Tag: গৌতম দাস

  • বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    গৌতম দাস

    ১৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3QG

     

       US  Democracy Summit 9-10 Dec 2021

    “Summit for democracy an ‘anti-China ideological clique’”

    গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আয়োজিত “ডেমোক্র্যাসি সামিট” [Democracy Summit] সমাপ্ত হয়েছে। যদিও করোনার কথা ভেবে এটা অন-লাইন বা ভার্চুয়াল সামিট ছিল। রয়টারের তথ্য মতে ১০০ এরও বেশি দেশ এখানে অংশ নিয়েছিল।  বাইডেন একে নাম দিয়েছিল  “ডেমোক্র্যাসি সামিট”। যেটা আসলে কার্যত   স্ট্রাটেজিক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” বা একে বাংলায় বললে এটা হয়ে যায় “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”। কিন্তু কৌশলগত কেন? এর মানে কী? 

    ছলনার কৌশলঃ
    বাইডেনের মূল সংকট হল কোন মানদন্ড ছাড়া তিনি ডেমোক্রাসি শব্দটা এস্তেমাল করতে চান।
    আর এভাবে আমাদের মত অনেক দেশেই আমেরিকা  অবরোধ আরোপ করতে চান এবং বিশেষ করে চীনের উপরে অবরোধ আরোপ না হলেও অন্তত বিব্রত করতে চান। কিন্তু কাজটা তিনি করেছেন বা তার করার পথটা অসৎ। যেমন ঘটনা হল আমাদের মত সেসব দেশ এমনকি চীনেও উপযুক্ত ও স্পষ্ট “জন-প্রতিনিধিত্বশীল” রাষ্ট্র থাকা বা না-থাকার ঘাটতি আছে। কিন্তু আমেরিকা  কোন মানদন্ড কাউকে
    ডেমোক্রাসির রাষ্ট্র  বলে দাওয়াত দিচ্ছেন বা কাউকে বাদ দিচ্ছেন তা প্রতকাশ করে নাই। ফলে সামিটে দাওয়াত দিয়েছে মূলত বাইডেনের আমেরিকার এখনকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতে। এটাই সেই বড় অসততা!  এটা হতে নুন্যতম আমেরিকা বা অন্যকোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থের উর্ধে, তা পরোয়া না করে। এবং ইন্ডিপেন্ডন্ট মানদন্ডে।  আমেরিকা যে তা মেনে করে নাই এর বড় প্রমাণ হল আমেরিকা কোথাও তার মানদন্ড প্রকাশ করে নাই। ফলে এটা অস্বচ্ছ আর তাই অসততা হয়েছে। একারণে সামিটের গায়ে কালি লেগে গেছে।

    আমাদের দেশে ‘কৌশল করা’ শব্দের একটা অর্থ হল ছলনা করা। ফলে কৌশলের সোজা কমন মানুষের বুঝ হল যে কেউ যখন যা বলবে তা করবে না বা করবে আরেকটা – এটাই কৌশল। ঠিক এ’অর্থেই বাইডেনের আমেরিকা এক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” ডেকেছিলেন। এর অর্থ হল আমেরিকা যাকে যাকে “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” মনে করে তারাই এই সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েছিলেন। কিন্তু তবু কথা বা কিন্তু আরও আছে।  আমেরিকার এই মনে করাটা হয়ত আগে আমেরিকা ‘মনে করত’ হলেও হবে না। এখনকার বাইডেন সরকারের নিজ লাভালাভের মানদণ্ড দিয়ে যদি বলেন তা হলেই কেবল সেটা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” বলে মানা হবে। 

    এক কথায় বললে, বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ এতই দেউলিয়া যে, এর ‘ডেমোক্র্যাসি’ ধারণার কোনো সংজ্ঞায় যাওয়ার মুরোদ নেই। তাই দেয়া হয়নি বা কাজ করে না। কোনো ক্রাইটেরিয়াই নেই। কী কী থাকলে ‘ডেমোক্র্যাসি’ মানা হবে তাও জানা যায় না। তারা বলতে পারেন না। যেন এটা কেবল বাইডেন প্রশাসনের স্বার্থের খেয়াল যে, তারা কাকে কাকে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ মনে করবে।

    কেন এটা এমন হয়ে গেলঃ
    এমনিতেই বাইডেনের সমস্যা দাড়িয়েছিল কাকে ডাকবেন আর কাকে না। বা অন্যভাবে বললে, কারা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” তা বলতে না পারলে ডাকবেন কী করে? অথবা কোন রাষ্ট্রকে ডেকে বসা মানে তো হয়ে যাবে বাইডেন তাহলে ঐ রাষ্ট্রকে তাহলে আপনাতেই বাই ডিফল্ট [by default] গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে করছেন। এছাড়া বাইডেনের মনে আরো এক বড় “চোরামি” তো কাজ করছেই যে তিনি চীনকে বিব্রত করবেন কোপাবেন!  

    তাই সব মিলিয়ে খুব সহজ সেই একই পন্থা অনুসরণ করেছেন!। তা হল যেমন, কোনো ঘটনাকে তারা ‘টেররিজম’ বলবেন বা বলেন? এরও কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখনো নেই। কখনো দেয়া হয়নি। এভাবেই চলছে। আর আছে এর বদলে তাদের একটা তালিকা। ওই তালিকায় যেসব রাষ্ট্রের নাম আছে সেটাই তখন থেকে টেরর বা জঙ্গি রাষ্ট্র। এই হল অসততার স্টাইলটা। বুশের আমল থেকে এ ব্যবস্থা চালু আছে আমেরিকায় এবং তা এখনো বহাল করে রাখা আছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘেরও টেরর রাষ্ট্রের কোনো সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া নেই। সেখানেও একই পদ্ধতি। এগুলোকেই বলা যায় ‘মাতবর’ রাষ্ট্রগুলোর বৈষয়িক মানে বিষয়-আশয়ের স্বার্থের ভিত্তিতে ওই তালিকায় নাম ঢুকানো বা বের করা।
    কাজেই এটা পরিষ্কার, বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে বড় মানবাধিকারের দোকানদার ও স্বার্থবাজ আর কেউ নেই। আমাদের ব্যবহারিক অসুবিধা এবং কঠিন সমস্যাটা হল, ক্ষমতাবান প্রধান রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ছাড়া হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ইস্যুতে সেই লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে  কোনো পদক্ষেপ আসার কোনো সুযোগই নেই। একমাত্র এখন এক বিকল্প হল যতটুকু যা সম্ভব তা হল, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনমতের চাপ কোন ইস্যুতে যদি তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের বেলায় এমন গ্লোবাল জনমত তৈরি প্রায় অসম্ভব। তবুও আমাদের লড়তেই হবে, এটা বটম লাইন। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

    থিঙ্কট্যাংক ফেলো এরা কী বলেনঃ
    গত লেখায় আমেরিকান “ফরেন পলিসি” পত্রিকায় মাইকেন কুগেলম্যানের নিয়মিত ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফিং’-এর কথা বলেছিলাম। এটা সাপ্তাহিক ব্রিফিং বা কলামের মত। চলতি এই সপ্তাহে সেই কুগেলম্যানও বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটকে’ ইস্যুতে সম্ভবত সরাসরি সমর্থক হওয়াটার বিপদ বুঝেছেন। তাই তিনি কিছুটা সমালোচক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন। তিনি আগেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটে’ দাওয়াতি কারা হবেন এ নিয়ে কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখানে নেই। তিনি লিখছেন তালিকায় নাম থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে আর এতে এই অনুমান তৈরি হয়েছে যে, বাইডেন প্রশাসন ‘অযোগ্য দাওয়াত-দাতা’ […controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host……]। কুগেলম্যানের ভাষায় ‘আনফিট হোস্ট’ এবং তিনি বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার নিমন্ত্রিত দেশের তালিকা দেখে বোঝা গেছে, এই সামিটে দাওয়াত পাওয়ার যোগ্যতা বা একমাত্র মানদণ্ড ডেমোক্র্যাটিক পারফরম্যান্স ছিল না; এটি প্রমাণিত। মানে, অন্য অনেক কিছু ছিল। কুগেলম্যান এমনকি ব্রিটিশ ফ্রিডম হাউজের র‌্যাংকিংয়ের সাথে তুলনা নিয়ে এসে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বাইডেন কোনো মানদণ্ডই মানেননি, এখানে অনুসরণ করেননি।

    “The Biden administration’s Summit for Democracy, hosted virtually today and Friday, comes at a moment of global democratic backsliding. However, controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host, has accompanied the event. The South Asian invitees prove democratic performance isn’t the sole criterion for a seat at the summit.” – ,

    এবার তিনি সরাসরি লিখেছেন, আসলে এশিয়ার যেসব দেশের নাম তালিকায় রাখলে ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হাসিল হয়’ (বেস্ট সার্ভ ইটস কারেন্ট ইন্টারেস্ট) সেসব দেশের নামই ওখানে রাখা হয়েছে; অর্থাৎ বাইডেনের তালিকার গরমিলের বোঝা এতই ভারী যে, তিনি সোজা এর দায়দায়িত্ব নেননি; ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। উল্টো নিজেই সমালোচকদের দলে ভিড়ে গেছেন।

    থিংকট্যাংক ফেলোঃ
    এখন আরেকজনের নাম করব তিনিও মাইকেল কুগেলম্যানের মতোই থিংকট্যাংক ফেলো- আলী রিয়াজ; তিনি কিন্তু একেবারে ‘ধরাশায়ী’ হয়ে গেছেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছেন থিংকট্যাংকের সিনিয়র বা জুনিয়র ফেলো হওয়ার কাজটা হল – উপস্থিত আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া। এমন ভাবাটা এশিয়ান অরিজিন মানুষের সমস্যা কি না, জানি না। আলী রিয়াজ ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ ইস্যুতে কুগেলম্যানের উল্টো অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন পত্রিকায়  [বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলন আলী রীয়াজের মূল্যায়ন] বিরাট এক সাক্ষাৎকারে বাইডেনের পক্ষে ব্যাপকভাবে সাফাই জোগানোর চেষ্টা করেছেন।

    বলাবাহুল্য, সাফাইটা দাঁড়ায়নি। কারণ, সম্ভবত কতটা উজানে বাওয়া যায় তারও তো কিছু সীমা থাকে! কারণ বাইডেনের রাষ্ট্রস্বার্থের খেয়ালে যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তার স্বপক্ষে সাফাই তিনি কোথা থেকে আনবেন?

    এমনকি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কী? গত ২০০৭ সালে এই একই কথিত ‘গণতন্ত্র’, মানবাধিকার আর দুর্নীতিবিরোধী কথা বলে আমেরিকান গণতন্ত্রী যারা  ‘তাদের’ আগমন ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ছিল এর পরিণতি! এটা কে অস্বীকার করতে পারবে? তা হলে আলী রিয়াজ আজ কোথা থেকে কী আর সাফাই আনবেন? কী সাফাই দেবেন? এরা গণতন্ত্রী???

    তাই বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন আসলে হয়ে গেছে কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন; অর্থাৎ কৌশলগত; মানে যা বলে তা করে না; করে আরেকটি। ছলনা করে। নানান নখরাও করে। কেন? ইংরেজি স্ট্রাটেজিক শব্দটার বাংলা করা হয় কৌশলগত বা কৌশলী। তাই আমরা দেখেছি আলী রিয়াজের মানবজমিনে দেয়া বক্তব্যে তিনি উপায়ন্ত না পেয়ে নিজের ইজ্জত ঢাকতে শেষে এই ‘স্ট্রাটেজিক” শব্দটা এনেছেন। অর্থাৎ তিনি সংজ্ঞাহীনতা বা মানদন্ড না থাকার সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েই যেন বলেছেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে, তা নয়। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এ অঞ্চলে ও অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে, সে দিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। এ কথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই ‘গণতান্ত্রিক দেশ’ বলতে পারব না।’

    “পাকিস্তান এবং ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে সেটি নয়? এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে এবং অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। একথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক দেশ বলতে পারবো না” – আলী রীয়াজের মূল্যায়ন মানবজমিন

    এখানে তিনি পুরো সারেন্ডার করেছেন; অর্থাৎ তার গণতন্ত্র এখন আর বিশেষণ ছাড়া শুধু গণতন্ত্র নয়। এর বিশেষণ এখন ‘কৌশলগত’ এই শব্দটা সামনে জুড়ে দিয়ে। তবুও সাফাই দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করেননি। তাই এবার কৌশলগত শব্দের আমদানি। অথচ কে না জানে যা কৌশলগত তা আর কোনো ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি নয়। এটা একান্তই বাইডেনের আমেরিকার নগদ লাভালাভের স্বার্থ!

    ইমরানের রসিক জবাবঃ
    তবে আমেরিকান দাওয়াত মানে গণতন্ত্রের সার্টিফিকেট বেচা বিক্রিটার মধ্যে এক চরম তামাশা ঘটিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি এই দাওয়াতে যেতে অপারগতা (decline) জানিয়েছেন [Pakistan declines US democracy summit invitation]। সাথে বলেছেন, তারা চীন-আমেরিকা এমন দলাদলি বা ব্লক ভাগাভাগিতে পড়তে চান না! [We don’t want to enter bloc politics: PM] বলাই বাহুল্য এ’এক ইমরানের ভাল “স্মার্ট মুভ”।

    যা হোক, মনে হচ্ছে আলী রিয়াজ কুগেলম্যানের কাছে জেনে নিতে পারতেন যে, থিংকট্যাংক ফেলোর চাকরি নেয়া মানেই আমেরিকান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে ‘পক্ষে’ লিখতেই হবে তা নয়। দায় না নিয়েও এবং সাথে সমালোচনা করে বা নিদেনপক্ষে অন্যরা কী সমালোচনা করেছে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেও সেসব উল্লেখ করে কথা বলা সম্ভব।

    তবে আলী রিয়াজের লম্বা সাক্ষাতকারে সমস্যা হয়তো অন্যখানে এবং তা আরো জটিল হয়ে গেছে; মুল কারণ সম্ভবত আলী রিয়াজ অহেতুক কমিউনিস্ট ও নন-কমিউনিস্ট ভাষ্যের বিতর্কে ঢুকে গেছেন। একালে কোনো রাষ্ট্র আর কমিউনিস্ট কি না, এটা কোনো ফ্যাক্টর বা ইস্যুই নয়।  যেমন স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র হতে গেলে তাকে কমিউনিস্ট হতে হবে, তা তো নয়। মোদির হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়ই কমিউনিজম নয় বা এই দোষে দুষ্ট নয়। আবার আজ পুতিনের রাশিয়া নিজেও দাবি করে না যে, সে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এছাড়া একালে ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় সদস্য হয়ে গেছে; কারণ এই সক্রিয় সদস্যপদ না থাকলে রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধা থাকে না। আর না থাকলে মানুষকে কাজ দেয়া খাবারসহ দেয়া এসব রাষ্ট্র চালানোই মুশকিল, একালে প্রায় অসম্ভব। এই মাপকাঠিতে চীন-রাশিয়া সবাই আর কমিউনিস্ট কি না সে প্রশ্ন তোলা এমন কমিউনিস্ট কে আছেন? অন্তত কমিনিস্টদের নিজের এই মাপকাঠি অনুসারে!  আর চীনের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন তো আরো অচল। কারণ আমেরিকা ক্রমশ আরো দুর্বল হচ্ছে এভাবে সব সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তাকে সরিয়ে চীন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা অর্থনীতির নেতার আসনে বসতে যাচ্ছে। কাজেই সে কমিউনিস্ট কি না, এটা নিয়ে আর কী করবেন? অবশ্য অভ্যন্তরীণভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি পুরনো বক্তব্যের সাফাইয়ের ওপরই চলে এবং কমিউনিজম-২ বলে কিছু একটা করার ভাবনা আছে, এ কথা ভাবছে।

    কাজেই আলী রিয়াজ যেমন লিখছেন, “সারা বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি হয়েছে যার একটির প্রতিনিধিত্ব করে যুক্তরাষ্ট্র। অপরটির প্রতিনিধিত্ব করে চীন ও (বলা যায়) রাশিয়া”  – এগুলো একেবারেই ভুয়া কথাবার্তা এবং অচল মুখস্থ কথাবার্তা। একালে এটা আর কোন বুদ্ধিমানের পর্যবেক্ষণ বা মিনিংফুল অবজারভেশন হয়নি। তবে ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’কে কমিউনিজমের বুদ্ধি বা ক্রাইটেরিয়া দিয়ে সাফাই ব্যাখ্যা দেয়া আসলেই বেশ অভিনব। তা হলে চীন যখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা হবে (ইতোমধ্যেই অনেকদুর আগিয়েছে), তখন কথিত ‘আদর্শিক অবস্থান’ জিনিসটা কোথায় থাকবে?

    আসলে আমাদের ভেবে কথা বলতে হবে। পুরনো কমিউনিজম কী শিখিয়েছে তাই শেষ কথা বা সবচেয়ে জ্ঞানের কথা মেনে নেয়াটাই তো ভিত্তিহীন এবং তা অবাস্তব, ননপ্র্যাকটিক্যাল। পুরান কথা আকড়ে ধরা নয়, বরং পর্যালোচনা, নিরন্ত্রর পর্যালোচনাই তো রাস্তা!

    কথা আরো আছে। এই যে গণতন্ত্র শব্দটা আমেরিকা চালু করল মডার্ন রাষ্ট্র সম্পর্কে এটা তো মূল শব্দ বা ধারণা কোনটাও নয়। মূল ধারণামূলক শব্দটা হল ‘রিপাবলিক’ [republic] বা মডার্ন রিপাবলিক। অথচ এই ধারণাটাই ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমেরিকা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে শব্দটি বদলে আনা হল নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’। এর পেছনের মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন  – এ’দুই রাষ্ট্রই তাদের স্ব স্ব  বিপ্লবের পরে নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে এই “রিপাবলিক” শব্দটা রেখেছিল। ইউএসএসআর (USSR) এই নামের মধ্যে ‘আর’ মানে রিপাবলিক। ওদিকে চীনের আনুষ্ঠানিক নাম পিআরসি (PRC) বা পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। অর্থাৎ এখানেও ‘রিপাবলিক’ শব্দ হাজির। তাই আমেরিকার পক্ষে  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো রিপাবলিক নয়, তা বলা সম্ভব হচ্ছিল না; যদিও তাদের ক্ষমতা কাঠামোতে সমস্যা আছে। তাই আবার সেই আমেরিকান কৌশল খাটানো বা স্ট্রাটেজি!

    রিপাবলিক শব্দটি ফেলে দিয়ে প্রমিনেন্ট করা হলো নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’কে। আর তাতে সবচেয়ে জোর দেয়া হল, যা কমিউনিস্ট দেশে নেই বা দুর্বল অপুষ্ট; এর একটা যেমন ভোট বা নির্বাচন। যার মূল এবং মৌলিক ধারণাটা হল জনপ্রতিনিধিত্ব। অথচ আমেরিকান কথিত “গণতন্ত্রের” ধারণায় জনপ্রতিনিধিত্ব ধারণাটার গুরুত্বই নেই।  সামনে আনা হয় না। ভোট মানেই গণতন্ত্র আর এই ভোটের ধারণার নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।  আবার ওদিকে যেমন বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা; অর্থাৎ যেসব শব্দ উচ্চারণ করলে কমিউনিস্টরা বিব্রত হবে সেসব শব্দকে সামনে আনা হয়েছে। এতে গ্লোবাল আইডিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকা মাইলেজ পেয়েছে, সন্দেহ নেই বিশেষ করে কোল্ড ওয়্যারের আমলে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণাগুলো বোঝাবুঝিতে, রাজনীতির বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে। রাজনীতি বা রাষ্ট্র মানে তা নেমে এসেছে ভোটাভুটিতে। এ ছাড়া সবচেয়ে ক্ষতি করেছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণার বিকাশ ঘটতে না দিয়েও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটানো হয়ে গেছে।

    যেমন কেন রিপাবলিক ধারণাটা? এটি যে মনার্কি[monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে রাজতন্ত্রের পেট চিরে একটি নতুন ধারণা বা সমাধান তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে – আমেরিকার এই গণতন্ত্র শব্দটি এনে। যেমন আরো গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল, ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ, এর ইতি ও নেতি দিক, পারসোনাল লিবার্টি, রাইট টু লাইভ, বেঁচে থাকার বা জীবনের অধিকার এমনকি খোদ রাজনীতি বা রাজনৈতিকতা শব্দটার অর্থ কী? এসব কিছুকে আড়ালে ফেলা শুধু নয়, কবরে মাটিচাপা দেয়া হয়ে গেছে। আর সব কিছুকে নামিয়ে আনা হয়েছে ‘গণতন্ত্র’ আর ভোটাভুটিতে। কোল্ড ওয়্যারের যুগের এই আমেরিকা-সোভিয়েত এই ব্লক রাজনীতির ধারণার আড়ালে। অথচ আজো এসব বাজে তর্ক- আমেরিকা-সোভিয়েত ঠাণ্ডা যুদ্ধে কার পক্ষে মাইলেজ আসবে- সেসব নিজ অযোগ্যতাতেই এখন আপনাআপনিই ক্ষয়ে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রশ্নটা আমেরিকা না সোভিয়েত- কে ভালো এর তর্ক একেবারেই নয়। কারণ আমাদের জানতে ও চিনতে হতো ও হবে রাষ্ট্রকে। নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে গড়তে। আমরা আমেরিকা না সোভিয়েত রাষ্ট্রের সমর্থক হব মামলাটা সেটা নিয়ে কখনই নয়।

    তবে আমেরিকার সমালোচনা করা হচ্ছে মানে চীনা বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র আদর্শস্থানীয় তা নিশ্চয়ই  নয়। কমিউনিস্টদেরও বয়স মানে রাষ্ট্র অভিজ্ঞতাও শত বছর হয়ে গেল। লেনিনের প্রথম গনভোটে পরাজিত বা অভিজ্ঞতা সুখকর হয় নাই বলে জন-প্রতিনিধিত্ব ধারণার বাস্তবায়ন নিয়ে আর ভাবা যাবে না এর কোন মানে নাই। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল দিকটা নিয়েও চীনকে ভাবতেই হবে। চীন নিজে আভ্যন্তরীণভাবে আজ ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত আছে থাকছে সেটা হতেই পারে। কিন্তু কাল নাও থাকতে পারে! মানুষের বাস্তবায়নযোগ্য আকাঙ্খায় লাগাম পরিয়ে রাখা যায় না। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল বলেও আলাদা কিছু আছে ;  কিন্তু গ্লোবাল নেতৃত্বের দৃশ্যপটের আস্থা অর্জনও কম জরুরী। এদিকগুলো ছাড়া চীনের কেবল গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়াটা আদৌও কতটা সম্ভব অথবা কতটা সুখকর অভিজ্ঞতা ও সফল বা শান্তিপুর্ণ থাকবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজেই আমাদেরটাও  “আমাদের মত গণতন্ত্র” – এটা মুখরক্ষায় বা সার্বভৌমত্বের অজুহাতে বলা যায় হয়ত কিন্তু অর্থ হয় না।  আর অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব মানুষের ভোগ-সংশ্লিষ্ট ফলে বৈষয়িক বিষয়গুলোকে ১৯৬৬ সালে কোনমতে জোড়াতালিতে জাতিসঙ্ঘের দলিলে কমিউনিস্ট মানবাধিকার বলে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে বটে। কিন্তু সরি, এই পাঁচটার একটাও “রাজনৈতিক” ধারণাই নয় বৈষয়িক-ভোগের ধারণা – যা রাজনৈতিক নয়। ফলে যা “রাজনৈতিক” ধারণা নয় তা “অধিকার” হবে কী করে? সবার আগে “রাজনীতি” শব্দের অর্থ ধরতে পারতে হবে। মানুষ কেবল ভোগী এক মেশিন তো নয়। সে আপাদমস্তক পলিটিক্যাল। এসব কথার অর্থ বুঝতে হবে। এর উপর আবার মানুষের স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা আছে। তাকেও জায়গা করে দিতে হবে।  এসব ছোটখাট বিষয় নয় বরং গভীর দর্শনের বিষয়। মানুষকে অনেক দূর যেতে হবে, আবার অনেক কিছু বাকি! ওদিকে কমিউনিস্ট অর্জনও নিশ্চয় অনেক। কিন্তু সব শেষ নয় অবশ্যই। বহু সংস্কারই বাকি! 

     আমাদের আগের প্রসঙ্গে ফিরি। একালে এসে কে কমিউনিস্ট আর কে মেন-স্ট্রিম এসব কোল্ডওয়ারের ভাগাভাগি কমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নাই-ই। তবু অনেকের জন্য সম্ভবত এটা কষ্টসাধ্য যে, একটা মনার্কি সিস্টেমের বিপরীতে রিপাবলিক-কে বুঝতে হবে এবং তুলনা করে। এছাড়াও এটা না বুঝলে জানা যাবে না যে, রাজতন্ত্রে ব্যক্তি-মানুষ বলে কিছু নেই। ছিল না কেন? ধারণাটাই নেই, তখনও উন্মেষ ঘটে নাই তাই।  আমেরিকা কী করে ‘লিবার্টির’ আমেরিকা হয়ে উঠেছে; আমেরিকান হিস্ট্রি গুরুত্বপুর্ণ সেই ইতিহাসে কমিউনিস্টদের আগ্রহ নেই। আগ্রহ হল, আমেরিকা কী করে ‘গণতন্ত্র’ নামে একটি ধাপ্পাবাজির প্রচারক হয়েছে অথবা এটা দিয়ে সোভিয়েতকে হারিয়েছে, সেখানে।

    ইতিহাসে এক গোত্র বা ট্রাইবাল [tribal] সমাজ পেরিয়ে অনেক পরে ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ হয়েছে তাও আবার রাজতন্ত্রের যুগের শেষপ্রান্তে এসে। তাও তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তির উন্মেষের খবর হয়নি, জানা হয়নি অনেক সমাজে। যেমন যেকারণে আমেরিকা তালেবানদের পশ্চাৎপদ বলে সুযোগ নেয় কিংবা এই সুযোগে ইসলাম পশ্চাৎপদ বলে প্রপাগান্ডা করতে ভালোবাসে। আর এসব বলাবলিকে কাজে লাগাতে চায় এভাবে যে, ওরা পশ্চাৎপদ; কাজেই তালেবানদের এখন আমেরিকান আধিপত্য মেনে নিতে হবে, কায়েমের কাজে লাগতে হবে। অথচ নিজেরা যে কথিত ‘গণতন্ত্রের’ প্রচারে লেগে আছে যেটা স্রেফ ভোটাভুটি আর আমেরিকার তাতে স্বীকৃতি। অথচ এসবের বিপরীতে আমাদের দরকার নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্রধারণার বিকাশ, নিজ রাষ্ট্র গড়ে তোলা। ট্রাইবাল সমাজের অভ্যাস রীতি কেন ব্যক্তি-উন্মেষ হয়ে যাওয়া সমাজে খাটবে না সেটা আগে উপলব্দি করা।

    একালের আমেরিকা আরো ভয়ঙ্কর। একটা উদাহরণ দিব, বাকিটা সবাই বুঝবে। ইটিআইএম- ইস্টার্ন টার্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM)। নাম শুনে অনেকের বুঝতে কষ্ট হতে পারে, তাই চিনিয়ে দেই। এরাই হলো চীনা উইঘুরের সশস্ত্র সংগঠন। এই সংগঠন সম্পর্কে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকের তথ্য-ভাষ্য এখানে।  এই সশস্ত্রতা, এদের এখনকার বসবাস ও তৎপরতা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে।

    বুশের আমল থেকেই এরা টেরর বা সন্ত্রাসের দল হিসেবে আমেরিকান ও ইউএনের লিস্টে তালিকাভুক্ত। কিন্তু তা এখন ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে; কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প তো খুবই বুদ্ধিমান ও ধূর্ত করিৎকর্মা। তিনিই এই ইটিআইএম দলকে নিজ সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন।  অথচ ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান, কিরঘিজস্তান, আমেরিকা ও চীন  [Afghanistan, Kyrgyzstan, the United States, and China] এদের সবার আবেদনে জাতিসংঘ এই সংগঠনকে তালিকাভুক্ত করেছিল। এনিয়ে আমেরিকান ট্রেজারি ডিপার্ট্মেন্টের এই বিবৃতি এখানে।  তাহলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী? খুবই ‘মহৎ’! আর ইটিআইএম এখন কী নিয়ে ব্যস্ত ও কোথায়?

    পাকিস্তানে চীনা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের শেষ নেই। তেমনই এক প্রকল্পের এলাকায় ভেতরের ঘটনা। প্রকল্প কম্পাউন্ডের ভিতরে সেটাও কয়েক মাইল বলে তাদের অভ্যন্তরীণ নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু করা আছে, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার থেকে শ্রমিক বা যেকোনো কর্মী চলাচল করে থাকে। তেমনই এক বাসে বোমা বেঁধে রেখে তা দিয়ে হামলা পরিচালনা করে ইটিআইএম। আর এতে ঐ বাস পাশের নদীর তীরে বা খাদে পড়ে যায়। এতে ১৩ জন চীনা ইঞ্জিনিয়ার মারা যান। আর এ হামলার নায়ক ইটিআইএম এর এক কর্মী।

    ট্রাম্পের তালিকামুক্তি কেন তা আমরা নিশ্চয় বুঝলাম। এখানে এনিয়ে একটা ইন্ডিয়ান রিপোর্ট আছে। কিন্তু খেয়াল করতে হবে; তা হলে এটা কি চীনের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধ লড়বার ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি! কী তামাসা!  না, তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই যে, বাইডেন এসব থেকে দূরে।  অথবা ট্রাম্প একমাত্র গণতন্ত্রী, আর বাইডেন তা নয়!   ট্রাম্প এই তালিকামুক্তি দিয়েছিলেন ক্ষমতা ছাড়ার অল্প আগ দিয়ে। মানে হল, এর পুরো ‘লাভালাভ’ ও পারফরম্যান্স সব ক্রেডিট এবং বাকি অনুমোদন বাইডেনের নামে।

    এরপরে আরো ঘটনা হল,  তালেবানরা গত আগস্টে কাবুলে ক্ষমতা দখলের আগে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তাদের নেতারা এক সাক্ষাৎ করেছিল। ওই মিটিং শেষে তালেবানরা প্রকাশ্যেই মিডিয়াকে জানিয়েছিল, এমন সশস্ত্র গ্রুপগুলো যারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে অন্য দেশে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের আর আশ্রয় দেয়া হবে না”। আমরা অনেকেই জানি এখনকার আফগানিস্তানে আইএস (কে) বা খোরাসান গ্রুপ যারা তালেবানদের চেয়েও আরো রেডিক্যাল ও আলাদা, তাদের কামনা তালেবানরা যেন বিফল ও পরাজিত হয়, তারা অপেক্ষা করছে। এদিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঐ সাক্ষাতের পরে ইটিআইএম (ETIM) এরপর থেকে অবাধে আফগানিস্তানে চলাচল সীমিত করে ফেলে শুধু না তারা ঐ আইএস (কে) এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রটেকশনে থেকে তৎপরতা চালু রেখেছে। এরই এক ততপরতা ছিল পাকিস্তানের ঐ চীনা প্রকল্পে হামলা।
    চীন-আমেরিকার স্বার্থবিরোধ থাকতেই পারে; থাকা খুবই স্বাভাভবিক!। কিন্তু সেই বিরোধে আপার-হ্যান্ড পেতে ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপকে লেলিয়ে দিতে হবে, ব্যবহার করা হবে? এটা কোন গণতন্ত্র?  

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল, বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ – এই বুলির মূল কথা কী?

    যেটা আমেরিকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থ, সেটাই গণতন্ত্র!

