Category: Politics

  • কেন ভারত সফর

    কেন ভারত সফর
    গৌতম দাস

    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২  0৮ঃ৫৫ সকাল

    https://wp.me/p1sCvy-4eE

     

    Bangladesh PM Sheikh Hasina Arrives In Delhi For 4-day Visit

    হাসিনার সদ্য সমাপ্ত ভারত-সফর নিয়ে সফরের আগে থেকেই দেশে হাইপ [hype] বা মিথ্যা উচ্ছ্বাস তোলার চেষ্টায় কমতি ছিল না। মনে করা হয় আওয়ামি যুগ্ম বা সহ-সম্পাদক এর নিচের নেতাকর্মিমহলে ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ট এটা দেখাতে পারলে, এরা বিরোধিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে  নির্দয় মারপিট করতে জোশ পায়, চাঙ্গা হয়ে উঠে। অনেকে তাই হাইপ তোলাটাকে এখান থেকে দেখেছে।  তবে এর আগে বাংলাদেশের কোন প্রধানমন্ত্রীর কোন সফর নিয়ে এমন হাইপ তোলার চেষ্টা আমরা দেখিনি। সেদিক থেকে একটা বাড়াবাড়ি ত অবশ্যই ছিল।

    অন্যদিকে, এই সফর কেন, কী এর মুখ্য উদ্দেশ্য এর একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সরকার বা দল হাজির করার ক্ষেত্রে ব্যাপক খামতি দেখা গেছিল।  এরা কেউ বলতেই পারে নাই বা চায় নাই যে এই সফরের উদ্দেশ্য কী বা মুখ্য ইস্যু কী?  এটা ঢাকতেই যেন হাইপ তোলা হচ্ছে তা মনে হয়েছে। কিন্তু মুল বিষয়,  দেশের সরকার প্রধান কোন সফরে কেন যাচ্ছেন এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে অসুবিধা হবে কেন – এটাই তো আসলে অকল্পনীয় এবং অবিশ্বাস্য! কিন্তু তাই হয়েছে।

    ভারত-বাংলাদেশের বর্তমান বা চলমান সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গত ১৪ বছরে ব্যাপক অস্বচ্ছতা ও নিরুত্তর সব প্রশ্ন ক্রমেই তৈরি করে ফেলা হয়েছে।  সরকার এদিকটা কোনই আমল করে নাই অথবা আমল করা অবস্থায় ছিল না। যেমন, “ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে” – পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন একথা বলে ১২ ঘন্টাও টিকতে পারে নাই। এই উদাহরণটা আমরা মনে রাখতে পারি। এছাড়া দিনকে দিন ভারতের সাথে আমাদের নানান পাওনা নিয়ে গত ১৪ বছরে (যেকালে ভারত আমাদের চরম বন্ধু সরকার বলে দাবি জারি আছে) অমীমাংসিত ইস্যুর সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমে নাই। আর পানির মত ন্যায্য পাওনার ইস্যুগুলোর সমাধান ভারত আরো জোর জবরদস্তিতে করে তা না দিয়ে চলতে চেয়েছে। আর আমাদের সরকার বরং সেগুলো পাশ কাটিয়ে সবসময় চেষ্টা করেছে উলটা ভারতের খাতিরদারি আর তোয়াজ করে চলতে।  তাই এটা আশা করা অস্বাভাবিক ছিল না যে যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ইন্ডিয়া সফর তাই এই সফরের অন্তত প্রধান ফোকাস ইস্যুটা কী এনিয়ে সরকার স্পষ্ট করে বলে রাখবে। কিন্তু তাও এবার সরকার করে নাই।

    তুলনায় এর আগে যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জটিলতা বা অস্বাভাবিকতা যাই থাক তা সত্বেও তো উভয় দেশ থেকেই  উভয় দিক থেকে সরকার প্রধানের সফর ঘটেছে। কিন্তু কখনই এবারের মত এই সফরে ইস্যু কী – তা উহ্য রাখা হয় নাই। অথচ এবার নুন্যতম ফোকাস ইস্যুটা কী তা কেউ জানে না। সরকার স্পষ্ট করে বলতে পারে নাই – এমনটা হয় নাই।

    তাই উপায় না পেয়ে এমনকি প্রো-সরকারি মিডিয়াগুলোও পাবলিককে সন্তুষ্ট করতে যাকে পেয়েছে তাকেই ধরে নিয়ে এসেছে কিছু বলার জন্য। আর তাতেও দেখা গিয়েছে বিশেষত সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা হিমশিম খেয়েছেন। প্রশ্নের জবাবের চেয়ে আরো নতুন নিরুত্তর প্রশ্নগুলো সামনে এসে হাজির হয়েছে।  আর এতে সব আলোচনাতেই মুখ্য প্রসঙ্গ হয়ে ছেয়ে গেছে যে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা একপক্ষীয় – বাংলাদেশের দিক থেকে কেবল দিয়ে যাওয়া অথচ বাংলাদেশের প্রতিটা ন্যায্য পাওনার যেখানে হদিস নাই। এক্ষেত্রে অবশ্য আমরা ২০১৮ সালের ৩০ মে হাসিনার নিজের মুখের আক্ষেপের কথা মনে রাখতে পারি যে তিনি বলেছিলেন,  “ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা সারাজীবন মনে রাখবে” – শেখ হাসিনা।

    ‘ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের’ উপরই নির্ভরশীলঃ
    এবার সফরে মূল ইস্যু না জানা থাকাতে দীর্ঘ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়েই আমাদের সমাজে আলোচনার চেয়ে সমালোচনা হয়েছে বেশি।  তাই শেষে এর একটাই ব্যাখ্যা আপনাতেই  সামনে হাজির গেছে যেন আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল তাই তার পক্ষে বাংলাদেশের পাওনা বা স্বার্থের দিকটা নিয়ে কথা বলার, তুলে ধরার সুযোগ ও সক্ষমতা তার নাই, সে হারিয়েছে।
    এছাড়া এমন আপনা হাজির ব্যাখ্যার পক্ষে আরো উস্কানি তোলা আগুন ধরিয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য। হাসিনার ভারত সফরের দু-সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে স্থানীয় হিন্দুদের এক জমায়েতে দেয়া , “বাংলাদেশের সরকারকে টিকানোর জন্য ভারতকে বলেছি” – এই বক্তব্য। মোমেনের বক্তব্যের কারণেই ‘ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল” আছে এই সরকার এরপক্ষে সরকারি অনুমোদন পোক্ত হয়েছে বলে সমাজ দেখেছে। যদিও ঐদিন সন্ধ্যা হতেই খারাপ প্রতিক্রিয়া টের পেয়ে সাধারণ সম্পাদক কাদেরকে দিয়ে ঐ বক্তব্য “দল বা সরকারের নয়” বলে অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু দলনেত্রীর হুকুমছাড়া  – মোমেন, কাদের বা পরবর্তিতে আব্দুর রহমান এর মত নেতারা কেউ কথা বলেছেন এটা বিশ্বাস করা কঠিন!!
    আর এথেকেই আগামি বছর নির্বাচনের কথা খেয়াল রেখে সাধারণ মানুষের অনুমান যে আসলেই আগামি নির্বাচনেও সরকার ভারতের সক্রিয় সমর্থন কামনা করছে। যেন ভারতের অবস্থান  হাসিনা সরকারের পক্ষেই থাকে, অন্যদলের দিকে না যায় – এটা নিশ্চয় এবারের হাসিনার ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য!!

    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা, কেনঃ
    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। অথচ এবার সরকার না চাইতেও তিস্তা নদীর না-পাওয়া পানি ইস্যু এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের গায়ের জোরের নীতি-পলিসি  আরো উন্মোচিত হয়েছে।  তাই, সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা এনিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পরেছে।  আর তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। কেন?
    গত ২০০৯ থেকে চলে আসা টানা ১৪ বছরের সরকার মূলত ভারতের নর্থ-ইস্ট বা আসামের সব চাহিদার ইস্যু বা দুঃখ ঘুচিয়ে দিবে যেন এই প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিল। এককথায় বললে, সারা নর্থ-ইস্ট বা আসাম, ত্রিপুরা ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরণের অবাধ করিডোর সুবিধা নিবে এর বিনিময়েই যেন তখন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। মনে হয়েছে যেন আমরা এখনও “অখন্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়ায় ১৯৪৭ সালের আগেই আছি”। এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাই ভারতের একক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অবাধে বাংলাদেশের ভুখন্ডের উপর দিয়ে সব করিডোর সুবিধা নেওয়া হয়েছে। আর তা যোগানোই যেন আমাদের সরকারের কর্তব্য!!

    এখন ২০০৭ সালের পরিকল্পনা মতে,  ভারত এভাবে একপক্ষীয় ভাবে সকল সুবিধা নিবে এটা দেখতে খারাপ লাগে তাই, ভারতের দিক থেকে দুইটা অমীমাংসিত ইস্যু তারা বাংলাদেশকে সমাধান করে দিবে বা ছাড় দিবে – এমন একটা ধারণা আমরা কার্যকর থাকতে দেখেছিলাম। এর একটা হল “ছিটমহল বিনিময়” যা সেই শেখ মুজিবের আমল থেকে চুক্তি করেও ফেলে রাখা ছিল।  যেটা সেই আমল থেকে আমরা আমাদের ভুমি ভারতকে ছেড়ে বসে আছি কিন্তু ভারতের খবর নাই – অবস্থায় ছিল; এই ছিটমহল প্রশ্নের সমাপ্তি টানবে। আর দ্বিতীয়টা ছিল, তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। এই কারণে বলা যায়, তিস্তা ইস্যু হল স্পেশাল যা ভারতের দিক থেকে নয়া হাসিনা সরকারকে আপোষে দেয়া প্রতিশ্রুতি।
    অথচ আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদি সশস্ত্র আন্দোলন সমস্যা মিটিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে আসামের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, আকাশ-স্থল-পানি ইত্যাদি সব মাধ্যমে করিডোর যোগাযোগ সুবিধা কী নয় – এমন সবকিছু ভারতকে দেওয়ার পরও আমাদের সরকারের হাত শুন্য – আশ্বাস ছাড়া সেখানে কিছুই নাই!!
    আর এখন এসব সত্বেও আমাদের বেচারা সাংবাদিক, কূটনীতিক বা অধ্যাপকেরা তবু আশার বাণী শুনাচ্ছেন যে এই সফরে তিস্তা ইস্যু নাকি আলোচনার বিষয় হবে – অথচ এনিয়ে কোথায় কোন আলাপ নাই।
    এমনকি কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে মোদি সরকার তো পানি দিতেই চায় কিন্তু মমতা চায় না তাইতেই  নাকি সব সমস্যা হয়েছে। আচ্ছা যদি সমস্যাটা তাই হয় এসব বক্তারা কী একবার ভেবে দেখেছেন এর অর্থ কী? এর অর্থ হল, তাদের মোদি-জী আসলে একটা খামোখা!!! মুরোদ নাই, অক্ষম; তাই তিনি কেউ নন। তাহলে ভারতের সরকার কাঠামো অনুসারে এখানে  মোদি সরকারের যদি মুখ্যমন্ত্রীর উপরে মুরোদ নাই হয়ে থাকেন মানে পানি দেওয়ার ক্ষমতা যদি মোদির না মমতার হাতে থাকে তাহলে আমরা মোদির সাথে কেন ডিল করতে বা চুক্তি করতে চাচ্ছি বা গিয়েছি কেন??? মোদি তাহলে কে আমাদের কাছে??? জয়শঙ্করের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা কথা বলছি বা বলব কেন??? কোন মুরোধীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের যাওয়ার দরকারই বা কী??

    একারণেই বাংলাদেশে একথার প্রতি বিশ্বাস বাড়ছে যে আমাদের সরকার ভাবছে তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের সমর্থন জরুরি আর একারণেই বলাই বাহুল্য ভারত তাই যেচে আমাদের কোন ন্যায্য পাওনা দিতে মনোযোগ দিবে কেন?

    ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা ছেড়ে, প্রসঙ্গে আসতে হবে – কেন ভারত সফরঃ
    উপরে এতক্ষণ ঘুরায় ফিরায় আমরা অনেক কথায় গেলাম। কিন্তু মূল বিষয় যে ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী তা জানা হল না। এককথায় বাংলাদেশে বা দেশের বাইরের মিডিয়ায় যাকিছু প্রকাশিত আলোচনা তারা কেউই সফরের উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট জানাতে পারে নাই। শেষে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়ে লিখেছে এই সফরের উদ্দেশ্য নাকি “রাজনৈতিক”। ‘রাজনৈতিক’ মানে?? সেটা আবার কী??  আসলে সেটা হল  মানুষ যখন বুঝে যায় তার কথার কোন মানে হচ্ছে না তখন কিছু অর্থহীন অবুঝ শব্দে (vague) মানে আন্দাজে অস্পষ্ট শব্দ নিয়ে আসে। এখানে ‘রাজনৈতিক’ শব্দের অর্থ তাই। ঠিক যেমন অনেকে নিজ বুদ্ধিতে না কলিয়ে দুনিয়ার নানান ফেনোমেনো ব্যাখ্যা না করতে পারলে বলে – এটা ‘ভূরাজনীতি’ বা ‘ভূরাজনৈতিক প্রভাব’। এই “রাজনৈতিক” শব্দের আমদানিও সেরকম। অর্থাৎ যেটা নিজেই বুঝে নাই, সেটা অন্যকে বুঝাতে লজ্জা ঢাকতে গিয়ে যে শব্দ তুলে আনা হয়।

    তাহলে আবার পুরানা প্রশ্ন, এই ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী? এবার আর রহস্য না করে বললে সোজা জবাবটা হল – ভারত সফরের উদ্দেশ্য ‘চীন’! সেটা আবার কী? যেখানে সফরে যাচ্ছে ভারতে তাহলে সেখানে উদ্দেশ্য চীন – একথার মানে কী?

    মানে হল, গত দুমাস ধরে বাংলাদেশের মিডিয়ায় লাগাতর যে প্রধান খবরে ডুবে ছিল ও আছে তা হল, রিজার্ভ সংকট। মানে সরকারের কোষাগারে দেশচালানোর মত  যথেষ্ট ডলার নাই। গড়ে প্রতি মাসে আমদানি আয় ও রপ্তানিতে ব্যয়ের ঘাটতিতে একে রেমিটেন্স ও ইত্যাদি আয় দিয়ে পূরণ করার পরও ব্যালেন্সে ঘাটতি গড়ে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। আর সামাজিক বাস্তবতার দিক দিয়ে যদি ব্যাপারটাকে বর্ণনা করি তা হল,  আমাদের নিয়মিত কমপক্ষে দুঘন্টা লোডশেডিং হয় আর সারা দেশের মানুষের সরকারি-বেসরকারি  ওয়ার্কিং আওয়ার  ৩ ঘন্টা কমানো হয়েছে, মূলত বিদ্যুতের চাহিদা কম রাখার জন্য। আর এদুটা হল আমাদের ডলার সঙ্কট কত তীব্র তা বুঝবার জন্য বাইরের মাত্র দুটা প্রকাশিত চিহ্ন। এছাড়া চারিদিকে মুদ্রাস্ফীতি যা মূলত উদ্ভুত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এতে বাজারে ডলার কেনাবেচার রেট ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এসবই হল মারাত্মক গভীর সব সংকটের বাইরের দুচারটা লক্ষণ। আবার সেই থেকে আইএমএফের কাছে বিশেষ ঋণের আবেদন করা হয়েছে, সে খবরের উদ্ভব। তবে আপাতত দেখা যাচ্ছে ডলার সংকট নিয়ে উদাম খবরগুলো আর বাইরে আসছে না। নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিছু লাগামও টানা হয়েছে। কিন্তু সংকট যে আগের মতই আছে সেটাও পরিস্কার!
    এসবের সারকথা হল, আমরা গভীরভাবে ডলার বা রিজার্ভের সংকটে আছি।

    আমাদের দেখা উদাহরণ বলছে, এমন ডলার সংকটে আইএমএফ সংকটের সুরাহা দেয় কিন্তু  তা প্রথমত, অন্তত ৪-৫ মাস লেগে যায় তাতে। আর, তবে এর আগেই বাছবিচারহীনভাবে খামোখা সব ভর্তুকি তুলে নেওয়ার দাবি করে আইএমএফ মুদ্রাস্ফীতি চরমে তুলে দেয়। (তবে আমাদের সরকার কেউ না বলতে আগাম নিজেই তেলের দাম দেড়্গুণ বাড়িয়ে সমস্যাকে ঘোলাটে করেছে।) দ্বিতীয়তঃ  সব চেয়ে বড় কথা আইএমএফ এক্ষেত্রে চলতি সরকারের সাথে চুক্তিই করে না। যদিও হবু নয়া ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা ও শর্তাবলি কী হবে তা নিয়ে আলোচনার সবই করে। কিন্তু শেষে চুক্তি করার আগে বলে থাকে চলতি সরকারের সাথে না, পরবর্তি সরকারের সাথে সে চুক্তি করবে। এর মানে যে যা বুঝার বুঝে নিতে পারেন। আর শ্রীলঙ্কায় ঠিক এই জিনিষটাই সম্প্রতি ঘটেছে।

    তাহলে এর থেকে সরকারের নুন্যতম বিকল্প বা পরিত্রাণ কি?  তা হল, চীনের মত দেশ থেকে বড় নগদ ঋণ নেয়া। চীনের নাম নেয়া এজন্য যে বাকি যারা দেশ তাদের সামর্থের প্রশ্ন আছে আর এরচেয়েও বড় হল, কোন ‘ক্যাম্পের’ তারা ইত্যাদি এসবের প্রশ্ন আছে। তবে আইডিয়ালি বললে, আইএমএফের লোন পাওয়া নিশ্চিতের বা পাওয়ার পরেও একই সাথে সাথে চীনা ঋণও পাওয়ার দরকার থাকে। আমাদেরও আছে। মূল কারণ, আইএমএফ লোনের পরিমাণ কম হলেও এর উদ্দেশ্য বা আমাদের লাভ ও দরকার হল দেশি-বিদেশি পুঁজি বাজার ও ব্যাংক ব্যাবসাকে আশ্বস্ত করা যে আইএমএফ (সে বাজারের চোখে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ) নিজে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চেক করেছে। আর চীনের ঋণ দরকার রিজার্ভের ঘাটতি পূরণে। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে সম্ভবত সরকার বেছে নেয়া লাইনটা হল, আইএমএফের  ঋণ পাওয়া যা হবে হোক, আগে চীনা লোন নিশ্চিত করা যাক!

    কিন্তু তাতে আবার সমস্যা কীঃ
    তাতে সমস্যা কী? নয়া চীনা লোন নিলেই তো হয়। আর এর সাথে আবার হাসিনার ভারত সফরে যাওয়ার কী সম্পর্ক?

    বিরাট সম্পর্ক। আর সেটা দশহাত শাড়ি পড়ার মত, যে ডানদিকটা ভালমত ঢাকলে তাতে বাদিকটা উদাম হয়ে যায়। সেটা আবার কী? এখন চীনেরও সদ্য পুরান  কিছু ক্ষোভ আছে। আর চীনের স্বভাব হল ক্ষুব্ধ হলে সে ঐ দেশ ছেড়ে চলে যায় না। বরং বিপদে পড়া দেশটাকে আরও সাহায্য করে ঠিকই কিন্তু এবার আরো কড়া সব শর্ত আরোপ করে।

    এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি গত ২০২১ সালে আমাদের করোনা টিকা পাওয়ার কাহিনী। আজ বাংলাদেশে দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার মধ্যে সবার চেয়ে আগিয়ে ৭৩.৭% সফল তিন ডোজ টিকাদান করা দেশ। কিন্তু এই মিরাকল কেমনে সম্ভব হল কেউ খবর নেই নাই। ভারত আমাদের সাথে শর্তভঙ্গ করে আমাদেরকে টিকা না দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পাপনের প্রকাশ্যে ভারতকে গালাগালি করা আমরা দেখেছি। এরপরও, এখন এই অর্জন সম্ভব করা গিয়েছে। কারণ, এখন আমাদের টিকা পাওয়ার মূল চালান চীনের দেয়া আর সেটা প্রায় বিনা পয়সায়। ঢাকা শহরের মধ্যে বিতরণ করা  (জাতিসংঘের হু এর দানে দেয়া কিছু টিকা) বাদে এর বাইরের সব টিকাই চীনা টিকা। কিন্তু কিসের বিনিময়ে সরকারকে এই টিকা পেতে হয়েছে আমরা সাধারণ্যে খবর নেই নাই।

    খুব সম্ভবত আজকের ডলার সংকটের ক্ষেত্রেও ক্ষুব্ধ চীনের শর্ত মেনে আমাদের লোন পেতে হবে। গত ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট এর ঢাকা সফরের পর থেকে আমরা প্রথম চীনা অবকাঠামো ঋণ পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই ছয়বছরে নিতে চাওয়া বহু অবকাঠামো প্রকল্প শেষে আমরা নিতে পারি নাই। কারণ, চলতি ১৪ বছরের টানা সরকারকে ভারতের সমর্থনের (ভারতের সমর্থনে সরকার বিষয়ক মন্তব্য করে মোমেন যেকারণে নিন্দিত) ব্যাপারটাকে সবার উপরে সবসময় আমল ও মনোযোগ দিতে হয়েছে। খুব সম্ভবত এবার চীনা নগদ ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আপত্তিতে আগে যেসব চীনা-প্রকল্প বাদ দিতে হয়েছে এর সিঙ্ঘভাগে এবার ফিরে গ্রহণ করতে বাংলাদেশকে রাজি হতে হবে।

    আর এতে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুমান করে আগেই ভারতের সাথে কথা বলে অন্তত যথাসম্ভব তা জানিয়েই কাজ করতে মনস্থ করেছে সরকার। অতএব সেখান থেকেই এই ভারত সফর। এনিয়ে একমাত্র সমকাল পত্রিকায় সঠিকভাবে সম্প্রতি কিছু রিপোর্ট এসেছে। স্বভাবতই খবরের সোর্সের নাম আড়াল করে ছাপানো  “তাসনিম মহসিন” এর লেখা সমকালের কিছু রিপোর্টে তা এসেছে। এর মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর   ‘ঢাকার মধ্যপন্থায় আশ্বস্ত দিল্লি’ শিরোনামে লেখাটা সবচেয়ে (তবে যতটা সম্ভব ইঙ্গিতে বলা) বিস্তারিত।  যদিও আসলেই কী ভারত এতে আশ্বস্ত হবে? এর জবাবটা ঘুরিয়ে দিতে হবে! বলতে হবে, কেউ আশ্বস্ত হবে কিনা সেটাই তো ওর নিজ যোগ্যতার উপর নির্ভর করে! তাই না!!

    যেমন ধরেন টিকা প্রসঙ্গে মানে, দিব বলে চুক্তি করে না দেওয়া এটা ভারতের ছেঁচরামো – এর পরিণতি কী হয়েছে? পরিণতি হল কক্সবাজারের কিছু স্থাপনা বাংলাদেশ চীনকে করতে দিয়েছে। মানে যেমন বিমানবন্দর-রানওয়ে ও ‘ইত্যাদি’ নির্মাণের কাজ দেয়া। এখন এতে ভারত অস্বস্তিবোধ করে তো লাভ নাই। এটাই তো টিকা না দেওয়ার  কাফফারা!! নয় কি? ভারতের নাই মুরোদ বা যোগ্যতা তবু তাকে চীন-বাংলাদেশ প্রথম টিকা-চুক্তিতে বা-হাত ঢুকাতেই হবে। চীনা টিকার  গবেষণায় থার্ড ফেজে বাংলাদেশ অংশ নেওয়ার বিনিময়ে  চীনা টিকা পাওয়া বন্ধ করে দিতে হবেই!!! এই ছিল অক্ষম মুরোদধীন ভারতের কূটনীতি! এতে পরিণতি কী হয়েছে সেটাই দেখব!

    অর্থাৎ সেই ভারত যোগ্য হয় নাই এখনও।  অন্যকে অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ হয় নাই। ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উন্নিত নয়। আর পছন্দের দেশকে ‘অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ” যখন হয়, এটাই কোন দেশের গ্লোবাল নেতা হবার বা কার্যত দাবি করার বা উঠে দাড়ানোর মুল লক্ষণ চাবিকাঠি।  এভাবেই  দাপটের সাথে গত পচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা এভাবেই মুরোদ দেখিয়ে এসেছে। যেটা এখন শীর্ণ প্রায়, বুড়া সিংহের মত।  এটাই অন্যদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের আসল  সক্ষমতা ও যোগ্যতা।  যা এখন আমেরিকার জায়গায় দেখাচ্ছে চীন। আর ভারতের সে মুরোদ হতে এখনো ধারে কাছেও নাই; তবে হয়ত হবে। অথচ এখনই বিরাট হা-করা আশার জিহবা বের করে ভারত বসে গিয়েছে। যেন কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ জেগেছে!!

    যেমন উপরে উল্লেখিত সমকালের তাসলিম মোহসিনের ঐ লেখার একটা অংশ হল এরকমঃ “…সাবমেরিন বিষয়ক সামরিক প্রশিক্ষণে বঙ্গোপসাগরে চীনা উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমুদ্রে নিরাপত্তা নজরদারি জোরদারের জন্য রাডার সিস্টেম দেবে ভারত।  এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে”।  এটাই হল, – কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ – এর পারফেক্ট উদাহরণ। ভারত যেন বলতে চাইছে – মাংস খেতে না পারলাম একটু ঝোল তো পেতে পারি।  আসলে যে মাংস পাবার যোগ্য নয়, হয়নি সে ঝোলও কেন পাবে???  আগে নিজের অবকাঠামো নির্মাণের সব প্রয়োজন পুর্ণ কর – এরপরেই না অন্যদেশে অবকাঠামো ঋণ দিতে শুরু করা!  মানে গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করতে, ছড়িয়ে দিতে শুরু করা এসব কাজের যোগ্য হওয়া আর এজন্য  ছেঁচরামো শুরু করা কি এককথা?? আর এসব করে শেষে লাভটা কী হয়?

    কাজেই এখন ভারতের মুরোদহীন আপত্তি উপেক্ষা করে চীন-বাংলাদেশের পুরানা বাদ-পড়া চীনা প্রকল্পগুলো আবার চালু করতে হাসিনার সামনের ভারতীয় বাধা কাটাতেই, মানে অন্তত মুখরক্ষা করতেই হাসিনার এবারের ভারত সফর ঘটেছে। এটাই মূল কারণ। আর লাভের লাভ যে ভারতীয় কোন আপত্তি যে হাসিনা আমল বা শোনার অবস্থায় নাই সেটা বলে দিয়ে এসে সব বাধা কাটিয়ে আনতে তিনি সফল – এই অর্থে তার সফর সফল বলে সরকার দাবি করছে। আর তা যাওয়ারই কথা। আর এর সাথে পাশাপাশি চীনা  কিছু নগদ ঋণের সংস্থানও হাসিনা করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে অবশ্যই যাতে তাঁর চেপে বসা ডলার সংকটের কিছু সুরাহা হয়।

    কিন্তু হাসিনার ভারত সফর সফল “হবারই কথা” বলছি কেন?
    বলছি কারণ ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে গেছে তা একেবারে ভেঙ্গে না গেলেও। ফলে ভারত যেন হাসিনার জন্য আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ নিয়ে যাক, এমন উদ্দেশ্য হাসিনার এই সফরে ছিল না।  কারণ, এখন আর আমেরিকার কাছে  ভারতের সেই মুল্য বা গুরুত্ব নাই।  একারণেই রাশিয়ান তেল বা জ্বালানি নিয়ে সেসব বকোয়াজি এটা শাহরিয়ার আলমের নিজের কল্পনা। যতদুর জানা যায় এটা আপার ফরমাইস ছিল না।

    কিন্তু  এখন কী দাড়ামো? এর মানে কী এই যে সরকারের ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাচ্ছে? না, এখনো অনেক সবুর করতে হবে। এছাড়া সবটা  না হলেও সরকার কিছু আলো দেখতে পাবে অবশ্যই। তাও যদি এখন চীনের সাথে নয়া কিছু চুক্তি সম্পন্ন-সহ সেসব কাজকে বাস্তবে করে দেখাতে পারে তা পরিকল্পনা-মত সফল হতে হবে আগে।

    পুরা ডলার সংকট সমাধান কী হবেঃ
    কিন্তু কেন পুরা ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা জাগাতে পারা যাচ্ছে না? মূল কারণ সংকটটা কৃত্রিম। মানে হল, গত ১৪ বছর যে পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ লোপাট হয়েছে এরা সবাই চাচ্ছে তাদের টাকা ডলারে রুপান্তর করে নিতে। এটা বাস্তবত অসম্ভব। কারণ, এই চাহিদা অস্বাভাবিক। এটা বাংলাদেশের স্বাভাবিক অর্থনীতি থেকে উঠে আসা কোন চাহিদা নয়। এটা আলটপকা এবং লুটেরাদের চাহিদা। যা স্বাভাবিক অর্থনীতিক চাহিদার বাইরের ঘটনা আর বাইরের লোকেদের। আমাদের স্বাভাবিক অর্থনীতি কখনও আমাদের অর্থনীতিতে সচল সব স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে ডলারে রুপান্তরিত করার কোনই চাহিদা তৈরি করে না।  কাজেই এখন দেখা দেওয়া সব চুরির টাকার ডলারে রুপান্তরের চাহিদা এটা স্বাভাবিক ও আমাদের অর্থনীতির পক্ষে তাদের চাহিদা মিটানো এবসার্ড! ফলে সোজা কথা,  চোরদের তৈরি করা “ডলার চাহিদার” উপর রাষ্ট্রের একশন লাগবে – সক্ষমতা লাগবে, একে কঠোর দমন করা লাগবে, যদি  সে মুরোদ থাকে!

    এই পরিস্থিতিতে জীবন নাভিস্বাসে উঠে যাওয়া মানুষের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সাথে এখন থেকে অর্থনীতি ক্রমশ স্থবির হতে চাইবে – এমন দশা স্পষ্ট হইয়ে উঠবে। যা ব্যাপক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে ঠিকমত কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনীতির সামনে চলে আসা, প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠা  – এটা এক খুবই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে তাদের আমেরিকান সমর্থনও পাওয়ার কথা।  বাকিটা আগামিতে…।

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • নাসিরুদ্দিন শাহরা ‘কথিত সেকুলার’ ভাঁড়ে পরিণত 

    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা “কথিত সেকুলার” ভাঁড়ে পরিণত 

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০৫ পিএম  

    https://wp.me/p1sCvy-3LG

     

    Had great faith when Modi ascended to power in 2014: Naseeruddin Shah

    [সার-সংক্ষেপঃ  ভারতের নাসিরুদ্দিন শাহরা অবুঝের মত কথা বলছেন। তারা ভারতের রাজনীতি নাকি নিজের ধর্ম – কোনটার সংস্কার চান, সেটাই পরিষ্কার নন বা পরিস্কার করছেন না। তিনি যে ধারণার উপর ফিরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন তা কংগ্রেসের কথিত-‘প্রগতিবাদী’ রাজনীতি; যা এখন নিজগুণেই পরাজিত ও মৃত।  আমরা তিন দেশ ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে এটাই জন্ম থেকেই আজও অশান্ত ও দুর্বল করে রেখেছে। এবং এখনও সমাধান করতে সক্ষম না হলে আগামিতেও আরও অশান্ত থাকতে বাধ্য হবে।  অথচ নাসিরুদ্দিন শাহরা তা বুঝতে পারছেন মনে হয় না।]

    কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের রাজনীতি ভারতেই আজ মৃত। কংগ্রেসের ক্রমে নিঃশেষ, মুছে যাওয়া আর বিজেপির দু’বার বিজয়ই এর প্রমাণ। হিন্দুত্ববাদের বিজেপি হয়ত আবার জিতবে বা জিতবে না, কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতি শেষ ও বিলুপ্ত, এটা আর ফিরে আসবে না, তা আমার কথা নয়। গত নির্বাচনে রাহুল গান্ধী নিজেই “সফট হিন্দুত্ববাদের” ভিত্তিতে ও পক্ষে ভোট চেয়ে তা প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ ভারতে প্রধান দুই দলের এখন একটাই রাজনীতি – হিন্দুত্ববাদ। সাথে এখানে বলে রাখা ভাল অনেকের হয়ত খেয়াল করে দেখাই হয় নাই যে “হিন্দুত্ববাদ” জিনিষটা কী!

    আগে বলে নেয়া যাক হিন্দুত্ববাদ কী নয়! এর মানে, কেউ হিন্দু (বা সনাতন) হলে সে হিন্দুত্ববাদী বা খারাপ তা এখানে বলা হচ্ছে না, হয় না। হিন্দু হওয়া খারাপ তাও না। এককথায়, হিন্দুত্ববাদ আর হিন্দু মানে একই কথা একেবারেই নয়। কেউ হিন্দু হয়েও হিন্দুত্ববাদি নাও হতে পারেন। তবে হিন্দুত্ববাদি সকলেই হিন্দুও।   ব্যাপারটা হল আজও কংগ্রেস এবং বিজেপি – প্রথমটা সফট [soft]  আর পরেরটা ভারি হিন্দুত্ববাদী হলেও এদুই দলের বাইরে এখনও অনেকেই হিন্দু থাকতে পারেন এবং তারা আছেনও।

    আবার, কেউ হিন্দুত্ববাদী হলে সেটা খারাপ এজন্য যে এটা উগ্র হিন্দু জাতিবাদ বা ন্যাশনালিজম। তবে উগ্র বা নরম যেটাই হোক এটা খারাপ। চিন্তা হিসাবে বিপদজনক। কারণ এগুলো “আমার জাতি শ্রেষ্ঠ” ফলে অন্যদের উপরে আমার স্থান – এধরণের জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর ধারণা; বলাই বাহুল্য সব জাত শ্রেষ্ঠত্ব ধারণাই বিপদজনক ও ক্ষতিকর। হিটলারের মত অন্য-সব জাতিগোষ্ঠিকে পুড়িয়ে মারার মত ধারণা –  এথনিক ক্লিনজিং ধারণা।  কোন ধর্ম বা কোন জনগোষ্ঠির মনের গহীনে “নিজ-জাত-শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা দুনিয়ার বাকি সব জাতিগোষ্ঠির জন্য বিপদজনক এবং পাশাপাশি অন্য কোন জাতিগোষ্ঠির সাথে বসবাস-অযোগ্য এক “জাতিবোধ।  তাতে এই জাত বলতে তা ইংরাজিতে race অথবা ethnic যাই বুঝাক বা যে অর্থেই জাত বা জাতি বুঝাক না কেন। সবার বেলাতেই সত্য। হিন্দুত্ববাদ একটা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারণা।

    আসলে, যেকোন  ধরণের জাতি-ধারণা মধ্যেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণা সুপ্ত বা লুকানো থাকেই।  আর তাই যেকোন সময় তা বের হয়ে এসে আমরাও একেকটা জাতি হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলারের মত “আমরা দেহে নীল চোখের এরিয়ান রক্ত বা ব্লাড, আমরা হলাম দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আমরা জাত-শ্রেষ্ঠ। এই ছিল হিটলারের মুখ্য বয়ান। আর এটাই সব রেসিস্ট (বর্ণবাদী racist) – এদের কমন ডায়লগ আর চরম ক্ষতিকর বয়ান। দুটা শব্দ দিয়ে এদের চিনা বা চিনানো সম্ভব। আমরা চেক করতে পারি তারা রক্ত  অথবা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলছে কিনা!  অথবা আমরা মহান বা  আমরা মহান জাতি; আমার ভারত মহান বা আমার জর্মানি মহান ইত্যাদি ধরণের বয়ান দেয় কিনা! আর এখানে  রক্ত মানে তাদের রক্ত নাকি সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ, এই তাদের দাবি।  একারণে কংগ্রেস বা বিজেপির “হিন্দুজাতি রাষ্ট্র” গড়তে চাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ গড়া একই কথা।  অনেক সময় আমরা অজানায় আরেকটা জনগোষ্ঠিকে  নিচা দেখানো যায় এভাবে শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে ফেলি – তাই এটা অবশ্যই রেসিজম এবং ক্ষতিকর । [যেমন পাকিস্তানিদের আমরা ‘পাকি’ বললাম।] আর এভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিক হল, এতে একটা রাষ্ট্রের ভিতরে আর সকলেই সম-নাগরিক অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ বা সম্ভাবনা থাকে না। নাই হয়ে যায়।  কাজেই মূলকথা কারও হিন্দু নাগরিক হওয়া (যেটা কোন সমস্যা নয়) আর হিন্দুত্ববাদী নাগরিক হওয়া এক কথা নয়।

    ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রভাব অর্থে বা ট্রেন্ড অর্থে বলতে পারি কংগ্রেসের রাজনীতির পতন হয়েছে।  অর্থাৎ উগ্র-হিন্দুবাদকে লুকানো রেখে আড়াল নেয়া হিন্দুত্ববাদ পরাজিত হয়েছে। আর এতে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দুজাতিবাদ উদাম হয়ে বিজেপি নামে ক্ষমতাসীন। অথচ নাসিরুদ্দিনরা যা নাই, যা মৃত, সেই কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের অলীক সেক্যুলার ভারতে ফেরার দাবি করছেন! গত বছর (২০২১) সেপ্টেম্বরে তার ফেসবুক ইউটিউবে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু বক্তব্য প্রচার করছেন সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    মনে রাখতে হবে, রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজেরই পরিণতি হল – এক হিন্দুজাতি রাষ্ট্র, হিন্দু নেশন স্টেটের ধারণা-কল্পনা। আর শেষে এরই বাস্তব রূপ হল ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া  ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া অনুমোদিত প্রথম রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ বা সংক্ষেপে কংগ্রেস। হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র কায়েম যার লক্ষ্য। বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে উস্কে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে পরিণতিতে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের আরেক রাষ্ট্র গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হবে। তাই হয়েছে …

    নাসিরউদ্দিন শাহ এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ
    নাসির উদ্দিন শাহ এর মূল পাবলিক পরিচয় তিনি দক্ষ শক্তিমান অভিনেতা ও পরিচালক তো বটেই; তিনি তিনবারের “ফিল্মফেয়ার” পুরস্কার প্রাপ্ত, তিনবার ভারতীয় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং একজন “পদ্মভূষণ” পুরস্কারপ্রাপ্ত। দিল্লির স্বনামে পরিচিত, “ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা” [NSD] এই ইন্সটিটিউটের ১৯৭৩ সালের গ্রাজুয়েট। আমার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতায় বললে, আমাদের তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়  জীবনে আশির দশকে আমরা তাঁর বিখ্যাত অভিনয় ও সিনেমাগুলো দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। নিঃসন্দেহে তিনি একজন ভাল পারফর্মার। হাতে গোনা কিছু সফল লোকেদের একজন একজন তিনি। যদিও সেকালের এক অর্থহীন আবেগী ভাষ্য অনুসারে বললে, আমরা “পুঁজিবাদবিরোধী সিনেমা” দেখতে চাই এমন ভাষ্যের কথা চালু হয়েছিল। এরই অধীন   কথিত “প্যারালাল সিনেমা” আন্দোলন এক ব্যর্থ অভিজ্ঞতা ছিল সেগুলা, তা অবশ্যই। কিন্তু এখানে আমাদের আলোচনার  বিষয় এসবের একেবারেই বাইরে। তাই এখন আর সেদিকে যাচ্ছি না।

