Tag: গৌতম দাস

  • বিএনপি কী ‘র’ বা ভারতীয় আধিপত্যের নয়া বাহক ১৬ বছরের পথে? 

    বিএনপি কী ‘র’ বা ভারতীয় আধিপত্যের নয়া বাহক ১৬ বছরের পথে?
    গৌতম দাস
    ২৮ নভেম্বর ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5S6

     

    ধর্মকে কেন্দ্র করে উন্মাদনা, উদ্বিগ্ন মির্জা ফখরুল | Mirza Fakhrul Islam Alamgir | BNP | Somoy TV

    আজ কী চলতেছে?
    গতকাল থেকে আজ  এ’পর্যন্ত মূলত যা চলতেছে তা হল, উপর উপর দেখলে এটা ইসকন কে নিষিদ্ধ প্রশ্নের ফয়সালা বা এনিয়ে আমাদের রাজনীতিতে দুই মেরুর লড়াই।  যা আসলে গত ১৬ বছরের মত বাংলাদেশে র-এর ততপরতা বা ভারতীয় আধিপত্য কী কন্টিনিউটি বা ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলতেই থাকবে কী থাকবে না – এরই রাজনৈতিক দুপক্ষের লড়াই এবং এর ফয়সালা কোন দিকে হতে যাচ্ছে এরই কালপর্ব এটা।
    আর এই কালপর্বে মুখ্য ভিলেনের ভুমিকায় নেমে গেছে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর। এটা কেউ ঠিক বিএনপি না বরং এটা আওয়ামি লীগ ২.০ হয়ে বিএনপির আসন্ন ক্ষমতায় আসার কসরত-মহড়া বলতে পারেন।  আর সেই মহড়ায় মির্জা সাহেব ওবায়দুল কাদেরের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে নিয়েছেন তো বটেই বরং সাথে আরো অনেক বেশি হাসিনার চরিত্রও নিয়ে ফেলার অবস্থায় চলে গেছেন। এই সামান্য ব্যতিক্রমের কারণ আওয়ামি লীগ ২.০ এর সভাপতি শারীরিকভাবে দেশে অনুপস্থিত তাই।

    গতকালকে মির্জার যে পারফরমেন্স এটা বলা যায় কারো যদি মনে হয় ক্ষমতা এই তো হাতের মুঠোয় দুহাত দূরে তখন একটু-আধটু কাপড় খোলা গেলে সেটা তেমন অসুবিধা কী বলেই মনে হবে। আর সেই খোলা শরীর ঢাকতে তিনি তখন শতভাগ কোশেশে নেমে পড়েন যাতে তাকে  শুশীল এবং বিখ্যাত (আসলে কুখ্যাত) হিন্দুত্ববাদ=প্রগতিবাদ হয়ে হাজির হইয়েছেন মনে হয়।
    গতকাল ছিল মির্জার দুইটা পারফরমেন্স দেখানোর দিন; বা অন্যভাষায় বলা যায় আসন্ন দুহাত দুরের ক্ষমতায় চড়ে বসার ক্ষেত্রে “হুজুর নাকি সন্ন্যাসীদের (কলকাতা আজকাল ‘র’এর ততপরতাকে সন্ন্যাসী  ততপরতা বলে পরিচয় করাচ্ছে ) বলব যেটাই হোক তাদের দেয়া দুইটা এসাইনমেন্ট সম্পন্ন করার দিন।  এর একটা হল, সকাল সকাল প্রথম আলোর জন্য মায়াকান্না। তবে এর চেয়ে অভিযোগ বা সাফাই টা বেশি মজার। “তার অফিস পুড়িয়ে দিচ্ছে! – মানে ঢাকায় প্রথম আলোর অফিস কী পোড়ায় দেয়া হয়েছে??

    না কী ঢাকায় অফিস টাচ করা হয় নাই ফলে ধর্মীয় উন্মাদলার কথা আনা যাচ্ছে না তাই ভাড়াটে নিজেদের লোক দিয়ে রাজশাহীতে যেখানে কোনায় এক-দুজন বসে ওর সাইনবোর্ড খোলার ছবি তুলে এনে এবার প্রোপাগান্ডা করা হয়েছে!
    তবে মানতেই হবে মির্জার অভিনয় ভাল হয়েছে! এতদিনে মির্জা যে অতীতের কমিউনিস্টগরি করেছেন তা যে বিএনপির ঘরে এসে বৃথা যায় নাই ব্যাপক কাজে লেগেছে কেঁদে ফেলার মত আবেগী অভিনয় করে বলা চিন্তা করতে পারেন চিন্তা করতে পারেন – বলা সত্যি চোখে পানি এসে যাবার মত হয়েছে। আর নিশ্চয় চেয়ারম্যান সাহেব তাঁকে  এক বড় পিঠচাপড়ানো উপহার দিবেন।

     

    আপনি চিন্তা করতে পারেন, ধর্মকে কেন্দ্র করে কী উন্মাদনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে! আপনি চিন্তা করতে পারেন, যে মুক্ত স্বাধীন মিডিয়ার জন্য
    আমরা এত দিন লড়াই করলাম, তার অফিস পুড়িয়ে দিচ্ছে! এই বাংলাদেশ তো আমরা দেখতে চাই না, আমি অন্তত চাই না।’

     

    আসলে আমরা জানতামই না যে মির্জা সাহেব মিডিয়া রক্ষার জন্য এতবড় জান কোরবানী দেয়া লোক! এটা এখন হয়ে গেছে যেন একটা কম্পিটিশন যে গরু জবেহ দেওয়াতে গরুটা নাকি মির্জা সাহেব এর এই কোরবানী হওয়ার ইচ্ছাটা কে বেশি কষ্ট পেয়েছে?

    মির্জা সাহেব তর্কটা হলঃ র-এর অর্থে বাংলাদেশের ভারতের স্বার্থে প্রপাগান্ডা করাটা কী জার্নালিজম? এটা কী মুক্ত স্বাধীন মিডিয়া র নমুনা? কাকে জার্নালিজম বলবেন আর কোনটাকে মুক্ত মিডিয়া স্বাধীনতা বলবেন? আপনি ও আপনার বিএনপি তো আসলে ভারতের অর্থ নিয়ে প্রপাগান্ডা করার মিডিয়া স্বাধীনতার পক্ষে নাটক করতে এসেছেন! তাই না? এজন্য নিচে দেখেন বাক্যটা হবে আসলে উলটাঃ

    আপনি চিন্তা করতে পারেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে ভারতীয় আধিপত্য ডেকে আনার শর্তে হলেও বিএনপি মরিয়া হয়ে কী উন্মাদনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে! আপনি চিন্তা করতে পারেন, যে মুক্ত স্বাধীন মিডিয়ার নামের আড়ালে  আওয়ামি লীগ ২.০ হয়ে বিএনপির আসন্ন ক্ষমতায় আসার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে!!! 
    আমরা এত দিন লড়াই করলাম, কী এই জন্য! এই বাংলাদেশ তো আমরা দেখতে চাই না, আমি অন্তত চাই না।’ এটাই আসলে পালটা আপনাদের প্রতি পাবলিক ভাষ্য!
    সারা বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে আর আপনারা এর উলটা দিকে বাইতেছেন!

     

    ভিডিও টা এখানে দেখতে পারেন।
    আর সেজন্যই কী গতকাল সারাদিন সরকারী এপিপি কেন তিনি সরকারী অবস্থান মোতাবেক দাঙ্গাবাজ র-এর স্বার্থের বাহক এজেন্ট চিন্ময় (যার আসল নাম চন্দন কুমার ধর) এর জামিনের বিরোধিতা করলেন তাই চিন্ময়ের সাগরেগেরা এপিপি সাইফুল ইসলাম কে কুপিয়ে খুন করে ফেললো। অথচ আপনি এক বিরাট দল বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এতে কোন প্রতিক্রিয়াই দেখালেন না? গতকাল সারাদিন চট্টগ্রামবাসীকে ধন্যবাদ দিতে হয় যে তারা ইসকনের কোন উস্কানিতে না মেতে কেবল আইনি প্রতিবাদ করে গেছেন। জনমানুষের সমসস্ত ক্ষোভ দুঃখকে তিনটা জানাজার মধ্যে শান্তভাবে ধরে রেখেছেন – অথচ কথিত কোন  ধর্মীয় উন্মাদনা দেখতে না চাওয়া আপনার কমিউনিস্ট মন  এসব তাতপর্যের কিছুই দেখতেই পেলেন না??? আপনি তো আসলেই কমিউনিস্ট? এবং কোন মানুষ না!  রক্তমাংসের মানুষ যা যেমন চিনি আপনি তা নন!! আপনি আপনার চেয়ারম্যান কে ক্ষমতা উপহার দিতে চান তাতে সেটা অভিনয় করে, আওয়ামি লীগ ২.০ হয়ে হলেও আপনার দলের নীতি-পলিসির সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নাই! বেপরোয়া!

    আর দ্বিতীয় এসাইমেন্ন্ধ্যাট হল, ইউনুস সাহেব এর সাথে সন্ধ্যায় ইসকন নিষিদ্ধের প্রশ্নে উলটা আপনারা বলে এসেছেন যে  উলটা ১।  চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে কেন গ্রেফতার করা হলো, তার কারণও জানতে চেয়েছেন আপনারা আর ISCKON এর সাথে আলোচনায় বসে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে যাওয়ার মতো পরামর্শও প্রদান করে। ২। দৈনিক প্রথম আলো এবং The Daily Star এর ওপর যে (কথিত কল্পিত )আক্রমণ হয়েছে, সেটার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখবার জন্য BNP এর পক্ষ হতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়।

    সার কথা র- এবং মোদির হাত ধরে আপনারা যেকোন ভাবে ক্ষমতায় যেতে চান। তাতে সারা বাংলাদেশ আবার ১৬ বছরের জন্য ভারতীয় আধিপত্যের কবলে পড়ে গেলেও আপনারা নির্বিকার! এই হল আপনাদের দেশবিক্রির নয়া রাস্তা!

    নিচের ছবিটার দিকে দেখেন।
    মির্জা ফকরুল আলমগীরের এই উন্নতি একেবারে প্রগতিশীল=হিন্দুত্ববাদ গোষ্ঠির মধ্যমনি হয়ে আসরে জায়গা পাওয়া – এটা বিএনপি জন্মের পর থেকে যত নেতা এর ছিল তারা কেউ চিন্তাও করতে পারবেন?


    একেবারে রাতারাতি মির্জার ইমেজ বদলে গেছে। তিনি কমিউনিস্ট প্রগতিবাদের পরিচয় ধারণ করে ফেলেছে। যেখানে ১৯৯১ সাল খালেদা জিয়া যখন প্রথম বারের মত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন – তখনও টিভি বলতে এক বিটিভি। সেই যুগে বিএনপি করা লোক দিয়ে বিটিভি চালাইবেন এই মুরোদ বিএনপির ছিল না। বিতিভি তখন নানান  কমিউনিস্ট প্রগতিবাদী প্রযোজকদের [মানে অনুষ্ঠান পরিচালক] চালাইতে হইত।
    অথচ এক রাতেই মির্জা সব কমিউনিস্ট প্রগতিবাদী প্রযোজকদের বাপ হয়ে বসেছেন!! কী মজা মজা না? তাও আবার যে সে আসর না। কবি-কবিতা সাহিত্যের আসর!!! চিন্তা করা যায়???  কমু সেলিমের পাসে আসন নিয়ে বসেছেন! আমরা এটা তাহইলে কী দেখতেছি??????? রাতারাতি বিএনপির কমিউনিস্ট বিপ্লব????? এটা দেখার জন্য সম্ভবত আমি এতদিন মরি নাই!!!
    দাবী করেছেন

    ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে: ফখরুল

    কারণ ফকরুলই তাই, সবকিছুতে ওবায়দুল কাদের কেও ছাড়িয়ে গেছেন!

    একটা কথা বলা শেষ করবঃ
    জেনারেল মঈন ও তার দুই সঙ্গী এখন কোন মতে আমেরিকায় মুদি দোকানে চাকরি নিয়েই প্রকাশ্যে আসতে পারেন না।
    আগেরবারের ১৬ বছরের আধিপত্য ভারত শুধু হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়েই কায়েম করতে পারে নাই। অন্যতম যে কাজ করতে হয়েছিল তা হল ২০০৯ সালের পিলখানা। সেবার যা কেবল উর্দি এমন ব্যক্তিবর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল।  যারা ভেবে গুটি সাজাচ্ছেন অভিনয় করতেছেন আর ভাবছেন ওসব তো কেবল উর্দিদের উপর চলবে, পিলখানা হয়ে ফলে তাতে আপনার কী? সবকিছু একইভাবে দুবার ঘটে না। বিশেষ করে ‘প্রহসন’ যেগুলা!! এবার সেটা উর্দি সহ ইউনুস সরকার ও তা ছাড়িয়ে সিভিলিয়ান বহুদুর পর্যন্ত যাবে ……..!!! বেশির ভাগেরই তা জানা নাই। কাজেই দুপক্ষের মাঝে পড়েও কাটা পড়তে পারেন! অবজেকটিভ বা আল্লার দেয়া  বিশ্বাসঘাতকতা আর লোভের শাস্তি কত কিছু হয়!
    তখন আপনি কোনদিকে মানে কোন ভুমিকায় থাকবেন? কাদের না হাসিনা? নাকি আজকের কাদের-হাসিনা!!!  হুশ করেন!

    নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সেসব অন্তত বুঝে নিয়েন! তাই না?  আর শেষ কথা টা হল আপনি একজন পুওর অভিনেতা!
    আর ক্ষমতা আদতে কিন্তু খুবই নোংরা আর এর চেয়ে বেশি তা রক্তাক্ত! এই অর্থে ক্ষমতা মানে কখনও লোভ করে পেতে যাওয়া বা চাওয়া ক্ষমতা [যার প্রতীক হয়ে আছেন ব্রি. খালেদ মোসাররফ], সে নিজে খুন হয় আর দেশসহ সবাইকেই খুন করে যায়!
    যে ‘র’ কী, এটা কীভাবে কাজ করে; আর এর সাথে মোদির রাজনীতি যেটা আসলে একমাত্র তুলনীয় হিটলারের সাথে ফলে মোদি আর র – এদুইয়ের কম্বিনেশন এর অর্থ তাতপর্যই হল একটা ম্যাসাকার – এসব যে জানে নাই সে এখনও মায়ের গর্ভে আছে! মানে সে আসলে এখনও নিজ জন্মের পুর্বাবস্থায় আছে! তাই সে নাদান হওয়ারও উর্ধে; যোগ্য হয় নাই!

    তবুও আপনার জন্য শুভ কামনা!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ      ২ ডিসে.  দুপুর দুইটা  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ      নভেম্বর ২০২৪

     

     

  • কেন বাংলাদেশ বারবার হিন্দুত্ববাদের কাছে হেরে যায়!

    কেন বাংলাদেশ বারবার হিন্দুত্ববাদের কাছে হেরে যায়
    গৌতম দাস
    ২৭ নভেম্বর ২০২৪ বিকেল ০৪ঃ ১১
    https://wp.me/p1sCvy-5QA

    বুধবার দুপুরে নগরের টাইগারপাস মোড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ সমাবেশ হয়- সমকাল

    প্রথমে নিচের  (উপরেরটা নয়) ছবিটার দিকে দেখেন। পরামর্শ হল, “বন্ধু দেশের জন্য তো অনেক লড়ছো এবার ধর্মের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত হও”। এটা একজনের ফেসবুক থেকে নেওয়া।

    যা সারকথায় “দেশ অনেক হয়েছে এখন আসো ধর্মের জন্য লড়ি”। এভাবে দেশ-রাষ্ট্র বোধ আর বিপরীতে ধর্মের মধ্যে  গন্ডগোল করে ফেলা – এটার মূলে আছে আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ-বোধ-হীনতা।
    রাষ্ট্র বনাম মুসলমানিত্ব (ধর্ম) – আসলে আমরা কোনটা পেয়েছি? এই বিভ্রান্তির শুরু সেই ১৯৪৭ সাল থেকে।  যার মূল হল রাষ্ট্রবোধ হীনতা। বা রাষ্ট্রস্বার্থ-বোধ হীনতা।
    আর এই রাষ্ট্রস্বার্থ-বোধ হীনতা যেটা আসলে রাষ্ট্র কী ও রাজনীতি কী এর বোধহীনতা – এটার কারণেই আমরা বাংলাদেশ বারবার হিন্দুত্ববাদের কাছে হেরে যাবো ও গিয়েছি।

    একারণেই বারবার প্রথম আলোর পক্ষে কোন একদল ‘৩৪ জন’ বিবৃতি
    দাতা জুটে যাচ্ছে, গিয়েছে সব সময়!
    অথচ এযুগে বিশেষ করে ২০০১ সালের পরে জঙ্গী-ইসলামিস্ট ট্যাগ এড়িয়ে মানে সুযোগ না দিয়ে আর নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থবোধের উপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক লড়াই করার কাল এটা।  ধর্মীয় জাতিবাদ বোধ এখানে পিছনে রাখতে হবে নইলে ট্যাগের শিকার হবেন আপনি।  অথচ এসব বিবেচনা ভুলে ধর্মযুদ্ধ যেন সেসব ইঙ্গিত প্রকট করে তুলতে চেয়ে বসছি আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে; এটাই প্রধান ধারা হয়ে যায় বলে বহু জেনুইন উদ্যোগ মাঝপথেই মারা যায়!

    ১৯৪৭ সালের  পাকিস্তান কায়েমকে কী করে দেখাবো বা দেখবোঃ 
    ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান কায়েমকে কী করে দেখবো? মানে সেটা কী রাষ্ট্র পেয়েছি না ধর্ম (ইসলাম / মুসলমান) পেয়েছি? এই বিভ্রান্তি আসলে সেই থেকে। এর উত্তর হল, মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রায় সকলে মনে করেছিল তারা নাকি ধর্ম মানে ইসলাম / মুসলমান হতে পেরেছে যেমন সেটা এই অর্থে যে তারা নাকি এখন খোলা বাতাসে শ্বাস নিয়ে বলতে পারবে তারা মুসলমান! কিন্তু তাই যদি হবে তাহলে রাষ্ট্র জিনিষটা কী? বা আরো প্রত্যক্ষ প্রশ্ন, নয়া এমন কি হল যে এখন তারা খোলা বাতাসে শ্বাস নিয়ে নিজেদের মুসলমান ভাববার সুযোগ পাবে? যেমন ধরেন তাহলে জিন্নাহ কে? আর পাকিস্তানই বা কী? কেন পাকিস্তানের ফরমাল নাম “ইসলামি রিপাবলিক অব পাকিস্তান”?
    সরাসরি জিজ্ঞাসা করলে যেমন, পাকিস্তান কী তাহলে? এটা অন্তত কিছু একটা নয়া প্রতিষ্ঠান তা তো বুঝাই যাচ্ছে; কিন্তু  এর কী দরকার? জবাবটা হল, এই নয়া প্রতিষ্ঠান এটারই নামই হল রাষ্ট্র যা এর জনগোষ্ঠির (যাদেরকে নাগরিক বলা হয়) স্বার্থ আকাঙ্খা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু রাষ্ট্র (!) সেটা আবার কী? এটা খায় না মাথায় দেয়  – এই ছিল আমাদের বোধের অবস্থা!

    এই অবস্থাটাই এখনও আছে। তাই উপরে দেখেন আমরা অবলীলায় বলে চলছি – এটা একজনের গতকালের  এই উপলব্দি / স্টাটাস। তিনি বলছেন যে  “বন্ধু দেশের জন্য তো অনেক লড়ছো এবার ধর্মের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত হও”!! যেখানে দেশের লড়াই আর ধর্মের লড়াই একেবারেই আলাদা?????
    কিন্তু আসলে সেকালে কায়েম হওয়া নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তান – এর হাজির হওয়ার মূল তাতপর্য ছিলঃ পাকিস্তান এক নয়া রাষ্ট্র  আর এটাই ছিল ঐ ভুখন্ড অন্তর্গত জনগোষ্ঠির প্রধান ‘রাজনৈতিক’ প্রতিষ্ঠান ও ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার’ প্রতিষ্ঠান।  কিন্তু এই রাজনৈতিক এর মানে?
    যা হওয়ার কথা ছিল কাম্য ছিল কিন্তু আজও হয় নাই এই আইডিয়াল ধারণাটা হল, নয়া পাকিস্তানের জনগণ এক নয়া রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি [পলিটিক্যাল কমিউনিটি বা POLITY] হিসাবে নিজেদের রাজনৈতিকভাবে গঠন [constitute]  করে নিবে, সে অনুসারে তাদের নয়া কনষ্টিটিউশন, নয়া জনআকাঙ্খার প্রকাশ হিসাবে নির্বাচন ও সরকার গঠন করে নিবে।
    কিন্তু হতাশার কথা হল, এসবই হয়ে থেকে গেছিল আইডিয়াল কথাবার্তা  বা বইয়ের কথা;   যা এর বিপরীতে রিয়েল [real] বা বাস্তব হয়ে উঠতে পারে নাই কখনই। এর মূল সমস্যাটা হল রাষ্ট্রবোধ শুণ্যতা। আর বিপরীতে যেন পাকিস্তান পাওয়া বা কায়েম যেন ছিল এক ধর্মযুদ্ধ আর সেই ধর্মযুদ্ধে জয়লাভের ঘটনা – এই বোধটাই প্রধান বা আধিপত্যশীল ধারণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।  যদিও রাষ্ট্রবোধের উপর দাঁড়িয়ে এক পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম  হলে সেই রাষ্ট্রই জনগণের বৈষয়িক স্বার্থ ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার রাষ্ট্র এবং একই সাথে  মুসলমানসহ সকল জনগোষ্ঠির নিজ নিজ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মপালনে স্বাধীনতা রক্ষার রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল।
    বাস্তবের পাকিস্তানে যার কোনটাই হয় নাই।

    বরং এরপরেও আবার আরেক বিতর্ক যে পাকিস্তান হওয়াতে আমরা কী ইসলাম পেলাম নাকি ভালো মুসলমান হওয়ার সুযোগ পেলাম, এভাবে রাজনীতিক বা পলিটিক্যাল হওয়ার মানে কী, তা অস্পষ্ট হয়ে থাকায় এসব অপ্রাসঙ্গিক তর্কে সমাজ ডুবে যেতে থাকে। এর সাথে আরো নয়া তর্ক যে কোন ব্যাখ্যার (ফেকড়া বা মাজহাব) ইসলামটা সহি এনিয়ে এক অনন্ত ভেদাভেদের তর্কে আমরা বিভক্ত হয়ে ডুবে যেতে থাকলাম! অথচ রাজনৈতিক হওয়া বা – রাজনৈতিক কমিউনিটি- হয়ে উঠার সাথে নিজ মুসলমান পরিচয় ঢিলা হয়ে যাওয়া বা হারানোর কোন সম্পর্ক না থাকলেও রাজনীতি ও রাষ্ট্র জিনিষটা কী তা আজও সমস্ত বোধ-হুশজ্ঞান থেকে দূর থেকে দুরস্তেই চলে যেতে থেকেছিল। যার প্রভাব এখনও।

    “জীবনে কোন দিন নামাজ পড়া ত দূর কি বাত,পশ্চিম দিকে উষ্ঠা না খাওয়া কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে মুসলিমরা আজীবন ঋণী থাকবে
    দু’দুটো স্বাধীন মুসলিম ভূখন্ডের জন্য। বৃটিশ আর হিন্দুত্ববাদীদের গ্রাস থেকে এই জমিন আমরা পেয়েছি যার অবদানে তাকে ভুলে গেলে চলবে না। ৪৭ তাই এখনও প্রাসঙ্গিক।”

    গতকালের ঘটনা-প্রতিক্রিয়ায় এটা আরেকজনের ফেসবুক প্রতিক্রিয়া, যা ছিল এরকম উপরের এই দুই লাইন। শুনতে ভাল লাগলেও আমার মনে হয় না কথাটা সঠিক। যেমন জিন্নাহর কাছে মুসলিমরা আজীবন ঋণী থাকবে কেন? কেবল, স্বাধীন মুসলিম ভূখন্ডের জন্য? পাকিস্তান রাষ্ট্র পাওয়াটা তাহলে কিছু না? অর্থাৎ এখানে রাষ্ট্র ও রাজনীতি বোধ বাদ দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে কেবল “মুসলমান” এর অপ্রাসঙ্গিক জয়গান?? এ’এক না-বুঝ অবুঝ জয়গান! এভাবে এই বোধ নিয়ে কী চলা যাবে আর কতদিন চলা যাবে?
    ইতিহাস বলছে না এভাবে একটুও চলে নাই।

    ইতিহাস বলছে – না এভাবে চলে নাইঃ
    ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরে মাত্র সাত বছর পাকিস্তানের ১৯৫৪ সালের প্রথম নির্বাচনেই সব সাফা – পাকিস্তান কায়েমের নায়ক বিপ্লবী মুসলিম লীগ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়, অন্তত পুর্ব-পাকিস্তান থেকে।  যুক্তফ্রন্ট যা পরে ক্রমশ দশ বছরের মধ্যে আওয়ামি লীগ হয়ে হাজির হয়ে যায়।
    এভাবে মাত্র সাত বছরের মধ্যে ইসলাম বা মুসলমানের ভুখন্ড পাওয়া গর্ব এর (রাষ্ট্রবোধ শূন্যতা) পাকিস্তান – সেটা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
    একটা মজার তথ্য দেই।

    জমিদারি ব্যবস্থাঃ
    ১৯৪৭ সালের আগের বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বেঙ্গলে পুর্ববঙ্গও সারা বেঙ্গলের মতই জমিদারি ভূমি মালিকানা ব্যবস্থার অন্তর্গত ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েম হওয়ার  পরের নয়া সোজাসাপ্টা অর্থ হল, পুর্ব পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল প্রজা কৃষকের  আর জমিদার-হিন্দুর প্রজা থেকে যাওয়া নয়; কার্যত এথেকে মুক্ত হয়ে গেছিল তারা। একেবারে জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া আর সেই প্রথম সমাজের সবচেয়ে নিচে পড়ে থাকা অসহায় উপেক্ষিত তুচ্ছ ‘মুসলমান চাষা’ এই প্রজা-মুসলমান পরিচয় ঘুচিয়ে তাদের এই প্রথম ভূমি মালিক মুসলমান হওয়া, এই ছিল পাকিস্তান কায়েমের মুখ্য তাতপর্য।  আর আইনগতভাবে তা ঘটেছিল ১৯৫১ সালে নয়া প্রজাস্বত্ব আইন [সরকারি কাগজে এই নামে – রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০] ।  

    এখন আমাদের নিজেরাই নিজেদের সাথে কেমন তামাসা করেছি দেখেন। গ্রামের গরীব মুসলমানেরা এই আইনের কারণে, [আসলে জমিদার হিন্দুকে খাজনা দেয়া মাঠে বন্ধ হয়ে যায় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই, শুধু তাই না পরে ১৯৫১ সালে  জমিদারি উচ্ছেদ ও নিজে  ভূমি মালিক মুসলমান হওয়ার পক্ষে আইনি দলিল হাতে পায়]; তাই এই প্রথম নিজেদের জীবন-মান উন্নতির পথে যাত্রার দিশা পেয়েছিল। ফলে স্বভাবতই এবার প্রান্তিক মুসলমান চাষা ভূমি মালিক মুসলমান হওয়ার  যার সোজা মানে হল তখন থেকে অনেক প্রান্তিক মুসলমানের ছেলেরাও তাদের বাপের অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে পারে।

    অথচ  ভূমি মালিক মুসলমান এই নয়া শ্রেণীই পরের বছর মানে ১৯৫২ সালে আরেক রূপে হাজির হয়েছিল।  ভাষা আন্দোলন ইস্যুতে সেই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানো তাঁর সন্তানের উপর কেন গুলি চালানো হলে এটা তাঁর আগামি তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা গণ্য করে সেবার থেকে সে শাসক মুসলিম লীগ এর হাত ছেড়ে দিয়েছিল। আর সেই থেকে  বা তাই থেকে; ক্রমশ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বয়ানের চক্করে পড়ে এই নয়া শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের ঝোঁক বাড়তে থাকে কথিত প্রগতিশীলতার ঝান্ডা ধরার। এডুকেটেড মুসলমানেই এর অর্থ হয়ে যায়, হয়ে দাড়ায় যে – কিসের জিন্নাহ কিসের পাকিস্তান ইত্যাদি সব ফেলে দেও; আর হয়ে যাও জেনে না জেনে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে “প্রগতিশীল”।  প্রগতিশীলতাই যে আসলে হিন্দুত্ববাদ তা আজও শিক্ষিত মুসলমানের মধ্যে তাই স্পষ্ট সচেতনা নাই এই অবস্থা হয়ে যায়।

    অনেকে আমার উপরের এই বাক্য শুনে মনে করবেন বা মিথ্যা প্রপাগান্ডা করবেন বা করতে পারেন যে আমি বোধহয় হিন্দুত্ববাদের কথা তুলে শিক্ষিত মুসলমানদেরকে ইসলামিস্ট (জঙ্গি) হতে উস্কানি দিলাম! তাই, কী করে বুঝবেন আমি ঠিক কী বলেছি?
    কথাটা বুঝা একদম সোজা। আমি বলতে চেয়েছি আপনাকে যা হতে হবেঃ

    আপনি বাংলাদেশি নয়া শিক্ষিত মুসলমান (হিন্দুসহ সকলেই) জনগোষ্ঠি যারা অন্তত আর
    ১। কলকাতাকে কেবলা মনে করেন না।
    ২। তারা মুসলমান হয়েই পাপ করেছেন
    এমন কোন ধারণা মনে জায়গা দেন না;
    ৩।  বরং তারাও কলকাতার চেয়ে ভিন্ন আরেক ধরণের বাঙালি যারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে ফলে নয়া রাজধানি ঢাকা-কেন্দ্রিক তাদের
    এক নয়া বৈশিষ্টের বাঙালি তাঁরা ও তাদের বাংলা ভাষা; এরা তাই কলকাতা বাঙালি জনগোষ্ঠির কাউকে ফলো করে না, চলে না।
    ৪। তাই তাদের কালচারাল প্রকাশ নয়া, আগের সবার চেয়ে ভিন্ন। ৫। কলকাতার
    জমিদার-হিন্দুর প্রভাবের হাতে আকার পাওয়া কালচার তা, কোন সুত্রেই এটা তাদের পুর্বপ্রজন্ম নয়। ফলে এর আনুগত্য তাদের জন্য হারাম। কলকাতাকে আমাদের পুর্বপুরুষ গণ্য করে আবার নিজে মুসলমান বলে মনে কোনভাবেই কোন পাপবোধে কলকাতা তাদের নমস্য বা অনুকরণীয় ইত্যাদি এসব কথা কঠোর ভাবে মনে থেকে বের করে দিতে হবে –
    এনিয়ে কোন ধরণের হীনমন্নতাবোধ যেন জায়গা পায়। এই হলো মূল ফ্রেম বা চিন্তা কাঠামোটা।

     

