Tag: গৌতম দাস

  • এবারের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তামাশাগুলো

    এবারের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তামাশাগুলো
    গৌতম দাস
    ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫   বিকাল ৫ঃ ১৭
    https://wp.me/p1sCvy-6yb

     

    [এই লেখাটার পিছনে একটা দুঃখের কাহিনী আছে। সংক্ষেপে বললে, এলেখা দুদিন আগে আমার সাপ্তাহিক লেখা হিসাবে দৈনিক যুগান্তরে পেশ করা হয়েছিল, ছাপানোর জন্য। কিন্তু সম্পাদকীয় বিভাগ এটা সেদিন থেকে ছাপতে পারছিল না। অবশেষে আজ বিকালে আমাকে জানায় দিল তারা আর আমার লেখা ছাপতে পারবে না। না আমার এই লেখার বিষয় কী বা শিরোনাম কী ইত্যাদি সেটা কোন প্রশ্নই নয়। প্রশ্ন হল আমি নিজেই।  গৌতম দাসের কোন লেখা তারা ছাপতে পারবে না। অনুমানে যে ধারণা পেলাম কোন রাজনৈতিক দলের আপত্তি! মানে এরা ক্ষমতায় আসীন না হলেও হওয়ার আগেই তারা সেনসরশীপ বা মিডিয়া ডিকটেশন চালু করে দিয়েছে। অর্থাৎ হাসিনা ফিরে না আসলেও ইউনুস ক্ষমতায় থাকতে থাকতেই নয়া হাসিনারা একটিভ হয়ে গেছে! রক্তের ফোঁটা এখনও ঝড়ছেই এর আগেই পুরানা জমানা আসন ফেলে বসে গেছে। এনি ওয়ে। তাই সে লেখাটাই কোন কিছু না বদলিয়ে এখানে এখনই হুবহু ছাপিয়ে দিলাম। ]

     

     

    প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের কয়েকদিন ধরে জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলি বা সাধারণ পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে নির্ধারিতই থাকে।যেকোন আম-সদস্যরাষ্ট্র এখানে এসে ঐসময়েই একমাত্র বক্তব্য রাখতে ইচ্ছা প্রকাশ করলে তা করতে পারেন।
    এটা প্রতিবছর সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসের (দেখা যায় মাসের ২০ তারিখের) পরের মঙ্গলবারে চালু হয়ে থাকে। সাধারণ পরিষদ মানে যেখানে (১৯৩ মোট সদস্যরাষ্ট্রের যেকোন) সাধারণ সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি ঐ সময়েই কেবল উপস্থিতি হয়ে তার বক্তব্য রাখতে পারে। একটু সাথে বলে রাখা ভাল এটা সাধারণ পরিষদ হলেও অন্য এক জাতিসংঘ ফোরাম মানে – “সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের” পরিষদ এটা নয়। সেটা জাতিসংঘেরই আরেকটা ফোরাম / কমিটি আছে যার নাম ‘সিরিউরিটি কাউন্সিল’ বা নিরাপত্তা পরিষদ; যার মোট সদস্য ১৫। এর মধ্যে আবার পাঁচটা স্থায়ী বা ভেটোক্ষমতা-ওয়ালা রাষ্ট্র আর বাকি দশটা ভৌগলিক বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঐ অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্রের সমর্থনে নির্বাচিত প্রতিনিধি এমন সদস্যরাষ্ট্র, যারা রোটেশনে একেক সময়ে একেকটা রাষ্ট্র সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসে। আর ওদের আয়ু থাকে সুনির্দিষ্ট দুই বছর। আর এই নিরাপত্তা পরিষদে দুইটা বৈশিষ্ট মেনে চলতে হয়। এক মোট নয় সদস্য একদিকে হলেই সেই সিদ্ধান্ত বলে গৃহিত হয়েছে ধরা হয়। আর দুই. সেটা হল আরেক সাধারণ বৈশিষ্ট যে, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোক্ষমতার কোন একটা সদস্য যদি ‘না’ করে দেয় তো সেই প্রস্তাব আর আলোচনাই হবে না; সিদ্ধান্ত তো অনেক দুরের কথা। জাতিসংঘের যেকোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক বডি হল এই নিরাপত্তা কাউন্সিল; যার উপর কথা নাই। আজকের মূল প্রসঙ্গ সাধারণ পরিষদ কিন্তু আমি সাথে তুলনার জন্য ‘নিরাপত্তা কাউন্সিল’ এর কথাটাও জানায় রাখলাম।
    আমাদের প্রধান নির্বাহি ডঃ ইউনুস এবার ২১ সেপ্টেম্বর রাতেই ঢাকা ছেড়েছিলেন সে এক বড় লটবহর নিয়ে যা প্রায় হাসিনার মতই। তফাত খালি তিনি ব্যক্তিগত ঘোড়ায় মানে ‘বাংলাদেশ বিমানে’ চড়ে যান নাই যে বাসায় ঢুকার আগে বাইরের দরজায় ঐ সাত / দশদিন খামোখা ঘোড়াটা বেধে রাখবেন। বাণিজ্যিক বিমানেই গিয়েছেন। যদিও তিনি বাংলাদেশ বিমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে গিয়ে আর কেবল ঘোড়া দরজায় অচল বসিয়ে না রাখলেই হত – এমন করতে পারতেন।
    এছাড়া এবারের সফরসঙ্গির সংখ্যা দৃষ্টকটু আর হাসিনার মত বাহুল্যই মনে হয়েছে। এনিয়ে কথাও শুরু হয়েছে। টিআইবি নামের এনজিও যারা নিজেকে সততার মূল দোকান মনে করে তারা সফরসঙ্গি ১০০ এর কাছাকাছি হওয়াতে সমালোচনা করেছে। যদিও অপরজন দাবি করছেন সংখ্যাটা ৬২ আর সেটাও গত বছরের সংখ্যা ৫৭ – মানে এর চেয়েও বেশি।  এবার ইউনুসের উপদেষ্টা বা সমতুল্য প্রধান সহকারিরা মিলিয়ে প্রায় দশজন সাথে গিয়েছেন।
    এককথায় বললে বাংলাদেশ সরকারের কাজেকর্মে হাসিনা যেসব কুঅভ্যাসে যেসব ভাইস বা পাপের জীবানু ঢুকিয়ে বা চালু করে দিয়ে গেছেন সেটা মন্ত্রণালয়ের ঘুষ থেকে শুরু করে সবকিছুতেই – এর কিছুই পরবর্তি একালে সহজে আমাদের পিছু ছাড়ছে না। বরং সেটাই “মডেল” হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে।

    এদিকে গতকাল ছিল ইউনুসের বক্তব্য রাখার পালা। সেখানে “ত্রি-জিরো” টাইপের উদ্বুদ্ধকরণ প্যাচাল বা মিথ্যা উত্তেজনা তৈরি এবার কমই ছিল বলা যায়। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে কচলানি, হাতিঘোড়া মারার কথা এবার দূরে থাক দেশে রোহিঙ্গা পালবার যে খরচ এর কিছুই তিনি এখনও জোগাড় করতে সক্ষম হন নাই; স্বভাবতই।
    ইউনুস-খলিল এর বিশেষত মহামান্য খলিল সারাজীবন ইউএন কম্পাউডে চক্কর কাটা লোক হলেও আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ঘোষিত পলিসিও স্টাডি করার যোগ্যতা তাঁর নাই; তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি এব্যাপারে খামোখা! এরই শোচনীয় পরাজয় আমরা দাড়ায় দাড়ায় দেখেই চলছি। তাদের কাছে আমেরিকা মানে যেন একই আমেরিকা যেটা সেই ১৯৪৫ সাল থেকে চলে আসে আমেরিকা।  আর তাতে আমেরিকা কী খেতে বা খাবলা দিতে ভালবাসে সে অনুযায়ী মন যুগিয়ে বা যোগাড় করে দেওয়াটাই প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের চোখে পড়া আর ইউনুস-খলিলদের কেউকেটা হওয়ার সহজ পথ!
    একাজটা যে অনেক সহজেই করা সম্ভব যদি তারা হবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারণার সময় থেকেই যেসব মৌলিক পলিসি বা গাইডলাইন তাঁরা হাজির করেন সেটা স্টাডি করার; আর এটাই সঠিক এক একাদেমিক / প্রফেশনাল এপ্রোচ সেটা ইউনুস বা খলিল কখনও বুঝেছেন তা মনে হয় না। তাদের লাইন হল তারা থিঙ্কট্যাংক, প্রভা্ব ফেলা কর্তকর্তা আর লবির খাতিরদারির জগতেই লেপ্টে থাকতে চান। এর বাইরে প্রেসিডেন্টের পলিসি বুঝবার যে আসল পথ আছে তা কখনও তারা আমল করেছেন মনে হয় না।
    যেমন, ইউনুস-খলিল মনে করেছেন আমেরিকাকে বার্মা-আরাকান দখল করিয়ে দিয়ে তারা আমেরিকার কাছে বিশাল কুতুব-প্রিয়পাত্র হবেন সহজেই! অথচ তাদের যে পলিসি স্টাডিরই মুরোদ নাই তা এখনও টের পেয়েছেন মনে হয় নাই। তারা স্বপ্ন দেখেছেন রোহিঙ্গাদেরকে পরবর্তি ঈদের আগেই তারা ফেরত পাঠিয়ে যার যার বাড়িতে তারা বাবা-মায়ের করব জিয়ারত করার সুযোগ করে দিয়ে পারবেন।
    অথচ কেউ ট্রাম্পের পলিসি স্টাডি দূরে থাকে সেটা খুলেই দেখেন নাই।

    সবাই কান খুলে শুনে রাখতে পারেনঃ ট্রাম্পের প্রকাশিত মৌলিক পলিসি হল তিনি নিজ রাষ্ট্র পরিচালনার খরচ জবরদস্তিতে হলেও কমাবেনই। এরই অংশ হিসাবে তিনি ইউএসএইড যে সরকারী সংস্থা দিয়ে সরকার লিল্লাহে-দান খয়রাত করে সেই সংস্থা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন। শুরুতেই একবারে বন্ধ করেছেন ‘রিভিউ’ এর নামে। পরবর্তিতে কোন এনজিওকে আগের মত আর দান-খয়রাত ফিরে চালু করেছেন জানা যায় না।
    আর এরই সোজা প্রভাব হল, রোহিঙ্গাদের এখন ফেরত পাঠানো দূরে থাক, তাদেরকে বাংলাদেশ বছরে খাওয়াবার যে বাজেট সেটাই এখন মাত্র ৩৫% আদায় বা প্রতিশ্রুতি যোগাড় করতে পেরেছেন ইউনুস-খলিল!!! আর বাকি অর্থ? ট্রাম্প আর অর্থ দিবেন না জানিয়েছেন। মানে বছরের বাকি দিন কী রোহিঙ্গারা না খেয়ে কাটাবেন? হা বাস্তবতা প্রায় তাই! উলটা এখানে বিশ্বব্যাংক খুবই সদয়(?)! তারা এই লিল্লাহ মহা পুর্ণীর কাজে বাংলাদেশকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করে দিয়েছে ঝড়ের গতিতে। এখন বাংলাদেশের জনগন নিজে না খেতে পেলেও রোহিঙ্গাদেরকেই বসে বসে খাওয়াবে! কী মজা না? আমরা কত মহান জাতি!!!!

    আমেরিকান দালাল হতেও যে কিছু পড়াশুনা লাগে; সেকাজে ব্যর্থ হওয়া পড়াশুনা না করা ইউনুস-খলিল এর পাল্লায় পরে আজ আমাদের এই দশা! ট্রাম্পের আমেরিকা ইউনুস-খলিলের দালালিতে আরাকান করিডোর, বার্মার “রেয়ার আর্থ মিনারেল” দখল, চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বার্মা দখল রুস্তমি ইত্যাদিতে অন্তত ট্রাম্পের আমেরিকার কোন আগ্রহই নাই! সেটা বেচারা ইউনুস-খলিল দেখতেই পান নাই! উলটা এখন রোহিঙ্গা পালার ৪০০ মিলিয়ন ঋণ দায় বাংলাদেশের আম-জনগণের উপরে! সেটা  ইউনুস-খলিলের এক বিরাট সাকসেস তা মানতেই হবে!  ইউনুস    এর পরেও গতকালের বক্তব্যে ক্ষীণভাবে রোহিঙ্গা ইস্যু এনেছেন এমনকি এবারও রোহিঙ্গা নিয়ে এক গ্লোবাল নেতা সমাবেশ ডেকেছেন জাতিসংঘেই!

    কিন্তু, কিন্তু কিন্তু – কী হবে তাতে????
    দুনিয়ার অবস্থা ট্রাম্পের পাগলামির এই কালে কী তা এবারের জাতিসংঘে খোলে-আম প্রকাশিত! ট্রাম্পের ভয়ে সারা ইউরোপই চুপ! মুখে তালা! ইউক্রেন যুদ্ধ থামা দূরে থাক আবার আরো জোরে শুরু করার দিকে! কে কার কথা শুনে? ধনি-গরীব সব রাষ্ট্রই আগে নিজে বাঁচলে বাপের নাম  – অবস্থায়! এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ফেরতের আলোচনা দূরে থাক; রোহিঙ্গাদের বাতসরিক খাওয়া খরচ নিয়েই কোন কমিটমেন্ট করতে ইউরোপ আগ্রহি নয়!
    এই অবস্থায় ইউনুস-খলিলের গো-ধরেছে যে আরেকবার এটা তৃতীয়বার তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে নেতাদের আবার ঢাকবেন, সরকারী অর্থ সময় ব্যয় করবেন। যারা পড়াশুনা করে না; ট্রাম্পের ঘোষিত পলিসি স্টাডি করতে জানে না, নিজ মুরোদ যোগ্যতার খবর নাই কেবল চোখভরা চকচকে লোভ আছে দালালির – আমেরিকান দালাল হবে, কী করে বাংলাদেশকে আরো ভালভাবে আমেরিকার হাতে তুলে দিবে – এদের পরিণতি তো এমনই হবে!!!

    এবার আসি ট্রাম্পের বক্তৃতায়ঃ
    এককথায় বললে এবার ট্রাম্পের ক্ষমতার বা তার পলিসির সার কথাটা হল – রিভার্স মানে উলটা দিকে হাটা। মানে?
    স্টাডি করলে দেখা যাবে পুরা দুই বিশ্বযুদ্ধ জুড়ে আমেরিকান পলিসি ছিল ঠিক কী করলে গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা যায়। আরেকটু ভিতরে গিয়ে বললে – কী করলে আমেরিকার বিপুল সঞ্চিত সারপ্লাস বিনিয়োগ পুঁজি হিসাবে আমাদের মত দেশকে এর গ্রাহক / ক্রেতা বানানো যায়। কিন্তু সেকালে যার সামনে প্রধান বাধা ছিল সারা ইউরোপের মূলত পাঁচ দেশ  যারা সারাদুনিয়াকে কলোনিদখল করে অর্থনৈতিকভাবে স্থবির করে রেখেছে। কারণ কলোনিদখলের লক্ষ্য কেবল আমাদের মত দেশ থেকে বাড়তি সম্পদ যা আমাদের অর্থনীতি জমা কর যাচ্ছিল সেই বাড়তিমূল্য-সারপ্লাস সমূলে নিজ নিজ মাস্টার দেশে পাচার করা; এরই মহোতসব। আর ততই আমাদের মত দেশ স্থবির – অর্থনৈতিক ততপরতা কমে আসছে।
    এককথায় এই পরিস্থিতিটাই ছিল আমেরিকার গ্লোবাল নেতা হবার খায়েস বাস্তবায়নের সঠিক সময়! আমেরিকা  আমাদের মত দেশ কলোনিমুক্ত স্বাধীন করে আমাদেরকে নিজ বিনিয়োগ-পুঁজির ক্রেতা বানাবে – এমনই এক নীতিতে কিন্তু আমেরিকান নেতৃত্ব-প্রভাবের গ্লোবাল ইকোনমিরীক নয়া দুনিয়ার রূপ দেওয়া ছিল আমেরিকান নীতি।  যা ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ সকলেই হেরে বা অধীনস্ত গেলে পরে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে আসন নিয়েছিল – সেই সাথে দুনিয়া থেকে যুদ্ধ যত কমানো যায় (কারণ যেকোন যুদ্ধ মানেই পুঁজি নষ্ট বা ধ্বংস) এই লক্ষ্যে একটা জাতিসংঘ বানিয়েছিল আমেরিকাস্ন উদ্যোগে যাতে গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইন্সটিটিউট বলে প্রতিষ্ঠান একটা শুরু করা যায়।
    ফলে স্বভাবতই গ্লোবাল যত দানখয়রাত এর দায়ও একা আমেরিকাকেই নিতে হয়। এর এমনই মাত্র একটা প্রতিষ্ঠান হল জাতিসংঘের অধীনে বিশ্বখাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফও)। লিল্লাহ না খেয়ে থাকা মানুষকে গম বা খাদ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে। আমরাও এই ডব্লিউএফও এর গম খেয়েই শেখের আমলে বেঁচে ছিলাম!

    কিন্তু ট্রাম্পই প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যিনি বলছেন তিনি আর দান-দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালাবার দায় নিবেন না। কথাটা অন্যভাষায় বললে, আমেরিকা আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সবকিছুতে নেতা থাকতেই চাইছে না। সেটা ট্রাম্প কতটা কী বুঝে বলছেন তা নিয়্যে সন্দেহ থাকলেই ট্রাম্পের সারকথা – আমেরিকা রাষ্ট্রের খরচ কমাতেই হবে। এটা ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা গ্লোবাল বাজার থেকে ইতোমধ্যে নিজ মাথায় নিয়ে ফেলেছে। সাথে গ্লোবাল বাজারে থেকে নয়া ঋণ (সরকারী বন্ড বিক্রি করা) নেয়ার ব্যবস্থাতেও বন্ডের চাহিদা বা কেনার গ্রাহক মারাত্মক কমে গেছে।
    মানে হল, যেটা পড়তি গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা আমেরিকা আর উঠতি চীনের পালাবদল কীভাবে ঘটবে তা নিয়ে দুনিয়াতে প্রবল আগ্রহ জন্মে আছে সেখানে আমরা সকলে দেখছি ট্রাম্প আগেই রণেভঙ্গ দিয়ে আমেরিকাকে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছে। না তিনি ঠিক নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান তা মনে করেন না। তার কথা হল, তিনি রাষ্ট্রীয় খরচ কমাতে চাচ্ছেন তাতে এর অন্য যা যা অর্থ যাই হোক! কিন্তু আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে ট্রাম্পের এই নীতি-পলিসি গ্লোবাল নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন যেটা এমনিতেই চীনা নেতৃত্বে আসন্ন সেটাকেই আরো ত্বরান্বিত করে ফেলবে। এছাড়া, সবচেয়ে বড় ফাঁদে পড়ে গেছে খোদ ইইউ যারা এখন একেবারেই দুনিয়াতে প্রভাব রাখার মত কোন নেতা এমন “কেউ না” হয়ে গেছে, আরো যাবে? তারা এখন কীভাবে স্ব স্ব রাষ্ট্রকেই টিকাবে (সারা ইইউ নয়) সেদিকে হাটছে। তাই কোন গ্লোবাল দায় দায়ীত্ব নিতে একেবারেই আগ্রহি নয়।

    একারণেই ট্রাম্প যেন নিজেই নিজেকে এক ‘গাধা’ বলে প্রচার শুরু করেছে। যেমন জাতিসংঘ বক্তৃতা দিবার সময় লিমিট ১৫মি. অথচ তিনি এক ঘন্টা নিয়েছেন। এটা পশ্চিমা কালচারে এক আনকুথ স্বভাবের প্রকাশ! এর উপর আবার গত কয়েক মাস ক্ষমতায় থেকে আমেরিকার কী কী উন্নতি তিনি করেছে এর ফিরিস্তি দিতে এসেছেন জাতিসংঘের বক্তৃতায়! এটাকেই বলে আক্কেল জ্ঞানহীনতা!
    সবচেয়ে বড় কথা তিনি যে আমেরিকান ইতিহাস বিশেষ করে ১৯১৪ সালের পর থেকে গ্লোবাল পরিবর্তনে আমেরিকান ভুমিকার ইতিহাস সহ ইউএন এর জন্ম ইতিহাস একেবারেই পড়েন নাই তা তার প্রতিটা কথায় প্রকাশিত!
    ফলে একালে এসে আজ – এই দেশ তো কাল সেই দেশ – দখল করে নিবেন বলে ট্রাম্প হুমকি দেয়া শুরু করেছেন। মনে হয় না তিনি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নাম শুনেছেন। জাতিসংঘ জন্ম ঘোষণার প্রথম অনুচ্ছেদটাই হল কেউ (চুক্তিতে স্বাক্ষারকারি যেকেউ) ‘নিজ নিজ দেশের ভুখন্ড বাড়িয়ে নেয়া্র খায়েস অবশ্যই ত্যাগ করবে”।  অথচ দেখেন ট্রাম্প আফগান বাগমার এয়ারপোর্ট প্রকাশ্যে দখলের খায়েশ ব্যক্ত করছেন!

    এবারের সাধারণ পরিষদ তাই যেন এক তামাসার হাট!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    লেখা হয়েছিলঃ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

     

  • সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তির কী ক্রমশঃ ‘মুসলিম ন্যাটো’ জোট হয়ে উঠতে পারবে

    সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তির কী ক্রমশঃ মুসলিম ন্যাটো জোট হয়ে উঠতে পারবে
    গৌতম দাস
    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫   ভোর রাত ০২ঃ ৩৭
    https://wp.me/p1sCvy-6xS

     

     

    সৌদি-পাকিস্তান চুক্তি:

     

    গ্লোবাল প্রভাব ফেলতে পারে এমন এক সামরিক চুক্তিতে সই করেছে সৌদি আরব ও পাকিস্তান গত বুধবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫।  ইতোমধ্যেই তাতেই দুনিয়াজুড়ে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক স্বার্থের দেশগুলোতে ও আমাদের এ অঞ্চলেও ব্যাপক হইচই পড়ে গেছে। অনেক পশ্চিমা মিডিয়া একে পৃথিবীর ভূমিগঠন কাঠামোতে কয়েকটা ইট খুলে নেওয়ার মতো ‘টেকটনিক’  [Tectonic] পদক্ষেপ বলেছে।

    কী সেই চুক্তিঃ
    আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ যা ইংরাজিতে ‘স্ট্রাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ [Strategic Mutual Defense Agreement (SMDA)]। এখানে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ [Mutual defence] শব্দগুলো সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এককথায় এর অর্থ হচ্ছে, কোনো শত্রুর দ্বারা চুক্তির এক রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটা অপর রাষ্ট্র নিজের ওপর আক্রমণ বলে মনে করবে, আর নিজ বন্ধুকে রক্ষায় মোকাবিলায় এগিয়ে সক্রিয় পদক্ষেপ নেবে; দুই. এতে দুই বন্ধুর শত্রুর বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়বে।

    ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ শব্দটার অর্থ খুবই গভীর। আর তা হওয়ার পেছনে বা এই আইডিয়ার উপরই দাঁড়িয়ে জন্ম নিয়েছিল ও আছে  সেই ১৯৪৯ সালে জন্লম নেয়া থেকে ন্যাটো (নর্থ আটল্যান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন NATO)। ন্যাটোর জন্ম দলিলের বিখ্যাত হল  ‘অনুচ্ছেদ পাঁচ’। এটা লেখা হয়েছে উপরে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ ধারণার আলোকে। দুনিয়াতে সেটাই প্রথম মিউচুয়াল ডিফেন্স ধারণার ব্যবহার। বইয়ের ভাষায় একে ‘কালেকটিভ ডিফেন্স প্রিন্সিপালও’ বলা হয়ে থাকে। মোট ৩২ সদস্যের ন্যাটোর কোনো এক সদস্য ন্যাটোর বাইরের কোন দেশ দ্বারা আক্রান্ত হলে এর বিরুদ্ধে ন্যাটো-সদস্যরা সবাই একসঙ্গে প্রতিরোধে নেমে পড়তে বাধ্য।

    এ কারণে অনেকেই সৌদি আরব-পাকিস্তানের এই চুক্তিকে মুসলিম ন্যাটো চুক্তির দিকে এটা যাবে এই প্রেরণা থেকে  উচ্ছ্বসিত হচ্ছে; আর ততই এটা ভারতের জন্য হচ্ছে হতাশার। কারণ সৌদির সঙ্গে অপর দেশটা হল পাকিস্তান,  আবার যে পারমাণবিক শক্তিধর! আর পাকিস্তানের অপর পার্টনার সৌদি আরব বলে এর অর্থ হল, সামরিক প্রস্তুতিতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ আর বড় কোনো বাধা নয়। এই নিয়ে ইংলিশ বিবিসির শিরোনাম হল, ইন্ডিয়ার কাপাকাপি শুরু হয়ে গিয়েছে [Why the Pakistan-Saudi Arabia defence pact is unsettling India]।  আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কংগ্রেস এটা মোদির ফরেন পলিসির পরাজয় বলে চারদিকে বিবৃতির হৈ চৈ তুলেছে [পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নরেন্দ্র মোদির ব্যর্থতা দেখছে কংগ্রেস]।
    আর সেই সঙ্গে এখন ক্রমশ জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে যে এই চুক্তিতে শামিল হতে চাইবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য বাদশাহশাসিত দেশের ‘জিসিসি [GCC] জোটে’র ছয় দেশ (সৌদি ছাড়াও বাকি পাঁচ দেশ-ইউএই আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহারাইন ও ওমান)। সেই জল্পনাকে আরো উস্কে দিয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী – তিনি বলেছেন সৌদিদের সাথে চুক্তি করে আমরা তো অন্যদের জন্য দরজা বন্ধ করে দেই নাই। DOOR NOT CLOSED শিরোনামে পাকিস্তানী ডন পত্রিকা সেকথাই লিখেছে। আমেরিকান পয়সায় স্থানীয় থিঙ্কট্যাংক এনজিও চালায় এমন ইন্ডিয়ান ব্রহ্ম চেলানী খুবই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন – সৌদিরা জানত এই চুক্তিকে ইন্ডিয়া নিজের জন্য এক সিকিউরিটি থ্রেট হিসাবে দেখবে / নিবে এরপরেও তারা এদিকে এগিয়েছে” –

    “Riyadh knew India would construe the Saudi-Pakistan pact as a direct threat to its security, yet it went ahead,”
    Brahma Chellaney, an Indian strategist, posted on X. –  BBC