    বলা যায় মোদির আমলের ভারত (২০১৪-এখনও) এইকালে চরম অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ নাসিরউদ্দিন শাহ এর ক্ষোভ আর তা থেকে তোলা হিন্দুত্ববাদী বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ে নাই। বিশেষ করে গত বছর থেকে। যার মূল কারণ হল, চরমতম মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন মোদি বিজেপি ও তার দলবল। যার পিছনে আছে ভারতের কোভিড দুরবস্থায় মোদি প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ফেল করা থেকে। সেখান থেকে অর্থনৈতিক সংকট, কাজ হারানো, চিকিতসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া ইত্যাদি। আর এত হারিয়ে ফেলা জনমত যা মোদিকে কোনঠাসা করে তুলেছে আর এই সংকট মোকাবিলায় মোদি নিয়মিত চলমান মুসলমানবিদ্বেষকে আরো চরমে তুলে এথেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হিসাবে একে হাজির করেছেন।
    যেমন, আফগানিস্থানে তালেবান-উত্থানে ভারতীয় মুসলমানদের উচ্ছাস প্রকাশ – এর বিরুদ্ধে নাসিরউদ্দিন শাহ  নিজের কথিত “সেকুলার অবস্থান” দিয়ে মোকাবিলা করতে গেছিলেন। আর এতে পরিণতিতে তিনি না ঘরের না ঘাটের অবস্থান পড়েছেন। এতে না ভারতীয় মুসলমানদের আম প্রধানধারা তাকে আপন করতে পেরেছে না এখনকার হিন্দুত্ববাদ প্রভাবিত ভারতের প্রধানধারা তাদেরঅও অন্তত এলিট বা সেলিব্রেটি বলে নাসিরউদ্দিনকে জায়গা করে দিয়ে পেরেছে। অথচ সবখানেই নাসিরউদ্দিন শাহ তার কাম্য তবে মৃত ও কথিত সেকুলারিজম খুজে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।
    কাশ্মীরের মুসলমান হত্যা-নিপীড়ন এর পক্ষে হিন্দুত্ববাদী সাফাই বয়ান তৈরির সিনেমা “কাশ্মীর ফাইলস নিয়েও নাসিরউদ্দিন শাহ কড়া প্রতিবাদ করেছেন। করেছেন তার কথিত সেকুলারিজম এর উপর দাঁড়িয়ে। অথচ এই কংগ্রেসি সেকুলারিজম (১৯৪৭-৯০ এর দশক) সেকালেও কিছুর সমাধান করতে পারে নাই। গান্ধী নিজেই খুন হয়ে গেছেন তাও না! আর নব্বই এর দশক থেকে ভারতে  কথিত সেকুলারিজম ক্রমেই শেষ প্রভাবটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। আর এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদের জমানা।
    মূলকথাটা হল, স্বাধীন ভারত জন্মের আগে থেকেই “কংগ্রেসি সেকুলারিজম” – এটা ছিল এক মিথ্যা অবলম্বন। অকেজো রাষ্ট্রনীতি। কারণ খোদ কংগ্রেসের জন্মই হয়েছে খোদ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়ার খায়েসে। যার সুপ্ত ও মৌলিক লক্ষ্য হল “হিন্দু আধিপত্য” কায়েম। এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র-সমাজ গড়তে হবে।
    অথচ কোন আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার চিন্তার মধ্যে যেকোন জনগোষ্ঠির যদি অন্যের উপর “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনা থেকে যায় তবে নিয়মিত সামাজিক সংঘাত তো চলারই কথা! এবং তাই ঘটে চলেছে। সারা কংগ্রেসি আমল এটা এভাবেই চলেছে। আর এই নোংরা চেহারা ঢাকতেই মিথ্যা-প্রলেপ হিসাবে আনা হয়েছিল কথিত ও অর্থহীন সেকুলারিজম ধারণা। অথচ সারা কংগ্রেসি আমলে হিন্দু “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনায় কোন বদল আনা হয় নাই। তাই, এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। তা সত্বেও নাসিরউদ্দিন শাহ এর মত ভারতীয় মুসলমানেরা নিজের সাথেই প্রতারণা করে নিজেকে বুঝ দিয়েছে যে না – কংগ্রেসি সেকুলারিজম ভাল ও তাদের কাম্য। তাদের সুরক্ষা দিবে!! এটা দিতে পারবে না। কারণ, হিন্দু “আধিপত্য” কায়েম কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য – তাই এটা জারি রেখে এরপর আর মুসলমানদের জন্য এটা আর রক্ষাকবজ হতে পারতে না।

    এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণাঃ
    অথচ এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল  এর সাথে আরেকটা শব্দ আছে “অসাম্প্রদায়িক”। মুল শব্দটা তারা বানিয়েছে – সাম্প্রদায়িক বা কমুনাল (communal)। এখন কমুনাল বা সাম্প্রদায়িক শব্দের মানে কী?
    সাম্প্রদায়িক শব্দটা আসলে “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের যে বাসনা তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এরই এক্সটেনশন বা বিস্তার করতে গিয়ে তৈরি এক ধারণা। যেমন এই প্রশ্নের জবাব কী যে, “হিন্দু আধিপত্যের সমাজ গড়ার যে বাসনা তাহলে মুসলমান বা অন্যধর্মের লোকেরা  সেখানে কীভাবে বসবাস করবে? এর জবাবে “হিন্দু আধিপত্য” আগ্রহিরা বলবে, আমার সমাজে তুমি মুসলমান থাকতে চাইলে আমি কিছু শর্ত দিব যা তোমাকে মেনে চলতে হবে বা সে অনুযায়ী তোমার নিজেকে সাজিয়ে নিতে হবে। আর সেসব শর্তগুলো মানলে তোমাকে আমি যে খেতাব দিব তার নামই হল “অসাম্প্রদায়য়িক”। মানে হল আমি হিন্দু আমি আমার আধিপত্যের সমাজ কায়েম করব, আমার ধর্মিয় আধিপত্য বা শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্নগুলো প্রদর্শন করব। কিন্তু তুমি মুসলমান তোমার চিহ্ন – টুপি বা পাঞ্জাবি ধরণের ইসলামি চিহ্ন প্রদর্শন করতে পারবা না। বরং আমার নির্দেশিত কালচারাল আইকন বা চিহ্নে নিজেকে সাজিয়ে নিবা। একমাত্র তাহলেই আমি তোমাকে আমার পাশে বসতে দিব। আমার স্কুল-কলেজে আমার পাশে বা একই সুবিধায় চাকরি-কাজের স্থলেও আমার পাশে তোমাকে বসতে দিব। যাতে তুমি যে আমার অধীনে তা জ্বলজ্বল করে প্রকাশ্য থাকে। সারকথায় বললে, অসাম্প্রদায়িক হলে মানে  নিজেকে ভুলে আমার শর্তে নিজেকে সাজালে কেবল তবেই আমি তোমাকে আমার সমাজে জায়গা দিব।
    এই কারণে বলা যায়, সাম্প্রদায়িক শব্দটার উপস্থিতি আর ধারণা থেকেই বুঝা যায়  “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের মুল  বাসনার বাস্তবায়ক শর্ত হল “অসাম্প্রদায়িকতা”।

    ভারতীয় মুসলমানদের উপর এই “অসাম্প্রদায়িকতার” শর্ত আজও চাপিয়ে রাখা আছে। আর নাসিরুদ্দিন শা বা কবি গীতিকার জাভেদ আখতার এর মত ভারতের কালচারাল জগতের লোকেরা  এই ভিত্তিতে নিজেদেরকে সেকুলার বলে পরিচয় দিয়ে বেদম খুশি ছিল। তারা মানতেই চায় নাই যে এট অধীনস্ততা!
    তারা এটাও মানতে চায় নাই যে কংগ্রেসের সেকুলারিজম আসলে ইসলাম কোপানোর আর ইসলামবিদ্বেষের সেকুলারিজম!

    যারা হিন্দুত্ববাদ বিরুদ্ধে লড়তে চান তাদের উচিত অসাম্প্রদায়িকতা বা কমুনাল শব্দগুলো একেবারে পরিত্যাগ করা।
    এগুলো হিন্দু আধিপত্য কায়েমের শব্দ ও চিহ্ন। আমাদের যেকোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন সেকুলারিজমই নয়। তাহলে এখন মুল সমস্যাটা কী? সেটা হল, না তারা হিন্দুত্ববাদের প্রতিবাদকারি না তারা অন্য মূসলমানদের সাথে একাত্ম। বরং তারা আজ একা! আর সর্বপরি তাদের পেয়ারের কংগ্রেস নিজেই আজ নিজেকে সফট হিন্দুত্ববাদী বলে নিজেদেরকে তুলে ধরছে।

    বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের দিকে ঠেলে দেয়া হবে। হয়েছেও তাই। কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগ বলে আলাদা দল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। যা পরে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল। পববর্তীতে কংগ্রেস তো বটেই বিশেষত কমিউনিস্টরা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার জন্য জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের ওপর সবদোষ চাপিয়ে প্রপাগান্ডা করে চলেছে। অথচ সবার আগে হিন্দুজাতি রাষ্ট্রের ভারতের কল্পনা ও এর ভিত্তিতে কংগ্রেসের জন্ম তারা দিয়েছে, এই খবর তারা লুকিয়ে রাখে।

    তাহলে একালে নাসিরুদ্দিনরা কী চাইছেন? তারা বলছেন তাদেরকে ওই হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেসের সরকার বা জমানাটা ফিরে এনে দিতে, যে হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেস চেহারা লুকাতে ‘সেক্যুলার’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ জামা গায়ে দিয়ে ঘুরত। আমরা নাসিরুদ্দিনদের খুশি করতে এখন চাইলেও সেই কংগ্রেসকে ফিরে আনতে পারব না। কারণ সে মৃত আর সে জায়গায় স্বরূপে আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদ কায়েম হয়েছে। কংগ্রেস আর জাগবে না। সে ইতিমধ্যে সফট হিন্দুত্ববাদে চলে গেছে।

    আসলে নাসিরুদ্দিনদের খেয়াল করলে দেখতেন তারা আসলে কংগ্রেসের হিন্দুজাতি ধারণার ভেতরে যে মার্জিনালাইজও চাপা পরে থাকা (কথিত সেক্যুলার) ‘মুসলমান’ ধারণা তৈরি হয়েছিল সেখানে ফেরত যেতে চাইছেন। কিন্তু সেটা তো নিজগুণেই এখন মৃত!

    নাসিরুদ্দিন শাহদের অনেক আগেই বুঝে নেওয়া দরকার ছিল যে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে টাইপের বৃটিশ শয়তানি ব্যাখ্যার সেকুলারিজম যা ভারতীয় কথিত সেকুলারিজম – এর সাথে ক্লাসিক সেকুলারিজমের কোন সম্পর্ক নাই। ক্লাসিক সেকুলারিজমের মুল বৈশিষ্ট ও তাতপর্য হল ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকই সম- অধিকারের নাগরিক।   ফলে এর ভিতরে “রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে বলাটাই শয়তানি”, হিন্দু আধিপত্য নিশ্চিত করার ছুপা খায়েস।
    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা এসব মৌলিক ধারণা থেকে বহুগুণ দূরে…।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা   গত  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “নাসিরুদ্দিন শাহরা ভাঁড়ে পরিণত হবেন“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    গৌতম দাস
    ২৯ আগষ্ট ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4dT

     

    এক কাল্পনিক আড্ডার আলাপঃ বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা বাক পরিবর্তন নিয়ে যেখানে কথা উঠেছিল।   বক্তা নিজেই প্রশ্নটা জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন ভারতমুখি হয়ে থাকে? মানে তিনি এই প্রশ্নের একটা সাফাই নিজেই দিতে চান তাই নিজেই কথাটা তুলেছেন। আর ভারতমুখি বলতে কেউ বাংলাদেশে থেকে আবার ভারতের স্বার্থকেই নিরন্তর নিজের স্বার্থজ্ঞান করে কথা বলে,এভাবে যে নিজেকে তুলে ধরতে চায় এমন কাল্পনিক একজনকে এখানে ধরে নেয়া হয়েছে।
    সব রাষ্ট্রেরই নিজ একান্ত কিছু স্বার্থ থাকে যা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা হবেই আর এনিয়ে  প্রশ্ন তোলার কিছু নাই। তবে এটা আবার যখন সীমা ক্রশ করে বাড়তে চায় মানে নাগরিক একদেশের কিন্তু আনুগত্য করে বসে অন্যদেশের এবং ভিন্ন দেশস্বার্থের তখন এটা বারবার বাকি সকলের কাছেই খুবই অস্বস্তিকর মনে হবে; এজন্য যে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিক-আনুগত্যের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে।  এটা অমান্য করতে চায় বলেই এই সীমাছাড়ানির কথাটা আসে। যেমন, কোন দুই ব্যক্তি একবার স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাবার পর স্ত্রীর স্বামীর প্রতি বা স্বামীর স্ত্রীর প্রতি এক লয়াল বা আনুগত্যের সম্পর্কের থাকতে বাধ্য। এই বস্তুগত আনুগত্য কোন কারণে যদি কখনও অনুপস্থিত হয়ে যায়, না থাকতে দেখা যায় তবে বুঝতে হবে ঐ সম্পর্ক কার্যত এরা আর স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কিত নয়; বা ভান করছে।  আর বাস্তবে এথেকেই পরকিয়ার মত কঠিন অমীমাংসিত জটিলতাগুলো তৈরি হয়।
    আবার এই ভারতমুখিতার ধরণের ভিতরেও গত বিশবছরে একটা কোয়ালিটিটিভ মানে গুনগত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। যেমন আগে, পাকিস্তান আমলে বা বাংলাদেশের আমলে কিন্তু ১৯৯২ সালের আগে দেখা যেত বাংলাদেশি হিন্দুদের বড় অংশই নিজেদেরকে কমিউনিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিশীল বলে পরিচয় তুলে ধরত। আর এই সাথে সেকালের ভারতের হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ বা যাদের একালের নতুন নাম বিজেপি-আরএসএস – এদের থেকে দূরে থাকত।  অথচ একালে মোদির আমলে বাংলাদেশের হিন্দুরা বিশেষত তরুণেরা মোদিকে তাদের নেতা ও ত্রাতা মনে করে থাকে। এটা এক তাতপর্যপুর্ণ পরিবর্তন সন্দেহ নাই।

    কিন্তু এই পটভুমিতে বক্তা চেষ্টা করছিলেন কেন এমন আনুগত্য সমস্যা তা নিয়ে এর স্বপক্ষে কিছু সাফাই তুলে ধরার। তিনি জানাচ্ছিলেন যে, একটা দেশের কোন কোন জনগোষ্ঠি তো অনেক রকম ভিন্নতায় অনেক কিছু চাইতেই পারে। সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই। তারা তো পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকতে চেয়েছিল। কথা বাস্তব সত্য এবং কথা তাদের মনের কথা সন্দেহ নাই। কিন্তু এই চাওয়া কী সঠিক ছিল? তাদের স্বার্থের পক্ষে ছিল?

    এককথায় বললে, আপাত দৃষ্টিতে সঠিক ও নির্দোষ এবং ইনোসেন্ট  মনে হলেও এটাই ছিল তার আত্মঘাতি চাওয়া। আজপর্যন্ত বাংলাদেশের হিন্দুদের সমস্ত দুর্দশার মুল ও ভুল এই চাওয়া। সবভুলের উতস এটা। যদিও ১৯৪৭ সালের আশেপাশের প্রেক্ষিতের দিক থেকে বললে, ততদিনে এটা বড় ধরণের ভুল অবস্থান।

    কিন্তু কিভাবে এটা বুঝব? তা কী দিয়ে বিচার করব?
    সবশেষে এই হলো এই তর্কের মূল প্রসঙ্গ!

    একঃ এটা যেকোন রাষ্ট্রগঠনের দিক থেকে এক মৌলিক সমস্যা যে সব নাগরিককে একমত হয়ে চাইতে হয় যে তারা কেমন রাষ্ট্র চায়। মানে কিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চায় এনিয়ে একমত থাকতে হয় বা হতেই হয়। তবেই এক মৌলিক বিষয়ের সমাধান পাওয়া যেতে পারে।  আর সেজন্য কেমন কী  ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে চাচ্ছি তা প্রস্তাবের সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন তা সবার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয় – কেবল এমন কিছুই যেন প্রস্তাব করা হয়। আর এতে ব্যর্থ হলে আগামিতে সব বিরোধে ও ব্যর্থতার শুরু হবে এখান থেকে।  ের কিছু সুত্র নির্দেশ করা যেতে পারেঃ –
    ১। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বা দাবিতে কোন কিছু চাওয়া জায়েজ  – এমন মনে করা সবার আগে ত্যাগ করতে হবে।

    ২। এরই আরেক ভার্সান বা মূলসুত্র হল, সমাজের কেউ অন্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ – সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে – এটাই যেকোন রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া বা কার্যকর না থাকার মূল কারণ হয়।
    ৩। তাই এরই উলটা পিঠের মানে ইতিবাচকভাবে বলা কথাটা হল – রাষ্ট্রে হতে হবে বৈষম্যহীন নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র এমন ভিত্তিতে।  মানে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে বেশি ক্ষমতা ও আধিপত্যের অথবা কেউ সংখ্যালঘিষ্ঠের কারণে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের, কেউ পাহাড়ি বলে বা সাঁওতাল বলে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের আইনি এবং সামাজিক চর্চার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতেই হবে ইত্যাদি এগুলো বন্ধ করতেই হবে। তাই মুল কথা, নাগরিক অধিকারেরর দিক থেকে নাগরিক সকলেই সমান – এই ভিত্তিতে। এই সাম্য-নীতি সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান করতে হবে।

    এটাই সংক্ষেপে “নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি” রাষ্ট্র বলা হয়। আরো সংক্ষেপ করতে ‘নাগরিক সাম্য নীতিও’ বলা যেতে পারে।

     

    এখন তাহলে বিচার করা যাক – সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই – এই বক্তব্যকে যারা বাংলাদেশের হিন্দুদের পক্ষের সাফাই মনে করছিল সেটা কী ঠিক ছিল? বাংলাদেশের হিন্দুরা কী নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি মেনে তাদের প্রস্তাব বা চাওয়া তুলে ধরে ছিল? অবশ্যই না। তাই হিন্দুদের সাফাই সঠিক না, তাদের পক্ষে গেছে বা কাজের হয়েছে তাও না, তাদের কাজে লেগেছে তাও না।
    এককথায় বললে, এর মানে, বাংলাদেশের হিন্দুদের পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকার দাবি বা যে বাসনা সেটা আসলে মুসলিম লীগের আত্মরক্ষামূলকভাবে “পাকিস্তান” নামে আলাদা রাষ্ট্র কায়েম করার যে দাবি -তারই হিন্দু ভার্সান।
    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় ঐক্যমত।

    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে যথেষ্ট প্রয়োজনীয় ঐক্যমত। 

    একথা শুনে হিন্দুদের পক্ষের সাফাই যারা দিতে এসেছিল তারা প্রসঙ্গটা কিছুটা বদলে এবার বলে বসল – এজন্যই তো ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বাংলাদেশের (পুর্ববঙ্গের) হিন্দুরা করেছিল।  এতে ঐ আসরে তারা ভেবেছিল নিশ্চয়  এবার বেশ শক্ত পয়েন্ট তুলতে পেরেছে! তাদের পয়েন্টকে আরো শক্ত-পোক্ত করতে তারা এবার  আরো কিছু কথা সাথে জুড়ে দিয়ে বলল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করার চিন্তা তো খুবই বিভেদমূলক ও পশ্চাতপদ চিন্তা! এই বক্তব্য অবশ্য আমাদের তি্নদেশে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা হিসাবে পরিচিত। কিন্তু তা আসলেই কী???  না বাংলাদেশের হিন্দুদের আসলেই  কপালই খারাপ!  কেন?

    এতদিন মনে করা হত, ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ার কাজটা সব খারাপ কাজের গোড়ার খারাপ কাজটা। এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করে থাকেন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা এমন এক মোক্ষম কথা তুলে মুসলিম লীগের মুখ বন্ধ করে দিতে পেরেছিল। আর এদের চোখে একাজটা ভারতের কংগ্রেসের চেয়েও ভাল ভাবে করেছিল  কমিউনিস্ট পার্টি।  কিন্তু ঘটনা আসলে উলটা যা উল্টেপাল্টে  বিচার করে দেখাই হয় নাই। কিভাবে?

    ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা যদি ধরে নেই খুবই খারাপ কাজ এমনকি জঘন্য কাজ তবে মুসলিম লীগ বা পাকিস্তান কায়েম করাই এধরণের প্রথম কাজ নয়।  ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা অখন্ড ভারতে সবার আগে করেছে, সবার আগে তুলেছে এবং এই ভিত্তিতে  নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্র সাজিয়েছে মুসলিম লীগ নয় – কংগ্রেস – যার পুরা নাম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল। কিভাবে?

    ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌল্লাকে পরাজিত করতে পারলেও নানা সমস্যার কারণে ১৭৬২-৬৪ সাল লেগে যায় ক্লাইভের বৃটিশ ইস্ট -ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে দেওয়ানি লাভ করতে বা প্রশাসন নিজের হাতে উঠিয়ে নিতে। পরে ঐ কোম্পানি আবার একই সময়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়াতে আর বৃটিশ রাণীর সহায়তায় কিছুটা উঠে দাড়ানোর পরে কোম্পানির প্রধান কাজ হয়েছিল যেভাবেই হোক তাতক্ষণিক রাজস্ব আদায় বা সংগ্রহ। একারণেই বাংলায় ব্যতিক্রমি জমিদার প্রথা (আগাম নগদ রাজস্ব জমা দিয়ে জমিদারি কেনা আর পরে প্রজার কাজ থেকে বছরান্তে খাজনা আদায় করে নেয়া) চালু হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির সেই প্রধান রাজস্ব আয়ের উতস জমিদারি ব্যবস্থাটা থিতু করতেই ১৮০০ সাল লেগে যায়। আর দেখা গেল, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জমিদারি কিনেছিল হিন্দু জমিদারেরা।  ফলে এরপরেই এই হিন্দু জমিদারদের মাথায় আসে হিন্দু আধিপত্য কায়েম করার।

    মনে রাখতে হবে সেকালে প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বলতে কৃষি তাও আবার সেটা জমিদারি মালিকানায় জমিদার-প্রজা ভিত্তিক সম্পর্কের কৃষি অর্থনীতি। ফলে সবার উপরে বৃটিশ কোম্পানি আর এর নীচে জমিদার হিন্দুর আধিপত্য কায়েমের সমাজ প্রতিষ্ঠা এটাই  বাস্তবে কায়েম হয়েছিল। যদিও পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কলকাতা সারা ভারতের বৃটিশ রাজধানী বলে অন্তত সারা বঙ্গে জমিদার হিন্দুর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম সহজ হয়েছিল।
    কিন্তু তবু এসবই ছিল অর্থনৈতিক বা মাঠের নয়া শ্রেণীর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম। কেন এভাবে বলছি?
    বলতে চাচ্ছি রাজনৈতিক অংশ এটা নয় তা বুঝাতে। নয়া শ্রেণীর  রাজনৈতিক অংশটা তৈরি হয়েছিল আলাদাকরে। তবে অবশ্যই এটা তৈরি হয়েছিল সমকালীন ভাবে। বা বলা যায় অল্প কিছুটা আগে। আর তা ঘটেছিল রাজা রামমোহন রায়ের হাতে তার আত্মীয়সভার আসর থেকে।  রামমোহন এর পরিচয় লম্বা না করে এখানে কমিউনিস্ট ইতিহাসে যেভাবে তাঁকে পরিচয় করানো হয়েছে কেবল সেটুকুই তুলে আনছি।

    আসলে রামমোহন রায়ের হাতে এক নয়া ধর্মের প্রবর্তন ঘটেছিল ১৮১৫ সালে, এটাই ব্রাহ্ম (ব্রাহ্মণ শব্দ বা ধারণার সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই) ধর্ম । ফলে সেই থেকে এখনও যারাই  ব্রাহ্ম ধর্ম বা সমাজ এর অনুসারি এরা সকলেই সেসময় থেকেই পারিবারিকভাবে রামমোহন প্রবর্তিত ব্রাহ্ম অনুসারি। সেটা রবীন্দ্রনাথের দাদামশায় (গ্রান্ডফাদার) দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে এখনও পুরা ঠাকুর পরিবার। আবার এদিকে ১৯৩৫ সালে পুনগঠিত প্রথম ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যপক সুশোভন সরকার তার সারা পরিবারও ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি হয়েছিলেন। আর এই সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে পরিচয় করানো হয়েছে।

    কিন্তু তাঁর এভাবে বলার মধ্যে সমস্যা কী হয়েছে তা হয়ত অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয় নাই। এছাড়া রামমোহন রায়ের কথা কেন তুললাম তা নিয়ে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। আর এর সাথে ধর্মের ভিত্তিতে দল গড়ার প্রসঙ্গে কে প্রথম এটা করেছিল সেকথাই এখন স্ইপষ্ট করে বলব।

    আমাদের এদিকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানে (এই তিনদেশে) কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের কাছে রেনেসাঁ বেশ আদরণীয় শব্দ ও ধারণা। রেনেসাঁ অনেকটা বড় মৌল ধারণা বা উতস ধারণার মত বলে  ধারণাটাকে মনে করেন তাঁরা। যদিও খোদ কার্ল মার্কস রেনেসাঁ  ধারণা দূরে থাক, আধুনিক রাষ্ট্র বা মর্ডার্ন স্টেট (তার ভাষায় ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্র’ ) নিয়েও  তিনি কোন আগ্রহই দেখান নাই। ভাল-মন্দ বড় কিছুই লেখেন নাই।  তাহলে কেন আদরণীয় হল? এর মূল কারণ প্রগতিশীলেরা মনে করেন, রেনেসাঁ ধারণার জপতে থাকলে মানে রেনেসাঁর আড়ালে থাকলে তাতেই অনেক উপকার হবে। তাদের প্রকল্প ধর্ম মানে, ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে খুবই ভাল সাফাই আনা যায় এখান থেকে।

    আর এধারণার নগদ খদ্দের হল জমিদার হিন্দু যারা যেন এই ধারণা কিনে নিবার জন্য অপেক্ষা করছিল।

    এখন প্রথম প্রশ্নে আসা যাক। শব্দাবলীতে বাক্যটাই লক্ষ্য করা যাক, লিখেছি “সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে দেখানো হয়েছে। আবার রামমোহন হচ্ছেন ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক এবং সুশোভনের নিজ ও পরিবার ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি। তাহলে “রেনেসাঁ আর ব্রাহ্ম” এখানে একসাথে উচ্চারিত হচ্ছে কেমন করে? তাহলে জানা যাচ্ছে একমাত্র কমিউনিস্ট সার্টিফায়েড ধর্ম হচ্ছে তাহলে ব্রাহ্ম। যেটা সত্যিই এক আজীব ব্যতিক্রম বটে!

    এনিয়ে সরাসরি কথা বললে, আসলে রামমোহন রায়ই বৃটিশ ভারতে প্রথম জাতিরাষ্ট্র বা মর্ডান রাষ্ট্র ধারণা আনেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে এই কল্পনাটা ছিল-  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র। অর্থাৎ ভারতের সবাইকে আগে আগে ব্রাহ্ম অনুসারি করে নিয়ে এবার –  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র – এমন ভারত ছিল রামমোহনের প্রজেক্ট। সারকথায়, ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের (নেশন স্টেটের) প্রথম ইমাজিনেশনটা আনেন রামমোহন। পরে তার মৃত্যু (১৮৩৩) আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অনুসারিরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে অচল অথর্ব হয়ে পড়লে এবার সেই প্রকল্পটাকে এবার ব্রাহ্মধর্মের বদলে ‘হিন্দুধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র’ – এভাবে বদলে নেয়া হয়। আর এটাই ১৮৮৫ সালে এটাই কংগ্রেস দল নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
    কাজেই দল হিসাবে প্রথম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হল কংগ্রেস।  আর এভাবেই প্রকল্প সুনির্দিষ্ট করে হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে এর বিশবছর পরে ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান ধর্ম-ভিত্তিক আরেক জাতিরাষ্ট্র’ পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য নয়া দল হয় মুসলিম লীগ।
    কাজেই মুসলিম লীগের পাকিস্তান কায়েমের বিরুদ্ধে কথা বলে   বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থান নেয়া কিন্তু আবার নিজেরা হিন্দু ধর্ম-ভিত্তিক ভারতে যুক্ত হওয়ার বাসনা  -এটাই তো আসলে কংগ্রেসি অবস্থান~!!!! ফলে এনিয়ে কোন সাফাই দিতে বা করতে তারা পারে না। এর মানে হয় না।

    তাহলে মূল সমস্যা ও সমাধান ছিল, ধর্মভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা সমূলে ত্যাগ করা। সকলকে নিয়ে “অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রের” প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা প্রস্তাব এর কথা বিবেচনা করা এবং সেভাবে আগানো।
    স্বভাবতই, নইলে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে সারাজীবন ইসকনের মাধ্যমে ‘মোদির দলের ভাড়াটে বাংলাদেশি’ উইংয়ের সদস্য হয়েই কাটাতে হবে।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    গৌতম দাস

    ২২ আগষ্ট  ২০২২   ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4dq

     

        EAM Jaishankar

    কেন শিরোনামটা এমন? ভেটো মানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) ১৫ সদস্যের যার ১০ আসন অস্থায়ী এবং বিভিন্ন মহাদেশের কোটা থেকে দুবছরের জন্য নির্বাচিত করে নেয়া হয়। আর পাঁচ টা আসন এগুলো স্থায়ী-আসন বলা হয় শুধু তাই না এই পরিষদে আলোচনার  জন্য হাজির করা যেকোন প্রস্তাবের উপর আলোচনার আগেই এই পাঁচ সদস্যের যেকোন একজন ভেটো বা আপত্তি দিতে পারে। আর তা দিলে ঐ প্রস্তাব পাশ হওয়া দূরে থাকে ঐ প্রস্তাবই বাতিল বলে গণ্য হবে।  এই পাঁচ ভেটোধারী ও স্থায়ী সদস্য হল আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া আর চীন।  গত ২০ বছরে ভারত অনেকবার এমন ভেটোধারী সদস্য হবার চেষ্টা করেছে, আমেরিকার দ্বারা সমর্থিত হবে বলে আশ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু বারবার সে আলোচনা চাপা পরে হারিয়ে গেছে। এবার জয়শঙ্কর যিনি এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী – তার মুখ দিয়ে আবার প্রসঙ্গটা আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তাঁর এক বক্তৃতার ইউটিউব ক্লিপ ভারতের মিডিয়ায় অনেক ছড়িয়েছে।

    জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (এরপর থেকে এ’লেখায় শুধু পরিষদ লিখব) ভারতের স্থায়ী আসন বা ভেটো ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন বহুদিনের। কিন্তু স্বপ্ন দেখনেওয়ালাদেরও দুইটা ধরণ দেখা যায়। এক হল যারা স্বপ্ন দেখতেই থাকে, পেলে কী করবে সেই হিংসাতেও তাদের বুক জ্বলে কিন্তু যোগ্যতার অভাবে স্বপ্ন বাস্তব করতে পারে না।  ফলে ধান্দাবাজ লোক ধরে যাদের মিথ্যা প্রলোভনের পিছনে তারা বছরের পর বছর ঘুরেই চলে, বেখবরে। কিছু আগালো কিনা সে মুল্যায়নও করে না।
    আরেক দল আছে যারা স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবায়িত করা যাবে এজন্য বাস্তবিক সমস্যা, বাধাগুলোকে স্টাডি করে আর একটা করে বাধা অপসারণ করে করে আগায়। তবে এরা অবশ্যই সবার আগে দেখে নেয় সেটা বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন কিনা। যদি হয় তবেই সে আগায়। এজন্য এদেরকে বলে রিয়েলিস্ট; মানে, যারা বাস্তবের চোখে দেখে স্বপ্ন বিচার করে।  কেবল স্বপ্নেই পোলাও খেয়ে চলে না!  এদুই ক্যাটাগরির বিচারে ভারত হল প্রথম ধরণের। তাই, আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাসের পিছনের সে ঘুরতেই আছে এই ভরসায় যে আমেরিকা তাকে ভেটোক্ষমতা এনে দিবে।
    অথচ একটা সহজ ভাবনা-কল্পনায় যদি দেখি জাতিসংঘের বর্তমান ওরিয়েন্টেশন মানে যেভাবে এটা সাজানো আছে এভাবেই যদি তাকাই তাহলে দেখব একা আমেরিকা নতুন কারও কোন ভেটোক্ষমতা পাইয়ে দিবার ক্ষমতা নাই বা রাখে না। কারণ, একা আমেরিকা না, পাঁচ ভেটোসদস্যই যদি ভারতকে ভেটোক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয় তবেই তা হতে পারে। চীনসহ যেকোন এক ভেটোসদস্য আপত্তি করলেই সব শেষ। তাহলে একা আমেরিকার আশ্বাসের উপর ভারতের অপেক্ষা তো অর্থহীন!! অথচ  গত বিশ বছর ধরে এটাই ভারতের আশ্বাসের  ভিত্তি হয়ে আছে, খামোখা।

    একালের হিসাবে যদি বলি তবে প্রণব মুখার্জির আমল এই আশ্বাসের ভরসা শুরু হয়েছে। মোটামুটিভাবে ২০০৭ এর পরে মানে যখন থেকে আমেরিকা বিশেষ করে বুশের আমল শেষে ওবামা চীন ঠেকানো বা China Containment এর ঠিকাদারি ভারতকে দিতে এসেছিল।

    তাই ওবামা যখন বুশের চেয়েও বড় করে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল (যে ভারতের স্থায়ী আসনের দাবিকে আমেরিকা সমর্থন দিবে) প্রণবের সরকার তা বেশ জোশের ঠেলায় বাস্তবতার দিকে তাকানোর বদলে স্বপ্নে ভাসতে শুরু করে দিয়েছিল। ভারত কতদুর নিজেকে নিচে নেমেছিল, বোকা চিন্তাশুন্য বানিয়েছিল তা বুঝা যায় যখন,  ২০০৯ সালে থেকে শুরু হওয়া হাসিনা সরকার পরে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিল এক বছরের মধ্যে ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি। সে সফরে প্রণব মুখার্জি লিখায়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশও (যে ঘরকা মুরগি ফলে যত খুশি জবেহ দেয়া যায়) ভারতের স্থায়ী আসনের দাবি সমর্থন করবে! সফরের শেষে যে ‘যৌথ ঘোষণা’ বের হয় তাতে একথা লেখা আছে। অথচ বাংলাদেশের সমর্থন তো কোন রিকয়ারমেন্ট নয়!

    জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতিঃ
    সবকিছুর গোড়ায় আছে আসলে জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতি – এই বিষয়টা। জাতিসংঘ এক আজিব জিনিষ; সেটা এই অর্থে যে এটা ঠিকঠাক বুঝলে তো বুঝছেনই। আর না বুঝলে তেজপাতা; মানে সারাজীবন আমি-আপনি সব বুঝিছি ভান করেই কাটিয়ে যেতে পারব। তাতে আপনি প্রণব মুখার্জি বা জয়শঙ্কর যাই হোন না কেন!! আপনার পদ-পদবি অনেক উচুঁতে হতে পারে কিন্তু তাতেও কোন নিশ্চয়তা নাই যে আপনি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানটা বুঝেছেন বা বুঝবেনই! যেমন বেশির ভাগ মানুষের ধারণা এটা একটা ‘গণতন্ত্রী’ প্রতিঠান; অথচ এরা খেয়াল করেন না যে পাড়ার ক্লাবের ক্ষেত্রেও এর মেম্বারেরা সবাই-ই দেখতে সমান মনে হলেও সবাই সমান ক্ষমতার হয় না।

    প্রথমত জাতিসংঘ অবশ্যই এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একটা দেশের পার্লামেন্টের মত সব সদস্যের সমান অধিকার, বা এক ভোট –  না জাতিসংঘ এমনটা নয়। বরং অসম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আবার বড় ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর কেউ যেন বেশির ভাগকেই নিজ দলে নিয়ে জোট পাকিয়ে অন্য আরেক বড় ক্ষমতার উপর চড়াও না হয়; এটাই জাতিসংঘ গড়ার সময়ের মুখ্য বিবেচনা ছিল। যেমন আমেরিকা যেন কমিউনিস্ট স্তালিনের সোভিয়েন ইউনিয়নের উপর কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোন কিছু চাপিয়ে না দিতে পারে তা নিশ্চিত করা এমন প্রতিষ্ঠানই হল ভেটোক্ষমতার জাতিসংঘ। এটাই নিশ্চিত করার উপায়ের নামই ভেটো পদ্ধতি। যাদের “এভিন্ন” অন্যভাবে বুঝ থেকে ভুল ধারণা আছে তারা এখনই তা কারেক্ট করে নিতে পারেন। সোজাকথা জাতিসংঘ কোন সাম্যের প্রতিষ্ঠান নয়। ্তাই এর সব সদস্যের ভোটের ক্ষমতা একরকম নয়। যেমন এমন ক্ষেত্রে মানে কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে কোন সিদ্ধান্ত এই পাঁচ ভেটোসদস্যের উপর চাপিয়ে দেয়া অসম্ভব।  যেমন, এমন হলে একা সোভিয়েত-ইউনিয়ন নিজের ভেটোটা প্রয়োগ করতে পারবে।  যার মানে হল, স্টালিন যা চায় না তেমন প্রস্তাব নিয়ে পরিষদে কোন আলোচনাই হবে না। সেক্ষেত্রে, আমেরিকা তখন আনা আগের প্রস্তাব চাইলে আবার তা সংশোধন করে হাজির করতে পারবে। তবে কীভাবে প্রস্তাব লিখলে পরে সোভিয়েতরা আর ভেটো দিবে না সেভাবে জেনে প্রস্তাব সংশোধন করে আবার তা উপস্থাপন করতে পারে। এভাবেই ভেটোক্ষমতা কার্যকর আছে।

    মুখ্য বুঝাবুঝির জায়গাটা হল জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, সেখানে ফোকাস করাঃ
    তাহলে জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কি ছিল? উপরের কথা থেকে পরিস্কার এটা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোন ‘সাম্যের’ পার্লামেন্ট ধরনের কিছু নয়ই। এর উদ্দেশ্য ছিল ‘নেতা’ রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা ও নানাবিধ চিন্তায় বিভিন্নতা থাকা সত্বেও তারা একটা ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ কায়েম করতে পারে কিনা সেই চেষ্টা। এবং কোনমতে তারা সেতা পেরেছিল। আর এরই উদ্যোগ ও মুখ্য আইডিয়াটা ছিল মূলত আমেরিকার মানে ততকালীন টানা চারবারের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর।

    তাঁর মূলকথাগুলো খুব সিম্পল। সেকালে (১৬০৭-১৯৪৫) দুনিয়া মানে চার-পাঁচটা রাষ্ট্র তারা দুনিয়ার বাকি দেশ-ভুখন্ডকে কলোনি করে রেখেছিল – আর জবরদস্তিতে শাসন ও লুট করে সম্পদ নিজ দেশে নিয়ে চলছিল। আমেরিকা এই স্টাইলে চলা দুনিয়াটার অবসান চেয়েছিল তবে নিজ স্বার্থে; মানে “দুনিয়ার ভাল হবে” ঠিক এমন কোন কারণে না। তাই এনিয়ে আমেরিকার মূল ভাষ্যটা হচ্ছে – দেশভুখন্ড ও তার বাসিন্দা কেন্দ্রিক; যেখানে আবার বাসিন্দারাই মূল ফ্যাক্টর ও নির্ণায়ক। বলা হয়েছে, “কোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবেন যে তাদের বসবাসের ভুখন্ড কার হাতে শাসিত হবে” 

    Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them;