    এরপর বাংলাদেশের এই নয়া জনগোষ্ঠি্র মধ্যকার কে কে আধুনিক হবে, তাতে পশ্চিমা অনুসরণ করবে বা একেবারেই করবে না; কে অল্প বা বিস্তর ভাবে সাথে মুসলমান পরিচয়ও ধারণ করবেঃ এমনকি কী মাত্রায় ইসলামিস্ট হবে বা একেবারেই হবে না ইত্যাদি এসবের যে কোনটা পছন্দ করবার স্বাধীনতা তাদের যার যার।  কথা একটাই কোনভাবেই কলকাতার কালচারাল আনুগত্য নয় বা ভারতের আধিপত্যের আনুগত্য নয় – এব্যাপারে কঠোর হারাম জ্ঞান ভিতরে জাগাতে হবে। এককথায় এটা হতে হবে এডুকেটেড মুসলমান এবং এডুকেটেড যে কোন বাংলাদেশির নয়া রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিমুখ।

    যেমন লক্ষ্য করেন, এখনকার সাদা আমেরিকানেরা, এরা আর বৃটিশেরা উভয়েই একই বৃটিশ (আমেরিকার বেশির ভাগ) এথনিক অরিজিনের মানুষ। মানে উভয়ের এথনিক অরিজিন একই।  কিন্তু তা হওয়া সত্বেও ১৭৭৬ সালের [১৭৭৬ সালে আমেরিকা বৃটিশবিরোধী, বৃটিশ কলোনিশাসন বিরোধী এক স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়] পরের স্বাধীন আমেরিকা (যেমন তাদের পুরানা এথনিক পরিচয় যে তারা) বৃটিশ- এংলো এটা পরিত্যাগ করে নিজেদের নয়া যেন এক এথনিক পরিচয় ধারণ করেছিল যে তারা স্বাধীন আমেরিকান; (আসলে বাস্তবে সেটা হয়েছিল আর কোন এথনিক-ই নয় বরং রাজনৈতিক পরিচয়) এমন এক নয়া পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিল;  আমাদেরকেও সেটাই বা তেমনই একটা কিছু করতে হবে। ফলে বুঝতেই পারছেন ভারতের আধিপত্য এর বিরোধিতা ও কলকাতার কালচারাল আধিপত্য এদুটাকে ত্যাগ করে নিজেদেরকে নয়া ভাবে উঠে গড়া – আমি এর কথাই বলছি। বলাই বাহুল্য এটা কোন সুনির্দিষ্ট ইসলামিজম বা ধর্মীয় কোন কিছুই নয়।  ভারতের আধিপত্য এবং কলকাতার কালচারাল আধিপত্যকে অস্বীকার ও বিরোধিতা করতে বলা মানেই আমি কোন ইসলামিজমের কথা বলছি না।  যদিও বুদ্ধিমান হলে, ইসলামিজমকে একেবারেই অন্তরের, ভিতরের বিষয় করে সাথে রাখতে পারেন। নইলে না।

    এই কথাগুলো যতক্ষণ আমরা রিয়েলাইজ বা অনুভব না করব ততক্ষণ আমরা বারবার হারতেই থাকবো। প্রথম আলো-রা ফাঁকফোকড় দিয়ে টিকে যাবে। বারবার ৩৪জন করে হিন্দুত্ববাদি=প্রগতিবাদিরা প্রথম আলোদের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে উঠে দাঁড়াবে আর অভিযোগ করবে যে যারা প্রথম আলোর বিরুদ্ধে তারা নাকি  –“সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভেদ (আসলে কলকাতা থেকে বিভেদ)”  ছড়াচ্ছে তাই তাদের এই বিবৃতি।
    এধরণের সাফাই চলতেই থাকবে যতদিন আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ বোধ কাজ না করবে। সবকিছুকেই যেন ধর্মযুদ্ধ – এমন ধর্মীয় বয়ানে নিজেদের হাজির করতে থাকবো ততবার এটা এসব ৩৪ বুদ্ধিহারানোদের বিবৃতি আসতেই থাকবে ও তাদেরকে সুবিধা করে দেয়া হবে। আর তাদেরকে বিরোধিতা করা মানেই আমরা “ইসলামিস্ট” ততপরতা করছি  বা তাদের ভাষায় ‘সাম্প্রদায়িক’ বা ‘মৌলবাদি’ কাজ করছি ইত্যাদি এসব বয়ান দিয়ে তাদেরকেই শক্তিশালী করা হবে। তা আমরা না চাইলেও। এই ফাঁক দিয়ে তারা ভারতীয় দালালি ও ভারতীয় বয়ানের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখার জায়গা করে নিবে।
    আর একারণেই ইসকন নিয়ে তাদেরকে কোন অসুবিধা বা অস্বস্তি বোধ করতে দেখবেন না। ইসকন বা চিন্ময়দের ততপরতা এমনকি এরা সরকারী পিপি কে হত্যা এটা কোন ব্যাপারই হবে না কোন ইস্যু হবে না তাদের কাছে। বরং উলটা চিন্ময়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে দাবী করবে যে আমাদের ইসকনের বিরোধিতা নাকি – “আত্মঘাতী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি” -এভাবে খোলাখুলি ভারতের দালালি শুরু করেছে ও করে যাবে এরা। যেমন ফকরুল বলতে চাচ্ছেন – আসুন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মুক্তির দাবীতে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি ।

    এখন আমার একটা দুঃখের কথা বলিঃ
    ইদানিং দেখলাম, অনেকে ফেসবুকে তর্ক তুলছেন যে পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল তাতে আমার প্রধান অর্জন কোনটা এনিয়ে। তারা দাবী করছেন যে এখন মানে পাকিস্তান কায়েমের পর থেকে তারা কোরবানি দেওয়া (গরু কোরবানি বা জবেহ দেওয়া) দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করা শুরু করেছেন।
    ঠিক এটাই আমার দুঃখ যে পাকিস্তান কায়েমের ফলে আমাদের প্রধান অর্জন হল জমিদারি উচ্ছেদ। যা না হলে, আমরা এখন গরীর প্রান্তিক ও সমাজের সবচেয়ে নিচু জাতের ( চরম জাতপ্রথা চিন্তায় দুষ্ট হিন্দুধর্মীয় সবচেয়ে নিচের জাত বলে চিহ্নিত যে মুসলমানের অবস্থান ছিল) এই অবস্থানে থাকা প্রজা মুসলমানেরা কোনদিনই এই সামাজিক অবস্থান থেকে মুক্তি পেত না – কোনদিনই নিজ চাষের জমির মালিক নিজেই হতে পারত না। যেই মুসলমান জনগোষ্ঠিই এখন সেই থেকে আপন উত্থান আমার মুক্তির দুয়ার খুলতে খুলতে আজ ৫০ বিলিয়নের ডলারের এক্সপোর্ট ব্যবসা সামলানোর মত ম্যানেজমেন্ট তারা দক্ষ হয়ে উঠেছে – আমাদের সেই মুসলমান চাষা জনগোষ্ঠিই। (কারণ মনে রাখতে হবে এই রপ্তানি মানে হল, যেদিন যতটার সময়ের মধ্যে মাল পৌছানোর কথা থাকবে তা ঘটাতে না পারলে ঐ সমস্ত মালামাল বিদেশি আমদানিকারক-গ্রহিতারা আর গ্রহণ করবেন না। তাই দক্ষতায় উতকর্ষ না হলে আপনি এই উতপাদন ব্যবস্থায় টিকতে পারবেন না। )   তাই এটা অকল্পনীয় উন্নতি, সুযোগ দিলে দাবিয়ে রাখা এই চাষা মুসলমান কত উপরে উঠতে পারে এর এক চমকপ্রদ উদাহরণ এটা। অথচ আমরাই মানে আমাদের একাংশ দাবী করছে পাকিস্তান কায়েমের ফলে আমাদের উন্নতি বা অগ্রগতির মাপকাঠি হল  কোরবানি দেওয়ার স্বাধীনতা অর্জন……!!!!!
    আর ওদিকে আমাদের এই চিন্তা-কৌশল ও নিজেকে উপস্থাপনের এই ব্যর্থতার দশা – এটাকে দেখিয়েই প্রথম আলো-রা দেখায় যে আমরা পশ্চাতপদ, আমরা জঙ্গী, ইসলামিস্ট! এসব আঙুল তুলবার সুযোগ নিয়ে প্রগতিবাদের নামে ভারতের আধ্যিপত্যের দালালেরা নিজেদের অপরাধ লুকিয়ে ফেলার সুযোগ নেয়, কত শত ৩৪জনও জুটে যায় তাদের পক্ষে বিবৃতি দেওয়ার জন্য!!!!!

    বলস [balls] – এই বল মানে মূলত খেলাধুলার বল। কিন্তু এই একই শব্দের একটা স্ল্যাং ব্যবহারও আছে। বহুবচনে ‘বলস’ বলা হয় তখন।  আমি প্রায়শই -মুরোদ- বলে একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকি।  কথাটা মুলত ক্ষমতা – মানে যেমন আপনার “ক্ষমতা” আছে  কিনা এটা বুঝাতে ব্যবহার করি। এই মুরোদ বা ক্ষমতা আছে কিনা তা বুঝাতেও স্ল্যাং শব্দ হিসাবে ‘বলস’ ব্যবহার দেখা যায়।   যেমন আপনার ‘বলস’ আছে? মানে আপনার মুরোদ আছে? অথবা ধরেন বলা হল, ‘বলস’ কাকে দিয়ে আসছেন? মানে হল, কার দালালি করতে, কার মুঠোর মধ্যে আপনার বলস দিয়ে এসেছেন বা আপনার সমস্ত ক্ষমতা আটকে রেখে আসছেন?

    তো ইদানিং ঢাকায় এমন আরেকটা কথার প্রচলন বাড়ছে। যেমন, আজকাল “র-এর হাতে বলস আটকে যাওয়া” লোকের সংখ্যা বাড়ছে বা বেশি দেখা যাচ্ছে। মানে শুধু র-এর প্রভাবের প্রথম-আলো বা ডেইলিস্টারের মত প্রতিষ্ঠানই না, এমন প্রভাবের ব্যক্তির সংখ্যা বা কথিত বুদ্ধিজীবির সংখ্যাও বাড়ছে। এরা এমনকি এটাও লিখছেন – “আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের পক্ষে নয়”। তাই দালালি করতে হবে, দালালিটা জায়েজ ইত্যাদি! অথচ অন্তত বিশ বছর আগে এরাই ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে জেএমবির সম্পর্ক করিয়ে দেয়াকে সেকালে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবীপনা গণ্য করেছিলেন।
    অর্থাৎ এদের এখন নিজের বলস র-এর হাতে আটকে পড়ার কারণে বা ছেড়ে দিয়ে আসার কারণে সবহারিয়ে এরাই এখন এসব বলে মানে করছেন যে – তখন বাস্তবতা নাকি “আমাদের  জেএমবির পক্ষে” ছিল, এখন নাই!!!!  তাই তিনি সব ধ্বংস করে নিজে ধ্বংস হয়ে এখন ইসকন-চিন্ময়-ভারতীয় আধিপত্যের পক্ষে নিজের বলস ভাড়া দিয়েছেন।

    সবচেয়ে মজার কথা হল, বলস আটকা পড়াদের এই লেখা দেখে অনেকে আবার এর মধ্যে বিরাট জ্ঞানের কথা আবিস্কার করেছেন। এটা নাকি  – তুলসি গ্যাবার্ড [Tulsi Gabbard] a Samoan American এর সঙ্গে সদ্ভাব করে আমাদের এখন বাঁচবার নাকি একমাত্র পথ বলে এসব নয়া মুরিদ অর্থ বের করেছেন। তাই চিন্ময়ের পায়ে ধরে মাফ চাইতে হবে – আর এটাই সঠিক লাইন – বলে দাবী করছেন। বলস আটকা পড়া বুদ্ধিবীচিদের পক্ষে সাফাই যোগাড় করে দিচ্ছেন। বুঝেন অবস্থা!

    কিন্তু তুলসি গ্যাবার্ড – এটা আবার কেঃ
    আসলে ‘র’ এখন – তাদের হাতে এসব বলস আটকানো লোকের মাধ্যমে আমাদেরকে জুজুর ভয় দেখাতে নেমে পড়েছে। আর এই ফাঁকে এসব পতিতরা ভারতীয় দালালিটা হালাল করে নিতে চাচ্ছেন।
    এদের কয়জন তুলসি গাবার্ডকে চিনেন কবে থেকে? কী জানেন তার সম্পর্কে?

    তুলসি আসলে আমেরিকার এক সাবেক নারী লেঃ কর্ণেল; মানে আমেরিকার দ্বীপ রাজ্য হাওয়াই এর মিলিটারিতে ছিলেন তিনি সেখান থেকে এই পদবী। পরে ২০১৮ সালে দুবছরের জন্য কংগ্রেস সদস্যও হয়েছিলেন।  এদের দাবী তুলসির মা সাদা চামড়ার হলেও তিনি নাকি হিন্দুত্ব নিয়েছেন। তবে তুলসি নন। কিন্তু তুলসির সাথে মোদির  ফলে আরএসএস ও ইসকন এর সাথে তিনি সম্পর্কিত।  সবচেয়ে মজার কথা হল যারা তুলসিকে নিয়ে আমাদেরকে ভয় দেখাচ্ছেন বা এই সুযোগে নিজেদের দালালি হালাল করতে চাচ্ছেন তারা কী জানেন তুলসি আমেরিকার কোন দলের সাথে সম্পর্কিত – ডেমোক্রাট নাকি রিপাবলিক?

    এবারের আমেরিকান নির্বাচনকালে সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের নির্বাচন-প্রচার কালে হঠাত তুলসি ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণায় প্রথম অংশ নিতে শুরু করেন। যার মানে হল, তুলসি আগে ডেমোক্রাট ছিলেন; মানে যতদিন ইসকনে ছিলেন তুখন তিনি আসলে ট্রাম্পের দলে না বরং বিপরীতে ডেমোক্রাট দলের লোক ছিলেন। এবং মোদির অর্থে প্রতিপালিত হতেন (এনিয়ে বিস্তারিত আমার পুরানা লেখা দেখতে পারেন, প্রিয়া সাহা- ইসকন ইস্যুতে)।
    কিন্তু এবার তিনি পুরানা দলসহ সবকিছু ছেড়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকে যোগ দিয়েছেন। আর ট্রাম্প তাকেই নিজের আগামি প্রশাসনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উপরে কো-অর্ডিনেটর প্রধান হিসাবে বসাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন যদি আমেরিকান দুই হাউজ এটা অনুমোদন করে।

    আর এটা শুনেই মোদি এন্ড গং আগেই প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছেন যে ট্রাম্প নাকি মোদির পক্ষে চলে গেছে? কিন্তু কীভাবে, এর কোন হদিস বা ব্যাখ্যা দিতে তারা রাজি না।  শুধু তাই নয়; এর মাধ্যমে ট্রাম্প নাকি একেবারে ইসকনকেই কোলে তুলে নিয়েছে। আসলে প্রপাগান্ডা গল্প বানাতে হয় কী করে তা যেন আমরা র-এর কাছ থেকে একটু শিখি, কানে কানে বলে মিথ্যা প্রচার কী জিনিষ তা যেন একটু শিখি জানি।

    তুলসি ডেমোক্রাট বা বাইডেনকে ছেড়েছিলেন ২০২০ সালে তিনি নিজেই প্রথম যখন সেবার ডেমোক্রাট প্রাইমারিতেই নিজেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করতে খায়েশ করেছিলেন, এর পরপরেই। স্বভাবতই এতে প্রথম ধাপই তিনি পার হতে পারেন নাই।  আর পরে বাইডেনের সাথে তাঁর মৌলিক বিরোধ বাধে যখন তিনি হঠাত যুদ্ধবিরোধী বলে নিজেকে হাজির করেন; ফলে বিশেষ করে ইউক্রেনের যুদ্ধ এর। এথেকে তিনি ডেমোক্রাট দলত্যাগ করে বসেছিলেন। আর ট্রাম্প তাকেই এবার নির্বাচনি প্রচারের শেষের দিকে তুলে নেন মূলত তুলসির যুদ্ধবিরোধি অবস্থান এটাকেই তিনি ব্যবহার করতে চান তাই। আমাদের মনে রাখতে হবে ট্রাম্পের নির্বাচনি নীতি হল – বিজয়ী হলে তার আমলে আমেরিকা কোন যুদ্ধে মেতে উঠবে না। মূলত এটা ট্রাম্পের রাষ্ট্রের ব্যয় সংকোচনের নীতি, তাই। তাই বেকার বসে থাকা তুলসিকে একাজে ব্যবহারের   ইচ্ছা থেকেই তুলসির আবার দৃশ্যপটে হাজির হওয়া। কিন্তু ট্রাম্পের বাকি সব নীতি কী প্রো-ইন্ডিয়ান?
    না বরং একেবারেই উলটা। আর তুলসি কী এখনও মোদি-ইসকনের সাথে যোগাযোগ রাখেন? জবাব হল দেখা যায় নাই, জানা যায় না।
    তার মানে মূলত ট্রাম্পের ভারত ইস্যুতে আসল অবস্থান কী দাড়ায় (ট্রাম্পের নীতির বেশির ভাগই ভারতের স্বার্থবিরোধি বলে প্রকাশিত) এর উপর সুযোগ হবে তুলসি ভারতের আদৌও কোন কাজে লাগে কিনা।  অথচ এখনই র-এর হাতে বলস ছেড়ে দেওয়া লোকেরা নিজেদের ভারতীয় দালালি হালাল করতে এখনই এরা তুলসি প্রপাগান্ডা হাজির করে দিয়েছে।

    এখন আসল কথায় আসি। ধরা যাক আগামিতে ট্রাম্প-তুলসি মিলেই ইসকনকে জাপ্টায় ধরলো। সেক্ষেত্রে বা সেজন্য কী আমরা আগেই এখন থেকেই ইসকন-চিন্ময়-ভারতীয় আধিপত্যের পায়ে চুম্মা দেয়া শুরু করবো?
    আর কেউ যদি বুদ্ধিবীচি না হন, তিনি কী আমাদেরকে এখনই পদচুম্বনে শরিক করাতে মাঠে নেমে যেতে পারেন? আহবান জানাতে পারেন?
    নাকি এসবের বিপরীতে আমাদের এখনই আমাদের স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী মেরুকরণে মাঠে নেমে যাওয়ার কৌশলের পথে চলে যেতে হবে? কোন যুক্তিতেই কী আমরা বাংলাদেশে আবার ১৬ বছরের ভারতীয় র-এর আধিপত্য ডেকে আনতে পারি? পারি না। আমেরিকা সহ সারা পশ্চিমও যদি আরেকবার তা চায় সেক্ষেত্রে আমাদের এর প্রাণপণ বিরোধিতার নেমে পড়া ছাড়া আর কী করার আছে????
    একমাত্র ভারতীয় দালাল ও যাদের বলস আটকে গেছে র-এর হাতে এমন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান তারাই কেবল তাদের নিজেদের দালালির পক্ষে সাফাই যোগাড়ের জন্য আমাদের বিরোধিতা করতে পারে…।

    সব শেষে  আজ বিএনপি-জামায়াত কী নিয়ে ব্যস্তঃ
    তারা ব্যস্ত যে সরকারী পিপি সাইফুল ইসলাম আলিফ কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে – সে কী বিএনপি নাকি জামায়েতের সমর্থক লোক? এই হল, তাদের গতকাল থেকেই ব্যস্ততার মূল ইস্যু। কারণ সাইফুলের বাডী লোহাগড়া জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরি এর কনস্টিটুয়েন্সি। একই দাবী বিএনপির। অর্থাৎ সব বিবেচনা এখন লোহাগড়ার কনষ্টিটুয়েন্সি কেন্দ্রিক – আগামি নির্বাচনি বক্তৃতায় কে কী বলবেন, তাই। এই হল তাদের ইস্যু। তাই দুপক্ষই দলিল দস্তাবেজ বের করে সাইফুলকে তাদের লোক প্রমাণ করতে। কাজেই সব কী সুন্দর তাই না?

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  সন্ধ্যা ০৬ঃ ১০   ২৭ নভেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ   সকাল ১১ঃ ৩০   ৩০ নভেম্বর ২০২৪

  • জামায়াতের উপর আনন্দবাজারি ইসলামিবিদ্বেষ

    জামায়াতের উপর আনন্দবাজারি ইসলামিবিদ্বেষ
    গৌতম দাস
    ২২ নভেম্বর ২০২৪ বিকাল ১৭ঃ ৫২
    https://wp.me/p1sCvy-5OI

     

     

     

    ১।  রাজনীতি আর চালাকি এক জিনিষ না। এক করে দেখলে খেসারত দিতেই হবে।
    ২। দাওয়া পার্টি (ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সংগঠন) আর রাজনৈতিক দল একেবারেই এক নয়।  তাতে আপনারা দাওয়া পার্টিওই থেকে যাবেন, রাজনৈতিক দল কখনই হতে পারবেন না।
    ৩। সবার আগে রাজনীতি বা পলিটিক্স ধারণাটার অর্থ তাতপর্য কী তা ভাল করে বুঝে নেন।  বিশেষ করে রাজনীতি বলতে কী কী না – তা স্পষ্ট করে বুঝে নেন।

    এমন তিনটা প্রশ্নের জবাব নিয়ে সব ইসলামি দলের আগে কিছু হোমওয়ার্ক করে নেয়া উচিত!

    জামায়াতের কেন্দ্রিয় সভাপতি ডাঃ শফিকুর রহমানের উপর কিছু একটা খারাপ প্রভাব ভর করেছে, মনে হচ্ছে।  নইলে তিনি কলকাতার ইসলামবিদ্বেষী পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হবেন কেন???
    কলকাতার  আনন্দবাজার পত্রিকা (যেটা ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া একটা বাক্য লিখতে পারে না এমন প্রবল হিন্দুত্ববাদী) সেই পত্রিকা ডাঃ শফিক সাহেবের সাক্ষাৎকার ছেপেছে।  সবচেয়ে বড় কথা তাদের করা প্রশ্ন এটা কোন সাংবাদিকতা বা জার্নালিজমের নীতিমালায় পরে না।

    যেমন প্রশ্নগুলো দেখেনঃ
    ১। জামায়াতে ইসলামীর ভারত-বিরোধিতা সর্বজনপরিচিত। কী বলবেন?

    ২। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীকে দেখা হয় কট্টর ইসলামি সংস্থা হিসাবে, অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্রে যে ‘ইসলামিক ব্রাদারহুড’ রয়েছে তার অংশ হিসাবে। নিজেদের সংগঠনকে কী ভাবে দেখেন?

    ৩। কিন্তু বিএনপি-র একটি অংশ আপনাদের কট্টরপন্থী মনোভাব নিয়ে অস্বস্তিতে। কী বলবেন?

    ৪। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় তাদের বিরুদ্ধে হিংসার প্রতিবাদে সরব। কী ভরসা দেবেন?

    ৫। শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আপনারা সরকারে এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?

    ৬। একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াত মিলিমিশে আওয়ামী লীগের পর এ বার বিএনপি-কেও সরিয়ে দিতে চাইছে। দুই বড় রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে নতুন শক্তির উত্থান হবে। কতটা ঠিক?

    অর্থাৎ আনন্দবাজার এটা আসলে কোন মিডিয়া না। এটা  নিজেই -“আরেকটা রাজনৈতিক সত্বা বা এনটিটি” – যার আবার বাংলাদেশ নিয়ে এক হিন্দুত্ববাদি অবস্থান আছে।
    আর জামায়াতের সভাপতিকে এখন সেই হিন্দুত্ববাদি আক্রমণ ভেদ করে নিজের কথা বলার জায়গা বের করতে হবে!!!

    প্রস্তুতিহীন জামায়াত সভাপতিঃ
    সবার আগে বলি, এবার ৫ আগষ্টের পরে জামায়াতের ভিতর এক স্ফুর্তি দেখা যাচ্ছে যেন দলের রাজনীতি ও অবস্থান কিছুই ঠিক না করে শুধু গলার জোরে বা চালাকি-পুর্ণ বাকচাতুরি দিয়ে সবার মন জয় করে ফেলবে। এমনকি যেন হিন্দুত্ববাদি মনের ভারতেরও!  অথচ সবার আগে নিজেদের কোন কোন অবস্থান-বক্তব্যগুলো দুর্বল তা কাটানো নিয়ে কোন হোমওয়ার্ক করেন নাই জামায়াত গত ১৬ বছর; যা  তাদের এখনকার কাজ-ততপরতায় ছাপ ফেলে চলেছে। কিন্তু কোন রিয়েলাইজেশন বা আত্ম-উপলব্দি নাই।

    যেমন ধরেন,  ৫ আগষ্টের পরে বিশেষ করে এবারের দুর্গাপুজা-কেন্দ্রিক মন্দির স্থাপনায় কমিউনিটি-পাহারায় জামায়াতের অংশ নেয়া – এপর্যন্ত ঠিক আছে। বরং ভারতীয় প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এটা বড় ইতিবাচক জবাব তো বটেই সাথে যাকে বলে ঠেসে চড় মারার মত জবাব, অবশ্যই!
    কিন্তু এর পরে কোথায় থামতে হবে তারা সে আক্কেল দেখাতে ব্যর্থ হলেন। তারা জামায়াতের হিন্দু শাখা খুলে বসতে গেলেন। সবচেয়ে মারাত্মক করলেন পুজা মন্ডপ পাহারায় গিয়ে জোশের ঠেলায় ওটা ইসলামের দাওয়া বা প্রচার ছড়ানোর জায়গা মনে করলেন সেটাকে। ‘ইসলামি সঙ্গিত’ পরিবেশন করে আসলেন। কী এক জটিল অবস্থা! ফলাফল বুঝতেই পারেন যা ক্রেডিট এতদিন জামায়াত কামিয়েছিল তা সব পানিতে গেল!

    আচ্ছা উপরে  আনন্দবাজারের অগ্নি রায়ের প্রশ্নগুলো দেখেন। এটা দেখার পরে এখন জামায়াতের নেতারা কী বুঝেছেন যে বাংলাদেশে তাদের পুজা বা হিন্দু সার্ভিস দেওয়ার কায়দা ও এর নতিজা কী? কোন ইতিবাচক প্রভাব কী আছে আনন্দবাজারিদের তাদের প্রশ্নের মধ্যে??? নাকি এটা আরো আক্রমাণাত্মক এক হিন্দুত্ববাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন সভাপতি ডাঃ শফিক??
    যার সোজা মানে হল, কোন কাজ কীভাবে করতে হবে, হিন্দুত্ববাদি মনকে ডিল করবেন কীভাবে? এর জন্য এক ভাল ও আগাম প্রস্তুতি লাগবেই! যতদিন তা রপ্ত না হয় ততদিন নিজেদের বিরত রাখেন, ওদের এড়ায়ে চলেন – এটাই একমাত্র পথ! ৫ আগষ্টের পরের জোশে, সব জয় করে ফেলতে পারবেন বলে বিনা প্রস্তুতিতে আগায় যাওয়া ঘটালে এর চেয়ে বড় আত্মহত্যা আর কী হতে পারে?

    আরেকটা দিক হল, জানায়াত নেতাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ধারণা। তা হল, তারা এখন ইন্ডিয়ান রাজনীতি মানে, মোদি সরকার, র-এর প্রতিনিধি, বা কোন হিন্দুত্ববাদি নেতা এমন যে কারো সাথে তারা এখন বোধহয় খুবই আপন হয়ে গেছেন!!!!!  এটা হতে পারে কোন র-এর লোকের সাথে কথা হয়েছে আপনাদের, তাদের মিঠা মিঠা কথা ছিল যেখানে ধরা যাক – আওয়ামি লীগের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না তুললে বা উচ্চবাচ্য না করলে – সদয় আচরণ প্রকাশ করলে বোধহয় তারা জামায়াতকে এখন থেকে অনেক আপন করে নিবে!!! সহাবস্থান তৈরি হবে? তাই কী??? কাজেই জামায়াতের এত উতফুল্ল খোশ-মেজাজের কারণ কী?

    সম্প্রতিকালে অর্থহীন ও কোন ব্যাখ্যা বিহীনভাবে জামায়াতের আওয়ামি লীগ ও ভারতের প্রতি উদারতা প্রকাশ বাংলাদেশের রাজনীতির পরিসরে ব্যাপক সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। তা তো জামায়াত নেতৃত্বের অগোচরে থাকার কথা নয়!  যে উদ্দেশ্য  আওয়ামি লীগ বা ভারত প্রীতি দেখানো – এতে ফলাফল কী একেবারে উলটা হয়ে যায় নাই, উলটা আসে নাই? লাভ দূরে থাক বদনাম আর গায়ে লাগা কালি কী তার চেয়ে বেশি হয় নাই?

    সর্বোপরি, কথিত এই সাক্ষাতকার কী প্রমাণ করে?
    এই হিন্দুত্ববাদি মিডিয়া জামায়াত দল ও এর সভাপতিকে নুন্যতম মর্যাদা দিয়ে কথা বলেছে? উত্তর হল যে, না।
    তাহলে এথেকে জামায়াত দল ও এর নেতারা কী শিক্ষা নিলেন বা নিবেন?
    হিন্দুত্ববাদি ভারতের কারও কথায় পটতে হয় না – তাতে তিনি  মিডিয়ার লোক কিংবা র-এর লোক যেই হন না কেন! তাই নয় কী? আর সবার উপরে নিজের সম্মান রক্ষা করতে হয় সবার আগে নিজেকে। কখনও অন্যের হাতে তা ছেড়ে দেয়া যায় না!

    জামায়াত ও বিএনপির জন্য কিছু শিক্ষা রেখে গেছেঃ
    সবচেয়ে বড় কথা বিএনপি ও জামায়াত কে মনে রাখা দরকার তাদের এই হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির সরকারের সাথে অবস্থান থেকে তাদের মিডিয়া ও তাদের আম জনতার অবস্থান এসব কিছু পক্ষে কখনই -বিএনপি ও জামায়াত – বিশেষ করে জামায়াতকে তাদের দরকার কারণ  তাদের সাফাই বা জাস্টিফিকেশন দরকার যে কেন তারা নিজেরা এমন উগ্র হিন্দুত্ববাদি একরোখা? অন্যভাবে বললে, তারা জানে তাদের হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির বিরুদ্ধে অজস্র মানুষ প্রশ্ন তুলে থাকে যার জবাব তাদের কাছে নাই। আর সেই ঘাটতি পূরণ  করতে তারা  -বিএনপি ও জামায়াত- কে বাঁকা ভাবে হাজির করবেই। যাতে এটা তাদের অসৎ কাজের সাফাই হয়ে হাজির হয়!!!
    কাজেই বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারা যারা ভাবছেন – ভারতের সমর্থন পিছনে নিয়ে (র-এর লোকেরা মিঠা আশ্বাস দিয়েছে )  বা পিছনে থাকলে তাদের আগামি নির্বাচনে বড় আসন নিয়ে সংসদে হাজির হওয়া প্রায় সমাগত – এই তো একটু দূরে – এমন তাদের সকলের জন্য আনন্দবাজারের এই কথিত সাকক্ষাতকার হল এক কঠিন শিক্ষা! যে গ্রহণ করবে, বুঝবে এটা তার জন্য শিক্ষণীয়; আর যে বুঝবে না তার জন্য এটা তেজপাতা!!!
    এরা মুখে যা আশ্বাসই দিক না কেন তারা ইসলামবিদ্বেষের জায়গা থেকে বিএনপি ও জামায়াত এর নেতাদের সুযোগ পেলে অপমান করবেই!
    অন্তত জামায়াত নেতাদের এতে কী কোন আক্কেল হবে???

