Tag: পরাশক্তি

  • গ্লোবাল অর্ডার কী

    গ্লোবাল অর্ডার কী
    গৌতম দাস
    ৩০ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SG

     

                      Locking China Out of the Global Order Could Backfire

    এবারের ব্রিকস এটা ১৫তম সম্মেলন; মানে হল এটা ২০০৯ সালে প্রথম তার জন্ম সম্মেলন করে যাত্রা শুরু করেছিল। গত ২৪ আগষ্ট এর ১৫তম সম্মেলন দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ হল। কিন্তু এই প্রথম এই সম্মেলন দুনিয়াটাকে ঝাঁকি দিয়েছে – এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি। আর ততধিক বেশি করে পশ্চিমা দুনিয়া (ইউরোপ-আমেরিকা) প্রকাশ্যে নিশ্চুপ কিন্তু তাদের সবগুলো ইন্দ্রিয়ই খাঁড়া; কি জানি হচ্ছে সেদিকে কান খাড়া। এর আগে কোন বিষয় নিয়েই এত করে সবার এন্টেনা খাঁড়া করতে তাদের দেখা যায় নাই। অন্যদিকে আবার, এমনকি আমাদের মত দেশ থেকে যারা গত ২০-২২ বছরের সময়কালে আমেরিকাসহ পশ্চিনা দেশে গিয়ে থাকবার রেসিডেন্স পারমিট যোগাড় করে নিয়েছে এরাও (মানে ব্ল্যাক-ব্রাউনেরা) সাদাদের সাথে মিলে এই প্রথম তাদের সব ইন্দ্রিয় খাড়া করেছে। অথচ এরা দুচার বছর আগেও যেমন ধরেন ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে প্রবল তর্ক করেছে যেন তারা পুর্ণমাত্রায় পশ্চিমা অরিজিনের নাগরিক হয়ে গেছে ফলে তাদের  স্বার্থও পশ্চিমারাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে এলাইনড, এক লাইনে। তাই তাদের স্বপ্ন-কামনার আমেরিকা বা পশ্চিম কত মহান, কত স্টেবল কত সম্ভাবনাময় আর তা তাদের স্বপ্ন-কল্পনা পূরণের জন্য পারফেক্ট!  ফলে চীন-রাশিয়া বা জাতিসংঘের ভাষার গ্লোবাল সাউথ [global south] – এরা তাদের স্বপ্নকল্পনা পুরণের পথে বাধা হয়ে জামা টেনে ধরছে যেন – এই মনোভাব দেখছিলাম আমরা। এরাও কানখাড়া! এমন পরিস্থিতিতে এই পটভুমিটা মাথায় রেখে এবার যদি ব্রিকস এর ১৫তম সম্মেলনের দিকে তাকাই তাহলে বলতে হয়, এবারের সম্মেলন সারা দুনিয়াকে এমন এক মজার জায়গায় নিয়ে ফেলে দিয়েছে; আর যেন বলছে এখন নতুন করে হাটা শিক্ষা কর!! আগের জানাশুনায় আর চলবে না, কাজ হবে না। তাই নতুন করে আগে হাঁটতে শিখে নে তাড়াতাড়ি!  বলতে চাচ্ছি, গত প্রায় আশি বছরের  আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেটায় ফাটল ধরেছে। আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!

    ব্রিকস জন্ম নিয়েছিল সেই ২০০৯ সালে, কিন্তু কেন কী পরিস্থিতিতে কি দরকারে এর জন্ম তা বাংলাদেশের একাদেমিক বা মিডিয়া জগত এখনও বেখবর আছে। এর মূল কারণ, ব্রিকস জিনিষটা কী অথবা কেন সেটাই এখনও পুরাপুরিই স্পষ্ট হয় নাই আমাদের দেশের ‘জানার’ জগতে।  বিশেষ করে এই সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের বাংলা মিডিয়াগুলোর রিপোর্ট দেখলে তা বুঝা যায়। তবে ইংরাজি মিডিয়া গুলো একটু ব্যতিক্রম। কারণ ইংরাজি রিপোর্ট এর সুবিধা হল কপি-পেস্ট বা অনুবাদ করে তারা কোনভাবে চালিয়ে দিতে পারেন। যদিও তাতেও তাদের দুর্বলতাও অপ্রকাশ্য নয়)। কারণ, সবচেয়ে মুখ্য প্রশ্ন, কেউ জানেই না বলতে পারছে না বাংলাদেশ কেন ব্রিকস থেকে বাদ??? গত ২৪ আগষ্ট (ব্রিকস সম্মেলনের শেষ দিন) পর্যন্ত সব রিপোর্টের এই এক দশায়। এমনকি ২৪ আগষ্ট রাত বারোটা মানে ২৫ আগষ্ট তারিখের শুরুতে যাদের হুশ হয়েছে জেনেছে তারাও ঘটনা বুঝে উঠে এরপর সেই ভিত্তিতে রিপোর্টে হাজির করতে গিয়ে কেউই ২৫ আগষ্ট সন্ধ্যার আগে পারে নাই। বিশেষ করে সে খবরটা কোথায় আছে, আবার তা পেলেও কী এঙ্গেলে তা দেখতে হবে এটাই তাদেরকে বেশি ভুগিয়েছে। কারণ রয়টার্স কী-কোথায় এটা তাদের অজানা নয় – হলেও সুনির্দিষ্ট হওয়া সহজ ছিল না।  তাতে  এরপরেও দেখা যায় কোন কোন মিডিয়া হাল ছেড়ে দিয়েছে। তাই তারা ২৫ তারিখে আর ব্রিকস নিয়ে হাজিরই হয় নাই। এরা যে হাল ছেড়ে দিয়েছে তা বুঝা যায় তারা এবার ব্রিকস নিয়ে মহা মাতবর তাদের কূটনীতিক সেকশন কে ক্ষমা দিয়ে দিয়েছে। আর  ২৫ তারিখ থেকে তাদের অর্থনীতি সেকশন থেকে ব্রিকস ইস্যুতে কিছু খবর ছেপেছে। এজন্যই বাংলাদেশে সবার রিপোর্টই তাই কমবেশি হালকার উপর ঝাপসায় মারা ধরণের বক্তব্য জুড়ে দেয়া।

    আমরা নতুন কোন কিছু দেখলে বা একে চিনতে চেষ্টা করলে বা কাউকে চিনাতে গিয়ে, – ঐ নতুনের সাথে কিছু তুলনীয় এমন কিছুর সাথে তুলনা করেই  নয়া ধারণাটা পরিচিত করাতে যাই। তাতে  যতটা সমতুল্য যতটা কাছের সদৃশ্য এমন কিছু পাওয়া যায় যা আবার ইতোমধ্যেই সমাজে অনেক পরিচিত থাকে; তবেই নতুন কাউকে এর পরিচয় দেয়া সহজ হয়। মুলকথা একমাত্র কাছাকাছিও  জানা কিছুর সাথে তুলনা করেই নয়া বিষয়কে মানুষ পরিচিত করাি আমরা।
    কিন্তু ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করে?  আর এর কাছাকাছি ঘটনা ফেনোমেনাই বা কী – তাই তো আমাদের অনেকের জানা নাই! মূলস্মস্যাটা ছিল আসলে এখানে!

    ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করেঃ
    আমি আগে বহুবার বলেছি ব্রিকস যা হতে যায় করতে চায় সেই উদ্দেশ্য হল – আমেরিকার নেতৃত্বে যে গ্লোবাল অর্ডারটা কায়েম আছে এখনও (যেটাকে বেশির ভাগই  আমরা ভুল করে একে আমেরিকান “পরাশক্তি” বলে বুঝি বা ডাকি) এই গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান থাকে বা আছে।
    ঠিক যেমন একটা দেশ-রাষ্ট্রে  ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে এটা তেমনই। আসলে  (গ্লোবাল অর্ডারের জায়গায়) “লোকাল অর্ডার” বললে সেটাই দেশ বা রাষ্ট্র ধারণা হয়ে যায়।  কারণ, রাষ্ট্র মানে সেটা নিজের বা স্থানীয় এই অর্থে রাষ্ট্রকে গ্লোবাল অর্ডারের সাথে তুলনায় লোকাল অর্ডার বলেছি। আর অর্ডার মানে মূলত নিয়ম-শৃঙ্খলায়  সাজানো বা বিন্যাস্ত করা।  তাই লোকাল অর্ডার বলতে বুঝা যেতে পারে নিজস্ব রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা  মানে, বুঝতে হবে তা একটা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে।  তবে লোকাল বলাটা অবশ্যই গ্লোবাল এই ধারণার সাপেক্ষে, এটাও মনে রাখতে হবে। কারণ লোকাল শব্দটা নানান অর্থের ব্যবহার হতে পারে। আর অর্ডার [order], এই অর্ডার বলতে অনেক সময় নির্দেশ বা হুকুম দেয়া অর্থ হলেও এখানে অর্ডার কথাটার মানে নিয়ম-আইন-শৃঙ্খলাময় একটা  সিস্টেম [system] যা বাংলায় ব্যবস্থা। যে অর্থে পুলিশ-কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলা হয়।
    ঠিক সেরকম ১৯৪৫ সাল থেকে দুনিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল অর্ডার (সেবারই প্রথম) চালু হয়েছিল যেন, তা এক ‘গ্লোবাল রাষ্ট্র ব্যবস্থা’। আর এটাকেই “গ্লোবাল অর্ডার” বলছি। তবে শুধু আমি না, বুঝমান একাদেমিকেদের দেয়া ভাষা এটা; ফলে তাদের থেকে নেয়া এই শব্দ ও এর ব্যবহার। আবার রাষ্ট্রে যেমন অনেক ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে  যেমন সংসদ, নির্বাহি বিভাগ (মানে প্রধানমন্ত্রীর অফিস; আর যার অন্তর্গত থাকে এডমিনিস্ট্রেশন, অর্থ বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি মন্ত্রণালয়-বিভাগ ) আর বিচার বিভাগ ইত্যাদিতে একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় তেমন, গ্লোবাল অর্ডার এর বেলায় সেটাও কিছু “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এমন গ্লোবাল রাজনৌতিক প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক । মূলত এইদুটো দিয়েই ১৯৪৫ সালে গ্লোবাল অর্ডার খাঁড়া করা; তা  যাত্রা শুরু হয়েছিল । তবে এগুলোকে “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” এর জায়গায় যেমন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর বেলায় এগুলো মাল্টিলেটারাল বডিও [multilateral body] বলা হয়। কারণ,  এখানে  মাল্টিলেটারাল বলতে তা ‘বহুরাষ্ট্রীয়’ ফলে তা  ‘বহুপক্ষীয়’ এমন বুঝানো হয়। তবে মাল্টিলেটারাল বলতে আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল,  বহু-বাহুবিশিষ্ট। পরবর্তিতে জাতিসংঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ছাড়াও ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO) অথবা একালে পরিবেশ প্রসঙ্গে [ UNEP], হিউম্যান রাইট [UNHRC] ইত্যাদি নানান মুখ্য গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে নেয়া হয়েছে। আর এমন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়েই সমন্বয় করেই একটা “গ্লোবাল অর্ডার”  বা বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয়ে আছে।  তবে সাবধান আমি গ্লোবাল অর্ডার [Global order] বলেছি কোন জিও [Geo-Order] বলি নাই। এমনকি জিও-পলিটিক্স [Geo-politics] -ও বলি নাই। একালে মানুষ যখন একটা কিছুকে বুঝতে পারে না বা ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন এটাকে বলে জিও-পলিটিক্স  বা ভূরাজনীতি। তাই কেউ যখন বলবে, “সবই ভুরাজনীতির খেলা” এর মানে হল, বক্তা বুঝতে পারছেন না এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করে বলবেন!! এটাই বুঝতে হবে!! যার মানে হল –  যা “আমি যা জানি না, বুঝি না” সেটাই ভুরাজনীতি।

    কিন্তু আমরা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ ধারণাটা – সেটা বহুল প্রচলিতভাবে জানি নাই কেন?
    মূল কারণ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা; যার আদিগুরু সেকালের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫) সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট, প্রধান কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ স্তালিন। যিনি পরে মারা যান ১৯৫৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। ঐ যুদ্ধে ১৯৪২ সাল থেকে হিটলারের অক্ষশক্তি [Axis powers] বিরোধি মিত্রশক্তি [Allied powers] – এভাবে যুদ্ধের দু-পক্ষ; আর হিটলারবিরোধী মিত্রপক্ষের মূল নেতা ছিলেন রুজভেল্ট।  তিনিই মিত্রশক্তি নামে জোটবদ্ধতার প্রথম উদ্যোক্তা, মিত্রশক্তির সকলের হয়ে যুদ্ধের মূল মোটা খরচগুলোর একা বহনকারি দেশ, সারা পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা সেকালের সারা দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তি কিন্তু সকলেই এরা যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে গিয়ে অর্থ সঙ্কটে দেঊলিয়া অবস্থায় – এঅবস্থায় এদের সকলকেই নিজ অধীনে আনার বা  ঐ যুদ্ধে বিজয়ী হলে শেষে তারা সকলেই কলোনি দখল ত্যাগ করতবে এই শর্তে বাধ্য করে রুজভেল্ট এদের সবার সাথে চুক্তি করেছিল। এভাবে  বাগে আনা ইত্যাদির মূল কারিগর হলে আমেরিকার নেতা রুজভেল্ট। তাই এই যুদ্ধে রুজভেল্টের প্রধান নেতা হিশাবে উত্থান এভাবেই, এসব কারণেই।
    পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী এদের দেশ সেটা আর এরা, যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে বাধ্য হয়ে রুজভেল্টকে নেতা মেনে নিয়েছিল তা বুঝা গেলেও সোভিয়েত ইউনিয়নও কেন এর ভিতরে একইভাবে ঢুকে গেছিল?  কারণ, হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া স্তালিন যিনি দেখতেছেন হিটলারবিরোধী একটা জোট হচ্ছে আর আবার সেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মুখ্য খরচগুলো বইবেন – কাজেই  হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে এত ভাল সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন নাই। তিনিও তাই রুজভেল্টের নেতৃত্বের মিত্রশক্তিতে যোগ দিতে দেরি করেন নাই। আসলে, মূল পলিটিক্যাল চুক্তি মানে যুদ্ধ শেষে আমরা একটা জাতিসংঘ গড়ব – এই চুক্তিতেই ভিত্তিমূলক সবকথা লেখা ছিল যা ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যা এখন ইতিহাসে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা”
    এমনকি যুদ্ধ শেষে দেশগুলোর পুনর্গঠনের অর্থও ঋণ হিশাবে দিয়েছিল আমেরিকা। বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে এই প্রতিষ্ঠানে মুখ্য ততপরতা ছিল ইউরোপের পুনঃর্গঠন। আর বিশ্বব্যাংক[WB] যার পুরা নাম হল ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনষ্ট্রাকশন এন্ড ডেভলবমেন্ট [International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)] –  এই নামের মধ্যে রিকনষ্ট্রাকশন [বা বাংলায়] পুনর্গঠন এই শব্দটাই বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও শুরুর কর্মের ইতিহাস এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ, বিশ্বব্যাংক যেখন আমাদের মত দেশে দেশে অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে ঋণ দেয় – সেই কাজটা তো পুনর্গঠন নয়। মানে অবকাঠামো (কোন ব্রিজ বা রাস্তা অথবা কারখানা) আগে  ছিল যুদ্ধে বা কোন কারণে ভেঙ্গে গেছে এমন নয়, বরং এই প্রথম বারের মত গঠন। তা সত্বেও বিশ্বব্যাংক-কে তার জন্মের দাগ পুনর্গঠন বা রিকনষ্টাকশন শব্দটা নামের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছে।
    স্তালিন কত রুজভেল্টের ঘনিষ্ট ছিলেন, ১৯৪২-৪৫ এই তিন বছর তা বুঝার একটা ভাল উপায় হল, এই তিন বছরে যত দেশ রুজভেল্ট ভ্রমন করেছেন সেখানে তার দুই বগলে সঙ্গে থাকতেন দুই নেতা স্তালিন আর চার্চিল (সেকালের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী)। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই যুদ্ধে রুজভেল্টের  এমন নির্ধারক অবদান যতটা কম পারা যায় এমনভাবে সোভিয়েত ইতিহাসে ছাটাই করে দেয়া হয়। যাতে মনে হয়, স্তালিনের একক কারিশমাতেই তিনি হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েতকে বাঁচিয়েছেন। [আমাদের মত দেশগুলোর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা কেবল লিখিত সোভিয়েত-রুশ ইতিহাসই, সহি বলে পড়ে থাকেন। আমার বহু সিনিয়র (কমিউনিস্ট)-কে এমন ইতিহাসই বলতে শুনেছি।  এছাড়া তাদের আরেকটা রুল হল,   যা কিছু লাল বইয়ে তাই তাদের জন্য সহি (খাঁটি সত্য) ও শ্রেণীর ইতিহাস। আর লালবইয়ের বাইরের সব “বুর্জোয়া” বা “সাম্রাজ্যবাদের” ইতিহাস – মানে মিথ্যা এই বিবেচনা।]

    পরবর্তিতে বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইতিহাসের এভাবে সাফল্যের ব্যাখ্যাটাই জোরদার হয়ে দাড়ায় ও আরেক সাফাই দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুজভেল্ট মারা যান ১৯৪৫ সালের আগষ্টে। আর ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে নয়া প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার এর আমেরিকা সেটা এবার আর আগের মত “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান” গড়া অথবা গ্লোবাল জনগণের জন্য কাজ ও ইমেজ গড়ার যে আমেরিকা সেটা  বদলে হয়ে যায় এক লুটেরা স্বার্থের আমেরিকা। যা শুরু হয়েছিল সিআইএ দল পাঠিয়ে ইরান দখল দিয়ে। তখন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে খেতাব দেয় বা ডাকা শুরু করেছিল।  অথচ আজ দুনিয়ার খুব কম কমিউনিস্টই বলতে পারবে কবে থেকে কমিউনিস্ট চোখে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ হয়েছে? বরং প্রায় শতভাগই সম্ভবত বলবে জন্ম থেকে!!! ্ওযডী সেটা আবার কার জন্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন নাকি আমেরিকা!!! সে আরেক ঝামেলা!!!   আর এই সুযোগেই সোভিয়েত ইতিহাস থেকে বিশ্বযুদ্ধের নির্ধারক আমেরিকা বা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকেই মুছে ফেলার সুযোগ পোক্ত হয়ে নিয়েছিল!

    আবার একটু পিছনে যাই, ওদিকে (১৯৪২-৪৫ এই সময়কালে) মিত্রশক্তির নেতা রুজভেল্টের দেয়া সুবিধা স্তালিন নিতে গিয়ে  আমেরিকার প্রস্তাবিত গ্লোবাল অর্ডার গড়ার পরিকল্পনায় সামিল হতে স্তালিন বাধ্য হয়েছিলেন, তা বলা যায়। সেই সাথে ১৯৪৪ সালের দিকে রুজভেল্ট প্রথম তার জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ার ধারণা স্তালিনসহ সেকালের প্রধান মিত্রদের কাছে হাজির করেছিলেন। ভেটো সদস্যপদ রাখার ব্যবস্থা চালু করে স্তালিনের মূল সব আপত্তি সামলিয়েছিলেন রুজভেল্ট। এরপরে এবার স্তালিনকে ঘনিষ্টভাবে পেয়ে নিজ “গ্লোবাল অর্ডার” গড়ার স্বপ্ন-পরিকল্পনায় স্তালিনকে সামিল করে নিয়েছিলেন।  এতে স্তালিন একসাথে রুজভেল্টের সাথে মিলে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ গড়তে রাজি তো হয়েছিলেনই।  জাতিসংঘ গড়ে গড়ে উঠতে পেরেছিল। এমনকি গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে ১৯৪৪ সালে এর যে জন্মসভা বসেছিল তাতে প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। সেই প্রতিনিধি ২২দিন ব্যাপী লাগাতর চলা জন্মসভায় হাজির থাকলেও এরপর প্রত্যেক রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ করা সাপেক্ষে সদস্যপদ গ্রহণের প্রসঙ্গ আসা ও সময় থেকে সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত হয়ে যায়। সেই থেকে গ্লোবাল অর্ডার তৈরির উদ্যোগের সাথে কার্যত স্তালিন থেকেও না-থাকা হয়ে যায় – জাতিসংঘ গড়তে হ্যা কিন্তু  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে না – এভাবে। কিন্তু এনিয়ে সোভিয়েত পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে  কোন আপত্তি অথবা উচ্চবাচ্য কিছু শুনে নাই।  কেন স্তালিন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক না গড়ে ফিরে এলেন – এনিয়ে কোন আর্টিকেল লেখা বা এটা আমেরিকানদের খারাপ কাজ এমন কোন বক্তব্য আনা এমন কোনকিছুই করা বা বলা হইয়েছে জানা যায় না। এমনকি ১৯৫৩ সালে প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে আইসেনহাওয়ার – তিনি আমেরিকার ভোল বা ইমেজ বদলানো ততপরতা শুরু করেছিলেন যেটা থেকে সোভিয়েত প্রতিক্রিয়া হল যে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে কোন ভাল-মন্দ মুল্যায়ন বা নাম নেয়া ইত্যাদি সোভিয়েত সরকারের দিক থেকে হয়েছে, নেতারা কখনও করেছেন এমন কিছু জানা যায় না।
    সব মিলিয়ে এসবে রুজভেল্ট-স্তালিন মিলে যে অভিমুখ একটা গ্লোবাল অর্ডার চালু করার যতটুকু একসাথে করার যাচ্ছিল বা পরিকল্পনা ছিল তা ১৯৫৩ সালের পরে শুকিয়ে মারা যায়, কোন চিহ্নই থাকে নাই। পরের সোভিয়েত নেতৃত্ব নিকিতা ক্রুশ্চেভ থেকে ব্রেজনেভ বা গর্বাচেভ পর্যন্ত কেউ কখনও নির্দিষ্ট করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিয়ে কিছু বলেছেন জানা যায় না। তবে আমেরিকা ওটা “পুঁজিবাদী সমাজ বা ব্যবস্থা” ফলে যেন তা তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য ও পাপকাজ এমন অনুমান থেকে কথা বলা, খারাপ চোখে দেখানো এটা বজায় ছিল সব সময়েই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমালোচনা জানা যায় না।

    কিন্তু কেন এমন ছিল?  আর এর চেয়ে বড় কথা যে সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোকে (মোট প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র) আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য করে না  নেওয়াতে বা তারা না হওয়াতেই কী আমেরিকান নেতৃত্বে পশ্চিম  এরা কী একটা গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করতে ব্যার্থ হয়েছিল বা থমকে দাড়িয়ে গেছিল? সোজা জবাব হল, একেবারেই না।  বরং গ্লোবাল অর্ডার  নিজের মত করে বিকশি হয়েছে আর এখন অনেক ডালপালা গজিয়ে আরো বিস্তৃত হয়েছে। তবে অবশ্যই এই বিকাশ আদর্শ নয়, দোষত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা ও খামতিও প্রচুর। কিন্তু সাফল্যও ফেলনা নয়।
    কিন্তু মজার কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯১) গেলে তা থেকে আলাদা হওয়া ১৫ রাষ্ট্র আর এই সোভিয়েতের প্রভাবাধীন বা বাফার রাষ্ট্র হিশাবে যেমন পোল্যান্ড, রোমালিয়া ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র ছিল যারা সকলে ঐ ১৯৯২ সালেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল। এখন ছোটখাট পাঁচটা দেশ বাদে দুনিয়ার সকলেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য। মানে ১৯৩ রাষ্ট্রের জাতিসংঘের বিপ্রীতে আইএমএফ সদস্য ১৮৮, তাই।  এখনকার দুনিয়া গ্লোবাল অর্ডার বানানোর দিক থেকে অনেকটাই অগ্রসর হয়ে গেছে। তবে আগেই বলেছি অবশ্যই দোষত্রুটি প্রচুর। সেসব সংস্কার করে যেতেই হবে প্রত্যেক কালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতটা একে এলাও করে।

    কিন্তু আমাদের মত দেশের বেলায়, তারা ১৯৯১ সালের আগের সোভিয়েত অনুসারি কমিউনিস্ট হয়েই থেকে গেছেন। এরা নিজেদের জন্য আর আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে তাদের প্রভাবের কারণে এরা না নিজেরা কিছু জেনেছে না কাউকে জানতে দিয়েছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ঠিক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান। কারণ, তাদের আপত্তি এক জায়গাতেই যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উতপাদন না হওয়া – মানে তাদের সমাজতন্ত্র না হওয়া মানেই এগুলো পাপের ফসল তাই অগ্রহণযোগ্য!!! এই হলো তাদের মূলকথা।
    এতে তাদের আপত্তিটা দাড়িয়েছে এমন যদি কোন আওয়ামীলীগ নেতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়  যে বিএনপি কে নিয়ে তোমাদের আপত্তিটা ঠিক কী? আর তাতে যদি লীগ নেতা জবাব দেয় যে ওরা আওয়ামীলীগ নয় এবং  ওরা আওয়ামীলীগ করে না – তাহলে এটা যেমন জবাব হবে এটা তাই!!

    তো সে যাই হোক তাদের আপত্তি তাদের সাথে থাকুক সেটা কোনই সমস্যা নয়।
    কিন্তু তাদের প্রভাব আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডারটা কী এসম্পর্কে বেখবর করে রেখে দিয়েছে। এদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে এক অর্ডারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা তো বহাল হয়ে এর বয়স  প্রায় আশি বছর হয়ে গেছে। আর ওদিকে রাইজিং চীন যে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্ব নিতে উঠে চলেছে (যদিও আরো সময় লাগবে)। ফলে নেতৃত্বের পালাবদলটাই আসন্ন হয়ে উঠেছে আর তাতে চীনা নেতৃত্বের  নতুন গ্লোবাল (যা আপাতত কেবল) অর্থনৈতিক অর্ডারটা কেমন হতে পারে – এটা নিয়ে লড়াই ঝগড়ায় তা কোথায় গিয়ে থিতু হবে – এরই সময়কাল চলছে। এখন। একথা শুনে মনে করার কারণ নাই যে এটা কেবল চীন-আমেরিকার লড়াই। তা একেবারেই নয়।
    বরং উভয় পক্ষই বাংলাদেশকে নিজের যেদিকে সুবিধা মনে হয় সেদিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইবে,চাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোন্দিকে যাব বা এই তানাতানি কিভাবে সামলাবো এর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা কী তাই তো বুঝিনাই!! গ্লোবাল শুধু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক যে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এটাও তো বুঝি নাই!! কমিউনিস্ট জ্ঞানিদের তো আরো ধারণা নাই। তাহলে? বাংলাদেশের একাদিমিক জগত বা সুনির্দিষ্ট করে আই আর বা অর্থনীতি কেউই তৈরি নয় – প্রয়োজনটাই বুঝে সারতে পারে নাই অবস্থা!!!!
    তাদের আল টপকা কথা হল, হাসিনা চাইলে ব্রিকসে যোগ দিতে পারে!!! যেন বিরাট এক জ্ঞানের কথা বলেছে!!

    আমরা নিজের জন্য কী করতে পারিঃ
    এদিকে গ্লোবাল পালাবদলে এতদিনের আমেরিকান নেতৃত্বের অবস্থানে চীন উঠে আসতে চলেছে। অথচ কমিউনিস্টেরা ১৯৪৫ সালে দুনিয়ায় কী গুরুত্বপুর্ণ বদলে এসেছে তা খেয়াল করে নাই। শুধু তাই না, দেশের একাদেমিক জগতকেও এটা খেয়াল করা বা বুঝার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নেতি ধারণাই দিয়েছে।  তাই  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান ও কেন, তা নিজেও জানে নাই, অন্যদেরও জানা হয় নাই। তাহলে এখন যখন প্রায় আশি বছর পরে আমেরিকান নেতৃত্বের বিকল্প হিশাবে চীনের নেতৃত্বের ব্রিকস খাড়া হতে চলেছে আর এরই প্রথম অর্থপুর্ণ কিছু পদক্ষেপ চীন নিয়ে ফেলেছে তখন এই ঘটনা-ফেনোমেনা নিয়ে আমাদের একাদেমিক বা কমিউনিস্টেরা কীভাবে আর কথা বলবে, যেটা সে আগে খেয়ালই করে নাই, প্রস্তুতি নেয় নাই?
    এজন্যই বলেছি আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেখানটায় ফাটল ধরেছে। তা আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!
    ফলে কী কী ও কেমন ধরণের বদল আসন্ন তাতে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী কী হতে পারে সেসব বুঝাবুঝির তরিকা জানতে হবে, পদ্ধতি জানতে হবে – দেখার নতুন অভ্যাস চর্চা লাগবে ইত্যাদি…। তবে সাবধান এটা ১৯৪৫ সালের মত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বদল যেমন ঘটেছিল এবার আগে থেকেই পরিস্কার যে এটা কেবল চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতিক এক অর্ডার আসতে পারে মাত্র।  ফলে ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কমে যাবে হয়ত কিন্তু নাই হবে না।  আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে যাচ্ছে না। আবার রাজনী আর  অর্থনৈতিক গ্লোবাল নেতৃত্ব যদি আলাদা হয় তবে কেমন ফিট করবে্‌, কার্যকরভাবে চলতে পারবে কিনা সেটা এক বিরাট প্রশ্ন যার জবাব অজানা!
    সবচেয়ে বড়কথা এই পালাবদল যদি আপোষে না হয়ে যুদ্ধ লেগে যায় বা এড়াতে না পারে মানে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ফয়সালার দিকে চলে যায় তাহলে কী হবে! আর এতে সব পক্ষের জন্যই তা মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে সন্দেহ নাই।  এর একটা চিহ্নের কথা বলা যায়। তা হল, আগামি বছর শুরুতে যদি ইউক্রেন যুদ্ধ না থামে তবে সেটা হবে খুবই খারাপ চিহ্ন। কেননা এর মানে হবে আমেরিকার আগামি নির্বাচন যেটা ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়ার কথা সেটাও যুদ্ধের মধ্যেই হবে??
    আর সেসব নিয়ে বুঝাবুঝি আর তাতে গ্লোবাল স্বার্থের ঝগড়াগুলোর মাঝে নিজ-রাষ্ট্রের ভালমন্দ বুঝবার জন্য আমরা কতটুকু যোগ্য হয়ে উঠব? যতটুকু পুরান কমিউনিস্ট প্রভাবের মধ্যে আমরা যে যেমন থেকে যাব তারা তক্তি গভীর অবুঝ থেকে যাব। এর বিকল্প হল, একটা ফ্যাক্টসকে আদর্শগত পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করা বা ব্যখ্যা করা বা ব্যাখ্যা দেয়া ত্যাগ করতে হবে।  সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে ঐ আদর্শগত বুঝাবুঝিতে খামতি আছে। সেই খামতি পূরণ করে বরং সামলানো – নিজের চিন্তাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।   একথাটাই আরেকভাবে বললে, আমি কমিউনিস্ট তাই কমিউনিস্ট-চিন্তা-ফ্রেমে ফেলেই আমাকে যেকোন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে হবে – এই জিদ ত্যাগ করতে হবে।

    আপডেটেডঃ    আগষ্ট  ২০২৩; 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

     

    বাংলাদেশ প্রসঙ্গেঃ
    ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

    ১৪ জুলাই ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০৫
    https://wp.me/p1sCvy-4In

     

                        VOA  –  MODI & BIDEN

     

    “বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা আর ভারতের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নিবে না!” – সেসব দিন শেষ হয়েছে। হ্যা কথা এটাই; যদিও কথাটা আমার নয়। কথাটা বলেছেন এসএনএম আবদি; ভারতীয় সাংবাদিক!  আবদি লিখেছেন “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” আক্ষরিক অর্থে বললে, আবদি বলছিলেন “ঘটনার মূলে হল – ভারত ও আমেরিকা আর একমতে বাংলাদেশের কোন কিছুকে দেখছে না”।

    হা বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি আর এক নয়ঃ
    আবার এসএনএম আবদি [SNM Abdi] ভারতীয় সাংবাদিক;  এক দৈনিকের সাবেক  সম্পাদক এসএনএম আবদি চলতি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আবার লিখেছেন। প্রায় একমাসের বেশি কিছুদিন আগে তাঁর লেখা নিয়ে আমার আলোচনা-মন্তব্যে তাঁর পরিচয় নিয়ে অনেক লিখেছি। তাই এবার আবার সেদিকে যাচ্ছি না। তবে দৃশ্যত আবদি আর সুবীর ভৌমিক (যিনি আবদির মত গত শতকের আরেক সাংবাদিক), এরা দুজনেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ও সম্ভবত এঁরা তাদের মিডিয়া উইংয়ে কাজ করেন বলে মনে করা হয়। অনেকে যারা ভারতের রাজনীতির উত্থান-পতন ও ট্রেন্ড-অভিমুখ মনিটর করেন, খেয়াল রাখেন এটা তাদের ধারণা বা মতামত। এদের দুজনেরই তাই একই সমস্যা যে তাঁরা পাবলিকলি বলতে পারেন না যে তাঁরা এখন কী করেন বা কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন বা কাজ করেন! কোন প্রতিষ্ঠানের বেতনের লিস্টে বা পে-রোলে তাদের নাম আছে! ইত্যাদি!