    স্বভাবতই বাসিন্দারা কেউ বিদেশি কলোনি শাসক বা লুটেরা শাসক চাইবে না। অর্থাৎ এই মূল বাক্যটাই দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসন উতখাত করার রাস্তা খুলে দিয়েছিল। আর এই মূল বাক্য বা শর্ত মানলে তবেই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পক্ষ ও অংশগ্রহণ করবে; এই ছিল আমেরিকান অবস্থান। কবে থেকে কতদিন?  এখানে বলে রাখা ভাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সালে শুরু হলেও ১৯৪২ সালের জানুয়ারির আগে আমেরিকা তাতে কোন অংশ বা পক্ষ নেয় নাই। এনিয়ে যদিও কমিউনিস্টদের না-জানা এক প্রপাগান্ডা ব্যাখ্যা আছে। সেই অনুমিত প্রপাগান্ডাটা হল, আমেরিকা ব্যবসা করার লোভে যুদ্ধে কোন পক্ষ নেই নাই। এটা শতভাগ মিথ্যা অনুমান তা জানা যাবে যখন  পরে ১৯৪১ সালের আগষ্ট থেকে আমেরিকা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সাথে চুক্তি (আটল্যান্টিক চার্টার চুক্তি) করেছিল। এই চুক্তি থেকেই পরিস্কার রুজভেল্ট কেন যুদ্ধে যোগ দিতে দেরি করছিল্বেন। আর এই চুক্তি থেকেই বিশ্বযুদ্ধে জোটবদ্ধ দুই পক্ষ-বিপক্ষ স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। আবার আমেরিকার অর্থনীতিক সক্ষমতা দিকটা যদি দেখি, এর প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই ততদিনে সবচেয়ে বড় অর্থনীতির বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যকে আমেরিকা ছাড়িয়েছে । ফলে সঞ্চিত সারপ্লাস সম্পদের কারণে যেকোনদিকে বিনিয়োগ সক্ষমতায় সে আনপ্যারালাল। তাই ঐ যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণে অনেক আগে থেকেই আমেরিকা ছিল নির্ধারক; অথচ ১৯৪২ সালের ১জানুয়ারির আগে সে কোনদিকের হয়ে যুদ্ধে নামে নাই।

    তাই প্রথমে ১৯৪১ সালের আগষ্টে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে তিনি তাঁর শর্তে দাসখত দিতে [আটল্যান্টা চার্টার চুক্তির মাধ্যমে] বাধ্য করেন। আর আটল্যান্টা চার্টার চুক্তিই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান মিত্রপক্ষ জয়লাভ করলে পরের সেই  দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ও শাসন চির উচ্ছেদের প্রথম দলিল। একারণেই হিটলারবিরোধী যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানোও আসলে সম্পন্ন করা হয় ঐ একই শর্তে। এরই ফলাফল হল, সাড়ে চারমাস পরে ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি, ঐ একই দলিলের ড্রাফটে কিন্তু এবার রুজভেল্ট ও চার্চিল ছাড়াও আরো দুই দেশের প্রধানকর্তা এতে স্বাক্ষর দিচ্ছেন। এরা হলে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টালিন আর চীনের প্রেসিডেন্ট চিয়াং কাইসেক (নতুন দুজন, ব্যক্তি হিসাবে নয় তারা প্রতিনিধি পাঠিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন)।  আর এই চারদেশের স্বাক্ষরের দলিলটাই হল জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার দলিল বা ডিক্লারেশন [Declaration by the United Nations, January 1, 1942] । যদিও পরে অন্যান্য প্রায় ২১টা দেশ এতে প্রতিস্বাক্ষর করেছিল।
    এদিনে রুজভেল্ট যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষের কথা পরিস্কার করেন। তাঁর পক্ষের দেশগুলোর নাম দেন “মিত্র-শক্তি” যা্দেরকে পরবর্তিতে তিনি “ইউনাইটেড নেশন্স” (UNITED NATIONS বাংলায় জাতিসংঘ) বলে চিহ্নিত করেছেন। আর বিপক্ষ অক্ষশক্তি বলতে হিটলারের জর্মানি সাথে ইটালি ও জাপান এভাবে।

    কিন্তু তখন থেকেই জাতিসংঘ কী কেন – মানে কী ভিত্তিতে এটা গড়ে উঠেছিল সেসব কথা ক্রমশ পিছনে চাপা পড়ে থেকেছে আর প্রধান হয়েছে হিটলারের বিরুদ্ধে জোট হয়েছে এই খবর। এতে জাতিসংঘের জন্মের খবর যতটুকু পড়ালেখা জানা লোকেরা জেনেছে তাও আবার তারা বুঝেছে একটা বিজনেস এসোসিয়েশন বা সমিতি যেমন [যেন একটা FBCCI] হয় তেমন কিছু এক তবে এটা যেন “রাষ্ট্র  সমিতি” বলে মনে করা হয়েছে। অথচ এর জন্ম ঘোষণা ভিত্তি সবসদস্যই মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই কিন্তু এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি সব সদস্যের সমান একভোট এই ভিত্তিতে নয়; বরং ভেটো পদ্ধতি।
    সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ঘটনাটা হল, এই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি হল দুনিয়া থেকে কলোনি উচ্ছেদ।  আর সেই সাথে তা এই অর্থে ও শর্তে তা লেখা হয়েছে যার আরেকটা মানে হয়ে গেছে এতে রাজতন্ত্রের কোন সুযোগ নাই। সদস্য রাষ্ট্রকে রিপাবলিক হতেই হবে। কারণ দেশ-ভুখন্ড এর বাসিন্দা যারা তারা নিজেরাই কথা বলবেন, সবকিছু নির্ধারণ করবেন। ফলে কলোনি দখলদার শাসকের সাথে রাজার ভুমিকাও বাদ হয়ে গেছে। এরা কেউ না হয়ে গেছে।

    কিন্তু এত সমস্যার আরেক দিকটা খুবই জটিল হয়েছিল। তা হল সঠিক বুঝাবুঝি। এটা এমনকি জওয়াহরলাল নেহেরু যিনি স্বাধীন  ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী –  তিনিও জাতিসংঘ জন্মানোর ভিত্তিমূলক দিকটা বুঝেন নাই।  না, তাঁকে ছোট করার জন্য এটা বলা হচ্ছে না। যেমন দেখেন, এরই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল, কাশ্মির ইস্যু। তিনি ভেবেছিলেন কাশ্মির কার – এই প্রশ্নে যেহেতু কাশ্মিরের রাজা হরি সিং নেহেরুর সাথে –ভারতভুক্তির- চুক্তি করেছেন অতএব কাশ্মির নিশ্চয় ভারতের অংশ হয়ে গেছে। এটা মনে করে তিনি এর স্বপক্ষে এই দাবির উপর  জাতিসংঘের সম্মতির সিল-ছাপ্পড় নিশ্চয় পেয়ে যাবেন মনে করে ঐ ভারতভুক্তি-পত্র জাতিসঙ্ঘের মতামত চেয়ে পাঠিয়েছেন। অথচ তিনি জাতিসংঘের জন্মভিত্তিই জানেন না যে সেখানে একটা দেশের হকদার-নির্ধারক কোন রাজা নয় বাসিন্দারা, তাদের গণ-সম্মতিকেই ভিত্তি মানা হয়েছে। ফলে নেহেরুকে ফেরত পাঠানো জাতিসংঘের রায় ছিল “কাশ্মিরে গনভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত” নেওয়ার।  যা পরে তিনি কখনই এটা করেন নাই। আর সেই নেহেরু থেকে একালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পর্যন্ত কারও জাতিসংঘ প্রতিষ্টানটা কী বৈশিষ্ঠের, কী উদ্দেশ্যের তা কখনই তাদের পড়ালেখা করা হয়ে উঠে নাই।

    সম্প্রতিকালে জয়শঙ্করের বক্তৃতার এক ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়েছে। সম্ভবত তা ভারতের কোন এক একাদেমিক প্রতিষ্ঠানের যেখানে তিনি স্টুডেন্টদের –  ভারত কবে জাতিসঘের স্থায়ী বা ভেটোধারী সদস্যপদ পাবেন – এই প্রশ্নে কথা বলছিলেন। জয়শঙ্কর আমাদের বিসিএস-ক্যাডার দেয়ার মতই ভারতের সমতুল্য ফরেন ক্যাডারের লোক; সেখান থেকে পেশাদার কূটনীতিক জীবনের অবসরে, এখন মন্ত্রী হয়েছেন।  তিনি সম্ভবত নিজেকে স্মার্টভাবে হাজির করতে চেয়েছেন। তিনি এক কড়া শব্দ প্রয়োগ করেছেন সেখানে সমালোচনায়। শব্দটা হল জাতিসংঘের “ক্রেডিবিলিটি” [Credibility] কী আছে, ইত্যাদি। এখানে ক্রেডিবিলিটি বলতে এর বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা কী, এটা বলতে চেয়েছেন। তার মূল অভিযোগ জাতিসংঘ প্রতিনিধিত্বশীল নয়। শব্দটা অনেক কর্কশ এবং একই সাথে তার প্রতিষ্ঠানটার গঠন, উদ্দেশ্য ও ভিত্তি সম্পর্কে যে কোন ধারণা নাই সেটাও প্রকাশ করে দিয়েছে।

    প্রথমত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানের যে অঙ্গের কথা বলা হচ্ছে সেটা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সিকিউরিটি কাউন্সিল [UNSC] যেটা মূলত রাজনৈতিক বিষয়াদি দেখাশুনা করে।  শুরুতে বলেছি এটা মূলত ১৫ সদস্যের প্রতিষ্ঠান যার পাঁচটা ভেটোধারী সদস্যপদ আর বাকি দশটা অস্থায়ী (দুবছর) রোটেশনাল সদস্যপদ যা মহাদেশভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বশীল করে বেছে পূরণ করে নেয়া হয়ে থাকে। কাজেই এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে সদস্যপদ গড়া হয় নাই এই অভিযোগ ভিত্তিহীন।

    তবে উনি সম্ভবত বলতে চাইছেন পাঁচ ভেটোসদস্যপদ এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে গড়া নয় বা বিতরণ হয় না। হ্যা সে কথা সত্য এবং এটা গ্লোবাল জনসংখ্যার ভিত্তিতে বা কোন প্রতিনিধিত্বশীল ভিত্তিতে বেছে পাঁচসদস্যকে দেয়া হয় নাই। আসলে তা হতেই হবে এই অনুমানই ঠিক না, এটা ভিত্তিহীন। যেমন এই পাঁচ স্থায়ীসদস্যের মধ্যে আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার কখনই কেউ নাই। [এই প্রতিনিধিত্বশীল করার দিকটা সম্পন্ন ও নিশ্চিত করা হয়েছে অস্থায়ী সদস্যপদ নেয়া বা বিতরণের বেলায়। ] আবার চীনকে নেয়া হয়েছে এর জনসংখ্যা ভারতের চেয়েও অনেক বেশি একারণেও না। কাজেই জাতিসংঘের জন্ম ইতিহাস না জেনে এমন অনেক কথাই বলা যায়।
    মূলত ভেটোসদস্যপদ দেয়া হয়েছে কারা ততকালীন সময়ে সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে বড় বা পরাশক্তি এদের কথা ভেবে (তাও চীনের বেলায় সেটাও নয়)। সামরিক বা পরাশক্তি বলে বিবেচনা করতে হয়েছিল রুজভেল্ট-কে। সেটা এজন্য যে পুরা জাতিসংঘের আইডিয়াটা রুজভেল্টের। তার এই আইডিয়াটা বাস্তবায়নে এরা যাতে বাধাগ্রস্থ না করে সেকথা ভেবেই।

    সাধারণভাবে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে খরচ (সোভিয়েন ইউনিয়ন-সহ সকল পক্ষশক্তিকে) এককভাবে যোগানো এমনকি যুদ্ধপরবর্তি পুনর্বাসনের শিল্প ও অবকাঠামোতে অর্থবিনিয়োগ এবং তা যুদ্ধের হেরে যাওয়া পক্ষের দেশগুলোকেও সহায়তা দেয়া সহ – দিয়েছিল আমেরিকা। সেকালের আমেরিকার একক সামর্থ ছিল বলেই তা থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য সব বিবেচনার উপরে উঠে যায় যা একটা কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল।

    আরও আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তো বটেই দুই বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই আমেরিকা দুনিয়াকে যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাওয়া মানে, – যুদ্ধ এড়িয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধগুলো মীমাংসার কোন উপায়, কোন রাজনৈতিক মৌলিক বক্তব্য অবস্থানের ভিত্তিতে – এক প্রতিষ্ঠান – গড়ে তুলে তা করা যায় কীভাবে এটা আমেরিকার মাথায় সবার আগে এসেছিল। তখনকার আমেরিকান সমাজ এধারণা প্রচলিত হয়ে উঠেছিল যে কোন যুদ্ধই মূলত দেশের পুঁজি বা সঞ্চিত সম্পদ ধংস করে দেয়; তাই এটা এড়ানোর উপায় খুঁজতে হবে। মনে করা হয় যে আমেরিকানরাও মূলত সাদা ককেশীয় হলেও তাঁরাও এশিয়ায় আমাদের মত এক শ্রেণীর বৃটিশ কলোনি শাসকের অধীনে শাসিত নিষ্পেষিত। আমেরিকান ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা বলতে বৃটিশসহ অন্যান্য ইউরোপীয় কলোনি শাসকের থেকে সামরিকভাবে লড়াই করে মুক্ত হওয়া ছিল।  ফলে অন্য কাউকে কলোনি করার বিরুদ্ধে এক শক্ত অভ্যন্তরীণ জনমত পরবর্তিতে আমেরিকান-সমাজে কাজ করত, সক্রিয় ছিল। তাই ল্যাটিন আমেরিকান অনেক ছোট দেশ দুতিন বছরের বেশি পরবর্তিতে আমেরিকা সেখানে কলোনি দখল চালিয়ে রাখে নাই, বা পারে নাই। এমন ব্যাকগ্রাউন্ডের আমেরিকাি আবার  প্রচুর সঞ্চিত সারপ্লাস (আজকের চীনও যেদিকে আগাচ্ছে) ছিল বলে এটাই বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকাকে নেতৃত্বের আসনে বা কমান্ডের পজিশন সহজেই পেতে সাহায্য করেছিল।

    তা সত্বেও যে জাতিসংঘ আমেরিকা প্রস্তাব করছিল তা না মানতে চাওয়ার সামর্থ তো কেবল তখনকার বিচারে তখনও যারা সামরিকভাবে সক্ষম এমন রাষ্ট্রগুলোকেই বুঝতে হবে। এই বিচারে এদের জন্য ভেটোসদস্য পদ রাখার প্রস্তাব করেছিলেন রুজভেল্ট। যাতে সামরিকভাবে সক্ষম বা পরাশক্তি দেশগুলো প্রস্তাবিত জাতিসংঘের ভিতরেই ধরে রাখা থাকে। নইলে জাতিসংঘ আইডিয়া কখনই কার্যকর হতে পারত না।
    মানে রাখতে হবে স্তালিন ছিলেন রজভে্লটের জাতিসংঘ আইডিয়ার প্রথম বিরোধিতাকারি। তাকে ঠান্ডা করতে বা তার ভয় দূর করতেই রুজভেল্ট ভেটো আইডিয়াটা আনেন। যার মূলকথাটা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আমেরিকা যেন পরাশক্তি অন্য দেশগুলোর উপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার মতলবে জাতিসংঘ গড়ার কথা বলছেন না, সেটা স্পষ্ট রাখা যায়; তাদের আস্থা আসে। এই বিচারে এই পাঁচ সদস্যপদ কোন বিজনেস এসোসিয়েশন সমিতি বা এফবিসিসিআই এর মত নয়; সাম্যও নয়। বরং একেবারেই বিশেষ। এদিকটা না বুঝলে জাতিসংঘ কেন বা কীরকম তা জানা যাবে না।

    এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের সংস্কার বা পুনর্জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক না; বিশেষ করে গ্লোবাল নেতৃত্ব (শুধু গ্লোবাল অর্থনৈতিক না রাজনৈতিকও) বদল এলে সেটাই একমাত্র জাতিসংঘের অন্তত ওরিয়েন্টেশনে তো বটেই আরো বহু খোলনলচেও বদল আসাটা অসম্ভব নয়।  তবে ভারত সবসময় যে কল্পনাটা করে এসেছে তাতে ধরে নেয়া থাকে যে আমেরিকা আজীবন যেন নেতা আছে থাকবে। ফলে জাতিসংঘের (কোন সংস্কারেও) আসন বন্টনের ক্ষমতা যেন আমেরিকার একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে!!! যেটা এখনও না, আগামিতেও হবে না।
    সে যাই হোক, জাতিসংঘের কোন নিয়মটা কেন ওরকম বা সেরকম তা বুঝতে চাইলে জাতিসংঘ জন্মকালীন পটভুমিতে রূজভেল্ট কী কী ব্যবহারিক সমস্যার মোকাবিলা করে আগাতে হয়েছে তা বুঝতেই হবে। নইলে কোনকিছুই বুঝা প্রায় অসম্ভব! এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের কোন পরিবর্তনে কী কী হতে পারে সে তা ইমাজিন করা সহজ হবে!!
    আবার পুরানা কথায় ফিরে যাই।  মুলকথা, সেকালে রুজভেল্ট ভেটোসদস্যপদ দিয়েই রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্সকে রাজি করিয়েছিলেন। ফলে আগামি দিনেও এমন কতকিছু দিয়ে হয়ত চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বি বা সহযোগীদেরকে সামলাতে হতে পারে।
    আবার লক্ষ্য করতে হবে সেকালে আমেরিকাকে মানে রুজভেল্টকে  চীনের ব্যাপারটা  আলাদা করে বিশেষ সুবিধা দিতে চেয়ে আলাদাভাবে চেয়ে নিতে হয়েছিল। সেক্ষেত্রে রুজভেল্টের যুক্তি ছিল তিনি এশিয়ায় হিটলারের একমাত্র বন্ধু  জাপান যে পরাজিত করেছেন বটে তা হয়ে গেলেও এর পুনরুত্থান ঘটতে পারে বলে আমেরিকা ভীত ছিলেন। আর কলোনি দখলদার জাপান ছিল উভয় কোরিয়া আর চীনের (কিছু অংশের) দখলদার। তাই বিশ্বযুদ্ধ পরের পরিস্থিতিতে জাপানের বিপরীতে চীনকে এক বিশেষ শক্তি হিসাবে উঠিয়ে আনতে রুজভেল্ট  এশিয়ার একমাত্র চীনকে ভেটোসদস্যপদ দিতে বাকিদের রাজি করিয়েছিলেন। যদিও কাজটা কঠিন ছিল না কারণ –  রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স এরা নিজেরা নিজেদের ভেটোসদস্যপদ পাবার পরে আর কোনদিকে আপত্তি তুলতে আর আগ্রহি ছিল না।

    তাই জন্মগঠন ইতিহাস সে সময়ের পরিস্থতি ও বিবেচনার ফ্যাক্টরগুলো কী কী ছিল তা না জেনে একালে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে তো অনেক কথা বলাই যায়। তাতে জয়শঙ্করের মত দেশের ভিতরের  অনেক হাততালিও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এগুলো আসলে নিজেরই অজ্ঞতা আর ইতিহাসবোধের অভাবই নির্দেশ করে এমন হয়ে যেতে পারে।

    তবে, এককথায় বললে, আমেরিকা বা রুজভেল্টের সঞ্চিত সম্পদ ব্যয় করার সক্ষমতা মূলত এটাই আমেরিকার হাতে দুনিয়া নতুন করে উঠে দাড়াতে ও আমেরিকান বক্তব্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

    তাই আজকের মোদির ভারতের জয়শঙ্করের জন্য একটাই বিকল্প হল, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেখানো। এটাই একমাত্র তাদের ভারতের ইচ্ছামত এক নয়া জাতিসংঘ তারা গড়ে নিতে পারলে হয়ত পারতেও পারে। আবার তখনকার “বাকিরা” তাতে রাজি হবে কিনা তাদেরকে রাজি করাতে ভারতকে কী কী নয়া প্রস্তাব দিতে হবে সেজন্যও ভারতকে বা জয়শঙ্কদেরকে রেডি থাকতে হবে। এরপরে তখন হয়ত তারা বুঝতে পারবেন কেন স্থায়ী ভেটোসদস্যপদগুলো দেশের ‘জনসংখ্যা আনুপাতিক’ ভাবে বেছে নেওয়া হয় নাই।

    আবার ধরেন,  না-বুঝা লোকেদের নিয়ে চলতে সমস্যা অনেক। জয়শঙ্কর অনেকবার ঐ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন ভারত তৃতীয় বড় অর্থনীতির দেশ। একবার বলেছেন “এমন একদিন আসবে”। সেটা আসুক আগে, তাই না!!! এপর্যন্ত ইকোনমিক বা স্টাটিস্টিক্যাল ডাটা নিয়ে স্টাডির ফোরকাস্ট হল সেটা ২০৫০ সাল নাগাদ হলেও হতে পারে। তাহলে এর ত্রিশবছর আগেই এজন্য হুড়োহুড়ি কেন?

    আবার মোদির বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সর্বনিম্ন। এটা ভারতের মুসলমান কুপিয়ে কতটা কী ঢেকে রাখা যাবে? ভারতের “হিন্দুত্ববাদ” এই রাজনীতিই এটা চলতে থাকলে তা ভারতকে যতটুক্তু সম্ভাবনা আছে সেতাও হতে দিবে না।  বারবার এমন কোন অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হতে দিবে না।

    আবার এটাকে তামাসাই বলতে হবে যে, জয়শঙ্করেরও ধারণা আমেরিকার সমর্থনে তিনি ভেটোক্ষমতা পেতে চান বা পাবার উপায় দেখেন। এটাও জাতিসংঘ না বুঝার আরেক প্রমাণ। কারোণ বর্তমান এই জাতিসংঘের মধ্যে চীনের হাতে ভেটোক্ষমতা আছে ফলে আমেরিকার যেকোন সমর্থনের বিরুদ্ধে চীনা এক ভেটো ভোটই সব আশা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটা তো জয়শঙ্করের না বুঝার কিছু নাই?? যার মানে  ভারতকে কেবল আমেরিকাই না অন্তত চীনের কাছেও প্রিয়পাত্র হতে হবে। কিন্তু ভারত তো মনে করে নিজেকে নিজে নিজেই “পরাশক্তি” ঘোষণা দিয়েই সব সমস্যা মোদি মোকাবুলা করতে পারবেন।

    অতএব জয়শঙ্করের ভারতের প্রথম কাজ হল, জাতিসংঘের জন্ম উত্থান নিয়ে স্টাডি করা। সাথে অন্তত ১৯৩৩-৪৫ এই সময়কালে পাশ হওয়া আমেরিকান আইন যেগুলো গ্লোবাল প্রভাবের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে স্টাডি করা। এর আগে চাপাবাজির মুখ খুললে বারবার বেইজ্জতি হতে হবে!!

    গ্লোবাল নাকি জিওঃ
    এটা আসলে হল, গ্লোবাল ফেনোমেনাকে না বুঝতে পেরে একে জিও বলে ডাকাডাকি!!
    এলেখায় অনেকবার “গ্লোবাল” শব্দটা ব্যবহার করেছি। এর অর্থ-তাতপর্য বুঝতে হবে। এই শব্দের উত্থান হয়েছে ১৯৪৫ সালের পরে।  আর ব্যতিক্রম কিছু ছাড়া প্রায় সবাই গ্লোবাল শব্দটার (যেমন গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদির) বদলে ব্যবহার করে জিও (geo) যেমন জিও পলিটিক্স  শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। আবার বুঝা যায় তারাও এই ব্যবহারে সন্তুষ্ট না, এক অস্বস্তি আছে তাদের মধ্যে।
    এক। উতপত্তি কাল হিসাবে দেখলে জিও-এই ধারণার উদ্ভব ও চর্চার শুরু (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে। এটাই ব্রিটানিকার ধারণা অনুসারে।
    আর এর বিপরীতে আইএমএফের জন্মের (১৯৪৪) পরেই কেবল সম্ভব হয়েছে গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদি ধরণের ধারণাওগুলোর।

    জিও দিয়ে যেকোন ধারণা (যেমন জিও-স্ট্রাটেজি বা জিও-পলিটিক্স) এদের মুল বক্তব্য জিও মানে কোনদেশের ভৌগলিক অবস্থান যখন ফ্যাক্টর, নির্ধারক উপাদান। এজন্যই জিও [Geo-, জিওগ্রাফি থেকে]। এসবই হল জিও+ ।
    আর আইএমএফ এর জন্ম মানে হল গ্লোবাল বা দুনিয়াব্যাপী যখন বাণিজ্য সম্ভব হয়েছে – ফলে গ্লোবাল অর্থনীতি বলে কোন ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। শুধু তাই না। যখন গ্লোবাল অর্থনীতির কারণে সবকিছুর গ্লোবাল ভার্সান দেখতে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

    কাজেই গ্লোবাল ধারণার বিকল্প কখনই জিও+ (জিও-পলিটিক্স)  হতেই পারে না।

    আর সবশেষে আসল সত্যি কথাটা বলে ফেলা যাক। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আমেরিকান নেতৃত্বের কারণে সবকিছু গ্লোবাল হয়ে উঠতে চাচ্ছে। ততদিন এর বাধা ছিল দুনিয়াজুড়ে থাকা কলোনি দখল-শাসন সম্পর্ক। যেটাকে একমাত্র আমেরকাই উচ্ছেদ করে দিয়েছে; বাধ্য করেছে। আসলে (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে – এটাই ছিল আসলে দুনিয়া গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবালি সম্পর্কিত হয়ে উঠার (গ্লোবাল বাণিজ্যের মাধ্যমে) আগমন বার্তা দেওয়ার কাল। আর সেটাকেই না বুঝতে পেরে ভুল করে জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে মনে করা হয়েছিল। এককথায় তাই,  জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে অনুমান এটা এক ভুল ধারণা। “গ্লোবাল” ফেনোমেনাকে বুঝতে না পারার খামতি। ভবিষ্যতে বিষয়টা নিয়ে আরো বিস্তার করে লিখার আগ্রহ রেখে আপাতত শেষ করছি।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    গৌতম দাস

    ১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4cM

     

         Chinese loans: Developing countries must ‘think twice’

    গ্রামদেশে একটা শব্দ চালু আছে “ভাঙরি” দেয়া; মানে বিয়ে ভাঙরি দেয়া বা বিয়ে ভেঙে দেয়া। এর মানে, গ্রামের কোনো দুই পরিবারে হয়ত বিয়ে ঠিক হয়েছে; প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সব গ্রামে কিছু লোক থাকে যাদের কাজ হল, বিয়ে ভাঙরি দেওয়া। হতে পারে, তাদের বেশির ভাগ নিজের জীবন নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ। হতে পারে তারা অবিবাহিত বা চিরকুমার ধরনের যাদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, তাই জীবনের আশা দুর্বল। এরা ছেলের পরিবারে গিয়ে রটায় মেয়ের চরিত্র খারাপ অথবা মেয়ের পরিবারে গিয়ে বলে, ছেলের আগে একবার বিয়ে হতে গিয়েছিল বা হয়েছিল – এ ধরনের গল্প-গুজব ছড়ানো এদের কাজ!

    ভারতের এখনকার অবস্থা এই হতাশ ভাঙরি দেয়া মানুষের মত। উঠেপড়ে লেগেছে ‘চীন কত খারাপ’- সত্য-মিথ্যা যেভাবে পারে, তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কান ভারী করতে। আর ভারতীয় মিডিয়া এই প্রপাগান্ডার উপর ভর করেই দেশ এক দেশপ্রেম-জাগরণের জোশ রচনায় অস্থির হয়ে উঠেছে।  আবার আমাদের সরকারও সময়ে প্রলোভনে পড়ে ভারতের প্রপাগান্ডা শুনতে চাওয়ার ভান করতে গেছে – “যদি কিছু লাইগা যায়” ভেবে। মূলত চুরির অর্থ ডলারে পাচার করতে গিয়েই এই ডলার সঙ্কট যা থেকে এক চরম অস্থির-অনিশ্চয়তা আমাদের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে। আর তাতে অসহায় বোধ করে সরকার কোথায় কী পাওয়া যায় যেন সব উলটা দেখতে চাইছে; অথচ আগেই জানে ওখানে কিছু পাওয়া যাবে না।

    ঘটনা হল, আমাদের সরকারের অর্থমন্ত্রী এ এইচ এম মুস্তফা কামাল কথিত এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ফাইনান্সিয়াল টাইমস [Financial Times, (FT)] পত্রিকাকে। সেখানে তিনি চীনা ঋণ কত খারাপ ও কেন বিপজ্জনক, তা বর্ণনা করেছেন বলে দাবি করেছে পত্রিকাটা। FT বা এফটি-এর গত ৯ আগস্ট প্রকাশিত ওই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী চীনা বেল্ট ও রোড ঋণ নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন’ [Bangladesh’s Finance minister warns on Belt and Road loans from China]। এটা মনে করার ‘যথেষ্ট’ কারণ আছে যে, এই কথিত রিপোর্টের সাথে ভারতের ইন্টেলিজেন্সের সংশ্লিষ্টতা আছে। কারণ পরের দু’দিন ধরে ভারত এই কথিত রিপোর্ট-কে দিয়ে দিনরাত তার চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। যেটা একটা দেশের পরিচালকদের যারা মানসিকভাবে সুস্থ তাদের পরিচালিত কোন কাজ ও তার নীতি-পলিসি হতে পারে না।

    ভারতে অন্তত দশটা পত্রিকায় [ economic Times India ,  AsiaFinancial ,   Swarajyamag , Hindustantimes ,  market.businessinsider , Newsonair , Theweek , Wionews ,  Sentinelassam , NewsBharati , Statecraft , News18 , OWSA , ANI  ……….. আরও আছে] ছেপে মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাতম তুলে ফেলেছে।

    সবগুলো নিউজই একই Financial Times  এর বরাতে ছাপা হয়েছে যদিও সেসবের ভাষ্য, নতুন আরো শব্দ ঢুকানো বা লেখার ভলিউম ছোটবড় করা অথবা শিরোনাম আলাদা করা বা নয়া শব্দ ঢুকানো ইত্যাদি করা হয়েছে; যার মূলকথা হল, রিপোর্টটা স্পষ্ট করে চীন কত খারাপ, চীন বিভিন্ন দেশকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলে আয় করে চলা একটা দেশ যেন এই টাউটারি-ই চীনের প্রধান আয়ের উতস আর এছাড়া , শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে চীন দায়ী – এসব অর্থ করে এভাবে সাজিয়ে লেখা।
    এভাবে পরবর্তীতে ভাষ্যগুলোর লিড আসে হিন্দুস্তান টাইমস থেকে [Bangladesh minister warns against China’s BRI lending, cites Sri Lanka’s example]। যেখানে শিরোনামের সাথে এবার বাড়তি শব্দ যোগ করা হয়, ‘শ্রীলঙ্কার উদাহরণের পরিপ্রক্ষিতে’ বা cites Sri Lanka’s example – এ বাড়তি শব্দগুলো। আর দশ তারিখ বিকালে বাংলাদেশের ‘মানবজমিন’ পত্রিকাও হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার বাংলা অনুবাদ করে ছাপে। মানে যেন ঘর পোড়ায় আলু পোড়া দিয়ে কিছু পয়সা কামানোর সুযোগ কেউ ছাড়ে নাই।

    এফটি [FT]-এর রিপোর্ট ছাপা হওয়ার পরে, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পরে অর্থমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয় এবার এক রিজয়েন্ডার [rejoinder] বা প্রতিবাদলিপি পাঠান; যা এমরা ১১ আগস্ট সন্ধ্যার পরে একমাত্র টের পাই। কিন্তু মন্ত্রীর প্রতিবাদলিপির ঠিক-ভাষ্যটা কী তা তখনও জানা যায় নাই। কেবল বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস পত্রিকা একটা সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পাওয়া গেছিল। ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস ওই রিপোর্টে জানায়, মন্ত্রী এক প্রতিবাদ দিয়েছেন যা তারা জেনেছে, “এক অফিস-কর্তার (অনুমান করছি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউকে বুঝিয়েছে) কাছ থেকে যে বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল [‘the official aware of the rejoinder told the FE.’]“। অর্থাৎ এর সোর্স তখনও খুবই দুর্বল।

    তবে এর পরের দিন ১২ আগস্ট ভোরবেলা বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টার একটু আগে, FT এবার অর্থমন্ত্রীর ওই প্রতিবাদলিপির মূল ভাষ্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ আরো প্রায় ১২ ঘন্টা পরে, এর আগে পাবলিকলি কেউ জানতে পারে নাই যে প্রতিবাদলিপিতে কী ছিল। ্কিন্তু এতেই ভারতীয় সকল মিডিয়া আন-মুভড থাকে। মানে কেউই তাদের মিথ্যা প্রপাগান্ডা বন্ধ করে নাই। মানে  ১২ আগস্ট সারা দিন ভারতীয় পত্রিকাগুলো যারা এফটি-এর বরাতের নামে খবর ছেপেছিল এই প্রতিবাদলিপির কথা তারা সবাই চেপে গিয়েছে। এমনকি প্রভাবশালী দ্য প্রিন্ট; যার প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত যিনি নিজে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন আর সাথে ঐ লেখার এক ভিডিও ক্লিপ-ভাষ্য তিনি নিজে তৈরি করে ইউটিউবে প্রচার করে থাকেন। তিনিও এফটি বরাতে কিন্তু হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার ওপর ভিত্তি করে তার ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছেন। সেটা চালিয়ে গেলেন প্রতিবাদ আসার পরেও; যা একটি খাসা চীনবিরোধী “দেশপ্রেমিক” ভারতের প্রপাগান্ডা হয়েছে অবশ্য। অর্থমন্ত্রীর প্রতিবাদলিপিটা ছাপানোর বদলে শেখর গুপ্ত বরং তার প্রপাগান্ডা ক্লিপটাই ১২ আগস্ট সারা দিন প্রচার করে গিয়েছেন, এমনই দেশপ্রেমিক তিনি!!!

    কী ছিল মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতেঃ
    সার কথায় তিনি লিখেছেন, এরিপোর্টে “মন্ত্রীর প্রকৃত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেনি” [does not properly reflect the minister’s actual position.]। কিন্তু মন্ত্রীর ‘প্রকৃত’ অবস্থানটা কী ছিল তাহলে? পরের প্যারায় মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতে লিখছেন, ‘The report mentioned Sri Lanka’। মানে যেন তিনি না রিপোর্টটা শ্রীলঙ্কার কথা এনেছে!! তাই কী? এমরা নিশ্চিত নই। যদিও এরপর মন্ত্রী শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ উল্লেখ করেছেন।    উল্লেখ করে বলেছেন – যে (মূলত) “সভরেন লোন নেয়ার কারণে গত মে মাসে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে গেছে এবং পরে আইএমএফ এর সাথে চুক্তিতে গিয়েছে”। মন্ত্রীর এই দাবিটা সত্য। আর মন্ত্রী তাই এখন দাবি করেছেন এই রিপোর্ট লিখেছে, বিআরআই (চীনা বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ লোন) লোনের কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম খারাপ হয়ে গেছে’- এটা তিনি বলেন নাই। অর্থাৎ চীনা লোনের কারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়েছে এটা বলেন নাই; বরং আসলে ‘সভরেন ঋণের কারণে সমস্যা হয়েছে’।

    পরের প্যারায় মন্ত্রী বলছেন, ‘ চীনা লোন নেওয়ার ব্যাপারে (কাউকে) তিনি সতর্ক করেন নাই”। এ ছাড়া সবশেষে তিনি একটা তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘২০২১ সালের হিসেবে আমাদের মোট বিদেশী ঋণ ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ৪ বিলিয়ন হচ্ছে চীনা লোন।’

    অর্থাৎ মন্ত্রী বলতে চাইছেন, বাংলাদেশের কোনো অর্থনৈতিক ক্রাইসিস চীনা লোনের কারণে নয়।
    তবে বাংলাদেশের টিবিএস পত্রিকা তারাও মনে করে মন্ত্রীর বক্তব্য  বদলানো (ডিস্টোর্ট distort) করা হয়েছে। তারা লিখেছে, “London-based daily Financial Times (FT) published a report recently distorting statements made by Finance Minster“। তাদের রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল এটা। 

    মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপিতে আমাদের প্রাথমিক মন্তব্যঃ
    দেখা যাচ্ছে এফটির রিপোর্টার হেরেও হার মানতে রাজি নয়। তিনি প্রতিবাদলিপিটা ছাপবার সময় একটা নয়া শিরোনাম দিয়েছেন, Letter: Why Bangladesh minister is phlegmatic on BRI loans , যেখানে একটা বাঁকা শব্দ তিনি ঢুকিয়েছেন – phlegmatic। অক্সফোর্ড যে শব্দের অর্থ করে আবেগশুন্য unemotional, মানে এক উচ্ছ্বাসশুন্য অবস্থা।  মানে বিআরআই ঋণ নিয়ে মন্ত্রী আবেগশুন্য কেন? এধরণের একটা ভাব বা বক্তব্য এর লেখক বেঞ্জামিন পারকিন দিচ্ছেন। এটা অন্যায় ও অসততা। কারণ প্রথমত একজন মন্ত্রী বলছেন তার কথা বিকৃত বা ডিস্টোর্ট করা হয়েছে। যেটা Financial Times (FT) ও এর রিপোর্টারের জন্য খুবই অসম্মানজনক অভিযোগ। যেটা আসলে বলা হচ্ছে এই পত্রিকা ও এর রিপোর্টার অসৎ ও বিশ্বাস করা যায় না- ইন্টিগ্রিটির অভাব আছে। যেটা একটা মারাত্মক অভিযোগ। অথচ রিপোর্টার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফাজলামো করছেন। কেন? এইক রিপোর্ট-টা ইংল্যান্ডের এই অর্থনৈতিক দুর্দিনে কেউ পয়সা দিয়ে করিয়েছে??? তাই মন্ত্রীর এত মারাত্মক অভিযোগ শুনেও এক ইউরোপীয় মন অনড়, প্রতিক্রিয়াশুন্য??? তিনি তো অন্তত বলবেন যে মন্ত্রীর অভিযোগ সত্য না!!! নাকি??? সত্যি এটা এক অদ্ভুত সাংবাদিকতা!!!

    কিন্তু মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপি-ও যেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেঃ
    ১। প্রথমত এ প্রতিবাদলিপিতে এটা এখন সন্দেহতীতভাবে পরিষ্কার যে, মন্ত্রী এফটি-এর সাথে কথা বলেছেন যেটাকে তারা ইন্টারভিউ বলছে।

    ২. কিন্তু কোন দেশের মন্ত্রী সাক্ষাৎকারে বা সাংবাদিকের সাথে আলাপে কোনো একাডেমিক বা ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ কথোপকথনে লিপ্ত হন না, হওয়ার কথা না। এটা তার করণীয় কাজ বা সাবজেক্ট না, এখতিয়ারও না। ফলে শ্রীলঙ্কা কেন সঙ্কটে ডুবেছে এ প্রসঙ্গে তিনি কথা বলবেন কেন? শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের মন্ত্রীর এক্তিয়ারের বাইরে – এটাও কী মন্ত্রী জানা নাই? শ্রীলঙ্কা এনিয়ে কোন আপত্তি বা ব্যাখ্যা চেয়ে বসলে তো আমাদের সরকার কঠিন বিব্রত হবে, মাফ চাইতে হবে??   মন্ত্রী বড়জোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কথা বলবেন। এটাই তার এখতিয়ার। বাংলাদেশে চীনা লোন নিয়েও কথা বলবেন যতটুকু একটা বিদেশি মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় মন্ত্রী হিসেবে তাঁর এখতিয়ার। তবুও সাবধান যে সেটাও – শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণ নিয়ে ডুবেছে কিনা – এ বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে, এড়িয়ে যাওয়া বক্তব্য হতে হবে। শ্রীলঙ্কায় তাদের সমস্যা কার জন্য কী হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দেয়ার কাজ আমাদের মন্ত্রীর কোনভাবেই নয়। কোন বিদেশী সাংবাদিক তাকে তবু যদি উস্কানিতে শ্রীলঙ্কা চীনের লোনে ডুবেছে কিনা – এনিয়ে মন্তব্য জানতে চায় তাহলে, অর্থমন্ত্রীর উচিত হবে, ঠাণ্ডা মাথায় ভদ্রভাবে ঐ সাংবাদিককে বিদায় করে দেয়া। আর সাংবাদিককে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, তিনি অর্থমন্ত্রী –  বাংলাদেশের কোনো পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল না; তাই রিপোর্টার যদি আরও  প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করতে পারেন বা প্রশ্ন না থাকলে তিনি কথোপকথন শেষ করবেন। কিন্তু জানা যাচ্ছে, মন্ত্রী সেটা করেননি, সাংবাদিকের সাথে মেতেছিলেন। আর রিপোর্টার নির্লজ্জের মত তাঁকে বিক্রি করে দিয়েছে!!