    ভারতীয় মিডিয়াকে মোকাবিলা করতে কিছু পরামর্শঃ
    প্রথম প্রশ্নটার ক্ষেত্রেই দেখা যাক।

    এর জবাবে বলা যেতে পারত যেমন, আমরা ভারত-বিরোধিতা না বরং আমরা বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যের খায়েসের বিরোধিতা করি –
    এতে ওদের তোলা বয়ানকে ফুটো করে  তা ফিরে ওদেরই মুখে মারা হতে পারত!
    সাথে আরেকটা বলা যেত যে ব্যাপারটা – সর্বজনপরিচিত যদি হয়েই গিয়ে থাকে তাহলে আর প্রশ্ন করতে এসেছেন কেন?

    পরের প্রশ্নঃ জামায়াত কে নিয়ে এই প্রশ্ন প্রায়ই আমাদের দেশেও প্রগতিবাদই=হিন্দুত্ববাদিদের থেকে  উঠতে দেখা যায় যা খুবই বিরক্তিকর। প্রশ্নটা হল যেমন – “জামায়াতে ইসলামীকে দেখা হয় কট্টর ইসলামি সংস্থা” বা জামায়াত একক কট্টর সংগঠন বা অনেক বলে এক জঙ্গি সংগঠন!

    এর জবাব হতে পারত যা তা নিয়ে কথা।  আসলে জামায়াত কখনও এসব ফালতু অভিযোগ কে চ্যলেঞ্জ করে নাই বা করতে পারে নাই।  অথচ জামায়াতের উচিত সোজা পালটা চ্যালেঞ্জ করা। দেখাতে বলা যে কোন ঘটনার কারণে কট্টর, জঙ্গী বা এজাতীয় বিশেষনের প্রমাণ কী? বা  এটা বলতে কী বুঝাতে চাইছেন? জামায়াত কী কোন সশস্ত্র সংগঠন? কেন এসব বিশেষণ ব্যবহার করা হুচ্ছে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচারে যা পারমিশেবল (মানে চলে বা গ্রহণযোগ্য) যেমন ককটেল, লাঠি, ইট ইত্যাদি বড়জোর কখনও দেশি পিস্তল  বিশেষ করে তা ছাত্র সংগঠন পর্যায়ে লীগ, বিএনপি, জাসদ ইত্যাদি সকলেই করে থাকে। জামায়াতও এসবের বাইরে না। কিন্তু গত ১৬ বছরের ছাত্রলীগ যেভাবে পেটোয়া বাহিনী, হেলমেট লীগ, বা পুলিশের  হাত ধরে পাশাপাশি অস্ত্র হাতে বিরোধিদলের মিছিলে আক্রমণ, খুন করে ফেলা ইত্যাদি করে গেছে – আর যারা এসবের দিকে নজর করে নাই এরা সকলেই হিন্দুত্ববাদি…! মিলিয়ে দেখেন।  এরকম পালটা জবাবে রুখে দাঁড়ানো যেত!
    সোজাকথা, আমাদের গড়ে উঠা নিজের রাজনীতির কালচার অনুযায়ী লীগ, বিএনপি, জাসদ ইত্যাদি যা করে জামায়াত কখনই এর বাইরে নয়; বাইরে যায় নাই। কাজেই এসব কট্টর বা জঙ্গী শব্দের ব্যবহার কেন? বরং এসব প্রশ্নের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ করা যায় যে আপনি কী উতরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগীর কট্টরতা (মুসলমান হলেই তাঁর বাড়িঘর বুলডোজ করায় চ্যাম্পিয়ান) ও নৃশংসতার সাথে তুলনা করে কথা বলছেন?
    যেমন আমাদের এক নারী উপদেষ্টা একইভাবে – বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রসঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যে না তেমন কিছু না। অন্তত ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার সাথে যে তান্ডব ঘটেছিল এর তুলনায় কিছুই হয় নাই বাংলাদেশে!

    তিন নম্বর প্রশ্নটা দেখেন। বলছে, – বিএনপি-র একটি অংশ আপনাদের কট্টরপন্থী মনোভাব নিয়ে অস্বস্তিতে আছে – এরপালটা জবাবে বলা যেত যেমন, আপনি কী বিএনপির সাথে আমাদের ঝগড়া লাগিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন? কিন্তু সেটা কী আপনার কাজ? আপনার এসব হাইপথিটিক্যাল (কল্পনা করে নেয়া প্রশ্ন) প্রশ্ন আনবেন না প্লিজ! সরি আপনার প্রশ্ন ঠিক নাই। এই বলে এই প্রশ্নের আর কোন কথা বলতেন না, এমন করা যেত!

    চতুর্থ প্রশ্নঃ ……অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় তাদের বিরুদ্ধে হিংসার প্রতিবাদে সরব। কী ভরসা দেবেন?
    জবাবে বলা যেতঃ আপনার প্রশ্নটাই কী বলছে না যে এটা আপনাদের উস্কানি! না হলে, “অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকেই” – এভাবে বলছেন কেন? আমাদের বর্তমান অন্তর্বর্তি সরকার বহুবার বলেছে এটা বাড়িয়ে বলা ভারতের প্রপাগান্ডা। এনিয়ে অন্তত আপনাদের প্রিয় বিবিসি বাংলার রিপোর্ট টা দেখে নিয়েন! তারা কেন এটাকে প্রপাগান্দা বলেছে দেখে নিতে পারেন!

    পঞ্চম প্রশ্নঃ শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আপনারা সরকারে এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?
    এখানে বলা যেত, এর মানে তাহলে,  হাসিনার ১৬ বছরের ফ্যাসিজম ও এই গুম-খুনের শাসনের পিছনে ও সহায়তায় যে ভারত ছিল তা স্বীকার করে নিচ্ছেন? তবে আপনার প্রশ্নের জবাব হল, এটা ভারতের উপরই নির্ভর করে। ভারত যদি আবার হাসিনা মত ঘনিষ্ট কাউকে তার পেতেই হবে বলে খুঁজে এর দায়ভার ও পরিণতি ভারতকেই নিতে হবে! তাই না?

    ষষ্ঠ প্রশ্নঃ
    একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াত মিলিমিশে আওয়ামী লীগের পর এ বার বিএনপি-কেও সরিয়ে দিতে চাইছে। দুই বড় রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে নতুন শক্তির উত্থান হবে। কতটা ঠিক?
    এর জবাব হতে পারত এভাবে –  এটা আপনার  সীমা ছাড়ানি এক কল্পিত বা হাইপথিটিক্যাল প্রশ্ন ? আপনি নিজেই তো এখনও নিশ্চিত হন নাই যে আপনার কথা-অনুমান সঠিক কিনা। তাই না? তো আগে সিওর হয়ে নেন এর পরে না এই প্রশ্ন করবেন?

    সারকথায়, জামায়াতের প্রতি আনন্দবাজারি এই ঘৃণ্য আচরণ থেকে বিএনপিও চাইলে শিক্ষা নিতে পারে। যারাই ভারতের মোদির সাথে ঘনিষ্ট হতে যাবে, সবকিছুকে খুব সহজ মনে করবে তাদের সবার জন্য এই একই ফলাফল অপেক্ষা করছে!  ভারতকে ডমিনেট বা আধিপত্য করতে দেয়া, বাংলাদেশের বাপ-মা হয়ে উঠতে চাওয়া – এটা নিয়ে যে কেউ নিশ্চিত থাকতে পারে যে যা দেখছেন এটাই এর পরিণতি হবে। আর এটাকেই তো আমরা নাম দিয়েছে ইন্ডিয়ান হেজিমনি বা ভারতীয় আধিপত্য!!!
    এমনকি হাসিনাও  – “ভারতকে আমি যা কিছু দিয়েছি ……” ডায়লগটা স্মরণ করতে পারেন, যদি না ইতোমধ্যেই অন্ধ না হয়ে গিয়ে থাকেন! আর বাংলাদেশের পাবলিক!!!
    ইতোমধ্যেই জনপরিসরে আপনাদের ইজ্জতের কী হয়েছে তা সাহস করে একটু খবর নিতে পারেন। যা সামনে আপনাদেরকে আরো ছিন্নভিন্ন করে দিবে!!!  চুড়ান্ত গণবিচ্ছিন্ন হবেন আপনারা!! – যদি চান, চাইতেই থাকেন!!!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৪০   ২২ নভেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ      ২০২৪

  • বক্তব্য সংশোধনী দিয়ে রিজভীর বিবৃতি

    বক্তব্য সংশোধনী দিয়ে রিজভীর বিবৃতি
    গৌতম দাস
    ১২ নভেম্বর ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5NF

    বক্তব্য সংশোধনী দিয়ে রিজভীর বিবৃতি | কালবেলা

     

    “বক্তব্য সংশোধনী দিয়ে রিজভীর বিবৃতি” –

    অল্পের উপর দিয়ে গেছে; একটু ইজ্জত গেছে কেবল এই আর কী!
    আর দেরি করলে এর সবটাই যেতো; এ’এক বিরাট শিক্ষা!
    কিন্তু বিএনপি বা তারেক রহমান কী একে শিক্ষা হিসাবে নিবেন??
    এটাই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন!
    যদি শিক্ষা না নেন তবে এটাই হবে তাদের দলের জন্য আত্মহত্যা বা জাপানি ভাষায় হারিকিরি!!! নিজেই নিজের দলটাকে খুন করে ফেলা!
    বিএনপির ছোট-বড়-টপ সব নেতাদেরকে দুইটা কথা বুঝতে হবে।
    এক. রাজনীতি আর চালাকি এক জিনিষ না। তাই রাজনীতি করা শিখেন, বুঝেন ও পড়াশুনা করেন। চালাকি আর রাজনীতি মাখায় ফেলতে যাইয়েন না। দয়া করে!!
    হাসিনা যেমন তাঁর চরিত্রের প্রতিহিংসাকেই নিজ রাজনীতি বলে চালাতে গিয়েছিলেন – সেই একই ভুল কইরেন না!
    ইতিবাচক হন; নিজ জনগোষ্ঠির জন্য একটা রাষ্ট্রের জন্য – গঠন [constitute], সংগঠিত [organize] করা; একটা স্থিতিশীল কিছু করতে সব প্রচেষ্টা নিবব্ধ রাখেন। স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে চালাকির আশ্রয় নিয়ে কিংবা আওয়ামি ভোটার (আওয়ামি দল বা অঙ্গসংগঠন এর ভোট না) দের ১৫-২০% ভোট পেয়ে যাবার লোভে হাসিনার ফ্যাসিজমের দায় নিজের কাঁধে নিতে যাবেন না। ভারতীয়দের পকেটে একটা হাত ঢুকিয়ে রাখা বুদ্ধিমান হতে যাবেন না। সেটা এখন থেকে বাংলাদেশের যেকোন দলের জন্য হয়ে গেছে এক আত্মঘাতি দায় – এই কথাটা মনে রাখবেন দয়া করে!!!
    আর দুইঃ
    সবসময় মনে রাখবেন; আগামি দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডমিনেটিং যে আইডিয়া বা “রুলিং আইডিয়া” হয়ে বিরাজ করবে সেটা হল, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধিতা বা এন্টি ইন্ডিয়ান-হেজিমনি। ফলে যারাই বা যে দলই এটা আপহোল্ড করবে না – নিজের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট বলে আঁকড়ে ধরতে দ্বিধা দেখাবে তারা এমন সকলেই ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়বেই! জুলাই-আগষ্ট এর আন্দোলন এভাবেই নিজেই নিজের মৌলিক পরিচয়-বৈশিষ্টে হাজির হতে যাচ্ছে।
    কাজেই বেঈমানি করবেন তো একেবারে কাটা পরে যাবেন! এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের নিজের………
    বক্তব্য সংশোধনী দিয়ে রিজভীর বিবৃতি | কালবেলা

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  সকাল নভেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ      ২০২৪

  • ট্রাম্পের বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য এক সংক্ষিপ্ত নোট

    ট্রাম্পের বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য এক সংক্ষিপ্ত নোট
    গৌতম দাস
    ০৬ নভেম্বর ২০২৪     সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৫
    https://wp.me/p1sCvy-5Nm

     


    2024 U.S. Presidential Election ট্রাম্পের বিজয় 

     

     

    ট্রাম্পের বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য এক সংক্ষিপ্ত নোটঃ
    ‘হাসিনা এন্ড গং’ বাদে বাংলাদেশের প্রায় সকলের ভয়/আশঙ্কা হল, আমেরিকান নির্বাচনের ফলাফল থেকে না এই হাসিনা-গোষ্ঠি কোন সুবিধা পেয়ে যায়। তাতে আবার কেউ কেউ বলত ট্রাম্প জিতলে হাসিনা সুবিধা পাবে আবার সংখ্যায় কম হলেও কেউ কেউ বলত কমলা জিতলে সেটা হবে!
    এখন পর্যন্ত, অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে ট্রাম্পকে পরিস্কার বিজয়ী (২৭৯ ইলেক্ট্ররাল ভোটে) দেখা যাচ্ছে।

    আমার অবস্থান হিসাবে অনেক আগে থেকেই আমি বলেছিলাম, ট্রাম্পই জিতবে – ‘আমেরিকান মন’ আমি যতটুকু বুঝি। মুল কারণ, কে বেশি মিডিয়ার সরব – ট্রাম্পের পক্ষ না কমলার? এই প্রশ্নে সবসময় ডেমোক্রাটেরা (কমলা) এগিয়ে থাকে। আসলে এদের আওয়াজ পাবলিকলি ও মিডিয়ায় বেশী উচ্চারিত হয় বলে এমন মনে হয়। তুলনায় রিপাবলিকান ট্রাম্পের আম ভোটার-সমর্থকেরা হল, ‘কোর এথনিক হোয়াইট ওয়ার্কিং ক্লাস’, যাদের আওয়াজ মিডিয়ায় কম আসে।  আর তা দেখেই মিডিয়া অনুমানে কমলা জিততেছে অনুমানের জন্ম হয়ে থাকে!! এনি-ওয়ে সেসব এখন অতীত; মূলকথা এখন  ট্রাম্প বিজয়ী!
    গ্লোবাল পরিসরে তাকিয়ে কিছু কথা বললে, মোটা দাগে সবার উপরে ট্রাম্প এবারও আগেরবারের মতই কট্টর ‘জাতিবাদি’ হবেন। এই যে – এথনিক সাদাচামড়ার শ্রেষ্ঠত্বের – সুরসুরি তোলা ‘জাতিবাদি’ নীতি – এতা আগেরবার কার্যত অকেজো থাকলেও এবারও সেটাই তিনি সবার উপরে ছেয়ে রাখবেন; সে ধারণা তিনি দিয়ে রেখেছেন।
    এখন বাংলাদেশিদের আশঙ্কা / চিন্তা যেখানে সেটা হল বাংলাদেশে সরকারের উপর ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিঃ  এটা কী হাসিনা-গোষ্ঠি অভিমুখি হবে??? এই হল মুখ্য প্রশ্ন!

    আসলে ঠিক এটাও মুখ্য প্রশ্ন না। আমরা যা বুঝতে চাচ্ছি তাতে মুখ্য প্রশ্ন হল, ভারত-আমেরিকা কী আগের মতই বাংলাদেশ প্রশ্নে ‘একসাথে’ ও ‘এক নীতিতে’ এবং ‘ভারতের চোখ দিয়ে দেখে’ কাজ করবে?  এর মানে, আমাদের উদ্বিগ্নতা আসলে ট্রাম্পের আমেরিকা বাংলাদেশ প্রশ্নে কতটা ভারতের ঘনিষ্ট থাকবে???

    এককথায় এর জবাব, বাংলাদেশ প্রশ্নে ট্রাম্পের আমেরিকা ও ভারত আর একসাথে কাজ করতে পারবে না। করবে না, সম্ভব নয়!

    মৌলিক কারণগুলোঃ
    ১। ইতোমধ্যেই গত সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ভারত-আমেরিকা পরস্পর থেকে ২০০৭ সালের আগের মতই – দূরে চলে গেছে।
    ২। এছাড়া, ভারতের প্রায়োরিটি বা প্রধান স্বার্থই বদলে গেছে। চীনবিরোধী হয়ে আমেরিকার সঙ্গে খাতির থেকে (বাংলাদেশের উপর দখল-মাতব্বরিসহ) ভারতের যা কিছু এতদিনের “প্রাপ্তি” ঘটেছে এর চেয়ে – আমেরিকার সে হাত ও ঘনিষ্ঠতা ছেড়ে দিয়ে ভারত বরং চীনের (সাথে রাশিয়া বা ব্রিকস ক্যাম্পে থাকলে) ঘনিষ্ট হলে নয়া যেসব প্রাপ্তি তা ভারতের জন্য এখন বেশী কাম্য ও লোভনীয়। যেমন, চীনা ঋণ ভারতকে এখন পেতেই হবে যা এতদিন দূরে থাকার কারণে সে লস করেছে।
    ৩। এনিয়ে চীন-ভারত হাত ধরাধরি করে এখন অনেক ঘনিষ্ঠ ও অনেক দূর চলে গিয়েছে এবং এক লম্বা-দুরি পথ তারা যাবে বলে ঠিক করে ফেলেছে। মানে সহসাই এই পথ থেকে আর সরবে বা ফিরবে না।
    ৪। অনাষ্ঠুনিকভাবে ট্রাম্প বিজয়ী হতে না হতেই আজকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ছোট ভিডিও ক্লিপ দেখে নেন। সেখানে জয়শঙ্কর জানিয়েছেন তিনি মনে করেন (সারকথায়) আমেরিকা এখন থেকে আইসোলেশন [isolation] মানে, বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হয়ে চলতে যাচ্ছে – এমন নীতির ফাঁদে আমেরিকা পড়ে গেছে।

    অতএব যারা অজানা আশঙ্কায় ভয় পাচ্ছেন অথবা হাসিনা গোষ্ঠি যারা নিজেদের দিকে আশার আলো খুঁজছেন – এমন উভয় পক্ষের ভাগে কিছু জুটছে না তা বুঝা যাচ্ছে। ট্রাম্পের বিজয়ে আম-বাংলাদেশিদের আশঙ্কার কোন কারণ নাই। আবার হাসিনা-গোষ্টিদের আগামি জীবন হতাশাতেই পরিপুর্ণ থাকতেছে – সে ইঙ্গিত একেবারে পুষ্ট ও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

    আর সবার উপরে ইউনুস সাহেবের যে ব্যক্তি পরিচিতি আমেরিকায় মানে তাদের – কোর থিঙ্কট্যাঙ্ক ও অন্যান্য ইন্টেলেক্ট ও একাদেমিক বা পলিটিক্যাল কর্তাদের – মধ্যে আছে তারাই বরং ট্রাম্প প্রশাসনকে গাইড করবে এই বলে যে এতদিন বাংলাদেশে আমেরিকান নীতির যে বেইজ্জতি ও দেউলিয়া  হয়ে থাকা দশা ছিল সেটা থেকে তাদেরকে উদ্ধারের জন্য বরকত হিসাবে এসেছেন ইউনুস! কাজেই তাঁকে বরণ করে আগলে রাখেন, এই হবে সম্ভাব্য নীতি! মোটা দাগে এই হয়ে পারে ট্রাম্পের হবু নীতি এবং এরচেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হল, আমেরিকান এই অবস্থানটা হবে বাই-পার্টিজান – মানে আমেরিকার প্রধান দুই দলই এটা সাপোর্ট করবে!!!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  সকাল ১১ঃ ০০  ০৭ নভেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ      ২০২৪

     

  • ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে

    মোদি হেরেছেন আগামিতে কী?
    এর অর্থ, তাতপর্য ও মূল্যায়ন” –

     

    ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে
    গৌতম দাস
    ০৫ জুন ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5Fv

    নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী

     

    প্রথম আলোসহ অনেক মিডিয়ায় আজ ভোরবেলায় দেয়া রিপোর্টের শিরোনাম –   ৫৪২ আসনের চূড়ান্ত ফল: বিজেপি ২৪০, কংগ্রেস ৯৯ আসন। এটা অবশ্য একা প্রথম আলো না, এমনকি সারা ভারতের ইংলিশ পত্রিকাগুলোরও প্রায় কমন শিরোনাম এটাই!
    কিন্তু এই ফলাফলের এমন উপস্থাপন আমাদের দেশে এতে অর্থ খোলসা হবে না। বলা যায় কিছুই বুঝা যাবে না। কিন্তু যদি একই তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে করা বা দেয়া অন্য শিরোনামটা হয় এমন যে – “বিজেপি একা সরকার গড়তে পারছে না – আবার কংগ্রেসও গড়ে ফেলতে পারার দাবিদারও” – তাতেও এই নয়া শিরোনামও সঠিকই থাকে মানে, একই তথ্য-সম্মত রিপোর্টের শিরোনামই  থাকে।  আর সেক্ষেত্রে আমাদের লাভালাভ হত এই যে আমরা ভারতের এবারের নির্বাচনী ফলাফলের অর্থ-তাতপর্য সহজেই ধরতে পারতাম!  কারণ এমন নয়া শিরোনাম শুনলে বাংলাদেশীরা সবাই নড়েচড়ে বসবেন।  হ্যা, কথা একেবারে সত্য! এতটুকু বাড়িয়ে বলা হয় নাই;  আর এতে কোন যদি-কিন্তুও নাই।

    এবার একটু খুলে বলা যাক, তবে স্বল্প কথায় বললে, ভারতে সরকার গড়তে কোন দলকে ২৭৩+ আসনে বিজয়ী হতেই হয়। আর বিজেপি এবার পেয়েছে ২৪০ আসন। অর্থাৎ মোদির বিজেপি তাই এবার  ৩২-৩৫ আসনের ঘাটতিতে আছে। একথার অর্থ হল বিজেপি কোনভাবেই একা সরকার গড়তে পারছে না। এই অর্থে বিজেপি এবারের ফলাফল হল, বিজেপি হেরে গিয়েছে।  সেজন্যই  গতকাল সকাল দশটার পর থেকেই বিজেপির সুর বদলে ফেলেছে। মোদি আর নিজ দলের সকলেই বিজেপির নাম মুখে নেয়া বন্ধ করেছে; এর বদলে তারা তাদের রাজনৈতিক জোট এনডিএ [NDA, National Democratic Alliance] এই নাম বলা শুরু করেছে। যেমন দাবি করছে, এনডিএ (বিজেপি নয়) আবার ক্ষমতায় আসতেছে। আসলে বিজেপি যে একা আর সরকার গড়তে পারছে না সেটা মোদির অজানা ছিল না। কিন্তু আগের মতই হামবড়া “ভাব” বজায় রাখতে না পারলেও কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে এই “সুক্ষ্ম কারচুপি” বা কথার ফাঁকি তৈরি করেছে যে বিজেপি নয়, এনডিএ আবার ক্ষমতা আসতেছে!

    বিজেপি এখন নিজের নাম ভুলে কেবল এনডিএ এনডিএ করছে, কেনঃ
    আসলে এতদিন মানে পিছনের দুবারই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজেপিই সরকার গঠন করে থেকেছে। তাই বিজেপি যা চায় তাই জোটের বাকি সকলকে মেনে চলতে হয়েছে। এতে আবার, এতদিন এনডিএ আছে ঠিকই কিন্তু তেমন উচ্চারিতই নয়, এমন দশা হয়েছিল !  এছাড়া সবচেয়ে বড়কথাটা হল বিজেপির সবসময় যে  প্রধান নীতি মেনে চলেছে তা হল অন্যের দল ভাঙ্গিয়ে প্রার্থীকে নিজদলের প্রার্থী করা; আর তা করে গেছে অর্থ বা যেকোন “অবৈধ সুবিধার” লোভ দেখিয়ে। তাতে সেটা এনডিএ জোটের ভিতরের কেউ হতে পারে আবার বাইরেরও! কোন পরোয়া করে নাই। আর মোদির এসব কাজের অর্থের যোগান? সেটাও কোন অসুবিধাই নয়; কারণ, দলের ফান্ডের ভান্ডার আদানি বা আম্বানিরা তো আছেই! এরই পরিণতি হচ্ছে এনডিএ জোটের প্রায় সকল দলই (যাদের এবার মোট আসন হল ৫২) বিজেপি বা তাদের নিজ এনডিএ জোটের প্রতি আনুগত্যহীন! এতে সারকথাটা দাড়িয়েছে এই যে – না মোদি না তাঁর এনডিএ জোটের কেউ – কারোরই কোন স্থির কমিটমেন্টে আর কেউ নাই। সব পক্ষই যখন তখন অন্য জায়গায় সুবিধা দেখলেই এনডিএ জোট ভেঙ্গে ত্যাগ করে চলে যায় অথবা সময়ে জোটে ফিরে আসে  – এটাই এতদিনের কমন প্রাকটিস!  গতকাল সন্ধ্যা থেকেই তাই মোদির প্রধান দুর্দশাটা হল – বিজেপি এই নাম ভুলে গিয়ে এই জায়গায় এনডিএ জোটের নাম বসিয়ে উচ্চারণ।  এছাড়াও আরও সিরিয়াস দিক মানে, মোদির গত দশবছরের ইজ্জত ধুলায় মিটানোর মত দুর্দশা হল যে মোদিকে এখন থেকে দুই এন বা N  দিয়ে যাদের নাম নাইডু আর নীতিশ – এদের মন যুগিয়ে চলতে হবে, পা-ধরতে হবে।

    আজ ভোর থেকেই নিশ্চিত হওয়া এই কঠিন বাস্তবতা হল, মোদিকে এখন নিশ্চিতভাবেই এই ৫২ জনের হাত-পা চাটতে হবেই। আর তিনি তা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন! যেমন এই ৫২ জনের মধ্যে বড় আসন ওয়ালা দুই এনডিএ জোট সঙ্গী দল হল – টিডিএ [তেলেগু দেশম পার্টি TDP] যেটা অন্ধ্রপ্রদেশ (হায়দ্রাবাদ) রাজ্যের দল; আর এরই মূল নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু [Nara Chandrababu Naidu ]। আর আরেকজন হলেন বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার; দেখুন “এবার খেলা দেখাবেন নীতীশ কুমার, কার্ড তো তাঁর হাতেই, তাকিয়ে গোটা দেশ”। সবচেয়ে মজার কথা হল, কংগ্রেসসহ অন্যান্য মোদিবিরোধী দলের বর্তমান জোট ইন্ডিয়া [I.N.D.I.A] এর জন্ম বলা হচ্ছে মাত্র ১১ মাস আগে (July 2023)। আর এই জোট গঠনের উদ্গাতা ও প্রথম উদ্যোগীদের একজন হলেন কিন্তু এই নীতিশ কুমার; যিনি পরে আর এই জোটে আর থাকেন নাই কারণ, তিনি এসেছিলেন মোদির এনডিএ জোট ভেঙ্গে আর মোদি আবার তাকে বড় কোন “সুবিধার” বিনিময়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।  এককথায় গত দশবছরের মোদি জমানায় তিনি সমসময় মোদির পক্ষে, আর না-হয় মোদিবিরোধী  এদুই জোটের কোন একটার সাথে বারবার বদলাবদলিতে থেকেছেন।

    যদিও নীতিশের তুলনায় নাইডু – তিনি অনেক স্থির। বেশির ভাগ সময় তিনি কংগ্রেস ও তার বন্ধুদলের সাথে জোটের সঙ্গি থেকেছেন; কেবল এবারই সম্ভবত তিনি মোদির কোলে। তিনিই ইন্ডিয়ার আইটি খাতে যা সুনাম এর জনক! এককথায় গ্লোবাল আইটি খাতে একদিকে আমেরিকান গবেষণায় বুদ্ধি-পরিকল্পনা-ডিজাইন ইত্যাদি সবই তাদের আর অন্যদিকে তাতে ভারতের সস্তা কিছুটা এডুকেটেড শ্রমের অংশটা মাথা হল চন্দ্রবাবুর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ রাজ্য। তাই ভারতের গৌরবজনক টেক সিটি [Tech city] বলতে এই হায়দ্রাবাদ।
    ওদিকে অন্ধ্রে কেন্দ্রের নির্বাচনের দিনই রাজ্য সরকারেরও নির্বাচন হয়ে যায় একই সাথে প্যারালাল, এমন চারটা রাজ্যের একটা সে। গতকাল পাঁচ বছর পরে নাইডু আবার রাজ্য নির্বাচনে (বিজেপির সাথে করা জোটে) বিপুল ভোটে ফিরেছেন। আর এদিকের হিসাবে, এবার নীতিশ-নাইডু মিলিয়ে তাদের মোট আসন প্রায় ২৮; নীতিশ ১২ আসন আর নাইডু ১৬ আসন। ফলে বুঝতেই পারছেন বর্তমানে এনডিএ জোটে থাকা  নীতিশ-নাইডু মোদির কাছে কত গুরুত্বপুর্ণ। যেমন নাইডুর বিজয়ে ইতোমধ্যেই নাইডুকে মোদি তোয়াজ করতে চলেছেন; বিজয়ে ফোন করেছেন। আগামি নয় জুন নাইডু নয়া মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিবেন আর তাতে উপস্থিত থাকবেন সম্ভবত মোদি স্বয়ং! দেখেন,  অন্ধ্র প্রদেশের বিধানসভায় শপথ নেবে, তখন সেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং!  এর পরিকল্পনা চলছে।

    কিন্তু মোদির দিক থেকে দেখলে ভয়ঙ্কর কথাটা হল, বিজেপি জোটের নীতীশ-নাইডুর সঙ্গে যোগাযোগ করছে কংগ্রেস। খবরটা হিন্দুস্তান টাইমসের আমি নিজেই গতকাল রানিং এনডিটিভিসহ স্থানীয় হিন্দি চ্যানেলে দেখেছিলাম; তখন নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের প্রেস ব্রিফিংয়ের পরে এই সংবাদ জেনেছিলাম। আর আজকে সব মিডিয়া লিখছে সব ছোট বড় দল এখন দিল্লিমুখি – মানে ধরাধরি পায়ে পরার কেনা বেচা এখন তুঙ্গে চলবে। আমাদের টিডিএস পত্রিকা সেগুলারই একটা সাম-আপ ছেপেছে – “মোদির ‘প্লেন’ ছেড়ে বিরোধী ‘প্লেনে’ নিতিশ? মাঝ-আকাশে জল্পনা তুঙ্গে!” । মানে হল নীতিশ কুমারকে নিয়ে টানা হেচড়া দরাদরি সম্ভবত চরমে উঠেছে।

    এসবের অর্থ কী?
    অর্থ খুব সোজা। মোদি একা (মানে কেবল বিজেপি) সরকার গড়ার দাবিদার নন; কারণ তাদের মোট আসন ২৪০ মাত্র, এটাই সব কিছু স্বাক্ষ্য! আর দ্বিতীয় কথা, আরো যে ৩২-৩৫ আসন মোদিকে যোগাড় করতেই হবে (যার মধ্যে নাইডু-নীতিশ মিলে ২৮ আসন থাকবে তা ধরে নেয়া আছে); আর এছাড়াও ৭-১০ জন আরো এমপি লাগবে; সাথে স্টান্ড-বাই আরো কিছু এমপি লাগবে। মজার কথা হল, এতে সব খুচরা আসন পাওয়া দলই এখন অনেক দাম হাকাবে। সবচেয়ে বড় কথা অলক্ষ্যে কংগ্রেসের ইন্ডিয়া জোটও যদি এতে মোদির চেয়ে বেশী সংখ্যায় এমপি যোগাড় করতে পারে তবে মোদিও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বাদ যাবেন। তাঁর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ খতম! যদিও ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী হবার প্রথম সুযোগ ও আহবান মোদিই পাবেন; কারণ তার দলের অবস্থান ২৪০ এমপি।
    এমনকি আগামি দশদিনের মধ্যে যদি মোদি আপাতত এমপি যোগাড়ে সফলও হয়ে যান তবুও পরের দুমাসের মধ্যে আবার ক্রাইসিস দেখা দেওয়া – সেটাও অসম্ভব নয়। মোদির যোগাড় করা এমপিগুলো আগামি দিনগুলোতে নিজেই ভেগে যাবে বা কংগ্রেস ভাগায়ে নিয়ে যাবে – এমন শঙ্কার মধ্যেই কাটবে! এককথায় নিয়মিত এক ভাঙ্গাগড়ার ভিতর দিয়ে দুর্বলভাবে খাড়া করা কোন সরকারই বারবার গঠন হতে থাকবে!  এজন্য শিরোনামে বলেছি কংগ্রেসও দাবিদার হয়েই থাকবে। এনিয়ে আরো একটু বিস্তারে যাব পরবর্তিতে এলেখার শেষের দিকে।

    তাহলে আগামিতে ভারতে কী হতে যাচ্ছেঃ এক.
    আপাতত পয়েন্ট দুইটা।
    ১। ভারতের মোদির হিন্দুত্ববাদ এখানেই আটকে গেল; আরও আগানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। ভারত হিন্দুত্ববাদ মুক্ত হতে থাকবে এখন থেকে; অন্তত উচ্চারিত হবে না আর! এটাকে বলা যায় হিন্দুত্ববাদের দিন শেষ; এর শুরু হল এখন থেকে!
    ২।  প্রমাণিত হল, হিন্দুত্বের সুরসুরি দিয়ে মানুষের পেটের ক্ষুধা বা কাজ না পাওয়া বেকারত্ব-কে ঢাকা দিয়ে সাময়িক চলতে পারলেও শেষে মোদি ফেল করতই; সেটা এবারই ঘটে গেল!

