Tag: গৌতম দাস

  • আরব স্প্রিং

    আরব স্প্রিং
    ২০১৩ জুলাই

    http://wp.me/p1sCvy-1p

    আরব স্প্রিং শব্দটা আমরা অনেকেই শুনেছি – আর এর অর্থ হতে দেখেছি একটা গণ-বিক্ষোভ বা গণ-আন্দোলন হিসাবে,কেবল এই দিকটাই নজরে রেখে। সেজন্য ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়কেই আরব স্প্রিং এর সমর্থক হতে দেখা গিয়েছিল। আরব স্প্রিং শুরু হওয়া তিউনিশিয়া পরে মিশরের পরিস্থিতিও কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। আসলে বিশ্ব-অর্থনীতি ও ক্ষমতা কাঠামো কিম্বা মতাদর্শিক লড়াই-সংগ্রামের ক্ষেত্রে আদৌ কোন নতুন পরিবর্তন ঘটেছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হয়ে ওঠে নি। কিন্তু আরও বিস্তারে লিবিয়া পেরিয়ে বিশেষ করে সিরিয়ান পরিস্থিতিতে এসে আরব স্প্রিং কথাটাকে যে আর কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা বুঝাবুঝিতে কুলাচ্ছিল না তা সকলে টের পেতে শুরু করে। ইতোমধ্যে সকলে অন্তত বুঝতে পেরেছে এটা নেহায়েতই গণ-আন্দোলনের ঘটনা নয়। ফলে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়ের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি সিরিয়ান প্রশ্নে এসে আরব স্প্রিং এর প্রতি ভালবাসা ও সমর্থন এবার ফিকে হয়ে গেছে; একটা জটিল গোলমেলে অবস্থায় সকলে। সেকুলারিষ্টদের কেউ কেউ অবশ্য এবার ৮০ দশকে ফেলে আসা রাশিয়া –আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক ধারণা দিয়ে ঘটনা ব্যাখ্যার এক অক্ষম চেষ্টা করেছিল। ব্যাখ্যায় থই না পাওয়ার মুল কারণ আরব স্প্রিং কেবল গণ আন্দোলন নয়। তাহলে গণ-আন্দোলনের দিক ছাড়া আর কি কি দিক আছে যা জানতে হবে যা দিয়ে আরব স্প্রিংকে বুঝা যাবে সেদিকে যেতে হবে।

    গত দুবছর ধরে চেষ্টা করেছি মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা – দুনিয়ার এই ভুগোলের নানান দেশের আরব স্প্রিং এর ঘটনাবলী অনুসরণ করার। আমার অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করেছি,এর আগেও। কিন্তু পুরা ঘটনা — মানে সব দেশের ঘটনা একসাথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কখনও শেষ করতে পারি নাই। আগের লেখা দুটো কেন্দ্রিভুত হয়ে গেছে কেবল মিশরের ঘটনায় ভিতর দিয়ে আরব স্প্রিংকে যতটা স্পষ্ট করা যায়, সেদিকে। আমার লেখার ক্ষমতার (গাফিলতি কুঁড়েমিসহ)চেয়ে ঘটনা ঘটেছে দ্রুত, সেটাও এর মুল কারণ। গত কয়েক সপ্তাহে সিরিয়ান ফেনোমেনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে, অভিমুখেও বদল ঘটছে। ঘটনা যদি তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণের চেয়ে দ্রূত ঘটতে থাকে তখনেই সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

    প্রথম কথা হলো, বাইরে থেকে যেটা আরব স্প্রিং সেটা এর গণআন্দোলনমূলক প্রকাশ্য দিক। আর এর অন্তরে মোটা দাগে দুটা স্বার্থ বা দুটো রাজনীতি আছে। এক. আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। দুই. নতুন ধরণের এক ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। কিন্তু আরব স্প্রিং এর ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা এসেছে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি –মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত তাগিদ থেকে। আর দ্বিতীয় দিকটা হলো, নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো। তবে এই ইসলামী ধারা কেন হাজির হলো? এর জবাব হলো, আসলে আমেরিকান নতুন নীতির লক্ষ্য হলো, এক “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার” কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। ফলে দ্বিতীয়টার জন্ম হচ্ছে আমেরিকার এই কৌশলগত প্রয়োজন থেকে ফলে মোটা দাগে কথা শুরু করব, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকায় আমেরিকান নতুন পররাষ্ট্রনীতি থেকে।
    মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা বলে একটা আঞ্চলিক ভৌগলিক এলাকা চিনানোর চেষ্টা করলাম বটে। কিন্তু সেটাও মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা এই অঞ্চলের গড়পরতা সব রাষ্ট্রের বেলায় ব্যাপারটা আবার তাও নয়। বরং এভাবে বললে ঠিক হবে যে, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার বেছে নেয়া কিছু দেশে। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের গালফ ষ্টেট অর্থাৎ দুবাই-সৌদি-বাহরাইন-কাতার-ওমান-কুয়েত এর মত আমির-বাদশার রাষ্ট্রগুলোর জোট (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি) – এই বাদশাজোট ভুক্ত রাষ্ট্র হলে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির অনুমোদিত আরব স্প্রিং সেখানে নো-গো এরিয়া। কোন জিসিসি রাষ্ট্রে আরব স্প্রিং করবার চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। কারা দমন করবে? ওসব দেশের স্ব স্ব বাদশা-শাসক একা অথবা সৌদি নেতৃত্বে যৌথভাবে জিসিসি। আর সেখানে আরব স্প্রিং ঘটলেও ওবামা সেখানকার বাদশা-শাসকদের পদত্যাগ করতে দাবী জানাবে না। ঠিক যেমন মিসরে মোবারকের বেলায় আমরা দেখেছি। অথচ মিসর, লিবিয়া বা সিরিয়ায় আরব স্প্রিং ঘটাবার জন্য সৌদি নেতৃত্বে অর্থ, লজিষ্টিক, ডিপলোমেটিক ইত্যাদির প্রধান পৃষ্টপোষক এরাই। আর নতুন উদিয়মান কাতার, এর বাদশা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আরব স্প্রিং এর একটা গড়পরতা আঞ্চলিক ভুগোল পাওয়া মুস্কিল। বরং আমরা দেখছি আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে বেছে বেছে নেয়া কিছু মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার রাষ্ট্রে। কেন? এর জবাব আমাদের জানতে হবে। সেখানে যাব। তবে ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা – আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখান থেকে কিছু কথা বলে নিব আগে।

    আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি বলেছি; “নতুন” শব্দটা ঢুকিয়েছি এর মানে আগে একটা নীতি ছিল। হা, আগে ছিল “ওয়ার অন টেরর” – অর্থাৎআমেরিকায় ৯/১১ এর আলকায়েদা হামলার পর নেয়া ২০০১ সালের শেষে নেয়া যে নীতি। সেটা থেকে আলাদা মানে আগেরটা ঠিক বাদ দিয়ে নয়, বলা যেতে পারে বোলচাল (rhetoric) ব্যাপারটাকে আর -ওয়ার অন টেরর – না, তবে ওর সাথে নতুন কিছু কৌশলগত বৈশিষ্ট যুক্ত করা। তবে আগের সাথে পরের নীতির মুল তফাত একটা তো করা যায় অবশ্যই। সেটা হলো, ইসলাম প্রসঙ্গে। পুরানোটা অর্থাৎ বুশের নীতিকে বলা যায়, ইসলামের যেকোন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ। ক্রুসেড। এসব প্রকাশকে দমন ও নির্মুল করেই আমেরিকাকে নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মুল ফোকাস আলকায়েদা। বিপরীতে নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো, ১। আমেরিকান রাষ্ট্র ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ইসলামকে মুখ্য হুমকি বলে মেনে নেওয়া, (It profoundly affects the security of the West)। ২। তাই করণীয় হিসাবে সব ধরণের ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের বদলে মার্কিন বিরোধী কিম্বা রেডিক্যাল আলকায়েদার বাইরে এক “মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করা। আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” খাঁড়া করা যেটা আমেরিকাকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
    দুই নীতির তুলনা করে বৈশিষ্টগুলো আলাদা করে বুঝার কাজটা আর একভাবে করা যেতে পারে। যেমন, বুশের বোলচাল ছিল, আরব “স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ও শাসকগুলো” থেকে তাদের জনগণকে তিনি “লিবার্টি”তে আনবেন, “ফ্রিডম” শিখাবেন। তাই তিনি ইরাক হামলা ও দখল করলেন। আর বিপরীতে এবার নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো – আগেরটা ছিল দেশ দখল করে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” রপ্তানী করার। আর এখন হলো, ওসব দেশের জনগণকে এক এনজিও কার্যক্রমের মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন আর উস্কানী দিয়ে তবে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রিত রেখে শাসকের পতন ঘটাবেন। আর সাধারণভাবে মুসলমান প্রধান দেশ আর বিশেষ করে বেছে বেছে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এই কর্মসুচী নেবার কারণ – এসব দেশের শাসকেরা “prevalence of authoritarian political structures” অর্থাৎ “স্বৈরাচারী” কাঠামোতে থাকে বলে ঐ রাষ্ট্রগুলো আলকায়েদা আন্দোলনের গড়ে উঠার পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য রাষ্ট্র হয়ে থাকে। আর তা সহজেই জনগণের জনপ্রিয় সমর্থন জোগাড় করে ফেলে। ফলে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” এর কথা বলে নিয়ন্ত্রিতভাবে শাসকের পতন ঘটানোর এক পুরা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে শেষে এক ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করার কাজটা ঘটাতে হবে। ফলে আলকায়েদার বিরোধী এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ে তোলা যাবে। এভাবে ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে হাজির করা আর আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড় তোলা এই কাজটারই বাইরের ডাক নাম “আরব স্প্রিং”।
    আমরা আরব স্প্রিং নামে কোন আমেরিকান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বয়ান করছি না। এককথায় বললে এটা একদিকে আলকায়েদা ধরণের ইসলামী ফেনোমেনাকে দমন করা আর পছন্দসই এক ইসলামী ফেনোমেনার জন্ম দেয়ার নতুন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি। এছাড়া মনে রাখতে হবে, আমেরিকান রাষ্ট্রনীতি কোন সিরিয়াস গবেষণা ছাড়া কারও এক মাথাগরম অথবা খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম হয় না। বরং আমেরিকান নতুন এই রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমরা দেখছি – এর ব্যাকগ্রাউন্ড গবেষণার কাজটা করেছে RAND Corporation, যা পরে বিস্তর সেমিনার আলাপ আলোচনা আভ্যন্তরীণ তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির পর ওবামা প্রশাসনের নীতি হিসাবে গৃহিত হয়েছে। এখানে ইংরাজিতে যেসব ব্রাকেটবদ্ধ কথা আছে তা RAND Corporation এর এক গবেষণা রিপোর্ট (RAND_MG574) থেকে নেয়া।