    ৩। বাংলাদেশের চলতি সরকারের একটি নিয়মিত সমস্যা দেখা গিয়েছে যে, কেন সে চীনের সাথেও সম্পর্ক রাখছে তা ভারতকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া। তবু এই কান্ড যদি সরকার টু সরকার পর্যায়ে হয় যেখানে ফরমাল-ইনফরমাল বহু দিকেই আলাপ হয়ে থাকে যা স্বাভাবিক, সেখানে এমন কিছু হতে পারে। কিন্তু পাবলিকলি বা প্রকাশ্যে মিডিয়া-সাংবাদিকতায় এ্টা একেবারেই কাম্য নয়। কেননা তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতকে ট্যাক্স দিয়ে আমাদের যেন চলতে হচ্ছে!!!

    ভারতও প্রায়ই এমন দাবি করে থাকে যে, তার পড়শি দেশগুলো যেন ভারতের নিজ বাসার পিছনের বাগানবাড়ি সে দেশগুলো যেখানে ভারত ইচ্ছামতো হাত ঢুকাতে পারে, ফুল তুলে আনতে পারে ইত্যাদি। [এনিয়ে আমার পুরানা কয়েকটা লেখা আছে যার একটা লেখা “এক মফস্বলী জেনারেল” দেখা যেতে পারে।] এই ধারণার আদিগুরু হলেন জওয়াহের লাল নেহরু। তিনি মনে করতেন মানে ভাব করতেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে ফিরে গেলেও ওর বদলে তখন থেকে নেহরু হলেন রানীর নয়া ‘ভাইসরয়’ বা প্রতিনিধি। ফলে ভারতের পড়শি দেশ যারাও ভারতের সাথে বা অংশ হয়ে ব্রিটিশ কলোনির অংশ ছিল, কিন্তু এখন এসব স্বাধীন দেশ হলেও সেই সূত্রে নেহরুর নয়া “কলোনি-অধীনস্থতা” তাদের মানতে হবে।

    ভারত এ কথাগুলোই রিপিট করা শুরু করেছিল যখন চলতি শতকে চীনা অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়ে যাওয়াতে এশিয়া-আফ্রিকা সবখানেই এর চীনা প্রভাব বাড়ছিল। ফলে  ভারতের পড়শি দেশগুলোর উপরও চীনা প্রভাব স্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল। কিন্তু ভারত চীনের মতই পালটা নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে না, যে মুরোদ তার এখনো হয় নাই তাই, বরং নেহরুর সামন্ত-কলোনি স্টাইল দিয়ে কিছু করার খামোখা চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর আমাদের সরকারের নিজ দুর্বলতার কারণে বিদেশী সাংবাদিক বা ভারতীয় সাংবাদিক পেলেই তাকে তোষামোদ করতে চেষ্টা করা থেকে এসব সমস্যা তৈরি হয় বলে অনেকে অনুমান করে। খুব সম্ভবত এমন কিছুর ফ্যারে পড়েই মন্ত্রীর এই বিপর্যয়!

    ৪।  তবে কোন সূত্রে (FT)এফটির প্রতিনিধি অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে অ্যাকসেস বা প্রবেশ-অনুমতি পায় ও কথা বলতে পেরেছিল সেটা এক বিরাট কৌতুহল ও রহস্য। অবশ্যই। কারণ মন্ত্রী এই সাংবাদিকের সাথেই চীন কেমন, শ্রীলঙ্কার সঙ্কটে চীনা ঋণের স্বভাব খাসলত কেমন ইত্যাদি যেন এটা তাদের খোশগল্প-আলাপের সাবজেক্ট ছিল, মন্ত্রী সে আলাপ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে করেছেন! আর এমন বিশেষ আগ্রহ বিচার করলে এটা তো ভারতের পলিসি যে চীনকে এক দানব বলে তুলে ধরতে চায়। এছাড়া যেন এই চীন এমন যে, যার বাসার ভাত চড়ে অন্যদেশকে ‘ঋণের ফাঁদে ফেলে – বিভিন্ন দেশ থেকে লুটে আনা পয়সায়’!
    কাজেই Financial Times (FT) সাথে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ দেয়ার পেছনের ঘটনার সাথে ভারত আছে, তার ইন্টেলিজেন্স আছে এমন অনুমান প্রবল। বিশেষ করে, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর মুখ দিয়ে চীনা ঋণের বিরুদ্ধে বলানো, আর এরপর সেটাকে আরেক দফায় ভারতের আরো দশটা পত্রিকায় আরো কঠোর চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ভাষ্য হিসাবে দ্রুত উপস্থাপন যেখানে আবার সেন্ট্রাল রোলে হিন্দুস্তান টাইমসকে রাখা- এ এক বিরাট খবর ম্যানিপুলেশন, প্রপাগান্ডা-হিন্দুত্বের জাতিবাদী চীনবিরোধী জোশ তৈরি করে ভারতের এক মহা-প্রপাগান্ডা তৎপরতা অবশ্যই!  সেটা ভারত করলে করুক যা ভারত আর চীনের ব্যাপার; কিন্তু ভারত এই প্রপাগান্ডা করেছে আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাঁধে বন্ধুক রেখে। যেটা অবশ্যই আমাদের সবার জন্য বদারিং পয়েন্ট! এটা ইনসাল্টিং; বিব্রতকর! তাতে এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, তিনি চীনা ঋণের নিন্দা করেন আর নাই করেন তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, তিনি ভারতের হাতে ব্যবহৃত হয়ে গেছেন। এবং সেটা জেনে বা না-জেনে!

    ৫। এফটির রিপোর্টের শিরোনামে একটি শব্দ হল, ‘বিআরআই’ [BRI] লোন মানে বেল্ট-রোড প্রকল্পের লোন। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে চীনা লোন মানেই যেন তা বিআরআই!  না, তা একেবারেই না। এটা ভারতীয় অনুমান এবং এটা মিথ্যা অনুমান। এর কারণ যখন বেল্ট-রোড প্রকল্প যার শুরুতে ২০১৩ সালে নাম ছিল ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড; আগে কয়েক বছর তা চলার পরে ২০১৭ সালে বিআরআই [Belt road Initiative] নাম দিয়ে সম্মেলন ডাকা হয়েছিল কেবল তখনি ভারত বিআরআই প্রকল্পের প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছিল। ভারতকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছিল আর তাতে অপারগতা প্রকাশ করতে গিয়ে ভারত প্রথম তার বিরোধিতা প্রকাশ্যে এনেছিল। কাজেই সবকিছুকে  ‘বিআরআই’ বলে হাজির করা নিজের ঘৃণা-বিরোধিতা প্রকাশ এটাই তো ভারতের অবস্থান!
    আরেক মজার দিক হল, মোদির ভারতে কি চীনা অবকাঠামো ঋণ নেই? মোদি মূলত ২০১৪ সালের আগে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই চীনা সখ্যতা, চীনা অবকাঠামো ঋণের পথ খুলেছিলেন। আর সেটাই তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার পরে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। কাজেই চীনা অবকাঠামো ঋণ  অবশ্যই আছে; মোদির প্রথম পাঁচ বছরে এ সখ্যতা ছিল ঘোরতর। ভারতের রেলওয়ে আধুনিকায়ন (স্টাফ ট্রেনিংসহ), এছাড়া ভারতের অন্তত পাঁচটা শহর আধুনিক অবকাঠামো নতুন করে গড়ে দেয়াসহ আরো অনেক অবকাঠামো প্রকল্প সেখানে নেয়া ছিল। কিন্তু বিআরআই বিরোধিতার পর থেকে ভারতে চীনা ঋণ বিষয়ে সব পাবলিক ইনফরমেশন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এখানের জন্য সার কথা হল, চীনা ঋণ মানে বিআরআই নয়। যেমন বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোন বরং নন-বিআরআই।  যদিও কোনো নন-বিআরআই লোন পরে বিআরআই হিসেবে উভয়পক্ষ মেনে নিয়েছে এমনও হয়েছে। আবার পদ্মা সেতুকে বিআরআই বলে দেখাতে রাজি হননি হাসিনা।
    আবার যদি আরেকটু আগাই তবে  চার দেশীয় চীনের কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা-কলকাতা [BCIM] যে রেলপথ পরিকল্পনা ছিল সেটা এখন সেভাবে নাই, পরিত্যক্ত। এর বদলে সেটা এখন কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা বলে কাজ চলছে। তাতে ভারত সরে গেছে মানে ঢাকা-কলকাতা পদ্মার রেলপথ হলে সেটা দিয়ে কানেক্ট করার কথা ছিল; তা আবার আলাদাভাবে শুধু ঢাকা-কলকাতা হয়ে আছে। ফলে চার দেশীয় ঐ প্রকল্প ছিল সত্যিকার বিআরআই। কারণ কোন প্রকল্পকে BRI বলার প্রধান নির্ণায়ক হল যে মূল বিআরআই এর সাথে তা যুক্ত হবে কীনা!!  যেকোনো অবকাঠামো যা ইউরোপ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে চীন হয়ে (সাথে অবশ্য সমুদ্রপথে আফ্রিকা যুক্ত) এরপর এশিয়ায় ছড়িয়ে বিভিন্ন দেশে – এটা হল সেই মূল বিআরআই। এমন মূল বিআরআইয়ে যুক্ত নয় তেমন চীনা প্রকল্পও বাংলাদেশে অনেক আছে। কাজেই সাধারণভাবে চীনা ঋণ না বলে সব ঋণ কে বিআরআই বলার মানে হল যেটা  একমাত্র ভারতই যার সুনির্দিষ্ট করে বিরোধিতা করে!

    কেন এসময়ে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডাঃ
    আগে যেমনই হোক, গত প্রায় দুই মাস ধরে ভারত বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা  বাড়িয়েছে। এর প্রধান দুটা কারণ মনে করা হয়। প্রথমটা হল, গত এক দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি; এটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ডাটা থেকে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই ফিগার নিয়ে ভারতে মোদিবিরোধীরা মোদির অর্থনীতি খারাপ চলছে, ফেল করেছে এর প্রমাণ বলে পাবলিক পর্যায়ের সমালোচনা তুলে ধরে এসেছে। সেটা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বা আরো ফেলবে বলে মোদির আশঙ্কা। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ডলার সঙ্কটে বা আইএমএফের কাছে হাত পেতেছে – এ তথ্য ব্যবহার করে ও ব্যাপক প্রচার করে মোদি তার অভ্যন্তরীণ ভোট-কাটা বিরোধীদের সোজা বা শায়েস্তা করতে চান, এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে ভারত ব্যাপক প্রপাগান্ডা করে তুলে ধরছে।

    দ্বিতীয় কারণটাও ভারত এর সাথে যুক্ত করেছে। সেটা হল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ হল চীনা ঋণ – এই কথাটা মিথ্যা হলেও ভারতের খায়েস – মিথ্যা প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ছেয়ে ফেলা যাতে ভারত তার চীনবিরোধী প্রচারের সব কাজ সেরে ফেলতে পারে।

                                   Chinese naval Hi-tech Tracking Ship Yuan Wang 5 docking at Sri Lanka’s Hambantota Port

    এদিকে আমাদের সরকারের এখনকার চাওয়া হল, আমেরিকান অবরোধের চাপের সাথে সে এখন ডলার-অর্থনীতির সঙ্কটে পড়েছে, এখানে ভারত তাকে সহায়তা করুক। চাইছে গত ২০১৩-১৪ সালের মত, বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান চাপ ভারত সামলে দিক। কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারত আর আমেরিকা বা বাইডেনের সম্পর্ক আর সেখানেই নাই; ভারত আর সেই প্রিয়পাত্র নাই। আসলে আমেরিকা আর ভারত, এদের উভয়ের স্বার্থ উভয়ের মৌলিক বিরোধী হয়ে দেখা দেয়া শুরু হয়ে গেছে। যদিও তাই বলে এখনই সম্পর্কচ্যুতির ঘোষণা দিলে তা আরো ক্ষতিকর হবে, তাই এটা রুটিন সম্পর্ক করে ফেলে রাখা হয়েছে; যদিও এখনকার পরিস্থিতিটা এমন যেমন,  মূল ফ্যাক্টর ভারত যতই রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে যাবে তত দ্রুত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক সব ভেঙে পড়বে। যেমন সর্বশেষ উদাহরণটাই দেয়া যাক। গতকাল রয়টার্সের নিউজ হল – ভারত রাশিয়ার অশোধিত তেল গোপনে এনে শোধন করে অন্যদেশকে সরবরাহ করছে – U.S. says India hid Russian origin of fuel shipped to U.S.,] এতে স্বভাবতই বাইডেন ক্ষুব্ধ।
    কাজেই এঅবস্থায় আমাদের সরকারের আকাঙ্খা মোতাবেক ২০১৩-১৪ সালের সুখস্মৃতিতে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সব জেনেও এবাস্তবতা মানতে সরকারের মন সায় দেয় না। বিশেষ করে তার ভয়, সে একেবারে একা হয়ে যাচ্ছে। তাই বারবার হাত বাড়ায় আর একটা করে ভারতের ঝাপ্টা খাচ্ছে।
    বাংলাদেশ সরকারের এ’আকাঙ্খা ন্যূনতম কোন বাস্তব রূপ দিতে ভারত অক্ষম বটে কিন্তু তাতে কী বাংলাদেশকে লুটে খাওয়া, অপব্যবহার করা এটা এখন ভারতের একটা বড় সুযোগ ও কাজে দাঁড়িয়ে গেছে।

    তাহলে অপর কাজটা কী?
    পুরানা কাহিনী হল,  চীন-আমেরিকার সম্পর্ক ২০১০ সালের পর থেকে প্রথম তিতা হতে শুরু করেছিল। অন্যভাবে বললে, প্রেসিডেন্ট ওবামা যতই এটা টের পাচ্ছিলেন, ততই বেশি করে চীনকে – বাণিজ্যিক সুবিধায় ছাড় দিতে হবে – ওবামার এদাবিকে জায়গা করে দিয়ে চীন আমেরিকাকে ম্যানেজ করছিল। কিন্তু এটাও অকার্যকর হতে শুরু করে পরে স্পষ্টত ট্রাম্পের দ্বিতীয় বছর থেকে। তবু চীন যেটা মেইন্টেন করে গেছে তা হল – সে দ্বিপাক্ষিক ডায়লগের রাস্তা শক্ত মনোযোগে খোলা রেখে চলতে পেরেছিল। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্পীকার পেলোসির তাইওয়ান উত্তেজনা সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। তাতে চীন এখন বাইডেনের ওপর এত ক্ষুব্ধ যে, পাবলিকের ভাষায় বললে, চীন আমেরিকার ফোন ধরছে না। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকাও, সেকালে কখনো দু’পক্ষ এমন ফোনের নাগালের বাইরে থাকেনি। কারণ এমন বাইরে থাকা মানে তাতে অনিচ্ছাতে বড় সামরিক সঙ্ঘাত যেকোনো সময় টার্ন নিতে পারে, যখন দু’পক্ষের হাতেই কঠিন মারণাস্ত্র মজুদ!

    এদিকে এ’পরিস্থিতিতে চীনের একটা হাই-টেক ট্র্যাকিং জাহাজ হাম্বানটোটা বন্দরের দিকে আগাচ্ছিল বন্দর থেকে রিফুয়েলিং ইত্যাদি রুটিন সুবিধা গ্রহণের জন্য। এটা অসামরিক গবেষণা মনিটরিং-এর  এক হাইটেক জাহাজ নাম “ইউয়ান ওয়াং ৫“। রয়টার্স লিখেছে, ” Foreign security analysts describe the Yuan Wang 5 as one of China’s latest generation space-tracking ships, used to monitor satellite, rocket and intercontinental ballistic missile launches.”
    কিন্তু চীন নিয়ে মানসিকভাবে ম্যানিয়াক ভারত তবু এটা নিয়ে হাইপ বা হৈচৈ তুলবেই। তাই ভারত ততই আমেরিকার মনোযোগ আকর্ষণে যেন এনিয়ে তীব্র আপত্তি হইচই ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ায় তুলেছিল; যদিও ভারতের শেষ লক্ষ্য এসবের কোন কিছু নয়।  আসলে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভারত নিজের ক্ষুদ্র সক্ষমতার ব্যবহার করে (নগদ বৈদেশিক মুদ্রায় লোন দেয়া নয়); তবে ভারতের ভেতরের বাজার থেকে যা যা রুপিতে কেনা যায় এমন প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চাল-গম ধরনের খাদ্য আর তেল-গ্যাস জ্বালানি ইত্যাদি লোন হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে পাঠিয়েছিল। এখন শ্রীলঙ্কায় আপাতত ভারত বা ভারতের সাথে চীনের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিমূলক এন্ট্রি নেই; বরং আমেরিকা একা মাতবরি করছে আর সেই খুশিতে ভারত মেটেরিয়াল লোন-সহায়তা নিয়ে এগিয়েছিল। কিন্তু রনিল বিক্রমাসিং নয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে গেলে ভারতের ভাগে অন্তত সাহায্য-সমতুল্য কর্তৃত্ব-প্রভাব কোন কিছুই আসেনি। কিন্তু এ্টা ভারত আশা করছে। সেই  মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আমেরিকার চেয়েও উচ্চৈঃস্বরে চীনা জাহাজের এসফরের বিরোধিতা ও আপত্তি দায়ের করেছিল শ্রীলঙ্কার কাছে। কিন্তু আমেরিকা ভারতের সাথে মিলে শ্রীলঙ্কার সাথে দেনদরবার কিছু করতে যায় নাই। যা করেছে একাই।  ফলাফলে গতকাল সকালেও ভারতের মিডিয়া ভারত কত শক্তিশালী আর চীন কত দুর্বিনীত তার ঢাক পিটাচ্ছিল যেন, ভারত চীনকে ঠেকিয়ে দিয়েছে আর পারলে সে চীনা জাহাজ আর বন্দরের মাঝে ভারতীয়-নৌবাহিনী দাঁড় করিয়ে চীনকে ভাগিয়ে দেয়।
    আসলে এনিয়ে গত তিন দিন ধরে ভারতীয় মিডিয়ায় মোদি সরকারের চীনবিরোধী ‘দেশপ্রেম’ আর দেশের কত স্বার্থসচেতন তারা এরই মহিমা প্রদর্শিত হচ্ছিল। এজন্য এর সাথে মিলিয়ে, বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ব্যবহার করে “চীন কত খারাপ” এটা তুলে ধরাটা এক বিরাট প্রপাগান্ডা মিডিয়া উচ্ছাস ঘটিয়েছিল।

    কিন্তু হায়! ভারতের এক পত্রিকা WIRE গত ১২ আগষ্ট সন্ধ্যায় ভারতের সব উত্তেজনায় ঠান্ডা পানি ঢেলে লিখেছে, শ্রীলঙ্কা সরকার চীন জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে অনুমতি দিয়েছে। কারণ, চীন ও আমেরিকার এ বিরোধিতা কেন তারা করছে এর সপক্ষে  যুক্তিগ্রাহ্য যথেষ্ট কারণ তারা দেখাতে পারেনি। আসলে এই ঘটনায় শ্রীলঙ্কা দেখিয়ে দিল এখনও সে ভাত-আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম!!!

    সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক, কেবল একটাই বেছে নিতে হবেঃ
    এটা এক তত্বকথার ‘হেদায়েত’ বাণী! কী হতে চান, সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক? তার মানে হল যেকোন একটা নিতে হবে। দুটোই এক সাথে হওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ঠিক তাই। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রবাদী উগ্র দেশপ্রেমিকরা হিন্দুত্ববাদীদের মতই ব্যাপারটা বুঝতে নারাজ। আসুন,  তা নিয়ে আলাপ করি। সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হল, ফ্যাক্টস। এতা ফ্যাক্টস বেসজড হতে হবে! একেবারে অবিকৃত বা এদিক-সেদিক মানে করা নয় বা ইঙ্গিত করে বলিয়েছেন, ফেবার করেছেন ইত্যাদি, এমন করা যাবে না। ফ্যাক্টের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে হবে।

    এখন এভাবে চললে এর অনেক কিছু আপনার দেশের স্বার্থের বিপক্ষে যেতেও পারে। তবু, বাস্তব-সত্য তো সত্যই তা ময়ানতেই হবে। এখন তাহলে আপনি কী চান? যদি সাংবাদিকতা চান তাহলে দেশপ্রেম প্রদর্শন তা হোক না-হোক তা পাশে ফেলে রেখে আপনাকে সাংবাদিকতা বা সাংবাদিক স্বার্থকে উপরে তুলে ধরতে হবে। জার্নালিজমকে ফাংশন করতে দিতেই হবে।
    কিন্তু ভারতীয় বর্ষীয়ান সম্পাদক শেখর গুপ্তা সাংবাদিকের আগে দেশপ্রেমিক হতে চান। তাই বাংলাদেশের এই মন্ত্রী-উপাখ্যান নিয়ে ভারতের  তার নির্মিত ভিডিও ক্লিপে তিনি কড়া দেশপ্রেমিক সেজেছেন। অথচ ভারতের পাঁচজন সিনিয়র সাংবাদিকের নাম নিলে তিনি নিজে একজন হবেন। এই হল, ভারতের সাংবাদিক দুর্দশা! সাংবাদিকতাকে চিপায় ফেলে দেশপ্রেমিকের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় নেমেছেন তিনি! দেখুন তার ইউটিউব! 

    তিনি শেখর গুপ্তা এখানে দুইটা বড় মিথ্যা বলেছেনঃ
    এক। হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নিয়ে, এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে এখন শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর এই পয়সাও ঋণের বোঝা নাই। কারণ, চীনা সরকারি ঋণের অর্থে এটা নির্মাণের পরেই শ্রীলঙ্কায় এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার এসেছিল।  তারা দাবি করতে থাকে যে সরকারের পক্ষে এর ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। এটাই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সরকারকে জানায়। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়ায় এমন যেন চীনক্বে এখন শ্রীলঙ্কাকে দেয়া ঋণ ফেরত নিয়ে নিতে হবে। ফলে দুপক্ষের আলাপ-আলোচনায় এটা সাব্যস্ত হয় যে তাহলে চীনা সরকার এক প্রাইভেট চীনা কোম্পানী যোগাড় করে দিবে যে নির্মিত হাম্বানটোটা বন্দর কিনে নিবে আর এই বন্দরের আয় থেকে নিজের এই বিনিয়োগ ধীরে ধীরে তুলে নিবে। এটা সাব্যাস্তের পরে নতুন বিতর্ক উঠে বন্দরের কতভাগের মালিক হবে নয়া ক্রেতা। যেহেতু সব প্রকল্পেই অন্তত প্রকল্পের জায়গা-জমি দেয়া বা যাদেরকে সরিয়ে ঐ জায়গায় বন্দর নির্মাণ হয়েছে তাদের পুণর্বাসন ইত্যাদিতে সরকার খরচ করে বলে যেকোন বড় প্রকল্পের ৩০% এর শেয়ার মালিকানা সরকারের হয়-ই। তাই ঐ চীনা প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার মালিকানা এখন প্রকল্পমূল্যের ৭০%।  আর ঠিক একারণের শ্রীলঙ্কা সরকার  হাম্বানটোটা বন্দরের মালিকও নয়, এনিয়ে কোন চীনা ঋণপরিশোধের দায়ও সরকারের নাই। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা সরকার অর্থনীতি ফেল করার পিছনে হাম্বানটোটা বন্দরের কোন ভুমিকাই নাই। অথচ শেখরগুপ্তা হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়েই যাচ্ছে।
    দুইঃ অন্যান্য চীনা ঋণ শ্রীলঙ্কাকে গছিয়ে দেওয়ার ভারেই ওদেশের অর্থনীতি ঢুবে গেছে?
    এটাও শতভাগ মিথ্যা।  এনিয়ে আমার আগের  ১৬ মে ২০২২ তারিখে লেখা শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’ এখানে বিস্তারিত আছে। শেখর গুপ্তা দাবি করছেন চীনা ঋণই শ্রীলঙ্কার অর্থনঈতি ফেল করার কারণ। অথচ তিনি ফ্যাক্টস অনুসরণ করতে রাজি না। ্তিনি শ্রীলঙ্কা সরকারের দেয়া কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কত ঋণ এই ফ্যাক্টস শীট অনুসরণ করে কথা বলতে চান না। সেটাই নিচে আবার তুলে এনেছি।

    এখানে শ্রীলঙ্কার সরকারের দেয়া তথ্য মতে, দেখা যাচ্ছে তাদের নেয়া মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ১০% হল চীনা লোন। এজন্য যদি চীনকে দায়ী করা হয় তাহলে শ্রীলঙ্কায় জাপানের ঋণও ১০%, বিশ্বব্যাংকের আরেকটু কম ৯% এছাড়া এডিবিও আরেকটু বেশি ১৩% – এদের সকলকেও দায়ী করতে হয় সমানে!!!। কিন্তু তা না করে কেবল চীনকে দায়ী করা মিথ্যা ও খারাপ উদ্দেশ্যমূলক অবশ্যই, সেটাই শেখর গুপ্তা ও ভারত করে চলেছে।
    আর বাস্তবে শ্রীলঙ্কার দুর্দশা বা ডিফল্ট হবার মূল কারণ, নেয়া মোট ঋণের ৪৭%, এক বিশেষ ঋণ। যেটাকে বলে সভরেন ঋণ [Sovereign loan ] যার মানে হল শ্রীলঙ্কা সরকারের ডলার বন্ড বাজারে ছেড়ে বিদেশ (যারা মূলত ব্যক্তি বিনিয়োগকারি) থেকে ডলার সংগ্রহ করেছিল। [সভরেন লোন মানে সরাসরি রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে ডলার বন্ড ছেড়ে নেয়া লোন।] আমাদের মত দেশের কিছু অতিচালাক নেতা-মন্ত্রীর কাছে এভাবে ডলার বন্ড ছেড়ে ডলার সংগ্রহকে খুব লোভনীয় খুব আরাম ও মজার মনে হয়। কিন্তু তা সব সময়ই ভীষণ রিস্কি এদিকটা তারা ভুলে থাকতে চায়। কারণ এই ঋণ ফেরত দেওয়ার যে কিস্তি তা প্রায়ই সরকার সময়ে ফেরত দিতে পারে না ফলে ডিফল্টার হয়ে যায়। যা থেকে গ্লোবাল ঋণ-বাজারে বদনাম ছড়ায় ব্যাপকভাবে! আর এটাই হয়েছে শ্রীলঙ্কার বেলায়। আর শ্রীলঙ্কার সভরেন বন্ড ছেড়ে নেয়া ঋণ সবচেয়ে বেশি ৪৭%। আর একারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে আইএমএফের কাছে সারেন্ডার করে লোন চাইতে গেছে। যা বাংলাদেশের বেলায়, সে এখনও কোন ডিফল্টার নয় তবে আইএমএফের কাছে আগেই সারেন্ডার করে লোন চেয়েছে। মন্ত্রী নিজেও তাঁর প্রতিবাদলিপিতে ঠিক এদিকটায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এদিকটা  অর্থাৎ শেখর গুপ্তা একজন মিথ্যা প্রপাগান্ডার লোক যিনি নিজেকে কোন সম্পাদকের দাবি দূরে থাকে তিনি নিজেকে কোন সাংবাদিকই দাবি করতে পারেন না।

    সবশেষের কথা হল, বাংলাদেশের আইএমএফের কাছে চাওয়া ঋণ পেলেও আমাদের আরো ঋণ লাগবে যার সম্ভাব্য দাতা এক চীন ছাড়া সরকার কারো কথা ভাবতে পারছে না। এমনকি আইএমএফ দেরি করলেও এ ঋণ প্রয়োজনীয় বেশি। কিন্তু এ ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সম্ভবত চীনের শর্ত হতে যাচ্ছে, যেসব চীনা প্রকল্প আগে ভারতের আপত্তিতে বাদ পড়েছে বা ঠেকিয়ে রাখা আছে – সেসব এবার আমাদের সরকারকে অনুমোদন দিতে হবে। ভারত সম্ভবত সে জন্য এমন আগ্রাসী! কিন্তু অক্ষম ডেস্পারেট! তাহলে, অর্থমন্ত্রী কী বুঝে এফটি-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন? যা তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিতে হয়!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা দৈনিক “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার ১৩ আগষ্ট ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে “অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার“ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • তাইওয়ান-আগুন ছড়ানো না, বাইডেনকে দায়িত্ববান হতে হবে

    তাইওয়ান-আগুন ছড়ানো না, বাইডেনকে দায়িত্ববান হতে হবে

    গৌতম দাস

    ০৮ আগস্ট ২০২২, ২৩ঃ২২ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4c

     

    Democratic foreign policy experts divided on Pelosi’s trip to Taiwan: ‘good for her,’ ‘not a good idea’

    তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগেই যাচ্ছে নাকি! গত সপ্তাহজুড়ে দুনিয়ার কোনায় কোনায় এই আশঙ্কা-আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘পাগলা বাইডেন’ কি ক্রমান্বয়ে সব খুইয়ে এখন চীনের সাথে যুদ্ধ লাগিয়ে দেবেন? আর তা থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জল্পনা এজন্য; কারণ, এমন যুদ্ধ একবার লেগে গেলে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ! মানে বাইডেনের এই পাগলামি হল, শিশু বয়সে খেলাপাতি খেলার বয়সকালে শিশুরা সময়ে যেমন “হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে” আচরণ করে বসে, সেটাই। কিন্তু বাস্তবে কোন অর্থেই বাইডেন শিশু নন, খেলাপাতি খেলার বয়েসেরও না। বরং তিনি এতই বয়স্ক যে কারণে তার দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই বলে নিজের দলেই আলোচনা আছে। তাহলে শিশু বয়সের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য বেমানান আচরণ তিনি কেন করছেন? সে এক বিরাট বিস্ময় বটে!

    চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে সরাসরি ফোনে কথা বলেও তাদের স্পীকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের উস্কানি তৈরি না করাতে রাজি করাতে পারেন নাই। ফলাফলে চীন সব ধরণের চীন-আমেরিকার যোগাযোগ মাধ্যম প্রটোকল যা তৈরি হয়েছিল যা উভয়পক্ষের জন্য বিশেষ সহযোগিতা এক ব্যবস্থা রচনা করেছিল তা এরপর থেকে কাট-অফ করে দেয়। কোন আমেরিকার দিক থেকে আসা ফোনকলে সাড়া দেয়া বন্ধ রেখেছে চীন। এরপর আমেরিকার হুশ আসে। ইন্দোনেশিয়া সফরে থাকা আমেরিকান পররষ্ট্রমন্ত্রী এন্থনি ব্লিঙ্কেন এনিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে কিছুটা দুঃখ করেন, কিছুটা চীনকেই ‘দায়ীত্বহীন’ বলে দোষারোপ করেন [Blinken chides China’s ‘irresponsible’ cut in U.S. communication]।

    বাইডেন প্রশাসনকে থমাস ফ্রিডম্যানের কলামের কষাঘাতঃ
    থমাস লরেন ফ্রিডম্যান [Thomas Loren Friedman] একজন নামকরা সাংবাদিক ও বই লেখক। তিনি তিনবারের পুলিৎজার পুরস্কার প্রাপ্ত সাংবাদিক। প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট চেষ্টা করেন তাঁর নিজের গুরুত্বপুর্ণ পলিসি ডিসিশন জনসমক্ষে প্রকাশ করার সময় ফ্রিডম্যানকে হোয়াইট হাউজে ডেকে সাক্ষাতকার দিয়ে থাকেন যাতে পাবলিকের কাছে ফ্রিডম্যানের যে একটা ইতিবাচক ইমেজ আছে সেটা তিনি ব্যবহার করতে পারেন। এই আমেরিকার পুরস্কারপ্রাপ্ত নামকরা সাংবাদিক ফ্রিডম্যান পেলোসির তাইওয়ান সফরে যাওয়া প্রসঙ্গে খুবই অসন্তুষ্ট এক প্রতিক্রিয়া-মন্তব্য কলাম লিখেন নিউইয়র্ক টাইমসে। তাতে তিনি পেলোসিকে [ …she will be doing something that is utterly reckless, dangerous and irresponsible.] অবিবেচক, বিপদজনক ও দায়ীত্বজ্ঞানহীন বলেছেন। ফ্রিডম্যানের এত ক্ষেপে উঠার মূল কারণ, তিনি বলতে চাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপুর্ণ পদে থাকে ব্যক্তিরা এমন দায়ীত্বজ্ঞানহীন আচরণ করতে পারেন না যাতে বড় ধরণের যুদ্ধ কোন বিশ্বযুদ্ধে দুনিয়া জড়িয়ে যায়।
    ফ্রিডম্যান আসলে নিউইয়র্ক টাইমসের নিয়মিত কলাম লেখক। তিনি তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে সেখানে আসলে “দায়ীত্ববান নেতৃত্বের আচরণ” করতে কে ঘাটতি দেখাচ্ছে সেই প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর দাবি, পেলোসির এই সফরের ফলে “তাইওয়ান আরও সুরক্ষিত হয়ে যাবে না কারণ আপনার এটা ত ছিল এক প্রতীকী সফর। বরং এথেকে অনেক খারাপ জিনিষ এখন উঠে আসবে, জন্ম নিবে” [Taiwan will not be more secure or more prosperous as a result of this purely symbolic visit, and a lot of bad things could happen]। আপনাদের তাইওয়ান উস্কানিতে চীনের সামরিক জবাব দেয়া যদি শুরু হয়ে যায় তাতে আমেরিকা আরো গভীর সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে যাবার হুমকি তোইরি করবে। আর সেখানে আমেরিকাকে একইসাথে দুইটা ফ্রন্ট খুলে দুই পারমানবিক-অস্ত্র-সজ্জিত রাশিয়া ও চীনকে মোকাবিলার বিপদজনক পরিস্থিতি নিজের জন্য তৈরি করা হবে! অথচ যার কোন মানে হয় না!!
    তিনি আরো বলেছেন, আমেরিকান প্রশাসন যদি মনে করে থাকে যে তাইওয়ানে সফর করে তাথেকে উস্কানি তুললে আমেরিকান ইউরোপীয় বন্ধুরা আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে যাবে তবে বুঝতে হবে দুনিয়া সম্পর্কে আপনাদের ধারণা কত ভুল ও ভিত্তিহীন [will join us if there is U.S. conflict with China over Taiwan, triggered by this unnecessary visit, you are badly misreading the world.]
    ফ্রিডম্যান আরো বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ন্যাটো ও আমেরিকা যখন ইউক্রেনকে ভারি অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছেন তখন আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান চীনকে অনুরোধ করেন যাতে চীন রাশিয়া কোন সামরিক সহায়তা শুরু না করতে তাতে চীন ইতিবাচকভাবে ও দায়ীত্বপুর্ণভাবে আমেরিকার পক্ষে সাড়া দিয়েছে [By all indications, U.S. officials tell me, China has responded by not providing military aid to Putin ]। অথচ বিপরীতে আমেরিকান প্রশাসনের আচরণগুলো দায়িত্বজ্ঞান শুন্য!! ফলে অগ্রহণযোগ্য!

    স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির বেপরোয়া তাইওয়ান সফরের জিদঃ
    মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, তাঁর এবারের এশিয়া সফরসুচিতে তাইওয়ান সফর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অথচ কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই গত ২ আগস্ট তাইওয়ানের ভুমিতে তিনি নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু সেটা তিনি করেছেন যেন যুদ্ধ করতে এসেছেন।। কিন্তু কেন এমন যুদ্ধ সাজের রব?

    ঘটনার সূত্রপাত যদিও অনেক আগের। তবে এর চলতি রূপ হল, গত বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাপকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং পেলোসির তাইওয়ান সফরের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, “আগুন নিয়ে খেললে পুড়তে হবে”।
    বিবিসি বাংলা লিখেছে, মার্কিন ‘যুক্তরাষ্ট্র বলে, তাইওয়ান কোনো স্বাধীন দেশ নয়, কিন্তু একই সাথে তারা তাইওয়ানকে মিত্র বলে গণ্য করে”। কিন্তু যে দেশ স্বাধীন নয় বলেই আমেরিকা মানে অর্থাৎ যেই তাইওয়ান কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয় বলে আমেরিকা নিজেই মানে সেই তাইওয়ান আবার আমেরিকারই “মিত্র” হয় কেমন করে??? দেখা যাচ্ছে বিবিসিও বাইডেনের এই গভীর স্ববিরোধিতার পক্ষে দাঁড়াতে চাচ্ছে না। যেন এটা হল, কোন বিদেশী রাষ্ট্র মোদিকে পাশ কাটিয়ে, না জানিয়ে যেমন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে স্বীকৃতি বা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না; করার মানে হয় না; সেরকম। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ ভারত থেকে স্বাধীন কোন ভূখণ্ড নয়। তাহলে তাইওয়ান কোন স্বাধীন দেশ-ভূখণ্ড নয় স্বীকার করেও আমেরিকা কেন তার সাথে মিত্রদের মতো আচরণ বা তাকে সামরিকভাবে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিতে চায়?