    আবদি আবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লিখেছেন গত ১০ জুলাইয়ে, ভারতের ফ্রি-প্রেস-জর্নাল নামে এক বহু পুরানা ইংরাজি পত্রিকাতে, যার শিরোনাম “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” । আমাদের মানবজমিনও আবার সে লেখা অনুবাদ করে চাপিয়েছে – “বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত থেকে আলাদা যুক্তরাষ্ট্র, নিতে চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” – এই শিরোনামে। ফলে পাঠক যারা বাংলা বা ইংরাজি যেটা থেকেই পড়তে চান পড়তে পারেন।

    আমার এলেখার বড় শিরোনাম,  “বাংলাদেশ-আমেরিকা প্রসঙ্গঃ ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!”। যেটা আবদির শিরোনামের কথাটাই তবে আমার ভাষায় লিখা বলা যায়।  আমরা বলে এসেছি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেনের ক্ষমতা দখলের পরে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা একথা বহুবার বলেছি।  ভারত কে দিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজের বিনিময়-মজুরি হিশাবে। কিন্তু তা কি চিরদিনের জন্য নাকি কতদিনের জন্য??

    এই প্রশ্নে বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী একাংশের ধারণা এটা যতদিন হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন। যদিও বাস্তবে ঘটনাটা এমন না। এভাবে ঘটে নাই। অপ্নতত এখন তো একেবারেই পরিস্কার যে দিন ফুরিয়েছে। তবুও যেমন এক. ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনে হাসিনা চেয়েছিল ভারত ২০১৪ সালের মত খোলাখুলি ন্যাংটা হয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানাক! কিন্তু মোদির ভারত বুদ্ধিমান হতে চেয়েছিল সম্ভবত! তাই এত দায় না নিয়ে দূরে দাঁড়ায় কেবল মাখনটা উঠিয়ে খেতে চাওয়া এক অবস্থান নিয়েছিল। আর এতে হাসিনা ক্ষেপে গিয়ে এক প্রকাশ্য হুঙ্কারে যে  বয়ান দিয়েছিলেন “ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে: শেখ হাসিনা” –  রিপোর্ট্ টা তখনকার বাংলা ট্রিবিউনের। কিন্তু তাতে কী এরপর ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কী নাই হয়ে গেছিল? না ঠিক তা নয়। তবে এই ভাষায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। যদি বলি এরপরে মানে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা-মোদি সম্পর্কে আর কোন নয়া চুক্তি হয়েছে কিনা – এই বিচারে বলা যায় হাসিনা-মোদি এরপর আর কোন চুক্তি হয় নাই অথবা নয়া চুক্তি করে কিছু দেয়া হয় নাই। তবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আগের করা চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন অর্থে ২০১৯ সালের পরেও অনেক কিছুই দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। আর সবসময়ই একটা রুটিন সম্পর্ক তো আছেই যেটা অবশ্যই বেশ ঘনিষ্ট। এমনকি যতটা ঘনিষ্ট সময়ে এর চেয়েও বেশি করে তা দেখানোও হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতিকালে যত অ্যামেরিকান চাপ বাড়ছে ততই ভারতের মুরোদ থাকুক আর নাই হাসিনা সরকার ততই ভারতের কোলে মুখ-গুজে – “দেখেন না কিছু করতে পারেন কিনা” টাইপের  চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এমন রিপোর্ট ভারতীয় পত্রিকায় বেশি দেখা যাচ্ছে; যা প্রথম আলো একেবারে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে হলেও তাদের বরাতের উপর চড়ে মিথ্যা করে ভারতীয় করিতকর্মের মিথ্যা বয়ান তৈরি করে চলেছে।   যদিও এর মানে এমনটা একেবারেই নয় যে ভারতের সাথে হাসিনার খাতিরের সম্পর্কটা অটুট আছে বা ধরে রাখা গেছে! সেটা একেবারেই নয়; বাস্তবতাই সেটা নয়। মূলকথা আমেরিকাকে সুপারিশ করে ভারতের সেই মুরোদই হারিয়ে গেছে!

    কিন্তু হাসিনার সাথে ভারতের সম্পর্কটা কী বা কেমন আর সবচেয়ে বড় কথা ভারত-বাংলাদেশের এই বিশেষ খাতিরদারি সম্পর্কটা ২০০৭ সালে কেন হতে পেরেছিল? তা নিয়ে আমাদের আম-জনতা লেবেলে জানা-বুঝা কম। বরং তর্ক হতে দেখা যায় এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার কীনা এনিয়ে; এবং বলাই বাহুল্য তর্কে দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ট অংশই মনে করে এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল কেন এটা হতে পারল? এককথায় এর জবাব হল, এটা আমেরিকার কারণে। অন্যভাবে বললে বড়ভাই আমেরিকা এশিয়ায় নিজস্বার্থে চীন-ঠেকাতে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতেই ভারতের ‘মুই কি হনু’ এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে সে নিজেকে অ্যামেরিকান বরকন্দাজ-প্রতিনিধি বা আমেরিকার লোকাল এজেন্ট ভাবা শুরু করেছিল। আর অন্তত টানা দশবছর এটা সে উপভোগ করেছিল যতক্ষণ না ট্রাম্প এসে  ২০১৭ সালে আমেরিকার আগের সরকার-প্রশাসন গুলোর দেয়া বিশেষ সুবিধা ট্রাম্প সেবার সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করেছিল। যদিও সেটা ছিল আসলে আগের দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নয়।

    আর এবার সব রাজনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার – এটাই ঘটেছে একালে বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরু থেকেই একট একটু করে। একমাত্র একালে যা সুনির্দিষ্ট আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে!  মূলত ভারতীয় মুসলমানদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন, বৈষম্য আর সাধারণভাবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ; যেটা প্রতিবছরের ধর্মীয় স্বাধীনতা [Freedom of religion or religious liberty – OHCHR] লঙ্ঘনের সুচকে প্রতিফলিত এবং এর  আমেরিকান কমিশনার প্রতিবছর প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করে গেছে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু এবার এসব কিছুকে ছাড়িয়ে বাইডেন মোদির বিরুদ্ধে কত সিরিয়াস আর কত আগিয়ে গেছে তা প্রকাশ হয়ে পরে যখন দেখা যায় মোদির বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন মোদিবিরোধী সকল গোষ্ঠির নেতা হিশাবে  কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে সহায়তা করছে। সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে,  গুজরাত হত্যার বিবিসিতে প্রচারিত ডকুমেন্টারি থেকে শুরু করে  আদানির শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ফাঁস ও ধ্বস নামিয়ে দেয়া, আদানিকে তুলাধোনা করে জর্জ সোরেস (গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটে হেজ ফান্ড বা hedge fund এর এক কুতুব শেঠ) এর পাবলিক বক্তৃতা ইত্যাদিতে প্রকাশিত। এরপরে রাহুল গান্ধীর প্রথমে লন্ডন ও পরে আমেরিকা সফর আর সেখানে গিয়ে সবখানেই থিঙ্কট্যাংক ও মানবাধিকার গ্রুপের সাথে দিনরাত বৈঠক – ইত্যাদি এঘটনা থেকেই প্রথম পরিস্কার হয়ে যায় যে ভারতের পিঠে হাত রাখার দিন এবার শেষ হয়েছে! ২০০৭ সালে  বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া নিয়ে আমেরিকা যেভাবে অভিযুক্ত যাই হোক না – মূল ভারত-আমেরিকান সম্পর্কই এখন আর সেই আগের জায়গায় নাই হয়ে গেছে। কারণ, বাইডেন এখন ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকে আর দেখতে চান না মর্মে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন আর বলা যায় তা প্রকাশ্যও হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় এটা এখন পরিস্কার যে সেজন্য আইন বাঁচিয়ে দুরত্বে থেকে বাইডেন যতটা সম্ভব সব ভাবেই মোদি বিরোধীদের জোটের রাহুলকে নেতা মেনে গড়ে উঠার পক্ষে আগিয়ে গিয়ে সহায়তা করেছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  তবে আমার আমেরিকা-ভারত দুরত্বের কথা লেখাতে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে, সম্প্রতিকালে মোদির আমেরিকা সফর এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব?

    স্বল্পে মূলকথায় বললে, এবারের মোদির সফর ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সফর। যেটাকে টেনেটুনে বড়জোড় সামরিক অস্ত্র কেনা-বেচা বা কিছু সামরিক ইকুইপমেন্ট ভারতে  উতপাদন করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও টেকনোলজির চুক্তি হয়েছে বলা যেতে পারে। এমনকি এই সফরে গ্লোবাল বা আঞ্চলিক কোন ভারত-আমেরিকা স্ট্রাটেজিক আলোচনা বা আমরা “কমন স্ট্রাটেজিক বন্ধু” জাতীয় কোন কথাবার্তাও হয় নাই।  তবে এশিয়ায় ভারত ও আমেরিকা উভয়েই চীনবিরোধি নিজ নিজ স্ট্রাটেজিক অবস্থানের রাষ্ট্র। যদিও তাদের মধ্যে কোন কমন জীবিত কোন প্লাটফর্মও [কোয়াডের মত যা এখন মৃত অকার্যকর অর্থে]  অবশিষ্ট নাই বা বেঁচে নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [নন অফিসিয়াল জোট ধরণের] উদ্যোগ বলে এতে ভারত-আমেরিকা চীনবিরোধী হয়ে আছে ধরে কিছু কথা হয়; তাও সেটা যৌথতায় নয়! এছাড়া ভারত কোন সামরিক জোট করতে চায় না – এই নীতির দেশ বলে এনিয়েভারতের নুন্যতম উচ্ছসিত হওয়ার বাস্তবতাই নাই। অর্থাৎ মোদির ঐ সফরটার একমাত্র ফোকাস বাণিজ্যিক। কোন রাজনৈতিক আলোচনায় সেখানে হয় নাই। বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা তো অনেক দুরের বাত!

    তাহলে হানিমুন শেষঃ
    হা শেষ! ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন ঘটিয়ে যেটা শুরু হয়েছিল – আমেরিকা বড় ভাই ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল বলে ভারত নিজেই ‘হাসিনার বাংলাদেশের’ মালিক হয়ে গেছে বলে যে ভাব নিয়ে চলছিল এর অবসান হয়েছে। এটাকে আবদি তার এবারের লেখায় বলেছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের প্রভাব বলয়ের দেশ [… Bangladesh is in India’s zone of influence, New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs. ] অথবা কখনও বলেছেন হাসিনা হলো ভারতমুখাপেক্ষী সরকার [pro-India Prime Minister Sheikh Hasina-led Awami League …।]।  এবং এভাবেই ভারত এতদিন নিজেকে ভুয়াবাজি মিথ্যা করে হলেও পরাশক্তি ভাব ধরে চলেছিল – এরই সমাপ্তিকাল!
    এর মূল কারণ, এখন বাইডেন প্রশাসন মোদি-যুগের অবসান দেখতে মনস্থ করেছে।  মোদির মুসলমান বিদ্বেষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কে ব্যবহার করে বাইডেন তাই এপ্রসঙ্গকে সামনে উঠিয়ে ফোকাসে এনেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই। এতে ইতোমধ্যেই মোদিবিরোধী জোট সবল হচ্ছে – নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভেদকে সেকেন্ডারি করে কার্পেটের নিচে তা চাপা দিতে পেরেছে – মিডিয়াও মোদিবিরোধীয় সরব হয়ে উঠছে। এমনকি এর ছাপ আদালত পাড়াতেও পড়েছে যে মোদির বিরুদ্ধে রায় দেয়া যেন এখন সহজ ও সম্ভব।   কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে থাকা প্রতিষ্ঠান সিবিআই, ইডি, রাজ্যপালের অফিস বা আয়কর বিভাগ লেলিয়ে দিয়ে  বিরোধীদের শাসিত রাজ্যে মোদি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার চরমে উঠেছে – আর এর অবসানে বিরোধীরা জোটবদ্ধ ও নিজেরা ভোকাল হওয়া সম্ভব বলে মনে করতে শুরু করেছে –  বাইডেনের একটু দুরবর্তি সহায়তাতেই!
    এসবের সারকথা হল, যদি ২০২৪ সালে মোদি যদি পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন তবে মোদিবিরোধী সেই ভারতের উপর অ্যামেরিকান প্রভাব অনেক বেশি হবে।  চাই কী সেই ভারত, আমেরিকার এশিয়া নীতি যেমন বার্মা নীতির সাথে এলাইন [align] বা সমপাতিত করে নিজেকে পুনর্গঠিত হতে পারে বলে আমেরিকার মনে আশা জাগতে পারে।  আর সেই আমেরিকা হবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা যেকথা বলবে সেটাই শেষ কথা! এনিয়ে ভারতের সাথে কোন আলোচনাই নয়।  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক সেই অভিমুখেই ইতোমধ্যে   রওনা দিয়ে দিয়েছে – এটাই আবদির এই নয়া লেখার প্রধান দাবি!!

    এজন্যই আবদি বলছেন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হঠাত সক্রিয় ভুমিকার বিরুদ্ধে ভারত বোবা হয়ে গেছে ও আছে [… New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs]। বাংলাদেশের ভিতরেও যতটা শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে নিজস্বার্থ উপযোগী করে আকার দিয়ে, এজেন্সি দিয়ে দাঁড় করিয়ে এতদিন রাজত্ব করছিল এমন সবকিছু থেকে আপাতত গুটিয়ে প্রত্যাহার শুরু হয়েছে।  আর হয়ত তা সীমিত করে পুনর্গঠিত করার ইচ্ছায়ও হতে পারে। এসবেরই সোজা মানে হল,  যেই “বাবা আমেরিকা” ভারতকে পড়শিদের উপর কিছু মাতব্বরি করার ক্ষমতা দিয়েছিল  সেই বাবা এখন ভারতের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ভারতকে ফকির করে দিচ্ছে।

    যে রাশিয়ান জাহাজের মালামাল খালাসের মুরোদ ভারতের হয় নাইঃ
    আবদি তার লেখার শেষের দিকে বাংলাদেশের রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কিছু রাশিয়ান ইকুইপমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাওয়া এক রাশিয়ান জাহাজ-কে কিভাবে মাল খালাস না করে তা রাশিয়ায় ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছিল এর বর্ণনা দিয়েছেন – একটা বড় উদাহরণ হিশাবে।  ঘটনা হলো রাশিয়ান জাহাজটা ছিল আমেরিকার স্যাংশন খাওয়া তালিকায়।  তাই ঐ জাহাজে বাংলাদেশে ভীড়তে গেলে আমেরিকা তা রোধ করতে বাংলাদেশকে আগাম তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছিল। এতে প্রতিক্রিয়ায়  রাশিয়া ও বাংলাদেশের সাথে আলাপ করে ভারত লিড নিয়ে রাজি হয়েছিল যে ঐ নিষিদ্ধ জাহাজ সে কলকাতার হলদিয়ায় ভিড়িয়ে মালামাল নামিয়ে সহজেই সড়ক পথে সেসব মালামাল বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু বিধি বাম! কারণ সেদিন শেষ হয়েছে। তাই আমেরিকা ভারতকেও তার আপত্তির কথা জানিয়ে দেয় যাতে সে নিষিদ্ধ জাহাজ নোঙ্গর না করায় কলকাতা। আবদি লিখছে, আমেরিকা আপত্তির পদক্ষেপে এগিয়ে এলে ভারত পিছু হটে যায়!

    শুধু তাই নয় ঐ লেখার শেষে আপনি একটা মরাল লিখেছে এভাবেঃ
    এই গল্পের শেষে প্রকাশিত নৈতিক ভাষ্যটা হল, আমেরিকা এখন মনে করে তার কথাই শেষ কথা – এর উপর কোন কথা নাই। এবং পুরান দোস্ত ভারত অ্যামেরিকান এই নয়া অবস্থান পছন্দ বা অপছন্দ যাই হোক ভারতকে এমন অ্যামেরিকান ইচ্ছাকে মেনেই বেচে থাকা অভ্যাস করতেই হবে!  [“The moral of the story is that the US believes in having the last word, and even allies like India must learn to live with it whether they like it or not.”। মানে মোদিকে এমন অপমান হজম করতে শিখতে হবেই!

    কেন আবদি এমন সংবাদের বাহক হলেনঃ
    ব্যাপারটা হলো, এই নতুন অভিমুখ সম্পর্কে অনেকদিন ধরেই বলছি। কিন্তু ভারতের  কেউ এসব কথাকে সত্যি বলে বলে আমাদেরকে জানায় নাই। বরং উলটা প্রপাগান্ডা করতেই দেখেছি। তাহলে এই অসহায় ভারত – আমেরিকার সামনে গড়াগড়ি খাওয়া এই ভারতের ইমেজ আমাদের সামনে আনার দায়িত্ব আবদি কেন নিলেন? আগে উপরে লিখেছি বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের ততপরতা অন্তত আপাতত গুটিয়ে রাখার কথা কানে আসার কথা বলেছি। আবদির এই লেখা কানে আসা সেসব সংবাদ নিয়ে নিশ্চয়তা যোগালো বলা যায়।  তার মানে ভারত এই খবর নিশ্চয়তা দিয়েই ছড়িয়ে দিতে চাইছে?? মানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ বা গোষ্ঠিতে ভাঙ্গা-গড়া না হোক অন্তৎ ক্রমশ এদের ভাঙ্গার কথা নিয়মিত শুনব আমরা – তাই কি???

    যাকিছু আপোষে নিজ ইচ্ছায় আসতেই আছে ও থাকবে  তা সাদরে গ্রহণ কর জনগণ! জনগণ বুদ্ধিমান!

    সবশেষে আবদির কিছু সত্যবচনঃ
     আবদি এখানে যে অবস্থান নিয়ে লিখেছেন তা হল বাংলাদেশে হাসিনার ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি আর গুম খুন হত্যায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের যত অভিযোগ সেসবকেই তিনি সত্য বলে গ্রহণ করে নিয়ে কথা বলেছেন। এসব পাশ কাটিয়েও তিনি সদর্পে বলছেন হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় রাখতে হবে! কেন? তার একটাই সাফাই আর তা হল, বাংলাদেশে ভারতের গভীর স্বার্থ আছে যে হাসিনা-ই রক্ষা করে দিতে পারবে।  অর্থাৎ কোন ন্যায়-ইনসাফ বা আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায্যতা নয়। শ্রেফ ভারতের স্বার্থ – কাজেই আব্দি ভারতের সেই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন????? বড়ই অদ্ভুত না! মানে কোন মানুষ কী কোন ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তি ছাড়াই – আমার  ওইটা ভাল লাগে বা ওইটা আমি খাবো আমাকে এনে দেও ইত্যাদি এভাবে কথা বলতে পারে???

    তিনি এটাও পরিস্কার করেই বলছেন তাই এই চাওয়া – ভারতের স্বার্থ বলে তা পেতে চাওয়া এটা হাসিনারও (বেইনসাফি) উচ্চাঙ্খা বটে; এমনকি এর মানে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মই থেকে ছিটকে পিছলিয়ে পড়ে যাওয়া এমনকি যেটা বাংলাদেশকে এক দলের ও এক নেতার বাংলাদেশে পরিণত করবে…। [That would no doubt serve India’s national interests; and of course, fulfil Hasina’s ambitions; but would also mean ignoring the democratic backsliding that has reduced Bangladesh into a one-party, one-leader nation.]

    তবুও এটাই তাঁর আকাঙ্খা! কি তামসা!

     

     

    আপডেটেডঃ  ১৪  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

  • জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!

    জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!
    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Gw

     

     

     

    সময়ে কারও কাছে আঙুর ফল খুবই টক মনে হয় কারণ আঙুর হাতের নাগালে না আসা বা লাভ করা দুষ্প্রাপ্য বা নিজ অযোগ্যতা; তাই এমন কথা বলে চালিয়ে দেওয়া। ঠিক যেমন  ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’ হয়ে গেছে ।
    তিনি দাবি করেছেন, “নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে “প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে“। প্রতিবেশীদের কাছে এখন ভারতের পরিচয় স্থিতিশীলতার স্থায়ী প্রতীক হিসেবে”। মানে জয়শঙ্কর এখন আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন যে মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে মানে গত নয় বছরে  অন্তত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোদি ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে!!!!! আচ্ছা, এ তো বড় আজিব বাত! 

    তাহলে মোদির সাম্প্রতিক আমেরিকা সফর যা ছিল ২১-২৪ জুন – এই সময়কালের সপ্তাহেরও বেশি আগে থেকেই, ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট ভারতে যারা ছাপে (মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী) আর বাংলাদেশের প্রথম আলোও – এরা সকলে মিলে অন্তত তিনবার ঝলক উঠিয়ে কেন প্রপাগান্ডা করল যে বাংলাদেশের হাসিনার ভাগ্য নাকি মোদির আমেরিকা সফরে মোদি-বাইডেনের এর আলাপের মধ্যেই নির্ধারিত হবে????

    এখন প্রশ্ন হল কে মিথ্যা বলছে?
    দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী লিখেছিল, “ভারতের দুই প্রতিবেশি দেশ বছর শেষে নির্বাচনে যাচ্ছে। ভারত চায়, আমেরিকা এমন কোন উদ্যোগ যেন না নেয় যাতে ভারতের নিজস্বার্থ তাতে ক্ষুন্ন হয়ে যায়”। ভারতের নিজস্বার্থ মানে – আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হাসিনাকে আরেকবার জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার উপর বাধা সৃষ্টি – এটা বুঝতে হবে। কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এই অবস্থান নিয়েই খোলাখুলি লেখা ছেপে চলেছে। আর আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি উপদেষ্টা (NSA) জ্যাক সুলিভান [Jake Sullivan] ভারতে এসে ভারতের NSA অজিত দোভালের সাথেকার আলোচনায় নাকি এমন আলোচনা হয়েছে বলে দীপাঞ্জন দাবি করেছেন।

    “Two of India’s neighbours –Maldives and Bangladesh will go to polls later this year and early next year respectively. India is of the opinion that no initiatives should be launched in its neighbourhood that impacts its national interests adversely.”

    হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর লিখেছেন, “বাংলাদেশ-আমেরিকার সম্পর্ক একটা চাপের মধ্যে ঝাকুনিতে পড়েছে। রাষ্ট্রদুত পিটার হাস বারবার করে আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় এর আহবান জানাচ্ছে।”  [“…Peter Haas, repeatedly calling for the holding of a free and transparent general election”] যখন ইতোমধ্যেই আমেরিকা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যে নিজেকে এই অঞ্চলের এক পরাশক্তি বলে মিথ্যা করে হলেও ফুটানি করে ভাব দেখাতে চায় – সেই ভারতের কাছে নাকি হাসিনার সাহায্য চেয়েছে। [“Bangladesh has sought India’s assistance to tide over a rough patch in its relations with the US, especially over the conduct of elections in the neighbouring country, people familiar with the matter said on Tuesday.”]

    প্রথম আলোর প্রচেষ্টাঃ
    আর  রেজাউল লস্করের এই রিপোর্টারই উধৃতি দিয়েই আমাদের প্রথম আলো এক রিপোর্ট ছেপেছিল। যেন বাংলাদেশের সরকার ও তার সমর্থক এবং যারা ভারতের স্বার্থের ভিতরেই নিজস্বার্থ দেখে অথচ থাকে বাংলাদেশে – এমন গোষ্ঠিগুলোকে মিথ্যা করেই আস্থার কথা শোনাতে চেয়েছিল – এই অপ্রমাণিত কেবল জল্পনা-কল্পনার খবর (?) ছেপে উত্তেজনা সৃষ্টি করার মাধ্যমে!
    তবে এখানে ভারতের জ্ঞোয়েন্দা বিভাগ ও প্রথম আলোকে দেয়া তাদের এসাইনমেন্ট এর উদ্দেশ্য খুবই পরিস্কার। যেমন প্রথম আলো লিখছে, “…হিন্দুস্তান টাইমসের সূত্র বলছে, নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় একটি মুক্ত ও সমৃদ্ধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনার ওপরও আলোকপাত করেছে তারা“।
    অর্থাৎ ভারত আমেরিকাকে  চীনা জুজুর ভয় দেখাচ্ছে যে, যদি আমেরিকা তোমরা বাংলাদেশের আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় – এই উদ্দেশ্যে হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা-সহ নানান উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতেই থাকো তাহলে নাকি হাসিনা চীনের কোলে গিয়ে উঠে পড়তে পারে!  মানে আরেকবার রাতের নির্মাবাচন করতে দাও – এই হলো ভারতের অদ্ভুত আবদার!!!  ভারত এই কথিত চীনা-জুজুর মিথ্যা ভয়ের কথা ছড়িয়ে হাসিনাকেই আরেকবার ক্ষমতায় রেখে দিবার পক্ষে কথা তুলতে চাচ্ছে।
    আচ্ছা তাহলে এটাই কী জয়শঙ্করের কথিত  ” প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়ানো – কী তামাসা! আমরা কী প্রথম আলোর পারফরমেন্সে অভিভুত – এটা বলে উঠব!!!

    আরো আছেঃ
    প্রথম আলোর নয়াদিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সৌম্যের লেখা প্রথম আলোতে কখন কী পরিচয়ে ছাপা হবে এর তাল-ঠিকানা পাওয়া মুশকিল। যেমন কখনও তাঁর লেখা ছাপা হচ্ছে মতামত হিশাবে, কখনও নাম ছাড়াই শ্রেফ ‘নয়াদিল্লির প্রতিনিধি’ এভাবে পরিচয় লিখে; নয়ত প্রকাশ্যে নিজের নাম উল্লেখ করেই!!  গত ১৮ জুন সৌম্যের একটা লেখা ছাপা হয়েছিল; মানে মোদি-বাইডেন সরাসরি বা সামিট বৈঠক হয়েছিল ২৩ জুন – এর পাঁচদিন আগের ঘটনা সেটা। অর্থাৎ মোদির আমেরিকা রওয়ানা দিবার আগেই। সে লেখার সারকথা ছিল মোদি-বাইডেন বৈঠকে নাকি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ উঠছেই। এমনকি এভাবে লেখা হয়েছিল যে, “……সন্দেহ নেই, মোদি-বাইডেন বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের মন বোঝার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বাংলাদেশের নির্বাচনী গতিপ্রকৃতি”। অর্থাৎ সোজাকথায়, বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে!!!!!

    সৌমের ১৮ জুনের লেখায় আরো বলা হয়েছিলঃ

    এক.
    “দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তির দিকে দুই দেশের নজর যতটা নিবদ্ধ, ততটাই আগ্রহে এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। সে দেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন যে ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এই মুহূর্তে সরগরম, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি”।

    দুই.
    “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর চাপ, নতুন ভিসা নীতির মধ্য দিয়ে যা প্রতিফলিত, বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতকেও তা খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। ওই নীতির রূপায়ণ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভারতের অস্বস্তি ও চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই নয়া ফরমান নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল পরস্পরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। বাংলাদেশকে এই বিষয়ে আশ্বস্তও করা হয়েছে যে আসন্ন সফরে এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্যই মতবিনিময় করবেন”।

    তাহলে আজ ৫ জুলাই মানে মোদির সফর শেষে ১১/১২ দিন পরের।  তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… অথবা কেউই না; সবাই চুপ হয়ে আছে আর মুখে কুলুপ! না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!

     

    তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব
    নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… না সবার মুখে কুলুপ; না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!
    আগের দুসপ্তাহ ধরে মিথ্যা চাপাবাজির সব রিপোর্ট ছাপিয়ে ২৪ জুন থেকে আজও সবাই লুকিয়ে পড়ে আছে!!! আহা! কী সুবিধা!!!

     

    এখানেই শেষ নয়ঃ
    এরপর আবার সেই সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি হাজির! কিন্তু নতুন বেশভুষায়!
    আর এবার একই প্রথম আলোতে গত ২ জুলাই তার লেখার শিরোনাম কিন্তু এবার একেবারে উলটা কথায় –  “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে, বললেন জয়শঙ্কর”। আর সবচেয়ে বড় কথা এটাও ঘরে বসে এক বানানো খবর! আচ্ছা কন তো সৌম্য এটা একটা কথা হইল? নিজের মান-সম্মান বিশ্বাসযোগ্যতা এগুলো কিছুই না??? টাকাই সব!
    আপনি সৌম্য এতদিন কইলেন বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে! – মানে ২৩ জুনের বৈঠকে, মানে প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি বাংলাদেশের বা হাসিনার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবেন!! আর এখন এখানে কইতেছেন,জয়শঙ্কর বলেছেন – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে…।

    তাইলে সৌম বা প্রথম আলো আপনারা বলেন আপনাদের কোন কথাটা সঠিক????
    আপনাদের দুইটা কথার একটা তো অবশ্যই মিথ্যা কথা, এটা নিশ্চিত!

