভারসাম্যে, গ্লোবাল রাজনীতিতে, স্ট্র্যাটেজিক ও সামরিক ইত্যাদি সব গ্লোবাল ফেনোমেনাকে তা প্রভাবিত করবে। চলতি একুশ শতকের প্রথম দশক (২০০১-২০১০) গ্লোবাল পরাশক্তিগত পরিস্থিতিতে দুইটি নতুন ইঙ্গিত হাজির হতে দেখা দিয়েছিল। প্রথমটি গ্লোবাল রাজনৈতিক ফেনোমেনা আকারে। দুনিয়ায় পশ্চিমের ক্ষমতা আধিপত্যের শাসনকে চ্যালেঞ্জকারী ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে সামনে আনা বা তুলে ধরার নতুন রাজনৈতিক ফেনোমেনা। গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের এ নয়া প্রভাব আর এর পাল্টা পশ্চিমের ‘ওয়ার অন টেরর’ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, পরিণতিতে আগামীতে দুনিয়া দেখতে কেমন হবে তা এখনও ফয়সালা হয়নি। তা আদৌ হবে কিনা, নাকি কে হেরে যাবে তা এখনও অমীমাংসিত অসমাপ্ত। তবে ছড়িয়ে পড়া বা বিস্তৃতির দিক থেকে বললে গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব ভালোই ছড়িয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকা বাদে সব মহাদেশকেই তা স্পর্শ করে ফেলেছে বলা যায়। এছাড়া ওদিকে ঐ দশকের দ্বিতীয় ফেনোমেনাটা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের উত্থান। আর এর প্রভাবে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভূমিকা নড়বড়ে হয়ে নতুন এক পরাশক্তিগত ভারসাম্য আসন্ন হওয়ার ইঙ্গিত। এর রাজনৈতিক ইঙ্গিতগুলো অনুভূত হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই; কিন্তু আমেরিকার সরকারি গবেষণা, স্টাডি এবং প্রাপ্ত নিউমেরিক্যাল ডাটা প্রজেকশন থেকে প্রথম নতুন চিত্র স্পষ্ট হয় ২০০৭-৮ সাল থেকে। অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজির প্রবাহ পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী হতে শুরু করেছে- এ তথ্যগত স্বীকৃতি তখনকার প্রকাশিত রিপোর্ট থেকেই প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, পুঁজির এ প্রবাহের ধরন কেবল একমুখী অর্থাৎ ভবিষ্যতে আবার কোনোদিন এর বিপরীতমুখী হওয়ার সম্ভাবনা নেই- এটাও সেই গবেষণালব্ধ ফলে প্রকাশিত হয়। এ গবেষণা হয়েছিল আমেরিকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের’ অধীনে এবং ২০০৮ সালে জনসমক্ষে প্রকাশিত রিপোর্টে। এমনিতেই এমন পরিসংখ্যানগত গবেষণা রিপোর্ট প্রতি চার বছর অন্তর প্রকাশিত হওয়া এক চলমান ঘটনা। তবে ২০০৮ সালের রিপোর্ট ছিল স্বভাবতই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওই রিপোর্টকে বলা যেতে পারে, গ্লোবাল অর্থনীতি ও পরাশক্তিগত পরিস্থতিতে আসন্ন নতুন করে সাজানো ভারসাম্যের ইঙ্গিত। এসব ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান কী হতে যাচ্ছে সেসব জানা ও জানানো। কিন্তু বাস্তবে সে জায়গায় চীন পৌঁছাবে কী করে আর তাতে উপস্থিত মাতবররা কে কি ভূমিকা নেবেন এসবের বাস্তব রূপ আকার দিতে যাচ্ছে AIIB-এর আবির্ভাব। কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের চীন যে এমন কিছু করতে যাচ্ছে তা অনেক আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। যেমন- নিজ বাণিজ্যের উদ্বৃত্তের অর্থ নিয়ে চীন চুপচাপ পুরনো কান্নি মারা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক যেমন আছে, তেমনি রেখে এতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুনিয়াতে নিজের নতুন প্রভাব যোগ করার চেষ্টা করা – এটাকে চীন সঠিক মনে করেনি। তাই এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটিং রাইট ইত্যাদিতে সংস্কারের দাবি করেছিল। প্রতিষ্ঠান দুইটি ২০০৯ সালের বার্ষিক সম্মেলন থেকেই এ ব্যাপারে নিজের সম্মতির কথা জানান দিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতে সাড়া দেয়নি। প্রতিষ্ঠান দুটোর সংস্কার প্রস্তাবের ফাইল সেই থেকে আমেরিকান কংগ্রেসে পড়ে আছে। ফলে ২০০৯ সাল থেকেই চীন বিকল্প উদ্যোগ নেয়ার পথে চলতে শুরু করে। আর এতে বিশেষত রাশিয়ার প্রবল আগ্রহে BRICS ব্যাংক নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ শুরু হয়। রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকাকে নিয়ে রাশিয়াতে প্রথম ব্রিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সে থেকে প্রতিবছর ব্রিক সম্মেলন হওয়া সত্ত্বেও ইন্ডিয়ার নড়বড়ে হাফ-হার্টেড ভূমিকার জন্য ব্রিক কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে এখনও অনেক দূরে থেকে যায়। এ অবস্থা দেখে চীন আর এক বিকল্প উদ্যোগে আগানো শুরু করে। মাত্র ২০১৩ সালে AIIB-এর ঘোষণা দিয়েই পরের বছর ২০১৪ সালে AIIB এর উদ্যোক্তা সম্মেলন ডেকে বসে চীন। ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের চেয়েও AIIB-এর উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনেক গতিশীল। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ব্রিটেনের এতে যোগদানের সিদ্ধান্ত বিরাট সাড়া ফেলতে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া অক্টোবরের AIIB-এর উদ্যোক্তা সম্মেলনে প্রায় যোগ দিয়েই ফেলেছিল; কিন্তু ওবামার কড়া হুমকি ও লবিংয়ের কারণে এরা শেষে থমকে যায়। এবার ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের প্রভাবে ওবামার বাধা পেরিয়ে দেশ দুইটি এবার সম্ভবত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। এ বছরের শেষ থেকে উদ্যোক্তারা AIIB-কে কার্যকর করে ফেলতে চান। AIIB-এর উত্থান ৭০ বছরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর ওলটপালট ঘটনা হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে।

    দুইঃ

    চীনের বিশ্বব্যাংক, এবার “উন্নয়ন” এর অর্থ কি বদলে যাবে
    আগের পর্বে বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং একে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনের নেতৃত্বে AIIB ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে বলেছিলাম। AIIB ব্যাংক গড়ার লক্ষ্যে চীনের সাংহাইয়ে প্রথম উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়েছিল গত বছর ২৬ অক্টোবর। ওই সম্মেলনে এশিয়ার বাইরের কোনো রাষ্ট্র যোগ দিতে আসেনি। AIIB প্রসঙ্গে আগের লেখাতে ফোকাস করেছিলাম ১২ মার্চ, আচমকা ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে। এবারের ফোকাস অন্যদিকে। AIIB-তে বিশ্বব্যাংকের মতোই শুধু কোনো রাষ্ট্রই এর সদস্য হতে পারে, কোনো প্রাইভেট কোম্পানি বা ব্যক্তি নয়। আর সম্মেলনের দিনেই কে কে উদ্যোক্তা হতে চায় এমন রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি স্বাক্ষর বইয়ে সই করেছিল এশিয়ার ২০টি রাষ্ট্র। এরপর সে স্বাক্ষর খাতা খুলে রাখা হয় পরবর্তী পাঁচ মাস, ৩১ মার্চ পর্যন্ত। মঙ্গলবার শেষ দিন গত হয়েছে। এর মানে কি এখন আর কেউ সদস্য হতে আবেদন জানাতে পারবে না? না ঠিক তা নয়। ৩১ মার্চের পরের আবেদনে কেউ সাধারণ সদস্য হতে পারবে, কিন্তু আর উদ্যোক্তা সদস্য হতে পারবে না। যেমন- বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল, স্বাক্ষর করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সদস্যদের একজন। তাতে বাংলাদেশের বাড়তি কী লাভ হতে পারে? লাভ হল। এখন শুধু উদ্যোক্তা সদস্যরাই বসে আগামী বছর থেকে কাজে নেমে যেতে চাওয়া AIIB ব্যাংকের ম্যান্ডেট অর্থাৎ এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেল লিখবে। আর একটু সোজা কথায়, কে কত শেয়ার মালিকানা নেবে, পরিচালনায় কে কোন পদপদবি নেবে-পাবে, দায় নেবে, পরিচালনার নীতি, সদস্যপদের চাঁদা ধার্যের নীতি, ঋণ দেয়ার নীতি ইত্যাদিসহ পরিচালনার সব বিষয়ে নির্ধারণ করতে পরস্পরের সঙ্গে নিগোসিয়েশনের টেবিলে বসবে, নিজ নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে, নীতি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। যারা ৩১ মার্চের পর সদস্যপদের আবেদন করবে তারা আর এই টেবিলে বসার সুযোগ পাবে না। এ হলো ফারাক। তবে একথা থেকে বোঝাই যাচ্ছে, ওই টেবিলে বসাটাই আবার শেষ কথা নয়, নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা, আরও স্পষ্ট করে বললে মূলত কী পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের অর্থনীতি আমার রাষ্ট্রের আছে এবং তা কতটা দীর্ঘ লাগাতার- এসবই ঠিক করে দেবে নেগোসিয়েশন টেবিলে আমার গলার স্বরের ওজন কেমন হবে। তবে আবার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার মতো ইস্যুগুলো নেগোসিয়েশনের মতো বিষয় নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের নিজের দক্ষ ও স্বচ্ছ হয়ে টিকে থাকা না থাকার বিষয়। তাই এসব বাস্তবে বেস্ট যা করা সম্ভব তাতে সবার ঐকমত্যই ঘটবে তা আশা করা যেতে পারে। আর কিছু প্রসঙ্গে সিরিয়াস বিতর্ক দেখা দেবেই, তা বলা বাহুল্য।

    যেমন ‘উন্নয়ন’ বা ইংরেজিতে ‘ডেভেলপমেন্ট’ শব্দের কথাই ধরা যাক। অনেকে আমরা হয়তো খেয়াল করেছি অথবা না, তবে এটা বুঝি এ শব্দটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে চলে এমন এক শব্দ। এ শব্দের বিশেষ অর্থ ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে নতুন বিশেষ অর্থে কয়েন করে নেয়া হয়। বিশেষ কিছু বোঝানোর শব্দ হয়ে যায় এটা। এ শব্দ আর এর ভাবের প্রভাবে আমাদের রাজনীতির ভোকাবুলারিও বদলে গেছে। যেমন বলা হয়, আমরা ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ করি বা করব। এমন ভাবের বাক্য ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্ব্বার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত চালু এবং সরকার বা বিরোধী সবাই ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, অহরহ ব্যবহার করি। ভোটার, জনগণের কাছেও এর অর্থ আছে, নিজের মতো করে বুঝে, কমিউনিকেটেডও হয়, পৌঁছায়। ভোটার-জনগণও কিছু একটা বোঝে। তাহলে এমন প্রশ্ন তুললাম কেন যে, AIIB ব্যাংক গঠনের নেগোসিয়েশনের কালে উন্নয়ন শব্দটা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিতে পারে? সে প্রসঙ্গ হলো এ পর্বের রচনার ফোকাস। কিন্তু সরাসরি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং কিছু বিষয় ধারণা পরিষ্কার করার ভেতর দিয়ে যাব। যেমন- AIIB ব্যাংক কী? এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলতে হচ্ছে এটা বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হতে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও সেই সূত্রে আইএমএফ এরা কেমন প্রতিষ্ঠান, কী করে, কেমনে করে ইত্যাদি সম্পর্কে সোজা ভাষায় কিছু ধারণা দেয়া ছাড়া AIIB ব্যাংক নিয়ে কোনো ধারণা স্পষ্ট করা যাচ্ছে না। তাই এবারের সেকেন্ডারি প্রসঙ্গ হলো এ দুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সংক্ষেপে একটা ধারণা দেয়া।

    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বাস্তবিক কার্যকারিতার দিক থেকে এর তাৎপর্য বলা হয়, এটা যেন আমেরিকা রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির বর্ধিত হাত ধরনের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো প্র্যাকটিক্যাল অর্থে বলা কথা, আইনি নয় বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যান্ডেট বা এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেলে সরাসরি এমন কথা লেখা নেই। কিন্তু আমরা সবাই জানি, টের পাই যে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর যে কোনো সিদ্ধান্তের ওপর আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রবল শুধু নয়, একচেটিয়া।

    আইএমএফের বেলায়, এরকমটা সম্ভব করে তোলা হয়েছিল সদস্যপদ লাভের নিয়ম বা শর্ত যেভাবে আরোপ করা হয়েছে সেখান থেকে। প্রত্যেক রাষ্ট্রকে তার অর্থনীতির সাইজের অনুপাতে নির্ধারিত-ধার্য সদস্য চাঁদা দিয়ে তবেই সদস্যপদ পেতে হয়। যেহেতু এটি ঠিক ব্যাংক নয়, সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ধার্য বিভিন্ন পরিমাণ চাঁদা একাট্টা করে তৈরি একটি ফান্ডমাত্র, ফলে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা শেয়ার যার বেশি পরিচালনা সিদ্ধান্তে তার বক্তব্যের মূল্য তত বেশি। এ কায়দায় আইএমএফের ওপর আমেরিকান প্রভাব বেশি নিঃসন্দেহে; কিন্তু সেটা কায়েম করা হয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি আমেরিকার, ফলে সদস্য পদে প্রবেশের চাঁদা তার সবচেয়ে বড়, এই কায়দা করে। তবে এভাবে সংগৃহীত আইএমএফের ফান্ড ঠিক বাণিজ্য বিনিয়োগের পুঁজি হিসেবে বা মুনাফা লাভের উদ্দেশে খাটানো হবে এমন ফান্ড নয়। এ ফান্ড ব্যবহার করা হয় শুধু কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ব্যয়ে ঘাটতি থেকে গেলে। সেক্ষেত্রে ওই বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য এ ফান্ড থেকে শর্তসাপেক্ষে তাকে ঋণ দেয়া হয়। তবে মাত্র ০.৭৫% সুদে, অর্থাৎ ওই ঋণ সুদে খাটানোর জন্য বা মুনাফা কামানোর জন্য নয় বরং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় তুলতে সার্ভিস চার্জ হিসেবে নেয়া হয়। তাই এত স্বল্প পরিমাণ। এটাই আমাদের মতো এলডিসি বা স্বল্পোন্নত (অর্থনীতির) দেশের বেলায় দেয়া কনসেশনাল আইএমএফ ঋণ সুবিধা। আর মধ্যম আয়ের দেশ হলে সার্ভিস চার্জের ওপর কিছু মুনাফাও ধার্য হবে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে ধার দেয়ার পূর্বশর্ত হলো, সদস্য দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে আইএমএফের ফর্দ অনুসারে সংস্কার আনতে হবে। এমন এক চুক্তিতে রাজি হতে হবে, আর তা মনিটরিং ও সঠিক পালন সাপেক্ষে কিস্তিতে ধাপে ধাপে ঋণের অর্থ ছাড় করা হবে। এ হলো আইএমএফের একটি প্রধান দায়িত্ব- ম্যান্ডেট বা ঘোষিত উদ্দেশ্য। আইএমএফের দ্বিতীয় করণীয় বা ম্যান্ডেট হলো, প্রত্যেক রাষ্ট্রের মুদ্রার মান-হার অন্য মুদ্রার তুলনায় কত তা প্রতিদিন সকালে প্রকাশ করা। এখানে অন্য মুদ্রা মানে, সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক লেনদেন হয় এমন চারটি মুদ্রা- ডলার, ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েন। এ চারের গড় করে প্রতিদিন তা ডলারে প্রকাশ করা হয়। আইএমএফের ভাষায় আর তার খাতাপত্রে প্রতিদিনের এ গড় মূল্যের নাম SDR, এমনকি প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের আইএমএফ অ্যাকাউন্টের অবস্থা কি, এর হিসাবকিতাব করা ও রাখা হয় SDR মূল্যে। এ অর্থে বলা হয়, আইএমএফের নিজস্ব মুদ্রার নাম SDR. আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের SDR-এর দাম লটকানো থাকে। যেমন ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে এক USD = 0.724763 SDR। আগেই বলেছি, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দাতা বা খাতক সদস্য শুধু কোনো রাষ্ট্রই হতে পারে। কারণ এর লক্ষ্য রাষ্ট্র মানে রাষ্ট্রের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এভাবেই আমেরিকার দুনিয়ার অর্থব্যবস্থার ওপর প্রভাব, কর্তৃত্ব আইএমএফের মাধ্যমে রাখার অবস্থা তৈরি হয়। তবে একটি সুবিধার দিকও আছে, কোনো রাষ্ট্র বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি বাধিয়ে না ফেললে আইএমএফের কাছে বন্ধক বা শর্তের বন্ধনে পড়ার দরকার হয় না।

    এবার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তির আয়োজন প্রসঙ্গে। কোনো কোনো ব্যাংকের নামের মধ্যে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’, ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘রিকনস্ট্রাকশন’ ইত্যাদি থাকতে দেখা যায়। নামের মধ্যে কামের অর্থাৎ ওই ব্যাংক কী ধরনের ব্যাংক, এর চিহ্ন ধারণ থাকে, ইতিহাসও লুকিয়ে থাকে। যেমন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘ইউরোপিয়ান ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আবার বিশ্বব্যাংকের পুরো নাম IBRD, ভেঙে বললে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আমাদের রাজনীতি ও সমাজে ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন শব্দটা আমাদের এদিকে সত্তর দশক থেকে আমদানি ঘটেছিল, পরিচিত হতে শুরু করেছিল। পশ্চিমা দেশেও এ শব্দটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পরিচিতি পেতে শুরু করে। যত জায়গাতেই ডেভেলপমেন্ট শব্দের ব্যবহার দেখা যাক না কেন ওই শব্দ আসলে অর্থ করে, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। অর্থাৎ ডেভেলপমেন্ট মানেই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বুঝলে তবে ডেভেলপমেন্ট শব্দের অর্থের তালাশ মিলবে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কথাটা সংক্ষিপ্তি পেয়েছে শুধু “ডেভেলপমেন্ট” বা ‘উন্নয়ন’ উচ্চারণ করে। কিন্তু ইনফ্রাস্ট্রাকচার মানে আবার কী? বাংলায় এর প্রতিশব্দ আমরা করে নিয়েছি ‘অবকাঠামো’। প্রতিশব্দ জানলেও তবু প্রশ্ন থেকে গেল, অবকাঠামো মানে আবার কী, কার অবকাঠামো, কী সূত্রে – এসব বুঝতে আমাদের যেতে হবে ক্যাপিটাল বা ‘পুঁজি’ ধারণায়। কারণ এসব শব্দ পুঁজি ধারণার চোখে দেখা এবং দেখে তৈরি হওয়া সংশ্লিষ্ট আরও ধারণা এবং ডেরিভেটিভ বা অনুসৃত শব্দ। অর্থাৎ পুঁজি এ ফেনোমেনার চোখ দিয়ে না দেখলে তা থেকে অনুসৃত শব্দগুলোর অর্থ খুলবে না। অবকাঠামো ঋণ বলতে ফিজিক্যাল (রাস্তাঘাট, ব্রিজ ইত্যাদি খাতে) ও হিউম্যান (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে) এ দুই ধরনের অবকাঠামো খাতেই ঋণ বুঝায়। অবকাঠামো বলার বা এ শব্দে চেনানোর কারণ এগুলো ঠিক বাণিজ্যিক তৎপরতা হিসেবে দেখে দেয়া ঋণ নয়। ঋণ ব্যবসার বাজারের তৎপরতায় টার্মোনোলজি হিসেবে যা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তা বোঝাতে অবকাঠামো ঋণ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কোনো ঋণ বাণিজ্যিক কিনা, তা বোঝার মূল নির্ণায়ক সুদের হার। বিশ্বব্যাংকের অবকাঠামো ঋণের সুদ ০.৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ শতাংশের নিচে। এটা ঠিক ঋণের অর্থের ওপর সুদ নয় বরং ঋণ দিবার বিষয়টা পরিকল্পনা, প্রজেক্ট নেয়া, তা বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যে অফিস পালতে হয় সেই অফিস পালা-পরিচালনার খরচ। ব্যাংকের ভাষায় এটাকে সুদ না বলে সার্ভিস চার্জ বলে। এতক্ষণ সব শুনে তো বিশ্বব্যাংকের সবই ভালো মনে হচ্ছে। তাহলে বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো ঋণ দেয় কেন? কী ঠেকা তার? এককথায় বললে, গ্লোবাল পুঁজিবাজারে (আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট, সিঙ্গাপুর বা দুবাই থেকে মূলত পরিচালিত) আমরা যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরও বড় বাণিজ্যিক বিনিয়োগের খাতক হই। যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে, বৈদেশিক ঋণ চাহিদা যত বাড়বে, আমরা ততই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের চোখে আকর্ষণীয় বাজার হয়ে ধরা দেব। অবকাঠামো খাতে ঋণ দিয়ে বিশ্বব্যাংক মূলত আমাদের অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজিবাজারের থেকে বাণিজ্যিক পুঁজি পাওয়ার চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। এটাই তার মূল কাজ, ম্যান্ডেট। কিন্তু অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয় বলে সে ব্যাপারটিকে এদিক থেকে হাজির করে বলবে সে ‘দারিদ্র্যদূরীকরণ’ করছে। তবে কথা ঠিক বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উপযুক্ত খাতক হয়ে যাওয়ার পড়ে পাওয়া (এটা টার্গেট নয় এই অর্থে) এবার পাওয়া বৈদেশিক ঋণের অবকাঠামোর খাতে ব্যয়, ফলে নতুন কাজ সৃষ্টির শর্ত তৈরি। এভাবে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা এমনভাবে সাজানো এক সিস্টেম যার কারণে এর বিভিন্ন শর্তের ফেরে পড়ে আমাদের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর পরাশক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।

    এ ব্যাপারে এত দিন একচেটিয়া কর্তৃত্ব পেয়েছে আমেরিকা। এখন চীনের নেতৃত্বে AIIB বা গ্লোবাল অর্থ ব্যবস্থার পাল্টা প্রতিষ্ঠান হাজির হয়ে যাওয়া মানে আমেরিকার কর্তৃত্বের ভাগে টান পড়া। শুধু তাই নয়, ‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ আমেরিকা যেভাবে নির্ধারণ করে রেখেছে তা বদল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন- উন্নয়ন লোনের পাবার সঙ্গে হিউম্যান রাইট পরিস্থিতি ভাল কি না তা শর্তযুক্ত করে হিউম্যান রাইট নাই এর উসিলায় হস্তক্ষেপ করার সুবিধা এখন আমেরিকার আছে। এখন লোন পাওয়ার বিকল্প উৎস চীন হাজির হয়ে গেলে সেখানে উন্নয়ন শব্দের অর্থ কী দাঁড়াবে? অন্ততপক্ষে চীনের নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে উন্নয়ন শব্দের নতুন অর্থ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সে হিউম্যান রাইট বা পরিবেশকে কি ঋণ বিতরণের সাথে শর্তযুক্ত করবে অথবা করবে না? এটা কী হয়, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

    [এখানে প্রকাশ করা লেখাটা এর আগে বাংলা দৈনিক “আলোকিত বাংলাদেশ” এর উপ-সম্পাদকীয় হিসাবে আমার নামেই ছাপা হয়েছিল। এখানে এক ও দুই পর্ব আকারে তেমন কোন নতুন এডিট না করেই এই ওয়েবে সংরক্ষণের জন্য সংকলিত করে প্রকাশ করা হল।]

  • নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাঃ চীনের বিশ্বব্যাংক আসন্ন

    নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাঃ চীনের বিশ্বব্যাংক আসন্ন
    http://wp.me/p1sCvy-9O

    আজ ৩১ মার্চ ২০১৫। দুনিয়ার শাসন ও নিয়ন্ত্রণে হাতবদল হয়ে আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্বে চলে যাবার দিক থেকে দিক থেকে খুবই তাতপর্যপুর্ণ দিন। এই মুহুর্তের গ্লোবাল মিডিয়া তোলপাড়ে মূল খবর AIIB বিষয়ক। সব খবরেই একটা শব্দ দেখা যাবে –AIIB যার সংক্ষেপ ভাঙলে দাড়ায়, Asian Infrastructure Investment Bank। পুরা মার্চ মাস ধরেই প্রতিদিনের খবর আজ কোন রাষ্ট্র AIIB ব্যাংক গড়ার উদ্যোগে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল। আজ এবিষয়ে সম্মতি জানানো ও উদ্যোক্তা স্বাক্ষর করার শেষ দিন।