    অনেকে অবশ্য আরেক সম্ভাবনার দিকটা দেখে বলতে শুরু করেছেন যে, এটা হয়তো ইরানকে একঘরে করার সৌদির পরিকল্পনা। না, এটা একেবারেই ভুল ব্যাখ্যা হবে। এটা কার্যত মুসলিম দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে দুর্বলতাগুলোকে বড় করে দেখিয়ে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে জেনে না জেনে, মুসলমান ফেরকার কথা তুলে নাকচ বা খামোশ করার এক বৃথা চেষ্টা হবে।

    তাহলে এমন দুর্বলের বদলে সবল দিকটা কীঃ
    সারা দুনিয়ায়  এর নানা ভৌগোলিক অঞ্চলের আন্তঃরাষ্ট্রীয় নানা রাষ্ট্রস্বার্থ দ্বন্দ্ব থাকে, থাকবেই। কিন্তু এসবের বাইরেও তবু সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেখা যাবে আবার একটাই ‘প্রধান দ্বন্দ্ব’ থাকবে! যেমন, এখনকার দুনিয়ায় সেই প্রধান দ্বন্দ্বটা হল ‘চীন-আমেরিকার স্বার্থদ্বন্দ্বের বিরোধ’! এগুলো মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব – মূল কারণ এক পালাবদল মানে একালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদলের কাল এটা। যদিও ক্রমশই এটা সামরিক, কৌশলগত, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি এবং সর্বোপরি এক নয়া বয়ান হয়ে সব ফ্রন্টেরও দ্বন্দ্ব হয়ে ক্রমশই ছড়িয়ে পড়বে।

    আর আমরাও বাকি সব রাষ্ট্রই ক্রমশ এই চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বে নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের আগ্রহে বা বিচারে এ দুই রাষ্ট্রের কোনো একটার স্পষ্ট পক্ষভুক্ত হতে থাকব। অনেকে ইতোমধ্যেই হয়ে গেছি বা আছি। যদিও দ্বন্দ্ব-বিকাশিত হওয়ার বর্তমান স্তরে বা পর্যায়ে পরিষ্কার করে আমাদের-হয় আমেরিকা না হয় চীনের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়া – এমনটা এখনই দেখা নাও যেতে পারে। এখন হয়তো দেখা যাবে, একটা রাষ্ট্র এখনই ৫০-৮০ শতাংশ যদি চীনের পক্ষভুক্ত হয়ে গিয়েও তবু পাশাপাশি সে রাষ্ট্র আবার আমেরিকার সঙ্গেও অবশিষ্ট মাত্রার ঘনিষ্ঠতা রাখছে। যেমন পাকিস্তান। পাকিস্তানে চীনা বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই ২০ বিলিয়ন ঢুকে পড়েছে, আর তা আগাচ্ছে পাইপলাইনে থাকা বাকি অংশের দিকে সবমিলিয়ে তা ৫০ বিলিয়নের আশপাশে যাওয়ার লক্ষ্যে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিশেষ মজার ব্যাপারটা হল এই বিনিয়োগের বেনিফিট ব্যবহারকারী আবার খোদ চীন (একা পাকিস্তান না) নিজেও – আর সেটাই গোয়াদর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে (যা শুধু একটা গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প নয়)। আসলে এটা সাড়ে তিনদিক ল্যান্ডলকড চীন যার আবার পশ্চিমদিক একেবারে সুউচ্চ (হিমালয়) পর্বতমালা দিয়ে ব্লকড। তবু এই পশ্চিম দিকটা দিয়েই পাকিস্তানের সারা বুক চিরে এখন সমুদ্রে ডিপ সি-পোর্টে [গোয়াদর পোর্ট] পৌঁছানোরই অবকাঠামো নির্মাণ করে নেওয়া হয়েছে; যার বৃহৎ ব্যবহারকারী হবে চীন নিজেই। তাই বলা যায়, চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনিয়োগের উপরে হলেও সব কিছুর উপরে এটা খোদ চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ – এক কথায়, চীন নিজ পুবদিকের চীন সাগর ছাড়াও চীন এখন নিজ পশ্চিমদিক দিয়ে সরাসরি আরব সাগরে পৌঁছাতে পারে।

    অথচ এতকিছুর পরও পাকিস্তান আমেরিকার হাতও ছাড়েনি; একটু দুর্বলভাবে হলেও সঙ্গেই ধরে আছে। আবার পাকিস্তানের মূল অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুরোটাই চীননির্ভর। আবার এই সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তির পর থেকে পাকিস্তান হয়ে গেল মুসলমান জনসংখ্যাপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর চোখে রক্ষাকর্তাঃ অন্য ভাষায় হবু ইসলামি ‘ন্যাটোর’ মধ্যমণি।

    কেন আমেরিকান পরপর প্রেসিডেন্টরা নেতানেয়াহুর খেদমতগারির প্রতিযোগিতায়ঃ
    ইসরাইল ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের জায়গাজমি দখল, তাদের উদ্বাস্তু বানানো থেকে শুরু করে এমনকি ক্রমাগত হত্যা, নির্যাতন করে চলেছে। এর সবই নাকি দখলবাজদের ‘আত্মরক্ষার অধিকারের কাজ’ বলে সাফাই দিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ সারা পশ্চিমাজগৎ জায়োনিজমকে উসকানি গেছে। এসবই জায়োনিস্ট ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের নৃশংস ইতিহাস। বিশ্বযুদ্ধ শেষে বৈশ্বিক নেতা হিসাবে আমেরিকান উত্থান আর ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা একসঙ্গে হাত ধরাধরি করেই চলেছে। এক কথায় ইসরাইলকে প্রটেকশন দিয়ে অন্যের দেশভূমি দখল করে ইসরায়েলের নিজ বিস্তার ঘটানো-প্রটেকটর যেহেতু আমেরিকা, তাই পরিষ্কার করেই বলা যায় যে, দুনিয়া থেকে জায়োনিজমের অবসান ও ইসরাইল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি বৈশ্বিক নেতা হিসাবে আমেরিকার পতনের ভেতরই নিহিত। প্রটেকটর আমেরিকার নেতাগিরির পতনের ভেতর দিয়েই একমাত্র ইসরাইলের বিনাশ ঘটতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

    আবার আমেরিকার নেতাগিরির অবসানের মানে হল, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতা হিসাবে চীনের উত্থান। এই উত্থানকে ত্বরান্বিত করার অন্তত একটা চাবিকাঠি আবার সৌদি আরবের হাতে আছে। তা হলো, আমেরিকান ডলার বাদে অন্য মুদ্রায় (যেমন ইউয়ানে) সৌদি তেল বিক্রি শুরু করা। কারণ সৌদি তেল বিক্রি যা সর্বোচ্চ তা কেবল আমেরিকান ডলারেই কেনাবেচা হয়। এতে ডলারের কারেন্সি ভ্যালু অটুট রাখার ক্ষেত্রে – একটা বড় ফ্যাক্টর হল কেবল ডলারেই সৌদি তেল বিক্রি করা।

    আর এতে আমেরিকান ডলার এক আধিপত্যশীল কারেন্সি হিসাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আমেরিকার নেতাগিরি টিকে যাওয়ার প্রধান কারণ। আর আমেরিকান ডলার ডমিনেন্সি টিকে থাকা মানে এটাই ইসরাইলের দানবীয় আচরণ দেখানোর শক্তির উৎস। চীনা মুদ্রা ইউয়ানে সৌদি তেল বিক্রি করা শুরু করলেই এর ফলাফলে ডলার দুর্বল হয়ে যাবে আর এতে আমেরিকা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতা থেকে পতন হওয়ার এক বড় ঘটনা হতে পারে সেটা।

    কিন্তু সৌদিরা এটা করতে এপর্যন্ত ভয় পেয়ে এসেছে। বরং সৌদি সরকার ভয়ে ভয়ে কাজ করেছে উলটা; সৌদিরা আমেরিকার কাছেই নিজ নিরাপত্তার গ্যারান্টি চেয়ে বসে আছে। এদিকে চলতি মাসে ৯ সেপ্টেম্বর ইসরাইল সৌদি আরবের সীমান্ত দেশ কাতারেই বোমাহামলা চালায়। বলাই বাহুল্য, এটাকে সৌদিশাসকরা আমেরিকান ‘প্রতিরক্ষার আশ্বাসের’ বরখেলাপ গণ্য করেছিল।

    এখন সেখান থেকে প্রতিক্রিয়ায় সৌদিরা সরাসরি তেল বিক্রিতে ডলার ব্যবহার বন্ধ করতে পারত। কিন্তু তা কঠোর আর ভারী হয়ে যাবে ভেবে সেদিকে না গিয়ে সৌদি শাসকরা এক তুলনামূলক নরম পদক্ষেপ নিয়েছে – এটাই পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ চুক্তি করে বসা।

    এদিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা লিখেছে, এটা দুই দেশের মধ্যকার চুক্তি হলেও এটা জিসিসি সদস্য দেশের মধ্যেও বিস্তার ঘটিয়ে বাকি গালফ দেশকেও একই ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা নেই। মানে কাতারসহ জিসিসির বাকি দেশগুলোও এ চুক্তিতে একইভাবে সৌদিদের মতো পক্ষভুক্ত হতেই পারে।

    কিন্তু তবু অনেকের মনে খচখচ করতে পারে এই ভেবে, এটা তো ঠিক ‘ইসলামি ন্যাটো’-এর মতো হচ্ছে না। কারণ ইরান বা তুরস্ক এতে শামিল নয় বা সেটা হবে কী করে?

    আমি এখানে একটা সূত্র বলে দেই। এক্ষেত্রে ইরান মুসলিম দেশের মধ্যে সবার আগে চীনের সঙ্গে পক্ষভুক্ত হয়ে গেছে। আর তা পেরে গেছে বলেই ইরান সাহসের সঙ্গে ফিলিস্তিনির পক্ষে হামাস, হিজবুল্লাহসহ অন্যদের সংগঠিত ও সহযোগিতা করে আসছে। ইরানের তেল কেনার জন্য চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি করা আছে।

    অতএব, সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ মানেই পাকিস্তান নিজ আরেক হাতে চীনের সঙ্গে সে যুক্ত-এটাও মনে রাখতে হবে। ফলে ইরানও এতে (আপাতত) পরোক্ষে যুক্ত!

    সৌদিদের দিক থেকে এটা হল, আমেরিকাকে দেওয়া হুঁশিয়ারি যে আমেরিকা সংশোধিত না হলে, জায়োনিস্ট রক্ষকের কাজ ত্যাগ না করলে তখন সৌদি শাসকরা সরাসরি ডলারে তেল বিক্রি বন্ধের পথে যাওয়ার কথা ভাববে।

    এক কথায় দিন শেষে এটাই দখলদার জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সর্বোচ্চ পদক্ষেপ হয়ে ওঠার পথে হাঁটবেই।

    গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫    


    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সানে ছাপা হয়েছিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় আমারই লেখা এক কলাম হিসাবে, গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫।  আজ এখানে সে লেখাটারই  আরেক বর্ধিত এক নয়া এডিটেড ভার্সান এখানে আমার নিজ সাইটে ছাপা হল। বলাই বাহুল্য এখানে শিরোনামটাই শুধু নতুন নয় বরং এমন অনেক প্রসঙ্গই নয়া এখানে যোগ করা হয়েছে যেটা পত্রিকার ভার্সানে ছিল না। আসলে পত্রিকার কলাম ভার্সান মানে যেটা যুগান্তরের এডিটরিয়াল পলিসি সঠিক মনে করে সেই ভার্সান; এভাবে দেখাটাই সঠিক হবে। আর তুলনায় এটা আমার নিজ পরিবর্ধিত-এডিটেড ভার্সান মনে করলেই সঠিক হবে বলে আমার বিশ্বাস! ]

  • নেপালি ‘রিপাবলিক’ এর স্বপ্ন কী একেবারেই ব্যর্থ হল!

    নেপালি ‘রিপাবলিক’ এর স্বপ্ন কী একেবারেই ব্যর্থ হল!
    গৌতম দাস

    ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
    https://wp.me/p1sCvy-6xb

     

    নেপালের তরুণদেরকে গ্লোবাল ভাষায় জেন-জি বা জেন-জেড নামে ডাকা হচ্ছে।  তারা মূলত নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি বিরুদ্ধে বিদ্রোহি উত্থান ঘটিয়েছেন।  এরাই নেপো-কিডস [NEPO-KIDS] -দের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়িয়েছে। নেপো- শব্দটা নেয়া হয়েছে ইংরাজি নেপোটিজম [Nepotism] থেকে। যার বাংলামানে হল, যারা জনগণের নামে ক্ষমতা নিয়ে ক্ষমতায় থেকে নিজ সন্তান বা আত্দেমীয় পরিজনদেরকে চরম অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ-সুবিধাদি দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা কর চলে। নেপালের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিকেরা শুধু একাজই করেন নাই। তাদের নেপো-গুষ্ঠি আর তাদের সন্তানরা ক্রমাগত বড়লোকি ফুটানি প্রকাশ করে সোশাল মিডিয়া ভারী করে রেখেছিল। আর এসবের বিরুদ্ধে নেপালের তরুণেরা সোশাল মিডিয়ায় প্রথমদিকে কঠোর সমালোচনাকে কেন্দ্র করে জড়ো হতে শুরু করেছিল।  কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা তা টের পেয়ে এই সমালোচনাকে দমন করার জন্য একটা কৌশল করেছিল। তারা আদালতে এসব সোশাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, এক্স থেকে শুরু করে এমনকি সিগনাল এপ (খুবই নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা একটা কথোপকথনের এপ।) এসব কিছুর উপর আদালতের এক নির্দেশনা নিয়ে এসেছিল তাতে এসব  সোশাল মিডিয়াকে নতুন করে নিয়ম মেনে সাতদিনের মধ্যে রেজিষ্ট্রেশনের নির্দেশ নিয়ে আস্তে হবে। এসব কড়াকড়ির জন্য এক টিকটিক ছাড়া উল্লেখযোগ্য বেশির ভাগ সোশাল মিডিয়াই নতুন করে রেজিষ্টার্ড হতে ব্যর্থ হয়। ফলে এসব এপ এর নেপালে উপস্থিতি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এতে এইবার নেপালী তরুণেরা এমন সমস্ত রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এদেরকে উপড়ে ফেলার জন্য বিদ্রোহ আর গণ-উত্থান ঘটিয়ে দিয়েছিল। এমনিতেই নেপাল গ্লোবাল মিডিয়ায় তেমন উপস্থতি থাকে না। তাই এই খবরটা বাইরের মিডিয়া প্রচার করেছিল যে নেপাল থেকে কেবল ফেসবুক ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে এই বিক্ষোভ। অর্থাৎ এসবের পিছনের মূল কারণ যে নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি সেই মূলকথাটাই চাপা পরে গিয়েছিল।
    যাহোক, নেপালের এই নেপো-কিডস কারা এনিয়ে একটা রিপোর্ট আমরা বাংলায় পেয়েছি বাংলাদেশের  যুগান্তরে অনুমান করি এটা কোন ইন্ডিয়ান পত্রিকা থেকে নেয়া। যুগান্তরে এটা ১২ সেপ্টেম্বর ছাপা হয়েছে এখানে লিঙ্ক দিলাম। শিরোনাম “নেপালে আন্দোলনের নেপথ্যে ‘নেপো কিডস’, কারা এরা?”। এছাড়া নেপালের কাটমান্ডু পোস্ট পত্রিকা পাঁচ প্রশ্নের উত্তর  দিতে গিয়ে সংক্ষেপে এই প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচারা করেছে।


    আইডিওলজির বিচারে  ২০০৬ সাল থেকেই নেপালের রাজনীতিতে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করার আন্দোলনের সময় থেকে কমিউনিস্ট ঘরানা আধিপত্য শুরু হয়ে যায় যা এখনও বর্তমান!  আর সম্ভবত সেটাই একালে এসে নেপালের তরুণের সংগঠিত বিদ্রোহী উত্থানের পেছনের এক কারণ। নেপালের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বড় প্রভাবের দুটি দলই কমিউনিস্ট আর তৃতীয়টি ইন্ডিয়ান কংগ্রেস অনুকরণে যার নাম ‘নেপালি কংগ্রেস’। প্রথম দুই কমিউনিস্ট দলের একটি হলো গত প্রধানমন্ত্রী কে পি অলির বা খড়্গ প্রসাদ শর্মা অলির দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (একীভূত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) [সিপিএন ইউএমএল] এভাবে নামে ডাকতে পছন্দ করেন। আর অন্য কমিউনিস্ট পার্টিটা হল, পুষ্প কমল দাহালের [সশস্ত্র সংগ্রামের সময় দেওয়া যার ছদ্মনাম ছিল প্রচন্ড] আরেক ‘নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী কেন্দ্র)’।

    মজা হল, কোনো কারণে ২০০৬ সালে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাতের আন্দোলনের পরে ২০০৯ সালে যখন প্রথম নয়া রিপাবলিক নেপাল রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়, তাতে ভোটের ফলাফলে দেখা গিয়েছিল, কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আর সেটি শুধু ২০০৯ সালের প্রথম নির্বাচনের (গণপরিষদ বা কনস্টিটিউশন প্রণয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন) সময়ই নয়, বরং এরপরের এ পর্যন্ত সব নির্বাচনের ফলাফল একই; মানে তিন দলের মধ্যে আসন বিভক্ত। এর মধ্যে নেপালি কংগ্রেস হয়তো সবচেয়ে কম আর অলির কমিউনিস্ট হয়তো সবার চেয়ে বেশি। কিন্তু কোনো দলই কখনো পঞ্চাশ ভাগের বেশি আসন পায়নি। নেপালের রাজনীতি বোঝার জন্য এ বাস্তবতার দিকে খেয়ালে রাখা খুব জরুরি। এ তিনটা মূলদলের বাইরে নেপালে আরও অন্তত গোটা দশেক ছোট দল আছে, যাদের বেশিরভাগই নানা কিসিমের কমিউনিস্ট দল।

    ইন্ডিয়া ২০০৯-২০১৫ পর্যন্ত সম্ভব সবরকমভাবে নেপালে একটা নয়া রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে সব কায়দায় সর্বোচ্চ বাধা তৈরি করে গিয়েছিল, যাতে নেপালে কোনো ‘রিপাবলিক কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র’ হিসাবে পুনঃগঠিত হতে না পারে। কিন্তু তা ততধিক খারাপভাবেই কেবল ব্যর্থ হয়নি; ইন্ডিয়ার এই ততপরতা এতে নেপাল এক চরম ভারতবিরোধী নেপালে পরিণত হয়। সফল হয়ে উঠে দাড়িয়েছিল।  ফলে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নয়া কনস্টিটিউশনের ‘প্রোক্লেমেশন’ বা ঘোষণা সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সেই শেষ! এর পরের নেপাল গত দশ বছরে ক্রমশ এ’তিন দলেরই দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির দেশ ও সরকারে পরিণত হয়। আর সেটারই পরিণতি আমরা দেখছি এবারের নেপালের তরুণদের গণ-উত্থান!

    আমি মনে করি, মাত্র দশ বছরেই এমন পরিণতি হওয়ার পেছনের প্রধান কারণ নেপালের রাজনীতিতে প্রকাশিত কমিউনিস্ট আধিপত্য। মনে রাখতে হবে, নেপালে রাজতন্ত্রের বিকল্প হিসাবে রিপাবলিক নেপাল গড়ার প্রধান কারিগর হলেন দাহাল প্রচন্ড, এবং তার সাথে ছিলেন মূলত তাঁরই বিদেশি তবে ইতিবাচক সাপোর্টিংয়ের একাডেমিক বন্ধু বা সিনিয়র একাদেমিক -এরা।

    এতে অনেকের মনে হতে পারে, এটা ভালোই তো হয়েছে। সেটা হয়ত। কিন্তু এর স্ববিরোধটা আমাদের খেয়াল করতে হবে। সেটা হল, একদিকে দাহাল মৌলিকভাবে – মাওবাদী কমিউনিস্ট। তাহলে তিনি নিজ ‘শ্রেণির রাষ্ট্রচিন্তা’ ফেলে এক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’ গড়ার ভক্ত হন কেমন করে? অনেকেই হয়তো এদিকটা খেয়াল করেননি। মনে রাখতে হবে, মার্কস বা লেনিনের ‘শ্রেণির রাষ্ট্রচিন্তায়’ জনগণ বলে কোনো ধারণা নেই; কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই!

    জনগণ শব্দটা ইংরেজি ‘পাবলিক’ শব্দের বাংলা। যদিও ‘পিউপল’ শব্দের অন্তর্ভুক্তি মার্কস বা লেনিনের নয়; এটি বরং চীনা মাওয়ের। মাও মোটা দাগে স্টালিনিস্ট (মানে মার্কস বা লেনিনকে নিজের মত করে বুঝা বা রপ্তকারী স্টালিন) হলেও ট্রাডিশনাল ‘শ্রেণির রাষ্ট্রচিন্তা’ থেকে কিছুটা বের হয়ে জনগণ ধারণার দিকে নিজ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। শেষ বিচারে মাও-ও ‘শ্রেণি’ না ‘পাবলিক’-কার পক্ষ নেবেন, সে ফয়সালা করতে পারেননি! আবার বলা যায়, পারেননি বলেই চীন এখনো ‘শ্রেণিবোধের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের’ চীন হয়েই আছে! পাবলিকের রাষ্ট্র (মানে রিপাবলিক রাষ্ট্র) ধারণার ‘মর্ম উপলব্ধ কোনো চীন’ হতে পারেনি, এখনো।

    বিশেষতঃ, পাবলিক মানে নাগরিক জনগণকে শ্রেণী নির্বিশেষে  মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার এক রিপাবলিক রাষ্ট্র, অধিকার ভিত্তিক এক রাষ্ট্রই আয়েম করতে হবে – এতদুর এখনও মাও বা দেং জিয়াও পিং -এর এখনকার চীন পৌছাতে পারে নাই! অস্পষ্টতায় আছে! যদিও গ্লোবাল হিয়ম্যান রাইট ইস্যুতে একালের চীনের আগেহ ক্রমশ বাড়তেছে!       

     

    আসলে শ্রেণি আর পাবলিক ধারণার মূল ফারাকটা কোথায়ঃ
    রাষ্ট্র মানে মূলত নাকি কোনো না কোনো একটা শ্রেণির রাষ্ট্র; এ কথা বলে মার্কস থেমেছিলেন। লেনিন সেটাকে আরও চরমে নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্র মানে মূলত কোনো না কোনো শ্রেণির একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র। লেনিনের যুক্ত করা বাড়তি শব্দটা হল – একনায়কতান্ত্রিক; যা মার্কসের বলা অন্তর্নিহিত অর্থটাকে স্পষ্ট করে সামনে নিয়ে এসে বলা। কিন্তু সেটা যাই হোক, মার্কস বা লেনিন কারও ধারণাই ‘পাবলিক’ ধারণাটাকে আপন করে নেয় না।ধারে কাছেও যায় নাই। 

    পাবলিক মানে হলো দেশের ‘এনিবডি’ বা শ্রেণী নির্বিশেষে যে কেউ, যে নাগরিক; এবং তাদের কমন স্বার্থ এটাই পাবলিক বা পাবলিক ইন্টারেস্ট, বাংলায় যা জনস্বার্থ।

    তুলনায় মার্কসের কাছে ‘জনগণ’ বলে কোনো ধারণা-ই নেই। সবই একটা শ্রেণির ধারণা আর এক শ্রেণির বিরুদ্ধে অপর একটা শ্রেণি ধারণা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জনগণ বা পাবলিক ধারণাটা এক রাজনৈতিক ধারণা। রাজনৈতিক ধারণা মানে? মানে হল, এটা যেমন এটা রাজনৈতিক অধিকারের ধারণা; যা মার্কসের অভিধানে নেই। বরং ১৯৬৬ সালে এসে এটা বড়জোর অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক স্বার্থের ধারণা যেমন – অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিতসা ও বাসস্থানের ধারণা।    পাবলিক শব্দটা যেমন নাগরিক মাত্রই এবং দেশের সবার ন্যূনতম ও কমন এবং সমান অধিকারের ধারণা; এর বিপরীতে শ্রেণি ধারণায় সমাজের কেবল একটা শ্রেণি এবং কেবল তার আধিপত্যের পক্ষে সব সাফাই দেওয়া; সেটা এমনকি তাকে একনায়ক বানানো পর্যন্ত!

    মনে রাখতে হবে, এর সুবিধা নিয়েই আমাদের দেশে ‘চেতনা ব্যবসা’ হাসিনা এত জাঁকজমক করে নিয়েছিলেন – নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণির নেতা বলে ঘোষণা দিয়ে। এতে তিনি বিশেষ ক্ষমতাবান শ্রেণির ক্ষমতার রাষ্ট্রনায়ক দাবি করতেন, আর যারা যাকেই তার বিপরীত শ্রেণি (রাজাকার শ্রেণি) বলে ট্যাগ, লেবেল বা ঘোষণা করে দিতেন, তার আর কোনো নাগরিক অধিকার থাকত না, নাই হয়ে যেত। ফলে তাকে গুম, আয়নাঘর বা গুলি করা  সব জায়েজ হয়ে যেত। এই হল, নাগরিক অধিকারের বিপরীতে শ্রেণিচিন্তার ব্যবহারিক তাণ্ডব এবং পরিণতি।

    তাহলে এবার প্রাসঙ্গিক করে বলি। নেপালের মাওবাদী দাহাল প্রচন্ড, তিনি রিপাবলিক নেপাল গড়লেও তিনি তো আসলে কমিউনিস্ট, শ্রেণিচিন্তার কমিউনিস্ট। ফলে ডিপ অন্তর থেকে  ‘পাবলিক’ ধারণায় কোনো নাগরিক অধিকার ধারণার নেতা তিনি নন! আসলে মৌলিকভাবে ‘রিপাবলিক’ ধারণার নেতাই তিনি নন। তাহলে ‘রিপাবলিক’ ধারণার আবার আলাদা বৈশিষ্ট্য কী? রিপাবলিক বুঝতে গেলে ‘রাজতন্ত্র’ বুঝতে হবে। কারণ রাজতন্ত্র উপড়ে ফেলা, এর বিকল্প নতুন ও এর বিপরীত শাসনব্যবস্থার চিন্তা থেকেই রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র) ধারণার উৎপত্তি। রাজা উতখাত করে বিপরীতে প্রজাদের শাসন!  যেমন রাজার বিপরীতে শাসন ক্ষমতার উৎস কী হবে? শাসককে ক্ষমতা কে দেবে? এরই জবাব হল জনগণ বা পাবলিক দিবে।


    পাবলিক সব ক্ষমতার উৎস। তাই পাবলিকের প্রতিনিধি মানে জনপ্রতিনিধি রাষ্ট্রশাসন করবে। তাই রাজা, সম্রাট, আমির, বাদশার বিপরীতে কোনো ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই’ কেবল রাষ্ট্রশাসন করবে। এ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির (কোনো শ্রেণির প্রতিনিধি নয়) শাসন সিস্টেমই হলো রিপাবলিক রাষ্ট্র!

