Category: Politics

  • বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    আটল্যান্টিক মানেই কলোনি,
    বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    গৌতম দাস

    ০৪ জুলাই ২০২২, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-49m

    NATO declares China a security challenge for the first time

     

    ন্যাটোঃ  এটা ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর এক বৃহৎ সামরিক জোট যার পুরো নাম- ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’। গত সপ্তাহে ২৮-৩০ জুন ২০২২, স্পেনের মাদ্রিদ শহরে বহুদিন পরে ন্যাটো হৈচৈ ফেলে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেছে, অথচ এতদিন এমন অনুষ্ঠানগুলো ন্যাটো যেন প্রায় সবার অলক্ষ্যেই কোনোমতে সেরে ফেলা হয়ে আসছিল। এখানেই শেষ না। আবার যেখানে একদিক থেকে দেখলে  ন্যাটো এখন ভেঙ্গে ফেলা উচিত; অথবা আমেরিকার ন্যাটো ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত – ধরণের কথাবার্তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এর মুখ দিয়ে উঠে আসা শুরু হয়েছিল সেখানে এখন উলটা হাওয়া। রাখঢাক ফর্মালিটি না করে সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন হঠাত ন্যাটো, জি-৭ ইত্যাদি পশ্চিমা রাষ্ট্রজোট খাড়া করে শেষ চেষ্টা হিসাবে উঠে দাড়াতে চাচ্ছেন। গ্লোবাল ইকোনমিক ও ততসহ এককথায় সংশ্লিষ্ট “প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব” কোন চিরস্থায়ী জিনিষ না। একটা সময়ের পরে এগুলোর আয়ু আপনাতেই শেষ হয়ে যায়। চাইলে তা বুঝাও যায়। জ্ঞানী ও বুঝমানেরা তা অনুসরণ করে সময় থাকতে উপযুক্ত জায়গা বেছে নিয়ে সরে যায়।  কারণ সামর্থ ও সক্ষমতা অনুসারে যথোপযুক্ত নেতৃত্ব-অবস্থান নিতে হয়, তার মধ্যে থাকতে হয়। নইলে শেষে অপমানিত হতে হতে পারে।  কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই প্রাকৃতিক দিকটা মানবেন না ঠিক করেছেন মনে হচ্ছে। যেন বলতে চাইছেন, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা-শক্তি গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিজের কোলেই রেখে দিবে। তারা ধরে নিতে চান আবার তাদের এনিমি (শত্রুতা বা মূলশত্রু) মূলত চীনের সাথে; ইউরোপের প্রেক্ষিতে যেটা রাশিয়ার সাথে। এই ধরে নেওয়ার ভিতরে একটু ভুল আছে। চীনের সাথে তাদের ঠিক এনিমিটি না প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। অনেকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জিদের চোখে দেখে একে শত্রুতা হিসাবে। এখানে তাই ঘটেছে।
    দুনিয়ার ইতিহাসের শেষ ৫-৬শ বছর ন্যায়-অন্যায় যেভাবেই হোক জনগোষ্ঠি হিসাবে পশ্চিমের সাদা ককেশীয়দের হাতে সারা দুনিয়া শাসিত হয়েছে; তারা দুনিয়ার উপর ঘুরে ফিরে রুল করে এসেছে, আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। ব্যাপারটাকে ঘটনাচক্র হিসাবে দেখাই সঠিক ছিল। দুনিয়াতে কোন ধর্ম-এথনিক জাতি দুনিয়া আজীবন শাসন করে যাবে এমন কোন চুক্তি বা শর্ত কোথাও লেখা নাই। অন্য এথনিক জনগোষ্ঠিও তা মেনে নিবার কোন কারণ নাই। কোন জনগোষ্ঠিরই এমন ধরে নিবার কোন ভিত্তি নাই যে যেহেতু তারা শাসক ছিল তাই তারা তা থেকেই যাবে আজীবন!   এই জবরদস্তির কর্তাগিরির চোখ সরিয়ে ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ দিক থেকে যেমন বস্তুগত যোগ্যতা ও সামর্থ সক্ষমতার দিক থেকে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হত।

    কিন্তু বাইডেন বুদ্ধিমান হতে চান নাই। তিনি এবার এককালের বড় অর্থনীতির সাত দেশ যা জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন কান্ট্রি – এই জোটকে আবার বুড়া হারে রঙ চড়িয়ে সাজাতে চেয়েছেন। তিনি এই জি-৭ আর ন্যাটো  কেগত সপ্তাহে সাজিয়ে এনেছেন, বুড়া হাড়েই জোর দেখাতে চেয়েছেন। অথচ  বাস্তবতা হল চলতি নয়া শতক থেকে জি-৭ নিজেকে বিগতযৌবনা বলে মেনে নিয়েছে। এটা আমার দাবি নয় বাস্তবতা। যেকারণে, এককালের জি-৭ গেলে তারা নিজেই এখন জি-২০ নামে নয়া গ্রুপ আকারে সাজিয়েছে। জি-২০ মানে যেখানে এই বুড়া সাত রাষ্ট্র আর সাথে নয়া রাইজিং অর্থনীতির দেশগুলোকে বেছে সাথে নিয়ে জি-২০ বানিয়ে নেয়া। মুল কারণ, বুড়া অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো স্থবির হয়ে গেছে। পুনরুতপাদন, পুন-বিনিয়োগের সক্ষমতা ও সামর্থ  অথবা কম্পিটিটিভনেস ঢলে পড়েছে। আর উলটা বসে বসে আয়েসে খাওয়া এমন ভোগের ঢিব্বা হয়েছে সেকারণে। “ওয়াল স্ট্রিট  বিনিয়োগ পাড়ার” কঠোর সমালোচনা এই বুড়ারা সহ্য করতে না পেরে অনেক আগেই তাই রাইজিং-দেরকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে জি-২০ গ্রুপ বানিয়ে নিয়্বেছিল। তাহলে  জি-২০ হিসাবে ঢেলে সাজানো ও এর উত্থানটাই কী যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে জি-৭ গ্রুপ বা ন্যাটো এর নামে বাইডেন এর আবার আমেরিকার নেতৃত্বকে জাগানোর চেষ্টাটা একটা প্রতারণা!! অথচ বাইডেন চীন-কে বাইরে দূরে রাখতে চান। কেন? কী যুক্তি?

    আমেরিকার নেতৃত্বে ‘পশ্চিমা শক্তির’ ভ্যালুজ [Values] মানে মুল্যবোধ নাকি চীনের চেয়ে উন্নত!!! তারা উচুজাতের ও  জাত-শ্রেষ্ঠ তাই তারা চীন-রাশিয়া ইত্যাদিদের সাথে চলতে পারবে না। এককথায় বললে, অর্থনৈতিক ততপরতায় একুমুলেশন [accumulation] বা সঞ্চয় ও সম্পদ সৃষ্টির বিচারে  চীন এখন সবার উপরে – ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা সারা ইউরোপকে ছাড়িয়ে উপর দিয়ে গেছিল। আর সেটাও ইউরোপের পছন্দ-অপছন্দ করার ব্যাপার ছিল না, থাকেও নাই। অথচ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশ এখন অজুহাত তুলেছে তাদের খায়েশ তারা মূলত চীনকে একঘরে করবে। বাণিজ্য সম্পর্ক অর্থে কোনঠাসা বা একঘরে। যেখানে অজুহাত তাদের মুল্যবোধ নাকি নিচা!! আর এভাবেই তাদের ঢলে পড়া সামর্থ ও নেতৃত্ব তারা ছলনা করে হলেও ধরে রাখতে পারবে।

    কিন্তু নেতৃত্ব নিজের কাছে রেখে দেওয়া মানে কী? এটা কী সামরিক সক্ষমতার কথা বলছেন তারা? পশ্চিম এখানেই খোদ নিজেকেই বিভ্রান্ত করে রাখতে চায়। কোন রাষ্ট্রের মুল সক্ষমতা আসে অর্থনীতি থেকে। পরে ওর ভরসায় আরও আসে রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সবকিছু। যার আবার একমাত্র অর্থনৈতিকটাই অবজেকটিভ অর্থাৎ বস্তুগত সক্ষমতা। এটাকে কোন বা কর্তা ব্যক্তি-আমির ইচ্ছা মনে করাটা ভুল। অথচ বাইডেন এন্ড গং এটা জেনেও ভুল করেছে বলে দেখাচ্ছে। ওথচ সবাই জানে, কোন দেশ নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটা দেখাতে পারলে বা হাজির হয়ে গেলে এরপর এর ভরসায় অন্যান্য সব কর্তা বা ইচ্ছানির্ভর  যেমন  রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সব ইচ্ছা হাসিল করা যায়।  অথচ বাইডেন দেখাতে চাইছেন সবটাই তাদের যেন তাদের ইচ্ছা!!
    অতএব বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম উন্নত মুল্যবোধের  – এই মিথ্যার আড়ালে,  নিজেদের হাতে দুনিয়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখবে বলে হুঙ্কার তুলতে দেখছি আমরা!! গত ২৮-৩০ জুন ২০২২, এবারের  ন্যাটো সম্মেলনের তাতপর্য এটাই!!

    ন্যাটো উত্থানের পটভুমিঃ
    বাংলায় লেখা হয় ন্যাটো আর ইংরাজিতে NATO; অথবা খুলে ইংরাজিতে বললে তা – North Atlantic Treaty Organization।
    আর “পশ্চিমা” শব্দটা বলতে আমরা মূলত একটা জাতিগত পরিচয়কেই তুলে ধরতে চাই। যদিও সহসা সবাই তা বুঝি না, সাথে উহ্য থাকে বলে। কিন্তু কাদের? মূলত ইউরোপের যারা সবচেয়ে প্রভাবশালী এথনিক-জাতি মনে করা হয় তারা হল ককেশীয় [Caucasion]।  এসব মোটাদাগে বলা ভাষ্য; কোন গজ-ফিতা নিয়ে বসে মেপে বলা কথা নয়। কারণ ঐ একই ইউরোপে ককেশীয় ছাড়াও অসংখ্য এথনিক জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল ও আছে। তবে যাদের প্রভাব বেশি এই অর্থে কথাটা প্রচলিত ও বলা। আসলে “আমরা সাদা চামড়ার লোক’ ফলে উন্নত – এই বলে অকথিত কিন্তু টের পাওয়া যায় যে আঁচ ও আওয়াজ এর কথা আমরা এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষেরা জানি বা অভিজ্ঞতা রাখি, এগুলো সেসব কথা। এজন্য বলছি বাস্তবে গজ-ফিতা দিয়ে মেপে প্রমাণ পাওয়া যাবে না এসব উগ্রজাতিবাদি ভাষ্য। কিন্তু এসব ভাষ্য ও চর্চা আছে। বাইডেনের কথাগুলোর ভিতরে এর সুক্ষ ইঙ্গিত আছে!

    “…Beijing’s ambitions and its ‘coercive policies’ challenge the Western bloc’s ‘interests, security and values’ ”.  – aljazeera

    এখন এই ন্যাটো নিজেই নিজেকে চেনায় এই বলে যে তারা এক “পশ্চিমা ব্লক” রাষ্ট্র বা “পশ্চিমা শক্তি”। সর্বশেষ চলতি ন্যাটো সম্মেলনে এভাবেই তারা নিজেদেরজে পরিচিত করেছে “Western bloc’s” বলে।  আর এটা বলতে তারা আরো ভেঙ্গে বলে তারা হল সারা ‘ইউরোপ এবং আমেরিকা’ মিলে এক শক্তি। এই কথাটা ভৌগলিকভাবে ভেবে দেখলে বুঝা যাবে ইউরোপ এবং আমেরিকা বলতে এরা আসলে আটল্যান্টিক মহাসাগরের দুই তীর। একারণে লক্ষ্য করব ন্যাটো শব্দের ভিতরে ‘আটল্যান্টিক’ বলে একটা শব্দ আছে; ওর ‘এ’ -মানে আটল্যান্টিক। যদিও এর দুপাড়ের ফারাকটা হল  এক মহাসাগরের আর যার দৈর্ঘ গড়ে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ যেকোন পুকুর বা নদীর দুপাড়ের মানুষের মধ্যে যেমন স্বভাব বা ভাষা ইত্যাদিতে মিল আমরা খুঁজে পাই তেমনই এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা – বলে মিল খুঁজা আমাদের করার কথা নয়।  কিন্তু আমরা খুঁজছি এমনকি কী খুঁজতে খুঁজতে আমরা ন্যাটো এসে পড়েছি! তাহলে মুখ্য প্রশ্ন দাড়াল, আমরা এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা  বলি কেন? মূলত কারণটা একেবারেই বাহ্যিক। অর্থাৎ আটল্যান্টিকের দু-পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে বাইরে থেকে মিল ঘটানো হয়েছিল। কারণ তাদের মধ্যে কোন মিল থাকার কথা নয়, সুযোগও ছিল না। তাহলে সেটা কিভাবে?

    বেশিদিন আগের কথা নয়, এই তো মাত্র ১৬০৭ সাল থেকে। ইউরোপ এবং আমেরিকা, এভাবে প্রায়ই আমরা বলে ফেলি এর মুল কারণ হল – ইউরোপের প্রথম ও জবরদস্ত কলোনিই হল আমেরিকা। এমনকি ভারতবর্ষেরও আগে খোদ আমেরিকা ইউরোপের হাতে কলোনিদখল হয়েছিল। এটাই তাদের পারস্পরিক মূল সম্পর্ক।  আর এটাই ইউরোপের মূলত বৃটিশ-ফরাসিরা দখল করা শুরু করেছিল ১৬০৭ সাল থেকে শুরু করে; আজ যেটা আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য সেটা দখল করার মাধ্যমে ১৬০৭ সালে। পরবর্তিতে আজকের আমেরিকার সব রাজ্য একইভাবে দখল হয়ে শেষে এককালে আমেরিকা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) নামে আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।  অর্থাৎ ব্যাপারটা এরকমঃ

    প্রথমে এক বৃটিশ, ধরা যাক নাম তাঁর কোন লর্ড ক্লাইভ, তিনি আজকের আমেরিকার কোন রাজ্য-ভুমি দখল করেছিলেন। যা আসলে ছিল আমেরিকার সেখানেকার স্থানীয় ট্রাইবাল বা এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠির বসবাসের ভুমি। কিন্তু পরবর্তিতে ক্লাইভ সাহেব জাহাজ ভরে গরীর বৃটিশ মানুষ নিয়ে গেছিলেন ভার্জিনিয়ায় এই বলে যে ওখানে গেলে তোমরা গরীব বৃটিশ বিনা পয়সায় বিস্তর জমি পাবে আর সাথে  উপকরণও দেয়া হবে। জমির লোভে তারা স্থানীয়দের মেরে-ভর্তা করেছে বা মাথা কেটে নিয়ে ফুটবল খেলেছে। আর নয়ত ভাল উর্বর জমিগুলো বৃটিশদের ছেড়ে দিয়ে  আরো গহীন বনে অনুর্বর জমিতে তারা নিজেদের স্থানান্তরিত করে নিতে বাধ্য হয়েছে।
    কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে এই গরীব বৃটিশ কৃষক তারাই পালটা সমবেত প্রতিরোধ গড়ে ক্লাইভ এন্ড গং বৃটিশদেরকে আমেরিকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল। আর সেটাই ১৭৭৬ সালের আমেরিকান স্বাধীনতা। ঐ স্বাধীন আমেরিকানরাই আজকের আমেরিকান জনগোষ্ঠির এমনকি বাইডেন সাহেবের পুর্বসুরি। কেবল একটাই কালোদিক  থেকে গেছিল যেমন, এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠি তারা নিশ্চয় কোথাও চিপায় পড়ে থাকা মার্জিনালাইড হয়ে আছে।
    তবে এতে আরো কিছু নতুন মাত্রাও আঁকা হয়েছে বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশেষষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময়কালে আমেরিকাই উলটা এই প্রথম সারা ইউরোপের উপর প্রভাবশালী রাষ্ট্র অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠি হিসাবে হাজির হয়েছিল। সেসময়ের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর হাতেই সিদ্ধান্ত মেনেই সারা ইউরোপ এরপর তাদের বিশ্বযুদ্ধ কোন অভিমুখে গিয়ে শেষ হবে অথবা, পক্ষ-গুলো কেমন ও কে হবে তা নির্ধারিত হয়। কারণ যুদ্ধের খরচ যে যোগায় সেই তো এসব বিষয়গুলো নির্ধারণের কর্তা হয়ে যায়!  আর শুধু তাই না,  যুদ্ধ শেষে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা ও শাসন  উচ্ছেদ এর কাজটা সারা ইউরোপ স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেয়।  রুজভেল্টের শর্তে ইউরোপ দুনিয়াকে কলোনিমুক্ত করে দিয়েছিল।  সেই থেকে থেকে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নেতা হিসাবে হাজির হয় যেখানে ইউরোপ আমেরিকান আধিপত্য মান্য করে নেওয়ার বিনিময়ে ছোট তরফের কর্তা হবার সুযোগ পায়। এরপরই  ইউরোপ এবং আমেরিকা শব্দদুটো পাশাপাশি লেখার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। কালক্রমে (১৯৪৯ সাল থেকে) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধজোট হিসাবে ন্যাটো গড়ে তুলেছিল ছিল তেমনই একটা কাজ!

    এবার একালে আরেকটু বিস্তারে আগাই। একালে মানে পরে ১৯৯১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবারও পরে চলতি শতকের কথা বলছি। বারাক ওবামা আমল থেকেই বলা যায় আগের মতোই একের পর এক আমেরিকান নয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন, আর আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের আয়ু আর কত দিন থাকবে এ-জাতীয় প্রশ্ন আকার-ইঙ্গিতে জবাব দেয়া শুরু হয়েছিল। এটা সেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরিসমাপ্তিতে। তবে চলতি শতকের শুরুতে সেসব সময় থেকেই আমেরিকার জন্য এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন প্রবল হতে থাকে, বলা যায় যা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ওবামা।

    কিন্তু তখন অথবা এখন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মানেই যেন তা একটা চরম অবস্থান! তখন মানে ২০১৯ সালের কথা বলছি আর এখন মানে ২০২২ সালের চলতি সময়। আর তখন ও এখন যে কমন প্রসঙ্গের কথা বলছি তা হল – এই ন্যাটো।  আগে বলেছি, ন্যাটো মানে আমেরিকা-ইউরোপ মিলে ১৯৪৯ সালে গঠিত এক যুদ্ধজোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরের নয়া পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ও তার প্রভাবাধীন পূর্ব-ইউরোপ, এ অংশটা বাদ দিলে এর বাইরে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি ইউরোপীয় দেশের সামরিক জোট এটা। সংক্ষেপে বললে সেকালে (কোল্ডওয়ার আমলে [১৯৫০-৯১] ) যা আমেরিকা-সোভিয়েত লড়াই প্রতিযোগিতা, তাকে কেন্দ্র করে গঠিত পশ্চিমের মূল সামরিক জোট ছিল এটা। যদিও সেকালে ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সাফাই দিতে অনেকে একালে বলে থাকেন যে, সেকালের আমেরিকা-সোভিয়েত এ দুই জোটকে একটা “কোল্ডওয়ারের মধ্যে” আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল  নাকি এই ন্যাটো জোটের উপস্থিতির কারণে। মানে দুই পক্ষেই গোছানো সামরিক জোট-প্রস্তুতিতে ছিল বলেই নাকি ওই আমলে তারা মুখোমুখি কখনোই যুদ্ধে নামেনি বা করে নাই।

    যা হোক, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ায়, এর পর থেকে ন্যাটো নিজেই কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ওবামার দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্সির আমল (২০১৩-১৬) থেকে ন্যাটো মোচড় দিয়ে উঠেছিল – যেখানে মূল ইস্যুটা হয়ে উঠেছিল ন্যাটোর খরচ কে বইবে? যার মূল কারণ আসলে, আমেরিকার জন্য ন্যাটো-কে পরিচালনের ব্যয় তখন থেকে আমেরিকান অর্থনৈতিক  সামর্থ ও বা ইকনমির সক্ষমতার তুলনায় বিরাট বোঝা হয়ে গেছিল। কারণ ন্যাটো জন্ম থেকেই এর খরচের প্রধান দায়ভার আমেরিকা একাই ব্যয় করে আসছে; যেন অনেকটা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হিসেবে উত্থিত হওয়ায় ইউরোপের সবাই ধরে নিয়েছিল যে, ন্যাটো গঠনের সব উদ্যোগ ও খরচের ভার তো ‘ওস্তাদ’ আমেরিকাই নেবে। স্বাভাবিক। কিন্তু ওস্তাদ এখন বয়বৃদ্ধ, রমরমা অর্থনীতির সেই দিন আর নাই!

    ফলে  ন্যাটোর জন্মের সময় আমেরিকা যা হাসতে হাসতে নিয়েছিল তা ২০১৫ সালের আশাপাশের সময় থেকে আর একই না। আর সেই থেকে শুরু করে একেবারে ২০১৫ সালে ওবামার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল ন্যাটোর এক মিটিংয়ে ইউরোপকে খরচের দায় শেয়ার নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর এতে পারস্পরিক খুবই মুখ কালো করা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

    কিন্তু অতটুকুই নয়, আমেরিকার জন্য আসলে খারাপ দিন ও যুগ এসেই পড়ছিল সেই থেকে। আর সেটা ওবামার পরে ট্রাম্পের আমলে এসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি সরাসরি ন্যাটো আর টিকিয়ে রাখার দরকার কী, এপ্রশ্নই তুলে বসেন; অন্য আরো অস্বস্তিকর বিভিন্ন আরো প্রশ্নের মত। এমনকি আফগানিস্তানের জন্যও আর ন্যাটো দরকার  নয় অথবা ‘ওয়ার অন টেররের’ জন্যও আর ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান রাখা ও এর খরচ বহনের প্রয়োজন তিনি দেখেন না বলে সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন। পরে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল লন্ডনে আরো মনকষাকষি তো বটেই।

    ট্রাম্প পার্সোনাল এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি ন্যাটো থেকে আমেরিকার সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে চান। নিউ ইয়র্ক টাইমসে তার এক সহকারীর বরাতে খবর ছাপা হয়েছিল, সেখানে তিনি ন্যাটো সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি অবসলিট বা ‘পরিত্যক্ত বোঝা’। লাগাতার পঁচাত্তর বছরের গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-এরই এক প্রতিনিধি ট্রাম্পের কথা ভেবে এসব শব্দ হজম করতে অনেকেরই এ কথা মানতে কষ্ট হয়েছিল। তাই অনেকেরই মনে হয়েছিল, এটি হয়তো একটা পাগলা ট্রাম্পের ‘চরমবাদ’।

    গত সপ্তাহে জুনের শেষ তিন দিনে এবার আমরা আবার আরেক চরমবাদের মুখোমুখি। এবার নায়ক জো বাইডেন- তিনি এবারের ন্যাটোর তিন দিনের সম্মেলনে আরেক চরমপ্রান্তে। ব্যাপারটা এক কথায় বললে, তা যেন আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ মানে সারা পশ্চিমা জগৎ যা চায়, এর বিরোধী বা তাদের পছন্দ নয় এমন কোনো কিছু চীন ও রাশিয়া করতে পারবে না। তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা চাইলে তাদের ইচ্ছার বিরোধী চীনসহ সবাইকে তারা গ্লোবাল বাণিজ্যের বাইরে রেখে দিতেই পারে। এতই ক্ষমতা তাদের! যেনবা মাথায় করে এক ঝুড়ি গোবরও চীন-রাশিয়া চাইলেও বেচতে পারবে না!

    ওই ন্যাটো সম্মেলন থেকে এই প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, ‘চীন ন্যাটোর জন্য হুমকি’! আলজাজিরা লিখেছে, ন্যাটো মনে করছে, চীন তার জন্য হুমকি তাই সে চীনকে স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব দিয়ে বলছে ‘চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ও ‘চাপে ফেলে বাধ্য করার নীতি’- এগুলো ‘পশ্চিমা ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে’।

    NATO has listed China as one of its strategic priorities for the first time, saying Beijing’s ambitions and its “coercive policies” challenge the Western bloc’s “interests, security and values”.

    এরই মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রায় চার মাস হল। এ প্রসঙ্গে বাইডেন পুরো ইউরোপকে তাতিয়ে রাশিয়াকেই এদের সবার শত্রু বলে হাজির করছিলেন। চীন এসব ক্ষেত্রেই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কিন্তু চীনকে আমেরিকার শত্রু বলা  আর প্রতিযোগী বলা এক অর্থ নয়। অথচ কেন ন্যাটো সম্মেলনে কোনো এক উছিলায় চীনকে ন্যাটোর হুমকিদাতা-শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে এ কথারও কোনো যথোপযুক্ত সাফাই ন্যাটো এখনো হাজির করেনি? আবার এত দিন শত্রু দেখানো হচ্ছিল রাশিয়াকে, অথচ এখন হঠাৎ করে খোদ চীনকেই হুমকিদাতা বলা শুরু হচ্ছে।

    চীন বড় রাইজিং ইকোনমির দেশ। ফলে এখনো চীনে সবার চেয়ে পুঁজি সঞ্চয় ও সম্পদ গঠনের হার অনেক বেশি হবে। এর অর্থনৈতিক প্রকাশ ও প্রভাব তো প্রকাশিত হয়ে পড়বে এবং স্বভাবতই এর অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের মন খারাপ-অসন্তুষ্ট হবে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, তাই এটা ফেয়ার। এছাড়া, এটা কোন সামরিক তৎপরতা নয়। তাহলে চীন চ্যালেঞ্জটা কোথায় করল? আর চ্যালেঞ্জমাত্রই তো খারাপ নয়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কখনোই খারাপ নয়।

    তার মানে দাঁড়াল, চীন ‘কেন ন্যাটোর হুমকিদাতা’ তা বর্ণনা বা ব্যাখ্যা দিয়ে বলার আগেই চীনকে শত্রু বানিয়ে দেয়া হয়েছে!! এ ছাড়া মতবিরোধ মানেই কি শত্রু? এমনকি কোনো কাজে গিয়ে আমেরিকা চীনের সাথে মুখোমুখি হয়েছে সেই বিরোধের কথা কেউ জানায়নি! আবার যদি তা হয়ও চাইলে তা নিরসনের আইনি উপায়ও বের করে নেয়া সম্ভব। যদি চায়।

    অথচ ন্যাটোর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বোলচালে মনে হচ্ছে, বাইডেনের নেতৃত্বে মানতে রাজি হওয়া ইউরোপ-আমেরিকা এসেছে যেনবা বাইডেনকে সারা দুনিয়ার পালনীয় কর্তা বলে প্রতিষ্ঠিত করতে যা আমাদের যেন মানতেই হবে!

    বাইডেনের মনে রাখা উচিত ‘অবরোধ’ (মার্কিন ডলার ব্যবস্থার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা) ও ‘হিউম্যান রাইটের’ কথা তুলে তিনি ইচ্ছামত যেসব দেশের উপর দাবড়ে বেড়াতে চাইছেন, তা আইনগতভাবে মানতে জাতিসঙ্ঘ-সদস্যপদপ্রাপ্ত কোনো দেশ মানতে বাধ্য? আইএমএফের চোখে এই অবরোধ বৈধ নয়, বড় জোর এটা আমেরিকার পড়ে পাওয়া অবৈধ কর্তৃত্ব। এটা আমেরিকা-রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত কেবল। তাই এই অবরোধ আরোপ করার কারণে যারাই  ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফলে আমেরিকা যা যা আচরণ ও অপব্যবহার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, এর প্রতিটি আগামীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।

    আমেরিকান মূল্যবোধঃ
    সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন, কারও একার ‘মূল্যবোধের প্রশ্ন’ একেবারেই নয়। অর্থনৈতিক অবরোধ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হিসেবে কখনো আরোপিত হয় বটে। কিন্তু বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দেয়া অবরোধ একান্তই আমেরিকার আরোপিত। সুযোগ পেলে ও মুরোদে কুলালে তা উপড়ে অন্য দেশ ফেলে দেবেই!

    ফিরে মূল্যবোধের কথা তুলা যাক, বর্তমান জাতিসঙ্ঘের এই রাষ্ট্রের দুনিয়ার এক রাষ্ট্রের সাথে অপর রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্ঘাত দেখা দেয় তাহলে কী হবে?
    আসলে সব মূল্যবোধের পেছনেই থাকে ভিন্ন ভিন্ন ইডিওলজি, যে কারণে মূল্যবোধের ভিন্নতা দেখা দিতেই পারে। আর মূল্যবোধে ভিন্নতা দেখা দিলেও ভিন্নদের হলেই সেই মূল্যবোধটা খাটো আর নিজ মূল্যবোধটা শ্রেষ্ঠ এই আচরণ ও বয়ান এক কথায় বললে, তা এক রেসিজম বা ঘৃণিত জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ হতে পারে। আসলে এসব বকোয়াজ কথাবার্তা তাই সরিয়ে রাখাই ভালো! মূল কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ জন্মের আগেই বা এর সদস্যপদ নেয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক কি কোনো মূল্যবোধ আছে? থাকলে কী? বা আদৌ বাইডেনের মূল্যবোধ যা সবাইকে মানতে হবে এমন কিছু ছিল নাকি? তাহলে আসেন প্রশ্ন তুলি, যেমন ইরাকের ওপর ২০০৩ সালে বুশের হামলা ও দখল – এটা আমেরিকা কোন মূল্যবোধ মেনে করেছিল? নিশ্চয় খুবই উন্নতমানের, বাইডেন বলতে পারবেন। বলা উচিত!

    প্রথম কথা, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এককভাবে এমনকি একত্রে কি জাতিসঙ্ঘের মা-বাপ বা মালিক? একেবারেই নয়। তবে আমেরিকার বাইডেনের যদি মনে হয়, অমুক দেশ মূল্যবোধ মানছে না, তাহলে কী হবে? তাহলে জাতিসঙ্ঘের উপযুক্ত স্থানে গিয়ে, যদি থাকে, সেখানে গিয়ে বাইডেন নালিশ রুজু করতে পারেন। সেটিই সমীচীন হবে। তাই না কি?? এর বাইরে পশ্চিমাদের আলাদা মুল্যবোধের স্টান্ডার্ড কী? তাতে কী এসে যায়?

    সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫ সালের আগে, মানে সেই ১৯১৭ সাল থেকেই বিপ্লব করে ক্ষমতায় আসা কমিউনিস্ট দেশ ছিল। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এসব জানা সত্বেও তিনি সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিনকে সম্মানের সাথে যুদ্ধে নিজপক্ষের পার্টনার হিসাবেই গ্রহণ করেছেন। কোন মুল্যবোধের সমস্যা দেখেন নাই। সোভিয়েত নেতা স্তালিন আপাদ্মস্তক এক কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্ট স্যহিরোমনি তি৯নি তাতে দুনিয়ার কারও কোন সন্দেহ নাই। তাহলে যুদ্ধে নিজপক্ষের এক পার্টনার গণ্য করতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তো কখনও কোন মুল্যবোধের অমিল বা অসুবিধার কথা কেউ শুনে নাই।স্তালিনের সাথে মিলেই হিটলারের বিরুদ্ধে রুজভেল্ট বিশ্বযুদ্ধ করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এখন কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন আমাদের বলবেন, মূল্যবোধের সঙ্ঘাত তখন কোথায় ছিল? তাহলে এখন এসব নখড়া করছেন কেন?

    যুদ্ধ শেষে স্তালিনকে সাথে নিয়েই রুজভেল্ট ভেটো-সিস্টেম ওয়ালা এক জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং আলোচনায় স্তালিনকে রাজি করিয়ে জাতিসঙ্ঘ গড়ে নিয়েছিলেন। আর এতে জাতিসঙ্ঘ গড়ার যে ভিত্তি তখন উদ্যোক্তারা মিলে সেট করেছিলেন, সেটাই এখনো একই আছে। গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেমগুলোর মৌলিক কাঠামো হয়েই আছে; যদিও এতে এসব সিস্টেম ও কাঠামোগুলো সবই আমাদের একালের সব বিবাদ মেটাতে সক্ষম, তা নয়। খামতি আছে, ঘাটতি আছে, এসব নিয়ে আরো ও আবার কথা বলতে হবে, সামনে এগোতে হবে আর এসবই সবচেয়ে স্বাভাবিক।

    কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে আমেরিকা-ইউরোপ ভাব ধরছে, নেতা বাইডেনের সাথে তারা হলেন দুনিয়ার সবচেয়ে একচ্ছত্র মূল্যবোধ বা শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধের কেউ একেকজন। অথচ এমন কথা ভিত্তিহীন ও গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল ধরণের। জাতিসঙ্ঘ বা কোনো গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে তোলার পথ কখনো এটা ছিল না, নয়ও। তাহলে তো কমিউনিস্ট হওয়া সত্বেও স্তালিনের সাথে মিলে রুজভেল্ট জাতিসংঘ গড়তে পারতেনই না!!! তাহলে একালে বাইডেন এন্ড গং কোথা থেকে উদয় হলেন??  এরা আগেভাগে নিজের মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে একলাই রাজা হতে চান। তাতে অন্য কেউ তাদের মানুক আর নাই মানুক!! এরপর অন্যের ুপর নিজআধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা- এটা একালের বাইডেনের ভুয়া পথ। অন্তত আমেরিকার অন্যতম ফোরফাদার রুজভেল্ট এমন নিকৃষ্ট কাজ বা পথে এগোননি – এসব নিয়ে তাদের পরামর্শকদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

    সেকালের মাওয়ের চীনঃ
    আবার চীনের প্রসঙ্গটাই দেখেন। আজকের যা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চীন। এতে একালে অর্থনীতিতে গ্লোবাল নেতার হকদার বা দাবিদার তিনি। কিন্তু এর উত্থান এটা তো মাত্র ১৯৭৮ সাল থেকে উত্থিত।  আমেরিকার সাথে এই চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু ১৯৭৮ এর ১ জানুয়ারি থেকে। মাওয়ের চীন ১৯৪৯ সাল থেকেই চীনে (নয়াচীন) ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তবু ১৯৭১ সালের অক্টোবরের আগে পর্যন্ত এই নয়াচীন জাতিসঙ্ঘের কেউ ছিল না। কারণ ১৯৪৯-৭১ এ বছরগুলোতে নয়াচীনের জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ ছিল না, স্বীকৃতি ছিল না। শুধু তা-ই নয়, চীনের নামে দেয়া জাতিসঙ্ঘের জন্ম থেকে বরাদ্দ ভেটোওয়ালা সদস্যপদটা ছিল তাইওয়ানের হাতে।

    আসলে মাওয়ের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বিতর্ক ছিল জাতিসঙ্ঘে চীনের নামে দেয়া (ভেটোসহ) সদস্যপদের হকদার কে? তাইওয়ান না মাওয়ের বিপ্লবী নয়াচীন? নয়াচীন – মানে এটাকে এখনো অনেকে ‘মেনল্যান্ড চীন’ বলে থাকে। আর বস্তুত জাতিসংঘ সদস্যপদের হকদার কে এই প্রশ্নে আমেরিকা তাইওয়ানকেই হকদার মনে করত তখন। তাই আমেরিকার সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে সবাই মিলে ভোট দিলেও আমেরিকার অবস্থানকে নাকচ করার সুযোগ ছিল না কারণ আমেরিকার হাতে ভেটো ক্ষমতা ছিল।  বলে যেকোন ভোটাভুটিতে আমেরিকার হকদার তাইওয়ানের পক্ষে; নয়া চীনের পক্ষে নয়।

    ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, জাতিসঙ্ঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবঃ
    ১৯৭১ সালের অক্টোবরের জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ‘চীনা সদস্যপদটা কে পাবে’- এই প্রশ্নটা আবার এক ভোটাভুটিতে তোলা হয়েছিল।  সেবার কিন্তু হঠাৎ  ইস্কযুটা তোলা হয় নাই। তবে ততপরতা বা অগ্রগতিগুলো বেশির ভাগ ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে সঙ্গোপনে।

    ঘটনা সংক্ষেপে বললেঃ
    ১. মাওয়ের চীন, ১৯৫৮ সাল থেকে “কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব  এক ক্যাপিটালিজমের পথে”  –  যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এরই বাইরের ডাকনাম ছিল “১৯৫৮ সালের চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। আমাদের এখনকার জন্য মূল প্রসঙ্গ – এসিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চীনে ব্যাপক বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা বলাইবাহুল্য। পশ্চিমা দেশের বা এক কথায় প্রতীকীভাবে আমেরিকার বিনিয়োগ পুঁজিবাজার ওয়ালস্ট্রিটের জন্য এটা ছিল এক বিরাট সুযোগ। আর এ সুযোগ দেয়ার আগে মাও এটা নিয়েই নিক্সন-কিসিঞ্জারদের সাথে দরকষাকষি করেন ও তাদের রাজি করান। মাও কী চেয়েছিলেন বিনিময়ে?

    জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ নয়া চীনের পক্ষে দিতে হবে, আমেরিকা ভেটোপ্রদান করতে পারবে না – এই দেয়ার মাধ্যমে তবেই মাওয়ের চীন আমেরিকার জন্য তিনি চীনে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিতে রাজি হয়েছিলেন। এই ছিল ডিল!

    জাতিসঙ্ঘের ঐ ’৭১ সালের অক্টোবরে যে ভোটাভুটি হয়েছিল তাতে চীনে বাজার-বিনিয়োগে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার লোভে আমেরিকা ভোটাভুটিতে ভোটদানেই বিরত ছিল; অর্থাৎ কোনদিকেই ভোট দেয় নাই। আর এতটুকু হলেই নয়া চীনের চলে। কারণ, এর আগে সবসময় সব ক্ষেত্রে আমেরিকা ভেটো দিয়ে তাইওয়ানকে ভোটাভোটিতে জিতিয়ে টিকিয়ে দিত। আর নয়া চীনের পক্ষে প্রস্তাব উঠলে আমেরিকার এক ভেটোতেই সব শেষ হয়ে যেত। এছাড়া আমেরিকা তার প্রভাবাধীন জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সদস্যদের সেবার ১৯৭১ সালে আর বিরত থেকে নয়, বরং নয়া চীনের পক্ষে ভোট দিতে লবী অনুরোধ রেখেছিল।

    আর তাতেই মাও সেতুংয়ের চীনই আসল চীনের জাতিসঙ্ঘের (ভেটো ক্ষমতাসহ) সদস্যপদ একমাত্র হকদার, এ সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সাত দিনের চীন সফরে গিয়ে সব আলাপ-আলোচনা শুরু করেছিলেন, যা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক স্বীকৃতি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৮, ১ জানুয়ারি থেকে।

    তার সোজা মানে সেই ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব থেকে তাইওয়ান-ই হয়ে যায় নয়া চীন- এই মূল ভূখণ্ডের অংশ। তাইওয়ান আর স্বাধীন নয়, কোনো আলাদা প্রদেশ নয়। কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাইওয়ান স্বাধীন কোনো দেশ আর নয়। জাতিসংঘের চোখে, তাইওয়ান আইনত পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (PRC) এর অংশ।

    এখন তাহলে তাইওয়ানকে নিয়ে বাইডেনের দরদ- এর অর্থ কী? এটা তো শঠতা! অবশ্যই তাই!

    এমনকি ১৯৭১ সালের পর থেকে চীন যখনই কোনো দেশের সাথে স্বীকৃতি বিনিময় করে সেখানে সে শর্ত রাখে যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, এটা সে আগে স্বীকার করলে তবেই তারা পারস্পরিক স্বীকৃতি বিনিময় আরো আগিয়ে নিতে পারে। এটাকেই চীন ‘একচীন নীতি’ বলে থাকে। একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বলে থাকে। সেই থেকে আমেরিকা একচীন নীতিতে স্বাক্ষর করা দেশ। কিন্তু তবু বারবার এটা নিয়ে সে প্রায়ই আমেরিকা উসকানি তৈরি করে চলছে। এমনকি গত বছর ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি,  বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরও একই পিছলাপিছলি শুরু করেছিলেন। শেষে চীন হুমকি ও চাপ দেয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন আবার এবার সত্তরের দশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০২ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেনের মূল্যবোধ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ইউক্রেন যুদ্ধ পরিণতিতে অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে আগাচ্ছে!

    ইউক্রেন যুদ্ধ পরিণতিতে অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে আগাচ্ছে!

    গৌতম দাস

    ২৭ জুন ২০২২, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-490

    .  ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও উতপাদনে মহামন্দা আনতে, বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে – বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট  – Ukraine war is economic catastrophe, warns World Bank

    গ্লোবাল ব্যাঙ্ক ও বিনিয়োগকারি সিটিগ্রুপ, গ্লোবাল মহামন্দা এগিয়ে আসছে দেখছে– 

    গ্লোবাল মহামন্দা ধেয়ে আসার হুশিয়ারি উচ্চারণ হতে শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও এক বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক সিটিগ্রুপ ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে! কোভিডের অর্থনৈতিক বিপর্যয় দুনিয়া সামলে উঠা শেষ না করতেই বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমাওশক্তির সীমাহোন লোভের যুদ্ধ ইউক্রেন এই নয়া বিপর্যয়ের আগমনি ধ্বনির ইঙ্গিত দেয়া শুরু করেছে। 
    ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতিতে কি গত ২০০৮ সালের মত আবার এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দা?  বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়া? দুনিয়ায় ক্ষুধা-দারিদ্র্য আরো খারাপ ভাবে ছেয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটবে? এমনিতেই গত তিন বছর ধরে কোভিড ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ছেয়ে বসা এক মুদ্রাস্ফীতি দুনিয়ার সবদেশকেই মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপে ফেলেছে। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাণিজ্যে কোভিডের প্রভাব এখনও মারাত্মক। আমরা তা কাটিয়ে উঠতে পারি নাই। কোভিডের আক্রমণও শেষ হয় নাই। তাই সব মিলিয়ে এবার খোদ আমেরিকাতেই এ নিয়ে ব্যাপক  জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট পাড়া, গ্লোবাল পুঁজিবাজার, বিজনেস হাউজগুলো এ নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছে।  অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জগত জুড়ে বাইডেনকে ফিরে  তাই অভিযুক্ত করা শুরু করেছে – বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধে উস্কানি তোলার জন্য, অন্তহীন করে ফেলার জন্য। সব অভিযোগের গোড়া  – কাটার মত যা সবাইকে বিঁধছে তা হল জ্বালানি তেল মুল্যবৃদ্ধি যা ১২০ ডলারের উপরে উঠেছে। এটাই সবাইকে এখন ভীত করে তুলেছে!