    সারসংক্ষেপ
    এককথায় বললে AIIB ১৯৪৪ সালে গঠিত হওয়া বিশ্বব্যাংকের তুল্য ও প্রতিদ্বন্দ্বি প্রতিষ্ঠান, এই অর্থে চ্যালেঞ্জকারি প্রতিষ্ঠান। তাই বিশ্বব্যাংকের ধারণা থেকে AIIB কে বুঝা সহজ হবে। সেসময় আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়েছিল আমেরিকার সবচেয়ে বেশি মালিকানা শেয়ার রেখে আর সারা ইউরোপকে নিজের জুনিয়র সাগরেদ জুটিয়ে। জাতিসংঘের ১৯১ সদস্যের মধ্যে প্রায় সব রাষ্ট্রই মুল প্রতিষ্ঠান আইএমএফের সদস্য। আর আইএমএফের সদস্য হওয়া বিশ্বব্যাংকের সদস্য রাষ্ট্র হবার পুর্বশর্ত। এভাবে প্রায় সকল রাষ্ট্রই বিশ্বব্যাংকের সদস্য। কেউ ঋণগ্রহিতা খাতক কেউ বিনিয়োগকারি হিসাবে। সেই থেকে দুনিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এক গ্লোবাল অর্থব্যবস্থা কায়েম এবং এই মাধ্যমে দুনিয়ার অর্থব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নেয় আমেরিকা। গত ৭০ বছর ধরে আজও সেই রুস্তমি চলছে। তবে অবশ্যই সেই নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব আগামি বছর থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাঙ্গা হাটের মত হতে থাকবে।
    AIIB আগামি বছর থেকে কার্যকর হয়ে গেলে কি বিশ্বব্যাংক ভেঙ্গে পড়বে – এর জবাব হল না কোনভাবেই তা হবে না। তাহলে কি হবে? আমাদের মত দেশের দিক থেকে বললে, বিশ্বব্যাংক যে ঋণ আমাদের সরবরাহ করে আমরা যার খাতক তা হল, বিশ্বব্যাংক আমাদেরকে ইনফ্রাষ্টাকচার বা অবকাঠামো খাতে প্রায় না সুদে কনসেশনাল ঋণ দেয়। এই অবকাঠামো বলতে ফিজিক্যাল (রাস্তাঘাট ব্রিজ ইত্যাদি খাতে) ও হিউম্যান (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে) এই দুই ধরণের অবকাঠামো খাতেই ঋণ। অবকাঠামো বলার বা এই শব্দে চিনানোর কারণ এগুলো ঠিক বাণিজ্যিক ততপরতা হিসাবে দেখে দেয়া ঋণ নয়। ঋণ ব্যবসার বাজারের ততপরতায় টার্মোনোলজি হিসাবে যা বাণিজ্যিক ঋণ নয় তা বুঝাতে অবকাঠামো ঋণ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। বাণিজ্যিক কি না তা বুঝবার মূল নির্ণায়ক সুদের হার। বিশ্বব্যাংকের অবকাঠামো ঋণের সুদ ০.৭৫% অর্থাৎ ১% এর নীচে। এটা ঠিক অর্থের উপর সুদ নয় বরং, ঋণের বিষয়টা পরিকল্পনা, প্রজেক্ট নেয়া, তা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের যে অফিস পালতে হয় সেই অফিস পালা-পরিচালনার খরচ। যেকোন ব্যাংকের ভাষায় এটাকে সুদ না বলে সার্ভিস চার্জ বলে। এতক্ষণ সব শুনে তো বিশ্বব্যাংকের সবই ভাল মনে হচ্ছে। তাহলে বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো ঋণ দেয় কেন? কি ঠেকা তার? এককথায় বললে, গ্লোবাল পুঁজি বাজারে (ওয়াল ষ্ট্রিট, সিঙ্গাপুর বা দুবাই থেকে মুলত পরিচালিত) আমরা যেন আরও বড় খাতক হই। বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে আমরা ততই পুঁজিবাজারের চোখে আকর্যণীয় বাজার হয়ে ধরা দিব। অবকাঠামো খাতে ঋণ দিয়ে বিশ্বব্যাংক আমাদের অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজিবাজারে বাণিজ্যিক পুঁজি পাবার চাহিদা, আকাঙ্খা সৃষ্টি করে। আর এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা এমন ভাবে সাজানো এক সিস্টেম যার কারণে এর বিভিন্ন শর্তের ফ্যারে পড়ে আমাদের অর্থনীতি রাজনীতির উপর পরাশক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।
    এশিয়ার অর্থনীতিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অবকাঠামো খাতে আগামি দশ বছর পর্যন্ত যে ঋণের চাহিদা আছে এর অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না। এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক বা এডিবি অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণ করে থাকে। অর্থাৎ এদের মিলিত সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম। ফলে বাস্তবতা হল যে, এই প্রতিষ্ঠান দুটো চাইলেও AIIB এর উত্থান রোধ করতে পারবে না। অর্থাৎ AIIB প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির হবে। এছাড়া গত অন্তত বিশ বছর ধরে চীনের লাগাতর বড় রকমের উদ্বৃত্বের অর্থনীতি হিসাবে হাজিরের কারণে চীনের বিনিয়োগ বিশেষ করে অবকাঠামো বিনিয়োগ সক্ষমতা ট্রিলিয়ন ডলারে হিসাব করতে হবে। প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে চীনের নেতৃত্বের AIIB এর শর্ত ভিন্ন ও সুবিধাজনক হবার সম্ভাবনা। যেমন আমাদের আলোচিত পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প প্রস্তাব ছিল বিনা সুদ বা সার্ভিস চার্জ। অবশ্য সেই সাথে দুই বিলিয়নের ঋণে কনসালটেন্সী ফি এর অপশন (তুলনায় খুবই কম মাত্র ৫৫ মিলিয়ন) ছিল না। তবে বাংলাদেশ চাইলে নিজ খরচে কনসালটেন্ট নিয়োগ দিতে পারত। এই প্রস্তাব আলোচনা, নিগোশিয়েশনের দিকে আর যায় নাই ফলে চুড়ান্তভাবে তা কোথায় দাড়াত তা আমাদের সামনে নাই। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, এই প্রকল্পে ঋণ পাবার সম্ভাব্য উৎস এখন আর একা বিশ্বব্যাংক-এডিবির জোটই নয়, এদের একচেটিয়া কারবারের অবস্থায়, শর্ত ডিকটেট করার সুবিধাজনক অবস্থায় আর নাই এটা প্রতিষ্ঠিত। AIIB হাজির হয়ে গেলে এই প্রতিষ্ঠান আরো সংগঠিতভাবে নতুন সুবিধাজনক শর্ত নিয়ে হাজির হবে। সারকথা হল, এশিয়ায় ঋণ চাহিদা পুরণের ক্ষেত্রে চাহিদা-যোগানের গ্যাপের কারণে AIIB এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক-এডিবি থেকে যাবে। কিন্তু কে কত ভাল সুবিধাজনক শর্ত দিতে পারে এনিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা দিবে। ফলাফলে আমেরিকান নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হাজির হতে থাকবে। শুরুতে যেটা দেখা দিবে তা হল, চীনের কাছে দুনিয়ার প্রভাব কর্তৃত্বে হারাতে থাকবে, শেয়ার দিতে হবে। এক পর্যায়ে সমস্ত কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে এখনকার অর্থব্যবস্থায় যেমন আমেরিকান কর্তৃত্বের অধীনস্ত হয়ে ইউরোপ ছোট সাগরেদ বা জুনিয়র পার্টনার হয়ে থাকতে হচ্ছে আমেরিকা চীনের অধীনে সে ভুমিকাটাও পাবে কি না সন্দেহ আছে। কেন? সে প্রসঙ্গে নিচে এখন প্রবেশ করবে চলতি ঘটনাবলি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে।
    তার আগে সার সংক্ষেপ টানব ওয়াশিংটনের এক থিঙ্কট্যাঙ্ক Peterson Institute for International Economics এর প্রতিষ্ঠাতা Fred Bergsten এর কথা দিয়ে। চলতি মার্চ মাস জুড়ে সারা পশ্চিমে যত থিঙ্ক ট্যাংক, একাদেমিক মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠান আছে সব জায়গায় আলোচনার বিষয়বস্তু একটাই AIIB বা চীনের উত্থান আর এর প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমের ক্ষমতা কর্তৃত্বের সৌধ ভেঙ্গে কী রূপ আকার নিবে সেসব। বাইরের দিক থেকে দেখলে এটা নেহায়েতই আর এক ঋণদানের প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব। কিন্তু এর আসল অর্থ তাতপর্য Fred Bergsten এর বরাতে শুনব। তিনি আমেরিকারই আর এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান NPR আর সাথে আলাপকালে AIIB প্রসঙ্গে বলছেন, “I think the fact that it is China and this is part of the broader competition for global leadership, economic leadership, broader political leadership – that is, I think, a central part of this equation.”। বাংলা করে বললে, “ব্যাপারটা হল আসলে চীন। এটা চীনের সাথে দুনিয়ার নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক নেতৃত্ব, বৃহত্তর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইত্যাদি পাবার বৃহত্তর প্রতিযোগিতা – এটাই এই সমীকরণের কেন্দ্রীয় বিষয়।

    চলতি মার্চেই আচমকা ট্রিগার দাবানোর কাজটা করল বৃটেন
    গত সাত বছর ধরে চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়” একটা মোচড়ানির কথা বলে আসছি। প্রায় সব রচনাতেই মুখ্য ইস্যু ছিল এটাই। এই মোচড়ানি ঠিক ব্যবস্থাটা ভেঙ্গে পড়ার অভিমুখি নয় বরং কাঁধ বদল অথবা আরেক কাতে পাশ ফরে শোয়া ধরণের অবস্থায় যেতে চাওয়া বলতে পারি। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের প্রবল অর্থনৈতিক উত্থান থেকে সেই মোচড়ানি, চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়” আসন্ন বদলের আলামত ক্রমশ স্পষ্ট দৃশ্যমান করে তুলছিল। লক্ষণগুলো ক্রমান্বয়ে ফুটে উঠছিল, পড়া যাচ্ছিল। সে ইঙ্গিত দেখে আরও সুনির্দিষ্ট করে জানতে আমেরিকান সরকারি সার্ভে, গবেষণা ষ্টাডি রিপোর্ট হয়েছে গত ২০০৮ সালে। এই রিপোর্টটাকে বলা যেতে পারে ঘুর্ণিঝড়ের রিপোর্টের মতন। আর এখানকার “ঘুর্ণিঝড় আসন্ন” বলে পুর্বাভাস মানে আমরা বুঝেছিলাম এটা আর পিছনে ফিরবে না, আঘাত হানবেই। এসব ক্ষেত্রে আমরা তখন খালি ক্ষয়ক্ষতি কত কি কম করা যায় করণীয় হিসাবে কেবল সেখানেই সব মনোযোগ নিবদ্ধ করি – এই রিপোর্টটাও ছিল তেমনি। আসন্ন ওলটপালট বদলের ঝাপ্টার অভিমুখ বিশ্লেষণ করে ঠিক করা হয়েছিল কি করলে এর প্রভাব আঁচ আমেরিকার উপর কমানোর চেষ্টা করা যায়, একে যতটা দেরি করিয়ে দেয়া যায় – এমন। সে মোতাবেক আমেরিকান বিদেশনীতিতে বদল করা হয়েছিল। আমেরিকার কাছে ভারতের দাম গুরুত্ব বাড়তে শুরু করেছিল। তার ঠেলা বাংলাদেশের ঘাড়ে কিভাবে এসে পড়েছিল সেসব আমরা জানি। কিন্তু “আসন্ন” বুঝা যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আঘাত হানাটা কোনখান থেকে কেমন করে শুরু হবে তা স্পষ্ট হচ্ছিল না। কারণ চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা”টা দাঁড়িয়ে আছে মানে চারটা গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে – আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা, জাতিসংঘ গ্লোবাল রাজনৈতিক (পরাশক্তিগত) ক্ষমতা, আর ডব্লিউটিও গ্লোবাল পণ্য রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কায়েম করে। ফলে আসন্ন নতুন “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটার” আঘাত হানা বলতে বুঝতে হবে যখন এই চারটা প্রতিষ্ঠানের কোন এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জকারি কোন ঘটনা ফেনোমেনা দেখা যাবে। অর্থাৎ এতদিন আসন্ন বলতে আমরা বুঝেছি তত্ত্ব, ফ্যাক্টস ফিগারের প্রজেকশন দিয়ে বাস্তব আঘাত বা চ্যালেঞ্জকারি পালটা প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেখা দিয়েছে এমন ভাবে নয়।
    আমাদের অপেক্ষার পালা সম্ভবত শেষ। আগামি দিনের ইতিহাসে মার্চ ২০১৫ সম্ভবত চিহ্নিত হতে যাচ্ছে নতুন “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার” শুরুর কাল হিসাবে।
    “আসন্ন” শুনতে শুনতে আর সহ্য করতে না পেরে প্রথম গুলি ছুড়া মানে ট্রিগার দাবানোর কাজটা করে বসলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যমেরনের বৃটেন। আকস্মিকভাবে গুলিটা একেবারে তাক করলেন আমেরিকার দিকে। এটা সেই আমেরিকা বৃটেনসহ ইউরোপও যার নেতৃত্ব ও খবরদারি মেনে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে এক নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক (পুঁজিতান্ত্রিক) ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। আর এরপর বিগত ৭০ বছর ধরে এই ব্যবস্থার দুনিয়াজুড়ে রুস্তমিতে বৃটেন আমেরিকার ছোট পার্টনার হয়ে সাথ দিয়ে চলেছে। কিন্তু সম্ভবত আর নয়, এবার ছন্দে পতনের সুর। গত সত্তর বছরের ওস্তাদ-সাগরেদের আস্থার সম্পর্ক এই মুহুর্তে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। গত ১২ মার্চ ২০১৫ বৃটিশ সরকার আমাদের জানিয়ে দিলেন যে, বৃটেন চীন প্রস্তাবিত ও নিয়ন্ত্রিত নতুন Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ব্যাংক গড়ার উদ্যোগে সামিল হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ এবার কাঁধ বদলের মত করে আমেরিকার বদলে চীনের সাথে সাথ মিলিয়ে নতুন এক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পথে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে AIIB ব্যাংক গড়তে সম্মতি জানিয়ে দিল। মাত্র পাঁচ মাস আগে গত বছর অক্টোবর ২০১৪ চীন সাংহাই শহরে এক সম্মেলন ডেকেছিল যারা AIIB এর উদ্যোক্তা সদস্য হতে ইচ্ছুক এমন সব রাষ্ট্রকে। ঐ সম্মেলন থেকেই মূলত প্রাথমিকভাবে একাই ৫০ বিলিয়ন ডলার পুঁজি ঢালার ঘোষণা দিয়েছিল চীন, যেটা পরে ১০০ বিলিয়ন ডলার হবে। সেই থেকে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের স্বাক্ষর চলছে। উদ্যোক্তা-স্বাক্ষরের সুযোগ শেষ হবে এই মাসের শেষ দিন, ৩১ মার্চ ২০১৫ । তাই ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের এই হুড়োহুড়ি আকস্মিকতা। বৃটেনের ১২ মার্চের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আমেরিকার দিক থেকে বিরাট আচমকা ঘুষি খেয়ে পড়ে যাবার মত। গত সত্তর বছর ধরে সারা ইউরোপকে আমেরিকা ভাগ দেবার সময় সবার চেয়ে বৃটেনকে আলাদা চোখে দেখেছে, ভাগবিতরণে মাছের মাথাটাই বৃটেনের পাতে দিয়ে গেছে। ওদিকে চীন যে এমন পালটা প্রাতিষ্ঠানিক আঘাত করবে সেটা আমেরিকার জানা থাকলেও, কিছু প্রস্তুতি ততপরতা থাকলেও সে আঘাতের ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ করে বৃটেন যে লীড নিয়ে পক্ষ বদল করতে পারে – এটা আমেরিকারও বিবেচনায় আছে এমন কোন আলামত গ্লোবাল মিডিয়াতে কখনও চোখে পড়ে নাই। গত বছর প্রকাশ্যে চীনের AIIB উদ্যোগের আগেও অন্য দিক থেকে আগানোর আর এক উদ্যোগ ছিল চীনের। গত ২০০৯ সাল থেকেই ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, নিজে আর সাউথ আফ্রিকা এই পাঁচ রাইজিং ইকোনমিকে নিয়ে BRICS ব্যাংক গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছিল চীন। এটা সবার জানা। কিন্তু চীনের ব্রিক উদ্যোগের প্রতি আমেরিকার মতই সারা ইউরোপের আগ্রহ বা প্রতিক্রিয়া শুরু থেকেই শীতল ছিল, যেন এটা তাদের চায়ের কাপ না, কিছু এসে যায় না ধরণের। ফলে সম্ভবত সেই উদাহরণ সামনে থাকাতে চীনের যে কোন উদ্যোগ প্রচেষ্টার প্রতি ইউরোপ টলে, ঢলে যেতে পারে এই দিকটা আমেরিকা খাটো করে দেখেছে। কিন্তু বৃটেনের এই আঘাতই শেষ নয়। বৃটেনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার চারদিন পড়ে জানা যাচ্ছে যে এটা একা বৃটেনের সিদ্ধান্ত নয়। গত ১৭ মার্চ -জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালীও বৃটেনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করার ঘোষণা প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। বার্তা সংস্থা এপির বরাতে আমরা জানছি জর্মান অর্থমন্ত্রী এই বিবৃতি দিয়েছেন। অথচ গত বছর অক্টোবরে যখন সাংহাইয়ে AIIB সম্মেলন ডাকা হয় তাকে কেন্দ্র করে আমেরিকা প্রকাশ্যে ততপরতা চালিয়েছিল যাতে এশিয়ার অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া মত দেশ যারা এশিয়া নীতিতে আমেরিকাকে অনুসরণকারি ও আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক শেয়ার পার্টনার, এরা AIIB উদ্যোগে যেন যোগ না দেয়। তবু সেসময় বৃটেন প্রকাশ্যে AIIB উদ্যোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন বক্তব্য দেয় নাই। এখন বৃটেনের যোগ দেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর আমেরিকা প্রকাশ্যেই নিজের অখুশি, অস্বস্তি জানিয়েছে। বৃটিশ অর্থমন্ত্রী জবাবে মিডিয়াকে বলেছে, এটা বৃটেনের “জাতীয় স্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত” এবং এমন সিদ্ধান্ত নেবার আগে এব্যাপারে তারা আমেরিকাকে জানিয়ে ও কথা বলে নিয়েছে।
    দুনিয়াজুড়ে রুস্তমিতে আমেরিকার নিজের একক নীতি সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে প্রধানত অর্থনৈতিক বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপের সাথে সমন্বয় করতে সাত শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানদের একটা ক্লাব আছে যার নাম জি৭ বা গ্রুপ সেভেন। জি৭ এ ইউরোপের ভিতরকার চার রুস্তমি রাষ্ট্রের মধ্যে বৃটেন ওর একজন। জি৭ থেকেও AIIB উদ্যোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন প্রকাশ্য বক্তব্য আসে নাই। ওদিকে AIIB সাংহাই উদ্যোক্তা প্রস্তুতি সম্মেলনেই ২০ রাষ্ট্র প্রতিনিধি সদস্য স্বাক্ষর করে ফেলেছিল। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিতও তাদের একজন -গিয়েছিলেন, স্বাক্ষর করেছেন। এখন বৃটেনের ঘোষণার আগেই ইতোমধ্যে মোট উদ্যোক্তা সদস্য সংখ্যা ত্রিশে পৌচেছে। তবে এতদিন এরা সবাই ছিল কেবল এশিয়ার সদস্য। বৃটেনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর এশিয়ার অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া যাদেরকে আমেরিকা ধমকায়ে বিরত রেখেছিল অথচ এসব প্রত্যেক দেশের ব্যবসায়ী, একাডেমিসিয়ান, পরামর্শক এবং এমনকি কোন কোন মন্ত্রীও AIIB তে যোগ দেবার প্রকাশ্যে পক্ষে ছিল ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিল। এখন এমন সব রাষ্ট্রেই সে তর্ক আবার জোরাল হয়েছে, যোগ দিবার পক্ষের লোক ও যুক্তি বেড়েছে। গত ২০ মার্চ রয়টারের খবর অষ্ট্রেলিয়া যোগদানের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। জাপান দ্বিধাবিভক্ত কাপাকাপিতে। থিঙ্কটাংক এক্সপার্টরা বলছেন জাপান যদি যোগ দেয় তাহবে এশিয়ার সর্বশেষ দেশ, এবং বিশেষ শর্তে। দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে মিডিয়ায় ইঙ্গিতপুর্ণ খবর বেরিয়েছে যে তারা নাকি ৫% শেয়ার আর একটা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দরাদরি করছে। যদিও এক ক্যাবিনেট মিটিংয়ের শেষে কোরিয়ান অর্থমন্ত্রী এই জল্পনাকল্পনা স্বীকার করতে চান নাই। ওদিকে ইউরোপের মধ্যে বৃটেনের সাথে জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালীর যোগ দেবার কথা আগে বলেছি। ইতোমধ্যে তা অনুসরণ করে আরও এগিয়ে যোগদানের ঘোষণা করেছে লুক্সেমবার্গ এবং সুইজারল্যান্ড। তবে বৃটেনের সাথে জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালী – এরা ইউরোপের কারা? এটা জেনে রাখা দরকার। আমেরিকার নেতৃত্বে এতদিনের গ্লোবাল মাতবর প্রতিষ্ঠানে আমেরিকার ক্ষমতায় সুখের ভাগ নিবার ভুমিকায় ইউরোপের মধ্যে চার রাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় সাগরেদ – চার ইউরোপিয়ান বৃটেন, জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালী। আমেরিকান নীতির সাথে চোখবন্ধ ধরণের সমর্থনের সবচেয়ে বেশি থেকে কম কার এই ধারাবাহিকতা মেনে নামের ধারাবাহিকতাগুলো লিখা হয়েছে। এই চারের বাইরে ইউরোপের বাকি রাষ্ট্র, এমনকি সে বাকি ইউরোপের রাষ্ট্র বলতে (ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৫) ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই চার বাদে বাকি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আর কেউই প্রভাবশালী নয়। এখানে প্রভাবশালী কথার অর্থ বর্তমান বিশ্বব্যাংকে ইউরোপের টপ বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার হল এরা সেই এই চার রাষ্ট্র। আবার যেমন, জি৭ – এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপের মধ্যে চার ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্র হল – এই চার রাষ্ট্র। এই গ্রুপের সদস্য কে হতে পারে তা মানার ভিত্তি হল দুনিয়ায় সঞ্চিত সম্পদ কোন রাষ্ট্রের হাতে বেশি এমন তালিকার উপরের সারির প্রথম সাত রাষ্ট্র। এই সাত রাষ্ট্রের মোট সম্পদ দুনিয়ার মোট সম্পদের ৬৪ শতাংশ। একটা ফুটনোট, যদিও এখানে জি৭ এর ক্রাইটিরিয়া বলার সময় শব্দটা ‘সম্পদ’ ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এই শব্দের প্রকৃত অর্থ বিনিয়োগ ক্ষমতা অথবা বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোন্ডিং বা দাতা মালিক। এছাড়াও মনে রাখতে হবে চীন জি৭ এর সদস্য নয়, হতেও চায়নি, অফারও করা হয় নাই। ফলে এই তিন রথি বৃটেনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করার সারার্থ হল, ইউরোপের প্রধান চার মোড়ল আমেরিকাকে এতিম করে দিয়ে চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগের পক্ষে চলে যাচ্ছে। এর ফলে সারা এশিয়া ও ইউরোপের মূল অর্থনীতিগুলো AIIB উদ্যোগের পক্ষে চলে যাচ্ছে বলা যায়। গত বছরের সাংহাই সম্মেলনের আগে আমেরিকান আমলা কুটনীতিকরা নিজেদের পিঠ চাপড়িয়েছিল এই বলে যে এই উদ্যোক্তা সম্মেলন মোট সদস্য সংগ্রহের সংখ্যা ২০ হয়েছে বটে কিন্তু চীন ও ভারত বাদে এশিয়ার বড় অর্থনীতির কেউ আর এর সদস্য হতে আসেনি। আর সেই সাথে ইউরোপ থেকেও কেউই আসেনি। এটা তাদের কূনৈতিক লবির সাফল্য। অর্থাৎ চীন উদ্যোগের বিরুদ্ধে কানপড়া দেয়া, ভাঙরি দেয়ার, ভয় দেখানোর তাদের প্রচেষ্টাটা সফল। স্বভাবতই এই হিসাবের মধ্যে এশিয়ার জাপানকে বাইরে রেখে বলা। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাস পড়ে সে দৃশ্যপট এখন একেবারে বদলে গিয়েছে, আগামিতে আরও বদলে যাবে সে আলামত দেখা যাচ্ছে। আর দৃশ্যপট বদলে দিবার পিছনের ট্রিগার টানার মত কাজটা করেছে বৃটেন। নিজে একা শুধু নয় ইউরোপের বাকি তিন মুল মুরুব্বিদেরও সাথে আনার কাজ হয়ে গেছে সেটা। এটা এমন এক ঘটনা যা ১৯৪৪ সালের পর থেকে দুনিয়াতে ঘটতে দেখা এমনকি কল্পনা করাও খুব সহজ ছিল না।
    ওদিকে অষ্ট্রেলিয়ার ঘনিষ্ট পড়শি, রাজনীতি-অর্থনীতিতে প্রায় সমনীতি অনুসরণকারি নিউজিল্যান্ডও আনুষ্ঠানিকভাবে AIIB তে যোগদান করেছে। তবে বৃটেনের পরের তিন ইউরোপীয় রাষ্ট্র ঠিক কি বলে এই আগ্রহের কথা জানিয়েছে সেটাও বেশ গুরুত্বপুর্ণ। বার্তা সংস্থা এসোশিয়েটেড প্রেস জর্মন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রচারিত তাদের তিন রাষ্ট্রের আগ্রহ-পত্রকে উধৃত করে জানাচ্ছে, “তিন ইউরোপীয় দেশ চলতি ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকগুলোর অংশীদারির পাশাপাশি AIIB তে যোগদানের পরিকল্পনা করছে যাতে এশিয়ায় প্রচুর অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটাতে AIIB তে ফান্ড সরবরাহ করে তাতে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে”। ফ্রান্স, ইটালি ও জর্মনি আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় পার্টনারদের সাথে ঘনিষ্ট সমন্বয় রেখে AIIB এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়ে কাজ করতে আগ্রহী যাতে এমন এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায় যেটা এর পরিচালনা, সুরক্ষা, ঋণ বিতরণ ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘বেষ্ট ষ্টান্ডার্ড ও প্রাকটিস’ অনুসরণ করতে পারে”।