    কমিউনিস্ট চিন্তা মাত্রই আইডিয়ালঃ
    আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখতে হবে, কমিউনিস্ট চিন্তা মাত্রই আইডিয়াল [ideal]। মানে “হওয়া উচিত” অর্থে একটা ধারণা। মানে বাস্তবে বাস্তবায়িত করে দেখানো কোন ধারণা নয়! তাই কমিউনিস্টদের প্র্যাকটিসটাই এমন যে, সেটা আসলে কমিউনিস্ট হিসাবে ‘কী হওয়া উচিত’-এরই বয়ান। মানে এটা বাস্তবে বাস্তবায়িত করে দেখানো, কতটা হয়েছে, হওয়া সম্ভব সেই ধারণা একেবারেই নয়। আর এ কারণের দাহালেরা  দশ বছরের ব্যবহারিক শাসন ক্ষমতা চালানোর মধ্যেই একেবারে ব্যর্থ শুধু নয়, চরমভাবে তরুণদের চাহিদা আর হাহাকার বুঝাবুঝি থেকেই বিচ্ছিন্ন!

    এর সঙ্গে রয়েছে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিতে ডুবে যাওয়া। আর এখান থেকেই এককালে রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অ্যাকশন দেখানো সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি তরুণদের প্রধান চয়েজ, তিনি নির্বাহী প্রধানের ক্ষমতায় শপথ নিয়েছেন। আর সেই সঙ্গে প্রধান তিন দলের ছয় সিনিয়র নেতাকে রাজনীতি থেকে অবসরের প্রস্তাবের বাস্তবায়ন চলছে : ‘আমরা ছয়জন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি যৌথ বিবৃতি পাওয়ার জন্য কাজ করছি, যাতে তাদের অবসর নেওয়ার এবং দেশকে নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।’

    তরুণদের এ আপসটা বাস্তবোচিত। কারণ, প্রধান তিনটি দলকেই উচ্ছেদ করে দিলে নতুন রাজনীতির সাময়িক নেতা কে হবে? নয়া নেতা গড়ে উঠতে তো সময় লাগবে! আর এর সঙ্গে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি একেবারে নির্মুল না হোক নাগাম টেনে ধরা সহজ কাজ নয়; এছাড়া তা করতে সময় তো লাগবেই!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ১৯  সেপ্টেম্বর ২০২৫     ভোর রাত ০২ঃ ৫৫

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সানে ছাপা হয়েছিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় আমারই লেখা এক কলাম হিসাবে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫।  আজ এখানে সে লেখাটারই  আরেক বর্ধিত এক নয়া এডিটেড ভার্সান এখানে আমার নিজ সাইটে ছাপা হল। বলাই বাহুল্য এখানে শিরোনামটাই শুধু নতুন নয় বরং এমন অনেক প্রসঙ্গই নয়া এখানে যোগ করা হয়েছে যেটা পত্রিকার ভার্সানে ছিল না। আসলে পত্রিকার কলাম ভার্সান মানে যেটা যুগান্তরের এডিটরিয়াল পলিসি সঠিক মনে করে সেই ভার্সান; এভাবে দেখাটাই সঠিক হবে। আর তুলনায় এটা আমার নিজ পরিবর্ধিত-এডিটেড ভার্সান মনে করলেই সঠিক হবে বলে আমার বিশ্বাস! ]

  • চীন-ইন্ডিয়া সম্পর্ক কী ঘনিষ্টতা দিকে; এর কী কোন ভবিষ্যত আছে?

    চীন-ইন্ডিয়া সম্পর্ক কী ঘনিষ্টতা দিকে? এর কী কোন ভবিষ্যত আছে?
    গৌতম দাস
    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫   রাত ২৩ঃ ৪৩
    https://wp.me/p1sCvy-6wP

     

    A united front at Beijing’s massive military parade as Xi, Putin and Kim meet for first time

     

    শেষের কথাটা আগেই যদি বলি তবে এই শিরোনাম-প্রশ্নের ছোট জবাব হল, না। সম্পর্ককে গভীর ঘনিষ্ঠতা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া মোদির ইন্ডিয়ার পক্ষে সম্ভব হবে না। এত পিছনের মূল কারণ, ইন্ডিয়ার নিজ দোদুল্যমানতা। আসলে বলতে গেলে ইন্ডিয়া এমনই। যেমন তারা বলে বা মনে করে থাকে (সেই ২০১৩ সাল থেকে) যে চীন আর আমেরিকার মাঝে দোল খেয়ে কখনও চীন আর কখনও আমেরিকা এভাবে ভাব ধরে এদের দুদিক থেকেই মাখন খেয়ে যাওয়াই হবে ইন্ডিয়ার কৌশলগত নীতি। এটা তো তাদের ২০১৩ সালের সিদ্ধান্ত, যখন ইন্ডিয়া চীনে অনুষ্ঠিত প্রথম বেল্ট-রোড সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েছিল, কিন্তু অংশ না নিয়ে নিজেদের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; তখন থেকেই ইন্ডিয়া এরকমই দায়দায়িত্বহীন সুবিধা চোষা! ঠিক এ কারণেই এখনকার ট্রাম্পের শুল্ক-বোঝায় পর্যুদস্ত ও মার খাওয়া ইন্ডিয়া এতকিছুতে নাস্তানাবুদ হয়েও আবার ইতোমধ্যেই ওই ট্রাম্পের কোলেই ফিরে গিয়ে আবার আশ্রয় খোঁজা শুরু করেছে; আর তাতে বলাই বাহুল্য, এতে এই ইন্ডিয়া এখন চীনের আস্থা অর্জন পর্যন্তই উঠতে পারছে না, পারবে না।

    এবার আস্তে আস্তে ঘটনাবলির ভিতরে প্রবেশ করা যাক। এটা একদম ঠিক যে এখন চীন- ইন্ডিয়া সম্পর্ক-ঘনিষ্ঠতা নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা তুঙ্গে। এর একটা অন্যতম কারণ হল, ঠিক এখনই এবারের বার্ষিক SCO এসসিও (সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন) সম্মেলনের সময়কাল এটা। ফলে  ট্রাম্পের আমেরিকার  সদ্য ছুড়ে ফেলে দেওয়া মোদির ইন্ডিয়াকে, একেও চীন এবারের এসসিও-তে আন্তরিকভাবেই দাওয়াত দিয়ে কাছে ডেকে নিয়েছিল।

    পাশাপাশি সেই সঙ্গে এই ট্রাম্পও প্রায় সব দেশের ওপর কঠোর শুল্কনীতি প্রয়োগ করেছেন। শুরুতে তা চীনের ওপর ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি চীনকে শুল্ক-আরোপ করে পর্যুদস্ত করে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাতে বাস্তবে ফলাফল উল্টা আসায় আর সঙ্গে আমেরিকার নিজস্ব সরকারি বন্ড বিক্রির ক্রেতা সংকট বা বাজারে ক্রেতা উধাও হওয়া শুরু হতেই ট্রাম্পকে পিছে হটতে হয়। তিনি বাধ্য হয়ে গত জুন মাসেই অনেক ইস্যুতে সরাসরি চীনের সঙ্গে এক ধরনের আপস করে ফেলেন।

    অনুমান করা যায়, এ ঘটনা থেকেই চীন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবারের এসসিও সম্মেলনটি বিরাট জাঁকজমকপূর্ণ এক সামরিক শো-আপ করে করবেন!


    SCO তে এবার সামরিক শো-আপ কেনঃ
    অনেকেই খেয়াল করেছেন যে এই সামরিক শো-আপে সম্ভবত ২৬ দেশের প্রধান ব্যক্তিত্বদের (রাষ্ট্রপ্রধান নয়ত প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী অথবা ন্যূনপক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের) একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি হেঁটে যাচ্ছেন, যার দুপাশে হাঁটছেন একদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন আর অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম-জং-উন!

    এসবের মধ্যে আরেক বৈশিষ্ট্য ছিল প্রেসিডেন্ট শির ‘পোশাক’। তিনি পরেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ ড্রেস, যেটা মাও – কেই সবসময় পরতে দেখা যেত। প্রেসিডেন্ট শি একালে নিয়মিত নরমাল পোশাক পরলেও সেদিন ছিলেন একেবারেই পার্টি ড্রেস-কোডে সজ্জিত! এসব থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, বিশেষ ‘অর্থ ও প্রতীকের’ মাধ্যমে এবারের এসসিও সম্মেলন পালন করার পরিকল্পনা নিয়েছিল চীন।

    গত বিশ বছর চীন সামরিক দিক থেকে কী কী খাতে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করে নিজেকে সজ্জিত করে চলছিল তা জনসমক্ষে আনেনি; এদিনটা ছিল আসলে সেটারই প্রদর্শনী ও মহড়া। যে মহড়ায় আবার বেশির ভাগ অস্ত্র-সরঞ্জামই হলো নিউক্লিয়ার এনার্জি-সংশ্লিষ্ট!

    এখানে একটা কথা আশা করি অতি-উক্তি হবে না যে, এর ফলে এসসিও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছিল ওদিনে। কিন্তু এমন কেন? বিশেষ করে অনেকেরই অজানা হয়ত যে চীন-চীন সাগর/দুই কোরিয়ার উপকূল এলাকাকে অ-পারমাণবিক জোন হিসাবে ঘোষণা করা যায় কিনা এরই একক প্রস্তাবক হল চীন নিজেই!

    তাহলে এখানে এমন চীনা আচরণের ব্যাখ্যা কীঃ
    মনে রাখতে হবে, কোনো রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ (যেখানে গ্লোবাল অর্থনীতির নয়া একালের অভিমুখ হল শুল্ক কমানো, ৮ শতাংশের মধ্যে রাখা) মানেই এটা হল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য যেটা আসলে গ্লোবাল বাণিজ্যের বিকাশ মেন-স্ট্রিম অভিমুখ সেটাকে পাথর চাপা দিয়ে গ্লোবাল বাণিজ্যের আমদানি-রপ্তানির পিঠে সরাসরি ছুরিকাঘাত! যেটা অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদিতা বা অর্থনৈতিক উগ্র-জাতীয়বাদিতা! সর্বোপরি এটা আত্মঘাতী! গত ১৯৮০ সাল থেকে পথচলা শুরু এই বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় এখন আর পিছনের দিকে ফেরা বা যেটা অর্থনৈতিক উগ্র-জাতীয়বাদিতা সেদিকে গন্তব্য ঠাউরানোর আর সুযোগ নেই। এতে সবার আগে নিজ রাষ্ট্রের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি!

    ট্রাম্পের বাড়তি শুল্কনীতির খাঁড়া – প্রত্যক্ষ অর্থ এটাই! যদিও ট্রাম্প ভাবছেন, আমেরিকাকে ছাড়িয়ে শীর্ষ উদ্বৃত্ত অর্থনীতির দেশ হিসাবে উঠে আসা চীনের অগ্রগতি এভাবেই তিনি ঠেকায় দিতে পারবেন! অথচ তিনি খেয়াল করছেন না, আমেরিকার পিছিয়ে পড়া বা একঘরে হয়ে যাওয়ার পথেই হাঁটছেন তিনি!

    আর এ থেকে চীনের অনুমিত ভয় হল, ট্রাম্প হেরে গিয়ে শেষে পাগলামি করে না  যুদ্ধ লাগিয়ে দেন; অথবা ব্যর্থতা ঢাকার অন্য কোন ব্যর্থ চেষ্টা!

    ফলে আমার অনুমান পাগলা ট্রাম্প যেন সেদিকে যেতে প্ররোচিত না হয়ে যান, তাই আগেই চীন নিজ সামরিক প্রস্তুতির প্রদর্শন করে রাখলেন। বিশেষ করে চীন যেন বোঝাতে চাইল, সামরিক দিক দিয়ে ট্রাম্প ও তার সহচররা পরিচালিত হতে যেন উৎসাহী না হয়ে যায়। আর সেটারই একটা কসরত – এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি কিক – যেন মেরে রাখল চীন! যেমন প্রেসিডেন্ট শি নিজের দুপাশে রাশিয়া আর উত্তর কোরিয়া নিয়ে দলবদ্ধ হাঁটার প্রতীকী অর্থ আমার কাছে এমনই মনে হয়েছে। যারা দুদেশ মূলত পারমাণবিক দিক থেকে খুবই সামরিক সজ্জিত!

    এক কথায় এর প্রতীকী সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হল, পাগলা ট্রাম্পকে ডিসকারেজ (নিরুৎসাহিতার প্রভাব) করে ফেলা!

    এবার এই আলোচনার দ্বিতীয় অংশঃ
    অথচ চীন সেই সম্মেলনে ভারতকেও আদর করে ডেকেছিল আর তাতে গলে গিয়ে দীর্ঘ সাত বছর পরে এই ওছিলায় খোদ মোদি এবার চীন সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শির ওই দলবদ্ধভাবে প্রতীকী হাঁটার মিছিলে শির আশপাশে মোদির স্থান হয়নি।

    বরং বিপরীত পর্দার কথা আমরা এখন জেনে গেছি। আমরা দেখেছিলাম মোদির বাণিজ্যমন্ত্রী পীযুষ গোয়েলকে! কী করেছেন তিনি?

    নভেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী

    তিনি আমাদের জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গেই ইন্ডিয়ার শুল্ক আলাপ নাকি এখনো চলছে। আর তিনি আশা করছেন, মোদির ইন্ডিয়া আবার সেই ট্রাম্পের কোলেই মুখ গোঁজার পরিকল্পনা করছে। আর তাতে তিনি দাবি করেছেন, নভেম্বরের মধ্যেই আমেরিকার সঙ্গেই আবার একটা রফায় পৌঁছাতে পারবেন!

    এই হলো ভারতের মোদি! তিনি ট্রাম্পের কোলে উঠে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে চীনের কাছে সুবিধা চাইবেন, আবার পরক্ষণেই চীনের কোলে উঠে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ট্রাম্পের কাছে সুবিধা ভিক্ষা করবেন। এভাবেই তিনি এখনো চলতে চান, এটাই আসল ইন্ডিয়া! গত ২ সেপ্টেম্বর ভারতের ‘ফরচুন ইন্ডিয়া’ পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম পীযুষ গোয়েল আশা করছেন, আগামী দুমাস নভেম্বরের মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে একটা রফাতে নয়া শুল্ক-চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে!

    কিন্তু বাস্তবতা কি তাই হবে? মনে হচ্ছে না। মূল কারণ এটা ২০১৩ সাল নয়, ২০২৫ সাল! চীন-আমেরিকা দুদিক থেকেই সেকালের মতো মাখন খেয়ে ভারত উপরে উঠে যাবে – সেই তত্ত্ব, এখন আর এত সহজে খাটবে না। এটারই প্রথম প্রতিফলন হল,

    মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রীর ‘ভারত দুই মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চাইবে’

    আর দ্বিতীয়তঃ
    প্রেসিডেন্ট শি দুপাশে পুতিন আর কিমকে নিয়ে হাঁটছেন অথচ আশপাশে মোদির কোনো ছায়াও দেখা যাচ্ছে না- এই প্রতীকী দৃশ্যে!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ১১  সেপ্টেম্বর ২০২৫    রাত ১১ঃ ৫৪

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সানে ছাপা হয়েছিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় আমারই লেখা এক কলাম হিসাবে, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫।  আজ এখানে সে লেখাটারই  আরেক বর্ধিত এক নয়া এডিটেড ভার্সান এখানে আমার নিজ সাইটে ছাপা হল। বলাই বাহুল্য এখানে শিরোনামটাই শুধু নতুন নয় বরং এমন অনেক প্রসঙ্গই নয়া এখানে যোগ করা হয়েছে যেটা পত্রিকার ভার্সানে ছিল না। আসলে পত্রিকার কলাম ভার্সান মানে যেটা যুগান্তরের এডিটরিয়াল পলিসি সঠিক মনে করে সেই ভার্সান; এভাবে দেখাটাই সঠিক হবে। আর তুলনায় এটা আমার নিজ পরিবর্ধিত-এডিটেড ভার্সান মনে করলেই সঠিক হবে বলে আমার বিশ্বাস! ]

  • সংক্ষেপে কিছু খাড়া কথা

    সংক্ষেপে কিছু খাড়া কথা
    গৌতম দাস
    ০৭ আগষ্ট ২০২৫   দুপুর ১ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-6v7

     

    অধ্যাপক ইউনূসের সাথে তারেক রহমানের বৈঠক হয় লন্ডনে – ছবি বিবিসি থেকে নেয়া

     

    ইউনুস সাব  ৫ আগষ্ট বর্ষপুর্তি পালন করেছেন, বৃষ্টিতে ভিজে অনুষ্ঠান করে। ঐরাতেই টিভিতে এক ভাষণও দিয়েছেন। যেখানে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগেই নির্বাচন হবে ঘোষণা করেছেন।
    এগুলো হল বাইরে দেখতে পাওয়া কথা।  আর ভিতরে?

    এটা পরিস্কার যে একাজগুলো করতে তিনি বিএনপির তারেককে সবচেয়ে বেশি আদর করেছেন কোলে নিয়েছেন। কেন? কারণ এভাবেই তিনি নিজ একক রচিত ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা এবং সাথে ‘জুলাই ঘোষণা’ করতে গিয়ে তিনি এটাকেই উপায় হিসাবে ব্যবহার করেছেন। মানে এই  কথিত – সনদ বা ঘোষণা – কোনটাই তার পক্ষে এটা ছাড়া সম্ভব হচ্ছিল না। মুল সমস্যাটা হল, মূল তিন-চারটা দলকেও তিনি ডেকে নিলেই এদের সব আলাদা আলাদা অবস্থান-গুলো বাইরে চলে আসত; ফলে ভাব নিয়েছেন এটা তিনি নিজের ক্ষমতায় করলেন। কিন্তু আসলে?
    আসলে তিনি (১) তারেককে দুবছরের সময় ঘুষ দিয়েছেন। মানে ‘জুলাই ঘোষণা’ বলে যা তিনি -কথিত সংস্কার- রচিত করেছেন তা এখনই মানে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই আইনী ভিত্তি দিতে হবেই না। যার সোজা মানে আগে আইনি ভিত্তি পরে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান, এমনটা করতে হবে না।  অর্থাৎ এগুলোর কোন কনষ্টিটিউশনাল ভিত্তি এখনই দিতে হবে না। আগে নির্বাচন হয়ে যাবে হাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে  মানে কোন আইনি ভিত্তি ছাড়া আর পরে যেই ক্ষমতায় আসবে সে পরে এটা সংসদে পাশ করে নিবে। এর আবার সোজা মানে হল, নয়া ক্ষমতাসীন দল সেটা না করলে বা ইচ্ছা-মনমত বদল করে নিয়ে করলেও চলবে! এটাকেই আমি দুবছর তারেককে ঘুষ দেয়া বলছি।

    তবে পাঠকেরা সাবধান!   
    উপরের উল্লেখ করা ইউনুসের বক্তৃতায়, দুইটা জিনিষ অস্পষ্ট বা ফাঁক রাখা আছে। আপনারা ধরে নিয়েছেন সেটা আপনারা যা বুঝেছেন তাই-ই লেখা আছে। কিন্তু না! যেমন ইউনুসের টিভিতে দেয়া স্পিচ যেটা অনেক পত্রিকাই টেক্সট করে ছাপিয়েছে সেখানে নির্বাচন হবে একথা বলা হয়েছে সব জায়গায় কিন্তু কোন নির্বাচন? প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনের প্রেসিডেন্ট (যেমন জিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার নির্বাচন, যেটা হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৯৭৮, ৩ জুন ১৯৭৮ সালে) নির্বাচন নাকি জাতীয় সংসদ এর নির্বাচন সেটা স্পষ্ট করা নাই। জিয়ার আমলে আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৯৭৮ হয়েছিল  আর পরে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৯, বাংলাদেশে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়।
    আর, দ্বিতীয় অস্পষ্ট বা ফাঁক রাখা ইস্যুটা হল, তাহলে নির্বাচন হচ্ছে ইউনুস সরকারের অধীনে! তাই কী? অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের দ্বারা জীবিত (ও অস্পষ্ট) হয়ে  থাকলেও এর কথা আর কেউ এখন তুলছে না। এই এখন মানে? এখন মানে হল, ৫ আগষ্ট্রের ইউনুসের ভাষনের পরে।

    ইতোমধ্যে আগেই আমি বলেছিল্লাম ইউনুস (নির্বাহী ক্ষমতার প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্ট জিয়ার মত) প্রেসিডেন্ট হতে চান! এমনকি সাথে এনসিপির কেউ কেউ তার সাথে মন্ত্রী থাকতে চান সেকথাও উল্লেখ করেছিলেন!
    এখন যেটা বিস্ময়কর তা হল, এনসিপি ইউনুসের ৫ আগষ্ট্রের টিভি স্পিচকে স্বাগত জানিয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে। তবে গতকাল ৬ আগষ্ট সেক্রেটারি আখতার হোসেন যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তাতেও এমন কথা নাই যে আগে কনষ্টিটিউশনাল  আইনি ভিত্তি পরে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান – এভাবে পরিস্কার করে কিছু বলা হয় নাই। তবে ঐক্যমত্য কমিশনে যা যা নিয়ে ঐক্যমত হয়েছে তা বাস্তবায়ন এর নিশ্চয়তা কোথায় ও কীভাবে হবে এনিয়ে সাধারণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবার তাদের দল নয়া কনষ্টিটিউশন চাওয়ার দল সেটাই কেবল উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ না কনষ্টিটিউশন না হলে অথবা সংস্কার শেষ হওয়া ও এর আইনি ভিত্তি না থাকলে এনসিপি নির্বাচনে যাবে এমন সোজাসাপ্টা কিছুই সেখানে বলা হয় নাই।   মানে এর এমন মানে করা সম্ভব যে আরেকবার বলিলেই খাইব!  শেষ পর্যন্ত সামনে যাই ঘটুক (আগাম নিশ্চয়তা কিছু পেলে!) আমরা কথিত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনে অংশ নিবই!!! – এমন অর্থ বের করার সুযোগ রেখে দেয়া আছে – জেনে বা না জেনে!
    আর জামায়াতঃ জামায়াতই প্রথম থেকে নির্বাচনের সময়ের তত্বাবধায়ক সরকারের আইনি ভিত্তি না থাকলে “মানবেন না” তা অনেক স্পষ্ট করে বলেছিল।  আর এখন মানে ইউনুসের বক্তৃতার পরে অতটা জোর দিয়ে বলছেন না; যদিও বলেছেন এমনকি নরম করে হলেও না হলে আন্দোলনে যাবেন তা উল্লেখ করেছেন।

    “পিআর পদ্ধতি ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও জানান তাহের।…..
    সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা জানান আবদুল্লাহ মো. তাহের। তিনি বলেন,
    দাবি না মেনে নির্বাচন দিলে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে জামায়াত।”

    আর হাত পাখা ইসলামি আন্দোলন তাদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া একটা ভিডিও ক্লিপ পাওয়া যাচ্ছে। তাতে দেখা যায় তাদের ডাকে নাই, মানে ইউনুস একা একাই সব ঘোষণা করেছেন এনিয়ে তাদের আপত্তি আছে ইত্যাদি।

    তাহলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ইউনুস সাব বুঝেছিলেন যে ঐক্যমত্য কমিশনে কিছুই ঐক্যমত হবেই না। এর চেয়ে কাউকে দুবছরের ঘুষ দিয়ে কাউকে অন্য কিছু বা এককথায় পক্ষগুলোর সাথে আলাদা আলাদা একটা ডিল করে এগিয়ে যেতে হবে। এবং এভাবেই তিনি এপর্যস্নত আগষ্ট পার হয়ে চলেছেন।

    তাহলে কী তিনি সব সমাধান করে ফেললেন?
    এমন বাক্যে জটিলতা টা হল, কোন নির্বাচন হচ্ছে তাহলে ইউনুসকে প্রেসিডেন্ট না তারেককে প্রধানমন্ত্রী? নাকি এর মানে ইউনুস প্রেসিডেন্ট আর তারেক ছোটভাই এমন নয়ত????? এর পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় না। যদিও তারেকের সাথে পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকেরা লন্ডন উড়ে গিয়ে দেখা করছেন – এমন খবরে বিএনপি সমর্থকেরা উতফুল্ল হয়ে উঠেছে! এদিকটা এখনই একেবারেই পরিস্কার নয়। আরো সময় লাগবে!