    তা হলে বাইডেনের এই ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ কী বস্তু? আলী রিয়াজ আমাদের গণতন্ত্রের ‘দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি’ শিখিয়েছেন। আমরা নিশ্চয় এখন এর মর্মবস্তু বুঝতে পেরেছি। আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থটাই হল আমেরিকান ‘গণতন্ত্রের আদর্শ’।

    তা হলে আমাদের বাংলাদেশের সরকার সে তো অবশ্যই নিপীড়ক; গুম-খুন থেকে পায়ে গুলি, নিশীথ ভোট ইত্যাদি সকল ইস্যুতেই তের বিরুদ্ধে  অভিযোগের এখানে শেষ নেই। আমরা সবাই এসব নিয়েই আছি, নিরন্তর ভুগছি।

    এখন এতে আমেরিকা যদি আগ্রহ নেয় তার মানে যেটা ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ সেটাই গণতন্ত্র!’ চলবে এখানে? এই সূত্র অনুসারে এগিয়ে আসে তা হলে আমাদের এখন খোঁজ নিতেই হয় যে এখানে আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থটা মানে গণতন্ত্রটা ঠিক কী? আর তা এবার কী মুল্যে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’সম্মেলন”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ঃ২৩ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3Qi

     

    The War That Changed The Course of History | The First World War

    ইতিহাস পড়ার অনেক পদ্ধতিই হতে পারে। এর মধ্যে একটা উল্লেখ করা যায় যেমন, কোন বিষয়ের আগে-পরের তুলনা করে বা এদুই সময়ের পার্থক্য জেনে পড়া। এভাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরে – এর মধ্যে পার্থক্য কী দেখা দিয়েছিল? আগে কী কী ছিল, যা পরে পরে আর থাকে নাই – এমনই বিষয়ে কিছু কথা বলব।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালটা হল ১৯১৪-১৮ সাল। সেসময়ের দুনিয়ায় বাণিজ্য ব্যবস্থা কেমন ও তা কতদূর বিকশিত হয়েছিল; এ ছাড়া বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পড়ে এর হাল কী হয়েছিল? মুলত এখানে সেই বাণিজ্যের দিকটা ফোকাস করে আগাবো।  এ’নিয়ে সবার আগের কথাটা হল, ১৯১৪ সালের আগে পর্যন্ত মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের জমানায়  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের কথা যদি বলি, এটা নিজেই তেমন কিছুই বিকশিত ছিল না। কেন? এবং কী দেখে বুঝলাম?

    প্রথমত,  বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতেই এটা সারা ইউরোপের সমস্যা। কথাটা আরেকটু ভেঙ্গে বললে, গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে বুঝাচ্ছি, দুনিয়াজুড়ে ছোট-বড় যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোন বাণিজ্য বা পণ্য লেনদেন বিনিময় কিছু ছিল কী না?  জবাব হল, তেমন কিছু ছিলই না। এই না থাকার প্রধান কারণ প্রথমত ও প্রধানত যা ছিল তা হল যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন ছিল না।  আমরা কিন্তু যোগাযোগ বলতে সবকিছুকে বুঝাই। যেমন পথঘাট মানে আকাশ, সড়ক রেল এবং  সব ধরণের জলপথ। আবার আরেক যোগাযোগ মানে হল, কথা বলা। মানে হল, সরাসরি দেখা করে কথা বলা থেকে টেলিগ্রাফ, ফোন থেকে একালের ইমেল থেকে ফেসবুক ইত্যাদি সব। এছাড়া আরেকটা আগাম কথা বলাই হয় নাই – তা হল ভাষা। পরস্পরকে বুঝা আর বুঝানোর মত কমন ভাষা বা জানা ভাষা থেকে কত দূরে ছিল, এটা এক বড় পয়েন্ট। আবার, আমরা জাস্ট চিন্তা করেন এখন বাংলাদেশে এক যোগাযোগ বলতে – সড়ক, সেতু, রেল, বিমান নৌ ইত্যাদি থেকে টিএন্ডটি বা আইসিটি ইত্যাদি সব মন্ত্রণালয়কেই বুঝাবে।  তাই মূল কথাটা হল, সেকালে এক মহাদেশের সাথে অন্য মহাদেশের কোন ধরণের যোগাযোগই ছিল না। এইটা হল বেজ ফ্যাক্টস। তাহলে যোগাযোগটা কে প্রথম ঘটালো? আর এখানে যে “সেকালে” বলছি এই সেকালে বলতে কোন সময় বা কোন বছর-কালের কথা এটা?

    সরাসরি প্রথম কথাটা আগে বলেও নেই। পরে তা ব্যাখ্যা করে বলি। সেকথাটা হল, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা আসলে মহাদেশের সাথে মহাদেশের যোগাযোগটা সর্বপ্রথম ও একমাত্র ঘটতে পেরেছিল কলোনি দখলদারদের হাতে। যতটুকু যা প্রথমে ঘটেছিল তা তাদের  অন্যদেশ দখল করে তা লুটতে বেরিয়ে পড়া ও সম্পদ লুটে নিজ দেশে ফিরে আসা এই ছিল কাজ বা লক্ষ্য। আর এটা করাই হত একটা কোম্পানি খুলে ব্যবসা হিসাবে। একাজ প্রথম শুরু করেছিল  ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। আর তাদের কলোনি দখলের স্বার্থেই এই নেতি কাজের সুত্রেই তাদেরই প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। সোজাকথা, এর আগের দুনিয়ায় এই লুটেরাদের দাঁড় করানো যোগাযোগ ব্যবস্থাটাও ছিল না।
    কাজেই কলোনি শাসক মানে ব্যবসায়ী  মালিক যিনি মানে আমাদের বেলায় যেমন বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এরা তাদের কলোনি লুটের স্বার্থের যেটুক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়েছিলেন তা খুব খারাপ তা বলা যাবে। কিন্তু সেটুকুও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিস্তারে কাজে লাগে নাই। কেন?
    কারণ,  কলোনি লুটেরা স্বার্থ আর বাণিজ্য স্বার্থ এক জিনিষ নয়। এনিয়ে আরও বিস্তারিত পরে আসছি।

    তাই গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কেন চালু হয় নাই সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে কথা নয়। কারণ, কলোনি লুটের কাজ ও স্বার্থ  এটা বাণিজ্য করতে আসাই নয়। মূলত একারণের যতদিন কলোনি অর্থনীতি টিকে ছিল (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত) ততদিন  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য তেমন বিকশিত কিছু ছিল না। তাতে সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই হোক বা পরে।
    তাই এটা ঠিক বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে নয়। বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য নিজেই ছিল অবিকশিত ও বাধাগ্রস্থ। এই বাধার পেছনের মূল কারণ বলেছি ‘কলোনি ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইউরোপজুড়ে একটা ক্যাপিটালিজম বিকশিত হয়েছিল ঠিকই; আর এর সময়কাল ধরতে পারি মোটামুটি ১৬০৭ -১৯৪৫, এই প্রায় সাড়ে তিনশ বছর। কিন্তু তা  অবশ্যই এক ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’। এটা কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত ক্যাপিটালিজম নয়, এমন কি তা বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করেও অর্জন করা নয়। এটা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে কলোনি দখল করে সেই বেপরোয়া লুটে ইউরোপে এনে জড়ো করা সম্পদ সংগ্রহে হাজির করা এরই এক প্রায় একমুখি এক  ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’।  এজন্য বলছি, আমরা যদি ১৬০৭ সালের পর থেকে বিচার করি মানে যখন থেকে সংগঠিত কলোনি দখল ব্যবসা একেবারে কোম্পানি খুলে তাতে আমাদের বেলায় বৃটেনে বিনিয়োগ ঢেলে অর্থনীতির প্রধান খাত হিসেবে শুরু হয়েছিল তখন থেকে পরের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর এই সময়কালকে কলোনি যুগ বলতে পারি।
    তবু আবার এ’সময়ের শুরুতে ধরে নেওয়া যায় যে, কোয়ালিটি স্টিল ও যুদ্ধজাহাজ তৈরির জ্ঞানবুদ্ধি আবিষ্কার ততদিনে চালু ও সহজপ্রাপ্য হয়ে গেছে। এককথায় ততদিনে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী বিনিয়োগের ব্যবস্থা দাঁড়িয়েও গেছে জাহাজ বহর কিনে চারদিকে কলোনি দখল করতে বেরিয়ে পড়া।

    পরের তিন-সাড়ে তিনশ’ বছর ইউরোপ এইভাবেই কলোনি দখল ব্যবসায় লিপ্ত থেকেই কাটিয়েছিল। তবে তাতে এমন দখলদার কোম্পানিগুলোর পরস্পরের মধ্যে লড়াই প্রতিযোগিতার ফলে কেবল যতটুকু যা পরিবর্তন এসেছিল। যেমন প্রথমত, কোম্পানিগুলোর লড়াই ও প্রতিযোগিতা আর শেষে তা আর কোম্পানিগুলোর মধ্যে না থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে লড়াই ও প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর তাতে একেকটা কলোনি লুটেরা কোম্পানি বা তার নিজ দেশ একেকটা মহাদেশে শক্তিশালী ফোকাস করে নিজেকে গড়ে নিয়েছিল। যেমন প্রথমে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশের সংখ্যা সীমিত হয়ে যায় কেবল ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস এই পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে। তাও আবার তাদের লড়াই ও প্রতিযোগিতায়ও নিজেরা তারা  মহাদেশে ভাগ হয়ে যায়। যেমন, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস কলোনি দখলদার কোম্পানি নিজেদের নিবদ্ধ করে কেবল ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশের মধ্যে। আর এদিকে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ব্রিটিশ আর ফরাসি কলোনি দখলদার কোম্পানিগুলো নিজেদের নিবদ্ধ করেছিল। আর ডাচ কোম্পানি নিজেদের জড়ো করেছিল ইস্ট এশিয়ায় যেমন ফিলিপাইন বা ছোট কোন দ্বীপে।

    এজন্যই বলেছি,  কলোনি দখলদারী যুগ শুরু হবার আগে, মানে মোটামুটি ১৬০৭ সালের আগের দুনিয়ায় দেশ-রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরস্পরকে তেমন চিনত না। অন্য ভাষায় বললে, মূলত যোগাযোগ ছিল না। ফলে বিনিময় বাণিজ্য-সম্পর্ক অনেক দূরের কথা ছিল। ফলে কলোনি দখলদারী শুরু হলে এর মাধ্যমে এই প্রথম তাদের মধ্যে যোগাযোগ ঘটে তবে সেটা এক কলোনি-সম্পর্ক, এটাই তৈরি হয়। এটা ঠিক বাণিজ্য সম্পর্ক একেবারেই নয়। যেমন আজকের দিনের মত (১৯৪৫ সালের পরে) আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে যা বুঝায়, সেটা কখনই তৈরি হয়নি।
    এর পিছনের মূল কারণ বলেছি, সম্পর্কটা যেখানে লুটের সেখানে দেশ-রাষ্ট্রের পরস্পরের মধ্যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক হতে পারে না। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটা এক পক্ষীয়। আর যেটা হল, কলোনিকৃত দেশ থেকে সম্পদ ও পুঁজি-পণ্য পাচার (উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার)। ফলে এটা ঠিক বাণিজ্য না, তবে সম্পদ পাচারের সম্পর্ক।

    কমিউনিস্ট চোখঃ
    এখানে আরো একটা মজার অবজারভেশনের কথা বলা যায়। কোনো কমিউনিস্ট চোখ কখনো বাণিজ্য নিয়ে বুঝাবুঝিতে আগ্রহী নয়। বরং যা নিয়ে সে আগ্রহী তা হল, উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার নিয়ে। তাই আসলে সে নিশ্চিতভাবে বলতেও পারে না যে বাণিজ্য করা কী হারাম, না হালাল বলবে। ব্যবসা বা মুনাফা করা নিয়েও তাদের একই দ্বিধা। তবে মুনাফা নিয়ে সম্ভবত তারা প্রায় নিশ্চিত যে, এটা প্রায় সারপ্লাস চুরি করার মত। তাই এটাকে তাদের চোখে হারাম বা অগ্রহযোগ্য মানতে দেখা যায়। তাই শেষ বিচারে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য জিনিসটা তাদের চোখে অননুমোদিত বা অনাগ্রহের বিষয় হয়ে আজও থেকে গেছে। অথচ দেশ-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য মানেই তো পণ্য বিনিময় লেনদেন এবং সব ধরনের বিনিময় ভাষা, ভাব-ভালোবাসাসহ সবকিছুর বিনিময়ের শুরু এখান থেকেই। আর সর্বোপরি এটাই সবচেয়ে দক্ষ, মানে কম শ্রম খাটিয়ে নানান পণ্য পাবার পথের উপযুক্ত ও একমাত্র উপায়; কিন্তু বাণিজ্য নিয়ে নিশ্চুপ থাকলে এর কোনো সম্ভাবনা নাই। তবে সার কথাটা হল, কলোনি যুগের প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক তাই দুনিয়ায় তেমন বিস্তৃত হতে পারে নাই, মূলত সেটা কলোনি যুগ বা একপক্ষীয় সম্পর্কের কারণে। তবুও একটা খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য চালু ছিল। যদিও তা আবার কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত কার্যকর ছিল। আমরা এখন সেপ্রসঙ্গে যাব।

    কিন্তু কীভাবে তা বোঝা গেল যে “খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য” চালু ছিল? এর ভালো প্রমাণ আছে কী?
    হ্যাঁ আছে। ‘রথশিল্ড ব্যাংক’ [Rothschild bank]। এটা মূলত জার্মানির এক পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ময়োর আমশেল রথশিল্ড (Mayer Amschel Rothschild) যার জীবনকাল (১৭৪৪-১৮১২)। তিনি ইউরোপের অন্তত পাঁচ বড় শহরে তার সন্তানদের দিয়ে ব্যাংকের শাখা খুলে পুরা ব্যবসাটা পরিচালিত করতেন। আর জর্মানিতে নিজে বসে সেগুলোর সমন্বয় করে আসলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন  এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা। মানে ইউরোপের একমাত্র প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা; কিন্তু সীমিত পণ্য-বিনিময় বা সীমিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

    মূল সম্পর্কটা হলো, আসলে মুদ্রা মানেই কোনো না কোনো দেশ-রাষ্ট্রেরই মুদ্রা। দেশের ভেতরে বিনিময় ওই একই মুদ্রার মাধ্যমে ঘটে থাকে, আর তা সহজও; কিন্তু আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় হতে হলে তা কোনো এক দেশীয় মুদ্রায় করা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে সবার আগে আন্তঃরাষ্ট্র মুদ্রাগুলোর মধ্যে ‘বিনিময় যোগ্যতা’ থাকতে হয়। আর বিনিময় যোগ্য হওয়া মানে সবার আগে তাদের ‘বিনিময় হার’ জানতে হয়; বা বলা যায় সাব্যস্ত হতে হয়। যার সোজা মানে হলো, কেউ বিনিময় হার সাব্যস্ত করে দিতেই পারে, কিন্তু তিনি বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থার হতে হবে। তবেই তা কাযর্কর ও এর এই বিনিময় হার অর্থপুর্ণ হবে!

    ঠিক যেমন মুদ্রা মানেই আসলে আস্থা, বিশ্বাস। যেমন আমাকে কেউ একটা ১০০ টাকার নোট দিলে, যদি আমি নিশ্চিত হই সেই নোটটা এরপরে অন্যকে দিলেও অনায়াসে এটাকে ১০০ টাকার নোট বলে সে গ্রহণ করবে- তবেই আমি তা নিব। ঠিক যেমন যদি রটে যায় যে একশ টাকার নোট ব্যাপক নকল হচ্ছে, তাহলে ব্যাংক থেকে আসা নয়া নোটও বাজারের কেউ আর নিতে চাইবে না বা দ্বিধা করবে।

    সেকালে ইউরোপের এই আস্থাভাজন বিশ্বস্ত লোকটাই হয়ে উঠেছিলেন আমশেল রথশিল্ড। প্রতিদিন সকালে তিনি ওই দিনের ইউরোপের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার টানিয়ে দিতেন। কিন্তু সেটা কী কাজে লাগত? কেউ ধরা যাক জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে এসে কোনো পণ্য কিনে তার দেশে গিয়ে বিক্রির ব্যবসায়ী। তাহলে তিনি বিনিময় হার জেনে সেই পণ্যের পাউন্ডে দামের তুল্য পরিমাণ জার্মান মার্ক পরিশোধ করে কিনতে পারতেন। তবে রথশিল্ড ব্যাংকের কারণে একমাত্র বিনিময় হার জানা থাকাতেই এই বিনিময় সহজেই সম্ভব হত।

    কিন্তু রথশিল্ড নিজে জানতেন কীভাবে যে আজকের বিনিময় হার কী রাখতে হবে? তার পদ্ধতি ছিল সোজা। সেকালে যেকোন দেশের মুদ্রা বলতে যে পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপা হবে তা ছাপার আগে সমমান পরিমাণ সোনা ভল্টে জমা রাখা হত। যাতে সত্যি সত্যিও নোটের বাহক চাইলে সমপরিমাণ আসল সোনা তাকে দিয়ে দেয়া যায়।  কথা আরো আছে। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক বলতে ধারণাটা আসে ১৯৪৫ সালের পর থেকে।  ফলে ব্যাংক ব্যবসা করত একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানী। ব্যবসায়ীরা সরকারকে কখনও বাজার ব্যবস্থায় ঢুকতে দেয় নাই বা দেওয়ার সাফাই খুজে পায় নাই।  এসবই শুরু হয়েছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু বিশেষ করে প্রত্যেক সদস্য দেশে একটা করে কেন্দ্রীয় ব্যংক থাকার প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে।  যেমন ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড” এক প্রাইভেট ব্যাংক ছিল। একে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রিয় ব্যাংক করতেই সরকার এই প্রথম এই ব্যাংককেওধিগ্রহণ বা মালিকানা নিয়ে নিয়েছিল। এর আগে সরকারের অনুমতি নিয়েই ওই ব্যাংক মুদ্রা ছাপাত। ফলে চাহিবামাত্র সোনা ফিরিয়ে দিবার দায় ছিল ঐ ব্যাংকের। এজন্য ঐ মুদ্রাব্যবস্থাকে বলা হত, “গোল্ড ব্যাকড মানি”। অর্থাৎ যে ব্যাংক কাগুজে নোট বা মুদ্রা ছাপাবে সেইই কোন মুদ্রার হোল্ডার বা ধারক মালিক তিনি সোনা ফেরত চাইলে তাঁকে তা দিতে বাধ্য থাকত।
    যেকথা বলছিলাম, মুদ্রা গোলড় ব্যাকড মুদ্রা হত বলে দেশের সোনার প্রবেশ বা বের হয়ে যাওয়া এর একাউন্টিং ভিত্তিক ছিল এই মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ ব্যবস্থা।  তাই   প্রতিদিন সকালে তিনি খবর নিতেন গত দিনে ধরা যাক পাউন্ডে মোট কেনার চেয়ে বিক্রি কত কম/বেশি হয়েছে। বিক্রি বেশি হওয়ার অর্থ হলো, তাহলে অন্য দেশের বেশি সোনা ইংল্যান্ডে এসে ঢুকেছে। তাই এটা পরদিন সমান করতে গেলে  যার অর্থ বিক্রি কমাতে হবে। বিক্রি কমানো মানে অন্যদেশের কম সোনা এসে ইংল্যান্ডে আগের দিনের চেয়ে কম ঢুকা। অর্থাৎ এটাই ছিল তার পরদিন হার সমান করার উপায়। এখন কতটা কমাবেন বা বাড়াবেন এটা অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্ধারণ করে নিতেন। আর তাঁর পাঁচ ছেলের কাজ ছিল ওসব দেশের মুদ্রার হার নিয়ে একই খবরা খবর পিতার সঙ্গে দেয়া-নেয়া করা। এভাবে একটা আস্থা-বিশ্বাসের ওপর মানে রথশিল্ডের ভরসায় সীমিত আকারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সেকালে চালু ছিল।

    কিন্তু ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পর থেকে এই ব্যবস্থাটাও আর টিকে থাকতে পারেনি। যদিও পেছনের মূলকারণ যুদ্ধ-বিশৃঙ্খলা ঠিক তা নয়। মূল কারণ, মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ যুদ্ধে খরচ যোগাতে বা মিটাতে গিয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করেছিল। যে কারণে, নিজ দেশেই সোনা ভল্টে রেখে সমপরিমাণ নোট ছাপানোর রেওয়াজ বজায় থাকেনি, মানে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ বলে য়াসলে কিছু বজায় না থাকা শুরু হয়েছিল।  পরিণতিতে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো মুদ্রা বিনিময় হার নির্ণয়ের রথশিল্ডের ব্যবস্থাটাও আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে অকেজো হয়ে গেছিল। আমরা মনে রাখতে পারি  মুদ্রাস্ফোত শব্দটার খাস মানে হল  সোনা আগাম ভল্টে না রেখে মুদ্রা ছাপানো। যুদ্ধের খরচ মিটাতে ইউরোপের সব মাতবর দেশই এভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে ছিল। এরই ফাইনাল প্রতিক্রিয়া হল আমেরিকার। ১৯৩৩ সালের ২০ জানুয়ারি এফডিআর [Franklin Delano Roosevelt ] বা  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রথমবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। শপথের পরেই তার প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ডলারের মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো। তার যুক্তি ছিল সারা ইউরোপ ঘটিয়েছে তাই তাদের সাথে সমান করতে তার এই সিদ্ধান্ত।  তিনি আগের এক আউন্স সোনার দাম ছিল ২৫ মার্কিন ডলার। তা বাড়িয়ে তিনি করেন ৩৫ ডলার। পরে ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার সমও গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা চালু ছিল আর ১ আউন্স সোনা ৩৫ ডলারের এই রেটই বজায় ছিল।  দুনিয়ায় গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় আসলে ১৯৫৮ সালে যা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থাকে পুণঃজন্ম দেয়া হয় ১৯৭৩ সালে। সে প্রসঙ্গ আলাদা, তাই এখানেই ইতি।
    ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্দ্ধধে যে রথশিল্ডের ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও এটা আর কখনো ফিরে কার্যকর হতে পারেনি। বরং কলোনি ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ায় আর ইউরোপের প্রবল অনুরোধে আমেরিকার নেতৃত্বে রথশিল্ডের কাজটিই আরও ব্যাপকভাবে করতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান গড়ে নেওয়া হয় ব্রেটেনহুড সম্মেলনে ১৯৪৪ সালে। দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের শুরু হয় তখন থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে কেন্দ্র করে।

    লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর  ০২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে প্রিন্টে   “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরের ফারাক”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

     চীন-ভারত সংঘাতে

    বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

    গৌতম দাস

    ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3PL

    _

    [সার-সংক্ষেপঃ   চীন-ভারত সামরিক সংঘাত আসন্ন কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কার পক্ষ নিবে? চীন না ভারতের পক্ষে? নাকি নিজেরই একটা পক্ষে? সম্প্রতিকালে এসব নিয়ে ‘অনুমিত’ দৃশ্যকল্প এঁকে নিয়ে এর আলাপ তুঙ্গে নিয়েছে মূলত ভারত। আর তাতে ভারতের মন রক্ষার্থে সাথে তাল দেয়া শুরু করেছে আমেরিকাও। এনিয়ে এদিক সেদিক, কার মনে কী আছে তা নামে-বেনামে এমন প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। আমেরিকা যদিও ভাব ধরেছে যে সে ভারতকে সাপোর্ট করতে নাকি এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করে নাই। আমেরিকা বরং নাকি “ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশ দেখা” ছেড়ে দিতে বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা নিজের এক পররাষ্ট্র ডেস্ক সাজিয়েছে যেখান  থেকে এখন বাংলাদেশ ইস্যু দেখাশুনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে – এসব চাপাবাজি-মূলক বক্তব্য এক সাক্ষাতকারে প্রকাশ করেছে। অথচ ফরেন পলিসি পত্রিকার এই আর্টিকেল উলটা সাক্ষ্য দেয় যে খাসিলত বদলায় নাই, বদলাবেও না।
    কিন্তু এসময়ে হঠাত চীন-ভারত সংঘাতের কথা উঠছে কেন? এটা আমেরিকা বা ভারত স্পষ্ট উচ্চারণ না করে এড়িয়ে যাচ্ছে যদিও তা করা হচ্ছে “যেন সংঘাত আসন্ন” এমনটা (given) ধরে নিয়ে। তবে ভারত পরোক্ষে এক আর্টিকেল ছাপিয়ে তা বলেছে। সেখানেও আগাম (given) ধরে নেয়া ঘটনাটা হল ভারত তো জীবনেও তিস্তার পানি দিবে না ফলে এক চীনা তিস্তা প্রকল্প যেহেতু বাংলাদেশ ভাবছে; তা ভাববেই স্বাভাবিক। সেটা হলে এর উলটা প্রভাবে ভারত কী কী হারাবে তা নিয়ে এক এজেন্সি রিপোর্ট ছাপিয়েছিল আমেরিকার ভোয়া বাংলায় মতিউর রহমান চৌধুরী। যেখানে ভারতের পক্ষে এক “ছায়া-ব্যক্তিত্ব”  অংশ নিয়েছিল। যেখানে বেপরোয়া ভয়াবহ সব কথা লেখা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশকে ভারতের সাথে চুক্তি করতে হবে যাতে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে সামরিক যান চলাচল করতে পারে। যেমন লিখেছে – “… বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করা, যে চুক্তিবলে সংঘর্ষের সময় সামরিক, বেসামরিক এবং ট্রাফিক ক্যারি করা যাবে”। মানে এক ন্যাংটা খোকার মামা বাড়ির আলাপ আর কাকে বলে!!!
    এমন এসব এজেন্সী ততপরতায় বাংলাদেশ ভরে গেছে। ডেইলি স্টার এমন  আরেক রিপোর্ট এখানে। এক পুরানা এজেন্ট সিপিডি (CPD) এবার ভারতের আরআইএস (RIS) নামের এক ছুপা থিঙ্কট্যাংকের সাথে যৌথ সেমিনার করেছে ঢাকায়।  ছুপা এজন্য যে এরা একদিকে দাবি করছে তারা স্বাধীন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান। অথচ এর পরিচালনা পরিষদ বা গভর্ণিং বডিতে দেখা যাচ্ছে  ভারত সরকারের পাঁচ মন্ত্রণালয়ের সচিব (পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি) এবং সাথে আর এছাড়াও আরএসএস নেতা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ডিরেকটরেই পরিপুর্ণ।  আর এমন RIS এই প্রতিষ্ঠানের সাথে CPD যৌথভাবে বাংলাদেশের ৫০ বছর পালন করেছে ঢাকায়! কী করে?? সিপিডির রেহমান সোবহান ভারতকে করিডোর দেওয়ার পক্ষের এজেন্সীর হয়ে ২০০৭ সাল থেকে সোচ্চার এবং বিরোধীতাকারীদের মুর্খ ও অশিক্ষিত বলেছিলেন তিনি। আবার এখন   ভারতের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছু লোক অতি উতসাহে আলোড়ন তোলার চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু তা অনাগ্রহে গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বরেই আটকে থেকে যাচ্ছে।

    আসলে সিপিডি  এমনই ভারত অনুগত যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা উঠায় কিন্তু সারা ভারতে গত আট বছর ধরে একটা প্রবল হিন্দুত্ববাদের যোয়াড় বইতেছে আর ভারতের এই বন্ধু হওয়া সত্বেও বাইডেন এই প্রসঙ্গে কথা তোলা ছাড়ে নাই। অথচ আমাদের সেকুলার রেহমান সোবহান সাহেব মুখে কুলুপ দিয়েছেন; কি জানি মহাজন রাগ করে নাকি!!  এমন যতই আনুগত্য [subordination] বা অধীনস্ততা দেখাক এথেকে ভারত কোন কিছু অর্জন করতে পারবে না।

    তবু নিশ্চিত বলা যায় যত  প্রচেষ্টাই নেয়া হোক, চীন-ভারতের কোন কল্পিত যুদ্ধে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না। এর কোন সুযোগই আর নাই। বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ তো নিবেই না এডিশনালি সাথে বাংলাদেশের নিজের সার্বভৌম বুঝের কোন অবস্থানও থাকতে পারে।  এমনকি তা হাসিনার নেতৃত্বের বাংলাদেশেও না।  মনে রাখা যেতে পারে, কোন শর্তে বা চাপে ফেলেও বাংলাদেশকে কোনদিকে নেওয়ার দিন শেষ, সেই পরিস্থিতিটাই লুপ্ত  হয়ে গেছে। এটা ভারত যত তাড়াতাড়ি  বুঝবে ততই সেটা ভারতের জন্য মঙ্গল হবে। তবে এর আগে নানা গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বর অথবা বহু চাটুকার বা এজেন্টদের ততপরতা  আমরা চলতে দেখব অবশ্যই। আর হাইকমিশনকেও আমাদের মিডিয়া কিনার জন্য আরো বহুদিন ফান্ড ঢেলে যেতে দেখব। ]

    DON’T LOOK AT BANGLADESH WITH INDIAN PRISM : USA MEDIA

     

     

    ‘ফরেন পলিসি’ (Foreign Policy Magazine), ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আমেরিকান পত্রিকা; দীর্ঘ দিন ধরে এটা মূলত ডিপ্লোমেসি ও রাজনীতিক ইস্যু নিয়ে চর্চার এক ম্যাগাজিন। আর বলাবাহুল্য, এ’কাজ তারা আমেরিকান স্বার্থের দিক থেকে তাকিয়ে করে থাকে। আর বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে এই ম্যাগাজিনের অনুসৃত লাইন যাই থাক, চলতি বছর থেকে এটা এখন বাইডেনের বড় ‘একটিভ সাপোর্টিং’ পত্রিকা; বিশেষ করে সাউথ এশিয়ার জন্য আর তা কাভার করার দিক থেকে। মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] ‘উড্রো উইলসন সেন্টার’ [Wilson Center] এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ডেপুটি প্রোগাম ডিরেক্টর ও সিনিয়র ফেলো। তিনি এখন ফরেন পলিসি পত্রিকায় নিয়মিত এক সাপ্তাহিক ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’ লেখার তত্ত্বাবধান ও প্রকাশ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত যেটা আসলে বাইডেনের সাউথ এশিয়া নীতির ছাপে ও পক্ষে এই অঞ্চলের বার্নিং ইস্যুগুলোতে তাদের অবস্থান মেলে ধরে। আর তাতে এ অঞ্চলের খুঁটিনাটি ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের মনোভাব সম্পর্কেও কিছু  আঁচ পাওয়া যায়। এছাড়া অনেক সময় এ’অঞ্চলের মিডিয়াগুলো কী লিখেছে তার ছোটখাটো রিভিউও দেখতে পাওয়া যায় এই ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’। অর্থাৎ বাইডেনের পক্ষেরই যেন এটি একটা আলাদা ভার্সন কিন্তু যারা বাইডেন প্রশাসনের সাথে অ-সরকারিভাবে ও ইনফরমালি যুক্ত।

    বুড়া সিংহ আমেরিকাঃ
    এদিকে চলতি শতক থেকে প্রায়ই আমেরিকান প্রশাসনকে অনেকে ‘বুড়া সিংহ’ বলে থাকে। টানা পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা দুনিয়াকে ভালো-মন্দ যাই হোক একভাবে দাবড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু তার সেসব বহু সক্ষমতাই আজ গত হয়েছে; সোজা নাই হয়ে গেছে; বিগত যৌবন হয়ে গেছে। ফলে যেন এটা এখনো সিংহ বটে তবে চামড়া ঢলে পড়া বুড়া সিংহ হয়ে গেছে।

    গত ১৯৪৫ সালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে একটা ভাল ‘জংশনের বছর’ বলা যায়। এই জংশন হল, এক দিকে  বিশ্বযুদ্ধে দুনিয়ায় ভেঙে পড়া পুরনো অসংলগ্ন [discrete] রাজনৈতিক অর্ডার মানে যেটুকু রাজনৈতিক সিস্টেম ছিল তা ভেঙ্গে, পরে ওর অবশিষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো ক্রমেই সে ত্যাগ করছে আর অন্যদিকে নতুন এক অর্ডারে এক সুষম সংগঠিত ও গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে দুনিয়া পুনর্গঠিত করে  নিজে চলতে শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। নতুন সেই গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে এর  গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার বা এই নয়াবিধি ‘ব্যবস্থা’ শুরু হচ্ছে মূলত জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্রে রেখে [এটাই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ড্রিম]  এবং অন্তত তিনটা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে। এই বিগত অর্ডারটাকে যদি বলি কলোনি যুগ বা কলোনি ক্যাপিটালিজমের কাল তবে, নতুন যা সেসময়ে গড়ে উঠছে তা আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম।  যদিও সোভিয়েত কমিউনিজম, যা তখন ইতোমধ্যে ২৮ বছর বয়স্ক, সে এটা সরাসরি স্বীকার করতে চায়নি। কেবল জাতিসঙ্ঘ গঠনের সময়ে নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক থাকে তা বুঝে নিয়ে বাকি ব্যাপারে  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তালে তাল দিয়ে গেছে। অর্থাৎ   আমেরিকা যা করে করুক, পরোক্ষে এভাবে মেনে নিয়েছিল। আর অন্য দিকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যাপক কোন বাণিজ্য যেটা ১৯৪৫ এর আগের দুনিয়ায় যা কোনদিন ছিল না  তা এবার পূরণে এক বিশাল গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করতে বা তার নিয়ন্ত্রক বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এদের জন্ম দেয়া হোক;  আর  তা আমেরিকা গড়ে তুলুক এটাই ইউরোপ মনেপ্রাণে চেয়ে ও সাপোর্ট করে গেছিল। তাই আমেরিকা এভাবে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু করে নিতে পেরেছিল।
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের টানা ২২ দিনের জন্মসভার হোটেলে বসবাসে সোভিয়েত ইউনিয়নও আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থেকেছিল; অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেলে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চাঁদা দিয়ে সদস্যপদ নেয় নাই বা নিতে আসে নাই। আবার কোনো বাধাও দেয়নি। কেন কী হয়েছিল, কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন সিদ্ধান্ত তা প্রকাশ্যে, স্টালিন তখনো জীবিত ও ক্ষমতাসীন- তা সত্ত্বেও কোথাও তিনি তা জানাননি। লিখিত কিচ্ছু নেই। তবে আমেরিকা তার নয়া গ্লোবাল অর্ডার নিয়ে  ঠিকই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে টানা পঁচাত্তর বছর পরে আমেরিকা এখন এক বুড়া সিংহ যার যৌবন কেটেছে ‘রুস্তমি’ করে। যখন সে কোন কিছু চেয়েছে জানলেই তখন অনেক কিছু হয়ে যেত। সেসব দিন আর নাই। এর বড় কারণ এখন আমেরিকা কাউকে দুর্নীতির  অজুহাতে ধরে অনুগত করতে বেকায়দায় ফেললে এটাই সুযোগ হয়ে উঠে – এই সুযোগে চীন বিপুল অনকাঠামো নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকই একমাত্র ও একচেটিয়া বিকল্পহীন সেসব দিন আর নাই। ওদিকে ইতোমধ্যে আমেরিকান আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দিবে সেই সক্ষমতাও শুকিয়ে আসে।