    এখানে শুরুতে চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার” কথা বলছি মানে একটা সিস্টেমের কথা বলছি। যেমন সাধারণ মানুষ বলে “একটা সিস্টেম করে নিয়েছি” – আসলে ঠিক তাই-ই বুঝাচ্ছি। অর্থাৎ এটা একটা সিস্টেম, এর অর্ডার, এর আইন-কানুন, নিয়ম প্রটোকল, প্রভিশন, ম্যান্ডেট, ট্রিটি-সম্মতিচুক্তি ইত্যাদি সব মিলিয়েই – এটা এক ব্যবস্থা। গত ১৯৪৪ সালে এই ব্যবস্থার জন্মটাকে বলা হয় দুই বিশ্বযুদ্ধের সার ফলাফল। যার মাখন হল আমেরিকার নেতৃত্বে কর্তৃত্বে জন্ম নেয়া এক “গ্লোবাল সামগ্রিক ব্যবস্থা”। প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে বললে, এই ব্যবস্থা মুখ্যত চারটা গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান – আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসংঘ এবং ডব্লিউটিও এর মাধ্যমে দুনিয়ায় ততপর ও হাজির। এছাড়া আরও প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো মূলত আমাদের মত দেশগুলোর উপর গ্লোবাল ঐ চার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সমন্বয় করে। অর্থাৎ সেগুলো সরাসরি আমাদের মত দেশের স্বার্থের বিপরীত প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে আমাদের মত দেশের সদস্যপদ নাই। যেমন G7, OECD। চার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্মের কথা বলছিলাম। না, ১৯৪৪ সালে এটা ঠিক বন্দুকের মুখে ফেলে সই করিয়ে নেয়া ঘটনা নয়। আর আমরা তখন কলোনি মাস্টারের বৃটিশ-ইন্ডিয়ার অধীনস্ত। ফলে আমাদের কথা বলার কিছু নাই। সব কলোনি মাস্টারের সারা ইউরোপের কাছে রুজভেল্টের আমেরিকা তখন হয়ে উঠেছিল একমাত্র ত্রাতা। সে এক অবজেকটিভ বাস্তবতা, পরিস্থিতি যেটা একদিক থেকে সবাই উপায়হীন এক অন্ধকার ভবিষ্যতে, অন্যদিকে একমাত্র আশা ভরসা রুজভেল্ট ও তার আমেরিকা। এবং আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধোত্তর ইউরোপকে বিশেষত ইটালিকে ত্রাণ দিবার ক্ষমতা বাস্তবতা একমাত্র আমেরিকার ছিল এবং দিয়েছিল। আর বিগত ১৯৪১ সালে বৃটেনকে আটলান্টা চার্টারে স্বাক্ষর করিয়ে নেবার পর থেকে ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত আমেরিকা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের সবার যুদ্ধের সিংহভাগ রসদ ও খরচ যুগিয়েছে। আবার, যুদ্ধশেষে এরপরেও আবার পুনর্বাসন, পুনর্গঠন এর জন্য ধার, বিনিয়োগ সবই এসেছে ঐ আমেরিকা, একই উৎস থেকে। ১৯৩৩ সাল থেকে সারা ইউরোপের তাগিদ আমেরিকা যেন একটা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” গড়ার উদ্যোগ নেয়। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু ১৯১৪ সালের পর থেকে ১৯৪৪ সালে পর্যন্ত এই ত্রিশ বছর ধরে কলোনি শাসনের হাত ধরে দুনিয়ায় যে খুবই সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু ছিল তা একেবারেই প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছিল। এই বাস্তবতার মধ্যেই ঐ চার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” গড়ে উঠেছিল। উপরে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে যে বাস্তবতার বন্দীত্বে সারা দুনিয়াকে আমেরিকার হাতে এনে দিয়েছিল এর মুল চাবিকাঠি হল, আমেরিকার অর্থনীতির প্রবল উত্থান, একমাত্র অর্থনীতি যার মধ্যে বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেও উদ্বৃত্ব সম্পদ সঞ্চিত হয়েছিল। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আয়-ব্যয়ে টানাভাবে উদ্বৃত্ব থাকছিল। যুদ্ধের আগের (১৯১৪) দুনিয়া ছিল যার যত কলোনি দেশ দখলে আছে সে তত বড় সাম্রাজ্যের রাজা। আর যুদ্ধের পরে হল উলটা ইউরোপের সব কলোনি দখলকারি মাস্টারেরা দেউলিয়া, সবাই আমেরিকার প্রজা, আমেরিকা একমাত্র দাতা। যেকথা বলছিলাম, আমেরিকার অর্থনীতির প্রবল উত্থান, একমাত্র উদ্বৃত্ব অর্থনীতি – এটাই তার নেতৃত্বে যেকোন নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম হবার পিছনের শর্ত, অবজেকটিভ বাস্তবতা তৈরি করে। এই অর্থে চলতি একুশ শতকের শুরুতে দ্বিতীয় দশক ১৯৪৪ সালের আশেপাশের সময়ের বাস্তবতা পরিস্থিতির সাথে তুলনীয়। নিশ্চয় সবটা হুবহু নয়, যেমন আমরা এখন কোন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে নাই। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ যে দুনিয়ায় একমাত্র অর্থনীতি চীনের, যেখানে সবচেয়ে দ্রুত এবং বেশি উদ্বৃত্ব সম্পদ সঞ্চিত হচ্ছে। এর তুলনায় কাছাকাছিও কেউ নাই। উদ্বৃত সম্পদ মানেই পুনবিনিয়োগের ক্ষমতা। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অবকাঠামোখাতে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিনিয়োগ ক্ষমতা। তাই AIIB শুধু বিশ্বব্যাংক বা এশিয়ার এডিবিকে চ্যালেঞ্জ করেই থেকে থাকবে না। অপ্রত্যক্ষে আইএমএফকেও চ্যালেঞ্জ করবে। চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাবস্থা কায়েমের পথে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু হবে। এই প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত যাব পরে।

    কেন আমরা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওলটপাল্টকে জানব, কোন জায়গায় বসে দেখব
    আবার চলতি শতকের প্রথম দশক মানে (২০০১-১০) সালের সময় থেকেই দুনিয়া জুড়ে নানান ঘটনায় বারবার আলামত ফুটে উঠছিল যে ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়’ এক মহা-ওলটপালট আসন্ন বলেছি। গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কথার সোজা মানে দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্লোবাল ক্যাপিটালের ততপরতা, ফেনোমেনা -গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। তবে একে ক্যাপিটালিজম বলে চিনিয়ে দিলে আমরা ‘ক্যাপিটালিজম কত খারাপ দেখেছ’ ধরণের এক নৈতিক সমালোচনার দিকে যেন ধাবমান না হয়ে যাই। সেটা আমরা বহু যুগ থেকে করে আসছি। এখন পরিপক্ক হবার সময়। ফলে এটা কত খারাপ বা ভাল এই প্রশ্নের চেয়েও অর্থনৈতিক এই সিষ্টেম বা ব্যবস্থাটাকে বুঝা, কিভাবে ততপর আছে করছে টিকে আছে তা বুঝা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আমাদের এই বুঝাবুঝির উদ্দেশ্যের দিকটা কি তা না ভুলে বা হারিয়ে সব সময় সামনে সমুন্নত রাখা। উলটাপালটা জঙ্গল পিটিয়ে পরিস্কার থাকতে হবে যে সে উদ্দেশ্য এটা নয় যে এই ব্যবস্থাটা ভাল না খারাপ, চাই কি চাই না। কারণ এই ব্যবস্থা ভাল না খারাপ, চাই অথবা না চাই এর চেয়েও বড় দিকটা হল এই ব্যবস্থার মধ্যেই আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে ও হবে আরও অনেকদিন। ফলে উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশে আমাদের সুনির্দিষ্ট করণীয় কি হবে সেই লক্ষ্যে ব্যবস্থাটাকে বুঝাবুঝি। এই গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ভিতরেই বদল ওলটপালট কি হচ্ছে আর এতে আমাদের উপর এর ততপরতা, নড়াচড়ার প্রভাব কোথায় কিভাবে পড়বে আসছে আসবে তা অনুমান করে আর তা থেকে নিজেদের কম্পিটিটিভ এডভ্যানটেজ বা তুলনামূলক সুবিধার দিক কি, কি আমাদের জন্য উন্মোচিত হচ্ছে এসব মিলিয়ে একটা সম্ভাব্য কৌশল নির্ণয়ে পৌছানো। অর্থাৎ এটা দূরে দাঁড়িয়ে বা গ্যালারিতে বসে মজা দেখা না, ভাল খারাপ বলে রায় দেয়া না। আমরা সংশ্লিষ্ট হয়েই আছি, থাকতে হবে এই উপলব্দি জাগিয়ে রেখে সম্ভাব্য নিজ করণীয় কৌশল কি হতে পারে তা বুঝাবুঝির দিকে নিজেদের নিবদ্ধ করা।

    চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা আজীবন দুনিয়াতে এমনই ছিল ব্যাপারটা তেমন নয়। দুনিয়াতে এটা সাজিয়ে নিজেকে মেলে ধরেছিল ১৯৪৪ সালের সময়কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পটভুমিতে। এই হিসাবে গত ৭০ বছর ধরে এই ব্যবস্থার রুস্তমি কায়েম আছে। আর আগেই বলেছি, প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে বললে, অর্থনৈতিক দিকটা সাজানো ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয়ে আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত দিকটা জাতিসংঘ আর ব্যবসা বাণিজ্য মানে আন্তর্জাতিক ট্রেডের দিকটা ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ‘সাজানো ও নিয়ন্ত্রণ’ এভাবে বলাতে এসবের নেতিদিকটা তুলে বলা হল। কিন্তু আমাদের উপর এসব প্রতিষ্ঠানের ভুমিকা কেবলই নেতিবাচক এমন ধারণা ও এপ্রোচে নেয়া ভুল হবে। কারণ নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও শেষ বিচারে এর ইতিবাচক দিকটা হল একটা গ্লোবাল সিষ্টেম এতে চালু হয়েছে। দুনিয়াতে কোন সিষ্টেমই চালু ফাংশনাল বা কার্যকর নাই এই সিনারিওটা বাংলাদেশে আমাদের জন্য কোন সুখকর দৃশ্যপট নয়। গ্লোবাল সিষ্টেম নাই কথার সিধা অর্থ, নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমার বাইরে কোন কমিউনিকেশন লেনদেন, পণ্য বিনিময় বাণিজ্য, বিনিময় মুদ্রা, ভাব বিনিময় দেয়ানেয়া কিচ্ছু নাই। এমন দৃশ্যপটটা বাংলাদেশের শ্রম, জীবন ব্যবস্থার জন্য বর্তমানের চেয়ে আরও দুঃসহ। অর্থাৎ সারকথাটা হচ্ছে, কোন গ্লোবাল ব্যবস্থা আমাদের অবশ্যই চাই। কিন্তু তাতে আমাদের উপযুক্ত শেয়ার, আমাদের স্বার্থ আমাদের কথা ভয়েস শোনানোর উপযুক্ত ব্যবস্থাও চাই। মানে এটা স্রেফ কোন প্রতিষ্ঠানের নিপাত যাকের মামলা নয়।

    আইএমএফ জন্মের আগে মুদ্রার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল না
    যেমন ১৯৪৪ সালের আগের দুনিয়াটা দেখতে কেমন ছিল তা যদি আমরা খুজি তাহলে দেখব চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” ধরণের কাছাকাছি তুল্য কিছু নাই। আছে কলোনি সম্পর্কের অধীন এক খুবই সীমিত অপুষ্ট এক বিনিময় ব্যবস্থা। কলোনি মানে কলোনি-দাস জনগোষ্ঠীর আত্মস্বীকৃতি এই মৌলিক দিকটাই সেখানে অনুপস্থিত। লেনদেনের গ্রহণযোগ্য কোন আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে কিছু দাড়ায় নাই, ছিল না। যদিও ভাল দিকটা ছিল কোন মুদ্রা মানে কোন না কোন প্রাইভেট ব্যাংকের নোট। ঐ নোট দেখালে সেই ব্যাংক নোটের বদলে গচ্ছিত রাখা সমতুল্য সোনা ফিরিয়ে দিত। এটাকে গোল্ড ব্যাকড নোট – বলা হয়। এই সময়ে চালু কলোনি অর্থনৈতিক সিষ্টেমের এক গুরুত্বপুর্ণ উল্লেখযোগ্য লক্ষণ চিহ্ন হল, কোন দেশের মুদ্রা কি হবে ওর মান হার কি হবে তা নির্ধারণে ঐ কালের কলোনি সাম্রাজ্য রাষ্ট্র ধরণের বৃটিশ বা ফরাসী এমপায়ার রাষ্ট্রের কোন হস্তক্ষেপ (অবমুল্যায়ন বা অতিমুল্যায়ন) ছিল না। মুদ্রার মান হার নির্ধারিত হত বাজার দিয়ে – শেষ বিচারে প্রাইভেট বা পারিবারিক ব্যাংকের হাতে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের হাতের বাইরে। এককথায়, কলোনি আমলে মুদ্রা ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু অসুবিধার দিকটা ছিল, আন্তঃ কলোনি মাষ্টারের মধ্যে বিনিময় যেমন বৃটিশের সাথে ফরাসী বিনিময় খুবই সীমিত অপুষ্ট পর্যায়ের। আর আমরা নিজেরা তখনকার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার আমরা গোনায় ধরিনা, বাইরে। তবে মূল একমুখি উদ্বৃত পাচার একটা ছিল বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে বৃটেনমুখি। এটাকে পণ্য বিনিময় বলা কষ্টকর। একথা নিসন্দেহে সত্যি যে আমরা কলোনি ধরণের বিনিময় ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে ১৯৪৪ সাল থেকে আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের অধীনস্ত গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যে পড়েছি। তবু তুল্য বিচারে এটা ভাল। এই ব্যবস্থা অসাম্যের হলেও অন্তত পণ্য, মুদ্রা, টেকনোলজি, ভাব ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে এটা অনেকানেক ব্যাপক বিস্তৃত ফলে কলোনি যুগের ব্যবস্থার তুলনায় ভাল। আবার ওয়াল ষ্ট্রিটের অধীনস্ত গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে খারাপ দিক হল, এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে ও একে কার্যকর করতে গিয়ে সাধারণভাবে “রাষ্ট্র ও মুদ্রাকে” গভীরভাবে সম্পর্কিত তো বটেই নিজ মুদ্রার মান হার বাজারের বদলে রাষ্ট্রের হাতে চলে গিয়েছে। “সমাজতন্ত্রী মনের” বিচারে অনেকের মনে হতে পারে এটা ভালই তো, বাজারের প্রাইভেট ব্যাংকের বদলে মুদ্রার উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয়েছে। কিন্তু এই বুঝ মিথ্যা আর ফাঁকির বুঝ, প্যারাডক্স।
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে গ্লোবাল বিশ্বব্যবস্থাটাকে আগের কলোনি যুগের সঙ্গে তুলনা করছিলাম। প্রথমটাকে ১৯৪৪ সালের সুচনা ঘটনা মানলেও পরেরটা ১৯৪৪ সালের আগে বলতে আসলে ১৯১৪ সালের আগে বুঝতে হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু ১৯১৪ সাল তাই এর আগে। কারণ ১৯১৪-১৯৪৪ এই ত্রিশ বছর সময়কালকে তুলনায় বলা যায় “নো সিষ্টেমের” যুগ। এমনকি অন্তর্বর্তিকালীন সময়ও সেটা নয় যে নতুন ব্যবস্থা সেখানে তৈরি হতে শুরু করেছে এমন। বলা যায় ঐ সময়টা পুরান কলোনি ব্যবস্থাকে কেবল ভাঙ্গছে আর ভাঙ্গছেই নতুন ব্যবস্থা জন্মানোর আলামত নাই, ফলে যে যেমনে পারে কোন মতে দিন গুজরান, সংকটের দিন পাড় করা ধরণের কাল। এসবের মূল কারণ যুদ্ধ আর চেপে বসা ক্রমবর্ধ্মান যুদ্ধের খরচ – এটাই সবার আগে চলতি মুদ্রার বাজার ব্যবস্থাকে নন-ফাংশনাল করে দিয়েছিল। আগেই বলেছি ঐ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট ছিল, প্রাইভেট ব্যাংক হলেও সোনা মজুদ রাখার বিনিময়ে সম-পরিমাণ মুদ্রা ছাপানো আর প্রতিদিন যে পরিমাণ সোনা বা ভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংক মুদ্রা ফেরত আসলে আর যে পরিমাণ বের হলে গেল এর সাম্য প্রতিষ্ঠা করার ভিত্তিতে পরের দিন সকালের মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ করে দেয়া। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই দুই গুরুত্বপুর্ণ ভিত্তির উপর আস্থা নষ্ট হয়ে পড়ায় ব্যবস্থাটাই নন-ফাংশনাল হয়ে যায়। এর উপর আবার – যেমন ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড তখনও প্রাইভেট ব্যাংক তবে মুদ্রা ছাপানোর একমাত্র লাইসেন্সধারি। এবং সেই সাথে ব্যক্তি একাউন্টধারি খাতকের মতই বৃটিশ রাষ্ট্রও তার একাউন্টধারি গ্রাহক মাত্র। এই বিশেষ গ্রাহককে যুদ্ধের খরচে মিটাতে ব্যাংককে প্রচুর বেধরক ধার দিতে হয়েছে, আবার কবে ধার শোধ করতে পারবে সে আলামত নাই। এই পরিস্থিতিটা হল, ব্যাংক থেকে সোনা বেরিয়ে গেছে যার ফেরার আলামত নাই। এই ক্ষতির ফলাফল সব খাতকের উপর পড়েছিল। দেশে বিদেশে পাউন্ড মুদ্রার উপর কারও আস্থা নাই। এটা ১৯৩০ সালের পর থেকে, একমাত্র নগদ সোনার বিনিময়েই আমেরিকার সাথে এক ধরণের সীমিত বিনিময় ঘটেছিল তাও আবার ওকে ঠিক বাণিজ্য নয় একমুখি বিনিময় বলা যেতে পারে। আমেরিকান ব্যবসায়ীর অস্ত্র বা যুদ্ধের রসদ নামিয়ে বিনিময়ে নগদ সোনা নিয়ে ভেগে পড়া ধরণের। আমেরিকার “ক্যাশ এন্ড ক্যারি আইন” ১৯৩৫, ১৯৩৭ এসবের সাক্ষ্য।
    আবার এখনকার দুনিয়ায় সব রাষ্ট্রেই একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রিজার্ভ ব্যাংক নামে প্রতিষ্ঠান থাকা স্বাভাবিক ফেনোমেনা হয়ে গেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক – মানে মুদ্রা, মুদ্রার মান, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ এসবের উপর নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠা করার এক প্রতিষ্ঠান থাকাটা অবশ্যম্ভাবি মনে করা হয়। কিন্তু এর ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ফেনোমেনাটা ১৯৪৪ সালের আশেপাশের সময়ের। তবে ১৯৪৪ সালের আগের ত্রিশ বছরে সময়ের ভিতর। তবে কিছুটা একমাত্র ব্যতিক্রম যেমন আমেরিকার ফেডারল রিজার্ভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয় ১৯১৩ সালে। এবং কারণও ভিন্ন। এর পিছনের কারণ ঠিক ডলারের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নয়। বরং তার আগে আলাদা আলাদা প্রাইভেট ব্যাংকের আলাদা সিলের নোট তো বটেই – এক আমেরিকান রাজ্যের নোট আর এক রাজ্যে গৃহীত হত না, চালু ছিল না। অর্থাৎ প্রত্যেক রাজ্য তার অর্থনীতির উদ্বৃত্ব নিজ রাজ্যেই পুনবিনিয়োগ হতে ধরে রাখতে চাইত। ১৭৭৬ সালে জন্মের পর থেকেই এই রক্ষণশীল অবস্থান ব্যবস্থা ছিল। মুল বিষয়ছিল ফেডারেল ব্যবস্থার নামে এক রাজ্য যেন অন্য রাজ্যের উপর বাড়তি সুবিধা না নিতে পারে। যেটা খুব সম্ভবত পরবর্তিতে পুঁজির সঞ্চয় বেড়ে যাওয়া বা উলটা করে বললে নিজ রাজ্যে পুনবিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে আসায় অপর রাজ্যে বিনিয়োগ সন্ধানে বের হওয়া বাস্তবতা হয়ে পড়েছিল। এছাড়া রাজ্যগুলোর মধ্যে সমন্বয়, একসাথে পরিকল্পনা ইন্টগ্রেশনে ও ফেডারেল ব্যবস্থা কার্যকর থাকার সুবিধার দিক চিন্তা করে ফেডারেল রিজার্ভ নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করা হয়। আর ওদিকে ইউরোপে প্রায় সব দেশে এমন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৩০-১৯৪৬ সালের মধ্যে। এর মূল কারণ এককথায় বললে, ১৯৩০ এর মহামন্দা ফলে প্রত্যেক রাষ্ট্রের মুদ্রার অবমুল্যায়ন ঘটিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য রাষ্ট্রের উপর রপ্তানি বাণিজ্যের সুবিধা পেতে চেয়ে করা হয়েছিল। যদিও এসবের মিলিত ফলাফল শেষ পর্যন্ত শুণ্য। কারণ সবাই কমালে কেউ কারো উপর সুবিধা হাসিল করতে পারেনি। সেটা আলাদা কথা। কিন্তু মুদ্রার অবমুল্যায়ন তখনই করা সম্ভব যখন মুদ্রার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধরণের কিছু আছে। মুদ্রা যদি বাজার আর প্রাইভেট ব্যাংকের হাতে পরিচালিত হয় তবে রাষ্টের অবমুল্যায়নের খায়েসে তারা সাড়া দিবে না। ওদিকে ১৯১৪ সালের পর থেকেই রাষ্ট্র নিজেই প্রাইভেট ব্যাংকের খাতক হিসাবে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশির ঘাটতিতে, সেই ঘাটিতি পুরণে ঋণ নেয়া আর ঋণশোধের ব্যর্থতায় দেউলিয়া – এই দশা থেকে একটা আপাত সুরাহা চাচ্ছিল রাষ্ট্র। যেমন, মুদ্রার অবমুল্যায়ন বা মুদ্রাস্ফীতি আগে নেয়া ঋণের প্রকৃত মুল্য ক্ষয়ে যায় বা কমিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের নিজের পুরানা দেউলিয়াত্ব কাটানো এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কেউ ১৯৪৪ সালের আগেই মুদ্রা নিয়ন্ত্রণকারি প্রাইভেট ব্যাংককে অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে ঘোষণা করে। এছাড়া সব স্থানীয় মুদ্রার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর আইডিয়ার বাস্তবায়ন ও এর কার্যকরি প্রতিষ্ঠান হওয়া একমাত্র সম্ভব এর প্রত্যেকে সদ্স্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রত্যেক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক অস্তিত্ত্ব থাকার পুর্বশর্ত। তাই বাস্তবে দেখা যায়, কোন রাষ্ট্রের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যলাভ করতে চাইলে ঐ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কিছু আছে কি না, ঐ রাষ্ট্রের স্থানীয় মুদ্রা তা ঐ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে কি না এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর যে কমন ফরম্যাটে অনুসারে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ততপরতার বিষয়ক বেস ডাটা সংগ্রহ ও সরবরাহের উপযোগী কি না ইত্যাদি সদস্যপদ লাভের টেকনিক্যাল পুর্বশর্ত।
    এসব ঘটনাবলির ভিতর দিয়ে মুদ্রা সরবরাহের উপর অবমুল্যায়ন্সহ সব ধরণের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের মাধ্যমে আইএমএফ হাতে নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থা ভেঙ্গে নিজ নিজ স্থানীয় মুদ্রার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রথম ঘটনাটা ঘটা শুরু এখান থেকে।

    AIIB এর উদ্যোক্তা-সদস্য হবার সুযোগ এই মাসেই শেষ, এরপর এই বছর শেষের মধ্যে মালিকানা শেয়ারসহ ম্যান্ডেট চার্টার আইন কানুন শেষ করে আগামি বছরের শুরু থেকে এই ব্যাংক কার্যকর হতে চায়। এই উদ্যোগের সাথে একটা জিনিষ নিশ্চিত থাকা যায় যে ডলারের বদলে চীনের মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক পণ্য বিনিময়ের মুল্য শোধের ব্যবস্থা খাড়া করা একটা মূল উদ্দেশ্য হবে। সব দ্বিধা ছেড়ে আগেভাগে বৃটেনের আগিয়ে আসার পিছনের বড় কারণ এটা। সে ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, হংকংয়ের বাইরে ইউয়ানে পণ্য বিনিময়ে দ্বিতীয় ক্লিয়ারিং হাউস হতে চায় লন্ডন। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে কার্যকর বড় বড় প্রভাব আমরা দেখতে শুরু করব আগামি বছর থেকে। AIIB চালু হলে এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া কোথায় কোথায় কিভাবে কতটুকু পড়বে, আমাদের অর্থনীতির জন্য কি সুবিধা অসুবিধা আনবে সেসব দিক নিয়ে আলো ফেলার চেষ্টা করব পরের পর্বে।

  • মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

    মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

    গৌতম দাস


    http://wp.me/p1sCvy-91

    ২৩ জানুয়ারি ২০১৫

     

