Tag: গৌতম দাস

  • গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার

    গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার

    গৌতম দাস

    ১৭ মে ২০২১, ২২:১৯, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3xu

     

    চীন না আমেরিকা, আমাদের জন্য কে ভাল বা আমাদের কার পক্ষে থাকা উচিত বা আমার কাকে পছন্দ – এনিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত আগ্রহ, লাভালাভ অথবা ভালো-মন্দ বিচারবোধ থাকতে পারে। কিন্তু এটা ব্যক্তিগত বা সাবজেকটিভ [subjective] বোধবিচার। কিন্তু এই ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ [objective] ভাবে  বিচার ও বুঝতে হবে, মানে সাবজেক্ট বা কর্তাসত্বা ভাবে নয়।  কর্তা-মানুষের কাকে পছন্দ সে ভিত্তিতে ও দিক থেকে বিচার করে নয়।  একটা ঘুর্ণিঝড় যেমন বাংলাদেশে কখন  ও কোথায় আঘাত হানবে তা মানুষ জানে না। মানুষের হাতে তা নির্ধারিতও না।  এমন ঘটনাগুলোকে অবজেকটিভ ঘটনা বলে। মানে সাবজেক্ট এর ইচ্ছার ভিত্তিতে না। আমাদের ইচ্ছার বাইরে প্রাকৃতিক ঘটনা দিয়ে বুঝতে হবে।

    গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীন বা আমেরিকার নেতৃত্ব অবস্থান কী হবে তা কোথায় দাড়াবে সেটা তাদের নিজেদের নেয়া স্ব স্ব নীতি-পলিসি অবশ্যই দায়ী। তবুও ব্যাপারটা এমন না যে আমেরিকা নিজের নেতৃত্ব অবস্থান ফাইনালি কী হবে কতটা স্থান কী ধরে রাখতে পারবে সেটা আমেরিকা চাইলেই রক্ষা করে ধরে রাখতে পারে। আবার চীন চাইলেই আমেরিকাকে নেতার অবস্থান থেকে ফেলে দিতে পারে তাও না। কারণ সবদেশেরই নীতি-পলিসি যাই নেয়া হোক না কেন এসবের বাইরে কিছু অবজেকটিভ ঘটনা উপাদান থেকেই যাবে যার প্রভাবে ফাইনালি সবকিছু নির্ধারিত হয় ও হবে যে কোন দেশের নেতাগিরি কতদিন ধরে সে ধরে রাখতে পারব আর কে নতুন উঠে আসবে। এই কারণে আমরা চীন বা আমেরিকা কাকে আমরা পছন্দ করব সেটা না। বরং  চীন বা আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব অবস্থান কতটা ধরে রাখবে বা পারবে তা নির্ধারণ হয় সেসব অবজেকটিভ ফ্যাক্টর দিয়ে সেগুলোকে আমলে নিতে ও খেয়াল করতে হতে হবে।  তাই আমরা চীন পছন্দ করি নাকি আমেরিকা এই ভিত্তিতে কোন একটার পক্ষে ঝাপিয়ে পড়ার মানে হবে না। তবে স্বভাবতই কেউ যদি নিজেকে ভাড়াটে বা দালাল হিসাবে কারও পক্ষে নামতে চায় সেটা অন্য আলাপ আর তা তো ঠেকানো যাবে না।
    তবে এ’প্রসঙ্গে বাংলায় “ভগ্নদুত” বলে একটা শব্দের সাথে পরিচিত  করে দেয়া যাক।  রাজার আমলে কোন যুদ্ধে  পরাজয়ের খবর তো কাউকে না কাউকে বয়ে রাজধানীতে রাজার কাছে আনতেই হয়, হত। যে বয়ে আনে তাকে বাংলায় “ভগ্নদুত” বলে। পরাজয়ের খবরের বাহক বলে। কিন্তু রাজাসহ  প্রায়ই মানুষ যা ভুল করে বসে তা হল  যেন ভগ্নদুতই যুদ্ধে রাজার পরাজয়ের জন্য দায়ী!  অথচ তা একেবারেই নয়। অনেকটা টিভি রেডিও তে যখন কোন আবহাওয়াবিদ এসে বিশাল দুর্যোগের পুর্বাভাস দেয় আর আমাদের শ্রোতাদের কেউ কেউ যখন ভেবে বসে ঐ দুর্যোগটাই নিশ্চয় ঐ আবহাওয়াবিদের তৈরি বা বানানো! কাজেই আবহাওয়াবিদকে গালমন্দ শুরু করে, এটা সেরকম! তবু ইতিহাসে ভগ্নদুতেরা অনেকেই খুন হয়েছেন রাজার ক্ষোভে!

    কাজেই দেশে প্রো-আমেরিকান বা প্রো-ইন্ডিয়ানদের চোখে আমি ভগ্নদুত অবশ্যই। তাদের চোখে আমি যেহেতু গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা প্রায়শই তুলি ও বলি পুর্বাভাস দেই; আবার বলি যে অ্যামেরিকার পতন আর চীনের উত্থানের কথার নানান দিক…। যদিও আমি পুর্বাভাস দাতা, নেহাতই  এক পলিটিক্যাল এনালিস্ট মাত্র।

    আবার যেমন দেখেন আমি আমেরিকাকে হয়ত পছন্দ করি না তাই অ্যামেরিকার নেতৃত্ব হারাচ্ছে তা বলি এমন তো নয়। বরং নেতৃত্ব বা সক্ষমতা  হারানো এগুলোই তো অবজেকটিভ ফ্যাক্টস।  আর এর চেয়েও বড় কথা এই ফ্যাক্টস বা রিপোর্টগুলোর ৯০ ভাগ হল আমেরিকারই সরকারি স্টাডি গবেষণায় পাওয়া  ও তাদেরই প্রকাশিত রিপোর্ট। কারণ আমেরিকান খোলা সমাজের কিছু সুবিধা তো আছেই, সেগুলো সহজেই পাওয়া যায়। আর চীনের সরকারি তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়।  যেটুকু পাওয়া যায় তা হংকং-কেন্দ্রিক বিভিন্ন ওপেন মিডিয়া। যা পশ্চিমা মিডিয়ার বিরুদ্ধে নিজেরা আগেই নতুন গ্লোবাল জগতে নাম কামিয়ে বসে পরতে চাইছে এরা।

    কাজেই বাংলাদেশে বসে চীন বা আমেরিকানদের নীতির বিচার করতে হবে আমাদের আর তা অবশ্যই অবজেকটিভ চোখে, আমরা কাকে পছন্দ করি সে ভিত্তিতে একেবারেই নয়। একমাত্র তবেই আমরা চীন-আমেরিকা নিয়ে বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সহজ সমাধান পাওয়া যেতে পারি।  আর যারা নিজেকে ভাড়াটে বা দালাল হিসাবে কারও পক্ষে নামতে চায়, তাদের নিয়ে এখানে বলার কী আছে!

     গরিব-বড়লোকের  টিকা বলে ভাগঃ
    করোনার টিকা জিনিসটা শেষ পর্যন্ত গরিব-বড়লোকের টিকা হয়েই হাজির হয়ে গেল। আবার একই সাথে তা গ্লোবালি এক ভুয়া এম্পায়ার আর উপযুক্ত এম্পায়ারের দাবি হিসাবে হাজির হয়ে গেল।

    গরিব-বড়লোকের টিকা বলতে সবমিলিয়ে দুনিয়ায় ব্যবহৃত টিকাগুলো হল, একদিকে ফাইজার [Pfizer], মর্ডানা [Moderna] আর জনসন [J&J]। অন্যদিকে – এস্টোজেনিকা [Oxford-AstraZeneca] , সিনোভ্যাক, Sinovac, সিনোফার্মা [Sinopharm], স্পুটনিক [Sputnik V] , কোভ্যাক্সিন [Covaxin] ইত্যাদি।

    এর মধ্যে প্রথম তিনটা – মানে ফাইজার, মর্ডানা, জনসন হল বড়লোকের টিকা। কারণ এর দাম অনেক বেশি আর এর চেয়েও বড় কথা হল এর সংরক্ষণের তাপমাত্রা আমাদের মত দেশে বজায় রাখা খুবই কঠিন। এদের দাম ২০ থেকে ৩৩ ডলারের মধ্যে। আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা (-১৫) থেকে (-৮০) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। যেখানে গরিব গোত্রের টিকাগুলোর প্রায় সবই ৪ ডলারের নিচে আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।
    সাধারণের বুঝার ভাষায় বললে, বাসায় আমরা যে ধরণের কমন ফ্রিজ ব্যবহার করি (ডিপফ্রিজ না) সেটাই গরীবের ভ্যাকসিনগুলো সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট। আর বড়লোকের ভ্যাকসিন আমাদের মত দেশে যেখানে গরমের সময় তাপমাত্রা +৪০ ডিগ্রি[] পর্যন্ত উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা সেখানে সংরক্ষণ কঠিন। তাই বড়লোকের কোন ভ্যাকসিন আমরা বিনা-পয়সায় পেলেও তা ঢাকাতেই ব্যবহার প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। [এখানে ভ্যাকসিন বিষয়ে তথ্যগুলো বিবিসি বাংলার ১০ এপ্রিলের আর ১৪ জানুয়ারির দুটি রিপোর্ট থেকে নেয়া ]।
    তাহলে এটা পরিস্কার যে, আমাদের মত দেশকে এস্টোজেনিকা, সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা, স্পুটনিক, কোভ্যাক্সিন – এসব গরীবদের টিকার মধ্যেই থাকতে হবে। এর মধ্যে এস্টোজেনিকা যুক্তরাজ্যে আবিস্কার হলেও এর ফর্মুলা ভারতে এনে তৈরির ফলে এর সস্তা ভার্সান কোভিশিল্ড পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশকে বিক্রি করেছিল ভারত এবং এজন্য তারা আগাম বিনিয়োগ হিসাবে টাকা নিয়েও এখন আর টিকা দিচ্ছে না। আগামিতেও দেয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
    এখানে স্বভাবতই ভারতে উতপাদিত এস্টোজেনিকা [Oxford-AstraZeneca] অথবা কোভ্যাক্সিন [Covaxin] কে প্রাপ্যতার তালিকা থেকে বাইরে রাখতে হল কারণ ভারতের পক্ষে বিদেশে কাউকে  টিকা সাপ্লাই অসম্ভব। এখন তারা উলটা বাইরে থেকে টিকা আনার প্রচেষ্টা শুরু করেছে।

    এরপরে,  সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা এ’দুই টিকা চীনের তৈরি। দুটোই  হু-এর [WHO] নোটিশ বোর্ডে ৭৮-৯০% পর্যন্ত কার্যকর দেখা যায়। যার মধ্যে সিনোভ্যাক এর কার্যকারিতা পরে ব্রাজিলে কমে গিয়ে ৫০.৪% হয়েছিল দেখা গেছে, তবে ব্লুমবার্গ ইন্দোনেশিয়ায় দেখা গেছে ফলাফল ৯৪-৯৮%, চিলিতে ৬৭% কার্যকারিতার কথা জানায়। আর সিনোফার্মা [WHO] হু-এর তালিকায় ৭৯% কার্যকর হিসাবে উল্লেখ আছে এখনো। আবার, ল্যানসেটে রাশিয়ান স্পুটনিক এখনো ৯১% কার্যকর বলে উল্লেখ রয়েছে।
    খারাপ খবর হল ভারতের অপর টিকা কোভ্যাক্সিন ৭৮% পর্যন্ত কার্যকর দেখালেও এটা তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শেষ হবার আগেই বাজারজাত শুরু করেছে বলে অভিযোগ আছে বিবিসির রিপোর্টে। দেখেন [What was the controversy around Covaxin?] এই শিরোনামের অংশটা পড়তে পারেন।

    তার মানে দাঁড়ালো দুনিয়াতে অন্য যত ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়ে থাকুক না কেন, বাংলাদেশের জন্য “পাওয়া সম্ভব” এবং “উপযুক্ত” ভ্যাকসিন বলতে বাকি থাকল চীনা সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা (এটা বেশি উপযুক্ত) আর রাশিয়ান স্পুটনিক।

    এদিকে আবার ‘পাওয়া সম্ভব’ আর ‘উপযুক্ত’ হলেও আরো কথা আছে। তা হল, কিনতে আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ আছে কিনা? কতটুকু? এছাড়া যদি নিজে দেশে উৎপাদন করে নিতে হয় সে মুরোদ (বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি) কতটা? এসব ক্ষেত্রে তাহলে কী হবে? সে প্রসঙ্গের আগে একটা কথা।

    এম্পায়ার (empire):
    এম্পায়ার (empire) ধারণাটা এ প্রসঙ্গে বুঝা জরুরি। ইংরাজিতে এম্পায়ার (empire) বলে একটা শব্দ আছে যার মূল বা রুট অর্থ হল  – এক বিরাট ভুখণ্ড বা কয়েকটা দেশজুড়ে ভুখণ্ড তবে যা কোন একক শাসকের অধীনে পরিচালিত। বাংলায় এটাকেই আমরা ‘সাম্রাজ্য’ শব্দ দিয়ে চিনি। তবে এই শব্দ দিয়ে যেমন অটোমান সাম্রাজ্য (১২৯৯-১৯১৮) থেকে শুরু করে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্য (১৭২১-১৯১৭), ব্রিটিশ সাম্রাজ্য (১৬০০-১৯৪৫) ইত্যাদি চিহ্নিত করার পাশাপাশি অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা আজকের আমেরিকাকে (১৯৪২-চলমান) ‘সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা’ বলে থাকে। যেখানে সাম্রাজ্য শব্দের সবখানেই মুল কমন বৈশিষ্ট্য বা মানে হল, কয়েকটা দেশজুড়ে বা বিরাট ভুখণ্ড যাতে পরিচালিত হয় একক শাসন কর্তৃত্বে। যদিও কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদ মানে এসবের উপরে আরো অনেক কিছু। আমাদের মত দেশে ক্যাপিটালিজম আর স্বাধীন মত হবে না; যারা আগে যেসব দেশ ক্যাপিটালিজম স্বাধীনভাবে বিস্তার করে নিবার সুযোগ নিয়েছে তাদের বাধার কারণে  – ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। তবে ১৯৪২ সালের পর থেকে দুনিয়ায় সাম্রাজ্য বলতে কমন ধারণাটায় বদল আসতে থাকে। জাতিসংঘ জন্ম নিবার পরের জমানায় পুরান সাম্রাজ্যগুলোর কেউ নিজেকেই আর সাম্রাজ্য বলে দাবি করে না বা ডাকে না। কেবল কমিউনিস্ট নথিপত্রে আভ্যন্তরীণভাবে আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী ডাকার দলিল থাকতে পারে।   বর্তমানে কেউ অন্তত আর সরাসরি অন্য দেশ গিয়ে বসে সাম্রাজ্য (বা সাম্রাজ্যবাদী) শাসক বলে দাবি করে উপস্থিত হয়ে শাসন করা বন্ধ হতে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন রাজনৈতিক ভিত্তির উপরেই লড়া হয়েছিল তাই।
    যেমন ১৯৪২ সালের (জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা ১জানুয়ারি ১৯৪২) আগের শাসনগুলো ছিল মূলত কলোনি-দখলি শাসন আর ওদেশের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ব সম্পদ ওদেশ থেকে লুট করে শাসকের দেশে পাচার করা বুঝাত। ১৯৪২ এর পর থেকে বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পর সেই সুযোগই আর বাস্তবে থাকেনি। কারণ কলোনি- দখলি শাসন আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
    তবে ১৯৪৫ সালের পরে মূলত প্রত্যেকটা দেশ কলোনিমুক্ত ইন্ডেপেন্ডেন্ট  স্বাধীন রাষ্ট্র ধরে নিয়ে তাদের পরস্পরের মধ্যে দুনিয়াজুড়ে এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যেটা একেবারেই নতুন এক দুনিয়া তৈরি করে আর এরই এক “গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার” বা নিয়ম শৃঙ্খলা চালু হয়েছিল। এটা আমেরিকার নেতৃত্বেই চালু হয়েছিল এবং এখনও আছে প্রায় ৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকার নেতৃত্বে আধিপত্য কিন্তু এখন যা আবার ঢলে পড়ার শেষের দিকে। কারণ আমেরিকার হারানো প্রভাবের জায়গা দখল করার উপযুক্ত হয়ে উঠে আসছে চীন।
    সে যাক, কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরের আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে গরিব দেশগুলো কলোনিমুক্ত অর্থে স্বাধীন হয়ে যায় বটে কিন্তু নিজ নিজ অর্থনীতি কার্যকরভাবে চালানোর উপযুক্ত অর্থে স্বাধীনভাবে তারা টিকে থাকতে পারছিল না। যোগ্য ছিল না। এর মূল কারণ, আগের দু’শ’ বছর ধরে যেমন বাংলাদেশের মত দেশ থেকে এমন সম্পদ লুট আর পাচার হয়েছে যে তার কিছু অংশ অন্তত কোনো শর্তে আবার ফিরিয়ে না আনতে পারলে এসব স্বাধীন দেশ  অর্থনীতি জাগবে না; বরং না খেয়ে মরার অর্থনৈতিক দশায় পড়েছিল।  সেসব শর্তেরই সাধারণ দিক হল কিছু সুদে আগের পাচার হওয়া অর্থই যেন ফেরত এনেছিলাম আমরা। আমরা একা নই এটাই নতুন গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার। এছাড়া আমরা যতটুকু তাদের / আমাদের জন্য অর্থনৈতিক ভাবে সচল হব যতটা তাদের পণ্য ও বিনিয়োগ কিনতে চাহিদা তৈরি হবে ততটাই তাদেরও বিরাট লাভ।  ফলে আমাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ তাদেরও বা তাদেরই কম ছিল না। আর এ কাজেই ওসব অনুদান বা প্রায় না সুদের ঋণের আয়োজন। আর এতে প্রধান ও প্রায় একক বিরাট ভূমিকা রেখে এসেছে আমেরিকা।

    গ্লোবাল এম্পায়ার আমেরিকাঃ
    আমেরিকার এই ভূমিকাটা্র একটা মন্দের ভাল দিক আছে। ফলে আমরা একে মন্দের ভাল বলতে পারি। তবে কথাটাকে এভাবে বলতে হবে যে, এটা গরিব দেশকে সাহায্য করতে, তাদের একটা ভায়াবল অর্থনীতির গড়ে দিবার জন্য করা আমেরিকান বিনিয়োগ – না ঠিক এতটুকু তা নয়। এটা উলটা, মূলত আমেরিকার হাতে জমে যাওয়া বিনিয়োগহীন বিপুল উদ্বৃত্ব সম্পদের হিল্লা করার জন্য, গরিব দেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বের করা হয়েছিল। আর সেটা করতে গিয়ে আগে গরীব দেকে মুক্তি আর এরপর প্রায় না সুদে বা অনুদানে (আসলও ফেরত দিতে হয় না যেখানে) অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। যাতে আমাদের অর্থনীতি যত সচল হবে ততই আমরা তাদের পণ্যের ক্রেতা হব। আমরা চাহিদাহীন বন্ধ্যা এক অর্থনীতি হয়ে থাকলে এতে আমেরিকা বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিরাট ক্ষতি। এছাড়া, অর্থনীতি যত বড় হতে হতে আরও সমৃদ্ধ হবে যাতে ন্যুনতম চার পার্সেন্টের উপরে সুদে বিনিয়োগ পাওয়ার যতই যোগ্য হব আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ততই সব বন্ধ করে দিবে। সুতরাং অ্যামেরিকার লক্ষ্য যেন আমরা আরও বড় বড় বিনিয়োগ নেবার যোগ্য হই। তাদেরকে সরাসরি ব্যবসা বিনিয়োগ করতে দিতে পারি এমন যোগ্য অর্থনীতির দেশ হই। এভাবে সারা দুনিয়া জুড়ে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়, দুনিয়ার আরো কোণে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই অর্থে আমেরিকার এই ভূমিকাটা মন্দের ভাল। কারণ আমাদের অর্থনীতি ক্রমশ তুলনামূলকভাবে ভাল হবার কিছু সম্ভাবনা এর ভিতর আছে। ফকির হয়ে থেকে ধুকে মরার চেয়ে। কমিউনিস্টদের শোষণতত্ব অনুসারে আমেরিকা যে শোষক এটা অবশ্যই এজন্য ভুলে যাবার দরকার নেই। কিন্তু আমরা কী সেজন্য আমেরিকাকে গালমন্দ করে, পেটে খিদা নিয়ে না খেয়ে বসে থাকব? ধুকে মরব? এটাও কোন কাজের কথা না। এতটুকু প্রাকটিক্যাল হওয়ার কথা বলছি। যাতে আমরা এই গ্লোবাল অর্থনীতির ভিতরে প্রবেশ করে অংশ হয়ে এর ভিতরেই আমাদের জন্য যেসব তুলনামূলক সুবিধা জেগে উঠতে দেখা যাবে সেগুলোর সুযোগ নিয়ে স্ট্রাগল করে উঠে এক ভায়াবল অর্থনীতিতে  আসার চেষ্টা করব? এই হল সেই লড়াই। আর অবশ্যই আমেরিকান সম্পর্কে কমিউনিস্টদের শোষণতত্ব অস্বীকার বা না ভুলেই তা করা সম্ভব।  দুর্ভিক্ষে না খেয়ে আটকে থাকা কোন কাজের কথা না!  এককালের গরীব চীন আজকে দেবারেবল কিন্তু অবজেকটিভ সুযোগ পেয়ে কী অ্যামেরিকার উপর উঠে যেতে রুল করতে চাইছে না!
    এখন এই যে আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে আমেরিকার (তার নিজের স্বার্থে) সাহায্য আমরা পাচ্ছি বা আমেরিকা সাহায্য করছে – এটাই আমেরিকার ‘ইতিবাচক এম্পায়ার ভূমিকা’। এই যে ১৯৭১ সালের পরে আমরা বিশ্বখাদ্য কর্মসুচি (WFP) খাদ্য সাহায্য নিয়ে টিকে বেচে ছিলাম এটা নিশ্চয় খারাপ হয় নাই। এখন WFP কে ফান্ড দিয়েছিল কে?  এসব লিল্লাহ ফান্ডের প্রায় ৭০ ভাগ এখনও আমেরিকা যুগিয়ে থাকে। কেন? কারণ আপনি আমেরিকা গ্লোবাল নেতা মানে, আপনি অ্যামেরিকার উপর এক এম্পায়ারের দায়িত্ব আপনাতেই বর্তায়, বর্তাবেই। আপনি আমেরিকা তো নিজের জন্য প্রবল প্রভাবের সুবিধা তো নিবেনই। আমরা ঠেকাতে পারব না। কাজেই গ্লোবাল এম্পায়ারের দায় ভুমিকা – রোল প্লে করাই আপনার কাজ। আর আমাদের দিক থেকে এটাই মন্দের ভাল, গ্লোবাল নেতা ইতি ভুমিকা।
    আবার দেখেন যেমন, আমাদের ১৯৮৮ সালের বন্যা। আমেরিকা প্রায় না সুদে বা কোনটা কম সুদে বা অনুদানে অবকাঠামো খাতে আরো ঋণ-বিনিয়োগ না করলে আমরা হয়ত সেই সময় বন্যার ক্ষতি থেকে উঠে আসতেই পারতাম না বা বিরাট কষ্ট হত, অথবা ঘুরে দাঁড়াতে দেরি হত। আবার আমেরিকার দিক থেকে ঐ নতুন অবকাঠামো খাতে ঋণ-বিনিয়োগটা সেসময় আরো না যোগালে তাদেরই আগের দেয়া কোন ঋণ-বিনিয়োগ আমরা ফেরত দেবার যোগ্য থাকতাম না হয়ত। তাই এটা ছিল আমাদের আগে তাদেরই বিরাট মৌলিক স্বার্থ।

    এই হলো সেই “এম্পায়ারঃ কথাটার বিশেষ মানে। এম্পায়ার এর ভুমিকা কথাটা বুঝতে হবে ভাল করে। মানে অ্যামেরিকার সাথে সামগ্রিক নেতিবাচক সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক ভূমিকা, তবে সেটাও এম্পায়ারের স্বার্থেই। এটাই গত প্রায় ৭৫ বছরের আমেরিকার কিছু ইতিবাচক ভূমিকাও রেখে গেছে। এবং পরের গ্লোবাল নেতাকেই এই দায় নিতেই হবে। মানে এটাই আবার গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্বে যখন পালাবদল ঘটে আর তাতে নতুন যে নেতা আসে তাকেই এই দান-অনুদানে খরচের দায় নিতে হয়। অর্থাৎ ইতিবাচক এম্পায়ার রোল নিতে হয়। চীন এখন সে রোল নিচ্ছে ক্রমশ।

    ঠিক যেমন শুরুতে রাজাও খাজনা, ট্যাক্স, সেলামি বা পুণার্হ ইত্যাদি নানান নামে চাঁদা তোলে। কিন্তু প্রজাদের জন্য এর কোন অংশই রাজা ফিরে খরচ করে না। কিন্তু কোন সাম্রাজ্যের সম্রাট তিনিও আরও বেশি চাঁদা তুলেন হয়ত। কিন্তু ওর বিরাট অংশ তিনি সিভিল ইউটিলিটি মানে পাবলিকের জন্য রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা বা পানির ব্যবস্থা নির্মাণ ইত্যাদিতে ব্যয় করেন। এজন্য এম্পায়ার রাজার চেয়ে অনেক বেশি কাম্য – তারা দু’জনেই জোর করে বসা শাসন ক্ষমতা হলেও এর মধ্যে মাত্রার পার্থক্য রয়েছে।

    সার কথা হলো, পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা বলে একটা ব্যাপার আছে। গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা আমেরিকা এতদিন সে দায় ও ভূমিকা পালন করেছে, অকাতরে অর্থ ব্যয় করেছে আরও সুবিধা পাবার জন্য। এখন তার গ্লোবাল নেতাগিরি ঢলে পড়লে নেতার সবার আগে যে সামর্থে টান পড়ে তা হল – এই ‘পজিটিভ এম্পায়ারের খরচ করার ভূমিকা’। আর ঠিক ততটাই যেন নতুন বা আসন্ন গ্লোবাল নেতাও ঐ ভূমিকাটা পালনের জায়গা নিতে যোগ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ চীন সেই ‘পজিটিভ এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা’ নেবার অনেক যোগ্য এখন!

    কেন এম্পায়ারের কথা তুললামঃ
    সারকথায় আমরা কেউ সাবজেকটিভ বা ব্যক্তি অর্থে আমেরিকাকে না চীনকে পছন্দ করি তাতে কিছুই যায় আসে না। আমেরিকাকে না চীন কাকে কার উপরে বেশি ভালোবাসি সেই সাবজেকটিভ বিচার এখন প্রসঙ্গের বাইরে তুলে রাখতে হবে, অপ্রাসঙ্গিক বলে। বরং এদের মধ্যে কে এখন ‘পজিটিভ এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা’ নেবার যোগ্য – এই ব্যাপারটা অবজেকটিভভাবে নির্ধারিত হচ্ছে। সেদিকটায় তাকাতে হবে। কে বেশি যোগ্য বা উপযুক্ত সেই অবজেকটিভ বাস্তবতাকে মানতে হবে, একমাত্র সেদিকে দিয়েই বাস্তবতা নির্ধারিত হবে। আমরা তা না করতে পারলে সেটা ভাঁড়ামো মানে আমাদের আমেরিকান (বগলে ভারতীয়) ভাঁড়ের দালালের ভূমিকায় নামা হবে।

    তাহলে?  বাংলাদেশে  আমরা ব্যাপারটাকে কিভাবে বিচার করব?
    দুনিয়া এখন কোভিড-১৯ ভাইরাসের কবলে পড়ে হাসপাস করছে। কে কতদিন আর কীভাবে বাঁচে তা অজানা। গ্লোবাল অর্থনীতি ক্রমশ দেবে গিয়ে ঢলে পড়ছে। গ্লোবাল অবকাঠামো ব্যাংকগুলো তা ঠেকাতে চেষ্টায় নানান উদ্যোগ নিয়েই যাচ্ছে। সবারই একই লক্ষ্য রিকভারি- মানে ক্ষতি সামলে আবার জেগে উঠার চেষ্টা। অর্থাৎ উল্টা ভাইরাসের উপরে আধিপত্য বিস্তার করা, অন্তত কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা খাড়া করা।

    এই কাজে প্রধান পদক্ষেপ, হা সেই পদক্ষেপ হতে পারে সোজা কথায় ব্যাপক হারে উপযুক্ত টিকা বিতরণ হতে পারে একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য প্রধান কাজ। কিন্তু গাফিলতি, অযোগ্যতা, পরিকল্পনায় মারাত্মক ত্রুটির কারণে বাংলাদেশে টিকাকরণে যতই দেরি হচ্ছে ভাইরাস ততই নিজেকে আরেক রূপ বা ভেরিয়েন্টে হাজির করার সুযোগে দুর্দমনীয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ দ্রুত ও একসাথে সবাইকে (অন্তত ৭০ ভাগ) টিকা দিয়ে শেষ করাই একমাত্র জিতবার পথ।
    আর এখানেই গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়ার আছে, যা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আবার তা আসলে একটা মাপক, কে দুনিয়ার যোগ্য নেতা। আর কার দিন ফুরিয়েছে। কারণ, প্রচুর পরিকল্পনার ব্যাপার এখানে আছে। আগে বিনিয়োগের প্রয়োজন। যেমন গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপার তো আছেই। সেই সাথে এরপর ঐ লাইসেন্স নিয়ে উৎপাদন এবং সুষ্ঠুভাবে টিকা বিতরণে বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটির একটা ব্যাপার আছে। এখন একটা ওপেন কোশ্চেন করা যাক! একাজে গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়াতে কে বেশি যোগ্য?
    প্রথমত, আগের ডোনান্ড ট্রাম্প তো নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে স্বীকারই করেননি যে এটা করোনা একটা মহামারি ও সমস্যা। মাত্র এবছরের শুরুতে বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এটা আমেরিকানদের জন্যই প্রথম ও উপযুক্ত মনোযোগ পায়। মানে গ্লোবাল রোল দূরে থাক আমেরিকা আগে নিজ জনগণের প্রতিই ঠিকমতো মনোযোগ দেয়নি। বরং ভাইরাসকে দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করতে যেন পরোক্ষে সাহায্য করেছে যেন!
    এরপর বাইডেন, তিনি কথিত কোয়াডের মিটিং ডাকলেন। সদস্যরা সবাই বিশেষ করে ভারত লাফিয়ে উঠে এখানে কর্তা বা প্রধান নায়কের ভাব ধরল। চীনের বিপরীতে ভারত যেন গ্লোবাল নতুন নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেওয়ার বেশি যোগ্য – খামোখা এই ভন্ড হামবড়া ভাব নিয়েছিল ভারত।  যে কখনও ক্যালকুলেটরই টিপে দেখে নাই  ভারতের মোট জনসংখ্যাকে টীকাকরণ করতে  সে নিজে কতটা মুরোদে সামর্থবান, যোগ্য।  সে সভার শুরুর দিকে বাইডেন যতই পরিষ্কার করে বলার চেষ্টা করছিলেন তিনি মূলত দ্রুত কেবল আমেরিকান নাগরিকদেরকে টিকাকরণের জন্যই এসেছিলেন যাতে এখাতে জাপানি বাড়তি বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা তিনি আমেরিকানদের জন্য কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু ততই চীনকে পরাজিত দেখানোর লোভে আর বাস্তব হোক না হোক চীনের চেয়ে ভারত যোগ্য দেখানোতেই দিল্লি চাপাচাপি শুরু করে। আর ভারত এর এক মুখরোচক নাম দেয় – ‘টিকা কূটনীতি’। যা অবাস্তব তো বটেই প্রয়োজনীয়ও ছিল না। শেষে বাইডেন মিথ্যা হলেও কোয়াডের হয়ে “এশিয়াকে টিকাদাতা” হিসাবে হাজির হবার মিথ্যা কথা দিয়ে রাজি বলার পরই কেবল ঐ সভা শেষ করতে পারেন।
    অথচ আজকের বাস্তবতা হল, আমেরিকা ভারতের টিকা পায়নি বা নেয়নি। তবে বাইডেন নিজেই অন্যান্য উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ বাড়াতে সক্ষম হন। আর এদিকে ভারত আমাদের দেশের বেক্সিমকোর মাধ্যমে ভারতীয় টিকা পেয়ে যাচ্ছে সাথে নগদ লাভও হচ্ছে এই মিথ্যা বাস্তবতা খাড়া করে। এতে আমাদের চীনা টিকা ও লাইসেন্স পাওয়া ভন্ডুল করে দিতে তারা সমর্থ হয়। কারণ আমরা লোভি হয়ে পড়েছিলাম। সময়মতো চীনকে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।  ভারত আমাদের টিকার সব সমাধান দিয়ে দিয়েছে আবার পকেটও ভরবে এই অবাস্তব চিন্তায় আমরা বাস্তব দুনিয়াটা উপেক্ষা করেছিলাম।
    আর ওদিকে এখন ভারতের জন্য কঠিন বাস্তবতা হল, বিদেশের কাউকেই তার টিকা দেয়ার সামর্থ নেই। সেটা দূরে থাক। তারপরেও ভারতের নিজ জনগোষ্ঠির সবাইকে টিকা দিতে আগামি  দু’বছরে পারবে কিনা সন্দেহ। যার মানে নিজ জনগোষ্ঠীকেই টিকাকরণ করতে ভারতের সামর্থ নেই। তাই ভারত ইতোমধ্যেই বাইরে থেকে টিকা আমদানির অনুমতি দিয়েছে। তাহলে এই ভারত আমেরিকা এবং বাংলাদেশসহ সারা এশিয়াকে টিকা কূটনীতিতে ছেয়ে ফেলার যে হুঙ্কার- এটা কেন দিয়েছিল? এতেই প্রমাণ হয়, গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেওয়ার কাজটা ভারত কোনদিন  বুঝেছে বলে আমাদের মনে করার কোন কারণ নেই। কেবল দুচোখ ভরে জ্বলজ্বল করা লোভ ছাড়া তাদের কোন মুরোদই নাই যেন!

    তাহলে ওরকম  পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কী করতে পারত? মানে টিকা বা টাকা ফেরত কোনোটাই না পেয়ে বাংলাদেশের তখন কোথায় যাওয়ার বাকি ছিল? আমেরিকার কাছে?

    আগেই বলেছি, টিকা উৎপাদন গরিব-বড়লোক বলে ভাগ হয়ে আছে। আমেরিকায় উৎপাদিত টিকা বিনা পয়সায় দিলেও আমাদের কাজে লাগানো কঠিন। তবু, আমাদের প্রায় ১৩ লাখ একডোজ নেয়া গ্রহিতা বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। কারণ ভারত তাদের জন্য দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেয়নি, আবার কখনও দিবে সে সম্ভাবনাও নেই। আবার অন্য উৎস থেকে আমেরিকার হাতে প্রায় ৫ কোটি এস্টোজনিকা মানে আমাদের মত একই টিকা থাকার কথা জানা গেছে। তাই সেখান থেকে মাত্র ঐ ১৩ লাখ ডোজ আমরা চেয়ে আমরা অনুরোধ করেছিলাম কিন্তু আমেরিকাও এখনও কোনো সাড়া শব্দ করেনি।

    তাহলে এখন চীন ভরসা ছাড়া আমাদের টিকা পাবার উপায় কী? এটাই সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। আর এই দুরাবস্থায় আমাদেরকে ফেলে গেছে ভারত ও তার হামবড়া ভাব! অতএব টিকা পেতে হলে আমাদের আগের লোভ ও ভুল সিদ্ধান্তের জন্য চীনের কাছে গিয়ে সরি বলে আবার তাকে রাজি করানো ছাড়া উপায় কী ছিল? এছাড়া বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি ইত্যাদি সবকিছুতেই আমাদের ঘাটতি আছে। অর্থাৎ আমাদের এক  মুরোদ ওয়ালা এম্পায়ার দরকার! আর ঠিক বিপরীতে চীনের সেই এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা নেয়ার সামর্থ আছে। এটাই বাস্তবতা।
    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, আমরা স্পুটনিক টিকা পাবার চেষ্টা করতে পারি। এটাও বাস্তবতার খবর না নিয়ে কথা বলা। রাশিয়ার আর কাউকে টিকা উৎপাদন করে সাপ্লাই দিবার সক্ষমতা নেই। তাদের কারখানা ওভার অকুপায়েড মানে সক্ষমতা সব পূরণ হয়ে গেছে। এছাড়া  ঐ টিকা দিতে পারলেও সে টিকার দাম পড়বে ১৫ ডলারেরও বেশি কারণ তাদের উৎপাদন খরচ বেশি। ভারতে দিতে চেয়েছে হাজার রুপিতে। এছাড়া কৌশলগত দিক থেকে চীন কোন দেশকে না করে দেয় তবে তাকে টিকা দিবার সিদ্ধান্ত রাশিয়া আর নিবে না। তাদের কৌশলগত পারস্পরিক  সম্পর্ক এরকমই। আর রিয়েলিটি হল, আমাদের স্পুটনিক টিকা উতপাদনের লাইসেন্স পাবার নিশ্চয়তার প্রসঙ্গে, চীনের হাতে (চীনা সরকারি নিয়ন্ত্রণে চীনা প্রাইভেট কোম্পানি) বাংলাদেশে উৎপাদনের জন্য রাশিয়া সহজেই লাইসেন্স দিতে রাজি হবে। নইলে নয়। কাজেই আগামী চার মাস নিয়মিত চীনে তৈরি টিকার সাপ্লাই পাওয়া আর ঐ চার মাসের মধ্যে বাংলাদেশে নিজেদের অন্তত দু/তিনটা প্রাইভেট কোম্পানিকে টিকা উৎপাদনে যোগ্য করে সাজিয়ে দিয়ে তাদের দিয়ে বাংলাদেশের নিজ উৎপাদন যোগাড় ইত্যাদিতে চীনকে রাজি করতে পারলেই একমাত্র টিকা দ্রুত পাওয়া সম্ভব।

    তাহলে সোজা কথা চীনের এই গ্লোবাল এম্পায়ার ভূমিকাটাই আমাদের জন্য কাম্য ও মুখ্য। এখন চীন যদি আমাদের কাছে বিনিময়ে নিশ্চয়তা চায় যে আগের মত আমাদের আবার পা পিছলাবে না? ভারত বা আমেরিকার কাছে লোভে ফাঁসবো না আমরা – চীন সেই গ্যারান্টি যদি চায় তাহলে কী হবে? এমনিতেই সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে চীন সে নিশ্চয়তা আমাদের কাছে চাইতেই পারে। এটা তার অধিকার।

    এখন প্রথমত, বিচার করেন আমাদেরকে চীনের কাছে ফিরে হাত জোড় করে অনুরোধ করার ভূমিকায় দাঁড় করালো কে? ভারতে মিথ্যা আশ্বাস ও প্রফিটের শেয়ারের লোভ। আর সেই সাথে কোয়াড, টিকা কূটনীতি এসব মিথ্যা বোলচাল। অথচ গ্লোবাল নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়া- এই মুরোদ তো আমেরিকাসহ কোয়াডের কিছু করার নাই,  আমরা দেখলাম না!

