Tag: পরাশক্তি

  • দশক আগেরটা নয়, সংশোধিত আমেরিকায় কিছু সম্ভাবনা

    দশক আগেরটা নয়, সংশোধিত আমেরিকায় কিছু সম্ভাবনা

    গৌতম দাস

      ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:৩৮

    https://wp.me/p1sCvy-3ce

    Bangladesh-US political relationship

    গ্লোবাল নেতৃত্ব বিশেষত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের নেতা হওয়ার লড়াই এবার সম্ভবত তুঙ্গে উঠতে যাচ্ছে। এটা ফাইনাল লড়াইও হয়ে উঠার লক্ষণ সম্পন্ন। আমেরিকার আসন্ন নভেম্বর নির্বাচনের জন্যই যেন সবাই অপেক্ষা করছে; রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকাও মরণপণ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে এই লড়াই হবে বাই-পার্টিজান। মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দু’দলই এমন লড়াইয়ের পক্ষে। যদিও ফারাক শুধু এখানেই যে নির্বাচনে যে জিতবে সে নিজের কায়দায় ও কৌশলে এ লড়াইয়ে নামবে, নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু তবু দু’দলে অনেকগুলো মিলও আছে। এর একটা হল যেমন,  এ’দুই দল যেন চাইলেই খোদ আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতৃত্বের আসনে ধরে রাখতে পারবে, এই মিথ্যা কথাটা দুদলই সত্যি ধরে নিয়েছে। “আমি সরব না” বললেই যেন গ্লোবাল এম্পায়ারের নেতার আসন ধরে রাখা যায়। যেমন অনেককে আবার দেখছি সামরিক শক্তির বিচারে চীন আমেরিকার কত পেছনে সেটা মেপে দেখিয়ে আর্টিকেল লিখে দাবি করছে, আমেরিকাকে কেউ নেতাচ্যুত করতে পারবে না। তাহলে সোজা আরেক কমন দিক হল, এ দু’দলই মনে করে  – গ্লোবাল এম্পেরা’র (সাম্রাজ্যশাসক) নেতা থাকার ব্যাপারটা আমেরিকার ইচ্ছাধীন।

    অথচ কেউ আর চাইলেও গ্লোবাল লিডার বা এম্পেরা’র ভূমিকায় আমেরিকাকে রাখতে পারছে না বা পারবে না, এটাই বাস্তবতা।  আবার সেই আমেরিকা আজ কোথায় – যে আমেরিকা আগে গত সত্তর বছর ধরে নিজেই ছিল গ্লোবাল নেতা, অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশনের লিডার, পণ্য বিনিময় ব্যাপকভাবে দুনিয়ার কোণে কোণে ছড়িয়ে এক গ্লোবাল বিনিময় লেনদেনের ব্যবস্থা বা অর্ডার গড়ে তোলার কাজে ছিল যার লক্ষ্য ও যে ছিল নেতা? সেই আমেরিকা তো এখন এখন ফিরে গ্লোবালাইজেশনের লিডার হওয়া ছেড়ে বুড়ো বয়সে এসে কেবল ‘আমেরিকান জাতির’ নেতা হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে! তা সত্বেও আবার এটা অবশ্যই ব্যর্থ হবে। কারণ যে দুনিয়া একবার কথিত ‘জাতি’ থেকে গ্লোবালাইজড বিনিময়ের এক ব্যবস্থা বা অর্ডারে ঢুকে গেছে সে আর ফিরে ঘরোয়া একা একা নিজ সীমানার ‘জাতি ব্যবস্থায়’ ফিরে যাবে না, চাইলেও পারবে না। গত ২০১৪ থেকে অনেককে বলার চেষ্টা করেছিলাম দুনিয়াতে আবার ভুয়া “জাতি” হবার একটা জোয়ার উঠানো আনার চেষ্টা হচ্ছে ও উঠবে। এরা বাস্তবতা না বুঝে মনে করেন জোর করে বা জোয়ার তুলে হলেও আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার ভুমিকায় রাখা যাবে এবং এটা সম্ভব। এটা অনেকটা যেন সেই স্বপ্ন যে দুনিয়াটাকে আবার যদি কলোনিদখল ব্যবসা ও ব্যবস্থার যুগে ফেরত নেয়া সম্ভব হত! সেই আলোকে এবার তাই আমরা দেখছি ট্রাম্পের এডভাইজার স্টিভ ব্যাননদের [Steve Bannon] আবির্ভাব কিংবা হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান; এসবই কিছু সেই নমুনা। তবু বলাই বাহুল্য এরা সমূলে ব্যর্থ ও নির্মুল বা উন্মুল হয়ে যাবেই।  তবে এর আগে আরো বহুবিধ ধ্বংস ঘটিয়ে এরপরে তা বিলীন হবে হয়ত। নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান বা ‘বিদেশি’ হত্যার ঘটনাগুলো আমরা এখানে মনে করতে পারি। গত সপ্তাহে আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান – মানে যে প্রতিষ্ঠান মুসলমানেরাই আমেরিকান প্রধান শত্রুজ্ঞান করে জন্ম দেয়া হয়েছিল – তিনি  আমেরিকান কংগ্রেসের (বা সংসদীয় কমিটির) এক শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন  আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য এখনকার সবচেয়ে বড় হুমকি হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিয়মিত চরমপন্থা বা এক্সিমিজম। এসব ততপরতা এখন বাড়ার আরেক বড় কারণ অবশ্য খোদ ট্রাম্পেরই পেটি-ক্ষুদ্র স্বার্থ বা লাভালাভে এসব গোষ্ঠিকে পরোক্ষে বা কখনও প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া বা নেয়া।

    তবু ‘জাতি ব্যবস্থায়’ ফিরে যাওয়ার চেষ্টা ট্রাম্পের গত চার বছরের ধরে তৎপরতা হয়েই ছিল। আজকের আমেরিকান প্রশাসন সেই আকার পেয়েছে বা দেয়া হয়ে গেছে যা ট্রাম্পের ততপরতার কিছু প্রত্যক্ষ ফসল। শুধু তাই নয়, এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবস্থা এমন জায়গায় চলে গেছে যে, বাইডেন জিতলেও ট্রাম্পের এক্সিকিউটিভ অর্ডার বা পলিসিগুলো আর বদলাতে বা পুরনো ট্রাম্প-পুর্ব জায়গায়  নিতে পারবেন না। বাইডেনকে ট্রাম্পের কাম-আকাম বহুকিছুই অনুসরণ করে যেতে হবে। আর এভাবেই যেন আমেরিকা ক্রমশ শেষ হয়ে যেতে চাওয়ার রাস্তায় উঠে গেছে; শেষ দিনগুলোতে যতদিন না গ্লোবাল নেতা আমেরিকা এভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিজেকে বিলীন হওয়ার দিকে নিয়ে চলে যায়। চলতি সপ্তাহের (১৯ সেপ্টেম্বর) ‘ইকোনমিস্ট’ ট্রাম্পের এমন নীতিগুলোর একটা তালিকা তৈরি করে রেখেছে, যার শিরোনামঃ How would Joe Biden change America’s trade policy?। আগ্রহিরা তা পড়তে এই লিঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন।

    কিন্তু এব্যাপারে আমেরিকার জন্য বাস্তব অসুবিধা হল, কেউ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হবে কি না এটা তার নিজের খেয়ালে নেয়া ইচ্ছায় সিদ্ধান্তের বিষয়ই নয়। অন্যভাবে সরাসরি বললে, মূল কথাটা হল- অর্থনৈতিক কারণে কোনো রাষ্ট্র যখন গ্লোবাল সারপ্লাস সঞ্চয় বা পুঞ্জীভবনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়, এটাই সেই পূর্বশর্ত যে, সে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হচ্ছে বা হবে কি না।

    এক্ষেত্রে চিন্তার জগতের বাস্তব সমস্যটা হল, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গ্লোবাল অর্থনীতি বিষয়টা নাড়াচাড়া করার জন্য যাদেরকে একাদেমিক বা প্রফেশনাল দিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব মনে করা হয় এরা হল মূলত যাদের “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” বিষয়ে ডিগ্রী আছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে বুঝা আর সাথে গ্লোবাল রাজনীতিতে এর প্রভাবকে বুঝতে পারার জন্য অর্থনীতির নুন্যতম ধারণা দরকার হলেও এটা তাদের জানা বা পড়ার সিলেবাসেই নাই। ভরসা একমাত্র কেউ যদি আলাদা করে অর্থনীতিও পড়ে নেন বা ডিগ্রী থাকে।  একারণে কেউ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা থাকবে কিনা এটাও যেন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কারো আছে কিনা আর সাথে ইচ্ছা থাকলেই এটা সম্ভব বলে মনে করতে থাকেন এরা। অথচ ঘটনার অবজেকটিভ দিক বা বাস্তব দশা পরিস্থিতিটা তাদের নাগালের বাইরেই থেকে যায়।

    ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে গ্লোবাল অর্থনীতির প্রভাবঃ
    যেমন ধরা যাক, আমেরিকা এখন খুবই আগ্রাসী হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের কথা তুলে এগিয়ে আসছে। সম্ভবত তাতে ভারত যতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে মাঠে আমেরিকাকে পাশে পেতে আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে তা এর চেয়েও বেশি আগ্রাসী। কিন্তু তবু আমরা দেখছি ফাইনালি মোদী চীনের সাথে আপস করতেই ছুটে চলে গেলেন। কেন?

    কারণ নরেন্দ্র মোদীর জন্য আবার ঠিক এর উলটা আরেক ফ্যাক্টস হল, তিনি জানেন তাঁর দরকার এখন বিপুল  বিনিয়োগ। করোনা শুরুর আগেও এ সমস্যা ছিল আর করোনার প্রভাবে পরে ভারতের অর্থনীতি এখন একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। অথচ এখনও করোনায়  প্রতিদিন নতুন একলাখ জনসংখ্যা আত্রান্ত হচ্ছে আর এক হাজার মারা যাচ্ছে। কাজেই মোদীর ভারতের এখন দরকার বিনিয়োগ – সেটা অবকাঠামো আর এফডিআই (বা সরাসরি প্রাইভেট ব্যবসায়িক বিনিয়োগ) এদুটো অর্থেই। যার একটা – এফডিআই, এটা আমেরিকা এক বিশেষ শর্ত (যা ভারতের স্বার্থের জন্য খারাপ) সাপেক্ষে হয়ত দিতে সক্ষম। সেই এমন বিশেষ সুবিধার শর্ত হল যে, আমেরিকান ব্যবসায়ীদেরই সরাসরি ব্যবসা, কারখানা নিয়ে ভারতে বসতে দিতে হবে। আর অন্যটা মানে, অবকাঠামো বিনিয়োগ, সেটা এখন আর আমেরিকা দিতে অপারগ।  কাজেই এই আমেরিকাকে নিয়ে মোদি কী করবেন? কোন কাজে আসবে? আর এটাই হল, যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল সারপ্লাস এখনও জমছে আর যে রাষ্ট্র এখন সেসব দিন পার হয়ে ফুরিয়ে এসেছে – এদুইয়ের সিরিয়াস ফারাক।

    কাজেই সোজা ভাষায় বললে,  আমেরিকার কোন প্রশাসন কত আন্তরিকতা আর মানসিক দৃঢ়তার শক্তিতে ইন্দো-প্যাসিফিক জোট নিয়ে এগিয়ে আসছে – কত জোরে দৌড়ে ভারতের দিকে ছুটছে – এতে মোদীর কোন দুঃখ আমেরিকা ঘুচাতে পারবে না। আবার এটা মোদীও জেনে গেছেন। অথচ এই সক্ষমতাটার সবই চীনের আছে।ঙ্কিন্তু ভারতের অন্যান্য চীনা-ভীতি বা সীমান্ত বা নেহাতই ঈর্ষা ইত্যাদি চীনকে নিয়ে ভারতের  মনে মনে যাই থাক, মোদীসহ ভারতের সিরিয়াস যেকোন ব্যক্তিত্বই অস্বীকার করে না চীন ভারতের জন্য কত দরকারি ও উপযুক্ত। এবং পারফেক্ট চয়েস।  এমনকি ভারতের এই প্রয়োজনের কাছে চীনের বদলি জাপানও ন্‌ তাও ভারত টের পায়। এটাই ভারতের জন্য এক উভমুখি বা কন্ট্রাডিকটরি সমস্যা ও বাস্তবতা। এর পিছনের মূলকথাটা হল, আমেরিকা ভারতের কাছে এক অতীত আর চীন হল আগামি। আর তা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা অর্থেও। কিন্তু তবু ভারতের সকল রাজনৈতিক নেতার চোখে অর্থনৈতিক অর্থে চীন খুবই কাম্য হলেও (যেটা মোদীর চোখে চীন সবার চেয়ে বেশি কাম্য। মোদীই প্রথম চীনকে ভারতের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে ডেকে এনেছিলেন। ) কিন্তু ঠিক এর উল্টাভাবে গ্লোবাল রাজনৈতিক অর্থে ভারতের চীনা ভীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে ট্রমার কারণে আমেরিকা তার এক নম্বর কাম্য। এছাড়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিষয়টাকে দেখা ও বুঝার মত কোন নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কেউ আছেন তা জানা যায় না।  কারণ উগ্র বিধ্বংসী হিন্দু ‘জাতি’ বোধ আর অকার্যকর স্বদেশিপনা ভারতের সংকট থেকে বের হয়ে আসার সব সম্ভাবনাকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলছে।

    অর্থাৎ বলাই বাহুল্য এই আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতার ভুমিকা নয়। অন্তত দৃশ্যত ভারতের কাছে। কিন্তু তা নয় বলে তাতে আমেরিকা মুখে যতই দাবি করুক করলেও কিছু হচ্ছে না, কিছু এসে যাচ্ছে না। এমনকি আমেরিকার সা্থে মোদীর ভারতের মিলন আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা কাজ করতে পারছে না। বরং আর আমাদের সবার মাথার উপরে টিকটিক করা ঘটনাটা হল,  আমেরিকায় যারা এটা মানছে না এরা এই অসম্ভব জিনিসটা মেনে নিতে না পেরে পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের ও দুনিয়াকে আরো দুস্থ অবস্থায় ফেলে দিতে পারে।

    আমেরিকান গ্লোবাল ভুমিকার পরে এবার আমেরিকান লোকালঃ
    লন্ডন ইকোনমিস্ট সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বাংলাদেশ নিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর এক আর্টিকেল ছেপেছে। এর একটা অনুবাদ এখানে পাওয়া যেতে পারে। যার শিরোনাম – “ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক দুর্বল বলে চীনের সাথে বন্ধন শক্তিশালী হচ্ছে”। ইকোনমিস্টের লেখাটায় কোনো লেখকের নাম নেই, কোন ছদ্মনামও নাই। যদিও লেখা পড়ে মনে হয়, প্রো-ইন্ডিয়ান মনের বাংলাদেশের কোন সাংবাদিকের সহযোগিতায় কোন ইন্ডিয়ান বা পশ্চিমা সাংবাদিক এটা লিখেছেন। তবে লেখক যেই হন, তিনি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কেন দুর্বল হল অথবা চীনের সাথেই বা কেন সবল হল এর কোন ব্যাখ্যা দেননি। এমনকি তিনি ধরে নিয়েছেন, ভারতের সাথে এখন যে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে বলছেন তা আগে এটা সবল ছিল। কিন্তু আগেই বা এটা সবল ছিল কেন অথবা কবে থেকে সবল ছিল এরও কোনো ধারণা বা ব্যাখ্যা দেয়া নেই এখানে। তবে পুরো রিপোর্টে একটা দুঃখবোধ চারদিকে ছড়িয়ে আছে যে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা ঢিলা হয়ে গেছে।

    আবার  শুরুর প্যারায় লেখার প্রসঙ্গ হল, সিলেটের এয়ারপোর্ট নির্মাণের টেন্ডারে ভারতের এক কোম্পানি হেরে গেছে, আর চীনের এক কোম্পানি কাজ পেয়েছে। কিন্তু এটা কী করে চীন বা ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের দুর্বল বা সবল হওয়ার উদাহরণ হয়? এটা লেখক বলেননি। একটা টেন্ডারে ভারত হেরে গেলে কার কী করার আছে? এটা তো বাংলাদেশের কারো সাথে সম্পর্ক সবল নাকি দুর্বল এর প্রমাণ হতে পারে না। ফলে পাঠকদের মনে এই প্রশ্ন উঠতেই থাকবে বা থেকেই যাবে।

    আবার বলা হয়েছে, গত জুন মাসে চীন বাংলাদেশের চীনাপণ্য আমদানিতে ৯৭ ভাগ পণ্যে ডিউটি ফ্রি সুযোগ দিয়েছে। অথচ বটম লাইন ফ্যাক্টস হল, এটাও ঠিক এখন কোন দেয়া সুবিধা নয়। এসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল ২০১০ সালে ‘কম্প্রিহেনসিভ কোঅপারেশন’ নামে যে আলাপ শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার প্রথম চীন সফরের সেই সময় থেকে। আর পরে, এতে ২০১২ সালে এ নিয়ে ডেইলি স্টারে চীনা রাষ্ট্রদূতের বিস্তারিত সাক্ষাতকার ও রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। সেসব চীনা প্রস্তাব এই প্রথম এখন কিছুটা কার্যকর করা হয়েছে দেখা যাচ্ছে, এই আর কি।  এ ছাড়াও ইকোনমিস্টের  লেখায় বলা হয়েছে – বাংলাদেশে কিভাবে ভারতের দখলদারসুলভ দম্ভ ও খারাপ আচরণে বাংলাদেশীদের মধ্যে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বাড়ছে।

    মজার দিকটা হল, আসলে ইকোনমিস্টের ওই রিপোর্ট অনেক জায়গাতেই নানাবিধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আর তা যে যার মত করে নিজের কাজে লাগাচ্ছে। যেমন বিবিসি বাংলা পরোক্ষে ওই রিপোর্ট নিয়ে আরেকটি রিপোর্ট করেছে। যেন ইকোনমিস্টের ঐ রিপোর্ট নিয়ে কংগ্রেসের কী প্রতিক্রিয়া সেটা জানা এর উছিলা। সেখানে ফোকাস বক্তব্যটা হল – আসলে ভারত না – আবার কংগ্রেসও না, মোদী সরকারের কারণেই বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক ঢিলা হয়ে গেছে। আর সম্পর্ক যে ঢিলা হয়েছে এর প্রমাণ হল ইকোনমিস্টের ঐ রিপোর্ট। রাহুল গান্ধীও ইকোনমিস্টের ওই রিপোর্টের বরাতে মোদীর বিরুদ্ধে লম্বা টুইট করেছেন।

    তবে এখানে লেখকের প্রো-ইন্ডিয়ান ঝোঁক-অবস্থান সবচেয়ে ভালোভাবে ধরা পড়েছে। যেমন তিনি লিখছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াটাকে বলেছেন, “ভারতের অবদান”। আর দাবি করছেন সেই থেকে নাকি “দুই দেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে”। অথচ এটাই সবচেয়ে ধুর্ত ভারতীয় বয়ান। যদিও এ’কথাটা কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বুঝেন, এমন লেখক বলতে পারেন না। তবে রাস্তার ধারে টংয়ের চা দোকানে বসে গুলতানির আলাপ হতে পারে হয়ত। কারণ দুই রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পর্কের ভিতরে কখনও দয়া বা দান-ধ্যান ধরনের আলাপ-ধারণা থাকে না। দুই রাষ্ট্র দু’পক্ষের কোনো বিষয়ের মধ্যে উভয়েই নিজের নিজের স্বার্থ দেখতে পেলে একমাত্র তখনই তারা ঐ প্রসঙ্গে একসাথে কাজ করে, পদক্ষেপ নেয়। পরস্পরের পক্ষে খাড়া হতে সম্মত হয়। স্বার্থ কমন না হলে এটা করতেই পারে না, ঘটেও না। তাই এখানে কেউ কাউকে ‘দয়া’ করার কিছু নেই। বাংলাদেশকে সহায়তা করতে ভারতেরও স্বার্থ ছিল। আর থাকলেই একমাত্র এমন করা সম্ভব। বিশেষত এতে ভারতের অবস্থান পাকিস্তানের উপর আরো শক্ত হবে, সীমান্ত ইস্যু এবং কূটনীতিক সভা ও ফোরামগুলোতে ভালো অবস্থান সৃষ্টি হবে – এসব স্বার্থেই ভারত বাংলাদেশকে সেসময় সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তখনকার পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশি সীমান্তে পাহারার দায় ও টেনশন কমে যায়। এটাও ভারতের এক বিরাট লাভ, যা বাংলাদেশের অবদান! তাই তো হয় নাকি? কাজেই দয়া করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে দিলাম টাইপের কথা এগুলো হীন মানুষের বাংলাদেশকে নিচা দেখানোর চেষ্টা মাত্র।

    আবার এরপরে,  ১৯৭২ থেকে “দুই দেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে” এটা অবাস্তব ও অমূলক কথা। অন্তত যদি তাই হত তবে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরে আমাদের পাহাড়িদেরকে ফুসলায়ে ভারতে নিয়ে এরপর তাদেরই হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সীমান্তে হামলা করতে পাঠিয়েছিলেন কেন? এটা কোন মনগড়া ক্যাম্পেইন নয়। এ্টাই সুবীর ভৌমিকের পিএইচডি থিসিস এর কনক্লুশন বা উপসংহার; যা পরে বই আকারেও প্রকাশিত।

    এছাড়াও হার্ড ফ্যাক্টস হল, ২০০৭ সালে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে “তুলে দিয়েছিল”; আমেরিকার পক্ষে চীন ঠেকানোর জন্য ভারতের কাজ করে দেয়ার বিনিময়ে ‘উপহার’ হিসেবে। কাজেই ২০০৯ থেকে ২০১৯ মোটামুটি এই সময়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের নিজের জন্য তা স্বর্ণযুগ বিবেচনা করা হয়, যেটা এর আগে কখনো বা ১৯৭২ সালেও ছিল না। আর ফাইনালি এখন সেটাই নানান কারণে চলতি বছর থেকে নানান সমীকরণে ক্ষমতাসীন সরকার আবার অনেক বেশি চীনমুখী হয়ে থাকাটা পাবলিকের স্বার্থ হোক আর নাই হোক, সরকারের ক্ষমতায় থাকার জন্য জরুরি মনে করা হচ্ছে।

    কিন্তু এ নিয়ে কোন রিপোর্ট লিখতে বসে, ভারতমুখী করে যা ইচ্ছা ব্যাখ্যা দেয়া তো অর্থহীন। বরং এতে ইকোনমিস্ট গ্রুপের সম্মান ইজ্জত ও ইন্টিগ্রিটি বা সততাকে ধুলায় লুটাবে। আমাদের কী মনে নেই, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে, যেটাকে দেশের মানুষ ‘নৈশভোটের নির্বাচন’ বলে চিনে, তাকে ইকোনমিস্ট গ্রুপের ‘ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ প্রেডিকশন দিয়েছিল যে ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ ‘লীগ সরকার পুনর্নির্বাচিত হবে’ বলে। অথচ এটা কেমন নির্বাচনী পূর্বাভাস বা ইন্টেলিজেন্স? এর মানে কি ইকোনমিস্ট জানত যে, এটা নৈশভোট হবে? তাই কী? ইকোনমিস্ট গ্রুপ কখনো এ নিয়ে অন্তত লজ্জা পেয়েছিল বলে শুনিনি।
    আবার লেখকের কাণ্ডজ্ঞান দেখে আমাদের অজ্ঞান হওয়ার দশা। তিনি আরো ঐ রিপোর্টের সাথে বাংলাদেশে চীনা ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের এক তুলনামূলক গ্রাফ দিয়েছেন। আচ্ছা, দুনিয়ার কোনো দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কি খুব নামডাক? তারা কি খুবই যোগ্য আর অতুলনীয়? তাও আবার প্রবল উঠতি অর্থনীতির হবু নেতা চীনের সাথে তুলনায়? আবার তামাসাটা হল, তাতে ফলাফল কী দেখানো হয়েছে? বলা হয়েছে যে, এটি ১:১২ অনুপাতে। মানে, ভারতের এক হলে চীন এর ১২গুণ বিনিয়োগকারী, চীনের আধিপত্যে। তাহলে এটা দিয়ে কী বুঝানো গেল? আর এতে কি উল্টা ভারতকে তুচ্ছ দেখানো হয়ে গেল না?
    লেখক বলছেন “চীনা মুগ্ধতা দেখানো অশোভন ইঙ্গিত” [Cue a Chinese charm offensive]। কেন, তা কিছুই বোঝা গেল না। কেবল পরের বাক্যে তিনি বলছেন, চীন বাংলাদেশকে সাম্প্রতিককালে সাতটি ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ বানিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ দিয়েছে, এগুলাই বুডিগঙ্গা ফ্রেন্ডশীপ ব্রিজ। আর এর সাথে একটি আধুনিক অডিটোরিয়ামও তৈরি করে দিয়েছে (আগারগাঁওয়ে যা বঙ্গবন্ধু অডিটরিয়াম), আর সবই বিনা পয়সায়। প্রথমে চীনারা তা বানিয়ে দিয়েছিল ঋণের অর্থে, পরে সব ঋণ তারা মাফ করে দিয়েছে অনুদান হিসেবে।

    সর্বসাকুল্যে এর খরচ সেকালের হিসাবে মাত্র কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার। আর এছাড়া তা সাম্প্রতিককালের ব্যাপার নয় আর বাংলাদেশের দুই দলের সরকারের আমলেই ঘটেছে এমন পুরনো ঘটনা এগুলা। কিন্তু মূল কথাটা হল, যে চীন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল এম্পায়ারের আসনে বসতে যাচ্ছে তার জন্য বাংলাদেশেও প্রভাববিস্তারের দরকার, এটাই স্বাভাবিক। আর সেজন্য কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা কি বেশি ব্যয়? গত ৭২ বছরের নেতা আমেরিকা কি এমন কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে পরে মাফ করেনি, অনুদান দেয়নি? এশিয়া আফ্রিকায় এমন কতগুলো দেশের নাম চান? গুগলে (HIPC) heavily indebted poor countries  লিখে সার্চ দিলেই টের পাবেন। এখনও অন্তত ৩৯ টা দেশের নাম পাবেন।  গ্লোবাল আম্পায়ার হতে গেলে এমন অনেক খরচ করতেই হয়। গত সত্তর বছর ধরে এটাই আমেরিকান প্রাকটিস, তাই নয় কী?