    হিন্দুত্ববাদের দিন শেষঃ
    গতকালই কলকাতা থেকে প্রথম আলোতে লিখেছে, নীতিশ-নাইডুর হাতে এখন বিজেপির বাঁচা-মরা। এটা আসলে খুবই কম করে বলা। কেন?
    গতকাল থেকেই কলকাতার আনন্দবাজার একেবারে মমতার পক্ষ আঁকড়ে ধরা অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। আর কোন এদিক-ওদিক তাকানোর অবস্থায় নাই এই পত্রিকা! আজকেও এরা এক মুল্যায়ন রিপোর্ট লিখেছে। নিচে দেখেন।

    “ভোটের ফলপ্রকাশের পর মঙ্গলের সন্ধ্যায় ‘জয় জগন্নাথ’ দিয়ে মঙ্গলবার বক্তৃতা শুরু করলেন নরেন্দ্র মোদী (ঘটনাচক্রে, এ বার ওড়িশায় বিপুল জয়
    পেয়েছে বিজেপি)। দেশে তৃতীয় বার এনডিএ কেন্দ্রে সরকার গড়ার জাদুসংখ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর মোদীর ৩৪ মিনিটের বক্তৃতায় এক বারও
    ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না। রামমন্দিরের কথা বললেন যদিও। বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। তাঁর ভাষণে বার বার
    শোনা গেল এনডিএ-র কথা”।

    আনন্দবাজারের অবজারভেশন তাতপর্যপুর্ণ! মোদির মুখে আর ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না, নাই।  জোর দিলেন বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। আর এই কথাগুলোই আমিও উপরে বলেছি। কেন এমন হচ্ছে? এককথায় কারণটা হল, মোদির এখনও আবার প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ থাকলেও সেটা অবশ্যই হতে হবে এক কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী!! আর কোয়ালিশন সরকার মানেই হল, বিজেপির শ্লোগান ও কর্মসুচী বা দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে চলবে না। এরই এককথায় বলা অর্থ হল, মোদির হবু কোন কোয়ালিশন সরকারে হিন্দুত্ববাদের বয়ান, বক্তব্য শ্লোগান চলবে না। এটা বলাই বাহুল্য।  হিন্দুত্ব বা হিন্দুত্ববাদের দাগ বা গন্ধ মোদির কোয়ালিশন শরীক কোন দলই নিতে চাইবে না। কারণ, বিশেষত মোদির চেয়েও কংগ্রেসের থেকে কখনও বেশী দাম পেতে কখন কোন শরীক দলকে কংগ্রেসের জোটের দরজায় টোকা দিতে হয় তা কে জানে? তাই ছোট দলগুলোর কেউই আগাম নিজ দলের সম্ভাবনা নষ্ট করতে চাইবে না! তাি মোদি এসব নিজেই বুঝে, আগাম নিজেই ঠান্ডা পায়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন!!! এটা বেশ মজার না?
    কে ভেবেছিল যে খোদ মোদিকেই হিন্দুত্ববাদ বা জয় শ্রীরাম ত্যাগ করে একদিন এসবকেই এড়িয়ে চলতেই হবে!! এর চেয়ে বড় তামাসা আর কী হতে পারে??? যদিও এরপরেও কোন কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোন নিশ্চয়তা মোদির হাতে নাই!

    দুই. পেটের ক্ষুধা বনাম হিন্দুত্বের সুরসুরিঃ
    এটা ঠিক যে উগ্র জাতিবাদ মানে যেটা খোলাখুলি নিজ জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর কথা সগর্বে বলে। তাও আবার সেই উগ্র জাতিবাদ  (ভাষা, ভুগোল বা অন্যকিছু ভিত্তিক জাতিবাদ না হয়ে যেটা ধর্মীয় জাতিবাদ) যদি ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতিবাদ হয় সেক্ষেত্রে এমন উগ্র জাতিবাদী অনুসারী মাত্রই এক কমন সমস্যার মুখে তাদের পড়তে দেখা যায়। সেটা হল ধর্মবোধ এমনই উচ্চে উঠে যায় যে তিনি নিজ শরীরের কথা ভুলে যান বা অস্বীকার করতে বসে যান। অথচ কোন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে কী নিজ শরীরের কথা চাহিদা ভুলে যাওয়া সম্ভব? মানে হল, মানুষ মাত্রই সে বৈষয়িক; মানে সে রক্ত-মাংসের শরীর, তার ক্ষুদা লাগে। আর এই নানা ধরণের শারীরিক ক্ষুধা এটা সারাদিন ধর্মবোধে ডুবে বুঁদ হয়ে থাকলেও কমবে না, ক্ষুদা পুরণ হবে না। এটাকেই বলে নিজ শরীরের চাহিদা বা ক্ষুধা অস্বীকার করে কারও স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠার সুযোগ নাই!  মানুষ আগে শরীর টিকায়ে বেঁচে থাকতে পারলে এরপরই কেবল সে স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠতে পারে! অর্থাৎ আগে শরীর (মানে চাকরি বা কাজ) পরে হিন্দুত্ববাদ!

    এখন এখানে এককথায় বললে, শাসক হিসাবে মোদি অযোগ্য কারণ তিনি গত দশ বছরে দেশে নুন্যতম সংখ্যায় কাজ সৃষ্টি করতে পারেন নাই; এমন কোন অর্থনীতি খাড়া করতে পারেন নাই।  [একই সমস্যা ছিল মোদির আগের কংগ্রেস কোয়ালিশনের (২০০৪-১৪) দশ বছরেও]। ফলে এবার নির্বাচনের আগে এমন বহু সাধারণ মানুষ বা পাশ করা বেকারদেরকে নিয়ে ছোট ইন্টারভিউ দেখেছি তারা বলছেন, মোদির হিন্দুত্ববাদ তাঁদের ভাল লাগে [হিন্দুত্বের  জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের সুরসুরি যেহেতু]; কিন্তু একই নিশ্বাসে তিনি বলছেন তিনি বেকার; এটা তাঁর খারাপ বা অসহ্য লাগে।
    মোদির হিন্দুত্ববাদ যাদের ভাল লাগে, মোদির এমন সাপোর্টার সবাই এবার মোদিকে ছেড়ে যান নাই; যদিও গেছেন কেবল একটা অংশ। ফলা ফল তাই বলছে! কিন্তু তাতেই মোদির এমন ভরাডুবি! শারীরিক ক্ষুধা সবসময়ই এমনই ধর্মবোধেরও  উপরে আগে বা প্রায়োরিটিতে অবস্থান করে থাকে! এর আরেকটা প্রমাণ হল, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে সুপ্রীম কোর্টকেই হাত করে রায় নিয়ে মোদি বাবরি মসজিদের উপর রামমন্দির নির্মাণ শেষ করলেন। ভেবেছিলেন এটা তাকে এবার ভোটে ব্যপক মাইলেজ দিবে; তিনি ভোটে অনেক আগিয়ে থাকবেন। অথচ ঘটেছে উলটা।
    এবার উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি (কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে) যে মূল শ্লোগান দিয়েছে তা আসলে এটাই যে হিন্দু-মুসলমানের অমীমাংসেয় ক্যাচাল উস্কে ঝগড়া বিতর্ক কিংবা রামমন্দির নির্মাণ ইস্যু এসব পাশে রাখেন, আগে কাজ সৃষ্টি করেন – মানুষ ক্ষুধার্ত সেদিকের তাকান!  সেদিকটা নিয়ে সরকারী কর্মসুচী, প্রকল্প তৈরি করেন আগে। আর এটাই এই দলকে পপুলারিটি দিয়েছে। মোদি-যোগীকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মোট আশি আসনের ৪৪ টাই নিজেরা পেয়েছে সমাজবাদী দলের জোট!
    ঠিক একই জিনিষ ঘটেছে মমতার পশ্চিমবঙ্গে। মুসলমান প্রধান আসনগুলোতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার শ্লোগানও ছিল একই। বুঝা গেল ধর্মবোধ গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই, কিন্তু শারীরিক ক্ষুধা চাহিদা ভুলে সম্ভবত দশ বছরের বেশী সমাজের একটা বড় অংশ এভাবে চলতে পারে না! মোদির বা হিন্দুত্ববাদের হার হয়েছে এখানেই!

    তাহলে কী দাড়ালো?
    মূলকথাটা হল ভারতের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে – রাইজিং ইন্ডিয়া হতে – ইন্ডিয়া এখনও অনেক দূরে। এবারের নির্বাচন যেন এমনই এক ম্যাসেজ বা রায় চোখ আঙুল দিয়ে দেখাল।  গালগল্প তুলে আর এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের চাপাবাজির দক্ষতা দিয়ে রাইজিং ইন্ডিয়া হওয়া যায় না। দেশে কাজ সৃষ্টি করতে হয়! টানা দশবছর হিন্দুত্ববাদের উত্থান দেখে যারা এতদিন এটাকেই ভারত শ্রেষ্ঠ, উগ্র হিটলারি হিন্দুত্ববাদী জাতিবাদই ভরসা আর এগুলোই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং ইন্ডিয়াতে পৌছে যাবার লক্ষণ মনে করেছিল – তারাই সেই আম জনতাই আবার ফিরে গেল তাদের মনে পড়ল তারা ভুল আর মোহ এর মধ্যে আটকে গেছে। তাদের পেটে ক্ষুধা চিনচিন করছে!  কারণ তাদের কাজ নাই, অর্থনীতি নাই মানে কাজ নাই! এবার প্রায় ১৮০০ কোটি রুপী খরচ করে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এটা ‘ফৈজাবাদ’ কনষ্টিটুয়েন্সী যার নাম বদলে অযোধ্যা করা হয়েছে। এই কথিত অযোধ্যেতেই বিজেপি হেরে গেছে, ৪৮ হাজারেরও বেশী ভোটে সমাজবাদি পার্টির কাছে।

    এতে ভারতের আগামি পরিণতি কী হতেপারেঃ
    আমি আগে অনেকবারই বলেছি নেহেরুর হাতে ভারত এই রাষ্ট্রগঠন – এটাই মারাত্মক ত্রুটিপুর্ণ। কারণ, “কেন্দ্র নামে” এই ভুতুড়ে ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠানের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে ভারতরাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল। আসলে বৃটিশ আমলেও ভারত বলে একই প্রশাসনের শাসনের অধীনে চলা কোন ভুখন্ড বলতে কিছুই ছিল না। ছিল কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হেড কোয়ার্টার। আর এই কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে আলাদা আলাদা কিছু রাজ্য এবং এরই পাশাপাশি ৫৫০ এরও বেশী আলাদা আলাদা করদ রাজ্য। এমন রাজ্য-প্রদেশ বা করদ রাজ্য এরাও আবার কেউ কারো অধীনে শাসিত নয়। সবাই আলাদা আলাদা ভাবে  এক কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে শাসিত! তাই এক ভারত বলে কিছুইর অস্তিত্ব ছিল না। তাই নেহেরু একেবারে গায়ের জোরে সবকিছুকে এক ভুতুড়ে কেন্দ্রের অধীনে করে একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে গেছিলেন। আর এটাই আজ কাল হয়েছে।  এতে সবচেয়ে খারাপ ও বিপদের কথা হল, এই কেন্দ্র জিনিষটা আসলে কী? এটা কেমন ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা? তা কখনই আমল করা হয় নাই। একাদেমিকেরাও না, রাজনীতিবিদেরাও না। এমন না হবার পিছনের মূল কারণ হল কমিউনিজম বা সবরোগ-হর সমাজতন্ত্রী ধারণা;  আর সমাজতন্ত্রী মানে সমাজের এক অংশ অপর অংশের উপর দাবড় দিয়ে রেখে চলে থাকে; ফলে চলতেই হবে – এমন ঘোষিত এক একনায়কতান্ত্রিক ধারণা। বিপরীতে এখানে রিপাবলিক বা পাবলিক ধারণাটাই অনুপস্থিত। পাবলিকের ক্ষমতা, গণ বা নাগরিক অধিকার ধারণাটাই অনুপস্থিত। এমনকি আমেরিকা কেন ফেডারল রাষ্ট্র -এর অর্থ বৈশিষ্ট কী তাও ভারতের কেউ, নুন্যতম কোন একাদেমিশিয়ান বুঝতে গেছেন জানা যায় না।   সবাই বড় জোর বাচ্চাদের মত করে আধো আধো বোলে (কেন্দ্রিয় সরকার না বলে) উচ্চারণ করে ইউনিয়ন গভর্মেন্ট। অথচ রাষ্ট্রই বুঝে না!

    এক কথায় বললে ভারতের কোথাও কোনও কোণায় না রাজনীতিক পাড়ায় না একাদেমিক পাড়ায় – রাষ্ট্রচিন্তা ও এর অলিগলি নিয়ে কোন ধারণাই নাই। তাই আপনা থেকে ভারতরাষ্ট্রের এই আদি ও মৌলিক ত্রুটি কখনও কাটবে না। আসলে সেই ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর শেষ আমল থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে উঠেছিল, নেহেরুর তৈরি কেন্দ্রের নামে জবাব্দীহিতা হীন একটা কথিত কেন্দ্রের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রিভুত করে রাখা ভারতরাষ্ট্র এর দিন শেষ হয়েছে। এতে হয়েছে যেটা সারা ভারত শাসন করতে গেলে প্রথম শর্ত হল সারা ভারতে স্থানীয় কমিটি সংগঠন আছে (এটাকে ভারতে সর্বভারতীয় দল বলা হয়) এমন একটা কেন্দ্রীয় দল থাকা। নেহেরু মারা যান ১৯৬৪ সালে, আর ১৯৮৯ সালে এসে রাজীবের হাতের কংগ্রেস বুঝে যায় যে তারা আর সর্বভারতীয় দল নয়। সম্ভবত রাজীব মারা (১৯৯১) যাবার আগেই বুঝে গেছিলেন এই সংকটের কথা। সেজন্যই কী তিনি বিজেপিকে একটা সুযোগ দিতে গেছিলেন? যেটা প্রথমে ১৯৮৯ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনে কারচুপি করে কাশ্মীরের ইসলামি রাজনীতিকে ভোটের রাজনীতি থেকে সশস্ত্র পথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন; পরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে বিজেপির উত্থানের রাস্তা খুলে গেছিল সেদিকে ঠেলে দিছিলেন? কিন্তু তাতেই মোদির দশবছরের শাসন শেষেও বলা যায় বিজেপিও সর্বভারতীয় দল হতেই পারে নাই। এরই সোজা সাপ্টা মানে হল, এখন এর এক মাত্র  বিকল্প হল কোয়ালিশন সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- এক. কোয়ালিশন সরকারঃ
    রাজীব গান্ধীই ছিলেন শেষ স সরকারের শাসন। যেন সেটা টের পেয়েই বিজেপির জন্য রাস্তা খুলে দিছিলেন তিনি। আর আজ এর পরিণতি হল, মোদির এবারের হারের ভিতর দিয়ে শুধু মোদির এবারেরই নয় আগামিতেও ভার শাসিত হতে থাকবে এক কোয়ালিশন সরকারের মাধ্যমে। মানে বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশন।  এটাই আবার আস্ত আস্তে বিজেপি বা কংগ্রেস দল দুটো আরো ছোট হতে হতে সেগুলো প্রভাব হারিয়ে ভারতের রাজনীতি হয়ে যাবে আঞ্চলিক দলগুলোর দলগুলোর কয়েকটা স্থায়ী জোটের সরকার। এমন কয়েকটা আঞ্চলিক দলের আঞ্চলিক জোটের কথা ভেবেই বলেছিলাম এমন প্রধান তিনটা আঞ্চলিক দলের জোট হবে সম্ভবত। যেমন দক্ষিণ ভারতীয় জোট, উত্তর ভারতীয় জোট আর পুর্ব ভারতীয় জোট ইত্যাদি।

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- দুই. দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারঃ
    দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার – এটাই হয়ে উঠবে বাকি সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রধান বৈশিষ্ঠ। এটা এবার থেকেই শুরু হয়ে যাবে। যে৪মন উপরে দেখিয়েছিম কেন খোদ মোদিকে ইতোমধ্যেই হিন্দুত্ববাদ বা রামমন্দির এসব ইস্যু নিয়ে কথা নিজের পেটেই দাফন করে দিতে হবে। কারণ কোয়ালিশন সরকারে শরীকের মন যুগিয়ে চলতেই হবে।
    এছাড়া আরো কথা আছে। যেমন ইতোমধ্যেই গতকাল বিকালে ভারতের হিন্দি নিউজ চ্যানেলে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টির কথা শোনা গেছে। এতদিন এই ব্যাপারটা ছিল বড় জোর রাজ্য সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। মানে শরীক দলকে মন যুগাতে উপ-মুখ্যমন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে তাদের আসন দেয়া হয়েছে। কখনও সেটা আবার আরো দু-তিনটা উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেখা গেছে। এবার সেই একই ভাবনা থেকেই সবচের‍্যে বেশী পিছলা শরীক বিহারের নীতিশকে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ অফার করা হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে হায়দ্রাবাদের নাইডু সাহেব কেন বাদ পড়বেন? সেক্ষেত্রে তিনিওও আরেক উপ-প্রধানমন্ত্রীর হকদার হয়ে যেতে পারেন।
    অনেকের কাছে ব্যাপারটায় ব্যাপক তামাসার দিক নজরে পড়লেও একটু সিরিয়াস দিকে যাওয়া যাক। এই উপ-প্রধানমন্ত্রী বানানোর যে অভিমুখ এর সোজা মানে হবে সেই কোয়ালিশন সরকার যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা মতভেদে ডুবে থাকবে। এককথায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেসব ইস্যুতে সে ব্যাপারে একেবারেই অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে যাবে।  তাই দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এর খাঁড়া অর্থ হল সিদ্ধান্তহীনতার অকেজো সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- তিন. ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবেঃ
    অনেকে ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন অথবা না। সামরিক বা ইল্টেলিজেন্স ধরণের প্রতিষ্ঠান; এগুলোর জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এমন সরকার হতে হয়।  যেকোন সরকারী প্রতিষ্ঠানকেই কোন না কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হতে হয়। আবার মন্ত্রণা লয়ের অধীনে চলে যাওয়া মানে দীর্ঘসুত্রিতা; কারণ মন্ত্রণালয় থেকে পরে আবার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌছানি আর সিদ্ধান্ত ফাইনাল করা এটাই দীর্ঘসুত্রিতা। এজন্য ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান এটা সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সেটা একই সাথে হ্যা আবার না। আসলে দীর্ঘসুত্রিতা এড়াতে মাঝখানে কোন মন্ত্রী নাই ঠিকই কিন্তু অজিত দোভাল-কে উপদেষ্টা করে রাখা হয়েছে। তাঁর মাধ্যমেই এটা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীকে জানানো বা অনুমোদনের ব্যাপারগুলো দ্রুত সেরে নেবার ব্যবস্থা সম্পন্ন। এটাই হল আদর্শ রূপ!

    কিন্তু সমস্যা হল যখন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় থাকে বিশেষত যখন শরীক দলও অনেক প্রভাবশালী বা ওজনদার – মানে কথা না শুনলে সরকার ভেঙ্গে যেতে পারে এমন। সেক্ষেত্রে একই প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কোয়ালিশন সরকারের বলে তিনি আগেই প্রতিজ্ঞা করেছেন পার্টনারের কাছে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও পার্টনার বা  উপ-প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না।

    এখন ধরা যাক, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় অপহরণ ও গুমের কেস। অন্যদেশ থেকে এনে ভারতের কোন রাজ্যের সড়কে তাকে ফেলে রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পরে ঐ শহরের এসপি গিয়ে সেটা উদ্ধার দেখানো হবে। এখন এতে র-কে জড়িত হতে হলে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন স্বাক্ষর লাগবে – অফিস বা বিজনেস অর্ডারে মনে করেন এভাবেই নির্দেশিকায় লেখা আছে। এখন সেই ফাইল প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পড়ে আছে কিন্তু কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। কেন?
    কারণ, গতবার এমনই এক সিদ্ধান্তগ্রহণের বেলায় এক উপ-প্রধানমন্ত্রীকে রাজী করানো হয়েছিল এভাবে যে তিনিও একটা বিজনেস ডিলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন চান। প্রধানমন্ত্রী সেটা দিতে রাজি হলেই তবেই তিনিও আগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে নানান প্যাচে আর ঝামেলায় পড়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেন নাই। কাজেই এখন র-এক্ষেত্রে এক-দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করলেও প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে অনুমোদন দিবার অবস্থায় নাই!

    এতে ফলাফল কী হবে?
    ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে। একদিক দিয়ে এটা ভাল হয়ত। যে র যেভাবে বেপরোয়া কানাডা-আমেরিকার মত দেশে গিয়ে গুম-খুন করে আসছে বীরদর্পে – সেগুলো ভারতে কোয়ালিশন ধরণের সরকারের কারনে সিদ্ধান্তহীনতায় দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে; এমন ততপরতা কমে আসবে।  অবশ্য অনেকে বলেন, এনিয়ে এক লেখা বইয়ে ভারতের অশোক রায়না এমনই ধারণা পোষণ করেছেন। 
    কিন্তু সাধারণভাবে যে কোন রাষ্ট্রস্বার্থ এমন হয় যেটা এমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করতেই হয় যেমন অন্যদেশের জাশুশি-গোয়েন্দাগিরি ঠেকানো। সেক্ষেত্রে ঐ রাষ্ট্রের কোয়ালিশন সরকার রাষ্ট্র-কাঠামো ও এর ততপরতাকেই স্থবির করে দিতে পারে।

    এককথায় বললে, সিদ্ধান্তহীনতা যে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্বরক্ষার বা নরমাল ফাংশনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। আর নিয়মিত কোয়ালিশন সরকার মানেই সিদ্ধান্তহীনতা।
    এজন্যই বলেছিলেম এভাবে চললে ভারত রাষ্ট্র এভাবে ক্রমশ স্থবির হতে থাকবে সম্ভবত তিনটা আঞ্চলিক রাজ্য জোটে বিভক্ত হয়েও টিকতে না পেরে।

    মোদির এবারের হারের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় তাতপর্য এটাই!

    আর সবশেষে বলাই বাহুল্য, ভারতে যতই দুর্বল আর কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে ততই সেই সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে বাংলাদেশের উপর তার অযাচিত সব হস্তক্ষেপ, সব প্রভাব ও আধিপত্য ঘটানোর ক্ষেত্রে !! নিজ মাথার ঘাঁয়ে পাগল এমন সরকার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময় দিতে চাইবে না। এমনকি ভারতের কোটারি সমর্থন স্বার্থের ও সহায়তার উপরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের যেকোন সরকারো দুর্বল হয়ে পড়বে!

     

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ      ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ   জুন মে ২০২৪, সকাল 

  • জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    গৌতম দাস
    ২১ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5DG

     

    ছবি ডেইলি স্টার থেকে নেয়া 

     

     

    গতকাল দুপুর থেকেই খবরটা  ঢাকায় ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছিল যে সাবেক এক ‘বাংলাদেশ আর্মি চীফ’ জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে আমেরিকান অসন্তোষ বা এনিয়ে তাদের “নয়া পদক্ষেপ” এর খবর। আজ ডেইলিস্টার লিখেছে, “আমেরিকা আজিজ আহমেদ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের উপর [“United States has imposed sanctions on former chief of Bangladesh Army Aziz Ahmed and his immediate family…”] স্যাংশন  দিয়েছে। এলেখায় বেশির ভাগ সময় জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান বিবৃতিকে  আমি “আমেরিকান পদক্ষেপ” বা শুধু “পদক্ষেপ” বলে চিহ্নিত করব। যদিও ডেইলি স্টার সহ অনেক মিডিয়াই এটাকে স্যাংশন আরোপ করা বলেছে। আর এর বিপরীতে আমেরিকান বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটা দেখিনি। তাই, এই বতর্ক থেকে দূরে থাকতে  একে “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলব এখানে।

    “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলতে শব্দে যাই থাক, বাংলাদেশে সামাজিকভাবে এক বড় খুশির প্রতিক্রিয়া হয়েছে দেখার মত। এতে লক্ষ্যণীয় যে,  বিগত দুবছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনকালে যারা আমেরিকান সাপোর্ট ও সহায়তার ব্যাপারে গভীরভাবে বাইডেন-লু এর আমেরিকার উপর “রাজনৈতিক আস্থা” রেখেছিল; গভীর নির্ভরশীলতায় আপন বোধ করত প্রবল খুশির প্রতিক্রিয়া এসেছে মূলত তাদের থেকে।  কিন্তু এসব সত্বেও , সেসময়ে এরাই আবার বাধ্য হয়েছিল নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকা  নিজেই নিজ কমিটমেন্টের উলটা ঘুরে গিয়ে বাংলাদেশকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল শুধু না, একেবারে “বিজয়ী” হাসিনার কোলে গিয়ে উঠেছিল; আর তা দেখে লজ্জায় মারা গিয়েছিল যারা মূলত তারাই এবার জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে আমেরিকান পদক্ষেপ দেখে আর নিজেদের চাপা কষ্ট বা প্রতারিতবোধের কষ্ট আর লুকিয়ে রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশের এই “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি” লজ্জায় মরমে মরে গিয়েছিল, নির্বাচন ঘটে যাবার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত। বিশেষ করে এখন বাইডেন-হাসিনা নাকি “কেমন জানি বন্ধু” যা নিয়ে আবার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উচ্ছ্বাস জানিয়ে বিএনপিকে টিটকিরি দিয়ে কথা বলে চলেছে। এদিকে আমেরিকার ধারণা তারা একসাথে বাইডেন-হাসিনা ‘কী জানি’ [ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি] উতযাপনও শুরু করে দিয়েছিল ইত্যাদি!  তাই গত চার-পাঁচ মাস “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি”দের কেটেছে এসব নখড়া দেখতে দেখতে!  অতএব পালটা এবার এদের উচ্ছ্বাসের প্রতিক্রিয়াই ছিল আজ দেখার মত। যেন তারা বলতে চাচ্ছে – তাদের প্রিয় আমেরিকা অনেক সুইট – এরা বিট্রে করে না, ফেলে পালায় না ইত্যাদি। মানে যেন সিনেমার ডায়লগের ভাষায়,   উদ্ধার করতে ‘মেরা অর্জুন [এখানে আমেরিকা] জরুর আয়েগা”। কিন্তু আসলেই কী তাই? এটার মানে কী আমেরিকার ফিরে এসেছে?   আমেরিকা কী ফিরে এসে গেছে? বা আসবে?

    বলা বাহুল্য উচ্ছ্বসিত এই আমেরিকা সমর্থকেরা কঠোর সরকারবিরোধী; তারা সরকারের পতন দেখার জন্য উন্মুখ বহুদিন থেকেই জেনুইনলি। কিন্তু তারা সকলে কী তা এবার দেখতে পাবে?
    এনিয়ে আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – এখনও উচ্ছ্বসিত না হয়ে “ধীরে চলেন”। প্রচুর [if, not, but’] এসবের যদি, কিন্তু আছে সামনে; সেসব ব্যাপারে – আমেরিকা কী অবস্থান নেয় সুযোগ থাকে; পরিস্থিতি কতটা আমেরিকার ফেবারে থাকে বা আমেরিকা চায় তা এখনও অনিশ্চিত। আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা যাদের ভরসায় বা যাদের সমর্থন পেতে বা খুশি করতে চেয়ে বা লক্ষ্য করে এই “পদক্ষেপ ঘোষণা” নিয়ে থাকুক না কেন বাংলাদেশের সেই রাজনৈতিক অংশ কী আমেরিকাকে আগের মতই গ্রহণ করবে? এটাই এখন একেবারেই অনিশ্চিত। যেমন, মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাক!