    ইউক্রেন যুদ্ধের আপডেটঃ 
    জুন মাস শেষ হয়ে এল। অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধ টানা মোট চার মাস পেরিয়ে গেল যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এক পরিবর্তন এখন দেখা যাচ্ছে তা হল –  আগে যেভাবে ……এই তো রাশিয়া হেরে যাচ্ছে কিংবা অবরোধে পড়ে রাশিয়ান অর্থনীতি এই ডুবে যাচ্ছে বলে অথবা সামরিকভাবে ইউক্রেন এই যুদ্ধে জিতেই যাচ্ছে – ইত্যাদি ধরনের পশ্চিমা নানা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট যেটা চারদিকে ছেয়ে গিয়েছিল তাতে আজ ভাটা দেখা যাচ্ছে। একালে অনেক পশ্চিমা মনের সাফাই হল, নিজদেশের জন্য “কথিত দেশপ্রমের স্বার্থে মিথ্যা প্রপাগান্ডা’ জায়েজ আছে। আর এই সুত্র ধরে এর উপর আবার তবু  শুরু থেকেই পশ্চিমে বিশেষত ইউরোপে; বিশেষ করে যুদ্ধের নিউজ রিপোর্ট আর ‘কথিত দেশপ্রেমী প্রপাগান্ডা’ যে এক জিনিস নয় এর কোন হুশজ্ঞান কারও আছে মনে হচ্ছিল না। এমনিতে কোনো দেশের মিডিয়ায় নিজ দেশের যুদ্ধের খবরে কিছু মাত্রায় প্রপাগান্ডা থাকে এটা হয়ত খুব অস্বাভাবিক নয় যদিও একালে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার যুগে অন্তত পশ্চিমাদেশের মিডিয়াগুলোতে “নিজ দেশের মিডিয়া” বলে কোনো ধারণা কার্যকর থাকার কথা নয়। কারণ এত দিনে সবাই বুঝে গেছে যে – মিথ্যা প্রপাগান্ডায় দেশপ্রেম দেখাতেই হবে এটা কোনো কাজের কথা বা পদক্ষেপ নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা মিথ্যা কথা আর জার্নালিজম  এম হওয়ার কোন সুযোগ নাই। শেষবিচারে মিথ্যা বলে কোনো দেশের আসলেই কোন লাভ হয় না। কারণ কিছুই শেষে লুকানো থাকে না।  তবু ইউরোপেই এবার বেশি দেখা যাচ্ছে লাগামছাড়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা করতে। আর মিথ্যা হওয়াতেই সম্ভবত এই প্রপাগান্ডা চার মাসও টিকতে পারেনি। কারণ চার মাস ধরে কেউ যদি লাগাতার বলে চলে যে, আমরা খালি ‘জিততেই আছি’ অথচ বাস্তবতায় কোনো বদল, পরিবর্তন নাই – এতে এক পর্যায়ে সব প্রপাগান্ডাই মুখ থুবড়ে না পড়ার কোন কারণ নাই! তাই সবাই এখন প্রপাগান্ডা রেখে অন্তত চুপ হয়ে গেছে।

    তবে এ’অবস্থার  জন্য আরো কারণও আছে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, এটা শুরু থেকে কখনই রাশিয়া-ইউক্রেন এদুই দেশের কোনো লোকাল যুদ্ধ মানে, এটা কোন বুদ্ধিতেই এ দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন কোন ধারণা দেয়া যায় নাই। বরং এটা সব অর্থেই সবদেশের উপরই একটা গ্লোবজুড়ে প্রভাব পড়া যুদ্ধ হিসেবে হাজির হয়েছে। আর এটা আগে বা শুরুতে এমনও ছিল না যে শুরুতে তে তা  দুই দেশের কোন লোকাল যুদ্ধ ছিল আর পরে তা গ্লোবালভাবে সবার ওপরে প্রভাব নিয়ে হাজির হয়েছে তা-ও নয়। এই যুদ্ধ শুরু থেকেই গ্লোবাল প্রভাবের। আর বাইডেনই এমন একটা যুদ্ধ হোক – এমনটা হ্ওয়ার ক্ষেত্রে  তাঁর কোন পরোয়া ছিল না, এটাই চেয়েছেন।

    যেমন- বাইডেনের হিসাব মতে, এটা তো সবসময়ই পরিস্কার থেকেছে যে যুদ্ধের প্রধান পক্ষাপক্ষ হোক সারা ইউরোপ আর আমেরিকা মিলে একসাথে; এভাবে সারা পশ্চিমজুড়ে এক নিজ পক্ষশক্তি খাড়া হোক। হয়েছেও তাই। আর তা না হয়ে অন্য কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল না। প্রধানত ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো সবাই এমনকি খোদ আমেরিকাও কম বা বেশি পরিমাণে (কোন রাষ্ট্র ৫০ শতাংশের বেশি) রাশিয়ান তেল অথবা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা তা কিনে চলত। তাই এটা রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত একটা যুদ্ধের ঘটনা যতটা না এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি প্রভাবশালী ঘটনা হল, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ। বাংলা ভাষায় বললে যার সারার্থ হল – রাশিয়াকে ‘ভাতে-পানিতে মারার’ পশ্চিমাশক্তির পরিকল্পনা ও যুদ্ধ বললে যা বোঝাবে ঠিক তাই।

    দুনিয়ার সবাই এখন এর আসল অর্থ বুঝে গেছে যে, এটা শুধু রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত যুদ্ধ একেবারেই নয়। এটা মূলত বাইডেনের আমেরিকার (বগলে ইইউ-কে নিয়ে) পুতিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তাই  ইইউ বা আমেরিকার যে কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, রাশিয়ার সাথে আপনাদের বিরোধের ক্ষেত্রটা কী? ইউক্রেনের যুদ্ধভূমির ক্ষেত্রে নাকি রাশিয়ার ওপর সর্বাত্মক, সবাই মিলে অর্থনৈতিক অবরোধ (ডলার বা ইউরো মুদ্রার অবরোধ) আরোপে? পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্র এর সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। যেমন – এটা কি “ইউক্রেনের এই যুদ্ধে” জিতার জন্য রাশিয়ার ওপর মুদ্রা অবরোধের যুদ্ধ? শুরুতে এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা তারা করেছিল। কিন্তু এখন অন্য কাউকে বিশ্বাস করানোর আগে তারা নিজেরাই আর তা বিশ্বাস করে না। তাদের পশ্চিমাশক্তির লক্ষ্য এখন পরিষ্কার ও উদাম যে, তারা পুতিনের রাশিয়াকে নিজ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবসায়-বাণিজ্য এমনকি কোনো স্ট্রাটেজিক স্বার্থ – এমন সব কিছু থেকে বঞ্চিত করাই পশ্চিমের লক্ষ্য। তারা রাশিয়াকে দেখতে চায় যেন সে ১৯৯১ সালের আগের মত এক সোভিয়েত ইউনিয়ন, যে রাষ্ট্রের সাথে দুনিয়ায় আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের সদস্যরাষ্ট্র যারা তাদের কারো সাথে বলার মত কোন বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না। এমনকি সেকালের সোভিয়েত ব্লকের বলে যেসব রাষ্ট্র ছিল যেমন – পোল্যান্ড বা রোমানিয়া এদের সাথেও সোভিয়েত ইউনিয়নের “বাণিজ্য-প্রধান” এমন কোন সম্পর্ক কখনও ছিল না। এসবের মূল কারণ – কোনো আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা ও এর সদস্যপদ নেয়া ছাড়া কোনো রাষ্ট্র আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য করতে পারে না। আর ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন বা কমিউনিস্ট ব্লকের কোনো রাষ্ট্রই আইএমএফ ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার সদস্য ছিল না।

    পরে সোভিয়েত ভেঙ্গে গেলে, ১৯৯২ সাল থেকে রাশিয়াসহ সব পুরানা কমিউনিস্ট ব্লকের রাষ্ট্রগুলো আইএমএফের সদস্য হয়ে যাওয়ার পরে এখন যেন বাইডেন চাইছেন পুতিনের রাশিয়ার সদস্যপদ শূন্য করে দেয়ার জন্য। পুতিনের রাশিয়া যেন সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থায় ফিরে যাক! তাই যেন সে উদ্দেশ্যেই এখন (ডলার, ইউরো ইয়েন ইত্যাদি) অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। মানে বাইডেন আসলে যেন চান রাশিয়া আগের মতই কার্যত আইএমএফের সদস্যপদ না থাক। কিন্তু ভাগাড়ে গরু বেশি না কম মরে পড়ে থাকবে তা শকুনের অভিশাপের ওপর নির্ভর করে না – এটাই সমস্যা!!!

    রাশিয়া ইরান নয়ঃ
    পশ্চিমাশক্তির রাশিয়াকে শুরু থেকে ইরান-ই মনে করা এসেছে – যা ছিল মারাত্মক ভুল। অন্যভাবে বললে, হয়তো এটা আসলে নিজেদের বড় করে দেখা [over-estimation] বা মেপে নিজেকে বেশি করে বলা। এটাকেই আমরা অনেকে ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ’-এর প্রকাশ বলব। যেমন ধরেন এক সাদা ককেশীয় বলল, আরে আমরা তো দুনিয়াকে গত পাঁচশ বছর ধরে অধীনস্ত করে শাসন করে চলেছি। আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, চাতুরি বা শঠতার সাথে কি কেউ পারবে? তাই দুনিয়া আগামীতে চীনের নেতৃত্বে কেন, কারো নেতৃত্বেই যাবে না – গত পাঁচশ বছরের মত বরাবরই এটা আমাদের নেতৃত্বেই থেকে যাবে। তাই আমাদের আপাত লক্ষ্য রাশিয়াকে ভাত-পানিতে মারা; রাশিয়াকে ইউরোপে প্রভাবহীন করে কোণঠাসা ও বিতাড়িত করাই তাদের লক্ষ্য! ইউরোপের যেকোনো কর্নারে একেবারেই প্রভাবহীন করা, হাতে ভিক্ষাপাত্র ধরানো ও ফেলে রাখা। অনেকে অবশ্য প্রশ্ন করতে পারেন, রাশিয়া তো চীনের মত কোন হবু গ্লোবাল নেতা নয়! যদিও রাশিয়া স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে দুনিয়ায় সামর্থ্য অনুসারে ব্যবসায়-বাণিজ্য করে চলতে চায়। পশ্চিমাশক্তির খায়েশ ছিল রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক-সামরিক সব রকমের চাপ সৃষ্টি করে তাকে কোণঠাসা, রিক্ত করে রাখা। আর এর সাথে তারা দেখতে চেয়েছিল রাশিয়ার এই কল্পিত দুস্থ দশা দেখে চীনের প্রতিক্রিয়া কী হয়!  চীন কী রাশিয়াকেই বাঁচাতে ছুটে যায় ও বিপদে জড়ায়, নাকি রাশিয়াকেই ফেলে চলে যায়! যদিও যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে চীন পরিষ্কার করে নিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে বলে দিয়েছিল – রাশিয়ার নিজ অর্থনৈতিক-সামরিক স্বার্থ যদিও চীনের স্বার্থ নয় তবু তারা আশা করে পশ্চিমের সাথে রাশিয়ার বিরোধে সব পক্ষই শান্তিপূর্ণ উপায়ে তা সমাধানের পথ বের করতে সফল হবে!’ তাহলে অবরোধ আরোপের বিচারে পশ্চিমাশক্তির রাশিয়াকে ইরান মনে করাকে মারাত্মক ভুল বলে কথা শুরু করলাম কেন?

    কারণ, আমেরিকান অবরোধ এর আগে বহুবার ইরানের ওপর দেয়া হয়েছিল, যা এখনো আছে। প্রায় একইভাবে রাশিয়ার উপরও তাই দেয়া হয়েছিল যা এখন সর্বব্যাপী অবরোধে এমনকি ইইউও রাশিয়ার ওপর এখন ‘ইউরো অবরোধ’ দিয়ে রেখেছে। আর এখান থেকেই আসছে রাশিয়ার সাথে ইরানের তুলনা। তবে রাশিয়া ও ইরানের আরেক মিলের দিকও আছে তা হল – এ’দুই দেশই তাদের তেল-গ্যাস আর কোনো দেশ কিনুক আর না কিনুক, এরা উভয়ই চীনে ২৫ বছর ধরে লাগাতার জ্বালানি সরবরাহ করতে চীনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আছে। আর এটাই এদুই দেশকে আমেরিকান অবরোধের হাত থেকে, এদুই দেশের অর্থনীতিকে অন্তত কিছুটা স্থায়ী রিলিফ দিয়ে থাকে।

    তবু ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে প্রধান ফারাক হল – সারা ইইউ রাশিয়ান তেল-গ্যাসের ক্রেতা হিসাবে খুবই নির্ভরশীল। ব্যাপারটা কেবল রাশিয়ার ঠেকা তা নয়; ক্রেতারও স্বার্থের ঠেকা কম বড় না। যদিও জো বাইডেনের পাল্লায় পড়ে তার মনরক্ষার্থে ইইউ বহু চেষ্টা এখন করে গেলেও তাতে সফল হতে পারে নাই। যেমন, সর্বশেষ রয়টার্সের খবর হল – ‘জার্মানি হঠাৎ করে বিশাল গ্যাস সঙ্কটের মুখোমুখি, রাশিয়া এক চলতি জুন মাসের ব্যবধানে ৬০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে [Germany is facing a sudden acceleration of its gas crisis. A 60% drop in Russian supplies since early June threatens to plunge Europe’s biggest economy into severe economic shock. ]।’ আসলে এটাকেই বলছিলাম রাশিয়ার পরিস্থিতি ইরানের চেয়ে আলাদা। কীভাবে? পণ্য কেনাবেচা না হলে রাশিয়ার বেলায় এর ক্ষয়ক্ষতি একপক্ষীয় নয় বরং বিক্রেতা (রাশিয়া) ও ক্রেতা (যেমন ইইউ রাষ্ট্রগুলো) উভয়েই তাতে অসুবিধায় পড়ে এখানে। আর এখানেই সুবিধায় রাশিয়া আছে। যেমনটা ইরানের বেলায় নাই। ইরানের বেলায় জ্বালানি বিক্রি না হলে এতে বিক্রেতা  ইরানের ক্ষতিটাই সবার চেয়ে বেশি।

    কেন ইউরোপে রাশিয়া সুবিধাজনক অবস্থায়? মূল কারণ- পূর্ব-ইউরোপ বলে বা কমিউনিস্ট ব্লকের দেশগুলোর নেতা বলে রাশিয়া দীর্ঘদিন বাকি-দুনিয়া থেকে বাণিজ্যবিচ্ছিন্ন ছিল, মানে  নিজ ব্লকের বাইরের অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিকভাবে কোন পণ্য লেনদেনের সম্পর্কে সে ছিল না ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেল-গ্যাস বাদে বাকি পুরো ইউরোপের মাটির নিচের সব তেল-গ্যাস ব্যবহার করে পশ্চিম-ইউরোপে তা শেষ করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বর্তমান ইইউ রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সবাই তেল-গ্যাস প্রশ্নে সবাই একই রাশিয়ার তেল-গ্যাসের উপর সকলেই কমবেশি পরিমাণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আছে সেই থেকে। যেখানে গ্যাস একদিকে তুলনামূলক ক্লিন এনার্জির উৎস। অন্যদিকে, ইউরোপ মানেই বছরের ছয় মাসের বেশি যেখানে ঘরগরম রাখতে জালানি না পুড়ালে ওসব দেশ বসবাসের অযোগ্য। ফলে ওই জীবনযাত্রা প্রচুর জ্বালানি খরচনির্ভর। এ কারণে, সেই থেকে একালে ইউরোপের কোন রাষ্ট্র রাশিয়ার তেল-গ্যাস কিনবে না এটা বললেই তাতে রাশিয়ার একটি বিকল্প জোগাড় করে ফেলাটা সহজ নয়। এজন্য তারা অনেকবারই বাইডেনকে বুঝিয়েছিল ও সিদ্ধান্তে এসেছিল যে, ২০২৭ সালের আগে তারা রাশিয়ার বিকল্প উৎসের কাছে যাবে না কারণ পাবে না। কিন্তু বাইডেনের চাপের মুখে ফিরে তারা অনেকেই অপারগতার কথা বাস্তব হলেও তা উচ্চারণ করতে চায়নি। আবার হাঙ্গেরি বা ইতালির মত কিছুদেশ খোলাখুলি চেঁচিয়ে বলে দিয়েছিল যে, রাশিয়ান গ্যাস ছাড়া তাদের অর্থনীতি চলবে না, তাই তারা কিনতেই থাকবে। অথবা গোপনে অসরকারিভাবে নগদ রুবল দিয়ে রাশিয়ান তেল-গ্যাস কিনে চলছে।

    আর এখন এমন অবস্থায় খোদ রাশিয়াই এবার গ্যাস বিক্রি বা সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ ইউরোপ ইচ্ছা বা পছন্দমত রাশিয়ার উপর (ইউরো) অবরোধ করার বদলে উল্টা রাশিয়া নিজ রুবল মুদ্রার শর্তপূরণ হলেই কেবল গ্যাস বেচবে তা তো বটেই, আবার রুবল দিলেও অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়া উল্টা কোন কোন ইউরোপীয় রাষ্ট্রকে পাল্টা চাপ দিবে বিপদে ফেলতে – গ্যাস সরবরাহ-ই করবে না। আর এ সূত্রেই বিপদে পড়েছে জার্মানি। রয়টার্সের রিপোর্টটা তা নিয়েই।

    অনেকের মনে হতে পারে, রাশিয়া গ্যাস বেচবে না? নিজে একথা বলার সামর্থ্য পেল কী করে? হ্যাঁ, রাশিয়ার সেই সামর্থ্য এখন হয়েছে। আমেরিকান মিডিয়া ব্লুমবার্গের উদ্ধৃতি, আর এনিয়ে বিবিসি এক লম্বা রিপোর্ট করেছে  দেখেন গত ২২ মে – “রুবল: ভ্লাদিমির পুতিনের যেসব কৌশলে রাশিয়ার মুদ্রার নাটকীয় উত্থান”।

    প্রথম কথা- রাশিয়ান অর্থনীতি এখন আমেরিকা ও ইইউ’র অবরোধের ঠেলায় কোণঠাসা হয়ে পড়বে বলে পশ্চিমাশক্তির মিডিয়া – প্রধান ও সোশ্যাল মিডিয়া দুটোতেই যে হইচই আতঙ্ক তুলে ফেলেছিল তা এখন উল্টে গেছে। বিবিসির এই রিপোর্ট বিস্তারিতভাবে রাশিয়া কী কী পদক্ষেপ নেয়ার কারণে তার রুবল এখন চাঙ্গা হয়ে গেছে এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। এছাড়া আমেরিকান স্থানীয় ভোক্তা-শ্রোতার মিডিয়া সিএনবিসি [CNBC] আরেক দিক থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট করে [Russia’s ruble hit its strongest level in 7 years despite massive sanctions. Here’s why] জানিয়েছিল –  গত মার্চ ২০২২ যেখানে এক মার্কিন ডলার কিনতে রাশিয়ার ১৩৯ রুবল লাগত; তা এখন ৫২ রুবলে নেমে গিয়ে রুবলকে শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ উল্টা এটা নেমে ৫২ রুবলে ডলার হয়ে যায়। কিন্তু এটা বেশি নিচে নেমে যাওয়া দর মনে করে রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ এতে রাশিয়া রফতানি বাজারে বেশি রাশিয়ান পণ্য হারাবে মনে করে এতে এ্কটা ভারসাম্য আনতে তা এখন একটু বাড়িয়ে ৬২ রুবল / ডলার এই রেটের আশপাশে মূল্যস্থির ধরে রাখার মেকানিজম বের করার চেষ্টা করছে রাশিয়া।

    অর্থাৎ রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক সঠিক নীতি-পলিসি প্রণয়নে সক্ষম ও সফল যে, অন্য দেশকে আগে রাশিয়ান রুবল কিনে পরে ওই রুবলে মূল্য পরিশোধ করার শর্তেই  রাশিয়ান তেল-গ্যাস কিনতে ক্রেতাকে বাধ্য করতে পেরেছে তারা। এটাই রুবলকে এখন এক চাঙ্গা চাহিদা সম্পন্ন  মুদ্রা, এটা খুবই দরকারি মুদ্রা হিসেবে বাজারে হাজির করেছে। আর এখানেই ইউরোপের জ্বালানি চাহিদায় রাশিয়ার বিকল্প নেই – এর সুবিধা তুলে নিতে পারাতেই এটা রুবলকে শক্তিশালী মুদ্রা করে দিয়েছে। আর এখান থেকেই রাশিয়া ইরান থেকে আলাদা হয়ে আপাতত নিজ ভাগ্য খুলে বসেছে।

    অথচ, যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ – এভাবে সারা পশ্চিমাশক্তির অনুমান-কল্পনা ছিল এটাই যেন রাশিয়ার উপর (অনেকটা যেমন ইরানের বেলায় তার অর্থনীতিতে করা হয়েছিল) আমেরিকান ডলার অবরোধ আরোপ করে ইরানের মতই রাশিয়ান অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত বা সঙ্কুচিত করার পথে সহজেই ঠেলে তা সফল করবে। কিন্তু এক কথায় বললে, বাইডেনের এখনকার প্রশাসন ও নির্বাচন-পূর্ব নির্বাচন পরিচালনা টিম আসলে প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্কই করেনি। যেগুলোর বিষয়ে শক্ত ও নির্মোহ পর্যালোচনা করে হ্যাঁ বা না সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিল সেসব ক্ষেত্রে তারা আবেগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যেমন বিজয়ী হয়ে গেলে কী হবে সেই কল্পনা করে সেই সুখা-বেগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপে রাশিয়ান তেল-গ্যাসের বিকল্প আছে কি না এর যাচাইও তারা আবেগ দিয়ে করেছিল বলেই রুবল আপাতত সারভাইভ করে গেল মনে হচ্ছে…!

    শুধু তাই তা, এতে সব মিলিয়ে এখন খোদ আমেরিকাতেই একটি অংশের মনে আমেরিকার যুদ্ধে হেরে যাওয়ার বাঁশি বেজে উঠছে। তারা বাইডেনের সমালোচনার দিকগুলো তুলে আনা শুরু করেছে। হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমস ওয়েবপত্রিকা এ নিয়ে এক কঠোর সমালোচক হয়ে উঠেছে [Neocon think-tanks are driving Biden’s Ukraine policy]। সেখানে তারা আরো এক রিপোর্ট লিখেছে, বাইডেন প্রশাসনকে ঘিরে থাকা ৩৬ এক্সপার্ট এক কোটারি গ্রুপের রেফারেন্স দিয়ে বলছে এরা সম্মিলিতভাবে এক চিঠিতে লিখেছে, ‘আমেরিকা ও ইউরোপকে অবশ্যই ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে কোনো যুদ্ধবিরতির চুক্তি ঘটানো থেকে ফেরাতে হবে যা ইউক্রেনের যুদ্ধলক্ষ্য পূরণের চেয়ে খাটো এবং যা পরিণতিতে লাখ লাখ ইউক্রেনীয়কে রাশিয়ার অধীনস্থ করবে।’

    The letter says, in part: 
    “The United States and Europe must avoid the urge to encourage Kiev to negotiate a ceasefire that falls short of Ukraine’s goals and could consign millions of Ukrainians to Russian control.”

    আর এই চিঠিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন পোস্ট ১৭ জুন প্রতিক্রিয়ায় আরেক রচনা ছাপিয়েছে। সেখানে প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে, ‘আমেরিকা ও এর সহযোগী দেশগুলো ইউক্রেনে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে বলে জানিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ান বিজয় যাতে না ঘটতে পারে তা থেকে রাশিয়াকে বঞ্চিত করতে চেয়ে কিয়েভে (ইউক্রেনে) সামরিক ব্যয় বিশাল বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে অথচ এতে যুদ্ধ বাড়িয়ে তোলাতে অস্থিতিশীলতা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে যার সোজা ফল হবে দুনিয়াতে তীব্র ক্ষুধার সঙ্কট ও গ্লোবাল অর্থনীতির সঙ্কট জটিলতর করবে”।

    “The United States and its allies are making preparations for a prolonged conflict in Ukraine, officials said, as the Biden administration attempts to deny Russia victory by surging military aid to Kyiv while scrambling to ease the war’s destabilizing effects on world hunger and the global economy.”

    এভাবে সবগুলো খবরকে উদ্ধৃতি করে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্ক কর্তা ইভো দালদার [Ivo Daalder] লিখছেন, ‘আমেরিকান প্রশাসন উভয় সঙ্কটে পড়েছে- হয় ইউক্রেনে চলমান ব্যাপক রক্তপাতের পথ হলেও তাই ধরে বসে থেকে এর ভয়ঙ্কর রকম সব গ্লোবাল পরিণতি আপন করতে হবে আর নয়তো ইউক্রেনকে সমর্থন বন্ধ করে মস্কোকে বিজয়ী হতে সহায়তা করতে হবে। এ পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাইডেন প্রশাসন দায়িত্বজ্ঞানশূন্য আচরণ করছে, ব্যর্থ পলিসি আঁকড়ে থেকে চলছে। অন্তত সৎ নাগরিকের উচিত হবে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা।’

    “Ivo Daalder, a former U.S. ambassador to NATO who now heads the Chicago Council on Global Affairs, said the battlefield impasse leaves the United States with a stark choice: either continue to help Ukraine sustain a potentially bloody status quo, with the devastating global consequences that entails; or halt support and permit Moscow to prevail.”

    আমেরিকান বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্কের কর্তারা এ নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছেন। কারণ ইতোমধ্যে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড অব গভর্নরের চেয়ারম্যান জেরোমে পাওয়েল [Jerome Powell ] আমেরিকান সিনেটের এক শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়ে জবাব দিচ্ছিলেন যে, গ্লোবাল রিসেশন[recession] বা মহামন্দা এখন ২০০৭-৮ সালের মতো আসন্ন কি না এ প্রসঙ্গে। তিনি জবাবে তা আসন্ন নয়, তা বলতে পারেননি। অর্থাৎ এর সম্ভাবনা নাকচ করেননি [Powell says recession ‘a possibility’ but not likely]।

    আর এরপর থেকেই ব্যবসায় পুঁজিবাজার বা অর্থনীতির তৎপরতার কেন্দ্রগুলোতে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। তারা বাইডেনের থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করে ও অবিবেচক বলে তাঁর সমালোচনা করেছে, বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধ উসকে তোলার জন্য ও তা জোরদার করতে শুরু করেছে বলে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৫ জুন  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতি কী মহামন্দা“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • সব এথনিক ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সমমর্যাদা ও সমঅধিকার

    অপর এথনিক-ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো অপরাধ;
    দরকার সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিশ্রুতি

    গৌতম দাস

    ১৯ জুন ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-48J

          Prophet Muhammad comments, by Nupur Sharma

    –

    গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ভারত মানে এখন তা “নূপুর শর্মা” ইস্যু। গত ২০১৪ সালে বিজেপির মোদি ভারতের ক্ষমতায় আসার পর থেকে এত খারাপভাবে ‘হিন্দুত্ববাদী’ এ’রাজনীতি মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়াতে গিয়ে উলটা পরাজয় ও পশ্চাদপসরণ করেনি। অথচ চলতি বছরের মার্চের মধ্যেও উত্তরপ্রদেশসহ অন্য পাঁচ রাজ্যে [Uttar Pradesh, Uttarakhand, Punjab, Manipur and Goa] নির্বাচনে সরাসরি ও প্রকাশ্যে মুসলমান কোপানোর (দমন, পীড়ন ও নিগ্রহ) কথা বলে ভারতের হিন্দু ভোট সব বিজেপির বাক্সে জোগাড়ের এমন তৎপরতা এর আগে কেউ দেখেনি। অর্থাৎ যেটাকে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো বিজেপি নেতা মুসলমান কোপানোতে কে কত নৃশংস হতে পারে এই হিন্দুত্ববাদই ভারতের একমাত্র রাজনীতি, সেই রাজনীতিও নুপুর শর্মা ইস্যুতে এসে হঠাৎ প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে যায়। ভারতের দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় এখন এ নিয়ে অন্তত এমন সাব-হেডিং দেখতে পাওয়া যাবে যে ‘বিজেপি বা মোদি শক খেয়েছে’!

    মানুষের সমাজ ও হাটবাজারঃ
    মানুষের সমাজের হাটবাজার মানুষের সমাজের মতোই সমান বহু পুরানা। আর হাটবাজার-গঞ্জ এগুলো হলো সেই জায়গা, যেখানে সমাজের আমরা আসলে সবাই একে অপরকে পরস্পরকে স্বীকৃতি দেই, তাতে সেটা সচেতন থেকে বা না থেকে যেভাবেই করি। আর তাতে যথোপযুক্ত সম্মান-মর্যাদাসহই আমরা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়েই তা করি। কিন্তু সেটি কিভাবে? যখন আমরা হাটে পরস্পরের সাথে পণ্য-বিনিময় সম্পর্ক করি। তাই একটা হাট মানে এর মূলকথা হল, নিজ পণ্য বা অর্থের বিনিময়ে অনের কাছ থেকে পণ্য বা অর্থ নেয়া, এর এক লেনদেন। যেটা একদিক থেকে দেখলে পরস্পরের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত হওয়াও বলা যায়। আবার অন্যদিক থেকে দেখলে পণ্য বিনিময়কারী আমরা এর মাধ্যমে পরস্পরকে স্বীকার করে নিয়ে থাকি যে অন্য-আপনি সমাজে আছেন  ও অবদান রাখছেন। এটাই আসলে উপযুক্ত সম্মানসহ পরস্পরকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া-নেয়া করা। এককথায় তাই, হাটবাজার মানে আসলে যেখানে মানুষ পরস্পরকে সামাজিক সম্মান ও স্বীকৃতি আদান-প্রদান করে নেই। সমাজে পারস্পরিক উপস্থিতি ও অব্দান রাখাকে স্বীকার করে নেই।

    আবার  গ্রামগঞ্জের এই প্রত্যন্ত হাটবাজারগুলোরই বৃহত্তম অর্থে এর রূপটাই হল এক ‘গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা’ বা সিস্টেম [Global Commerce & Exchange System]। এক গ্লোবাল স্বীকৃতির আদান-প্রদান ব্যবস্থার এক গ্লোবাল বাণিজ্য যেটা দুনিয়াজুড়ে এখন সব রাষ্ট্রেরই প্রাণভোমরা। সব রাষ্ট্রের জন্যই এটা এখন খুবই জরুরি যে, এই গ্লোবাল ব্যবস্থার অংশ হয়ে এতে অবস্থান নিয়েই তাকে থাকতেই হবে। সোজা কথা, এই ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ আপনার রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তা নাই; আপনি এর কেউ নন; আপনাকে ছাড়াই এই ব্যবস্থাটা চলছে অথবা এর মধ্যে ন্যূনতম কিছু ঢিলেঢালা দেখা যাচ্ছে – এটা টের পেলেই সেই সরকার ও দেশের মানুষ বুঝে যায় সামনে খারাপ দিন আসছে, এখন কষ্ট করতে হবে। খেয়ে না-খেয়ে মরার দশায় পড়াসহ যেকোনো কিছু্ইর বিপদ এখন আসন্ন হতে পারে।
    পুরনো গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত হাটবাজারগুলোর কথায় যদি আবার ফিরি আর এবার যদি কল্পনা করি যে, ঐ হাটবাজারে মানুষ পারস্পরিক স্বীকৃতির আদান-প্রদানও করব বা পণ্য বেচাকেনাও করব কিন্তু একইসাথে হাটে কিছু কিছু ব্যক্তির বাবা-মা নাম ধরে গালাগালি ও নিচা দেখানোর রেওয়াজও আমরা চালু রাখতে চাই – তাহলে কী সেটা করা যাবে?

    আসলে সে ঘটনাটাই ঘটেছে মোদির ভারতের ক্ষেত্রে। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্রগুলো সেসব দেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে প্রকারান্তরে এই হুমকিটাই তৈরি করেছে যে, তারা ভারতের সাথে গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক আর করবে না যদি ভারত ক্ষমা না চায়। কারণ তুমি আমার নবীকে অপমান করেছ। এর ফলে মোদির ভারত গ্লোবাল বাণিজ্যে পারস্পরিক পণ্যবিনিময় ও স্বীকৃতির চাওয়ার সাধারণ তৎপরতা এবং একই সাথে নবীর অপমান ও ইসলামবিদ্বেষ – এদুটো একসাথে চাইতে পারে না।  মোদির ভারতের রাষ্ট্রদুত-দেরকে তলব করার অর্থ-তাতপর্য হয়েছে এটাই। মুলত এই ম্যাসেজটাই মুসলমান-জনগোষ্ঠিপ্রধান রাষ্ট্রগুলো ঐ রাষ্ট্রদুত তলবের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে।

    এক কথায় বললে, এ’দুটো আসলে একেবারেই পরস্পরবিরোধী।  হাটবাজার বা গ্লোবাল বাণিজ্য সেটা যাই হোক  সেক্ষেত্রে তখন হয় তা সম্মানের সাথে পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে আগের মতোই হাটবাজারটা চলবে আর নয়ত এই হাটবাজারকে উঠে বা ভেঙে যেতেই হবে। এছাড়া কথা আরো আছে। যেমন – আবার মানুষ তো কেউ একা নয়। এমনকি কেউই কেবল সে আর তার মা-বাবাই আছে, এমন হয় না। বরং সব মানুষের সাথে ও কাছেই অজস্র তাঁর সম্মানিত অন্যান্য অনেক ব্যক্তিত্বরাও থাকেন। আর সেটা আরো ছাড়িয়ে একেবারে তার স্ব স্ব ধর্মীয়জগতের সর্বোচ্চ সম্মানীয় স্থানে অধিষ্ঠিত ও অবস্থিত ব্যক্তিত্বরাসহ আরো অনেকেই থাকেন! সে কারণেই হাটবাজারে ব্যক্তিদের পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয়া-নেয়া কথাটার ব্যবহারিক মানে হল, এখানে ব্যক্তি বলতে সবারই স্ব স্ব সংশ্লিষ্ট এমন ধর্মীয় জগতের সর্বোচ্চ সম্মানীয় ব্যক্তিত্বের সম্মান করাসহ-ই বুঝায়।  আমরা প্রত্যেকে একে-অপর মানুষের প্রিয় ও সর্বোচ্চ সম্মানীয় ব্যক্তিত্বের সম্মান করতে বাধ্য। কারণ তা নইলে আমাদের লোকাল বা গ্লোবাল কোন বাজার-বিনিময় ব্যবস্থা ফাংশনাল থাকতে পারে না।

    একমাত্র পথ সব এথনিক ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা ও সমঅধিকারের এক দুনিয়া:
    আমরা সবাই নিজের একেকটা সভ্যতাগত (সিভিলাইজেশন) পরিচয় বহন করি, যা আমাদের স্ব স্ব এথনিক [ethnic] বা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের উতস। আর এথনিক পরিচয়ের মধ্যে অনেকগুলো উপাদানে তা পুর্ণ থাকে; যার মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হল থিওলজিক্যাল [Theological] পরিচয় বা ধর্মীয় পরিচয়। মানুষের বৈষয়িক চাহিদার মতই থিওলজি যা আমাদের আরেক ধরনের চাহিদার মিটিয়ে থাকে এর নাম। থিওলজি, এটাই আমাদের স্পিরিচুয়াল চাহিদা মিটিয়ে এসেছে পুরনো সেই যুগ থেকে। কাজেই মানুষমাত্রই তাঁর আরেক থিওলজিক্যাল গ্রুপ ও ট্রাডিশন-সহ পরিচয়ও থাকে। তাতে আপনি ধর্ম মানা বা চর্চায় কতটা সিরিয়াস বা সক্রিয় সেটা কোন বিষয়ই নয়। কিন্তু কেউ আমাকে আমার থিওলজিক্যাল পরিচয় তুলে ধরে আমাকে নিচা দেখানোর চেষ্টা করলে সেই আমিই সম্ভবত নিজ ধর্মীয় আইডেনটিটির পক্ষে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে কঠিন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাব! এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক!  মানুষের এসব অপমানবোধের প্রতিক্রিয়া খুবই মারাত্মক-ই হয় এবং তা সবচেয়ে স্বাভাবিক!  কাজেই এগুলো হাল্কা করে দেখার কোন সুযোগ-ই নাই!

    মধ্যপ্রাচ্যের কাতারের কাছে কাতারীয় গ্যাস-বিক্রির ক্রেতা হল ভারত; এক বিরাট বাজার। কিন্তু কাতার ভারতের কাছে নিজ গ্যাস বিক্রির লোভে ভারতকে তার ঘাড়ে পা রেখে হাঁটতে দেয়নি। বরং সোজা তাঁর নবীর অপমানের বিরুদ্ধে রুখে উঠেছে। ব্যবসা অনেক পরে; আগে আত্মসম্মান, নিজ মহানবীর মর্যাদা, এই চিন্তা অনুসরণে!

    ভারতে হিন্দুত্ববাদের নষ্টামি:
    ভারতে হিন্দুত্ববাদের নষ্টামির উৎস অনেক পুরনো; ব্রিটিশ আমলের প্রায় শুরু থেকেই। জেনে না জেনে রামমোহনের আমল থেকে (১৮১৫) তাঁর হাত ধরে ও তাঁর অবাস্তব ও কিছু ভুল চিন্তার কারণে। এরই পরিণতি হল এক হিন্দুত্ববাদ। সবাইকেই কথিত এক ‘হিন্দুজাতির অংশ’ – জবরদস্তিতে তা কল্পনা করে নিয়ে ‘কংগ্রেস’ হল সেই ‘হিন্দুজাতির’ ভারত গড়ার প্রথম রাজনৈতিক দল। আর এর প্রায় শত বছর পরে আরো বড় ভুল ও কট্টর রেসিজম হল ‘সাভারকারদের’ [Vinayak Damodar Savarkar] হিন্দু মহাসভা দলের জন্ম ও ততপরতা। যেটা আবার কংগ্রেসের মত ঠিক রাখঢাক করে থাকা বা চলে না এমন বেপরোয়া এক কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। তার উত্তরসূরি হল এখনকার আরএসএস-বিজেপি সংগঠন। গত আট বছর মোদির বিজেপি ক্ষমতায়, সামনে তৃতীয়বারও (২০২৪) আবার ক্ষমতায় আসা তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু মোদির অর্থনীতি বারবার তার হাত ছেড়ে দিয়ে বিগড়ে যেতে চেয়েছে। তাই গত বছর থেকে মোদির রাস্তা হয়েছে এখন সরাসরি মুসলমান কোপানো এমনকি প্রকাশ্যে সংসদেসহ সবখানে বসে বেপরোয়াভাবে ইসলামবিদ্বেষী হয়ে কথা বলা, ঘৃণা ছড়ানো। এতে অবস্থা এমন যে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন – এসব প্রতিষ্ঠান নিজেই এখন মোদির নির্বাহি ক্ষমতার সামনে নিজেকে গুটিয়ে সরে থাকাটাই করণীয় মনে করছে। ভারত-রাষ্ট্রকে আরো দুস্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। সর্বশেষ যেমন, ভারতের তিন নির্বাচন কমিশনারের একজন [Ashok Lavasa] যিনি কমিশনকে আইনমাফিক পরিচালিত করতে চাইতেন তিনি এখন আর মোদির চাপ সহ্য করতে না পেরে আপসের রাস্তায় নিজ চাকরি বদলে নিয়েছেন। তিনি এখন নির্বাচন কমিশন ছেড়ে ম্যানিলায় এডিবির (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ADB) হেড অফিসে মোদির প্রতিনিধি হয়ে নিজ চাকরি বদলে নিয়েছেন!

    বিজেপি দলীয় প্রধান মুখপাত্রঃ
    একটা দলের প্রকৃত অবস্থান ঠিক কার মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে মনে করতে হবে তা বুঝানোর জন্য যখন কাউকে দলের ‘মুখপাত্র’ বলে ঘোষণা করে, তা বলতে বুঝানো হয় তিনি দলের ফরমাল বক্তা ও মুল প্রতিনিধি। অর্থাৎ ‘মুখপাত্র’ ছাড়া অন্য কারো বক্তব্যই বরং দলের বক্তব্য নয় মনে করতে হবে, এই হল এর অন্তর্নিহিত অর্থ। এই বিচারে নূপুর শর্মা-কে [Nupur Sharma] দলের মুখপাত্রই করা হয়। যদিও নূপুর শর্মা সিরিয়াস বিশ্বাসী বলতে যা বোঝায় তেমন আরএসএস-বিজেপির কেউ নন। বরং একজন ‘কেরিয়ারিস্ট’ [Careerist] বললে আমরা যা বুঝি তাই বুঝায়। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট থাকার সময় সংসদের ভিপি ছিলেন ও পরে তার লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে একটা  ল’এর ডিগ্রি আছে অর্থাৎ তিনি চিন্তায় মডার্ন ওরিয়েন্টেশনের। অন্যভাবে বললে, তিনি প্রজ্ঞা ঠাকুর নন। তুলনায় নূপুর শর্মা, তিনি যেমন সরাসরি আরএসএস কর্মী ও এমপি ‘প্রজ্ঞা সাধ্বী ঠাকুর’-এর মত কেউ নন। বরং নুপুর শর্মা হলেন দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে এক পরাজিত প্রার্থী। তিনি আসলে “টেবিল টক” এর বক্তা হিসেবে ভাল পারফরম্যান্সের বলে বিজেপি তাঁকে উপস্থাপক হিসেবে ভাড়া করেছিল এই অর্থে তিনি বিজেপির সাথে সম্পর্কের।

    এদিকে গত বছর থেকে মোদির রাস্তা এখন সরাসরি মুসলমান কোপানোর পথে, যেভাবেই হোক – ‘হিন্দু ভোট বিজেপির বাক্সে আনতেই হবে’ – এই লাইনের। আসলে এই নীতি-পলিসির কারণে ভারতে টিভি টকশোতে নূপুর শর্মার মতো বক্তা-পারফরমারের প্রয়োজন বিজেপির কাছে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাতে মোদি চিন্তাও করেননি, এখানে মুসলমান-কোপানো তৎপরতায় ‘কোন সীমারেখা’ বলে দেয়ার দরকার আছে বা হবে। কারণ মোদির ভারতে মুসলমানরা নয়, বরং উল্টো হিন্দু নাগরিকই যেন মুসলমানের হাতে ভিকটিম – এই ইমেজ, এই রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ-ঘৃণা অবলীলায় মোদি খাড়া করে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। যা আসলে ভারতের ‘হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব’ এই নিকৃষ্ট বর্ণবাদী চিন্তার প্রাবল্যের তলে ফেলেছিল সবাইকে। অবস্থা এমন করা হয়ে আছে যেন হিন্দু জনগোষ্ঠির কেউ এচিন্তা  থেকে ন্যূনতম দূরত্ব তৈরি করতে চাইলে বা সমর্থন না করা দেখাতে চাইলেই এর যেন একটাই অর্থ হয় যে ‘সে হিন্দু দেশদ্রোহী’। তাই এমন ইমেজ তৈরি হতে পারে, এই ভয়ে তটস্থ থাকে – তাই করে রাখা হয়েছিল।
    এমনকি মধ্যপ্রাচ্যও যেন ব্যবসার লোভে ক্রমেই ‘মুসলমান কোপানো মোদি’ পরিচয় ও তৎপরতা দেখেও যেন এদিকে আর তারা দেখছিল না। এসব মিলিয়ে মোদি দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছেন। কিন্তু মহানবী সম্পর্কে নূপুর শর্মার অসম্মানজনক মন্তব্য করা এবং তা ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় এই সীমা ছাড়ানো তৎপরতা যাতে আর কেউ-ই মানিয়ে চলা বা সহ্য করতে পারেনি। ভারতীয় মিডিয়ার থেকে জানা গেছে যে এপর্যন্ত কমপক্ষে প্রায় ২০টা মুসলমানপ্রধান দেশ নিজ নিজ ওসব দেশে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া আপত্তি জানানো, ব্যাখ্যা চাওয়া, মাফ চাইতে বলা ইত্যাদি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিল। এরপরেরও টানা সাত দিন নূপুর শর্মা (ও এর সমর্থকরা) নিজেদের পক্ষে ভোকাল ছিলেন। কিন্তু প্রথমে মূলত কাতার, কুয়েত ও ইরানের একশন; এতে বাকি সবার তৎপর হয়ে উঠতে এটাই মোদির বিরুদ্ধে আপত্তি ঝড়ের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠেছিল।

    তাতে কী দাঁড়াল এখনঃ
    প্রজাতি হিসাবে মানুষ শুরু থেকে যাযাবর হয়ে জীবন যাপন করত। আর শেষের দিক থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর ধরে মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে একেক গ্রুপ একেকটা অঞ্চলের ভুমির সাথে লেপ্টে স্থায়ী জীবনযাপন শুরু করেছিল। তবু তাতেও  সারা দুনিয়ার ভূগোলের সবখানেই এবং একইসাথে মানুষ-প্রজাতির কৃষিকাজভিত্তিক নতুন থিতু জীবনযাপন শুরু হয়নি। এই নয়া জীবনযাপন যাকে আমরা সভ্যতার জীবন [Civilization] এর শুরু বলে থাকি। এভাবে নানান সভ্যতার শুরু হয়েছিল দুনিয়াতে। এটাকেই আমরা কালক্রমে এখন বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতার জীবন বলে গণ্য করি যে অর্থে আমরা বৃহত্তর সিন্ধু সভ্যতার বাঙালি এথনিক জনগোষ্ঠি। অথবা আরো সুনির্দিষ্ট করে আরেকভাবে বলা যায় এই বাঙালি এথনিক গোষ্ঠির মুসলমান ধর্মীয়-এথনিক অংশ। এভাবে পরিণতিতে দুনিয়ায় বিভিন্ন জাতির এথনিক (এথনিক-জাতির) জীবনের শুরু বলে মনে করা হয়। দুনিয়ায় এখন অসংখ্য এথনিক জাতিগত জনগোষ্ঠীর দেখা পাওয়া যায়। তবে এরও আবার শেষ প্রায় ছয়শ’ বছর ধরে মূলত ইউরোপীয় কলোনি দখলদারেরা এই এথনিক জাতিগত জনগোষ্ঠী অন্য সব এথনিক জনগোষ্ঠীকে নিজ অধীনস্থ করে শাসন করে এসেছিল। এখান থেকে অন্য এথনিক জাতিগত জনগোষ্ঠীকে নিচা দেখানো – এই রেসিয়াল-এথনিক বর্ণবাদ তখন থেকে এখনো প্রায়ই ছড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিটলার ছিলেন তেমনই এক এথনিক রেসিজমের প্রবল প্রকাশ। এটা বুঝার এক সহজ প্রকাশ হল, যখনই আমরা দেখব কেউ নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বলছে বা নিজ এথনিক জাতিগত জনগোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ বলছে – সোজা কথায় নিজের যেকোনো কিছু আইডেনটিটির ভিত্তিতে সেটার শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করছে যার আসল উদ্দেশ্য অন্য এথনিক-ধর্মীয় জনগোষ্ঠিকে  দমিয়ে রাখতে চায় আর বিপরীতে তাকে নিচা দেখানো – এমন রেসিজমেরই একটি হলো ‘হিন্দুত্ববাদ’।

    এখন আমাদের এই একটাই দুনিয়াতে যদি সব এথনিক জাতিগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে পাশাপাশি ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে একসাথে বসবাস করতে পারতে হয় তবে একটাই নীতিতে তা সম্ভব হতে পারে। তা হল কোনো এথনিক পরিচয়ই শ্রেষ্ঠ বলে কিছু নেই, বরং বৈষম্যহীনভাবে সবার সমমর্যাদা ও সমঅধিকার সম্পন্ন সকলেই – এই নীতির ভিত্তিতেই তা একমাত্র তা হতে পারে।

    কিন্তু মোদির হিন্দুত্ববাদ এর দাবি হল সেই রেসিজম বা শ্রেষ্ঠত্বের দাবি, যা সব এথনিক জাতিগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে সমাধান চায় না। যেমন ভারতে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে ভারতকে হিন্দুত্বের আধিপত্য এর ভারত হতে হবে। এর এক শাসনব্যবস্থার ভারত কায়েম করতে চায় বিজেপি-আরএসএস। কারণ বিজেপি-আরএসএসের বিচারে ভারতে হিন্দু জনগোষ্ঠী ৮০ ভাগের বেশি বলে হিন্দুত্ববাদ, এই শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে আরামে হিন্দু ভোট ভোটের বাক্স ভরে শাসন ক্ষমতায় আসা ও থাকা সোজা বলে তাদের বিশ্বাস। অথচ শ্রেষ্ঠত্ব মানেই রেসিজম। অপর এথনিক-ধর্মীয় জনগোষ্ঠিকে দমিয়ে নিজ অধীনে আনার সাফাই। এই রেসিজমই এবার আবার রুখে দেয়া হল। অবশেষে এই প্রথম মুসলিম মধ্যপ্রাচ্য গ্লোবাল বাণিজ্যে এসে মোদির হিন্দুত্ববাদের এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে তারা আটকে দিয়েছে, তা সাময়িক হলেও। ধর্মীয় এথনিক জনগোষ্ঠি ভারতের মুসলমানেরা কারও চেয়ে নিচা নয়, সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু জনগোষ্ঠির সমান্তরাল তারাও সম-মর্যাদার ও সম-অধিকারের। তাই এই ভিত্তিতেই ভারত-রাষ্ট্র গড়ে উঠতেই হবে। এটাই সমাধান!