    পরাশক্তি হওয়ার নির্ণায়ক
    কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার অথবা গ্লোবাল পাওয়ার বলে যেটা আমরা বুঝাই) খেতাব পাবার নির্ণায়ক কি? অনেকের মনে হতে পারে পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষমতা আর সে বোমা কোন রাষ্ট্রের সংগ্রহে থাকলেই তাকে বোধহয় পরাশক্তি বলা যায়। আসলে এই ধারণার কোন ভিত্তি নাই। তবু কারও কারও এমন ধারণা থাকে। সেটা তৈরি হবার পিছনের কারণটা হল – কোন রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা এটা নিঃসন্দেহে তার সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার একটা মাত্রা ও সেই মাত্রাকে প্রকাশ করা মাত্র। কিন্তু শুধু ঐ একটা মাত্র দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পায় একথা সত্যি না – ভুল অনুমান এখানে। অর্থাৎ সার কথাটা হল, কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতাকে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলে বুঝা – এটা ভুল। আবার পরাশক্তি ধারণা মানে  কেবল কোন সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নও নয়, বরং সামরিকের সাথে ষ্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন এবং সর্বোপরি সব ধরণের সক্ষমতার মূল ভিত্তি হল ঐ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। কারণ কারও পরাশক্তি হয়ে উঠার প্রথম শর্ত নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলে, উদ্বৃতের অর্থনীতিতে পৌছালে তা বাকি সামরিক, স্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার পুর্বশর্ত বলে এরপর পরাশক্তি হয়ে উঠা কিছু সময়ের ব্যাপার কেবল। যদিও, এটা ঠিক যে নিজের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকলে শত্রুর কাছ থেকে বড় বা সর্বাত্মক ধরণের হামলা বা আক্রমণ আসার সম্ভাবনা এটা কমায় মাত্র। আবার শত্রুর উপর এই বোমা ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগও একই কারণে খুবই সীমিত হয়ে যায়। যেমন ভারত-পাকিস্তান কখনও কোন বড় বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ায় না একারণেই। দুদেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে কেউই যুদ্ধকে বড় করতে বা ছড়াতে চায় না – সীমিত স্তরে রাখতে চায়। কারণ কোন পক্ষ অপর পক্ষের হাতে চরম নাস্তানাবুদ হয়ে গেলে সে অপমাণিত বোধ থেকে এটা তাকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে উস্কানি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এই অস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রকৃতি ও মানুষের উপর বিকিরণ বিষয়ে পার্মানেন্ট ক্ষতির কথাও বিবেচনায় নিতে হয়। না নিয়ে গত্যন্তর থাকে না। কারণ বিকিরণের প্রভাব তার নিজ ভুখন্ডেও আসতে পারে। ফলে সামগ্রিক বিবেচনায় পারমাণবিক বোমা মূলত আত্মরক্ষামূলক; এবং তাও সীমিত অর্থে।
    আত্মরক্ষামূলক কথার আরও মানে হল সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা যাই থাক না কেন, কোন রাষ্ট্রের সে সক্ষমতা তার প্রতিপক্ষের তুলনায় ছাড়িয়ে গেলেও হামলা করার সময় আক্রমণকারী যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করবে। করবে এই ভয়ে যে সেক্ষেত্রে উপায়হীন দেখে আক্রান্ত প্রতিপক্ষ, দুর্বল হলেও, নিজের কাছে মজুদ থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভেবে বসতে পারে, সেদিকে যেন উস্কানি দেয়া না হয়। আবার আক্রমণকারী শত্রুরও যদি পারমাণবিক সক্ষমতা থাকে সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করে থাকে, উভয়কেই কড়া সর্তক থাকতে হয় যেন কেউ কাউকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেয়। সর্বশেষ ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ফলে নিট ফলাফল হচ্ছে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহে থাকার কারণে উভয় পক্ষকেই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করতে হয়, উভয়কেই একটা স্ব-আরোপিত সীমা তৈরি করে ও তা মানতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে শত্রুকে ঘায়েল বা ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং ভয় দেখানো এবং ভয় পাবার দিক থেকে এটা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে।
    আবার ২০০১ সালের পরে আমেরিকার আফগানিস্তান বা ইরাক হামলার বেলায় ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন; ঐক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন নয় যে আমেরিকার পারমাণবিক সক্ষমতা আছে বলেই সে সহজে ঐ দুই দেশকে আক্রমণ করে পদানত ও দখল জারি করতে পেরেছিল। যদিও আফগানিস্তান বা ইরাকের হাতে পারমানবিক বোমা থাকলে ফারাক কিছু হতেও পারত। পারমাণবিক বোমা মূলত ভয় দেখানোর অস্ত্র, যতটা ঠেকিয়ে রাখার অস্ত্র ততটাই তা ব্যবহারের নয়। এসব কারণে, জাপানে ১৯৪৫ সালে এই বোমা ব্যবহারের পর বিশ্বে কোন যুদ্ধ সংঘাতে আর কোথাও এর ব্যবহার হয় নাই। এছাড়া ইদানীং বোমা কেন, পরমাণু এনার্জির ব্যাপারেও প্রত্যেক দেশেই জনগণ যেভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে, ব্যবহার-বিরোধী জনমত প্রবল হচ্ছে তাতে বোমা সংগ্রহে থাকলেও তা ব্যবহারের বিরুদ্ধে খোদ নিজ জনগণেরই মনোভাব প্রবল বাধা হয়ে উঠতে পারে, এটা নাকচ করা যায় না। অতএব বাস্তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
    আবার আর একদিক থেকে দেখলে, পারমাণবিক সক্ষমতা মানে নুইসেন্স করার ক্ষমতাও বটে; যেমন উত্তর কোরিয়া। সে তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করছে দেশের ভিতরে ও বাইরে একটা ভয়ের রাজত্ব তৈরির কাজে। একদিক থেকে মনে হতে পারে উত্তর কোরিয়ার শাসক এই বোমার জোরে নিজ সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু আবার অন্যদিক থেকে যদি প্রশ্ন করি, সার্বভৌমত্ব রক্ষা মানে কি? এর অর্থ খুঁজতে ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে, উত্তর কোরিয়ায় এর আসল অর্থ হয়ে আছে নিজ অর্থনীতিকে ক্ষুদ্র বামন করে রাখা, এমনকি বর্তমান ক্ষমতার অধীনেই ন্যূনতম সংস্কার করার আগ্রহ না দেখানো, জনগণের উদ্যমকে দাবিয়ে রাখা, জীবনের মান অচলায়তনে আটকে ধুঁকে ধুঁকে মরা ইত্যাদি। ফলে এগুলো করে কার সার্বভৌমত্ব রক্ষা হচ্ছে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা। সবমিলিয়ে দেশের ভিতরে বাইরে সবার কাছেই উত্তর কোরিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা অন্যদের চোখে ‘নুইসেন্স’ হিসাবেই হাজির হয়ে আছে। অতএব এখানেও আমরা দেখছি, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার অধিকারী বলেই পরাশক্তি হিসাবে গণ্য নয়।
    যদিও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে উঠাকেই পরাশক্তির হয়ে উঠা বলে ভুল অনুমানের ধারণা এক সময় বেশ প্রকট হয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় কোন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া বাদে অন্যান্য দিক বিকশিত করবার দিকে ঝোঁক ক্রমশ বেড়েছে। আগের কিস্তিতে বলেছিলাম সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কোন রাষ্ট্রের কেমন থাকবে কি থাকবে না অথবা তা কতটা হবে এটা মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তি অর্জনের উপর। পারমাণবিক সক্ষমতা তো নয়ই এমনকি সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটাও ঠিক কারও পরাশক্তি হবার পরিমাপক অথবা নির্দেশক নয়। কারণ সামরিক খরচ বইবার মত একটা সামঞ্জস্যপুর্ণ উপযুক্ত ও যোগ্য অর্থনীতি সবার আগে থাকতে হবেই। এর উপরই দাঁড়াতে পারে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটার অর্থ। এক্ষেত্রে এখনকার রাশিয়া এক আদর্শ উদাহরণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে থাকার সময় এর যে সামরিক সক্ষমতা ছিল এখন রাশিয়ান ফেডারেশন হয়ে যাবার পর সে নিজ অর্থনীতির মাপে নিজের আগের সামরিক সক্ষমতাকে ছেঁটে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। সেটাও বহাল রাখতে পারছে অর্থনীতির ইন্ডাষ্টিয়াল সক্ষমতা্র ভিত্তি দিয়ে নয়, মাটির নিচের তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থনীতি দিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে।
    অতএব, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় যে কোন রাষ্ট্রের জন্য সবার আগে দরকার একটা দ্রুত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি অর্জনের সক্ষমতা নীতি গ্রহণ করা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে সম্পদ বিতরণ ও বণ্টনের নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থা যেন আভ্যন্তরীণ সংকট রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে না পারে। এই দুটো দিক অর্জিত হলে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা আসা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু তারপরও কোন দেশ নিজেকে পরাশক্তি বলে গণ্য নাও করতে চাইতে পারে। অর্থাৎ গণ্য হওয়াটা ঠিক অনিবার্য বা জরুরিও নয়।
    মনে রাখতে হবে পরাশক্তি ধারণাটা মূলত ঐতিহাসিক। অর্থাৎ দুনিয়ায় একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ শর্তে এই ফেনোমেনা হাজির হয়েছে যেটা ভিন্ন সময় শর্ত পরিস্থিতি এটা উধাও হতে পারে। ফলে অনিবার্য বা চিরন্তন কিছু নয়। দুনিয়ায় কলোনি শাসনের আবির্ভাবের কাল থেকে ধারণাটার উদ্ভব। ধারণাটা মূলত কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল প্রভাব আধিপত্য কেমন এরই এক নির্দেশক। আবার অন্যদিক থেকে নেতিবাচক। আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন বিনিময় সম্পর্ককে কেবল জবরদস্তি খাটানো বিনিময় সম্পর্ক হিসাবে জারি রাখা, জবরদস্তিতে নিজের মতাদর্শগত দিকটা দুনিয়ার অন্য জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া, নিজেকেই একমাত্র সভ্যতার ধারক-বাহক, আদর্শ বিবেচনা করা -এগুলো হল পরাশক্তি ধারণাটার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। পরাশক্তির এটা খারাপ অর্থ। তবে আগামী দিনের নতুন কোন গ্লোবাল অর্ডারে যদি পরাশক্তি ধারণার প্রত্যক্ষ ও খারাপ অর্থগুলো কমতে কমতে নাই হয়ে যায় তবু এরপর কোন রাষ্ট্রের নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক সক্ষমতার সূত্রে গ্লোবাল প্রভাব রাখার বিষয়টা থেকে যাবে, সম্ভবত সহসাই উবে যাবে না।

    সম্ভাবনা সম্পন্ন হয়তো, কিন্তু ভারত পরাশক্তি নয়
    পরাশক্তি শব্দটার এই স্বল্প ব্যবচ্ছেদ থেকে আমরা এতটুকু স্পষ্ট হতে পারি যে, পরাশক্তি ধারণার বিচারে ভারত কোন পরাশক্তি এখনও নয়। কিন্তু তবু আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতকে পরাশক্তি বিবেচনা করার কথা উঠেছে। এর কিছু কারণ নিশ্চয় আছে, সেদিক যাব। যেমন, ২০০৪ সালের মে মাসে কংগ্রেসের ইউপিএ সরকারের প্রথম টার্মে ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২৭ জুন ২০০৫, ভারত-আমেরিকা একটা “ডিফেন্স প্যাক্ট” সই করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সহায়তায় ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ উপলক্ষে টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৯ জুন ২০০৫ এর রিপোর্টিং এর প্রথম বাক্যটা এরকম, “India and the United States have signed a 10-year defence relationship agreement that gives credence to the Bush administration’s pledge to help India become a major world power in the 21st century.” এই বাক্যের ভিতরের পরের অংশটা ইন্টারেস্টিং। বলছে, “ভারতকে ২১ শতকে ‘মেজর ওয়ার্ল্ড পাওয়ার’ বা পরাশক্তি হতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছিল এই চুক্তি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে”। এখন পরাশক্তি কথার আমরা আসল যে অর্থ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে ন্যূনতম শীর্ষ তিন-চার জনের একজন হওয়া -এমন অর্থবোধে গত দশ বছরেও ভারত পরাশক্তি হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট অথবা দাবি আমরা কোথাও দেখি নাই। তাহলে এই মিডিয়া রিপোর্টটা এমন কেন? এটা পড়ে অনুমান করা যায় যে অর্থে ভারতের পরাশক্তি হওয়া মানে করা হয়েছে, তাও আবার আমেরিকার সহায়তায়, এটা কারো পরাশক্তি হওয়া বুঝায় কি না? অন্য রাষ্ট্রের সহায়তায় কেউ পরাশক্তি হতে পারে কি না এমন প্রশ্ন বা সন্দেহ এই রিপোর্টে নাই। এছাড়া এই রিপোর্টটা মূলত ভারতকে আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার ও টেকনোলজি সরবরাহ সংক্রান্ত। অর্থাৎ এতে ভারতের বড়জোর সামরিক সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু তাতে ওয়ার্ল্ড পাওয়ার বা পরাশক্তি হবার সম্পর্ক কি – সে প্রশ্ন করতে মিডিয়া ভুলে গেছে। রিপোর্টের এসব ভুয়া অনুমান উদোম করতে এই রিপোর্ট থেকে আরও কিছু প্রসঙ্গ তুলে আনব।
    প্রথমত রিপোর্ট জানাচ্ছে, “Hugely ambitious in its size and scope, the agreement envisages a broad range of joint activities, including collaborating in multinational operations ‘when it is in their common interest,’ ”। অর্থাৎ ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে আছে, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ বলে উভয়ে মনে করলেই ‘টেররিজম ধ্বংস’ জাতীয় কোন কিছুর উছিলা তুলে ভারত আমেরিকার সাথে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ঐ “টেররিষ্ট” দেশের বিরুদ্ধে লড়তে সম্মতি জানাচ্ছে। এই পত্রিকার রিপোর্ট নিজে অবশ্য চুক্তিতে কেবল এমন অনুচ্ছেদ থাকাকে ভারতের “উচ্চাকাঙ্ক্ষা” হিসাবে দেখছে। আর এই চুক্তি অনুমান করছে এভাবেই নাকি “two militaries to promote security” তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে আগিয়ে যাবে। রিপোর্টের আর এক অংশ বলছে, “The framework agreement also envisages what is tantamount to the U.S and India jointly policing the world.”। এখানে পত্রিকা প্রতিরক্ষা চুক্তিটা সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্য লিখে বলছে, যেন ভারত-আমেরিকা যৌথভাবে বিশ্ব-পুলিশের ভূমিকায় নামতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্ব-পুলিশী করার খায়েস রাখার বিপদের দিকটা নিয়ে পত্রিকা আপত্তি তুলছে। তৃতীয়ত, ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে সই করেছিলেন, যুদ্ধবাজ বুশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফিল্ড আর ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রণবকে এক রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিলেন, এটা “playing a subservient role to a uni-polar US agenda” অর্থাৎ ভারতের দিক থেকে দুনিয়াতে এক মেরুর মাতবর আমেরিকার এজেন্ডার অধীনস্থ হওয়া হয়ে যাচ্ছে কি না। এর জবাবে প্রণব আমেরিকাকে বিশাল ঠকান ঠকিয়ে এই চুক্তি জিতে এনেছে এমন এক মিচকি হাসি দিয়ে বলেছেন, “This is the real deal…we have both put down what we want for the next decade… “he didn’t expect convergence or agreement on all issues at all times.”। তর্জমা করলে, “এটাই তো আসল খেলা, … পরের দশক পর্যন্ত আমরা কি চাই তা উভয়েই ওখানে লিখে রেখেছি।… সব ইস্যুতে সবসময় আমাদের উভয়ের একমত হতে বা মিলতে হবে এটা আমি আশা করি না”। প্রণবের এমন আস্থাবাচক মুচকি হাসির কারণ, ঐ প্যাক্টের আর এক অনুচ্ছেদ হল এরকম, “এই চুক্তি ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়ার অধিকার খর্ব করে না”। “ The agreement does not preclude India’s right to its independent views.”। এই হোল প্রণবের “ভারত পরাশক্তি” নামক প্রপাগান্ডার ফানুস। তবে ফানুস উড়িয়ে একটা ভাব তো ছড়ানোই যায় যে আমরা এই তো চাঁদে চলে যাচ্ছি। সে যাক, কিন্তু ‘আমেরিকাকে মহা ঠকিয়েছে’ ভাবটা প্রণব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। ভারত প্রথম ধাক্কা খায়, ২০১১ সালের প্রথম অর্ধে যখন বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর রাখার পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। স্বভাবতই ওবামার এই ইচ্ছার ভিতরে ভারত এবার খোদ নিজেরই নিরাপত্তার জন্য হুমকি আর বিপদের দিকটা দেখেছিল। ভারত আমেরিকান পরাশক্তির যাঁতাকাঠি ধার পেয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ থেকে; বাংলাদেশে কে সরকারে আসবে থাকবে, কি শর্তে থাকবে তা ঠিক করার কর্তা হওয়ার ভিতর দিয়ে। এটাও প্রণবের চোখে পরাশক্তি ভাবার সুখবোধ হতে পারে।

    দুই হাজার চৌদ্দ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কথাবার্তার পর নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন কম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ছিল ২৬%, সেটা এখন বাড়িয়ে ৪৯% করা হয়েছে। দুই হাজার পনেরো সালে ভারত ও মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ হবার কথা ছিল। মোদীর মার্কিন সফরের পর সেটা আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে।

    কিন্তু ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভারতের সেই সুখবোধে টান পড়তে শুরু করে প্রায় একই সময় ২০১১ সাল থেকে। এরই এক প্রকাশ্য রূপ হল, বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারত-আমেরিকার দুই মেরুতে অবস্থান। অর্থাৎ আমেরিকার বিদেশনীতি আর ভারতের বিদেশনীতি হরিহরাত্মার মত একই আত্মা না হলেও “নিরাপত্তা”, “টেররিজম” এসব শব্দের আড়ালে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এই হরিহর মিলনের মধ্যে কোন খটমটর নাই, আসবে না এই ভাব ছড়ানো হয়েছিল। এমন মিথ্যা ধারণাটা উন্মোচিত হয়ে যেতে শুরু করেছিল ২০১১ সাল থেকে। অথচ ভারত ও আমেরিকা দুজনেই জানত যে মূলত আমেরিকার চীন ঠেকানোর ইচ্ছা থেকে এসব ঘটছে এবং ঘটানো হচ্ছে। যদিও আসলে চীন ঠেকানো অসম্ভব এটাই অবজেক্টিভ বাস্তবতা। একেই আগের কিস্তিতে “উদ্বৃত্ত বাস্তবতা” বলেছিলাম। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে যতটুকু ও যতদিন আমেরিকা পরাশক্তি হিসাবে নিজের উঁচু জায়গা জাগিয়ে রাখতে পারে সেই উদ্দেশ্য সাধনে সাময়িক সে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। কিন্তু উভয়েই এই জানা জিনিষটা লুকানোর ভাব ধরেছিল। বিশেষত ভারত ভাব ধরে ছিল যে সাদা চোখে ধরা পড়া জিনিষটাও সে দেখেও দেখে নাই। যেন এটাই তার পরাশক্তি হবার পথ, যেন আমেরিকা তাকে পরাশক্তি হতে সহায়তা করছে, এই ধারণা প্রণবের সরকারই মিডিয়াতে ছড়িয়েছিল।

    আজকের দুনিয়ার মুল দ্বন্দ্ব
    আজকে চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্বের মুল বিষয় হল, আগামি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কে নিয়ন্ত্রণ করবে? একালেও ব্রিটেনের সাথে আমেরিকার ছোটখাটো স্বার্থবিরোধ দ্বন্দ্ব আছে কিন্তু এই দ্বন্দ্ব তুলনায় তেমন একেবারেই কিছু নয়। তবে এককালে, ব্রিটেন ও আমেরিকার সত্যিকারের একটা বড় দ্বন্দ্ব ছিল, যা ক্রমশ চরমে উঠা আর ফয়সালার সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টা (১৯১৪-১৯৪৪), এই ত্রিশ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের কর্তা হিসাবে ব্রিটেনের পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে আমেরিকার মাতব্বরিতে নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল। যদিও বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে হাজারো বই-পুস্তক সিনেমায় হাজির বয়ান আছে। যেখানে যুদ্ধের মুল প্রতিপাদ্য হল হিটলারের জার্মানি, ইটালি বনাম বাকি পশ্চিমা শক্তি – যেন এমন এক “ন্যায়ের যুদ্ধ” সেটা। জেনারেলদের বীরত্বের এক এক গাথা সেগুলো। কিন্তু কোন বর্ণনায় যেটা বলে না তা হল, ঐ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক তাতপর্য। তা হল, সারা দুনিয়াকে উপনিবেশ বা কলোনিতে ভাগ করে নেয়া, এক একটা সাম্রাজ্যের অধীন করে রেখে দেয়া আর শিরোমনি হিসাবে থাকা বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা সীমিত বিকশিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারটা ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষে হস্তান্তর হয়ে আমেরিকার হাতে চলে যাওয়া। সেটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে -এই প্রথম জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া আর নিজের পরাশক্তিগত উত্থান। অর্থাৎ আগে বৃটিশ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে নড়বড়ে অবিকশিত এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ছিল কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো ছিলই না। এমনকি কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল না, ছিল Rothschild family এর পারিবারিক ব্যাংকের মত কিছু প্রতিষ্ঠান মাত্র। এসবের বিপরীতে কায়েম হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে এক প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার। তবে তা ছিল তখনকার “উদ্বৃত্ত বাস্তবতায়” আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার জোরে, সামরিক বা গায়ের জোর দেখিয়ে নয়। আর, ব্রিটেন সেকালের উদীয়মান শক্তি আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের পুরানা কলোনি ব্যবস্থা অর্থাৎ তখনকার গ্লোবাল অর্ডারকে টিকানো বাস্তবত অসম্ভব ছিল বলে কিছুই করতে পারে নাই। তবে পরাজিত হবার পর ব্রিটেন আবার আমেরিকার নেতৃত্বে যে নতুন গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হল সেখানে আমেরিকার খুবই ছোট পার্টনার হয়ে আমাদের মত ছোট অর্থনীতির উপর রুস্তমির ভাগ যতদূর পায় তা টুকিয়ে সেই থেকে দিন চালাচ্ছে।

    আজ চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব ১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ-আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বড় দ্বন্দ্বের মতই। দ্বন্দ্বটা একই ধরণের, পুরান ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডার বনাম আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার; এর নিয়ন্ত্রণ করবে কে –সেটাকেই আমরা আর এক অর্থে মাতবর বা পরাশক্তি হবার লড়াই বলছি। আজ চীন আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারটা চ্যালেঞ্জ করে ফেলেছে। এটা ভেঙ্গে দিয়ে নিজের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম করতে চাইছে। দ্বন্দ্বের সারকথা এটাই। ফলে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব লড়াইয়ের মুখে আমেরিকা ভারতকে পাশে রাখতে চায় যাতে ভারত চীনের সাথে নতুন গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করবার সহযোগী সাথী না হয়ে ওঠে। সে লক্ষ্য হাসিল করতে আমেরিকা ভারতকে পরাশক্তি হবার মিথ্যা লোভ দেখিয়েছে। মিথ্যা এজন্য যে, পরাশক্তি হওয়াটা কারও সহযোগিতায় পাওয়া না পাওয়ার উপর নয় বরং আপন অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করার উপর নির্ভর করে। ফলে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে আমেরিকা প্রলুব্ধ করেছে আর প্রণবের কংগ্রেস সে লোভে মশগুল থেকেছে। এভাবেই স্বপ্ন দেখতে দেখতে কংগ্রেস ইউপিএ সরকারের দশ বছর পার হয়েছে। আর সেই থেকে ভারত একটা পরাশক্তি এমন ভুয়া ধারণা মিডিয়ায় খামাখা চালু হয়ে রয়েছে।

    আগে বলেছি ভারতের সামরিক শক্তিতে শ্রীবৃদ্ধি হলেও এর মানে তার পরাশক্তি হওয়া নয়। তাছাড়া মুল কথা, কোন রাষ্ট্র কাউকে সহযোগিতা দিয়ে পরাশক্তি বানিয়ে দিতে পারে না। তবু সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজির আকাঙ্ক্ষা ও লোভে ভারত আমেরিকার এই প্ররোচনায় পা দিয়েছে। তাও হয়ত হতে পারে। কিন্তু, আমেরিকা কি চীন ঠেকাতে গিয়ে ভারতকে পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা বাস্তব করে তুলতে পারে? অর্থাৎ আমেরিকা যদি চীনের পরাশক্তি হওয়া খর্ব করতে চায় সেই আমেরিকা আবার আর এক পরাশক্তি হতে ভারতেকে কি সহযোগিতা আদৌ করতে পারে? কেন করবে? জবাব হল করতে পারে না, কোন কারণ নাই। তবু ভারত সেটা বিশ্বাস করে যে সে পরাশক্তির হতে চলেছে বা হয়ে গয়েছে। এমন স্বপ্নে দিল্লী বিভোর থেকেছে।

    তাহলে সারকথা, ভারতের পরাশক্তি হবার আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঠিক মৌলিক করণীয় কাজ হল সবার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা, সবার আগে অর্থনীতি ফোকাস করে এগিয়ে যাবার নীতি গ্রহণ করা। “নিরাপত্তার” নামে বাকচাতুরি, আমেরিকাকে ফাঁকি দিতে পারছে মনে করা -এগুলো আসলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া, সদর রাস্তা থুয়ে ব্যাকডোরে কাজ হাসিল করার মত শর্টকাট কাজ – পণ্ডশ্রম। আবার অন্যদিকে প্রণবের কংগ্রেসের দশ বছরে সর্বোচ্চ জিডিপি ছিল একমাত্র ২০১০ সালের প্রথম দুই মাস, ডাবল ডিজিটে। এরপর এটা পড়তে পড়তে কংগ্রেসের বাকি আমল ছিল পাঁচের নিচে। গত বছর কংগ্রেসের পতনের পরে, এসবের বিপরীতে যা কিছু বুঝে বা মনে করেই হোক মোদীর ভারতের উত্থান অর্থাৎ অর্থনীতি ফোকাস করে নিজের আগানোর নীতি নির্ধারণ স্বভাবতই সঠিক পদক্ষেপ। যদিও মোদী আমেরিকার সাথে ডিল করবে কি করে সে প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিতই রয়েই গেছে।

    জুন-সেপ্টেম্বর মোদীর ক্ষমতার প্রথম চার মাসের পরে
    আগের কিস্তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মানসিক আমোদ, আদর্শ এবং সুখবোধের উৎস হয়ে থেকে গেছে। আমলাদের এমন মনোগাঠনিক প্রভাব সত্ত্বেও মোদি নিজেকে পরিচালিত করতে সুযোগ পেয়েছিলেন প্রথম চার মাস। এর মধ্যেই ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওবামার সাথে শীর্ষ বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসে। ফলে আমেরিকার সাথে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসে, গোয়েন্দা-আমলাদের মনোগাঠনিক প্রভাবের বাইরে মোদি আর থাকতে পারেন নাই। এর সম্ভাব্য কারণ, মোদী এবং তাঁর টিম ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য যে পথে পরিচালিত করতে চান এনিয়ে স্বপ্ন পরিকল্পনায় যতটা হোমওয়ার্ক করেছেন ততটা সময় আমেরিকার সাথে ডিলিং এর বিষয়ে দিতে পারেন নাই। এর কারণ ভারত-আমেরিকার দেনাপাওনার ফোকাস সিম্পল অর্থনৈতিক নয়। এছাড়া ভারতের চাওয়াগুলো কি করে আদায় করবেন, এমনকি তা কোন জায়গায় রেখে কংগ্রেস সরকার বিদায় নিয়েছে সেখান থেকে এর বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং উত্তরণের পথ কি হতে পারে এনিয়ে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তার টিমকে স্টাডির কাজ দিয়ে হয়ত শুরু করতে হত। আর মুখ্য বিষয় কংগ্রেসের অকেজো “নিরাপত্তা” লাইনের বদলে নিজের “অর্থনীতি” লাইনে চলতে চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সেই একই রয়ে গেছে।
    ওদিকে নতুন গ্লোবাল অর্ডার যা ভারতেরও অর্থনৈতিক স্বার্থ, তা নির্মাণে BRICS ও AIIB মত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়তে মোদী কি চীনের মতই পাশে থেকে সক্রিয় উদ্যোগ নিবেন? নাকি আমেরিকার প্ররোচনায় সেই উদ্যোগে গড়িমসি করে বিনিময়ে আমেরিকার থেকে নিজের অমীমাংসিত স্বার্থগুলো আদায়ে একে ব্যবহার করবেন? বিগত কংগ্রেস এই বিনিময়ের লাইন বজায় রেখে এগিয়েছিল, যদিও বাস্তবে তাতে ভারতের কোন স্বার্থই হাসিল হয়নি, কোনদিকে তেমন ফল দেয় নাই।