    আবার জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবরে গৃহিত সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব হল, চীন বলতে ‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়না’ (PRC) বা মাওয়ের চীনই, এটাই একমাত্র চীন। ফলে তাইওয়ান এই একক চীনেরই ভূখণ্ড অংশ মাত্র। জাতিসঙ্ঘ তাই এর বাইরে না গিয়ে, তার চোখেও তাইওয়ান কোন স্বাধীন দেশ-ভূখণ্ড নয় মনে করে। 1971 25 oct UN 2758 Restoration of the lawful rights of the People

    এছাড়াও, চীন কোন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়্র জড়িত হয় বা ঐ দেশকে স্বীকার বা স্বীকৃতি দেয় তখনই যখন “চীন বলতে” সেটা PRC এই একটাই চীন – এটা তারা স্বীকার করে নেয়। আর এটাই চীনের ‘একচীন নীতি’। আমেরিকাও এটা স্বীকার করে নিয়েছিল বলেই ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকার প্রথম কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটেছিল। তবে এর পরেও কোন দেশের তাইওয়ানের সাথে অনানুষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক হতে পারে। যেমন, এখনো তাইওয়ানের সাথে খোদ চীনেরই “এমন সম্পর্ক” আছে। এবং চীনে তাইওয়ানের মোট রপ্তানির পরিমাণ ১৮৮ বিলিয়ন ডলার; যেটা আবার তাইওয়ানের মোট রপ্তানির ৪০%।
    কাজেই সব মিলিয়ে ন্যান্সির এই সফর পরিপূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন উসকানিমূলক; একটা সেটল জিনিষকে ফের খুচিয়ে ঘা করা!! আর ঠিক এ কথাটাই সাহসের সাথে কলাম লিখে বলেছেন নিউইয়র্ক টাইমসের নামকরা সাংবাদিক থমাস ফ্রিডম্যান।

    Pelosi, 82, is a close ally of U.S. President Joe Biden, both being members of the Democratic Party, and has been a key figure in guiding his legislative agenda through the U.S. Congress. – REUTERS

    আমেরিকান কংগ্রেস বা ‘সংসদের স্বাধীনতার’ বকোয়াজিঃ
    যেন বিভ্রান্ত না হই যে পেলোসি আর বাইডেন একই ডেমোক্রাট দলের দুই কর্তৃত্বস্থানীয় কর্তা। এবং যারা একই এজেন্ডার রাজনীতি ও পলিসির পক্ষে কাজ করে থাকেন। অর্থাৎ তাদের ঘনিষ্ঠতাও যথেষ্ট। কথাগুলো লিখেছে রয়টার্স।
    এরপরেও এখন কথা উঠেছে, বাইডেন নাকি স্পিকার ন্যান্সিকে তাইওয়ান সফরে না যাওয়া নিয়ে কিছুই বলেননি; এমনকি না যেতে পরামর্শও রাখেননি। অপরদিকে যদিও কিছু মিডিয়ার দাবি আমেরিকার আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোতে তাদের কংগ্রেসের (সংসদের) স্পিকার হলেন তিন নম্বর ব্যক্তি; মানে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই, তাই। কিন্তু বিবিসি বাংলা এক সাফাই দিয়ে লিখেছে যে, “প্রেসিডেন্ট বাইডেন অবশ্য ন্যান্সি পেলোসিকে থামানোর চেষ্টা করেননি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস হচ্ছে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন”।
    আবার এই বক্তব্যের বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সাংবাদিক থমাস ফ্রিডম্যান। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, “প্রেসিডেন্টের উচিত ছিল ন্যান্সিকে তাইওয়ান না যেতে পরামর্শ দেয়াঃ।’ অর্থাৎ এর মানে হল, প্রেসিডেন্ট না যেতে নির্দেশ দিতেই যদি পারেন, অন্তত পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের আছে ও ছিল যা প্রেসিডেন্ট ব্যবহার করেননি তাই জানা যাচ্ছে এখান থেকে [But the president did not call her directly and ask her not to go, apparently worried he would look soft on China, …]।

    তার চেয়ে বড় কথা, এ কেমন ‘সংসদীয় স্বাধীনতা’ যে, বাইডেন তিনি একজন সর্বময় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট; আর তাঁরই পররাষ্ট্র নীতি উল্টে দিতে বা হাত ঢুকিয়ে দিতে পারেন কংগ্রেসের স্পীকার??? এটা অ্যাবসার্ড। এক খামোখা বকোয়াজের নীতি অবশ্যই – যদি তা সত্যি হয়ে থাকে। কাজেই এমনটা হওয়ার কথা না। আমেরিকা রাষ্ট্র এত অসংলগ্নভাবে পরিগঠিত হয়নি। আবার পেলোসির এই সফর – এই আচরণের বিরুদ্ধে চীনের প্রতিক্রিয়া দেখেন – এখানে চীন কোনো ভিন্নতা দেখায় নাই যে এটা বাইডেনের এক্ট না!! এটা স্পীকার পেলোসির এক্ট তাই ভিন্নভাবে দেখতে হবে এমন না। থাকার কথাও না। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আর স্পিকারের আচরণ- আমেরিকা এ দুই আচরণকে চীন ভিন্নভাবে দেখেনি, দেখবে না। চীনের কাছে দুটোই একই আমেরিকান প্রশাসনের উসকানি এবং চীনবিরোধী হস্তক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।

    আসলে লক্ষ্য করলে দেখব, ‘স্বাধীনতা’ এই শব্দের সাথে সাথে সব ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার ‘দায়দায়িত্ব’ এই কথাটাও চলে আসে। যার সারার্থ হল, স্বাধীনতা ভোগ করতে চাইলে দায়িত্ববান হতে হবে, দায় নিতে জানতে হবে। তাহলে কথিত স্বাধীন পেলোসির সফরের কারণে যদি বিশ্বযুদ্ধ লেগে যায় তবে এর দায় কার হবে – স্পিকারের নাকি প্রেসিডেন্টের? আবার স্পিকার কি যুদ্ধ পরিচালনার নির্দেশ দিতে ক্ষমতা রাখেন না? সেটা এককভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের একক এখতিয়ার; নয় কী? কাজেই ‘স্পিকারের স্বাধীনতা’ নামক হাস্যকর কথা বলা – এটা আসলে মাথা খারাপ লোকেদের তত্ত্ব!

    স্পিকার ন্যান্সির তাইওয়ান সফর গুটানোর পরেঃ
    স্পিকার ন্যান্সি এখন সফর গুটিয়েছেন, তিনি তাইওয়ান ছেড়ে পরে জাপান সফরও শেষ করে এখন দেশের পথে; ৪ আগস্ট সকালে তিনি তাইওয়ান ছেড়েছিলেন। আর এরপর থেকেই তাইওয়ানকে ঘিরে ধরে চীন লাইভ এমুনেশনে (সক্রিয় গোলাবারুদ) সামরিক মহড়া শুরু করেছে, যদিও এটা এখনও ঠিক যুদ্ধ শুরু না। তবে তাইওয়ান তাতে আত্মরক্ষামূলক প্যাসিভ বা নিস্ক্রিয় মুডে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। আর না গেলে চীনের এই আগ্রাসী অবস্থানের কারণে গোলা খেতে হত, না হলে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে হত।
    তবে বড় লক্ষ্যণীয় ঘটনা হল, ন্যান্সি এখন সফর গুটিয়ে নেওয়ার পর থেকে এনিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার সুরও বদলাতে থাকে। যেমন ইকোনমিস্টের শিরোনাম হয়ে যায়, “পেলোসি তাইওয়ান ছেড়েছেন, আসল সঙ্কট শুরু হবে এখন” [ Nancy Pelosi has left Taiwan. The real crisis may be just beginning]। আর বিবিসির শিরোনাম, “তাইওয়ানঃ ন্যান্সি পেলোসির সফর যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক চীন’ নীতিকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে“।

    আর বিবিসি ভিতরে লিখছে, ‘গত ২৫ বছরের মধ্যে ন্যান্সি পেলোসি হচ্ছেন তাইওয়ান সফরে যাওয়া সবচেয়ে উচ্চপদস্থ মার্কিন রাজনীতিক। চীন-মার্কিন সম্পর্ক এমনিতেই ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন সেটাকে ঠিক করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তখন ন্যান্সি পেলোসির এই সফর যেন তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক টেনে আরো নিচে নামাল”।

    তাহলে পেলোসি এমন সফর করতে গেলেন কেন? কী লাভ বা অর্জন হল এতে?

    বিবিসি আরো বলছে, “তাইওয়ান নিয়ে এই যে একটা ধোঁয়াটে অবস্থান, সেটা সবাই মেনে চলে এবং কেউ নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য একটা আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয় না। কারণ সেখানে ভঙ্গুর একটি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এটাকেই ‘মন্দের ভালো’ বলে মনে করে সবাই”।

    তাহলে এই ‘ধোঁয়াটে অবস্থান’ বা এই ‘মন্দের ভালো’টাকেই ভেঙে ফেলতে পেলোসি এমন মরিয়া সফরে গেলেন কেন? এর জবাব নেই!

    বিবিসি আবার বলছে, “কিন্তু তাইওয়ান নিয়ে এই যে, একটা পরস্পর-বিরোধী অস্পষ্ট অবস্থান, সেটার ওপর হঠাৎ যেন খুব কড়া আলো ফেলেছে মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির ওই দ্বীপে এক সফর। চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে সেটি তৈরি করেছে বড় ধরনের টানাপড়েন”।

    কিন্তু ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে সব বিবাদ মিটিয়েই তো “এক চীন নীতি” মেনে নিয়ে আমেরিকা সম্পর্ক শুরু করেছিল। তাহলে ক্রমান্বয়ে এই ‘সম্পর্কের টানাপড়েন’ আবার কেন? নতুন করে ‘অস্পষ্টতা’ তৈরি কেন?

    আসলে বিবিসির এই রিপোর্ট নিজেই সব (বাইডেনীয়) স্ববিরোধিতার দিকগুলো তুলে এনেছে। যেমন বিবিসি এতে আরো দুই এক্সপার্টের মন্তব্য নিয়ে এসেছে। এদের একজন হলেন সাবেক কূটনীতিক ড্যানি রাসেল। তিনি এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের একজন বিশ্লেষক। তিনি বলছেন, “বিশ্বে এখন আরো যেসব সঙ্কট মোকাবেলায় বড় দুই পরাশক্তির (চীন-আমেরিকার) মনোযোগ দেয়া দরকার, সেই চেষ্টায় আগে থেকেই ঘাটতি দেখা যাচ্ছিল, এখন সেটা যেন আরো বেশি পণ্ড হয়ে যাবে”।
    “যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় সবচেয়ে উপরের দিকে আছে রাশিয়ার প্রতি চীনের যে কূটনৈতিক সমর্থন, সেটা কিভাবে থামানো যায়। এরপর চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ তো আছেই। এরপর জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলা এবং উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র নিয়েও চীনের সহযোগিতা আশা করে যুক্তরাষ্ট্র।’ তার মানে সবকিছু একেবারে ভেস্তে দেওয়ার দিকেই বাইডেন হাঁটলেন”।

    আরেক এক্সপার্টের কথা বলেছে বিবিসি। তিনি জার্মান মার্শাল ফান্ডের একজন বিশেষজ্ঞ বনি গ্লেসার। তিনি এক মারাত্মক কথা বলেছেন এভাবে, তাইওয়ানের ইস্যুটি এখন ‘বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন’ সামনে নিয়ে এসেছে। বলছেন, আমার মনে হয় না প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এখন আর জো বাইডেনের কথায় আস্থা রাখতে পারবেন। বনি গ্লেসার আরো বলছেন, তাইওয়ানের ব্যাপারে এখন যে একটা ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ আছে, তার পরিবর্তে এখন আসলে সবার উচিত যার যার ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা কোথায়, সেটা পরিষ্কার করে বলে দেয়া। আর এজন্য দরকার একটি অকপট আলোচনা।

    আসলে সমস্যাটা এখানেই। কারণ এখন সবকিছুকেই বাইডেন ‘কপট’ বানিয়ে ফেলেছেন।

    আসুন, বাইডেনের কপট অবস্থানের কিছু আলামত দেখি!
    ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দু’বছর হয়নি, কিন্তু এপর্যন্ত বারবার তাইওয়ান প্রসঙ্গে বাইডেনকে মাফ চেয়ে বলতে হয়েছে যে, আমেরিকান পুরান তাইওয়ান নীতি বা এক চীন নীতিতে আমেরিকা এখনো অনড় আছে – এটা কয়েকবার বাইডেনকে বলতে হয়েছে।কারণ, বারবার তিনি এই প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গেছেন। এরই সর্বশেষটা হল, গত ২৪ মে ২০২২। বাইডেন ঐদিন টোকিওতে কোয়াড মিটিং করতে গিয়ে একদিন আগে তারই করা মন্তব্যের জন্য মাফ চান। যেমন আমেরিকান মিডিয়া সিএনবিসি’র এনিয়ে করা নিউজের হেড লাইন হল, ‘বাইডেন বলেন, তার তাইওয়ান নিয়ে মন্তব্য থেকে আমেরিকান পলিসিতে কোনো পরিবর্তন হয়েছে মনে করা ঠিক হবে না, যা চীনকে বিরক্ত করেছে”। কেন বাইডেন সেবারও সমস্যায় পড়েছিলেন? কারণ তিনি আগের দিন বলে ফেলেছিলেন যে ‘তার প্রশাসন সামরিকভাবে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে আগ্রহী” [Biden says U.S. willing to use force to defend Taiwan — prompting backlash from China]। তাই পরদিনই তার ‘থুক্কু’ বলা! এভাবে নিয়মিতই তিনি মাফ চেয়ে যাচ্ছেন। মানে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন অথচ মুখে লাগাম নাই!!!

    এ ঘটনার পরে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী জ্যাক সুলিভানও আবারও মাফ চাওয়ার মত বলতে হয় যে, আমেরিকা এখনো ‘একচীন নীতিই’ আঁকড়ে আছে; কোনো বদল হয়নি। বাইডেন গত ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকে এভাবে অন্তত চারবার মাফ চেয়ে বা “ভুল না বুঝতে অনুরোধ করে” বলে চলেছেন যে, আমরা ‘একচীন নীতিতেই আছি’। এক কথায় ব্যাপারটা বাইডেন একেবারে ছেঁচড়ামোর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাই পেলোসির সফরের পরে জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশেষজ্ঞ বনি গ্লেসার এমন মন্তব্য করছেন যে, ‘তিনি মনে করেন না আর বাইডেন চীনের বিশ্বাসযোগ্যতায় থাকতে পারবেন”।
    বাইডেনের ধামাধরা জি৭ গ্রুপ বিভক্তঃ
    এই প্রসঙ্গে আমেরিকান ফক্স নিউজের শিরোনাম হল “Democratic foreign policy experts divided on Pelosi’s trip to Taiwan: ‘good for her,’ ‘not a good idea”। অর্থাৎ পেলোসির সফরকে নিয়ে জি৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা – “সবার নয় পেলোসির জন্য ভাল” আর ওদিকে “এটা ভাল আইডিয়া না” এদুই ব্লকে বিভক্ত। তবে এই জি৭ দেশ মানে এককালের বড় অর্থনীতির দেশ বলে গুরুত্ব পেত যারা যেমন আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, জর্মানি, ইটালি, যুক্তরাজ্য জাপান। ২০০৯ সালের পর থেকে এই গুরুত্ব হারিয়েছে; নয়া গ্রুপ জি২০ এর কাছে। যাই হোক এদেরকে এখানে যদিও এক ফলস মুকুট লাগিয়ে বলা হচ্ছে কথিত ডেমোক্রেসিস মানে “ডেমোক্রেসি” আছে এমন দেশগুলো এই ফুটানির চিহ্ন টাঙ্গিয়ে বলা হচ্ছে; মূলত চীন বা রাশিয়াকে নিচা দেখানোর জন্য।
    আবার ইইউ এর মিডিয়া বলতে পলিটিকো নামের আরেক মিডিয়া গতমাসে লিখেছিল বাইডেন নাকি বলেছিলেন, আমের মিলিটারি মনে ক।..।..।।।।।

    কেন বারবারন অবশ্য পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, বাইডেন গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচতায় আগ্রহ দেখানোর আগে থেকেই যে হবু পলিসির কথা ভেবেছিলেন সেখানেই এটা ছিল যে – ‘তিনি চীনবিরোধী একটা ‘পশ্চিমা ব্লক’ বা ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ জমায়েত করবেন; ইইউকে সাথে নিয়ে; যার মূল ইচ্ছা-করণীয় হবে চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে চলে আসা ঠেকানো; যদিও এটা একটা অসম্ভব কল্পনা মাত্র। কারণ এটা প্রাকৃতিক ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়কে যেমন মানুষ ঠেকাতে পারে না তেমনই ফেনোমেনা। কারণ, সাবজেক্ট-মানুষের পক্ষে কোন প্রাকৃতিক (অবজেকটিভ) ফেনোমেনাকে ঠেকানো অসম্ভব।

    তবু সম্ভবত বাইডেন মনে করেন এটা জিদ ধরে বসে থাকলেই হয়ে যাবে। কেননা তিনি ইউরোপ বা ইইউকেও সাদা শ্রেষ্ঠত্বের সুড়সুড়ি জাগাতে পারবেন যে, চীনের গ্লোবাল নেতৃত্ব মানে গত ৫-৬ শ’ বছরের লাগাতারভাবে সাদাবাদীদের শ্রেষ্ঠত্ব যেটা চলে এসেছে; এই শাসন যাতে না লোপ পেয়ে যায়, এই ভয় দেখিয়ে তিনি ইউরোপকে সাথে রাখতে পারবেনই। এরই প্রথম ধাপ হল ইউক্রেনের যুদ্ধ লাগানো যেখানে তিনি রাশিয়াকে “বধ” করার খায়েস নিয়ে আগাচ্ছেন। এতে আরো কল্পনা ছিল যে, রাশিয়াকে উদ্ধার করতে পরে চীন এগিয়ে এলে সেও এতে জড়িয়ে যাবে এবং তা চীন সামরিকসহ সবভাবেই। কিন্তু এই শেষের অংশটা ঘটেনি। অর্থাৎ বাস্তবে চীন রাশিয়ার পাশে গেছে, থেকেছে ঠিকই কিন্তু সরাসরি কখনো সামরিকভাবে যায় নাই।

     

    তাই এবার বাইডেনের সেকেন্ড উদ্যোগ হল, তাইওয়ান ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে চীনকেও উসকানো। যাতে সে সামরিকভাবে জড়ায়। কিন্তু সমস্যা হল, আমেরিকার এক চীন নীতিতে সম্মতি দেয়া আছে, চীন-আমেরিকার সম্পর্কের সেই শুরু থেকে, ১৯৭৮ সালের আগে থেকে। আর সে অবস্থান থেকে এখন বাইডেনের হাত-ধরে আমেরিকার সরে যাওয়ার মানে হবে, চীনের সাথে আমেরিকার যতসব ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে সব ভেঙে যাওয়া, ইতি টানা। সেটা আমেরিকান ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা সবাই মানে, বলতে একেবারে ওয়াল স্ট্রিট সংশ্লিষ্ট সবাই – এদের পক্ষে তা গ্রহণ করা অসম্ভব। কিন্তু এটা ছাড়া বাইডেনের হাতে আর কোন মোক্ষম অস্ত্র নেই। তাই লজ্জার মাথা খেয়ে বাইডেন বারবার একচীন নীতি ভাঙছেন আবার মাফ চাচ্ছেন।

    এছাড়া এসবের সাথে বাইডেনের হাতে আরেক সাফাই বয়ান ঞ্জোগাড় করেছেন। সেটা হল, বাইডেন অ্যান্ড গং তার ভাষায় ওয়েস্টার্ন ফোর্স বা পশ্চিমা ব্লক এদের ‘মূল্যবোধ’ [VALUES] নাকি আলাদা, আর তা নাকি অনেক উন্নত। তুলনায় চীন, এরা যেন “ছোটলোক”!!! আর এর ইঙ্গিতেই প্রায় সব জায়গায় বাইডেনের সঙ্গী-সাগরেদরা বলে থাকেন – তারা হলেন ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের’ [“rules–based international order,”] পক্ষের লোক। মানে হল , ১৯৪৫ সালে গঠিত যে ‘জাতিসঙ্ঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক’ ইত্যাদি, এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে “গ্লোবাল ব্যবস্থা”; মানে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার গড়ে উঠেছিল সেটা আমেরিকার নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছিল। তাই তারা শ্রেষ্ঠ। আর এখন আগামীতে চীনের নেতৃত্বে যা কিছু গড়ে উঠবে এটা নিচা মুল্যবোধেরই হবে কারণ, এরা নিচা জাত। ফলে এখন এটা বাইডেন গংয়ের কাছে মূল্যবোধের লড়াই – এই বুলিতে খই ফুটতে শুরু করেছে। তবে এটাই কিন্তু “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব” – এই রেসিজমের সাফাই বয়ান। আর এর ওপর ভর করেই বাইডেন জিততে চান!!!

    কিন্তু যদি প্রশ্ন করি, আইএমএফকে পাশ কাটিয়ে খেয়াল খুশিমতো যাকে ইচ্ছা তাকে ডলার-অবরোধে ফেলে দেয়া; বাইডেন সাবের এটা কোন ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের’ কাণ্ড? রুলের কথা যদি তোলে, তবে আমেরিকাকে মানতে হবে যে, আইএমএফ-ই এক সঠিক অথরিটি যারা ডলার-অবরোধ কাউকে দিতে হলে তা নির্ধারণের বৈধ কর্তা। আইএমএফের বদলে এটা আমেরিকার খেয়ালে ইচ্ছামত আরোপ মানে হল, এটা আমেরিকার ক্ষমতার অপব্যবহার।

    ঘটনা আরো বড় দিকও আছে। যেমন, আবার ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মাঝের মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে চীনের আমদানি-রফতানি-বন্দর আটকাতে যেতে হবে – কারণ এটাই চীনে নৌপথে বন্দরে পৌছানোর একমাত্র উপায়। অথচ আমেরিকা এই পথ বন্ধ করাই তার সামরিক স্ট্র্যাটেজিক কৌশলের চিন্তা। আমেরিকার সিনেট রিপোর্টে যেটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে – এমন এক আমেরিকান পদক্ষেপ এটা। এখন এই পদক্ষেপ কোন মহান “রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের” নমুনা? আপনি আরেকটা দেশে নৌপথে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করার পরিকল্পনা আটবেন – এটা কোন নিয়ম শৃঙ্খলার নমুনা, কোন মুল্যবোধের নমুনা বাইডেন সাহেব?

    আর আমেরিকা এই মহান কাজে নেমে গিয়েছে বলে এতে স্বভাবতই, চীন নিজের জন্য বিকল্প পথ ও পোর্টে প্রবেশপথ খুঁজবে, নয়া কিছু গড়ে নিয়ে চেষ্টাও করবেই। এরই বাস্তব রূপ হল , গোয়াদর, হাম্বানটোটা, বার্মা, বাংলাদেশ ইত্যাদিতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে সেখান থেকে চীনের পশ্চিম দিক দিয়ে চীনে প্রবেশের রাস্তা, গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ খুলতে চেষ্টা করবেই। সেটাই চীন করছে। সবচেয়ে বড় কথা চীন যে বিকল্প পথ গড়তে আগাচ্ছে এটা একেবারেই অসামরিক; মানে বাণিজ্যিকভাবে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে।
    ভৌগলিকভাবে দেখলে চীন সাড়ে তিন দিক দিয়ে ভূমিতে বা সুউচ্চ হিমালয়ের মত পর্বতমালায় আবদ্ধ এমন এক ভূখণ্ড। সেখানে ওর পুবদিকের একমাত্র বন্দরের প্রবেশপথ আমেরিকা বাধা দিয়ে বন্ধ করতে গেলে চীন তো বিকল্প বের করতে চাইবেই। অথচ এই চেষ্টা করলেই এবার প্রপাগান্ডা শুরু করা হয়েছে – চীন এসব বন্দর গড়ছে নাকি ভারতকে মুক্তমালার মতো চার দিক থেকে ঘিরে ধরার জন্য। ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা খুলে এবার তাদেরকে দিয়ে আমেরিকা-ভারত এই প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে বা গিয়েছে।

    আবার ঠিক একই কারণে চীন, পূর্ব চীন সাগরে কোনো নিয়ম মেনে চলার পক্ষে নয় বরং তা না করে এতে নিজের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টার দিকে আমেরিকা তাকে ঠেলে দিয়েছে যেন। কিন্তু এবার বলা হচ্ছে চীন এখানে ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’ মানে না। জাতিসঙ্ঘের আনক্লজে (UNCLOS) ফিলিপাইনের সাথে বিরোধ মীমাংসায়, সে চীনের বিরুদ্ধে বাদী। ঐ সালিসীতে এক বিচারক বদলে দেওয়ার চীনা অনুরোধ উপেক্ষা করে এক জাপানি বিচারককে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
    অথচ আনক্লজ – এটি তো কাউকে ঠিক শাস্তি দেয়ার কোনো আদালত নয়, (আদালত বললে আমাদের মাথায় যে কমন জিনিষটা ভাসে এটা তা নয়)। এটা আর্বিটেশন [arbitration ]. অর্থাৎ এটা বরং আর্বিট্রেশন মানে সালিশ আদালত ধরনের। মানে যেখানে আপসে সমাধান বের করা হয়; কাউকে সাজা-শাস্তি দেওয়া যেখানে উদ্দেশ্যই নয়। তাই এখানে বাদী-বিবাদী যেকোন পক্ষ থেকে বিচারক বদলে দেয়ার অনুরোধ করা যায়। অথচ সেই নীতি এখানে কাজ করতে দেয়া হয়নি। ফলে প্রতিবাদে চীন আর ওই আদালতে অংশ নেয়নি। ঐ সালিশের রায়ও বাস্তবে মানে নাই। অথচ প্রপাগান্ডা হল , চীন তাদের কথিত ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’ মানে না।
    আর বিপরীতে তাদের দাবি মহান আমেরিকা নাকি অবাধে সমুদ্রে ঘুরেফিরে বেড়ানোর মুক্ত স্বাধীনতা চায়! আর চীন সেটা দিতে চায় না। এই হলো মুক্ত দুনিয়ার মানুষের কারবার!

    আসলে, আমেরিকা কত মুক্ত দুনিয়ার মানুষ তা কী আমরা আমাদের ‘ওয়ান-ইলেভেন’ এর সময় বাস্তবে দেখিনি? ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেয়ার মুক্ত দুনিয়ার বাসিন্দা আমেরিকার কায়কারবার কি আমরা দেখিনি? এটাইবা কোন ‘রুল বেইজড ইন্টারন্যাশনাল অর্ডারের’ অধীনে করা হয়েছিল? কে দেবে এর জবাব? হাসিনা বা আমেরিকা কেউ কি দেবে? আজ উল্টা হাসিনা আমেরিকার থাবায় আটকে পড়ে কান্নাকাটি করছে। কিন্তু পাবলিকের মুড হল যেন কাটা দিয়ে কাটা তোলার মত!! মনে হচ্ছে, আমেরিকার হাতে হাসিনা সরকার উতখাত হলেও পাবলিক সিমপ্যাথি সরকারের পক্ষে যাবে না। কারণ, হাসিনা এতদিন জনমত নিজের পক্ষে রাখার দায় অনুভব করে নাই, উপেক্ষা করে এসেছে।

    এখানে একটা কথা আগাম স্পষ্ট রাখা দরকারঃ
    এখানে বাইডেনের আমেরিকার নীতি-পলিসির স্ববিরোধ বা তাদের মুরোদ চলে গেলেও গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব ধরে রাখার মিথ্যা চেষ্টার বিরুদ্ধে কথা তুলেছি। কিন্তু এর মানে এই না চীন এসব ইস্যুতে ফিট বা যোগ্য। কথা পরিস্কার করে বলে রাখতে চাই চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হতে ফিট বা যোগ্য অবশ্যই। কিন্তু গ্লোবাল পলিটিক্যাল নেতা হতে নয়। তার আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র ধারণা ও কাঠামো যাই থাক গ্লোবাল অর্থে চীনকে প্রথমত হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স হতেই হবে। চ্যান্সেলার এঞ্জেলার মার্কেলের আমলে যে ভাব-বিনিময় ইইউ-চীন সামিট থেকে শুরু হয়েছিল তাকে পুর্ণতায় নিতেই হবে। যা সম্ভবত এখন বন্ধ হয়ে আছে। রাষ্ট্র আপন নাগরিককে গুম-খুন করতে পারে এটা চলতেই পারে না। এনিয়ে অবশ্যই সর্বসম্মতির গ্লোবাল স্টার্ন্ডার্ড থাকতে হবে। রাজনৈতিক-রাষ্ট্র ইস্যুতে চীনকে আপডেটেড হতে হবে। এটা নিজ সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন না। সার্বভৌমত্ব ধরে রাখা এই কথার আড়ালে নিজ দেশে নাগরিককে গুম-খুন জায়েজ করা যাবে না। তা থাকলে চীনের গ্লোবাল পলিটিক্যাল নেতা বা স্টান্ডার্ড ঠিক করার নেতা হবার কোন সুযোগ নাই।
    কারণ, এতে আবার সবচেয়ে বড় বিপদ যে যে দেশ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা সে আবার পলিটিক্যাল নেতা নয়; অন্য কোন রাষ্ট্রের প্রভাব বা নেতৃত্ব এখানে শীর্ষে – সেটা হলে তা খুবই এবসার্ড ধারণা তৈরি হবে। চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো “রুজভেল্ট স্টাডিতে” খামতি আছে তা মনে হয় নাই। অন্তত অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলোতে। কিন্তু রুজভেল্টের রাজনৈতিক ভুমিকার দিকও আমল করতে হবে, তাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। আর এটা না হল, চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বও ধরে রাখা কঠিন হবে!

    তাহলে কী বাইডেন তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধে জড়াতে চায়?
    একেবারেই না। বরং বারবার চীনের সাথে যে আরেক খাতা খুলেছে। সেটা এই বলে যে আসেন আমরা একটা চুক্তি-বুঝাবুঝি করে নেই যে আমাদের মধ্যে যত বিরোধই থাক সেই বিরোধ যেন যুদ্ধে রুপান্তরিত না হয় তাতে আমরা এক সাথে কাজ করব এই অঙ্গিকার করি। বিস্ময়কর মনে হলেও বাইডেন এতাই করেছে গত বছর। এতাই গার্ড্রেল চুক্তি [GUARDRAIL]. যেমন সরকারি হোয়াইট হাউজের নথি দেখেন, এখানে [we will also continue to engage with the PRC at a senior level to ensure responsible competition.] কিন্তু পেলোসির তাইওয়ান সফর কী “responsible competition” এর মত কাজ হয়েছে?? অর্থাৎ বাইডেন আসলে এক দিশা হারা ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। আর কী চেয়ে কী করছেন এর কোন তাল-মিল নাই???

    এজন্যই ক্রমশ বাইডেন মানুষের আস্থা হারাচ্ছেন। সকলেই ভীত যে এই মানুষটা কখন হতাশ হয়ে পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে না ঠেলে দেন। আর এখন করোনা-উত্তর দুনিয়াতে ইউক্রেন-যুদ্ধের ধকলে থাকার এসময়ে আবার নয়া তাইওয়ান যুদ্ধে দুনিয়া জড়িয়ে গেলে – যুদ্ধের গোলায় না, না খেয়ে মানুষ মরবে বেশি। ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদেরকে এজায়গায় নিয়ে ঠেকিয়েছে যে অর্থনৈতিক মন্দায় দুনিয়াতে এত নয়া নয়া চাপে এখন এক বিরাট সংখ্যক গণ-মানুষের খাদ্য কিনবার সামর্থই হারিয়ে গেছে। তাই আমরা সকলে আসলে সত্যি বা মিথ্যা মিথ্যা এক তাইওয়ান-যুদ্ধের মুখে আছি। যদি দায়ীত্ববান না হই, যে যুদ্ধের আগুনে আমরা সবাই পুড়ে মরে যেতে পারি!!!
    মনে রাখা দরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্ত হলে পরে, ইতালিতে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল; মানে আমেরিকার নেতৃত্বের মিত্রশক্তির বিরোধী ইতালির শাসক ফ্যাসিস্ট মুসোলিনীর দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। আর সেটা যুদ্ধে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট হতে দেন নাই, ঠেকিয়েছিলেন। দুহাতে সাহায্য দিয়েছিলেন; আর সারা ইউরোপকে পুনর্বাসনের অর্থ বরাদ্দ তো দিয়েছিলেনই!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা দৈনিক “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার ০৬ আগষ্ট ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে “বাইডেনের তাইওয়ান-আগুন সবাইকে পোড়াবে“ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    গৌতম দাস

    ০১ আগষ্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4bH

     

      Russia, Turkey and Iran have in recent years been holding talks as part of the so-called ‘Astana peace process’ to end more than 11 years of conflict in Syria [File: Reuters]

     

     

    ঠাণ্ডা পানিতে গোসল, মানে “নো হিটার” গোসল; কখন? যখন তাপমাত্রা শূন্যের দিকে ধাবমান বা মাইনাসে চলে গেছে। যেকোন কারও জন্য এটা অবশ্যই একটা বড় রকমের শাস্তি। অথচ তা শুরু হয়ে গেছে!

    সারা ইউরোপেই কমবেশি আগস্ট থেকেই তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির নিচে নামতে শুরু করে আর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে চরমে ওঠে, মানে এটা শূন্য বা মাইনাসে নেমে যায়। আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে যেন রাশিয়া এখন থেকেই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমানো শুরু করেছে। বিশেষ করে জার্মানির অবস্থা ভালো না।

    বিবিসি জার্মানির হ্যানোভার শহর নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে “কোল্ড শাওয়ার [Cold showers ]” শিরোনাম দিয়ে; মানে গোসলখানায় ঠাণ্ডা পানিতে গোসল নিয়ে। রিপোর্টের সারকথা, এখন থেকেই  রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহের অভাবে ইউরোপে জ্বালানি মিতব্যয়িতা শুরু হয়ে গেছে। হ্যানোভার সিটিতে সব পাবলিক গোসলখানায় পানির হিটার বন্ধ করা হয়েছে। রুম হিটার সীমিত করা হয়েছে। এমনকি হাতে করে বয়ে নিয়ে বেড়ানো এসি, হিটার বা রেডিয়েটর ধরণের সবকিছুই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূল কারণ,  ইউরোপে রাশিয়া তার গ্যাস সরবরাহ ইতোমধ্যেই অর্ধেক করে দিয়েছে। সামনে আরো কী করে কেউ জানে না। এদিকে ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইইউর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত রাশিয়ান গ্যাসের অভাবে তারা সবাই গ্যাসের ব্যবহার এবার শীত সিজনে কমপক্ষে ১৫% কম করবে। এসব থেকেই বিবিসির এ রিপোর্ট ‘কোল্ড শাওয়ার’। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপ কি এবার ‘কোল্ড শাওয়ারের’ শাস্তি সহ্য করতে সক্ষম হবে?

    না ব্যাপারটা এমন নয় যে, রাশিয়ার গ্যাস ছাড়া ইউরোপের কোনো বিকল্পই নেই; ঠিক তা নয়, কিন্তু অন্য যেকোনো বিকল্প জ্বালানি পাওয়ার জন্য কোনো চুক্তি করা দিয়ে শুরু করতে হবে। এরপর সবচেয়ে কষ্টকর অংশ হল, সেই জ্বালানি বয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নয়া বিনিয়োগ করে নয়া অবকাঠামো গড়ে সেই জ্বালানি এনে এবার তা ব্যবহার-উপযোগী করে ঘর গরম বা পানি গরমের জায়গায় নিতে সব মিলিয়ে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগাতে হবে। এটাই ইইউ এতদিন বহুভাবে বাইডেনকে বুঝাতে চেয়েছে, পারেনি। তাহলে আগামী ২০২৭ সালের আগে পর্যন্ত তারা চলবে কী করে? নাকি আগামী ডিসেম্বরের (২০২২) আগেই বাইডেনের হাত ছেড়ে ইইউ পুতিনের হার ধরে আপস করে ঘর গরম, পানি গরমের সুখ নিতে মরিয়া হয়ে উঠবে! সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায়!
    বিবিসির ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যটা হল, ‘ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহ যুদ্ধের আগে ছিল মোট চাহিদার অর্ধের বেশি একা রাশিয়ান গ্যাস এখন যা এক-চতুর্থাংশের কম’।

    “Russian gas supplies now account for about a quarter of the nation’s needs, compared with more than half before the war.”

    রাশিয়ার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠাঃ
    দুনিয়ায় অন্য দিকের সব ঘটনাবলিতে রাশিয়া যেন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। পুতিন বিদেশ সফরে বের হয়েছেন, তিনি ইরান সফরে গেছেন। রাশিয়ার ওপর ডলার-ইউরো-ইয়েন ইত্যাদিসহ আরো কয়েকটা মুদ্রার অবরোধে রাশিয়া যেন টুপ করে ভেঙে পড়বে! বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির [Western bloc] এই ছিল প্রবল বিশ্বাস ও আকাঙ্খা যাতে তারা দেখতে পাবে পুতিন সারেন্ডার করে মাফ চাচ্ছে! কিন্তু সরি, তা বাস্তবে ঘটেনি তা তো আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। উল্টো দুনিয়াজুড়ে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই শুধু নয়, এখন বিশ্বব্যাংকই দাবি করছে, গ্লোবাল বাণিজ্য-অর্থনীতিতে মহামন্দা আসন্ন, তা এলো বলে। সাথে নিয়ে আসছে খাদ্যাভাব দুর্যোগে এলেমেলো করে দেয়া মানুষের জীবনযাত্রায় প্রবল ধাক্কা! গ্লোবাল জিডিপি ২.১% এ নেমে যাবে এ বছর আর আগামী বছর ২০২৩ সালে যা আরো নেমে ১.৫% হয়ে যেতে পারে।

    “In a news conference, World Bank President David Malpass said global growth could fall to 2.1% in 2022 and 1.5% in 2023, driving per capita growth close to zero, if downside risks materialized.” – REUTERS

    বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস এক সংবাদ সম্মেলন করে সাবধান করছেন যে, “অনেক দেশই এই ধাক্কা এড়াতে পারবে না”।  তিনি এই সঙ্কটের নামকরণ করেছে ‘মন্দা-মুদ্রাস্ফীতি’ বা ‘স্টাগ-ফ্লেশন’ [stagflation]।

    এদিকে খোদ আমেরিকার প্রথম তিনমাস বা প্রথম কোয়ার্টারের জিডিপিতেই যেখানে টানাটানিতে তা ছিল মাত্র ১.৬%। সেটা দ্বিতীয় কোয়ার্টারে আরো কমে হয়েছে  ১% এরও নিচে, তা ০.৯%। গত পরশু মানে ২৮ জুলাই তা প্রকাশিত হয়েছে। যেটাকে আমেরিকা অর্থনৈতিক মহামন্দা আসা নিশ্চিত হবার লক্ষণ বলে আমেরিকান অর্থনীতি ও বাজার জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ধারণা বলে তা হাজির হয়েছে।

    Real gross domestic product (GDP) decreased at an annual rate of 0.9 percent in the second quarter of 2022, following a decrease of 1.6 percent in the first quarter. The smaller decrease in the second quarter primarily reflected an upturn in exports and a smaller decrease in federal government spending. – BEA.GOV

    কিন্তু তবু বাইডেন নির্বিকার। তিনি ইউক্রেনকে আরো ভারী অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ আর সেই সাথে, ইইউর উপর রাশিয়ান জ্বালানি নেওয়ার চেষ্টা না করতে চাপ দিয়েছেন। আপস না করতে চাপ দেয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনোভাবেই এরা যেন পুতিনের সাথে রফা না করে ফেলে তার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন।

    তাই, এসব চাপ যে, রাশিয়ার উপর কাজ করছে না তা দেখাতেই যেন রাশিয়া গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেকারণে, পুতিন পাল্টা পশ্চিমের অবরোধে যারা কষ্টভোগী তাদেরকে সাথে মিলে নয়া জোট করে উঠে দাঁড়ানো চেষ্টা করছেন – এমনই কিছু লক্ষ্যে পুতিন ইরান সফরে গিয়েছিলেন গত ১৯ জুলাই। আসলে ইরানে এটা ছিল এক ত্রিদেশীয় সামিট। কারণ, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানও একই সাথে একই দিনে ইরান সফরে আসাতে তিন সরকারপ্রধানের এক সামিট মিটিংও অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে। কিন্তু কী ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য বা মতিগতি বা আলোচ্যসূচিইবা কী কী ছিল- তা জানতে [তা বুঝতে বাংলাদেশে খুব সিরিয়াস ডেফিনেশন নয় বরং হালকাভাবে যাদের ‘ইসলামিস্ট আকাঙ্খা’ বলে বুঝা হয়, এমন] তরুণদের ভিতর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যেমন একজন লিখছে, “পুতিনের ইরান সফর এবং বাইডেন কেন সৌদিতে, এই দুটো বিষয় নিয়ে একটা লেখায় দেখতে চাই”।

    এমনিতে কোন “আকাঙ্খাই” দোষের নয়, কেবল যদি খেয়াল রাখা থাকে যে, তা কতটা কল্পনার রঙের বা ইউটোপিয়াতে দেখা হয়েছে আর কতটা তা বাস্তবসম্মত। যেমন মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সরকার একটা গ্লোবাল ইসলামিক স্বার্থের পক্ষে একত্রে  কাজ করবে – এই হল এমনই একটা আকাঙ্খা। এখন এই আকাঙ্খা তা কতটা বাস্তব আর কতটা কল্পনার রঙে দেখা হয়েছে তা কী দিয়ে মাপব? যেকোনো দেশের সরকারকে দেশের বৈষয়িক-অর্থনৈতিক স্বার্থ- এটাকেই সব বিবেচনার শীর্ষে রাখতেই হয়। এ দিকটাই ভারী থাকে; কারণ এগুলো মানুষের বেসিক চাহিদাসংশ্লিষ্ট। আর এর পরে এসে থাকে কোনো চিন্তা-আদর্শ অনুসরণ বা হেদায়েতের কথা।

    প্রথমত, ইরানে ওই তিন সরকার প্রধানের সফর ছিল অনেক উদ্দেশ্য বা ইস্যুতে। তবে প্রত্যেকটা ইস্যুই আবার তিন পক্ষের সবার জন্য নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ছিল দ্বিপক্ষীয়। যেমন তিনপক্ষীয় বড় বা একটাই প্রধান ইস্যু ছিল – সিরিয়া বা আসাদ সরকার প্রসঙ্গ বা বিবিসির ভাষায় “সিরিয়ায় সহিংসতা কমানোর” ইস্যু যেটাকে আরো একদম সুনির্দিষ্ট করে বললে, সিরিয়ান কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপ ওয়াইপিজিকে [YPG] নিয়ে দুটো ভিন্ন মত এই তিন রাষ্ট্রের কথা বলা। এরদোগান চান এদের সামরিকভাবে হামলায় দমন-উতখাত করতে। কিন্তু রাশিয়া-ইরান চায় আলোচনায় সমাধান।

    আসলে এরদোগানের জন্য যেকোনো কুর্দি ন্যাশনালিজমের বা কুর্দি-জাতিরাষ্ট্র চিন্তার দল তা সে ইরাকি কুর্দি কিংবা সিরিয়ান কুর্দি অথবা টার্কিশ কুর্দি যেই হোক, “এই রাজনীতি” তিনি ধ্বংস করে দিতে চান ফিজিক্যালি। কারণ সত্যি সত্যিই এই তিন দেশের কুর্দিদের নিয়ে একটা নতুন কুর্দি জাতিরাষ্ট্র করতে চাওয়া এর ব্যবহারিক মানে হল এই যে,  এটা ‘কুর্দি-জাতিরাষ্ট্রীয় রাজনীতি’। মানে এতে (ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক) এই তিনটি দেশই ভেঙে যাওয়া যা যদি ঘটে তবে এই তিন দেশের কোনো শাসক সরকারই নিজ নিজ দেশের বাকি মানুষের কাছে মুখ দেখানোর লায়েক থাকবে না। যার সোজা মানে তারা আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।

    এ ছাড়া তিন দেশের কুর্দিদের জন্য তাদের নিয়ে  -একটা নয়া জাতিরাষ্ট্রই একমাত্র বা সব সমাধান – এ কথাও তো সত্যি নয়। কারণ তাতে “প্রতিটা কুর্দির রাজনৈতিক অধিকারের প্রসঙ্গটা”  তা সে তারা এখনকার যে রাষ্ট্রেরই বাসিন্দা হোক না কেন এতে, জাতি ধারণার নিচে সব চাপা পড়ে আড়ালে চলে যাবে, যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। অর্থাৎ জাতি-ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইডেনটিটি নির্বিশেষে তারা সকলেই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক  – এভাবে আর দেখা হয় নাই। চাপা পড়ে গিয়েছে। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রে ধারণাটা প্রবল হওয়াতে এর নিচে সবার নাগরিক অধিকার এবং সমান অধিকারের “সাম্য” প্রসঙ্গটা চাপা পরে গিয়েছে। সবমিলিয়ে ফলাফল এই যে বাংলাদেশ বলে রাষ্ট্র কায়েম হয়েছে ঠিকই কিন্তু নাগরিক অধিকার প্রশ্নে বা নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রসঙ্গের দিক থেকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে খামোখা।
    তাই এক নয়া জাতিরাষ্ট্র কায়েম করার রাজনীতি এটা কোন সমাধানই নয়। বরং ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক এই প্রতিটা রাষ্ট্রকেই নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা আর জাতি নির্বিশেষে সেখানকার সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার ভেতরেই আছে সব সমাধান। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বার্নিং অবস্থায় আছেন এরদোগান। কারণ আমেরিকার অবস্থান কুর্দিদের পক্ষে। এটা এরদোগানের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কুর্দিদের অধিকার বা তাদের ভিকটিম হয়ে থাকার প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়া কারো জন্যই অবশ্যই কোন দোষের নয়।  কিন্তু এই সুযোগে তাদের তিনটি রাষ্ট্র ভেঙে এক নয়া কুর্দি জাতিরাষ্ট্র গড়তে সমর্থন দেয়া অপরাধ।

    আসলে রাশিয়া-ইরানকে এরদোগান বলছেন তোমাদের সাহায্য আমার লাগবে না। তুরস্ক একাই ওয়াইপিজিকে দমন করতে পারবে। তবে দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইরানের মতে সফট লাইনে এদের বুঝানো বা পিঠে হাত বুলিয়ে কাজ হবে বলে এরদোগান মনে করেন না। তাহলে এবারের ইরান-আলোচনায় ফলাফল কী হল? ফলাফল এই যে, তবুও তিনপক্ষই অন্তত একমত যে, কুর্দি ইস্যুতে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে।
    ওদিকে ওই আলোচনায় রাশিয়া-ইরানের স্বার্থ ছিল সিরিয়াকে এক স্থিতিশীল রাষ্ট্র আর এর সব ভূখণ্ডই আসাদের নিয়ন্ত্রণে আছে তা দেখাতে চাওয়া। এ ছাড়া সিরিয়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী বা ইসলামী গ্রুপগুলোর তৎপরতা লোপ পেয়ে যাক যাতে সব কিছুর ওপর আসাদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। তাই এই সুযোগে তুরস্ক প্রস্তাব রেখেছে যে, তুরস্ক-সিরিয়ান বর্ডারে, মাঝখানে একটা ৩০ কিলোমিটারের সেফ জোন বা নিরাপত্তা জোন তৈরি করা হোক। এটা তিনি চাইছেন মূলত যাতে দুই দেশের কুর্দিরা অবাধে যাতায়াত আদান-প্রদানে করে চলে ঘোট না পাকাতে পারে!