    কিন্তু একটা গভীরতম কাঁটা মানে একটা পক্ষ এখনও উপরের আলোচনার বাইরেঃ
    সেটা হল আর্মি!
    যতদুর জানা যায় ওয়াকারের মূল সমস্যা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হল, ১৪০০+ মৃত্যুর মুল হুকুমদাতা হাসিনার প্রথম বাস্তবায়ক (বা সেনাদেরকে প্রধান কমান্ড রেস্পনসিবিলিটির দায়) হিসাবে বিচার; যেটা আবার জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের পাঠানো সংশ্লিষ্টদের তালিকা ও বিচারের অনুরোধ এবং বিচার শেষে রিপোর্ট পাঠানোর আদেশ / অনুরোধ / পরামর্শ! এখান থেকে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন। যদিও কথিত ধারণা এখন চলছে যে ইউনুসের আকাঙ্খার নির্বাচন টা সমাপ্ত করে দিতে পারলে ওয়াকারকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে তিনি সম্ভবত আমেরিকায় তাঁর মেয়ের কাছে চলে যেতে দিবেন!  কিন্তু নিশ্চয়তা?  সেটা এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে একেবারেই নাই! কারণ, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক ধরনের ফ্যাক্টর এখানে জড়িত!
    এদিকে তাঁর সঙ্গিসাথীরা মানে ৪৫০ জনের বাকীরা? বিশেষ করে এই গ্রুপের লিডার সিনিয়ার আর্মিরা? এদের ভাগ্য কী হবে সেক্ষেত্রে?  এনিয়ে ইউনুসের কোন ভাবনা / পরিকল্পনা আছে জানা যায় না। সম্ভবত তা নাই!   তাহলে তাঁরা নিউট্রাল বা স্থির হবে কী প্রকারে???? যদিও মুরোদের কথা এদিক থেকে ভাবলে যতটুকু জানা যায় এরা বিদ্রোহ করা বা একটা ক্যাওয়াজ গন্ডগোল লাগাতে পারবে হয়ত কিন্তু সফলতার কোন সম্ভাবনা নাই! এদের অনেকে আবার এখনও ইন্ডিয়ার সাথে সম্পর্কিত; সেকারণে অনেকে মনে করে ইউনুসের পরিকল্পনায় ইন্ডিয়ার ভাগে কিছুই যদি না আসে তবে এসব কথিত বিদ্রোহিরা নিজেদের শক্তিশালী অনুভব করতে পারে। কিন্তু আসল কথাটা যদিও  শক্তিশালী অনুভব আর বাস্তবে শক্তিশালী হওয়া এদুটো এক কথা না!  বরং আকাশ-পাতালের ফারাক!
    যাহোক, সারকথাটা হল, এটা একটা ফ্যাক্টর!
    এখন এই সুত্রে আরেক অংশ মানে ওয়াকার-বিরোধী, এরাও আরো বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু আমার জানা মতে এদের অবস্থান মনোচাব কনসার্ণ বা বক্তব্য নিয়ে ইউনুস আমল করেছেন বা করছেন তা আমার জানা নাই। বরং তিনি ধরেই নিয়েছেন যেন ওরা তো আছেই তাঁকে সমর্থন দিয়ে যাবে মানে তিনি যা করবেন তাতেই!!!!!
    কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন!  সারকথায় বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়, আমেরিকা তাও আবার সেয়ান পাগলা ট্রাম্পের আমেরিকা বাংলাদেশকে যেভাবে দেখতে ছাইবে সাজাতে চাইবে  সেদিন আর নাই। আমেরিকা আমাদেরকে ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিল যাতে ইন্ডিয়া আমাদেরকে নিয়ে যা খুশি করতে পারে। সেদিনও নাই, আমেরিকার সে মুরোদও নাই। সর্বোপরি আমেরিকার সেই আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে অপমান আমরা ভুলবো না শুধু তাই নয় বরং সেই সুত্রে তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান দানব হাসিনার ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিল। আর সেই ইন্ডিয়াসহ সেই দানবকে আমরা উপড়ে ফেলে দিয়েছি। ফলে আবার সেই আমেরিকার কোলে এবার সরাসরি বাংলাদেশকে তুলে দিবার চেষ্টা হলে ইউনুসের দশা-পরিণতি হবে হাসিনার চেয়েও খারাপ! তা বলাই বাহুল্য! একথাটা ইউনুস সাবকে মনে রাখতে হবে!!!! যদিও ইদানিং তার মুভমেন্টে এর ঘাটতি দেখছি আমরা!

    এবার হেড লাইনে সারকথাঃ
    ১। ফেব্রুয়ারিতে কী নির্বাচন হবে? আমরা তো এখনও নিশ্চিত জানি না সেটা কিসের নির্বাচন –  নির্বাহি প্রেসিডেন্টের নাকি জাতীয় সংসদের? সেটা এখনও কেউ জানে না। ফলে অনিশ্চিত!
    ২। আমেরিকা রাষ্ট্রদুত ট্রেসি লন্ডনে তারেককে বুঝাতে গিয়েছিল ইউনুসের হয়ে, সেটা এই বলে যে তারেক যেন ইউনুস সাবের সাথে “ক্ষমতার ছোট ভাই” হয়ে থাকে; কিন্তু সেটা কী তারেক রাজি হবে, পালন করতে? তাই এটাও অনিশ্চিত!
    ৩।  ইউনুস সাবের বাংলাদেশকে একচেটিয়া আমেরিকার কাছে বন্ধক রাখার চেষ্টা কী তিনি সংবরণ করবেন? থামবেন? এটাও অনিশ্চিত! যদিও আরও একটু বাড়লে তিনি উতখাত হওয়ার রিস্ক নিবেন তা বলা যায়!
    ৪। উনি নির্বাহি প্রেসিডেন্ট হতে হলে আইনি ভিত্তি কোথায় পাবেন? যেখানে এখনও কথিত ফেব্রুয়ারী নির্বাচনেরই কোন আইনি ভিত্তি নাই এবং তা অনিশ্চিত?
    ৫। এতদিন পর্যন্ত ইউনুস সাব ‘আর্মি ফ্যাক্টরকে’  উপেক্ষা বা আন্ডার-এস্টিমেট করে চলছেন বলে আমার বুঝাবুঝি! অথচ একচেটিয়াভাবে না আমেরিকা, না চীন এর কোলে উঠানো যাবে না। যারাই বাংলাদেশকে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টাকরতে যাবেন এমন চেষ্টা কে “আর্মি ফ্যাক্টর” প্রতিহত করবেই নিজ স্বার্থে – এটা ইউনুস সাবের বুঝতে পারা উচিত! আর এবিষয়ে সেটা যদি ইন্ডিয়া হয় তো এনিয়ে আর্মির অবস্থান হাসিনাকে উপড়ে ফেলা দেখে যে কারো আগেই বুঝে যাওয়া উচিত! এসব কারণে, যেকোন সময় ইউনুস সাবের ভুলে বা সীমা ছাড়ালে তিনি নিজে ক্ষমতাকে অনিশ্চিত  করে ফেলতে পারেন!

    তাই,  কথিত ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে কিনা-সহ আমাদের জন্য সামনের দিনগুলো সবই অনিশ্চিত!

     

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ০৭ আগষ্ট, ২০২৫    রাত ০৮ঃ৪৮
     

     

     

     

     

  • প্রতি বিপ্লব কী? ওয়াকার ম্যাজিক?

    প্রতি বিপ্লব কী? ওয়াকার ম্যাজিক?
    গৌতম দাস
    ২৭ এপ্রিল ২০২৫  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫১
    https://wp.me/p1sCvy-6rH

     

    আমার অবজারভেশন এটাই প্রতি-বিপ্লব বহনের চিহ্ন, ছবিটা বাংলা নিউজ / কালের কন্ঠ থেকে নেয়া

    দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে বিপ্লব শব্দটা যতটা পরিচিত; আর এটাও বুঝি বা-বুঝি এটা ব্যবহার করতে দেখি আমরা অনেককেই এবং অতি সহজেই। বিশেষ করে এটা যখন “জুলাইয়ের বিপ্লব” বা “আগষ্ট বিপ্লব” বা “২৪ এর বিপ্লব” এর যুগ বা কাল পার হচ্ছি আমরা। কিন্তু ঠিক তার দ্বিগুণ হল আমাদের অজ্ঞতা বা বেখবর!!! কিন্তু কী নিয়ে? সেটা হল বিপ্লব না হয় যা হয় বুঝলাম; তাহলে প্রতি-বিপ্লব, সেটা আবার কী? এমনিতে বিপ্লব এই কথা বা ধারণাটাকে কমিউনিস্ট-প্রগিতির লোকেরা নিজেদের একচেটিয়া মনে করে থাকে। তারাই সবচেয়ে ভাল বুঝে এমনও মনে করে থাকে। তবুও তাদের মধ্যেও দেখা যায় প্রতই-বিপ্লব জিনিষটা কী? কেন তা আসে? কখন আসে? – এসব প্রশ্নে খুব স্বচ্ছ ধারণা রাখেন না। যদিও তারা প্রতি-বিপ্লব কথাটা শুনেছেন এমন দাবি করে থাকে।

    তত্ব কথা প্রতি-বিপ্লব কে বুঝানো যায়; বুঝাবও অবশ্যই। কিন্তু আগে প্রাকটিক্যালি দেখাবো। এর মূল কারণ, আমরা সকলে প্রগতি বুঝি কিংবা ইসলামিজম বুঝি অথবা আম-জনতা যাই হই না যেন বিপ্লব কী তা ৫ আগষ্টের পর থেকে আমরা সবাই বলব আমরা বুঝি। কারণ এটা বাস্তবে আমাদের সবাইকে দেখায়ে দিছে; আগে না জানলেও এখন জেনে গেছি বিপ্লব কী!
    তাহলে প্রতি-বিপ্লব কী?
    এর ইংরাজি হল,  কাউন্টার-রেভেলিউশন [counter revolution] । বুঝাই যাচ্ছে কাউন্টার মানে একটা ঘটে যাওয়া ঘটনাকে উলটা দিকে ঘুরানো।  অর্থাৎ হাসিনা উতখাত উপড়ে ফেলা যদি বিপ্লব তবে এখানে প্রতিবিপ্লব হচ্ছে হাসিনাকে ফিরে ক্ষমতায় বসানো! হা ব্যাপারটা তাই এখানে একটু টুইস্ট বা মোচড় আছে। হাসিনা ক্ষমতায় ছিল ১৬ বছর ইন্ডিয়ান আধিপত্যের প্রতিনিধি হিসাবে। তাহলে হাসিনার উতখাত মানে আসলে তা সেই ইন্ডিয়ান আধিপত্যেরও উতখাত। তাহলে এখানে প্রতিবিপ্লব মানে কেবল হাসিনাকে নয় মূলত একেবারেও মূল শক্তি হচ্ছে ইন্ডিয়ান আধিপত্য একেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা মানে ইন্ডিয়ান আধিপত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এটাই হল মৌলিক দিক!
    আর সেখান থেকেই এতে আরো কিছু ভিন্নতা থাকবে বা দেখব আমরা। অর্থাৎ কেবল ঠিক হাসিনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয় এর বদলে আমরা দেখব মূল শক্তি  ইন্ডিয়ান আধিপত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা তাই।  এটাই প্রতি-বিপ্লব ও প্রতি-বিপ্লবী চিহ্ন বা মূল প্রতীক।

    এবার আর ইন্ডিয়ান আধিপত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এর সাথে আরো দেখব – তারেক জিয়ার বিএনপি, স্পষ্ট করে জামায়াত, ফাঁকে কান্নি মারছে এমন হাসিনার লীগ ইত্যাদি আর সবার উপরে ভাসবে তাদের সমন্বয়ক ওয়াকার।  আর সব মিলিয়ে এরাই হতে যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রতিবিপ্লবী শক্তি!

    এবার আরেকটু সার করে বলিঃ তাহলে ৫ আগষ্ট কে যদি ধরি হাসিনার সাজানো সেনাবাহিনী এর অর্ডার ভেঙ্গে দিয়ে এই সেনা প্রতিষ্ঠানেরই (ওয়াকার বাদে) বাকীদের (মূলত জুনিয়র অফিসারদের) আধিপত্যের বিজয় (যেখানে অসহায় ওয়াকার পুরানা পদপদবীসহই ব্যক্তি মাত্র); আর এটাই মূলত হাসিনার উতখাত ও পলায়নের মূল চালিকা শক্তি। আর পরবর্তিতে এই ঘটনাটাই ৫ আগষ্ট ২০২৪ থেকে ছাত্র-জনতার দ্বারা এন্ডোর্সড বা অনুমোদিত হয়ে যাওয়াতে  পুরা পরিবর্তন টাই একটা বিপ্লব; একটা বিল্পবী চরিত্র নিজে হাজির হয়ে যেতে পেরেছিল। যদিও ভিতরে নানান পকেটে অনেক ধরনের দুর্বলতাও থেকে গেছিল। যেমন ওয়াকারকে উপরে প্রতীকী হলেও রেখে দেওয়া। বাওইরে থেকে ইউনুস সাহেব-কে এনে সরকার প্রধান করে বসানো ইত্যাদি অনেকগুলো দুর্বল-পকেট এতে থেকে গেছিল।

    তবুও অর্থ তৈরির দিক থেকে আবেগ-উচ্ছাসে এটা সবার দিক থেকে এটা একটা বিপ্লবই গন্য হয়েছিল ।   আর এই বিপ্লব ও এই বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রথম বিরুদ্ধচারণ শুরু করেছিল ইন্ডিয়া ও মোদি। এদিকটা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা বুঝা যাবে। এতবড় সধিপয়ত্য হারানো মূল শক্তি প্রতিবিপ্লব বা বিরোধিতার মূল হাল ধরবে তা বলাই বাহুল্য! কিন্তু এর সাথে সহযোগী হবে তারেকের বিএনপি, আগা-পিছা করা জামায়াত (যার শুরুটা হয়েছিল ইসকন-চিন্ময় আর এদের গলা জড়িয়ে ধরে চুমা দেয়াদের কে দিয়ে)। ওদিকে সেনা প্রতিষ্ঠানের ভিতর বিজয়ী শক্তিরো যতটা সম্ভব খামতি পূরণ করে পয়লা স্ত্র পেরিয়ে নিজেদের সংহত হয়ে দারাতেই নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ লেগে যায়।
    কিন্তু সবচেয়ে বড় আরেক দুর্বলতা ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে থাকে। সেটা হল, খো ইউনুস সাব, আসিফ নজরুল ও অন্যেরা। এদের কাজটা ইনোসেন্ট বা নিস্পাপ অজ্ঞতা বলবেন হয়ত অনেকে। কিন্তু এটা আসলে বাচ্চাদের আপাত নির্দোষ পুকুরে ঢিল মআরা যেটা পুকুরের ব্যাঙের দিক থেকে প্রাণঘাতি, এরকম।  না ইউনুস না তার মন্ত্রীসভা (উপদেষ্টারা) কেউই প্রতি-বিপ্লব ব্যাপারটা কী তা আমল করেন নাই শুধু তাই না প্রায় অযোগ্যও বটে। কিন্তু এটা যে গণমানুষ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে বাঁচামরার সেখবর তাদের নাই। এরই প্রমাণ হল, মুজিবের ছবি অবলীলায় মাথার উপরে টাঙাতে অসুবিধাবোধ না করা, লীগেরও রাজনৈতিক অধিকার দিতে ব্রি. শাখাওয়াত প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাচাল কথাবার্তা ও অপসারিত হওয়া অয়থবা ধরেন খোদ ইউনুস সাবের সস্তায় ইলিশ মাছ খাওয়ার রাষ্টড় ও সরকার প্রধান হয়ে থাকার লক্ষ্য নির্ধারণ……!!!  আমাকে বারবার লিখতে হপ্যেছে ক্ষমতা কী? রাষ্ট্রক্ষমতা মানে মারো নাহলে নিজে মরো! ফ্রেন্ড-এনিমি টনটনে বোধ! আগেই আপনাকে নির্মম্ভাবে আপনার ক্ষমতার এনিমি কে মারতে হবে নইলে পরে শত্রুর হাতেই নিজে উতখাত হতে হবে!! ক্ষমতা মানে এটাই।
    এটাই বিপ্লব কে রক্ষা করা! ফলে হয় মারো নয়ত মরো! বিপ্লব কে সুরক্ষা দাও আর নয়ত প্রতি-বিপ্লবে মারা যাও!  একথাতাই কখনও ইউনুস সাবকে পরিস্কার বুঝানো যায় নাই আধা-বুঝ ভাবে উনি থেকে গেছেন। আর ততই উনি মটিভেশন আর স্পিচ নিয়ে নিজের ক্যারিসমা দিয়ে সব জয় করতে রওনা দিয়েছেন। প্রতিবিপ্লব বুঝাতে যান নাই।  এমনকি আমি বলে আপনি নিজেও মারা পড়তে পারেন এই ভাল-ভালাইয়াতে! ক্ষমতা ভাল-ভালাইয়ার জিনিষ নয়।

    যাই হোক, আজ “জেনারেল ওয়াকার ম্যাজিকে গণমানুষের উচ্চাশা” – এই শিরোনামে যে আর্টিকেল ছাপা হয়েছে কালেরকন্ঠ সহ বসুন্ধরা, বাংলাভিষন ও এলাইক মিডিয়াতে একযোগে এতাকে আমি মনে করি আরো ঘনিভুল হয়ে আবার দাড়ানো এক প্রতিবিপ্লবী পরিকল্পনা হিসাবে। ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা বলবেন হয়ত অনেকে।

    সরকার প্রধান হওয়া তুলনামূলক সহজ কিন্তু যদি আপনার প্রতি-বিপ্লব ঠেকানো কাজটা কী ও কেন? – এমন ধারণা নাই থেকে থাকে ?????
    তবে আপনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে নিজের জন্য, দেশের ও গণস্বার্থ রক্ষার দিক থেকে বিপদজনক! তাই আপনার উচিত এদিকটা রাষ্ট্রক্ষমতা রক্ষা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য  “উপযুক্ত” যাকে ইউনুস সাব আপনার কম্পাটাবল মনে হয়;  তাকে বিশেষ এসাইনমেন্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত করে দিতেই পারেন। বলাই বাহুল্য তিনি ওয়াকার সাব নন! নির্দিষ্ট সময়-অন্তে এর রিভিউ ও অগ্রগতি মনিটর মিটিংয়ের ব্যবস্থাও রাখতে পারেন।


    লেখকঃ

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com


    সবশেষ আপডেটঃ  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৩৫,    ২৭ এপ্রিল ২০২৫

  • সম্প্রতি বদরুদ্দিন উমর সাহেব ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে

    সম্প্রতি বদরুদ্দিন উমর সাহেব ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৫ এপ্রিল ২০২৫
    https://wp.me/p1sCvy-6qi

     

     

     

     

    [বদরুদ্দিন উমর আমাদের প্রবীন রাজনীতিবিদের মধ্যে অন্যতম যাকে আলাদা করে চেনা যায়।  এখন ৯৪ বছরের উর্ধে তাঁর বয়স। ৫ আগষ্ট-উত্তর মানে, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি উত্তরকালের এসময়ে, গত দুদিন আগে ২২ এপ্রিল ২০২৫ তার এক সাক্ষাৎকার ছেপেছে প্রথম আলো। সেখানে পরিচিতি অংশে লিখেছে, …”বদরুদ্দীন উমর লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক। ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পিপিই ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন”……”তিনি (উমর সাহেব প্রথম আলোতে) কথা বলেন চলতি আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়া নতুন দল, অন্তর্বর্তী সরকারের করণীয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে“। আমি প্রথম আলোর সেই পরিচিতিটাই এখানে তুলে দিলাম। এই পরিচয়টা সম্ভবত উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া। সেখানেই উমর সাহেবের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে লেখা রয়েছে যে তিনি “একজন বাংলাদেশি মার্কসবাদী–লেনিনবাদী তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক সক্রিয়তাবাদী, ইতিহাসবিদ, লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (উমর)-এর নেতা”। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তবে উমর সাহেব হলেন ষাটের দশকে প্রথম্ভাগে (১৯৬৪) বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন মস্কো-পিকিংয়ে ভাগ হয়ে গেলে তিনি পিকিং ধারার অংশে পড়েন। যেটা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে মো. তোয়াহা গ্রুপের অংশের আর সেটাও তিনি সম্ভবত ত্যাগ করে নিজের ধারা গড়েন ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময়কালের ভিতরেই। পেশা এবং কর্মততপরতা দিক থেকে দেখলে তিনি মূলত একাদেমিক রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশে প্রকাশিত ইতিহাস-বিষয়ক বই-পুস্তকের একটা বড় অংশ জুড়ে তাই তাঁরই রচনা।  এখন যাদের বয়েস ২০ বছরের উপরে সেই প্রজন্মের কাছে তাঁর নুন্যতম কিছু পরিচয় করিয়ে দিতে আমার লেখার প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে খুবই অল্প কিছু কথা লিখলাম।]

    আমার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে পড়াশুনা শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে তখনকার প্রকাশনা জগতে পাওয়া তার লেখা বই পাঠের মধ্য দিয়ে।  আগেই বলেছি প্রথম আলোতে এই সাক্ষাতকারে তিনি চলতি আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়া নতুন দল, অন্তর্বর্তী সরকারের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন।  তার সেসব কথা বলায় আরেক রেলেভেন্সি বা গভীর সংশ্লিষ্টতা দিকটা হল, হাসিনার উন্মাদপ্রায় হয়ে নিজ কথিত বাবার ইতিহাস জোর করে লিখবার একটা গভীর ঝোঁক ছিল যা থেকে তৈরি বিশৃঙ্খলায় আমরা সকলেই অস্বস্তি অনুভব করেছি। যেমন  তা্র একটা হল যেমন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভাষা আন্দোলনও শেখ মুজিবই করেছেন বলে হাসিনার দাবি ও সেভাবে নয়া ইতিহাস রচনার চেষ্টা। যেটা সেসময়ের ঘটনাবলী নিয়ে প্রত্যক্ষ গবেষক হিসাবে সেই অথরিটিতে উমর সাহেব নিয়মিতভাবে হাসিনার দাবির বিরোধিতা ও নাকচ করে গেছেন সাহসের সঙ্গে!  তাই অনুমান করি হাসিনা উতখাতের পরে এটা তারও একটা অর্জন তো বটেই। অন্তত সেই উতপাত তাঁকে বা আমাদেরকে আর মুখোমুখি হতে হবে না এটাই শান্তি!

    রাজনৈতিক ইতিহাসের বয়ানে পরিভাষাঃ
    প্রত্যেক দেশেই রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষ করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের লিখিত ইতিহাসের বয়ান ভাষ্যে শব্দ বা পরিভাষা [Terminology] তৈরি হয়ে যায় যেটার সহসা বদল হয় না। যদিও লম্বা সময় পরে  নয়া পরিভাষা তৈরি হয়েও যেতে পারে’ বাংলাদেশে হয়েছেও বলে আমার ধারণা। যেমন আমার কথাই যদি বলি উমর সাহেবদের প্রজন্ম আমার চেয়েও কমপক্ষে ৩০ বছরের সিনিয়র; কিন্তু আমি তাদের প্রজন্মের পরিভাষা সম্পর্কে পরিচিত যদিও এই আমি আবার পরবর্তি প্রজন্মের পরিভাষা সম্পর্কেও পরিচিত।  যেমন একটা উদাহরণ যদি দেই উমর সাহেবের প্রজন্ম – ব্যবহার করতে ভালবাসেন – “সামাজিক বিপ্লব” শব্দটা। মানে বিপ্লব মানেই একে সামাজিক [social] বিপ্লব বলে তাঁরা ব্যতিক্রমহীনভাবে লিখে থাকেন। আর একালে আমাদের ধারণা, বিপ্লব বলতে তা তো আসলে এসেনসিয়ালি পলিটিক্যাল রেভেলিউশনই (রাজনৈতিক বিপ্লবই)। যদিও যেকোন রাজনৈতিক বিপ্লবই এরপরে এর প্রভাবে পরে আনুসাঙ্গিক আরো অন্যান্য সামাজিক নানা বিপ্লবও ঘটাবে অবশ্যই!

    এখানে আম পাঠকের জন্যও একটু জানায় রাখি যে বিপ্লব বলতে ঠিক কী বুঝব? আমার বুঝাবুঝিতে বললে প্রথম মনোযোগ জড়ো করতে হবে যেখানে তা হল, ইভোলিউশন [evolution] আর রিভোলিউশন[revolution] সম্পর্কে। প্রথমটা মানে হল, কর্তা মানুষ [subjective] যা করে নাই; মানে, প্রাকৃতিকভাবে বা নেচারালি যা ঘটেছে। এই অর্থে এটা অবজেক্টিভলি [objectively] ঘটা ঘটনাও বলা যেতে পারে। দুনিয়ার সব প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ঘটনাবলী ঘুর্ণঝড়, জলোচ্ছাস, ভুমিকম্প এর মত ঘটনাবলী যেগুলা ওসবই  ইভোলিউশন এর ঘটনা বলা যায়। আর এর বিপরীতে কর্তা মানুষ যেসব পরিবর্তনকে আর প্রাকৃতিক থাকতে দেয় নাই, ঘটনায় মানুষ-কর্তা সক্রিয় হাত ঢুকিয়ে পরিবর্তনে প্রভাব ঘটিয়েছে, নতুন মাত্রা দিয়েছে, জোর খাটিয়ে সুনির্দিষ্ট ডিরেকশনে পাঠিয়েছে, পুরানা অভিজ্ঞতায় জেনে-বুঝে যা বুঝেছে ঘটিয়েছে – এটাই হল রিভোলিউশন। তাই রিভোলিউশন মানেই যেখানে সচেতন কর্তা মানুষ হাজির আছে। আর তিনিই বিপ্লবী তা, বলাই বাহুল্য!