    জাস্ট কল্পনা করেন। ঈদের পরের ঢাকায় আক্রান্ত লোকের সংখ্যা যদি বেড়ে যায়, সেইসাথে ভারতীয় ধরণের ভাইরাস যদি ছড়িয়ে যায়? এদিকে দেশে ইতোমধ্যে আমাদের টিকা পাওয়া লোকের সংখ্যা এখন যেখানে মাত্র দু-তিন পার্সেন্টের মত তখন ঐ পরিস্থিতিতে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?

    গত ১০ মে বিবিসি রিপোর্ট করেছে ‘কোয়াড’ এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে যথেষ্ট খারাপ করবে বলে চীন মন্তব্য করেছে। আমাদের অতিউৎসাহী প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকান লোকজন এনিয়ে আমেরিকার কাছে নালিশ নিয়ে গিয়েছিল।  আর এতে আমেরিকান প্রতিক্রিয়া হলো ‘চীনের রাষ্ট্রদূত যে মন্তব্য করেছেন, তার ওপর নজর আছে যুক্তরাষ্ট্রের’। বাস এখানেই শেষ। মনে হচ্ছে না   অ্যামেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা দেখানোর কোন মুরোদ বা ইচ্ছা আছে।  এতো দেখি নালিশ করে বালিশ পাবার মত ঘটনা!  কাজের কাজ কিছু নাই।  আমরা দেখতে চাই অ্যামেরিকার ইতি এম্পায়ার ভুমিকা? কোথায় সেটা?  তাহলে আমরা টিকা পাব কী করে? সেটাব জবাব কী আমেরিকা বা ভারত অথবা দেশের এই অতিউৎসাহী প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকানদের আছে? এনিয়ে তাদের বক্তব্য কি? আমরা শুনি না।

    ব্যাপারটা খেয়াল করেন!  বাংলাদেশ চীনের কাছে ফিরে টিকা চাইতে যেতে হচ্ছে এমনই খারাপ অবস্থায় যখন চীনের কাছে আমাদের কোনো পজিটিভ ইমেজ নেই। কারণ আমরা চীনের আগের অফার কোন সদুত্তর ছাড়াই এর অবজ্ঞা, অপব্যবহার করেছি। কাজেই চীন আমাদের আগের আচরণের বিরুদ্ধে এবার নিশ্চয়তা তো চাইতেই পারে! একই ভুল কাজ করব না এর গ্যারান্টি তো চাইবেই!
    আর এ ঘটনাকে চীনের রাষ্ট্রদুতের মন্তব্য  বিবিসি রিপোর্ট করেছে এভাবে,
    “এ ধরনের ছোট গোষ্ঠী বা ক্লাবে যুক্ত হওয়াটা ভালো না।
    বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে তা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যথেষ্ট খারাপ করবে”।

    আর প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকান লবিস্টরা এটাকে ব্যাখ্যা করছে ‘চীনা হুমকি’ হিসেবে। অথচ বিবিসির পুরা রিপোর্টে ‘হুমকি’ বলে কোনো শব্দই নেই। এর মানে এটা লবিস্টদের উস্কানি দেবার জন্য কিছু মিডিয়ার  ব্যবহৃত নিজস্ব শব্দ ও ব্যাখ্যা। এবং কিছু বিশেষ মিডিয়া কোন রেফারেন্স ছাড়াই ইচ্ছামত ব্যাখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথা বলে তা রিপোর্ট করে চলেছে।

    আবার দেখি কেউ কেউ লিখছেন তারা নাকি বিস্মিত হয়েছেন। আর  আসলে আমরা তাদের আচরণ দেখে বিস্মিত হচ্ছি। তারা টিকা পাবার কোনো পাল্টা উৎস বা প্রপোজাল কি দিয়েছে?

    একমাত্র অবজেক্টিভ চোখেই কোয়াড, টিকা পাওয়া বিষয়ের ভালো-মন্দ বিচার করার মত যদি আমাদের অবশিষ্ট কিছু যোগ্যতা থেকে থাকে তবেই হয়ত আমরা এ যাত্রায় পার পেয়ে যেতেও পারি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৫ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে   “কোয়াড-টিকার ভালো-মন্দ বিচার” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে আর  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ডেস্ক রিপোর্টিংয়ের নামে

    ডেস্ক রিপোর্টিংয়ের নামে

    গৌতম দাস
    ১২ মে ২০২১ ভোর ৪:৫০

    https://wp.me/p1sCvy-3xm

     

    প্রথম আলোর মতিভাইয়েরও তাল রাখা কঠিন হয়ে যাবে। এভাবে হবে না। হুশ-জ্ঞান ওয়ালা কিছুলোক অন্তত লাগবে। এমনিতেই বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো প্রায়শই দিকভ্রান্ত থাকে ফলে যার যেটুক সামর্থ আছে সেটুকুও নিয়েই তারা  বাংলাদেশের  মানুষের কাজে নিজেদেরকে লাগাতে পারে না। প্রথম আলোরও যেটুকু দক্ষতা ছিল তা  উপযুক্ত দিক-নির্দেশনার অভাবে মৃত অতৃপ্ত আত্মার মত ‘ভটক রাহা হ্যায়’ মানে বেঘোরে ঘুরে মরছে যেন!

    যেমন আমাদের বাংলা মিডিয়ায় /পত্রিকায় বিদেশি খবর ছাপা হওয়া মানেই একটা ত্রাস যেন। মিডিয়ার বেদিশ কর্মিগুলা নিরুপায় হয়ে এক জবরদস্ত সুবিধা তাঁরা বানিয়েছে, “ডেক্স রিপোর্ট” নাম দিয়ে। মানে কারখানাটার নাম ‘ডেক্স’ যেখানে সব কিছু বানানো যায় অথচ মেটেরিয়াল বিদেশি পত্রিকার। আর মূখ্যত যেখানে ভুলে যাওয়া হয়েছে যে এটাও তো একটা জার্নালিজমের নামেই চলছে!

    বাংলাদেশে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া কম নাই। এর সাথে প্রো-চাইনিজও থাকুক কিংবা প্রো-ইন্ডিয়ান তাও থাকুক! কী আর করা যেখানে মিডিয়াটা চলে মালিকদের অন্য ব্যবসার আয়ের টাকার উপরে!  কিন্তু সে থাকারও তো একটা নিয়ম থাকতে হবে! মানে কিভাবে তারা থাকবে সেটা মুল প্রশ্ন এড়ানো যাবে না। এমনিতেই বাংলাদেশের মিডিয়ায় বিদেশি পত্রিকা থেকে তুলে আনা নিউজ প্রায় নিজের ভাষ্য বলে ছাপিয়ে দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছে, যেন তারা নিজেরাই সেগুলার মুল রিপোর্টার বা ফাস্ট রিপোর্টার। এরপর আরো আছে। “ডেক্স রিপোর্ট” মানেই তা প্রথমত কোন রেফারেন্সই ছাড়াই রিপোর্ট করার মহোতসব। “ডেক্স রিপোর্ট” এর নামে প্রথম যে এটা চালু করেছিল তার ছবি বাধিয়ে রাখা উচিত। তিনি এর একেবারেই পথ প্রদর্শক!

    এছাড়াও এরপর কখনও যদি দয়া করে কখনও তাঁরা এক কোনায় লিখে যে অমুক বিদেশি ও ইংরাজি পত্রিকায় সেখবরটা দেখেছে ধরা যাক শিনহুয়া, তবু ওখানেই শেষ। সেটা কবেকার পত্রিকা, রিপোর্টের শিরোনাম কি ছিল, লেখক-রিপোর্টারের সম্পর্কে কোন বাড়তি তথ্য ইত্যাদি তা কিছুই সাথে দিবার বলার রেওয়াজ তাদের নাই। এদিকে আবার রেফারেন্স মানে যে উলটা কমা দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হয় কোন শব্দগুলো ওখানে বিদেশি বা অন্য পত্রিকার! না এরা মনে হয় উলটা কমার ব্যবহারই জানে না। অবস্থা এতই শোচনীয় যেটা আসলে ‘যা ইচ্চছা তাই’ করার এক জগত যেন।

    অথচ দেশের ভিতরের ঘটনাবলিতে তাদেরই নিজস্ব নিউজ রিপোর্টিং যথেষ্ট স্টান্ডার্ড। যার মানে হল, তারা এই বেপরোয়া হওয়াটাকে  সুবিধা হিসাবে নেন, যেন কা্রো হয়ে প্রপাগান্ডা করে দিবেন এরই কাজ এটা!  আর সবচেয়ে বড় কথা “ডেস্ক রিপোর্ট” এই সেকশন কীভাবে চলবে এর স্টান্ডার্ড  বা কী নীতিতে চলবে এর মা-বাপ বলে কিছু থাকতে নাই যেন।

    তাই মনে হয় এটা বলার সময় পার হয়েছে, যে অনেক হয়েছে প্লিজ এবার একটু দায়ীত্ববান হন। এই বেপরোয়া, খামখেয়ালিপনা আত্মঘাতি! আসলে সমস্যাটা হল, ধরেন আপনি প্রো-আমেরিকান হয়ে থাকতে চান। সেটা হয়ত খুব সমস্যা না। কিন্তু সমস্যা হল, বুঝবেন কেমনে কী করলে সেটা প্রো-আমেরিকান হবে, নাকি না বুঝার কারণে নিজেই নিজের মাথার উপরেই বোমা মারবেন? মূল সমস্যাটা এখানে!

    ভারতের এক কথিত থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো (নাকি মালিক) হলেন ব্রহ্ম চেলানি। ভারতে তার দোকানের নামটা তার লেখার শেষে পরিচয়ে দেওয়া আছে এভাবে – নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক। আজকাল গ্লোবাল অর্থনীতিক নেতৃত্বের পালাবদলের যুগ, আমেরিকানেরা তাই আরো বেশি করে সংগঠিত হয়ে কাজ করার চেষ্টা করে থাকে। অনেকে আবার উতসাহি হয়ে আমেরিকানদেরকে একাজে সাহায্য করে থাকে। তেমনই এক উদ্যোগ হল “প্রজেক্ট সিন্ডিকেট“, মানে কলাম-মতামত লেখা শেয়ার করে অনেকগুলো পত্রিকায় ছাপানোর সুযোগ করে দেওয়া। এখন প্রথম আলোই দেখা যায় অনেক সময়  প্রজেক্ট সিন্ডিকেট এর লেখা অনুবাদ করে ছাপে। আর তা থেকেও “ডেক্স রিপোর্ট” ঘটিত বিশৃঙ্খলা বা আত্মঘাতি হওয়া কম নয়!

    যেমন “ডেক্স রিপোর্ট” সেকশনের জন্য লেখা বাছাই এক বিরাট ধাপ। যে ইংরাজি কোন পত্রিকার কোন লেখাটা অনুবাদ করতে দেওয়া হবে! যেমন প্রজেক্ট সিন্ডিকেট বা যেকোন বিদেশি পত্রিকার কোন লেখা অনুবাদ করতে হবে এটা কে বাছাই করবে। কারণ সারাদিনে যত বিদেশি লেখা প্রকাশিত হয় বা হাতে লাগে তার সবগুলো তো ছাপা যাবে না। ফলে অনুবাদ করার মানে হবে না।  আবার সেসব লেখা নিজ পত্রিকার যে লাইনে আর্গুমেন্ট করে সেই তালের সাথে যায় এমন হতে হবে।  লেখা বাছাই ব্যাপারটা  তাই খুব এক্সপার্ট কাজ। এরপরেও ধরা যাক আপনি ভাবলেন এটা “নাম জমা দিবার” এক পদ্ধতিতে সেরে ফেলবেন। সেটা এভাবে যে ‘ডেস্ক ইনচার্জ’কে নাম জমার এক চিরকুট ধরায় দিবার ব্যবস্থা করলেন। যে এই চিরকুটের নামের লেখা হলে ছাপবেন, এই হল কন্ট্রোল সিস্টেম। কিন্তু না, এটাও কাজ করবে না!

    আগেই বলেছি পালাবদলের কাল এটা। তাই আমেরিকা গত প্রায় ২০বছর ধরে নিয়মিত অর্থ ঢেলেছে ইন্ডিয়ান একাদেমিক জগতের এক অংশের (থিঙ্কট্যাংক) উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে। যাতে সে চীন ঠেকানোর [China containment] কাজে ভারতকে ব্যবহার করতে পারে। যার কেন্দ্র আছে আমেরিকান কিছু থিঙ্কট্যাঙ্ক যারা নিজেদের সংগঠনের ভারতে এক্সটেনশন শুধু না, তাদেরকে দিয়ে ভারতের কিছু গ্রাজুয়েটদের ধরে পশ্চিমে মাস্টার্স বা পিএইচডি করতেও পাঠানোর মাধ্যমে তাদেরকে আমেরিকান পলিসির প্রবক্তা বানানো। তেমনই এক ছোট দোকান চালিয়ে থাকেন ব্রহ্ম চেলানি। দোকান ছোট আবার ফান্ড যোগাড়ের কম্পিটিশন য়াছে এলাইনে। ফলে চটকদারি হিন্দুত্বের লাইনে কড়া প্রো-আমেরিকান অবস্থানে চীনবিরোধী এক ভারতের সরকারি অবস্থান খাড়া করা নিয়ে তিনি অনেক কষ্টে নিজের দোকান টিকিয়ে রাখেন  ব্রহ্ম চেলানি। তবু যেভাবেই হোক “প্রজেক্ট সিন্ডিকেট”  হয়ে প্রথম আলোর “ডেস্ক” পর্যন্ত তিনি পৌছে গেছেন। নেটওয়ার্ক তাকে হেল্প করেছে। কিন্তু প্রথম আলোর ম্যানেজমেন্ট সমস্যা তাতে একেবারেই যায় নাই। বরং সবই কপাল খারাপ।

    মোদী মহাশয় হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে ছেয়ে ভারত তোলপাড় করে ফেলতেছিলেন গত সাতবছর ধরে, তা ভারতের প্রথম সারির কোন ইংরাজি দৈনিকের ফরেন এফেয়ার্স এডিটরের অজানা থাকার কিছু নাই। তিনি আবার হিন্দু হয়ে প্রেমের টানে মুসলমান বিয়ে করেছেন। অথচ যার বাবা আবার বিজেপির জাঁদরেল এক নেতা-এমপি। তাই যেন  তিনি আবার সকাল-বিকাল মুসলমান-বাংলাদেশকে দখল করে নিবার হুমকি দিয়ে থাকেন এমন অবস্থা। এহেন সম্পাদকের তাই বাপ থেকে দূরে গিয়ে কথিত সেকুলারজমই ভরসা করবেন এমনই হবার কথা হয়েছেও। কিন্তু কাহিনী হল সেই ফরেন এফেয়ার্স এডিটর – সেই সম্পাদকই আমরা দেখছি তিনি আবার প্রচন্ড মোদী সরকারের ও তাঁর ফরেন পলিসির ভক্ত। কেন? ব্যাপারটা এমন জটিল কেন?

    খুব সোজা। মোদী হিন্দুত্ব করুক বা যা খুশী সেটা সম্পাদকের চোখে সমস্যা না। কারণ মোদীর রাজনীতি যত নোংরা হিন্দুত্বই হোক মোদী নিজের এক ইমেজ খাড়া করতে পেরেছেন এই সম্পাদকের কাছে যে তিনি ভারতকে নাকি  এই এক সুপারপাওয়ার প্রায় বানাইয়েই ফেলেছেন। আবার মোদীর কিছুটা শুবিধা হল সম্পাদকেরা পরাশক্তি কী অথবা তা ভাল চিনেন তাও না। কাজেই সম্পাদকেরা যদি তার হিন্দুত্বের উপেক্ষা করে দেশপ্রেমে গদ্গদ হয়ে মোদীকে সাহায্য না করেন তাহলে মোদী সফল হবেন কী করে?  মোদীর এই ভাষ্য ওমন সম্পাদকেরা খুবই পছন্দ করেছেন! অতএব  বাপেরবিরোধী এমন সম্পাদক যে আবার মোদীভক্ত!  – এই কম্বিনেশন ঘটতে পেরেছে।

    কিন্তু তারও কপাল খারাপ!  কারণ, কুম্ভমেলা করে মোদী এখন করোনার সেকেন্ড ওয়েভে সবাইকে নিয়ে মাখায় ফেলেছেন, এখন ধরাশায়ী। তাঁর পরাশক্তি ভারতের গল্প এখন থার্ল্ড ওয়ার্ল্ডের ভারতে নেমে গেছে। ফলে সম্পাদকেরাও স্বপ্নভেঙ্গে হতাশ!

    এদিকে কান্ড ঘটেছে একটা।  আমেরিকান চেম্বার অফ কমার্স বিপদ গুনেছে। ব্লিঙ্কেনের উপ্সথিতিতে তাদের অনুমান-সিদ্ধান্ত যে ভারতের ইকোনমিতে একেবারে ধবস আসন্ন। কাজেই আগামি জুলাইয়ে ফার্স্ট কোয়ার্টারে সেটা সবাই জেনে যাবে। এর ফলে গ্লোবাল ইকোনমিতে বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে খবর হয়ে যাবে। আর যা থেকে আমেরিকান ইকোনমিতে। কাজেই  ইীনিয়ে আগাম কী ব্যবস্থা নেয়া যায় তা আলোচনার মিটিং ছিল সেটা। না এটা সেই “কান্ড” নয়।

    কান্ডটা হল, সিএনএনের এক নারী সাংবাদিক মোদী-যোগীর উত্তরপ্রদেশের এক হাসপাতালের অব্যবস্থতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব আর অভাব, মানুষের শেষ প্রাণবায়ু কিভাবে বের হয়ে যাচ্ছে এরই এক প্রামাণ্য সচিত্র প্রতিবেদন হয়ে দাড়িয়েছে যা তিনি নিয়েছেন  সেটা। দেখা যাচ্ছে যেটা ইউটিউব-ফেসবুক ছেয়ে ফেলেছে। কারণ এটা আমেরিকান চেম্বারের অবস্থানকে  আরও শক্ত বা কোরাবোরেট করেছে ও সচিত্রভাবে। শুধু তাই নয় এর ইমিডিয়েট এফেক্ট হবে আরো আগাম আমেরিকান সব ব্যবসা-পুঁজি দ্রুত ভারত থেকে প্রত্যাহার। কারণ মূল ভয় এখানে, যেকোন দিন মোদী সরকারের পতন ঘোষিত হতে পারে। তাই এর আগেই সব প্রত্যাহার, পালাও পালাও রব!

    কিন্তু সেই ব্রহ্ম চেলানি এবার আবার মাঠে নেমেছেন ঠিকই কিন্তু কলম ধরেছেন উলটা করে। তিনি এখন পশ্চিমা সমাজের সমালোচক এই বলে  যে তারা ভিকটিম ভারতের প্রতি সংবেদনশীল না। মানে কেন সিএনএনের ঐ  নারী সাংবাদিক ভিডিওও ক্লিপ প্রচার করল! অর্থাৎ তিনি এখন ভারতে আমেরিকান ব্যাবসা বা স্বার্থের এজেন্ট না। তিনি এখন হিন্দুত্বের দেশপ্রেমিক হয়ে মোদী সরকারের পক্ষে, বিদেশের বিরুদ্ধে স্বদেশী।

    কিন্তু এতে প্রথম আলোর কী জটিলতায় পড়েছে? প্রথমত আমরা স্পষ্ট না সেবুঝেছেই যে সে জটিলতায় পড়েছে। কারণ  চেলানি তার ঐ লেখা ছাপিয়েছে আমেরিকান স্বার্থের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে ফেলে মোদীর পক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়ে। কিন্তু সে যে আমেরিকান গ্লোবাল লাইনের যে ব্রহ্ম চেলানি ছিল তা সে নয়। অথচ প্রথম আলোতে ব্রহ্ম চেলানির লেখা অনুবাদ করে ছাপে তিনি তো আমেরিকান গ্লোবাল লাইনের ব্রহ্ম চেলানি।

    তাহলে ডেস্ক রিপোর্টিং চালানোর সমস্যা কোথায় এর কিছুটা আমরা এখানে দেখলাম।  কিন্তু কথা আরো আছে। ভারতের ভিতরেই আবার অন্য মিডিয়াগুলো সবাই কী সিএনএনের অথবা ঐ  নারী সাংবাদিকেরা বিরুদ্ধে হিন্দুত্বের দেশপ্রেমে মজে থেকে রিপোর্ট করে যাচ্ছে?

    একেবারেই না। ভারতের আরেক টপ মিডিয়া “দ্যাপ্রিন্ট”। তার এক রিপোর্টের শিরোনাম হল – “না ওয়েস্টার্ণ মিডিয়া ভারতের কোভিড নিয়ে পক্ষপাতের রিপোর্ট করে নাই। কেন, এখানে দেখুন” [No, the Western media isn’t biased in reporting Indian Covid. Here’s why]  ০৯মে ২০২১ দ্যাপ্রিন্ট। অন্তত শিরোনাম থেকেই প্রথম আলোর বুঝা উচিত সে কী ভুল করেছে। কিভাবে তার মুখে মাটি গেছে!

    এছাড়া আরো পথ ছিল যদি ধরে নেই, লেখা বাছাইটা প্রথম আলো গুরুত্বপুর্ণ মনে করে। তবে সেই বিচারে তারা একা চেলানির বায়াসড লেখা না। উপরে দ্যাপ্রিন্টের লেখাটার অনুবাদ করেও ছাপতে পারত!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    গৌতম দাস

    ১০ মে ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3wM

     

     

    India not really a Superpower

    গত ২ মে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। বিজেপির ৭৭ আসনের বিপরীতে তৃণমূল ২১৩ আসন পেয়ে বিধানসভায় জিতেছে। কিন্তু আরএসএস-বিজেপি ব্যাপারটাকে যেন ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ও সরকারের নির্বাচনের মত পর্যায়ের  বিশাল গুরুত্বের বানিয়ে ছেড়েছিল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় থাকায় বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারি প্রশাসনকে দুমড়ে মুচড়ে কিভাবে সেই ক্ষমতাকে এক রাজ্যের নির্বাচনে চরম অপব্যবহার করতে গিয়ে হারতে পারে এরই নজির হয়ে থাকবে এই নির্বাচন!

    মোদীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেন গুরুত্বেরঃ
    আরএসএস-বিজেপি এই রাজ্য নির্বাচনকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং এতে সম্ভবত সর্বোচ্চ অর্থকড়ি ও সময় ঢালার পেছনের কারণ কী?  যেমন একমাসেরও বেশি সময় ধরে  আটপর্ব এইনির্বাচনের শ্লট বানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর কোথাও আট পর্বে তা হয় নাই। আবার আটপর্ব যে অপ্রয়োজনীয় ছিল এর প্রমাণ কমিশন অজান্তে নিজেই তুলে ধরেছে। পাঁচপর্ব নির্বাচনের পর কোভিড ভাইরাসের প্রভাব বেড়ে যাওয়াতে কমিশন সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিল। সেখানে বাকি সবভোট একদিনে নিয়ে সব শেষ করার জন্য মমতা প্রস্তাব দিলে  কমিশন টেকনিক্যাল আপত্তির কথা তুলে তা নাকচ করেছিল।  তা হল, একদিনে ভোট নিতে গেলে মোট যে পরিমাণ ফোর্স লাগবে তা এখন সংগ্রহ করার সময় নাই। তাদের এই কথায় প্রমাণিত যে এত মাস জুড়ে নির্বাচন আয়োজনের দরকার ছিল না। কেবল সময় থাকতে ফোর্স সংগ্রহ করলেই হত। তাহলে  নির্বাচনের মাঝের দিনের গ্যাপ এত বেশি রাখা হয়েছিল ইচ্ছা করেই। আর এই “খেয়ালি” ইচ্ছাটা কার খেয়ালে?  এটাই এখন স্পষ্ট এক রাজ্যের নির্বাচনে  মোদী  নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে রেকর্ড গড়েছেন। যাতে তিনি একমাসের মধ্যে মোট ১৮ দিন কলকাতায় সভা করতে পারেন এবং তা করেছেন। এটাই ক্ষমতার অপব্যবহার আর পশ্চিমবঙ্গের  এবারের  নির্বাচনকে আরএসএস-বিজেপি  কী মাত্রার গুরুত্ব দিয়েছে তার প্রমাণ। তাহলে কথা সোজা, দেখা গেল এবার ‘কলকাতা দখলকে’ আরএসএস-বিজেপি মাত্রারিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেটাই বা কেন?

    সবাই রাম-পুজারী হিন্দু না, বিজেপির দরকার একই হিন্দুঃ
    ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক দিক থেকে বললে ভারত মানে বৃহত্তর উত্তরপ্রদেশের হিন্দু ভারত- এমন ভাবনার আধিপত্য চলে আসছে।  ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার উপর ভারতের জন্ম থেকেই এই আধিপত্য সবসময় ক্রিয়াশীল থেকে আসছে।  আর তাই এর সাথে দক্ষিণ ভারতের বিরোধের কথা আমরা অনেকে কম-বেশি শুনেছি। দক্ষিণ ভারত হিন্দি জানলে বুঝলেও হিন্দি ব্যবহার করে না চল নাই – একথাও আমরা শুনেছি।
    হায়দরাবাদের (বা অন্ধ্রের) পরে তেলেঙ্গানা থেকে কর্নাটক, তামিলনাড়ু হয়ে কেরালা পর্যন্ত এই দক্ষিণী অঞ্চল একে ভারতের ভাষায় দাক্ষিণাত্য (ডেকান বা Deccan) বলা হয়।  দক্ষিণদিক কথার সংস্কৃত উচ্চারণ ‘দাক্ষিণাত্য’ আর এই খটমটে শব্দ বৃটিশেরা ইংরেজিতে সহজে উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘ডেকান’ বানিয়ে ফেলেছে। ভাষার দিক থেকে এই অঞ্চলের চারটা ভাষাকে একসাথে একে দ্রাবিড়ীয় ভাষার অঞ্চল বলে। এটাই হিন্দিবিরোধী ও আর্যবিরোধী দ্রাবিড় সমাজ অঞ্চল। আসলে দাক্ষিণাত্য বলতে বুঝায়, ভারতের দক্ষিণের পুর্ব ও পশ্চিম উপকুল এবং এক বিস্তৃর্ণ উচু মালভুমি ও পর্বতমালা (plateau and mountain ranges) যার সর্বোচ্চটা আনাইমুদি (২৬৯৫ মিটার), এভাবে এই পুরা অঞ্চলকে।  আর এই বিস্তৃর্ণ মালভুমি ও পর্বতমালা এলাকা টপকাতে পারে নাই বলেই উত্তরের আর্য আক্রমণ ও সম্ভাব্যদখল থেকে দক্ষিণ বেঁচে যায়। প্রাচীনকালের সেই লড়াই প্রতিরোধ এবং এর ফলাফল এখনও সক্রিয় ও কার্যকর ফলে ঐতিহাসিক গুরুত্বের। ফলে দক্ষিণ-ভারতের হিন্দি না-বলা এটা শ্রেফ শখ বা কারও খেয়াল মোটেও নয়।
    এছাড়া আরও আছে।  যেমন, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনের পর থেকেই এই দ্রাবিড় সমাজ “ব্রাহ্মণ তাদের সমাজে অপ্রয়োজনীয়” বলে এক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন করেছিল। ব্রাহ্মণ ছাড়াও বিয়ে করা যাবে বলে আইনও তৈরি করেছিল, যা এখনো চালু আছে। এরই উত্তরসুরি আঞ্চলিক ডিএমকে ও আন্না-ডিএমকে দল। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার আন্দোলনও করেছিল এই রাজ্যগুলো যার কেন্দ্র ছিল তামিলনারু। [আগ্রহিরা  E V Ramaswami (EVR or “Periyar”) এই ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্ট যেকোন ইতিহাস পড়তে পারেন।] এছাড়াও ১৯৬২ সালে হিন্দিভাষা চাপানোবিরোধী আন্দোলনে জীবন দিয়ে রুখে দেয়ার কারণে আজও ভারতের সুপ্রীম কোর্টের ব্যাখ্যায় ভারতের কনষ্টিটিউশনে উল্লেখিত কোনো “রাষ্ট্রভাষা” নেই – এমন করে রাখা হয়েছে। তবে সরকারি দাপ্তরিক ভাষা আছে আর তা হিন্দি (ঠিক হিন্দি নয় হিন্দুস্থানি) এবং ইংরাজি।  আর্য-হিন্দির আগ্রাসন দক্ষিণে এমন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। আর একইভাবে  একই রকম আর্য-হিন্দির আগ্রাসন  প্রতিরোধ পেয়েছিল বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্রবেশমুখে। তাই বাংলাভাষা টিকে যায়, যদিও প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের সেই প্রতিরোধ ভারতের দক্ষিণের মত পর্যায়ের প্রবল ছিল না বলে এর প্রচারও কম হয়েছে। এসব প্রতিরোধের চিহ্ন হয়েই এবং সে কারণে এখনও ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বৈশিষ্ট বলতে মেজর তিনটা ধারা দেখতে পাওয়া যাবেই – উওর, দক্ষিণ ও পুর্ব  ধারা বা ঘরানার সঙ্গীত ও নৃত্যধারায়।  অবশ্যই এগুলো এথনোলজি  অর্থে [ethnological] ভারতীয় জাতিবৈশিষ্ঠের ভিতরের মৌলিক ভিন্নতা।  এই ভিন্নতা বলতে আলাদা আলাদা ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে এথনিক-ধরণের ভিন্নতাগুলো তো  বটেই এছাড়া আরও ভালভাবে  এই ভিন্নতা  সাংস্কৃতিকভাবেও ধরা যায় যেমন নাচ-গানে, বাদ্যযন্ত্রে, ঘরানায় স্পষ্ট সাংস্কৃতিক ট্রেডিশনের ভিন্নতায়।  তাই এককথায় বললে, তামিলনারুর মত কলকাতাও আর্য-হিন্দিবিরোধী আরেক হাব। এজন্য পশ্চিমবাংলা আরএসএস-বিজেপির আরেক মাথা ব্যাথা।  মূল কারণ আগেও বলেছি বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা হল ভারতের রাজ্যগুলোতে এথনোলজি-সাংস্কৃতিক অর্থে তারা ভিন্ন ভিন্ন হিন্দু। বিজেপি সেগুলোর উপর এক রাম-পুজারী হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিয়ে সবাইকে বেধে এক হিন্দুত্বের জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চায়।  হিন্দুত্ববাদের আরএসএস-বিজেপি এবার কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে সেই ‘বাংলা’কে বিজয় মানে, জবরদস্তিতে উপর থেকে এক ইউনিফর্ম হিন্দুত্ব চাপানোর খেয়ালে কলকাতায় এসেছিল। এবং পরাজিত হয়ে গেল। বিজেপির যে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের জাতিবাদ – এটা তারা সারা ভারতে কায়েম করতে চায়। অর্থাৎ এখনকার ভারতের ২৮ রাজ্যের মোট ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী সনাতন ধর্মাবলম্বী বলা হলেও এরা সাংস্কৃতিক-এথিনিক অর্থে সবাই একই ধরনের হিন্দু নয়। কিন্তু বিজেপির ভাষায় বললে, তারা ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে “রামের অনুসারী” হিন্দু বানাতে চায়, এমন এক পরিচয়ে বাঁধতে চায়। যাতে এর ফলে ভারত এক হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের জাতিরাষ্ট্র হয়।

    Supremacist বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতাঃ
    সারা দুনিয়ায় আমিই সুপ্রীম বা শ্রেষ্ঠ এমন শ্রেষ্ঠত্ববাদি [Supremacist] – এই চিন্তার প্রাবল্য জেগে উঠা দেখেছিলাম আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে জর্মান, ইটালি ও জাপানের মধ্যে যার প্রধান ভোকাল নেতা ছিলেন হিটলার।  আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ এই জাতগর্ব বা রেসিজম [Racism] – এই হল সমস্যা ও সংঘাতের শুরুর ভাষ্য বা মিথ্যা সাফাই।  কারণ এরপরেই বলা হবে যে আমিই শ্রেষ্ঠ অতএব তাই আমার কথা তোমাকে শুনে চলতে হবে, আমার অধীনতা মানতে হবে, আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব, গ্যাস চেম্বার করব, তোমাকে কলোনিদখল করব ইত্যাদি। অনেক সময় আবার এই জাত বলতে নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব যেটা হিন্দু বা মুসলমান বা অন্যকোনটা হতে পারে অথবা ‘গায়ের রং’ যেমন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার – ইত্যাদি হয়ে পারে। এগুলো আমরা কমবেশি দেখেছি বা পরিচিত।
    কিন্তু সাবধান – কেউ হিন্দু মানেই সে রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদি (হিন্দুত্ববাদী) হবেই এমন নিশ্চিত ধরে নেয়াটা খুবই ভুল হবে। কারণ নাও হতে পারে। েকইভাবে, কেউ মুসলমান মানেই সে রেসিস্ট নাও হতে পারে। পাকিস্তানি পাঞ্জাবী মানেই সেও ব্যক্তি হিসাবে রেসিস্ট নাও হতে পারে। উলটা আমি বাঙালি জাতিবাদি এই ভাব ধরে যখন পাকিস্তানিদের “পাকি” বলে ডাকব – এটাই রেসিজম হবে। তাহলে মূল কথাটা হল কেউ কী করে নিজেকে  প্রেজেন্ট বা হাজির করছি, কী দাবি করছি;  বিশেষ করে দলবদ্ধ হয়ে বা রাজনৈতিক দিক থেকে  – এর উপরই নির্ভর করবে  কেউ  শ্রেষ্ঠত্ববাদি বা রেসিস্ট কিনা।  এই বিচারে  আরএসএস-বিজেপির হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমের দল যারা এখন ভারতে ক্ষমতায়।  আর লক্ষ্য করেন, চেক করে দেখেন সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব – আমিই শ্রেষ্ঠ, আমারটাই শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি ধরণের ভাব বা ধারণা আছে কি না? যদি থাকে তবে অন্যকে নিন্দা করার আগে নিজেকে সংশোধন করে নেন। অনেক সময় আমরা না-বুঝে, না খেয়াল করে অসচেতনে অনেক কিছু করে বসি।

    আবার আরেক চিহ্ন হল,  রেসিজমের মধ্যে –  শ্রেষ্ঠত্ব, মহান বা বেস্ট এসব শব্দ বা ধারণা থাকবেই। ফলে এখান থেকে বের হতে হবে বা এড়িয়ে থাকতে হবে আমাদের।  বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতিসংঘের জন্মের ভিতর দিয়ে এই প্রথম আইডিয়া বা  বয়ান হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমকে ক্রিমিনাল অপরাধ মনে করা হইয়েছে আর তা বলা বাহুল্যই  নিন্দনীয় করা হয়েছে। কিন্তু তবু ব্যবহারিক চর্চায় মনের কোণায় ছোট রূপে হলেও তা এখনও থেকে গেছে শুধু না, তা আরো  প্রকাশ্য হবার চেষ্টা অনেক প্রবল হয়েছে। যার পিছনের মূল কারণ মনে করা হয় যে সময়টা এখন  -“গ্লোবাল সিস্টেমে নেতৃত্বে পালাবদলের”।  সারা দুনিয়া এতদিন বেশিরভাগ সময়েই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবেই জনবসতি বা সিভিলাইজেশনগুলো শাসিত ও পরিচালিত হয়ে এসেছে। কেবল শেষ প্রায় পাঁচশ বছর বলা যায় কলোনিদখল সুত্রে দুনিয়া পশ্চিমের সিভিলাইজেশনের অধীনে সংগঠিতভাবে অধীনস্ততা চলে গেছিল।  এরই ভিতর আবার য়ারও শেষের ইমিডিয়েট ৭৫ বছর তা দুনিয়ার আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বে কেটেছে। আর এটাতেই পালাবদল আসন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এতে  বদল অনিবার্য জেনেও পুরানা শাসনের সুখ যাদের ছাড়তে ও নতুনকে মেনে নিতে ইচ্ছা করছে না এদেরই একটা অংশ এক সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ আকড়ে উঠে দাড়াতে চাইছে। পুরানা গল্পের উস্কানি  – যে আমাদের কতকিছুতে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল – এই কথিত অতীত মহান, গ্রেট, বেস্ট এসব শব্দ দিয়ে – এক শ্রেষ্ঠত্ববাদ খাড়া করার জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও তারা জানে কারণ আমেরিকান সরকারি গবেষণার সবগুলো ফাইন্ডিংসই (২০০৮ থেকে সর্বশেষ ২০২১ সালেরটা) তাদের জানিয়েছে এই পালাবদল অনিবার্য অবশ্যই কিছুই তারা ঠেকাতে পারবে না কারণ এই পরিবর্তন অবজেকটিভলি নির্ধারিত। সাবজেক্ট বা মানুষের নিয়ন্ত্রণে আর নয়।  কিন্তু তবু মরিয়া হয়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে কেউ কেউ এগিয়ে আসা বন্ধ করে নাই।