    চলতি শতক বা দুই হাজার সাল থেকে আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে ঢলে পড়ছে তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। বিশেষ করে আফগানিস্তানে ফলহীন যুদ্ধে একতরফা অর্থ ঢালার পর থেকে আরো মারাত্মকভাবে। আর এর বিপরীতে চীনের উত্থান এবং সমৃদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন সেই নেতৃত্বের জায়গা নিতে উঠে আসা, সেটাও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।
    মজার কথা হলো, ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) পর্যন্ত যত প্রেসিডেন্ট তারা কেউ স্বীকার করেননি যে, চীন উঠে আসছে, আমেরিকা বুড়া সিংহ হচ্ছে। এই বাস্তব সত্য স্বীকার না করাটাই যেন আমেরিকান সব প্রশাসনের অফিসিয়াল অবস্থান। একমাত্র কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায় জিবিগনিউ ব্রেজনিস্কি যিনি চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে প্রথম (১৯৭৮) পারস্পরিক স্বীকৃতির রূপ দিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন, তার বেলায়। যখন তিনি ছিলেন (১৯৭৭-৮১) প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA)। তিনি খোলাখুলি চীনা উত্থান প্রসঙ্গে নিজের বইয়ে লিখেছেন। এমনকি ওবামাও আমেরিকান নেতৃত্ব আরো বজায় থাকবে কি না এ নিয়ে সেকালেই যেসব প্রশ্ন উঠে গেছিল তা তিনি মানেন না দেখাতে উলটা দাবি করে বেড়াতেন যে, আমেরিকাই আরো বহুদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে থেকে যাবে।

    কিন্তু কেন এখানে চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা আমেরিকান বুড়া সিংহ হয়ে যাওয়ার স্বীকার-অস্বীকার নিয়ে কথা তুলছি?
    কারণ উপরে উল্লিখিত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে এবারের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’ কুগেলম্যানের সাথে যৌথভাবে লেখা একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। ওতে সহলেখকের নাম আনু আনোয়ার [Anu Anwar], জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির যিনি পিএইচডি প্রার্থী। আর ঐ লেখার শিরোনাম হল “আমেরিকার বাংলাদেশকে নিয়ে বাজি ধরা উচিত” [America Should Bet on Bangladesh]। আর উল্লেখ্য যে এ’লেখায় চীনের চেয়ে আমেরিকা অক্ষম হয়ে পড়েছে এর স্বীকারোক্তি করা হয়েছে। সেসব প্রসঙ্গে ঢুকব এখন।

     কিন্তু লেখার প্রসঙ্গ কেন এমন?
    গত মাসে, মানে নভেম্বরের মাঝমাঝি এক আমেরিকান ডেপুটি সহকারী মন্ত্রী (সাউথ এশিয়া) কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কোনো এক বহুরাষ্ট্রীয় সভায় যোগ দিতে। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি ডেইলি স্টারকে এক সাক্ষাৎকার দেন যার প্রসঙ্গ হল – তিনি দাবি করেন, আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ আলাদা গুরুত্ব লাভ করেছে, যে কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এখন থেকে আর ভারতের সাথে একই ডেস্ক থেকে দেখাশোনা করা হবে না। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশকে আর ‘ভারতের চোখ দিয়ে’  দেখা আমেরিকা  বন্ধ করেছে। তাই কুগেলম্যান ও আনু আনোয়ারের যৌথ লেখাটা হল, সেই বক্তব্যের গুরুত্ব আরো বিস্তারিত একটা সাফাইয়ে তুলে ধরা।
    ওই যৌথ লেখা নিয়ে কোন সেন্সিবল বাংলাদেশের যে প্রতিক্রিয়া হবে সবার আগে তা শিরোনাম আকারে বলে রাখি। বাস্তবে ফরেন পলিসির এই আর্টিকেল ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকার দেখার অভ্যাস ত্যাগ করা দূরে থাক, বরং আরো পোক্তভাবে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থের চোখ দিয়েই বাংলাদেশকে দেখেছে। মানে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থ বাংলাদেশ কতটা দেখবে অথবা না, সেই আলোচনাই ওখানে করা হয়েছে।

    আগাম অনুমান  
    কোন লেখা শুরু করার আগে লেখকের কিছু আগাম অনুমান সেখানে থেকে থাকে। সেই অনুমানটা আমরা এখানে দেখব। যেমন আনুদের লেখাটা সে অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা এখানে আমরা পাব। আনু লিখছেন, “ভবিষ্যতের কোনো সঙ্কটে বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নিতে হয় অথবা  কোনো নিজস্ব ভূমিকায় হাজির হয়, তা সামরিক অথবা কূটনীতিক যাই হোক না কেন, তাহলে তা এঅঞ্চল বিপদে পড়ার মত ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে [If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region. অর্থাৎ মূলকথা বাংলাদেশের নিজের ভুমিকা নেওয়াটাই ভারতের জন্য হবে মারাত্মক – এটাই তিনি বলতে চাইছেন।

    “If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region.”

    এখানে একটি কথা বলে রাখি। এ লেখাটায় জিও-পলিটিক্যাল [geopolitical] এই অস্বচ্ছ শব্দটা যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে একেবারে বিরক্তির পর্যায়ে।  এমনিতেই যারা ‘জিও-পলিটিক্স’ শব্দ ব্যবহার করেন তাদের ওপর ভীষণ বিরক্তি লাগে। মনে হয় এসব মানুষের যখন কোনো কিছু বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতা টের দেয়, তখন এরা সোজা সেখানে জিও-পলিটিক্স শব্দটা ব্যবহার করে পার পেতে চায়। ফলে এক অর্থহীনতা তৈরি করে। অথচ তারা কোথাও কোন রাষ্ট্রের (কূটনৈতিক) সিদ্ধান্তগুলো বা ততপরতার কারণে যখন  তার স্থানীয় পড়শি রাষ্ট্রের উপরে এর প্রভাব পড়া শুধু নয়, তাতে শুধু আঞ্চলিকও নয় একেবারে গ্লোবাল পর্যায়েও প্রভাব পড়ে – এরা সেই গ্লোবাল প্রভাব কথাটাকে বুঝতে বুঝাতে না পেরে সম্ভবত সেটাকে “জিও-পলিটিক্স” বলে চালাতে চেয়ে থাকে।
    এর পেছনের মূল কারণ দুনিয়ায় ক্রমেই গ্লোবাল হয়ে ওঠা অর্থনীতি। এতে সব কিছুই এখন গ্লোবাল; মানে কোনো কিছুই আর স্থানীয় থাকছে না যেহেতু বাণিজ্য এখন গ্লোব-জুড়ে মানে গ্লোবাল হয়ে উঠেছে; ফলে পণ্য-বিনিময়ও গ্লোবাল রূপ নিয়েছে। তাই একটি ভূগোলে (জিও) কিছু একটা ঘটলে এর প্রভাব-পরিণতি স্থানীয় থাকছে না, বরং স্বতঃই তা গ্লোবাল হয়ে উঠছে।

    ঠিক আছে, তাহলে লেখক এখন কী নিয়ে উদ্বিগ্ন? বাংলাদেশের সামর্থ্যবান হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন?  সেটাই বা কেন? কারণ প্রধান প্রশ্ন, তা হলে এর মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? বাংলাদেশ সামর্থবান হলে যদি ভারতের ক্ষতি হয়ে যায় তার মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? এবং কোথায়?

    আসলে এখানে আমেরিকার সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই। স্বার্থটা মূলত ভারতের আর এটিই আমেরিকার উদ্বেগের কারণ। এই হলো আমেরিকার ধরে নেয়া অনুমান বা নিজের স্বার্থসংক্রান্ত বুঝ। মানে আবার বোঝা যাচ্ছে তা হলে, আমেরিকার বাংলাদেশের জন্যও কোনো উদ্বেগ নেই।

    নিজের নয়, কিন্তু ভারতের স্বার্থ নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন কেন? জবাব হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে যা কিছু ভারতীয় স্বার্থ, এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

    তাহলে দাঁড়াল যে, এই আর্টিকেলটা বাংলাদেশ নিয়ে মনে হলেও আসলে এটা ভারতের স্বার্থরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমেরিকার পক্ষে লেখা এক আর্টিকেল। তার মানে, সেই একই পুরান কথাটাই হল যে, এখানেও আসলে আমেরিকার ভারতীয় প্রিজমের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছে – সেই পুরনো অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। সেই ২০০৭ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকার পুরনো কায়দাটাই।
    তা হলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ‘বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নেয় মানে নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়,…তো খারাপ ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে’  – এর মধ্যে সারকথাটা হল, বাংলাদেশ যদি চীনের পক্ষ নেয় বা আরও নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় – এসব ক্ষেত্রে এক উদ্বিগ্ন আমেরিকাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    অথচ কথাটা একেবারেই সোজা।  চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ইস্যুতে এমন দুটোর মধ্যে বাংলাদেশ ঠিক কী করবে তা যাই করুক সেটা তো বাংলাদেশের একান্ত সিদ্ধান্ত এবং স্বভাবতই বাংলাদেশ চাইবে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিজের কাছে রেখে দিতে। এমনিতেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সঠিক অবস্থান হবে কোন দুপক্ষের বিবাদে কোনই পক্ষ না নেয়া; এ বিষয়ে তাদের উভয় থেকে দূরে থাকা।

    আর এখানে আবার আমেরিকা চাচ্ছে আমরা যেন ভারতের পক্ষে থাকি, যেটা অ্যাবসার্ড ও অলীক। আর সেটা কোন ভারত বা কোন আমেরিকা? যে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে?  আহা রে কিউট বাবুটা! সত্যি এ এক অদ্ভুত আবদার!

    এ ছাড়া এই প্রসঙ্গে আরেকটা মজার দৃশ্যপট পরীক্ষা করা যাক। আসলেই কি চীন-ভারত কোনো সঙ্ঘাতে খোদ আমেরিকাই ভারতের পক্ষে দাঁড়াবে? যুদ্ধ করবে? সত্যি?  এটা তো সুখে কান্না চলে আসার মত বেবি!  আচ্ছা, দুই বছর আগে লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত সঙ্ঘাতে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়েছিল (যখনিকার ভারতীয় সৈন্যদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বা কান্নার দৃশ্যের ভিডিও নেটে প্রায়ই প্রকাশিত হতে দেখি আমরা), সেই উত্তেজনার সময়েও কি আমেরিকা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল? প্রশ্নই আসে না। আমেরিকা আসেনি। এমনকি আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে কোন সান্ত্বনাবাণী দানের কথাও আমরা জানি না। তাহলে? আমেরিকা আসলে কার পক্ষে? আর আমরা কোন পক্ষ নিব তা নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন হওয়া কী সাজে???  টু উ উ মাচ!

    এ নিয়ে ইদানীংকালের প্রশাসন, বাইডেন প্রশাসনের দুর্গতি আরো ভয়াবহ। একালের এই আমেরিকা এখন সব ব্যাপারে আসলে লিম্ব মানে ঝুলে থাকে, কোনো পরিস্থিতিতে কোন  দিকে নড়ে না। যেমন আমেরিকান (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) বা CAATSA আইনে কেউ রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইল কিনলে সেই রাষ্ট্রের উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হবে। সে বিচারে এমন মিসাইল কেনায় ভারতের উপরে অবরোধ আরোপ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা কী স্টাটাস অবস্থায় আছে কেউ ঠিক জানে না- ব্যাপারটা ‘লিম্ব’ হয়ে ঝুলে আছে।
    আবার ওদিকে তাইওয়ান নিয়ে অযথা খোঁচাখুঁচি ব্যাপারটা আবারো একেবারে ছেচড়ামোর পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। “এক চীননীতি” [One china policy] মানে হল তাইওয়ান আলাদা দেশ নয়;  বরং একই চীনা ভূখণ্ডের অংশ – এটা কোন রাষ্ট্র না মানলে সে রাষ্ট্রের সাথে চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করে না। সেই বিচারে ১৯৭১-৭৭ সাল পর্যন্ত নানান ইস্যুতে দীর্ঘ আপস আলোচনার পরে আমেরিকার এক চীননীতি মেনে নিয়েই চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে।
    এভাবেই দীর্ঘ পথ চলার পরে  ট্রাম্পের আমলে এসে তিনিই প্রথম এক চীননীতি মানি-মানি না টাইপের লিম্ব তৈরি  করেন। । শেষে এবছর গত  অক্টোবর মাসে এসে চীন তাইওয়ান ইস্যুতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলে বাইডেন এবার তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলেভানিকে দ্রুত চীনের সাথে বৈঠকে বসেই সোজা ১৯৭৮ সালের এক চীননীতিটাই বাইডেনের আমেরিকা এখনো বজায় রেখেছে বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন। এভাবে চীনের সব ক্ষোভ মিটিয়ে দিলেন। কিন্তু আবার গত দুই সপ্তাহ ধরে পুরানা চুলকানি! বাইডেন তার ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ এবার তাইওয়ানকেও রাষ্ট্র হিসেবে দাওয়াত করেছেন।  অথচ তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য নয় ঐ ১৯৭১ সাল থেকে। যখন থেকে সেটা কেড়ে নিয়ে মাওয়ের চীনকে আসল চীন বলে ভেটোসহ ঐ সদস্যের হকদার বলে মানা হয়েছিল। তাই মূল চীনাভুখন্ডের একচীন নীতি জাতিসংঘের চোখেও ভ্যালিড। এটা স্রেফ কোন গোয়ার্তুমি নয়। )  তাই আবার খামোখা টেনশন! অর্থাৎ এ কালের  বুড়া সিংহ  আমেরিকা  যে মুরোদ হারাচ্ছে তার আরেক প্রমাণ হল এসব ছেচরামো। এরই আরেক প্রকাশ হল, সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার ঝুলে থাকতে সবচেয়ে ভালো পারে!

    বাংলাদেশ কেন চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার দিকে ঝুঁকেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে আনু নিজেই বলছেন, “চীনের অল্প সময়ের ভেতর বিপুল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানো বা জোগাড়ের ক্ষমতা এবং তাও আবার তুলনামূলক অল্প কিছু শর্তে। যেটা নয়াদিল্লি তো বটেই ওয়াশিংটনেরও কম্ম নয়, তাদের এমন মুরোদ নেই” [Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.]”।

    “Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.”

    আমার মনে হয়, লেখক আনু আনোয়ারের  এত খোলাখুলিভাবে চীনের চেয়ে আমেরিকার অক্ষমতার কথা এই কঠিন সত্যকে প্রকাশ করা, কোনো আমেরিকান লেখায় আগে আসেনি। এ্ইটা বুড়া সিংহের নিজেকে বুড়া হিসাবে  এক আপন স্বীকারোক্তি!

    তবু লেখক এখানেই থামেননি। পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকাকে আবার তার যৌবন কালের মতো নয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে [By funnelling more investments into Bangladesh……]। কারণ একথাটা অবাস্তব তিনি জানেন। কিন্তু এটা বলা ছাড়া তার লেখাটাই দাড়ায় না, অর্থহীন হয়ে দাড়ায়।  সবাই জানে, আমেরিকার সে ‘ব্যবসা’ মানে যোগ্যতা চলে গেছে বহু বছর আগেই। তবু ‘গপ্প ফলিয়ে বেড়ানো’ আমেরিকা ত্যাগ করেনি। গত জি-৭’ বৈঠকে সবাইকে সাথে নিয়ে তারা নতুন উদ্যোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ আনবেন, যেটা নাকি আবার চীনা বেল্ট-রোডেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। কিন্তু এসবই গল্প যা এখন পর্যন্ত কোনো রকমের বাস্তব প্রকল্প হিসেবে শোনা যায়নি। তাই শেষে আনু নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘চীনের মতো দ্রুত আর বিশাল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানোর মুরোদ আমেরিকার নেই”।

    তাই সারকথায় ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের এই আর্টিকেলটা লেখা অথবা বাংলাদেশের আলাদা ডেস্কের কথা বলে লোভ দেখানো  – এসবই আসলে লিপ সার্ভিস বা কথার কথা। সিংহ বুড়া হয়ে গেলে তারা আর কী করে?  তবু তাদেরকে এসব চাপাবাজি করে যেতেই হয়। তাই এসব করেই চীনের বিরুদ্ধে “ভারত নাকি পরাশক্তি” একথা বলেই পরিচয় করিয়ে দিতে হয় আমেরিকাকে।

    খামোখা কূটনৈতিক শোডাউনঃ
    গত মাসের শেষ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদিকে আরেক চাপাবাজি চলবে, একই কারণে। মানে ফরেন পলিসির আর্টিকেলের সাথে ঢাকায় ভারতের কূটনৈতিক নড়াচড়া সম্পর্কিত ঘটনা ততপরতার কথা বলছি। যেমন, দোরাইস্বামীর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ, বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধনের ৭ ডিসেম্বরে ঢাকা সফর  –  আর এসবই আগামী ১৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে।

    “বাংলাদেশ ভারতের সৃষ্টি, ভারতেরই ফসল, কাজেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে যায় কী করে” – ভারত যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করে তখন অলক্ষ্যে এ খামোখা বয়ানটাই তার কূটনীতিকরা তাই মনে মনে আওড়াতে থাকেন। অতএব চীন-ভারতের কোনো সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ তো ভারতেরই, ভারতের প্রভাব বলয়ের জবাইযোগ্য এক নধর খাসি যেন!  কাজেই বাংলাদেশ আর যাবে কোথায়! এই দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় স্বার্থগুলো এসব বয়ানেরই জপ করতে থাকবে।

    কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, মানে কোন রিটার্ন কী আসবে? না, আসবে না। বরং ফলাফল একদম হবে শূন্য। এমনকি বর্তমান  হাসিনার বাংলাদেশও ভারতের পক্ষে যাবে না, মুভ করার সে সুযোগটুকুও নেই। বাস্তবতা এমনই। কিন্তু তাই বলে সে বাস্তবতার কথা আবার সরকারের দিক থেকে ভারতের কাছে মুখে উচ্চারণও করা হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফর উপলক্ষে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিডিয়াকে বলছেন, “আমি ঢাকায় থাকলে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে”। কাজেই কী পরিমাণ প্রাণহীনভাবে এ’দুই সপ্তাহ কাটবে, এখান থেকে অনুমেয়; অর্থাৎ কেবল মুখেই বলা হবে না যে, বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে নেই। আর কার্যত এটা ভারতেরও পরিস্কার করেই অজানা নয়। তা হলে ভারত চীনের কাছে তার ‘হবু ও কথিত’ শিলিগুড়ি করিডোর অথবা সাত রাজ্য হারানোর কথা যে লেখক আনু তুলেছেন, তার কী হবে?

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের দিগগজেরা আর কথিত ‘পরাশক্তি’ ভারত কী করে নিজেদের রক্ষা করবে, তা তো তাদেরই বিষয়। সাধারণভাবে বললে, এটা তাদের জবরদস্তিতে তোলা ইস্যুতে  খানিক এক ভীষণ উত্তেজনা মাত্র। আর বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কোন মানুষ এর ভেতরে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এটা মৃত এক ভারতীয় উদ্বেগ যাকে চাবুক মেরে জাগানোর চেষ্টা দেখছি আমরা। এমনকি যার শেখ হাসিনা সরকারের কাছেও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সত্য নয়।

    তবুও ঢাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লি-ঢাকা কত কাছাকাছি, কত নিকটাত্মীয় ও বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবাধীন তা প্রদর্শনের এ ধরনের কিছু ইমেজ ফাঁপা ডেকোরেটেড উত্তেজনা তৈরি করা হতে দেখব অবশ্যই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা, সাথে পিকের কৌশল

    মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা, সাথে পিকের কৌশল

    গৌতম দাস

    ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    –

    For India’s opposition to recover, the Gandhis should quit

    [সার-সংক্ষেপঃ উপরের বা সাথে দেয়া ছবিটা লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকার চলতি সংখ্যায় এক আর্টিকেলের প্রচ্ছদ। যদিও আমার এলেখার প্রসঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ও তার দল। ইকোনমিস্টের  ঐ আর্টিকেলের সারকথা হল, ভারতের বিরোধী দলকে জোটবদ্ধ হতে পিছিয়ে দিয়েছে  ও দিচ্ছে এই গান্ধী পরিবার।  আর ঠিক এজায়গায় প্রত্যক্ষ না হওয়া সত্বেও বিপরীতে মমতা নিজেকে উত্থিত করার যে চেষ্টা করছেন তা সম্পর্কিত।  ইকোনমিস্ট সরাসরি বলেছে গান্ধী পরিবারের ভারতের রাজনীতিকে এভাবে স্থবির করে রাখা “ত্যাগ করা উচিত” । শিরোনামেই সেকথা বলেছে যে “গান্ধীদের ত্যাগ করা উচিত” [Gandhis should quit]।
    কিন্তু ততদিন কী তাহলে মমতা অপেক্ষা করবেন? গান্ধী পরিবার কী করে তা দেখার জন্য? একেবারেই না। ভারতের মিডিয়া এনিয়ে অনেক কথা লিখেছে। যেমন যা লেখা শুরু করেছে তা হল,  “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমশই নিজেকে মোদী-বিরোধী শিবিরের ‘মুখ’ করে তুলছেন”।  এমন নেতা  হিসাবে নিজেকে হাজির করার কাজে মমতা অনেক দূর আগিয়ে গেছেন।  আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দল হচ্ছে গান্ধীদের কংগ্রেস।
    আরেক পত্রিকা লিখছে, “আঞ্চলিক দলের তকমা ঝেড়ে তৃণমূল এখন সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পথে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে মোদিবিরোধী জোটে সোনিয়া, রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কা নন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন মুখ”।
    কেন?  কারণ, মমতার নিজেকে এই প্রধান মুখ হিসাবে উপস্থাপনে বিভিন্ন দল ভেঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গ্রুপ দল বেধে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করেছে। অনেকে সরাসরি যোগদান করছে।  চলতি নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে মমতার দিল্লি সফরে একটা অন্যতম কর্মসুচি ছিল এমন যোগদানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটিয়ে তা দেখানো।  আর এবার মিডিয়া লিখছে এভাবেঃ “একের পর এক উইকেট পড়ছে কংগ্রেসে। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে”। অর্থাৎ অনেক দল থেকে লোক আসছে তৃণমূলে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে দল ভেঙ্গে লোক মমতার দলে যোগ দিচ্ছে সেদলটা হল গান্ধী পরিবারের কংগ্রেস।
    কোন কোন পত্রিকা তাদের রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা শুরু করেছে কেন আভ্যন্তরীণভাবে কংগ্রেস স্থবির ও অগোছালো। যার মূলকথাটা হল, গান্ধী পারিবারিক নেতৃত্বটাই এর মুল কারণ। এই পরিবার এটা কংগ্রেসের তরুণ নেতাদের আকাঙ্খা দাবায় রাখার প্রতীক হয়ে গেছে। আবার কংগ্রেসের বয়স্ক বা পরীক্ষিত নেতারাও মনে করছে তাদের পোটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাবনা সব এই পরিবারের জন্যই স্বীকৃতি পাচ্ছে না। মিডিয়ায় লেখা হয়েছে, রাহুল গান্ধীকে দলে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।  আর এতেই ফলাফলে সবকিছুই স্থবির হয়ে বসে থাকা। আর ঠিক এ’জিনিষটার দিকে নজর ঢেলেছেন পিকে মানে প্রশান্ত কিশোর । যিনি আসলে মমতার পক্ষে ও মমতার নিয়োগকৃত  রাজনৈতিক দলের জন্য  পেশাদার এক  “ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট”; ভারতের আনন্দবাজারি ভাষায় “ভোটকুশলী”।  যদিও শব্দটা হবে সম্ভবত ভোটকৌশলী এক্সপার্ট। বাংলায় প্রকৌশলী শব্দের “কৌশলী” শব্দটা যেখান থেকে।

    এছাড়া ওদিকে ঠিক বিজেপি না, আরএসএসে আভ্যন্তরীণ বিরোধের টেনশনে্র কথা শুনা যাচ্ছে মোদিকে তৃতীয়বার প্রার্থী না করার ব্যাপারে ফলে আরএসএসের মমতার প্রতি তাদের কিছু আগ্রহের খবরও বাজারে এসেছে দেখা যাচ্ছে। ]

     

    মমতার তৃণমূল কংগ্রেস রাইজিংঃ
    অসময়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও এর নেতা মমতা ব্যানার্জি নিয়ে আজকের প্রসঙ্গ। অসময়ে এজন্য যে, এটা পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনের আগের অথবা অব্যবহিত পরের সময় অবশ্যই একেবারেই নয়। আবার যদিও একটা পৌরসভা  (ওদের ভাষায় পুরভোট)  বা মেয়র নির্বাচন আসন্ন। তবে  এর রাজনৈতিক গুরুত্ব তেমন নেই। সাধারণত যতটুকু একটি পৌর নির্বাচনের থাকে, এবার তাও নেই। এর মূল কারণ গত   ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিলে মমতা শুধু নিজে ও দলকে টানা তৃতীয়বার রাজ্যের ক্ষমতায় বিজয়ী হয়ে নিয়ে এসেছেন সে জন্য নয়। আসলে এই নির্বাচন ছিল হেভিওয়েট বিজেপি পুরা দলকেই কলকাতা থেকে পুরো উৎখাত করে ফেলা। অথবা বলা যায়, সারা ভারতের বিরোধীরা যখন মোদির সামনে শিশু বা বামন হয়ে যায়, কেবল সেখানে একা মমতা নিজ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দিয়ে লড়ে প্রমাণ করে দিলেন, এক প্রধানমন্ত্রী মোদির ইমেজের ওপর দাঁড়ানো চালু এদলটিও তার সামনে কিছুই না। ফলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে যে ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার ঝড় বিজেপি তুলেছিল, সেটাসহ মোদি বা বিজেপি কোনো কিছুকেই মমতা আস্ত রাখেননি। উপড়ে ফেলেছেন। এরপর যারা নির্বাচনের আগ দিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের এবার বিজেপি ছেড়ে আবার একমাত্র দল মমতার তৃণমূলেই ফেরতের হিড়িক পড়ে যায়; যেন সবাইকেই ফিরে যেতে হবে, বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।  এছাড়া “দ্রুত অনুগ্রহ যোগাড় করে” কার আগে কে ফিরে জায়গা নেবে যেন এর প্রতিযোগিতাও শুরু করাতে পেরেছিলেন মমতা।

    তবে বছরের শুরুতে মার্চ-এপ্রিল ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পরেও আবার ওরই  উপনির্বাচনও ইতোমধ্যে হয়ে গেছে অনেক আসনে; কারণ করোনার জন্য আটকে থাকা, শিডিউলে থাকা অনেক উপনির্বাচন দীর্ঘ দিন হতে পারেনি।  আর সেই উপ-নির্বাচনেও বিজেপি আরেক দফা আরো তুচ্ছ হয়ে যায়।
    এসব কারণে এখন পৌর নির্বাচনের গুরুত্ব এবার আরো কম বা নাই; কারণ গত ৩০ সেপ্টেম্বরে, ছয় মাসের মধ্যে ঐ উপ-নির্বাচন হয়েছিল। আর এবার সুযোগ পেয়ে একসাথে সারা ভারতেও অনেক উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর তা ছিল ভারতের ১৩টি রাজ্যের লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা মিলিয়ে মোট ২৮টি আসনে উপনির্বাচন। এতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন ছিল চারটি। আর ওদিন আরো তিন রাজ্যের তিন লোকসভা আসনে উপনির্বাচন হয়। রাজ্য তিনটি হলো – হিমাচল, মধ্যপ্রদেশ ও কেন্দ্রশাসিত রাজ্য দাদরা ও নগর হাভেলি; যার  মধ্যে বিজেপি জিতেছিল কেবল মধ্যপ্রদেশে; আর বাকি দুই রাজ্যে বিজেপি হেরে যায়। এ বছরের কলকাতায় মমতার রাজ্য নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর থেকে সেই জোয়ার এতই তীব্র  উঠেছিল যে, এই উপনির্বাচনে ছয় মাসের ব্যবধানে এক লাখেরও বেশি ভোটে উল্টো বিজেপি প্রার্থীরা এবার হেরে যান। আর বিজেপি প্রার্থী প্রায় সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

    পশ্চিমবঙ্গে মোদির এই ব্যাপক হার গত প্রায় আট বছরের মোদির শাসনামলে এই প্রথম, যা তার বিজেপি দলসহ তাকে এই প্রথম সমূলে এত বড় আঘাত হেনেছে মনে করা হচ্ছে। একটা পত্রিকা লিখেছিল,

    উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিজেপি শিবিরে প্রচণ্ড উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে বিজেপিবিরোধী তৃণমূলের পালে হাওয়া লেগেছে, তাতে মনে করা হচ্ছে, সেই হাওয়ায় সত্যিই এবার বিজেপির বাগান তছনছ হয়ে যেতে পারে?

