Tag: গৌতম দাস

  • নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
    গৌতম দাস
    ২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

     

     

    নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

    গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
    বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
    চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
    এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
    ১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
    ২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
    প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
    এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
    চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]

     

  • কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

    কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়
    গৌতম দাস
    ১৮ আগস্ট ২০১৬

    কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

    সম্প্রতিকালের বাংলাদেশ ‘জঙ্গী’ হামলার ব্যাপকতা দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। গত এক-দেড় বছর ধরে কিছু বিশেষ ধরণের সশস্ত্র হামলা, গলা কেটে দেওয়া বা বোমা হামলার মত ঘটনাগুলো আমরা দেখছিলাম। হামলার বৈশিষ্ঠের দিক থেকে এগুলোর কোনটাই ঠিক হামলাকারির আত্মঘাতি ধরণের তৎপরতা ছিল না। এর পরবর্তিতে আমরা বড় ব্যতিক্রম দেখলাম গুলশানের ‘হলি আর্টজান বেকারি’ নামের রেস্টুরেন্টে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ঘটনা। এটাকে ব্যতিক্রম বলছি এজন্য যে এই ঘটনাটা প্রথমে জিম্মি করা আর পরে সকলকে হত্যা করা ধরণের। যদিও এরপর সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কালে পাঁচজন হামলাকারির মৃত্যু ঘটে। এই অর্থে হামলাকারিরা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বা আত্মঘাতি প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়েই এই হামলা চালিয়েছিল বলা যায়। এর আগে কখনও এমন  বৈশিষ্ঠের হামলা আমরা দেখি নাই। আগে হামলাকারিরা কখনও আক্রমণস্থলে নিহতও হন নাই। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারি গ্রেফতারও না হয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এসব দিক থেকে বিবেচনায় গুলশানের হামলার ধরনটা ভিন্ন – জিম্মি করে হত্যা করা আর শেষে নিজেরাও নিহত হওয়া – এটা একেবারে নতুন।

    এই নতুনত্ব শুধু হামলার ধরণেই নয় আরও অনেক জায়গায় নতুনত্ব এনেছে। যেমন আগে সমাজে ‘জঙ্গিবিষয়ক’ নানা আলাপ হতে দেখা যেত, যেখানে সত্য-মিথ্যা প্রচারণা করতে দেখা যেত। যার বিবেচনা যে তাঁর শত্রু সে আসলে জঙ্গি হোক আর নাই হোক তাঁর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ প্রচারণায় নামতে আমরা দেখেছিলাম। অথবা, কারা জঙ্গী হয় এই প্রশ্নে একচেটিয়া বাছবিচার ছাড়া মাদ্রাসাগুলোকে দায়ী করে প্রচারণা ইত্যাদি এসবও আমরা দেখে আসছি গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। কিন্তু এবার বড় ব্যতিক্রম। স্পষ্ট হাতেনাতে প্রমাণে জানা গেল হামলাকারিরা সমাজেরই উচু ঘরের। একেবারে রাজধানী শহরের সবচেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের শিক্ষালাভ দেশের মর্ডান ইংলিশ স্কুলের ও দেশি বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এককথায় বললে তা মাদ্রাসা তো নয়ই, বরং তারা একেবারে আধুনিক উচ্চস্তরের শিক্ষা, মর্ডান কারিকুলামের ভিতরে থেকে তাদের পড়াশুনা করছিলেন। ফলে হামলাকারিদেরকে ‘পশ্চাদপদ’ বলে নাক সিটকানো, গরীব মাদ্রাসার তুচ্ছ ও দায়ী করা অথবা লজিক্যাল র‍্যাশনাল মন থাকলে সবকিছুর সমাধান পাওয়া যেত ইত্যাদিতে আধুনিকতার শ্রেষ্ঠত্ব ধারণা যা এতদিন করে খাচ্ছিল সেই ভ্যানিটি আর মিথ্যা গৌরব সবকিছুই এবার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছিল। এটাও একটা বিশাল ব্যতিক্রমি ঘটনা মানতে হয়। এরকম করে হয়ত আরও  অনেক ব্যতিক্রমী দিক আমরা খুঁজলে বের করতে পারব। কিন্তু আসল  উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম যা এখানে লেখার মুল প্রসঙ্গ তা হল, হামলাকারি ‘জঙ্গিদের’ মৃত্যু পরবর্তি জটিলতা। অর্থাৎ মৃত ‘জঙ্গিদের’ মাটি পাওয়া বা দেওয়া। যতদুর মিডিয়া দেখে জানা গেছে তাতে মৃত ‘জঙ্গিদেরকে’ মাটি দেওয়া বা সৎকারের কাজ করার ব্যাপারে খোদ নিজ পরিবারের প্রধানদেরকে প্রকাশ্য অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এমনকি লাশ গ্রহণ না করার পক্ষেই প্রকাশ্যে ঘোষণা বা অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

    মানুষ মারা গেলে সে তখন লাশ মাত্র – একে সৎকার করতে হবে। এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়। গোত্র বা ধর্মীয় নানান রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণে করে দুনিয়ার সব সমাজ কমিউনিটিই তা পালন করে থেকে। আমাদের যার যার ধর্ম ও সমাজ সভ্যতার রীতিনীতি সম্পর্কে যত প্রাচীন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় সব ধরণের কমিউনিটিতে লাশের সৎকার করার বাধ্যবাধকতা সব সমাজেই আছে থাকে দেখা যায়। এছাড়া আর একটা দিক হল, জীবিত অবস্থায় মানুষ কারও কাছে অথবা অনেক মানুষের কাছে বন্ধু হয়,আবার শত্রুও হয়। একারণে মানূষের কাজ ততপরতার মুল্যায়নে জীবিত অবস্থাতেই সে খুবই ঘৃণিতও হয়, হতেই পারে। প্রচন্ড অন্যায়কারি বা অত্যাচারিও হতে পারে। আবার মানুষের যা কিছু স্বভাব বা বদস্বভাব এর মুল্যায়ন শুধু তার জীবতকালে এবং মারা যাবার পরও চলে, চলতে থাকে। তবে মারা যাবার পর কেবল একটা জায়গায় তফাত হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে নানান মূল্যায়ন তখনও জারি থাকে। যেটা থাকে না তা হল মুল্যায়ন-উত্তর করণীয় একশন – অর্থাৎ মুল্যায়নে যদি দোষ পাওয়া যায় তবুও ওখানেই তার সমাপ্তি টানা হয়। দোষের জন্য আমরা কোন বিচার বা শাস্তির পদক্ষেপ আর থাকে না। মানে আমাদের মুল্যায়নে যদি দেখা যায় যে উনি জীবিত অবস্থায় খারাপ ছিলেন, ধরা যাক অত্যাচারি ছিলেন – তবুও মারা যাবার পর এর জন্য তাকে কোন শাস্তি দেওয়া, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ইত্যাদি থেকে আমরা বিরত থাকি। কারণ তখন এগুলো অর্থহীন। কিন্তু পরিস্কার রাখার জন্য মনে করিয়ে দেই, মৃত মানুষের মুল্যায়ন মৃতের-বাসায় না হোক সমাজে বন্ধ হয় না। কিন্তু তবু মুল্যায়ন করার পর সেটা আর বিচার শাস্তি বা অভিযোগের পদক্ষেপের দিকে যায় না, আমরা নেই না। কারণ বাস্তবে সে তখন শাস্তির উর্ধে।  এধারণাটাই অনুসরণ করে আধুনিক রাষ্ট্রের আদালতেও মৃত ব্যক্তির পক্ষে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট দাখিল করলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কিন্তু মৃত অপরাধীকেও আদালত ঐ ব্যক্তির নামে আনা সব অভিযোগ থেকে তাকে রেহাই ও মুক্ত করার রায় দেন।

    মুল্যায়ন বিচার কথাটা ব্যাপক দিক থেকে দেখলে, মানুষের বিচার দুই দুনিয়াতেই হয় বলে মনে করা হয়। এই দুনিয়ার বিচার মানে রাষ্ট্রের আইন আদালত। রাষ্ট্রের আদালত কোন মৃত মানুষের বেলায় দুনিয়ায় তাঁর কৃতকাজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত বলে রায় দেয়। আর অন্য দুনিয়া বেলায়, সেখানে আবার  বিচারের এক্তিয়ার আর আমাদের নয়, একমাত্র আল্লাহর। এই পরেরটার ব্যাপারে আমরা কেউ জানি না সেই বিচারে কার কী হবে, কে কীসে দোষী না বেকসুর বলে সাব্যস্ত হবে। আমাদের মানুষের এক্তিয়ারের বাইরে সেটা। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ মারা যাবার পর মুল্যায়ন তখনও চলে কিন্তু বিচার বা মুল্যায়ন-পরবর্তি কোন একশন আর চলে না। মানুষের সাধ্য নাগালের বাইরে এটা। তাহলে দাঁড়াল, দুনিয়ার আদালত তাকে মুক্ত করেই দেয়। আর আল্লাহর এক্তিয়ার তো আমাদের নয়। এটা আল্লাহর উপরই ছেড়ে রাখতে হয় আর সেটাই বিধানও বটে।

    এই অর্থে সারকথাটা হল,মানুষ মারা গেলে সে সব বিচার-শাস্তির উর্ধে চলে যায়। কারণ সব অভিযোগ তখন অর্থহীন হয়ে যায়।

    গুলশান ঘটনার পর সরকারের দিক থেকে সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার তাগিদ অনুভব খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। সরকার জনগণের সাথে বন্ধুমুলক মানে যাকে ফ্রেন্ডলি বা পপুলার বলি – তা হোক আর নাই হোক সব সরকারই এমন ঘটনার পর হামলা ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টাই করে থাকে। এদিক থেকে তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তুই কতদুর এটা স্বাভাবিক? যতদুর তা মাটি দেওয়ার বিরুদ্ধেও জনমত তৈরির ব্যাপার পর্যন্ত প্রসারিত না হয়।

    তাহলে অভিভাবক পিতারা কেন অনীহা দেখাচ্ছেন,কেন প্রকাশ্যে লাশ নিতে চাচ্ছেন না? মনে হচ্ছে তারা বাবা হিসাবে নিজ মৃত সন্তানের সৎকারের দায় আর ব্যক্তি বা সমাজের একজন হিসাবে দায় – এই দুইয়ের মধ্যে গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

    ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে আমাদের এমন গন্ডগোলে পড়ার কথা না। সমাজে একই মানুষের একই সাথে নানান রকমের ভুমিকা পালন করতে হয়, থাকে। মুল ব্যাপারটা হল, নিজ সন্তান ‘জঙ্গি’ হবার পথে গিয়েছে অথবা কাউকে হত্যা করে শেষে নিজেও নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম কথা হল, যেভাবে যাই ঘটুক, শেষ বিচারে সাবালক সন্তানের কৃতকর্মের দায় ঐ সন্তানের। লিগাল দায় সন্তানের, পিতা বা অভিভাবকের নয়। রাষ্ট্রীয় আইন আদালতের ক্ষেত্রেও এটা এমনই। এমনকি শুধু সন্তান কেন, যে কোন একজনের দায়ে অন্য জনকে শাস্তি দেওয়া যায় না। আর ওদিকে ধর্মীয় বা আখিরাতের বিচারেও দুনিয়ায় যার যার কৃতকর্মের দায় তাঁর নিজের। এমনকি, চুরি ডাকাতি করে সংসার চালানো পিতার ঐ সংসার থেকে ভরণপোষণ পাওয়া পোষ্য সদস্যদের কারও উপর কোন চুরি ডাকাতির দায় বর্তায় না। না এই দুনিয়া না সেই দুনিয়ার বিচারে। যদিও সন্তান ‘জঙ্গী’ বলে পিতা বা অভিভাবকের মনে অস্বস্তি থাকতে পারে, সন্তাহ হারানোর বেদনাও সেখানে  থাকে, এমনকি সন্তান যাকে হত্যা করেছে তার বা তাঁর পরিবারের প্রতিও সমবেদনা থাকে – সেগুলো আলাদা জিনিষ।

    অতএব ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ততপরতার বিরুদ্ধে সমাজ বা রাষ্ট্র জনমত তৈরি করলে সেখানেও  কোন মৃত ‘জঙ্গির’ পিতাও সমাজের একজন হিসাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি একইসাথে কোন মৃত সন্তানের পিতা হন আর নাই হন। স্বাভাবিক অংশগ্রহণই তিনি করবেন। এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি যদি নিন্দা জানাতে মনস্থ করেন সক্রিয় অথবা নিষ্ক্রিয়ভাবে – তবে তাও করবেন, একদম স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তাই বলে সেই একই পিতা সন্তানের সৎকারের প্রসঙ্গে তার করণীয় যা, সৎকারে আয়োজনের ক্ষেত্রে পিতার যা ভুমিকা হয় তাও পালন করবেন, তাকে করতে হবে। কেননা এটা শুধু পিতা বলে নয়। মনে রাখতে হবে, এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়ও।

    আমরা আশা করব অভিভাবক পিতারা ‘জঙ্গী’ ততপরতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ব্যাপারের অংশগ্রহণের সাথে সাথে, মৃত সন্তানের  লাশ গ্রহণ ও  সৎকারের  প্রসঙ্গে পিতা হিসাবে তার যা কিছু দায় তারও প্রতিটা তিনি পালন করবেন। এই দুইয়ের মধ্যে কোন স্ববিরোধ নাই।

    আচ্ছা, কোন পিতা বা অভিভাবক যদি লাশ না নেন, অস্বীকার করেন তাহলে সেক্ষেত্রে লাশের কী হবে? এখান একটা কথা মনে রাখতে হবে – ধর্মীয় রীতিনীতি যাই থাক, জীবিত মানুষ নিজের ব্যবহারিক স্বার্থেই মৃত মানুষকে কবরস্ত করে। পাশে রেখে ঘুমায় না। এটাও জীবন বাস্তবতার আর এক দিক। কারণ লাশ পাশে রেখে বা পচিয়ে ঘর সংসার পরিবার করা চলে না। পচনশীলতার ম্যানেজমেন্ট দিক থেকে সে হিসাবেও লাশ সম্মানের সাথে কবরস্তই সঠিক ও বাস্তব বিধান। একাজ  মৃতের  পিতা বা অভিভাবক না করলেও সমাজ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে না কাউকে তা করতেই হবে। এবং সেটা করতে হবে একেবারে সম্মানের সাথে। কারণ মৃত মানুষের ভিতরে আমরা জীবিতরা  প্রত্যেকেই নিজেকে দেখতে পাই। আমার মৃত্যুর পর যেহেতু  আমিও আমার অসম্মান দেখতে চাইতে পারি না। তাই আমার মৃত্যুর আগেই সমাজে সৎকার ব্যবস্থা – এটা সমাজের রেওয়াজ হিসাবে গড়ে উঠুক, আমরা সবাই তা চাই। তাই আমরা দুনিয়ার সব লাশ এমনকি একেবারে অচেনা অজানা লাশকেও অজান্তে মনের গভীর থেকে সম্মান করি। তবুও কেউ কেউ, কাউকে হত্যা করে সেই লাশের উপর নৃত্য করার রেফারেন্স দিতে চাইতে পারেন।  হা পারেন তবে সেটাকে আমরা জিঘাংসা বলি। জিঘাংসা এক মানসিক রোগ যা থেকে বের হয়ে আসার উপায় বা পাথেয় হল মনোরোগের চিকিৎসা। কী আর করা,  জিঘাংসা মানুষের মৌলিক স্বভাব না হলেও আমরা অনেক মানুষকে জিঘাংসার ভিতর সুখ খুজতে দেখি।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ

    হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ
    গৌতম দাস
    আগস্ট ১২, ২০১৬

    http://wp.me/p1sCvy-1EO

    ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার সময়কালের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে (১৭৫৭-১৯৪৭) বাংলা ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নির্ধারক ভূমিকা যিনি রেখেছিলেন, তিনি হাজী শরীয়তুল্লাহ। তাঁর ভূমিকা প্রভাবশালী ও নির্ধারক বলছি এই অর্থে যে, ব্রিটিশ শাসন-উত্তরকালে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য কী রূপ ধারণ করতে পারে, তা নির্ধারণে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা তিনি রেখেছেন। এমনকি আজকের বাংলাদেশেও আমাদের যা কিছু ‘বিশেষ বৈশিষ্ট্য’ তাকে বুঝতে হলে হাজী শরীয়তুল্লাহ যে বিশেষ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ইসলামচর্চা করেছেন, সেদিকে নজর না ফিরিয়ে উপায় নেই। অনেকে কখন কীভাবে এ দেশে ইসলামের আগমন ঘটেছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস অনুসন্ধান করছেন। বিশেষত তলোয়ারের দ্বারাই যদি এ অঞ্চলে ইসলাম কায়েম হয়ে থাকে, তাহলে দিল্লির আশপাশের চেয়েও দিল্লি থেকে বহুদূরে কীভাবে তা সম্ভব হল, তা নিয়ে তর্কবিতর্ক করছেন। এ দেশের জনগণের আত্মপরিচয়ের স্বরূপ কিংবা সেই স্বরূপ নিয়ে বিতর্ক বোঝার জন্য ইসলামের আগমনকেই নির্ধারক মনে করা হয়। কিন্তু ইসলাম কীভাবে এই ভূখণ্ডের ইহলৌকিক বাস্তব লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে মূর্ত করেছে, সে হদিস আমরা বিশেষ নিতে চাই না। এ পরিপ্রেক্ষিতে হাজী শরীয়তুল্লাহ আমাদের জন্য নতুন ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসেবে হাজির হন। হাজী শরীয়তুল্লাহর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইসলামের এক বিশেষ ঐতিহাসিক পর্বের দিকে আমাদের নজর ফেরাতে বাধ্য করে। যাকে শুধু ইসলামের আগমন দিয়ে বোঝা যাবে না। এমনকি শুধু ধর্ম দিয়েও নয়। বরং আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ইসলাম গণমানুষের লড়াই-সংগ্রামে কী ভূমিকা রেখেছে, সেদিকেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করার তাগিদ তৈরি করে। হাজী শরীয়তুল্লাহর ভূমিকা প্রভাবশালী ও নির্ধারক এ অর্থেই।

    হাজী শরীয়তুল্লাহর জীবনকাল ১৭৮১ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ। তিনি ধর্মীয় সংস্কারক এবং ব্রিটিশ-ভারতের বাংলায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা। তার জন্ম হয়েছিল ফরিদপুরে; মানে, সেকালের ফরিদপুরের এক মহকুমা, যা একালের মাদারীপুর জেলা, এরই শামাইল (বাহাদুরপুর) গ্রামে। বেশির ভাগ লিপিকার তাঁর সম্পর্কে পরিচিতি দেয়া এভাবে শুরু করেন যে, “তিনি শুধু ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, বরং কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন”।

    হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম এক ‘তালুকদার’ পরিবারে বলে জানা যায়। তিনি হজ করতে মক্কা শরিফে যান ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে। হজ শেষে ১৮১৮ সালে বাংলায় আসেন। দেশে ফিরে তিনি ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন। শরীয়তুল্লাহর নামানুসারেই বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে।

    ‘ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া’ নামে একটি কথা চালু আছে। যারা আমাদেরকে কলোনি বানিয়ে আমাদের ওপর এক দখল শাসন কায়েম করেছিল। সেকালের অবিভক্ত ভারতবর্ষ ব্রিটিশ কলোনির শাসনাধীন থাকার সময়কালকে বোঝাতে সাধারণত ব্রিটিশ- ইন্ডিয়া লেখা হয়। যদিও ব্রিটিশ কলোনির শাসনাধীন বলতে বাস্তবে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার নয়, বরং শুরুতে ছিল এক ব্রিটিশ জয়েন্ট স্টক কোম্পানির শাসন, যে কোম্পানির নাম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া (সংক্ষেপে এখন থেকে শুধু ‘কোম্পানি’ বলা হবে)। আমাদের অতি পরিচিত ১৭৫৭ সালের পলাশি যুদ্ধেও ব্রিটিশ দখলদারীর আগের অনেক কিছুরই তখন শেষ হয়নি, চূডান্ত ফয়সালা হয়নি।

    সেদিক থেকে পরবর্তীতে নির্ধারক আরেক ঘটনা হল, ১৭৬৪ সালের ‘বক্সারের যুদ্ধ’ (বক্সার বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত)। ওই যুদ্ধে মোগল সম্রাট, অযোধ্যার নবাব ও বাংলার নবাব এই ত্রয় ছিল কোম্পানির বিপক্ষের ক্যাম্পে। এদের পরাজয়ের পরই বাস্তবে বাংলায় কোম্পানির শাসন বা ব্রিটিশ কলোনির পত্তন ঘটেছিল। যদিও আমাদের পপুলার ধারণা হল, বাংলার পলাশীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় হওয়া থেকেই বাংলায় কোম্পানির শাসন শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা না হলেও পপুলারলি আমরা তা বলে থাকি এই অর্থে যে, আমরা বোঝাতে চাই পলাশির পরাজয়ের পর কোম্পানি শাসন সঙ্গে সঙ্গে না এলেও কোম্পানি শাসন আসার বীজ বপন করা হয়ে গিয়েছিল। পলাশিতে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নবাব সিরাজের পরাজয়ের পর আসলে কোম্পানির সহায়তায় পাপেট নবাব হয়েছিলেন মীরজাফর। কিন্তু মীরজাফর কোম্পানির পক্ষে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল কোম্পানির ভারতে পণ্য আমদানি-রফতানিতে ট্যাক্স না দেয়ার সুবিধাদি ও নগদ অর্থ কোম্পানিকে দেয়ার আঁতাতের শর্তের বিনিময়ে। এতে সে নিজে নবাবও হয়েছিল, কিন্তু ওসব দেনা-পাওনার শর্ত পরে বাস্তবে কাজ করেনি। দুপক্ষই শর্ত ভেঙেছিল। ফলে কিছুই থিতু হতে পারেনি। এরই মধ্যে মীরজাফরের মৃত্যুর পর ১৭৬০ সালে তাঁর জামাই মীর কাশেম বাংলার নবাব হন। আর কোম্পানির সঙ্গে পুরানা অসন্তোষের বিষয় আরো প্রকট হতে থাকে। মীর কাশেম নিজের কৌশলগত নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার স্বার্থে নদীপথের ব্রিটিশদের কর্তৃত্বের নাগাল থেকে দূরে থাকতে তারা রাজধানী নিয়ে যান বিহারের মুঙ্গেড়ে। ফলে সব পক্ষের অসন্তোষের ফয়সালার যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল বিহারের বক্সারের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে কোম্পানির হাতে পরাজয়ের পর বিজয়ী হিসেবে কোম্পানির দেয়া শর্ত হিসেবে এই প্রথম আইনগত ভিত্তিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। অষ্টাদশ মোগল সম্রাট শাহ আলম (দ্বিতীয়), যুদ্ধে হারার খেসারত বা শর্ত হিসাবে কোম্পানিকে বাংলার দেওয়ানি লিখে দিয়েছিলেন। যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় আরও যেসব শর্তে নবাব ও সম্রাটরা কোম্পানীর সাথে চুক্তি করেছিলেন তাই বিখ্যাত ‘এলাহাবাদ চুক্তি’, যার অংশ ছিল এই দেওয়ানি লিখে দেওয়া।  দেওয়ানি মানে খাজনা-রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক দেখভালের কর্তৃত্ব। বাংলার দেওয়ানি লাভ কোম্পানির দিক থেকে এক গুরুত্বপুর্ণ মাইলস্টোন অর্জন। কারণ দেওয়ানি লাভের পর ভূমি খাজনা আদায় ব্যবস্থায় কোম্পানি এক আমূল বদল আনে। আগের মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় দেওয়ান বা দেওয়ানের প্রতিনিধিকে জমির খাজনা দেয়ার বিনিময়ে জমির ভোগদখল করত আবাদি কৃষক যাদের ‘রায়ত’ বলা হত। কিন্তু এবার দেওয়ানি অধিকারপ্রাপ্ত কোম্পানি আর খাজনাদাতা জমির ভোগদখলকারী কৃষকের মাঝে তৃতীয়পক্ষ এক জমিদারকে এনে এক ‘জমিদারি ব্যবস্থা’ চালু করা হয়। জমিদার কোম্পানিকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে আগাম ও স্থায়ীভাবে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দেবে এ শর্তে স্থায়ীভাবে জমিদারকে জমিদারিস্বত্ব দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয় এই ‘জমিদারী আইন’ থেকে। এর পর জমিদার ইচ্ছামত পরিমাণ খাজনা আদায় করে প্রজাদেরকে জমি বন্দোবস্ত বা পাট্টা দিত। ভূমি মালিকানা ও চাষাবাদ ব্যবস্থায় এভাবে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় জমিদারি আইন। জমিদারি আইন কথাটা প্রচলিত ভাষায় বলা, আর তা আনুষ্ঠানিক নামে বলা হয় – চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন ১৭৯৩ (বা পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট অ্যাক্ট, ১৭৯৩)।

    মোগল আমল থেকেই পুরো ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাপনাটা দাঁড়িয়ে ছিল মূলত দুটো পক্ষ দেওয়ান ও আবাদি কৃষক, এদের সম্পর্কের উপরে। যেখানে ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে দেওয়ানের পক্ষে কালেক্টর বা তালুকদার বা কানুনগো ইত্যাদি নানা নামের আর এক পক্ষকে দেখা যেত। কিন্তু যারা কোনোমতেই দেওয়ানের ঠিকাদার নয়, বরং অবশ্যই তাঁর বেতনভোগী বা কমিশনভোগী কর্মচারী। এবং তারা আগাম কোনো অর্থ দিয়ে দেওয়ানের কাছ খাজনা তোলার অধিকার লাভ করা কোনো ঠিকাদারও নয়। পুরানা মোগল ভূমি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এ অঞ্চলের কৃষিকাজ একেবারেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এতে ফসলের ভালো-মন্দ বা কম-বেশি হওয়াটা একেবারেই প্রকৃতি নির্ভরতার তালে এগিয়ে চলত। ফলে জমি থেকে ফসল বা আয় প্রাপ্তির ব্যাপারটা বা এই প্রকৃতি নির্ভর থাকার অনিশ্চয়তাটার দায়ক্ষতি মোগল শাসকরা রায়তের সঙ্গে শেয়ার করত। কিন্তু ব্রিটিশরা এসে সেটা আর করতে চাইল না। এছাড়া তারা নতুন বলে, নিজেদের ব্রিটিশ রাষ্ট্র চালিয়ে আসা লোক বলে মনে করেছিল তারা বাংলাকে আগের চেয়ে ভাল, আরো বেশি প্রফিট আদায় অর্থে ভাল এক ব্যবস্থা চালু করতে পারবে। আর তা করতে গিয়েই নতুন ব্যবস্থা – জমিদারি আইন। তবে এখানে ব্রিটিশ শাসকরা জমিদারকেই নিশ্চিত ও স্থায়ী পরিমাণ খাজনা জমা দিতে বাধ্য করার পুরা দায় ও এজেন্ট হিসেবে হাজির করাতে গিয়ে তাকে এক স্বৈরাচারী দানব বানিয়ে দিবার সব শর্ত পুরণ করেছিল। ফলে এবার ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাপনাটা পরিষ্কার তিনপক্ষ ব্রিটিশ দেওয়ানি, বাংলার নতুন শ্রেণী জমিদার আর আবাদি কৃষক – এভাবে করে সাজানোতে প্রথম দুপক্ষই তাদের স্ব স্ব স্বার্থটা নিংড়ে বের করে নিতে পেরেছিল ঠিকই, আর তা করা গিয়েছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আবাদি কৃষক ঘাড়ে চড়ে, তাদেরকে চুষে শুষে নিয়ে। অর্থাৎ আবাদী কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ সেখানে ছিল না। নতুন জমিদারি ব্যবস্থায় আবাদি কৃষকরা তাই হয়েছিল সব হারানো, কেবল জমিদারের প্রজা। মোগল আমলে  রায়ত হিসাবে জমির টাইটেল ছিল খাজনাদাতা আবাদি কৃষকের নামে। জমিদারি আইনে জমির ঐ টাইটেল রায়তের থেকে কেড়ে নিয়ে তা দিয়ে দেওয়া হয় জমিদারকে।

    এ জমিদারি ব্যবস্থার ভেতর আরো এক অত্যাচার হাজির ছিল। বলা হয়ে থাকে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় জমিদারকেন্দ্রিক ভূমি ব্যবস্থা পছন্দ করেছিলেন। সেটা নাকি এই যুক্তিতে যে, এভাবেই ব্রিটেনের মত বাংলার কৃষিতেও একটা ক্যাপিটালিজম সম্ভব হবে। যদিও এটা প্রমাণের জন্য তাদের বক্তব্যকে আপসে মেনে নেবার মতো কোনো যুক্তি দেখা যায় না। বরং বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সাথে বাংলাসহ সারা বৃটিশ-ভারতের সম্পর্ক তো কলোনির  – কেন এটাকে কলোনিয়াল বলছি – এই প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে উহ্য রেখেই বরং জমিদারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে পণ্ডিতদেরকে কথা বলতে দেখা যায়। কেন প্রকৃতি-নির্ভরতার কৃষিতে ফসল না হওয়া বা কম হওয়ার দায় শাসক বা রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনাও শেয়ার করবে না, দায় সবাই শেয়ার করে উন্নত কোনো ব্যবস্থাপনার উদ্যোগই যেখানে সমাধান, সেখানে এ নিয়ে এটা যেন কোনো প্রশ্নই নয়, এমন মনে করা হয়েছে। শাসকের এ দায় শেয়ার না করে কেবল শাসক হওয়ার চেষ্টা— এ স্বভাবটাই তো ‘ফরেন’ এবং ‘কলোনিয়াল’। ইউরোপ থেকে এসেছে ওরা তাই ‘ফরেন’ ঠিক তা নয়। ফলে সেকালে কৃষিতে ‘অর্থকরী ফসল’ বলে একটা ধারণা ছিল। ব্রিটিশ শাসকের হাতে পড়ে তা কেবল শুধু পাট চাষ নয়, বরং আরো ভয়ঙ্করভাবে তুতগাছের চাষ বা নীলচাষ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আর শুরু থেকেই কোম্পানি এ্তে এতই উত্সাহী ছিল যে, জমিদার ব্যবস্থার পাশাপাশি সরাসরি বহু ব্রিটিশ ব্যবসায়ীকে নীলচাষের জন্য জমি দেয়া হয়েছিল। ওই ব্যবসায়ীরা এতই মরিয়া ছিলেন যে, নির্মম অত্যাচারের ভূমিদাস ব্যবস্থা (বন্ডেড লেবার বা ফোর্সড লেবার) চালু করে হলেও তারা এ কাজে সফলতা পাওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছিলেন। এটাই ইতিহাসে নৃশংসতায় নীলকরের নীলচাষ।