    আজ বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়াঃ
    আজকে বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞা আরেকটা বিভ্রান্ত করাঃ মির্জা ফখরুল”। এর সোজা মানে হল, আমেরিকা আগেও বিভ্রান্ত করেছে তাই আবার আরেকটা বিভ্রান্তি আনা বলেই দেখতে চাচ্ছে বিএনপি – আমেরিকান এই পদক্ষেপকে!  কেন তিনি এমনটা বললেন সেটা বুঝার চেষ্টা করতে পারেন আমেরিকা সমর্থকেরা। উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থকদের মত করে, আলমগীর সাহেবেরও তো অন্তত ইতিবাচক মন্তব্য করার কথা! কিন্তু এই মন্তব্য অন্তত নেতিবাচক! কিন্তু সেটাই বা কেন?  এছাড়া আরেকটা কথাও তিনি ওখানে বলেছেন।  আলমগীর সাহেব বলছেন – “নিজের ঘরকে যদি নিজে সামলাতে না পারি, অন্য কেউ সামাল দেবে না। নিজের শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের শক্তি দিয়ে তাদের (আওয়ামী লীগ) পরাজিত করতে হবে”। এই বাক্যের মূল শব্দ নিজের শক্তিতে দাঁড়ানো, আমেরিকার না। এদিকটা মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।
    কাজেই আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – বাংলাদেশের “উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থক”, আপনারা একেবারেই ধীরে চলেন; স্থির হয়ে নেন আগে! আর সমস্ত স্ব-সক্ষমতা  দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে ও ব্যাখ্যা পেতে চেষ্টা করেন সবার আগে। এর আগে কোন মুভ করলে ভুল হবে।

    এখন কেন এই আমেরিকান পদক্ষেপঃ  
    জবাবটা এবার এখানে খাড়া বলে ফেলি। ভারতের নির্বাচনে মোদি নাকি এবার হেরে যাবেন। আমেরিকান এই পদক্ষেপ এমন এই অনুমানের উপর নির্ভর করে নেয়া হয়েছে; যেটা এখনও ঘটে নাই। আগামি ৪ জুনে প্রকাশিতব্য ভারতের নির্বাচনী ফলাফলে মোদি হেরে গেছে – এটা আমেরিকাসহ আমরা সকলেই শুনতে পাব হয়ত। এই হল সেই অনুমান। সোজা কথা এটা এখনও ঘটে নাই; ঘটতেও পারে!

    তাই বলাই বাহুল্য যদি উলটা হয়। মানে মোদি যদি নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেখাতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য – “আমেরিকার পদক্ষেপের” এখানেই আপাতত ইতি হয়ে যাবে।
    তবে মির্জা ফকরুলের নেতি-প্রতিক্রিয়ার কারণ ভিন্ন। এর সাথে আমরা যেন আবার আমেরিকার ভাবনা বা অনুমানের সাথে সম্পর্কিত করে না দেখি; এটা সম্পর্কিত নয় তাই। সেটা বিএনপির নিজস্ব আলাদা কারণ।

    এখন আমার অনুমান হাসিনা বা মোদি সরকারও খুব নিশ্চিত নন যে আমেরিকা বা বাইডেন-লু ঠিক কী বুঝে এমন বেমাক্কা এক পদক্ষেপ হাঁকালেন?  বিবৃতির কাগজে আমেরিকা  “ডেজিগনেশন” [designation] এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। মানে নামকরণে সাবেক জেনারেল আজিজকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করে ফেললো।
    তবে আমি মন্ত্রী হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে আমাদের সরকার জানত দুদিন আগে বাংলাদেশের আমেরিকার এমবেসিকে বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছিল, এনিয়ে কিছু বলছি না।

    আরেকটা কথা, হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে – এটা “ভিসা স্যাংশন নয়” – একথা কিন্তু সত্য [US sanction on Aziz not under visa policy: foreign minister]। বরং অরিজিনাল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতেও স্যাংশন বলে কোন শব্দই নাই। এছাড়া আমেরিকার ঐ বিবৃতিতে আজিজ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের  – আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ বা সম্পত্তি বায়োজাপ্ত ইত্যাদি কোন শব্দাবলীও নাই।

    কেবল একটাই শব্দ আছে “ডেজিগনেশন”। মানে, বাংলায় বললে “চিহ্নিত করা” ধরণের বা নামকরণ করা যেন। তাই বলছে, আমেরিকান প্রশাসন সাবেক জেনারেল আজিজকে দুর্নীতিবাজ যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধবংস বা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। এই হলো অভিযোগ ও নামকরণ। একথা অবশ্যই বেশ ওজনদার!  কিন্তু সেজন্য আমেরিকার দিক থেকে শাস্তি কী বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কী আরোপ করা হবে – এধরণের কোন বাক্য আর সেখানে নাই। তবে কোন আইনে এই ডেজিগনেশন এর একটা ধারা নম্বরউল্লেখ করা আছে; তা হল  [7031(c)] ।  হতে পারে ঐ ধারার বিস্তারে কোন শাস্তির কথা লেখা আছে। তবে আপাতত আমরা তা জানি না।

    তাই,  উপরে আমি লিখেছে, জেনারেল আজিজের উপর স্যাংশন আরোপ করা হয়েছে। হা বলেছি তবে নিজ বরাতে না। বলেছি ডেইলিস্টারের বরাতে। বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটাই নাই আগেই বলেছি; আমি গত রাতে পড়েছি। তাই ঢাকার মিডিয়ায় কীভাবে আসছে এমনকি হাসান মাহমুদ তিনিওও স্যাংশন আরোপ হয়েছে বলেছেন।

    তাহলে মূলকথাটা হল, আগামী ৪ জুন ভারতের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের দিন। এদিন যদি মোদিই হেরে গেছেন বলে প্রকাশিত হয় তবেই আমেরিকান বিবৃতি আরো পাতা খুলে ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে উঠতে চাইবে। এবং সেক্ষেত্রে খুব দ্রুতই বহু বহু সব ঘটনা ঘটবে।   ইতোমধ্যেই অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতার করিডোরে প্রবল আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে যে মোদি এবার হারছেন। ভারতের যত জুয়ার আড্ডা আছে বড় বড় সব বিখ্যাত ডেরা সেখানে মোদি হেরে যাওয়ার পক্ষে বাজি ধরা জুয়ারি লোকের সংখ্যাই বেশী, রেটও হাই। এটা একটা খুবই তাতপর্যময় তথ্য! ইতোমধ্যে ভারতীয় শেয়ার বাজারও সব বিক্রি করে দাম ফেলে মানে আগে নিজ বিনিয়োগ বাচাও – এমন জোয়ার তুলেছিল আমরা দেখেছি।  আার অন্যদিকে, ভারতে ভোটপ্রদানের % যদি ৬০ এর নিচে যায় তবে মনে করা হয় এটা মোদির হারার লক্ষণ! সেটাও চারপর্বের পর থেকে দেখা যাচ্ছে!
    তবুও আমার শেষ কথা, এমন যত আলামতই দেখা যাক না কেন –  মোদির হাতে থাকা “ভোট বাক্সকে সফটওয়ার ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা” যদি অকার্যকর হয়ে থাকে তবেই একমাত্র তবেই, উপরে যা বলেছি তা সত্য হতেও পারে, নইলে মোদি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করবেনই আগেরবারের মতই!!
    এবার এক বাক্যে বলি,  যদি মোদি হেরে যায় তবে সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটে পড়বে হাসিনা সরকার! আর হবু সেটাই আমেরিকার পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য!
    নিচে আমেরিকান বিবৃতিটা সেঁটে দেয়া হলঃ

    Designation of Former Bangladesh Official for SIGNIFICANT Corruption:

    The U.S. Department of State announced today the public designation of former General Aziz Ahmed, previously Chief of the Bangladesh Army Staff, due to his involvement in significant corruption.  His actions have contributed to the undermining of Bangladesh’s democratic institutions and the public’s faith in public institutions and processes.

    Aziz Ahmed engaged in significant corruption by interfering in public processes while helping his brother evade accountability for criminal activity in Bangladesh.  Aziz also worked closely with his brother to ensure the improper awarding of military contracts and accepted bribes in exchange for government appointments for his personal benefit.

    This designation reaffirms the U.S. commitment to strengthening democratic institutions and rule of law in Bangladesh.  The United States supports anticorruption efforts in Bangladesh through assistance to make government services more transparent and affordable, improve the business and regulatory environment, and build capacity in investigating and prosecuting money laundering and other financial crimes.

    These public designations are made under Section 7031(c) of the annual Department of State, Foreign Operations, and Related Programs Appropriations Act.  This action renders Aziz and his immediate family members generally ineligible for entry into the United States.

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ২১ মে ২০২৪  রাত ১১ঃ ২৬
    শেষ আপডেটঃ   ২৩ মে ২০২৪, ভোর  ০৫ঃ ৪৬

  • রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?

    রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    হাসিনা থেকে পদক, সম্মাননা পেতে তিনি এত মরিয়া কেন?
    গৌতম দাস
    ২৯ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-5xj

     

    দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান

     

    [রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া দেশে ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    এছাড়া তিনি হাসিনা থেকে পদক সম্মাননা পেতে এত মরিয়া কেন?]

    বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সিপিডি [CPD] এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ও চেয়ারম্যান হলেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান,  যার বয়স এখন ৮৯ বছর। ভেবেছিলাম এই বয়সে আর তাঁকে নিয়ে কিছু বলব না; অন্তত তিনি মুরুব্বি বয়সের, এই খাতিরে! কিন্তু না। তিনি নিজেই যেন তা হতে দিতে চান না! মানুষের জীবনকালের কাজে-কর্মে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ভুল শুদ্ধ বহু কিছুই হয়, হতেই পারে। কিন্তু জীবন সায়হ্নে এসেও স্বাভাবিক বাস্তবতা থেকে পালিয়ে কেউ যখন নিজেকে ভুলহীন বিশুদ্ধজ্ঞানে উপস্থাপন করতে চায় অথবা এদিকটা যেন বুঝেবই নাই, খেয়াল করেন নাই অথবা নিজ কৃতকর্মের কোন দায় নিতে চায় না ইত্যাদি আচরণ করে বসে,  এটা খুবই পীড়াদায়ক!  একারণেই মনে হচছে, এই শেষ জীবনে এসে এখন তিনি যেন “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হয়ে উঠতে চাইছেন। যিনি আবার যেন সব ভুল-শুদ্ধের উর্ধে! অন্যদিকে আবার হাসিনার এই পনেরো-ষোল বছরের শাসনের দিকে তাকালে দেখতে পাই – যারা হাসিনার বাবার আমলে মানে তাঁর বাবার সাথে কাজ করেছেন, স্মৃতি আছে তাদের অনেকের প্রতি হাসিনা বিশেষ “আনুকুল্য” দেখিয়েছেন। পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া ইত্যাদি্র ভাল-মন্দ তিনি করেছেন।  আর এটাই আবার অনেকের ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাড়িয়েছে যে জীবন সায়হ্নে এসে হলেও যেভাবেই হোক হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু একটা উসিলায় হাসিনার আনুকুল্য আদায় করে তবেই বাকি জীবন শেষ করতে চান!
    যদিও এই দৃষ্টি-আকর্ষণ করে সুবিধা নেয়ার ফেনোমেনা – এটা আবার দেখা যায় সুবিধা-বাদিদের কেবল শেষ জীবনের আকাঙ্খার বিষয় না। যেমন উপরের দিকের সরকারী আমলারা জেনে গেছেন যে নিজ পরিবারের কেউ আওয়ামি লীগ করতেন বা তিনি নিজে ছাত্রলীগ করেছেন এটা বেচে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে; এমন অনেকেই সচিব হওয়া বা ভাল পদোন্নতি নিয়েছেন এটা তো হাসিনার এই আমলে ডাল-ভাতের রেওয়াজ।  এমনকি সারা জীবন জাসদ বা বাসদ করেছেন অথচ এখন হাসিনার ছাত্রলীগ করেছেন বলে দেখিয়ে দাবি করে সচিব বা সমতুল্য পদোন্নতি নিয়েছেন এমন অনেক পরিচিত, সহপাঠি বা অপরিচিতকেও চিনি। এসব এখন খুবই কমন! এটাকেই অনেকে আবার মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী এখন ক্ষমতায় অথবা এটাই ‘চেতনার” রাজনীতিক ক্ষমতার মহিমা ও তাতপর্য বলেও  এক নামি কমিউনিস্ট একবার আমাকেই বুঝিয়েছিলেন!

    বাংলাদেশ যাত্রা শুরু কথিত এক  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” দিয়ে, কারা ছিলেন এর মূল কারিগরঃ
    বাংলাদেশে জন্মযাত্রার শুরুতে কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির” এক অন্যতম কারিগর ছিলেন রেহমান সোবহান। তবে কমিউনিস্ট-সমাজতন্ত্রীদের আবেগ-বিবেকের তর্কের চক্কড়ে না পড়ে, ব্যাপারগুলো আরেক দিক থেকে দেখব ও দেখাব।  বাংলাদেশের ইতিহাসে কমিউনিস্টদের কমিউনিস্ট ভাবনা থেকে আনা গজব, সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যবহারিক কাজ হল কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”; ১৯৭২ সাল থেকেই যার নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ – ততকালীন অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী ও পাট মন্ত্রী এসবগুলোই ছিলেন তাজউদ্দিন একাই। তাঁর নেতৃত্বেই কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েম করতে যাওয়া হয়েছিল। যার করুণ পরিণতিই হল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ! এমনকি এখান থেকেই যে শেখ মুজিবের হত্যা বা মৃত্যুর পরিস্থিতি যে আসন্ন হয়ে উঠবে এমনটা খুব কেউ বুঝেনই নাই। তবে তখন এমন অনুঘটক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ কিন্তু এই কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ডেকে আনা  দুর্ভিক্ষ – এই করুণ পরিণতি, সেটা বলাই বাহুল্য! তবে এই কথিত সমাজতন্ত্রের সারকথা বা মুখ্য বাণী-টা ছিল যে, দেশের কারখানাসহ “সকল উতপাদন ব্যবস্থাকে সরকারী মালিকানায়” নিয়ে যেতে পারলেই নাকি মোক্ষলাভ ঘটবে!

    এমনিতেই কোন প্রতিষ্ঠানের ‘ম্যানেজমেন্ট’ মানে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ব্যবস্থা যা ঐ প্রতিষ্ঠান/অফিসের, দক্ষতার সাথে উতপাদন ব্যবস্থার জন্য খুবই জরুরি; আর এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটা টিকতে পারবে কিনা এর জন্য ভাইটাল বিষয়। কিন্তু সোভিয়েত কমিউনিজম এর চোখে ম্যানেজমেন্ট ধারণাটাই নাকি এক “শোষণ ব্যবস্থার” ধারণা; তাই এটা তাদের চক্ষুশুল ছিল!  অর্থাৎ ম্যানেজমেন্ট মানে দক্ষ উতপাদক হওয়া এটা নাকি বুর্জোয়া ধারণা; আর এটা নাকি তাই শোষণের হাতিয়ার!

    কোন নীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় তা কাজ করছে আগাচ্ছে যেটা বুঝার ঊপায় কিঃ
    তবু এসব কথা এখন থাক; এসব কথা এখন পাশে ফেলে রেখে যদি একটু আগাই তবে, একটা দেশের সমগ্র অর্থনীতিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানো (তা বিশেষ “পবিত্র জ্ঞান করা” সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বা যেকোন অর্থনীতিই হোক না কেন)  বা বাস্তবায়নে চলে গেলে এরপর এই অগ্রগতি কাঙ্খিতভাবে চলছে কীনা এটা দেখার কোন ব্যবস্থাও সাথে থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয় একটা দিক। এটাকেই বলে মনিটরিং বা অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা যার থাকাটা খুবই এসেনশিয়াল আর প্রফেশনাল কাজের পুর্বশর্ত। এখান থেকেই মনিটরিং এর ইন্ডেক্স [index] বাংলায় যেটাকে আমরা সূচক বা নির্দেশক নামে চিনি বা বলি – তা খুবই গুরুত্বপুর্ণ!  কারণ কী দেখে বুঝব অগ্রগতি  পরিকল্পনা মাফিক ও দিকে চলছে কিনা?   কারণ না হলে যদি পরিকল্পনাটা পাঁচবছরের হয় তাহলে কী কেবল পাঁচবছরে পরেই জানা যাবে যে পুরা পরিকল্পনাটাই আসলে ফেল করেছে? অথবা সফল হতে যাচ্ছে?  নাকি প্রকল্প শুরু হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় পরে পরে যেমন ধরা যাক,  প্রতি তিনমাস পরে কখন কী কী  অগ্রগতি ও লক্ষণ-সুচক দেখা যাবে; এভাবে বা ওভাবে কখন কী দেখা যেতে  হবে  – এটাই সুচক ইন্ডেক্স এর মাপামাপি।  অর্থনীতির অভিমুখের সিগনাল দেয় এটা!   কিন্তু যদি অন্তত শুরুর একবছর পরেও এমন কোন রেজাল্টই না দেখা যায় তবে আগেই বুঝে নিতে হবে যে এই প্রকল্প ফেল করতে যাচ্ছে, ইত্যাদি। এগুলোকেই মোটাদাগে – অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা- বলে বুঝা হয়।

    এখন তাজউদ্দিনের সেই “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”  কায়েমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অপরাধ ও অঘটনমূলক ঘটনাটা ছিল যে, তারা সমাজতন্ত্র  প্রতিষ্ঠার এই “পবিত্রকাজে” রওনা করার পরে মানে একেবারে আড়াই বছর পরেই দেখলেন ও জানলেন যে এটা নুন্যতম সফলতা দূরে থাক তাদের এই পবিত্র অর্থনীতি দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে সব শেষ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র-সরকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই ফলাফল দেখে আমাদের অনুমান কোন মনিটরিং ব্যবস্থার সুচক সেখানে রাখা হয় নাই; বরং বিপ্লবী রাজনৈতিক আবেগে সবাই ভরপুরভাবে ডুবে ছিল!!

    আর এই পরিণতি  দেখে সবার আগে এসব “অকর্মা সমাজতন্ত্রীদের” সকলকে পদত্যাগ করিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষুব্ধ শেখ মুজিব।  শুধু তাই না, ঐ ১৯৭৪ সালেরই সেপ্টেম্বরে (সেবারের জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উসিলায়) আমেরিকা গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে প্রথম দেখা করেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য সেই প্রথম বিশ্বব্যাংক-কে সংশ্লিষ্ট করা; মানে দ্রুত অনুদান, ঋণ জোগাড়। গত ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভ করলেও মুজিব সরকার বা অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সাথে কার্যকরি কোন সম্পর্ক করতে যান নাই; তাঁরা সম্পর্ক না রাখাটাই বিপ্লবীপনা বলে বুঝেছিলেন!  ফলে আমাদের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের অনুদান, সাহায্য যোগাড় ধরণের কোন খাতাই খোলা হয় নাই। কারণ এই মন্ত্রী তাজউদ্দিন ও তাঁর সহ বিপ্লবীরা কেনিয়াতে ১৯৭৩ সালেও সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের [রবার্ট ম্যাকনামারা] সাথে আলোচনার প্রস্তাব (পরিচিতি ও সৌজন্য সাক্ষাত) পেলেও এই সোভিয়েত বিপ্লবীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ফেলে রেখেছিলেন। প্রতি পরের-বছর বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন হয় দুনিয়ার নানান দেশে; সেটাই সেবার হয়েছিল KENYA 1973 হিসাবে; এখানে এক আর্কাইভ লিঙ্ক দেওয়া হল যারা এবিষয়ে আরও গভীরে যেতে চান এমন আগ্রহিদের জন্য। আবার একালেও অনেক বিপ্লবীকে (আনু মোহম্মদ ও তাঁর বন্ধুদের) দেখা যায় বিশ্বব্যাংককে এই প্রত্যাখানকে নিয়ে গর্ব করতে।  আসলে না জানার অনেক সুবিধা যা খুশি বলা যায়!!!  এছাড়া যদিও এর আগে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা বাংলাদেশে এসে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে একই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এছাড়া, VOA এর এক ভিডিও তে দেখা যায় তাজউদ্দিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

    এবার মূল প্রসঙ্গে আসি;  রেহমান সোবহান ক্রমশ চরম বিপদজনক হয়ে উঠছেন। যেন দেশ জাহান্নামে গেলেও মৃত্যুর আগে তাঁকে হাসিনার থেকে পদক-সম্মাননা পেতেই হবে! জীবন সায়হ্নে হাসিনার দৃষ্টি ও আনুকুল্য পেতে যাতে তিনি “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হিসাবে কোন পদক বা সম্মাননা পেতে পারেন যেন একারণেই মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশ জন্মের পরে সেই ১৯৭২ সাল থেকেই তিনি কথিত “পরিকল্পিত ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েমের কালে টপ তিন-চারজনের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তি সেকালের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য।  আবার মনে রাখতে হবে সেকালের পরিকল্পনা কমিশন মানে সাংঘাতিক ব্যাপার, আজকের মত গুরুত্বহীন না। এর মূল বৈশিষ্ট বুঝতে হবে এভাবে যে, সেকালে সমাজতন্ত্র মানেই হল পরিকল্পিত অর্থনীতি এমনটাই গর্বের সাথে বুঝা হত;  আবার এর অর্থনীতিক পরিকল্পনা হত পাঁচসালা, পাঁচ বছরের জন্য। তাই সব সময়ই দেশের অর্থনীতি এক চলমান পাঁচসালা পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকত। কিন্তু ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের এসব ভংচং সবকিছুই নিজ গৌরবে খতম হয়ে গেলেও এই পাঁচসালা পরিকল্পনার রেওয়াজটা পরেও কিছুদিন চালু ছিল।। স্মরণ হাতড়ে বলছি ১৯৮০ এর দশকে এটা লুপ্ত হয়ে যায়। কাজেই রেহমান সোবহানের সেকালে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য থাকা ছিল অনেক ভারী জিনিষ। একালে দেখছি সিপিডি থেকে প্রকাশিত তাঁর বায়োডাটায় ব্যপারটা লেখা আছে এভাবে ……He served as Member, Bangladesh Planning Commission, in charge of the Divisions of Industry, Power and Natural Resources, । সেই সাথে ওখানে আরো লেখা আছে যে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন যার এক্তিয়ার বা কর্মক্ষেত্র ছিল পরিকল্পনা বিভাগ ও অর্থনীতির ইআরডি [ERD] বিভাগ। এখানে  পাঠককে জানিয়ে রাখা ভাল যে বাংলাদেশে বাকশাল শাসন (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) কায়েমের পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল।  যার সারকথা হল সেটা প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা নয় বরং প্রেসিডেন্টই সব ক্ষমতার উতস ও সরকারের প্রধান নির্বাহি ক্ষমতাধারী; মানে কোন প্রধানমন্ত্রী নয় বরং প্রেসিডেন্টের হাতেই সব ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। তাই রেহমান সোবহানের ১৯৯১ সাল পর্যন্ত – প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য- কথার মানে ও ওজনদার তাতপর্য, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। আর তা জিয়া ও এরশাদ এদুই প্রেসিডেন্টের আমল জুড়ে সেটাও বুঝতে হবে।

    আবার সম্প্রতি দেখলাম সম্ভবত রেহমান সোবহান তার জীবনী প্রকাশ উপলক্ষ্যে তিনি যা বলছেন এর সারকথা হল, বৃটেনে থাকার সময়ের লেবার পার্টি করেই তিনি ‘কমিউনিজম’ শেখেছেন। কি সাংঘাতিক কথা আর, কী সহজ তাই না!!  এর মানে কার্ল মার্কসের কোন মূল লেখা বই বা কোন গুরুত্বপুর্ণ আর্টিকেল পাঠ নিয়ে কিছু জেনেছেন – এভাবে এটা তাঁর জানবার পথ ছিল না। এখন তাই তাঁর নিজেই নিজেকে মুল্যায়ন করা উচিত যে, শুধু এটুকু দিয়ে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” করতে যাওয়া কী ঠিক হইছে? বাংলাদেশের প্রতিটা সাধারণ মানুষ যার দ্বারা এফেক্টেড ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল??? এটা কী কোন ছেলেখেলার বিষয়?  বিশেষ করে বৃটিশ লেবার পার্টি মানে তো ওয়ার অন টেররের কালে প্রেসিডেন্ট বুশের সহযোগী প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর পার্টি! এছাড়া বড় জোর ওর জ্ঞানের দৌড় হল এক ট্রেড ইউনিয়নিস্ট এর যেমন থাকে! লেনিন কেন নিজ পার্টিরই কোন ট্রেড ইউনিয়ন করার বিরুদ্ধে ছিলেন, আগ্রহিরা সেটা জেনে নিতে পারেন!

     রেহমান সোবহানের “ভ্যালু এডিশন” বুঝঃ
    আমি অনেকবার বলেছিল রেহমান সোবহান হলেন, বাংলাদেশে বসে ভারতের স্বার্থরক্ষা ও দেখার কনসাল্টেন্ট। বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়ে ভারতকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ইন্ডিয়ান এজেন্ট হল রেহমান সোবহান ও তাঁর এইকাজের প্রতিষ্ঠানটাই হল সিপিডি। উলটা করে বললে, সিপিডির সর্ববৃহত ক্লায়েন্ট হল ভারত সরকার বা তার গোয়েন্দা বাহিনী। যদিও তিনি নিজে এটাকে “প্রগতিশীল আর ইতিবাচক” কাজ হিসাবেই গণ্য করে থাকেন!!!
    Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP) is a free-trade agreement (FTA) – এদুই ধারণার মধ্যে FTA সারকথায় এর মানে হল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে একে অপরের বাজারে পণ্য নিয়ে ঢুকলে কত কী শুল্ক ছাড় দিবে বা শুল্কই আরোপ করবে না এরই ছুক্তি। এমন FTA বানিজ্য জোটের ভিতর আবার RCEP একেবারেই নতুন ধারণা। আর এই RCEP এটাই হল এক “ভ্যলু এডেড চেইন” এই ধারণার ভিত্তিতে পণ্য উতপাদন ও ভোগ – তা শেয়ার করার ব্যবস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ধারণা হল ভ্যলু (value); এই ভ্যালু আসলে কী? মনে রাখতে হবে মার্কস সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের জন্য বিখাত আর এটাই তাঁর জীবিনের মুখ্য অবদান মানেন অনেক। তাই ভ্যলু (value) সম্পর্কে তার বিস্তারে লেখা রচনা আছে। একেবারেই সার কথায় ভ্যলু (value) মানে হল কোণ পণ্য উতপাদনে একদিকে থাকে কাঁচামাল আর এই কাঁচামালের উপর মানুষের শ্রম যোগ করেই পণ্য উতপাদন করা হয়। এই শ্রম যোগ করা এটাই ভ্যলু (value) এডিশন। একারণের উতপাদিত পণ্যের মূল্য কাঁচামানের মুল্যের চেয়ে ছাড়িয়ে। কাজের উতপাদনে শ্রম যোগ করাই ভ্যালু এডিশন। এখন কয়েকটা দেশ মিলে কোন অর্থনৈতিক জোট যদি কোন পণ্য উতপাদনের ক্ষেত্রে যে দেশ যে অংশটায় দক্ষতার সাথে ভ্যালু এড করতে পারে তা করে ফাইনালি কোন একটা দেশে যদি তা এসেম্বল করে ফিনিস প্রডাক্ট-টা তৈরি হয় আর এবার ঐ পণ্য যদি জোটের সব দেশ কিনে ও ভোগ করে তবে ঐ উতপাদিত ঐ পণ্য হল  “ভ্যলু এডেড চেইন” পদ্ধতিতে উতপাদিত ও ভোগ্য এক পণ্য। আর বলাই বাহুল্য এই পণ্য যেহেতু সবদেশেরই শ্রম আছে তাই কেউই আর এর প্রবেশের উপর শুল্ক-আরোপ করে না আর সুবিধাটা সদস্য সকল দেশ পাবে। এমনই চীনা উদ্যোগের প্রথম জোট হল RCEP  যা পুর্ব-এশিয় আশিয়ান দশ দেশ ও এর বাইরে ঐ অঞ্চলের আরো ছয় FTA সদস্য দেশ; যাদের মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, অষ্টেলিয়াও আছে। আইডিয়াটা হাজির করা হয় ২০১১ সালে।
    এমন জোট বাস্তবায়িত হয় ২০২০ সালে। কিন্তু ভারতের স্বার্থ-ধর রেহমান সোবহান ব্যাপারটা জানার পর সম্ভবত ভেবেছিলেন তাঁর ক্লায়েন্ট ভারতকে সুবিধার হাড়ি খুলে চমকে দিতে হবে। তিনি ক্লায়েন্ট ভারতকে খুশি করতে বিবেচনাবোধ হারিয়ে দাবি তুললেন ভারত-বাংলাদেশকে মিলে  “ভ্যলু এডেড চেইন” পণ্য উতপাদনে যেতে হবে।

    আবার ভারতও সব শুনে মনে করেছিল রেহমান সোবহানের কাছে খুবই জ্ঞানের এক কথা তারা শুনলেন। কারণ ভারত ভেবেছিল এটাকরতে পারলে তাহলে ভারতও তো চীনের সমতুল্য এক বিরাট দেশ হয়ে যাবে!!  তারা রাজি হয়ে যায়।  রেহমান সোবহান ঠিক করে দেন এই জ্ঞানের আলোচনাটা ঢাকায় হবে আর এটা ডেইলি স্টারের নামে আয়োজন করা হবে। তাই হয় আর এতে ভারত সরকারের হুকুমে ভারতীয় আমলারা দল বেধে অংশ নিয়েছিল।  এটাসি ঘটেছিল ২০১৬ সালে তিনি ডেইলি স্টারকে দিয়ে আয়োজিত সেমিনারে ভারতীয় আমলাদেরও ঢাকায় জড়ো করেছেন – উদ্দেশ্য “ভ্যলু এডেড চেইন” শিখাবেন।

    ‘ভ্যালু এডিশন চেইনে’ উতপাদন, উগ্র অর্থনীতিক জাতিবাদ এর জন্য হারামঃ 
    চোথা মারা মানের অপরের ধারণা বুঝে বা বুঝে টুকলিফাই করা – ব্যাপারটা শেষে তাই হয়েছিল। গোড়ার ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহান ‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ জিনিষটাই ঠিকমত বুঝেন নাই; এছাড়া মার্কসের ভ্যলু সম্পর্কেও প্রাথমক কিছু ধারণা থাকতে হবে। তিনি ভেবেছিলেন চীন বা RCEP এর ধারণাটা তিনি সহজেই ক্লায়েন্ট ভারতের কাছে বেচে দিতে পারবেন। কিন্তু ফাঁকি বা চোথা মারা ধারণার কারণে ভ্যলু এডিশনের সাথে শুল্ক-আরোপের সম্পর্ক কী তিনি জানেন নাই। আবার মনে রাখতে হবে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করা আর এভাবেই বিদেশি পণ্যের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়া ১৯৪৫ সালের পরে জাতিবাদি ও কলোনিমুক্ত দেশগুলোতে খুবই পপুলার পদক্ষেপ ছিল। এটাকেই ইকোনমিক ন্যাশনালিজম বলে।  সব জাতিবাদিরাই ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট, মোদির মত উগ্র হলে তা আরও বেশী। এমনকি স্তালিন ও তার কমিউনিজম ও আসলে ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট।  মুল কারণ, এরা বা এই চিন্তার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ধারণাটাই নাই। আর একারণেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হয়েও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫-১৯৯১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এমনকি সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যাবস্থা ছিল না;  আসলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যই সম্ভব নয়।