    আসল ঘটনা  বা কথা অন্য জায়গায়। এককথায় বললে,  আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক করার কৌশলেও চীনের কাছে হেরে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার তথাকথিত ‘বাংলাদেশী এক্সপার্টদের’ ভুয়া আকামের পরামর্শের কারণে।

    আমেরিকা একে তো বিনিময়ে কিছু না পেয়ে বাংলাদেশকে তারা ভারতের হাতে “তুলে দিয়েছে”। আর শুধুমাত্র এ’জন্যই আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে চির-বিতাড়িত হয়ে যেতে পারে। সেজন্য অন্তত কারেকশন হিসেবে আমেরিকার একবার মাফ চেয়ে আবার শুরু করা উচিত। দেখানো উচিত, আশস্ত করা উচিত সে শিক্ষা নিয়েছে – সংশোধিত হয়েছে। এখনো বাংলাদেশে তার পজিটিভ রাজনৈতিক ভূমিকা রাখার সুযোগ সম্ভবত সব শেষ হয়নি, যদিও ইতোমধ্যেই তা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমেরিকা নিজেই নিজেকে ডুবিয়েছে। আর বাকিটা তার কথিত  “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” আর ইউএসএইড ফান্ডেড দেশী ‘বোকা’ এনজিও কর্তাদের কারণে। এরা এখন দাবি করেন, চীন-ভারত নাকি বাংলাদেশের সব ক্ষতি করে ফেলছে। এরা এখন টের পেয়েছেন, ভারতই নাকি বাংলাদেশে পাকিস্তানের চেয়েও বড় শোষক ইত্যাদি…। আসলে এরা না বাংলাদেশের জন্য না আমেরিকার জন্য প্রয়োজনীয়, বা কোনো কাজের ভূমিকা রাখতে পারছেন।

    চীন নিজের কাজ ও লক্ষ্য ঠিকমতোই বুঝে। কাজেই চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও টেলিকম ইত্যাদি সব খাত দখলে নিয়েছে বলে এখন আপসোস করার কী আছে? যেটা ঐ রিপোর্টে করা হয়েছে। চীন যে বাংলাদেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ-বাণিজ্য ও প্রভাব চায়, আর তা কী করে নিজে পেতে হয় – প্রতিযোগিতার এই যুগে চীন তা ভালোই জানে আর প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্কসহ সবকিছু তারা করে এসেছে। চীনের দিক থেকে এটাই তো স্বাভাবিক। এনিয়ে চোখ টাটানোর কী আছে? হবু গ্লোবাল ইকোনমিক এম্পায়ার চীনকে তো এমনই তো হতে হবে। ঠিক আমেরিকা যেমন তার উত্থানের কালে গ্লোবাল এমপের’র (Emperor) হয়েই গত ৭২ বছর ধরে রাজত্ব করেছে, আমেরিকা তো এমনি এমনিতে টিকে ছিল না! কিন্তু ‘শেষ বয়সে’ তার বাংলাদেশে নেয়া পদক্ষেপগুলো ছিল ধারাবাহিকভাবে ভুল আর ভুল। যেমন দেখেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ইস্যুতে বিশ্বব্যাংক যদি প্রশ্নই তুলে থাকে, তবে প্রশ্নের মীমাংসা করল না কেন, শেষ করল না কেন? প্রমাণ করল না কেন? উল্টা মামলাটাই প্রত্যাহার করে সব ছেড়ে পালাল কেন? আর এমনভাবে ও এমন সময়ে পালাল যাতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগী ও বিকল্প হিসেবে চীনের নিজেকে হাজির করা যেন তাতে সবচেয়ে সহজ হয়ে গেল। এটা তো হাস্যকর ভাবে “করিয়া ভাবিবার” আদর্শ লক্ষণ হয়ে গেল!

    আজকের চীন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও অনেক বড় ও সক্ষম বিনিয়োগ বা অনুদান দাতা। সেই সাথে সে উদীয়মান, পরিকল্পিত ও স্ট্র্যাটেজিক এবং সর্বোপরি তার প্রকল্পে লোকাল এজেন্ট বা কমিশন ব্যবস্থা সে রাখে। যে গ্রহীতা সরকার যেভাবে সন্তুষ্ট হয় সেটাই সে অনুসরণ করে। এটা কি ২০১৩ সালের আগে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা বিশ্ব ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিস্টরা বুঝেন নাই যে, প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন এসে যাচ্ছে? যদি না বুঝে থাকেন এটাই তো প্রমাণ, চীন উত্তম ও যোগ্য গ্লোবাল ইকোনমিক এমপেরর হয়ে উঠেছে, যার সাথে তুলনায় আমেরিকার দিন ফুরিয়ে গেছে।

    আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক দিক, যে খাতে চীনের দেয়ার কিছুই নেই বরং আমেরিকান রাজত্ব আছে। অথচ আমেরিকার কথিত এক্সপার্টদের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে আজ আমেরিকার কোনো আবেদন নেই। এর এক নম্বর কারণ খোদ আমেরিকায় – মুসলমানদের সাথে তার বিদ্বেষী আচরণ। আমেরিকান রাষ্ট্র আর তার বেকুব প্রশাসন – বুশ থেকে ট্রাম্প পর্যন্ত – এরা সকলে ভুলে গিয়েছিল আমেরিকান রাষ্ট্রের মানবাধিকারের প্রতি কিছু প্রতিশ্রুতি আছে যা রক্ষা করতে পারলেই কেবল সে আমেরিকা রাষ্ট্র আর, গ্লোবাল পলিটিক্যাল লিডার হয়ে টিকে থাকতে পারে। নইলে সব মিথ্যা আর ফাঁকা আওয়াজ হয়ে যায়!

    মূল কথাটা হল, যারা আমেরিকান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয় কেবল সেই ব্যক্তিরাই আমেরিকান রাষ্ট্রের শত্রু। এটা খুবই কমন কথা। দুনিয়ার সব ধরণের রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে এই একই কথাটাই লেখা থাকে ও থাকতেই হয়। কিন্তু আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এর অর্থ করেছে – না “মুসলমানরা” আমেরিকার শত্রু। অথচ কনষ্টিটিউশনের মতে তারা মুসলমান বলে আমেরিকার শত্রু নয়, একেবারেই নয়। কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার জন্য তারা এনিমি অব দা স্টেট। সেজন্য যা বিচার হয় তারা করুক। কিন্তু মুসলমানবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা কেন? এটা তো রাষ্ট্রের কাজ না। অথচ হোমল্যান্ড এটা ছড়িয়েছে যে  ‘মুসলমানরা’ আমেরিকার শত্রু। আর এতে কোনপক্ষই আবার এটাকে ভুল বলে আপত্তিও তুলে নাই।  এভাবে যেখানেই মুসলমান পেয়েছে তারা কিছু করুক আর নাই করুক সবাইকে হোমল্যান্ড উঠিয়ে এনেছে। নির্যাতন, কথা আদায় সবই করেছে। অথচ আর সবার মত দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের ও পেশার মুসলমানেরা ভাগ্য অন্বেষনে আমেরিকায় এসেছিল ন্যাচারালাইজড আমেরিকান সিটিজেন হয়ে যেতে। তাদের সকলের স্বপ্ন গুড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র দানব হয়ে হাজির হয়েছে, তাতে দাড়িয়েছে যেন মুসলমান হওয়াটাই তাদের অপরাধ।  এভাবে বুশের আমল থেকে এ পর্যন্ত ভুল পথে আমেরিকা হাঁটছে। এতে আমেরিকান রাষ্ট্রের ‘কবর’ ঐদিন থেকেই দেয়া হয়ে গেছে। এটা হয়ে গেছে, কারণ মুসলিমবিদ্বেষী আর নাগরিক বৈষম্যের কোন রাষ্ট্র যে নিজের প্রতিশ্রুতি বা কনস্টিটিউশনই ধরে রাখতে পারে না, মানে না; সে তো আসলে মৃত।

    আবার আমাদের এদিকে এশিয়াতে তারা ভারতের সাথে কৌশলগত মিত্রতা করেছে। এই ঐক্যের ভিত্তিও এ’দুই রাষ্ট্রের মুসলিমবিদ্বেষ, যারা মুসলমানদের নিজের রাষ্ট্রের শত্রু মনে করে থাকে। এটা তো হতেই পারে না। যা সবার জন্য সমান রাষ্ট্র নয়, সেটা আদতে কোন রাষ্ট্র নামে ডাকার যোগ্য নয়। কারণ, রাষ্ট্র নিয়ে মৌলিক বোঝাবুঝিটা হচ্ছে, যেকোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বা অসাম্য করা, এটা নিজ রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করে ফেলার সামিল। তাই আমেরিকা বা ভারত মুসলিমবিদ্বেষী রাষ্ট্র বলে নিজ বিলুপ্তির পথে কয়েক ধাপ আগিয়ে যেতে বাধ্য, হয়েছেও তাই।
    আমেরিকার আত্মস্বার্থও যারা বুঝে না আর মনভর্তি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে আছে যারা; এমন কিছু আমেরিকান প্রজন্ম চলতি শতকের শুরু থেকেই আমেরিকার প্রশাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

    এবার, যারা আমেরিকার চোখে “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” বা আমেরিকার বন্ধু ও কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেন তাদের দিকে দেখি। তারা মনে করেন, একজন ইসলামিস্ট কতদূর সেক্যুলার বা আধুনিকতা থেকে দূরে আছে তা মেপে রায় দেয়াটা তার কাজ। এর অর্থ, তাহলে একজন আল্লামা আহমদ শফী হুজুরকেও যেন তিনি মেপে বলতে আহ্বান জানাচ্ছেন যে, দেখুন তো, আমি আমেরিকান এক্সপার্ট কতটুকু ইসলামিস্ট হয়েছি। তাই নয় কী? বলাই বাহুল্য, এতে শফী হুজুরের মত কোনো আলেমকে দাওয়াত দিয়ে আনা আর তাকে দিয়ে বলানো যে, আমি তো আপনার মতো কওমি মাদরাসায় পড়িনি তাই আমি আধুনিক বলে আমাকে নাকচ করে দেন। অথচ এটাও কোনো ইসলামিস্টের কাজ নয়।
    ব্যাপারটা হল, আমরা কেউ আরেকজনকে তার ইডিওলজি মেনে নিতে বা নিয়ে চলার দাওয়াত দিতে বা দাবি করতে পারি না। কারণ এগুলো একটাও আমাদের কারোই কাজ নয়। হতেই পারে না। বরং সব ইডিওলজির লোকেরা যেন পাশাপাশি বৈষম্যহীনভাবে সমান ও একই সুযোগসুবিধাসহ বসবাস করতে পারি এমন নীতি ও অধিকারভিত্তিক একটা রাষ্ট্রের জন্য সবাই ঐক্যমত্য হওয়া, কাজ করা ও গড়ে তোলা, এটাই আমাদের সবার কাজ। এতে এরপর থেকে সবাই ঐ  রাষ্ট্রের কমন নীতিগুলো মেনে চলা সাপেক্ষে সবার নিজ মতাদর্শ সবাই কারো সাথে একমত না হয়েই বাধাহীনভাবে চর্চা করতে পারব।

    অথচ তারা খুঁজতে গেছে কওমিরা কীংবা ইসলামিস্টরা কত খারাপ, কত পশ্চাদপদ, কতটা তাদের মত নয় এইসব। বরং নুন্যতম কী না হলে সকল ইডিওলজি বা ধারা একই রাষ্ট্রে থাকতে সমস্যা হবে, আর তা কেন হবে, এর সমাধান কী ইত্যাদি সেসব নিয়ে আলোচনা তর্ক এবং মীমাংসায় পৌছানোর চেষ্টার চেয়ে ইসলামিস্টদের কথিত ‘সেকুলার’ বানানো যেন তাদের কাজ এমন গোঁ ধরে তারা।

    মানে কথিত এক্সপার্টরা আসলে নিজের আসল কাজটা কী তাই তো বুঝেননি। তারা ভেবেছেন, একজন ইসলামিস্ট যে প্রগতিশীল নয়, কথিত সেকুলার নয় হতেও চায় না এই ফতোয়া দেয়া ও জারি রাখাই তার কাজ। ইসলামিস্টরা কত পশ্চাদপদ তা দেখিয়ে প্রপাগান্ডা করাই যেন তার কাজ। ফলে এরই পরিণতি হল ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণার চর্চা বাড়িয়ে চলা।

    আয়না-ছবিঃ
    আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি যে মুসলমান সেগরিগেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ ও বিদ্বেষী ততপরতা শুরু করে দিয়েছিল এরই আরেক অর্থ হল, আমেরিকানদের মনে দুনিয়ায় কোন মুসলমান নাই বা না থাকে যেন – এমন এক অবাস্তব দুনিয়ার আকাঙ্খা জাগিয়ে তোলা।  এর তামশার দিকটা হল আমেরিকায় আঁকা আকাঙ্খিত সেই দুনিয়াটাই যখন পরে সে বাংলাদেশের মত মুসলমান-অধ্যুসিত দেশে দেখতে পায়, [তবে বাংলাদেশেরটা আসলে আমেরিকারই এক ‘আয়না-ছবি’ – মানে ঠিক আপনি না তবে, আপনি আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে ছবিটা আয়নায় ফুটে উঠে সেটাই আপনার আয়না-ছবি] – বাংলাদেশে সেই ছবিটাই ফুটে উঠলে এবার আমেরিকা আঁতকে উঠেছে।

    কারণ বাংলাদেশের ছবিটা হল এবার কেবল মুসলমানেরাই আছে এমন এক দুনিয়া পাবার আকাঙ্ক্ষার ছবি। এটা বাংলাদেশে এখন অনেক বেড়েছে আপনি আমেরিকা দাবি করবেন বা দেখাতে পারবেন হয়ত। আপনি আমেরিকান শাসক – এটা দেখে হয়ত ভাববেন দেখেছো তারা কত খারাপ। তারা প্লুরাল (plural) না, এই ইসলামিস্টরা এদের স্বভাব হল যারা তাদের মত না এমন কাউকে তারা সাথে নিতে একসাথে বসবাস করতে চায় না। বরং নির্মুল করতে চায়, তারা inclusive না; তারা সেকুলার না। ইত্যাদি এমন কতকিছু অভিযোগ আপনার থাকবে হয়ত।

    এখন বুঝেন আপনি যদি মুসলমান-ছাড়া এমন কোন দুনিয়ার কল্পনা করতে পারেন তাহলে এটা পরিণতিতে কেবল মুসলমানেরা আছে এমন এক দুনিয়া পাবার আকাঙ্ক্ষা যাদের আপনি ইসলামিস্ট বলছেন, তাদেরই হাতে আপনার এমন এক আয়না-ছবিই কী আপনি দেখবেন না? এটা তো আসলেই আপনারই আয়না-ছবি! কাজেই এদের দেখে আপনি আঁতকে উঠেন কেন? বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন সাহস থাকলে যে, আপনি নিজে কেন এমন? অধঃপতিত! কেন হয়েছিলেন? তাই, কারও দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন ব্যাপারটা আপনারই তৈরি বা এক ‘আয়না ছবি’ নয়ত?

    কাজেই এখন দেখেন আপনি আসলে ঠিক কী হতে চান? এবার জেনেশুনেই ঠিক তাই হতে চান, না উলটা তওবা পড়বেন! মাফ চেয়ে নিয়ে নতুন কিছু করার শপথ নিবেন? সিদ্ধান্ত আপনার!

    আমেরিকা আবার উঠে আসার চেষ্টা করছে আমরা টের পাচ্ছি। হিউম্যান রাইটের উপর শক্তভাবে হয়ত দাঁড়াতে ইচ্ছা করবে, পারব কতটুকু সেটাই প্রশ্ন ! বাংলাদেশে আমেরিকা তার প্রভাব ফিরুক, এটা সে চাইবে সম্ভবত, অনুমান করি। কিন্তু সেটা কী ফিরবে?  কিন্তু এর আগে আমেরিকা কি নিজেদের সংশোধন করে হাজির করতে সক্ষম হবেন? আমরা অপেক্ষা করব দেখার জন্য! তবে তারা কিছু মাত্রায় সংশোধন হয়েছেন কিনা এর একটা চিহ্ন হবে মনে হয় যে তারা তাদের এক্সপার্ট ও এনজিও ব্যক্তিত্ব বদলে নিইয়েছেন কিনা! যারা বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া ও স্বার্থটাই বুঝেন না তারা আপনাদের পরামর্শক হবেন কী করে?

    তবে ইকনোমিস্ট ঐ লেখায় সব শেষে তাদেরই এক রিডিং জানিয়েছে। বলেছে, “চীনের কাছে খুব বেশি দায়বদ্ধ হয়ে যাওয়া নয়, আবার ভারতের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ না করা নিয়ে সতর্ক বাংলাদেশ” [It is wary of becoming too indebted to China, and is careful not to snub India. ]।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “সংশোধিত আমেরিকা দেখব কি? ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • সচেতন হল, না ‘রক্তের সম্পর্কেই’ রইল

    সচেতন হল, না ‘রক্তের সম্পর্কেই’ রইল

    গৌতম দাস

    ২৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-39x

     

    ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা হঠাত করে বাংলাদেশ সফরে আসছেন বলে ঢাকঢোল পিটানো হচ্ছিল গত ১৮ আগষ্ট সকাল থেকে। এটা নাকি তাঁর দুদিনের ঝটিকা সফর। বরাবর প্রো-ইন্ডিয়ান জায়গা থেকে নিউজ করা প্রথম আলো এখানেও তা করতে ব্যতিক্রম করে নাই। তাই ভারতীয় উতস ব্যবহার করে বানানো খবর দিয়ে রিপোর্ট করে গেছে।  অথচ অন্তত একবার পালটা উতস থেকে খবরটা পরীক্ষা করে নেয়া জরুরী ছিল। এমন বেপরোয়া ভুয়া খবর প্রথম আলো যেমন লিখেছে,

    আজ ঢাকায় অবস্থানের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গণভবণে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

    কিন্তু না। মঙ্গলবার রাত না যেতেই সবাই বুঝে যায় “ডাল মে কালা” আছে। প্রথম আলো ঢাকার উতস দিয়ে পালটা যাচাই করে নাই।  যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন শ্রীংলা ঢাকায় নামা সত্বেও মঙ্গলবার সকালে তিনদিনের সফরে সিলেট চলে গেছেন। মতিউর রহমান চৌধুরী লিখেছে, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন কেন তিনদিনের সফরে সিলেট চলে গেলেন তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলছে” ।

    আবার প্রথম আলোর ঐ প্রো-ইন্ডিয়ান ভাষ্য যে এটা নাকি শ্রীংলার দুদিনের ঝটিকা সফর, না সে কথা মানতে চান নি আমাদের পররাষ্ট্র সচিব।  এনিয়ে  মানব্জমিন লিখছে, সফরটি ঝটিকা নয় বরং রেগুলার বা নিয়মিত বলে দাবি করেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।

    এছাড়া,  বিবিসি বলছে, ‘…বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকারই করেনি”। আরো লিখেছে, “ সেই রাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোন বৈঠক বা সাক্ষাৎ সেদিন হয়নি”।

    এতে সব মিলিয়ে দেখা গেল শ্রীংলার  বাংলাদেশ সফর  একটা অপমানজনক অভিজ্ঞতা হিসাবে শেষ হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান এজেন্টদের দিয়ে বহু প্রপাগান্ডা প্রটেকশনের চেষ্টার কমতি করেন নাই শ্রীংলা। তবু এটা একটা শিক্ষা যে শ্রিংলার মানসম্মানবোধ থাকলে সহসাই আর দাওয়াত না নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অফিসমুখী হবেন না কখনো?

    তিস্তা ইস্যুর শুরু কীভাবেঃ
    গত ২০০৯ সালের ভারত-বাংলাদেশের যে বুঝাবুঝি যেখানে মূল বিষয় ভারত আসাম-ত্রিপুরার জন্য বিনা পয়সায় করিডোর নিয়ে যাচ্ছে।  এটাই ছিল ভারতের মূল টার্গেট।  কিন্তু ব্যাপারটা দেখে খারাপ লাগবে তাই একটা কাভার দরকার ছিল যাতে মনে হয় একটা বিনিময় হইতেছে। আর সেই বিনিময় হিসাবে ভারতের প্রস্তাবে তিস্তা ইস্যুওটা লটকে যায়।

    কিন্তু তিস্তার পানি কী ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ইস্যু?  এটা কী ভারতের দিক থেকে বিনিময়ে বাংলাদেশকে কিছু দেয়া বলে আমলযোগ্য? প্রশ্নই আসে না। কারণ আন্তর্জাতিক নদী আইনে তিস্তার পানি পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার। তাই এটা ভারত দিতে বাধ্য।  অথচ বাংলাদেশের এই অধিকারের দিকটা উপেক্ষা করে তিস্তার পানি একটা বিনিময়ের আইটেম  – মানে আমরা করিডোর দিলে এর বিনিময় হিসাবে ভারত তিস্তার পানির সাথে এর বিনিময় করছে – এমন আবহ তৈরি করেছিল।

    অথচ এটাও ছিল ভারতের দিক থেকে চরম ফ্রড একটা কাজ।   কারণ, তিস্তা একটা ‘ডেড ইস্যু’ ভারতের কাছে, ২০০৯ সালের বহু আগে থেকেই।  কেন ডেড কেন?  কারণ, তিস্তা থেকে আসলে ভারতের কাউকে কিছু দেয়ার নেই। উৎস থেকে যা নেয়া সম্ভব এমন সব পানি আন্তর্জাতিক নদী আইন ভঙ্গ করে বহু আগেই টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়। ২০০৯ সালের আগেই ভারতের এসব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার কাছে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, তিস্তা চুক্তি হবে।  এমনকি আজও সেই মিথ্যা  বলে যাওয়া হচ্ছে। অন্তত গজলডোবায় অন্যায়ভাবে  যে পানি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এটাও ভারতের পক্ষে কোথাও আলোচনার ইস্যুওও নয়।

    আজ আবার ভারত যখন শুনেছে, চীন-বাংলাদেশ তিস্তা নিয়ে নতুন করে এক প্রকল্পের কথা ভাবছে তাতে অস্থির হয়ে ছুটে এসেছেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। যাদের না শক্তি না আত্মসম্মানবোধ কোনোটাই থাকে না, তারাই এভাবে আসে আর ‘ফুটা’ হয়ে যান।

    দাওয়াত খেতে এসে দেখছেন, হোস্ট নিজের শ্বশুরবাড়ি রওনা দিচ্ছে- এর মানে হলো, আপনি নিজেই নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলেছেন, কারণ আপনার দাওয়াতই ঠিকমতো নেয়া হয়নি, কেউ দেয়নি বা দাওয়াত ছিল না। আপনি সৌজন্যও বোঝেন না, বা সৌজন্য সাক্ষাতের সময় কোলাকুলির নামে অস্বস্তিকরভাবে জড়িয়ে ধরতে চান। এতে একসময় সবাই আপনাকে কিন্তু এড়িয়েই চলবে। কিন্তু আপনার মনে ধারণা, আপনি নিজে বিরাট একটা কিছু। ভারত বিরাট কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে গেছে যেন। তাই কি? কোনো দেশের জন্য বিরাট কিছু হওয়ার মানে একটাই- প্রথমত অর্থনীতিতে বিরাট কিছু হওয়া। কিন্তু ভারত কি অর্থনীতিতে বিরাট কিছু হতে পেরেছে? না তা ভারতও কখনো দাবি করেছে বলে শুনিনি। তাহলে এই আত্মপ্রবঞ্চনা কেন?