    সিনেমা উপন্যাসের স্ক্রিপ্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ভিলেন। অনেকের মনে হতে পারে, না, এর উত্তর হবে নায়ক। আসলে ভিলেন মানে হল নেগেটিভ নায়ক। সামাজিক দ্বন্দ্বের বা গল্পে দ্বন্দ্বের নেগেটিভ দিকটা, যার মাধ্যমে প্রকাশ করার সুযোগ নেয়া হয়। ভিলেন যত নেগেটিভ করে ফুটিয়ে তোলা যাবে, ততই স্পষ্ট বোঝা যাবে ওখানে নায়কের ভূমিকা কত ইতিবাচক, কেন সে নায়ক। ঠিক সেরকম, এতক্ষণ বাংলার কলোনিয়াল ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ভিলেনের দিক থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। এবার এতে নায়কের প্রবেশ ঘটবে। অথবা আরেক দিক থেকে বললে, এতক্ষণ বাংলার কলোনিয়াল ভূমি ব্যবস্থাপনাকে যেন নৈব্যক্তিক দিক থেকে তুলে ধরা হয়েছে। এবার এতে সাবজেক্টিভ অ্যাক্টর বা কর্তাস্বত্বা হাজির হবে।

    গণ-প্রতিরোধ শব্দটা একালের, বিশেষত ‘রাজনীতি’ বলে আমাদের ভু-অঞ্চলে কোনো ফেনোমেনা হাজির হওয়ার পরের। এমনকি জনগণ, বা ইংরেজি mass শব্দটাও ‘রাজনীতি’ বলে শব্দ হাজির হওয়ার পর, ওরই অনুষঙ্গ শব্দ হয়ে এসেছে। আগে নয়; রাজনীতি শব্দটা ফুটিয়ে তোলার দরকারে। কারণ রাজা, সম্রাট বা বাদশা-নায়েব নবাবের আমলে আবার জনগণ কী জিনিস!, জনগণ বলে কিছু ছিল না।  এ বিচারে বলা যায়, বাংলায় ব্রিটিশ কলোনি শাসনের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ‘জমিদারি ব্যবস্থা’। এর বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ এবং গণ-প্রতিরোধের ঘটনাটা ঘটেছিল হাজী শরীয়তুল্লাহর হাতে।

    আগেই বলেছি, তিনি হজ করে দেশে ফিরে আসেন ১৮১৮ সালে। ফিরে তার প্রধান কাজ হয়েছিল ধর্ম সংস্কারের কাজে মনোযোগ  দেয়া। বলা হয়, সেই ৮০০ বছর আগে ভারতবর্ষে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু ১৭৯৯ সালে দেশ ছেড়ে হজে যাওয়ার আগেও তিনি দেখে গেছেন, ফলে জানেন যে ন্যূনতম ইসলামের রিচুয়াল বা ফরজ কাজ যেগুলো, তাও করতে অভ্যস্ত ছিল না সে সময়ের বাংলার আম-মুসলমানরা। সেজন্যই ফিরে এসে তাঁর ধর্ম সংস্কারের কাজে নামা। সবাই একালে তাই হাজী শরীয়তুল্লাহ পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই তাঁর ধর্ম সংস্কারের প্রসঙ্গ আনেন। কিন্তু ধর্ম সংস্কার কথাটা এই অর্থে যে, মুসলমানদের ন্যূনতম ফরজ কাজগুলো করতে উদ্যোগী করার দিকটা জোর দিয়ে তিনি কাজে নেমেছিলেন। যেজন্য তাঁর ধর্ম ও সামাজিক সংস্কারের আন্দোলনকে ‘ফরায়েজি’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু তিনি ধর্মীয় সংস্কারের আন্দোলনকে জীবনের বৈষয়িক দিকের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে করেননি। ফলে উপরে যে জমিদারকেন্দ্রিক কলোনি ভূমি ব্যবস্থার কথা বলেছিলাম, যেটা তিনি হজের পর দেশে এসে পেলেন, এটা তার চোখ এড়ায়নি। কারণ বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থা তত দিনে ১৭৯৩ সালে জন্মের পর থেকে ২৫ বছর পার করে ভিত পুঁতে ফেলেছে। জমিদার ও কলোনি শাসকরা মিলে প্রজাদের ওপর তাদের অত্যাচার, শোষণ নির্মমতাগুলোও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তাই এখানে আমরা যে মুসলমান ফেনোমেনার কথা বলছি, তা ঠিক কলেমা পড়লেই যাকে মুসলমান বলি এতটুকু অর্থে নয়।

    ব্রিটিশ-ভারতের আইন অনুযায়ী জমিদারদের খাজনা আদায় বৈধ। বলা হয়, জমিদারদের ৯০ ভাগ ছিল হিন্দু। এর ওপর আবার তাদের বারো মাসের তেরো পূজা পার্বণের চাঁদা/খাজনা থেকে শুরু করে সন্তানের অন্নপ্রাশন, বিয়ে বা  ‘জামাই খরচা’ ইত্যাদি নানা নামে জমিদারদের বাড়তি খাজনার দাবি লেগেই থাকত। ফলে শরীয়তুল্লাহ মূল খাজনার ব্যাপারে আপত্তি না তুলে (কারণ সেক্ষেত্রে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেটসি ক্ষমতা দেয়া ছিল, যা সীমিতভাবে হলেও পেয়াদা দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রজাকে নিজের জেলে রেখে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা জমিদারদের ছিল) বরং বাড়তি খাজনাগুলো না দেয়ার ছলে জমিদারের সর্বময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা শিখিয়েছিলেন শরীয়তুল্লাহ। এই হলো বিশেষ ‘মুসলমান’ ফেনোমেনা। তিনি প্রজার আপত্তি-যুক্তিকে আরো জোরদারে হাজির করতে দাবি করতেন প্রজারা ‘মুসলমান’। ফলে কেন তাঁরা পূজার চাঁদা দেবে? সেকালে জমিদার মানে প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী, যার স্বার্থ আর কলোনি শাসকের স্বার্থ এক সুতায় গাঁথা, জমিদারের ক্ষমতা দুর্বল হওয়া মানে তা কলোনি শাসকেরও। এদিক থেকে দেখলে জমিদারের সর্বময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার তাত্পর্যটা বোঝা যাবে। আবার অনেকের মনে হতে পারে, এখানে শুধু জমিদারের ক্ষমতা বিষয়টা সবকিছুর কেন্দ্র ভাবা হচ্ছে, এটা কি ঠিক?

    বলা হয় সব সমাজেই মানুষের সঙ্গে মানুষের মাঝে অসংখ্য কিসিমের স্বার্থের বিরোধ, ছোট-বড় সংঘাত কাজ করে থাকে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এর ভেতর প্রধান কিছু একটা বিরোধ থাকে, যেটা বাকি সব বিরোধের ওপর প্রধান, মাও সে তুংয়ের ভাষায় যেটাকে সমাজের ‘প্রধান দ্বন্দ্ব’ বলে। এই দ্বন্দ্বে সমাজের সবচেয়ে বেশি মানুষ অ্যাফেক্টেড থাকে, আর এ বিরোধ ক্রমে সবার আগে তাই মানুষ সমাধান চায়। পুরা ব্রিটিশ শাসনকালটাই অন্তত বাংলার সমাজজুড়ে প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে থেকেছিল, জমিদার-প্রজা সম্পর্কের দ্বন্দ্ব বা ভূমি মালিকানা বন্দোবস্ত ব্যবস্থায় দ্বন্দ্ব। আবার সেকালের সমাজের অর্থনীতিক জীবন বলতে পঁচানব্বই ভাগজুড়েই বোঝাত কৃষির অর্থনীতি। এ কারণে ভূমি মালিকানা বন্দোবস্ত ব্যবস্থার দ্বন্দ্বকে বলা যায়, – প্রধান দ্বন্দ্ব – যা সমাজের প্রায় সবাইকে অ্যাফেক্টেড করে রেখেছিল। অর্থাৎ প্রত্যন্ত মাঠেও ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রভাব উপস্থিতি টের পাওয়া যেত জমিদারি শাসনের উপস্থিতি থেকে। সারা বাংলার কৃষির প্রত্যন্ত মাঠ থেকে কৃষির উদ্বৃত্ত পুঞ্জীভূত সেই সারপ্লাস এটাই ছিল ব্রিটিশ কলোনির রুস্তমি আর নিজ দেশ বৃটেনে উদ্বৃত্ত পাচার এমন সবকিছুর রসদ। আর একদিকে এই কৃষি-উদ্বৃত্ত আবার এর স্থানীয় দিক ‘কলকাতা’, এর প্রাণশক্তি। এভাবে কলকাতা মূলত কলোনি মাস্টার আর জমিদারের শহর, তাদের পোষ্য কিংবা তাদেরও পোষ্য শ্রেণীর কায়কারবারের শহর।

    অতএব, সবকিছুর কেন্দ্র এ জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নায়ক হিসাবে কাউকে না কাউকে উঠে দাঁড়াতেই হত। হাজী শরীয়তুল্লাহ সেই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যিনি বাংলার সবার হয়ে কাজটা করেছিলেন। সেটা শ্রেণী-সংগ্রাম বা রাজনীতি বুঝি, তা বলার কাল ছিল না। কারণ ১৮৩২ সাল, যাকে মনে রেখে কথাগুলো বলছি, যেটা ছিল তাঁর সক্রিয়তা ও প্রভাবের তুঙ্গ বছর। তিনি বলেছিলেন, জমিদারের কালচার বা আচার যেটা, সেটা তো প্রজার নয়, হতে পারে না। ফলে কলোনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রত্যক্ষ শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে তিনি কালচারাল শ্রেণী সেপারেশনের দিক থেকে কথা তুলেছিলেন। এজন্য তিনি বরং তার মত করে মুসলমান প্রজাদের নতুন লাইফ স্টাইলের কথা বলেছিলেন। না লাইফ স্টাইল বলে একালের কোন ফ্যাশন শো- এর মেয়েদের ক্যাটস ওয়ার্ক বুঝাই নাই। এমন বুঝাটাও ডাহা ভুল।  লাইফ স্টাইল কথার মূল অর্থ , মানুষ জীবন সম্পর্কে স্পিরিচুয়ালি বা মেটারিয়ালি যা বুঝে সেটাই প্রকাশিত হয়ে পড়ে তার বাস্তব জীবনে। তাই মানুষ যেভাবে তাঁর স্পিরিচুয়ালি বা মেটারিয়ালি জীবন প্রকাশ করে তাই লাইফ স্টাইল। হাজী শরীয়তুল্লাহ যে লাইফ স্টাইল আমাদের শিখিয়েছিলেন সেই চিহ্ন বা trait তা আজও বাংলার মুসলমানদের মৌলিক বৈশিষ্ট হয়ে আছে। তবে এ কথা বুঝলে ভুল হবে যে, তিনি ছাড়া আর কেউ জমিদারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলেননি বা করেন নি। অবশ্যই বলেছেন। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ও সংগঠিত ভাবে বলেছেন এবং টিকে থেকেছেন বাংলায় মুসলমান মানুষের স্পিরিচুয়াল ও বৈষয়িক জীবন এক গ্রন্থিতে একসঙ্গে প্রভাবিত করে গেছেন, এমন ঘটাতে পেরেছেন একমাত্র তিনি। এখানেই তিনি অদ্বিতীয়। ১৮৪০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ফরায়েজি আন্দোলনের হাল ধরেন তার ছেলে মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়া। এই আমলেই আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কার রূপের দিকের চেয়ে কলোনি-জমিদারি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ফরায়েজিদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বিস্তারের দিকের রূপটা সবচেয়ে ভারী হয়ে উঠেছিল। স্থানীয়ভাবে এক সরকার অর্থে পাল্টা এক সরকারের মতো কাঠামোতে নিজ কমিউনিটিতে ধর্ম নির্বিশেষে বিচার-আচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। পরে ১৮৬২ সালে দুদু মিয়ার মৃত্যুর পরও তার সাংগঠনিক কাঠামো কার্যকর ছিল। তবে ধর্ম সংস্কারের দিকটা আবার প্রাধান্যে আসে।

    ফরায়েজি আন্দোলন সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো প্রামাণিক গ্রন্থটা হল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুঈন উদ-দীন আহমদ খান স্যারের ‘বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস’ বইটা। এ বইটা আসলে উনার পিএইচডি থিসিস ও গবেষণা গ্রন্থ। ১৯৬১ সালে তিনি এ পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। শরীয়তুল্লাহ সম্পর্কে একটা কথা অনেকে দাবি করে থাকেন যে, তাঁর ফরায়েজি আন্দোলন আসলে ওহায়েবি আন্দোলন। এ বিষয়টা নাকচ করেছেন মুঈন উদ-দীন আহমদ খান। যদিও হাজী শরীয়তুল্লাহ  ওহায়েবি ছিলেন কিনা, সে তর্কে তাঁর সম্পর্কে আমাদের উপরের মূল্যায়নের হেরফের হয় না। হাজী শরীয়তুল্লাহ সবচেয়ে কার্যকরভাবে ‘মুসলমান’ নাম ধারণ বা মুসলমান পরিচয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে কলোনি-জমিদার কোটারি স্বার্থের বিরুদ্ধে লড়বার পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের শরীয়তুল্লাহ। মুঈন উদ-দীন খান তার বইয়ে শরীয়তুল্লাহর সমসাময়িক অন্তত আরো তিনটা ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন, তাদের মধ্যে তুলনা করেছেন। ফরায়েজিদের প্রতিযোগী মওলানা কেরামত আলী জৈনপুরীর ‘তাইউনী’ ধারার সঙ্গে বাহাসের বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন সত্যিকারের একজন গবেষকের ভূমিকায়। সেখানেই তিনি দেখিয়েছেন, কেউ তাকে ওহায়েবি বলেননি। আবার শরীয়তুল্লাহ ওহায়েবি ধারার অনুসারি হলেই সেটা দোষের, তাও আমরা বলতে পারি না। বরং তার ফরায়েজি ধারার সমান্তরাল লড়াকু  হয়ে জমিদার ফেনোমেনাকেই প্রধান আক্রমণের কেন্দ্র বিবেচনা করে লড়াই প্রতিরোধ সাজাতে আমরা আর কাউকে দেখিনি। তাই বাংলায় ‘মুসলমানেরা’ কেন নিজেকে ভিন্ন আত্মপরিচয়ে হাজির করেছিল এবং সেটা করতে গিয়ে সমাজের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য কীভাবে বদলে গেল, সেটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরিপ্রেক্ষিতে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে গণ-মানুষের লড়াই সংগ্রামের অর্থনৈতিক মর্মের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই। ‘মুসলমান’ এ নাম নিয়ে কার্যকর গণ-প্রতিরোধের পথপ্রদর্শক তিনি।