    যখন আলোচনার বিষয় ড্রোনঃ
    তেহরানে ড্রোন আলোচনার ইস্যু হলেও এটা ছিল কেবল দ্বিপক্ষীয়- মানে রাশিয়া আর ইরানের মধ্যে আলোচনার ইস্যু। এটা এরদোগানের জন্য আলোচনার ইস্যু নয়। কারণ তিনি আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উল্টো ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহকারী। মানে ইউক্রেনের হাতে যে টার্কিশ ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে তা হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ও উপরে। তবে ইউক্রেনের হাতে থাকা সব ড্রোনই টার্কিশ নয়। বড় অংশই বরং আমেরিকার সরবরাহ করা। আর ওদিকে রাশিয়ার সব ড্রোনই ইরান থেকে নেয়া নয়। রাশিয়ার নিজস্বও আছে। যা হোক, এই ইরানিয়ান ড্রোন রাশিয়াকে সরবরাহ নিয়েই রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বিপক্ষীয় আলাপ হয়েছে এবার।

    ইউক্রেনের শস্য রফতানি ইস্যুঃ
    এটাও আরেক দ্বিপক্ষীয় ইস্যু। তবে এবার তা রাশিয়া আর তুরস্কের মধ্যে। যদিও সেটাও আবার সরাসরি রাশিয়া আর তুরস্কের স্বার্থে নয়। কেন?  মূলত বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া এদের মধ্যে আপোষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে তুরস্ক, এমনকি কখনো এরদোগান নিজে উপস্থিত থেকেই তা ঘটিয়েছেন। তাই শস্য ইস্যু যেটা হল আসলে – যুদ্ধের কারণে, ইউক্রেন শস্য রফতানির বড় দেশ হওয়া সত্বেও এ পর্যন্ত ইউক্রেনের সব শস্য রফতানি বন্ধ করে রেখেছিল  নিজ সাইলো গুদামে, যা প্রায় ২২ মিলিয়ন টন। গ্লোবাল বাজারে খাদ্যশস্যের (গম) দাম আকাশচুম্বী হওয়ার অন্তত একটা কারণ এটাকেই মনে করা হয়। তাই জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল (António Guterres ) আর এরদোগান – এরা দু’জন নিজে উপস্থিত থেকে রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে শস্য রফতানিতে রাশিয়ান সহযোগিতা করবে – এমন এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল  [Ukraine, Russia sign grain export deal]। যদিও তা স্বাক্ষরের পরেই ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে এক বোমা পড়ায় রফতানি আশঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাই এরদোগান ইরান সফরের সময়ে এই সুযোগে পুতিনের সাথে কথা বলে রফতানি যেন ঠিকমত বাধাহীন চালু হতে পারে এর আশ্বাস নিয়েছেন পুতিনের কাছ থেকে।

    বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্যে সফরে ইসরাইলের সাথে তাঁর অসৎ ঘনিষ্ঠতাঃ
    গত ১৯৭৯ সালে খোমেনির ইরান বিপ্লবের সংঘটিত হবার পর থেকে আমেরিকা ইরানকে শুধু স্বীকৃতি দেয়নি তাই নয়, ইরানের বিরুদ্ধে নানান স্যাবোটাজ করে গেছে নিয়মিত। অথচ ইরান বিপ্লবের অপরাধ কী? অপরাধ হল এই যে, ১৯৫৩ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ারের অপরাধের বিরুদ্ধে উঠে দাড়িয়েছিল, বিপ্লব করেছিল। আইসেনহাওয়ার সিআইএ পাঠিয়েছিলেন; পপুলার ইরানি সরকারকে ফেলে দেওয়া, ইরানের সব তেলের খনি দখল আর এক পুতুল সরকার হিসেবে শাহ পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো ইত্যাদি যা যা অপরাধ ঘটিয়েছিলেন, এঘটনাগুলোর ২৬ বছর (১৯৫৩-৭৯) পরে এর পরিসমাপ্তি টানা এবং ইরানিদের নিজেদের জন্য নিজেদের দেশ ও সরকার কায়েম করা। এতাই ইরানের অপরাধ!!! এরপর থেকে আমেরিকার সাথে বিল্পবী বা খোমেনির ইরানের সাথে আমেরিকার কখনো ন্যূনতম সম্পর্ক বা স্বীকৃতি বিনিময় ঘটেনি। আমেরিকান ভুল নীতি-পলিসির কারণে  অন্যকিছু ঘটবার সুযোগও ছিল না। কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামা বিড়ালের গলায় এক ঘণ্টা বেঁধেছিলেন ২০১৫ সালে!

    যদিও এই ওবামাই আইএস-এর উত্থানে সহায়তাকারী, পরে আইএসকে দিয়ে গাদ্দাফিকে হত্যাকারী, এরাই বেনগাজীতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ সব আমেরিকান স্টাফের হত্যাকারী; শেষে সিরিয়ার আসাদেরও একই পরিণতি ঘটাতে সিরিয়াতে  গিয়েও তা ব্যর্থ-অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু সেই আইএস এরপর ইরাকে ফিরে গিয়ে নিজ নামে হাজির হয়ে গেলে, তাতে পাল্টা ইরাকের ক্ষমতা তাদের হাতে প্রায় দখলের উপক্রম হয়ে গেলে এবার ওবামা ভীষণ বিপদে পড়ে ধরা খেয়ে যান। কারণ, কথিত ওয়ার অন টেররে যেসব যুদ্ধক্ষেত্র বুশের আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল, ২০১৪ সালেই ওবামা সেসব স্থান থেকে আমেরিকান সৈন্য তুলে ফেলেছেন। ইরাকেরসহ মেজরিটি সংখ্যক [মোট দশ হাজার রেখে বাকি সব ফেরত] আমেরিকান সৈন্য দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কারণ একটাই, সমাপ্তিহীন অন্তহীন যুদ্ধের ব্যয় বইবার  সক্ষমতায় আমেরিকা-রাষ্ট্রের অপারগতা, অযোগ্যতা!!

    অথচ পরের বছরই ইরাকে আইএস হাজির হয়ে গেলে তাদের তাড়াতে গেলে তো আবার প্রয়োজনীয় সৈন্য আমেরিকা থেকে ফেরত আনতে হয়, যা বিরাট খরচের দায়ভার!!কিন্তু আমেরিকার ব্যয়-নির্বাহের মুরোদ নাই। অতএব উপায় না দেখে ওবামা এই প্রথম ইরানের সাথে আপসের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইরাক থেকে ইরান নিজ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আইএস মুক্ত করে দিবে। আর এতে বিনিময়ে আমেরিকা ইরানের উপর নিজের আগে থেকে দেয়া সব স্যাংশন প্রত্যাহার করে নিবে। আর ওদিকে কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা থাকবে যদিও তা দিয়ে অস্ত্র তৈরি না করে আইনি মাত্রায় আটকে রাখবে আর তা জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে নিরীক্ষিত হবে – এই শর্তে এক চুক্তি হয়েছিল। ইরানের সাথে ২০১৫ সাল থেকে যা কার্যকর চুক্তি তার নাম ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ [Joint Comprehensive Plan of Action, JCPOA] ; যাকে অনেকে ইরানের সাথে পি৫+১ চুক্তিও বলে থাকে। কারণ এটা ছিল জাতিসঙ্ঘসহ তার নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও সাথে জার্মানিকেও নিয়ে করা। তাই (পি৫+১) বলা।

    কিন্তু পরবর্তিতে  ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সব উল্টে দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালেও ‘ইরান যথাযথভাবে চুক্তি মেনে চলছে’ বলে ট্রাম্প প্রশাসন রিপোর্ট দেয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সালের ৮ মে এই চুক্তি থেকে “আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে ট্রাম্প ঘোষণা দেন এবং পুরানা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। মূলত ইসরাইলকে ফেভার বা খুশি করতেই তিনি এসব করেছিলেন।

    যদিও সে সময়ে ডেমোক্র্যাটরা এমনকি ইইউও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ও সমালোচনা করেছিল। অথচ এখন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন সেই ট্রাম্পের পথ ধরেছেন। তিনি উসিলা খুঁজছেন কিভাবে পুরানা (JCPOA) বা ‘ইরান ডিল’ চুক্তি ফিরে তাকে না করতে হয়। সম্প্রতি সিনেটে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান মিলে আরো শর্ত চাপিয়ে একটা বিল পাস করিয়েছে যাতে সহজেই নয়া কোনো “ইরান ডিল” স্বাক্ষরিত না হয়। এটা ছিল এক রিপাবলিকান প্রস্তাব অথচ বাইডেনের দল তাতে সমর্থন দিয়েছে। এ ছাড়া বিশেষত এবার জুলাইয়ে বাইডেনের ইসরাইল সফর ও ঘনিষ্ঠতা এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

    এসব মিলিয়ে পুতিনের ইরান সফর নিয়ে করা বিবিসির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, “উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের মাখামাখি যেভাবে বাড়ছে এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে জোট বাঁধছে, সেটা ইরানকে উদ্বিগ্ন করছে। তাদের আশঙ্কা, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের বিপক্ষে নিয়ে যেতে পারে। কাজেই ইরান চেষ্টা করছে, রাশিয়ার সহায়তায় পাল্টা কিছু করা যায় কিনা”।

    এখন একটি সাম-আপ যদি করি তাহলে দেখব, প্রতিটা রাষ্ট্রই বিভিন্ন ইস্যুতে এনগেজ হয়ে থাকলেও; একটা রাষ্ট্র অন্য আরেক রাষ্ট্রের থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে বসে আছে। এগুলোকে একই জায়গায় আনা খুবই কঠিন, কখনো প্রায় অসম্ভব। এর ভেতর আবার দুটো মুসলমান প্রধান দেশ হলেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের স্বার্থ-অবস্থানে বিরাট ভিন্নতা দেখা যাবেই। এটাই স্বাভাবিক। যেমন এখানে ইরান ও তুরস্ক উপরে যে দুটো ইস্যুতে আলাপ করেছি, দেখা যাচ্ছে তারা একই অবস্থান নিতে পারছে না। আসলে কার্যত দেশ দুটো হলেই আর তাদের এক অবস্থান নেয়াটাও সহজ কাজ নয়। এই বাস্তব দিকটা মনে রেখে আমাদের চলতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৩০ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “পুতিন, এরদোগানের ইরান সফর“ এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

     

  • ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি কী এই শীতের আগে-পরেই!

    ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি কী এই শীতের আগে-পরেই!  

    গৌতম দাস

    ২৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4ba

     

    How Will the Ukraine War End? 10 Experts Weigh In

    ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আর বাইডেনের অপ্রয়োজনীয় বাহাদুরি দেখানোর নীতি-পলিসির পতন – এসব ব্যর্থতা কি আসন্ন? অবস্থা যেন ক্রমেই সেই অভিমুখেই হাঁটছে! ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি স্টেজে নাটক করতে করতে স্বপ্ন-কল্পনা দেখিয়ে তাদের পপুলার ভোটে ক্ষমতায় এসে পড়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে এখনও নাটক করছেন। ভেবে নিয়েছেন মানুষের জীবন রক্ত-মাংসের বাস্তব মানুষের নয়। এদিকে সাতাশ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ),  তাদেরকেও সাদা এথনিক-জাতের দুনিয়া শাসনের “শ্রেষ্ঠত্ববাদ” পেয়ে বসেছে। জেলেনেস্কি আর ইইউ-কে বাস্তবতা ফেলে চটকদার স্বপ্ন-কল্পনা দেখানোর নায়ক যাদুগর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সকলেই এক ব্রেকডাইন পয়েন্টের দিকে চলেছেন যেটা সম্ভবত চলতি বছরের শেষভাগে!!   গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল আসন্ন, কঠিন ভাবেই আসন্ন!! বাইডেনের “ওয়েস্টার্ণ ফোর্স” তা স্বীকার করুক আর নাই করুক কিছু যায় আসে না! বাস্তবতা অস্বীকার করে কেউ টিকে নাই। আপনার-আমার পছন্দ-অপছন্দের উর্ধে থাকে যেটা সেটাই বাস্তবতা!

        Biden’s Dangerous New Ukraine Endgame: No Endgame   – Foreign Policy

    ওয়্যার অন টেরর কুখ্যাত বুশের সাগরেদ টনি ব্লেয়ার সবার আগেই ভেঙ্গে পড়েছেনঃ
    ইউক্রেন যুদ্ধকে, ইইউ-এর নেতারা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এটা শুরু হওয়ার পর থেকে একে “রাশিয়ান আগ্রাসনের যুদ্ধ” বলে আসছেন। কিন্তু টনি ব্লেয়ারের কথা আমরা নিশ্চয় ভুলে যাইনি। এককালে যার প্রধান পরিচয় হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-৮) জুনিয়র বুশের কুখ্যাত ওয়্যার অন টেররের কালে ইনি তার ঘনিষ্ঠতম সাগরেদ; সহযোগী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৭-২০০৭) ছিলেন এই টনি ব্লেয়ার। তারা যৌথভাবে ইরাকে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে মিথ্যা অস্ত্র মজুদের কথা বলে “রেজিম চেঞ্জ” তত্ত্বে ইরাকে হামলা ও দখল করেন; পরে সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করেন ও ফাঁসিতে ঝোলান।

    “After Ukraine, What Lessons Now for Western Leadership?” –  Tony Blair

    পশ্চিমা আধিপত্যের দিন শেষ হওয়ার পথেঃ
    সম্প্রতি সেই টনি ব্লেয়ার এবার আবার রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। তাঁর এক নয়া বক্তৃতামালার  “‘ইউক্রেনের পরে, পশ্চিমা নেতৃত্বের জন্য কী শিক্ষা হলো?’ [“After Ukraine, What Lessons Now for Western Leadership?” ]; এই শিরোনামে ব্রিটেনে আহূত এক সভার বক্তৃতায় টনি ব্লেয়ার বলেছেন, “ইউক্রেন যুদ্ধ দেখাল দুনিয়ার ওপর পশ্চিমা আধিপত্যের দিন শেষ হওয়ার পথে যেহেতু দুনিয়াতে নয়া সুপার পাওয়ার হিসেবে চীনের উত্থান ও আসীন হওয়া ঘটছে; এই চীনের পার্টনার হলো রাশিয়া। তবে এই শতাব্দীর এটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মোড় পরিবর্তন” [ “The Ukraine war shows that the West’s dominance is coming to an end as China rises to superpower status in partnership with Russia at one of the most significant inflection points in centuries”, former British Prime Minister Tony Blair said.]।
    টনি ব্লেয়ারের বক্তৃতার ইউটিউব লিঙ্ক এখানে।

    তিনি যেন সব খোলাখুলি বলে ফেলতে চাইছেন, আর মিথ্যার টেনশন নিতে পারছেন না। তাই স্বীকার করে বলছেন, “দুনিয়ার ইতিহাস এক মোড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গেছে যা একমাত্র তুলনা করা সম্ভব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার সাথে। শুধু ফারাকটা এই যে, পশ্চিম আর এবার উপরে উঠছে না, বরং পরিষ্কারভাবেই পতিত, নিচে নামছে। পরিষ্কারভাবেই আমরা পশ্চিমারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পতনের প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছি” [The world, Blair said, was at a turning point in history comparable with the end of World War Two or the collapse of the Soviet Union: but this time the West is clearly not in the ascendant.]।

    সেই ২০১৪ সাল থেকে এই কথাগুলোই আমি এতদিন আমার লেখায় বলে আসছি। আর বলেছি, ‘এই মোড় পরিবর্তন ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান যেমন ঘটেছিল কেবল তার সাথেই তুলনীয়। তবে টনি ব্লেয়ার একে বাড়তি ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার সাথেও তুলনা টেনেছেন। এই তুলনা ভুল, সমতুল্য ঘটনা নয় বলে।  তাই এটা তিনি না তুললে তাঁর জ্ঞানবদ্ধি সম্পর্কে পাঠকের ধারণা ভাল থাকত। যাই হোক, আজ আমেরিকান নেতৃত্ব লাভের ৭৫ বছর পরের এঘটনা; এর সাথে পার্থক্য কেবল আমেরিকার জায়গায় এবারে চীনের উত্থান ঘটছে। সাথে এটাও বলেছিলাম, এসবের মূল কথাগুলো আমার কথা একেবারেই নয়। বরং আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে-স্টাডি রিপোর্টের ফাইন্ডিংস থেকে পাওয়া।

    লক্ষণীয়, এখানে আমি ‘চীনের ফাইন্ডিংস’ বলিনি। তবু আমেরিকান-প্রীতিতে থাকা লোকেরা এর অর্থ করেছিল যে, আমি  নিশ্চয় আমেরিকাকে দেখতে পারি না আর ওদিকে, কমিউনিস্ট বলে চীনকে পছন্দ করি, তাই আমি এসব বলেছি।

    তাই আমি আবার এও বলেছিলাম, কোনো রাষ্ট্রের এমন গ্লোবাল নেতৃত্বে অর্থনৈতিক উন্নতি; এটা একেবারেই অবজেকটিভ (objective) ঘটনা। মানে, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্প যেমন অবজেকটিভ ঘটনা, এগুলো কর্তা-মানুষের ইচ্ছায় ঘটে না।  যুদ্ধ লাগাব বা লড়ব বলে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন সাবজেকটিভ বা কর্তা মানুষের কাজের ঘটনা- এটা তেমন নয়। কোনো দেশের শাসককুল আগ্রহ করে যুদ্ধ লাগাতে পারে কিন্তু বাস্তব সুযোগ থাকাসহ অনেক কিছুই আলোচ্য ঘটনাবলিতে অবজেকটিভ বাস্তবতা হয়ে থেকে যায়। তাই সবকিছুই মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়া এটা কোন মানুষের ইচ্ছায় তার  সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার নয় বরং ‘বাস্তব করে দেখানোর’ ব্যাপার মানে কষ্ট করে বাস্তবে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হয়ে দেখানোর ব্যাপার।

    সে যাই হোক, আমরা দেখছি বুশের সহযোগী ব্লেয়ার, এখন আগেভাগেই সব স্বীকার করে নিলেন (তার পুরা বক্তৃতা এখানে)। বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন এখনও তাঁর জিদ আর সাদা শাসন চালিয়ে যাবার স্বপ্নে বিভোর আছেন! ওদিকে পরিচিত আর বড় নেতাদের মধ্যে যারা এর আগে ব্লেয়ারের মতই স্বীকার করে নিয়েছিলেন তিনি হলেন – জিমি কার্টারের আমলের আমেরিকান এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সেক্রেটারি অব স্টেট (১৯৭৭-৮১) ব্রেজনেস্কি (Zbigniew Brzezinski)। আমার জানা মতে তিনিও প্রথম এমন স্বীকারোক্তি করেছিলেন।  কারণ তাঁর জমানাতেই চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান ঘটেছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরের দেশে অফিস চালু হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ থেকে।   আগ্রহিরা দেখতে পারেন Surveying a Global Power Shift নামে তাঁর বইতে, নিউইয়র্ক টাইমস এর রিভিউ দেখা যাবে এখানে। 

    মনে হচ্ছে, টনি ব্লেয়ার এক্ষেত্রে সমসাময়িকদের চেয়ে এগিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন? তিনি ব্লেয়ারের উল্টা! জিদ ধরলেন; আর যদিও ইতিহাস বলে এগুলো একেবারেই জেদাজেদি বা প্রতিহিংসার বিষয়ই নয়। বাইডেনের ক্ষমতায় আসার আগের তাঁর বোকা ও অবাস্তব সাফাই-যুক্তি ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প (তাঁর চেয়েও) বোকা, গোঁয়ার ও আরেক জেদি, তাই ট্রাম্প নাকি  চীনসহ অন্যান্যদের শায়েস্তা করতে এখনো আমেরিকার হাতে কী কী অস্ত্র মজুদ আছে তাই-ই জানেন না। বিপরীতে, বাইডেন যেন তা জানেন। আর সেগুলো ব্যবহার করে বাইডেন দুনিয়াকে দেখিয়ে দিতে চান ও পারবেন যে, আমেরিকার দিন শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু আমেরিকার হাতের কী বিশেষ অস্ত্র যা তাকে এখনো গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন করে রাখবেই বলে তার নিজের অনুমান?

    বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে (যদিও মনে খায়েশ ছিল যদি রাশিয়াকে বাঁচাতে চেয়ে চীনও সাথে নেমে যায়) নামিয়ে এরপর আমাদের দেখালেন তার চোখে আমেরিকার সঞ্চয়ে থাকা বিশেষ অস্ত্রগুলো কী কী? তিনি খুলে দেখালেন ‘ডলার অবরোধ’ আর মানবাধিকার– এই দুটো আমেরিকার হাতের অস্ত্র বলে মনে করেন বাইডেন; যা আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর (অবশ্যই তা অপব্যবহার, তাহলেও) তিনি তা প্রয়োগ করে তাদের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাবু করে ফেলে, সারেন্ডার করতে বাধ্য করে জিতে যাবেন। মোটামুটি এই হল তার মূল তত্ব!!!

    এখানে ‘ডলার অবরোধ’ মানে হল, বাইডেন মনে করেন তিনি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ দেশকে মার্কিন ডলারে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে না দেয়া বা ওসব দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবেও ডলারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই বাইডেন সহজেই ধসিয়ে দিতে পারেন। যেহেতু ডলার গ্লোবাল বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও চালু মুদ্রা, তাই তিনিই সফল হবেন।’ এই ছিল বাইডেনের মূল অনুমান!

    অন্য দিকে, মানবাধিকার বলতে, বাইডেন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবেন। ভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ কারো জেনুইন  মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলতেই পারে। এর উপযুক্ত ফোরামও আছে, সেটা হল জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার অফিস। কিন্তু এখানে বাইডেন তা তুলবেন নিজ রাষ্ট্রের তরফে আর মানবাধিকারকে নিজ পররাষ্ট্রনীতির অংশ করে নিয়ে, আর এর শাস্তিও দেবেন নিজেই। তাই সত্যিই ওই রাষ্ট্র মানবাধিকার চরম লঙ্ঘনের দেশ হলেও- আমেরিকার এই অভিযোগ তোলার স্বচ্ছতায় সমস্যা তাতে থেকেই যায়। মানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ জেনুইন হলেও এই অভিযোগ তুলে একে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে ফায়দা তোলা – বাইডেন এই অপব্যবহারের দিকটাই এখানে প্রধান।

    এছাড়া বাইডেন তো পরিষ্কার করেই জানাচ্ছেন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও গ্লোবাল লিডারশিপ ক্রমেই আসন্ন হয়ে উঠলেও তিনি তা মানবেন না। উল্টা, চীনা উত্থান  ঠেকানোর জন্য লড়বেন।

    অর্থাৎ তিনি অপব্যবহার করবেন। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও গ্লোবাল লিডারশিপে বদল আসন্ন হয়ে উঠা – এই বিষয়গুলো কী কোন আমেরিকার সরকারি দলিলে স্বীকার করা হয়েছে? কোনো আমেরিকান সরকারই বা কি এটি স্বীকার করেছে?

    বাস্তবতা হল, হ্যা অবশ্যই স্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে সার্ভে-স্টাডি রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে গত ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে। গ্লোবাল ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস নামে যেমন শুরু হয়েছিল গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০০৮ নামে ২০২৫ [Global Trends 2025: A Transformed World] সালের দুনিয়া কেমন দেখতে হবে এ নিয়ে, এটা আমেরিকান প্রথম সরকারি দলিল। আবার, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০১২ নামে ২০৩০ সালের দুনিয়া কেমন, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০১৭ নামে ২০৩৫ সালের দুনিয়া কেমন এভাবে নিয়মিত রিপোর্ট বের হয়ে এসেছে। আর মজার কথা হল, এসব কোনো রিপোর্টেই, এই ট্রেন্ড বা গ্লোবাল অভিমুখগুলোকে গায়ের জোরে কোন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কি রোধ করতে বা ঠেকাতে যাওয়া উচিত অথবা যাওয়া সম্ভব?

    না, তা একেবারেই ওসব রিপোর্টে উৎসাহিত করা হয়নি। বরং অবজেকটিভ ঘটনা হিসেবে সেগুলো উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও বুশের আমল থেকে শুরু করে শেষে ট্রাম্প এবং বাইডেন পর্যন্ত এই আসন্ন বদল বা চীনা উত্থানকে উল্টে দিতে সব প্রেসিডেন্টেই চেষ্টা-পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছেন, আমরা দেখছি। যেমন বুশের আমল ২০০৬ সাল থেকে চীনের উত্থান ঠেকাতে ভারতকে সুবিধা, পিঠ চাপড়ানি দিয়ে ভারতকে ব্যবহার করার পলিসি বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। চীন ঠেকাতে ভারতকে ঠিকা দাও, এই নীতিকে বুশসহ পরবর্তী সব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অনুসরণ করে চলে এসেছেন। কিন্তু তাতে আবার কোন ফলাফল না দেখে ভারতকে সুবিধাদি দেয়া বন্ধ করেছিলেন (২০১৭) একমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পই। আর বাইডেন এসে ভারতের বিরুদ্ধে নানাবিধ মানবাধিকারের লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তা মুখেই কিন্তু কোন অবরোধ আরোপ কখনোই করেননি এখনও।

    সারকথায়, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান কোন কিছুতেই ঠেকবে না- তা জেনেও সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই কমবেশি ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে লেলানো-সহ নিজেই চীনের বিরুদ্ধে নানা কিছুই করে গেছেন, যাচ্ছেন যার আবার বিশেষ একটা হল, বাংলাদেশকেও ভারতের হাতে তুলে দেয়া যাতে ভারত আরামে আমাদের ছিঁড়ে খেতে পারে এমন সরকারও বসিয়ে দিয়েছে। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে নামিয়ে এরপর আমাদের দেখাতে চেয়েছিলেন রাশিয়ার ওপর ইউরোপের ইউরো আর আমেরিকান ডলার অবরোধ করে কত সহজেই তিনি রাশিয়াকে পরাস্ত করে ও মাফ চাওয়াতে বাধ্য, তারা ঘটাতে পারেন। কিন্তু হায়! রাশিয়ান অর্থনীতি সস্তায় সহজেই ডুবে যাওয়ার বদলে রাশিয়ান মুদ্রা রুবল এখন উল্টা শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ ইইউ-আমেরিকা এদের মিলিতভাবে, বাইডেনের ভাষায় তারা ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’, বিজয়ের বেশে হাজির হবেন- এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন দূরে থাক এখন নিজেদের ইজ্জত বাঁচানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

    ইইউর এই ব্যর্থতার মূল কারণ হল – সারা ইউরোপের রাশিয়ার উপর তেল-গ্যাসের জ্বালানিনির্ভরতা, যা  সীমাহীন এবং অন্তত আপাতত বিকল্প-হীন এক দশায় তারা । এটা এক কঠিন বাস্তবতা। আর এটাই তারা স্বীকার না করে গায়ের জোর দেখাতে গেছেন। এই কঠোর বাস্তবতার কারণেই বাইডেনের সব বাহাদুরি এক ফাজলামিতে পরিণত হয়েছে। বহুবার বহুভাবে ইইউ নিজে এই নির্ভরতার দিকটা বাইডেনের সামনে তুলে ধরে দেখিয়েছেন। বলেছেন, এখন এই নির্ভরতা কাটাতে উদ্যোগ নেয়া শুরু করলেও ২০২৭ এর শেষেই একমাত্র ফল পাওয়া মানে ইইউর রাশিয়ানির্ভরতা কাটতে পারে। যদিও তেল-গ্যাস জ্বালানি জিনিষটা এমন প্রাচুর্যের না যে “আরেক দোকান থেকে কিনলাম”।  কিন্তু বাইডেনের জিদের কাছে ইইউও হার মেনেছে, অসহায় হয়ে থেকেছে। ইইউ জোটের ২৭টা রাষ্ট্র ঠিক কী কারণে কোন জাদুতে বাইডেনের কথার উপরে কথা বলার ‘ভয়েজ নাই’ হয়ে গিয়েছিল ও আছে তা সত্যিই বিস্ময়কর লাগে!!!

    অনুমান করা হয়, চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে গেলে দুনিয়া থেকে গত পাঁচ-ছয় শ’ বছরের টানা সাদা চামড়ার শাসন আধিপত্য ও দখল এবং অন্যদিকে যা এক সাদা ককেশীয় শাসন, এমন এথনিক বর্ণবাদের আধিপত্য লোপ যাতে না পায় এই লোভ দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছেন বাইডেন। ফলে ইইউকে বাইডেনের আমেরিকার সাথে বেঁধে নিয়ে জিদের ঝড় তোলেন – মানে ইইউর এসব রাষ্ট্র এথনিক বর্ণবাদ (তাদের সাদা ককেশীয় জাত শ্রেষ্ঠত্ব) এই আধিপত্য দেখানোর লকলকে লোভে পড়েছিলেন! আর এটা এতই তীব্র যে, ২৭ রাষ্ট্রের ইইউর সবাই লোভে পড়ে বোকা আর বোবা হয়ে গেল – এটা ভাবতেও হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়! অথচ এরাই এই কথিত ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ গত মাসেও তাদের মূল্যবোধ নাকি শ্রেষ্ঠ; (আর চীন-সহ আমরা বাকি এথনিক দুনিয়ার বাসিন্দারা যেন নিচা) এই বলে খুব গর্ব দেখিয়েছে! অথচ আগামী শীতে ইউরোপ জ্বালানি কোথা থেকে পাবে এর কোনো সংস্থান কথিত ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ এখনো করতে পারেনি। অর্থাৎ আগামী উইন্টারে [Winter] প্রতিটা ইউরোপবাসীকে ঘর গরম রাখার সংস্থান হয়নি বলে ঠাণ্ডায় ঠকঠকিয়ে কাঁপতে হবে নয়তো ঘরবাড়ি ছেড়ে গরমের সন্ধানে ভেগে যেতে হবে।

    বাইডেনের গত সপ্তাহের মধ্যপ্রাচ্য সফর থেকে শুণ্য হাতে ফেরাঃ
    বড় হামবড়া মুখের বাইডেন তাই জ্বালানি যোগাড়ে নিজেই মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়েছিলেন গত ১৬ জুলাই। সৌদি আরবের জেদ্দাতে আরব দেশসহ মোট দশ দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ছিল বাইডেনের সেই বৈঠক। ১০ আরব দেশ বলতে সৌদি, ইউএই [UAE]সহ ছয় গালফ স্টেট আর সাথে মিসর, জর্দান ও ইরাক এবং বাইডেনের আমেরিকা তো ছিলই যার আবার সাথে ফেউ এর মত দ্বিপাক্ষিকভাবে আমেরিকা-ইসরাইল আলাপ হয়েছে।

    বাইডেনের মুল উদ্দেশ্য ছিল দুটা। এক. মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের জন্য বাড়তি তেল-গ্যাস জ্বালানির ব্যবস্থা করা যায় কি না! আর সাথে দুই. গ্লোবাল জ্বালানি তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম দেয়া যাতে দুনিয়াব্যাপী যে মুদ্রাস্ফীতি জাগিয়ে বাইডেন ‘কৃতিত্ব’ রেখেছেন এর দায়দায়িত্ব তিনি এখন কিছু লাঘব করতে পারেন কিনা; যাতে তাঁর জিদ্দি অবিবেচক সিদ্ধান্তের দায়ভার কিছুটা কমে। কিন্তু হায়, সেটাই ব্যাক-ফায়ার করেছে। সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা বেঁচে থাকলেও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (সংক্ষেপে এমবিএস বা MBS ডাকা হয়) কার্যত তিনিই সৌদি আরবকে এখন নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এখানে নিচে সেই সভায় এমবিএস যে জবাবটা দিয়েছিলেন সেই বক্তৃতার সারাংশ নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের, আমার নিজের করা অনুবাদ তুলে এনেছি। ভুল অনুবাদের দায় আমার তবে পাঠকের কোনখানে সন্দেহ হলে মূল টেক্সট দেখে নিতে পারেন।

    গত ১৬ জুলাইয়ে রয়টার্স লিখছে : “সৌদি যুবরাজ ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান শনিবার বলেছেন, ফসিল ফুয়েল (মাটির নিচের তেল) খাতে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন ও গ্লোবাল চাহিদা মেটানোর মত শুদ্ধ (clean) জ্বালানি টেকনোলজি দরকার এবং বলাই বাহুল্য কোন, অবাস্তব জ্বালানি নিঃসরণ পলিসি নিলে তা আমাদের অকল্পনীয় পর্যায়ের মুদ্রাস্ফীতির দিকে নিবে; জ্বালানির মূল্য বাড়িয়ে দিবে, বেকারত্ব বাড়াবে এবং সমাজ ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরো দুর্বল (vulnerable) করে ছাড়বে”।

    এরপর ” সৌদি যুবরাজ তাঁর দেশের তেল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেন, এটা ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত বাড়বে যা এখন ১২ বিলিয়ন সক্ষমতায় আছে। আর এরপর আমাদের কিংডমের আর বাড়ানোর কোনো সক্ষমতা অবশিষ্ট থাকবে না”।

    তিনি এসব কথা বলছিলেন জেদ্দায় আমেরিকা ও আরবদের নিয়ে এক শীর্ষ সম্মেলনে যেখানে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উপস্থিত ছিলেন। বাইডেন আসলে আশা করে এসেছিলেন, সৌদি আরব ও তার ওপেক পার্টনাররা বাজারে আরো বেশি তেল ছাড়ুক যাতে জ্বালানি তেলের মূল্য নেমে আসে, যাতে এর প্রতিক্রিয়ায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে উপরে উঠে যাওয়া আমেরিকান-সহ সারা দুনিয়ার মুদ্রাস্ফীতি নেমে আসে, জীবন সহজ হয়। এমবিএস স্পষ্টতই দুনিয়াব্যাপী চরম মুদ্রাস্ফীতির জন্য বাইডেনকেই দায়ী করেছেন। আর তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আপনাদের সেই ভুল নীতির দায় আপনারা কেন আরবদের ওপর চাপাতে এসেছেন?

    এক কথায় বললে, এই রিপোর্টের মূলকথা হল, খুবই নরম উপস্থাপনায় কিন্তু কঠোর কূটনৈতিক ভাষায় তিনি বাইডেনের পলিসিকে বোকা জিদ্দি বলেছেন। বলেছেন, বাইডেনের চিন্তা-পলিসি অবাস্তব ফলে অকেজো! অর্থাৎ, আসলে একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের এটাও দেখতে বাকি ছিল!!!