    এটা ত একদিন হওয়ারই ছিল! কিছু কথা সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে হয়। যেমন,  ভারতের সাথে বাংলাদেশের “অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ” বা “ঘনিষ্ট বন্ধুর” বা “রক্তের” সম্পর্ক কবে ছিল? মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে যা কিছু ছিল তবু সেটি কি গভীর কোনো ‘রক্তের সম্পর্ক’ না, তা কখনো বলা বা দাবি করা হতে দেখিনি আমরা। কেউ দাবি করেননি। তবে প্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠ তা অবশ্যই ছিল। আর পরে শেখ মুজিব দেশে ফিরলে সবকিছু তো আরো ফরমাল হয়ে যায়, অর্থনৈতিক দিক থেকে সময়টাও খুবই কঠিন ছিল। তেল অবরোধে পরে জ্বালানি তেলের দাম দশ গুণ হয়ে যাওয়াতে সবার অর্থনীতিরই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায়। সবাই নিজেকে কোনো মতে টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে কোনো ‘বাড়তি উচ্ছ্বাস প্রকাশ’ কি আদিখ্যেতা- কোনো পক্ষেরই ছিল না। আর মুজিবের মৃত্যুর পর সেই বাস্তবতাও অন্য দিকে চলে যায়।

    তাই, এটা কেবলমাত্র এই ২০০৯ সাল যখন থেকে ভিত্তিহীন সব কথার ফুলঝুরি শুরু হয়েছে, যার শুরু হয়েছিল দীপুমনির পররাষ্ট্র মন্ত্রী থাকার আমলে। তবে অবশ্যই এটা দীপুমনির কোন ক্রেডিট না। এটাই ছিল চীনা ঠেকানো [China Containment] ঠিকা ভারতকে দেওয়াতে প্রাপ্য তার উপহার।  উপহার পাওয়ার কথা ত ভারত পাবলিকলি দাবি করতে পারে না তাই এসব বন্ধুত্বের ভংচং, রক্তের সম্পর্ক এসব অর্থহীন বাতচিতের আমদানি করা।  এরই এক সারকথা হল –  ভারতকে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বলে দাবি করা। ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ শব্দটার ব্যবহার শেখের আমলেও কখনো ছিল না। এটা একটা ভংচং  কারণ এর মানে, এক ধরনের সোনার-পাথরের বাটি। বাটি হয় সোনার হবে না হয় পাথরের! সোনার-পাথরের বাটি কথাটা একটা ফ্রডারি। আর এই ফ্রড আর মিথ্যা কথা দিয়েই ২০০৯ সালে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল।   আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের পরে আরো অপমানজনক শব্দ ‘স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক’, এটা নিয়ে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। আর গ মাস থেকে আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন শুরু করেছে ” আমাদের বিজয়,ভারতের বিজয়। আমাদের উন্নয়ন, ভারতের উন্নয়ন – এসব অর্থহীন প্রলাপ। কেন করেছেন?  কারণ, চীনের সাথে সরকারের নতুন ঘনিষ্ট সম্পর্ক করার দরকারে। কিন্তু তাতে ভারতের বারবার বাগড়া তোলাতে ব্যাপার রি-ডিফাইন  করে দিতে বলেছে –  “ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্ক। আর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক”।  কিন্তু লাভ হচ্ছে না। এথেকেই শেষে শ্রিংলার কথিত ঢাকা সফর।

    কিন্তু ২০০৯ সালের বাংলাদেশকে ভারতের ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বলে ‘সম্পর্ক’কে কেন দেখানো হয়েছিল? এটা কি ভারতের কোনো অর্থনৈতিক অর্জন? অথবা ভারত কোনো ইনফ্লুয়েনশিয়াল দেশ হয়ে উঠেছে সেই জন্য কি? না, এর কোনোটাই নয়। কারণ বড়ভাই পিঠে হাত রেখেছিল। গ্লোবালি নতুন নেতা হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকাতে, ভারত ‘চায়না ঠেকানোর’ (চায়না কন্টেইনমেন্ট) কাজ করবে আর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তার হাতে ‘তুলে দেয়া হবে’। আর এই থেকেই ভারতের ‘মুই কী হনু’-এর শুরু। আজ কংগ্রেসের এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর লিখে বলছেন, চীন ঠেকানোতে ক্ষেপ মারতে যাওয়া ঠিক হয়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার থিংকট্যাংকের মতামতেও টান পড়েছে; বলা হচ্ছে, চীন ঠেকানো প্রোগ্রাম নেয়া ঠিক হয়নি। কেন? কারণ এর কোনো কার্যকারিতা নেই। আমেরিকার কোনই লাভ হয় নাই।  কারো অর্থনৈতিক উত্থান ‘ঠেকানোর’ জিনিস এটা নয়। তবে বলাই বাহুল্য যারা ২০০৭ সাল থেকে চীন ঠেকানো প্রোগ্রামের ঠিকা ভারতকে দেওয়ার ক্ষেত্রে কনসালটেন্সি, বা “বাংলাদেশ এক্সপার্ট”,  কিংবা আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের “বাংলাদেশে শাখা দোকান” খুলেছিলেন – এদের কাউকে এখন পাওয়া যাবে না। কেউ দায় স্বীকার করবে না।

    অথচ এটাই তো আমেরিকাও মানতে চায়নি তখন।  আর হাভাতে বাংলাদেশের কনসালটেন্সদের কথা আর কী বলব!  নিজের বউ অথবা মাকে বিক্রি করে ঐ দালালি কথিত কনসালটেন্সিটুকু যোগাড় করাই তাদের যোগ্যতা ও মুরোদ। অবজেকটিভ বাস্তবতা বুঝা ও বিশ্লেষন করার যোগ্যতা তাদের কখনই ছিল না। অথচ ঘটনা হল,    চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও প্রভাব বেড়ে যাওয়া এসব তো অবজেকটিভ বা বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা। যার মধ্যে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্ভরতা নেই। ওবামা আমলের শেষেই এই অনুভব উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল – যে চায়না কনটেনমেন্ট  প্রোগ্রাম ফেল করবেই। তাই ওবামার শেষ আমলে পুরা ২০১৬ সাল্টা সব শুনশান হয়ে গেছিল। তবে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ভাঙ্গার কাজটা করে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের জাতিবাদ। তাই ট্রাম্প এসে অকার্যকর, চায়না ঠেকানো প্রোগ্রামে ভারতের সাথে সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে দূরে চলে যান। অর্থাৎ চীনা উত্থান অবজেকটিভ। কাজেই এটা ঠেকানোর বিষয় নয় – এটা পরোক্ষে তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

    এখন ভারতের মিডিয়া জগত ও এর সাংবাদিকেরা ২০০৯-২০১৭ সাল পর্যন্ত চীন ঠেকানোর কাজে ভারতের ফলস উত্থান এবং এর নায়ক নায়ক ভাব আর এসব ঘটনার উত্থান ও পতন যদি না বুঝেন আর যদি বিশ্বাস করতে থাকেন, ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে তাতে তাদের স্টুপিডিটি কে ঠেকাবে? বিদেশ মন্ত্রণালয়ে কিছু বাড়িয়ে বলা চাপাবাজি থাকে, মোদীর ভারত হঠাত করে বিরাট পরাশক্তি হয়ে গেছে – এটা ভারতের যে মিডিয়া আর সাংবাদিকেরা বিশ্বাস করে তাদের চিন্তা করার সক্ষমতা ও যোগ্যতা নিয়ে আর কী বলব? ভারত বাংলাদেশের জন্য একটা ডোনার কান্ট্রি- এসব কথা তাঁরা  বিশ্বাস করে। এখন ভারতের সাংবাদিকদের বিশ্বাস করা-না-করা ফেলে যাচাই ও ফ্যাক্ট জেনে রাখা কী তাদের দায়িত্ব ছিল না?  কিন্তু দ্য হিন্দু’র সুহাসিনী হায়দার বা কল্লোল ভট্টাচার্য বা একালে দ্য প্রিন্টের নয়নিমা বসু ইত্যাদি এরা যেন নিজেই নিজেদের মিথ্যা কথার ফাঁদ থেকে বের হতে পারতে চান না। তাদের কে বের করবে? এরা ভারতকে বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো ঋণদাতা ডোনার কান্ট্রি বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ভারত কিসের ডোনার?

    ভারত মফস্বলের কোনো পৌরসভায়  পাচ লাখ টাকার চাপকল সরবরাহ করেছে, রাজশাহীতে ভারত তিন লাখ টাকা বৃত্তি দিয়েছে বা ছাগলনাইয়ার এক প্রাইভেট কলেজের চার লাখ টাকায় দোতলায় চার-পাঁচটা ঘর তুলে দিয়েছে ইত্যাদি। এসব হলো নাকি বাংলাদেশে  পরিচালিত ভারতের ‘উন্নয়ন কর্মসূচি’। অথচ আসাম-ত্রিপুরা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে করিডোর সুবিধা নিচ্ছে এর জন্য অবকাঠামোর ঋণ ব্যায় হচ্ছে তা বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে নিজের জনগণকে বন্ধক রেখে নিয়েছে। যাদের নিজ করিডোরের অর্থনৈতিক দায় ও খরচ বইবার মুরোদ নেই তারা নাকি ঋণদাতা! পদ্মা সেতু এবং সেতুর রেল ব্যবহার করে ভারত কলকাতা-আগরতলা যোগাযোগ শক্ত করবে।

    ভারতের এসব মিডিয়া সাংবাদিকেরা, এরা ঠিকাদার আরা ঋণদাতাকে এক মনে করে থাকেন। সেকারণে, বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে ভারতকে চীনের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে চায়, কাজ পেতে চায়। এরা ঠিকাদার আর ঋণদাতা চীনের এই দুই ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখেন আর ভাবেন, এটা আসলে কেবল চীনের ঠিকাদারি ভূমিকা। তাই ভারতকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো কোম্পানি মনে করেন। কিন্তু বুঝতেই পারেন না, চীন যদি ঋণদাতার ভূমিকাতে নাই থাকে তাহলে আর বাংলাদেশে ঠিকাদারের দরকার কী?

    তবে চীন ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে কেবল ঠিকাদারই ছিল। আর ২০১৬ সাল থেকে কম সময়ে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা হয়ে গেছে অবশ্যই। মাত্র তিন বছরে চীন ঋণ বিতরণ করেছে ২৬ বিলিয়ন ডলারের যেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল ২০ বিলিয়ন ডলারের। এটা কত পরিমাণ অর্থ এর একটা ধারণা দেয়া যাক। এর আগে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া অবকাঠামো ঋণ; ধরা যাক ১৯৯১ সালের কথা। আমরা তিন বছরে এক বিলিয়ন মানে, বছরে ৩৩৩ মিলিয়নের মত অবকাঠামো ঋণ পেলেই মনে করতাম যথেষ্ট ঋণ পেয়েছি। কারণ তাতে আর ঐসব বছরগুলোতে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতির মোকাবিলায় পড়তে হত না। সুতরাং আমাদের তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানেরা সন্তুষ্ট থাকতেন। আর এখন চীনা ঋণ তিন বছরে ২৬ বিলিয়ন, মানে গড়ে বছরে আট বিলিয়নের বেশি। অথচ ভারতীয় সাংবাদিকরা ভাবছেন,  কী সহজ বাংলাদেশে ভারত চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী দাতা দেশ হয়ে গেছে!

    আমাদের সরকারের সবচেয়ে বড় এক আত্মঘাতি ভুল হল ২০১৪ সালে, তারা ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব ভেবেছিল। ফলে ভারতের সমর্থনটাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক বলে ভেবে নিয়েছিল।  এমনকি পরখও করে নাই।  এমনকি সেই অভ্যাসে পরের ২০১৮ সালেও ভারত এই সরকারকেই সমর্থন দিক, এটা চাইতে গিয়েছিল।  কিন্তু ‘জ্ঞানী’ দিগগজ ভারতীয়রা চিন্তায় পড়ে যায় যে, বাংলাদেশে যে সরকারের পাবলিক রেটিং-ই নেই সেই ব্যক্তি আবার পরের নির্বাচনে জিতে আসবেন কী করে? এই চিন্তা করে তারা বাংলাদেশের অনুরোধ রাখেনি। ঘটনা হল, ভারতের  গোয়েন্দা বিভাগ খুবই দক্ষ তো তাই  তারা বুঝতেই পারেনি যে, নিশীথ ভোটের সাথে রেটিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

    সরকার তাই ২০১৯ সালে নিশীথ ভোটে বিজয়ী হয়ে শুরু থেকেই ভারতনির্ভরতা উপেক্ষা করে চীনের দিকে আরো ঘনিষ্ঠতার নীতি নিয়েছিল। যেগুলো এতদিন সেই ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ধমকানি আর  বড়ভাই-ইচ্ছায় কেবল মাত্র যেসব চীনা প্রকল্প ভারত এলাও করেছে কেবল তার মধ্যে সরকারকে সীমাবধ থাকতে হত। সোনাদিয়া ফেলে পায়রা নিতে বললে তা যতই গলার কাটা কীংবা অকেজো হোক তাই নিতে হয়েছে।  গত নির্বাচনের পর থেকে এটাই বিরাট পরিবর্তন গয়ে সামনে আসতেছে, ক্রমশ ।   তাই হবার কথা কোন না কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে সম্পর্ক সবার উপরে প্রভাবশালী হয়ে হাজির হবেই।  বিনা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভারত আর কত ফলস মাতব্বরি চালাবে! ‘সামআপ’ করে বললে, বাংলাদেশে কেউ ক্ষমতায় থাকতে হলে তাকে ভারতের সমর্থন পেতেই হবে – এটা এখন একেবারেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর তাতেই মূলত ভারতের কপাল পুড়েছে!  তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত চার বছরের নীতির পরোক্ষ কারণে মূলত এই অবস্থাটা তৈরি হয়েছে। আর তাই এবার নির্বাচনের পর থেকে শেখ হাসিনার সাহস করে চীনের পক্ষে ও সাথে দাঁড়ানো – এবং এটা কার্যকর আছে।।

    আবার হাসিনা নিজে নিজেই একটু কনজারভেটিভ থেকেই ইন্ডিয়া নিরভরতাওহীন থাকতে চেয়েছেন।  এর মানে হল, ভারতকে এতিম করে দেয়া নয় বা যা আগে দিয়েছেন, তা কেড়ে নেয়া নয়। কিন্তু ভারতকে  আর নতুন কমিটমেন্ট দেয়া হবে না, কোনো নতুন নির্ভরতার সম্পর্ক হওয়ার কথা না। কিন্তু এটা ভারতকে মানানো – এটাই হাসিনার সবচেয়ে বড় অস্বস্তি।  মোমেনকে টুঙ্গিপাড়া পাঠিয়ে খুবই গুরুত্ব দিয়ে স্পষ্ট করে  – ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্ক। আর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক” – একথা বলার পরেও  কিন্তু লাভ হচ্ছে না। বান্দরকে একবার মাথায় তুললে এমন বিপদই হয়!
    আর এর ফাঁকে, চীন নিজেকে বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক এবং বিশেষত এপর্যন্ত নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প ইতোমধ্যে রিভিউ করে নিয়েছে। তাই আবার নতুন অবকাঠামো ঋণ দিতে চীন রেডি। সাথে এবার চীন কিছু হোমওয়ার্কও করে এসেছে।

    নতুন করে তিস্তা প্রসঙ্গঃ
    আগেই বলেছি ভারত যে বাংলাদেশকে তিস্তার কোনো কিছুই দেবে না- সেটি ২০০৯ সালের আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। পানি টেনে নিয়ে গিয়ে যেখানে ভারতের আর নতুন করে কিছুই করার নাই; যা নেয়ার তা সব করা হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আর কোনো দিন ভারতকে হাত লাগাতে হবে না। তবু প্রণব মুখার্জি তিস্তা চুক্তি করবেন বলে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এটাই হল সেই ঠান্ডা মাথার ফ্রডারি। তিনি চেয়েছিলেন হাসিনা সরকারের সাথে একটা চুক্তি সই করতে যার কোনো বাস্তবায়ন মূলত ভারত কোনো দিন করবে না। মমতা দোষ দেবেন কেন্দ্রকে আর কেন্দ্র দোষ দেবে মমতাকে- এভাবেই পার করে দেয়া হবে সময়।

    এ কারণে ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নির্ধারিত ঢাকা সফরের তিন দিন আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব কলকাতায় সফরে গিয়েছিলেন। গিয়ে মমতাকে জানান, তিনি যেন কোনো আপত্তি না তোলেন তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে। কারণ তাকে বাংলাদেশকে ‘ত কোন পানি দিতে হবে না’। কিন্তু মমতা বলেন, এই অসততার চুক্তি করতে তিনি মনমোহনের সাথে বাংলাদেশে যাবেন না। বেকে বসেন, এমন কাজে তিনি সম্পৃক্ত হতে অপারগতা জানান। আর সেখান থেকেই সব দায় মমতার উপরে চাপিয়ে কংগ্রেস সরকার দায় সারে চলছে কংগ্রেস, বিজেপি সকলেই। আর এদিকে আমাদের গওহর সাহেব পন্ডিত মানুষ গভীর আস্থার সাথে চুক্তিটা ধরে বসে আছেন – আয়েগা কোন এক ছোটা প্রণব মুখার্জি আয়েগা, পানি লায়েগা!  উনি আজও বুঝতেই পারলেন না পানি দেওয়া আর একটা পানিচুক্তির কাগজ পুরাই সম্পর্ক হীন বিষয়। তিনি কোন ফ্রডের পাল্লায় পরেছেন সেটা আজও বুঝতে পেরেছেন মনে হয় না। যদিও পারা না পারায় আর কিইবা এসে যায়!  রের চেয়ে নেত্রীই ভাল – একশনে বিশ্বাসী। তাই নতুন তিস্তা প্রকল্পের দিকে রওনা দিয়েছেন।  অতএব হাসিনা নতুন তিস্তা প্রকল্পে আবার ভারতকেও ওয়াকেবহাল রাখবেন   শ্রিংলার এই মহান খায়েস?  – না না – এটা নেত্রিকে খুবই আন্ডার এস্টিমেট করা হবে। তাঁর দোষ আছে, ক্ষমতার জন্য যেকোন কিছু করতে চাওয়া আছে, বন্ধুত্ব কী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের লমছোম কথা আছে – কথা সত্য। কিন্তু কে নিজেকে দেখতে চায় যে অন্যেরা তার মাথায় কাঠাল রেখে খাচ্ছে!

    চীন এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশে কী ফ্রড করেছে তার পুরোটাই ওয়াকিবহাল। তাই সে বাংলাদেশকে এই প্রকল্প সাহায্য দিয়ে হাত বাড়িয়েছে। আর স্বভাবতই এই প্রকল্প বাই ডিফল্ট ভারতবিরোধী এবং বাংলাদেশে জনপ্রিয় হবে আর ভারতীয় চাতুর্যকে আরো ভালো করে সামনে তুলে ধরবে। এগুলোই চীনের হোমওয়ার্ক বা পুরনো প্রকল্প রিভিউ। অর্থাৎ এভাবে প্রায় আরো নয়টা নতুন প্রকল্প নিয়ে চীন আগাচ্ছে যাদের মোট মূল্য ৬.৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও একটা বড় খচখচে কাঁটা আছে।  নতুন তিস্তা প্রকল্প পরিবেশগত দিক থেকে জবরদস্তি নয় সত্যিকারের  গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও স্বচ্ছ নয়। যদিও প্রকল্পের ডিটেইল করতেই এখনও অনেক কিছুই বাকি।
    অতএব, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা ‘উন্নয়ন-ই’ দিতে গেলে, নিজের কর্মীদের খাওয়াতে গেলে, চীনই তাদের একমাত্র ভরসা। সেটা কিন্তু ফিকসড হয়ে আছে।

    চীনকে নতুন করে স্থানীয় মিডিয়ায় মুল্যায়নঃ
    ঢাকার কোনো কোনো রিপোর্টে চীনের এই ‘নতুনভাবে’ হাজির হওয়াটাকে চীনের বাংলাদেশে শুধু অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও জড়িয়ে পড়া বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এটা একেবারেই ওভার-রিডিং বলে মনে করার শক্ত কারণ আছে। এ ছাড়া অনেকে আবার এখানে অনেকদিন আগে থেকেই ভারতের প্রভাব এবং তা ও আবার একচেটিয়া প্রভাব ছিল বলে অনুমান করে কথা বলছেন দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের অনুমানও ভিত্তিহীন। এরা চায়না কনটেনমেন্ট প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানেনই না সম্ভবত। আর কনসালটেন্ট যারা জানেন তারা কোন সুখে নিজের দালালি জীবনের কথা শেয়ার করবেন?  ভারতের প্রভাব কোথা থেকে আসবে? ভারতের প্রভাব মানে সেটা তো অবশ্যই অর্থনৈতিক সক্ষমতা। তো ভারত কবে অর্থনৈতিক শক্তি ছিল, যার অর্থনীতি নুন আনতে পান্তা দুরায়? যারা এসব কথা বলেতারা কী বলছে নিজেরা দুদন্ড চিন্তা করে বলে না।
    এক কথায় বললে, প্রথমত চীনের বাংলাদেশে ‘রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়া’ কথাটার কোনো ভিত্তিই নেই। এ জন্য যে, চীনের রাজনৈতিক ভূমিকা মানে কী- কোন টাইপের রাজনীতির প্রতি ফেভার দেখানো? যেমন আমেরিকান টাইপ হলে এর মানে হলো হিউম্যান রাইটস সুরক্ষা করতে হবে এবং প্লুরালিজম চর্চা করতে হবে- এরকম? কথা এরকম চিন্তা করে বলতে হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে চীনের এখনো এমন কোনো “বিশেষ পছন্দের’ টাইপের রাজনীতি নেই। মূল কারণ, হিউম্যান রাইটস এখনো কমিউনিস্টদের চিন্তার সাথে কম্পিটিবল বলে মনে করা হয় না।
    তবে কি চীনের রাজনীতি মানে আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি আগ্রহ?  না অবশ্যই না।  সে সুযোগও নেই। কারণ যে চীন গ্লোবাল নেতা হতে চায়, সে কেবল একটা নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নিয়ে দাঁড়াতে পারে না। এটা আত্মঘাতী কারণ, চীনকে সবার নেতা হতে হবে।

    আর ওদিকে আগের আমেরিকার নেতৃত্বের জমানাতেও এশিয়ায় ভারতের কখনো একচেটিয়া প্রভাব ছিল বলে অনুমান- এসব কথা অমূলক। খুব সম্ভবত তারা ভারতের একালে চীন ঠেকানোর ‘ক্ষেপ’ নেয়ার কথা মনে রেখে এগুলো বলছেন।  কিন্তু সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক ও অকার্যকর হয়ে গেছে। নিজেরাই প্রমাণিত হয়ে গেছে বলে, সেই ২০১৭ সালে। কাজেই আমেরিকার কাছে ভারতের আর কোন গুরুত্ব নাই।  ভারতও সেই আগের মতোই গুরুত্বহীন আম-ভারত হয়ে গেছে। কারণ, এতে আমেরিকার কড়া এক আক্কেল হয়ে গেছে। কারণ এর সুযোগে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকাকেই বাইরে রেখে সব স্বার্থলাভের বাইরে রেখে ঢাকা-দিল্লি রুল করে গেছে। এছাড়াও এদিকে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট হয়েছে প্রচুর। টিআইবি, আর সুলতানা কামালরা মিলে এখন এন্টি-ইন্ডিয়ান হয়েও সুবিধা করতে পারছে না। তারা এখন অভিযোগ করেছেন সবাই নাকি কয়লা বিদ্যুৎ করে পরিবেশ নষ্ট করছেন। তা ভালো। কিন্তু ভাসুরের নাম নেন না কেন? দোষ ধরেন চীন আর ভারতের। মাতারবাড়িতে জাপান আর তার সাথে আড়ালে আমেরিকা কী নাই? তারাও কী কয়লা বিদ্যুৎ করছে না? কাকে এগুলো মিথ্যা বলেন? কাজেই, এতে হবে না। ফ্রেশ সৎ ইমেজ লাগবে।

    তবে আগামীতে মানে নভেম্বরের পরে এবং জানুয়ারি থেকে আমেরিকা আবার নিজের গ্লোবাল ভূমিকা ফিরে পেতে চেষ্টা করবে। তা কতটা ফিরে পাবে তা দেখতে হবে। তবে আগামী দিনে ভারতকে আর আমেরিকার বগলে দেখা যাবে না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।  আর যদি আবার এই ভুল করে তবে এবার প্রকাশ্যে মার খেতে হবে আমেরিকাকে!