    এরপর আরেকটা পরিভাষাঃ পলিটিক্যাল বা পলিটিক্স মানে কী? ঠিক কী বুঝব?
    মানুষ হিসাবে আমরা অনেক কিছু করি, বিশেষত পরিচয় দেই বা পুর্বনির্ধারিত কারণ বা পরিচয়-বৈশিষ্টগত কারণে তা করে থাকি। যেমন, আমাদের প্রজাতিগত বা রেস [race] পরিচয় য়াছে অথবা পরবর্তি ইতিহাসে মানে মানুষের প্রথম কৃষিকাজ শিখে ফেলার পরের কোন ভুপ্রাকৃতিক-অঞ্চলে স্থির হয়ে বসবাস শুরুর পরের হাজার বছরের মধ্যে আমাদের একটা নয়া এথনিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্থায়ী পরিচয়-বৈশিষ্ট লাভ করা হয়ে যায়। মজার কথা হল এই পরিচয় বা বৈশিষ্টগুলো মানুষের জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। মানে যেমন আমি মুসলমান বা বাঙালি হব কিনা এটা আমি ঠিক করি নাই, চয়েজ করি নাই, এতে আমার কোনই ভুমিকা নাই, ছিল না। বরং আমি যে ঘরে জন্ম নিয়েছি, যে পিতামাতার ঘরে ও তাদের রক্ত বা ডিএনএ-তে আর তাদের যে এথনিক পরিচয়ের মধ্যের আমার জন্ম – এতে আমার জন্মের পরে আমার রেসিয়াল-এথনিক-ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সব পরিচয় কী দাঁড়াবে তা এসবের মধ্য দিয়ে আমার জন্মের আগেই ঠিক হয়ে গেছে।  সবচেয়ে বড়কথা এতে আমার নিজের কোন সক্রিয় ভুমিকা নাই, ছিল না।
    আর ঠিকএর বিপরীতে পলিটিক্স, পলিটিক্যাল বা রাজনৈতিক পরিচয় হল সেটা যেটা আমি নিজেই এবং সচেতনে জেনে-বুঝে কোথায় যাব বা পৌছাবো তা জেনেই তৈরি করেছি। মানুষের  জন্মের থেকে নির্ধারিত রেসিয়াল বা এথনিক বৈশিষ্টকে যদি বলি গিভেন [ GIVEN বা আগে থেকেই দেয়া আছে] বৈশিষ্ট-পরিচয় তাহলে এর বিপরীতে, পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট মানে হল যা মানুষ নিজেই এবং সচেতন [conciousness] ও সক্রিয় [active] ভাবে নিজেই নিজেকে নির্মাণ করে নেয়  – গিভেন যা আছে তা আছে এর বাইরে; কিন্তু এসবের উপর ভরসা না করে।  বা তার প্রভাবের কারণে নয় নিজ সক্রিয়তায় মানুষ যা নির্মাণ করে সেটাই মানুষের পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট। আর মানুষের পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট মানেই তাই  মানুষের নিজ পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট। নিজে নির্মিত।  এবং মানুষের পলিটিক্যাল এক্টিভিটি এটাই পলিটিক্স বা রাজনীতি।  রাজনৈতিক ততপরতা।

    এই ফাঁকে সুযোগ নেই একটু। তাহলে পলিটি [polity] কী?
    এর সোজা অর্থ পলিটিক্যাল কমিউনিটি।মানে? মানে হল, একটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি গড়ে নিজেদের পলিটিপ্রকাশ করা করে নিতে পারি আমরা।  অনেকে অবশ্য এই পলিটি শব্দের [polity] বাংলা করে রাজনৈতিকতা।
    সেটা আবার কেমন?
    যেমন,  পলিটিক্স মানে আবার কিন্তু আইডিয়া [idea]। অনেকে এটাকে সিরিয়াস অর্থে “ভাব বা গভীর ভাব” বলে। মানে এটা আবার “ভাব দেখানো” নয় কিন্তু।  আমি এরচেয়ে বরং আরেকটা ভাল বাংলা শব্দ আছে; যা ব্যবহারে অনেকেই সাহস করে না, নিশ্চিত না বলে সে শব্দটা হল “চিন্তা”। ইংরাজিতে আইডিয়া মানে হল চিন্তা। অর্থাৎ ফিলসফি-ক্যালী বা দার্শনিক অর্থের দিক থেকে,  পলিটিক্স মানে হল “চিন্তা“।

    তা হলে এবার পলিটি বা রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়া বা হয়ে উঠা বলতে ঠিক কী বুঝব?
    বুঝব যেঃ রাজনীতি বা পলিটিক্স – এই কাজ একা করা যায় না। রাজনৈতিক বৈশিষ্টের অধিকারীরা ( আমাদের সব গিভেন বৈশিষ্ট পাশে ফেলে রেখে) আমরা একা একাজ করতে পারি না। সমাজ বা কমিউনিটিতে চর্চা করে হতে হয়।  এখন সারা সমাজে যখন সচেতন ও সক্রিয় মানুষেরা  ততপরতায়  চর্চায় (সব ‘গিভেন’ বৈশিষ্ট পিছনে ফেলে রেখে) এক পলিটিক্যাল কমিউনিটিতে নিজেদের হাজির করে ফেলতে সক্ষম হয় – এটাই পলিটি কায়েম করা বা হয়ে উঠা।

    কিন্তু এখন এই পলিটি কোন কাজে লাগে? খায় না মাথায় দেয়? এর দরকারটা কি?
    উলটা করে জবাব দিবার সুযোগ নিব। রাষ্ট্র মানে আসলে জনগণের রাষ্ট্র মানেই, রিপাবলিক রাষ্ট্র [কিন্তু এটা কমিউনিস্ট চিন্তা-পরিক্রমার বাইরের ঘটনা]। এই রাষ্ট্রচিন্তার স্ফুরণ – গ্লোবাল ইতিহাসে দেখলে, এটা মানুষের মধ্যে এসেছিল ১৬৫০ সালের দিকে বা এরপরে এবং ইউরোপে (আমেরিকাতেও নয়)। আর এটা নিজেকে নুন্যতম পরিশুদ্ধ, অসংলগ্নতা কাটিয়ে আর সৎ বা ন্যয়সম্মত -উপস্থাপনে হাজির হতে হতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪৫) পার হয়ে যায়। সে যাই হোক, এমন রিপাবলিক রাষ্ট্র মানেই সেখানে আবার কনষ্টিটিউশন বলে কিছু একটা থাকতেই হবে। এখন  কনষ্টিটিউশন [constitution]  শব্দের রুট শব্দটা হল কনষ্টিটিউট [constitute]। এর বাংলা করতে পারি গঠন– নিজেদেরকে গঠন করা – গঠিত করে নেয়া – এটাই সংগঠিত [organise] করে নেয়া অর্থে।  আর এটাই পলিটি বা পলিটিক্যাল কমিউনিটিতে নিজেদের গঠন বা কনস্টিটিউট করে নেয়া। যার আউটকাম বা ফলাফল হল একটা কনষ্টিটিউশন এর জন্ম দেয়া। এটা এক অর্থে পলিটি বা পলিটিক্যাল কমিউনিটির পরস্পরের সাথে চুক্তি বা বোঝাপড়া (আন্ডারস্টান্ডিং) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া যেমন এই যে আমরা এই এই জিনিষ মানুষের অধিকার মনে করি এবং আমরা সেটা রক্ষার্থে পরস্পর পরস্পরের পাশে এসে দাড়াবোই; এরকম। তাহলে সারকথায় একটা জনগণের রাষ্ট্র তখন কায়েম হবে ও কাজ করতে পারবে যখন ওর পিছনে একটা পলিটিবা পলিটিক্যাল কমিউনিটি আগেই গড়ে নিয়ে খাড়া হয়ে আছে।  তাই ঐ রাষ্ট্রে আমাদেরকে কনষ্টিটিউট বা গঠন করামানে সেটাই একটা কনষ্টিটিউশন জন্ম দিয়ে ফেলা  –  এভাবে এগুলা সব আসলে একই কথা।

    এখন আসবো প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নঃ
    উপরে লেখার শিরোনাম বলছে এটা বদরুদ্দিন উমরের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে কোন রচনা; তাহলে সেসব কোথায়? আর এতক্ষণ যা লিখলাম সেসবের সাথে এর সম্পর্ক কী?

    সেদিকে এখন যাব। তবে সবার আগে বদরুদ্দিন উমর সাহেব কে গভীর সম্মান, শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে শুরু করতে চাই। তিনি আমাদের মুরুব্বি, আমাদের অগ্রজ – আমার থেকেও যদি বিচার করি তাহলেও তিনি আমার চেয়ে ৩০ বছরের পুর্ব-প্রজন্ম! ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে গিয়ে একালে বসে ভিন্নভাবে দেখে কিছু কথা এখানে তুলবো এই ভরসা যে তিনি আমাকে পাশে এক ভিন্ন একালের দৃষ্টিভঙ্গি বলে জায়গা দিবেন, বেয়াদবি নিবেন না।

    যেমন ধরেন,  উমর সাহেব এই সাক্ষাতকারে প্রথমেই বলছেন, “…… এই যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, এটা তো কোনো সামাজিক বিপ্লব নয়, যদিও এর মধ্য দিয়ে একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে”।
    পাঠক লক্ষ্য করবেন এই সামাজিক বিপ্লব বলা – [মানে রাজনৈতিক বিপ্লব না বলে, এটা তাদের প্রজন্মের কথা বলার রেওয়াজ। তাঁরা ব্যতিক্রমহীনভাবে বিপ্লব মানেই সেটাকে সামাজিক বিপ্লব বলে লিখে থাকেন।] আর একালে আমাদের ধারণা, বিপ্লব বলতে তা তো আসলে এসেনসিয়ালি পলিটিক্যাল রেভেলিউশনই (রাজনৈতিক বিপ্লবই)। যদিও যেকোন রাজনৈতিক বিপ্লবই এরপরে এর প্রভাবে প্রায় সবখানেই এর আনুসাঙ্গিক সামাজিক নানান দিকে বিপ্লবও ঘটাবে, অবশ্যই। আর সেসব থেকে এটা সামাজিক বিপ্লবও ঘটেছে পরে তা বলা যাবে। তবে প্রথমে যেটা ঘটবে বা ঘটে থাকে সেটা রাজনৈতিক বিপ্লব। তবু উনারা ব্যাপারটাকে  সামাজিক বিপ্লব এভারেই বলে থাকেন। আসলে এটা হল তাদের আকাঙ্খায় যেটা কমিউনিস্ট বিপ্লব সেটাই বুঝাতে চান। বা তা না হলেও একটা প্রগতিশীল বিপ্লব এমন কিছু একটা। আর সেই তুলনায় আগষ্ট ২০২৪ সালে হাসিনার উতখাত এটা তার বিপ্লব বলে যে আকাঙ্খার নামকরণ এর  ধারেকাছের কিছু নয় বলেই তারা মনে করে থাকেন। তবে তিনি খুবই পরিস্কার নিজের আকাঙ্খা মত তা না হলেও এটাকে তিনি অর্জন মানেন।  তাই কোন কার্পন্য না করে তিনি বলছেন, .“…..একটা নিষ্ঠুর ফ্যাসিস্ট সরকার অক্টোপাসের মতো দেশকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেটা উৎখাত হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের এটা একটা খুব বড় অর্জন”।

    আবার এরপরের প্যারায় নিজের আকাঙ্খার দিকে নজর ফিরাচ্ছেন। বলছেন, “…কিন্তু এই সংগ্রামের তো কোনো শ্রেণি–পরিচয় নেই, এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না। একটা রিগ্রেসিভ (নিপীড়নমূলক) সরকারকে ফেলে দিয়েছে এই অভ্যুত্থান। যারা ফেলে দিয়েছে, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল না। যারা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই ছাত্রদের মধ্যে তত্ত্বগত বোঝাপড়া খুব একটা আছে, সেটাও দেখা যাচ্ছে না”।

    আসলে তিনি বলতে চাইছেন, ছাত্রদের মাথায় কমিউনিস্ট চিন্তা নাই। এখানে বলে রাখি, উমর সাহেবদের প্রজন্ম  বিপ্লব মানে তাদের সামাজিক বিপ্লব মানেই কিন্তু তা কমিউনিস্ট বিপ্লব! এভাবে একমাত্র বলে বুঝে থাকেন।  তাও আবার সেটা শ্রেণী সংগ্রামের হতে হবে, রাজনৈতিক (কমিউনিস্ট) তাত্বিক ভিত্তির হতেই হবে। এছাড়াও – এতে  শ্রেণীর পরিচয় থাকতে হবে ইত্যাদি।
    আসলে এগুলো হচ্ছে তাদের মাথায় গেথে বসে থাকা একটা বিপ্লবী ছক বা ইমেজ, যেটা একটা ইমাজিনেশন বা স্বপ্ন-কল্পনার মত। যেটা প্রায় তাঁর বয়সের সমান বয়সী এক কল্পনা মাত্র! এজন্য এটা এক কল্পিত আকাঙ্খা! তবে একটা কথা এখানে নিশ্চিত করেই বলা যায় এটা বিপ্লবের এক আইডিয়েল [ideal] চিন্তা। আইডিয়েল মানে যেটা রিয়েল [real] নয়, রক্তমাংসের বাস্তব মানুষের মত বাস্তব নয়; এই অর্থে। যেটা অবশ্য আইডিয়েল বনাম রিয়েল এর ফারাক জানা  থেকে বুঝতে হবে।

    কিন্তু সেই প্রজন্মের কমিউনিস্ট চিন্তা কেন এমন আইডিয়েল হলঃ
    এর প্রথম কারণ হল যা কিছুই ১৯৪৫ সালের আগের উতপত্তি হওয়া চিন্তা, তা এমনই হবে। হতে বাধ্য।  কারণ, জাতিসংঘের মত গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার বা গ্লোবাল অর্ডার শৃঙ্খলা বলে কিছু  এর আগের কালে জন্মায় নাই। যে কোন যুদ্ধ, আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার যুদ্ধ বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় তা যেটাই হোক সে যুদ্ধ কোন আন্তর্জাতিক নিয়ম-আইন মেনে হতে হবে এমন কোন গ্লোবাল অথরিটি (জাতিসংঘের মত) এর আগে ছিল না; জন্মই হয় নাই। এমনকি রেডক্রস ধরনের প্রতিষ্ঠানও ছিল না। যুদ্ধবন্দী বলে কোন ধারণা নাই, যুদ্ধেও পালনীয় আইন বলে কিছু ছিল না। আর সবচেয়ে বড় কথা হিউম্যান রাইট বলেও কোন ধারণা বা প্রতিষ্ঠানই তখন ছিল না। জন্ম হয় নাই।
    এখন মজাটা হচ্ছে, একালে এসেও কমিউনিস্ট চিন্তায় মানবাধিকার বলে কিছু নাই; যেটা [জাতিসংঘের (১৯৪৫) জন্ম,] আর (১৯৪৮ সালে) হিউম্যান রাইট চার্টার এর জন্ম হয়ে গেলেও কমিউনিস্টেরা নির্বিকার; তারা  এটা গ্রহণ-বর্জন কিছুই করবে না। অংশও নিবে না। বেশি জোড়াজুড়ি করাতে ১৯৬৬ সালে এসে জাতিসংঘের ফ্রেমে তারা হিউম্যান রাইটের এক নতুন কমিউনিস্ট সংজ্ঞা দিয়ে বসে যে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিতসা ও বাসস্থান হল নাকি মানবাধিকার????  অধিকার শব্দটাই যে একটা রাজনৈতিক ধারণা;  আর সেই সাথে রাজনৈতিক ধারণা আর অর্থনৈতিক ধারণা বলে যে দুটা মোটা  ক্যাটাগরি খেয়াল রেখা কথা বলতে বা চিন্তা করতে হবে সেটা কমিউনিস্টেরা এখনও আমল করতে রাজি হয় নাই, নিজেরাও আমল করতে শিখে নাই। মূলকথা বৈষয়িক মানুষ আর রাজনৈতিক মানুষ এদু্টা যে শার্প আলাদা বুঝ তা এরা আমল করতে পারে না এখনও!

    খেয়াল করলে দেখব, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিতসা ও বাসস্থান এগুলা মানুষের বৈষয়িক চাহিদা। এগুলা বৈষয়িক চাহিদা মাত্র। তাহলে পলিটিক্যাল মানে কী? আর অধিকার মানেই তো সেটা পলিটিক্যাল ধারণা পলিটিক্যাল চাহিদা সেদিকে বুঝতে যেতে হবে। না, এগুলো মার্কস তো নয়ই লেলিনের আমলেও এগুলো আমলযোগ্য ধারনা হতে পারে নাই। এর উপরে দুইটা আরো বড় বড় প্রবলেম বা বাধা আছে। এক. শ্রেণীবোধের ধারণায় বিশেষ করে শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণায়। শ্রেণী বুঝ দিয়ে সমাজ ব্যাখ্যা করেন তত্ব সাজান বড় সমস্যা হবে না হয়ত চলবে কোনভাবে। কিন্তু যখনও কমিউনিস্ট বুঝ থেকে শ্রেণীর একনায়কত্বের রাষ্ট্র বানাতে যাবেন মানে শ্রমিক শ্রেণী ক্ষমতায় গেলে অন্য সকল শ্রেণীকে (আবার যাকে ইচ্ছা তাকে অপর সব শ্রেণী আপনার শত্রু শ্রেণী ঘোষণা করে দিতে পারবেন) গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সবকিছু করতে পারবেন তখন সব শেষ।  [এখনও কমিউনিস্ট চীন যেমন সিটিং প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে গুম করে রেখে দিয়েছে।] ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীরা  নেতা মানে ক্ষমতায় থাকা হাসিনা যেমন কাজেই তিনি যাকে রাজাকার (বা জঙ্গী) ট্যাগ দিবেন তাকেই তিনি  গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সবকিছু করতে পারবেন। এটাই তো ছিল ১৫ বছরের হাসিনার [চেতনা] শ্রেণীর রাষ্ট্র!!!!
    সোজা কথায় বললে, কমিউনিস্টেরা এখনও অধিকার শব্দটা নিয়ে কী করবে না করবে জানে না। ফলে তাদের রাষ্ট্র ধারণায়, সকল শ্রেণীর (নাগরিক) অধিকার বলে কিছু থাকে না। বরং সুনির্দিষ্ট কেবল ক্ষমতাসীন শ্রেণীরই যাখুশি অধিকার থাকে ?
    এর উপর আবার শ্রমিক শ্রেণী বা এর নামে যারা ক্ষমতায় থাকবে তারা কী কী করতে পারবে, কাকে কাকে বুর্জয়া বলতে পারবে তার কোন নির্ণায়ক কী কোথাও লেখা থাকবে? বিচার বিভাগ বলে কিছু থাকবে? কনষ্টিটিউশন বলে কী কিছু থাকবে? কোন কমিউনিস্টই তা জানে না। কেউ বুর্জোয়া কিনা তা কে কীভাবে সাব্যস্ত করবে???
    আসলে সমস্যা হল, খোদ মার্কসের মাথাতেই রিপাবলিক বলে কোন ধারণা ছিল না। তার শ্রেণীবোধের তলে সব ঢাকা পরে গেছিল। এছাড়াও বাস্তবত ১৯১৬ সালের পরে আর কোন তাত্বিক লেখা বা বইই নাই। লেনিন মারা গেছে ১৯২৪ জানুয়ারিতে। ফলে যা কিছু ইস্যু এরপরে এনিয়ে কমিউনিস্টেরা বিভ্রান্ত। সাথে এর আগের যা কিছু (চিন্তাগত) খামতি ছিল তা সহ!

    কমিউনিস্ট চিন্তা আরেক বিশাল গ্যাপ হল, ক্ষমতা ধারণা। মানে রাষ্ট্রক্ষমতা ধারণা।

    কথাগুলো বললাম এজন্য যে  হাসিনা উতখাতে যে পালটা ক্ষমতাকে জন্মাতে ও কাজে সফল হতে হয়েছে- সেটা তো সবাই বুঝতে পারে যেটা সেনাবাহিনীর ভিতর থেকে এসেছে। তবু মানুষ ভাবতে ভালবাসে সে ছাত্র-জনতাই সব করেছে! যেটা উমর সাহেব তার দৃষ্টিকোন থেকে  প্রশ্ন তুলছেন, সেই ছাত্রদের শ্রেণী পরিচয় কী?  বলেছেন, তাদের তো শ্রেণি–পরিচয় নেই,  (অতএব) এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না।
    উমর সাহেব এর শ্রেণীবোধের চিন্তার বিচারে – “তাদের তো শ্রেণি–পরিচয় নেই” বললে আমরা বুঝতে পারি ১৯৪৫ সালের আগের চিন্তায় বা পরে আর কখনও শান না দেয়া চিন্তায় তিনি ঠিক কী বলছেন তা বুঝা যায়।
    কিন্তু  যখন বলছেন, জুলাই-আগষ্ট ২০২৪ এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না – এখানে এসে বিনীতভাবে বলতে চাই এটা বোধহয় তার অসতর্ক মন্তব্য!
    কারণ তাহলে “আজ পর্যন্ত দুনিয়ার সব ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস” – কার্লমার্কসের একথার অর্থ থাকে না। মানে কার্ল মার্কসের জন্ম হওয়ার আগের ইতিহাসও তো শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস – এটা তাহলে কেমনে হবে?? সেই প্রশ্ন উঠবে।

    যা হোক এসব খুচরা তর্ক থাক। সমস্যার কথা বলি। একালে আমাদের আর্মি সহ রাস্তায় আন্দোলনকারীদেরসহ সবাইকে হাসিনা উতখাতের লড়াইয়েও হিউম্যান রাইট ইস্যুটা কীভাবে সক্রিয় ছিল তা খেয়াল রাখতে হয়। নইলে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় আমরা করতে ব্যর্থ হতাম। যা একালের যেকোন পরিবর্তনে একটা বড় বিবেচনা। আমাদের আর্মির বেলায় এটা তো আরো মারাত্মক! জাতিসংঘের মানবাধিকার না মানলে তারা আমাদের আর্মিকে মিশনে অংশগ্রহণ থেকে বের করে দিবে – যেটা আসলে এক বিরাট ফাইন্যান্সিয়াল বোঝা হয়ে আমাদের সামনে হাজির হত তাহলে। ফলে ক্ষতিও। কারণ, আমাদের গরীবী পেমেন্ট পাওয়া সাধারণ সৈনিকদের কাছে তাদের মিশন বন্ধ হলে তাদের জীবনের সব আশার প্রদীপ নিভে যাবে। ফলে ইউএন এর কথা খেয়ার রেখে হাসিনা উতখাতে তাদের অংশ নিতে হয়েছে। আবার বিজয়ের পরে তাদেরকে কোন ক্রেডিটই দেয়া যাচ্ছে না। সবই ছাত্র-জনতা বলে এর আড়ালে রেখে দিতেই হচ্ছে।

    এসব দিকগুলো উমর সাহেবদের ইমাজিনেশনের যে বিপ্লব ধারণা যেটাকে আমি আইডিয়াল ধারণা বলছি যেটা একালে ২০২৪ সালে এসেও এটাকে রিয়েল ধারণা নয় বলছি। একালে আন্তর্জাতিক নানান প্রতিষ্ঠান সুবিধা-অসুবিধা দুটাই মারাত্মক! কাজেই বিপ্লব নিয়ে আবার সেটা আইডিয়েল না, রিয়েল ধারণায় ইমাজিনেশন করতে হবে। এককথায় চিন্তার বিভিউ। পুনঃর্গঠন লাগবে। নয় কী!

    আর এই সাক্ষাৎকারটা ছিল অনেক ছোটই। তবু এই ছোট পরিসরে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত শব্দ হল, রাজনৈতিক বা পলিটিক্যাল শব্দটা! কিন্তু কেন? কেন সামাজিক বিপ্লব বলছেন রাজনৈতিক বিপ্লব বলছেন না কেন? এটা আমাদেরকে ভাবতে হবে, আগামী প্রজন্মের জন্য চিন্তার এসব দিকের এক ব্যাপক রিভিউ লাগবে।

    সবকিছুতেই শ্রমিক-কৃষক দিয়েই বুঝতে হবে কেনঃ
    উমর সাহেব বলছেন, “কোটার বিরুদ্ধে বৈষম্য না হয় বুঝলাম, সামাজিক বৈষম্য বলতে তারা কী বোঝে? তাদের এখন পর্যন্ত দেশের কৃষক, শ্রমিকের পক্ষে কোনো কথা বলতে শুনিনি”। আসলে সত্যিটা হল, এই ছাত্রদের তো কোন পার্টি পরিচয়ই তো ছিল না। তারা প্রথম পার্টি খুলেছে এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে হাসিনা উতখাতের পরে। আর তাদেরকে কৃষক, শ্রমিকের পক্ষে কথা বলতে দেখতে চাচ্ছেন উমর সাহেব! এর মানে এরা কমিউনিস্ট নাহলে তিন তাদের গোনায় ধরতে পারছেন না!
    আচ্ছা যারা কৃষক, শ্রমিকের পক্ষের বলে – কথা বলতে জানে তারাও কেউ কী বলেছে আমার জানা নাই। যদিও অনেক কমিউনিস্টই দাবি করছে তারা জুলাই বিপ্লবে ভুমিকা রেখেছিল।
    আবার ধরেন বাংলাদেশে যথেষ্ট বিকশিত শ্রমিক মানে বিস্তৃত কারখানা এখনও নাই। তখন কী করব আমরা?

    কথা আরো আছে মারাত্মক!
    আমরা কী খেয়াল করেছি যে আমাদের গার্মেন্ট শিল্প আছে সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কেমন? কেমনে চলছে সেগুলো?
    বইয়ের ভাষায় আমাদের ধারণা হল, গার্মেন্টসে মালিকও আছে শ্রমিকও আছে। তাহলে এটা মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব আর আমাদেরকে শ্রমিকের পক্ষে থাকতে হবে। কিন্তু তাই কী বাস্তবতা???

    তাহল একর্ড [accord] গ্রুপ এরা করাঃ
    আমরা কী জানি সেখানে একর্ড বলে একটা বিদেশি বায়ার্স [buyers’] গ্রুপ আছে। আর ট্রেড ইউনিয়ন গুলার সাথে তাদের ব্যাপক খাতির! কেন এমন?
    বায়ার্স গ্রুপ মানে হল যাদেরকে  (স্থানীয়) মালিক মনে করেছি তারাই মালিক নয়। বায়ার্সরাই হল মালিকের উপরে আসল মালিক? তাহলে শ্রমিকদের সাথে তাদের খাতির হবে কেন?

    কাজেই এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার – শ্রমিক-কৃষকের কথা বলে যেতে হবে – এটা কতটুকু সঠিক হবে? আবার সেই শ্রমিকের পক্ষে থাকার মানে? এই  বাস্তবতায় এটা কী????
    এথেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে  ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার শ্রমিক-কৃষকের কথা বলা সম্ভবই নয়। বাস্তবের শ্রমিক-কৃষক অন্য জিনিষ!  ফলে এখানেই ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার -শ্রমিক-কৃষক- বলার যে চল সেই কমিউনিস্ট চিন্তারও রিভিউ লাগবে। এর আগে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির পক্ষে কথা বলতে হতেই হবে বলে বা এদিয়ে কিছুই বুঝা যাবে না।

    উপরে যে বক্তব্যের কার্ডটা দেখছেন সেটা প্রথম আলোর উমর সাহেবের সাক্ষাতকারে দেয়া আছে, সেখান থেকে নিয়েছে। এই কার্ডে উমর সাহেবের তিন নম্বর পয়েন্ট টা অস্বস্তিকর! দেখেন, খোদ কমিউনিস্টেরা কী কনষ্টিটিউশন / সংবিধানকে জরুরি কিছু মনে করে? কাজের জিনিষ মনে করে? করে না।
    এমনিতেই কমিউনিস্টদের চিন্তায় পার্টি আর রাষ্ট্র বলে দুটা আলাদা কিছু নয়। এছাড়াও মূলত রিপাবলিক ধারণাটাই মার্কসের ধারনায় নাই। শ্রেণী ধারণা দিয়ে বদলে ফেলেছেন, অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছেন তিনি। কাজেই উমর সাহেবের মুখে  কনষ্টিটিউশন / সংবিধান নিয়ে কথা তোলা এটা কীভাবে দেখব জানি না; অর্থই বা কী হবে?