    কেন বিজেপির হিন্দুত্ব বা এক হিন্দু-ভারতের কথিত এক জাতিরাষ্ট্র গড়তে ব্যর্থ হবে?
    এর মূল ব্যবহারিক সমস্যাটা হল,  ভারতের সব রাজ্যের বাসিন্দারা শ্রীরামকে তাদের প্রধান দেবতা মানে না বা তাকে ঘিরে প্রধান দেবতাপূজা বা প্রধান উৎসব উদযাপন করে না। যদিও আবার শ্রীরামকে তারা অমান্য করে ঠিক তাও নয়। অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যেই তাদের নিজস্ব ‘প্রধান দেবতা’ ও সে অনুযায়ী এক প্রধান বার্ষিক উৎসবও আছে। ফলে বাংলায় দুর্গা বনাম রামের একটা প্রধান ভিন্নতা আছে এবং এটা প্রধান বাস্তবতা। শুধু তাই নয়, মনে রাখতে হবে, এটা অন্য কারো দেবতাকে অমান্য করা এর মূল বিষয় নয়। কিন্তু নিজ ভাষা, নিজ শিল্পকলা, নিজ গাথাগল্প সাংস্কৃতিক এ ট্র্যাডিশনে অন্য কোনো রাজ্যের, ন্যূনতম অন্যের হস্তক্ষেপ বা আধিপত্য অথবা ডিকটেট, সামান্য চুল পর্যন্ত কোনো বদল আনা এরা একে অন্যের বেলায় বরদাশত করতেই পারবে না। কারণ এভাবেই তো ভারতে একেকটা রাজ্য স্ব স্ব ভিন্নতা নিয়ে হাজির ও ঐক্য হয়ে হাজির আছে। এভাবেই এরা একেকটা  ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ অর্থে ভিন্ন ভিন্ন জাতি। যেমন, বাঙালি, উড়িয়া, গুজরাতি, মারাঠি রাজস্থানী  ইত্যাদি এরা ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ জাতি। ঠিক যেমন কলকাতার বাঙালি ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’  জাতিবোধ নিয়ে তারা সবসময় নিজের মতো হয়ে থাকতে ও উঠতে চাইবে। অথচ সবাই মূলত হিন্দু হলেও এই কালচারাল গভীর ভিন্নতা এটাই বার বার বলছে   আরএসএস-বিজেপির রাজনীতি ভুল ও অকেজো অবাস্তব বলে তা ব্যর্থ হবেই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা অপ্রয়োজনীয়।
    কিন্তু  তবু আরএসএস-বিজেপি  হিন্দুত্বভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভারত গড়ার জিদে আটকে থাকা দল, তারা এমন ভারত গড়ে নিজ একক রাজনীতি ও নিয়ন্ত্রণে ভারতকে আনবেই এই জিদের প্রচেষ্টার দল। তাই আরএসএস-বিজেপি বলা যায়, এই রাজ্য নির্বাচনকে এই প্রথম নিয়েছিল দুর্গার ওপর রামের আধিপত্য কায়েম করা যায় কি না এর উদ্যোগ হিসেবে। সেক্ষেত্রে মমতার দলের বিজয়ের তাৎপর্য হল, বাংলা তার দুর্গা আঁকড়ে ধরে বিজেপির হিন্দুত্ব এবং তার রাজনৈতিক ‘রামকে’ পরাজিত করল। এই অর্থে পুরনো আর্য-বাংলা ঐতিহাসিক লড়াইটা আবার বাংলা জিতে রিনিউ করে নিলো।

    এ জন্যই এই নির্বাচন নিয়ে কলকাতার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনে কেবল তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাই তৃণমূলকে ভোট দেননি। অর্থাৎ তৃণমুলের  হিন্দু-মুসলমান সমর্থকেরা  মিলেই কেবল তৃণমূলকে ভোট দেননি। এর সাথে আরো আছে বাঙালি অর্থে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট; এমনকি বিজেপির সমর্থকদের একটা বড় অংশ যারা নিজ দল ছেড়ে মমতাকে মানে ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ বাঙালির পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই বিশ্লেষকদের দাবি এটা হয়েছে বলেই মমতার পক্ষে মোট প্রায় ৪৮.৫% ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। যেমন আনন্দবাজার লিখেছে, “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে”।
    এবারের নির্বাচন তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিজেপির হিন্দুত্বের আধিপত্যের কাছে নত না হওয়া বরং, হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র গড়ার প্রপাগান্ডায় কলকাতার বাঙালিদের সেই পাল্লায় না পড়া। তারা নিজ বাংলা এথনিসিটির অর্থে জাতি রক্ষার লড়াইয়ে রাজনৈতিক শ্রীরামকে পরাজিত করতে এগিয়ে এসেছিল। এই অর্থে বাংলার সাথে লেপ্টে লেগে থেকেছে, তাকে ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। অথচ ব্যাপারটা হলো, বিজেপির ভাষ্যের এক আর্য-হিন্দির রাজনৈতিক ‘রাম’-এর ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র; এ নিয়ে জোরাজুরি করাতেই মমতার জন্য অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক ‘রাম’কে হারানো।

    কিন্তু একারণেই আবার অনেকেই আশঙ্কা করছেন এখন; অনেকে বলছেন এটাই বিজেপির হামলার শেষ নয়। আরএসএস-বিজেপির স্টাইল এভাবে হার স্বীকার করে নেয় না। প্রতিশোধ নিতে তারা ফিরে আসে। সাধারণত এরপর আসে মুসলমান হত্যা-নিপীড়নের হুজুগ নিয়ে। মুসলমান নির্যাতন, দাঙ্গা হত্যা নিপীড়ন করা খুবই সহজ – এই সুযোগ নিয়ে তারা কৌশল সাজিয়ে আসে। কারণ দেখা যায়, আরএসএস-বিজেপির একটা স্থির ধারণা হল যে, ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় এক চরম মার-হত্যা-নিপীড়ন দাঙ্গা ঘটানো- এই ‘ভয়ের রাজনীতি’ কায়েম করা তাদের হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জিগির তোলার উস্কানি ও সাংগঠনিক শ্রীবৃদ্ধির প্রধান অস্ত্র ও উপায়। এটা তারা বিশ্বাস করে থাকে। তাই যখনই ভোটে পরাজয় হয় তখনই তারা এ কৌশলের কথা চিন্তা করে। কারণ নিজেদের পরাজয়ের হতাশাকে তারা প্রতিহিংসা দিয়ে পূরণ করে এগোনোকেই সঠিক কৌশল মনে করে।

    ঠিক যেমন সর্বশেষ দিল্লির রাজ্য নির্বাচনে সেটাই আমরা দেখেছিলাম। সে সময় নাগরিকত্ব ইস্যুতে দিল্লির নির্বাচনে মুসলমানরা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে এরপরে দিল্লিতে মুসলমান পাড়াগুলোতে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা ও হত্যা, তথা ম্যাসাকার হয়েছিল। দিল্লির কোর্ট-হাইকোর্ট আজো সেসব মামলায় কোনো প্রতিকার করতে পারেনি। অথচ মূল নেতা ‘মিশ্র’ সব ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। বাংলায় মমতার বিজয়ের পরে এ হামলা হবেই এমন বলার কোন মানে নাই; তবে এটা হবেই না – তা বলাও অবশ্যই ভুল। বরং সব দিকে সচেতন ও সোচ্চার থাকাই সঠিক কাজ।
    কিন্তু বাংলাদেশে একটি ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে ‘কেন্দ্রীয় শাসনের হস্তক্ষেপ’ চেয়ে চার-পাঁচজনের একটা গ্রুপকে মানববন্ধন নামে দাড়াতে দেখছি আমরা। অনেকটা ‘হিন্দুদের জন্য হিন্দুরা’- টাইপের যুক্তিতে এসব আজব দাবি; যেখানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশের কেউ কোনো পক্ষের নয়। তাই কলকাতার আরএসএস-বিজেপি ঢাকায় এসে ব্যানার নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দাঁড়ানো – এগুলো অবশ্যই কোনো ভালো লক্ষণ নয়। ফলে অবিলম্বে সরকারের এ বিষয়ে সতর্কতা, পদক্ষেপ নেয়া ও নজর দেয়া উচিত। কারণ সবশেষে এরা সবাই সংখ্যালঘু অজুহাতে ভিকটিম সেজে নিজেদের সব আকাম কাজের দায় চাপাবে আমাদের সরকারের উপরেই!

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দনঃ
    এদিকে আমাদের প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর দলনেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দন বার্তা যথেষ্ট আগ্রহ সঞ্চার করেছে। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মোমেনের ওই চিঠি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধেও এক প্রচ্ছন্ন বার্তা”। কিন্তু তিনি লিখেছেন এই প্রথম নাকি ভারতে “রাজ্যের নির্বাচনকে ‘ধর্মীয় আধারে’ করার চেষ্টা হয়েছিল। বিজেপি নেতারা ভোট প্রচারে নাকি সরাসরি ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দিয়েছেন”।
    সরি, আপনার দাবি গ্রহণ করতে পারলাম না। প্রথমত, ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দেয়া অথবা ‘ধর্মীয় আধারে’ ভারতের রাজ্য নির্বাচন বিজেপির এটিই প্রথম নয়। কলকাতা তো বটেই এমনকি রাজস্থানের নির্বাচনেও বাংলাদেশের মুসলমানদের ভারতে অনুপ্রবেশের ভুয়া অভিযোগ তুলে ‘তেলাপোকা’ বলা হয়েছে। আজ হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাওয়ার মত অনুভব হতে পারে কারও; তবু এসব একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। বিজেপি কখনো কি লুকিয়েছে যে, সে প্রায়ই মুসলমানদের জন্য দাঙ্গা ও হত্যার আজাব হয়ে আসে না? তার দলের রাজনীতিই তো হল , হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব বা হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ভারতের রাজ্যগুলোর সবাই প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে সনাতন হিন্দু বলে পরিচিত হলেও বিজেপিসহ যেকোনো শ্রেষ্ঠত্ববাদী দলের এই কমন ফিচার হয় যে, তারা এক একক পরিচয়ে সবাইকে বাঁধতে চাইবেই – এক জাতশ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করার চেষ্টা করবেই। যা এক পন্ডশ্রম যদিও! বিজেপি তো এগুলো লুকায় না! কিন্তু যাদের এসব নজরদারি করার কথা সেই নির্বাচন কমিশন বা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এখানে নজর দিতে রাজি নয়। অথচ ধর্মীয় আধারে বা বিভাজনের নীতিতে ভোট চাওয়া – এটা বিজেপির জন্য দল নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মত কৃত অপরাধ, তবু  তা তারা করেই চলছে, অবলীলায়। এখন এসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা খোদ নিজেদেরই যদি নিজেদের ভারতের নাগরিক নয়, হিন্দু হিসেবে আবিষ্কার ও গর্ব করে থাকেন ও চলেন তবে ভারতের কনস্টিটিউশনে কী লেখা থাকল তাতে কিছুই আসবে যাবে না। উল্লিখিত ব্যক্তিদের মত সাংবাদিকের চোখেও এগুলো কোনো বড় সমস্যা হিসেবে ধরা পড়বেও না।

    উনি আরো লিখেছেন, কলকাতার “ভোটে বিজেপির বিপর্যয় ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় সেই স্বস্তির ছোঁয়া স্পষ্টতই পরিলক্ষিত। সেটাই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে আগ্রহ জাগিয়েছে”।
    তাঁর এ’কথাতে বলা যায়, সেটা কলকাতায় যা হয় হোক কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এ ছাড়া আর কী বলতে পারতেন? তবে তার অবশ্যই ভারতের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করার মত বোকামি করার কিছু নেই! আবার এতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রটোকলের যে ব্যত্যয় নেই তা তো কূটিল কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেছেন আর নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে, ‘মোমেনের অভিনন্দন বার্তা কূটনৈতিক প্রটোকলের দিক থেকে নিখুঁত”। কাজেই এনিয়ে আমাদের কী আর বলার আছে!

    মোদির বিজেপি ভারতে ক্ষমতাসীন আছে ও নির্বাচন করে যাচ্ছে সাত বছরের বেশি ধরে। তিনি যে ‘এক শ্রীরামের নামে’ [শুধু হিন্দু হলে হবে না] এমন এক পরিচয়ে ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে নিয়ে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চান সেই মেরুকরণের চেষ্টা তিনি সবসময় করে চলেছেন। কিন্তু সাত বছর ধরে, দেব মুখার্জির মত অনেকেই ব্যাপারটাকে প্রশ্রয়ের চোখেই দেখে এসেছেন।

    বরং এমন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের বিরাট কুল – তাদের চোখে  মোদী এখন ‘বিরাট সফল নেতা’। কারণ এদের চোখে তিনি নাকি ভারতকে এক “পরাশক্তির প্রায় কাছাকাছি’ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। তাই সেই মোদী বাঙালির দুর্গার উপর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদী’ চাপালেন কি না বা কোনো ‘ধর্মীয় বিভাজন’ টেনে ভোটের জোশ তৈরি করলেন কি না তাতে তাদের কী আসে যায়! বরং মোদী বলতে চেয়েছেন – ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ বোধ এসব কোনো ভিত্তি নয়। বরং অন্যায়কারী হিন্দু হলেই সে আপনার ভাই, তার পাশে দাঁড়াতে হবে। এই হলো মোদীর আরএসএস-বিজেপির রাজনীতির ভিত্তি।
    এতে মোদীর এই রাজনীতিতে যদি কলকাতায় একটি দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করে ফেলতে পারে , তাতে বাংলাদেশের হিন্দুদের কোন স্বার্থটা উদ্ধার পাবে? নিজেকে রক্ষা পারবে কেন? কার দয়ায়? না, এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। চিন্তা করতেই রাজি না। এছাড়া কোনো কেন্দ্র থেকে কোনো মোদি কি তাদের বাঁচাতে আসবেন? আর আমাদের সরকার এ-কোন মোদীর ভারতকে করিডোরসহ অসংখ্য সুযোগ সুবিধা খুলে দিবে যে কলকাতায় একটা দাঙ্গা ও হত্যার আয়োজন করতে চায়?

    অতএব যেখানে বসে যে যা বলছেন তা চিন্তা করে দায়-দায়িত্ব নিয়েই মুখ খুলবেন – এটাই আমরা সকলকেই আগাম সতর্ক করতে পারি!

    বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো এবং বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক শ্রীরাধা দত্ত। যতটুকু শুনেছি এটা  আরএসএস-বিজেপির দল ও চিন্তা প্রভাবিত একটি থিংকট্যাংক। সেখানকার শ্রীরাধা বলছেন, ‘ভারতের অঙ্গরাজ্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিই প্রধান বিবেচ্য।”
    এসব মুখস্থ আপ্তবাক্য বা কথার কথা ভারতে অনেক লেখা হয়েছে। তাই এসব শুনলে আমাদের অস্বস্তি লাগে। পারলে বিজেপির ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ অথবা ‘ধর্মীয় বিভাজন’ রাজনীতি- এর বিরুদ্ধে লিখে দেখান। পারলে পক্ষেও লিখতে পারেন। কিন্তু চুপ থাকবেন না। এ সময় লিপ সার্ভিস দিয়ে পরিবর্তন আসবে না যদিও বাংলাদেশে আমরা আপনাদের উপর আশা রাখি না। আপনাদের মোদীর ভারতরাষ্ট্র ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’-এর রাজনীতি করে যাবে আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব আশা জিইয়ে রাখবেন এটা আর কত চলবে? বা চলতে পারে?  না, চলতে পারে না। এসব বুঝা কী খুব কঠিন!

    ‘পরাশক্তি’ ভারতঃ
    এখন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের এক বিরাট দল সব প্রসঙ্গ ছেড়ে এমন প্রচন্ড মোদীভক্ত হয়ে উঠেছেন যে দেখার মত! কেন? তারা কিভাবে মোদীভক্ত হয়েছেন? তাতেই বাকি সবাই নিজে নিজেই বুঝে যাবেন।
    ভারতের এখন বিভিন্ন রাজ্যে করোনা মহামারীতে রোগীদের অক্সিজেনের অভাবে বহু লোকের প্রাণ যাচ্ছে। এছাড়া সরঞ্জাম বেড এমনকি মৃত সতকারে শ্বশানেও পর্যাপ্ত  জায়গা পাওয়ায়ো কঠিন হয়েছে। অর্থাৎ মোদী যে ‘সরকার চালাতে’ গিয়ে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেছেন – এখানে এসে তা আর কারো থেকে তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। এ ব্যাপারটাকে ‘সরকার চালাতে’ না বলে ফরমাল ভাষায় বলা হয় ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর; যার চেয়ে দুনিয়ায় আর বড় ফেল বা পরাজয় নেই।

    ভারতে গত ১৬ বছরের এক ভ্যানিটি বা অহমিকা ভারতের আমলা-রাজনীতিবিদরা চালু করে রেখেছিলেন যে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্যও নেয়া যাবে না। কিন্তু কেন কংগ্রেস-বিজেপিসহ সব আমলা-রাজনীতিবিদ সাহায্য না নেয়ার এমন জিদ করেছিলেন? মিলিয়ে দেখুন, ১৬ বছর মানে হলো ২০০৫ সাল থেকে। তার সোজা মানে হলো, বুশের আমলে ভারত যখন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার থেকে ‘চীন ঠেকানোর’ ঠিকা পেয়েছিল, সে সময়ের সিদ্ধান্ত এটা। বাংলাদেশকে অ্যামেরিকার ভারতের হাতে  তুলে দিবার সিদ্ধান্তও এর একটু পরে ঘটেছিল। কিন্তু ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, এ সুযোগে নিজেকে এক ‘পরাশক্তি’ হিসেবে অসত্য হলেও তুলে ধরবে, দেখাবে। তাই তারা ১৬ বছর আগে মুরোদে না কুলালেও দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্য নেয়া নিষিদ্ধ করেছিল।
    তা হলে এখন সে কথা কেন তুলছি?

    কারণ অক্সিজেন সঙ্কটের শুরুতেই মোদি আর (সাহায্য না নেয়ার) ‘ফুটানিকা ডিব্বা’টা বহন করতে রাজি হননি কিংবা বলা ভালো এটাই তা ত্যাগের মোক্ষম সময় যে এই সুযোগে তিনি ভ্যানিটি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নিয়ে ফেলেন। সে কারণের যেন মোদী এবার মোট ২০টি দেশের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করেন, যার মধ্যে চীন আছে। এমনকি ক্ষুদ্র ভুটানও।

    আর এতেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সাংবাদিক-ইন্টেলেকচুয়ালরা। এ নিয়ে তাদের মনোভাব সবচেয়ে ভালো পাঠ করা যায় দ্যা প্রিন্টে ছাপা এক আর্টিকেলে। ওর শিরোনামটাই তাদের চিন্তা পাঠ করার জন্য যথেষ্ট। ওই আর্টিকেলের শিরোনাম হল, ‘ভারত কি তৃতীয় বিশ্ব হয়ে ফেরত গেল? মশকরাটা হল, আমাদের পরাশক্তির আকাঙ্খাটা এভাবে কোভিডের হাতে পড়ে ন্যাংটা হয়ে গেল”  [Is India back to being ‘Third World’? Irony of an aspiring superpower exposed by Covid crisis]।

    একই মনোভাব ‘দ্যাহিন্দু’র সুহাসিনী হায়দারের। তিনি প্রায় চ্যালেঞ্জের মত মোদিকে লিখেছেন তিনি কেন বিদেশী সাহায্য নিতে গেলেন? [Why has India accepted foreign aid after 17 years?]  এভাবে লিডিং সাংবাদিককুলের মধ্যে হতাশার ছায়া নেমে আসতে দেখছি আমরা।

    মূল কথাটা হলো, মোদীর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’- এসব দিকের জন্য তারা মোদীকে কাঁধে বসিয়ে তুলে ধরতে কোনোই শরম বোধ করেন না। কারণ এই হিন্দুত্বের মোদী তাদের মিথ্যা হলেও পরাশক্তির স্বাদ চাটিয়েছে বলে মনে করে তাঁরা। এখন মোদী সেই মিথ্যা গর্ব বা ভ্যানিটিটা কেড়ে ফেলে দেয়ায়ই তাদের এত হইচই।

    কাজেই হিন্দুত্ব কলকাতায় মার খেয়ে গেল কি না আর তাতে দিল্লির মত কলকাতার মুসলমান মারার উৎসব আসন্ন কি না!  না, এগুলো তাদের অ্যান্টেনার নজরে আসার যোগ্য হয়নি। এই জয় শ্রীরামের জয়জয়কার থেকে ভারতকে কে বাঁচাবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ভারত এখন তৃতীয় বিশ্ব ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    গৌতম দাস

    ০৪ মে ২০২১, ০০:০৩ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3we

     

    ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল যার মধ্যে আবার দুই রাজ্য হল আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ, যারা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব আর পশ্চিম সীমানাজুড়ে। এর মানে হল গত পুরা মে মাসে আমাদের হিন্দুত্বের প্রবল প্রপাগান্ডার ভেতরে বসবাস করতে হয়েছিল। তবে এই নির্বাচন শেষে গণনা ও সব ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, পাঁচ রাজ্যের একই সাথে ২ মে সকাল থেকে। যা এখন প্রায় সব রাজ্যে রাজ্যের পুর্ণফল প্রকাশিত।
    আর  গতকাল ২মে দুপুর তিনটা নাগাদ পরিস্কার হয়ে যায় যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতাসীন তৃণমুল কংগ্রেস দল মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে এককভাবে দুশ-এর বেশি আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরতেছে।  সর্বশেষ সোমবার রাত সাড়ে সাতটায়, তৃণমূল ২১৩ আর বিজেপি ৭৭ আসন এভাবে আনন্দবাজার ফলাফল দেখাচ্ছে। এদিকে মমতার নিজের নন্দীগ্রাম আসনে তিনি হেরেছেন বলা হচ্ছে। যা তিনি আপাতত মেনে নিয়েছেন তবে আপত্তিসহ এবং তিনি সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত যাবেন সে হুশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে মমতা আজ সন্ধ্যায়  বলছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আগামি বুধবার শপথ নেবেন। রাজ্যের প্রাদেশিক সংসদ মানে বিধানসভায় বিজয়ী সদস্য না হলেও ছয় মাস পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা যায় অস্থায়ীভিত্তিতে। আর যেখানে ঐ ছয়মাসের মধ্যে কোন আসন খালি হলে (মানে  দলের কাউকে পদত্যাগ করিয়ে খালি করে নিয়ে) সেই উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এলেই স্থায়ী ও রেগুলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়।
    ওদিকে ৩মে বিকাল পাঁচটায় খবর ছিল, মমতা সাংবাদিক বক্তৃতায় জানিয়েছেন মোট বিজয়ী আসন হতে যাচ্ছে সম্ভবত ২২১। মানে এমন আসন সংখ্যা বা এর কাছাকাছি দেখতে চাওয়া মমতার অনুমান।

    এই ফলাফলের তাতপর্যঃ
    আমাদের সাধারণ মন্তব্য এককথায় বললে সেটা হবেঃ  সারা ভারত না হোক, এটা হল – অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় এবং আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্বকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাবলিক প্রত্যাখ্যান।  কিন্তু কেন এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেছে, যা হওয়াই স্বাভাবিক। কলকাতার আনন্দবাজার এমনই একটা ভারতীয় বিশ্লেষণ তুলে এনেছে দেখা যাচ্ছে  যা ঠিক তার নিজের নয় তবে সংগৃহীত। নিচে সেটাই এখানে হবহু তুলে  দিচ্ছিঃ
    তৃণমুল দলের “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের [এখন পর্যন্ত যা প্রায় ৪৮%] হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে। বিজেপি যখন রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচার চালাচ্ছে, মমতা তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করে ফেলেছেন বলেই বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তা না হলে এই জয় এবং ভোট শতাংশ তৃণমূলের ঝুলিতে আসা সম্ভব নয় বলেই তাঁদের ধারণা। কারণ, তৃণমূলের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট শতাংশপ্রাপ্তি এ বারই”।

    এখানে বিশ্লেষক বলতে যারা বুথফেরত ভোটারদের সাথে কথা বলে একটা জরিপকাজ সমাপ্ত করে থাকেন আর সেই ফলাফলের বিশ্লেষণ হাজির করেন – এনিয়ে তারা পেশাদার কাজ করেন। উপরে তাদের সারকথা হল, মমতার দল কেবল তার রেগুলার সমর্থক ভোটারদেরই ভোট পান নাই। সেটা ছাপিয়েও তিনি অবশ্যই যারা বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের ভোটার এদের অনেকেরও ভোট পেয়েছেন।  কেন পেলেন আর কেন তারা এমন কথা বলছেন কিসের ভিত্তিতে? কারণ তাদের ভিত্তি হল, এমনটা হয়েছে বলেই মমতার দল  এত ভোট (এখনই এটা প্রায় ৪৮% যা গণনার শেষপর্যন্ত ৫০% এর কাছে যাবে বলে অনুমান ) ও আসন পেয়েছেন।

    অনেকে জানেন শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই  মোট মুসলমান ভোটার প্রায় ২৭-২৮% হয়ে থাকে। আর এর মধ্যের আবার  বড় অংশটাই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে তৃণমুল একাই পেয়ে আসছে। তাহলে  মমতার দলের বাক্সে এখনকার সম্ভাব্য  মোট ৫০% ভোটপ্রাপ্তি হতে যাচ্ছে একথার  মানে হল –  মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের ভোট ছাড়াও প্রায় সব ধর্মের সমান সংখ্যক সমর্থক ভোটারদের ভোটও মমতার দল যোগাড় করতে এবার সক্ষম হয়েছে।  আর এতেই  মমতা ও তার দল হল পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম নির্বিশেষে সেই প্রতীক যারা একটা কমন ধারা, তৃণমুল দলে ভিতর “যাদের ইচ্ছা” সমবেত হয়ে – এমন একটা “মেজরিটি ম্যান্ডেট” তৈরি করেছে। আর মমতা হলেন যে ম্যান্ডেটের বাহক নেতা। তাহলে কী কারণে মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের বাইরের ভোটারদেরও টানতে পারলেন?

    অন্যদিকে আরও প্রশ্ন, তাহলে তৃণমুলের নিজে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঠিক কাদেরকে  প্রত্যাখান করলেন? আর কীইবা এই বিজয়ের তাতপর্য?

    ঠিক অখন্ড ভারত না,  আজকের রাজনৈতিক ইন্ডিয়া, এই রাষ্ট্র ২৮ রাজ্যের সমাহার।  কালচারাল দিক থেকে বললে ভারতের মেজরিটি বা ৮০ ভাগ নাগরিক সনাতন ধর্ম অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু তবুও কোন একক “দেবতার” (মানে সবাই একই দেবতার) অনুসারি-পুজারি তারা নয়। বরং রাজ্য-ভিত্তিতে দেখা যায় তাদের  একেক আঞ্চলের আলাদা ‘প্রধান দেবতার পুজার” প্রচলন আছে। এমনকি সেই দেবতার পুজা উতসবকে ঘিরেই আলাদা আলাদা বার্ষিক প্রধান ধর্মীয় উতসব ঐ রাজ্যে পালিত হয়।  অর্থাৎ কলকাতার মত সব রাজ্যে বা সবার প্রধান উতসব ‘দুর্গাপুজা” নয়। কিন্তু এটার সুবিধা-অসুবিধা কী? এটা নিয়ে কথা বলছি কেন?
    কারণ আর কারোই তেমন কোন অসুবিধা না হলেও,  আরএসএস- বিজেপির এতে বিরাট অসুবিধা। কেন? কারণ এরা  যারা রাজনৈতিক এক “হিন্দুত্ব নির্মাণ” করতে চায়, এজেন্ডা নিয়েছে  এবং “হিন্দুত্বের এক জাতিরাষ্ট্র” খাড়া করা ইমাজিন করে; এই নামে ভারতীয়দের সকলকে বাধতে চায় তাদের এমন ২৭ রকম রাজ্য বা  হিন্দুত্ব হলে চলে না।

    তাদের দরকার একটাই রকমের হিন্দুত্ব, প্রাকটিস। তাই আরএসএস- বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি ও ব্যাখ্যা হল, ভারতের উত্তরের ওপারে (কথিত আছে ইউরোপ বা জার্মান এরিয়ান থেকে আসা ধারা) সেখান থেকে এসেছে সেই এরিয়ান রেস যা ভারতের আর্য প্রজাতি বলে দাবি করে তারা। আর এমন দাবি করলে সুবিধা হল তাতে সবাই একই উৎসের বলে এই অজুহাতে সকলকে এক সুতায় বাধা যায়, সহজেই। যদিও এই ভারতেই আবার মোট তেত্রিশ কোটি দেবতার বয়ানও বিদ্যমান। আর বড় কঠিন বাস্তবতা হল,  আলাদা আলাদা রাজ্যে প্রধান উতসবের ভিন্নতা – এসবই  আরএসএস- বিজেপি র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পক্ষে মানে কোন একক হিন্দুত্ব তৈরির পক্ষে সায় দেয় না।  যেখানে এমনকি কালচারালি ভাষার ভিন্নতায় প্রত্যেক রাজ্য ভিন্ন। সেটা তো বটেই এছাড়া আবার যেমন কালচারাল  গান-নাচের বৈশিষ্ঠে তা  মৌলিকভাবেই আলাদা আলাদা ঘরানার। একেবারে বাদ্যযন্ত্রগুলোই আলাদা, রাগ আলাদা স্ব স্ব বৈশিষ্ঠের মহিমায় মহিমান্বিত। যা স্বভাবতই  কোন রাজ্য পরশি কারও তারা অস্বীকার বা অভারল্যাপ হওয়া বা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সেনসেটিভ।  এককথায় তারা আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ঠে ভরপুর এবং সেদিক থেকেই আলাদা। আর তাতে অন্তত কম করে হলেও মূল তিনটা ভাগে যা ভাগ করা যায়।

    কিন্তু  অন্যদের উপরে উত্তরভারত কেন্দ্রিক আর্য চিন্তাচর্চার জীবন ধারার প্রভাব  প্রাচীনকালে অখন্ড ভারতের আমল থেকে এই উত্তরের  অগ্রযাত্রা ছেয়ে বসলেও ভারতেরই   দুঅঞ্চলে বা জায়গায় প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। যে প্রতিরোধ সে আর পাড় হতে পারে নাই। এক হল দাক্ষিণার্তে [Decan] “দ্রাবিড়ীয়” [Dravidian] প্রতিরোধ আর এদিকে তাদেরই আরেক ধারার মারাঠা-বিহার পেরিয়ে আরো পুবে “বাংলার” প্রবেশমুখে প্রতিরোধ। এি প্রতিরোধ টিকে যাওয়া তাদের আগে থেকে চলে আসা  ভিন্নতার রূপবৈশিষ্ঠের ছাপটাই তাই প্রবল্ভাবে এখনও গান-নাচের ক্লাসিকাল চর্চাতেও স্পষ্ট। ভাষা তো আছেই। কিন্তু এসব ন্যাচারাল হিস্টোরিক্যাল অমিল-বেমিলগুলোকেই আরএসএস- বিজেপি  জবরদস্তিতে অস্বীকার করে এক দাবি করতে চায়, এক বলে দেখাতে চায়। আসলে চায় কথিত এক আর্য-চিন্তা (যা আসলে আরএসএস- বিজেপি এর) এরই আধিপত্য।

    দুনিয়ার সব (ভিতরে ভিতরে বা বাইরেও) জাতিবাদী বা জাতি-রাষ্ট্রবাদীরাই এই একই ভুল করে। এমন পথেই যায়। তারা সবাইকে এক ভাষায় কথা বলাতে চায়, নয়ত একই কালচারে বা একই ধর্মে বা একই দেবতায়। তাদের একেবারেই ভিত্তিহীন কিন্তু তবু দৃঢ় বিশ্বাস এভাবেই মানুষকে নাকি কেবল এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায় – এক জাতি-রাষ্ট্রে। অথচ দেখা যায় এর বিপরীতে আমেরিকার বয়স আড়াইশ বছর আর সে জাতি-রাষ্টর  নয়।  বরং এটাই এক প্রথম ও সবল এক ফেডারল রাষ্ট্র। যা পঞ্চাশটা বড় বড় সাইজের রাষ্ট্রের ভিন্নতার সমাহার। কাজেই আগের সব জাতি-রাষ্ট্র পরিশেষে যেমন ফেল করেছে ভেঙ্গে গিয়েছে ; আরএসএস- বিজেপি র একই আর্য-হিন্দুত্বে (রামকে প্রতীক করে) এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এটাও প্রত্যাখ্যাত হবে। প্রায় কাছাকাছি সমস্যা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের। যখন ১৯৯২ সালে ভেঙ্গে ১৫ টুকরা হল তাতে বুঝা গেল কী জবরদস্তি না চলেছিল। যেমন একটা জবরদস্তি হল, সবাইকে রুশ ভাষা শিখানো।

    এমনিতেই বেশীরভাগ  দেশি-বিদেশি মানুষ আরএসএস- বিজেপির  এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এমন প্রজেক্টের কথা জানে না, ধরতেই পারে না।  বিজেপি তাদের চোখে এক আম রাজনৈতিক দলই মনে হয় তাদের কাছে। কলকাতায় কংগ্রেস বা নানা ধরণের বাম যখন একে একে ভেসে গেছে আর একই সাথে আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনায় প্রবল অর্থ ও রিসোর্স খরচ করে হিন্দুত্বের রাজনীতি সব ছেয়ে ফেলতে সে যখন মরিয়া – এমন সব রাজনীতিকেই এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিনে রুখে দিয়েছেন একা মমতা।  কেন একা মমতা বলছি? কারণ মমতার বিশ্বস্ত কমরেডদেরকে যখন বিজেপি প্রলোভন দেখিয়ে কেড়ে নিয়ে গেছে ফলে তৃণমুল – সেই দল মানে আক্ষরিক অর্থেই একা মমতা হয়ে গেছে।  একটা তথ্য দেখেন অনেক অর্থ তাতপর্য বুঝা যাবে তাতে। এই নির্বাচনে এবার একা মোদী এক মাসেই ২২ বার এসে জনসভা করেছেন।  মানে প্রায় প্রতিদিন একটার কিছু কম। এথেকে বুঝা যায় কলকাতার এই নির্বাচন মোদী ওতার দলের কাছে কী! সেই নির্বাচনে মমতা এদের সবাইকে পরাজিত করে দিয়েছেন।
    কিন্তু প্রশ্ন হল, মমতা তাহলে তিনি হারালেন কাকে? তিনি হারিয়েছেন উতখাত ও প্রত্যাখান করেছেন – মূলত আরএসএস- বিজেপিকে সাথে তাদের যে হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা আছে সেটাকেও। যেটা গত সাত বছরে ক্রমশ ধেয়ে আসছিল, ছেয়ে বসছিল। কোথাও তেমন কোন শক্ত প্রতিরোধ কেউ তৈরি করতে পারে নাই।  এমনকি দ্রাবিড়িয় এলাকায় অন্তত কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি থাকার চেষ্টা করে গেছিল। এজন্যই এটা শ্রেফ একটা তৃণমুল দলের না, একজন মমতার বিজয় নয়। এটা ভারত রাষ্ট্রকে হিন্দুত্বের নামে হিটলারের মত এক তান্ডবের হাত থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করা।

    যারা মমতার তিন তারিখে বিকেলের কালিঘাটে তার বাড়ির পাশের সাংবাদিক সম্মেলন দেখেছেন (ফেসবুকে ক্লিপে দেখেছি আমি) তারা খেয়াল করবেন মমতাও এবিষয়ে সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই বিজয় ভারতের জনগণকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কী থেকে? এক উদগ্র হিন্দুত্ব, এক হিন্দুত্বের রাষ্ট্র, সবাই একই এক  টাইট  ইউনিফর্ম-এ – এমনই কিন্তু নতুন করে আরেক নীলচোখের আরিয়ান উগ্র জাতিবাদ, আরেক জার্মান হিটলারের উত্থান হতে চাচ্ছে যেন ! – এসব কিছু থেকে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, মমতা তাই এই জনগণকে বারবার সালাম আর থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলেন। বিপরীতে মমতা বলতে চাচ্ছিলেন সবাইকে একই রকম হিন্দু [আরএসএস- বিজেপির হিন্দু] হতে হবে কেন?

    অথচ ভিন্নতার ঐক্যের হিন্দু হলে অসুবিধা কী? সবাইকে ইউনিফর্ম হিন্দু হতে হবে কেন?  আর জবরদস্তি কেন? এছাড়া হিন্দু ছাড়াও তো অন্যধর্মের নাগরিক আছে, অনেক হিন্দু আরএসএস- বিজেপির হিন্দু নাও হতে চাইতে পারেন, এমনকি কোন রাজনৈতিক হিন্দু হতেই নাও চাইতে পারেন! তারা কোথায় যাবে? অথচ সকলকে নিয়েই এক রাজনৈতিক সাম্যে –  এমন বৈচিত্রগুলোর ঐক্যের এক ভারতীয় নাগরিক হলে হতে চাইলে পারবে না কেন?