    সমান মালিকানা শেয়ার, সমান ভোট ফলে মতামতের সমান ওজন
    দ্বিতীয় আর এক দোনোমনা অবস্থা ভারতের রয়ে গেছিল। BCIM অথবা BRICS গড়ার প্রশ্নে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বা নতুন সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগের প্রশ্ন ছিল সেখানেই চীনের শেয়ার যাতে কোনভাবেই বেশি না হয় তা ঠেকানোর বিষয়টাকে মুখ্য বিবেচনা করে এগিয়েছে। অন্যভাবে বললে ভারত এমন নিয়ম আরোপের পক্ষে কাজ করেছে যাতে উদ্যোক্তাদের সবার বিনিয়োগ সমান হতে হবে, এই নিয়ম আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলেছিল। বাস্তবে যে কথার মানে হল, BCIM অথবা BRICS প্রতিষ্ঠানগুলো আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্যারালাল প্রতিদ্বন্দ্বী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়াতে নিজস্ব প্রাইমারি মূলধন চাহিদা যাই থাক এবং তা পূরণের চাহিদা সম্মিলিতভাবে থাক আর না থাক, তাকে ছেঁটে ভারতের নিজের নিচু বিনিয়োগ ক্ষমতার মাপের সীমায় আটকে বামন ও অকার্যকর করে রাখা। ফলাফলে এগুলো প্রভাবশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হোক না হোক তা ভারতের বিবেচনার বিষয় নয়। অথবা সেকেন্ডারি বিবেচনা। একথা ঠিক আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসারে, ওসব প্রতিষ্ঠানে আমেরিকান শেয়ার সবার চেয়ে বেশি বলে, যে কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ মালিকানা নীতি অনুসারে মালিকানা শেয়ার যার বেশি মানে ভোটের ক্ষমতা তার বেশি, মানে তার নিজের অবস্থান মতামতের ওজন অন্য সবার চেয়ে বেশি। এর ফলাফলে এগুলো হয়েছে আমেরিকান স্বার্থে কান্নি মারা প্রতিষ্ঠান। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসরণে নতুন করে BCIM অথবা BRICS গড়তে গেলে তা একই সমস্যার জন্ম দিবে। ফলে ভারতের উদ্বেগ জেনুইন। কিন্তু এই উদ্বেগের সমাধান করবার ফর্মুলা কোনভাবেই উদ্যোক্তা মালিকানা সবার শেয়ার সমান করে দেয়া হতে পারে না। কারণ এর অর্থ তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বামন ও অকার্যকর করে রাখা হবে। ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপ মানে ততোধিক নিচু মূলধন বিনিয়োগের ক্ষমতা। মনে রাখতে হবে আমরা এই প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগ বলতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের কথা বলছি না। এটা অবকাঠামোগত অথবা নতুন অর্থনৈতিক সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি বীজ-পুঁজির কথা বলছি। যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মুনাফা নয়, এই বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসবে আধা পার্সেন্টের নিচে অথবা হয়ত কোন মুনাফাই নয় এমন। ফলে ভারতের এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সক্ষমতার চেয়েও কম হবে। তাহলে আমাদের এই পথে নয়, অন্য সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অর্থাৎ ভারতের উদ্বেগ অস্বস্তি জেনুইন, কিন্তু সমাধানের প্রস্তাবনা নয়। কি হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান?
    মালিকানা শেয়ার ভিত্তিতে ভোট বা বক্তব্যের ওজন – সিদ্ধান্ত ও পরিচালনা নীতি এমন না করে সদস্যদের মালিকানা শেয়ার অবশ্যই অসমান হবে আর তা যার যাই হোক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি হয় কনসেনসাস বা ঐক্যমত্য এবং অবজেক্টিভ টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত বিবেচনা তাহলে সহজেই এই সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ কারও মালিকানা ভোটকে তার অবস্থান বক্তব্যের ওজন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। অবস্থান মতামতকে নিজ মেরিটে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী হতে হবে, ভোটের ক্ষমতার জোরে নয়। এটা করতে পারলে প্রধান সুবিধা যা পাওয়া যাবে তা হল, চীনের হাজির প্রবল বিনিয়োগ সক্ষমতাকে BCIM অথবা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করা। যেটা BCIM অথবা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত প্যারালাল সমতুল্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির করতে পারে। ঠিক এরকম অন্য কারও কোন প্রস্তাবও হতে পারে। কিন্তু মূলকথা, মালিকানা ভোটের ভয়ে নব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বামন করে রাখা যাবে না। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে নতুন কিন্তু বামন প্রতিষ্ঠান করা আর না করা সমান। কোন অর্থ হয় না তাতে।
    প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? আমরা একেবারেই নিশ্চিত নই। আমরা অপেক্ষা করছি। মোদী সম্পর্কে মূল্যায়নে শেষকথা বলার সময় এখনও আসেনি। আর তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাসের নীতির কারণে এই নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মোদীর পক্ষে এমন চিন্তা করা অবশ্যই সম্ভব হলেও তিনি তা করবেন, তাঁর গোয়েন্দা-আমলাদেরকে পিছনে ফেলে আগাতে পারবেন এতদূর এখনই বলা ঠিক হবে না। তবে আরও কিছু ফেভারেবল দিক আছে; যেমন, চীনের প্রতি তাঁর সাধারণ মনোভাব অন্তত প্রণবের মত নয়। আমেরিকার প্রতি সাধারণ মনোভাবও অন্তত প্রণবের কংগ্রেস বা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মত নয়। আমেরিকা ভারতকে একটা “পরাশক্তি ভাব” দিবার সক্ষমতা বাস্তবতায় থাক আর না থাক তাকে ঢলে পড়তে হবে, না দিলে আবদার অথবা আকাঙ্ক্ষার সুখবোধে বিভোর থাকতে হবে – এমন একেবারেই নয়। তবুও মোদীর অবস্থান দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সাথে মুলাকাতের প্রথম পর্ব মোদীর শেষ হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তাতে মোদীর ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের অমীমাংসিত এবং জট পাকিয়ে যাওয়া ইস্যুগুলোর সাথে সাক্ষাত বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়েছেন। আমরা অনুমান করতে পারি, আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজি পাবার বিষয়ে তিনি যতদূর নমনীয় হওয়া সম্ভব হবেন। কিন্তু সেটা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে রাখার বিনিময়ে নয়। এই ভরসা রাখছি এজন্য যে শেষ বিচারে মোদী তাঁর অর্থনীতি” ফোকাস থেকে সম্ভবত কোনভাবেই সরবেন না। কারণ তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাস আকাঙ্ক্ষাকে জীবিত রাখতে চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব তাঁর চেয়ে ভাল আর কে বুঝে। এই পটভূমিতে ওবামা এমাসেই ভারত সফরে আসছেন বিশেষ দাওয়াতি হিসাবে। ভারতের “প্রজাতন্ত্র দিবস” মানে কনষ্টিটিউশন গৃহীত হবার দিন, ২৬ জানুয়ারি উৎযাপনে, প্রধান অতিথি হিসাবে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার হিসাবে খ্যাত সি রাজামোহন এটাকে বলছেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের দিক থেকে মোড় ঘুরার সফর। অর্থাৎ ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে যে দোলাচল আছে তা অনেকটা থিতু হবার সফর। তিনি একটা বিশেষ দিকে নজর এনেছেন যার সারকথা হল, গত সেপ্টেম্বরের মোদীর সফরের সময় ওবামা-মোদী উভয়ে তাদের আমলা প্রশাসনের অবস্থান মতামতকে পিছনে ফেলে বাণিজ্য বিষয়ে ঝগড়ার মীমাংসা করেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, পত্রিকায় তিনি লিখছেন, … suggests that the two leaders had personally driven their bureaucracies to bring the dispute on trade facilitation to an end.। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে সামরিক ইস্যু ছাড়াও অন্য মুল ইস্যু হল WTO সম্পর্কিত বাণিজ্য সুবিধাদি নিয়ে বিতর্ক। অর্থাৎ আমলা প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতে পুরাপুরি পরিচালিত না হয়ে বরং এর উপরে নিজেদের রাজনৈতিক বিবেচনাকে স্থান দেবার একটা চল মোদী-ওবামা উভয়ের মধ্যে আছে। এই বিচারে ওবামার এই সফর থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে থিতু হচ্ছে এর আরও কিছু অগ্রগতি এখানে আমাদের দেখতে পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও রাজামোহনের দৃষ্টিতে এই সফরকে দেখার করার দরকার নাই। মনে রাখতে হবে, তিনি ভারতকে আমেরিকার “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” হিসাবে দেখতে চাইবার লোক। এখানে “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” কথাটা ভাঙলে এর সারার্থ, চীন বিরোধী হয়ে ভারত-আমেরিকার আগানোর ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ জোট।

    নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি প্রণব মুখার্জির দৃষ্টিভঙ্গী
    প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? সে প্রসঙ্গে যাবার আগে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারের প্রতি প্রণবের মনোভাব সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক। এটা শুধু প্রণবের মনোভাব নয় বরং বিগত কংগ্রেসের সরকার যে রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেছে তা হল – ভারত চীনের সাথে এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে চলে যেতে পারে আমেরিকাকে এই ভয় দেখিয়ে এটাকে জিম্মির বুটি বানিয়ে এ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা। সারকথায় পুরানা গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটার আয়ু আরও লম্বা করে দেওয়া। যেমন, ভারতের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি হয় নি সেটা বিবেচ্য না, কিন্তু ভারতের লোভ বর্তমান জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে চীন বা আমেরিকার মতই ভেটো মেম্বার কিভাবে হওয়া যায়। আর এই লোভের কথা টের পেয়ে আমেরিকারও তাকে মুলা ঝুলিয়ে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মিথ্যা লোভের তীব্রতা বুঝার জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে হাসিনার প্রথম ভারত সফরে মনমোহন-হাসিনার যে ৫১ দফা যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর হয়েছিল এর ৪৮ নম্বর দফা দেখা যেতে পারে। ঐ দফা বলছে, “ভারতের ভেটো মেম্বার হবার খায়েসে বাংলাদেশ ভারতকে সমর্থন করে”। অর্থাৎ এর অর্থ হল, প্রণবের ভারত কল্পনায় নিজেকে এমন এক আগামী দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে যেখানে আদতে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাই থাকবে আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে চীন ঠেকানোর পুরস্কার হিসাবে তাদের স্বার্থে সাজানো গ্লোবাল অর্ডারকে টিকিয়ে রাখে এমন জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের মতই সমান গ্লোবাল ক্ষমতায় ভারতকে পাশে বসাবে। এভাবে পুরান ময়লার ভিতরে প্রণবের ভারত নিজের ভবিষ্যৎ দেখে, এর বেশি ভাবতে পারে না। এটা ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বের চিন্তা-প্রতিবন্ধতার সমস্যা, তারা স্বপ্ন দেখতেও শিখেনি। তারা জানতে শিখতে খবর করতে এখনও অক্ষম যে ১৯৪৪ সালে কোন শর্ত বা পরিস্থিতিতে পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকা গঠন করে নিতে পেরেছিল। কাদের মধ্যে ভেটো ক্ষমতা ভাগ করে নেয়া হয়েছিল, কেন তা সম্ভব হয়েছিল। এ সম্পর্কে স্টাডি করে সেটা না বুঝলে এটা বুঝা যাবে না এই অর্ডার ভেঙ্গে পড়বে কেন এবং কখন। কোন্‌ আলামত দেখলে তা বুঝা যাবে। অথবা কেন তারা আজ গ্লোবাল অর্ডারের পড়তি দশায় ভারতকে তাদের সমান আসনে বসাবে অথবা আদৌ বসিয়ে দিতে পারে কি না। একদম মৌলিক প্রশ্ন – জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা কি কেউ কাউকে অনুগ্রহ করে অথবা চীনকে জিম্মি করার বুটি হিসাবে দিবার বিষয়? নাকি নিজেই নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে নিজেই তা নিবার বিষয়? প্রণবের কংগ্রেস চিন্তা কতবড় নাবালক এরই প্রমাণ এগুলো। ভারতের ভেটো সদস্য হবার স্বপ্ন দেখাটা শুধু স্বপ্ন অর্থ কোন সমস্যার নয়। কিন্তু চিন্তার দেউলিয়াত্ব বা সমস্যা হল, নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে উঠার উদ্যোগে সামিল না হয়ে বরং আমেরিকার অনুগ্রহে পাবার চেষ্টা আর পুরান অর্ডারের ময়লা ঘেঁটে এর মধ্যেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় মনে করা। তারা ভুলে থাকতে চায় অথবা খেয়াল করেই হয়ত দেখেনি যে, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে তাদের সমমর্যাদা দিবার লোভ দেখানোর অর্থ কি? এটা কি পশ্চিমের নিজেদেরই ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডারে নিজেদের গুরুত্ব বা মর্যাদাকে চ্যুত করা নয়? সারকথায় পশ্চিমের উপস্থিত সমস্যা হল, পুরান গ্লোবাল অর্ডারের পড়ে যাওয়াটাকে কি করে ঠেকানো যায় অথবা অন্ততপক্ষে দেরি করিয়ে দেয়া যায়। সেই দশায় সে কাকে কি দিতে পারে? কেন দিবে? আমাদের সৌভাগ্য যে প্রণবের এসব এবসার্ড স্বপ্ন তাদের সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থাতেই অকেজো, ফলহীন বৃক্ষ হয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। তাসের ঘরের মত প্রণবের স্বপ্নের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক নন-ফাংশনাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটা আজ প্রমাণিত যে এই লাইন অনুসরণ করে ভারতের পাতে কিছুই আসেনি। আমেরিকার সাথে তার জমে উঠা দূরে থাক, এশিয়ায় আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থকে জায়গা করে দিতে গেলে এখন খোদ ভারতের মৌলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি যায় এটা আজকের বাস্তবতা। ফলাফলে আমেরিকার সাথে মনোমালিন্য আর ঝগড়া তুঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতাকাল শেষ করেছিল।
    তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রণবের এই অবাস্তব ও অকেজো আমেরিকান অনুগ্রহ পাবার স্বপ্নের বলয়ের মধ্যেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে। হাসিনা-প্রণব সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশকে দিল্লি হয়ে মার্কিন অনুগ্রহের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল, ঢাকা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও। প্রণবের দিল্লি বোঝাতে চেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার দায় দিল্লির, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন মনোমালিন্য সেই ক্ষেত্রে বড় কোন সংকট হয়ে ওঠে নি। প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লীর মার্কিন অনুগ্রহ পাবার মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ কি? সেটা বোঝা যাবে ভারতের মনমোহনের সাথে শেখ হাসিনার যৌথ ঘোষণার মধ্যে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যা স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনার ক্ষমতায় আসার প্রায় ঠিক একবছর পর। এটা ভারতের সমর্থনে হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্ন, হাসিনা মানে দিয়েছিলেন যে তার স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ। এমনকি দল হিসাবে এটা আওয়ামী লীগের স্বার্থ এটাও অনিবার্য ধরে নেয়ার কারণ নাই। প্রণবের সরকারের আয়ু-দশাতেই এটা প্রমাণিত যে প্রণব ও কংগ্রেসের স্বপ্নটাই অবাস্তব। ইতোমধ্যে ভারতে সরকারই বদলে গিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এখনও সে পথেই আছেন। ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সকল বিষয় ভারতের স্বার্থে যায় তাকেই হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছেন।। এই ভরসায় যে দিল্লী তাতে অনুরাগ বোধ করবে এবং মূল্য হিসাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ভারতের স্বার্থ হয়ে উঠবে। প্রণব যেমন ছিলেন, এখন মোদীও যেন হাসিনার পক্ষে ভারতের সমর্থন নিয়ে হাজির হন বা হবেন। কিন্তু এর মিসিং লিঙ্ক হল, প্রণব বা কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচ্যুত। যদিও একই চিন্তার লাইনের গোয়েন্দা-আমলারা রয়ে গেছেন। কিন্তু মোদী কি গোয়েন্দা-আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত প্রভাবিত হবেন? এখনও কিছুই স্পষ্ট নয়। আপাতত এতটুকু বলা যায় যে মোদীর সরকার পরিচালনা নীতি স্পষ্টতই সেদিকে নয়। মোদী প্রণবও নন।

    [এই রচনা প্রথমে চিন্তা ওয়েবে ছাপা হয়েছিল এখানে গত ১৮ জানুয়ারী ২০১৫। এখন এখানে আরো আপডেটসহ আবার এডিট করে ছাপা হল।]

     

  • মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী

    মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী
    হাসিনা লোভনীয় সম্পদ নাকি দায়

    গৌতম দাস

    ০২ জুলাই ২০১৪।
    ভারতের নবগঠিত মোদি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তিনদিনের সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়ায় দাদাগিরি মন্তব্য আর মুই কি হনুভাব আবার চেগে উঠেছে। ভারতের নির্বাচন শুরু হবার পর থেকে ফলাফল প্রকাশ শেষে সুষমার বাংলাদেশ সফরের আগে পর্যন্ত – সব মিলিয়ে প্রায় চার-পাঁচ মাস এসব উতপাতে ভাটা পড়েছিল। এমনিতেই ভারতের সব তরফের দাদাগিরিতে আমরা অস্থির অসহ্য থেকেছি গত প্রায় ছয় বছর। এর উপরে আরও সবচেয়ে অসহ্য ঠেকে ভারতের মিডিয়া, সেরের উপর যেন সোয়া সের। “রাজার চেয়ে পারিষদ বলে শতগুণ”। এরা বুঝতেই পারে না সবকিছুর একটা সহ্য সীমা লিমিট আছে। এরপর সেটা বুমেরাং হয়।
    ভারতীয় মিডিয়া তবু যদি গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ বুঝতে নজর দেবার ক্ষমতা দেখিয়ে তাতে ভারতের কি সম্ভাবনা – ভারত কোন উচ্চতায়, সম্ভাব্য কোন ভুমিকায় তার অবস্থানের গুরুত্ত্ব, মোদি সেটা কিভাবে পাঠ করছেন ও নীতি নিচ্ছেন এনিয়ে যদি তাদের উগ্রজাতিবাদী জোশমুক্ত ও নির্মোহ কোন বাস্তব মুল্যায়নের উপরে দাঁড়ানো কথা বলতে দেখা যেত তাও নাহয় সহ্য করা যেত। সেদিকে না গিয়ে বরং গায়ে মানে না আপনি মোড়লি মন্তব্যের নামে উস্কানিমূলক কলাম আবার প্রতিদিন একটা না একটা পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে।
    কাকে ফেলে কার কথা দিয়ে শুরু করব? দ্যা হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দার, না টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটোরিয়াল নাকি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের শুভজিত রায়ের কথা? এছাড়া বিখ্যাত আঁতেল ডঃ সুবীর ভৌমিক তো নিয়মিতই আছেন। মোদির বিপুল জয়লাভের পর আবার দেখা গেল কেউ কেউ পুরা ভোল পালটিয়ে ফেলেছেন। যেমন, ডঃ সি রাজামোহন, গত দশ বছরের কংগ্রেস শাসনে তিনি নয় বছরই কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির সমর্থক ছিলেন। যা আসলে সেসময়ের ভারতের পিঠে হাত রাখা আমেরিকার সমর্থিত কংগ্রেসের নীতি ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের সাথে আমেরিকার বিবাদ শুরুর পরের সময়ে তিনিও কংগ্রেসের শেষের বছর একটু দুরত্ত্ব রাখছিলেন। আর সেই তিনি এখন একেবারে মোদি ভরসা। সপ্তাহ দুয়েক আগে তিনি বাংলাদেশে এসে সভা সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে গিয়েছেন। সেই সাথে গত ১৩ জুন চ্যানেল আই টিভিতে টকশোর সময়ে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সুবীর আর রাজামোহন মূলত আমেরিকান খুটি ভরসা মানে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রাখায় বলশালী অনুভব করে কথা বলতেন। তাদের ভারতই বিশাল রুস্তম এই ভাবের উপর দাঁড়িয়ে তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনগণকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কথা বলতেন।

    অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
    মোদির উত্থানে কংগ্রেস টানা দশ বছর ক্ষমতায় কাটানোর সমাপ্তি ঘটল। এই শাসনকালের শুরুটা কেটেছিল ওয়ার ওন টেররের রমারমা কোলে। বুশের আমেরিকার দরকার ছিল ভারতকে কোলে তুলে নিবার, পিঠে হাত রাখার। কিন্তু কংগ্রেসের ভুল ছিল সে ঐকালকে বুঝেছিল আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় আশেপাশে পড়শির উপর রুস্তমি দেখাবার কাল হিসাবে। কংগ্রেসের অযোগ্যতা হল ঐ সময়ের আসল দিকটা পাঠ করতে না পারা। সেটা হল, গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ মোচড় দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে, এশিয়ামুখি হয়ে পাশ ফিরে শুতে চাচ্ছে। তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” হাসিলের নামে রুস্তমি করলে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবে নাকি গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি হওয়াতে যেসব সুবিধা ভারতের জন্য ধেয়ে হাজির হচ্ছে তাকে কাজে লাগানোই নিজ অর্থনীতি বিকশিত করার পথ – রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নাকি অর্থনীতি কোনটা ফোকাস হবে এখান থেকেই এর পয়েন্ট অব ডিপারেচার; পথ আলাদা হয়ে বিভক্ত। কংগ্রেস তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” বলে বিষয়টাকে বুঝছিল। আর এরই তৈরি আবর্জনার নাম বাংলাদেশের বর্তমান হা্লের হাসিনার সরকার। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এটা সবার কাছে দিনের মত পরিস্কার ছিল যে বিগত কংগ্রেস সরকার হাসিনাকে তাদের বিশেষ পছন্দের সরকার হিসাবে পেয়েছিল। অবস্থা এমনও দেখা গেছে যেন বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হলেও নিজের স্বার্থকে ভারতের স্বার্থের অধীনস্ত রেখে সরকার চালানো – এমন নীতিতে সাজানোর জন্যই হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সেটা ভরা নদী ভরাট করে ভারতীয় যান চলাচলে বিনা খরচের ট্রানজিট দেয়া থেকে শুরু করে সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যার জন্য উলটা ভারতের পক্ষেই সাফাই গাওয়া পর্যন্ত সবকিছুতে। এছাড়া খুবই কৌশলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অসংখ্য অমীমাংসিত ইস্যু থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যেন কেবল দুটো -তিস্তার পানি আর সীমান্তে ভুমি বিনিময় – এভাবে নামিয়ে আনতে মিডিয়া প্রচার প্রপাগান্ডায় সফলতা দেখিয়েছেন হাসিনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ঐ দুটা ইস্যুও কোন ধরণের মীমাংসা ছাড়াই কংগ্রেস সরকারের সময়কাল শেষ হয়েছে। এরপরও হাসিনার পাঁচ বছর শাসনের শেষে ভারতের আবদার আর হাসিনার খায়েসের শেষ হয়নি। বাংলাদেশে ভারতের হাসিনাকেই আবার ক্ষমতায় চাই, তাতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খা জাহান্নামে যাক – এই অবস্থান নীতি নিয়েছিল। এভাবে বাংলাদেশ ছিল ভারত সরকারের তাদের তথাকথিত “নিরাপত্তা স্বার্থের” নামে এক অবারিত অভয়ারণ্য – কংগ্রেসের এই আগ্রাসী ও জবরদস্তির নীতির সহায়ক ছিল ভারতের আমলা, কূটনীতিক ও গোয়েন্দা বিভাগ, আর সবার উপরে ছিল ভারতীয় মিডিয়ার ঐ দঙ্গল। সবাই একটা বিষয়ে একমত হয়ে কাজ করেছিল যে ভারতের “নিরাপত্তার স্বার্থের” নামে তাদের পড়শি অপর রাষ্ট্রে যা খুশি করার জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের অবারিত অভয়ারণ্য করে নিতে পারে। যেন এটা জায়েজ। আর এটাই নাকি বাংলাদেশের ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র, ভারতের সাথে সম্পর্ক ভাল হয়ে থাকার মডেল। এই প্রচার ভারতের মিডিয়ায় তুঙ্গে করে রেখেছিল এই খেদমতগারেরা। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত ইস্যু নাকি কেবল দুইটা এটা প্রতিষ্ঠা করার পরও তা নিয়ে কোন অগ্রগতি না হওয়াতে ভারতের ঐ ম্যানেজড মিডিয়াও লজ্জায় পড়ে। মুখ লুকানোর জায়গা খুজে না পেয়ে এদের কেউ কেউ শেষ বছরে কংগ্রেস সরকারের মৃদু সমালোচনা শুরু করে, সরকারের সাথে নিজেদের দুরত্ত্ব প্রকাশের চেষ্টা করে। দায়দায়িত্ত্ব অস্বীকার করে।
    এটা পরিস্কার যে নতুন মোদির সরকার কংগ্রেসের এই নীতি ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক হয়েছে এমন ভাবতে শুরু করেছে। বহুবার বলেছি, মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু বিজেপির অতীত কেমন তা দিয়ে এবারের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে। অন্তত মোদির প্রথম দুই বছরে কি ফলাফল অভিমুখ তৈরি হয় সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ফলে বিজেপির মোদি নয়, মোদির বিজেপি কি তা বুঝতে চেষ্টার দরকার আছে। মোদির বিদেশনীতির মুখ্য ফোকাস অর্থনৈতিক উন্নতি বা নিজের জনগণকে কাজ দেবার চ্যালেঞ্জ। অন্যভাবে বললে, আসন্ন গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটের সুবিধা বুদ্ধিমানের মত ব্যবহার করে এক ফাইন টিউনের মধ্য দিয়ে নিজের বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হবার যে সুযোগ দেখা দিয়েছে তাকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা। বিপরীতে কংগ্রেসের ফোকাস ছিল তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। মোদির হুশজ্ঞানের সাথে যদি তুলনা করি তবে বলতে হয় কংগ্রেস অবুঝ শিশু, পোলাপান। প্রথমত ভারতের গ্লোবাল সম্ভাবনার কথা কংগ্রেস বুঝেই নাই। অথবা বুঝেছে আমেরিকান স্বার্থের ফাঁদে পড়ে। ওয়ার অন টেররের নীতির দিক থেকে। যেটা আগে বলেছি কংগ্রেস মনে করেছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটে হাজির সুবিধা কথার অর্থ আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা। আর তাতে ভারত অর্থনৈতিক অর্থে নয় রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক অর্থে পরাশক্তির ভুমিকায় এসে গেছে। এভাবে এতটুকুই বুঝেছে। কিন্তু নিজেকে মৌলিক প্রশ্নটা করে নাই যে নিজের অর্থনৈতিক ভিতের উপর না দাঁড়িয়ে কেউ রাজনৈতিক পরাশক্তি হতে পারে কি না। কারও যাতাকাঠি ধার করে রাজনৈতিক পরাশক্তি ভাবের মাসল দেখিয়ে পড়শিকে ধরব মারব কাটব – এটা কি ধার করে দেখানোর জিনিষ? কংগ্রেস আমেরিকার ওয়ার অন টেররের মধ্যে নিজের বিশাল সম্ভাবনা দেখেছে, আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে পেয়ে নিজের আঞ্চলিক মোড়ল হবার চকচকে লোভে পড়েছে, ফাঁদে পড়েছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত যে উলটপাল্ট চলছে এর প্রধান অভিমুখ ও ইঙ্গিত হল ভারতের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা। আর কোন রাষ্ট্র নিজ সক্ষমতায় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হলে সেই সাথে এবার তার রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হিসাবে উদয় হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেটা এমন নিজের পায়ে দাঁড়ানো যা অন্য কেউ চাইলেও অস্বীকার করতে পারে না। মোটা বুদ্ধির শর্টকাটে মারা লোভি কংগ্রেস এসব দিকে খবর না রেখে নিজদেশের গত দশ-বার বছর নষ্ট করেছে পিছিয়ে দিয়েছে – শুধু নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে, নিজের অর্থনীতি ধুঁকে মরার অবস্থায় নিয়ে গেছে তাই নয়, এই অঞ্চলে সবচেয়ে ক্ষতি করেছে বাংলাদেশের।
    এই ব্যাপারটাকে এককথায় বললে, কংগ্রেসের ফোকাস ছিল অর্থহীন তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” আর বিপরীতে মোদির ফোকাস অর্থনীতি। আবার এর মানে এমন নয় যে মোদি ভারতের সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে খাটো করছেন, তা নয়। যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফকে তিনি কি বলতে পারেন? ডিল রফা করবেন এভাবে যে কাসাবদের বোম্বাই হামলার মত বিষয়গুলো আর না ঘটার বিষয়ে তিনি পাকিস্তানের নীতিগত সক্রিয়তা ও নিশ্চয়তা চান। আর এই নিশ্চয়তা নিয়েই তিনি পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের সকলে মিলে এক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট করে সব দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে হাটতে চান। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটা আসলে বিচ্ছিন্ন আলটপকা আলাদা বিষয় নয়, গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপাল্টের সুবিধায় এশিয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেই অর্থনীতি ফোকাসে পথ চলার অবিভাজ্য অংশ।
    অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা – বলে দুই ফোকাসের ভাগ দেখালাম এটা কি কাল্পনিক? মোদির উপরে নিজের মনের ভালভালাইয়া সৎ খেয়ালে আরোপ করা? মোটেও নয়। মোদির সরকারের বয়স মাত্র একমাস। ওর নীতিগত দিক কি হতে যাচ্ছে তার অনেককিছু অনুমান করা, অপ্রত্যক্ষে জানা গেলেও লিখিত ডকুমেন্টে এখনও তা যথেষ্ট হাজির নয়। কিন্তু তবু সুষমার এই সফরে তাঁর এক লিখিত বক্তব্য আমরা ইতোমধ্যেই হাতে পাই। সুষমার টাইট কর্মসুচীতে বিকেলে এক সেমিনারে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ওখানে এক লিখিত বক্তব্য তিনি পড়েছিলেন যা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটেও গুরুত্ত্বের সাথে পাবলিক করে দেয়া হয়েছে। সুষমার এই সফরে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক প্রস্তুতি করেই যে তিনি এসেছিলেন এর ছাপ সব জায়গায় আছে। যেমন ভারতের নতুন সরকারের দিক থেকে দেখলে প্রথমত গত ছয় বছরে কংগ্রেস বাংলাদেশে যথেচ্ছাচার তান্ডব করেছে, অথচ তাতে অর্থনৈতিক বা ষ্ট্রাটেজিকভাবে ভারতের জন্য এমন কোন লাভালাভ ফল আনে নাই যা নিজে টিকে থাকে। বরং এটা অজস্র দায় ও আবর্জনা তৈরি করেছে। বিশেষত ঐ আবর্জনা পরিস্কার না করে ওর উপরে মোদির নতুন কোন নীতি কার্যকর হবে না – তা মোদি ও তাঁর নীতিনির্ধারক টিমের লোকজনের উপলব্দি হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন ভারতের অর্জনের দিক থেকে দেখলে এখন ভারতের সামনে আষ্টেপৃষ্টে বাধা এক হাসিনার বাংলাদেশ আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এটা ভারতের জন্য এক বিশাল দায়। এর মূল কারণ ক্ষমতা ভিক্ষা করা হাসিনার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশই হাসিল করে আছে ঠিকই কিন্তু হাসিনারই নিজ দেশে কোন বেইল নাই। অন্তত পাবলিক রেটিং এর দিক থেকে যদি বলি এটা যতটাই শুণ্য এটা ভারতের জন্য ততটাই বোঝা। হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগি ছাড়া সারা বাংলাদেশের সব কোনা আজ ভারত বিরোধি হয়ে উঠেছে। এমনকি বাম রাজনীতিক যারা এর আগে কখনই ভারতের জবরদস্তির বিরুদ্ধে কিছু বললে সেটা নাকি “সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে” এই পবিত্র শুদ্ধ থাকার লোভে কখনও এনিয়ে কথা বলে নাই সেই বামেরাও এখন সোচ্চার হতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বহু আওয়ামি বন্ধুকে বলতে শুনেছি হাসিনা নিজেকে বিক্রি করছে কাজটা খারাপ। কিন্তু কি করব আমি আমার ফয়দাটাই কেবল এখান থেকে তুলে নিচ্ছি কিন্তু কোন দায় নিব না। কংগ্রেসের হাসিনার বাংলাদেশ রেটিং আজ এমন দুরবস্থায়। কিন্তু তবু এই রেটিং শুণ্য হাসিনাকে দিয়েই বাংলাদেশ থেকে কোন লাভালাভ সুবিধা ভারত যদি আদায় করতে চায় তবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরও জবরদস্তির উজান নৌকা তাকে বাইতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খার সরাসরি বিরুদ্ধে গিয়ে মোদির ভারতকে দাঁড়াতে হবে। স্বভাবতই এটা ভারতের সুবিধা নয়, লায়াবিলিটি। ওদিকে মোদি যে স্বপ্ন দেখে তাতে তাঁর দরকার বাংলাদেশকে এক গুরুত্ত্বপুর্ণ অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে, কংগ্রেসের মত ভারতের তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে এক দাস বাংলাদেশ নয়। যেমন প্রেমের বেলায় পুর্বশর্ত হল, কেউ কারও দাস হলে চলবে না, পার্টনার উভয়কে উভয়ের জবরদস্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। যে মাত্রায় মুক্ত সেই মাত্রায় লেবেলের প্রেম-সম্পর্ক হবে। জমিদারের প্রেমাকাঙ্খা নিজ কুলবধুর সাথে মিটে না, কারণ ওখানে বধুর ভুমিকা কেবল কুল বা বংশরক্ষা ও বিস্তারের মধ্যেই সীমিত। তাই জমিদার দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে বাঈজির কাছে যায়। আসলে জমিদারের দরকার কুলবধু আর বাঈজি এই দুই ভুমিকার মিলিত এক বধু। আবার সেটা যদি হাসিলই হয় তখন দেখা যাবে জমিদার আবার জমিদার নাই। জমিদারি পরিচয় লোপ পেয়ে নিজেই অর্থনৈতিক উতপাদনের উদ্যোক্তা হয়ে গেছে। মোদি জানে নিজের উদ্যোক্তা ভুমিকা। ফলে তাঁর দাস নয় বা দাসের বোঝা নয়, এক মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেই তার চাই।
    মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেএগুলো কোন সুখস্বপ্ন কল্পনা নয়। সুষমা লিখিত বক্তব্যে বলছেন, “We are convinced that India’s development cannot be complete and sustainable unless we succeed in building productive partnerships with our immediate neighbours. We will, therefore, devote our energy to working much more closely with our neighbours in pursuit of our development goals. We will walk the extra mile to create opportunities and to build virtuous cycles of prosperity in the region. We will pursue the goal of economic integration and interconnectedness through trade, investment, transportation, capacity building, environment friendly practices and means that promote equitable development in the region”। নিজ দায়িত্ত্বের এর বাংলা করে বললে সুষমা বলছেন, “আমরা বুঝতে পেরেছি ভারতের (অর্থনৈতিক)বিকাশ নিজে টিকে থাকার মত স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হতে পারে না যদি সংলগ্ন পড়শীদের সাথে কার্যকর সক্রিয় পার্টনার সম্পর্ক আমরা তৈরি করতে না পারি। তাই আমরা আমাদের বিকাশের লক্ষ্য অভিমুখে আমাদের পড়শিদের সাথে আরও ঘনিষ্টভাবে কাজ করতে আমাদের শক্তি ব্যয় করব। এই অঞ্চলের এমন সুযোগ সুবিধা আর দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্র (virtuous cycles of prosperity) তৈরি করতে আমরা নিজেই আগবাড়িয়ে বাড়তি পথ হাটব। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যাতায়াত,অবকাঠামোগত সক্ষমতার এক প্রকৃতি-পরিবেশ সহায়ক চর্চা তৈরির মাধ্যমে ও উপায়ে আমাদের অর্থনীতিগুলোকে পারস্পরিক পরিপূরক ও আন্তঃনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে আমরা জোর দিব যা এই অঞ্চলে সবার সমান বিকাশ (equitable development)আগিয়ে নিবে”।