    এ ছাড়াও প্রথমে মনে করা হয়েছিল, মোদির ওপর এ আঘাত বোধহয় কেবল পশ্চিমবঙ্গেই। কিন্তু এখন একেবারেই পরিষ্কার, এটা ভারতজুড়েই বিরাট ছাপ ফেলেছে।
    আসলে এটা এক ‘আন্ডার কারেন্ট’ যেখানে সেটা নদীর যত তলদেশে ততই সেখানে স্রোতের বেগ তত বেশি। অথচ পুরো ব্যাপারটা বাইরে থেকে তেমন বোঝাই যায়নি। কিন্তু কী সেটা?
    বিজেপি বা মোদিবিরোধী সব বিরোধী দলের অভ্যন্তরেই প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত ও ক্ষোভ বর্তমান। এসব ক্ষুব্ধ ভগ্নাংশ বা গ্রুপগুলোতে অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত এতই তীব্র কিন্তু তারা দল ছাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সেদিকে ফায়সালার পথ বেছে নেবে, তা ঘটছিল না। সম্ভবত তাদের দ্বিধার মূল কারণ, এসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ ভেঙে বেরিয়ে যেতে চাইলেও তারা কোথায় যাবে কোন দিকে বা গন্তব্যে? এটা স্পষ্ট খুঁজে না পাওয়ায়ই তারা উদ্দেশ্যহীন হয়ে পুরনো নিজ দলের সাথে লেপ্টে থেকে গিয়েছিল।

    কিন্তু দেখা যাচ্ছে আজ এটা প্রমাণিত যে, তৃণমূলের মমতা হলেন সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক যার বাঁশির পেছনে ওসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ একেবারে সদলে এসে একের পর এক যোগদান শুরু করেছে এখন। আর তাতে রাতারাতি মমতার তৃণমূল দল এক আঞ্চলিক দলের পরিচয় থেকে বেরিয়ে সর্বভারতীয় দলের পরিচয় ধারণ করতে যাচ্ছে।

    ‘সর্বভারতীয় দল’ মানে কীঃ
    ভারতে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে মোট রাজ্যের সংখ্যা ২৮টা। কোনো একটা রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকটা রাজ্যেই বা বেশির ভাগ রাজ্যেই উপস্থিতি মানে কমিটি থাকলে সাধারণত চলতি অভ্যাসে তাকে “সর্বভারতীয়” দল বলে বুঝানো হয়ে থাকে। তবে স্বভাবতই এটা আইনি বা নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত সংজ্ঞা নয়। কমিশনের মতে, তাদের কতগুলোর শর্তের একটা পূরণ করলেই সেটা ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদা লাভ করে থাকে। এছাড়াও সময়ে সময়ে নির্বাচন কমিশন এই মর্যাদা কোন দলের জন্য সে দল “প্রাপ্ত বা কেড়ে নেয়া” হল বলে ঘোষণা দিয়ে থাকে।

    যেমন এমন কিছু শর্তগুলো হল, দলটাকে ভারতের যেকোনো তিন রাজ্য থেকে লোকসভার (কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে যেটা) নির্বাচনে মোট ভোটারের কমপক্ষে ২ শতাংশ পেতে হবে। অথবা দলটিকে লোকসভা বা বিধানসভা (রাজ্য সরকার গঠনের লক্ষ্যে) নির্বাচনে যেকোনো চার বা ততোধিক রাজ্য থেকে মোট ভোটের ৬ শতাংশ পেতে হবে। আর সাথে আরো চারটি লোকসভা আসন জিততে হবে। অথবা দলটাকে চার রাজ্যের যেকোনো একটাতে ‘রাজ্য দল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হবে।

    যেমন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে কমিশন ঘোষিতভাবে ভারতে আটটা ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল আছে যদিও সম্প্রতি এদের চারটির অবস্থা খারাপ যে, সম্ভবত তারা নয়া রিভিউয়ে বাদ পড়বে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস কখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল নয়; যদিও গত ২০০১ সালের রাজ্য নির্বাচনের সময় থেকে তৃণমূল খুবই কঠোর চেষ্টা শুরু করেছে। আর আগামী বছর মানে সারা ২০২২ সালে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এগুলো হল – গোয়া, মনিপুর, উত্তরখণ্ড, পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশ। এতে একমাত্র উত্তর প্রদেশের নির্বাচন হবে মে মাসে আর বাকি চারটি নির্বাচনই হবে মার্চ মাসের বিভিন্ন সময়ে। বাংলা ভাষায় এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিধানসভার নির্বাচন’ বলে পরিচিত। ইংরেজিতে যা ‘লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’ বা সংক্ষেপে শুধু “অ্যাসেম্বলি” নির্বাচন বলার চল আছে।
    আর সার কথাটা হল, তৃণমূল কংগ্রেস এখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত নয়। তৃণমূল মূলত আঞ্চলিক দল মানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যভিত্তিক দল।

    তাহলে ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিলের নির্বাচনের পর এবার তৃণমূলকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও হইচই ওঠার কারণ কী?
    এক কথায় বললে, পশ্চিমবঙ্গের গত এপ্রিল নির্বাচন হয়েছিল মোদির নামে, মোদির সুনাম বা ক্রেডিটকে দেখিয়ে, তাঁকে সামনে রেখে। এমনকি বিজেপি দলের চেয়েও মোদির নাম এগিয়ে রাখা হয়ে থাকে সবসময় ঠিক যেমন গত সাত বছর ধরে বিজেপি একা মোদির নাম ও ক্রেডিটের উপরে নির্বাচন করে যাচ্ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এতে কলকাতায় এমন প্রপাগান্ডা ঝড় তারা তুলেছিল যেন নির্বাচনের পরে সারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ছাড়া “আর কোনো দল থাকছে না”। ফলে অন্যান্য দল থেকে সুযোগসন্ধানীদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায় যে, নিজ নিজ দল ছেড়ে কার আগে কে বিজেপিতে যোগ দেবে। অথচ ফলাফল প্রকাশের পরে পেলে দেখা গেল, কিছুই বাস্তব-সত্য নয়, সব প্রপাগান্ডা। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টিতে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি পায় ৭৭টি আসন। অথচ মোদি-অমিত আওয়াজ দিয়েছিলেন বিজেপি নাকি ২০০ এর বেশি আসন পাবে। বাস্তবে  তাও আবার সেই ৭৭ এখন ৭২ হয়ে গেছে। অর্থাৎ  ঐ পাঁচজন তৃণমূলে আবার ফেরত গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোটের সাথে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ‘সেক্যুলার ফ্রন্ট’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল  জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পীরজাদার দলের একটা আসন পাওয়া ছাড়া এই পুরো দল বা জোট এবার আর কোনো আসন পায়নি। অনেকে এটাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, এটা গত ২০১৯ সালের কেন্দ্র নির্বাচনে সিপিএমের নিজ কর্মের শাস্তি বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। কেন?
    সিপিএমের বামফ্রন্ট ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেসের সাথে জোট করে নির্বাচন লড়ে আসছে। কিন্তু যেহেতু মমতাই তাদের ৩০ বছরের সাজানো দুর্গ ২০১১ ভেঙে দিয়ে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন, তাই মমতার দলই তাদের প্রধান শত্রু ও বিরোধী তা আজও এরা মনে করে থাকে। তাতে ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতায় যে দলই থাক। কিন্তু এখানে ফাঁকিটা হল, এতে ক্ষমতাসীন মোদি কমিউনিস্টদের ভাবধারার অলক্ষ্যে এবং একথা তারা মুখে না বললেও পরোক্ষে  সিপিএমের দোস্ত হয়ে উঠেছে। এরই চরম অবস্থাটা আমরা দেখে ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনে। তারা বিজেপির সাহায্য নিয়ে মমতা উৎখাতের পরিকল্পনা করে ভোটকেন্দ্রে বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়েছিল। এই কৌশল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মত বয়স্ক নেতারা পছন্দ না করলেও সেবার তারা পাত্তা পাননি। তাদের আপত্তি দলের কেউ শুনে নাই।  আর তাতে হঠাৎ বিজেপি তিন আসন থেকে এক লাফে ১৮ আসন লাভ করেছিল যেখানে মোট পশ্চিমবঙ্গের ভাগে মোট আসন ৪২টা আর তৃণমূল একাই প্রায় সবটা পেয়ে থাকে। এ কারণেই ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে একটা সিটও না পাওয়াকে সিপিএমের কর্মের শাস্তি বলা হচ্ছে। এ ছাড়া তারা পীরজাদাকে জোটের সাথে নিয়ে মূসলমান ভোট ভাগ করতে চেয়েছেন, যাতে বিজেপির সুবিধা হয়। কিন্তু মুসলমান ভোটাররাই সব রুখে দেন, তারা ভোট ভাগ হতে দেননি। মমতার এত আসন পাওয়া বা বাম-কংগ্রেস সাথে পীরজাদার জোট মাত্র একটিই আসন পাওয়ার ঘটনাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।

    এ তো গেল শুধু পশ্চিমবঙ্গের হিসাব, সাথে এখন তৃণমূলের বিস্তৃতি বাইরের রাজ্যেও। সর্বভারতীয় দল হিসেবে তৃণমূল নিজের নতুন কেন্দ্রিয় কমিটি সাজিয়ে নিয়েছে। আর এতে একেক করে অন্যান্য রাজ্যের দলের নেতাকর্মীরা যোগ দেয়া শুরু করেছেন; যার মধ্যে গোয়া আর ত্রিপুরা সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে।

    এবার গত সপ্তাহে (২৫ নভেম্বর) মমতা দিল্লি সরকারি সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে এর ফাঁকে নিজ দলের শুভযাত্রার অনেক কাজ করে এসেছেন তিনি, যাতে অন্তত তৃণমূলকে এখন এক সর্বভারতীয় দল মনে হয়। আসলে বিভিন্ন দল থেকে মমতার দলে যোগদান করতে আসছেন; এরই এক অনুষ্ঠান ছিল এবারের মুখ্য আকর্ষণ। যেসব রাজ্য থেকে পুরনো দল ছেড়ে নেতারা (সাবেক বা বর্তমান) এমপিরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন এদের মধ্যে আছেন উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে; বলা হচ্ছে হিন্দি বলয়ের তিন সাবেক সাংসদ কীর্তি আজাদ, অশোক তনওয়ার ও পবন বর্মা যোগ দিয়েছেন। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখছে, “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমেই নিজেকে মোদিবিরোধী শিবিরের ‘মুখ’ করে তুলছেন।”

    আসলে বলা যায়, এটাই হল মমতার মুখ্য মেসেজ। অর্থাৎ মোদিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট গড়তে গেলে এর সম্ভাব্য নেতা কে কে হতে পারেন – এই বিচারে মমতা নিজেকে সর্বভারতীয় নেতার ইমেজ দিয়ে রাখলেন। কিন্তু কেন এটা?

    প্রশান্ত কিশোর বা পিকেঃ
    রাজনীতিতে কনসালটেন্সি বা ভারতে একালের ভোটযুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে প্রফেশনাল এক্সপার্ট নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনে পরিকল্পনা করে ভোটে নামা শুরু হয়েছে। ভারতের রাজনীতি ষোলোআনাই নির্বাচননির্ভর। তাই “ভারতে রাজ্যের বা কেন্দ্রের নির্বাচনের আগেই কেবল রাজনীতি করো। বাকি সময় দলের বাতি ধরে রাখলেই হবে”। এই হলো ভারতের রাজনীতি। ফলে দলের হয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা, লড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে যেহেতু এটা ‘পরিচালনা’ মানে ডিরেকশন বা নির্দেশনা দেয়া; কাজেই ব্যাপারটা আসলে একটা ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক কাজ যার এক বাংলা করতে পারি পরিচালনা বা ম্যানেজ করা বা সামলানো। কাজেই এজন্যই তো “ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট” নিয়োগ। তাই না?

    বিহারের প্রশান্ত কিশোর (পিকে) হচ্ছেন আপাতত ভারতের একমাত্র এমন পলিটিক্যাল কনসাল্ট্যান্ট। এটা আসলে জনমত যাচাই, পাবলিক মনোভাব আগাম বুঝা, নির্বাচনে ভোটারদের মুখ্য আশা-আকাঙ্খা কী, কী হলে তারা খুবই খুশি হবে, দলের সবচেয়ে খারাপ দিক কোনটা, দলের পজিটিভ-নেগেটিভ সব জেনে নেয়া ইত্যাদি সবকিছুই এর কাজের মধ্যে পড়ে। এসব কাজের জন্য একেবারে স্যাম্পল ডাটা সংগ্রহ করে গবেষণা স্টাডিতে নেমে পড়া; আর সে স্টাডির ফলাফল অনুসারে দলকে পরিচালিত হতে, নড়াচড়া করতে নির্দেশ দেয়া, এটাই কনসালটেন্টের কাজ। পিকে এর আগে পুরান পেশা হিসাবে পেশাদার কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে জাতিসঙ্ঘে এমন স্টাডি গবেষণার কাজ করতেন। এরপর কী খেয়ালে সেসব ছেড়ে এখনকার কাজে নেমে এসেছেন। এ’পর্যন্ত কোনো দলের সাথে (ও পক্ষে) পরামর্শদানের চুক্তি করে সে দল কখন ঐ নির্বাচনে হারেনি। ফলে এটা তার এক ভালো রেকর্ড। এককালে বিজেপিকেও এমন পরামর্শ দিয়েছেন। কংগ্রেসকেও। বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষমতাসীন রাজ্য সরকারকেও। আবার পাঞ্জাবসহ এমন অনেক রাজ্যকেই। মমতার সাথে  তাঁর  সম্পর্কের শুরু ঐ ২০১৯ সালে; সেবারের কেন্দ্র নির্বাচনে খারাপ ফলাফলের প্রেক্ষিতে এরপর থেকেই মমতা পিকে-কে নিয়োগদান করেছিলেন; যার ফলাফল পরেরবার মমতার ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে মোদি হারানোর জয়জয়কার লাভ করেন। কিন্তু এরপর থেকেই কেন্দ্রের নির্বাচনে মমতার দলের পক্ষে নেমে পড়া, নতুন চুক্তি হাতে নেন পিকে। আনন্দবাজারের ভাষায় এটাই ‘ভোট-কুশলীর কাজ’। শব্দটা ইংরেজি স্ট্রাটেজিস্ট শব্দটার বাংলা কৌশলী আর সেখান থেকে ব্যক্তি কুশলী। এটা কুশল বিনিময়ের কুশল নয়। আসলে, এটা প্রকৌশলী লিখতে যে কৌশল শব্দ ব্যবহার করি সেই কৌশল শব্দ থেকে কৌশলী হবে।

    পিকে তার কাজের শুরুতেঃ
    গত মে মাস থেকে কাজে নেমেই পিকে ‘বিরোধী জোটের ঐক্য’ গড়া দিয়ে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। ঘোষণাও করেছিলেন, কংগ্রেসকে সাথে নেয়া ছাড়া এ কাজ শুরু করার মানে নেই; এ ধরনের বক্তব্যও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মাথাতেই অগ্রগতি না দেখে এবার আবিষ্কার করেন যে, খোদ কংগ্রেস দল ও এর অভ্যন্তরীণ বর্তমান দশাই সব সমস্যার উৎস। আর এরপর থেকেই তিনি প্রকাশ্যেই কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো কী তা বিভিন্ন ঘটনার সময় প্রকাশ্যেই তুলে ধরতে শুরু করেন। ইঙ্গিত দিতে থাকেন কংগ্রেস যোগ্য দল নয়; তাই সে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। এর পরই তিনি মমতাকে নেতা হিসেবে ‘প্রজেক্ট’ করা শুরু করে দেন। খুব সম্ভবত তারই পরিকল্পনায় মমতার এবারের দিল্লি সফর।

    ঘটনা যতটুকুই যা, তা সঠিক হোক বা না; বাস্তবতা হলো পিকের কৌশলে মোদিবিরোধী জোট গড়তে এখনো অগ্রসর হতে পারেন আর না পারেন, মমতাই যে কিছু করার ক্ষমতা রাখেন, এই ইমেজ তিনি (পিকের মাধ্যমে) চার দিকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন, সন্দেহ নেই। এরই সোজা মানে হল, পিকে সঠিকই ধরেছেন, মোদিবিরোধী দল বা কর্মীরা কোন নেতা, কোন পরিকল্পনা, কোন দল ও জোট ইত্যাদি, এমন সব কিছু আছে এমন একটা জায়গা যে খুঁজে ফিরছে – তা পিকে ধরে ফেলেছেন। আর সেজায়গাটাই হতে যাচ্ছে মমতার তৃণমূল।  বিভিন্ন দল ও গ্রুপে তারা যে এখন পুরান দল ছেড়ে বের হয়ে আসবে, সাহস করবে, মমতাকে দেখে তারা পথ খুঁজে পেয়েছে মনে করবে –  তা ফল দেয়া শুরু করেছে। আর এ কাজটা করতেই রাহুল বা সোনিয়ার নেতৃত্বের কংগ্রেস আনফিট, সেটিই সম্ভবত প্রমাণ হতে যাচ্ছে। ইকোনমিস্ট সেকথাটাই বলেছে।

    বাংলাদেশের বাংলা ট্রিবিউনে তাদের কলকাতা প্রতিনিধি লিখেছেন শিরোনাম দিল্লি দখলের পথে মমতা!। বলছেন, ‘একের পর এক উইকেট পড়ছে কংগ্রেসে। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। অন্য দিকে বাংলার বুকে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া তৃণমূল আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে দেশে বিজেপিবিরোধী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে। আঞ্চলিক দলের তকমা ঝেড়ে তৃণমূল এখন সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পথে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে মোদিবিরোধী জোটে সোনিয়া, রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কা নন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন মুখ্য। এমনটিই বলছে রাজনৈতিক মহল। তবে কী ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর ‘মহামিশন ২০২৪’-এর গেমপ্ল্যানকে লক্ষ্য করে এখন দিল্লি দখলের পথে মমতা!”।
    কথা সঠিক; এখন পর্যন্ত যে দলটা সবচেয়ে বেশি ভেঙে দলে দলে নেতাকর্মী বের হয়ে তৃণমূলে যোগ দিচ্ছে এদের বেশির ভাগই পুরনো কংগ্রেস দলের।

    তবে আমাদের অতি উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। আপাতত মনোযোগে পর্যবেক্ষণই আমাদের কাজ বোধ করি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২৭ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা ও পিকে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কেলি কেইডারলিং-কে জানতে হবে, বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে!

    কেলি কেইডারলিং-কে জানতে হবেঃ
    বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে!
    গৌতম দাস
    ২৬ নভেম্বর ২০২১
                                  Ambassador Kelly Keiderling
    আমেরিকান এক কূটনীতিক ও উপ-মন্ত্রী কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশে এসেছিলেন তাঁর অফিসিয়াল সফরে।  তবে সেটা এক বহুরাষ্ট্রীয় সম্মেলনে [Indian Ocean Rim Association ministerial meeting – IORA] , ঠিক বাংলাদেশের সাথে নয়। অর্থাৎ তাই সম্ভবত সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে কেবল এক সালমন এফ রহমানের সাথে সাক্ষাতের কথা দেখেছি।  যাবার আগে তিনি ডেইলি স্টারের সাথে কিছু কথা বলেন, যা নিয়ে একটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২১ নভেম্বর। এই কেলি কেইডারলিং আসলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া (বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এই পাঁচ দেশ) বিষয়ক ব্যুরোর ডেপুটি অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি, যা আমাদের উপমন্ত্রী তুল্য।
    কেলির যে কথার উপর জোর দিয়ে এই সাক্ষাতকার তা হল – তিনি বলছেন, “সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার বাকী ৫টি দেশ থেকে ভারতকে আলাদা করতে বাইডেন প্রশাসন স্টেট ডিপার্টমেন্টে আমলাতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে”। তিনি আরও বলেছেন, “অর্থনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে” বাংলাদেশের আমেরিকার কাছে গুরুত্ব বেড়েছে। আর এই “ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সম্পর্কে পুরনো ধারণা থেকে সরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র”।
    সোজা করে বললে আগে দক্ষিণ এশিয়ার একই ডেস্কের মাধ্যমে ভারতসহ আরও পাঁচ দেশ বিষয়ক আমেরিকান স্বার্থ একসাথে দেখাশুনা করা হত। আর এখন এই “পাঁচ দেশকে ভারত থেকে আলাদা ডেস্কে নিয়ে, ভারতের নিচে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলা থেকে এদের মুক্ত’ করা হয়েছে। একথাই তিনি জানালেন।
    আর সমস্যা হয়েছে এখান থেকে। কেন?
    অনেকে এটাকে পড়েছে এভাবে যে এতে আমেরিকা ‘বাংলাদেশকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখা থেকে’ আমাদের নিজেকে মুক্ত হয়েছে বলে।
    সরি, এটা একেবারেই ভুল রিডিং!
    বরং প্রধান ও প্রথম কথা হল, আমেরিকা বাংলাদেশে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। অন্তত, ২০০৭ সালের শুরু থেকেই। কাজেই বাংলাদেশে ‘আমেরিকান মূল সংকট বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকার’।
    কথা অনেকঃ
    ১। কেন ২০০৭ সালে ক্ষমতা দখলঃ
    কেন এই ক্ষমতা দখল করানো হয়েছিল এর কোন ‘গ্রহনযোগ্য’ ব্যাখ্যাও আমেরিকা আমাদেরকে দেয় নাই। হয়ত নিমরাজি ভাবে মেনে নেয়া যেত যদি ফলাফল খুবই প্রয়োজনীয় ও কাজের বা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ লাভজনক মনে হত। যার কোনটাই হয় নাই, তা ছিলও না। শুধু তাই না বরং মানুষ মনে করে, আজকের সরকারের বিরুদ্ধে যা কিছু মুখ্য বড় বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে সেসময়ে। যেভাবে সরকারকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল আর পরে বিরোধিদের দমনকে ও করার পদ্ধতিকে উতসাহ ও অনুমোদন দেয়া হয়ে এসেছে। এব্যাা্পারে শক্ত শব্দে বলব, প্রধান আসামি বেপরোয়া আমেরিকা! জঙ্গিদমন, চোরাচালানি দমন, মাদক পাচারকারি দমন ইত্যাদি এসবের উসিলায় রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে দেয়া হয়েছে।
    ২। বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছেঃ
    আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ এই একান্ত উদ্দেশ্য হাসিলের পক্ষে ভারত কাজ করে দিবে। আর এর বিনিময় পাওনা মিটাতে ভেট হিসাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। কেন? এর দায় কে নিবে? আর কেন এই আমেরিকাকে বাংলাদেশ আবার বিশ্বাস করবে?
    আমেরিকা তুল্যহীন গ্লোবাল শক্তি ছিল। ছিল বলেছি। সেই শক্তি সে দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করেছে। এটা এতই বেপরোয়া যে এভাবে অপব্যবহার করে আমেরিকার নিজের কী লাভ হয়েছে হচ্ছে কিনা তাও যাচাই করা হয় নাই। এর কোন মুল্যায়ন আজ এক দশক পেরোলেও তা কোথাও দেখা যায় নাই। কে দায়ী, কী জবাবদীহিতা এর – এসবের কোন বালাই নাই।
    ৩। তাহলে আমেরিকা যদি এমন বেপরোয়া যা খুশি করতে থাকে তাকে বাংলাদেশের জনগণ নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস রাখবে কেন?
    এই শতকে চীনা উত্থান প্রসঙ্গে আমেরিকার সরকারি [DNI বা Office of the Director of National Intelligence] স্টাডি গবেষণা রিপোর্ট গত ২০০৮ সাল থেকে প্রতি পাঁচবছরে যতগুলা Global_Trends_Final_Report প্রকাশিত হয়েছে – এর এমনকি যা ২০০৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বের হয়েছে তাতে কোথাও এমন পরামর্শ নাই যে
    ক. চীন ঠেকানো, মানে চীনের এই অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো আদৌ সম্ভব। বরং irreversible মানে কখনও তা পুর্বের জায়গায় ফিরবে না – বলা হয়েছে।
    খ. ভারতকে চীন ঠেকানোর ঠিকা দিলে আমেরিকার কোন লাভ হবে, বাস্তবতা বদলাবে।
    গ. সর্বশেষ 2040 Global_Trends_Final_Report যা ২০২১ সালে প্রকাশিত সেখানেও এমন পরামর্শের কথা জানা যায় না।
    ৪। অযোগ্য আমেরিকান প্রশাসনঃ
    গত ২০১২ সালে আমরা দেখেছিলাম আমেরিকার বিশ্বব্যাংকের দিয়ে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা দায়ের। কিন্তু কোন কিছু আদালতে প্রমাণ হবার আগেই ২০১৭ সালে সেই মামলা বিশ্বব্যাংক আদালত থেকেই প্রত্যাহার করে নেয়। প্রশ্ন হল এই কাজ কে করেছিল? এত কাঁচা কাজ? দুর্বল ইমান?  এর মানে তো আমেরিকান উদ্দেশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন! মামলার যদি মেরিট-ই না থাকে সে মামলা কেন করতে যাওয়া? এ তো এক অযোগ্য আমেরিকান প্রশাসন!
    এতে ফলাফল এই যে চীন তো এরই অপেক্ষায় ছিল যে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে সে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হয়ে বাংলাদেশের মত সব দেশেই ঢুকবে। চীন সেই সুযোগ পেয়েছে ও নিয়েছে।  তবু বাংলাদেশ ঢুকতে একটু সময় লেগেছে। গত ২০১৬ সালে চীনের মহাপ্রবেশ ঘটে যায়। যোগ্য হিসাবেই। তবে এতে আগে হত অন্তত টেন্ডারে কাজ, এখন কিছুর বালাই নাই। এই আর কী? তাহলে একোন আমেরিকা দুনিয়ায় একালে হাজির এবং সে আবার বাংলাদেশে উত্থিত হতে চাচ্ছে?
    ৫। বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ঘটনাঃ
    বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ঘটনা যেটা আমেরিকা ঘটিয়েছে বা আমেরিকার কারণে ঘটেছে তা হল ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেওয়া এবং ওর পরের যাবতীয় পরিণতি। যা বাংলাদেশ এখনও চরমভাবে ভুগতেছে। গণভবনে কোন রুম বাকি নাই যেখানে সঙ্গোপনে কোন সভা করা যায়, এই হল দুর্গতির সর্বশেষ। ভারতকে ছাড়তে ছাড়লেও কম্বল ছাড়ে না।
    এর প্রধানতম দায় এক চরম দায়ীত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া আমেরিকার। যে মনে করে সে সব কিছু করতে পারে। মানুষের রাষ্ট্র এখান থেকেই বিপদ্গামি হয় যখন সে ভাবতে শুরু করে সে সব পারে। প্রকৃতিগত বা অবজেকটিভ বাধা-নিষেধ যাকে কমন মানুষের ভাষায় আল্লাহর বাধা নিষেধও বলে এমন কোনকিছুকেও যে আর পরোয়া করে না – এর ধ্বংস তো অনিবার্য!
    সেই আমেরিকা নাকি আবার উঠে দাড়াতে ফিরে আসতে চাইছে? এর কী কোন আপিল আছে না থাকতে পারে? সময় থাকলে আমেরিকান নেতারা দুদন্ড ভেবে দেখতে পারেন।
    ৬। আমেরিকা এখনও ভারতকে বগলে নিয়েই এশিয়াতে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত পাশে ভারত নিজের পায়ে দাঁড়ায় আছে, আমেরিকা এটাও পারে নাই। এমন দুরত্বের ইঙ্গিতও কোথাও দেয় নাই। তাহলে কেন বিশ্বাস করব? কোন আমেরিকাকে বিশ্বাস করব? আমেরেইকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু হিসাবে ভারত থাকতেই পারে। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশকে ভারতের হাতে বন্ধক দেয়া আমেরিকা! এমন ভারত-আমেরিকান সম্পর্কের বিনাশ ও ধবংস তো যেকোন ট্রু (true) বাংলাদেশি সবার নুন্যতম কাম্য।

    উপসংহারঃ

    কাজেই আমেরিকা বাংলাদেশকে আলাদা ডেস্কে দিয়েছে কিনা হু কেয়ারস? আগে বাংলাদেশের প্রায় নব্বইভাগ মানুষের মনের খবর নেন। কেন এটা একালে এত ভারতবিরোধী? এটা সেই দেশভাগের বিরোধিতা একেবারেই নয়। এটা তো ২০০৭ সালের আগে কখন এমন পর্যায়ের ছিল না। কেন ২০০৭ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এমন হল? ২০১৪ সালের আগে তো মোদির হিন্দুত্ববাদ ছিল না!
    লক্ষ্য করবেন আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের দিক থেকে কথাগুলো তুলি নাই। তাহলে?
    আসলে আমেরিকারই জবাবদীহিতা নাই। তাই সে চরম দায়ীত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া। আমেরিকানদের এদিকটাই মুখ্য করে বলেছি এটাই এর ধবংসের কারণ হবে, যদিনা এর আগে নিজেকে সংশোধন, নিজের প্রায়শ্চিত্ত শেষ করতে সুযোগ পায় বা নিতে পারে।
    চীনা উত্থান হয়েছে – সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমেরিকান গ্রহণযোগ্যতা তাই বলে কেন থাকবে না? যদিনা সে বেপরোয়া হয়!

    সাহস থাকলে আমেরিকা নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে পারে কেন মুসলমানেরা এমন পর্যায়ের আমেরিকাবিরোধী!

    বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাযোগ্যতার সংকটে! এটাই মূলকথা।
  • শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    গৌতম দাস

    ২২ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    –

    Nehru was way ahead of his time. Seeing him through a 20/20 lens is wrong

    ভারতের শ্যাম সরণ [Shyam Saran], একজন কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাট। গত ১৯৭০ সাল থেকে ভারতের ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে তিনি ২০০৪-০৬ সালে এই সময়কালে মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদ ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন। পরে সে পদ থেকে ফরমাল অবসর নিলেও এরপর সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভারত সরকারের বা সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও নানান দায়িত্বে কাজ করে গেছেন। বহু ধরনের কাজে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বা বেসরকারি ও বিদেশে অনেক কিছুর সাথে এখনো সক্রিয় তিনি। দেশী-বিদেশী থিংকট্যাংকের কাজের সাথেও তিনি জড়িত। একেবারে সক্রিয় এখন সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ [CPR] এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে। এছাড়া প্রায়ই তাঁর লেখা কলাম বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত।

    সম্প্রতি তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু সম্পর্কে উঁচু মূল্যায়নমূলক এক কলাম লিখেছেন। ভারত সরকারের ফরেন সার্ভিস ক্যাডারে যারা যোগ দেন তাদের সবারই এক স্বপ্ন-খায়েশ থাকতে দেখা যায় যে, তিনি ফরেন সচিব হওয়ার পরেই অবসর নেবেন। যদিও টেকনিক্যাল ঝামেলায় সচিব পদটা খালি নেই এমন হয়ে দাড়াতে পারে কারো বেলায়; অবসরে যাওয়ার সময় এসে গেলে অনেকের ভাগ্যে তা হয় না। এমনকি আরেকটু এগিয়ে অনেকের জ্বলজ্বলে খায়েশ মনে পুষে রাখে যে, সার্ভিস লাইফে যদি ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সাথে লাইন-ঘাট, সম্পর্ক, পারফরম্যান্স দেখিয়ে মন পাওয়া ইত্যাদি ঘটে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কারণ তাহলে তিনি চাকরি থেকে অবসরের পরে কপালও খুলে গেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন।

    যেমন কংগ্রেসের সালমান খুরশিদ এমন এক কূটনীতিক ছিলেন যিনি এখন কংগ্রেস দলের সাবেক মন্ত্রী এবং এখন কংগ্রেস দলের এক রাজনৈতিক নেতা হিসাবেও পরিচিত। আর বিজেপির মোদির ক্ষেত্রেও তাঁর বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করও তেমনদের একজন। তখন মোদি কেবল প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ২০১৪ সালে। কোন আমেরিকান সরকার-প্রশাসনকে ছুঁতে বা পৌঁছাতে গেলে সবচেয়ে ভাল উপায়টা কী? তারাই বা ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করে থাকেন? বিষয়গুলো ব্যক্তিগত মত করে জানা জরুরি। মোদির সেসব প্রয়োজন মিটাবার মত করে ২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসার পর থেকে এরই প্রধান হাতিয়ার হয়ে আছেন জয়শঙ্কর, ঘটনা চক্রে যিনি তখন আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।  ঘটনাচক্রে  মোদির তাঁকেই পছন্দ হয়েছিল।  আবার মোদিও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু নিশ্চিত নন যে, আমেরিকার কাছে কী চাইতে হয়, কী পাওয়া যায়; কিভাবে তা চাইতে হয় আবার কী চাওয়া ঠিক নয়, ইত্যাদি। আবার যেখানে মোদি আমেরিকার খাতায় ওসময়ের  কিছু দিন আগে পর্যন্ত গুজরাটে দাঙ্গা লাগিয়ে মুসলমান হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ তালিকায় থাকলেও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। আবার আমেরিকারও মোদির সাথে বিশেষ সম্পর্ক করা দরকার। কাজেই জয়শঙ্কর হয়ে যান মোদি আর আমেরিকা এ’দু’পক্ষের মনোভাব আগাম বুঝাবার ব্যক্তি ও দু’জনা দু’জনের বিশেষ দুত।  তাই সেসময় জয়শঙ্কর অবসরে চলে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে হঠাৎ মোদি সেসময়ের উপস্থিত ফরেন সচিব সুজাতা সিংকে  সরিয়ে দিয়ে জয়শঙ্করকেই সচিব পদে নিয়ে নেন। আর এরপরে ২০১৯ সালে মোদি দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জিতে এলে ততদিনে জয়শঙ্করেরও  সচিব থেকেও অবসরে যাবার সময় তখন। কিন্তু আবার ভাগ্যের শিকা ছিড়েছিল।  তখন হঠাৎ মোদির আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মারা যাওয়াতে মোদি এবার জয়শঙ্করকে  মন্ত্রীও করে নিয়েছিলেন।

    কিন্তু সচিব হওয়ার এসব লালিত স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে একটা মূল ফ্যাক্টর থেকে যায় তা হল ‘বহনকারী’; মানে একটা রাজনৈতিক দল লাগে। কারণ তিনি তো আমলা ফলে একটা  রাজনৈতিক দলই কেবল তাকে রাজনৈতিক পদ দিতে পারে ও বসাতে পারে। শ্যাম সরণের ক্ষেত্রে এই দলটার নাম হল কংগ্রেস। অর্থাৎ ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ শেষের দিকে যত সামান্যই হোক পক্ষে একটা রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেতেই হয়। সচিব বা বিশেষ করে মন্ত্রী পর্যায়ে পৌঁছাতে গেলে রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট পাওয়া নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে যায়।