    আবার কার্ডের প্রথম পয়েন্ট তিনি বলছেন, “কোটার বৈষম্য আর সামাজিক বৈষম্য তো এক জিনিষ নয়”।
    এখানে ভুল বুঝা হচ্ছে মানে মারাত্মক ভুল বুঝা আছে। উমর সাহেব আসলে সামাজিক বৈষম্য বলতে একটা কথাই বুঝেন আর সেটা তিনি মিন করছেন অর্থনৈতিক বৈষম্য। এর বাইরে বৈষম্য  বলে আর কিছু নাই। এধারণাটাও ভুল বলে আমার ধারণা। আসলে বৈষম্য শব্দতার তাতপর্য এখানে (তাতে সেটা কোটা বা সামাজিক বৈষম্য যেটাই বলেন) এটা একটা পলিটিক্যাল শব্দ। অধিকার ভিত্তিক শব্দ বলেও বুঝতে পারেন। কিন্তু ওদিকে রাজনৈতিক বা অধিকার শব্দ কমিউনিস্ট ডিকশনারিতে আবার নাই। এটাই মূল সমস্যা। আর পলিটিক্যাল বৈষম্য বা অধিকারে বৈষম্য করা অপরাধ তা হলেও এটা কমিউনিস্ট এন্টেনায় ধরা পড়বে না।
    সারকথাটা হচ্ছে, ক্লাসিক বা মুখস্ত কমিউনিস্ট ভোকাবুলারি দিয়ে এযুগে কাউকে মুল্যায়ন করা অর্থহীন; যদি না আগেই আমরা ১৯৪৫ সালের আগের ধারণাওগুলোকে নিয়ে ব্যাপক রিভিউ করতে আগেই না বসি। আর পলিটিক্স শব্দের অর্থ তাতপর্য বুঝলে অর্থনৈতিক ক্যাটাগরি দিয়ে কমিউনিস্ট ভাব প্রকাশের ভুল আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব।

    সবশেহ উমর সাহেব নিজ ক্লাসিক ধারণা বিবেচনার দ্রুত নির্বাচন দিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। আর সেটাকে কাজে লাগাতে উঠে ততপর হয়ে গেছে প্রথম আলো। তারা উমর সাহেবের কথাকে বিএনপি র এখনই নির্বাচিন দাবি – এর সাথে যেন উমর সাহেবও একই কথা বলছেন এই ভাব তৈরি করে নির্বাচন কথাটাকে হাইলাইট করে দিয়েছে!

    আপাতত এতটুকু!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com


    সবশেষ আপডেটঃ  ,   এপ্রিল ২০২৫

  • মোদির র, তারেক ও সাথে আরেক ভাড়াটে মিডিয়া রয়টার্স

    মোদির র, তারেক ও সাথে আরেক ভাড়াটে মিডিয়া রয়টার্স
    গৌতম দাস
    ০১ এপ্রিল ২০২৫ দুপুর ০১ঃ ১৪
    https://wp.me/p1sCvy-6np

     

     

    ডঃ মঈন খান

     

    গতকাল ছিল ঈদের দিন! কিন্তু ষড়যন্ত্রকারী তবে বেকুবেরা বসে ছিল না। মোদির ‘র’ আর তার ফাঁদে আরো বেশি করে আটকে যাওয়া তারেক ও তাঁর বিএনপি এই ততপরতায় সক্রিয়। গতকাল ‘র’ এর দালাল প্রথম আলো একটা খবর ছেপেছে যার শিরোনাম, “নির্বাচন ডিসেম্বরের পরে গেলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, সতর্ক করল বিএনপি”।
    প্রথম আলো এরকম দালালির আয় দিয়েও পত্রিকাটা চালায় রাখছে জানি আমরা বলে এটা তেমনই একটা কিছু বলে প্রথম চোটে তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু এরপর চোখ আটকে যায় সাথের দুটা শব্দে “রয়টার্স নয়াদিল্লি”। শুধু রয়টার্স লিখলেই তো হত সাথে নয়াদিল্লি লিখল কেন? সন্দেহ এখান থেকে ঘনিভুত, আর তা থেকে ভিতরে পড়তে শুরু করি!  এটা বুঝতে যে রয়টার্স তাহলে এবার এক ভাড়াটে রিপোর্ট ছেপেছে! রয়টার্স মূল ইংরাজি নিউজ এর লিঙ্ক এখানে দিয়ে দিলাম। 

    এই গল্পের  সারকথাটা শিরোনাম আকারে আগে বলে নেই।  মোদির ‘র’ আর তার ফাঁদে আটকে যাওয়া তারেকের বিএনপি এক নয়া যৌথ কর্মসুচী নিয়ে মাঠে নেমে গেছে। সেটা হল, বিএনপি সব বড় নেতাগুলাই বেচারা তবু এদের মধ্যে পাতে দেয়া যায় এমন একজন হলেন ডঃ মঈন খান। সেই মঈন খান এখন এই ষড়যন্ত্র কর্মসুচী নিয়ে নিজ দেশ-পরিবার ঈদ ফেলে আমেরিকায় গেছেন। রয়টার্সের এই ভাড়াটে রিপোর্টটা সেই ষড়যন্ত্র পরিকল্পনার কথা আমাদের খোলাখুলি জানিয়েছে। লিখেছে, “বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থানরত মঈন খান বলেন………”। [“……said Khan, speaking from Washington D.C. where he is seeking meetings with U.S. officials to discuss Bangladesh.”]

    “বাংলাদেশের পরিস্থিতি” মানে?
    আসলে মঈনের এই আমেরিকা লবিইং কর্মসুচী থেকে দেখা যাচ্ছে মোদির ‘র’ আর তারেকের বিএনপি – একেবারেই খোলাখুলি এক “যৌথ উদ্যোগে” নেমে পড়েছেন। ব্যাপারটা অনেকটা এই দুপক্ষের যার যা আছে তাই নিয়ে খোলাখুলি নেমে পড়া – হয়ে গেছে। তাতে তারেক বা বিএনপির গায়ে ‘র’-এর স্পষ্ট দাগ লেগে যাবে কিনা এনিয়ে  তারেক বেপরোয়া হতে দেখা যাচ্ছে! যেখানে যার যা হাতিয়ার আছে মানে মোদির ‘র’ এর হাতে আছে “রয়টার্স নয়াদিল্লি” – এটা সাথে নিয়েই মোদির ‘র’ মাঠে নেমে গেছে। এতে ঢাকার প্রথম আলো / স্টার এদের রেট বা ইন্ডিয়ার যেকোন মিডিয়া ভাড়া নেওয়ার রেট এর তুলনায় “রয়টার্স নয়াদিল্লি” এর রেট অনেক মহেঙ্গা – ত্রিশ-চল্লিশ গুণ খরচা বেশি! তবু নিজের ক্ষমতা দেখাতে মোদির ‘র’ এটাই তারেকের জন্য ভাড়া করে দিয়েছেন!

    তো এখন এখানে “বাংলাদেশের পরিস্থিতি” বলতে আমাদেরকে সুনির্দিষ্ট কী বুঝতে হবে?
    এতদিন ‘র’ আর তারেকের যৌথ বয়ান ছিল একঃ
    যে এখনই নির্বাচন” বা তারেকের ভাষায় তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন” দিতে হবে। এই “তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন” এই বুলি টা তারেকের সেই ২০২১ সাল থেকেই যখন বাইডেনের প্রশ্রয়ে মানে, বাইডেন স্যাংশন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয় দেখাবেন ফলে আমাদের পক্ষে হাসিনার বিরুদ্ধে রাস্তায় মিছিল ও ব্যাপক জমায়েতের সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। (যদিও ২০২১, ২০২২, ২০২৩ এর মাঝামাঝি এসে বাইডেন পল্টি মেরেছিলেন হাসিনার সাথে একসাথে কাজ করবেন বলে, তবুও সেদিকে এখানে আর যাচ্ছি না)।  তবে সেকালের শুরু থেকেই তারেকের সার বক্তব্য ছিল একটাই ১। হাসিনাকে কে ফেলাবে? কী করে ফেলাবে ক্ষমতাচ্যুত করবে তা আমি জানি না। ২. তবে হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গেলে (মানে কেউ করে ফেললে) তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে। ৩. আর এই পরিবর্তনের এর মাঝে কোন “সেনাবাহিনী” সংশ্লিষ্ঠতা চলবে না।  এই অবস্থানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ৫ আগষ্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পলায়নের কয়েক ঘন্টা পরের সন্ধ্যায়। তারেকের জাতীয় সরকার গড়তে রাজি না হওয়া আর, তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে দাবি – এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। এছাড়া সত্যি সত্যি হাসিনা কী করে ক্ষমতাচ্যুত হবে তা তিনি তারেকে একেবারেই সংশ্লষ্ট হতে চান না, এটা মাথাব্যাথা তিনি নিবেন না। সেসব দূরে থাক এমনকি সেনাবাহিনীর কোনই সংশ্লিষ্টতা থাকুক তিনি চান নাই। বারবার নাকচ করেছেন! আজিব ব্যাপারটা হল, যেন সেনাবাহিনীর ভিতরেও একটা আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন দরকার নাই বা তাঁর কাম্য নয়; মানে, সেখানে তারেক সিদ্দিকীর পরিচালিত  র-প্রভাবিত অফিসার বনাম এদেরকে পরাজিত করতে চাওয়া বাকি সকল সেনা-অফিসারের লড়াই এবং ফয়সালা ছাড়াই যেনবা হাসিনা ক্ষমতাচ্যুতি সম্ভব ছিল!!!! আর এপ্রসঙ্গে তারেক নিয়মিত বলে চলেছিলেন – হাসিনা ক্ষমতাচ্যুতি (যার সোজা মানে হল, সেনাবাহিনীর ভিতরে ক্ষমতার পালাবদল বা হাসিনা-সিদ্দিকী এন্ড গং বা র-এর দালালদের উচ্ছেদ)  কীভাবে হবে কে করবে এসব তাঁর চিন্তা-বিবেচনার বিষয় না। কিন্তু তিনি কেবল হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন চান; এই মুখ্য ও নির্ধারক ভাগটা তারেককেই দিতে হবে! এককথায় বললে, তিনি আসলে  হাসিনার জায়গায় নিজেকে প্রতিস্থাপন দেখতে চান!!! কিন্তু কীভাবে তা ঘটবে এর দায় নিবেন না! হেব্বি মজা!!
    আর তাঁর এই অবস্থানটাই মোদির র-এর জন্য খুবই সুইটেবল, ভাল মিলেছে! একারণেই শুধু তোতাপাখির মত ‘দ্রুত নির্বাচন’, ‘এখনই নির্বাচন’ এসবই নয়। সাথে ইন্ডিয়ান কু-ভাষ্যও আছে। যেমন, ইউনুস সরকার হল একটা তত্ববধায়ক সরকার  (মানে ইন্টেরিম বা বাংলায় অন্তর্বর্তিকালীন সরকার নয়)। কেন ইন্ডিয়ার এই ভাষ্য বদল বা শব্দ বদল?
    কারণ, তত্ববধায়ক সরকার মানে তো তিনমাসের সরকার যার কাজ হল একটা নির্বাচন ঘটিয়ে দিয়ে বিদায় নেয়া! কাজেই তিনমাস এর পরেও ইউনুস সরকার বিদায়ে যাচ্ছেন না কেন? এই হল শয়তানি বয়ানটা!

    আসলে র-এর কাজ হল সময়ে বোকা সেজে বসে থাকা! যেমন র-এর দালাল ও চাকর হাসিনা যে  কনষ্টিটিউশন সংশোধন করে বহু আগেই “তত্ববধায়ক সরকার” ধারণাটাই গায়েব করে দিয়েছেন সেটা এখন মোদির ‘র’ সেটা এখন যেন জানেই না – এমন ভাব ধরে বসে গেছে। আর র-এর ভাড়াটে কিছু ব্যক্তিত্ব ও অবসরের পরে ‘র’-এর খেদমত করে দুপয়সা কামানি বিনা সিক্রি এই বয়ান জারি রেখেছে সেদিন থেকে বিবিসি বাংলায় মোদি যেটাকে ভাড়া করে রেখেছে! আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউনুস সাবের এই সরকার গঠনের সময় থেকেই নিজেকে  ইন্টেরিম বা বাংলায় অন্তর্বর্তিকালীন সরকার  বলেই চিনিয়েছে ( নিজেদেরকে কখনও কোন তত্ববধায়ক সরকার বলেন নাই)। অন্য কোন কিছু অন্য কোন শব্দ নয়।  আর সবচেয়ে বড় কথা এসব ষড়যন্ত্রকারীরা এসব ঝামেলা পাকাতে চাইবে আমরা জানতাম বলেই (আমি যতটুকু জানি ২০২২ সাল থেকে এটা যে ইন্টেরিম [interim] সরকার বলে গড়তে হবে সে ধারণা পরিস্কার রাখা ছিল। অর্থাৎ কেবল ৫ আগষ্ট ২০২৪ বিকেলে হঠাত করে আমরা ইন্টেরিম [interim] সরকার গড়ি নাই। ) উপরে বলেছি তারেক বা তাঁর বিএনপি তাদের এসব  তো তাদের কনসার্ণ-বিবেচনা ছিল না। সবসময় তারেকের বুঝ ছিল একটাই – তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন – দিতে হবে!

    অতি বুদ্ধিমানের গলায় দড়িঃ
    আপনি যখন বলবেন, হাসিনা ক্ষমতাচ্যুতির পরে তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন চাই; কিন্তু, হাসিনা কী করে ক্ষমতাচ্যুত হবে সে দায় আপনার নয়, আপনি জানেন না। শুধু তাই নয় হাসিনার পতনে বা অন্তর্বর্তি সময়ে সেনা সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারবে না – তখন আসলে আপনি কী চাচ্ছেন? আসলে কী বললেন? এটা তারেক জিয়া বুঝেন নাই, বুঝতে চান নাই। বুঝার যোগ্যতা নিয়েও আমি সন্দিহান!  এভাবে তারেক আসলে কল্পনা করেছেন যে  যে শক্তি (এক বা একাধিক শক্তির সম্মিলন) হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে সেটা তিনি নন শুধু তাই নয় – হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুতকারীরা আবার হবেন ভীষণ বোকা! তাদেরকে বোকা হতেই হবে। না হলে তারা এরপর সেই বিজয়ী ক্ষমতাটা এবার তারেক ও বিএনপির হাতে কেন সঁপে দিবেন???? কেন তারেকের পায়ে সঁপে দিবেন???? কেন? এটাই বোকার, গোয়ারের বুঝ! আমার অভিজ্ঞতা খারাপ! আপনার “পারসোনাল অভিজ্ঞতা” বাসায় রেখে আসেন।  দেশের স্বার্থ, গন ক্ষমতার স্বার্থের কথা বলেন!

    এর সম্ভবত একটা জবাব হতে পারে যে তারেক জিয়াউর রহমানের ছেলে, তারেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে!!! সেজন্য কী? অথবা ধরেন তারেক বড় গুন্ডা অথবা তারেক ঢাকায় কয়েক লাখ লোক জড়ো (যদি এলাও করেন তা করতে) করতে পারেন সেজন্য? কিন্তু সরি! এগুলোই একেবারে অরাজনৈতিক ও বোকা-স্টুপিড চিন্তা!

    আমি বহুবার বলেছি গুন্ডামি আর ক্ষমতা (মানে রাজনৈতিক ক্ষমতা) এক জিনিষ নয়। যে সমন্বিত শক্তি (একাধিক শক্তিগুলা যেমন একটা,  যারা সেনাবাহিনীকে র-মুক্ত করেছে এবং এমন এদেরকে সমস্ত কী-পজিশন থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছে, বিচার বা ফোর্স রিটায়ার্ড করিয়ে দিয়েছে যারা আর সাথে আরেক শক্তি বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার রাস্তাঘাট দখল – জনগণ রাস্তায় নামিয়েছে গণক্ষমতার প্রদর্শন ঘটিয়েছে যারা এই শক্তি আর এরসাথে যারা বুদ্ধি-বিবেচনা খাটিয়ে সময়মত জাতিসংঘকে মানবাধিকার ইস্যুকে নিজের লড়াইয়ের পক্ষে হাজির করতে পেরেছে যারা এরাও আরেক শক্তি) – এই সমন্বিত শক্তি কেন বিজয়ী হবার পরেও তারেক কে নেতা মানবে???? কেন? যে তারেক মনে করে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি কিভাবে হবে কে করবে তিনি জানেন না! এটা তাঁর দায় না। এতে তারেক মনে করতেই পারেন তার এই অবস্থান খুবই বুদ্ধিমান অবস্থান! কারণ, তিনি গুন্ডামি আর ক্ষমতার ফারাক বুঝেন না। তাই গুন্ডামিকেই ক্ষমতা মনে করেন। আর সাথে তিনি কয়েক লাখ কর্মীর সমাবেশ ঘটাতে পারেন – সেজন্য????
    এর চেয়ে স্টুপিড ভাবনা দুনিয়াতে আর কিছুই হতে পারে না।
    এককথায় যে বা যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে তারাই এককভাবে ক্ষমতায় আসবেই! এর পাল্টা আমি বড় গুন্ডা (রাজনৈতিক ক্ষমতা কী তা না বুঝা গুন্ডা) অথবা আমার লোক জমায়েতের সামর্থ আছে সক্ষমতা আছে তাই আমি তারেকই ক্ষমতা???? এটা এক স্টুপিড চিন্তা! ক্ষমতা কী এনিয়ে রাজনৈতিক নুন্যতম জ্ঞানশুন্য এক চিন্তা! তারেক কী জানেন যাদের তিনি নিজের কর্মি মনে হয়, ইদানিং তিনি যাদেরকে বেধরক চাদাবাজি করতে উতসাহ দেন অথবা বড় নেতাদেরকে বিভিন্ন হাসিনা-চোরদের সম্পত্তির শেয়ার মালিক বা পুরাই মালিক বানায় দিচ্ছেন তা সত্বেও তারেকের এই নিজস্ব নেতাকর্মিরা তারেককে ছেড়ে চলে যাবে। মুহুর্তের মধ্যেই! কখন???
    যখন বাজারে এই আওয়াজ স্পষ্ট হয়ে যাবে যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে তারাই ক্ষমতায় আসবেই! তারাই ক্ষমতায় এবং তারাই আগামিতে নির্বাচিত ক্ষমতা হয়েই আসবে, বসবে! সেদিন তারেক হঠাত আবিস্কার করবেন যে তিনি একা!!!!

    তাহলে এখন “বাংলাদেশের পরিস্থিতি” বলতে কী বুঝায়ঃ
    এখন “বাংলাদেশের পরিস্থিতি” বলতে আমেরিকায় বসে মঈন খান  বা তারেক যেটা বুঝাতে চাইছেন তাহল, ইউনুস সাহেব আগামি ডিসেম্বর ২০২৫ নয়ত পরের জুন ২০২৬ সময়কালে যেটা নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ না হলেও যে ধারণা দিয়েছেন সে ধারণাতে ইউনুস সাব যেন ডিসেম্বর ২০২৫ এর মধ্যেই আটকে থাকেন; আরও না সরে যান বা অনির্দিষ্ট না হয়ে যায় – এটা নিয়েই মূলত মঈন খান  বা তারেক এর বড় উদ্বিগ্নতা! বলা যায় এটাই মঈন খান  বা তারেক জিয়ার উদ্বিগ্ন এক “বাংলাদেশের পরিস্থিতি”।

    এথেকে বুঝা যায় তাদের প্রথম অনুসিদ্ধান্ত হল যে,
    মোদির ‘র’ আর তারেকের বিএনপি এরা দুপক্ষই এখন স্বীকার করে নিচ্ছেন যে (তারেকের) তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন, বা এখনই নির্বাচন, দ্রুত নির্বাচন ইত্যাদি আর ওদিকে মোদির ‘র’ এর বাংলাদেশের ইন্টেরিম সরকারকে তত্বাবধায়ক সরকার বলে চালিয়ে দেয়া আর তাই তিনমাসের মধ্যেই নির্বাচন (মানে তারেককে ক্ষমতায় বসায় দেয়ার) দাবি আর সেই সাথে ইউনুস সরকারের সাথে মোদির ইন্ডিয়ার কোন সম্পর্ক নয়, পরের নির্বাচিত  (তারেকের) সরকারের সাথেই কেবল তারা সম্পর্ক করবেন যে গোঁ ধরেছিলে এসব সবকিছুই এখন পরাজিত বক্তব্য-বয়ান হয়ে গেছে।
    তাদের দ্বিতীয় অনুসিদ্ধান্ত হল যে,
    তারা দুপক্ষই (মোদির ‘র’ আর তারেকের বিএনপি) শুধু হেরে গেছেন তাই নয় সামনে তাদের আরও বড় পরাজয় অপেক্ষা করছে। আর সেকারণে তারা এখন আরো বেশি করে ঘনিষ্ট হয়েছেন। শুধু তাই না, আরো ঘনিষ্ট হয়ে এবার মোদির র এবার রাজনৈতিক বুদ্ধিশুন্য তারেককে আরেকটা টোপ দিয়েছে। সেটা হল, এবার তারা একসাথে আমেরিকায় গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনে লবি করবেন যেন ইউনুস সাব আগামি ডিসেম্বরই নির্বাচন দিতে বাধ্য হন (মানে মোদির ‘র’ আর তারেকের বিএনপি এরা দুপক্ষের কপাল খুলে)।
    এখন তাহলে এতে কী দাড়ালো?
    মানে আমরা এবার দেখতে পাচ্ছি ঠিক যেমন হাসিনা কে নানা সময় আমেরিকার কাছে লবি করে দিব বলে মুলা ঝুলিয়ে মোদি-জয়শঙ্কর হাসিনার ফ্যাসিজম দীর্ঘায়িত করে নিজেরা বাংলাদেশকে লুটেছিল ঠিক সেই একই পথে (কেবল হাসিনার জায়গায় তারেককে বসিয়ে) ‘র’-এর সাথে নিজের ভাগ্য বেধে তারেকও এখন হাটছে অজানা উদ্দেশ্যে ও পথে!!! কথা হল, মোদি হাসিনাকে বাচাতে পারে নাই। তারেক কে পারারও কোনই কারণ নাই!

    আমি বারবার বলেছি, এখন আমেরিকায় কে প্রধানমন্ত্রী বা কে রাষ্ট্রপতি কিছু এসে যায় না;  – সারকথাটা হল আমেরিকা-ইন্ডিয়া যে এলায়েন্স গড়ে উঠেছিল ২০০৭ সালে – বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে তাহলেও  সেই আমেরিকা-ইন্ডিয়া বুঝাবুঝি বহু আগেই (২০১৬ সালের মধ্যে) নাই হয়ে গেছে। তা সত্বেও ২০১৭ থেকে পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্টেরা ট্রাম্প১ -বাইডেন এই সময়কালে আগের তুলনায় দুর্বল হলেও আমেরিকা-ইন্ডিয়া একটা স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক ছিল। যেটা ২০২৪ সালে বাইডেনের হাসিনার সাথে কাজ করার প্রকাশ্য ঘোষিত পলিসি নেয়ার পরের বাইডেন মানেই তিনি তখন থেকেই হাসিনার মতই পরাজিত বাইডেন। এই পরাজিত বাইডেনের দায় আমেরিকান কোন সরকার, পলিসিদাতা, থিঙ্কট্যাঙ্ক ইত্যাদি কেউ আর নিতে চাচ্ছেন না। নেওয়ার কোন কারণ নাই। বরং ইউনুসের মাধ্যমে আমরা তাদেরকে পালানো  আর মুখের কালিমা লুকানোর যে সুযোগ দিয়েছে এবং আমাদের ইউনুস সরকারকে সমর্থনের যে সুযোগ দিয়েছি এতেই তারা কৃতার্থ!
    ওদিকে মোদি ট্রাম্পের সাথে দেখা সাক্ষাত, অস্ত্র কেনার লোভ কিছু দিয়েও বিনিময়ে কোন সম্পর্ক, ট্রাম্পের সাথে নুন্যতম ঘনিষ্ঠতা – কিছুই অর্জন করতে পারেন নাই। এতে সব অর্থ পানিতে গেছে। হাত-পা বেধে ইন্ডিয়ানদের সামরিক প্লেনে তুলে দেয়া, বারবার ইন্ডিয়ান এক্সপোর্টের সবকিছুতে ট্রাক্স আরোপ ইত্যাদি সব কিছুতেই মোদি-জয়শঙ্কর এখন পরাজিত শক্তি। ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকান ছাতার নিচে থেকে ইন্ডিয়া বাংলাদেশের উপর রুস্তমির যে সুযোগ এমন সব কিছুই এখন শেষ, আর কোনদিনই যা ফিরে আসবে না। এসব দিনের আলোর মতই পরিস্কার।
    সর্বশেষ তুলসী গাবার্ড কে সাজিয়ে এনে মোদি যা ভাব তৈরি করতে চেয়েছিল সেটাও একেবারে মুখোমুখিতে ট্রাম্পের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে সব মুছে গেছে; আমরা সবাই দেখেছি। ভাড়াখাটা তুলসী এখন বেকার। মোদির সব অর্থ এরা খেয়ে নিয়েছে, মোদিও বেকার!!

    ঠিক এই অবস্থায় তারেক কেন মোদির র-এর সাথে কোন বুদ্ধিতে নয়া ষড়যন্ত্রে মাততে চাইছে?? যেটা দিবালোকের মত পরিস্কার ট্রাম্পের প্রশাসনকে মোদির প্রভাবিত করার নুন্যতম কোন যোগ্যতা মোদি-জয়শঙ্করের নাই, এটাই তলানিও না এটা শেষ! একমাত্র রাজনৈতিক জ্ঞানশুন্য এক তারেকই এই ছাইয়ের মধ্যেই তবু নিজের ও বিএনপির ভাগ্য খুঁজে ফিরতে পারে। মোদি-জয়শঙ্করেরা তো নিজেরা লবি করতে আমেরিকায় যায় নাই বা নিজেদের কাউকে পাঠায় নাই – তারেকের মঈন খান কে পাঠিয়েছে!!! যাতে এটাও তো ব্যর্থ হবেই। আর ব্যর্থ হলে যাতে তারেক ও তার নিজ কপালকেই দোষারোপ করে চুপচাপ নিজ ব্যর্থতাকে আপন কর্ম বলে মেনে নেয়!
    দুনিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার এত পরিস্কার করে বারবার বলার পরেও রাজনীতিক জ্ঞানশুন্যরাই কেবল তবু ঐ মোদি-র-এর গার্বেজের মধ্যেই নিজ ভাগ্য খুঁজে ফিরতে পারে। তারেক নিজ রাজনৈতিক-নেতা জীবনের শেষ স্তর পার করছেন! তিনি এখন কেবল রাজনীতি থেকে একেবারেই উতখাত ফলে প্রভাবশুন্য হবার জন্যই অপেক্ষা করতে পারেন!!