    সেকালে ১৯৪৫ সালের বিচারে গ্লোবাল নেতা আমেরিকা আর সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের সূচনা করেছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ৭৫ বছর আগে বাদশাহ আবদুল আজিজের সাথে সাক্ষাৎ দিয়ে। আর সেই সাক্ষাৎটা ঘটেছিল মিসরে। আজ যেমন মিসর সৌদিতে এসে দেখা করেছে বাইডেনের সাথে। সেকালে ১৯৪৫ সালে বাদশাহ আজিজ উজিয়ে মিসর গিয়ে রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন । সে বছরই রুজভেল্ট গ্লোবাল নেতা হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হন। আর আজ প্রেসিডেন্ট বাইডেন সৌদি সফর করে আমেরিকান মুকুট ধুলায় লুটিয়ে দিয়ে গেলেন। কারণ, সব আলাপ শেষে, এমবিএস বাইডেনকে কোনো কিছুরই প্রতিশ্রুতি দেয়নি ।

    রয়টার্স তাই শেষে লিখছে, বাইডেনের ওই সফর শেষে “কোনো আশ্বাস বা সৌদি প্রতিশ্রুতির কোনো যৌথ ঘোষণা ছাড়াই আলাপ শেষ’ হয়েছে […but there was unlikely to be any bilateral announcements from the talks.] । তাতে সারা দুনিয়া দেখেছে এমবিএসের যেটুকু বাস্তবতা জ্ঞান আছে এই বিচারে বয়োবৃদ্ধ বাইডেন হেরে গেছেন; জিদ্দি গোঁয়ার বয়স্ক মানুষ কেউ দেখতে পছন্দ করে না। বরং আশা করে, আমাদের মুরুব্বিরা অবশ্যই আমাদের চেয়ে ধৈর্যশীল স্থির এবং অভিজ্ঞতাব্ধতায় আমাদের ছাড়িয়ে যাবেন, সর্বোপরি আমাদের সবার চেয়ে বড় বিবেচক হবেন। কিন্তু হায়! বাইডেন সবাইকেই হতাশ করেছেন! একারণে বেশির ভাগ মিডিয়ার এ নিয়ে রিপোর্টের শিরোনামের সাধারণ সুরটা হলঃ  “আরব শীর্ষ সম্মেলনে তেল চুক্তিতে ব্যর্থ বাইডেন, ফিরলেন ‘শূন্য হাতে’।”

    তাহলে কি আগামী নভেম্বরে আমেরিকান মিড টার্ম নির্বাচনে বাইডেনের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি শুধু গো-হারা হারবে? তাই নয়। আরো অনেক ব্যর্থতাও বাইডেনকে সম্ভবত আঁকড়ে ধরবে, পিষে ফেলবে!! ফলে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে আপস করার মুখে ফেলে কী বাইডেন হয়ত পালিয়ে যাবেন? আর সব দিকের বিপদ টের পেয়ে সবার আগে ইইউ কী বাইডেনের হাত ছেড়ে এবারের শীতকাল শুরুর আগেই রাশিয়ার দিকে হাত বাড়াবেন? সবাইকেই বাস্তবতার সামনে মাথা নামাতেই হয়, এই বাণী দিতে দিতে?

    এদিকে ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইউক্রেন যুদ্ধ লাগানো এটাকে মিসক্যালকুলেশনে ব্যর্থ উচ্চাশা বলা শুরু হয়েছে; ওয়াল স্ট্রিট এর দিক থেকে [President Joe Biden’s administration faces a double disaster after its Ukraine miscalculation, namely a US recession and a second strategic humiliation……] । এমনকি এটা তার স্ট্রাটেজিক মানহানিকর নাকানি বলছে। 

    কেন এমন কড়া কথা বলছিঃ
    গত ১৯ জুলাইয়ের খবর হল ইইউ ইতোমধ্যেই ‘অধোমুখ’ মানে মাথা নিচু করে ফেলেছে। অর্থাৎ ‘রাশিয়ার সাতটি ব্যাংকের উপর অবরোধের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ইইউ’– এই হল সংবাদ শিরোনাম। এটাও রয়টার্সের খবর যে এক ‘ বৈঠকে রাশিয়ার সাতটি ব্যাংকের ফ্রিজ করা অর্থ ছাড় দেয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন তারা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিটিবি, সোভকোম ব্যাংক, নোভিকোম ব্যাংক, অটক্রিটি ব্যাংক, প্রমসভায়াস ব্যাংক ও ব্যাংক রাশিয়া। তবে রুশ বৃহত্তম ব্যাংক সেবার ব্যাংকের সম্পদ ছাড়ের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক ইইউ কর্মকর্তা।

    আবার আরেক হট নিউজ দিচ্ছে রয়টার্স। সৌদি আরব নিজের তেলের বিশাল রফতানিকারক হওয়া সত্ত্বেও উল্টা রাশিয়ান তেল আমদানি শুরু করেছে কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল। কেন?

    কারণ, রাশিয়া সৌদি আরবকে ডিসকাউন্ট মূল্যে তেল বিক্রি করছে [Russia has been selling fuel at discounted prices after international sanctions over its invasion of Ukraine left it with fewer buyers. ]  বলে সৌদি আরব এই তেল আমদানি দ্বিগুণ করেছে যে তেল দিয়ে সে আসন্ন শীতে নিজের পাওয়ার স্টেশনের জ্বালানি চাহিদা মিটাবে। এতে তার নিজের বেঁচে যাওয়া জ্বালানি তেলও যার দাম বেশি তা তাকে বাড়তি সুবিধা দেবে।

    এসব খবর বাইডেনের দিক থেকে দেখলে তার জন্য আত্মহত্যামূলক বলতেই হয়! গত দুই বছরে তার নেয়া সব সিদ্ধান্ত, সব পলিসিই কি তাহলে মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে? ইউক্রেন যুদ্ধ  কী তবে থেমে যাচ্ছে!!!

    সর্বশেষ, গতদিনের খবর হল, বাইডেন ইউক্রেনের উপর কড়া শর্ত আরোপ করে রেখেছেন এই বলে যে, তারা যেন রাশিয়ার সাথে কোনো বিষয়ে আপসের কোনো আলাপই না করে। অথচ ইউক্রেন খাদ্য রফতানির দেশ হওয়া সত্বেও যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ান বাধায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য গুদামে আটকে আছে। গত এক মাস ধরে জাতিসঙ্ঘ আর তুরস্কের মধ্যস্থতায় এবং ফাইনালি এবার সেক্রেটারি জেনারেল গুতেরেস ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের উপস্থিতিতে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে যাতে আটকে থাকা খাদ্য ইউক্রেনের ওডেসা বন্দর দিয়ে বের হতে পারে। এটাও কি বাইডেনের জন্য ভালো লক্ষণ? সম্ভবত তার কপালই ভালো জানে!

    আর আজকের খবর হল, যুদ্ধে ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে রাশিয়ান এক গোলা গিয়ে পড়েছে (যদিও রাশিয়া আজ তা অস্বীকার করেছে)। ফলে কার্যত রপ্তানি কার্যক্রম থমকে দাড়িয়েছে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি মন্তব্য করেছে তারা জানতেন পুতিন এমন একটা অজুহাত বের করবেন!!! যুদ্ধে কোনপক্ষই এথিক্যাল যুদ্ধ করে না, বরং সুযোগ পেলেই ভাঙ্গে। তবে কষ্ট করে যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে চেষ্টা করে। আসলে কেউই প্রতিপক্ষের উপর সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। কাজেই জেলেনেস্কির উচিত হবে বাইডেনের পুতুল হয়ে থাকার দিন শেষ করা। কারণ, শেষে বাইডেন তাকে ফেলে পালাবেই!!! তাই, বেটার আগেই নিজের ভাগ্য গুছানো!!   ওদিকে ইউরোপিও ইউনিয়নও মুচরানো শুরু করেছে [নিজেদের আর্থিক সংকটের অজুহাতে ইউক্রেনকে সাহায্য পাঠানো বন্ধ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন]।

    সবশেষে লেটেস্ট বিদ্রোহের খবরঃ বিদ্রোহীর নাম ইটালি সাথে আছে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি যারা ইইউ এর গ্যাস ব্যবহার ১৫% কমানোর বিপক্ষে। ওদিকে পর্তুগাল ও স্পেন পাবলিকলি এই পরিকল্পনার বিরোধিতা শুরু করেছে। ইটালির প্রেসিডেন্ট বক্তৃতা দিয়ে বিরোধীতা করছে। যেটা দুদিন আগে আমাদের সময় টিভিতে দেখানো একটা নিউজ ক্লিপে প্রচারিত হয়েছে। এদিকে আজ আমাদের এনটিভি এই একই নিউজ টেলপে প্রচার করেছে। এখনই হাতের কাছে নাই তাই লিঙ্ক দিতে পারলাম না। পরে পারব। আর বিদ্রোহের মূল খবরটা আছে ব্লুমবার্গ নিউজে এখানে শিরোনাম Italy, Poland Raise Concerns About EU Proposal to Cut Gas Use.।

    ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটছে?” এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    গৌতম দাস

    ১৮ জুলাই ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4aK

     

     

    [ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন চলতি আমেরিকা নিয়ে কিছু আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছে। আর তা করতে গিয়ে আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কত গভীর এর আভাস দিয়ে ফেলেছে। আজকের প্রসঙ্গ এনিয়ে। ]

    অরিজিনালি এর পরিচয় ছিল “সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট” বলে। বিগত ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা একালে এসে তা আমেরিকাতেও নিজের বিস্তার ঘটিয়েছে – এমনকি ‘কোর এডিটরিয়াল অফিসটা’ এই আমেরিকা থেকেই পরিচালিত। আবার এখন এক ওয়েব ভার্সনও বের করেছে যাতে সে যেন এক দৈনিক পত্রিকাও হয়ে গেছে। কারণ, কী আর করা! শক্ত প্রতিযোগিতায় মিডিয়া বলতে একালে তাতে  “লোকাল” বলতে কিছু নাই কারণ সবই তা অনলাইনের দুনিয়া হয়ে গেছে। ফলে সাপ্তাহিক বলে কেউ এক সপ্তাহ হাতগুটিয়ে বসে থাকলে সেই মিডিয়ার বাজার তাতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দখলে চলে যেতে পারে। অতএব অনলাইনে হলেও দৈনিক উপস্থিতি বা হাজির নিশ্চিত করতে হয়েছে সকলকে।

    অবশ্য এর পিছনে অন্য আরেক বড় কারণ আছে। সেটা আমেরিকার এক সরকারি সার্ভে রিপোর্টের ভাষায় বললে, ‘গ্লোবাল পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ’ প্রসঙ্গে, যা দুনিয়ার বাকি সবকিছুর প্রবাহ – এদের অভিমুখ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।  ঐ রিপোর্ট বলেছিল, গ্লোবাল বিনিয়োগপুঁজির প্রবাহের অভিমুখ একালে পশ্চিম থেকে পুবে মানে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়; এই এশিয়ামুখী অভিমুখ আপাতত যেটা ফিক্সড বা এমন স্থিরতা লাভ করে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে যে তা আর আগামীতে আবার কখনোই তা উলটে পশ্চিমামুখী হবে না;  অর্থাৎ এটা ই-রিভার্সিভ্যাল [irreversible] হয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে লাগাতার গত ৪০০ বছর ধরে এটা পশ্চিমমুখী হয়ে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত হয়ে চলেছিল। সারা দুনিয়াকে কলোনি বানিয়ে লুট করে ইউরোপ নিজের হাতে দুনিয়ার সব অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত পশ্চিমমুখী করে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত করে নিয়েছিল। সেটাই এখন উল্টা, স্থায়ীভাবে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। আর এভাবেই উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের এক নয়া-কাল হতে শুরু করে দিয়েছে। এশিয়ান এক চীনা উত্থানে এসব উল্টে গেছে; যেটাকে অনেকে অবজেকটিভ বা প্রাকৃতিক প্রতিশোধের এক নয়াকাল বলতে শুরু করেছে।

    আমেরিকান ঐ সার্ভে রিপোর্টের মূল অর্থ-তাৎপর্যের আলোকে এখন গ্লোবাল মিডিয়াকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। প্রায় ২০০ বছর আগের প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা মিডিয়াগুলো একালের এই ‘অভিমুখ বদলের’ ব্যাপারটা তৎক্ষণাৎ বুঝে না ফেলার কোনো কারণ নাই, তারা বুঝে গেছিল। আর তারই প্রতিক্রিয়াজাত সিদ্ধান্তে পশ্চিমের প্রতিটা মিডিয়া হাউজ দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই টিকে যাবার জন্য, এশিয়ামুখী হয়ে নয়া অবস্থান সূচনা করে দিয়েছে। যেমন তাদের ফোকাস এখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালী পাঠক বা প্রতিষ্ঠান কারা [মানে কাদের পাঠ এশিয়ার সমাজগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে] – দ্রুত এমন তাঁদেরকে খুঁজে বের করা আর নিজ নিজ মিডিয়া প্রডাক্ট এসব ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের প্রভাবিত করতে না পারলে এশিয়া-কেন্দ্রিক নবউত্থিত গ্লোবাল-বাজার ওসব পশ্চিমা মিডিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাবে; আর,  তাতে প্রভাবশূন্য হয়ে যেতেও পারে, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক এটাই ঘটতে শুরু করেছে। এমনিতেই আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীটের বাইরে সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া গ্লোবাল পুঁজিবাজার এর এক্সটেনশন –  এই শিফটিং অনেক আগেই ঘটে গেছে। সেই সাথে গত ১৪ বছর ধরে এখন হংকং, সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া মিডিয়া হাউজগুলোরও দ্রুত উত্থান হচ্ছে।  যেমন এশিয়া টাইমস অথবা সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট ইত্যাদি সেন্ট্রাল ভুমিকা নিয়ে নিয়েছে।  অতএব, ইকোনমিস্টও এখন অনলাইনে হলেও দৈনিক ভার্সনে হাজির!

    ইকোনমিস্টের এমনই এক অনলাইন দৈনিকের ভার্সন, আমার মত অনেকের ই-মেল বক্সেও এসেছে এই সপ্তাহে। সেখানে গত ১৬ জুলাই সংখ্যা এর এক প্রধান আর্টিকেলের ছোট শিরোনাম হল – ‘ওয়েক আপ, ডেমোক্রাটস’ [Wake up, Democrats! (উপরের ছবিতে দেখেন)]! বাংলা করে বললে, “আমেরিকান ডেমোক্র্যাট দলের লোকেরা, এবার জেগে ওঠো!” নিচে যার আবার বড় আরেক শিরোনাম দেয়া আছে। সেটা হল এমন, “ডেমোক্র্যাটদের জেগে ওঠা দরকার আর তাদের অ্যাক্টিভিস্টদের চরমপন্থী খায়েশে সব তছনছ হয়ে যাওয়া বন্ধ করা উচিত” [The Democrats need to wake up and stop pandering to their extremes]।’ আবার একটা সারকথা শেষে লিখে দিয়ে বলেছে, ‘আমেরিকার ভালোর জন্য শাসক দলের জরুরিভাবে নিজ দলের অ্যাক্টিভিস্টদের নিয়ন্ত্রণ নেয়া উচিত” [For the good of America, the governing party urgently needs to take on its own activists] !’ বলাই বাহুল্য, কী সাংঘাতিক এসব কথা! কিন্তু ইকোনমিস্ট কেন এত গরম কথা বলছে? সেটা দেখা যাক।

    এরপর ঐ আর্টিকেলের প্রথম কয়েকটা বাক্য আমি এখানে তুলে আনছি। লিখছে, আমেরিকার “প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তিনি এক ঐতিহাসিক কালের প্রেসিডেন্ট হবেন। তবে সেটা যেন অবশ্যই জো বাইডেনের মত ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট নয়”। পরের বাক্যে লিখেছে, “এপর্যন্ত বাইডেনের প্রেসিডেন্টগিরিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর পাবলিক রেটিং বা গ্রহণযোগ্যতা ১৯৫০ সালের পরে সর্বনিম্ন”। ইকোনমিস্ট কেন এমন লিখল, কারণ রয়টার্সের ১৩ জুলাই প্রকাশিত এক সার্ভে বলছে – বাইডেনের গ্রণযোগ্যতা মাত্র ৩৯%। আর বাইডেন “সরাসরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রকাশিত মতের” পাবলিক হল ৫৫%।

    Every president yearns to be historic—but not historic like Joe Biden. At this point in his presidency Mr Biden’s singular achievement is to have the lowest approval rating of any incumbent since the 1950s. Even among Democrats, 67% think the economy is doing poorly, 78% think the country is heading in the wrong direction and 64% want another presidential candidate on the ticket in 2024.

    এরপরে আরেকটা তথ্য যোগ করেছে ইকোনমিস্ট, যেটা আরো মারাত্মক! লিখছে, ‘এমনকি ডেমোক্র্যাট দল মানে বাইডেনের নিজ দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতাবিষয়ক তথ্যে দেখা যাচ্ছে – ৬৭% দলীয় কর্মী মনে করেন বাইডেনের অর্থনীতির পারফরম্যান্স খুবই খারাপ। এমনকি “৭৮% পাবলিক মনে করেন দেশ ‘ভুল পথে’ চলছে আর সে কারণে, ৬৪% মনে করেন আগামি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাইডেন নয় ভিন্ন প্রার্থী খোঁজা দরকার”।

    গতবছর ক্ষমতাসীন হওয়ার সময়  মানে ‘১৮ মাস আগে বাইডেন জনগণকে একটু শান্তি দেবেন, ভালো দিন দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন”। কিন্তু ঘটেছে উল্টা। তাদের সব সুখ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। চরমতম মুদ্রাস্ফীতি, সব সদিচ্ছা সু-বোধ সব হারিয়ে গেছে। এক গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই যেন সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি এখন ৯.১%। যেখানে কোন দেশে্র  মুদ্রাস্ফীতি ৫-৬% এর উপরে দেখা দিলে – ব্যবসায়ী নয়, তবে চাকরি করেন বা ছোট ব্যবসায়ী যারা, এমন সব নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এমন মুদ্রাস্ফীতি খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ, এটা তাদের ছোট ছোট সঞ্চয়ের উপর তারা সাধারণত যে ব্যাংক ইন্টারেস্ট পান, মুদ্রাস্ফীতি তাকেই ছাপিয়ে যায়, নেগেটিভ করে দেয়। এতে এককথায় সঞ্চয়ের মূল্য নেগেটিভ হয়ে যায় মানে, যেন সঞ্চয় ক্ষয়ে যায়।

    কাজেই আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা গো-হারা হারবে তা নিয়ে তাদের নিজেদের আর কোনো সন্দেহ নেই। সার্ভে রিপোর্টগুলোও তা বলছে। এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচন মানে হল, তাদের চার বছরের প্রেসিডেন্ট টার্মের ঠিক প্রথম দু’বছর পূর্তিতে নয়া যে নির্বাচন। না, তাই বলে মিড-টার্ম এটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিছুই নয়। যেমন, এখানে এবারের মিড-টার্মে ডেমোক্র্যাটরা হেরে গেলে তাতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে পদত্যাগ করে বাসায় চলে যেতে হবে না। তিনি বরং ২০২৪ সাল পর্যন্ত আগের মতই প্রেসিডেন্ট থেকে যেতে পারবেন। আসলে এই নির্বাচন হল, কংগ্রেস (আমাদের তুলনীয় ভাষায় বললে সংসদ) ও সিনেট (বা দ্বিতীয় সংসদ) এই দুই জায়গাতেই হবু নির্বাচন। তবে সব আসনে নয়, মিড-টার্মে কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনেই নতুন নির্বাচন হবে। আর সার্ভে প্রেডিকশন বলছে, এবারের মিড-টার্ম নির্বাচনে বাইডেনের পাপে ডেমোক্র্যাট দল বেশির ভাগ আসনেই গো-হারা হেরে যাবে। আর এতে পরবর্তীতে ফল হবে এই যে, পরে বাইডেন সরকার চালাতে গিয়ে পদে পদে বাধা পাবে। কারণ, ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না বলে বাইডেন যাই করতে যাবেন তাতে আইনি সহায়তার দরকার হলে তাতে কংগ্রেস বা সিনেটের অনুমোদন না পেয়ে এর জ্বালায় প্রেসিডেন্টকে ভুগতে হবে।

    এরপর এক কড়া নেতিমানের মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে ইকোনমিস্ট। শব্দটা হলো জেরোন্টো-ক্রাটিক [Geronto-cratic]। একে খাস বাংলা করে বলতে হয় – ‘বুইড়াদের’ শাসন বা সরকার। কেন এমন কথা? মানে ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই বাইডেন যে এক অনেক বয়স্ক ব্যক্তি একথাটা এর মধ্যে অনেকবারই প্রকট হয়ে উঠতে দেখা গেছে। বিশেষত, এক অসুস্থতায় বাইডেনকে ল্যাবটেস্ট করাতে গিয়ে তাকে ‘আংশিক অচেতন’ হতে হত। তাই ল্যাবে যাওয়ার আগেই তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা দিয়ে এরপর ল্যাবটেস্টে গিয়েছিলেন।

    আর এই ব্যাপারটাতে “প্রেসিডেন্ট আসলে অনেক বুইড়া” অথবা “এর বেশিদিন আয়ূ নাই”  এ্ধরণের কথা যেন নগদে প্রমাণ হিসেবে পাবলিকলি হাজির হয়েছিল। আবার ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তিনিও যথেষ্ট বুড়া সেকথাটাও সত্যি বটে; আবার পাবলিক পারসেপশনেও তাই। একারণেই ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, যেন বুইড়া বাইডেন আগামী দু’বছর আরো খারাপ সরকার চালিয়ে শেষে সেই কারণেই না আবার আরেক বুইড়া ট্রাম্প – একেই না প্রেসিডেন্ট বানিয়ে নিয়ে হাজির করেন! অবশ্য মূল কথাটা এখানে আসলে আমেরিকান আম-মানুষের মধ্যে হতাশা, এক গণহতাশা এসে গেছে!  মানে সামনে আমেরিকানদের ভাগ্য বদলের কোনো আশা নেই – তাই খায়েশ হল একেই ঠীকঠাক করতে হবে; এটাই হল ইকোনমিস্টের মূল মেসেজ!

    আবার ইকোনমিস্ট আগেই ডিসক্লেমার করে বলে নিচ্ছে, ‘রাজনৈতিক দলকে পরামর্শ দেয়া এই পত্রিকার কাজ বা দায়িত্ব নয় [This newspaper does not usually hand out advice to political parties, but America’s sickly democracy requires urgent repair.]।’ এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে তাহলে যে ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেল ছাপানোর দরকার কী? তাই এর উত্তরে আগাম তারা বলে রাখছে, ‘আমেরিকার অসুস্থ গণতন্ত্র এর জরুরি মেরামত দরকার’ তাই এ বিশেষ ব্যবস্থা।

    তবে উপরে যে হতাশার কথা বলা হল সেটা অবশ্যই রেগুলার বা সাধারণ হতাশা একটা সমাজে যেমন দেখি তেমন বলে বুঝলে ভুল হবে। কেন?
    এর জবাব পাওয়া যাবে ইকোনমিস্টের কিছু আকার ইঙ্গিতে বলা পরের মন্তব্য থেকে।  যা আসলে বর্তমান আমেরিকান সমাজের অভ্যন্তরীণ গাঠনিক তন্তুতে দুর্বলতা ও নুন্যতম সামাজিক ঐক্যের অভাবে যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ছোট ছোট শিরোনাম আকারে ইকোনমিস্ট তা উল্লেখ বা একটা তালিকা করে বলেছে  যেমন – ১. “ডি-ফান্ড দ্যা পুলিশ” মুভমেন্ট [a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, ]; মানে হল পুলিশ যদি সমাজের ঐক্য ধরে রাখতে কাঙ্খিত ও প্রয়োজনীয় কর্তব্য পালন না করতে পারে তাহলে পুলিশ বাহিনীতে ফান্ড দেয়া বন্ধ করতে হবে – বলে গড়া এক সামাজিক আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে এখানে। এ ধরনের, অনেক আন্দোলনের কথা তুলেছে ইকোনমিস্ট। যেমন আরো আছে – ২। সীমান্তে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা কার্যকর না করে তুলে দেয়া বা ‘abolish immigration enforcement’; অথবা মেয়েদের জন্মদাত্রী মানুষ হিসেবে তুলে ধরার আন্দোলন [relabel women as birthing people]; অথবা ক্লাসরুম থেকেই ছাত্রদের অ্যান্টি-রেসিজম শেখানো (আসলে বলতে চাইছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তায় সমাজ ছেয়ে গেছে তাই এর বিরোধিতার কথা) ইত্যাদি। লক্ষ্য করার বিষয় এসব প্রতিটা দাবিই মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিরা তুলে থাকে এমন দাবি।

    “……a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, shun capitalism, relabel women as birthing people and inject “anti-racism” into the classroom……”

    আসলে সার কথায় অপ্রত্যক্ষভাবে ইকোনমিস্ট বলতে চাইছে, রিপাবলিকানরা একালে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারায় বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা তা থেকে ওঠা অসন্তোষকে উসকে দিচ্ছে। তাই ইকোনমিস্ট চাইছে ডেমোক্র্যাটদের এর বিরোধিতায় পাল্টা এথিকস, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কাজে উঠে আসতে হবে – এই হল ইকোনমিস্টের বাসনা। যদিও এমন আকাঙ্খা পূরণ হতে হলে এর  মূল  সমস্যা হল, বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?

    কারণ, খোদ বাইডেনই আরেক ধরনের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী [Colonial White Supremist Global Power হতে চায়] – যাকে হয়ত বলা যায় ‘গ্লোবাল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’। এই কায়দাতেই তিনি ইউরোপকে সাথে নিয়ে চীনবিরোধী এক আটল্যান্টিক জোট গড়তে নেমে পড়েছেন। বাইডেন তার “পশ্চিমা শক্তি” – ইউরোপ-আমেরিকা মিলে যে পশ্চিমা-মন, এই মনকে সুরসুরি দিচ্ছেন যে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে এসে গেলে গত পাঁচ-ছয়শ বছর ধরে দুনিয়ার উপর সাদা মানুষের শাসন যা এখন প্রান্তে এসে ঠেকেছে এই রামরাজত্ব উবে যাবে। একে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তাই যেন তারা চীনবিরোধী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট গড়ে লড়তে এগিয়ে আসে। এভাবেই পশ্চিমা-মনকে উস্কে সকলকেই তিনি এক বর্ণবাদি-রেসিজমের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি গ্লোবাল – এখানেই তিনি কেবল ট্রাম্প থেকে আলাদা। তাহলে  ডেমোক্কেরাট না রিপাবলিকান? কে কাকে নৈতিকতা শেখাবেন?

    তাছাড়া মূল সমস্যা তো এগুলোর একটাও নয়। আমেরিকান সমাজে অনৈক্য কেন?
    এর কারণ খুঁজবে কে?
    যেমন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে আছে। আর সেই থেকে নিজ সমাজে আমেরিকানরা যেসব আয়েসী জীবনের সুযোগ সুবিধার জীবনভর উপভোগ করে আর  সেই সাথে দুনিয়ার উপর মাতব্বরি করে এসেছে – এক চীনা অর্থনৈতিক উত্থানেই তা এখন এলোমেলো হয়ে গেছে। তবে এতে পুরনো আমেরিকান সমাজ যেন এর ধাক্কায় ধসে পড়বে তা তো হওয়ারও কথা ছিল না। যদি আমেরিকানরা বুদ্ধিমানের মত চীনের সাথে প্রয়োজনীয় পজিটিভ ডিল করে কিছু প্রয়োজনীয় রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট করে, মেনে নিয়ে এগিয়ে যেত। বৃটিশদের টপকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে যাওয়াতে তো সেই থেকে লন্ডন বসবাসের অযোগ্য শহর হয়ে যায় নাই!! তাই না!!  তাহলে?
    অথচ গত ছয় বছরে, না ট্রাম্প না বাইডেন কেউ চীনের সাথে সহবস্থান বা আপোষে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থান খোঁজার পথে যায় নাই, সেদিকে যাননি। বরং ঘুরেফিরে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের নেতা হয়ে উঠতে চেয়েছে। যেন এই বর্টাণবাদি রাস্তাটাই তাদের কেবল চোখে পড়েছে আর খুবই পছন্দ হয়েছে। এখন নিজ সমাজকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন। দুনিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারার ‘সীমাহীন লোভ’ তাদের চোখ-মুখে ঝিলিক দিয়ে গেছে, এখনো যাচ্ছে – বাস্তবে সব জায়গা থেকে নিজেরা হারিয়ে যাচ্ছেন এটা দেখার পরও।

    ফলে এখনকার আমেরিকান সমাজ হল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতি ‘সীমাহীন লোভ থেকে জাত’ এক  অনৈক্ক্যযের সমাজ; এটা অনৈক্য কে কাটাতে আসবে, কে পাড়বে? কারণ, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই রাজনৈতিক ধারাই এখন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের অনুসারি; কেবল, তাদের প্রকাশ ভিন্ন। এ অবস্থায় ইকোনমিস্ট প্রস্তাব করতে চাইছে ডেমোক্র্যাট দল কিছু এথিক্যাল দায়িত্ব পালন করুক।’ কিন্তু এটা কার্যত অসম্ভব! বরং আমেরিকান সমাজের খেয়াখেয়িই তাদের সমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সেই ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। যার মূল কারণ হচ্ছে আমেরিকান রাজনীতি এখন – ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – বলে বিভক্ত নয় বরং তা পিছনে ফেলে ক্রমশ  – কে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” আর কে এর বিপক্ষে – এই ভিত্তিতে দুইটা পক্ষ হয়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু তাতেও সংকটটা হল, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – দুইটা পার্টিই একে-অপরকে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপক্ষের দল বলে দেখাতে চাইছে। এটাকেই ইকোনমিস্ট “সামাজিক অনৈক্য” বলে দেখাচ্ছে।

    “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী” বাইডেনঃ
    সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন আসলে চীন ঠেকাতে  বেপরোয়াভাবে হলেও আরো বড় ধরনের এক ‘আমেরিকান যারা  “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী’ হতে রওনা দিয়েছেন। যেমন ধরেন,  বাইডেনের অপছন্দ যেকোন দেশের উপর খেয়াল-খুশিমত  “ডলার অবরোধ আরোপ” করা – এটা তো অপব্যবহার। আইএমএফ  জন্মের সময় (১৯৪৪) আমেরিকান ডলারভিত্তিক এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইএমএফ তো ছিল এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। ফলে আইডিয়ালি আইএমএফের পূর্ব-অনুমোদন সাপেক্ষে  একমাত্র কোন রাষ্ট্রের উপর আমেরিকার “ডলার অবরোধ আরোপ” করা সঠিক বা জায়েজ হত। কিন্তু বাইডেন ক্ষমতা অপব্যবহারকারি হতেই বেশি পছন্দ করেছে, বেপরোয়া হয়েছে! কিন্তু তাতে “অপব্যবহারকারিই হয়ে উঠেছে!

    আমেরিকান ডলার যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা, তা তো আসলে একই সাথে আমেরিকার-রাষ্ট্র এর ন্যাশনাল বা রাষ্ট্রীয় মুদ্রাও। জন্মের সময় নিরুপায় হয়ে এই টেকনিক্যাল ফাঁক থেকে গেছে বলে এর সুযোগ নিয়ে আমেরিকা যেকোন রাষ্ট্রের ওপর যা তার খেয়াল-ইচ্ছা, সে নিজ ডলারকে অবরোধ আরোপে হাতিয়ার বানিয়ে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। কাজেই আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, আগামীতে ডলারের বদলে অন্য যেকোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুল মুদ্রার জায়গা নিলে এর ‘কাফফারা’ তখন আমেরিকান ডলারকে দিতেই হবে।  আর আইএমএফ ভবিষ্যতে অবশ্যই পুনর্গঠিত করে নিতে হবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য তা করে নেয়া হবে নেয়া আইএমএফ অবশ্যই নতুন করে তখন গৃহীত যেকোন আন্তর্জাতিক মুদ্রার  উপর এই খেয়ালি অপব্যবহার বন্ধে শর্ত আরোপ করবেই। কাজেই বাইডেন এন্ড গং – এরা যতই অন্যান্য মুদ্রার রাষ্ট্রকে এখন অসন্তুষ্ট করবে ততই এখন থেকেই তারা ডলারকে এড়িয়ে এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাবেই। যার অর্থ বাইডেনের ডলার অবরোধ আসলে আমেরিকার স্থায়ী শত্রুর জন্ম দেয়াই হচ্ছে।

    বাইডেনেরই এমন আরেক অপব্যবহারের হাতিয়ারঃ
    আমাদের সরকার লুটপাটের সরকার করে, এতে জবাবদিহিতা নাই, জনপ্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা নাই; এগুলো সব ঠিক আছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে এটা এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে ক্রমেই ঝুঁকছে। ফলে প্রত্যেক দেশের অর্থনীতি টালমাটাল আর তাতে নিজ ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের অস্থিরতা ও সঙ্কটে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে সকলে –  আমরা আগেই ব্যবস্থা নিতে চাই বা বিপদে পড়ার পরে হলেও নিতে চাই – তাই আইএমএফের সাথে কথা বলতে চাই বলে ভাবতে শুরু করেছে। আসলে ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট হলে, আমাদের কেবল আইএমএফের তত্ত্বাবধান আর আইএমএফের ঋণের শরণাপন্ন হতেই হয়, এর বিকল্প নাই। বলা যায়, আমরা বাধ্য। কেন?

    কথাটা এভাবে বলা যায়, ধরা যাক  যদি ১০ বিলিয়ন ডলার হলে আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট মোচন হয় আর সেই অর্থ যদি আইএমএফ নয়, একা চীন থেকেই এনে নেই, তাহলেও আমাদের সঙ্কটমুক্তি ঘটবে না। কেন?

    এর মূল কারণ গ্লোবাল বাণিজ্য ও পুঁজিবাজারের অনাস্থা তাতে আমাদের অথনীতির উপর থেকে যাবে, তাই। যেমন এমনিতে চীন এখনো কমিউনিস্ট চীন। তাই চীনের যেকোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর হস্তক্ষেপ ঘটাতে কেবল চীনা সরকারের একটু ইশারাই যথেষ্ট বলে, গ্লোবাল লেনদেন জগতের বাণিজ্য বা পুঁজিবাজারের ধারণা। তবে  চীন ছাড়া অন্য অকমিউনিস্ট কোনো রাষ্ট্র এসব সাহায্য দিলেও তাতে বাজারের আস্থা আসবে কিনা বলা মুশকিল। তাহলে আস্থা কিসে আসবে? গত পঁচাত্তর বছর ধরে গ্লোবাল বাজারে আইএমএফ নিজের সম্পর্কে এই আস্থাটাই গড়ে তুলেছে বা নিয়েছে।  আসলে বাজার-বিনিয়োগে নিয়োজিত অর্থটা যার, একমাত্র  কেবল তারই আস্থায় আসতে হবে বাজারকে – এর কোনো বিকল্পও নেই। আর আপাতত বাজারের আস্থার একমাত্র প্রতিষ্ঠান হয়ে আছে আইওএমএফ, অন্য যেকোন বিকল্প প্রতিষ্ঠানের চেয়ে। এই হল বাস্তবতা!

    এখন আবার আইএমএফের সবচেয়ে বড় মালিক শেয়ারহোল্ডার আমেরিকা বলে এর ওপর আমেরিকার কর্তৃত্ব  সবার চেয়ে বেশি। এছাড়াও যেমন এখনকার বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যান তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়োগ দেয়া, প্রায় তারই নিজ দোস্ত-জিগার তিনি। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি তিনি পেশাদার বুরোক্রাট নন, রাজনৈতিক বিচারে নিয়োগপ্রাপ্ত। যদিও কোনো দেশের রাজনীতিতে ন্যূনতম হস্তক্ষেপ ঘটানো আইএমএফের ম্যান্ডেট অনুসারে খুবই গর্হিত অপরাধ। কিন্তু এর পরেও বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যায় মেরে ফেলার পরিকল্পক আইএমএফ, এমন রেকর্ড এর অভাব নাই।

    আর একালে আমরা ট্রাম্প-বাইডেনের আমলে দেখছি তারা (তাদের ভাষায় চীনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে) আইএমএফকে দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে অ্যাবিউজ বা অপব্যবহার করছে। যেমন বর্তমানের কারেন্সি মজুদ সঙ্কটে – কোনো দেশে আইএমএফ পুরনো সরকারের সাথেই সব আলাপ শুরু করছে, চুক্তির শর্তও ঠিক করছে, ইত্যাদি সবকিছু। কিন্তু চুক্তি সম্পন্ন করছে না। বরং উপস্থিত সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে – এটা বলাচ্ছে বা নিজেই বলছে। এতে আভ্যন্তরীণ ও বাইরে থেকে যৌথ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে সরকার ফেলে দিয়ে এরপর  নয়া সরকার না এলে চুক্তি করা বা পরে অর্থ ট্রান্সফার, কোনোটাই আইএমএফ করছে না। এভাবেই বাইডেনের ইচ্ছার বরকন্দাজ সেজে চলেছে আইএমএফ।  পাকিস্তানের ইমরান ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এলে ট্রাম্প তার উপরও একইভাবে আইএমএফ-কে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় গোটাবায়ে-কে ক্ষমতা ছেড়ে যেতে হল একইভাবে বাইডেনের আইএমএফ-কে ব্যবহারের কারণে। বাংলাদেশও একই ফাঁদে পড়ে গেছে বলে অনুমিত হয়। যদিও আমাদের সরকার ভাবছে ভারতীয় অরিজিন এমন আইএমএফের শীর্ষ  স্টাফদের মাধ্যমে তার কথা আগাচ্ছে ফলে গোতাবায়ের মত ভয়ের কারণ নাই। সরকারের এই অনুমান ভুল প্রমাণ হবার সম্ভাবনাই প্রবল!  মুল কারণ, আমরা আমেরিকার আইএমএফের মুরুব্বি হওয়াকে বাইডেনের অপব্যবহার – এই যুগে প্রবেশ করে ফেলেছি।

    এদিকে এবিষয়ে পাবলিক পারসেপশন আবার হাসিনার বিরুদ্ধে। তারা মনে করে হাসিনা অসহ্য এক টেরর ক্ষমতার মানুষ। ফলে বাইডেন  আইএমএফ-কে অপব্যবহার করলেও তাদের এখন এটা অনুমোদন করা উচিত।  তাদের এখন হাসিনার হাত থেকে মুক্তি দরকার, পরেরটা পরে!!!  এদেশের মত সরকারগুলোর প্রতি জনগণ অতিষ্ঠ থাকার কারণে এ অপব্যবহার বা হস্তক্ষেপের সুযোগটা বাইডেনের পক্ষে যাচ্ছে। যদিও এটা নিরেট বাইডেনের ক্ষমতার অপব্যবহার। তাই আজ বাদে কাল এই হস্তক্ষেপের ‘কাফফারা’ আমেরিকাকে  চুকাতে হবেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৬ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ অপূর্ণ থাকবে“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৫ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-49S

     

    Ignoring BRICS is ignoring turn of history

     

    শশী থারুর [SHASHI THAROOR] একজন ভারতীয়, কংগ্রেস দলীয় রাজনীতিবিদ। মূলত, তিনি রাজনীতিকের চেয়ে বরং একজন কেরিয়ারিস্ট; তিনি প্রফেশনাল কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি এবং গ্রাজুয়েশন করেছেন আমেরিকার স্বনামধন্য ফ্লেশ্চার স্কুল [The Fletcher School of Law and Diplomacy] থেকে। এই অর্থে তাঁর এক নামী একাডেমিক ইনস্টিটিউশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদিও তিনি ততটুকুই রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন বা চেয়েছেন যতটুকু  কেরিয়ার বাড়াতে তাঁর দরকার মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এতে তিনি যতটা যোগ্য হয়েছেন তার চেয়ে বেশি  নিজ একাডেমিক (ফ্লেশ্চার) বড়াই বা গর্ব করে থাকেন এবং তা বাড়াবাড়ি রকম। তার সমসাময়িক বা এল্যুমনিদের [alumni] মধ্যে যারা এমনকি বাংলাদেশী (ফ্লেশ্চার) তাদেরকেও এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।

    মোদির ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার আগের টানা দুই টার্ম (২০০৪-১৪) কংগ্রেসের মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় ছিল; সেই সময়কালে থারুরের কেরিয়ার ও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল। সে সময়টা ছিল কংগ্রেস সরকারের – তাই তিনি কংগ্রেস দলের (কেরালা থেকে) এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন। মানে সে সময় অন্য দলের সরকার হলে তিনি সেই দল করতেন হয়ত, এ রকম কেরিয়ারিস্ট তিনি। কেন এমন বলছি?