    BCIM জোটের তাতপর্য
    অনেকের মনে হতে পারে কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষায় এরকম অনেক কথাই তো বলা হয়,এটাকে এত গুরুত্ত্ব দিবার কি আছে। না, এটা কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষার কথার কথা নয়। সেজন্য আরও কিছু পটভুমির কথা বলব, যে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাগুলো পাঠ করতে হবে।
    অনেকবার বলেছি,১)গ্লোবাল অর্থনীতি এখন এশিয়ামুখি। ২)দুনিয়ার আগামি নির্ধারক দুই অর্থনীতি চীন ও ভারতকে কেন্দ্র করেই এশিয়ামুখি গ্লোবাল অর্থনীতি আবর্তিত হবে। ৩) চীন ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার উচানিচা আছে আর এই দেশদুটোর ঠিক মাঝেই বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে সক্ষমতার উচানিচার ভিতর জোটের (BCIM জোট, বাংলাদেশ,চীন,ভারত ও মায়ানমার মিলিয়ে যে অর্থনৈতিক জোট)নীতিগত সাম্য এবং ভারসাম্য তৈরিতে বাংলাদেশের ভুমিকা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ হবে। [আমেরিকার প্ররোচনায় পড়ে কংগ্রেসের ভারত এতদিন এই সম্ভাবনাকে ছুপিয়ে রেখেছিল, উপেক্ষা করেছিল। মাত্র গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে বিষয়টাকে আমেরিকার উপর প্রতিহিংসা ও রাগ দেখানোর বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করে এবার সে নিজেই BCIM ঢোল পিটিয়েছিল।ঐ সময় চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ভিতর দিয়ে ভারত-চীনের পারস্পরিক সীমান্ত হামলার সন্দেহের সমাপ্তি হয়।যদিও ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়াই এখনও এই তথ্য আড়াল করে ভারত-চীনের কোন প্রসঙ্গ আসলেই তাকে সেনসেটিভ করে উস্কানি দেয়ার খাসিলত ত্যাগ করে নাই।] ৪) BCIM জোট খাড়া করা মানে এটা কোনভাবেই আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মিটানো নয়। আমেরিকার কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্য চীনের কোলে চলে যাবার ভয় দেখানো নয়। আমাদেরকে কাজ করে দেখাতে হবে। এই চার দেশের অর্থনীতিতে সব অঞ্চলে সম উন্নয়নের সিরিয়াস বিষয় এটা। ৫) কেবল ভৌগলিক অবস্থান নয়,BCIM জোটের তাতপর্য যতটা না এই অঞ্চলের চার দেশের বাইরের বাকি দেশগুলোর সাপেক্ষে নিজেদের জোটবদ্ধ শক্তি হওয়া এরচেয়েও বেশি গুরুত্ত্বপুর্ণ হল জোটের বাইরে নয় বরং এই চার দেশের প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুষম বিকাশের দিকটা। মূল কারণ এই BCIM অঞ্চলটা মুলত চীন ও ভারত উভয়েরই ল্যান্ডলকড পুর্বাঞ্চল। যার আবদ্ধ অবস্থা থেকে সরাসরি সড়ক রাস্তাঘাটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগের দুয়ার খোলার উপায় BCIM জোট। ফলে তা এই অবরুদ্ধ অঞ্চলগুলোতেও স্ব স্ব মূল রাষ্ট্রের সব জায়গার মতই সমান অর্থনৈতিক বিকাশের উপায়। আর এই মুক্তি ঘটবে বাংলাদেশ ও বার্মার ভুমির উপর দিয়ে এবং বাংলাদেশে নির্মিতব্য গভীর সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে। ফলে “ভারতের বিকাশ পড়শিদের উপর নির্ভরশীল আর স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হবার উপায়” – একথাটা একেবারেই বাকচাতুরি কূটনৈতিক রেঠরিক নয়। সুষমা বা মোদি একথা “বুঝতে পেরেছে” তা স্বীকার করলে বা না করলেও তখনও এটা সত্যি। এছাড়া প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিকাশের দিক মুখ্য করে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট যদি ঠিকমত দাঁড়িয়ে যেতে পারে তবে এশিয়ার বাকি অঞ্চলের উপরে এই জোট ভারকেন্দ্র ভুমিকায় চলে আসবে। কল্পিত সে পরিস্থিতি -এটা আর শুধু বাংলাদেশ থেকে সংকীর্ণ ভারতের জবরদস্তিতে ও বিনাপয়সায় ট্রানজিট আদায় করার মত মুদি দোকানি ভাবনা নয়। যেমন, কংগ্রেসের ভারত যে কতবড় ছেচড়া খুদে মুদি দোকানি তা বুঝা যায় তাদের আগাবার পদ্ধতির দিকে দেখলে। তারা জোর দিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিট অনুমতির কাগজ যোগাড়ে এবং তা বিনা পয়সায় হতে হবে। কিন্তু অনুমতি সে তো একটা কাগজ মাত্র। কাগজের উপর দিয়ে তো ভারতীয় মালামাল পারাপার হবে না,বাস্তব রাস্তাঘাট অবকাঠামো লাগবে,আর সেটা যে সে না ভারি যানবাহন চলার অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ট্রাফিক রুল,প্রটোকল, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি অনেক কিছু। এমনকি বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থকথা যদি বাদও দেই তো তবু তাতে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে একটা কিছু লাগবে। ফলে অন্তত ৫০০ কিমি ভারি রাস্তানির্মাণের বিনিয়োগ লাগবে যেটা তা বাংলাদেশ দূরে থাক ভারতও যোগানোর সামর্থ রাখে না। ফলে BCIM কেই জোটবদ্ধভাবে এর প্রয়োজনীয় ফান্ড যোগাড় করতে হবে। এবং এটা অবশ্যই সম্ভব শুধু নয় অন্য বিনিয়োগ দাতারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই বাস্তব দিকে ভারতের কোন আগ্রহ নাই। মুদি দোকানি যেন ধরেই নিয়েছে ভারতের ট্রানজিটের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চাহিদা বাংলাদেশের অর্থনীতিই পূরণ করবে। কিন্তু কেমন করে – এটা ভারতের ভাবনার বিষয় নয়। বরং ভাবটা এমন যেন হাসিনার ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে ওর কাছ থেকে একটা অনুমতির কাগজ হলেই তো ভারতের হবে। এজন্যই একে মুদি দোকানি বলছি যে নিজেকেও ক্ষুদ্র করে রাখে,নিজেকে অবাস্তব ও ক্ষুদ্রস্বার্থের আলোকে হাজির করে। অন্যদিকে ব্যাপারটাকে আবার বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে তার ভারতের শত্রু হয়ে থাকার কোন কারণ নাই,মতলব উদ্দেশ্য লক্ষ্যও হতে পারে না,কোন ফয়দা নাই,যদি না সেটা যে করেই হোক বাংলাদেশের স্বার্থ নয় সংকীর্ণ কেবল হাসিনার ক্ষমতায় থাকতেই হবে এই স্বার্থ হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুর শেষ নাই বরং বাড়ছে। সেগুলোকে জবরদস্তিতে অমীমাংসিত ফেলে রেখে কেবল ভারতের এবং সংকীর্ণ করে তা ট্রানজিটের কাগজ ধরণের উপস্থাপনের চিন্তায় কংগ্রেস গত ছয় বছর চালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের অমীমাংসিত সব ইস্যুগুলোর একটা প্যাকেজ ফয়সালা হলে ভারতের সাথে BCIM এ জোটবদ্ধভাবে সবার অর্থনৈতিক বিকাশে সামিল না হতে বাংলাদেশের আপত্তির কিছু নাই, থাকতে পারে না। সেখানে তখন কেবল ভারতের ট্রানজিট খুবই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়। বরং BCIM এর ট্রানজিট হাব হওয়ার মধ্যেই আসলে বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে। তবে অবশ্যই তা কোন জবরদস্তিতে নয় সমান ও সমলাভের জোট পার্টনার হিসাবেই।
    সুষমা এই কথারই প্রতিধ্বনি করছেন। তাঁর virtuous cycles of prosperity শব্দ ব্যবহার যেটার অনুবাদ করেছি “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ” -একথার অর্থ বুঝতে হবে অন্য আর এক অনুমিত বিপরীত শব্দের প্রেক্ষিতে। “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধি” শব্দের বিপরীতটা হল, পরস্পর রেষারেষি তথাকথিত “দেশের নিরাপত্তা স্বার্থ” এই নীতি থেকে যা উতসারিত। যেটা এতদিন কংগ্রেস অনুসরণ করেছে। মোদির সুষমা এর বিপরীতে “দায়িত্ত্ববান” হতে, হয়ে সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করতে আহবান রাখছেন। ফলে এটা কংগ্রেসের নীতি সম্পর্কে মোদির মূল্যায়ন এবং তা পরিত্যাগও।
    সুষমা আগের উদ্ধৃতির শেষে আরও বলছেন,”Building a comprehensive and equitable partnership with Bangladesh is essential for the realization of our vision of a stable, secure and prosperous South Asia. History and geography have destined us to live together. How we do so is within our hands, and our hands alone.”- এর বাংলা করে বললে,”এক সুস্থির,সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া দেখার আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ এক সামগ্রিক ও সমমর্যাদার পার্টনার, এই সম্পর্ক তৈরি করা মৌলিকভাবে জরুরি। আমাদের ইতিহাস ও ভুগোল আমাদের একত্রে বসবাসের ভাগ্য ঠিক করে দিয়েছে। এটা কি করে করব তা আমাদেরই হাতে, একান্তই আমাদের হাতে”। এখানে comprehensive and equitable partnership অর্থাৎ অনুবাদে “সামগ্রিক” ও “সমমর্যাদার পার্টনা” শব্দদুটো বিশেষ গুরুত্ত্ব বহন করে।

    সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা আসলে কি
    অর্থনীতি বনাম তথাকথিত নিরাপত্তা – কার কি ফোকাস প্রসঙ্গে এভাবে কংগ্রেস ও মোদির বিজেপির তুলনা করছি। কংগ্রেস মনে করেছিল উত্তরপুর্ব ভারতের সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা নাকি ভারতের নিরাপত্তার সমস্যা। জবরদস্তি উত্তরপুর্ব ভারতে ওদের পিটাপিটি দিয়ে আর বাংলাদেশে শিখন্ডি হাসিনার ক্ষমতা থাকা নিশ্চিত করার ভিতরেই ভারত সাত রাজ্য সমস্যার সমাধান। গত সাত বছর কংগ্রেস সমস্যাটা দেখেছে “সাতরাজ্য যেন বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়” এই নীতিতে। ফলে কংগ্রেসের চোখে এটা ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু হিসাবে থেকেছে, আর এই নষ্টা বয়ানকে মিডিয়া তাল দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মোদির দেখবার চোখ সম্পুর্ণ ভিন্ন। মোদি অত্যন্ত সঠিকভাবে সমস্যার গোড়ায় তাকাতে পারেন। মোদির চোখে ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর এমন সমস্যার সমাধান বলপ্রয়োগ বা নিরাপত্তা নয়। রিসোর্স এলোকেশন মানে সম্পদের বরাদ্দ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলেই একমাত্র এর সমাধান। এসব রাজ্যগুলো ছোট অর্থনীতির ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদ মানে বিনিয়োগেরও ক্ষমতা কম,ফলে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি। মোদি কথাটা তুলেছিলেন ঠিক সাত রাজ্যকে কেন্দ্র করে নয়,মমতার পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে। মমতার দেখার মধ্যেও সংকীর্ণতা আছে,আছে অর্থনীতিকে মানবতা দেখানোর কাজ ভেবে বিচার করার ঝোক। তিনি গরীব মানুষকে প্রায় সরাসরি নগদ অর্থ বিতরণ ধরণের বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এক কর্মসুচী চালাচ্ছেন। মমতা বলছেন তিনি তার রাজ্যের অর্থমন্ত্রীকে অর্থ যোগাড় সম্ভব কি না জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি যোগাড়ে সমর্থ হয়েছেন। তাই তিনি এটা চালাচ্ছেন। ছোট অর্থনীতির পশ্চিমবঙ্গও এমনিতেই ছোট উদ্বৃত্ত সম্পদের ফলে সবসময় সক্ষমতা্র অভাবে ভুগবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই অভাবের আকাঙ্খা মিটাতে মমতা মনে করেন কেন্দ্রের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এভাবেই এর সমাধান। বিপরীতে মোদি গত নির্বাচনের আগে এই সাক্ষাতকারে বলছেন,এটা কোন সমাধান নয়। বসিয়ে ভর্তুকিতে খাওয়ানো নয়,বরং কাজ সৃষ্টি ফলে বিনিয়োগ এর সমাধান। ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিনিয়োগ যোগাড় করে দেয়া কেন্দ্রের দায়িত্ত্ব মনে করেন তিনি। তিনি কেন্দ্রে গেলে এটাই করবেন।অর্থাৎ আমরা দেখছি কংগ্রেস যেটাকে যুদ্ধবাজি দমনের সংকীর্ণ চোখে “নিরাপত্তার” সমস্যা হিসাবে দেখে মোদি সেটাকে বিনিয়োগ অর্থনীতিক বিকাশে সমাধান দেখেন। দুটো এপ্রোচের আকাশ-পাতাল ফারাক এখানে।

    সুষমার আমলা বাঁচানো নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোল তৎপরতা
    গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের সক্রিয় হস্তক্ষেপে পক্ষ নেয়া ও কূটনীতিক সীমালঙ্ঘন করে হাসিনাকে পুন-ক্ষমতায় আনা এটা আমাদের দেশে ও বিদেশে সবাই অবাক বিস্ময়ে নজর করেছে। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই ভোট দিতে চাক নিজেদের প্রতিনিধি মনে করতে চাক সেগুলো তুচ্ছ। কংগ্রেসের হাসিনাকেই ক্ষমতায় চাই – এই ছিল কংগ্রেসের নীতি অবস্থান। ভারতের পররাষ্ট সচিব সুজাতা সিং নির্বাচনের ঠিক আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসে প্রকাশ্যেই সেসব ততপরতা চালিয়েছিলেন। এর কয়েকমাসের মধ্যে ভারতের নির্বাচনে খোদ সেই কংগ্রেস মোট আসনের ১০ ভাগেরও কম আসনপ্রাপ্তিতে ভরাডুবি এবং বিপুল ভোটে মোদির উত্থান – এই পটভুমিতে নতুন সরকা্রের সুষমার বাংলাদেশ সফর ঘটেছে। কংগ্রেসের ভুমিকা হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগী ছাড়া বাংলাদেশের সবার মনে দগদগে ঘাঁ এর মত জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। সুজাতা ছাড়াও এর আর এক প্রকাশ্য প্রবক্তা হলেন হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ। তিনিও চাকুরিজীবি আমলার সীমায় থাকেন নাই। কংগ্রেসী হয়ে গেছিলেন। তিনিও ভারতের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত বলে গেছেন ভারতের বাংলাদেশ নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে। অন্তত দুবার প্রকাশ্যে তা উচ্চারণ করেছিলেন। এটা তাঁর সীমা লঙ্ঘন। চাকুরিজীবি আমলাকে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের অধীনতা মেনেই কাজ করতে হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বই রাষ্ট্রের নীতি ঠিক করেন যেখানে সেটা অনুসরণ করাই তার আমলা ভুমিকা। আর তিনি কিভাবে জানবেন কে নির্বাচিত হতে যাচ্ছে? আর কংগ্রেস আবার নির্বাচিত হলেও তো নিজের আগের নীতিতে সবটা অথবা কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু তিনি প্ররোচিত হয়ে হাসিনার সমর্থকদের আশঙ্কা দূর করতে নিজেকে বলি দিলেন। নিজেকে কংগ্রেসী রাজনীতির অংশ করে ফেললেন। কিন্তু মোদির বিপুল বিজয়ের পর পঙ্কজ ঠিক সময়মত তওবা পড়ে নিয়েছেন। একাত্তর টিভিতে দেয়া সাক্ষাতকারে যেটা বিডিনিউজ২৪ ট্রান্সস্ক্রিপ্ট করে ছাপিয়েছিল। ট্রান্সস্ক্রিপ্ট থেকে এবিষয়ের প্রয়োজনীয় অংশ তুলে আনছি। ইমরোজ খালিদী প্রশ্নকর্তা, বিডিনিউজের মালিক সম্পাদক।
    খালিদী: আপনি আগে বলেছিলেন, সরকার পাল্টালেও স্বার্থের পরিবর্তন হয় না। দিল্লিতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের হেরফের হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কোন কোন স্বার্থগুলো কখনোই পরিবর্তন হবে না বলে আপনি মনে করেন?
    সরণ: আমি আমার সেই বক্তব্য স্পষ্ট করতে চাই। আমি বলতে চেয়েছি, সাধারণ বিবেচনায় দুই দেশের স্বার্থ একই থাকে এবং তা রক্ষায় সম্পর্কের মূল নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে। ফলে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর দেয়াটাও জরুরি।
    খালিদী: তাহলে আগের ওই বক্তব্য নিয়ে আপনি একটু চিন্তিত?
    সরণ: না, ওটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমি যা বলতে চাই তা হলো- নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক করে প্রেসিডেন্ট লোকসভায় একটা বক্তব্য দিয়েছেন।
    বলছে। তবে ভারত ওই নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও কি একই রকম থাকবে?
    সরণ: আমার মনে হয়, সেসময় আমাদের বক্তব্য ছিল- সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে- এমনটাই আশা করা হয়েছিল। আমি মনে করি, আমাদের এখন বর্তমানকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। পুরনো বিষয় নতুন করে সামনে আনার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না, এখনকার এজেন্ডাই ভিন্ন।