    কোনটা নিশ্চিত মিথ্যাঃ
     প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া সৌমের লেখাটার শিরোনাম – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে  – গুগল সার্চে দেখা গিয়েছে এটা ভারতে কোথাও ছাপা হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।  আর এই বানানো খবরটা বাংলাদেশে কেবল যুগান্তর, কালবেলা আর মানবজমিনে মাত্র; মানে বাংলাদেশেও আর কোন মিডিয়ায় ছাপা  হয় নয়। আর এরচেয়েও তাজ্জব ব্যাপারটা হল, এটা প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি হিশাবে সৌমের নিজস্ব রিপোর্ট হিশাবে। মানে সৌম নিজেই সোর্স!  তাহলে সে একই লেখা যুগান্তর, কালবেলা [পরে আবিস্কার হল যে সে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে তার খবরটা প্রথম আলোরটাই মানে ওটার কপি] আর মানবজমিনে ছাপা হয় কী করে???  খবর ছাপলে যে সোর্স বলতে হয় যেন তারা এটা জানেই না। তাই যেন এরা এই দুই মিডিয়া কেউই তাদের খবরের সোর্স কী তা লেখেই নাই।  বাংলাদেশের জার্নালিজমে সবচেয়ে বিপদজনক এক ধারা শুরু হয়েছে সোর্স-রেফারেন্স ছাড়া রিপোর্ট ছাপা অথবা আরো বিপদজনক এক শব্দ তারা লিখে  – “ডেস্ক রিপোর্ট”! অথচ  জার্নালিজমে ডেস্ক রিপোর্ট(!) বলে কিছু  কী আছে? হতে পারে না। তবে বাংলাদেশে এর মানে হল, অন্য মিডিয়া থেকে কপি করে এনেছে কিন্তু অসততা করে দেশি-বিদেশি সেই মিডিয়ার নামটাও বলতে চায় না। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটা হল – ডেস্ক রিপোর্ট মানে খবরের সোর্স বলে কিছু নাই (মানে পুরাটাই মিথ্যা বা গুরুত্বপুর্ণ কোন শব্দ বা বাক্য বদলে দেয়া টুইস্ট নিউজও তা হতে পারে) অথচ একে মিডিয়া রিপোর্ট আর জার্নালিজম বলে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে!! আর প্রথম আলো এই নষ্ট-সাংবাদিকতার নেতা উদ্গাতা!

    আরো গভীরে যাইঃ
    সৌমের প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া লেখা এটা কী এর আগের দিন বা আগের এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন প্রেস ব্রিফিং বা কোথায় দেয়া বক্তব্য???
    জবাব হল – না একেবারেই না। সৌম্য রিপোর্টে কেবল লিখেছেন, “……রাজধানী দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে নরেন্দ্র মোদির শাসনের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের ‘সাফল্য’ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। কিন্তু কোথাও কবে  জয়শঙ্কর একথা বলেছেন সে প্রসঙ্গে সৌম লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত শুক্রবার এ মন্তব্য করেন।  কিন্তু গুগল সার্চে এই রিপোর্টটা এক প্রথম আলোতে সৌম্যের লেখা  ছাড়া আর কেউ লিখে নাই বা কোন পত্রিকা নিজে রিপোর্ট লিখে ছাপে নাই। আর আগেই বলেছি বাংলাদেশের যেদুই একটা মিডিয়া এটা ছেপেছে তা তারা প্রথম আলোর নাম উল্লেখ করে বা না করে মানে সোর্স উল্লেখ না করেই ছেপে দিয়েছে। আর কোন “এরেঞ্জমেন্ট” থাকলে সেটা গোপন রেখে দিয়েছে।

    কেন আর কোথাও (ভারতে বা বাংলাদেশে) সৌম্যের লেখা এই রিপোর্ট এর বিষয়ে রিপোর্ট নাইঃ
    ভারতের কেন্দ্র সরকার বা সংসদের নির্বাচন আর সাত-আট মাস বাকি; মোটামুটি বললে আগামি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর শুরু হতে পারে।  ফলে জয়শঙ্কর-মোদি সহ সরকারের সকলের সব কাজকর্ম এখন নির্বাচন-মুখি বা মোদির ইমেজ বাড়ানোকে লক্ষ্য করেই আগাচ্ছে।  তাই গত নয় বছরে দেশে-বিদেশে মোদির সাফল্য কী – দেশের মুখ-উজ্জ্বল কী করেছেন এনিয়ে প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন জয়শঙ্কর! তাই তিনি এক বক্তৃতা আয়োজন করেছিলেন। আর সেখানেই দিয়েছিলেন এমন কিছু বক্তব্য। কিন্তু প্রথম কথা সেটার তারিখ কবে??? ওর তারিখ ছিল ৮ জুন। কীভাবে বের করলাম?
    অনেক খুজাখুজির পরে দেখা গেল মোদির নয় বছরের সাফল্য  আর জয়শঙ্করের বক্তব্য এদুই শব্দে মিল আছে এমন একটাই ইংরাজি রিপোর্ট আছে – যা ভারতের প্রায় সবাই ছেপেছে। যদিও স্বভাবসিদ্ধ ভাবে মোদি-বিজেপি এই প্রপাগান্ডা খবরটাকে টুইস্ট করেছে কুখ্যাত ANI কে দিয়েও। অনেকে সেটাই ছেপেছে। যেমন দ্যাপ্রিন্ট এর লেখা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস্র লেখা। ইত্যাদি। আর এর বাইরে এক মিডিয়া যা আমার নজরে এসেছে তা হলো “লাইভ-মিন্ট” – এই কম চলা পত্রিকার রিপোর্টটা ভাল- এটা সরকারি এজেন্সি পিটিআই এর নিউজ।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ হল এসব খবরই ভারতে প্রকাশিত হয়েছে  ৮ জুন তারিখের; মানে যেদিন জয়শঙ্কর তা বলেছেন।
    তাহলে কী ৮ জুন তারিখে প্রকাশিত জয়শঙ্কর এর বক্তব্য প্রসঙ্গে কী জয়শঙ্কর আবার পরবর্তিতে পয়লা জুলাই তারিখে এসে তিনি একই বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলেছেন??? কারণ সৌম্যের রিপোর্টের দাবি এই তারিখ ১ জুলাইয়ের!!!! এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য!!!  কারণ, যে প্রশ্নের উত্তর নাই তা হল,  সেক্ষেত্রে কেন ভারতের আর কোন মিডিয়ায় জয়শঙ্করের এই কথিত ১ জুলাইয়ের মিডিয়ার সাথে কথা বলা নিয়ে ভারতে কোন রিপোর্ট কেউ ছাপে নাই কেন??? এটা বেশ অস্বাভাবিক, বিশ্বাস অযোগ্য!!!

    তাহলে সৌম্য বন্দোপাধ্যায়  ১ জুলাই জয়শঙ্কর এমন সব কথা বলেছেন বলে দাবি করে রিপোর্ট লিখলেন কেন??? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।
    তবে, খুব সম্ভবত একাজ করার কারণ হল কংগ্রেস দল।  আসলে জয়শঙ্কর খুব সম্ভবত আবার একই প্রসঙ্গে – ফিরে নতুন করে কিছুই বলেন নাই। কিন্তু কংগ্রেস দল চায় জয়শঙ্করের বক্তব্যকেই একটু সমালোচনা করতে যা বাংলাদেশে প্রকাশিত হবে। আর তাই সৌম্যের ঐ ভুয়া রিপোর্টে  যার মধ্যে (বাড়তি হিশাবে) কলকাতার বাঙালি এক সাবেক কূটনীতিক দেব মুখোপাধ্যায়  এর বরাতে কিছু সমালোচনা ছাপা হয়েছে। যেখানে তিনি “তিস্তা চুক্তি না হওয়া” আর “অখণ্ড ভারতের মানচিত্র” মোদি প্রকাশ করেছে বলে –  এনিয়ে অসন্তোষ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। যদিও ফ্যাক্টস হল, ভারত বাংলাদেশ থেকে করিডোর নিয়েছে কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েও তিস্তা পানি আজও  দেয় নাই – এর প্রথম ভায়লেটর (২০১১ সালে বাংলাদেশে সফর) বা লঙ্ঘনকারী সেসময়ে কংগ্রেসেরই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর ক্ষমতাকালের ও ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরকালে এটা উন্মোচিত হয়েছিল যে ভারত তিস্তা পানিচুক্তি ভঙ্গ করছে। দেখুন সেসময়ের বিবিসি রিপোর্ট।    আর সেই একই ভায়োলেটর পরের প্রধানমন্ত্রী মোদি – এই ফ্যাক্ট তো লুকানো যাবে না। সে যাই হোক তাহলে, সৌমের এই রিপোর্ট কী মোদির নয়, কংগ্রেসের অর্থে লেখানো??? প্রথম আলো অর্থের লোভে এই জুয়াচুরি-সাংবাদিকতা করেছে???

    শেষ কথাঃ প্রথম আলোতে ছাপা সৌম বন্দোপাধ্যায়ের ২ জুলাইয়ের এই রিপোর্ট  অস্পষ্ট রহস্যময়ই থেকে গেল!

    আপডেটঃ ৭ জুলাই ২০২৩; দুপুর ১২ঃ ৩৪

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন

    মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন
    গৌতম দাস

    ২২ জুন ২০২৩      সকাল ০৯ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4E8

     

                   Biden hosts Indian Prime Minister Modi at White House

     

    মোদির বাইডেন সাক্ষাত হবে আজকে। কিন্তু এর আগেই ভারত একটা হাইপ [HYPE] তুলেছে মানে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ‘ওভার-পাবলিসিটি’ শুরু করেছে গত কমপক্ষে প্রায় দশদিন ধরে।
    এর উদ্দেশ্য দুইটা। এক.  আভ্যন্তরীণভাবে ভারতের ভোটারদের দেখানো যে মোদি এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব পরাশক্তি নেতা হয়ে গেছে। আর দুই. বাংলাদেশে হাসিনা সরকার টিকবে কিনা সেই নির্ধারক ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি, সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক এই ইমেজ তিনি গড়তে চান।
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২১-২৪ জুন তার আমেরিকা সফরে ইতোমধ্যেই আমেরিকায় পৌছেছেন। আজ ২২ তারিখ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে তার সাক্ষাতের কথা।
    এদিকে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য অ্যামেরিকান নয়া ভিসা পলিসিতে দেয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে, বাংলাদেশে ভিতর সরকার বা বিরোধী দলগুলোর যেখানে আমেরিকান এই নীতির বিরুদ্ধে কোন আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য প্রায় নাই বললেই চলে; বরং এর চেয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অপর দলের জন্য কত খারাপ হয়েছে  আর তাতে অন্যদলটা কত বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এনিয়ে সরকারি  প্রপাগান্ডাটাই মুল আসর দখল করেছে; যদিও এতে ব্যাপারটা মানুষ তামাসা হিশাবে দেখেছে। অন্তত ফেসবুক কে যদি আমার সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানার (সোশাল মিডিয়া) উৎস বলে  ধরি তাহলে  এমনটাই সোশাল মিডিয়ার ডমিনেটিং মুড।  আর মানুষের কাছে যে ওয়েলকামিং মেসেজ গেছে তা হল, অ্যামেরিকান ভিসা পলিসি এবার মানুষকে একটা ভাল কিছু দিবে কারণ, এটা হাসিনা সরকারের উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে!
    ওদিকে আবার ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়েছে উলটা। ভারতের মিডিয়া, কলাম লেখক, একাদেমিক বা থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইত্যাদিতে যুক্ত যারা তাদের সবার একই ভাষ্য আমেরিকা “কত্ত-ই না খারাপ দেশ” – যে তারা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে! আর এতে বাংলাদেশের উপর ভারতের আলগা খবরদারি মানে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” সেটা আর কিছুই এখন উসুল করা যাবে না; আগের সাজানো বাগান থেকে কত সহজেই না লুট ততপরতা চালানো যে অবারিত সুযোগ ছিল যেন সেটা এখন বন্ধ বা ক্ষুন্ন হতে যাচ্ছে আর এই ম্যাসেজ তারা পাঠ করে ফেলেচ্ছে। আর একারণে তারা রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।
    এতে সবচেয়ে অসুবিধা যেটা তা হল তাদের স্বার্থের পক্ষে ন্যায্যতা কী? সাফাই বয়ান কী? এমন কিছু তো একটা থাকতেই হবে। নইলে “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” হারিয়ে যাচ্ছে বললেই এর অর্থ হবে সেটা অবৈধ স্বার্থ নয়, ন্যায্য স্বার্থ অথবা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে নেয়া কোন অসম চুক্তি বা ঘুষের চুক্তি নয় এমন একটা নুন্যতম বয়ান অবশ্যই হতেই হবে। আর এখানেই অসাঞ্জস্যতা এক বিরাট ঘাটতি ভারতের সব বক্তব্য বা দাবিকে দুর্বল করে রেখেছে।

    পেড মিডিয়া প্রপাগান্ডাঃ
    এই সুযোগে প্রথম আলোর মত পত্রিকাগুলো যারা ভারতের গোয়েন্দাবিভাগের মিথ্যা সাজানো প্রপাগান্ডা খবর নিজেরা একে সত্যি বলে নিজ পত্রিকায় খবর ছাপে; তাদের এই দালালি ততপরতারর রেট মনে হচ্ছে বেড়ে গেছে। অথবা গোয়েন্দাবিভাগ নিজেরাই যেচে রেট বাড়িয়ে দিয়েছে হয়ত যাতে  মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছাপতে এরা আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠে, লোভনীয় পরিমাণ অর্থের লোভে অস্থির, ডেসপারেট। বেচাইন হয়ে যায় যেন!
    সম্ভবত সেকারণেই আমরা  নিউজ দেখছি প্রথম আলোতে যেখানে মরিয়া হয়ে বিপদে পড়বে জেনেও এসব প্রপাগান্ডার আবর্জনা  তারা খবর বলে ছাপছে। ধরা পড়লে শিরোনাম বদলে লঘু করার চেষ্টা করছে তবু প্রপাগান্ডা কাজ চালিয়েই যাচ্ছে। এসব মিথ্যা খবর তৈরির ভঙ্গিটা হল এমন দাবি করা যেন ভারতের মোদিই হচ্ছে বাংলাদেশে বাপ! তাই যেন বাংলাদেশে কী ঘটবে এর একমাত্র নির্ধারক ও ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি! মোদি যেন বাংলাদেশকে তাঁর কোন বাপের তালুক হিশাবে পেয়েছেন। তাই মোদিই একমাত্র হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির অ্যামেরিকান চাপ থেকে বাঁচাবেন, উদ্ধার করবেন। এই হল এসবের সারকথা!

    যেমন, গতকাল ২১ জুন সকাল থেকে দেখা গেল আরেক প্রপাগান্ডা যে বাংলাদেশ মানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন নাকি জয়শঙ্কর বা ভারতকে অনুরোধ করেছে যেন মোদি তার আমেরিকার সফরে বাইডেনের কাছে হাসিনার জন্য কিছু সুপারিশ করে। যার সার ইঙ্গিতটা হল, লেম্যানের ভাষায় বললে মোদি যেন হাসিনা সরকারকে আরেকবার রেখে দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়, আমেরিকাকে বলে!

    ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বারানসিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ ভুক্ত
    দেশগুলোর
    মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে গত ১২ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে
    বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
    এ কে আব্দুল মোমেনের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। সূত্র বলছে, বিভিন্ন
    পর্যায়ে ভারতের কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিষয়টি তুলেছেন।

    যদিও ভারতের মিডিয়ার এই দাবি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও সেতুমন্ত্রী কাদের অস্বীকার করেছেন। তার মানে ভারতের দাবি একপক্ষীয়, সকলেই বিনা তর্কে গ্রহণ করে এমন দাবি নয়।
    আর এটাই ছিল ২১ জুন সকাল থেকে প্রথম আলোর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট। অথচ প্রথম আলোর এই কাজটা এক মারাত্মক জার্নালিস্টিক অসততা। কেন?

    বর্তমান বাংলাদেশ প্রশ্নে, আমাদের মোমেন অথবা আমেরিকা সফররত মোদির ভারত এদের যে কেউ নানা প্রপাগান্ডা করতেই পারে যার সোজা অর্থ ফ্যাক্টস লুকাইতে পারে। তাহলে এক্ষেত্রে প্রথম আলোর অবস্থান হওয়া উচিত অন্তত নিজে ফ্যাক্টস না লুকানো বা কাউকে লুকাতে না দেওয়া বা সাহায্য না করা। এই সাপেক্ষে মানে এটা করার পরেই কেবল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অর্থের ভান্ডে প্রথম আলো একটু-আধটু মুখ দিতে পারে; যতটুকু যা পায়। কিন্তু প্রথম আলো – খোদ জার্নালিজম – এই কাজটাই ত্যাগ করে চলে গিয়েছে।

                                                                TIMES

    যেমন, ভারতের কিছুপক্ষের নানান দাবি বা মোমেনের দাবিতে তা সব তোলপাড় করে ফেলতে পারে, এমনকি মোদির অ্যামেরিকান সফরকে কেন্দ্র করে মিথ্যা আশা বা প্রপাগান্ডা যে হাসিনা আবার টিকে যাচ্ছে বলে হৈচৈও শুরু করতে পারে। আর এক্ষেত্রে মোদি ও বিজেপির প্রধান লাভের লক্ষ্যটা হল মিথ্যা হলেও এটা দিয়েই মোদির ইমেজ গড়া; মানে মোদিকে এক পরাশক্তি নেতা হিশাবে তুলে ধরা যে বাংলাদেশে সরকারকে বাঁচায় – এই ইমেজ গড়াটাই বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। তাতে এটা পুরাটাই মিথ্যা  হয় যে বাইডেন মোদির কথা শুনবেই না অথবা আদৌও এনিয়ে মোদি-বাইডেন হয়ত আলাপই হবে না – এমন হলেও ক্ষতি নাই। কারণ মোদির এই পরাশক্তি বা মিথ্যা গ্লোবাল নেতার ইমেজ – এটাই আগামি ভারতের নির্বাচনে বিজেপি ব্যবহার করবে আর দাবি করবে মোদির নেতৃত্বে ভারত কত উঁচুতে উঠেছে। আর এতে হাসিনা মিথ্যা আশা আকাঙ্খা তৈরি করে এর ছলনায় আরো হতাশ হয়ে যাবে কিনা সেটা তো মোদির বিবেচনাই নয়!
    অতএব এই ভুয়া উচ্ছাস তুলে হলেও ভারত মরিয়া হয়ে হাসিনার -জান যাওয়া অবস্থায়- এই মিথ্যা পরাশক্তি নেতার ইমেজ কামাতে নেমেছে। এমনকি পরোক্ষে তিনি হাসিনাকেও ট্রাপে ফেলেছেন, তা হলেও।
    আর এই পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম আলো যেপথ নিল, তা হল এর মধ্যে ফ্যাক্টস বা সত্যটা কী? সেটা বের করতে না যাওয়া।  মোদি কী আসলেই বাইডেনকে বলে হাসিনার সব বালা-মুসিবত মানে আরেকবার ক্ষমতায় থেকে যাবার বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন? নাকি এর কোন আদৌ সুযোগই নাই?
    না, প্রথম আলো এবিষয়ে ফ্যাক্টস উদ্ধার সেদিকে গেল না – বরং সে গেল মোদির মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে হাইপ বা উচ্ছাস তোলা বা যোগানো – যেটা সরাসরি একটা প্রতারণা???
    অথচ জার্নালিজমে সৎ থাকলে প্রথম আলোর ন্যায্য কাজ হত ফ্যাক্টসের সন্ধানে যাওয়া; যে অন্তত মোদির আদৌ কিছু করার সুযোগ আছে কিনা! সেটা যাচাই করে আসা!

    অনেকের মনে সন্দেহ হতে পারে সেটা কী খুবই সহজ হবে? এমন ভেবে! হা এটা এখানে একেবারেই সহজ এবং তৈরিই ছিল। যেমন, মোমেন বা মোদির ভারতের অনেকের দাবির প্রসঙ্গ হল বাইডেন বা অ্যামেরিকান অবস্থা নিয়ে – মানে বাইডেন-মোদি সামিটে (বাংলাদেশ প্রসঙ্গে) বাইডেন কী অবস্থানে থেকে কথা বলবেন? তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসুক বা না আসুক – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাইডেনের অবস্থান আগে থেকেই কী জানা যায় না, সেই তালাসে যেতে হত।

    এই প্রসঙ্গে অথেনটিক নিউজ পাবার এক বেস্ট জায়গা ও এক ব্যক্তি হল জন কিরবি [John Kirby ]। যিনি হোয়াইট হাউসে বসেন কারণ তিনি হলেন হোয়াইট হাউসের ন্যশনাল সিকিউরিটির স্ট্রাটেজিক কমিউনিকেশনের কো-অরডিনেটর কাম মুখপাত্র [National Security Council coordinator]। যিনি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং দিয়ে থাকেন। মোদির এই সফরটা দুই রাষ্ট্রের দুই এক্সিকিউটিভ হেড এর মধ্যে। মানে অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে। তাই কোন অথেনটিক নিউজ পেতে হলে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এখান key personality বিবেচ্য হবে। আর জার্নালিস্ট তো বটেই এমনকি  যারা এডভান্স পাঠক  এটা এদের কারোরই অজানা নয়। আর বাংলাদেশে বসে তাঁর [কিরবি-র] যেকোন ব্রিফিং পাবার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হল অ্যামেরিকান সরকারি ওয়েব সাইটে [সাধারণত যেটা https://www.state.gov] যাওয়া যেখানে সব বিস্তারিত থাকে। যেমন মোদি-বাইডেন হবু সাক্ষাত উপলক্ষ্যে আগাম যে ব্রিফিং সেটা ছিল ২০ পৃষ্ঠারো বেশি তাহলেও পুরাটাই ঐ ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। এখন জার্নালিজম করতে চাইলে এসব খবর জানা ও সংগ্রহ করা ছিল প্রথম আলোর সরাসরি দায়ীত্ব!

    এখন দেখা যাক প্রথম আলো হিন্দুস্থান টাইমস এর যে প্রপাগান্ডা রিপোর্ট ২১ তারিখ ভোর থেকে লোড করেছে সেটার সময় হল আমাদের ভোর পাঁচটায়। অথচ জন কিরবি এর ব্রিফিং হয়ে গেছে অ্যামেরিকান ২০ তারিখ সকাল ১১টায়। মানে এর ব্রিফিং আমরা বাংলাদেশে বসে রিপোর্টটা সংগ্রহের যোগ্য হয়ে গেছিল  ঐদিনই (২০ জুন) তবে আমাদের মোটামুটি রাত বারোটার পর থেকেই।
    অর্থাৎ প্রথম আলো জন কিরবি এর ব্রিফিং বক্তব্য আমলেই নেয় নাই; নেওয়ার দরকারও মনে করে নাই। বলতে গেলে উপেক্ষা করে লুকিয়েছে আর বরং এরই পালটা প্রপাগান্ডা রিপোর্টটাই পরের (২১ জুন) ভোরবেলা থেকে প্রচারণায় এনেছে।

    জন কিরবি – তিনি কী বলেছিলেনঃ
    জন করবি এর ব্রিফিং সাধারণত অনেক লম্বা হয়, সারা দুনিয়ার নানান দেশ প্রসঙ্গ হিশাবে থাকে তাই! তাই এটা ছিল জন কিরবির বিশ পৃষ্টা জুড়ে দুনিয়ার প্রসঙ্গ এর ব্রিফিং এখানে পাবেন ;  তা হলেও ওর ভিতর বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা আছে ওর চতুর্থ পৃষ্টায়। পুরাটা ডাউনলোড করে চতুর্থ পৃষ্টায় খুজেন। 

                         NSC Coordinator John Kirby


    জনকিরবি বলছেনঃ

    বাইডেন-মোদি হবু আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠুক বা নাই উঠুক; অথবা এমনকি মোদি সেখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যাই বলেন না কেন –  বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারিত। আর তা হচ্ছেঃ আমরা ইতোমধ্যেই পরিস্কার করে বলেছি যে আমরা চাইব বাংলাদেশে একটা ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন হবে। আর আমরা ভিসা পলিসিতে ট্রাভেল নিষেধাজ্ঞা তো এজন্যই দিয়েছি যাতে কেউ এই ইলেকশনে যা ইচ্ছা তাই না করতে পারে। অতএব এপ্রসঙ্গে এভাবে আমি কেবল আমাদের অবস্থান থেকেই কথাগুলো বলে দিলাম। আর আপনারারো বুঝলেন আমাদের স্পষ্ট অবস্থানটা কী। আর আমরা এব্যাপারে একেবারের পাবলিক সামনে খোলাখুলিও তবে একই সাথে আমরা ভারতীয় সরকারকে তাদের বাংলাদেশ সরকারের সাথে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সেটা যাই থাক সেনিয়ে চাইলে তাদের কথা বলতেই দিব বা আমাদের শুনাতেও পারবে।

    We have already made clear our desire to free and fair elections in Bangladesh, and you’re right, we adapted our visa policy to restrict travel to individuals who undermine Bangladeshi elections.  So I can only speak for ourselves.  You know where we are.  We’ve been pretty public about that, but we would let the Indian Government talk about their bilateral relations.

    মূল বিষয়টা হচ্ছে আগে বলেছি অ্যামেরিকান ভিসানীতি প্রকাশের পরে ভারত নিশ্চিত হয়ে যায় যে গত ১৫ বছর ধরে হাসিনাকে ক্ষমতায় সমর্থন জুগিয়ে বাংলাদেশ উপর যে জুলুম লুটপাটের রাজত্ব গড়ে যে সমস্ত অসম সুবিধা খেয়ে এসেছিল সেসবের ইতি হতে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই লিখছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের কথিত নির্বাচনে যেসব কান্ডকীর্তির ভোট করে বারবার নিজের ক্ষমতাকে হাসিনা বাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন তা আর এবার আগামিতে হচ্ছে না। এটাই অ্যামেরিকান ভিসানীতির সবচেয়ে বড় ইম্পিকেশন বা খাঁড়া অর্থ। যেটা ভারত ও হাসিনার উপর ও বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ হতে যাচ্ছে।
    ভারতীয় মিডিয়ায় সকলেই কমবেশি একথা ছাপছেঃ

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means.    

    তাহলে, এই হলো দুধ আর পানির আলাদা হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রথম আলোর এই এভেলএবেল ফ্যাক্টস টা তুলে আনে নাই। বরং এর উলটা মিথ্যা প্রপাগান্ডাকেই গতকাল সকাল থেকে প্রচার করে গেছে।

    এখন এই প্রথম আলো; এই জার্নালিজম কী টিকে থাকতে পারবে? না পারে?

     

    আপডেটঃ ২৩ জুন ২০২৩ ০১ঃ ৫৪ am

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • চীন ভাইসাবের সমস্যা

    চীন ভাইসাবের সমস্যা
    গৌতম দাস
    ১৬ জুন ২৩  মধ্যরাত  ০০: ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4CP

           আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত: চীন। [চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন]

    চীনা এমবেশির ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল মিডিয়ার কিছু খোরাক এসেছিল [মুল ইংরাজিটা এখানে]। এরপর সবাই নিজ নিজ মত করে ফোকাস সাজিয়ে সে খবর মিডিয়ায় এনেছে। এর মধ্যে সবাইকে ছাড়ানো ফোকাসে প্রথম আলোও তা হাজির করেছে। তাতে মনে হইয়েছে চীন এবার বোধহয় যেন  হাসিনার বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে। দুনিয়াকে সব অনাচার থেকে মুক্ত করবে ইত্যাদি এমনই বোধহয় এর শপথ!
    না বাস্তবতা একেবারেই তা নয়। আমরা একসাথে কাজ করব এতটুকু তো বলাই যাই। কিন্তু পরের শব্দটা যখন নীতিগতভাবে, মানে মূলত কমন পলিসিতে তহ্ন একথার একরকম মানে হবে। আর যখন সরাসরি বা আকার ইঙ্গিতে বলা হবে যুদ্ধের বা বলপ্রয়োগের কথা তাহলে সেটা অন্যরকম! অনেকেই চীনাদের কথাটা –  “We stand ready to work together with Bangladesh and other countries to oppose all forms of hegemonism and power politics,…।” কথাটাকে নীতিগত সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নাই। বাইরে নিতে চেয়ে ইঙ্গিত রেখে মানে করেছেন। তাতেই এটা সাংঘাতিক শুনাচ্ছে। খুব সম্ভবত এটাই ভারতের ইচ্ছা যেকারণে প্রথম আলো এসব কথার এক্সট্রিম অর্থের ইঙ্গিত এনেছে।

    কিন্তু কোর ফ্যাক্টস-টা মানে মর্মশাসটা হল, আমেরিকা হাসিনাকে সরাতে পারলে, মোদিকেও সরাতে পারলে এতে লাভের গুড়ের এক বড় অংশ যাবে চীনের পক্ষে আর তা কিছুই না করেই!

    আমাদের উচিত হবে, “একসাথে কাজ” বলতে এইটারে নীতিগত পর্যায়ে রাখা ও বুঝা পর্যন্তই; তা ছাড়িয়ে ফিজিক্যাল যুদ্ধ, বা পাশে দাড়ায় যুদ্ধ এসবের ইঙ্গিত দেয়াটা হল উস্কানি তোলার চেষ্টা – এটা যেন মনে রাখি।

    এখন তাহলে চীন ভাইসাবের সমস্যাটা কীঃ
    চীনের মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, যে আমেরিকা “hegemonism and power politics”করে।
    আচ্ছা, চীনই কী প্রথম বা এবারই প্রথম যে আমেরিকার “hegemonism and power politics” এর নিন্দা করে কথা বলছে বা তুলছে?

    মোটেও না, একেবারেই না। এমনকি ১৯৫৩ সাল থেকে একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকা একাজ করে চলেছে। সেবারই প্রথম সিআইএ বাহিনী পাঠিয়ে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিল আমেরিকা। এটা দুনিয়া সকলেই জানে শুধু তাই নয়, এটা একালে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করে নিয়েছে। পরে একালে ২০১৩ সালে এই স্বীকারোক্তি নিয়ে নিউজ রিপোর্ট এখানে CIA admits role in 1953 Iranian coup

    । 
    কিতু তামাশা হল আমেরিকার এসব বিশেষ স্বভাব পরিচয় জানার পরও আজকের চীন [১৯৫৮ সাল থেকে মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে ঢেলে সাজানো যে চীন]  সেও কী সেই আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠতম সুসম্পর্ক করে নাই; আর সেটা অন্তত ২০১০ সাল পর্যন্ত????
    শুধু তাই না এই চীন-আমেরিকা হানিমুন এমনই হানি-ময় ছিল হবু বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়ে আমেরিকা-চীন এর সখ্যতা কী তখন ঘোষণা দিয়ে  এরা একসাথে সেসময়ের (১৯৭১) পাকিস্তানের আয়ুব-ইয়াহিয়ার পক্ষ নেয় নাই?
    আর তখন কী আমেরিকা  hegemonism and power politics নীতিতে ছিল না??? আমি নিশ্চিত কোনপক্ষই এটা অস্বীকার করবে না।  এমনকি ২০১০ সালের পর থেকে আজকের আবার আমেরিকা-চীন প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্রমশ এটা মুখোমুখি সংঘাতের সম্ভাবনা হাজর করার দিকে যাচ্ছে – এটাই তো বাস্তবতা!

    কাজেই আজকে হঠাত আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর কর্তা বলে আবিস্কার কেন? এটা পরিস্কার করে বলা উচিত ছিল চীনা মুখপাত্রের। এটাই সেই ফ্যাক্টস যে আজ আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর জন্য দায়ী করে কথা তোলা এটা চীনের এখনকার বাংলাদেশ নীতি! আবার এটাই সত্য কাল যদি আর কোন দৈব দুর্বিপাকে হাসিনা ক্ষমতা হারায় ফেলেন তাহলে আবার তখনও চীনা অবস্থান আবার বদলে যাবে, আর সেটাও স্বাভাবিকই হবে!
    সারকথায় তাহলে মূল বিষয়টা হল চীনা স্বার্থ। এটাই সবক্ষেত্রেই সবকিছুর নির্ণায়ক আর তাই এর মধ্যে আমেরিকা ভাল কী খারাপ কিংবা hegemonism and power politics কিনা সেটা খোজা অর্থহীন।কাজেই বাংলাদেশেও তো রাজনৈতিক ধারাগুলোর স্বার্থ – এর অন্তত দুইটা পক্ষ তো আছে আমরা ধরে নিতে পারি যে তারা হল – “প্রো  আর এন্টি” – হাসিনা। চীন যেমন তার যখন যেমন স্বার্থ সে ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তেমনই  তারাও তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ মোতাবেক অবস্থান নিবে, কোনটাকে সঠিক বা কোনটাকে বেঠিক বলবে! তাই না? এটাই তো স্বাভাবিক!