    আর এর ফলাফলেই আমরা দেখছি, মোদির সাময়িক পিছু হটা। কিন্তু অচিরেই যত তাড়াতাড়ি পারা যায় মোদি আবার মুসলমান কোপানো রাজনীতিতে ফেরত আসতে চাইবেন, আমরা অনুমান করি। খুব সম্ভবত কেবল নবী-পয়গম্বর প্রশ্নে হয়ত সংযত থাকার চেষ্টা করবেন। বাকিসব প্রশ্নে হিন্দুত্ববাদ এই রেসিজম ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। এপথে তাদের সম্ভাব্য ফিরে আসার মূল কারণ, এ’ভিন্ন তাদের অন্য রাজনীতি নাই। আবার ভারতের অর্থনৈতিক ন্যূনতম সমৃদ্ধির আশু সম্ভাবনা নেই। বাইডেন প্রশাসন নিজের মুখেই এরই মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে ডেকে আনাতে তা তাদেরকে ২০০৮ সালের মতই আরেকবার নয়া গ্লোবাল মহামন্দার দিকে নিচ্ছে কি না এনিয়ে কথা বলা শুরু হয়ে গেছে। এসব কারণে মোদির কাছে হিন্দুত্ববাদ ও মুসলমান কোপানোর নীতিভিন্ন অন্য কিছুতেই নিজ-ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা তারা দেখে না। একারণেই সেসব ইঙ্গিত ভারতে বিজেপি দেয়া শুরু করে দিয়েছে। ভারতের মুসলমানেরা হচ্ছে মোদির কাছে সেই বুটি বা বলির পশু যেন যাকে বলি দিয়ে হিন্দু-উন্মাদনা তুলে সেই ভোটে তারা নিজ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে চায়।

    বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়াঃ
    এর মধ্যে আমরা দেখছি বাংলাদেশের সরকার মোদির নূপুর ইস্যুতে কোনো আপত্তি দর্জ করা দূরে থাক কোন সমালোচনাও করেনি। বরং উলটা, আমাদের তথ্যমন্ত্রী ভারতীয় সাংবাদিক দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে একাজকে বাংলাদেশ সরকারের ক্রেডিট – এই হিসেবে তুলে ধরাচ্ছে। এখানে পাবেন – “Why Bangladesh is absolutely quiet when it comes to anti-Prophet remarks by BJP leaders” তাদের দেশে প্রকাশিত সেসব রিপোর্ট এভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।  আবার মোদি সরকারও বাংলাদেশের এ’আচরণকে তার সরকারের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে [ (Hasan – Bangladesh information minister Hasan Mahmud ) “Mahmud’s fulsome praise of Prime Minister Narendra Modi is certainly unusual.” ।

    অথচ এককথায় বললে, ভারতে মহানবীর অপমান বা নুপুর শর্মা ইস্যুতে ভারতের কাছে বাংলাদেশের আপত্তি না তুলে উলটা মোদি সরকারের প্রশংসা করে আমাদের মন্ত্রীর বলা – “……But the government of India has taken action and we thank them for it. We congratulate them. Now the law will take its own course,” – এটা খুবই গর্হিত ও বোকার কাজ হয়েছে। এটা এদুই দেশের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। বিশেষত বাংলাদেশের জন্য।
    সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশ – এটা এখন আমেরিকান অবরোধের মুখে। তাই এটা বাংলাদেশের সরকারের একটা মিস-ক্যালকুলেশন। এসময় এটা প্রো-ইন্ডিয়ান (তাও আবার এই সময়ের) ও এর  এন্টি মুসলমান অবস্থানের পক্ষেই বাংলাদেশকে দাঁড় করাবে। এতে ঘরে হাসিনা সরকারের কর্তৃত্ব ও ইমেজ আরো নেতি হবে। হয়ত এসবের পেছনে সরকারের এমন অনুমান থাকতে পারে যার কল্পনাটা হল, – এটা এন্টি আমেরিকান এক বাংলাদেশ-ভারত এলায়েন্সের সুবিধা দিবে। আর তাতে আরও ওদিকে রাশিয়া এবং সাথে চীনের সমর্থনে কিছু একটা দাঁড়িয়ে যেতেও পারে।
    তবে এটা হাসিনা সরকারের খুব বোকা কল্পনা যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সাফল্যে দেখাতে প্রমাণ করতে ভারতের সাংবাদিক গোষ্ঠি (এমনকি ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআইয়েরও সাহায্যে) নিয়ে তাদেরকে প্রপাগান্ডা শুরু করতে দাওয়াত দিয়ে আনা – এটা সরকারকে কোন মাইলেজ দিবে না উলটা নেতি ইমেজ আনবে।

    আমেরিকান চাপ কাটাতেও বাংলাদেশের চলতি ভারতের সাথে খাতিরদারি ও বিশেষ সখ্যতা এটা সাহায্য তো করবেই না। উলটা ক্ষতি করবে। কারণ এটা একেবারেই এক ভিত্তিহীন কল্পনা। মূল কারণ নুপুর শর্মা ইস্যুর প্রেক্ষিতে  মোদির ভারত এখন যার পক্ষেই অবস্থান নিবে সেই পক্ষটাই হেরে ধংস হয়ে যাবে। বরং নুপুর শর্মা ইস্যুর পরে,  ভারতে আগামী ২০২৪ সালের মে এর কেন্দ্রীয় নির্বাচন তো মোদির জন্য এক অনিশ্চিত হয়ে হাজির হল। সেটা বটেই, এমনকি এবছর দ্বিতীয়ার্ধে ও আগামী বছর ভারতের রাজ্য নির্বাচনগুলোও মোদির জন্য অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এসব অনিশ্চয়তার মধ্যে মোদির ভারত বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য কারও পিঠে হাত রাখলে তা এক মারাত্মক লায়াবিলিটি হয়ে উঠেছে। মোদির এটা অজানা থাকার কারণ নাই, তিনি জানেন। তবে মোদি বরং এখানে এখন চেষ্টা করছেন বাংলাদেশকে কী করে নিজের ইমেজ পুনরুদ্ধারে ব্যবহার করবেন। এ কথাটাই প্রকাশ পেয়েছে ভারতে দ্য প্রিন্ট পত্রিকার জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়, যিনি আমাদের তথ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় মুসলমান-জনসংখ্যা প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও আরো প্রায় ২০টি রাষ্ট্রের মতো তাদের স্ব স্ব দেশে তারা যেমন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করতে আপত্তি ও ক্ষমা দাবি করেছে বাংলাদেশ তেমন করেনি [” ……– but Bangladesh has remained absolutely quiet.” ] বলে হাসিনা সরকারের প্রশংসা করেছেন। তিনি এমনও লিখেছেন, বাংলাদেশের কাছে মোদিভিন্ন ভালো বিকল্প নেই, এটি নাকি আমাদের সরকার বুঝে গেছে। [liberation war 50 years ago, but that party today mostly manifests its angst by tweeting and fulminating on social media. Other regional parties are powerful in their own right, but the fact remains that there is no national alternative to Narendra Modi today.] জ্যোতি মালহোত্রার এবক্তব্য মোদির দেশে অভ্যন্তরীণ ইমেজ বাড়াতে কাজে লাগলেও এটা ঠিক ততটাই বা এর বেশি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এর মধ্যে চলে গেছে। মানে লাভের গুড় খেয়েছে মোদি সরকার আর এতে পয়সা ঢেলেছে আমাদের সরকার নিজেরই যেন ক্ষতি করতে – ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে!

    মানে পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে প্রায় দু-এক দিন পরপরই ভারতের প্রতি আমাদের সরকারের অবস্থান অদলবদল হয়ে যাচ্ছে এবং তা কোনো কার্যকর লাভালাভ ছাড়াই। লাভালাভ হচ্ছে না টের পেলে আবার মন খারাপ করছে। কটু কথা বলছে…। এ’এক চলমান দিকবদলের সার্কাস যেন…। আমাদের মানবজমিন লিখছে,  “বিজেপির মুখপাত্রের অবমাননাকর বক্তব্যের পর বাংলাদেশ এ ইস্যুতে কোনো বিবৃতি দেয়নি। এমনকি ভারতীয় দূতকে তলবও করেনি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তাদের এমন অবস্থানের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ”।

    নুপুর শর্মা ইস্যুতে, ইউরোপ অপরাধীর মত নিশ্চুপঃ
    আরেক তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষণ হল, ভারতে মহানবীকে অপমান ও ইসলামবিদ্বেষ-ঘৃণা ইস্যুতে দুনিয়ার যে অঞ্চল অপরাধীর মতো প্রায় নিশ্চুপ, সেটা হল ইউরোপ – ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাদের এনিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। যেখানে জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলও ‘হেট স্পিচের’ দায়ে ভারতকে অভিযুক্ত ও সাবধান করেছেন [UN Secretary General Calls For India To Respect All Religions, Condemns Hate Speech]। আবার ওদিকে পশ্চিমা শক্তি বলতে বাইডেন প্রশাসন – এর স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র বলেন, তারা বিজেপির সাবেক কর্তার (নূপুরের) মন্তব্যের নিন্দা জানান [ US condemns remarks on Prophet]।

    অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের (১৯১৮) পর থেকে ব্রিটিশ-ফরাসি শক্তির অটোমান সাম্রাজ্য দখল করে নেয়া এবং তুরস্কে কামাল-কিয়ার শাসনের আড়ালে নিজ প্রভাব কায়েম আর ওদিকে “রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার’ অসৎ ও ভুয়া তত্ত্ব হাজির করা– এসবই ছিল এক কথায় পরিকল্পিতভাবে ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণাচর্চার শুরু, যা এখনো চলছে। যা এবার ভারতের ঘটনায় সম্ভবত সবচেয়ে প্রবলভাবে প্রকাশিত।

    সারকথায়ঃ
    কোন ধর্মীয়-এথনিক জনগোষ্ঠি অপর ধর্মীয়-এথনিক জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে অপরকে নিচা দেখানো অথবা বিদ্বেষ ও ঘৃণার চর্চা করতে পারে না। সব ধর্মীয়-এথনিক জনগোষ্ঠিই সম-মর্যাদার ও সম-অধিকারের। এই প্রতিশ্রুতি দিতে হবে সকল ধর্মীয়-এথনিক জনগোষ্ঠির রাষ্ট্রকে। এটাই হতে পারে দুনিয়ায় শান্তির রক্ষাকবচ; এক পারস্পরিক সহ-অবস্থানের প্রধান শর্ত!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৮ জুন  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “সব এথনিক ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সমমর্যাদা ও সমঅধিকার“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • পশ্চিমের শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ?

    পশ্চিমাশক্তির শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ??

    গৌতম দাস

    ০৬ জুন ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-48q

      US Treasury Secretary Janet Yellen

    Antony Blinken

    সামনের দিনগুলোতে গ্লোবাল পরিসরে যুদ্ধ-লড়াই ক্রমেই ‘জাত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হিসেবে’ খাড়া করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। মানে, কারা নৃতাত্ত্বিক-জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ যেন এ নিয়ে হতে যাচ্ছে লড়াইটা – এ ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। কথাটা আরো সরাসরি করেও বলা যায়। যেমন পশ্চিমা শক্তি আসলে সোজা বলতে চাইছে, আগামী যেকোনো যুদ্ধ-লড়াই তারা ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’-এর লড়াই হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে তারা আগেই জানত ও জানে যে, দুনিয়াতে কোন নৃতাত্ত্বিক-জাতি শ্রেষ্ঠ – এই অনুমান বা তুলনা করাটাই অর্থহীন। প্রতিটি জনগোষ্ঠীরই একেক দিকে বিশেষত্ব থাকে, থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা, কোন অজুহাত বা জুতসই সাফাই-যুক্তি কেউ দিলেও আমরা কেউ কারো অধীনে অধীনস্থ নই বা করতে দিতে পারি না। অতএব ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রতিষ্ঠার লড়াই বলে কিছুই নেই।

    তবু দুনিয়াতে আমরা দেখেছি টানা সাড়ে তিন শ’ বছরের কলোনি দখল ও লুটেরা শাসন চলেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত যার ভুয়া সাফাই ছিল এই যে, পশ্চিমা সাদা ককেশীয়রা ছিল নাকি ‘বেশি সভ্য’। কাজেই তারা আমাদের মত দেশের  উপর শাসন কায়েম করবে লুট করবে, এ উছিলায় যে, তারা আমাদের সভ্য বানাবে ইত্যাদি।

    সবচেয়ে বড় কথা, মনে করা হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধে মুখ্যত জার্মান হিটলার ও তার দোসর-বন্ধুদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের পতনের মধ্য দিয়ে হয়তো দুনিয়া যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছে। ফলে বর্ণবাদ বা রেসিজম [RACISM] এই জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ সেবার পরাজিত হওয়ার পর ক্রমেই এই চিন্তা হয়তো চাপা পড়ে যাবে। এছাড়া তখন ধরে নেয়া হয়্বেছিল যে মানুষ শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপদ ও চরম খারাপ দিক সম্পর্কে  নিশ্চয় ইতোমধ্যে অনেক জেনেছে। ফলে কোন রেসিজমের চিন্তা আবার জেগে উঠার সুযোগ নেই। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে এই পশ্চিমা শক্তিই খোদ এবার রেসিজম, এই পুরনো ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ হয়ে ফিরতে চাচ্ছে।

    এমনিতে নয়া চলতি শতক হল অর্থনৈতিক দিক থেকে আমেরিকার পতন ও চীনের উত্থানের সময়কাল। তাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছি এটা অবজেকটিভ মানে মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ এক ফেনোমেনা। যেমন আমেরিকান কোনো প্রেসিডেন্ট কোনো যুদ্ধ লাগিয়ে চীনা উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করবেন হয়ত কিন্তু তাতেও এটা ঠেকবে না। অন্তত সেই ২০১৪ সাল থেকে তাই নিয়মিত বলে আসছি যে, এককালে পুরনো ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্যও পেছনে পড়ে যেমন উত্থিত আমেরিকার কাছে হেরে গিয়েছিল আর নানা ঘটনাপ্রবাহ শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এক গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল, আজ প্রায় ৭৫ বছর পরে এটাও আবার পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। এবার চীনা উত্থান মানে চীনের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয়, এই পুঞ্জিভবন [accumulation] ব্যাপক ও সবাইকে ছাড়িয়ে হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। এটা চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতাতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে; ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা ব্রিটিশ অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

    আমেরিকার এই ক্রমেই পতন ও চীনের ক্রমেই উত্থান প্রমাণিত সত্য হিসেবে আমেরিকার ন্যাশনাল সার্ভেতেও ২০০৮ সাল থেকে স্পষ্ট হয়ে চলেছে। গত ২০০৮ সাল ছিল এ নিয়ে প্রথম পরিসংখ্যানগত প্রকাশিত সার্ভে রিপোর্ট ও প্রমাণ, যা এরপর থেকে প্রতি চার বছর পরপর এর বিকাশ আরো স্পষ্ট করে একই রিপোর্ট তুলে ধরছে। এ নিয়ে বুশ বা ওবামা আমলে তারা উভয়েই দুই টার্ম করে ক্ষমতায় থাকলেও তাদের মিলের দিকটি হল – এদুই প্রেসিডেন্টই সার্ভে রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন ঠিকই কিন্তু নিজ সার্ভে রিপোর্টও মানতে চাননি। অস্বীকার করে গেছেন, ‘এতে তেমন কিছু হবে না’ ধরনের কথা দাবি করে। তবে তলায় তলায় উভয়েই এশিয়ায় চীন ঠেকানো বা China Containment পলিসি নিয়েছেন। সেটা হল, ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে ঠেকানোর নীতি।

    সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল তারা উভয় তাদের প্রেসিডেন্টশিপের মোট ১৬ বছর ধরে দেখেছেন এতে আমেরিকার ফেভারে কোনো অগ্রগতি নেই। তবে কেবল কয়েক বছর পরে পরে চীনের উপরে চাপ সৃষ্টি করে আমেরিকার জন্য নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা আদায় করেছেন, চীনের কাজ থেকে। চীনও কখনোই তাদের নিরাশ করেনি। এভাবেই চলে আসছিল এমনকি এত পাগলাটে ও জাতিবাদী ভাব দেখানো ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর আমলেও। তিনিও একইভাবে চীনের কাছে দাবি করেছেন আর এতে নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা তিনিও পেয়েছেন। এমনকি সর্বশেষ তা ২০১৭ সালেও যে বছর প্রথম ‘কোয়াড’ বা QUAD (আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার দেশের) জোটকে চাঙ্গা করা হয়েছিল তখনো ট্রাম্প সুবিধা পেয়েছিলেন।

    কিন্তু এরপরই আমেরিকাকে ট্রাম্প এক মহাপরিবর্তনের দিকে মোচড় দিয়েছিলেন। সেটা হল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist]। মানে আমরা সাদারাই দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি – এই ধারণা। এখানে সাদা বলতে ফর্সা হলেই হবে না। ককেশীয় ]Caucasian] নৃগোষ্ঠির  গায়ের সাদাচামড়ার অর্থে ‘সাদা’ হতে হবে।  ট্রাম্প দল হিসাবে নিজে রিপাবলিকান দলের লোক।  এর উপর নিজেকে  “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist] এর দিক ঝোঁক দেখানো! এটা স্বভাবতই এক ভয়ঙ্কর রেসিজম। কিন্তু ২০১৬ সালে নির্বাচন করতে আসার শুরু থেকেই এই ঝোঁক-অভিমুখ ট্রাম্পের সাথেই ছিল। তবে প্রথম দিকে খাপ ছাড়া বা অস্পষ্টতার কারণে সাধারণ্যে তা হয়ত স্পষ্ট হয়নি। যেমন ধরা যাক স্টিভ ব্যাননের [Steve Bannon] কথা। তিনি ছিলেন আগে ট্রাম্পের  ২০১৬ সালের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আর পরে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের পরে হন, প্রেসিডেন্ট অফিস হোয়াইট হাউজের প্রধান উপদেষ্টা হন ব্যনন। যদিও তিনি মাত্র সাত মাস এই পদে ছিলেন। আর এরপর ওই সৃষ্টপদটাই আবার অবলুপ্ত করে দেয়া হয়। রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে এই ব্যানন ছিলেন ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বড় নেতা, তাত্বিক। তবে প্রেসিডেন্টশীপের  শুরুর থেকেই তাঁর এত উগ্র অবস্থান ট্রাম্প নিতে পারেননি; তাই ব্যননকেই সরে যেতে হয়েছিল। যদিও ট্রাম্প যতই ক্ষমতামলের শেষের দিকে গেছেন ততই তিনি আরো বেশি ও প্রকাশ্যে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) গ্রুপের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে গেছেন।

    পরেরবার গত ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হলে এরপরের বাকি তিন মাস তিনি লাগাম ছাড়া, তিনি আর রিপাবলিকান না, যেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মূল নেতা হয়ে উঠেন। আর এরই সবচেয়ে বড় প্রকাশ তিনি ঘটান ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালে। ঐদিন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস [Congress] ভবন দখল করে নিয়েছিল ও এর শিখরে উঠে কংগ্রেস বিল্ডিংয়ে তাদের রাজত্ব কায়েম করে ছাদে দেয়ালে নাচানাচি-বিজয় প্রকাশ করেছিল। সরকারি হিসেবে ওদিন সাতজনের মৃত্যু ও কয়েকজনের আহত হওয়ার মধ্যে দিয়ে ঘটনা শেষ হয়েছিল।

    সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদী বলতে এরা কারাঃ
    বাংলাদেশের মত পাঠকদের মধ্যে সাধারণ্যে ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ কথাটা অনেকের কাছে আবছা ধারণায় থাকতে পারে বা তা খুব একটা পরিষ্কার না এমন হতে পারে। তাই এনিয়ে আগে একটু কথা বলে নেই। শব্দটার মূল বিষয় ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা’ বা নিজেকে সব ব্যাপারে, অন্য এথনিক জনগোষ্ঠীর চেয়ে ধর্ম-জাতি ইত্যাদি যেকোনো দিকে শ্রেষ্ঠ-বোধ করার দাবি তুলে ধরে। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে সুপ্রিমেসিস্ট [Supremacist]। আর, ইংরেজি ‘সুপার’ বা সবার চেয়ে ভাল – এ ধারণা থেকে ‘সুপ্রিমেসিস্ট’ শব্দ তৈরি করা হয়েছে। এই সুপ্রিমেসিস্ট শব্দেরই খাস বাংলা হল শ্রেষ্ঠত্ববাদী। বলাবাহুল্য, সুপ্রিমেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদী এগুলো নেতিবাচক শব্দ। এগুলো শুধু নেতিবাচক শব্দই নয়, এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘ডেরোগেটরি’ [derogatory] শব্দ মানে, কাউকে – নিচা দেখানোর-  শব্দ। বাংলায় বললে কাউকে ইচ্ছা করে ‘নিচা দেখানোর’ জন্য এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়।

    কিন্তু কোন জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এই বোধ তাদের কেউ কেউ আনে কেন? এটার দরকার কী?  আসলে যখন থেকে মানুষ টের পেয়েছে নিজের গায়-গতরের শ্রমে সম্পদ জোগাড়ের চেয়ে সহজ ভিন্ন পথ আছে; তখন থেকে শুরু হয়েছে এই সমস্যা। সেটা হল, অন্যের শ্রম-সম্পদ লুটে খাওয়া ও নেয়া, অন্যের কাঁধে চড়ে খাওয়া ইত্যাদির জন্য অন্য পুরো জনগোষ্ঠীকেই নিজ অধীনস্থ করা বা বাধ্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে যারা।

    কিন্তু তাতেও পেছনে আরো বড় কাহিনী আছে। দুনিয়াতে মানুষের থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক জীবনযাপন শুরু করা বলা হয় মোটামুটি প্রায় ছয় হাজার বছর বয়সী। সে কারণে এখান থেকেই আমাদের তৎপরতাকে আমরা সভ্যতা বলি বা ‘সিভিলাইজেশন’-এর শুরু বলা হয়। আর দুনিয়াতে এমন সভ্যতার জীবন বা কৃষিকাজে মানে থিতু হয়ে কোনো ভূগোলে বসবাস শুরু করা, যাযাবর জীবন ত্যাগ করা- এসবই শুরু হয়েছিল আর এটাই সভ্যতার শুরু। আসলে অন্তত দশের অধিক বিভিন্ন সভ্যতা যারা প্রায় কাছাকাছি সময়ে (কিন্তু পরস্পর সম্পর্কে একেবারেই না জেনে, যোগাযোগ ছাড়াই) শুরু হয়েছিল। যেমন এসব সভ্যতার বিচারে আমরা ‘সিন্ধু সভ্যতার’ অংশ (যার মূল ভূখণ্ড এখন পাকিস্তানের অংশ)। আর এর ভেতরেও আবার অনেক নৃতাত্ত্বিক-জাতির জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল, যার মধ্যে আমরা বৃহত্তরভাবে সিন্ধু সভ্যতার অংশ হলেও এর ভেতরের “বাঙালি” – এই নৃতাত্ত্বিক-জাতির অন্তর্ভুক্ত বা অংশ। যেমন এশিয়ায় আমাদের কাছাকাছি সবচেয়ে প্রভাবশালী আরেক সভ্যতার নাম হল মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক-কুয়েত), টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরের এই সভ্যতা।

    আগের দিনে এথনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বা সভ্যতাগতভাবে তাদের মধ্যে কোন সঙ্ঘাত হয়নি এমন নয়। তবে ধরনটা ছিল যেমন, দেখা গেছে দেশ যুদ্ধ-মারামারিতে অন্যের দখলে চলে গেছে পেয়েছে অথচ এরপর থেকে  দখলদারও সেই ভূমিতেই (যেভুমি থেকে সে এসেছে তা ফেলে) এর পর থেকে নিজেও বসবাস শুরু করেছে। এটাই প্রধান ধরণ ছিল। মোগল শাসকেরা এমন ধারার ছিল। তাই এতে সম্পদ পাচার বা নিজ পুরানা দেশে লুটে ফেরত নিয়ে যাওয়া এমন ফেনোমেনো তা ছিল না।   পরবর্তীতে টেকনোলজি বিকাশের সুযোগ নিয়ে এক কলোনি দখল যুগ (১৬০৭-১৯৪৫) শুরু হয়েছিল। আর এ্রতে একমাত্র দখলদার হাজির হয়ে যায় ইউরোপ যারা,  এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা সব মহাদেশকেই কলোনি, নিজের শিকার বানিয়ে নিয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছরের এই লুটেরা শাসন চলেছিল। কিন্তু এটি বিশেষ লক্ষণীয় যে, এই প্রথম ইউরোপীয় কলোনিবাজ দখলদাররা দখলের পরে সাথে এ কাজের পক্ষে সাফাই বক্তব্যও দেয়া শুরু করেছিল। আর সেই প্রথম আমরা কে সভ্য আর কে নয় এ নিয়ে  শঠতাপুর্ণ তুলনা হতে দেখেছিলাম। আর এ থেকে দেয়া সাফাইটা হয় যেমন, এশিয়ায় আমাদের চেয়ে ইউরোপীয় দখলদাররা “ভালো সভ্য” বা “বেশি সভ্য” বলেই সবার আগে তাড়া দাবি করেছিল। পরে এই মিথ্যা  সাফাই দিতে শুরু করেছিল যে  “যেন তারা আমাদের সভ্যতা শিখাতেই আমাদের দেশ দখল করেছে। এ থেকেই শুরু হয় সভ্যতা শব্দটার শঠতা বা ছলনার নেতি ব্যবহার। যেন ইংল্যান্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়া দখল করেছিল আমাদের সভ্যতা শিখাতে এসে আর এতে  আমাদের স্থায়ী মজুদ বা উদ্বৃত্ত সম্পদ সবই নিরন্তর লুট করে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের কাজ।
    আসলে সরাসরি বললে আমরা শ্রেষ্ঠ কিংবা আমরা অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এ ধারণা, এ অনুভবটা থেকেই সব অপরাধের উতস বা শুরু হতে পারে। কারণ আপনি হয়ত সতর্ক থাকলেন কিন্তু অন্যে হয়ত আপনার না করে দেয়া ধারণা-কথাটাই অন্য জনগোষ্ঠীকে পদানত বা অধীনস্থ করার সাফাই হিসেবে কেউ ব্যবহার করবেন।

    যেমন আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ ধরণের চিন্তাচর্চার ঘাঁটিঁ বা ফেবারেবল অঞ্চল। এদের মূল কথা হল, তাদের গায়ের চামড়ার সাদা (বলতে চায় সাদা ককেশীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী) অতএব তাঁরা অন্য সব নৃ-গোষ্ঠির মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যেখানে কেউ শ্রেষ্ঠ কিনা এটা অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রমাণিত ধারণা, এর চেয়েও বড় কথা এর কারণে কাউকে লুটে নেয়া, নিজ অধীনস্ত করে নেয়া অথবা  একই দেশের ভিতরে সহ-নাগরিকের সাথে কাউকে বৈষম্য করা  ইত্যাদি সব এগুলো ক্রিমিনাল অপরাধ। অথচ কেউ যখন জাত শ্রেষ্ঠত্বের মুইথ্যা বড়াই করে সে আসলে ইঙ্গিতে বলতে চায় তাদের ন্রৃ-গোষ্ঠি চার-পাঁচ শ’ বছর ধরে অনেক জনগোষ্ঠীকেই অধীনস্থ করে রাখতে পেরেছিল তাই তারা এখনও শ্রেষ্ঠ। তবে একালে ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ চিন্তা ফিরে জেগে ওঠার কারণ আরেকটু ভিন্ন।

    গ্লোবাল ইকোনমি যেখানে পরিবর্তিত হচ্ছে এর অভিমুখ হল, চীনের উত্থানে আমেরিকান ইকোনমির পতন বা তাদের অন্ততপক্ষে রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট (ভিন্ন কাজ ভিন্ন দেশ ইত্যাদি) একটি খুবই স্বাভাবিক বা প্রায়ই ঘটা ঘটনা হিসেবে উঠে আসছে। বড়লোক অবস্থাপন্ন অনেকেই তো বটেই, মিডল ক্লাসের ব্যবসা বা চাকরি প্রায়ই টলায়মান হয়ে উঠছে। আগের বাজার, আগের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে টিকে থাকছে না। আর এ’বস্থায় তাদের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ বয়ানটা  মুখরোচক হয়ে উঠে আসছে এমন যে, “আগে তারা সুন্দর দিন ‘কাটাইত”! কিন্তু অ-সাদা মানুষেরা সব নষ্ট করে দিয়েছে। মানে এখন কালো বা বাদামি চামড়ার লোকেরা তাদের পশ্চিমাদেশে এসে ছেয়ে ফেলাতেই নাকি তাদের চাকরি-ব্যবসার সব সুবিধা এরা নিয়ে গেছে।

    আসলে, স্বভাবতই এখানে অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশনের কারণ, পশ্চিমা দেশ থেকে সাদা চামড়ার মানুষ অন্য দেশে ব্যবসা-কাজের লোভে বেরিয়েছে বা অন্য চামড়ার কিন্তু সস্তা শ্রমিক বলে তাঁরা পশ্চিমা দেশে কাজ ও থাকার অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু যেকোনো উগ্র জাতিবাদের মত এই হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরা সত্য-মিথ্যা মিলিয়েই কথা বলবে। মূলকথাটা সোজা  – যখন পশ্চিমা কোনো দেশের অর্থনীতি ভাল চলে তখন বাইরের আমাদের মত দেশের সস্তা শ্রমিক পেতেই তো মাইগ্রেটেড শ্রমিক সে আমদানি করবে। কাজেই অ-সাদা চামড়াদের তখন ভালো লাগবে যখন পশ্চিমা দেশে অর্থনীতি ভালো চলবে। অতএব এর সাথে কোনো রঙের গায়ের চামড়ার মানুষ ভাল অথবা শ্রেষ্ঠ – এটা ডাহা মিথ্যা ও ভুয়া কথাবার্তা। কিন্তু তবু পশ্চিমের ঘৃণায়, নরওয়ে-তে হত্যা বা সর্বশেষ নেদারল্যান্ডসে মুসলমান বলে হত্যাকাণ্ডগুলো প্রায়ই উঠে আসছে।

    আবার গ্লোবাল ইকোনমিতে  চীনা উথান ও চীন নেতা হলেই সেটা সাদা চামড়া জনগোষ্ঠীর মানুষেরা না খেয়ে মরবে, বা তাদের জন্য খারাপ ঠিক তা নয়। তবে সুযোগ সুবিধা কমে বা ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। আবার তারাও এশিয়ায় মাইগ্রেটেড (লেবার, টেকনিশিয়ান বা যেকোনো স্পেশালাইজড) হলে তারাও ভালো করবে যেভাবে গত অন্তত শ’বছর আমরা এশিয়ানরা এভাবেই নিজেদের ভাগ্য খুলবার চেষ্টা করে এসেছি। তবে একটা জিনিষ, দুনিয়াতে গত প্রায় ছয়শ বছর ধরে একনাগাড়ে সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন চলে আসছে।  এখন গ্লোবাল ইকোনমিতে  পরিবর্তনের মোচড়ে যদি সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন দূর হয়ে যায় তাতে চীনের কী করার আছে??  আবার পশ্চিমাদেশের আধিপত্য চলে যাওয়া মানে সব হারানো তা তো নয়! আমেরিকা বৃ্টিশদের থেকে গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে বলে লন্ডন তো পরিত্যক্ত শহর হয়ে যায় নাই। একালেও এখন অনেকেই নন্ডনে সেটেল হতে চাচ্ছেন। সৎ মনোভাব নিয়ে তাকালে অনেক কিছুই খারাপ লাগার কথা নয়!

    একই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ ট্রাম্প ও বাইডেনঃ
    ট্রাম্প সম্পর্কেই উপরে বেশি কথা লিখেছি তবে তাতে ট্রাম্পই কেবল খারাপ আর বাইডেন ভাল, তিনি জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট নন অথবা কম? তাই কি? না, তা একেবারেই নয়।
    তবে নতুন যেটা তা হল, বাইডেন তাঁর যুগে সবচেয়ে বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে হাজির হতে চাইছেন। এটাই একালের সবচেয়ে বড় শিফট! এখন এটা একেবারেই পরিষ্কার যে, বাইডেন আরো বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েই ২০২১ সালে্র জানিয়ারিতে শপথ নিয়েছিলেন। তা হলে ট্রাম্প ও বাইডেন দু’জনই কি সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী? সাধারণ উত্তর হ্যাঁ-সূচক। কিন্তু তবু দু’জনের কাজের ফিল্ড বা ফোকাস ভিন্ন। যেমন, ট্রাম্প অভ্যন্তরীণভাবে মূলত আমেরিকার ভিতরে অর্থে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। আর বাইডেন সারা পশ্চিমাশক্তি মিলে, যার মধ্যে ইউরোপীয় নেতারা শামিল আর ব্যতিক্রমী জাপানিজরা। তারা মনে করে, গত পঁচাত্তর বছরে  আমেরিকার পুরনো গ্লোবাল নেতৃত্ব তারা আরো কিছু দিন যেভাবেই হোক ধরে রাখবেন।

    এতে বাইডেন এন্ড গংয়ের সবচেয়ে যেটা বড় বিভ্রম ও জিদ তা হল ইকোনমিক নেতৃত্বটা যেন সাবজেক্টটিভ বা ব্যক্তি ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়। যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা প্রধানমন্ত্রী চার্চিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দাসখতে রাজি বা বাধ্য না হয়েও বৃটিশ সাম্রাজ্য তার পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব হিটলারের হাত থেকে চাইলেই বাঁচতে ও বাঁচাতে পারত। বাইডেন আসলে এর থেকেও এককাঠি উপর দিয়ে চলেছেন। বাইডেন মনে করছেন, পাঁচ-ছয় শ’ বছর ধরে সাদা চামড়ার শাসন দুনিয়ায় চলছে। এ শাসন চীনের (অ-সাদা) নেতৃত্বের তলে পড়তে পারে না, যেভাবেই হোক টিকিয়ে রাখতেই হবে – এই জবরদস্তির উসকানি দিয়ে বাইডেন নিজ গ্লোবাল নেতার সুপ্রিমিজম যেন তিনি ধরে বা টিকিয়ে রাখতে সফল হবেন – এই হল তার বাজনার মূল সুর!

    কিন্তু বাইডেনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের খাস প্রমাণ কী?
    বাইডেন প্রশাসন এতদিন ঠিক কী বলে ইউরোপকে ইউক্রেন যুদ্ধে শামিল করেছেন, তা পাবলিকলি খোলাসা করেননি। যারা বারবার রাশিয়ান তেন-গ্যাস ছাড়া চলতে পারবে না বলে অনবরত বেঁকে বসছিল! কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল বাইডেন নিজেদের সাদা শাসন হারিয়ে যাবে এমন ভয়-উস্কানি দেখিয়ে থাকতে পারেন। সম্প্রতি তা নিয়ে একটু ডিটেইল ব্যাখ্যা করেছেন বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দুই মন্ত্রী কর্তা- পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken ] ও ট্রেজারি বা অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন [Janet L. Yellen], তবে দুই আলাদা আসরে। দুটোই লম্বা পলিসি বক্তব্য।  আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council] নামে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক আছে, এর এক বক্তৃতায় জ্যানেটের বক্তব্য গত ১৩ এপ্রিলে। জ্যানেটের দেয়া বক্তব্যের ট্রান্সক্রিপ্ট ওরেই তাদের সাইটে দিয়ে দিয়েছে এখানে।  আর ওদিকে ব্লিঙ্কেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতা দিয়েছেন গত ২৬ মার্চ ২০২২। সেখানেই তিনি ‘চীনা সরকারের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের পলিসির রূপরেখা’ দিচ্ছেন বলে এ বক্তৃতা দিয়েছেন। ইইউ এর পলিটিকো মিডিয়া তার রিপোর্টের শিরোনাম দিয়েছে, “Blinken calls China ‘most serious long-term’ threat to world order”। এককথায় চীনকে ওয়ার্ল্ড অর্ডার মানে বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলার জন্য হুমকি বলে বর্ণনা করছেন ব্লিঙ্কেন। সোজা করে বললে, চীনা অর্থনৈতিক উত্থানে আমেরিকার কষ্ট হচ্ছে অথচ সেকথাটা ব্লিঙ্কেন লুকিয়ে হাজির করছেন এভাবে যে চীন ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থার জন্য ফিট নয়!!!  আসলে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা বা গড়ে যাবার প্রায় পচাত্তর বছর পরে এসে এসব কথা অর্থহীন!  আগ্রহিরা লেখা দুইটা সরাসরি পড়ে নিতে পারেন। আমি কিছু ক্যাচি অংশ তুলে আনব। 

    এখনকার সার কথাগুলো বোঝা খুব কঠিন না। আমি ব্লিঙ্কেনে কিছু মুখ্য ভাব-শব্দ তুলে আনছি। মুখ্য শব্দগুলোর দিকে খেয়াল রাখলেই মূল বক্তব্য বুঝা যাবে। যেমন –

    এক. ইউনিভার্সাল ভ্যালু [ …… Beijing’s vision would move us away from the universal values]; ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার, ইন্টারন্যাশনাল রুল বেজড অর্ডার [we will defend and strengthen the international law, agreements, principles, and institutions that maintain peace and security] ;

    দুই. ইকোনমিক অর্ডার, ইন্টারন্যশনাল ল, প্রিন্সিপাল ও প্রতিষ্ঠান;

    তিন. রাশিয়ার সাথে চীনের অ্যালায়েন্স [……potential security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia. ] ইত্যাদি।

    এসব কিছুর সার কথা একটাই – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত যেন আমেরিকার নেতৃত্বে জাতিসঙ্ঘ ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি যেসব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল চীন এগুলোর কেউ নয়। এ-সংক্রান্ত সব মূল্যবোধ ও ইউনিভার্সাল মূল্যবোধের বাইরে চীন।

    তা হলে ব্লিঙ্কেন এখন কী করবেন?
    তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীন হল একমাত্র দেশ যার আন্তর্জাতিক অর্ডার বদলে ফেলার ইচ্ছা ও সামর্থ্য আছে- যে সামর্থ্য বলতে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, কূটনীতিক, সামরিক ও টেকনোলজিক্যাল সব বোঝায়। কিন্তু চীনের আর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ এক নয়।’ [……“China is the only country with both the intent to reshape the international order and, increasingly, the economic, diplomatic, military and technological power to do it,” ]

    তা হলে ব্লিঙ্কেনের প্রতি এখন প্রথম প্রশ্ন হল, যদি চীন আর আমেরিকার মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মূল্যবোধ বা কাম্য ও প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ার নিয়ম-শৃঙ্খলা বা গ্লোবাল অর্ডারে মিল না থেকে থাকে তা হলে চীনের সাথে আমেরিকার এত দিন চলল কী করে? জাতিসঙ্ঘ গঠন হতে পেরেছিল কী করে? যদি ধরে নেই চীন (মাওয়ের চীন) পরে এসেছে, তবু জাতিসঙ্ঘের জন্মের থেকে সবচেয়ে প্রবল্ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সক্রিয় সদস্য ছিল। কিন্তু তাই বলে কী লুটেরা কলোনি মাস্টার (বৃটিশ-ফরাসির) ইউরোপ নিশ্চয় সেকালের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মূল্যবোধ ও অর্ডার-শৃঙ্খলা (ব্লিঙ্কেন কথিত) কায়েমের পক্ষে বা দোস্ত ছিল না। তা হলে এর পরেও সেকালের রুজভেল্ট একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকেই গোনায় ধরে গ্লোবাল অর্ডার সাজাতে হয়েছিল? তা হলে আজ অন্য যে কারও প্রতি বাইডেনের এত বিতৃষ্ণা কেন? এর সাফাই কই??  রুজভেল্ট কী জানতেন না যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন পাক্কা কমিউনিস্ট ছিলেন? তবু ব্লিঙ্কেন সাহেব আজ যে মুল্যবোধের বড়াই অমিল দেখছেন তা রুজভেল্ট আমলই করেন নাই। তা করলে তো জাতিসংঘের জন্মই হওয়ার কোন কারণ নাই। আর তা হয় নাই। কাজেই ব্লিঙ্কেন অবশ্যই অর্থহীন কথা বলছেন! মূলকথা রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও তাঁরা একসাথে জাতিসংঘ গঠন করেছিলেন। আর আজ ব্লিঙ্কেন নয়া বৈরাগী হতে চাইছেন, মুল্যবোধ বুঝাবুঝির তর্ক উঠিয়েছেন!!!

    আবার চীনের কথায় আসিঃ  সত্তরের দশকে কিসিঞ্জারের আমেরিকা ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের স্বার্থসহ দুনিয়ার সব মূল্যবোধকেই পায়ে দলে চীনের মন পেতে কি গোপনে বেইজিং ছুটে যাননি? তখন সেটা কি আমেরিকার বৈষয়িক স্বার্থের ভিত্তিতে বাকি সবভুলে পা ফেলা ছিল না? তা হলে তখন আজকের তোলা মূল্যবোধের কথা কোথায় ছিল? ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক মিটিংয়ে মাওয়ের চীনকে ভেটোক্ষমতাসহ সদস্যপদ ফিরে দেয়া হয়।  আবার টানা সাত বছর (১৯৭১-৭৭) চীন-আমেরিকার নেগোসিয়েশন চলেছিল – উভয় উভয়কে যা কিছু সব বুঝে নেবার যথেষ্টের চেয়েও অতিরিক্ত সময়  দিয়েছিল। এই হিসাব শেষে ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু হয়েছিল। তা হলে তখনকার আরো কড়া কমিউনিস্ট চীনকে সহ্য হলে এখন লিবারেল চীনকে অসহ্য লাগা শুরু হবে কেন? আমেরিকান পুঁজি ওয়াল স্ট্রিটের সেকালে অবাধে চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায়, চীন অনুমতি দেয়ায় যদি তখন চীনকে ভালো মনে হয়ে থাকে – মূল্যবোধে কোনো সমস্যা না দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে এখন এমন কী ঘটেছে সেটা অবশ্যই বাইডেন-ব্লিঙ্কেনকে আগে স্পষ্ট বলতে হবে। সুপ্রিমিজম করতে দেয়া হবে না।
    আবার আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ইস্যুতে যদিও চিয়াংকাইশেকের জাতিবাদী চীন ১৯৪৫ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য।  কিন্তু ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব হয়ে যায় মূল চীন ভূখণ্ডে। চীন জাতিসঙ্ঘেরও সাধারণ সদস্য ছিল না তখন। পরে ১৯৭১ সালে তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মূল চীন (জাতিসঙ্ঘ জন্মের সময়ের )ভেটো-ওয়ালা সদস্যপদ ফিরে পেয়েছিল। আর একইভাবে চীন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় মেম্বার হয়েছে ১৯৮০ থেকে। এমনকি মাওয়ের চীন, মূলচীন ডব্লিউটিওয়ের সদস্যপদ নেয় আরো পরে, ২০০১ সালে। তা হলে জাতিসঙ্ঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের ইন্টারন্যাশনাল মূল্যবোধ না বুঝে থাকাটার আর কি চীনের বুঝতে বাকি ছিল? আর মুল্যবোধ বুঝা নিয়ে কোন সময় কোন আপত্তি আমেরিকা তুলে নাই কেন? মুখ খোলার আগে ব্লিঙ্কেন কী এতটুকু বুঝেন নাই কথা বুঝে বলতে হয়!!! গুছিয়ে মিলিয়ে কথা বলতে হয়!!