    আর ভারত? বাংলাদেশে ভারতের দিন শুকিয়ে গেল। মনে হচ্ছে সরকারের মোহ কেটে গেছে। তাহলে কি একটা যুগ, একটা পর্বের সমাপ্তি ঘটল? আমাদের আক্কেল কী হয়েছে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২২ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বাংলাদেশ কি এবার সচেতন হতে পারবে?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কোল্ড ওয়ার ‘টু’ বলে কিছু ঘটবে না

    কোল্ড ওয়ার ‘টু’ বলে কিছু ঘটবে না

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-39k

     

    কোল্ড ওয়ার ‘টু’ সিনেমা

    ‘কোল্ড ওয়ার’ [COLD WAR]; যার সরাসরি আক্ষরিক বাংলা কেউ কেউ করেন “ঠাণ্ডা যুদ্ধ”। তবে তাতে এর অর্থ খুব একটা পরিষ্কার হয় না। এছাড়াও আরেকটা বাংলা অনেকে করেন – “স্নায়ুযুদ্ধ”। নার্ভে লাগে এমন টেনশন অর্থে নার্ভ বা স্নায়ুতে চাপ ফেলে যে যুদ্ধ। কিন্তু কোনোটাই অর্থ ঠিক পরিষ্কার করে না। তবে কেন কোল্ড ওয়ার নাম – এর ব্যাখ্যাটা একটা পাওয়া যায় যে, ‘যুদ্ধ’ বলতে আমরা যা বুঝি তাকে যদি ‘হট ওয়ার’ বলে বুঝি তবে যেটা ঠিক যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধের মতই একটা রেষারেষি অস্থিরতা আর সব সময়ের জন্য লেগে থাকা টেনশন – এ অবস্থার নাম দেয়া যায় ‘কোল্ড ওয়ার’। এই হলো সূত্র। আর কোল্ড ওয়ারের মূল দুই বৈশিষ্ট্য হল যখন দুই দেশের মধ্যে ঠিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বা সেনা সমাবেশ নয়, কিন্তু যুদ্ধকালীন সময়ের মত একটা বিরাট টেনশন সব সময় সক্রিয় থাকে। এছাড়া সব সময়ই একপক্ষের কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অপরপক্ষ এক পাল্টা পদক্ষেপের কথা চিন্তা করতেই আছে – এমন অবস্থা। তবে একটা কথা মনে থাকতে হবে যে, কোল্ড ওয়ার বলতে অবশ্যই আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার ব্যাপার হিসাবেই তা কেবল হাজির হয়েছিল। আর এই প্রতিযোগিতা মূলত পরাশক্তিগত লড়াই, গ্লোবাল ইকোনমিক ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডারের নেতা হবার লডাই নয়। কারণ গ্লোবাল বাণিজ্যের কী হবে, চলবে কী করে কি ব্যবস্থায় এটা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সারা কমিউনিস্ট জগতের কারই ভাববার এজেন্ডা নয় বা কমিউনিস্ট রাজনীতিই নয়।  কাজেই সাকথায় কোল্ড ওয়ার মূলত পরাশক্তিগত – গ্লোবাল ক্ষমতা বাড়ানোও প্রভাব বাড়ানোর লড়াই যা অর্থনীতিগত কোন কিছুই নয়।

    কেন এরকম?
    সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিনের রুশ কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছিল ১৯১৭ সালে। এ সময়টা ছিল এমনই যখন সে দেশে কী হচ্ছে সে দিকে মনোযোগ দেয়ার অবস্থায় ছিল না ইউরোপের কেউ; মানে ইউরোপের কলোনি দখলদার মালিকদের কারো। কারণ এর চেয়েও বড় স্বার্থ নিয়ে তারা সবাই ডুবে ছিলেন। সেটা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মাতব্বরেরা সবাই যুদ্ধে যার যার স্বার্থ নিয়ে একেবারেই ডুবে ছিল, যে যুদ্ধ চলেছিল ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সময়কালজুড়ে। এই যুদ্ধে জার্মানিকে সামলাতেই ইউরোপের বাকিরা কঠিন হিমশিম অবস্থায় পড়েছিল। আর এ সুযোগ নিয়ে সবাব অলক্ষ্যে লেনিনের বিপ্লব বা ক্ষমতা দখল সম্পন্ন হয়ে যায়। সেই থেকে আলাদা রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেশ বলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপের ঘটনাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই কাটিয়ে দিয়েছিল। এরপর ১৯৩২ সাল থেকে জার্মানিতে হিটলারের উত্থান আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) শুরু, এ দুই ঘটনার উদয় হওয়া পর্যন্ত ইউরোপের কেউ তাকিয়ে দেখার ফুরসত পাননি যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে ঠিক কী ঘটেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সোভিয়েত আর (হিটলারের) জার্মানির মধ্যে অনাক্রমণ চুক্তি থাকলেও হিটলার সোভিয়েত আক্রমণ করেছিলেন। তখনো আমেরিকা যুদ্ধে কোনো পক্ষেই অংশ নেয়নি। ফলে হিটলারবিরোধী অ্যালায়েন্স বা মিত্রবাহিনী যুদ্ধজোট জন্মের তখনো কোনো খবর ছিল না। যুদ্ধ শুরুর প্রায় তিন বছর পরে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকে সোভিয়েতরা আমেরিকার সাথে একই জোট পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ঠিকই।  কিন্তু ততদিনে হিটলারের হাতে সোভিয়েতের ক্ষয়ক্ষতি  হয়ে গিয়েছিল অনেক। তবু ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি মিত্রবাহিনী গঠনের শর্তাবলিতে স্বাক্ষর দিতে সোভিয়েত রাশিয়া ব্যাপারটাকে বিরাট সুযোগ হিসাবে নিয়েছিল। পরের চার বছরে ১৯৪৫ সালের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে এলে এবার সারা পশ্চিমের এই প্রথম নজরে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি। সব কিছু সরকারি মালিকানায় আনতে হবে – আমেরিকা ও ইউরোপের সব রাষ্ট্রের কাছে এটাই মূলত ভীতি আর এটা একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে বলে এটাকে তারা হুমকিরূপে দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমের এসব আপত্তি  প্রকাশ্য না এনে বরং তারা বাইরে বলার সময়  বলত, কমিউনিস্ট দেশে নাগরিক অধিকার না দেয়া, মানুষকে কথা বলতে না দেয়া, দমিয়ে রাখা, ন্যূনতম স্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি চাপের অভিযোগ তুলত।
    এমনিতেই অবশ্য ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে আমেরিকার সাথে সোভিয়েতের যুদ্ধজোটের সময়ের সম্পর্ক ঢিলা হতে শুরু করেছিল। এ ছাড়া প্রথম মনোমালিন্য দেখা দেয় জার্মানি ভাগ করা নিয়ে। এ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধে ভেঙে পড়া  অর্থনীতি – অবকাঠামো আর শিল্প-প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসনের জন্য আমেরিকা এক বিশাল, খুবই কম সুদের অবকাঠামো ঋণ প্রকল্প নিয়েছিল, যা ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত ছিল। আমরা বলতে পারি, বিশ্বব্যাংক জন্মের পরে কাজ শুরু করে প্রথম হাত পাকিয়েছিল এই মার্শাল প্ল্যান বাস্তবায়ন করেই। এরপর ষাটের দশকের শুরুর দিকে ইউরোপে অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। কিন্তু মূল কথা হল,  মার্শাল প্ল্যানের ব্যাপারে স্টালিনের আপত্তি ও অস্বস্তি ছিল। স্বভাবতই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে যাওয়া মানেই ঐ সব ইউরোপীয় দেশে আমেরিকান প্রভাব বাড়বে, এটাই ছিল তার অস্বস্তির কারণ। কিন্তু এতে স্টালিনের বাস্তবে কিছুই করার ছিল না। কারণ যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, রেল বা কলকারখানা ইত্যাদি নিয়ে ইউরোপের বসে থাকা বা ধুঁকে মরা তো চলতে পারে না। আবার কমরেড স্টালিনের মুরোদও ছিল না যে নামেমাত্র সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে কোনো অবকাঠামো ঋণ দেয়। আবার ঋণ দেয়া তাদের চোখে ‘পুঁজিবাদী কারবার।’ ফলে তা কমিউনিস্টদের দৃষ্টিতে, পাপকাজ। এ অবস্থাটা ছিল ‘মিয়াবিবি রাজি’র মত। ঋণদাতা আমেরিকা আর গ্রহীতা ইউরোপ রাজি। কাজেই তা ঠেকাবে কে?
    ওদিকে ইরানের তেল তোলার কন্ট্রাক্ট পাওয়ার জন্য সোভিয়েতের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপের জোটের প্রতিযোগিতা নিয়ে টেনশনও শুরু হয়ে গিয়েছিল।
    কাজেই আমেরিকার সাথে স্টালিনের টেনশন বেড়েই চলছিল। এর মধ্যেই ১২ মার্চ ১৯৪৭ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান তার ‘ট্রুম্যান ডকট্রিন’ আমেরিকার কংগ্রেসে ঘোষণা করেছিলেন। এর সার কথা হল, ‘কমিউনিজম ঠেকানো [containment] – কমিউনিজম’ ঠেকাতে হবে। ট্রুম্যান বললেন, কোনো রাষ্ট্র কমিউনিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে চাইলে তিনি তাদের সাহায্য করবেন। এ কাজই তিনি ১৯৫২ সাল পর্যন্ত চালিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে এই প্রথম টানা ২০ বছর পরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ক্ষমতায় আসেন। তারা আরো সবলভাবে ‘কমিউনিজম ঠেকানো’ নীতি কার্যকর করে গেছেন। আর তখন থেকেই সোভিয়েত-আমেরিকান ঠাণ্ডা যুদ্ধ আরো প্রবলভাবে জেগে উঠেছিল। ১৯৯১-তে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তা বজায় ছিল। তার মূল কারণ হল, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের। আর সেখান থেকেই ঘটনা এবার তৃতীয় মাত্রায় উন্নীত হয়।
    আসলে, ততদিনে এ দুই রাষ্ট্রের হাতে দুনিয়াকে কয়েকবার নির্মূল করে দিতে সক্ষম, এমন পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ হয়ে গেছিল।

    কিন্তু তাতে আগে যেমন মনে হত  নানান কিসিমের অস্ত্রের  মজুদ হাতে আসা মানেই নিরাপত্তা বোধ জগত। কিন্তু তখন এই প্রথম মনে হতে লাগলে যে না অস্ত্রই নিরাপত্তাহীনতার কারণ। কারণ দুপক্ষই এই ভেবে  প্রচণ্ড মাত্রায় ভীত হয়ে পড়েছিল যে, কোনো ভুলচুক হয়ে গেলে বা ছোট ঘটনায় যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়ার কারণে একপক্ষ যদি অপরের ওপর বোমা ফেলে, তা হলে কী পরিণত হবে? এতে এবার কোল্ড ওয়ার শব্দটার উপর তৃতীয় আরেক বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছিল। যুদ্ধ লেগে যায় কি না এ নিয়ে সর্বক্ষণ টেনশন ছিল আগের এই বৈশিষ্ট্ তো ছিলই। আর এখন কে কার মাথায় পারমাণবিক বোমা ফেলে দেয়; এমনকি ভুলেও যদি হয়ে যায়? সেই দুশ্চিন্তাই সেই তৃতীয় বৈশিষ্ট্য।
    একটা কথা বলে রাখি। স্টালিন বা পরবর্তীকালের সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধানরা যে নীতি অনুসরণ করে গেছেন তা হলো, মূলত আমেরিকা থেকে কোন অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কোন ব্যবসায়িক পুঁজি (এফডিআই) নেয়া যাবে না এবং কেউ নিলে এর বিরোধিতা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো কলোনি লুটেরাদের হাতে সব ফোকলা হয়ে যাওয়া আমাদের মত দেশের সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার ফলে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ পুঁজি পাওয়া এসব দেশের জন্য মৌলিক প্রয়োজন। অথচ এটাই সোভিয়েত বা কমিউনিষ্টরা মেনে নিতে চায়নি। তাদের পয়েন্ট হল, এতে আমাদের মতো দেশে আমেরিকান প্রভাব বেড়ে যাবে, তাই তারা এতে একমত নন। কিন্তু  তাহলে আমাদের পুঁজি পাওয়ার বিকল্প উপায় কী? না, এ নিয়ে সোভিয়েত নায়কদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
    কিন্তু এর একটা মজার পরিণতি ঘটে গিয়েছিল সত্তরের দশকে। আমাদের সবার লিডার হয়ে এখন সামনে হাজির হতে চাইছে চীন। এর আনুষ্ঠানিক শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সাল থেকে। যখন চীন আমেরিকান পুঁজি গ্রহণের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। তবে এর অনেক আগে চীনকে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হয়েছিল, ১৯৫৮ সালেই। সোভিয়েত ইউনিয়নও ‘আরেক কিসিমের সাম্রাজ্যবাদী’ দেশ বলে চীন অভিযোগ তুলেছিল; যার নাম দিয়েছিল ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’।
    আমরা আমাদের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এরপর পুরো আশির দশকটাতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের আয়-ইনকাম রাজস্ব কমতে শুরু করেছিল, বিশেষ করে কারখানা উৎপাদন যেখানে মালিকানা মাত্রই সরকারি ছিল। মূলত উৎপাদনে অদক্ষতার দরুন এটা ভেঙে পড়া শুরু করেছিল। আর এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে অন্য সব কিছু মিলিয়ে ফেল করাতে ১৯৯১ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। রাশিয়া বাদে আরো ১৫টি আলাদা রাষ্ট্রে সোভিয়েত মহারাষ্ট্র টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
    সবচেয়ে বড় কথা, কোল্ড ওয়ার জিনিসটারও পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে।

    কোল্ড ওয়ার ২.০
    সেকালে কোল্ড ওয়ারের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা একালে এখানে আবার বয়ান করতে নিশ্চয় বসিনি। তাহলে? অন্তত গত ছয় মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উঠতে বসতে চীন-ব্যাশিং বা চীনকে গুঁতা দেয়া একবারে চরমে নিয়ে গেছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের পুরো চার বছর (২০১৭-২০) চীন বিরোধিতার বাণিজ্যযুদ্ধ সারা সময়ই কমবেশি ছিল। এমনকি এ বছরের শুধু চীন-আমেরিকার আপসী বাণিজ্যচুক্তির প্রথম ভাগও দু’পক্ষ স্বাক্ষর করে রেখেছে। কিন্তু আর কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্প করবেন না নির্বাচন পর্যন্ত। কারণ তার বিশ্বাস একমাত্র চরম ও কড়া চীনা ব্যাশিং করলেই তিনি ভোটে হেরে যাওয়ার অবস্থার মুখে, একমাত্র সম্ভাবনা হিসেবে পরিস্থিতি নিজের দিকে ঘোরাতে পারেন।
    সে যাই হোক, নির্বাচনে জয়-পরাজয় তো একটা হবেই। কিন্তু এর আগের যে ভাষ্যটা ক্রমেই প্রবল হচ্ছে সেটা হল, কোল্ড ওয়ার আবার নাকি ফিরে আসছে। দেশের-বিদেশের মিডিয়াতেও প্রায়ই এমন লেখা দেখা যায়। অনেক সিরিয়াস লেখক বা মিডিয়া এমন ভুল করতেছেন।  ইতোমধ্যে ২০১৬ সালে কোল্ড ওয়ার টু – এই নামে একটা প্রপাগান্ডা সিনেমাও হয়ে গেছে। তাই বুঝুক না বুঝুক পেটি মধ্যবিত্ত জোশও একটা তৈরি হয়েছে।  ্বসবের মুল বক্তব্যটা হল, যেহেতু  চীন-আমেরিকার মধ্যকার এবারের হবু টেনশন-সঙ্ঘাত ভালই চড়ছে দেখা যাচ্ছে তাই এর কোন বৈশিষ্ট লক্ষ্মণ বিবেচনা ছাড়াই নিজের আতলামি প্রকাশের জন্য এটা বলা শুরু করে দিয়েছে  যে কোল্ড ওয়ার ২.০ আসতেছে।

    এনিয়ে আমার প্রথম মন্তব্য হল, আমাদের পরিচিত একমাত্র দুনিয়াটাতে আবার নতুন করে কখনো কোথাও কারো সাথে কারো আর কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক তৈরি হবে না, তা দেখা যাবে না।

    কাজেই যারাই কোল্ড ওয়ারের কথা আবার তুলছেন, তারা সময় ও পরিবেশ মিলিয়ে যাচাই করে না দেখেই মুখস্থের মতো এসব কথা বলছেন। তাদের উচিত হবে, কেন সোভিয়েত-আমেরিকা একটা কোল্ড ওয়ার সম্পর্কে জড়াতে পেরেছিল, তার পেছনের অবজেকটিভ বা বাস্তব শর্ত কী ছিল আগে তা খুঁজে দেখা।
    কথাটা সরাসরি বললে, সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য বিনিময় ছিল না। এটাই হল সবচেয়ে নির্ধারক বাস্তবতা। এ কারণে কোল্ড ওয়ারের মতো চরম বিরোধাত্মক সম্পর্কে যাওয়ার বাস্তব শর্ত সেকালে তৈরী ছিল, যা এখন আর নেই। আর কখনো ফিরেও আসবে না। এর বিপরীতে আজকের পুতিনের রাশিয়া আর ভেঙে তৈরি হওয়া ১৫টি রাষ্ট্রসহ সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য। মানে একই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের সদস্য।  যখন লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না বলেই  এক রাষ্ট্র অপরের রাজধানীতে বোমা ফেলে আসার কথা অবলীলায় ভাবা তখন সম্ভব ছিল। কারণ পরস্পরের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলেই অপরের মাথায় বোমা  নিজের ক্ষতিগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু আজ আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট চীনের বাজারে বিনিয়োগ করে ছেয়ে আছে। তাই চীনের মাথায় বোমা মারতে হলে এর আগে য়ামেরিকাকেই অনেক কিছু ভাবতে হবে। নিজের স্বার্থের মাথায় কে বোমা ফেলে?কারণ আজ সেটা নিজ দেশের বা স্বার্থের প্রতিষ্ঠানের ওপরই বোমা মারা হয়ে যেতে পারে। কাজেই আজকের সম্পর্ক নতুন করে অন্য কিছু একটা হলেও হতে পারে; কিন্তু পুরনো কোল্ড ওয়ার আর হবে না।

    এছাড়াও ফারাক আরও অনেক আছে। সোভিয়েত বনাম আমেরিকার বিরোধ ছিল পরাশক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতিযোগিতা। কিন্তু আজ চীন-আমেইরিকার বিরোধ গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্বের যেখানে আমেরিকা নিজের গবেষণা থেকে জানে সে হারু পার্টি। কাজেই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে টেনশন দেখলেই সেটাকে কোল্ড ওয়ার বলে দিজ্ঞজি বুঝ তুলে কথা বলতে হবে,  এটা কোন ভাল কথা না।

    দুনিয়াতে কোল্ড ওয়ার আর ফিরবে না। এখন চাল-ডাল মিশে যাওয়ার মত অবস্থায় আমরা যখন একবার তা মিশিয়ে দিলে যেমন তা আবার চাল-ডাল আলাদা করা কঠিন, সেরকম আমরা সবাই গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অধীনে চলে গেছি বলে চাইলেই অনেক কিছু করা যাবে না। আবার পুজিঁ-পণ্য শ সবকিছু ভাষা পর্যন্ত লেনদেন বানিজ্য বিনিময়ে বন্ধের জায়গায় ফিরে যেতে পারব না। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বলছেন, তিনি সম্পর্ক ভালো করতে চীনের দিকে আগাবেন না। কিন্তু নির্বাচনের পরে ট্রাম্পই জিতে গেলে অথবা যেই জিতুক, আবার চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক হওয়া খুবই সম্ভব। এই যে আগে-পিছে করার সুযোগ নিতে পারি এখন, এটা পুরনো কোল্ড ওয়ারের আমলে সম্ভবই ছিল না। কাজেই না-বুঝ অবুঝ কোল্ড ওয়ার নিয়ে কথা বলতে সাবধানতা   নিতেই হবে। যা মনে চায় বলা যাবে না, ভেবেচিন্তে বলতে হবে। কাজেই আমরা আশা করব সকলে এবিষয়ে দায়ীত্ব নিয়ে কথা বলবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৫ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “কোল্ড ওয়ার ‘টু’ হবে কি?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

    ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার,

    আপডেটেড ১৭ জুলাই, ২০১৯ ১৭:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2CP

    –

    একালে আপনি কার দিকে? চীন, আমেরিকা নাকি ভারতের? সাথে রাশিয়ার নামটা নিলাম না, সেটা একটু পেছনে পড়েছে বলে। তো চীন, আমেরিকা নাকি ভারত – এই প্রশ্নের জবাব হল – একটাও না। আর সরাসরি বললে, জবাবে এখানে বিকল্প শব্দটা হল “ভারসাম্য”। কারও দিকে ঝুঁকে পড়া না, কান্নি মারাও না – বরং একটা ভারসাম্য। নিজের স্বার্থের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা ভারসাম্য। এই অর্থে এটা ভারসাম্যের যুগ।  চীন, আমেরিকা নাকি ভারত কারো সাথে নয়, এক ভারসাম্য অবস্থান বা ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট- এমন পজিশন নেয়া।

    এককালে আপনি কোন দিকে? অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে – আমেরিকা না সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) কোন দিকে অবস্থান নিয়েছে? এটা খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন ছিল। এভাবে ‘আপনি কোন দিকে’ বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বা কলোনি-উত্তরকালে ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়ায় চলতে শুরু করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা আমেরিকার নেতৃত্বে সেকালের নতুন দুনিয়া। তখনো পরাশক্তি বা দুই মেরুতে বিভাজন শুরু হয়নি। সেটা হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। শুরু হয়েছিল গ্লোব-জুড়েই এক ব্লক রাজনীতিঃ সোভিয়েত ব্লক না আমেরিকান ব্লক। এভাবে সেই থেকে ৭০ বছর আমরা পার করে দিয়েছি। ফলে আমাদের মতো দেশের ভাগ্য সেকালে লুকিয়ে ছিল ‘কোন দিকে’ বলে যার যার মতে, এক ভাল ব্লক খুঁজে নেয়ার ভিতরে। আর এই ছিল আমাদের “কোন দিকের” ধারণার জন্ম কাহিনী। এভাবেই চলছিল একনাগাড়ে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর লোকে বলতে শুরু করেছিল যে, দুনিয়া এবার এক মেরু, আমেরিকান মেরুর দুনিয়া হয়ে গেল। কথা হয়তো আপতিকভাবে সত্য, অন্তত সাদা চোখে সবার তো তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলেই তাই কী?