    বলছি, সেকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই যেমন এতদিন তিনি ছিলেন এক মোদিবিরোধী কংগ্রেসী। কিন্তু গত ৭ জুলাই ২০২২ তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate] এক আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে – অবস্থান বদলে নিতে চাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি  বাইডেনের মহাউদ্যোগে নবগঠিত বা চলতি যে ‘পশ্চিমা জোট’ শক্তি তৈরি হচ্ছে (সাম্প্রতিকালে জি-৭ আর মাদ্রিদে ন্যাটোর সম্মেলন ডেকে বাইডেন হইচই ফেলতে চেয়েছেন, ইউরোপের সাথে আমেরিকার জোটকে তিনি  ‘পশ্চিমা ব্লক জোট’  [Western bloc’s] বলে পরিচয় করিয়েছেন সেখানেই) শশী থারুর বাইডেনের এই উন্মাদনা দেখে  আর বসে থাকতে পারেননি। একেবারে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকালতি শুরু করেছেন। যেখানে এতদিন তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকার ভারত পলিসির ক্রিটিক।

    শশী থারুর নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।  সেখানে তার ব্যক্তি অবস্থান হিসেবে যে লাইন তিনি পারসু করতেন বা পক্ষে কথা বলে থাকেন তা হল যেমন – কেন আমেরিকা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেনমেন্টের [China Containment] এ’কাজের ঠিকা দিয়েছে; এর সমালোচক ছিলেন তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই চীন ঠেকানোর পুরস্কার বা মজুরি হিসেবেই ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল।

    এই ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ প্রশ্নেই থারুর  মোদির প্রো-আমেরিকান হয়ে লেপ্টে থাকার নীতির সমালোচক ছিলেন। ফলে যেন কংগ্রেসি হিসেবেই মোদির সমালোচক তিনি, এ’পরিচয় লটকে চলতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি পাশ ফিরছেন; মোদির সমালোচক হয়ে বাইডেনকে অতি আপন করে নিতে চাইছেন। যেটা অনেকে পাল্টিমারাও বলতে পারেন। কিন্তু কী প্রসঙ্গে ছিল থারুরের সেই লেখা?

    আলোচ্য সেই লেখার শিরোনাম হল  – ‘ব্রিকস থেকে ভারত কি বেরিয়ে যাবে?’ এটা বাংলাদেশে অনেকে এভাবে বাংলা করে ছেপেছে – যেটা ভালো বাংলা হয়নি। কারণ, মূল ইংরাজি ভাষ্যটা ছিল Are the BRICS Breaking Up?  বা – ‘ব্রিকস কী ভেঙে পড়বে’-এরকম।

    প্রতি বছর ব্রিকস জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার গতমাসে ২৩-২৪ জুন তা হয়েছিল চীনে। একইসাথে তা বিশেষ গুরুত্বে ‘বেইজিং ঘোষণা’ [XIV BRICS Summit Beijing Declaration] বলে এক ঐক্যমতের দলিলে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। আর এবার ব্রিকস সম্মেলন হয়েছে এমন পটভূমিতে যখন বাইডেনের ‘পশ্চিমা-শক্তি’ আগেই ঘোষণা দিয়ে যা যা বলেছে এর অর্থ হয় যে, মূলত চীন ও সাথে রাশিয়া এবং এদের সহযোগী সব রাষ্ট্রকে তারা একঘরে করবে, কোনো অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কও রাখবে না; ভিন্ন করে দিবে; যেন অ-জাত বা নিচা-জাত তারা। সেটা অনেকটা ১৯৯২ সালের আগে সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই-ব্লকে দুনিয়া ভাগ হয়ে থাকার সময়কালে দুনিয়া যেমন ছিল তেমনি।
    সেখানে আবার দুনিয়াটাকে ফিরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাইডেনের এটা এক অবাস্তব খায়েস-কল্পনা মাত্র। যেটাকে ‘কোল্ড ওয়্যার’ [cold war]-এর সেকাল বলে অনেকে চিনে থাকে যার মূল অমন বৈশিষ্ঠ যে ব্লকে ভাগ হতে পেরেছিল যে, তাতে সোভিয়েত-আমেরিকা বলে এ দুই ব্লকের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্য-পুঁজিবিনিয়োগ বিষয়ক (ফলে  জ্ঞান বা স্বাভাবিক বাতচিত-সহ সবকিছুও) মানে ভাব বা ব্যবসা কোনোকিছুরই বিনিময় সম্পর্ক ছিল না।

    ঐ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ, খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের কোনো দেশ কেউই – ১৯৪৪ সালে আইএমএফ প্রথম  জন্ম ও গঠন হওয়ার পর থেকেই – এরা কেউ  সদস্যপদ নেয়নি। আর যে সুযোগে পরে আমেরিকাও সদস্যপদ না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাইডেনের নয়া-কল্পনার খায়েস অনেকটা সেকালের মতই যা একালে আবার সেখানে পৌঁছানো যায় কি না; এই তাঁর আকাঙ্খা বা মনোবাঞ্ছা। যদিও একালে সে বাস্তবতাটাই নাই ভেঙে গেছে, মানে বাস্তবে তা আর উপস্থিতিও নেই। তবু এ জায়গায় বাইডেন নির্বিকার। কিন্তু জিদ ধরেছেন সেকালেই ফিরতে চান! বাইডেনের ভাষায় বললে, তার নেতৃত্ব গড়ে তোলা ‘পশ্চিমা শক্তির’ সাথে চীন ও এর বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নাকি ‘মূল্যবোধে’ [Beijing…. challenges the Western bloc’s ‘interests, security and values’] এক বিশাল ফারাক আছে; তাই তিনি যেন অবাস্তব জেনেও এমন জিদ ধরেছেন।

    এ ছাড়া এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেক তাৎপর্য ছিল, এতদিন এতে পাঁচসদস্য রাষ্ট্র শুধু অংশ নিয়েএসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম অতিথি হিসেবে আরো ১৩টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। যে দেশগুলো হল – আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, সেনেগাল, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আমরা বলতে পারি, এর মানে, এদের কাছে বাইডেনের উদ্যোগে নবগঠিত যে ‘পশ্চিমা ব্লক’ করেছে, চীনকে একঘরে করবে বলে হুমকি দিয়েছে- সেসব দিকগুলো এসব দেশের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। কেন এভাবে বলছি?

    গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস (BRICS) আসলে কীঃ
    এক কথায় বললে, এখনো আমেরিকা গ্লোবাল ইকোনমির নেতা হয়ে থাকলেও এর অবস্থা পড়তি শেষ পর্যায়ে। বিপরীতে চীনের নেতৃত্ব উত্থিত হয়ে তা সেই জায়গা নিতে চাইছে। আ্মাদের অর্থ-বাণিজ্যের দুনিয়া এখন এরই জংশনে আছি। আর এতে গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; যেটা নিজে আছে আবার আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণে।
    কারণ, নিয়ন্ত্রক আইএমএফ এর বড় শেয়ার মালিকানা একা আমেরিকার নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। এমনকি চীন উঠে এলেও তার সাথে শেয়ার শেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। আর তা থেকেই ওয়াল স্টিটের পরামর্শে ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম! তাহলে ব্রিকস হল সেই আগামী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান; যখন গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল ঘটবে তখন যা কার্যকরি হবে। কিন্তু তা সক্রিয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে যখন চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে তখন। কেন? এখন নয় কেন?

    ইকোনমিক-টেকনিক্যাল কারণে একই দুনিয়াতে দুইটা ‘আইএমএফ’ ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে একটা দেশে একই সাথে দুটা সরকার থাকতে পারে না। তাই ২০০৯ সাল থেকে ব্রিকসের জন্ম হলেও এখনই তা দুনিয়াজুড়ে ‘আইএমএফ’-এর সমান্তরালে সক্রিয় হয়নি, ইচ্ছা করেই।
    চীন, ভারত, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল – এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস গঠিত। যদি অনুমান করে নেই আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে কেবল এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে সমান্তরাল আরেকটা দুনিয়া যেন আছে; তবে এখন অস্থায়ীভাবে এই পাঁচ রাষ্ট্রের জন্যই শুধু ব্রিকস যেন, আর সেই দুনিয়ায় আরেক আইএমএফ হিসেবে তা আপাতত হাজির আছে।
    এভাবে মনে করা যেতে পারে। যেদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে চীন আসীন হবে সেদিন ব্রিকস আর আইএমএফ মিলিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। তবে তা আজকের আমেরিকান প্রভাবের (মানে লায়ন শেয়ার) আইএমএফ যেমন, সেই রকম তখন সেটা চীনের প্রভাবের একটা নয়া আইএমএফ প্রতিষ্ঠান হবে, তাতে নতুন নাম কিছু একটা হবে হয়ত বা পুরনোটাই থাকবে। কিন্তু নয়া মালিকানা শেয়ারে বড় ভাগটা চীনের পক্ষে পুনর্গঠিত হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। কাজেই চীনকে উপেক্ষা করে নয়া দুনিয়া সাজানো বাইডেনের আমেরিকার এক মরণ খায়েশ মাত্র। অথচ বাইডেনের এ’অবস্থানের পরোয়া না করে ১৩ রাষ্ট্রের এবার ব্রিকসের অতিথি হয়েছে – নিজেদের স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটা ঘটিয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাইডেন যেখানে চীনকে গ্লোবাল বাণিজ্য থেকে বের করে একঘরে করার জিদ ধরেছেন; সেখানে এই ১৩ রাষ্ট্র উল্টা বাইছে – এমন পদক্ষেপ নজর-আমল করার মতই বলতে হবে!

    তবে ওদিকে একই দুনিয়াতে বিশ্বব্যাংক টাইপের প্রতিষ্ঠান একাধিক হতে পারে। টেকনিক্যাল অসুবিধা নাই। যেমন ইতোমধ্যেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এডিবি ADB) অথবা ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি IDB) আসলে এরা বিশ্ব ব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছে। এছাড়া চীনা প্রভাবাধীন নয়া এআইআইবি [AIIB] অথবা ব্রিকসের ভেতরেই আরেকটা ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক [NDB]’ নামে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে আছে।

    সার কথায় এতক্ষণের কথাগুলো সারকরে বললে, ব্যাপারটি হল, শশী থারুরকে এতদিন ব্রিকস নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। বরং ভারত-আমেরিকার চীন ঠেকানো নিয়ে কথা বলতেন। সেই তিনি এখন “ব্রিকস ভেঙে যাবে কি না” তা নিয়ে কথা বলছেন!
    আসলে আগেও অনেকবার বলেছিলাম যে গ্লোবাল ইকোনমি বা আইএমএফ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় কূটনীতিকদের সাবধান হওয়াই ভাল; এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির ইস্যু বলে ঠাওরে নিয়ে কথা বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের বিদ্যের দৌড় প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে – তাই অসাবধানে এ ইস্যুর সাথে আচরণ না করা ভুল। আর ঠিক সেই ভুল ও ফাঁদে আটকে গেছেন শশী থারুর!
    আগে বলে নেয়া যাক – কেন এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ‘বেইজিং ঘোষণা’ জিনিসটা কী যার ওপরই মূলত শশী থারুর এত ক্ষোভ বা আপত্তি!

    পাকিস্তানি আবদুল রহমান মক্কিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা নিয়ে তিন পর্যায় :
    প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগের সপ্তাহে ১৭ জুন, একজন পাকিস্তানি কিন্তু আইএস সদস্য আবদুল রহমান মক্কির নাম জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকায় তোলা হবে কি না এ নিয়ে ভারত-আমেরিকার এক যৌথ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন এটা আরো ছয় মাস দেরি করার পক্ষে নিজ ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে, পরের সপ্তাহে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের ভারতের মোদি নিজ বক্তৃতায় সরাসরি এ প্রসঙ্গটা উচ্চারণ না করে তবে প্রসঙ্গটা মাথায় রেখে বলেন, ‘আমাদের (ব্রিকসের সদস্যরা) একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝা উচিত, সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা দেয়া উচিত; যাতে এমন ইস্যুর রাজনীতিকরণ না হয়ে যায়।’

    Modi has said that the BRICS member nations should understand each other’s security concerns and provide mutual support in the designation of terrorists, asserting that this sensitive issue should not be “politicised”.

    আর এতে তৃতীয় ঘটনাটা হল, ব্রিকস সম্মেলন শেষে ‘বেইজিং ঘোষণা’ নামে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আর এই প্রস্তাবের  বিষয়টা সারকথায় বললে – আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যুতে ব্রিকস সদস্যরা  যখনই একসাথে জাতিসঙ্ঘে অবস্থান  নিতে পেরেছে তাতে কত ভাল কিছু ফলাফল এসেছে -সেসবের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখন থেকে আবার পরস্পরের সহযোগী হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

    কেন এসব বলেও বারবার চীন-ভারত একসাথে থাকতে পারেনি :
    এর মুলকথা হিসাবে বলা যায়, গ্লোবাল নেতৃত্বের পরিবর্তনের একালে গত ২০ বছর ধরে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে তাতে মৌলিক বোঝাবুঝিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেছে বা রাখা হয়েছে বলে এর উল্টো ফলই ভারত বারবার পেয়েছে। যেমন- ভারত মনে করে এসেছে, এযুগে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভারত এদের দুজনের মাথার উপরে উঠে যেতে পারবে। নিজ ভাগ্য গুছিয়ে নিতে পারবে, কারণ ভারতের কূটনীতি খুবই চতুর!!  কিন্তু এটা এতটাই উচ্চাশা যে, এ নিয়ে কথা বলাই সময় নষ্ট। কারণ, এখানে মূল বিষয়টা – কূটনীতিক দক্ষতা দেখানোর নয়- বরং ‘নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ও তা দেখানোর’। নিজেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করে দেখানোর।
    এতে মোদি ভাল নেতা কি না, বা দেশপ্রেমিক জাতিবাদী কি না কেবল তা দিয়ে বা এই কর্তাসত্তা দেখিয়ে দাবি করা অর্থহীন যে- ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’ অর্জন হয়ে গেছে। ফলে এখন চীন-আমেরিকাকে কূটনীতিক চাতুরি দিয়ে টেক্কা মেরে দিলেই সব অর্জন হয়ে যাবে?  না, তা হওয়ার কারণ নাই। বরং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে দেখাতে হয়। তার আগেই নিজেকে পরাশক্তি দাবি করা অর্থহীন। বাগাড়ম্বর! আর কিছু হওয়ার আগেই আমি বিরাট কিছু এই বাগড়ম্বরতাই ভারতের কিছু না হতে পারার কারণ। সর্বোপরি আছে হিন্দুত্ববাদ, এই ভুল শুধু না বিরাট ক্ষতিকর রাজনীতি।
    যেমন ধরেন, সম্প্রতি ভারতের জনসংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়েছে। বিবিসি বাংলা খবরটা ছেপেছে যেন এটা নিজেই এক অর্জনের ঘটনা।   গ্লোবাল অর্থনীতির প্রধান কেউ হতে হলে বড় জনসংখ্যা এর অর্জনের জন্য অবশ্য একটা ইতিবাচক উপায় (ফ্যাক্টর) ও সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বড় জনসংখ্যার কোনো দেশ হয়ে যাওয়া মানেই সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কারণ, ওই বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতিতে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বানাতে রূপান্তর করতে সক্ষম হতে হবে আগে – তবেই বড় জনসংখ্যা ইতিবাচক; না হলে ওই বিপুল জনসংখ্যাই হবে তখন বড় বোঝা বা ভার।

    আর এই ভারতীয় ভুল মনোভাবকেই ফুসলিয়ে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে দিল্লিকে নিয়ে গেছে, ঠিকা দিয়েছে; মানে উল্টা ভারতকে ব্যবহার করেছে। চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়েছে। অথচ আমেরিকা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘পতিত শক্তি’। অর্থাৎ ভারতসহ উদীয়মান যেকোন অর্থনীতির জন্য বিপরীত শক্তি। কাজেই আমেরিকা ভারতের দোস্ত বা এলাই হতে পারে না!!

    এবার সুনির্দিষ্ট করে জঙ্গি ইস্যু :
    চীনের উইঘুর ইস্যু। আপনি উইঘুর বাসিন্দাদের পক্ষে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন এবং যাওয়া উচিতও। কিন্তু এক শর্তে! তা হল – উইঘুররা আবার আফগানিস্তানে আইএসের সহযোগী হয়ে সশস্ত্র তৎপরতা করে বেড়াতে পারবে না। আসলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানেরাও উইঘুর [ETIM]  এদের এমন তৎপরতা করতে আপত্তি ও বাধা জানিয়েছে। এইখানে দেখেন এনিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট।
    কিন্তু তারা তবু ভারত ও আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কাজে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচরাও থাকছে।

    পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা ইনস্টিটিউটে হামলা বা পাকিস্তানে গোয়াদর ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী মারতে বেলুচদের সাথে মিলে উইঘুরের বাসিন্দারা যদি তৎপরতা চালায় তবে এরপর আপনি আর একই সাথে তাদের প্রতি চীনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরেক বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, গত ২০০১ সাল থেকে উইঘুররা আমেরিকা সরকারের “সন্ত্রাসী দলের তালিকায়” অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগ-দিয়ে  ট্রাম্প প্রশাসন এই [ETIM] গ্রুপকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে মুক্ত করে দেয়। আর পরে বাইডেন উইঘুর বাসিন্দাদের উপর চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেইজিংয়ের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। রফতানিতে চীনা তুলা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে বাইডেন আসলে কী চায়?

    সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবান গ্রুপ টিটিপির [Tehrik-i-Taliban Pakistan] সাথে এদের মিলিত তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্রয় অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তাদের তৎপরতা স্তিমিত করেছে। আসলে বটমলাইন হল – আপনি আরেক দেশে সন্ত্রাস উসকে দিয়ে নিজ দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারবেন না। আমেরিকার সাথে মিলে ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস উসকে তোলার নীতিতে চলে তারা স্ব স্ব নিজ দেশ সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে পারবে না। ভারত-আমেরিকা মিলে পাকিস্তানে [চীনা স্থাপনা বা প্রকল্পে] সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দিয়ে নিজেরা ভাল থাকতে পারবে না। সন্ত্রাস প্রসঙ্গে সবখানেই সব ফোরামেই একই নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। এটাই একমাত্র এথেকে মুক্তির উপায়। পিস-মিল করে একেক সন্ত্রাসের ঘটনায় একেক অবস্থান নিবেন কোনটা কাছে টেনে কোল দিবেন আবার কোনটাকে জাতিসংঘের তালিকায় তুলবেন – এগুলো কোনটাই কাজ করবে না। শেষ বিচারে এসব কোন কাজের অবস্থান হবে না।  কেবল নুইসেন্স সৃষ্টি করা যাবে।

    যেমন যদি প্রশ্ন করি, ভারত মুক্কি ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে আমেরিকার সাথে মিলে ভারত জাতিসঙ্ঘে যৌথ প্রস্তাব উত্থাপনে গেল কেন? একই সাথে এ ইস্যুতে চীনের সাথে কথা বলা ও একই নীতি তৈরি করে উভয়েই তাতে চলতে চাইল না কেন? সমস্যা তো এখানেই! ভারত তো আসলে মুক্কি ইস্যুতে মানে সন্ত্রাস ইস্যুতে চীনের সাথেও এক অবস্থানে যেতে চায় না। চাইলে এই পথ ধরত। ভারত চেয়েছিল আমেরিকার সাথে গলা মিলিয়ে চীনকে জাতিসঙ্ঘের আসরে বিব্রত করতে। ভারত সমাধান চাইলে আগেই চীনের সাথেও একই অবস্থান নিয়ে কথা বলত। যেটা মোদি ব্রিকসের সভায় নিজ বক্তৃতায় বলেছেন যে, “ব্রিকসের পাঁচ সদস্যের সবাই অন্যের সন্ত্রাস নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আমল করা উচিত”। কিন্তু ভারত নিজেই তো তা অনুসরণ না করার নীতিতে চলেছে। না হলে পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে মিলে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, উইঘুর বা আইএস সশস্ত্র তৎপরতাকে ক্রমাগত সাহায্য সমর্থন না করে তা থেকে দূরে সরে আসত! কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়ে কোন সশস্ত্র হামলা হয় নাই। কিন্তু সেজন্য ইমরানের সাথে মোদি সরকারের কোন ঘনিষ্ঠতা, কাজের আলাপ বা সম্পর্কের উন্নতিতে কোন পরিবর্তন আসে নাই। বরং পাকিস্তান-মুসলমান বলে বিদ্বেষ-ঘৃণা আরো বেড়েছে। মুসলমান কোপানো এখন আরো প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটা ভারতীয় নির্বাচনি প্রধান ইস্যু। এরই শেষপ্রান্তে আমরা নুপুর শর্মা-কে দেখতে পাচ্ছি!!!

    আগেই বলেছি, মূল কথা্টা হল – ভারত মনে করে চীন-মার্কিন বিরোধে ভারতকে আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকতে হবে, আর এরপর এ থেকে ফয়দা তোলার কূটনীতিতে চলতে হবে। চীন-আমেরিকার বিরোধ কাজে লাগিয়ে এভাবেই নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। যেন ভারতের কূটনীতিই খুবই বুদ্ধিমান তাই এটাই জিততে থাকবে সবস্ময়!!!  কিন্তু বাস্তবতা কী?? সময়ে তা ধরা যাক কিছুটা আদায় হলেও হতে পারে হয়ত, কিন্তু এথেকে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কীভাবে? অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সাথে কূটনীতিতে ওস্তাদ হওয়া বা না থাকার কী সম্পর্ক? চালাকি কূটনীতি আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী এক জিনিস? না কি এটা উলটা ক্ষতি করবে? করছে!! এখানে কবি নীরব! অথচ এসব নিয়ে  নুপুর শর্মা ইস্যুতে ডুবে যাওয়া দিনে শশী থারুর এ নিয়েই আমেরিকার পক্ষে তৎপর হতে উঠে দাঁড়ানোর সঠিক সময় ভাবলেন।

    ভারত কিসে ডুবে যাচ্ছে?
    মূলত মুসলমান নির্যাতন ও কোপানো। অথচ একমাত্র  মুসলমান নিধন করেই মোদি নির্বাচনে বাক্স ভরার নীতিতে তাকে চলতে হবে বলে মনে করেন। কারণ অর্থনীতির পারফরম্যান্স আগামিতে আর ভাল করার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সর্বশেষ ফরেন কারেন্সী্তে বিপর্যয়ের ধাক্কা আরো বিশাল। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাহার করে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার-  সবদেশের উপর প্রয়োগ করা ছাড়া তার অস্ত্র ভোঁতা – তাই বাইডেনের পক্ষে ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাওয়া আবার দিল্লির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রয়োগ না করা স্ববিরোধী।

    অথচ থারুর ভাবছেন মোদি তার মত বুদ্ধিমান নন। সেজন্যই নাকি সমস্যা!! তাই তিনি ভেবেছেন বাইডেনের এ নয়া উদ্যমে চীনের বিরোধিতা করার সময়গুলোতে একে ভারতের নিজের কাজে লাগাতে বাইডেনের বন্ধু হতে হবে ও আমেরিকার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ ভাব দেখাতে হবে। অথচ এসব অবস্থান মোদি-জয়শঙ্কর সব উল্টে-পাল্টে যতদুর ব্যবহার করা যায় করেছেন । এরপরেই সব অকেজো অবস্থায় তারা। ভারতের উপত লাগাতর তিনবছর ধরে  মুসলমানদের উপর আক্রমণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শুণ্যের কোঠায় আনার জন্য অবরোধ আরোপের সুপারিশ ঝুলছে। অথচ সেদিকে শশী থারুর খবর নাই। কেবল নিজেকে মোদির চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবা ছাড়া……!!!

    ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা- একথা দিয়ে শিরোনাম লেখা কেনঃ
    শশী থারুর তার লেখার শিরোনাম করেছেন ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে। কেন?
    এনিয়ে লেখায় একটাই কারণ জানা যায় যে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ঐক্যমত না দেখাতে পারা। প্রশ্ন হল, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে তা তো না। এনিয়ে ভিন্নতা ব্রিকসের জন্মের আগে ছিল। মাঝে ছিল এখনও আছে। তাহলে এখন সেকথা তুলে এই প্রশ্ন কেন? এটাই সন্দেহজনক। এমনকি মোদি  নিজে বা  সরকারের কেউ এমন “ভেঙ্গে যাওয়া” ধরণের মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন দেখা যায় নাই।  তাহলে “ভেঙ্গে যাওয়া” নিয়ে যেন আলোচনা উঠে এর কৃতিত্ব একা থারুরের। কেন? তিনি এই ইঙ্গিত তুলে মোদির আগে বা উপরে আমেরিকার প্রিয় হতে চান? আমেরিকার নয়া এজেন্সি নিতে মোদির সাথে টক্কর দিয়ে আগায় থাকতে চান? যদিও কংগ্রেস এখনও কোথাও চীন ফেলে প্রো- আমেরিকান অবস্থান নিবে এমন ইঙ্গিত এখনও কোথাও কোন ইস্যুতে দেখায় নাই। বরং একাদেমিক বা সোশাল পর্যায়ের ঘরোয়া আলোচনায়, মোদি জমানা শেষ হলে চীন-ভারত সম্পর্ক ভাল হবে এমন ইঙ্গিত নন-পার্টিজানদের দিয়ে অনেক সময় দেয়া হয়েছে।
    তো সেটা হতেই পারে। শশী থারুর তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি অবস্থান নেন, বদলান।
    কিন্তু ২০১৬ অক্টোবরের এক সংবাদ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শশী থারুর  ব্রিকস সম্পর্কে বলছেন, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ নেয়া উচিত, তাই ব্রিকস কে উপেক্ষা করলে এমন মোড় পরিবর্তন থেকে নিজেকে উপেক্ষিত করা হয়ে যেতে পারে [Ignoring BRICS is ignoring turn of history: Shashi Tharoor]। তাহলে, মিস্টার থারুর, কী দাড়ালো ব্যাপারটা?
    মনে হচ্ছে খোদ শশী থারুরেরই মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যাহোক, সেটা হতেও পারে। কিন্তু এনিয়ে তার একটা ব্যাখ্যা পেলে আমাদের জন্য সব বুঝাবুঝি সহজ হতে পারত।  তা শশী থারুর কী এখন অবলীলায় “ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকেও উপেক্ষার” পক্ষপাতি হতে বলছেন!!!! কোথায় গেল তার সে ইতিহাসবোধ!!  কেন?

    শশী থারুর গ্লোবাল অর্থনীতির ব্যবস্থাটাই বুঝেন না তা উদামঃ
    তাই শেষ কথাটা হল – শশী থারুর যে গ্লোবাল অর্থনীতি বুঝেন না সেটাই এতে উদাম হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন “ব্রিকসকে আরও চীনকেন্দ্রিক করা হোক, সেটা ভারত চায় না।’। আসলে এই হল হাজার কথার এক কথা। গোপেন এবার ধরা পড়েছে!!!! শশী থারুর যে ব্রিকস কী ধরনের প্রতিষ্ঠান এটাই বুঝেন না, তার এক শক্ত প্রমাণ এটা।

    প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে আইএমএফ কী এবং – এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ও গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ছাড়া দুনিয়াতে কোন দেশ আরেক দেশের সাথে পণ্য-বিনিময়, পুঁজিবিনিয়োগ বিনিময় ইত্যাদি চলতেই পারত না কেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা ও যুদ্ধের খরচ একক বহণকর্তা হিসাবে আমেরিকার উঠে আসা ও পরবর্তিতে আবার অর্থনীতির পুণর্বাসনে রিপেয়ারে অর্থ ঢেলেছে ঐ আমেরিকাই। এরসাথে সেই উদ্যোগ নিয়ে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  ব্যবস্থা জন্ম দিয়ে গিয়েছে বলে আজও দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা বলে একটা কিছু চলছে। তবে এটা মন্দের ভাল। আর এই ব্যবস্থা আমেরিকার দিকে কান্নিমারা ভাবেই তৈরি হয়েছে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে এই শতকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আর চীনের হাতে নয়া ও বিপুল সঞ্চিত সম্পদের কারণে একা চীনের হাতেই সবার চেয়ে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা পুঞ্জিভুত হচ্ছে। এটাই চীনের সব ধরণের ক্ষমতা বা সক্ষমতার উতস।  এই কারণেই মূলত চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সবখানে বেশি উঠছে। কিন্তু ঐ ১৯৪৫ সালের দিকে যদি আওয়াজ তোলা হত যে  (ঐকালের ব্রিকস মানে) আইএমএফ এই প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না, তাহলে কেমন হত?  এককথায় এর উত্তর হত তাহলে আজও দুনিয়ায় কোন বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুই হত না।

    উদ্বৃত সম্পদ  বা সারপ্লাস কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকাই ছিল সেকালে (মোটামুটি  ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া শতক জুড়ে)  একমাত্র রাষ্ট্র যার হাতে বা যার অর্থনীতি হচ্ছিল উদ্বৃত সম্পদে ভরপুর। সেকালের কলোনি সাম্রাজ্যের নেতা বৃটিশ বা ফরাসীদেরকে ছাড়িয়ে।  ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতাই ছিল সেকালের একমাত্র ভরসা যে যুদ্ধের পরেও এই আমেরিকার ভরসাতেই, সেই প্রথম দুনিয়াতে একটা গ্লোবাল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন গড়ে উঠে। এবং তাই হয়েছিল। তাই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। তাই আমেরিকা ছাড়া বা আমেরিকা-কেন্দ্রিক নয় এমন এক আইএমএফ গড়ার কথা কেউ যদি বলে তাহলে বুঝতে হবে তিনি আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা কী ও কেন এর দরকার সেটাই আসলে বুঝেন নাই।
    এখন সেকালে কী শশী থারুর মত টেরা কিন্তু বোকা চিন্তার কেউই ছিল না যে বলে নয়া আইএমএফ কে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না ???
    হা অবশ্যই ছিল।  আর সেটা হল ফ্রান্স।  ফ্রান্স আপত্তি তুলেছিল যে একমাত্র আমেরিকান ডলার-কেন্দ্রিক  এক আইএমএফ বাণিজ্য-অর্থনৈতিক  এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। ফ্রান্সের যুক্তি ছিল অনেকটা কথিত ‘গণতন্ত্রি’ বা রাষ্ট্রের সাম্য ধারণার মত যে একা আমেরিকা কেন সব খাবে? সব কর্তৃত্ব নিবে!!
    কিন্তু  বলাইবাহুল্য ফ্রান্সের আপত্তি সবাই নাদান বালকের আপত্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ সেকালে আমেরিকাই ছিল একমাত্র উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশ। আর উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশের মুদ্রা ছাড়া  (এটাই মূল টেকনিক্যাল যুক্তি বা কারণ) ঐ একই ন্যাশনাল মুদ্রাকে একই সাথে গ্লোবাল বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। তাই সদস্য সকল দেশই একমাত্র ডলারকেই পছন্দ না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।   

    এখন একালে, চীনকে নিয়েও প্রায় একই আচরণ দেখাচ্ছে বাইডেনের আমেরিকা। নাদান আচরণ করছে।  আওয়াজ তুলছে বাইডেন। যেমন একটা তুলনা চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পকে নিয়ে। বাইডেন এই প্রথম এই চীনা প্রকল্পকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বলে আওয়াজ উঠিয়েছে। যদিও সবাই জানে ও বুঝছে এটা অবুঝ বাচ্চার আকাশের চাঁদ পাবার জিদের মত!
    বাইডেন বহুকষ্ট পশ্চিমের সবদাতা মিলে কুথে-কাথে ছয়শ বিলিয়ন ডলার যোগাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেবল। যদিও এখনও সে অর্থ দিয়ে কাজে নামে নাই। এর ভিতর আমেরিকা দিয়েছে মাত্র দুইশ, সারা ইইউ মিলে দুইশ আর জাপান ও অন্যেরা মিলে বাকি দুইশ বিলিয়ন এভাবে। আর  এভাবে তারা সবাই মিলে বিনিয়োগ সক্ষমতা যোগাড় করেছে ছয়শ বিলিয়ন ডলার। ভাল, খুব ভাল!!

    কিন্তু চীনের বেল্ট-রোডে বিনিয়োগ কত?  
    চীন মনে করে, বেল্ট-রোড এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর স্বপ্ন। সে যা হয় হোক, এর যাত্রাশুরু মাত্র এই ২০১৩ সাল থেকে।   ইতোমধ্যেই এর বিনিয়োগ চার ট্রিলিয়ন (মানে চারহাজার বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে [China Belt And Road Projects Value Now Exceeds US$4 Trillion]।
    ব্যাপারটা সোজা। আমেরিকাও ওর অর্থনৈতিক উত্থানে যখন ওর যৌবনকালে ছিল তখন বেশির ভাগ এমন বিনিয়োগ প্রকল্প একা আমেরিকাই চালিয়েছে। সেটাই এখন শিফট করে গেছে, চীনের উত্থান ঘটছে একালে।

     তাহলে, এটা চীনা উদ্বৃত সম্পদে উত্থানের যুগঃ
    তাই সেকালে আমেরিকার নেতৃত্বে আইএমএফের বদলে একালে আমরা চীনের নেতৃত্বে হবু আইএমএফ এর ভ্রুণ হিসাবে যেন – ব্রিকসকে দেখছি। কাজেই একালে চীন ছাড়া তো ব্রিকস দাড়াবেই না। আর এতে বড় বিনিয়োগ-মালিকানাও চীনেরই হবে। যেমন এখনও আইএমএফের শেয়ার মালিকানা আমেরিকার সবার চেয়ে বেশি; তা আমেরিকা জবরদস্তিতে হলেও ধরে রেখেছে।

    তাহলে, বটম লাইন ফ্যাক্টস হল – চীন নাই এবং প্রধান ভূমিকায় নেই এটা যদি কল্পনা করি, তবে ব্রিকস বলে কোনো প্রতিষ্ঠানই হবে না, দাঁড়াবেই না। দাঁড়ানোর দরকারও হবে না।

    আসলে ব্রিকস প্রতিষ্ঠান দরকার কেন? এটা নিয়ে শশী থারুর নিজেই প্রশ্ন তুলে নিজেই যেসব জবাব দিয়েছেন তাতেই তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধির খামতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন- প্রথমত, ব্রিকস বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক নাকি ভূরাজনৈতিক জোট?

    এর জবাব হল – ব্রিকস না অর্থনৈতিক না ‘ভূরাজনৈতিক’ জোট। না বুঝে প্রশ্ন তুলতে গেলে এভাবেই ধরা খেতে হবে!!!! যেমন যদি প্রশ্ন তোলা হয় – আচ্ছা আইএমএফ কী কোন জোট? অর্থনৈতিক না ভূরাজনৈতিক জোট? এটা তেমনই এক বোকা প্রশ্ন হয়েছে।  আইএমএফ মূলত এক “গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম’ খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে  আর এই সিস্টেমের মুল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ, সাথে সহযোগী বিশ্বব্যাংক।

    আর নয়া ব্রিকস [BRICS],  এটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তবে পুর্ণ প্রস্ফুটিত নয় বা করা হয় নাই ইচ্ছা করেই। এক ঘরে দুই পীর থাকে না তাই।  এখন আইএমএফ কেমন প্রতিষ্ঠান এটা যখন শশী থারুর, আপনার ধারণায় নাই তখন ব্রিকসও আপনি বুঝবেন না। কেবল প্রশ্ন করবেন আর নিজের বোকামিটাই তুলে ধরবেন!

    কাজেই মুখ খোলার আগে শশী থারুরের উচিত হবে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটি কী – এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ফ্লেশ্চার স্কুল কিন্তু আইন আর কূটনীতি বিষয়ে জোর দেয় সত্ত্বেও এটা মান্টিশেডের সাবজেক্ট এমন প্রতিষ্ঠান। একথা বারবার বলা হয়েছে। তবে এর বাকি শেডগুলো স্টুডেন্টদেরকে নিজ যোগ্যতায় পূরণ করে নিতে হবে। থারুর সেদিকে মনোযোগ দেন নাই দেখা যাচ্ছে। অতএব তার এখন এসব ব্যাপারে দ্রুত মুখ খুলা এড়ায় চলা উচিত! এটা অপ্রয়োজনীয়! এজন্যই বারবার বলেছি এই যুগের কূটনীতিতে মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা আইআর [আন্তর্জাতিক রিলেশন] এবিষয়ে পড়ুয়াদের ক্লাসের পাঠ্য না হলেও নিজ উদ্যোগে অর্থনীতি পড়ে নিতেই হবে।

    একারণে শশী থারুর নিজে বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে, ভারত ব্রিকসের সদস্য ঠিকই হতে চান। কিন্তু তার দাবি, “চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না”। এর মানে কি?  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফে কী ভারতের জন্য কোন জায়গা আছে? আইএমএফে ভারতের উল্লেখ করার মত কোন মালিকানা নাই কেন? আর সেটা কী আমেরিকা একালে ভারতকে দেওয়ার জন্য বসে আছে? দিবে? আমেরিকার প্রিয়বান্দা হতে চাওয়া  শশী থারুর কাছে এর কী কোন জবাব আছে? অতএব তাঁর না বুঝে কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয় কী!!!

    তাহলে নবগঠিত বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান AIIB, আসেন এখানে দেখিঃ
    এটা চীনা উদ্যোগের একালের বিশ্বব্যাংক যেন। ব্রিকস (বা আইএমএফ) গড়তে গিয়ে আগেই নিজস্ব বিশ্বব্যাংকটা যেন গড়ে নিয়েছে।  ফলে চীনা প্রভাব ও সিদ্ধান্ত এখানে প্রধান ভুমিকায়। চীনের নিজের মালিকানা শেয়ার এখানে ৩০% এর মত। এটাই সবার চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হল, ভারত যার, শেয়ার মালিকানা ১০% এর মত। আমেরিকার নাই, ইউরোপের খুব কিছু উল্লেখ করার মত নয়। অর্থাৎ আর কাউকে তেমন নয়, তবে ভারতকে  চীন ঠিকই গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে পাশে রেখেছে। তাতে ভারতের সাথে চীনের যতই রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকুক।  এটা স্বাভাবিক!

    তাহলে শশী থারুর কীবুঝে বলছেন – চীনকেন্দ্রিক  ব্রিকস তিনি চাননা?? 

    ভারী কথাবার্তা থাক একটা গল্প বলে শেষ করব।
    শশী থারুর ব্রিকস চান কিন্তু চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না। আর বাস্তবতা হল, চীন না থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে উদ্বৃত্ব সম্পদ – বিনিয়োগ দিবে কে? বুঝা যাচ্ছে এদিকটা নিয়ে তিনি ভাবেনই নাই। তাহলে আইএমএফ অথবা ব্রিকস বলতে তিনি কী বুঝছেন? কেমন প্রতিষ্ঠান এর কিছুই বুঝেন নাই। আবার  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফ নিয়েও তার আপত্তি দেখি না। তাই সবমিলিয়ে, তাঁর এই অবস্থানেরই প্রতীক যেন নিচের এই গল্প!
    শ্রাদ্ধঃ  কোন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সৎকারের নানা অনুষ্ঠান হয়। এই  ক্রিয়াকর্মাদি যা কিছু করা হয় একে শ্রাদ্ধ বা শ্রাদ্ধাদির নানা অনুষ্ঠান বলে। আর কয়েকদিন ব্যাপী এমন অনুষ্ঠান শেষে সাধারণত একটা নিরামিষ ভোজ বা খাওয়াদাওয়া ভিতর দিয়ে এসবের সমাপ্তি ঘটে থাকে। এখন এক ব্যক্তি দাওয়াতে এমন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।  কিন্তু উপস্থিত হয়ে তিনি সৌজন্য আলাপ জমাতে গিয়ে  ঐ বাড়ির কর্তাগোছের এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আচ্ছা যার শ্রাদ্ধ খেতে এলাম তাঁকে দেখছিনা? তিনি কোথায়???” 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “শশী থারুরের ব্রিকস বুঝ!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]