    কথা আরও আছে খানিকটাঃ
    এই যে চীন আজ হাসিনার পক্ষে দাঁড়িয়ে আমেরিকার hegemonism and power politics বলে খারাচ্ছে [নীতিগতভাবে] – তাতে, চীন নিশ্চয় জানে এটা কোন ক্ষমতার হাসিনা!

    ওয়ান-ইলেভেন বা ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে নয়া (অ্যামেরিকান) ক্ষমতার উদয় হয়েছিল এর সরাসরি সুবিধাভোগী এবং সরাসরি সেই ততপরতার গন্তব্য ও পরিণতিই তো হাসিনা ক্ষমতাসীন হয়ে উঠে যেটা আজ পনেরো বছর ধরে বহাল। এটা কী চীনের অজানা? তা তো নয়। তাহলে সেটাও তো এই আমেরিকারই hegemonism and power politics এর এক সদম্ভ প্রকাশই ছিল। অথচ চীন কী তখন এই আমেরিকারই অথবা আমেরিকার কোলে উঠে ক্ষমতা নেওয়ার জন্য কী হাসিনা সরকারের কোন সমালোচনা করেছিলেন? কোন অ্যামেরিকান hegemonism and power politics তখন চীন দেখতে পায় নাই কেন????

    বরং চীন কী করেছিল?
    ২০১০ সাল থেকেই চীন শুধু হাসিনা সরকারই নয়, পার্টি টু পার্টির কথা বলে আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষ সম্পর্ক শুরু করেছিল। ঐ বছরের ঈদের ছুটিতে ততকালীন লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম চীন সফরে গেছিলেন। আর চীন সরকার তক্কে তক্কে ছিল কীভাবে বিশ্বব্যাংকের পাশ দিয়ে হলেও অবকাঠামো ঋণদাতা হিশাবে বাংলাদেশে ঢুকা যায় কিভাবে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তা পেতে চীনের (বিশেষত ভারতীয় বাধা পেরিয়ে) ২০১৬ সাল লেগে যায়। কিন্তু কখনই চীন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান হেজিমনির (hegemonism and power politics) সমালোচনা করেই নাই। কেন? হোপ চীন এই সত্যের সাথে একমত হবে।
    তাহলে এখানেও সারকথা হল চীন যেটাকে তখন স্বার্থ মনে করেছিল সেটাই ছিল নির্ণায়ক! তাতে আমেরিকা hegemonism and power politics এর শক্তিধর – সেটা হ্যা কিংবা না তাতে কিছু আসে যায় নাই।

    তাহলে এখন শেষ কথাটা চীনকে শুনতে হবেঃ।
    তাহলে এখন সেই আমেরিকারই একই হাসিনা সরকারের উপর স্যাংশন দেয়া – এটা আসলে কী?

    সম্ভবত বাংলাদেশের মেজরিটি মানুষ বলবে এটা কাফফারা! আমেরিকার ২০০৭ সালে আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত! তবে স্বভাবতই এগুলো আমজনতার ভাষা যারা থিওলজি বা ম্যাটোফোরে [matafor] কথা বলে থাকে তাই! – ঠিক রাজনৈতিক ভাষা বা ভাষ্য হয়ত নয় তা বলতে পারেন!

    তাহলে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা পরিভাষাটা কী?
    সেটা হল, এখন অ্যামেরিকান স্বার্থ হল এশিয়ায় একটা ওলটপাল্ট বা ঢেলে সাজানো। গত ২৩ বছর ধরে অনুসৃত অ্যামেরিকান এশিয়া নীতি ঢেলে সাজানো। আর এই নয়ানীতিতে বাইডেন প্রশাসন  এখন আর হাসিনাকে আর দেখতে চাইছে না। কেন?

    কম করে বললেও এতে একটা সংযোগ হল ভারত মানে মোদির ভারতের! সেখানেও বাইডেন মোদিকে দেখতে চাইছে না। খাড়া ভাবে (ব্যক্তি বাদ দিয়ে) বললে, গত ২৩ বছর আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল, চীন ঠেকানোতে ভারতকে ব্যবহার করবে বলে। আর এরই মজুরি ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।
    কিন্তু এখন সময়টা হল অ্যামেরিকান বদল যাওয়ার –  মানে গত ২০০১ সালে ওয়ার অন টেরর বা এর কিছু আগে যার শুরু হয়েছিল সেই নীতি-পলিসির পল্টে যাওয়া বা পল্টানি শুরু হয়েছে এখন। যখন প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত এনপিটি [NPT] এর সদস্য না হওয়া সত্বেও তাকে পরমানুর কাচামাল পাওয়া, পরমানু এনরিচমেন্ট ইত্যাদিয়ে সাহায্য করে ভারতের মন জয় করে বুশের আমেরিকা ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছিলেন। কাশ্মীর নির্বাচনি ব্যবস্থা রাজীব থেকে বাজপেয়ি সকলেই ভেঙ্গে দিয়ে কাশ্মীরকে সশস্ত্র আন্দোলনের ভুমি এই নতুন দিকে ঠেলে দিলেন অথচ বুশ এটাকে মুসলমানদেরই দোষ, সশস্ত্রতা – কথিত “জঙ্গীবাদই” সমস্যা বলে সুর মিলিয়েছিলেন সেই সময়ে।

    ঘটনা হল আমেরিকা এখন হায় হায় করছে পুরানা সেই নীতি নেওয়াটা ভুল মনে করছে, সেটা মুখে না বললেও এক্ষণকার পদক্ষেপগুলো তা বলছে। তারা মনে করে ভারতের পিঠে হার রাখার জন্যই ভারত যেন ‘বেয়াদব’ হয়ে গেছে ভুয়া পরাশক্তির দাবিদার হয়ে গেছে। তুলনায় আমেরিকার খুব একটা কোন লাভ হয় নাই। এটাই পরোক্ষে সেসময়ের নীতি-পলিসিটা ভুল বলা হয়ে যাচ্ছে – কারণ তা বলেই না তা এখন বদলে দিতে চাচ্ছে।   তাই এখনকার অ্যামেরিকান লক্ষ্যকে ভারতের শব্দে বললে এটা যেন আমেরিকার “ভারতকে আওকাত শিখানোর” সময় এটা। কথাটা জামা পড়িয়ে বললে এককথায়, এক সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত ভারত দেখতে চায় আমেরিকা। যেটা সারকথায় কোন চীন-রাশিয়া-ভারত জোট এর হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাড়াবার হুমকি দিবে না। যদিও আপাতদৃষ্টিতে চীনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভারতের প্রপাগান্ডা যাতে ভারত মানে করে থাকে চীনই তার প্রধান শত্রু – এধরণের কথাই আমরা এখনও দেখছি। কিন্তু অ্যামেরিকান চাপ যত বাড়বে তাতে ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠবে এটাই সবার স্থির অনুমান!

    মোদি বাইডেনের দাওয়াতেঃ
    মজার কথা হল এমাসেই ২১-২৪ জুন  মোদি বাইডেনের আমন্ত্রণে আমেরিকা যাচ্ছেন। সেখানে বাইডেন ভারতকে নিয়ে যেন তোলায় তোলার সুযোগ নিবে; দরদামে নিবদ্ধ হবে।  সারকথায় বাইডেন সম্ভবত মোদিকেই বলবেন, সাব-অর্ডিনেট হয়ে ভারতকে তেমন সাইজে ছোট হয়ে যেতে। না হলে তিনি রাহুলের পক্ষ হয়েই  নিশ্চিত দাঁড়াবেন।
    বিপরীতে মোদি চাইবেন তাকে জিততে দিতে আর জিতবার পর ভারত-আমেরিকা এক কমন স্টাটেজিক দোস্ত হবেই এই ওয়াদা করতে চাইবেন তা যত গভীরে সম্ভব এমনটাই হতে পারবেন তিনি। এমনকি, এটা বলাও বিচিত্র নয় যে মোদি বলবেন বাকি সবদেশের সাথে সম্পর্কের উপর আমেরিকার সাথে সম্পর্ককে তিনি জায়গা দিতে চান ইত্যাদি।
    স্বভাবতই মোদি একবার নির্বাচন করে ফেললে আর মোদিকে আটকানোর কোন সুযোগ আমেরিকার হাতে থাকবে না, তাই বলাই বাহুল্য  যা করার আমেরিকাকে আগেই করতে হবে। কাজেই এই আলাপ থেকে কোন ডিলে বা রফায় এবারে পৌছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রায় তা  যাবে না।
    তবে বাইডেনের দিক থেকে এটা মোদিকে একবার শেষ বাজিয়ে দেখা বা নেওয়া যে মোদির দিকে গেলে বাইডেনের জন্য কোন ভাল ডিল ছিল না –  এখন ২৪ জুনের পরে এব্যাপারে বাইডেন নিশ্চিত হয়ে যাবেন হয়ত। এবং দেখা যাচ্ছে বাইডেনের গন্তব্য ক্রমশ  মোদিবিরোধীদের দিকে, মানে  রাহুলের দিকে! এদিকে শেষে যাবে হয়ত!
    তাহলে সেক্ষেত্রে এই পুরা প্রক্রিয়ায় শেষে ভারতের আসল সাইজ সক্ষমতাটা কী সেটাই উদোম হওয়ার দিকেই যাচ্ছে। এভাবে ভারতের সক্ষমতাটা প্রকাশ্য হয়ে যাওয়াটা এতে তো তা চীনের জন্যও কম লাভজনক হচ্ছে না- তাই নয় কী???
    তবে আমার কথা হল, ঘটনাটাক যেদিকেই যাক মোদি বা রাহুল বা মোদিবিরোধী জোট যাদের হাতেই ক্ষমতা গিয়ে শেষে ঠেকুক – ভারতরাষ্ট্র এতে এক্ষণকার চেয়ে মারাত্মকভাবে সক্ষমতায় এক দুর্বল ভারত হিশাবে পরিণত হবেই। ভাই পিঠে হাত রেখেছিল বলে এত দিনকার সব রোয়াবি পরাশক্তির ভাব সব চুপসে যাবে! আর এথেকে পরে পাওয়া চার আনা আসবে বাংলাদেশের পকেটে! এছাড়াও এতে সেই নয়া ভারতও কী চীনের দিক থেকে এক কাম্য-ভারত নয়, হবে না!! অবশ্যই!
    তার মানে আমেরিকার নীতি-অবস্থান চীনের জন্যও লাভজনক হতে পারে!

    তাহলে বাংলাদেশে আমেরিকা যদি কোন প্রায়শ্চিত্য করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তাতে চীনের বিরোধী অবস্থান অপ্রয়োজনীয়; বাংলাদেশের কেউ কেউ এরমধ্যে এটা তার পক্ষের মনে করে দাঁড়িয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক, তাই না! সময় দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘুর্ণিঝড় ভুমিকম্প ইত্যাদির মত করে অবজেকটিভলি দেখাও খারাপ হয় না!

    শেষকথাঃ
     এবিষয়ে আমার নিজের রিডিং নিয়ে দুটা কথা বলব।
    এক. আমি মনে করি এই মন্তব্য বাংলাদেশ বা হাসিনার নাম ধরে চীন বললেও এর টার্গেট বাংলাদেশ নয়। এর টার্গেট হল গ্লোবাল শ্রোতা এই অর্থে যে যেন বলা যে, চীন নয় আমেরিকাই এশিয়াকে আউলা ঝাউলা [প্লানডার বা plunder] করছে।  তোমরা অযথাই সবকিছুতে চীনকে দোষী করছো [বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির কথা যদি মনে রাখি।]। চ্চীন এটা বলবারই মওকা নিয়েছে – বাংলাদেশ ইস্যু বা এই ইস্যুর মাথায় দাঁড়াবার সুযোগ নিয়ে। কাজেই এসব চীনা কথা বার্তায় বাংলাদেশ ঠিক কোন প্রসঙ্গই না।

    দুইঃ দুনিয়াতে হিউম্যান রাইট ইস্যুটা ইস্যু হতে পেরেছে এই সেদিন, জাতিসংঘের জন্মেরও পরে ১৯৪৮ সালে। তাও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো এখনও জাতিসংঘ এর হিউম্যান রাইট বিষয়ক কোন কথায় মানে না আমল করে না; তা মানে না। মূল কারণ কমিউনিস্ট চিন্তায় রাজনীতিতে হিউম্যান রাইট বলে কিছু নাই।  বিপরীতে জাতিসংঘের ভিতরের যেকোন ফোরামে কোনটাই ইস্যু হিশাবে উঠাবে হবে কোনটা হবে না, এসবের চেয়েও বড় কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে কোন ইস্যুকে উঠানো হবে এসব ব্যাপারে আমেরিকা এখনও একলাই রাজা।  সে আগ্রহ দেখালে হবে না হলে কিছুই হবে অথবা দাফনায় দেয়া হবে – এই হল বাস্তবতা! এসবই আমেরিকাকে নির্ণায়কের এক বশাল ভুমিকা দিয়ে রেখেছে। কাজেই যখন আমেরিকা কোন হিউম্যান রাইট ইস্যু তুললে তাতেআমেরিকা যদি নিজের কোন স্বার্থ দেখে কেবল  তখনই সে উঠবে; নইলে দাফন হয়ে যাবে। যেমন দেখেন হাসিনার গুম খুন তো প্রথম পর্বে সবচেয়ে একচেটিয়া ছিল ২০১৬ সাল পর্যন্ত। অথচ সবকিছু আমেরিকার জানা সত্বেও তা কোথাও এক চিলতেও ইস্যু হয় নাই। কারণ আমেরিকা আগ্রহী ছিল না, ইস্যু মনে করে নাই যা তার কাজে লাগবে!  আজ মনে করছে বলেই তো এটা বিরাট ইস্যু! এসব দিক দিয়েই ইস্যুটা বুঝতে হবে।
    আবার উল্টা কথাটা হল, এবারর বাইডেনের আমলে এসে ইইউ শেষ বেলায় বাইডেনের নীতির মধ্যে মিশে গেল। এটা যদি না হত তাহলে কী দেখতাম?
    আমরা দেখতাম ইইউ এর পাঠশালায় চীন হিউম্যান রাইট এর  ক্লাস করছে। এবিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে আমার ২০১৯ সালের পুরানা লেখা এখানে দেখতে পারেন আগ্রহীরা।   এব্যাপারটা দুদুবারের চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণাতেও উল্লেখ আছে। কাজেই হিউম্যান রাইট যদি কোন ইস্যুই নয় বা বাজে কথা হয় – তা নিশ্চয় নয়; তাহলে তো চীন ইইউ এর পরামর্শ নিত না। সমস্যাটা হিউম্যান রাইট ইস্যু কী গুরুত্বপুর্ণ ইস্যু নয় না বা তা নিয়ে অন্যদেয়াশ কথা বলতে পারবে সেটাই বরং বাজে কথা। সবাইওই বলতে পারবে। কিন্তু ইস্যু হল বলবে কিনা। আর কোন রাষ্ট্র তখনই বলবে পক্ষে অথবা বিপক্ষে যেদিকে নিজের স্বার্থ দেখব। এই হল বটম লাইন!

    আপডেটঃ ১৬ জুন ২০২৩  ভোর রাত ০১ঃ ৩৭
    আপডেটঃ ১৭ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৩৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

    ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
    গৌতম দাস

    ০৪ জুন ২০২৩   ০০ঃ ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4yT

     

         দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে – প্রথম আলো

    অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভারত হাসিনা-বিরুদ্ধ-ততপরতায় নেমে পড়েছে, অবস্থান নিয়েছে। কিছু জায়গায় তো একেবারে প্রকাশ্যে, দেখিয়েই তা করতে শুরু করেছে।
    ভারতের মোদি সরকার বিশেষত তার গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশে হাসিনা সরকার আর টিকছে না যেন তা ধরে নিয়ে কাজকাম শুরু করে দিয়েছে। তাদের সকল ততপরতা এখন এমন হাসিনাবিরোধীতাকে টার্গেট করে যে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের জন্য তারা এখন ঝেঁড়ে কেশে হাসিনাকেই দায়ী করে বাইডেনের কাছে নালিশ দিয়েছে ও একশন দাবি করেছে। সেই চিঠির ইংরাজি পিডিএফ কপি এখানে। আর এর এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ অংশ বাংলা করে দিচ্ছি নিচে।


    ” যখন থেকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় তখন থেকে আজ অবদি বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে। বাড়িঘর পুড়ানো, লুট করা, মন্দির ধবংস করা ও প্রতিমা ভাঙচুর, খুন রেপ আর বাধ্য করে ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদিতে সবকিছুরই পরিণতি হয়েছে যে হিন্দুরা ভারতে পালায়ে গেছে।  শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের খৃশ্চান জনগোষ্ঠিকেই নিপীড়ন-নির্যাতন করেছে; তাদের তাদের উপাসনালয় জ্বালিয়ে দেয়া লুট করা, পাস্টার-পাদ্রীকে জেলে নেওয়া আর ধর্মান্তকরণ এর সময় পরিবার তছনছ করে দেয়া ইত্যাদি সবই ঘটেছে”।
    চিঠির যে অংশটার বাংলা অনুবাদ এটা নিচে সেটারই ইংরাজিটা, 

    “Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs”.

    আসলে ভারতীয় প্ররোচনায় ড্রাফট করা আর কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে সে অভিযোগ তোলার সময়ে হাসিনার বিরুদ্ধে বিরোধীদলের কর্মীদেরকে যতগুলো গুম, খুন, অপহরণ, বিনাবিচারে হত্যা বা বেআইনি আটকে রাখার অভিযোগ দায়ের কাছে ভারতের কৌশল সেসব অভিযোগই আসলে যেন কেবল হিন্দুদের কিছু খৃশ্চানের উপর করা হয়েছে – এইভাবে তুলে এনে সাজানো হয়েছে ঐ চিঠিতে। আরেক দিক থেকে দেখলে মোদি যেভাবে সবকিছুতে ভারতের মুসলমানেরা হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ [কেরালা স্টোরি সিনেমা]  করছে বলে ভুত দেখে থাকে সব জায়গায় সেভাবেই হাসিনাকেও ঐ একই ধর্মান্তকরণের কর্তা-নায়িকা বলে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাপারটায় বেশ আমোদ হয়েছে আমাদের! এই আর কী!
    আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাইলে নিশ্চয় এখন আপসোস করতে পারেন যে গত ২০২১ সালের কুমিল্লায় দুর্গাপুজার  হামলার ঘটনায় জড়িত সকলের খবর ম্যাপ এঁকে বের করলেও কেন তিনি এদের পিছনের ভারতীয় হাত ও লিঙ্ক উন্মোচন বা-প্রকাশ করেন নাই কেন একথা ভেবে!!! স্বামীর সুখের কথা ভেবে স্ত্রীরা এভাবে আর কতদিন……।

    অর্থাৎ হাসিনা সরকার আর টিকবে না মনে হচ্ছে ভারত যেন এমন সিদ্ধান্ত-অবস্থান পৌছে গিয়েছে। এনিয়ে সুবীর ভৌমিক গেল একসপ্তাহে দুবার লেখা দিয়েছে। প্রথমটাই হাসিনাকে বিরোধিতা দেখালেও আবার দ্বিতীয়টাতে ভান করেছে যে যেন ভারত সরকার ও গোয়েন্দা বিভাগ হাসিনা সরকারের টিকানোর জন্য কাজ করেছে। নিচে দেখেন সুবীরের লেখা থেকে সেই দাবির অংশটুকুছিল এরকমঃ

    “Indian diplomats and national security officials have flown back
    and forth in a week of intense parleys
    (foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka, to cite a few)”

     মানে হল, বাস্তবে ভারত হাসিনাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেও সুবীর এখনও একটু নাটক করতে চাইছেন। অথচ এনিয়ে ভারত সরকার ভারতের মিডিয়াকেও হাসিনা (বাংলাদেশ)বিরোধি সরকারি গাইড লাইন দেয়া হয়েছে। যেমন দেখুন “ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পালটা কূটনৈতিক বার্তা? চিনের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকা” ।  অথবা দ্যাহিন্দু পত্রিকার বিরাট আঁতলামো রিপোর্ট যার শিরোনাম  – Explained | How has Dhaka reacted to the U.S. threat on visas? – অথচ ভিতরে শিরোনামে দাবির কথা নিয়ে কিছুই নাই কেবল খামোখা চীনকে দোষারোপ ছাড়া।   মানে হল হাসিনা যেন চীনের পক্ষে নতুন করে যাচ্ছে অথচ এর কোনটাই সত্যি না।  আর ভারত এই উসিলা তুলছে  যেন বাইডেনের কোলে উঠে হাসিনাবিরোধি সাজতে পারে সে। ফ্যাক্টস হল, হাসিনা নতুন করে কোন চীন-ঘনিষ্ঠতা করে নাই। কারণ সেই সুযোগই নাই। এই ভোলাটাইল [volatile] বা অস্পষ্ট মুহুর্তে চীন নিজেই কোনদিকে ঝুঁকতে আগ্রহি নয়, কেবল রুটিন ততপরতা ছাড়া।

    কিন্তু কেন এখন ভারত হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে সময় হয়েছে মনে করলোঃ
    ভারতীয় র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন – একথা সুবীর ভৌমিক তার নিজের লেখাতেই “ভারতের বীরত্ব হিশাবে দেখাতে গিয়ে” স্বীকার করেছেন। যদিও গোয়েল সাব এসেছিলেন এনিয়ে হাসিনাবিরোধী শক্তির সাথে একসাথে কাজ করতে চাওয়ার অফার দিতে। কিন্তু বাংলাদেশের তেমন বা অমন কোন শক্তিই সামন্ত গোয়েলের সাথে কাজ করতে আগ্রহ দেখায় নাই। গোয়েল সাব ভেবেছিলেন হাসিনাবিরোধি কোন একশনে যৌথকাজ কারবারের অফার দিলে বাংলাদেশের যে কেউ ঝাপায় পড়ে গোয়েল সাব রে কোলে তুলে নিবে। আর এর ভিতর দিয়ে আগামি হাসিনা-উত্তর  নয়া সরকারের মধ্যেও হাসিনা আমলের মতই গোয়েল সাবেরা ঢুকে বসে থাকার সুযোগ নিবেন, ধারাবাহিকতা বা কন্টিনিউটি বহাল থাকবে! কিন্তু হায়! গোয়েল সাব হতাশ হয়েছেন!
    এই খবর নিয়ে যদিও আরেকটা সুত্র একটু কারেকশন দিয়েছে। তাদের মতে সামন্ত গোয়েলের সাথে বাংলাদেশের হাসিনাবিরোধী শক্তির দেখা হয়েছে সেকথা সত্য তবে সেটা বাংলাদেশে নয়, বিদেশে দেখা হয়েছে। মানে গোয়েল সাহেব বাংলাদেশে আসেই নাই। সে যাই হোক, এখানকার মূল কথাটা হল, ভারত হাসিনার হাত ছাড়ার সময় হয়েছে মনে করেছে।

    আসলে সারকথাটা হল, সামন্ত গোয়েল বা ভারত সরকার প্রচন্ড অধৈর্য ও অস্থির হয়ে উঠেছে। মূল কারণ, হাসিনা সরকারের টিকে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে অবস্থা তেমন ভাল না এমন ভয় অনেকের মধ্যেই ঢুকেছে; অন্তত ভারতের মত বিদেশিস্বার্থের মধ্যে “এক অনিশ্চয়তা” শুরু হয়েছে। সেখান থেকেই এমন অনুমান যে  হাসিনা যদি টিকতে নাই পারেন সেক্ষেত্রে হাসিনার সরকারের ক্ষমতা-উত্তর বাংলাদেশে কোন অন্তর্বর্তি সরকার বা পরের নির্বাচিত সরকার ইত্যাদিতে সম্ভব্য যারাই ক্ষমতায় আসবেন অনুমিত সেসবের কারোর সাথেই এখনও ভারতের কোন ঘনিষ্ঠতা দূরে থাক কোন নুন্যতম সম্পর্কের কিছুই তৈরি হয় নাই। কাজেই এই সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতেই এখন থেকেই ভারত বেপরোয়া অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু কী থেকে শুরু করবে তার কিছুই খুজে পাচ্ছে না।  যেখানে বিএনপি সেই প্রণয় ভার্মার বাসায় কথিত ডিনারের দাওয়াতের পরে যেন হ্যালো বলা থেকেও আরো দূরে চলে গেছে। মূল কারণ, ভারতের নিজ সম্পর্কে হুদাই খুবই উচ্চ ধারণা! ভারত ধরে নিয়ে আছে যে সেই-ই এতই ক্ষমতাবান যে বিএনপির নেতা কে হবে অথবা কী রাজনীতি করবে তা ভারত ঠিক করে দিতে পারে! যেখানে বাইডেনের হাত থেকে মোদি বাঁচে কিনা, কিভাবে তাই এখন নিলামে উঠেছে বড় বাজি হয়ে! অথচ এটা তো বুঝাই যাচ্ছে,  সরকার বদল না হলে বিএনপি কারোও সাথেই কথা বলবে না। এমনকি ভারতের বেলায় সরকার বদলের পরও কী হবে বিএনপি ভারতকে নিয়ে কী করবে এর পুরাটাই এখনও অনিশ্চিত।  সম্ভবত সঠিক শব্দ হবে যে  – সেটা এখনও বিএনপির কাছে  “এজেন্ডাই হতে পারে নাই”।  যেকারণে, সবমিলিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই বিএনপিবিরোধী প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে। অনেকের ভারত-ইসরায়েলি কালেকশনের সোয়েব চৌধুরীর কথা মনে আছে হয়ত। সেই সোয়েব একাজ শুরু করে দিয়েছে। যদিও এসব কাজ এখন মানুষ আর খায় না। কারণ সব গুমোর উদাম হয়ে গেছে তাই এসব ছেচড়ামির আর কোন দাম নাই!

    কিন্তু ভারত কেন এত মরিয়া হয়ে আগেই হাসিনার হাত ছাড়তে চায়?
    এর পিছনের সবচেয়ে বড় কারণ, গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশকে চুষে চুষে খেতে, একপক্ষীয় সুবিধা নিতে যত দীর্ঘ তার অফুরন্ত স্বার্থের লিস্ট ভারত তৈরি করেছে, হাসিনা-উত্তরকালে সেসবের কী হবে? সেই একই ধারাবাহিকতা-সুবিধা তখনও  থাকার তো কোন কারণ নাই। এছাড়া চুষে-লুটে যেসব একতরফা কর্মকান্ডে বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে আর এসবের উপর নির্ভরশীল হয়ে যে নিজস্বার্থ ব্যবস্থা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছে তা তো আর বজায় থাকবে না – সব অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক।  সুবীর ভৌমিক সরাসরি এসব  ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে বিএনপির নাম ধরেই লিখেছে যে আগামি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে কখনও যদি ভারতকে হাসিনার দেয়া বিভিন্ন একপক্ষীর চুক্তির সুবিধা সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করে দেয় তাহলে কী হবে [what with khateda Zia’s threart to review all agreements Hasina has signed with India]!!  সকলেই জানে এবিষয়ে ভারতের স্বার্থের স্টেক বা স্বার্থ-বহর অনেক লম্বা। তাই এখান থেকেই  ভারতের সব দুঃশ্চিন্তার শুরু। তাই বাংলাদেশে এমন যেকোন একটা রাজনৈতিক গ্রুপ বা শক্তিকে পেতে মরিয়া যারা আগামিতে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন হবেন – ফলে ভারতের বাংলাদেশ লুটার স্বার্থের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে! ভারতের দুর্ভাগ্য যে এখনও এমন কোন বাংলাদেশি শক্তির হদিস তারা পায় নাই। আর বিএনপি সে তো আরো দূরে। আর ততই গোয়েল সাহেবেরা ডেসপারেট হয়ে বলতে চাচ্ছেন হাসিনার বিরুদ্ধে কাজ করা বা তাঁকে বেচে দিয়ে হলেও ভারতকে বাংলাদেশের একটা আগামি রাজনৈতিক শক্তির নাগাল পেতেই হবে।
    ভারতের হাসিনার হাত ছাড়ার প্রথম উদ্যোগের হদিস  আমরা কিছু এখান থেকেই পাচ্ছি। তবে এটার প্রকাশ্য রূপ-ততপরতা নাগাল পাওয়া বা জানা যথেষ্ট কম-ই বলতে হবে। কারণ সেনা বা গোয়েন্দা বিষয়ক তথ্য যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর পেলেও সেনসেটিভ বলে অত খুলে আলোচনা করা যায় না। সেটা সঠিকও না, হিতে বিপরীত হতে পারে।  তাই ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটার দিকে তাকানো যাক। এটা তুলনায় অনেক স্পষ্ট  আর উন্মুক্ত।

    ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগঃ
    ভারতের এই উদ্যোগ অনেক প্রকাশ্য এবং অনেক দূর ইতোমধ্যে আগিয়ে গেছে।  আর সুবীর যেমন ক্রেডিট নিতে বলেছিল যে, ভারতের foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka ) যারা হাসিনারর পক্ষে কাজ করতে ভীষণ দৌড়াদৌড়ি করছে – সেটা দৌড়াদৌড়ি ছিল অবশ্যই কিন্তু তা ছিল হাসিনার বিপক্ষে, তাঁকে বেচে হলেও হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও ভারতের আগামি স্বার্থ উদ্ধার বা যা ছিল বাংলাদেশের আগামি রাজনৈতিক শক্তি যারা হবে তাদেরকে তালাশ বা অন্তত তাদের একটা লিঙ্ক যোগাড় -এই ছিল ভারতের ওসব দৌড়াদৌড়ির উদ্দেশ্য।

    কংগ্রেসম্যান বা কংগ্রেস প্রতিনিধি সম্পর্কে কিছু কথাঃ
    সরাসরি হিন্দুইজমের সমর্থক এক অ্যামেরিকান কংগ্রেস প্রতিনিধি ছিলেন তুলসী গাব্বার্ড।  [Tulsi Gabbard] এই নামে দেখুন এখানে যিনি সর্বশেষ ২০২০ সালেও কংগ্রেস সদস্য ছিলেন। তাকেঁ ঘিরে এছাড়া  হিন্দু অ্যামেরিকান ফাউন্ডেশন [Hindu American Foundation (HAF)], ইসকন এমন আরো অনেক কিছু মিলে ভারত কিছু কংগ্রেসম্যান যোগাড় করেছিলেন যাদেরকে ভারত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ব্যবসা দিয়ে নিজরাষ্ট্র স্বার্থে  ভারত ওসব কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে লবি করাত। আমেরিকার মোট কংগ্রেসম্যান হল ৪৩৫ জন। এদের মধ্যে নুন্যতম দশজনকে ভারত তার স্বার্থের পক্ষে লবি-কারি বানাতে পারবে সেটা নিশ্চয় অসম্ভব কিছু নয়। সেসবের একালের ততপরতা হিশাবে মনে করা যায় যখন একালে ছয় রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠান এক চিঠি।

    তাই একালে  হাসিনা-উত্তরকালে  ভারতের কী হবে এর সন্ধানে থাকা ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটা হল এই ছয় অ্যামেরিকান রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান (আমাদের ভাষায় যারা অ্যামেরিকান সংসদ সদস্য) প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে চিঠি পাঠানো থেকে। গত ১৭ মে এমন ছয় জন কংগ্রেসম্যান একটা চিঠিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠিয়েছিল। এই চিঠির বিষয়বস্তুই হল, বাংলাদেশে হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণ ও এর প্রতিকার!  এই চিঠির কপি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে অনেকে দেখে থাকবেন, আর এর একটা কপি ঢাকার নিউ এজ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আবার অনেকের কাছে আমেরিকান ইউনুস সেন্টারের কপিটাও আছে দেখেছি। শুরুতে বা উপরে আমি দিয়েছে অরিজিনাল কপির লিঙ্ক।

    সবচেয়ে বড় কথা এতে শেখ হাসিনাকে চরমতম ভিলেন – হিউম্যান রাইট ভায়োলেটর, র‍্যাবের নামে ডেথ স্ক্যায়াড [death squard] বা ভাড়াতে খুনি বাহিনী চালানো, বিরোধীদেরকে নির্যাতন, ঘুম, খুন, অপহরণ ইত্যাদি সব ধরণের অভিযোগে অভিযুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড়কথা এটা হাসিনা ক্ষমতাসীন হবার সেই ২০০৯ সাল থেকেই হাসিনার অপততপরতা বলে দাবি করা হয়েছে।
    এমনকি এর মধ্যে  তাই হাসিনার সহযোগী বাহিনী হিশাবে বাংলাদেশের সেনাসহ এসব বাহিনী থেকে (স্বল্প কিছু যা) জাতিসংঘ বাহিনীতে যুক্ত হয় এদের সকল বাহিনীকেই জাতিসংঘ শান্তিবাহিনীর কাজে নিষিদ্ধের করার জন্য বাইডেনের কাছে এবার সুপারিশ করা হয়েছে।

    সেনাবাহিনী বা জাতিসংঘ সম্পর্কিত চিঠিতে এই বাড়তি অনুচ্ছেদ – এটা বেশ নতুন তা মানতেই হবে। কারণ, এর ভিতর অন্তর্নিহিত বক্তব্য-অর্থ বা ইমল্পিকেশন [implication] অনেক গভীর ও মারাত্মক। এটা সৈনিকদেরকে অফিসারদের বিরুদ্ধে খেপানোর শয়তানি কাজ, অবশ্যই। অনুমান করা হচ্ছে যে এর ভিতরের যে অন্তর্নিহিত বক্তব্য তা নিয়েই কাজ করতে  এটা সুবীর ভৌমিক কথিত সামন্ত গোয়েলের ঢাকা আগমন ঘটিয়েছিল। অর্থাৎ ভারতীয় পক্ষ থেকে তাদের এই ততপরতা ফলাও করে হাসিনার পক্ষের কাজ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ ভারত করেছে উলটা কারণে, ভারতের হাসিনার হাত ছাড়তে বলা – এটাই সে ফেরি শুরু করেছে।

    কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ এবং চমক লাগানো দিক হল এই চিঠির আরেকটা অংশ, সেদিকটা। আর সেখান থেকে এটা পরিস্কার যে – এই ছয় কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষরে চিঠি পাঠানো – এটা ভারতেরই কাজ। তারাই কংগ্রেসম্যান জুটিয়ে এই চিঠি লেখার ঘটনাটা ঘটিয়েছে। কিন্তু  কেন?
    কংগ্রেসম্যানদের চিঠিতে কী আছে  সে সম্পর্কে আগে বলেছি। যেমন হাসিনাকে সেখানে হিউম্যান রাইট দলনকারী হিশাবে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে  উপরে বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু কীভাবে সেই বর্ণনা থেকে পরের প্রসঙ্গ যাওয়া হয়েছে তাপাঠককে সরাসরি জানানো দরকার।
    প্রথমত এই চিঠিতে  এক দীর্ঘ অভিযোগে দাবি করা হয়েছে  হাসিনা  হিন্দু-খৃশ্চানদের দলনকারী, জুলুমকারী [……persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh.] !!!!!  মানে হাসিনা তাদের ভাষায় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনকারী – যেকথা রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইবেন কিনা সন্দেহ!  কিন্তু সরি। এটা এখন সত্য  যে একথা এখন রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইছেন; আসছি সেখানে। এটাই ভারতের ম্যাসেজ বা ভারতের এখন দানের পাশা ঊল্টানো আচরণ!