    রাজনৈতিক সাম্য মানে নাগরিক হিসাবে সবাই সমান, সম অধিকারে সমান। ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, গায়ের রং, সমতলি-পাহাড়ি সব ধরণের পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিক্কারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে হবে রাষ্ট্রকে। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের বিপরীতে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। সব ভিন্নতাগুলোর ঐক্য গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি।

    এদিকে কোভিড সমস্যা মোকাবিলা করতে গয়ে মোদী প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা, এই পটভুমিতে ভারতকে নতুন দিশা আর ঐক্যের পথ দেখানোর সুযোগ ……

    এসব দিকগুলাই হল, তৃণমুলের টানা তৃতীয় বা এবারের বিজয়ের গভীর তাতপর্য।

    গৌতম দাস
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ০৪ মে ২০২১

  • না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    গৌতম দাস

    ২৬ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৮

    https://wp.me/p1sCvy-3vl


    সরকার সঙ্কটে। মোদী সরকারের  নির্বাচন কমিশন, সুপ্রীমকোর্ট , মিডিয়া ইত্যাদি এমন প্রধান সব ইনস্টিটিউশনগুলো কোভিড ক্রাইসিসের সময় ভারতকে নিচে নামিয়ে, অকার্যকর করেছে। এক সাক্ষাতকারে এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক এক প্রেসিডেন্ট, দুষ্মন্ত দুবে।
    আর নিচের ছবিতে, ডঃ রামচন্দ্র গুহ একজন স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ তিনিও এক সাক্ষাতকারে বলছেন, মোদী ক্ষমতা-লোভী অসুস্থ [megalomaniac]; আর এটাই  কোভিডকালে ভারতের প্রশাসনিক মিস-হ্যান্ডিলিং পিছনে মোদীর নেতৃত্বের স্টাইল, এটাই প্রধান কারণ। এখানে সাথে দেয়া লিঙ্কগুলো আসলে সাক্ষাতকারের ইউটিউব লিঙ্ক, পাঠক খুলে দেখতে পারেন।

    চারদিকে “হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব” – এই সুরসুরি  বেচে ক্ষমতা দখল আর এভাবেই ২০১৪ সাল থেকে এতদিন করে খেয়ে আসছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  কোন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা এমন ধর্ম-ভাষা ইত্যাদির সুরসুরি তুলে নানা কিসিমের জাতিবাদগুলো এভাবেই মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজত্ব করে থাকে। তবে আগে ছিল সেটা মোদীর উত্থানের সময়। আর এখন পতনের সময় এর চেয়েও ভয়াবহভাবে তিনি হঠাত পড়তে শুরু করেছেন। ভারতের কোভিড ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে এই দ্বিতীয় ঢেউ [মাল্টিপল  বংশ-প্রজাতির ভাইরাস [variant] একসাথে আবির্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে] এর কালে মোদী সরকারের হিন্দুত্বের চাপাবাজি ও উন্মাদনা তুলে  এবার আর কিছুই ঢাকতে পারছে না। সব ম্যানেজমেন্ট অক্ষমতা আর ব্যর্থতা উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। উপরের সাক্ষাতকারের বক্তাদের বক্তাদের বক্তব্যের সারকথা এটাই।

    A Naga Sadhu, or a Hindu holy man, waves the Indian flag as he takes a dip in the Ganges river during the first Shahi Snan at “Kumbh Mela”, or the Pitcher Festival, in Haridwar, India, March 11, 2021. REUTERS/Anushree Fadnavis

    এদিকে, এটা উত্তরাখন্ড প্রদেশের (আগের উত্তর প্রদেশের অংশ) “হরিদ্বারে কুম্ভমেলা্র” ছবি। এসব ধর্মীয়-স্নান জাতীয় ততপরতার সাথে  [সাধু আর পতাকা এদুই এর মিলন এটা খুবই তালমিল-হীন ] ভারতীয় পতাকার কোন সম্পর্ক এর আগে কখনও দেখা গেছে বলে মনে পড়ে না। সম্ভবত, এটা বিদেশিদেরকেও দেখানো [এই ছবিদুটা আলজাজিরা ও জাকার্তাপোস্ট পত্রিকা থেকে নেয়া] যেন এর উদ্দেশ্য।  এছাড়াও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্বের জোশ-জজবা তুলে ভোট আদায়ের সাথে, মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সাথে সাধুগিরির সামাজিক ততপরতা একে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে বলে এমন; যা আগে পুরানা দিনে কখনও দেখা যায় নাই। এখন হচ্ছে এটাই  হিন্দুত্বের ভারতের মোদীর বিরাট নেতি অবদান।  মোদীর আরো বড় অবদান হল কোভিড দ্বিতীয় ঢেউ এর মধ্যেই অভয়দান করে এমন লাখ লাখ লোকের জমায়েতের আয়োজন করতে উতসাহ দেয়া। এই মেলায় এমনকি, এখানে কোন লালার স্যাম্পেল না দিয়েই আপনি কোভিড নেগেটিভ বলে সার্টিফিকেট পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা আছে [Testing negative without even giving a sample]। মোদী এখন বুঝতেছেন নিশ্চয়, এখানে কে কাকে আসলেই ফাঁকি দিতে পেরেছিল!

    আবার এর বিপরীতও আছে। কিছু আনন্দবাজারি মাথাব্যাথাও দেখে গিয়েছিল যে,  এক সাধু অভয় দিচ্ছিলেন – ভগবান আছে সব নাকি তিনিই রক্ষা করবেন……“It’s the voice of god, who says nothing will happen. God won’t let anything happen to us. I have full faith,” said Baba Prakash Puri Maharaj।
    আবার মেলার আয়োজক প্রধান  বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেছেন, “আমাদের কাছে বিশ্বাস সবথেকে বড়। মা গঙ্গার উপর মানুষের বিশ্বাস রয়েছে বলেই তো এত মানুষ এখানে স্নান করতে এসেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন মা গঙ্গা তাঁদের এই অতিমারির হাত থেকে বাঁচাবেন”। এমনকি উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়াতও বলেছিলেন, ‘‘মানুষের স্বাস্থ্য অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। তাই বলে ধর্মকে অবহেলা করতে পারব না”। ভোটের বাজার এতই চড়া।  কারণ, এবার হিন্দুত্বকে পিছনে ফেলে ছাপিয়ে উঠেছে কোভিড পরাক্রমশালী। মানে কোভিডে মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ফেল করায় আবার গরীবের কাজ ও পেটের বন্দোবস্ত করতে মোদী সরকার ফেল করায়।   অথচ ঠিক উলটা হয়েছিল গতবছর লকডাউনের আগে মারকাজের ইসলামি জমায়েতের বিরুদ্ধে সরকারি একশনে। বিবিসি লিখছে “প্রসঙ্গত, গত বছরের মার্চে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলীগ জামাতের যে মারকাজে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুসুল্লী জড়ো হয়েছিলেন, সেটিকে করোনা সংক্রমণের একটি ‘সুপার স্প্রেডার’ ইভেন্ট হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাই চিহ্নিত করেছিলেন”। যা মুসল্লিদেরকে সাজা খাটতে হয়েছিল, আদালতে দারস্ত হয়ে কোনমতে বাঁচতে হয়েছিল।  যদিও ইসলামবিদ্বেষ উঠানো হয়েছিল চরমে এই বলে যে প্রজাতি হিসাবে মুসলমান মাত্রই তাঁরা নিম্নস্তরের জীবন-অভ্যাসের মানুষ এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ও ঘৃণা ছড়িয়ে ।

    এটা এক প্রভাবশালী সাংবাদিক-সম্পাদক রাজদীপ সারদেশাই এর ভাবনা বলা যায়। তিনি বলতে চাইছেন, “অনুপযুক্ত শাসকের [inappropriate Governance] জন্যই কী ভারতের এই পরিণতি হল?

    এসব নিয়ে এখন সারকথায় বললে, এতদিন মোদী ও তার হিন্দুত্ব নাকি খুবই পপুলার, মারাত্মক জনপ্রিয়, এসব শুনতে শুনতে কাল ঝালাপালা অবস্থায় ছিলাম আমরা। কিন্তু এবার হঠাত করে মনে হচ্ছে সবার কানে পানি ঢুকে গেছে। কারণ, একেবারে উলটা গান শুরু হয়ে গেছে। মোদী আর হিন্দুত্ব নিয়ে নাকি ভারত আর ভাল নাই। মোদীর জনপ্রিয়তা হঠাত করে ব্যাপক ধ্বসের মুখে!  ভারতে এখন প্রতিদিনে কোভিডে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখের উপরে। আর সাথে মৃত্যুর সংখা ২৬০০ এর উপরে। কোন কোন রিপোর্ট দাবি করছে টুইটারে  হ্যাশটাগ #ResignModi এখন ক্রমশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।  অর্থাৎ ঠিকমত চিকিতসা না পাওয়া – যেমন টিকা বা অক্সিজেনের অভাবে থাকা চিকিতসালয়  আর কাজ না পাওয়ায় মানুষ প্রত্যেকের পেটে টান দেওয়াতে এবার মোদী আর আর তাঁর হিন্দুত্বকে পরাজিত করে সবার উপরে জোয়ার বা প্রভাব বিস্তার করেছে মানুষের বৈষয়িক জীবন  – যেমন স্বাস্থ্যসেবা আর কাজ পাওয়া। এই বেসিক বাস্তবতা। এতদিন মোদী ও তার বন্ধুরা ভেবেছিল তাঁরা হিন্দুত্ব এই জোশ বা আবেগ দিয়েই বাকি দিনও চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু এই প্রথম  হিন্দুত্বের উপর কোভিড ক্রাইসিসে মোদীর ব্যর্থতা প্রধান ইস্যু হিসাবে উঠে আসছে। মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না হওয়া – এটাই হিন্দুত্বের মোদীকে ধাওয়া করে পরাজিত করতে চাইছে।

    হিন্দুত্ব ফেল করেছে কেন?
    আগে বলেছি মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না করেও মোদীর হিন্দুত্ব বিজেপিকে গত সাতবছর ধরে কেবল সার্ভিসই দিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু সম্ভবত আর না। সেই রাতারাতি নোট বাতিল (পাঁচশ ও হাজারের নোট বাতিল) সিদ্ধান্তের সময় থেকেও যদি ধরি। মানুষের সহ্যক্ষমতা অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য।  আজ রিপোর্টারেরা লিখছে, তারা ভেবেছিল, মোদী এটা বেচতে সক্ষম হয়েছিল  যে হিন্দুত্বের ঐক্য – এই জাতিবাদ মানুষের জন্য অনেক কিছু এনে দেবে, অনেক সমস্যার সমাধান আনবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য  সাধারণ মানুষের। তারা তখনও প্রতারিত, এখনও। এটা তখনও সত্যি ছিল এখনও সত্যি যে মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ করতে যেমন এক নুন্যতম দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন প্রয়োজন, মোদী এর কখনই উপযুক্ত নয়, ছিল না। কিন্তু কোভিড ক্রাইসিস এখন চরমে উঠার মাধ্যমে এই ম্যাসেজ কী পাবলিকের কাছে পৌছাবে? আমরা এখনও নিশ্চিত নই।  তবে গণহারে পাবলিক যে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে, এটা প্রায় নিশ্চিত।  যেটা আরও ভয়াবহ ঘটনা হবে, দরজায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করছে তা হল, কোভিডে ঢলে পড়া অর্থনীতি যা নেগেটিভ প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে ও আছে দেড় বছর ধরে তা কী এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় আদৌও সামলাতে পারবে? এটাই হয়ে উঠতে পারে হিন্দুত্বের উপর প্রধান নির্ধারক ধাক্কা।  ভারতের বাজেট-বর্ষ শু্রু হবার মাস বা কাল হল ১ এপ্রিল। অথচ ভারতের উভয় সঙ্কটটা হল যে, এখনই লকডাউন আরোপ না করলে কোভিড একেবারেই আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আবার উল্টা দিকটা হল, এখন লকডাউনের দিলে এর ধাক্কা সামলানোর মত অর্থনীতি আর চালু থাকবনে না। এছাড়া, মানুষের সুস্থ থাকা ও কাজ থাকার বাস্তবতা আরও শুকিয়ে মরবে। এমন বাস্তবতায় গত সাতবছরে মোদীর হিন্দুত্ব ভারতের জন্য আরো কী কী হারানোর কারণ হয়েছে তা নিয়ে কিছু কথা বলব।

    ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কঃ
    রাজনীতিবিদ অপেক্ষাকৃত তরুণ কেউ হলে একটা বাড়তি সুবিধা কখনো পেতে বা নিতে দেখা যায়। সেই হল, এপ্রোচ বা আগানোর ধরণ। মানে কোন মনোভাব থেকে বসে একটি সমস্যাকে নেতা দেখবে? তাঁর আগের রাজনীতিক নেতারা যেভাবে দেখে এসেছেন সেভাবেই? নাকি নয়া উদ্যোগে? কোনো নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিকল্প পথ খুঁজে দেখে তাতে সমাধান বা অবস্থা বদলের চেষ্টা করবেন? দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা বা প্রধানমন্ত্রী নতুন বা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হলে তিনি অনেক ভিন্ন দিক থেকে সমাধান খুঁজতে চাইছেন, যা আগে ভাবা হয়নি। সমস্যা বা বিরোধগুলোকে বিপক্ষ অংশের সাথে বসে মানে তাদের চোখেও দেখে এক নয়া এপ্রোচে নতুন পথে সমাধান বা বিপক্ষকে মানানোর বা পরস্পরের সমস্যাটা ঠিক কোথায় তা ঠিকঠাক বুঝে এগোনোর পথ এক্ষেত্রে খুঁজে থাকেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব!

    ইমরান যখন ২০১৮ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন, তখন ভারতে বিজেপির মোদীর প্রথম টার্মে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে চার বছর পার করে ফেলেছেন তিনি। মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের মে মাস থেকে। মানে পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদী আবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা তখন। মোদী দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনিই ‘বিজয়ী’ বলে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ইমরান খান পাকিস্তানের আগের যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নয়া এপ্রোচ, নয়া উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই। কিন্তু সার কথাটা বললে, নয়া উদ্যোগের প্রধানমন্ত্রী ইমরানের থেকে মোদীর ভারত নয়া উদ্যোগ বা অ্যাপ্রোচের কোন সুবিধা পেতে বা নিতে চান বা নিয়েছেন; এমন আমরা দেখিনি। কেন?

    প্রথমত, এটা ঠিক মোদীর বিরুদ্ধে যতটা অভিযোগ, এর চেয়ে বরং বলতে হবে মোদির পক্ষে আসলে এমন কোনো আশা দেখতে পাওয়া বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নয়া উদ্যোগর পথে আগোনো অথবা ইমরানকে উৎসাহ দেয়া ইত্যাদি কোনটাই আসলে মোদির পক্ষে সম্ভবই ছিল না। সেই প্রসঙ্গেই এখানে বলব।

    তবে এর আগে সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এই তিন দেশের দুর্ভাগ্য যেখানে আটকে গেছে ও আটকানো শুরু হয়েছিল তা নিয়ে দু’টি সাদা কথা বলে নেব।

    ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ইস্যুগুলো এমন যে, এর অন্তত কিছু গূঢ়-ইস্যু নিয়েই অনন্তকাল বিবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। মানে কোন সমাধানের দেখা পেতে এখানে কতগুলো প্রজন্ম লাগবে এর হদিস কেউ জানে না। কাশ্মির ছাড়াও জন্ম থেকেই বিরোধের সূত্রপাত এমন অনেক ইস্যু আছে।

    কিন্তু এসব বিরোধের আসল উৎস কী তা স্বল্প কথায় বললে – এর প্রধান উৎস হলো ব্রিটিশরা কলোনি-ইন্ডিয়া ত্যাগ করে চলে গেলে কলোনিমুক্ত ভারত কেমন রাষ্ট্র হবে এ নিয়ে অপরিপক্ব জবাব দেয়ার চেষ্টা এবং রাষ্ট্র নিয়ে খাটো চিন্তা-ধারণা হাজির করা থেকেই আজকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান- এ তিন দেশ সেই থেকে সাফার করে আসছে, ধুঁকে মরছে।

    সমাজের কোন একদল নিজ ধর্মীয় বা যেকোনো আইডেনটিটিরই এক জাতি-রাষ্ট্র করবে বলে, বুঝে বা না বুঝে যদি গোঁ ধরে তবে এর পরিণতিতে তা বাকি সব পক্ষই আরেকটা করে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা অথবা অন্য যেকোনো ভিন্নতার আইডেনটিটির ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র গড়তেই তো চাইবেই। সব বিবাদের শুরু এখান থেকে, আর এথেকে নানান দিকে তা যাবেই। এটাই অনিবার্য আর তাই হয়েছিল। এই সরল সত্য ও বাস্তবতা বোঝার যোগ্যতা যারা প্রধান নেতৃত্ব দাবি করেছিল তাদের কারো ছিল না; বরং সবাইকে একটা আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রে আনতেই হবে আর সেটা হতে হবে এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই; এভাবে তা বাকি সবার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে হলেও যেন ‘এটাই হতে হবে’। কংগ্রেসের এই জবরদস্তি, এ থেকেই সব বিরোধের আরো ডালপালায় বিস্তার এখনো চলছে। এর শুরু বা আদিপাপের রচয়িতা-কর্তা মুসলিম লীগ বা জিন্নাহ একেবারেই নয়। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডাও চালু আছে। তবে এরা অবশ্যই নিরুপায় হয়ে অনুসারী মাত্র। সেই মূল রচয়িতা-কর্তা হলেন রাজা রামমোহন রায়;  এবং বিগত ১৮১৫ সাল থেকে শুরু করা তাঁর ব্রাহ্মসমাজ গড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এই ব্যর্থতা থেকেই পরে বঙ্কিম-প্রমুখেরা এক “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” জন্ম দেয়া বা গড়াই কংগ্রেসের লক্ষ্য সেট করেন।  আর তাতে সব বিবাদের শুরু হয় এখান থেকে।  রামমোহন, তিনি বোকা নাকি ইসলামবিদ্বেষী? সে যাই হোক, পাঠক বিচার করবেন, তবে কমিউনিস্টদের চোখে রামমোহনকে তারা মানেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু’ হিসাবে! এখন তাহলে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরাই ব্যাখ্যা করে দেন যে, কমিউনিস্টদের চোখে ধর্মচর্চা তো এখনোও খুবই খারাপ কাজ। অথচ এই বহু কথিত রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন, তিনি কী করে নতুন একটা আস্ত ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন? এ কোন বিপ্লবীপনা? আবার এটা নিয়েইবা সব রেনেসাঁবাদী কমিউনিস্টরা আজও বেমালুম চুপচাপ নির্বিকার কেন? কিভাবে? এর সাফাই কী এবং কৈ? তারা কেউ বলেন না! কেন?

    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, ভারত-পাকিস্তানের ক্যাঁচাল থেকে বাংলাদেশ এখন স্বাধীন হয়ে অনেক দূরে গিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু তা একেবারেই না। এমন মনে হলেও এটা সত্য নয়। কারণ অখণ্ড ভারতে আমাদের মূল বিবাদ ছিল, ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতিরাষ্ট্র খাড়া করে সমাধা পাওয়ার খায়েশ থেকে শুরু হওয়া নানা লড়াই থেকে বিভক্তি। তাতে বাংলাদেশে আমরা এখন ভৌগোলিকভাবে ভারত-পাকিস্তানের কেউ না বলে তাদের ক্যাঁচালের কেউ না – এই আত্মপ্রসাদ পেতে চাইলেও যা আমরাও সাথে নিয়েই হাঁটছি তা হল, বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই না? মূল কারণ যেকোনো আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র। এ কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যায়।

    বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষাভিত্তিক  আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে বা বের হতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই বা বিবাদের বাইরে না? মূল কারণ যেকোন আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে – এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র চাইবে। এসব কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যাবে। অথচ দরকার ছিল নন-আইডেনটিটি ও এক; সবাই সমান নাগরিক এই ভিত্তিতে এক “রাজনৈতিক সাম্য”; মানে সমঅধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র।

    এখন আমাদের প্রসঙ্গ মোদী-ইমরানের মধ্যে সীমিত করব। ভারত-পাকিস্তানের অবস্থা এখন এমন যে, সবাই ন্যূনতম এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায় হয়ত; সব পক্ষেরই কাম্য।  কিন্তু একই সাথে এর সমস্যা অন্যখানে। কারণ এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এমনকি বিজেপি-আরএসএসের মোদীরও হয়ত অকাম্য নয়। শান্তি পেয়ে গেলে তা মোদীর জন্য খারাপ কিছু হতো না। কিন্তু সমস্যা হল প্রায়োরিটির, অর্থাৎ মোদীও পাকিস্তানের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চান না অথবা কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন তার সাথে নতুন উদ্যোগ নিতে চাইবেন, তা করতেও মোদির কোনো আপত্তি আছে – ব্যাপারটা তা নয়, তা একেবারেই নয়। সমস্যা হলো প্রায়োরিটির।

    মোদির প্রায়োরিটি হল মানে এসবের আগে আরেকটা কাম্য জিনিষ আছে। সেটা হল,  ভারতের নির্বাচনে ‘হিন্দু-ভোটের মেরুকরণ’ হতে হবে, পরিস্থিতিকে এমন হতে বাধ্য করতে হবে, যাতে সব হিন্দু-ভোট বিজেপির বাক্সমুখী হয়, এমন এক জজবা-উত্তেজনা সৃষ্টি করা। কারণ ইমরান ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদীকে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্বাচনে জিততে হবে। তাই পাকিস্তানের সাথে মিথ্যা করে হলেও সীমান্ত-উত্তেজনা সৃষ্টি করা, সেভাবেই ভারতের সেনা ও সিভিল প্রশাসনকে সাজানো আর ঠিক নির্বাচনের আগে এই সীমান্ত বিবাদকে কোন একটা উসিলায় চরমে তোলা- এটাই হয়ে পড়েছিল মোদীর প্রায়োরিটি। যার মূল্কথা, পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ভাল সম্পর্কের খারাপ সম্পর্কই মোদীর জন্য বেশি ফলফায়ক। এমনকি সম্পর্কখারাপ এতা দেখানোতেই বেশি ফলদায়ক হবে – এই ছিল মোদীর চাওয়া। অর্থাৎ ভোটের বাক্সে হিন্দু মেরুকরণের ভোট, এটাই মোদির সবার উপরের প্রায়োরিটি হয়ে পড়েছিল। তাই ছদ্মযুদ্ধ লাগানো, পাকিস্তানে ভারতের মিথ্যা বোমা ফেলে আসার দাবি বা ছলনা তৈরি, ইত্যাদিই খুবই টপ প্রয়োরিটি ছিল মোদির কাছে। আর ৩৬ ইঞ্চি ছাতি দেখিয়ে মোদীই একমাত্র ভারত রক্ষাকারী নায়ক – এই ইমেজ ছিল নাকি ভোটে মোদীর ‘তুরুপের তাস’!

    অন্য ভাষায় বললে, মোদির হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাত-ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব- এমন দাবি করে যে রাজনীতি মোদী খাড়া করতে চান, অর্থাৎ কেউ হিন্দু হলেও বাস্তবত বরং সে হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার নাও হতে পারে, এমন হিন্দুত্বের রাজনীতির বাহক তিনি নাও হতে চাইতে পারেন – কিন্তু এটাই মোদী কখনোই এটা হতে দিতেই চান না, পারেন না। পরিষ্কার করে, মোদী মানে দিতে চান উল্টা। বলতে চান, কেউ হিন্দু মানেই সে মোদীর হিন্দুত্ব রাজনীতির বাহকও। এই একমাত্র অর্থ এবং ব্যাখ্যা ও বয়ানে মোদী পুরা ব্যাপারটাকে  আটকে রাখতে চান। এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি এবং এটা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদ। এটাই হিটলারের জার্মানি আর্য-নীল চোখের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ – এদের সবারই আরেক ভাই হিসেবে মোদী হিন্দুত্বের এক উত্থান ঘটাতে চেয়ে এসেছেন।

    মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইমরান খানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী – যিনি পাকিস্তানের তরুণ; নতুন করে যারা পাকিস্তানকে নিয়ে চিন্তা করতে চান এরই প্রতীক হলেন ইমরান। ইমরানই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, পাকিস্তানি নাগরিক সে যে ধর্মেরই হোক – পাকিস্তানের সব নাগরিকের মতই সবার সমান অধিকার আছে। ব্লাসফেমি আইন – যেটা মূলত এতদিন  জমিজমার দখলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ উদ্ধারের কাজে করা মামলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, এমন আসামিদের মামলার বিচারে সুপ্রিম আদালত যাকে খালাস দিয়েছে, নির্বাহী সরকারপ্রধান হিসেবে ইমরান তার মুক্তি নিশ্চিত করেছেন ; ইচ্ছামতো দেশ-বিদেশ যাওয়া বা চলাচলের অধিকার। ইমরান এটাকেই তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য কর্তব্যজ্ঞান করেছেন।

    অথচ চরম সঙ্কীর্ণ ও হিন্দুত্বের ভোট জোগাড়ে ব্যস্ত বিজেপির মোদী এমন ইমরানের কাছ থেকে ভারতের জন্য কোনো সুবিধাই চাইতে বা নিতেই পারেননি। কারণ মোদীর লক্ষ্য অন্য সংকীর্ণ কিছু। মোদীর লক্ষ্য মুসলমান-পাকিস্তানের সাথে টেনশন তুলে বা জিইয়ে রেখে সেই ইত্তেজনা নিজ দেশের নির্বাচনে হিন্দুভোট পোলারাইজ করতে ব্যবহার করা।  তাই ভারত-পাকিস্তানের বিবাদের ইস্যুগুলোর কোনো একটার বেলায় কিছু হাল করতে বা উদ্যোগী হতে পারেননি মোদী।  মোদীর সবার আগে দরকার বা প্রায়োরিটি হল, ইমরানকে মুসলমান দেশের নেতা ফলে শত্রু হিসাবে চিত্রিত করণ। এতেই মোদী তার সব ফয়দা দেখেছিলেন। যেমন এই আমলে,  ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানে পড়েছে যে কার্তারপুর-এর শিখ গুরুদুয়ারা, তা ভারতের পাঞ্জাবের শিখরা এখন যেকোন ভ্রমণকারীর মত মাত্র ২০ ডলার ফি দিয়ে ভ্রমণ করে আসতে পারেন। মানে গুরুদুয়ারা তীর্থ করে আসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরানের কারণে এটি সহজেই বাস্তব হয়ে গেছে।

    পরাক্রমশালী করোনার সামনে মোদীর হিন্দুত্বও খাটোঃ
    কিন্তু পরাক্রমশালী করোনাভাইরাস মোদীর মত যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক তাদেরকেও সোজা করতে পারে। অনেক কিছুই করতে বাধ্য করতে পারে, তাই মনে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় মুখে স্বীকার না করেও মিডিয়া রিপোর্ট হাজির হতে দিচ্ছিল যে ভারত-পাকিস্তান আলোচনা চলছে কখনো গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর ‘র’-এর মধ্যে। অথবা প্রশাসনিক কর্তা পর্যায়ে এবং মিডিয়া থেকে দূরে থেকে। এমন আলাপ আগের কংগ্রেস বা বিজেপি আমলেও হয়েছে, আর সেসব হয়েছিল মূলত ব্যাংককে। এবারো তা ব্যাংককে বা দুবাইয়ে হচ্ছে বলে মিডিয়া রিপোর্ট দিচ্ছে।

    কিন্তু কেন তারা এত লুকোচুপি করে আবার দেখাও করছে? এবং তা নিজ নিজ দেশের বাইরে করছে? কেন?

    একমাত্র কারণ মোদীর ‘ভোটবাক্স’ প্রায়োরিটি, যা আগে বলেছি। ভারতের কল্পিত বিরাট শত্রু মুসলমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোদী একাই লড়ে ভারতের হিন্দুস্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন, এই ইমেজ মোদীর ভোটবাক্সের জন্য খুবই দরকারি। কিন্তু এর অবস্থা এখন খুবই সঙ্গীন। যেমন কাশ্মিরে লাদাখ সীমান্তে যখন চীনের সাথে ভারতের সামরিক টেনশন চলছিল তখন মোদীর-সেনাদের টেনশন বাড়ছিল যে, কখনো যেন ভারতকে চীনের পাশাপাশি পাকিস্তান – এই দুই দেশের সাথে না তাদের নিজ নিজ সীমান্ত দুটা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে না হয় এটাই নিশ্চিত করা। তাই সে সময় চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথেও কথা বলে ভারত ধারণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভারত পাকিস্তানের সাথেও সঙ্ঘাত চায় না। এটা অবশ্যই ভারত পাকিস্তান দুই দেশের জন্যই লাভজনক ছিল। কারণ যুদ্ধের ফ্রন্ট খুললে তা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য কোনো ইতিবাচক ঘটনা ভাবার কারণ নেই। আর এ বাস্তবতার সুবিধাটাই ভারত উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পাবলিকলি দেখা করলে মোদীর ভোটবাক্সে টান পড়বে। আর সে কারণেই এত লুকোচুরি।

    এখানে কোভিডের আরেক সুবিধা বা অসুবিধার কথাও বলা দরকার। গত দেড় দুই বছরে মিডিয়া প্রশ্নে মোদী সরকার বিরাট সুবিধা ভোগ করে চলেছে। ভারতের লিডিং প্রায় সব মিডিয়া এখন মোদীর অনুগত, পায়ের কাছে ঘুরঘুর করার অবস্থা! কেন? কোন মন্ত্র বলে? কারণ প্রতিটি মিডিয়া কোভিডের ঠেলায় বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে এক অর্থনৈতিক টানাটানিতে ডুবে গেছে। ফলে কর্মীদের ৪০ শতাংশ বেতন দেয়ার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থাটাই বোঝা যাবে এটা দেখলে যে, ধনী-গরিব প্রতিটি মিডিয়াই এখন পাবলিক ডোনেশনের চাঁদা চেয়ে নোটিশ টাঙ্গিয়ে রেখেছে। কাজেই সবাই এখন একমাত্র ও সহজ উপায় হিসেবে দেখছে বিজেপির রাজনীতির পক্ষে সাফাই দেয়ার কাজকে। এমন মিডিয়া হয়ে যাওয়ার বিনিময়, সরকারি দল বা সরকারি ফান্ড হাতিয়ে নেয়া – এভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টাই এখন সব মিডিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা ধারা। তবে মিডিয়াগুলো আরেক নয়া কৌশল ধরেছে। তারা বলতে চাচ্ছে, তারা আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ঠিক প্রমোটর নয়। কিন্তু তারাই আবার দাবি করছে, তারা আসলে সেটা করেনি। তারা বরং হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের সরকার, সরকার যেই হোক তাকে সমর্থন দেয়া এটাই দ্য হিন্দুর সুহাসিনী হায়দারের কর্তব্য, অথবা দ্য প্রিন্টের শেখর গুপ্তের কর্তব্য – এরা এই আড়াল টেনে কাজটা করে যাচ্ছে।

    কিন্তু তবু সম্প্রতি আরো কিছু উইকেটের পতন ঘটেছে। এটা শ্রুতি কপিলা [SHRUTI KAPILA] নামে এক লেখকের দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় এক মন্তব্য-রিপোর্ট। তিনি বলছেন, টুইটারে ‘রিজাইন মোদি’ এই হ্যাশট্যাগ পপুলার ভিত্তি পেয়ে উঠছে [The trending of #ResignModi on Indian Twitter…… ]। তিনি দাবি করেছেন, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোভিড মহামারী এবার এই প্রথম ‘রাজনৈতিক’ হয়ে উঠছে। [It finally signalled that the Covid pandemic had become political.] মানে, রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

    তিনি লিখছেন, “গত বছরের এনিয়ে বিপর্যয়ের সময়ও মহামারী ছাপিয়ে উঠা সত্ত্বেও নিজ পপুলারিটি নিয়ে ‘চির-স্ট্রং’ মোদী এসবের ঊপরে থাকতে চেয়েছিলেন। বহু সার্ভেতেই দেখা গেছে, তিনি উপরে আছেন”। মিস কপিলা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলতে চান, গত বছরের কোভিড পরিস্থিতি কোনোভাবেই কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না। কিন্তু জনগণ এরপরও সম্মিলিতভাবে মোদীর উপর (তাঁর হিন্দুত্বের উপর) আস্থা রেখেছিলেন যে, তাদের হিন্দুত্বের ঐক্যবদ্ধতার কারণে মোদী সবাইকে রক্ষা করে নেবেন।

    মিস কপিলা আরো লিখছেন, ‘ভারতে এখন প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত কোভিড-রোগী ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ জনের; এমন সংখ্যা এটাই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আর মাফ করতে পারছে না। কমতেছে। টুইটারে প্রকাশিত ট্রেন্ড, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া হতাশা, এগুলোই সম্ভবত মোদীর হিন্দুত্বের সমর্থন হারিয়ে ফেলার প্রথম ইঙ্গিত! এখন ক্রমেই তাদেকে দেখা যাচ্ছে ভয়ের  বদলে ‘বিক্ষুব্ধ’ হয়ে উঠাকে প্রাধান্য দিতে। সম্ভবত এদিকটা খেয়াল করেই, মোদি সম্প্রতি পাবলিককে ডিসিপ্লিন থাকার জন্য আকুল আবেদন করেছেন”।’

    তাহলে দেখা যাচ্ছে এবারে মোদীর হিন্দুত্ব – এটা আর মহামারীর কারণে সরকারের উপর পাবলিকের আস্থার সঙ্কট কমে যাবার  বিপর্যয় ঠেকাতে পারছে না? কোভিডের মহামারীতে চিকিৎসার অভাব আর পেটের টানের বিরুদ্ধে এবার ‘হিন্দুত্ব’ আর কিছুই ঢেকে ফেলতে পারছে না! হিন্দুত্বের জোশ আর কি কাজ করছে না? মোদী এবার সব লুকিয়ে আগলে রাখতে কি ফেল করবেন! মোদি কী পাবলিকের আস্থাহীন নেতা হয়ে যাবেন? দেখা যাক! পানি কতদুর গড়ায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “হিন্দুত্ব ফেল, কোভিডে চিকিৎসাস্বল্পতা ও পেটের টানে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেন আফগানিস্তান ছাড়ছেন না দুনিয়াকে শাসন

    বাইডেন আফগানিস্তান ছাড়ছেন না দুনিয়াকে শাসন

    গৌতম দাস

    ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3uR

    America’s Slow-Motion Failure in Afghanistan – FOREIGN AFFAIRS

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন হল, হিটলারের উত্থান ও দমনের পর থেকে রেসিয়াল [race or racial] জাতের গর্ব দেখানো, কাউকে রেসিয়ালি অন্যের সাথে তুলনা করা, উঁচা-নিচা দেখানো ইত্যাদি সবই মারাত্মক অপরাধ-কাজ বলে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তবু  ছোট গ্রুপের চর্চায় ফাঁকে-ফোকড়ে এখনো এসব বিষয় উঠে আসতে ও থাকতে দেখা যায়। যদিও  লিখিত অক্ষরে বা প্রকাশ্যে তা আর চর্চা তেমন করা হয় না, তবে প্রমাণ না থুয়ে কানে কানে চর্চাই পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বেশকিছু ব্যতিক্রম, আইন-নিয়ম ভাঙ্গা ট্রাম্পের গত চার বছরের প্রশাসনের আমলে আমরা খোদ আমেরিকাতেই ঘটতেও দেখেছি । সেটাই প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রশাসন যা যতটা সম্ভব প্রকাশ্যে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” ও রেসিয়াল বা বর্ণবাদী  রাজনৈতিক ধারাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গেছে। সেটি অনেক কাছ থেকেই আমরা দেখেছি। বিশেষ করে ৬ জানুয়ারি ২০২১ যা JAN6 capitol hill riot  নামে পরিচিত সেদিনের অপতরতা-ঘটনা ইতিহাসে লেখা হয়ে গেছে ও থাকবে। কিন্তু সেসব সাদা-কালো অথবা জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদের কথা এখানে এখন কেন? মূল কথা হল, জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা ব্যাপারটা কেন খারাপ ও অন্যায়-অপরাধ সে সবই এখন গ্লোবজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের এই সময় যারা হেরে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন তাদের কারো কারো মধ্যে ওই হার স্বীকার না করে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা” আঁকড়ে ধরে আবার উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা ও বৃথা চেষ্টা করার ঝোঁক বর্তমান থাকতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটাও তো প্রবল বেড়েছিল ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ কয়েক মাসে যা শেষ হয়ে এখন বাইডেনের ক্ষমতায় আসা তিন মাস পার হওয়ার পর ক্রমে বাইডেনের পাকাপোক্ত হয়ে বসার সাথে সাথে ওসব সাদা-বাদী ঝোঁক তো আপাতত শীতল হয়ে গেছে বা যাচ্ছিল! তাহলে আবার হঠাৎ পুরান অভিযোগ কেন?

    একমাত্র কমন শব্দের শিরোনাম – উইথড্রলঃ
    গত ১৩ এপ্রিল সারা পশ্চিমা মিডিয়ার মূল শিরোনামে একমাত্র শব্দ ছিল, উইথড্রল [Withdrawal] বা সেনা প্রত্যাহার। অর্থাত কমন শিরোনামটা প্রায় এরকম যে,  “বাইডেনকে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে আসতে হবে” [Biden to Complete Full Afghanistan Withdrawal by Sept. 11]।’ লন্ডন ইকোনমিস্ট  প্রিন্টেড পত্রিকায় অনেক রিপোর্টের শিরোনাম পরবর্তিতে অনলাইন ভার্সানে বদলে দেয়া হয়ে থাকে, তবে দুটা শিরোনামের রেফারেন্সই থাকে। আর প্রিন্টেডের শিরোনামটা খুবই ছোট রাখা হয়। ওর এক অনলাইন শিরোনাম করেছে, বাইডেন আফগান যুদ্ধে তার দুর্বল বন্ধু ফেলে পালিয়ে আসছেন”, [Joe Biden gives up on the war in Afghanistan, leaving a weak ally]। আর সাথে আরেকটা ছোট শিরোনামও আছে, সেটি বলছে, “চিরদিনের জন্য যুদ্ধ শেষ করে” [Ending the forever war]।  কিন্তু এমন করে কথাটা লিখছে কেন? কারণ, এই ছোট অংশটাই বাইডেনের উচ্চারিত কোট-আনকোট কয়েকটা হুবহু শব্দ।

    কিন্তু, এর মানে কি আমেরিকা আর কখনো যুদ্ধে যাবে না? তাই কি বুঝাচ্ছে? কিন্তু এর আগে ট্রাম্পও তার ক্ষমতায় আসার প্রথম বছর (২০১৭) থেকেই তো প্রায় একই সেনা প্রত্যাহারের কথা বলে আসছিল। সেটা বাস্তবায়ন হলে এতদিনে ট্রাম্পেরই তো  সব ফেলে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসার কথা! কিন্তু তখন তো ইকোনমিস্ট এমন শিরোনাম করেনি? এবার করছে কেন? তার মানে কী ট্রাম্পকে পাগল ভেবেছিল, সিরিয়াসলি নেয় নাই? এখন তাই তো মনে হচ্ছে! আবার এমন কি কেবল ইকোনমিস্ট পত্রিকাই শিরোনাম ও রিপোর্টে করছে? না তা একেবারেই না। আমেরিকা-ইউরোপ মিলিয়ে সারা পশ্চিমের সব লিডিং পত্রিকার টোনই প্রায় একই, এই ইকোনমিস্টের মতনই।

    যেমন আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’ শিরোনাম করেছে, বাইডেনের “আফগানিস্তান ছেড়ে আসা কি বিপথগামিতা না অনেক আগেরই বকেয়া?’ [Is Leaving Afghanistan Misguided or Overdue?] তখন ওয়াশিংটন পোস্ট আবার আরো কড়াভাষায় লিখছে, “আমেরিকান-মিথ্যা-গর্বের এক কবরে পরিণত হয়েছে আফগানিস্তান” [“Afghanistan became the graveyard of American hubris“]। ওদিকে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, “আমেরিকা আফগান সেনা প্রত্যাহারের পরে কী করে দূর থেকে আবার কোনো যুদ্ধ করার পরিকল্পনা আঁটতে পারবে” [How the U.S. Plans to Fight From Afar After Troops Exit Afghanistan“]।  মানে বলতে চাচ্ছে এরপরে আফগান ছেড়ে দূরে বসে আমেরিকা হয়ত ড্রোন ছুড়ে কিভাবে আফগান সামলাবে কী করে?