    আসলে এসব প্রশ্নের উত্তরে ব্লিঙ্কেনের খবর নেই। যেন তাদের কথা একটাই, তাদের সাদা চামড়ার নেতৃত্ব দুনিয়াতে তাদের স্থায়ী করে দিতেই হবে। না হলে চীনা মূল্যবোধ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলতেই থাকবেন???

    সবশেষে, ব্লিঙ্কেন  সম্ভবত বুঝেছিলেন তারা কথার মেরুদণ্ড নেই – খামোখা কথা বলছেন। তাই এবার তিনি বলে বসেন, “চায়নার বন্ধু রাশিয়ার’ হুমকিতে তারা ভীত [security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia]। অতএব, এটা চীনের দায়। ইউক্রেনের যুদ্ধও চীনের দায়!
    এক কথায় বললে, সাদা চামড়া সুপ্রিমিজম, জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর আওয়াজ তুলে এভাবেই ডুবে যাবে বাইডেনের আমেরিকা!! এ’ভিন্ন কোন পরিণতি নাই!

    বাইডেন আসলে কোথায় যেতে চাইছেন? কোন বাস্তবোচিত কোন চিন্তা তিনি করতে পারতেছেন তা মনে হয় না। তবে খুব সম্ভবত বাইডেন-ব্লিঙ্কেন-জ্যানেট এদের যে এক অলীক কল্পনাটা আছে সেটা খুব সম্ভবত এই যে, কোল্ডওয়ার যুগের মত মুখ্যত, একটা মূল আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া আরেকটা বাকিদের ব্লক এর বাইরে; এমন দুটা ব্লকে দুনিয়া ভাগ করা। এমন শখ বা কল্পনা অনেকের মধ্যেই প্রায় দেখা যায়। কিন্তু হার্ড ফ্যাক্টস হল, দুনিয়াতে আর কখনও দুই অর্থনৈতিক ব্লক ফিরে আসবে না। চাইলেও ফেরা যাবে না।  দুনিয়ায় ফিরে আসবে না। মূল কারণ, আমরা এখন (১৯৯১ সালের পর থেকে) সব দেশই একই  আইওএমএফ কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া চালু করে ফেলেছি। আমরা  আইওএমএফ বদল করে আরেকটা আইএমএফ বানাতে পারি, নামে বদল হিসাবে। কিন্তু আইএমএফ টাইপের কিছুই বানাবো না এটা হবে না। আর যেমন এক ঘরে দুটা পীর থাকতে পারে নাই, তাই দুনিয়াতে একসাথে দুটা ‘আইএমএফ’ থাকবে না।  মূলকথা, সকলকেই একই আইএমএফ (ধরণের প্রতিষ্ঠান) এর এবং এমন একটাই প্রতিষ্ঠানের সবাই সদস্য এভাবে – হয়েই থাকব!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৪ জুন  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ট্রাম্প ও বাইডেন, সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • কিসিঞ্জার ইউক্রেন যুদ্ধ কেন দ্রুত শেষ চান?

    কিসিঞ্জার ইউক্রেন যুদ্ধ কেন দ্রুত শেষ চান?

    গৌতম দাস

    ৩০ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-47y

     

                 Henry A. Kissinger, former U.S. secretary of state, seen in 2020. (Christoph Soeder/Picture Alliance/Getty Images)

    যুদ্ধ বা কোন বড় রাজনৈতিক ততপরতার মধ্যে একাজের পক্ষে ঘটনা শুরুর পরে এতে মরাল [moral]  ও এথিক্যাল [ethical] ভিত্তি দিতে বা দাঁড় করাতে দেখা যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এথেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে এখানে সবার আগে পশ্চিম বিশেষত ইউরোপ এনিয়ে সক্রিয়তা দেখাতে শুরু করে। যেমন তাদের বয়ান শুরু হবে এভাবে যে এটা একটা রাশিয়ান আগ্রাসি (aggressive) কাজ। এই শব্দাবলীর ব্যবহার করতে পারা মানে বক্তা দাবি করছে যে আমি না উনিই প্রথম আক্রমণকারি। অতএব মরাল বা ন্যায়-অন্যায়ের বিচারে এবং এথিক্যাল  নীতি-নৈতিকতার বিচারে প্রতিপক্ষ দায়ী। ইউরোপ সবার আগে চেষ্টা করে যাচ্ছে এই ভিত্তিটা দাড় করাতে যাতে এরপরে তাদের সবকাজ জায়েজ মনে হয়, সব বয়ান জায়েজ হয়ে যায়।

    কিন্তু ভ্যাটিক্যান সিটির পোপ তাদেরকে ব্যতিক্রমিভাবে ফুটা বা অকেজো করে দিয়েছেন। পোপ বলেছেন, আপনি যদি কারও বাসার সামনে গিয়ে অনবরত চিৎকার করেন ভুকেন তো একসময় বাড়ির মালিক আপনাকে পিটাতে আসবে  এবং সাথে তিনি পরিস্কার করে দেন যে ন্যাটো নিজেই রাশিয়ার দরজায় গিয়ে প্রথমে ভুকেছে[barking of NATO at the door of Russia]।  অর্থাৎ তিনি কোন ছাড় না দিয়ে একেবারে মুখে মেরেছেন। এর মানে তিনি রাশিয়ান অনুপ্রবেশ কিনা সেটা নিয়ে কথা না তুলে বরং উলটা ন্যাটোকেই উস্কানিদাতা মনে করে বলছেন, এই উস্কানির জন্যই ন্যাটো দায়ী[ NATO Provoked Russian Invasion of Ukraine]। সোজা কথায় পোপ ফ্রান্সিস পশ্চিম-কেই মরালি-এথক্যালি ডুবিয়ে ছেড়েছিল গত ০৩ মে ২০২২। । 

    এবার আক্রমণ কিসিঞ্জারেরঃhenry
    আর চলতি মে মাসের শেষের সপ্তাহে এসে এবার আক্রমণ হেনরি কিসিঞ্জারের। নিজ ঘরের ভেতর বোমা ফাটানোর মতো ঘটনাটা ঘটিয়েছেন হেনরি কিসিঞ্জার [Henry Kissenger]! হ্যাঁ সেই কিসিঞ্জার! বাংলাদেশের আম মানুষের কাছে সেই কিসিঞ্জার যার অর্থ ‘কুচক্রী’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’। তবে  আওয়াম মানুষের জগতের মত একাডেমিক জগৎ-এ  খোলা মনের ভাব সরাসরি বলা যায় না, পারে না বা চলে না। ফলে কিসিঞ্জার সম্পর্ক এখানে ভদ্র ও শোভন ভাষায় সমালোচনা করতে হয়। ভাব করতে হয় একে – কূটনীতি – বলে যে যেখানে এক আরেক জগৎ আছে। আর কিসিঞ্জারের ভাষ্য সেই কূটনীতিক জগতের চোখে গ্রহণযোগ্য, বৈধ!

    ঘটনাটা হল, ইউক্রেন ইস্যুতে কিসিঞ্জার কিছু পরামর্শসুচক মন্তব্য রেখেছেন তাতে ব্যাপক হইচই পড়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইম তাতে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে। কিসিঞ্জার তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘ইউক্রেনের উচিত হবে নিজ জায়গা জমি রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিয়ে হলেও এ’যুদ্ধ শেষ করা Ukraine: Cede territory to make peace with Russia.।’ কিসিঞ্জার আরো মনে করেন, ‘রাশিয়াকে অপমান-অবমাননাকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়ার পরিণতি পশ্চিমের জন্যই’ ভালো হবে না [would have dire long-term consequences for stability in Europe.]। সাথে মনে করিয়ে দেন যে, রাশিয়া কিন্তু ইউরোপেরই অংশ, এটা যেন কোনোভাবে অস্বীকার করা বা ভুলে যাওয়া না হয়। তাই এখন তার সোজা সিদ্ধান্ত যে‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দুই পক্ষ যে যে অবস্থায় ভ‚মিতে আগে ছিল […force Ukraine into accepting negotiations with a “status quo ante,”], সেটিকে স্থিতাবস্থার লাইন মেনে দুই পক্ষই যেন সেই সীমার মধ্যে প্রত্যেকে নিজেকে ফিরিয়ে নেয় এবং এই ভিত্তিতে চুক্তি ও এর বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা আগামী দুই মাসের মধ্যেই [the dividing line should be a return to the status quo ante,” ]।’

    কে এই কিসিঞ্জারঃ
    বাংলাদেশে যারা আশির দশকের পরে জন্মেছেন তাদের কাছে কম পরিচিত হয়ত এই কিসিঞ্জার। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারে পদ-পদবিতে থেকে হেনরি কিসিঞ্জারের সবচেয়ে সক্রিয়তার বছর বলতে তা ছিল আসলে ১৯৬৯-৭৭ এই সময়কালকে। তিনি মূলত আমেরিকার দুই পরপর প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও ফোর্ড এদের আমলে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার বা NSA মানে নিরাপত্তামন্ত্রী ছিলেন. এছাড়া কখনো বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমতুল্য উপদেষ্টাও ছিলেন। এমনকি কখনো এ দুটো পদেই এবং একই সাথে নিয়োজিত থেকেছেন। আর সেই যুগ শেষ হলে এরপর থেকে তিনি মূলত একাডেমিক কাজ যেমন, বইপত্র  লেখা বা থিঙ্কট্যাঙ্ক উপদেষ্টা হওয়া; অথবা কোন পরিচালনা বোর্ড বা কমিশন ধরনের সংগঠনের প্রধান বা স্থায়ী উপদেষ্টা হয়ে থেকেছেন। এখনো তিনি ডিকটেশন দিয়ে বই লেখাতে পারেন।  বলা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের আশপাশে যারাই পদচারণা করেন, তাদের চোখে তিনি এখনো নমস্য এবং তার থেকে শেখার আছে বলে তারা মনে করেন!

    কথাগুলোকে আরেকভাবে একটু আপন মনে হবে এভাবে বলা যাক! তাই সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭১ সাল হল কিসিঞ্জারকে আমাদের সবচেয়ে স্মরণ ও স্মৃতিময় ঘটনাবলিতে ভরপুর হয়ে থাকার সময়! তাতে তিনি হয়ত তখন খলনায়ক! কারণ তখন তিনি এরই মধ্যে টানা (১৯৬৯-৭৫) আট বছর প্রেসিডেন্ট নিক্সনের NSA (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার) ছিলেন। আর সেকালে তার প্রথম সবচেয়ে বড় ভুমিকাটা হল, তিনি ছিলেন প্রথম চীনা-আমেরিকান সম্পর্ক স্থাপনকারী দূত। কথাটা একটু ভেঙে বুঝতে হবে। চীনে মাওয়ের কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হয় ১৯৪৯ সালে। এরপর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়কালে নয়াচীন আর আমেরিকার মধ্যে কখনোই কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। আনুষ্ঠানিকভাবে চীন বলতে তাই আমেরিকা তাইওয়ানকে ও এর সরকারকেই বুঝত। আর এই ২২ বছরের বিচ্ছেদ ও উপেক্ষার অবসান হতে নড়াচড়া প্রথম  শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। যখন আমরা যুদ্ধের মধ্যে ও পাকিস্তানি আক্রমণের মুখে আশ্রয়ের সন্ধানে ভারত সীমান্ত অভিমুখে অথবা তা ক্রস করে ছুটছিলাম। আর তখনই  ৯-১১ জুলাই ১৯৭১ কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন সেখান থেকে গোপনে এরপর চীন যাবেন বলে। অথাৎ পাকিস্তান সফরের আড়ালে গোপনে পাকিস্তান থেকে সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন কিসিঞ্জার। চীনে গিয়ে নয়াচীনের চেয়ারম্যান মাও জে দং ও প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাইয়ের সাথে বৈঠক করেছিলেন।

           Photo: Premier Zhou Enlai and National Security Advisor Henry Kissinger. জুলাই ১৯৭১

    আর গোপন সফরের নির্ধারিত হয় যে পরের বছর প্রেসিদেন্ট নিক্সন চীন সফরে যাবেন। এনিয়ে সেকালে ২৬ জুলাই ১৯৭১ এর টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ ছিল এমন। আর একালে আমেরিকার সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা চীন-আমেরিকা ইন্সটিটিউট খোলা হয়েছে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয় কিসিঞ্জারের সেই সফর নিয়ে ডকুমেন্টারি করেছে। এই ছবি তাদের সাইট থেকে নেয়া।

    Visual search query image.    সেকালে ২৬ জুলাই ১৯৭১ এর টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ

    কিন্তু আমাদেরর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল,  চীন-আমেরিকা সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ নিতে গিয়েই কিসিঞ্জারের আমেরিকা ততকালে হবু বাংলাদেশের স্বার্থকেই পরিত্যক্ত করে ফেলে রেখে হেঁটে চলে গেছিল। তা কার্যত হবু বাংলাদেশের বিপক্ষে ও পাকিস্তানের সামরিক একশনের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে দাড়িয়েছিল। অবশ্য যুদ্ধকালীন ও পরের রিলিফ তৎপরতা বা মানবিক সাহায্যগুলো আমেরিকা বাংলাদেশে চালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ ভেসে যাওয়ার পরের সেবছরের সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিব তাঁর আমেরিকা সফরকালে কিসিঞ্জারের সাথে এই প্রথম সাক্ষাৎ করেন। ঘটনাটাকে বলা যায় সেই প্রথম শেখ মুজিব, তাজুদ্দিন এন্ড গংয়ের কমিউনিস্ট ফ্যান্টাসি মানে কথিত “কমিউনিস্ট ইকোনমি” গড়ার ফ্যান্টাসি – এই বেকুবি শখ থেকে বাংলাদেশকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার প্রথম কার্যকর এক্ট বলা যায়।  তিনি কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করে সহায়তা চান। বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির যোগসূত্র স্থাপন ও তৎপরতা শুরু বলা যায় সেটাকে। কথাটা আরেকভাবে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের হবু বাংলাদেশ  উপায়ন্ত না পেয়ে সোভিয়েত ব্লকে ঢুকে অন্তর্ভুক্ত হয়ে এই একমাত্র পথেই  স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দেখেছিল ও পেয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরে সবার হুশ ছুটে যায়। শেখ মুজিব এই ফ্যান্টাসি ভাঙতে তাজুদ্দিন এন্ড গংয়ের  হাত থেকে সবক্ষমতা কেড়ে নেন, মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। ফলে সেই প্রথম কিন্তু এবার উল্টো পথে মানে বাংলাদেশের  অন্তত প্রো-সোভিয়েত ব্লকে থেকে যাওয়াটার ইতি ঘটিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের কিসিঞ্জারের সাথে সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে যার শুরু। ‘বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কিসিঞ্জারের মন্তব্যটা তখনকার! যদিও ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিয়েছিল কিন্তু তাহলেও তা কার্যত অকার্যকর করে ফেলে রাখা ছিল। সেই সম্পর্ক কার্যকর ও চালু করে প্রথম বিশ্বব্যাংকের ঋণ-অনুদান ঋণপ্রাপ্তি ঘটতে ঘটতে ১৯৭৬ সালের প্রথমার্ধ লেগে গিয়েছিল; তত দিনে শেখ মুজিব আর নাই।  মনে করা হয়,  কিসিঞ্জার অনেক কিছুই ওকে করেছিলেন কিন্তু আবার প্রবল পপুলার হয়ে উঠতে পারেন এই শেখ মুজিবকে বেঁচে থাকতে দেন নাই। সেকালে প্রচলিত আমেরিকান ফরেন পলিসির  বিভিন্ন ( ভিনদেশে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা চালানোর স্বভাব )  বৈশিষ্টের কথা মনে রেখে এই অনুমান প্রচলিত আছে। এসব ঘটনার কারণে, কিসিঞ্জার বাংলাদেশ ইস্যুতে খুবই নির্ধারকভাবে জড়িত ছিলেন মনে করা হয়। আসলে গোপন তৎপরতায় কাজ করা, মিটিং বা চুক্তি করা এগুলো যেন সেকালের কোল্ডওয়ারের যুগে কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক তৎপরতার মুখ্য বৈশিষ্ট্য!!!

    একালে জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের চলতি সভায় কিসিঞ্জারঃ
    বর্তমানে প্রায় ৯৮-৯৯ বছর বয়সের কিসিঞ্জার, সাম্প্রতিকালের খবর, চলতি সপ্তাহেই জেনেভায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক সভায় ভার্চুয়াল বা অনলাইনে যুক্ত হয়ে ইউক্রেন নিয়ে তিনি ওই সব মন্তব্য করেছেন। এটা ইউক্রেন যুদ্ধের এমন একটা সময় যখন প্রায় আপসরফায় সমাপ্তির দিয়ে চলে যাওয়া রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধকে বাইডেনের আমেরিকা উসকানি দিয়ে ফের চাঙ্গা করেছেন নতুন করে অস্ত্র ও অর্থ ঢেলে চলেছেন। একাজে ৪০ বিলিয়ন ডলার কংগ্রেস-সিনেট থেকে অনুমোদন এসেছে, যাতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রসদ ঠিক থাকে। ঠিক এমন সময়ে ইউক্রেনকে জমি-ভূমি-সীমানা ছেড়ে দিয়ে হলেও রাশিয়ার সাথে আপসে যুদ্ধবন্ধের দিকে যেতে কিসিঞ্জার জেনেভার ভরা হাটে দাবি করেছেন। কিন্তু কেন?

    আসলে, খুব পরিষ্কার করে তা বুঝিয়ে বলা হয়নি, এর পেছনের কারণ। তবে কিসিঞ্জারের কয়েকটা বিচ্ছিন্ন বাক্য পাওয়া গেছে এ নিয়ে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টে। যেমন লন্ডন টেলিগ্রাফ, নিউজউইক, ওয়াশিংটন পোস্ট বা নিউ ইয়র্ক টাইমস ধরনের মিডিয়ায় যেভাবে এ খবর রিপোর্টেড হয়েছে তা থেকে; যেসবের সারকথা, ইউক্রেনকে নিজ ভূখণ্ড ত্যাগের বিনিময়ে হলেও রাশিয়ার সাথে আপসে যুদ্ধবন্ধের চুক্তি করতে উৎসাহ দিতে হবে। কারণ কিসিঞ্জার মনে করেন কোনোভাবে এতে রাশিয়ার জন্য এটা কোনো অসম্মানজনক হার হলে তাঃ

    ১. দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে । কথাটা কিসিঞ্জার বলেছেন এভাবে‘যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার যে অপমানজনক পরাজয় আশা করছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে [it could worsen Europe’s long-term stability.]। অর্থাৎ তিনি যেনতেনভাবে রাশিয়ার কোন — এই হার সেই হার- একেবারেই চান না। কারণ লংটার্মে এটা ব্যাকফায়ার করবে মানে আরো বড় ক্ষতি ডেকে আনবে বলে তিনি মনে করেন।

    ২. পরের বাক্য আরো মারাত্মক। বলছেন ‘রাশিয়া তো তোমাদের ইউরোপই’। তাই বলছেন, “পশ্চিমা বিশ্বের এ বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত যে, রাশিয়া ইউরোপের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিমের উচিত হবে না ‘তড়িঘড়ি’ কোনো সিদ্ধান্তে আসা।” পশ্চিমা বিশ্বের এই বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত যে—রাশিয়া ইউরোপের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

    কিন্তু এতে কিসিঞ্জারের কথাগুলো মানে  তিনি রাশিয়াকেও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্ররোচনার চোখে দেখে মানে ‘হোয়াইট ককেশিয়ান’ রেস-জাতির ধারণার চোখে গণ্য করে কথা বললেন? যেটা ক্রমেই এখন বাইডেনেরও অব্যক্ত এজেন্ডা হিসেবে উঁকি দিয়ে হাজির হচ্ছে? এক কথায় বললে এর জবাব হল – এখানে কিসিঞ্জারের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট নয়; অর্থাৎ কেন তিনি রাশিয়াকে ‘ইউরোপেরই অংশ’ গণ্য করতে বলছেন তা স্পষ্ট করেননি। এ ছাড়া রাশিয়ানরা জাতিগত পরিচয় হিসেবে মানে রেস-জাতির বিচারে আসলে প্রধানত তারা ইস্ট স্লাভিক ট্রাইব [East Slavic Tribe] ba  স্ল্যাভ -রেসের অংশ।  অর্থাৎ ঠিক ককেশীয় নয় যদিও ফেলে আসা সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে বিবেচনা করলে সোভিয়েতের ভেতরের একটি বড় অংশই ছিল সাদা ককেশীয় রেস-জাতির। সে যাই হোক, কিসিঞ্জার এর চেয়ে বেশি কিছু স্পষ্ট করেননি।

    ৩. কিসিঞ্জারের বক্তব্যের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি আহবান জানিয়ে বলছেন যে, তারা যেন ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ‘আগের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো অ্যান্টি – status quo ante]’ ফিরিয়ে আনতে আলোচনায় চাপ প্রয়োগ করে। যেটা অনেকটা ২০১৪ সালের সময়কার অবস্থান, যখন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ বলে ইউক্রেন থেকে কেটে রাশিয়া নিজের সাথে যুক্ত করে নিয়েছিল।

    এখানে কিছু পুরনো ফ্যাক্টসঃ
    এখানে কিছু কথা পরিষ্কার করে রাখা যেতে পারে। ক্রিমিয়া বিগত রূশ সম্রাট বা জারের আমল থেকেই স্বতন্ত্র রেস-জাতি অর্থে আলাদা ছিল বিবেচিত হত। যদিও ক্রিমিয়া জার সাম্রাজ্যের অধীনস্ত প্রশাসনিক অংশ হিসেবে শাসিত ছিল। কিন্তু ১৯১৭ সালে লেনিনের রাশিয়ান বিপ্লবের পরে, ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনকালে ক্রিমিয়া অঞ্চল প্রশাসনিকভাবে রাশিয়ান ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্রিমিয়ার কেউ কেউ হিটলারের জার্মানিকে সাহায্য করেছিল, এই অজুহাতে নেতা স্তালিন আমলে ক্রিমিয়ার বেশির ভাগ মানুষকেই শাস্তি হিসেবে ‘ফোর্সড’ সাইবেরিয়া [জারের আমল থেকেই রাজা বা কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী ব্যক্তিকে নির্বাসনে পাঠাতে  সেই ভুমি বা অঞ্চল হিসাবে সাইবেরিয়া ঠান্ডা বনাঞ্চলে পাঠানো হত ] পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল; মাত্র  কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অপেক্ষামান  ট্রেনে তুলে দিয়ে। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তারা আবার ক্রিমিয়ায় ফিরে আসে কিন্তু প্রশাসনিক দিক থেকে ক্রিমিয়া এবার রাশিয়ার সাথে আবার যুক্ত না হয়ে ক্রিমিয়া সীমান্তের অপর পাড়ে ইউক্রেনের সাথে প্রশাসনিকভাবে যুক্ত হয়েছিল। এদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে গেলে রাশিয়াসহ মোট ১৫টা রাষ্ট্রে তারা আলাদা হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার প্রভাব বাকি ১৪ নয়া রাষ্ট্রের ওপর থেকে জবরদস্তিতে হটাতে আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য এক শর্টকাট ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পথ নিয়েছিল। সেটা হল, তারা যেকোনো উপায়ে ওই ১৪ রাষ্ট্রকে ন্যাটোতে যোগদানের নীতি-পলিসিতে অগ্রসর হতে থাকে। আর এতেই রাশিয়ার নিজ ভূখণ্ড-রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকে ব্যাপারটাকে হুমকি মনে করতে শুরু করেছিল। সব বিরোধের শুরু এখান থেকে।
    তাই একই এই কারণে ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার বিরোধ দেখা দিলে ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে  ইউক্রেন থেকে ফেরত নিয়ে নিজ প্রশাসনের অধীনস্ত করে নিয়েছিল। আর এরই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা সেই থেকে পুতিনের রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করতে এগিয়ে এসেছিল। নিজের একশনের পক্ষে সাফাই বয়ান যুক্তি শক্ত করার জন্য এটাকে রাশিয়ার ইউক্রেনের ভূমিদখলদার হিসাবে মানে জবরদখল হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেছিল যেন ক্রিমিয়া তার অতীতে সবসময়ই ইউক্রেনের অংশ ছিল। অথচ মাত্র ১৯৯১ সাল থেকেই সোভিয়েত ভেঙে গেছিল বলেই রাশিয়া ক্রিমিয়াকে যে আপসে ইউক্রেনের প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হতে দিয়েছিল, এই ফ্যাক্টস চেপে যাওয়া হয়ে চলছে এখনও।

    ফলে এখন রাশিয়ার হাতেই ‘ক্রিমিয়াকে ছেড়ে দেয়া্র” কিসিঞ্জারের প্রস্তাব এটি ঠিক ইউক্রেনের কোন নিজস্ব ভূখণ্ড রাশিয়াকে ছেড়ে দেয়ার মত ঘটনা একেবারেই নয়। কারণ ইতিহাসে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অধীনস্থ অঞ্চল নয়। বরং ক্রিমিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই কয়েক শ’ বছর ধরে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত ও পরিচালিত ছিল। এই হিসেবে কিসিঞ্জার যেন নিজেই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের শঠতা বয়ানের বাইরে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। এ বিচারে পুতিনের রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনকে ভূমি ছেড়ে দিয়ে রাশিয়ার সাথে সমঝোতা করার জন্য কিসিঞ্জারের আহবান – এটা ‘তেমন অস্বাভাবিক’ কিছু নয়। মূলকথা, ক্রিমিয়া ইউক্রেনের কোনো কোর-ভূখণ্ড বা নিজ রেস-জাতিগত ভূখন্ড তা একেবারেই নয়। এই ফ্যাক্টস যদি আমরা মনে রাখি, কেবল তাহলেই আজকের তর্কে পশ্চিমা বয়ানের অসারতার দিকটা  বুঝব।

    এখন এ ঘটনায় ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি যেন,  দিনকে দিন এক রাজনীতিবিদ রাজনৈতিক দায়-দায়িত্ব নিয়ে কথা আচরণের পরিবর্তে অভিনেতার একটিং তাও আবার ভাঁড়ামো কমেডিয়ান হতে চাচ্ছেন বেশি। ইনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি এক মাস আগেও তিনি মিডিয়ায় নিজেই বলেছেন তিনি ইউক্রেনকে আর ন্যাটোর সদস্যপদ নিতে বা পেতে আগ্রহী নন। কারণ আমেরিকান প্ররোচনায় পড়ে – এটা ছিল  তাঁর লোভে পড়া, এটাই এখন ইউক্রেনের দুঃখের কারণ হয়েছে। তিনি খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি আমেরিকার প্ররোচনায় পড়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তিনিও তখন আমেরিকার ওপর হতাশ সে কথাই খোলাখুলি বলেছিলেন। আর এর পরই তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সাথে জেলেনস্কি সমঝোতা এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আবার সেই বাইডেন তখন অস্ত্র-অর্থের লোভ দেখাতে লাগলেন। সেই জেলেনস্কি আলোচনার টেবিল ফেলে এবার আমেরিকান উসকানি তার আবার ভালো লাগতে শুরু করেছিল। তিনি আবার ভোল বদলে ফেলেন। সেই জেলেনস্কি এখন কিসিঞ্জারের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
    জেলেনস্কি বলেছেন, ‘রাশিয়ার সাথে শান্তি আলোচনার পূর্বশর্ত হল –  দুই দেশই তাদের মধ্যকার আগের সীমানায় ফিরে যাবে যার সহজ অর্থ রাশিয়া ইউক্রেনের অভ্যন্তরে যা দখল করেছে তার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে যেতে হবে;’ অর্থাৎ তিনি এখন ‘বাইডেন-মুডে’ আছেন।

    আসলে কিসিঞ্জারের বক্তব্য অনেককেই প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। এদের একজন হলেন উরসুলা লেয়েন [Ursula von der Leyen]। উরসুলা বর্তমানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলছেন, ‘যুদ্ধ কেবল ইউক্রেনের টিকে যাওয়া নয়, অথবা এটি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তার ইস্যু নয়, বরং এটি সব গ্লোবাল কমিউনিটির কাজ ও দায় [……war is not only “a matter of Ukraine’s survival” or “an issue of European security” but also “a task for the entire global community.”]। একথা শুনে অনেকের কোন মহা-জ্ঞানের কথা শুনছেন মনে হলেও আসলে তা এর উলটা। যেমন তিনি এরপর দুঃখের ভঙ্গিতে বলছেন, এতে ‘পুতিনের ধ্বংসাত্মক ক্ষোভের খেলাও আছে [Vladimir Putin’s “destructive fury” ।’ আবার সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে যেন বলে রাখতে চাইছেন, ” রাশিয়া এক দিন হয়ত ইউরোপে তাদের বিশেষ জায়গা নিয়ে ফিরে আসবে। তা আসতেই পারে যদি সে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক নিয়মশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় ফিরে আসার পথ খুঁজে নেয় – কারণ রাশিয়া তো আমাদেরই পড়শি! […Russia could one day recover its place in Europe if it “finds its way back to democracy, the rule of law and respect for the international rules-based order … because Russia is our neighbor.”]। আসলে জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদে সবাই কমবেশি আক্রান্ত!!

    একালে বাইডেনের আবির্ভাব ও সবকিছুকেই তিনি পশ্চিমাগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে নিজেদের হাজির করার কায়দা শুরু করেছেন। আর এতে যারাই আমেরিকান নেতৃত্বের বা অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি – তাদের নিচা দেখানোর এই রেসিয়াল (racial) শ্রেষ্ঠত্ব শো করা যে, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিরা হলো রেস-জাতির দিক থেকে নিচা। মানে নয়া এক ‘বাইডেন রেসিজম বা পশ্চিমা রেসিজমের প্রদর্শন শুরু হয়ে গেছে। আর তাতে মেতে ওঠে এই উরসুলা লেয়েনো ভালোই প্রভাবিত হয়েছেন দেখা যাচ্ছে। তিনি পশ্চিমের গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা দেখানো গর্ব শুরু করে দিয়েছেন। আচ্ছা তিনি  কি জানেন তিনি কী করছেন? জানলে তিনি দেখতে [পেতেন, এই কথিত গর্ব-উপাদানের বয়স কত?

    অর্থাৎ পশ্চিমের গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা ইত্যাদি এর বয়স মাত্র ৭৫ বছর। আর এর আগে তারা কী ছিলেন? তাদের সারা ইউরোপ ছিল পেশাদার ডাকাত!!! ডাকাত মানে তাদের রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনীতি বলতে তা ছিল  কলোনি দখলদারের লুটেরা ডাকাত ব্যবসা!! হা তাই, একটুও বাড়ায় বলা হয় নাই। লাগাতার সাড়ে তিন শ’ বছর ধরে যাদের প্রধান ব্যবসা-অর্থনীতি ছিল জাহাজে বিনিয়োগ আর এমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলে  ঐ জাহাজ নিয়ে কলোনি দখলদার লুট আর ডাকাতি করতে বেরিয়ে পড়া। এভাবেই ওসব দেশের প্রধান অর্থনীতি ছিল লুট আর ডাকাতি। অথচ তারা এখন সবাইকে আইনের শাসন শেখান! যেন এটা তাদের সভ্য জীবন ছিল, যেন  তারা  এভাবেই সেই থেকে কথিত সভ্যতায় এগিয়ে ছিলেন!!! উরশুনার উচিত হবে সবার আগে কলোনিদখলদারদের জীবন কাহিনী তার পুর্বপুরুষদের চিনে নেওয়া……

    এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টের শেষে আরো কিছু কথা জুড়ে দেয়া হয়েছে,  থেকে নেয়া। তারা লিখছে, কিসিঞ্জার ইউরোপীয় লিডারদেরকে উদাত্ত আহবান জানিয়ে বলছেন – ইউরোপে রাশিয়ার ভুমিকা অবস্থানকে খাটো করে দেখানো বা, দৃষ্টিশক্তির আড়ালে ফেলা না। আর? আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাশিয়াকে চীনের সাথে কোনো স্থায়ী অ্যালায়েন্সে যেতে দিও না; এতে ইউরোপের নিজেকেই রিস্কের মধ্যে ফেলা হবে! [ ……urged European leaders to not lose sight of Russia’s place in Europe and risk the country forming a permanent alliance with China.}

    আশা করি এবার পাঠক পরিস্কার বুঝতে পাবেন যে তা হলে কিসিঞ্জার ঠিক কী চাচ্ছেন? কিসিঞ্জার বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির মত তিনিও আসলে চীনা উত্থানে ভীত। কিন্তু তবু একটা জায়গায় তিনি বাইডেন ও ইউরোপের রাশিয়া-ঘৃণার দৃষ্টি থেকে আলাদা। সেটা হল –  চীনের ভয়ে তিনিও ভীত, কিন্তু পশ্চিমাশক্তি মানে বাইডেন ও ইউরোপ মিলে যেমন রাশিয়াকে সমানে কোপাচ্ছে, এটাকে তিনি ঠিক মনে করছেন না। কেন? কারণ তিনি মনে করেন এভাবে কোপাতে থাকলে চীন ও রাশিয়ার স্থায়ী অ্যালায়েন্স তৈরি হয়ে যাবে বা অ্যালায়েন্স করতে রাশিয়াকে ঠেলে দেয়া হয়ে যাবে, যা পশ্চিমা স্বার্থের বিরোধী হয়ে হাজির হবে। সারকথায় কিসিঞ্জার মনে করেন চীন ও রাশিয়ার স্থায়ী অ্যালায়েন্স তৈরি হতে দিলে তা আমেরিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।  একথাটাই তিনি ফেলো পশ্চিমাদের বুঝাতে চাইছেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৮ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “আবার কিসিঞ্জার! ইউক্রেন ইস্যুতে কেন?“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও’নিল পাঠ


    যে নায়ক এখন ভিলেন হতে চায়?
    গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও
    ’নিল পাঠ

    গৌতম দাস

    ২৩ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46Y

     

          Brics ‘grew more than I thought’, says Jim O’Neill 2016

    The Big Issues for 2022

    জিম ও’নিল [Jim O’Neill] মূলত যুক্তরাজ্যের [UK] এক অর্থনীতিবিদ। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়াল স্ট্রিট পাড়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী এক বিনিয়োগ কোম্পানি ‘গোল্ডম্যান স্যাশে’[Goldman Sachs] আর এরই প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন তিনি; আর এর পুরা সেই সময়কালটা হল ১৯৯৫-২০১৩ সাল। তাঁর প্রসঙ্গে বৃটিশ সরকারের উপস্থাপিত এক বাইওগ্রাফিতে দেখা যাচ্ছে সেখানে লেখা আছে – Jim O’Neill worked for Goldman Sachs from 1995 until April 2013, spending most of his time there as Chief Economist.। পরে ২০১৫-১৬ সালে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’ [Project Syndicate] নামে বিভিন্ন নামি-লেখকের প্রবন্ধ সংগ্রহ ও মজুদের যে ওয়েবসাইটটা আছে সেখানে ২০০৮ সাল থেকেই তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন বলে তারা জানাচ্ছে।

    গোল্ডম্যানের সাথে থাকার সময়ের তার কিছু কাজ ছিল দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রভাব পড়া ঘটনার একটা যা, তাকে বিখ্যাত করেছিল বলে মনে করা হয়। সেই ২০০১ সালের এক নিবন্ধে তিনি প্রথম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান হিসাবে নয়া ব্রিকসের {BRICs} ধারণা (যা থেকে পরে ব্রিকস BRICS ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়) নিয়ে আসেন। কাজের অংশ হিসেবে তিনি তখন আসলে একটা নিবন্ধ বা পেপার লিখেছিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘বিল্ডিং বেটার গ্লোবাল ইকোনমিকস ব্রিকস’ [“Building Better Global Economic BRICs.”]। পরে সেই ধারণাটাই আরো সবিস্তার করেছিলেন ২০০৩ সালে সিরিজ আকারে লিখে। সেখানেই তিনি পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস-ফিগার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটা পূর্বাভাস বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘২০৪০ সালের মধ্যে চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে’ [China’s economy could become as large as the US economy (in nominal dollar terms) by 2040]।

    সেই ও’নিল গত বছর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর তাঁর সেই প্রথম রচনার ২০ বছর পূর্তিতে এ নিয়ে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটেই একটি কলাম লিখেছিলেন। “ব্রিকস কী আদৌ কখনও জাগবে? [Will the BRICS Ever Grow Up?] শিরোনামে।  যেখানে তার আরো কিছু আপডেট মূল্যায়ন যোগ করেছিলেন।

    যদিও তাঁর ২০০১ সালের প্রথম মুখ্য মন্তব্যটা ছিল, তিনি “রাইজিং ইকোনমিজ” [Rising Economy] দেশ বলে একটা নয়া শব্দ চালু করেছিলেন। সেকালেই দাঁড়িয়ে দেখে, শতকোটির উপরের জনসংখ্যার দুই দেশ চীন ও ভারতকে এদের অর্থনীতির গ্রোথ রেট দেখে তিনি ‘রাইজিং ইকোনমি’র দেশ বলে আলাদা এই ক্যাটাগরি চালু করেছিলেন। সার কথায় বলেছিলেন, চীনা অর্থনীতি সবাইকে ছাড়িয়ে এক নম্বর অবস্থানে যাবে। আর ভারত সেকালের এশিয়ার জাপানকেও ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া আমেরিকার পরে, মানে তৃতীয় স্থানে উঠে যাবে […… India could surpass Japan to become the third-largest economy soon thereafter; ]। শুধু তা-ই নয়, তৎকাল থেকেই এক বিবেচনায় সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির ব্লক বা গ্রুপের দেশ বলতে জি-৭ [G7 group] দেশগুলোকে বুঝানো হত; সেই জি-৭ ভুক্ত (কানাডা বাদে) দেশগুলোর মোট প্রবৃদ্ধির চেয়ে একত্রে এই নয়া রাইজিং ইকোনমিগুলোর দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগ করলে এটাই বেশি হবে – এই ছিল তার প্রধান দৃষ্টি-আকর্ষণী মন্তব্য!! অর্থাৎ তিনি তুলনা করছিলেন সেকালের অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারে শীর্ষ ইকোনমিক ব্লকের সদস্য এমন সাত দেশের সাথে রাইজিং ইকোনমিগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগফল – এটা তুলনায় ভালো ও বেশি সম্ভাবনাময় বলে দাবি উঠিয়ে!!

    স্বভাবতই জিম ও’নিল এর এই কাজ, এটা কোনো গণকের ভাগ্য গণনা ছিল না। ছিল বাস্তব পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্ট ও ফিগারের উপরে দাঁড়িয়ে করা বিশ্লেষণ। তাই ওই প্রবন্ধ সেকালে ওয়াল স্ট্রিট জগতে অর্থাৎ গ্লোবাল বিনিয়োগ পুঁজির পুঁজিবাজারের জগতে ব্যাপক আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এর মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে কখনো এতে কম হারে প্রবৃদ্ধি হলে তা গ্লোবাল বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জগতে খুবই নেতি চোখে ও ব্যবসা খারাপ যাওয়ার ইঙ্গিত বলে বিবেচিত হয়। তাদের হিসাবটা সোজা;  সেটা হল যে যত ভাল বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ততই তা আরো বড় বিনিয়োগ পুঁজির জন্য বড় চাহিদার বাজারের ইঙ্গিত আর ততই তাদের ব্যবসা  ভাল ও বাড়বার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে সেটা।
    আর এখানেই একপর্যায়ে জাতিবাদি অর্থনীতির ধারণা ব্যর্থ ও ভেঙে পড়া শুরু হয়ে যায়। কিভাবে, কেন?

    ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বলতে এখানে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে:
    আক্ষরিক অর্থে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street] বলতে  সেটা নিউ ইয়র্ক শহরের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই মাত্র। আমাদের মতিঝিলের মত! কিন্তু এখানে এখন থেকে সেটা আর কেবল নিউ ইয়র্কের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই নয়, বরং প্রতীকী অর্থে এটাই গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থ – এটাকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ধরণের কোম্পানির প্রধান অফিসগুলো বেশির ভাগই নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট পাড়াতেই অবস্থিত বা শুরু হয়েছিল। অনেকটা যেমন খুবই ক্ষুদ্র-অর্থে হলেও বাংলাদেশের পুঁজি ও শেয়ারবাজার বলতে ‘মতিঝিল’ পাড়া বুঝানো যায়। অবশ্য একালে “ওয়াল স্ট্রিট” ততপরতা আর কেবল ওয়াল স্ট্রিটেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছাড়িয়ে এর একটা দুবাইয়ে ও আরেকটা সিঙ্গাপুরে গড়ে উঠে ইতোমধ্যেই আসর জমিয়েছে; যদিও তা ওয়াল স্ট্রিটেরই ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বি না বরং সহযোগী হিসেবে নয়া কিছু অঞ্চলে, গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের নয়া কিছু তুলনায় ছোট কেন্দ্রভুমি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বললে এখন থেকে বুঝতে হবে এর ব্যাপকার্থে  – গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থের কথাই বলছি।

    নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের জন্ম বা যাত্রা শুরু ধরা হয় ১৭৯৪ সাল। তখনকার গভর্নর পিটার স্টাইভেসেন্টের [Then-Governor Peter Stuyvesant] এক নির্দেশে ওয়াল স্ট্রিট গড়ে উঠেছিল মূলত নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে [NYSE]। যেটার ঠিকানা ১১ নম্বর ওয়াল স্টিটে।  আর এর প্রায় শত বছর পরে ১৮৮০ এর দশকে আমেরিকান অর্থনীতি তখনকার বড় অর্থনীতি ব্রিটেনকে প্রথম ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যে ব্রিটিশ এম্পায়ার ছিল সবচেয়ে বড় কলোনি দখলদার যার সূর্য নাকি ‘কখনো অস্ত যায় না’ বলে গর্ব করা হত। আর এরও পরবর্তীতে আরেক বিরাট ঘটনাটা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫)। যে সময়ের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, যাকে বলা হয় আমেরিকাকে দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা বানানোর নায়ক; সেই রুজভেল্ট ছিলেন আসলে প্রধানত ওয়াল স্ট্রিটেরই স্বার্থ মাথায় রেখে চলা প্রেসিডেন্ট। আর এভাবে চলে তিনিই প্রথম আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার স্তরে উত্তীর্ণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের হাতে সঞ্চিত বিপুল উদ্বৃত্ত সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, মূলত ওয়াল স্ট্রিটের কোর [core] স্বার্থে, তিনি আমেরিকাকে এই স্তরে উঠিয়েছিলেন। আর তাই দেখা যায় এই প্রেসিডেন্টের চার টার্মের সময়কালে তাঁর আশপাশের  প্রায় সব উপদেষ্টা-মন্ত্রী-পরামর্শদাতা বা দফতর পরিচালকরা যারা ছিলেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড হল যারা এর আগে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো চালাতেন, মানে ওর (ঠিক মালিক না) পরিচালন-কর্তা বা এক্সিকিউটিভ হিসাবে কাজ করেছেন।

    এখন যে প্রশ্নটা তুলব, সেটা হল নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ কি সবসময় আমেরিকা রাষ্ট্রের স্বার্থ ছিল? হয়ে আছে বা থাকতে পেরেছে? এর জবাব খুঁজব এখন।

    জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ বলে নয়া টার্মে কথা বলা শুরু করেছিলেন তখনকার চীনা অর্থনৈতিক উত্থান মানে  সেটা ডাবল ডিজিট গ্রোথের (১০% বা এর উপরের জিডিপি) প্রথম দশকটা (১৯৯০-২০০০) পার হয়ে গেছে। ও’নিল মূলত চীনের এই উত্থান দেখেই ‘রাইজিং ইকোনমি’ টার্মটা আনছেন, কারণ ভারতের অর্থনীতিতে তখনও তেমন নড়াচড়া শুরু হয়নি। তবে ভারতেরও চীনের (এখন ১৪২ কোটি 2022) মতই বিপুল জনসংখ্যার দেশ শতকোটি (এখন ১৩৮ কোটি) ছাড়িয়েছে যা। যার সোজা মানে, একটা সঠিক নীতি-পলিসি বেছে নিতে পারলে এই জনশক্তিই হয়ে উঠতে পারে সম্পদ আর তাতে বিপুল উদ্বৃত্ত ও সঞ্চিত সম্পদের এক রাষ্ট্র হতে পারে ভারত। তাই চীনকে দেখেই ভারতও সেই থেকেই হতে পারে এমন সম্ভাবনাময় গোনায় ধরা দেশ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল।

    পরিস্কার করে রাখি, এখানে সেসময় বলতে তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-০৮) জুনিয়র বুশের শেষ আমল আর প্রেসিডেন্ট (২০০৯-১৬) ওবামা আমলের শুরু এদুই কালের এক মিলিত সময়কাল ছিল সেটা।
    সময়টা একই সাথে আরো অনেক কিছুর। যেমন আফগানিস্তানে বুশের ওয়ার অন টেররে পা আটকে গেছে তা টের পাবার সময় সেটা। মানে ২০০৫-০৬ সাল থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তখন আর দুনিয়াটা সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই মেরু দুনিয়া নয়। আর সেখান থেকেই এই দৃষ্টিভ্রম যে কাজেই একা আমেরিকা তখন দুনিয়াতে যা খুশি করতে পারে বাধাহীনভাবে একথায় তখন জুনিয়র বুশ এন্ড গংয়েরা ভেবেছিল – আর এটাই, তখন পরিস্কার হয়ে যায় যে এই বুঝাবুঝি ছিল ভিত্তিহীন। কারণ আমেরিকা তখন আফগানিস্তানে নিজেই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে যেখানে বিজয় দূরে থাক যুদ্ধ-ফেলে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশু সম্ভাবনাটুকুও নাই। মানে নিরন্তর খরচের এক অন্তহীন যুদ্ধে আটকে গেছে আমেরিকা যা থেকে কোন প্রাপ্তি বা সুফলও নাই। আর এতে খরচ জোগাতে ব্যর্থ আমেরিকান অর্থনীতি শেষে এথেকেই এক নয়া গ্লোবাল মহামন্দা্র (২০০৭-০৮) ডেকে এনেছিল বা গড়িয়ে যায়। অথচ তুলনায় তখনো চীনের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিট না হলেও ৭-৮ শতাংশ চালিয়ে যাচ্ছিল। মহামন্দার প্রভাব পশ্চিমা দেশগুলোতে ছিল সর্বোচ্চ অথচ যেটা চীন-কেন্দ্রিক এশিয়া দেশে ততটা অনুভুত নয়!  ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবেঃ এতদিনের পশ্চিমের হাতে উপেক্ষিত হয়ে থাকা এশিয়ার অর্থনীতি এবার উলটা উপেক্ষিত হয়ে থাকাটাই তো তাদের সুবিধা – মানে এশিয়ান অর্থনীতি পশ্চিমের সাথে ততটা সমন্বিত বা ইন্ট্রিগেটেড ছিল না, করা হয় নাই  বলেই পশ্চিমের মহামন্দার আঁচ এশিয়ায় কম দেখা যাচ্ছিল।

    আর এসব কিছু দেখে শেষে ওয়াল স্ট্রিট আর আমেরিকা-কেন্দ্রিক বা পশ্চিমাকেন্দ্রিক থাকতে পারেনি বা চায়নি। বিদেশে যেখানেই আয় করুক, আমেরিকাতেই তাকে উদ্বৃত্ত সম্পদ ফেরত নিতে হবে, এই বাধ্যবাধকতা এই প্রথম সে ভুলতে শুরু করেছিল। এশিয়াতেই নয়া বিনিয়োগ বাজার, তাই নয়া চাহিদার দেশ অঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে যায় সে!! এটাই জিম ও’নিলের পর্যবেক্ষণের মর্মার্থ বলে দাবি করা যায়!  আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে রিপোর্টগুলোতেও তা প্রতিফলিত হতে থাকে। সার কথায়, ওয়াল স্ট্রিট আর জাতিবাদি থাকেনি, পারে নাই। গ্লোবাল স্বার্থ হয়ে উঠেছিল। রুজভেল্টের আমেরিকায় এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিটের সাধারণ স্বার্থ আর আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হয়ে থাকতে পারে নাই। এক ব্যাপক বিচ্ছেদ ঘটে যায়। এটা মনে করা ভুল হবে না যে এই বিচ্ছেদের ঘটনাটাই জিম ও’নিল এর পর্যবেক্ষণে ধরা পরেছিল। আবার এখানেই জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ এই তত্ব আনলেন এটাই আসলে তখন ওয়ালস্টিটের আচরণের সাফাই হিসেবে ব্যবহৃত হতে থেকেছিল। এক কথায়, এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিট আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ ফেলে চীনা ‘রাইজিং ইকোনমি’র ভেতরে নিজের ‘কোর’ মানে, গ্লোবাল বিনিয়োগের বাজার এই মৌলিক স্বার্থ খুঁজে পেয়েছিল!

    ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সংস্কারঃ
    সাথে আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ছিল ২০০৯ সালের। যেমন একটা হল,  বিশ্বব্যাংকের ঢেলে সাজানোর ঘটনা। না, সবটা বোধহয় ঠিক বললাম না। আসলে এটা হল ঘটনার কেবল বাইরের দিকটা দেখে বললে। বিশ্বব্যাংক জন্ম থেকেই এর “অভ্যন্তরীণ তথ্য উন্মুক্ত নয়” – এভাবেই গড়ে উঠেছিল। এর সম্ভাব্য দুটো কারণ আছে মনে করা হয়। এক. বিশ্বব্যাংক কাজের ধরণ অনুসারে কোন সাধারণ আম পাবলিককে সার্ভিস দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। তবে পাবলিকের যে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান আছে মূলত এর সাথে তার কারবার ও ডিলিং [dealing]। আর সেটাকেই সুযোগ হিসেবে নিয়ে এর কান্ট্রি অফিসগুলো (যেমন বাংলাদেশের বিশ্বব্যাংক অফিস) পাবলিক থেকে দূরে পাবলিক ডিলিং না করেও চলতে পারত। সাধারণ তথ্য যেমন কোন দেশের মৌলিক তথ্যাবলী বা কান্ট্রি প্রোফাইল – এ’তথ্যও উন্মুক্ত ছিল না তখন। দুই. এরই সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়, কোল্ডওয়ার যুগ বলে তখন ছিল  কড়া কমিউনিস্ট ভীতি। এ’ভীতির কারণে নিজেকে ঢেকেঢুকে কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহির্বিভাগ (ERD বা এক্সটারনাল রিসোর্স ডিভিশন) আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন) সাথে যোগাযোগ রক্ষার মধ্য দিয়েই নিজ তৎপরতা চালিয়ে নিতে অসুবিধা হতো না। আগের এই ঢেকেঢুকে চলার সিদ্ধান্ত ভেঙে নিয়ে বিশ্বব্যাংক উন্মুক্ত হয়ে যায় ২০০৯ সাল থেকে। এমনকি এখন তো কান্ট্রি অফিসেরও ফেসবুক পেজ আছে যেখানে অনেক ইস্যুতে ওপেন আলোচনাও দেখতে পাওয়া যাবে। প্রশ্নোত্তর ও তথ্য সেখান থেকে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া প্রতিটি ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের কান্ট্রি অফিসগুলো বা হেড কোয়ার্টারের বহু কিছুই এখন নানা ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি যে কেউ আম-পাবলিক নিজেই জানতে পারে। একালে ‘ডিসকাশন ব্লগও’ [discussion blog] আছে যার বুলেটিন পাওয়া বা ওয়েবে সদস্য হওয়া যায়। কিন্তু কেন এই উন্মুক্ততা? সেটাও জিম ও’নিল-এর পরোক্ষ প্রভাব। কিভাবে সেটা?

    আসলে রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর মোট প্রভাব তখন ক্রমশ জি-৭ উন্নত অর্থনীতিগুলোকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে এ’কথার গুরুত্ব তখন কেউ অস্বীকার বা ছোট করে আর দেখতে পারছিল না। এ’ছাড়া ওয়াল স্ট্রিট আপন স্বার্থেই এসব ঘটনা ও তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছে। মূল কথা, এর আরো কিছু প্রভাব ছিল মারাত্মক।

    যেমন, বিশ্বব্যাংকের প্রাকটিস বা নিয়ম হল, নিজ অর্থনীতির সাইজ-প্রভাব অনুসারে সদস্য দেশকে কম বা বেশি চাঁদা দিয়ে শুরুতে বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিতে হয়। আর পরে যাদের অর্থনীতির সাইজ ব্যাপক বড় কিছু হয়ে যায় ততই বাড়তি চাঁদা দিতে হয়। এখন এই চাঁদা মানে কী আবার? চাঁদা মানে, বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা আসলে এক শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানির মত আর সদস্য দেশগুলোর চাঁদা দেওয়াটাই আসলে সদস্য দেশের বিশ্বব্যাংকের শেয়ার কেনা হিসেবে দেখা হয়। কাজেই সদস্যদেশের অর্থনীতি যত বড় হয়ে যাবে ততই বড় শেয়ার কিনতে হবে। কিন্তু ব্যতিক্রম হল, একেবারে বড় মালিকানাগুলোর বেলায়। যেমন এখন সবচেয়ে বড় মালিকানা আমেরিকার; তা ১৬.৫৭% [অবশ্য গত ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এটা ১৬-১৮% এর মধ্যে নড়াচড়া করেছে]। পরে জাপান ৮.৩২%। আর এরপর ইউরোপের বড় অর্থনীতির চারটা দেশ ৪-৫ শতাংশের বেশি কেউ নয়। তুলনায় বাংলাদেশ ১ শতাংশের শতভাগের এক অংশের মত, এরকম। নিচের এই ডাটা পেয়েছি  সরাসরি বিশ্বব্যাংকের সাইট থেকে, তবে একটু পুরানা। যা কম্পাইল করা হয়েছে ২০১৯ পর্যন্ত আর প্রকাশিত ২০২০ সালে। [নিচের এই তথ্য যথেষ্ট আপডেটেড না, তবে এর চেয়ে আপডেট সংগ্রহ আমার নাগালে আসে নাই।]

    Who are the World Bank’s shareholders and
    how much capital do they own?
    • 189 member countries have subscribed to US$280
    billion of subscribed capital (paid in capital + callable
    capital)
    • The largest shareholders include the United States
    (16.57% of total subscribed capital), Japan (8.32%),
    China (4.59%), Germany (4.16%), and France and
    the United Kingdom (with 3.90% each
    source: WORLD BANK 2020

    কিন্তু বিরোধ বাধে চীন নিজের শেয়ার বাড়াতে চাইলে। চীন তার নয়া অর্থনীতির সাইজে শেয়ার মালিকানা বাড়াতে চাইলে তাতে আমেরিকা মানে তার সিনেট সেই ফাইলে অনুমোদন দেয়নি। মানে অভ্যন্তরীণভাবে বিশ্বব্যাংক টেকনিক্যালি চীনের প্রস্তাবের পক্ষে সায় দিলেও তা পাস করতে আমেরিকান মতামত চেয়ে পাঠালে সেই ফাইল আর (মূলত আমেরিকান সিনেট থেকে) ফিরে যায়নি। ফলে চীনের শেয়ার (২০১৯ পর্যন্ত) ৪.৫৯% এর নিচেই থেকে যায়। তুলনায় ভারতের শেয়ার হল ২.৯১%, এটা ভারতের সরকারি তথ্য।  

    আসলে বিশ্বব্যাংকে চীনের মালিকানা বাড়ানোর আবেদনে সাড়া না দেয়া  এটা ছিল চীনের প্রতি আমেরিকার এক অব্যক্ত মেসেজ। মানে কিছু না বলে যেটা ইঙ্গিতে বলা হয়ে যায় তা হল যে, আমি আমেরিকা বিশ্বব্যাংকের মালিকানায় চীনের শেয়ার বাড়াতে দিব না। একে নিজ নিয়ন্ত্রণেই রাখব। আমেরিকা জানত [জিম ও’নিলের ততপরতার কারণে অনুমানে] যে, চীন তাহলে নিজেই আলাদা করে বিশ্বব্যাংক খুলবে। আর সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য সেটাই তুলনায় আমেরিকার স্বার্থের জন্য ভাল বলে আমেরিকার কাছে মনে হয়েছিল।

    আসলে ততদিনে, মানে সেই ২০০৩ সাল থেকে জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমির’ তত্ব দিচ্ছেন, সম্ভবত পরোক্ষে তিনি চীনের রাইজিং অবস্থা দেখে আগে থেকেই চীনকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন যে, চীন যেন নিজ প্রভাবাধীন (আমেরিকান প্রভাবের বিপরীতে) নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান দুটোই গড়ে নেয়।

    পাঠককে মনে করিয়ে দেই, জিম ও’নিল-এর কথাগুলো কিন্তু আদতে ছিল ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলা কথা। অর্থাৎ যে কথা এখন সহজ করে বলতে পারি যে, আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট স্বার্থ সে রাইজিং চীনা সরকারকে পরামর্শে দিয়ে বলে চলছিল যে, নিজ প্রভাবাধীন নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান খাড়া করে নাও। অর্থাৎ সেই থেকে ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আর জাতিবাদ আমেরিকান সীমায় থাকেনি, থাকতে চায়নি বা থাকলে নিজ অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যেত।

    অতএব সেই থেকে ও’নিলের BRIC বা ব্রিক ধারণাটা সবল হচ্ছিল। আর ২০০৯ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সংস্কার এবং উন্মুক্ত করা আর সেই সাথে চীনকে প্রত্যাখ্যানের সেই বছরই ব্রিকস ব্যাংক [BRICS Bank] নামে চীনা প্রভাবাধীন নয়া প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে যায়। এখানে একটু তথ্যের কারেকশন আছে। জিম ও’নিলের প্রথম আইডিয়াটা ছিল চীন, ভারত আর সাথে রাশিয়া ও ব্রাজিলকে নিয়ে মানে তাদের দেশের নামের প্রথম অক্ষরত নিয়ে BRIC বা ব্রিক এভাবে। ২০০৯ সালে এই চার দেশ নিয়েই ব্রিক নামে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও সাথে জুড়ে নিলে এবার নয়া নাম হয়ে যায় ব্রিকস [BRICS]।

    এখন একটা প্রশ্ন, তাহলে ব্রিকস ব্যাংক যদি এর নাম হয়  তো সেক্ষেত্রে এটা একটাই প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তো প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলাদা দুটো; যদিও তাদের সমন্বয় আছে। এমনকি কোনো দেশের বিশ্বব্যাংকের সদস্য হতে হলে সেই দেশকে আগে আইএমএফের সদস্য হতেই হয়। সেটা হয়ে থাকলে এবার বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার সে যোগ্য হয়। তা হলে ব্রিকস ব্যাংক কার সমতুল্য, আইএমএফ না  বিশ্বব্যাংক এর? এর উত্তর হল, আসলে ব্রিকস ব্যাংকটাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মিলিত ধারণা। আর এর ভেতরে ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ [NDB] বলে বিশ্বব্যাংক সমতুল্য আরেকটা নয়া প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে।

    কিন্তু জিম ও’নিল এখন অন্য কিছু বলছেনঃ
    গত ১৭ মে ২০২২ ও’নিল আরেক কলাম লিখেছেন সেই প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ওয়েবেই। যার শিরোনাম হলো ‘ফের গ্লোবাল মহামন্দা কী আসন্ন?’ [Another Global Recession?]  আর আমাদের প্রথম আলোও এ’লেখার একটা অনুবাদ ছাপিয়েছে।   এখানে পাঠককে আবার একটু মনে করিয়ে দেই। এখানে “এখন” মানে সুনির্দিষ্ট করে যখন বাইডেন তার নয়া ও শেষ অস্ত্র [স্যাংশন ও মানবাধিকার] নিয়ে হাজির যেটাতে জিদ আছে কিন্তু সাফাই নাই। মনের গহীনের জিদটা হল যে, দুনিয়াতে সাদা চামড়ার (সাদা ককেশীয় এথনিসিটি) শাসন চলে আসছে, যা প্রায় ৫০০ বছর [মোটামুটিভাবে ১৬০৭ সালে আমেরিকাকে (আজকের ভার্জিনিয়া রাজ্য) বৃটিশ কলোনি করা দিয়ে শুরু থেকে আজও] ধরে টিকে আছে। এটা যেভাবেই হোক বাইডেন আরো টিকিয়ে রাখবেন। চীনা অবজেকটিভ উত্থানের বিরুদ্ধে  জিদ-জবরদস্তিতে যা করা যায় এমন সবকিছু করে হলেও টিকে থাকবেন! তাতে অবজেক্টিভ বাস্তবতা ভিন্ন কিছু বললেও তিনি জিদ ধরে আড়াআড়ি বসে থাকবেন। একবার বলবেন অবরোধ আর মানবাধিকার  নামে নতুন দুটো অস্ত্র এনেছেন। এতে আর অর্থ-অস্ত্র কোনটাই আর লাগবেই না। আমেরিকা এমনিতেই ইউক্রেনসহ সবকিছুতেই জিতে যাবে। আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় শেষ বা আপস হতে যাওয়া অবস্থায় পৌছে গেলে এবার নয়া ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ-অস্ত্র ঢেলে সেই মরা যুদ্ধকে তিনি আবার চাঙ্গা করছেন। এমনকি এতে ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই মিলে আপোষের অর্থের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই যে আসলে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব” জাতিবাদ বা সাদা চামড়ার শাসনের ঘোর সমর্থক তা এখানে উদাম হয়ে প্রকাশিত। কিন্তু এতে স্বভাবতই আমেরিকান জন্য বড় যুদ্ধের খরচ বাইডেন ডেকে নিয়ে আসছেন, যা বইবার অর্থনৈতিক অবস্থা আমেরিকারই নাই, এই দুইদল তা জানা সত্বেও একাজ করছে অবলীলায়!! অর্থাৎ আবার আরেক ভয়াবহ হিটলারিজম মানে এক এথিনিসিটির শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম কিন্তু তফাত এই যে এবার জর্মান শ্রেষ্ঠত্বের বদলে সাদা ককেশীল শ্রেষ্ঠত্ব – করে হলেও তারা দুনিয়ার নেতা থেকে যাবেই। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব যেন গায়ের জোর জবরদস্তি বা সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করার বিষয়???

    তাই এ অবস্থায় ও’নিল নিজের এ লেখার সারাংশ শুরুতেই লিখছেন এভাবেঃ
    এককথায় ও’নিলের এই লেখা পড়লে অনুমান হবে ও’নিল তিনিও সম্ভবত দুনিয়া থেকে সাদা শাসন উঠে যাওয়ার শকুনি শোকের ফাঁদে পড়েছেন!!!
    যদিও তিনি এলেখার শুরুতেই নিজ লেখার সারাংশ করে বলছেন, “উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে আসল আয় ক্রমেই কমছে, ওদিকে চীনের দুর্বল বাইরের চেহারা আর সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে লতিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা এসব কিছুর মধ্যে করোনা মহামারীর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বদলে নিচে চলে যাওয়া দেখে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্তে¡ও নীতিনির্ধারকদের এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, যাতে ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠা যায়!

    Between falling real incomes in advanced economies, China’s weakening outlook, and the uncertainties stemming from Russia’s war in Ukraine, there is more than enough reason to worry that the post-pandemic recovery is giving way to a downturn. But there is still much that policymakers could do to mitigate the blow.

    এ বক্তব্যের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, ও’নিল গ্লোবাল অর্থনীতি করোনা মহামারী ক্ষতি কাটিয়ে উঠার বদলে নিচের দিকে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু তাতে বাইডেনের বর্তমান অনুসৃত নীতি-পলিসিই যে এটা তৈরি করছে সেদিকে জিম ও’নিলের ভ্রুক্ষেপ নাই। তিনি বাইডেনের নীতিতে খারাপ ভুমিকা বা আপত্তির কিছু দেখছেন না। একেবারে বাইডেনের নামই তিউনি উচ্চারণ করেন নাই। কেন? ভাসুরের নাম? পতিত বৃটিশ অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাইদেনকে দরকার? তাই এখন কিছু বিপক্ষে বলা যাবে না??   আসলে সবমিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে হয়েছে এই পশ্চিমা বায়াসড অবস্থানটাই তিনি গ্রহণ করেছেন। সাধারণত পলিটিক্সের চেয়ে যার আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি হয় তিনি যেকোনো উপায়ে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে খাড়া অবস্থান নেন। কিন্তু এখানে তিনি ব্যতিক্রম, তা করেননি।
    আবার ধরা যাক পুতিন সবকিছুর জন্য দায়ী তবু সেক্ষেত্রে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ানোর দিকে আরো ঠেলে দেওয়া কী বাইডেনের নীতি-পলিসি হতে পারে? করোনা উত্তরকালে অর্থনীতির রিকভারি গুরুত্বপুর্ণ, খাদ্যের মূল্য নিচে নামানো গুরুত্বপুর্ণ নাকি পুতিনকে শায়েস্তা?

    আবার ও’নিল রাজনীতির প্রসঙ্গেই যদি ঢুকলেন তা হলে বাইডেন কেন বিনা অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের কথা বলে শেষে প্রায় আপস হয়ে যাওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে টেনে অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের মধ্যে ঢুকালেন এটাও ও’নিলের চোখে আমল পায়নি। তা হলে তিনিও কী এখানে চীনা উত্থানে সাদা শাসন হারানোর আশঙ্কার দ্বারা প্রভাবিত? অথচ তিনিই না অবলীলায় ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে মানে, পরোক্ষে রাইজিং চীনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ফোরকাস্ট করেছিলেন এবং তার ফোরকাস্ট ২০৪০ সালে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে, যা এখন ‘২০২৮ সাল’ বলছে ইন্ডিপেনডেন্ট পরিসংখ্যান স্টাডির লোকেরা। তিনি এখন তা হলে পিছাচ্ছেন কেন? পালাচ্ছেন কেন? এখানে তিনি নিজ পুরনো অবস্থানের বদল সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ছোঁয়ায় প্রভাবিত হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে!!!

    আবার চীনের বর্তমান লকডাউন প্রসঙ্গে দুই রকম কথা বলছেন। এক দিকে বলছেন, ‘সেই দিক থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক থাকার ব্যাপারে চীনের সমালোচনা খুব কমই করা যেতে পারে” [China can hardly be criticized for being generally cautious. ]।’ আবার বলছেন, চীন “কোভিডের বিরুদ্ধে এত কড়া অবস্থান নিবার বদলে শিথিল করলে চীনা অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; এটা চীনের জন্য ভাল, গ্লোবালিও ভাল”!  আসলেই জিম ও’নিল কী বলছেন এগুলা????

    শেষে বলছেন তিনটা ফ্যাক্টরের কথা, আমেরিকান ফেডারল রিজার্ভসের সিদ্ধান্ত, চীনা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর পুতিনের কথা। প্রথমত তিনি বাইডেনের নীতি-পলিসির উপর দুনিয়ার যেন কিছুই নির্ভর করে না, এই মিথ্যা অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। অর্থাৎ দুনিয়া উলটে গেলেও এমন অবস্থানে থেকেই তিনি কথা বলবেন বলে আগেই ঠিক করেছেন।  কারণ এই তিন ফ্যাক্ট্রের মধ্যে বাইডেনের সিদ্ধান্ত-করণীয় কোনোই ফ্যাক্টর নয়, তিনি ধরে নিয়েছেন। তাই এই তিনের একটাতেও বাইডেন ফ্যাক্টর নয়।  অথচ বাইডেন ৪০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ নিয়েছেন যেন তিনি ইউক্রেনকে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে এই যুদ্ধ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত চালাতে পারেন। আর মরা যুদ্ধকে জাগিয়ে আরো কমপক্ষে ছয়মাস জীবিত-যুদ্ধ করে দেয়া মানেই সরাসরি অন্তত জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম বা খাদ্যের দাম কমার বদলে আরো বেড়ে যাবার সব লক্ষণ নিশ্চিত করেছেন বাইডেন। অথচ ও’নিল এখানে এসে বাইডেনের নাম উচ্চারণই করছেন না।  সোজা কথায় ও’নিল দেখা যাচ্ছে তাঁর নিজ কথা আর কাজের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। তিনি কেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা বাইডেনের নীতির সমর্থক হচ্ছেন এর কোন কারণও বলছেন না। এমনকি তিনি যে সমর্থক তা পাঠক যেন বুঝবে না বলে ধরে নিয়েছেন!

    সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, বাইডেনের হাতে এখন আরো ছয় মাস আরামে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ আছে। মানে, যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যাবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অথচ ও’নিল এটাকে কোনো ফ্যাক্টর মনে করছেন না!! তার এ অবস্থানের মধ্যে ওয়াল স্ট্রিটের কোনো স্বার্থ কিভাবে লুকিয়ে আছে? তিনি নিশ্চুপ!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২১ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জিম ও’নিল : যে নায়ক এখন ভিলেন!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন বন্ড’

    শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’

    গৌতম দাস

    ১৬ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46k

    Sri Lanka To Default on Dollar Bonds.  GOTA GOTA YOU FAILED!  GOTA GOTA YOU FAILED!

     

    উপরের প্রথম ছবিটা বিবিসির এক ভিডিওও ক্লিপ রিপোর্ট থেকে নেয়া। যেখানে নারী বিক্ষোভকারিরা শ্লোগান তুলছে GOTA মানে “প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া – তুমি ব্যর্থ!”   শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া, তাঁর সরকার পরিচালনা বা ম্যানেজমেন্ট চরমভাবে ফেল করেছে। এক কথায় বললে তা মূলত ‘ইকোনমিক মিসম্যানেজমেন্ট’-এর কারণে। বাংলায় বলা যায়, অর্থনীতি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক দ্রুটি ও ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে এখানে। আর এতে এর ইমপ্যাক্ট মানে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এর যা প্রভাব সেটা কড়া মানসিক আঘাতের পর্যায়ের! কিন্তু কেন মানসিক অবস্থার দিকটা এত গুরুত্ব দিচ্ছি?

    সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন মানেই সবসময় তা একটি স্ট্রাগল; এক নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্যে থাকে এমন জীবন। সমাজের যত নিচের বর্গে মানুষে লড়াই ততই যেন নির্মম সে লড়াই! কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে এটাই এক প্রধান ও মারাত্মক প্রসঙ্গ! কেন?

    মানুষ তার জীবন-সংগ্রামের লড়াইগুলো কী হাসিমুখেই লড়তে পারে?? এটাই হচ্ছে মূখ্য প্রশ্ন! মানুষ অবশ্যই হাসিমুখেই তা লড়তের পারে কিন্তু কেবল এক শর্তে; সেটা হল এই যে, তাঁর এই লড়াকু জীবনের একটি শেষ আছে, এর অবসান আছে এবং তাহতে পারে এমন আশা আছে, ভবিষ্যৎ আছে – এই ইঙ্গিত চলতি লড়াকু জীবনে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। অর্থাৎ কষ্টকর জীবন-সংগ্রামে আশা আছে কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা? নাকি কোন শেষ নাই ফলে ভবিষ্যতই নাই – এমন নয় তো!!! একদিন এই কষ্টকর জীবন শেষ হবে এক নয়া ভোর আসবে – এটুকু দেখতে পেলেও কেবল মানুষ সব কষ্টের জীবন বাইতে রাজি থেকে যায় – না থাকলে অবশ্যই আত্মহত্যার কথা ভাববে! এমনকি চরম কষ্টের জীবন যার আরেক বটম লাইন হল, নিজ প্রজন্ম তো গেছেই – লড়তে লড়তেই এটা শেষ হয়ে যাবে দেখা যাচ্ছে; মানুষ নিজের সেই জীবন ও প্রজন্মও বাজি ধরে লড়তে লড়তেই শেষ করে ফেলতেও রাজি হয় – কিন্তু কেবল এক শর্তে। সেটা হল, এই নিজ প্রজন্ম বিলিয়ে দেয়ার বিনিময়ে হলেও যেন তার পরের প্রজন্ম থেকে, মানে নিজ সন্তানদের প্রজন্ম থেকে তাদের যেন আর অন্তত আর না খেয়ে থাকতে হয়। এই হলো সেই ন্যূনতম আশা; আর এটাকেই সে নিজ লড়াকু জীবনের ভবিষ্যৎ আছে বলে মানে। ইংরেজিতে এটাকে সাবসিস্টেন্স লেভেল [subsistence level] মানে কেবল বেঁচে থাকা ও অস্তিত্ব ধরে রাখার লড়াই হিসেবে দেখা হয়; অর্থাৎ ন্যূনতম অস্তিত্ব ধরে থাকতে পারবে, এ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আর অন্তত এটা ক্রমশ ভালর দিকে পরিবর্তিত হতেই হবে – এটাই সেই প্রণোদনা বা এই বোঝাবুঝির মৌলিক-বুঝ। নিম্নবর্গের মানুষকে এ নিশ্চয়তাটুকু দিতে হয়, এই আশার বাতিটুকু যেন না নিভিয়ে দেয়া হয় সে দিকে রাজনীতি ও সরকারকে খেয়াল রাখতে হয় – এটাই সাধারণ মানুষের এজীবন সমাপ্ত করে এথেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ। সেটাই  একটা ন্যূনতম বুদ্ধিমান সরকারের লক্ষণ যে এদিকটা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল এবং বাস্তব বোধবুদ্ধিসম্পন্ন! তাই নিচের ছবিতে আমরা দেখব এই মেয়েতা বলছে আজ আমার জীবনের আর কোন কোন ভবিষ্যত নাই [……at this point I don’t see any future]। অর্থাৎ যেন আত্মহত্যার পুর্বাবস্থায় পৌছে গিয়েছে তরুণী মেয়েটা! তাঁর পুরা বক্তব্য হল,

    “As a young person may be about seven months ago, I would have said I have a future here but at this point I don’t see any future here” – নিচের ছবির তরুণী মেয়েটার বক্তব্য এটা। যারা ভিডিওও লিঙ্ক চান, এখানে খুলে দেখতে পারেন। 


    দুঃখের বিষয়, শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার সরকার এই ন্যূনতম যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। তাই নিজেই হেরে গেছেন। আর এতে স্বভাবতই ফলাফলে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষকেও তাদের নিজ নিজ জীবন সম্পর্কে পুরোপুরি হতাশ করে দিয়েছে। বেঁচে থেকে জীবন সংগ্রামের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। এ নিয়ে বিবিসির এই শিরোনাম এক টিনএজ তরুণী বলছে, ‘আমি অল্পবয়সী তবু এখন এখানে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখি না।’ অথবা রান্নার গ্যাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো মানুষ হঠাৎ আর্তনাদ করে বলছে, ‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের চাইলে বাঁচাতে পারে।’ এসবই হল – জীবনের আশার বাতি নিভিয়ে দেয়ায়  কঠিন সব খেদোক্তি!!

    এই হলো এখনকার শ্রীলঙ্কান জীবনের সাধারণ ও কঠোর বাস্তবতা! গত সোমবার ৯ মে এর সারা দিনে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত গণসন্তোষ-বিক্ষোভে এক সিটিং সরকারি এমপিসহ মোট আটজন নিহত হলেন। সিএনএনের ভাষ্যমতে, ৩৮ জন রাজনীতিবিদের বাড়ি তারা পুড়িয়ে দিয়েছে। আর স্থানীয় লাইভ টেলিভিশনে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে যে, ‘সরকারি দলের সংগঠিত গুণ্ডারা লাঠিসোটা আর বুলেটের অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাজধানীর কয়েকটি স্থানে প্রথমে চড়াও হয়েছিল। সরকারের অনুমান ছিল, এসব বিক্ষোভ শক্তহাতে দমন না করে সামলালে তাদের জন্য বিপদ হবে। কিন্তু এতেই ঘটনা ঘটে উল্টা অর্থাৎ সরকার যে মানুষের জীবনের সব আশা কেড়ে নিয়েছে, এসব দিকে সরকারের খেয়াল ছিল না। আর এতেই আরো বিক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষেরা প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি নেতাদের বাসায় বাসায় গিয়ে হামলা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসা ছেড়ে এক নৌঘাঁটিতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। আর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের করার চেষ্টা করেন।

    তামিল-সিংহলি দ্বন্দ্বঃ
    শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক বড় দীর্ঘ দিনের অসন্তোষের ইস্যু হল, দেশের প্রধান এথনিক জনগোষ্ঠী সিংহলিদের সাথে জনসংখ্যার প্রায় ১৮%  [২০১২ সালের সরকারি গণনার হিসাবে, যা বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে তবে ১৯৮১ সালের হিসাবে যা ১৫% ছিল]। এই তামিল এথনিক জনগোষ্ঠী যাদের প্রায় ১১% শ্রীলঙ্কার স্থানিয় আর বাকিরা ভারত থেকে মাইগ্রেটেড তামিল।   স্থানীয়ভাবে তামিলেরা  মূলত শ্রীলঙ্কার উত্তরে ও পুবে বসবাস করে। মনে করা হয়, যারা মাইগ্রেটেড ব্রিটিশ আমলে এরা চাবাগান ইত্যাদিতে অগ্রসর ও দক্ষ শ্রমিক বলে তাদের ভারতের তামিলনাড় (পুরানা মাদ্রাজ) – থেকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলেও  তামিলনাড়–র থেকে আসা তামিলরা স্থায়ী হয়ে শ্রীলঙ্কায় থেকে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সিংহলিদের সাথে চেয়ে তামিলদের সাথে নাগরিকবৈষম্য বেড়ে গেলে সশস্ত্র রাজনীতির এলটিটিই [LTTE] গোষ্ঠীর জন্ম হয়। কিন্তু লম্বা ২৬ বছরেও কোনো আপস-সমাধান না আসায় বা অনেকের চোখে এ আন্দোলন সশস্ত্রতাতেই থেকে যাওয়ার আগ্রহ সীমাহীন ছিল বলে এটা কোনো সমাধানের চেয়ে যেন আজীবন সঙ্ঘাত চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত তৈরি করেছিল। ফলাফলে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনী সশস্ত্র বলপ্রয়োগে আক্রমণ শুরু করলে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছারখার হয়ে যায়। আর সেটা ছিল মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারের আমল। তাই অনেক মনে করেন, সেই থেকে জাতিবাদী বীরের অহং তৈরি হয়েছিল মহেন্দ্র রাজাপাকসের পরিবারকে কেন্দ্র করে। যেমন এখন যিনি শ্রীলঙ্কা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে তিনি পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র-এর আপন ছোট ভাই। এই পরিবারের মহেন্দ্র-ই প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ২০০৯ সালে, যার বাবা কেবল একজন এমপি ছিলেন।   আর পরে এভাবে ২০১৯ সাল থেকে  নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন মাহিন্দার ছোটভাই গোটাবায়া। আর এরপর থেকে আস্তে আস্তে তাঁর সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের অন্তত ২০ জন সদস্য মন্ত্রী বা এমপি হয়ে নানা পদে জড়িয়ে ছিলেন। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কান রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি, তা অনুমান করা কঠিন নয়; যদিও এদিকটা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবিসির এক রিপোর্টের শিরোনাম হলঃ  শ্রীলঙ্কার সঙ্কট : যুদ্ধবিজয়ী বীরেরা কী করে ভিলেন হয়ে গেলেন [Sri Lanka crisis: How war heroes became villains]??

    এখান থেকে আরেকটু অনুসিদ্ধান্ত টানা যাক। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা গণ-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করার পরে আগেই উঠা প্রেসিডেন্ট ও ছোট ভাই গোটাবায়ার পদত্যাগের পাবলিক ডিম্যান্ড বা দাবি এখন আরো জোরদার হয়েছে। এরই মধ্যে গোটাবায়া তাদের দলীয়, আগে পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। যদিও তিনি বিরোধী দলীয়  এখন এক এমপি মাত্র ছিলেন কিন্তু তাকে রাজাপক্ষে পরিবারের ঘনিষ্ট মনে করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হয়েই বিবিসিকে তিনি বলেছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে গেছে [……PM described the Sri Lankan economy as “broken]। তাই তিনি পাবলিকের কাছে আহবান রেখেছেন “ধৈর্য ধরতে, তিনি সব কিছু ভালো জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন” [“be patient, I will bring things back”.]”। কিন্তু তিনি কি সেই সুযোগ পাবেন?

    ওই সাক্ষাৎকারে তিনি কোনো আশা জাগাতে পারেননি। নিজেই এমন শঙ্কা ব্যক্তও করেছেন। বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক অবস্থা আবার ভালো হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই না আরো বেশি খারাপ হয়ে যায়” […… misery and unrest is “going to get worse before it gets better”.]”। এরই প্রতিধ্বনি যেন পাবলিক ডিম্যান্ডে যে গোটাবায়াকেও পদত্যাগ করতে হবে।

    শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বাস্তব অবস্থাটা কীঃ
    এক কথায় এর জবাব, এই অর্থনীতির এক ব্যাপক সংস্কার করতে হবে এবং কমবেশি সবাই মানেন যে, আইএমএফের [IMF] হাতেই এই সংস্কার হলেই ভাল। অনেক এটাকে নয়া ঋণ গ্রহণের সাথে পরিশোধেরও কাঠামোতে বদল আনা বলছেন। এক পেছনে মূল কারণ হল, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (প্রধান পণ্য উৎপাদন চা-সহ) কোম্পানিগুলোর বড় একটা অংশ বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানায়। মানে পুরানা দিন থেকেই স্থানীয় ব্যবসায় বিদেশী নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। সোজা কথায় এতে অর্থনীতির বৈশিষ্ঠ হবে – শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে প্রডাকটিভ ক্যাপিটালের (উতপাদক পুঁজি) চেয়ে বিনিয়োগ ক্যাপিটালের ()ইনভেস্টমেন্ট বা সুদী পুঁজির) ভুমিকা ও এর প্রভাব অনেক বেশি ও তা ডমিনেটিং হয়ে আছে। এছাড়া এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক বড় ফ্যাক্টর – সভরেন বন্ড [Sovereign Bond] !!

    সভরেন বন্ড কীঃ
    ইংরেজি সভরেন [sovereign] শব্দের আক্ষরিক অর্থ সার্বভৌম। কিন্তু অর্থনীতিতে সভরেন শব্দ ব্যবহার হয় একটু ভিন্ন অর্থে। এখানে সভরেন মানে ‘রাষ্ট্র নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছে’ এ ধরনের। কিন্তু ঠিক কিসের গ্যারান্টি? সে প্রসঙ্গে যাবো।

    সাধারণত ‘বন্ড’ বলতে তা সরকারি সিল-ছাপ্পড় মারা এবং যা এক কাগুজে “নোট” [note] লিখে দেয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর এই শব্দের মূল অর্থ একটা নোট লিখে দিয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়া।  কিন্তু সভরেন বন্ড, একসাথে শব্দদুটা কথার মানে হল, কেউ নিজ অর্থ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের সভরেন বন্ড কিনতে পারে। এর বিশেষত্ব হলো এর ম্যাচুরিটি মানে পাঁচ বছরের বন্ড হলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া শেষে এর সুদসহ আসল অর্থটা ঐ রাষ্ট্র বন্ড ক্রেতাকে ফেরত দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আর স্বভাবতই এই সভরেন বন্ডের বেলায়, এটা কোনো ব্যক্তি বা প্রাইভেট কোম্পানির ইস্যুকৃত ও বিক্রি করা কোন বন্ডে দেয়া গ্যারান্টির চেয়ে খোদ রাষ্ট্রের নিজের দেয়া গ্যারান্টির ওজন ও আস্থা পাবলিকের কাছে অনেক বেশিই হবে।

    এই বিচারে কোনো সরকারের ইস্যু করা ‘ডলার সভরেন বন্ড’ (International Sovereign Bond – ISB) মানে, বৈধ আমেরিকান ডলার খরচ করে যে বন্ড কিনতে হবে – এমন বন্ড (ইস্যু করে) ছেড়ে সরকার নিজ প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড়ের এক সহজ উপায় বলে একালে মনে করা হয়। যদিও এটা অনেক রিস্কি একটা পদক্ষেপ। তবে এটা আমেরিকার মত বড় ও প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির দেশের বেলায় গ্লোবাল পুঁজিবাজারে আমেরিকান সভরেন বন্ড যথেষ্ট আস্থাবাচক – এক বন্ড কেনা ও বেচার ব্যবস্থা – তা বুঝা যায়। যেমন জাপান ও চীন এদের একেক দেশ, এখন আমেরিকার এমন এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সভরেন বন্ড এখনো কিনে রেখেছে। কিন্তু বলাবাহুল্য বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সরকার যদি অমন সভরেন বন্ড ইস্যু করে থাকে তবে তা একই মাত্রার আস্থাবাচক  বা ওজনদার হবে না।

    তবে বাস্তবে বাংলাদেশ কখনোই এমন সভরেন বন্ড ইস্যু বা চালু করেছে বলে জানা নেই যদিও চলতি সরকারের আমলেই সময়ে এমন কিছু বিক্ষিপ্ত আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর প্রতিশ্রুত সুদাসল  পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকারের অপারগতা। বলে, অনেক ইন্ডিপেনডেন্ট রিপোর্ট অথবা সিএনএন, বিবিসিসহ শ্রীলঙ্কার স্থানীয় মিডিয়াতেই মানা হয় যে, শ্রীলঙ্কান সভরেন বন্ডের সর্বশেষ সুদ ফেরত দেয়ার তারিখ ছিল গত ১২ এপ্রিল ২০২২।

    কিন্তু  শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর দেয়া প্রতিশ্রুত সুদাসল পরিশোধে শ্রীলঙ্কান অর্থনীতির  অপারগতা!

    সরকার নিজেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে তারা এই অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে; পারছে না – রেডি নয় বলে অপারগতা জানায়। আর তখন থেকে গ্লোবাল পুঁজি বাজারে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ও সরকার ডুবে যাচ্ছে এখবর আর লুকানো না থেকে চাউর হয়ে যায়। তবে এসব কথা কেবল গত এপ্রিল ২০২২ এর নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসেও একইভাবে (ISB) এর পাওনা পরিশোধ করতে শ্রীলঙ্কা সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও তখন শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি যে সংকটের কথা স্বীকার করা হয় নাই।এনিয়ে তখনকার আলজাজিরার রিপোর্ট এখানে।

    The government is due to make a $36 million interest payment on a 2023 dollar bond April 18, as well as $42.2 million on a 2028 note, Bloomberg-compiled data show. A $1 billion sovereign bond was maturing July 25.

    এটা ছিল ভারতের এক মিডিয়া  বিজনেস স্টান্ডার্ড এর রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু অংশ।
    আর সেবার এপ্রিলের ব্যর্থতায় আরো বলা হয়েছিল জরুরি খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ ইত্যাদি আমদানির অর্থ না থাকাতে তারা তখনই আর নিজ বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার খালি করতে চাইছেন না। কিন্তু কার্যত এটা দাঁড়িয়ে যায় যে, সরকার একদিকে আইএসবি বন্ডের পাওনা শোধ করেনি আবার প্রয়োজনীয় জরুরি দ্রব্যাদিও সব আমদানি করতে পারেনি। ফলে জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও খাদ্যশস্য এমনকি স্কুলের পড়ালেখার কাগজ ও ওষুধও পর্যাপ্ত আমদানি করতে পারেনি বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে। মুল কারণ চাহিদার তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রা ছিল অনেক কম।  আর একবার এমন সাপ্লাইয়ের অভাবের কথা বাজারে রটে গেলে আমদানি-সাপ্লাই দ্বিগুণ করেও বাজার থিতুতে আনা যায় না। কালোবাজারি-মজুতদারি হয়ে যায় বাজারের মূল ফেনোমেনা। আর এথেকেই সেটাই শ্রীলঙ্কার সমাজ ও অর্থনীতিতে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠার অবস্থা সৃষ্টি করেছিল।

    বৈদেশিক বন্ড বা ISB প্রসঙ্গে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমাদের মত দেশে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক বা চীনা বা অন্য কোনো দেশের ঋণ নেয়ার চেয়ে ISB  ইস্যু করে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ডলার জোগাড় করা – এদুটার মধ্যে কোনটা ভাল? অথবা দুটোর ভালো-মন্দ কী? বিশেষজ্ঞরা আমাদের মত দেশের বেলায় বন্ড বা ISB ইস্যু করাকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, তুলনায় অবকাঠামো (বিশ্বব্যাংক বা চীনের মতো দেশ থেকে) ঋণ নেয়াকে ভাল মনে করে। এর পিছনের কারণ বলা হয়, অবকাঠামো প্রকল্প বাজেটে বরাদ্দ (ডলার মুল্যে) যেসব অর্থ অন্তত স্থানীয়ভাবে কিনতে বা ব্যয় করতে হবে; যেমন, স্থানীয় শ্রম কিনতে হবে হয়ত অথবা সিমেন্ট বা রড ধরনের কাঁচামাল ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য বা প্রকল্পের জন্য একোয়ার [acquire] করা জমির মূল্য পরিশোধ – এসবের তুল্য সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যা বাজেটে বরাদ্দ থাকে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রাপ্ত  স্থানীয় মুদ্রা ওই প্রকল্প নিজ অ্যাকাউন্টে তা জমা করে নেয়। এরপর সেখান থেকে ঐ টাকা স্থনীয় ক্রয়ে ব্যয় করা হয়। এতে ব্যয়িত ঐ বৈদেশিক মুদ্রাকে রাষ্ট্রের অর্থনীতি রাষ্ট্রের  বৈদেশিক মুদ্আরা আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকে। আর তুলনায় বন্ড- ISB ইস্যু করে বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করলে তা সুদসহ আসল এর সবটাই আবার ডলারে ফিরে পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে বন্ড- ISB ইস্যুর চেয়ে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে প্রকল্প উৎসাহের বিষয় বলে গণ্য করা হয়। দেখা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কা এসব বাছবিচার বিবেচনাকে আমল না করে এগিয়ে চলতে গিয়ে বন্ড- ISB ইস্যু করা অনেক সহজ কাজ মনে করতে গিয়ে আজ বিপদে পড়েছে! এটা অবশ্যই বেপরোয়া আচরণ!