    ইতিহাসের পদ্ধতিগত দিক থেকে বিচার করলে আমরা এটুকু দাবি পেশ করে শেষ করতে চাই যে, বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মের ইতিহাস আলোচনা, কিন্তু ইতিহাস থেকে ধর্মের ইতিহাস বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ইতিহাসের বিচার সম্ভব নয়। এতে কিছুই বোঝা যাবে না। ‘মুসলমান’ ইতিহাসের বিচারে নিছকই একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ‘মুসলমান’ আত্মপরিচয় নিছকই ধর্মীয় পরিচয় মাত্র নয়। ঔপনিবেশিক দখলদারি এবং তাদের আরোপিত ভূমি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ঐতিহ্যের মধ্যে ‘মুসলমান’ পরিচয়ের ঐতিহাসিক তাত্পর্য নিহিত।

    এ’পরিচয়ের চাবিকাঠি উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সময়ের বহু সমস্যাকে নতুনভাবে চিহ্নিত ও মীমাংসা করতে পারব বলে আশা করি।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক বণিকবার্তা ১১ আগষ্ট প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায় । তা এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপানো হল।]

  • শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

    শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
    গৌতম দাস
    ০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

    শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

    তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

    ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
    কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
    খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
    বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

    শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

    না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

    মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

    [এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

    লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

    সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

    এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

  • ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
    গৌতম দাস
    ২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
    প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


    Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
    কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


    জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
    যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
    কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
    আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
    বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

    এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
    আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
    সব শেষ।

    আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
    আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

    দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

    আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
    সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

  • যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    গৌতম দাস
    ১৪ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার
    http://wp.me/p1sCvy-1uG

    গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান কাফের ঘটনা দেশি-বিদেশি সকলকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। সিএনএন, বিবিসি আর আল-জাজিরা এই তিন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল পুরা দশ ঘন্টা জুড়ে সমানে কভার করাতে, এছাড়া সময়ে লাইভ ব্রডকাস্ট করাতে সারা দুনিয়ায় খবরটা এত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এতদিন যে যা নিয়ম-নীতি মেনে অথবা কোন কিছুই না মেনে বেপরোয়াভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই ঘটনা এবার এমন সবাইকে অভিমুখ বদলাতে, বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত এটা আলকায়েদা বা আইএস ধরণের ততপরতায় ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের উপর প্রথম হামলার ঘটনা। যা এর আগে দেখা যায় নাই। ভারতীয় মিডিয়া এই হামলার ঘটনাকে গত ২০০৮ সালের তাদের বোম্বাই হামলার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখাতে চেয়েছে। প্যারালাল টানার চেষ্টাও করছিল। ভারতের মিডিয়ার এই অক্ষম প্রচেষ্টা ২০০১ সালের ৯/১১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার সময় থেকে করে আসছে। অথচ বোম্বাই হামলা – হামলার ঘটনা হিসাবে অনেক ঘটনার সাথে মিললেও আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনাগুলোর উৎস কাশ্মীর কেন্দ্রিক যা কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা না, বড় জোর হয়ত তা আঞ্চলিক ঘটনা বলে দাবি করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা কাশ্মীর ইস্যু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধরণের ক্যাটাগরির ঘটনা। নিশ্চয় আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর গ্লোবাল ইসলামি ফেনোমেনা যা পশ্চিমের চোখে “আন্তর্জাতিক টেরর মুভমেন্ট” – এর তো ফারাক টানতেই হবে। আসলে দুই ধরণের ঘটনাকে মিলিয়ে গুলিয়ে মিডিয়ায় দেখানোর চেষ্টা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির কৌশল মাত্র। এটা দোষের নয় হয়ত, নিজের বয়ান খাড়া করার জন্য অনেক রাষ্ট্রই এমন করে থাকে। তবে স্বভাবতই এমন বয়ানের খাতক সবাই হবে এমন আশা ভারতের মিডিয়ার না থাকাই ভাল। সবাইকে এটা মেনে নিতেই হবে তাও নয়। অন্যদিকে যারা আইএসের উপস্থিতির বিষয়টা যে কোন উদ্দেশ্যে অস্বীকার করে যাচ্ছিল, বলা যায় এরা সবাই এর পরিণতির দিকটা উপেক্ষা করে এক ধরণের বেপরোয়া চলছিলেন একথা সত্যি হলেও তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারটা অজানা ছিল তা নয়। অথচ সকলেই একটা ভান কর গেছে যেন তারা এমন একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে জানতেনই না। অথবা অবস্থান হল যে দেখি না আগে বাস্তবে ঘটুক, ততদিনে আর একটু বেশিক্ষণ সুবিধাদি খেয়ে নেই। এজন্য এরাই হামলার ঘটনা ঘটবার পরেপরেই একেবারে উলটা গান ধরেছে, সব ছেড়ে ভদ্র সভ্য হবার চেষ্টা করছে,সেই সুবিধা খাওয়া শক্তি। হামলার ঘটনার শুরু পয়লা জুলাই রাত প্রায় পোনে নয়টা। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম জিম্মি করার ঘটনা বলে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার দিকটা বুঝতে সকলের সময় লেগেছিল। প্রায় রাত দশটার আগে কেউই ঘটনার মাত্রা ঠাহর করে বুঝতে সক্ষম হন নাই। এরপর সারারাত ধরে উতকন্ঠা শেষে জিম্মি উদ্ধার একশন অভিযান শুরু হয় সকালে অর্থাৎ ২ জুলাই সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। তাতে কী ঘটল সকালে, ফলাফল কী দাড়াল – সকাল দশটার আগে এর নিউজ মিডিয়ায় আসে নাই। তবে এরপর থেকে দিনভর ক্রমশ পরিস্কার হতে থাকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
    পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ইদানিং মানে, গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আগেকার দিনে দৈনিক পত্রিকা বলতে আমরা প্রিন্ট পত্রিকাই বুঝতাম। কিন্তু সেগুলো সবই এখন একই সাথে অনলাইনও হয়ে উঠেছে। অনলাইন মানে আগে যেমন ছিল, প্রতিদিনের খবর পরেরদিন সকালে একসাথে প্রিন্ট হয়ে বের হওয়া সে নিয়ম-ছন্দ এখানে ভেঙ্গে ফেলা। দিনের ঘটনা দিনেই যখন ঘটছে প্রায় তখনই প্রকাশিত করে ফেলা হল অনলাইনের বিশেষ বৈশিষ্ঠ। এমনকি ঘটনা উদ্ভাসিত হয়ে ঘটা শেষ পর্যন্ত ডেভেলপিং স্টোরি হিসাবে ক্ষণে ক্ষণে একাধিক রিপোর্ট বের করে ফেলা যায় ও হয় এখানে। এটাও অনলাইন পত্রিকার আর এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ। আনন্দবাজার অনলাইন শুধু হয় নাই, নিয়মিত সম্পাদকের বাইরে অনলাইন সম্পাদক বলে আলাদা লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠক টানার জন্য আনন্দবাজার দিনের শুরুতে সরাসরি পাঠকের মেলবক্সে অনলাইন পত্রিকার লিঙ্ক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আরও আছে। পত্রিকায় আগে যে সাব-ক্যাটাগরি হেডিং করা খবর পরিবেশন করত যেমন – কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের জেলা, রাজ্য, কেন্দ্র এরপর বিদেশ এভাবে মোটা দাগের ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। এবার এর পাশাপাশি –কেন্দ্র আর বিদেশের মাঝখানে ‘বাংলাদেশ’ বলে নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত এক বা একাধিক বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর সেখানে তোলা হয়ে থাকে। আর থাকে নতুন নিয়োগ পাওয়া– সম্ভবত বাংলাদেশ পাতার ভার যার উপর সেই “অমিত বসুর” একটা রিপোর্ট। যদিও এটা রিপোর্ট না কলাম, তা নিশ্চিত কর বলা মুশকিল। তবে যেটা নিশ্চিত তা হল অমিত বসুর রিপোর্ট মানেই – প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, উন্নতি হচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে আগে যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে ভাল বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদির ঢেডা পিটানো প্রশংসাসুচক রিপোর্ট। আর বলা বাহুল্য এসবের বিপরীতে ‘বিএনপি-জামাত’ এর নানান নেতিবাচক ফেনোমেনায় তাদেরকে ভিলেন বানানো থাকে। সবমিলিয়ে এই হল অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর আলাদা সম্পাদকীয়সহ সাজানো অনলাইন আনন্দবাজার, বাংলাদেশ যার বিশেষ ফোকাস।
    শুরুতে যেকথা বলছিলাম, ০২ জুলাই সকাল দশটার পর থেকে জিম্মি উদ্ধার কাহিনী নিউজ হয়ে প্রচারিত হওয়া শুরু করেছিল। দুপুর তিনটা চল্লিশ মিনিটে আনন্দবাজার অনলাইনের বাংলাদেশ নিউজ সেকশনে একটা রিপোর্ট আপলোড করা হয়। শিরোনাম “মধ্য এশিয়ার অর্থই অনর্থ ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে!” – যার লেখক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। লেখাটা মন্তব্য প্রতিবেদন ধরণের বলা যেতে পারে। লেখার প্রসঙ্গ বিচার করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের জিম্মি ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া এর উদ্দেশ্য। অথবা হয়ত লেখককে সম্পাদকের অনুরোধটা হয়ত এমনই ছিল।
    হোলি আর্টিজানের ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্ট ইন্টারেষ্ট বা কনসার্ণ গ্রুপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রধান কমন প্রতিক্রিয়া হল, স্বভাবতই ভয়ভীতি। এছাড়া এথেকে উতসারিত পরের প্রতিক্রিয়া হল – যতটা সম্ভব দুরত্ত্ব তৈরি করে দাঁড়ানো যাতে তা ভারত ‘অ-সংশ্লিষ্ট’ এই ভাব তৈরি করে। ভারত এসব ছুয়ে নাই তা দেখান। এর মূল উদ্দেশ্য ভারত এসবে সংশ্লিষ্ট না ফলে ভারত যেন বাংলাদেশের সাথে টার্গেট না হয়। হামলা যেন না ছড়িয়ে ভারতে প্রবেশ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা পদক্ষেপ। যেমন এব্যাপারটা সবচেয়ে প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার রূপ হল, কোন স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে অনির্দিষ্ট ও হঠাত করে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বন্ধ করে দেয়া। সাদা চোখে এসব পদক্ষেপ হয়ত অস্বাভাবিক না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জায়গায় আজ এসে পৌছছে তা সে জায়গায় আনতে ভারতের বাংলাদেশ নীতির দায় আছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের নীতি অবস্থানকে সাথে নিয়ে দেখলে তা বুঝা যাবে। সেক্ষেত্রে বলা যায় এটা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে এখন পালিয়ে যাওয়া, সম্পর্ক ও দায়–হীন বলে হাত ধুয়ে ফেলা – এভাবে ভারতের নিজেকে হাজির করার চেষ্টা।
    উপরে ভারতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া বুঝাতে প্রথম শব্দটা লিখেছে ‘ভয়ভীতি’। মানুষ ভয় পেলে বয়ান ১৮০ ডিগ্রী বদলে ফেলতে পারে তাই যেন বুঝা গেল সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর এই লেখায়। মোট ৬৭৬ শব্দের এই লেখার প্রথম ৫৩৮ শব্দ তিনি ব্যয় করেছেন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ ব্যাখ্যা করতে বা বলা যায় দায়ী করতে। বলা বাহুল্য সেটা এক অর্থনীতিবাদী ঝোকের ব্যাখ্যা। দুনিয়ার সব অঘটনের জন্য ‘পুঁজিবাদ দায়ী’ করা ধরণের। এছাড়া এই ব্যাখ্যা-ধারা বলতে চায় – দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘটে নৈব্যক্তিকভাবে, বা ঘটবেই ধরণের। ফলে যেন মানুষ দায়ী না, ঘটনার কর্তাও সে নয়। অথবা কর্তা কেউ নয় ও নাই। এই ব্যাখ্যার ঝোক, ঘটনার কর্তা দেখতে পায় না বা চায় না। তবে লেখক সব্যসাচীর লেখায় ‘পুঁজিবাদ’ মূল প্রসঙ্গ নয়, বরং যা তিনি বলবেন এর পটভুমি রচনার উপাদান বলা যায়। কী তিনি বলবেন?
    এককথায় বললে তাঁর বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী। ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের এর হামলাকারিরা কোন কিসিমের মাদ্রাসা ছাত্র নয়। বরং একেবারে দেশ-বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা উচু সমাজের সন্তান। এসব প্রকাশ হয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্যাপক অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ এতে ‘সন্ত্রাস’ বিষয়ে তাঁদের সব গালগল্প আর গরীব-ঘৃণা উদোম হয়ে গেছে। লেখক সব্যসাচীও তাদের একজন তবে একটু ভিন্নভাবে। সারকথায় বললে, তিনি বলতে চাইছেন, পুঁজিবাদের কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেটেড লেবার গিয়েছে। সেই লেবাররাই বাংলাদেশের “জঙ্গীবাদ” সমস্যার জন্য দায়ী। সব্যসাচীর নিজের ভাষায় পড়েন, “……পাঠানো অর্থে তাঁদের পরিবারদের সমৃদ্ধ করে তুলছেন, তাঁরা কিন্তু নিজেরা দ্রুত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন ওই দেশগুলোর স্বাভাবিক ‘আফিমের নেশা’ ধর্মীয় উন্মাদনায়, বাড়াবাড়িতে। দারিদ্র্য,অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষার জন্যই এটা হচ্ছে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কড়া ‘ডোজ’-এর মৌলবাদে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর যে বাংলাদেশিরা রুটি-রুজির টানে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছেন, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য তাঁদের তেমন নেই বলে (যাকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বলা হয়) তাঁরা চট করে ওই ‘সোনার হরিণ’-এর টানে মজে গিয়ে ওই ধর্মীয় ‘আফিম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ওই ‘আফিমের নেশা’ (মৌলবাদ) আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে”।
    প্রথমত, সব্যসাচীর ভুগোল-বোধে সমস্যা আছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন মিডল-ইষ্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা। কিন্তু শব্দে সেটাকে বলছেন, “মধ্য এশিয়া”। কিন্তু ইষ্ট মানে তো এশিয়া নয়, প্রাচ্য। যে অর্থে ওয়েষ্ট বলতে যেভাবে পাশ্চাত্য বুঝি। আবার সেন্ট্রাল এশিয়া বলে আলাদা রিজিয়ন আছে। বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি সাম্রাজ্যের যুগে যা আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তের রুশ জার সাম্রাজ্য অঞ্চল। ফলে তিনি মধ্য এশিয়া বলতে সেন্ট্রাল এশিয়া বুঝাচ্ছেন কিনা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত সব্যসাচীর আর বাকী দিকটা হল, ইসলাম-বিদ্বেষ। আবার শুধু তাই না, বরং সাথে আছে শ্রেণী ঘৃণা। একেবারে “শিক্ষা,বংশ পরিচয়,সামাজিক কৌলিন্য” কথা তুলে তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এতকিছু করেও সব্যসাচীর কোন লাভ হয় নাই। সব পানিতে পড়ছে। কেন? এই লেখা তিনি লিখছেন ২ জুলাই দুপুরে। আর্টজানের হামলাকারিদের “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” তখনও প্রকাশ হয় নাই। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে দেখা গেছে “হামলাকারি জঙ্গীদের” “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” অর্থাৎ হামলাকারিদের পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত পরিচয় সব্যসাচীরা নিজের জন্য যেমন কাম্য মনে করেন সেই একই শ্রেণীর অথবা সম্ভবত আরও উচু শ্রেণীর। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না সব্যসাচীর ঘৃণাতত্ত্ব বুমেরাং হয়ে ‘ধরা খেয়েছে’। ইংরাজিতে কথা বলা, স্বচ্ছল ঢাকার এলিটদের সন্তান, দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যারা সম্ভবত সব্যসাচীর চেয়ে আপাদমস্তক আধুনিক তারাই আর্টিজান হামলাকারি। ফলে স্পষ্টত সব্যসাচীর গরীব ও মুসলমান-বিদ্বেষী অবস্থান এখানে সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

    ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো প্রথম ৫৩৮ শব্দের পরে সব্যসাচীর লেখার শেষ ১৩৮ শব্দ। এটাও ভীষণ কৌতুক কর। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনি – ধরণের। মানুষ অনেক সময় প্রচন্ড ভয় পেলে আগাম ও যেচে অনেক সত্য কথা বলা শুরু করে। এটা যেন তেমনই এক ঘটনা। সরাসরি সব্যসাচীর বক্তব্য উঠিয়ে আনছি, বলেছেন, “৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে ভাবে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে আর সে সব দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশি যুব সমাজের কাছে এই বার্তা যাচ্ছে যে, হাসিনা সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছেন। তাঁরা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন যদি কোনও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হত বা বাংলাদেশি আদালতে ওই মামলাগুলোয় যদি অন্তত এক জন বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত”।

    তার মানে সব্যসাচী একটা হামলা খেয়েই সাথে সাথে স্বীকার করছেন যে সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছে। এটা সত্যিই এক দেখার মত তামাশা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কথা সত্য, যা আইনী ভাষায় বললে, এটা আদালতে প্রমাণ করলে তা শাস্তিযোগ্য বিষয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অবিচার আর বেইনসাফি করা হয়েছে। তবে সেটাও তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র বিষয়। এর তুলনায় এঘটনার ভিতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্র আজ অন্যের দাস হয়েছে। রাষ্ট্র আজ ভেঙ্গে পড়ার দশায়। এটা আমার কথা নয়, প্রকারন্তরে এটাই আসলে সব্যসাচীই স্বীকার করছেন। তিনি এটাকে “সরকারের প্রতিশোধস্পৃহায়” করা কাজ বলছেন। তার মানে এখানে কোন বিচার হয় নাই, ‘প্রতিশোধস্পৃহায়’ করা কাজ হয়েছে। কিন্তু এঘটনাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ আউলিয়ে সব ধবংস হয়ে যাবার পর এখন সব্যসাচী এর কারেকশন খুজছেন। আদালতের স্টান্ডার্ড নিয়ে কথা তুলছেন। অর্থাৎ সাব-স্টান্ডার্ড আদালত ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারন্তরে তা বুঝিয়েছেন। বলছেন, যদি “আন্তর্জাতিক আদালতে” বিচার করা হত এবং “বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত” – এসব কথা বলছেন। তাহলে স্বভাবতই এখানে যে প্রশ্নটা নিরুত্তর থেকে যায় যে, এটা এতদিন তিনি আমাদের বলেন নাই কেন? এখন বলে তিনি কী হামলাকারিদের এক্টকে ন্যায্যতা দিলেন না? তবে এখানে একটা ফ্যাক্টস বলে রাখা ভাল। আর্টজানে হামলাকারিরা জামাত রাজনীতির খাতক না, এটা বলা যায়। কারণ আইএস খোদ তাদের মাসিক প্রকাশনাতে জামাতকে “মুরতাদ” মনে করে বলে জানিয়েছে।

    কিন্তু অবাক কান্ড যে আনন্দবাজার সব্যসাচীকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ধরণের আর্টিকেলে কারেকশনের কথা বলে সেই আনন্দবাজারই আবার গত ৮ জুলাই এই অবস্থানের ঠিক উলটা কয়েকটা “পেজ ফর সেল” রিপোর্ট ছেপেছে। গত ৮ জুলাইয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ছয়টার বেশি রিপোট ছেপেছে যার সবগুলাই “পেজ ফর সেল” ধরণের রিপোর্ট। অর্থাৎ আনন্দবাজার তার পত্রিকার পাতা বা জায়গা কোন বিশেষ গ্রাহককে বিক্রি করেছে। আর ঐ গ্রাহক ঐ পাতায় যা মনে চায় তাই লিখে ভরিয়েছে। এরপর আনন্দবাজার আবার তা ছাপলেও কিন্তু নিজে মনে করে গ্রাহক ঐ পেজে যা লিখেছে তার দায়দায়িত্ত্ব আনন্দবাজারের নাই। এই হল ‘পেজ ফর সেল’।

    গত ৮ জুলাই প্রকাশিত সেসব রিপোর্টের মধ্যে দুই দুখানা হল জমিদারি-রুস্তমি আমলের কিশোরগঞ্জের জমিদারদের জমিদারি চলে যাবার হাহুতাশ ও হাহাকার বিষয়ক। প্রথমত কিশোরগঞ্জ কেন? কারণ এবার ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদের জামাতকে টার্গেট করে সেই মাঠে পৌছানোর রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে কিশোরগঞ্জ এখানে বিষয়। কিন্তু কাদের দিয়ে আনন্দবাজার কিশোরগঞ্জ নিয়ে আর্টকেল লিখে ছাপাচ্ছে? কিশোরগঞ্জের জমিদারের দুই উত্তরাধিকারী। এটাই হল ইন্টারেস্টিং রগড়ের দিক। আমাদের অনেকের পরিচিত The Autobiography of an Unknown Indian বইয়ের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নবগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরী আবার এই শতকে বসেও পুর্ববঙ্গের মানে একালের বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। এটা অবশ্য উনি একা নন, বৃটিশ কলকাতা হল জমিদারির আয় পয়সায় বেড়ে ঊঠা শহর। ভেঙ্গে বললে, বাংলার জমিদার-প্রজা সম্পর্কের কৃষি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত লুটেরা সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে যে শহর গড়ে উঠেছিল তার নাম কলকাতা। আর কলকাতায় এতে যে ধরণের চিন্তা, রাজনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি বা লাইফ ষ্টাইল যা গড়ে উঠেছিল এককথায় এটার প্রতীকী শব্দই “বাঙালী”। সেজন্য শব্দ হিসাবে কলকাতা ও বাঙালী প্রায় সমার্থক শব্দ। তবে এই বাঙালী ধারণাতে অবশ্যই আমরা পুর্ববঙ্গের কেউ অন্তর্ভুক্ত নই, গণ্য নই। আর ঐ কলকাতা বা বাঙালী – এটা জমিদার ঔরসের বাঙালি, বা সংক্ষেপে “জমিদার বাঙালি”। পুর্ববঙ্গের আমরা, আমাদের দুটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার, এক. বাংলার জমিদার প্রজা সম্পর্কের কৃষির সেসময়ের শোষিত প্রজাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ছিল মুসলমান। আর দুই, ‘কলকাতা’ বা ‘বাঙালী’ প্রকল্প প্রজা মুসলমানদের বাঙালি মনে করতে না, স্বীকৃতি ছিল না। ফলে বলা যায় ‘জমিদার বাঙালি’ প্রকল্প খুবই ‘ক্লাস কনশাস’ প্রকল্প ছিল।

    সেই সুত্রে এজন্য নীরদ চন্দ্র চৌধুরি (১৮৯৭-১৯৯৯) নিজ জীবদ্দশায় গত আশির দশকেও আনন্দবাজার পত্রিকায় পুর্ব্বঙ্গের মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছিলেন “তথাকথিত বাঙালী”। সেই নীরদ চৌধুরির সন্তান হলেন ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী। আর নীরদ চৌধুরিরই আপন বড় ভাইয়ের মেয়ে হলেন কৃষ্ণা বসু। (কৃষ্ণা বসু নিজেই তার আর এক পরিচয় জানিয়ে বলেছেন তিনি, ভারতের প্রাক্তন লোকসভা সাংসদ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যা।) ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী এবং কৃষ্ণা বসু এরা দুজন আনন্দবাজার পত্রিকায় দুটো আর্টিকেল ছাপিয়েছেন গত ৮ জুলাই। তাদের বাপ-দাদাদের জমিদারি আমলে কিশোরগঞ্জে কত দুধ-ননীর নহর বয়ে যেত এরই বর্ণনা দিয়ে। এবারের ঈদের শোলাকিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে তাদের মনে পড়ছে বাপ-দাদার কিশোরগঞ্জের কথা। তারা তুলনা করছেন বাপ-দাদাদের জমিদারির কিশোরগঞ্জ কত ভাল ও আদর্শ ছিল। যদিও দুজন মানছেন কিশোরগঞ্জ তারা দুজনই প্রায় কখনও যান নাই। আনন্দবাজারের এই প্রজেক্টটাই আসলে ইন্টারেস্টিং। যেন “জঙ্গীবাদ” খেদিয়ে আনন্দবাজার বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আবার জমিদারি ফেরত আনার স্বপ্ন দেখছে! আমরা আজ জঙ্গীবাদের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি এর মানে কী পরিত্যক্ত পরাজিত জমিদারি ব্যবস্থা আমরা এখন ভাল মনে করব? আনন্দবাজারের ধারণা এটাই জমিদার নীরদ চৌধুরির উত্তরাধিকারদের দিয়ে হাহুতাশ ছড়ানোর ভাল সময়। তাই জঙ্গীবাদের চেয়ে জমিদারি শোষণ নিষ্পেষণ ব্যবস্থা ভাল ছিল এমন তুলনা ইঙ্গিত টানছে। অথচ আনন্দবাজারের কী খেয়াল রাখা উচিত ছিল না যে “জমিদারি” শব্দটা কলকাতায় না-বুঝা গৌরবের ভাবতে পারে। ওর বনেদিয়ানাকে কুর্নিস জানাতে পারে এমনকি তা কারো পেয়ারের হলেও বাংলাদেশ “জমিদারি” খুবই ঘৃণিত একটা শব্দ। আর কোন প্রজারই জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের কথা না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দবাজারের চেষ্টা হচ্ছে পরাজিত জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা কিশোরগঞ্জের বর্ণনা একালে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া। বাংলাদেশ মূলত মুসলমান প্রজাদের আবাসভুমি। বৃটিশ উপনিবেশ মাস্টারের কোলে বসে কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা কী মৌতাতে হুকায় টান দিতেন,ইংলিশ নাটক মঞ্চস্থ করতেন কী না এসব গল্পগুলো এপার বাংলাদেশ খাবে না। খাবার কোন কারণ নাই। বরং ক্রোধ হবার সম্ভাবনা।

    সবশেষে মুরোদ তত্ত্ব দিয়ে শেষ করব। দানব সরকারের বিরুদ্ধে যখন নিজের গুম খুন হয়ে যাওয়া অথবা সরকারের দাবরানির চোটে নিজের জান বাঁচাতে যখন নুন্যতম সরকার বিরোধীরা সবাই ব্যস্ত ঠিক সেই সময়টাই হল সবচেয়ে বিপদজনক। কেন? কারণ সেই সময় জনগণ মুরোদ ওয়ালাদের খুঁজে,তাদের মর্দানি দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। মানে দানব সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ সশস্ত্র সবল প্রতিরোধ করতে মুরোদ রাখে তাদের দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ ফাঁকা রাজনীতির কথা না “মুরোদ”। তাই এটা আমাদের সবার জন্য ভীষণ বিপদজনক সময়। অন্যভাষায় এটা তাই “জঙ্গীবাদ” জন্মাবার জাগবার সবচেয়ে ফেবারেবল সময়। এভাবে জঙ্গীবাদ জনগণের মৌন সমর্থন পেয়ে যায় ‘যদি’ সেটাই সবার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হবে। অনেকে এধরণের সময়কে নকশাল যুগ বলে। এটাই মুরোদ তত্ত্ব। আশা করি আমরা মুরোদ তত্ত্ব মনে রাখব।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জুলাই দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১১ জুলাই প্রিন্টে)ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাম ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

  • ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

    ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

    গৌতম দাস

    ৩০ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ব্রেক্সিট : কার বিরুদ্ধের অসন্তোষ কার পাতে

    ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফলে জানা গেল সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যাওয়ার পক্ষে হয়েছে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ভোটের ফলাফলে ত্যাগের পক্ষ জয়ী হয়েছে শতকরা ৫২-৪৮ অনুপাতে। এতে গণভোট-উত্তর পরিস্থিতি যা হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল তা একের পর এক ঘটা শুরু হয়েছে। ফলাফলের নেতিবাচক গ্লোবাল প্রভাব পড়েছে সর্বব্যাপী। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে তা সংশ্লিষ্টরা মানছেন। গতকাল  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদকে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের “পোশাক খাত চ্যালেঞ্জের মুখে” পড়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যে প্রতি বৃটিশ পাউন্ড গণভোটের আগের তুলনায় দশ টাকা করে মূল্য হারিয়েছে। পরিস্থিতি আরো কতটা খারাপের দিকে যাবে তা নিয়ে অনুমান চলছে।
    এ নিয়ে গভীরে প্রবেশের আগে কিছু ধারণা পরিষ্কার করা দরকার। যেমন- ব্রিটেনের ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া মানে কী? ব্যাপারটা কী, বিভিন্ন রাষ্ট্র যেমন নানান কিসিমের রাষ্ট্রজোটে অন্তর্ভুক্ত হয় যার কোনটা অর্থনৈতিক অথবা রাজনৈতিক বা সামরিক ইত্যাদি সে রকম কোনো রাষ্ট্র-জোট ত্যাগ করা? অথবা ধরা যাক,  জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় জোট প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সদস্যরাষ্ট্রের তা ছেড়ে যাওয়া সেরকম?  অথবা  বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিল্যাটারাল) ক্যাটাগরির আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কে ওর কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ছেড়ে যাওয়া, এ ধরনের? অথবা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন ধরা যাক, আমাদের সার্ক জোট ছেড়ে গেলে কী হবে তেমন একটা কিছু? এরকম নানা ধরনের রাষ্ট্রজোটের উদাহরণ আর না বাড়িয়ে এবার উত্তরের দিকে যাওয়া যাক। প্রথমত কোনো সদস্য রাষ্ট্রের জোট ত্যাগ করার উদাহরণ খুব একটা নেই, তুলনায় জোটের অকার্যকর হয়ে পড়ার উদাহরণ পাওয়া যাবে। তবে আলোচনা সেদিকে নিব না। তাহলে আমরা এখানে কথা বলছি – ইইউ ধরণের বিশেষ রাষ্ট্রজোটের।
    ব্রিটেনসহ ধরলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছিল মোট ২৮ সদস্য-রাষ্ট্রের। এখন এই ইইউ ধরনের রাষ্ট্রজোটের সাথে অন্য আর সব ধরনের রাষ্ট্রজোটের একটা প্রধান ফারাক আমরা এখন টানব। তা হল, ইইউ ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রজোটের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্র একেকটা সার্বভৌম ইউনিট, এটা বজায় রেখে বা মেনে নেয়ার পরই এসব রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক রাষ্ট্র নিয়ে জোট অথবা জাতিসঙ্ঘের মতো প্রায় সব (বর্তমানে ১৯৩ সদস্যের) রাষ্ট্রের রাষ্ট্রজোট হবার পরও জাতিসংঘ নিজে এর যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্বধারী কোনো সুপার স্টেট নয়। যেমন বাংলাদেশ সম্পর্কে যেকোনো ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, জাতিসঙ্ঘ অথবা এর অধীনস্থ কোনো প্রতিষ্ঠান বা কমিটির নয়। জাতিসঙ্ঘ কি সার্বভৌম – এই ধারণার উপরে জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান? যেকোনো সদস্যরাষ্ট্রের ওপরে কী জাতিসংঘ সার্বভৌম ক্ষমতা, এখতিয়ার রাখে? এককথায় জবাব মোটেও না। প্রশ্নই আসে না। প্রত্যেক সদস্য-রাষ্ট্রই কেবল সার্বভৌম যার উপর কেউ নাই, আর কোন মাতব্বর নাই।  ফলে জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্ত মানার ব্যাপারটি কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটে কী এই অর্থে যে, ওই সিদ্ধান্ত বা আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে জাতিসঙ্ঘের সব সদস্যের সম্মতিতে অনুমোদিত হয়েছে শুধু সেজন্য? না সেজন্য নয়। বরং ওই আইনের অনুরূপ করে লেখা একটা আইন (যেটা রেটিফিকেশন বলে পরিচিত) আমরা আমাদের সংসদে পাস করিয়ে নিয়েছি সেজন্য। সারকথায় জাতিসঙ্ঘের কোনো আইন বা কনভেনশন ইত্যাদি আমরা মানি এ জন্য যে, সেটার অনুরূপ এক আইন আমাদের নিজের সংসদ পাস করে নিয়েছে, তাই। নিজের আইন তো নিজে মানবই। জাতিসঙ্ঘ কখনোই এমন কোনো তৎপরতা দেখায় না বা এমন কোনো রেওয়াজ নেই, যা থেকে আমরা অর্থ করতে পারি যে সে আমাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে অথবা আমাদের রাষ্ট্রের ওপরে অবস্থিত এক চূড়ান্ত কর্তৃত্বের কর্তৃপক্ষ হল জাতিসঙ্ঘ। বরং রাষ্ট্রই সার্বভৌমত্বের শেষ কথা। এর ওপর কাউকে রাখা হয়নি। এভাবে দুনিয়ার যেকোনো রাষ্ট্রজোট তার আলাদা আলাদা সদস্যরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অটুট রেখেই নানান রাষ্ট্রজোটের অংশ হয়।

    কিন্তু এই ধারণার একমাত্র ব্যতিক্রম বা ব্যতিক্রম হওয়ার উদ্যোগ হল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কী অর্থে? যেহেতু ইইউ গড়ার লক্ষ্য হল সদস্যরাষ্ট্রগুলো একটা লম্বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিন প্রত্যেকের আলাদা রাষ্ট্ররূপ বিলুপ্ত করে সবাই মিলে একক এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তবে এখনই সেই প্রক্রিয়ার পুরোটা সম্পন্ন হয়ে যায়নি। তাই ইইউ এখনই কোনো সার্বভৌম অস্তিত্ব নয়। তবে ইইউর কিছু কিছু ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক হয়েছে। এই অর্থে ওসব জায়গায় ইইউ নিজের সদস্যরাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম কর্তৃপক্ষ।  যেমন ইইউর ফোরামে গৃহীত প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রে কাজের দৈনিক শ্রমঘণ্টা  কত হবে- এ বিষয়ক ইইউ ফোরামে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য এখনই বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট এখানে ইইউর ভূমিকা সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সুপার স্টেট ধরনের। আর এটাই প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র তার নিজ নিজ সংসদে আগে অনুমোদন দিয়েছে যে ঐসব ক্ষেত্রে ইইউ এর সিদ্ধান্ত সদস্য-রাষ্ট্রের উপর সুপ্রীম, তাই এটা বৈধ। সারকথায় রাষ্ট্রজোটের নানা ধরনের মধ্যে একমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন হল আলাদা ধরণের কারণ এটা হবু সুপার স্টেট। এক সুপার ষ্টেট হবার লক্ষ্যে সে আগাচ্ছে তাই।
    ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণ সিদ্ধান্ত জানাল যে ব্রিটেন ইইউর মধ্যে নিজ রাষ্ট্র একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিলীন করার যে সিদ্ধান্ত সে আগে নিয়েছিল (ব্রিটেন ১৯৭৩ সালে ইইউতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল) সে সিদ্ধান্ত বদল করে তারা এবার নিজের ব্রিটেন রাষ্ট্রই অটুট রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
    ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটেনের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রক্ষণশীল টোরি আর লিবারেল লেবার- এরা কেউই ইইউ ত্যাগের পক্ষে নয়, বরং ইইউর সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষে বলে দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রচারও করেছিল। ফলে আর অন্য ছোট দল হিসেবে যারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ও প্রচার চালিয়েছিল, তেমন এক দল হলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি)। গণভোটের ফলাফল ত্যাগের পক্ষে যাওয়ার পর মিডিয়া এই পার্টির সেক্রেটারিকে প্রশ্ন রেখেছিল- কেন তারা জিতলেন বলে মনে করেন? তিনি বললেন, আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা জনগণ নিজেরাই নিতে চাই, তাই। এটা অবশ্যই সঠিক জবাব নয়। একই ভাবে আর এক নেতা তিনি “না-ভোট প্রচারক” কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক। নাম (Michael Gove) বা মাইকেল গভ। কিন্তু তিনি আসলে আবার মাইকেল ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল টোরি পার্টির এমপি। তিনি তার ওয়েব সাইটে তাঁর নাভোটের পক্ষে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে তিনিও UKIP দলের মত বললেন। এককথায় বললে, যেসব নেতারা ইইউ-ত্যাগের পক্ষে কাজ করেছেন, এরা মূলত সাধারণ মানুষের নানান ক্ষোভ অসন্তোষকে সস্তা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী সুরসুরি দিয়ে আরও বড় করে কাজে লাগিয়েছেন। যেমন মাইকেল লিখছেন, তার আপত্তি্র পয়েন্ট হল তাঁর “রাষ্ট্র বৃটেনের ভাগ্য অন্য জাতেই রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদের ঠিক করছেন “decided by politicians from other nations”। এটা খুবই বাজে ও ফালতু যুক্তি। এক রংপুরের রাজনীতিবিদ যদি বলে, বাংলাদেশের বাজেট দিচ্ছেন এক (ভিন্ন জেলা অর্থে ভিনজাতের) সিলোটি নেতা … এটা বললে যেমন বুঝতে হবে এগুলো মাথায় শয়তান ভর করা লোকের সস্তা সুরসুরি মার্কা কথা – ঠিক তেমনি। আমরা নানা জেলার মানুষ মিলিয়েই বাংলাদেশ গঠন করেছি। ফলে কেউ যদি সংসদে সিলেটি হয়ে রংপুরের ভাগ্য নির্ধারণ করে তবে কোথাও আবার রংপুরিয়াও সিলটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ইইউ তে বৃটিশ না হয়েও ধরা যাক সে জর্মন, যাদের সিদ্ধান্ত বৃটেনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে, বৃটিশের সিদ্ধান্তও অন্য কোথাও জর্মনের উপর প্রযোজ্য হচ্ছে। সুতরাং এটা কোন পয়েন্টই না। পরিস্কার দগদগে উগ্র জাতিবাদি বিদ্বেষ, রেসিজম। যদি ইইউ ভাইস ভারসা ভাবে জর্মনী বা অন্য জাতি রাষ্ট্রের উপর বৃটিশ (ইইউ এমপি বা MEP )র সিদ্ধান্ত কার্যকর না হত তাহলে এসব কথা বলার সুযোগ থাকত। এছাড়া সবার উপরে বৃটেন কী স্ব-ইচ্ছায় ১৯৭৩ সালে ইইউ তে যোগ দেয় নাই? স্ব-ইচ্ছায় যোগ দেয়ার মানে কী  এটা না যে অ-বৃটিশেরও মতামত মাতব্বরি শুনতে ইউ তে যোগ দিতে যাওয়া হচ্ছে?  অতএব এসব ফালতু জাত-বিদ্বেষী বক্তব্যকে যদি জবাব হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে হয়, তবে মানতে হবে এত দিন বেআইনি বা অবৈধভাবে ব্রিটেনবাসীকে বঞ্চিত করে, তাদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইইউ সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, যেন সেটার অবসান ঘটালেন তারা গণভোটে ভোট দিয়ে। কিন্তু না তা তো নয়। আইনে যা লেখা আছে তা মেনেই সেই ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হওয়া এক ক্রমপ্রক্রিয়ায় ব্রিটেন ইইউর ভেতরে বিলুপ্ত হওয়ার লক্ষ্যে ও সেজন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। ইইউ তো কোন জবরদস্তি প্রক্রিয়া তো ছিল না।
    আবার সেই ইইউ প্রক্রিয়া যেহেতু এখনো শেষ বা সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি, ফলে ২০০৭ সালের লিসবন চুক্তি, যার আরেক নাম ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি, যেটা তার আগের করা ইইউ বিষয়ক সব চুক্তির আপডেটেড বা সর্বশেষ রূপ, এর আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রক্রিয়া থেকে এখনও যেকোনো সদস্যের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ বৈধভাবেই ছিল। যেটার সুযোগ নিতেই ব্রিটেনের জনগণ তাদের আগের সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ নিয়েছে এই গণভোট করে। এটাও বৈধ। ফলে ১৯৭৩ সালে ইইউতে ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত এবং এই গণভোটে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুটোই আইনি দিক থেকে বৈধ সিদ্ধান্ত। তাহলে আসলে এখন কী ঘটেছে? আর কেন সেটা ঘটল?

    সাধারণ নির্বাচন বা গণভোট মানে ঐ একবারই যখন সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণের পর্যায়ে নেমে আসে। কার তুলনায়? সরকার গঠন হয়ে গেলে যে সংকীর্ণ গোষ্ঠি এবার সরকারের নীতি-সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের ক্ষমতার তুলনায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে বা গ্লোবাল কাপিটালিজমে অনেক প্রভাবশালী অর্থনীতি আছে। এরাসহ সব আধুনিক রাষ্ট্রেই পুঁজি ব্যবসায়ী, শিল্পকারখানা বা ট্রেডার ব্যাংকার সমাজের এ অংশটিই তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে। নির্বাচন একবার হয়ে গেলে পরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত এসময়গুলোতে রাষ্ট্র কার্যত থাকে এই গোষ্ঠির প্রভাবে। মূলত এসব সময়গুলোতে নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ জনগণ ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছিল। যেমন ২০০৮ সাল থেকে চলে আসা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এখনো গ্লোবাল অর্থনীতিতে কাটেনি। আর ওই মন্দা আসলে ডেকে এনে ছিল যেন এক প্রতিযোগিতা! কীসের? ঐ মহামন্দায় দেইলিয়া হয়ে পড়া কোম্পানী পুঁজির কারবারিদের দায়দেনা ও ক্ষতি জনগণ বা রাষ্ট্রের কাঁধে কেমন লটকিয়ে দেয়া যায় এরই প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ঢেলে সব ব্যক্তি কর্পোরেট কোম্পানীর দায়দেনা ও ক্ষতি মিটানো হয়েছিল। এরপর আবার শুরু হল (austerity) অস্টারিটি মানে অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধন। অর্থাৎ রাষ্ট্র তখন আর সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগ কমিয়ে দিবে আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ধরনের সামাজিক বেনিফিটে কাটছাঁট করবে, যার সবচেয়ে আর সব দিক থেকে চাপটা এসে পড়বে কেবল শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সমাজের নিচের কম আয়ের জনগণের ওপর। এর ওপর আবার বিগত ২০০১ সাল থেকেই –  ‘ইসলামি জঙ্গি’ মারতে গিয়ে লম্বা শেষ নাই এমন যুদ্ধে আটকে গিয়েছে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। এর অর্থনৈতিক দায় বইতে পশ্চিমা রাশ্ট্রগুলোর অসমর্থ হওয়া ছিল সব কিছুর  প্রধান ফ্যাক্টর।  ঐ যুদ্ধের ঘটনার লেজে লেজে যেখান থেকে আবার দুনিয়াতে রিফিউজি বা উদ্বাস্তু সমস্যা খাড়া হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ইউরোপেরই নিচের মানুষদের চেয়েও কম বেতনে রিফিউজিরা খারাপ দুস্থদশায় বলে কাজ করতে রাজি – ফলে এরাই প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রমজীবীদের বাজারে হাজির হতে চাইছে। ফলে ইউ যেটাকে যুদ্ধের রিফুইজি ঠেলে ফেলতে পারে না, জাতিসংঘ উদ্বাস্তু কমিশনে কমিটমেন্ট ইত্যাদির কারণে রফুইজি নিচ্ছে বা প্রতিদানে অর্থের সংস্থান করেদিচ্ছে। এগুলো প্রতিটার ক্ষেত্রে  ইউরোপেরই নিচের মানুষদের স্বার্থ আর তাদের শাসকদের স্বার্থ পরস্পুর মুখোমুখি। ফলে শ্রমজীবিদের চোখে ইইউ এক ভিলেন। ফলে সব কিছুকে উল্টে ফেলে দেয়ার অছিলা খুঁজছিল ইউরোপেরই নিচা আয়ের জনগণ। কারণ স্ব স্ব রাষ্ট্রে এসব সিদ্ধান্ত ও কাজ করা হচ্ছিল ইইউর আইনি বাধ্যবাধকতা আছে, ইইউ এর ওমুক আইনের বাধা আছে অথবা যেমন- ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের রুল আছে তাই অস্টারিটি করতে হচ্ছে অথবা ইইউর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাই উদ্বাস্তু নিতে হবে- এভাবে ইইউকে দেখিয়ে সামনে রেখে নিজের রাষ্ট্র এগুলো করছিল। ফলে স্বভাবতই জনগণ সেই ইইউ নামে ভুতুড়ে ক্ষমতাকেই উপড়ে ফেলার পক্ষে চলে যায়। অর্থাৎ সমাজে এসব অসন্তোষ বাড়ছিল। এই অসন্তোষ নিরসন বা আমলে নেয়ার নামে ক্যামেরন ভেবেছিলেন ইইউতে থাকা না থাকাকে গণভোটে দিলে আবার ইইউতে থাকাই জিতবে। ফলে গণক্ষোভ প্রশমিত করার রাস্তা তার নাগালেই আছে। তাই আগবাড়িয়ে ২০১৩ সালে তিনি গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ দিকে সমাজের ওপরের অংশ এবং দুই প্রধান দল ধরেও নিয়েছিল, গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ জিততেই পারে না। এটা তাদের কাছে অসম্ভব কল্পনা মনে হয়েছিল। কিন্তু যত গণভোটের নির্ধারিত দিন এগিয়ে আসতে থাকে ততই গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে পরিচালনের রাষ্ট্রনেতা, বিভিন্ন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান নেতারা ততই ইইউ ত্যাগ করে গেলে কী বিপর্যয় ঘটবে, একের পর এক এর ভয়াবহতা উল্লেখ করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়া হয় আরো নেতিবাচক। বিবিসি যে আটটা কারণ তুলে ধরেছে, তার এক নম্বর কারণ হিসেবে “ব্রেক্সিটের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাবে উল্টো ফলকে” । ব্রিটিশ সাধারণ ভোটাররা ব্যাপারটিকে তাদেরকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়া হিসেবে দেখেছিল। ফলে চাপের ভেতরে তাদের দিশেহারা অবস্থা। এর ওপর আবার সর্বক্ষণ হবু সুপার স্টেট ইইউর দোহাই দেয়াতে এই ভুতুড়ে আড়ালি ক্ষমতাকেই মাস জনগণ সবার আগে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা মনে করা যেতে পারে।
    ব্রিটেনের ভাষায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (আইপি) হলো এক ‘ডানপন্থী’ পার্টি। এরা এই গণভোটকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিটানোর মহাসুযোগ পাওয়া গেছে হিসেবে নিয়েছিল। এভাবে তারা জনগণকে মিথ্যা আওয়াজ তুলেছে যেন উগ্র জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুললে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সব সঙ্কট দূর হয়ে যাবে। ইসলামি জঙ্গি মারার নামে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যে সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তোলা হয়েছে, তা আপনাআপনিই মিটে যাবে, এই মিথ্যা স্লোগান দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ সংস্কৃতি মূল্যবোধ সবার চেয়ে ভালো এই উগ্র প্রচার করেছে। ফলে বৃটিশরা  নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে মূল সমস্যা থেকে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণের দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হয়েছিল। এসব কিছুর নিট ফলাফল হলো গণভোটের ইইউর ত্যাগের সিদ্ধান্তের জয় লাভ।