    মোদি যা পারেন তা হল মিথ্যা প্রপাগান্ডাঃ
    তাই তিনি এবার কমপক্ষে দশগুণ বেশি অর্থ দিয়ে রয়টার্স কে ভাড়া করেছেন। এটা দিয়ে তিনি তারেকের মন জয় করতে গেছেন। কিন্তু এতে তারেকের সাথে মোদি ও র-এর ঘনিষ্ঠতার লেভেল কত গভীর তা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আর দ্বিতীয়ত, বিএনপির নেতা-কর্মিরা এখন নিজেই পরিস্কার দেখতে পাবে যে তাদের দলের ভাগ্য এখন কোন গভীর সংকটে। পালানোর কোন পথও নাই!!!

     

    রয়টার্সকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবেঃ
    আমি এর আগে সরাসরি ইউনুস সাবকে সতর্ক করে লিখেছিলাম কেন রয়টার্সের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অথচ আমরা এনিয়ে ইউনুস সাবের কিছুই প্রতিক্রিয়া দেখি নাই। ইউনুস সাহেব কে বুঝতে হবে সব ব্যাপারে ঢিলেঢালা চলে না। গৃহস্থ দেখতেছে চোরে সিঁদ কেটে ঘরে ঢুকেছে। তবুওও তিনি ভাবছেন “দেখি না কী করে”। এরপর চোর বমাল নিয়ে বিদায় নিবার পরে আর কী করবেন???? কাজেই এসব বাদ দেন, একশন চাই! যে মিথ্যা বলে বা ছড়াই তাকে দমন করতেই হবে!

    রয়টার্স এই ভাড়াটে রিপোর্টটা লিখেছে এক বাঙালি হিন্দু কৃষ্ণ এন দাস [Krishna N. Das]; আরেক শয়তান ভাড়াটে রএর দালাল; রুমা পালের যুগ শেষে তাকে সরিয়ে আরেক শয়তান কৃষ্ণ দাস কে তার জায়গায় বসানো হয়েছে। এখন এই কৃষ্ণ তিনি বারবার প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস সাবকে প্রধানমন্ত্রী বলে  (লিখেছেন  • Interim PM suggests ) লিখে গেছেন। কেন? নিচা দেখানোর জন্য?? অথচ বাংলাদেশে ইন্টেরিম পিএম বলে তো কেউ নাই!

    দুইঃ
    এরপর  এই কৃষ্ণ দাস নিজ ভাষ্যে এক ভয়ানক প্যারাগ্রাফ লিখেছেনঃ
    “…. An unelected interim government led by Nobel Peace Prize laureate Muhammad Yunus has been running the South Asian country of 173 million since August, after deadly student-led protests forced Prime Minister Sheikh Hasina, a long-time India ally, to flee to New Delhi. ”

    ইউনুস সাহেব নাকি আন-ইলেকটেড!!! দেখেন তিনি নাকি রয়টার্সের রিপোর্টার!!!! কৃষ্ণ দাস মোদির দালালি করছেন? কৃষ্ণ দাস – আপনি কী জানেন স্বাধীন ইন্ডিয়ায় প্রথম কবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়েছিল? জেনে নিতে পারেন সেটা ছিল ১৯৫১ সাল (25 October 1951)। অথচ নেহেরু তো ক্ষমতায় সেই ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭ দিন থেকেই! তাহলে??? তিনি কী তখন ১৯৪৭ সালে নির্বাচিত ছিলেন? তাহলে কী ছিলেন – ইলেকটেড নাকি An unelected?????
    এসব খোঁজ না নিয়ে  বাঁদরামো করতে আসা উচিত না। মোদির  বা ‘র’-এর থেকে অর্থ নিয়েছেন? এই বাদঁরামো করার জন্য?
    আর এই প্যারাগ্রাফ টা আপনি লিখেছেন নিজ ভাষ্যে কারও বরাতে নয়। রয়টার্স এর জার্নালিজমের নীতিতে আপনি কী এমন নিজ ভাষ্য বয়ান লিখতে পারেন???

    আর এখানে রয়টার্স কেও জানিয়ে রাখি, নিজের ফাঁসির দড়ি এভাবে আপনারা নিজের জন্যও তৈরি করলেন!!!

    রয়টার্স কে বলছিঃ কান খুলে শুনে রাখেন। এই যে সব রিপোর্টের শেষ লিখে রাখেনঃ

    Reporting by Krishna N. Das in New Delhi; Editing by Michael Perry
    Our Standards: The Thomson Reuters Trust Principles., opens new tab এভাবে, আপনাদের প্রত্যেকটা রিপোর্টের নিচে লেখা থাকে। এখন বলেন Krishna N. Das এর এই লেখাটা আপনাদের নিজের ঘোষিত স্টান্ডার্ড থমসন রয়টার্স ট্রাস্ট এর প্রিন্সিপাল মেনে কী করা হয়েছে???? নাকি এটাই রয়টার্সের নীতি? এটা জার্নালিজম ?????
    রুমা পালকে নিয়ে আপনাদের কাছে বহুবার লিখেছি। বারবার বলেছি ইন্ডিয়ার ভিতর বসে বাংলাদেশ কাভার করবেন না, এটা বন্ধ করেন! আপনারা কানে শুনেন নাই। এখন আপনাদেরকে বাংলাদেশ থেকেই একেবারে উতখাত করতে হবে। বাংলাদেশের কোন মিডিয়া যেন আপনার ব্যুরো নিউজ কিনতে সাবসক্রাইব না করতে পারে এর ব্যবস্থা করতে হবে আমাদেরকে!!!

    সব শেষে ডঃ মঈন খান সাহেবকে কিছু কথাঃ
    আমার যতটুকু ধারণা ছিল তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বয়স্ক ও সিনিয়র নেতার একজন যার খোদ জিয়াউর রহমানের সময়ে জিয়ার সাথে বিএনপিতে কাজ করেছেন অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু তিনি কী বুঝে আমেরিকাতে যেতে রাজি হলেন! আমি বিস্মিত! তারেক সাব বলেছেন আর আপনি রওনা দিয়ে দিলেন? আপনি কী খেয়াল করছেন ইতোমধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকার বাংলাদেশ নিয়ে অবস্থান! আপনি কী নজর করেন নাই তুলসী গাবার্ড এর ভরাডুবি! তিনি ইন্ডিয়ায় থাকা অবস্থায় আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট তার বিরুদ্ধে নিজেদের বাংলাদেশ নীতি প্রকাশ করেছে! এত কী আপনি বুঝেন নাই  আমেরিকায় মোদির দৌড়, প্রভাব ক্ষমতা ইত্যাদি একটা ভুয়া ধারণা! চাপাবাজি!  আর আপনি আর তারেক সেগুলো দেখা-জানা সত্বেও আবার সেই মোদির বগলে সুগন্ধ খুজতে গেছেন??? আমি শুনেছি আপনারই নাকি তারেককে কিছু বুঝিয়ে বলার ব্যক্তিত্ব আছে! তাহলে কোথায় সেগুলা???

    আচ্ছা, আপনি সুস্থ আছেন তো নিশ্চয়! আচ্ছা তাহলে, ইউনুসের সাহেবের বিরুদ্ধে আমেরিকায় লবি করতে যান কোন বুদ্ধিতে? তাও আবার মোদি-জয়শঙ্করের ভরসায়? যাদের নিজেদেরই ভরসা নাই; ট্রাম্পের কাছেই নিজেদের কোন বেইল নাই!!!
    তাহলে আপনি এই বেকুবি ষড়যন্ত্রে শামিল হন কেমনে? আবার দেখেন এটা এমন এক ষড়যন্ত্র যা বেকুবেরা করে। এটা অন্তত আপনাকে নিশ্চয় মানায় নাই! নাকি এটাও বুঝেন না!

    আগামি দিনে বিএনপির ভরাডুবি বা সম্ভবত প্রায়  বিলীন এক মুসলিম লীগ যেন এমন যদি হয় তবে তারেকের পাশে আপনার নামটাও লেখা হয়ে থাকল আজ থেকে!   কোন কিছুর খবর নাই! কীসের নেশায় আপনারা এখনও রাজনীতিক বলে দাবি করে আছেন আমি বুঝতে পারি না!! সরি!! আমি সম্ভবত আমার হতাশাই ব্যক্ত করতে পারি!!!
    আর শেষ কথাটা হল, এই যে আপনি ভুয়া এক হুমকি দিয়েছেন যেন আপনি (সাথে আপনারা) আমেরিকায় গিয়ে কোন এক মহাযজ্ঞ করে ফেলতেছেন বলে ভাব তৈরি করতেছেন বলছেন “নির্বাচন ডিসেম্বরের পরে গেলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে,  এখন এই কথাগুলো বলে আপনাদের নাড়াচাড়াতেই না আপনাদের প্রিয় নির্বাচনটাই অনির্দিষ্ট হয়ে যায়। এতে হতে পারে এক গণভোটের দাবি সামনে চলে এসেছে। আর সেটাও তো নির্বাচনই! “নির্বাচিত প্রধান উপদেষ্টা” পেয়ে যেতে পারেন হয়ত! তখন কী করবেন? পাবলিক মাইন্ড বুঝতে মনোযোগ প্রচেষ্টা নিয়ে দেখতে পারেন, কান পাতেন!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     আপডেটঃ  দুপুর  ০২ঃ ৪০,  ১ এপ্রিল ২০২৫
    সবশেষ আপডেটঃ  দুপুর  ০৪ঃ ১০,  ১ এপ্রিল ২০২৫

     

  • ইউনুস সরকারের কড়া শক্ত হাতের অবস্থান চাই! 

    ইউনুস সরকারের কড়া শক্ত হাতের অবস্থান চাই!
    গৌতম দাস
    ২১ মার্চ ২০২৫ রাত ০৯ঃ ৩৯
    https://wp.me/p1sCvy-6mH

     

    সময়ে রাত একটার পরের কারও কোন স্টাটাস দেয়া তা একটা দেশকে তোলপাড় করে তুলতে পারে। গতকাল বাংলাদেশ এমনই এক রাত কাটিয়েছে। যতটুকু খবর শুনলাম অনেক গুরুত্বপুর্ণ লোক সারারাত ঘুমান নাই!
    গতকাল (দিনশেষের রাত ১২টার পরের) রাত আড়াইটা থেকে হাসনাত আব্দুল্লাহ-র এক পোস্ট থেকে এই তোলপাড়!
    যদিও সেনাপ্রধানের গত ২৫ ফেব্রুয়ারির ফুলস্টপ বক্তৃতার বক্তব্য থেকেই তার নামে দেয়া হাসনাত এর এমন অভিযোগ যে সত্য হতে পারে এমন সন্দেহ সমাজে বিশেষ করে ফেসবুকে আগে থেকেই তা প্রবল ছিল। এককথায় সেনাপ্রধান (মোটাদাগে) পাবলিক আস্থা,  বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন বলে মনে হয়েছে – বিশেষত তাঁর ঐ রাওয়া ক্লাবের বক্তৃতার পর থেকে।

    আবার তার ঐ বক্তৃতার পর থেকে তিনি ঐ ইন্ডিয়ান ব্যাগেজ টানা বা বোঝা বওয়া থেকে বের হয়েছেন তা আমার কখনও মনে হয় নাই। বরং মনে হয়েছে তিনি একের পর একটা ট্রাই করে যাচ্ছেন কিছু একটা থেকে মুক্ত হবার বা বের হতে চাছেন কিন্তু কোন কিছুতেই তাঁর লাক ফেবার করছেন না – দিশার আলো হয়ে হাজির হচ্ছে না।
    এই অর্থে তিনি, ইন্ডিয়ান স্বার্থ আর ক্রমশ বড় খেদমতগার হয়ে উঠে বিএনপি, (জামাতও কিছুটা) ইত্যাদি সকলেরই ভাগ্য যেন এক হয়ে গেছে। সবাই তা থেকে বের হবার পথ খুজছে প্রাণপণ!!

    গতরাতে সবচেয়ে তামসার কান্ড ঘটিয়েছে বিএনপি মানে তাদের মিডিয়া সেল! এটা পরিস্কার গত রাতে হাসনাতের স্টাটাসের পরে বিএনপি ইন্ডিয়ার হাতে প্রতাড়িত হয়েছে এমন এক ফিলিং যেন তাদের হয়েছে এমন আচরণ শুরু করেছিল।
    যেমন রাত ০৩ঃ ৩৫, ২১ মার্চ মানে হাসনাতের স্টাটাসের প্রায় এক ঘন্টা পরে মিডিয়া সেল প্রচার করা শুরু করে এক ভিডিও কার্ডঃ

    আওয়ামী লীগ নামে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না।
    সেই আওয়াজ আমরা উঠাচ্ছি।
    গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আ. লীগের সাংগঠনিকভাবে বিচার দাবি করছি।
    -সালাহউদ্দিন আহমদ, সদস্য, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, বিএনপি।
    ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

     

    অর্থাৎ মির্জা আলমগীরের সেই কুখ্যাত বাক্য – “জনগণ” আওয়ামী লীগের বিচার করবে বা নিষিদ্ধ করবে বা নির্বাচনে অংশ নিতে দিবে কিনা ইত্যাদি সবই  – জনগণ বিচার করবে  – এই লাইনে যেটা ছিল সেখান থেকেও সরে আসা সালাউদ্দিনের এই বক্তব্য। আর যদিও সালাউদ্দিনের এই বক্তব্য গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ মানে প্রায় দুমাস আগের। অথচ  সেটাই কেন গতরাত দুপুরে বিএনপির মিডিয়া সেল কেন আবার প্রচার করতে শুরু করেছে এর কোন ব্যাখ্যা দেয় নাই। এমনকি এর  আরও আধা ঘন্টা পরে (০৩ঃ৫৯ am  ২০২৫) ছাত্রদলও ফেসবুক পেজে একই স্টাটাস দিয়েছিল। এসবের সার কথা যেন এরকম ইন্ডিয়া বিএনপি কে ফেলে পুরানা প্রেমিক আওয়ামী লীগের সাথেই চলে গেছে, তাই গোসসা! আর হাসনাত কথিত অভিযোগের আঙুল যেদিকে সেই সেনা প্রধান (বিএনপি বা তাদের দলের সাথে যতই খাতির আছে বলে শুনা যায় তা শেষ) তিনিই লীগকেই (বিএনপিকে ফেবার করা না ) সামনে এনেছেন তাহলে, পুণর্বাসিত করতে আগিয়ে এসেছেনন – হাসনাতের অভিযোগের সারকথা এমন হয়ে গেছে!।
    যদিও পরে দিনের আলো ফোটার পর থেকে বেলা বাড়তে বাড়তে দুপুরের দিকে রিজভি সাহেব দলের অবস্থান আবার পুরান জায়গায় নিয়ে দাড় করিয়েছেন!

    লীগ নিষিদ্ধ হচ্ছে বা নির্বাচন করতে দেয়া হবে কীঃ
    লীগ নিষিদ্ধ হচ্ছে কিনা বা নির্বাচন করতে দেয়া হবে কী এটা নিয়ে গত সাত মাস জুড়েই প্রবল উদ্যোগ ও উদ্বেগে একচেটিয়া ভাবে  থেকেছে ইন্ডিয়া বা মোদি সরকারের।
    আর ক্রমশ এখন সেটা যারাই ইন্ডিয়ান স্বার্থ / দায় যেটাকে আমি প্রায়শই ইন্ডিয়ার বোঝা  মানে, ব্যাগেজ বা লাগেজ বলে থাকি – এটা যারাই কাধে নিয়েছে তাদের সকলেই নিজ নিজ স্বার্থের সাথে ইন্ডিয়ান স্বার্থকে মাখিয়ে একাকার করে দেখছে; যেখান থেকে মনে হচ্ছে তাদের কারই আর বের হবার বা ত্যাগ করার সুযোগ নাই। বা পারবে না!

    ইন্ডিয়া ক্রমাগত বিদেশী (ভাড়া করা) সাংবাদিক পাঠিয়ে ক্রমাগত ইউনুস সাহেবকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে যে –  “লীগ নিষিদ্ধ হচ্ছে বা নির্বাচন করতে দেয়া হবে কী না”। আর ঐ চালাকিটা না বুঝে সরল উত্তর দিতে গিয়ে সকলেই পরিস্থতি জটিল করে তুলেছে। মূলত সকলেরই এমন শঠতা-প্রশ্ন এড়ায় যাওয়া উচিত ছিল যেহেতু ঠোস জবাব তাদের হাতে / কাছে প্রস্তুত নাই। যেমন যদি প্রশ্নের জবাবে বলতেন যে, –  আমরা অন্য কিছু নিয়ে প্রায়োরিটি তে এখন ব্যস্ত আছে। ক্রমশ আমরা এসব নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিলে মিডিয়াকে জানাবো”  –  এভাবে বলে দিতে পারত।
    কিন্তু সকলেই বিপদে পড়েছে কী হলে  – “লীগ নিষিদ্ধ হচ্ছে বা নির্বাচন করতে দেয়া হবে কী”  – এভাবে সেই “শর্তগুলো” তা বলে জবাব দিতে চেষ্টা করতে গিয়ে!

    এজন্যই র-এর দক্ষতা এখানে বার বার যারাই জবাব দিতে গিয়েছে তাদেরকেই বিপদে ফেলতে পেরেছে। অন্ততপক্ষে সাময়িক!
    বাস্তবত আসলে লীগ নিষিদ্ধ হচ্ছে বা নির্বাচন করতে দেয়া হবে কী – না এই বিষয় টা  – অনেক যদি কিন্তুর পরের পরিস্থতিতে কী হবে এর উপর নির্ভরশীল। এর চেয়েও বড় কথা যেকথা আমার শত্রুদের কৌশল ঠিক করতে সহায়তা করবে তার জবার আমরা সহজ ভাবে দিব কেন????

    আমি অনেইকবার বলেছে আমাদের সমাজ অনেক ছোট; আবার আরেক অর্থে খুবই ভাইব্রেন্ট। মানে পাবলিক একদিকে আছে তার জীবন সংগ্রাম নিয়ে আর রাজনীতি বা ব্যারাক এটা তাদের কাছে আরেক জগত – আমরা এমন না। সামাজিক পর্যায়ে আমরা আমরা খুবই কাছেরই। ব্যারাক আর সিভিল সমাজ সব খবর শেয়ার করি। সে হিসাবে আমার ধারণা, বাইরের সমাজের কিছু উত্তেজনা গত রাত থেকে যার শুরু সেটা ব্যারাকের কিছু উত্তেজনা তৈরি করার কথা। এখন আজ রাত সাড়ে নয়টায় মনে হচ্ছে আপাত সব জগতেই সব শান্ত হয়েছে।

    সবার কাছে আমার একটা পরামর্শ হবে, সেসব সরিয়ে রেখে সব পক্ষই ইউনুস সাবের হাতে সব ছেড়ে দেয়া উচিত। উনার বিবেচনায় যেটা স্থায়ীভাবে সব উত্তেজনা স্তিমিত করে এমন সিদ্ধান্ত তিনি দিবেন – এদিকে পরিস্থতিকে থিতু হতে আগিয়ে দেয়াই সঠিক হবে।  নিশ্চয় আমরা ইন্ডিয়া বা বিদেশি কারও হাতের পুতুল হয়ে আমাদেরকে তারা নাচানোর সুযোগ নেক তা হতে দিতে পারি না।
    গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এটা চলছে কাজেই আর নয়! এবার থামাতে হবে সব পক্ষকে!

    ইউনুস সরকারের কড়া শক্ত হাতের অবস্থান চাই!

    সামনে আমাদের অনেক কাজ পড়ে আছে সেসব দিকে মনোযোগ দিতে হবে!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     আপডেটঃ  রাত ১০ঃ ০৫, ২১ মার্চ ২০২৫

     

  • ভলকার টুর্ক কেন আমাদের জুলাই ইতিহাসের এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব!

    ভলকার টুর্ক কেন আমাদের জুলাই ইতিহাসের এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব!
    গৌতম দাস
    ০৭ মার্চ ২০২৫
    https://wp.me/p1sCvy-6li

    ভলকার টুর্ক [Volker Türk]

     

    কিছু প্রাক-পরিচিতিঃ
    ভলকার টুর্ক [Volker Türk] হলেন বর্তমানে জাতিসংঘ হিউম্যান রাইট ইস্যুতে মুখ্য প্রতিনিধি। আরো ভেঙ্গে বললে, জাতিসংঘ [United Nations; সংক্ষেপে  UN] এই মুল প্রতিষ্ঠানের অধীনে স্পেশালাইজড আরো প্রায় ১৫ টা প্রতিষ্ঠান আছে যাদেরকে ইউএন এর এজেন্সি প্রতিষ্ঠান বলা হয়;  যার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড়টা হল ইউএনডিপি [UNDP] যা আমাদের মত সবদেশেই অফিস আছে কারণ, এটা সামাজিক অবকাঠামোগত প্রকল্প দেখাশুনা্র প্রতিষ্ঠান; তাই ‘ডিপি’ মানে ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। তো সবদেশেই এই UNDP মানে, মূল UN বা জাতিসংঘের অধীনের এজেন্সি প্রতিষ্ঠান হলেও যেকোন দেশের UNDP অফিসের প্রধানকে, মূল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি / প্রতিষ্ঠান মানা হয়।
    ঠিক সে রকমই জাতিসংঘ হিউম্যান রাইট ইস্যুতে এক এজেন্সি প্রতিষ্ঠান হল OHCHR [Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights]। যার দেখাশুনা বা ডিল করার ইস্যু হল হিউম্যান রাইট বা মানবাধিকার। তাই এটাকে ‘মানবাধিকার হাইকমিশনারের অফিস’ বলাও হয়।  আর এই ভলকার টুর্ক নিজেই হচ্ছেন সেই জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট হাইকমিশনার; OHCHR এর প্রধান কর্তা ।
    একটা ছোট আরেকটা কথা এখানে জানায়ে রাখি। সেটা হল, সবাই জানি ইউএন এর হেড কোয়ার্টার আমেরিকার নিউ-ইয়র্কে। হা অবশ্যই, মূল অফিস সহ একগুচ্ছ এজেন্সি হেডকোয়ার্টারও সেখানে একসাথে। কিন্তু এর বাইরে আরেকগুচ্ছ জাতিসঙ্ঘের হেডকোয়ার্টার হল জেনেভায় [Geneva, Switzerland]। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টাই হল এই  মানবাধিকার হাইকমিশনারের অফিস OHCHR।  জাতিসংঘের মোট প্রায় ১৯৩-৪ সদস্য রাষ্ট্রের প্রায় সকল প্রতিনিধিকেই (নিউইয়র্কের বাইরে) জেনেভাতেও অফিস খুলে রাখতে হয়েছে যাতে স্ব স্ব রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধিরা OHCHR এর সাধারণ সভায় অংশ নিতে পারে।  এই বিচারে জেনেভা হয়ে উঠেছে আসলে লবিইং [lobbying] এর শহর। OHCHR এর কোন সাধারণ সভায় হয়ত দেখা যাবে  কোন ছোট (বাংলাদেশের কাছে অচেনা) রাষ্ট্রকে দিয়ে আমেরিকা  বাংলাদেশের বিরুদ্ধে / পক্ষের কথা ঐ সভায় তুলিয়েছে। এভাবেই ছোট বা বড় সবদেশের ভয়েজ জেনেভায় গুরুত্বপুর্ণ!
    গত দুদিন আগে এমনই এক সভাতেই বাংলাদেশে হাসিনার ২৪ শের জুলাই-আগষ্ট হত্যাকান্ড নিয়ে জাতিসংঘ যে প্রাথমিক অনুসন্ধান রিপোর্ট  তৈরি করেছে তা পেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের আইন মন্ত্রী / উপদেষ্টা সহ ভিকটিমদের কয়েকজন স্বজনও ঐ সভায় অংশ নিয়েছে।  অর্থাৎ এই সভা থেকে হাসিনার অপরাধের চিত্র ও  ডকুমেন্ট এখন থেকে গ্লোবাল হয়ে উঠল। মনে রাখতে হবে, হাসিনার অপরাধ নিয়ে কোন ভুয়া বিতর্ক তৈরি করে হাসিনা (সাথে মোদির ইন্ডিয়া) যেন পালিয়ে না বাঁচতে পারে তা ভেবে  ইউনুস সাব সরাসরি ভলকার টুর্ক এর সাথে কথা বলে এই অনুসন্ধান শুরু করার আহবান রেখেছিলেন সাথে তাঁর সরকারের পুর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেই জাতিসংঘের এই প্রাথমিক অনুসন্ধান এর কাজ সহজেই অল্প সময়ের মধ্যে এক সলিড প্রমাণ আমাদের সবার কাছে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। ফলে তা সারা দুনিয়ার কাছেও।

    বিবিসির হার্ডটক প্রোগ্রামে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভলকার টুর্কঃ
    বিবিসির (ইংলিশ) হার্ডটক [Hard Talk] শিরোনামের এক বহু পুরানা প্রোগ্রাম আছে – মুখের উপর শক্ত প্রশ্ন করা হয় বলে সেখান থেকে এই নাম। এককালে (১৯৯৭-২০০৬)  Tim Sebastian ছিলেন এর এঙ্কর [anchor] বা প্রধান হালধরা ব্যক্তি পরিচালক। আমরা সে আমলের লোক, বলতে পারেন প্রেসিডেন্ট বুশের ওয়ার অন টেরর আমল অথচ আল-জাজিরা তখনও চালু হয় নাই (হয়েছিল ২০০৫ সালে); এমন একটা সময় সেটা। তো সম্প্রতি এই হার্ড টকের  অতিথি হয়েছিলেন  ভলকার টুর্ক নিজেই। এই ফাঁকে একটা কথা সবাইকে বলে রাখিঃ নোট করে রাখতে পারেন। আমাদের জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ভলকার টুর্ক এর নাম ইতোমধ্যেই গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসাবে জড়িয়ে গেছে, যার নাম আর আলাদা করা যাবে না। এর পিছনের মূল কারণ একাধিক। কী সেই গুলা?