    কিন্তু রেহমান সোবহান এসব জানতেন পড়াশুনা আছে তা তাঁর কাজদেখে এমন জানা যায় না। যেমন ধরেন, তিনি কী জানেন উগ্র জাতিবাদী রাষ্ট্র ভ্যালু এডিশন বুঝতেই পারবে না।  গ্রহণ করবে না বা সম্ভব না? কারণ এই রাষ্ট্র-সরকার উগ্র জাতিবাদী মানে সে ইকোনমিক ন্যাশনালিজম করে বেড়ায় – মানে অন্য দেশের পণ্যকে সে কড়া ট্যাক্স বসিয়ে নিজ সীমান্তের বাইরে রাখাটাই সঠিক মনে করে। নিজ অদক্ষপুর্ণ দামে প্রস্তুত পণ্যকে যে এভাবেই প্রটেক্ট করে; আর দেশের মানুষকে তাই কিনতে বাধ্য করে থাকে। এটাই তো ইকোনমিক ন্যাশনালিজম । তাহলে তিনি মোদীর ভারতকে ভ্যালু এডিশন বুঝাবেন কেমন করে? রেহমান সোবহান সেদিকটা না বুঝেই বাগড়ম্বরা করতে গেছেন ইন্ডিয়া বাংলাদেশের পাটের উপর, ব্যাটারির উপর, বাথ সোপের উপর এরকম ট্যাক্স বসিয়ে রেখেছে। আর রেহমান সোবহান বলছেন ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ভ্যলু এডেড চেইন”  এর যৌথ পণ্য উতপাদন করতে যাওয়া উচিত!!! এই হল প্রগতিশীল বিরাট বুঝমান রেহমান সোবহান!    দেখেন এখানে এনিয়ে ২০১৬ সালের ডেইলিস্টারের রিপোর্ট। এছাড়া এসব ইস্যু নিয়ে আমার পুরানা লেখা আগ্রহিরা এখানে  আর এখানে দেখতে পারেন।

    কিন্তু তবু এত ক্ষমতাধর রেহমান সোবহান কখনও ১৯৭৪ এর কথিত সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির পরাজয় ও দেশকে একটা দুর্ভিক্ষে নিয়ে ফেলা এজন্য কোন দায় কখনও নেনই নাই। কোন একাদেমিক আলোচনাও টেনেছেন জানা যায় না।  এমনকি যদি কেন ঐ অর্থনীতি ফেল করেছিল এনিয়ে কোন সৎ মূল্যায়ন বা তাঁর কোন সৎ অনুভবও কোথায় আলোচনা করেছেন জানা যায় না।

    বিআইডিএস ও রেহমান সোবহানঃ
    বিআইডিএস [BIDS] কী তা এই প্রজন্ম কমই জানে, আমার অনুমান। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিক চিন্তা ও সক্রিয়তায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা যেভাবে এখন উপেক্ষিত কোনঠাসা, গুরুত্ব-প্রভাবহীন নিস্তেজ হয়ে গেছে বিআইডিএস এই প্রতিষ্ঠানের দশাও তাই। আমাদের প্রজন্মের একাদেমিক যৌবনে বিআইডিএস – একে দেখা হত এক বিরাট প্রগতিশীল জ্ঞান ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান।  বিআইডিএস সরকারী ফান্ডে চলা এক আধা-সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অরিজিনালি বিআইডিএস এর জন্ম পাকিস্তান আমলে করাচিতে; আর নাম ছিল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকনোমিকস বা পাইড [PIDE]। ১৯৭১ সাল ঘুরে,  একে বাংলাদেশে এনে ১৯৭৪ সালে এসে এর নাম হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ  বিআইডিএস [BIDS]। বিস্তারে গিয়ে কথা না বললেও, অরিজিনালি করাচিতে এটা আমেরিকা প্রভাবিত এক প্রতিষ্ঠান ছিল; মানে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শী নয়।  কিন্তু বাংলাদেশে এসে এটা হয়ে যায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের প্রতিষ্ঠান; এমনকি এখনও প্রচ্ছন্নে এটা তাই মানা হয়। দুই বাক্য উপরে ডেভেলবমেন্ট শব্দটা আমি সবুজ রঙ দিয়েছি; আর BIDS শব্দের D যার প্রতীক! ক্রিটিক্যালি বললে এই ডেভেলবমেন্ট বা বাংলায় উন্নয়ন – এই শব্দ ও ধারণাটাই এন্টি কমিউনিস্ট।  কেন? ডেভেলবমেন্ট মানে হল – মানে এর পুরা কথাটা হল “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট” – কিন্তু একে সংক্ষেপে বলতে শুধু ডেভেলবমেন্ট শব্দটা নেয়া হয়েছে। আর বাংলাতে বললে এটা অবকাঠামো উন্নয়ন [Infrastructure Development] যাকে সংক্ষেপে আমরা শুধু উন্নয়ন বলি।  ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর জন্মের সাথে সম্পর্কিত এক মুখ্য কনসেপ্ট হল এই “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট”। মনে রাখা যেতে পারে বিশ্বব্যাংক এটাও এর সংক্ষিপ্ত নাম। আর এই প্রতিষ্ঠানের পুর্ণনাম হল, International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)।

     কমিউনিস্টদের কাঙ্খিত ক্যাপিটালিজমের বিনাশ বা পতন এখনও হয় নাইঃ
    খুবই সংক্ষেপে বললে, খোদ কার্ল মার্কস সহ কমিউনিস্টদের আকাঙ্খা ও অনুমান ছিল যে দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম টিকবে না; টিকতে পারবে না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিজ গুনেই ভেঙ্গে পড়বে। কার্কস তাঁর সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের প্রেক্ষিত এমনটা মনে করতেন। তাই এই আকাঙ্খা-বিশ্বাস খোদ মার্কসের (১৮১৮-১৮৮৩) ছিল; একইভাবে লেনিনেরও (১৮৭০-১৯২৪) ছিল। ফলে পরবর্তি প্রায় সকল কমিউনিস্টদেরও। কিন্তু কমিউনিস্ট অনুমান বা ভবিষ্যতবাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করা এক্ট বা এমন প্রধান ততপরতা মনে করা হয় – এই ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হওয়া।  যেটা লেনিন পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালের এসে সোভিয়েত  প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্তালিন চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন যে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হচ্ছে। কিন্তু তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসেছিলেন। কোন প্রতিক্রিয়া দেন নাই, দেখান নাই, কিছু লেখেনও নাই। সম্ভবত তিনি অস্পষ্ট ছিলেন, নিশ্চিত ছিলেন না যে কী বলা ঠিক হবে! অন্যদিকে এদুই প্রতিষ্ঠানের জনক  বা ফাউন্ডিং ফাদার মনে করে খোদ আইএমএফ-ই নিজের ওয়েব সাইটে লিখে রেখেছে যাদের নাম – এমন দুজন হলেন, বৃটিশ অর্থনীতিবিদ কেইনস [John Maynard Keynes ]  আর অপর জন হলেন সেকালে আমেরিকান ট্রেজারি মন্ত্রণালয়ের চীফ ইকোনমিস্ট ডেক্সটার [Harry Dexter White]। এরা মূলত দুনিয়ায় উন্নত দেশ মানে অর্থনীতিতে সারপ্লাসের দেশ থেকে গরীব দেশের জন্য অবকাঠামোগত ঋণ এর ব্যবস্থা করে দুনিয়াকে এক নয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পথে সাজিয়ে ফেলেছিলেন। এদিকের ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়া জুড়ে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশের এক দুনিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই, সারপ্লাস অর্থনীতির বড় দেশগুলো তাদের সম্পদের একটা ছোট অংশ আমাদের মত দেশে অবকাঠামোগত ঋণ (প্রায় নাই সুদে) দেওয়ার একটা গ্লোবাল কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক) গড়াতে এদুই প্রতিষ্ঠান শুরুতে খুবই প্রাণবন্ত ও সচল এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম চালু করতে পেরেছিলেন। এটাই অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি। সংক্ষেপে উন্নয়নের অর্থনীতি।  মজার কথা হল জনবহুল চীন এই অর্থনীতির সুবিধা নিবার পথ ধরেই আজ প্রায় খোদ আমেরিকাকেই ছাড়িয়ে যাওয়া দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যা আগামিতে পালাবদলে নেতা আমেরিকার স্থান নিবার পথে উঠে  আসছে!  অর্থাৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ধারণাটাই কমিউনিস্ট আগের ভবিষ্যতবাণীকে আপাতত নাকচ করে রেখেছে, এটা এক কঠিন বাস্তব সত্য।  আর একারণে বলাই বাহুল্য যে “উন্নয়ন”, এটা এন্টি কমিউনিস্ট ধারণা; যা কমিউনিস্ট প্রেডিকশনকেও নাকচ করে রেখেছে।

    এজন্যই BIDS [প্রাক্তন নাম PIDE] কে বলেছি এটা আমেরিকা প্রভাবিত ধারণা। আবার তামাসাটা হল, এই BIDS ১৯৭৪ সালের পর থেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়; যা এখনও কম-বেশি তাই।  আর রেহমান সোবহান প্রগতিশীল পরিচয়েই অবসরের (১৯৯২) আগে পর্যন্ত এই BIDS এর  ডিজি বা প্রধান ছিলেন।  সারকথায়,  ১৯৭৪ এর আগে পর্যন্ত রেহমান সোবহান বাংলাদেশে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” গড়ার বিরাট কুতুব কারিগর; আবার ১৯৭৪ সালের পরবর্তিতে BIDS জেগে উঠলে মানে পুঁজিতান্ত্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি শুরু হলে পরে (১৯৮০) তিনিই আবার BIDS এর প্রধান হয়ে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতিরই মুল্যায়নকারী, প্রকল্পের গবেষক! ব্যাপারটা হেভি মজার নিঃসন্দেহে। তবে একটা বাক্য পাওয়া যায় উইকিতে যেটা রেহমান সোবহানের  বায়ো বা পরিচিতি্র অংশ। সেই বাক্যটা এরকম, …… After the liberation of Bangladesh in 1971, Sobhan was appointed a member of the Planning Commission. He quit when he, along with others, fell from the grace of Sheikh Mujib in 1975. । বাংলায় বললে, ১৯৭৫ আসতে আসতে শেখ মুজিব কমিশনের সকলকে বের করে দেন; তারা সকলে নিজে পদত্যাগ করতে বলেন  আর এভাবেই তাঁরা শেখ মুজিবের অনুগ্রহ বা গুড-বুক থেকে  সকলে ঝড়ে পরেছিলেন।

    অথচ, ১৯৭২ সাল থেকেই এই প্রগতিশীল কথিত “কমিউনিস্ট অর্থনীতির গোষ্ঠির” এরা আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংক সাহায্য করতে বা অনুদান দিতে অথবা প্রায় না সুদে ঋণ দিতে চাইলেও এরা তা ঠেকিয়ে রেখেছিল। যেটার জন্যই  শেখ মুজিবকে পরে তবে ঐ ১৯৭৪ সেপ্টেম্বরেই নিউইয়র্ক গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করে প্রথম বিশ্বব্যাংকের সাহায্য নিতে তাঁর আগ্রহ তিনি পুনরায় প্রকাশের সুযোগ নিয়ে তা নিশ্চিত করে এসেছিলেন।   কিসিঞ্জার তাতে একমত হলেও তা বাংলাদেশে আসার প্রস্তুস্তি শেষ করে আসতে আসতে ১৯৭৬ সালের বাজেট বছর শুরু হতে সময় লেগে যায়। আর ততদিনে শেখ মুজিব নিহত, এই কাফফারা দিতে হয়! বিশ্বব্যাংক সেই প্যাকেজে প্রথমে অনুদান (যার সুদ-আসল কিছুই ফেরত দিতে হয় না ) সাহায্য আর পরে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (প্রায় না সুদের ০.৭৫%) ঋণ দেয়া শুরু করলে এর স্থানীয় ইভ্যালুয়েটর ও সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনার কনসালটেন্সি পায় কিন্তু আধা-সরকারি বিআইডিএস [BIDS] আর এই বি আইডিএসের প্রধান ছিলেন রেহমান সোবহান। মানে দাড়িয়েছিল এমন যে, দুভিক্ষ লাগানো কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির এক কর্তা তখন হয়ে গেছেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের ইভ্যালুয়েটর!!!

    এখন পুরাই বিষটাকে যদি ইতিবাচকভাবে দেখি তবে এটা ছিল রেহমান সোবহানের জন্য একটা খুবই ভাল সুযোগ। তিনি এই দুই প্রচেষ্টা [কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি আর পরে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতি ]  এই দুই অর্থনীতির ব্যবহারিক তুলনা (আতলামো না) এমন ভালো-মন্দের মুল্যায়ন মন্তব্য তিনি নিজ সৎ -অভিজ্ঞতা আকারে হলেও লিখে যেতে পারতেন! যা নিঃসন্দেহে পরবর্তি প্রজন্মের জন্য এক মৌলিক সোর্স হতে পারত!  কিন্তু হায়! কিছুর বলার নাই। রেহমান সোবহান এখন একালে বাংলাদেশ যেন ভারতকে  করিডোর দেয় – এই জবরদস্তি ও বিনা পয়সায় তা দেওয়ার দালাল হয়েছেন!

    এমনিতেই ২০০৭ সাল থেকে (আসলে ২০০৪ সালে সিপিডির সৎপ্রার্থী আন্দোলনের সময় থেকেই) তিনি বাংলাদেশে ভারতের লুটে নেয়া স্বার্থ হাসিল বা পাইয়ে দিবার ক্ষেত্রে সরাসরি এজেন্টের ভুমিকায় নেমে গেছিলেন। যেটা এখনও নানা উছিলায় ও ডালপালায় সক্রিয় আছে। যেমন বাংলাদেশ থেকে ভারতকে বিনা পয়সায় আর বাংলাদেশের স্বার্থ ত্যাগ করে কেবল একচেটিয়া ভারতের স্বার্থে ভারতকে করিডোর পাইয়ে দিবার পক্ষে তিনি এক নম্বর ওকালতকারি।  এমনকি যারা ভারতকে করিডোর দিবার বিপক্ষে তাদেরকে তিনি প্রকাশ্য সভায় ‘অশিক্ষিত’ বলেছেন; এতই ঘামন্ডি আত্মদর্পী তিনি। দেখুন ১। ট্রানজিট বিরোধিতাকে ‘অশিক্ষিতদের বিতর্ক’ বললেন রেহমান সোবহান; ২।  “Bangladesh is the only country to see debate over transit, which is very usual through borders,” ……“I think it’s a debate of ignorant people,”। 

    এগুলো হল এখন তাঁর ক্রেডেনশিয়াল; বিরাট অর্জন!!! বাংলাদেশে এই লবি আর দালালি করে দিয়েই তিনি শেষ জীবনে সিপিডি [CPD] কে খাড়া করেছেন। এটা নাকি তাঁর যোগ্যতা!! আর প্রতীকিভাবে বললে যেমন ধরেন মুচকুন্দ দুবে যিনি ভারতের এক সাবেক আমলা কূটনীতিক; বাংলাদেশে এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুত ও বলা যায় যিনি প্রো-কংগ্রেসী। তিনি একালে ঢাকা আসলে পরে রেহমান সোবহান তাঁকে নিয়ে যেন পবিত্র তীর্থে যাচ্ছেন এভাবে তাঁরা দুজনে প্রথম আলোর অফিসে এসে মতিউর রহমানের সাথে মোলাকাত করবেন! আবার অনেকে বলেন, প্রথম আলো আর সরকারের মধ্যে যে টেনশন বা যেমন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অনা-আমন্ত্রণ বা ঢুকতে না দেওয়া এসব পেরিয়ে তাদের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারি হলেন রেহমান সোবহান! ইত্যাদি।

    কিন্তু কেন এই লেখাঃ
    উপরে এতক্ষণ যা যা লিখেছি তা বলার জন্য  মূলত এলেখা লিখতে বসি নাই।  সেগুলো পটভুমি মাত্র! আর এখন সেই মূল প্রসঙ্গে যাব।  সম্প্রতিকালে রেহমান সোবহান এক মহৎ কর্ম করেছেন!!
    গত দুবছর একটু একটু করে এবছরে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর দুর্দশায় নিমজ্জিত; এটা সারা দেশের লোক টের পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যেকটা বাণিজ্যিক ব্যংক ব্যাপক অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর ভারে ডুবে আছে। যদিও কম বেশী আছে যা থেকে দুর্বল আর সবল ব্যাংক এর ধারণা টানা হয়েছে। যেখান থেকে মূল সমস্যাটা হল, প্রত্যেকটা ব্যাংক তার আমানত মানে আম পাবলিকের জমা টাকা খেয়ে ফেলেছে – অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর সংকট কথাটার প্রকৃত অর্থ এটাই। তাই মিডিয়া রিপোর্ট আসছে যে প্রায় প্রত্যেকটা ব্যংকই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে টিকে আছে, প্রতিদিনের দায় মিটাচ্ছে। এই সময় রেহমান সোবহান এক সভায় বক্তৃতায় বলেছেন, “দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান”। খোজ নিয়ে জানা গেল এমন কথা তিনি ২০১৮ সালেও একবার বলেছেন। দেখুন, ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি জিয়ার আমলে শুরু: রেহমান সোবহান।

    কোন একাদেমিক বা গবেষকের জন্য এমন বক্তব্য অপরাধমূলক; এক ক্রিমিনাল বক্তব্য। জনমানুষকে বিভ্রান্তকারি বক্তব্য। কেন এমন বলছি??

    তাঁর এই বক্তব্যকে দুভাবে দেখব। এক,  বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি এদের বিতর্ক-ঝগড়া কোন সিরিয়াস আলোচনায় আনার যোগ্য নয়। যদিও তাদের এমন ঝগড়া কালচারে পরিণত হয়েছে। আমরা এক্ষেত্রে বড়জোড় যা পারি তা হল, কোন সিরিয়াস আলোচনায় অথবা একাদেমিক টেবিলে বা জগতে এসব তর্ক-কে না আনতে পারি; এড়িয়ে যেতে পারি। অর্থাৎ ইতিবাচক  ও অর্থপুর্ণ আলোচনার তাগিদ থাকলে কোন একাদেমিশিয়ানের এই বিতর্ক-ঝগড়া সচেতনভাবেই টেবিলে আনার কথা না বরং এড়িয়ে চলার কথা। কিন্তু আমরা দেখছি রেহমান সোবহান এটা এনেছেন। ১৯৮০-৮১ সালের ঘটনাকে লীগ বনাম বিএনপির ক্যাচালের মত করে এখানে তুলে এনেছেন। কেন এনেছেন?

    কারণ দুই, তিনি বর্তমানে দুর্দশায় নিমজ্জিত অর্থনীতির এই কালে হাসিনার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ জনমানুষের ক্ষোভ বা তা থেকে উঠা হাসিনার সংকটকে লঘু করে দিয়ে চেয়েছেন। যেন বলতে চেয়েছেন যে খোদ জিয়াউর রহমানই যেহেতু এটা শুরু করেছেন আজ থেকে ৪৫ বছর আগে তাইলে আর একালে হাসিনার আর দোষ কী? কিন্তু আসলেই কী তাই যে, জিয়াই খেলাপী ঋণের কালচার সৃষ্ট করেছিলেন কী?

    অন্যদিকে আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখছি কথাটা হাসিনা, ওবায়দুল কাদের বা লীগের কেউ রেহমান সোবহানের এই চাতুরিকে প্রশ্রয় দেয় নাই, পিক-আপ করেই নাই। যাকে বলে লীগের কেউ এতে মাতে নাই!!! কেন? খুব সম্ভবত হাসিনা খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনাতেই ঢুকতে চায় নাই। কারণ তিনি জানেন প্রায় প্রত্যেকটা ব্যাংকই অনাদায়ী খেলাপি ঋণের দুর্গতি আটকে আছে। শুধু তাই না এই খেলাপিরা সোজা বা ঘুর পথে সরকারী দলের বা আড়ালে থেকে সুবিধা খেয়ে নিয়েছে।  আসলে এগুলো আদায় করার মুরোদ সেটা সরকারেরও নাই!  আর সবচেয়ে বড়কথা ঋণগুলো যারা নিয়ে ভেগে গেছে এরা বেশির ভাগই তার দলীয় নেতা বলে সরকার এদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। খুব সম্ভবত এটাই সরকারের মূল্যায়ন!

    কিন্তু রেহমান সোবহানের এনিয়ে এত তাগিদ উতলা কেন?
    এলেখাতেই শুরুতে বলেছি, হাসিনা তাঁর বাবার আমলের লোক, শেখ মুজিবের সাথে কাজ করেছেন স্মৃতি আছে এমন ব্যক্তিত্বদের একালে  পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া তিনি করেছেন। আবার আরেকটা ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহানের পেশাগত এক বড়ভাই আছে। নাম প্রফেসর নুরুল ইসলাম (গতবছর ২০২৩ সালে মারা গেছেন)। যিনি ১৯৭২ সালে গঠিত সরকারী পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট। কথাটা একটু বুঝায়ে বলতে হবে। সোভিয়েত ভাষ্য বলে থাকে যে তারা পরিকল্পিত অর্থনীতি করে থাকে। তাই পরিকল্পনা কমিশন বা মন্ত্রণালয়, সেখানে এটা খুব গুরুত্বপুর্ণ। সেই আদলে, আমাদের পরিকল্পনা কমিশনের তখন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট আর প্রেসিডেন্ট পদ ছিল। পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রীই কমিশনের প্রেসিডেন্ট হতেন। আর এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন (একালের হিসাবে যেটা পরিকল্পনামন্ত্রী পদ) তবে এটা টেকনিক্যাল পোস্ট – আর এই নুরুল ইসলাম ছিলেন সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট।

    এখন আওয়ামি আমলে কথিত আছে যে পাকিস্তান আমলে এই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম আর জুনিয়র রেহমান সোবহান এরাই নাকি শেখ মুজিবের ১৯৬৬ সালের ছয়দফার প্রনেতা বা ড্রাফটকারি। শুধু তাই নয় এরাই দুই পাকিস্তান অংশের অর্থনীতির দশা ইকোনমিক ডাটা ব্যবহার করে তুলে দেখিয়েছিলেন যে তুলনায় পুর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত ও অসাম্যের শিকার!  সেকালের এসব ততপরতা থেকেই এরা নিজেদের হিরো ভাবতে ভালবাসেন আর তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিব ঘনিষ্ট ছিলেন। তাই সেকাল থেকেই এই ক্রেডিট কিছু বিনিময় মূল্য কিছু বিশেষ করে রাখা ইত্যাদি তারা তাদের শেষ জীবন্বের মরিয়া হয়ে চেয়ে থাকেন।  কিন্তু সমস্যা হল, আগেই বলেছি বাংলাদেশের শুরুতে কথিত ঐ  সমাজতান্তিক অর্থনীতি দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে শেষ হলে শেখ মুজিব তাজউদ্দিন সহ সকলকে পদচ্যুত করেন, মানে পদত্যাগ করতে বলেন। এতে তাদের স্বাধীনতা-পুর্ব সব ক্রেডিট কালো হয়ে যায়।  অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম এর কেসটা আবার আরো খারাপ। কারণ, তিনি সেকালের অর্থনৈতিক দুর্দশা আর দুর্ভিক্ষের মধ্যেই বা কিছুটা আগেই (সম্ভবত সেপ্টেম্বর ১৯৭৪) বিদেশে জাতিসংঘের [FAO] er চাকরি নিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। যেটা শেখ মুজিবকে আহত করেছিল। আবার বলা হয় একবছরের ছুটি নিয়ে গেলেও আর ফিরে আসেন নাই।
    অথচ বিদেশি চাকরি শেষ করে গত কয়েক বছর ধরে তিনি দেশে এসে হাসিনার মন, দৃষ্টি ও স্বীকৃতি পেতে কোন কিছুই করতে বাদ রাখেন নাই। উদ্দেশ্য একটাই হাসিনা যেন স্বাধীনতা-পুর্ব অবদানের ঘটনায় তাদের স্বীকৃতি দেন। কিন্তু তাঁর দেশত্যাগ ও শেখ মুজিবের আহত হওয়া; আর ওদিকে এমনকি অনেকে দাবি করেন ১৯৭৪ সালে তাজউদ্দিননের পদত্যাগ উত্তরকালে শেখ মুজিব নুরুল ইসলামকেই নাকি অর্থমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুরুল ইসলাম তখন দেশত্যাগে ব্যস্ত। খুব সম্ভবত, সমাজতন্ত্রী করতে গিয়ে দেশকে দুর্ভিক্ষে ফেলা আর নুররুল ইসলাম-সহ এমন তাদের অন্যান্যা সহযোগী অনেকেই নিজ উন্নতির লক্ষ্যে হারিয়ে যান। (যেমন আনিসুর রহমান, মোসাররফ ইত্যাদি অনেকেই যেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম  সম্ভবত প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ যাকে জিয়া নিজ ক্যাবিনেটে শিল্পমন্ত্রী উপদেষ্টা করে রেখেছিলেন, যিনি বিশেব্যাংকের অনুদানে ঢাবিতে আইবিএ প্রতিষ্টান সাজিয়ে নেন। ) এসব বিবেচনা থেকেই শেখ হাসিনা সমাজতন্ত্রী অর্থনীতিবিদ এই গোষ্ঠির কাউকেই কোন আনুকুল্য বা কোন বিশেষ সম্মন্ননা জানাতে এখনও কারও প্রতি রাজি হন নাই। হাসিনার এই মুল্যায়ন খারাপ বা ভুল তা বলা কঠিন; বা অন্যভাবে বললে, এমন বলার মত যথেষ্ট পয়েন্ট আমাদের হাতে নাই। বিরাট জ্ঞানীরা দেশে দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে দিয়ে কেটে পড়বেন বা কোন দায় নিবেন না, রিকভারিতে হাত লাগাবেন না – তো এরা তাহলে দেশের জন্য কারা? রেহমান সোবহানও পরের পাঁচ বছর বিদেশে চাকরিতে ছিলেন।

    তামাসার কথাটা হল, গত বছর নুরুল ইসলাম মারা [৯মে ২০২৩] যান, য়ার এতে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে যে শোক সভা ডাকা হয়েছিল সেখানে উপস্থিত প্রগতিশীল গোষ্ঠির তরফ থেকে তাতে বক্তারা সবাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে হাসিনাকে দুষে কথা বলেছিলেন। এখানে   এখানে  এখানে দেখুন।    এছাড়া দেশে ফিরার পর থেকে নুরুল ইসলাম মৃত্যুর আগে পর্যন্ত  তার আক্ষেপ ছড়িয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিয়ে গেছিলেন। যার সর্বশেষটা সম্ভবত এইটা। আর এতে লক্ষ্য করা যায় কেউই সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির দুর্ভিক্ষ এই পরিণতি নিয়ে, এর দায় নিয়ে কোন প্রসঙ্গই তুলেন নাই। আমার ধারণা অন্তত একারণে, তারা কোন কিছুর বিশেষ প্রাপ্তির দাবিদার হওয়াটা নিজেরাই ম্লান করে দিয়েছেন! আবার নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে খোদ রেহমান সোবহানের লেখাটাও এখানে দেখতে পারেন।

    তবু এই লেখায়  মুলকথাটা হল, রেহমান সোবহান এর ভাষায় তার “কমরেড” নুরুল ইসলামকে হাসিনার পাত্তা না দেয়া বা নিরুত্তাপ থাকা – এটা দেখার পরও মনে হচ্ছে রেহমান সোবহান হাসিনার মত পেতে হাল ছাড়তে রাজি না। তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, তাঁর লাস্ট ট্রাম্প হল – দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান -একথাটা রটায় দিলে নিশ্চয় হাসিনা এবার তাঁকে কোলে তুলে নিবেনই!!! কিন্তু হায়!  রেহমান সোবহানের পোড়া কপাল, তেমন কিছুই ঘটে নাই! হাসিনাও একথা তুলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে কোন ব্যাশিং করতে যান নাই!

    তবে মূল প্রশ্ন, আসলেই কী জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক? নাকি এই বক্তব্য রেহমান সোবহানের এক অসৎ কাজ – এক ইন্টেকচুয়াল অসততা?
    প্রথম কথা হল জিয়ার আমলে ঋণ খেলাপীর ঘটনা ঘটেছে।  কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এমন ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার ছিলই না।  এই সিদ্ধান্ত ছিল খোদ বিশ্বব্যাংকের।
    এর প্রমাণ, আমি নিচে বাংলা অর্থসুচক পত্রিকা থেকে রেহমান সোবহানের এই বক্তব্য নিয়ে ছাপানো রিপোর্ট উঠিয়ে এনেছি আর নিচে সেঁটে দিয়েছি।  ওখানে দেখা যাচ্ছে রেহমান সোবহান বলছেন, “বিশ্বব্যাংকই এই ঋণদানে চালিকাশক্তি। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে”
    ।

    “সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেশে খেলাপি ঋণের জনক হিসেবে আখ্যা দিয়ে রেহমান সোবহান বলেন,
    ওই সময় বিশ্বব্যাংকও খেলাপি ঋণ তৈরিতে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের দিকে তাকানো হয়নি।
    শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের খেলাপি
    ঋণ বেড়ে গেলে বিশ্বব্যাংক একটি কথাও বলেনি, যদিও পরবর্তীকালে তারাই খেলাপি ঋণের বিষয়ে সোচ্চার…”

     

    পয়েন্ট দুইঃ
    রেহমান সোবহান কী চেক করেছেন কোন কোন ব্যাঙ্ক এমন ঋণ বিতরণ করেছে যা খেলাপি ঋণ হয়ে গেছিল?

    এর জবাবটা রেহমান সোবহান  নিজেই সম্ভবত অজান্তেই আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন।

    ১। সেকালের খেলাপি ঋণ যে ব্যাংকের সে ব্যাংকের কার আমানতের অর্থ এটা?
    রেহমান সোবহান নিজেই বলেছেন এগুলো – “শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে” -সেই ঋণ।  এখন শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার যে ঋণ দিয়েছে খেলাপি হয়ে যাবার জন্য সেই অর্থ মানে ব্যাংকের আমানত কাদের অর্থ? কারা এদুই ব্যাংকে অর্থ রেখেছিল, অর্থ আমানত রেখেছিল যাতে তা ঋণ হিসাবে বিতরণ করা যায়? [যে ঋণ পরে অনাদায়ী খেলাপি ঋণ হয়ে যায়?]। এর জবাব হচ্ছে,  এই অর্থ আম পাবলিকের কারও না। সরকারেরও না।
    কারণ শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা – এদুই নামে এরা ব্যাংক হলেও এদের গ্রাহক বা সেবা-ক্রেতারা সাধারণ মানুষ নয়। এদুই ব্যাংকে কোন সাধারণ মানুষ বা স্বল্প আয়ের মানুষের একাউন্ট নাই। তাই এমন আম নাগরিকের কোন অর্থ এখানে রাখা নাই, একাউন্ট খুলে দেয় না। এদুই ব্যাংক কেবল মাত্র যারা সম্ভাব্য উদ্যোক্তা যারা শিল্প- কারখানা গড়বেন তাদেরকে ঋণ দেওয়া ও ফেরত নেওয়ার ব্যাংক। কেবল এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আমানত ও একাউন্ট আছে। এককথায় এগুলো বিশেষায়িত ব্যংক। যাদের সার্ভিস-ক্রেতা জনসাধারণ নয়। কেবল সম্ভাব্য শিল্প উদ্যোক্তারাই এর খাতক। তাও আবার এই খাতকেরা কিন্তু এই ব্যাংকে তাদের নিজের অর্থ আমানত হিসাবে রাখতে আসেন নাই।

    এখন আসেন আরো সরাসরি প্রশ্ন তাহলে,  এই দুই ব্যাংক তাহলে ঋণ দিবার মত অর্থ কোথা থেকে পায়? কারা এই অর্থদাতা?

    এর জবাব হল, এই অর্থই বিশ্বব্যাঙ্ক আমাদের সরকারের মাধ্যমে দুই বিশেষায়িত সরকারী ব্যাংক শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা কে দিয়েছে; যাতে এদুই ব্যাংক সিলেক্টেড উদ্যোক্তা যাদের ঋণের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে তাদেরকেই কেবল বিতরণ করবে এমন ব্যাংক। এর মানে সোজা ভাষায় হবু শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে বিতরণের জন্য দেয়া এই অর্থ যা, না আমাদের সরকারী অর্থ, না তা কোন সাধারণ মানুষের অর্থ। অর্থাৎ এই ঋণদান শেষে খেলাপি হয়ে গেলেও এর দায়ভার সরকারের নয়।  এসবের প্রকৃত কারণ এটা ছিল বিশ্বব্যাংকের এক এক্সপেরিমেন্ট প্রকল্প এর ঋণ যে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ঘটাতে গেলে তাদেরকে কিভাবে আগাতে হবে এজন্য তাদের বুঝাবুঝি শক্ত করার প্রকল্প এটা।

    বিশ্বব্যাংক-কে বুঝাবুঝিঃ
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে বুঝাবুঝির সমস্যা, এটা আসলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান, এর কাজ ও ম্যান্ডেট কী এটা নিয়ে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের বুঝা-পড়া সবচেয়ে করুণ!  ব্যাপারটা তাদের কাছে নিপাত যাক বলতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ!
    তবুও সেকালের বিশ্বব্যাংক কেন এমন করেছিল তা নিয়ে আরো বিস্তারিত বুঝাবুঝি যারা প্রবেশ করতে চান তাদেরকে সত্তর ও আশির দশকের বিশ্বব্যাংককে স্টাডির বিষয় হিসাবে নিতেই হবে। এছাড়া তাদের জন্য আরেক বড়কাজ হবে – ROBERT McNAMARA  (5th President of the World Bank Group, April 1, 1968 – June 30, 1981) – এই ব্যক্তিত্বকে জানতেই হবে; তার  কাজ ও জীবনী প্রক্রিয়াকে।  তবে সাবধান; তাঁর কাজ ন্যয়সম্মত নাকি অন্যায় এসব মুল্যায়ন পাঠকের হাতেই থাক! কিন্তু ফ্যাক্টসগুলো জানা থাকতেই হবে – তাতে বা পাঠকের কাছে নেতি বা ইতিবাচক যাই হোক! এটাই আমার আবেদন থাকবে।
    কেন তাকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল? তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকান ফোর্ড মটোর কোম্পানির প্রেসিডেন্ট। পরে তাঁকে (১৯৬১-৬৮) আমেরিকান সরকারের নিরাপত্তা মন্ত্রী  [Defence Secretary] করা হয়। এরপর তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিলেন। কিন্তু কেন? কী তার এক্সপার্টিজ যা তাঁকে নিয়ে এত চাহিদা তৈরি করেছিল? খুবই সংক্ষিপ্তভাবে একটু উত্তর দেই। তিনি তাঁর বিশেষ ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটি এই সক্ষমতার জন্য বিখ্যাত বলে নিয়োগদাতারা বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আমলটাই ছিল আসলে আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের কাল। আর সবশেষে বিশ্বব্যাংকে তাঁকে আনা হয়েছিল এটা মনে করে যে তাঁর আগমনের আগে বিশ্বব্যাংক এশিয়াতে এসে ভাল কাজ করতে পারছিল না। এর সুরাহা করতে। এশিয়ায় সরকারগুলোর সাথে মিলে কোন দেশের মূল অর্থনীতি খাঁড়া করলেও এর সুবিধা নিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলের বহু গরীব লোককে তা স্পর্শ করতে পারছিল না। ঐ দেশের অর্থনীতিক কার্যক্রমে একেবারে প্রান্তিক গরীবদেরকে তাতে সামিল করতে পারছিল না। এটাই এককথায় বিশ্বব্যাংকের কর্মসুচি গ্রামের প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে সমস্যার  মুখোমুখি হচ্ছিল। এটা ভাঙতেই ম্যাকনামারার ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধি কাজে আসবে মনে করা হয়েছিল।
    তাই ম্যাকনামারার টেকনিক অনুসরণ করতে গেলে এজন্য অর্থ অপচয় কিছু হলে হোক, এই নীতি নেয়া হয়েছিল। তিনি এক নয়া টার্গেট নেন প্রান্তিক অঞ্চলে যেভাবেই হোক কম সুদের ঋণ সহজলভ্য করতেই হবে – তাতে কিছু চোর বাটপার বিশ্বব্যাংকের অর্থ মেরে দিলেও ক্ষতি নাই। একবার প্রান্তিক অঞ্চলে অর্থ (ঋণ বা মূলধন) এভেলএবল করতে পারলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি তাদেরকে ক্যাপিটালিজম এর অংশ করে ফেলতে পারলে পরে এরা নিজেরাই এগিয়ে আসবে। তাতে শুরুতে কিছু অর্থ ফেরত আসবে না, মেরে দিবে, অপচয় হবে তা হলেও কেবল শুরুতে এই পথেই আগাতে হবে। বিশ্বব্যাংক তাই অনুসরণ করেছিল। আর এসময়কালের অপচয় নিয়েই আনু মোহম্মদের মত অনেকেই সেকালের বাস্তবতায় লিখেছেন, এর অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু আশির দশকের শেষে বিশেষ করে ৯১ সালের পরে এসব এলোমেলো হয়ে থাকা অব্যবস্থা, ক্ষতি, অপচয় ইত্যাদি সবকিছুকেই কঠোর এক জবাবদীহিতার অধীনে আনা হয়। ইন্টিগ্রইটি [INTEGRITY] বা জবাবদীহিতা শাখাকে মূল আলাদা এক প্যারালাল শাখা তৈরি করা হয় যারা কেবল বিশ্বব্যাংকের বোর্ডের কাছে জবাবদীহিতা করবে। এভাবেই ম্যাকনামারার আমলের ইচ্ছা করে তৈরি কিছু আবর্জনা তখন সব সাফা করা হয়। এই পরীক্ষারই আরেক অংশ ছিল আমাদের শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা মত  প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পঋণ বিতরণ করার উদ্যোগ। যেখানে বিশ্বব্যাংকের অনেক অর্থেরই অপচয় হয়েছিল। এতে বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারের নয়, তাই এতে অনাদায়ী খেলাপী ঋণের দায়ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উপর চাপায় নাই। কিন্তু সেকথা উল্লেখ না করে জিয়াকে দায়ী করে এমন বক্তব্য দেয়া ইন্টেলেকুচুয়ালি গ্রহণযোগ্য নয়! সৎ ততপরতা নয়!

    আরেকটা কথা বলে শেষ করব, এটা মার্কসের এক তত্ব যে যেকোন দেশের শিল্পায়নের শুরুতে যে পুঁজির যোগাড় তা এসেছে অন্যের অর্থ আত্মসাত করেই বা সরকারী ট্যাক্সের অর্থ না দিয়ে সেই অর্থ মেরে দিয়ে ইত্যাদি ধরণের সব অসদুপায় ব্যবহার করেই। এটাই মার্কসের আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের তত্ব।  ম্যাকনামারার বিশ্বব্যাংক এটাকেই ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। তাই খেলাপি ঋণের নামে অর্থ লোপাট করতে দিয়েছিল।  যেমন একটা একসময়ের বিড়ি ফ্যাক্টরির কথা জানি যে ১৯৯৯ সালের ১০০ কোটি টাকা আবগারি টাক্স মেরে দিয়েছিল যা সরকারের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সে ছিল আসলেই ভাল উদ্যোক্তা। তাই সে মেরে দেওয়া সেই ১০০ কোটি সেকালের বিচারে অনেক টাকা। সেই অর্থ দিয়ে সে ছয়টা নতুন কোম্পানি খুলেছিল যার চাওরটাই ছিল কারখানা আর দুইটা মার্কেটিংয়ের। এবং সবগুলোই এখন খুবই ভাল চলে এখন সে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী। ম্যাকনামারা এই পথ ধরার পক্ষপাতি ছিলেন।
    কিন্তু ম্যাকনামারার শেষ জীবন কাটে হতাশায়। শেষ পনেরো বছর তিনি কারো সাথে দেখা করতেন না। কোন সাক্ষাতকারো না। এভাবেই তিনি ২০০৯ সালে মারা যান। কিন্তু কেন তিনি একান্তে চলে গেছিলেন সেটাই জানা জরুরি। তাঁর কোনকিছুই   গ্রহণ করে নিবার কথা আমি বলছি না। তবে তাকে বিস্তারিত জানা আমাদের অনেক কাজে লাগবে বলে আমি মনে করি।

    শেষ কথাটা হল, নিশ্চয় আমি রেহমান সোবহানকে এসব দিক জানাবার বা শিখাবার কেউ নই; আমি তুলনার অনেক ছোট্ট তুচ্ছ। তবে দাবি ও আশা করব অন্তত তিনি এসব জেনে নিয়ে তবেই না মূল্যায়ন করে মন্তব্য করবেন যে দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান – কথাটা সত্যি কিনা!! অবশ্যই আমি এবিষয়ে তাঁকে শিখাবার কেউ না, এটা আমার কাজও না। তাঁর প্রতি কোন উদ্ধত্ত দেখানো এটাও আমার জন্য হারাম। তিনি আমাদের কাছে সম্মানিত অবশ্যই! কিন্তু কম বা যথেষ্ট চিন্তা না করে কেউ একটা মন্তব্য বা কথা বলে ফেলবে এটাও আশা করি না!  অগ্রহণযোগ্য!

    ২।  এবার তুলনা করব। বাংলাদেশের এখন যে ঋণ খেলাপির ঘোরতর সমস্যা তা কী শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার এর খেলাপি ঋণের মতন?
    প্রশ্নই আসেনা। পদ্মা ব্যাংকের কথাই যদি ধরি, পদ্ম্যা ব্যাংকের খাতক আর শিল্প ব্যাংকের সেবা খাতক এক নয়। সবচেয়ে বড়কথা আমানতের প্রশ্ন। পদ্মা বা ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানত সরাসরি দেশের আম জনতার। আপনার-আমার বাসায় গৃহিকর্মী হেল্পারের কাজ যারা করে এখন গরীব মহিলাদের অর্থ। যারা মাসে দুশ-পাচশ করে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে, তাদের কষ্টার্জিত আমানত করা টাকা। আর সে টাকাই ঋণ দিয়ে খেলাপী করা হয়েছে। তাই কোনভাবেই ন্যাশনাল ব্যাংক আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক বা তুলনীয় উদাহরণ নয়। কারণ, শিল্পব্যাংকের আমানত বিশ্বব্যাংকের দেয়া আর তারা জানে এটা তাদের এক্সপেরিমেন্ট; তাই অর্থ ফেরত নাও আসতে পারে।

    তাহলে এখন প্রশ্ন রেহমান সোবহানের মত এক ব্যক্তিত্ব তিনি ন্যশনাল ব্যাংক ধরণের ক্রাইসিসে পরা ব্যাংকের খেলাপি হওয়া আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি – এদুটাকে এক করে দেখলেন কেন? কীভাবে?  এ যেন “সোবহান” যার যার নামের সাথে আছে তারা সবাই কী একই রকম ব্যবহারের হবেই? তেমনই অনাদায়ী খেলাপি ঋণ মানেই কী এমন সব কেসগুলো একই?  তাহলে  এসব ফারাক বুঝা কী রেহমান সোবহান সাহেব এর জন্য কঠিন কোন কাজ? আমরা বুঝতে অক্ষম!

    একমাত্র পথ হল, ইন্টেলেকচুয়াল সততা বজায় রেখে আমাদের সকলের কাজ-মন্তব্য করা উচিত!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     ০৩ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ৬ঃ ১৫
    এই আপডেটে মূলত -‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ নিয়ে অংশটাই একটু বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

     

     

     

  • ইরান-ইসরায়েল বিরোধের ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে অন্যান্য

    ইরান-ইsরায়েল বিরোধে,
    এই ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে আমার কিছু রিডিং
    গৌতম দাস
    ১৫ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা

    https://wp.me/p1sCvy-5wh

     

    US will not take part in any Israeli retaliatory action against Iran

     

    ইsরায়েলের উপর ইরানের হামলা আসন্ন বলে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল আর এর আগে গাজায় লাগাতর ইরায়েলি ম্যাসাকার ঘটে চলা ইত্যাদি এসব কিছুর একটা পর্যায় সম্ভবত আমরা পার হতে যাচ্ছি। বিশেষত ইরানের হামলার পরে কী যুদ্ধ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাবে – এই ছিল সারা দুনিয়া তো বটেই গ্লোবাল অর্থনীতি ও রাজনীতির মুখ্য টেনশন। এই টেনশন বা টান টান উত্তেজনার একটা আপাত পর্যায়কাল শেষ হল বলে সকলের ধরে নিচ্ছে।  বিশেষ করে খোদ ইsরায়েল বড় বাঁচা বেঁচে গেছি বলে দুর্ঘ্নিশ্বাস ফেলেছে। আর কথিত পশ্চিমা ওস্তাদদেরকে থ্যাঙ্ক জানিয়েছে। ……credited an international military coalition with helping thwart   .।
    কিন্তু আকাঙ্খা –  নানান মুসলিম-প্রধান দেশের মূলত তরুণদের পর্বত প্রমাণ ‘মুক্তির’ আকাঙ্খা মানে প্যালেসটাইনিদের জন্য সহমর্মীতা থেকে উতপন্ন যেসব আকাঙ্খা সেই আকাঙ্খা-চাহিদার তুলনায় বাস্তবে ইsরায়েলকে ইরানের শিক্ষা দেয়া মানে, মিসাইল ও ড্রোন নিয়ে হামলার কার্যকারিতা হয়ত তুলনায় কম মনে হচ্ছে! সেকারণে, অনেকেই অসন্তুষ্ট! অনেককে দেখেছি ফেসবুকে ইরানের উপরই ঝাল ঝেড়ে ক্ষোভ প্রশমণ করেছেন!
    এবারের গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় হত্যার যে অসহনীয় পরিস্থিতি ও গাজাবাসীর আত্মত্যাগ তা কী এবারও ক্ষতি বেশী লাভ তুলনায় কম হয়েই থাকবে?

    আগেই মূলকথাটাই সরাসরি বলে নেয়া যাক; প্রসঙ্গের ভিতরে ঢুকে বিস্তারে যাবার আগেই। আরব-ইরায়েলের যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-রক্তাক্ত সংঘাত সেই ১৯৪৮ সালে ইsরায়েল – এই দানব রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই। অথচ প্রকৃত ও শুরুর দ্বন্দ্বটা ছিল ইsরায়েলের সাথে পশ্চিমাস্বার্থের, পশ্চিমা দেশগুলোর। বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে ইউরোপ থেকে ইহুদিবিরোধী চরম মনোভাব বা জর্মান-কেন্দ্রিক নির্মুলের [cleansing] মনোভাব থেকে।  তাই ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি জনগোষ্ঠি শেষে সারা ইউরোপ ছেড়ে পুনর্বাসিত হতে  দখলীকৃত প্যালেস্টাইনী ভুমিতে ইsরায়েল রাষ্ট্র জন্মাক, গড়ে উঠুক – এটা চেয়ে আমেরিকার নেতৃত্বে সারা পশ্চিরা সরকারগুলো এই ভূমি দখলী কাজে ইsরায়েলকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তা-সমর্থন করেছিল। এভাবেই নিজেদের পাপ ও অপরাধ তারা মুসলমান উপরে সঁপে দিয়েছিল!

    হিটলার ইউরোপ থেকে ইহুদি জনগোষ্ঠি নির্মুল-নিধনের এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর অপরাধ করেছিলেন। এই নৃশংস ঘটনায় কোন মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্র বা কোন মুসলমান জনগোষ্ঠি একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয় বা কখনও  কোন দৃশ্যপটেই ছিল না। মূলত জর্মান থেকে তাদের নির্মুল ও বের করে দেওয়া হলেও যেহেতু আরব বা প্যালেস্টাইন ভুমিদখল করে তাদের ঘাড়ে চড়ে সেখানেই ইহুদিদের বসতি গড়তে ঠেলে দেয়া হয় তাতে ইহুদিরাও আর সারা ইউরোপ বা আমেরিকাকে আর শত্রু ঠাউড়ালো না। নয়া শত্রু ঠাউড়ালো আরব বা মুসলমানদের।  যে নয়া শত্রুর ভুমি ইহুদিরাই দখল করেছিল। আর দখলিকাজে পশ্চিমারা ইহুদিদের সাহায্য-সহায়তা তাদের করেছিল বলে ইহুদিরা নিজেদের আসল শত্রুদের ভুলে যায় ও মাফ করে দেয়। অথচ জন্ম থেকেই খৃশ্চান ধর্ম বা এর অনুসারীরা ইহুদিদের শত্রু হয়েই জন্মেছিল – ইহুদি-খৃশ্চান বিরোধ তাই তখন থেকেই।  তা সত্বেও  ওদিকে যারা কিছুই করে নাই সেই মুসলমান বা আরবেরা হয়ে যায় ইহুদিদের নয়া টার্গেট, নয়া মূল শত্রু!

    এ যেন বাইরে ব্যাপক মার খেয়ে এসে হতাশ পুরুষের বাসায় ফিরে মনের সুখে  বউ পিটানোর বিপ্লবীপনা!! ইহুদিরা যদি প্যালেস্টাইনিদের উপর তাদের ভুমিতে জবরদখলি করে পুনর্বাসিত না হয়ে যদি, ইউরোপের কোন ভুমিতেই নয়া আবাস গড়ত হত তাহলে যারা ইহুদি এথনিক ক্লিনজিং এর হোতা তাদের সঠিক ভাবে অপরাধের প্রতিকার হত!!
    অথচ নয়া ঠাউড়ানো শত্রু মুসলমানদের উপর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের অত্যাচার এখনও চলছে; আর এটাই এখন আর কোন আরব রাষ্ট্রই দায় নিতে চায় না; একে কেকে সবাই কেটে পড়েছে আর যেন সব দায় সওয়ার হয়েছে ইরানের ঘাড়ে। আর সেটাই একালে ইরান-ইsরায়েল বিরোধ-সংঘাত হিসাবেই হাজির! গত ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর থেকে কোন মুসলমান রাষ্ট্র আর প্যালেস্টাইনের পক্ষে লড়াইয়ে লক্ষ্যহীন হয়ে সক্রিয় থাকতে চায় নাই ; আরব জাতিবাদের পক্ষের রাষ্ট্র বলেও কেউ আর থাকতে চায় নাই। আরব জাতিবাদের পরিচয় ফেলে সবাই সেই থেকে নিজ নিজ আরব পরিচয় পিছনে ফেলে নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রের জাতিবাদ [আরব জাতিবাদের বদলে সিরীয় বা মিসরীয় জাতিবাদ হয়ে গেছে] বলে পরিচয় বদলে নিয়েছিল। আর এঘটনারই আরেক ভাষ্য হল, আরাফাতের পিএলও [PLO] বা পিএফএলপি [PFLP] নামে যত বিপ্লবী যোদ্ধা ছিল সেসব হারিয়ে এখন মূখ্য নাম ইরান-সমর্থিত হামাস [HAMAS]! প্রথম দিকে হামাস এরা ইসলামি দল বলে প্রগতিশীলেরা নাক শিটকালেও এখন বাস্তবতা হল, হামাস ইসলামিস্ট কিনা সেই আপত্তি তলিয়ে গেছে – বাস্তবতায় মুরোদ দেখানোর সক্ষমতার বিচারে হামাস হল  এক সাহসী লড়াকুর নাম!  এরাই একমাত্র – ভুলে যাওয়া প্যালেস্টাইনদের লড়াইকে আবার চাঙ্গা করেছে! সামনে এনেছে! যদিও পথটা খুবই কঠিন ও চড়া মূল্যের। ইতোমধ্যেই তেত্রিশ হাজারের উপর জীবন, গাজাবাসীকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু তবু মুখ্য সাফল্য হল, ভুলিয়ে দেয়া লড়াইকে আবার সামনের কাতারে হাজির করা গেছে।  এবারের লড়াই-সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই। একে তুচ্ছ করা খাটো করে দেখা অপরাধ হবে! সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করব, আকাঙ্খার তুলনায় এই অর্জন হয়ত কম মনে হতেই পারে! কিন্তু দেখা-বিচারের ক্ষেত্রে একে যেন খাটো করে দেখা না হয়। ছোট করে না দেখা হয়। কারণ, এই অর্জনের তাতপর্য ব্যাপক!

    ইতোমধ্যে এতদিনে অন্যদিকের আরেক ডেভেলবমেন্ট হল, আমরা জানি চলতি নয়া শতকে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার বলে একটা অনুভব ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে; এই বলে তাদের মুক্তি – গ্লোব-জুড়ে তাদের মুক্তির আকাঙ্খা এখন অনেক দূর ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বুশের ওয়ার অন টেররের আমলে তাদের উপর আক্রমণ, সীমাহীন বৈষম্য অন্তহীন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমাদের মত দেশে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত বলে তাদের মুক্তি চাই বলে যতই চিতকার উঠুক – তা বাস্তবায়িত হবে ততটুকুই যতটুকু  এখনকার দুনিয়ার মূল দ্বন্দ্ব-বিবাদে ও মেরুকরণে  ইসলামি আকাঙ্খা কতটা বাস্তববাদী হয়ে প্রধান দ্বন্দ্বে ভিতরে নিজেকে সফলভাবে গেঁথে দিতে / নিতে পেরেছে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা খুব গুরুত্বপুর্ণঃ
    ইরান কেন আরো বেশী করে ইসরায়েলের উপর আমাদের তরুণের আকাঙ্খা পূরণের মত আক্রমানাত্মক হতে পারলো না? – এটাই এখনকার  এক প্রধান জিজ্ঞাসা! অনেকে মনে করছেন ইরান ভিতু, কম মুরোদের কিংবা ওরা শিয়া বলে নেতৃত্ব দিতে পারল না!
    কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এগুলো একটাও সঠিক না। বিষয়টা সঠিক বুঝবার এপ্রোচ নয়!  তাহলে কীভাবে বুঝব কোনটা সঠিক? তরুণের আকাঙ্খা কী এভাবে মার খেতেই থাকবে?

    না, অবশ্যই না। তবে এসব ঘটনা বুঝবার পদ্ধতি না জানা থাকলে এমন অপ্রয়োজনীয় দোষারোপ চলতেই থাকবে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা এসব এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি। প্রধান দ্বন্দ্ব মানে?
    একটা সমাজ, রাষ্ট্রে বা এমনকি একটা পরিবারে অনেক ধরণের স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা সমস্যা থাকে। একটা পরিবার দিয়েই যদি বলি ধরা যাক – অনুমিত এমন পরিবারে ধরা যাক দু-তিন ভাইবোন আর বাবা-মা নিয়ে সংসার; যেখানে বাবা চাকুরিজীবী মানে যার আয়ে ঐ সংসার। এখন ঐ বাবার চাকরি টিকিয়ে রাখা, তিনার নিজে সক্ষম থাকা ফিট থাকা এটাই সেখানে প্রধান স্বার্থ। এর বাইরে ধরা যাক বড় ছেলে রাজধানীতে গিয়ে ইঞ্জিয়ারিং পড়তে চায় আর এই লক্ষ্যে কলেজ স্তরেই তাকে ভালো টিউশন শিক্ষক মানে পড়ালেখায় বিনিয়োগ দেয়া জরুরি।  কিন্তু এই চাহিদা-আকাঙ্খা কোনভাবেই বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থ যেটা ঐ পরিবারের এর চেয়ে বড় হতে পারবেই না। ছেলের স্বার্থই প্রধান এমন গুরুত্বপুর্ণ জিনিষ হতে পারবে না। একইভাবে অন্য ভাইবোনদেরও পড়ালেখা বেড়ে উঠার যেসব চাহিদা-আকাঙ্খা আছে সেগুলো পুরণ হওয়া এটাও বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারবে না।  এমনকি মায়ের কোন অসুস্থতাও না। বাবার ফিট থাকা প্রধান স্বার্থ কারণ, বাবাটাই প্রধান বা পরিবারে একমাত্র আয় আনবার ব্যক্তি। বাবা না থাকলে পরিবার পথে বসবে।

    আমাদের বর্তমান দুনিয়া ইতিমধ্যে (মূলত অর্থনৈতিক কারণে) এতই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে একালে যে কোন কিছুই আর লোকাল-আঞ্চলিক বিরোধ দ্বন্দ্ব নয়। সব দ্বন্দ্বই মিটাতে গেলে সমাধান পেতে চাইলে তা গ্লোবাল ইস্যু হয়ে যায়। কিন্তু গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব আরেক জিনিষ, আরেকটা ইস্যু। তাই সব লোকাল ইস্যুকেই সবার আগে গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্বে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতেই হয় – এক মেরুকরণে অবস্থান নিতে হয়। প্যালেস্টাইন ইস্যু বা আরব স্বার্থ বা মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা যেটাই হোক তা মিটতে পারে তাই গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব মিটা বা সমাধান কিভাবে হবে সেই সাপেক্ষে।  প্রধান দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে  মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা পূরন হতে পারবে না।

    গ্লোবাল পালাবদল এর সময়কালেঃ
    আসলে, গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব-বিরোধ হল যে এটা পালাবদলের কাল, মানে গ্লোবাল নেতৃত্বেই এখানে পালা বদল আসন্ন। গত প্রায় আশি বছরে ধরে আমেরিকা যে গ্লোবাল নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে তা পরিবর্তিত হতে চাইছে – উদিয়মান চীনের হাতে। তাই চীনকে এখন এক নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ ঘটাতে নামতেই হচ্ছে।
    মধ্যপ্রাচ্য নীতি বা মিডল-ইস্ট পলিসি অর্থে কথাটা তুলছি। ১৯৭৩ সালের শেষে কিসিঞ্জার আমেরিকান মিডল ইস্ট পলিসি দিয়েছিলেন যা এতদিন ধরে আমেরিকা নিজ স্বার্থ, রাজত্ব সামলিয়েছে। এটা মুখ্যত গালফ রাজতন্ত্রগুলোকে নিজের পক্ষে দাঁড় করিয়ে আমেরিকা এদের ব্যবহার করে গেছে।
    কিন্তু একালে কখন চীন মধ্যপ্রাচ্য এর ভিতরে ঢুকে গেছে আর সব মেরুকরণ উলটে দিয়েছে বাইডেনের আমেরিকা তা টের পাবার আগেই কাজ শেষ করেছে। আমেরিকান ব্যর্থতার শুরু এখান থেকেই। সবচেয়ে দৃশ্যমান হল, ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে লাগাতর সৌদি-ইরান বিরোধ। আমেরিকা এই বিরোধকে আরো উস্কে তুলে সৌদিদের সুরক্ষা দিচ্ছে এই ভান করে আমেরিকা নিজের পক্ষে মানে ইরানকে দাবড়ে বা বঞ্চিত রাখতে এর সুবিধা ব্যবহার করে গেছে। কিন্তু কখন চীনা মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান নুন্যতম একসাথে কাজ করতে সম্মত এমন কূটনীতি-ব্যবসা বিনিময়ে নয়া পথ খুলে ফেলেছে তা আমেরিকা যখন টের পেয়েছে তা অনেক দেরি হয়ে গেছে। চীনা নয়া মেরুকরণে, তুরস্ক, ইরান আর এদিকে মালয়েশিয়া ইত্যাদি মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্রগুলো একটা কমন রাজনীতি নীতিমালা যেন অনুসরণ করতে পারে এমন কাছাকাছি চলে এসেছে।
    আবার ওদিকে নয়া আফগানিস্থানে দেখেন;  আমেরিকা বিতাড়িত করে সদ্য মুক্ত আফগানিস্তানে তা-লে-বা-নদের সাথে চীন নয়া ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আফগান মাটির নিচের কেবল দামি পাথর উত্তোলন ও তা বাজারজাতকরণ ঘটিয়েই চীন আফগান অর্থনীতি উজ্জ্বল করে দিয়েছে। যদিও বিনিময়ে চীনা রাজনৈতিক  চাহিদা ছিল একটাই যে,  আফগান শাসকদেরকে তাদের দেশের ভিতরে আশ্রয় নেয়া আইএস-কে [খোরাসান] দূরে ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যারা মূলত সশস্ত্র চিনা উইঘুর গোষ্ঠির আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষক!  আর ওদিকে  আইএস-কে এখন প্রায়ই গোপনে আমেরিকা পক্ষ হয়ে (এমনকি সময়ে ভারতেরও হয়েও) খেপ মারা এসাইমেন্ট (বোমাবাজি বা হত্যার) করে দেয়। [সম্প্রতি রাশিয়ায় গানের কনসার্টে হামলার ক্ষেত্রে এরা সি আইএ এর হয়ে কাজ করেছে বলে পুতিনের অভিযোগ অনুমান।]।  হিলারি ক্লিনটনের আমলে এরাই একইভাবে ঠিকা নিয়ে লিবিয়াকে তছনছ করে রাস্তায় গাদ্দাফিকে লিঞ্চিং করেছিল। কিন্তু সবটা লাভ হয় নাই। এরাই শেষে বেনগাজি আমেরিকান এমবেসিতে রাষ্ট্রদুত-সহ সকল স্টাফকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিল!