    যদিও এটা ঘরের “আমরা আমরাই তো” ধরণের সাক্ষাতকার তবু পঙ্কজের পিছ-পালানোটা বেশ রগড়-তামশার। পঙ্কজ বলছেন, “কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে”। “সময়ের অনেক পার্থক্য আছে”, “বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার” – এই বাক্যাবলিতে তিনি এবার আগের পাপের হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। সুজাতা বলেছিলেন, “সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে” এই প্রসঙ্গ সেখানে এসেছিল। সুজাতার বক্তব্য তিনি এখানেও সমর্থন করেন তবে একটু পুনঃব্যাখ্যা করে নিয়ে। কিন্তু পঙ্কজ নিশ্চয় মানবেন, বাংলাদেশের জনগণ খোদ সংবিধানই বদলে নিতে পারেন, ১৯৯১ সালের মত অমান্য করতে পারেন এমন বহু কিছু। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ হল এটা তো বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনীতির আভ্যন্তরীণ প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি এই ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে আছে। সেখানে ভারতের কোন একপক্ষের দিকে পছন্দ প্রকাশ মারাত্মক গর্হিত ও এমন “মন্তব্য করাটা ভারতের জন্য ধৃষ্টতার সামিল”। এবং লজ্জার মাথা খেয়ে সুজাতা তাই করেছিলেন।
    এই “এরেঞ্জড সাক্ষাতকার” দিয়ে পঙ্কজ তওবা পড়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন,ফলে বাংলাদেশে তাঁর চাকরি রক্ষা করে তিনি টিকে আছেন। অনুমান করা যায় এই তওবা পড়ার কাজটা সুষমাকে না জানিয়ে পঙ্কজ ঘটান নাই।এতে সুষমার এক সমস্যা মিটল এতে।কিন্তু আরও বড় কালপ্রিট সুজাতা সিং তিনি তো এখনও পররাষ্ট্র সচিব। এখানে সুষমার সমস্যা হল,নিজের মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ছাড়া তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন না। অন্তত খারাপ দেখাবে সেটা। আবার সুজাতার কৃতকর্মের জন্য তিনিও বাংলাদেশে প্রেসের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যেতেও পারেন। এই সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে সুষমার এই সফর ছিল কংগ্রেসের কৃত পাপ-আবর্জনা থেকে নিজ সরকারকে মুক্ত করার সফর। ড্যামেজ কন্ট্রোলের সফর। তাই,সুষমা নিজেকে এবং সুজাতাকেও বাংলাদেশে মিডিয়া থেকে দূরে রেখেছিলেন। ভারতের মন্ত্রী বা সচিবের বাংলাদেশ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এর আগে কখনই সঙ্গি হন নাই। কিন্তু এবার মন্ত্রী ও সচিব দুজনই আসা সত্ত্বেও তিনি এসেছেন এবং একা এককভাবে প্রেস সামলানোর ভার তাঁর উপরে। সেই সাথে অবশ্য নিয়ে এসেছেন,আসার আগে নিজ সরকারের সবাই মিলে হোমওয়ার্কে সাব্যস্ত করা বক্তব্যটা। সেটাই তিনি সব জায়গায় বলেছেন, -”সরকার সরকারের সাথে কাজ করে” আর সেই সাথে “তারা বাংলাদেশের জনগণের সাথেও কাজ করতে চান”। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট হাসিনা তাদের আগ্রহের বিষয় নয় – একথাটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকাশ করলেন। অনেকে মনে করতে পারেন এটা জোর করে অর্থ টেনে বের করে ভারতীয় মুখপাত্রের কথা পাঠ করছি। আসলে তা নয়। এর প্রমাণ হিসাবে আগে উদ্ধৃত সুষমার ঐ লিখিত বক্তব্যের আর কিছু অংশ তুলে আনব।
    “I am aware that the Indian general elections in April and May this year were followed closely in Bangladesh. I thank you for all the good wishes that we received. These elections were not just the largest democratic exercise in the world. They mark a turning point in the evolution of India’s democratic polity. They were an election of Hope. I stand before you as the representative of a Government that has come to power through an election process, in which, after a gap of nearly 30 years, the people of India have given a clear verdict in favour of a single political party. … My Government’s foreign policy will be based on the principles of developing peaceful and friendly relations with all countries, anchored in enlightened national self-interest. … We know from experience that democracy requires building strong institutions and promoting a culture of tolerance, inclusion and respect for differences. The strength of democracy lies in its ability to manage differences and resolve them through peaceful means. We all espouse same universal values where there can be no place for violence. We will be glad to share our experiences and best practices, if asked to do so.নিজ দায়িত্ত্বের বাংলায় বললে,“ আমি জানি এবছরের এপ্রিল মে মাসে ভারতীয় নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বাংলাদেশে খুব মনোযোগের সাথে অনুসরণ করা হয়েছে। অনেকে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এজন্য আমি ধন্যবাদ জানাই। এই নির্বাচন কেবল দুনিয়ার এক বৃহত্তম গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল না। এটা একই সাথে ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকতা পরিমাপে এক মোড় ঘুরানোর মত ঘটনা ছিল। এটা ছিল আশাভরসার নির্বাচন। আমি আপনাদের সামনে সরকারের এক প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছি যারা একটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে; যেটা বিরাট এক ত্রিশ বছরের গ্যাপ, এবারই ভারতের জনগণ কোন একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে পরিস্কার রায় দিয়েছে।…… আমার সরকারের বিদেশনীতি হবে সব দেশের সাথে শান্তিপুর্ণ ও বন্ধুত্ত্বপুর্ণ সম্পর্কে উন্নতি করার নীতিতে অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ অনুসরণ করবে। …… অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বুঝি গনতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী (রাষ্ট্রীয়) প্রতিষ্ঠান তৈরি আর মতভিন্নতাকে সহ্য করা, সাথে নেবার ও সম্মান করার সংস্কৃতি দরকার হয়। মতভিন্নতাকে সামলানোর এবং শান্তিপুর্ণ উপায়ে তা মীমাংসার সক্ষমতা ভিতর দিয়ে গণতন্ত্রের শক্তি প্রমাণ করা যায়। আমরা কিছু সার্বজনীন মুল্যবোধ ধারণ করি যেখানে সহিংসতার কোন জায়গা নাই। এব্যাপারে যদি চাওয়া হয়, আমরা আমাদের চর্চার ভালমাপের উপায় ও আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো অন্যান্যদের সাথে আনন্দে শেয়ার করতে পারি”।

    বিএনপির প্রেস ব্রিফিং
    উদ্ধৃতিটা টুকে এনেছি তিনটা অংশ থেকে। সে প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে একটা অন্য কথা। খালেদা জিয়ার সাথে সুষমার সাক্ষাতে কি কথা হয়েছে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসম্পর্কে বিএনপির মঈন খান জানিয়েছেন —“বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতন্ত্রের দেশ তার প্রতিবেশী দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না,তা আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে”(২৭ জুন প্রথম আলো থেকে)। মঈন খানের এটা খুবই দাসত্ত্বমূলক মনোভাব। যদিও খালেদা ঠিক এই ভাষায় সুষমাকে এই প্রসঙ্গে বলেছেন কিনা জানার উপায় নাই। বলে থাকলে সেটাও দাসত্ত্বমূলক। অর্থাৎ বিএনপি কোন হোমওয়ার্ক করে যায় নাই অথচ মনের ভিতর ভারতের দাসত্ত্বভাব রয়ে গেছে;এরই প্রকাশ এটা। ভারত বাংলাদেশে কেমন অথবা এমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না – ভারতকে এই সুযোগ বা অপশন আমরা দিতে পারি না। এটা যেচে ভারতের দাসত্ত্ব নেয়া। দেশ একাজ করতে বিএনপিকে দায় দেয় নাই। বরং বিএনপির দিক থেকে যেটা খাড়া অথচ কূটনৈতিক শোভন কথা হতে পারত -”বাংলাদেশের গত নির্বাচন উপলক্ষ্যে ভারতের বিগত সরকারের নেয়া একপেশে ও পক্ষপাতিত্ত্বমূলক (ইচ্ছা ও সাহসে কুলালে “কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভুত” শব্দ বিএনপি যোগ করতে পারে) অবস্থান আমাদের হতাশ করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। ভারতের নতুন সরকার বিষয়টাকে কিভাবে দেখে আমরা জানতে আগ্রহী” -এভাবে বলা যেত। ঠিক এভাবেই বলতে বলা হচ্ছে না,তবে মূলভাবটা অবশ্যই এমনই হতে হত। অর্থাৎ ভারতকে নাক গলানোর কোন অপশন দেয়া নয় বরং তাদের নীতি কি,ওর পরিণতি কি এসম্পর্কে অসন্তুষ্টি জানানো। বিএনপির মত “অবিপ্লবী” দলের পক্ষে ভারতের নীতিতে “হতাশা” জানানো কঠিন কোন কাজ নয়। এটা খুবই স্বাভাবিক কূটনৈতিক রেওয়াজি শব্দ।
    টুকে আনা সুষমার উদ্ধৃতির প্রথম অংশঃ এতে স্পষ্টতই সুষমার পরোক্ষে হাসিনাকে নিজেদের মনোভাব বুঝিয়ে দেয়া যে ভারত গণতন্ত্র বা জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের মত কোর বিষয়কে কিভাবে দেখে এবং হাসিনা তেমন প্রতিনিধি নয় সেটাই মনে করিয়ে দেয়া। সুষমার দলের মত ত্রিশ বছর অপেক্ষা করে হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিকতাগুলোকে দুর্বল করে দেয়া উচিত নয়,জবরদস্তি খাটিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা উচিত নয়। ঝিকে মেরে বঊকে শিখানোর মত করে কথাগুলো এভাবেই সুষমা বলে গেছেন।

    “enlightened” মোদি
    উদ্ধৃতির মাঝের অংশঃ এটা একটাই বাক্যের, এই উদ্ধৃতিটা সাদামাটা কূটনৈতিক বাক্যই তবে একটা শব্দ ছাড়া। শব্দটা হল enlightened national self-interest। বাংলা করেছি,“অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ”। শব্দটা ইন্টারেষ্টিং। যে কোন রাষ্ট্রের কাজই হল স্ব-স্বার্থ মানে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ দেখা, সেজন্যই ওটা রাষ্ট্র। মুখ্যত কেবলমাত্র নিজ ভুখন্ডের জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ দেখভাল করাই ওর কাজ। কিন্তু স্ব-স্বার্থ মানে কি? অনেক সময় আঞ্চলিক স্বার্থের ভিতর নিজের মুখ্য স্বার্থ থাকে সেগুলো সংকীর্ণ চোখে না দেখাই বুদ্ধিমানের, আরও বড় লাভের দিক থেকে দেখার মত চোখ সেখানে খুব গুরুত্ত্বপুর্ণ। এই অর্থে enlightened। শব্দটা প্রয়োগের প্রশংসাই করতে হয়। ছোট মুদি দোকানদারের চোখ থাকে দুএক পয়সার দিক পর্যন্তও। একজন বড় রপ্তানিকারক সফল ব্যবসায়ী হতে চাইলে এত ছোট চোখে চলে না। তাঁর যে ডিষ্টিবিউটর যার মাধ্যমে তার মালামাল খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে তাদেরও স্বার্থের ভিতরে নিজের স্বার্থ দেখে বড় ব্যবসায়ী উতপাদক। ফলে সে ব্যবসায়ীকে enlightened বলা যায় অবশ্যই।
    টুকে আনা সুষমার বক্তৃতার শেষ অংশঃ মতভিন্নতাকে জায়গা করে দেয়া, অন্তর্লীন করে নেয়া বা একপাত্রে ধরা -কেন গুরুত্ত্বপুর্ণ সে প্রসঙ্গে এটা সুষমার সবক। এখানে বড় তামাশাটা হল,হাসিনার আওয়ামি লীগ নিজেদের সেকুলার রাজনৈতিক শক্তি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে,বিপরীতে বিজেপি সম্পর্কে তাদের রিডিং হল ওটা সাম্প্রদায়িক দল। কিন্তু এখানে সেই বিজেপি সরকারের কাছ থেকেই হাসিনাকে জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের অর্থ কি, গণতন্ত্রের কোর ভ্যলু মতভিন্নতাকে কিভাবে দেখতে হয় এর সবক শুনে যেতে হল।
    সুষমার এই সফরকে সামগ্রিক দিক থেকে বলা যায়,কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির বিপদ ও আত্মঘাতি দিক মোদির বিজেপি উপলব্দি করেছে। কিন্তু অন্য দেশ সফরে এসে তা প্রকাশ্যে খোলাখুলি বলতে পারেনা, বলা যায় না। এটা হাসিনার কারবার নয় যে নিউইর্য়কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মিটিংয়ে গিয়ে বিগত খালেদা সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে। কিন্তু তাদের উপলব্দি কি সেটা তারা পরিস্কার করেছে সুষমার ঐ সেমিনারের লিখিত বক্তৃতায়। আর সেই সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাবার নতুন নীতির কথা বলে আসলে পুরানো কংগ্রেসের নীতি যে ভুল ছিল সেটাই পরোক্ষে বলে গেলেন সুষমা। মোদি পরিস্কার করেছেন তাঁর স্বপ্ন অনেক উচু। অনেক উচুতে বসে enlightened হয়ে তিনি নিজের স্বার্থ দেখতে পারেন। এটা কংগ্রেসের মত ফাকা বুলি ও আকামের তথাকথিত “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নয়।

    ভারতের মিডিয়ায় অসময়ী কংগ্রেসী প্রপাগান্ডা
    ভারতের মিডিয়ার কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। এরা মোদির চিন্তা অভিমুখ নীতি কি সেদিকে খবর নাই। সুষমার সফরকে ঘিরে এরা কংগ্রেসের “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নামের নীতি অনুসরণ করে পরামর্শ কলাম রিপোর্ট লিখেই চলেছে। এর কতটা পুরানা অভ্যাস আর কতটা হাসিনা-গওহরের মিডিয়া প্রভাবিত করা বা পেজ কিনে নেবার ক্ষমতা তা আলাদা করা মুশকিল। এমন রিপোর্টেগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সীমা ছাড়ানি লেখাটা হল টাইমস অব ইন্ডিয়া। এটা মূলত টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার এডিটোরিয়াল তাই লেখকের কোন নাম ছাপা হয় নাই। ১৯৭৪ সাল থেকে পেন্ডিং ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি বা ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ভারতীয় সুপ্রিম আপিল কোর্টের রায় হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনও লটকে আছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা এবার এর বিস্তর আলাপ আলোচনা টেকনিক্যাল কাজ শেষে কেবল ভারতীয় সংসদে পাস হওয়া বাকি। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়া সেটাকে আবার নতুন করে ঘোলাটে করার উদ্যোগ নিয়েছে। বলছে, বাংলাদেশের তেতুলিয়া সীমান্তে নতুন করে চার কিলোমিটার করিডোরে দিলে ভারতের পুর্বাঞ্চলে পৌছানোর রাস্তা ৮৫ কিমির মত কমবে তাই মোদির এব্যাপারে বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া দরকার। যেন ব্যাপারটা এমন যে ভারত বাংলাদেশকে চাপ দিলেই সব পেয়ে যেতে পারে। তো হাসিনাকে চাপ দিয়ে গোটা বাংলাদেশটাই নিয়ে নিলেই তো হয়? নাকি? যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশ কেন দিবে? একথার পিছনে টাইমসের যুক্তি জ্ঞানবুদ্ধি কি? না সেসব কিছু পাওয়া যায় নাই। দাদাগিরি একটাই কথা ভারতের দরকার। ভারতের দরকার এটাই একমাত্র র্যাাশনালি। এটা কংগ্রেসের দাদাগিরির চেয়ে বড়, মিডিয়া দাদাগিরি।
    আবার, দ্যা হিন্দু পত্রিকার ডিপলোমেটিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার। তিনিও হিন্দু পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতই বুঝা যায় সুহাসিনীরও মোদির লক্ষ্য নীতি সম্পর্কে তার কিছুই জানা হয় নাই। জানার দরকার অনুভব নাই। বরং এখনও কংগ্রেসের নীতিতে বিভোর আছেন। কংগ্রেস-হাসিনা নীতির পক্ষে মিথ্যা প্রপাগান্ডার সোরগোল তোলাই এর লক্ষ্য। তাঁর লেখা তথ্যের সত্য-মিথ্যায় ভরপুর এবং কষ্ট না করে আওয়ামি পছন্দের লোকে ব্রিফে লেখা এই উপসম্পাদকীয়। যেমন সুহাসিনী লেখার আগেই অযাচিতভাবে ঠিক করেছেন আবার বিএনপি-জামাতের ক্ষমতায় আসা ভারতের স্বার্থের বিরোধী ফলে এটা প্রমান করবেন যে তাদের আগের আমলে ভারতের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে। সুহাসিনী ২০০৩ সাল থেকে কাহিনী শুরু করেছিলেন। জামাত-বিএনপির ঐ আমলে বাংলাদেশ ভয়াবহ এন্টি-ইন্ডিয়ান সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল এর ঘটনাবলির ইতিহাস ধারা বর্ণনা দিচ্ছেন। কিন্তু একথা বলতে বলতে হঠাত বছর সাল পিছিয়ে ২০০১ সালে পদুয়ার ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যর কথায় চলে আসলেন। কিন্তু সুহাসিনী খবর রাখেন নাই যে পদুয়ার ঘটনা শুধু ২০০১ সালের বলে নয় এটা তাঁর প্রিয় হাসিনা সরকারের আমলেরই ঘটনা। ইণ্ডিয়া টুডে এর ঐ সময়ের এক রিপোর্ট বলছে ২২ এপ্রিল ২০০১ প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফলে সুহাসিনী যে প্রেমিজের উপর দাঁড়িয়ে তাঁর লেখার যে বিএনপি মানেই ভারতের স্বার্থবিরোধী সন্ত্রাসের বাংলাদেশ এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আর ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনাকে যদি তিনি ভারত বিরোধী সন্ত্রাসের নমুনা হিসাবে উপস্থাপন করতে চান তবে ঐ সন্ত্রাসের কারিগর হন শেখ হাসিনা। নিশ্চয় এটা তার পছন্দ হবে না। সুহাসিনী আরও বলছেন ২০০৩ সালে বিএনপির-জামাতের আমলে হুজির হেড কোয়ার্টার নাকি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, আমরা পছন্দ করি আর নাই করি আফগান ফেরত বাংলাদেশিদের ইসলামি রাজনীতিক উত্থান ১৯৯৩ সালের পর থেকে, হুজিও তাদের তেমনই এক সংগঠন ও প্রকাশ। হুজির হামলাগুলো তাই হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছরের আমলেও ছিল, উদিচী, নারায়নগঞ্জ ঘটনা পর্যন্ত। অর্থাৎ হুজির এই উত্থানের সাথে হাসিনা অথবা খালেদা কার সরকারের আমল এমন কোন তাল মিল রেখে ঘটেছে এমন কোন সম্পর্কই নাই। অর্থাৎ বাংলাদেশের বোমাবাজির ঘটনাগুলো কোন সরকারের আমলে ঘটেছে এর ভিত্তিতে ঐ সরকারের তাতে পৃষ্ঠপোষকতা আছে এমন বয়ান খাড়া করে প্রপাগান্ডা চালাতে চাইলে অভিযোগ করলে হাসিনাও দোষী হবেন। একথা সুহাসিনী খেয়াল রাখেন নাই। ফলে বলা বাহুল্য সুহাসিনীর এই রিপোর্ট মিথ্যা ও বায়াসড অথবা পেজ বিক্রি করার চুক্তিতে এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট।
    সুষমার সফর উপলক্ষ্যে ভারতের মিডিয়া রিপোর্টগুলো কমবেশি এরকমই। ব্যতিক্রম হিসাবে চোখে পড়েছে ইংরাজি অনলাইন ফাষ্ট পোষ্ট এর এসএনএম আবদির লেখা আর্টিকেল যেখানে তিনি মোদিকে সাবধানে বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে পরামর্শ রেখেছেন। আর ওদিকে রয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের এক কলাম যেটা থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক Syed Munir Khasru এর লেখা। এই কলামে তিনি বাংলাদেশের অসন্তুষ্টি এবং স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার ইস্যুগুলো এবং প্রণব বন্দোপাধ্যায়ের দেয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপের তালিকা – সব তুলে এনেছেন। ওদিকে আর এক আগ্রাসী নীতির ডঃ সুবীর ভৌমিক সুষমার সাথে বাংলাদেশেও এসেছিলেন কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছু লিখেছেন চোখে পড়েনি।

    শেষের কথা
    সামগ্রিক বিচারে সুষমার সফরে হাসিনা বেচতে চেষ্টা করেছেন ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” রক্ষার্থে তিনি কত কিছু করেছেন সেকথা। কিন্তু মোদির চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি নীতি কিছুই হাসিনা ষ্টাডি করেন নাই। মোদি আসলে এগুলো কিনতেই আসেন নাই। ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে তিনি আগ্রহী নন। এটা তাঁর ফোকাসও নয়। তার ফোকাস আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এক বড় ভুমিকা রাখা যেখানে তাঁর লক্ষ্য আরও অন্য অনেক কিছু, দেয়ানেয়ার equitable partner পার্টনার হিসাবে বাংলাদেশ। ফলে বলা বাহুল্য অপ্রতিনিধিত্ত্বের হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে কোন মদদে তাঁর ঠেকা নাই। হাসিনা মোদির কাছে নিজ চাহিদার পক্ষে কোন সম্পদ নয়, লায়াবিলিটি। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুষমার সফর শেষ হচ্ছে, হাসিনার দিক থেকে অবিক্রিত পসরা মাথায় তিনি হাট থেকে ফিরছেন। আর সুষমার দিক থেকে তাঁর পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যে ইমেজ ড্যামেজ করে রেখেছিলেন তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন এমন ধারণায় এটা গুড ষ্টার্টার ভাবছেন।।

  • ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ১৬ জুন  ২০১৪    ০৩ঃ ৪৪

    https://wp.me/p1sCvy-7m

     

    প্রথম পর্ব এখানে দেখুন

     

    রবার্ট ডি কাপলানঃ
    তাঁকে আমেরিকার এক প্রভাবশালী নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। প্রভাবশালী Stratfor ম্যাগাজিনের চীফ ভুরাজনৈতিক বিশ্লেষক তিনি। আমেরিকান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্যও তিনি। “Beijing’s Caribbean Logic” শিরোনামে গত মার্চ ২০১৪ তিনি এক আর্টিকেল (আসলে তাঁর নতুন বইয়ের এক আর্টিকেল) লিখেছেন। ওখানকার সারকথা হলঃ বৃটিশ বা ফরাসী সাম্রাজ্য যখন দুনিয়াকে লূট দখলের কলোনী রাজত্ত্ব করে রেখেছিল এর শেষের দিকে আর বিপরীতে আমেরিকার যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ পরাক্রমশালী হয়ে উঠছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগের সেই সময়ে আমেরিকা প্রথম ক্যারেবিয়ান সাগরের কর্তৃত্ত্ব নিয়েছিল কলোনী মাষ্টার বৃটিশ সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে। ক্যারেবিয়ান সাগর হল, মার্কিন দেশের দক্ষিণ দিকে যেখানে আমেরিকা মানে উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ (বা ল্যাটিন) আমেরিকা বিভক্ত হয়েছে সেই বিস্তৃর্ণ সাগর জলরাশি। ক্যারেবিয়ানের উত্তরদিকে আমেরিকার মিয়ামি, মেক্সিকো আর ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র পানামা, কিউবা জামাইকা ইত্যাদি আর দক্ষিণদিকে কলম্বিযা, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্র – সেই অঞ্চল। এটাই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে এক চিকন ভুখন্ডগত (সবচেয়ে চিকন অংশটাই পানামা রাষ্ট্র) সংযোগে ধরে রেখেছে। আবার বলা যায় ঐ চিকন ভুখন্ড পুবে আটলান্টিক মহাসাগর অঞ্চল আর পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল এভাবে মহাসাগর দুটোকে বিভক্ত করে রেখেছে। আমেরিকা নিজের অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত উত্থানের যুগে প্রথমেই সে তার নিজ ভুন্ডের দক্ষিণের ক্যারেবিয়ান সাগরের দখল নিয়েছিল, বৃটিশদের থাকতে দেয়নি। এখন কাপলান ঐ লেখায় যুক্তি দিচ্ছেন, তাহলে আজকের রাইজিং ইকোনমির চীন কেন এশিয়ায় জলরাশিতে আমেরিকাকে ঢুকতে দিবে? চীন তো আসলে আমেরিকার “ক্যারেবিয়ান লজিকই” প্রয়োগ করছে। তাই কাপলানের লেখার শিরোনাম “বেইজিং এর ক্যারেবিয়ান লজিক”।
    কাপলানের কথার এক ধরণের গুরুত্ত্ব আছে সন্দেহ নাই। তবে তিনি এম্পেয়ার নষ্টামির পিছনের ভাবাদর্শগত ন্যায্যতা খুজতে গিয়েছেন। কিন্তু এতে যেদিকটা আড়ালে পড়ে গিয়েছে তা হল, চীন নিজে প্রথমে কাউকে হটিয়ে এশিয়ার জলরাশিতে নিজের কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যায় নাই। উত্তেজনাহীন নিঃতরঙ্গ এশিয়ার জলরাশিতে জাহাজ নৌরুটে পণ্য আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহার করে চীন তার অর্থনীতিতে বিকাশ সাধন করে যাচ্ছিল। তার পড়শিরাও যার যার মত নিজের অর্থনীতিতে মশগুল ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে চীনের পড়শিদেরকে আমেরিকার নৌ-সামরিক শক্তি অফার করা, নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করার উস্কানি থেকে। স্বভাবতই এটা চীনের দিক থেকে বিরাট হুমকি মনে করারই বিষয়। বিশেষত তার নৌবাণিজ্য বা পণ্য আনা-নেয়ার প্রধান রুট এশিয়ার জলরাশি বিশেষত সাউথ চায়না সি অবাধ চলাচল এলাকা রাখার স্বার্থে, এই কারণে। দাবার পালটা চালের মত, আমেরিকার ঐ পদক্ষেপের ফলে চীনের এতদিনের -দুনিয়ার কারো সাথে সামরিক সংঘাতের সম্পর্কে সে নাই – এই নীতি থেকে সরে গিয়ে চীনের এখনকার নীতি হয়ে দাড়িয়েছে – যারাই আমেরিকার কাছে আশ্রয় খুজছে, সামরিক জোটে আবদ্ধ হতে চাইছে বা হয়ে আছে এমন সব দেশের প্রতি চীনের ভুমিকা মাসল দেখানোর। যেমন উদাহরণ হিসাবে জাপানের প্রসঙ্গঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জাপান ঐ অঞ্চলের সকলের কাছেই এক কলোনী মাষ্টার হিসাবে পরিচিত; চীনসহ দুই কোরিয়াকে সে কলোনী দখল করে রেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর মৃত এবং জীবিত জাপানী যারা যুদ্ধাপরাধী হিসাবে ফাঁসি সাজাপ্রাপ্ত এদের সহ সকলের উদ্দেশ্য নির্মিত স্মৃতিসৌধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কখনই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ফুল দিতে যান নাই। কিন্তু এবার গিয়েছেন। এঘটনাটা চীন ও কোরিয়াকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এরচেয়ে হাস্যকর হল তিনি নিজের ফুল দিতে যাওয়ার পক্ষে যে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলছেন, দুনিয়ার সব রাজনৈতিক নেতারাই নিজ দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন তাই তিনি গিয়েছেন। বিপরীতে চীনের প্রতিক্রিয়া হল, পিছনের ইতিহাস না ঘেটে যখন আমরা সামনের দিন নির্মাণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচনের চেষ্টা করছি তখন এই আচরণ খুবই বিভেদমূলক ও শত্রুতা উস্কে দেয়ার। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে এটা কোরিয়ান জনগণের অনুভুতিকে পায়ে মাড়ানো। এছাড়া ছোট্ট যে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে জাপান-চীনের বিবাদ সেটাও কলোনী দখল যুগের মালিকানার বিবাদ। স্পস্টতই জাপানের ভুমিকা মাসল ফোলানোর, খুচিয়ে পুরান ঘা তাজা করার, টেনশন তৈরি করার। এর পিছনের কারণ হল, আমেরিকার সাথে বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের সামরিক চুক্তি আছে যে জাপান আক্রান্ত হলে সেটাকে আমেরিকা নিজের উপর আক্রমণ মনে করবে, ফলে জাপানের শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিবে। এসব কিছু মিলিয়ে এককথায় বললে, চীন বর্তমান অবস্থান নিয়েছে, এশিয়ার জলরাশিতে আমেরিকার কোন ভুমিকা সে দেখতে চায় না – এটাই তার নীতি ও আকাঙ্খা।