    কংগ্রেসম্যানদের চিঠি হাসিনার অপরাধ সম্পর্কে লিখেছে …...The well-documented abuses by the Hasina government are not confined to her political opponents; the government also has persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh. মানে হাসিনার মানবাধিকার দলন এটা আর কেবল বিরোধীদলের উপরেই নাকি সীমাবদ্ধ নাই। এটা ধর্ম ও জাতিগতভাবে যারা সংখ্যালঘু [ মানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ভারত স্বঘোষিতভাবে যাদের কাস্টডিয়ান] দের উপরেও নির্যাতন জুলুমবাজি করছে হাসিনা!

    Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs.

    কী তামসা দেখেন! দাবি করে বলা হচ্ছে হাসিনার এবারের ক্ষমতা নিবার পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা নাকি অর্ধেক হয়ে গেছে [Hindu population has been halved]।  আর যে অভিযোগ এই সেদিনও সেতুমন্ত্রী বিরোধীদলের উপর আবার একালে গত কয়েক সপ্তাহ আগে আরোপ করতে চাচ্ছিলেন যে বিএনপি নাকি  সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর কাজ করছে! আর আজ সে অভিযোগ ভারতের মুখ দিয়ে উঠে আসছে খোদ হাসিনার বিরুদ্ধেই। তাই এটা এক কঠিন তামাসাই বটে! তবে এখনও আমরা আসল জায়গায় যাই নাই, এখন যাব।

    ‘দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক’ হয়েছেঃ
    এই প্রসঙ্গটা হল বাংলাদেশে ঘটা একটা ঘটনা যেটা ভারতীয় উদ্যোগে ঐ ছয় কংগ্রেসম্যানের চিঠিতে হাজির করা আর হাসিনাকে হিন্দু নির্যাতনকারি হিশাবে তুলে ধরার-ই বাংলাদেশ ভার্সান ও সংশ্লিষ্ট ততপরতা। এনিয়ে  প্রথম আলো লিখছে, “দেশের বিশিষ্টজনেরা  বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। সেটা ছিল   ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৪: ধর্মীয়–জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার’ শীর্ষক এক সভা যা বুধবার বিকেলে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয়। মজার কথা হল সেখানে প্রথম আলো প্রতিষ্ঠান হিশাবে নিজেও এক অংশগ্রহণকারী দাওয়াত গ্রহিতা হিশাবে উপস্থিত ছিল। তাদের যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান এতে প্রতিনিধি হিশাবে বক্তৃতা করেন।

    আসলে এখানে অংশগ্রহণ করেছেন যারা তারা হলেন  – যারাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভারতীয় অর্থে বা অর্থের প্রতিপত্তিতে তৈরি হওয়া ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তাদের আয়-জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই,  ভারত এই সভায় তাদের সকলকে যোগ দিতে সহজেই বাধ্য করতে পেরেছে। কথিত এই মতবিনিময় সভায় প্রথম আলতে ছাপা হওয়া রিপোর্টটাকে খুটিয়ে দেখলে এমন অনেক কিছুই পরিস্কার হওয়া সম্ভব। এককথায় এটা হল, ভারত এতদিন বাংলাদেশের যাদেরকেই (কথিত হিন্দু সংগঠন ও এর নেতারা সহ) পেলেপুষে  নিজের প্রভাবে রেখেছে তাদের সর্বোচ্চ সমাবেশ ছিল এটা। এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল হাসিনাকে ত্যাগ করা [disown] বা হাত ছেড়ে অস্বীকার করা যে তিনি আর তাদের কেউ নন।  শুধু তাই নয় গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা ‘সংখ্যালঘু’ নিপীড়ন-জুলুমবাজি করেছেন বলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করে দেওয়া। এটাই সবচেয়ে কঠিন কঠোর পদক্ষেপ ছিল ভারতের।  এর মানে ঐ কথিত সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা যে ভারতের পাপেট বা হাতের পুতুল ছিলেন সেটা যেন তারাই হাজির করেছেন। কেন?
    কারণ, বাংলাদেশের ভারতের কোরস্বার্থ সহ সবকিছুই এখন কঠিন বিপদের মুখে। তাই এসকল মুখ এক্ত্রে ঐ সভায় উপস্থিত হয়ে  হাসিনার মুন্ডু-নিপাত করছেন অবলীলায়!!!  সত্যি তামাশা চলছেই!!! কারণ বাংলাদেশে হাসিনা তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদের উপর যে নিপীড়ন জুলুম করেছে সেসব কিছুকে এক ঘটকার এই শয়তানেরা একে হিন্দু নিপীড়ন বলে নামিয়ে ছোট করে নিজের পক্ষে নিয়ে গেল!

    ঐ সভায় উপস্থিত এক মুখ্য চরিত্র দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যঃ
    দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সিপিডির মূল উদ্যোক্তা-মালিক রেহমান সোবহান এর পরের ব্যক্তি তিনি। সেই ওয়ান-ইলেভেনের সময় থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট কে করিডোর দিতেই হবে; দিলে সেই আয়ে আমরা নাকি সিঙ্গাপুর হয়ে যাব – এরপক্ষে ভারতীয় দালালি দিয়েই প্রতিষ্ঠানটার বড় ততপরতা শুরু।  তাই ভারতীয় স্বার্থরক্ষার কনসালটেন্সির অর্থ তাদের এক বড় আয়ের উৎস আমরা বুঝতে পারি।  কিন্তু তাই বলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য – তিনি বাংলাদেশের কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হয়ে যাবেন?? দেবপ্রিয়ের এই ভুমিকার এত চিপ …… একথা আমাদের জানা ছিল না। খুব সম্ভবত সিপিডি “ঠিকঠাক” চালাতে গেলে এখন দেবপ্রিয়কে কথিত সংখ্যালঘু  হিন্দু নেতার ভুমিকায় নামতেই হবে, হয়েছে দেখা যাচ্ছে।  তাহলে মানুষের আত্মমর্যাদা বলতে কী  আসলে কিছু নাই?
    প্রথম আলো সুনির্দিষ্ট করে বলছে,   ” মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে” – এই কথাটা বলেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য!  আর তা পুনরায় সমর্থন ও উচ্চারণ করেছেন রামেন্দ্র মজুমদার, শাহরিয়ার কবির প্রমুখ। সত্যিই দেবপ্রিয়-র বিল এইবার ম্যাচিউরড আর সবাইকে ছাড়িয়ে তা বড় পরিমানের হবে।

    সাম্প্রদায়িক জিনিষটা কী তা একটু পরে আসছি। তার আগে এখন ওবায়দুল কাদের – সেতুমন্ত্রী ওকার মুখটা মনে পড়ে করুণা লাগছে।  বেচারা কত না এতদিন প্রমাণ করলেন যে “বিএনপি মানে সাম্প্রদায়িক” একথা বলে; এভাবে মনে সুখ নিচ্ছিলেন তিনি। আর এখন বাংলাদেশের হিন্দু-সব বড় বড়কর্তাদের সভায় যেটা আবার ভারতের আশীর্বাদে সমবেত এক সভা; সেখান থেকে তার মানে ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কাউকেই ছাড়লো না ভারতীয় স্বার্থ? তারা ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কেই সাম্প্রদায়িক বলে রায় দিল????

    বাংলাদেশে যেখানে গত পনেরো বছর ধরে লাগাতর সেপাই, এসআই ওসি থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে হিন্দুদের সর্বোচ্চ পদায়ন ঘটে চলেছে, যেটা কারও কারও হিশাবে এটা ২৫% বা এরই বেশি। হাসিনার কথা শুনেছি অনেকের মাধ্যমে তিনি নাকি ধারণা করেন যে হিন্দুরাই নাকি তাঁর সবচেয়ে বিশ্বশ্ত, মুসলমান কর্মচারিরা যেটা নাও হতে পারেন! তাহলে?  এ কোন বাংলাদেশি হিন্দু ? ভারতের এক ইশারায় যারা তামাম-ই হাসিনা ছেড়ে শুধু না; সমস্ত দায়-অভিশাপ হাসিনার উপর চাপিয়ে দিয়ে ভারত-রাষ্ট্রস্বার্থ এর পক্ষে এলাইন হয়ে গেল? হাসিনাকে ছেড়েই চলে গেল? এরপরেও কী বাংলাদেশের সব হিন্দুরা না হোক  ঐ কথিত মত বিনিময় সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন? বলা যাবে, তাদের রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব পরিচয় বাংলাদেশী?
    ব্যক্তির রাষ্ট্র পরিচয় কেন একালে লাগে আর তা গুরুত্বপুর্ণ কেন সেটা  আগে বুঝার চেষ্টা করতে পারি আমরা।  রাষ্ট্র-পরিচয় না থাকায় বেওয়ারিশ লাশের মত কোন এয়ারপোর্টের মেঝেতে মাসের পর মাস শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়া মানুষের জীবনের দিকে একবার কিছুক্ষণ তাকান!! রাষ্ট্র স্পষ্ট না থাকা প্যালেসটাইনিদেরকে বুঝার চেষ্টা করেন অন্তত! মানুষের রাষ্ট্রীয় পরিচয় যেমন গুরুত্বপুর্ণ তেমন রাষ্ট্রটাকে টিকিয়ে রাখা  আর ওর দায় নেয়া বা রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষাও নাগরিক হিশাবে আপনার দায় – এদিকটাও বুঝতে হবে। কাজেই বাংলাদেশে আপনার যত দুঃখই থাক অভাব থাক তা মিটাতে সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই নতুন করে পুনঃগঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক লড়াই করেন, এটাই আপনার একমাত্র করণীয়। কিন্তু কোনভাবেই আপনার সুখ নিরাপত্তার জন্য মোদিকে আপনাকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে আহবান করতে পারেন না। কারণ, এতে আপনিও আর কার্যত বাংলাদেশের নাগরিক থাকেন না, রাষ্ট্রও আপনার থাকে না, নাই হয়ে যায়। মোদিও কী ভারতের কোন মুসলমান নাগরিককে পাকিস্তানকে ডেকে আনার পক্ষে থাকতে এলাও করবেন? সেটা একবার ভাবেন? সেটা মোদি হিন্দুত্ববাদি বলে নয় এটা কোন রাষ্ট্রই পারে না। তবে কিছুই করতে না পারলে একালে মাইগ্রেট করে জন্মরাষ্ট্র ফেলে মাইগ্রেটেড রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া যায় সেটা ট্রাই করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে বসে নিজ সুখ বা পেটিস্বার্থের জন্য  ভারতের ব্যাগ-বোঝা বইতে পারেন না।
    এটা খুবই অদ্ভুত একজন পিএইচডি হোলডার দেবপ্রিয়-কে নিয়ে এসব কথা বলতে হচ্ছে!! কথা আরও কত কী হয়ে গেছে দেখেন।  দেবপ্রিয় এখন কোনটা নিজের সামাজিক পরিচয় বলে দাবি করবেন? তিনি কী  বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থের নেতা? যেটা আসলে ভারতরাষ্ট্রের বাংলাদেশে যেসব স্বার্থ আছে এর কোন তল্পিবাহক সংগঠন বা এর নেতা ছাড়া আর কিছুই নয়!  নাকি দেবপ্রিয় সিপিডির এক বড়কর্তা প্রতিনিধি? দেখেন গতকাল সিপিডি বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে আবার সরকার সমালোচনার মুডে চলে গেছে। গতকাল কড়া সমালোচনা করেছে সিপিডির প্রতিনিধিরা। যদিও গতকাল দেবপ্রিয় সেখানে ছিলেন না,  সিপিডির অন্যেরা ছিল। এখন সপ্তাহ খানেক আগেও দেবপ্রিয় সরকারের পক্ষে দাঁড়ায়ে আইএমএফ রে দায়ী করে (বোকা বোকা দালালি) বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে আজকে হাসিনা ছেড়ে যাচ্ছেন কে?
    সোজা কথাটা হল, কাল যদি তিনি সিপিডির বাজেট সমালোচনায় উপস্থিত থাকতেন তাহলে তার মুখে বাজেট সমালোচনা কে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে নিত – আপনি বাংলাদেশের আম-মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে বাজেট সমালোচনা করছেন নাকি  হিন্দু নেতা হয়ে ভারতের স্বার্থের পক্ষে এটা কোন সমালোচনা?  আমাদেরকে এদুটার ফারাক বুঝবার তো কোন উপায় রাখেন নাই! যে কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হতে চায় (যা আসলে ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ) তিনি তো একই সাথে বাংলাদেশের আম-মানুষেরো প্রতিনিধি বা বক্তা হতে পারবেন না!  

    দেখেন হাসিনা ফ্যাসিস্ট – গুম, খুন ‘ডেথ স্ক্যায়াডের’ রানী হওয়াই তার পরিণতি। কিন্তু আপনি দেবপ্রিয় এতদিন হাসিনার মাখন খেয়ে চলেছিলেন আর এখন এই বিপদে পড়া হাসিনাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, কেবল ভারতের স্বার্থে? আপনি তো হাসিনার চেয়েও খারাপ! পনেরো বছর ধরে হাসিনার ‘ডেথ স্কয়াড’ চলেছে মুখ খুলেন নাই, আকার ইঙ্গিতেও না, কেন?  এমনকি এখনও হাসিনার সমালোচনা যেটা করছেন সেটাও ভারতের ইচ্ছায়! ঐ সভায় যারা উপস্থিত তারা সকলে এই অপরাধে অভিযুক্ত, নয় কি? 

    সাম্প্রদায়িকতা কী?
    খুবই সংক্ষেপে বলব। আর আমার আগে বলা লেখা পড়ে নিতে লিঙ্ক দিব।
    সেটা ১৮০০ সালের দিকের কথা যখন হিন্দু জমিদারের বৃটিশ শাসনের অধীনে নিচে নতুন শাসক শ্রেণী হিশাবে বাংলায় আসর জমিয়ে বসতেছেন।  তারা দুটা সিদ্ধান্তের উপর তাদের নয়া বাংলার মসনদ সাজিয়েছিলেন। সারকথায় এর এক হল, মুসলমানেরা বাঙালিই না। জমিদারদের এই চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত।  কেউ বাঙালি কিনা এই এথনিক পরিচয়াবলী ভা এথনিসিটি নির্ধারণ যেন কোন শাসকের ইচ্ছা দিয়ে নির্ধারণ সম্ভব!    দুইঃ বাংলা ভাষা সংস্কৃত থেকে এসেছে। যেটার বিপরীতে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লার উচ্চারণ বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা (কন্যা) নহে।

    এদুটা মূল সারকথার উচ্চারণে কী এমন ফারাক হয়ে গেল তা প্রগতিশীলেরা হয়ত বুঝবে না।  বলবেন হয়ত এটা হুদাই ভারতবিরোধিতা। এবিষয়ে প্রগতিশীলতা=হিন্দুত্ববাদ এই সমীকরণটা মনে রাখলেই আপাতত চলবে! এদিকে জমিদার হিন্দুর নেয়া সবচেয়ে আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা হল যে নয়া তাদের নে্তৃত্বে সমাজে মুসলমানদের উপর আধিপত্য (সম্পর্ক) কায়েম তাদের করতেই হবে। যেকোন জাতিবাদি চিন্তা মাত্রই তা অন্য সকল জাতির উপরে নিজ শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করতে চায় – এটাই তার  লক্ষ্য মনে করে থাকে। জাতিবাদ মানে তাই “জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ”। তাই জমিদারদের আধিপত্যের খায়েস মূলত হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদ কায়েমের খায়েস। এছাড়া, জমিদারির অর্থনৈতিক জবরদস্তি সে তো আছেই।

    সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। 
    এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’।

    মুসলমানেরা বাঙালি নয় এই ফতোয়া দিলে তা মুসলমান মাত্রই তারা অধস্তন, আর তা হিন্দু জাতভেদের হিশাবে হিন্দু-জাতের সবচেয়ে নিচা মুচি বা চন্ডালদের চেয়েও নিচে  – এখানে মুসলমানদের কোন অবস্থান হবে। এছাড়া পুর্ববঙ্গে আবার মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট। তাই এই নিচা অবস্থান দেখিয়ে দিলে জমিদারদের পক্ষে অখন্ড বাংলায় আধিপত্য করতে এটা সহায়ক হবে। কিন্তু আধিপত্য করতে হবে কেন এই প্রশ্ন কেউ করতে নিজেকে করতে চায় নাই!
    এরপরেও জমিদারদের দুঃখ ঘুচে নাই। মোটাদাগে যদি পশ্চিমবঙ্গে  মুসলমান জনসংখ্যা ২৫% ধরে নেই তবে সেটাও যথেষ্ট বড় সংখ্যা বলে এদেরকে  চাইলেও শুধু দাবিয়ে রাখা মুসকিল।  বৃটিশ ভারতে ১৮৩০ সালের দিকে আধুনিক শিক্ষা মানে স্কুল কলেজে শিক্ষা শুরু হয়েছিল।  অর্থাৎ সরকারি চাকরির জন্য জনসম্পদ [Human resource HR] তৈরি তা বৃটিশ-ইন্ডিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজ স্বার্থে। এই সিদ্ধান্তটাকে যদি একজামিন করি তাহলে দেখব শাসক জমিদার শ্রেণীর হাতে মুসলমানদেরকে এই সুবিধা নিতে ঠেকিয়ে দিবার মত তেমন অস্ত্র ছিল না। তাই তাদের সমাজ মানে তাদের হিন্দু আধিপত্যের সমাজে মুসলমানদের জন্যই অন্তত কিছু জায়গা ছেড়ে রাখাটাই সঠিক হবে বলে মনে করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই স্কুলে মুস্লমান ছেলেটাকে পাশ বসতে দিবে কিভাবে, কিংবা চাকরিস্থলে  বা এমনকি এই সুত্রে সমাজে পাশাপাশি চলতে দিবে কিনা ইত্যাদি মেলা প্রশ্ন ভর করে এসেছিল। তখন জমিদার শাসনের হিন্দু সমাজ যেসব শর্ত আরোপ করেছিল যে শর্ত পুরণ সাপেক্ষে এই “সর্ব অন্তজ-জাত” মুসলমানেরা তাদের সামনের হিন্দু ডমিনেটেড সমাজে একটি প্রবেশ ও কোনায় বসার অনুমতি পেয়েছিল সেটাই “অসাম্প্রদায়িক” হওয়া।  মুসলমান আদব কায়দা দেখানো যাবে না, ইসলামি চিহ্ন  প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা যাবে না মানে  হিন্দু সমাজের কমন প্লেসে দেখানো যাবে না। ব্যাপারটা দাড়ায় স্কুলে ব্যাকবেঞ্চে জায়গা হয় একটু কিন্তু কেউ পাশে বসে না।  নিজেরা টিকি আর চন্দনে মুখে বা কপালে ড্রয়িং এঁকে হিন্দুরা সাত জায়গা ঘুরে বেরাচ্ছে অথচ মাথার টুপি ভুলে মাথা থেকে না খুলে প্রকাশ্য রাস্তায় বের হওয়া যাবে না। মানে সবসময় মনে করিয়ে দেয়া You are not equal to us – এই লক্ষ্যেই এটা পরিচালিত হত, শাসন সহজ করার জন্য। তাহলে সাম্প্রদায়িকতা কী? এর মানে হল যে হিন্দু সমাজ যে অধীনতা শর্ত চাপিয়েছিল মুসলমানদের উপর সেটা ভঙ্গকারিকে সাম্প্রদায়িক বলা হত।  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে না চাইলে আপনি সাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ সেটা মেনে চললেই কেবল আপনি “অসাম্প্রদায়িক সার্টিফিকেট প্রাপ্ত” হয়ে শর্ত পূরণ করেছেন বলে কেবল ঐ সমাজে প্রবেশাধিকার লাভ করতে পারেন।
    কালক্রমে আবার একদল  হিন্দু একাদেমিক হিন্দুত্বের অসাম্প্রদায়িক হবার শর্ত  যেটা  সেটাই যেন আধুনিকতা, এই বলে প্রলেপ দেয়া এক নয়া সাফাই চালানোর চেষ্টা করেছিলেন।  কিন্তু  এরা জানেই না যে ‘অসাম্প্রদায়িকতার শর্ত’ যারা চাপাতে চায় তারা আধুনিকই নয়। তাদের আধুনিক হবার সুযোগ নাই। কারণ আধুনিকতা প্রথম শর্ত হচ্ছে সাম্য। অথচ আপনাদের চাওয়ার ভিত্তি তো আধিপত্য, জাত শ্রেষ্ঠত্ব। কাজেই মানুষকে সমান চোখে দেখতে শিখেন আগে। নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক সেটা শিখতে হবে আগে। এছাড়াও প্রত্যেকের মর্যাদা, স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা আছে সে কথা খেয়াল রাখতে হবে।  অথচ ওদিকে সাম্প্রদায়িক শর্ত দিবার উদ্দেশ্যই তো  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে অপর যেকাউকে বাধ্য করা। যেটা সাম্য ধারণার উলটা। বরং জাতভেদে বিভক্ত ও ছেড়াবেড়া হিন্দুত্বের ধারণাটাই এজন্য আধুনিক হবার অযোগ্য, এটা এক মৌলিক অযোগ্যতা।  আর তাদের কথিত রেনেসাঁর আদিপুরুষ রাম মোহন রায় এজন্যই তো সবার আগে  ১৮১৫ সালেই একটা নয়া ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ গড়ে নিতে চেয়েছিলেন। এসব কেন হয়েছে সেসবের ব্যাখ্যা করতে শিখেন আগে।  না বুঝে কথা বলা এসব অন্নদাশঙ্কর মার্কা  রেনেসাঁ-বুঝার ভাবসাব আর কতদিন দেখাবেন! বরং যেসব ধর্ম বা থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যায়  বাই ডিফল্ট সাম্য অনুসরণ যোগ্য হয়েই থাকে সেসব থিওলজি থেকে আধুনিকতায় যাওয়া আসা সহজ।   মর্ডানিটি বুঝবার আগেই কমিউনিস্ট- প্রগতিশীল হয়ে যাবার সমস্যা এগুলাই!  মূল কথাটা হল, সবার আগে সবাইকে সমানজ্ঞান করা ও মর্যাদা দিতে শিখতে হবে। আর এই হল কথিত অসাম্প্রদায়িকতার গুমোড় ফাঁক!

    “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও
    বাংলাদেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়ে যাওয়ার কথাটি
    বলেন বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।”

    এখন আসেন, দেবপ্রিয়ের ঐ কথিত মত বিনিময় সভার কথায়। তিনি হাসিনাকে দায়ী করে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে”। তাহলে তিনি আসলে কী বলেছেন যা শুনে ঐ আসরের আরও অনেক কর্তা-হিন্দুনেতা হাততালি দিয়েছেন?  এর মানে তারা পনেরো বছরের হাসিনার শাসনে একেবারেই সন্তুষ্ট নন। আমরা দেখছি তারা চাচ্ছেন অসাম্প্রদায়িকতা – একটা খুব সুন্দর অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ!  যা মুসলমান হাসিনা দিতে পারেন নাই, এই হলো অভিযোগ। কিন্তু সেটা কী জিনিষ! আচ্ছা থাক সেকথা বাদ দিলাম। বরং আসেন জিজ্ঞাসা করে জেনে নেওয়া যাক কখন হিন্দুরা অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ উপভোগ করেছিল? তাহলে একটা ধারণা পেয়ে যেতে পারি।
    আমি নিশ্চিত দেবপ্রিয় বা রামেন্দ্র মজুমদার তো বটেই এমনকি খুশি কবির আর সাথে শামসুল হুদাও বলে উঠবেন – কেন, ১৯৪৭ সালেরও আগের জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের সমাজে! 

    এবার কী বুঝা গেছে তাদের খাঁটি অসাম্প্রদায়িকতার মাপকাঠি কী? মানে আমাদেরকে  শুরু করতে হবে জমিদারদেরকে জমিদারি ফেরত দিয়ে। কারণ জমিদারি ফেরত না দিলে জমিদার-হিন্দু আধিপত্য আর তাদের রুস্তমির সমাজ ফিরে আসবে কোথা থেকে? আর সেটা না হলে জমিদারি-অসাম্প্রদায়িক সমাজ আসবে কোথা থেকে? আহ রে অসাম্প্রদায়িকতা, কোথায় রাখি তোরে!!!! My Foot!

    আচ্ছা তাহলে কলকাতায় কী অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ আছে? আছে তয় মমতা মাঝে মাঝে মুসলমানদের ভোট নিতে গিয়ে সব নষ্ট করে দেয়! অবশ্য ইদানিং আরএসএস উঠে আসছে। তারা হিন্দু জনবসতির মধ্যে হোটেলে মুসলমান স্কুল শিক্ষকদের ভাড়া দিয়ে  থাকতে এলে তাদেরকে থাকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিজেপি ফতোয়া দিয়েছে । ভালই হয়েছে, সব পরিস্কার হয়েছে। এটা খুবই  অসাম্প্রদায়িক কাজ হয়েছিল একটা!  অতএব শেখ হাসিনা যতই শেখের মেয়ে হোক, তিনি তো আসলে মুসলমান! মানেই বিল্ট-ইন সাম্প্রদায়িক! তাই না!

    তাহলে ভারত কেন এই মত বিনিময় সভা করে নিজের স্বার্থ জড়ো ও হাজির করছে?
    কারণ, হাসিনার অবস্থা ভাল না। যদি তিনি ক্ষমতা হারায়েই ফেলেন কোন কারণে তবে আগামির রাজনৈতিক শক্তির সাথে  ভারত যদি কোন সখ্যতাই না গড়তে পারে তবে এই হিন্দুস্বার্থে প্রতিনিধিত্বের নামে ভারত নিয়মিত ডিস্টার্বেন্স হিন্দু জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করা ছাড়া আর তো কোন লিভার [lever বা চারাকাঠি] ভারতের হাতে থাকবে না!

    +++
    আপডেটেডঃ ০৫ জুন ২০২৩ দুপুর  ০২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • আবার সুবীর ভৌমিক!