    ওদিকে চীনের উত্থানঃ  শুরু হিসাবে ধরলে চীনের উত্থানে আজকের চীন হয়ে উঠার শুরুটা বলা যায় সেই ১৯৬৮ সাল থেকে, যদি না ১৯৫৮ সালের তথাকথিত “সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে” এর শুরু বলে কেউ কেউ না-ই ধরতে চান। না, তথাকথিত লিখেছি, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভুয়া ছিল বা মনে করি কিনা সেজন্য না। লিখেছি কারণ, আসলে সেটা ছিল দলের চিন্তার মূল খোলনলচা বদলে দেয়া এক বদল।  কিন্তু সেটা করা হয়েছিল “সাংস্কৃতিক বিপ্লবের” নামের আড়ালে। ফলে এটা দলের পলিটবুরোর নেতাদের সাথে তৃণমুল কর্মীদের সাংস্কৃতিক ফারাক দূর করার আন্দোলন একেবারেই নয়। বরং সেটা ছিল, পলিটবুরোর নেতাদের সাথে নেতাদের লড়াই। দলের পুরানা অবস্থানের সাথে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের লড়াই। আজকের চীন বলে যেটা দেখছি আমরা এটাই ছিল সেই নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। এমনকি মাওও ছিলেন এটারই পক্ষে।
    যাহোক, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভাল না মন্দ সে তর্ক এখানের নয় বলে সেটা এখন এড়াতেই মূলত ১৯৬৮ বলেছি। যেখানে ১৯৬৮ সাল হল যখন আসলে “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” শেষে তা বিজয়ী ও মোটামুটি থিতু হবার কাল। তবুও দুনিয়া জুড়ে চীন আজকের এজায়গায় যেতে রওয়ানার এটা কোন ইঙ্গিত কিনা এমন আলোচনা কোথাও ছিল না। এর চেয়েও তখন মুল আলোচ্য ছিল কথিত “চীনা সমাজতন্ত্র” কোথায় যাচ্ছে।
    এমনকি ১৯৬৮ সালই বা কেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৮ সালেও খুবই কম একেবারেই হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া কেউ বুঝেনি যে, সেটাই আজকের চীন হওয়ার শুরু। অথচ চীনের কাছে ১৯৭১ সাল মানে আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি অনুসারে, ওর সাহায্যে চীন মানে মাও সে তুংয়ের চীন, সেই প্রথম জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর এটা ছিল ভেটো দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটা সদস্যপদ। অনেকের কাছে তথ্যটা আজব লাগতে পারে কিন্তু এই তথ্য শতভাগ সত্য। কারণ, জাতিসংঘে এই সদস্যপদ এত দিন (চীন বলতে) তাইওয়ানকে দিয়ে রাখা ছিল। আর সেটাই ১৯৭১ সালে সেবার তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মাওয়ের চীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল, আমেরিকার সাথে চীনের গোপন আলাপের ফলাফল অনুসারে। গোপন বলছি এজন্য যে ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জার [Henry Kissinger] গোপনে প্রথম “মাওয়ের  চীন” সফর করেছিলেন, আর সেখানেই ভেটোওয়ালা সদস্যপদ ফেরত পাবার বুঝাবুঝিটা তৈরি হয়েছিল।

    আরও ওদিকে ১৯৭৮ সালঃ এটা উল্লেখযোগ্য এ জন্য যে, মোটাদাগের সব দেনা-পাওনা [চীন আমেরিকান পুঁজি, বিনিয়োগ ও পণ্য ইত্যাদি নিজ বাজারে প্রবেশ করতে দিবে। এতে বিনিময়ে কী কী নিবে এরই দেনা-পাওনা] ডিল সম্পন্ন করে চীন-আমেরিকা উভয় রাষ্ট্র পরস্পর পরস্পরকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে উভয়ে একে অন্যের দেশে অফিস খুলে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ সাল থেকে। এভাবে পরবর্তিতে ১৯৯০ পর্যন্ত চীন ছিল আসলে আমেরিকান পুঁজি ও টেকনোলজি কিভাবে ব্যবহার করবে এর, আর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি ও গ্লোবাল বাজারে প্রবেশ করে চীনের নিজেকে অভ্যস্ত, সাজানো ও খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রস্তুতিকাল। আর এরও পরের প্রায় ২০ বছর ধরে চলে চীনের অর্থনৈতিক ডাবল ডিজিট (বা সময়ে এর চেয়েও বেশি) উত্থানের পর্ব। তবে ২০০৭ সালে গ্লোবাল রিসেশন শুরু হলে তা কমতে থাকে। তত দিনে আমেরিকা বুঝে গেছিল যে, চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার দিকে, তাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
    তাই ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমেরিকা আগে তা জানত না বা অনুমান করেনি। আসলে বিষয়টা ছিল জেনেও কিছুই করার নেই ধরণের পরিস্থিতি। গ্লোবাল পুঁজির এক আপন স্ববিরোধী স্বভাব এটা। চীনের জনসংখ্যার শত কোটির ওপরে (২০১৮ সালের হিসাবে ১৪২ কোটি)। এমন দেশে সত্তরের দশকেও সে ভার্জিন এই অর্থে যে তখনও সেখানে কোন বিদেশি বিনিয়োগ যায় নাই। তাই এর বাজার খুলে দিলে এর বিদেশি পুঁজি পাবার আকাশচুম্বি চাহিদা পুরণ করতে বাইরের সকলে ঝাপিয়ে পড়বে। মানে উলটা করে বললে ওয়ালস্ট্রিটের চোখে এত বড় ক্রেতা সে জীবনেও কল্পনা করে নাই। তাই চীনে বিদেশি বিনিয়োগে বাজার চাহিদা ধরতে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট একে উপেক্ষা করা কথা চিন্তাও করতে পারে না।  তাই আমেরিকান পুঁজিতে চীন ফুলে-ফেঁপে উঠতে থেকেছিল ১৯৯০ সালের আগেও,  তবে ১৯৯০ সালের পরে আরও প্রবলভাবে। এটা জানা সত্বেও যে এই পুঁজি চীনে ব্যবহৃত হবার পরে যে নতুন উদ্বৃত সঞ্চয় ও সম্পদ তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য আমেরিকাকে পিছনে ফেলে দিবে এবং চ্যালেঞ্জ করবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে চীনে প্রবেশের সুযোগ আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট উপেক্ষাও করতে পারে নাই কারণ উপেক্ষা করলে তাতে তার নিজের মরণ। মূল কথা, সব সময় নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগের ভিতরই কেবল আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট এর জীবন। তাই নতুন শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা জেনে যায় চীন উঠে আসতেছে। এটা দেখেই বুশের আমলে, ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এবার চীন ঠেকানোর [China Containment] কৌশলের তোড়জোড়। প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর (২০০৬ মার্চ) থেকে ভারত আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর কাজ হাতে নেওয়ার ব্যাপারটা আর একধাপ আগিয়েছিল। আর তখন থেকেই ধীরে ধীরে আপনি কোন দিকে অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে, সেটা বুঝতে পারা ও জবাব দেয়া আর আগের মত সহজ থাকেনি। কেন?

    আপনি কোন দিকে, এর জবাব দেয়া শুরুর সেকালে সহজ ছিল। কারণ, আমেরিকা নাহলে সোভিয়েত – এদুটোর কোন একটা মেরু বা পরাশক্তি আপনি বেছে নিলেই হত। কিন্তু একালে ব্যাপারটা আর মেরু বা পরাশক্তি-কেন্দ্রিক বিষয় নয়। যেমন – আপনি কোন দিকে চীন, আমেরিকা নাকি ভারত? এই প্রশ্নের মধ্যে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কাউকে পরাশক্তি গণ্য করা নাই বা হয়নি। একালে কেউ পরাশক্তি কি না তা এখানে মুখ্য বিষয়ই নয়। মুখ্য বিষয় গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা বা নেতৃত্ব কার, সেখানে। ফলে তা আসলে এখন মূলত পুরনো নেতা আমেরিকার জায়গায় নতুন হবু নেতা চীনের যোগ্য হয়ে দখল নেয়ার ইস্যু।

    এই হিসাবে এখানে নেতা বা কেন্দ্র দুইটা – চীন ও আমেরিকা। তাহলে, সাথে ভারতের নামও আসছে কেন? কারণ, ভারত আমেরিকার হয়ে সে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটত। প্রতিদান হিসেবে পেয়ে গেছিল বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান ছড়ি ঘুরিয়ে মাতবরি। এছাড়াও আর একটা দিক হল, চীনের প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যার দেশ হল ভারত। ফলে এখনই না হলেও ভারত পটেনশিয়াল বা আগামীর সম্ভাবনা ভাল, এমন অর্থনৈতিক হবু শক্তি; এতটুকুই। তাতে সব মিলিয়ে ভারত ভেবেছিল এভাবেই দিন যাবে “চীন ঠেকানোর” বোলচালের মধ্যে থাকবে আবার চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ খুললে তাতে চীনের পরই বড় মালিকানা শেয়ারটা চীন ভারতকেই দিবে। ব্যাপারটা সেই কবিতার মতো যেন বলছে – “এভাবে কি দিন যাবে তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে অথচ তোমার কথা না ভেবে!’ ভারত আগামি গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা চীনের কোলে শুয়ে অথচ আমেরিকার কথা ভেবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারবে – তাই ভেবেছিল।
    কিন্তু না একালে দিন তেমনভাবে যায়নি। যাওয়ার কথাও ছিল না। এখন ফলাফল হল বাংলাদেশ আমেরিকার হাতছাড়া, উল্টা বাংলাদেশ এখন ভারতের কোলে, সেটা সত্য। কিন্তু ওদিকে আবার ট্রাম্পের আমলে এসে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটাতে ট্রাম্পের আমেরিকাই আর আগ্রহী নয়। উল্টো চীনের মত ভারতের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প বাড়তি শুল্ক আরোপের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। যেখান থেকে ভারত আবার মোচড় দিয়ে নিজের আত্মগরিমা আর ট্রমা-ভীতি পেছনে ফেলে চীনের কোলে য়ুহান সামিটে হাজির। বলা হচ্ছে, ওই য়ুহান সম্মেলন সেখানে এমন কিছু মৌলিক বোঝাবুঝির ভিত্তি নাকি তৈরি হয়ে গেছে, যা আরো বিকশিত বা বাড়তে না পারলেও নাকি পিছাবে না। আমেরিকার সাথে ভারতের পরস্পরের পণ্য অন্যের যার যার বাজারে ঢুকার বিরুদ্ধে উভয়েরই বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ফলে – এটা দুদেশেরই রপ্তানি প্রায় স্থবির করে ফেলেছে। গতমাসে জাপানে জি২০ এর বৈঠকের ফাঁকে সাইডলাইনে ট্রাম্পের চাপ বা হুমকি – মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্কারোপ গ্রহণযোগ্য নয় – এসবই একালের পরিণতি।

    কিন্তু ট্রমা- ভারতের ট্রমা [Trauma] সে ব্যাপারটা কী? বিষয়টা হল, ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের হার, এটাই তাকে বারবার বেচাইন অস্থির করে যে যদি একালে আবার সেটা হয়, এটি ভীতিই ভারতকে বারবার আমেরিকার দিকে টেনে নিয়ে যায়। চীন আগামির ফ্রেশ গ্লোবাল নেতা, তুলনায় আমেরিকা ক্রমশ ডুবে যাওয়া নেতা – এটা ভারতের অজানা নয়। তাই আমেরিকার চেয়ে আগামি নেতা চীনের সাথে আগেই গাটছাড়া বাধলে গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রভাব প্রতিপত্যি আগেই বাড়বে শুধু তাই না, আগামি দুনিয়ার যা কিছু নতুন রুল তৈরি হবে তা তৈরিতে নিজের ভুমিকা মতামত আগেই চীনের পাশাপাশি জোরদার করে রাখতে সুবিধা পাবে।  কিন্তু ট্রমার জন্য ভারত আমেরিকার দিকেই বারবার ফিরে আসে, কান্নি মেরে পরে থাকে। অর্থাৎ বলা যায়, ভারত আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ককে ভারসাম্যের জায়গা থেকে দেখে না, দেখতে পারে না। বরং আমেরিকাকে পুরনো পরাশক্তির আলোকে দেখতে চায়। কিন্তু চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব তো পরাশক্তিগত নয়। তবু ভারত আমেরিকার দিকেই কেবল ছুটে যায়। এছাড়া সবখানেই ভারতের গাছের খাওয়া আবার তলারও খেতে চাওয়ার নীতি তো আছেই। আবার তাতে সময়ে ধরাও খায়। যেমন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ট্রাম্প নিজের আফগান পলিসি প্রকাশ করেছিলেন। এতে পাকিস্তানকে সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেবার অভিযোগ দিয়ে সাজানোতে ভারত আবার তাতে ছুটে গিয়েছিল মোহে। কিন্তু না! ছয় মাস যেতেই জানা গেল ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে শেষ হাজার দশেক আমেরিকান সৈন্য, তাও এবার ফেরত আনতে চান। অথচ আফগান নীতিতে এর কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। যা হোক, সৈন্য ফেরতের চিন্তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেখল, পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া তা অসম্ভব। ফলে যে পাকিস্তানকে আমেরিকা চীনের কোলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, তাকেই আবার কুড়িয়ে নেয়া শুরু করেছিল।

    আমেরিকার আফগানিস্তান-বিষয়ক বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ [U.S. envoy Zalmay Khalilzad ] এই সেই বিশেষে দুত যিনি ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রকাশের সময় পাকিস্তানের কঠোর সমালোচক, উঠতে বসতে সন্ত্রাস লালনকারী বলেছিল। সেই তিনি এবার সৈন্য ফেরানোর উপায় হিসেবে তালেবানদের সাথে কথা বলা আর রফাচুক্তি করার চেষ্টায় পাকিস্তানের সহায়তা কামনায়  এসে এবার পাকিস্তানকেই প্রায় বাপ ডাকা বাকি রেখেছে।  এরই সর্বশেষ হল আজ ১৫ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে “আফগান শান্তি আলোচনা থেকে ভারতকে কুনুই মেরে বের করে দেয়া হয়েছে” [India elbowed out of Afghanistan peace talks]।

    আবার, সাম্প্রতিককালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান “ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স” [Financial Action Task Force (FATF)] প্রবল সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এই সংগঠন মূলত মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার যার একটা বড় অংশ জঙ্গিসংগঠনের অর্থ যোগানদাতা বলে অনুমানে এরই কাউন্টার করতে নানান পদক্ষেপ নিয়ে থাকে ও তা মনিটর করে। এতে আমেরিকার উদ্যোগে পাকিস্তানকে চেপে ধরাতে [পাকিস্তানের অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুতিমত তা নেয় নাই। তারিখ মিস করেছে।] ভারত খুবই খুশি ছিল। নিজ মনকে আশ্বস্ত করেছিল ভারত যে, হ্যাঁ অন্তত এই টেররিজম ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার এই অ্যালায়েন্স, এটাই তো ভারত চায়। এটা খুব দরকারি আর কাজেরও। এবং তারা দুই-রাষ্ট্র কত ভাল এবং তার টেররিজম ইস্যুতে একটা ন্যায্য লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। তাই তারা পাকিস্তানের মত নয়। অনেক ভাল। কিন্তু ঘটনার বাস্তবতা হল, এমন টেররিজম ইস্যু বলে আসলে বাস্তব দুনিয়াতে সত্যিকারের কিছুই নেই। টেররিজম কী, কোনটাকে বলবে, কী হলে বলবে এর এমন সংজ্ঞাই নাই – না আমেরিকার নিজের কাছে, না জাতিসংঘের। কেবল এক তালিকা আছে, কাদেরকে বা কোন সংগঠনকে তারা টেররিস্ট মনে করে। আর সেই থেকে বরং টেররিজম বলতে ভারত-আমেরিকা নিজেরা কী বুঝবে ও বুঝাবে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে “গভীর বোঝাবুঝি” আছে অবশ্যই। কাকে টেররিজম বলে চালিয়ে দিবে – সেটাই আসল সেখানে। যেমন- ২০০৭ সালে যা বলা হয়েছিল ওর সারকথা ছিল যে, বাংলাদেশকে টেররিজম মোকাবেলার যোগ্য করে সাজাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। অথচ এই “টেররিজম” কথাটি ছিল এক সাইনবোর্ড মাত্র। ভারতের মূল স্বার্থ ছিল আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাতে, তা ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা আর কলকাতা থেকে নর্থ-ইস্ট সরাসরি যোগাযোগের নানান করিডোর হাসিল করা।  সেকাজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর এককভাবে হাসিল করেছে ভারত। এখানে এককভাবে কথাটার মানে হল, করিডোর কেবল ভারতই ব্যবহার করবে, চীন পারবে না। এছাড়া সেই সাথে ভারত পুরা বাংলাদেশের বাজার দখল পেয়ে নিবে।  সার কথা ভারত কেবল “কানেকটিভিটি” “কানেকটিভিটি” বলে চিৎকার করবে, মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। কিন্তু এর মানে হবে বাংলাদেশের উপর দিয়ে কেবল ভারতই যাবে। কিন্তু ভারতের উপর দিয়ে কেউ যদি বাংলাদেশে আসতে চায়, আমরা যেতে চাই – না সেটা সে পারবে না। সেটা নেপাল, ভুটান কিংবা চীন এমন পড়শি কেউ যেই হোক তারা বাংলাদেশে আসতে পারবে না বা আমরাও যেতে পারব না। আর ভারত সব পাবার বিনিময়ে  আমেরিকার স্বার্থে ভারত এবার  “চীন ঠেকানোর” কাজে অবস্থান নিয়ে ভাড়া খাটবে। তাহলে দাঁড়াল যে এই হল ভারত-আমেরিকার টেররিজমের সংজ্ঞা ও বিশেষ বুঝাবুঝি। আর সেই সাথে সীমান্তে বাংলাদেশি মেরে শেষ করে চলবে। কিন্তু? হা আরও বিরাট “কিন্তু” তৈরি হয়েছে এখন।

    ভারত-আমেরিকার এই “বিশেষ টেররিজম-বুঝের” সাইনবোর্ড তাদেরকে অনেক কিছু এনে দিয়েছিল, বিশেষ করে তাতে ভারতের  আস্থা ছিল দৃঢ় ও গভীর। কিন্তু টেররিজম-বুঝের সাইনবোর্ড এখন তা করলার চেয়েও তিতা। কেন? বালুচিস্তান!

    বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা পাকিস্তান থেকে আলাদা স্বাধীন হতে চাওয়ার আন্দোলন অনেক পুরনো। কিন্তু এতে পাকিস্তান সরকারের সাথে কোনো নেগোসিয়েশন বা রফা-পরিণতিতে না যেতে পারার পেছনে একটা বড় কারণ হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এই আন্দোলনের দলকে [(বিএলএ), Baluchistan Liberation Army (BLA)) প্রায় খোলাখুলি সহায়তা ও সমর্থন। কিন্তু এবার এক বিরাট কিন্তু হল,  গত ২ জুলাই আমেরিকা পররাষ্ট্র দফতর বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট [Specially Designated Global Terrorists (SDGTs)] বলে ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের এক নির্বাহী নির্দেশে এটা জারি করা হয়েছে গত সপ্তাহে, ০২ জুলাই।

    পাকিস্তানে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে (বিএলএ) বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ২০০৬ সালে এই সশস্ত্র গ্রুপটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। বলাই বাহুল্য, এবারের ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে চীন ও পাকিস্তান উভয়ে স্বাগত জানিয়েছে। অথচ চিপায় আটকা পড়ে ‘কোথাও নেই’ হয়ে গেছে ভারত। বিএলএ-কে টেররিস্ট বলায় এতে চীনেরও স্বার্থ ছিল সরাসরি। কারণ, পাকিস্তানের পেট চিরে পাকিস্তানের সব প্রদেশ ছুয়ে তাদের উপর দিয়ে টানা “চীন-পাকিস্তান করিডোর” [CPEC] স্থাপনার কাজে চীনা ঠিকাদারের কর্মীরা বারবার বিএলএ’র হাতে অপহরণের বা চাঁদা দানের শিকার হয়েছে বহুবার, চলতি শতকের শুরু থেকেই। সেসময় মনে করা হত, চীন-পাকিস্তানের এমন সহায়তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ভারত  (বিএলএ)কে সহায়তা দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই নির্বাহী নির্দেশের পরে? আরও আছে!