    ১৬ জুলাই ২০২৪ ছিল শেষ দিন। কীসের? এদিক দুপুরের পর থেকে সশস্ত্র ছাত্রলীগ ও দলবাজ পুরা পুলিশ বাহিনী মাঠ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এরপর সন্ধ্যায় ডিএমপি হেড কোয়ার্টারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনের সব বাহিনীর শীর্ষকর্তাদের বৈঠকে সব বাহিনী প্রত্যাহার করে সরাসরি সামরিক বাহিনীর হাতে সিভিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়ীত্ব তুলে দেয়া হয়েছিল। যেটা ছিল আসলে হাসিনার দিক থেকে দেখলে এক আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। যদিও তিনি ভেবেছিলেন সীমাহীন বলপ্রয়োগে কঠোর হাতে দমন আর বেপরোয়া গোলাগুলির ব্যবস্থা করলে ভয়ে ছাত্র-জনতা সব মাঠ ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু ঘটেছিল উলটা! এমন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, হাই-হ্যান্ডনেস ইত্যাদি এসবই  আসলে ঘুড়ে মাঠের ছাত্র-জনতার পক্ষে আরো ব্যাপক হারে সাধারণ মানুষের সমর্থন পেয়ে বসেছিল।  শুধু তাই না এই পরিস্থিতিটাই আরেক নির্ধারকশক্তি জাতিসংঘ কে পটভুমিতে হাজির করেছিল – এরাই ওয়াকারের নেতৃত্বের সেনাবাহিনী ও হাসিনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে সতর্কতা ওয়ার্নিং জানিয়ে এদের উলটা বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ওয়ার্নিং দিয়েছিল যে এমন করলে সেনাসদস্যদের জন্য জাতিসংঘ শান্তিমিশনের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে!

    সুবিধাটাই যখন অসুবিধাঃ
    জেনেভা মানবাধিকার হাইকমিশনারের অফিস – এদের কাজই হচ্ছে কোন সদস্য রাষ্ট্রে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোন  ঘটনা চলছে কীনা সেদিকে তা নজর রাখা বা করা।  কিন্তু আমাদের কমিউনিস্ট ভায়েরা এটা জাতিসংঘের জন্মের পর থেকে কখনই এই ভাষ্য হজম করতে চায় নাই বা পারে নাই। উলটা তাদের কথা হল, জাতিসংঘ দিয়ে কিছু হয় না, হবে না!  হা সেকথাও  অবশ্যই আংশিক হলেও সত্য; যার মূল কারণ হল, আমেরিকান প্রভাব জাতিসংঘের সব অফিসের উপরই প্রবল!আবার এর পিছনের মূল কারণ, আর কোন রাষ্ট্র জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠান চালানোর ব্যয় বহণ করতে চায় না বা সক্ষম নয় বলে অপারগ! আর উলটা দিক থেকে বললে, এটাই গ্লোবাল নেতা রাষ্ট্রের (আমেরিকার) দায় হয়ে আছে বা যায়!  কিন্তু তাই বলে জাতিসংঘের সবই তুচ্ছ বা অহেতুক এই প্রতিষ্ঠানের থাকা না থাকা – এই অনুমানও একেবারেই ভিত্তিহীন – আমার বাড়িটা পড়শির চেয়ে নিশ্চয় ভাল ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা বোধ!

    সেই একই ভঙ্গিতে প্রসঙ্গ তোলা হয়েছিল  হার্ডটক অনুষ্ঠানে যেখানে ভলকার টুর্ক ছিলেন প্রধান অতিথি। তিনি সেখানে শক্তভাবে পরিস্কার করে দাবি করেন তাঁর অফিস থেকে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানকে ওয়ার্নিং বা সতর্কতামূলক বার্তা দেয়া হয়েছিল (বলে ক্রমেই হাসিনার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল) ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখের পরে।  আসলে সেসময় এই বার্তা দেয়া হয়েছিল দুইভাবে। একটা তো সরাসরি মানবাধিকার হাইকমিশনের অফিস থেকে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানকে ভায়া ইউএন মিশন নিউইয়র্ক [DPKO], যেখানে মিশন সংশ্লিষ্ট সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা বসেন তাদের মাধ্যমে, এভাবে। এটাই ভলকার উল্লেখ করেছেন হার্ডটক অনুষ্ঠানে সেটা এখানে  বাংলাদেশ নিয়ে ফলকার টুর্ক  দেখতে পারেন। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী (তিন বাহিনীই) ইউএন মিশনে সর্বাধিক সেনা সরবরাহকারী প্রথম দুই দেশের একটা।  এমনকি কোন কোন সুনির্দিষ্ট মিশনে সবার চেয়ে বেশি তা এক নম্বরে। তবে মিশনে অংশ নেবার ক্ষেত্রে একটা রুল করা হয়েছে একালে – যেকোন সেনা সদস্যের নামে নিজ দেশের অপরাধীর লিস্টে মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ থাকলে তিনি বাদ পড়বেন সাথে ওদেশের খোদ সরকারই যদি ব্যাপক লঙ্ঘণকারী সরকার হয় সেক্ষেত্রে ঐ সদস্য রাষ্ট্র থেকে সব সেনা সদস্যকেই নিজ দেশে ফিরে যেতে জাতিসংঘ মিশন বলতে পারে। এর পিছনের মুল যুক্তি যে দেশের সেনা নিজ দেশেই মানবাধিকার লঙ্ঘণকারি সেদেশ কীভাবে আরেক দেশে শান্তি মিশন স্থাপনে অংশগ্রহণকারী হতে পারে!!! এটা যথেষ্ট শক্ত যুক্তি অবশ্যই!

    এছাড়াও আরেকটা হুশিয়ারি গিয়েছিল মানবাধিকার র‍্যাপোটিয়ারের কাছ থেকে।  OHCHR অফিসের অনেকগুলো  র‍্যাপোটিয়ার [Rapporteur] থাকেন যারা অবশ্যই OHCHR অফিসের কোন পেড [paid] স্টাফ নন, বেতনভুকও নন; বরং একেবারেই স্বাধীন এবং সুনাম থাকা দেশি-বিদেশি ব্যক্তিত্ব। এই স্বাধীন র‍্যাপোটিয়ারের দেয়া রিপোর্ট এটাকেই মাঠের সত্যের ভিত্তি গণ্য করে আভ্যন্তরীণ ভাবে OHCHR অফিসের যেকোন কমিটি আলোচনা-পর্যালোচনা শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ইস্যুতে তখনকার র‍্যাপোটিয়ার  আইরিন খান সরাসরি  হাসিনা সরকার ও সেনাপ্রধানের অফিসের সাথে বাদানুবাদে জড়ান। তিনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দাবি করেন মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘণের প্রমাণ আছে তার কাছে। আসলে ফিল্ড লেবেলে বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানবাধিকার ডিফেন্ডার কর্মীরা ভলিনটিয়ারেরাই এসব তথ্য-প্রমাণ জড়ো করে আইরিনের হাতকে শক্তিশালী করে রেখেছিলেন। তাই তিনিও পাল্টা এমন চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছিলেন।

    আসলে এর সাথে যুক্ত হয়েছিল দুইটা ইস্যু।
    সেনা তত্বাবধানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাদেরকে দেয়ার  মধ্যে –  হেলিকপ্টার থেকে র‍্যাবের গুলি ছোড়া,   বিভিন্ন বাসার উচু ছাদ থেকে আশেপাশে নিচে পুলিশের ( বা সাদা পোষাকে) নির্বিচারে গুলি ছোড়া আর বিশেষ করে রামপুরা-মৌচাক রোডে হাই স্পিডে আর্মোড কার [ armoured car লোহার খাঁচায় মুড়ানো] ফলে ভিতর থেকে বসে আরামে নির্বিচার গুলি ছোড়া ঘটেছিল। এর উপর ঐ কার গুলো ছিল জাতিসংঘের লোগো মার্কা লাগানো সাদা কার – মানে জাতিসংঘ মিশন থেকে ফেরত আসার পর আর রঙ বদলানো হয় নাই গরিমসি করে। তাই এনিয়ে জাতিসংঘ থেকে শক্ত আপত্তি দেয়া হয়েছিল যে এই নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞা এতে যেন জাতিসংঘ জড়িয়ে আছে এমন ইঙ্গিত বহন করা হচ্ছে।
    সব মিলিয়ে এক ব্যাপক গ্লোবাস্ল ও স্থানিয় সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছিল এতে। আর এর প্রভাবে আমাদের খুবই ঘন বসতির সমাজে আমাদের সেনা সদস্য আর তার সিভিল সমাজ খুব দুরের কিছু নয়। তাই এর সামাজিক উত্তাপ সেনাবাহিনী মেস-ক্যান্টিনের – এই ধরনের কমন সময় কাটানোর জায়গায়  তা জুনিয়র অফিসারদের জন্য প্রকাশ্যেই আলোচনার প্রসঙ্গ হয়ে যায়। সেটা এই বলে যে নিজ জনগণকে নির্বিচারে হত্যার দায় এসে লাগছে তাদের  সেনাসদস্য, কলিগ সকলকে আর তাদের প্রতিষ্ঠানের উপরে!!!!   এনিয়ে সেনাবাহিনীতে  আত্মীয় বন্ধুবান্ধব যাদের আছে তাদের কাছে থেকে ভিতরের ঘটনাবলীতে প্রতিক্রিয়াও বাইরে আসতে থাকে। এসব কথাই আমিও বিস্তারিত তখনই জেনেছিলাম।   অর্থাৎ বাংলাদেশের কম-বেতনপ্রাপ্ত [poor paid] সৈনিক সদস্যদের জন্য জাতিসংঘে যেতে পারা যেমন তাদের জন্য এক বিরাট রিলিফ বা আয়ের বিকল্প ব্যবস্থা হয়ে উঠেছিল   আর সেই বিকল্প ব্যবস্থাটাই আবার হাসিনা ফ্যাসিস্ট-শাসকের জন্য এক বিরাট গলার ফাঁস হয়ে উঠেছিল। সাধারণ সৈনিক আর জুনিয়র অফিসার যারা সেনাজীবনে মোট তিনবার মিশনে যাবার সুযোগ পেয়ে থাকে তারাই এতে হাসিনার নির্বিচার গোলাগুলি গুম-খুনের প্রবল প্রতিবাদি এবং বিরোধী হয়ে উঠেছিল। কারণ পরিস্থিতি তাদের জন্য শান্তিমিশনে যাবার বিরুদ্ধে এমন হয়ে যাচ্ছিল। এটাই ১৯ জুলাই থেকে সেনাপ্রধানকে দিয়ে নির্বিচারে গুলির ভয় দেখিয়ে হাসিনার নিজ জনগণের বিক্ষুব্ধ জনরোষকে নিয়ন্ত্রণ একেবারেই অসম্ভব করে তুলেছিল।  সেনাপ্রধান ওয়াকার এর পরাজয়ের (আত্মীয়ের স্বার্থ -খায়েসের পক্ষে সার্ভিস দিতে না পারা) মূল কারণ ছিল এটাই। শুধু তাই নয়, সেই অপরাধের অভিযোগ এখনও তার মাথার উপরে ঝুলছে। এভাবে  সেনা প্রতিষ্ঠানের এভাবে বিপক্ষে ঘুরে যাওয়া এটাই হাসিনার ক্ষমতা হারানোতে ও পলায়নে  নির্ধারক হয়ে গেছিল। এর কারণে, ওয়াকার তখন বিপরীত পদক্ষেপে,  সেনাসদরে দরবার ডেকে নতুন করে নতুন নীতিতে অস্ত্র সংবরণ এর ঘোষণা ও সংশোধন করে নেয়া ছাড়া ওয়াকারের সেনা-নেতৃত্বের আর কোন উপায় ছিল না।  এটাই সেনাপ্রধানের একক কর্তৃত্ব হারানোর ক্রমশ শক্ত কারণ হয়ে উঠেছিল। পদবী তিনি শেয়ার করছেন না কিন্তু কার্যত তিনি কর্তৃত্ব হারানো বা তা শেয়ার করতে বাধ্য হয়ে যাওয়া অবস্থায় আছেন। বাংলাদেশের সেনা ইতিহাসের এ’এক আজীব পরিস্থিতি বলেই অনুমানে মনে হয়!

    ইতোমধ্যে আপনারা এখন সবাই জানেন ৫ আগষ্ট ২০২৪ হাসিনা পলাতক হন, দেশত্যাগ করেন।  ওদিকে বাসায় বসেই নিয়মিত সব খবরাখবর আমি পেতে থাকি। এরকমই এক ঘরোয়া কথাবার্তায় আমার এক ছোটভাই মাসুদ [Masud zakaria] ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয়েছিল একদিন যাতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আমার টাটকা মন্তব্যগুলো (আগামিদিনের ইতিহাস হিসাবে যা গণ্য হতে পারে) সে রেকর্ড করে রাখতে পারে। সময় দিনক্ষণটা যতটা অনুমান করা যায় তা ২০ আগষ্টের আগে নয়, আমার বাসায় বসেই প্রায় আড়াই ঘন্টার সেই কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছিল। এই কথোপকথন নানা কারণে খুব বেশি প্রচার করা হয় নাই। আমি নিজে পাবলিকলি তা শেয়ার করি নাই। আজ এখানে তা তুলে দিব হয়ত!

    কোন গভীর বা ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তন – যেমন আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান – এর ইতিহাস লেখা বর্ণনা করা সহজ নয়। এছাড়া তা দেরি করে লেখা ভাল। যাতে এই ভাল-মন্দ দিক পাবলিক ততদিনে ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে রিভিউ করতে সক্ষম হয়। টাটকা অস্থির বা থিতু হয় নাই যখন তখনকার চেয়ে এতে স্থিরতার সুবিধা বেশি পাওয়া যায়।  তবু ঐ কথোপকথন  রেকর্ডিংয়ে আমার চোখে ঘটনাবলি বর্ণনায় আমি তিনটা মুখ্য নির্ধারকের কথা উল্লেখ করেছি – ১। ছাত্র-জনতা  ২। সেনাঅভ্যন্তরে নেতৃত্ব-ক্ষমতায় বদল আর ৩। জাতিসংঘের ভুমিকা(OHCHR অফিস)। বেশিরভাগ জনই এই তৃতীয় ফোর্স ও ফ্যাক্টর টার কথা জানেই না। সেটাই গতকাল ভলকারের বক্তব্যে উঠে এসেছে, শিরোনাম হয়েছে।   যেটা আমার ২০ আগষ্টের পরের রেকর্ডিংয়ে আমি স্পষ্ট  উল্লেখ করেছিলাম।

    ঘটনাবলি বর্ণনায় আমি তিনটা মুখ্য নির্ধারক বা ফ্যাক্টর এর কথা উল্লেখ করেছি –
    ১। ছাত্র-জনতা
    ২। সেনাঅভ্যন্তরে নেতৃত্ব-ক্ষমতায় বদল আর
    ৩। জাতিসংঘের ভুমিকা(OHCHR অফিস)।

     

    আর প্রথম দুইটা নির্ধারক ফোর্স ও ফ্যাক্টর এর কথা প্রসঙ্গে বলব – এই দুইটা ফোর্স বা ফ্যাক্টর আসলে পরস্পরের পরিপূরক!  তবুও  সেনাঅভ্যন্তরে নেতৃত্ব-ক্ষমতায় বদল এই ফ্যাক্টরটাকে  আমি আগিয়ে রাখব। তা এজন্য যে আমার জানামতে এই শক্তির জন্ম ও বিস্তার প্রস্তুতি সেই ২০১৯ সাল থেকে হলেও বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কখনই এর জন্য অনুকুলে আসে নাই। এমনকি লাগাতর তিন বছর বাইডেনের (স্যাংশন ও মানবাধিকারের খড়্গ ) হাসিনার উপর ঝুলে থাকলেও এর সুবিধা নিয়ে হাসিনাবিরোধিদের আন্দোলন মাঠে নামা পর্যন্তই সবকিছু থেমে থেকেছিল – এরপরে দুইটা রাজনৈতিক দলের বারবার অনিহা – মূলত এর (তাদের বিশেষ স্বার্থ, বিশেষ হিসাব মিলে নাই বলে) কারণে এটা আর আগাতে পারে নাই। আর ২৮ অক্টোবর ২০২৩ এটা একেবারেই হাতগুটানো মৃতপ্রায় হয়ে যায়। ইতোমধ্যে এর আগেই অবশ্য বাইডেনও পল্টি মেরেছিল সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে – পরে যা বাইডেন-হাসিনার সাথে এক হয়ে কাজ করবে  – বলে ফতোয়া দেয়া বাইডেনের হাসিনাকে লিখিত চিঠি প্রকাশ্যে এসেছিল।
    এই বিচারে বলা যায়, যেখানে রাজনৈতিক মাঠ আটকে পড়েছিল সেখান থেকে একে উঠানোর কাজটা বলা যায় নিজের অজান্তেই সম্পন্ন  করে ফেলেছিল ছাত্রদের কোটা আন্দোলন। যা পরে এক দফা বা হাসিনা পতনের ডাক পর্যন্ত উঠে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করাটা এটাকেই পুঁজি করে ‘সেনাঅভ্যন্তরে নেতৃত্ব-ক্ষমতায় বদল”   ব্যাপারটা ঘটিয়ে দিবার সুযোগ নিয়েছিল।
    তাই এককথায় বলা যায়, ছাত্র-জনতা সবল্ভাবে সেসময়ে মাঠে যদি হাজির না হতে পারত তবে ‘সেনাঅভ্যন্তরে নেতৃত্ব-ক্ষমতায় বদল’ – কোনভাবে সম্পন্ন হতে পারলেও এটাকে গণঅভ্যুত্থান বলা দূরে থাকে এটা এক ব্যারাকের ক্যু মানে সামরিক ক্ষমতা দখল বলেই আমাদের ইতিহাসে হাজির হত – একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়!
    আবার উলটা দিক থেকে বললে, ‘সেনাঅভ্যন্তরে নেতৃত্ব-ক্ষমতায় বদল’ এর লক্ষ্য বলে যদি কিছু নাই থাকত তবে এই ছাত্র-জনতা রক্তস্নান করে কয়েক হাজার মরে রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকত! এতে হাসিনা রক্তস্নাত হত অবশ্যই কিন্তু ক্ষমতা নিজ মুঠোর মধ্যেই রেখে দিতে সক্ষম হয়ে যেত!  এই হল মোটা দাগে আমার অনুমান বিশ্লেষণ!
    তবু এরপরে এখনও শেষ একটাই কথা যা অব্যক্ত রেখে দিয়েছি তা হল, সশস্ত্র ছাত্রলীগ ও আওয়ামি-বেপরোয়া-পুলিশ লীগ কীভাবে ও কেন পরাজিত হয়ে গেছিল। আর এর ফলাফলে যা থেকে হাসিনাকে আর্মির উপর নির্ভরশীল করে দিয়েছিল। তা বলা হয় নাই।  ইতিহাসের বহু অধ্যায় বলা হয় ১৫-২০ বছরের আগে ওপেন বলা যায় না।  এটা সম্ভবত সেই অধ্যায়; কেউ হয়ত বলবে সেকথা!

    শেষ করব দুটা কথা বলেঃ
    ভলকার টুর্ক এর অফিস যদি সেনাবাহিনীকে ওয়ার্ণিং না দিত, আপত্তি না তুলত তাহলে  ‘সেনাঅভ্যন্তরে নেতৃত্ব-ক্ষমতায় বদল’ – এটা ঘটত বা সহজে ঘটানো যেত না। এই অর্থে এটা যেন সবকিছুর উপরে প্রধান ফ্যাক্টর-নির্ণায়ক।
    কিন্তু এর উপরও আরেকটা নির্ণায়ক আছে। সেটা হল, কেন বাইডেনের আমেরিকা  ভলকার টুর্ক এর অফিস কে এই স্বাধীনভাবে কাজ করতে এলাও করেছিল?????

    এটা বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন!
    যদিও জানা থাকলে জবাবটা খুব সহজ মনে হবে!  সাধারণত, ভলকার টুর্ক এর অফিস কে আমেরিকা তার স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট মানে আমেরিকান পররাষ্ট্র বিভাগ সব সবসময় নিজ সহায়ক অভিমুখে চলতে সব সময় বাধ্য করে থাকে। যতটা যতক্ষণ আমেরিকা একে প্রভাবিত করতে পারে। এটা সাধারণভাবে সবসময় সত্য! কিন্তু আমাদের আলোচ্য ক্ষেত্রে এটা একটা নতুন ঘটনা হয়ে হাজির ছিল। তা হল,  ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনা সরকারের সাথে একযোগের কাজ করবে বলে চিঠি লিখে তা পাঠিয়েছিল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের হাত দিয়ে। আর তা ব্যাপক মিডিয়া পরিচিতিতেই ঘটেছিল, এমনকি এর আগে ৭ জানু. ২০২৪ কথিত নির্বাচনটা বাইডেন হাসিনাবিরোধী সকলের সাথে বিশ্বাকসঘাতকতা করে হাসিনার কথিত নির্বাচনকেই সমর্ত্থন দিয়েছিল। ফলে এককথায়, বাইডেন ১৮০ ডিগ্রী ঘরে হাসিনার পক্ষে পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে বাইডেন প্রশাসন ভাবতেও পারে নাই যে এর চার মাসের মাথায় খোদ হাসিনা ঢাকার এক গণঅভ্যুত্থানে উতখাত হবেন, দেশছাড়া হবেন। তাই এই মিরাকেল হাসিনা উতখাত ঘটে যাওয়া আসন্ন হয়ে উঠলে বাইডেন প্রশাসন নিজ পরাজয় নিজ বোকামিতে মুখ লুকানোটা ফরজ হয়ে যায়।
    কারণ আসলে, বাইডেন-হাসিনা একসাথে কাজ করবে একথা বলে ফেলার পরে হাসিনার উতখাত হয়ে যাওয়া মানে তো বাংলাদেশ থেকে বাইডেন প্রশাসনেরও উতখাত হয়ে যাওয়া। এবং বাস্তবে ঘটে গেছিল সেটাই। ফলে এখন কী হাসিনা পতনের পরে বাংলাদেশে আমেরিকা নিপাত যাক, কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, ঢাকায় বাইডেনের কুশপুত্তলিকা দাহ কংবা আমেরিকান ফ্ল্যাগ পায়ে দলা বা পুড়ানো শুরু হবে? হাসিনা উতখাতের সাথে তো তাই হওয়াটাই উচিত ও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হয় নাই; হতে দেয়া হয় নাই। প্রাকটিক্যাল কারণে। যা্রাই কেবল মাত্র দূরের জিনিষও দেখতে পায় তারাই এটা নিয়ন্ত্রণ করেছিল! এককথায়, আমেরিকা অপরাধী কিন্তু একে সাথে নিয়েই আমরা সামনের দিকে তাকাতে চাই! এটা এজন্য যে আমেরিকা যেন তা আমল করে সামনে আমাদের বিরোধিতা না করে আর ভারতকেই উলটা আমাদের পিছনে লেলায় না দেয়। এতে আমাদের সুবিধা হবে, আমেরিকা-বিচ্ছিন্ন এক ইন্ডিয়াকে আমরা পাবো যাকে মোকাবিলা করতে আমাদের জন্য তুলনামূলক সহজ বাস্তবতা আমাদের সামনে থাকবে। আর আমেরিকা মনে করিয়ে দেয়া যে তুমি অপরাধী; আর তা হলেও আমরা আমেরিকার সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক চাই। এই পররাষ্ট্র-নীতির কারণে ইউনুস সরকার এক গ্লোবাল ভারসাম্য তৈরি করে টিকে থাকতে পারছে।
    যদিও (নিজ অযোগ্যতা ও ছদর ঢাকতে) মোদি-জয়শঙ্কর মিথ্যা প্রপাগা্নডার চেষ্টা করেছিল যে বাইডেন প্রশাসনের বিরূপতার কারণেই হাসিনা নাকি উতখাত হয়েছে। কিন্তু এই বয়ান ভাত পায় নাই! আমরা বিজয়ী হয়েছি!
    তাহলে বাইডেন প্রশাসন জুলাই ১৬, ২০২৪ থেকে ভলকার টুর্ক এর অফিস কে কী বলেছিল, কী আমেরিকার নীতি জানিয়েছিল? তা এককথায় বললে,   ভলকার বাংলাদেশ আর্মিকে ওয়ার্ণিং দিতে মনস্ত করলে বাইডেন প্রশাসন তাতে কোন বাধা দেয় নাই। এটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট উপকারি ছিল! ফলে ভলকার টুর্ক ওয়াকার এন্ড হাসিনা গংয়ের উপর প্রবল হুমকি ও চাপ সৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। আসলে বলতে গেলে এটাই ভলকার টুর্ককে ওয়াকারের উপর (বাই বুক মানে মানবাধিকারের বইয়ে যেভাবে লেখা থাকে সেভাবেই) স্ব উদ্যোগ যা তিনি সফলভাবে চাপ প্রয়োগ করতে পেরেছিল।
    এককথায় বাইডেনের আমেরিকা হাসিনার সাথে এক দড়িতে ফাঁসির আসামি হয়ে গেছিলেন তখন – এটা জানলে পেরে নিজ অপরাধ কমাতে আমাদের সাথে কাজ করতে টুর্ক এর অফিস একে “গো এহেড” জানাইয়েছিল বাইডেন তবে প্রকারন্তরে – আপত্তি নাই মর্মে!  আর এতটুকুই আসলে আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল ওয়াকার এন্ড গং কে পরাজিত করতে!
    আবার এক্সট্রা সুবিধা একটা আমরা পেয়েছিলাম ইউনুস সাবের এক তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে! তিনি ভলকার টুর্ককে ডেকে তাদের হাতে স্বাধীনভাবে তারা তদন্ত করে হাসিনার হাতে গুম-খুনের বিশেষ করে জুলাই-আগষ্ট্রের খুনের ততপরতার স্বাধীন অনুসন্ধান করতে ওপেন হ্যান্ড দিয়েছেন। এতে আমরা ভলকার টুর্কের জাতিসংঘের অফিসের স্বাধীন এক অনুসন্ধান রিপোর্ট আজ পেয়ে গেছি। যাকে নিয়ে কোন ধরনের সন্দেহ বা ইউনুস সরকারের কোন সংশ্লিষ্টতাহীন এক বিশ্বাসযোগ রিপোর্ট আমরা হাতে পেয়ে গেছি।
    এতে গ্লোবালি হাসিনার অপরাধ এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আজ পানির মত স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হয়ে গেছে!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     আপডেটঃ  রাত ০৯ঃ ০৪, ০৭ মার্চ ২০২৫

     সর্বশেষ  আপডেটঃ রাত ১২ঃ ১৫, ০৮ মার্চ   ২০২৫