    আবার সুবীর ভৌমিক!
    গৌতম দাস

    ২ জুন ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4yv

             Why Did the United States Just Sanction Bangladesh – FP

     

    আবার সুবীর ভৌমিক! তিনি আবার একটা লেখা পয়দা করেছেন, একই ফেডারেল পত্রিকায়। তবে এবার সম্ভবত শ্রীরাধা দত্তের দ্বারা সুবীর উদ্বুদ্ধ হয়েছেন যে – “ভারত এক পরাশক্তি”, এমন ভাব দেখানিতে সামিল হয়ে।  স্বপ্নে পোলাও খাবার মত এই ভাব ধরে কল্পিত ধারণার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নিয়ে আরো কত কী তো লেখা সম্ভব!! অসম্ভবএর কী আছে? আর এতে মোদির ভারতের ইমেজ অনেকটাই ফাও ফাও বাড়িয়ে নিবার অনেক সুযোগ আছে। তাই সুবীর মনে হচ্ছে এবার সে লাইনে আবার একটা লেখা পয়দা করেছেন।

    লেখার শিরোনামঃ “India intervenes to douse tempers in US-Bangladesh spat” মানে হল – “আমেরিকা-বাংলাদেশের মধ্যে গরম হয়ে যাওয়া কথাবার্তায় ভারতীয় হস্তক্ষেপ, উত্তেজনার পারদ নামাতে”।

    তার মানে সারকথা হল, ভারত এক বিরাট পরাশক্তি আর মোদি তার বিরাট নেতা – এই প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সুবীরও। এতে তিনি মোদিকে এতই বিরাট নেতা বানাচ্ছেন যে তিনি যেন দুপক্ষকে শান্ত করেছেন [নিচে মূল ইংরাজিটা দেখতে পারেন।]। এই অভিনয়ের উপর দাঁড়িয়ে সুবীর কথা সাজিয়েছেন। আবার সুবীর নিজেই এক সাফাইও হাজির করেছেন যে কেন ভারত গুরুত্বপুর্ণ হল। সুবীর বলছেন, ভারত নাকি “উভয় পক্ষকে সহনশীল সংযত [advising moderation] হতে পরামর্শ দিয়েছে”। কিন্তু কেন দিতে গেল আর কেন আর কী সুত্রে ওরা উভয়পক্ষ ভারতের কথিত পরামর্শ গ্রহণ করল বা ভারতকে পরামর্শ দিবার জায়গা করে দিল? এনিয়ে সুবীর নিজেই ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, কারণ আমেরিকা নাকি ভারতের কৌশলগত পার্টনার আর বাংলাদেশের কাছে ভারত হল সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু , তাই।

    “India has played a vital role by advising moderation
    on both sides since it is close to both the US(its strategic partner)
    and Bangladesh (its most trusted friend in South Asia).”

    সমস্যা হল, বাংলাদেশের মানুষ জানে যে এটা একটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ, স্বামী প্রাক্তন হয়ে গেলে তাকে কী আর স্বামী বলে চালায় দেয়া যায়? আমেরিকার সাথে ভারতের স্ট্রেটেজিক মিল অবস্থানের যে সম্পর্ক ছিল সেটা আর কার্যত নাই। বাইডেন মোদি-বিহীন ভারত চাওয়া শুরু করলে কী আর পুরানা এসব সম্পর্ক এখনও জিন্দা আছে বলে চালিয়ে দেয়া সম্ভব?? আবার  অন্যটা, মানে হাসিনা সরকার? ভারত যে সুযোগ পেলে হাসিনা সরকারকে বেঁচে দিয়ে হলেও পরবর্তি সরকারের সাথে সম্পর্ক বা খাতির জমানো করতে পিছপা হবে না সেটা তো কারও অজানা থাকার কোন কারণ নাই! তাহলে কেন সুবোর এদিকটা আড়াল করতে চাইছেন?

    আর ইতোমধ্যেই ভারত যে এমন বেচাবিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে এর প্রমাণ সুবীর তার এই লেখাতেই রেখেচেন। সেখানে যাচ্ছি একটু বাদে। তার আগে, সবচেয়ে আজিব বাত হল, সুবীর নিজেই জানাচ্ছেন “……  R&AW chief Samant Goel to Dhaka,” – মানে র-এর চীফ নিজেই ঢাকা-ইন্ডিয়া দৌড়াদৌড়ি করতেছেন। প্রথমত সুবীর কেন সামন্ত গোয়েলের এই গোপন ততপরতা পাবলিক করে দিচ্ছেন? সুবীরের হয়ত ধারণা এতে হাসিনা সরকার খুশি হবে? অথবা র-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবছায় থাকবে! তাই কী? না হলে, গোয়েলের এই গোপন ততপরতা পাবলিক করে দিবার কোন লাভজনক কারণ তো দেখা যাচ্ছে না!
    তবে অন্যদিকে,  সুবীর কী জানেন না যে এই কথাটা বাংলাদেশের আম-মানুষ সবচেয়ে অপছন্দ করবে????? যেখানে বাংলাদেশের  আম-মানুষের ভারতীয় ততপরতা নিয়ে সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকে; অবিশ্বাস করে!  অন্যভাবে বললে, R&AW অথবা এর chief এর প্রতি বাংলাদেশের আম মানুষের নুন্যতম সহানুভুতি নাই, থাকার কোনও কারণও নাই! কারণ, গত ১৫ বছর ভারত বাংলাদেশিদের স্বার্থের এদিকটায় কোন আমলই করে নাই! তাহলে সুবীরের এই বেপরোয়া ভাবটা কেন?  সামন্ত গোয়েল বা প্রণয় ভার্মা-রা বিরাট দৌড়াদৌড়ি করছেন এই তথ্য কী হাসিনা সরকারের পক্ষে যাবে, তার জন্য ভাল হবে? প্রশ্নই আসে না, পাবলিকের চোখে ভাল হবে না বরং নেগেটিভ হবেই! তাহলে সুবীরের এসব পাকামো কেন? এর একটাই কারণ হতে পারে যে মোদি ও তার ভারত যে বিরাট পরাশক্তি হয়ে গেছে – সেই ফাঁপা আর শতভাগ মিথ্যা হলেও সেই কথাটাকেই ফুটানি দেখানোর জন্য ব্যবহার করা!!

    এটাই আসলে হাসিনা সরকার মরুক আর বাচুক জাহান্নামে যাক এই সরকারকে এখন বেচা দিয়ে হলেও সামন্ত গোয়েল বা মোদির স্বার্থ উদ্ধার মনে হচ্ছে তাদের প্রধান লক্ষ্য!

    আবার লেখার শুরুর প্যারাতেই সুবীর হাসিনা সরকার সম্পর্কে লিখছেন Bangladesh has promised ………who are linked to electoral fraud.
    মানে সুবীর বলছেন, – অ্যামেরিকা বলেছে যারা নির্বাচনী প্রতারণা বা কারচুপিতে সংশ্লিষ্ট তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে, এজন্য সরকার সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।  আবার পরে সুবীর আরো বলেছেন, ২০১৪ আর ২০১৮ এর নির্বাচনে যারা ভোটচুরিতে দুবারই ব্যাপারটাকে আবর্জনা বানিয়ে ফেলেছিল তাদের উপর আমেরিকা খুবই ক্ষুব্ধ। [it feels, has marred two successive national elections in 2014 and 2018.]
    আবার সুবীর সাথে জুড়ে দিয়েছেন হাসিনা সরকার এসব কারচুপির কথা ঝেড়ে অস্বীকার করেছে……। তাই কী করার কথা না? সরকার স্বীকার করার পরে কী আর সরকার থাকে?

    আচ্ছা সুবীর সাব এত পিছলা-পিছলি করতাছেন কেন? যেমন,  ২০১৪ সালের কথাই ধরেন, ভারত সরকার বা তার গোয়েন্দা বিভাগের কাছে ফাস্ট-হ্যান্ড ইনফরমেশনই আছে?  নাই কী? ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং-কে দিয়ে ভারত সরকার যে এসাইনমেন্টে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল তা কী তামাম ভারতীয় সরকারি পক্ষের কাছে অজানা? সেখানে বিএনপি বাদ আর এরশাদকে বিরোধী দল সাজিয়ে নির্বাচন পার হতে হবে – এই ছিল সুজাতার এসাইনমেন্ট তা তো সেই সময়ই এরশাদ ঐ সময়ের সুজাতার সাথে এরশাদ তাঁর মিটিং থেকে বের হয়েই ভারতের এই সিদ্ধান্তের কথা সরাসরি সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। একালেও চলতি বছরে সংসদে জাতীয় পার্টিও সেসব পুরানা ভারতীয় প্রতারণার কথা তারা নিজেরাই স্বীকার করে আবার আমাদের জানিয়েছে, এখানে দেখুন।  কাজেই এসব তো সুবীর সাবের কিছুই অজানা নয়। তাহলে এখন এমন ঢং করে নিঃস্পাপ সাজা – এটা তো বাংলাদেশের আজ-জনতার জন্য বিরক্তিকর নেকামোই ঠেকবে! নাকি?

    আবার র‍্যাবের উপর অ্যামেরিকান স্যাংশনের জন্য হাসিনার যেসব দুর্বল সাফাই – যে র‍্যাব কথিত জঙ্গিবাদ দমন করেছে – বলেছেন সেগুলোকেই সুবীর আঁকড়ে ধরে আবার হাজির করেছেন এখানে। কিন্তু কথা হল সুবীরের টার্গেট শ্রোতা কে? আমেরিকা? বাংলাদেশের আম-জনতা? এদের কারও কাছেই তো এই সাফাই গ্রহণীয় নয়। তাহলে কে টার্গেট শ্রোতা? ভারতের সরকার অথবা হাসিনা সরকার? সেটা তো ঘরে ডেকে নিয়ে বললেও হত! এর প্রয়োজন কী? কার ভোগে লাগবে এই প্রকাশ্য চামচামি?

    সোজা কথায় আমরা দেখছি এবার সুবোর ভৌমিক খুবই অস্থির বেচাইন; কথার তালমিল রাখতে পাচ্ছেন না।
    তবে সুবীরকে যা মনে রাখতে হবে তা হল এটা ২০১৩-১৪ সাল নয়। এটা ২০২৩ সাল। ফলে নানার আমলে ঘি খাইছিলেন সেই গল্প হাজির করে এখন তুড়ি বাজাতে চাইলে তো আর বাজবে না। এখন আমেরিকান অবস্থান আর ভারতের অবস্থান এক নয়, স্ট্রাটেজিক মিলের গল্প সে তো বহু দূর, যা বহু আগেই ছিঁড়ে গেছে; এশিয়ায় ভারত-আমেরিকা এখন যার যার তার তার আর সর্বপরি খোদ মোদিকেই ক্ষমতাচ্যুতি বা অপসারণ এখন অন্তত বাইডেনের কামনা!  কাজেই পরাশক্তি ভাবধরা মোদির চেয়ে এক অধীনস্ত ইন্ডিয়া –  এটাই  বাইডেনের এশিয়া নীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ।  সেটাকে অধীনস্ত বা বাইডেন-রাহুল ডিল যাই বলি না কেন!   আদতে সবকিছুই মোউলিক জায়গায় আসলে বদলে গেছে। কাজেই খামোখা মোদিকে পরাশক্তি বা বাংলাদেশের ত্রাতা ভাব ধরে লাভ নাই। আমেরিকা ভারতের এখনও স্ট্রাটেজিক বন্ধু বলে মিথ্যা ভাব ধরেও লাভ নাই! এতে মোদির গুরুত্ব বাড়ারও কোন কারণ নাই! এমনকি তা হাসিনা সরকারের কাছেও না!

    কে মিথ্যা বলছেন সুবীর না শ্রীরাধাঃ
    আবার সবচেয়ে বড় কথা শ্রীরাধা দত্ত [যাকে নিয়ে গত সপ্তাহেই লিখেছি এখানে দেখেন] অফিসিয়ালি আরএসএস এর সাথে যুক্ত মানে আরএসএস এর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিআইএফ [VIF] এর এক কর্ণাধর। বিপরীতে সুবীর ভৌমিক আপনি যা কিছুই হন না কেন অফিসিয়ালি ভারত সরকারের কেউ না।
    এখন  শ্রীরাধা দত্ত বিবিসি-কে বলে গেছেন ভারত সরকার হাসিনার জন্য কিছু করবে না। আর সুবীর আপনি বলছেন উল্টাটা। কী হল তাহলে?
    আবার হাসিনা সরকার টিকানোর পক্ষেই নাকি র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েলের ঢাকা সফর ছিল বলে গল্প দিচ্ছেন! মানে এসেছিলেন এটা আপনিই সাক্ষ্য দিয়ে বলছেন তাই এটা আমাদের অস্বীকারের কিছু নাই। কিন্তু সরকার টিকানোর জন্য কী এসেছিলেন? না উল্টাটা, আমরা বিভ্রান্ত! তাহলে আসলটা কী?  ঠিক কোনটা আসল তা নিয়ে আপনার উপর আস্থা রাখা যাচ্ছে না! তাই,  খুব সম্ভবত শ্রীরাধা নয়,  সুবীর আপনি একদম ডাহা মিথ্যা বলছেন।

    কথা বেশি বললে চাপাবাজি সব বের হয়ে পড়ে!!! এত বারবার একেক কথা দিয়ে আপনার হাজিরাটাই সব অস্থিরতারই ইঙ্গিত!
    আর স্বভাবতই এতে, বাংলাদেশে ভারত সরকার বা মোদি বা সুবীর ভৌমিক ইত্যাদি এদের সকলেরই বিশ্বাসযোগ্যতা শুণ্যের কোঠায় ডুবে যাচ্ছে! অসৎ লোকে দুনিয়াটা ভারি হয়ে উঠছে!

    +++

    আপডেটেডঃ ০২ জুন ২০২৩ দুপুর  ১০ঃ ৫৮ ১১

    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত

     

     

    বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত
    গৌতম দাস

    ৩০ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4xe

     

            মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর

     

     

    কোন নিউজ বা মিডিয়া গ্রুপ যখন কথিত “ফাইনান্সিশিয়াল সংকটে” পড়ে তখন যে সে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে তা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে সে দুনিয়াতে যদি মোদি আর তার গোয়েন্দাবিভাগ হাজির থাকে।  ভারতের ভিতরে অথবা বাইরে  অঘোষিতভাবে ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) মিডিয়া কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠান এর নাম হল এএনআই (ANI) যে নিজেই এক ‘বেসরকারি সংবাদ সংস্থা-ই’ যেন অন্য কিছু নয়, এই ভাব ধরে থাকে। অথচ এ’হলো ভারতে সরকারি প্রটেকশনে  ব্যক্তিমালিকানাধীন নিউজ এজেন্সী যে আমাদের বাসসের মত পর্যায়ের হয়ে উঠেছে কিন্তু কাজ করে সরকারি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের বাড়ানো হাত যেন! শুধু তাই নয়, ভারতের প্রধান সরকারি নিউজ এজেন্সি প্রতিষ্ঠান পিটিআই [PTI] এর চেয়েও ভারত সরকারের কাছে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত নিউজ এজেন্সি এটা;  অথচ লিগ্যাল স্টাটাসে সে বেসরকারি সংবাদ সংস্থা মাত্র। আর তা দিয়েই কথিত সংকটে পড়া মিডিয়া গ্রুপগুলো তাদের ফাইনান্সিল খারাপ সময়ে অভাবকে ব্বযবহার করে অর্থালোভি হয়ে উঠলে তাদেরকে শিকারে নেমে পড়ার প্রতিষ্ঠান হল এই এএনআই। কথিত অর্থ-সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর খুবই কাছের বন্ধু হয়ে উঠে এই এএনআই। এমনকি সে ঘটনা বাংলাদেশের বেলাতেও একই, সত্য! বাংলাদেশের প্রথম আলোর ক্ষেত্রে দেখেছি  তার বন্ধু হয়েছে এএনআই। এভাবে বন্ধু হয়ে জার্নালিজমের বেসিক নীতি ত্যাগ করে হলেও ভারতীয়দের আকাট পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে পড়েছিল ো পরে প্রায়ই এই প্রথম আলো,  স্রেফ কিছু নগদ অর্থ কামানোর জন্য।  এগুলো ২০২১ সালের শেষের দিকে সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল; এই উসিলায় যে করোনাকালে নাকি কর্মচারীদের ঠিকমত বেতন দিতে পারে নাই বা আয় কমে গেছে – মালিক বকা দিবে – এই ছিল সম্পাদকদের অজুহাতে।

    সম্প্রতিক বছরগুলোতে বিবিসিরও অর্থসংকট, ছাটাই ইত্যাদির কথা অনেকদিন ধরে কানে আসছে আমাদের। বিশেষ করে এসময়ে বিবিসি বাংলাকে প্রায়ই “এএনআই-এর এসাইমেন্ট ধরণের” নিউজ করতে দেখছি। একালের  বিবিসি বাংলার এই  ফেনোমেনাটা হল বিজেপি-আরএসএস এর আইটি চীফ অমিত মালব্যর অনুগত-রিপোর্ট করা; যেটা মালব্য-রা লাগাতর পয়সা খরচ করে মিডিয়া কিনে প্রপাগান্ডা  তৈরি করে – সেখান থেকে এটা এএনআই পর্যন্ত বিস্তৃত এই ততপরতা। এবিষয়ে এএনআইয়ের সিন্ডিকেটেড রিপোর্ট  – যা ছাপলে উলটা মিডিয়াগুলো পয়সা পায় – এমন কুখ্যাত ততপরতা এর ভাল প্রমাণ। রিপোর্টে কলমের একটা আচড়ও বসায় না অথচ সেটা নিউজ বা জার্নালিজম বলে ছেপে দেয় এরা নগদ পয়সা পাওয়ার লোভে।  যারা অমিত মালব্যকে চিনেন নাই তারা জেনে রাখতে পারেন, ভারত-বাংলাদেশ জুড়ে ফেসবুক যার নিয়ন্ত্রণে; প্রান্তীয় পর্যায়ে  যেকোন প্রোফাইল-একাউন্ট গায়েব করে দেয়া যার কাছে তুড়ি বাজানো…।  এছাড়াও ভারতীয় অরিজিন ফেসবুকে কাজ করা স্টাফদের সবার উপরের অলিখিত কর্তাব্যক্তিটার নাম হল যেন অমিত মালব্য।  তবে এসবের বাইরেও অনেক ঘটনা আছে যেমন পুরানা যারা কলকাতা অরিজিন বিবিসি বাংলার স্টাফ যেমন, শুভজ্যোতি ঘোষ আর সে আমলে কলকাতা আরএসএসের তথাগত রায় যখন বাংলার প্রধান ব্যক্তিত্ব – এরা ছিল দুজনে দুজনার।

    গত দুদিন ধরে তেমনই এক ততপরতা আমরা দেখছি বিবিসি -বাংলায়। সেটা হল ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) তরফে কিন্তু ফ্রন্টাল ফেস যেমন, ডঃ শ্রীরাধা দত্ত-কে সামনে এনে তাঁর বয়ানে ভারত ও মোদিকে বিরাট পরাশক্তিগত নেতা হিশাবে তুলে ধরার এক প্রপাগান্ডা চালিয়েছে বিবিসি।  এই নারীকে বাংলাদেশের ত্রাতা বা বাপ-মা হিসাবে তুলে ধরারও প্রকল্প এটা। কে এই শ্রীরাধা দত্ত?  ফরমালি তিনি বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন [VIF] নামের যেটা সরাসরি আরএসএস এর এক থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান, তার সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা।  এছাড়া ভারত আরএসএস প্রভাবিত নানান একাদেমিক / কমার্সিয়াল কিন্তু দলীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি জড়িত।  বাংলাদেশে প্রায়ই তিনি সিপিডি [CPD] ভিজিট করে থাকেন।
    সবমিলিয়ে মানে হল, তাঁর RSS  এর সাথে খোলাখুলি যুক্ত থাকা বা সংশ্লিষ্টতা আমাদেরকে তাঁর সম্পর্ক কিছু বিশেষ ধারণা দেয়।  সেখান থেকে অনেকে মনে করেন,  মোদি-আরএসএস এর দুনিয়াব্যাপী হিন্দুত্ববাদ ছড়ানোর যে স্বপ্ন-কল্পনা আছে তা বাস্তবায়নের কর্মী একজন তিনি।  তাই কার্যত ভিআইএফ (VIF), থিঙ্কট্যাঙ্কের নামে আরএসএস এর গ্লোবাল হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান হয়েছে মনে করা ভুল হবে না; যার কান্ডারি তিনি।  যেমন  এই প্রসঙ্গ বিবিসিসহ অনেক অনেক ইউটিউব ভিডিও-ও ছাড়া হয়েছে সব জায়গায় একই প্রপাগান্ডা তুলে ধরা হয়েছে; যার প্রধান কাজ হচ্ছে  শ্রীরাধার তুলে ধরছেন – বাংলাদেশে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরে যেন মোদি হলেন হাসিনার বাংলাদেশের ত্রাতা যে মোদি চাইলেই হাসিনা সরকারকে উদ্বার করে দিতে পারেন অথবা হাসিনা সরকারের এখনকার পরিত্রাণ যেন কথিত এক ক্ষমতাধর পরাশক্তি ভারত ও এটা মোদির ইচ্ছা বা ভাল মুডের উপর নির্ভরশীল।
    এটা ফুটিয়ে তোলা মত এক উপস্থাপক হচ্ছেন শ্রীরাধা দত্ত ও তাঁর কারিশমা; আর ওদিকে তা বাজারের ছড়িয়ে দিবার দায়ীত্ব-ঠিকাদারি পেয়েছে যেন বিবিসি বাংলা!

    বিবিসির রিপোর্টের নামে এক গারবেজের প্রসঙ্গঃ
    বিবিসির রিপোর্টের নামে এই গারবেজের শিরোনাম হল, “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর উপায় কী হাসিনা সরকারের”, যার রিপোর্টার হলেন শাকিল আনোয়ার।
    আচ্ছা এমন শিরোনাম কেন?  মানে রিপোর্টার এখানে এটাকে একটা ‘হুমকি’ বলে ধরে নিয়েছেন কেন? কী দেখে নিশ্চিত হয়েছেন? আর ধরে নিয়েছেন যে “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” এটা বাংলাদেশ সরকারের উপর এক “হুমকি”?   কিন্তু  এন্থনি ব্লিঙ্কেনের টুইট বা ডোনাল্ড লু এর বাংলাদেশি টিভিতে গিয়ে ব্যাখ্যাদানের পরে হাসিনা  সরকার ও সরকারি দলের প্রতিক্রিয়া কী ? নেগেটিভ ? তা তো নয়। এমনকি   আওয়ামি লীগ, বিএনপি এমনকি জাতীয় পার্টি – এর নেতারা কেউই একে নেতিবাচক ভাবে দেখে নাই, নেয় নাই। অন্তত তাদের অফিসিয়াল ভার্সানে এটা তাই। পরেরদিন রাষ্ট্রদুত পিটার হাস এই তিন দলের প্রতিনিধিদেরকে ডেকে কথা বললে তারা কেউই “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” নিয়ে কোন নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখান নাই।
    আবার ওবায়দুল কাদের এর প্রতিক্রিয়া দেখুন। সরকারি বাসস-এর রিপোর্ট লিখছে – “মার্কিন ভিসা নীতি নিয়ে বেকায়দায় বিএনপিঃ  ওবায়দুল কাদের”  অর্থাৎ আওয়ামি লীগ এর জন্য কোন বিপদ ঘটে নাই বরং বিএনপি এই নিষেধাজ্ঞায় বিপদে পড়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।  অথবা আবার দেখেন,  একই বাসস কিন্তু আরও এক রিপোর্টে লিখছে – “নতুন মার্কিন ভিসা নীতিতে অগ্নিসংযোগ বন্ধ হবেঃ মোমেনের আশাবাদ“। তাহলে কিসের ভিত্তিতে শাকিল আনোয়ার এটাকে হুমকি বলে চিহ্নিত ও  প্রচার করছেন? সেটা কী এই যে এটাকে হুমকি বলে  প্রচার না করলে শ্রীরাধা দত্ত বা তার মহাজন মোদিকে –  হাসিনা সরকারের এক ত্রাতা ও বীর হিশাবে তুলে ধরা যাবে না??? বাঃ বেশ ভাল কায়দা তো!  আর সেক্ষেত্রে  হয়ত বিবিসির ক্লায়েন্ট এসাইনমেন্টের বিল সেক্ষেত্রে পে করবে না, তাই কি? তার মানে বিবিসির এই এসাইমেন্টের ফোকাস হল, মোদিকে এক বিরাট ত্রাতা আর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা!! সেটা কতটা সত্যি – এই প্রশ্নটাকে মাথায় রেখে আমরা বিবিসির রিপোর্ট পড়ব।

    রিপোর্টের শুরুতেই বিবিসি এক গায়েবি কূটনীতিকের কথা এনেছে। নাম না আনা এই কূটনীতিক বলেছেন, “……এই রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে তলে তলে আমেরিকার সাথে দেন-দরবার দর-কষাকষির পথে যাবে সরকার“। আচ্ছা ভাইসাব,  কূটনীতিক ট্যাগ দিলেই কী কারো নামে যা খুশি লেখা বা চালানো যায়; জায়েজ?  আমেরিকার সাথে হাসিনার কোন ডিল বা রফা করতে গেলে একটা দেয়া-নেয়া লাগবে, এটা তো কোন গুঢ় জ্ঞান না, এটা সবাই জানে। এখন প্রশ্ন হল হাসিনার হাতে এমন কি আছে যেটা আমেরিকার কাছে লোভনীয় ফলে যা সে কামনা করে?  এমন কিছুই নাই, যেটুকু ছিল তা আগেই দেয়া হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয়ত, হাসিনার সাথে আমেরিকার কোন ডিলে জড়ানোর মানে হল হাসিনার প্রথম চয়েজ তাকে আরও এক টার্ম ক্ষমতায় রাখতে হবে – আর এর দায় আমেরিকাকে নিতে হবে। কিন্তু আমেরিকা ইতোমধ্যে প্রতিটা কথাতে জুড়ে দিয়ে বলেই যাচ্ছে যে একটা ফেয়ার ইলেকশন হতেই হবে। তাহলে এখানে বটম লাইনটা হল, একটা ফেয়ার ইলেকশন আর হাসিনাও আবার ক্ষমতায় – এদুটো একসাথে ঘটাতে হবে ; কিন্নোতু সরি এদুটো একসাথে সম্ভব নয়। কোন ম্যাজিকেও সম্ভব নয়! তাহলে এসব “তলে তলে বা দর কষাকষি টাইপের” বুকিস মুখস্ত কথা বিবিসি ঐ কথিত কূটনীতিকের মুখ দিয়ে বলাচ্ছে কেন?

    তাহলে,  রিপোর্ট-টাকে কী বিবিসি কোন রহস্য উপন্যাস বানাতে চেয়েছিল ?? অবশ্য না হলে মোদি ত্রাতা, মোদি পরাশক্তির মত ক্ষমতাধর এই গল্প কিভাবে আনা যাবে? ব্যাপারটা তো তাই, তাই না?

    দুইঃ
    দেখা গেল বিবিসি এভাবে প্রথম পর্ব জমাতে পারল না। এখন পরের পর্ব। এবার প্রকাশ্যে সাবেক কূটনীতিক তৌহিদ হোসেন বলছেন “বাংলাদেশে এক সামরিক ঘাটির” কথা। যদিও তিনি নিজেই তা শুরু করেছেন এটা একটা গুজব একথা বলে।
    প্রথমত এটা গুজব নয়, এটা আমেরিকানদের একটা খায়েস যে তারা তাদের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের জলসীমায় নোঙ্গর করতে পারলে তাদের শান্তি লাগত, এতে এশিয়ায় তাদের গায়ে বল বল ঠেকত। খায়েস তো মানুষের কত রকম থাকে! যেমন এই শতকের শুরুর আগে থেকেই অর্থহীন “ইসলাম কোপানিতে” লেগে পড়া ভারত-আমেরিকার দোস্তালির ইস্যুতে ভারতের  (তখন সেটা বাজপেয়ীর ভারত) সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অ্যামেরিকান প্রশাসন গ্রহণের পর থেকেই এই ঘাটি বানাবার খায়েস তারা লুকিয়ে ফেলেছিল, কোন ঘরের চালে গুজে রেখে চলছিল। কারণ, অ্যামেরিকান এই খায়েসের ইস্যুতে এর বিরুদ্ধে চীনের চেয়েও কোর আরও বড় বিরোধি হল ভারত। অর্থাৎ ভারত-ঘনিষ্ঠতা চাওয়ার আগেই আমেরিকাকে এই খায়েস ডেড করে তুলে রাখতে হত তাই করেছিল আমেরিকা। আর তাই সেটা সেই থেকে তোলাই আছে। অর্থাৎ খায়েস টা একেবারেই কোন গুজব নয়, তবে তুলে রাখা আছে, এক্টিভ নয় এই আরকি!
    কিন্তু আমেরিকান এই খায়েস নিয়ে আমাদের কী করার আছে?
    সেটা এবার এককথায় বললে, অ্যামেরিকান এই খায়েস ঠেকানো এটা আমাদের চেয়েও ভারত ও চীন এদুই শক্তির জন্য আরো বড় ইস্যু; সেটা এতই বড় যে এরা দুই রাষ্ট্রই তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা ঠেকাতে প্রস্তুত। কাজেই আমাদের ভুমিকা এখানে এতটুকু হলেই যথেষ্ট হবে যে বাংলাদেশকে ওদের লড়াইয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হওয়ানো যাবে না। বরং না হয়ে ওদের পায়ের পারার নিচে চাপা পড়ে মরতে না চাইলে আমাদের ভুমিকাটা খুবই ছোট্ট! তা হল, এই ইস্যুতে কোনপক্ষের সাথে না গিয়ে কোন খাতির জমানোর ইস্যু বলে বিবেচনাই না করা  – যেটাকে বলে – এটা আমাদের জন্য NO GO ইস্যু! যদি তা না মানি তাহলে এই ইস্যুর কারণে, আমেরিকা আসার আগেই ভারত ও চীনের দুদিক থেকে আক্রমণে আমরা শেষ হয়ে যাব।  মানে এটা হাসিনা বা কারও ক্ষমতায় আসা বা ক্ষমতার আয়ু বাড়ানোর কোন ইচ্ছার আইটেমই নয়! দরকষাকষির ইস্যু নয় বা এভাবে দেখা হারাম! এই কথাটা মনে রাখতেই হবে!।   কাজেই কূটনীতিক বলে নয় যেকারোই ভাব ধরে এনিয়ে কিছু বলা বা ভয় দেখানো অর্থহীন, অমূলক!

    আচ্ছা দুনিয়াতে আমেরিকার আর একটা সামরিক ঘাটি করা না করাতেই বা কী হয়েছে? কী হতে পারে? গত ২০১৬ সালে আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়াতে কোস্টাল এরিয়ায় একটা সামরিক ঘাটি চালু করেছে। তাতে কী হয়েছে? আমেরিকা চীনের উপর বিজয়লাভ করেছে নাকি কোন অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছে? কিছুই পায়নি। মনে রাখতে হবে কড়া ভাবে যে  একালে  আমেরিকা-চীনের প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এটা কোনভাবেই সামরিক চরিত্রের নয় সামরিকও নয়, এটা অর্থনৈতিক। আরো স্পষ্ট করে বললে, কার অর্থনীতি  এই মুহুর্তের দুনিয়ায় নিজ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস একুমুলেশন  বা অতিরিক্ত সম্পদ জমা করতে সক্ষম  হয়ে উঠেছে তারই প্রকাশের লড়াই । যদিও এটা তো প্রতিযোগিতার ইস্যু নয়, অবজেকটিভ ঘটনা। অর্থনীতিতে এই বাড়তি সম্পদ এটাই অন্যদেশের  উপর আমেরিকা বা চীনের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দেখা দিতে সক্ষম এবং হয়ও তাই।  যেখানে আমেরিকা দ্রুত তার পুরানা প্রভাব-বিস্তারের  সক্ষমতা হারাচ্ছে আর বিপরীতে চীন জাগছে। তাই আমেরিকা এটাকে সামরিক সক্ষমতা হিশাবে উলটে দিবার বা হাজির করে দেখানোর প্রাণপন চেষ্টা করছে। যে সামরিক ফিল্ডে আমেরিকা এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সক্ষম। কিন্তু আমেরিকা চাইলেই তা হচ্ছে না। কারণ, কোনদেশই সামরিক সংঘাত চাচ্ছে না, যদিও চীনের সাথে অনেক পড়শি দেশেরই সীমানা বিতর্ক  বিরোধ আছে। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার কোলে উঠে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে কেউ আগ্রহি নয়; এটা গাধামি এটুকু সকলেই বুঝে। তাই আমেরিকা বার বার ফেল করছে এখানেই।   আর তাতে কী হয়েছে?  হয়েছে এই যে অষ্টেলিয়ায় বানানো অ্যামেরিকান সামরিক ঘাঁটি কারই অন্তত এখনই কোন কাজে আসছে না। বিনিয়োগটা খামোখা হয়ে বসে আছে!