    এছাড়া আরেকটা দিক হল, পশ্চিমা  প্রত্যেকটা মিডিয়ায় গত দু-তিন দিনের মধ্যে এই একই প্রত্যাহার ইস্যুতে আট-দশটা পর্যন্ত আর্টিকেল ইতোমধ্যে ছাপা হয়েছে। আর বলাই বাহুল্য, প্রতিটা লেখাতেই  যে সুর তা হল – পশ্চিমা মন ভারাক্রান্ত, হতাশ, তাদের সব হারিয়ে গেছে এমন সুর ও টোনে লেখা। এব্যাপারে সবার চেয়ে আগিয়ে সম্ভবত লন্ডন ইকোনমিস্ট। ইংরাজি এক্সোডাস [EXODUS]  যার আক্ষরিক অর্থ দেশান্তরি হওয়া বা, ছেড়ে পালানো। আর, ইহুদী ধর্মতত্বীয় ভাষ্য অনুসারে অশুভ মনে করে টের পেয়ে সটকে পড়া। এমনিতেই ইহুদী ধর্মতত্বীয় গল্পের ভাষ্যগুলো মিথ-গল্পে ঠাসা। তাদের সৃষ্টিতত্ব বিষয়ক মিথিক্যাল [Myth-ical] গল্প সব এই দেশান্তর বা ইক্সোডাস ধরণের। তার ৪১ নম্বর গল্পটা যিশুর পিতা জোসেফের মিসরের এক ফারাওয়ের স্বপ্নের অর্থ ব্যাখ্যা করা বিষয়ক যার সফলতাতে জোসেফ দাসজীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিল। সাপ্তাহিক তার এর রিপোর্টের শিরোনাম করেছে “Exodus, chapter 41 – Can Joe Biden get America out of the Middle East”।

    এখন সোজা মূল পয়েন্টে এসে বললে, কথা হল – সারা পশ্চিমের মনে ভয় ঢুকেছে, হতাশা পেয়ে বসেছে যে, আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে (মে-সেপ্টেম্বর ২০২১ এর মধ্যে ) ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত এটা কী কোন আরো বৃহত্তর (পরাজয় বা কোন দেশান্তরি) ঘটনার ইঙ্গিত! সৃষ্টিতত্ব বা Genesis! কোন এক্সোডাস বা দেশান্তরির মত ইঙ্গিত? যে এটা আসলে গত প্রায় পাঁচশ বছর সাদা চামড়া বা সুপ্রিমিস্টদের দুনিয়ার উপর তাদের যে শাসন (মানে কলোনি ও লুন্ঠন) চালিয়ে এসেছে এবার এরই সমাপ্তির ইঙ্গিত? তাই  আমেরিকা এই আফগানিস্তান প্রত্যাহার কেবল আফগানিস্তানই না, সারা দুনিয়া থেকে আমেরিকানদের মানে কেবল আমেরিকানদেরই না এটা আসলে সাদা পশ্চিমা শাসকদের সারা দুনিয়া থেকেই পাততাড়ি গুটানোর ইঙ্গিত? তারা কী দুনিয়ায় আর কোথাও শাসনে ফিরতে পারবে না সেই ইঙ্গিত?  এই আশঙ্কার পটভুমিতে ইকোনমিস্ট যেমন আরেকটা রিপোর্টে ধর্মতত্বীয় ইঙ্গিত ঢুকিয়ে বলছে – এক্সোডাস, সৃষ্টিতত্ব ৪১; বাইডেন কী ধবংস হয়ে যাবার আগেই মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে বের হয়ে পালাতে পারবে?

    সুতরাং, এক কথায় বললে, এটা শুধু আমেরিকার আফগান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়া নয়, এটা আসলে যেন বাইডেনের আমেরিকার সারা দুনিয়া থেকেই আমেরিকান সেনা ও নেতৃত্ব প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা। আর এমনই আশঙ্কায় – অনুভবে ও সুরে আর্টিকেলগুলো পশ্চিমা মিডিয়ায় লেখা হয়েছে। আর এখানকার এমন মনোভাবটার সঠিক প্রকাশকে ফুটিয়ে তুলতে গেলে বলতে হবে, দুনিয়াতে একদিন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব, সাদা শাসন, সাদাদের গর্ব, সাদারাই মরদ এ টাইপের যেসব বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছিল – ঠিক তারই উল্টা ঘটনাই যেন এটা। তাই সাদা-বাদের এই  শোক – যখন তারা বুঝে গেছে বাইডেন কথাটা কেবল আফগানকে লক্ষ্য করে বললেও এর উপলক্ষ্য যেন আসলে এর অর্থ সবারই কানেই কু-স্বরে বেজে উঠেছে যে বাইডেন বলছেন, “আমেরিকা আর কখনো কোনো যুদ্ধেই যাবে না” [Ending the forever war]। যেন আমেরিকার ও গোটা পশ্চিমের  “দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে”।

    আমেরিকান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টঃ গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০
    উপরের এতক্ষণ সেসব কথাগুলো বলেছি এর অনেকাংশই ইহুদি-খ্রীশ্চান ধর্মতত্বীয় মিথে যা সব আছে সেসবেরই ছায়ায় বসে লেখা। তাই এবার বস্তুগত বা বৈষয়িক ও আধুনিক ভাষায় যেসব শাস্ত্র আছে তার ভিত্তিতে কিছু কথা লিখা যাক। আমেরিকাকে আমেরিকার মতন করে এবং আন্তরিকভাবে না বুঝলে এটা বলা বা লেখা যাবে না।  আমেরিকা রাষ্ট্রের রেওয়াজ হল শুধু ঠিক চার বছর পরপর একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে দেয়া না।  সেই সাথে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে নতুন এক “ইনটেলিজেন্স রিপোর্টও” তুলে দেওয়া। ইন্টেলিজেন্স শব্দের বাংলা আমরা করি ‘গোয়েন্দা’। আর যা গোয়েন্দাদের বিষয় তা যেন আর একাদেমিক বিষয় না, গবেষণা-স্টাডি আর নয় – এই হল আমাদের গোয়েন্দা শব্দের সাথেকার বুঝাবুঝি। কিন্তু আমেরিকান  এই রিপোর্টের মুল ফরমাল নাম GLOBAL TRENDS।  যেমন এবারের রিপোর্টের নাম ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০। এই গবেষণা  রিপোর্টিংয়ের কাজটা নিয়মিত প্রতি চারবছর পরপর করে থাকে “আমেরিকান National Intelligence Council (NIC).- Office of the Director of  National Intelligence, এই অফিস।

    বিশেষ করে আমেরিকা চীনের কাছে গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাচ্ছে গত ২০০৪ সালে এই অনুমান-ইঙ্গিত চাউর হবার পর থেকে গত ২০০৮ সালে এই অফিস থেকে প্রথম যে অফিসিয়াল রিপোর্ট বের হয়েছিল যার নাম ছিল “গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০২৫”। অর্থাৎ ২০২৫ সালে দুনিয়ায় গ্লোবাল লিডারশীপ বা রাষ্ট্রগুলোর পরাশক্তিগত বিন্যাস দেখতে কেমন লাগবে।  যেখানে ফাইন্ডিংস বা প্রাপ্ত ফলাফলে প্রথম স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল যে চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গা নিতে অবশ্যম্ভাবী ভাবে আসছেই এবং তা আর কোনদিন উলটা পথে যাবে না। মানে আমেরিকাসহ পশ্চিম চিরদিনের মত এশিয়ার কাছে নেতৃত্ব হারাচ্ছেই। আর মনে রাখতে হবে, তা বলছে, আমেরিকারই এক সরকারি সার্ভে রিপোর্ট। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের চতুর্থ রিপোর্ট হল, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০।

    এখন যারা এই খবরের বিস্তারে যেতে চান, তাঁরা মূল রিপোর্টটা এখানে পাবেন পিডিএফে, না্মিয়ে নিতে পারেন। আর আসলে, এটাই আমেরিকানদের বিউটি যে তাদের এই রিপোর্ট  কখনই কোন গোপন রিপোর্ট নয়, সকলেই কপি নিতে পারে।  আর যারা প্রথম আলোতে এক আধা বুঝা রিপোর্ট হলেও মোটামুটি কাজ চলবে বলে মনে করেন তারা এখানে গিয়ে এই রিপোর্টটা পড়তে পারেন।

    ঝোঁক আকারে দুনিয়াতে কলোনি দখল শুরু বলা হয় ১৫ শতাব্দীতে (১৪০০-১৪৯৯)। আর মোটামুটি ১৬০৫ সাল থেকেই একদম কোম্পানি খুলে কলোনিদখল করার ব্যবসায় নেমে পড়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, এই ছিল সেকালের বৃটেনের প্রধান ও বড় ব্যবসা ধারা।  আর এটাকেই সাদাদের শাসনের যুগ, সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা সাদারা ফিটেস্ট ইত্যাদি নাম দিয়ে নানা সাফাই তত্ত্ব চালু হয়েছিল। তাহলে বাইডেনের এই আফগান ঘোষণা, এটাই কি সেই সাদা যুগের অবসান বলে পশ্চিমা মনে কু-ডেকে উঠেছে! সে কারণেই সাদা মনের আহাজারি এগুলো? তাই কী?

    পশ্চিমাশক্তি বলতে রেসিয়াল প্রতীক আকারে বললে,অনেক সময় তারা নিজেরাই বলে যে তারা হোয়াইট ককেশিয়ান। বিপরীতে নতুন ও আসন্ন গ্লোবাল নেতা হিসেবে এবং রেস বা প্রজাতি পরিচয়ে দেখলে চীনারা সম্ভবত মঙ্গোলয়েড প্রজাতি-ভাগের। যদিও এই ২১ শতাব্দীতে এসে জাত্যাভিমান, জাতগর্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি সব ধরনের জাতবাদিতা এমনকি ধর্মীয় জাতবাদিতা, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা ইত্যাদি সবই ভয়ঙ্কর রকমভাবে সবার জন্যই প্রবল ক্ষতিকারক হবে। এই মেসেজ যারা আমল করবেন তা তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। আর যারা আমল করবেন না, বুঝমান নন তাদেরকে বলেও লাভ নেই। তবে সম্ভবত এককালে সাদাদের “সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট” ধরনের আর্গুমেন্ট আমাদের আর কাউকে মুখোমুখি দেখতে হবে না!  আশা করি! তবু, আমরা কি পারব এই নতুন সময়কে সামলাতে! কোনো আরেক জাত বা ধর্ম শ্রেষ্ঠত্ব সামলাতে? তবে এবারও মঙ্গোলয়েডদের সাথে আরেক অর্থে পূর্ব-ইউরোপীয় (রাশিয়ান বা অন্যরা) অর্থে আরেক ধরণের সাদা ককেশিয়ানও থাকবে। এ ছাড়া সাথে থাকবে ব্যাপক বাদামি এশিয়ান আর আফ্রিকানও। অর্থাৎ প্রথম সাদা-বাদের একক উত্থানের তুলনায় এবার অনেক সম্মিলিত, মিশ্রিত জনগোষ্ঠী উত্থিত হবার সুযোগ পাবে ও নিবে – যারা মিশ্রিত ব্যাপক রেঞ্জের জনগোষ্ঠী জড়িত ও সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ পাবে। আশা করব সাথে আবার কোনো ‘ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের’ নামে কোনো কিছুর উত্থান ঘটবে না, আমাদের সেই হেদায়েত নিজ থেকেই জেগে উঠুক সে কামনা করি! তবে আজ যেমন উচ্চশিক্ষার জন্য, উচ্চ-ট্রেনিং ওরিয়েন্টেশনের জন্য আমরা পশ্চিমামুখী হই এটাও নিশ্চয় দিক বদলাবে। সেই ঝোঁকটাই তবে এবার সেটার অভিমুখ হতে পারে পশ্চিম থেকে এশিয়ামুখী, এমন দেখতে পাওয়াটা আর অসম্ভব থাকবে না সম্ভবত!  

    এবার কথাগুলো অন্য দিক থেকে বলিঃ
    জো বাইডেনের শপথ নেয়ার দিন থেকে হিসাব করলে তার প্রশাসন বা সরকারের আয়ু আগামী ২০ এপ্রিলে মাত্র তিন মাস পূর্ণ হবে। গত ২০ জানুয়ারিতে শপথ গ্রহণের পর থেকে দুনিয়ার সব কোণে তিনি আশা জাগিয়ে চলছিলেন। কিসের আশা? একটাই মূল বক্তব্য যে আমেরিকাকে তিনিই আবার ২০০১ সালের আগের (নাইন-ইলেভেনে টুইন টাওয়ার হামলার আগের) অবস্থায় নিয়ে যাবেন যে আমেরিকা ছিল গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতা, যা ছিল গত টানা প্রায় ৭৫ বছরের।

    এমনকি, বাইডেনের এই আশা জাগানি  ছিল বাঘের মুখ থেকে ইউরোপ – এই বন্ধু-পার্টনারকে ছিনিয়ে আনার মতও। মানে? ইউরোপ আমেরিকার বন্ধু-পার্টনার গত ৭৫ বছর ধরে। যখন সেই ইউরোপ, অন্তত ৩০০ বছর (১৬৫০) আগে, সেই কলোনিযুগের নেতা ইউরোপ যখন – আমেরিকা না, ইউরোপই ছিল প্রধান শক্তি। হ্যাঁ, কলোনি মাস্টার ইউরোপ, ব্রিটিশ-ফ্রান্সের ইউরোপ ছিল প্রধান শক্তি। কিন্তু কপালের ফেরে পড়ে শেষে হিটলারের হাতে সর্বস্ব, সম্পদ ও ভূমি (নিজ ভূখণ্ডসহ কলোনিতে পাওয়া ভূমিও) হারানোর দশায় পড়ে যায় ব্রিটিশ-ফ্রান্স সহ ইউরোপের এসব শক্তি, বিশেষ করে গত শতকের ত্রিশের দশকের পর থেকে ক্রমে। বিগত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ঐ সময়ে অবস্থা এতই খারাপ জায়গায় পৌঁছায় যে তাদের জন্য একটাই অপশন খোলা ছিল; তা হল – আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা মেনে নেয়া, দুই. তার নেতৃত্বে ও তারই অর্থ ব্যয়ে হিটলারের অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা আর তৃতীয়ত, ওই যুদ্ধে বিজয়ের পরে সব দখলি কলোনি ত্যাগ করে প্রাক্তন কলোনিগুলোকে স্বাধীন-মুক্ত করে দিয়ে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ, স্প্যানিস ইত্যাদি কলোনিশক্তিগুলোর সবারই নিজ নিজ দেশে ফিরে চলে যাওয়া। আমেরিকার কথা মেনে একমাত্র এই পথে গেলে তবেই সে ক্ষেত্রে কেবল কলোনি-মাস্টাররা তারা কেবল অন্তত নিজ ভিটামাটি-দেশ রক্ষা করতে পারে, আবার চাই কি আমেরিকান দান-সাহায্য-বিনিয়োগের সহায়তায় আবার অর্থনৈতিকভাবে তাদের রাষ্ট্র উঠে দাঁড়াতেও পারে। আর তাই-ই হয়েছিল। আর সেই থেকেই ইউরোপ অনেকটা আমেরিকার ছোট-পত্নীর মত এমন মর্যাদা পেয়ে আসছে।

    এতে আমেরিকাও ইউরোপকে আপন পাশেই রেখে আসছে, নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেছে বটে, তবু ইউরোপকে ছোট-পার্টনারের মর্যাদা দিয়েছে। গত ৭৫ বছরের আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব মানে সবসময় ইউরোপকে ছোট-পার্টনারের মর্যাদায় রাখা। আর সাথে এতদিন যত যুদ্ধের খরচ, যেমন ইউরোপে বা জাপানের কোন ব্যারাক চালানোর সব ব্যয় ও ন্যাটো পরিচালনার ব্যয়ভার সব কিছুর লায়ন-শেয়ার একা আমেরিকা বহন করে এসেছে। এনজিওও দান-অনুদান কিংবা অবকাঠামো বিনিয়োগ ইত্যাদির  নব্বই ভাগ ব্যয় যোগান দিয়ে আসছে আমেরিকা।  যদিও আমেরিকার ঢলে পড়া অবস্থায় ওবামার সেকেন্ড টার্মের সময় থেকে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ে ইউরোপ কেন কোনো ব্যয়ের দায় নেয় না – আমেরিকা ইউরোপের এই অযোগ্যতার কথা তুলে খোঁচা দেয়া শুরু করেছিল। আর চরম ও বিরাট ব্যতিক্রম ঘটে যায় ট্রাম্পের চার বছরে। ট্রাম্প নিজেকে জাতিবাদী-আমেরিকা বলে ঘোষণা দিয়ে নেয়াতে (মানে সে আর গ্লোবাল নেতা থাকতে চায় না) ইউরোপ বুঝে যায়, আমেরিকার কাছে ইউরোপ আর সেই ছোট-পত্নীর মর্যাদাতেও থাকছে না।

    দিন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। এরই প্রকাশ ঘটে যায় আরসিইপিতে [RCEP] (এটা সাধারণ বাণিজ্যজোট নয়, চীনের নেতৃত্বে এক ভ্যালু-এডিশন শেয়ারড প্রডাকশনের এক নয়া উতপাদন ব্যবস্থা)। চীন এই ব্যবস্থাটা করেছিল মূলত আসিয়ান-দেশ কেন্দ্রিক, সাথে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দ: কোরিয়া ইত্যাদি যারা কেউই এর বাইরে থাকতে চায় না তাই তাতে তাদের মধ্যেই আবার কেউ কেউ যতই কোয়াড [QUAD] জোটেরও সদস্য হোক না কেন! আর পরবর্তিতে এই আরসিইপি জোটের সাথে ইইউ মিলিয়ে Comprehensive Agreement on Investment (CAI) গড়ে তুলেছিল; শেষ সময়ে। মানে? মানে হল, সে সময়টা হল গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। কারণ, চীন চাইছিল বাইডেন পরের মাসে, ২০ জানুয়ারি শপথ নেয়ার আগেই ইইউর সাথে সিএআই (CAI) চুক্তিটা সম্পন্ন করে ফেলা। কারণ বাইডেনের মূল পরিকল্পনা ছিল আবার ইইউকে আমেরিকার নেতৃত্ব ও আস্থায় ফিরিয়ে আনা। শুধু তাই নয়, চীনের বিরুদ্ধে ইইউর সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। চীনের হিউম্যান রাইটের খামতির কথা তুলে প্রবল চাপ সৃষ্টি করা যাতে চীন তাদের সম্মিলিত চাপের কাছে হার মানে। তাই, এর বিপরীত দিকে, পাল্টা  আমেরিকাকে বাইরে  রেখে  চীন ইইউর সাথে আগেই (CAI) চুক্তি করে ফেলতে পেরেছিল বটে।

    কিন্তু চীনা জিনজিয়াংয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগের আঙুল তুলে আমেরিকাও ঠিকই ইইউকে সাথে নিয়ে একসাথে হিউম্যান রাইটের অভিযোগ তুলতে সক্ষম হয়ে যায়। যদিও পুরা জিনিসটাতে পশ্চিম আর   তাতে চীনকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করার লক্ষ্যের জায়গায় থাকেনি, বরং চীনের দিকে আঙুল তুলে বাণিজ্য সুবিধা চীনের থেকে বাগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই নেংটাভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ এখন পর্যন্ত চীনের বিরুদ্ধে পশ্চিম কী চায়?  তারা কী চীনকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে তুলতে চায়, নাকি চীনের নির্মুল চায় তা স্পষ্ট করে না বললেও তারা যেন চীনের উতখাত ও নির্মুল চায় তাই মানে হয়ে আছে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম নিজেই দুনিয়াকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে গড়ে তোলার পক্ষের শক্তি কিনা এই প্রমাণ নাই। হলে তো অন্তত তাদের তোলা অভিযোগ সত্য কিনা এর জন্য নিরপেক্ষ ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ইত্যাদির দিকে আলোচনা আগাত……এমন কোন আলোচনাই শুরু হয়নি! অর্থাৎ তারা হিউম্যান রাইট এর লোক না, তারা চীনের কাছ থেকে পালটা সুবিধা নিয়ে হিউম্যান রাইটের সওদা করতে চায়! তবে বাঘের মুখ থেকে বন্ধু-পার্টনারকে ছিনিয়ে আনার কথা যেটা বলছিলাম যে বাইডেন ইইউকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি ট্রাম্পের উল্টা পথে যাবেন, ২০০১ সালের আগের আমেরিকান অবস্থানে যাবেন – এই লোভ দেখিয়ে ইউরোপকে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন।

    কিন্তু না, সেটাও এখন তলানিতে আর সব কিছু ওদিকে ভেঙে পড়েছে! কেন?

    কারণ, বাইডেনের আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথাটা সারা ইউরোপে সাদা পশ্চিমা শক্তিরই কানে দুনিয়া থেকে সাদা-শাসনের দিন ও সুযোগের চিরসমাপ্তি হিসেবে পশ্চিমা মনে অনুরণিত হয়েছে। আফগান সেনা-প্রত্যাহার মানে গোটা পশ্চিমা শক্তিরই দুনিয়া থেকেই শাসনের পাততাড়ি গুটানো হিসেবে কানে বেজেছে!

    এদিকে দিনকে দিন গত চার বছর ট্রাম্প যেসব অবস্থান নিয়ে কট্টর চীনবিরোধী তবে জাতবাদী, সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ডানাও মেলেছিলেন সে সবের সাথে বাইডেনের নীতিগত পার্থক্য কমে প্রায় শুণ্য হয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার সঙ্গীরা এই কথাটাই বলে গেছিলেন যে ট্রাম্পের নীতির বিরোধী কোনো অবস্থান যেন বাইডেন না নিতে পারেন এবং বাইডেন ট্রাম্পবিরোধী হতেই পারবেন না। বাস্তবত, ব্যাপারটা সে দিকেই ক্রমশ যাচ্ছে !

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “কাকে ছাড়ছেন বাইডেন, আফগানদের না দুনিয়া শাসন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেনের দুত জন কেরি ঢাকায়

    বাইডেনের দুত জন কেরি ঢাকায়

    গৌতম দাস

    ১২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3uD

     

    জন কেরির ঢাকা সফর

    গৌতম দাস

    ১২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৬

    প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্লাইমেট-বিষয়ক বিশেষ দূত, আমেরিকার এক সাবেক সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) – জন কেরি গত শুক্রবার পুরা ‘ওয়ার্কিং ডে’ বাংলাদেশ সফরে কাটিয়ে গেলেন। এর আগে তার দিল্লি সফর শেষ করে তিনি সেখান থেকে বাংলাদেশে আসেন আর এই অবস্থানের সময় ছিল বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।

    প্রথমত কেন একজন সাবেক সেক্রেটারি অব স্টেট জন কেরিকে বাইডেন বিশেষ দূত করেছেন? অর্থাৎ তিনি ট্রাম্পের মত দায়িত্বজ্ঞানহীন নন বরং উল্টা অবস্থানে; ক্লাইমেট ইস্যুটাকে তিনি অনেক গুরুত্বের সাথে দেখে থাকেন, এছাড়া গত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কারণে ইস্যুটা আমেরিকা প্রশাসনের হাতে খুবই তাচ্ছিল্ল করা হয়েছে সেখান থেকে ফিরে তিনই অনেক সিরিয়াস হতে চাইছেন – এই ম্যাসেজ তিনি দিতে চেয়ে এত সিনিয়র একজন ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দিয়েছেন।

    আমেরিকায় দুই প্রধান পুরানা রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট [Democrat Party] আর রিপাবলিকান [Republican Party] – এদের মধ্যে মূল ফারাক, আমরা যারা বাইরে থেকে দেখি তাদের মনে হয় প্রথমটা যদি তুলনামূলক “উদার” বলা হয় তবে পরের বা অন্য দলটাকে সেই বিচারে “রক্ষণশীল” বলবেন অনেক। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোতে আদৌ উদার বা লিবারেল বলে কোনো রাজনীতি আছে বা হয় কীনা এই প্রশ্নটা নাইন-ইলেভেনের পর থেকে দুনিয়ায় সব কর্নার থেকেই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গিয়েছে। যদিও একালে সেই প্রশ্ন উঠুক আর নাই উঠুক সবসময়ই “লিবারেল” কথাটার আসল মানে হল,   – আমার হাতের ক্ষমতা যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ চ্যালেঞ্জ করছে বা আমি চ্যালেঞ্জড হয়ে যাচ্ছি ততক্ষণ আমি খুবই লিবারেল। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, “আমার ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেলে আমি আমার সবার চেয়ে খারাপ ও নৃশংস রূপটাই দেখাব”। এই কোটেট বাক্যটাই হল, লিবারিজমের প্রকৃত সংজ্ঞা।

    তবু আমেরিকান অভ্যন্তরীণ বিচারে উদার বনাম রক্ষণশীলতা, এটাই ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান এ দুই দলের আসল ফারাক নয়। এদের মূল ফারাক হল পাবলিকের ওপর  (আসলে বড় অংশটাই মূলত ব্যবসায়ীদের উপর) সরকারের ট্যাক্স আরোপ করা না করা নিয়ে। সরকারি ট্যাক্স যত কম আরোপ করা যায় রিপাবলিকানরা হল এমন নীতির পক্ষের দল। এ কারণে অনেকে বলেন এরা প্রধানত ব্যবসায়ী বা বড়লোকদের দল ও সরকার। যদিও ট্যাক্স আরোপ ও আদায়ের আসল মানে হল – স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্য-শিক্ষা ইত্যাদি ধরনের পাবলিক সার্ভিসে অর্থ ব্যয় করার পক্ষে সরকারের সক্ষমতা। তাই ট্যাক্স কথাটার সোজা মানে গিয়ে দাঁড়ায় নানা ধরনের পাবলিক সার্ভিস দিতে সরকার অর্থ ব্যয় করবে কি না বা দায়িত্ব নিবে কি না। ডেমোক্র্যাটরা বলবে হ্যাঁ নিবে আর রিপাবলিকানরা বলবে না নিবে না, যত পারে কম নিবে।

    এখন মনে হতে পারে, পাবলিকের থেকে ট্যাক্স সংগ্রহ করে সরকার সে অর্থ জনসেবার ব্যবস্থায় সে অর্থ ব্যয়  করবে না এ কথাটা নৈতিক দিক দুর্বল; এছাড়া এই দুর্বল নৈতিকতার কথাটাকে রিপাবলিকানরা প্রকাশ্যে এটা তাদের মূলনীতি এমন কথাটা বলে কী করে? হ্যাঁ, অবশ্যই বাস্তবে  এত অনৈতিকভাবে রিপাবলিকানরা তাদের কথাগুলো বলে না। তাদের মনের কথা বলতে যদি পুরো সুযোগ দেয়া হয় তবে জানা যাবে তাদেরও একটি শক্ত যুক্তি আছে বলে তারা মনে করে। সে যুক্তিটা হল, সরকারের হাতে ট্যাক্সের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ থাকা মানেই সেই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক বিরাট অংশ অপচয় করে ফেলার সম্ভাবনা। দুনিয়ার সবচেয়ে দক্ষ সরকারটাও অপচয়ের অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়, এই হলো রিপাবলিকানদের সাফাই যে কেন তাই তারা বেশি ট্যাক্সের বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়ে থাকে।

    যদিও রিপাবলিকানদের এই যুক্তিতে সবচেয়ে বড় খুঁত ও ফুটাটা হল, ব্যবসা, বাণিজ্য-বিনিয়োগের সোজা মানেই হল, উদ্বৃত্ত-সঞ্চিত অর্থ কেবল কিছু লোকের হাতেই জড়ো হয়ে যাওয়া; অর্থাৎ যা সমাজে ক্রমান্বয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক অসাম্য তৈরি ও আয়বৈষম্য বাড়িয়েই চলবে। এই খারাপ প্রভাব কমাতে চাইলে সরকারের ট্যাক্স আরোপ অন্তত একটি পথ। কারণ এতে একপেশে সঞ্চিত অর্থ রিডিস্ট্রিবিউট করার একটি উপায় পাওয়া যায়। তাই অপচয় হয় কথা সত্য যদি হয়ও, তবু এই কথার আড়ালে অর্থ-সম্পদে ধনীদের পক্ষে যুক্তি সাজানো গ্রহণযোগ্য নয়। তবু এরাই আমেরিকায় রিপাবলিকান!

    গত ২০০১ সালের প্রেসিডেন্ট বুশ থেকে একালে ট্রাম্প পর্যন্ত রিপাবলিকানরা কখনোই  সারাদুনিয়ার ক্লাইমেট ক্ষতি করার দায় বা পাল্টা পদক্ষেপ নেয়া – তা রিপাবলিকান কোনো প্রেসিডেন্টই তা করেনি। অর্থাৎ রিপাবলিকান দল ও এদের প্রেসিডেন্টরা অবলীলায় দুনিয়া ধ্বংস করে চলবে, দু’হাতে মুনাফা কামিয়ে চলবে কিন্তু কোনো দায় নেবে না এমনই বেপরোয়া হয়ে থাকবে- এটাই বাস্তব  রিপাবলিক-ইজম। এই আলোকে পাগলামির ভাব ধরে ট্রাম্প এমনই বিজ্ঞানবাদী হয়ে হাজির হয়েছিল যে মানুষ চাইলে প্রকৃতির ওপর যেন সে যথেচ্ছাচার করতেই পারে, তিনি এমনই বেপরোয়া হুশহারা প্রেসিডেন্টের ইমেজ তৈরি করেছিলেন!

    সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়কালে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে কপ-২১ নামের এক সম্মেলনে জলবায়ু চুক্তির ব্যাপারে সম্মত হন বিশ্বনেতারা। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ২০০টি দেশ এতে স্বাক্ষর করে। কিন্তু দায়িত্বজ্ঞান লোপ পাওয়া এক দেউলিয়া ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, তিনি ওই চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করে এনেছিলেন। আর এর বিপরীতে অন্তত তুলনামূলকভাবে দায়িত্ববোধের পরিচয়ে বাইডেন আবার প্যারিস চুক্তিতে আমেরিকাকে অন্তর্ভুক্ত করিয়েছেন।

    তবে অন্য আরেক দিক আছে। সময়টা এখন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বদলের; আমেরিকার বদলে চীনের উত্থান ও আগমন-আবির্ভাবের। ফলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় ট্রাম্পের কারণে তাঁর দায়ীত্বজ্ঞান লোপ-পাওয়া এক নেতা হিসেবে ট্রাম্প আমেরিকাকে পরিচিতি দিয়েছিলেন ও তাতে আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছিল। ফলে এবার বাইডেনের বিজয়ের ফলে  ক্লাইমেট ইস্যুতে পরে যেন চীন ও আমেরিকা না কোনো অশুভ-ক্ষতিকর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে যে কে ক্লাইমেট ইস্যুতে মূল নেতা হবে – আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলো থেকে এ নিয়ে সতর্ক করা হচ্ছিল। তাদের পরামর্শ ছিল এটি হলে তা বিরাট ভুল হবে। বাইডেন মনে হচ্ছে সে পরামর্শ আমল করেছেন। যেমন বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে আর ক্লাইমেট ইস্যুতে কার্বন-নিঃসরণ প্রায় না ঘটিয়েও বাংলাদেশের মতো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো – এমন ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাইডেন এই ভার্চুয়াল গ্লোবাল সম্মেলন আয়োজন করেছেন আগামী ২২-২৩ এপ্রিল। তবে বাইডেনের এই আয়োজনে ইতিবাচক দিক থেকে অনেক কিছুই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যেখানে, ক্ষতিকারক প্রতিযোগিতা যেগুলো হতে পারে তা এড়িয়ে চলা হয়েছে। যেমন আমেরিকান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকেও বাইডেনের ক্লাইমেট সম্মেলনে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। আর এর চেয়েও বড় আরেক তাৎপর্যময় ঘটনা হলো পুতিনের রাশিয়াকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে [Biden invites Russia, China to first global climate talks]।

    বাইডেনের রাশিয়ার পুতিনকে দাওয়াতঃ
    এটা অনেক বড় তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এ জন্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙে ১৬ টুকরা হয় ১৯৯২ সালে। এরপর রাশিয়াকে বড় অর্থনীতির সাত রাষ্ট্রের ক্লাব “গ্রুপ সেভেন” বা [G7] -এর মধ্যে রাশিয়াকে ঢুকিয়ে সমতুল্য বড় নেতা করে নেয়া হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এতে তা হয়ে যায় জি-এইট ক্লাব। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বের হওয়া ছোট রাষ্ট্রগুলোতে রাশিয়ার প্রভাব-সম্পর্ক যেন নিঃশেষ হয়ে যায় আর বিপরীতে যেন এসব দেশে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রভাব একচেটিয়া হয়ে বেড়ে চলে – পশ্চিমের এই কাড়াকাড়ির নীতির কারণে রাশিয়া-আমেরিকার অবস্থান-সঙ্ঘাত মুখোমুখি হয়ে বাড়তে থাকে। কোন রাষ্ট্রের উপর অন্যরাষ্ট্রের প্রভাব কমবে বাড়বে স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু পশ্চিম এটা ন্যাচারালাইজড রাখতে পারে নাই। এতে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করেছে এই অজুহাতে রাশিয়াকে জি-এইট ক্লাব থেকে বের করে দিয়ে বাকি নিজেরা আবার জি-৭ ক্লাব হয়ে যায় ২০১৮ সালে আর শুধু তাই নয়। ঐবছরই আমেরিকা রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ করেছিল। অন্য ভাষায় বললে, েকালে  লক্ষ্য করা যাচ্ছে চীনের সাথে আমেরিকার প্রতিযোগিতা যতই তীব্র হয়ে উঠছে তাতে ক্রমে পেরে না উঠে ঢলে পড়া আমেরিকার যাকেই বড় বেকায়দা প্রতিদ্বন্দ্বি মনে হয় তাকেই সে অর্থনৈতিক অবরোধের অস্ত্র (যা মূলত মার্কিনডলারে বৈদেশিক বাণিজ্যিক পণ্যবিনিময় করতে বাধা দেয়া) অপব্যবহার করে এসেছে, তাতে সে্টা ইরান বা রাশিয়া ইত্যাদি এমন যেই রাষ্ট্রই হোক। আর সেই থেকে আমেরিকাই যেন নিজেই নিজের বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়ার এক শক্ত বিশেষ অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোট গড়ে উঠুক সে দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তাই স্বভাবতই চীন রাশিয়ার (প্রথমে রাশিয়া পরে ইরানও) তেল ও গ্যাসের সরবরাহ পাবার বিনিময়ে চীনের বিপুল বিনিয়োগ পায় এ দুই দেশ। আর এভাবেই তারা নিজেদের উপর আমেরিকান অবরোধের প্রভাব মারাত্মকভাবে পড়া ঠেকাতে সক্ষম হয়ে টিকে গিয়েছে।

    কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হল, বাইডেন নির্বাচিত হওয়ার পরও রাশিয়ার সাথে প্রকাশ্যে ও নাম ধরে সঙ্ঘাতময় সম্পর্ক প্রকাশিত করে ফেলেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রায় আট বছরের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে রাশিয়াকেও এবারের ক্লাইমেট সম্মেলনে বাইডেন আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এতে বাইডেন যে ম্যাসেজ দিতে চাইছেন তা হল, বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার যতই স্ট্র্যাটেজিক বা বাণিজ্যিক বিরোধ থাক না কেন, ক্লাইমেট ইস্যুতে তিনি এসব বিরোধকে পাশে সরিয়ে রেখে হলেও সব রাষ্ট্রের সাথেই কাজ করতে চান। এর মানে জন কেরির ঢাকা সফরকে আমাদের এই আলোকে দেখতে যেন পরামর্শ দিচ্ছেন বাইডেন! মানে আমেরিকার সাথে আমাদের সরকারের যত টেনশন বা অবিশ্বাস যাই থাক বা না থাক ক্লাইমেট ইস্যুটাকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে দেখতে হবে, এই হলো বাইডেনের ম্যাসেজ! কিন্তু তাই কি?

    সন্দেহটা প্রকাশ করার দরকার হত না যদি জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে ছাড়া অন্য ইস্যু তুলেও কথা না বলতেন! যেমন ঢাকার মিডিয়া রিপোর্ট : জন কেরি বলেছেন, ‘“২০ কোটি জনগণকে দেয়ার পর টিকা উন্মুক্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র’– মানে আমাদেরও টিকা সরবরাহকারী হতে চায় আমেরিকা। আবার সরাসরি বলেছেন, “বাংলাদেশ চাইলে করোনার টিকা দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র”।

    এথেকে আমাদেরকে সোজা বুঝতে হবে এর অর্থ হল, জন কেরি বিশেষ দূত হলেও কেবল ক্লাইমেট ইস্যুতে তিনি ও তার কথা আটকে রাখছেন না। তিনি সাধারণভাবে বাইডেনের দূত হিসেবেও কাজ-কথাবার্তায় হাজির হচ্ছেন আমরা দেখতে পাচ্ছি! এমনিতে কথিত টিকা কূটনীতিতে বাংলাদেশে বেলায় চীনারা তেমন অবস্থায় নয় হয়ত কিন্তু কোনো দেশকে টিকা সরবরাহ দেয়াটাকে ভারত ও আমেরিকা এ দুই দেশই পুরোদমে সরবরাহ-নেয়া ঐ দেশের উপর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে টিকাকে দেখতে ও ব্যবহার করতে আগ্রহী তা দেখা যাচ্ছে। এমনকি ভারতের সেনাপ্রধান মুকুন্দ নারাভানে যিনি এখন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে সাক্ষাতের সফরে ঢাকায় আছেন; তিনিও এক লাখ ডোজ টিকা সাথে এনেছেন বলে জানাচ্ছেন। অথচ তিনি তো ঠিক কূটনীতিক ব্যক্তিত্ব তাই-ই তো নন। আবার এই টিকা কি চুক্তি অনুযায়ী অর্থ-পরিশোধের পর আমাদেরকে যে টিকা ভারতের এক কোম্পানির সরবরাহ করার কথা তারই অংশ কি না তাও পরিষ্কার নয়। আবার যদি তাও হয় তবে সেনাপ্রধান কী করে এর বহনকারী হন, ইত্যাদি সবই অস্পষ্ট ও সীমাছাড়ানি। কেবল বোঝা যাচ্ছে টিকা এখন অন্য দেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার করতে চাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সবাই। যদিও এই টিকা আমরা অর্থ পরিশোধ করে কিনেছি তারা সরবরাহকারী মাত্র, এই হলো সম্পর্ক। তাই এখানে কেউ কাউকে খাতির করছে ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়।

    তবে মূল কথা তাহলে জন কেরি কি ক্লাইমেট ইস্যুরও বাইরে, বাইডেনের হয়ে কেবল টিকা-কূটনীতিতে জড়িয়েই থেকে যাবেন, না ‘বঙ্গোপসাগর ইস্যু’ পর্যন্তও যাবেন! যেমন এক আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো পরামর্শ রেখেছেন, “……শুধু ভারতের ওপর নির্ভরতা নয়, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার জন্য ইতিবাচক…’ এমন কিছু করতে হবে। … ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”। এমন এই পরামর্শ মেনে কোনো দিকে ও কতটা জন কেরি বা বাইডেন এই সুযোগে অগ্রসর হতে চাচ্ছেন? সেসব কথা কী তিনই এই সফর থেকে কাউকে বলে গেলেন না আগামি বলার ব্যবস্থা-সুযোগ খুজতেছেন?

    বাইডেনের হিউম্যান রাইট ঢলে পড়তে যাচ্ছেঃ
    গত ২৭ মার্চ ছিল বার্মা বা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠা দিবস। কিন্তু এ দিনটা বার্মার অভ্যন্তরের চেয়েও এক গ্লোবাল গুরুত্বের দিন হয়ে হাজির হয়েছিল। সেটা হল, বাইডেনের কথিত “হিউম্যান রাইট নীতি” পুরোপুরি অমান্য করার বা defiance -এর দিন হয়েছিল সেটা। এ দিন বাংলাদেশ-ভারত-বার্মাসহ ওদিকে চীন-রাশিয়া মিলে মোট আট রাষ্ট্রের এক কমন অবস্থান তুলে ধরার দিন ছিল সেটা। এই আট রাষ্ট্র এদের কমন পরিচয় ছিল ওসব দেশে পাবলিক রাস্তায় মিছিল-মিটিংয়ে জড়ো হলে তাতে সরাসরি গুলি চালানো বা যাকে খুশি গুম-খুন করা ইত্যাদি ধরনের কাজ- এক কথায় রাষ্ট্রের নাগরিক মানবিক অধিকার রক্ষা ও মেনে চলাটা এরা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে না। এই অর্থে এটা তাদের বাইডেনকে কলা দেখানো মানবাধিকার ডিফায়েন্স-এর নীতি বলা যায়। আবার বাইডেন হিউম্যান রাইটের কথা তুলছেন তাই তিনি সাধুপুরুষ নেতা- না তা কখনও নয়। সরি।  এটাও বিবেচনা করতে পারছি না। কারণ, মূলকথা, হিউম্যান রাইটকে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা বা কাজে লাগানো, বাণিজ্যিক সুবিধা পেলে বিনিময়ে হিউম্যান রাইট বেচে দেয়া ইত্যাদি এসবের দিকে প্রবলভাবে আমেরিকা ছুটছে, বিশেষ করে ২০০৭ সালের পর থেকে নির্লজ্জ হয়ে। গত ২০১৭ সালের বার্মায় জেনারেলদের রোহিঙ্গা বিতারণের সপক্ষে কথিত আরসা সন্ত্রাসের গল্প – এটাকে সাফাই হিসেবে হাজির করেছিল চীন ও ভারতের মতই আমেরিকার এক উপমন্ত্রী; এসব কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। তবে এবারের বার্মায় আট রাষ্ট্রের সামরিক এটাসেদের সম্মিলনের ম্যাসেজ হল  – ভারত বলতে চাচ্ছে আমেরিকার ‘হিউম্যান রাইট নীতি’ এতে ভারত ও তার বন্ধুদের বেলায় ছাড় দিতে হবে। না হলে কী হবে?

    না হলে যা হবে তা আমরা দেখলাম এবার গত সপ্তাহে কোয়াডের নৌ-সামরিক মহড়ায়।  এবার যদিও  সামরিক মহড়ায় কোয়াডের চারদেশের সাথে বাড়তি যুক্ত হয়েছে ফ্রান্সও। এদিকে ভারত যদি বাংলাদেশ, বার্মা থাইল্যান্ড, লাওস ভিয়েতনাম আর ওদিকে চীন-রাশিয়া মিলে মোট আট রাষ্ট্রের সাথে বাইডেনবিরোধী নীতিতে জোট পাকায় আবার একই সাথে ভারত যদি কোয়াডের মধ্যেও থাকে এর সোজা মানে হল, এবারের কোয়াড আর অন্তত ঐ আট-রাষ্ট্রের জন্য কোনো সামরিক হুমকি নয়, হতেই পারবে না!  কারণ দুই পক্ষের দিকেই ভারত আছে! কাজেই চীন-রাশিয়ার জন্য কোয়াড কোনো ইস্যুই নয়! এক কথায় এমন ভারত একাই কোয়াডকে অকেজো করে রাখার জন্য যথেষ্ট! মানে সারা এশিয়ায় বাইডেনের ভাত নাই, এমন হয়ে যাবে না কি! এখন এই পরিস্থিতিতে বাইডেন কী করবেন? বাংলাদেশকে কোলে তুলে নিতে চাইবেন! ওয়েট অ্যান্ড সি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১০ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “জন কেরির ঢাকা সফর” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    গৌতম দাস

    ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০ঃ০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3uj

    বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পার করেছে। আর এ’বছরেরই ২০ জানুয়ারি মানে মাত্র দুমাস আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার শপথ নিয়েছেন। আমরা অনেকেই দেখার জন্য উদ্গ্রীব ও আগ্রহি ছিলাম যে ট্রাম্পের পাগলামি-উত্তর বাইডেন নতুন কী রাজনীতি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে এর কী প্রভাব পরে ইত্যাদি। অপেক্ষার পালা একটু দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মন-সংযোগ একটু ঢিলা পড়ে গিয়েছিল হয়ত আর এই ফাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত বা ঘটনার প্রকাশ ঘটে গিয়েছে। এই বিচারে গত ২৬ মার্চ মোদীর মত আরএসএসের ক্যাডার তিনি বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির প্রধান অতিথি হয়েছেন বলে নয়, এর চেয়েও বড় তাতপর্যপুর্ণ ছিল মোদীর এই সফর। যেটা বাইডেনের ২০ জানুয়ারিতে শপথের সময় কেন ২০ ফেব্রুয়ারিতেও আগাম বুঝা যায় নাই যে পরের মাসে ২৬ মার্চ এত তাতপর্যপুর্ণ হয়ে যাবে। যেমন এখন হয়ত আমাদের মনে পড়বে,  আমরা মনে করতে পারি, এবার ২৬ মার্চের প্রধান অতিথি কে হবেন ভারতের কসাই মোদী না তুরস্কের এরদোয়ান, এই আলাপ উঠতেও আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু বরং মার্চ মাস শুরু হবার পর ক্রমশই মোদীরই প্রধান অতিথি হওয়া ক্রমশ এক বিরাট গুরুত্ব নিয়ে হাজির হতে শুরু করেছিল। কেন?

    নতুন করে গ্লোবাল পোলারাইজেশনঃ আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুতগতিতে এটা আগাচ্ছে। আর বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের আমল পর্যন্ত আমরা কোয়াড (চীনবিরোধী চার রাষ্ট্রীয় জোট- আমেরিকা-ইন্ডিয়া-অষ্ট্রেলিয়া-জাপান) আর  সাউথ চায়না সি কেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাটেজি (উদ্যোগ) – এদুটার কথা জোরেশোরে শুনে আসছিলাম। ফলে “কোয়াড” ও “ইন্দো-প্যাসিফিক” কেন্দ্রিক পোলারাইজেশনই আগামিতে প্রধান হবে ও বাড়বে এমনটা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। এই ইঙ্গিত এখন পরিস্কার। বাইডেনের শপথ নেয়ার দুমাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বহু উলট-পালট হতে শুরু করেছে। আর এরই মাঝে বাইডেনের নিজের ফরেন পলিসির প্রায়োরিটি এর নিজের নতুন বৈশিষ্টগুলো নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসা মাত্র পালটা প্রতিক্রিয়াও শুরু এবং তা থেকেই নতুন করে নতুন পোলারাইজেশন এবং তা ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া আবার  এককথায় মেরুকরণ যা ভাবা হয়েছিল বাইডেলের আমলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইচ্ছা আকাঙ্খার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেমন, কোয়াড থেকে ভারতকে বেরিয়ে যেতে হবে – এটা ধরে নিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই আগানো শুরু করে দিয়েছে।

     এবার পোলারাইজেশনের রঙ্গমঞ্চ বঙ্গোপসাগরঃ আগের অনুমিত সাউথ চায়না সি,যেটা সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশমুখ, ঠিক সেটা এখানে আর মূল রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার থাকছে না। নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। এর উপর আবার এতে ভারত, বাংলাদেশ বা মায়ানমারের – এভাবে বঙ্গোপসাগর এই তিনদেশের  মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে ফোকাস।  অন্তত আমেরিকান ফোকাস। কেন এমনটা ঘুরে গেল?

    দুটা কারণে এই পরিবর্তন। পরপর বলে যাব। তবে পাঠক চাইলে নিজের মত আগেপিছে করেও পড়তে ও বুঝতে পারেন।

    প্রথমটাঃ  এখানে পরপর দুটা ট্রিগার টিপা হয়েছে। প্রথম ট্রিগার টানার ঘটনাটাই প্রথমে রেখে বলছি। এশিয়ায় আমেরিকা নতুন রূপে হাজির হয়েছে, এটাই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের হানিমুনের সমাপ্তি ঘোষণার ট্রিগার হতে যাচ্ছে। চীনবিরোধী আমেরিকা-ভারত এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক পুরানা, তৈরি শুরু ২০০৪ সালে। অবশ্য এরও আগেই বিজেপির বাজপেয়ির আমলে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নৌকায় ভারত নিজ কিছু শর্ত দিয়েছিল যে তাদের আতঙ্কবাদের (মানে পাকিস্তানকে টেরর-কান্ট্রি ধরে নিয়ে সেই চোখে দেখতে হবে) উঠে গিয়েছিল। পরে ভারতের ২০০৪ সালের মে মাসে মনমোহন সিংয়ের প্রথম টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্ব শুরু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের মার্চে বুশ প্রথম ভারত সফরে আসেন। আর তাতে যুগান্তকারি ঘটনা ছিল প্রথম আমেরিকান অস্ত্র এমনকি পারমানবিক কাঁচামালও ভারতকে বিক্রি এবং ভারতকে চীনবিরোধী করে (বয়ান মুখে তুলে দেয়াসহ) আকার-প্রকার দেয়া সবই এই সফর থেকে শুরু হয়েছিল। এরই ফরমা্ল নাম ছিল চায়না কনটেইনমেন্ট মানে চীন ঠেকানোর কাজটা ভারতকে ঠিকা দেওয়া।
    আমেরিকার এতে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইজিং ভারতকেও চীনেরবিরুদ্ধে ব্যবহার। কিন্তু মুদ্রার এপিঠের উল্টোদিক মানে তাতে আমেরিকান উলটা আরেক ফরেন পলিসিও ছিল, যেটা তখন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেটা হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ীভাবে নোঙর করার ইচ্ছা। যেটাকে ভারত জেনে সবসময়ই দেখে এসেছে গরীবের একতলা বাডির পাশেই বড়লোকের সাততলা বাড়ি বানানো আর ভারতের ঘরের ভিতরে কী ঘটছে সেদিকে নজরদারির চোখ ফেলা। আমেরিকা তার এই লুকিয়ে ফেলে রাখা জিনিষটা এতদিন লুকিয়ে রেখেই চীনবিরোধী নানাকিসিমের “ভারত-আমেরিকান সহযোগিতা” বলে ভারতকে দিয়ে কাজ করিয়ে চলছিল। সেটাই এবার স্থগিত, একাবারেই শুকিয়ে যাবে।

    কারণ, বাইডেনের আমলে তিনি এখন চায়না কনটেনমেন্টের চেয়েও বঙ্গোপসাগরে পড়শি সকলের ঘরে নজরদারি ফেলা – এটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ মনে করে আগানো শুরু করেছে। মানে এতদিন এশিয়ায় ভারতের পড়শিদেশগুলোতে (বা ভারতের কথিত নিজ-প্রভাবাধীন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর) সবখানে চীন ঢুকে পড়তেছে বলে অনবরত খামোখা ভারতের ন্যাগিং দেখছিলাম আমরা। যার ভিতর আমেরিকা ভারতকে আরো তাল দিত, আর বলত চীন ভারতকে নাকি মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন? সেখানে এখন চীন-ভারতের কথিত প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাইডেনের আমেরিকা নিজেও এক প্রার্থী হিসাবে মঞ্চে হাজির হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এনিয়ে হাতের কাছে ভাল ইঙ্গিত-প্রমাণ হল, আলী রীয়াজের প্রস্তাব বাংলাদেশ যেন আমেরিকার সাথে মিলে “বঙ্গোপসাগরকে হাব” বানায় অথবা “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”……।

    আমেরিকান এমন অবস্থান থেকেই আসলে ট্রিগার পয়েন্ট হল বাইডেনের আমেরিকার “বঙ্গোপসাগরের খায়েস” প্রকাশ হয়ে পড়া। কিন্ত এথেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় তাতে এরচেয়েও বড় ট্রিগার টিপতে প্রস্তুত এখন ভারত। কি সেটা?

    দ্বিতীয়টাঃ আগেই বলেছি আমেরিকার এতদিন লুকিয়ে রাখা এই খায়েস যেকোন সময়ের জন্যই ছিল ভারত-আমেরিকার মাঝে চরমতম শত্রুতা শুরু করার সুপ্ত পয়েন্ট। ভারত এতই কঠোরভাবে সবসময় আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে ছিল ও আছে। ভারতের এত শত্রুতা-জ্ঞানবোধ চীনের বিরুদ্ধেও সম্ভবত নাই। ভারতের সব সরকারই এবং ইল্টেলেক্টরাও মনে করে এসেছে এটা ভারতের জন্য এতই ক্ষতিকর যে আমেরিকা এতে ভারতের সব উত্থান সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিবে। তাই বাইডেন যতটা না ট্রিগার টেনেছেন এর চেয়েও প্রকাশ্যে ট্রিগার ইতোমধ্যেই ছোড়া শুরু করে দিয়েছে ভারত। এরই একটা পর্ব ছিল ২৬ মার্চ মোদীর বাংলাদেশ সফর। সেটা কী রকম?

    কমন এনিমির বিরুদ্ধে এক হওয়াঃ  অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি যে  এতদিনের ভারত-আমেরিকার চীনবিরোধী যে গভীর আত্মীয়তা চলেছিল এর দিন শেষ হয়েছে। আমেরিকাই এখন ভারতের প্রধান এনিমি। এদিকে আমরাও অনেকবার দেখেছি ও বলে এসেছি যে, আমাদের সরকার গত চৌদ্দবছরের চড়াই-উত্রাইয়ে  সবচেয়ে কম আস্থা রেখে এসেছে আমেরিকার উপর; তা সে ওবামা,  ট্রাম্প বা বাইডেন যারই আমেরিকা হোক। এমনকি সরকারের আয়ু বাড়ানো প্রস্তাব বা আলী রীয়াজের প্রস্তাব যতই লোভনীয়ভাবে হাজির করা হোক না কেন এথেকে দূরে থাকলেই তা সরকারের আয়ুর স্বার্থে যাবে বলে আমাদের সরকার মনে করে এসেছে।  এই সুত্রেই  এবার মাঠে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের এক কমন এনিমির আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রশ্নে ঘনিষ্ট হওয়া ও পরস্পরকে রক্ষায় সহায়তা করার এক বাস্তবতা হাজির হয়েছে, মনে হচ্ছে। প্রায় ঠিক যেমনটা এর আগে সুজাতা সিংয়ের সফর থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন ওর প্রাক্কালে যেটা হয়েছিল। অনুমান করা যায় গত ২৬ মার্চ ছিল এই গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গে তাদের সিরিয়াস আলোচনার এক ভাল সময়। এটাই স্বাভাবিক।

    তাহলে বাইডেন কী বোকা মানুষ, তিনি কেন বঙ্গোপসাগর সেভেন্থ-ফ্লিট মোতায়েনের আকাঙ্খার ইঙ্গিত এসময় হাজির করতে এলেন? না; অবশ্যই তিনি বোকা নন। মূল কারণ ইতোমধ্যেই  আমেরিকা ভারতকে কোয়াড থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে এর সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। যেমন ব্যাপারটা দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষ্য হল, US Will ‘Expel’ India From Quad।   আবার ভারত নিজেই নিজেকে কোয়াড থেকে বের করে নিতে যাচ্ছে তা আসন্ন  – এটা ভারত-আমেরিকা দুপক্ষের কাছেই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কিভাবে?

    দুই ইস্যু এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইটঃ
    এস-৪০০ এটা রাশিয়ার তৈরি এক এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম যা আমেরিকার এফ-৩৫ এর মত যত বোমারু বিমান আছে সেসবের ‘যম’ মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার ভাষায়, “এস-৪০০ এর কাছাকাছি স্থানে এফ-৩৫ চালানো অনুচিত”। কারণ, তা ঐ বোমারু বিমানকে নামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এনিয়ে আমেরিকার মূল নীতি অবস্থানটা হল আরো কঠিন। তা হল, একই দেশের হাতে একসঙ্গে এস-৪০০ আর এফ-৩৫ এর মত কোন বোমারু বিমান থাকতে পারবে না। তাই সোজা সিদ্ধান্ত যে দেশ এস-৪০০ কিনবে আমেরিকা তার উপর বাছবিচার ছাড়াই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কেবল পাগলা ট্রাম্পের কথা। কিন্তু এখন সবাই পরিস্কার যে এটা বাইপার্টিজান – খোদ পেন্টাগনের অবস্থান। তাই যে এস-৪০০  কেনাটা শুরু হয়েছিল তুরস্ককে দিয়ে তা এখন পাকিস্তান, ভারতসহ যারা যারা এমন যে কেউ কিনবে ভেবেছে, তারা সবাই আবার সাথে ভেবেছিল যে কেবল তার বেলায় অনুরোধ করলে আমেরিকান প্রশাসন বিশেষ ছাড় দিবে – কিন্তু এখন সবাই বুঝে গেছে, এটা সবার ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
    শুধু তাই না, ব্যাপারটা আরো এগিয়ে কঠিন হয়েছে ভারতের বেলায়। এপ্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক শক্ত ও আগাম নির্ধারিত। এতদিন  ভারত মনে করে এসেছিল ভারতকে আমেরিকারই নিজ স্বার্থে দরকার আর ভারতও রাইজিং। ফলে আমেরিকা যদি বিশেষ ছাড় না দেয় তবে ভারত আমেরিকাকেই ত্যাগ করে হলেও এস-৪০০ কিনে নিজের সামরিক বহর সাজাবেই। এই প্রসঙ্গে সর্বশেষে দেনদরবার হয়ে গেল গত ১৯ মার্চ থেকে তিনদিনের বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ভারত সফরে [Russian Arms Sale Clouds U.S.-India Ties]। এতে দুপক্ষই কড়া শেষকথা শুনে বুঝে যায় কোন পক্ষই সরতে পারছে না।
    ওদিকে ইতোমধ্যে বহু আগে মানে নির্বাচনে প্রচারণার সময় থেকেই বাইডেন পরিস্কার করে উল্লেখ করে আসছেন কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের উপর হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ইস্যুতে তিনি ক্ষমতাসীন হলে সরব অবস্থান নিবেন।  কিন্তু এদুটাই মোদীর ভারতের নির্বাচনে হিন্দু মেরুকরণ করে তাদের ভোট বিজেপি-বাক্সে তোলার গুরুত্বপুর্ণ কৌশল যা তিনি কোনভাবেই ত্যাগ করতে চান না বা পারবেন না। অতএব এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইট – এদুই বড় সংঘাতের ইস্যুতে আমেরিকা-ভারত বিচ্ছেদের ঘোষণা এখন  যেকোন সময়ের ব্যাপার।

    ইতোমধ্যেই প্রথম প্রকাশঃ বার্মা
    গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল বার্মার সামরিক বাহিনী দিবস। মায়ানমার যা কার্যত সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন এক রাষ্ট্র সেখানে এই দিবসের তাতপর্য আমরা অনুমান করতে পারি। এক রিপোর্ট বলছে, বার্মায় ৪২ বিদেশি মিশন আছে যাদের এমবেসিতে “মিলিটারি এটাসে” পদ আছে আর তাতে কেউ আসীন হয়ে বার্মায়  উপস্থিত  আছেন। এদের মধ্যে আটজন এটাসে [attaché] ঐ প্যারেড অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।  জাপানি নিক্কি পত্রিকা বলছে ঐ দেশগুলো হল, Russia, China, India, Pakistan, Bangladesh, Vietnam, Laos and Thailand ।  মানে ঐ আট রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গুরুত্বপুর্ণ এক রাষ্ট্র। এর মানে  যে ভারত  তার কোয়াডের সব বন্ধুদের  ত্যাগ করেছে যা পক্ষ বদল করেছে বলা যায়, আর এভাবে প্রকাশ্যে তার মিলিটারি এটাচে হিসাবে একজন ঐ প্যারেডে যোগ দিয়েছিল। এমনকি  বাংলাদেশও রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমান তাসত্বেও “ব্যবহারিক কারণে”, [pragmatic attitude]ভারত-চীন-রাশিয়াকে অনুসরণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা এতে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অতিথি ছিলেন রাশিয়ার ডেপুটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন।
    মূলকথা,বাইডেন তার নিজের পলিসি-স্বার্থগুলো খুলে বসাতে এবার নতুন করে এক ব্যাপক গ্লোবাল পোলারাইজেশন এর বাস্তবতা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এই আট দেশের মিলিটারি এটাসে দের একসাথে অংশগ্রহণ এটা যেন বাইডেনের বিপরীতে চীন-রাশিয়া পক্ষ দেখাতে চেয়েছে যে তাদের পক্ষে কে কে আছে। আসলে ভারত পক্ষ বদলিয়েছে এটাই পুরা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর যেন বাইডেনকে দেখানো যে তোমার পক্ষের ভারত আর তোমার সাথে নাই।

    কে কোন পক্ষে থাকছেঃ
    জিনজিয়াং-উইঘুরে মানবাধিকার ভায়োলেশন ইস্যুতে বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সাথে পেয়েছিল। একসাথে তারা এই ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে আবার বড় ক্ষত ও বাইডেনের দুর্বলতার দিকটা সব সময় আছে যে, উইঘুরে মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে চীনবরোধী জোট পাকায়ে চীনের থেকে বৈষয়িক সুবিধা হাসিল করা এতদিন পশ্চিমের মূল উদ্দেশ্য  হয়ে এসেছে।  সোজা কথায়,  পশ্চিম এখন পর্যন্ত সবসময় এভাবে মানবাধিকার ইস্যু তুলেছে কিন্তু শেষে তা বিক্রি করেই খেয়েছে। কাজেই পশ্চিম এই নৈতিকতার সংকট খুবই মারাত্মক থেকেছে। যেমন বার্মার ২০০৮ সালের গঠিত কনস্টিটিউশনে  আর্মি রাজনীতিতে অংশ নিবে সহ সব নির্বাহী ক্ষমতার ভাগীদার থাকবে  – সেকথা লেখাই আছে। আর সেসব কথা থাকা সত্বেও কি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জেনারেলদের প্রশংসা করে গো এহেড অনুমোদন দেয় নাই, জেনারেলেরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু কল বলে সার্টিফিকেট দেয় নাই? তাহলে আজ প্রতিদিন বার্মায় প্রতিবাদকারিরা হত্যার শিকার হলে এখন সহানুভুতির নাকিকান্নার উদ্দেশ্য কী? ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা খেদানো যখন চলছিল তখন আমেরিকা চীন-ভারতের সাথেও গলা মিলিয়ে কথিত আরসা আক্রমনের গল্প ফেঁদেছিল যেটা ছিল বার্মার জেনারেলদের হল্প আর সেটাই আমেরিকানেরা আমাদের কাছে সাফাই দিয়েছিল যে আরসার কথিত আক্রমণের কারণেই নাকি পাল্টা রোহিঙ্গা খেদানোর শুরু।
    সোজা কথায় মানবাধিকারের ইস্যু বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে সুবিধা আদায় – এদিকটাই প্রধান পশ্চিমা স্বার্থ, সেটাই অনেকদিন থেকেই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।  ফলে বাইডেনের যে মেরুকরণ দাড়াচ্ছে চীন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে – এই বাইডেন জোট এখনও বড় বড়  নৈতিকতা সংকটে আছে এবং থাকবে।

    ফলে বাইডেনের জোট -কোন নৈতিক বা নীতি-পলিসিগত ভিত্তির সমস্যায় আছে  ও এমন ইমেজ সংকটে হাজির হয়েছে। আর এমন মিস-ফায়ার হওয়াতে এর সুযোগ নিয়ে পালটা চীন-রাশিয়ার জোটে আর তাতে (কোয়াড ভেঙ্গে) ভারতের যোগ দেয়া আর তাতে হবু বাংলাদেশ বা বার্মার যোগদান – এটাই বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নতুন রঙ্গমঞ্চ।

    সবমিলিয়ে বাইডেন যা করলেন তাতে তার পক্ষীয় জোটের নৈতিক বা গ্লোবাল কমন পলিসিগত শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর প্রশ্নে তিনি মারাত্মক খাটো হয়ে হাজির হলেন। শুধু তাই না, আবার একই সাথে তারা দুপক্ষজোটের সামরিক ঝোঁকগুলোকে তিনি জেনে অথবা না-জেনে উসকিয়ে দিলেন যা খুবই অবিবেচক অবশ্যই!

    সর্বশেষ জন কেরিঃ
    জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে বাইডেনের বিশেষ দুত। তিনি আগামি ৯ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন। সম্ভবত আগামি ২২ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যে ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এর দাওয়াত দিতে। আর সেখানে কী সাইড লাইনে আলী রীয়াজ যেভাবে বলেছিলেন “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা  আর অর্থনৈতিক করিডরের একটি ‘হাবে’ পরিণত করার আলাপ প্রস্তাব – সেটাই কী সেরে নেয়া হবে? মনে হচ্ছে সেটাই এজেন্ডা। যদি তাই হয় তাহলে একদিকে বাংলাদেশ নিয়ে মানবাধিকার অবণতির রিপোর্ট আর এদিকে এমন বঙ্গোপসাগর এজেন্ডা – ঠিক এটাই বাইডেনের জোটের সংকট, এই চরম নৈতিক সংকটের কারণের তার জোট ও তিনি ঠুঠো আর ধান্দাবাজ বলেই মানুষ দেখবে!
    বাইডেনকে একটা বেছে নিতে হবে – বঙ্গোপসাগর না হলে মানবাধিকার!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    গৌতম দাস

    ২৯ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3tW

    SOURCE

    আলী রীয়াজ আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। ঢাকার আরেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে যৌথভাবে তিনি এক রচনা লিখেছেন প্রথম আলো পত্রিকায়। তারই তৃতীয় পর্বে যে লেখাটা ছাপা হয়েছে, এর শিরোনাম “রাজনীতিতে ধর্মের ফিরে আসা”।

    রাজনীতিতে ধর্ম আসতে পারবে না বা ফিরে আসতে পারবে না ইত্যাদি এসব খুবই একঘেঁয়ে ধারণা, অতি ব্যবহারে জীর্ণ ফলে ক্লিশে [cliché] আর ভুল; এছাড়া সর্বোপরি বহু আগেই চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া এই ধারণা। এএসব কথা ন্যাগিং-এর পর্যায়ে পৌছানোয় তা আর নুন্যতম আগ্রহ তৈরি করে না। সিরিয়াস কোন আলোচনা এখান থেকে শুরু করা যায় না। এছাড়া কেন এই তর্ক কেউ তুলছে এর উদ্দেশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সৎ বা পরিস্কার রাখা হয় না। এছাড়া পলিটিক্যাল বায়াসনেস তো আছেই। যেমন যেই ভারতকে “সেকুলারিজমের পিতৃভুমি” হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে এতদিন একে তুলনা করা হয়েছে এক বিশাল তুচ্ছতার চোখে যে কথিত ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান বা মুসলমানের বাংলাদেশ বলে – যেসব গর্বের ঠেলায় আমাদের প্রাণ যায় অবস্থা। অথচ “সেকুলারিজমের” নামে হাজির এই শক্তি মোদী বা আরএসএসের উত্থানে নির্বিকার। আবার মোদী তাদের ঘরের লোক এবং গ্লোবাল লিডারদের ক্ষমতার গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার হয়ে উঠেছে।  অথচ গুজরাট, দিল্লি কী উত্তরপ্রদেশের মুসলমানের রক্তে তার হাত রঞ্জিত হয়ে উঠেছে; এমন রাজ্যের সংখ্যা বাড়ছে তবু মোদীর রাজনীতি তাদের চোখে তেমন ‘ধর্মের রাজনীতি” নয়। এদের অনেকেই, “রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” নীতিগত অবস্থানের লোক – এই বলে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সারকথায়, রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” কথা যারাই তুলে তাদের উদ্দেশ্য এমনই গভীরভাবে অস্বচ্ছ থাকতে দেখা যায়। ফলে এদের কারণেই কোন সিরিয়াস আলোচনা সম্ভব হয় না। আর উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ থাকলে কোনদিকেই আগানো সম্ভব হবার কোন কারণ নাই। তবে সব জায়গায় দেখা যায় যে ইসলামি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে যারা আসছে বা ইসলামিস্টরা খারাপ  আর কথিত সেকুলারিস্টরা ভাল – এটাই একমাত্র এপ্রোচই।

    এদিকে রাজনীতি আর ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে যদি শুধু নাইন-ইলেভেনের পরই ধরি, তাতেও গত ২০ বছরে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। একেবারে উল্টে-পাল্টে অনেক দিক থেকে দেখে আলোচনা সমালোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রভাব এমন লেখকদের উপর পড়েছে তেমন মনে হয়নি।  যেমন এখানে দেখে যাচ্ছে  তিনি সত্তর দশকের মধ্যে থেকেই কথা শুরু করতে চেয়েছেন।

    যেমন আলী রিয়াজ শুরুতেই লিখেছেন, “১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলায় একে বলা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ “। এর মানে, কথিত সেকুলারিজম একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে নেওয়ার বিষয়। কিন্তু এই অনুমানটাই ভিত্তিহীন।  এছাড়া কেন এটাকে নীতি হিসাবে নিতেই হবে?  আর কী উদ্দেশ্যে?  ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখতে হবে তাই?  আবার পরিস্কার হয়ে কী তারা কথা বলছেন?  যেমন, ব্যাপারটা কী সাধারণভাবে ধর্ম নাকি নির্দিষ্ট করে ইসলাম? মানে ধর্মটা ইসলাম হলে এটাকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখার প্রশ্ন তুলতে হবে? ব্যাপারটা কী এমন? এর জবাব সব সময় কথিত সেকুলারিস্টদেরকে অস্বচ্ছ রাখতে দেখেছি।  কখনও রিভিজিট করে নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন জানা যায় না!

    মূলত প্রশ্নটা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করারই নয়। একেবারেই না।  প্রশ্নটা নাগরিকদের মধ্যে কোন ধরণের বৈষম্য না করার। এটা নিশ্চিত করা, এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের প্রধান শর্ত ও উদ্দেশ্য। তথাকথিত সেকুলারিজম যেখানে কোন ইস্যুই নয়। কারণ বৈষম্যহীন না থাকলে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সকলে সমান এমন সাম্যে থাকবে না। ধর্মীয়সহ সব পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সকলে সমান অধিকারের এটা চর্চায় নিশ্চিত করতে গেলে ব্যবহারিক দিক থেকে সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র আর ঠিক আর কোন একটা ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হবে না আবার কোন এক ধর্মবিরোধী তাও হবে না। এই অর্থে এটা ব্যবহারিকভাবে যতটুকু যা আলাদা। এর বাইরে যারাই নাগরিক-বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নয়, রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করতে হবে – এমন উদ্দেশ্যের কথা বলবে এরাই ইসলামবিদ্বেষী উদ্দেশ্যে কথা বলছে বুঝতে হবে। ইসলাম-কোপানি এদের উদ্দেশ্য।

    ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজম নীতি এসেছিল ইন্দিরার আত্ম-সংকটেঃ
    আসলে ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজমের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন ইন্ধিরা গান্ধী নিজেই, আত্মসঙ্কটে। এছাড়া সেটা ছিল  তাঁর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার শর্ত হিসেবে। অর্থাৎ অরিজিনালি সমস্যাটা তাঁর নিজের। কী সমস্যা? তা হল, সাতচল্লিশের দেশভাগ হয়েছিল নেহরুর স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে;  আর তা ভারতের মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র বানানোর মধ্য দিয়ে। ফলে নেহেরুর চোখে পাকিস্তান ভারতের স্বার্থের শত্রু, তা মেনেই এর জন্ম। তা হলে এই ভাষ্য অনুযায়ী ইন্দিরার চোখে ১৯৭১ সালেও শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীন তো মূলত সেই মুসলমানই যারা স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙ্গেছিল। তা হলে একাত্তর সালে এসে ইন্দিরা গান্ধী ঐ মুসলমানদেরই সহায়তা করবেন কেন? তাই আমাদের নয়, ইন্দিরার মন ভাল করতে পারে এ প্রশ্নের এমন একটা যুৎসই  সাফাই জবাব দরকার ছিল ইন্দিরার। সেই প্রশ্নটা যেন ইন্দিরার মনে উঠেছিল ১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে; যখন ভারত বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে কি না সেটা আর বাস্তবে অমীমাংসিত ছিল না। তবে ‘কী পরিচয়ের’ বাংলাদেশক্ব স্বীকৃতি ঘোষণা দিবেন, ইন্দিরা নামবেন তাই তিনি খুঁজে ফিরছিলেন।

    যেমন, আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন,  কোল্ডওয়্যারের ঝগড়ায় দুই ব্লক-রাষ্ট্রজোটে বিভক্তির সেই যুগে যখন পাকিস্তান-আমেরিকা-চীন এই  ব্লক-গ্রুপের বিপরীতে বাংলাদেশ-ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অ্যালাইনমেন্ট তৈরি সম্পন্ন হয়ে গেছিল ও এভাবে যুদ্ধ হতে যাচ্ছে তা মুখ্যত নির্ধারিত হয়ে গেছিল, এটা ছিল সেই সময়। কিন্তু তখনই ইন্দিরার মাথায় যেন উদিত হয়েছিল, কেন এই মুসলমানের বাংলাদেশকেই তিনি সমর্থন করতে যাচ্ছেন এর এক সাফাই-জবাব তাঁর হাতে থাকতেই হবে।  তাকে সুরাহা দিতে মুজিব বা তাজউদ্দীন যদি বলতেন যে তারা আর মুসলমান নয় তাহলে হয়ত ইন্দিরার মনষ্কামনা পুর্ণ হত। কিন্তু হায়! এমনটা সম্ভব নয়!  অবাস্তব স্বপ্ন বলে, এর বিকল্প হিসেবে যেন ইন্দিরার মাথায় আসে ‘সেকুলারিজম’ শব্দটা। অর্থাৎ বাংলাদেশ যেন নিজেকে সেকুলার রাষ্ট্র বলে স্বীকার করে নেয়, এমনটা করার পরই অষ্টম চিঠি চালাচালিতে ইন্দিরা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মানে ইন্দিরার ইচ্ছা পূরণ হয় এতেই যে, তিনি ‘মুসলমান বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি দেননি, ‘সেকুলার’ বাংলাদেশকে দিয়েছিলেন। এভাবেই  তাঁর অস্থির-মন কিছুটা শান্তি পায়!
    কিন্তু একাজ করেও ইন্দিরার সব দ্বিধা-সন্দেহ তবু চলে যায়নি। কারণ যেমনটা আলী রীয়াজের ভাষ্য, ‘সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ’ করা হয়েছিল – ব্যাপারটা ঠিক তা নয় আবার ওমনটা ফ্যাক্টসও নয়। অন্তত আমরা মানে বাংলাদেশ এটা নিজে যেচে কখনও গ্রহণ করেননি, বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া ছিল – তাই এখন প্রমাণিত।
    এছাড়া পাল্টা একটা বড় প্রশ্ন করা যায়, কথিত সেকুলার নীতি নেয়া ইন্দিরার চোখে যদি এতই কাম্য ও জরুরি হয়ে থাকে এমনকি ধরা যাক পবিত্র হয়ে থাকে তবে খোদ ভারতই ১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে (ওর কনষ্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে রচিত/গৃহিত) কথিত ‘সেকুলার’নীতির রাষ্ট্র ছিল না কেন? এই মহান সুযোগ ইন্দিরার বাবারা নেহরু বা গান্ধী খুঁইয়েছিলেন কেন? তাহলে তখনো ইন্দিরার ভারত নিজেই সেকুলার না হওয়া সত্বেও উলটা বাংলাদেশকে জবরদস্তিতে সেকুলার বানানো কেন? আলী রিয়াজের উচিত হবে এদিকটা খুঁজে দেখতে পারেন আগে। ইন্দিরার কাছেও এর জবাব ছিল না। বরং এনিয়ে আত্ম-অস্বস্তি ছিল, অনুমান করতে পারি। তাই এর ফায়সালা করতে ১৯৭৬ সালে (অর্থাৎ কথিত সেকুলার বাংলাদেশের জন্মেরই চার বছর পরে) ভারতের কনস্টিটিউশন বদলানোর সুযোগ পেয়ে খোদ ভারতকে কথিত সেকুলার ঘোষণা করিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হিসাবে দেখতে পারেন, The Constitution (Forty-Second Amendment) Act, 1976.

    কেন আওয়ামি লীগের পক্ষে নিজেকে কথিত সেকুলার বলা সম্ভবই ছিল নাঃ
    আবার বাংলাদেশের আওয়ামি লীগের  কাছে “তারা সেকুলার” এমন কথা মুখে আনাই সেকালে ক্ষতিকর ছিল – এটাই সেকালের ইতিহাস ও বাস্তবতা ছিল। এভাবেই আওয়ামী লীগ তৈরি হয়েছিল। সেটা কেমন?  কারণ, অন্তত ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দেওয়ার পরে আওয়ামী লীগের বিরোধীরা (মানে মূলত ইসলামী দলগুলো ও আর্মি সরকারের ভাষ্য যেটা)  ছয় দফার বিপরীতে তারা  অভিযোগ তুলে বলে চলত যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও ইসলামকে দুর্বল করতে চায় বলে ছয় দফা বা স্বায়ত্তশাসনের কথা তুলেছে। অর্থাৎ মূলকথা তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে “ইসলামকে দুর্বল ও ক্ষতি” করার অভিযোগ তুলত। এর অর্থ যেই আওয়ামী লীগের কাঁধে এমন অভিযোগ সেই দল তো যেচে বলতেই পারে না যে, সেকুলারিজম তার কোন হবু-রাষ্ট্রনীতি হবে! কারণ এতে ঐ অভিযোগকেই মেনে নেয়া বা প্রমাণ করে দেয়া হবে! এ কারণে কথিত “সেকুলারিজম” আওয়ামী লীগের দলে বা কোন নেতার মুখে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত থাকবার কোন সুযোগই ছিল না। এটাই আরেকটা খাস প্রমাণ যে “কথিত সেকুলারিজম” আওয়ামি লীগের নীতি ছিল না।
    অতএব, ১৯৭১ সালে আমাদের কথিত সেকুলার হওয়ার কথা যা আলী রীয়াজ দাবি করছেন তা  ভিত্তিহীন। তবে এটা পরিষ্কার যে, এটা ছিল ইন্দিরার ছুপা-মনোবাসনা! তাঁর মনের ‘খচখচি’ মিটানো! যা আমাদের উপর চাপানো হয়েছিল। অর্থাৎ উল্টো করে বলা যায়, এক অন্যায় মনোবাসনা যে, যে যে মুসলমানদের কারণে অখণ্ড ভারত  হতে পারেনি, সেই মুসলমানদেরই ইন্দিরা সহায়তা করেন কিভাবে? এই খচখচানি দূর করতেই আমাদের সেকুলার হতে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে ইন্দিরার মনোস্তুষ্টি রিয়াজ নিজের কর্তব্য বলে হয়ত অজান্তে গ্রহণ করে নিয়েছেন; যদিও একাদেমিকদের কাজ হওয়া উচিত কোন বক্তব্যের পক্ষ-বিপক্ষ দুই দিকেরই সাফাই পয়েন্টগুলো নির্মোহ যাচাই করা এবং তা, খুলে ও মেলে ধরা।

    কোন রাষ্ট্রকে  কথিত এই সেকুলার হতেই হবে কেন; আর তা হওয়ার উপায়ইবা কী ও দরকার কেনঃ
    সেকুলারিজম নাকি এক ‘পবিত্র’ রাষ্ট্রীয় নীতি- এ কথাটা হল সবচেয়ে অর্থহীন এবং নিজেকেই ফাঁকি দেয়া এক বয়ান। অর্থাৎ এটা আসলে বুঝে বা না বুঝেই বলা কিন্তু মূলত অসৎ উদ্দেশ্যের এক বয়ান। আসলে এখানে মূল প্রশ্ন, কেন কোন রাষ্ট্রকে ‘সেকুলার’ হতেই হবে, দরকার কী? আবার তা হওয়ার উপায় কী? আর ‘সেকুলার’ হওয়া মানেই বা কী?
    আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সেকুলারিজম এক পবিত্র রাষ্ট্রীয় নীতি এ কথা বলে যারা রাষ্ট্রের গায়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে আমরা দেখেছি, এরা কার্যত মুসলমানবিদ্বেষী। এই বিদ্বেষ চর্চা করতেই তারা ঐ সাইনবোর্ড ব্যবহার করেছে। কেন বারবার এই বিদ্বেষের দিকে আঙুল উঠাচ্ছি বা উদ্দেশ্যকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছি?
    কারণ, কোন কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    তা হলে প্রথমত এটা কোন রাষ্ট্রীয় নীতি বলে সাইনবোর্ড টাঙানোর কাজই না যে, এটা সেকুলার রাষ্ট্র। তা হলে ‘অসততা বা উদ্দেশ্যের কথা’ তোলা হচ্ছে কেন? কারণ অনেক পুরনো ও প্রথম কথা হল, আপনি একটা একচেটিয়া ক্ষমতার আধিপত্যে থেকে এরপর অন্য ধর্মের লোককে ডিকটেট করতে পারেন না যে, তাঁর সেকুলার হওয়া উচিত। সবসময় এই ব্যাপার ঘটেছে এইভাবে।  ঠিক যেমনটাকে আলী রিয়াজ এখন সমস্যা হিসেবে হাজির করছেন। যেমন, আমরা দেখেছি ১৯০ বছরের জমিদার আমলে, দুই বাংলার সেই জীবন জমিদার-হিন্দুর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যে কেটেছে। আর সেই আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে তারা মনে করত যেমন ইসলামী টুপি মাথায় দেয়া বা ইসলামী লেবাস পড়ে শহরে ঘোরা যাবে না। করলে নাকি তা সেকুলার নীতি ভঙ্গ হবে। তবে ব্রিটিশ আমলে  জমিদাররা এটাকে ঠিক সেকুলার না,  বলতেন “সাম্প্রদায়িকতা”। আর একালে সেটাকেই গুছিয়ে বলা হয়, কথিত “সেকুলার রাষ্ট্রীয়নীতি”। অথচ উদ্দেশ্যটাই অসৎ! একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখা!
    তাহলে সেকালের সাম্প্রদায়িকতার মানে হল, জমিদার-হিন্দুর যে আধিপত্য কায়েম ছিল সেটাকে কোনো চ্যালেঞ্জ করা যাতে না হয়ে যায়, এমন হতে না দেয়া। অর্থাৎ হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের নিজ সম্প্রদায়েরও চিহ্ন প্রদর্শন করতে না দেয়াই সেকুলারিজম। এমন না করা যেন অ-সাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলারিজম বলে সেকালে জমিদার-হিন্দু আর একালে ইন্দিরা বা মোদি সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছেন।
    আর তাই মুসলমান বা কোনো ধরনের ইসলামিজমের কাছে সেকুলারিজম শব্দের অর্থ দাঁড়িয়েছে, এটাই ইসলামবিরোধীতার ও বিদ্বেষের এক হাতিয়ার এবং এটা তাদের সাথে বৈষম্য করার জন্য এসেছে।
    তা হলে মূল কথা, আগে থেকে থাকা কোনো মুসলমান বা হিন্দু আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আশ্রয় নেয়া বা এটাকে রাষ্ট্রীয়নীতি বলে চালিয়ে দেয়া- এগুলোই অসততা ও খারাপ উদ্দেশ্য বলছি। তাদের হাত পরিস্কার নয় তাই।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য বৈষম্যহীনতা, নাগরিক অধিকারে সাম্যঃ
    তা হলে, মূলকথাটা হলো বৈষম্যহীনতা। আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল- বৈশিষ্ট হিসেবে তার নাগরিকদের মধ্যে সাম্য, সব নাগরিকের অধিকার সমান- এই নাগরিক বৈষম্যহীন নীতির ভিত্তিতে দাঁড়ানো। যেখানে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকদের পরিচয় একটাই যে, সে নাগরিক এবং সবার সাথে বৈষম্যহীনভাবে সমান অধিকারের নাগরিক। তাতে নিজস্ব আইডেনটিটি (যেমন ধর্মীয় বা ভাষা বা পাহাড়ি-সমতলী, নারী-পুরুষ প্রভৃতি) আগের মতোই আছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইডেনটিটি একটাই যে, সে রাষ্ট্রের নাগরিক। অর্থাৎ নাগরিকের অন্যসব আইডেনটিটি আগের মতই নানান ভিন্নতা নিয়ে আছে; কিন্তু সেসবের ভিত্তিকে কাউকে কারো উপরে অধিপতি না বানানো, কাউকে নাগরিক বৈষম্যের শিকার না বানানো – এসব কঠোরভাবে চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকারে সাম্য নিশ্চিত করা, এটাই মূল দরকারি কাজ। খেয়াল করেন, এই পুরো প্যারাটায় কোথাও সেকুলার শব্দটাই লিখতে হয় নাই। অথচ অর্থ পরিষ্কার। নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের এটাই মূল-বৈশিষ্ট্য হতে হবে এবং তা কোনো ‘সেকুলারিজম আমার রাষ্ট্রীয় নীতি’ এমন কথার চাতুরি বা আড়াল না নিয়েও বলা যায়। এটা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই হয়ত আর কোনো মুসলমান বা যে কোন ধারার  ইসলামিজমের পুঞ্জীভূত অনাস্থা ও ক্ষোভ আমরা কাটাতে পারি। বাংলাদেশের হিন্দুরাও অনাস্থা কাটিয়ে তেমন বৈষম্যহীন বাংলাদেশকেই আপন মনে করে আস্থা খুজতে পারেন।
    অর্থাৎ মূল কথা, সেকুলারিজম শব্দের উচ্চারণই অপ্রয়োজনীয়। ফলে এ শব্দের আড়ালে কোনো চাতুরীও চলবে না। নাগরিক সাম্য-নীতি অনুসরণ করবেন এবং কোন সাইনবোর্ডে না – চর্চায় তা প্রতিষ্ঠা করবেন, এটাই এর মূল ফোকাস হতে হবে।

    রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন – বৃটিশ অসততাঃ
    আলী রিয়াজ লিখেছেন, ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকার কথা ছিল, রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ ছিল। এই শব্দ ও বাক্যগুলোই আড়ালেই প্রবল অপ-ব্যবহার ঘটানো হয়েছে। ইসলাম কোপানোর পারফেক্ট সুযোগ করে নেয়া হয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, এতে এক বিরাট অনাস্থা তৈরি হয়ে গেছে বিশেষ করে মুসলমান বা কোন ধরনের ইসলামিজমের জনগোষ্ঠীর মনে। মূলত ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ এর নামে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করা হয়েছিল। এই অসততার ‘গুরু’ ব্রিটিশ সরকার। বিশেষত ১৯২৩ সালের নেশন স্টেট ব্রিটিশ রিপাবলিক। এর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া তুরস্ক বা অটোমান এম্পায়ার দখল করে ব্রিটেনের নিজ ইচ্ছায় একে সাজানো। ‘কামাল তুনে কামাল কিয়া’- এই কামালকে ক্ষমতায় বসিয়ে ব্রিটিশরা ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ কথাগুলো সাজিয়েছিল।
    আগেই বলেছি সাম্য-নীতিকে চর্চার বাস্তবায়ন, নাগরিক বৈষম্যহীনতা বাস্তব করে তোলা – এসব কাজ সম্পন্ন করতে পারলে “জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক” কী হবে, কোথায় তা ভারসাম্য আনবে সেটা আপনাতেই ঠিক হয়ে যাবে। আর সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও বাস্তব সমাধান হবে। কিন্তু যার উদ্দেশ্য ইসলাম-কোপানি আর মনে বিদ্বেষ, ক্রুসেদে হারার পুরান রাগ তার মুখে এসব রুচবে না!
    যেমন, সুলতানি তুরস্ক ছিল ডমিনেটিংভাবে ইসলামী। তা এক সাম্রাজ্যরাষ্ট্র ছিল। আবার তুরস্ক মানেই, একই সাথে বারবার ক্রুসেড হেরে যাওয়ার ইউরোপীয় খ্রিশ্চীয়-মনের ক্ষোভ ও অভিজ্ঞতাও। কিন্তু যেটাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের হেরে যাওয়ার পরের ১৯২৩ সালের সেকালের মডার্ন তবে জাতিরাষ্ট্রের ব্রিটেন চায়নি যে, ১৯২৩ সালের তুরস্কের কারণে ব্রিটেনে্র নিজ আভ্যন্তরীণ   খ্রিশ্চীয় থিওলজি আবার রাজনীতির চেয়ে  প্রবল হয়ে উঠুক বা রাজনীতিকদের পাশাপাশি ক্ষমতার ভাগীদার হয়ে উঠুক। তাই ব্রিটিশ শাসকেরা  ব্যাপারটাকে ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন” থাকা জরুরি এভাবে সাজিয়ে কথা তুলেছিল, ‘রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ কথাগুলো এনেছিল।  যাতে বৃটেনেও  খ্রিশ্চীয় থিওলজির সত্ত্বা আগের মতই রাজনীতিক সত্ত্বার অধীনস্ত হয়ে নিচে চাপা থাকে। এছাড়া বাস্তবে পেয়ে যাওয়া তাদের বসিয়ে দেয়া শাসক কামাল আতাতুর্ক  জবরদস্তিতে খাড়া হতে পারেন বা কোন ধরণের ইসলামিজমের হাতে আক্রান্ত না হন। কামালকে রক্ষা করতেই এই নীতি। কথিত সেকুলারিজম মানেই রাষ্ট্র আর ধর্মের বিভাজন, এমন কথা সত্য নয়। এককথায় এটা ছিল তুরস্ক বা বৃটেন স্পেসিফিক তাদের আভ্যন্তরীণ হবু কোন সংকট যে উদয় না হয় এর জন্য সাবধাণতা। রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকতেই হবে এভাবে সেকুলারিজমকে উপস্থাপন করা একটা চিহ্ন হিসাবে একে দেখানো এমন কোন কথা কোনকালেই ছিল না।

    কাজেই মোদ্দা কথা ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’-এর তত্ত্ব কামালের তুরস্ককে বৃটেনের নিয়ন্ত্রণে সামলানোর এক আলাপ মাত্র।  এটা কোনোভাবে নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের আলাপই নয়। কাজেই রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের এই আলাপ এক কথায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ইউরোপে এটা যার যেভাবে কাজে লাগে সে সেভাবে এটা ব্যবহার করে, মানার ভান করে। এমনকি আমেরিকান রাষ্ট্রও এটা মানে না। আমেরিকা মনে করে, নাগরিকের ধর্মপালনের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষাই রাষ্ট্রের কাজ। তবে মুখ্য বিষয়টি হল – তুরস্কে রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের কথা নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের কথা নয় বা সেদিক থেকে তোলাই হয়নি। তাই এটি উপেক্ষাযোগ্য। এই সারকথাটা আমাদের মনে রাখতেই হবে।
    সোজা কথাটা বললে, লেখক যদি বেড়ে চলা ইসলামিজমের দিকে তাকিয়ে তা ঠেকানোর উপায় খুঁজতে থাকা কেউ হন, তা হলে তিনি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক – এ আলাপে আমাদের কেউ নন। তার এজেন্ডা ও প্রসঙ্গও তাই আলাদা। ১৯২৩ সালে তুরস্ক থেকে ব্রিটিশদের হাতে তৈরি করা ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দের আড়ালে আরো কত কিছু যে আমাদের দেখতে হবে সেটি তাদের ব্যাপার। এভাবে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করতে থাকুন। কিন্তু আমরা তাদের সাথে একই নৌকায় নাই। উই আর নট ইন্টারেস্টেড! কারণ ওটা নষ্টা রাস্তা! এই সেকুলারিজম আমাদের রাস্তা নয়। এটি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক চিন্তারও কোন অংশ বা আত্মীয় কিছু নয়।
    আবার কলোনি জমিদার আমলে, যা আগেও বলেছি, যে এমনটাই জমিদার-হিন্দুর আকাঙ্খা ও বয়ান ছিল যাকে তার অলীক বাসনাও বলতে পারি। যে মুসলমানকে ‘বাঙালি’ বলে মনে করা হতো না, বাংলা ভাষাটা কেবল বাঙালি হিন্দুর ভাষা মনে করা হত। তাই এর শ্রীবৃদ্ধি ও বিকাশে যা বলার সেটাও বাঙালি হিন্দুরই একচেটিয়া মনে করা হত। এরাই এখন ‘হিন্দুত্ববাদের “হিন্দু সংহতি“র নামে আরএসএসের ছায়াতলে অঙ্গসংগঠন হয়ে আছে।

    আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’ হল মূল আসামীঃ
    বেড়ে চলা নানান ধরণের ইসলামিজম ও পশ্চিমের উপর তাদের জেনুইন অনাস্থার জন্য মূল দায়ী আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকার ‘হোম ল্যান্ড সিকিউরিটি’ নামে ডিপার্টমেন্ট খোলা (Nov 2002) এবং তার ইসলামবিদ্বেষী নীতির চর্চা করা। সচেতনে অথবা অচেতনে এই চর্চার ফলে যে মেসেজ তারা হাজির করেছিল তা হল, আমেরিকানরা কথিত সন্দেহভাজন “মুসলমান-মুক্ত” এক দুনিয়া গড়তে চায় আর সেখানেই বসবাস করতে চায়। অথচ এটি ছিল আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজ ভিত্তিমূলক বক্তব্য – নাগরিক বৈষম্যহীন রিপাবলিক ধারণার বিরোধী। আসলে এটাই ছিল ইভানজেলিক-খ্রীশ্চান বুশের শর্টকাট পথ।
    আর এর ফলাফলে ও পরিণতিতে ঠিক এরই উল্টো প্রতিক্রিয়াই হল – এরই নাম বেড়ে চলা নানা ধরনের ইসলামিজম। ইসলামিজম তাই স্বভাবতই আমেরিকাকে পাল্টা বলছে, তারাও এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করে যেখানে কেবল মুসলমানরা আছে। কাজেই বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার আগে উচিত আমেরিকা খোদ নিজ-নীতির দিকে তাকানো। বাইরে বাঘ খুজার আগে নিজ মনে যে বাঘের ভয় ও সীমাহীন ঘৃণা-বিদ্বেষ তাঁরা জন্ম দিয়েছিল এর পরিণতি তো এমনই হবার কথা!  সবার আগে নিজ ভুলগুলো তাদের বুঝতে হবে। বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার চেয়ে আমরা কামনা করব, আগে আমেরিকা নিজেই আত্মসমালোচনার যোগ্য হয়ে উঠুক। তবেই হয়ত তার চরম ইসলামবিদ্বেষ ভালো হয়ে যাক: তাহলেই তো হয়। কিন্তু সে কথা বলার মুরোদ কি অনেকেরই হবে? সন্দেহ আছে!

    ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপনের অভিযোগঃ
    ৯/১১ এ আলকায়েদা আমেরিকা-রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দুনিয়ার সব ধরণের রাষ্ট্রের উপরই কোন সশস্ত্র হামলার শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা সর্বোচ্চ শাস্তি।  লিগাল পয়েন্টে এই শাস্তি নিয়ে তর্কের কিছু নাই। কিন্তু সাবধান। আপনি যদি বলেন ঠিক আক্রমণকারী এখানে অপরাধী না।  ইসলাম এখানে অপরাধী? অর্থাৎ অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় তুলে আপনি প্রপাগান্ডা বিদ্বেষ তৈরির এক আসর চাইতেছেন। এবার আপনি তাহলে ইসলামবিদ্বেষ করলেন। অর্থাৎ আমেরিকান রাষ্ট্রের যা করা উচিত না, করণীয় ছিল না তাই করা হয়েছে এখানে।
    যেমন আলী রীয়াজ আরো লিখেছেন, “ইসলাম ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপন করে শাসনের হাতিয়ারে” পরিণত করেছে। সার কথায় তিনি বলতে চাচ্ছেন, “ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ” বলে ব্যবহার করা যাবে না। কেন যাবে না?  কোন কথিত সেকুলারিজম এটা না করতে চায়?  কিন্তু এ’ব্যাপারে আমাদের সবার পথ প্রদর্শক কি সাবেক মার্কিন  প্রেসিডেন্ট খোদ বুশ (জুনিয়র) নন? তিনি কি নাইন-ইলেভেনের দিনেই হামলার কয়েকঘন্টা পরে তাঁর প্রথম টেলিভিশনে হাজির হওয়ার বক্তব্যে আমাদের ইভানজেলিক খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডের হুমকি, আর আবার ক্রুসেড লড়ার হুমকি শোনাননি?  তাহলে ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ হিসাবে ব্যবহারের দায়ে  রিয়াজ ঠিক কাকে এ জন্য অভিযুক্ত করতে চান? আমরা জানি না। আগে রিয়াজের এটা আমাদেরকে জানানো উচিত!
    তবে এগুলো অবশ্যই এর বাইরের দিক। ভেতরের কথা হল, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকবে না – এটা বাস্তবত এক অলীক কল্পনা। অবশ্যই ধর্মতত্ত্ব (Theology) আর রাজনীতি আলাদা বিষয়। বিশেষ করে দুটোর ভাষাই তো আলাদা। এমনকি প্রেজেন্টেশন ও বলার স্টাইল এবং পূর্ব-অনুমানগুলোতে তারা একেবারেই আলাদা। কিন্তু আবার এমন ঘোরতর মিলও আছে যে আলাদা করাই মুশকিল। যেমন আপনি আজ বলছেন, ধরা যাক, আপনার পার্টির কোন এক রাজনৈতিক ‘রেজুলেশনের’ [resolution বা সিদ্ধান্ত প্রস্তাব] কথা। তাতে মনে হতে পারে, আপনি বিরাট জ্ঞানী রাজনীতিক রাজনীতির আলাপ করছেন। কিন্তু তলায় হাত দেন। পারবেন? মুরোদ থাকলে প্রশ্ন করেন এই ‘রেজুলেশন’ শব্দটি কই পাইলেন? এই শব্দটা শতভাগই এক ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ ও ধারণা যার অর্থ খ্রিশ্চীয় বছর শুরুর প্রথম দিনে খ্রিশ্চীয় মানুষ নতুন বছরে কী কী করবে বলে তাঁর গডের কাছে প্রতিজ্ঞা করে, এটাই তাঁর নতুন বছরের ‘রেজুলেশন’ বলে। ঐ দিন শেষে তাঁরা একে অপরের কাছে তার তার রেজুলেশন কী, জানতে চাইবে, ‘উইশ’ করবে ইত্যাদি। তাহলে এখন বলেন রেজুলেশন কী রাজনীতির না ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ?
    সারা দুনিয়াতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস বা এর চিহ্ন পাওয়া অনুসারে, এটা সর্বোচ্চ ছয় হাজার বছরের পুরানা মনে করা হয়। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি চিহ্ন পাওয়া যায় এই বিচারে তা তিন হাজার বছরের পুরানা। এই তিন হাজার বছরের প্রায় পুরাটা সময় কোন না কোন বা একটা না একটা “ধর্মতত্ব” তাঁর সাথে ছিল, মানুষকে সাথে নিয়ে যে পথ হেঁটে চলছে। আর এসবের বিপরীতে মাত্র দেড় হাজার বছর আগের এক নতুন ফেনোমেনা হল – দুনিয়াতে ধর্মতত্ব বা এর প্রভাব বলে কিছুই নাই, না চাইকি ধর্মতত্ব বলেই কিছু নাই এমন ধরে নেয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে দুনিয়ার সব ফেনোমেনাকে দেখার পদ্ধতির নাম হল বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির এনলাইটেনমেন্ট। অর্থাৎ সোজা বললে,  দুনিয়ার যেন সব ঘটনা-ফেনোমেনাই ফিজিক্যাল, এই অনুমান। মানে স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা বলে কিছুই নাই। আবার এর ফলাফল কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই খুবই ভাল। তা হওয়ারই কথা।  বিশেষত যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝবার ক্ষেত্রে এর উপর থিওলজির কোন প্রভাব নাই বলে এটা নাই তা ধরে নিতেই পারি। তাতে সুত্রে কোন হেরফের আসে না।  কিন্তু সাবধান যেখানে রক্তমাংসের মানুষের জীবন জড়িয়ে  আছে বা থাকে সেসব ক্ষেত্রে সেখানে বিজ্ঞান বা র‍্যাশনাল চিন্তার পদ্ধতি যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে না। এছাড়া থিওলজি এখনও তার মত করেই প্রভাব ফেলে থাকে।মানুষের চিন্তা বিষয়ক সব শব্দের আদিতে ধর্মতত্বের গর্ভ থেকে উতসারিত।

    তাই মূলকথাটা হল, মানুষের চিন্তায় বিশেষত যেসব শব্দ সে  ব্যবহার ও ধারণ করে এমন প্রতিটা শব্দের উতপত্তি ধর্মতত্বের হাতে ও ঘরে।  যদিও শব্দের উতস বা রূট ধর্মতত্বের তা হলেও সেসবের অর্থ অবশ্যই বদলে যেতে পারে, বদলে নিতেই পারি। secularize বা ধর্মতত্বীয় আগ্রহের বাইরের  সিভিল লাইভে ব্যবহার ধরণের এর অর্থ করে নিতেই পারি।
    দুনিয়াতে শব্দের অর্থের বিবর্তন হয়, নতুন অর্থে পুরনো শব্দের ব্যবহার দেখা যায় যদিও শব্দের রুট একই থাকে। যে ডিকশনারি শব্দের রূটের হদিস দিতে পারে না সেটা ভাল ডিকশনারি নয় বলে মানা হয়। অতএব, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির বন্ধন ও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তা হলে ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো পাকা দেয়াল তোলাও অসম্ভব। যদিও আবার বলছি ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির ভাষ্য ও প্রেজেন্টেশন আলাদা, বলার ঢঙ, গদ্যরূপ আলাদা; উদ্দেশ্যও আলাদা। সেটাও মেনে চলা উচিত।

    অতএব সাবধান। বুঝহ সুজন! আর মূলকথা, অমন সেকুলারিজমকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেও আমাদের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ

    ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
    প্রথম পর্ব

    গৌতম দাস

    ২৫ মার্চ ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3n4

    সাতচল্লিশের দেশভাগ মানে যখন নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল আর সেকথার সোজা মানে হল এমন রাষ্ট্রজন্ম হওয়াতে বৃটিশ জমিদারি ব্যবস্থাটাই উচ্ছেদ হয়ে যায়।  আর এথেকেই সারা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রজারা জমির ভোগদখল (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) লাভ করে। ফলে বাস্তবত পুর্ববঙ্গ আলাদা নিজেই (এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ অর্থে)  এক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে আগের জমিদারদের হাতে জমিদারী থাকার কাগজপত্র থেকে গেলেও কার্যত তারা সব জমিই হারিয়ে ফেলেছিল। মূল কারণ, এবার  জমিদারেরা আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেউ নয়। মুসলীম লীগ এর ক্ষমতায়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই এটা জমিদারী-উচ্ছেদের এক বিপ্লব ছিল।  যদিও আইনিভাবে এই জমিদারি উচ্ছেদ হয় পরে ১৯৫১ সালের ১৬ মে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950 এই আইনে, পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে তা পাশ হওয়াতে। সবচেয়ে মনে রাখার মত ঘটনাটা হল এই বিপ্লব ঘটেছিল তথাকথিত কোন কমিউনিস্ট পার্টির হাতে নয়। বরং যাকে প্রগতিবাদীরা উঠতে বসতে “সাম্প্রদায়িক দল বলে গালাগালি করে”, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল বলে নিন্দা ও তুচ্ছ করে  সেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। তবে মুল কথা আজকের বাংলাদেশের সারা ভুখন্ডের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে (ততকালীন প্রজারা যারা আমাদের দাদা নানা বা পুর্বপুরুষ) জমির মালিক হয়েছিল যারা যে যেই জমি প্রজা হিসাবে চাষাবাদ করত সেই জমির খাজনা নতুন পাকিস্তান সরকারকে পরিশোধ করা সাপেক্ষে সেই সেই জমির মালিক এবং ভোগ-দখল ও উত্তরাধিকারিকে হস্তান্তরকারি মালিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঐ ১৯৫১ সালের আইন এখন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ গণ্য করা হয়।

    কিন্তু বিরাট ট্রাজেডিটা হল, এভাবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জমি পেয়েছিল কিন্তু কেউ অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি, গ্রুপ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম যে সঠিক হয়েছিল অন্তত জমিদারি উচ্ছেদের ফলে যে তারা বাসিন্দারা জমির মালিক হয়েছিল এই কারণে অথবা, এই কৃষি-বিপ্লবের তাতপর্যকে স্মরণ করে – এমন সাফাই-বয়ানের ভিত্তিতে কোন ইতিহাস, কেউ লেখে নাই। স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রচনা করে নাই। এর বদলে স্কুলে পড়ানো হয়েছে প্রগতিশীলতা, জমিদারদের বয়ানে লেখা  ইতিহাস ইত্যাদির যা কলকাতায় পড়ানো হত সেই ইতিহাস বই। 

    উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ;  মানে কলোনি ‘বৃটিশ-ইন্ডিয়া’ ত্যাগ করে চলে যাবার সময় বৃটিশ শাসকদের এই কলোনিকে ভারত ও পাকিস্তান এ’দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এঘটনাই সাধারণ্যের মুখের ভাষায় ‘দেশভাগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের জর্মানের পক্ষশক্তি,  কিন্তু যুদ্ধে তারা উভয়ে (সাথে মুসোলিনি-সহ)) মিলে হয় পরাজিত শক্তি। আর ঐ  পরাজয়ের পর জাপানের ফাইনাল সারেন্ডারের দিন ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫। তাই এঘটনার সাথে মিল রেখে, এর দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭, এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস বা ক্ষমতা হস্তান্তর দিবস হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।

    দেশভাগ কী খারাপ কাজ, নেতি ঘটনাঃ
    দেশভাগ মানে সেটা একদিক থেকে বিচারে বৃটিশ “ভাইসরয়” এর ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাওয়াও বটে। ইংরাজিতে ব্যবহৃত Viceroy বা Vice-roy শব্দটা ফরাসি “vice-king” থেকে এসেছে। কিন্তু ভাইস-রয় আমাদের প্রেক্ষিতে অর্থ কি?
    ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম প্রায় একশ বছর (১৭৫৭-১৮৫৮) আমরা ছিলাম “বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির” দখল-শাসনে। আর পরে ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট, থেকে ঐ দখল-শাসন শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৃটিশ রাজসরকারের শাসনের অধীনে চলে যায়। শেষের সেই শাসন ছিল আরও প্রায় নব্বই বছরের, ১৯৪৭ এর আগষ্ট পর্যন্ত। আর ঐ বৃটিশ-শাসকপক্ষের সর্বোচ্চপদ বা রাজা/রানীর মুখ্য প্রতিনিধির পদকে বলা হত “ভাইসরয়”। কথাটা আসলে ভাইস-রয় (রয়েল শব্দকে ছোট করে নেয়া অংশ হল ‘রয়’ সম্ভবত সেজন্য; অথবা অনেকে মনে করেন ফরাসি ভাষায় আরওআই (roi) – এই ‘রয়’ মানে রাজা;  সেখান থেকে) অথবা বাংলা করে বললে, ভাইসরয় মানে রাজা/রানীর প্রতিনিধি। ভারতের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটন। তিনি চেয়েছিলেন নতুন দুই স্বাধীনদেশেরই ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। তাই একই দিনে অনুষ্ঠান না করে একদিন আগে ১৪ আগষ্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয়েছিল। আর পরদিন ১৫ আগষ্ট ভারতে তা করা হয়েছিল।
    এরপর ভারত ও পাকিস্তান নামে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দুইদেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকেও প্রচলিত জনপ্রিয় ডাকনাম হিসাবে ‘দেশভাগ’ বলে ডাকার চল শুরুও হয়। অনেক সময় একাদেমিকভাষাতেও “দেশভাগ’ শব্দটা ব্যবহার হতে দেখা যায়। যদিও এর সাথে এক অনুষঙ্গ অনুমানও থাকতে দেখা যায়।  অল্পকিছু  ব্যতিক্রমে সেই অনুমানটা হল, “দেশভাগ” জিনিষটা একটা খুবই নেগেটিভ ঘটনা বা খারাপ কাজ। মানে দেশভাগ শব্দ ব্যবহারকারি বক্তা যেন বলতে চান যে দেশভাগ হওয়াটা ভাল হয় নাই, না হলে ভাল হত। ফলে যাদের কারণে দেশভাগ হয়েছে তারা যেন খারাপ লোক। এদিকটা আমরা এখানে পরখ করে দেখব আসলে তা  সত্য কিনা বা কতটা সত্য।

    কিন্তু দেশভাগ ঘটনাটা কেন ঘটল আর ঘটনাটা খারাপ বা নেতিনাচক ঘটনা কিনা সে আলাপে একটু পরে যাব। এর আগে, দেশভাগ খারাপ – একথার মানে কী? এটা বলে ঠিক কী বুঝাতে চায়? ব্যাপারটা কী এরকম যে এই দেশভাগ কেউ চায় নাই, চাওয়ার পক্ষে কেউ ছিল না, এমন? কিন্তু না, এটা তো হতেই পারে না!  কারণ চাহানেওয়ালা পক্ষ কেউ যদি নাই থাকে তবে দেশভাগ বা বৃটিশ-ইন্ডিয়া ভাগ হল কেন? তাই ভাগ যেহেতু হয়েছে অতএব চেয়েছে এমন জনগোষ্ঠিও অবশ্যই ছিল এবং তারা উপেক্ষিত হবার মত অল্প জনসংখ্যার তা মনে হবারও কোন কারণই নাই। তাহলে এরা কারা? এখান থেকেই আমরা কথা শুরু করব।

    কথাটা উলটা করে বললে, কারা মনে করেন দেশভাগ ইতিবাচক এবং কী নির্ণায়ক-বৈশিষ্ট দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা বা চিনা যাবে? অনেকের মনে অনুমান হতে পারে অন্তত যারা নবগঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন নিশ্চয় তারা সকলে দেশভাগ হওয়াকে সঠিক ও আপন ভাবতেন! না খুবই সরি। এই অনুমানও ভিত্তিহীন, অন্তত পুরা না আংশিক সত্য। যদিও একেবারে জন্মের পরপরই পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে দেশভাগ আপন ঘটনা ছিল অবশ্যই। তবে, এটা পুর্ব পাকিস্তানে যতটা না পশ্চিম পাকিস্তানে তার চেয়ে শতগুণই  আপন মনে করা হয়েছিল।  পশ্চিম পাকিস্তানের যারা বাসিন্দা হলেন তারা ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হওয়াটাকে নিজেদের জন্য একটা বড় অর্জন বলে মনে করে এসেছে, এখনও করে। যে কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাইরে যারা আমরা, এই আমরা যাই মনে করি না কেন ঐ পাকিস্তানের ভিতরে সর্বত্র আজও তাদের পাকিস্তান রাষ্ট্রলাভের প্রতীক হয়ে আছেন জিন্নাহ। এবং তা অবিতর্কিত “জাতির পিতা” পরিচয়ে; তিনি পাকিস্তানের সকল দলের রাজনীতিতে ও দলের কাছে এক অবিতর্কিত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পুর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপারটা একবারেই ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে ধাপে ধাপে আসছি।

    পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের জমির মালিকানা ধরণ একেবারেই ভিন্ন ছিলঃ
    এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। পুর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশভাগ ব্যাপারটা নিয়ে অনুভব-অনুভুতির প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেও একটা বড় ভিন্নতা ছিল। যে ভিন্নতার মূল কারণ হল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থার দিক থেকে পুব ও পশ্চিমের অবস্থা একই ছিল না। দুশ বছরের বৃটিশ শাসনামল জুড়েই পুর্ববঙ্গ (মানে আসলে এখনকার পশ্চিমবঙ্গসহ সারা-বঙ্গও) ছিল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা্র দিক থেকে বৃটিশ শাসনের প্রবর্তিত “জমিদারি” মালিকানা ব্যবস্থা । যার আবার  বেশিরভাগ জমিদার মালিকেরা ছিল হিন্দু। মানে মুসলমান জমিদার কিছু ছিল বটে;  কিন্তু সেটা যেন ব্যতিক্রম। যেমন এভাবে বলা যায় জমিদারদের নিজেদের ‘কমন স্বার্থ’ কী হবে তা নির্ধারণে মুসলমান জমিদারদের কখনও কোন ভুমিকা বা বক্তব্য ছিল এমন জানা যায় না। আর এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুমি মালিকানা ব্যবস্থাটা ছিল ট্রাডিশনাল;  যেটা মোগল আমল থেকে চলে আসছিল। যেটার মূল বৈশিষ্ট হল,  মোগল শাসক অথবা তার প্রতিনিধিকে আপন  ভোগদখলে থাকা জমির খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আপনিই জমির মালিক। আর মালিক বলতে, খাজনাদাতার নামেই জমির টাইটেল জারি হত। তাতে কোথাও কোথাও বিশাল বিশাল জোতদার যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘জাঠ’ এথনিক গোষ্ঠি বলা হয়, এদের দখলি জমির পরিমাণ আকাশ ছোয়া। যেমন পাকিস্তানের ৬৪% জমি ৫% জোতদারের মালিকানায়, এমন ইউটিউব বর্ণনা দেখতে পারেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম জমির সিলিং [ceiling, জমির মালিকানা থাকার পরিমাণ]  বেধে দেয়া হয়েছিল। আয়ুবের হাত ধরে ১৯৫৯ সালে সেখানে আরোপিত সিলিং দেয়া হয়েছিল সেচ সুবিধার জমির বেলায় ৫০০ একর আর না থাকলে ১০০০ একর পর্যন্ত জমির মালিকানা বৈধ। এর মানে এই সিলিং আরোপের আগে কেমন জোতদারি ছিল তা অনুমেয়। সারকথায় জমির মালিকানার প্রশ্নে  এসবই ছিল পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক। তবে জমিদারি ব্যবস্থা থাকা আর না থাকা ছিল এক বড় রাজনৈতিক ফারাকের কারণ। তবে আমাদের এখানকার আলোচনার জন্য মুল কথা পুর্ব পাকিস্তানে জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থা।

    কাদের কাছে দেশভাগ কাম্য ছিলঃ
    আমরা কথা বলছিলাম, দেশভাগকে ইতিবাচক বা কাম্য – এভাবে দেখার লোক কারা ছিল তা নিয়ে। সারা ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দু জনসংখ্যা সেকালে সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। যেমন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পর্যন্ত সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫%।  তাই সব মিলিয়ে এসবের কারণে বৃটিশ আমলে – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকি কেবল পুর্ববঙ্গকে বিচারে নিলে হিসাবে মুসলমানেরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলেও এখানেও সেই একই – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পুর্ববঙ্গেও বজায় ছিল। এর পিছনের আরও কারণ  – যেভাবে বৃটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্থান ঘটেছিল, সেদিকে তাকাতে হবে।

    তত্বগত কথা হল,আধুনিককালের যেকোন রাজধানী মানেই যেখানে তুলনায় তা অন্যান্য প্রদেশ বা জেলাগুলো রাজধানীর চেয়ে অবকাঠামোর দিক থেকে হয় কম উন্নত বা পিছিয়ে পড়া। তাই পিছিয়ে পড়া এলাকার রাজধানীমুখি হওয়া খুবই কমন ঝোঁক। গ্রামে জমি থেকে উতখাত হওয়া লোকেরা রাজধানীতে কাজ-পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা নিতে ও ভাগ্য-অন্বেষণে রাজধানীতেই এসে ভীড় করে থাকে। ফলাফলে রাজধানী এক নতুন ধরণের মিশ্র জনগোষ্ঠির নতুন (আধুনিক) ভাষা্র শহর হয়ে উঠে। কিন্তু কলকাতা সেদিক থেকে বেশ ব্য্যতিক্রম। কলকাতা বৃটিশ সংস্পর্শে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা প্রথম প্রহরের ঘটনা এমন রাজধানী কলকাতা বলে সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আবার এর বাইরে আরেক দিক হল, কলিকাতার সাথে বাকি ভারত তো বটেই এমনকি বাকি বঙ্গের সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও অবিকশিত। এমনটা বজায় থাকার কারণে কেবল মূলত স্থানীয় বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসক শ্রেণীই এখানে রাজধানীতে প্রভাব-আধিপত্য জমিয়ে বসার সুযোগটা নিয়েছিল। কিন্তু এরাই বা কারা?