    আবার দেখেন, বাইডেনের প্রথম তিন বছরে,  ইরানের উপর আমেরিকা নিরন্তর ডলার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে পঙ্গু করে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে। এর বিপরীতে চীন ইরানি তেল কেনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছে, বিভিন্ন পণ্য বিনিময়, চীনা বিনিয়োগ আর চীনা ইউয়ান ব্যবহার করতে দিতে দিয়ে চীন ইরানকে এক বিকল্প দুনিয়ার সন্ধান করে দিয়েছে। সারকথায় সব মিলিয়ে এক নয়া ভারসাম্যে নয়া মেরুকরণের মধ্যপ্রাচ্য – এই অর্থে এক নয়া গ্লোবাল অর্ডারের ইঙ্গিতও এখানে আছে। আর এর ভিতর দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রস্বার্থগুলো যখন নিজেদের মধ্যেকার স্বার্থ-বিরোধকে যদি সামলে রাখতে পারে তরে সকল রাষ্ট্রই এক এক নয়া মুক্তির দিশা – টানেলের প্রান্তে আলো দেখতে পেতে পারে। এই হল এর সারকথা।   সৌদি আরবও তার ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমানের কেবল তেলবিক্রির উপর নির্ভরশীল এমন  একচেটিয়া নির্ভর করা দেশ নিজ অথনীতিকে তেলের বাইরে এক নয়া অর্থনৈতিক ভিত্তির সৌদি হয়ে উঠতে -যুদ্ধ সংঘাত টেনশেন ও অস্থিতিশীলতা পাশে ফেলে নিজ আকাঙ্খা পূরণ করতে পারে – চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে সৌদি এখান থেকে দেখছে।
    একটা সাবধানবাণী দিয়ে রাখি।
    এটা চীনপন্থি হওয়া নয়; তা হয়েছে বা হতে ইঙ্গিতও দিচ্ছি না।  সারকথাটা হল, গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল হঠাত সহসা ঘটে না। তবে এখন এটা আসন্ন, তাই সবাই এর সুযোগ নিতে চাইছে – এতে আমেরিকার বিকল্প যে কোন নেতৃত্বের বেলাতেই এমনই ঘটবে। এতে সব রাষ্ট্রই পুরানা বৃত্ত পুরানা রেস্টিকশন বা টেনে দেওয়া সীমা ভেঙ্গে – নয়া কোন ভারসাম্য নিজের পক্ষে গড়ে নিবার সুযোগ হিসাবে দেখবেই। তাতে এই বিকল্প এটা চীন কী না – আমি বা আপনি চীনকে ভালবাসি পছন্দ না ঘৃণা করি বা ভক্ত? সেসব বিচার এখানে একেবারেই গৌণ! এককথায় একমাত্র নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই এখানে প্রধান এক্টর!!
    শেষের ঘটনা দিয়েই যদি বলি, সংকীর্ণ আত্মস্বার্থে পলায়নপর গালফ স্টেট এর লজ্জাজনক ২০২০ সালের কাজ ছিল তথাকথিত আব্রাহাম একর্ড [Abraham accords ] নামে ইরায়েলের সাথে নিজ  নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের প্রটেকশন চুক্তিতে যাওয়া। দুবাই ও বাহারাইন [UAE and Bahrain ] প্যালেস্টাইনিদের ভুলে গিয়ে ই-রায়েলের সাথে এই আপোষ চুক্তি করেছিল।  যেখানে দুবাই ছিল আসলে সৌদি আরবের এডভান্স পার্টি। মানে সোদিদের এই আপোষপথ অনুসরণ করার কথা ছিল। এনিয়ে দ্বিপাক্ষিক সৌদি-ইওরায়েল বৈঠকও চলমান ছিল। কিন্তু গত বছর এপ্রিল ২০২৩ সালে সব উলটে যায়।

    The United Arab Emirates and Bahrain made peace with Israel in 2020 through
    the so-called ‘Abraham accords’ and Saudi Arabia was considering following
    suit in return for U.S. security commitments.

     

    সারকথায়, এই গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে উপেক্ষা করে কোন মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাত প্রধান দ্বন্দ্ব মীমাংসার অংশ নিতে হবে। আর এরই নয়া মেরুকরণের ভিওত্রে ঢুকে এর মধ্যে নিজ নয়া স্বার্থ বের করে আনতে হবে।
    আর একই কথা প্যালেসটাইনের মুক্তির প্রশ্নের নয়া ও বাস্তব দিশা!

    দানব ইসরায়েলি রাষ্ট্র গড় উঠেছে নেতা আমেরিকার প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে এবং এখনও টিকে আছে আমেরিকান ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদল নির্রবিশেষে এদের প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে। চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি প্রতিক্রিয়ায় কার্যত ইসরায়েলকে আরো বেশী করে আমেরিকার কোলে উঠিয়ে দিয়েছে যেটা এখন ইউরোপের কোলেও তুলে দিবার সামিল। আর এতেই ওদের আসল নৈতিক সংকটকে উদাম করে দিয়েছে।
    ইসরায়েলকে এবারের ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করতে এগিয়েছে কারা? বৃটিশ, ফরাসি আমেরিকা এরা? আর বলছে নাম প্রকাশ করতে চায় না এমন আরো কিছু দেশ! যে অন্যের ভুমি দখলকারি তার আবার নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে এসেছে পশ্চিম, এই নৈতিক সংকট এতই দেউলিয়া এখানে!

    পুরানা প্রগতিশীল (ইসলাম কোপানো) ধারণার উপর দাঁড়িয়ে অনেকে বলে থাকেন, যে দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা আমেরিকা এনেছে এথেকে দুনিয়াকে মুক্ত হতে নাকি আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ লাগবে। মানে এদের সারকথাটা দাঁড়ায় সে এটা নাকি প্রায় অসম্ভব!!  কিন্তু না, সরি; এই চিন্তা অপরিপক্ক!
    ব্যাপারটা বিশ্বযুদ্ধ হতেই হবে তা না। বিষয়টা হল দানব ইসরায়েল টিকে আছে আর নিরন্তর নুইসেন্স করে যেতে পারছে কারণ একে প্রটেক্ট করছে আমেরিকা। কাজেই গ্লোবাল নেতা থেকে আমেরিকার সরে যাওয়া, চ্যুত হয়া দুর্বল হয়ে যাওয়া এটা ঘটে গেলেই – এটাই একমাত্র প্রয়োজনীয় শর্ত। এখন আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে চলে যাওয়া কী করে ঘটবে তা আমরা নিশ্চিত জাতি না। কিন্তু সেকারণে, এটা ঘটতে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধই লাগবে এমন করে কথা বলাটা একেবারেই বোকামি; আর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি এর বাস্তবায়নের পথ কেবল এটাই বলতে পারা উচিত; দানব ইsরায়েলের বিলুপ্তি অসম্ভব – এমন মানে করা ইঙ্গিতপুর্ণ কথা বলার তো প্রয়োজন নাই। এর চেয়ে গ্লোবাল পালাবদলকে ফলো করা য়ার বুঝতে পারাই যথেষ্ট।

    আমাদের মত দেশের মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খার কথা বলছিলাম।  তাদের আকাঙ্খায় থাকা কোন ইসলামি বিপ্লব বা রাজনীতি কতটা সঠিক বা ভাল সে বিচার-পর্যালোচনা এখানে এখন পাশ কাটাবো, প্রসঙ্গটা আলাদা বলে। তবে এর মধ্যে কেবল পরিবর্তনের  আকাঙ্খাটাকে নিয়ে কথা বলব। আর তা করতে চাইলে তাঁদেরকে অন্তত গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব বা পালাবদলের ভিতর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নয়া নীতি নয়া মেরুকরণকে দেখতে পারতেই হবে। এটা কেবল ইরানের বা সৌদি রাষ্ট্রের বিচার-পর্যালোচনা নয়। মনে রাখতে হবে প্যালেসটাইন ইস্যু নিজে নিজেই দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব নয়। আসন্ন  গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে ঘিরে যে নয়া মেরুকরণ ঘটছে ঘটবে এই ভিতরেও প্যালেসটাইন ইস্যু বা দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ-কে দেখতে পারতে হবে। আর তবেই সফলভাবে এর সমাধান বের করে আনা যাবে। অরুণদের আকাঙ্খাকে অস্থিরতা দিকে নয় বরং স্থিরতা ও গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে বুঝাবুঝির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে; কারণ এটাই এখানে মুখ্য হবে। সবচেয়ে বড় কথা চীনা নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি আর একে ঘিরে মেরুকরণের সময় প্যালেসটাইন ইস্যুর সমাধান ও দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ উপযুক্তভাবে প্রোথিত করে নিতে হবে।

    ইরানের এবারের ইসরায়েলে হামলা কেন সীমিত ছিল এর প্রধান কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতি এমনিতেই নুব্জ হয়ে আছে বিশেষত করোনা ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বাইডেনের ভুল সিদ্ধান্ত ভুল যুদ্ধ ইউক্রেন থেকে এখন ক্রমশ আরো সব সঙ্কট ছড়িয়ে পড়ছে। গত সাড় তিন বছরে দিশাহীন ডলার অবরোধের নেতি প্রভাব এখন ক্রমশ আরো সবল হচ্ছে – ডলারের বদলে ইউয়ানে গ্লোবাল বাণিজ্যে অগ্রগতি ঘটে গিয়েছে যা খোদ বাইডেনের নীতির প্রতিক্রিয়া – নিজের পায়ে কুড়াল মারা হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আমেরিকান মুদ্রাস্ফীতি গত তিনমাসে আরো বেড়েছে আর তাতে ইতোমধ্যেই বাণিজ্য ব্যবস্থায় শঙ্কা ছড়িয়েছে। এর মাঝে যদি ইরানের ইসরায়েল হামলা তীব্র হয় তবে এর ধকল কাটানো মুশকিল হবে। যেমন সবার আগে তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে যা এত সংকটের মধ্যেই গড়ে আশি ডলারের মধ্যে ছিল যা এখনও আশি-নব্বই ডলারের মাঝে থাকছে – এটা উথাল-পাথাল হলে সবার আগে উতপাদন ও মুল্যবৃদ্ধিতে সব এলোমেলো অনিশ্চিয়তার পথে হাটবে – যেটা আরেক অর্থে পধান ইস্যু।
    এই স্বার্থেই ইনফরমালি হলেও চীন=-আমেরিকার ম্যাসেজ বিনিময় ঘটেছে।  মধ্যপ্রাচ্য লেবেল এনিয়ে ব্যাপক কটনীতি  কাজ করেছে। রয়টার্স এনিয়ে চারটা রিপোর্টে এসব দেখিয়েছে। এমনকি ইরানের ইওরায়েলে হামলার পরে ইওরায়েল কোন পালটা হামলার চিন্তা করলে তা এই দেশকে নিলে দায়ীত্ব ও পরিণতির দায় নিয়ে করতে হবে বলে বাইডেন হুশিয়ারি দিয়েছেন। ইসরায়েলের যুদ্ধ-ক্যাবিনেটও এখন নিজে একা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বা চাচ্ছে না। সে বন্ধু-শ্যন্য হয়ে পড়েছে। তাই পশ্চিমা-বন্ধুদেরকেও আর হারাতে চাচ্ছে না বলে এই সিদ্ধান্ত। আর মুখে বলছে ইরানের হামলার পরে তা যতই ক্ষতি ইসরায়েলের হোক না কেন এর কোন প্রতিক্রিয়া তারা এখন না ভবিষ্যতে কখনও দেখাবে।

    আপাতত এতটুকুই!

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৫ এপ্রিল ২০২৪  রাত ৯ঃ ০০

  • জেনেট ইয়েলেনঃ চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?

    বাইডেনের আরেক হারঃ
    চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?
    গৌতম দাস
    ০৮ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা ০৭ঃ ৫২
    https://wp.me/p1sCvy-5vk

     

           U.S. Treasury Secretary Janet Yellen meets with Wang Weizhong, deputy party secretary and governor of Guangdong, … in southern China’s Guangdong province, April 5, 2024. (Pool/AP)

     

    আমেরিকায় বলে ট্রেজারী সেক্রেটারি, ইংল্যান্ডেও বলে ‘চ্যান্সেলার অফ এক্সচেকার’ আর সমতুল্য ভাবনায় আমরা যাকে বলি অর্থমন্ত্রী। তবে অবশ্যই কড়া সমতুল্য বলে কিছু নাই। কারণ, কঠোর বিবেচনায় সবগুলো ধারণাই আবার আলাদা বলেও মানে ট্রেজারী সেক্রেটারি আর অর্থমন্ত্রী এক নয় বলেও প্রমাণ করা যাবে। আমরা এখানে  তুলনীয় অর্থে ট্রেজারী সেক্রেটারি বলতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অর্থমন্ত্রী ধরে নিয়ে এখানে কথা বলব। বাইডেনের বর্তমান অর্থমন্ত্রীর নাম জেনেট ইয়েলেন [Janet Yellen]।  নিয়মিত হুঙ্কার দেয়া বাইডেন এর এই অর্থমন্ত্রী জেনেট চীনের কাছে এক আর্জি নিয়ে চীন সফরে গেছেন ও আছেন। একলম্বা সফর এপ্রিল ৩-৯ জুড়ে [From April 3-9,…… ] চলবে এই সফর বলে জানিয়েছে চীনের অবস্থিত আমেরিকান এমবেসী। কেন এই সফর তা এককথায় বললে, আমেরিকান এক রাজ্য জর্জিয়ার সোলার বিদ্যুৎ কোম্পানীগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সোলার কোম্পানি বলতে যারা electric vehicles, solar cells and lithium batteries ইত্যাদি এসব সম্পর্কিত পণ্য উতপাদক! কেন, আর তাতে চীনের সাথে এর সম্পর্কটা কী?

    জেনেটের নিজ সরকারী বিবৃতির ভাষায় বললে, ……because it could not compete against large quantities of goods that China was exporting at artificially depressed prices. সারকথাটা বাংলা করে বললে – “  চীনে উতপাদিত এই পণ্য উতপাদনের বিপুল সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম-মুল্যের সাথে সমতুল্য আমেরিকান কোম্পানিগুলো পেরে না উঠাতে[could not compete] “ –  আমেরিকান কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
    পাঠককে পরিস্কার করে দেই এটা কোন নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট থেকে কোট করি নাই। এটা জেনেটের নিজ মন্ত্রণালয় এর ওয়েব সাইটে প্রকাশিত জেনেটেরই বিবৃতি। তাই কোন ভিন্ন ব্যাখ্যা বা অর্থের ভিন্নতার সুযোগ নাই। আর, এখন আসি যে জেনেট ঠিক কী চাইতে চীনে এসেছেন? রয়টার্স লিখেছে, ...concerns are growing over the global economic fallout from China’s excess manufacturing capacity, বাংলায় সারকথা – এই পণ্যের গ্লোবাল মার্কেটে [এখানে গ্লোবাল মার্কেট বলতে মুলত আমেরিকান মার্কেটের উদ্বেগ বুঝতে হবে ] উতকন্ঠা বাড়ছে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতার সাথে পারছে না বলে!!

    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরেঃ
    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরে তা বুঝবার সহজ পথ হল,  সফরে আলোচনা শেষে তিনি কী পেলেন এনিয়ে তার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত বিবৃতি পাঠ – এটাই সবচেয়ে ভাল সোর্স। সেই বিবৃতিটা এখানে পাওয়া যাবে।  এই বিবৃতির শিরোনাম – Statement from Secretary of the Treasury Janet L. Yellen on Announcement of New U.S.-China Initiatives Following Meeting -। আর ওর ভিতরের অংশ ছোট ছোট করে তুলে এনে বাংলায় পাঠককে দেখাবো এখন।

    ভিতরের বক্তব্য ১ঃ
    উচ্ছসিত খুশি প্রকাশ করে জেনেট ইয়েলেন বলছেন,
    আমি খুবই খুশি যে আমরা (তিনি ও চীনা প্রতিনিধি) একমত হয়েছেন যে তারা দুইটা তাতপর্যময় নয়া উদ্যোগ চালু করতে পেরেছেন। এতে কী হবে? এতে “আমেরিকান শ্রমিক ও কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা পাবে আর এতে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষিত হবে” – জেনেট বলছেন। সারকথায় এতে চীন আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য গ্লোবাল বাজারের কিছু অংশের ভাগ আপোষে আমেরিকাকে ছেড়ে দিবে।  আর সেটাই জেনেট কথিত  “two significant new initiatives”, আর এটাই এই সফরে তাঁর চীনের কাছ থেকে অর্জন! 

    “I am pleased that we have agreed to launch
    two significant new initiatives that will advance
    the interests of American workers and firms
    and help protect U.S. national security.”

    ভিতরের বক্তব্য ২ঃ
    এক নম্বর অর্জন হল, জেনেট বলছেন যে, “এখন চীন-আমেরিকা তাদের আভ্যন্তরীণ ও গ্লোবাল অর্থনীতির ইস্যুতে এক ভারসাম্যপুর্ণ অর্থনৈতিক উন্নতি [মানে আমেরিকাকে ছুড়ে ফেলে একক চীনা উন্নতি নয়] পথে গভীর নিচ পর্যন্ত স্বার্থ-মতামত বিনিময় করতে পারব। আর এতে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতায় ভারসাম্য টানাসহ সাথে আমি এখানে সুযোগ নিব যাতে আমেরিকান কারখানা আর শ্রমিকেরা চীনের কাছে থেকে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিজেদের জন্যও পায় – এদিকে চীন যেন খেয়াল রাখে। আমি বিশেষ করে কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ প্রসঙ্গে খেয়াল রাখব যেমন কিছু উতপাদন সেক্টরে সরকারী সহায়তায় চীনের অতিউতপাদন সক্ষমতার ধাক্কা যা আমাদের উপর পড়ছে আর এই ধাক্কা আমেরিকান অর্থনীতির উপর পড়ছে”।

    First, we agreed that the U.S. and China will hold intensive exchanges on balanced growth
    in the domestic and global economies. These exchanges will facilitate a discussion around
    macroeconomic imbalances, including their connection to overcapacity, and I intend to
    use this opportunity to advocate for a level playing field for American workers and firms.

    I am particularly concerned about the impact of Chinese industrial overcapacity in
    certain sectors as a result of government support, and the impact it could have on
    the American economy. 

    ভিতরের বক্তব্য ৩ঃ
    এটা হল জেনেটের বলা এই সফরে তাঁর দ্বিতীয় তাতপর্যপুর্ণ অর্জন প্রসঙ্গে। কী সেই অর্জন?
    চীন-আমেরিকা দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে গ্লোবাল অর্থনীতিক নিয়ন্ত্রণ আনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা।  এখানে দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুঝাতেই শব্দদুটো হল, Treasury-PBOC Cooperation।  যেখানে টেজারি হল জেনেটের মন্ত্রণালয় আর PBOC  মানে হল পিপলস ব্যাংক অফ চায়না – চীনে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক সমতুল্য তাদের প্রতিষ্ঠানকে বুঝাতে তা PBOC নামে ডাকা হয়। এবং এই সহযোগিতা বিনিময় হবে বিদেশে অর্থপাচার বিরোধী কাজগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা।

    Second, we agreed that the U.S. and China will start Joint
    Treasury-PBOC Cooperation and Exchange on Anti-Money
    Laundering to expand cooperation against illicit finance
    and financial crime.
     

    অর্থাৎ এই পুরা সফরটার একটাই উদ্দেশ্য ছিল – সেটা হল, চীন-আমেরিকান সহযোগিতা, বিরোধ না।  কিন্তু সেটা এত দেরিতে এই বোধোদয় এত দেরিতে কেন? 

    চীন-আমেরিকান বিবাদ কী ও কেনঃ
    শুরুতে এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি গত ৩ এপ্রিল ২০২৪ মানে জেনেটের সফর শুরুর একই দিনে তবে কিছু আগেই,  বাইডেন-শি এক গুরুত্বপুর্ণ টেলিফোন কথোপকথন করেছেন। শি  মানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং  [Xi Jinping]। এই কথোপকথন নিয়ে আগ্রহিরা এই দুটা রিপোর্ট দেখতে পারেন। APnews আর  REUTERS  এদুইটা হল বিখ্যাত তিন গ্লোবাল নিউজ এজেন্সীর অন্যতম দুই কর্ণাধার। এটা পাঠক যারা এই প্রসঙ্গের গভীরে ঢুকতে চান তাদের জন্য।  তবে সারকথাটা বলে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার চারবছরের ক্ষমতা-আয়ুর তিনবছর তিন মাস পার করে ফেলেছেন; এছাড়া আর ছয়মাস (নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহে)  এর মধ্যে তাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে পাস দেখাতে হবে।  আর মিডিয়ায় জোর অনুমান পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে যাবে। সে যাই হোক এই সময়কালে বাইডেন গড়ে বছরে একবারের কিছু বেশী হয়ত চীনা প্রেসিডেন্টের শি সাথে এমন  ফোনালাপ করেছেন! অর্থাৎ বাইডেনের নীতি ছিল চীন-মার্কিন অসহযোগিতা। এর পিছনের মূল কারণ কী?

    এটা পালাবদলের যুগ চলছেঃ
    এর পিছনের মূল কারণ বলতে প্রথমে যা আমাদেরকে বুঝতে হবে এটা পালাবদলের যুগে প্রবেশ করেছি আমরা।  এটা পালাবদলের যুগ মানে হল, গত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা সেই যে গ্লোবাল নেতা হয়ে বসেছিল সেটা এখন ফুরিয়ে আসছে আর বিপরীতে চীন সেই আসনে গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠে আসতে চাইছে। এখানে গ্লোবাল নেতা বলতে – কোন দেশের অর্থনীতি এখন সবাইকে ছাপিয়ে সারপ্লাস বা নয়া বাড়তিমূল্য নিজ অর্থনীতি জমা করতে পারছে – যার সোজা অর্থ হল অন্য দেশের অর্থনীতিকে ঋণ-বিনিয়োগ দিবার নেতা হয়ে উঠছে এরই হিসাবের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলা। আর বলাই বাহুল্য অন্যদেশকে বিশেষ করে আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ দেয়া আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হিসাবে বাণিজ্যিক পুঁজি ধার দেয়া  – একাজে এখন সবার উপরে সক্ষম রাষ্ট্র হল চীন। আমাদের মত কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ থেকে দখলদারেরা ২০০ বছরের সারপ্লাস সব লুটে নেয়া হয়েছিল। ফলে এই ঘাটতি যে রাষ্ট্র মিটিয়ে নয়া আশার আলও যে এগিয়ে আসে সেই চীনের প্রভাব আমাদের উপর থাকবেই!  এটাকে ইতিবাচক দেখা হবে, স্বাভাবিক! এটা পন্থি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না – যে আপনি কাউকে বলবেন যে উনি আমেরিকা ছেড়ে চীন-পন্থি বলেই নাকি তিনি দেশে চীনা বিনিয়োগ-সহযোগিতাকে ইতিবাচক দেখছেন। সবচেয়ে বড় কথা গত প্রায় ৮০ বছর এই ভুমিকাতেই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা ছিল!
    এককথায় বললে, আমাদের মত সব গরীব খাতক-দেশকে  অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ [development loan] আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ [FDI] যে দাতা দেশ দিতে পারে সেই-ই গ্লোবাল নেতা ধারণাটার সারকথা!
    উলটা দিকে চীনের এই উত্থান এটা ততই আমেরিকার গ্লোবাল নেতা স্টাটাস ও সক্ষমতা শুকিয়ে যেতে থাকছে ও থাকবে এটা স্বাভাবিক। এককালের এমন গ্লোবাল নেতা বৃটিশ সরকারেরও মুরোদ এভাবে শুকিয়েছিল বলে আমেরিকার উত্থান হয়েছিল।

    কিন্তু এটা আমেরিকার কোন প্রেসিদেন্ট (বিশেষ করে ২০০০ সালের পরের কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট) শেষে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। ভেবেছেন তাদের সামরিক সক্ষমতা ও গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান সমুহকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো অটুট আছে – এই ভাবনা থেকে। তবে একটা লাইন টেনে বলা যায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকান প্রতিটা প্রেসিডেন্ট যে নীতি অনুসরণ করেছেন তা হল, চীনের কাছে যাওয়া আর একটা না একটা সেক্টরে নিজের অর্থনীতির জন্য বাজার ছাড় চীনের থেকে নিয়ে এসেছেন।  সবচেয়ে বড় কথা চীনও এই সহযোগিতা করে গেছে। সবচেয়ে বেশী এখন সহযোগিতা নিয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা (দুই টার্মের ওবামা ২০০৯-২০১৬ সময়কালে)। আর এটাই এই একই চীনা সহযোগিতা টোকাতে এখন বের হয়েছে এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইদেন।

    এমনকি ডনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথম বছরও একই নীতিতে চীনা বাজার সহযোগিতা টোকানো – তা এনেছেন। কিন্তু পরের বছর থেকে ট্রাম্পের নয়া রাস্তা হয়ে যায় অসহযোগিতা – মানে সংঘাতে মোকাবিলার পথে যাওয়া। শুরু হয় আমেরিকায় চীনা আমদানি নানা পণ্যের উপর ইচ্ছামত কর আরোপ – এটা ছিল ২৫% থেকে ৬৬% পর্যন্ত করারোপ। যদিও ট্রাম্পের শপথের পর থেকে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন তিনি তা হল অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন আর নয়। মানে ১৯৮০ সাল থেকে  অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন এর নেতা ছিল খোদ আমেরিকা। এটা ছিল তথাকথিত অর্থনীতিক জাতিবাদ – এই মৃতপ্রায় নীতির বিপরীতে অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন  এর পথে দুনিয়াকে সঠিকভাবেই ঠেলে দেওয়া। অথচ ট্রাম্পই প্রথম ২০১৭ সালে ক্ষমতার শপথের পর থেকেই পুরানা  অর্থনীতিক জাতিবাদ   কে কতটা ফিরিয়ে আনা যায় এই ব্যর্থ পথে তিনি ফিরে রওনা দিয়েছিলেন। যদিও এর মূলধারা হোয়াইট সুপ্রিমিজম [সাদা ককেশীয়রাই শ্রেষ্ঠ জাতি] ধারণা। একি কারণে, তিনি আমেরিকার একাই ন্যাটো [NATO] এর ৯৫% খ্রচ যোগানো ত্যাগ করার পক্ষে। তিনি কোন গ্লোবাল নেতা থাকার ব্যয়ভার বইতে রাজি ছিলেন না।
    বিপরীতে বাইডেনও তাই তবে একটু ঘুরিয়ে ভিন্ন পথে।
    যেমন চীনা পন্যে বাড়তু করারোপ যা ট্রাম্প করে গেছিলেন তিনি তা বন্ধ না করে সেটাই চালিয়ে গেছেন, এখনও চালু আছে। আর বাইডেনও  হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি নিয়েছেন। তবে তফাত হল, ট্রাম্প আমেরিকার ভিতরের সাদা বাদ বাদামি বা কালো লেবার তাড়িয়ে দিবার পক্ষপাতি – মেক্সিকো বর্ডার পারলে পুরা ল্যাটিন আমেরিকান বর্ডার বন্ধ করতে চান। বিপরীতে বাইডেন দেশের বাইরে হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি অনুসরণ করে গেছেন। সারকথায়, দুনিয়ায় সাদা ককেশীয় শাসন কলোনি দখলদারের হাতে যার বয়েস হয় প্রায় পাচশ বছর।  তিনি তাই  ইইউ-কে সাথে এই সাদা শাসন আরো চালিয়ে যেতে চান। কেন? চীন গ্লোবাল নেতার আসনে বসে যাওয়া মানে পশ্চিমা সাদা শ্রেষ্ঠত্ব এর শাসনের দিনের শেষ হবে। আর এখান থেকে ইউক্রেনকে সামনে রেখে রাশিয়ার সাথে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের লড়াই এর শুরু। তবে তাদের ময়ল আগ্রহ ছিল রাশিয়ার অবস্থা খারাপ হলে চীন তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসে সামরিকভাবে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের কাছে হেরে যাবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠলেও এই কৌশলে চীন হেরে লোপাট হয়ে যাবে আর দুনিয়া সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের শাসন টিকে যাবে – চলতে থাকবে। যদিও চীন দূরে থেকেই রাশিয়াকে সহযগিতা দিয়্বে গেছে।  আর বাইডেনের ডলার অবরোধ কাজ করে নাই। উলটা ইন্ডিয়া রাশিয়াত সস্তা তেল নিয়ে রপ্তানিকারক হয়ে অর্থ লুটেছে আর ও দিকে রাশিয়াও বিদেশি মুদ্রার সমস্যায় না পরে উলটা রিজার্ভ বাড়িয়েছে সোনা কিনেছে।
    বাইডেনের টানা তিন বছর ছিল তথাকথিত গণতন্ত্র-মানবাধিকার এর পররাষ্ট্রনীতি আর সাথে ডলার অবরোধ সহ নানান ধরণেরস্যাংশন আরোপ করার নীতি। তিনি দাবি করে এসেছিলেন আমেরিকার এসব অস্ত্র লুকানো অবস্থায় পড়ে আছে আর তিনি এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দুনিয়া থেকে চীনা প্রভাব কাটাবেন।
    এরই সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ও প্রদর্শন স্থল ছিল সাউথ চায়না সি – অন্যভাষায় বললে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি দিয়ে চীনকে একঘরে করবার খায়েস। যেমন বাংলাদেশকেই চীনা বিনিয়গসহ সব ধরণের প্রভাব মুক্ত করা এর লক্ষ্য ছিল।

    কিন্তু গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে আমেরিকা আমাদেরকে পথে ফেলে চলে যায় শুধু তাই না। এবার আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে যায়।

    বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনেঃ
    আর সব হারিয়ে অর্জন-শুণ্য বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনে!!!! নিজ কারখানা-কোম্পানি বাঁচাতে এখন চীনের কাছেই হাত পাতা।
    সগযোগিতা অবশ্যই সঠিক ও বিনা-যুদ্ধের পথে স্বার্থ-দ্বন্দ্ব এর মোমাংসার পথ!! তার মানে বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি করে কোন লাভ হয় নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি একটা পুরাটাই ভুল পথ ভুল সিদ্ধান্ত ছিল!!!  সবটাই গচ্চা গেছে পানিতে। ডোনাল্ড ল্যু এই কথিত মহান ব্যক্তিত্বকে তাহলে আসলে বাইডেনের দরকার ছিল না, দুনিয়ারও না।  উনি তাহলে একতা খামোখা ছিলেন!!!! নাকি তাই তো? 

    তাহলে আমাদের আম-স্বার্থ, রাষ্টড় রাজনীতি ও অধিকার এসবের যে ক্ষতি বাইডেন করে গেলেন এর দায় কে নিবে এখন???
    এসবের সোজা মানে এক ভারত ছাড়া দুনিয়াতে কেউ আর আমেরিকাকে বিশ্বাস করবে না! 

    এরপরেও আবার বাইডেনের আয়ূ আর মাত্র ছয় মাস। যদি ট্রাম্প বাবাজি জিতে আসেন তো সেক্ষেত্রে কী হবে?
    কথা একটাই, আমাদের রাস্তা আমাদের স্বার্থ নিয়ে আমাদেরকেই ভেবে-চিন্তে  আর সর্বোপরি শত্রু-বন্ধু বুঝে ফারাক করে উঠে দাঁড়াতে হবে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪    সন্ধ্যা
    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪   রাত