    ভারত পাশে দাঁড়াবে?- এর গল্পঃ
    ভারত পাশে দাঁড়াবে – একথা শুনলে আজকাল আর হাসিনাও খুশি হয় না। কারণ, মোদি ও ভারত মুরোদহীন, উত্থানরহিত এক ব্যক্তি বা শক্তি! আর এই মিথ্যা কথা কে বিশ্বাস করে!
    এরপরেও বিবিসি ও শাকিল আনোয়ার এসেছেন আসলে তাদের সাবজেক্ট বা এসাইনমেন্ট নিয়ে যে – ভারত পাশে দাঁড়াবে? ! আচ্ছা একালে ভারত কবে থেকে কারও পাশে দাড়ানোর মত পরাশক্তি হয়ে গেছে? আর কিভাবে সেটা? যখন একাল বলতে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে আমেরিকা-চীনের রেষারেষি, লড়াই বা প্রতিযোগিতা তুঙ্গে উঠার কাল বলে এটাকে বুঝতে হবে। একালে ভারত তাহলে কী কেউ?? অবশ্যই না।  তবে ভারত বড়জোর কখনও  আমেরিকা অথবা চীনের পক্ষে তাদের কারও থেকে আলগা খেপ-মারার মত কাজ বা এসাইনমেন্ট পেয়ে গেলে সীমিত অর্থে ভারত নিজেকে কিছু ক্ষেত্রে পাওয়ারফুল বোধ করতেও পারে। যা সে আগে করেছেও; বাংলাদেশকে ভারতের হাতে আমেরিকার তুলে দিবার পরে!

    আমাদের ওয়ান-ইলেভেন ছিল ২০০৭ সালের তেমনই একটা ঘটনা।  আমেরিকার চাওয়া ছিল এশিয়ায়  চীন-ঠেকানোর ঠিকাদারির কিছু কাজ ভারতকে দিয়ে করিয়ে নেয়।  আর তাতেই বিনিময়ে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই মাখন আমেরিকা কিছুই খেতে পারেনি বরং তার চেয়ে পিঠার আসল ভাগটা গিয়েছে ভারতের মুখে! আর তাতেই ২০১৪ সালের শুরু থেকেই আমেরিকাই সরাসরি বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ ও চাওয়া-পাওয়ার  সকল ক্ষমতা ও সুযোগ হারিয়ে ফেলেছিল। আর এতে  ভারত তখন বাংলাদেশকে একেবারে লুটে আর চুষে সব খেয়ে ফেলার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। এখন এটাকেই কী শাকিল বলছেন – এটাই কী ভারতের পাশে দাঁড়ানো?   বিবিসি বা শাকিলের উচিত শব্দের ওজন, অর্থ জেনে মেপে এরপর ব্যবহার করা! আর এটা আমার বলার বা মনে করিয়ে দিবার কথা না, তাদের নিজেদেরই জেনে আসারই কথা!

    আরএসএসের আছে একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্পঃ
    আরএসএসের একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্প আছে। যেটা হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে শুধু একটা অখন্ড ভারত কায়েম নয়; বরং সারা দুনিয়া জুড়ে হিন্দুত্ববাদ কায়েম করার স্বপ্ন। আর মোদি হলেন সেই স্বপ্ন-প্রকল্পের এখনকার প্রধান কান্ডারি। আমার একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ মিলবে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষত যেসব রাজ্যে প্রবাসী ভারতীয়দের সংখ্যা বলার মত একটা চাঙ্ক! সেসব রাজ্যের দেখা যাবে ক্যালেন্ডারে আরএসএস ঘোষিত হিন্দুত্বের চোখে পালনীয় দিন, মানে সরকারি ছুটির দিন নয় – যেমন একালের রামনমমী পালনের নামে অ-হিন্দুদের কোপানোর দিন হয়ে উঠেছে; এসব দিনে আমেরিকায় বসে এরা হিন্দুত্বের জয়গান গেয়ে মিছিল-সমাবেশ করছে। মনে রাখতে হবে অ্যামেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশন বলে তাদের সংগঠন আছে।
    কাজেই এমন লক্ষ্য ও ততপরতার অংশ হিশাবে – বাংলাদেশের উপর অ্যামেরিকান ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এই উসিলায় ত্রাতা ও বীর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা আর মোদি কী ত্রাতা হবেন –  এভাবে এমন মুরোদবিহীন কিন্তু উস্কানিমূলক প্রশ্ন তুলে  এরপর এরই জবাব দেওয়া বা নেওয়ার উসিলায় শ্রীরাধার কাছে গেছে বিবিসি। এটাই মোদি-আরএসএসের পক্ষে প্রোপাগান্ডা করার জন্য বিবিসিকে দেয়া এসাইমেন্ট!

    কেন কথাগুলো এত কঠোরভাবে বলছিঃ
    লেটেস্ট বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। সেটা হল বাইডেন এখন ভারতকে কিভাবে দেখছে তা বুঝতে হবে।  অন্তত এই ২০২৩ সালের শুরু থেকেই পুরানা – ভারত-আমেরিকা যতটুকু যা এলায়েন্স খাতির অথবা চীন-ঠেকানোর চুক্তি এবং হাতে হাত ধরে ওয়ার্কিং রিলেশন যা আগে তৈরি ছিল – এর সবটাই ফুল স্টপ হয়ে যায়। এর বহু আগেই অবশ্য ট্রাম্পের আমলেই ২০১৭ সালে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকায় এক্সপোর্ট  এর বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়েছিল। আবার একালে কোয়াড [] শুকিয়ে অকেজো হয়ে গেলে অথবা  ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ান তেল, কয়লা ইত্যাদি পুণঃরপ্তানি শুরু সহ নানাবিধ প্রকাশ বলছে যে দুপক্ষই অঘোষিতভাবে স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক সমাপ্তি টেনেছে। ভারতের সাবেক কূটনীতিকেরা আমাদের জানাচ্ছে যে ভারত এখনও স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সটা ফিরে চায়। মানে হল আমেরিকা চায় না। এসবের কারণে, আমরা বুঝতে পারি যে চীনের সামনে ভারতের অসহায়বোধ  আরও বেড়েছে। আর সর্বোপরি – আমেরিকা বড় ভাই তার পিঠে হাত রেখেছে – এতে ভারতের গা-গরম ভাবভঙ্গি ভারত সেটা গত ২৩ বছর ধরে দুনিয়ার বাজারে বিক্রি করে চলেছিল তা বন্ধ হয়ে আছে। – আর এখান থেকেই মিথ্যা আর ফাঁপা হলেও মোদির যে পরাশক্তি ভাবদেখানো এর উৎস হিশাবে আবার আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নাই কিন্তু আছে দেখাতে মোদি-রা এখনও উদগ্রীব যদিও সেসব দেখানোটা এখন একেবারেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে!
    তবু স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স টা যে নাই তা  বাস্তবে দেখা ঘটনা, সিম্পটম বা ইঙ্গিত দেখে বলা ঘটনা-ই, কারণ সরকারি বা ঘোষিতভাবে দুপক্ষের কেউ তা বলে নাই।  তাই এবার কিছু সরাসরি ইঙ্গিত-প্রমাণ নিয়ে কথা বলব।

    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্সঃ
    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্স মানে আসলে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – মানে স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সে যে দীর্ঘ কমপক্ষে ২২ বছরের সমপর্ক ছিল এর অবসান ঘটা। এর প্রমাণ হিশাবে একালে আমেরিকার বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ এর ইচ্ছা নিয়ে যতটুকু যা প্রকাশিত তা যথেষ্ট ভাল প্রমাণ অবশ্যই। কারণ এটাই অ্যামেরিকার নয়া এশিয়ান স্ট্রাটেজির বেজ বা মূল অংশ, অবশ্যই আর তা ভারতবিরোধী বা ভারতের স্বার্থকে আমল বা কেয়ার না করে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু আমি এর কথা  এখানে এখন টানবো না। কারণ আরও বড় প্রমাণ-লক্ষণও হাজির হয়ে আছে তাই। কী সেটা?

    এককথায় এটা হল, ভারতকে সাইজ করে ছোট করা বা আসল সাইজে আনা –  বলতে পারি। মানে হল আমেরিকা যেন বলতে চাইছে গত তেইশ বছর আমার প্রভাবে থেকে ফুলে উঠা ভাব করেছো -পরাশক্তি মারাও? তাই এখন তোমাকে সাইজ করবে আমি। তোমার আসল সাইজে তোমারে ফিরিয়ে আনব।  এসব ভাব-ইঙ্গিতের বক্তব্যেরই বাইরের মানে হল –  ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর আমেরিকা-বাইডেন প্রশাসন আর মোদির শাসন দেখতে চায় না। তবে এক্ষেত্রে পরোক্ষে এবং আইন মানা সব ততপরতায় আমেরিকা ভারতের বিরোধীদলদের সুবিধা হয় সুবিধা পায় এমন সব পদক্ষেপ নিবে। এটা ইতোমধ্যেই আমেরিকা শুরু করে দিয়েছে। বলা যায় গুজরাত-ফাইল বা গুজরাতে মুসলমান নিধন এর ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রচার দিয়ে এর শুরু। পরে আদানিকে ডুবিয়ে দেয়া যেটা মোদির সব ততপরতার অর্থনৈতিক উৎস ও সাপোর্ট যেখান থেকে পেত সেটাকে ধবংস করে দেয়া; রাহুল গান্ধীকে বিকল্প হিশাবে প্রমোট করা ইত্যাদি। এভাবে বিরোধী সকল দলকে ম্যাসেজ দেয়া যে রাহুলের পিছনে তারা যেন দাঁড়ায় আর নিজেদের নানান স্বার্থগুলো এলাইন করা এক রাস্তা ধরে সহযোগিতা করে সাজিয়ে নেয় যাতে তাদের সকলেরই আমেরিকার সহায়তা পেতে সুবিধা হয়, আমেরিকারও কাজগুলো সবার জন্য এফেকটিভ হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের ছোট্ট একটা কথা – যা এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল যখন বলেন ‘আমরা সব মনিটর করছি” –  তা অনেক কথারই স্বল্পকথা আসলে।
    আবার লক্ষ্য করেন সম্প্রতি ফেসবুকে ভারতীয় স্টাফদেরকে যে সমুলে ছাটাই করা হয়েছে সেটাও বাইফ+ডেনের দিক থেকে মোদিবিরোধিদেরকে দেয়া উপহার। এটা যে মোদির ঘরে আঁচ ও আগুন লেগেছে এর কিছু নমুনা দেখতে পারেন এখানে। এই পত্রিকাটা আরএসএসের স্বরাজ -উইংয়ের পত্রিকা।

    মজার কথা হল, বাইডেন যতই এক্টিভ বা এগ্রেসিভ হচ্ছেন যা জন্মের পর থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই উপস্থিত ছিল না ততই যেন মোদি পিছু হটছেন; মানে হয়ে গেছে যেন তাই করছেন বাইডেন। আমেরিকার হেফাজতে থাকা ভারতের আভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গে যত গোয়েন্দা রিপোর্ট ডকু আছে [যেমন পুলোওয়ামায় পাকিস্তানের সাথে কোন বোমাবাজি ঘটেই নাই, সেতাই আমেরিকা মোদির পছন্দের লোক কাশ্মীরে মীদি যাকে প্রতিনিধি বা গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন সেই সত্য মালিক তা ফাঁস করে দিয়েছেন।] এর সবগুলো যেন বাইডেন ভারতের বিরোধীদলের সামনে খুলে দিয়েছে, এক্সেস দিয়ে দিয়েছেন।  অথচ প্রতিক্রিয়ায় মোদি ততই কুকড়ে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, সরে যাচ্ছেন – সর্বপরি এড়িয়ে প্রতিরোধ অবস্থান ত্যাগ করে চলে যাচ্ছেন। যেন মোদি বুঝে গেছেন যে  প্রতিরোধ অবস্থানে গেলে তাঁর আরো বেশি ক্ষতি হবে, ন্যাংটা হয়ে যাবে্ন!
    এটা এক অদ্ভুত খেলা যেন! ওদিকে সর্বশেষ অনেক বাধা পেরিয়ে রাহুল তার নিজের জন্য একটা সাধারণ পাশপোর্ট ইস্যু করাতে পেরেছেন তাও সেটা আবার মাত্র তিন বছরের জন্য – বাকি আগের সব পাশপোর্ট সারেন্ডার বা বাতিল করেছে মোদি সরকার। আর এই পাশপোর্ট নিয়েই আগামি মাসে রাহুল আমেরিকা যাচ্ছেন। বাজারের অনুমান এটাই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে তার ফাইনাল ডিল মানে – কাজের লক্ষ্য কী হবে, কে কী করার দায়ীত্ব নিবে ইত্যাদি এসবেরই ফাইনাল হবে সেখানে।   বাস্তবে কী হবে না হবে সে আমরা আগামিতে দেখতেই পাবো অবশ্যই।
    কিন্তু আসল কথাটা হল,  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক যে এখন ডিভোর্সির  – স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স থেকে পতিত হয়ে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – এর একথা তো অন্তত বিবিসির কাছে কোন কিছুতে অজানা নয়! ছিল না। কারণ গুজরাত ডকু তো তারাই প্রচার করেছে! তাহলে???

    একালে ভারতের নিজের সক্ষমতায় বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো, কিংবা আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের জন্য  সুপারিশ করা ইত্যাদি কোন কিছুই হচ্ছে না, কারণ মোদির তা করার মুরোদ নাই, শেষ। তা নাই এবং ছিলও না যতটুকু যা ভারত দেখিয়েছিল আগে সেটুকুও  মোদি ফুলিয়ে ফাপিয়ে নিজেকে পরাশক্তি কল্পনায় দেখিয়েছে – এসবের পিছনের কারণ ভারতের পিঠে কিছুটা সময় হাত রেখেছিল আমেরিকা – সে কারণে। অর্থাৎ অ্যামেরিকান স্বার্থে সে ভারতকে যতটুকু মাতবর বলে দাবি করার সুযোগ দিয়েছিল সেটাই। সবচেয়ে বড় কথা সেটা আর এখন একেবারেই নাই। অথচ এটাকেই মোদি ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে বলে চালাবার দেখাবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছে। যার সর্বশেষ প্রচেষ্টার নাম হল বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত এদের ক্যারিকেচার!  তাহলে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো বা না দাঁড়াতে চাওয়া নিয়ে জল্পনাওকল্পনা ছড়ানো এর সবকিছুই ডাহা মিথ্যা। মোদির ইমেজ তৈরির প্রপাগান্ডা মাত্র!

    আসল কথাটা হল, যে মোদির ভারতের এখন বাইডেনের আমেরিকার কাছে নিজেদেরই বেইল নাই  – না ভারতের না মোদির – সেই মোদি কিভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারে? হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ নিয়ে যেতে পারে, কে তিনি?????

    অথচ এ পুরা ব্যাপারটাই ডিটেইল অন্তত বিবিসির নিজের জানা থাকার পরও   দিল্লি কি তাদের সেই কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে – হাসিনাকে উদ্ধার টাইপের রিপোর্ট তাহলে কী করে করতে পারল??
    এটাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে নেয়া বিবিসির এসাইনমেন্ট!

    বিবিসি একালে অনেক এক্টিভ একাজে। বিবিসি যদি এমন চালাতেই থাকে তবে আগামিতে হাসিনার যুগ শেষে তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।  বাংলাদেশে  গণধিকৃত মিডিয়া হিশাবে পরিচিত হবে! নিজের ভাগ্য নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার তো অবশ্যই বিবিসি বা শাকিল আনোয়ারের!   মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য গড়ে থাকে!

    আপডেটেডঃ ৩১ মে ২০২৩, দুপুরঃ ১০ঃ৩৯


    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে

    গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৬ এপ্রিল ২০২৩    ০০ঃ০৫

    https://wp.me/p1sCvy-4nv

     

    US-China Split Could Hinder Foreign Investment, Lower Global GDP, IMF Warns - BloombergUS-China Split 

     

    গ্লোবাল নেতা মানে গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতা হিশাবে, দুনিয়ায় আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ১৯৪৫ সাল থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এর পরিণতি বা ফলাফলে। যদিও অনেকের ধারণা এই অবস্থান যেন অফুরান বা অনন্তকাল ধরে চলবে। কিন্তু যার শুরু কিভাবে, কবে ও কী পরিস্থিতিতে আর যদি তা তা জানা-বুঝা যায় সেক্ষেত্রে তার শেষও আমাদের জানা থাকবে ও যাবে। এর মানে তাহলে বুঝতে হবে যে  সেটা আসলে আর অনন্তকালের কোন ঘটনা-ফেনোমেনা নয়। এছাড়া অনেকের আরও একটা ভুল ধারণা করেন যে গ্লোবাল নেতা ধারণাটা যেন সামরিক শক্তির, মানে সামরিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের। ফলে যেন কোন দেশ  পরাশক্তির [Superpower] দিক দিয়ে কতবড়  এর দ্বারাই বোধহয় নির্ধারিত হয়েছে কে গ্লোবাল নেতা বা কে নেতা নয়। না, সরি; এই ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বরং এককথায় বললে, কোন দেশকে গ্লোবাল নেতা বলতে যে সক্ষমতা বা যোগ্যতা কথা বলা হয় এটা মৌলিকভাবে  মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দুনিয়াতে একেকটা দেশ একেক সময়কালে নানান কারণে নিজ অর্থনীতিতে বাড়তি সঞ্চয়ে তা উদ্বৃতের (সারপ্লাস) পাহাড় হয়ে হাজির হতে দেখা যায়। এটাই ঐ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিকসহ সব ধরণের সক্ষমতার আদি উৎস। অর্থাৎ মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই ঐদেশের বাকিসব সক্ষমতার উৎস হয়ে হাজির হয়।  আর উত্থিত অর্থনীতির দেশ তা থেকেই অন্যদেশ বা বাকি দুনিয়ার উপর (ইতি বা নেতি আধিপত্য) এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে হাজির হয়। তাই অর্থনৈতিক বিপুল উত্থান থেকে  তা সবদিকে বিকশিত হয়ে উঠলে তা থেকেই ক্রমশ একটা দেশ গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে উঠে।  তাই বটম লাইনটা হল, গ্লোবাল নেতা মানে আসলে প্রাথমিকভাবে অথবা ওর প্রাথমিক রূপ হল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠা। একারণে চীনের অর্থনীতি কবে আমেরিকার ছাড়িয়ে আরো বড় অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে সেদিকে দুনিয়ার অভিমুখ বুঝতে চাওয়া লোকেদের, এমন সব এনালিস্টেরা আগ্রহের ফোকাস।

    তবে সাবধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠার ফেনোমেনাটা সাবজেকটিভ বা কোন কর্তা-মানুষের সিদ্ধান্তমূলক নয়। বরং তুলনা করে বললে,  যেমন সাবজেকটিভের বিপরীত শব্দ হল অবজেকটিভ। সেদিক থেকে  বলা যায়  ‘বিপ্লব’ [Revolution] ধারণাটাই  সাবজেকটিভ বা কর্তাবাচক। সক্রিয় মানুষ চাইলে বা করার চেষ্টা করলে তবেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে পারে; নইলে নয়। বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে কোন ‘বিপ্লব’ ঘটে না অথবা বলা যায় যা প্রাকৃতিক বা নেচারাল তা বিপ্লবী ঘটনা নয়। প্রাকৃতিকভাবেও অবশ্যই দুনিয়াতে হাজারো পরিবর্তন ঘটে থাকে এখনও ঘটে চলেছে তবে সেগুলো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক ঘটনাবলী নয়, মনে করা হয় না। তাই প্রাকৃতিক মানে অবজেকটিভ।  আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ইংরাজিতে তাই বলে ইভোলিউশন [Evolution]। মানে সেটা রি-ইভোলিউশন [Re-evolution বা Revolution (বিপ্লব)] জাতীয় কিছু  নয়। এই পরিবর্তনগুলোকে তাই ‘অবজেকটিভ’ ঘটনা বলা হয়। এখানে কোন কর্তা থাকেনা, এটা প্রাকৃতিক।
    অর্থাৎ আমাদের এখানকার আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই, কোনদেশের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা তাই ঠিক কোন সাবজেকটিভ ঘটনা নয়; যে তা  ঐ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাপ্রসুত এমন। বরং অবজেকটিভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত; মানে মানুষের ইচ্ছায় যেমন কোন জলোচ্ছাস বা ভুমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আসে না, তেমনই।

    আবার অনেককে আরেক মিথ্যা অনুমান পুষে নিয়ে থাকতে দেখা যায় যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই যেনবা সে দেশ গ্লোবাল নেতা হবেই; এমন মনে করে থাকে। এমন ধারণা ভুল। তাদেরকে বরং মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনসংখ্যা কখনও চীন বা ভারতের মত ১৪০ কোটির আশেপাশেও ছিল না, এখনও নয়। আমেরিকা এখনও কেবল আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার, যা প্রায় ৩৩ কোটি মাত্র।  আর এই জনসংখ্যা দিয়েই  আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল এবং এখনও আছে বা শেষ যুগ পাড় করছে বলা যায়। তবে গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ হতে গেলে জনসংখ্যার অধিক্য একটা পজিটিভ ফ্যাক্টর বা উপাদান অবশ্যই। তবু, সাবধান বড় জনসংখ্যা মানেই তা গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ; তা এমনটা নাও হতে পারে। নির্ভর করে নিজ ঐ বড় জনসংখ্যাকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ম্যানেজ করে কাজে লাগিয়ে বড় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তারা কতটা সক্ষম আর কপালও ভাল কিনা – এর উপর। যেমন, ভারত ও চীনের জনসংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি, এখন ভারত বরং একটু বেশি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলারের যেখানে চী্না অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়নের আর আমেরিকা এখনও ২৩ ট্রিলিয়নের, মানে চীনের চেয়ে বড়। তবে এখনকার  আরেক অনুমান হল আগামি ২০৩০ সালের দিকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে,  এনিয়ে হাতের কাছের ভোয়ার [VOA] এক রিপোর্ট  দেখে নেয়া যেতে পারে।
    এসব সত্বেও ভারত ব্যাপারটাকে নিজ উগ্র জাতিশ্রেষ্ঠত্বের [হিন্দুত্ববাদের] ধারণা দিয়ে দেখে থাকে। মনে করে সে চীনের চেয়ে কম কিসে, সেও চীনের সাথে এব্যাপারে সমতুলনীয়; এমন ধারণার প্রাবল্য অবশ্য ২০১৩-১৪ সালের ফেনোমেনা। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ শানিয়ে মোদি যখন ২০১৪ সালের পর থেকে নিজ-প্রচার শুরু করেছিল যে ভারত নাকি একটা ‘পরাশক্তি’ হয়ে গেছে!  এই ব্যাপারে অন্তত একটা ফ্যাক্টস বা ঘটনা মনে রাখলেই এর কারণ অনেকটাই বুঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

    বিদেশি পুঁজি নিয়ে কমিউনিস্ট ও জাতিবাদি চিন্তায় বেশি-বুঝের মিথঃ
    এককথায়, বিদেশি পুঁজি নেয়া না-নেয়া প্রসঙ্গে ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা আসলে একেবারেই উগ্র জাতিবাদিদের অনুসারী।  যেমন বিদেশি পুঁজি নেওয়া বা দেশে আসতে দেয়া দেশের জন্য কী হারাম না হালাল? এনিয়ে উগ্র-জাতিবাদি একরোখা ধারণাটাই কমিউনিস্টদেরও ধারণা। এরা উভয়েই মনে করে বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজি দেশে আসতে দেয়া হারাম, তাই তা দেশে আনাই যাবে না।  আর এপ্রসঙ্গে বাস্তবতার আমল-মুল্যায়নহীন জাতিবাদিদের একচেটিয়া হারাম ধারণাটাই আরও পোক্ত করেছে কমিউনিস্টেরা; তাদের ‘শোষণ’ ধারণা দিয়ে।

    যদিও এটা তো বলাই বাহুল্য আইডিয়ালি বললে যে বিদেশি পুঁজি এনে শিল্প-ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বরং নিজ দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতায় এগুলো করা তো নিঃসন্দেহে ভাল; এনিয়ে কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু বাস্তবতা তো এখানে না অন্যখানে! মানে তর্কটা এখানে না।
    তাই আরেকটু আগিয়ে এর পক্ষে বলি। দুনিয়ার যেকোন দেশের অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমে, যদি বাইরের হস্তক্ষেপ করতে না দেয়া যায় তবে, ঐদেশের অর্থনীতি বিকশিত হতে যত যা বিনিয়োগ লাগে তার সবটাই ঐ দেশীয় অর্থনীতি নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে, এবং তা সম্ভব; ইতিহাসে এটা প্রমাণিত সত্য। যেমন সারা ইউরোপে একেবারে শুরুর দিকে  মানে ১৬০০ সালের পর থেকে যখন তাদের কলোনি দখল ব্যবসা শুরু হয়েছিল এর আগের কালে, তাদেরকে কোন বাইরে থেকে পুঁজি বা সম্পদ লুটে  আনতে হয় নাই। নিজ অর্থনীতিতেই নিজ সঞ্চয় উদ্বৃত্ব ব্যবহার করেই নিজে বিকশিত হতে পেরেছিল; সম্ভব করেছিল। আমাদের মত দেশের যেমন বিনিয়োগ আনার জন্য “পশ্চিম আছে”,  সে তুলনায় সেকালে পশ্চিমের জন্য ১৬০০ সালের আগে তাদের জন্য কোন “পশ্চিম” বা বিনিয়োগদাতা বলে কেউ ছিল না।
    ১৬০০ সালের আগে-পরে বলে কথা টানছি এজন্য যে ১৬০৭ সালে ইউরোপ প্রথম কলোনিদখলে বেরিয়েছিল।   আর যাদেরকে কলোনিদখল করতে বেরিয়েছিল প্রথমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশ এর কোনটাই নয়।  সেটা ছিল উত্তর আমেরিকা যা এখন ইউএসএ বা আমেরিকা নামে পরিচিত। গত ১৬০৭ সালে প্রথম কলোনিদখল করা ভুখন্ড বা দেশ হল আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia] সর্বপ্রথম কলোনিদখল হয়ে যায়।  যারা দখল করেছিল তাদেরকে বৃটিশ বা ইংলিশ সেটেলার বলা হয়েছে। এর রেফারেন্স দেখতে এখানে[Colonial America (1492-1763)] আমেরিকান সরকারি লাইব্রেরিতে যেতে পারেন। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকাকে কলোনিদখল করা হয়েছিল এরও পরে নানা সময়ে।

    কিন্তু সর্বশেষ আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় যারা ইউরোপের কলোনি হয়ে থেকেছিলাম পরের অন্তত টানা দুশ বছর তারা ১৯৪৫ সালের পরে স্বাধীন মুক্ত দেশ হয়ে গেলেও এরপরে আমাদের নিজ অর্থনীতির বেলায় একই ফর্মুলা কাজ করে নাই যে আমাদের অর্থনীতিও নিজ বিনিয়োগ পুঁজি বা অর্থনৈতিক উদ্বৃত দিয়ে নিজের অর্থনীতির বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারবই। তা হয় নাই আর এটা করবেও না। আমরা পুষ্টির অভাবে ভুগা শিশুর মত বিনিয়োগ পুঁজির অভাবে ভুগবোই। কারণ অন্তত টানা দুশ বছর ধরে লাগাতর ইউরোপের কলোনিদখলদারেরা আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে সেকালের আগে থেকে যাকিছু  সারপ্লাস জমা হয়েছে তা উঠিয়ে দখলদারেরা নিজ নিজ দেশে লুট করে নিয়ে গেছিল। এতে তৈরি হওয়া গভীর স্থায়ী ক্ষত বা বিনিয়োগ পুঁজির ঘাটতি সেটা ১৯৪৫ সালের পরে আমরা স্বাধীন মুক্ত দেশ হলেও তা আপনাতেই নিজ নিজ অর্থনীতিতে পূরণীয় করা যায়নি কারণে এত অধিক লুট আর পূরণীয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ছিল আমাদের জন্য সেই নয়া বাস্তবতা যে আমাদের বিনিয়োগ পুঁজি লুট হয়ে গেছে অথচ আমরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অন্তত কাগজে কলমে ।

    অতএব ঐ খারাপ সময়ে  বিদেশি পুঁজি নেওয়া হারাম এই ফতোয়া যা এখনও তাদের মুখে বর্তমান, এসব কথা ছিল একেবারেই চরম অবিবেচক ও আত্মঘাতি। কার্যত এটা ছিল একদিকে চিন্তার মারাত্মক এক অক্ষমতা অন্যদিকে তা বাস্তবতাবিমুখ ভরপুর এক  বিশুদ্ধবাদিতা। ‘খাঁটি’ থাকতে চাওয়ার স্টুপিডিটি! যেন সাময়িক বিদেশি পুঁজি গ্রহণ করলে আমরা অশুদ্ধ হয়ে যাব!! আমাদের এদিকে এমন এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ভারতের জওয়াহরলাল নেহেরুর চিন্তা ও তাঁর অর্থনীতি। তিনি মারা গেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু তার কমিউনিস্ট অরিয়েন্টেড ইকোনমির চিন্তা বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ প্রসঙ্গ এটা চালু থেকেই গেছিল ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত।   যেটা ১৯৯০ সালে এসে ঐ নেহেরু-ইজমের অর্থনীতি তা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল।  সেকালে চন্দ্রশেখরের কোয়ালিশন সরকার অর্থের অভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে যা মূলত  balance of payments বা বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম ও ব্যয় বেশিতে ঘাটতিতে পরা থেকে সৃষ্ট – এই কারণে তিনি বাজেট পেশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন।  আর  balance of payments এর নিয়মিত ঘাটতি হলে একটাই এর ওষুধ, আইএমএফ-এর কাছে ঘাটতি পুরণে ঋণে বৈদেশিক মুদ্রা পেতে হাত পাতা। আর এর পুর্বশর্ত হচ্ছে এতদিনের আয়েসি আন্দাজি বিশুদ্ধবাদিতা ছেড়ে এবার বাস্তবতায় ফিরে আসতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর সংস্কার করতে বাধ্য হওয়া।  ঠিক কী ঘটেছিল এনিয়ে আইএমএফ-এর একটা ভাষ্য এখানে অন্য আরও ভাষ্য এখানে পাওয়া যেতে পারে।  সে সময়ে সব ব্যর্থতায় দায়ভার চন্দ্রশেখরেরর উপর যদিও এসেছিল কিন্তু নেহেরুসহ সকল পুর্ব-সরকারগুলোই এজন্য দায়ী ছিল। চন্দ্রশেখর সে যাত্রায় পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের নভেম্বরে যা থেকে কংগ্রেসের নরসীমা রাও ক্ষমতায় আসেন। আর তাঁর নয়া অর্থমন্ত্রী হন  মনমোহন সিং, যিনি আইএমএফ-এর সাথে মিলে অর্থনৈতিক সংস্কারটা সম্পন্ন করেছিলেন।  তবে মনে রাখতে হবে এঘটনার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ার সাথে (যা ভেঙ্গে গেছিল ১৯৯১ ডিসেম্বরে ) ভারতের এই অর্থনৈতিক পতন ও সংস্কারে বাধ্য হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই।   কারণ ভারতে তা ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগেই ১৯৯০ সালেই।