    এই বিচারে শ্যাম সরণকে দিনশেষে কেউ কংগ্রেসের লোক বলে ফেলবে অবশ্যই। তবে এর বাইরেও ভারতে আরেকটা রেওয়াজ আছে যা এখন হয়ে উঠেছে আরেকটা বিষয়ের প্রশ্ন। তা হল  – জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ। এটাও প্রায় ফরেন মিনিস্টারের মতোই আরেক পদ। কারণ উপদেষ্টা ঠিক মন্ত্রী না হলেও মন্ত্রীর সম-মর্যাদার পদ। কোনো সাবেক ফরেন সচিব অবসর নেয়ার পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নিযুক্তি পেয়েছেন এমন হতে পারে ও হয়েছে। তাই এটাকেও এসব সাবেক আমলারা জীবনের বিরাজ ক্রেডিট ও অর্জন গণ্য করে। তা করুক কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এই উপদেষ্টা পদে সাবেক গোয়েন্দা বিভাগের আমলারাও নিয়োগ পেতে পারেন এবং পেয়ে থাকেন। যেমন বর্তমান মোদির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সাবেক “ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর” (আইবি) সর্বোচ্চপদ ডিরেক্টর ছিলেন। কিন্তু সমস্যা হল – ফরেন সার্ভিস আর ইন্টেলিজেন্স বুরো এরা উভয় উভয়কে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে বসার জন্য অনুপযুক্ত বা কম যোগ্য মনে করে রেষারেষির কারণে। তাই কনুই-গুঁতা মারামারি চলে নিরন্তর। যেমনটা এখন জয়শঙ্কর আর দোভালের মধ্যে চলে আর মোদিকে সবসময় তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তা সামাল দিতে হয়।

    এখানে একটা বাড়তি তথ্য দিয়ে রাখি, আশাকরি অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিনিষটা কী? আবার এটার সর্বোচ্চ উপরে কোন মন্ত্রী নয়, তবে এক উপদেষ্টা কেন? প্রশ্নদুটার জবাব একই। এটাই আসলে ‘র’ [RAW] এর আসল মন্ত্রণালয়-ঘটিত ডিপার্টমেন্ট এর নাম।  অন্যভাবে বললে ‘র’ – এটা ভারতের বাইরে ভিন্নদেশে গিয়ে নাশকতার কাজ করে বেড়ানোর প্রতিষ্ঠান; এটাকে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হবে – এই প্রশ্নের সমাধান হিসাবে এটা  জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার অধীনে; যেখানে আবার তিনি উপদেষ্টা, ঠিক মন্ত্রী নন। কেন?
    কারণ ‘র’ এর পরিচালনার জন্য দরকার ছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাইরেক্ট একসেস, রাত-বিরাতেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি পৌছে যাওয়ার সুবিধা। বিদেশে কাউকে খুন করার সিদ্ধান্ত দেয়া ও এর দায় নেয়া কোন ছোট সিদ্ধান্ত নয়।  অথচ অন্য সবের মত এই প্রতিষ্ঠানকেও আর পাঁচটা কোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অধীনে রাখলে ডাইরেক্ট একসেস বন্ধ হয়ে যাবে। আর ঐ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরই আগে সবকিছু বিবেচনা করে দেখা একটা এক্তিয়ার ও তাতে সময়ব্যয় করতে দিতেই হবে। এরপরে দরকার হলে প্রধানমন্ত্রী।  এই কালক্ষেপণ বন্ধ করতেই ‘র’ মূলত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনেই একটা বিভাগ করে রাখা হয়েছে। আর ওর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়মিত পরামর্শদান ও তথ্যে আপডেট রাখার কাজটা করেন ঐ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বাইরে থেকে বুঝবার সুযোগ নাই যে  এই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা – উনার কাজকর্ম  ‘র’ কে নিয়ে যারা, কাকে মারবে ধরবে, খুনোখুনি ধবংস বিনাশ কাকে করবে ইত্যাদি এসব নিয়ে। এবং ভারতের নিয়ম অনুযায়ী, এই পদে সাবেক ফরেন সচিব অথবা সাবেক ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো চীফ এমন দুদিক থেকেই আসতে পারে। [এই ব্যাপারগুলো পাবলিকলি আরো  জানার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে ২০০৭ সালে ভারতে প্রকাশিত “কাও বয়েস” বা [The Kaoboys of R&AW] এই বই থেকে।]  যেমন  শিবশঙ্কর মেনন তিনি সাবেক ফরেন সচিব থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আর এপর্যন্ত  কেবল পাঁচজন মানে পাঁচবার নয়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগে বদল এসেছে।  এ’হল, ভারতের আমলা থেকে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হবার গল্প।

    যেটা বলতে চাচ্ছি তা হল – ফরেন সার্ভিসের ব্যক্তিত্বরা সার্ভিসের শেষের দিকে পছন্দের দলের দিকে লীন হয়ে যেতে থাকেন আর অবসরের পরে তো ওই দলের লোকই হয়ে যান। সেই বিচারে শ্যাম সরণের ভাগ্যে জুটেছিল কংগ্রেস দল। সে কারণেই বা সেই থেকে কি নেহরু সম্পর্কে তার এত উচ্ছ্বাসের মূল্যায়ন? আমরা তা খেয়াল করে দেখব, বিচার করব।

    নেহেরুকে নিয়ে শ্যাম সরণের লেখাঃ
    গত ১৭ নভেম্বরে ভারতের দ্যা প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় শ্যাম সরণের প্রায় ১২০০ অক্ষরের কলামের দ্বিতীয় প্যারাতেই তিনি এক সমালোচনামূলক মন্তব্য লিখে বলছেন, “নেহরুর নেতৃত্বে ভুলত্রুটি ছিল, যার কিছু আবার দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক পরিণতি রেখে গেছে। তার কাশ্মির ইস্যু নাড়াচাড়ার মধ্যে ত্রুটি দেখি, ঠিক যেমন আমি তার ১৯৬২ সাল চীনের ভারতে অনুপ্রবেশকে ভুলপাঠ করার দোষ দেখি” [“There were flaws in his leadership, some of which left enduring and negative consequences. I would fault his handling of the Kashmir issue, just as I would his misreading of Chinese intentions in 1962.” ]।

    সারা জীবন আমলা হিসাবে কাটানো কাউকে শেষে কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক ব্যক্তিত্ব বলে অনুমান করে নেয়াটা ভুল হবে। তা সত্ত্বেও নেহরুর মত ‘পরম’ নেতার ভুলত্রুটি  আছে সেটা বলা – সেটা সম্ভবত এই প্রথম আমরা উচ্চারিত হতে দেখলাম। তা সু-রেওয়াজের ধারা হতে উঠতেও পারে হয়ত আগামিতে; যেটা ভারতে এখন নেই বা আমরা দেখি না। তবে শ্যাম সরণ সম্ভবত আদর্শ বা খাঁটি কোন চোখে নয়, প্র্যাকটিক্যাল চোখে দেখে বিচার করতে অনুরোধ রেখেছেন।

    কিন্তু এরপরেও আবার শ্যাম সরণ ডিপ্লোম্যাটের মত এখানে এসে পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন। এছাড়া আবার এই সুযোগে না বলার সুযোগ নিয়েছেন যে, কাশ্মির ইস্যু অথবা ১৯৬২ সালের চীনের আসাম দখল ইস্যুতে নেহরুর ত্রুটিটা ঠিক কী ও কোথায়? বরং এবার তিনি নেহরুকে প্রশংসায় ছেয়ে ফেলেছেন, আগের যে কারো চেয়ে এগিয়ে। আর তা করতে গিয়ে তিনি আর পাঁচটা ‘হিন্দু জাতিবাদীই’ হয়ে থাকার মধ্যে আটকে গেছেন। কোন ধরনের ব্যতিক্রম হতেও চেষ্টা করেননি। সবচেয়ে মজার কথা, তিনি নিজে “হিন্দু জাতিবাদী” অবস্থান নিচ্ছেন আর ‘জাতিবাদের’ পক্ষে কথা বলছেন সেদিকে খেয়াল নাই অথচ একই সাথে অভিযোগ করছেন সাতচল্লিশ সালে “ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ” হয়েছে [The country had been partitioned on the basis of religion…… ]। নেহেরু-গান্ধি যদি এক ‘হিন্দু জাতিবাদের ভারত’ বানাতে লেগে পড়েন এই এক্টটাই তো দেশভাগের পক্ষে তাদের শুরু করা প্রথম কাজ!  তাই নয় কী? এর মানে হল – নিজের অবস্থান যে, একটা ‘হিন্দু জাতিবাদের’ সেটা খেয়াল করার পরিপক্কতা তার এখনও হয়নি অথচ ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ’ কেন হল তা নিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। আসলে ব্যাপারটা হল – নেহরু-গান্ধী যদি ভারতকে একটা হিন্দু জাতিবাদী ভারত হিসাবেই গড়তে শুরু করে দেন (যা তারা বাস্তবে করেও ছিলেন) তাহলে এর সোজা মানে হল – তারাই তো তাহলে মুসলমানদেরও একটা মুসলমান জাতিবাদী পাকিস্তান গড়ে নিতে ঠেলে দিয়েছেন – তাই নয় কি? এটা বুঝতে কারো কষ্ট হলে বুঝতে হবে, সেটা হচ্ছে তাঁর হিন্দুত্বের  প্রতি গভীর ভালোবাসার আর মুসলমান বা ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও ফোবিয়ার কারণে। এসবই পুরা এর পেছনের কারণ।

    এরপর তিনি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার সময় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৫০ করদ রাজ্যের কথা তুলেছেন। মানে  যাদেরকে হবু ভারতে কেমনে জোর করে ঢুকিয়ে নিতে সেকাজে নেহরুর প্রশংসা করে নিতে চান এই সুযোগে। সরি এটা কোন প্রশংসনীয় কাজ ছিল না যে তাদেরকে নেহরু সামরিক শক্তি দেখিয়ে নেহরুর ভারতে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিলেন। অথচ তিনি এটাকে নেহরুর সাফল্য হিসেবে দেখছেন। অথচ এটাই ছিল ব্যর্থতা; কারণ, তিনি গায়ের জোরে কাজটা করেছেন; যা না করেও হয়ত এটা করা যেত।

    যেমন কোন স্বাধীন মানুষকে যদি চয়েজ দেয়া হয় যে, তিনি এক রাজার শাসনাধীনে থাকতে চাইবেন নাকি পাবলিকের প্রতিনিধিত্বের শাসনের অধীনে যেটা রিপাবলিক না জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র, এমন চান? করদ রাজ্যের সমাধান আসলে ছিল এ দুই চয়েজের প্রশ্ন। কাজেই নেহরুকে ওই সব করদ রাজ্যের বাসিন্দাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হত যে, তারা কী চায়। কিন্তু নেহরু তা করেননি। তিনি গিয়েছেন করদ রাজ্যের রাজার কাছে। আসলে নেহরু বাসিন্দা নাগরিকদের কাছে নয়, তিনি গেছেন রাজার হুকুমের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে। আর এটাকেই তিনি সহজে কাম সারা ভেবেছিলেন।  এটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এর মানে, তিনি তো রিপাবলিক ধারণাই বুঝেননি। তাই এর শক্তিও বুঝেননি। স্বাধীন মানুষ নিজের স্বাধীন চয়েজ প্রকাশের সুযোগ পেলে জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র-এর পক্ষে থাকবে। কিন্তু নেহেরুর ভিতরে এসব বোধ কাজ করে নাই। কেবল এক হিন্দু জাতিবাদ বুঝের অন্ধকারে তিনি সব হারিয়ে ফেলিয়েছেন।

    আর সবচেয়ে বড় কথা, কাশ্মির সমস্যার মূল কথা বা মূল সমস্যাটাই তো এটাই। কারণ, প্রথমত কাশ্মিরও একটা বড় করদ রাজ্য অথচ এর সমাধানে তিনি কিছুই করতে পারেননি। করতে গেছেন হিন্দু রাজাকে পক্ষে টেনে সহজ সমাধান, যেহেতু বাসিন্দারা বড় সংখ্যায় মুসলমান তাই। একারণে, বাসিন্দাদের মতামতের কাছে যাননি। তাই এতে উল্টা তা এমন জটিল করেছেন যে, আজো ভারত-পাকিস্তান সব সঙ্ঘাতের প্রধান ইস্যু এটাই। অর্থাৎ শ্যাম  সরণের করদ রাজ্য ইস্যুর সমাধান নিয়ে নেহরু প্রশংসা করতে গেছেন যা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা ‘খামোখা’ আর স্রেফ চাটুকারিতা! এই বয়সে (৭৫) এটা তাকে মানায় নাই বলাই বাহুল্য।

    শ্যাম সরণের জন্ম ১৯৪৬ সালে। পরের ২৪ বছরের মধ্যে  তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ১৯৭০ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে ফেলেছেন। মানে, মোটামুটি ১৯৬৬ সাল থেকেই ধরা যায় তিনি যথেষ্ট ‘ডাগর’ হয়ে গিয়েছিলেন। লক্ষণীয় ওটাই ছিল সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের দুনিয়া। অথচ আর পাঁচজন সেকালের গ্র্যাজুয়েট বা রাজনীতিকের মত তিনিও খবর রাখেননি যে, দুনিয়ার জন্য “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের” মুখ্য অর্থ ও তাৎপর্যটা কী? আর ১৯৪৫ সাল মানে, বিশ্বযুদ্ধ শেষের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে প্রধান ফারাকটা কী ও কেন?

    কিন্তু সে কথা আমরা কী দেখে বুঝলাম? কারণ, তিনি লিখছেন, “যুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শান্তি স্থাপনের কিন্তু তা না হয়ে দুনিয়া দুই ইডিওলজির দুই সামরিক ব্লকে ভাগ হয়ে গিয়েছিল [The post-war world was already moving from the promise of enduring peace to a prolonged confrontation between two powerful ideological and military blocs, with the constant threat of a nuclear holocaust.]। তিনি আসলে সোভিয়েত ও আমেরিকা এভাবে দুই ব্লকে ভাগের কথা বলছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন বা কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ব্লকে ভাগাভাগি এসেছিল একমাত্র ১৯৫৩ সালের পরের ঘটনা হিসেবে। এমনকি তাও ইমিডিয়েট পরে নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার শপথ নিয়েছিলেন ২০ জানুয়ারি ১৯৫৩। আর এরপর প্রেসিডেন্ট তাঁর নীতি বিশেষ করে সামরিকনীতি যেখানে আসলে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়াদি এসেছিল; আর তা বাইরে প্রকাশ্যে আসতে আসতে দুই বছর লেগেছিল। য়ার সবচেয়ে বড় কথা এগুলো তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাৎপর্য নয় বরং যুদ্ধ শেষের দশবছর পরের ঘটনা। যা প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার (১৯৫৩-৬১)-এর দুনিয়াকে একেবারেই উলটা এক নতুন গতিপথ যার সাথে বিশ্বযুদ্ধের নেতা রুজভেল্টের (১৯৩৩-৪৫) কাজ ও তৎপরতার কোনোই সম্পর্ক নেই বরং উলটা ততপরতা এগুলা। যার মানে শ্যাম সরণও নেহরুর মতই রুজভেল্ট বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই স্টাডি অথবা ন্যূনপক্ষে আমেরিকান ইতিহাস পাঠ ইত্যাদি ঘটনার দিকে যানই-নি। কাজেই তিনি নেহরুর মূল্যায়নকারী হবেন কিভাবে? আর ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে ফারাকটা কী ও কেন তা কিভাবে বুঝবেন?

    অতএব তিনিও যে মুখস্থ কথার এক গতানুগতিক চাপাবাজ তাও প্রমাণ করছেন এখানে। আবার যেমন লেখার শেষের দিকে তিনি  “সেকুলারিজমে” নিষ্ঠাবান এক  মহাভক্ত হিসেবে নিজেকে হাজির করেছেন।

    ভারত সম্পর্কে লিখছেন, “একটা বহু ধর্মীয়, বহু কালচারের রাষ্ট্র ভারত সেকুলার রাষ্ট্র না হলে আর কী হতে পারে [A multi-cultural and multi-religious country could not be anything but a secular State ……]?  অথচ  ঘটনা হল, শ্যাম সরণ সেকুলার শব্দটা জানছেন, শিখেছেন কবে থেকে? তিনি কি জানেন ১৯৭৬ সালের আগে সেকুলার শব্দটা ভারতের কনস্টিটিউশনে কখনো ছিল না! আসলে ১৯৭৬ সালেই প্রথম সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনের আরেকটা নীতি হিসেবে নয়া সংশোধনী জারি করে তা ঢুকানো হয়েছে এবং তা খামোখাই এবং নিজেদের হিন্দুজাতি চিন্তা লুকাবার জন্য। আর তাতে তাই কেবল একটাই লাভ হয়েছিল যে, এটা দিয়ে নিজেদের হিন্দুত্ব প্রীতি ও হিন্দু-জাতিবাদ প্রীতিকে লুকিয়ে এর উপরে সেকুলার জামা টাঙানো গিয়েছিল তখন থেকেই। এই আর কী! আর সেকুলারিজমকে যারা নীতি হিসেবে দেখতে ও বুঝতে চায় তারা অবশ্যই ভণ্ড ও মুসলমানবিদ্বেষী। আমার রাষ্ট্রনীতি সেকুলারিজম এমন কথা লিখে কনুষ্ষ্টিউশনে সেটে দিয়ে বাস্তবায়ন করার বিষয়ই নয়। এমনকি কোথাও না লিখে রেখেও সৎভাবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব।  তাই  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এরা এসবের কোনো পাঠ-পড়াশোনা ও ফ্যাক্টস যাচাইসহ কোনো হোমওয়ার্কই করেননি।

    করণীয় সেকুলারিজম নয়; মূল করণীয় মানুষ জাতি নয় নাগরিক এই বোধে এবার  নাগরিক অধিকারে সাম্য মানে বৈষম্যহীন করা – এর বাস্তবায়ন – এটাই সব কাজের কাজ।  অথচ তারা কোন একটা জাতির কথা মানে “ধর্মীয় জাতির” কথা আনবেই আর এরপর জাতি-রাষ্ট্রের গড়ার দিকে হাটা দিবে।  অথচ সকলেই জানে এই জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট মাত্রই তা নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করবেই।  ফলে সে আবার কিসের সেকুলার নীতি করবে?  আর নেশন স্টেট মাত্রয়ই সেখানে আর না নাগরিক ধারণা  না নাগরিক অধিকার ধারণা কোনটাই থাকে না। সব আবছা করে ফেলা যায় সহজেই জাতি আর দেশপ্রেমের জোশে।
    কথা আরও আছে। নেশন-স্টেট যারা আদি চর্চাকারী (১৬৫০-১৯৫০) তারা সবাই ইউরোপের কলোনি দখলদার রাষ্ট্র ছিল। সারা দুনিয়ায় কলোনি দখল করে বেড়ানো তাদের প্রধান ব্যবসা, প্রধান পেশা এবং প্রধান রাষ্ট্রনীতি ছিল, এই টানা ৫০০ বছর ধরে।  ফলে তারা নাগরিক অধিকার বা মূল নাগরিক ধারণা কী বুঝবেবা বুঝেছিল? ফলে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতার কী আর বাস্তবায়ন করবে? অথচ আমরা তা পড়িনি, খোঁজ খেয়াল  রাখিনি।

    এজন্যই এসবের বিপরীতে মূল প্রশ্নটা আসলে ‘নাগরিক সাম্য’ কায়েম। মানে, সবার সমান নাগরিক অধিকার থাকতেই হবে। সেকুলার বলে দুনিয়াতে কিছু থাকলে এর একটাই ইতিবাচক অর্থ, সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ এটা কোনো জাতিরাষ্ট্র মানে নেশন-স্টেটে অর্জন একেবারেই সম্ভব নয়। যেমন বাঙালি জাতিবাদ পাহাড়িদের সমান নাগরিক গণ্য করবে না। করেনি। এমনকি পাহাড়িদের জুম্ম-জাতিবাদ সেটাও তাদের বাইরের কাউকে তার সমান গণ্য করবে না। হিন্দু নেশন-স্টেট মুসলমানকে সমান নাগরিক অধিকারের গণ্য করবে না, প্র্যাকটিস করবে না। একই অবস্থা হবে মুসলমান নেশন-স্টেটে হিন্দু নাগরিকের।
    এসবই একেবারে গোড়ার মূল সমস্যা; এগুলোই চিন্তার গভীর ত্রুটি । হিন্দুত্ববাদ আড়াল করা যার লক্ষ্য সেই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধি দিয়ে এসব কোনো সমাধান নয় বা কিছুই আড়াল কেমন করে করবে!  বরং মুসলমানবিদ্বেষের উৎস লুকানো হয়ে আছে এটাই!

    শ্যাম সরণ বলছেন, একালের ভারত নাকি “ভারত রাষ্ট্রের সেকুলার থেকে দূরে চলে যাওয়ার কুৎসিত পরিণতি” [We see the ugly consequences of the State departing from the secular norm.]।  মানে হল, তবু এসব লোকগুলো পড়াশুনা না করে, বাস্তবে কি হচ্ছে তা না দেখে কথা বলবে।   খুব ভালো কথা। তাহলে গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেস ও তার একালের প্রতিনিধি ও নেতা রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ‘সফট হিন্দুত্ব’ চাচ্ছে কেন আর মোদির সাথে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে কেন? তাহলে আসলে সারা ভারতজুড়ে  প্রধান রাজনৈতিক ধারা এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ। হিন্দুত্ব মানে এই হিন্দু-জাতিবাদ এটাই কি নেহরু-গান্ধীর ভারত নয়? এর আরও  সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – মোদি বা বিজেপি কি ঘোষণা দিয়ে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ চর্চা করতে গিয়ে কোন সমস্যা হচ্ছে?  কোনো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা কোনো নির্বাচন কমিশনের আইনে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, হচ্ছে? কোথাও হয়নি। কারণ এটাই তো নেহরু-গান্ধীর ভারত ও ভারতের কনস্টিটিউশন, তাই নয় কি? মোদি তো তাদের কনস্টিটিউশন বা ভারতকে কোনো বদল করে নেননি! কাজেই আর কী প্রমাণ লাগবে? ফলে,  এনিয়ে একে তাকে দায়ী বা অভিযোগ করার সুযোগ কই?

    তাহলে এভাবে নিজের সাথে প্রতারণার দরকার কী? শ্যামসরণ এভাবেই মোদির আগের কংগ্রেসের প্রতারণাপূর্ণ হিন্দু-জাতিবাদ করে যেতে চান, এটাই ফারাক দেখাতে চান, তাই কী?  এতে কী ফারাক হবে? অথচ পরে অপর অংশ মানে মোদিকে তিনি বলছেন, ওরা ধর্মান্ধ বা বাইগট-ধারা [small-minded, vulgar and bigoted version]।  অর্থাৎ নিজেকে আড়াল করার নখরা এরা তবু করবেই! অথচ মোদি-আরএসএস এরা বরং তুলনায় ‘ভালো’; কারণ তারা খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদী। তারা কংগ্রেস, নেহরু বা শ্যাম সরণের মত নিজের হিন্দুত্ববাদ লুকায় না, অর্থহীন সেকুলার জামা গায়ে দেয় না! শ্যাম সরণের চোখ এই নেহরুই তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব!! এটাকে এক বোকা চাটুকারিতা ছাড়া আর কী বলা যায়?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২০ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “শ্যাম সরণের নেহরুপ্রীতি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলো কী ভারতের হাসপাতাল ব্যবসার লোকাল এজেন্ট?

    প্রথম আলো কী ভারতের হাসপাতাল ব্যবসার লোকাল এজেন্ট?
    গৌতম দাস

    ১৫ নভেম্বর ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3Ou

     

    প্রথম আলো মানে হল ‘প্রগতিশীল’ মুল্যবোধ! প্রথম আলো নাকি প্রগতিশীলতার প্রতীক, অনেকের কাছে এখনও। যাকিছু ভাল সবই নাকি ……কি জানি! এটা আসলে এখন কয়লা; যে কয়লার কালো রঙ ধুলেও কখনও যায় না!
    প্রথম আলো এবার ভারতের বাণিজ্যিক হাসপাতালের দালালের ভুমিকায় নামল। এসব হাসপাতাল যেগুলো চলত ভারতের রোগী বা ক্রেতার উপর ভরসা করে চলে না বা চলতে পারে না। বাংলাদেশের রোগীর উপর ভরসা করে। কিন্তু করোনা সব এলোমেলো করে দিয়ে যায়।
    বুঝা যায়, ভারতের করোনা পরিস্থিতি একটু ভাল হতেই প্রথম আলো ওসব হাসপাতালগুলো দালালের ভুমিকায় নেমে পড়েছে। কেন এই ইতরোচিত কাজ?
    প্রথম আলো “বার্তা” মানে একটা নিউজ লিখে ছাপাচ্ছে যেন এই ভান করে আসলে এই ‘বিজ্ঞাপন’ ছেপেছে। আবার নাম দিয়েছে ‘বিজ্ঞাপন বার্তা’। হয় বিজ্ঞাপন হবে নয়ত বার্তা বা নিউজ রিপোর্ট হবে। ‘বিজ্ঞাপন বার্তা’টা কি জিনিস? মানে এক সোনার পাথরের বাটি, আর কী! যা বুঝার বুঝেন।
    এটা সরাসরি অনৈতিক। পাঠককে প্রতারণা। প্রথম আলো জানে পাঠক বিজ্ঞাপন শুনলে এক রকম মনোযোগ দিবে আর রিপোর্ট বা বার্তা শুনলে এর চেয়ে সিরিয়াস আর নিরপেক্ষ (কাস্টমার ফুসলাতে আসছে না এই বিশ্বাসে)ধরে নিয়ে তা পড়বে। অথচ প্রথম আলো ঠিক এই প্রতারণাটাই করেছে আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এর সুযোগটাই করে দিয়েছে এখানে!
    এত অনৈতিক নিচে নামবে প্রথম আলো, কল্পনার বাইরে!
    আবার যেসব বাণিজ্যিক হাসপাতালের সম্পর্কে প্রথম আলো রিপোর্টের ‘তথ্য’ যেন এই ভঙ্গিমায় প্রকাশ করল এতে যদি মিথ্যা কথা থাকে, প্রতারণামূলক তথ্য থাকে তবে এর দায় কে নিবে? প্রথম আলো কী নিবে?
    অবস্থা এখন এমনকি যদি প্রথম আলো বিপ্লবী ভাবে দাবি করে তারা দায়িত্ব নিবে তাহলে প্রথম প্রশ্ন উঠবে এটা কী তাহলে আর সাংবাদিকতা থাকল? প্রথম আলো কী ‘সংবাদপত্র’ থাকল? নাকি প্রথম আলো এখন থেকে বাংলাদেশের রোগী প্রত্যাশী ভারতের হাসপাতালগুলোর দালাল মানে লোকাল এজেন্টে রূপান্তরিত হয়ে গেল?
    আর, মনে তো হচ্ছে এটা পাইকারি দর! বিজ্ঞাপনের পয়সা হাসপাতালগুলো না, এমবেসি দিয়েছে! তাই এত গরজ? এত সিরিয়ানেস, কাপড় খোলা গুরুত্ব? তাই কী?
    কী হচ্ছে এগুলো বাংলাদেশে?

    ##
    যারা প্রথম আলো’র রিপোর্টটাতে কী ছিল, যা সরায় ফেলা হয়েছে তা দেখতে চান তবে নিচে ক্লিক করতে পারেন।

    এটা আমার কপি [সাধারণ কপি, ক্যামেরা snapshot নয়] করে রাখা সেই রিপোর্টঃ
  • এক মফস্বলী জেনারেল

    এক মফস্বলী জেনারেল

    গৌতম দাস

    ০৮ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Nt

     

    –China Attempting To Reduce India’s Influence In Myanmar, Sea: Bipin Rawat

     

    ভারতের জেনারেল বিপিন রাওয়াত [General Bipin Rawat], তার পদবি হল চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ, সিডিএস বা CDS; যা ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদেরও উপরের এক পদ ও পদবি। এই পদটি সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে। জেনারেল রাওয়াত ভারতের যখন (২০১৭-১৯) আর্মি চীফ ছিলেন তখন এটা মোদির হাতে তৈরি হচ্ছিল।  বলা যায় আর্মিকে হিন্দুত্ববাদ ও আরএসএসের আলোতে ছাপ দিয়ে সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ এটা।  তাই এই পদ সৃষ্টি হলে এর প্রথম পদাধিকারী হয়েছেন ততদিনে অবসর নেয়া ভারতের আর্মি চিফ এই জেনারেল বিপিন রাওয়াত। আর ওর শুরু, গত ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

    তিনি সম্প্রতি আসাম সফরে গিয়েছিলেন; গত ২০ অক্টোবর এক অভ্যন্তরীণ সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিতে। ঘটনা হল – আসাম পুলিশের এক অনুষ্ঠান ছিল সেটা। সভাটা হল – “প্রথম রবিকান্ত সিং মেমোরিয়াল লেকচার সিরিজ” যা আয়োজিত হয়েছিল ভারতের আইপিএস অফিসার ও পুলিশের এসপি রবিকান্ত সিং স্মরণে। তিনি আসামে তাঁর কাজের জেলা তিনসুকিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবিরোধী তৎপরতা দমনের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দল ‘উলফা’র হাতে তিনি খুন হয়ে যান। এসবই তাই আসামের আভ্যন্তরীণ ঘটনা।

    জেনারেল রাওয়াত ছিলেন সেই স্মরণসভার প্রধান বক্তা। পুরো অনুষ্ঠানে এক তিনি ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন সিভিলিয়ান। আর সাথে বক্তৃতার স্টেজে দেখা যাচ্ছে পেছনের টাঙানো ব্যানারে বাংলাদেশে বর্তমান ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দোরাইস্বামীর নাম, মানে তিনিও সেখানে বক্তা ছিলেন।

    যে উদ্দেশ্যে এই অনুষ্ঠান, তার সাথে ওর দুই প্রধান বক্তা এবং প্রধান বক্তার বক্তব্যের বিষয় ইত্যাদি এসবগুলোর সাথে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। বরং দেখা গেছে, খামোখা কোথা থেকে বাংলাদেশ সেখানে আলোচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউ না হয়েও। কেন?

    কেন বাংলাদেশঃ
    “Assam at crossroads: Geopolitical events its Geographical events in its neighbourhood impacting North East India” – এই ছিল সভায় আলোচ্য বিষয়। বাংলা করলে হয়, নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়ার পড়শি দেশের জিও-পলিটিক্যাল ঘটনায় আসাম বড় বিপদে আছে, এরকম।

    সেখান থেকে  বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট মূল কথাগুলো তুলে আনলে, জেনারেল রাওয়াত বলছেন, ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে (আর নট ইন ইন্ডিয়াস ইন্টারেস্ট’)। আরো বলছেন, “আমাদের সাউথইস্ট এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে চীন ঢুকে পড়ছে তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে। সম্প্রতি আমরা দেখছি একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।

    এখানে বক্তব্যগুলো নেয়া হয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস, আসামের নিউজ-লাইফটিভি ও স্ক্রল (Scroll)ওয়েব ভারতীয় পত্রিকা থেকে। এছাড়া এখানে আলাদা করে বাংলাদেশের বণিকবার্তা পত্রিকার নাম ও রিপোর্টের কথা উল্লেখ করতেই হয়। বিশেষত ভারতীয়  নিউজ বাংলাদেশে স্থানীয় বাংলা পত্রিকায় কী করে রিপোর্টিং করতে হয় এর অনুকরণীয় উদাহরণ হিসাবে। বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া যেখানে বিপরীতে এটাকে ভারতীয় প্রপাগান্ডা করে অর্থ আয়ের উপায় হিসাবে নিয়েছে। তারা  “পছন্দের” ভারতীয় পত্রিকা বা ‘র’ এসাইন্ড নিউজের বাংলায় অনুবাদ করে বা অনুবাদের নামে যা খুশি লিখে ছাপিয়ে থাকে।  ঢাকার এমন অন্য বাংলা সব মিডিয়ার জন্য বণিকবার্তা এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত; যদি কেউ ভাল হতে চায় অনুসরণ করতে পারে।

    উপরে তুলে আনা জেনারেল রাওয়াতের কথায় ফিরে যাই, তার প্রথম বাক্য  ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে” – এই  বাক্যতেই তার কথা মিললো না।  যেমন চীন বাংলাদেশে ‘হানা’ দিচ্ছে, এই হানা দেওয়ার মানে কী?  চীন বাংলাদেশের কীভাবে হামলা দিয়েছে? কোন সামরিক হামলা করেছে নাকি? তা অবশ্যই না।  এছাড়া চীন বাংলাদেশে হানা দিলে বাংলাদেশ কি তাতে আপত্তি জানিয়েছে কারও কাছে নাকি? তা তো না।  এমনকি সে কথা কিন্তু রাওয়াতও আমাদের জানাচ্ছেন না। তাহলে?