    RAND Corporation সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
    RAND Corporation সংগঠন হিসাবে নিজেকে এক নন-প্রফিট দাতব্য প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দেয়। এটা অবশ্যই এক ধরণের বেসরকারী তবে আমেরিকার নীতিনির্ধারণী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ধরণের প্রতিষ্ঠান। জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে যখন এর মুল প্রতিষ্ঠান ছিল আমেরিকান বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরির এক প্রাইভেট কোম্পানী, নাম Douglas Aircraft Company,। ডগলাস কোম্পানী পরবর্তিতে বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য বিভিন্ন বিমান কোম্পানীর সাথে মার্জ বা যুক্ত হতে হতে এটাই এখনকার আমেরিকান এয়ারবাস কোম্পানী, এক বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান কোম্পানী। মুল ডগলাস কোম্পানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরি ও সরবরাহের সাথে সাথে আমেরিকার জন্য যুদ্ধনীতি বিষয়ে গবেষণার কাজও করত। তবে সেটা Douglas Aircraft Company এর অধীনেই ‘RAND প্রজেক্ট’ নামে শুরু করা হয়েছিল। আর যুদ্ধ শেষে, ১৯৪৮ সালে ‘RAND প্রজেক্ট’ নিজেই মুল বিমান কোম্পানী থেকে আলাদা প্রতিষ্ঠান RAND Corporation নামে ক্যালিফোর্নিয়ায় রেজিষ্টার্ড করা হয়। আগের মত আর কেবল যুদ্ধনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বদলে আমেরিকার জন্য সোশাল, পলিটিক্যাল, ষ্টাটেজিক ও ইকোনমিক নীতিনির্ধারণী গবেষণা কাজ করা নিজের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছিল। এটা এখন নিজেই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও চালায়। আমি RAND এর যে রিপোর্টের রেফারেন্সে এখানে কথা বলছি সেটার শিরোনাম হলো, RAND_MG574 Building Modern Muslim Networks । ২১৭ পৃষ্টার এই ডকুমেন্ট অনেক বড় মনে হলে শুরুতে ১৩ পৃষ্টার সামারি পড়ে নেয়া যেতে পারে। আমার এই লেখায় আমি এটাকে “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” বলে রেফার করব। এছাড়াও এই ওয়েব সাইটে সংশ্লিষ্ট আরও অন্তত ৫-৭টা রিপোর্ট পাওয়া যাবে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
    তাহলে আমরা উপরে দেখলাম, আরব স্প্রিং এর পুরা কনসেপ্টই হলো, “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট” ওর গবেষণার সময়ের নাম। যা পরে আমেরিকান রাষ্ট্রের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে আরও অনেক কম্পোনেন্ট বা উপাদানের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্টপূর্ণ দিক। আর আরব স্প্রিং ওর ডাকনাম বা বাইরের নাম। “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” আর পরে এটাই ওবামার হাতে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। বলা বাহুল্য, আমেরিকান সরকার কবে কোন দলিল্‌ কোন মিটিংয়ে “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট”কে নিজের পররাষ্ট্রনীতি বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিল এবং কিছু বাদ রাখলো না পুরাটাই নিল এর খুটিনাটি ও সুনির্দিষ্ট হদিস পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আমরা যদি উল্লেখ্য রিপোর্টের কেবল সামারিটাই দেখি তবে সেখানে যেসব ধারনা ও শব্দ পাই যেমন, Democracy Promotion, Civil-Society Development, Public Diplomacy বা স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি – এই একই শব্দ ও ধারণাগুলো আমরা হিলারী ক্লিনটনের হাতে আকার নেয়া এখনকার আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্টসুচক নীতিতে পাই। এছাড়া যেসব আমেরিকান এনজিও এর মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন, নিয়ন্ত্রণ রাখবেন সেগুলো নাম হলো National Endowment for Democracy NED), the International Republican Institute (IRI), the National Democratic Institute (NDI), the Asia Foundation, and the Center for the Study of Islam and Democracy (CSID)। বাস্তবে মিশরের আরব স্প্রিং এর ক্ষেত্রে আমরা এই আমেরিকান এনজিও সংগঠনগুলোকেই পাই। তবে সাথে আরও কিছু আমেরিকান এনজিওকে পাই যেমন, ফ্রিডম হাউস, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্ট, আর জর্মনদের মধ্যে আছে রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমক্রাটিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান – কনরাড এডেনেওয়ার, ইত্যাদি। এসব আমেরিকান এনজিওগুলোর ফান্ডের উৎস আমেরিকান রাষ্ট্র, সরাসরি; এবং ফান্ড বিতরণ করা হয়েছে আমেরিকার বিদেশকে এইড বিতরণের সরকারি প্রতিষ্ঠান USAID এর মাধ্যমে।এই রিপোর্টে এই আমেরিকান এনজিওগুলোকে USAID এর implementation contractors বলা হয়েছে। এছাড়া রিপোর্টে American Federation of Labor (AFL) ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটা ওবামার ডেমোক্রাট পার্টির প্রভাবান্বিত আমেরিকান স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর রাজ্য ফেডারেশনগুলো আছে, এদেরই মুল ফেডারল বা কেন্দ্রিয় ফেডারেশন। American Federation of Labor বাংলাদেশে গার্মেন্টসে ট্রেড ইউনিয়নে নেত্রী কল্পনা আকতারের সংগঠনের মাদার সংগঠন। “RAND এর ইসলাম প্রজেক্টে” এধরণের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের মত ইসলাম জনগোষ্ঠির দেশে আরব স্প্রিং ধরণের প্রভাব বিস্তারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাস্তবে আমরা তাই দেখছি।
    বাংলাদেশের মত দেশে শ্রমিকেরা ভাল আছে, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষিত আছে আর আমেরিকানরা কেবল সুস্থির এদেরকে অস্থির করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এমন মানে করাটাও ঠিক হবে না। বলা ভাল যে, বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নকে কাজ করতে দেয়া হয় না, শ্রমিকদের সমস্ত অধিকার, স্বাভাবিক প্রতিবাদী তৎপরতা দাবিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতির সুযোগ আছে বলেই সেটার উপর ভরসা করেই AFL এর মাধ্যমে আমেরিকান পরিকল্পনা তৎপরতা আছে।

    আসলে “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” পরিকল্পনা ও সুপারিশগুলো সাজানো হয়েছে ৬০-৮০ দশকে কোল্ড ওয়ার ডিপ্লোম্যাসির যুগে আমেরিকা-রাশিয়ার লড়াইয়ে রাশিয়া যেমন করে নিজের পররাষ্ট্র নীতি সাজিয়ে ছিল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে ও উপর সুবিধা পেত, নিত সেকথা মনে রেখে। তৃতীয় বিশ্বের যে কোন উপনিবেশ বিরোধী স্থানীয় জাতীয় সংগ্রাম আন্দোলন আমেরিকা বিরোধী হয়ে যেত, আর ব্যতিক্রমহীনভাবে তা রাশিয়ামুখী হত। এখনকার RAND গবেষকেরা কেন এমন হত, রাশিয়া কেন সুবিধা নিতে পারত এর মুল্যায়ন করেছেন। বলছেন, আমাদের মত দেশগুলোতে কমিউনিষ্টরা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি নানান সংগঠন গড়ত (তুলনা করুন, কচিকাচার আসর থেকে শুরু করে, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়ন সংগঠন, টিইউসি ট্রেড ইউনিয়ন, উদিচী সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি) আর একাজে সহায়তা হিসাবে রাশিয়ানরা টাকা দিত। ফলে তৃনমূল থেকে সামাজিক সবজায়গায় আমেরিকা বিরোধী কিন্তু স্থানীয় সংগঠন ভিত্তি হিসাবে কাজ করত। আর এগুলো গড়ে তোলাই রাশিয়ান বিদেশনীতি ছিল। অর্থাৎ আইডিয়া হিসাবে সেকালের রাশিয়ান বিদেশনীতিটাই তারা আদর্শ ধরে অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু এবার সেই মডেলের আলোকে আমেরিকানদেরকে টাকা ও সংগঠন দিয়ে মুসলমান প্রধান দেশে আলকায়েদার প্রভাব খর্ব করতে আলকায়েদার বাইরে এক ইসলাম – “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে নেমে পড়তে হবে। একালে এই সংগঠন গড়ার কাজটাই “সিভিল সোসাইটি” গড়ার কাজ। আবার তুলনা করে আলকায়েদার দুটো সুবিধার কথা উল্লেখ করে বলছে, ওদের আছে অর্থ আর বিস্তার হয়ে থাকা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক…(The first is money……..The radicals’ second advantage is organization. Radical groups have developed extensive networks over the years, which are themselves embedded in a dense net of international relationships)। [ফর্মাল রিপোর্টে আলকায়েদা না লিখে এর বদলে তারা radicals লিখে]। আরও বলছে যাদের নিয়ে তারা সম্ভাব্য “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়বে এদের নির্বাচনের ব্যাপারে প্রাথমিক ফোকাস হবে,( initially focus on a core group of reliable partners whose ideological orientation is known) নির্ভরযোগ্য পার্টনার যাদের আদর্শগত মনোভাব জানা। আর যাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এরা হলো, সেকুলার ও লিবারেল মুসলমান একাডেমিক ও বুদ্ধিজীবি, মুসলিম স্কলার, কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট নেতা, নারী সংগঠন, মিডিয়ার জার্নালিষ্ট, লেখক। ( Liberal and secular Muslim academics and intellectuals; Young moderate religious scholars; Community activists; Women’s groups engaged in gender equality campaigns; Moderate journalists and writers)। আর মডারেট নেটওয়ার্ক গড়তে আমেরিকান ভুমিকা কি হবে কারা কিভাবে তা গড়বে বলা হচ্ছে, Moderates, however, do not have the resources to create these networks themselves; they may require an external catalyst। অর্থাৎ একদল মডারেট মুসলিমরা এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে কিন্তু যেহেতু তাদের রিসোর্স নাই (টাকাপয়সা ও সংগঠন), তাই বাইরের ক্যাটালিষ্ট অনুঘটক বা উস্কানিদাতা হিসাবে আমেরিকানদেরকে লাগবে।

    শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী
    আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য তালিকায় মুসলিম একাডেমিক বুদ্ধিজীবি বা স্কলার এর কথা বলা হয়েছে। “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে উপযুক্ত লোক হিসাবে যে স্কলারকে পাওয়া গেছে তার নাম শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi)। যার হাত দিয়ে নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলা হবে। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো।
    এটা কারযাভী কেন হলেন তা আমাদের ব্যাখ্যা পেতে হবে। তাই আগে তাঁর একটু সংক্ষিপ্ত ব্যাকগ্রাউন্ড ও পরিচয় পেতে হবে।

    কারযাভী মুলত একজন মিশরীয় এবং এই সময়ের মুসলিম ব্রাদারহুডের সবচেয়ে প্রভাবশালী তাত্ত্বিক নেতা। জন্ম ১৯২৬ সালে। ছাত্র অবস্থা থেকে তিনি ব্রাদারহুডের সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশুনা বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে গ্রাজুয়েট হন। এরপর ১৯৫৮ সালে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ডিপ্লোমা ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় মৌল দিক (Usul al-Din)ফ্যাকাল্টি থেকে কোরানিক ষ্টাডি বিষয়ে মাষ্টার ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে কাতারের Secondary Institute of Religious Studies এর প্রধান করে পাঠানো হয়। কারযাভীর কাতার নিবাস শুরু হয় এখান থেকে। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পিএইচডি শেষ করেন, তাঁর বিষয় ছিল Zakah and its effect on solving social problems। এরপর ১৯৭৭ সালে তাঁর হাত দিয়েই কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়া ও ইসলামী ষ্টাডিজ ফ্যাকাল্টি খুলা হয়। তিনি এর প্রথম ডিন হন। এরপর ১৯৯০ সাল থেকে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে Director of the Seerah and Sunnah Center at Qatar University হয়ে আছেন এখনও পর্যন্ত।

    রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিনবার জেল বন্দী থাকেন, ১৯৭০ সালে রাজনৈতিক কারণে তাঁর মিসরীয় নাগরিকত্ত্ব বাতিল করা হয়। সে কারণে এরপর থেকে তাঁর কাতারে বসবাস। মিশরীয় ব্রাদারহুড তাকে দুবার (১৯৭৬ ও ২০০৪ সালে) সংগঠনের প্রধান হয়ে আহবান জানায়। কিন্তু তিনি স্বাধীন একাডেমিক স্কলার জীবন যাপনে স্বস্তি পান বলে তা ফিরিয়ে দেন। তাঁর লেখা রচনা, কখনও ফতোয়া অথবা বক্তৃতা ব্রাদারহুডসহ দুনিয়া জুড়ে ইসলামী রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব রাখে। ২০১১ সালে মোবারকের পতনের পর তিনি প্রথম আবার মিশরে বেড়াতে আসেন। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে খুতবা দেন। তাহরীর স্কয়ারে গণ সমাবেশে বক্তৃতা দেন।

    নিজ দেশে থেকে বহিস্কারের পর কাতারই হয়ে উঠে কারযাভীর সেকেন্ড হোম। উলটো করে বলা যায়, কাতারের বাদশা থানি হয়ে উঠেন তাঁর প্রধান পৃষ্টপোষক। আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নিয়ে আমেরিকান রাজনীতির নতুন পথ শুরুর পর কারযাভী এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কেন হলেন? তাঁর চিন্তার সাথে এর মিলের দিকটা কি? এদিক থেকে বললে আরব স্প্রিং এক রাষ্ট্র বদলের কর্মসুচি; রাষ্ট্রের রেডিক্যাল বদল না হলেও এটা আমেরিকার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র বদল তো বটেই। কারযাভীর রাষ্ট্র-বোধ বিষয়ে জানা যায় তাঁর State-in-Islam বইতে পাওয়া যায়।
    এই বইয়ে কারযাভী নিজের অবস্থানকে বুঝাতে বলছেন, The Moderate Islarnic trend comes in the middle between the deviated secularists and the narrow-minded ones. আর narrow-minded ones বলতে তিনি নাম করেছেন হিজরি অষ্ট শতকের মানে ১৪০০ খ্রী. এর ইমাম ইবনে আল কাইউম ও তার মত অনুসারিদের কথা যারা হিজরি পনেরো শতক অর্থাৎ এখনকার খ্রী. শতক পর্যন্ত অনুসরণ করছেন। বলছেন, Imam Ibn ul-Qayyim spo ke sadly of the narrow -minded j urists of his time (the 8″1 ce ntury AH) ……. Ironically. those narrow-minded jurists still have disciples in our time. who live in the 15th century AH] অর্থাৎ একদিকে তিন এদের সংকীর্ণমনা বলছেন আর বিপরীতে সেকুলারিষ্ট – এর মাঝে তাঁর মডারেট ইসলামী ট্রেন্ড। ফলে তাঁর এই অবস্থান থেকে আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” প্রতি আগ্রহ ও নিজ অবস্থান থেকে সমর্থন বলে বুঝার চেষ্টা করতে পারি।