    সারা বাংলা সমাজের প্রধান উতপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষিকাজ আর পরে (১৭৯৩ থেকে) ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা জমিদারি বলে, জমিদার হিন্দুরাই বৃটিশ-কলোনি ক্ষমতার কোলে বসে ও ঔরসে কলকাতার শাসক শ্রেণী হয়েছিল। আর সেখান থেকেই কলকাতা মানে তা হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায় ভারত মানে সবসময় বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথার [cast system] শাসনটাই যেন আবার “জমিদার হিন্দু” এই নতুন নামে ও জমিদার-প্রজা সম্পর্কের ঢংয়ে চেপে বসেছিল। যদিও আবার এর ভিতরেও আরেক ভাগাভাগি বজায় থাকতে দেখা যেত। প্রজা বলতে সারা বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধরণেরই প্রজা থাকলেও তাঁদের মধ্যে আরেক বড় ভাগাভাগি ছিল। সেটা কেমন বা কেন?

    প্রজাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকলেও হিন্দু প্রজারা জমিদার হিন্দুদের সাথে ‘কালচারাল নৈকট্য’ অনুভব করত। মানে জমিদারদের কালচারাল হেজিমনি বা আধিপত্য আছে তা হিন্দু-প্রজাদেরও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে অনুভব করত। ফলে তাদেরও মুসলমান প্রজাদের উপর (অর্থনৈতিক স্টাটাসে সমগোত্রীয় হলেও) আধিপত্য আছে –  জমিদারদের এই কালচারাল ক্ষমতার শেয়ার হোল্ডার তাঁরাও এবং তাঁরা সম্বন্ধযুক্ত বলে অনুভব করত। তারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় উপরের বলে স্থান ও বিবেচনা নিজেরা মনে করত এবং তা দাবি ও চর্চা করত। জমিদারের বৈঠকখানায় আগত হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজাদের তুলনায় আলাদা ভাল ট্রিটমেন্ট পেত বলে এমন অনুভবের পিছনে এটা একটা কারণ মনে করা যায়। যেমন মুলমান-প্রজাদের মাটিতে বসানোর বন্দোবস্তের বদলে হিন্দুপ্রজাদের আলাদা শতরঞ্জিপাতা আসন, মুসলমান প্রজাদের দেয়া সস্তা নারকেলের মালার হুকার বদলে পিতলের হুকা,ভাল তামাক ইত্যাদি পেত। অর্থাৎ জাতপ্রথার প্রবল বলবত থাকার প্রভাব ও অজুহাতে মুসলমান প্রজাদের সামাজিক মর্যাদা-অবস্থান হিন্দু নমশুদ্র বা চর্মকারেরও চেয়েও অন্তত আরেক ধাপ নিচে বিবেচনা করা হত।
    আর এভাবেই কেবল জমিদার হিন্দুর দাপট ও পরিচয়ে সে একমাত্র শাসক ও শ্রেণীর আধিপত্য, এই ধারণা বলবত রেখেছিল। যদিও   কলকাতার জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মূল ইংরাজি বই “Bengal Divided” [Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947] , যার অনুবাদ বইয়ের নাম  “বাঙলা ভাগ হল”,সেখানে এদেরকেই “বাংলার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ বা এলিট” বলে তিনি চিনিয়েছেন। এপ্রসঙ্গে লেখা আমার ক্রিটিক এখানে পাবেন।

    কেন কলকাতা ব্যতিক্রম কী অর্থেঃ
    কিন্তু কেন কলকাতা ব্যতিক্রম হতে পেরেছিল? এর আরেকটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এখানে জমিদার হিন্দু যাদেরে বলছি ইংরাজী [race] রেস এবং [ethnic] এথনিক এই দুই অর্থেই জাতি বুঝলে এই জমিদার এরা কোন ‘জাতি’? এর জবাব হল, জমিদারি ব্যবস্থা চালু হওয়াতে যে শাসক-ক্ষমতা সে ক্ষমতার বলে এরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে এক নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছিল ও পরিচয় দিত। কথাটাকে ‘তারা বাঙালি ছিল’ এতটুকু না বলে, এভাবে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলার কারণ আছে। পুব-পশ্চিম বঙ্গ এবং এই সারা ভুখন্ডের হিন্দু ও মুসলমান মিলে যে সারা বঙ্গ অঞ্চল, তারা সকলে মিলেই যে ‘বাঙালি রেস’, সারা দুনিয়া বাঙালি বলতে এদেরকেই চিনে, তাই একথাটাতে অস্বীকার করার কিছু নাই। তাই তো হবারই কথা।

    কিন্তু কলোনি-ক্ষমতা্র ঔরসে উত্থিত কলকাতা, জমিদারের কলকাতা সেটা মেনে উত্থিত হয় নাই। প্রথমত,আগেই বলেছি কলকাতা – সমাজের ক্লাসিক্যাল ডেভেলবমেন্ট যেমন কোন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও পরিণতির অর্থে যেমন বলা হয় – ‘একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা সারপ্লাস যেখানে সঞ্চিত হয় এমন নদীতীরের কোন গঞ্জ বা শহর অর্থে কলকাতা কোন শহর নয়, ছিল না। যে অর্থে কলকাতা কলোনি প্রভাব ও সংস্পর্শের বাইরে গড়ে উঠা অর্থে ভারতেরই কোন শহর নয়। যেমন মোগল আমলেই  মানে প্রাচীন ভারত কলোনি মাস্টারের হাতে পড়বার আগেই – হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি বড় মোগল শহর হিসাবে হাজির ছিল। কিন্তু কলকাতা তা ছিল না। মানে  কোন কলোনিদখলকারির ছোঁয়া লাগার ছাড়াই, সুনির্দিষ্ট করে বৃটিশেরা ভারতদখলের আগে থেকেই ভারতে অনেক বড় শহরের জন্ম হয়ে গেলেও কলকাতা সে তালিকার কেউ নয় বা তালিকায় ছিল না। তাই হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি মোগল আমলেই বড় শহর, এগুলোকেই স্বাভাবিক পরিণতির শহর বলছি। আর বিপরীতে  কলকাতা এসবের বাইরে ছিল বৃটিশের হাতে গড়ে উঠা শহর। অর্থাৎ যেমন আফ্রিকায় কলোনিদখলের ফেনোমেনা। ওখানে কলোনিদখলের আগে আফ্রিকায় নিজ শহর বলতে যা বুঝায় এমন কিছু কোন আফ্রিকান দেশে ছিল না। বরং প্রায় সবদেশের বেলায় তারা কলোনি মাস্টারের হাত ধরে আফ্রিকানেরা প্রথম শহর কি তা  গড়েছিল ও চিনেছিল। আমাদের কলকাতার বেলায় তার অনেকটাই সত্য।

    এই সুবিধাটাই কলকাতার জমিদার হিন্দুরা নিয়েছিল। এই শহরের স্থানীয় শাসক শ্রেণী হিসাবে নতুন উত্থিতরা হল এই জমিদারেরা । যেটাকে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের (জমিদারি আইন ) ফলাফল বলা যায়। এছাড়াও এতে দুটা জিনিষ এই জমিদার হিন্দুরা নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল। তা হল, একটা হিন্দুস্বার্থের চোখে কারা বাঙালি? আর কারা নয়? আর বাংলা ভাষা কোনটা বলতে কোনটা বুঝাবে? এদুটাই তারা একক হাতে ও সংকীর্ণ স্বার্থের চোখে  নির্ধারণ করে নিয়েছিল।

    না একথা বলা বাতুলতা হবে যে বৃটিশেরা আসার আগে অতীতে বাংলার কোন কোণে ভাষা কী কী কতদুর বিকশিত হয়েছিল সেটা কেমন, আর্কিলজি বা প্রাচীন ইতিহাসে কী পাওয়া গেছে অথবা চাই কী চর্যাপদ কী ইত্যাদি। না, আমি এসবের কথা  এখানে তুলছি না, তোলা হচ্ছে না। বরং আগেই বলেছি জমিদার হিন্দু শাসকেরা এরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার আগে বাংলায় কি ছিল সেটা যাই থাক সেটা এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আসলে তাদের কলকাতায় তাঁরা মূলত বাঙালি কারা এর এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল, তাতে বৃটিশেরা আসার আগে আমরা কী, কেমন ছিলাম বলে যে যাই বুঝি না কেন। আর এখান থেকে জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে নির্ধারিত ও নির্মাণ হয়েছিল এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা যে, বাঙালি কারা, বাংলাভাষা কোনটা। আর এদেরই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল –  “মুসলমানেরা বাঙালিই নয়”। এটাই কলোনি-কলকাতার বাঙালির সংজ্ঞার মৌলিক দিক। আর সংস্কৃত ঘেঁষা করে আর সংস্কৃত-ব্যকরণ-সম্মত করে (সাথে ইংরেজ পাদ্রী ধর্মপ্ররচারকদের স্বার্থে ও তাদের হাতে) যে বাংলা গদ্যভাষা খাঁড়া করা হয়েছিল তা নিয়ে এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আপত্তি ছিল।

    —–“মুসলমানেরা বাঙালিই নয়” – কথাটা কী সত্য? —-

    আধুনিক শব্দটা অদ্ভুত, এটা সবচেয়ে ভাল অপ-ব্যবহার হয় কাউকে আধুনিক নয় বলে দাবি করে খালি একবার কোন ফতোয়া দিয়ে দেয়া। এরপর অতএব সে নিশ্চয় “পশ্চাতপদ” [মুসলমানেরা পশ্চাতপদ], এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি করা যাতে বিপরীতে, বক্তা নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে প্রমাণ করতে ও তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে যায়। এসব বদ-মতলবের বাইরে বর্ণনা অর্থে “আধুনিক ভাষা” বলে একটা ধারণা-শব্দ ব্যবহার করব। বলাই বাহুল্য এটা রেনেসাঁর পরিণতি অর্থে যে আধুনিক ধারণা,  সে অর্থেও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

    আইডিয়েল [ideal] চোখে যখন আমাদের ভুখন্ডের সকল অংশের, সকল জেলা বা অঞ্চলের প্রতিনিধি সকলকে রাজধানিতে হাজির রেখে কমবেশি সকলের প্রভাব ও মিশ্রণে একটা ভাষা উত্থিত করার চেষ্টা করা হয় সেটাকে আধুনিক বাংলা ভাষা। তবে এর সাথে  আরেকটা বড় ফ্যাক্টর অর্থনৈতিক বিকাশ; মানে  কিভাবে ও তখন পর্যন্ত কতদুর সেটা বিকশিত ছিল বা হবার সুযগ ছিল – সেটাই। যে অর্থে শহর বা নগর মানে  হাঁটুরে গঞ্জের চেয়েও উপরে আরো বড় ‘গঞ্জ’ মানে accumulation of Capital  বা উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের কেন্দ্র যেটা বা যেখানে এটা ঘটে বা হয়ে উঠে সেটাই শহর বা নগর। এটাই বুর্জোয়া [bourgeois] সিভিল সোসাইটি জন্মাবার বৈষয়িক পুর্বশর্ত। (বুর্জোয়া শব্দটা এখানে গালি বা নেতিবাচক অর্থ করা ভুল হবে।) যা এরপর নগর রাষ্ট্র, রিপাবলিক ইত্যাদির হওয়ার দিকে রওনা দিতে পারে যদি না তা বিদেশি কলোনিদখলদারদের হস্তক্ষেপের খপ্পরে না পড়ে।
    এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এই পিঙ্ক কালারে লেখা অংশটা এটা আমিই বাক্য সাজিয়ে লিখেছে অবশ্যই।  কিন্তু এর আইডিয়াটা আমি পেয়েছি আমার – কার্ল মার্কসের জার্মান ভাবাদর্শ (পার্ট ওয়ান) – পাঠ থেকে। অর্থাৎ পাঠ ও এখানে উপস্থাপন এর সব দায় আমার কিন্তু মূল আইডিয়াটা অবশ্যই ওস্তাদের। যার কাছে যা নিয়েছি সে ঋণ আগে স্বীকার করে নেয়া ভাল। কেউ আমার একথায় একমত না হলে ক্ষতি নাই, আমি আমারটা স্বীকার করে রাখলাম।  আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের চোখে ও বিচারে – ‘শহর বা নগর’ মানে আসলে কী তা বুঝবার ক্ষেত্রে এটা মার্কসের দুর্দান্ত অবদান, বেস্ট জায়গা হচ্ছে এটা। 

    তবে এখানে আলোচনায় এটাকে আধুনিক বলার সুত্র এটাই যে সারা বাংলাদেশের সব জেলা অঞ্চলকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে বসবাস শুরু করানোটা চাট্টিখানি কথা নয় যে এটা চাইলেই করা যায় এমন নয়। যেমন এখনকার ঢাকাকে বলা যায় তুলনামূলক পারফেক্ট রাজধানী। কারণ অন্তত ১৯৮২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের (উপজেলা) সাথেই এর যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই ভাল বলে সব অঞ্চলের লোক এখন ঢাকায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় একাদেমিক ও কালচারাল পাড়াগুলোর অলিগলি পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে লোকেদের একসেস বা যাতাযাত আছে; পৌছাতে পারে। ফলে সব আঞ্চলিক ভাষারই ঢাকায় প্রবেশ ও পৌছানো এখন অনেক সহজ। ফলে ঢাকায় বাংলা ভাষা বলে যেটা ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে তাকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভাষার হাতের কাছে আছে। এখন যেকোন অঞ্চলের ভাষার বা কোন একটা অঞ্চলের শব্দে এর ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা যত প্রবল  বা তা যত ‘কমিউনিকেটিং’ (এক্সপ্রেসিভ অর্থে) সেই ভাষা বা শব্দ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে তত বেশী। অন্য সকলে  সেই ভিন-আঞ্চলিক শব্দও এখানে আপন করে নিবার সম্ভাবনা তত বেশি। এমন এই আদর্শ সুযোগটা ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশে ছিলই না। এরপর ইকোনমিক বা কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে আস্তে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে আজ  এই জায়গায় এসেছে। এখানে একালের ঢাকার প্রসঙ্গ আনলাম তুলনা করে জমিদার আমলের একেবারে শুরুর দিকের কলকাতাকে পরিচয় পরিয়ে দিবার জন্য।

    যেমন এখন বলব,  আর ঠিক এর উল্টাটা ঘটেছিল কলকাতায় মোটাদাগে সেই ১৮০০ সালের আশেপাশের সময় থেকেই। সেসময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পুরাটাই যেন এমন প্রিমিটিভ স্তরে ছিল যে ফলে অব্যবস্থার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জমিদার হিন্দু শ্রেণী যাকে ইচ্ছা তাকে বাঙালি বলা থেকে বাদ দিয়েছে, মুসলমানেরা বাঙালি নয় বলতে পেরেছিল আর বাঙালি জাত ও ভাষা যেকোনটাকে তা জমিদারের নিজের একক ইচ্ছা ও খেয়ালে হস্তক্ষেপ ও নির্ধারণ করে নিতে পেরেছিল।

    সারকথায় যার পরিণতিতে, এটাকে আমরা বলতে পারি বাংলার সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশকে শাসক জমিদার-হিন্দু “মুসলমানেরা বাঙালি নয়” বলে তাদেরকে জমিদার-হিন্দুর মার্জিনালাইড প্রজা [যার অবস্থান হিন্দু-প্রজারও নিচে] মাত্র করে (চাপানো ব্যাখ্যায়) ফেলে রাখার সুযোগ নিয়েছিল।

    মানুষের রেস (race বা জাতি) পরিচয় বিষয়টা ডিএনএ সংশ্লিষ্ট যাকে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের সম্পর্ক বলি’ সেই সম্পর্কিত ও জাত। তুলনায় ধর্মীয় পরিচয় যেটা এথনলজিক্যাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে যুগ যুগে তৈরি ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়। কারোরই রেসিয়াল পরিচয় কেউ বদলানো যায় না পারে না, তবে তুলনায় ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়গুলোর খুবই স্বল্প কিছু অংশ বদলে যেতে পারে। কাজেই (রেসিয়াল ও এথনিক) জাত পরিচয়ে যে বাঙালি সে আবার মুসলমান ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের কারণে রেসিয়াল বাঙালি থেকেও মুসলমান মানে বাঙালি-মুসলমান অবশ্যই হতে পারে। অবিভক্ত বাংলায় এর পুরা বাঙালি জনগোষ্ঠির এই অর্ধেক  ছিল মুসলমান-বাঙালি আর আবার পুর্ব বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। অথচ এদেরই কোনঠাসা করতে ও আধিপত্যের ছড়ি ঘুরাতে ও দাবিয়ে রাখতে, জমিদার-হিন্দুরা তাদেরকে বাঙালি রেসের (race) অংশ মানতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু কী এসে যায় যেখানে কোন রেস পরিচয় যা আসলে মূলত বদলানো বা অস্বীকারেরই অযোগ্য! সেই জবাব তারা জমিদার হিন্দু বা এইচিন্তার উত্তরসুরিদের পরবর্তিতে দিয়েছিল। পুর্ববঙ্গ বা একালে বাংলাদেশে এরাই ১৯৭১ এক সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই মুসলমানেরা  নিজেদের “বাঙালি” এবং একই সাথে মুসলমান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, ব্যাপকভাবে নাড়া ফেলে দিয়ে। কারণ মা আর সন্তানের প্রথম কথোপকথন কোন ভাষায় শুরু হবে সেটা যেমন বদলানো যায় না – সেটা জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়েই থাকে – এটা তেমনই, বদলানো যায় না। কলোনি-জমিদার আমল থেকেই মুসলমানদেরকে বাঙালি বলতে অস্বীকৃতি যতটা তীব্র হয়েছিল ১৯৭১ সালে এটাই ততোধিক বেগে – মুসলমানেরাই সেই প্রকৃত বাঙালি যারা ভাষার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে তা প্রমাণ করে ছেড়েছিল। ফলে তারা রেসিয়াল ও এথনোলজিক্যালি বাঙালি কীনা এই স্বীকৃতি কারও থেকে চায় না্‌ কারও থেকে নিবার দরকার ফুরিয়ে গেছিল। তা রক্ত দিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল।

    কিন্তু তবু, একালে আরএসএসের উত্থান, গায়ের জোর খাটিয়ে সব ইচ্ছামত করে ফেলবে এমন এক জবরদস্তির হিন্দুত্বের বা হিন্দুত্ববাদের নয়া উত্থানের যুগ। তেমনই সময়কালে এবছর ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মশতবার্ষিকী। তাই নিচে এদিকে ‘হিন্দু সংহতি’ বলে আরএসএসের এক অঙ্গসংগঠন এর ততপরতাকে দেখেন, উপরে বলা আমার কথাগুলোর মিল পাবেন।  যারা গত অন্তত চার বছর ধরে প্রকাশ্যে জনসভা করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাম ধরে উস্কানি তৈরি করে চলেছে। ফেসবুক পেজে তাঁদের ভারচুয়াল উপস্থিতি দিয়ে তারা এবার সেপ্টেম্বরের ২০২০ এর শেষে বাংলাদেশিদের কাছে পৌছে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল। তাঁদের শ্লোগান ও বক্তব্য ছিল এমন যেন তা সেই কলোনিযুগে জমিদার হিন্দুর বয়ানেরই পুনঃআবির্ভাব। বক্তব্য গুলো এমনঃ
    ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হ‌ওয়ার পরে এই পশ্চিমবঙ্গ হল বাঙ্গালী হিন্দুর ন্যাচারাল হোমল্যান্ড। অর্থাৎ এই মাটির মালিক হল হিন্দু বাঙ্গালীরা। তাই পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সম্পদের উপরে অধিকার সর্বপ্রথমে হিন্দু বাঙ্গালীর। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হিন্দু বাঙ্গালীর”।
    “বাংলাদেশী ভাষা পৃথক করো, সনাতনী বাংলা রক্ষা করো।
    বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়?”

                                                                                         হিন্দু সংহতি ফেসবুক

    আরএসএস-এর  অঙ্গসংগঠন “হিন্দু সংহতি”  নামে এই সামাজিক সংগঠন, উপরে এই সংগঠনেরই ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে। তাদের এসব কথার জবাব একটাই, যে পুর্ববঙ্গ বা একালে মুসলমান অধ্যুসিত বাংলাদেশ একে,  কলকাতার জমিদার হিন্দুরা কোন কালেই তারাও “বাঙালি” এই স্বীকৃতি দেয় নাই; আমরা তা চাইও না, অপেক্ষাও করে নাই। বরং আমরা তাদের কেয়ার করি নাই কখনও, এখনও করি না। আমরাই আমাদের রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে যে বাংলাদেশ নিজেই এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা তো বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এর থেকে বাইরে এবং তাদের চোখে অছ্যুত (untouchable)। আর আমরাও কী কলকাতার স্বীকৃতি কখনই চেয়েছি? বরং আমরা নিজেই প্রজা-বাঙালির বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছি। [যদিও শাহবাগের কিছু  কবি-সাহিত্যিক এখনও প্রবল আছে এরা নিজেদের লেখা কবিতা বা সাহিত্য হয়েছে কিনা তা নিজেরা নিজেকে মুল্যায়ন করতেও অক্ষম তাই উত্থানরহিত। এদের অযোগ্যতা ক্ষমাহীন যখন দেখি এরা কলকাতার পদতলে নিজেদের সঁপে দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে চায় যে তাদের সাহিত্য হয়েছে কিনা; এরা এমনই সেলফ-লেস বা মর্যাদা বোধহীন স্টুপিড।] অতএব বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে আরএসএস এর কোন প্রকল্প যা আছে আমরা একে কেয়ার করি না, পাত্তা দেই না। বরং পরামর্শ থাকবে দূরে থাকেন। দাদাগিরি করতে এসেন না। চাইলে হিন্দুগিরি করেন কিন্তু কেবল কলকাতার ভিতরে সীমাবদ্ধ থেকে, যদি কলকাতার তা সহ্য হয়। এদিকে আমরা নিজেকে নিয়ে খুবই ভাল আছি। পুর্ববঙ্গকে মর্ডানিটি শিখাতে এসেন – এটা আপনাদের কাজ বা আপনারা এই যোগ্যতা নিজের জন্য রেখে দেন, প্লিজ। আর ভারতীয় হিসাবে  কলকাতার সমস্ত দায় এবং আবর্জনা সবই তো কলকাতারই! আমাদের তাতে ভাগীদারি বা দাবি নাই। ডিজ-ওনড এন্ড ফুলস্টপ!

    ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বা ভিকটিমহুডঃ
    সব ক্রিয়ারই নাকি প্রতিক্রিয়া থাকে, থেকে যায়। তবে আসলে কথাটা হল ফোলানো বেলুন টিপাটিপির মত! ফোলানো বেগুনের কোন  একদিকটা চাপ দিয়ে ধরলে তাতে প্রতিক্রিয়ায় অন্যদিকটা বেশি ফুলে যাবে। প্রতিক্রিয়া ঘটতে অনেক সময় হয়ত তা ‘ফেবারেবল’ সুযোগের অপেক্ষা করেন। আপনি কাউকে যেমন ট্রিট করবেন, নিচা দেখাবেন কী পায়ের নিচে পিষবেন, অপমানে কোনঠাসা বা মার্জিনালাইজ করবেন তার পুরাটা না হলেও এরই বড় কিছু প্রতিক্রিয়া এরপরে আপনার উপর পালটা আসবেই। সেটা চিন্তা করে তাই এর মুখোমুখি হতে আগেই তৈরি থাকতে পারেন! আপনি হয়ত তখন নাকিকান্না করবেন, কী ভিকটিম হিসাবে পুরান সেই দাপুটে জমিদারের ছাতার নিচের আপনি এবার নিজেকে ভিকটিম হিসাবে ভিকটিমহুড দেখিয়ে তুলে ধরে দেখিয়ে উলটা সহানুভুতি তৈরির চেষ্টা করবেন, এমনটাই সাধারণত দেখা যায়। ঠিক এই জিনিষটাই যেন ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পরে। কারণ পাকিস্তান মানে তার পুর্ব-পাকিস্তান অংশে মানে, আগের পুর্ব-বঙ্গে স্থানীয় শাসক যে জমিদার-হিন্দু ছিল, পরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে বলাই বাহুল্য এবার আগের ঐ জমিদার হিন্দুদেরই এতদিনের আয়েস ও লালিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য যুগের অবসান ঘটেছিল, অন্তত পুর্ববঙ্গে বা পুর্ব-পাকিস্তানে। আরও এতে বিশাল রাজনৈতিক এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পুর্ববঙ্গীয় বাসিন্দাকে উল্টপালট প্রভাবিত করেছিল। তবে পরিবর্তন মূলত সবই পুর্ববঙ্গে। দেশভাগে পুর্ববঙ্গে যখন জমিদার-হিন্দু শাসন ক্ষমতা ও আধিপত্য হারিয়েছিল তখনও বাংলার অপর অংশ পশ্চিমবাংলায় তাঁদের আধিপত্য কিন্তু আগেরর মতই অটুট ছিল। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে জমিদার-হিন্দু ও তার মাখনের স্বাদ চাখনা প্রজা-হিন্দু এবার পুর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এটাই তাদের সেই দুঃখে হু হু করে উঠা মনে দেশভাগ – আর অভিশাপ, শাপান্ত! অর্থাৎ সেটা আর শুধু জমিদার-হিন্দু বা এলিট হিন্দুরাই নয় বরং জমিদারেরই আদরের ব্যাপক প্রজা-হিন্দুরাও এথেকে বাদ পরে নাই। আর তা মূলত এতদিন  প্রজা-হিন্দুরা যারা জমিদার-হিন্দুর সাথে “কালচারাল নৈকট্য” অনুভব করে  মুসলমান-প্রজার উপরের স্তরের জাতবিভাগের অবস্থান দাবি করে সেই অজুহাতে মুসলমান প্রজার উপর আধিপত্যের স্বাদ নিত, সব সুবিধা নিয়ে এসেছিল সেসব – বলা যায় এবার কাফফারা হিসারে সেই অপকর্ম যেন সুদে-আসলে উসুল হয়ে এসেছিল।

    যেকোন ফোর্স মাইগ্রেশন অবশ্যই খারাপ, কখনই তা কাম্য নয়। কিন্তু পুর্ববঙ্গের প্রজা-হিন্দুরা সাময়িক “কালচারাল নৈকট্য” এর আধিপত্যের মজা খেতে গিয়ে লং-টার্মে নিজেদের জন্য নিজেকেই এর ভিকটিমে পরিণত করেছিল।  এরপর  আজও যে ৮-১০% হিন্দু বাংলাদেশ অবশিষ্ট আছে তারা সেই থেকে নিজের দুঃস্থ অবস্থা এই ভিকটিমহুডকে বিক্রি করে যতটা প্রভাব তৈরি করা যায় এর উপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। এই বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞ এসবেরই মূল বা ফোকাস দল হল সিপিবি। আর এরপরে ন্যাপ, আওয়ামি লীগ থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সকল প্রগতিশীল – এরা এখনও সেই হেরে যাওয়া ঝান্ডা আকড়ে আছে!!!  সত্যি এক দুর্দান্ত অপচয় বটে!!! যাদের সাহসও নাই যে তারা গত দু’শ বছরের বেশি জমিদার-হিন্দুর অসম্পুর্ণ সন্তুষ্টির এক আকাঙ্খা  -ভটক তে হুয়ে আকাঙ্খা – তারা কেন বয়ে বেড়াচ্ছে, কী করে আসছে তা উল্টে-পাল্টে দেখে! এটাই এখন এক তীব্র ইসলামোফোব ঘৃণা ও বিদ্বেষ!!!

    পাকিস্তান পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র – এটাও নেহেরু-গান্ধীর ভারতের মতই আরেক নেশন স্টেট যার সারকথা হল, ব্যাপক নাগরিক বৈষম্য। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে এই চরম অসাম্য চর্চা হতে দেখা যায়।  যার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান জাতি-রাষ্ট্র উপড়ে ফেলা আর এর বদলে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়ে পুণর্গঠন। রামমোহন রায়ের (১৮১৫ সালের ব্রাহ্ম-সমাজ এর নেশন-বোধ) এই আদি পাপ বা আদি ভুল থেকে বেরিয়ে আসা।  যদিও রাষ্ট্রগঠনের এসব দিক নিয়ে সচেতনতা এখনও রাজনীতিতে এমনকি একাদেমিক পাড়াতেই নাই, কোথাও নাই।  এবং বিশেষত এই না থাকার আসল কারণ  “ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তার” ক্ষতিকর আধিপত্য। বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত (কারণ এরপর নিজেই মারা যায়) কমিউনিস্ট আধিপত্য। যারা আজও রাষ্ট্রগঠনের এদিক নিয়ে আলোচনা বা বুঝাবুঝি করতে অযোগ্য। কারণ তারা এসব আলোচনাকে “বুর্জোয়া” বা “ডানপন্থি” বলে দেখিয়ে এসেছিল। সেসব এক অবুঝ ও নাদানদের  দুর্দশা হয়ে আছে এখনও।  আর মূলত “শ্রেণী রাষ্ট্রের” বা রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের কথা জোর দিয়ে তুলতে গিয়ে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মৌলিক দিক – নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠার  কাজটাই তুচ্ছজ্ঞানে বাদ দিয়ে গেছে। কেবল রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের বুঝের খোদ রাষ্ট্রচিন্তা বলতেই তা এক দানবীয় স্বৈর এমনকি কখনও অবলীলায় এক ফাসিজমের ধারণায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টরা জনপ্রতিনিধিত্ব বা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন ধারনাটাো কখনও গ্রহণ করে নাই বরং তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয়-জ্ঞান করে ফেলে দিয়েছে ও হারিয়ে ফেলেছে।  বাস্তবে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে এরাই আজ অচল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

    এভাবে এরপর কী হতে হবে সে আলাপে আপাতত ছেদ দিয়ে একটু পিছনে ফিরা যাক। আসলে ১৯৪৭ এর দেশভাগ বলে যা পরিচিত, এতে পুর্ববঙ্গের জমিদারি ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়াতে তার ফেলে আসা জমিদারি বা জমি সেটা তো তখন আরেক রাষ্ট্র বা ওর অংশ হয়ে গেছে। সারকথায় যার উপর পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতেরও আর কোন owning বা কর্তৃত্ব বা এক্তিয়ারই নাই হয়ে গেছিল। ইতোমধ্যে কালক্রমে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালের পুরানা জমিদারি আইন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন) বাতিল করে ১৯৫১ সালের ১৬ মে নতুন প্রজাস্বত্ব আইন (ল্যান্ড একুজেশন এন্ড টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫০) পাশ হয়ে যায়। সেই ‘জমিদার উচ্ছেদ আইন’ এখনও বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ হয়ে আছে। আর এতে জমিদারির শেষ ক্ষমতাটুকু অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা বাতিল ও চিরসমাপ্তি লাভ করেছিল। আর এরই ফলাফলে পুর্ববঙ্গে আগে যারা প্রজা বা ভাগচাষী ছিল তারা তখন থেকে সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আগের চাষাবাদের জমিরই মালিক বলে আইনি স্বীকৃতি পায়, তাঁদের নামেই টাইটেল জারি হয়। ১৭৯৩ সালের জমিদারি ব্যবস্থা চালুর আগে যে টাইটেল প্রজাদের নামেই ছিল। আর এই আইনটা তৈরির সময় যে সাধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করে তৈরি বা মেনে করা হয় তা হল, (এখনও বাংলাদেশের জমি অধিগ্রহণ আইন আছে এটা সেটাই) জমি অধিগ্রহণ আইন  অনুসারে পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে, পুর্ব-পাকিস্তান সরকার যেকোন জমি “অধিগ্রহণ করা হল” বলে ঘোষণা দিতে পারে। সেই আইন দিয়েই প্রথমে সারা পুর্ব-পাকিস্তানের সব জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড একুজেশন) করে নেয়া হল বলে ঘোষণা জারি করা হয়। আর এর ফলে আগের সব জমিদারি মানে, জমিদারের মালিকানা টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবার যে প্রজা যে জমি চাষাবাদ করত এবার সেই প্রজাই ঐ জমির জন্য সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে তাকেই মানে তার নামেই জমির নয়া মালিকানা টাইটেল জারি করে দেয়া হয়েছিল। আর এই হল আজকের বাংলাদেশের সকল ভুমি মালিক যাদের পুর্বপুরুষের জমির টাইটেল কেড়ে নিয়ে বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে জমিদার নামে নতুন একটা শ্রেণীর কাছে তাঁদের জমি নতুন টাইটেল করে দেয়া হয়েছিল, দুশবছর পরে হলেও এই জবরদস্তির অবসান ঘটেছিল। পুর্ব পাকিস্তানের ‘প্রজারা’ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমির মালিকানা টাইটেল ফেরত পেয়েছিল তখন থেকে। সোজা কথায় পাকিস্তানের জন্ম মানে পুর্ব-পাকিস্তানের আগের প্রজাদের এবার নিজের নামে জমি ফিরে পাওয়া। অন্তত এই একটা কারণে পুর্ব্বঙ্গের সকল প্রজারা পাকিস্তান আন্দোলনের সুবিধাভোগী বেনিফিশারি বলে পাকিস্তান কায়েমকে অন করা উচিত!   অতএব সারা পুর্ববঙ্গের প্রজা-কৃষকেরা (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে এখান থেকেই ডাইরেক্ট বেনিফিশারি হয়ে যায়, কারণ তারা জমি পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তান কায়েমের সরাসরি বেনিফিসিয়ারী ফলে নিট সমর্থক হওয়ার কথা! কিন্তু না! যদিও এই অবস্থাটা পরবর্তিতে দুএক বছরের মধ্যে একই রকম আর থাকে নাই। কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত ও উলটে যায়। এবার পয়সা হাতে পেয়ে কৃষকেরা নিজ সন্তানকে যতই শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছিল ততই তারা মাথা কামিয়ে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট হতে পথ ধরেছিল। এটাই নাকি আধুনিকতা!!! কেউ যা উল্টে-পাল্টে চেক করে দেখে নাই – সেই পুরানা জমিদার-হিন্দুর স্বার্থবয়ানের চোখে লেখা মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদির চক্করে পড়ে গেছিল তা আজও তারা টের পায় নাই যে ভুলটা কোথায় হয়েছিল!!!  জমিদার-হিন্দুর মূল বয়ান হল ধর্মই সব নষ্টের গোড়া। তবে সাবধান!  এখানে ধর্ম মানে কেবল ইসলাম বা মুসলমানদের কারণেই তার জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। একারণে ১৯৪৫ সালের পরে জমিদার ও অনুসারিরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। তাই মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদি  আধুনিকতার ধারণাগুলোকে তারা ইসলাম-উচ্ছেদের প্রকল্পের দিক থেকে ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছিল।  অতৃপ্ত আত্মা নাকি মারাত্মক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়। জমিদারি-হারানোর অতৃপ্ত আত্মার তাই হয়েছিল।  তাই তামাসাটা দেখেন, সে নিজে কিন্তু নিজধর্ম পালন করেও আধুনিক-প্রগতিশীল হয়ে আছে!  কেন?  [দ্বিতীয় পর্বে দেখেন আগামী কাল শুক্রবার]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    সর্বশেষ এডিট আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩ ভোর-রাত  দুইটা চল্লিশ

    [সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল এই পত্রিকা গ্রুপেরই এক ভগ্নি, আরেক ত্রৈমাসিক সাময়িকী পত্রিকাও আছে।  কিন্তু মূলত সেটা প্রিন্টেড পত্রিকা, যার  সাথে কেবল এক ই-পেপার ভার্সান আছে।  এই লেখাটা ঐ ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার গত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২০  সংখ্যায়, “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাতপর্য ও  অতঃপর ……” এই নামে ছাপা হয়েছিল।  তা প্রায় পাঁচ হাজার অক্ষরের অনেক বড় লেখা  ছিল। সেই লেখাটাকে এবার আবার এডিট করে আরো সংযোজন-বিয়োজন করে তিনপর্বে তা  এবার নতুন নামে  নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।

    ওদিকে ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার  ই-পেপার পাঠক ফেন্ডলি নয়।  তাই আগের লেখাটার এক পিডিএফ ভার্সান এখানে পেতে পারেন। নামিয়ে নিতে হবে। ]