    ইইউ ত্যাগের পক্ষের প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসন ও অন্য প্রবক্তারা জানেন, যে তারা মিথ্যা প্রলোভনে ত্যাগের পক্ষকে জিতিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসনকে মিথ্যা বলার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বরিস জনসনের ছবিসহ ঐ সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল ব্রেক্সিটের প্রবক্তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।   অথচ সবাই জানত ইইউ-ত্যাগের পক্ষে জিতলেও গরিব শ্রমজীবীর মূল ক্ষোভ অসন্তোষ এতে কাটবে না। তাই নিউইয়র্ক টাইমস গত ২৬ জুন আর এক রিপোর্টে বলছে ইইউ-ত্যাগ ভোটের জিতার পরে অনেক নেতা উলটা প্যাডেল মেরে ভাগতেছে কারণ জিতলে তারা কী করবে এনিয়ে তাদের কোন অর্থনৈতিক পরকল্পনা ছিল না।  প্রতিদিন ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড নাকি ইইউকে দিতে হত খামোখা বলে বরিস জনসনরা প্রচার চালিয়েছিল। এখন স্বীকার করছে ওটা ভুল ছিল।  তাই তারা এখন ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যত দেরিতে শুরু করা যায়, এর পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যেমন ইইউ ত্যাগের আইনগত পদ্ধতি হলো কোনো সদস্যরাষ্ট্র নিজ রাষ্ট্রের আইন বা কনস্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা পালনের মুখোমুখি হয়ে পড়লে (যেমন- বৃটেন এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য) সে ইইউ ছেড়ে যাওয়ার জন্য সবার আগে ইইউকে নোটিশ দেবে। এটাই সর্বশেষ লিসবন ইইউ চুক্তির আর্টিকেল ৫০ অনুসারে ইইউ ত্যাগ করতে চাওয়া দেশের ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম পদক্ষেপ। অর্থাৎ বৃটেনে গণভোট হয়ে ফলাফল চলে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ এখনো বৃটেনের কাছ থেকে ত্যাগের ইচ্ছার কথা জানে না। আর এই ইচ্ছা জানানোর এখতিয়ার বা জানানোর পার্টি হল, যে ত্যাগ করতে চায়। সে হিসেবে কেবল ব্রিটেন। তাই সাবেক মেয়র বরিস জনসন আর্টিকেল ৫০ স্মরণ করিয়ে বলছেন, এটা তাদের এখতিয়ার এবং তারা আগামী অক্টোবরের আগে ইইউকে আনুষ্ঠানিক নোটিফাই করতে চিঠিই দেবেন না। ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে আর্টিকেল ৫০-কে সক্রিয় করে জানানোর প্রক্রিয়া শুরু করলে এর পরের কমপক্ষে দুই বছরের আগে এই বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শেষ হবে না। ফলে যারা ইইউ-ত্যাগ পক্ষকে জিতিয়েছেন, সেই প্রবক্তারা তাই যদ্দুর সম্ভব আগামীতে নিজেদের সম্ভাব্য ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখার সুযোগ নিতে চান। বিপরীতে যে ছয় রাষ্ট্র ১৯৫১ সালে ইইউর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল সেই মূল ছয় রাষ্ট্র- জর্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, লেদারল্যান্ডস, ইতালি ও লুক্সেমবার্গ- এদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মিলিত হয়ে এক যৌথ আহ্বান রেখেছেন ব্রিটেনের প্রতি। দাবি করেছেন ইতোমধ্যেই গণভোটের ফলাফল গ্লোবাল বাজারের আনাচে-কানাচে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মার্কেটে উথাল পাথাল ঘটা শুরু হয়েছে। ফলে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করতে ব্রিটেন যেন দ্রুত শুরু করে, যাতে ব্রিটেন বাদে ইইউ (২৭ সদস্যরাষ্ট্র) নিজেদের আরো কোনো বিপর্যয়ের হাতে না পড়ে এর বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে পারে।
    এখন দেখার বিষয়, এই বিচ্ছেদ কি সহজেই ঘটতে পারবে, নাকি আরো গ্লোবাল বিপর্যয়ের মুখোমুখি করবে দুনিয়ার সবাইকে- এটাই এখন দেখার বিষয়!
    দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের এখানেই শেষ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখার প্রথম পর্ব যার শিরোনাম ছিল, “ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু” ঐ লেখা বিগত ১৯ জুন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় আগে ছাপা হয়েছিল। আর চলতি শেশাহ পর্বের লেখাটা আগে ২৬ জুন ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তে ছাপা হয়েছিল। দুটো লেখায় আবার নানান সংযোজন ও সম্পাদনার পর এখানে ছাপা হল।

  • ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু

    ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : ভাঙন মানেই ভাঙাগড়া
    গৌতম দাস
    ২৯ জুন ২০১৬, বুধবার

    ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ : গড়ার ভাঙনের শুরু

    আজ প্রথম পর্বঃ
    ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্র বৃটেন বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে এক গণভোটে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত এখনও আভ্যন্তরীণ। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ কে এখনও জানায় নাই। ইতোমধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এর উল্টাপাকল্টা প্রভাব পড়া শুরু করেছে। বৃটেনের গণভোটের এই সিদ্ধান্তে গ্লোবাল প্রভাবশালী শেয়ার বাজারগুলোতে টালমাটাল অবস্থা শুরু হয়রছে। এই প্রেক্ষিত মাথায় রেখে বর্তমান লেখাটা শুরু করেছিলাম গত ২৩ জুন গণভোট অনুষ্ঠানের আগে। চলতি পর্ব সেটাই। এছাড়া গণভোটের পরেও এলেখা শেষ অংশ লেখা হয়েছে যা পরবর্তিতে দ্বিতীয় বা শেষ পর্ব আকারে এখানে প্রকাশিত হবে।