    কারযাভীর এই অবস্থানের কারণে, আরব স্প্রিংয়ের বাস্তবায়নের মুল কেন্দ্র এখন কাতার। RAND এর RAND Gulf States Policy Institute এখন আমেরিকার পরে নেমে এসেছে কাতারের রাজধানী দোহায়, নাম RAND – Qatar Policy Institute। কিন্তু কাতার কেন কারযাভীকে ঘিরে এই নতুন ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে নিজেকে জাহির করা ঠিক মনে করল এর জবাব পাওয়া যাবে এখনকার কাতারি উদীয়মান অর্থনীতি, নতুন বিশাল বিনিয়োগের ভিতরে খুজতে হবে। আমরা আপাতত সেদিকে যাব না। কিন্তু তাতপর্যপুর্ণ মুল ব্যাপার হলো, সৌদি ওহাবি বা সালাফি ইসলামের কেন্দ্রের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে কারযাভী ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে কাতারকে আমরা পাচ্ছি। তবে দুই ইসলামি ট্রেন্ডের সম্পর্ক বন্ধুত্ত্বপুর্ণ, যদিও ইদানিং সংঘাত দেখা দিচ্ছে। সার করে বললে, আরব স্প্রিং আমেরিকার নীতি কিন্তু বসবার কুশন দিয়েছে কাতার। আর যেসব দেশে আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে এর জন্য ফান্ড ও লজিষ্টিক সেন্টার কাতার। আর ওদিকে সৌদি বাদশা ওহাবি বা সালাফি হওয়া সত্ত্বেও গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের কারণে কারযাভী ইসলামকে সমর্থন দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে আরব স্প্রিং শুরু থেকেই অর্থাৎ ডিজাইন পরিকল্পনা রচনার সময় থেকেই শিয়া বা ইরান-সিরিয়া বিরোধী। অন্যভাবে বললে আরব স্প্রিং কর্মসুচি চালু করার আগেও আমেরিকান নেতৃত্ত্বে গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের বৈশিষ্ট হলো তা শিয়া বিরোধী, যেটা সৌদি বাদশার বিশেষ আগ্রহের কারণ।

    আরব-ইসরায়েল তৃতীয় যুদ্ধের (১৯৭৩) সংক্ষেপে একটু সালতামামি করব। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে প্যান আরব জাতীয়তাবাদ শুকিয়ে মরতে থাকে এবং নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ মানে নিজ রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেমন, মিশরীয় জাতীয়তাবাদ, সিরীয় জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি মুখ্য বিবেচনার বিষয় হয়ে যায়। কমন প্যালেষ্টাইন স্বার্থকে পিছনে ফেলে আগে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচাও, দরকার হলে অন্যকে বিক্রি করার বিনিময়ে; যেমন আমেরিকান মধ্যস্থতায় মিসর-ইসরায়েলের ক্যাম্প ডেভিড প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই নতুন ফেনোমেনা দেখা দিতে শুরু করে। আর এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন ফেনোমেনা, নতুন ধরণের আন্দোলন – প্যালেষ্টাইনে হামাস আর লেবাননে হিজবুল্লাহ – এদের জন্ম। পলিটিক্যাল ওরিয়েন্টেশন হিসাবে এই দুই আন্দোলন মিসরের ব্রাদারহুডের মত হলেও আবার অর্থ ও লজিষ্টিকের দিক থেকে এরা ইরান-সিরিয়ার উপর নির্ভরশীল ও সম্পর্কিত। আইডোলজির দিক থেকে এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ প্রতিষ্ঠাতা বান্নার আমল থেকেই ব্রাদারহুড শিয়া-সুন্নি বলে ভাগের রাজনীতি করেনি। বান্না নিজেও বলতেন, ব্রাদারহুড আন্দোলনের বৈশিষ্ট হলো একদিকে এটা সালাফি অন্যদিকে এটা সুফিজম। পরবর্তিতে কারযাভীর খুতবাগুলোতেও সুফিজমের প্রতি তাঁরও সহানুভুতি দেখতে পাওয়া যায়।

    এই লেখা গত দুসপ্তাহ ধরে লেখার চেষ্টা করছি। ব্যকগ্রাউন্ড ম্যাটেরিয়াল পড়ে ঝালাই করে আপটুডেট হতে সময় নিয়ে ফেলেছি বেশি। ইতোমধ্যে গত রাত্রে মিশরীয় আর্মি সেকুলারদের আপাত সমর্থনে প্রেসিডেন্ট মরসিকে পদচ্যুত করে ক্ষমতা নিয়েছে। ওদিকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিরিয়ায় যুদ্ধকে আমেরিকান প্রশাসন সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে নেমে পড়ে যুদ্ধকে এক নির্ধারক দিকে নেবার চেষ্টা করছে; লেবাননের হিজবুল্লাহ সরাসরি প্রেসিডেন্ট আসাদ এর পক্ষে যুদ্ধে নামার প্রেক্ষিতে এতে নড়াচাড়া পড়েছে। কারযাভী এই প্রথম প্রকাশ্যে হিজবুল্লাহকে শয়তানের দল বলে ভিডিও বক্তৃতা করেছেন। এখানে দেখুন,
    এসবের প্রেক্ষিতে “আরব স্প্রিং” এখন মারাত্মক ব্যর্থ ও ব্যাকফায়ার শুরুর আলামত বলে মনে করার কারণ আছে। তাই লেখাটা আপাত শেষ করব কেন আরব স্প্রিং ব্যর্থ হবে তার উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ আলোচনা করে।

    আরব স্প্রিং কেন ব্যর্থ হবে, এর মৌলিক দুর্বলতাগুলো কি কি
    ১। কথিত স্বৈরাচারঃ মুসলমান প্রধান দেশগুলোতে কথিত “স্বৈরাচারী” শাসক চলতে দেয়ার অর্থ এটা আলকায়েদার ঘাটি হবার জন্য পটেনশিয়াল হবে। কারণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায্য ক্ষোভ বিক্ষোভকে পুজি করে আলকায়েদা নিজের রাজনীতির ন্যায্যতা যোগাড় করে ফেলবে। ফলে স্বৈরাচার রাখার আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্য পটেনশিয়াল থ্রেট। তাই এনজিওর মাধ্যমে লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ শিখিয়ে এক পপুলার আপরাইজিং তবে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচারকে সরিয়ে দিতে হবে, একটা লিবারেল ইসলামী সরকার কায়েম করতে হবে। আর এর ভিতর দিয়ে আমেরিকার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন মডারেট ইসলামি নেটওয়ার্ক গড়ে নিতে হবে। এটাই আরব স্প্রিং। কিন্তু এই পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। স্বৈরাচার মানে কী? যদি সুনির্দিষ্টভাবে মিসরের দিকে তাকাই – কাম্প ডেভিড চুক্তির কারণ মিসরের আর্মি মানে হলো, যে অসমাপ্ত আরব-ইস-রায়েল যুদ্ধ এবং ক্রমআগ্রাসী ভূমি লোভী ইসরায়েলি দস্যুতার বিরুদ্ধে আরবদের ক্ষোভ থেকে ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা করবে। আভ্যন্তরীণভাবে দেশে দমন করবে এবং সীমান্ত পার হতে দিবে না। এটাই ঐ চুক্তির শর্ত, এর বিনিময়েই মিসরের সিনাই উপত্যকা ইসরায়েল ছেড়ে যায়। আর এই প্রতিরক্ষার সার্ভিসের খরচ হিসাবে বছর বছর আমেরিকান তিন বিলিয়ন এইড পাবে মিসর। ইসরায়েলও পাবে ১০ বিলিয়ন করে। আমেরিকার দিক থেকে এটাই মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তেলের দামের উপর কর্তৃত্ত্ব রাখার কাফফারা। অন্য ভাষায় আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ১৯৭৯ সালের চুক্তি এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই হয়েছিল। এখন মিসরীয় আর্মিকে যে মহান দায়িত্ত্ব দেয়া হলো এটা স্রেফ আর্মি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে সীমাবদ্ধের বিষয় নয়। বরং এটা হলো সামগ্রিকভাবে মিসরীয় রাষ্ট্রকে সাজিয়ে নেয়া, ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা দেয়ার মত যোগ্য দুর্দমনীয় মিলিটারী রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারলে ইসরায়েলের পক্ষে ভাড়া খাটা অসম্ভব। গত ৩২ বছর ধরে এরই প্রতিকী দিক হলো, আর্মি চীফ (একা ব্যক্তি না, এক কমান্ড কাউন্সিলের প্রধান তিনি) সবসময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হয়েছেন। আবার বাহিনীর সবাইকে খুশি রাখতে হবে। ফলে আর্মি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স যার প্রধান আবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। আলাদা আয়ের ব্যবস্থা। আমেরিকাতেও বাহিনী পোষার খরচ কমাতে বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বা অস্ত্র, কমিউনিকেশন ইত্যাদির টেকনোলজি কমার্সিয়াল কোম্পানীকে ভাড়া দেয়া থাকে। এটা তা নয়। এটা হলো, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স এর আয় আর্মি প্রতিষ্ঠান চালাবার ইকুইপমেন্ট কেনার কাজে নয়, বরং বাহিনীর সদস্যদের জন্য বাড়তি নগদ আয় হিসাবে সরবরাহ বিতরণ করা হয়।
    বলেছিলাম আরব স্প্রিং পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। মানে নতুন আরব স্প্রিং ঘটবার পরের পরিস্থিতিতে আর্মির ভুমিকা তো বদলাতে হবে। কিনতি বদলে গিয়ে কি হবে সেটা সাধারণভাবে সব মুসলমান প্রধান দেশের বেলায় এক বিরাট প্রশ্ন। আর বিশেষ করে মিসরের বেলায় যেখানে আর্মি মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সার্ভিস দেয়া সেখানে আর্মির ভুমিকা বদল মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এক্ষেত্রে কে দিবে? সে এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” এক্ষেত্রে নিরুত্তর।
    আরব স্প্রিং এ লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ তুলে পপুলার আপরাইজিংকে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচার হঠানোর নাটক করা কাগুজে পরিকল্পনায় যত সহজ মনে হোক বাস্তবে তা ভীষণ রিস্কি। কোন গ্যারান্টি নাই যে তা আমেরিকার হাতে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। হাতছুট ঘটনা হিসাবে আলকায়েদা ধরণের রেডিক্যাল নয়, অন্য অর্থে এটা সাম্রাজ্যবাদ বা পশ্চিম স্বার্থ বিরোধী রেডিক্যাল দিকে দৌড়াবে না কোন নিশ্চয়তা নাই। সেই অযাচিত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আমেরিকার জন্য শেষ ভরসা হবে আর্মি প্রতিষ্ঠান। একথাগুলো “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” লেখা নাই। কিন্তু এটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। এজন্যই আর্মি প্রতিষ্ঠান শব্দটা স্পর্শ করে কোন বাক্য নাই এই দলিলে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট মিসরীয় পরিস্থিতিতে আর্মি (SCAF) এক নির্ধারক প্রসঙ্গ। এটা আরব স্প্রিং এর দলিলে উহ্য করে রাখা হয়েছে বলেই মিসরে আরব স্প্রিং অকেজো ও ব্যর্থ হবেই, হচ্ছে। এজন্য আর্মি কখনই সুপ্রীম জুডিশয়াল কাউন্সিল, সুপ্রীম নির্বাচন কাউন্সিল, সুপ্রীম কাউন্সিল অব আর্মড ফোর্স ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান যেগুলো ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির ছানাপোনা – এগুলো কখনই ভাঙ্গতে দেয়নি। ফলে গত দুবছর ধরে বারবার এই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে আগের রাষ্ট্র নিজেকে পুনর্গঠিত করে নিতে পারছে। মিসরীয় আর্মির দিক থেকে আরব স্প্রিং এর প্রতি সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, প্রজেক্টের দলিলে আর্মির ভুমিকা কি হবে তা লেখা নাই, ভাবাই হয়নি। এজন্যই সে ৪২ দেশি, আমেরিকান এনজিও কর্মিকে আরব স্প্রিং করার দায়ে ৫ বছরের সাজা ও জরিমানা শুনিয়ে দিয়েছে। মোবারক, আগের আর্মি চীফ তানতাওই পদত্যাগ করেছেন, ইন্টিলিজেন্স চীফ আর্মি জেনারেল মারা গেছেন যাকে মোবারক উত্তর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল – সবাই চলে গেছেন কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অটুট ও শক্তিশালী আছে। একটা সাবধানতার কথা বলব। উপরের কথাগুলো যেন আমাদের দেশের সস্তা সামরিক শাসন-বেসামরিক শাসনের কুতর্কের মত ভেবে বুঝবার চেষ্টা না করি। পিছনে আমেরিকান পরিকল্পনা না থাকলে, কোন জেনারেলের ব্যক্তিগত খায়েসে ক্ষমতা দখল ঘটায় না।