    অথচ – এক. রাওয়াত নিজেই বলছেন, চীন অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। তার মানে ব্যাপারটা বাণিজ্যিক। তাহলে এটাকে রাওয়াত হানা দেওয়া [foray] বলছেন কেন?  মানে সাথে একটা সামরিক  ভাব-ইঙ্গিত তুলছেন কেন? এটা একে বাণিজ্যিক জিনিস তার ওপর ‘অবকাঠামো বিনিয়োগ’ কোনো বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয় – ফলে গ্রহিতা দেশের জন্য খুবই কাম্য; যা  বাংলাদেশকে  দেওয়ার ভারতের  মুরোদ নেই, এখনো হয়নি। বরং পারলে এই বিনিয়োগ ভারত-ই চীনের কাছ থেকে নেয়। তাহলে রাওয়াত এটাকে চীনের বাংলাদেশে ‘হানা দেয়া’ বলছেন কেন? অবকাঠামো বিনিয়োগ দেয়া কী করে ‘হানা’ দেয়া হয়? সেটাও কি ঈর্ষায় বলা কথা? সে জন্য?  নাকি সম্ভবত  রাওয়াত কি সামরিক তৎপরতা আর অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে আসা – এ দুয়ের ফারাকই বুঝেন না? একটা বাণিজ্যিক তৎপরতাকে যদি তিনি সামরিক হানা দেয়া বলেন, বুঝেন, তাহলে বলতেই হয় চার স্টার জেনারেল হলে হবে কী তিনি এখনো এক “মফস্বলের লোকই’ রয়ে গেছেন।  মানসিক বৃদ্ধি-বিকাশ কিছুই ঘটেনাই।  মফস্বলিয়া মানে শহরায়ন হয় নাই। জ্ঞানবুদ্ধি, মুল্যাবোধে অপুষ্ট থেকে গেছে যার।  ভারতের মডার্নাইজেশন, এডুকেশন ধারা যথেষ্ট বিকশিত ফলে ওর সামরিক মান তো খারাপ মনে করার কিছু নাই। তাহলে জেনারেল রাওয়াতের বেলায় এমন কেন সে এক প্রশ্ন বটে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায় – এটা কোন সামরিক জেনারেলের নুন্যতম স্ট্যান্ডার্ড নয়।

    আর এর মানে দাঁড়ালো জেনারেল বিপিন তো চীনের বিরুদ্ধে তার অভিযোগটা কী তাই তো প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না। চীনের বাংলাদেশে বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ানোর মুরোদ যদি থাকে ও প্রয়োগ হয় তা নিয়ে ভারতের কিছুর বলার নাই। আর যেকোন দেশ তা করবেই এবং তা বৈধ। তবে বড় জোর রাওয়াতের এনিয়ে ঈর্ষা হওয়া জায়েজ। কিন্তু তবু এই ঈর্ষা হতে হবে গোপনে বা মনে মনে অথবা আভ্যন্তরীণ গোপন নন-পাবলিক দলিলে।  কারণ, প্রকাশ্যে ঈর্ষা দেখানো  ভাল আদব ও রুচির পরিচয় নয়। তবে সবচেয়ে ভাল হবে চীনের যোগ্য প্রতিযোগী হয়ে আরো বড় বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের দরজা খটখটানো।আর এই মুরোদ না থাকলে ভারতের চেপে যাওয়াই ভাল! নয় কী? দেখা যাচ্ছে জেনারেল বিপিন যেন জিদ করেছেন  যে তাঁর এই বোকা ব্যবহার আমাদের সামনে বের করবেনই!

    এমন মন্তব্য করেও কেন জেনারেল বিপিন রাওয়াত এমন বোকা বোকা ব্যবহার করতে পারেন আর সেটা কেন কেমন হল এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে গিয়ে মনে হল, এটা এমনি এমনি সম্ভবত বুঝা যাবে না। তার ‘ভারতীয় মনগঠনে’ প্রবেশ করতে হবে।  একাজে আগে কিছু কথা আগাম ধরে নিতে হবে যেটা সম্ভবত তাঁর মনে ধরে নেয়া আছে। বছর কয়েক আগে ভারতের এক মিডিয়ায় দেখেছিলাম এক অনুমান যে, সারা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই ফলে বাংলাদেশের উপরেও, মানে যেন বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারির অধীনে আছে। নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া এই অনুমানের উপর তারা লিখছিলেন। অনেক ভারতীয় মিডিয়ায় সেকালে দেখেছিলাম লেখা হয়েছে একইভাবে ও অভিযোগে যে, চীন সাউথ এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়া নাকি ভারতের বাগানবাড়ি – এটা আগাম ধরে নিতেই হবে। আর বাগানবাড়ি মানে মূল বাড়ির পেছনের যেমন বাড়ির মালিকের বাগানবাড়ি থাকে, বাংলাদেশ হলো ভারতের সেই বাগানবাড়ির অংশ। বাংলাদেশে মানে ভারতের সেই কথিত বাগানবাড়িতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে এসে ঢুকে গিয়েছে।

    কেন ধারণাটা আমদানি করতে হল?
    কারণ এই উটকো ধারণাটা ছাড়া চীনের সাউথইস্ট এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এটাকে নেগেটিভ বা খারাপ কাজ বলা যাচ্ছে না।  এটা ভারতের স্বার্থের বিরোধী কাজ তাও বলা যাচ্ছে না। অথচ এতে বেকুবিটা হল –  বাংলাদেশ কী করে ভারতকে বাগানবাড়ি হল? কে দিয়েছে, ও কীভাবে? এর সাফাই কে দিবে সে খবর নেই। কিন্তু এটা আগাম ধরে নেওয়া আছে।
    এখন বাংলাদেশ যদি ভারতের বাগানবাড়ির অংশ হয় তাহলে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ( রাওয়াত নিজেই বলছেন, ……a tremendous influx of Chinese investments to build community projects and infrastructure.) নিয়ে বাংলাদেশে আসা মানে চীনের ভারতের বাগানবাড়িতে আসাই হয় – আর সেই সুত্রে, তা তো চীনের বাংলাদেশে হানা দিয়ে আসাই হয় – তাতে বিপিন রাওয়াত বলতেই পারেন! নাকি?
    এ ছাড়া দুই নম্বর পয়েন্ট হল – রাওয়াত বলেছেন, “বাংলাদেশ অনেক চীনা অস্ত্র কেনে”। (…… countries have been the largest recipients of military-grade weapons from the Chinese)।
    হ্যা, তো কিনে! কিন্তু তাতে কী হয়েছে? বাংলাদেশের অস্ত্র কেনা কী বেআইনি? না কি?  ভারতও কী আমেরিকা, রাশিয়া বা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড থেকে ‘মিলিটারি গ্রেড’ অস্ত্র কিনে না? আর এমন ক্রয়ের আগে কি ভারত প্রতিবেশী বাংলাদেশের অনুমতি নেয়? না। তাহলে  রাওয়াতের মনে এতে কী সন্দেহ জাগে তাতে আমাদের কী? আর অনেককে নিয়ে অনেকেরই নানা সন্দেহ থাকতেই পারে যা নিজ নিজ বাহিনীর অভ্যন্তরে কৌশলপত্রে থাকে ও এর অংশ হয়। তো  থাক  সেসব কথা। কিন্তু আসামের ঐ প্রকাশ্য সভায় তা উগরানোকেন? এটা কী কোন বুদ্ধিমানের কাজ? মানে এসব কী তাহলে বাংলাদেশকে শুনানো, ভয় দেখানোর জন্য?

    দিন সব একই রকম থাকেনা, বদলায়। তাই একালে বিপিন রাওয়াতের এসব ছেড়ে দেয়া উচিত। আগের এক লেখায় বলেছিলাম বোকা মানুষ জেনে না জেনে নিজেই নিজের শত্রু জন্ম দেয়, শত্রু খাড়া করে এবং শত্রুর মধ্যে বিশেষ সব আকার-বৈশিষ্ট্য তাতে এঁকে দেয়। আবার পরে এই মানুষই কান্নাকাটি করে যে, আমার শত্রু এমন কেন হলো! কাজেই রাওয়াতের বুদ্ধিমান হওয়া উচিত, এসব ‘কইরেন না।’ বাংলাদেশকে ভারতের শত্রুর আকার-বৈশিষ্ট দিয়েন না, নিজের খাতিরে।  ভারত চাইলে অবশ্যই এসব কাল্পনিক শত্রু কল্পনায় এঁকে চলতে পারে। এতে এক পর্যায়ে ভারত বাংলাদেশকে চীনের কোলে আশ্রয় নিতে ঠেলে দিতেও পারে। কেননা, অকারণে ও অত্যধিক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হলে যে কেউই নিরাপত্তার জন্য ছোটাছুটি করবেই। তাতে উপায়ন্তর না পেলে সে চীনকে বা যে কাউকে শক্তিশালী ও ভারতবিরোধী পাবে তাকেই ডেকে আনবে। এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই বলছিলাম ঠেলেন না!  কাজেই বাংলাদেশ ভারতের  কেমন শত্রু হবে সেটা নির্ধারণ বা নির্বাচনও ভারতের হাতেই আছে, রয়েই গেছে – এটা খেয়াল রেখেন।

    ভারতের আরো করণীয় কী?
    করণীয় হল – ১. আমরাও ব্রিটিশদের কলোনি ছিলাম যা থেকে ১৯৪৭ সালে মুক্তি পেয়েছি। কাজেই এরপর আমরা কোনোভাবেই ভারতের বাগানবাড়ি নই। সারা সাউথ এশিয়াও নয়। কথাগুলো ভারতের লিখে মনে রাখা উচিত। এছাড়াও লাস্ট ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কখনোই নেহরুকে পরবর্তী ভাইসরয় করে দিয়ে যাননি। কারণ মাউন্টব্যাটেনই সর্বশেষ। কাজেই নেহেরুর মত  মিথ্যা কল্পনায় স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেন। রাওয়াতের মত সবাই বন্ধ করেন যে, বাংলাদেশ ভারতের বাগানবাড়ি আর চীন সেখানে ‘হানা দিতে’ এসেছে।

    বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারি নয়। ইঙ্গিতেও এটা সত্যি না, ভুল। তাই, প্রথমে মিথ্যা স্বপ্নের গল্প বা মিথ থেকে বের হয়ে আসেন। আর জেনে রাখেন, আপনারা আমাদের চাপাচাপিতে ভয় না দেখালে, পুশ না করলে, বাধ্য না করলে (আমরা জানি চীন-ভারত সামরিক সমস্যা বিতর্ক-বিরোধ আছে; তবে) আমরা সেই সামরিক বিরোধে কখনো কোনো পক্ষ নিব না। কারণ ওতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া কোনো স্বার্থ নেই। এটা চীন বা কারো কোনো হবু প্ররোচনা বাংলাদেশের ওপর আসার আগে থেকেই আমরা নিশ্চিত, আমাদের স্বার্থ নেই। আর সস্তা বলে চীনের থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি আমরা, সেটা এক জিনিস। কিন্তু এর মানে কোনো বিরোধে চীনের পক্ষে দাঁড়াতে হবে এমন মুচলেকা কোথাও দেইনি আমরা। এখন বাকিটা হলো বুদ্ধিমান ভারতের হাতে ও উপরে।

    কাজেই “আসাম নাকি ক্রসরোডে পড়েছে” – এটা আমাদের জানার কথা নয়। আমাদের কনসার্ণ না।  তাই যদি পড়েও থাকে এর মধ্যে বাংলাদেশ কেউ না এবং নেই। সবটাই আপনারা ভাইসরয় বা বাংলাদেশ আপনাদের তালুক এই- জাতের অসার কল্পনাপ্রসূত চিন্তার সমস্যা। আর নয়তো তা ভারত-চীনের কোনো সামরিক, ভৌগোলিক বা স্ট্র্যাটেজিক বিরোধ যার কোনোটার অংশ আমরা নই। তবে এই অজুহাতে আবার ২০০৮ সালের মত বাংলাদেশের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে চান? কে বসবে ঠিক করে দিতে চান? পরের ১২ বছরের জন্য কাউকে বসাতে চান? আসেন চেষ্টা করে দেখেন! তবে মনে রেখেন, কোনো ঘটনা দুনিয়ায় একই রকমভাবে দু’বার ঘটে না! কেবল আবার বলব, নিজের শত্রু কেমন হবে মানুষ নিজেই এর আকার-বৈশিষ্ট্যদাতা!

    সত্যি কথা সরাসরি বললে, বিপিন রাওয়াতের কথার আসলে মানে হয় না। প্রথমত বাণিজ্যিক আর সামরিক তৎপরতা বা স্বার্থের ফারাক তিনি পরিষ্কার বুঝেন ও মনে রাখেন বলে আর মনে হয় না।। যেমন ধরেন – আমরা কি বলতে পারি যে, আমার ছেলে কেবল ম্যাট্রিক দিলো তাই পড়শির ছেলে  বুয়েটের পরীক্ষায় টিকে চান্স পাওয়াতে এটা আমার পরিবারের স্বার্থবিরোধী কাজ ও ঘটনা হয়েছে? পড়শির কোন সমৃদ্ধি মানে কী তা আমার স্বার্থবিরোধী? এভাবে বলা যায়? সেক্ষেত্রে, এটা বড়জোর হিংসার কথা, তাও আবার বেকুবি হিংসা কথা হবে!

    অথচ রাওয়াতই বলছেন, “চীন তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে সাউথ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে ঢুকে পড়ছে” সম্প্রতি আমরা দেখছি “একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।  মানে  রাওয়াতের কথাতেই এটা পরিষ্কার যে, এর পুরোটাই বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো বিনিয়োগ, সামরিক নয়। কাজেই এটা ভারতের স্বার্থ কি না, এতে ভারতের স্বার্থ আছে কি না ইত্যাদি প্রশ্ন তোলারই তো মানে হয় না, বোকামি। পড়শির ঘরে মেলা বাজার-সওদা আসলে এটা আমার স্বার্থে না, একথা বললে কী মানে হয়? তখন রাওয়াতকে বলতেই হয় যে, হ্যাঁ, অবশ্যই এসব বাজার-সওদা আপনাদের জন্য নয়, কাজেই এটি ভারতের স্বার্থ নয়। কিন্তু সে জন্য কান্নাকাটি করা যায় না, অভিযোগ করা যায় না, কেবল এ ঘটনা আপনাদের স্বার্থবিরোধী বলে চিৎকার করলে আপনাদের পাগলাগারদে পাঠানোই বাকি থাকে!

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত, আপনাকে আবার মনে করিয়ে দেই। ভারতের নীতি আসলে – ‘আমরা ভালো প্রতিশ্রুতিশীল পার্টনার হতে পারব না’- এটাই যেন হয়ে আছে। বরং কে কত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারে, ঠকাতে পারে এরই দক্ষতা দেখানোকেই আপনারা যোগ্যতা মনে করে আসছেন। ভারত বড় দেশ, ১৩৫ কোটির দেশ, তাই ভারতের এসব ‘জুয়াচুরি’ পড়শিরা যেন মানতে বাধ্যই থেকে যাবে। আর এই পরিস্থিতিতে এখন আপনাদের পড়শি দেশে আপনাদের কথিত বাগানবাড়িতে চীন কেন আসবে – আপনারা সেই দুশ্চিন্তায় থাকলে আমাদের কী করার আছে? এটি আপনাদেরই সম্ভবত মানসিক সমস্যা।

    বৃহত্তর দিকটা দেখিঃ
    ব্যাপার হল, ভারত বাংলাদেশের আইনিভাবে প্রাপ্য ৫৪ নদীর পানিতে আমাদের ভাগ লুটে খাচ্ছে – এটা কি এভাবেই চলতে পারে মনে করেন? কখনোই নয়। ভারত নাকি দক্ষিণ চীন সাগরে সবার অবাধ চলাচলের নেভিগেশনের রাইট চায়? সে জন্য চীনবিরোধী কোয়াড জোট বেঁধেছে। তাহলে আমাদের পানির রাইট দিতে চায় না, জন্ম থেকে পানি আটকে রেখেছেন কেন? যদি বলেন আপনাদের গায়ে বল আছে তাই দিবেন না। এর মানে বুঝেন?  আসলে বলছেন, আমাদেরকে ঠেলছেন যে, ভারতের চেয়ে বড় বা বেশি গায়ের বল নিয়ে আসো। তাহলে এসে নিয়ে যেও। অর্থাৎ বলশালী ভারতবিরোধী দেশের কাছে যেতে বলছেন? বুঝে বলেন কিন্তু!

    বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার সময় আগে থেকেই ভারতের দুই শর্ত হল যে, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় আসামের জন্য সব ধরনের করিডোর নিবেন। দিতে হবে। এমনকি রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। আর সেটা আড়াল করতে শর্ত হল, বিনিময়ে ভারত ছিটমহল লেনদেন সম্পন্ন করবে, যেটা শেখ মুজিবকে আনুষ্ঠানিক কথা দিয়ে বাংলাদেশের দিক থেকে বেরুবাড়ি হস্তান্তরের পরও ভারত আমাদেরটা তখনো দেয়নি। সেটাই এবার দেয়ার কথা। এটা কিন্তু দয়া নয়, আমাদের পাওনা। পাওনাটা আটকে রেখেছিলেন। কাজেই এটা তো করিডোর দেয়ার বিনিময়যোগ্য কিছু নয়। তাই আসলে এটাও ছেলেভুলানি!

    আর দ্বিতীয় শর্তটা ছিল তিস্তা নদীর পানি। যা ভারত আজও দেয়নি, কখনো দিবে না বলে বুঝা  হয়ে গেছে। ভারতেরই কেউ নাকি বাংলাদেশকে পানি দিতে দেয়নি – এ কথা যদি ভারত বলে তার মানে হবে ভারতেরই কথিত ‘কেন্দ্র’- এর সার্বভৌম মুরোদ নেই। এমন যদি ‘মাজাভাঙা’ হয় তাহলে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ভারত করে কেন, কী করেই বা করে যা পালন করার মুরোদ নেই? নাকি অজুহাত খাড়া করতে এমন চুক্তি করে?

    তাহলে এখন কেন বাংলাদেশ আপনাকে যোগ্য পার্টনার মনে করবে? আবার দেখুন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে এমন বড়ভাইয়ের ভয় দেখিয়ে ভারত চলে আসছে। তাহলে এখন, চীন কেন পড়শিদের দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসে, এ নিয়ে আপনাদের জ্বলুনি দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, ভারতের হাত ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে সব নিয়ন্ত্রণ? তাহলে আপনাদের কথিত প্রভাব এখন কোথায়? কাজেই সাবধান হওয়া উচিত! কী চাচ্ছেন, মানে কিভাবে আপনার হবু শত্রুর আকার আমাদেরকে দিচ্ছেন – এ দুটি বুঝেই  কথা আগাবেন আশা করি। এটা মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।

    বিপিন রাওয়াত কে?
    ২০১৭ সালের শুরু থেকে জেনারেল বিপিন রাওয়াত ভারতের আর্মি চিফের দায়িত্বে এসেছিলেন। সেই থেকে জেনারেল রাওয়াত সম্পর্কে বাংলাদেশের মনোভাব কেমন তার এক সারসংক্ষেপে জানা যেতে পারে।

    ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত তিন বছর রাওয়াত ছিলেন ভারতের সেনাপ্রধান। তিনি তিন বছরের আর্মি চিফের পোস্টে আসীন ছিলেন রুটিনভাবেই। তবে সে সময়ই নতুন পদ সিডিএস সৃষ্টি করা হয় এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। এই পদ ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের পদ হলেও এটা শুরু থেকেই পোশাকী মানে উর্দি বা সামরিক পদ ছিল। কিন্তু এটা ঠিক, তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের আগের যে যারা যেখানে সরকারি পদ যা একেবারে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত যার যা দায়িত্ব কর্তব্য ও কমান্ড যা ছিল সিডিএস [CDS] পদ সৃষ্টির পরেও, আগের সে কাঠামোতে কোনো বদল আনা হয়নি।
    আনুষ্ঠানিকভাবে তাই যা আগে বলা হয়েছিল, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বা সিডিএস পদ তৈরির পরও তাতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর সোজা মানে, সিডিএস তিন বাহিনী প্রধান আবার বাইরের কাউকেও কমান্ড করতে পারবেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে সিডিএসের কাজ হল তিন বাহিনী প্রধানের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা। আর সাথে কোথাও কোথাও আকার-ইঙ্গিতে বলা হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথেও সমন্বয় করা।

    একারণে, এটাই অনুমান আকারে ভারতে প্রচলিত আছে যে, আরএসএস-মোদি ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও হিন্দুত্বের ছাপ দিতে চায়। একারণেই এই নতুন পদ তৈরি করা হয়েছে। বাইরের চোখে যা একটা কথিত কো-অর্ডিনেশন।

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত আর্মি চিফ থাকার সময় থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে যেন তিনি বিজেপি কর্মী এমন আচরণ ও তাল দেয়া শুরু করেছিলেন; যার প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্ট বলে মনে করা হয় ২০১৯ মার্চ-মে মাসের নির্বাচনের ঠিক আগেই পাকিস্তান হামলার ভনিতা সাজানো। বিজেপি ও মোদি চেয়েছিলেন পাকিস্তানে সাজানো হামলা ও এভাবে প্রতিশোধ নেয়ার জোশ তোলা। তাতে যেন মোদির নেতৃত্বে বীরত্বের সাথে প্রতিশোধ নিয়ে আসা হয়েছে- এই জোশ তুলে হিন্দু ভোটার পোলারাইজেশন ঘটানো ও তা বিজেপির বাক্সে জড়ো করা। অর্থাৎ মেসেজটা হলো, অ্যান্টি পাকিস্তান মানে অ্যান্টি মুসলমান মানে এবার হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে একমাত্র মোদির দলকে ভোট দাও এই ছিল ২০১৯ নির্বাচনের স্লোগান সূত্র। এখন বিজেপির ওই ভোট রাজনৈতিক প্রোগ্রামে আর্মি কেন আসতে বা সায় দিতে রাজি হবে, এটাই নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল এই রাওয়াতের।

    এ কারণে, পাকিস্তানি বিরাট ঘাঁটিতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে বলে ভারতীয়রা সাফল্য দাবি করলে পরে ইমরান খান কূটনীতিকদের স্বচক্ষে সেই হামলাস্থলে নিয়ে গিয়ে দেখান, একটা মরা পাখি ছাড়া সেখানে কোনো প্রাণী আহত-নিহত কিছু নেই। তবে মাটিতে বোমা ফেলায় গর্ত হয়েছে অনেক, এর সচিত্র বর্ণনা তারা দেখিয়েছিল। কিন্তু তত দিনে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হয়ে যায়। ফলে এর কোনো প্রভাব সেখানে ছিল না।

    এর অনেক আগে অবশ্য বিপিন রাওয়াত যে আনুগত্য প্রদর্শনে সম্মতি জানিয়েছেন তাও পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। অনেকের মনে থাকতে পারে ঘটনাটা। কাশ্মিরের এক তরুণ কথিত সন্দেহভাজন জঙ্গি। তাকে ভারতীয় আর্মি তাদের এক জিপ গাড়ির বনেটের উপরে সামনে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধেছে। এরপর সেই গাড়ি নিয়ে সারা শহর ঘুরানো হয়েছে। এই নৃশংস অমানবিক কায়দায় এবং আইনবহির্ভূত অবস্থায় তাকে বসিয়ে সারা শহরে ফুল স্পিডে গাড়ি চালানো হয়েছিল। এটা মিডিয়ায় রিপোর্ট হওয়ার পর হইচই উঠেছিল। আর সামরিক কর্তারা সাফাই দিয়েছিলেন, বন্দীর বন্ধুদের ভয় দেখাতেই নাকি এমন করা হয়েছিল। অথচ বন্দীর সাথে এই আচরণ বেআইনি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর্মি চিফ বিপিন রাওয়াত সে সময় এর স্বপক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন। এর আগে ভারতের কোন আর্মি চীফ এমন দলবাজ হতে দেখা যায় নাই। নিজের পেশার প্রতিওই অনুরক্ত থেকে কাজ করেছেন। অনুমান করা হয়, মোদি এভাবেই তাকে পরীক্ষা করে নিয়েছিলেন। মনে করা হয়, এটাই তার হিন্দুত্ববাদী-রাজনীতির পক্ষে প্রথম অ্যাক্ট ও অফার, ফলে তা এক অন্তর্ভুক্তি ও সম্মতি। কারণ, একই সময় মুম্বাইয়ের কিছু অভিনেতাও বিজেপিতে রিক্রুট করা হয়েছিল। সাধারণভাবে অভিনেতাদের কাছে ব্যাপারটা টাকা নিয়ে অভিনয়ের মতোই রাজনৈতিক অভিনয় করে দেয়া। এমন অভিনেতাদের অনেকের মধ্যে ছিলেন সস্ত্রীক অনুপম খের, পরেশ রাওয়াল, কঙ্গনা রানাউত ইত্যাদি। পরেশ রাওয়ালসহ অনেকেই জিপে বেঁধে ঘুরানোর ওই ঘটনায় বিপিন রাওয়াতদের পক্ষে প্রপাগান্ডামূলক পাবলিক আর্গুমেন্ট দিয়েছিলেন।

    তাই জেনারেল বিপিন রাওয়াত এখনো যা করছেন তা এক আরএসএস ক্যাডারেরই তৎপরতা যেন। আর এতে আমরা দেখলাম, আরেক ক্যাডার বিপিন রাওয়াত  আসামে কী করলেন!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “এক জেনারেল “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

      ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

    গৌতম দাস

    ০১ নভেম্ববর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3MV

     

    আ.লীগ কি আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাচ্ছে— প্রশ্ন রানা দাশগুপ্তের

    গত বৃহস্পতিবার ২৮ অক্টোবর   চট্টগ্রামে ইসকনের এক জনসমাবেশ হয়েছে। পরদিনের প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে এ সমাবেশের আয়োজকদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে- “বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের নন্দনকানন চত্বরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি আয়োজিত এক সমাবেশ হয়েছে”।

    ‘ইসকন’ [ISCKON] ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড এক হিন্দুধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যা ‘কৃষ্ণনাম চর্চার এক বিশেষ ব্যাখ্যা’ প্রচারের সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তা সত্বেও চলতি শতকে এসে আমেরিকান সংসদে ও সিনেটে ভারত সরকারের পক্ষে আমেরিকান নীতি পলিসিকে প্রভাবিত বা লবি[lobby] করতে ভারত আমেরিকায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির মিলিত এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, ক্রমেই ইসকনও তার অংশ হয়ে যায়। এর নিট ফলাফল হল ইসকন আর নেহায়েতই ধর্মপ্রচারের সংগঠন থাকেনি। এর ফোকাস বদলে রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে যায়।

           চট্টগ্রামে সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার সমাবেশ

    আমেরিকা হল এমন সমাজ যেখানে বহু বছর আগে থেকেই মানুষের জীবনে থিওলজি [theology] মানে ধর্ম বা ধর্মতত্বের আর প্রয়োজন নেই; মানুষের থিওলজিক্যাল নিড বা ধর্ম-বিষয়ক কোন চাহিদা আর নেই – এমন মনে করা, রটিয়ে বা  ঘোষণা করে দেয়া এক সমাজ। এই অনুমান-ধারণাটা যে ভিত্তিহীন এবং যথেষ্ট ভেবেচিন্তা বলা ভাষ্য নয় এরই প্রমাণ হল সেকালের জন্মের শুরুতে ইসকনের টিকে যাওয়া। যেকোন থিওলজির সারকথাটা  হল এটা এক আন্তঃসম্পর্ক বোধ, যা আমাদের ভেতরে এক ‘সম্পর্কিত’ বা  কানেকটেড বোধ জাগিয়ে দেয় বা রাখে। আমার যায় আসে আমাকে টানে, এমন একটা টান-বোধ করা কাজ করে টের পাই। সে আন্তঃসম্পর্ক বলতে তা হতে পারে মানুষে-মানুষে অথবা প্রকৃতির (মানুষ বাদে) সব কিছুর সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্ক বোধ। আর এসব যেকোনো দুইয়ের সম্পর্কের মাঝে থাকে ‘আল্লাহ’ ধরনের এক ধারণা যার মাধ্যমে মধ্যস্থতায় আসলে আমরা সবাই সব কিছুর সাথে কানেকটেড বা সম্পর্কিত বোধ করতে থাকি। এতে মানুষের বেঁচে থাকাটা মিনিংফুল এবং উদ্দেশ্যসম্মত মনে হতে থাকে। কিন্তু মডার্নিটির সস্তা বা দায়দায়িত্বহীন ব্যাখ্যার কারণে নিজেরা থিওলজিক্যাল নিড শূন্য ঘোষণা করে দেয়াতে পশ্চিম নিজের ক্ষতি করে ফেলেছে; অথচ বাস্তবে মানুষমাত্রই কম-বেশি একটি থিওলজিক্যাল চাহিদা থেকেই যায়। আমেরিকান সমাজের থিওলজিক্যাল নিড নাই, দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা এই ধারণা  এতে তৈরি হওয়া যে শুণ্যতা বা গ্যাপটা পূরণ করতেই এশিয়ান থিওলজিগুলোর অনেকেই পশ্চিমে এসে পপুলারিটি পেয়ে যায়। কারণ মানুষ মাত্রই তার থিওলজিক্যাল নিড থাকে থাকবেই। কম অথবা বেশি; জীবনের শুরু থেকেই নয়ত শেষের দিকে, তরুণ জোঁসে নয়ত অবসর জীবনে – এসব খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া বুঝা যায় আরো বহু যূগ থিওলজিক্যাল নিড থাকবে। ফর্ম বা আকারে হয়ত বদল আসবে।  বহুবার দেখা গিয়েছে মানুষ মারাত্মক আত্মঘাতি ভুল করেছে, তাঁর জানা জ্ঞান কোনটাই তাকে সতর্ক বা সাহায্য করে নাই।  পরে আবার থিওলজি থেকে, পড়তে গিয়ে বুঝছে তাকে সাবধান করা হয়েছিল কিন্তু সে বুঝে নাই, মোল্লাদের কারবার বলে তুচ্ছ করে গেছিল। আবার সাথে বলে রাখা ভাল যে তাই বলে জীবনের বস্তুগত দিকটাও উদাসিন, নজর আন্দাজ বা বেখেয়ালি হওয়া বা থাকাটাও সমান বিপদের হবে।
    যা হোক আমেরিকার সমাজের থিওলজিক্যাল গ্যাপ আছে-ছিল বলেই  ইসকন আমেরিকায় হবার  প্রথম দিকে এ সূত্রেই ‘জায়গা’ করে নিতে না পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে ভারতের লবি প্রতিষ্ঠানগুলোর জোটের অংশ হয়ে যাওয়াতে ইসকনের ফোকাস সরে গেছে। এমনকি নেতৃত্বও বদলে যায়, পরিচালন ক্ষমতায় এমন এক ক্যু হয়ে গিয়েছিল। যারা ভারত সরকারের পক্ষে সরাসরি কাজ করতে চায় ইসকন সংগঠনের এই ধারা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। এতে আগের ধর্মপ্রচারের উছিলায় আমেরিকায় জন্মানো এশিয়ান থিওলজির প্রতিষ্ঠানটা এবার হয় ঘোরতর এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষত ভারত সরকারের বর্ধিত হাতের ভুমিকায় তার গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজ করার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ইসকন হল বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে ও কাছে ভারত সরকার ও তার গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়ার বা পৌঁছানোর হাতিয়ার। ইসকন এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিরোধী এক সংগঠন; যদিও পরিকল্পিতভাবেই ইসকনের আগের ধর্মীয় ভাব ও এর বাইরের আদল সবই বজায় রেখে দেয়া হয়েছে। আর ওদিকে এই নয়া ইসকন এখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশে নাশকতা ও অপতৎপরতার সংগঠন ‘র’-এর বর্ধিত হাত হয়ে নিজেকে সাজিয়ে হাজির করতে থাকে।