    সাংগ্রিলা ডায়লগঃ
    এশিয়ায় জলরাশিতে উস্কানি তৈরি করে আমেরিকার নিজের কদর বাড়ানো, বিপরীতে চীন আমেরিকান জোট পাকানোর বিরোধীতা তার বর্তমান নীতি, এর ফলে এখনকার সময়টাকে বলা যায় এটা এশিয়ার জন্য মাসল দেখানো, টেনশনের পিঠে টেনশন তৈরি করার এক সময় চলছে। কিন্তু এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে বা কিভাবে থিতু হতে পারে – সেই ছবিটাকে ধরার জন্য গতমাসের শেষদিকে ৩০ মে থেকে তিনদিন সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা হোটেলে এশিয়ার বার্ষিক (১৩তম) নিরাপত্তা সম্মেলন হয়ে গেল, সেখানকার রিপোর্টিং কে ব্যবহার করব।
    বৃটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক International Institute for Strategic Studies (IISS)এর দায়িত্ত্বে পরিচালিত সাংগ্রিলা ডায়লগ মূলত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ২৮ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদেরকে নিয়ে বার্ষিক আলোচনাসভা বা ডায়লগের স্থান। থিঙ্কট্যাঙ্ক IISS এটাকে “The IISS Asia Security Summit” বলে পরিচিত করিয়ে থাকে। শুরুতে মূল উদ্যোক্তা ছিল আমেরিকা; থাইল্যাণ্ডকে সাথে নিয়ে এর আয়োজক হয়েছিল ২০০২ সালে। উদ্দেশ্য পরাশক্তিগত স্বার্থগুলো ডায়লগ আলোচনার মাধ্যমে যতটা সম্ভব বুঝে শুনে নেয়া। ঐ ২৮ দেশের মধ্যে আমেরিকা বৃটেন রাশিয়া চীন জাপান কোরিয়া ভারত পাকিস্তান অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি প্রায় সকলেই অন্তর্ভুক্ত। এটাকে বলা যায় গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্রে চলে আসার আর এক প্রতিক্রিয়া। “সাংগ্রিলা ডায়লগ” (Shangri-La Dialogue বা সংক্ষেপে SLD) নাম হবার পিছনের কারণ এটা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চেন হোটেল সাংগ্রিলার “সিঙ্গাপুর সাংগ্রিলায়” আহুত হয় বলে সেখান থেকে এই নেয়া নাম।
    Shangri-La Dialogue 2014 সভার এবার উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। খুবই আক্রমাণাত্মক তাঁর বক্তৃতার সারকথা হল, রুল অব ল এট সি অর্থাৎ সমুদ্র বিষয়ে আইনের শাসনে চলতে হবে সবাইকে। মানে সীমানা বিবাদ মীমাংসায় চীনকে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন ইত্যাদির মধ্যে আসতে হবে। “আইনের শাসন” কথাটা শুনলে সকলের সহজেই আকৃষ্ট হবার ইচ্ছা জাগে, তাই তাঁর এই শব্দ দিয়ে বলা। সেকথায় পরে আসছি। শিনজোর পরে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তাঁকে সমর্থন করে বক্তৃতা উত্তেজনা আরও এক ধাপ সুরে চড়িয়ে দেন। চাক হেগেল চীনকে অভিযুক্ত করেন,“অস্থিতিশীল করার দেশ” “আগ্রাসী শক্তি” ইত্যাদি বলে। মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, আগে থেকেই আমেরিকা ও জাপানের উপর ক্ষিপ্ত ছিল বলে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ত্ব চীনাদল আসেনি, এর বদলে এসেছে চীনা সামরিক জেনারেলদের নেতৃত্বে এক চীনাদল। সেই জেনারেলও বক্তৃতায় পালটা জাপানের দানবীয় সামরিক অতীতের কথা তুলে মুখ ছুটিয়েছিল। বলেছেন, “চীন যে কোন “নির্মম ফ্যাসিষ্ট এবং সামরিক দাঙ্গাবাজ আগ্রাসনকারীর আসরে ফিরে আসা প্রতিহত করবে”। আর আমেরিকা সম্পর্কে বলেছে্ন, “চীনের বিরুদ্ধে ঘোট পাকাচ্ছে, সকলকে খেপিয়ে তুলছে”। চাক হেগেলের বক্তৃতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলেছে এটা “কল্পনাতীত”, “আধিপত্যসুলভ, হুমকির মত এবং হস্তক্ষেপমূলক” বক্তব্য। এবিষয়ের সারকথাটা বলবার জন্য পশ্চিমা সাপ্তাহিক “ইকোনমিষ্ট” থেকে ধার নিব। সাংগ্রিলা ডায়লগ শুরুর দিন তিনেক আগে ওবামা “ওয়েষ্ট পয়েন্ট” বলে খ্যাত আমেরিকার এক মিলিটারি একাডেমিতে বক্তৃতায় ক্যাডেটদের আশ্বস্ত করার ছলে বলেছিলেন, ”আমেরিকা অবশ্যই বিশ্ব পরিসরে নেতৃত্ত্ব দিয়ে যাবে” এবং “আমেরিকার জোট-বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সে এক-পক্ষীয়ভাবে সামরিক বল প্রয়োগ করবে”। ইকোনমিষ্ট বলছে,এসব কথা চীনের নজরে না আসার কারণ নাই, তাই সম্ভবত চীনা জেনারেলের এমন প্রতিক্রিয়া। এছাড়া ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের কিছু শেষকথা চীনা অবস্থান ভাবনাকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে মনে করা যেতে পারে। অনুবাদ করে বললে তা দাঁড়ায়,- “…… চীন আমেরিকা জাপানের এসব কথাবার্তা, এক ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থার’ মাতবরদের কথা হিসাবে দেখছে যা তার কাছে গ্রহনীয় নয়। চীনের দিক থেকে দেখলে ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থা’ মানে পশ্চিমের স্বার্থে বিশেষত আমেরিকার নেতৃত্ত্বে জারি করা অর্ডার, এক নিয়ম-কানুন শৃঙ্খলা। যা নিজ শাসন-শৃঙ্খলার বাসার ভিতর উত্থিত চীনকে অন্তর্ভুক্ত হতে দেয় অবশ্যই, কিন্তু ততটুকুই যতটুকুতে চীন ঐ বাসাতে আগে থেকে সেট করা নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুগত হয়ে মেনে নেয় আর ওদিকে অন্য দেশগুলো ঘোট পাকিয়ে চীনের বিরুদ্ধে সমালোচনা জারি রাখে। এসব তারা করে এই বিশ্বাসে যে এভাবে চীনের বিরাট শক্তি হিসাবে উত্থানকে দমায়ে রাখতে পারবে”।

    এশিয়া নীতির সম্ভাব্য পরিণতি
    “সাংগ্রিলা ডায়লগে” কি ঘটেছে সে প্রসঙ্গে এরপরে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু কথা বলে শেষ করব। এই লেখার পরের নিচের অংশ বেশিরভাগই টাইমসের রিপোর্ট থেকে টুকে নেয়া ছোট ছোট ঘটনা বর্ণনা, সাথে নতুন কিছু ব্যাখ্যামূলক পয়েন্ট তাতে যোগ করে লেখা হবে। টাইমসের মূল ইংরাজি রিপোর্ট এখানে আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।
    টাইমসের রিপোর্টের শিরোনামটাই মজার,“জোটবন্ধুরা চীনা চ্যালেঞ্জের মুখে, আমেরিকা কাপাকাপি দশায় এশিয়ায় ডুবতে বসেছে” । শিরোনাম থেকেই যথেষ্ট সরাসরি কথাবার্তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
    সম্প্রতিকালে পড়শিদের সাথে চীন যেসব বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও জাপানের সাথে; যেমন, ভিয়েতনামের এক মাছধরা নৌকা ডুবিয়ে দেয়া ও সাগরের নিচের তেল তোলার রিগ বসানো নিয়ে ভিয়েতনামের সাথে বিরোধ আর জাপানের সাথে এক ছোট দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জাপান গোয়েন্দা সার্ভিলেন্স স্থাপনার খুব কাছে দিয়ে চীনা যুদ্ধজেট বিমানের উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ঐ অঞ্চলে। অন্যদিকে আগেই বলেছি, ঐ অঞ্চলে চীনের পড়শিদের সাথে আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং পার্টনারশীপ ডায়লগ প্রোগ্রামে আমেরিকা নিরাপত্তা ফেরি বিক্রির চেষ্টায় রত; যাতে এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে এক শক্ত জোট খাড়া করে আমেরিকা নিজের পরাশক্তিগত উপস্থিতির ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে। এসব বিষয়কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তা নিয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং প্রাক্তন এক অষ্ট্রেলিয়ান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা হলেন Hugh White। ওয়াশিংটনের সাথেও তাঁর ঘনিষ্টভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর বরাতে টাইমস পত্রিকা লিখছে, চীনের লক্ষ্য আমেরিকাকে দেখানো যে সে যদি এশিয়ায় এভাবে এন্টি-চীন শক্তিজোট খাড়া করতে চায় তবে তাকে চীনের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার রিস্ক নিতে হবে। White বলছেন, “চীন উদ্দেশ্যপুর্ণভাবে দেখতে চায় যে আমেরিকা চীনের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার পড়শিদের সাথে জোট বাধার চেষ্টা – এভাবে এই অঞ্চলে আমেরিকার নেতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা -এটা টিকাতে পারবে না”। চীন যেন বাজি ধরে বসেছে সবশেষে ক্লান্ত ও ঘরমুখে গুটানো আমেরিকা পিছু হটবেই আর এতে এশিয়াতে নিজের প্রভাব যতটুকু আছে তা খুইয়ে প্রকারন্তরে এটা চীনের শক্তিকেই বাড়িয়ে তুলবে।
    টাইমস আরও জানাচ্ছে, ওবামা প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে ভিতরের অনেক খবর দিচ্ছেন। বলছেন, চাক হেগেল ও আমেরিকা প্রশাসন জনসমক্ষে জাপানের পিছনে সমর্থনে দিয়ে যাবার কথা বলে চলবে এমনকি কিছুটা মাত্রায় ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের মত অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তা করে যাবে। কিন্তু প্রশাসন আসলে নিজেকে চীনের সাথে মুখোমুখি সংঘাত অবস্থাতেই দেখছে। এটা দেখে প্রশাসনে হতাশা বাড়ছে যে নিজে সকলকে নিয়ে এমন এক খেলার প্যাচে জড়িয়ে যাচ্ছে যা যুদ্ধের পরিণতি ডেকে আনতে পারে। টাইমস ম্যাগাজিন আরও লিখছে, প্রশাসনের আর এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমেরিকান নীতির সমস্যাগুলো নিয়ে মন খুলে কথা বলতে নাম প্রকাশ না করে বলছেন, “দেশগুলোর (বিবদমান চীনের পড়শিরা) কেউ বিষয়টা সামলাতে সাহায্য করছে না”; জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে আমেরিকা যদিও জনসমক্ষে সবসময় জাপানকে সমর্থনের কথা বলে যাবে কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমপর্যায়ের জাপানী কর্মকর্তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বারবার বুঝাচ্ছেন যে যে কোন পদক্ষেপ নেবার আগে সাতবার ভাবতে; আর তারা যেন কোনভাবেই চীনকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়ার অবস্থায় না নেয়।
    ওদিকে আর এক কর্মকর্তা বিক্রম জে সিং, গত ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যিনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্ত্বের আমেরিকার উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি বলছেন, “ তাদেরকে যদি স্কুলের বাচ্চা ধরি তাহলে বলতে হয় তারা আসলে হাতে কাঁচি নিয়ে চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছে”। “ছোটখাট জিনিষ থেকেই দুর্ঘটনায় বা হিসাবের ভুলের ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যেমন যুদ্ধপ্লেন চলতে চলতে খামোখা বিপদজনক গোত্তামারা মোড় নেয়া থেকে দুর্ঘটনা বা আগ্রাসী মনোভাবের প্রকাশের ফলে অযাচিত পালটা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখিতে পড়তে হতে পারে”।
    সাংগ্রিলা ডায়লগের সভায় চাক হেগেল ও তার সাথী সামরিক বাহিনীর অনুগামি দল জয়েন্ট চীফ অব ষ্টাফের চেয়ারম্যানসহ বাঘা জেনারেলরা খুবই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ব্যাডমিন্টন খেলার কর্কের মত দৌড়াদৌড়ি করে। কেন? কারণ, ঐ সভায় প্রধান উস্কানিদাতা বক্তা ছিলেন জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। প্রধান বক্তা হিসাবে তার বক্তৃতার পর ডায়াসে থাকা অবস্থায় তিনি এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এক তরুণ চীনা অফিসার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, দ্বীপের মালিকানা বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি কি চীনের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবতে রাজি আছেন? প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে ছুপা জবাবে তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিয়ে রাখাটা জরুরী” যাতে কোন “অজানা, যদি ঘটে যায় এমন ঘটনাকে ঠেকানো যায়”। আমেরিকান জেনারেলরা তাই দৌড়াদৌড়ি করে সবার কাছে গিয়ে নিশ্চয়তা নিচ্ছিলেন “অজানা, যদি ঘটে যায় ঘটনা” যেন কোনভাবেই না ঘটে।
    এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ও পুর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ Andrew L. Oros বলেছেন,”কোন বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখিতে ওর রেফারি হওয়ার চেয়ে বরং যেকোন ভাল শিক্ষক জানেন বাচ্চাদেরকে সব কিছুর আগে ডিসিপ্লিন আচরণ শিখিয়ে নিতে হয়”। এখানে “রেফারি” প্রসঙ্গে টিটকিরি করে বলা হয়েছে। এমন হওয়ার কারণ,ওবামার প্রথম টার্মে তার নতুন “এশিয়া পলিসি” হাজির করেন যেখানে রেফারি মানে “এশিয়ায় আমেরিকার pivot বা ভারকেন্দ্র ভুমিকা” থাকবেই একথা বারবার উচ্চারিত হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আমেরিকান ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে অক্টোবর ২০১১ সালে নিজে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন, America’s Pacific Century শিরোনামে। ঐ আর্টিকেলের প্রথম বাক্য ছিল “As the war in Iraq winds down and America begins to withdraw its forces from Afghanistan, the United States stands at a pivot point”. ফলে এখান থেকেই ওবামার এশিয়া পলিসি মানেই শব্দটা কয়েন হয় নতুন শব্দে “এশিয়াতে আমেরিকার পিভোটাল রোল” বা রেফারি ভুমিকা – এভাবে। আমেরিকান একাদেমিকরা সেকথার সুত্র ধরে এখন ঠাট্টা মশকরা করে বলছেন, “ওবামার রেফারি ভুমিকা”। কারণ অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, ওবামার এশিয়া পলিসির অর্থ এন্টি চীন মাতবরির আমেরিকান জোট এভাবে না ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে যায়। এবং সেক্ষেত্রে এই নীতি অকার্যকরে হয়ে যাবে।

    ওবামা্র মানে গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধ
    উপরে এন্ডারসন সাহেবের রিপোর্টের ম্যাপে দেখিয়েছিলাম লাল গোল দাগ দেয়া “চোকিং পয়েন্ট”। চোকিং পয়েন্ট এর আক্ষরিক মানে শ্বাসরুদ্ধ করে চেপে ধরার এমন সহজ জায়গা। অর্থাৎ চীনের অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ করে দেবার মত সহজ জায়গা কোনটা – চীনের পণ্য বাণিজ্য জাহাজের নৌচলাচল পথে এমন দুটো জায়গা যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই চিকন হয়ে থাকা কিছু অংশ পার হতে হয়। এর একটা ইরানের নৌসীমায় হরমুজ প্রণালী (সমুদ্র নৌপথের চিকন অংশকে বাংলায় প্রণালী আর ইংরাজিতে strait বলা হয়ে থাকে) আর অন্যটা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভুখন্ডের মাঝে মালাক্কা প্রণালী [Malacca Strait মালাক্কা প্রণালী]। প্রণালীতে কোন যুদ্ধজাহাজ আড়াআড়িভাবে রেখে দিলে অথবা ঠিক প্রণালীর উপর কোন বাণিজ্যিক জাহাজও ডুবিয়ে দিতে পারলে ঐ নৌচলাচল পথকে সহজেই কয়েক মাসের জন্য স্থবির রুদ্ধ করা সম্ভব। ফলাফল এটা চীনের অর্থনীতিকে অকেজো করে দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই টুটি চেপে ধরার চোকিং পয়েন্ট।
    আমেরিকার সাথে চীনের ১৯৭১ সালে প্রথম সম্পর্ক স্থাপনের সময় দেনা-পাওনার মৌলিক যেদিকটা নিয়ে রফা হয়েছিল তা হল, চীন আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজি নিজ ভুখন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিবে, পুঁজিকে প্রয়োজনীয় আইনী সুরক্ষা দিবে। বিদেশী পুঁজি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করে নেয়ার মত কোন পদক্ষেপ নিবে না। (এগুলো আজকাল আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শর্ত হয়ে গেছে।) বিনিময়ে আমেরিকান রাষ্ট্র চীনকে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্যপদ পাবার সহযোগিতা থেকে শুরু করে চীনের বিকাশে অর্থনৈতিক, ষ্ট্রাটেজিক,পণ্যবাজার সুবিধা ইত্যাদি চীনা স্বার্থের দিকগুলোতে বাধা তো হবেই না বরং সহযোগিতা করবে। এটা চীনের দিক থেকে খুব স্বাভাবিক চাওয়া। কারণ চীনে বিদেশী পুঁজি এসে উতপাদন বাণিজ্য করতে গেলে এগুলো তার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ চাওয়া। কারণ মূলত তা ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজির স্বার্থেই, কারবার ভায়াবল হওয়া, তার মুনাফাসহ আরও স্ফীত হওয়ার স্বার্থেই। কিন্তু সে প্রসঙ্গটা এখানে এখন তোলার কারণ আছে। আমেরিকা-চীনের প্রথম সম্পর্কের সময়ের মৌলিক দিকটা খুবই সংক্ষেপে এখানে বলা হলেও তবু এটুকু থেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে এই রফার ভিতর আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্যই এক বড় বিপদ লুকিয়ে ছিল, এখনও আছে। বিশাল ভুখন্ড ও জনসংখ্যার চীন মানে বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার আর ওদিকে সস্তা শ্রমে প্রতি জোড়া হাতে সস্তায় রপ্তানিযোগ্য ও কমপিটিটিভ পণ্য উতপাদন – এতে চীনের দুনিয়া কাপানোর কথা সন্দেহ নাই। এতে এক বিশাল অর্থনৈতিক উত্থান চীনকে সবদিক থেকেই পরাশক্তি করে তুলবে, তা সকলেরই জানা ছিল। যেটা আবার খোদ আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও হুমকি। কিন্তু শুরু থেকেই এটা টের পাবার পরও আমেরিকান রাষ্ট্রের কিছুই করার ছিল না। কারণ এটাই গ্লোবাল পুঁজির আপন স্ববিরোধীতা। যেমন, একদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থ হল সবসময় নতুন নতুন অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে,ওটাই তার প্রাণভোমরা। যেভাবেই হোক অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে। অন্যদিকে ওয়াল ষ্ট্রিট পুঁজির নিজেরই আকার দেয়া দানব এমপায়ার বা দুনিয়ায় সবাইকে পিটায় ধমকায় বেড়ানো “সাম্রাজবাদ” রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকান রাষ্ট্রের এমন কিছু নিজস্ব স্বার্থ আছে যা সব সময় তারই ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থের সাথে হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। এমনিতেই ওয়াল ষ্ট্রিটের মালিক রাষ্ট্র নয় ব্যক্তিবর্গ, যার মুনাফা লাভালাভে আকার বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের এর উপর কোন নগদ লাভ নাই কর্তৃত্ত্ব নাই। ফলে ওয়াল ষ্ট্রিটের একান্ত নিজ স্বার্থে খোদ আমেরিকান রাষ্ট্রকে বিপদে হুমকির মুখে ফেলে হলেও তার বিনিয়োগ বাজার চাই। ফলে রাষ্ট্র টিকে থাকার স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রিটের টিকে থাকার স্বার্থ এখানে এক নয়, এক তালে নয়। এজন্য একদিকে চীনে প্রবাহিত গ্লোবাল পুঁজি (ওয়াল ষ্ট্রিট যার কেন্দ্র বা প্রতীকী নাম) এর ফুলেফলে বেড়ে উঠা সুরক্ষা করতে ওবামা কমিটেড ও বাধ্য আবার বিপরীতে রাইজিং চীন রাষ্ট্র আমেরিকান রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে ওর চেয়েও বড় পরাশক্তি হয়ে উঠার বিপদে নিজেই হুমকিতে, দুনিয়ায় নিজের একছত্র সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার ভুমিকার মুকুট যায় যায় অবস্থা। তাই একদিকে ওবামা চীনের চোকিং পয়েন্ট মানে টুটি টিপে ধরার জায়গাটা খুজে বেড়ায় আবার ওর খুজে বেড়ানো দেখে রাইজিং চীনের খারাপ প্রতিক্রিয়া হুমকিতে তটস্থ হয়ে যায় সে। নিজেই জাপানকে উস্কানি দেয় আবার নিজেই তাকে জোরে চিৎকার করতে না করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (জাতিসংঘ,আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি) গড়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আমেরিকান রাষ্ট্র দুনিয়ায় তার সাম্রাজ্যের রুস্তমি চালায়, আমেরিকান মাতবরিতে সাজানো তৈরি এসব প্রতিষ্ঠানে ঢুকার চেয়ে চীন বরং আবার নতুন করে নতুন ভারসাম্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চায়। এর ভিতরই নিজের স্বার্থ দেখে স্বস্তিবোধ করে। BRICS যার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ওদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের এক বিশাল মোড়ল “গোল্ডম্যান স্যাসে” কোম্পানী তাই নিজেই BRICS গড়তে পরামর্শ উতসাহ জুগিয়েছে কারণ এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেই তা তাকে নতুন আয়ু দিবে। তাতে আমেরিকান রাষ্ট্র ডুবে মরল না বাচল এটা তার কাছে গৌণ, মুখ্য হল কে তাকে অফুরন্ত নতুন নতুন বিনিয়োগ বাজার এনে দিচ্ছে। ওয়াল ষ্ট্রিটের বাইরে আফ্রিকাকে মাথায় রেখে দুবাই আর চীনকে মাথায় রেখে সিঙ্গাপুরে পুঁজি বাজার ক্রমশ বড় ও বিকশিত কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ওবামা তাই একদিকে এশিয়ায় এন্টি চীন নয়, এশিয়ায় নিজের পিভোট বা ভারকেন্দ্র অথবা রেফারির ভুমিকা দেখে। আবার একইসাথে এখনও দুনিয়াকে নিজ রাষ্ট্রের সাম্রাজ্য নেতৃত্ত্ব চালিয়ে যাবার স্বপ্নে চীনের চোকিং পয়েন্ট হাতড়ে বেড়ায়। গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধীতা স্বভাব এভাবে চারদিক থেকে ফুটে উঠে।
    এখন ফলাফল? টাইমসের ঐ রিপোর্টের শেষ অংশে চীনের সাঙহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির ‘আমেরিকান ষ্টাডি সেন্টার’ এর ডিরেক্টর Wu Xinbo এর উধৃতি দিয়ে বলছে, “ওবামা প্রশাসন সম্ভবত এশিয়ার আকাশ ও নৌ-সীমা বিষয়ক বিবাদ্গুলোকে হাওয়া দিয়ে জাগিয়েছে আমেরিকার এশিয়া নীতির দিকে মনোযোগ দিবার কথা তুলে”। সে আসলে চীনের নার্ভ পরীক্ষা করতে গেছিল। “একারণে চীন আর কখনও এশিয়ায় আমেরিকার নেতৃত্ত্বে শক্তিজোট পাকানোর বিষয়্টাকে স্বাগত জানাবে তা যেন কেউ আর আশা না করে। চীনের স্বার্থের দিকটাই এরা উপেক্ষা করেছে”। অবস্থা দেখে ওদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট গত মাসের ১৯ মে তারিখে “নতুন এশিয়ার নিরাপত্তা কৌশলের” রূপরেখা হাজির করেছেন এক আন্তর্জাতিক সভায়। ওখানে আহুত সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলো ছিল চীন রাশিয়া ও অন্যান্য এশিয়ান দেশ। কিন্তু আমেরিকাকে বাইরে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছে, এটা চীনের জেনেবুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত।

    কয়েনের উলটা দিক
    কিন্তু কয়েনের আর একটা দিক থেকে কিছু কথা বলা দরকার। আমেরিকার সাথে এই টানাপোড়েন করতে গিয়ে চীন সাগরের পড়শি বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে চীন একটা খারাপ ম্যাসেজ পাঠিয়ে ফেলেছে। আকাশ বা নৌপথ অথবা সাধারণভাবে সীমানা বিষয়ক কোন বিবাদ বিতর্ক উঠলে এর সমাধান কি তবে সামরিক পথেই লাঠির জোরে করতে চায় নতুন রাইজিং চীন? নাকি জাতিসংঘের আনক্লজ পদ্ধতি পছন্দ না হলে আরও ভাল কোন আন্তর্জাতিক সালিসের পথে করতে চায়? এদিকটা নিয়ে চীনকে অবশ্যই ভাবতে হবে। যদিও মূলত চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্ত্বে আর এক পলিটিক্যাল জোট হাজির হয়েছে দেখা যাচ্ছে, নামঃ Conference on Interaction and Confidence Building Measures in Asia (CICA)। এর নামের মধ্যে ইন্টার-একশন আর কনফিডেন্স বিল্ডিং মানে “পারস্পরিক আলাপ আলোচনা” ও “পরস্পরের আস্থা অর্জন” শব্দ দুটোর তাতপর্য আছে অনুমান করা যায়। কারণ CICA এর সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়া জানা গেল, ওখানে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে সকলের সর্বসম্মতিক্রমে। জাতিসংঘ জন্ম দেবার আগের ৫-৭ বছর ধরে এমনিভাবেই বিভিন্ন ধরণের নানান জোটের জন্ম হয়েছিল, সবগুলো টিকে নাই বটে তবে সবগুলো উদ্যোগের মিলিত পরিণতি্তে জন্ম হয়েছিল জাতিসংঘ। বলা বাহুল্য, একদিকে CICA উদ্যোগের আর অন্যদিকে চীনের পড়শিদের সাথে চীনের বিরোধ মীমাংসার পথ – এদুটো পরস্পর অসামঞ্জ্যপুর্ণ। আমরা আশা করব এদিকগুলোতে চীন মনোযোগী হবে।

    আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩, সকাল নয়টা সাত