    ২। মুল বিরোধ সেকুলারিষ্ট বনাম ইসলামিষ্টঃ
    “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” দলিলে সম্ভাব্য যাদের নিয়ে আরব স্প্রিং বা নতুন রাষ্ট্রের আকার দেবার কথা বলা হয়েছে তার মুল দুই এলিমেন্ট সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট। আবার ইসলামিষ্টদের প্রতি আগ্রহটা বেশি। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দুই আদর্শের ঐক্য হবে বা এক পাত্রে দুটোকে ধারণ করা যাবে? এই বিষয়ে RAND প্রজেক্টের গবেষণা দলিল নিরুত্তর। বরং ওখানে সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট উভয়কেই ধারনা দেয়া হয়েছে তারা “গণ আন্দোলনের ভিতর দিয়ে স্বৈরাচার উৎখাত করতে হবে। কিন্তু স্বৈরাচার উৎখাত এর মানে কি? উৎখাতের পরেই বা কি হবে? একটা লিবারেল রাষ্ট্র? তাহলেও তো আসলে তা একটা নতুন রাষ্ট্র। অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠন, রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা মামলা। যাতে একমাত্র একটা নতুন কনষ্টিটিউশনেই এর পরিণতি টানা যায়। এই প্রসঙ্গে সেকুলারিষ্টরা বিহবল। কোন চিন্তাগত প্রস্তুতি তাদের নাই। ফলে রাষ্ট্রগঠনের কাজটা আড়ালে ফেলে ইসলামিষ্টদের সাথে তাদের আদর্শগত দ্বন্দ্বের বাইরে কোন কিছুই তাদের মাথায় আসে না। একমাত্র সমাধান দেখে ইসলামিষ্টদের সেকুলার হয়ে যাওয়া। অথচ এর বাইরে রাষ্ট্রগঠনের কাজে এমন কি তার কাছে আছে যা সে ইসলামিষ্টদেরকে অফার করতে পারে যাতে আদর্শগত বিরোধ বা শ্রেণী বিরোধ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগঠনে কোন মৌলিক সুত্রে তারা ঐক্যমত তৈরি করতে পারে – এটা তার জানা নাই। বিপরীতে ইসলামিষ্টরা, এদের একালের রাষ্ট্র সম্পর্কে এমপেরিক্যাল তথ্য সংগ্রহও নাই। যেমন, কারযাভী তাঁর “ষ্ট্রেট ইন ইসলাম” (State in Islam) বইতে (১৯৯৭) এক নিঃশ্বাসে তিনি নবীর আমলেও সেটাকে রাষ্ট্র বলছে, চার খলিফা আমলকেও, অটোম্যান সুলতানের আমলকেও। ফলে রাষ্ট্র বলতে আসলে তিনি ঠিক বুঝাচ্ছেন তা বুঝা মুশকিল। আবার সাধারণভাবে বললে, “ইসলামে রাষ্ট্র” নিয়ে তাঁর ধারণা বয়ান করতে গিয়ে একটা চেষ্টা দেখা যায় তিনি অবলীলায় মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায় বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করছেন। যেমন, রাইট বা অধিকার, তিনি প্রায়ই ব্যবহার করছেন। রাইট বা অধিকার তো ইসলামের ধারণা নয়। আর রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘অধিকার’ ধারণা তো ইউরোপের সবকালের একই ধারণাও নয়। এছাড়া পশ্চিমে ব্যক্তি ও নাগরিক বলে ধারণাটার পিছনে একটা আগাম অনুমান আছে; যার উপর দাঁড়িয়ে আছে অধিকার ধারণা। ইসলাম কিভাবে ব্যক্তি ও নাগরিক ধারণাকে গ্রহণ করে, আদৌ গ্রহণ করে কি না, না করলে ইসলামে যে রাষ্ট্র তিনি দেখছেন সব জায়গায় কালোর্ধ হিসাবে সেখানে ধারণাগুলো কি ছিল এর একটা হিস্টোরিক্যাল অনুসন্ধান তো নিতেই হবে আগে। ফলে জবরদস্তি মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাগুলোকে ইন্টারচেঞ্জিংলি ব্যবহারের একটা ঝোক তার মধ্যে দেখা যায়। এতে তিনি কি বুঝছেন, কি বুঝাচ্ছেন এর হদিস এক অসম্ভব কাজ। যেমন, শাসককে মেনে চলার (obey) প্রশ্ন তিনি তুলেছেন। বলছেন,
    To obey the rulers stipulated that they are from among themselves. Allah put this obedience after obedience to Him and the Messenger (peace be upon him) and it ordained that in time of dispute the whole matter must be brought before Him and His Messenger, (i.e. the Glorious Quran and the Sunnah). This is based on the assumption that Muslims have a state that dominates and a ruler that is to be obeyed. Otherwise all this would be in vain.

    কিন্তু রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায়, শাসক সরকারের সাথে নাগরিকের সম্পর্কটা অন্তত obey করার না। আর এই সম্পর্ক কারযাভীর বর্ণনা তালাল আসাদের থেকে অনেক পিছনের। তালাল আসাদ এব্যাপারে obey ধারণার ভিতরে যান নি। তাছাড়া সম্পর্কটা রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের – এটা ঠিক পারশনিফায়েড শাসক ব্যক্তির সাথে নাগরিকের একেবারেই নয়। এছাড়া নাগরিক নিজে মুল ক্ষমতার উৎস। এটা তিনি কনষ্টিটিউশনে বলে রাখা নির্দিষ্ট বিষয়ে শর্ত সাপেক্ষে রাষ্ট্রকে সেই ক্ষমতা আমানত হিসাবে দেন।
    এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগঠন কনষ্টিটিউট ধারণায় (সে অনেক দুরের ব্যাপার যদিও) সেকুলারিষ্টের সাথে তিনি কি করে একসাথে রাষ্ট্র গড়বেন। সার কথায় সেকুলারিষ্ট ও ইসলামিষ্ট উভয়েই আসলে ওবামার আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি -মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত ষ্ট্রটেজিক তাগিদের দিক থেকে আরব স্প্রিংকে বুঝবার চেষ্টা করেন নি। ফলে উভয়েই প্রতারিত।

    ৩। আরব স্প্রিং এর প্রথম সাফল্যের জমানায় ২০১১ সাল বছর জুড়ে আমেরিকান প্রশাসন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। তিউনিশিয়া, মিসর, ইয়েমেন, জর্দান, আলজেরিয়ার ঘটনায় সব দেশেই স্ব স্ব দেশের ব্রাদারহুডকে নিরুপদ্রব সঙ্গী হিসাবে তারা পেয়েছিল। পরিস্থিতি আমেরিকান হিসাব মত নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল। এতে আরও উতসাহিত হয়ে এবার আর মাস-মুভমেন্ট বা গণ আন্দোলনের তরিকা না। তা ছেড়ে লিবিয়ায় আরব স্প্রিং আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও আমেরিকানদের বুক কাঁপেনি। রাশিয়া চীন নিজের ভাগের কথা বুঝে উঠার আগেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল থেকে লিবিয়ার আকাশে নো ফ্লাই জোন আরোপের সম্মতি পাশ করে আনা হয়েছিল। একই বা আরও প্রবল উতসাহে সিরিয়াতে আরব স্প্রিংকে আর লোক দেখানে গণ আন্দোলন না, দ্রুত একেবারে আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও তাদের মধ্যে কোন দ্বিধা কাজ করতে দেখিনি।

    আরব স্প্রিং আলকায়েদা বিরোধী আলাদা ইসলামী রাজনৈতিক ধারা জন্ম দেবার আমেরিকান প্রচেষ্টা হলেও এর প্রতি আলকায়েদা প্রতিক্রিয়া কি ছিল তা হয়ত আমরা অনেকেই খেয়াল করিনি। এপর্যন্ত আলকায়েদা কখনই আরব স্প্রিংয়ের বিরোধাতা করে বিবৃতি দিয়েছে নজরে আসেনি। বরং মোবারকের পতনের পর আলকায়েদা একে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু দুবছর ধরে সিরিয়ান যুদ্ধ চলার পর এখন পরিস্থিতি কি? আমেরিকান সিনেট কমিটি সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে সিরিয়ার মাঠে নামার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেবার পরও এক মাস সেটা স্থগিত করে রেখেছিল। গত এক বছর ধরে আমেরিকান ইন্টিলেজিন্স সাবধান করে আসছে সিরিয়ার সশস্ত্রতা আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আলকায়েদা সমর্থিত স্থানীয় Al-Nusra Front এখন সবার ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। ওদিকে লিবিয়ার বেলায় মিডিয়া রিপোর্টে মনে করা হয়েছিল সশস্ত্র আরব স্প্রিং এর পরও লিবিয়া বুঝি আমেরিকান নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বেনাগাজিতে আমেরিকান এমবাসেডরসহ সাতজন ষ্টাফ খুন হয়েছেন। রাজধানী ত্রিপোলীর বাইরে সশস্ত্রগ্রুপগুলো কেউ অস্ত্র ফেরত দেয়নি বরং তথাকথিত কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী এমন এক একটা বাহিনীকে অটুট রেখে স্বীকৃতি দিয়ে বাহিনীগুলোর স্বাধীন কাম কাজ স্বীকার করে নিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, লিবিয়ার ডামাডোলে সেখান থেকে ভারী অস্ত্রসহ আলকায়েদা নিয়ন্ত্রিত এক আফ্রিকান গ্রুপ মালিতে জড়ো হয়েছে। মালি দেশকে ভাগ করে ফেলেছে, যেটা পরবর্তিতে ফরাসী আর্মি পাঠিয়ে আফগানিস্তানের মত আফ্রিকার এক নতুন ফ্রন্ট খুলতে হয়েছে। এসব ফেনোমেনার সার লক্ষণ হলো, জোশের ঠেলায় যেখানে যেখানে আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করা হয়েছিল সেখানেই তা ক্রমশ আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। শেষ হাসি তারাই হাসছে, লাভের গুড় তাদের পকেটে। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” দলিলে কোথাও আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করার পরিকল্পনা এমনকি ইঙ্গিত নাই। ফলে লিবিয়ার ক্ষেত্রে এমপায়ারের চকচকে লোলুপ দৃষ্টি ছাপিয়ে উঠেছিল সেটাই পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে সহজেই টেনে নিয়ে গেছিল বলা যায়। আর সিরিয়ান পরিস্থিতি এখন যা তাতে আমেরিকান অবস্থান এখন যেদিকেই যাক না কেন ঐ পুরা জোন আলকায়েদার দখলে চলে যাচ্ছে। তাহলে যে উদ্দেশ্যে কারযাভী ইসলামকে সঙ্গি করে নেয়া হয়েছিল যে একটা – নন-রেডিক্যাল ইসলাম, কারযাভী ইসলাম সেভাবে হাজির হতে পুরাপুরি ব্যর্থ। শুধু তাই নয়, আরব স্প্রিংকে শিয়া বিরোধী হিসাবে হাজির করার যে সুপ্ত অভিমুখগুলো ছিল সেগুলো প্রকাশ হয়ে এখন খোদ কারযাভিকেই শিয়া বিরোধী বয়ান দিতে হচ্ছে। হিজবুল্লাহ (আল্লাহ দল) কে শয়তানের দল বলে বয়ান দিতে হচ্ছে। হামাসের সাথে হিজবুল্লাহর বিরোধ সংঘাত প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। কাতারি বাদশা প্যালেষ্টাইনে গিয়ে হামাসকে বলেছেন সিরিয়া –ইরানের উপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে। এখন থেকে অর্থ সরবরাহ তিনিই করবেন। কিন্তু অস্ত্র দিবে কে? তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ কি বন্ধ হয়ে যাবে? সিরিয়ায় আসাদকে সরানোর ঘটনার শুরু থেকেই তো কারযাভীর এটা বুঝার কথা যে সিরিয়ায় “সশস্ত্র আরব স্প্রিং” জয়লাভ করলে তাতে হামাস ও হিজবুল্লাহ আন্দোলন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
    [অসমাপ্ত]
    এখানে অনেক ধারণা স্পর্শ করেছি, তুলে এনেছি, সময়াভাবে বিস্তার করতে পারিনি। আগামিতে সেগুলো করার ইচ্ছা রাখি। ফলে আপাতত একটা প্রাথমিক রচনা হিসাবে এটাকে পাঠ করার আবেদন রাখছি।