    ভারত ছেড়ে এবার বিদেশি পুঁজিতে চীন প্রসঙ্গেঃ
    কম কথায় সেরে ফেলতে এভাবে বলি, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি বা আমেরিকান পুঁজি দেশে আসতে অনুমতি দান শুরু করেছিল। যদিও এর আগে ১৯৫৮ সাল থেকেই মাও সেতুং আর সোভিয়েত বা স্তালিনীয় পথ বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিদেশি পুঁজি গ্রহণ প্রসঙ্গে ভিন্ন পথ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন মাও। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে যদিও এটা চীনের “সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ১৯৫৮” বলে পরিচিত। এসব রাখডাক বা ভিন্ন শব্দে নাম দেয়া খুব সম্ভবত ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য। কারণ,  আদতে এটা ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  আজকের দিনেও যারা কমিউনিস্ট সমালোচক তারা মাওকে তাদের হিরো বলে আপন করে রেখে দিয়েও সব দায় ও এর ভিলেন হিশাবে দেখাতে চায় দেং জিয়াও পিং-কে। তা যাক সে তর্ক অন্যখানে, করেছিও। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, মাও-এর অর্থনৈতিক সংস্কার,  কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাত্রা ইত্যাদি এসব নিয়ে কমিউনিস্টেরাসহ যেকারও  স্তালিনীয় সমাজতন্ত্র বুঝের দিক থেকে যত সমালোচনাই থাক এক জায়গায় গিয়ে সেসবের সবকিছু বেকার হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, চীন এই সংস্কারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ অনুমতি দিয়ে একে আপন করে নিয়েছে; মানে  নিজ অর্থনীতিতে আমেরিকার ওয়াল স্টিটের জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিয়েছে। শুধু তাই না পরে শুরুর দিকে এসব বিনিয়োগ চীন সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা শিল্প-বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগে তারা এখন তাদের পার্টনার। আর এ সবকিছুই ঘটেছে উল্লেখযোগ্য কোন সংঘাত বা ফ্রিকশন ছাড়াই। সেটাও না মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে চীন আজকে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ – চীন নিজেই আজ গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবার পথে। এদিকটার তাতপর্য সেটাও কোন দিক দিয়েই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই গ্রহিতা  চীন নিজেই এখন দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা প্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের এখানে সারা বছরের ঋণদানের বাজেটের চেয়েও এক চীনের বাজেট অনেক বড়। সারকথায় চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব।

     সারকথায়, চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব। 

    চীন ১৯৭৮ সালেএর জানুয়ারি থেকে আমেরিকার সাথে  আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও এমবেশি খোলা দিয়ে শুরু করেছিল।  পরে আমেরিকান বিনিয়োগের আসা বা প্রবেশ শুরু হয়েছিল। আর চীনের বড় অর্থনৈতিক উল্লফন ঘটেছিল (ডাবল ডিজিট জিডিপি) (১৯৯০-২০১০) মোটামুটি এই বিশবছরের সময়কালে।  তুলনায় ভারত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদেশি পুঁজি আসতে দেয়া হালাল কিনা তখনও সেই সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নাই। তাই ১৯৯১ সালকে মানা হয় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার বছর, যখন ভারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে মিটাতে ব্যর্থ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতিতে) হয়ে আইএমএফের সাহায্য পেতে দ্বারস্ত হয়েছিল। ফলাফলে সেই প্রথম নেহেরু কথিত ও প্রচলিত কমিউনিস্ট ইকোনমি ১৯৯১ সালেই খোলনলচে বদলায় বাধ্য হয়ে মনমোহন সিং এর অর্থনৈতিক সংস্কারে ঢেলে সাজানো শুরু হয়েছিল – যা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি।

    তবে এসব নিয়ে কথা বলাও বিপদের। আপনার কোন পছন্দের রাজনীতি বা আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাবধান। বাস্তব ঘটনা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও পেতে গিয়ে একাজে নিজ রাজনীতি-আদর্শকে শ্রেষ্ঠ মানতে হবে বা দেখাতেই হবে এই জিদ সবার আগে ত্যাগ করেন।  কারণ আপনি তখন আসলে তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গেছেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা বুঝাবুঝি আপনার অস্তিত্বের মত জরুরি। আর এটাই প্রধান ও আপনার আসল কাজ। কাজেই আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ দিয়েই কেবল তা পারতেই হবে এই জিদ ও চিন্তা ভুল। যেখানে আপনার দরকার বাস্তবতাকে বুঝবার জন্য একটা চিন্তা বা পদ্ধতিতে তা করতে সক্ষম হওয়া। যে চিন্তা বা পদ্ধতি এটা করতে সক্ষম তাই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে, আপন করতে হবে। এরপরে বা বাইরে প্রেমিকার মত আপনার পছন্দ বা বিশেষ নেকের একটা রাজনীতি বা আদর্শ আছে থাক না। কাজ না পারলেও জোর করে  আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ এর পক্ষে  ঢোল পিটানো তো সহি হতে পারে না! এরপর এবং সেই সাথে এবার কেন আপনার রাজনীতি-আদর্শ ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপযুক্ত টুলস হতে পারে নাই সেটা খুজে বের করেন। সংশোধন করে নেন।
    অনেকবার বলেছি চলতি শতক শুরুই হচ্ছে গ্লোবাল নেতা বদলের পালাবদলের সময়কাল হিশাবে যেটা আমরা পছন্দ করি নাই। বরং ঘটনা-ফেনমেনাই আমাদেরকে এটা দেখতে বাধ্য করেছে। এখন এতে আমেরিকান প্রভাবের ক্রমপতন আর চীনের প্রবল উত্থান যদি বাস্তবতা হয় – অবজেকটিভ বাস্তবতা হয় তা হলে এনিয়ে আমার কথা বলা মানে তো এটা নয় যে আমি চীনের দালাল। অথবা আমি চীনকে পছন্দ করি তাই এটা করছি। অথবা চীন কমিউনিস্ট তাই চীন আমার পছন্দ এটা  ধরে নিতেই হবে!!! অথচ আমেরিকা কী করে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভুমিতে সেই ব্যাপক ইতিবাচক ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণ আমার চেয়ে বেশি এবং ভাল করে কেউ করে নাই। একাজের সময় আমাকে কেউ আমেরিকান দালাল বলে না কেন?
    বাস্তবতা হল, নিজ পছন্দের আদর্শ দিয়ে ঘটনা না মিললেও জোর করে তেমন ব্যাখ্যা দেওয়াটা বোকামি; কারণ জরবরদস্তি পাঠক পছন্দ করবে কেন! কাজেই নিজ পছন্দের আদর্শের ভিত্তিতে কথা বলার দিন শেষ।  আর শেষ কথা হল আমি কোন কমিউনিস্টই নই। এছাড়া চীন    কমিউনিস্ট কিনা সেটাও কমিউনিস্টদের মধ্যেই অর্ক সাপেক্ষ, যা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই। গ্লোবাল পরিবর্তনগুলোকে কতটা উপযুক্তভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছি সেটাই মুখ্য দিক!  সেদিকটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হচ্ছি কিনা সেটার পরীক্ষায় উতড়ানো বা সফলতাই একালের মাপকাঠি।

    এখানে আমাদের পাঠকের সমস্যা হল, তারাও সময়ে বিভ্রান্ত হয়ে সময়য়ে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা এমন কোল্ডওয়ার এর তর্কের ফাদে আটকে যান। অথচ সেই কোল্ডওয়ার এর যুগ এখন অতীত, সেসব ভাবনা এখন অকেজো। তবুও কেউ কমিউনিস্ট না আমেরিকা-বাদী এমন কথিত একটা ধারণার আগে চালু করে পরে  পাঠক কোন মানুষ ও তার ব্যাখ্যাকে আমল করা শুরু করে থাকে। এটা খুবই ভুল পদ্ধতি।  আশা করব পাটঘক কমিউনিস্ট লুপ-হোল এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হবে ও বাঁচিয়ে চলা শিখে যাবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

    [উপরের এই লেখা আসলে দুদিনের মধ্যেই পরবর্তি যে লেখা দিব তার আগাম অংশ। তাই বুঝাই যাচ্ছে পরের লেখাটা চলতি এই রচনার উপরে দাড়িয়েই লেখা হবে। পরের রচনাকে তাই এলেখারই দ্বিতীয় অংশও বলা যেতে পারে।]

  • ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!

    ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!
    গৌতম দাস
    ২০ এপ্রিল ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4mT

    ‘The next few months are a crucial test of our democracy’   ‘The next few months are a crucial test of our democracy’ | Photo Credit: AP

    রাজনৈতিকভাবে গ্লোবাল ইস্যুতে  এশিয়া উত্তাল হয়ে উঠছে।  বিশেষ করে সাউথ-ইস্ট এশিয়া সামনের দুবছরে আরও বড় করে উত্তাল হবে। লঙ্খণগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে।   ঘটনার মূল ফেনোমেনাটা হল অর্থনৈতিকভাবে  রাইজিং চীনের দুনিয়া জুড়ে প্রবল  গ্লোবাল প্রভাবের প্ক্ষেটভুমিতে  ব্যাপারটা উঠতি চীন আর নামতি আমেরিকা এরই উত্থান-পতনের ঘটনাবলী ও প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে । যেটাকে অনেক সময় আমি “গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল” বলে ব্যাখ্যা করেছি। চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা আর তা থেকে জেগে উঠা কোন হবু সংঘাত – এই ঘটল বলে, লাগল বলে ধরণের পরিস্থিতিতে যা গত অন্তত দশবছর ধরে ক্রমশ বাড়ছে বা অস্থির হয়ে উঠছে – এটা হল সেই দৃশ্যপট।

    এর আগে আমরা দেখেছি ওবামা আমলের সেকেন্ড টার্ম (২০১৩-১৬) থেকে এই পালাবদলের ফেনোমেনা সাধারণ চোখে মোটামুটি  দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। তাতে তা বড়জোড় শ্রীলঙ্কা, বা মালদ্বীপ বা নেপালের নির্বাচনে ওসব দেশের দলগুলো একেকটা হয় ভারত বা চীনের সমর্থক হয়ে এমন ‘পালাপদলের’ প্রক্সি খেলে  চলছিল – এতটুকুই দেখা যেত। এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও  তখনকার ভারত মানে? সেকালের ভারত ছিল মূলত এশিয়ায় – এঅঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থের প্রতিনিধি ফলে ভারতের উপস্থিতি যেন এক বরকন্দাজি “যৌথ” উপস্থিতি। আমেরিকা তখন ব্যাপারটাকে আমাদের বুঝাতে এক বয়ান ভাষ্যে বলত – ভারত হল “এশিয়ায় আমেরিকার চীন ঠেকানো এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্ট”। তাই এশিয়ায় ভারতকে আমেরিকার এই চাঙ্গে তোলা!

    কিন্তু এখন এশিয়া উত্তাল হবার কথা যেটা বলছি, তাতে কথিত সেই যৌথ উপস্থিতি জিনিষটাই নাই, উধাও! তা একেবারে বদলে গিয়েছে। এককথায় বললে – যৌথ উপস্থিতি দূরে থাক বরং এশিয়ার ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যেকোন স্ট্রেটেজিক ইস্যুতে আলাদা; যার যার তার তার। তবে এমন আলাদা অবস্থান যত গভীরে ততই আরো বেশি করে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে; তবে ততদুর তা প্রকাশিত করা হয় না; তবে সেটা দুপক্ষেরই নিজ নিজ স্বার্থের আলাদা কারণে।

    যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান একবারেই আমেরিকার চেয়ে আলাদা। ভারত এখন রাশিয়ান তেল রপ্তানির  প্রধান পার্টনার। কিভাবে  নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া সরাসরি তেল রপ্তানি করতে পারে না। তাই ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি করে এরপর, রিফাইন করে পরে আবার বিদেশে বিক্রির সবচেয়ে বড় দেশ। ভারত তার আট-নয়টা রিফাইনারির সবগুলাই এখন কেবল একাজেই ব্যস্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেলের সেকেন্ডারি উতস হিশাবে ভারত ঐ তেল আবার বিভিন্ন পশ্চিমা দেশেই  রপ্তানি করছে।
    কাজেই সরকথাটা হল ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত রাশিয়ার পক্ষে আর বিপরীতে আমেরিকা রাশিয়ার বিপক্ষে তা সবাই জানেন।

    আমেরিকার বার্মায় রেজিম চেঞ্জে আগ্রহঃ
    তবে ভারত আর আমেরিকা  স্ব স্ব স্ট্রাটেজিক স্বার্থে কত দূরদুরান্তে আলাদা এর মোক্ষম উদাহরণ হল আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” [Regime Change] বা সরকার বদলের আগ্রহ – এই ইস্যু। এই ইস্যুতে বরং ভারত-চীন-রাশিয়া এই তিন দেশ যৌথভাবে আমেরিকার বিরোধী অবস্থানে।  ভারতে আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিডিয়া এনালাইসিসে রিক [RIC] বলে একটা শব্দ ব্যবহার শুরু হয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। [আগ্রহীরা এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন।] যেটা আসলে যথাক্রমে রাশিয়া, ভারত ও চীন এই তিনদেশের ইংরাজি নামে  প্রথম অক্ষর  নিয়ে তৈরি।  তবে আবার সাবধান এজন্য যে  এটা আর ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ (১৯৫৩-৯২) নয়। দুনিয়াতে কোথাও আর কোল্ড-ওয়ার এর নীতি ও অভ্যাস নাই। মানে হল, কোল্ড-ওয়ারের কালে কোন দুই দেশ স্ট্রাটেজিক বন্ধু হলে তারা এতে বাকি অন্য সব ইস্যুতে আপনাতেই ‘বন্ধু’ হয়ে যেতই। কিন্তু একালে সব উলটা। একালে দুই রাষ্ট্রের যেকোন শত্রুতা বা বন্ধুত্ব হল মূলত ইস্যু ভিত্তিক। তাই একালে দুইটা রাষ্ট্র এক ইস্যুতে চরম শত্রু হলেও অন্য ইস্যুতে কিছুটা ‘বন্ধু’ থাকতে দেখতে পাওয়া সম্ভব। চীন-ভারত এখনও বিভিন্ন স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ইস্যুতে যথেষ্ট শত্রুতা বজায় রাখে, আর ভারতের মিডিয়া এখনও এন্টি-চায়না টোনে যেকোন কিছু বয়ান করে থাকে। কিন্তু  আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” ইস্যুতে  ভারত-চীন একসাথে আমেরিকা বিরোধিতায় ও অবস্থানে;  আর তা রাশিয়াকে সাথে নিয়ে। আর একথাও সত্য যে এই ইস্যু খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশাল বলেই অন্য অনেক ইস্যুর উপরে  – তা খুবই নির্ধারক। যেমন “বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ” ইস্যু ভারতের কাছে খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশালী ইস্যু বলতে বুঝতে হবে এই ইস্যু ভারতের অন্যান্য ইস্যুতেও যা প্রভাব রাখবেই। যেমন, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে নোঙর করে উপস্থিত থাকুক এটা আমেরিকার বহুদিনের খায়েস। আর ঠিক এর উলটা অবস্থানটাই ভারতের। মরে গেলেও আমেরিকান এই খায়েসে একমত হবে না ভারত।
    ‘বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ’ ইস্যু বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান নৌ-উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। যদিও এর চেয়েও বড় কথা বার্মা আর ভারতের বিস্তির্ণ সীমান্ত আছে যা বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেলে এর ব্যাপক প্রভাব ভারতের উপর পড়তে বাধ্য। শুধু তাই নয়, এঘটনা ভারতের আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট অঞ্চল এর উপরেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। যদিও  এতদিন ভারত ভেবে এসেছে তার আসামসহ নর্থ-ইস্ট অঞ্চল রক্ষার স্বার্থ  এর প্রধান বাধা ও বিরোধি হল নর্থ-ইস্ট সীমান্তেরওপারে চীনের উপস্থিতি বা চীনের তিব্বত সীমান্ত। আর এটাকে বিক্রি করেই ভারত এতদিন বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর আদায়, বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ আর ফেনী-অঞ্চলকে যত রকমভাবে সম্ভব কব্জা করে নেয়া ও রাখা তা করে গিয়েছে। কিন্তু এখন টের পাচ্ছে আমেরিকা ভারতের জন্য প্রকৃতপক্ষে কে ও কী???

    কিন্তু কাকে ঘিরে এশিয়া উত্তাল হচ্ছেঃ
    এলেখায় কথা শুরু করেছিলাম ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলে। কিন্তু কাকে ঘিরে তা হবে? মানে এর কেন্দ্র বা ফোকাস হতে যাচ্ছে কোন ভুগোল? সোজা জবাব হল,  সেই মূল ফোকাস হতে যাচ্ছে সম্ভবত বার্মা। তবে এটা সেখানেই একমাত্র বা ঘনীভুত থাকবে তা না। এর সরাসরি ভৌগলিক কেন্দ্র হবে চীনের তিব্বত-কুনমিং সীমান্তের নীচের অংশ থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট ও সংলগ্ন সব অংশ আর বলাই বাহুল্য বাংলাদেশও; ইত্যাদি সব ভূখন্ডই। তবে এসব কথা ভুগোল হিশাবে বলা, রাজনৈতিক প্রভাব বা বলয়ের দিক থেকে নয়, সেটা আরও বড় ও ব্যাপক।

    তাই  ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলতে এসবের বাইরেও নানান জায়গায় ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থে পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠছে ও উঠবে। যেমন উপরে ভারতের কিছু ভৌগলিক অঞ্চলের কথা বললেও রাজনৈতিক দিক থেকে সারা ভারতের উপরেই ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠতে পারে। আর ভারতে এসব কিছুই ইতোমধ্যে নড়াচড়া করা শুরু করে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। যদিও তা বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে তা বোধহয় আগামি “২০২৪ সালের আসন্ন কেন্দ্রিয় নির্বাচনকে” কেন্দ্র করেই।  আসলে, কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর কাছে  ২০২৪ সালের নির্বাচনে   মোদি ও বিজেপির ভরাডুবি ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে এই আমেরিকান পরিকল্পনা আগাচ্ছে।
    যেমন একটা ঘটনার কথা বলি।
    রাহুলের কংগ্রেসের সাথে মমতার তৃণমূলের সম্পর্ক খুবই খারাপ, বিশেষেত মোদিবিরোধি জোটের নেতা হিশাবে কংগ্রেস অথবা রাহুল গান্ধী কোনটাকে মানতে তৃণমূল রাজী নয় বলে। আবার, কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস  বিজেপিকে শত্রু মনে করে না বরং গোপনে বা প্রকাশ্যে বিজেপির সাথে মমতাবিরোধী এলায়েন্স করে।  একারণে গত ২ মার্চ ২০২৩ মমতা জানিয়ে দেন যে আগামি  “২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিরোধী জোটে যাচ্ছে না তৃণমূল, লড়বে একলাই, জানিয়ে দিলেন মমতা“। কোন জোটে যাবেন না।  কিনতু বেশি না ঐ মাসের তিন সপ্তাহের মাথায় একেবারে বিরোধি জোটের নেতা হিশাবে রাহুলের পক্ষে নিজে টুইট করলেন খোদ মমতাই। তিনি সব “তিক্ততা ভুলে কার্যত রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে … “রাহুলের পক্ষে মমতার টুইট: আমাদের গণতন্ত্র আজ নতুন নীচতায় পৌঁছাল। কেন?
    কারণ, ততদিনে মমতা জেনে গেছেন এই বিরোধি জোট নেতা রাহুল আগের জন নন। এটা সর্বাত্মক! তার মানে আমেরিকা ভারতে মোদির বিরোধিদের একাত্ম করতে পেরেছে এই মাঝের সময়ের মধ্যে।

    এখন এতে কী হতে পারে? সারা ভারতরাষ্ট্র মূলত এতে শেষে এমন এক যুগে প্রবেশ করতে পারে তাতে তা এই প্রথম হিন্দুত্ববাদ-সহ  মোদির বিজেপি-আরএসএস সমূলে উপড়ে পড়তে পারে। পুরানা গান্ধী-নেহরুর সফট বা লুকানো হিন্দুত্ববাদ ( মানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদ) যা একালে (২০১৪) মোদির প্রধানমন্ত্রী হবার আগে ঢলে পড়ে বিলীন হবার যুগে হাজির হবার পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনি বিজয় থেকে মোদির বিজেপি-আরএসএস একে আরো উগ্রভাবে  আর নরমের বদলে উগ্র-হিন্দুত্ব হয়ে হাজির হয়েছিল। তাতে ভারত চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও  চরম মুসলমান নিপীড়নমূলক এক চরম বৈষম্যমূলক  রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল, এবার এই পর্যায়ের একটা অবসান ঘটতে পারে।

     

    ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার সম্পর্কঃ
    কিন্তু ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার কী সম্পর্ক? বিশেষ করে যেখানে গতবার মানে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে তো আমরা তেমন কিছু দেখি নাই!
    হা সেকথা সত্যি; তবে সেবার আর এবার এক নয়; আর তেমন থাকছে না। মানে কী?
    আমাদের দেশেও আজকাল রাজনীতিক দল ক্ষমতায় বা বাইরে যেখানেই থাকুক এরা বলা শুরু করেছে “আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে, করার ক্ষমতা রাখে ইত্যাদি. যেমন এখানে দেখেন,  ….. যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোনও দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে।

    তবে এটা বলতে তামাসার মত শোনাচ্ছে যদিও তবু কথাটা হল – আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে বলতে মনে করা হয় এটা কেবল বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের বেলায় সত্যি। তবে, যেখানে ভারত অবশ্যই একালে আর যেন তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলে বুঝানো যাবে না। কেন?
    কারণ, মোদির প্রপাগান্ডায় ভারতের সারা মিডিয়া এক উগ্র-হিন্দুজাতি-বোধ থেকে সময়য়ে নিজ পত্রিকায় লিখেছে ও বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে ভারত তৃতীয় বিশের দেশ থেকে একলাফে কবে যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে। দ্যা-হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দারও একথা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু মোহভঙ্গের পরে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন।
    মোদির সেই ‘পরাশক্তি ভারতকে’ বাইডেনের আমেরিকা এখন মোদি রেজিম চেঞ্জের জন্য উঠে-পড়ে লেগে গিয়েছে – যদিও পুরা ঘটনাটা দেখে আগামি ২০২৪ সামের মে মাসের ফলাফলে জনগন দেখবে মোদি সেই নির্বাচনেই হেরে গেছে – এমনই মনে হবে হয়ত।
    তাই এশিয়া উত্তাল হচ্ছে বলতে যদি ভারতের দিকে তাকিয়ে বলি তবে, বলতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে আগামি বছর ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এই নির্বাচন শুরু হতে এখন থেকে এক বছরেরও কম সময় আর বাকি আছে বুঝতে হবে। কারণ গতবারের (২০১৯ সালের নির্বাচন) কথা মনে রেখে বললে ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন শুরু হয়ে যাবার কথা। আর আমেরিকা ও রাহুলের নেতৃত্বের বিরোধী দলের টার্গেট হল ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি ( ফলে সাথে তার হিন্দুত্ববাদও) উপড়ে উঠিয়ে ফেলে দেওয়া। আর আমেরিকান টার্গেট হল, এভাবে ভারত থেকে প্রো-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক নীতি-পলিসির এক ভারতকে পাওয়া।

    মোদি-উপড়ানোতে উতসাহিদের বয়ান দাবি করে যে ভারতে ধারাবাহিক একশন শুরু হয়ে গেছে। যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, শেয়ার বাজারে মোদির দোস্ত আদানির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুলের ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ] বলে মোদির অভিযোগ, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে যুক্ত।

    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্টঃ
    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট মানে হল আমাদের ভাষায় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় এর মুখপাত্র ছাড়াও আরেকজন উপ-মুখপাত্র আছেন যার নাম বেদান্ত প্যাটেল। তাকে আগে আমরা খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু তিনি এখন খুব এক্টিভ। ভারতের কেন্দ্রিয় সংসদের স্পিকার কংগ্রেসের রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করে দিয়েছেন।  আর এর অজুহাত হল গুজরাতের এক মেজিষ্টেট কোর্টে দুবছর আগের মামলা যে রাহুল মোদির মানহানি করেছেন, তার তাকে দুবছরের সাজা দিয়েছেন। তবে কোর্ট নিজেই তাকে আগাম জামিন দিয়েছেন উচ্চ আদালতে যাবার জন্য, এর আগে সাজা বলবত স্থগিত রেখেছেন ইত্যাদি। এমনিতেই বহু আইনি ত্রুটিতে ভরা এক সাজা আদেশ আর এছাড়া ঐ আইনেই বলা আছে চলতি সংসদ সদস্যের বেলায় আপিলের আগে এই সাজা বলবত করা যাবে না তবু স্পিকার  রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করেছেন। এরপর ঐ বেদান্ত প্যাটেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন আমেরিকা রাহুলকে নিয়ে আদালতের ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখছেন। ‘Importance of freedom of expression’: US says it’s watching Rahul Gandhi’s case – এই শিরোনাম দেখুন।
    অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে এখানে এসে ভারত আর বাংলাদেশ যেন একাকার – এক তৃতীয় বিশ্বের দেশ নিয়ে আমেরিকান বিবৃতি যেমন হয়ে থাকে।

    হিউম্যান রাইট নিয়ে আমেরিকাঃ
    আমাদের মত দেশে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ কী কাম্য? স্বাগত জানানোর মত? নাকি আমাদের আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপের উসিলা?
    এককথায় বলা যায়, কমিউনিস্টেরা মনে করে এটা হস্তক্ষেপ। কোন দেশ উত্তর কোরিয়া হয়ে গেলেও ভিন্ন কোনদেশের তা একেবারেই আমল করা উচিত না। কারণ, এটা তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়।

    এ সম্পর্কে একটা কথা বলাই যথেষ্ট যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক বলে কোন ধারণা নাই, অনুপস্থিত। অতএব সে অবস্থায় আবার নাগরিক অধিকার বা অধিকার [Citizen’s right] বলে কোন ধারণা সেরখানে থাকার আশা করা অর্থহীন। তবে রাষ্ট্রে শ্রেণী [Class] বলে ধারণার প্রাবল্য আছে। কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে বাসিন্দারা সকলে নাগরিক এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলে সমান নাগরিক অধিকারের নাগরিক। কমিউনিজমের রাষ্ট্র চিন্তায় নাগরিক বলে ধারণাটাই নাই, তাই সমান অসমানের বালাই নাই। তবে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা শ্রেণী ধারণা আছে।  আর তাদের ওই রাষ্ট্র কেবল প্রলেতারিয়েটের পক্ষের রাষ্ট্র, এর পক্ষে সগর্ব ঘোষণা আছে। সুতরাই এখানে সমান নাগরিক, সমান অধিকারের মানুষ বা নাগরিক বলে কিছু নাই। বরং মারাত্মক অসম ক্ষমতার বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা ও অসম শ্রেণী ধারণা আছে।
    অতএব কমিউনিস্টেরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা বলে, আভ্যন্তরীণ ইস্যুর কথা তুলে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকবে বা লুকাবে স্বাভাবিক!

    কিন্তু তাই বলে কী  হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে কথা তুলে আমরা আমেরিকাকে ডেকে আনবো? হস্তক্ষেপের উসিলা করে দিব?
    সেটাও অবশ্যই না।  এককথায় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘণ বা হস্তক্ষেপ না করতে দিয়েও অধিকার দিয়ে কথা বলতে দেয়া সম্ভব ও তা যায়।  এছাড়া মনে রাখতে হবে হিউম্যান রাইট তো জাতিসংঘের ঘোষিত ম্যান্ডেট এবং ইস্যু তাই এনিয়ে জাতিসংঘের ফোরামে তো কথা উঠবেই।  আর এখানেও কোন কথা না তোলার মানে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিতরে  সরকারবিরোধী সবাইকে গুম-খুন অপহরণ বা পিটায়ে মেরে ফেললেও তা নিয়ে বাইরের কাউকে কথা বলতে না দেয়া হবে।
    আসলে মূল তর্কটা অন্যখানে, সেখানে সরাসরি যাওয়া যাক।
    আমেরিকান সরকারি ফরেন পলিসিতে, আমেরিকান সরকার যদি কোন দেশ ও সরকারের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন এর বিরুদ্ধে কথা বললে আমেরিকারর নিজের স্বার্থ আছে বলে না দেখে তবে আমেরিকা সেক্ষেত্রে নিঃশ্চুপ থাকবে। অর্থাৎ ভায়োলেশন হলেই তা নিয়ে আমেরিকা মুখ খুলবে না। যদি তাতে আমেরিকান স্বার্থও না থাকে বা আমেরিকান সরকার না দেখে।

    তাহলে কনক্লুশন কীঃ
    ওয়ান-এলেভেনের হস্তক্ষেপ এর সুবিধা  যাদের পক্ষে গেছিল স্বভাবতই তারা এই হস্তক্ষেপকে ভাল বলবে। অন্যেরা সমালোচক হবে। বর্তমানে বা আগামিতেও এই নিয়মে সব হিসাব মিলবে দেখা যাবে। এর বাইরে আপাতত কোন কমন সুত্র বা সমাধান দেখছি না।

    সবশেষে ভারত প্রসঙ্গে আরেকটা তথ্যা দেই। সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও রাহুলের মা। দলের এক শীর্ষ বা প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি মোদির দুটার্মের প্রায় দশ বছরে রাজনৈতিক অপরাধ ও অন্যায়গুলোর একটা তালিকা করেছেন। অন্যভাবে বলা যায় মোদির নাগরিক অধিকার লঙ্ঘণ-গুলোর এক গ্রহ্নিত তালিকা এটা।  সিরিয়াস ও ভাল তালিকা সন্দেহ নাই। শিরোনাম করেছেন,  “An enforced silence cannot solve India’s problems.” জবরদস্তিতে চুপ করিয়ে দেয়া ভারতের সমস্যার কোন সমাধান নয়।  কিন্তু একটা অসুবিধা হল তিনি এটা কেবল দ্যা হিন্দু পত্রিকাকে দিয়েছেন আর তারা পাঠক এটা পুরাটা পড়তে চাইলে পয়সা চাচ্ছেন। যা খুবই অন্যায়। কংগ্রেসের দিক থেকেও বড় অন্যায়।  তবে অর্ধেকটা বিনা পয়সাতে পড়া যায়।
    একটা ভিন্ন বিকল্প আছে। আরো কয়েকটা পত্রিকা এনিয়ে পর্যালোচনার ছলে প্রায় অনেকটাই ছাপিয়ে দিয়েছে, যাদের একটা হল ইন্ডিয়া টুডে – সেটা এখানে দেখা যেতে পারে।  এমন করে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা এর টা এখানে।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক