Tag: গৌতম দাস

  • ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা
    গৌতম দাস

    ২২ মে, ২০২৩   ০০ঃ০৩
    https://wp.me/p1sCvy-4ul

           Wary Delhi watching Dhaka 

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক আবার একটা লেখা ছাপিয়েছেন – ‘দ্যা ফেডারল’ [The Federal], এই নামের দক্ষিণ-ভারতীয় পত্রিকায়। বাংলাদেশের পাঠককুল সাধারণত  সুবীরকে ধরে নেন যে তিনি ভারত সরকারের (গোয়েন্দাবিভাগ) এক অঘোষিত মুখপাত্র। বা উলটা করে বললে শুরুর দিকে সুবীরও যেন এটাই চেয়েছিলেন যার নতিজা এটা। তবে যেকোন সরকারের নানান মুখপাত্র থাকে; আর মুখপাত্র ব্যাপারটা হল,  কোন ঘটনায় সরকারের মানে সরকারি ভাষ্যটা কী তা জানাতেই এই পদের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো সরকারি প্রতিনিধি বা কর্মচারির মধ্যে  কার কথাটা সরকারের অবস্থান বলে সরকার মনে করে সেটার নির্ধারক হল কাকে মুখপাত্র বলে সরকার আগেই পরিচয় করিয়েছে।  যেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও এক মুখপাত্র থাকে; সম্প্রতি বাংলাদেশেও এই প্রথম এমন পদে একজন মুখপাত্র নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু মুখপাত্র দরকার হয় যারা সরকারের অফিসিয়াল বা ঘোষিত মুখপাত্র নয় বা থাকেন না; অথচ তাদের মুখ দিয়ে সরকার নিজ অবস্থানও জানায় রাখতে চান। অর্থাৎ অফিসিয়ালি তাঁকে মুখপাত্র বলে স্বীকার না করেও সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ অবস্থান জানানোর এক ব্যবস্থা করে থাকে, যেখানে পাঠক আর সরকার – এরা উভয় পক্ষই এই অঘোষিত ব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন। অর্থাৎ ইনফরমালি এক ফরমাল ব্যবস্থা যেন! সুবীরকে তেমনই এক মুখপাত্র মনে করা হয়!
    আবার এমন ব্যবস্থা চীনেরও আছে, যদিও তা আরেকটু গোছানো। চীনের বেশিরভাগ খবর প্রকাশিত হয় জিনহুয়া  [Xinhua] নিউজ এজেন্সি থেকে তবে তা চীনে সারা দেশের নানান নামের পত্রিকায়। কিন্তু চীনা গ্লোবাল টাইমস [Global Times] হল সরকারি অবস্থান প্রকাশ করার আলাদা এক পত্রিকা তবে সে কথাটাও অঘোষিতই থাকে। মানে কোথাও তা উল্লেখ নাই; তবুও পাঠক অনুমান করে নেয় বা ধরে নেয় যে এটাই চীনের অফিসিয়াল ভার্সান।

    সুবীরদের এই লেখার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন ঢাকার উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে” [As Hasina faces heat in Dhaka ahead of polls, Delhi finds itself in a corner too]। মানে সারকথায় সুবীর যেন বলতে চাইছেন,  বাংলাদেশের হাসিনা যেমন  আমেরিকান চাপ থেকে বের হবার পথ না পেয়ে মোদির সহায় হয়েছিলেন; মোদিও তাতে ব্যর্থতা অসহায়ত্ব দেখিয়ে ফেলে পালাতে বা কেটে পড়তে চাইছেন!

    এতদিনের ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বা মোদি-হাসিনার সম্পর্কের কথা পাশে সরিয়ে রেখে যদি কেবল এবারেরটা মানে গত মাসে ২৫ এপ্রিল হাসিনা সরকারের জাপান সফর থেকেই আমলনামা শুরু করি – তাহলে বলতে হয় জাপান সফরটা মূলত ছিল মোদির ভারতের জন্য কিছু করে দিবার সফর। যাতে আমাদের সরকার মোদির জন্য কিছু করে দিলে  মোদি সরকারও আমাদের সরকারের জন্য গুরুত্বপুর্ণ কিছু করে দিবেন!  যেমন এক, বাংলাদেশ জাপানি লোনের ভার নিজ কাঁধে নিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে শুধু সমুদ্র বন্দর না একেবারে একটা (মাতারবাড়িতে) গভীর সমুদ্র বন্দরের ব্যবস্থা পাইয়ে দিতে জাপান সফরে গেছেন।  আর দুইঃ যদিও  মোদির ভারত ক্রমান্বয়ে নিজেকে এক পরাশক্তি বলে এক শতভাগ মিথ্যা দাবি বা আচরণ করে চলে –  যেন কোন মানুষ যখন অলীক সব স্বপ্ন-কল্পনাকে বাস্তবে তা আছে বলে মনে করে বিশ্বাস করা শুরু করে আর সেসবকে তাঁর স্মৃতি বলে চালিয়ে দিতে চায়, এটা সেরকম। যা বাস্তবে নাই ঘটেই নাই তা কারো স্মৃতি হয় কেমনে?  যেখানে বাস্তবের ভারত হল এমন এক অর্থনীতির নাম যার প্রচুর অবকাঠামো ঋণ আর এফডিআই- এদুই ধরণের বিনিয়োগ ঋণের ঘাটতিতে আছে বা থাকছে; মানে একটা বিদেশি ঋণচাহিদায় থাকা দেশ। উদ্বৃত্বের অর্থনৈতিক দেশ ভারত নয়। ফলে তার ঋণ প্রয়োজন যেটা সে সবাইকে জানিয়ে চীনের (যে এখন ঋণদাতা হিশাবে শীর্ষে) কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারে না। তার অহঙ্কার-ভ্যানিটিতে লাগবেই যদি সে নিজ পুর্ণ ক্ষমতায় বিকশিত হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু মোদির ভারতের আবার চীন-এলার্জি আছে বলে – মানে হলে হুদাই মোদি হল এক কঠোর জাতিবাদি স্বরাজ্য-জ্ঞানসম্পন্ন শক্তি হিশাবে দেখিয়ে পাবলিকের কাছে ভোট চেয়ে ফেলেছে; ফলে যেখান থেকে সে আর এখন বের হতে পারবে না –  অতএব চীন তার বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারলেও মোদিকে এখন চীনের একটা বিকল্প খুঁজতে নেমে পড়তে হয়েছে। ভারত সেই বিকল্প হিশাবে সে পেতে চায় জাপানকে। যদিও ভারত জানে এটা তেমন জুতের না; কারণ এটা আবার পায়ে জুতার কাটার মত খচখচ করে লাগে। কারণ জাপানি ঋণের খরচ তুলনায় বেশি; এছাড়া জাপানি শিল্প ভারতকে সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত করার ঝোঁক প্রবল বেশি। তবে মাঙনা যদি কিছু জাপান থেকে আসে তো খারাপ কী! এটাও ঠিক! হাসিনার সফরকে আমরা এখান থেকে দেখতে পারি!

    সমস্যা হল মোদির ভারতের অর্থনীতিবিষয়ক স্বপ্ন আসলে এক অলীক স্বপ্ন। কারণ, মোদি বা আরএসএস এর রাজনীতি এক উগ্র জাতিবাদী ধারণা বলে, তাদের অর্থনীতি জ্ঞান ও ধারনাও উগ্র জাতিবাদ প্রসুত! কিন্তু এর মানে কী? মানে হল এই চিন্তা্র শাসকেরা বাস্তবে কখনও আরেক দেশের সাথে শেষবিচারে লেনদেন বা বাণিজ্য-অর্থনীতিতে লিপ্ত হয়ে পারে না, পারবে না। কেননা এমন উগ্র জাতিবাদ মনে করে আমার দেশের মানুষ যাকিছু উতপণ্য ভোগ-ব্যবহার করব তা কেবল নিজ-দেশের উতপাদনই হতে হবে। আমিও রপ্তানি করব অন্যদেশেও আমার দেশে রপ্তানি করবে – না এমন নীতিতে উগ্র জাতিবাদ বিশ্বাস করে না। এটা কার্যত ওয়ানওয়ে  মানে কেবল একদিকে আমিই কেবল রপ্তানি করব এমন হতে হবে। এমনকি তা যদি তা সোজা আঙ্গুলে না হয় (বাস্তবে তা না হওয়ারই কথা) তবে শঠতা, প্রতারণা করে হয়েও আগাতে হবে। ভুয়াভাবে এমন বিশ্বাস আছে তা দেখাতে হবে আর এই দেখানোটা জায়েজ মনে করতে হবে। যেটা অনেকটা ছলনাময় ও চতুর কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী বৃটিশদের মত, তাদের পররাষ্ট্রনীতির মত;  আর এটাই উগ্র জাতিবাদিদের অর্থনৈতিক মডেল।  একারণে গত একদশকেরও বেশি এই জাপান-ভারতের সম্পর্ক এক স্বপ্ন-কল্পনাই হয়ে চলছে যার তেমন কোন বাস্তবায়ন অগ্রগতি নাই। যদিও তাতে উচ্ছ্বাসে কমতি নাই। যেকারণে,  যাকিছুর নামে সাথে স্বরাজ অথবা জাগরণ ধরণের শব্দ আছে বুঝতে হবে সেসবগুলো আসলে আরএসএস এর প্রকল্প। তাই স্বরাজ্য-মাগ ম্যাগাজিনে জাপানকে নিয়ে উচ্ছাস দেখা যাবে যারা বলতে চাইবে এই তো চীনের বিকল্প এক বিড়াল হিশাবে জাপানকে পেয়ে গেছি আর চিন্তা নাই। কিন্তু এটা যে মাঙনায় পাওয়া হাসিনা সরকারের দেয়া জাপান থেকে হবু সুবিধা তা উগ্র জাতিবাদিরা পরিস্কার করে বলবে না।

    কিন্তু হাসিনা সরকার তাহলে এর বিনিময়ে নিজে কী পাবে ভেবেছিল? সেটা অনেকটা –  “দেখেন তো ভাইজান কিছু করতে পারেন কিনা – আমেরিকার ঘেরাও এর ভিতর থেকে আমাকে উদ্ধারে কিছু করতে পারেন কিনা” – ধরণের কিছু।
    এমনকি গত সপ্তাহে বাংলাদেশের হোস্ট করা (১২-১৩ মে) ভারত মহাসাগর কনফারেন্স নামে যেটা হল সেটাও ছিল আরেক রাজভেট – ভারতকে দেয়া আমাদের উপহার। সেটা আবার কী? এছাড়া এই সম্মেলনের তাতপর্যই বা কী?

    সেটা বুঝাতে একটু পিছন থেকে বলি। আগেও  অনেকবার বলেছি যে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের একালের সকল প্রতিযোগিতার  ফোকাস-ভুখন্ড হবে (আসলে হয়ে গেছে) এশিয়া; আর যা  নুন্যতম আগামি তিনদশকের জন্য। অর্থাৎ একথাটাই আবার ভুখন্ডের দিক থেকে না বলে এর বদলে, মহাসাগর এর দিক থেকে বললে তা হল, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে সমুদ্র-অঞ্চল হল এর ফোকাস এরিয়া ।  আমেরিকা নিজের সেই সমুদ্র-কেন্দ্রিক ততপরতার ফোকাস করেছে  – সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ যেটা – সাউথ চায়না সি বলে ইতোমধ্যেই পরিচিত; তাকে কেন্দ্র করে তবে তা, অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়ে হৈ চৈ করে শুরু করে দিয়েছে।  চীনও কমবেশি তা করেছে তবে প্রোফাইল লো রেখে এবং সেও অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়েই সেটা শুরু করেছে। যেমন, আমাদের কক্সবাজর কেন্দ্রিক চীনের উপস্থিতি ও সব ততপরতা হল সেগুলোই।

    কিন্তু ‘পরাশক্তি’ নামের ভাঁড় ভারত, তার খায়েসের কী হবে? তারও একটা কিছু দেখানো যে লাগবেই! যাতে মনে হয় নকল হলেও সেও একটা পরাশক্তি! তাই এ যেন -পোলাও মনে করে গরীবের চালভাজা- খাওয়ার সুখ! আর সেটাই হাসিনার কান্ধে চড়ে এবারের ভারত মহাসাগর কনফারেন্স এর হোস্ট ভারত করে নিয়েছে বাংলাদেশকে। এটা করে, ভারত দেখাতে চাইলো সেও কম যায় না। এদিকে,  কূটনৈতিক রেওয়াজ হল কোন কনফারেন্সের গুরুত্বের মাত্রা বুঝার একটা তরিকা হল তাতে আগত বিভিন্ন দেশের কারা প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছে তা দিয়ে। মানে এরই একটা মাপকাঠি মানা হয় হল  – রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন সেখানে এসেছেন। তাতে ভারতকে দেখা গেল তবু একজন রাষ্ট্রপতিকে আনতে পেরেছেন। কিন্তু কে তিনি? তিনি হচ্ছেন মরিশাসের রাষ্ট্রপতি! মহাদেশ-হিসাবে যা আফ্রিকায়; মানে আফ্রিকার পাদদেশে যে মাদাগাস্কার দ্বীপ আছে তারও আরও পুবে খুবই  ছোট্ট একদ্বীপ। মোট জনসংখ্যা যার মাত্র ১২ লাখ, মানে আমাদের মাঝারি মানের একটা উপজেলার জনসংখ্যা যেমন। আর মরিশাসের ৬৭% জনসংখ্যা আবার ভারতীয় অরিজিন। কেন এমন? কারণ,  যাদেরকে সস্তা শ্রমিক হিশাবে বৃটিশ কলোনিদখলদারেরা সেকালের বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে মাইগ্রেট করে নিয়ে গেছিল, তারাই। যেমন অনেকেই লক্ষ্য করেছেন বাংলাদেশে এসে এই মরিশাস প্রেসিডেন্ট – নাম পৃথ্বীরাজসিং রূপম – তিনি  সস্ত্রীক আমাদের ঢাকেশ্বরী মন্দির দর্শন করতে গেছিলেন। সারকথায়, এজন্য এটা এক ভারত-নির্ভরশীল দ্বীপ-রাষ্ট্র। এই হল সেই একমাত্র প্রেসিডেন্টের নমুনা! দাবি করা হয়েছে পঁচিশটা দেশের প্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিল যার প্রায় সবই ভারতের আমন্ত্রণে বা ভারতের কূটনৈতিক জোরে।  আর বাংলাদেশ কেবল হোস্ট মাত্র যার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে সদ-ব্যবহার করে দেখাতে পারে সে বাংলাদেশে অনেক প্রভাবশালী! ভারতের ‘এরিয়া অফ ইনফ্লুয়েন্সেই’,  “আমার তালুকেই”যেন বাংলাদেশ অবস্থিত!

    বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেলঃ
    কিন্তু এসব করার বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেল? হা; সেকথাটাই যেন আমাদেরকে জানাতে মোদি সরকার সুবীর ভৌমিকের আর্টিকেল্টা প্রকাশিত কররার ব্ছেযবস্থা করেছে। যেমন শিরোনাম থেকেই শুরু হয়েছে এটা বলে যে “বাংলাদেশ সরকার (অ্যামেরিকান) “চাপের” তাপ বুঝতেছে আর তাতে দিল্লিও কোণার চিপায় পড়ে গিয়েছে”। কিন্তু এতে তো ভারতকেও বিপদে পড়া দেখানো হয়ে গেল, তা কেন? কারণ এখন ভারতের খাই-দাই শেষ; মানে আমাদের সরকার ভারতের জন্য যা যোগাড় করে দিয়েছিল! ফলে এখন ভারতও নিজেকে অসহায় কোণার চিপায় পড়া দেখালেই তো দায়িত্ব শেষ – যেন বলতে চাচ্ছে, “অনেক চেষ্টা করলাম, আর পারি নাই ভাই!”  এমন বলে হলেও তো খালাস পেতে হবে!!!

    সাথে আবার সুবীরের আরও অজুহাতও আছে। এমনকি এতে খোদ ভারতই বিপদে আছে বলে সে আড়াল নিতেও চেয়েছে। একাজে, ভারতকে অসহায় দেখানোটাও জরুরি মনে করেছেন সুবীর! যেমন সাব-হেডিং দিয়েছেন, “খোদ ভারতই এক শক্ত-ঠেলার মধ্যে” [India in a tight spot] পড়েছে। এরপর বলছেন, এবারের পরিস্থতিতে দুইটা জিনিষ নাকি ভারতের বিপক্ষে, নাহলে ভারত হাসিনার জন্য কতকিছু করে দেখায় দিত!
    সে দুটা অসুবিধা কী? সুবীর বলছেন এক হল, জাতিসংঘে ভারতের হাতে চীনের মত ভেটোক্ষমতা নাই যে যেকোন অ্যামেরিকান প্রস্তাবে বিরুদ্ধে সে ভেটো মেরে দিতে পারত। আচ্ছা সুবীর সাব, আমেরিকা কী হাসিনার বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কোন প্রস্তাব এনে হাসিনাকে চাপে রেখেছে? তা তো বাস্তবতা নয়! তাহলে এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা কেন বলেন? বাস্তবতা হল,  আমেরিকা  নিজ-রাষ্ট্র-ক্ষমতাবলেই নানান স্যাংশন দিয়ে রেখেছে? শুধু তাই না। এখনও জাতিসংঘের যেকোন ফোরামে অ্যামেরিকান প্রভাব সবার চেয়ে বেশি। এই প্রভাবের অর্থ হল অন্যান্য ভেটো হোল্ডার সদস্যদের (চীন বা রাশিয়ার) এতে তেমন কিছুই করার নাই।  আজ জাতিসংঘ গঠন প্রায় আশি বছর হয়ে গেল তবুও গ্লোবাল নেতা আমেরিকা ঢলে পড়ার যুগে  আজ প্রবেশ করলেও  আমেরিয়ান প্রভাব এখনও একক; আমেরিকা চাইলেই কেবল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট [OHCHR] এজেন্সি সংগঠনে যেকোন প্রস্তাব সহজে নড়েচড়ে উঠতে পারে।  ফলে ভারতের অযোগ্যতা, অসহায়ত্ব তো নতুন নয়। এমনকি আজ ভারত ভেটো ক্ষমতা পেলেও তাতে কিছুই হবে না। কারণ, এখনই আমেরিকা ছাড়াও আরও চার ভেটোক্ষমতা-ওয়ালা দেশ আছে। যার মধ্যে দুজন হল বৃটিশ ও ফরাসিরা। কই জাতিসংঘে তাদের উদ্যোগে বা চাপ কী হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু আছে??? কাজেই ভারতের আলগা মাতবরি দেখানোর ত এখানের কিছু নাই!!! সোজা কথাটা হল, ভারতের হাতে ভেটোক্ষমতা থাকলেও সেটা হাসিনা সরকারের উপর আমেরিকান চাপের  বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারত না। কাজেই ভারতের আলগা ভাব নিবার কী আছে এখানে???
    সুবীর ভৌমিক দ্বিতীয় আরেক ওজুহাত সুনিয়েছেন হাসিনা-কে। তিনি বলছেন ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা। সেসময় নির্বাচনের আগের ডিসেম্বরে (২০১৩) ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ভারত পাঠিয়েছিল। প্রকাশ্যেই তিনি বলে গেছিলেন, বিএনপি ছাড়াই (কারচুপির) নির্বাচন হবে কোন সমস্যা হবে না কারণ এরশাদ না চাইলেও জাতীয় পার্টিকেই গৃহপালিত বিরোধী দল করে নেয়া হবে – যেটা সুজাতার সঙ্গে এরশাদ মিটিং শেষে বেড়িয়েই মিডিয়ার সামনে সব উদাম করে দিয়েছিলেন এরশাদ। মজাটা হল,  সে ঘটনাটা সুবীর ভৌমিক এখন স্মরণ করছেন আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের বিরাট কৃতিত্ব বলে দাবি করে।
    অথচ ফ্যাক্টস হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা ও এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের ক্ষমতা সবই তখনও এককভাবে সবই আমেরিকার দখলে ছিল। আর আজকের চেয়ে তা আরও ভাল ভাবে। যার কাছে ভারত তুচ্ছাতিতুচ্ছই ছিল। কিন্তু ঐ ভারতকে আমেরিকা এশিয়ায় চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি বরকন্দাজ বানিয়ে রেখেছিল বলে তাতে ভারতের কিছু “ভয়েস অর্থে ক্ষমতা” তৈরি হয়েছিল যা আমেরিকা সদয় হলে ভারতকে সময়ে আমল করত। [মনে রাখতে হবে সেই ক্ষমতাটুকুও এখন ভারতের নাই]  কারণ আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতেই তুলে দিয়েছিল বলেই সুজাতা সিং অ্যামেরিকান ক্ষমতার উপর ভর করেই ওসব মাতব্বরি কথা সেকালে বলে যেতে পেরেছিল।  সুবীরের ধারণা এগুলো কেউ জানে না,  বা তার চাপাবাজি কেউ ধরতে বা বুঝতে পারবে না। পুওর সুবীর!! সুবীর তাই এবার লিখছে সুজাতার এই খেল এসবই নাকি ভানুমতির খেল  আর সেই আসলে ভানুমতি ছিলেন প্রণব মুখার্জি। যিনি এখন মারা গেছেন বলেই নাকি এবার আর হাসিনাকে অ্যামেরিকান চাপ থেকে উদ্ধারে মোদি কিছু করতে পারল না।!!!!
    মিঃ সুবীর, মিথ্যা কথা বলতে গেলেও তো কিছু নিয়ম মানতে হয়, নাকি?? সুবীর সেটাও বুঝে না। অথচ এবারের লেখাতেই সুবীর স্বীকার করে নিয়েছেন যে সুজাতার সেসময়ের ক্ষমতার অপ-ব্যবহারের ও অবৈধ হস্তক্ষেপের ক্ষমতাটাই ছিল আমেরিকারর ক্ষমতাই। সুবীর সেসব কথা স্বীকার করছে এভাবে আর লিখেছে,    its (India’s) strategic alliance with the US to take on China – মানে  চীন ঠেকানোর বরকন্দাজি সুত্রে আমেরিকার সাথে ভারতের যে স্ট্রাটেজিক এলায়্যেন্স ছিল সেটাই সেসময়ের ভারতের সুজাতার ক্ষমতার উৎস। মানে এটা ব্যক্তি প্রণব মুখার্জির কোন ক্যারিসমা বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু তবুও সুবীর এই লেখায় দাবি করেছে [India now also lacks someone like Pranab Mukherjee……… ] – আজ প্রণব বেঁচে থাকলে ভারত আমেরিকাকে দেখায় দিতে পারত, হাসিনার বিরুদ্ধে অ্যামেরিকান চাপ থেকে হাসিনাকে উদ্ধার করে দিতে পারত!
    সুবীর এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নাই। প্রণব মুখার্জির ক্ষমতা সম্পর্কে আরো লিখে দাবি করে বসেছেন যে ….. [প্রণব].who battled it out with the US to ask the military-backed caretaker to stand down.  মানে প্রণব এতই ক্ষমতাবান যে তিনি খোদ আমেরিকার সাথে লড়ে বাংলাদেশের  সেনাবাহিনীকে সরে দাঁড়িয়ে হাসিনাকে ক্ষমতা দিবার ব্যবস্থা করে দিতে আমেরিকাকে বাধ্য করতে পেরেছিলেন।  আর এটাই এখন মোদি সরকার হাসিনার জন্য কিছু করতে পারছেন না; কারণ প্রণব মুখার্জি এই একটাই রত্ন ছিল ভারতের, তিনি তো মরে গেছেন!!

    তার মানে দাড়ালো যে প্রণব মরার পর ভারত আর হাসিনার সরকারের জন্য কিছুই করতে পারবে না। তাহলে তো ভারতের সবকথা এখানেই শেষ হয়ে যাবার কথা, নাকি?
    না, সুবীর মিথ্যা বলতেছেন।  তাই এসব বলার পরেই তিনি এবার ভারতের এখনকার মনের শঙ্কা হাজির করছেন। সেই আশঙ্কা নিচে ছবি আকারে দিয়েছি।  কথাগুলো সুবীরের লেখা থেকে নেয়া। যা বাংলা করলে হয় যে, কী হবে যদি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে এতদিন যাকিছু হাসিনা সরকারকে দিয়ে চুক্তি করে ভারত পেয়ে নিয়েছে তার সবকিছু পুণর্মুল্যায়ন করে খালেদা যদি ওসব চুক্তি বাতিল করে দেন – এই হুমকির কী হবে???

    কিন্তু এই আশঙ্কা কেন? হাসিনা সরকার আর ভারতের মধ্যে কী কোন আন্ডারহ্যান্ড অসম বা আনফেয়ার ডিল করা হয়েছে? সুবীর সেতাই কী পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন না!  এই বাক্যটা লিখে সুবীর ভৌমিক সেই আশঙ্কা তার বাংলাদেশি পাঠকের মনে নিজেই স্বগোক্তিতে প্রবেশ করিয়ে দিলেন!  যখন বাংলাদেশের বিগ মেজরিটি মানুষ বিশেষ করে তরুণদের মনে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” এখন সর্বোচ্চ!  বাংলাদেশে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” ও নেতি লুটেরা ধারণা এর আগে কখনও এমন তুঙ্গে উঠে নাই! এই বাস্তবতায় এটাই কী তাহলে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ ডিলিং এর নতিজা নয় কী?  – প্রণবের এসব শঠতা এটা কী আসলেই ভারতের জন্য খুবই ভাল কিছু হয়েছে? ইতোমধ্যেই যা কিছু প্রকাশিত হয়ে গেছে তা আসলেই ভারতের বিপক্ষে চলে যায় নাই, যাবার কারণ নয়? মানে আমরা যেটাকে – লাভের গুড় পিপড়াতে খেয়ে গেছে অবস্থার কথা বলি ! এটা কী তাই নয়?   সুবীর ভৌমিক সহ ভারতের নীতি নির্ধারকদের জন্য ব্যাপারটা তাদের জন্য রিভিউয়ের খোরাক হতে পারে- যদি সতভাবে চিন্তা করতে পারে তবে এই ভিউ পয়েন্ট তাদেরকে আগ্রহি করতেও পারে!

    কিন্তু এর পরেও ইতোমধ্যে আরো কিছু খারাপ ডেভেলবমেন্ট তৈরি হয়ে গেছে। আগামিতে কী হতে পারে তা নিয়ে সুবীর এক সার্ভে রিপোর্টের বরাতে অনেক কিছুই বলেছেন। আর এর সাথে  সুবীর ভৌমিকের মুখ দিয়ে আরও কিছু ভারতের নয়া খায়েস-ফরমায়েস হাজির হয়ে গেছে। সুবীর  হাসিনা সরকারের কাজে নয়া আরও চাহিদা হাজির করতে দ্বিধা করেন নাই। একাজে সুবীরের  নয়া উপশিরোনাম হল, হাসিনাকে যা করতে হবে [What Hasina needs to do]। মানে হল, ভারত যা করল তাতে হাসিনা এখন শেষ হয়ে যাচ্ছেন; অথচ সেদিকে সুবীরের কোন দৃষ্টি নাই। বরং ভারত এখনও আছে কেবল নিজ সংকীর্ণস্বার্থ নিয়ে। তাই বলতে চেয়েছেন,  নিজ স্বার্থ ভুলে হাসিনা সরকারকে এখনও এরপরেও যা করতে হবে তার  এক তালিকা দিয়েছেন সুবীর।

    এটা বেশ ইন্টারেস্টিং যে সুবিরের বরাতে আমরা জানছি যে ভারতের অবস্থান হল, বটম লাইনটা হল, “হাসিনাকে চীনের সংস্পর্শ ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু এর সাথে যেটা বলা নাই তা হল, কেন হাসিনাকে তা করতে হবে? হাসিনার স্বার্থ বা লাভ কী এতে? এর কোন হদিস রাখেন নাই। যেন এটা ভারতের একক স্বার্থের নির্দেশ!!! ভারতের প্রেজেন্টেশন এমন সবসময় সবকিছুতে ভীষণ স্বার্থপর ও সংকীর্ণ – যেখানে সেটা হল ও মডেলটা হল কলোনিদখলদারের মডেল। যেটাপ্রথম কপি ও চালু করেছিলেন জওয়াহরলাল নেহেরু, আর তা এখনও চর্চায় ভারতের প্রধান ধারা। ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক এবং করুণার… কেন?

    কারণ, সুবীর এক আজিব ও অবিশ্বাস্য কথা বলেছেন, যেন ভুতের মুখে রামনামঃ

    Delhi wants to see the Awami League return to power but through a fair election
    that can shut up the Western nitpickers and prevent Bangladesh’s slide
    into a one-party rule that will augment Chinese influence.

    সোজা ভাষায় বলছেন,  ভারত দেখতে চায় হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরুক কিন্তু একটা ফেয়ার নির্বাচনের মাধ্যমে। যদিও এই ফেয়ার নির্বাচনের মানে কী  সেটা সুবীর পরিস্কেকার করেন নাই। আবার গত কোন নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে কিনা সেটা নিয়ে ভারত কখনও কিছুই বলতে চায় নাই, পাশ কাটিয়ে গেছে, তাই এনিয়ে ভারতের কোন উদ্বেগ ছিল না। একমাত্র উদ্বেগ ছিল নিজ স্বার্থ হাসিল, তা যেভাবেই হোক। তাহলে আজ  ফেয়ার নির্বাচনের কথা কেন?  আগে (সুজাতা সিংয়ের কেসের আমলে) ফেয়ার নির্বাচন না করার ফর্মুলা দিয়ে যাওয়া –  মানে সেটা কী তাহলে ভুল হয়েছিল? বলে এখন স্বীকার করছে? যদি তাই হয় তো  ভারত কী এর দায় নিবে?
    ঐ সার্ভে রেজাল্টের বরাতে সুবীর অনেক চেষ্টা করেও হাসিনার দলকে জিতবে বা সে সুযোগ আসবে তা দেখাতে পারে নাই। শুরু করেছিলেন যে হাসিনার লীগ দল 32 to 47 seats পাবে বলে।  পরে নানান শর্তে সেটা  83–117 seats হতে পারে বলেছেন। আর সবশেষে ১৪০ আসনের উপরে আর তুলতে পারেন নাই।  
    কিন্তু তবু, যে ফর্মুলা দিয়েছে এর সোজা মানে, আ লীগের ভিতরে যুদ্ধ শুরু করতে হবে। অপর গ্রুপকে চীনাপন্থি নামে লেভেল লাগিয়ে তাদেরকে দলছাড়া করতে হবে। এমনকি বেচারা মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে ভারতকে স্বামী মেনেও নিজে আজ চীনাপন্থি তকমা পেয়েছেন। ভারত তার উতখাত চায়। এমন মন্ত্রণালয়ের নামও দিয়ে দিয়েছেন সুবীর এরা হল -” home, finance, foreign, information, industry, commerce, and water resources” ইত্যাদি।
    এই ব্যাপারটা বা ভারতের কামনার পার্জিং [purging]; বাংলায় বললে তা দলে বিভক্তি আনতে সুপারিশ করা। অর্থাৎ ভারত এখন লীগকেই চীনাপন্থি নামে লেভেল  আরেক ভাগ করতে চায়। মানে ভারতীয় হস্তক্ষেপ কত গভীরে চলে গেছে এর চিহ্ন।  সম্ভবত এর আরো বড় চিহ্ন হল, কালবেলা পত্রিকায় আরেক প্রপাগান্ডা লেখা; যার শিরোনাম আরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসছে, প্রস্তুত সরকার এই মিথ্যা জল্পনা-কল্পনা ওয়ালা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে।  সেই রিপোটটা আওয়ামি লীগ দলে বিভক্তি আনার আরও বিস্তারিত ভারতীয় উদ্যোগ বলে মনে করছেন অনেকে।  কারণ, আমেরিকার আরও স্যাংশন দেওয়ার আর কোন কারণই নাই। কারণ সেক্ষেত্রে স্যাংশন খেয়ে হলেও হাসিনা সরকারের জন্য তো ভালই। আর সেটা এই অর্থে যে এটা হাসিনা সরকার থেকে যেতে পারে, সে সম্ভাবনা বাড়াবে!

    এখন ফিরে আবার সুবীর ভৌমিকের লেখার শিরোনাম টা মনে করা যাক  – নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে।
    হাসিনা সরকার একা নয়, বাংলাদেশ ইস্যুতে সাথে ভারতও চরম বিপদে পড়েছে।  সুবীর সেই দুর্দশার একাউন্টগুলো আমাদের সামনে খুলে ফেলেছেন!

    +++++
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!

    কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!
    গৌতম দাস

    ১৮ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4t2

     

             India: Congress victory strong message against majoritarian politics

     

    দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্য সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১০ মে যার, ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ১৩ মে এবং  এই ফলাফল হয়েছে মোদির জন্য একালের খুবই বিপর্যয়কর এক আঘাত। অনেকটা যেন ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভাগ্যে নেমে এসেছিল এক কঠিন নেতি ফলাফল বিপর্যয় হিশাবে যখন, বিজেপি ঐ নির্বাচনে বিরাট মার্জিনে জিতে আসতেছেই বলে ব্যাপক প্রপাগান্ডা  আওয়াজ তোলার পরে বাস্তব ফলাফল দেখা গিয়েছিল একেবারে উলটা; বিজেপি সেবার তার গত ২০১৯ সালের সফলতাটাই ধরে রাখতে পারে নাই; বরং আরও নিচে নেমে গেছিল। এবার কর্ণাটকের ফলাফল বিজেপির জন্য অনেকটা সেরকম তো বটেই তবে এর চেয়েও বেশি নেতি প্রভাব ফেলেছে। এর বড় কারণ হল প্রথমত, আগামি কেন্দ্রীয় নির্বাচন আসন্ন। মানে হল, আগামি বছর মে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন ততদিনে শেষ হয়ে ফলাফলও প্রকাশিত হয়ে যাবে।

    এছাড়াও, অন্যান্য বড় ফ্যাক্টরগুলো হলঃ এতদিন গত ২৩ বছরেরও বেশি যে ভারত ছিল এশিয়ায় অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজিক পার্টনারই শুধু না, ভারত ছিল আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর বরকন্দাজ। আর এর বিনিময়ে মানে বরকন্দাজির নামে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার চলতি বছর থেকে বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা অনুসৃত নীতি থেকে সরে এসেছে। যদিও সরকারি আনুষ্ঠানিকভাবে   আমেরিকা বা ভারত দুই সরকারের কোন পক্ষ থেকেই কোন ঘোষণা  দেওয়া হয় নাই কৌশলগত কারণে কিন্তু, দুপক্ষই নিজ নিজ সরকারের পথচলা ও আচার আচরণে এমনকি ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রকাশিত করে ফেলছে যে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। তবুও যেটা অনেকটা একটা বিয়ে ভেঙ্গে গেছে কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স হয় নাই – এর মত। তাই আচার-আচরণ বসবাসে তা প্রতিফলিত হবেই, সেরকম। সেই নয়া  গতি-প্রকৃতি কেমন এনিয়ে ভারতের মনোভাব যেভাবে প্রকাশিত তা নিয়ে একটা লেখা আসবে আগামিতে।

    এতদিন বাইডেন সরকার বিভিন্নদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে   মানবাধিকার লঙ্ঘণের এর অভিযোগ আনা আর স্যাংশন আরোপ – অন্তত এই দুই নীতি নিয়ে সামনে আগিয়েছে। তাসত্বেও এর কোনটাই এতদিন মোদি সরকারের উপর প্রয়োগ করে নাই। ছাড় দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলেছিল। কিন্তু এবার সবকিছুই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর সংসদ সদস্যপদ খারিজ ও সাজা দান ইস্যুতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট(পররাষ্ট্র বিভাগ) এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল জানিয়েছিল তারা সব লক্ষ্য করছে [we r Watching], নোট নিচ্ছে। তাই, আমার আগেরই এক লেখায় কিছু বিস্তারিত বাক্যে লিখেছিলাম। সেই গত লেখায় এখানে, যার সারকথাটা হলঃ
    “যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, মোদির দোস্ত আদানির শেয়ার বাজারে করা কারসাজির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার পরোক্ষ আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ]  যেটাকে প্রত্যক্ষ আহবান বলে দাবি করে মোদির অভিযোগ, আদালতে মোদির কারসাজি করে রাহুলকে শাস্তির রায় ঘোষণা ও প্রভাব বিস্তার; এছাড়া, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে গাথা ও যুক্ত।”
    অর্থাৎ মোদির ভারত থেকে অ্যামেরিকার আলাদা হয়ে যাওয়া রাস্তাটা হল এই যে, বাইডেন এখন দেখতে চান ২০২৪ সালে্র নির্বাচনে মোদি সরকার যেন ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়; আর এর স্বপক্ষে “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে”  আইন বাঁচিয়ে যতটা সহায়তা করা যায় এর সবটা করতে নেমে পড়েছে আমেরিকা। তাই কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির গোহারা হার “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নতুন উতসাহে আগিয়ে যেতে উতসাহিত করবে আর ঠিক ততটাই যেন তা বিজেপি-কে হতাশ ও নিরুতসাহিত করবে! এটাই হল কর্ণাটক নির্বাচনের একতা বড় তাতপর্য, যা একেবারেই ভারতের একটা আঞ্চলিক হিশাবেও যায় না কর্ণাটক এমন এক রাজ্য নির্বাচন মাত্র হওয়া সত্বেও, এর মধ্য দিয়ে এক  গ্লোবাল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দিক ফুটে উঠেছে! এনিয়ে সবচেয়ে বড় করে ভোটের হার-জিত দুপক্ষই পরস্পরকে টিটকারি করেছে টুইটারে।  যেমন তেমনই একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক মোটা ভাই কর্ণাটক নির্বাচনের ফলাফল আসতেই ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে অমিত শাহ প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করেছেন আর সকল প্রার্থীই ভোট ছেয়েছেন মোদির নামে। তাই ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক “মোটা ভাই” পালাচ্ছে। আর গুজরাতি ভাষায় মোটা ভাই মানে বড় ভাই যার মাথায় আবার প্রতীকিভাবে অমিত শাহের মত বিশাল টাক আছে।

    ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটক কোথায়, কেন আর এর গুরুত্বই বা কীঃ
    শুরুতে একবাক্যে কর্ণাটকের এই নির্বাচনের ফলাফল একটু বলে নেই। এই নির্বাচনে মোট আসন ছিল ২২৪ যার মধ্যে এবার কংগ্রেস একাই জিতেছে ১৩৯ আসনে, যেখানে সরকার গঠনের জন্য নুন্যতম প্রয়োজনীয় হল ১১৩ আসন। এখানে গত রাজ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে আর সেবারই প্রথম বিজেপি দল ১০৪ আসন পেয়েছিল যা এককভাবে সরকার  গঠন করার মত যথেষ্ট আসন নয়। কিন্তু এদিয়েই বিজেপি ষড়যন্ত্র এঁটে বাকি আসন সেবার বিরোধীদের থেকে ভাগিয়ে এনে গত পাঁচ বছর রাজ্য সরকার গঠন করতে সক্ষম ও তা চালিয়ে এসেছিল। কারা সেই ভাগিয়ে আনা লোক তা নিয়ে এলেখার শেষে কথা বলব।

    এবার, ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটকের পরিচিতি প্রসঙ্গে। উত্তর-ভারতের আর্য-প্রভাবিত সব রাজ্যগুলোর বিপরীতে ভারতের দক্ষিণের চারটা প্রদেশকে   ‘দ্রাবিড়ীয়ান’ রাজ্য বলা হয়। অনেক সময় এই রাজ্যগুলোকে ‘দাক্ষিণার্ত’ [DECCAN] অঞ্চলও  বলতে দেখা হয়। আসলে ভূ-গঠনশৈলী হিশাবে এই পুরা অঞ্চলটাকেই (সংস্কৃতঘেঁষা বাংলায়) বলে মালভুমি, ইংরাজিতে যা  Plateau বলে পরিচিত। আর গ্রামের সাধারণ বাংলায় যেটা পাহাড়ের উপরের এক ব্যাপক বিস্তীর্ণ সমতলভুমি – এমন ভুখন্ডকে বুঝায়।  যার নাম বাংলা উচ্চারণে লিখলে হবে  ডেকান প্লাটো [DECCAN Plateau]। 

    মিথিওলজি বা প্রচলিত ধারণায়ঃ
    মিথিওলজি [mythology] মানে বলা যায় কিংবদন্তি ধারণা; বহু পুরানা প্রচলিত থাকা ধারণায় যা আছে বা থাকে কিন্তু যার প্রমাণ নিয়ে কেউ আগ্রহ করে না বা মাথা ঘামায় না।  সব এথনলজি [ethnology] বা জাতির ধারণার মধ্যেই এমন নানান মিথ [myth] থাকতে দেখা যায়। সেকথা একটু পরে আসছি।   ভারতের উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে ধর্মীয় ও কালচারাল ঝগড়ার মূল ইস্যুটা প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একারণে যে ভারতের বাইরে থেকে এসে আর্যরা যেখানে প্রথম খুঁটি গেড়ে বসেছিল সেটা সারা ভারত না বরং,  কেবল উত্তর ভারত মাত্র। পরে সেখান থেকে এর আশেপাশের প্রদেশ যেমন মহারাষ্ট্র (মারাঠি) এর উপর অংশ, মধ্যপ্রদেশ আর পুবে বিহার পর্যন্ত সহজেই প্রভাব বিস্তার ও ভাষার দিক থেকে এসব রাজ্যের উপর সংস্কৃত ভাষার প্রভাব-আধিপত্য ছড়াতে পেরেছিল। কিন্তু কখনই দাক্ষিণার্থে প্রবেশ করতে পারে নাই। আর প্রায় একইভাবে ওদিকে পুবে বিহারে – ভোজপুরি ভাষার বিহার পেরিয়ে বাংলায় পুরাটা দখল নিতে পারে নাই আর্যরা।  আর্যরা মহারাষ্ট্র পেরিয়ে আরও দক্ষিণে দাক্ষিণার্থের কোথায় প্রবেশ না করতে পারার মূল কারণ মনে করা হয় এই ডেকান প্লাটো মানে পাহাড়ের উপরের সমতলভুমি, এটাকে তারা সদলে পার হতে পারে নাই।
    এমনকি মিথিওলজিতে [এথনিক মিথের ধারণায়] দেখা যায় আর্যদের দেবতা ও তাদের আবাস স্বর্গের ধারণায় – সেখানে সুরালোক বলতে স্বর্গ বুঝানো হয়ে থাকে অর্থাৎ স্বর্গ মানে সুর বা দেবতা-দের আবাস যেখানে।  আর বিপরীতে যারা দেবতাদেরকেই স্বর্গচ্যুত করতে চায় এরাই হল তাদের চোখে অসুর। যেন দেবতাদের দিক থেকে দেখলে সুর হল তারা নিজেরা; তারা নায়ক সেখানে আর অসুর হল ভিলেন বা বিপরীত।  দুর্গাপুজার মুর্তিতে দেখা যাবে ওটা হল, দুর্গা লড়ছেন এক অসুরের সাথে। আর কেমনে চিনব যে এটা অসুর? দেখা যাবে মহিষের পেট চিড়ে যে বেরিয়ে এসেছে আর দেখতে কুচকুচে কালো – এই হল আর্যদের ভিলেন-বোধ। আর তাতে এটাই মহিষাসুর!
    সারকথায় মিথিক্যাল বর্ণনাগুলোতে সেটা কার দিক থেকে দেখা বর্ণনা – এটাই খুবই নির্ধারক। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই একদল সাঁওতাল ট্রাইব আছে যারা দুর্গাকেই উলটা ভিলেন মনে করে থাকে; আর মেনে বিপরীতে মহিষাসুর এরই পুজা করে থাকে। এনিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক নিউজ এখানে। আবার মহিষাসুর নিয়ে কলকাতার বাঙালির আলাদা ভার্সান এখানে দেখা যেতে পারে।

    দাক্ষিণার্ত – ভারতের এই অঞ্চলটা হল এই উচু পাহাড়-মালভুমি তা আগেই বলেছি; কিন্তু যার আবার দুই দিকেই দুই সাগর। মানে বামে বা পশ্চিমে হল আরব সাগর আর ডানে বা পুবে হল বঙ্গোপসাগর। ভূ-প্রাকৃতিক এসব কারণে এই অঞ্চলের মানুষেরা প্রচন্ড খাঁড়া রোদের মধ্যে বসবাস করতে হয় আর তাতে রোদে পোড়া বলে তাদের গায়ের রঙ খুবই কালো হয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা যত বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকুলে ও মাছধরা পেশায় তারা ততই কালো। কাজেই এই কালো রং-ই হয়েছে আর্যদের চোখে নিচা মানুষ; মানে,  যাদের আর্যরা ঘৃণা ছিটিয়ে নিচা দেখাতে চায় যাদের সেই আম জনগণ – এরাই নাকি  আর্যদের চোখে অসুর! এরা অসুরের জাত! কেউ কেউ তাদের দ্রাবিড়ীয়-ও [DraviDian] বলে থাকে।  তামিলনাড়ূর সবচেয়ে বড় দলের নাম ডিএমকে [DMK -Dravida Munnetra Kazhagam ] যেখানে ডি [D] মানে দ্রাবিড়। [ভারতের নামগুলোর মধ্যে তাই কখনও ইংরাজিতে ‘ডি’ অক্ষর দেখা গেলে এর উচ্চারণ বাংলায় “ড়” করতে হবে]।
    আর একটা কথা বলার সুযোগ নেই। কর্ণাটক এর ভাষার নাম কানাড়া যা দ্রাবিড়ীয় চারটা ভাষার একটা।  কর্ণাটকিরা নিজেদের কন্নড় জাতির লোক মনে করে থাকে, তাই তাদের ভাষার নাম কানাড়া। কর্ণাটকের কন্নড় ভাষা পাশের মানে উপরের সীমান্ত সংলগ্ন মহারাষ্ট্র (মুম্বাই) এর দক্ষিণ সীমান্ত বা পুবে বা ডানপাশে অন্ধ্রপ্রদেশ ও নিচের তামিলনাড়ুতেও কন্নড় ভাষা বলার চল আছে।

    দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্যের কর্ণাটকঃ
    দ্রাবিড় শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঘন কালো চামড়ার মানুষ যাদের দক্ষিণ ভারতে দেখা যায় [a member of an ancient dark-skinned people of southern India.]  । এদিকে ১৯১৬ সাল থেকেই তামিল বা দ্রাবিড়ীয়রা তাদের দলীয় প্রতীক ছিল এক দাড়িপাল্লার ছবি যা হিন্দুধর্মীয়  জাত-বিভাজন ও বৈষম্যের বিপরীতে সাম্যের প্রতীক। আর এদের সাথে ছিল একটা ফ্লাগ – যা ছিল একটা পুরাটাই কালো ফ্লাগ; আর এর কেন্দ্রে কেবল একটা লাল সার্কেল চিহ্ন থাকত। যেখানে এই কালো হল তাদের নিচা করে রাখা মর্যাদার ও নিপীড়নের প্রতীকি বিরুদ্ধতা যার বিরুদ্ধে উঠে দাড়ানোর  প্রতীক হল লালচক্র চিহ্ন।

    The party at its inception retained the flag of the South Indian Liberal Federation, which had a picture of a traditional type of balance signifying the idea of equality.[26] Its central theme was to remove the degraded status imposed on Dravidians. 

    ভারতে দ্রাবিড়ীয়ান বলতে এরা পুরানা হিশাবে চার রাজ্য ছড়িয়ে আছে – কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু আর কেরালা।
    কর্ণাটকঃ কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর (নতুন নাম ব্যাঙ্গালুরু)। আর এই ব্যাঙ্গালোর রাজধানী থেকে ১২০ কিমির ভিতরে পশ্চিম দিকে টিপু সুলতানের মহীসুর বা ইংরাজিতে মাইসোর [Mysore] অবস্থিত। আর মাইসোর শব্দটা আবার অনেকে দাবি করেন যে মহিষাসুর শব্দের নাকি অপভ্রংশ যেখানে এর অর্থ  ‘মহিষের মত তুচ্ছ প্রাণীর গর্ভে জন্মানো অসুর’।
    আর অন্ধ্রপ্রদেশ – এই নয়া রাজ্য গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবার পরে এবং এই অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী করা হয়েছিল বৃটিশ আমলের নিজামের হায়দ্রাবাদকে। এছাড়া মোগল আমল থেকেই বিকশিত লক্ষ্ণৌ এর পরের দ্বিতীয় বড় শহর ছিল হায়দ্রাবাদ – এই সেই হায়দ্রাবাদ। অর্থাৎ পুরানা হায়দ্রাবাদ রাজ-রাজ্যকে এর রাজধানী করে নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠিত হয়েছিল।
    তেলেঙ্গনা  – এটা বাড়তি; মানে হল আগের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের এক অংশ এখন তেলেঙ্গনা হয়েছে। ভেঙ্গে গেলেও  বাকি অন্ধ্রপ্রদেশ এখন আগের নামেই তবে আলাদা রাজ্য।
    তামিলনাড়ু – এই নামেই বুঝা যাচ্ছে এটা দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী তামিল এথনিক জাতি-রাজ্য, আগের নাম মাদ্রাজ।
    আর সর্বদক্ষিণে হল কেরালা রাজ্য। এভাবেই পুরানা হিশাবে ভারতের দক্ষিণী চার রাজ্য (নতুন হিশাবে পাঁচ রাজ্য) মিলিয়ে দাক্ষিণার্ত। সমুদ্র সংযোগের দিক থেকে ভারতের নিচের দিকের বা দক্ষিণী অংশ এটা। যার আবার পশ্চিম দিকে আরব সাগর কিন্তু দক্ষিণ দিকটা তখনও বঙ্গোপসাগর বা এর সর্ব-পশ্চিম প্রান্ত – এভাবে বিভক্ত। আর দক্ষিণের আরব সাগরের সংযোগ দিয়েই আরব দেশ থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে ধর্মপ্রচারকেরা আরবদেশ থেকে ১০০০-১১০০ সালের দিকে প্রধানত এই কেরালা দিয়েই প্রবেশ করেছিল। এভাবে প্রথম ব্যাপক মুসলমান সংযোগ ও ভারতে ইসলামের প্রসার শুরু হয়েছিল।  এমনকি খ্রীশ্চানিটিও বিশেষত পর্তুগীজেরাও এই দাক্ষিণার্ত দিয়েই ভারতে এসেছিল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে।

    মোদির হিন্দুত্ববাদের এযুগে এসেও আর্যদের অসমাপ্ত কাজ করার খায়েসঃ 
    এখন,  একালে মোদির হিন্দুত্ব হিন্দিভাষাভাষি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব-আধিপত্য ছড়িয়ে বসেছে। তাই এক অর্থে হিন্দুত্ববাদ যেন আর্যদেরই নয়া অনুসারি এবং ব্রাক্ষ্মণ-ইজম এর ধারা হয়েই থাকতে চায়। যদিও আবার সাধারণভাবে সব হিন্দুভোট তাকে পেতে ও নিতেই হবে। তাই আর্য-ভাব ও ব্রাক্ষ্মণ-ভাব সে প্রকাশ্যে আনে না; অন্তরে চর্চা করে।  আবার জায়গামত জাত-পাত ভেদের বা উচ্চ-বংশের ঠাকুর এর সুবিধাও পেলে উঠিয়ে নিবে। তাই মোদির হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হল তার মানে – এটা পুরানা আর্য-শ্রেষ্ঠত্ব ধারণারই যেন আর এর একালের রূপ  হল আরএসএস-বিজেপি;  পুরানা আর্য কারবারিদেরই যেন একালের এক নয়া উত্থান!  তাই উত্তর ভারতের দিক থেকে দেখলে কর্ণাটক হচ্ছে দাক্ষিণার্তে প্রবেশের এক প্রবেশদ্বার যেন!
    তবে মোদির বিজেপি-আরএসএস এদের খায়েসস হল আর্যদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা। মানে হল দাক্ষিণার্তকেও হিন্দি বলয়ের অধীনে ও প্রভাব প্রতিপত্যিতে নিয়ে আসা। এজন্য গত ২০১৮ সালের সরকার গঠন করার পর থেকে  বিজেপি-আরএসএস এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করতে থাকে যে তারা দাক্ষিণার্ত প্রায় দখল কর্বে ফেলেছে! যদিও বাস্তবে ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়!

    মোদির বিজেপি-আরএসএসের এমন যত স্বপ্ন বা খায়েসই থাক এনিয়ে দুটা বড় ঘটনার কথা বলব।
    এক হলঃ সরাসরি এন্টি-ব্রাহ্মণ আন্দোলন যা প্রথমে সংগঠিতভাবে শুরু হয়েছিল  ১৯১৬ সালে তামিলনাড়ুতে। পরে ১৯৩৭, ১৯৪০ সহ অনেক বারই।  সেবার জাস্টিস পার্টি নামে দল গঠন করে তা শুরু হয়েছিল। পরবর্তিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতে আবার সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল তামিলনাড়ুতে পেরিয়ার রামস্বামী [ E. V. Ramasamy (Periyar)] নামে নেতার হাতে। সেসময় দ্রাবিড়ীয় সমাজে বিয়ে করতে গেলে যেন ব্রাহ্মণ-কে ডাকতে বা নির্ভরশীল হতে না হয় তাই এই আন্দোলন। তারা স্বাধীন ভারতের তামিল রাজ্য সরকারের হাত দিয়ে সংসদে এক সিভিল ম্যারেজের আইন পাশ করিয়ে নেন। যেহেতু রাজ্য সরকারের আইন ফলে ব্রাহ্মণ ডেকে এনে বিয়ে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা এতে নাই হয়ে যায়।  পরবর্তিকালে রামস্বামীর এই আন্দোলনই ১৬৬৪-৬৫ সালের দিকে [এর আগে ১৯৬৩ সালে নেহরু  Official Languages Act in 1963 চালু করেছিলেন – এর বিরুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ও বাধা হিশাবে উঠে এসেছিল। হিন্দি চাপানোর প্রতিবাদে সারা দাক্ষিণার্তে জুড়ে তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। তামিলনাড়ুতে কিছু মানুষ গায়ে আগুন ধরিয়েও প্রতিবাদ করেছিল। এই আইনে সারা ভারতের সব রাজ্যের স্কুলে হিন্দি ভাষা শিখা বাধ্যতামূলক করা হয়। যা দ্রাবিড়ীয় অঞ্চলে কোথাও গ্রহণযোগ্য হয়  নাই।

    আবার ওদিকে, অনেকে মনে করেন এরপরেই নেহরু মারা যান ১৯৬৪ সালে হার্ট এটাকে। তাই অনেকের ধারণা সেসময়ের দুটা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের শক নেহরু শারীরিক-মানসিক ভাবে অসহ্য হয়ে যায় বলে অনেকে মনে করেন।  সে দুই রাজনৈতিক ঘটনার এক হল, নেহেরুর হিন্দি-ভাষার ভারত-সাম্রাজ্য বা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে ভারত গড়ার খায়েস মার খেয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ এবং আসাম দখলসহ (সাথে লাদাখের অনেক অংশ-ভুখন্ড ও জম্মুকাশ্মীরের বর্তমান আকসাই চীন) এর ঘটনা; যেটা  ২১ নভেম্বর ১৯৬২ তে চীন একমাস একদিন পরে স্বেচ্ছায় সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে গেছিল।
    আর নেহেরুর হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার জোড়জবরদস্তির প্রতিক্রিয়ায়, এতে দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্য আরও বেশি করে এন্টি-হিন্দি রাজ্য হয়ে উঠেছিল এবং এখনও সেই সেন্টিমেন্ট বর্তমান যা সবচেয়ে বেশি তামিলনাড়ুতে। সেখানকার ডিএমকে পার্টি এরপর থেকে তামিলনাড়ুতে প্রধান দল হয়ে উঠে আছে। পরবর্তিতে অবশ্য কেবল ডিএমকে দলটাকে ছেড়ে বেরিয়ে আরেকটা আন্না-ডিএমকে দল হয়েছে। যারা দুই দল অদলবদল করে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসে – অন্য কোন দল নাই। ওদিকে নেহেরুর মৃত্যুর পরের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী কম্প্রোমাইজ হিশাবে হিন্দি-কে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারটা কনষ্টিটিউশনে উহ্য করে রাখেন। যেটা পরবর্তিকালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এক অবজারভেশন-রায়ে ঘোষণা করে যে ভারতে রাষ্ট্র-ভাষা বলতে কিছু নাই, ভাষার বাধ্যবাধকতাও নাই। তবে অফিসিয়াল ভাষা বলে অনেক কিছু আছে যা সব মিলিয়ে এখন ইংরাজি ও হিন্দিসহ মোট ২২টার মত।

    গত ১৯১৮ সালের মানে আগের বারের কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল ঘাটতিতে থাকা নয়্টা আসন কিনে নিয়ে। আর তা জুগিয়েছিল কর্ণাটকের আরেক ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী সামাজিক-ধর্মীয় গোষ্ঠি যাদেরকে লিঙ্গায়েত [Lingayat or  Lingayatism] নামে ডাকা হয়।   যারা লিঙ্গায়েত নিয়ে আর একটু পড়াশুনা করতে চান তারা এখানে লেখাটা পড়তে পারেন।  এরা বলাই বাহুল্য হিন্দুত্ববাদের বিরোধী।  এছাড়া  ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব লিঙ্গায়েত রাজ্য-সংসদ সদস্য বিজেপিতে বা কংগ্রেসেই সবাই এমন ছিল না। অর্থাৎ দুদলের মধ্যেই লিঙ্গায়েত সদস্য ছিল। লিঙ্গায়েত-রা কর্ণাটক ভোটারদের মধ্যে ১৭% জনগোষ্ঠি। তা হলেও তারা দুই দলের মধ্ইযে নির্বাচিত সদস্য হয়ে ছিল। কিন্তু মোদি সেবার লিঙ্গায়েতদের জজবা তুলে তাদের সব রাজ্য-সংসদ সদস্যকে দলছুট করে নিজ দলে ভিড়ান। এভাবেই তার নয় আসনের খামতি তিনি পূরণ করে সেবার সরকার গঠনে সফল হয়েছিল।  কিন্তু এবার নির্বাচনের আগে লিঙ্গায়েত হবু রাজ্য-সংসদ সদস্যদের কংগ্রেসে যোগ দিবার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু পরে ফলাফল প্রকাশের পরে একটা রিপোর্ট এমন ফলাফলের ব্যাখ্যা করে বলেছে যে এতে কংগ্রেসের পক্ষ্যে সব লিঙ্গায়েত সদস্যের আসন যায় নাই সত্য। তবুও তা এমন হয় নাই যে কংগ্রেস এতে তেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ শেষ বিচারে ভোট ব্যালেন্স হয়ে গেছে।

    ওদিকে ভোটারদের আরেক বড় চাঙ্ক হল মুসলিম ভোট। কর্ণাটকে মুসলমান ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটারের ১২% এর মত।  আর এতে মোদির সেই পুরানা কৌশল -ইসলামোফোবিয়া আর ঘৃণা ছড়ানী চালু করেছিল। আপনাদের অনেকেরই গত ২০২২ ফেব্রুয়ারিতে মুসকান নামের এক কলেজ তরুণীর সাহসী প্রতিবাদের ভিডিওদেখেছেন; এখানে টুইটারে দেখেন, মনে আছে নিশ্চয়। হা সেটাই ছিল মোদির নোংরা পুরানা কৌশল যে তরুণদের মাঝে হিজাব তর্ক তুললে তাতে ইসলাম-ঘৃণা জোরদার হবে আর হিন্দু-ভোটারদের মুসলমান-বিদ্বেষী করতে পারলে তাতে বেশির ভাগ হিন্দুভোট বিজেপির পক্ষে আসবে – এই ছিল মোদির অনুমান। কিন্তু ভাগ্যের ফের মুসলমান-বিদ্বেষী জজবা তেমন করে কর্ণাটকে উঠে নাই।  মোদি মুসলমান ঘৃণা এতই তুঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন যে তার ২২৪ আসলে প্রার্থীদের মধ্যে একটা আসনেও মুসলমান প্রার্থীকেই রাখেন নাই।  তাই ফলাফল দেখে এখন মনে করা হচ্ছে মুসলমানেরা হিজাব মামলায় আদালতে তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হলেও নির্বাচনের আগে তারা সংগঠিত হয়ে কংগ্রেসের পক্ষে একযোগে ভোট দিতে পেরেছেন।

    এব্যাপারে এটা মনে করা অমুলক হবে না যে  এক্ষেত্রে আমেরিকার সমর্থন মানে মোদিবিরোধী  “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নৈতিক সমর্থন দিয়ে যতটা সম্ভব সহায়তা দেয়া – এটা যথেষ্ট কাজ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিরোধীদলের সবাইকে আস্থা দিয়েছে যে তারা চাইলে মোদির বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে পারে, মোদিকে হারাতেও পারে।  আসলে বিরোধী জোটের পক্ষে অ্যামেরিকান সংসর্গ সম্পর্কে আগেই বলেছি এটা সাবধানী ও পরোক্ষ পদক্ষেপ হলেও গ্লোবাল মহলে মোদি সরকারের আভ্যন্তরীণ পরিচালনায় কতটা সে স্বৈরাচারী আর মূলত মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা প্রচারক – মোদির এই পরিচয়কে বাইরের দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা এক বড় সহায়ক।
    যদিও ভারতের রাজনীতি এপর্যন্ত ভিতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কখনই বিরোধীদলকে বাইরে নিতে দেয়া হয় নাই। এটা সম্ভব হয়ে এসেছে কারণ বেশির ভাগ দ্বন্দ্ব পাকিস্তান বা কাশ্মীর-কেন্দ্রিক। অথবা কখনও পাঞ্জাব বা আসামের মত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমস্যাকে দেশের স্বার্থ বলে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করা হয়ে এসেছে।  এছাড়া জন্ম থেকেই ভারত এত উগ্র জাতিবাদ (যা মূলত হিন্দু-জাতিবাদ) দিয়ে শাসিত- পরিচালিত হয়ে এসেছে যে এটা মূলত শেষবিচারে এক “এন্টি-পাকিস্তানি জাতি” ধারণা; তাই এটা সহজেই এক উগ্র-হিন্দুজাতিবাদ ধারণা হতে পেরেছে। [অনেকে অবশ্য  পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর উল্টাটাও বলবেন।]
    ভারতে কখনই  রাজনৈতিক অধিকারের ইস্যুকে অথবা জনগণের নাগরিক অধিকারের অথবা বাক ও ব্যক্তির অধিকারের ইস্যুকে  যেকোন রাষ্ট্রের গঠনে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখতে দেয়া হয় নাই। এবং সবচেয়ে বড়কথা রাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে সেই রাজনীতিক চিন্তার অভ্যাস বা চর্চাই হতে দেয়া হয় নাই। প্রতিটা উগ্র-জাতিবাদী জাতিরাষ্ট্রে এমনটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক; আর বিপরীতে শাসকের প্রথম পছন্দও [নেহেরু সহ সকল ভারতীয় শাসক] তাই একটাই –উগ্র জাতিরাষ্ট্র– যেখানে জাতিবাদ, দেশপ্রেম, দেশ মাতৃকা ইত্যাদি এসব শব্দের আবেগ-সুরসুরি তৈরি করে জনগণকে দাবায় রাখাটাই শাসকদের কমন কৌশল হয়ে থাকে।
    তৃতীয় বিশ্বের দেশে এমন হওয়ার পিছনে আরেক দায়ী ফ্যাক্টর হচ্ছে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট। আসলে এদের রাষ্ট্র- সম্পর্কিত অস্পষ্ট ও অপুষ্ট ধারণাই  [শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণাই] এজন্য দায়ী।  যেটা অন্যভাষায় মনে করিয়ে দিলে কমিউনিস্ট চিন্তায় অধিকারের ধারণা নাই শুধু না এটা হারাম – এমন হওয়াটাই সেই দায়ী ফ্যাক্টর। নয়া চলতি শতকের শুরু থেকে আবার সেটা জঙ্গীবাদ দমনের নামে বিরোধী রাজনীতিকের নির্মুলকরণ কর্মসুচি হয়ে দাড়িয়েছে।  যদিও আমেরিকা আজ মোদির চাপে দাবিয়ে রাখা ভারতের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে বের করে  মুক্ত  করে আনার পক্ষে কাজ করছে কিন্তু এই  জঙ্গীবাদ দমনের নামে জনগণের অধিকার ও বিরোধী রাজনীতিকে কোনঠাসা করে রাখার পক্ষে শাসকের এই নয়া চর্চার জন্য খোদ আমেরিকার ওয়ার অন টেরর নীতিও কম দায়ী নয়!  আবার, মোদির ক্যাশিয়ার আদানির শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি ও তাতে ধস নামানোর পিছনে এতে পরিবেশ তৈরি করে দিতে অ্যামেরিকার কিছু সহায়ক ভুমিকা থাকায় এর সুবিধা ভারতের বিরোধী দলেরা পেয়েছে। যেমন আদানির পতনের পরে গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটের উতসাহীদের সাথে নিয়ে আরেক শেঠ শেয়ার ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস, তিনি এক আসরে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে আদানিকে সমালোচনা করে শুইয়ে দেয়া – এটা শেষবিচারে ভারতের বিরোধিদের পক্ষে গিয়েছে।  যদিও ভারতের বিরোধী রাজনীতিকদের  আজকে আমেরিকার এই সমর্থন নেওয়ার কিছু নেগেটিভ এফেক্টও আছে যা কার্যকর হতে পারে। তবুও বর্তমানে সতর্কভাবে অ্যামেরিকান এই সমর্থন নেয়াটা খুবই সঠিক ও হালাল কাজ-ই হবে।

     Temple run: Hard lessons for Rahul Gandhi’s ‘soft Hindutva’

    এর পিছনের মূল কারণ হল ভারতের এক বাস্তবতা। সেটা হল আমেরিকা আজ আছে বলেই “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দল” বলে কোন কিছুই ভারতে সম্ভব হচ্ছে যা এতদিন সম্ভব ছিল না। কংগ্রেস বা রাহুল গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক চিন্তায় বড় খামতি এজন্য দায়ী।
    যেমন ২০১৮ সালে থেকেই মোদী বিরোধী রাজনীতি বিশেষত মোদির হিন্দুত্ববাদ বিরোধীরা কিভাবে মোকাবিলা করবেন – এনিয়ে রাহুল ও কংগ্রেস চরম অযোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল মোদির তখন প্রায় পাঁচবছরের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি ছেয়ে ফেলাতে পেরেছিলেন। আর এতে কংগ্রেস ধরেই নিয়েছিল  যে এরপর থেকে ভারতে বোধহয় আর কংগ্রেস নিজের রাজনীতিও হিন্দুত্ববাদকে আপন ও অনুসরণ করে গড়ে নেয়া দিক এসে গেছে। তাই ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের আগে্র বছর গত কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচনে রাহুল নিজে এক মন্দিরে পুজা দিয়ে কংগ্রেসের সফট হিন্দুত্ববাদ চালু করেছিলেন উপরের ছবি ও লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন কংগ্রেসও হিন্দুত্ববাদের নামে ভোট না চাইলে ভারতের হিন্দুরা তাদেরকে আর ভোট দিবে না! এই মিথ্যা অনুমানের পিছনে ছূটতে যাওয়া কংগ্রেস এটাই ইঙ্গিত করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এটা তো হিন্দু জাতিরাষ্ট্র এর ভারত কায়েমেরই প্রথম রাজনৈতিক দল হয়েই গড়ে উঠেছিল।

    অথচ এর বেকুবিপনার পাল্টা উদাহরণ কিন্তু তখনও রাহুলের সামনে ছিল।
    কলকাতার রাজনীতিতে তৃণমূল সেই ২০১১ সাল থেকে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসছে। আর সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় হল যে তৃণমূলের মমতা কখনই কোন ব্রান্ডের কোন হিন্দুত্ব এর নামে হিন্দুদের কাছে ভোট চাইতে হয় নাই, তবু যথেষ্ট হিন্দুভোট তার দল পেয়েছে।   কোন হিন্দুত্ব বয়ান ছাড়াই তিনি লাগাতর তিন তিনবার হিন্দুদের ভোট পেয়ে রাজ্যে সরকার গড়ে চলেছেন। কোন সমস্যা হয় নাই! কেন? তার মানে একবারও এদিকে রাহুল বা কংগ্রেস একবারও চোখ মেলে তাকায়নি! এটাই কংগ্রেস দলের ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাবার পিছনের অন্যতম মূল কারণ, যেন এটা কংগ্রেসের নিজেই নিজেকে যেন বলা যে এই দলের আয়ূ শেষ!!! আজকে রাহুল “ভারত জোড়ো” [ মুসলমান ঘৃনাবিদ্বেষে জনগণ বিভক্ত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে জনগণের একত্র হওয়া বা জোড়া লাগানো পক্ষে এক প্রচারণা] নামে পদযাত্রা কর্মসুচিতে এসেছে।  এটা তখনই কংগ্রেস শুরু করেছে যখন পিছনে অ্যামেরিকান ফ্যাক্টর উপস্থিত হয়ে কংগ্রেস রাজনীতিকে নয়া সাহস ও দিশা দিয়েছে!  অর্থাৎ মোদি যুগের ভারতে সবাইকেই একমাত্র হিন্দুত্ববাদের নামেই ভোট চাইতে হবে – এই মিথ্যা অনুমান থেকে রাহুল ও কংগ্রেস এখন বের হয়ে এসেছে। যেটা না করে স্ফট হিন্দুত্বের পক্ষে দাড়ানোটা শুধু আত্মঘাতিই তা না; কংগ্রেস দল যে মূলত জন্ম থেকেই হিন্দু-ইজমের [গান্ধীর Hinduism -তাও বলা চলে] দল হিশাবে গড়ে তোলা হয়েছিল এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ!

    সবশেষে একটা কথাঃ যদিও কর্ণাটকের নির্বাচনে মোদিবিরোধীরা বিরাট জয় পেয়েছে এরপরেও খুবই শক্তভাবে পাঠক সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এই নির্বাচনের দুটা কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান যারা আইনীভাবে দায়ীত্বপ্রাপ্ত ছিল এই নির্বাচনকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার – এমন দুই প্রতিষ্ঠান হল সুপ্রীম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন।  যাতে এমনকী সরকার বা সরকারি দলের বিরুদ্ধেও নির্বাচনি আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেন। কিন্তু আগের নির্বাচনেওর মতই এখানে এওদুই প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধি দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অপব্যবহার ও হয়রানি করে যাচ্ছে। এমন প্রতিষ্ঠান গুলো যেমন সিবিআই [CBI – Central Investigation boreau), ইডি ED [Enforcement Directorate, For Economic Law], আয়কর অধিদপ্তর ইত্যাদি এগুলো প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিরোধীদের হয়্রানি করা হচ্ছে যাতে চাপে ফেলে বিরোধীদলের নেতাদেরকে সরকারের সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করা যায়। মোদির চাপের কাছে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান নত হয়েছে, মোদির খাম খেয়ালির অধীনস্ত হয়েছে।
    এরকম দশটা ফ্যাক্টর মোদি বিরোধিদলের বিরুদ্ধে এখনও খাড়া করে রেখেছে। The WIRE পত্রিকা এমন দশটা ফ্যাক্টরের কথা উল্লেখ করে রিপোর্ছেট করেছে যার শিরোনাম Ten Factors to Remember Amidst the Congress’s Win and BJP’s Defeat in Karnataka। পাঠকের উচিত হবে এই দশ বাধার কথাও যেন তারা জেনে রাখে।

    কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচন ভারতের সকল বিরোধিকেই সাহস যোগাক যে তাদের একত্রে উঠে দাঁড়াতেই হবে। যদিও সামনে অনেক পথ আর তাতে অনেক যদি-কিন্তু আছে! আপাতত তাদের জন্য শুভ কামনার বেশি আগানোটা আমার জন্য প্রয়োজনীয় নয়!  তাই শুভ কামনা জানিয়ে শেষ করছি!

    +++++++
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা

    চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা
    গৌতম দাস

    ১২ মে, ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4rH

     

         Top Pakistan court orders ex-PM Imran Khan’s release after deadly riots

     

    পাকিস্তানের পিটিআই [PTI] বা তেহরিকে ইনসাফ যার বাংলায় মানে “ইনসাফের জন্য আন্দোলন” – এই  দলের প্রধান ইমরান খান। তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা (যার স্বপক্ষে  ইতিবাচক রেটিং ৬১%) তাঁকে গত বুধবার ০৯ মে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করেছে। অ্যামেরিকান সিএনবিসি [CNBC] নিউজ এঘটনায় শিরোনাম লিখেছে, Former Pakistani Prime Minister Imran Khan arrested amid tensions with military.]  সেনাবাহিনীর সাথে উত্তেজনার মধ্যেই ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদিও আইনত দেখানো হয়েছে যে গ্রেফতার করা হয়েছে পাকিস্তানের NAB [National Accountability Bureau] আইনে ও মামলায় যেটা আমাদের “দুদুকের” মতই যেন এক প্রতিষ্ঠান তবে এটা দুদুকের চেয়ে আরও ক্ষমতাবান আর আমাদের মতই সরকার অনুগত। তবে সরকার গ্রেফতার করেছে বলছি  যে কারণে প্রথমত তা হল, ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে আমাদের র‍্যাব এর কাছাকাছি এক প্যারা-মিলিটারি বাহিনী [paramilitary Rangers] দিয়ে এবং তা ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে। বিশেষত যেখানে আদালত (হাইকোর্ট) আগে থেকেই কোন ধরণের গ্রেফতার না করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। এবং এর পরেও গ্রেফতারের করার বিরুদ্ধে আদালত প্রশাসনকে শো-কজ করেছে। দ্বিতীয়ত, তবে সবচেয়ে বড়  ঘটনাটা ঘটিয়েছে সেনাবাহিনী নিজেই এক উস্কানিমূলক বিবৃতি দিয়ে; এখানে দেখেন । ফলে এটা একটা শাহবাজ সরকার আর বর্তমান সেনাবাহিনী এভাবে নেতৃত্বের যৌথ-উদ্যোগের ফসল হয়ে দাড়িয়েছে, তা্রা চাক বা না-চাক!

    এতে সবমিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। সীমার বাইরে মানে তা সেনাবাহিনীরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে – বুঝতে হবে। কেন তা বলছি কারণ, এক. ইমরানকে গ্রেফতারের সাথে সাথে পাকিস্তানের চার প্রদেশেই ১৪৪ ধারা জারি করে চারজনের বেশি একসাথে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কোথাও “বিক্ষোভকারি জনগণ” তা মানে নাই। রাস্তায় নেমে গিয়েছে  – যা লক্ষণ হিশাবে একেবারেই কারও জন্য ভাল ইঙ্গিত নয়। সবচেয়ে বড় কথা সবপ্রদেশেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে, কোথাও তা সেনাব্যারাক-গেটের বাইরে। তবে লাহোরে পাশের এক সেনা-আবাসনে হামলা পর্যন্ত ঘটেছে।  তাই এর মধ্যে পরিস্থিতি সেনা নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে চলে যাবার উপাদান আছে। এবং এই অর্থে তা যেন পাকিস্তানে অ্যামেরিকান স্বার্থেরও বাইরে চলে যেতে চাইছে।  কারণ, এরই মধ্যে সবচেয়ে খারাপ কাজটা করে ফেলেছে সেনাবাহিনী।  সেনা-মিডিয়া আইএসপিআর [ISPR] এর বিবৃতির নামে তারা ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে। সেটা এমন ভঙ্গিমায় যেন তারা পাকিস্তানের সব আইনের উর্ধে। 

    একটু পিছনে থেকে বলা যাকঃ
    শুধু সেনার প্রসঙ্গটা একটু পিছন থেকে যদি বলি। গতবছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এক জনসমাবেশে যোগ দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে  ইমরান খানের উপর জান-হামলা ঘটেছিল। সৌভাগ্যবশত গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার পায়ে লেগেছিল ফলে তিনি জানে বেঁচে যান। কিন্তু প্রত্যক্ষ সেই আততায়ী বন্দুকধারী স্পটেই জনতার হাতে ধরাও পড়ে যায়। সেটার ভিডিও ক্লিপও ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমরান খান সবসময়ই ভোকাল; তিনি কোনহুমকিতেই ভিতু হন না, চোখে চোখে রেখে কথা বলতে পারেন। দীর্ঘদিন বৃটেনে বসবাসে থাকার কারণে পশ্চিমা ভ্যলুজ ও আচার-কালচার সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল যা থাকাটাই স্বাভাবিক। সর্বোপরি আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোতে সেটা খাটো কোন কাজ ছিল না – বিশেষত দেশকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার থেকে  তা কোন অংশ দূরে বা খুবই খাটো ছিল – এমনটা ভাল মন্তব্য হবে না। আবার এখনকার পাকিস্তানের বিচারে  ইমরান অবশ্যই একজন পাকিস্তানি বড় এলিট কিন্তু আজ তার সেসব অর্জন তাঁর সেসব এলিটজম সবই আজ পাকিস্তানের জনগণের সেবায় তাদের পদতলে সমর্পিত! কাজেই এরচেয়ে মধুর এলিটিজম আর কী হতে পারে!! আবার তিনিই বুকফুলিয়ে বলতে পারেন আমি বিদেশে ডলার পাচার করিনা, দরকার হয় না। বরং দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলে যেসব বিদেশি আয় জমিয়েছি তা সময়ে পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনি।

    তিনি তাই সরাসরি এই হত্যা প্রচেষ্টার জন্য সিনিয়র মিলিটারি অফিসার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সেটাকে “গুন্ডামির” কায়দায় প্রতিহত করার চেষ্টা করতে থাকে। কেন গুন্ডামি বলছি?
    আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় অভিযোগ আনা বা অ্যামেরিকান ভাষায় যেটা ইনডাইক্টমেন্ট (indictment) এর মানে হল “বিচারের জন্য যেসব অভিযোগ” আনা বা তোলা হয়েছে। এটা বিচার করে দেখার আগে [Pre-] করা অভিযোগ। যার সোজা মানে এগুলো অভিযোগ তবে অবশ্যই প্রমাণিত নয়। কেবল শুনানি-বিচার প্রক্রিয়া শেষেই জাজের রায়ে যা প্রমাণিত গণ্য হতে পারে, এর আগে নয়। এর আগে সবই অপ্রমাণিত এবং কিছু অভিযোগ মাত্র।
    সিএনবিসি লিখছে, “…this week for “highly irresponsible and baseless allegations against a serving senior military officer without any evidence,” to which Khan replied via video statement Tuesday: “This is my army and my Pakistan. I don’t need to lie.’ “। যার সারকথাটা বাংলায় বললে্‌, এক সেনা মুখপাত্র ইমরানকে বলেছেন যে ইমরান একজন সিনিয়র সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন। পরে এনিয়ে ইমরান যার এক ভিডিও জবাবে বলেছেন, ” ‘এই হল আমাদের আর্মি এবং আমাদের পকিস্তান! আমার কি আর মিথ্যা বলার দরকার আছে!’ ” অর্থাৎ সেনা ভাষ্যটা হচ্ছে এমন যেন আমাদের গুলশান-বারিধারার কোন এলিট কাউকে ধমকাচ্ছে আর বলছে তো এত বড় সাহস – তুই জানিষ কার বিরুদ্ধে তুই অভিযোগ করেছিস??????

    ফ্যাক্টস হল এটা আধুনিক রাষ্ট্র বা জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র গড়ার যুগ, রাজা-শাসনের যুগ নয়। রিপাবলিক আর রাজার যুগের ফারাক বুঝতে হবে। ফলে যেকোন কারও বিরুদ্ধেই মামলা করা ও অভিযোগ দাখিল এখন জায়েজ। এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক আজকের শাসন ব্যবস্থায়! অন্তত আইনে এটা স্বীকার করে নেয়া আছে!  আর তাতে কোন মামলা “…..প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন” ভাবে কেউ তুলেছে কিনা  সেটা দেখার জন্য তো আদালত ও বিচারক তো আছেই। এটা তো  জমিদারি কায়দায় ধমক দিয়ে কাউকে বসানোর কিছু নাই, এবং ও দিন গয়া! এছাড়া আপনি কথিত জমিদার চাইলে আপনার স্বার্থ দেখভালের জন্য আরও দশটা উকিল-ব্যারিস্টারও লাগাতে পারেন। কিন্তু ধমকানোর তো কোন সুযোগ নাই। এটাই তো গুন্ডামি!! আর সবচেয়ে বড় কথা, কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রে  আমরা কেউ-ই আদালত ও বিচারের উর্ধে নই।  আদালতই আমার বিরুদ্ধে যেকোন অভিযোগের বিচার করে দেখতে পারে; খালাস অথবা শাস্তি দিতে পারে।  এমনকি সেনাপ্রধানসহ যেকোন  সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে কোন সিভিলিয়ানের অভিযোগ যদি সেনাদের মনে হয় সেটা সেনা আদালতের ভিতরে হওয়া উচিত তাতেও কোন সমস্যা নাই। সিভিত আদালতে মামলা উঠার পর সেনারা আপীল দিতে পারেন এই যুক্তিতে যে কেন এই  মামলাটা সেনা আদালতে হতে হবে, সেনা প্রতিষ্ঠানও নিশ্চিত করুক যে তারা বিচারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে আর তা সিভিল বিচারক যদি তার রায়ে এব্যাপারে একমত হয় তাহলে তো হয়েই গেল। আর যদি সিভিল বিচারক নিজেই বিচারের ইক্তিয়ার দেখেন তিনি বিচার চালু রাখবেন আর সেনাদের তা মানতে হবে। এনিয়ে কারোরই নিজেকে সব আইনের উর্ধে বা কোন রাজা বা এলিট ভাববার তো কোন সুযোগ নাই, প্রয়োজন নাই।

    অ্যামেরিকান ভুমিকাঃ
    আমাদের অনুমান এখানেই আমেরিকার অন্তত কিছু  ইতি ভুমিকা আছে; কারণ, পাকিস্তানে অ্যামেরিকান অনেক বড় স্বার্থ জড়িত আছে। যদি শুধুমাত্র চলতি শতকের শুরু থেকেই দেখি সেদিকে তাকাই তবে বলতেই হয় যে  ২০০১ সালের ওয়ার অন টেররের লঞ্চিং প্যাড ছিল পাকিস্তানের ভুমি। এবং খামোখা বিনা কারণে জাস্ট অ্যামেরিকান স্বার্থে পাকিস্তানকে আমেরিকা তার লঞ্চিং প্যাড হয়ে থাকতে ২০ বছর ধরে বাধ্য করে গেছে। কোন আইন বা ন্যয্যতা ছাড়াই। লঞ্চিং প্যাড মানে যেমন আফগানিস্তানে মারা আমেরিকার প্রতিটা বোমা বা উড়ে যাওয়া প্রতিটা যুদ্ধযান পাকিস্তানের ভুমি ইচ্ছামত ব্যবহার করেই তা করেছিল। এমনকি আফগানিস্তান তো ল্যান্ড লকড দেশ; কাজেই সেখানে প্রবেশ করতে গেলে পাকিস্তানের উপর দিয়ে তাদের যাওয়াই ছিল একমাত্র উপায়, ভরসা ও সহজ। আর এতে পাকিস্তানের প্রতিটা সাধারণ মানুষের জনজীবন আমেরিকার প্রতিটা ততপরতায় একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। তাদের জীবনযাত্রা যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমেরিকা ভাবতে পারে পাকিস্তানের দুই পুরানা দলের  [নওয়াজের মুলসিল লীগ ও ভুট্টোর পরিবারের পিপিপি] নেতাদেরকে তো আমরা যথেষ্ট পয়সা খাইয়েছি তারা বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে – কিন্তু কে না জানে এসব করে এতে কিছুই শোধ হয় না বা এগুলো কোন প্রতিদানও নয় ঘুষ মাত্র!  এখন একালেও আমেরিকা যদি বুঝমান ও বুদ্ধিমান আচরণ করতে চায় তাহলে অন্তত নতুন করে আর অপরাধের মাত্র না বাড়িয়ে একালের যেকোন গণমানুষের স্বার্থের ইস্যুতে সহানুভুতি হয়ে থাকতে পারে। অন্তত কিছু পাপ ধুয়ে যাক এতে, একটু মন জয়ের চেষ্টা করুক!!! এটা কী খুব বেশি চাওয়া? যদি আমেরিকার তাই মনে হয় তবে বুঝতে হবে আমেরিকার গ্লোবাল নেতা থাকার দিন ফুরিয়েছে!

    নিশ্চয় আমেরিকার জানা আছে ইমরানের পিটিআই-ই একমাত্র পাকিস্তানি রাজনৈতিক দল যে আমেরিকার এই পাকিস্তানকে লঞ্চিং প্যাড হতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে কথা তুলে তৈরি হয়েছে। নিশ্চয় বুদ্ধিমান ও প্রাকটিক্যাল অ্যামেরিকান নীতিনির্ধারকেরা মানবেন যে এজন্য অ্যামেরিকার পাকিস্তানের পিটিআই দলকে আগাম এনিমি ঠাউড়ে রাখা কোন কাজের কথা নয়। এটা স্টুপিডিটি হবে।  বরং পিটিআই এর সাথে ইতিবাচকভাবে সহানুভুতির সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টার মধ্যেই সবার ভাল লুকিয়ে আছে – ইতিবাচক কোন কিছু শুরু হতে পারে সেখান থেকে।

    তাহলে কী করতে হতঃ
    একালের দুনিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা অভিমুখ হল গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের বিকাশ ঘটানো।
    মানে ব্যাপারটা যদি পাবলিকের স্বার্থের চোখে দেখেন তাহলে এটা হল যে কলোনিদখল যুগের শেষ বা ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত স্বাধীন আমাদের মত দেশগুলোতে – গ্রাম থেকে লোক জমি থেকে থেকে উচ্ছেদ হয়ে শহরে কাজ- ও নয়া জীবনের খোজে আসতেই থাকে এটা সব দেশেই স্বাভাবিক ঘটনা-ফেনোমেনা। কিন্তু শহরে এসে যে টেম্পর হেলপারির চাকরি জুটাতে পেরেছে তাযদি দেখা পরের পাঁচটা প্রজন্ম হয়ে গেছে কিন্তু জীবন মান একই জায়গায় থেকে গেছে – এটাই হল কমিউনিস্ট চিন্তার নেগেটিভ প্রভাব ও মারাত্মক নেগেটিভ অচলায়তন প্রভাব।  এটাই হল অর্থনীতিতে কোন দিকে বিকশিত হতে না দেওয়া। যেন চারি-তে কুকুরের শুয়ে থাকা। যেখানে চারি মানে হল মাটির বড় পাত্র যা গো-পালন ঘরে গরুকে খৈল-ভুসিতে মেখে দেয়া খাদ্যদানের মাটির পাত্র – যেখানে থেকে গৃহপালিত গরু আরামে খেতে পারে। কিন্তু সময়ে আবার এও দেখা যায় যে একটা গৃহপালিত কুকুর ঐ চারিতে আরামে শুয়ে আছে।  চারি কুকুরের খাদ্য-পাত্র নয় অথচ সেই পাত্র কুকুর দখল করে রেখেছে আর গরুকেও খেতে দিচ্ছে না। এটাই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামের অর্থনৈতিক চিন্তার জন্য খুবই প্রতিকী! তাদের অর্থনীতি-চিন্তা  এরকমই যে নিজে ঐ পাচ-প্রজন্মকে ঐভাবে টেম্পো হেল্পার করে আটকে রেখেছে বাড়তে দেয় নাই; নিজেরাও দেশের অর্থনীতিকে বাড়তে দেয় নাই – যেমন বিদেশি পুঁজি হারাম জাতীয় নানান আপ্ত বাক্যে।
    এই বিচারে একালের অভিমুখ হচ্ছে আর তথাকথিত কোন আদর্শ আর নয়, বরং গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের নুন্যতম বিকাশ ঘটানো – গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমার জন্য বিশেষ কী সুবিধা লুকিয়ে আছে তা তালাশ করে [Comparative advantage] বুদ্ধিমানের মত তা নিজ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে কাজে লাগানো। গরীবের জানগুলো একটু বাচুক, একটু শ্বাস নিতে দেন আগে পরে বাঁচলে কোন বাপের নাম আবার নিব না-হয়!!!!!।

    আসলে বলতে চেয়েছি পুরানা অচল স্থবির চিন্তা থেকে বের হতে হবে। আর তাই, একালেও পছন্দ না হলে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে গ্লোবাল নেতাদের ভিনদেশের অপছন্দের কোন প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট মেরে ফেলা এগুলা খুবই পুরানা ধারণা। অন্তত কোল্ডওয়ারের পরের যুগে এবার তাতে ক্ষান্ত দেয়ার সময় হয়েছে মানা উচিত।  একালে চীন-ভারত ঝগড়াও করে আবার ব্যবসায় করে সমান তালে। এটাই বর্তমান কাল তা বুঝতে হবে! এসব  খুনোখুনি কলোনি আমলে, কিংবা কোল্ড ওয়ারের যুগে এমনকি আশির দশকের ইউরোপেও হয়ত মানাত। কিন্তু নয়া শতকে সেটা আর নয়, তা একেবারেই বেমানান; অনেক হয়েছে আর নয়। যেই ঘটাক ইমরানকে আততায়ী দিয়ে হত্যা প্রচেষ্টা এটা খুবই নিম্নমানের চিন্তা, কাজ-আচরণ। এটা অগ্রহণযোগ্য। একালে যাকে শত্রু মনে হচ্ছে তার সাথেও বাণিজ্য- ব্যবসায়ীক সম্পর্ক রাখতে জানতে হবে। এটাই একালের ট্রেন্ড, ও নয়া বৈশিষ্ট।

    তাহলে আমেরিকার ভুমিকা কী হতে পারত?
    এসব আততায়ী-মার্কা ঘটনায় আমেরিকার কোনও সংশ্লিষ্টতা নাই ধরে নিয়েই বলা যায়, আমেরিকার অনেক কিছুই করণীয় ছিল, নিজ স্বার্থেই। তার উচিত ছিল অন্তত বিবদমানদের মধ্যে মধ্যস্ততার ভূমিকা নেয়া, এভাবে করে ব্যাপারটা বাড়তে না দেয়া।  প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত  হতে হত – আমেরিকাকে লিড নিতে হত –  সবপক্ষই যাতে মানে ও গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট তদন্ত ও বিচারের ভিতর দিয়ে ইস্যুটার সমাপ্তি টেনে মিটিয়ে দেওয়া।
    ওদিকে যদিও এটা ঠিক যে  ২০১৮ সালের পরে একালে আমেরিকাকে পাকিস্তানে জায়গা করে নিতে হয়েছে নওয়াজ-শাহবাজ (সেই সাথে ভুট্টো পরিবার) গংয়ের হাত ধরে, যারা চিহ্নিত সম্পদ লুটেরা। এভাবে স্টার্ট আপ – এটাই আমেরিকার কপালের দুর্ভাগ্য! বাইডেন প্রশাসনের জন্য এটা খুবই খারাপভাবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের শুরু! যে সম্পর্কের কোনই নুন্যতম স্টান্ডার্ড নাই। যেন কোন নীতি-পলিসির বালাই না থাকাটাই স্বাভাবিক!

    এখন এর শেষ হবে কোথায়?
    পাকিস্তানের শাহবাজ সরকার এক অদ্ভুত রেওয়াজ চালু করেছে; এতে এই সরকার কত অক্ষম অপারগ ও অযোগ্য আর আনফিট এরই প্রমাণ । তিনি প্রধানমন্ত্রী বলছেন তিনি চীফ জাস্টিসের রায় মানবেন না??????  কারণ চীফ জাস্টিস সমন্বয়ে গঠিত এক আদালত রায় দিয়েছিল যে মে ২০২৩ মাসের মধ্যে প্রাদেশিক নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এদিকে মিডিয়া আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে জেনারেল মোশাররফের পরের পাকিস্তানে  এপর্যন্ত আদালত  দুইটা প্রধানমন্ত্রীকে শ্রেফ রায় দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তা যেন আমরা মনে রাখি!!!

    তাহলে পাকিস্তানে সিভিল সরকারের ভবিষ্যত কই?
    সেনাবাহিনী কী তাহলে শাহবাজ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে ক্ষমতা নিবে?  আর তখনও কী আমেরিকা বসে দেখতেই থাকবে – কিছু না ছুয়ে বা না দেখে? আর কাউকে কী আমেরিকা বিশ্বাস করাতে পারবে যে সে কিছুই করে নাই?  আর তাতে কী তার ইজ্জত বাঁচবে?
    পাকিস্তানের সামরিক শাসন নিয়ে সেই অর্থে একটা মৌলিক ঘটনা জেনে রাখা ভাল হবে।  কোল্ডওয়ারের আমলে মানে সোভিয়েত আমলে বা ১৯৫৩-১৯৯২ এই সময়কালের এক কমন ফেনোমেনা ছিল, আমাদের মত গরীব দেশে পপুলার কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার কাছে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়ে আমেরিকাকে একমাত্র নির্ভর করতে হত কোন  সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে। আর এটাকেই যেন সামরিক বাহিনী ক্ষমতালোভী বলে তারা নিজ ইচ্ছায় এমন করে থাকে বলে প্রচার করে থাকে; তারা একদল সুশীল বা বাকশাল-পছন্দের লোক এমন করে থাকে যেমন প্রথম আলোর (মৃত) মিজানুর রহমান খান বা একালের সোহরাব হাসান। আবার প্রায় একই চিন্তার আরেক বৃটেন প্রবাসী পাকিস্তানির অধ্যাপক আছেন নাম আয়েশা সিদ্দিকা [Ayesha Siddiqa] । এটা আমাদের মত দেশের সেনাবাহিনী নিজে নয় বরং এর পিছনে আমেরিকার কাজ করার ধরণই তাদের এমন করেছে – এই অংশটা তারা অজানা রেখে দিতে চায়। এনিয়ে রান্ডের [RAND Corporation] এক গবেষণা রিপোর্ট আche.

    সংক্ষেপে ঘটনাটা হল – গত ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাওয়ার কালে সেসময় ১৯৯৩ জানুয়ারিতে ক্ষমতার শপথ নিয়েছিলেন বিল ক্লিনটন – সেটা তার প্রথম টার্ম ছিল আর তিনি দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  অ্যামেরিকান রাজনীতি নির্ধারিত হওয়ার একটা বড় সামাজিক জায়গা হচ্ছে ওর থিঙ্কট্যাংকগুলোর যে সমাজ সেখানে; কারণ তাদের থিঙ্কট্যাংকগুলোর ফান্ড সংগ্রহ ও ফান্ড ব্যবহারের কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয় হয়ে থাকে ইনফরমালি কিন্তু খুবই নিবিড়ভাবে – এসব সামাজিক ইনফরমাল আসরে বসে। র‍্যান্ডের ঐ রিপোর্টে আছে – এমনই এক ইনফর্মাল সভায় থিঙ্কট্যাংকগুলোর যুক্তি ছিল  – এতদিন আমেরিকান ধারাবাহিক সরকার- প্রশাসনগুলো সোভিয়েত উপস্থিতির যুক্তি দিয়ে বলত ওদের প্রপাগান্ডার জন্যই আমাদের মত দেশে আমেরিকা অজনপ্রিয় আর সেটা পূরণ করতেই আমেরিকাকে সামরিক আইন জারি করে ওসব দেশে ক্ষমতা ও প্রভাব চর্চা করতে হয়ে থাকে। অতএব সোভিয়েত পতনে যেহেতু দুনিয়া এক-মেরুর হয়ে গেছে, অ্যামেরিকান এক-মেরুর দুনিয়া – তাই এখন থেকে অ্যামেরিকান সরকার-প্রশাসকদের সামরিক শাসন থেকে সরে আসার নীতি নেয়া উচিত। এটা সবচেয়ে ভাল সময়। এই প্রেক্ষিতে তাই   ক্লিনটন বা ডেমোক্রাটদের  পক্ষ থেকে  থিঙ্কট্যাংকগুলোর কাছে প্রতিশ্রতি দেয়া হয়েছিল যে তারা আর আমাদের মত দেশকে সামরিক শাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে না।  এর পিছনে মূল আর্গুমেন্ট ছিল যে দুনিয়া যেহেতু আমেরিকাই এক  পরাশক্তির কাজেই আমেরিকার আর সেনা শাসন দরকার হবে না। [যদিও ভারত-পাকিস্তান কারগিল সীমিত যুদ্ধ (১৯৯৯) হয় আর এর সব দায় মোশাররফ এর বলে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী  নওয়াজ ভারতের কাছে মন্তব্য করেন, পরে তিনি মোশাররফকে ক্ষমতাচুত করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া আর শেষে কার্যত পালটা মোশাররফ এর নামেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্ষমতাদখল করেছিল –  শ্রীলঙ্কা থেকে মোশাররফকে বহনকারী  বাণিজ্যিক বিমানকে করাচীর মাটিতে নামতে জায়গা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল যা নওয়াজ সরকার কিছু সময় আটকে রেখে দিয়েছিল।] এই ঘটনার পরে ক্লিনটন তাই সামরিক ক্ষমতা বলেই মোশাররফ এর (১৯৯৯ সালের) এই ক্ষমতা দখলকে স্বীকৃতিই দেয় নাই। চলেছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। এরপরে, ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন বুশের আমলে টুইন টাওয়ার হামলার দিনের শেষভাগে  সেকালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোলিন পাওয়েঙ্কে সিএনএন-এ স্বীকার করে নিতে দেখা যায় যে তারা মোশাররফ সরকারের সাথে কাজের কথা বলেছেন – অর্থাৎ তখন থেকে কার্যত বুশের আমেরিকা পাকিস্তান সরকারকে স্বীকার নিচ্ছে। তবে এখন এতকথা বলার মূল বাক্যটা হল, এরপর থেকে পিছনের এই কারণেই  এতদিন পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতাদখল আর কখনও হয় নাই বলে মনে করা হয়।

    তাহলে স্বভাবতই প্রশ্নঃ  পাকিস্তান সেনাবাহিনী কী  এবার আবার ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে আবার ক্ষমতাদখলের পথে রওনা দিবে? আর তারপরেও এবার আমেরিকা  কাউকে কী বিশ্বাস করাতে পারবে যে সেকিছুই করে নাই, ভুমিকা নাই?

    একাল আর সেকাল অনেক ফারাকঃ
    এমনিতেই দুনিয়ার সব “একাল আর সেকালে”  এর মধ্যে  অনেক ফারাকই থাকে, থাকবেই। তাহলে আর এবারের আলাদা বিশেষত্ব কী? মানে এবার গ্লোবাল নেতা হিশাবে অ্যামেরিকার ক্ষেত্রে এর আর বিশেষত্ব কী?
    আগে একটু বলে নেই। গ্লোবাল নেতা কথাটার অর্থ কোল্ডওয়ারের আমলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া হত এর অর্থ পরাশক্তি  – মানে সামরিক পরাশক্তি বা পরাশক্তিগত সামর্থ। অথচ একালে মানে ১৯৯২ সালের পরে থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে ধারণাটা মোটেও  সামরিক নয়। এটা আসলে মূলত দুনিয়ায় মানে কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিসরে সামর্থ কতটা। অর্থাৎ নিজ অর্থনীতিতে এক বিপুল উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের নয়া এক নিরন্তর ধারাবাহিক সক্ষমতার দেশ হওয়া যা অন্তত পরের শতবছর ধরে এমনি টিকে থাকবে। যারা আরও আগ্রহী তারা “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” নামের একটা ধারণার তালাশ করতে পারেন। গত ১৯৪১ সালের অ্যামেরিকান টাইমস ম্যাগাজিনের এক নয়া সহযোগী পত্রিকার যার প্রচ্ছদ কাহিনীর নাম ছিল এই “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” । আমার কোন পুরা লেখায় এই আর্টিকেলটা সংযুক্ত আছে – সেটা এখানে দেখতে পারেন। কেন ওর নাম “দ্যা অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী”  হল তা বুঝতে হবে। আরেকভাবে বললে এটাই বিনিয়োগ করার সামর্থ বিশেষ করে সারা দুনিয়ার গরীবদেশগুলোকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঋণ [Infrastructure Dev. loan] এবং সাথে এফডিআই [FDI]  দেওয়ার সক্ষমতা আর তা রাষ্ট্রীয় ভাবে বা বিশ্বব্যাংকের মত নানান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা কথাটার অর্থ এটাই – এভাবে একালে বুঝতে হবে।

    এই সক্ষমতার বিচারেরই একালে আমেরিকা চীনের চেয়ে অনেক পিছনে পড়ে গেছে। এই উপলব্দি বা বুঝাবুঝিটা এমন না যে  আপনার পছন্দ  আমেরিকা, আর আমার পছন্দ চীন সেজন্য আমি প্রসঙ্গটা তুলছি আর তাই আমি আর আপনি ভিন্ন ভিন্ন কথা বলব।  এমন না।  যখনই কোন দেশে একালে অ্যামেরিকান এই ঋণ-বিনিয়োগ সক্ষমতায় ঢিলা পড়ছে – মানে সরাসরি জি-টু-জি বা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ-বিনিয়োগ দিতে পারছে না  – আর তখনই ঐ ফাঁক দিয়ে চীনা ঋণ-বিনিয়োগ বিপুল পরিমাণে ঢুকে পড়ছে।  আবার কোন দেশের  চীনের কাছে নেয়া ঋণ তা সময়কাল পুর্ণ হবার পর ফেরতদান যদি ডিউ [due] মানে বকেয়া হয়ে যাবার তারিখ পার হয়ে যায় তবে অনুরোধ করলে চীনের সেই তারিখ আরো দু এক বছর বাড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ প্রচুর – এটাও চীনের আরেক শক্তি অন্য গ্লোবাল নেতা  অথবা এর কাছাকাছি দাবিদার  যে কারো তুলনায়!

    যেমন ধরা যাক আমেরিকা সাপোর্টেড শাহবাজ-ভুট্টো সরকার ক্ষমতায় এলো ইমরানের সরকারকে সরিয়ে। এখন এমনিতেই অর্থনৈতিক চরম সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে জাগিয়ে তুলতে শাহবাজ সরকারকে চীনে দৌড়াতে হবে কেন? এটা অড! কেন আমেরিকা এই সহায়তা করার উপযুক্ত থাকবে না – এটাই একালের আমেরিকার সামর্থের প্রশ্ন! পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তারের রাজনৈতিক সামর্থ তার অটুট আছে কিন্তু অর্থনৈতিক সামর্থ ছাড়া রাজনৈতিক সামর্থ অকেজো – এটাই প্রমাণিত হচ্ছে! এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ আমেরিকাকে যদি কাজ করতে হয় তবে কোনভাবেই এসব সেনা গুন্ডামি সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না। সেনা বনাম জনগণের সংঘাতে নিশ্চুপ দর্শক হতে পারে না। এটা আত্মঘাতি!

    এককথায় বললে, আমেরিকান যেকোন ব্যর্থতা, বোকামি বা ভুল এর সুযোগ আপনাতেই বিপরীতে চীনের কোলে গিয়ে জড়ো হবেই। তাতে আমরা কে অ্যামেরিকান সমর্থক আর কে চীনের – সেটা অপ্রয়োজনীয়। তা চোখে আঙুল দিয়ে পাকিস্তানের পরিস্থিতি আমাদের দেখাচ্ছে!

    এর উপরে শাহবাজ সরকার এই কথিত বিরাট নায়ক NAB (মানে যেন আমাদের দুদুক), NAB – তারা শাহবাজকে অর্থ পাচার মামলায় নির্দোষ সার্টিফিকেট দিয়েছে। এটাও কী আমেরিকা বসে বসে দেখবে?
    এদিকে সর্বশেষ খবর হল সুপ্রিম কোর্ট গত ৯ মে, NAB [এটাই Al-Qadir Trust case] মামলায় ইমরানকে নাটকীয়তা করে গ্রেফতারকে অবৈধ ঘোষণা করে ইমিডেয়েট রিলিজ করে দিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে।  আর এসব সমস্ত ঘটনাবলীতে অ্যামেরিকান অবস্থান কোথায়, কোথাও প্রকাশ্য সে হদিস নাই। আর সেনাবাহিনীর অবস্থান তাহলে এখন কোথায় দাঁড়ালো? সেনাদের গণবিরোধী [anti-people] ইমেজ এটা অবশ্যই পাকিস্তানের আমজনতা পাবলিকের কাছে আমেরিকা-ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে।

    আর ওদিকে আগামিতে যে মেজর সংঘাতের ইমেজ বা আগমনিবার্তা এসবের ভিতর দিয়ে উঠে আসছে তাতে আদালত শাহবাজ সরকার  ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে  আদালত-নিজস্ব তার ক্ষমতাকে সংহত ও প্রো-পাবলিক এবং তা ন্যায্য বলে প্রতিভাত করে নেয়ার সুযোগ তৈরি করে ফেলল। আর সেনাবাহিনী এখানে দুধ-আম এক হয়ে যাবার পর নিজে শুকনা আঠি হয়ে পাত্রের বাইরে গড়াগড়ি দিচ্ছে.. এমন অবস্থায় চলে গেল।  আগামিতেও তা দিতে থাকবে। অর্থাৎ আদালতের পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের রায় ও নির্দেশ অমান্যের দায়য়ে এবার শাহবাজ  সরকার শজেই অভিযুক্ত হবে। এবার জনসমর্থন নিয়ে এখন সুপ্রিম কোর্ট  নিজ প্রাতিষ্ঠানিক অথরিটি  প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে যাবে – যার অর্থ শাহবাজ সরকারের জন্য খারাপ সময়ের দিন সামনে , এরই ইঙ্গিত!

    আমেরিকা মনে করতে পারে, দাবিও করতে পারে বা নিজেকে বুঝ দিতে পারে যে তারা পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এতে তাদের কিছু বলার নাই করার ছিল না; কাজেই তারা নিরপেক্ষ। কিন্তু সমস্যা হল পাকিস্তানের আম-পাবলিক মাইন্ডে এটা জায়গা পাবে না। পাকিস্তান আর্মি আর আমেরিকা যে আলাদা – আলাদা তাদের স্বার্থ ও উপস্থিতি তা যতটুকুই সত্য হোক না কেন পাবলিক মাইন্ডে – তারা আলাদা – এমন ধারনা তৈরি করার পক্ষে আমেরিকা এতদিন কোন কাজ করেছে বলে জানা যায় না।

    তবে এপর্যন্ত পুরা ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে লুজার – সবচেয়ে ইমেজ খুয়ানো ক্ষতিগ্রস্থ সংগঠনের নাম হল পাকিস্তান সেনাবাহিনী – সে এখন সত্যিই গণবিচ্ছিন্ন একটা বোঝা –  অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও! আভ্যন্তরীণ নিজ জনগণকে থ্রেট করা বা ধমকানো এ্টা দুনিয়ার কোন সেনাবাহিনীর কাজ হতে পারে না।  কিন্তু তাই ঘটেছে পাকিস্তানে – বর্তমান সেনা নেতৃত্ব এমনই বোকা আত্মভরি, উদ্ধত ও আন-সিভিল! তাহলে ইতিহাস বোধহীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইমরানের গ্রেফতারকে ও ততপরবর্তি জনবিক্ষোভকে কালো অধ্যায় [BLACK CHAPTER] বলে চিহ্নিত করেছিল – তার কী হবে এখন???
    যদিও পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি এখন ৩৬% এর উপরে। ফলে জীবনের উপর উঠে পড়া এই কঠোর সময়েও পাবলিকের রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ, এটা উদাহরণ হয়ে থাকবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

     

     

  • বিগ-বি তে আমেরিকাকে দেখা যাচ্ছে না, ফলাফল? 

    এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ঢুকে পড়ার পথ দুইটা
    কিন্তু জাপান-ভারত-বাংলাদেশের কথিত বিগ-বি তে আমেরিকাকে দেখা যাচ্ছে না, ফলাফল?

    ০৯ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4qz

     

                                          The Big-B Initiative: Alive or Dead? 

     

    এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ঢুকে পড়ার এপর্যন্ত দুইটা পথ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এশিয়ায় আমেরিকাকে প্রবেশের বিশেষ পথ খুঁজতে শুরু করতে হল কেন ও তা কবে থেকে?
    যদিও গত শতক পর্যন্ত এশিয়া তো গতানুপতিকতা ভাবেই অ্যামেরিকান নেতৃত্বে বয়ে গেছিল।  চীনা উত্থান ঘটনার উল্লেখ করার মত কিছু ঘটে নাই, কোন চিহ্নও ছিল না। কেবল, ডাবল ডিজিটে চীনা জিডিপি বাড়ছিল যেটা বিগত ১৯৯০ সাল থেকে সেটা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন লক্ষণ ছিল না। এমনকি ২০০৮ সালের যে গ্লোবাল মহামন্দা [বাড়তি পড়তে আগ্রহিরা দেখতে পারেন The Great Recession and Its Aftermath] ; এটাকে আমেরিকা সরকারি ভার্সানের এক বয়ান মনে করা যেতে পারে। তারাও জেনেছিল যে এই মহামন্দার কেন্দ্রভুমি মূলত পশ্চিমা জগতেই; মানে এশিয়ায় এর প্রভাব তেমন দৃশ্যমান নয়। একমাত্র চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সেটা ১৯৯০ সাল থেকে এক নাগাড়ে ১৭-১৮ বছর চলার পরে সেই প্রথম ৮-৯% এভাবে ক্রমশ সিঙ্গেল ডিজিটের দিকে নামতে শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ গ্লোবাল ইকনমি (যেটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম) বলতে যেটা আমরা বুঝি সেটাও মাত্রার দিক থেকে তখনও তত গ্লোবাল হয়ে উঠে নাই – পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার আর এশিয়ার বাজারগুলো ততটা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে নাই – গভীর বাণিজ্য লেনদেনের সম্পর্কই এই পারস্পরিক নির্ভরশীল এক গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে উঠে, তা তখনও ছিল না।  কিন্তু এখন সেটা অনেক ইন্টিগ্রেটেড বা পরস্পর সম্পর্কিত। বিশেষ করে সারা এশিয়া দেশগুলোর বাজারে চীনা উপস্থিতি ও চীনের যায়গা করে নিয়েছে অনেকখানিই।
    প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ত্রিদেশীয় সফর ছিল মূলত ইমেজ তৈরির সফর, দেশের অর্থনৈতিক সংকট বিশেষত বৈদেশিক রিজার্ভের দৃষ্টিকটু ঘাটতি যা সাধারণ মানুষ পর্যায়ে তাদের জীবনেও অনুভুত হয়ে গেছে ভালভাবেই। অথচ আসন্ন নির্বাচন যেমনই হোক বা না হোক – সরকারের ইমেজের প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তাই তিনি রাজনৈতিক নুন্যতম অধিকার দিতে পারেন আর নাই পারেন সরকার “উন্নয়নের চ্যাম্পিয়ান” এই ইমেজ তৈরিই মূলত এসফরের লক্ষ্য ছিল।  সরকারের প্রায় ১৫ বছরের আয়ুতে কেবল ২০১৬ সালের পরেই (চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর সফর) সরকার উন্নয়ন করছে বলে মনোযোগ টানা শুরু করতে পেরেছিল। এর একদম খাড়া কারণটা হল অবকাঠামো ঋণ [ যেটা ইংরাজিতে – Infrastructure Development Loan বা  ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলবমেন্ট লোন-  এথেকেই বাংলায় উন্নয়ন শব্দটা এসেছে] এর দাতা ছিল একচেটিয়া বিশ্বব্যাংক। এটা বলাই বাহুল্য বিশ্বব্যাংকের লোন নিয়ে কোন দেশ “উন্নয়নের চ্যাম্পিয়ান” দাবি করে নাই, করা যায় না। এর মূল কারণ, আমাদের মত দেশ যাদের সকলেরই এমন বিশাল ঋণ চাহিদায় ভুগছে যেটার খুবই অল্প অংশই কেবল বিশ্বব্যাংক (এর নিজস্ব ফান্ড ক্যাপাসিটি) পূরণ করতে সক্ষম।  তাই ২০১৬ সালের আগে আমরা ছিলাম উন্নয়নের ঋণ পাবার দিক থেকে সাপ্রেসড বা চাপিয়ে রাখা দেশ। আর আরেক সবচেয়ে বড় অ্যামেরিকান বোকামির খেসারত দিয়েছে আমেরিকা। তারা ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করেছিল। এই অভিযোগ কতটা সঠিক বা বেঠিক আমরা জানতেই পারি নাই। তবে আমেরিকা যে অবিবেচক আনপ্রফেশনাল এটা একেবারেই প্রমাণিত। তারা দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করেছে  ভাল কথা কিন্তু বছর দুই ঘুরতেই নিজেরাই সে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তাহলে প্রধান প্রশ্ন অভিযোগ দায়ের কেন করেছিল? যথেষ্ট চিন্তাভাবনা না করেই? যারা এত কম চিন্তা করে কাজ করে তারা কী প্রফেশনাল??  এরপরে আরও বড় প্রশ্ন আছে।  চীন যে এই শতকে বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে অবকাঠামো ঋণ দানের সুযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠে আসছে – সেটা কী সারা অ্যামেরিকান প্রশাসন বা বিশ্বব্যাংকের পরিচালকেরা কেউ খেয়াল করে নাই?? বাংলাদেশের সাথে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক ঝুলে গেলে এটাই যে চীনের বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার সুযোগ হিশাবে হাতে এসে যাবে – এটা যে আমেরিকা বুঝেই নাই সেই আমেরিকা তো ডুবে মরবেই…। নাকি!!!
    তাই এটা একটা ক্লাসিক উদাহরণ যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনা উত্থানের সক্ষমতায় সে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবেই এবং ছাড়িয়ে গেছিল এর হাতে নাতে প্রমাণ। তাই এভাবে বলা যায় পুরানা নেতা আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতায় চীন সক্ষমতায় এগিয়ে যাওয়া চীন আমেরিকাকে পরাজিত করে নিজ প্রভাব বাড়িয়ে নিয়েছিল; আর আগিয়ে যাওয়ার সেটাই ছিল শুরু। বিপরীতে আমেরিকা পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছে।

    আমেরিকা এশিয়ায় কতটুকু আগিয়েছেঃ
    বহু পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর একালে এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ইন্টারভেনশন বা হস্তক্ষেপ বা পদক্ষেপ নিয়ে ঢুকে পড়তে এখন শেষ পর্যন্ত দুটা পথ বা পাটাতন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও মনে রাখতে হবে এটা চীন-আমেরিকার মধ্যে এশিয়ায় কোন অবকাঠামো ঋণ দান করে নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়। চীন সেটাতেই নিজেকে আকড়ে ধরে থেকেছে  বটে কিন্এতু আমেরিকা  বহু আগেই এটাকে সামরিক ও স্ট্রাটেজিক দিক দিয়ে আগানোই তার পথ চুনেছে। যার সোজা মানে সে চীনের কাছে অবকাঠামো ঋণদানের প্রতিযোগিতার পথ ছেড়ে দিয়েছে – হার স্বীকার করে কেটে পড়েছে। তবে আমেরিকার অনুসৃত  সেই পথই এখন ফাইনালি ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি এই মুখ্য নামে আপাত থিতু হয়েছে। যদিও এটা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে ওবামা্র এশিয়া পিভোট নামে। সেটা অনেক আগেই ব্যর্থ হলে পরে ট্রাম্পের আমলে পুরানা কোয়াড নামে আবার তা চালু করা হয়েছিল।  পরে তা অ্যামেরিকান বন্ধুদের মধ্যে কে কার কাছে সাবমেরিন বেচবে এসব তর্কাতর্কিতে পরে আর ওদিকে মাঝখান থেকে ভারতের কার্যত কোয়াড থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। মূল কারণ ভারত কোন সামরিক জোটে যেতে চায় না; কেবল চীনবিরোধী পলিটিক্যাল জোটে থাকাতেই তার স্বার্থ বলে মনে করে।  আরও পরে বাইডেন এসে সব ঝিমিয়ে পড়া দশাকে আবার চাঙ্গা করতে চায় তবে এবার এরই নাম হল ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি। যার খাস অর্থ হল কে কে চীনকে একঘরে করতে চাও (ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জাতিসংঘের ফোরামেও), বলো।  এটাই লেটেস্ট হয়ে খাড়িয়ে আছে। এই গেল বাইডেনের একটা প্রথম পথ   বা এশিয়ায় পা রাখার পাটাতন বা সম্পভাব্থয উপায়।

    তাহলে অপর পথ বা পাটাতনটা  কী?
    শিরোনা্মে আমরা সেটাকে বলতে পারি আমেরিকার বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ। যার সবচেয়ে বড় সাফাই-অজুহাত হল এক মিলিয়ন এরও বেশি রাখাইন রোহিঙ্গা খেদিয়ে বাংলাদেশে তাদের মানবেতর জীবনে ফেলে দিয়েছে বার্মার জেনারেলেরা। কথা সত্য। নিঃসন্দেহে যা এক চরম মুসলমানবিদ্বেষী জাত-ঘৃণার প্রকাশ; এক হিটলারি এথনিক উদগ্র ঘৃণা ছড়ানির বেপরোয়া কাজ। আর এত নিচা পর্যায়ের কাজের নয়া-উস্কানি বার্মার জেনারেলেরা ভারত থেকে পেয়েছিল – সেকালে ২০০৭ সালের আগের একঘরে হয়ে থাকা বার্মাকে পশ্চিমের দুনিয়ার সাথে মুলাকাত – পশ্চিমের অবরোধ তুলে দেওয়া – একাজে পশ্চিমের এক এজেন্ট হিশাবে ভুমিকা রাখার সুযোগ নিয়ে ভারত এই পরামর্শ দিয়েছিল। ভারত আশ্বাস ও পরামর্শ দিয়েছিল জেনারেলদের যে এটাই ভাল সময়। ভারতের ক্যালকুলেশন সঠিক তবে তা বার্মার জন্য আত্মঘাতি ছিল। কারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়াতে এক নয়া বার্মা যেভাবে ২০০৮-১০ সাল থেকে উন্মেচিত হয়েছিল  ফলে বার্মার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য আর মাটির নিচের সম্পদ লুটে খাওয়ার এক নয়া বার্মা যেভাবে ২০০৮-১০ সাল থেকে উন্মেচিত হয়েছিল তা  চীন, ভারত আর আমেরিকাসহ পশ্চিমের কাছে তাতে কোনপক্ষই নিজের লোভ সামলাতে পারে নাই। তাই রোহিঙ্গা খেদানি কাজকে চীন, ভারত আর আমেরিকা সকলেই সমর্থন করেছিল। আর এর পক্ষে বার্মা বা আমেরিকাসহ সকলেরই  সাজানো বয়ান ছিল কথিত এক আরসা (ARSA) নাকি বার্মিজ সামরিক বাহিনীর উপরেই হামলা করেছিল আর তার পালটা হামলাতেই নাকি রোহিঙ্গাদের নির্মুল শুরু হয়েছিল। চীন, ভারত আর আমেরিকা এই সাফাই বয়ান সমর্থন করেছিল।
    এখন আমেরিকা গত কয়েক বছর হলো, সে অবস্থান বদলিয়েছে।  এখন সে রোহিঙ্গা খেদানোকেই প্রধান কারণ বানিয়ে এর প্রতিকার হিশাবে  বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ এর পরিকল্পনা করেছে।

    এমুহুর্তে আমেরিকার মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখছে কেনঃ
    এতক্ষণ পশ্চাত পটভুমি বর্ণনা করলাম। আর এতে আমরা দেখলাম আমেরিকার হাতে এখন দুটা খাতা  বা পথ খুলা আছে। তবে এদুইয়ের কোনটা নিয়ে আমেরিকা আগামিতে এশিয়ায় নিজ প্রভাব বিস্তারে আগাবে এহলো প্রশ্ন! যদিও এনিয়ে আমেরিকার মধ্যে কেউ কেউ দোনোমনো দেখছে কেন? যদিও এই পথের দ্বন্দ্ব বলতে এমন না যে বাইডেন দুই খাতার কোন একটাকে নিয়ে আগাবে!  বরং আগানোর পথ হিসাবে সে পথ দুটাকেই একসাথে ব্যবহার করতে পারে অবশ্যই। কিন্তু কোনটা ডমিনেটিং বা ফোকাসে আর কোনটা সেকান্ডারি হয়ে সহায়তার ভুমিকা নিবে – এনিয়ে বাইডেনের পরামর্শদাতাদের মধ্যে সাময়িক ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে এটাকে  দ্বিধাদ্বন্দ্ব বলে মনে করা ভুল হবে। আর এসব নিয়ে বাংলাদেশে যারা নিজেকে হাসিনাবিরোধি  মনে করে তাদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে একধরণের সাময়িক –  ঢাকার বাজার অন্তত কিছুটা হতাশা ও কৌতুহলে দেখছেন বলে দাবি করেছেন! জাপান সফর থেকে জাপান-বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে আর পরে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেলের কিছু বক্তব্যকে ভোয়া যেভাবে কায়দা করে হতাশব্যঞ্জকভাবে হাজির করেছে – তাতে এথেকে এসব তৈরি হতে পারে হয়ত।

    জাপানে দুই প্রধানমন্ত্রীর এক যৌথ ঘোষণার মূলকথা কীঃ
    যৌথ ঘোষণার মূলকথা কী – তা নিয়ে আমার বুঝ কী সেটাই সবার আগে বলে দিয়েই শুরু করা যাক। জাপান, (হাসিনার) বাংলাদেশ আর (মোদির) ভারত – এই তিনদেশ মিলে যদি একটা পথচলার জোট খাড়া করতে পারত তাহলে হয়ত সেই আলোকে এই যৌথ ঘোষণা কে একটা পারফেক্ট যৌথ ঘোষণা বলে মানা যেত। কিন্তু অসুবিধা হল যে এমন তিন নেতার তিনদেশীয় আকাঙ্খার সবচেয়ে বড় খামতিটা হল এদের এওই পরিকল্পনার আমেরিকাকে কোথাও দেখা যায় নাই। এশিয়ায় এমন যেকোন জোটের-কৌশল পরিকল্পনায় যদি আমেরিকা অনুপস্থিত থাকে তবে বুঝতে হবে এমন পর৮ইকল্পনার কোন ভবিষ্যতই নাই। তাতে যদি আমেরিকাকেও ভিতরে না রাখা যায় তবে অন্তত এনিমি হিশাবে বিপরীতে দেখাতেই হবে।  তবু আমেরিকাকে অনুপস্থিত বা উহ্য রেখে যেকোন পরিকল্পনা মাত্রই তা এক অলীক আকাশ-কুসুম বলেই আমাদের মানতে হবে। হতে বাধ্য।

    তাহলে জাপান ও বাংলাদেশের সাথে বিগ-ব [BIG-B] বলে প্ল্যান যেটা মোদি সাজাচ্ছে দেখেন এখানে [JAPAN AND THE BIG-B PLAN FOR BANGLADESH: AN ASSESSMENT] , এখানে বিগ-বি নিয়ে জাপানের জাইকার উদ্যোগ [The Initiative of BIG-B, JICA], অথবা এখানে চীন এবং  আমেরিকাকেও বাদ দিয়ে ভারতের এক “নয়া ওয়ার্ল্ড অর্ডার” এর স্বপ্ন-কল্পনা [“THE NEW WORLD ORDER” ]; অথবা এমনকি মোদির হিন্দুত্বের স্বরাজ্য ম্যাগাজিন যেভাবে এতে মোদির বিজয়  দেখছে –A Quiet Diplomatic Victory for India, Japan Against China in Bangladesh – এরকম যত কথা এখন উঠেছে এর সবই যেন নিশ্চিত বৃথা যাবার জন্যই অপেক্ষা করছে। বলা হচ্ছে BIG-B উদ্যোগটা নাকি ২০১৪ সালে শুরু হয়েছিল। তাহলে এতদিনেও এর কোন অগ্রগতি নাই কেন? কারণ, আমেরিকারকে উদ্যোক্তারা কী কোথায় রাখবে এর ভিতরে না বাইরে তা ঠিক করতে পারে নাই তাই??? আর আমেরিকা এতে রাজি হবে কেন এসব প্রসঙ্গ-গুলো নিয়ে কথা আগাতে ভারত ও জাপান উভয়েরই দ্বিধা অস্বস্তি আছে তা তো বলাই বাহুল্য! মোদি এখন একালে একেবারেই চাইবে না এতে আমেরিকা কোনভাবেই যুক্ত হোক বা তার ছায়া কোথাও থাকুক। আবার বিপরীতে বাইডেন এর অবস্থাও তাই!

    এছাড়া এখন এটা কে না জানে যে, বাইডেনের বার্মা দখল প্রকল্পে সে সরাসরি মোদির ভারত এবং চীনেরও বিরোধী। আর এমনিতেই আগামি ২০২৪ সালের ভারতের  আগামি নির্বাচনে বাইডেনের বাজি হল সে মোদিকে উতখাত আর রাহুলকে ক্ষমতাসীন দেখতে চায়। তাই আইন বাঁচিয়ে যতটুকু যা করা যায় এর সবটুকুই করতে শুরু করেছেন বাইডেন। তাহলে মোদির ভারত আর বাংলাদেশ-কে সাথে নিয়ে জাপানের ত্রিদেশীয় খায়েশ এর তো কোন ভবিষ্যতই নাই!!!!  আসলে এককথায়, যেখানে আমেরিকা নাই অথচ জাপান-মোদির ভারত আর হাসিনার বাংলাদেশ – এমন ত্রিদেশীয় কোন পরিকল্পনা আছে এখন তাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে জাপানি বিনিয়োগ হানতেন ইত্যাদি যাই দেখানো হোক না কেন এসবকিছুর ভবিষ্যত শুণ্য!!  এসব অবাস্তব ও অলীক সব কল্পনা হয়েই থাকবে – যেভাবে ২০১৪ সাল থেকে এই উদ্যোগটা কেবল টিকেই আছে!
    এছাড়া আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির এনিমি ও হেরে যাওয়া জাপানের কথা মনে রাখি তবে কিছু কথা আমরা হাতে গুনে মনে রাখতে পারি যে যুদ্ধের পর থেকে জাপানি পররাষ্ট্রনীতি অ্যামেরিকান পররাষ্ট্রনীতিরই অনুগত হয়ে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এই প্রতিশ্রুতির কারণ হল –  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পক্ষ নেয়া ও হেরে যাওয়া সত্বেও জাপানের পুণর্বাসনে ও পুনর্গঠনে সমস্ত বিনিয়োগ আমেরিকাই দিয়েছিল। কাজেই  Initiative of BIG-B   এটা যতই উচ্চে তুলে সম্ভাবনাময় হিশাবে দেখানো হোক না কেন  অ্যামেরিকান স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে বা বাইরে জাপান যেতে পারবে না; কিছুই করতে পারবে না।

    কেন Initiative of BIG-B এর ভবিষত নাই এর দ্বিতীয় আরেক কারণঃ
    এই উদ্যোগটা আসলে মূলত গভীরভাবে নিজেদের চীনবিরোধী মনে করে তাদের আগ্রহে তৈরি হওয়া উদ্যোগ। সে হিশাবে এটাক ভারত ও জাপানের উদ্যোগ; কিন্তু তাহলে এর ভিতর বাংলাদেশ কেন?  কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা এটা প্রথমে চীনা নেতৃত্ব আরেক উদ্যোগ আগে তৈরি হয়ে যাবার পরে এরই নকল এক উদ্যোগ মাত্র। চীনা সেই উদ্যোগের নাম RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership] । এটা আশিয়ান [ASEAN] জোটের গর্ভ থেকে প্রথম প্রস্তাবিত হয়েছিল ২০১১ সালে। মজার কথা হল চীনা নেতৃত্বের RCEP তৈরি হলেও  এখানে জাপানও সদস্য হয়ে আছে।  মূলত আশিয়ান দশটা দেশই ভারি এরা দশটা দেশ আর এদের সাথে  জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন – এভাবে এরা সবাই মিলে এটা একটা Free trade agreement (FTA) এর বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্ত। এটা গত বছর ২০২২ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে সক্রিয় ততপরতায় চলে গেছে; জার্কাতা এর হেড কোয়ার্টার। কিন্তু  এর চেয়েও বেশি ইম্পর্টেন্ট তথ্যটা হল এটা মূলত শেয়ার্ড ভ্যালু চেন [shared value Chain] – ভিত্তিতে এক উতপাদন ব্যবস্থায় সদস্যরা সকলে যুক্ত হবে – যেখানে যেকোন একটা পণ্য নির্মাণে সদস্য সকল দেশের শ্রম যুক্ত করে [শ্রম যোগ করা মানে ভ্যালু এড করা] নির্মিত হবে আর সদস্য সকলেই ঐ পণ্যের ক্রেতা ব্যবহারকারি-ভোক্তা হবে। এটাই দুনিয়ার লেটেস্ট অর্থনৈতিক জোটবদ্ধতার এক নয়া ধারা যা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে অবশ্যই ।  আর এর সদস্য হতে গেলে প্রধান শর্ত হল আপনার নিজ দেশে বিদেশি পণ্য আমদানিতে যে শুল্ক ব্যবস্থা বজায় আছে তাতে গড়ে শুল্ক হার  ৮-১০% এরও নিচে হতেই হবে। এটা আশিয়ান জোটের সদস্যপদ পাবার ক্ষেত্রেও শর্ত।

    কিন্তু তাতে কী?
    তাতেই এটা ভারতের পক্ষে এসব শর্তপূরণ একেবারেই অসম্ভব। কেন?

    আসলে কোন উগ্র জাতিবাদি বিশেষ করে যাদের জাতিবাদ এক অর্থনৈতিক জাতিবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত তেমন ধারায় বিরাজ করে ভারত। এমনিতেই ভারত জন্ম থেকেই এক উগ্র-জাতিবাদি অর্থনৈতিক দেশ। আর একালে মোদির উগ্রজাতি-বোধের হাতে পড়েছে এটা আরও মারাত্মক দিক। ঠিক এই অর্থনৈতিক উগ্র-জাতিবাদ অবশ্য ব্যবহারিক কমিউনিস্ট বা স্তালিনিস্টদের মধ্যেও  গেথে থাকা একই ধারণা।  এরা মনে করে দেশের মানুষ যা কিছুর ভোক্তা বা সেবা নিবে এমন সকল পণ্যই দেশে তৈরি হতে হবে। একারণের জাতিবাদি ও কমিউনিস্টেরা কার্যত বাণিজ্য-বিরোধী। এমনিতেই নেহেরুর হাতে গড়ে উঠা ভারত অন্যের পণ্য তো কিনবেই না – এমন কঠোর নীতিতে বিশ্বাসী; আর এর উপর আবার এক কলোনিদখল মানসিকতাও তারা ক্রেডিট হিশাবে দেখে থাকে। সেটা এমন যে পারলে ছলেবলে অন্য দেশের বাজার দখল করবে আর এজন্য চাপ দিয়ে বা বেকায়দায় ফেলে হলেও এটা তারা জায়েজ মনে করে। একারণেই নেহেরুর সেই নীতি একালে এখনও ধরে রেখে চলছে মোদি।
    আরেকটা তথ্য দেই তাহলে অনেক কিছু পরিস্কার হবে।
    RCEPএর জন্মের প্রস্তাব যখন তুঙ্গে তখন কথা উঠেছিল মোদির ভারত কেন তাতে যোগ দিবে না?  স্বভাবতই মোদি ও তার পররাষ্ট্র নেতা জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন এসব উদ্যোগ ভারতের জন্য নয়। আসলে ভারতকে ত অন্যের পণ্য ঠেকাতে ট্যাক্স বেশি ধরতে হবে বা ডাম্পিং করতে হবে। যেমন আমাদের পাটের উপর এখন এমন ট্যাক্স আরোপ করে, আমাদের রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছে। তাহলে আমরা ভারতের পণ্য আমদানি করব কেন? এই প্রশ্নের জবাব তারা দিবে না বুঝাতে চাইবে তারা বড় ভাই। এনিয়ে আমার পুরানা লেখা একটু পরে খোজ করে দিচ্ছি।
    এমন পুরানা লেখার শিরোনাম ও লিঙ্ক এখানেঃ
    ১।    আরসিইপিঃ দুনিয়ায় নতুন সম্পর্ক আনার সম্ভাবনা

    ২। যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    আর ঠিক একই প্রস্তাব বাংলাদেশকেও দেয়া হয়েছিল। কিছুদিন পরে বাংলাদেশ আশিয়ান সদস্য হবার জন্য আবেদনও করে রেখেছে।

    তাহলে এখন এটা সবার কাছেই পরিস্কার হয়ে যাবার কথা যে ভারত দুনিয়ার কোন দেশের সাথেই অর্থনৈতিক জোট গড়বার যোগ্য নয়। তাতে সেটা সার্ক বা যেকোন অর্থনীতিই হোক না কেন!
    অতএব, এত ঘটা করে তাহলে RCEP  এর বিকল্প হিশাবে  Initiative of BIG-B  নিয়ে এত গল্প আর এই জাপান-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণার কী আর কোন অর্থ আছে? এক নিজ নিজ দেশের পাবলিককে বোকা বানানোর প্রপাগান্ডা ছাড়া…।।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
     

     

     

  • আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!

    আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!
    গৌতম দাস

    ০৫ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4pZ

     

     

     

    সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে! আজ ৫ এর ২০১৩ এর দশম বার্ষিকী!
    অনেকে যেটাকে শাহবাগ বনাম শাপলা, অথবা শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলার সমাবেশ বলে।
    জমিদার হিন্দুর জমিদারি বন্দোবস্ত ব্যবস্থা ১৯৫১ সালে উচ্ছেদ হয়ে গেলে একারণে, জমিদার হিন্দুর রাজনৈতিক ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেলেও এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক [Cultural] প্রভাব থেকেই যায়।
    সেই কালচারাল প্রভাব – যা মূলত ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান ঘৃণা চর্চার এক ভরপুর আধার – প্রগতিশীলতার নামে গড়ে উঠা শাহবাগের ততপরতার বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধের দিন!

    বৃটিশ আমলে জমিদারি হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর জমিদারি আইনের পরে মোটামুটি ১৮০০ সাল থেকে ক্রমাগত রাজত্ব করতে উঠে চলেছিল। এর বিরুদ্ধেই প্রথম সবল ধাক্কা ও আমাদের বিজয় হল ১৯৪৭ সালের আগষ্টে্র ভারতভাগ নামে যা পরিচিত যার অপর নাম পাকিস্তান কায়েমে সফল হওয়া।  পাকিস্তান কায়েমের অনেক অর্থ তাতপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নেতি ব্যাখ্যাও আছে দেখা যায়। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থ তাতপর্য হল, পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল – মানে কোন আপোষ হয় নাই বলেই দেশ ভাগ হয়ে গেছিল। আর তা হয়েছিল বলেই এরপরে সহজেই জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ সম্ভব হয়েছিল।
    এই ধারাবাহিকতায় ১৬ মে ১৯৫১ সালে আইনগতভাবে জমিদারি আইন উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছিল। আইনি ভাষায় যা “পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০” নামে পরিচিত দেখুন বাংলাপিডিয়াতে । আইনটা ইংরাজিতে দেখতে এখানে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act 1950 ক্লিক করেন।  পাকিস্তান কায়েমের ফলে এভাবে সবচেয়ে বড় অর্জন হল পুর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে বসে এই জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস করতে সক্ষম হওয়া। তাতে কমিউনিস্টেরা যতই জোরগলায় মিথ্যা-ব্যাখ্যায় বলুক না কেন যে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম করেই নাকি পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল।
    অথচ তারা স্বীকার করতে চায় না যে এই একই পাপ করার রাস্তা তো কংগ্রেসই আমাদের দেখিয়েছিল; যেটা কমিউনিস্টেরা চেপে যায়।  কংগ্রেস কী আমাদেরও আগে একই কাজ করে নাই?  আর আমাদেরও একই পথে যেতে বাধ্য করে নাই? তাঁরাই কী ১৮৮৫ সালে ধর্মের ভিত্তিতেই এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ভারত কায়েম করতে – “কংগ্রেস” [যার ফর্মাল নাম “ইন্ডিয়ান জাতীয় কংগ্রেস”] নামে দলের জন্ম দেয় নাই!  আর আমাদেরকে সেই উপেক্ষা থেকেই কী ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয় নাই!!! তবে পাকিস্তান কায়েমে যতটুকু যা আমাদের ভুল [যেমন ধর্ম, ভাষা বা যেকোন ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভুল] ছিল তাতে কংগ্রেসের ভারত কায়েমেও ততধিক ভূল। আর সেক্ষেত্রে মোদির হিন্দুত্ববাদের বিজেপির ভারত? তাকে কী বলবেন? এক্ষেত্রে প্রগতিবাদীরা বাকশুণ্য, কেন?  এটাকেই তো নিরেট ইসলামবিদ্বেষ আর দগদগে মুসলমান ঘৃণা বলছি!  জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল গতবছর অক্টোবরে আন্তোনিও গুতেরেজ ভারতে  এসে কঠোর ভাষায় প্রকাশ্যে ভারতের মুসলমান-ঘৃণা চর্চার বিরুদ্ধে সমালোচনা আর সাবধান করে গেলেন। প্রতিক্রিয়ায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিল নিজেই এক মামলা ডেকে নিয়ে। অথচ এখন বিকার নাই।  কিন্তু এখন কোথায় সেই প্রতিশ্রুতি? দ্যা কেরালা স্টোরি নামে বিদ্বেষমূলক ও মনগড়া কাহিনীতে গড়া সিনেমা রিলিজের বিরুদ্ধে বাধা দিতে সুপ্রিম কোর্ট ও কেরালা হাইকোর্ট নিঃশ্চুপ। তারা এখন সিনেমা বানানোর খরচ  যেন ঠিক মত উঠে আসে তোলা হয় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।  কোর্ট আসলে বলছে সিনেমার বাজার ঠিক করবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে কিনা। ‘Market will decide’ — SC, Madras HC refuse to stay release of ‘The Kerala Story’ অথবা বলতে চাইছে,  নির্বাচনের আগে মুসলমানবিরোধী হিংসা বিদ্বেষ এর ঝড় তুললে কোনই অসুবিধা নাই!

    নিজেকে কমিউনিস্ট বলে দাবি করতে এদের ভাল লাগে মানে, যেটা লতিফ সিদ্দিকীর ভাষায় “কমিউনিস্ট মাড়ানি” তা এদের হতে খুব ভাল লাগে; অথচ জমিদার শ্রেণীকে উচ্ছেদের বিরোধীতা করা এরা কোন কমিউনিস্ট???  বাংলাদেশে এরাই বা এটাই প্রগতিশীলতা!!! এনিয়ে আমার আগের দুপর্বে লেখা আগ্রহিরা পড়তে পারেন।

     নুন্যতম অর্থনীতি জ্ঞান থাকলে এরা বুঝত জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ ছাড়া কোন দেশের অর্থনীতি গড়া, ভিত্তি স্থাপন সম্ভব নয়।  এবং সেটা অবশ্যই ক্যাপিটালিজমের প্রথম পদক্ষেপ। তাতে এই ক্যাপিটালিজম বলতে যেকোন ধরণের ক্যাপিটালিজমই হোক না কেন! তাতে কমিউনিস্টদের পছন্দের রাষ্ট্রীয় ক্যাপিটালিজম [State Capitalism; যেটাকে তারা সমাজতন্ত্র নামে ডাকে] সেটা হোক অথবা মালিকানা ভিত্তিক স্বাভাবিক ক্যাপিটালিজম – যেটাই বুঝেন না কেন – বটম লাইন হল, যে পথেই যান  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ আপনাকে করতেই হবে এটাই হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশে নিজ অর্থনীতি সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ। সমাজের সবাইকে কাজের সংস্থান দিবার মত একটা অর্থনীতি চাইলে আপনাকে  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ থেকে শুরু করতে হবে। অথচ জমিদার হিন্দুর স্বার্থ হল ঠিক এরই বিরুদ্ধে; তারা এর ঘোরতর বিরোধী। আর এই জমিদার হিন্দুর কায়েমিস্বার্থ ও আধিপত্যের সমাজ ও চিন্তাকেই প্রগতিশীলতা বলে এক কমিউনিস্ট রাজনীতি বাংলায় যাত্রা শুরু করেছিল। কেন জমিদারি উচ্ছেদ বাংলাদেশের  অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি গড়ার জন্য জরুরি ছিল তা জানতে প্রিয়া সাহা ইস্যুতে আমার পুরানা দুপর্বে লেখা এখানে  দেখতে পারেন। এতে বুঝা যাবে কেন কোন কৃষি সংস্কার মানে জমিদার মালিকানা  এই মালিকানার ধরণ উচ্ছেদ না করলে কোন শিল্পায়ন গড়ে উঠবে না। সকলকে কাজ দিবার মত অর্থনীতি হবে না।

    অথচ কমিউনিস্টেরা নাকি মুখ্যত শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন। তাহলে জমিদার হিন্দুর জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার কাজ কিভাবে কমিউনিস্টদের প্রগতিশীলতা হয়??? এই জমিদার হিন্দু একই সাথে তাল দিয়ে প্রজা-হিন্দুদেরও কালচারালি তাদের স্বার্থপক্ষ হতে বুঝিয়ে নিজ জমিদারি স্বার্থের পক্ষে সামিল করেছিল। এর ফলাফলে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রাও জমিদার হিন্দুর  (যা কার্যত জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার) পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। জমিদারি মালিকানা নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধাচারণকে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রা হিন্দু-বিরোধিতা জ্ঞান করত।  এটা ছিল আসলে,  প্রজা-মুসলমানদের উপর প্রজা-হিন্দুদেরকে কালচারাল শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া ও এই জাত-শ্রেষ্ঠত্বের ভাবনা মাথায় ঢুকানোতে প্রজা-হিন্দুরাও কালচারালি  জমিদার হিন্দুর  জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার পক্ষে লাঠিয়াল হয়ে যায়। আগ্রহীরা আরো পড়ে দেখতে পারেন আমারই ২০১৬ সালে লেখা – হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ। 

    এরই পরিণতি হল, দেশভাগের পরে মূলত ১৯৫০ সালের পরে দেশত্যাগের কালে  প্রজা-হিন্দুরা পুর্ব-পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) থেকে যেতে পারে নাই। সামাজিক এনিমিটি আগেই তৈরি হয়ে গেছিল। কারণ বহু আগেই তারা প্রজা-মুসলমানেদের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন [alien] মানে এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতা রচনা করে ফেলেছিল।   জমিদার হিন্দুর স্বার্থ আর সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দুর স্বার্থ যেনবা এক এই হুদাই ভাবনায় এমন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো লাঠিয়াল-গিরিতে তারা দেখিয়ে ফেলেছিল তারা যেন জমিদার স্বার্থেরই লোক – এমন মনোভাব আগ থেকেই বলে ও ভেবে ফেলার জন্য বাংলাদেশে তারা থেকে যেতে পারে নাই।

    সবচেয়ে বড় কথা জমিদারি উচ্ছেদ আইনে তো  কেবল প্রজা-মুসলমানদেরকেই  নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমির মালিক করে দেওয়া হয় নাই। বা ঐ আইনে কেবল মুসলমানেরাই সুবিধা পাবে, হিন্দুরা নয় একথা বলে তো লেখা নাই। সকল প্রজাই এই সুবিধা পেয়েছে বা পাবার যোগ্য ছিল। কাজেই হিন্দু-প্রজারাও একই সুযোগে  ‘নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে’ জমির মালিক হয়েছে। তবু কালচারালি তারা জমিদার হিন্দুর সাথে সংযুক্ত বা এটাচড [Cultural attachment] – এই বোধের কারণে এটা ক্রমশ তাদের জন্য দেশত্যাগই একমাত্র সত্য ও পরিণতিতে নিয়ে গেছে। এরই কাফফারা বা খেসারত হিশাবে বাংলাদেশের হিন্দুরা এখন ভিকটিম-হুড বা সংখ্যালঘু ইত্যাদি যা পায় সে বয়ান আকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করে চলছে আজও।

    তবে এখানে আমাদের সকলেরই কিছু গুরুত্বপুর্ণ করণীয় আছে। পুরানা প্রজা-হিন্দু ভুল করেছে বলে আমরা এখন তাদের প্রতি কোন বিদ্বেষ বা বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারিনা। তাতে তাঁরা একালে হিন্দুত্ববাদে উতসাহিত হোক কিংবা মোদির কোলে উঠে তাঁকেই ত্রাতা মনে করুক না কেন; আমাদের কাজ কর্তব্য আমাদের করে রাখতে হবে। তা হল, ধর্ম-নির্বিশেষে বা এমনকি শাঁওতাল বা পাহাড়ি ট্রাইব বা উপজাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকই একই এবং সমান অধিকারের নাগরিক এই ভিত্তিতে ব্যবহারিক রাষ্ট্র তাড় আইন প্রয়োগ ও চর্চায় তা বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রতিফলিত করতে হবে। এমন একটা ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে যেতে হবে। এ’দায় আমাদের সকলের; তাতে পুরানা বিবাদে আমাদের অবস্থান ভিন্নতা যাই থাক। তবেই একটা নয়া বাংলাদেশের স্থিতিশীল সমাজ আমরা পাব।  পুরানা কোন বিবাদ-বৈষম্য জিইয়ে রাখলে এটাই আগামিতে নানা দিকে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে অস্থিতিশীলতার বড় কারণ হবে।  এটাই সম-সুযোগের [Equal Opportunity], সকলকে নিয়ে [inclusive] এক বাংলাদেশ গড়ার শেষ সুযোগ – যা আমরা যেকোন মূল্যেই হারাতে পারি না।

    তাহলে আজ ৫ মে এর তাতপর্য কী?
    এদিন থেকেই আমাদের বুঝতে আর বাকি থাকে নাই প্রগতিশীলতা ও তাদের কথিত সেকুলারিজম আর কমিউনিজম কী জিনিষ। শাহবাগ আমাদের চিনিয়েছে প্রগতিশীলতা আর কমিনিজম এর নামের আড়ালে এটা ইসলামবিদ্বেষ আর মূসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর পরিকল্পিত কাজ। যা আমরা হয়ত আগে তত খেয়াল করি নাই। এটাই জমিদার হিন্দুর অসমাপ্ত আধিপত্যকে কালচারাল মোড়কের আড়ালে আবার প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ। এটাই একালে ভারতের রাজনৈতিক ও কালচারাল আধিপত্য যেটাকে বাংলাদেশের উপর আবার জেঁকে বসানোর আমেরিকার সহায়তার নয়া উদ্যোগ। তাই ৫মে এর প্রতিরোধ ছিল এর সম্মিলিত বিরোধিতার দিন, একে সমূলে উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টা – এই আত্ম-সচেতনতার দিন!
    জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থকে বিশেষত এর রাজনৈতিক দিকটাকে আমরা উতখাত করতে পেরেছিলাম পাকিস্তান আমলে, বিশেষ করে ১৯৫১ সালে। কিন্তু প্রগতিশীলতার নামে কমিউনিজমের নামের আড়ালে এর সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ও আধিপত্য আমাদের সমাজের উচ্চ-অংশ ও শিক্ষিত অংশের মধ্যে কালচারালি টিকেই ছিল, এখনও আছে। আর এভাবেই জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থ সব বিনষ্ট হয়ে গেলেও এটা কালচারালি-সাংস্কৃতিকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছে।

    আর এর বিরুদ্ধে প্রথম সফল ও সদর্প প্রতিবাদ ছিল শাপলা সমাবেশ। শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলা সফল কালচারাল প্রতিবাদ। এখান থেকেই আমরা প্রথম টের পাই এখনও আমাদের অসম্পুর্ণ কাজ কী এবং আমাদের অর্জন কী কী ছিল।
    এখন এর মূলনীতিটাকে এভাবে হয়ত বলা যায়, বাঙালি মুসলমান স্বাধীন। ১৯৭১ সালেও সে বাংলাদেশি হিন্দুর সাথে মিলে নয়া রিপাবলিক গড়েছে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে। কিন্তু কোনভাবেই এর অর্থ এমন নয় যে এখন বাঙালি মুসলমানকে (এবং সেই অর্থে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিকেও)  কলকাতার বাঙালিকে অনুসরণ করে বাঙালি হতে হবে বা বাঙালিত্ব শিখতে হবে; ইসলামবিদ্বেষ বা মুসলমান-ঘৃণা করতে শিখতে হবে।

    বাঙালি মুসলমান কেউ চাইলে মর্ডান জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে চাইলে হতেই পারে। কিন্তু কলকাতা এখানে বাঙালির মুসলমানের (বা সেই অর্থে বাঙালি হিন্দুরও) মডেল (কথিত সেকুলার বা ইসলামবিদ্বেষী) হতে পারবে না। এখানে সচেতনতা লাগবে।  এই নয়া সচেতনতা নিয়ে সামনে আগালে নয়া রাষ্ট্র-রিপাবলিকে ইসলামি-ওরিয়েন্টেড মানুষ [যাদেরকে সাধারণভাবে অনেকে ইসলামিস্ট বলে থাকে ]  এরাও মর্ডান বাঙালি মুসলমানকেও জায়গা করে দিবে।   বলাই বাহুল্য শর্ত একটাই যে সে কলকাতা-অনুসারি বাংলাদেশি মুসলমান বা ঘৃণা-বিদ্বেষী বাঙালিয়ানার চর্চা করবে না। এককথায়, কলকাতায় গড়ে উঠা বাঙালি কালচারাল চোখ ও অভ্যাসকে আমাদের সীমানার বাইরে রেখে আসতে হবে। তাতে কলকাতার প্রতি আমাদের কোন বিদ্বেষ নাই, তারা তাদের কালচার নিয়ে ভাল থাকুক, যা হতে চায় হোক। মোদির হিন্দুত্ববাদকে নিয়ে যা করতে চায় করবে। আমাদের বলার নাই। কেবল মনে রাখতে হবে তারা আমাদের অনুসরণীয় বাতিঘর নয়! তাদের “বিদ্যাসাগরেরা” কেবল তাদেরই থাকুক!

    ৫মে এর আত্মত্যাগ যেন ভুলে না যাই!  এর তাতপর্য আমাদের মধ্যে জিন্দা থাকুক! আরও বিকশিত, উদ্ভাসিত হোক!

    last Edit – 06:35am 06 May 2023


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি

    হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি
    গৌতম দাস

    ০২ মে ২০২৩  মধ্যরাত ০০ঃ০১
    https://wp.me/p1sCvy-4oK

     

    United Communist League of Bangla Desh

    দেশে না জেনে আন্দাজের উপর কথা বলা লোকের সংখ্যা বাড়তেছে। গত ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ত্রিদেশীয় জাপান-আমেরিকা-যুক্তরাজ্য সফর শুরু করেছিলেন। আর এরপরেই ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় সিপিবি-র এক জ্ঞানী বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি পরের দিনও তাদেরই “বাম গণতান্ত্রিক জোট” একই ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছিল। সরকারকে অভিযুক্ত করার ভাবে তেমনই টোনে এসব বিবৃতি। যেমন সিপিবির বিবৃতির শিরোনাম – ‘প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে যেন জাতীয় নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়া না হয়: সিপিবি’। আর জোটের বিবৃতির শিরোনাম – ‘তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চুক্তি প্রকাশ করার দাবি’।
    যারা এতদিন মানে, কম করে ধরলে গত পনেরো বছর ধরে ‘সরকারের বিকল্প দেখে নাই’ তারা আজ হঠাত এত কড়া অভিযোগে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে – এটা কেন?  তার মানে, বামেরা কী মনে করে সরকারের কী তবে আয়ু শেষ? তাই বিপ্লবীপনায় ফিরে যেতেই…!  সম্ভবত একারণেই, সবার আগে বামেরা তাই হাসিনার দায়দায়িত্ব আর এতদিনের সমর্থন ও ঘষাঘষি সম্পর্ক এখন থেকে  মুখে অস্বীকার করে ডিস্ট্যান্স তৈরি করে দূরে দাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে মনে হচ্ছে!

    তাই দেশে এখন একটা “হালকা, আবছার উপর ঝাপসা মারা বিবৃতি” ও তা নিয়ে পত্রিকা রিপোর্ট করা শুরু হয়েছে; যে ঘটনার  শুরু প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাপান সফর থেকে, সফর শুরুর দিন থেকে। সেদিন আবার দৈনিক যুগান্তরেও একটা খবর ছাপা হয়েছিল যার শিরোনাম, “গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে”। একইদিনে মাদারবাড়িতে জাপানের গভীর বন্দর নির্মাণ আর ভারতকে চট্টগ্রামের পরে এবার মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার রাজস্ব বিভাগের খুটিনাটির নির্দেশ জারি এবং বাংলাদেশেরও আগে ভারত প্রায়োরিটিতে যেন বন্দর ব্যবহার করতে পারে ইত্যাদি এসব বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। আর তা থেকে বাম-বিপ্লবীপনার জোয়ার ছড়িয়ে পরা শুরু হয়েছে। যা অন্যান্যদের রাজনীতিকেও বিভ্রান্ত-প্রভাবিত করেছে স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, মনিষীরা বলে গেছেন – বিভ্রান্তিই ছোঁয়াচে রোগের মত যা সহজেই ছড়িয়ে পরে; তুলনায় যা ‘জ্ঞানবুদ্ধির’ কথা তা সুস্বাস্থের মত। মানে যা ছোঁয়াচে নয় বলে মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ানো যায় না। আর তাতে বর্তমান রাজনৈতিক জ্ঞানগম্যি-তথ্য-পরিস্থিতি বুঝতে সবাই ছুটছে “তেল-গ্যাসের মধ্যে’।

    মানুষ মানে কী কেবল অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান? তাহলে রাজনৈতিকতা কীঃ
    কমিউনিস্টেরা আজও – রাজনীতি- এই শব্দের অর্থ আমল করতে চাইলো / পারলো না। মানুষের বৈষয়িক স্বার্থ আর রাজনৈতিক স্বার্থ যে দুটা আলাদা জিনিষ ও আলাদা চাহিদা তা তারা হদিশ জানলো না। মানুষের কেবল তাঁর তনু বা দেহ বাঁচায় রাখলেই, কেবল এতেই সতুষ্ট থাকলেই চলে না। প্রাণ শুধু জৈবিক না – এর স্পিরিচুয়ালিটি বা রাজনৈতিক দিকের মত বহু আরও দিকে এর উন্মেষ দরকার হয়। অথচ এরা মানুষকে কেবল বৈষয়িকতায় সীমাবদ্ধ [reduced] করে রাখতে চায়, এভাবে কল্পনা করতে চায়। অথচ আমাদের শুধু অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব বৈষয়িক চাহিদার দিক পূরণ হলেও মানুষের একেবারেই চলে না। কারণ, এসব ছাড়াও মানুষ তো অন্তত রাজনৈতিক মানুষ!  বৈষয়িকতা ছাড়িয়েও যে মানুষ আছে তাঁর  আরও যেসব চাহিদা আছে তা কমিউনিস্টেরা কখনও বুঝতে চাইলো না। আর এরই পরিণতি হল একালে; যেমন, তাঁর রাষ্ট্র কী তাকে গুম-খুন-অপহরণ ইত্যাদি করতে পারবে? রাষ্ট্রে জায়েজ আছে, থাকবে? কথিত শ্রেণী শাসনের একনায়কতন্ত্রের রাষ্ট্রে সব কী জায়েজ, এর নামে?  এসব প্রশ্ন, মানুষের ‘রাজনৈতিকতার’ প্রশ্ন – যা কমিউনিস্টেরা আমল করতে জানে না। অধিকার কী, নাগরিক কী – এসব ধারণা তাদের ভোকাবুলারিতেই নাই।  অথচ এদের জবাব  জানা না থাকা, এসব নাগরিক মানুষের ধারণা ও প্রশ্ন সম্ভবত একালে ভাতের প্রশ্নের চেয়েও বেশি জরুরি!

    কিন্তু তবু এরা “সরকারের বিকল্প দেখে” না। খুঁজে পায় না। আর  না পেয়ে সেজন্যই কী এরা “তেল-গ্যাসের বৈষয়িকতার মধ্যেই’ কেবল মানুষকে দেখতে চায়। এভাবে খুঁজতেই যেন মানুষকে আবার ঠেলতে শুরু করেছে কিছু বামেরা।
    তেল-গ্যাস বা মাটির নিচের সম্পদ নিয়ে কথা উঠলেই দেশের বামপন্থিরা মনে করে এটা তাদের একচেটিয়া এক সাবজেক্ট  আর তাঁরা নিজেকে এর বিষয়ের চ্যাম্পিয়ান মনে করে। আর তাতে তারা ইস্যু্টার অলিগলি বা রাজনীতি জিনিষটা বুঝুক আর নাই বুঝুক। তারা মনে করে তেলের খনির ইস্যু উঠলেই তারা একে এক মুখস্ত শব্দ ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে দিলেই বা ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বলে এক অর্থহীন ফতোয়া বিবৃতি দিয়ে দিলেই তারা এই ইস্যুতে চ্যাম্পিয়ান হয়ে যাবে। সব রাজনৈতিক দায় অবস্থান হাজির করে ফেলতে পারবে, আর এতেই তাদের কথিত “রাজনীতি-বোধ”  প্রকাশের কাজ হাসিল হবে? তাই কী?

    সরকার আমেরিকান ব্কেযক্তি কোম্পানিকে তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষঃ
    সরকার আমেরিকান কোন কোম্পানিকে  তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষ, মানে সরকার টিকে যাবে? কথিত কোন ডিল হয়ে যাবে?  দৈনিক যুগান্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে  ধরণের রিপোর্ট ছাপা হবার পর থেকেই বামপন্থিরা এমন অনুমান ও গুজব ছড়িয়েছে। যার মূল কারণ সম্ভবত, তারা মনে করে আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনীতিক স্বার্থ মানে কেবল বৈষয়িক স্বার্থ – কয়েকটা তেলের খনি হস্তান্তর।
    প্রথমত, এটা গত পনেরো বছরে লটকে থাকা একটা তেল অনুসন্ধানের কাজ বিতরণের ঘটনা যার কিছুই অন্ত নাই, দেখা যাচ্ছে না। কারণ, এটা “তেল আছেই” এমন জানা কোন ভুখন্ডের কোন অনুসন্ধান নয়। খুব সম্ভবত এর প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম বা অনিশ্চিত মানে একটা এমন ঘটনার নুন্যতম নিশ্চয়তা্র প্রাইমারি থ্রেসহোল্ড [Primary Threshold] যদি না থাকে তাতে ঐ কাজে অর্থ ঢালার আগ্রহ কম হবেই, সক্রিয় প্রতিযোগিতায় উতসাহ কমে যায় এটা তেমন।  তাই ব্লক বিতরণ পনেরো বছরে লটকে আছে।  এতে নয়া উতসাহ পেতে এবার কোম্পানি প্রস্তাব করছে যে ১৫টা ব্লক-ই তাকে দিতে হবে। অথবা নয়া উতসাহ দেখা যেতে পারে হয়ত আগামিতে কোন কারণে গ্লোবালি তেল-গ্যাসের দাম আকাশ্চুম্বি হলে, উতসাহ বাড়তে পারে। কিন্তু সেসব যাই হোক না কেন বেশিরভাগ ব্লকে এক্সপ্লোরশনে কিছু পাওয়া না গেলেও গড়ে তা লাভজনক হয়ে যায়। অর্থাৎ উতসাহের অভাব দূর না করতে পারলে কেউ আসতে চাইবে না।
    তবে সেসব যাই হোক ঘটনার মূল পয়েন্ট সেটা না। বরং ধরা যাক, এখানে তেল-গ্যাস পাওয়া একেবারে নিশ্চিত সেক্ষেত্রে কে “লাভবান” হবে? আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ নাকি এক্সন মবিল? যদি ধরে নেই ‘লাভবান” বলতে রাজনৈতিক স্বার্থ  বলে কিছু নাই সবটাই বৈষয়িক স্বার্থ তাহলে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এখানে কোন খাতক নয়। মূল সম্ভাব্য খাতক এক্সন মবিল [Exxon Mobil Corporation] কোম্পানি একা আর এর উচ্ছিষ্ট কুড়াবে বাইডেন প্রশাসনের কেউ কেউ বড় জোর। সোজা কথা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এতে কোন  লাভালাভ পাবে না।
    এর মানে হল – আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ কী – এটা যারা বুঝতেই পারে না, এটা হল সেই কমিউনিস্টদের বয়ান! অর্থাৎ ঐ ১৫টা ব্লকে যদি তেল উপচিয়ে পড়া নিশ্চিত ব্লকও হয় তবু আমেরিকা-হাসিনা সরকারের এখন এথেকে  সমঝোতার সংকট তা কাটার কোন সম্ভাবনা নাই।  অথচ এই শতকের শুরু থেকেই আমেরিকার প্রধান সংকট গ্লোবাল পালাবদলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতার নিজের আগের গ্লোবাল নেতৃত্ব ও প্রভাব আগের মতই পক্ষে ধরে রাখা। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ২০১৫ সালে ওবামা আমল থেকে এশিয়ায় চীনকে হারানো ও প্রভাব বাড়াতে না দেওয়া ইত্যাদি করতে যতগুলো কর্মসুচি আমেরিকা নিয়েছে তার কোনটাই ফলাফল আনে নাই। সাউথ চায়না সি – কে কেন্দ্র করে মালাক্কা প্রণালি বাধা তৈরির সম্ভাবনা থেকে শুরু করে কোয়াড আর সর্বশেষ ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্রাটেজি ইত্যাদি  কোনটাই আমেরিকাকে জুতমত চীনের উপরে কোন মাইলেজ দেয় নাই। সব উদ্যোগই ফেল করেছে বা করছে ক্রমশ। মূলত আশিয়ান দেশগুলোর [ASEAN] অনাগ্রহের জন্যই, তা বিশাল ফ্যাক্টর হয়ে থাকছে! আমেরিকান নীতিনির্ধারক ও থিঙ্কট্যাংকগুলো আশিয়ান দেশগুলোর স্বার্থ বা আগ্রহকে ছুতেই পারে নাই। তারা কেবল নিজ-রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে লাভালাভ আশিয়ান সদস্যেদের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। তাই  কোনভাবেই আমেরিকা তাদের হিলাতে পা্ররে নাই, পারার সম্ভাবনাও নাই।  ওতএব নয়া উদ্যোগে আমেরিকার জন্য নয়া কর্মসুচি হল বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ; আর এতে এবার যদি আমেরিকার কোন ভাগ্য খুলে…! এগুলোই হল আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ বা রাষ্ট্রস্বার্থ।  এখন কমিউনিস্টেরা যদি  দশ-পনেরোটা তেল-গ্যাসের উপচে পড়া খনি পাবার স্বার্থ দিয়ে আমাদেরকে ইস্যুটা ব্যাখ্যা করতে চায় বা বুঝতে বলে তাহলে আমরা কী বুঝব? এরা কী কোন রাজনৈতিক দল, কমিউনিস্ট ? এসব পেটি মধ্যবিত্ত, এরা কারা?
    যারা গ্লোবাল নেতৃত্বে –  প্রতিযোগিতা ও স্বার্থ-সংঘাত দিকটা আমল করার যোগ্যই নয় – বড় জোর তেলের খনি আর সবকিছুকেই বস্তুস্বার্থ দিয়ে বুঝে তাই সবকিছু তেলগ্যাসের বুঝ দিয়েই বুঁদ হয়ে থাকে তবে এদের লইয়া আমরা কী করিব!!

    সিপিবির এক ফাঁকা বিবৃতিঃ
    সিপিবির বিবৃতির এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ হল –

    বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ এশিয়াভিত্তিক সামরিক অভিলাষ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশলগত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রামের মাতারবাড়ীতে জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছিল, সেটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং এর সহায়ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইচ্ছানুযায়ী বাংলাদেশে একটি মার্কিন নৌঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি বিষয় জাপান সফরকালে আলোচিত হবে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এটি হলে তা হবে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

    প্রথমত এটা আমেরিকার নেহায়েতই কোন “সামরিক অভিলাষ” -মাত্র নয়।  ঠিক যেমনটা আমরা কোল্ড-ওয়ারের (১৯৫৩-৯১) আমলে সোভিয়েত-আমেরিকান ঝগড়ায় আমরা সবকিছুকেই ‘সামরিক’  বলে বয়ান করতে সোভিয়েত  বয়ানের মধ্যে দেখতাম। এছাড়া এমনকি সত্তর-আশির দশকের বয়ান দিয়েও বিশেষত,  কোল্ড-ওয়ারের চিন্তা ফ্রেমে একালে কিছুই ব্যাখ্যা বর্ণনা করা যাবে না। নিজেকে বোকা প্রমাণ করা ছাড়া ওতে আর কোন লাভ হবে না।
    দুই. ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি এটা কোন আমেরিকান প্রকল্পই নয়। বড়জোর একটা কনসেপ্ট মাত্র। আর তা হল,  চীন নাকি কোন আন্তর্জাতিক রুল, নিয়ম-কনভেনশন মানে না, রুল বেজড নয়। বিশেষ করে আড়ালে বলতে চায় চীন নাকি  জাতিসংঘের [UNCLOS – The United Nations Convention on the Law of the Sea] মানে, সমুদ্রসীমা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরবিট্রেশন (যা ঠিক বিচার নয় তবে সালিশীর মত জাতিসংঘের অধীনে এক  মিটমাট ব্যবস্হা) মানে না। এই অজুহাতে চীনকে একঘরে করে আমেরিকা – ভায়েরা আসেন একটা কনসেপ্ট তৈরি করি যার যার কনসেপ্ট অবস্থান বলি বললে যেমনটা হত – এটাই আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি বাতচিত।  এই লক্ষ্যে, সবদেশের একেকটা স্ট্রাটেজি প্রকাশিত হোক এটাই আমেরিকার ইচ্ছা। আর এর বিরুদ্ধে চীনা রাষ্ট্রদুতের অভিযোগ ওরা সুনিদির্ষ্ট করে একটা দেশকে (মানে চীন)  বাদ দিয়ে একটা কোন ইন্টারন্যাশনাল জোট কনভেনশন করতে পারেন না। তবে মূলকথাটা বা বটম অব দা ফ্যাক্টস হল, চীন কখনও এপর্যন্ত সে – জাতিসংঘ মানে না বা UNCLOS মানে না বা আইনের শাসন মানবে না ইত্যাদি বলে কোন বিবৃতি বা ধারণা দেয় নাই। ফলে এমন অভিযোগ গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে অ্যামেরিকান একটা চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন মাত্র। যদিও একথা ঠিক, সাউথ চায়না সি (যেটা চীন থেকে সমুদ্র পথে বের হলেই যে নৌ-অঞ্চল)  -তে চীন তার প্রায় সকল পড়শির সাথেই সমুদ্রসীমা বিতর্কে আছে।
    তিন. মাতারবাড়ি জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর এর সাথে “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত” -এসবকথা কোথায় পেল সিপিবি? হঠাত এনিয়ে মাঠে উদিত হল কোথা থেকে – এই কমিউনিস্টেরা ভারতের উত্তর পুর্বাঞ্চল রক্ষার দায়ীত্ব কাধে নিল কেন?  মাতারবাড়ি মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের (যা মাতারবাড়ি প্রকল্পের আরেক অংশ) জন্য বড় বাল্ক জাহাজে করে কয়লা (ছোট লাইটার জাহাজ না) সরাসরি বিদ্যুৎ প্রকল্প পর্যন্ত প্রবেশ সহজ করতে পারার এমন উপযোগী করে নির্মিতব্য এক গভীর সমুদ্রবন্দর। আর এতে আমেরিকার নৌঘাঁটি করার খায়েস এর পথে তা সাহায্য হতে পারে তাই এটা জাপানকে সামনে রেখে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তা করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আর এসবের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য মূল বা বাণিজ্যিক গভীর সমুদ্রবন্দর করার স্টাডি-পরিকল্পনা করা হয়েছিল পাশে মহেশখালির সোনাদিয়াতে। যেটা চীন (কুনমিং), বাংলাদেশ ও বার্মায় পণ্য আনা-নেওয়া জন্য ব্যবহার করা যায় – সাথে আর চাইলে ভারতও তা ব্যবহার করতে পারবে;  এতে তাহলে এর নির্মাণ খরচ সহজেই বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করে উঠে আসবে।  কিন্তু ভারতের আপত্তি ও ফুসলানিতে এই প্রকল্পই ২০১৫ সাল থেকেই বাগড়া, শেষে সরকার বাদ দিয়ে দেয়। আর আজকে পট উলটে যাওয়ায় সিপিবি  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য রক্ষার গল্প ও কান্নাকাটি নিয়ে এসেছে! এটাই ভাগ্যের পরিহাস! কিন্তু এখন কেন?  ভারতের পিঠে আমেরিকার হাত থাকাতেই এতদিন ভারত-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক বন্ধু  এই গর্বে মাটিতে পা না পড়া ভারত এতেই কী বাংলাদেশকে করদ রাজ্যের মত ব্যবহার করে আসে নাই???  তখন সিপিবি ও বামেরা কারদিকে কোথায় ছিল??? কোন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ছিল???
    চার. বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত তার “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি” পাবলিক করেছে। এনিয়ে বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম হল – “ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা: চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে ভারসাম্যের নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ”। মানে হাসিনার বাংলাদেশ চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে কোন পক্ষ নিবে না, বরং ভারসাম্যের নীতি বজায় রাখবে – যেকোন কারণেই হোক এটা সঠিক পদক্ষেপ। এটা ২০২০ সালে বা তারও আগে থেকেই হাসিনার একই অবস্থান – মানে এটাই হাসিনার নিজেকে ক্ষমতায় রাখার দিক থেকেও বরং উপযুক্ত বলে তাঁর নিজস্বার্থ ও  বিবেচিত। আর তা তিনি বজায় রেখেছেন। তাহলে হাসিনার এই চলতি ত্রিদেশীয় সফরে আমেরিকান সাথে আতাঁত আপোষ হয়ে যাচ্ছে বলে ভয় দেখানোর সুযোগ কই???
    অতএব,  হাসিনার এই ত্রিদেশীয় সফর নিয়ে আমরা বড়জোর বলতে পারি এটা হাসিনার শেষ চেষ্টা কোন “ওয়ার্কেবল রিলেশন” বের করার তবে সেটাও যদি লাইগা যায় ধরণের, তবে তুকতাকে বিশ্বাসের। তুকতাক বললাম এজন্য যে মানুষ সব হারালে তুকতাকে বিশ্বাস করতে চায়। মানে, মনে হয় না হাসিনা লজিক্যালি এমন কোন সম্ভাবনা দ্যাখেন।
    সারকথায় তাহলে, সিপিবির তরুণ নেতাদের নতুন করে পড়াশুনা করতে হবে। পুরানা সত্তর-আশির দশকের ভাবনা একেবারেই অচল, মুখস্থ কথা অচল হয়ে গেছে। কমিউনিস্ট চিন্তা একালে ঢেলে সাজাতেই হবে – মার্কস যাকে নিরন্তর পর্যালোচনা বা নিজেকেই ক্রিটিক [Critique] করতে বলতেন। রিভিউ [Review] বা ঢেলে সাজানো এটাই। এই মুরোদ ছাড়া সব পন্ডশ্রম, সময় নষ্ট – এই পথেই যাচ্ছে কমিউনিজম, যাবেই!

     

    কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদঃ
    সিপিবি’র বিবৃতির একটা বাক্য হল এরকম, “সিপিবি মনে করে, শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কখনো শুভ হবে না” ।
    এখন একথার মানে কী?  তাহলে বাংলাদেশে গত পনেরো বছরে কী হয়েছে? এসময়ে “ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেয়া” – বলতে কিছুই ঘটে নাই? এটাই কী সিপিবি মনে করছে? তাহলে এতদিনে হাসিনার বিকল্প নাই কথা এখন ফেলে ত্যাগ করে সরকারের সমালোচনায় আসার ভাব দেখানোর দরকার কী?
    ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটা কমিউনিস্ট ভোকাবুলারিতে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে চালু হয়েছিল কমিউনিস্টদের এক গুরু-নেতা লেনিন এর ১৯১৬ সালে লেখা বা প্রকাশিত ‘সাম্রাজ্যবাদ’ নামের বই থেকে। আর ওর পরের বছরই ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় রুশবিপ্লব বা দুনিয়ায় প্রথম এক কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল। যেটা পরে  ১৯২২ সালের পর থেকে – সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই নয়া নামে ১৫টা আলাদা মোটা জাত-ভুখন্ডের এক সমাহার রাষ্ট্র হিশাবে তা পুণর্গঠিত হয়েছিল। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়তে গিয়ে তা ১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত তাতে নয়া দেশ যুক্ত করা তখনও চালু ছিল। সবচেয়ে বড় কথা কবে থেকে কমিউনিস্টেরা আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ট্যাগিং বা নাম দেওয়া বা নিচা দেখানি শুরু হয়েছিল এর হদিস খুব কম কমিউনিস্ট দিতে পারবে। তাদের বেশির ভাগেরই এনিয়ে ধারণাটা আবছা, তবে তারা সারকথায় বলবে হয়ত কমিউনিজমের জন্ম থেকে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবা্দী” বলে কমিউনিস্টেরা ডাকে, যা একেবারেই ভুল। ফ্যাক্টস হল লেনিন সাম্রাজ্যবাদ নামে নয়া ধারণা আনতে বই লিখলেও ঐ বইয়ের ভিতরে অন্তত আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয় নাই। বরং ওখানে প্রসঙ্গ ছিল সেকালের জর্মানি। লেনিন ১৯১৭ অক্টোবরের রুশবিপ্লবের পরে বেঁচেছিলেন মাত্র আরো প্রায় ছয় বছর, ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। আর ওদিকে আমেরিকা ১৯৪৫ সালে মানে বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির আগে গোনায় ধরার মত কেউ কিছু ছিল না, মানে গ্লোবাল নেতা বলেও কিছু ছিল না। যখন সারা দুনিয়া ছিল কেবল ইউরোপ-কেন্দ্রিক কলোনি দখলদারদের হাতে বা নেতৃত্বে। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যে কোন বিশেষ বিরোধ-সংঘাত বা শত্রুতা কিছুই ছিল না।

    তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদি দেশ বলা শুরু করেছিল কবে থেকে? স্বভাবতই সেটা ১৯৪৫ সালের পরের পঞ্চাশের দশকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৫৩ সাল থেকে জব্বর ভাবে। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে স্তালিন তো প্রেসিডেন্ট রুজভেন্টের ঘনিষ্ট বন্ধু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ্যামেরিকান নেতা রুজভেল্টের ডানে-বায়ে থাকা আরো দুই ঘনিষ্ট দেশবন্ধুর একজন ছিলেন খোদ স্তালিন, আর তাতে অপরজন ছিলেন  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। এই তিন নেতা ১৯৪২ সালের পর থেকে একসাথেই বিভিন্ন দেশ নানান ইস্যুতে নেতৃত্ব দিতে ভ্রমণ করতেন। পরে ১৯৪৫ সালে রুজভেল্ট এর হঠাত স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান যিনি রুজভেল্টের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন ও একই নীতি অনুসরণ করতেন। ফলে তাঁর সাথে স্তালিনের সম্পর্কও প্রায় একই ছিল – সো নো সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগিং!
    পরের রিপাবলিকান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিলে সোভিয়েতের সাথে আমেরিকান সম্পর্ক একেবারেই বদলে এনিমি হয়ে যায় যা যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। যেমন, সিআইএ দল পাঠিয়ে আইসেনহাওয়ার এর ইরানের সরকার বা রেজিম চেঞ্জ, যেটা ইরানে মোসাদ্দেক সরকারকে  উপড়ে ফেলা ও তেলের খনির দখল নেয়া এমনকি আবার ওদিকে, চীনের তিব্বতে নেহেরুর ভারতের সাহায্যে ভারতে সিআইএ ঘাটি করে একই কাজ করা এর আরেক উদাহরণ। এখান থেকেই দালাইলামাদের তিব্বত ত্যাগ, ভারতে আশ্রয় আর পরিণতিতে শাস্তি হিশাবে চীন কয়েকদিনের জন্য সারা আসাম দখলে রেখে দেয়া ঘটিয়েছিল যা ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ বলে বাইরে থেকে বিবেচিত।  ভারত-চীনের সম্পর্ক তিতা সেই থেকে আর যা এনিমি হয়ে যায়।

    অন্যদিকে মনে রাখতে হবে লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা ও প্রসঙ্গ এর সাথে ১৯৫৩ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের আমেরিকাকে ট্যাগ লাগানো সাম্রাজ্যবাদ ধারণা – এদুটো ঠিক একই নয়।  মনে রাখতে হবে,  এমনিতেই রাষ্ট্র মাত্রই তা এক একান্ত স্বার্থ। এবং যা বাকি সব রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে আলাদা ও অপর [Other] গণ্য করা; এবং সবকিছুর উর্ধের নিজস্বার্থ – এক স্বার্থপর স্বার্থ। এবং এমন এক একান্ত স্বার্থ এটা যে অন্য কোন অপর রাষ্ট্রকে নিজ স্বার্থে অবলীলায় ব্যবহার করে ফেলতে পারে।  তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যতই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হোক না কেন অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্র বা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি  যতই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে নিজেদের আদর্শগত মিল আর হরিহরাত্মা এক দেহ-বোধ দেখাক না কেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থের প্রশ্নে সে সবকিছুর উর্ধে এক নিরঙ্কুশ আত্মস্বার্থ দিয়েই পরিচালিত স্বার্থ। কাজেই আইসেনহাওয়ারের আমল থেকে আমেরিকা-সোভিয়েতের যে বৈরিতা তাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজের সেই একান্ত চোখেই দুনিয়ার সকল কমিউনিস্ট দেশ ও পার্টি আমেরিকাকে দেখুক সেটাই হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি। আর এই পররাষ্ট্রনীতি,  আবার এর ভিতরে যদি আরেক কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র তার নিজস্বার্থের বেলায় তারও একান্ত স্বার্থ বের করে তাহলে?? তাতে অন্তত আমারও একান্ত স্বার্থ বইলা সেটা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে একটু আলাদা তো হতেই পারে। কিন্তু সেই ভিন্নতা কী সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি এলাও করবে বা শ্বাস নিতে দিবে???  তাই একই কমিউনিস্ট আদর্শের হওয়া সত্বেও দুই কমিউনিস্ট রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতার বিরোধ কমিউনিজমে কখনও রিসলভড বা সমাধা করা হয় নাই বা যায় নাই। মূল কারণ, দুই রাষ্ট্রের আদর্শ একই – এর মানে তাদের রাষ্টস্বার্থও এক  – এই অনুমান ভিত্তিহীন। মূলত দুই রাষ্ট্রস্বার্থ কখনও এক হতেই পারে না। এমন হওয়া মানে তারা তো এক-রাষ্ট্র হয়ে যেত!!!  তাই সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগ কতটা কমিউনিস্ট  আদর্শগত ধারণা আর কতটা সোভিয়েত রাষ্ট্রস্বার্থের একান্ত পররাষ্ট্র নীতি তা ভেদজ্ঞানে আলাদা করতে জানতে হবে। একারণে ১৯৫৮ সালের মাওয়ের  চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব এই নয়া ধারা  ডাকার কারণে পরে চীনও সোভিয়েত হামলার ভয়ে উলটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে  সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বলে ট্যাগ দিয়েছিল; যেটা পরে ১৯৯২ সালে  সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙ্গে যায় বলে এই ট্যাগিংয়ের সমাপ্তি ঘটে আর দরকার থাকে নাই।

    তাহলে একালে কে সাম্রাজ্যবাদ?
    কাকে কে, কেন সাম্রাজ্যবাদ বলবে সে ব্যাপারটা  নতুন করে পরিস্কার ঝালাই করে নিবার সময় এটা। যেমন ধরেন আজকের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে শুরু করা চীন-কে সিপিবি বা কোন কমিউনিস্ট পার্টি কী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগে ডাকার মত চীনকেও সাম্রাজ্যবাদ বলে ডাকবে? কেন ডাকবে আর কেন ডাকবে না এর ব্যাখ্যা-বুঝ একালের বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের লাগবে। নয়া পক্ষে বা বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক সে সাফাই লাগবে। কোল্ডওয়ার আমলের বুঝ ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার রিভিউ ঢেলের সাজানো আগে করে নিতে হবে। এই বুঝাবুঝির আবার যোগ্য হতে হবে।  সত্তর-আশির দশকের মুখস্ত ধারণা দিয়ে চলবে না। সোভিয়েত ভেঙ্গে গড়া ১৫ দেশই এখন আইএমএফের সদস্য, বলা ভাল যে দুনিয়ায় কে এখন আর আইএমএফের সদস্য নয় তাই এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার আনরিয়েলিস্টিক [অবাস্তব] ও আইডিয়েল [আদর্শগত] ধারণা আঁকড়ে কথা বলার মানে হবে না। তাহলে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা বুঝতে হবে আগে, বুঝাবুঝিতে ভুল কী ছিল  এর জানাবুঝা শুরু করতে হবে সেখান থেকে।   ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানটা জন্ম নেওয়ার সম্মেলনে তখন জীবিত স্তালিন; তিনি সেই জন্মসভায় সোভিয়েত প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। যদিও পরে যখন চাঁদা পরিশোধ করে আইএমএফের সদস্যপদ নিবার কথা তখন যোগাযোগ ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ঠিক কী কারণে? স্তালিনের বুঝ কী ছিল তা নিয়ে কোথাও তিনি কিছুই লেখেন নাই।  আজকের আধা-বুঝের কমিউনিস্টেরা অবশ্য মনে করেন তারা এই প্রতিষ্ঠানটা বুঝেন? যেন তারা স্টাডি করেছেন? অথচ তারা বলতেই পারবেন না যে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান এটা, ম্যান্ডেট কী? যেমন তারা কী বলতে পারবেন – বাংলাদেশ যদি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে বাংলাদেশের  লাভ বা ক্ষতি কী কী হবে? বাংলাদেশ বা যেকোন দেশ আইএমএফ এর সদস্য না হয়ে অর্থনীতিতে টিকে থাকতে পারবে কিনা, এনিয়ে কমিউনিস্টদের বক্তব্য কী??
    ক্যাপিটালিজমকে কমিউনিস্টরা যদি পাপ মনে করে সেক্ষেত্রে এটা তো এক এথিক্যাল বিবেচনা মাত্র – সে বোধ কী  কমিউনিস্টদের আছে – যদিও তাদের এই বিচারে বাংলাদেশের বা সেই অর্থে দুনিয়ার সব মানুষই পাপী। এমনকি যেসব অর্থনীতির শিক্ষক ও কমিউনিস্ট  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তারাও সমান পাপী। কারণ তারাও ক্যাপিটালিজমের বাংলাদেশ সরকার ও সমাজের থেকে বেতন নিচ্ছেন – তাদের  ভাত গলার নিচে যাওয়া এমন প্রতিটা ভাত – এর সবই ক্যাপিটালিজম পাপের ভাত। তাহলে পাপের বাইরে কে?

    “জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করলেই” এসব পাপের মুক্তি ঘটবে – এই অনুমানও এক স্বপ্ন-কল্পনা। কারণ এগুলাও আর বাস্তবে রিয়েলিজমে নাই।

     

    আরেক বিপদ কমিউনিস্টদের সার্বভৌমত্ব ধারণাঃ
    সবশেষের এক প্রসঙ্গ; বাংলাদেশে আরেক  বয়ান তৈরি করছেন  সিপিডি [CPD] এই প্রতিষ্ঠানের ডিস্টিঙ্গুইশুড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। যা খুবই বিপদজনক ও এথিক্সের ভয় সৃষ্টিমূলক।
    সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটি [Sovereignty] নিয়ে এথিক্যাল বুঝকে রাজনীতি বানিয়েছে কমিউনিস্টেরা। আমাদের মত রাষ্ট্রগুলো কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ফলে সার্বভৌম হয়ে গেল কেমনে আর তা থেকে একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার বা জাতিসংঘ দুনিয়াতে কোথা থেকে হাজির হল যারা এর কিছুই জানে না – এরাই আবার কিছু হলেই দেশের সার্বভৌমত্বের বুঝ হাজির করবে। যেমন দাবি করবে বাংলাদেশে সার্বভৌম তাই বাংলাদেশ নিজ ইচ্ছায় এটা সেটা কত কী করতে পারে। মনে মনে ভাব নিবে প্রবোদ দিবে যে এসব প্রশ্ন তোলা বুদ্ধিমানেরা যেন আমেরিকাকে কত্তবড়ই না বিপদে ফেলতে পারছে!
    না ভাই সরি, আপনারা পারেন নাই। আসলে বাংলাদেশের মত দেশগুলো কী করে কী অর্থে সভরেন তা আপনি আজও জানেন না। মানে কী? মানে হল, এটা আমেরিকারই অবদান যে সে দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রের অন্যদেশকে কলোনিদখল করে রাখা এই কাজটা অন্যায়, অবৈধ বলে – এই ভিত্তিতে এক জাতিসংঘ বানিয়েছিল – এটা অ্যামেরিকান আইডিয়া ও তাদের একক অবদান। এতে আমাদের মত দেশগুলো তাই ১৯৪৫ সালের পর থেকে কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ও জাতিসংঘের সদস্যদেশ হয়েছে; তাই এই অর্থে সে সভরেনও। কলোনিদখল হারাম কাজ –  এটাই দুনিয়াতে প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার তৈরি করেছিল, আর তারই রায় এটা। যদিও এর আর অনেক কিছুই এখনও পূরণ হয় নাই, খামতিতে আছে অনেক; কথা সত্য কিন্তু দয়া করে এই অর্জন টুকুকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না।  কারণ, সার্বভৌমত্ব এটা আসলে কী ও কতটুকু হয়েছে তা নিয়ে কমিউনিস্টেরা এখনও বেখবর।

    এখন আরো একটা কথা মনোযোগে শুনেন।
    এরপরেও যে  সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটির ধারণা যা তবুও আপনি শুনে ফেলেছেন তা কোথা থেকে  এলো বাংলাদেশ সভরেন দেশ বলে বিবেচিত হল তা না জানা সত্বেও –  একথা সত্য যে এই সার্বভৌম ধারণাটা আসলে এক আইডিয়াল [IDEAL] ধারণা। মানে তা রিয়েল [REAL] বা বাস্তবে দেখানো যাবে, এমন সত্য করে দেখানো যাবে – এমন ধারণা নয়।এটাই আইডিয়েল ধারণা। আর আইডিয়েল বলতে বুঝতে হবে – হওয়া উচিত – ধরণের ধারণা যেটা কাগজে বা খাতায় থাকা ধারণা মাত্র। সেকালে জন্ম নেয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডারটা অতটুকুই আপনাকে দিতে পেরেছে। এখন আপনি কতটুকু বাস্তবে সভরেন সেটা তো আপনার রাষ্ট্রকে  -হয়ে উঠে  মানে, মুরোদ অর্জন করে দেখিয়ে দিতে হবে।  অর্থাৎ আপনার রাষ্ট্রকে রিয়েলি [really] -ই সত্য করে দেখাতে হবে যে এটা সার্বভৌম। চীন বা ভারত যেমন আজকাল – রাশিয়াল তেল বুক ফুলিয়ে আমদানি করে দেখাচ্ছে, আমেরিকাকে অবজ্ঞা করছে। আমরা অবশ্যই তা পারি না। এমনকি  রুপপুরের রাশিয়ান প্রকল্পের পেমেন্ট রাশিয়াকে বাংলাদেশ ইউয়ানে শোধ করতে পারব কিনা তা নিয়েও আমেরিকারআপত্তি শোনা যাচ্ছে। এসব শুনতে বা আমাদের রাষ্ট্রকে আমল করতে হচ্ছেই। মানে হল রিয়েল সার্বভৌমত্ব বা মুরোদ দেখানোর মত সভরেনিটি হতে পারি নাই। কারণ, এটাও না-বুঝার কারণ নাই যে এসব জায়গায় – আমরা সভরেন দেশ – বলে বোকার মত বীরত্ব দেখাতে যাওয়ার মানে হয় না, অবশ্যই!

    কিন্তু দেবব্রত ভট্টাচার্য বিজ্ঞের মত বলেছেন,  “আইএমএফ ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে আমরা অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করেছি। আমরা তাদের শর্তাবলি মেনে নিয়েছি”। আচ্ছা কারও ঋণ শর্ত মেনে নিয়ে ঋণ নিলেই তাহলে আমাদের সার্বভৌত্ব চলে যাবে, ঢিলা হয়ে যায়। তাহলে মানুষের ব্যক্তি বা ব্যবসার জন্য ব্যাংক ঋণ নিলেই ইজ্জতের মত আমাদের সার্বভৌমত্ব চলে যাবে! কেন?  আইএমএফ এর ঋণ নিলে সার্বভৌমত্ব চলে যাবে কেন?   আইএমএফ কী তাহলে কোন পাপী সংগঠন।  দেবব্রত কী জানেন খোদ আমেরিকান রাষ্ট্র মানে যেটাকে আমেরিকা রাষ্ট্রের নেয়া  সভরেন লোন বলে, সেটা ৩১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে [দেখুন, On December 16, 2021, lawmakers raised the debt limit by $2.5 trillion to a total of $31.4 trillion.1 ] ; এবছর আরো ঋণসীমা বাড়ায়ে  নিতে হবে? আবার ওদিকে জাপান নিজ রাষ্ট্রের সভরেণ লোন (দেশি-বিদেশি বাজার থেকে খোদ রাষ্ট্রের  নেয়া ঋণ এটাই সভরেন ঋণ)  হল তা ইতোমধ্যেই ঐদেশের বাৎসরিক জিডিপির ২০০% এর বেশি?  তাহলে এদুই দেশের সভরেনিটিও কী নাই ধরতে হবে?? আর যারা ঋণ দিয়েছে তারা আমেরিকা বা জাপানকে কী বিনাশর্তে এসব লোন দিয়েছে? তাই কী? দেবব্রত ভট্টাচার্য কী বলেন!!

    আবার,  আচ্ছা দেখেন; আইএমএফ কী  হাসিনার বাংলাদেশকে বাধ্য করেছিল যথেচ্ছারে রিজার্ভ খরচ করতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ এর দেশ হতে, ডলারে সম্পদ পাচার করতে – রিজার্ভ ভেঙ্গে সঙ্কটে পড়তে? এমনকি শেষে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতেও কী আইএমএফ আমাদের সরকারকে বাধ্য করেছিল? এমন তো কোন সরকারি বা খাতক ভাষ্য জানা যায় না। তাহলে রিজার্ভ খুইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতে গেলে সেটা আইএমএফেরই দায় ও দোষ জ্ঞান করে কমিউনিস্টেরা কেন?  নিজেই দেশকে বিপদে ফেলে এরপরে নিজেই আইএমএফের কাছে আমাদের শাসকেরা যায় কেন, এমন তো কোন বাধ্যবাধকতা নাই! কিন্তু কমিউনিস্টেরা এমন প্রপাগান্ডায় বিশাল জ্ঞানী সাজতে চায় কেন???
    সাধারণ ফেনোমেনা হল, যেখান থেকেই কোন লোন নেন না কেন, তা আপন ভাই হলেও – সেই ভাইয়েরও কিছু সুবিধা-অসুবিধা বা স্বার্থ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যেমন কবের মধ্যে ভাইয়ের থেকে নেয়া ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে অন্তত এমন কথা তো থাকবেই। এখন এমন শর্ত দিলে কী সেটা নিজ ভাইয়ের কাছে আমার সারর্ভৌমত্ব চলে যাবে? কেন এই আজিব ভাবনা?
    তাহলে “শর্তাবলি মেনে নিয়েছি” একারণে, “আইএমএফ এর কাছে কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ” – মনে করছেন কেন দেবব্রত?? এত পাপবোধের অতিশুদ্ধতা কেন? অতিভক্তি কেন? রাজনীতিতে পাপপুণ্যের ধারণা মানে এই এথিক্স রাজনীতিতে নাই। তবে ধর্মতত্বে আছে। দেশীয়  কমিউনিস্ট কাছে ক্যাপিটালিজম বা সেই সুত্রে আইএমএফ এর ধারণা একেবারেই এমন ভুতুড়ে ধারণা! এর চেয়েও তা পাপ আর ছুয়াছুয়িতে শুদ্ধ-অশুদ্ধতার ধারণায় ভরপুর। এজন্যই তাদের কাছে  আইএমএফ ঋণ   মানে যেন শুদ্ধতা খুইয়ে আত্মসমর্পণ করা!  কমিউনিস্ট  মস্কোর পিএইচডি হলে কী এমন ভেট দেয়া বয়ান দিতেই হয়?  মা কালীর ভোগ চড়ানোর মত!!!

    আচ্ছা গত ওয়ান ইলেভেনের সময় ভারতের নর্থ-ইস্টকে সব ধরণের করিভোর দিয়ে দেওয়ার পক্ষে সিপিডি আদাজল খেয়ে লাগা ততপরতা দেখেছিলাম আমরা; সেটা কী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য করা হয়েছিল??  এমনকি যারা সিপিডির বিরোধিতা করবে তারা মুর্খ অশিক্ষিত বলতেও সিপিডির মালিক মহাজনদের সেসময় মুখে আটকায় নাই। আর ভারতকে করিডোর দিলে এর আয়ে নাকি আমরা সিঙ্গাপুর হয়ে যাবার কথা কারা বলেছিল?  এসব গুলো কী ছিল? ভারত-স্বার্থের পক্ষে ওপেন  দালালি নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষার উদাহরণ?   এগুলো কী আমাদের “অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ধরে রাখার” কাজ? কোন ধরণের “আত্মসমর্পণ না করার” উদাহরণ এগুলো?? বাহরে নন্দলাল…!! মারহাবা!

    সর্বশেষ এডিটঃ সকাল ০৯ঃ৫৭, ৩মে ২০২৩
    ____
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

  • ডলার-স্যাংশনের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেনেট ইয়েলেন 

    ডলার-স্যাংশনের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেনেট ইয়েলেন
    গৌতম দাস

    ২৮ এপ্রিল ২০২৩      ০০ঃ ০১
    https://wp.me/p1sCvy-4nV

     

          What Janet Yellen Can Do……..

    ঠিক দুদিন আগে গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে – এই শিরোনামে  একটা লেখা দিয়েছিলাম। অর্থাৎ এর ঠিক আগের লেখা ছিল সেটা।  আজকের প্রসঙ্গ সেই লেখাটার উপর দাঁড়িয়ে লিখবো। সেখানে আগের “গ্লোবাল নেতা” ধারণাটা আরো অনেক বেশি বিস্তারে ব্যবহার করব। একটা দেশে সবচেয়ে বড় রাজনীতি ও ক্ষমতা-কাঠামোর প্রতিষ্ঠান হল ঐ দেশের রাষ্ট্র মানে ওর রাষ্ট্র ব্যবস্থা। যেটাকে আমরা ওর State System বা Political Order & System বলে বুঝি। এখন এটাকে যদি লোকাল বা স্থাণীয় পর্যায়ের ঘটনা বলে বুঝি তবে ঠিক তেমনি দুনিয়াজুড়ে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল অর্ডার ও সিস্টেম  বলে কিছু একটা আছে; যার মুখ্য পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ।  এটাই লোকাল রাষ্ট্রগুলোর বিপরীতে গ্লোবাল ইন্সটিটিউশন। আর যে রাষ্ট্র এমন গ্লোবাল ইন্সটিটিউশন-গুলোর উপর এর সকল সিদ্ধান্ত-ততপরতার উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ও আধিপত্য রাখে সেটাই গ্লোবাল নেতা-রাষ্ট্র বলতে পারি।
    এই সুযোগে এটাও বলে রাখি গ্লোবাল নেতা ধারণাটা সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে ছড়িয়ে পড়েছে ১৯৪৫ সালের পরে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই দুই অর্থেই গ্লোবাল নেতা ধারণাটা বিস্তার ঘটিয়ে দুনিয়ায় ছেয়ে বসেছিল আমেরিকাকে কেন্দ্র করে। মানে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা বলে ধারণাটা ১৯৪৫ সালের আগে তেমন বিস্তারিত কিছু ছিল না। যদিও ইউরোপের কলোনিদখলদার হিশাবে টপ পাঁচটা দেশ (বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগীজ ও স্পানিজ) এর মধ্যে বৃটিশেরা ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী, যাদের প্রধান অর্থনীতি বা ব্যবসা ছিল অন্যদেশকে কলোনিদখল করা – ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মত কোম্পানি খুলে বা বিনিয়োগ করে কলোনিদখলে বেরিয়ে পড়া।  সেকালের ভাষায় এমন দখলদার শক্তিগুলোকে  ‘সাম্রাজ্য’ বলার চল ছিল। যেমন গর্ব করে সেকালে বলা হত – “বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্য কোনদিন অস্ত যাবে না, ঢুববে না”। এমন গর্বে ফেটে পড়া বাক্য থেকে অনেক কিছু বুঝা যায়। যদিও কোম্পানি-সাম্রাজ্যের এই দুনিয়া টিকে থাকতে পারে নাই, ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়।

    সংক্ষেপে বললে বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪০ সালের জুনে হিটলারের জর্মানির হাতে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গ দখল হয়ে যায়, পজর্মান সেনাবাহিনী নিজ প্রশাসন বসিয়ে এসব দখলি ভুখন্ডে শাসন শুরু করেছিল। এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা এজন্য যে সামরিক ও অর্থনৈতিক দখলদার শক্তি হিশাবে  ইউরোপের বৃটিশের পরেই ছিল ফ্রান্সের অবস্থান। সেই ফ্রান্সই হিটলারের জর্মানির দখলে চলে যাওয়া ছিল তাই তাতপর্যপুর্ণ ও ইঙ্গিতময়। আর তা দেখে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল নিজেদেরও একই ভবিষ্যত এঘটনার মধ্যে  দেখতে পেয়ে যায়। কারণ সাউদার্ণ ইংল্যান্ড আর নর্দার্ণ ফ্রান্স এদের মাঝে মানে এই দুই ভুখন্ড মাত্র এক ইংলিশ চ্যানেল দুরত্বে। কাজেই হিটলারের ইংল্যান্ডে আসতে আর কতক্ষণ – এই ছিল চার্চিলের মুখ্য ও চরম উদ্বিগ্নতা। এই চিন্তা করে চার্চিল সব ধরণের সাহায্য লাভে আশায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দারস্থ হওয়া ছাড়া বাঁচবার উপায় দেখেন নাই। আর ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও রুজভেল্ট তখনও যুদ্ধে কোন পক্ষ না নিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েই চলেছিলেন।  আর অপেক্ষা করছিলেন ইউরোপের মাথা গ্লোবাল নেতারা কবে সাহায্যের জন্য তার পায়ে পড়েন। সেবার চার্চিল কার্যত নিজ কলোনিসাম্রাজ্যের মালিক গর্ব বা সমস্ত ভ্যানিটি ভুলে নিজেকে লুটিয়ে সারেন্ডার করেছিলেন। আর তা থেকে সাহায্যদাতা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল নেতা আর যুদ্ধে সকলের (নিজ মিত্রশক্তির)খরচদাতা হয়ে উঠেছিল। এটা ১৯৪১ সালের আগষ্টের সিদ্ধান্ত। চার্চিল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এরপর যুদ্ধে হিটলারকে হারাবার পরের নতুন দুনিয়াটা হবে কলোনিদখল-মুক্ত এক দুনিয়া।  এটাই হয়েছিল রুজভেল্টের আমেরিকা ও এর ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ ব্যবসায়ী প্রধান চাওয়া ও তা অর্জনের সাফল্য। স্বভাবতই এই সুফল আমরাও পরে নিয়েছিলাম। বৃটিশ-মুক্ত স্বাধীন হয়েছিলাম।  কিন্তু এর আগে রুজভেল্ট-চার্চিল চুক্তির পরে এর চারমাসের মাথায় ১৯৪২ জানুয়ারি এক জানুয়ারিতে, স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নও একই পথ অনুসরণ করে মানে, আমেরিকান নেতৃত্ব মেনে চুক্তিস্বাক্ষর করেছিল। কমিউনিস্টেরা এই ইতিহাস স্মরণ করতে চায় না; বরং না জেনে থাকতে চায়। তারা হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েত দেশ বাঁচানো এক বীর হিশাবে স্তালিনের জয়গান দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের বয়ান সাজায়। অথচ আমেরিকার নেতৃত্বে মিত্রশক্তিতে স্তালিন যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বলেই আর এতে, যুদ্ধের খরচ হিশাবে আমেরিকান অর্থসাহায্য  না পেলে বীর স্তালিনের সোভিয়েত দেশ বাঁচানো কি করে সম্ভব হত – সেদিকটা ভুলে চুপ থাকতে চায়।
    তবে  মোটামুটি ১৯৫০ সালের পর আর ১৯৫৩ সালের পরে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। সুনির্দিষ্ট করে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বলা শুরু করেছিল; যেখান থেকে আমেরিকা-সোভিয়েত কোল্ডওয়ার [Cold War] এরও যাত্রা  শুরু মানা হয়। কারণও ছিল এই যে আমেরিকান রাজনীতিতে টানা ২০ বছর পরে ১৯৫৩ সালে এসে প্রথম কোন রিপাবলিকান আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে উঠেছিলেন; তিনি হলেন আইসেনহাওয়ার, তাঁর বিজয় ঘটেছিল। আর তাতে এতদিনের আমেরিকার সে গ্লোবাল ইমেজ যে আমেরিকা  বিশ্বযুদ্ধে জিতিয়ে দুনিয়াকে গড়া নতুন রূপ দেয়া, জাতিসংঘ এর জন্ম দেয়া, আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান গড়া যে ইতিবাচক উজ্জ্বল আমেরিকান ভুমিকা ছিল এর পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। কারণ আইসেনহাওয়ার আমেরিকা তখন এক নয়া আমেরিকা যে এক নয়া ফেনোমেনা চালু করেছিল – সিআইএ দল পাঠিয়ে রেজিম চেঞ্জ, দেশ দখল বা তেলের খনির মত সম্পদের দখল নেয়া ইত্যাদি বহু কিছু শুরু হয়েছিল, সে আরেক প্রসঙ্গ।

    কিন্তু এত পরিবর্তনের মাঝেও পরবর্তিতে কমিউনিস্ট চিন্তা ও ভুমিকা ততই  সব মিলিয়ে আরো পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছিল। যেমন “গ্লোবাল নেতা” বা একটা নয়া “গ্লোবাল অর্ডার”  বলে দুনিয়ায় এতবড় পরিবর্তন নয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু হওয়াকে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন আমল না করার পথে চলে যায়। অথচ নয়া দুনিয়ায় নয়া বিশ্বব্যাবস্থা যেটা তখন হাজির হয়েছিল যার ভিত্তি হল, কাউকে কলোনিদখল হারাম এটা মানতে আমেরিকার সারা ইউরোপকে লিখিতভাবে বাধ্য করা থেকে ইত্যাদি এসব দিক গ্লোবাল কমিউনিস্ট রাজনীতিতেই আর কখনও আমল হয় নাই। অথচ স্তালিনের নয়া ভাষ্যটা হল সেটা নাকি নয়া-উপনিবেশবাদি দুনিয়া। তাহলে ১৯৪২ সালের পয়লা জানুয়ারিতে স্তালিন কোন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন??  যেটা জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা ১৯৪২ এর দলিল?

    এই প্রসঙ্গটা নানাভাবে বহুবার আমার লেখায় যুক্ত করেছি। কিন্তু খুব একটা প্রভাব পরেছে টের পাইনি। আগে খাড়া রেফারেন্স দিয়েছিলাম ইংরাজি ডকুমেন্ট থেকে। সম্প্রতি একটা বাংলায় করা পিডিএফ পেয়েছি। সেখান থেকে ওর সপ্তম পাতা থেকে নিচার অংশ তুলে এনেছি। আগ্রহিরা পুরা পিডিএফ ডকুমেন্ট এখানে পেতে পারেন। এটা সম্ভবত স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বাংলায় করা।

    অথচ কমিউনিস্টেরা জানতেও পারে নাই বা জানতে চায় নাই যে কলোনিদখল ব্যবস্থার উতখাত ও নিষিদ্ধ এই ঘোষণা দিয়েই জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা, যার মধ্যে স্তালিনও একজন স্বাক্ষরকারি।
    এভাবে কমিউনিস্টেরা কখনই জানতেই পারে নাই, চায় নাই যে  গ্লোবাল নেতা বা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু ফেনোমেনাগুলো আসলে কী? অথচ আজ দুনিয়া ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকান নেতৃত্বে ৭৮ বছর পার করছে আর সবচেয়ে বড় কথা এটা এখন সেই গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল আসন্ন এর সময়। কমিউনিস্টেরা এখানে এনিয়ে এখনও বেখবর। খাড়া বলতে গেলে, কমিউনিস্টেরা আসলে  এরপর থেকে বিশেষত চলতি শতকের দুনিয়ার ঘটনা-ফেনোমেনা গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। পিছিয়ে অযোগ্য হয়ে গেছে। যার মূল কারণ, ১৯১৬ সালের পরে কমিউনিস্ট চিন্তায় আর কোন আপডেট বা কোন ব্যবহারিক ভাষ্য আর নাই, আসে নাই।

    তবে এখানে আরেকটা কথা বলে রাখি, ১৯৪৫ সালের আগের যতটুকু গ্লোবাল নেতার ধারণা ছিল সে ধারণা মতে গ্লোবাল নেতা সেটা মূলত সামরিক শক্তি গত ধারণা বলেই বুঝা হত। বিপরীতে  ১৯৪৫ সালের পরে একালের গ্লোবাল নেতা বলতে আরও অনেক দিকে ধারণাটা ছড়িয়েছে। যেমন এর একটা বড় অনুষঙ্গ অংশ বা দিক হল গ্লোবাল কমিউনিটিতে দান বা লিল্লাহ। জাতিসংঘের দিক থেকেই যদি বলি মূল জাতিসংঘের অধীনে আরেক এজেন্সি প্রতিষ্ঠান হল ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম [WFP] বা বাংলায়, বিশ্ব খাদ্য  কর্মসুচি। এটাই হল দুনিয়ার ভুখা মানুষকে দানের খাদ্য পৌছে দেওয়া। আমাদের যুদ্ধের পরে ১৯৭২-৭৩ সালে আমরা এই WFP এর ভরসাতেই বেচে গেছিলাম। ১৯৭৪ সালে আর পারি নাই, সে আরেক কাহিনী, তা পরে কখনও।  গুলশান ধরণের জায়গা বাদে ঢাকার বাকি এলাকায় কমিউনিটি বা মহল্লা সেন্স কাজ করে প্রবল্ভাবে। দেখা যাবে মহল্লার কোন মুরুব্বি প্রায়ই ডেকচি বসিয়েছেন – খিচুরি-বিরিয়ানি কিছু একটা রান্না করে গরীব বস্তিতে বিলাচ্ছেন। WFP এই অর্থে লিল্লাহ সংগঠন যেন। এখন WFP এর সাথে গ্লোবাল নেতার কী সম্পর্ক? WFP-কে বড় চাঁদাটা দেয় কে? কেউ গ্লোবাল নেতা হতে চাইলে সবচেয়ে বড় চাঁদাদাতা হতেই হয়। এমনকি সরকারি অর্থের ঘাটতি থাকলে রাষ্ট্রীয় ঋণ করে হলেও গ্লোবাল নেতাকে WFP-কে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারতে হয়। গতবছর আফগানিস্তানে খাদ্য সংকট হয়েছিল চরমে। জাতিসংঘ নয়া সরকারকে এখনও স্বীকৃতি না দিলেও খাদ্য সাহায্য যোগাড় করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করে নাই। সারকথায় মানবিক সাহায্যের এক সেফটি নেট এক নয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ১৯৪৫ সালের এই দুনিয়া হাজির এবং তা খুবই সুসংগঠিত এক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম হিশাবে তা স্বীকৃত।

     

    সরাসরি ব্যবহারিক বাস্তবতায়, বাইডেনের আমেরিকাঃ
    বাইডেন ২০২১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন মূলত একথা বলে যে গ্লোবাল নেতা হিশাবে আমেরিকার এখনও কতসব হাতিয়ার বা টুলস আছে যা অন্য বিশেষ করে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টেরা কখনও এক্সপ্লোর বা হাতড়ে খুজে দেখেনই নাই।  এগুলো ব্যবহার করে আমেরিকা এখনও চীনকে ছাড়িয়ে গ্লোবাল শীর্ষনেতা থেকে যেতে পারে। তাই তাঁর ক্ষমতামলের বৈশিষ্টই হবে আমেরিকার সেসব পড়ে থাকা মারাত্মক হাতিয়ার প্রয়োগে আনতে হবে।  যেমন, তিনি এমন দুটা হাতিয়ার এর কথা বললেন – শত্রু বা বেয়াড়া দেশের বিরুদ্ধ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ এনে তাকে পর্যদুস্ত করে ফেলা। এমনি আরেকটা অস্ত্র হল অবরোধ বা স্যাংশন [Sanction] আরোপ করা।

    চলতি প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তিনি তাই তাঁর পুর্বসুরি ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান আর তিনি ডেমোক্রাট, আর নিজে ডেমোক্রাটে বলে তারা আতেঁল ও বুদ্ধিমান, বুদ্ধির চর্চা করে চলে থাকেন এটা রিপাবলিকানদের উপর ডেমোক্রাটদের চিরাচরিত উচা ও গর্বের ধারণা! তাই ‘বোকা’ ট্রাম্পের উপর তাদের বুদ্ধির ছটা দেখাতেই যেন তিনি যে নীতি-পলিসি নিয়ে সামনে এসেছিলেন তা হল এরকম যে, আমেরিকা কেন চীনের কাছে হারবে যেখানে আমেরিকার এখনও অঢেল বাড়তি সুবিধার হোল্ডার! বাইডেন যেন বলতে চান যে বোকা ট্রাম্পের মত লোকেরা ঝটাপট প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে – তাই চীনের উপর আমেরিকার হাতে থাকা বাড়তি সুবিধাগুলো কী কী তা এদের ‘জানাই নাই’! আর এসব বাড়তি সুবিধার দুটা বাইডেন বের করে দাবি করলেন যে তিনি এমন দুইটা কে তাঁর নীতি-পলিসি করে হাজির করছেন। যা অন্যদের বা শত্রুদেশকে বিপদে ফেলতে সক্ষম আর তা থেকে তাদেরকে আমেরিকার হাতে একধরণের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তেমনই এক মোক্ষম অস্ত্র হল তাদের ‘হিউম্যান রাইট’ ভায়োলেশনের প্রশ্ন তুলে তাদেরকে বেকায়দায় ফেলা। অন্যভাষায় বললে, এজন্যই বাইডেন-ব্লিঙ্কেন ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ‘হিউম্যান রাইট’ কমপ্লায়েন্সের প্রশ্ন তোলা তাঁদের বৈদেশিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    বিগত ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক জোটঃ
    বিগত বাইশ বছর ধরে মানে চলতি শতকের শুরু থেকে  ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক জোট বা ঐক্য যা আমরা এতদিন কাজ করতে দেখেছিলাম সেই প্রেসিডেন্ট বুশের আমলের শুরু থেকে, মনে হচ্ছে তা এই ২০২৩ সালে এসে এবার ক্ষান্ত দিতে চাইছে বা থেমেছে; যে স্ট্রাটেজিক ঐক্যজোটের অকার্যকারিতা বা স্তব্দ হয়ে যাওয়া এখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে না বললেও প্রায় সবটাই এখন কার্যত প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। আগামি নির্বাচনে মোদি সরকার যেন জিতে আসতে না পারে সেকাজে বাইডেন কমবেশি প্রকাশ্যে উঠেপড়ে লেগে পড়েছে। অথচ গত বাইশ বছর ধরে এই চীন-ঠেকানোর ঐক্য বা চায়না কনটেইনমেন্ট [China Containment] এর ঐক্য যেন চিরকালের তাই অনেকের মনে হচ্ছিল। মোদি এখন ক্রমশ বাইডেনের ‘হিউম্যান রাইট’ অস্ত্রে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ছেন। বার্মায় রেজিম চেঞ্জ প্রশ্নে আলাদা স্বার্থ বা আলাদা রাস্তার দুই দেশ হয়ে উঠছে।

    বাইডেনের ব্যবহৃত আরেক অস্ত্রের নাম ‘ডলার অবরোধ’ অনেকে যেটাকে অনেক সময় “ইকোনমিক স্যাংশন”[Economic Sanction] আরোপ বলছেন.  এর সোজা মানে হল ডলারে কোন বাণিজ্য বা বেচাকেনা করা যাবে না অথবা আমেরিকান কোন ব্যাংকের সুইফট কোড ব্যবহার করা যাবে না আমেরিকান সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে। আন্তর্জাতিক দুনিয়াজুড়ে যত বাণিজ্য বা পণ্য কেনাবেচা হয় এর সত্তরভাগের বেশি বাণিজ্য-লেনদেন হয় আমেরিকান ডলারে। অর্থাৎ পণ্যমুল্য ডলার এই মুদ্রায় লিখে ইনভয়েস তৈরি করা হয়। আর সেকারণে এই লেনদেন সম্পন্ন হতে হলে প্রক্রিয়ার মাঝে কোথাও কোন আমেরিকান ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা বা সাহায্য লাগবেই। আর এখানেই আমেরিকান স্যাংশন মানে আপনি (যেমন তেল-বিক্রেতা রাশিয়া হলে) আমেরিকার ব্যাংকের সুবিধা ব্যবহারে অযোগ্য।

    এখন এটা হল দুইধারী তলোয়ারের মত। কারণ, এটা ঠিক যে কোনদেশের উপর আমেরিকান ব্যাংক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিষধাজ্ঞা যেটা স্যাংশন নামে পরিচিত এবং তা আমেরিকান সরকারের পক্ষে বাস্তবায়নও সহজ। কারণ আমেরিকান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এই নির্দেশ পাঠিয়ে তা বাস্তবায়ন করানো সম্ভব। আর নির্দেশ অমান্য করলে ব্যাংকগুলো দুই বিলিয়ন ডলার ফাইন করারও উদাহরণ আছে। ইরানের উপর নিষধাজ্ঞার বেলায় হংকং ব্যাংকের উপর এমন দু বিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিল। কিন্তু দিনকে দিন এই ইচ্ছামত ডলার অবরোধ অপব্যবহার আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যেমঞ্চীনের সাথে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যও এখন উঠতি ট্রেন্ড। মানে আসলে বলতে চাচ্ছি ডলারের পাশাপাশি চীনা ইউয়ানেও বাণিজ্য বাড়ছে। অর্থাৎ যত বেশি ডলার ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে ততই এথেকে ছুটকারা পেতে প্রচেষ্টাও প্রবল হবে। আর এতে এখন গ্লোবাল মোট বাণিজ্যিক লেনদেন তা ডলারে লেনদেন এর ৭০-৯০% ডলারে  হয়ে থাকে। তা একবার ৭০% এর কাছাকাছি হতে শুরু করলে এই ঝোঁক স্থায়ী হতে চাইবে। মানে অবরোধের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বিপুরীতে কাজ করবে।
    একথাটা যেকোন ভাবেই হোক মিডিয়ার সামনে এসে গেছে। আমেরিকান অর্থ-ট্রেজারি মন্ত্রী হলেন জেনেট ইয়েলেন [Janet Yellen]। সিএনএন এর ফরিদ জাকারিয়ার সাথে এক আলাপ তিনি মন্তব্য করে বসেন যে অপর দিকটা হল,  “আমরা যখন কোন দেশের বিরুদ্ধে স্যাংশন ব্যবহার করি যা ডলারের ভুমিকার সাথে সম্পর্কিত – এতে এমন রিস্কও থেকে যায় যাতে তা ক্রমশ ডলারের আধিপত্য ক্ষুন্ন করে ফেলতে পারে”।  তিনি আরও বলেন, “এভাবে ডলার অবরোধের যথেচ্ছ ব্যবহার  এটা অবশ্যই চীন, রাশিয়া বা ধরেন ইরাণকে ডলারের বিকল্প খাড়া করার জন্য প্রবল আকাঙ্খার জন্ম দেয়”।  অর্থাৎ আমেরিকাও রিস্কের পথে হাটছে তা জেনেট স্বীকার করে নিয়ে বলেই ফেলেছেন ।

    “There is a risk when we use financial sanctions that are linked to the role of the dollar that over time it could undermine the hegemony of the dollar,” “Of course, it does create a desire on the part of China, of Russia, of Iran to find an alternative,” 

    আরো কিছু প্রতিক্রিয়াঃ
    এদিকে এখনকার পাকিস্তান খুব ভাল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আগের ইমরান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে ডোনাল্ড লু এর ভুমিকা নিয়ে অনেক কথা উঠেছিল। সেটা যাই হোক, তাতে ইমরানের ক্ষমতাচ্যুতি এড়ানো যায় নাই। পরিবর্তে শাহবাজ শরীফ ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ক্ষমতা পেলেও  সরকার চালাতে গেলে খারাপ অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়া পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় ডলারের ব্যবস্থা যদি আমেরিকা না করে দিতে পারে; নিদেনপক্ষে বিশ্বব্যাংককে দিয়েও যদি আমেরিকা ব্যবস্থা এরেঞ্জমেন্ট না করে দিতে পারে তবে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব ক্রমশ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে যাবে। পাকিস্তানের নিয়মিত অর্থসংকট এমন ইঙ্গিত দেয়। আবার এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে যদি চীনের কাছ থেকে নিয়মিত লোন দেরিতে পরিশোধে ছাড় রোল আউট[Roll Out] বা নয়া ঋণ চাইতে হয় তবে এটা তা আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের জন্য ভাল সংবাদ নয়।  মানে ইমরানও তার আমলে ক্ষমতা ছাড়ার দুমাস আগে এমন রোল আউট নিয়েছিলেন।

    আবার রয়টার্সের এক নিউজ যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে ওর শিরোনাম হল, রাশিয়ার তেলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিতে ইউরোপ, লাভ তুলছে এশিয়া। মানে হল ডলার অবরোধ কাজ করছে না। আর শুধু আমেরিকা না বলে পশ্চিমা অবরোধ মানে হল এখানে আমেরিকার মত করেই ইইউ জোটেরও আলাদা অবরোধ দেয়া আছে। এমনকি এশিয়ার জাপান বা অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশেরও একই অবরোধ দেয়া ছিল।

    অন্যদিকে, জ্বালানি তেল প্রসঙ্গে আরো দুর্দশার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। যেমন, আমেরিকা রাশিয়ার উপর তার তেল বিক্রির লেনদেনে ডলারে করার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এতে ভারত হয়ে উঠেছে রাশিয়ান ক্রুড ওয়েল আমদানি করে পরে নিজে রিফাইন করে তা পুণ-রফতানীর প্রধান দেশ বা  রাশিয়ান তেল রপ্তানির সেকেন্ডারি উৎস দেশ।  অথচ আমেরিকা এতে বাধা দিতে পারছে না। বা অন্তত দিচ্ছে না তাই আমরা দেখছি যার অন্তত একটা বড় কারণ হল অর্থনৈতিক লেনদেন ডলারে হচ্ছে না। এতে ফলাফলে রাশিয়ার উপর অবরোধ কার্যত এখানে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ অবস্থা হল এতে বিপদ ক্রমশ আরো বাড়ছে। কারণ পাকিস্তানের কথাই যদি ধরি,  ইতোমধ্যে এবার পাকিস্তানও দুই চালান এমন রাশিয়ান অশোধিত তেল যা ভারত শোধন করে রপ্তানি করছে তা ভারত থেকেই আমদানি করে ফেলেছে পাকিস্তান।  শুধু তাই না, এবার সরাসরি রাশিয়া থেকেই (তবে অশোধিত) রাশিয়ান তেল আমদানি করে ফেলেছে পাকিস্তান, পরে নিজ রিফাইনারিতে শোধন করে ব্যবহার করবে বলে। আর এতে কোন মুদ্রায় তা আমদানি করেছে তা মিডিয়ায় পাকিস্তানের মন্ত্রী অপ্রকাশ্য রেখেছেন। অর্থাৎ ধরে নিতে পারি তা ডলারে অবশ্যই নয় এবং সম্ভবত তা ইউয়ানে।
    এতে নিট ফলাফলে, রাশিয়ার উপর আমেরিকান অবরোধের পরিণতি যা দেখা গেল তা নিঃসন্দেহে বিব্রতকর!  মানে হল একদিকে, আমেরিকা নিজ সমর্থনের শাহবাজ সরকার যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বিদেশি মুদ্রার অভাবে মারাত্মক ভুগছে – এই বাস্তাতবতায় আমেরিকা শাহবাজ সরকার রাশিয়ান তেল যেন না কিনে তা করতে চাপ দিতে পারছে না। অপরদিকে চাপ দিতে না পারায় রাশিয়ার উপর আমেরিকান অবরোধ অকার্যকর হয়ে থাকছে। এভাবে আমেরিকার যদি সকল দেশকেই নানান অজুহাতে ছাড় দিতেই হয় তাহলে অবরোধ-শ্যাংশন কথাটা অর্থহীন!!  এসবই কী আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের সক্ষমতার বিরুদ্ধে ইঙ্গিত হয়ে উঠবে!!!  মানে হল শুধু রেজিম চেঞ্জ নয় সাথে নয়া সরকার চালানোতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আমেরিকান সক্ষমতাতেও সে যেন শর্টেজে না থাকে তা,  একালে আমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকার জন্য সমান গুরুত্বপুর্ণ  এসেনশিয়াল বলে হাজির হচ্ছে!!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে

    গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৬ এপ্রিল ২০২৩    ০০ঃ০৫

    https://wp.me/p1sCvy-4nv

     

    US-China Split Could Hinder Foreign Investment, Lower Global GDP, IMF Warns - BloombergUS-China Split 

     

    গ্লোবাল নেতা মানে গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতা হিশাবে, দুনিয়ায় আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ১৯৪৫ সাল থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এর পরিণতি বা ফলাফলে। যদিও অনেকের ধারণা এই অবস্থান যেন অফুরান বা অনন্তকাল ধরে চলবে। কিন্তু যার শুরু কিভাবে, কবে ও কী পরিস্থিতিতে আর যদি তা তা জানা-বুঝা যায় সেক্ষেত্রে তার শেষও আমাদের জানা থাকবে ও যাবে। এর মানে তাহলে বুঝতে হবে যে  সেটা আসলে আর অনন্তকালের কোন ঘটনা-ফেনোমেনা নয়। এছাড়া অনেকের আরও একটা ভুল ধারণা করেন যে গ্লোবাল নেতা ধারণাটা যেন সামরিক শক্তির, মানে সামরিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের। ফলে যেন কোন দেশ  পরাশক্তির [Superpower] দিক দিয়ে কতবড়  এর দ্বারাই বোধহয় নির্ধারিত হয়েছে কে গ্লোবাল নেতা বা কে নেতা নয়। না, সরি; এই ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বরং এককথায় বললে, কোন দেশকে গ্লোবাল নেতা বলতে যে সক্ষমতা বা যোগ্যতা কথা বলা হয় এটা মৌলিকভাবে  মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দুনিয়াতে একেকটা দেশ একেক সময়কালে নানান কারণে নিজ অর্থনীতিতে বাড়তি সঞ্চয়ে তা উদ্বৃতের (সারপ্লাস) পাহাড় হয়ে হাজির হতে দেখা যায়। এটাই ঐ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিকসহ সব ধরণের সক্ষমতার আদি উৎস। অর্থাৎ মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই ঐদেশের বাকিসব সক্ষমতার উৎস হয়ে হাজির হয়।  আর উত্থিত অর্থনীতির দেশ তা থেকেই অন্যদেশ বা বাকি দুনিয়ার উপর (ইতি বা নেতি আধিপত্য) এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে হাজির হয়। তাই অর্থনৈতিক বিপুল উত্থান থেকে  তা সবদিকে বিকশিত হয়ে উঠলে তা থেকেই ক্রমশ একটা দেশ গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে উঠে।  তাই বটম লাইনটা হল, গ্লোবাল নেতা মানে আসলে প্রাথমিকভাবে অথবা ওর প্রাথমিক রূপ হল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠা। একারণে চীনের অর্থনীতি কবে আমেরিকার ছাড়িয়ে আরো বড় অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে সেদিকে দুনিয়ার অভিমুখ বুঝতে চাওয়া লোকেদের, এমন সব এনালিস্টেরা আগ্রহের ফোকাস।

    তবে সাবধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠার ফেনোমেনাটা সাবজেকটিভ বা কোন কর্তা-মানুষের সিদ্ধান্তমূলক নয়। বরং তুলনা করে বললে,  যেমন সাবজেকটিভের বিপরীত শব্দ হল অবজেকটিভ। সেদিক থেকে  বলা যায়  ‘বিপ্লব’ [Revolution] ধারণাটাই  সাবজেকটিভ বা কর্তাবাচক। সক্রিয় মানুষ চাইলে বা করার চেষ্টা করলে তবেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে পারে; নইলে নয়। বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে কোন ‘বিপ্লব’ ঘটে না অথবা বলা যায় যা প্রাকৃতিক বা নেচারাল তা বিপ্লবী ঘটনা নয়। প্রাকৃতিকভাবেও অবশ্যই দুনিয়াতে হাজারো পরিবর্তন ঘটে থাকে এখনও ঘটে চলেছে তবে সেগুলো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক ঘটনাবলী নয়, মনে করা হয় না। তাই প্রাকৃতিক মানে অবজেকটিভ।  আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ইংরাজিতে তাই বলে ইভোলিউশন [Evolution]। মানে সেটা রি-ইভোলিউশন [Re-evolution বা Revolution (বিপ্লব)] জাতীয় কিছু  নয়। এই পরিবর্তনগুলোকে তাই ‘অবজেকটিভ’ ঘটনা বলা হয়। এখানে কোন কর্তা থাকেনা, এটা প্রাকৃতিক।
    অর্থাৎ আমাদের এখানকার আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই, কোনদেশের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা তাই ঠিক কোন সাবজেকটিভ ঘটনা নয়; যে তা  ঐ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাপ্রসুত এমন। বরং অবজেকটিভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত; মানে মানুষের ইচ্ছায় যেমন কোন জলোচ্ছাস বা ভুমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আসে না, তেমনই।

    আবার অনেককে আরেক মিথ্যা অনুমান পুষে নিয়ে থাকতে দেখা যায় যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই যেনবা সে দেশ গ্লোবাল নেতা হবেই; এমন মনে করে থাকে। এমন ধারণা ভুল। তাদেরকে বরং মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনসংখ্যা কখনও চীন বা ভারতের মত ১৪০ কোটির আশেপাশেও ছিল না, এখনও নয়। আমেরিকা এখনও কেবল আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার, যা প্রায় ৩৩ কোটি মাত্র।  আর এই জনসংখ্যা দিয়েই  আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল এবং এখনও আছে বা শেষ যুগ পাড় করছে বলা যায়। তবে গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ হতে গেলে জনসংখ্যার অধিক্য একটা পজিটিভ ফ্যাক্টর বা উপাদান অবশ্যই। তবু, সাবধান বড় জনসংখ্যা মানেই তা গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ; তা এমনটা নাও হতে পারে। নির্ভর করে নিজ ঐ বড় জনসংখ্যাকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ম্যানেজ করে কাজে লাগিয়ে বড় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তারা কতটা সক্ষম আর কপালও ভাল কিনা – এর উপর। যেমন, ভারত ও চীনের জনসংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি, এখন ভারত বরং একটু বেশি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলারের যেখানে চী্না অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়নের আর আমেরিকা এখনও ২৩ ট্রিলিয়নের, মানে চীনের চেয়ে বড়। তবে এখনকার  আরেক অনুমান হল আগামি ২০৩০ সালের দিকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে,  এনিয়ে হাতের কাছের ভোয়ার [VOA] এক রিপোর্ট  দেখে নেয়া যেতে পারে।
    এসব সত্বেও ভারত ব্যাপারটাকে নিজ উগ্র জাতিশ্রেষ্ঠত্বের [হিন্দুত্ববাদের] ধারণা দিয়ে দেখে থাকে। মনে করে সে চীনের চেয়ে কম কিসে, সেও চীনের সাথে এব্যাপারে সমতুলনীয়; এমন ধারণার প্রাবল্য অবশ্য ২০১৩-১৪ সালের ফেনোমেনা। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ শানিয়ে মোদি যখন ২০১৪ সালের পর থেকে নিজ-প্রচার শুরু করেছিল যে ভারত নাকি একটা ‘পরাশক্তি’ হয়ে গেছে!  এই ব্যাপারে অন্তত একটা ফ্যাক্টস বা ঘটনা মনে রাখলেই এর কারণ অনেকটাই বুঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

    বিদেশি পুঁজি নিয়ে কমিউনিস্ট ও জাতিবাদি চিন্তায় বেশি-বুঝের মিথঃ
    এককথায়, বিদেশি পুঁজি নেয়া না-নেয়া প্রসঙ্গে ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা আসলে একেবারেই উগ্র জাতিবাদিদের অনুসারী।  যেমন বিদেশি পুঁজি নেওয়া বা দেশে আসতে দেয়া দেশের জন্য কী হারাম না হালাল? এনিয়ে উগ্র-জাতিবাদি একরোখা ধারণাটাই কমিউনিস্টদেরও ধারণা। এরা উভয়েই মনে করে বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজি দেশে আসতে দেয়া হারাম, তাই তা দেশে আনাই যাবে না।  আর এপ্রসঙ্গে বাস্তবতার আমল-মুল্যায়নহীন জাতিবাদিদের একচেটিয়া হারাম ধারণাটাই আরও পোক্ত করেছে কমিউনিস্টেরা; তাদের ‘শোষণ’ ধারণা দিয়ে।

    যদিও এটা তো বলাই বাহুল্য আইডিয়ালি বললে যে বিদেশি পুঁজি এনে শিল্প-ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বরং নিজ দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতায় এগুলো করা তো নিঃসন্দেহে ভাল; এনিয়ে কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু বাস্তবতা তো এখানে না অন্যখানে! মানে তর্কটা এখানে না।
    তাই আরেকটু আগিয়ে এর পক্ষে বলি। দুনিয়ার যেকোন দেশের অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমে, যদি বাইরের হস্তক্ষেপ করতে না দেয়া যায় তবে, ঐদেশের অর্থনীতি বিকশিত হতে যত যা বিনিয়োগ লাগে তার সবটাই ঐ দেশীয় অর্থনীতি নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে, এবং তা সম্ভব; ইতিহাসে এটা প্রমাণিত সত্য। যেমন সারা ইউরোপে একেবারে শুরুর দিকে  মানে ১৬০০ সালের পর থেকে যখন তাদের কলোনি দখল ব্যবসা শুরু হয়েছিল এর আগের কালে, তাদেরকে কোন বাইরে থেকে পুঁজি বা সম্পদ লুটে  আনতে হয় নাই। নিজ অর্থনীতিতেই নিজ সঞ্চয় উদ্বৃত্ব ব্যবহার করেই নিজে বিকশিত হতে পেরেছিল; সম্ভব করেছিল। আমাদের মত দেশের যেমন বিনিয়োগ আনার জন্য “পশ্চিম আছে”,  সে তুলনায় সেকালে পশ্চিমের জন্য ১৬০০ সালের আগে তাদের জন্য কোন “পশ্চিম” বা বিনিয়োগদাতা বলে কেউ ছিল না।
    ১৬০০ সালের আগে-পরে বলে কথা টানছি এজন্য যে ১৬০৭ সালে ইউরোপ প্রথম কলোনিদখলে বেরিয়েছিল।   আর যাদেরকে কলোনিদখল করতে বেরিয়েছিল প্রথমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশ এর কোনটাই নয়।  সেটা ছিল উত্তর আমেরিকা যা এখন ইউএসএ বা আমেরিকা নামে পরিচিত। গত ১৬০৭ সালে প্রথম কলোনিদখল করা ভুখন্ড বা দেশ হল আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia] সর্বপ্রথম কলোনিদখল হয়ে যায়।  যারা দখল করেছিল তাদেরকে বৃটিশ বা ইংলিশ সেটেলার বলা হয়েছে। এর রেফারেন্স দেখতে এখানে[Colonial America (1492-1763)] আমেরিকান সরকারি লাইব্রেরিতে যেতে পারেন। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকাকে কলোনিদখল করা হয়েছিল এরও পরে নানা সময়ে।

    কিন্তু সর্বশেষ আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় যারা ইউরোপের কলোনি হয়ে থেকেছিলাম পরের অন্তত টানা দুশ বছর তারা ১৯৪৫ সালের পরে স্বাধীন মুক্ত দেশ হয়ে গেলেও এরপরে আমাদের নিজ অর্থনীতির বেলায় একই ফর্মুলা কাজ করে নাই যে আমাদের অর্থনীতিও নিজ বিনিয়োগ পুঁজি বা অর্থনৈতিক উদ্বৃত দিয়ে নিজের অর্থনীতির বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারবই। তা হয় নাই আর এটা করবেও না। আমরা পুষ্টির অভাবে ভুগা শিশুর মত বিনিয়োগ পুঁজির অভাবে ভুগবোই। কারণ অন্তত টানা দুশ বছর ধরে লাগাতর ইউরোপের কলোনিদখলদারেরা আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে সেকালের আগে থেকে যাকিছু  সারপ্লাস জমা হয়েছে তা উঠিয়ে দখলদারেরা নিজ নিজ দেশে লুট করে নিয়ে গেছিল। এতে তৈরি হওয়া গভীর স্থায়ী ক্ষত বা বিনিয়োগ পুঁজির ঘাটতি সেটা ১৯৪৫ সালের পরে আমরা স্বাধীন মুক্ত দেশ হলেও তা আপনাতেই নিজ নিজ অর্থনীতিতে পূরণীয় করা যায়নি কারণে এত অধিক লুট আর পূরণীয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ছিল আমাদের জন্য সেই নয়া বাস্তবতা যে আমাদের বিনিয়োগ পুঁজি লুট হয়ে গেছে অথচ আমরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অন্তত কাগজে কলমে ।

    অতএব ঐ খারাপ সময়ে  বিদেশি পুঁজি নেওয়া হারাম এই ফতোয়া যা এখনও তাদের মুখে বর্তমান, এসব কথা ছিল একেবারেই চরম অবিবেচক ও আত্মঘাতি। কার্যত এটা ছিল একদিকে চিন্তার মারাত্মক এক অক্ষমতা অন্যদিকে তা বাস্তবতাবিমুখ ভরপুর এক  বিশুদ্ধবাদিতা। ‘খাঁটি’ থাকতে চাওয়ার স্টুপিডিটি! যেন সাময়িক বিদেশি পুঁজি গ্রহণ করলে আমরা অশুদ্ধ হয়ে যাব!! আমাদের এদিকে এমন এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ভারতের জওয়াহরলাল নেহেরুর চিন্তা ও তাঁর অর্থনীতি। তিনি মারা গেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু তার কমিউনিস্ট অরিয়েন্টেড ইকোনমির চিন্তা বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ প্রসঙ্গ এটা চালু থেকেই গেছিল ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত।   যেটা ১৯৯০ সালে এসে ঐ নেহেরু-ইজমের অর্থনীতি তা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল।  সেকালে চন্দ্রশেখরের কোয়ালিশন সরকার অর্থের অভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে যা মূলত  balance of payments বা বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম ও ব্যয় বেশিতে ঘাটতিতে পরা থেকে সৃষ্ট – এই কারণে তিনি বাজেট পেশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন।  আর  balance of payments এর নিয়মিত ঘাটতি হলে একটাই এর ওষুধ, আইএমএফ-এর কাছে ঘাটতি পুরণে ঋণে বৈদেশিক মুদ্রা পেতে হাত পাতা। আর এর পুর্বশর্ত হচ্ছে এতদিনের আয়েসি আন্দাজি বিশুদ্ধবাদিতা ছেড়ে এবার বাস্তবতায় ফিরে আসতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর সংস্কার করতে বাধ্য হওয়া।  ঠিক কী ঘটেছিল এনিয়ে আইএমএফ-এর একটা ভাষ্য এখানে অন্য আরও ভাষ্য এখানে পাওয়া যেতে পারে।  সে সময়ে সব ব্যর্থতায় দায়ভার চন্দ্রশেখরেরর উপর যদিও এসেছিল কিন্তু নেহেরুসহ সকল পুর্ব-সরকারগুলোই এজন্য দায়ী ছিল। চন্দ্রশেখর সে যাত্রায় পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের নভেম্বরে যা থেকে কংগ্রেসের নরসীমা রাও ক্ষমতায় আসেন। আর তাঁর নয়া অর্থমন্ত্রী হন  মনমোহন সিং, যিনি আইএমএফ-এর সাথে মিলে অর্থনৈতিক সংস্কারটা সম্পন্ন করেছিলেন।  তবে মনে রাখতে হবে এঘটনার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ার সাথে (যা ভেঙ্গে গেছিল ১৯৯১ ডিসেম্বরে ) ভারতের এই অর্থনৈতিক পতন ও সংস্কারে বাধ্য হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই।   কারণ ভারতে তা ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগেই ১৯৯০ সালেই।

    ভারত ছেড়ে এবার বিদেশি পুঁজিতে চীন প্রসঙ্গেঃ
    কম কথায় সেরে ফেলতে এভাবে বলি, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি বা আমেরিকান পুঁজি দেশে আসতে অনুমতি দান শুরু করেছিল। যদিও এর আগে ১৯৫৮ সাল থেকেই মাও সেতুং আর সোভিয়েত বা স্তালিনীয় পথ বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিদেশি পুঁজি গ্রহণ প্রসঙ্গে ভিন্ন পথ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন মাও। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে যদিও এটা চীনের “সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ১৯৫৮” বলে পরিচিত। এসব রাখডাক বা ভিন্ন শব্দে নাম দেয়া খুব সম্ভবত ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য। কারণ,  আদতে এটা ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  আজকের দিনেও যারা কমিউনিস্ট সমালোচক তারা মাওকে তাদের হিরো বলে আপন করে রেখে দিয়েও সব দায় ও এর ভিলেন হিশাবে দেখাতে চায় দেং জিয়াও পিং-কে। তা যাক সে তর্ক অন্যখানে, করেছিও। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, মাও-এর অর্থনৈতিক সংস্কার,  কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাত্রা ইত্যাদি এসব নিয়ে কমিউনিস্টেরাসহ যেকারও  স্তালিনীয় সমাজতন্ত্র বুঝের দিক থেকে যত সমালোচনাই থাক এক জায়গায় গিয়ে সেসবের সবকিছু বেকার হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, চীন এই সংস্কারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ অনুমতি দিয়ে একে আপন করে নিয়েছে; মানে  নিজ অর্থনীতিতে আমেরিকার ওয়াল স্টিটের জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিয়েছে। শুধু তাই না পরে শুরুর দিকে এসব বিনিয়োগ চীন সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা শিল্প-বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগে তারা এখন তাদের পার্টনার। আর এ সবকিছুই ঘটেছে উল্লেখযোগ্য কোন সংঘাত বা ফ্রিকশন ছাড়াই। সেটাও না মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে চীন আজকে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ – চীন নিজেই আজ গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবার পথে। এদিকটার তাতপর্য সেটাও কোন দিক দিয়েই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই গ্রহিতা  চীন নিজেই এখন দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা প্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের এখানে সারা বছরের ঋণদানের বাজেটের চেয়েও এক চীনের বাজেট অনেক বড়। সারকথায় চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব।

     সারকথায়, চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব। 

    চীন ১৯৭৮ সালেএর জানুয়ারি থেকে আমেরিকার সাথে  আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও এমবেশি খোলা দিয়ে শুরু করেছিল।  পরে আমেরিকান বিনিয়োগের আসা বা প্রবেশ শুরু হয়েছিল। আর চীনের বড় অর্থনৈতিক উল্লফন ঘটেছিল (ডাবল ডিজিট জিডিপি) (১৯৯০-২০১০) মোটামুটি এই বিশবছরের সময়কালে।  তুলনায় ভারত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদেশি পুঁজি আসতে দেয়া হালাল কিনা তখনও সেই সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নাই। তাই ১৯৯১ সালকে মানা হয় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার বছর, যখন ভারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে মিটাতে ব্যর্থ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতিতে) হয়ে আইএমএফের সাহায্য পেতে দ্বারস্ত হয়েছিল। ফলাফলে সেই প্রথম নেহেরু কথিত ও প্রচলিত কমিউনিস্ট ইকোনমি ১৯৯১ সালেই খোলনলচে বদলায় বাধ্য হয়ে মনমোহন সিং এর অর্থনৈতিক সংস্কারে ঢেলে সাজানো শুরু হয়েছিল – যা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি।

    তবে এসব নিয়ে কথা বলাও বিপদের। আপনার কোন পছন্দের রাজনীতি বা আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাবধান। বাস্তব ঘটনা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও পেতে গিয়ে একাজে নিজ রাজনীতি-আদর্শকে শ্রেষ্ঠ মানতে হবে বা দেখাতেই হবে এই জিদ সবার আগে ত্যাগ করেন।  কারণ আপনি তখন আসলে তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গেছেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা বুঝাবুঝি আপনার অস্তিত্বের মত জরুরি। আর এটাই প্রধান ও আপনার আসল কাজ। কাজেই আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ দিয়েই কেবল তা পারতেই হবে এই জিদ ও চিন্তা ভুল। যেখানে আপনার দরকার বাস্তবতাকে বুঝবার জন্য একটা চিন্তা বা পদ্ধতিতে তা করতে সক্ষম হওয়া। যে চিন্তা বা পদ্ধতি এটা করতে সক্ষম তাই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে, আপন করতে হবে। এরপরে বা বাইরে প্রেমিকার মত আপনার পছন্দ বা বিশেষ নেকের একটা রাজনীতি বা আদর্শ আছে থাক না। কাজ না পারলেও জোর করে  আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ এর পক্ষে  ঢোল পিটানো তো সহি হতে পারে না! এরপর এবং সেই সাথে এবার কেন আপনার রাজনীতি-আদর্শ ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপযুক্ত টুলস হতে পারে নাই সেটা খুজে বের করেন। সংশোধন করে নেন।
    অনেকবার বলেছি চলতি শতক শুরুই হচ্ছে গ্লোবাল নেতা বদলের পালাবদলের সময়কাল হিশাবে যেটা আমরা পছন্দ করি নাই। বরং ঘটনা-ফেনমেনাই আমাদেরকে এটা দেখতে বাধ্য করেছে। এখন এতে আমেরিকান প্রভাবের ক্রমপতন আর চীনের প্রবল উত্থান যদি বাস্তবতা হয় – অবজেকটিভ বাস্তবতা হয় তা হলে এনিয়ে আমার কথা বলা মানে তো এটা নয় যে আমি চীনের দালাল। অথবা আমি চীনকে পছন্দ করি তাই এটা করছি। অথবা চীন কমিউনিস্ট তাই চীন আমার পছন্দ এটা  ধরে নিতেই হবে!!! অথচ আমেরিকা কী করে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভুমিতে সেই ব্যাপক ইতিবাচক ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণ আমার চেয়ে বেশি এবং ভাল করে কেউ করে নাই। একাজের সময় আমাকে কেউ আমেরিকান দালাল বলে না কেন?
    বাস্তবতা হল, নিজ পছন্দের আদর্শ দিয়ে ঘটনা না মিললেও জোর করে তেমন ব্যাখ্যা দেওয়াটা বোকামি; কারণ জরবরদস্তি পাঠক পছন্দ করবে কেন! কাজেই নিজ পছন্দের আদর্শের ভিত্তিতে কথা বলার দিন শেষ।  আর শেষ কথা হল আমি কোন কমিউনিস্টই নই। এছাড়া চীন    কমিউনিস্ট কিনা সেটাও কমিউনিস্টদের মধ্যেই অর্ক সাপেক্ষ, যা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই। গ্লোবাল পরিবর্তনগুলোকে কতটা উপযুক্তভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছি সেটাই মুখ্য দিক!  সেদিকটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হচ্ছি কিনা সেটার পরীক্ষায় উতড়ানো বা সফলতাই একালের মাপকাঠি।

    এখানে আমাদের পাঠকের সমস্যা হল, তারাও সময়ে বিভ্রান্ত হয়ে সময়য়ে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা এমন কোল্ডওয়ার এর তর্কের ফাদে আটকে যান। অথচ সেই কোল্ডওয়ার এর যুগ এখন অতীত, সেসব ভাবনা এখন অকেজো। তবুও কেউ কমিউনিস্ট না আমেরিকা-বাদী এমন কথিত একটা ধারণার আগে চালু করে পরে  পাঠক কোন মানুষ ও তার ব্যাখ্যাকে আমল করা শুরু করে থাকে। এটা খুবই ভুল পদ্ধতি।  আশা করব পাটঘক কমিউনিস্ট লুপ-হোল এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হবে ও বাঁচিয়ে চলা শিখে যাবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

    [উপরের এই লেখা আসলে দুদিনের মধ্যেই পরবর্তি যে লেখা দিব তার আগাম অংশ। তাই বুঝাই যাচ্ছে পরের লেখাটা চলতি এই রচনার উপরে দাড়িয়েই লেখা হবে। পরের রচনাকে তাই এলেখারই দ্বিতীয় অংশও বলা যেতে পারে।]

  • আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    গৌতম দাস

    ২৬ জানুয়ারি ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4mg

     

     

    Fact Sheet: Indo-Pacific Strategy of the United States – U.S. Embassy in the Philippines

    বাইডেনের আমেরিকা সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। বেচারা হয়ে গেছে! তাঁর কোন নীতি-পলিসিই কাজের না, ফলে আনতে পারছে না। তাতে সেটা হোক ইউক্রেন ইস্যু অথবা বাংলাদেশের মত ছোটদেশের উপর আমেরিকান প্রভাবের ক্ষেত্রে; সব অকার্যকর। ফলে শেষে কেবল বকোয়াজ আর বোলচালে ভরপুর এক আড়াল তুলে দাঁড়িয়ে থাকছে তাঁর প্রশাসন। ব্যাপারটা হল কেবল ফাঁকা দাবি না,  ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় তিনি ভাল বিকল্প – সেটা নিজ আমেরিকান জনগণের কাছে তো  অন্তত প্রমাণ করতে হত; এখন এশিয়ায় বা বাংলাদেশের মত দেশের ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে  মূলত যেন এক ‘খামোখা’ বলেই পরিচিতি তুলে ধরছেন। বাংলাদেশের যারা হাসিনার শাসন এই ফ্যাসিজম থেকে মুক্ত হবার স্বপ্ন দেখছিলেন যেখানে আমেরিকার একটা ভুমিকা থাকার সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে, তারাও সমুলে হতাশ হয়েছেন।

    যেমন ধরা যাক, বাইডেন তাঁর শাসনের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘হিউম্যান রাইট’ বা মানবাধিকার নাকি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গ। যারা পোড় খাওয়া ‘আমেরিকা অবজারভার’ তারা বিশ্বাস করেন নাই; কিন্তু এটাই পরিণতি তা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন। যেমন বাইডেনের শাসনকে বলা যায় “স্যাংশনের রেজিম’ বলা যায়। যা কিছুই বাইডেনের অপছন্দের বা আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে তিনি মনে করেছেন তাতে সেখানেই তিনি যেন এক স্যাংশন আরোপের রাজা বনে গিয়ে অবিরাম সেসবের উপর স্যাংশন আরোপ করে গেছেন। এসবের মধ্যে কোথাও সত্যিই হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ঘটনাবলীও মাখামাখি করে আছে, অবশ্যই। যেমন বাংলাদেশের গুম, খুন হত্যা, অপহরণ, গায়েব, ‘ক্রশফায়ারের’ নামে হত্যা ইত্যাদি যতধরণের অপরাধ আছে তা গত পনেরো বছরে ঘটে চলেছে। নিঃসন্দেহে এগুলো হিউম্যান রাইট চরম ভায়োলেশনের ঘটনা। যেসবের উপর আমেরিকা স্যাংশন আরোপ করেছে। আবার একই নিঃশ্বাসে যেমন, রাশিয়া তার জ্বালানি তেল বিদেশে বেচতে পারবে না – এজন্য সে একই স্যাংশনও যথেচ্ছাচারে আরোপ করে চলেছে। যা মানবাধিকারের ইস্যুওই নয়; বরং খাসা একান্তই আমেরিকান ব্যবসা-বাণিজ্যিক স্বার্থ বৈ আর কিছু না – এমনটাও আছে।

    ঠিক যেমনি বাংলাদেশে হাসিনা রেজিমের তার রাজনৈতিকবিরোধীদের নির্বিচার দমনকে জঙ্গীবাদ দমনের নামে চালিয়ে দেয়াতে –  এর বিরুদ্ধে হাসিনার র‍্যাবসহ নানা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের উপর স্যাংশন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইতিবাচক বলে দেখে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু না – পরিশেষে আমেরিকা সবকিছুকেই তার চীনবিরোধী বাণিজ্যিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বলে যে মনে করে সেকথা আর লুকায়ে রাখল না বা পারল না!

    এককথায় বললে, ঢাকার শাহীনবাগে গুন-খুনের ভিকটিমদের সাথে দেখা করতে রাষ্ট্রদুত পিটারহাস উপস্থিতের সাথে সাথে হাসিনা যে মৃদ্যু পরোক্ষ বাধার পালটা অবস্থান দেখিয়েছিল তাতেই আমেরিকার নিজের আগানোর পথ নিয়ে রিভিউ-এ বসেছিল। এই আদ্যোপ্রান্ত পর্যালোচনা থেকেই আমেরিকার পথ চলায় গিয়ার বদল! মানে যেটারই পরিণতি আমরা দেখলাম ডোনাল্ড ল্যু এর বাংলাদেশ সফর। আর সেখান থেকে বাইডেনের মতিগতির ল্যাংটা হয়ে পড়া! কেমন সেটা?
    সেটা হল ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এসব বাইডেন প্রশাসনের কাছে কিছু না! তারা এসবের আসল ভক্ত না। সিনসিয়ার বা সিরিয়াস কোনটাই না! বকোয়াজ মাত্র!! বাইডেনের আসল স্বার্থ সারা দুনিয়ায় যেমন, তেমন এশিয়াতেও তার প্রতিযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বি নয়া উত্থিত হতে থাকা চীন; এই চীনবিরোধীতায় নিজ স্বার্থ উদ্ধার এটাই বাইডেনের মুখ্য নীতি-পলিসি। আর সেকাজ তার বাকি সব ততপরতা বিক্রিযোগ্য! যেমন এসময়ের এশিয়ায় বাইডেনের স্বার্থ সোজা  ভাষায় যা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) নামে পরিচিত।

    একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাঃ
    এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, এই আইপিএস (IPS) বা আগের কোয়াড (QUAD) গঠন – এদুইয়ের সম্পর্কই বা কী? প্রথম সমস্যা আমাদের মিডিয়া রিপোর্টার লেবেলেই ব্যাপারটা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। এর উপর আবার ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF) বলে আরেক ফেকড়া বা বাড়তি দিক (এক্সটেনশন) বা নয়া খাতা আছে।
    খুবই অল্প কথায় বললে, কোয়াড [QUAD] বা চারদেশীয় জোট (আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া)  যেটা ছিল তা কার্যত অকেজো। হাত লাগলেই ভেঙ্গে যাবে, সম্ভবত ভারত বেরিয়ে যাবে; এরকম! মূলত, একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাকে না বুঝা থেকে এই সমস্যা। আমেরিকা বরাবর এব্যাপারে ফেল করছে এজন্য যে তাদের মাথায় জোট বলতে সবসময় কোল্ডওয়ার কালের (১৯৫৩-৯১) সোভিয়েত (ব্লক) বনাম আমেরিকা (পশ্চিমা জোট) এর স্বপ্ন মাথায় ঘুরে থাকে। এই স্বপ্নকল্পনার কারণে আমেরিকার মনে ইচ্ছা করে আগের সোভিয়েতের মত যদি একালে চীনবিরোধী এক পশ্চিমাজোট (মূলত আমেরিকা ও ইইউ এর সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট) গড়তে পারা যায়।
    অথচ এই স্বপ্নটা একেবারেই অবাস্তব, অথচ সেটা আমেরিকার ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদলের কোন প্রেসিডেন্ট যারা হয়ে আসছেন তাদের  নীতি-পলিসিতে এটা প্রতিফলিত নাই। কিন্তু কেন অবাস্তব বলছি? সেকথা বললেই বাকি সব কথা পরিস্কার হয়ে যাবে। যাকে সোভিয়েত ব্লক বলছি এদের মূল ও কমন পরিচয় এটা না যে তারা কমিউনিস্ট অর্থনীতির চক্করে আটকে থাকা দেশ ছিল তাই। তাদের মুল পরিচয় আসলে তারা কেউই আইএমএফের [IMF] সদস্য ছিল না; তবে সেটা দু’এক রাষ্ট্র হতে চেয়েও সদস্যপদ পায় নাই বলে, আর বাদ বাকিরা, বেশির ভাগই রাশিয়ার স্টালিনের  অবস্থানের কারণে নিজেরাও সদস্য হতেও চায় নাই, একারণে। কিন্তু সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো আইএমএফের সদস্য ছিল না তাতে কী?

    এর এককথায় উত্তর হল, আইএমএফের সদসদ্য নয় একথার ব্যবহারিক মানে হল এসব রাষ্ট্র অন্যকোন রাষ্ট্রের সাথে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে পারবে না বা পারত না। এই কারণে তখনকার মানে কোল্ডওয়ারের  [Cold War]আমলে যেকোন জোট মানে কার্যত তা সামরিক-স্ট্রাটেজি অথবা রাজনীতিক আদর্শ কেন্দ্রিক জোট হত।  এর চেয়েও বড় কথা সেকালের ‘জোট ধারণা’ একালের ‘জোট ধারণা’ একেবারেই এক নয়। মানে কী?

    মানে হল একালের জোটে যার সাথে সামরিক-স্ট্রাটেজিক অথবা এমনকি অর্থনৈতিক স্বার্থের গভীর বিরোধ আছে তারই সাথে আবার একালে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘটে আছে। ফলে সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ গভীরবিরোধ থাকলেও তারই সাথে আবার গভীর বাণিজ্যিক লেনদেন ও পরস্পর গভীর নির্ভরতা তা শুধু সম্ভবই নয় একেবারে প্রধান বাস্তবতা। চীনের সাথে আমেরিকা, চীনের সাথে ভারত, চীনের সাথে জাপান, চীনের সাথে অষ্ট্রেলিয়া এমন প্রায় সকলের সাথেই চীনের যে  গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং এতে পণ্য-পুঁজির গভীরতম বিনিময় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা – এটাই বাস্তবতা। এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক এতই প্রধান যে একই সাথে চীনবিরোধী কোন সামরিক-স্ট্রটেজিক বা রাজনৈতিক জোট গড়া তা প্রায় অসম্ভব হয়ে আছে; এতে হয়ত তা গড়া হয়েছে ঠিকই, কার্যত যা অকেজো! যেমন সর্বশেষটা হল, অষ্ট্রেলিয়া বা জাপান। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় স্কট মরিসনকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন অ্যান্থনি আলবানিজ। স্কট মরিসনের দল লিবারেল পার্টি। আর নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন লেবার পার্টির অ্যান্থনি আলবানিজ। অষ্ট্রলিয়া-চীন বিরোধে চীনে অষ্ট্রেলিয়ার সব রপ্তানি সুবিধা  প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল।  অষ্ট্রেলিয়ায় নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী এখন আগের দলের উপর দোষচাপিয়ে আগের মতই চীনে রপ্তানির সুযোগ কতটা পুনরুদ্ধার করা যায়, চীনের সাথে সেসব সম্পর্ক ও চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গভীরভাবে ব্যস্ত।  আবার ওদিকে জাপান; চীনে কোভিডের কারণে চীনের অর্থনীতির অনেক খাত ঝুলে পড়াতে জাপানের র্অথনীতি সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ও এর ধাক্কার শিকার দেশ হয়ে উঠেছে। আবার কোয়াডকে আমেরিকা সামরিক অভিমুখী করে ঘুড়িয়ে দিতে চাইলে সবার আগে পিছটান দিয়েছে ভারত; ভারত কারও সাথে সামরিক জোট করতে চায় না, তাই। তাই বাইডেন আর কোয়াড নিয়ে সমস্ত নাড়াচাড়া স্তব্দ করে রেখেছেন।

    আর তাতেই আইপিএস (IPS) নামে আমেরিকা নয়া এক খাতা খুলেছেন বা এদিকে জোর দিয়েছেন। কিন্তু আইপিএস কী কেন? বলা হচ্ছে এটা কোয়াড থেকে আলাদা। জিজ্ঞাসা করলে বলে এটা কোন রাষ্ট্রজোট নয়, ডোনাল্ড ল্যু এবারের বাংলাদেশ সফরে যেমন পাবলিকলি বলেছেন। তাহলে এটা কী? বলছেন এতে নাকি সবদেশই ইন্দো-প্যাসেজিক জোন প্রসঙ্গে নিজের নিজের স্ট্রাটেজি জানাবে। কিন্তু কেন বা কী উদ্দদেশ্য? এখানেই কবি একটু নিরব! মানে প্রথমত এটা কী কোন একটা দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য স্ট্রাটেজি বা কৌশল? নাকি যুদ্ধ কৌশল, না সামরিক স্বার্থের কৌশল, নাকি রাজনৈতিক, না অর্থনৈতিক – এসব এই প্রশ্ন আছে। তা কেউই প্রকাশ্যে পরিস্কার করছে না। দ্বিতীয়ত, এখানে শত্রুদেশটা কে? এটা সবচেয়ে নির্ধারক প্রশ্ন! এটা লিখিত ভাষায় বা রেকর্ডে না বলে চর্চায় তারা বলে থাকে; ফলে মনে মনে ধরে নেয়া সেই শত্রুদেশ হল চীন!

    তাহলে কী দাড়ালো এটা?  যেখানে আমেরিকাসহ সকল দেশই চীনের সাথে বাণিজ্য- অর্থনীতিতে পুঁজি-পণ্য বিনিময়ে গভীরভাবে সম্পর্কিত সেখানে একই সাথে চীনবিরোধী আইপিএস (!) এটা কেমন স্ট্রাটেজিক জোটের কল্পনা???  আমেরিকা ঠিক চাইছেটা কী???  এর বাস্তব দিকটা তো খোদ আমেরিকার কাছেই অপরিস্কার!! তবু আমেরিকা চাইছে এশিয়ার সবদেশ তো বটেই কানাডাকেও কার্ড দেখাতে হবে! বা কানাডার কাম্য ইন্দো-প্যাসেজিক স্ট্রাটেজি কী তা লিখে জানাতে হবে। মানে হল কতটা সে চীনবিরোধী তা দেখাতে বলতে হবে! আর ঠিক এর মতই হাসিনার বাংলাদেশেকেও মূলত সেকথা বলতেই এসেছিলেন ডোনাল্ড ল্যু। তিনমাস মানে মার্চ মাসের মধ্যেই তা আমেরিকাকে জানাতে হবে। এদিকে আরও প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

     

    ওদিকে আইপিএস, এর আরেক বাড়তি ঝালড় আছে – সেটা হল, ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF)। মানে এটাই আসল অর্থনৈতিক জোটের কল্পনা। কিন্তু সমস্যা হল, এটা টু লেট (too late)!! কেন?

    কারণ ইতোমধ্যেই চীনা আগ্রহের আরেক এবং আরো গুছানো এক অর্থনৈতিক জোটের জন্ম ও ততপরতা গত ২০২০ সাল থেকে শুরু হয়েই আছে যার নাম RCEP। বাংলা লিখলে, রিজিওনাল কম্প্রিহেন্সশীপ ইকোনমিক পার্টনারশীপ [RCEP]। যেটা আসলে কালজয়ী; কারণ এটা জোটদেশগুলোর যেকোন উতপাদিত পণ্যে সদস্য সবদেশেরই শ্রম যুক্ত করার সুযোগ (shared value addition) রাখা হয় ও তাতে সকলেই এই পণ্যের ভোক্তা-ক্রেতা। যেমন জাপান, অষ্ট্রেলিয়া দুই কোয়াড সদস্য এমনকি আমেরিকা প্রভাবিত দক্ষিণ কোরিয়াও এই জোটের সদস্য হতে মিস করে নাই। জন্ম থেকে এরা সবাই সদস্য, তাতে কোয়াড বা IPS বলে কিছু গঠিত থাকুক আর নাই থাকুক!

    তাহলে এতদিনে  IPEF খাড়া করার আমেরিকান নয়া বাসনা কেন আর কতটুকু এটা নতুন কিছু করতে পারবে? যদিও এটা RCEP এর নকল করে তার চার বৈশিষ্টের একটা হিশাবে supply chains বলে একটা ধারণা রেখেছে যেটা shared value addition ধারণার ধারেকাছের নয় বলেই অনুমান। কারণ, shared value addition এটা আমেরিকান কনসেপ্ট নয়। বরং উঠতি অর্থনীতি বা ‘প্রাক্তন কমিউনিস্ট’ দেশ হলে এনিয়ে তাদের নিরীক্ষায় আগ্রহী দেশ হতে দেখা যায়। কারণ এখানে লেবার মানে ভ্যালু এডিশন“ভাগাভাগির” প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
    কিন্তু সেটাই মূল ইস্যু বা প্রধান বাধার দিক নয়। প্রধান বাধার দিক হল, আমরা যদি IPEF-এ যোগ দেই তবে আমাদের  কারখানা পুঁজি (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ) এবং  অবকাঠামো পুঁজির উতস কে হবে?

    একাজে আমেরিকা বুড়া সিংহ, আর বিপরীতে চীনকে উঠতি বাঘ বলা যায়। উদাহরণ, এই বুড়া বয়সে বাইডেনের আমেরিকা উঠে দাড়ানোর সখ করেছিলেন। বর্তমানের চীন দুনিয়ার আমাদের মত সবদেশের জন্যই অবকাঠামো পুঁজির ঋণদাতা ভুমিকায় একছত্র হয়ে উঠে আছে। এমন এক অর্থনীতিকে আমেরিকার বাইডেন এই বুড়া বয়সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। দেখা গেলে এতে তারা সবাই মিলে মাত্র ৬০০ বিলিয়ন ডলারের কমিটমেন্টের জোগাড় করতেই তাদের হিসশিম। এছাড়া এখনও এই সংগ্রহ হাতে আসা ও কাজে নেমে পড়ার ততপরতার কোন কিছুই শুরু করতে পারেন নাই। তাই খুব সম্ভবত ২০২৪ সালে বাইডেন ক্ষমতা ত্যাগের পরে এই উদ্যোগ্রটারও মৃত্য সংবাদ আমরা পাব!!!  তাহলে IPEF-এ যোগদানে আমাদের কী হবে????

    আসলে, কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক এসব শব্দ দিয়ে এপর্যন্ত আমেরিকান পেসিডেন্টেরা পিসমিল একমুঠো করে যা কিছু করে যাচ্ছেন এসবের কিছুই টিকবে না, শুরুতে কার্যকরই হতে পারবে না। তবুও  RCEP এর সমান্তরাল আরেকটা IPEF বলে জোট অবশ্যই খাড়াতে পারে তবে এর অন্যতম শর্ত হতে হবে যে এসব কোন অর্থনৈতিক জোটই বিশেষে দেশের (যেমন চীন অথবা আমেরিকা্র বিরোধী হতে পারবে না। ফলে একই দেশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সাপেক্ষে ইচ্ছা মত একই সাথে দুইটা জোটের মধ্যেই থাকতে ও সদস্য হতে পারবে, এমন জট হতে হবে। একটা জোটের মধ্যে সবাই থাকবে তাও হতে পারবে। কিন্তু কোন ভাবেই প্রকাশ্যে বা গোপনে আমরা চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক জোট করতে চাই, এমন করা যাবে না – এসব চিন্তা অবাস্তব, অকেজো। ঘৃণা ছড়াতে পারবে কিন্তু নিজে কার্যকর কিছুই হতে পারবে না। মুল কারণ আমরা সবাই একই [IMF] আইএমএফের সদস্য। মানে আমরা সকল রাষ্ট্র একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ ফলত আমরা মূলত একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ।  ক্যাপিটালিজমে “কোটারি” হয় না; সব ক্যাপিটালিজমই পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে  যাবেই; এভাবেই সে টিকে থাকে যা এর মৌল স্বভাব!

    চীন একারণের এটাকে নিন্দা করতে বলে, বাইডেনের ‘কোল্ডওয়ার মানসিকতা’।  এমনকি বাংলাদেশের চীনা নয়া রাষ্ট্রদুতই এসব ধারণা আড়াল নিয়ে বলেছেন “কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে: চীনের রাষ্ট্রদূত”। ওথবা “কোনো দেশকে বাদ দিয়ে গড়া জোটে যোগদানে সতর্ক থাকতে হবে”।

    এখনও তিনটা কথাঃ
    প্রথমত, আমেরিকা ল্যু এর সফরে মার্চের মধ্যে হাসিনা সরকারকে নিজদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরি করে তাদের জানাতে বলে গেছে বলে জানা যায়। কিন্তু এটা কেন?
    ল্যু যেটা বলতে চাইছেন এর সারকথা হল, বাংলাদেশ যেন চীনের সাথে সম্পর্ক বিশেষত অর্থনৈতিক যেটা যেমন প্রধানত, চীনা অবকাঠামো ঋণ ও চীনের উপর নির্ভরশীলতা না করে চলা। এছাড়া চীনা অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামও মানে করে থাকতে পারে। এছাড়া সাউথ চায়না সি নিয়ে আমেরিকা যে গায়ে পড়া ঝগড়া-বিরোধ বানিয়ে রেখেছে তাতে আমেরিকার পক্ষ নেয়। বাংলাদেশ যেন এমন অবস্থান নেয়!

    আমরা উপরে দেখেছি, আমেরিকান এই আকাঙ্খাটা আনরিয়েলিস্টিক; বাস্তবে তা সংঘটন বা করে দেখানোর কারও কোন সম্ভাবনা নাই বা সম্ভাবনাচ্যুত! তাহল এটা নিয়ে এই জিদ ধরার অর্থ কী?

    দ্বিতীয়ত, আমেরিকা বা এমনকি সে বগলে জাপানকে নিয়েও যে আমেরিকা সে আমাদের অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটানোর যোগ্য কোন দেশ নয়। যদিও এটা ঠিক ওয়ার্ল্ডব্যাংকের যেকোন ঋণপ্রকল্পে ওপেন টেন্ডার হতেই হয়।  যমুনা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের তরফে সিংহভাগ লোন দিয়েছিল জাপান। অথচ ১৯৯৭ সালে এই সেতু নির্মানে জাপান কোন অংশের কাজই পায় নাই। আর একালে, বাংলাদেশে চীনাঋণের প্রকল্পের কমিশন সরাসরি সিঙ্গাপুরে জমা হয়ে যায়, এটা এক বিরাট সমস্যা হয়ে আছে। কাজেই তরুণ উঠতি আকাঙ্খার ঋণ আকাঙ্খার বাংলাদেশকে আমেরিকা নিজ বাহুডোরে আটকে রাখার খায়েস; অর্থহীন!  তবে বাংলাদেশে নয়া এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ভিত্তিক নুন্যতম কিছু সংস্কার করতে পারলে এর অনুষঙ্গ হিশাবে চীনাঋণের কমিশন সমস্যার সমাধান সম্ভব। কারণ, চীনা সরকার আমাদের মত দেশে নুন্যতম সাধু বা সীমাহীন চরম চোর নির্বিশেষে সব ধরণের সরকারের সাথে কাজ করে থাকে।

    তৃতীয়ত,
    আমেরিকা কেন ডোনাল্ড ল্যু পাঠিয়ে এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) যোগদানের জন্য হাসিনা সরকারকে জোরাজুড়ি করছে?
    প্রায় ছয় মাস আগে থেকে বিএনপির এবারের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এবারের আন্দোলন শুরুর পিছনে গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১০ তারিখে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর আমেরিকান স্যাংশন আরোপের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে।  কারণ এবারের আন্দোলন শুরুর প্রথম দিকে সরকার আগের মত অভ্যাসে গুম-খুনের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারে যে এতে আগে থেকেই দেয়া স্যাংশনের চাপ আরো বাড়ছে ও বাড়বে। আর সরকারের এমন ততপরতা সব মনিটরিংয়ের অধীনে। তাই বলা যায় আমেরিকান অপ্রত্যক্ষ ইঙ্গিত ছিল এই আন্দোলন শুরু করার। শুধু তাই না, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ঢাকায় গোলাপবাগে বিএনপির লাখো সমাবেশের পরে প্রথম দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়  যে হাসিনা সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে এবার সত্যিই গণভিত্তি পেয়ে এক আন্দোলন উঠে দাড়িয়েছে। এরপর আসে পিটার হাসের আরেক স্টেপ আগানো। তিনি হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ভিমটিমদের ভিজিট করতে শুরু করে সরকারের দিক থেকে কিছু পরোক্ষ বাধার সম্মুখীন হন। আর এরপরেই আমরা দেখি পরিস্থিতি ক্রমশ আমেরিকার সাথে সরকারের “বাতচিত, ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর” ইত্যাদির দিকে যাচ্ছে। স্যাংশন আরোপের দিক থেকে বললে এটা নিঃসন্দেহে আমেরিকার পিছনে হাটা। কারণ, হাসিনা সরকারের সাথে যা যা ডায়লগ প্রয়োজন আমেরিকা মনে করে সেরকম  “বাতচিত ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর ইত্যাদি শেষ হবার পরই তা থেকে আমেরিকার প্তেরাপ্তি মনে করা যায় এমন  “কোন রফা” বা ভদ্র ভাষায় কোন অগ্রগতি না হলে এরপরই তো আমেরিকার স্যাংশন আরোপের দিকে যাবার কথা! এটাই অনুমান করা যায়!
    তার মানে আমেরিকা এই উলটাপালটা করে আগে-পিছে মানে এক-পা আগে পরে দুই-পা পিছের কূটনীতি করতে গিয়েছে! কেন? অনুমান করা যায় তাদের ধারণা এতে হাসিনার উপর  চাপের প্রভাবটা বেশি হবে!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা আমেরিকাকে বেশি চাপের সুবিধা দিবেঃ
    প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সেকথায় যাবার আগে অন্য কিছু কথা।
    তাহলো এর মানে বাইডেনের মানবাধিকার ও স্যাংশন তার পররাষ্ট্রনীতির কোন পলিসি তা একেবারেই নয়। বাইডেন মূলত মানবাধিকার ব্যবসায়ী হিশাবে নিজেকে হাজির করেছেন।
    এর মূল কারণ,  হাসিনা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি পেশ করবেন কিনা বা আমেরিকার নেতৃত্বে চীনবিরোধী কোন এক কমন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির অংশ হবেন কিনা অথবা ক্রমশ  ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক(IPEF) এ যোগ দিবেন কিনা অথবা চীনের সাথে অবকাঠামো ঋণসহ অন্যান্য প্রকল্প সুবিধা ও সম্পর্ক করা সব গুটিয়ে নিবেন কিনা ইত্যাদি এসবের সাথে  সমান্তরালে হাসিনার মানবাধিকার ভায়োলেশনের রেকর্ডের কী সম্পর্ক??? মানে হাসিনা চীনের থেকে সরে আসলে তার সব মানবাধিকার অপরাধ আর অপরাধ মনে করা হবে না???? তাই কী?
    ধরা যাক হাসিনা-সরকারের কাছে আমেরিকার যা কিছু খায়েস এর প্রায় সবকিছুতেই হাসিনা একমত হলেন। তাহলে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের  অভিযোগ এর রেকর্ড কী সব তখন থেকে ইতিবাচক বলে বিবেচিত হবে??? আমাদের জানা মতে, ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি হতে পারে একমাত্র উপযুক্ত আদালতে এর বিচারের পরে। এরপরেই কেবল অভিযোগ বা স্যাংশন উঠিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন!  তাহলে???

    তাহলে এই পরিস্থিতিতে এখন সরকারের সাথে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি ইস্যুতে আমেরিকার কথা বলা, সময় দেয়া কেন? আবার আমেরিকান সব প্রস্তাবে যদি সরকার একমত হয় তবে তাতে দেশে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সেই সাথে সেই নির্বাচনে এই সরকারকে পুনরায় জিতবার নুন্যতম নিশ্চয়তাও তাতে ব্যবস্থা কী থাকবে?? আমেরিকা কীভাবে হাজির করবে তা? নাকি তা সম্ভব? আর এসব নিশ্চয়তা না থাকলে সরকার কেন আমেরিকার এত কথা শুনবে, বা মান্য করবে? এমনিতেই হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ঘটানো – এমন সমীকরণ অসম্ভব। এর উপর হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কোন নির্বাচনে বিএনপিকে সামিল করা আরেক  অসম্ভব।

    অর্থাৎ বাংলাদেশের এক্ষণকার বাস্তবতা হল আগামি নির্বাচন পার হবে কীকরে আর  সাথে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি এদুইয়ের কোনটাকে বগলে নিয়ে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি-তে বাংলাদেশের এলাইনমেন্ট করে নেয়া নিয়ে কথা তোলা – এটা একদিকে আন-এথিক্যাল অন্যদিকে এমনটা ঘটবার কোন বাস্তবতাই নাই। আর সবার উপরে এসব ডিল বা সমঝোতা-অযোগ্য আইটেম। সেটা আমেরিকা বা হাসিনা সরকার দুদিক থেকে এটা ডিল অযোগ্য ইস্যু।
    যেমন গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার ভায়োলেশন চরমে উঠে আছে।  আর ওদিকে এই লম্বা সময়কালগুলোতে অভিযোগ সবকিছু জানা সত্বেও আমেরিকা এনিয়ে নিঃশ্চুপই ছিল। তাই বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিবার পরেও যদি এনিয়ে ধারাবাহিক নিশ্চুপ থাকত তাহলে একরকমের পরিস্থিতি হত। কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিজের পররাষ্ট্রনীতির নীতি-পলিসি বানানোর ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্য আচরনের পথে আর বাইডেন প্রশাসন যে নাই তাই তো উন্মোচিত!!  এককথায় “মানবাধিকার ও স্যাংশন”  এর পলিসি ঘোষণা ও স্যাংশন আরোপের পরে এটা  ডিল অযোগ্য ইস্যু হয়ে গেছে।
    আবার একটা মজার তথ্য হল, এখন ভারতও চায় না যে হাসিনা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তে সামিল হয়। প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদুত একথা বলেছেন বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে!

    আবার হাসিনার দিক থেকে যদি দেখি, কোন কিছু পাবার বিনিময়েও হাসিনার চীনের হাত ছেড়ে দেওয়ার যোগ্য থাকবে না। কারণ, সরকারের উন্নয়নের ঢোল পিটানোর সঙ্গে সামনজস্যপুর্ণ কাজ হল এই ধরণের ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা ও তা থেকে চুরির অব্যবস্থাপনা জারি রাখতে হবে। কারণ নাহলে দলের যারা এর বেনিফিসিয়ারী এরা কেউ আর দলের সাথে থাকবে না। অথচ সরকার চীনের হাত ছেড়ে দিলে  আমেরিকা-জাপানের পক্ষে হাসিনা সরকারকে ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা একই লেভেলে জারি রাখা অসম্ভব।
    মূলত এই প্রধান কারণেই আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে হাসিনা সরকারের চীনবিরোধী কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরির ততপরতায় সামিল হওয়ার বাস্তবতা নাই। এছাড়া আবার এটাই ছিল ২০২১ সালে হাসিনা সরকারের চীনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি; আর সেই সৌজন্যেই আমরা সে সময় বিনা পয়সায় আমাদের সমস্ত চীনা টিকা প্রাপ্তি ঘটেছিল!

    কাজেই সব ব্যাপারেই অবজেক্টিভিটি বা কঠিন বাস্তবতাই হয়ে উঠেছে একমাত্র নির্ধারক! আমেরিকা বা হাসিনা সরকার ডিল অযোগ্য বা সমঝোতায় আসা অযোগ্য এসব বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে আছে!
    তাই, আইপিএস (ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি) বা এর সংশ্লিষ্ট কোনও ততপরতায় হাসিনা সরকারের যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ! এছাড়া, বাংলাদেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছে; এতে একমাত্র রাস্তার আন্দোলনের দিকেই এই পরিস্থিতি থেকে বের হবার অভিমুখ রাস্তা!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

     

    ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

    গৌতম দাস

    ১৮ জানুয়ারী  ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4m2

     

        What is the message Donald Lu left for Bangladesh? Daily Star

    ডোনাল্ড ল্যু ঢাকা সফর শেষে চলে যাবার পরে আমাদের সমাজের প্রায় সব কোণে বিস্তর আলাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা শুরু হয়েছে এই বলে যে হলো-টা কী বা ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়ালো – এধরণের!
    তবুও এটা এখন কমবেশি পরিস্কার – যেটা সোজাসাপ্টা বললে, ডোনাল্ড ল্যু কিছুটা  পিছু হটাছেন অথবা এক দিশা হারানো বাইডেন প্রশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এবং সেই অনুসারে তাদের এখনকার অবস্থানই যেন জানাতে এসেছিলেন।  তারা যে তাদের আগের অবস্থান থেকে অন্তত কিছুটা সরে গেছেন সেই পিছু হটা অবস্থান অনুসারে বাকি সবকিছু এডজাস্ট করে নিতে বা সে অনুযায়ী একটু ঢেলে সাজিয়ে নিতে এসেছিলেন তিনি।  যদিও মনে রাখতে হবে এই “পিছু হটা’ – এটা সাময়িক হতে বাধ্য! আমার বিচারে এটা স্থায়ী অবস্থা হবে না, বরং সাময়িক হতে বাধ্য।  মানে বলতে চাচ্ছি ল্যু ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা তাদের এই পিছু হটা অবস্থানও ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে; ফলে আবার আগের জায়গায় যেতে তাদের চেষ্টা করতে হবে! এজন্যই এটাকে ‘সাময়িক’ বলছি। কিন্তু এখন অবশ্যই এটা কিছুটা হলেও পিছু হটা !

    কথাটা সম্ভবত আরেকভাবে বলা যায়। যদি অনুমান করে নেয়া যায়, বাইডেন প্রশাসনের ভিতরে দুটা ধারা আছে বা হয়ে গেছে।  যার একটা ধারা যেটাকে আমরা এতদিন একমাত্র জ্ঞান করেই এসেছি সেটা হলঃ বাইডেন প্রশাসন ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এই অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে আর এভাবেই এশিয়ায় চীনবিরোধি আমেরিকান স্বার্থগুলো ভাল আদায় হবে বলে এতদিন মনে করে এসেছে এরা। এই ধারারই বাংলাদেশে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের গুম-খুন-অপহরণ-গায়েবের যেসব ভিকটিম আছে তাদের সাথে দেখা করার প্রোগ্রামে শাহীনবাগে যাওয়া। আর তা থেকেই হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সরাসরি কিছুটা সংঘাতময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

    অন্যদিকে, প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারাকে চিনাতে বলা যায়, এরা মনে করে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে হাসিনা সরকারের উতখাতের ঝামেলায় যাবার দরকার নাই। অন্যভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে…।

    সেক্ষেত্রে তাহলে জানতে হবে বা শুরু করতে হবে যে তাহলে বাইডেনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখান থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এমন চিন্তা করা বা পিছু হটার কথা সহজেই  বলতে পারছে কেন? আর কীইবা সেই উদ্দদেশ্য??
    বাইডেন প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে “মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা’ একেবারেই নয়। বরং সে জায়গায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘বার্মা দখল’! কিন্তু  সেক্ষেত্রে  ‘বার্মা দখল’ করতে চাইলে হাসিনা উতখাতের দায় সাথে নিয়ে আগানো কেন? সেকথায় পরে আসছি।

    আসলে প্রথম ধারার পথে চলতে গিয়ে এটা এখন অনুমানে বলাই যায় যে বাইডেনের আমেরিকার নিজ ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজি” ধরে আগাতে গিয়ে এমনভাবে হাসিনা সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে যাবে এটা তাদের কল্পনায় ছিল না। আগের দিনের মত সবই চুপচাপ পাড়িয়ে যেতে পারবে! কারণ, বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হবার পর থেকে প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল – সেই অভ্যাস মতে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকান প্রভাবে তারা যা করতে চেয়েছে মোটামুটি তাই হয়েছে ও পেয়েছে।

    কিন্তু বারে বারে বলেছি এটা “পালা-বদলের কাল” যখন আমেরিকাকে চীনা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতায় মোকাবিলা করতে হবেই ও হচ্ছে। পালা-বদল” মানে যেটা গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব বদলের এটা সময়কাল। যেটাকে অনেকেই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারে না অক্ষম বলে তারা তাদের চিন্তার অসক্ষমতা, দুর্বলতা ঢাকতে “ভূরাজনীতিক” বলে একটা আবছা অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে নিজের অস্পষ্ট চিন্তার প্রকাশ ঘটায়ে থাকে। এই পালাবদলে “ভূ-” বা কোন দেশের বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” জন্য এসব ঘটছে তা একেবারেই নয়; তা ভাবার কোন সুযোগও নাই। ভুরাজনীতি শব্দটার ব্যবহার ও আবির্ভাব প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে তবে এর শেষের দিকে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল ১৯৪৪-৫ সালে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও উত্থান ঘটে যাবার পরে  মানে এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও উদিত প্রভাবের পরে  ‘ভুরাজনীতি’ শব্দটা সেবার হারিয়েই যায়। এর মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কেন আমেরিকা এর একছত্র নেতা হিশাবে উঠে আসবে আর এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়া এক গ্লোবাল অর্ডার [new Global Order] বা বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা চালু হবে সেটা কোন দেশেরই বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” কারণে-পরিণতিতে এমনটা  ঘটে নাই। সে জন্য যারাই এই তিন প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও এদের সেকাল থেকে নয়া ভুমিকা ও তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে অপারগ তারাই geo- বা ভ্যু- বলে একটা পরাজিত ধারণাকে ধুয়ে মুছে আবার একালে খাড়া করে নিজেদের অকর্মণ্যতা আড়াল করে থাকে।

    তবে এখন যেটাকে পালাবদল  বলছি এতেও এমন অনুমান ভুল হবে যে, এতে আমেরিকা যেভাবে সেকালে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল চীনও একইভাবে একই ধরণের নেতা হবে। এই অনুমান অতি সরলিকরণও হবে। তাই সাবধান থাকতে হবে। তবে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক যে বিশ্ব ব্যবস্থা তখন জন্ম নিয়েছিল ও এখনও ধুকে হলেও চলছে – এখন পালাবদলে যেটা কেবল আমেরিকার জায়গায় চীনা নেতৃত্ব হয়ে যাবে এমনটা হল এক কপি-পেস্ট ধারণা। দুনিয়ায় কোন ঘটনাই একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ঘটে না। যদিও জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত আবার পুনর্গঠিত হবেই।

    আবার, এসব পালাবদল প্রসঙ্গে খোদ আমেরিকানদের কোন স্টাডি নাই বা ফেনোমেনাটা জানা নাই তা একেবারেই নয়। তবু তারা যেন নানার আমলে খাঁটি ঘি খাবার অভ্যাসে এখনও সহজেই আগের মতই তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করে ও ফেল মারতে থাকবে। কারণ পরিস্থিতি যে আর আগের মত একই রকম নাই তাই তারা সময়ে ভুলে যায়। আর বার বার পরাজিত হয়। এধরণের উদাহরণের অভাব নাই। যেমন ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটা ঘটনা। সে সময় আমেরিকা-বিশ্বব্যাংকের আগ্রহে তারা হাসিনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা। এই দুর্নীতির মামলা সত্যি হোক বা না হোক, এটা মনে করা ভুল হবে না যে এমন মামলা করার পিছনের তাদের অপর উদ্দেশ্যের দিক ছিল। সম্ভবত তা হল, যাতে আরো ভাল করে আমেরিকার অধীনস্ততায় আনা যায় যাতে হাসিনা আরো অনুগত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আমেরিকান বেকুবিটা হল দুর্নীতি মামলাটা যখন আনলই তখন কয়েক বছর পরেই আবার শেষে আদালত থেকে ঐ মামলাটাই বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কেন? অথচ তাতে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নয়া এক হারুপার্টিতে পরিণতি পেল!  সেটা কিভাবে?

    বিশ্বব্যাংক মানে হল নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে কম সুদে যে ঋণদাতা – তা ছোট বড় সব প্রকল্পে সে এমন ঋণ দিয়ে থাকে। আর এথেকেই “পড়ে পাওয়া বাড়তি চার আনার মত ঘটনাটা হল – আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বেড়ে যাওয়া।
    তাহলে দুর্নীতির মামলা এনে পরে পিছু হটে যাওয়ার আমেরিকানদের পরিণতি কী হয়েছিল? হয়েছিল এই যে নয়া ঋণদাতা উতস হিশাবে ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণদাতা’ হতে অপেক্ষা করছিল চীন বা প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চেয়ে অপেক্ষা করা চীন এই ফাঁকে সে বাংলাদেশে প্রবেশ ও নিজের হাজিরা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। যেটা এরপর হাসিনার চীন-সফর আর পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট  সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর শেষে ২০ বিলিয়ন ডলারের অধিক (যেটা পরে ঠেকেছিল ২৬ বিলিয়নে) প্রকল্পের বন্যা বাংলাদেশে বয়ে গেছিল।

    তাহলে চীনকে অবকাঠামো ঋণদাতা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে রাস্তা করে দিয়েছিল কে??? এটাই আমেরিকান বেকুবি!!   অথচ ঋণদাতা মানেই ওর ঋণগ্রহিতা দেশের উপর দাতার প্রভাব হাজির হওয়া বা বেড়ে যাওয়া। অনেকে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বলতে পরাশক্তির ‘সামরিক ক্ষমতা’ বলে বুঝে থাকে। এটা ভুল মিথ্যা। গ্লোবাল নেতা দেশের প্রভাব-আধিপত্য বলতে সেটা প্রধাণত নেতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানে যেমন তার ব্যাপক ‘ঋণদানের সক্ষমতা’ একেই বুঝায়।  তাহলে দাড়ালো যে আমেরিকা সেই বার নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল আর তাতে চীন উত্থান বা চীনা প্রভাব কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এবারও দ্বিতীয়বারও এমন কিছু একটা ঘটতে পারে সে ইঙ্গিত ফুটে উঠছে!!

    এবার বাইডেন প্রশাসন শপথ নিবার পর থেকে আমরা দেখছি তিনি আরেক “বাংলাদেশ প্রকল্প” খুলতে চাচ্ছেন – যেটাকে আমরা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প বলে চিনাতে পারি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ অবস্থায় উঠেছে এব্যাপারে সন্দেহ নাই।  কিন্তু প্রশ্ন হল বাইডেন কী আসলেই বাংলাদেশের মানবাধিকার চরম লঙ্ঘণ নিয়ে উদ্বিঘ্ন? মিন করেন? ঠিক তাই বুঝাতে চান???

    না একেবারেই না। তা সরাসরিই বলা যায়। যেমন এবার বাংলাদেশের বা হাসিনার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার পিছনে আমেরিকার দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি উদ্দেশ্যটা কী সেদিকে মনোযোগ দেই।  বাইডেনের আরেক উদ্দেশ্য বা মুল উদ্দেশ্য ছিল ও এখনও আছে – তা হল ‘বার্মা দখল”। এটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এটাকে পরোক্ষে বা পিছনে লুকিয়ে রেখে বাইরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্যটা বাইডেন মিথ্যা করে জানিয়ে চলছিলেন যে বাংলাদেশের হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য। আবার হাসিনার গুম-খুন-অপহরণ উঠায়ে নেয়া- ক্রসফায়ার ইত্যাদিতে মহামারি লাগিয়ে দেয়া এগুলোও বাস্তব ও সত্য। অর্থাৎ বাইডেনের “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প তো বাস্তবতার উপরেই দাঁড়ানো। হা অবশ্যই তাও সত্য । কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন গত পনেরো বছরের যেগুলো হাসিনা গুম-খুনের মহামারি হয়ে চলছিল তা তো আমেরিকা অজানা ছিল না। তবুও তখন কোন আমেরিকান প্রশাসন এদিকে মনোযোগ দেয় নাই – আসে নাই বা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিয়ে তাদের কোন কথা ছিল না কেন? যেটা আসলে অন্ধ ও নিশ্চুপ হয়ে পরোক্ষে হাসিনাকে সমর্থন দেয়া – তা করে গেছিল কেন? এর জবাব মিলে না!  কবি নীরব এখানে!
    এর জবাব হল, ডোনাল্ড ল্যু যতই বলুক যে আমেরিকার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্টে [1st amendment of US constitution, 1791] যে পাঁচ মৌলিক অধিকারের কথা দেয়া বা বলা আছে এনিয়ে আমেরিকা দেশে দেশে কথা বলবেই – সেকথা সবটা সত্যি না। সত্যিটা হল, ঐ পাঁচ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ হলেই হবে না সাথে ঐ লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে তখনই প্রশাসন কিছু বলবার পক্ষ নিবে যখন আমেরিকান রাষ্ট্র নিজের গভীর স্বার্থ ওর মধ্যে দেখবে বা থাকতে হবে তবেই আমেরিকা আগাবে এবং “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আগাবে।  আর আমেরিকান রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থগুলোকে আড়ালে ও পরোক্ষে রেখে দিবে। তাহল বাংলাদেশেও  হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড নিয়ে এগিয়ে আসার পিছনের আমেরিকান গভীর স্বার্থটা কী?

    গোড়ার স্বার্থ আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতেঃ
    হা, আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতে আর এটাই তার গোড়ার গভীর স্বার্থ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশকে জড়ানো কেন? বা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা পর্যন্ত উঁকি মারা কেন? কী দরকারে?

    আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো।

    কিন্তু বার্মা দখল মানে তো নুন্যতম একটা সেনা সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপার। হা তাই। তবে দখল কাজটা কম পয়সা খরচে, নিজ সেনা কম করে জড়িয়ে ও আয়েসে এই দখল ঘটাতে গেলে আমেরিকান স্টাইলটা হল, নিজ দেশের “এরিয়াল সাপোর্ট”[aerial support] দেয়া আর এই ছায়ায় সম্ভাব্য কোন দেশের (বাংলাদেশের!) একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল নেয়া।  তাই হাসিনাকে সরানো দরকার – এইছিল এতদিনের বাইডেনের গৃহিত লাইন এবং মূল স্বার্থ। কারণ তাহলে  সহজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সময়ের পদাতিক বাহিনীকে দিয়ে বার্মা দখল সহজ!  যেটা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে বাইডেন সেরে ফেলতে চেয়েছিল।

    এরিয়াল সাপোর্ট মানে কী?
    আরেক ভাষায় বললে এর অর্থ বার্মার নিজের আকাশ সীমানার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সেটা এই বলে যে, বার্মিজ বিমান বাহিনী যেন কোন উড়া-নড়াচড়া না করতে পারে এই মর্মে বার্মিজ বিমান বাহিনীর উপর এক  ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে দেয়া। সেটা আবার কী? মানে হল, বার্মার আকাশ-সীমার উপর আমেরিকার ‘নো ফ্লাই জোন’ঘোষণা বা দাবি জানিয়ে দেয়া।  আর তাতে এরপরে বার্মীজ কোন আকাশযান মানে কোন সামরিক-এয়ারফোর্স সক্ষমতা যাই থাক – বার্মার কোন হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান বার্মার নিজ আকাশের উপর দিয়ে উড়তে চাইলেও সেই বিমানের উপর আমেরিকান কোন জেট সেটার উপর বোমা ফেলে  গুড়িয়ে দিবে এই হুশিয়ারি আগাম দিয়ে রাখা।

    এতে সুবিধা হল, যেহেতু বিমান সক্ষমতা বার্মার থাকলেও সে ব্যবহার করতে পারবে না বা করলে তা মোকাবিলা করবে কোন আমেরিকান জেট ফলে সেই আড়ালে একেবারে সহজেই কেবল একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল করে নেয়া সহজ। এই কারণে “বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনীই” বাইডেনের আকাঙ্খা ও মূল কাম্য এবং টার্গেট। আর সে প্রয়োজনেই মূলত হাসিনার অপসারণ বা না-অপসারণের ‘এদুই লাইনের’ মাঝে দোল খাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

    আর বরং হাসিনাই যদি বাইডেনের বার্মা দখল আকাঙ্খায় পদাতিক বাহিনী সরবরাহকারি হিশাবে সামিল হতে রাজি হয়ে যায়??? এরাই হল সেকেন্ড অপিনিয়নধারী!!!! বা দ্বিতীয় ধারা!
    কিন্তু “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এর আড়ালে তো বাইডেন ভালই আগাচ্ছিল, এখন নয়া এপথের উত্থান হল কেন? দুইটা কারণে।

    কী সেই দুই কারণঃ
    এক. মূলত বার্মা দখলের আমেরিকার এই আকাঙ্খাটাই অবাস্তব। মনে হচ্ছে এনিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক আগে করে নেওয়ার দিক থেকে আমেরিকার ঘাটতি আছে!  যেমন যেটা আমেরিকার প্রাথমিক অনুমান যে সরাসরি “বার্মা দখল” এই ভাষায় না বলে ‘আরাকান ভুখন্ড’ দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া – এমন মানে জুড়ে দিয়ে কথাটা তারা বাংলাদেশকে বলতে চেয়েছিল। মনে করেছিল – এভাবে বললে নিশ্চয় বাংলাদেশ খুব খুশি হয়ে সামিল হতে চাইবে! বা পদাতিক বাহিনী নিয়ে সামিল হবে!!!  সেই কূটচাল এই হাসিনাই বহু আগেই (২০১৯ সালেই) প্রত্যাখান করে দিয়েছিলেন খুবই সঠিক ও কঠোর ভাষায়।
    কারণ কোন দেশের ভুখন্ড আমেরিকা অপর দেশের সাথে জুড়ে দিবার ক্ষেত্রে কে??  কেউই নয়! আমেরিকার কোন এক্তিয়ারই নাই। কোন দেশই একাজ করতে পারে না, ক্ষমতা রাখে না। জাতিসংঘের চোখে এটা গর্হিত ও অপরাধ্মূলক কাজ।

    একারণেই বার্মার ক্ষমতাসীন জেনারেলদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আড়ালে আমেরিকা আমাদেরকে বলতে চায় এতে আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা মিটিবে বলে আমেরিকার ধারণা আমরা খুশি হব এতে। অথচ এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও ২০১৯ সালে হাসিনার এই আমেরিকান প্রস্তাব প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে  মুল চালিকা ছিল চীনের এব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া; শুধু তাই না ভারতও আমেরিকার এই খায়েশের বিরুদ্ধে ছিল। ওদিকে আমেরিকানদের ধারনা তারা বার্মার দখল নিয়ে কোন এক পছন্দের জেনারেলকে বা সুচি-কে বসিয়ে নয়া বার্মা সরকার চালু করতে পারলে সেটা এক প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকারই হবে! কিন্তু বলাই বাহুল্য ঠিক এই দিকটার কারণের ভারত ও চীন ঘোরতরভাবেই এই ইস্যুতে আমেরিকার চরমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। বার্মাদেশের সাথে চীন ও ভারতের লম্বা সীমান্ত আছে তাই এদুই দেশ কিছুতেই বার্মায় এক  প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকার দেখতে চাইতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক!

    শুধু তাই না বাইডেন এমন এক সময়য়ে তার বার্মা দখলের খায়েশের পিছনে ছুটছে যখন আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে শুধু চীন-ভারতই না রাশিয়াও (ইউক্রেন যুদ্ধের পুটভুমিতে) খুবই সবল বিরোধীতা করতে আসবে। গত ২০১৯ সালের দিকে পরিস্থিতি ছিল একরকম কিন্তু এখনকার পটভুমিতে আমেরিকান নো ফ্লাই ছত্রছায়ায় যেকোন দেশের পদাতিক বাহিনী সীমানা অতিক্রম করে বার্মায় প্রবেশ মানে সেটা এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত যুদ্ধের ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হবে; বলে আমেরিকা এতই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
    মানে হল, আমেরিকার বার্মা দখলের উদ্দেশ্য হল চীনকে দুর্বল করা, চীনের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলা মত কাজ। অথচ এখন এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মাত্রই চীন দুর্বল হবার পরিবর্তে উলটা আমেরিকার তিন শত্রুদেশ (চীন-ভারত-রাশিয়া) একজোট হয়ে যাবে। একেবারে হিতে-বিপরীত অবস্থা। একারণের পিটার হাসের শাহীনবাগ ততপরতায় কিছুটা বাধা পেয়ে আমেরিকান প্রশাসন আভ্যন্তরীণ রিভিউয়ে বসলে সেই উসিলায় প্রশাসনের এসব দুর্বলতার দিক সামনে চলে এসেছিল বলে অনুমান করা যায়। আর তাতেই এই ডামাডোলে দ্বিতীয় ধারা যারা হাসিনাকে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অপসারণের পক্ষে কাজ করতে চায় না – এই ধারা উপরে উঠে বা সামনে চলে আসে।

    পরে তাদের প্রস্তাব হল, তাহলে বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো।  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে।

    আদর্শ উদাহরণ মাইকেল কুগেলম্যানঃ
    এই প্রসঙ্গে আগ্রহিরা কুগেলম্যানের লেখা ও আরেক সাক্ষাতকার পড়ে দেখতে পারেন।  মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] হচ্ছেন মূলত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের [WILSON Centre] ফেলো। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর। কিন্তু অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কের চেয়ে এই সেন্টারের ফারাক হল এই প্রতিষ্ঠানটা সেমি-গভর্মেন্ট। মানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফান্ড সরকারের দেয়া। এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের অনেক কথা বলার সুযোগ বা পছন্দ প্রকাশের সুযোগ আছে। ফলে কুগেলম্যান-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার পরে পরেই; আর তা এই চিন্তা করে যে কুগেলম্যান সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাইডেনের চোখের দেখে তাঁর অবজারভেশন ফরেন পলিসি [Foreign Policy] পত্রিকায় নিয়মিত লিখবেন। যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক ভাল ফিডব্যাক। এককথায় কুগেলম্যান অনেক বেশি বাইডেন প্রশাসন ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এখন আসল কথাটা হল যে কুগেলম্যান গত তিনমাসের বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নাখোস! বিএনপির জনসমাবেশকে তাই তিনি লাখে নয় হাজারে গুনে বলা উচিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আসলে প্রায় একজন – বাইডেনের ওবায়দুল কাদের। মানে হাসিনার জন্য একটা ওবায়দুল কাদের অবশ্যই সামঞ্জ্যপুর্ণ যেটা বাইডেনের জন্য বা এক্ষেত্রে একটা ভাঁড় অবশ্যই। তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are people who see reasons to support it. বাংলাদেশে এই লেখা ইংলিশ এবং বাংলায় ছাপা হয়েছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

    তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে,
    ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are

    people who see reasons to support it.।

    কুগেলম্যান এর এই অবস্থান এটাই বাইডেন প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারা। এটা প্রমাণ করে “মানবাধিকার” বাইডেনের ইস্যুই না; এটা কেবল  হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটাকে পুঁজি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা বাইডেনের লক্ষ্য।

     


    তাহলে  আইলিন লা বাকারকে পাঠিয়ে তাদের কী লাভ বা অগ্রগতি হলঃ

    মূলত তিনি এসেছিলেন দুটা সমর বিষয়ক চুক্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা যায় কিনা, তা দেখতে। নাম হিশাবে এরা হল General Security of Military Information Agreement (GSOMIA) and the Acquisition Cross-Servicing Agreement (ACSA)। তবে প্রথমটার ব্যাপারে আমেরিকা খুবই আগ্রহি, এটা সামরিক তথ্য সুরক্ষা ও শেয়ার বিষয়ক। যেটা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে এর আগেও বাংলাদেশের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। আর এবার এনিয়ে আলোচনার ফাঁকে হাসিনা সরকার বার্মায় পদাতিক বাহিনী পাঠানোতে আগ্রহি হতে পারে কিনা সে চেষ্টাও বাজিয়ে দেখা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    আবার অনুমান করা হয় যে এই একই অনুমানের কারণেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভোর রাতে এসে হাজির  হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় যে সরকার চীনের সাথে কোন প্রতিশ্রুতিতে যায় নাই। এতে বলা যায় অসন্তুষ্ট হয়েই চীনা মন্ত্রী মাত্র আধাঘন্টা মিটিং করে ঐ রাতেই চলে যান। কিন্তু এর মানে আবার আমাদের সরকার আইলিন লা বাকার-কেও কোনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা করেছেন তাও না। কিন্তু তাতে পুরা আসরের সব পক্ষগুলো পরস্পরের প্রতি পরস্পর সন্দেহ করে গেছেন, তা এড়ানো যায় নাই।
    বাংলাদেশের যেকোন রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ তাতে সে সরকার বা বিরোধী যাই হোক এদের সবার জন্য যেটা নো-গো এরিয়া [no-go area] তা হল, সামরিকভাবে কোন দেশের পক্ষে বা বিপক্ষের সাথেই না জড়ানো; এটা করাই যাবে না। এমন ভিমরতি যেন কাউকে না ধরে। আর একটা দিক হচ্ছে চীন ও আমেরিকা প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্যাচালে আমাদের (লীগ বা বিএনপি) কোন দলই যেন এদুই দেশের মধ্যে একেকটা দেশের পক্ষে একেকটা দল তাদের এজেন্ট এর ভুমিকা না নিয়ে বসে। যেমন লীগ যদি এই সীমারেখা না মেনে আমেরিকার এজেন্ট হয়ে বসে তবে সিওর বিএনপি তখন চীনের এজেন্ট হয়ে বসবে – অথবা ঠিক এর উলটা বা ভাইস-ভারসা! তাই সীমারেখা লঙ্ঘনের পরিণতি কী হবে তা সবার আগে থেকে জানা থাকতে হবে; কেউ যেন না বলে আমি আগে বুঝি নাই। এই সুযোগ নাই।  আজকের শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ক্ষমতায় থাকার লোভে তারা এই সীমারেখা ভেঙ্গে এখন পস্তাচ্ছে! এই সীমা ভাঙ্গার কাজ করা যাবে না।

    তাহলে ডোনাল্ড ল্যু এর ভারত সফরের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    আসলে পিটার হাসের শাহীনভাগ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর  পরে হোয়াইট হাউজের রিভিউ মিটিংয় থেকে সবাই বুঝে যায় বার্মা দখল বা হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ততপরতার কথা তাদের যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেভাবে আগায় নাই। মূল কারণ, বার্মা দখল এর চিন্তাটাই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে করা হয় নাই। তাই বার্মা দখলের খায়েসে তা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এক মোক্ষম জবাব হবার পরিবর্তে তা উলটা হয়ে গেছে; তা হয়ে গেছে আমেরিকার তিন শত্রু চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছাকাছি ঘনিষ্ঠতায় এনে দেওয়া। যা বার্মা দখল নিয়ে ফারদার চিন্তা পরিকল্পনাটাকে অসম্ভব, অকেজো করে তুলেছে।
    এই কারণে,  ডোনাল্ড ল্যু ভারত এসেছিলেন ভারতকে ঐ ‘ঘনিষ্ঠতা’ থেকে আলাদা করা যায় কিনা তা যাচাই করতে। ডোনাল্ড ল্যু এর সাথে NDTV এর এক সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে ল্যু ব্যাখ্যা করছিলেন তার সফরে আসার কারণ ও কী তিনি ভারতকে অফার করতে চান।
    বুশ ২০০৬ সালের মার্চে প্রথম ভারত সফরে এসেছিলেন। গত ২০০১ সাল থেকে ওয়ার অন টেররের প্রধান এলায়েন্স পার্টনার হিশাবে ভারতকে আরও কাছে টেনে চীনের উত্থান ঠেকানোর কাজে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চাওয়ার খায়েস থেকে। তখন থেকে বুশ অফার করেছিলেন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার জিএসপি এক্সপোর্ট সুবিধা ভারত পাবে তাতে। যে সুবিধাটা ট্রাম্পের আমলে ২০১৭ সাল থেকে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরই এক্সটেনডেড অংশ হল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকেও   ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  ল্যু বলছিলেন আগের দেয়া ঐ এক্সপোর্ট সুবিধা আবার ভাববার কথা। ল্যু এর কথাবলার স্টাইলও ছিল এপিজিং [appeasing] বা তেলানোর…। ওদিকে ল্যু এর সারকথা ছিল ভারত যদি আমেরিকার বার্মা দখলে আমেরিকার পক্ষে থাকে তাহলে সে কৃতার্থ হয়……।

    এনিয়ে সুবীর ভৌমিক কী বলেছেনঃ
    সেকথারই আরো বিস্তার পাওয়া গেছে সুবীর ভৌমিকের লেখায়। বলা যায় এই লেখায় সুবীর আমাদের অনুমানগুলোকেই যেন বাস্তবতা দিয়েছে।
    উপরে বার্মা দখল প্রশ্নে বাইডেনের যে এরিয়াল সাপোর্টের কথা বা নো ফ্লাই জোন বানানোর কথা বলেছিলাম,  সুবীরও সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সুবীরের লেখার শিরোনাম – “ আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারত সামিল হবে” [Will US do a Bosnia on Myanmar? No-fly-zone move may involve India]? ক্লিনটনের আমলে বসনিয়াকে রক্ষার জন্য তিনি বসনিয়ার আকাশের উপর এমন “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা করেছিলেন। বাবা অথবা সিনিয়র বুশ এবং ক্লিনটনও ততকালীন সাদ্দামের ইরাকের উপরে “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা দিয়ে সাদ্দামকে অকেজো করে দিয়েছিলেন।  তো বুঝা যাচ্ছে যে ল্যু এর ভারত সফরের উদ্দেশ্য হল, ভারতকে নো ফ্লাই জোন আরোপে আমেরিকার সাথে সামিল করে বার্মা দখল পরিকল্পনায় সম্ভাব্য জোটবদ্ধ করে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই। যাতে “চীন-রাশিয়া-ভারত” এই জোট থেকে ভারতকে আলাদা করার চেষ্টা করে দেখা যায়। যদিও দিনকে দিন এটা পরিস্কার হচ্ছে যে বার্মা দখল পরিকল্পনা নিয়ে দুর্বল হোমওয়ার্কের কারণে এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা পরিত্যক্ত হবার দিকে আগাচ্ছে!

    যদিও ভারতীয়দের মধ্যে এমন ধরণের একটা ভ্যানিটি ভেসে থাকতে দেখা যায় যেন লেখক (সুবীর) বলছে চান যে “দেখেছো চীন-আমেরিকার আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়িয়ে আমার দাম কত উপরে উঠেছে?” – সুবীরের আলোচ্য লেখাটাও আসলে এদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। আসলে ভারতের ইন্টেলেক্ট বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই বলে একটা ভাবনা কার্যকর থাকতে দেখা যায় যে সে আর চীন বা আমেরিকা কোন একটার পক্ষে সহসা ঝুকবে না। কেবল নিজের দাম বাড়িয়েই চলবে যাতে এক পর্যায়ে এই উত্থিত দামকে ব্যবহার করে সে চীন-আমেরিকারও উপরে উঠে যেতে পারে!! এমন ভাবনার বিষয়টা অবশ্যই আবেগে টইটম্বুর বা স্বপ্নে পোলাও খাওয়ার মত, বিশেষত যখন আমার জানাই নাই যে পোলাও কী করে পেতে হয়, রান্না করতে হয় ইত্যাদি। গত ২০১৩ সালে চীনা বেল্টরোড উদ্যোগ প্ররকল্পের প্রথম সম্মেলনের সময়ে ভারতকে চীনা দাওয়াত দেওয়ার পরে ভারত এভাবে বলেই তা প্রত্যাখান করেছিল।

    তবে সেসব যাই হোক ভারত এখন একালে বাইডেন আর পুতিনের তুলনায় অনেক বেশি পুতিনের দিকে থাকতে মন বেধে ফেলেছে। যদিও মুখে বলছে রাশিয়ার উপরে ভারতের গোলাবারুদে ৬০% নির্ভরশীলতার কারণে সে এই পথ সে নিয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার সস্তা তেলের সরবরাহ পাওয়া এর পিছনের কারণ। এমন কী তৃতীয় দেশে তা পাচার করার সুবিধাও ভারত পাচ্ছে। যেমন খোদ বৃটেনের ঋষি সুনাক তিনিও গোপনে রাশিয়ার তেল কিনছে ভারতের মাধ্যমে। আসলে খারাপ গ্লোবাল অর্থনীতি অ এতে ধস নামার সময়ে সস্তায় রাশিয়ান তেল পাওয়াকে সকলেই বিশাল রিলিফ বলে গণ্য করছে!! আর সাধারণভাবে ভারত আবার  আমেরিকার ঘনিষ্ট হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত ভারত তলে রেখেছে – ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের পরে, দেখে শুনে তখন তারা সিদ্ধান্ত নিবে!

    সবশেষে বলি, লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই সংক্ষেপে।
    তাহলে কী ল্যু এর পিছু হটা বা  বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকার হাসিনাকে টলাতে ফেল করার পর ল্যু যা প্রলেপ দিয়ে গেলেন যেটাকে অনেকেরই কল্পনায় ধরা আছে দেখা যাচ্ছে। যে কল্পিত  হাসিনা ও ল্যু এর মধ্যে কোন রফা হোক আর নাই হোক আর তাতে আমেরিকার সাথে বিএনপির সম্পর্কের মধ্যে এখন কোন দুরত্ব বোধ আমরা কেউ দেখতে পাই আর নাই পাই  – আগামিতে সম্ভবত মাস খানেকের মধ্যে ল্যু বা বাইডেন প্রশাসনে আবার পল্টি আসবে। প্রথম ধারা আবার জেগে উঠার সম্ভাবনাই বেশি নানান কারণে।  মানে মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে নিয়ে আগের মতই বাইডেন প্রশাসন আবার স্পষ্ট করে সোচ্চার হবে, এমন অনুমান করছেন অনেকেই!!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকালঃ ০৭ঃ৩০