  • জাতীয়তাবাদী মনের অসুখঃ মেহেরজান সিনেমা

    মেহেরজান সিনেমাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখ খোলাখুলি বাইরে এসে পড়েছে। মনের এই অসুখটা অনেক গভীরের, অনেক পুরানোও বটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী মন মেহেরজান নিয়ে তাদের আপত্তির ন্যায্যতা কতখানি তা তাদের চিন্তার মুরোদ দিয়ে গলা ও কলমের জোরে দেখিয়ে দিতে পারত। কিন্তু মোকাবিলার সে পথে তারা যায়নি। মাত্র আটদিন মেহেরজান-এর প্রদর্শনী সহ্য করার পর নিজের অসুখের উত্তাপে তারা প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার বীরত্ব দেখিয়েছে। সিনেমা হলে মেহেরজান দেখানোর শুরু থেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ছবিটা ‘নিষিদ্ধ করা হোক’। কেউ কেউ নাকি আতঙ্কিতও হয়ে পড়েছিলেন এরপর প্রশ্ন করেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকারের সেন্সর বোর্ড এ ছবি মুক্তি দিল কী করে”। অর্থাৎ নিজের চিন্তার মুরোদের উপর তাঁর ভরসা নাই, তাই শেষ অবলম্বন সেন্সর বোর্ড। যাত্রা নাটকের উপর সরকারের সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে এদেরকেই এককালে আমরা সোচ্চার হতে দেখেছি। অথচ আজ এরা নিজেরাই সরকারকে ছবি নিষিদ্ধ করতে দাওয়াত দিচ্ছে। বড়ই আজীব তাদের সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে লড়াই। অনেকে বলেছেন এ ছবি লাহোরের বদলে ভুল করে ঢাকায় রিলিজ করা হয়ে গেছে। এসব এলোপাথাড়ি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পর জানিয়েছেন তিনি ছবি নিষিদ্ধের পক্ষে নন, বরং গভীর আগ্রহে সিনেমা হলে দর্শকের প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখতে চান। কিন্তু সম্ভবত আট দিনে সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে “কাম্য প্রতিক্রিয়া” না দেখতে পেয়ে নিজেরাই সেন্সর বোর্ডের ভূমিকায় নেমে পড়েন। তবে পিছনের দরজা দিয়ে। প্রদর্শক বা ডিস্টিবিউটরকে চাপ দিয়ে সে কাজ করিয়েছেন। ডিষ্টিবিউটর হাবিব খান তাঁর সে লড়াই আর দুঃখের কথার গুমোর কিছুটা ফাঁস করে জানিয়েছেন বিডিনিউজ২৪ আয়োজিত এক আলোচনা সভায়। ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেবার পর স্বভাবতই “সেন্সর নিষেধাজ্ঞা আইনের বিরুদ্ধে” ঐসব লড়াকু সৈনিকদের কাউকেই বন্ধের বিপক্ষে দাঁড়াতে দেখা যায় নি। কেউ কেউ চিন্তার দৌড় অনুপাতে স্বভাবসুলভ “পাকিস্তানী লবির এজেন্ডা” আবিষ্কার করেছেন, এদের কেউ আবার নিজেকে আলাদা করে এসব “ষড়যন্ত্র তত্ত্বের” বাইরে থাকার কপট দাবি জানিয়ে শেষমেশ নিজেও সেই পাকিস্তানী এজেন্ডারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ স্রেফ ‘পাকিস্তানের’ ভয় দেখিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার ফ্রেমের মধ্যে সবাইকে বেধে রাখার সেই পুরানো অক্ষম প্রচেষ্টা। ঠিক যেভাবে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান সব কিছুর ভিতরে ‘হিন্দুদের’ ষড়যন্ত্র দেখতে পেতেন।
    সব কিছুকে পাকিস্তানী এজেন্ডা বা একটা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে দেখার খপ্পর থেকে বেরিয়ে আমরা যদি আমাদের সংকীর্ণ চোখকে মুক্ত করি, মনকে স্বাধীন চিন্তা করার সাহস যোগাই তবে আমাদের বহু চিন্তার জট খুলে যাবে, ব্যাখ্যা মিলবে, আমাদের সমস্যা আর সম্ভাবনা দুটোই দেখতে পাব। যদিও আপাতত সেটা একটা সম্ভাব্য পথ মাত্র। যদি তা মানি তবে বুঝব, প্রেম যদি সব দূরত্ব-বাধা ভেদী সর্বগামী এবং সার্বজনীন বলে মানি তবে পাকিস্তানী-বাঙালির মধ্যে প্রেম হতে না পারার কোন কারণ নাই। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রেও কী সম্ভব? সাথে ধর্ষণ যখন প্রকট সত্য হয়ে হাজির? সেটা নির্ভর করে কাহিনী কীভাবে উপস্থাপন করছি। চিত্রনাট্য, দৃশ্যকল্প, অভিনয় ইত্যাদি ও সর্বোপরি পরিচালকের মুন্সিয়ানায় যদি ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য,লজিক ও শক্ত জাষ্টিফিকেশন খাড়া করে উপস্থাপন করা যায়, ঘটনা ও চরিত্রের প্রতি দর্শকের সহানুভূতি আকর্ষণ করাতে সমর্থ হয় – তবে সেখানেও প্রেম সম্ভব ও ন্যায্যও বটে। এইক্ষেত্রে মেহেরজান ছবির দুর্বলতা আছে। কিন্তু মেহেরজানকে যারা পাকিস্তানী-এজেন্ডা আখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করছেন এটা তাদের সংকীর্ণ চিন্তার সমস্যা। তাঁরা চিন্তার সংকীর্ণতা দেখিয়ে শেষ করেন নি, ছবি বন্ধের একশনে গিয়েছেন।
    আশির দশক থেকে আক্ষেপ শুনে আসছি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন মহাকাব্য লেখা হলো না বলে। এতে বক্তা যে মহাকাব্য পড়েছেন তা জানা গেছিল বড় জোর। কিন্তু কোন জনগোষ্ঠিতে মহাকাব্য রচিত হতে গেলে সামাজিক মানস গঠনে কী প্রাকপ্রস্তুতি লাগে, সামাজিক না হোক অন্তত নিজের সে পরিপক্কতা এসেছে কীনা – সে খবর এদের জানা হয় নাই। সংকীর্ণ “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বা বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কর্ম এটা নয় তা বলা বাহুল্য। কারণ যে নাদান অপরিপক্ক চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে, এক্ষেত্রে সে নিজেই তো মস্ত এক বাধা। প্রাকপ্রস্তুতি সেরে পরিপক্ক হতে চাইলে সবার আগে আমাদের অন্তত নিজের জীবনকে নানাভাবে দেখতে জানতে হবে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের কাছে জীবন মানে “বাঙালি” – যার আগে কিছু নাই, পরেও কিছু নাই। এই ‘বাঙালি’ বলতে সাংস্কৃতিক নাকি রাজনৈতিক – সে কী বুঝে সেসবের সতর্কতা তার নাই। সে নিজেকে ‘বাঙালি’ বলে চিনেছে এই সত্যের বাইরে আর কোন সত্য কি আছে? নাকি আর কোন সত্য হতেই পারে না? এঁদের জানা হয় নাই। যদি সে ‘বাঙালি’ এটাই একমাত্র সত্য হয় তাহলে সে কি আবার মানুষও? যদি মানুষ হয় তবে দুনিয়ার অপরাপর সব অপর মানুষের প্রেক্ষিতে সে কে? তাদের সাথে কোন সম্পর্ক, টান কি অনুভব করে? যদি না করে তাহলে তো বালাই নাই। যদি করে তাহলে অ-বাঙালি সব অপরের সাথে টান অনুভবের কারণ কী? কারণ যে নিজের বাঙালি পরিচয়কে একমাত্র সত্য জ্ঞান করে তাঁর তো অ-বাঙালি সব অপরের সাথে সম্পর্কিত–এ অনুভব থাকার কোন কারণ নাই। ফলে অপর সব মানুষ কী তাকে অর্থাৎ ‘বাঙালি’কে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, অথবা সে নিজে অপরকে? জর্জ হ্যারিসনের কথাই ধরা যাক, নিশ্চয় তিনি বাঙালি ছিলেন না। তাহলে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ কায়েম হলো কি হলো না তাতে তাঁর কিসের ঠেকা? আর আমরাই বা এই অ-বাঙালি অপর মানুষটাকে আমাদের বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে জায়গা দিব কোথায়, ধারণ করব কী করে!
    এই পরিস্থিতিতে মেহেরজান সিনেমা প্রমাণ করল মহাকাব্য দূরে থাক ছকবাঁধা ফ্রেমে আটকা মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বাইরে অন্য কোনভাবে জীবনকে দেখতে, অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে দেখা বা দেখানোর চেষ্টার পরিণতি কী হতে পারে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণ মন এখনো এতই নাদান যে এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানানোর মত পরিপক্কতা সে লাভ করে নাই। এর মানে এমন নয় যে মেহেরজান একটা ‘উৎরে যাওয়া’ ছবি। ‘উৎরে যাওয়া’ মানে–কী বলতে চাই, কীভাবে বলতে চাই, সিনেমা বানানোর পর তা বলতে পারা গেছে কী না এসব। এই বিচারে মেহেরজান সফল হতে পারেনি। তবে বলা যেতে পারে, সে কাজের একটা ছোট পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেষ্টা এটা। আর এতটুকুতেই খড়্গ নেমে এসেছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী মন একে তাড়া করে আঁতুড় ঘরেই মেরে ফেলতে চাইছে।

    ইতিহাসে বিতর্ক তাই ইতিহাসেরই সমবয়সী
    দুনিয়ার কোন দেশের যুদ্ধের ইতিহাস একাট্টা নয়, হওয়ার কোন কারণও নাই। অসংখ্য বয়ান থাকে, থাকবে ওখানে। এটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা, বিভিন্ন স্বার্থের দিক থেকে দেখা, বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে দেখার কারণে এসব ভিন্নতা দেখা যায়। ইতিহাসে বিতর্ক তাই ইতিহাসেরই সমবয়সী। আবার এসবের মধ্য থেকে সাধারণ একটা বয়ানও বের করা যায়, যাকে আমরা অবিতর্কিত মুলধারার বয়ান বলে মানি। কিন্তু ইতিহাসের বিতর্ক আর পলিটিসাইজড ইতিহাসের বিতর্ক (যেটা আসলে ইতিহাস নিয়ে দলবাজীর কুতর্ক) এক কথা নয়। যেমন, ধরা যাক স্বাধীনতার ঘোষণা, যুদ্ধে শহীদের সংখ্যা, ধর্ষণ ঘটনার সংখ্যা ইত্যাদি নিয়ে যে তর্ক করা হয় তা ইতিহাসের বিতর্ক বলে মানা যায় না; এগুলো এমনভাবে করা হয় যেন এই তর্কের সমাধানের উপর নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধ আদৌ হয়েছে কি হয় নি, অথবা যেন ২৫শে মার্চের কালোরাত্রির নৃশংসতা ইত্যাদি সব মিথ্যা হয়ে যাবে। অথচ ঘটনা হলো, ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা বা শহীদের সংখ্যা বেশি কিংবা কম হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণসহ সব অপরাধ, নৃশংসতা জায়েজ হয়ে যাবে না। শেখ মুজিবের অবদান খাটো হয়ে যাবে না। কিন্তু এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়েছে যেন ধর্ষণের সংখ্যা বেশি হলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রেডিট আর কম হলে ডিসক্রেডিট। অদ্ভুত এ’এক মনের খবর পাই এখানে।
    আবার আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, এমন একটা লজিক তৈরি করা হয়েছে যেন, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবের ক্রেডিট কতখানি তা দিয়ে এখনকার আওয়ামী লীগের রাজনীতির ক্রেডিট রেটিং আমাদের করতে হবে এবং আওয়ামী লীগকেই ভোট দিতে হবে। একই লজিক বিএনপিরও। রেডিওতে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কারণে এখনকার বিএনপির রাজনীতির ক্রেডিট রেটিং আমাদের করতে হবে এবং বিএনপিকেই ভোট দিতে হবে। আর এইসব হাস্যকর লজিককে আমরা ইতিহাস-বিতর্ক বলে দাবি করতে দেখছি। আবার এই খাঁটি দলবাজিগুলোই নাকি “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি”! জাতীয়তাবাদী মন ইতিহাসের নামে দলবাজির এই চক্করে আমাদের সবাইকে বেধে রাখতে চায়, তাদের চিন্তার ফ্রেমের বাইরে যে কোন চিন্তাকে শেকল পড়াতে চায়।
    যুদ্ধ ব্যক্তি মানুষকে জনগোষ্ঠীগত মানুষের একজন, এক মানুষের মধ্যে হাজারও মানুষের অস্তিত্ব, মানুষের এক একক কমিউনিটিবোধ জাগাতে বাধ্য করে। এক মানুষ সারা পৃথিবীর মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে দায়, দায়িত্ত্ব বোধ করে। এতে চিন্তার অর্গল খুলে যায় বলে নানান দিক থেকে জীবন পরখ করা, ছুঁয়েছেনে দেখার সুযোগ মিলে। মনের শঠতা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, পলায়নপরতাগুলো কোন এক কোণে চাপা পড়ে যায়। এর মানে এই না যে রক্তমাংসের দোষত্রুটি-ওয়ালা মানুষের বদলে সবাই বইয়ের আদর্শ মানুষ বনে যায়। আদর্শ মানুষ তো আদর্শ-আইডিয়েল, বাস্তবের রক্তমাংসের রিয়েল মানুষ সে নয়। বইয়ের আদর্শ মানুষ বই থেকে বেরিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বাস্তব মানুষ কোনদিন হতে পারে না, আমরাও দেখব না। রক্তমাংসের দোষত্রুটি-ওয়ালা মানুষই একমাত্র বাস্তব মানুষ হতে পারে। তবে একথা সত্য ইতিহাস লেখার সময় মানুষের আদর্শগত দিকটা প্রধান হয়ে উঠে। তবে এক্ষেত্রে, মানুষের আদর্শগত দিকটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি রক্তমাংসের মানুষের দোষত্রুটি আছে থাকে এটাও সমান সত্যি হয়ে তখনও থেকে যায়।
    তবে যারা শিল্পজগতের লোক, নতুন কিছু করতে চায়, শিল্প করতে চায়, তাদের পছন্দ রক্তমাংসের মানুষ। তারা রক্তমাংসের মানুষ আর আদর্শ মানুষ – এই একই মানুষের ভিতরের দুইদিকের দ্বন্দ্বকে উপজীব্য করে শিল্প রচনার ভিত গড়ে।
    সেসব দিক থেকে সুনির্দিষ্টভাবে মেহেরজানে কী আছে সে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতেই পারে। এখানে সেসবের আগে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের অসুখটা কী তা একটু বিশদ করে দেখব, সেখানে প্রবেশ করব।

    সাংস্কৃতিক বাঙালি ও রাজনৈতিক বাঙালি
    আমরা বাঙালী – দুটো অর্থে কথাটা বলা যায়।
    বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগেও আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম, পরেও ‘বাঙালি’। এই বাক্যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার বাঙালি আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট অর্থে। আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে জীবনযাপন, জীবন প্রকাশ করার ধরণ অর্থে। দুনিয়ায় বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও অনেকানেক নৃবৈশিষ্টের মানুষের পাশাপাশি আমরা আমাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। ভাষা, ধর্ম, সৃষ্টিশীলতা, জীবনকে দেখার ধরণ, পারস্পরিক সম্পর্কের রূপ, পরিবার, সমাজের ধরণ, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে প্রকাশিত আমাদের সুদীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ছাপ যার প্রতিটি পরতে পরতে লুকানো। তবে এটা আবার একাট্টা না, মোটাদাগের সাংস্কৃতিক ফ্রেমের মধ্যে আভ্যন্তরীণ লড়াই সংগ্রাম আছে, বাঁক ফেরা আছে; যদিও নদীর স্রোতের মত তা বহমান, যাতে পরিবর্তন আছে তবে সদা বিকশিত। এভাবেই আকার নিচ্ছে, ভাঙছে আবার আকার নিচ্ছে। সব মিলিয়ে এককথায় একে বাঙালি সাংস্কৃতিক রূপ, বৈশিষ্ট্য বলছি।
    অন্যদিকে যদি বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে আমরা ‘বাঙালি’ ছিলাম না, এরপর ‘বাঙালি’ পরিচয় নিয়েছি; আর এরপরে কী হব এখন জানি না। তবে ভবিষ্যতে অন্যকিছু পরিচয় নিতেও পারি। এবার এই কথার মধ্যে যে ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার করেছি তার অর্থ কিন্তু এখানে রাজনৈতিক; সাংস্কৃতিক পরিচয় সীমা ছাড়াও রাজনৈতিক অর্থে বাঙালি। এতে আমাদের সাংস্কৃতিক বাঙালীত্ব ঘুচে গেল না, তবে যোগ হলো রাজনৈতিক পরিচয়। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ কথা হলো, রাজনৈতিক পরিচয় বলতে এটা কোন চিরস্থায়ী ধরণের ব্যাপার নয়।
    বাঙালি – এই শব্দ ব্যবহারের সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলে এই ভাগটা সতর্কভাবে মনে রাখা দরকার। আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? রাজনৈতিক পরিচয় হলো, অফুরন্ত সম্ভাবনাময় মানুষের চিন্তায় নিজেকে অনুভব, চিন্তার এক প্রডাক্ট বা ফসল। এটা আমরা জনগোষ্ঠী হিসাবে নিজেরা নির্মাণ করি। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগোষ্ঠীর নিজে নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবনে লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে। এটাই কোন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে বড় ফারাক।
    রাজনৈতিক পরিচয়- এই কথাটায় এমন কী আছে যা সাংস্কৃতিক নয়? কেন মনে ভাগ বজায় রাখার কথা বলছি? এর জবাব অনেকভাবে দেয়া যেতে পারে। সেসবে এখানে বিস্তার না ঘটিয়ে সংক্ষেপে মূল কিছু দিক উল্লেখ করব। কোন জনগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বলে যা আকার নেয় এর মূলে আছে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট। যেমন, হিমালয় – সুউচ্চ পর্বত, এর পাদদেশের শেষ মাথায়, এর বরফগলা পানি, বিশেষ মিঠা পানি সমুদ্রে মিশে নিজ বৈশিষ্ট্য লোপ পাবার ঠিক আগে প্রায় সমতল এক ভূমিতে আমাদের জন্ম। পর্বতের বরফগলা বিশেষ মিঠা পানিতে কৃষি চাষাবাদ করে ও মাছ খেয়ে আকার পাওয়া কোন নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী দুনিয়াতে আর কোথাও আছে কিনা খোঁজ করে দেখা যেতে পারে। গরুর দুধকে নানানভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন নতুন নানান খাদ্য ও খাদ্যাভাসের কথা দুনিয়ার নানান জনগোষ্ঠির মধ্যে চল আছে আমরা দেখতে পাই, যেগুলো আবার প্রায় নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কমন। যেমন, মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি। কিন্তু ছানা? রসে সিদ্ধ করা সেই ছানার রসগোল্লা? এটা এতই আন-কমন খাদ্য বা খাদ্যাভ্যাস যে ‘ছানা’ শব্দের ভাষান্তর মেলে না। সাধারণভাবে বললে ছানা একধরণের প্রসেসড মিল্ক। একই দুধ কিন্তু আমাদের প্রক্রিয়াজাত করণের মধ্যে এমন এক বিশেষ ধরণ আছে যার কারণে এটা দুধের অন্য আর সব সাধারণ প্রক্রিয়াজাত ফল মাখন, চীজ-পনির, দই ইত্যাদি থেকে একেবারে ভিন্ন। সব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এমন বিশেষ কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। একথাগুলো পড়তে পড়তে পাঠককে জাতগর্বে বা আবেগে আপ্লুত হতে বারণ করি। কারণ আসল কথাটা এখন বলতে হবে। লক্ষ্য করলে দেখব, আমরা যা বাঙালি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে চিনছি তা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামোর উপর। আর গুরুত্ত্বপূর্ণ হলো, এই মৌলিক কাঠামোটা প্রকৃতি-প্রদত্ত, আমাদের কোন কেরামতি নাই। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত বা গিভেন, অনেকে যা গড-গিভেন বলতে পছন্দ করেন। আগে থেকে নির্ধারিত ঐ পটভূমির উপর বেঁচে থাকা, জীবনধারণ, যাপন করতে গিয়ে আমাদের কেরামতিটা অতটুকুই যে, আমাদের জীবন সংগ্রাম লড়াই ও তার মধ্যে দিয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর জীবন প্রকাশের বিশেষ ধরণ এটা—এককথায় যাকে আমরা সাংস্কৃতিক বাঙালি বলে জানছি। কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে আকার দিচ্ছে আমাদের নৃবৈশিষ্ট্য, ভূগোল ইত্যাদির মৌলিক কাঠামো—এই পূর্বনির্ধারিত পটভূমি মেনে নিতে হচ্ছে কেন? কারণ, আমরা কেউই আল্লার সাথে চুক্তি করে বঙ্গদেশে জন্ম নেইনি; আমার নাক-বোচা, শ্যামলা, গড়ে সাড়ে পাঁচ ফুটের হব কিনা তা আমরা কেউই ঠিক করিনি; মাটিতে হিমালয় পর্বত থাকতে হবে যার পাদদেশে আবার বিস্তীর্ণ সমতলভূমি থাকতে হবে এমন নিশ্চয়তা জন্মের আগে আমাদের কেউ দেয়নি। এর মানে আকার পাওয়া সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মৌলিক দিকগুলো পূর্বনির্ধারিত, প্রকৃতি-প্রদত্ত; কোন জনগোষ্ঠীর ওতে কোন হাত নাই। ওকে খণ্ডান বা বদলে নেয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।
    তাহলে এখানকার জন্য মুলকথা, আমাদের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় আমাদের চয়েস বা পছন্দের বিষয় না; প্রকৃতি-প্রদত্ত।
    কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয়? এটা জনগোষ্ঠী নির্মাণের রাজনৈতিক ভাব, কাজ ও তৎপরতার মধ্যে মানুষ তৈরি করে। এটা প্রকৃতি-প্রদত্ত নয়। একে আমরা ভাঙ্গতে পারি আবার গড়তে পারি। এবং তাই আমরা করি। জনগোষ্ঠীর নিজের নির্মাণ করে নেয়া রাজনৈতিক পরিচয় একবার করে না এবং একটাই থাকে না। জীবন লড়াই সংগ্রামের নানান সময়ে নানান রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করতে পারে।
    রাজনৈতিক পরিচয় কথাটা একটু ভেঙ্গে বলি। রাজনৈতিক পরিচয় মানে রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়; একটা নতুন রাষ্ট্র গঠনে যা কালমিনেট অর্থে পরিণতি পায়। এখানে রাষ্ট্র বলতে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থাৎ রাজা সম্রাটের সাম্রাজ্য অর্থে রাষ্ট্র নয়। যেমন ১৯৭২ সালে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কালমিনেটেড, মোটাদাগে এর রাজনৈতিক পরিচয় বিনির্মাণ (রিকনষ্ট্রাকশন) শুরু ষাটের দশকে। আমরা এক নতুন রাজনৈতিক পরিচয়, বাঙালি (সাংস্কৃতিক নয় রাজনৈতিক অর্থে) বা বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিচয় ধারণ করে জনগোষ্ঠীগত ভাবে নতুন আকার নিতে শুরু করেছিলাম। এটা সাংস্কৃতিক অর্থে খেয়ে পড়ে জীবনযাপন বেঁচে থাকা ও স্রেফ জীবন প্রকাশ নয়; নতুন রাষ্ট্র গঠন, রাষ্ট্রে পরিণতি পাওয়ার মামলা; তাই রাজনৈতিক। প্রকৃতি-প্রদত্ত বিষয়াবলীর উপর মানুষের নিজস্ব অর্জন, চিন্তার মুরোদ হাজির করা। পাঠক হয়ত লক্ষ্য করেছেন, আগের বাক্যে ‘রিকনষ্ট্রাকশন’, ‘নতুন’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছি। তার মানে রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে বা কনষ্ট্রাক্ট করে নেবার বিষয়; যা আগে থেকেই হয়ে বা গড়া থাকে না। এটা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মত প্রকৃতি-প্রদত্ত অর্থে গিভেন না। আবার ‘রি-কনষ্ট্রাকশন’ এর ‘রি’ অথবা ‘নতুন’ বলেছি—তার মানে এক্ষেত্রে আমাদের অন্য কোন রাজনৈতিক পরিচয় আগেও একবার নির্মিত হয়েছিল! হ্যাঁ, হয়েছিল। যেটা পাকিস্তান রাষ্ট্র। ভুল বা শুদ্ধের প্রশ্ন নয়; ফ্যাক্টস হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক পরিচয় ধারণের আগেও আমরা একবার মুসলমান ডাকনামের রাজনৈতিক পরিচয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের ফসল বা পরিণতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রে আকার পেয়েছিলাম। আর ওটা ছিল আমাদের প্রথম রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ। [এর আগে আমরা ছিলাম বৃটিশ-ইন্ডিয়া এই কলোনী রাষ্ট্রের প্রজা, আর এরও আগে মোঘল সাম্রাজ্যের প্রজা; ফলে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণতি চাই এমন নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় এগুলোর কোনটাই নয়, ঘটনা নয়। তাই রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ওগুলোকে বলতে পারব না।]
    তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ গড়নের বিষয়টা আসলে কেবল একবারই নয়, বারবার তা নির্মাণ পুণর্গঠন হতে পারে; জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয়কে আবার নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই পূর্ববঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর আমাদের বিভিন্ন সব সম্ভাব্য পরিচয়ের মধ্য থেকে এক সময়, মূলত কলোনী ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটাতে মুসলমান পরিচয় মুখ্য গণ্য করে একবার পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং পরবর্তীতে সেই নিপীড়ক পাকিস্তান রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের নিগড় থেকে মুক্তি পেতে নতুন আর এক রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমাদের উদ্ভব ঘটেছিল। এখান থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, একই বাঙালি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী আগামীতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবার নতুন রাষ্ট্রে পুণর্গঠিত হবার চেষ্টা করতে পারে।
    উপস্থিত কোন রাষ্ট্রের মধ্যে বসে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করে রাজনৈতিক সংগ্রামের কাজ একটা নিরন্তর ঘটনা। কিন্তু কাকে রাজনৈতিক পরিচয় মেনে ধরে নিয়ে তা বারবার আগাবে তা নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর মধ্যে দূর-মীমাংসীত্ব বিরোধ স্বার্থসংঘাত কী রূপ, চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছে। তবে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করা মানে রাষ্ট্রের সীমানা ভেঙ্গে নতুন সীমানা নিয়ে রাষ্ট্র হতেই হবে এমন কোন কথা নাই। একই বাংলাদেশ ভৌগলিক সীমার মধ্যে থেকেই রাষ্ট্র নতুন করে নতুন পরিচয়ে পরিগঠিত হতে পারে। বাংলাদেশের এখনকার রাষ্ট্র বদলে আগামীতে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে একই ভৌগলিক সীমায় যদি নতুন রাষ্ট্র, কনষ্টিটিউশনে পুণর্গঠিত হয় তবে একাদেমিক ভাষায় একে নতুন বাংলাদেশের সেকেন্ড রিপাবলিক বলা হবে।
    এখনকার জন্য মূল কথা হলো, সাংস্কৃতিক অর্থে বাঙালি একই জনগোষ্ঠী বারবার রাজনৈতিক পরিচয় বদল করতে পারে, রাষ্ট্র বদলে পুণর্গঠিত হতে পারে। তবে এখনকার ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ভবিষ্যতে নতুন কোন রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করে বদলে গেলেও সাংস্কৃতিক অর্থে অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক, ভৌগলিক অর্থে সে একই বাঙালি জনগোষ্ঠীই থাকবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ – এই রাজনৈতিক পরিচয় তার শেষ কথা নয়; এর যেমন শুরু আছে তেমনি শেষও আছে। আর, এটা সাংস্কৃতিক অর্থে শেষ হওয়া নয়। আবার, সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি বলে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ওর একমাত্র ও থিতু-রূপ হবে এমন ধারণার কোন ভিত্তি নাই।
    আবার সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঙালি –এটাও শুকিয়ে মরা অর্থে শেষ হতেও পারে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের কথা ধরা যাক। ওর সাংস্কৃতিক পরিচয় এখনও বাঙালী হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে ওরা ৪৭ সাল থেকেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। এখন ওর রাজনৈতিক পরিচয় তো বিলীন হয়েছে দেখা যাচ্ছে, এই সাংস্কৃতিক পরিচয়টুকুও কী শেষ পর্যন্ত থাকবে? এটা নির্ভর করে সর্বভারতীয় যে আগামী রাষ্ট্র পরিচয় দাড়াবে তা সে বর্তমান ভারতীয় জাতীয়তাবাদ থাকুক আর যাই থাকুক—তাতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীর চিন্তার অবদান কতটুকু ও কী থাকবে এর দ্বারা। ঠিক একইভাবে দুনিয়াতে বাংলাদেশ বলে আগামীতে কিছু কি থাকবে? আলাদা করে চেনা যাবে? এটা নির্ভর করে গ্লোবাল চিন্তা জগতে আলাদা করে চেনা যায় এমন কোন অবদান যদি আমাদের থাকে, রাখার মুরোদ রাখি তবে। নইলে এমনও হতে পারে কারও কোন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে চাপে প্রভাবে আমরাও বিলীন হয়ে গেছি।

    রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ ও রেসিজমের বিপদ
    এবার কথা আর একটু সরাসরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করব। রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ মানে একইসাথে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করে ফেলাও বটে। কলোনী ভূমিব্যবস্থা অর্থাৎ জমিদারী-প্রজা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ইস্যুতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পূর্ববঙ্গীয় প্রজাদের পক্ষে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারে নি। বরং দেশভাগ ঘটনার শেষের দিকে বিশেষত ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময় থেকে সংখ্যাগরিষ্ট পূর্ববঙ্গের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ বা হিন্দুদের রক্ষা করার নামে জমিদারদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এসব ঘটনায় পূর্ববঙ্গ পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে মিলে মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে দেশভাগের দাবির সাথে একাত্ম হয়ে যায়, আর এর নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ নির্ধারিত হয়ে যায়। সেই সাথে বিপরীতে নতুন সম্ভাব্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় হয়ে যায় ‘হিন্দু’; এটা এড়ানোর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না। এখন মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে দেশভাগ ঘটে যারার পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ গরহাজির হয়ে যায়। অথচ ইতোমধ্যে ‘মুসলমান’ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করে ফেলার কারণে চাইলেই ঐ রাষ্ট্রের শত্রু যে আর বাস্তবে ‘হিন্দু’ নয় সেই বয়ান থেকে সরে আসা সম্ভব হয় না। কারণ আগেই ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যে নতুন প্রোথিত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি ‘মুসলমান’। এটাই যে কোন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ, গ্রহণের আজন্ম স্ববিরোধ।
    অবিভক্ত বৃটিশ ভারতে পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা সংঘাত ছিল ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটানো। কিন্তু বিশাল ভারতবর্ষের হাজারো বিরোধ সংঘাতের মধ্যে পূর্ববঙ্গ নিজের দাবিকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতার রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে হাজির করতে পারার মত রাজনৈতিক শক্তি তার ছিল না। একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৪৭ সালের আগের দেড়শ বছর ধরে চলা বৃটিশ ভূমি চিরস্থায়ী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রজা-কৃষক আন্দোলন। তিতুমীর, শরিয়তুল্লাহ বা ফরাজী আন্দোলনকে বাইরের আবরণ দেখে ভুলে এগুলোকে ধর্মীয় আন্দোলন বলে মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো মুলত বৃটিশ ভূমি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকের জমি পাওয়ার আন্দোলন সংগ্রাম। জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড় থেকে মুক্তির আন্দোলন। কিন্তু এগুলোর কোনটাই সফল হতে পারেনি। কারণ এগুলো সর্বভারতীয় বৃটিশ রাষ্ট্রক্ষমতার বিপরীতে কোন পালটা ক্ষমতা হতে পারেনি, বড়জোর স্থানীয় ঘটনা হিসাবে থেকে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯০০ সালের পরের ও ১৯৪৭ সালের আগে এই সময়কালে পূর্ববঙ্গের ভূমি ব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের বদলের আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে পালটা ক্ষমতা হয়ে উঠতে এবার সে রাজনৈতিক মৈত্রী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এই রাজনৈতিক মৈত্রী গড়া ভাল না খারাপ অথবা ভুল না শুদ্ধ হয়েছিল সে বিচারে নয়, ফ্যাক্টস হিসাবে কী ঘটেছিল সেদিক থেকে বললে, পূর্ববঙ্গে প্রথম এলায়েন্সটা গড়ে উঠেছিল ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের নিগড়ে আটকে থাকা প্রজা-কৃষক আর মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে; এরা কলকাতাকেন্দ্রিক ততদিনে গড়ে উঠা শহুরে প্রথম প্রজন্মের মুসলমান মধ্যবিত্ত। পড়াশুনা, সরকারী চাকরি, ওকালতি ইত্যাদি নানান পেশা—সবমিলিয়ে এক শহুরে মুসলিম মধ্যবিত্ত, মোটাদাগে সোহরাওয়ার্দী এদের নেতা বা বলা যায় এটাই সোহরাওয়ার্দীর কনষ্টিটিউয়েন্সী। এরপর পূর্ববঙ্গে প্রথম এই এলায়েন্সটার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের এলায়েন্স— এটাই পালটা ক্ষমতা, বৃটিশ রাজ আর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সক্ষম এক সংহত ক্ষমতা হয়ে উঠতে পেরেছিল। পূর্ববঙ্গের মুখ্য সমস্যা ভূমিবিরোধ একমাত্র এভাবেই অন্যেরা শুনতে বাধ্য করা যায় এমন শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছিল, পূর্ববঙ্গের একমাত্র গতি হয়ে উঠেছিল। মুসলীম লীগ নামের এই এলায়েন্সের ভিত্তি একটাই –তাদের সবার শত্রু কমন, অবশিষ্ট ভারতের রাজনৈতিক শক্তি; আর ঐ এলায়েন্সের দাবি হলো মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে তাদের আলাদা রাষ্ট্র হতে হবে। অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ নিজের মূল দাবি জমিদার-প্রজা বিরোধের সমাধান শেষে, মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের মধ্যে খুঁজে নেবার একটা রাস্তা পেল। কিন্তু এতে নতুন অনুসঙ্গ, সেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় ভিত্তি হয়ে উঠল ‘মুসলমান’।
    ওদিকে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ মানে আসলে কী? নতুন পরিচয়ের মানে খুঁজতে গিয়ে তা শেষে গিয়ে দাঁড়াল পাকিস্তান রাষ্ট্রকে “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র হতে হবে—এই পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এখন পুর্ববঙ্গের দিক থেকে দেখলে তার প্রধান বিরোধ যার সে সমাধান খুজছিল তা ছিল ভূমিব্যবস্থার সমাধান; কিন্তু কাম্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে তা শেষে হয়ে দাঁড়াল “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। বুঝাই যাচ্ছে মূল জায়গা থেকে সরে যাওয়া এ এক লম্বা জার্নি; ছিল ভূমিবিরোধ সমাধান দাবি, কিন্তু শেষে তা হয়ে দাঁড়ালো ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয়ে এক “ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক” রাষ্ট্র। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে গিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রুর পরিচয় দেয়া হয়ে গেছে হিন্দু। এটাই রাজনৈতিক পরিচয় খাড়া করতে যাওয়ার স্ববিরোধ ও বিপদ। কারণ দেশভাগ হয়ে যাবার পর, যখন বাস্তবে ভূমিব্যবস্থা বা জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান ঘটে গিয়েছে এরপর হিন্দুরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রু একথা বলবার আর কোন মানে হয় না, ভিত্তি থাকে না।
    শুধু তাই না, ভূমি বিরোধ অবসানের পর নতুন বিরোধ নতুন রাষ্ট্রে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে তা মুখ্য হয়ে উঠেছিল। সেসবের খবর যারাই করতে গিয়েছিল এমন পূর্ববঙ্গের প্রতিটা প্রশ্নকে নতুন “পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সংহত” করার নামে তা “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা বিরোধী” বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হতে লাগল। আরও একটু আগ বাড়িয়ে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলা হতে লাগল।
    ‘মুসলমান’—এই রাজনৈতিক পরিচয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়েও আর এক বড় বিপদ ঢেকে আনে। বিপদটা হলো দেশভাগ ঘটে যারার পরেও শত্রুকে দেখানো, চেনানোর সমস্যা। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে জমিদারী প্রথা বিলোপ ও প্রজাসত্ব আইন পাশ হয়ে যাবার পর ভূমিব্যবস্থায় বাস্তব শত্রু জমিদার বা সেই অর্থে ‘হিন্দু’ হাজির নয়। ফলে এই নতুন বাস্তবতায় শত্রুকে আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে দেখানো চেনানো বাস্তবে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জমিদারী উচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল জমিদারকে কোন ক্ষতিপূরণ দেবার মত আপোষমূলক ছাড় না দিয়ে; ফলে ‘জমিদার-প্রজা’ ধরণের কোন পুরানো উৎপাদন সম্পর্কের জের ওখানে থাকেনি, সমুলে উৎখাত হয়ে গিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান বলে নির্মম নৃশংস দাঙ্গা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এর তলে তলে পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে গিয়েছিল অথচ মালিকানায় রদবদল অর্থে কোন ধরণের সামাজিক ঝাকুনি এতে তৈরি হয়নি। যেন কেউ টেরই পায়নি। এতে মজার এক ব্যাপার ঘটে। কোন সামাজিক ঝাকুনি তৈরি না করে, পূর্ববঙ্গের ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটে যাবার ঘটনা ঘটেছিল অথচ সবার মনে ছাপ ফেলেছিল, ঝাকুনি দিয়েছিল হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আর ভূমিমালিকানা ব্যবস্থায় এত বড় ওলটপালট ঘটনার সুফল সবাই ভোগ করেছে। ওদিকে এই অবস্থায় নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র ততদিনে অদৃশ্য ‘হিন্দু’ শত্রুর ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্র সংহত করতে চাইছে, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববঙ্গের সম্পর্ক কী হবে সেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুললে তাকে “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা” মানে ‘ইসলাম’ বা “ইসলামী চেতনার” বিরোধীও বলে টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছে। একইভাবে আমরা যদি পরবর্তীকালের ভাষাভিত্তিক বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, এই ‘পরিচয়ের রাজনীতি (politics of identity) বিচার করতে বসি তবে আগের ‘মুসলমান’ ‘পরিচয়ের রাজনীতি’র সাথে এর অবাক করা মিল খুঁজে পাব।
    পাকিস্তান থেকে আমরা আলাদা নিজের রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছি ৪০ বছর হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন আমাদের উন্মেষ, বিকাশ, চিন্তাভাবনা চর্চার, সিদ্ধান্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা– একথা বলবার কোন মানে হয় না। কিন্তু ‘পাকিস্তান’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র করেছি। ঠিক যেমন ‘হিন্দু’ আমাদের শত্রু –একথার বিপরীতে পাকিস্তান নামে রাষ্ট্র হয়েছিল।
    পাকিস্তানের প্রেক্ষিতে, পূর্ববঙ্গের দিক থেকে মূলত জমিদার-প্রজা সম্পর্কের অবসান চাইতে গিয়ে রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা, ঘটনাপ্রভাবে ‘হিন্দু’ শত্রুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হয়ত গ্রহণযোগ্য মনে করা যেতে পারে। কিন্তু এর মানে যদি হয় হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠা? ‘মুসলমান’ এই রাজনৈতিক পরিচয় ধারণ করা তাল সামলাতে না পেরে আগ বাড়িয়ে যদি হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে যায়? তবে এটাকে রেসিজম বলে। যে কোন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণের সাথে সহজাতভাবে তবে লুকিয়ে হাজির থাকে রেসিজম। এটাই ‘পরিচয়ের রাজনীতির (politics of identity)ভয়াবহ দিক। মুসলমান পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘হিন্দু’কে শত্রু ঠাউরে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে তার নিজের হিন্দুবিদ্বেষী বা হিন্দু-রেসিষ্ট (রেসিষ্ট হিন্দু নয়) হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া এড়ানো খুবই কঠিন। আর ঘটলে তা হবে ভয়াবহ। একইভাবে ‘পাকিস্তানী’কে শত্রু ঠাউরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে গিয়ে তার পাকিস্তানীবিদ্বেষী বা পাঞ্জাবীবিদ্বেষী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এর উপর কেউ যদি পাকিস্তান ও ইসলাম – শব্দ দুটোকে মনে মনে সমার্থক জ্ঞান করে তাহলে সে ইসলামবিদ্বেষী হবে সন্দেহ নাই।
    রাজনৈতিক বা আকাদেমিক দুনিয়া রেসিজম (Racism) কথাটার সাথে আমাদের পরিচয়, সচেতনতার খুব বেশি দিন আগের নয়। সাউথ আফ্রিকার শাসকের সাদা-কালো বর্ণবাদের বিরোধিতা অথবা একালের পুর্ব-ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গোত্র বা নৃজাতি (Race)দের মধ্যে পরস্পরকে খতম বা নির্মূল অভিযানমুলক সংঘাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন ইত্যাদি এগুলোর চিহ্ন। কিন্তু আমাদের চিন্তার মধ্যে রেসিজমের ব্যাধি এমনই অদ্ভুত যে বহনকারী গর্বের সাথে সে কথা বলে এবং সে কোনদিন খেয়াল করেই দেখেনি যে ঐ বক্তব্য রেসিজমের ব্যাধিতে ভরপুর। মানুষকে যত ধরণের পরিচয়ে বিভক্ত করে হাজির করা সম্ভব বা বলা চলে মানুষে মানুষে যত ধরণের বিভক্তিমূলক চিহ্ন আবিস্কার করা সম্ভব যেমন, গায়ের রং, শরীরের গড়ন (বেটে-লম্বা, নাক খাড়া-বোচা ইত্যাদি), সমতল-পাহাড়ী বা কোস্টাল, ধর্ম, গোত্র, বংশ, প্রাচ্য-পশ্চিম, নারী-পুরুষ ইত্যাদি। এসব বিভক্তি চিহ্ন মানুষের মধ্যে হাজির আছে। এসব বিভক্তি টের পাওয়া সচেতন হওয়া কোন সমস্যা নয়। এবং সম্ভবত এই বিভক্তি চিহ্নকে ভিত্তি করেই রাজনৈতিক পরিচয় গঠন, নির্মাণ ঘটে থাকে, আমরা এড়াতে পারি না। কিন্তু এই বিভক্তি চিহ্নের ভিত্তিতে একটাকে অন্যটার বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ গণ্য করা, হেয় গণ্য করা, খাটো বা নিচু করে দেখানো, উচু-নিচু ধারণা তৈরি করে বিদ্বেষী হয়ে যাওয়া রেসিজমের ব্যাধি, রেসিস্ট মন তৈরি করা।
    জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকে তৈরি হয়, সেই দ্বন্দ্বে লড়াই সংগ্রাম চলে, চলতেই থাকে। সে লড়াইয়ে স্বার্থে শত্রু-মিত্র সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেজন্য রেসিজম তৈরি করা, ওর মর্ম অপর জাতবিদ্বেষী হয়ে পড়া জরুরী নয়।
    কিন্তু জরুরী না হলেও রেসিজম, বিদ্বেষই ঘটতে দেখি আমরা। পাকিস্তান রাষ্ট্র হিন্দু রেসিজমে ভুগেছিল। ঠিক একইভাগে বাঙালি জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিজমে ভুগছে। পাকিস্তানের বেলায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পর সে হিন্দুবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল। কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেতনা”, ‘“ইসলামী চেতনা’র” বিরোধী বলে ট্যাগ লাগিয়ে দমন নিপীড়ন, নিষিদ্ধ ঘোষণার পথে মোকাবিলা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের বেলায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের পাকিস্তানীবিদ্বেষী হতে বলছে। ‘পাকি’, ‘পাঞ্জাবী’, ‘সিন্ধী’ এসব শব্দে জাতিবিদ্বেষ ছড়িয়ে আমোদ জাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন নতুন চিন্তা, ঘটনাকে ভিন্নভাবে ভিন্ন কোণ থেকে দেখা, সমাজের নতুন কোন সমস্যা দ্বন্দ্ব সংঘাতের দিকে নজর কারা—সবকিছুকেই “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বিরোধী ট্যাগ লাগিয়ে দমনের পাকিস্তানের দেখানো রাস্তা বেছে নিচ্ছে।
    “পাকি’’ বা ‘পাকিস্তানী’ বলে জাতবিদ্বেষ জাগিয়ে তোলার যারা চেষ্টা করেন তাদের পক্ষে যে যুক্তি তাকে পরীক্ষা করলে পাওয়া যায় তার সার বয়ানটা হলো, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী রাষ্ট্র-সেনাবাহিনী নৃশংস অত্যাচার ধর্ষণ চালিয়েছে তাই আমাদেরকে পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী রেসিষ্ট হতে হবে। কেউ কেউ আবার নিজের মনের রেসিজমকে ঢাকতে শর্ত দিয়ে বলে, পাকিস্তান এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায় নাই। কাজেই পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী জায়েজ। পাকিস্তান কিভাবে নিজের গায়ের রক্ত কৃতকর্ম, পরিচয় সাফসুতরা করবে, দুনিয়ায় নিজেকে হাজির করবে সেটা একজন পাকিস্তানী ও পাকিস্তানী রাষ্ট্রের নিজস্ব গভীর সমস্যা। এই ইমেজ পরিচয় সঙ্কট পাকিস্তান নিজে না কাটানো দায়িত্ত্ববোধ না করা পর্যন্ত তাদের প্রতি সারা দুনিয়ার সাথে আমাদেরও খারাপ ধারণা থাকবেই, করুণা ছাড়া আর কীইবা করতে পারি। কিন্তু ওদের ইমেজ পরিচয়ে দাগ নিজস্ব সমস্যা সঙ্কট আছে বলে সেটাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে আমাদের নিজেকে কলঙ্কিত করব? বাঙালি জাতীয়তাবাদী মনের পাকিস্তান জাতবিদ্বেষী জায়েজ করার এই যুক্তিটা এমনই আজীব।
    এই বয়ানের ফাঁকির দিকটা হলো, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভূমিকা আমরা এখনো জ্বলজ্বলে স্মরণে রাখতে পারি, মাফ না করতে পারি কিন্তু এই সুযোগে আমাদের জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা ন্যায্য হয়ে যায় না। এমনকি পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে যুদ্ধের ভয়াবহতা, বিভৎসতা দেখে কেউ যদি ট্রমাটাইজড হয়ে যান তখন বা এখন তবে সেই ট্রমার সাইকোপ্যাথিক চিকিৎসা করতে পারি। কিন্তু সেই ট্রমাকে মহৎ জ্ঞান করে মুকুট বানিয়ে আমরা নিজেদের স্বভাবে তা অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারি না, জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে যেতে পারি না। বিভৎসতা দেখে আমাদের ঘৃণা জাগতে পারে, ট্রমাটাইজডও হয়ে যেতে পারি—এতদূর পর্যন্ত একটা স্তর। কিন্তু তা থেকে এবার জাতিবিদ্বেষী রেসিস্ট হয়ে ওঠা এটা দ্বিতীয় ধাপ—এর দায় যে হয়ে ওঠে তাঁর। প্রথম স্তরের দায় পাকিস্তানের আর দ্বিতীয়টা আমাদের।  ঘটনাচক্রে কোন ধর্ষণের ঘটনায় নারীর ট্রমাটাইজড হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে নারী এ থেকে পুরুষবিদ্বেষীও হয়ে যেতে পারেন। সমাজের দিক থেকে এ ঘটনায় মনোভাব হয় ঘৃণা, নিন্দা ও ধর্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির। ধর্ষণের ঘটনার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ কারণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হলো, আমরা কেউ এজন্য সব নারীকে পুরুষবিদ্বেষী হয়ে উঠার জন্য তাগিদ দেই না। আবদারও করি না। করতে পারি না।
    পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় ‘মুসলমান’ বিকৃত হয়ে ঐ রাষ্ট্রকে হিন্দুবিদ্বেষী রেসিস্ট এই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনে গৃহীত রাজনৈতিক পরিচয় “বাঙালি” বাংলাদেশের অনেককে পাকিস্তানবিদ্বেষী রেসিস্ট জায়গায় নিয়ে গেছে।

    * লেখাটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বিডিনিউজ২৪ মতামত-বিশ্লেষণ বিভাগে ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১১ , সেই লিঙ্ক এখানে আবার কিছু এডিট করার করে এখানে ছাপানো হলো।