    ট্রাম্পের বিএলএ-কে শুধু টেরর ঘোষণা করা নয়, আগামী ২২ জুলাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-ইমরানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার এক ঘোষণাও দিয়েছে হোয়াইট হাউজ, গত ১১ জুলাই। মানে ব্যাপারটা এক কথায় বললে আমেরিকার নিজের কৌশলগত অন্য কোনো স্বার্থে – এককালে আচারের আঁটির মতো চুষে রস খেয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া পাকিস্তানকে আবার এবার সমাদরে কোলে তুলতে চাইছে আমেরিকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এখানেও (বিএলএ)কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়া আসলে কোন টেররিজম ইস্যু নয়, সাইনবোর্ড মাত্র; আমেরিকার কৌশল্গত স্বার্থ মাত্র, যা আগে বাংলাদেশের মতোই। তাহলে ভারতের এখন এতে বাকশূন্য বোকা হয়ে যাওয়া কেন? যাকে কেউ কেউ বলছে তিতা ওষুধ খাওয়া। কারণ হল, ভারতের কাশ্মিরে সরকারি টেররিজমের নিপীড়ন ও হত্যার পক্ষে এতদিন ভারতের পক্ষে একটা ন্যায্যতা বা সাফাই জোগাড় করে দেয়া হয়ে যেত এই বলে যে, টেররিজমের একক হোতা হল পাকিস্তান বা মুসলমানরা। কিন্তু আমেরিকার বিএলএ-কে টেররিস্ট ঘোষণা করাতে এবং  ঘোষিত সেই দলকে খোদ ভারতই সমর্থন করত বলে ভারত হয়ে গেল এখন টেররিস্ট-সমর্থক রাষ্ট্র ; আমেরিকা পরোক্ষে এবার তাই বলে বসল।

    তাহলে এখান থেকে কী শিক্ষা? শিক্ষাটা হল, চলতি এযুগ গ্লোবাল নেতৃত্বের বিশেষত, অর্থনৈতিক নেতৃত্বের নেতা বদলের যুগ এটা। আবার খেয়াল রাখতে হবে, এটা সোভিয়েত-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়। ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা কথাটা বুঝতে হবে। সেকালে এর মানে ছিল এক ব্লকের কোনো রাষ্ট্রেরই অপর ব্লকের কারো সাথে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক রাখত না, হারাম মনে করত, তাই সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না।

    অথচ এ কালে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যতই ঝগড়া বা রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধই থাক না কেন- সেখানে একই সাথে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে সব বিনিময় লেনদেন-বাণিজ্যও সমানে চলে থাকে। অতএব, এ কালের ফর্মুলা হল সবার সাথেই নিজস্বার্থ মুখ্য করে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে লেপটে থাকা। তাই চীন, না আমেরিকা, নাকি ভারত এভাবে কারও দিকেই এককভাবে কান্নি মেরে থাকা যাবে না। এটা আবার শর্টকাট কোনো ন্যাশনালিজমের মত তা ভেবে বসাও ভুল হবে।

    কাজেই আপনি ভারতের দালাল – নিজভূমিতে অন্যকে করিডোর দিয়েছেন, বাজারসহ সব খুলে দিয়েছেন এমন ভারতের দালাল, নাকি আপনি চীনের বিনিয়োগ এনে সয়লাব করেছেন সেই চীনা দালাল- এ দুটোই ভুল পথ। এমনকি এ দুইয়ের ভয়ে আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছেন, এটাও ভুল। বরং তিনের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে হবে কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণভাবে। এককভাবে কারো সাথে সম্পর্ক [এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ সম্পর্ক, বন্ধুরাষ্ট্র ইত্যাদি সব] একালে হারাম, বরং কার সাথে কতটুকু যাবেন তা আগেই নিজ বোঝাবুঝি ঠিক করে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তা বলা যেতে পারে, কখনো বলা যাবে না, কাজে দেখাতে হবে। কিন্তু নিজে কী করবেন সেই নিজ হোমওয়ার্ক অবশ্যই আগে করে রাখতে হবে।

    সোনাদিয়ায় বন্দরসহ বিসিআইএম করিডোর নির্মাণ আমাদের কৌশলগত মৌলিক স্বার্থ। অথচ ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্যে রাখতে এটা কমপক্ষে ১০ বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রাখা হয়েছিল। আমাদের ‘নিশীথ ভোটের’ পরবর্তীকালে এ থেকে পরে পাওয়া দিকটা হল, এটা উন্মোচিত হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় আসার জন্য কারোই আর ভারতের সমর্থন জরুরি বা এসেনশিয়াল নয়। আবার আমেরিকাও এখন বিষহীন ঢোঁড়া সাপে পরিণত। আর বিরোধী দলসহ সারা দেশের মানুষ আজ ভারতকে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা দানব মনে করছে। ফলে তারা ভারতবিরোধী। লক্ষ্যনীয় যে এবারই প্রথম এই ভারতবিরোধিতা পুরাপুরি রাজনৈতিক, এ টু জেড রেখা টানতে পারবেন। তাই এটাই তো হাসিনার জন্য ছিল সব উপেক্ষা করে নিজস্বার্থে চীন সফরের সবচেয়ে ভালো সময়। শেখ হাসিনা যা বুঝেই নিয়ে থাকেন না কেন, এক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ওদিকে এতে চীনা প্রতিক্রিয়া বা সাড়া ব্যাপক। তারা আশাতীত খুশি যে, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। চীনা গ্লোবাল টাইমস তিনটারও বেশি আর্টিকেল ছেপে উচ্ছসিত। হাসিনাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, বাংলাদেশ বেল্ট-রোড আর বিসিআইএম [BCIM-EC] করিডোরে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, Hasina in balancing act between China, India। [এই রিপোর্টের শেষেই সবগুলো খবরের লিঙ্ক পেতে পারেন]।

    তারা আসলে আরও খুশি এ জন্য যে, বিসিআইএম প্রকল্প জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এতে বা বেল্ট রোডে ভারত যোগ দেবে হয়তো কোনো এক কালে, আমেরিকার হাতে কোনো পরিস্থিতিতে চরম নাকানি-চুবানি খাওয়ায় বিধ্বস্ত হওয়ার পরে। কিন্তু কথাটা তারা ইতিবাচকভাবে লিখেছে।  সেকথা আমাদের ইউএনবি বার্তা সংস্থার বরাতে ভারতের দ্যা হিন্দু পত্রিকা বিরাট করে লিখেছে [“the initiative would have to be revived working together with India,” the United News of Bangladesh (UNB) reported on its website.]।

    প্রথম আলোতে চীন সফরঃ
    তবে হাসিনার চীন সফর প্রসঙ্গে প্রথম আলোর ভুমিকা খুবই নেতিবাচক। প্রায় সময় সে আমেরিকান অবস্থান নিয়ে খবর হাজির করে থাকে। এবার আমেরিকার হাসান ফেরদৌস যে লেখাটা লিখেছে সেটা অর্ধ সত্য বা পুরাই অসত্য। আর তা আমেরিকার তো বটেই, ভারতেরও কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে লেখা। মূলত তিনি কোন যুক্তি বলা ছাড়াই, চীনবিরোধী। এই খামতি তিনি পুরণ করতে, আশির দশকের চিন্তায় ও তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আবার ভারতীয় প্রপাগান্ডা খেয়ে লিখছেন, ভারত নাকি আমাদের চীনের মতই ঋণ দিয়ে অবকাঠামো গড়ে দেওয়ার সঙ্গী। যেমন লিখছেন, “চীন ও ভারত দুই দেশই আমাদের অবকাঠামো খাতে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে”। কিন্তু ভারত কোন অবকাঠামো আমাদের গড়ে দিয়েছে? নিজস্বার্থে করিডোরের কিছু অবকাঠামো গড়ে নেয়া ছাড়া? তা আমাদের জানা নাই। যেমন ভারতের বহরমপুর জেলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে আসাম – এই তেল পাইপ লাইন স্থাপন কী বাংলাদেশের স্বার্থে্র অবকাঠামো? ভারতের টাটা আর লিলেন্ড গাড়ি, আমাদের বিআরটিসি- এর ঘাড়ে ডাম্প করতে কোন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এটা করা হচ্ছে। আর এতে দেখানো হয় যে ভারত আমাদের ঋণ দিয়েছে এই গাড়ি কিনতে। অথচ ব্যাপারটা উলটা, ভারতের রুগ্ন ইস্পাত শিল্পকে বাঁচাতে ভারত সরকার ওসব গাড়ির দাম আগেই শোধ করে কোম্পানিগুলোকে বাঁচায়। এরপর কেনা সেই গাড়ি ভারত সরকার আমাদেরকে ঋণে বিক্রি করেছে বলে কাগজপত্রে দেখায়। এই হল “অবকাঠামো ঋণ”!
    এছাড়া ভারত কী কাউকে অবকাঠামো ঋণ দিতে সক্ষম এমন অর্থনীতির রাষ্ট্র? নাকি ভারত এখনো মূলত ঋণ নেওয়ার রাষ্ট্র? কাজেই ভারত আমাদের অবকাঠামো গড়ে দেয়, এসব আজগুবি তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? এগুলো তো ভারতের প্রপাগান্ডা দালালি! আজীব! এছাড়া লেখার শিরোনামসহ তিনি হাসিনা সম্পর্কে আনন্দবাজারি স্টাইলে লিখছেন, হাসিনা নাকি “চীনা তাস” খেলতে গেছেন। যেন এক বিনোদন রিপোর্ট লিখতে বসেছেন।
    সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সম্পর্কে লিখছেন, “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” সেজন্যই নাকি এই বন্দর নির্মাণ হয় নাই। আবার নিজেই বলছেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সে (সোনাদিয়া) উদ্যোগ ভেস্তে যায়”। এই তথ্যও ভিত্তিহীন কারণ, যুক্তরাষ্ট্রকে হাসিনার “বিকল্প কিছু” দেওয়াতে সোনাদিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এতে কোন আপত্তি নাই। আপত্তি একমাত্র ভারতের।  আবার “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” – এই কথা সত্যি হলে তাহলে আর হাসিনা চীন সফরে গেলেন কেন? কী বিনোদন কাটাতে গেছিলেন? তাহলে চীনে গিয়ে আবার [BCIM-EC] প্রকল্প শুরু করতে আলাপ তুললেন কেন? সে ব্যাখ্যা কই?
    আর [BCIM-EC] প্রকল্পতে যদি বন্দরসহ প্রকল্প এটা নাই হয় তবে এটাকে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পে যুক্ত হবার এক “করিডোর” ভাববার তো কোন সুযোগই নাই। কাজেই বন্দর-ছাড়াই BCIM-EC প্রকল্প, এমন ভাবনা তো আসলে ভারতের অবস্থান। তাও পুরানা অবস্থান। সম্প্রতিকালে সেঅবস্থান থেকে ভারতের নড়াচড়ার আলামত দেখাচ্ছে। আসলে হাসিনার চীন সফর নিয়ে কিছু বলার জন্য নুন্যতম তথ্য নিয়ে পড়াশুনা বা নাড়াচাড়ার দরকার তা ফেরদৌসের কাছে নাই, ফাঁকিবাজ ছাত্রের মত যার হোমওয়ার্ক নাই।

    আরও আজিব কান্ড তিনি পায়রা বন্দরকে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের বিকল্প বলে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পায়রা চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে একটু বড় মাত্র। এছাড়া ড্রাফট বা গভীরতার লিমিটেশন, মানে বড় জাহাজ ঢুকানোর লিমিটেশন আছে, তাই একে গভীর সমুদ্র বন্দর বলতে অনেকের দ্বিধা আছে। আরও পরিকল্পনাগত বিরাট ত্রুটি হল,  সারা বছর এই বন্দরের প্রবেশ অংশকে নাব্য রাখতে হলে সারা বছরই একে ড্রেজিং করে যেতে হবে। সোনাদিয়া লোকেশনে ড্রাফট যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই ১৮ মিটার। তাই আমেরিকার চোখেই বাংলাদেশের দুটা বিস্ময়কর অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প হল, পায়রা আর রূপপুর। এককথায় বললে, চীন ঠেকানী মুডের ভারতের মান-মন রাখতে ‘পায়রা’ আসলে এক অর্থহীন, টাকা পানিতে ফেলা প্রকল্প।

    হাসান ফেরদৌসের আজগুবি তথ্য আরও আছে। তিনি বলেছেন, এবার এপ্রিলে চীনে “বেল্ট-রোড সামিটে নাকি প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম নেতৃত্ব দিতে” গিয়েছিলেন। এটা ভুল তথ্য। বরং প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে গেছিলেন কোন প্রতিমন্ত্রী না বরং ফুল মন্ত্রী। আর সেই মন্ত্রী হলেন, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন । যেটা গওহর রিজভিও নিশ্চিত করেছেন পাবলিকলি। আর হংকংয়ের পত্রিকায় সাক্ষাতকার শাহরিয়ার আলম দিয়েছিলেন কথা সত্য কিন্তু, কোথায় বসে তা অস্পষ্ট। ঢাকায় বসেই খুব সম্ভবত, এবং তা ভারতের আয়োজনে। খুব সম্ভবত ঠিক সেসময়ের দ্বিধাগ্রস্থ হাসিনাকে চাপ দিয়ে কাজে লাগিয়ে। যেটার পুরা পরিস্থিতি বদলে যায় চীনা রাষ্ট্রদুতের উদ্যোগে ফলে, বিশেষ করে বিএনপিকে -সহ  স্থানীয়ভাবে সরকার, রাজনীতিক, সাংবাদিক ইত্যাদি নানান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে “বাংলাদেশ-চীন সিল্ক রোড ফোরাম” গঠন করে ফেলার পরে; হাসিনা তখন থেকেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
    এখন কথা হল, প্রথম আলো এমন আধা-সিদ্ধ লেখা ছাপাচ্ছে কেন? লেখকের পরিচয় হিসাবে তাঁর লেখার নিচে লেখা থাকে, ” হাসান ফেরদৌস, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি”। অর্থাৎ এটা অপিনিয়ন বা কোন গেস্ট লেখকের কলামও নয়, প্রথম আলোর নিজের স্টাফ রিপোর্ট। তাহলে প্রথম আলো, সে কার পক্ষে থাকতে চায়? ভারত বা আমেরিকার সমর্থনে ভারতের পক্ষে? প্রথম আলোর ম্যানেজমেন্ট কী এগুলো দেখে নাই, জানে না? অদ্ভুত ব্যাপার! তবে একটা জিনিষ আমরা পরিস্কার থাকতে পারি। এমনটা চলতে থাকলে আগামিতে বড় কাফফারা দিতে হবে।

    কিন্তু কথা হল, তাতে চীন ভারতকে যতই সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ডালি চীন বা বাংলাদেশ যতই সাজিয়ে রাখুক না কেন অথবা বিসিআইএম প্রকল্পে ভারতের যোগদানের দরজা খুলে রাখুক না কেন – এতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি খুব সহজ নয়। আবার তা অসম্ভবও নয় নিশ্চয়। আবার এটা হতেও পারে যে, দেখা গেল ট্রাম্পের বাকি আমলের (জানুয়ারি ২০২১) মধ্যেও মোদী সিদ্ধান্ত নিতেই পারলেন না। [একটু আগের খবর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ভারত সফরের (এটা গত বছর চীনে মোদীর “য়ুহান সামিটের” পাল্টা সমতুল্য সফর)] তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও তা সেই অক্টোবর ১২ তারিখে। অর্থাৎ বুঝা গেল মোদীর তেমন তাড়া নাই।  যদিও অনেকে অবশ্য বলছেন, গত জুন মাসে কাজাখস্তানে সাংহাই করপোরেশনের [SCO] শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানে ঐ সম্মেলনের এক যৌথ ঘোষণা থেকে বেল্ট রোড প্রকল্পের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়। আগে এমন হলে, তাতে ভারতের আপত্তি আছে বা অংশগ্রহণে ভিন্নমত আছে বলে তা সাথে উল্লেখ থাকত। এবার তেমন কিছুই দেখা যায়নি। অনেকে এর অর্থ করছে যে, ভারত সম্ভবত এখন থেকে এতটুকু সরেছে যে সে বেল্ট-রোডের প্রসঙ্গটা গ্রহণও করেনি আবার বিরোধিতাও করেনি, এমন অবস্থায় এসেছে – আগের আপত্তির জায়গা থেকে সরে এসে।

    তবুও এতে তেমন আশাবাদী না হওয়ার অন্য কারণ হল, যে হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা তুলে মোদি আবার ক্ষমতায় এসেছেন তা হলো চরম মুসলমান বিরোধিতা, যেটা পারলে ভারত থেকে প্রায় মুসলমান জনগোষ্ঠিকে মুছে নির্মুল করে ফেলার এক আকাঙ্খা যেন, যার মানে মুসলমানের কারণে পাকিস্তান বিরোধিতাও। কিন্তু এই ডিভিডেন্ড বা বাড়তি লাভ মোদী সহসাই লঘু করতে চাইছেন না। আগামী পাঁচ বছরজুড়েই ভারতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ রাজ্য করে নির্বাচন হবে। তাই এই একই মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুত্ব মোদীকে ব্যবহার করে যেতে হবে। এ ছাড়া বাবরি মসজিদ মন্দির বানানো, আসামসহ সারা দেশে নাগরিকত্ব পরীক্ষার নামে মুসলমান খেদানো, পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে সেসব রাজ্যসরকার দখল, কাশ্মিরে চরম বলপ্রয়োগে একে  কনষ্টিটিউশনালি ভারতের অঙ্গ করে নেয়া; এমন অনেক কিছু মোদির কর্মপরিকল্পনার তালিকায় আছে।

    এদিকে যদিও ঐ সাংহাই করপোরেশন মানে হল, যেখানে চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া আর, ভারত-পাকিস্তানও এর সদস্য। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ‘টোন-ডাউন’ করা মোদীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর হলেন মোদী – এই বোলচাল মিথ্যা হলেও নিজের এই নির্বাচনী ইমেজে তিনি জিতেছেন তাই এটা তিনি আবছা হতে দেবেন না। যদিও ওদিকে আবার মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে এবার আমেরিকা ভারতের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নাই এটা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে মুখোমুখি।

    অতএব, ভারতকে বাদ রেখে বন্দরসহ বিসিআইএম প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। ভারতের জন্য অপশন খোলা থাকবে, যার ফাইন্যান্সিয়াল দায়ভারসহ যুক্ত হতে চাইলে ভারত সে সুযোগ নিতে পারবে। কারণ, ভারত সহসাই প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে, এমন আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিন।

    শ্রীলঙ্কা ড্রামাঃ
    অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা এক নতুন ড্রামার মঞ্চস্থল হয়ে উঠেছে। এম ভদ্রকুমার হলেন ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত। তিনি তার কলামে হাসিনার চীন সফর সফল ও বিরাট অর্জন বলে প্রভুত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আবার  লিখেছেন, ” শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালেই, অ্যাঙলো-আমেরিকান ‘রেজিম বদল’ প্রকল্পে সঙ্গ দিয়ে ভারতের কূটনীতি ইতোমধ্যেই হাতে রক্ত লাগিয়ে ফেলেছে [“In Sri Lanka (2015), Indian diplomacy tasted blood by collaborating with the Anglo-American project at ‘regime change.”] …… আর এখন যা হচ্ছে তাতে ভারতকে পাপোষের মতো ব্যবহার করে আমেরিকা শ্রীলঙ্কায় ঢুকে পড়েছে। শ্রীলঙ্কাকে সামরিক চুক্তিতে জড়িয়ে নিচ্ছে, অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ধন্য আমেরিকান হস্তক্ষেপ নীতি। [Meanwhile, the US used India as a door mat to make inroads into Sri Lanka. And the result is Sri Lanka has been seriously destabilized, thanks to intrusive US policies]। আসলে ওখানে রাষ্ট্রপতি সিরিসেনা আমেরিকাকে ডেকে আনার নায়ক। তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রয়োগ করে এক উগ্র বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা [নাম Galagoda Aththe Gnanasara], নানাসারা বলে পরিচিত এই নেতাকে অপহরণের অভিযোগে ছয় বছরের ও আদালত অবমাননার সাজার জেল থেকে ছুটিয়ে এনেছেন। রাজনৈতিক দলের মত তাঁর এক ধর্মীয় সংগঠন আছে – নাম Bodu Bala Sena (BBS) or “Buddhist Power Force”। মানে কথিত অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের এই নেতা নিজ সংগঠনের নাম রেখেছে “পাওয়ার ফোর্স”। বুঝা যাচ্ছে তিনি শিকারির “খুবই অহিংস”। এরপর তাঁর সম্পর্কে আর কিইবা বলার বাকি আছে। তিনি সম্প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উগড়ানো এক পাবলিক মিটিং করেছেন। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের এই ধারাই মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন রোহিঙ্গাবিদ্বেষী একই বৌদ্ধ ধারা। অর্থাৎ তাহলে ফলাফল হল, শ্রীলঙ্কায় চীনের প্রভাব দমাতে গিয়ে ভারত ব্যাপক রক্তপাত ঘটানোর পর এখন এর মাখন উঠিয়ে দিচ্ছে বা তা নিয়ে যেতে এসেছে আমেরিকা।

    তা হলে এশিয়ায় মূল বিষয়টি হচ্ছে, না চীনের কোলে না ভারতের – এটাই বাঁচার উপায়। ভারসাম্যের নীতিতে, কারো দিকে কান্নি না মেরে থাকা। আর কেবল নিজের স্বার্থের দিকে ফোকাসের নীতি – এভাবে হোমওয়ার্ক করে আগানো, এই নীতিই একমাত্র বাঁচোয়া। কিন্তু ভারত ভারসাম্যের নীতি না মেনে চলার দেশ। বরং উলটা, আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকার নীতি ভারতের। যে আমেরিকা আবার চলে নিজের একক স্বার্থে। আমেরিকার বেলায়, বালুচদের টেররিস্ট ঘোষণা করে দেয়া অথবা শ্রীলঙ্কায় (SOFA সহ) সামরিক চুক্তি করে ঢুকে পড়া, এগুলো এর উদাহরণ হলেও এসব বিষয় ভারতকে হুঁশে আনবে, এমন ভরসা করা কঠিন।

    তবে যারাই চীনের বদলে ভারত অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য খুনখারাবি পর্যন্ত যাবে, সম্পর্কের ব্যাপারটা যারা এভাবে দেখবে বা এই ভুল করে বসবে – এরাই সবশেষে সব খুইয়ে নিজের সব অর্জন আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে থাকে। হাসিনার জন্য এটাও এক বিরাট শিক্ষা হতে পারে যে, যদি না তিনিও আবার শেষে সব হারিয়ে, আমেরিকাকে ডেকে নিয়ে না আসেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “এটা ভারসাম্যের যুগ“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

    ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

    গৌতম দাস

    ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

    https://wp.me/p1sCvy-2sc

     

     

    আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

    প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

    এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

    আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
    রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

    আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

    দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

    তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

    অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

    ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

    প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

    যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

    ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

    কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

    আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
    হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

    জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়।

    লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

    গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

    সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

    উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

    এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

    দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

    তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

    এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

    তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

    প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

    এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

    কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

    দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

    সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
    এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

    এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

  • চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

    চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    গৌতম দাস
    ২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

    https://wp.me/p1sCvy-2lK

     

     

    চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

    ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

    তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

    সাইড লাইন
    যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

    আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

    গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

    আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

    জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
    কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

    এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

    এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

    ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

    প্রথম পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

    উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

    গৌতম দাস
    ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার

    দ্বিতীয় পর্বঃ
    কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

    http://wp.me/p1sCvy-2hE

     

    দ্বিতীয় পর্বঃ
    কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

    ১৯৪৮ সালের বৃটিশ কলোনি শাসকমুক্ত মায়ানমারের জন্মের আগে থেকেই দমন নির্মুল আর নির্বিচারে হত্যা, এই রাষ্ট্রকে ধরে রাখার একমাত্র উৎস হয়ে গেছে ও আছে। বার্মা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যায় আকর্ণ ডুবে থাকার সমস্যা ওর জন্মের সময় থেকেই।  মায়ানমারের সবচেয়ে বড় এথিনিক জনগোষ্ঠি হল  ‘বার্মান’ বা ‘বর্মীজ’; এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ। এই বর্মী জনগোষ্ঠির রাষ্ট্র জন্মের পর থেকেই এর মূল সংকট হল অভ্যন্তরীণ অন্যান্য এথিনিক জনগোষ্ঠির সাথে সংঘাত;  অন্যভাবে বললে, বর্মীছাড়া অন্য এথিনিক জনগোষ্ঠিকে বর্মীজদের নিজেদের কর্তৃত্বের নিচে দাবায় রাখাকেই একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নেওয়া – এটাই সব বৈরীতা ও সংঘাতের উতস। অথচ এক ফেডারেল ব্যবস্থা হতে পারত এর সহজ সমাধান। বৃটিশ শাসনামলেও মায়ানমারে কোথাও কোথাও স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ ছিল।  কিন্তু ১৯৪৮ সালে জন্মের পর থেকে মায়ানমারে কোন ফেডারেল ব্যবস্থা  চেষ্টা না করে বরং পুরানা স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে সবকিছু বর্মীজদের অধীনে আনার জবরদস্তির চেষ্টা করা হয়েছে। আর তা থেকেই শুরু হয়েছে Bamar. Chin. Kachin. Kayin. Kayah. Mon. Rakhine. Shan ইত্যাদি জনগোষ্ঠির বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র ততপরতা। পরে সামরিক ক্যু করে জেনারেল নে উইনের বিগত ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলের পরও সেই বিচ্ছিন্নতাবাদে আকর্ণ ডুবে থাকা  অবস্থা থেকে বের হতে মায়ানমারের সরকারগুলো  “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” চর্চাকে উপায় হিসাবে হাজির করেছে। এই “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর আর নাম  “মায়ানমারিজম”। ফলে মায়ানমার রাষ্ট্রের আকার পরিচয় হয়েছে, “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী” ভিত্তিতে গড়া এক রাষ্ট্র। একমাত্র এতেই তারা ‘এক’ থাকতে পারবে  এমন আঠা বা গ্লু এর নাম হয়েছে “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ”, আর এর জিগির। যদিও এই নামের আড়ালে আসলে এক তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ চর্চা করে এসেছে তারা।  ব্যাপারটা পরিস্কার হবে মায়ানমারকে ধর্মীয় জনসংখ্যার দিক থেকে দেখলে। গত ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মায়ানমারের প্রায় ৮৮ ভাগ বৌদ্ধ,  ৬ ভাগ খ্রীশ্চান ও ৪ ভাগ মুসলমান। জনগোষ্ঠির বড় অংশ বৌদ্ধ বলে, এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বয়ান তৈরি করে ফেলা হয়েছে যা আবার ইসলাম বিদ্বেষী করে সাজানো – একে নিজের রাজনীতিক ভিত্তি হিসাবে বেছে নিয়েছিল নে উইন সরকার। নে উইনের অনুমান ছিল এতে মুসলমান বাদে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী জনগোষ্ঠিগুলোকে (প্রায় সবাই আবার বৌদ্ধ বলে ) “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর পরিচয়ে বেধে রাখতে। এতে  পুরান বর্মীজ আধিপত্যটা উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের (ইসলাম বিদ্বেষ) আড়ালে থেকে শাসনকাজ চালাতে পারবে। আবা ইসলাম বিদ্বেষী এই বয়ানটা  “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে” উগ্র আর গাঢ় হতে সাহায্য করবে। মুসলমানেরা সব বৌদ্ধ জনগোষ্টির কাছে এক ইমাজিনড কমন শত্রু হিসাবে হাজির করবে।  এটাই অনেকে মায়ানমারিজম বলে। এই মায়ানমারিজম তৈরি করতে পারার প্রথম সফলতা আসে ১৯৭৭ সালে। একারণে ১৯৭৭ সাল থেকে নে উইন তৈরি রোহিঙ্গা সমস্যার প্রথম প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিল এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী আসর জোয়ার দেখা গিয়েছিল। পরে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মায়ানমার বেশীর ভাগ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও, আবার ১৯৮২ সালের নতুন ইমিগ্রেশন আইন সবকিছুকে আগের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে যায়।  এরপর ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর এর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত থেমে থেমে সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা নির্মুল অপারেশন বিভিন্ন সময় চলেছে। এরপর আগের ‘মায়ানমারিজম’ সাথে এবার বয়ানে ‘ইসলামি সন্ত্রাসের’ অভিযোগ তুলার সুযোগ যুক্ত হয়েছিল। ফলে তা নিজের দানবীয় উগ্রতার পক্ষে আরও সাফাই নিয়ে হাজির হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে এক বৃটিশ সাংবাদিক ১৯৭১ সালের প্রথমার্ধে অভিযোগ করেছিলেন আপনি পুর্ব-বাংলার শরনার্থী লোকদেরকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করছেন। ইন্দিরার জবাব ছিল, ওরা কোনটা আগে হয়েছে, শরনার্থী না মুক্তিযোদ্ধা? একথার মধ্যে সব জবাব আছে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা বুশ-ব্লেয়ারের ২০০১ সালে ওয়ার অন টেররের যুদ্ধ শুরু আগে থেকেই রোহিঙ্গারা শরনার্থী হয়েছে। কাজেই একথাটা মোদি-সুচির সন্ত্রাসের বয়ান ও অভিযোগকে ভিত্তিহীন করে দেয়।

    তাই বলা যায়, মায়ানমারের মুল সংকট রোহিঙ্গা বা মুসলমান ছিল না, নয়। বরং ‘মায়ানমানিজম’ এই বয়ান হাজির করার দরকারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। আর এটা বলা বাহুল্য ৮৮% বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির দেশে ৪% মুসলমান নিজে ভিকটিমই হয়, অত্যাচারিত মজলুমই হয়। অন্যের উপর অত্যাচার নির্যাতনকারি বা অন্যকে নির্মুলের কর্তা সে হতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে সে সুযোগ বিরাজ করে না।

    মায়ানমান পরিস্থিতি ২০০৬ -৭ সাল থেকে এক নতুন মাত্রা পায়। আর ততদিনে মায়ানমার ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের নিন্দা ও অভিযোগের মধ্যে আর  আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ রকমের অবরোধের অধীনে। এমনিতেই জেনারেল নে উইনের শাসনামলে (১৯৬২-৮৮) বার্মা ছিল বাকশালী সমাজতন্ত্রের মত এক ‘নে উইনি সমাজতন্ত্রের’ অধীনে;  আর এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ ছিল জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-বিদ্বেষ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মায়ানমার এমন হওয়ার পিছনে ওর দুটা গঠন বৈশিষ্ট উল্লেখযোগ্য।

    এর একটা হল জেনোফেবিক যার উৎস হল ভারতবিরোধীতা। ১৮২৪ সালে বৃটিশদের বার্মা দখল নিবার পর থেকে,  বার্মাকে ভারতের এক প্রদেশ (১৮২৪-১৯৩৭) বানিয়ে কলোনি শাসকেরা শাসন চালাত। [১৯৩৭ সালের পর থেকে বার্মা সরাসরি বৃটিশ শাসিত কলোনি হয়েছিল।] এতে ভারতীয় নেটিভদের মাধ্যমে বৃটিশরা শাসন করত, ফলে ভারতীয় কর্মচারি বা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেখানে ইত্যাদি। আর এখান থেকে একধরণের ভারতবিদ্বেষী জেনোফোবিক বৈশিষ্ট বার্মার জনমানসে ও  রাজনীতিবিদদের মধ্যে গেড়ে বসেছিল। ফলে বৃটিশেরা ১৯৪৮ সালে বার্মা ছেড়ে যাবার পর পর বহু ভারতীয় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর একই কারণে, ১৯৬২ সালে নে উইন সামরিক ক্যুতে ক্ষমতা দখলের পরে প্রায় চার লাখ ভারতীয় বার্মা ত্যাগ করেছিল অথবা মারা গিয়েছিল। (see Thant Myint-U’s recent fine historical travelogue, Where China meets India).

    আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হল, ১৯৪২ সালের আগে সেকালের জাপান – কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক জাপান – এই কলোনি মাস্টারের হাতে সেকালের বার্মার স্বাধীনতা- যোদ্ধাদের সামরিক ট্রেনিং হওয়া। বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে কেড়ে নিবার পরিকল্পনায়, জাপানিজ কলোনি মাস্টার  মার্শাল তেজোর বাহিনীর হাতে, বেছে নেওয়া ত্রিশজন রাজনৈতিক তরুণ সামরিক ট্রেনিং পেয়েছিল। যারা পরে দেশ ফিরে প্রথম সামরিক সংগঠন ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’ বানিয়েছিল আর ১৯৪২ সালে জাপানিজ বাহিনীর সহায়তায় এরাই বৃটিশদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। সু কি বাবা অং সান (Aung San) এর নেতৃত্বে উ নু (U Nu) আর নে  উইন (Ne win) ও রাখাইন রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ – টপ এদের নেতৃত্বে ছিল সেই ত্রিশজনের দল। এদের নেতৃত্বেই নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে বার্মার সামরিক বাহিনীর ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’  (Burma Independence Army (BIA) গড়া হয়েছিল। বলা হয় জাপানিজদের দেয়া নির্মমতার ট্রেনিং, নির্যাতনের টেকনিক সেই থেকে বর্মীজ সেনাবাহিনীতে বৈশিষ্ট হয়ে যায়। পরে অবশ্য ১৯৪৫ সা্লে এসে এরা সবাই জাপান এম্পায়ারকে ছেড়ে বৃটিশ এম্পায়ারের পক্ষে সুইচ করেছিল। আর পরে এই ত্রিশ কমরেড এরাই ১৯৪৮ সালে নিগোশিয়েশন করে বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেছিল। আজও মায়ানমারে সব রাজনৈতিক সামাজিক গোষ্ঠির মধ্যে তাদের চিন্তা ও বয়ানে (সস্তাবুঝের) দেশপ্রেম ও জাতীবাদের উদাহরণ বা হিরো হয়ে আছে ঐ ত্রিশ জন। গেড়ে বসা ঐ ত্রিশজন সম্পর্কে নানান মিথ এবং তাদের চিন্তা ও বয়ান ভেঙ্গে নতুন করে তা ভেবে দেখা, ফিরে দেখা আর নতুন করে মুল্যায়নের সাহস না হওয়া পর্যন্ত মায়ানমারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি তার নির্মমতা, নির্মুলের সামরিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
    কিন্তু এখনকার মূল প্রসঙ্গ হল, কলোনি শাসক জাপানিজদের হাতে জন্ম হবার কারণে ‘রাজনীতি’ বিষয়টাকে এই ‘ত্রিশ জেনারেল’ যতটা ক্ষমতা, সামরিকতার দিক থেকে বুঝেছিলেন ঠিক ততটাই যেন রাজনীতি বলতে একই সাথে আইডিয়া বা চিন্তাও – এদিকটা বুঝতে ব্যর্থ ছিলেন।  রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা ও সামরিকতা নয়, এর অন্যদিকও আছে। অন্যভাবে বলা যায়, একারণে বলা যায় মর্ডান রিপাবলিক স্টেট অথবা আধুনিকতা সম্পর্কে ততটাই তাদের জানাশুনার অভাব দেখা যায় বা তারা কম আগ্রহী ছিলেন। এই ঘাটতির কারণে পরবর্তিকাল  ঐ ত্রিশজনকে দেখা যায় দুটা ঝোঁকের পক্ষে ভাগ হয়ে যেতে; যারা রাজনীতিতে গেলেন আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলেন, এভাবে। সামরিক ধারায় যারা ছিলেন যেমন এদের শিরোমনি জেনারেল নে উইন, তার অভিযোগ রাজনীতিবিদ ধারার শিরোমনি উ নু এর প্রতি যে এরা কম দেশপ্রেমিক, এরা নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবে, এরা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে জানে না (অর্থাৎ কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন) ইত্যাদি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাস হল ঐ ত্রিশজন ও তাদের অনুসারীর – যারা রাজনীতিতে গেল আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলে এই দুভাগ হয়ে যাওয়া – আর পরস্পর পরস্পরের খামতি পুরণে দুপক্ষই অযোগ্য হিসাবে থেকে যাওয়া। যা একালেও রাজনীতিক বনাম সামরিক অফিসার এভাবে ভাগ হয়ে থেকে গেছে। মায়ানমার রাষ্ট্রের বৈশিষ্টেও এর বিরাট ছাপ রয়ে আছে।  মায়ানমারই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কমান্ডার ইন চিফ আর রাজনীতিক রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। এতে যেন খোদ রাষ্ট্রটাই ভাগ হয়ে আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এক ঠিকই কিন্তু তার আবার দ্বৈত-নির্বাহী।  এক ঘরে দুই পীর যেমন বসবাস করে থাকতে পারে না, দ্বৈত-নির্বাহীও তাই। নির্বাহী বা একজিকিউটিভ একজনই হয়, হতে হয়। নইলে সেটা ক্ষমতাই নয়। তাই কার্যত মায়ানমারে প্রধান একজিকিউটিভ হয়ে আছে সামরিক বাহিনী। যেমন ১৯৬২ সাল থেকে  সর্বেসর্বা হয়ে আছে এক মেলেটারী কাউন্সিল। এই কাউন্সিল হল আসলে পিছনে এক সামরিক বাহিনী আছে, যার মধ্যকার ক্ষমতার বিন্যাস বা সাজানো কাঠামোর শীর্ষ স্থানটাই হল কাউন্সিল। এরপর এর কাউন্সিলের অধীনে আবার একটা রাষ্ট্রও আছে। অর্থাৎ যেমন আমরা দেখতে অভ্যস্ত যে, রাষ্ট্রের ভিতরে সামরিক বাহিনী বলে এক প্রতিষ্ঠান থাকে। এখানে এর উলটা; সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানটা হল কাউন্সিল, আর সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটা রাষ্ট্রও আছে।  এখানে আবার  কমান্ডার ইন চীফ আর কাউন্সিল কথাটা সময়ে পাল্টাপাল্টি করে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যখন সামরিক ক্ষমতার একটা অংশ সিভিলিয়ান ফেসে হাজির রাখার অবস্থা তৈরি হয় তখন সামরিক বাহিনীর আবার একটা রাজনৈতিক দলও আছে। বাহিনীতে সক্রিয় চাকরিতে আছে এমন অফিসার আর অবসর নেয়া বুড়া জেনারেলরা এই দলের সদস্য হয়।  এর নাম Union Solidarity and Development Party (USDP)।  গত ২০১০ সালের আগে এটা সামরিক বাহিনীর এক এসোসিয়েশন নামে ছিল। এখন সেটাই এক রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দল। আর সবচেয়ে বড় কথা হল,  কমান্ডার ইন চীফ চাইলে যে কোন নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারে। গত ২০১৫ সালে সংসদ ঐ  USDP দলের দখলে ছিল, তখন একটা প্রস্তাব উঠেছিল ভেটো ক্ষমতা রদ করা হবে কী না এনিয়ে। যদিও বাহিনী শেষ এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।  তা নিয়ে বিবিসির ২০১৫ জুনের এই রিপোর্টটা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
    দ্বৈত- নির্বাহী ক্ষমতার কথা উঠেছিল, মায়ানমারের  কমান্ডার ইন চিফ নিজেই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র  ও সীমান্তরক্ষা এই তিন মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে থাকেন আর প্রেসিডেন্ট প্রধান নির্বাহি তিনি বটে, কিন্তু তিনি ঐ তিন মন্ত্রীকে মেনে নিয়ে এবার বাকী মন্ত্রী নিয়োগ দেন। ফলে নে উইনের হাতে আর্মির সেট করে দেওয়া এই বিশেষ রাষ্ট্র বৈশিষ্ট – ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ -এর  ভিতরে অধীনে থেকে সু কি কে নোবেল প্রাইজের ধ্বজাধারী হতে থাকতে হয়, কাজ করতে হয়। এব্যাপারটা সুকি চায় কী চায় না তাতে কোন ফারাক আসে না। অর্থাৎ কার্যত সুকিও এই মায়ানমারিজম চায়। এজন্য গত সপ্তাহে বিবিসি লিখেছে, “মিয়ানমারে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্যানিং  বিবিসিকে বলেছেন তিনি (সু চি) রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। ‘বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’ সেদেশ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাকে সমর্থন না করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে”। আবার একই কারণে সু চি এর জীবনীকার উইন্টেলের বরাতে বিবিসি ঐ রিপোর্টেই লিখছে,” ………তিনি (সু চি) এখন সেনা বাহিনীর পকেটে”। ………”মিস সু চি হাড়ে মজ্জায় বার্মিজ। আমার বলতে খারাপ লাগছে – কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের পশ্চিমে রাখাইনে যা ঘটছে তা চরম জাতিবিদ্বেষী। সেখানে মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সমন্বিত বিদ্বেষ রয়েছে”।

    তাহলে ২০০৬ -৭ সাল থেকে মায়ানমার পরিস্থিতি নতুন কী মাত্রা পেয়েছিল? গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৮৮ সালে নে উইন দৃশ্যত পদত্যাগ করলেও ক্ষমতা নেন তারই শিষ্য জেনারেলেরাই। ক্ষমতা ও রাজনীতি বলতে যারা একটাই জানে  – দমন ও নির্মুল – ফলে সেই পুরানা অভিজ্ঞতায় প্রায় কয়েক হাজার লোক মেরে দমিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার কাউন্সিল’ এই নতুন নামে ক্ষমতা নেন এবার জেনারেল স মং (Saw Maung)। পরবর্তিতে অবশ্য তিনি নিজেই মাত্র ৫০০ জন ‘দুষ্ট লোক’ সরিয়ে ফেলার কথা নিজেই গর্ব করে পাবলিককে বলেছিলেন।  এই সময় থেকে কথিত ‘নে উইনি সমাজতন্ত্র’ তিনি নিজেই ও তার সরকারকে সরে যেতে, গড় হাজির হতে শুরু করিয়েছিলেন। আর  ১৯৯০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন দেয়া হয়, কিন্তু বিরোধীরা জিতলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং সে নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করে দেয় জেনারেলেরা।  পরবর্তিতে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মায়ানমার একের পর এক পশ্চিমের (আমেরিকা ও ইউরোপের) স্যাংসন বা বাণিজ্য লেনদেন অবরোধের মুখে পড়ে যায়। এই অবস্থায় বাইরের প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে মায়ানমারের বাণিজ্য বিনিয়োগ লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম থেকে যায় পড়শি চীন। ফলে একমাত্র চীনের ভিতর দিয়ে যতটুকু বাইরের দুনিয়ার সাথে বার্মার সংযোগ সম্পর্ক বজায় ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মায়ানমারে চীনা বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ২০০২-৩ সালের পর থেকে। এমন অবস্থায় ২০০৬ -৭ সালের দিকে এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতি হিসাবে  চীন ও ভারত নিজ নিজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকেই মায়ানমারের গ্যাস কেনার (বুকিং ও চুক্তি) জন্য প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এই সময় থেকেই অবরোধের ব্যাপারটাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়।

    ততদিনে আবার, আমেরিকা নীতি পলিসিতে এশিয়ায় ভারতকে কাছে টেনে চীন ঠেকানোর চর্চা পোক্ত নির্দিষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে ভারতের মাধ্যমে বার্মার অবরোধ তুলে নেওয়ার এক ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। এই অবস্থানের পিছনে যে মুল্যায়ন কাজ করেছিল তা হল মায়ানমারের উপর অবরোধ দেওয়াতে কোন লাভ হচ্ছে না। বরং পশ্চিমের অবরোধের সুফল চীন একা খাচ্ছে। তাই ভারতের মধ্যস্থতায় অবরোধ তুলে নেওয়ার নতুন ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। পশ্চিম পরিস্কার জানত, মায়ানমার কোন গণপ্রজাতন্ত্রী নয়, সামরিক বাহিনীর পকেটের রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও  সু চি কে কেবল ঐ কাঠামোর উপরে এক সিভিলিয়ান ফেস হিসাবে সামনে রেখে সামরিক ক্ষমতাটাই চালু রাখার পক্ষে নাম কা ওয়াস্তে এক সংস্কার করার পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। এই হল সেই ফর্মুলা। কেন “দ্বৈত নির্বাহী” এই ভুতুড়ে ধারণার ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসাবে আমরা এখনও মায়ানমারকে দেখছি – এর মূল কারণ এটা। যেমন এর আর এক বৈশিষ্টবলছিলাম যে, এই রাষ্ট্রে কমান্ডার ইন চীফ সরকারের কোন নির্বাহী সিদ্ধান্তের উপর ভেটো প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাহী সরকার একমাত্র বা একক নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী নয়, এটা এক সতীনি ক্ষমতা বলেই এমন বাক্য রচনা এখানে সম্ভব হচ্ছে। আর ২০০৮ সাল থেকে চালু যে কনষ্টিটিউশনে এসব কথা লেখা আছে তা সংশোধন করতে গেলে ওতে শর্ত দেওয়া আছে যে, ৭৫% এর বেশী ভোটের সমর্থন থাকতে হবে। কিন্তু ৭৫% কেন? কারণ প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্র সংসদে ২৫% আসন সব সময় বাহিনীর জন্য রিজার্ভ করে রাখা আছে। অর্থাৎ সারকথায় কমান্ডার ইন চিফ রাজী না থাকলে ঐ ২৫% এর একটু সমর্থনও পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, ফলে কোন সংশোধনীও সম্ভব নয়।

    আসলে সব কথার এক কথা বা সেই মূল কথাটা হল, ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছিল এই কনষ্টিটিউশন। আর তা একা মনের মাধুরি মিশিয়ে সামরিক বাহিনীই এককভাবে নিজের খাতিরে লিখেছিল। কিন্তু যারা কনষ্টিটিউশন লিখেছে এরা কারা? এদের হাতে ক্ষমতা দিল কে, কী তাদের ক্ষমতার ভিত্তি – এসব প্রশ্নের ভিতরে সব জবাব আছে। যার সোজা অর্থ মায়ানমার এখনও প্রি-ষ্টেট মানে রাষ্ট্রগঠনের আগের অবস্থায় বা কোন গণপরিষদ বা সংবিধান সভা বসার আগের অবস্থায় আছে।  এই অর্থে মায়ানমার এখনও কোন মর্ডান রিপাবলিকই নয়।

    ফলে এই রাষ্ট্রের কাছে মানবাধিকার, জনগণের মৌলিক অধিকার এসব কথা অর্থহীন। আর ‘ডেমোক্রাসির নেতা সু চি’ এই শব্দ আর বাক্যগুলো তো আরও হাস্যকর।

    অতএব পশ্চিম সংস্কারের নামে যেটা করেছে সেটা হল ঐ সামরিক স্বৈরক্ষমতাকে সিভিলিয়ান সু চির টোপর পরিয়ে ঐ ক্ষমতাকে উদ্ভোধন বা হালাল করে দিয়েছিল। বিনিময়ে তারা নিজের ব্যবসা বিনিয়োগের করার সুযোগ বুঝে নিয়েছিল। এমনকি এই লক্ষ্যে কোন ধরণের সংস্কারের কাজ শুরু হবার আগেই এমনকি তা আসলেই কতটুকু কী সংস্কার হয় তা দেখার আগেই ২০১০ সালেই আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম নিজের বিনিয়োগ নিয়ে  মায়ানমারে ঢুকে পড়েছিল। তবে এটা নিয়ে চীনের সাথে মায়ানমারের জান্তার কোন বিরোধ দেখা দেয় নাই। চীনের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক অটূট রেখে আপোষেই তা হয়েছিল। জেনারেলেরা বিশেষ করে প্রাক্তন জেনারেল ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি থেন সিন (যিনি ২০১৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন) চীনকে বুঝাতে পেরেছিল যে পশ্চিমের অবরোধ উঠে যাওয়া মায়ানমারের জন্য কতটা জরুরি। ফলে চীন যেন জায়গা ছেড়ে দেয়।  চীনও সেটা সহজেই মেনে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। আর এসবের ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই হঠাত কেবল ২০১০ সালেই মায়ানমারে বিদেশি ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হয়েছে ২০ বিলিয়ন, আর এর অর্ধেক হল একা চীনের।

    কিন্তু ভারতের অর্জন কী এতে? না তেমন কোন বৈষয়িক বিনিয়োগ ব্যবসা, না প্রভাব – কোনটাই অর্জন হয় নাই ভারতের।
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনদিনের মায়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। চলতি রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরনার্থী হওয়া প্রসঙ্গে,   সু চি বলেছেন,  “অসত্য খবর প্রচার করে রাখাইনে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে”। সু চি হামলাকারিদের “টেররিস্ট” বলেছেন। আর মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”।  কিন্তু এই সাফাই যুগিয়ে দেয়ায় ভারতের কোন লাভ হয় নাই। তবে মায়ানমার সফর থেকে মোদি কী অর্জন করতে চান এই প্রশ্নে বিবিসি কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিককে সাক্ষী মেনে অনেক কথা বলিয়ে নিয়েছেন। সুবীর ভৌমিক এই কথাগুলো ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তরফ থেকে আমাদের কাছে পৌছাতে চেয়েছেন, এটাও ধরে নিতে পারি। সুবীর বিবিসিকে বলছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য বিবৃতির মূল্য উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা”। মি ভৌমিক বলছেন, “রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার”। “মুসলিমদের প্রশ্নে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী এবং কট্টর বৌদ্ধরা মি মোদি এবং তার দল বিজেপির সাথে একাত্ম বোধ করে”। ভারত যে সম্প্রতি বিশেষ অভিযানের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেছেন, সেটাকেও দেখা হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনা অভিযানের প্রতি দিল্লির সমর্থন হিসাবে”। উপরে সি রাজামোহনের লেখায় দেখেছিলাম ভারতের বিনিয়োগ মুরোদহীনতার কথা। অর্থাৎ ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রশ্নে কোন অর্জন নাই। বরং বর্মীজ জেনারেলদের ইসলামবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়ার জন্য ভারত কাজ করছে। এই কাজটাই ২০০৮ সাল থেকে ভারত করে জেনারেলদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা হত্যার বড় ঘটনাগুলো ঘটতে পেরেছে বলে মনে করা হয়।

    এবারের নতুন সংযোজন মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমার মাইন পুতে রেখেছে। মায়ানমার অল্প কিছু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা যে মাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ জাতিসংঘের কনভেনশন স্বাক্ষর না করা দেশ। বাংলাদশ এখন পর্যন্ত এনিয়ে জাতিসংঘে নালিশ বা সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতে যায় নাই। পলায়নপর আশ্রয়প্রার্থিদের জন্য মাইন পুতে রাখা হয়েছে, এরা কী কোন বিদ্রোহী? অর্থাৎ নিরীহ সাধারণ মানুষ কোন আশ্রয়ও না পাক, মায়ানমারের হাতেই তাকে মরতে হবে এই স্যাডিজম এখানে কাজ করছে।  আর এই স্যাডিজমকে মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”। তার মানে ব্যাপারটা দাড়াল যেহেতু ভারতের নিজ বিনিয়োগের সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাড়ানোর মুরোদ নাই, তাই তাকে নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে। বর্মী জেনারেলরা গণহত্যার ক্লিনজিং অপারেশনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকছেন ক্রমাগত, ভারতের এই মনোরঞ্জনে কোন জেনারেলের দায় কী কমছে? অথবা বার্মার সাথে চীনের সম্পর্কে কোন ফাটল? ভারতের উতসাহে বার্মার জেনারেলরা গত ফেব্রুয়ারির রোহিঙ্গা হত্যা অপারেশন ঘটানোর পরেও কী, এই এপ্রিলে চীনের সাথে বর্মার প্রেসিডেন্ট ১০ বিলিয়ন ডলারের বন্দর নির্মাণ চুক্তি করেন নাই?  তাহলে ভারতের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অর্জন কোনটাকে ধরেন? স্যডিজমে অন্যের শরীরে কষ্টের পিন ফুটানোতে সুখ?