    শুধু তা-ই নয়, এতে অবস্থা এখন এমনই যে, একালের আরএসএস-মোদির যুগে বাংলাদেশের ইসকনের তৎপরতায় বাংলাদেশের হিন্দুরা যেন কালচারালি আর বাঙালি হিন্দু নয়; তারা যেন আরএসএসের যে উত্তর প্রদেশের হিন্দু ব্যাখ্যা আছে – তার অনুসারী করে নেয়ার এক প্রোগ্রাম। এটাই ইসকনের প্রধান কর্মসূচি এবং তা নিশ্চিত করাই এর কাজ। যেমন বাঙালি হিন্দুকে উত্তর প্রদেশের হিন্দুর স্টাইলে নিরামিশাষী হতে শেখাচ্ছে তারা, ইসকন মার্কা কৃষ্ণভক্ত হওয়ার নামে। অথচ এথনোলজিক্যাল [ethnological] জাতির বিচারে এটা  প্রতিষ্ঠিত যে  বাঙালির খাদ্যাভ্যাস হল সে আমিষ-ভোজী। আর সেখান থেকেই প্রবাদ তারা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সেও হিন্দু অবশ্যই কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত এথনিক প্রজাতি্তে এক নয়। মানে এরা নিরামিষের লোক নয়। সোজা কথায় এথনোলজির বিচারে আমরা বাঙালি হিন্দু, উত্তর প্রদেশের আর্য অনুসারী হিন্দু নই। এই পুরান কাহিনী হিসাবে আর্যদের ভারত দখল অভিযানে দুটো অংশে গিয়ে তাদের অভিযান আর আগে বাড়তে পারে নাও, মূলত প্রাকৃতিক গাহাড় বা নদীর কারণে। এক হল ভারতের দক্ষিণে যেখান থেকে ভারতের দাক্ষিণার্ত-এর শুরু ধরা হয় – অন্ধ্র-হায়দ্রাবাদের কিছু অংশ থেকে দক্ষিণের পুরাটাই। আর এদিকে ভারতের পুবদিকে মারাঠা-বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্তবেশের পরে পরেই। ভাষার স্টাইল, খাদ্যাভাস, দেবদেবীর ভিন্নতা এমন কী আর্টকালচার গানের সুর-রাগ, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি অনেক কিছুতেই এথনিক ভিন্নতাগুলো বেঁচে যায় টিকে যায়।
    অথচ বাংলাদেশে ইসকন এসেছে পুরো উল্টা-পাল্টা হয়ে, আরএসএস-হিন্দুর প্রতিনিধি হয়ে।  তারা বাংলাদেশে এসেছে হিন্দু বাঙালি  সবাইকে আরএসএস বর্ণিত হিন্দু সাজাতে। পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে মমতা (হিন্দু-মুসলমান) বাঙালি বনাম আরএসএসের হিন্দু এই প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের জয় নিজের পক্ষে এনে মোদিকে ঠেকিয়েছিল।
    আর এসব কারণের বাংলাদেশে ইসকন আবার এদিকে, হিন্দু বাঙালিকে বাইরে থেকে দেখে চেনার উপায় চিহ্ন হিসেবে গলায় ‘কাঠের মালা’ পরাচ্ছে। অথচ ফ্যাক্টস হল, গলায় কাঠের মালা মূলত যারা নদীয়ার গৌড় বা বৈষ্ণব অনুসারী তাদের রেওয়াজ; এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাঙালি হিন্দু মাত্রই সবাই নদীয়ার শ্রীচৈতন্যের অনুসারী বা বৈষ্ণব নয়। অর্থাৎ বাঙালি হিন্দু মাত্রই গলায় কাঠের মালা পরা তাদের রেওয়াজ নয়। অথচ ইসকনের আরএসএসের হিন্দু হল, তারা এটিকে এক ইউনিফর্ম ধারণায় (গলায় কাঠের মালা) সাজিয়ে নিতে চায়। তাই হিন্দু বাঙালি মাত্রই ইউনিফর্মের মতো সবাইকে কাঠের মালা পরার রেওয়াজে নিতে চায়; অর্থাৎ পুরোটাই রাজনৈতিক ও ভিন দেশের অসৎ রাজনৈতিক স্বার্থ তারা চাপিয়ে রাজত্ব করতে চায়। মূলত এর মূল উদ্দেশ্য হল আরএসএসের উত্তর প্রদেশকেন্দ্রিক যে হিন্দুত্ববাদী ব্যাখ্যা আছে, বাংলাদেশের হিন্দুদেরও বলপ্রয়োগ করে হলেও এর অংশ করে নেয়া – তাও খাঁটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

    কাজেই আরেক অর্থে বাংলাদেশে ইসকন হয়ে উঠেছে ‘র’-এর “ফুট সোলজার”; মোদি সরকারের ‘বাংলাদেশ দখল নীতি’ বাস্তবায়নের ভয়ঙ্কর হাতিয়ার। স্বাধীন দেশে এটা বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের কাছ থেকে ‘আশা’ করা যায় না। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক মোদির নীতির বাস্তবায়ক হতে পারেন না। কারো প্রভাবহীন নয় ও স্বাধীন থাকতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারও এসব দিকে কোন নাগরিককে কোন ছাড় দিতে পারে না; উলটা সরকারকে এসব দমন করতেই হবে। এটা তার কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়ীত্ব ও মুখ্য কাজ।  এটা রাষ্ট্রস্বার্থের গুরুতর প্রশ্ন।

    এসবের পটভুমিতে এটা হতবাক করার বিষয় যে, গত ২৮ অক্টোবর সেই ইসকন চট্টগ্রামে জনসমাবেশ ডেকেছে আর তাতে যোগ দিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে লেগেছে প্রতিযোগিতা যে, কে বেশি ইসকনের সুনজর ও অনুগ্রহ লাভ করবে! এর প্রতীকী অর্থও খুবই বিপদের ও লজ্জাজনক! অর্থাৎ কে বেশি ভারতের অনুগ্রহ লাভ করবে? আর তাতে আওয়ামী লীগ যদি ১৩ বছরের শাসন চালাতে পারে তবে বিএনপির ভাগ্যেও নিশ্চয় এর কাছাকাছিই কিছু একটা হবে! এমন অনুমান, তাই কি? ওদিকে মিডিয়া রিপোর্টের এনিয়ে ইঙ্গিতে উপস্থাপনটাই মারাত্মক। লিখেছে, ‘সমাবেশে চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ, নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি নগর বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন”। কিন্তু মজার কথা হল, ওখানে বিএনপির কেবল একটি নেতার নাম আছে। অথচ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ছোট নেতাটার নামও সেখানে দেয়া আছে। আর ভোরের কাগজ লিখেছে, “নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা: শাহাদাত হোসেন” সেখানে বক্তৃতা করেন।

    ‘সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, এটা ষড়যন্ত্র’
    গুগল সার্চে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে দেখা যায় “সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: “ এমন বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি রেফারড হয়েছেন আইনমন্ত্রী। আর ভারতের কিছু মিডিয়ায় দেখা গেছে একই বক্তব্য দিয়েছেন বলে কোট করা হয়েছে খোদ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এমনকি গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৃত্যু ও ধর্ষণের নানা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।’ অর্থাৎ সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা মানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে দাবি। অথচ এরপরও চট্টগ্রামের সমাবেশের নাম হল – ‘সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে’ এই সমাবেশ। কেউ সরছেনা; প্রচলিত শব্দ ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ কথাটা দিয়েই সব জায়গায় কুমিল্লার ঘটনাকে বর্ণনা করা হচ্ছে। অথচ ইকবাল হোসেন গং তারা এখনো রিমান্ডে আর তাদের পেছনে কে আছে? নিয়োগ বা অ্যাসাইনমেন্ট দাতা কারা? ‘র’ না ‘ইসকন’ না থার্ড কেউ? এখনো তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এই অংশটা ঢেকে দেয়ার প্রপাগান্ডা চলছেই! ইকবাল হোসেনেই যেন সবশেষ খোঁজাখুজি শেষ ধরা হয়, এর পিছনে আর কেউ নাই; ভারতীয় মিডিয়ায় এমন  আকাঙ্খাই প্রবল!

    এদিকে চট্টগ্রামে ইসকনের সমাবেশে প্রধান গুরুত্ব পায় দু’জন হিন্দু-ব্যক্তিত্বের বক্তব্য। এর প্রথমজন রানা দাসগুপ্ত, তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তাদের দেয়া ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দের বর্ণনা অনুযায়ী কি খোদ রানা দাসগুপ্তের সংগঠনের নামটাই তাদের কথিত ‘সাম্প্রদায়িক’ নয় কি? আর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের নাম ডঃ অনুপম সেন।

    আবার লক্ষণীয়, ওই সমাবেশে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ। সময়ে মনে হয়েছে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিকল্প এবার পেয়ে গেছে। যেন এবার তারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে। রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। কেউ কেউ এই দ্বিতীয় বাক্যটাকেই মিডিয়ায় শিরোনাম করেছে। কিন্তু রানা দাসগুপ্তের বক্তব্য স্ববিরোধী।
    রানা দাসগুপ্তই কড়া অভিযোগগুলো তুলেছেন। এমনকি এটাও বলেছেন, ভোরের কাগজ লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগ ক্রমেই ১৯৪৮ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে চলে যাচ্ছে”।  এর জবাব আওয়ামি লীগ কী দেয় আমরা দেখব।  তবে এটা বহু পুরনো দিন থেকেই মুসলিম লীগ নিয়ে হিন্দু নেতাদের অভিযোগের শেষ নেই। এসব অভিযোগ, রাগ বা ক্ষোভের আদি উৎস হল – ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কেন করা হল।  কারণ এতে পুর্ববঙ্গেও   হিন্দু জমিদারদের যে পলিটিক্যাল, কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য ছিল তা এক নিমিষেই নাই হয়ে  গিয়েছিল। তাই একালে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় তারা এখন কী চায় আর যদি তারা মনে্র কথা খুলে বলতে রাজি হয় তাহলে সম্ভবত এর জবাব আসবে তারা সেই পুরানা আধিপত্যটাই ফেরত চায়। এমনকি একালের প্রজন্ম যারা তারাও ঘুরেফিরে একালের ভারত না হলেও কলকাতাকে যেভাবে দেখে জানে তেমন একটা পলিটিক্যাল যদি নাও হয় তবে অন্তত একই কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য দেখতে চাইবে। কিন্তু খুবই দুঃখিত এটা এবসার্ড, এক অবাস্তব কল্পনা!   আবার আমরা খেয়াল করলে জানব  যদিও খোদ শেখ মুজিবও এর নিন্দা করেননি বা নিজে মুসলিম লীগার ছিলেন বলে কখনো অস্বীকার করেননি। এমনকি হাসিনা শেখ মুজিবের আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন তাকে মুসলিম লীগার হিসেবেই বর্ণনা বজায় রেখে এবং কোনো রাখঢাক না করেই। কিন্তু “মুসলীম লীগ” শব্দটা হিন্দু নেতাদের কাছে একটা গভীর পাপের নাম।

    অথচ ভারতের কংগ্রেস যেমন এক হিন্দু-জাতিবাদী দল; সমতুল্যভাবে (পূর্ব) পাকিস্তানে মুসলিম লীগ মুসলমান-জাতিবাদী দল।  বাংলাদেশের হিন্দু নেতারা কংগ্রেসের চোখ দিয়ে কংগ্রেস যেমন মুসলিম লীগকে তার মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বি-শত্রু  দল হিসেবে দেখে, সেভাবে ঐ চোখেই তারা দেখে গেছে। অথচ কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি কোনো সর্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড নয়, কারণ এটা তো হিন্দু-জাতিবাদী চোখ। বরং কোন সর্বজনীন, কোন সুনিদ্দিষ্ট পরিচয়হীন দৃষ্টিভঙ্গীর এক অবিভক্ত ভারতের কল্পনা করতে না পারার অযোগ্যতা আর ব্যর্থতা থেকেই তো তিনদেশে বিভক্ত হয়েও তো আমরা আজও মূল প্রশ্ন সমাধান করতে পারি নাই, হাতড়ে মরতেছি। য়ার এমনিতেই  পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ভারতের ওই দৃষ্টিভঙ্গি কখনো গ্রহণ করেনি, করার কথাও না। কারণ মূল ত্রুটি ওটা হিন্দু-জাতিবাদী বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী।  অথচ রানা দাসগুপ্তরা অযথা এই পণ্ডশ্রম করে গেছেন। এখানেও করেছেন। কংগ্রেস বা একালের বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদীর চোখ দিয়ে তারা আগের পূর্ব পাকিস্তান বা এখনকার বাংলাদেশকে দেখতে হবে এবং সাজানোর দাবি করতে হবে এই অদ্ভুত কল্পনা তারা করে গেছেন।  হিন্দু-জাতিবাদী ভারত বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী  ভারত এটাই এখনও তাদের চোখে সেকুলার রাষ্ট্রের মডেল। তাদের কল্পনা শুধু না দাবিও যে বাংলাদেশকে তাদের কল্পনা মত হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী “কথিত সেকুলার রাষ্ট্র” করে গড়ে দিতে হবে।  নইলে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেবে।
    অবশ্য এখানে আরেক  সূক্ষ্ম দিক আছে। লক্ষণীয়, আসলে রানা দাসগুপ্ত কিন্তু “মুসলিম লীগ” বলেনইনি। বলেছেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। দুটার অর্থ একেবারেই উলটা। অর্থাৎ যেটা আওয়ামী লীগেরই আগের নাম বা প্রথম জন্মকালীন নাম সেটাসি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মানে আজকের হাসিনা আওয়ামি লীগের  আগে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামেই জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন। সবচেয়ে বড় কথা তারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ ত্যাগ করে বেড়িয়ে এসেই নতুন এইদল খুলেছিলেন।  তা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাওয়া বলতে তিনি আজকের হাসিনা আওয়ামী লীগের জন্ম হওয়াটাই দোষ বলছেন যেন। এককথায় মুসলিম লীগের উলটা এবং শত্রুদল হল আওয়ামী মুসলিম লীগ। তাহলে রানা দাসগুপ্ত এতে আপত্তির দেখছেন কী বা তার বিশেষ অভিযোগটা কী? আসলে  পুরোটাই ভুয়া।  রানা দাসগুপ্ত কি তাহলে ভাসানী-শামসুল হকের ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের গায়ে হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের চোখে তাকিয়ে দাগ লাগিয়ে দিতে চাইছেন? নাকি কিছু ভেবেচিন্তে বলেননি?

    আসলে ব্যাপারটা হলো, কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের প্রবক্তা ও কায়েমকারী হয় তা হলে এই দলের বা সমর্থকের কি আর মুসলিম লীগকে বিরোধিতা বা নিন্দা করার সুযোগ থাকে?  কেন? কারণ কংগ্রেসই কি মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের জনক নয়? সেটা আবার কীভাবে? তাদের হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়তে বেপরোয়া হওয়াটাই কি অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়তে ঠেলে দেওয়া, বাধ্য করা ও উৎসাহ দেয়া নয়? অর্থাৎ হিন্দু-জাতিবাদী দল খাড়া করে একটা  কংগ্রেস দলের জন্মই কী সমস্ত বিপর্যয় ডেকে আনার মূল প্রতিষ্ঠান ছিল না বা ঘটনা নয়? ভারতকে কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র করে আকার দিতে চায়, তবে এটাই কি প্রকারান্তরে মুসলমানদের ঠেলে দেয়া নয় যে, মুসলমানেরা তোমরা শুনে রাখ – ভারত বা কংগ্রেসে তোমাদের জায়গা নেই তাই তোমরা একটি পাল্টা মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়ে নাও? নইলে আমাদের তৈরি ভারত বা কংগ্রেসে আমাদের আধিপত্য ও অধীনতা মেনে চেপে গিয়ে কোনার চিপায় পড়ে থাকতে পারো। কাজেই এই অবস্থায় অতএব – হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রধারী কংগ্রেসের মুসলিম লীগকে কোনো সমালোচনা বা আপত্তির জায়গা কই? করলে সেটা তো তাদের নিজেরই সমালোচনা হবে!

    আবার দেখেন,  মনে হচ্ছে সূর্য সেনদের রাজনীতি রানা দাসগুপ্ত এখনো করে যাচ্ছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা ১৯০০ সালের পরেও আগের শতবছরের (১৮০০-১৯০০) রামরাজত্ব  তাদের পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রভাব কলকাতাকে কেন্দ্র করে ধরে রাখতে চান। আবার এ-ও আবদার যে, ততদিনে ব্রিটিশদের প্রায় দেড়শ বছরের সব অবকাঠামোগত ব্যয় সব কলকাতাতেই হোক, থেকে যাক। কিন্তু ব্রিটিশরা তা মানেনি, সম্ভব ছিল না। তারা বাংলাকে ভাগ করে ঢাকাকে রাজধানী করে আলাদা নতুন অবকাঠামো গড়তে ব্যয় করতে চেয়েছিল। কেন? মূল কারণ ততদিনে আসাম চা উৎপাদন যোগ্যতার জন্য তৈরি ও সম্পন্ন হয়ে গেছিল। অথচ চা বিক্রি, বিতরণের জন্য সেই চা চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যেতে ঢাকা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে ছোট জাহাজে তুলে তা চট্টগ্রাম বন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিবার কোনো অবকাঠামোই ছিল না। না আসাম থেকে ঢাকা হয়ে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত। এ’কারণে ঢাকাকে রাজধানী করে আসাম ও পূর্ববঙ্গকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ করা হয়েছিল ১৯০৫ সালে। এটাই ‘বঙ্গভঙ্গ’।  মানে  ঢাকাকে কেন্দ্র করে আরেক বাংলা প্রদেশ বানানো।  আর এটাই সহ্য হয়নি কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের, চ্যালেঞ্জ বোধ করেছিলেন যে, ঢাকা তো তাহলে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে যাবে তাতে। সক্ষমতাতেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ এখানে বাণিজ্যিক দিক এখানে ভারী – চায়ের সাথে পাটও আছে; আর বিস্তীর্ণ ধানের জমিতো আছেই। যার উপর আসামের লোভ ছিল। কারণ পুর্ববঙ্গ এব্যাপারে আসামের চেয়ে এগিয়ে ও দক্ষ। এসব ছাড়াও আরো দিক আছে। পূর্ববঙ্গে জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা বেশি, সংখ্যাগরিষ্ট; ফলে কলকাতার ম একচেটিয়া কুক্ষিগত প্রভাব  হিন্দু জমিদারেরা ঢাকায় সামাজিক সাপোর্ট সমর্থনে  জমাতে নাও পারতে পারেন। এসবই ছিল হিন্দু জমিদারদের মূল ভীতি। আর এসব স্বার্থে তারা নতুন প্রদেশ করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। এবং এনিয়ে তারা এত মরণপণ সিরিয়াস হন যে যে জমিদারেরা একশ বছরে বৃটিশদের সমর্থন ও ঔরসে  জমিদারি কামাইলেন অবিভক্ত বাংলার একছত্র নেতা হলেন যেই বৃটিশদের বদৌলতে সেই বৃটিশদের তারা অস্ত্র হাতে বিরোধীতার করতে লোক নিয়োগ ও সন্ত্রাসী দল গড়ে  শাসকদের বিরোধিতা করেছিলেন। তা হলে সূর্য সেনরা ছিল মূলত হিন্দু জমিদারদের স্বার্থে কাজ করেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামের লোক হয়েও সূর্য সেনরা নিজ পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধী। কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের লেঠেল। আর তারা জমিদার স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো লোক হলেন। পূর্ববঙ্গের বা, বাংলাদেশের কেউ হতে পারেন না। বরং সরাসরি কলকাতার হিন্দু জমিদারের পক্ষের লোক। কাজেই পূর্ববঙ্গের চোখে তারা কোনো বীর নন,  না হতেই পারেন না।  বরং পূর্ববঙ্গের বা ঢাকার স্বার্থের বিরোধী।  মানে চট্টগ্রামের লোক হয়ে ঢাকার কথা ভুলে মাড়িয়ে কলকাতার পক্ষে অস্ত্র হাতে মাকালীর নাম নিয়ে দাড়িয়ে গেলেন। কাজেই আপনারা নাকি কথিত স্বদেশী এটা কাদের আন্দোলন? কোন স্বদেশ? কলকাতার এবং হিন্দু জমিদারদের জন্য স্বদেশী!  কিন্তু দেখা যাচ্ছে এটা তো পূর্ববঙ্গের কোন স্বার্থই নয়। অথচ জবরদস্তিতে কলকাতা বা কংগ্রেসের স্বার্থটা বারবার আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এখনও।

    দেখা যাচ্ছে, এখনো কংগ্রেসের স্বার্থ ও অবস্থানের চিন্তাটাই রানাদের মাথায় সবসময় ভর ও ডমিনেট করে এবং গাইড করে থাকে। ফলাফলে হিন্দু জমিদার স্বার্থ তাদের চোখে হয়ে যায় কথিত অসাম্প্রদায়িক আর কেউ এর বিরোধিতা করলেই হয় ‘সাম্প্রদায়িকতা’। এই মুখস্থ কথা আর কত দিন?

    একালে কিছু হলেই আরেক বক্তব্য হল রাষ্ট্রধর্ম বলে ইসলামের বিরোধিতা। আচ্ছা,  আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালতে কোনো হিন্দু নাগরিক কী মামলায় হেরে গেছে এজন্য যে, আদালত তাকে এক মুসলমান নাগরিকের মতই সমতুল্য ও  সমান অধিকারের সাথে সমান অধিকারের ট্রিটেড হননি বলে এবং শুধু তাই না  সেটা ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়ার কারণে এবং এমনটা চালু হবার পর থেকে? এমন রেকর্ড কোথাও আছে কি?

    অর্থাৎ আদালত  অধিকার ও ট্রিটমেন্টে এর দিক থেকে কখনও নাগরিক বৈষম্য করে নাই, কোনো অসাম্য হয়নি। তবে ডেকোরেটেড পিস হিসেবে  রাষ্ট্রধর্ম শব্দগুলো অবশ্যই আছে। যা না থাকলে ভাল হত। অর্থাৎ এটা একটি জেদ-ক্ষোভের  সিম্বল। ফলে একটু ভেদের সিম্বলও অবশ্যই। কিন্তু তা-ই-বা কেন থাকবে? কারণ ইন্দিরা গান্ধী প্রগতিশীলতার নামে, অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত এক অর্থহীন ‘সেকুলার’ শব্দ ও ধারণা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এবং বুঝা যাচ্ছিল কারণ তখন তিনি  একাত্তরের শেষের দিকে সম্ভবত অক্টোবরে পাঁচবার আমাদেরকে স্বীকৃতির অনুরোধের ফাইল ঘুরাচ্ছিলেন।  পরে আমাদেরকে পরোক্ষে জানানো হয় এটা না মানলে আমাদের অনেক ভোগান্তি হবে।  ফলে এতে আবার সেই ইসলামবিদ্বেষ ফোবিয়া হিন্দু-জাতিবোধের চিন্তা ও  ডোমিনেন্স যা ভারতে গড়ে উঠেছে তাই আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এটাই তো ইসলামবিদ্বেষ। যেন তাজউদ্দিন সাহেব যত নিজেকে ইন্দিরা গান্ধীর সামনে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় করান না কেন, ইন্দিরা ভুলতেই পারছিলেন না যে তাজুদ্দিন তো আসলে মুসলমান!  তাই তিনি যেন “সেকুলার” সাবধানতার জোরাজুরি্তে তাজুদ্দিনকে বলতে চাচ্ছিলেন তাজউদ্দিন তুমি মুসলমান নও, তুমি সেকুলার……।
    আবার সেকুলার মানে কী তা তো তিনি ইন্দিরা বা আজকের রাজনৈতিক ভারত জানে  এর প্রমাণ তাদের রচিত কনষ্টিটিউশনে আজও নাই। তাদের ধারণা একটা হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তা ভিত্তিক রাষ্ট্রে কোন সমস্যাই নাই। কেবল “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” একথা ঢুকিয়ে দিলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়!
    অথচ বাংলাদেশে আমরা তো সবাই হিন্দুও নই। আমরা সেসময় ছিলাম রাজনৈতিকভাবে “বাঙালি জাতিবাদী”। ফলে ফেলে আসা জমিদার আধিপত্যের ইমেজ আমাদের ক্ষুব্ধ আশংকিত করবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের নতুন বাংলাদেশ বলে কী হচ্ছে এনিয়ে সন্দেহ করবে। জনমনের মনে আবার  সাতচল্ভেলিশের আগের জমিদারি অত্যাচারের ছবি ভেসে  উঠবে  চালু হবে।  এসব ভেবেও   আমাদেরকে সব মেনে নিতে হয়েছিল। (এনিয়ে বিস্তারিত আরো অন্য অনেক বইয়ে আছে। এখানে সেদিক আর টানছিনা।
    আবার মজার গোলমেলে ফ্যাক্টস হল, ১৯৪৭ সালে ভারতকে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র (নেশন-স্টেট) বানালেও নেহরু-গান্ধী কখনোই ভারতের কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলার’ শব্দটা রাখেননি; বরং আমাদের ওপর ১৯৭১ সালে জবরদস্তি করার বহু পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৬ সালে এবার ভারতের কনস্টিটিউশনের ৪২তম সংশোধনী হিসেবে ‘সেকুলার’ শব্দটা অন্তর্ভুক্ত করেন। [ সংশোধনীর প্রথম পাতাতেই  STATEMENT OF OBJECTS AND REASONS এই শিরোনামের অধীনে তৃতীয় পয়েন্টে]। এই লিঙ্কে গিয়ে দেখুন। আর সেই থেকে অনেকের ভুল অনুমান হল, যেকোন রাষ্ট্রে এমনকি তা  হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত রাষ্ট্র হলেও এতে  আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল  ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দ থাকলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়। ফলে এভাবেই ইন্দিরা গান্ধী আগে আমাদের দেশে এমন নীতি ঘোষণা করতে বাধ্য করেওছেন ১৯৭১ সালে পরে ১৯৭৬ সালের ভারতেও তাই করেছেন। এসব এমনই রাষ্ট্রচিন্তায় নাজুক  অবস্থা, দুরবস্তা। আসলে  নিশ্চয় আমাদের কনস্টিটিউশনেও  এই সকুলারিজম এই শব্দ থাকতে পারলেই এদিয়ে তারা মুসলমানদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন আর তারা তাদের হিন্দুত্ববোধ বুদ্ধিকে সেকুলার বলে চালাতে পারবেন, রাষ্ট্রে ছেয়ে রাখতে পারবেন এতটুকুই তাদের লক্ষ্য।  অথচ যারা সেকুলার শব্দ কোথাও না লিখে কায়েম করা যায়। মূলকথা সবাই নাগরিক আর নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র হতে হয়ে যেখানে সবাই একমাত্র পরিচয় নাগরিক হতে হয় ও সমান অধিকারের নাগরিক  – এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে হয়।  এতে কে কী হিন্দু না মুসলমান না পাহাড়ি এটা এখন যা আছে তাই থাকি কিন্তু কনষ্টিটিউশন এই পরিচয় সামনে অধিকারে কোন কমবেশি বা ভাগাভাগি করে না। সবাই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে মুসলমানের দেশে সেকুলার লিখে রেখে ইসলামবিদ্বেষ জারি রাখার যে সন্দেহ আমাদের দেশের মুসলমান নাগরিকদের মনে ভাসে, সন্দেহ জাগে তা তো অমূলক নয়।
    এভাবেই আরেক সন্দেহযুক্ত শব্দ হল “অসাম্প্রদায়িক”। এটা ডিকশোনারিতেই নাই। হিন্দু জাতিবাদের সৃষ্টি এই অদ্ভুত শব্দ।  এটাও হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের বোধবুদ্ধিতে খাড়া করা শব্দ যা দিয়ে যেকোন অ-হিন্দুর উপর চাপ সৃষ্টি বা তাকে, কোনঠাসা করার হাতিয়ার হয়। য়ার তারা আরামে অসাম্প্রদায়িক এই শব্দের আড়ালে হিন্দু-জাতিবাদিতা বা হিন্দুত্ববাদ এর আধিপত্য কায়েম করে নিতে পারে। আবার এই আকামকে তারা সেকুলার বলেও সার্টিফাই বা সাফাই দিতে পারে। অথচ  নতুন বাংলাদেশ তো অন্তত ইন্দিরাদের হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই নয়। এ্টা ছিল মুজিবের “বাঙালি নেশন স্টেট”; ভারতের মতো ‘হিন্দু নেশন স্টেট’ও কোনোভাবেই নয়। ফলে ভারতকে কপি করতে হবে কেন আর তা ফিট করবে কেন? ফলে সেই থেকে রানা দাসগুপ্তরা তাদের ‘কল্পিত দুঃখে’ আমাদেরও মাথা খাচ্ছেন।
    ওদিকে ১৯৭১-৭২ সালের এই সেকুলারিজম চাপিয়ে দেয়ার বিরোধিতা সহজ বা সময়ের সাথে মানানসই ছিল না বা হতো না। এজন্য এমনকি শেখ মুজিবও দেশে ফেরত আসার পর পরিস্থিতি বুঝে তখনই তা বিরোধিতা করতে যাননি। তাই পঞ্চম সংশোধনী লেখার সময় সেই প্রথম আর পরে অষ্টম সংশোধনী লেখার সময় আমাদের হাতে সুযোগ এসেছিল। ফলে সেকুলারিজম উঠিয়ে ফেলে দিলেও ঐ জায়গা ফাকা ফেলে রাখতে চায় নাই। এছাড়া রাগ-জিদও ছিল। তাই সেই জিদ উসুল করা হয়েছিল।  যদিও ‘সেকুলারিজম’ বা ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ইত্যাদি যে অসৎ শব্দ, খারাপ উদ্দেশ্যের শব্দ সেটা চিনতে আমাদের আমজনতার কোন অসুবিধা হয় নাই।
    যেমন এই রাগ-জেদের দিকটা ভালো বোঝা যায় যখন পঞ্চম সংশোধনীতে সেকুলারিজম ফেলে দিয়ে লেখা হয়েছিল “আল্লার উপর অগাধ বিশ্বাস”। এটা তো লিখে কায়েমের কিছু না। কিন্তু দেয়া হয়েছিল অনেকটা হুশিয়ারি বা পাল্টাপাল্টি হিসাবে। অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে, ভারতের এক হিন্দু নেশন স্টেট রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত ‘সেকুলার’ শব্দটা বাংলাদেশে তোমরা চালু করতে চেয়েছো অযথাই, খারাপ উদ্দেশ্যে। কারণ বাংলাদেশ তো হিন্দু নেশন স্টেট কখনোই নয়। কাজেই ইসলাম বা মুসলমানদের কন্ট্রোল করা আবদ্ধ রাখা জাতীয় কোনো শব্দ ইসলামবিদ্বেষ ও ফোবিয়া থেকে জন্ম নেয়া বুদ্ধি। আর এর প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দিতেই ১৯৮৮ সালে আরো পোক্ত হবে ভেবে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করে দেয়া – এমন মনে করা যায়। অথচ এর কোনো ব্যবহারিক বা লিগ্যাল ইমপ্লিকেশন নেই, কারো কারো জন্য হয়ত কিছুটা অস্বস্তি ছাড়া। আর এটাই মুসলমান হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড গংদের ওপর শাস্তির মত বা প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দেয়া।

    তবে আমার ধারণা একদিন পুর্ণ ও স্বাধীন জনগোষ্ঠির ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে নতুন কনষ্ঠিটিউশনে আমরা কোন বিভেদ চিহ্ন রাখব না।  জেদাজেদি করারও কিছু থাকবে না। সব মাফ করে দিয়ে পুরানা ভুলে জনগোষ্ঠি হিসাবে আমরা হয়ে দাড়াতে পারব। বৈষম্যহীন এক  সম-নাগরিক অধিকারের সমাজে আমরা জীবন গড়ব।

    উপরেও রানা দাসগুপ্ত বা অনুপম সেনদের চিন্তায় যে ফোবিয়ার কথা বলেছি এসব কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো সম্ভবত তারা এখন কী বলছেন তা যদি দেখি। ইসকনের ওই সভায় সারকথায় তারা বলছেন, তাঁরা বাহাত্তরে ফিরে যেতে চান। অথচ খোদ শেখ হাসিনাই তো ১৫তম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম আর সেকুলারিজম দুটোই রেখে  দিয়েছেন। যা এখনও লেটেস্ট ভাষ্য।  অথচ কায়দা করে রানা দাসগুপ্ত বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। অর্থাৎ কথার কোন তাল-ঠিকানা নাই।

    আসলে এসব কায়দা করে লাভ নেই। কিন্তু তারা এখন এসব কথা তুলছেন কেন? আমাদের দুই রাজনৈতিক দলই এখন ভারতের আনুগত্য লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এবং দেখা যাচ্ছে তা আবার সরাসরি ভারতের কাছেও না, তার ‘র’-এর কাছেও না। একেবারে ‘র’-এর হ্যান্ডলার ইসকনের কাছে হাত পেতেছে আর তা দেখে রানা দাসগুপ্তদের নিজেকে অনেক পাওয়ারফুল মনে হচ্ছে? তাই তো?  কিন্তু আর কত? ২০০ বছর হয়ে গেল এই মুসলমানদের দাবড়ে রাখতে হবে নাইলে নাকি মাথা চাড়া দিবে – এমন এই দাবড়ানোর চিন্তা এটাই তো ফ্যাসিজম, হিটলারি চিন্তা।  আপনার এই দাবড়ানির চিন্তার জন্যই তো আপনাকে বিশ্বাস করবে না কেউ, কোন আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে না। এটা এমনই ক্ষতিকর চিন্তা তা একবারও ভেবে দেখেন নাই। এজন্য হিন্দুত্ববাদি বা হিন্দুজাতিবাদ চিন্তাকে আমাদের এদিকের হিটলারিজম বলা হয়! এমন চিন্তার জন্যই আজ আমরা তিন দেশই বিচ্ছিন্ন, ধুঁকছি। হাতড়াচ্ছি।  খারাপ চিন্তাই প্রতিহিংসায় অন্য খারাপ চিন্তাকে ডেকে আনে। মানুষ নিজেই নিজের শত্রুর স্বভাব বৈশিষ্ট তৈরি করে।

    আসুন হিংসা পাশে ফেলে রাখি। আর আপনাদের চোখে ধর্মই যদি সব সমস্যার উৎস হয়ে থাকে তবে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজের কথা তো শুনেছেন। অবিভক্ত ভারতে রাষ্ট্র ধারণার গোড়া যেখান থেকে, সেই ১৮১৫ সালের রামমোহন রায় তাঁর আত্মীয় সভা আর যিনি আবার বেঙ্গল রেনেসাঁর নাকি আদিগুরু কমিউনিস্টরা দাবি করে, তা হলে তিনি রেঁনেসার আদিগুরু হয়ে নতুন করে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ চালু করেছিলেন কেন? করেন কী করে? রেনেসাঁর আদিগুরুর সাথে ধর্ম? কেমন মিলাবেন? এতো দুধ আর লেবুর চেয়েও খারাপ মিশ্রণ! হবে? তাই নয় কী এবং কেন?  আপনাদের উচিত হবে এর কারণ খুঁজে দেখা। ব্রাহ্মসমাজ জন্মের কারণ ধরতে পারলে বুঝে যাবেন, ধর্ম (আসলে ইসলাম ধর্ম) নিয়ে আপনাদের অনুমান কতটা ভিত্তিহীন, অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা!

    অথচ খুবই সহজ এসবের সমাধান। আমাদের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। বদলে তা অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র হতে হবে যেখানে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে হিন্দু বা মুসলমান (বা জুম্ম জাতি) জাতি পরিচয় নিয়ে লড়ার কিছু থাকবে না। তখন দেখবেন, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক ধরনের শব্দের আড়াল আর দরকার নেই, লাগছে না।

    শেষ কথা
    এত সেকুলারপ্রিয় আপনারা যারা সেকুলার ভারতের কনস্টিটিউশনকে আদর্শ মনে করেন,  তাহলে ভারতের এই কনস্টিটিউশনই আরএসএসের মোদিকে রাজত্ব করতে জায়গা করে দেয় কেমন করে? সেই প্রশ্ন করুন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনও বিজেপি দলকে অনুমোদন রেজিষ্ট্রেশন দিয়েছে কী করে? সহ্য করে কী করে? এতে কোনো সেকুলারিজমের সমস্যা দেখে না! কী অদ্ভুত? সহ-বাস! হিন্দুত্ববাদ আর সেকুলারিজম সহ-বাস করে কেমন করে? তাহলে কেবল মুসলমান-বাদ দেখলেই এবার ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ হাতে দৌড়ে আসেন কেন?

    এছাড়া  বাংলাদেশের হিন্দুনেতাকেই দেখি এই মোদির সাথে দেখা করে এসে বলশালী অনুভব করেন। আবার দেশে ফিরেই সেকুলার বাংলাদেশ নাই, কিংবা রাষ্ট্রধর্ম আছে বলে কান্নাকাটি করেন। কিভাবে করেন এগুলো? তা হলে আপনারা ঠিক কী চান? বাহাত্তরের কনস্টিটিউশন নামের আড়ালে মোদির ভারতের আধিপত্য ও অধীনস্থতা কায়েম? এসবের জন্য আপনারা বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার হতে পারেন না। পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা না বাড়ালে স্বল্প কিছু পরিবর্তনও কাজ করার কোন কারণ নাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩০ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ইসকনের মন পেতে প্রতিযোগিতা “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আবদির প্রিয় ‘র’ এর ‘মরটাল ফিয়ারে’ জীবন

    আবদির প্রিয় ‘র’ এর ‘মরটাল ফিয়ারে’ জীবন

    গৌতম দাস

    ২৮ অক্টোবর ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3MI

     

    [সার-সংক্ষেপঃ ‘মরটাল ফিয়ারে’ [mortal fear] মানে র’ এর হাতে খুন হবার ভয়।  আমরা সবাই ভারতের র [RAW] এর হাতে মরার ভয়ে আছি, ‘র’ আমাদের তাড়া করছে। বলেছেন – ভারতীয় সাংবাদিক আবদি]

    তাঁর নাম এসএনএম আবদি [SNM ABDI]।  গত  আশির দশকে ইন্দিরা আমলে ভারতের বিহার পুলিশের এক কান্ড। তারা অপরাধ কমাতে এক সহজ পদক্ষেপ নিয়েছিল।  অপরাধীর চোখে এসিড ঢেলে দেওয়া যাতে তারা আর অপরাধ না করতে পারে। করা এই  নৃশংসতার বিরুদ্ধে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করে বিষয়টাকে মিডিয়ায় এনে বিখ্যাত হয়েছিলেন এই আবদি। এখনও আবদির পরিচয়ের সাথে তা সবজায়গায় এমন লেখা পাওয়া যাবে। জাতিসংঘের পুরস্কারও পেয়েছিলেন এজন্য। তিনি ভারতের আউটলুক পত্রিকার ডেপুটে এডিটর ছিলেন পরে আরেক ওয়েব মিডিয়া ফাস্ট পোস্ট এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। সেসময় গত ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর বাংলাদেশ সফরকালে (তিস্তার পানি দিবার চুক্তি করতে এসেও না দেয়ার সেই সফর) সফরসঙ্গী দলের সদস্য হয়ে আবদি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। স্মৃতি হাতড়ে সেখান থেকে বলছি।

    করোনাকালে বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ায় ভারতে প্রত্যেকটা মিডিয়াই টিকে থাকার জন্য এক  মুশকিলের লড়াইয়ে এখনও পড়ে আছে। সব প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াতেই তাদের রিপোর্টের শেষে অর্থ,অনুদান চাঁদা ইত্যাদির আবেদন সংযোজন করা হয়েছে দেখতে পাবেন। আর তাতে ফলাফলে আমরা দেখছি বেশির ভাগ প্রধান ধারার মিডিয়া মোদির দারস্থ হয়েছে।

    আরেক দেশে গিয়ে নিয়মিত নাশকতা কর্মকান্ড চালানোর ভারতের গোয়েন্দা এক প্রতিষ্ঠান হল ‘র’। এই  ‘র’ স্পনসরড বা অর্থ দিয়ে পরিচালিত এক প্রাইভেট সংবাদ সংস্থা বা এজেন্সি হল এএনআই [ANI]  যার প্রধান কাজ হল ফেক নিউজ ছাপা। অর্থাৎ এএনআই-এর কাজ হল ‘র’ স্পনসরড প্রপাগান্ডা বক্তব্যকে  নিউজ হিসাবে প্রান্তিক মিডিয়াতে সরবরাহ করা।  আর যে প্রান্তিক মিডিয়া এটা ছাপে সে এর বিনিময়েই মোদির ‘সাহায্য’ বা মিডিয়া ফান্ড পেয়ে থাকে। আর এমন নিউজ ছাপার মাধ্যমেই ভারতের মিডিয়াগুলো করোনাকালে তাদের আর্থিক সংকট সামলেছিল। বাংলাদেশের মিডিয়াজগত আরো দুর্বল,এখানে কেউই বাণিজ্যিকভাবে কোনকালেই  সফল নয়। তাই ‘র’ স্পনসরড এএনআই এর “নিউজের” আছর বাংলাদেশে আরো বেশি।

    তবু ভারতে এসবের বাইরে থেকে অর্থের লোভ সামলানে এই কষ্টের দিনে টিকে থাকা অল্প ওয়েব পত্রিকাও আছে। যদিও তারা খুবই ছোট ফলে  বাজার শেয়ার খুবই কম। তবু এরা অনেকেই যথেষ্ট প্রভাবশালী নিজ মেরিটে। আমার ধারণা এমনদের শীর্ষে আছে এখন সম্ভবত ওয়াইর[WIRE] –  এই মিডিয়া। যদিও মেরিটেড পত্রিকাও বছর দশেক আগে রেগুলার না,হঠাত করে কিছু ক্যাশের লোভে দু একটা ‘র’ স্পনসরড প্রপাগান্ডা বক্তব্য ছেপে দিত। আর করোনাকালে এটাই এখন রেগুলার ফেনোমেনা। তাই করোনাকালেও মোদির ফান্ডে আগ্রহ যারা দেখায় নাই বলে মনে হয় তেমনই এক ওয়েব পত্রিকা হল ‘দ্যা কুইন্ট’ [The QUINT]।

    এই ‘দ্যা কুইন্ট’ পত্রিকায় আবদি গতকাল বাংলাদেশ ও হাসিনাকে নিয়ে একটা ‘নিচা দেখানো’ [derogatory] লেখা লিখেছেন। তবে কিছু জায়গা খুবই আপত্তিজনক ও অপমানসুচক। এছাড়া ভুল তথ্য ও ভুল ব্যাখ্যায় তা মনগড়া ভাবে লেখা। এসব ছাড়াও লেখকের বাকি সমস্যাটা হিন্দুজাতিবাদের চোখ দিয়ে সব দেখলে যেমন হয় সেই সমস্যা। হিন্দুজাতিবাদের চোখে দেখার এই স্টাইল; এটার একটা ভাল নাম আছে যেটাকে বলে ‘সেকুলার প্রগতিশীল’। অর্থাৎ লেখক  আবদি আসলে এক ‘সেকুলার প্রগতিশীল’ সম্পাদক।

    হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদের চোখে ও চর্চায় ভারতের কোন মুসলমানকে তারা যেসব শর্তে তাদের সমাজে থাকতে চলতে বসবাস করতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা চাকরির প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে ও তাদের পাশে বসে তা করতে গেলে যে শর্তে এসব তারা করতে দেয় সেই শর্তেরই আনুষ্ঠানিক নাম হচ্ছে ‘সেকুলার ও প্রগতিশীল’। এই সেকুলার প্রগতিশীল রুল মানে হল হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সাজানো (orientation) ধর্মীয়-কালচারাল ভিত্তিতে সেট করা রীতিনীতির এক একচেটিয়া আধিপত্য নিশ্চিত করে এটা। ভারতের বা কলকাতার মুসলমানের সেকুলার প্রগতিশীল নিয়ম রুল ও শর্ত পালন সাপেক্ষেই একমাত্র ভারতীয় সমাজে থাকতে পারে। কাজেই সম্পাদক এসএনএম আবদিও এর বাইরে নন। এটাই তারও ছোট থেকে বেড়ে উঠার শর্ত ও স্মৃতি; যা এখন এই মোদি-যুগে তো আর বদলবার কোন সুযোগই নাই। আবদি সাহসী এবং ইনভেস্টিগেটিভ কাজ করা লোক।  মানে খুজে বের করে সামনে আনার মত সাহসী সাংবাদিক বটে। কিন্তু এখানে এসে তার সেই সাহসও অচল। কারণ এটা একার সাহসের প্রশ্ন নয়। এই উপমহাদেশ যেখানে কলুসিত করা হয়েছে সেই ১৮১৫ সাল থেকে। কিভাবে এটা এজায়গায় পৌছালো,এখান থেকে বের হবার পথ কী এনিয়ে কোন ইনভেস্টিগেশনে তিনি অচল অপারগ দেখা যাচ্ছে!

    বরং উলটা কারবার দেখা যাচ্ছে।যেমন  র [RAW] নিয়ে তিনি ভারতের হিন্দুত্ব -এই কট্টর জাতিবাদী ধারার সকলের মতই গর্বিত। বাংলাদেশে জবরদস্তিতে ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার প্রতিষ্ঠান হল এই র। তাই র এর কর্ম-পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের ততপরতা মানে তা বাংলাদেশের জন্য তা নাশকতা,স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ। দেশপ্রেমে বিগলিত আবদি এই র সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এমন ফুলা ফুলেছেন যে লিখছেন, “জাতিসংঘের ভেটোসদস্য-ওয়ালা পাঁচ রাষ্ট্রের শক্তি একসঙ্গে করলে যত বাংলাদেশে ভারতের শক্তি-সক্ষমতা এর চেয়েও বেশি” [India wields more influence in Bangladesh than the Security Council’s five permanent members put together.]। বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে উপর  র এর ক্ষমতার কথাই তিনি বলছেন আমরা দেখছি খুবই আহ্লাদিত হয়ে, হিন্দুত্ব জাতিবাদের জোসে, দেশপ্রেমিকতায়।

    “India wields more influence in Bangladesh than the Security Council’s five permanent members put together. The Research and Analysis Wing (RAW) is the most dreaded outfit in the neighbouring country surpassing even the brutally unforgiving RAB. Hasina lives in mortal fear of RAW. She knows that she will be toppled if she displeases India. So she has adopted the policy of pleasing India to retain power at any cost.”

    এরপরের বাক্যে এবার খোলাখুলি বলছেন, “ভারতের প্রতিবেশি দেশে রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং (RAW বা বাংলায় র) হল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের প্রতিষ্ঠান, যা এমনকি ক্ষমার অযোগ্য র‍্যাবের চেয়েও নৃশংস” [The Research and Analysis Wing (RAW) is the most dreaded outfit in the neighbouring country surpassing even the brutally unforgiving RAB]।

    এখানে এই সেকুলার ও প্রগতিশীল হিন্দুত্ববাদপ্রেমী আবদির কান্ড দেখেন। ভারতের র যদি বাংলাদেশের র‍্যাবের চেয়েও নৃশংসতায় ছাড়িয়ে যাওয়া সংগঠন হয় আর সেক্ষেত্রে তাতে  র‍্যাব ক্ষমার অযোগ্য [unforgiving] হলে দেশপ্রেমি আবদির কাছে র RAW কেমন প্রতিষ্ঠান হয়ে দাড়ালো? দেশপ্রেমে ডুবে আবদির এদিকটার কথা খেয়াল নাই। তার কাছে র হল প্রশংসার ও আদরণীয় প্রতিষ্ঠান।

    তাঁর এরপরের বাক্য তাঁর তো বটেই মোদী সরকারেরও অনেক কিছুর স্বীকারোক্তি। সব কথার এককথা এই বাক্য। আবদি বলছেন “হাসিনা র এর হাতে মরবার ভয়ে (মরটাল ফিয়ার) জীবন কাটাচ্ছেন” [Hasina lives in mortal fear of RAW.]। বুঝা যাচ্ছে আবদির এমন কেউ নাই খুবই বন্ধুহীন যে তাঁকে বলে দেয় যে এভাবে লেখা যায় না। এতে নিজের বিরুদ্ধেই লেখা হয়ে যায়।

    তামাশার কথা হচ্ছে আবদি এতই দেশপ্রেমে আপ্লুত, বীরত্বের কথা ভেবে মসগুল যে তিনি বুঝতেই পারছেন না যে তিনি এক অপরাধীর স্বদেশের-অপরাধের স্টেটমেন্ট বা আত্মস্বীকারোক্তি দিয়ে ফেলছেন। অথচ তাঁর সে খবরই নাই। এর মানে হল  র  আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হবু গুপ্তঘাতক আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই গুপ্তঘাতকের ভয়ে সিটিয়ে আছেন। আর জার্নালিস্ট আবদি আমাদেরকে নিজে লিখে এই স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন!  বা! থ্যাঙ্কু আবদি! খুব সুন্দর করে আমরা আবদির খুবই দেশপ্রেমিকতার কাহিনী জানলাম বটে!

    পরের দুই বাক্য আরো স্পষ্টিকরণ বক্তব্য। বলছেন “হাসিনা জানেন তিনি ভারতকে সন্তুষ্ট করে না রাখতে পারলে ক্ষমতাচ্যুত হবেন! তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে হাসিনা ভারতকে সন্তুষ্ট করে রাখার নীতি-পলিসি নিয়েছেন” [She knows that she will be toppled if she displeases India. So she has adopted the policy of pleasing India to retain power at any cost.] ।

    বুঝা গেল এক দগদগে হিন্দুত্ববাদের দেশপ্রেম ছাড়া তিনি জীবনে আর কিছু শিখেন নাই। আর তিনি তার ভারত সরকারের বাংলাদেশের প্রতি অপততপরতা-গুলো সম্পর্কে ভালই ওয়াকেবহাল!

    এক বিরাট জট খুলে গেলঃ
    তার মানে আমাদের জন্য এক বিরাট জট খুলে গেল। গত দুর্গাপুজায় কুমিল্লা কাহিনী, যেটা ইকবাল হোসেন এর কোরান শরীফ রেখে আসা, গদা কাধে বীরত্বে ফিরে আসা আর শেষে তার নিজেরই মুসলমান ভাইদেরকে প্রতিবাদে নেমে আসার উস্কানি – এসবটা নিয়ে ১২টা ক্যামেরা লাইভ ফুটেজ সংগ্রহ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রমাণিত স্টোরি, যেটা মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সবাই জেনে গেছি। এখন বাকি থেকে গেছে ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে এসাইনমেন্ট দাতা শক্তিটা কে? তা জানা।

    এখন আমরা সম্ভবত বলতে পারি আবদি আমাদের কে বলছেন এই শক্তিটা হল  ‘র’। এমন শক্তিধরই নাশকতা বা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করতে পারে, কারণ,১। এ’শক্তি বাংলাদেশে ভেটোসদস্য-ওয়ালা পাঁচ রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ২। এ’শক্তি বাংলাদেশে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম, এক প্রতিষ্ঠান। যা এমনকি ক্ষমার-অযোগ্য র‍্যাবের চেয়েও বেশি নৃশংস। ৩। হাসিনা র-এর হাতে মরবার ভয়ে মরটাল ফিয়ারে [mortal fear] দিন কাটাচ্ছেন। ৪। হাসিনা এই গুপ্তঘাতকের হাতে মরবার ভয়ে ভারতকে ক্রমাগত সন্তুষ্ট করেই টিকে আছেন ও চলেছেন।

     

    অতএব ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে এসাইনমেন্ট দাতা শক্তিটাই RAW বা বাংলায় ‘র’। এই অপততপরতা বা অ-কাজ সে করতে পেরেছে এক সহজ ফর্মুলায় যে মন্দিরে কোরান শরীফ মানেই তা হিন্দুদের কাজ বলে ভাড়াটে কিছু মুসলমানকে দিয়েই উস্কানি তোলা।  আবার এরাই এর মানে দিয়েছে এটাই হিন্দুদের হাতে কোরান শরীফের অবমাননা। অথচ এটা যে ‘হিন্দুদের কাজ’ না হয়ে, ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের কাজ হতে পারে এবং হয়েছে – এবং ইকবালদের পিছনের শক্তি যে আবার বিদেশি ‘হিন্দুরাই’ হতে পারে, র নিজেই হতে পারে, এসব নিয়ে চিন্তা করতে কেউ চায় নাই। মনে হতে পারে যারা রাস্তায় কথিত সাম্প্রদায়িকতা লড়েছে এরা “অশিক্ষিত” মুসলমান তাই এসব  বুঝেন নাই। না বভুঝেই করেছে। তাই কী? না তা একেবারেই মিথ্যা কথা।

    হিন্দুদের মন্দির বা মুর্তি ভাঙলে তা মুসলমানদের কাজ না হয়ে যায় না। এই হল গত দুশ বছরের অনুমান। অন্যের মুর্তি বা মসজিদ ভেঙ্গেও যে অন্যের উপর দোষ চাপানো সম্ভব অতএব আমাদের ফ্যাক্টসে যেতে হবে সবার আগে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনুমান যেটাকে এখনও সত্যি কিনা তা নিয়ে কেউ ভেঙ্গে খুলে দেখতে যাচাইয়ে রাজি না। তাই কুমিল্লার ঘটনায় শহুরে আর শিক্ষিত পড়ালেখাওয়ালারা আগাম মুখস্ত বলে গেছেন এটা “মৌলবাদীদের” কাজ। কেউ আরও আগেবাড়িয়ে এটা ‘জঙ্গীবাদের’ কাজ বলেছেন।

    এককথায়, এটা সংগঠিত মুসলমানের কাজ,আগাম এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করেছে শিক্ষিতরাই। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলো যেমন। সাথে বিবৃতিদাতারাও আছে। তাদের একটা মুখস্ত শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িকতা’, মানে হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল। এরা সেই ফর্মুলায় ফেলে চোখ বন্ধ করে মুসলমান বা ইসলামি রাজনীতিকদের দায়ী করছেন। অথচ এতে যে এই শিক্ষক সমিতির নেতাদের পছন্দের দল ও নেত্রী হাসিনাও দায়ী হচ্ছেন তাতেও তারা কেয়ার করছেন না। এতই তাদের হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীল পরিচয়ের প্রতি লোভ ও নেক।

    এমনকি আবদি যেখানে বলছেন হাসিনা ‘র’ এর ভয়ে পালিয়ে কাপতেছেন,যেকোনভাবে ভারতকে সন্তুষ্টি করতে লেগে আছেন! অথচ  তাতে বাংলাদেশের সেকুলার ও প্রগতিশীল পরিচয়ের জগতে কোন বিকার নাই। হাসিনার দুর্ভাগ্য এটাই! অন্তত আবদিও তো হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীলই! তাই না? যদিও এসব শিক্ষক সমিতি বা সাথে ৪৭ জনএর বিবৃতিবাজরা জেনে অথবা না জেনে কিন্তু ইতোমধ্যেই হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়ে ইকবাক হোসেন এন্ড গঙদের পিছনের নেতাদের হাত আকড়ে ধরে নিয়েছে।

    বেচারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই চিৎকার করে ভারতের বুঝবার মত ভাষায় বলছেন, Attack on Hindus not communal issue, but conspiracy, – যা ভারতের সব প্রধান পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তবু ভারতের কেউই হাসিনা ও তার মন্ত্রীদের কথা আমল করছে না। সবাই এটা হিন্দু-মুসলমানের কথিত সাম্প্রদায়িকতার ক্যাচাল, এমন মুখস্ত প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে যেতে রাজি হয় নাই। দেখা যাচ্ছে র’ এর এই ব্যাখ্যা হাসিনা ও মন্ত্রীদের হারিয়ে দিয়েছে। অবশ্য  বাংলাদেশেও হাসিনা ও মন্ত্রীদের বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব আছে অনেক আগে থেকেই। এরা এরই সুযোগটা নিয়েছে এমনকি আওয়ামি দলীয় শিক্ষক সমিতিও হাসিনা ও মন্ত্রীদের পক্ষে নাই; তারা র এর অবস্থানের পক্ষে দাড়িয়ে গেছে।

    আবদিও সেকাজটাই করেছেন। তিনি হাসিনাকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আর্ডেন্ট এর মত হতে পারেন নাই বলে সমালোচনা করেছেন। মানে আবদি বলতে চাইছেন, হাসিনারও ব্যাপারটাকে কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতার’ গল্পের ফ্রেমে ফেলে ইকবাক হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে যারা আছে,যাদেরকে ‘মৌলবাদী’ বা ‘জঙ্গি’ (যে শব্দগুলো একটা হিন্দুত্ববাদী সেকুলার ও প্রগতিশীল মন শুনতে পছন্দ করে) বলে হাসিনার এদের নিন্দা করা উচিত ছিল। অর্থাৎ হাসিনা যতই বলেন এটা not communal issue, but conspiracy সেটা আবদিও তা শুনতে রাজি না।

    অথচ এত সাহসী* সাংবাদিক আবদি কিন্তু দেখেনই নাই যে হাসিনা সরাসরি মোদীকে হুশিয়ারী দিয়েছেন অন্তত বিবিসি তা যতটা সম্ভব স্পষ্ট করে ছেপেছে? এটা আবদি এড়িয়ে গেছেন কেন? দেশপ্রেমে? হাসিনা মোদিকে দায়ী করেছে বলে? তাই আপনার জন্য রিস্ক হয়ে যায়? এর মানে আপনি মোদীকে সার্ভিস দিতেই কী এই লেখা লিখেছেন? এমন বহু প্রশ্ন উঠতে পারে।

    একারণেই একথাটাই আমি বলছি যে যতই সাহসী মেডেল পাওয়া হন না কেন, ভারতীয় মুসলমানদের হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীলই থাকতে হয়!

    সবশেষে একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। তাহল, আবদি বাংলাদেশের বা দুনিয়ার ইসলামি রাজনৈতিক ধারাগুলো সম্পর্কে ধারণায় সীমাহীন অজ্ঞানতা,এটা পীড়াদায়ক! এসম্পর্কে ভারতের একজন সাধারণ হিন্দুর যে ধারণা আপনার ধারণা এর উর্ধে না। আপনি সাহসী জার্ণালিস্ট আর অন্তত পারিবারিক পরিচয়ে মুসলমান  – অন্তত এটুকুর খাতিরে আপনার নুন্যতম জানাশুনা আছে মানুষ যেটাই আশা করবে। আপনি ভারতীয় “হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীল” বয়ানে আটকে থেকে নিজের কেরিয়ারের সীমা টানতে চাইলে কে ঠেকাবে। অন্তত একাদেমিক ভাবে হলেও তো আপনাকে জানতেই হবে। অথচ ইদানিং আপনার ট্রেন্ড হল এশিয়ান বিদেশি পত্রিকার সাথে কাজ করা, লেখা দেয়া। যেমন আমরা দেখছি আপনি অহরহ ব্যবহার করেছেন ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ এই শব্দটা। এটা না-বুঝ অবুঝ এক ঘৃণাবাচক শব্দ। অথচ কেরিয়ারে নুন্যতম সিরিয়াস কথিত সেকুলার ও প্রগতিশীলরাই  এখন বুঝে গেছে এই শব্দ দুহাজার সালের আগের, মানে গত শতকের। চলতি শতকে নাইন-ইলেভেনের পরে এনিয়ে নতুন শব্দ ধারণা পশ্চিমাজগতই এনেছে। যেগুলোও আবার এখন (২০২১ সালে এসে আফগান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরে) চ্যালেঞ্জের মুখে। যেমন আমেরিকান থিঙ্কট্যাংক ফেলোরাই এখন প্রকাশ্যে নিজের আর্টিকেলে ‘তথাকথিত ওয়ার অন টেরর’ বলছে। অর্থাত বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’ এর দায় নিচ্ছেন না;দায় আমেরিকান প্রশাসনকে দিয়ে সরে যেতে চাইছেন।

    আপনি আবদি আবার হেফাজত নিয়ে কথা তুলতে গেছেন। এতে আপনার অজ্ঞানতা আরও ফেটে প্রকাশিত হয়েছে। আগেই বল্লেছি আপনি বাংলাদেশের ইসলামি ধারাগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ। পলিটিক্যাল টার্ণগুলো সম্পর্কেও। ফলে আন্দাজে ভারতের হিন্দুমনের উপর দাঁড়িয়ে অনুমানে কিছু বললে তা আপনার বিরুদ্ধেই যাবে। ভারত সরকার হাসিনা হেফাজতের সাথে ডিলিং (আমি সম্পর্ক বলি নাই) একেবারেই পছন্দ করে নাই। এর মানে আপনাকেও মোদির পো ধরতে হবে? নাকি ইন্ডেরপেন্ডেন্টলি ব্যাপারটা বুঝতে হবে? প্রশ্নটা খারাপ ভালোর চেয়েও কেন এমন হয়েছে সেটা বুঝাই আপনার প্রফেশনের দিক থেকে উপযুক্ত করণীয় হতে পারত।

    শেষ কথাঃ
    ইতিহাস বলে, বিশ শতকে একটা মুসলিম জাতিবাদ অথবা  একালে “সারা দুনিয়াকে কেবল মুসলমানের দুনিয়া বানিয়ে”  রাজনীতিতে মুসলমানেরা নেমেছে নিজে নিজে নয়। বেকুব অন্যেরা তাদের এভাবে নামতে বাধ্য করেছে।  ইতিহাসে দুবার এমন ঘটেছে।

    একঃ ভারতের হিন্দুনেতারা নিজেদের খুবই বুদ্ধিমান আর চালাক মনে করে জবরদস্তিতে একটা হিন্দু জাতিবাদের ভারত কায়েম বা হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের ভারত কায়েমের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেটা ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্ম থেকেই। যদিও এর আদি উদ্যোগ চিহ্ন খুঁজতে আপনাকে ১৮১৫ সালে যেতে হবে। অথচ হিন্দুনেতারা কেউ বুঝেন নাই যে এটা আত্মঘাতি। তাদের এই হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের কায়েমের চিন্তা এই হিন্দুত্ববাদের ভিত্তি খাড়া করা – এটাই মুসলমানদেরকেও এক মুসলমান জাতিরাষ্ট্র গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করবে। হিন্দু জাতিরাষ্ট্র চিন্তা এক মুসলমান জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার জনক হবে; এথেকে মুসলমান মনে মুসলমান- জাতিরাষ্ট্র চিন্তা ডেকে আনবে। এবং ঠিক তাই হয়েছিল। আমরা জিন্নাহর হাত ধরে ও মুসলিম লীগ গড়ে নিয়ে পাকিস্তান কায়েম করে নিয়েছিলাম। এখন কমিউনিস্ট আর হিন্দুত্ববাদী মুসলমান-ঘৃণার মনগুলো জিন্নাহকে দোষারোপ করে নিজেকে বাচানোর চেষ্টা করে চলে।

    দুইঃ ঠিক প্রায় একইভাবে প্রেসিডেন্ট বুশ মনে করেছিলেন সোভিয়েত পতনের পরের দুনিয়া একমেরুর দেশ হয়ে গেছে। তিনি এক বিরাট কুতুব। ফলে কেউ তাকে বলার কিছু নাই। এমন ভেবে নাইন-ইলেভেনের হামলার প্রতিশোধের উছিলায় নিজেকে সীমাহীন ক্ষমতাধর ভেবে যা করলেন তা দেখতে আফগানিস্তানে হামলা। কিন্তু ইভেনজেলিক বুশ এর অর্থ দিলেন যে,আমেরিকান আপনারা মুসলমানদের সাথে আর আমেরিকায় থাকবেন না। আর পারলে অন্যান্য দেশেও। মুসলমান – এরা সবাই নাকি আমেরিকার জন্য সন্দেহজনক।  অথচ টেরও পেলেন না  এতে নিজের জন্য কী ক্ষতিটা করলেন। এতে বুশ আসলে প্রকারন্তরে মুসলমানদেরকে বলে দিলেন মুসলমান তোমরাও এমন একটা দুনিয়ার কথা কল্পনা কর যেখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ নাই। এটাই গ্লোবাল খলিফা-ইজম কায়েমের চিন্তা। অথচ এখন আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম বলছে এরা জঙ্গীবাদ, টেরর। এরা ইনক্লুসিভ না। আরও কত কী? দোষের শেষ নাই। আর ভারত ২০০২ সালে থেকে বুশের এই টেররিজমের সাথে হাত মিলিয়েছে। এতে বুশ  ভারতের সেই পুরান পাপ “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” সাথে যা ততদিনে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ হয়ে গেছে তার সাথে নিজের টেররিজমের বয়ানের মুসলমানবিদ্বেষ – এই দুই বয়ান গাটছাড়া বেধেছেন। এছাড়া কাশ্মীরের ভুল এবং অন্যায়ের উপর চাদর ঢাকতে এটাই বাজপেয়ি করেছিলেন। ফলাফল আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি।

    এজন্যই এক বাণী বা তত্ব বলে, তত্বটা হলঃ
    আপনার এনিমি কেমন হবে সেটা কিন্তু আপনিই আকার দেন! তাই নিজের আচার আচরণ চিন্তা সম্পর্কে সাবধান। কারণ, এগুলাই আপনার শত্রু কেমন হবে সেই আকার বৈশিষ্ঠের নির্মাতা!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    ২৮ অক্টোবর ২০২১
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [ আমার এই লেখাটা  আর কোথাও ছাপা হয় নাই।]