    ব্রেক্সিট, একটা নতুন শব্দ। নতুন পরিস্থিতিতে পড়ে জন্ম নেয়া একটা নতুন শব্দ এটা। দু’টি শব্দ – ব্রিটেন আর এক্সিট, এদুইয়ের সংমিশ্রণ করা হয়েছে। পুরনো শব্দ দু’টি মিলিয়ে পয়দা করা হয়ে হয়েছে নতুন শব্দ ব্রেক্সিট। কেন? বিগত ১৯৭৩ সাল থেকে  ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য। ব্রিটেন ইইউ ছেড়ে যাবে কি না তা জানতে গণভোট ডাকা হয়েছে। ব্রিটেন ইউরোপের পুরনো ও বড় মাতবর । কলোনি ইতিহাস সাথে ধরে নিলে দেশটা কলোনি সাম্রাজ্যকালের মাস্টার রাষ্ট্রগুলোরও শিরোমণি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগীজ বা স্পানিশ ইত্যাদি  সবার কলোনি সাম্রাজ্যের মাস্টারি পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। কিন্তু তা  গেলেও এর পরবর্তীকালে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন করে সাজানো দুনিয়াতে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ব্রিটেন ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে জায়গা দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। আজ যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন যা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে আর আলাদা আলাদা না থেকে ক্রমশ ধাপে ধাপে এক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবার পরিকল্পনা সেই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে। ইতোমধ্যে ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ প্রায় প্রতিবছর নতুন নতু কমন আইনের অনুমোদনে রাষ্ট্রগুলো এক ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হবার পথে অনেক দূর এগিয়ে যায়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হলেও এরমধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী তিন রাষ্ট্র হয়ে থাকে – বৃটেন ও বাকি দু’টি ফ্রান্স ও জার্মানি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য দেশগুলো একই কারেন্সি হিসেবে ইউরোকে গ্রহণ করে ১৯৯৯ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে। যদিও ব্রিটেন এর পরও বিশেষ বিবেচনায় তার নিজ মুদ্রা পাউন্ড নিয়েই ইউরো জোনের বাইরে থেকে যায়। ব্রিটেনকে ইইউ’র সদস্য হয়ে থেকেও বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে ইউরোর বাইরে থাকতে জায়গা করে দেয়া হয়েছিল। চলতি মাসেই ২৩ জুন ব্রিটেনে এক গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। যেখানে নাগরিকেরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে থাকবে না বের হয়ে যাবে এই প্রশ্নে গণভোটে মতামত দেয়। অর্থাৎ গণভোটের ফলাফলে ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় এসেছে বলে ব্রিটেন এখন আর “ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য থাকবে না”। এর প্রাথমিক শর্ত পুরণ হয়েছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউকে জানানোর পরে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই আনুষ্ঠানিকতা ও নিগোশিয়েশন শেষ হতে কমপক্ষে দুই বছর লাগবে।
    গণভোটের ঘটনাটাকে মনে হতে পারে সাধারণ যেকোনো একটা রাষ্ট্রের গণভোটের ইস্যু। আইনি আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা তাইও। কিন্তু এটা শুধু বৃটেন নয় খোদ গ্লোবাল ইকোনমিতেই ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এক কথায় বললে, এর প্রধান কারণ দুনিয়াতে এখন একটাই অর্থনীতি, পরস্পর পরস্পরের সাথে আষ্টপৃষ্টে জড়িয়ে যাওয়া নির্ভরশীল হয়ে পড়া একক অর্থনীতি। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই সেই একক গ্লোবাল অর্থনীতির একেকটা অংশ মাত্র। যারা পরস্পর পরস্পরের সাথে পণ্য, বিনিয়োগ, বাজার কাঁচামাল ইত্যাদি মাখামাখি একাকার হয়ে শেয়ার করে চলে। পরস্পর বিনিময় লেনদেনে জড়িয়ে আছে, ফলে তাদের সব কিছুই গভীরভাবে আবদ্ধ ও পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ও সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। কথাগুলো গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থেও সত্য, এমনকি আবার ইইউ’র সাথে ব্রিটেনের সম্পর্ক অর্থেও সত্যি।
    নেদারল্যান্ডের মাসট্রিক্ট শহরে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ১৯৯২-৩ সালের স্বাক্ষরিত চুক্তির ভেতর দিয়ে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ এক রাষ্ট্র জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। যে এই জোট বাধা শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে ভিন্নভাবে কেবল ইউরোপীয় উৎপাদক কোম্পানিগুলো কিছু পণ্যের কমন বাজার জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশে। বিগত ১৯৫১ সালে জন্ম নেয়া ঐ প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত কমিউনিটি’। পরবর্তীকালে এটা আর কয়েকটি পণ্য থেকে শুধু সব পণ্যই বিক্রির কমন বাজারের জোট নয় – কমন মুদ্রা, কমন শ্রমবাজার ও কমন পণ্যবাজার ইত্যাদি বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রের জন্য এক কমন মার্কেট কায়েম করে ফেলেছিল। এটাই আরো এগিয়ে কমন আদালত, কমন পার্লামেন্ট, বিভিন্ন ইস্যুতে যেমন পরিবেশ বিষয়ে এক কমন নীতি ইত্যাদি শেষ করে এগিয়ে যাচ্ছিল যার লক্ষ্য ছিল কমন এক রাষ্ট্রে পৌঁছানো। এ সব কিছুর মূল তাৎপর্য ছিল নিজেদের বিশাল কমন বাজার। যেকোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্রের কোন পণ্য উৎপাদক কোম্পানী কমন ইউরোপীয় বাজারের আয়তনের কথা চিন্তা করে নিজ উৎপাদন পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতা সাজাতে পারে। কমন ইউরোপীয় একজোটের শক্তি হয়ে এবার গ্লোবাল বাজার শেয়ার কতটা নিজের জোটের পক্ষে আনা যায় এজন্য লড়তে পারে। আবার চাকরিজীবী বা শ্রম অবাধে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো জায়গায় ভ্রমণ করতে ও অবাধে চাকরি নিতে পারে। মূলত এই দিকগুলোর সুবিধার কথা ভেবে সব সদস্য রাষ্ট্রের ভোটাররা এক ইইউ’র পক্ষে থাকার ভোট দিয়ে থেকেছে। অর্থাৎ ইইউ’র পক্ষে থাকলে বিরাট কমন বাজারের সুবিধা পাবে এটা কোম্পানীগুলো যার যার জায়গা থেকেই দেখতে পায়। আর যেকোনো শ্রমজীবী চাকরি খোঁজার বিরাট বাজার পাবে, এই লোভে ইইউ’র পক্ষে থাকে।
    এগুলো গেল ইইউ’র অভ্যন্তরীণ দিকের সুবিধা। আবার বাইরের দিক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের কলোনি মালিকদের কলোনি ক্যাপিটালিজমের রুস্তমির দিন শেষ হয়ে যায়। শুরু হয় আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানির ক্যাপিটালিজমের যুগ। এখানে আমেরিকার সাথে তুলনায় ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রই আর প্রতিযোগী হিসেবে হাজির হওয়া দূরে থাক,  আমেরিকান অর্থনীতির ধারে-কাছে গোনায় ধরার মতো কেউ ছিল না। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনে বাজার, শ্রম ও মুদ্রার কমন ব্যবস্থা তৈরির পেছনে প্রধান প্রণোদনা ছিল যে এই নতুন উদ্যোগের পরিণতিতে তারা আমেরিকার প্রতিযোগী না হতে পারলেও অন্তত গোনায় ধরার মত অবস্থায় পৌছাবে আর গ্লোবাল পণ্য বাজার শেয়ারের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যেন ইইউ’র দখলে আসে। এই লক্ষ্যে তাই তাদের মূল চালিকাশক্তির মৌলিক অবস্থান ছিলঃ নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা করে শক্তি ক্ষয় না করা, বরং আপন সক্ষমতাগুলোর সমন্বয় করা। আর সেই মিলিত সম্মিলিত ক্ষমতা দিতে ইইউ’র বাইরের সবার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা করা। এভাবে গ্লোবাল বাজার শেয়ার নিজেদের পক্ষে বাড়ানো। তবে ব্রিটেন শুরু থেকেই অমনোযোগী ছাত্রের মত আচরণ করে গেছে। ১৯৫১ সালের ইইউ উদ্যোগে যোগ দিয়েছে ১৯৭৩ সালে। এভাবে ইইউ’র একই মুদ্রা ইউরো তো ঢুকেই নাই এ’বাদে প্রায় সব কিছুতে ইইউ’র সাথে নানান স্পেশাল খাতিরের শর্তে। ফলে এভাবে এক কথায় বললে বিগত প্রায় ষাট বছরের বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে। আর এখন এক দিনের গণভোটের ফলাফলে ইইউ ভেঙে ব্রিটেন বেরিয়ে চলে যাওয়ার পথে।
    গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষ যে জিতেছে সেটা মূলত কার ওপর নির্ভর করে? সমাজের কোন অংশ?  বলা বাহুল্য সাধারণ ভোটার, চাকরি বা শ্রমজীবী এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্থাৎ ইইউ ত্যাগের পক্ষে গেলে ব্রিটেনবাসী আমজনতার চাকরি পাওয়ার সুবিধা বাড়বে  এই বিবেচনা এটা এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। চাকরির সুবিধা বাড়বে কি না সেটা তো এখন বোঝা যাবে না। বাস্তবে কী দাঁড়াবে তা তো বোঝা যাবে বাস্তবে ইইউ ত্যাগ করে যাওয়া কার্যকর হবার পরে। তাহলে এখন কিসের ওপর নির্ভর করবে? নির্ভর করবে কাজ-চাকরির সুবিধা বাড়বে কি না এ নিয়ে যে পারসেপশন, মানুষের যে ধারণা অনুমান (অনুমান মানে শ্রেফ আন্দাজে অনুমান, যা সত্যি নাও হতে পারে) তার ওপর। এই পারসেপশন তৈরি করছে কী কী ফ্যাক্টর তা খুঁজে দেখতে হবে। তবে তা বলার আগে আমাদের কাছে এ বিষয়ে একটা আগের উদাহরণ হলো গ্রিস। গ্লোবাল মহামন্দা (২০০৮)-এর ধাক্কা  দুনিয়ার সবাইকে কম-বেশি সবাইকে সহ্য করতে হলেও তা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় গ্রিসে। বাস্তবতা হলো রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যায় এতে। আর তা থেকে ছুটে বের হতে গ্রিস শেষে ইইউ’র কাছে আগামি  ত্রিশ বছর ঋণগ্রস্ত গোলাম হয়ে থাকার পথ বেছে নেয়। আর এর অন্যথা অন্য একটা ছিল – ইইউ থেকে মানে ইউরো মুদ্রার জোন থেকে বেরিয়ে গ্রিসের নিজ পুরানা মুদ্রায় ফিরে যাওয়া, যার সার কথা নতুন মুদ্রার মূল্য ইউরোর প্রায় অর্ধেক বলে ঘোষণা দেয়া বা ডিভ্যালুয়েশন। কিন্তু গ্রীসে এ নিয়ে কয়েকবার গণভোট বা সাধারণ নির্বাচন হওয়ার পরও দেখা গেল গ্রিসে তবু ইইউ এ থেকে যাওয়ার পক্ষ জয় লাভ করেছে। এর সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয় যে, কেবল গ্রিসের বদলে সারা ইউরোপে কাজ খোঁজা ও পাওয়ার সুবিধা পাওয়া যাবে, সাধারণ ভোটার চাকরিজীবী, শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই লোভ ত্যাগ করতে পারল না বা কাজ পাওয়ার দিক থেকে ইইউ ত্যাগ সেটা বেশি বড় বিপদের মনে করল।
    গ্রিস ইইউ থেকে বের হয়ে আসবে কীনা তা নিয়ে উঠা তখনকার সামাজিক রাজনৈতিক  উত্তাপ এখনকার ব্রিটেনের চেয়ে কয়েক গুণে উত্তপ্ত ও সরব ছিল। কিন্তু গ্রীসে বারবার ভোটের ফলাফল দেখা যায়,  ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষ জিতেছে। ব্রিটেনের পরিস্থিতিতে জনমত জরিপ অবশ্য আগে থেকেই ইঙ্গিতে বলছিল যে ইইউ-ত্যাগের পক্ষ জয় লাভ করবে। অনেকে যদিও বলছে ইদানীং জরিপের ফল বাস্তবের উল্টা দিচ্ছে। সে কথাও ঠিক।
    তবে সাধারণ ভোটার বলতে চাকরিজীবী বা শ্রমজীবীদের সবাইকে এক কাতারে সাধারণ করে দেখিয়েছি বটে, কিন্তু ভোটের প্যাটার্নের দিক থেকে এরা সবাই একমুখী নয়। যেমন বাংলাদেশী অরিজিন, যারা হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সাথে জড়িত তারা ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দিয়েছে বলা হচ্ছে। তাদের কাছে সারা ইউরোপ কাজ চাকরি পাওয়ার দিকটি ততটা লোভনীয় নয়। এর চেয়ে ত্যাগ-পক্ষ জিতলে তাহলে তাদের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনকার প্রতিদ্বন্দ্বী রোমানীয়রা ব্রিটেন ছেড়ে বিদায় নেবে। এতেই তারা তাদের ফায়দা দেখে নাকি ভোট দিয়েছে। আপাতত এটাই তাদের মুখ্য লক্ষ্য। ফলে তাদের ধরনের কাজ ব্রিটেনেই পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বলে তারা আশা করছে।
    এত গেল শ্রমের কাজ পাওয়া না পাওয়ার পারসেপশন। কিন্তু ত্যাগ পক্ষের জিতে যাওয়ার অর্থ হবে ভয়াবহ; এর অর্থ হবে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, টাক্স বেড়ে যাওয়া, বাজেট কাটছাঁট করা, হাউজিংয়ের মতো খাত ধসে পড়া এটাই একলা চলতে চাওয়া ব্রিটেনের অর্থ। সাধারণভাবে এর মূল কারণ হল, ইইউতে অন্তর্ভুক্ত থাকা মানে বাজার বড় বলে অনেক খরচই ভাগাভাগি হয়ে কমে যায়, একই অবকাঠামো সবাই শেয়ার করা যায় বলেও খরচ কমে আসে। বহু অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায় পরস্পরের সক্ষমতা  খোয়ানো তাতে এড়িয়ে যাওয়া যায়। তাই ইইউ ত্যাগ করলে এই খরচগুলো এবার চেপে বসবে। এ কারণে ইইউ ত্যাগ না করার পক্ষে ব্যবসায়ী, ট্রেডার ব্যাংকার বা বিনিয়োগকারী ধরণের সবাই সোরগোল তুলেছে। যদিও এটা ঠিক কেবল ব্যবসায়ী, ট্রেডার ব্যাংকার বা বিনিয়োগকারী ধরনের লোকদের স্বার্থের বিষয় নয়। আবার যদিও টপ সাত শিল্পায়িত রাষ্ট্রপ্রধানের ক্লাব জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন বহু আগে থেকেই রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে সুপারিশ করে যাচ্ছিল, যাতে গণভোটে ব্রিটেন ইইউ ত্যাগের পক্ষে সিদ্ধান্ত না নেয়। ইতোমধ্যে আইএমএফও ত্যাগের বিপক্ষে বিরাট বিরাট বিপদের হুঁশিয়ারির কথা বলে গিয়েছিল। এর প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চান লাগার্ডে বলেছিলেন, শেয়ার মার্কেট ক্রাশ করতে পারে। ইতোমধ্যে তা হওয়ার আলামত শুরু হয়ে গেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, অর্থনৈতিক মহামন্দা চেপে বসতে পারে। ইতোমধ্যে চীনের শেয়ারবাজার শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বড় কারণ ব্রিটেন হল, চীনা ইউয়ান মুদ্রা বিনিময়ের বাজার, ইউয়ান ভাঙ্গিয়ে অন্য গ্লোবাল মুদ্রায় নিয়ে যাওয়ার মূল মার্কেট। ব্যাংকার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জর্মানির দুটো ব্যাংক, যারা ব্রিটেনে ব্যবসা করে এরাও প্রায় একই রকম বিপদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে নিজের অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি প্যারিস সফরে গেলে প্যারিসের প্রধানমন্ত্রীও তাকে ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে থাকতে বলেছিলেন। ত্যাগ-পক্ষ জিতলে ফ্রান্সে আশ্রয় নেয়া রিফিউজিরা ব্রিটেনে চলে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে, সীমান্তে ভিড় করতে পারে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে এগুলো পড়ার সময় মনে রাখতে হবে এসব মন্তব্যগুলো তখন কেবল ব্রিটেনের ক্ষতির কথা ভেবে বলা হয় নাই। কারণ ব্রিটেন বের হয়ে গেলে ইইউও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা বিখ্যাত পত্রিকা লল্ডন ইকোনমিস্টের অবস্থান। ফলে চেইন রিয়াকশনে সারা গ্লোবাল ইকোনমিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এসব ভেবে এই হুঁশিয়ারি।
    এবার শেষ করব, আরেক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার কথা বলে। আমেরিকার একটি পত্রিকাটির নাম ‘ফাইনান্সিয়াল সেন্স’। নাম শুনে কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন অনেকে যে, এটা ওয়াল স্ট্রিট বা বিশাল বিনিয়োগ পুঁজি বা পুঁজিবাজার কোম্পানির আড়ত মোকাম আছে ওয়াল স্ট্রিট নামে ঐ জগতের পত্রিকা। এই আর্টিকেলের লেখক ড্যানিয়েল পার্ক পুঁজিবাজারের বিশেষজ্ঞ পরামর্শক, তাদেরই মন্তব্যের পত্রিকা এটা। ঐ রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘ব্রেক্সিট গণভোট তো শুরু কেবল’। কিন্তু কিসের শুরু? কিসের কথা বলছেন তিনি? তার কথাগুলো সার করে এখানে বলব।

    তিনি বলছেন মূল সমস্যা হলো, “একবার যদি মানুষের হাতের সঞ্চয় ফুরিয়ে যায়, আয় বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় আর সেই সাথে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার স্থবির পালা হয়ে চলাচলহীন জমে ওঠে ফলে যা আবার ধার দিবার জন্য উদ্গ্রীব – খুবই নিচু শূন্যের কাছাকাছি অথবা শূন্য সুদে ধার দেয়ার জন্য তৈরি  হয়ে বসে আছে, কিন্তু বিতরণ করতে পারছে না কারণ বাজারে ধার গ্রহণের লোক নেই, ঋণ গ্রহিতা ক্রেতা নাই, ক্রেতার বাজার নেই বা ক্রেতারা বাজারে নাই”। এবার তিনি এক বিজ্ঞাপন সাথে এনেছেন তার কথাটা প্রমাণ করার জন্য।নিচে বিজ্ঞাপনটা কপি করে দেয়া হল। DODGE – এটা আমেরিকান এক গাড়ী প্রস্তুতকারক কোম্পানীর নাম।

    http://www.financialsense.com/sites/default/files/users/u199/images/2016/June-Zero-No-Payments-238x488-Website-Panos-en-0002-caravan-238x488.jpg

    তিনি বলছেন, আজকের গাড়ি বিক্রির বাজারে ঠিক এই বাস্তবতাই আমরা দেখছি। ডজ গাড়ি বিক্রির এক বিজ্ঞাপন দেখিয়ে তিনি বলছেন, “এরা শূন্য সুদে তিন, পাঁচ বা সাত বছরের (৮৪ মাস) জন্য ঋণ দিতে চাচ্ছে। এর উপর আবার প্রথম ৯০ দিন কোনো কিস্তি দিতে হবে না বলছে। এছাড়া পরবর্তিতে নতুন নতুন মডেলের গাড়িতে আপগ্রেড করে নেয়ার সুযোগের অফার দিচ্ছে”। ‘ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, আমার ক্রেতা খুবই কম অথবা নেই। তাই আমি আমার সম্ভাব্য ক্রেতার হাতে অর্থ তুলে দিয়ে হলেও আমার ব্যবসার সার্কুলেশন চক্র চালু রাখতে চাচ্ছি। দেনার ওপর দেনা বাড়িয়ে হলেও টিকে থাকতে চাচ্ছি। ঋণ-গ্রহীতার বাজারের এমনই দুরবস্থায় পৌঁছেছে।” তাহলে কিসে তিনি এ থেকে সমাধান দেখছেন?
    তিনি বলছেন রেডি হওয়ার জন্য। কিসের জন্য রেডি? তিন দশক ধরে যে দম ধরা অবস্থা চলছে এর ভেঙেচুরে পড়া বা ছেদ সমাপ্তি দরকার, তিনি চান। সব দেউলিয়া হয়ে ভেঙ্গে পড়ুক, এরপর পুনর্গঠন করে নিবার সুযোগ আসবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা আসুক  – ইত্যাদি সব এগুলো দেখার জন্য তৈরি হতে হবে। দুনিয়া এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এর পরিশুদ্ধতা ( খ্রিষ্ট ধর্মীয় এক শব্দ ও  ধারণা -‘ক্যাথরেসিস’ ব্যবহার করেছেন তিনি) দরকার। এ জন্য প্রবল উদ্যমী একটা ‘সৃষ্টিশীল ধবংসের’ (ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন) কথা তিনি প্রস্তাব করেছেন, যা পরিশেষ আমাদের বাসাবাড়িগুলোতে বসবাসকারিদের হাতে সঞ্চয়ের ঢল নামাবে। এটা ঘটার আগে ‘ব্রেক্সিট মেক্সিট বহু কিছু বিপর্যয় আমরা দেখব। এভাবে আমরা বহু ভাঙন আর পুনর্গঠন দেখতে পাবো, কিন্তু তাতে আমরা যেন আঁতকে না উঠি।’

    [আগামিকাল দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত হবে।]

     

     

  • শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

    শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
    গৌতম দাস
    ১৮  জুন ২০১৬

    শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

     

    ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

    হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
    যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
    ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

    ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
    তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
    এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
    সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
    পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
    তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
    পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
    বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
    এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
    অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
    লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
    গৌতম দাস
    ০৭ জুন, ২০১৬

    স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

    তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

    গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

    একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

    ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

    ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

    আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

    এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

    এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

    যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

    সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

    ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

    ‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

    তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

    কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

     

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]