    [এই লেখা এপর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হয়েছে। তবে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। সেটা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

    ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

    গৌতম দাস

    ২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

    http://wp.me/p1sCvy-2hm

     

    ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

    “I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

    তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

    গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

    আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

    গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

    আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

    সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

    আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

    মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

    আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

    গৌতম দাস

    ২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

    http://wp.me/p1sCvy-2hc

     

    সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

    ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

    এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

    গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

    [জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

    কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
    সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

    যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

    তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

    অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

    পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

    কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

    এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

    ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

    ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

    আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

    একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

    ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

    ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • “চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

    “চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

    http://wp.me/p1sCvy-2h7

     

     

    চীন-ভারত সামরিক সংঘর্ষ কী আসন্ন? সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় এটা নিয়েই জল্পনা-কল্পনা চলছে। ভুটানের  ডোকলাম উপত্যকায় মুখোমুখি হয়ে থাকা ভারতীয় ও চীনা সেনাদের এই অবস্থান আরো উত্তেজনাময় হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত মুখোমুখি অবস্থান ছেড়ে কেউ ফেরত যায় নাই। যদিও সৈন্য সমাবেশের সংখ্যা কমানো-বাড়ানো ঘটেছে সময়ে। কুটনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে চীনা দাবি হল, ভারতীয় সেনাদেরকে সবার আগে ঐ অবস্থান ছেড়ে  ফিরে যেতে হবে। এরপর ভারতের সাথে কথা হতে পারে, এর আগে নয়।  কারণ চীনের ব্যাখ্যা হল, বৃটিশ ও চীনা রাজশক্তির ১৮৯০ সালের  সীমান্ত চুক্তি  অনুসারে সেই থেকে ঐ স্থান আর কোন বিতর্কিত ভুখন্ড নয়, বরং চিহ্নিত ভাবে চীনের ভুখন্ড। তাই ভারত চীনা ভুখন্ডে ‘অনুপ্রবেশকারি’। এই প্রসঙ্গে গত ১১ আগষ্ট আনন্দবাজার লিখেছে, “চিন দাবি করছে, অতীতে ভুটান লিখিত ভাবে তাদের জানিয়েছে ডোকলামের ভূখণ্ডটি চিনের অধীনে। সুতরাং ডোকলামে ভারতীয় সেনা পাঠানো সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি যখন চিনের সঙ্গে ভুটানের তখন ভারত নাক গলাচ্ছে কেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে”।

    বিপরীতে ভারতীয় কুটনৈতিক অবস্থান হল, ঐ স্থান চিহ্নিত নয় বিতর্কিত, এবং তা ভুটানের দাবিকৃত ভুখন্ড। ভারত ভুটানের পক্ষ থেকে চীনাদেরকে বাধা দিয়েছে। কিন্তু এরপর ভারত আরও বলতে চাইছে, আসলে ওগুলো কথা আর ভারতের জন্যও আর কোন গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপুর্ণ হল, ‘আসেন চীনা ভাইয়েরা’, “একসাথে” বরং সেনা প্রত্যাহার করি। ভারতের এই বদল অবস্থান কেন?

    চীনা অবস্থান কত কড়া তা  বুঝা যায় গত জুলাই মাসে জর্মানিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদী চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং-এর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও চীন রাজি হয়নি। এমনকি এখনও চীন তার নিজের অবস্থান থেকে একচুল সরে নাই।  ওদিকে আনন্দবাজার আরও লিখেছে, “তাতপর্যপুর্ণ ভাবে আজ ডোকলামকে চিনা এলাকা বলে মেনে নেওয়ার কথা (এখন) অস্বীকার করেছে ভুটান। থিম্পু জানিয়েছে, ডোকলাম তাদেরই এলাকা। সেখানে রাস্তা তৈরি করে চিনা সেনা ভুটানের সার্বভৌমত্বে হাত দিয়েছে। ভারতের চাপেই ভুটান এই পদক্ষেপ করেছে বলে ধারণা কূটনীতিকেরা”। অর্থাৎ ভারত চেষ্টা করছে নিজের অন্যের ভুখন্ডে “অনুপ্রবেশকারি” হওয়ার যে আন্তর্জাতিক আইনি দায় তা থেকে নিজের নাম কাটাতে।

    আর ওদিকে এখন আর রাস্তা তৈরিতে চীনকে বাধা দেয়া ভারতের কাছে কোন ইস্যু নয়। ভারত চাইছে যত দ্রুত মানুষ ভুলে যাক যে ভারত চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। ভারতের মূল ইস্যু এখন ‘সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণ করা’। এর সুযোগ সে পেতে চাচ্ছে। অর্থাৎ ভারতীয় সেনা যে এখনই ফিরে যেতে চায়, এ ব্যাপারে তারা একপায়ে রাজি। কিন্তু চুপচাপ ফিরে গেলে নিজের বেইজ্জতি হয়, তাই ভারতের মুখ রক্ষার স্বার্থে ভারত-চীন একসাথে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে  ভারত চীনকে যে প্রস্তাবে  রেখেছে,  চীন তাতে রাজি হলে ভারতের ইজ্জত বাঁচে। বিপরীতে চীনের অনড় ভূমিকা এবং তারা অনবরত হুমকি দিয়ে বলে চলছে, ভারতীয়রা বিতর্কহীন চীনা ভূখণ্ডে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। অতএব সবার আগে তাদেরকে চুপচাপ ফিরে যেতে হবে। সারকথায়, সব বাদ দিয়ে ভারত এখন মরিয়া হয়ে একটা সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণের সুযোগ খুঁজে ফিরছে। কিন্তু তাদের দশা এমন দুস্থ অবস্থায় পৌঁছল কেন?

    কারণ এক. নির্বাচনী অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরির কথা ভেবে মোদি সরকার পরিকল্পনা করেছিল, আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোদি বেশি তৎপর – এটা দেখানো। এই উগ্র জাতীয়তা প্রদর্শন করাই মোদির লক্ষ্য ছিল। এমনটা দেখাতে পারলে আগামী ভোটে এটা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি সুবিধা দেবে বা আগিয়ে রাখবে, এই ছিল বিজেপি এবং মোদির হিসাব। ভুটান-চীন সীমান্তে চীন রাস্তা তৈরি করতে গেলে তাই মোদি সরকার অন্য কোনো উপায়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পথ না খুঁজে এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে  সরাসরি নিজ সৈন্য পাঠিয়ে উগ্রতা প্রদর্শন করতে গিয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এতটাই কাঁচা ছিল যে, ঘটনা তিন সপ্তাহে না গড়াতেই তৈরী করা টেনশন সামলাতে না পেরে আপসের পথে যেতে অস্থির হয়ে উঠেছে। এ কারণে, মোদি ভারতীয় সংসদের সব দলকে ডেকে এক সর্বদলীয় পরামর্শ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। ওই সভায় সবার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায়, মোদি সরকার সেনা পাঠিয়ে অযথা সামরিক টেনশন তৈরি করেছে অথচ, কূটনৈতিক পদক্ষেপে হিসাবে সম্ভাব্য বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে তেমন কোন প্রস্তুতি নেয়নি। যেমন জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে যদি ডোকলাম প্রসঙ্গ উঠে বা ইস্যু হয়ে যায় তবে সেখানে রাশিয়া কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে – এমন কোনো আগাম প্রস্তুতি বা রাশিয়ার সাথে আলোচনা করে কোন নিশ্চয়তা নেয় নাই , মোদির সরকার। বরং অনুমান করা যায়,  সে পরিস্থিতিতে রাশিয়া সম্ভবত চীনের দিকে তাকিয়ে অবস্থান নেবে।

    অপর দিকে এত আশা-ভরসাস্থল, বন্ধু মনে করা আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে? এরও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। নেয়া হয় নাই। আর আমেরিকা সম্ভবত ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। ইতোমধ্যেই নানা উছিলায় প্রকাশিত আমেরিকান অবস্থান এটাই। সারকথায় আমেরিকা দূরে দাঁড়িয়ে বলবে, তারা মিটসাট করে নেক।  ফলে ভারতের বিরোধী দল, বিশেষ করে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী মোদিকে এই বলে অভিযুক্ত করেন, তার আমলে এসে আমাদের ট্র্যাডিশনাল বন্ধুরা দূরে অনিশ্চিত অবস্থানে চলে গেছে। এসব মিলিয়ে ওই সর্বদলীয় মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হয় সরকার যেন সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়। এতে অবশ্য মোদির লাভের গুড় ঠিক থেকেছে। অন্তত সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নেয়ার দায় একা মোদির নয়, সবার বা সর্বদলীয় – তাই হয়ে গেছে। আসলে মোদির লক্ষ্য ছিল, নিজের আগামি নির্বাচনের জন্য অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরি। সে কাজ ইতোমধ্যে যা অর্জন  হবার তা হয়েই গেছে। যদিও এখন বিরাট সমস্যা হল, চীন তাকে সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নিতে দিচ্ছে না, বরং এর বদলে সীমিত আকারে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে অনবরত চীনা হুমকি দিয়ে।

    ভারতের থিংকট্যাংক ডোকলাম ইস্যুকে কিভাবে দেখছে?
    প্রত্যেক সামর্থ্যবান রাষ্ট্র, মানে এমন রাষ্ট্র যে এক বা একাধিক থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ জোগাতে সক্ষম –  তার জন্য একাধিক থিংকট্যাংক গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ বলে বিবেচিত হয় একালে। থিঙ্কট্যাঙ্কের মানে হল, এ কালের রাষ্ট্রের কৌশলগত বহুবিধ স্বার্থ থাকে, সেসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা চালানো এবং এতে পাওয়া ফলাফল ব্যবহার করা হয়। ঐ গবেষণার ফলাফল সমাজে একাদেমিক দুনিয়ায় খোলা থাকে, চর্চা আলোচনায় আরও সমৃদ্ধ হয়। এসব থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা ওই গবেষণার ফলাফল বা সুপারিশের আলোকে সঠিক নীতি গ্রহণে তা ব্যবহার করতে পারে। যেহেতু রাষ্ট্রস্বার্থে এই গবেষণা ফলে এসব থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় বা দাতব্যভাবে সাধারণত নিজের খরচ জুগিয়ে থাকে। কিন্তু কখনই তা রাষ্ট্রের বাইরের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠতে পারে না বলে সাধারণত মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার রেওয়াজ হল, বেশির ভাগ থিঙ্কট্যাঙ্ক  অভ্যন্তরীণ দান দাতব্যে অর্থ সংগ্রহ করে চলে।

    কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারত এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। সে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের পয়সায় নিজের থিঙ্কট্যাঙ্কের এক্সপার্ট ও গবেষক তৈরি করছে। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতের স্বার্থে কাজ করতে পারে। এটা কি সম্ভব? খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে দিবার নেশায় তা এখন সম্ভব-অসম্ভবের উর্ধে এক বাস্তবতা। গত  ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর থেকে  আমেরিকা-ভারত প্রথম পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের প্রয়োজনে কাছে আসা শুরু হয়েছিল। যদিও আমেরিকার তাগিদে ‘ওয়ার অন টেরর’ ইস্যুতে তা শুরু হয়েছিল, কিন্তু খুব দ্রুত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ ইস্যুতেও ভারতের সাগরেদ হয়ে যাওয়ায় এটাই মুখ্য ইস্যু হয়ে যায়। ‘চীন ঠেকাও ইস্যুতে দোস্তালির’ দিন শুরু হয়ে যায়।  সেকালে অবশ্য থিঙ্কট্যাঙ্কের ধারণাই ভারতে তেমন একটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না; কেবল যুদ্ধ-কৌশল অর্থে গবেষণার কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু বুশের ওই সফরের ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলতে শুরু করে দেয়। সত্যি সে এক আজব ঘটনা। না আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর শাখা বাংলাদেশে নাই তা নয়। অথবা আমেরিকান সরকার বা  এনজিও ফান্ডেড লোকাল থিঙ্কট্যাঙ্ক বাংলাদেশে নাই, ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু সেগুলোর ভুমিকা বাংলাদেশের সরকারকে গবেষণা দিয়ে নীতি নিতে সাহায্য করা নয়। বরং বাংলাদেশে আমেরিকান নীতি কী হলে আমেরিকান স্বার্থের জন্য সঠিক হবে  তা আমেরিকান সরকারকে বুঝতে বা তথ্য সংগ্রহ করে দিতে কার্যকর থাকাই এদের লক্ষ্য।

    প্রেম, রোমান্স – এগুলো কি করে করতে হয় থেকে তা নিয়ে কারও কাছ থেকে কোচিং বা ট্রেনিংয়ে তা শিখার বিষয় কখনও নয়। কারণ সেক্ষেত্রে নিজের প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে না, বরং ঐ কোচ বা ট্রেনারের সাথে প্রেম রোমান্স হয়ে যাবার সম্ভাবনা।  তাই প্রেমিক-প্রেমিকারা বাইরের কারো কাছ থেকে কোনো ট্রেনিং নেয়া ছাড়াই এটা নিজেরা নিজেরা ‘সরাসরি স্টেজে পারফর্ম করতে করতে ব্যাপারটা শিখে ফেলার বিষয়। এ জন্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের কৌশলগত নীতি-পলিসি কী হবে, সে গবেষণার খরচ রাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু তা না করে নানান আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের অর্থ ও গাইডে ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক গড়ে তোলা হয়েছে। আমেরিকানরা খরচ বহন করছে, ভারতীয় মধ্যবিত্তকে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছে পিএইচডি, মাস্টার্স করাতে- এতেই তারা খুশি। আর ভাবছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান যেন ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখবে। ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন, যেন আমেরিকার স্বার্থচোখ দিয়ে কেউ ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখছে। এ’এক সোনার পাথরের বাটি! ফলাফল হয়েছে যে আমেরিকান শিখানো বুলিই তারা প্রায়ই আউড়ায়।

    গত ১০-১২ বছর আগে থেকে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতে গড়ে তোলা শুরু হওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এর অন্যতম প্রভাবশালী এমন এক ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। বর্তমানে তিনি আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’র ডিরেক্টর। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ‘রাজা মন্ডলা’ (Raja Mandala) শিরোনামে তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। এক্সপার্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশেও আসেন। ডোকলাম ইস্যুতে তার লেখা কয়েকটি কলাম  আছে। এর একটি হল – ‘মাইন্ড দ্যা পাওয়ার গ্যাপ’ (Mind the power gap)। অর্থাৎ প্রভাব-ক্ষমতার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের তুলনীয় সক্ষমতার অর্থে, ভারত পিছিয়ে পড়া দেশ, এক বিরাট পাওয়ার গ্যাপ আছে দুই দেশের মধ্যে, ফলে সাবধানে পা ফেলো! এটাই বলতে চাইছেন তিনি।

    তার এই কলামের প্রথম বাক্য হল, “উপমহাদেশে একের পর একটি ক্ষেত্রে চীনের ঢুকে পড়ার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নবাবি চিন্তা করার অবস্থায় ভারত নেই”। (As India settles into an extended military standoff with China in the Himalayas, it can’t afford to take its eyes off Beijing’s maritime forays in the Indian Ocean….। India no longer has the luxury of contesting Chinese strategic incursions into the Subcontinent one piece at a time.)   তিনি শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার আর ভুটানের ডোকলাম, এ তিন ইস্যুতে চীনের সাথে ভারতের নিজেকে তুলনা করার কথা ভাবাকে “নবাবি চিন্তা” বলছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর চীনা মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অপর দিকে মিয়ানমারও চীনা সহযোগিতায় একটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছে; উদ্দেশ্য ওই পোর্ট থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। এটাই এর মূল উদ্দেশ্য, তবে মায়ানমারও তা ব্যবহার করবে।

    রাজামোহন বলতে চাইছেন, ওই দুই পোর্টের মাধ্যমে চীনা প্রভাব যেভাবে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের ওপর বাড়বে, সে তুলনায় ডোকলামে কিছু জায়গাজমির মারামারি খুবই তুচ্ছ ঘটনা। অর্থাৎ পোর্ট ইস্যু ভারতের অনেক বড় স্বার্থ হারানোর বিষয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর কাজ হল – নিজেদের ‘চীন ঠেকাও’ বুলি ভারতীয় শাখায় জড়ো হওয়া ইন্টেলেক্টদের মনে গেঁথে দেয়া। সে কাজে যেসব বয়ান ভারতীয়দের মনে তারা গেঁথে দিয়েছে, সেটা হল অবাস্তব কিছু হাহাকার। যেমন – ‘সব চীন নিয়ে গেল’, ‘চীন ভারতকে ঘিরে ধরছে’ ইত্যাদি। ভারত যেন চাইলেই চীনা অর্থনৈতিক প্রবল প্রভাব উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে পারে। এটা যেন ভারতের সাবজেকটিভ ‘ব্যক্তি ইচ্ছার’ ব্যাপার।  অথচ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বা সক্ষমতা এগুলো অবজেকটিভ, বাস্তবতা। চীনের কিছু ব্যক্তি এমন দাবি করেন বলেই এটা সত্য, তা এমন একেবারেই নয়। এটা হল অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

    ধরা যাক, চীনের “সব নিয়ে যাওয়া” বা “ঘিরে ধরা” বয়ান শতভাগ সত্য। কিন্তু এসব তৎপরতা কি বেআইনি, অবৈধ কাজ? মোটেও তা না। এমনকি ভারতও তা দাবি করে বলতে পারছে না। অর্থাৎ অভিযোগ করছে না। কিন্তু তাহলে অভিযোগটা কী? বাস্তবতা হল, চীনের পরাশক্তিগত সক্ষমতার সাথে ভারতের সক্ষমতা তুলনাযোগ্য নয়। কিন্তু সেটা তো চীনের অপরাধ নয়। পরাশক্তিগত সক্ষমতা মানে যার মূল ভিত্তি হল, নিজ অর্থনৈতিক অগ্রসরতা।

    রাজামোহনেরই ওই লেখায় তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীনের বর্তমান জিডিপির আকার ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বড় এবং চীনের সামরিক খাতে ব্যয়ও ভারতের চেয়ে চারগুণ বেশি”। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের শেয়ার সবচেয়ে বড়, চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতার সাথে কেউ তুলনীয় নয়। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এশিয়ায় চীনের প্রভাব ভারতের চেয়ে অনেক বেশি হবে এবং এটা স্বাভাবিক। এমনকি যারা ভারতের পড়শি রাষ্ট্র তাদের ওপর চীনা প্রভাব, তাদের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ অনেক বেশি হবে এবং তা বিরাট ভূমিকা নিবে। কিন্তু এরপরই আবার রাজামোহনসহ ভারতীয়দের আহাজারি আমরা শুনতে পাবো – “ভারতের প্রভাবাধীন এলাকায়”, ভারতের ‘পড়শি রাষ্ট্রে’ চীন ঢুকে পড়ছে।

    এখানে ভারতের প্রভাবাধীন এলাকা কথাটি বড়ই তামাশার। এর অর্থ কী? যেন এর অর্থ হল, সেটা ভারতেরই তালুক। আসলে তারা বোঝাতে চান, ভারতের বাপ-দাদা হল ব্রিটিশেরা। আর ওইসব এলাকা ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশদেরই তো ‘তালুক’ ছিল, কাজেই ভারতের বাপ-দাদা বৃটিশদেরগুলাই এখন ওগুলো যেন ভারতের তালুক!  এছাড়া আর এর অন্য মানে কী?  একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছিল। কিন্তু সে জন্য কি ১৯৪৭ সালের পর এসব দেশের ওপর নেহরুর ভারতের কোনো মৌরসি তালুক-প্রভাব বর্তায়? অথচ ভারতের ইঙ্গিত এমন যেন কলোনিয়াল ব্রিটিশ-প্রভাবের উত্তরসূরি হল নেহরুর ভারত। ব্রিটেন যেন ভারতের বাপ-দাদা। অথচ ‘প্রভাবাধীন এলাকা’ কথাটির একটিই মানে হতে পারে আর তা হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রভাব আশপাশে যতটুকু। এটা লিগ্যাল প্রভাব না, কোনো বৈধ মালিকানাবোধও এখানে নাই, থাকে না।

    এছাড়া আরও বলা যায়, আজ আমার অর্থনীতি প্রভাবশালী বলে এর প্রভাব থাকলেও কাল যদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যায়, তবে প্রভাব কমে আবার শূন্যও হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অন্য কেউ আমার চেয়ে অর্থনীতিতে বড় প্রভাবশালী হিসেবে হাজির হয়ে গেলে স্বভাবতই আমার প্রভাব নেমে যাবে, শূন্য হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের কাছে তার পড়শি মানেই ব্রিটিশ কলোনি সূত্রে নেহরুর ভারতের কল্পিত “স্থায়ী প্রভাবাধীন এলাকা’ বলে কিছু একটা। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হল, এত যুক্তিবুদ্ধি নিজেই দেয়ার পরও খোদ রাজামোহন একইভাবে চীনের বিরুদ্ধে হা-হুতাশ করার বাইরে না। অথচ ব্যাপারটা হল, আগামীতে যদি ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কখনো, তবে ‘ভারতের প্রভাবাধীন’ কথাটি অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটা এখনই আগেই হয়ে গেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এসব বালক- সুলভ আবদার করার মানে হয় না।

    এ ছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। যখন দুনিয়া কলোনি দখলের প্রতিযোগিতার যুগে ছিল, আর ব্রিটিশরা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সবার শ্রেষ্ঠ ছিল, সে যুগের পড়তি দিকে ১৮৮০-এর দশকে আমেরিকা প্রথম অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, তবু দুনিয়ার মাতবর হয়ে উঠতে আমেরিকার আরো ৬০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের পর আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের নেতৃত্বের অধীনে নিতে পেরেছিল। আরো লক্ষণীয়, এই ৬০ বছরে আমেরিকানরা কোনো বড় যুদ্ধে নিজেকে বিরাটভাবে জড়ায়নি। তবে যুদ্ধ একবারই করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেটা নির্ধারক যুদ্ধ, যার শেষে আমেরিকা ‘দুনিয়ার রাজা’ হয়েছে। এর মাঝে আমেরিকা কোনো নাকি কান্না করেনি, সব নিয়ে গেল বলে হাত-পা ছোড়েনি। আজকের চীনের কাছে তার উত্থানের মডেল সেই আমেরিকা, তাকেই অনুসরণ করে।

    কিন্তু ভারত? আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির সমর্থক হওয়ায় বড় ভাই পিঠ চাপড়ে দিয়েছে আর ভারত মনে করছে – সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা গায়ে-গতরে খেটে অর্জন করার জিনিস। বড় ভাই পিঠে হাত রাখলেই এটা অর্জিত হয়ে যায় না, কখনও যাবে না। অতএব ভারতের একেবারে পড়শির ওপর চীনের লংটার্ম কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব যদি এসে হাজিরও হয়, তবে এ নিয়ে নাকিকান্নার সুযোগ নেই। এছাড়া এটা বেআইনি বা অবৈধও নয়। আর চীনের এই প্রভাব ছুটানোর জন্য ভারতের একটাই করণীয়, চীনের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে ফিরে আসতে পারা। কিন্তু পড়শি দেশের রাজনীতিতে, নির্বাচনে হাত ঢুকিয়েও এই পাল্টা প্রভাব অর্জন করা যায় না। যা প্রায় প্রত্যেকটা পড়শি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ সবখানে ভারত করে যাচ্ছে, আর ঘৃণা অর্জন করছে। এমন শর্টকাটে কিছুই অর্জন হয় না, বরং এই কূটকৌশল পুরোটাই ভারতের বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৬ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]