    আসলে যারা বন্ড- ISB কিনেছিলেন তাদেরকে প্রদেয় এপ্রিল ২০২২ এর কিস্তির অর্থ দিতে ব্যর্থতা ছিল সবচেয়ে বড় ঘন্টা বেজে যাওয়া যে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি বিশাল সংকটে পড়ে গেছে। অথচ এথেকে দেশকে বের করার মত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে গোটাবায়া সরকার ছিল ততোধিক উদাসীন। যেন সরকার আরামে অপেক্ষা করছিল যেন এক মিরাকল ঘটবে আর অর্থনীতির এই মারাত্মক সংকট মুহুর্তেই সমাধান হয়ে যাবে। অথচ ব্যাপারটা মোটেই তা ছিল না। ফলে সরকার এসব সংকটকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে নাই বা সংকটটারই গুরুত্ব আমল করতে সক্ষম ও যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। আর এটাই মূল ব্যর্থতা।

    সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে এথেকে উদ্ধার পেতে গেলে সেই সমাধানের ব্যাপারে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর গ্লোবাল বাজারের আস্থা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি মনে করা হয়। যেমন গত ফেব্রুয়ারি থেকেই শ্রীলঙ্কান অর্থনৈতিক রেটিংয়ের ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এমন অন্তত দু’টি প্রতিষ্ঠান শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে খারাপ রেটিং দেয় বা রেটিং নামিয়ে দিয়েছিল। এর সোজা ফলাফল হল, বিদেশীরা এই রেটিং দেখেই কিন্তু বন্ড-ISB  বা কোনো দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে আসে। এসব কারণে, যখন গ্লোবাল বাজার দেখে যে, একটা দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটে ফাইনালি আইএমএফ এসে ঐ দেশকে উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করছে কীনা??? এটাই গ্লোবাল পুঁজি বাজারে সবার কাছে এক আস্থার চিহ্ন ছড়িয়ে দেয়। অতএব, সে কারণেই সবাই এখন তাকিয়ে আছে আইএমএফের সাথে শ্রীলঙ্কা সরকারের যে কথা-নেগোশিয়েশন চলছে গত ফেব্রুয়ারি থেকে, তা কবে এথেকে তা একটা চুক্তিতে তা পরিণতি ও সম্পন্ন হতে সমর্থ হয়!!  যার ব্যবহারিক অর্থ, শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি উদ্ধারে আইএমএফ তার কাজ শুরু করে!

    উপরে যে সভরেন বন্ডের কথা বললাম, যা পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকার এখন বিনিয়োগকারিদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারি [defaulter] হয়ে আছে – এই অর্থ পরিশোধ করবে কী করে? কার থেকে আবার অর্থ ঋণ করে এনে? এই বাস্তবতাটা এতই কঠিন যে একমাত্র আইএমএফ-ই [IMF] হতে পারে সেই সম্ভাব্য উতস।  এক রিপোর্ট ধারণা দিচ্ছে যে শ্রীলঙ্কাকে এক্ষণি পরিশোধ করতে হবে এমন অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার [……Sri Lanka’s external debt servicing obligations were thought to be over USD 6 billion.]।  আর এত বিশাল পরিমাণ অর্থ একমাত্র  আইএমএফ-ই যোগাতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা বাজারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে!

    যদিও এসবের মধ্যে আরেক বড় জটিলতা হল, ঐ দেশের চলতি রাজনৈতিক অবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া, তাঁরও পদত্যাগ বিনা কোন নুন্যতম রাজনৈতিক স্থিরতা আসছে না। যার অর্থ আইএমএফ তা হলে কি পরবর্তি নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে? সোজা কথা, গোতাবায়া যতই নিজের পদত্যাগে দেরি করবেন ততই আইএমএফ সংস্কার কাজে নামতেই দেরি করবে! বলাবাহুল্য এর মানে শ্রীলঙ্কা আরো দীর্ঘসময় ধরে চলবে চরম বিশৃঙ্খলা!! অথচ ঘটনা সে দিকেই যাচ্ছে। একদিকে বাজারে খবর হল, নতুন শপথ নেয়া প্রধানমন্ত্রী রনিলকে গোতাবায়ার লোক মনে করা হয়। অর্থাৎ তাই দেশের মানুষেরই আস্থা নাই। ফলে এদের সবার পদত্যাগ না দেখলে নয়া রাজনৈতিক ঐক্য আনা ও সংস্কার কার্যকর করতে এগিয়ে আসা সব পিছিয়ে অনিশ্চিত হয়ে যেতে থাকবে!!!।

    চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার কী খবরঃ
    শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থা নিয়ে যেসব সিরিয়াস মিডিয়া রিপোর্ট করছে এদের মধ্যে যেমন ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা বিজনেস স্টান্ডার্ড ইত্যাদি আছে – সব মিলিয়ে এরা কেউই এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্য শ্রীলঙ্কা ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ পড়েছে বলে কোন কারণ দেখায় নাই। মানে এসব মিথ্যা তথ্যের প্রপাগান্ডা করেনি। বরং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা ব্যাখ্যামূলক [Explained] রিপোর্ট করেছে। এখানে দেখেন,……Explained: What led to Sri Lanka’s economic crisis, and who’s is helping?। তাতে স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণের (সেটা নাকি ৫১ বিলিয়ন ডলার বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে – Sri Lanka announces default on all of its $51 billion external debt )। কিন্তু এই কথাটা সবটা সত্য না। ৫১ বিলিয়ন ডলার – এটা সবটাই প্রতিশ্রুতি ফেল করা ঋণ যেটাক্বে ডিফল্টার (default) বলে টঝিক তা না। একটা দেশের নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণ আর  সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডলার যোগাড় একই জিনিষ নয়। মূলত সভরেন বন্ড জিনিষটা ঋণ নেয়াই নয়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বা চীন জাপান থেকে নেয়া ঋণের বেলায় সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে পারার পরিণতি হল – পুনরায় পরিশোধের সময় দেয়া [রিসিডিউল বা reshedule] তবে সাথে আরো কিছু কড়া শর্তে। কিন্তু ডিফল্টার করে বাজারে খবর রটিয়ে ঐদেশের রেটিং বা অর্থনীতির মান ফেলে দিয়ে নয়।  আর সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি ফেল করা অন্য জিনিষ। এখানে রিসিডিউলের কিছু নাই। যতদ্রুত সম্ভব সব পাওনা দেরির সুদ-সহ পরিশোধ করা। নইলে গ্লোবাল পুঁজি বাজারের বদনামে রেটিং আরো নিচে নেমে না দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়।
    কিন্তু এই ৫১ বিলিয়ন ঋণ দেখানো এটা সবটাই সভরেন বন্ডের ডিফল্টার বা প্রতিশ্রুতির অর্থ নয়। এটা শ্রীলঙ্কার পরিশোধযোগ্য মোট বৈদেশিক দায়। দায় মানেই তা ঋণ নয়। আর এই মোট ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের হল সভরেন বন্ড-ISB ইস্যু করে নেয়া বৈদেশিক দায়। তাই টাইমস অব ইন্ডিয়া পরোক্ষে এমন মানে করে রেখেছে (যেটা আসলে একটা প্রপাগান্ডা) যেন এই ৫১ বিলিয়ন ডলারের পুরোটার ওপর ডিফল্টার হওয়াতেই যেন শ্রীলঙ্কার ক্রাইসিস। এ কথা সত্য নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, বন্ডের ক্রেতার দায় মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের আর এসব বন্ড যারা কিনেছে এরা হলো প্রধানত জাপান, চীন ও এডিবি সাথে কিছু খুচরা বিনিয়োগকারী [ISBs make up the largest share of Sri Lanka’s foreign debt at $12.55 billion, with the Asian Development Bank, Japan and China among the other major lenders.]।

    এর সোজা মানে হল, চীনের কোনো ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদে পড়ার গল্প এটি নয়। এটা সোজাসাপ্টা বন্ড-আইএসবি ইস্যু করার বাজার থেকে অর্থ তুলে আনার বোকামি, এটাই মিস-ম্যানেজমেন্ট এবং বন্ড ক্রেতাদের কিস্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতায় বাজারে খারাপ ইমেজ আর খারাপ অর্থনীতি আর তা মিস-ম্যানেজ বা ভুল পরিচালনাজনিত সমস্যা।

    কিন্তু তবুও ভারতেরই আরেক দল মিডিয়া (যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম আলো বা নিউএজ যারা হয়ত না বুঝে প্রপাগান্ডার শিকার) – এরা শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকটকে চীনের ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদ বলে পুরোনা স্টাইলের প্রপাগান্ডার মধ্যে এখনো আছে ও চালিয়ে যাচ্ছে। আর এদের মিথ্যা প্রপাগান্ডার ভিত্তি এএফপির নামে চালানো এক রিপোর্ট। যে একই রিপোর্ট টাইমস অব ইন্ডিয়া,  ভারতের   এনডিটিভি,     আমাদের প্রথম আলোর অনুবাদ আর নিউ এজ সহ আরো অনেকে তুলে এনেছে। মজার কথা হল শিরোনাম এবং খবরের একই সোর্স হলেও তাতে ভিতরে বডিতে কনটেন্ট সবার এক না।   আর এদের সবার মধ্যে কেবল এনডিটিভি একটা ডিসক্লেমার জুড়ে দিয়ে শেষে জানিয়েছে (This story has not been edited by NDTV staff and is auto-generated from a syndicated feed.)।অর্থাৎ তারা কোন শব্দও এতে ঢুকায় নাই।

    এ ছাড়া একই প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে ভারতের আইপি টিভি (প্রথম কলকাতা) বা সোশ্যাল মিডিয়া টিভি অথবা ফেসবুক ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি, এসব জায়গায় গেঁথে বসা প্রপাগান্ডা ধারণাটা হল, সেই পুরানা গল্প – চীনা ঋণের কারণেই শ্রীলঙ্কা অর্থনীতির আজ এ দুর্গতি। অথচ এটা ভিত্তিহীন।
    আর সবচেয়ে বড় কথা, ওই হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরের মালিকই এখন আর শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। তাই ওটা নির্মাণের ব্যয় পরিশোধের কোনো দায় বা ঋণের বোঝা শ্রীলঙ্কান সরকারের নয় ও নাই। সোজা কথায়,  এখন বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। ওর মালিক এখন চীনের এক প্রাইভেট কোম্পানি যারা বন্দর চালিয়ে নিজের আয় থেকে দায় তুলে নেবে ও নিচ্ছে। ফলে ওই বন্দর নির্মাণ খাতের কোনো ঋণ শ্রীলঙ্কা সরকারকে বইতে হচ্ছে না ও নাই; ওই বালাই-ই নেই এই হলো বাস্তবতা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৪ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জীবনের ভবিষ্যৎ আছে, এ আশা কেড়ে নিতে নেই“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

    –

     

  • সভ্যতা মানে কী

    সভ্যতা মানে কী
    সিন্ধু সভ্যতাঃ এই প্রেক্ষিতে

    গৌতম দাস
    ১২ মে, ২০২২  ১৪ঃ৫২ বৃহস্পতিবার

    https://wp.me/p1sCvy-44A

    দ্বিতীয় পর্ব পেতে এখানে https://wp.me/p1sCvy-47s

     

    Machu Picchu is an ancient city from the Inca civilization.

    Ancient ruins of Karnak temple in Luxor. Egypt. Image credit: Zbigniew Guzowski/Shutterstock.com

    দুনিয়াতে একেকজন মানুষ বিচ্ছিন্ন কেউ নয়, বিচ্ছিন্নভাবে একা একা তারা আসেনি বা দুনিয়াতে বসবাস শুরু করে নাই। দল বা গোষ্ঠিবদ্ধ ভাবে এসেছিল। জৈবপ্রাণ প্রজাতির টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত হিসাবে শুরুতেই এক পর্যায়ে তাদের হাজিরা হয়ে ইঠেছিল দলবদ্ধ, একথা বলা যায়। কারণ জৈবপ্রাণ প্রজাতিগুলো দুনিয়াতে টিকে যাওয়ার পিছনে এটা একটা গুরুত্বপুর্ণ শর্ত কাজ করেছে বলে অনুমান করা যায়। এছাড়া দুনিয়ায় সবকালেই  মানুষের উপস্থিতির যতগুলো রূপ-ধরণ আমরা এখন পর্যন্ত দেখি তাতে সবকালেই মানুষ মাত্রই তারা যৌথ মানে, তাকে দল বা গোষ্ঠিবদ্ধ ভাবেই দেখি। অর্থাৎ মানুষ একা জন্মায় হয়ত ঠিকই কিন্তু জন্মানোর পর থেকে বসবাস তার গোষ্ঠিবদ্ধতায় অথবা সেই থেকে গোষ্ঠির ভিতরেই তার সব প্রজন্ম ও তাদের বড় হওয়া ঘটেছে দেখি আমরা। তবে কথাটা এভাবে বলায় অন্য এক  লক্ষ্যণীয় দিক হল এখানে ব্যাপারটাকে পেশ করবার চেষ্টাটা হল দুনিয়াতে একেবারে শুরুর দিক থেকে মানুষ প্রজাতির কবে কখন এসেছে বা যুক্ত হয়েছে সেদিক থেকে কথা বলবার চেষ্টা করা হল।

    তা সত্বেও এভাবে “শুরু” থেকে বলার অসুবিধা হল, এক্ষেত্রে বেশিরভাগ তথ্যই কোন প্রমাণিত উৎস থেকে সংগ্রহ করা সহজ নয়। যদিও ইন্টারনেটের যুগে অনেক কিছুই আমাদের কাছে এখন লেখাপড়া বা স্টাডির জন্য সহজ লভ্য হয়ে উঠেছে। তবু অনেক উৎস আমাদের এখনও নাগালে নাই।

    এছাড়া এক্ষেত্রে আর সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল এরপরেও মানুষের ইতিহাসের সব মানুষের জানা হয়ে গেছে, খুঁড়ে দেখা ও খোঁজাখুজি করা হয়ে গেছে আবার পাওয়াও গেছে ব্যাপারটা তা তো নয়। ফলে  বহু প্রসঙ্গই একেবারেই অজানা বা জানার মাঝেও অনেক অজানা পকেট বা ফাঁকা থেকে গেছে হয়ত।  এমনটাই স্বাভাবিক।

    লিখিত ইতিহাসঃ
    মূল কারণ হিসাবে বলা যায়, আমরা যে আদি মানব রূপ নিয়ে কথা তুলেছি এসব ঘটনা প্রসঙ্গগুলো হল কমপক্ষে কয়েক মিলিয়ন (এক মিলিয়ন মানে দশ লাখ) বছর আগের ঘটনা [One of the earliest known humans is Homo habilis, or “handy man,” who lived about 2.4 million to 1.4 million years ago in Eastern and Southern Africa.]। আবার অন্যদিকে,  যেমন দুনিয়ায় মানুষ-সহ অনেক জৈবপ্রাণ প্রজাতি আছে। এর মধ্য মানুষ এই প্রজাতির বয়স ধরা হয় (গুগলের বিচারে)  যতগুলো তত্বগত ধারণা আছে এর কোনটাই দুই লাখ বছরের কম না। কাজেই এমন প্রসঙ্গের সব তথ্য সহজ লভ্য হবার কোনই কারণ নাই। এটাই স্বাভাবিক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায় একালে আমাদের জানা আছে ততটুকুই যখন থেকে কিছু  লিখিত ইতিহাস আছে। তাহলে লিখিত ইতিহাস কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।

    তবে তাহলে আবার আরেকটা কথা এসে গেল যে  যদি লিখিত ইতিহাসের কথা ধরে বলি, লিখিত ইতিহাস? এর মানে কী বুঝব? যখন থেকে ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে? তা বলতে পারি হয়ত তবে তাও একেবারেই এত সহজ কথা নয়। কেন?
    যেমন শুধু ‘লিখিত’ শব্দটার অর্থ প্রচলিত বা চালু হওয়ার আগেই অন্তত কয়েক হাজার হাজার বছরের মনুষ্য-জীবন এবং তা দলবদ্ধ  ধরণের বিশেষ জীবন পার হয়ে যেতে হয়েছে। মানেই এর আগে বহু বহু কিছু ঘটে যেতে হয়েছে এবং তা অবশ্যই আবার কয়েক হাজার বছরের ফেকড়া। কেমন সেটা?

    সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনঃ
    বড় হেড লাইনে বললে, একটা নতুন শব্দ এই আসরে আনব – শব্দটা হল সভ্যতা।  সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন (civilization) যখন থেকে শুরু। অর্থাৎ দুনিয়াতে অন্য অনেক জৈবপ্রাণ প্রজাতির মত মনুষ্য-প্রজাতির আগমন – এটা একটা কয়েক লক্ষ বছরের পুরানা ঘটনা। কিন্তু তা সত্বেও অপর আর একটা  রেফারেন্সের দিক থেকে আমরা কথা বলতে অভ্যস্ত – সেটাই “সভ্যতার” রেফারেন্সে কথা বলা। এই সভ্যতা মানে কী? শারারণভাবে বললে,  তখন কথাটা এভাবে বলা যায় যে যেখানে  মানুষের খোঁজ পাওয়া যায় এমন পুরানা সভ্যতাগুলোও মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরানা। এছাড়াও কথাটা এভাবে সম্ভবত বলা যায় যে সব মানুষের জনগোষ্ঠিই কোন না কোন এক সভ্যতার অংশ; যেমন এই বিচারে আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ।
    আর সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, উপরে যে লিখিত ইতিহাসের কথা বলছি সেটা ঘটেছিল কেবল ‘মানুষের সভ্যতা’ শুরুর পরেই। এটাই এর অপরিহার্য শর্ত, তা বলা যেতে পারে। তাহলে আবার ফিরে প্রশ্ন থেকে গেল যে সভ্যতা তাহলে কী?
    এর খুবই সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞাটা হল, মানুষ আদি মানব রূপ [homo sapiens] – এভাবে  কয়েক লাখ বছর আগে দুনিয়াতে হাজির হলেও মানুষের কৃষিকাজের জীবন যাপন শুরু বড়জোর ছয় হাজার বছরের বছরের পুরানা। মানুষের কৃষিকাজ শুরু খুবই গুরুত্বপুর্ণ হদিস। কারণ কৃষিকাজ মানে আর যাযাবর জীবন নয়। থিতু হয়ে যেখানে তাঁর চাষের জমি তারই সংলগ্ন হয়ে বসবাস করতে সে বাধ্য হয়েছে। মানুষের এই জোবনের শুরু মাত্র কয়েক হাজার বছরের পুরানা। তুলনায় মানুষের দুনিয়ায় আদি মানব রূপে আগমন হিশাব করতে হয় লাখে।   অর্থাৎ লাখ নয় কয়েক হাজার বছরের আগে যে মানুষের কৃষিকাজ-ভিত্তিক জীবন-যাপন শুরু হয়েছিল এটাকে আমি একেকটা মানুষের সভ্যতার জীবন বলি। এর আরো বিস্তারিত পরে আসবে।

    “লিখিত ইতিহাস” এর আবশ্যিক পুর্বশর্তঃ
    এমনিতে লিখিত ইতিহাস বলতে সেটা আসলে একালে বসে পুরানা ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহ। যদিও আবার ইতিহাস মানে ‘শ্রেফ অতীত প্রসঙ্গে তথ্য সংগ্রহ ও এর সমাহার নয়’। কারণ ইতিহাসের জন্য আরেক বড় অধ্যায় হল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটাই শুধু না, এর শেষে মূলত আত্মসচেতনতার [self-consciousness] জগতে প্রবেশ করা এবং আরো এগিয়ে যাওয়া। চিন্তা যে চিন্তা করে তা জেনে বুঝে যাওয়া। চিন্তারও বিভিন্ন পর্যায়, বিশেষত চিন্তারও যে পদ্ধতি আছে তা সম্যক জানাশুনা করে নেওয়া। এরই প্রথম পর্যায়টা হল  র‍্যাশনালিটি [rationality] মানে যুক্তি-তর্ক করতে শিখে ফেলা – এই অর্জনটা লিখিত ইতিহাসের আগে থাকা জরুরি [essential pre-condition]। মানুষের চিন্তার এই নুন্যতম পর্যায়টা পার হলে তবেই “লিখিত ইতিহাস” সম্ভব হয়। অর্থাৎ কত লাখ বছর আগে মানুষ হোমো সেপিয়ান যুগে তার আদিরূপ ছেড়ে এসেছে সেটা যথেষ্ট নয়; পরবর্তিতে সে তাঁর লম্বা যাযাবর [nomad বা  Pastoral] জীবন ছেড়ে কৃষিকাজের লোভে বা এই নয়া জীবনকে তুলনায় সহজ মনে হওয়াতে কোন মাটিতে থিতু হয়েছিল – সে ঘটনা এই তো মাত্র তিন-ছয় হাজার বছর আগে। এই স্থির হয়ে কোন নিদির্ষ্ট ভুমিতে বসে পড়া আর কৃষিকাজ যেখানে তার পেশা এখান থেকে সভ্যতার শুরু। দুনিয়ায় মানুষের সব সভ্যতাগুলো কমবেশি শুরু হয়েছিল এরপর থেকে এবং তারা পরস্পর পরস্পরকে জানাশুনা না রেখেই বিভিন্ন সময়কালে শুরু হয়েছিল।  এই সভ্যতার জীবনেরই আবার শেষের দিকে মোটামুটি হাজার বছরের অগ্রগতি হল – তবেই মানুষের এই লিখিত ইতিহাসের যুগ প্রবেশ ও পেরোনো। এভাবে শেষে আজকের জায়গায় আসা।
    এসবের পিছনের মূল কারণ, এটা মানুষের চিন্তাজগতের এক বড় অর্জন এবং তার নুন্যতম চিন্তায় পরিপক্ক হওয়া বা ম্যাচিউরিটি [maturity]। এমন ঘটবার পরেই মানুষ পুরানা সেসব সময়কালের কী কী ডকুমেন্ট সংগ্রহ করবে বা রাখবে, সাংস্কৃতিক কী কী চিহ্ন-বৈশিষ্ঠ খুঁজবার ও বুঝবার দিকে নজর-মনোযোগ নিবদ্ধ করবে আর এছাড়া মুখে মুখে মানে, মুখ আর কানে বয়ে চলা প্রজাতি পরম্পরায় ধরে রাখা তথ্যকেও যতটা সম্ভব  “ডকুমেন্ট” করে রাখার কথা ভাববে ইত্যাদি  – কেন গুরুত্বপুর্ণ তা বুঝেছে। অর্থাৎ মানুষের পক্ষে এই গুরুত্ব অনুভব করার যোগ্য হতে হতেই হয়ত আরো হাজার বছর কেটে গেছে। আর পরিস্কার মনে রাখতে হবে মানুষের লিখিত ইতিহাস কেবল অন্তত কোন একটা জনগোষ্ঠির এক সভ্যতার যাত্রা শুরু করতে পেরেছিল কিছু অপরিহার্য শর্ত পূরণের পরেই তা সম্ভব হয়েছিল। অন্যভাবে বললে, নিজের একটা সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনের কোলে কোন জনগোষ্ঠি থিতু হয়ে বসতে পারলে এরও বহু্বছর পরে একটা লিখিত ইতিহাস শুরু হওয়া সম্ভব হয়েছিল।

    সুমেরীয় সভ্যতাঃ
    আগে বলেছি দুনিয়াতে সব সভ্যতা একই সময়ে যাত্রা শুরু করে নাই। অর্থাৎ সভ্যতাগুলো বিভিন্ন সময়কালে যাত্রা শুরু করেছিল এছাড়া সেকালের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে তারা পরস্পরের কাছে অজানাই ছিল। তবুও দুনিয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে  সভ্যতাগুলোর কোনটাই মোটামুটি ছয় হাজার বছরের বেশি বয়সী নয়। এছাড়া আগে বলেছি আমরা বৃহত্তর বাঙালি অর্থে এই এথনিক জনগোষ্ঠি আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ।  আমাদের কাছাকাছি ভুগোলে আরো অনেক সভ্যতার কথা জানা যায়। এদের মধ্যে কাছাকাছি ভুগোলে প্রভাবশালী সভ্যতা হল সুমের সভ্যতা।
    সুমের (Sumer)বা সুমেরীয় সভ্যতা  এর ভৌগলিক অবস্থান হল আজকের ইরাক, কুয়েত ও  অংশত সিরিয়া যেখানে। অন্যভাবে বললে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝের ভুমিতে এই অববাহিকায় গড়ে উঠে সভ্যতা। আর সুমের হল আসলে মেসোপটমীয়া এই সভ্যতা-ভুমির প্রধান নগরের নাম। ফলে অনেক সময় সুমেরীয় সভ্যতাকে মেসোপটমীয় [Mesopotamia] সভ্যতাও বলা হয়।

    এই সভ্যতার বিশেষ এক বৈশিষ্ঠ হল এর লিখিত ইতিহাস বা ইতিহাসের উপাদান এখানে পাওয়া গিয়েছে। ফলে এই সভ্যতার অনেক কিছুই ডকুমেন্টেড।  এর সেই লিখিত ধারার নাম আবার কিউনিওফর্ম (Cuneiform)। এই শব্দের অর্থ বাংলায় গোঁজ বা খুটা (গরু বাধা দড়ির যার প্রান্তে আটকানো থাকে)। ইংরাজিতে (wedge)বা গোঁজ দিয়ে নরম কাঁদামাটির স্লেটের উপর চিহ্ন এঁকে লেখা,যা পরে শুকিয়ে-পুড়িয়ে স্থায়ী করে নেয়া – এই হল এর লেখা ও সংরক্ষণের পদ্ধতি। সেখান থেকে এটা ‘সুমেরীয় কিউনিওফর্ম স্ক্রীপ্ট’ এই নামের এক প্রাচীন লিখিত ইতিহাস রাখার পদ্ধতি বলে পরিচিত আছে।

    আবার মেসোপটমীয়াকে সব সভ্যতার সুতিকাগার বা দোলনাঘর (cradle of civilization) বলা হয়। অর্থাৎ এটা সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা। এছাড়াও, কোথাও সভ্যতা গড়ে উঠতে গেলে যেসব উপাদান সেখানে থাকলে তা গড়ে উঠার জন্য সবচেয়ে সহায়ক বলে মনে করা হয় সে বিচারে  মেসোপটমীয়া সভ্যতা সবার চেয়ে  আগিয়ে মানে তাতে সহায়ক উপাদান সবচেয়ে বেশি ও আদর্শভাবে উপস্থিতি পর্যাপ্ত বা বেশি।

    সেসব উপাদানকে সহায়ক শর্ত ধরা হয় সেপ্রসঙ্গে যাবার আগে কিছু সাধারণ কথা। যেমন সভ্যতা বিষয়ে আমরা কয়েকটা কথা একেবারে মুখস্ত রাখতে পারি। সভ্যতা শব্দটার প্রায় সমান্তরাল আরেকটা শব্দ হল ডমেস্টিক (domestic) বা গৃহপালিত। এটা প্রচলিতভাবে ডোমেস্টিক শব্দটা আমরা ব্যবহারে যেভাবে অভ্যস্ত তার চেয়ে একটু ভিন্ন। কেন?

    মিলিয়ন বছরের মানুষ এই প্রজাতি (spacies) ছয়হাজার বছরের সভ্যতার যুগে প্রবেশেরও আগে অবশ্যই অনেক কিছুর বিপরীত স্রোতের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া যেখানে মাঝের এই সময়গুলোর মানে, মিলিয়ন থেকে হাজার বছরে নেমে আসার বড় একটা অংশই কেটেছে – প্রকৃতির সাথে ভাল “খাপ খাইয়ে নেয়া” প্রজাতি হয়ে উঠতে। অর্থাৎ মানুষের স্বভাব ও শরীরের যেসব বৈশিষ্ঠ বাস্তবের প্রকৃতিতে টিকে থাকার উপযোগী ছিল না এটা বলা অতুক্তি হবে না যে হয় তা মানুষ তার নিজের বাইরের প্রকৃতির সাথে প্রকৃতির উপযোগী হতে বা খাপে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে নিজেকে নিজের শারীরিক গঠন সহ বহু কিছুতে ব্যপক ভাবে বদলে নিতেই হয়েছে, বদলে গিয়েছে। আর নয়ত টিকতে না পেরে ঐ বিশেষ মানুষ-প্রজাতিটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে এর জবাব সোজা বলে দেয়া যায় যে যা তার পরিচিত ও গমনযোগ্য [accessable] ভূমিতে ঐকালে প্রচুর পাওয়া যেত তারই কোন একটাই তার খাদ্য হয়েছিল; তবে অবশ্যই যা তার খাদ্য হবার উপযুক্ত কেবল সেগুলোই। আর একটা দীর্ঘ সময় মানুষের গড়ন-বৈশিষ্ঠের এই ভাঙ্গা গড়ার ভিতর দিয়েই কেটেছে তা আমরা নিশ্চিত ধরে নিতে পারি।

    তবে একটা কথা পরিস্কার মনে রাখতে বলা যায় যে দুনিয়ার ভুগোলের কোন ভুমিতে সভ্যতা গড়তে বসা শুরু হবে তা শুরুর আগের মানুষের যে রূপ ও জীবন – সেটাই ছিল এক ব্যাপক যাযাবর (nomads) জীবন। অর্থাৎ মিলিয়ন বছর থেকে মানুষের বয়স যখন কয়েক হাজারে নেমে এসেছিল এই মাঝের দীর্ঘ সময়কাল এটাই মানূষের যাযাবর জীবনকাল। যাযাবর মানে হল খাবার টোকায় খেয়ে বা গাছ থেকে পেড়ে খেয়ে এক লম্বা শিকার ও সংগ্রহের জীবন মানুষকে পাড়ি দিতে হয়েছিল। মানে, হান্টিং এন্ড গ্যাদারিং [hanting & gathering]  জীবন ছিল সেটা!

    এখানে যাযাবর বা নোমাড জীবন আর পশুপালক (pastoral)এদুইয়ের জীবনের মধ্যে মধ্যে একটা ফারাক মনে রাখা যেতে পারে। পশুপালকেরা সাধারণত যাযাবর হয় কিন্তু যাযাবরেরা পশুপালক নাও হতে পারে। কারণ হয়ত খাদ্যের প্রাপ্যতা [availability] জন্য, যে ভুমিতে সে ছিল তাতে কিছুদিন পর পর খাদ্য ফুরিয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তখনকার মানুষ কৃষিকাজ কী তা জানত না। অর্তঝাত প্রকৃতি নিজের খেয়ালে যা কিছু ফল-ফলারি গাছে জন্মাত তা পেড়ে সংগ্রহ করেই পাওয়া এমন খাদ্য দিয়েই কেবল ঐ ভুমির মানুষদেরকে চলতে হত। তাই খাদ্যাভাব মানে চাষাবাদ জ্ঞানহীন জীবনের মানুষ গাছের ফল-মূল সংগ্রহ করে খেয়ে চলতে। তাই কোন ভুগোলের ভুমিতে খাদ্যের প্রাচুর্য আছে সেই খোজ রেখে তাকে যাযাবরের জীবন যাপন করতে সে বাধ্য ছিল। এমন অস্থিরতার জন্যও মানুষ যাযাবর হতে হত। যদিও যাযাবর এর সাধারণ সংজ্ঞা হল যে এক দেশ-ভুগোলের ভূমিতে বেশিদিন বসবাস করে না। কারণ খাদ্য প্রাপ্যতার অভাবেও (একই ভুমিতে খাদ্য ফুরায়ে গেলে) তার  যাযাবর হওয়া প্রয়োজন হয়েছে।

    তবে আবার এই একটা কথায় অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। যেমন এর মানে হল সে সময়ের মানুষ বা নোমাড মানুষ মানে এরা ১। তখনও এমন মানুষ যারা কৃষিকাজ জানে না বা তা করতে শুরু করে নাই। ২।  তখনও অর্থাৎ এটাকে বলে সংগ্রহ বা গেদারিং সমাজ (gathering society)- এমন সমাজ হয়েই তারা ছিল কেবল। যেমন কোন কোন গাছের ফল পাওয়া যায়, তা পেড়ে আনা বা সংগ্রহ করা যায়, কোথাও তা প্রচুর পাওয়া যায় ইত্যাদি সবকিছু সভ্যতা-পুর্ব কালের মানুষের ভাল জানা ছিল। এটা সভ্যতা শুরুর পুর্ব সমাজ কেন বললাম?

    সভ্যতা শুরুর পুর্ব সমাজঃ
    কারণ, সভ্যতা শুরু হতে গেলে এক অপরিহার্য শর্ত হল, মানুষকে সেক্ষেত্রে থিতু হয়ে কোন ভুগোল-ভুমিতে এর আগেই বসবাস শুরু করতে হবে। আর স্বভাবতই এর আগে পর্যন্ত মানুষ যে যাযাবর ছিল  সেই যাযাবর জীবনযাত্রায় তার আগে ইতি টানতে হয়েছিল। সোজা কথায় যাযাবর জীবনের মানে সভ্যতা শুরুর হয়েছিল যেখান থেকে এমন  জীবন সেটা। 

    কারণ যাযাবর জীবন কালও অনেক লম্বা ছিল যা লাখে হিসাব করতে হবে। সাধারণত এর শেষের কালটা হল পশুপালক-যাযাবর (pastoral) জীবন। অর্থাৎ যখন পশু চড়িয়ে বেড়ানো তাঁর পেশা। তবে সাবধান এটা আমাদের এখনকার কল্পনায় দেখা বা বইয়ে পড়া কোন রাখাল বালকের গরু চড়ানো মত কোন গল্প নয়, এমন সরলও নয়। কারণ তখনও সে নোমাড বা যাযাবর। ফলে তারা “গৃহস্থ” হয়ে উঠে নাই তখনও। অর্থাৎ ‘বাসা’ বা আবাসস্থল বলে কোন ধারণা তখনও তাদের নাই। অর্থাৎ যেখানে সে রাত কাটায় সবটাই অস্থায়ী। তাই বাড়ি বা বাসা ধারণাটা তখনও মানুষের মধ্যে আসে নাই। এমন পশুপালক ((pastoral)) জীবন এখনও দেখতে পাওয়া  যেতে পারে আফ্রিকার কোথাও কোথাও।  যেমন কেনিয়ায় মাসাইমারা ট্রাইবে [Maasai mara Tribe & culture], ইথিওপিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে [Gambella Region] [In Ethiopia, about 10 million pastoralists rely on animal husbandry as a key source of wealth and subsistence.] বা  ইথিওপিয়ারই সোমালি অঞ্চলে। এদের কমন ফিচার হচ্ছে তারা ট্রাইব (Tribe) গোত্রবাদি সমাজে বসবাস করে। অর্থাৎ এরা একটা বৃহত অঞ্চলে একালের রাজনৈতিক ভুগোলে বসবাস করলেও  এরা গোত্র সমাজের লোক – মানে ঠিক হান্টিং-গেদারিং সমাজের যাযাবর বলতে যা বুঝায় তা নয়। আবার মনে রাখতে হবে কোন ভুমিতে থিতু হয়ে বসা মানুষের জীবন-সমাজেরও আবার দুটা পর্যায় দেখা যায় কোথাও কোথাও। যেমন এর প্রথম রূপ হল গোত্র-সমাজ। যেটার আরেক রূপ  ব্যক্তিভিত্তিক সমাজ।  আর অবশ্যই “ব্যক্তিভিত্তিক সমাজের” আগের রূপ হল গোত্রভিত্তিক সমাজ।

    এই সুযোগে গোত্র সমাজ নিয়ে কিছু কথাঃ
    মূলকথা, গোত্রসমাজ আর ব্যক্তি সমাজ দুটাই সমাজ মনে হলেও দুটা একেবারেই এক নয়।  আবার “সমাজ” বলছি যখন তখন এটা অবশ্যই আগের মানুষের নিরন্তর যাযাবর জীবনের পরিসমাপ্তিতেই তা এসেছে আমরা ধরে নিতে পারি।  তবে হান্টিং এন্ড গেদারিংয়ের যাযাবর জীবন ধারা শেষে  সরাসরি কোন ভুমিতে থিতু হয়ে যারা কৃষিকাজের জীবন সমাজ শুরু করে নাই – ফিরে আবার পশুপালক (pastoral) জীবন যারা শুরু করেছিল এদের মধ্যেই গোত্রসমাজ সবচেয়ে দীর্ঘসময় টিকে যেতে দেখা যায়। সাধারণভাবে বলা যায় এশিয়ার সমতল-ভুমি অঞ্চলে গোত্রসমাজ সবার আগে উঠে গেছে মানে ক্ষণস্থায়ী ছিল। এর বাইরে যত হাইল্যান্ডার বা মরুভুমি অঞ্চল বা সংলগ্ন অঞ্চল – সেখানে গোত্রসমাজ দীর্ঘকাল টিকে থাকতে দেখা যায়।

    গোত্রসমাজে ব্যক্তিবোধ নাই বা তখনও আসে নাই। ফলে ব্যক্তি সম্পত্তি নাই, গোত্র সম্পত্তি আছে। গোত্রসমাজে গোত্র-প্রধানই সব। তিনিই গোত্রের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেন বা দেন। আর এটাক ভেঙ্গে পড়লেই ব্যক্তি-সমাজ গড়ে উঠে। আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠি তাদের এখনও গোত্রপ্রধান বলে পদ আছে। যদিও তার কর্তৃত্ব নাই। এদিকে তারা এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনত নাগরিক। আর যে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র মানেই তা ব্যক্তিভিত্তিক। এছাড়া পাহাড়িদের পাশের বড় ও প্রভাবশালী বাঙালিরা ব্যক্তিসমাজ এর পর্যায়ে উঠে গেছে। সব মিলিয়ে তাই তাদের গোত্র সমাজ মূলত ভেঙ্গে গেছে, ব্যক্তি সমাজের দিকে রওয়ানা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক ভাবে পুরানা গোত্রসমাজের সংস্কৃতির চর্চা-অভ্যাসগুলো রয়ে গেছে – যা বার বার উঠে আসছে আর সেগুলো তাদের “নিজস্ব কালচার” এই যুক্তিতে; যদিও সেগুলো আসলে তাদের পুরানা গোত্র (ব্যক্তিবোধ না জাগার কালের) কালচার।
    গোত্রসমাজের বৈশিষ্ট বা কালচারাল ধরণ দেখে সহজেই চেনা সম্ভব। যেমন, পাকিস্তানের উত্তর সীমান্তের ভিতর থেকেই আরো উপরে দিকে যতই আফগানিস্তানের দিকে যাওয়া যাবে ততই ঐ অঞ্চলটাই গোত্রসমাজের প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট গোত্র কালচারের আধিপত্য দেখতে পাওয়া যায়। যেমন শহুরে জীবনের চোখে তাদের সম্পর্কের আমরা দেখি মিডিয়ায় লেখা হয়েছে – “অনার কিলিং” (honour killing) এর কথা।  এটা কী জিনিষ?
    শহুরে চোখে তা খুব আজিব লাগে, আধা বুঝ বা না-বুঝা লাগে হয়ত। ঘটনা বর্ণনা হয়ত শুনব এভাবে যে ওমুক গোষ্ঠির এক টিন-এজ মেয়ে নিজের পছন্দের কোন ছেলেকে বিয়ে করতে গেছে বলে ঐ মেয়ের ভাই নিজ বোনকে খুন করেছে। বর্ণনা শুনে এটাকে আমাদের মতই কোন ব্যক্তিসমাজের ঘটনা বলে ভেবে সে বিচারে  ব্যাপারটা”একটু উগ্র” মনে হবে হয়ত।  কিন্লেতু কেন তাদের সমাজ ওরকম? আর এই খন করার মধ্যে “অনার” মানে সম্মান রক্ষা করার ঘটনা কোনটা? কারই বা সম্মান??
    আসলে এখানে এটা পুরাটাই এক গোত্রবাদী কালচারের চর্চা ও এর প্রভাব বা ওরই প্রাকটিস ওখানে করা হয়েছে। কেন ও কীভাবে?

    গোত্র সমাজে ব্যক্তিবোধ নাই, থাকে না বা কাজ করে না। গোত্র সমাজে গোত্রপ্রধান থাকে আর তার হুকুমেই চলে। সেখানে তাই গোত্রপ্রধানের সিদ্ধান্তই সবার পালনীয়।  গোত্র পরিবারের কে কার সাথে বিয়েতে বসবে সেটাও গোত্রপ্রধানের বা তাঁর মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অর্থাৎ গোত্রের সদস্যরা ব্যক্তি বলে গণ্য হয় না; নিজেদের তারা ব্যক্তি গণ্য করে না। এমন গোত্র সদস্য তারা। অতএব কোন ব্যক্তিবোধের চর্চা সেখানে থাকত না। আসলে ব্যক্তি নাই মানে সেখানে প্রেম বলে কোন নাই। কারণ প্রেমের পুর্বশর্ত হচ্ছে – দুজনাই স্বাধীন ব্যক্তিবোধ হাজিরা আর তা তাদের স্বজ্ঞানে বা অজ্ঞানে। (যদিও সেটা প্রেমের পরে বাস্তব পরিবার চর্চায় সেটা আর ততটা বাস্তবে ক্রিয়াশীল নাও থাকতে পারে।)  কাজেই কোন গোত্র পরিবারের সদস্য কোন ছেলে বা মেয়ে নিজ পছন্দের বিয়ের পথে যেতেই পারে না। এটা গোত্রপ্রথারই বা গোত্রপ্রধানেরই বিরুদ্ধাচারণ।
    কিন্তু একালে এসে হয়ত কোন পুরানা গোত্রসমাজ ঠিক ভেঙ্গে যায় নি; ফলে নয়া ব্যক্তিসমাজও উদয় হয় নাই। কিন্তু একটা মাঝামাঝি দশায় আছে। ফলে সেটা ঠিক গোত্র কালচারের ভেঙ্গে পড়া কিন্তু আধাখেচড়া অবস্থা। ফলে গোত্রপ্রধানের নিয়ন্ত্রণও  ঢিলা তবে তা একেবারে ভেঙ্গে না পড়ে নাই হয়ত। এছাড়া পাশে হয়ত আছে কোন বড় ও ভিন্ন ব্যক্তিভিত্তিক সমাজের উপস্থিতি আছে। ঠিক যেমন, আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠির পাশে আমরা বাঙালি জনগোষ্ঠি যারা। আমরা পাহাড়িদের অনেক আগেই আমাদেরও হয়ত কোন গোত্রজীবন যা আগে ছিল তা শেষ ও ত্যাগ করে এসে গেছি। পাহাড়িদের তুলনায় আমরা সংখ্যাতেও অনেক বড়। তাই সব মিলিয়ে এসব কারণে আমাদের প্রভাবই ওদের উপরে পড়তে ও কাজ করতে বাধ্য।  এরকম পরিস্থিতেই অনার কিলিং ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। যার শাস্তি হল পরিবারের তরফ থেকে (পুরুষ ডোমিনেটেড পরিবার বলে) মেয়ে সদস্যকেই আগে হত্যা করে ফেলা, সাজা দেয়া হতে দেখা যায়। অর্থাৎ গোত্র-পরিবারেরর সম্মান রক্ষার্থে হত্যা এটাই “অনার কিলিং” (honour killing)। একালের পরিভাষায় হয়ত ভাই বলবে “এটা পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে হত্যা”। কিন্তু পিছনের কারণ এটা গোত্রসমাজের মুল্যবোধ ও প্রথা অনুসরণ করে করা হয়েছে। এছাড়াও, যেমন চোখের বদলে চোখ তুলে নেয়ার প্রথা অথবা যাকে অপরাধী মনে করা তাকে নিজের হাতে শাস্তি দিয়ে চাওয়া – এগুলো গোত্রসমাজ কালচারেরই পুরানা জের ও এর প্রভাব। যেমন ব্যক্তিসমাজের দৃষ্টিতে কেউ যদি প্রেমের কারণে  নিজ বোনকে হত্যা করে তবে নাগরিক রাষ্ট্রের আদালত পুরানা গোত্রপ্রথার যুক্তি-সাফাই মানবে না, গ্রহণ করবে না।  বরং ভাইকে সোজা হত্যাকারি বলে উলটা ফাঁসির সাজা দিবে এই বলে যে ঐ ভাই তাঁর আপন বোন যে ঐ রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক তাকে খুন করেছে – আর কোন স্বাধীন নাগরিককে আরেক ব্যক্তি খুন করতে পারে না – এই অপরাধে ব্যক্তি-ভাই মৃত্যুদন্ড সাজা পাবে।
    আবার এর উল্টাও হতে পারে। যেমন ব্যক্তিসমাজ হলেও কখনও সেখানে গণপিটুনির (মব লঞ্চিং বা Mob lynching) ধারণা দেখতে পাওয়া যায়। যার সোজা মানে হল ব্যক্তিসমাজে বিচারবিভাগ বলে আলাদা কিছু একটা আইন-বিচার আদালত চালু হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু দুর্নীতি আর স্বৈর হস্তক্ষেপের কারণ বিচার ব্যবস্থা গণ-মানুষ মানে পাবলিকের আস্থা পায় নাই। এই অবস্থায় ঐ ব্যক্তিসমাজে “গণপিটুনির ধারণা” ক্রিয়াশীল দেখা যেতে পারে। আমরা এখন আবার একটূ পিছনে ফিরে শুরু করব!

    সংগ্রহ বা গেদারিং (gathering) সোসাইটিঃ
    আরেকটা গুরুত্বপুর্ণ দিক নিয়েও আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি – কী সেটা? আগে উল্লেখ করেছিলাম গেদারিং (gathering)) সোসাইটি। মানে তখন মানুষ বড় জোর গাছের ফলফলারি সংগ্রহ করে খাওয়া ও এ৪ভাবে দুনিয়াতে নিজেকে টিকিয়ে রাখা শিখেছে – ঐ সময়কালের মানুষ। কিন্তু কী করে তা আমরা জানলাম? কারণ গেদারিংয়ের পাশে বা সাথে আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করা হয় –  যেমন হান্টিং (hunting) এন্ড গেদারিং সোসাইটি। অর্থাৎ শিকার ও সংগ্রহকারী সমাজ। অর্থাৎ সাথে পশু শিকার -এর কথা বলে হচ্ছে। পশু খাওয়া যায় কীনা এটা মানুষের জানা ও খেতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে  অবশ্যই মানুষের কাছে আগুন আবিস্কার হয়ে থাকতেই হবে।  কারণ মানুষের পক্ষে অন্য পশুর মাংস সরাসরি খাওয়া যায় না বলে তা প্রক্রিয়াজাতকরণ বা আগুনে রান্নার কালচারাল অভ্যাস মানুষের রপ্ত বা জানা থাকতে হবে। মানে আগুনে সিদ্ধ বা ভাজা-পোড়া করা না জানলেও অন্তত ঝলসিয়েই কেবল পশু খাওয়া যায় – একাজে আগুন আবিস্কার আগেই জানা হয়ে থাকলে তবেই পশুর মাংস মানুষের খাদ্য হয়েছে। অর্থাৎ আগুনের ব্যবহার জানা আগে; এরপরে পশু মানুষের খাদ্য হতে পারে। সারকথায় তাই হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটি মানে হল পরের কৃষিকাজ ভিত্তিক থিতু সমাজের পৌছানোর বহু আগের এবং তা এক অবশ্যই নোমাড ও পশুপালক সমাজ পার হয়ে আসতে হবে। তবে শুধু গেদারিং সোসাইটি  মানে হল এটা যাযাবর জীবনের লক্ষণ; অন্তত আগুন আবিস্কারের আগের মনুষ্য-জীবন সেটা!!

    তাই সোজা সিদ্ধান্ত হল, মানুষের কৃষিকাজ ভিত্তিক সমাজে পৌছানো মানে এই থিতু সমাজে পৌছানোর আগে মানুষকে বহুকিছুতে জীবন-অভিজ্ঞতার পর্ব শেষ  করে আসতে হয়েছে। সেগুলো, ফলমুল খাদ্যের কিন্তু নোমাড সমাজ, এরপর হান্টিং শিখা কিন্তু এর আগে আগুনের আবিস্কার জেনে রাখা। এরপর হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটিতে বসবাস যেটা তখনও নোমাড। এরপর সবশেষে পশুপালক (pastoral)জীবন। আর পশুর খাদ্য পাওয়া সহজ করতে যেদিকে পশুর খাদ্য ধরণের গাছপালা বেশি পাওয়া সেদিকে ক্রমান্বয়ে নোমাড মানুষের যেতেই থাকতে হবে। তাই এটাও সেই লম্বা নোমাডিক বা যাযাবর জীবন এর সম্ভবত শেষ ভাগ। আর এসবের সমাপ্তি ঘটলে তবে আসতে পারে  মানুষের কোন কৃষিকাজ জীবন। এটা আসলে আরো অনেক কিছু  যেমন, যেমন এখান থেকেই মানুষের গৃহস্থ হওয়ার শুরু। আর সর্বোপরি এটাকেই আমরা মানুষের সভ্যতার শুরুর যুগ বলছি!!

    সভ্যতার শুরু মানে মানুষের কৃষিজীবনের শুরুঃ
    হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটির জীবন এরও বহু পরে কৃষিকাজের জীবনে পৌছানো মানুষের জীবন-ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। যেমন  মানুষের কৃষিকাজের জীবনে পৌছানো  এর এক নম্বর লক্ষণ হল নোমাড পশুপালক জীবনসহ পিছনের পুরা যাযাবর জীবন পার হয়ে সেসবের ইতি টানা। কিন্তু এটাকে থিতু জীবন বলা হচ্ছে কেন? কারণ, খুব সহজ! সেটা এজন্যই যে এটা আগের যাযাবর জীবনের ইতি অথবা অন্যভাবে বললে কৃষিকাজ মানে তখন থেকে কৃষির জমির সাথে মানুষের জীবনযাপন বসবাসের জীবন আটকে যাওয়া। তখন মানুষ চাইলেও আর পুরানা যাযাবর জীবন যাপনে ছেদ পড়তে বাধ্য। কৃষিকাজ মানে ঐ জমির সাথে মানুষের গাটছাড়া বেধে যাওয়া।  জোবঙ্ঘুরেফিরে ঐ জমিতেই বা আশে[পাশে ফিরে আসতেই হবে এক-মন দশায় আটকে যাওয়া। সব সময় মনে রাখতে পারি মানুষের আগের জীবনের যেকোন স্বভাব তখনই বদলাবে বা বদলিয়ে যেতে পারে যখন আগের চেয়ে সেটা সহজ  ও বেটার জীবনযাপনের উপায় – এই বুদ্ধিশুদ্ধি সে জেনে গেছে এবং সেটা আগের জীবনযাপনের ভিতরেই কিন্তু হঠাৎ করে ঘটনা-দুর্ঘটনায় সে জেনে গেছে মানে তা বেশিরভাগ সময় এক্সিডেন্টালি ঘটে থাকে!

    নয়া এক কৃষিকাজের জীবনে আসতে গেলে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধিতে একটা বড় উল্লম্ফন ঘটাতে, মানে এক গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছিল। সেটা হল জ্ঞানবুদ্ধির অনেক পরিশীলিত ব্যবহারের জগতেও প্রবেশ করতে হয়েছিল;  অর্থাৎ  গায়ে-গতরে বলপ্রয়োগের জীবন থেকে বাদ দেয়া অবশ্যই নয়, তবে এবার আর এশুধু গায়ে-গতরে বলপ্রয়োগ করে জীবন কাটানো আর নয়।
    যদিও কৃষিকাজ মানে প্রথমত মানুষের নিজ জ্ঞানবুদ্ধিতে আগের জীবনের চেয়ে অনেকানেক বেশি ব্যবহারে অভ্যস্থতা। এতা অবশ্যই জ্ঞানবুদ্ধিতে মানুষের এক নয়া পরিশীলিত অবস্থা। কেন? কারণ এই জীবনের পুর্বশর্ত হল বিপুল পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারি আগে হতে হবে।  যেমন ছোট-বড় সব গাছগাছালির প্রকৃতি – অর্থাৎ এখন যাকে আমরা উদ্ভিদ বলতে অভ্যস্ত এর জীবন প্রণালী খুবই মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছিল। অর্থাৎ এর আগে পর্যবেক্ষণ কী জিনিষ সেটাই বুঝে ফেলতে হয়েছিল। কোনটা ধান বা গমের বীজ বা কাকে বীজ বলে তা বুঝেসুজে আর কেমন মাটিতে কী করে ফেললে তা থেকে আবার নয়া গাছ হয় ইত্যাদি সেসব “উদ্ভিদ জীবনচক্র” বুঝে ফেলতে হয়েছিল।

    আবার এর আগেই আরেক পর্ব অবশ্যই ছিল। যেমন মানুষের শরীর টিকাতে গেলে দু’বৈশিষ্ঠের দুটা খাদ্য লাগবেই। বিজ্ঞানের ভাষায় কার্বোহাইডেট আর প্রোটিন, এছাড়াও সাথে অবশ্যই আরো অনেক কিছু বাড়তি খাবার কথাও ছিল। আর ঠিক উপাদানের উপযুক্ত নাম জানা নয় কোন ধরণের খাদ্যে তা থাকে এটা জানার কথা বলছি।   তাই সম্ভবত সব সভ্যতার মানুষেরা শুরুতেই মানুষই বুঝে ফেলেছিল তার অন্তত একটা কার্বোহাইডেড বা স্টার্চ (starch)এই উপাদানের কোন একটা উতস খাদ্য হিসাবে লাগবেই। কমন ভাষায় যাকে আমরা প্রধান খাদ্য বা স্টেপল ফুড (staple food) বলি। যেমন, চাল, গম, ভুট্টা, বা মাটির নিচে জন্মানো মিস্টি আলু অথবা তেফ (teff, এক ইথিওপিয়ান স্টার্চ যা গমের আটার মত পিষিয়ে নিয়ে তা খাওয়া যায় এমন খাদ্য) ইত্যাদি এসবগুলো বিভিন্ন সভ্যতায় প্রধান খাদ্য কার্বোহাইডেট-এর উৎস। বলাই বাহুল্য এমন গাছ বা খাদ্য কে চিনে নেওয়া ও বেছে নেওয়া এটাই হিউম্যান প্রজাতির এক বড় অগ্র-পদক্ষেপ –  এক বিরাট পর্যবেক্ষণ শক্তির অধিকারি হয়ে উঠা।
    যেটার কারণে, আর হান্টিং এন্ড গেদারিং সমাজে অভ্যস্ত পুরানা যাযাবর মনুষ্য-জীবন  আর নয় বা একে বাই বলা সম্ভব হয়েছিল।
    তাই আসলে কৃষিকাজ মানে  – এটা মানুষের শুধু বিশাল এক  পর্যবেক্ষণ শক্তি গুণই নয়, আরও বহু বহু কিছুর এক নব অধ্যায়!!

    যেমন আগে যে কথা বলছিলাম মানুষের কৃষিকাজের জীবনে প্রবেশ ঘটা – এটা তার জীবনে এক বিরাট নতুন শর্ত তার অজান্তে জুড়ে দিয়েছিল।  যেমন যে কৃষিকাজে অভ্যস্ত সে আর নোমাড থাকা সম্ভব না। আল্লাহর দুনিয়ায় কোন না কোন ভুগোল-ভুমিতে তখন থেকে তাঁকে  থিতু হয়ে গেড়ে বসতেই হবে। কারণ চাষাবাদ একেক দিন একেক জায়গায় করার জিনিষ তো নয়ই  বা একেক বছরে আরেকটা পাড়াতে বা আরেক দেশে গিয়ে করতে বসা তো আর  যাবেই না। কৃষিকাজ মানেই একই জমি একই পদ্ধতি ফলে একই ভুমিতে তা হতেই হবে। অতএব, এই প্রথম যাযাবর স্বভাব ত্যাগ করে, মানুষের থিতু হওয়া অর্থাৎ মানুষ মাত্রই সুনির্দিষ্ট কোন ভুমির মানুষ হতেই হবে – এমন হয়ে যাওয়া শুরু হয়ে যায়। মানুষ মানেই তখন থেকে গোপালগঞ্জের মানুষ কিংবা ছাগলনাইয়ার মানুষ কিংবা মানুষ তখন বাবুনগর গ্রামের বলে “বাবুনগরী” হয়ে যাবে। এমন করেই সে তখন  এশিয়ার বা আফ্রিকার মানুষ হতেই হবে – এমন এই ভুগোলের শর্তযুক্ত হয়ে গিয়েছিল মানুষ।

    এখন এই জীবনের সাথে আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করব তাতে আমি যা বলতে চাচ্ছি  তা বুঝতে আরেকটু সহজ হয়ে যাবে। শব্দটা হল ডমেস্টিক (domestic) বা গৃহপালিত। শব্দটা আমাদের খুব কম মানুষের কাছেই অপরিচিত। তবু আমি কিছু বিশেষ দিক থেকে শব্দটাকে পরিচিত করাব। যেমন, কী গৃহপালিত নয়? এই প্রশ্ন থেকে তা বুঝা যেতে পারে। সংক্ষেপে জবাব হল যা বন্য [wild] তা আর গৃহপালিত নয়।  আসলে মানুষের কৃষিকাজভিত্তিক ভৌগলিক-ভুমিতে স্থিতির যে  জীবন, যা কিছু এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ তাই গৃহপালিত। এটাই হল এর বৃহত্তর সংজ্ঞা! যেমন, গৃহ শব্দটা খেয়াল করেন। যাযাবরের একেবারেই উলটা শব্দ এটা। যেমন সন্ধ্যাবেলায় যে পশু নিজ স্বভাবে ‘বাসায়’ (এখানে শুরও বাসা থাকে) ফিরে না (মানে নিরাপদ জীবনে) সেটা গৃহপালিত নয়। যে তখনও ‘বন্যই’ মানে পুরানা প্রাকৃতিক স্বভাবেই থেকে গেছে।  মানুষের সভ্যতার জীবন বা কৃষিজীবন শুরুর সাথে সাথে  প্রকৃতিতে প্রধান যে বাঁক বদল ঘটে গেছে শব্দ হিসাবে সেটাকেই আমরা বলে গৃহপালিত করে নেওয়া (domestication)। অন্য আরেকটা শব্দ আছে যেটা (tame)বা স্থিতিজীবনের উপযোগী করে নেওয়া। অর্থাৎ দুনিয়াতে মানুষই কেবল একা কোন গৃহে কোন ভুমিতে নিজেকে আবদ্ধ করে নাই। বরং যতটুকু তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতা বিস্তৃত সবটাকেই নিজের জীভবনের সাথে বদলে নিয়েছে। কিছু পশু গাছপালা ইত্যাদি সবকিছুকেই সে বদলে পোষ-মানিয়ে মানে নিজের নয়া কৃষিজীবনের উপযোগী করে নিয়েছে। নইলে সেই প্রজাতিকে লোপাট করে দিয়েছে।  যেমন বিছুটি পাতা, যারা গ্রাম-জীবনের সাথে এখনো সম্পর্কে রাখেন তারা চিনবেন; তবে হয়ত ভিন্ন নামে। এই পাতা মানুষের গায়ে লাগলে ঐ জায়গা চিলকায় ফুলে উঠে, লাল হয়ে যায়। আর এর প্রভাব অন্তত আর্ধেক দিন পর্যন্ত থাকে। সাধারণত মাঠে মানুষের  হেঁটেচলার পথের ধারে তা জন্মায়। কিছু সমাজে এই গাছ দেখলে তা উপড়ে ফেলে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কেন?
    এরা বলতে যায় এই গাছের “ডমেস্টিক স্বভাব” নাই। মানে এই গাছ tame হয় না। মানুষের থিতুজীবনের সাথে যায় না। তাই এরা যে বনে মানুষ যায় না বা কম যায় কেবল সেখানেই থাকুক। তাই এই গাছে দেখা মাত্র তা উপড়ে ফেলে দেওয়ার সামাজিক অভ্যাস রপ্ত করেছে।

    গৃহপালিত শব্দের আসল মানে কীঃ
    মজার কথা হল, সভ্যতা কোথায় বসে, কোন ভুমিতে? এই প্রশ্ন যদি করেন তাহলে এর জবাব হল, যেই মাটি ডোমেস্টিক বা যেটা (tame)বা স্থিতিজীবনের উপযোগী করে নেয়া যায়; মানে ‘পোষ মানানো’ বলে যে শব্দটা আছে সেরকম! যেমন যে মাটি সফট নয় পাথুড়ে, নাঙল দিয়েও ভাল নরম করে নেয়া যায় না, একেবারেই পানি ধারণ করে না ইত্যাদি এমন হলে হবে না। গৃহপালিত বা  কৃষিকাজভিত্তিক থিতু জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ হতে হবে এককথায় বললে  যেন উদ্ভি্দের  চারা মাটি  ভেদ করে সহজেই উঠার উপযোগী হয় – কারণ এটা এক অন্য ধরণের জীবনযাপন ব্যবস্থা। এটাই সবচেয়ে বড় শর্ত। এটাই গৃহ বা গৃহপালিত শব্দের আসল মানে।

    আর সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী শর্ত বা ঘটনাটার কথা এখন বলব। মানূষের চাষাবাদ কৃষিকাজ শিখে-জেনে ফেলার তাতপর্য কী?  জবাব হল, আগে প্রকৃতি যেভাবে যে রূপে তার সামনে হাজির হত মানুষ কেবল সেভাবেই ঐ রূপের সাথে নিজেকেই খাপখাইয়ে বদলে নিয়ে তবেই একে ব্যবহার করতে পারত। নিজের ভরণপোষণের উপায় হিসাবে তা কাজে লাগাত। কিন্তু মানুষের কৃষিকাজ-চাষাবাদের জীবন সব বদলে দিয়েছে।

    যেমন  কৃষিজীবন শুরুর আগের সেই প্রাকৃতিক ধানগাছটাই এখনও হবে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে হবে না। মানুষ কেবল মাঝে একটু হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। কথাটা এভাবে বলা যায়  – সেটাই এখনও হবে তবে যেভাবে হলে মানুষের জন্য একটু সুবিধা হয় সেভাবে বা সেদিক একটু ঘুরে হলেও এরপরে আবার আগের প্রক্রিয়া প্রণালিটাই চালু রেখেছে মানুষ। ধরা যাক, কোন কোন মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে আগে ধান হয়ত হত না, এখন মানুষ হওয়াইতেছে। এছাড়া যেমন পরিমাণেও কম-বেশি করতেছে। কোন মাটিতে বন্য (মানে আগের প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত যেমন সেটাই) না গৃহপালিত চাষাবাদ হবে তা মানুষ ঠিক করে দিচ্ছে।

    এতে আগের পুরা প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত উদ্ভিদ-প্রকৃতিটা যা ছিল তা জন্মানো ঠিক বন্ধ করা নয়, তবে আগের মতই কিন্তু একটু মানুষের স্বার্থের দিক-ঘুরে প্রবাহিত এক উদ্ভিদ-প্রকৃতির দুনিয়া হয়ে প্রাকৃতিকতা বজায় রাখছে। এটাকেই আমরা বলতে পারি – গৃহপালিত মানুষের স্বার্থের দিক-ঘুরে প্রবাহিত হচ্ছে – এটাকেই আমরা কৃষিকাজ বলছি মানে, নতুন শর্তযুক্ত করে নেওয়া বলছি।

    এখান থেকেই সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনাটা দুনিয়া ঘটে গেছে। কীভাবে?
    এতে দুনিয়া আগের মতই দুনিয়াটা থাকবে তবে একটা কিন্তু সহ। আগে প্রকৃতি আমার জন্য প্রাকৃতিক ভাবে বা স্ব স্বভাবে এখন খাদ্য উতপাদন নাও করতে পারত। এই হাত ঢুকানোর কারণে মানুষ তা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রকৃতি এখন মানুষের খাদ্য উতপাদন করেই – এমন পরিবর্তনের ভিতর দিয়েই যেন গাছের জীবনচক্র বদলায় – এই শর্ত ঢুকিয়ে দেয়া হয়ে গেছে।

    তবে এটা হল, আমরা প্রকৃতিকে একটা সীমার মধ্যে থেকে বদলে নিয়েছি। আগে প্রাকৃতিক ভাবে ঠিক হত সারা দুনিয়ায় ধান উতপাদন আর হবে নাকি প্রকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা প্রকৃতির মৌলিক স্বভাবের নিয়ম মান্য করে ওর শর্ত-সীমার মধ্যে থেকে ধান উতপাদন চালু থাকা নিশ্চিত করেছি। সারকথায় প্রকৃতিতে আগের মতই বদল ঘটছে তবে এই বদল মানুষের স্বার্থের বাড়ীর পাশ দিয়ে যাচ্ছে – এটাই বাড়তি। তবে এই বাড়তি ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য ও সঠিক হবে যদি না এটা প্রকৃতির মৌলিক কোন স্বভাব বা শর্ত-সীমা লঙ্খন না করে।  কতটা বাড়ানো বা বদল হলেও ভারসাম্য ঠিক থাকবে সেটা মেনে চলার মধ্যে থাকা এটাই অন্যভাষায় পরিবেশসম্মত বসবাস। যদিও লোভী মানুষদের খপ্পরে পরে প্রায়শই এই ভারসাম্য ভাঙছে।

    কিন্তু সেজন্য সাবধান; প্রকৃতির মৌলিক স্বভাব-ধরণ বুঝতে হবে। আবার খোদ মানুষই তো প্রকৃতির অংশ একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না। প্রকৃতির স্বভাব  থেকে মানুষ নিজের মৌলিক স্বভাবও ঠাহর করতে পারে। অতএব খুব সাবধান প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম বা স্বভাবে হাত দেয়া যাবে না, ভাঙ্গা যাবে না। না ভেঙ্গে মানে মৌলিক স্বভাবে হাত না দিয়ে যতটা ছোট বা সীমিত শর্তযুক্ত করে বদল ঘটানো যায় মানুষকে ওর মধ্যে ঐ সীমার মধ্যে থাকতেই হবে। যদি মানুষ নিজেরর সীমা না বুঝে ভেঙ্গে ফেলে তবে খোদ প্রকৃতিই ধবংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ তাতে প্রকৃতি বা নেচারের উপর নির্ভরশীল মানুষও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
    এটাকে আরেক ভাষায় পরিবেশসম্মত বসবাস, এনভায়রণমেন্ট সেনসেটিভ, প্রাণ পরিবেশের জ্ঞানসম্মত বসবাস ইত্যাদি কথাগুলো বলা হচ্ছে।

    লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    দ্বিতীয় পর্ব পেতে এখানে https://wp.me/p1sCvy-47s

     

    [এই লেখাটা এর আগে এক প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ছাপা হয়েছিল “ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন” – এই নামের ছাত্র সংগঠনের এক সংকলনে। সেটা ছিল গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, তাদের কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত “সভ্যতা ও সংস্কৃতি” এই শিরোনামে এক প্রকাশনায়। সেই প্রিন্টেড সংকলনে এ’লেখার শিরোনাম ছিল  “সিন্ধু সভ্যতায়ঃ সভ্যতা মানে কী”।   যদিও দুঃখের বিষয় ঐ প্রিন্টেড সাময়িকীর কোন অনলাইন ভার্সান এখনও তাঁরা বের করে নাই।  হয়ত পরে করবে। তবে সেই পুরানা ছাপা লেখার একটা পিডিএফ কপি এখানে পাওয়া যাবে।  এছাড়া  সেই লেখাটারই আরেক ফাইনাল ভার্সান যেখানে এখন প্রচুর সংযোজন-বিয়োজন ও এডিট করে নয়া ভার্সান হিসাবে এখানে প্রকাশ করা হল। তাতে আগের শিরোনাম যেটা ছিল তা একটু বদল করা হয়েছে।  আর এবার লেখাটা বড় হয়ে যাওয়াতে তা দুই পর্ব করে, এখানে আজ কেবল প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হল।  দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আগামি সপ্তাহে প্রকাশিত হবে। ]

  • বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    ইউক্রেন-যুদ্ধকে ‘নয়া পর্যায়ে’ ঠেলে দিলেন !
    বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    গৌতম দাস

    ০৯ মে ২০২২, ০০:০৭  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-451

       Biden   seeks $33 billion war chest to support Ukraine

    ইউক্রেনের যুদ্ধ তৃতীয় মাসে পড়েছে, আর এরই মধ্যে এই যুদ্ধ এক নব ও বৃহৎ পর্যায়ে প্রবেশের মুখে মানে, এই যুদ্ধ বাইডেন এখন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বা কমপক্ষে আরো ছয় মাস গড়িয়ে নিতে যাচ্ছেন, তা বুঝা যাচ্ছে। অন্তত বাইডেনের নয়া পরিকল্পনা এটাই। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ-ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে দুটা মিডিয়া রিপোর্টে। মূলত গত এপ্রিলের শুরু থেকেই এই নয়া পরিকল্পনার উদ্ভব যার প্রকাশ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। তবে দুটো মিডিয়া রিপোর্টের শেষেরটা নিয়েই আগে কথা বলা যাক।

    আমেরিকান অভ্যন্তরীণ এক নিউজ নেটওয়ার্ক সিএনবিসি [CNBC] ২৮ এপ্রিল জানাচ্ছে, আমেরিকান কংগ্রেসের কাছে বাইডেন ইউক্রেনে সামরিক (অস্ত্র ইত্যাদি) ও মানবিক সাহায্যের জন্য মোট আরো ৩৩ বিলিয়ন ডলার পেতে অনুমোদন চেয়েছেন [Biden to ask Congress for $33 billion to support Ukraine through September] অর্থাৎ এই রিপোর্টে এটাও পরিষ্কার করে লেখা যে, এই অর্থ দিয়ে তিনি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে চান! আর এর মাত্র তিন বিলিয়ন খরচ হতে পারে মানবিক সাহায্য খাতে। কিন্তু মোট অনুমোদিত অর্থের প্রায় দু-তৃতীয়াংশই মানে, প্রায় ২১ বিলিয়নই আমেরিকা খরচ করবে ইউক্রেনকে সামরিক অস্ত্র সাহায্য জোগাতে। এ ছাড়া আরো প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার বাইডেন খরচ করবেন ইউক্রেনের ভাঙা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে।

    অন্য দিকে এবার আসি মিডিয়া রিপোর্টের প্রথমটায়। এই ইঙ্গিত-প্রমাণটা হল, গত মাসে ২৪ এপ্রিল বাইডেনের দুই মন্ত্রী- প্রতিরক্ষামন্ত্রী (আসলে তারা উপদেষ্টা আমাদের মন্ত্রীর সমতুল্য) লয়েড অস্টিন [Lloyd Austin ] আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken]- এরা দু’জন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে হাজির হয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাথে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। আর তাঁদের কিয়েভে হাজির হওয়াটাও গল্প-উপন্যাসের মত বেশ থ্রিলিং। তুরস্কের মধ্যস্থতার উদ্যোগে  রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে গত মার্চের শেষ সপ্তাহে  দ্বিতীয় ডায়ালগে বসার সময়ে তারা রুশ সৈন্য সমাবেশ কিয়েভ অভিমুখ থেকে ডনবাস অঞ্চলে সরিয়ে নিয়েছিল।  আর এই সুযোগে দিনে পোল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া কূটনীতিকরা  দিনে কিয়েভ এসে দিনেই ফেরত যাওয়া এভাবে  কিয়েভে হাজির হওয়া শুরু করেছিলেন। আর এরই উসিলায় লয়েড অস্টিন আর অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন প্রথমে পাশের দেশ পোল্যান্ডে (পোল্যান্ড ন্যাটো মেম্বার ও এই যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে) সফরে আসেন। আর সেখান থেকে নীরবে অজ্ঞাত সফরে বের হয়ে, ট্রেনে করে কিয়েভে পৌঁছে জেলেনস্কির সাথে দেখা করেন। তবে কিয়েভে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার কিছুটা আমরা বুঝতে পারি এনিয়ে প্রকাশিত ২৫ এপ্রিলের রয়টার্সের রিপোর্ট থেকে যার শিরোনাম ‘ইউক্রেন সফরঃ ব্লিঙ্কেন ও অস্টিন আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসার আর সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি [On Ukraine visit, Blinken, Austin pledge return of U.S. diplomats, more security aid]’। যদিও ওই রিপোর্টে সামরিক সাহায্যের কথা যতটুকু ছিল তার সবগুলোই খুবই কম, কয়েক মিলিয়ন ডলারের মাত্র। আর আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসা বলতে বুঝানো হয়েছে যে গত তিন বছর ধরে কিয়েভে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ছিল না আর অন্যান্য আমেরিকান কূটনীতিকদের যুদ্ধেশুরুর ১৫ দিন আগে পাশের পোল্যান্ডে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট। তাই এখন এই ইস্যুতে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ও কূটনীতিকদের ইউক্রেনে ফিরে আসার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আর সেকথাই ও’দুই  সফররত মন্ত্রী বলছিলেন।

    আসলে বাইডেনের এই ‘নয়া পর্যায়ের’ ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিকল্পনা অনেক বড় আর গভীরের। সিএনবিসির ঐ রিপোর্টে স্পষ্ট করেই লিখছে, ‘আমেরিকান সামরিক নেতারা বলছেন, ইউক্রেনে আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য দুটো। প্রথমটি হলো, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে সজ্জিত করা যাতে তারা ইউক্রেন থেকে রাশিয়ান সেনাদের পুরো বের করে দিয়ে সরাসরি বিজয় আনতে পারে। আর আমেরিকার দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, রাশিয়ার সমগ্র সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়া আর সাথে বাণিজ্যে ও অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওর অর্থনীতিকেও একেবারে ধসিয়ে দেয়া।’

    “U.S. military leaders say their strategic objectives in Ukraine are now two-fold.  The first is to arm Ukrainian forces so that they can secure an outright victory in the war by expelling Russia from Ukraine entirely.  The second is to weaken Russia’s entire power structure over the long-term by tying up its troops in a war of attrition while crippling its economy with sanctions and trade embargoes.”

    তবু আরো সহজে তা বুঝার আরেক উপায় হল অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন – বিশেষত অস্টিনের এই পর্যায়ের এপ্রিল মাসের সব সফরগুলোকে যদি এক সাথে মিলিয়ে দেখি। আমরা শুরু করতে পারি ৮ এপ্রিল অস্টিনের অফিস পেন্টাগনের থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতি থেকে। ওখানে বলা হয়েছে, অস্টিন ১০ এপ্রিল থেকে ইসরাইল, জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার এবং যুক্তরাজ্য সফরে বের হচ্ছেন। কিন্তু এগুলো ছিল সবই কেবল ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সফর তালিকা যার মধ্যে জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার ও যুক্তরাজ্য সফর সবই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার – এগুলো ছিল আসলে প্রথমবারের মত সফর! আর এরপর? এরপর শুরু হয়েছিল নয়া পর্যায়। তারা দু’জন এবার ২৩ এপ্রিল থেকে সফর শুরু করেছিলেন যেখানে ২৩ এপ্রিল তারা এই নয়া সফরে পোল্যান্ড পৌঁছে গেছিলেন। আর সেখান থেকেই পরদিন কিন্তু ট্রেনে অজ্ঞাতযাত্রা হিসাবে ইউক্রেনের কিয়েভে চলে গেছিলেন, যার কথা উপরে বলেছি।

    এর পরই শুরু হয়েছিল আসল সফর। ইউক্রেন সফর শেষে অষ্টিন এবার একা ২৬ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয়বার জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার সফর শুরু করেছিলেন। আর অস্টিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সফর ও উপস্থিতি ছিল মুখ্যত ২৬ এপ্রিল ন্যাটো-ইইউ [NATO-EU Talk] বৈঠকে। সেটা ছিল ৪০ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ইউক্রেন ইস্যুতে এক সভা। আসলে এটাই ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাইডেনের সর্বাত্মক যুদ্ধের ডাক- এরই সভা!

    বাইডেনের এই নয়া পরিকল্পনার চাপ সংশ্লিষ্ট ওই ৪০ দেশে কত প্রচণ্ড হতে পারে তা এখান থেকে সহজেই অনুমেয়।

    খুব সম্ভবত সে কারণেই নতুন করে ইইউর দেশগুলো যেন কোনোভাবেই রাশিয়ার তেল-গ্যাস না কিনতে পারে এজন্য কমিটমেন্ট দেয়ার প্রসঙ্গ এর পরই আবার উঠে আসে; যদিও ওই যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের এক সপ্তাহ পরই এই প্রতিশ্রুতি চাওয়া নিয়ে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে আরো আলাপের আগে গত ২৬ এপ্রিল অস্টিনের উপস্থিতিতে ৪০ দেশের ন্যাটো-ইইউ বৈঠক নিয়ে আরো কিছু কথা বলে নেয়া যাক।

    যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের নিউজের প্রায় সব রিপোর্টের হেড লাইন করা হয়েছে যার ভাষ্য এভাবে যে, “ইউক্রেন বিশ্বাস করে, সে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিততে পারবে”। যেমন- ইইউ জুড়ে উপস্থিত থাকা মিডিয়া ‘পলিটিকো [POLITICO]’ এর শিরোনাম হল – “অস্টিন : আমেরিকা বিশ্বাস করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন ‘যুদ্ধে জিততে পারে” [Austin: U.S. believes Ukraine ‘can win’ war against Russia]।” আবার ‘ইউরোনিউজ [EURONEWS]’ এর হেডলাইন হল, “সবাই বিশ্বাস করে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধে জিততে পারে’ বলেছেন আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে” [‘Everyone believes Ukraine can win the war,’ says US defence secretary at NATO-EU talks ]। অর্থাৎ “সবাই বিশ্বাস করে” অথবা “আমেরিকা বিশ্বাস করে” এই দুটো ভাষ্যই অস্টিন ওই বৈঠকে উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু কেন তিনি এই ‘বিশ্বাসের’ ওপর জোর দিলেন? এটাই মুখ্য!

    কারণ রাশিয়া যে, আমেরিকার সাথে টক্কর দেয়া পরাশক্তি ছিল বা আছে আর ইউক্রেন যে ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টা খণ্ডের এখন একটা খণ্ড-দেশ; আর সেই দেশ ইউক্রেন এখন রাশিয়াকে যুদ্ধে হারিয়ে দিবে – কথাটা না হাসির বিষয় হয়ে যায় তা আগাম ভেবেই মনে হচ্ছে, এখানে বিশ্বাসের উপর  জোর দেয়া হয়েছে। তবে মুখ্য বিষয়টা এখান থেকেই অনুমেয় যে, ইউক্রেনের রাশিয়াকে যুদ্ধে হারাতে গেলে আমেরিকা ও ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করে প্রায় ঢেকে ফেলতে হবে – এমন অবস্থায় যেতে হবে যা আদৌ কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন তো আছেই!

    তার মানে আমরা এখন অন্তত ৪০টা দেশ সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকবে – এমন এক “যুদ্ধ” প্রসঙ্গে কথা বলছি। এমন যুদ্ধের কথা শুনলেও  এদিকে অনেকে ভাবতে পারেন, আমার দেশ তো এই যুদ্ধের কেউ নয়, ফলে আমরা দূরে বসে খেলা দেখার মত যুদ্ধ উপভোগ করব। কিন্তু না; এই অনুমান দুনিয়ার সব দেশের বেলাতেই মিথ্যা হয়ে যাবে। মূল কারণ আমাদের বড় যুদ্ধের সবচেয়ে কমন ধারণা বলতে আমাদের মনে আসবে (১৯৩৯-৪৫) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ত। তাও আবার বয়স্ক লোকদেরই এনিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। সমস্যা হল, সে সময়কালের জমানায় গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে; যেটা এখন উল্টা। মানে এখন সব দেশই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে এক গ্লোবাল বাণিজ্যে পরস্পরের অর্থনীতি সরাসরি, সবার সাথে সবার অর্থনীতিই সংযুক্ত হয়ে গেছে। তাই এযুগে কোন ঘটনাই আর লোকাল বা এমনকি আঞ্চলিক বলে আর কিছু অবশিষ্ট নাই। ফলে এক দেশে কোনো পণ্যের অভাব হলে দুনিয়াতে ওই পণ্যের প্রধান উৎস দেশগুলোতে প্রথমে আর পরে দুনিয়ার সব দেশেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পরতে দেখা যায়। তাই পুরনো কোনো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়েই এবারের যুদ্ধের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। যেমন, কেবল তিনটি পণ্যকে যদি আলোচনায় আনি –  জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম – যা উৎপাদনের  একালে বড়  উৎস হল রাশিয়া ও ইউক্রেন (কেবল গম আর ভোজ্যতেলের বেলায়) উভয়েই। এ তিনটি পণ্যের মূল্যে গ্লোবালি ইতোমধ্যে আগুন লেগেছে; এরই মধ্যে যার মূল্য দ্বিগুণ বা এরও বেশি হওয়ার পথে। ফলে যারা চাল না, গম তাদের প্রধান খাদ্য যেমন পাকিস্তান বা ভারতের উত্তর অংশ, এরা বিশাল সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। শুধু খাদ্যের দ্বিগুণ মুল্যবৃদ্ধির কারণেই দুনিয়াব্যাপী এক বিপর্যয় আমাদের সকলের দিকে নব পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হবার আগেই ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। এথেকে আন্দাজ করা যেতে পারে গ্লোবাল অর্থনীতির হাল কী হবে অথবা কী পরিমাণ লোক অনাহারে বা খাদ্য কিনতে না পেরে মারা যাবে।
    এখন বাইডেন কি এসব সম্ভাব্য গ্লোবাল মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাগুলোকে আমল করেছেন? সম্ভাব্য জবাব হল, তিনি এসব আমল করলে এই নয়া যুদ্ধের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা – তারা সারা পশ্চিমের সবাই এখন ইউক্রেনের ঘাড়ে চড়ে নিজেদের স্বার্থের যুদ্ধটা সেরে ফেলতে চাইছেন! কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই যুদ্ধে কি কোন একটা পক্ষ নিজেকে বিজয়ী বলে দাবি করতে পারবে? সবচেয়ে বড় কথা – বাইডেন কী  মাত্র “৩৩ বিলিয়ন ডলারের’ মধ্যে এই নয়া যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন? এটা কি  আদৌও পারা সম্ভব?  আমেরিকা পরাশক্তির ইজ্জত হারিয়ে সদ্য – বহু কষ্টে ২০ বছরের আফগানিস্তান যুদ্ধ যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হত মানে, সেই অর্থ সব ড্রেনেজ হত –  কোনমতে ইজ্জত ভুলে হলেও তা শেষ করতে পেরেছিল, সেটা কি এই বাইডেনের হাতেই ঘটে নাই? সেই বাইডেন কী করে আবার এবার ইউক্রেনের কাঁধে সওয়ার হয়ে যুদ্ধে নামতে সবাইকে উত্তেজিত করতে নামেন কী করে!!!! এটা আক্ষরিক অর্থেই ‘ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন’ বটে!

    এই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিজ ব্যক্তি ইমেজ বাঁচাতে অথবা দলের ইমেজ বাঁচাতে বহুবার নিজ দেশকে যুদ্ধে নিয়ে গেছেন এমন রেকর্ড আছে। এমনকি বাইডেনের মত ডেমোক্রাট, কথিত “লিবারেল ভদ্রলোক ইমেজের” ক্লিনটনেরও মনিকা লিউনেস্কি কেলেঙ্কারি মামলা থেকে মনোযোগ সরাতে ইরাকের সাদ্দামের উপর বিমান হামলা – বোমা মেরেছিলেন তিনি। তাহলে এখন বাইডেনও কি আগামি নভেম্বর মিড-টার্ম নির্বাচন যেটাতে তার দল প্রেসিডেন্টের পারফরমেন্সের জন্য শোচনীয়ভাবে হারবে বলেই সার্ভে রিপোর্ট এরই মধ্যে প্রকাশিত, সেই নির্বাচনে বিজ খারাপ ইমেজ কমাতে বা ঢাকতে মানে প্রভাব ফেলতেই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ জোগাড় করতে গেছেন??  মানে ঐ অর্থ খরচ করতে তা আগামী নভেম্বর কেন, আরো অনেক নভেম্বর পেরিয়ে যেতে পারে – ঘটনা কি এভাবে আমেরিকার হাতছুট হয়ে যাওয়ার দিকে আরেকবার যাচ্ছে?

    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখিঃ
    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখি, বাইডেনের এ’যুদ্ধকে নয়া পর্যায়ে নেয়ার পরিকল্পনা বোঝা যাচ্ছে এপ্রিলের শুরু থেকেই। অথচ তুরস্কের উদ্যোগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির লক্ষ্যে ডায়লগ অনেক দূর এগিয়ে গেছিল। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ডায়লগ ঘটে যাওয়া মানে  এই যুদ্ধ একটা সমাপ্তির কাছাকাছি চলে যাওয়া এমন আশা দু’পক্ষের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল। যেমন প্রথম আলোর এক অনুবাদ রিপোর্টে যা ৩০ মার্চ প্রকাশিত, এর শিরোনাম ছিল, “ইস্তাম্বুল সংলাপ কি ইউক্রেন যুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।” মানে বলতে চেয়েছে এই যুদ্ধ কী সমাপ্তির দিকে চলে যাচ্ছে!!  আবার ২৯ মে বিবিসির রিপোর্ট থেকে নেয়া অনুবাদ রিপোর্টের শিরোনাম, “ইউক্রেনের যে প্রস্তাবে নমনীয় হলো রাশিয়া”। ভিতরের একটা বাক্য ছিল এরকমঃ এক মাসের বেশি সময় ধরা চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের দিকে এটাই সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। মস্কোর এই নমনীয় অবস্থানের পেছনে রয়েছে ইউক্রেনের প্রস্তাব”। অর্থাৎ যুদ্ধ যে সমাপ্তির দিকে তা এখানে একেবারে স্পষ্ট। এমনকি ৫ এপ্রিল রুশ বার্তা সংস্থা তাসের খবর অনুবাদ করে প্রথম আলো লিখছে, “লিখিত সমঝোতা হলেই পুতিন-জেলেনস্কি আলোচনা সম্ভবঃ পেসকভ”।

    অথচ বাইডেন প্রায় সমাপ্তি ও আপোষের দিকে চলে যাওয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে ঐ ৫ এপ্রিলের মধ্যেই নব পর্যায়ের আরেক বৃহৎ পরিসরে ৪০টা দেশের যুদ্ধের হিসাবে ঠেলে দিলেন। সোজা কথায় যা আগে কখনও করেন নাই এবার তাই করলেন – তাঁর পরিকল্পনা এবার একেবারে এর উল্টো। তিনি এপ্রিলের শুরু থেকে নয়া উদ্যোগে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছেন। তাই ১০ এপ্রিল থেকেই সেই বার্তা নিয়ে অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন ইউরোপ যুদ্ধের ডঙ্কা বাজিয়ে নেমে পড়েছেন! আর ২৬ এপ্রিলের মধ্যে ৪০ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সবাইকে ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে শামিল করে ফেলেছেন। চাপের মুখে ইউরোপ রাজিও হয়েছে।

    কিছু কথা মনে করিয়ে দেইঃ
    গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করেছিল। এর একদিন পরে জেলেনেস্কির হতাশা যে তারা একাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তেছেন পাশে আমেরিকাসহ ইউরোপের কোন দেশ নাই। অর্থাৎ তিনি প্রতারিত হয়েছেন তাই বলতে চেয়েছিলেন। এর পরোক্ষ জবাবে বাইডেন বলেছিলেন আমেরিকা রাশিয়া বিরুদ্ধে ইউক্রেন বা অন্য কোন দেশের মাটিতে যুদ্ধে লড়বে না। কারণ তার যুদ্ধের অস্ত্র ছিল আসলে রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে তুলে বিনা-অস্ত্রের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া।  একই যুক্তিতে এপর্যন্ত তিনি ন্যাটোর মাধ্যমে ইয়ক্রেনে কোন অস্ত্র সরবরাহ করেন নাই। যেটা সম্প্রতিকালে শুরু হয়েছে।
    তাহলে এখন ইউক্রেনে বা ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনকে অস্ত্র করতে চলে তিনি আগের সব প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে ফেললেন!!! আর তাতে এবারের সকল ততপরতাড় জন্য দায় তিনি নিজের মাথায় নিতেও বেপরোয়া হয়ে গেছেন। একারণের বলছি বাইডেন নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে নিজ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলেন। সারা দুনিয়াকে একটা অনন্ত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিলেন!!  আর ভাবছেন ৩৩ বিলিয়ন ডলারে তিনি ইউক্রেন-কে দিয়ে রাশিয়া জয় করাবেনই……। এই বাইডেন এখন সারা দুনিয়ার জন্য বিপদজনক ও দায়ীত্বজ্ঞানহীন হওয়ার পথে চলে গেছেন। তাই বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে চলেছেন!!

    ‘কিন্তু’ বিরাট বিরাট সব কিন্তুঃ
    ২৬ এপ্রিলের ন্যাটো-ইইউ এর ৪০ দেশের সভায় রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানি একেবারে বন্ধ অথবা ইইউ দেশের নিজ জ্বালানির সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনাই তোলা হয়নি। কিন্তু এরপর থেকে কানাঘুষা অথবা “চরম বিদ্রোহী” বা অসহ্য মনে করা দেশগুলো প্রকাশ্যে রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারবে না বলে প্রেসকে জানিয়ে দেয়। যেমন ইতালি, হাঙ্গেরি বা অস্ট্রিয়া এসব দেশের এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আর জার্মানি যে সবচেয়ে বেশি রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানিতে নির্ভরশীল (প্রায় ৪২ শতাংশ); যদি সে আজ এক কথা বললে পরের দিনই নিশ্চিত থাকা যায়, সে একটা উল্টো কথা বলবে। হয়তো বলে ফেলল, আমদানি বন্ধসহ অনেক কিছু করবে, কিন্তু পরের দিন বলবে ‘যদি সব দেশ রাজি থাকে তবেঅই জর্মানি সেটা করবে। আমরা যদি এসব স্ববিরোধী রিপোর্টের একটা সারাংশ করি তবে দেখব ৩ মে এর দুটো রিপোর্টই যথেষ্ট – পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি আঁচ করার জন্য। যেমন ৩মে এর  বিবিসির রিপোর্ট লিখেছে,  ইইউর মধ্যে এই প্রশ্নে বিভক্তি দেখা দিয়েছে [EU divided over how to step away from Russian energy]। ইংরেজি শিরোনামের অনুবাদ, ‘রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সরে আসা হবে কবে এই প্রশ্নে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত।’ সার কথায় এর জবাবে একদল বলছে, ২০২৭ সালের পর থেকে। প্রো-আমেরিকান অন্য গ্রুপ বলছে, চলতি বছর শেষ থেকে। আবার জার্মানি বলছে এখনই তো একেবারেই সম্ভব না। এদিকে প্রথম আলোরও ঐদিনের বাংলা  শিরোনাম – “রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিভক্তি”।

    কিন্তু একই দিন মানে ৩ মে এর নিউ ইয়র্ক টাইমস একেবারে সরাসরি ভাণ্ড ফুটা করে দিয়েছে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন লাগিয়ে এর শিরোনাম – ‘ইউরোপ কি রাশিয়ান তেল আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেয়ার পথেঃ এরপরে কী?’ [Europe Is About to Ban Russian Oil: What’s Next?]। আসলে ভেতরে খবর এর একেবারে উল্টা; অর্থাৎ কোন প্রশ্ন নয়, একেবারে জবাব!!! কী সেটা?

    এক্সপার্টদের জবানে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে- ১. এক্সপার্টরা বলেছেন রাশিয়ার সাথে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করা সম্ভব। ২. কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন; এ ছাড়া এ উদ্যোগ নিতে গেলে সরবরাহের অভাব ও বাড়তি মূল্যের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। ৩. আর তাতে আমরা এমন একটি অবস্থার মুখোমুখি হতে পারি যে, যেখানে ভোক্তারা এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়ছে সেই তাদেরই আমরা নয়া বাড়তি বোঝার শাস্তির মধ্যেই ফেলে দিতে পারি। আর এতে শেষ ফলাফল হবে, মানুষ করোনার দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়া অর্থনীতির সঙ্কোচন থেকে উত্তরণের যে লড়াই চালাচ্ছিল, তা শেষে লাইনচ্যুত হয়ে সব মাথায় ভেঙে পড়তে পারে।’

    “Analysts say it will be possible to sever Europe’s oil ties to Russia, but the effort will take time and may lead to shortages and higher prices for gasoline, diesel, jet fuel and other products — a situation that could penalize consumers already struggling with inflation and, ultimately, derail the economic recovery from the pandemic.”

    আর এই তিন পয়েন্টের সারাংশ কথাটা হল, আমরা বাইডেনের বাঁশির পেছনে হেঁটে একটা সম্মিলিত ধ্বংসের পথে যাচ্ছি!!! কেন?

    কেন ইইউ বাইডেনের আঁচল ধরে হাটছেঃ
    সবশেষে একটা অনুমিত ধারণার কথা বলে বিদায় নিব। নতুন করে ইউক্রেন যুদ্ধে হাওয়া দেয়া, অস্ত্র পাঠানোর ঘটনায় বাইডেনের স্বার্থ না হয়  উপরে ব্যাখ্যা করলাম কিন্তু ইউরোপ মানে সারা ইইউ কেন বাইডেনের পিছনে??? ইইউ-এর নেতা দেশগুলোই বলছে রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই তারা চলতে পারবে না, অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত এমন থাকতেই হবে এই কথা তারা নিজেরাই বলছে। তাহলে  আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অষ্টিন যখন ২৬ এপ্রিল, ৪০ রাষ্ট্রের ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে বসেন তখন সেখানে ইইউ চুপ করে থাকল কেন??? অথচ আবার মিটিং শেষে বাইরে এসে এবার আবার তারা সোচ্চার তারা রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই চলতে পারবে না – বলা হচ্ছে এনিয়ে তারা বিভক্ত?? কেন এমন??
    এরই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা একটাই দেখতে পাই, সেকথাটাই বলব এখন!
    ইউক্রেনের যুদ্ধ আসলে এক হিসাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব আসন্ন পালাবদলে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রক্সি যুদ্ধ।  গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনা উত্থান এই অনিবার্য এবং অবজেকটিভ ঘটনাটাকে জবরদস্তিতে তবু বাইডেন যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টায় নেমেছে। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু যে ঘটনাটা পর্দার পিছনে সেদিকে একটু আলো ফেলি।
    গত প্রায় পাঁচশ বছর এভাবে অথবা সেভাবে দুনিয়া শাসন-আধিপত্য করে আসছে সাদা ককেশিয়ান এথনিক জনগোষ্ঠি –  এবং একারণে তাদের কালচারাল আধিপত্যও শাসন করছে আমাদের সভ্যতা শিখানো সরকার বদল সবই করছে। মূলত কলোনি দখল করে তারা টিকেছিল, এই সময়কালের বেশিরভাগ সময়টা। আজ তা চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ এই প্রথম এশিয়ার চীন গ্লোবাল ম্নেতা হবার পথে। যার সোজা অর্থ এই প্রথম এটা সাদা শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে।  আমাদের চেয়ে এই এথনিক সাদা গোষ্ঠি এদিকটা অনেক বেশি খেয়াল রেখেছে। এই সাদা শ্রেষ্ঠতত্ববাদ – যেটার রাজনৈতিক উপস্থিতির একালের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ডোনাল্ড ট্রাম্প; এটা যতটা না তার রিপাবলিক দল তার চেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষক তিনি নিজে। এরা তাই চীনা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসায় আপত্তি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার। আসলে সারা পশ্চিম জুড়ে চীনা উত্থান ইউরোপ-সহ সারা পশ্চিমা দেশ ও কালচারের মধ্যে একটা আতঙ্ক হিসাবে ছড়িয়ে গেছে, হাজির হয়েছে।
    বাইডেন কী সেই চীনা ভয় আতঙ্ক মনে করিয়ে দিয়ে বার বার ইইউ-কে নিজের নেতৃত্বের অধীনে  নিচ্ছে??
    কিন্তু সারা পশ্চিম চাইলেও তো চীনা উত্থান ঠেকাতে সক্ষম হবে না। কারণ, – যা অবজেকটিভ যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত ঘটনা – তা ঠেকানো সাবজেকটিভ কাজ নয়; কর্তা মানুষের সেখানে কোন ভুমিকা থাকে না। মানুষ চাইলেই ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্প ঠেকায় দিতে পারে না।  যেমন বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সাম্রাজ্য আমেরিকান উত্থান ঠেকাতে পারে নাই, নিজেই ডুবে গেছে! আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা হয়েছে ১৯৪৫ সাল থেকে। অবজেকটিভ ঘটনা  যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত – এটা কোন দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ইস্যুও না। তাই কারও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তা ঠেকানোও যাবে না। এটা অবজেকটিভ সক্ষমতা অর্থাৎ, এক অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইস্যু। ঠিক যে সক্ষমতার জোরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হয়েছিল আমেরিকা!! প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর  তাঁর পিছনে ছিল সেকালেই  –  সারা ওয়াল স্ট্রিট, এই অর্থনীতিক পাওয়ার সেন্টার!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৭ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    গৌতম দাস
    ০১ মে ২০২২, ০০:০৮  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-444

    –

         If China’s Economy Falls, Ours Will Too

           Dependence on China shrinks the US economy in Q1

    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ কথাটার মানে হল, এমন এক অবস্থা ও সিস্টেমের মধ্যে বসবাস যখন, মূলত আন্তঃরাষ্ট্রীয়ভাবে সব রাষ্ট্রের সাথে সবার এক ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলাই সেই গ্লোবাল সমাজের বৈশিষ্ঠ। দুনিয়াতে বাণিজ্য নতুন না অবশ্যই। তাই অনেকের মনে হতে পারে এই গ্লোবাল বাণিজ্য তো দুনিয়াতে সব সময়ের মতই এখনও আছে। কিন্তু সরি, তবু এ’কথাটা সত্যি না। বাণিজ্য বলতে আসলে দুটো মেজর ভাগ আছেঃ এক. কোন রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বাণিজ্য, অপরটা বা দুই. রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য। কেন এই ভাগের কথা বলছি? বাণিজ্য বলতে একটা আগাম-দরকারি [pre-requisite] শর্ত হল, বাণিজ্য ঘটতে হলে আগাম যার উপস্থিতি দরকার সেটা হল মুদ্রা [currency]। তাই বাণিজ্য ও মুদ্রা কার্যত সমনামীয় শব্দ। এখন মুদ্রা যে প্রচলন করত সেই অথরিটি হল সেকালের রাজা আর একালের ভাষায় রাষ্ট্র। আর কোনো দেশের মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা কেবল ঐ রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটাকেই তাই প্রথম ধরনের বাণিজ্য বলছি।

    এখন দ্বিতীয় ধরন মানে আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য যেটাকে বলে, এটা পরিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে মাত্র এই তো সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন ও ১৯৪৫ সালে এদের কার্যক্রম চালুর পর থেকে। মানে মাত্র ৭৭ বছর আগে থেকে। আর এখানে একই মানে কোন কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রা একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনেরও মুদ্রা হিশাবে ব্যবহৃত হয় তবে সেক্ষেত্রে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দ্বারা অনুমোদিত থাকতে হয়।  তাহলে কি এর আগে (১৯৪৫ সালের আগে) গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কিছু ছিল না? ‘ছিল না’ বলার মতই। মানে ছিল তবে খুবই সীমিত পর্যায়ে আর সেটাও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া থেকেই এই সীমিত বাণিজ্য ব্যবস্থাটাও চিরদিনের মত অকার্যকর হয়ে যায়। এছাড়া ঐ সীমিত বাণিজ্য মানে যা হারিয়ে যাওয়া সেকালের অর্থনীতির মূল তৎপরতারও ছিল খুবই তুচ্ছ এক অংশ। মূল প্রধান ধারার অর্থনীতি তা ছিল না। এছাড়া তা ছিল এক পরিবারের প্রাইভেট ব্যাংকের উদ্যোগ। রথশিল্ড ব্যাংক (Rothschild) যাকে ফ্যামিলি ব্যাঙ্কিং ডায়নেস্টি বলা হয়,  তা ইউরোপে ১৭৪৪ সাল থেকে ১৯১৪, এই সময়কালে ততপর ছিল। যদিও এনিয়ে কমিউনিস্ট প্রপাগান্ডামূলক ষড়যন্ত্রতত্বে লেখা প্রচুর ‘রহস্য’ ছড়ানো মুখরোচক আর্টিকেল অনলাইনে পাওয়া যায়। যেগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি খুব জরুরি কিছু না।  তবু এক পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে হলেও এই সীমিত বাণিজ্যও বা  কেন এমনভাবে তা চালু ছিল? অথবা অন্যভাবে বললে সেকালের ইউরোপে ব্যাপক কোন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় ছিল না কেন?

    কলোনিদখল ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিঃ
    এর মূল কারণ, সেকালে মানে ১৬০৭-১৯৪৫ সাল এই প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে চালু দুনিয়াটা ছিল কলোনি দখলদারদের যুগ। অর্থাৎ  আমাদের মত দেশকে কলোনিদখল করা – এই ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিক ততপরতা ছিল। যদিও এটাকে এই প্রথম ইতিহাসের রাজতন্ত্র ছেড়ে “রিপাবলিক” [republic] বা জন-রাষ্ট্র গড়ার যুগ বলে প্রশংসিত। তবুও এর সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল ওমন নব-রাষ্ট্রগুলোর প্রধান অর্থনীতি বলতে তা ছিল জাহাজে বিনিয়োগ আর সেই জাহাজ বেয়ে কলোনিদখল করে বেড়ানো। সোজা ভাষায় অন্যের দেশ দখল ও তার সম্পদ লুটে নিজ দেশে আনা। মানে সে সময়কালে  স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে ছিল ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি দখলদার দেশ (বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, পর্তুগীজ ও স্পানিজ) আর বেশির ভাগই এদের কারো না কারো কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ। আর এর ব্যতিক্রম হিসাবে ছিল রাশিয়ান জার বা অটোমান সাম্রাজ্য ধরনের কিছু সাম্রাজ্য অথবা আমেরিকা (১৭৭৬ সালের  আগে পর্যন্ত ছিল কলোনি) পরে স্বাধীন দেশ। ফলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য বলতে বড় কিছুই ছিল না; মূল অর্থনীতিও তা ছিল না। তবে একটা বিশেষ ধরনের লেনদেন ছিল যে, দখল হয়ে থাকা কলোনি (যেমন বৃটিশ-ইন্ডিয়া) থেকে একপক্ষীয় সম্পদ পাচার  ধরণের ততপরতা; মানে বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে তাদের মূল ভূখণ্ড ইংল্যান্ডে সম্পদ লুটে নিয়ে যাওয়া ধরনের। এভাবে “ওয়ান ওয়ে” সম্পদ পাচারের ততপরতা, একে ঠিক বাণিজ্য বলা মুশকিল এবং তা অর্থহীনও!! আবার যেমন বরফ আবিষ্কারের পরে বৃটিশ আমলেই, আমেরিকা থেকে জাহাজ ভরে কলকাতার এলিটদের জন্য বরফের জাহাজ আসত। এটা বৃটিশ-ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা ছিল না বলে একে কলোনি ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা মনে করা মুশকিল। তবে কলোনি সম্পর্কের কারণেই বা কোন স্বাধীন রাষ্ট্র না থাকার কারণেই মূলত সেকালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে কিছু গড়ে উঠেনি।

    তাই ১৯৪৪ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও পরের বছর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল নয়া কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো ও পুরানা রাষ্ট্র, সবার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করার জন্য; একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। একদিক থেকে এটা ছিল এক বিশাল তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা যে দুনিয়াব্যাপী এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এবং এমন এক দুনিয়াতে যেখানে আইনিভাবেই আর কোন দেশকে আর কলোনি করে রাখা যায় না। জাতিসংঘের আইনে ও দৃষ্টিতে তা বেআইনি ও অন্যায়।  তবু নয়া এই গড়ে উঠা বাণিজ্য ব্যবস্থা এর পণ্য বিনিময়ের সিস্টেমটা বড়লোক দেশগুলোর দিকে কান্নি মারা ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। তাই এই বিনিময় ব্যবস্থায় বৈষম্য আছে।  তবে এটা অস্বীকার-উপেক্ষা করা ভুল হবে যে ১৯৪৫ সালের আগের কোন বাণিজ্য ব্যবস্থাই না থাকার চেয়ে এবং ইউরোপের হাতে কলোনি দখল হয়ে  না থাকার চেয়ে এমন স্বাধীন রাষ্ট্র অবশ্যই ভাল!
    কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরও কিছু রাষ্ট্র যারা জাতিসঙ্ঘের সদস্য হলেও তবু তারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি বা তাদের করা হয়নি। অন্য ভাষায় বললে, এরা মূলত তখনকার কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো, এরাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি। তাই এই অপারগতার জন্য তারা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় যোগ দিবার যোগ্য হয়নি। তবে এনিয়ে আরেকটু বিস্তারে বলা দরকার।

    বাণিজ্য ও কমিউনিজমঃ
    কমিউনিজমে কী বাণিজ্য থাকে? মানে কমিউনিস্ট দেশের অর্থনীতিতে কী বাণিজ্য থাকে? মানে অনুমোদিত?? এই হল, আদি কনফিউশন! আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যও না থাকলে আভ্যন্তরীণভাবে যেকোন উতপাদিত পণ্য  বিতরণ মানে ভোক্তা পর্যন্ত তা পৌছে দিবার বিতরণ ব্যবস্থা (এটাই ট্রেড বা বাণিজ্য) বলে কী ওদেশে কিছুই নাই? আর থাকলেই বা তা কেমন?
    তবুও স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন-এই মোড়ল কমিউনিস্ট দেশ, এর প্রতিনিধি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের সময় উপস্থিত ছিলেন। বিখ্যাত ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে টানা ২২ দিনের সেই সম্মেলনে কিছু সোভিয়েত প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম নিয়ে আলোচনা ও দলিলপত্র খসড়া তৈরি শেষে, পরে দলিল স্বাক্ষরের সময় এবং তারও পরবর্তী সময়ে সদস্যপদের চাঁদা জমা দিয়ে সদস্য হওয়ার সময় সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও পরে স্টালিন বেঁচে ছিলেন ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি তা কাউকে জানানো হয়নি। অথবা এই নিয়ে স্টালিন কোন কারণ তুলে ধরেছেন বা লেখাও লিখেছেন বলে জানা যায় না। আবার  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবার পরে যদিও কমিউনিস্ট দেশগুলো আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হবে না – এমন একজোট হয়ে কোন দিন এধরনের কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও সত্য নয়।
    তবে এখান থেকেই একদিকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু আর অন্যদিকে এসবের বাইরে থেকে গেছিল ২০-২৫ রাষ্ট্র যারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নেয় নাই। যার অর্থ এই ২০-২৫ রাষ্ট্র এদের নিজেদের মধ্যেও কোন বাণিজ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না। প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিক অস্তিত্ব হয়ে টিকে ছিল। যদিও এমন দেশগুলোকে “সোভিয়েত ব্লক” বা “কমিউনিস্ট ব্লকের” রাষ্ট্র বলার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। আর তা টিকে ছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে না যাওয়া পর্যন্ত।
    তবে কেবল পোল্যান্ডের কথা কিছু জানা যায়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে কার্যক্রম শুরু করলে পোল্যান্ড কমিউনিস্ট ব্লকের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকও রাজি ছিল, অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল একদিন না একদিন সবদেশকেই একই গ্লোবাল অর্থনীতির সম্পর্কের মধ্যে  আনা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেট। কাজেই তাঁরা পোল্যান্ডকে সদস্যপদ দিবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাড়া ও সমর্থন না পাওয়াতে ব্যাপারটা ওখানেই থেমে যায়। অর্থাৎ পরে সদস্যপদ না নেয়া বা পাওয়ার সিদ্ধান্তটা আর একা সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর সমস্যা থাকেনি। আমেরিকার না চাওয়াও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

    কিন্তু অন্য দিক থেকে বললে, কমিউনিস্ট  দেশের ব্যবহারিক চিন্তায়, বাইরের অন্যদেশের সাথে কোনো আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য – এই আইডিয়াটা নিয়ে কমিউনিস্টদের মধ্যেই মূলত অস্বস্তি ও অস্পষ্টতা ছিল গভীর এবং যা এখনো কমিউনিস্ট চিন্তায় আছে- এ কথাও আরেক কড়া সত্য। এটা অনেকটা যেন ‘কমিউনিস্ট হারাম-হালাল’-এর সমস্যা। যেমন কমিউনিস্ট চোখে খোদ বাণিজ্য জিনিসটা কি হালাল? উৎপাদন একমাত্র সরকারি মালিকানায় হতে হবে এই ছিল সেকালের কমিউনিস্ট রাস্তা। ফলে এর সাথে আবার বাণিজ্যের দরকারটা কী? এমনই ছিল মনোভাবটা। যার সারকথা হল, এসব চিন্তার মুল জায়গাটা হল কমিউনিস্ট অর্থনীতিক চিন্তায় তাদের অর্থনীতিতে “পণ্য আমদানি” বলে কোন ধারনা নাই।
    তবে এসব অস্পষ্ট কথা হয়ত সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নে নিজে অনেক বড় দেশ বলে চিন্তা করা যেত যে, দেশের প্রয়োজনীয় সব ভোগ্যপণ্যই সে নিজ দেশে উৎপাদন করে নিবে। তাই, পণ্য আমদানি হীনতার অর্থনীতি এটাই কমিউনিস্টদের বাস্তব অর্থনীতি বলে খারা করা সম্ভব হয়েছিল।   কিন্তু তুলনায় ধরা যাক বাংলাদেশের মত ছোট কোনো কমিউনিস্ট দেশ হলে তার বেলায় কী হবে?? সব প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য অথবা এমনকি কোন কাঁচামাল আমদানি তার জন্য অত্যাবশিকীয়। কারণ তার পক্ষে এসব কিছুই নিজ দেশে উতপাদন করা অথবা কম শ্রমমুল্যে তৈরি করাই অসম্ভব হবে। এছাড়াও আরেক বড় সমস্যা! তার ব্যাপক প্রয়োজনীয় হবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ পাওয়ার। এবং সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কারখানা নির্মাণে সরাসরি  বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) – এদুটাই ঐ কমিউনিস্ট দেশ কোনভাবেই যোগাড় করতে পারবে না। তত্সব হিশাবে দুনিয়ার প্রত্যেকটা দেশ বা অর্থনীতি নিজের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিজেই জেনারেট ও সঞ্চয় করে থাকে। ফলে বিদেশ থেকে ঋণ আনা প্রয়োজনীয় হবার কথা না। কিন্তু শতভাগ বাস্তবতা হল, আমাদের মত সবদেশই নিজ প্রয়োজনীয়  যে থাকবে এটাও স্বাভাবিক; তার পক্ষে আমদানি বাণিজ্য ছাড়া গতি কী? এ ছাড়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য ছিল না বলে কমিউনিস্ট দেশগুলো বাণিজ্যে জড়িত হতে সুযোগ না পেয়ে ধুঁকে মরেছে। যদিও আধাখেঁচড়াভাবে কথিত বার্টার সিস্টেমের কথা বলে বছরে একবার হয়তো কোনো পণ্য ‘আমদানি’ করতে তাদের দেখা গিয়েছে। কেবল অবাস্তব জিদটাই থেকে গিয়েছে!!

    সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মেঃ
    অথচ পুরা কমিউনিজমেই বাণিজ্য করা যাবে কি না, সহি বা তা সঙ্গত কি না এই অস্পষ্টতা কখনো কাটেনি। সারপ্লাস ভ্যলু বা শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিবে এমন নয়া এক অর্থনীতির তাঁরা প্রচলন করবেই। বাস্তবে এই চরমপণ এর প্রতিরুপ হল কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” যেটা কার্যত –  “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়লেই নাকি সেই কাম্য সমাধান পাওয়া যাবে – কিন্তু নানান কারণে এই কল্পিত অর্থনৈতিক সিস্টেমটাই  কার্যত যেন টিকে থাকে তা কায়েম করাই যায় নাই।  ফলে কল্পিত সেই “শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিতে পারব – এমন অর্থনীতিটাই অধরা থেকে গেছে, এই হল কড়া বাস্তবতা। এতে সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও তবু “সেই কল্পনাটা মানে সমাজতন্ত্র – সেটাই ভাল ছিল” – এই জিদটাই কেবল এখনও টিকে আছে।  কিন্তু জিদ – এটা না কল্পনায় না বাস্তবে – এর কোনই মুল্য নাই, অর্থহীন।
    এটা তো গেল সেই সমাজতন্ত্র ভাবনা যার সারকথাটা এখন হতে পারে যে “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়াটাই টিকানো যায় নাই বলে এই পদ্ধতিতেও শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত আনার প্রতিশ্রুতিও ব্যার্থ হয়ে গেছে। তাই এখন আবার নতুন কোন অর্থব্যবস্থা – একটা সাসটেইনেবল কিছু কি করা যায় তা নিয়ে নয়া খোজ শুরু করতে হবে। কিন্তু এতে আমাদের আলোচ্য ইস্যু যে কমিউনিস্টদের জন্য বাণিজ্য হালাল কিনা – এই অনুমান-বিশ্বাসও জড়িয়ে আছে বলে – এই প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে গেছে ফলে বাণিজ্য ও কমিউনিজম – এদের পারস্পরিক সম্পর্কও কমিউনিজমে অমীমাংসিত। তবে এটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলেও কার্যত সকলেই বাস্তবে তা মেনে নিয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট নিজেই ব্যবসা করছে, ব্যবসাদারদের বিল্ডিং ভাড়া দিয়ে সে পয়সায় দল চালাচ্ছে।   যেখানে সারা বাংলাদেশের অর্থনীতিটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ  মানে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের  অংশ এখন। তখন আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন বা রাস্তায় ভিখারি কিংবা উন্নয়ন কনসালটেন্ট বা গবেষক কিংবা বসে বসে বই লিখছেন – ইত্যাদি যাই করেন কোন ফারাক নাই। আপনি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থের ভাগীদার। এই ক্যাপিটালিজম আপনার মুখের ভাতের প্রতিটা গ্রাস এর যোগানদাতা। আমাদের রক্তের কণায় কণায় ক্যাপিটালিজম। তাহলে আপনি কমিউনিস্ট হন আর না হন  কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মে???

    গ্লোবাল বাণিজ্যের পণ্য কেনাবেচায় অংশ নিতে গেলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে থাকতেই হবে এটা একটা আবশ্যিক পূর্বশর্ত। তা মূলত এজন্য যে, প্রত্যেক দেশের নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশের কোনো পণ্য কেনাবেচায় অংশ নেয়া সম্ভব নয়। কারণ নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশী পণ্যের মূল্য নিজ মুদ্রায় কত, তা জানা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের মুদ্রার নাম এসডিআর [SDR] যার মান প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠান, এক মার্কিন ডলার সমান কত এসডিআর তা প্রকাশ করে থাকে। সাধারণত তা, এক ডলার মানে ০.৭৪৩ এসডিআর – বিনিময় হার এর ‘আশপাশে’ হয়ে থাকে। আর এখান থেকেই প্রত্যেক সদস্য দেশ তার মুদ্রার মান বা তুল্য বিনিময় হার সম্পর্কে জেনে নিতে পারে। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে সেটাও জানা সম্ভব নয়। তাই এমন কমিউনিস্ট দেশের পক্ষে অন্যদেশের সাথে কোন বাণিজ্য করা অসম্ভব।

    কবে কার্যত কমিউনিস্ট দেশগুলোর “বাণিজ্য করা পাপ” ধারণা থেকে আপাত মুক্তি মিলেঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। ভেঙে রাশিয়াসহ মোট ১৫টা আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে। আর এরপর এসব রাষ্ট্র সবাই নতুন রাষ্ট্র হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করেছিল। ১৯৯২ সালের মধ্যে তারা সবাই সদস্যপদ লাভ করে, গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেবার যোগ্য হয়ে যায়। কমিউনিজম মাথায় থাক কিন্তু পাপ-মুক্তি মিলে যায় সকল কমিউনিস্ট দেশে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম চীন। মাও-এর চীন  সকল কমিউনিস্ট দেশের আগে অগ্রগামি যে ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। কখন ও কিভাবে সেই সময় সেকথা আপাতত এখানে না বলি; অন্য কখনও বলব বা বলাই আছে!!
    ফলে বলতে গেলে, সোভিয়েত ভেঙ্গে গেলে পরে সেই প্রথম সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্রই একই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে যায় মানে, গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চালু করার কার্যক্রমও যা পারে নাই তা সেই প্রথম সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে, দুনিয়াতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীনস্থ গ্লোবাল অর্থনৈতিক এক মহাগোষ্ঠীর বাইরে ‘সোভিয়েত অর্থনৈতিক ব্লক’ বলে আর কোনো দেশ থাকার অবসান ঘটেছিল।

    আগের এই ব্লক রাজনীতিতে দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা রাজনীতির আরেক প্রকাশ ছিল কোল্ড ওয়ার। মানে হল আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন (গত পঞ্চাশের দশক থেকে) এদুই পরাশক্তির রেষারেষি থেকে তারা যেন সবসময় কোনো যুদ্ধাবস্থায়, এমন টেনশন দেখা যেত; অথচ বাস্তবে তারা কোনো যুদ্ধে জড়িত নয় এমন থাকলেও এই টেনশন কাজ করত। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ায় এই কোল্ড ওয়ারের অবসান ঘটেছে।

    আমেরিকার নয়া অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনঃ
    কিন্তু একালে আমেরিকার নয়া প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, যার অর্থনীতি ২০২৮-৩০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে নানান স্বাধীন পরিসংখ্যানগত অনুমান বলছে। যেহেতু এখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তাও অভ্যাসবশত অনেক অধ্যাপকেও  প্রায়ই মন্তব্য প্রকাশ করতে দেখা যায় যে, আবার কি কোল্ড ওয়ার তাহলে ফিরে আসবে? ফ্যাক্টস হল, কোল্ড ওয়ার দুনিয়াতে সত্যিকারার্থে আর ফিরে আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই। এর একেবারেই মৌলিক কারণটা হল, এখন দুনিয়ার প্রায় সব দেশ একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ (আমরা অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তা পছন্দ করি বা না করি) হয়ে গেছে যে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। আর পুরনো কোল্ড ওয়ার যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে কিছু রাষ্ট্র ছিল যারা গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়নি বা সম্পর্কিত ছিল না। সেটাও এখন আর নাই। আর কোল্ড ওয়ার রেষারেষি সেকালে (১৯৫০-৯১) এর বাস্তবতায় দেখতে পাবার একটা বড় কারণ ছিল এমন ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে আলাদা অর্থনৈতিক ব্লক হিসাবে কিছু দেশের অস্তিত্ব থাকার সুযোগ তখন ছিল, তাই। একালে এই বাস্তবতাটাই আর নাই, সব লোপ পেয়ে গেছে। এখন সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। তাই চাইলেও কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আবহ আবার তৈরি করা সম্ভব নয়।

    তাহলে একালে এই ব্যাপারটা আমরা এখন কী বা কেমন হবে-থাকবে, নতুন করে কী দেখতে পাবো?
    উপরে এতক্ষণ ধরে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থাটা নিয়ে পাঠকের ধৈর্য চুরি করে কথাগুলো বলে গিয়েছি – এখন সিদ্ধান্ত টানতে পারব বলে।

    “এশিয়া টাইমস” [Asia Times] হংকং থেকে প্রকাশিত এক প্রভাবশালী পলিটিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ওয়েব পত্রিকা। বলা যায় যেন এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল“।  এর গত ২৮ এপ্রিল এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আমেরিকান অর্থনীতি প্রথম কোয়ার্টারে জিডিপি নেমে গেছে” [Dependence on China shrinks the US economy in Q1]।’ এর ভিতরের রিপোর্ট বলতে চাইছে, আমেরিকান অর্থনীতি চীনা পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কারণে আমেরিকার জিডিপি চীনের সাথেই ওঠানামা করা শুরু করেছে। এ কারণে রিপোর্টারের মন্তব্যঃ  দুনিয়াতে আগের কোনো রেকর্ড নেই এমন এক ঘটনা এটা- দুনিয়ার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বা রাইভাল [rival] অর্থনীতি তারা এমনই আজব রাইভাল যে, তারা একে অপর দেশটা থেকে আমদানিতে পণ্য আনাতে নির্ভরশীল হয়ে গেছে, অথচ তারা স্ট্র্যাটেজিকভাবে রাইভ্যাল দুই দেশ যে, পারলে অপরকে মেরে ফেলে! সারকথায় এতে চীন-আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি আমেরিকার বিরুদ্ধে, চীনের পক্ষে গেছে। চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি এখন প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার আর এটাই আমেরিকার জিডিপি-কে নামিয়ে দিয়েছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে ক্রমশ এই ঘটনাটা ঘটে গেছে। ট্রাম্প আমলের সাথে তুলনায় চীনাপণ্য আমদানি এখন ৬০% বেড়ে গেছে।

    তাহলে, এখানে প্রাসঙ্গিক মূল কথাটা হল, একালে কোল্ড ওয়ার উত্তর যুগে, কেউ কারও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বলে তার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নাই বা করা যাবে না – বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না। একালে বরং রাইভালের সাথেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক হতে দেখা যাবে; তা অবশ্যই হবে। এমনকি তা সবচেয়ে গভীর নির্ভরশীলতার অর্থনৈতিক সম্পর্কে ডুবে থাকছে ও থাকবে। এখানেই একাল পুরোপুরি আলাদা!  আর এখান থেকেই জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝা একেবারে ফেল করে, অচল হয়ে যায়। জাতবাদি বুঝের উল্টাটাই বাস্তবে দেখা যায়।  অতএব কোল্ড ওয়ারের যুগ আবার দুনিয়াতে ফিরে আসবে বলে কেউ যেন গল্প না ফাঁদে। আর সাথে জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝ যেন আর কেউ প্রাকটিশ না করে নিজেকে যেন শাসন করে রাখে!!

    আর এটাই কমবেশি একই অবস্থা ভারত-চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যেও। প্রথমত তারা উভয় দেশ এখন ঘোরতর এক বাণিজ্য সম্পর্কে লেপটে জড়িয়ে আছে। অথচ তারা প্রবল ও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক রাইভ্যাল দুই দেশ। ভারত পারলে চীনকে ছিড়ে খায়!! ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখছে, ‘২০২১ সালের পরিসংখ্যান বলছে গত এক বছরে ভারতের চীনা পণ্য আমদানি বেড়েছে ৪৩%।’ এই খবরের শিরোনামটা হল, [Amid bilateral chill, India-China trade marks record surge in 2021]  অথচ চীন-ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন শীতলতম, ঠাণ্ডা। গত  ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে নরেন্দ্র মোদি গত কয়েক বছর ধরে চীনা আমদানি কমাবেন বলে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলেন – স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ [Swadeshi Jagran Manch] নামে আগে থেকে এক সংগঠন গড়া ছিল সেটা দিয়ে। কিন্তু ফলাফল উল্টা এবং নিজের এই দুরবস্থা দেখে মোদিও নিশ্চুপ!

    এটাই কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী যুগের ফেনোমেনো। কারো সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক থাকলেও সে দেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক, আমদানি নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আরো জোরদার হতে পারে, একালে। সোজা কথায় জাতিবাদী অর্থনীতি বলে কোনো ধারণা এখানে ব্যর্থ শুধু নয়; জাদুঘর আর্কাইভে ফেলে রেখে দিবার বিষয় হয়ে গেছে। বাস্তবে বরং প্রায় উল্টারূপে তা  এখন হাজির হচ্ছে! তাই মোদি এ নিয়ে এখন একেবারেই চুপ!

    কিন্তু ব্রহ্ম চেলানি ততই ভোকাল!
    ব্রহ্ম চেলানি [Brahma Chellaney] – ছোট হলেও দিল্লিতে তার একটা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান আছে; নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ। প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক বলা যায়। কিন্তু এই বাইডেনের আমলে তিনি বারে বারে বাইডেনের ওপর ক্ষেপে উঠছেন। আবার প্রচণ্ড চীনবিরোধী তিনি, আর তা কখনও একেবারে আনলাইক একাদেমিক স্বভাবে!!!  সময়ে মোদির চেয়েও বেশি ন্যাশনালিস্ট হয়ে উঠতে দেখা যায় তাকে! চীনকে তিনি ‘আগ্রাসনবাদী চীন’ [aggressor]- সবসময় তিনি এভাবে লিখেন। মানে সময়ে তিনি আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে চীনবিরোধি হয়ে যান। এমনকি খোদ তিনিই আমেরিকার-বিরোধি হয়ে উঠেছিলেন একসময়।  তাকে প্রথম এমন ক্ষেপে উঠতে দেখা গিয়েছিল গত ২০২১ আগষ্টে বাইডেন যখন আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসেন; সব সেনা ফিরিয়ে আনেন। চেলানি পরাশক্তির এই শিয়াল ভূমিকা দেখে এটা মেনে নিতে পারেননি। তাই  বাইডেনেরই কঠোর সমালোচনা করেছিলেন আর সেটা এমনই পর্যায়ে যে  প্রায় ফিরে যেন তিনি আবার বুশের কোলে গিয়ে উঠতে চাইছেন দশা!

    সেই ব্রহ্ম চেলানি, তিনি ইদানীং আবার ক্ষুব্ধ! প্রধানত কোয়াডকে [QUAD] নিয়ে। কোয়াড-এর  চার দেশের প্রধানদের এবার সাক্ষাতে (অন লাইন বা ভার্চুয়াল নয়) সম্মেলন হচ্ছে আগামী ২৪ মে ২০২২। আর তাতে এখনই চেলানির হইচই শুনে মনে হচ্ছে যেন এবার ভারতের বদলে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম নতুন অন্তর্ভুক্ত হবার কথা উঠেছে, তা হয়েই যাবে। সেটা হোক আর না হোক, চেলানির এবারের কলামের (প্রথম আলো যার অনুবাদ ছেপেছে – কোয়াড কি চীনকে ঠেকানোর লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছে? – এই নামে) শিরোনাম। বুঝা যাচ্ছে এখানেও খুবই এগ্রেসিভ তিনি! যেমন-  আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে ঠেকানো যেন কোয়াডের লক্ষ্য এটা ধরে নিয়ে তিনি লিখছেন। অথচ, এটা বোধহয় কোথাও পাওয়া যাবে না।
    যা হোক, তিনি কোয়াডের চার দেশের উপরই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। কেন? তিনি দেখতে চান যে, এ’চার দেশের কারো সাথে চীন থেকে চীনা পণ্য-আমদানির বা বাণিজ্য সম্পর্ক বলতে কিছু নাই। অর্থাৎ মনে মনে তিনি যেন একটা কোল্ড ওয়ার আমলের সোভিয়েত-আমেরিকা সম্পর্ক দেখতে চাইছেন। এ কারণে তিনি মোদির উপরেও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত!

    কিন্তু তাকে কে বুঝাবে, একালের গ্লোবাল পরিস্থিতিতে তিনি যেমনই একে দেখতে চান না কেন সেটা আর দেখার সুযোগই নাই; সব বদলে গেছে। অর্থাৎ উপরে লেখার শুরুতে গ্লোবাল বাণিজ্য ও এর গতিপ্রকৃতিকে প্রসঙ্গ করে অর্ধেরই বেশি পাতা খরচ করেছি – এজন্য যে এই ধারণাটা সকল পাঠকেরই খুব কাজে লাগবে। অসংখ্য  ব্রহ্ম চেলানি-রা ছড়িয়ে আছে এবং আরো গজাবে। কিন্তু তাঁরা কী বলতে চাইছেন এবং কেন এসব কথাগুলোর এখন আর বাস্তবতা নাই – সেটা সম্পর্কে পাঠকে সচেতন ও প্রস্তুত করতেই এই লেখা।  ফলে কোল্ড ওয়ার যুগের মত চেহারা-বৈশিষ্ট্য একালে আর দেখা যাবে না বা তা আর ফিরবে না। জাতিবাদী অর্থনীতিই তো লোপ পেয়ে গেছে – সেই ১৯৮০ সালের শুরু থেকেই গ্লোবাল বাণিজ্যই দুনিয়ার মুখ্য অভিমুখ হতে চেয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গেছে। অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন জীবিত থাকতেই এই পরিবর্তন যাত্রা শুরু করেছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর থেকেই বাণিজ্য গ্লোবাল হয়ে  উঠা আর এর প্রভাব টের পাওয়া প্রবলভাবে শুরু হয়েছে। তাই একালের বৈশিষ্ট্য হল, যেকোনো দেশের স্ট্র্যাটেজিক রাইভালের সাথেও তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক একালে অবশ্যই থাকবে। সেটা চীন হলেও তাতেও ব্যত্যয় ঘটবে না;  বরং যেন আরও ভালোভাবে থাকবে। কারণ যেসব চীনাপণ্য সবচেয়ে সস্তা তা আপনি না কিনে (আমদানি করে) তো আপনার রেহাই নেই। বরং চীনাপণ্য কিনতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবানই মনে করবেন।
    যেমন এই উদাহরণটা ভালো করে লক্ষ করেন!!!  তবে সাবধান এটা চীনের প্রশংসার ইস্যু নয় বা চীনের প্রশংসা করার জন্য লিখা মনে করলে ভুল হবে। বরং আজকের বাস্তবতাটা খেয়াল করতে ও বুঝতে হবে। ভারতে বেশির ভাগই জাপানি প্রাইভেট কার – এই গাড়ির জয়েন্ট ভেঞ্চারে গড়ে ওঠা কারখানা ভারতে আছে। কিন্তু সেই জাপানই মোদি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে যেন চীনা স্পেয়ার্সের (যন্ত্রাংশ) ওপর বাড়তি ট্যাক্স বসানো না হয়। মানে, প্রত্যাহার করা হয়। কেন? কারণ, গাড়ির অরিজিন জাপানি আর এসেম্বল ভারতে হলেও এর স্পেয়ার্সগুলো ভারতে বসে ওর যন্ত্রাংশগুলো চীনাপণ্য আমদানি করে এনে লাগানো। কারণ চীনা স্পেয়ার্স-এর দাম আকাশপাতাল কম। সে কারণেই জাপান সরকারের নিজেরই অনুরোধ এটা মোদির কাছে। [ভারতের বোকার “জাতিবাদি অর্থনীতি বুঝ” যে অচল ও অকেজো সেটা দেখাতে ২০২০ সালের আমারই এক পুরান লেখা এখানে দেখা যেতে পারে। ]

    অর্থাৎ ব্রহ্ম চেলানির চিন্তাটা পুরনো যা ১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত কোনোমতে চলতে পারা “জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ” দিয়ে তৈরি। অথচ এই “মফস্বলি বুঝ” নিয়ে তিনি এখন দুনিয়াকে এবং কোয়াড-দেশের অর্থনীতিকেও ব্যাখ্যা করতে গেছেন। এর মানে, তিনি খোয়াবে আছেন যে, তিনি যেন ১৯৮০ সালের আগেই এখনো আছেন।

    এমনকি তিনি চীনা আরসিইপি [RCEP] জোট মানে যেটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশন শেয়ার্ড প্রোডাক্ট’ উৎপাদনের এক নয়া জোট যেটা আসলেই এক বিরাট আগামী সম্ভাবনার জোট – এর প্রবল বিরোধিতাও করেছেন। জাতিবাদি বুঝের ভারত এতে যোগ দিতে চায়না, আঙুর ফল টক মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশ সাহস করে এত যোগ দিবার আবেদন করেছে সঠিক ভাবেই। বহু আগে থেকেই বলে আসছি যে, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক গ্রাজুয়েট-বিশ্ববিদ্যালয় লেভেল থেকেই সিলেবাসে অর্থনীতিকেও অন্তত একটা সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে একালে রাখতেই হবে। কারণ যে কেউ অর্থনীতির কিছু না পড়লেও নিজেকে জাতিবাদী অর্থনীতির ওস্তাদ বলে হাজির করতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখন জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ থেকে বহু দূরে চলে গেছে। কাজেই নতুন বাস্তবতা বুঝতে অন্তত কিছু অর্থনৈতিক নতুন ধারণা জানতেই লাগবে। অনেক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক প্রফেসরের মধ্যেও এই (জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ দিয়ে সব ব্যাখ্যার) ঝোঁক দেখা দিতে পারে বা এখনও থেকে যেতে পারে।

    তাই অন্তত জাতিবাদী অর্থনীতির বাস্তবতা যে আর নাই এটুকু রিয়ালাইজ করাই হবে তাদের প্রথম পাঠ! মোদির “স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ’ তাই এখন চীনের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ। আবার সাবধান, ব্যাপারটা চীন বলে নয়; যেকোনো দেশের সাথে হতে পারে। বিদেশী পণ্য আমদানি এখন সাধারণ ব্যাপার যখন আপনিও রফতানিকারক। এটা গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ!

    তাই যাকে পছন্দ করেন না তার সাথেই সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক; ফলে রাজনীতিক সম্পর্ক শীতল থাকলেও বাণিজ্যিক  ঘনিষ্ঠতাই এখান খুবই স্বাভাবিক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “যারে দেখতে পারি না তার আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই, কেন? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]