Category: Politics

  • দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া, চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে 

    দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া,
    চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে

    গৌতম দাস
    ১৫ নভেম্বর ২০২২  রাত ০০ঃ১৫

    https://wp.me/p1sCvy-4k2

        কয়েক ঘন্টা আগের ছবিঃ US President Joe Biden, left, arrives with Chinese President Xi Jinping for a meeting on the sidelines of the G20 summit meeting, November 14, 2022, in Bali, Indonesia [Alex Brandon/AP Photo]

    আগে কিছু বিষয়ের সংজ্ঞা দিতে দিতে আজকের কথা শুরু করব। পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে West – এসব শব্দ বলতে একালে বুঝতে হবে সারা ইউরোপ ও সাথে আমেরিকাও। সাধারণত, কালচারাল অর্থে অবশ্য এনিয়ে আরেকটা শব্দও আছে – ‘পাশ্চাত্য’। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতা বলতে যেমন ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’ শব্দটা এভাবে, ব্যবহার করে অনেকে। ঠিক পশ্চিম এর বিপরীত শব্দ পূব তেমন, পূর্ব বা এশিয়ান কালচার বা সংস্কৃতি বুঝাতে অরিয়েন্টাল [oriental] বা বাংলায় ‘প্রাচ্য’ সভ্যতা বলার চল আছে। মানে পশ্চিম বা ইউরোপের বিপরীতে পুব-কে প্রাচ্য বা এশিয়া বলে বুঝানো।
    ওদিকে ভৌগলিকভাবে আটল্যান্টিক মহাসাগর ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে অবস্থিত  হয়ে থেকে এদেরকে দুই পাড়ে বিভক্ত করে রেখেছে। এমনভাবেও অনেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। এই অর্থে তাই ট্রান্স-আটল্যান্টিক মানেও পশ্চিম; যার অর্থ হল ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে আটলান্টিক মহাসাগরটা যেন অবস্থিত নাই বরং তারা লাগোয়া বা পাশাপাশি – এই কল্পনাতে তৈরি শব্দটা হল ট্রান্স-আটল্যান্টিক [trans-atlantic]। তাই ইউরোপ আর আমেরিকাকে অন্তত এথনিক কালচারাল অর্থে তারা এক, এভাবে একসাথে বুঝাতে অনেকে “আটল্যান্টিক” শব্দ দিয়ে সেটা বলে বুঝাতে চায় অনেকে। যেমন, সামরিক জোট ন্যাটো [NATO] এর ভিতরের ক্যাপিটাল  ‘A’ এই অক্ষরটা আটল্যান্টিক বুঝাতে ব্যবহার হয়। মানে ন্যাটো হল ইউরোপ আর আমেরিকার মিলিত সামরিক জোট; তাই এটা এক আটল্যান্টিক জোট। আবার ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ বলে অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়; যেমন এ’নামে এক থিঙ্ক ট্যাংক আছে। আবার একইভাবে, সারা দুনিয়ার জন্য নির্ধারক ও সবচেয়ে বিখ্যাত হিটলারবিরোধী ১৯৪১ সালের হবু জোটের পক্ষে প্রথম যে চুক্তি হল সেটার নাম আটল্যান্টিক চার্টার ট্রিটি বা ইংরাজিতে Atlantic charter Treaty । যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে বিরোধী এলাইড ফোর্স বা ‘পক্ষ শক্তি’ নামে জোট গড়ে তোলার লক্ষ্যের পিছনের ভিত্তি, এমন এক প্রধান চুক্তি। এটাই ছিল হিটলারের ‘এক্সিস ফোর্স’ নামে জোটের বিরোধী জোট।

    আবার আমেরিকান ভুমির মূল এথনিক  জনগোষ্ঠি অর্থে  জাতি [নেশন], এই অর্থে বিচার করে বললে, এখনকার আমেরিকা এটা ইউরোপের কোন এথনিক জনগোষ্ঠিরই জন্মভুমি ছিল না। বরং ১৬০৭ সাল থেকে বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ ইত্যাদি কলোনিদখলদারেরা তাদের জন্মভূমি ইউরোপ থেকে গিয়ে আমেরিকাকে কলোনিদখল করে নিজেদের ভুমি হিসাবে দাবি করে সেখানেই থেকে যাওয়া ও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়েছিল। আর এতে সেখানকার মূল আদিবাসিদের উতখাত বা তাদের আরো গহীন বনে চলে যেতে ঠেলে বাধ্য করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই ওসব আদিবাসিদেরকে পশ্চিমারা নাম দিয়েছিল “রেড ইন্ডিয়ান” বা  তাদেরকে এই নামে ডাকা চালু হয়েছিল। সেই থেকে ইউরোপের বা পশ্চিমা দেশান্তরি বা মাইগ্রেন্টরা [migrants], এরাই যেন আমেরিকার মূল বাসিন্দা এমন হয়ে বসবাস শুরু করেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকা কার্যত ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের শহর হয়ে যায়। একইভাবে ঠিক যেমন অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড অথবা কানাডা এই দেশগুলো ইউরোপীয়দের হাতে কলোনিদখলের পরে এখন এরা মাইগ্রেট করা ইউরোপীয়দেরই শহর -যেন নিজস্ব দেশ- এমন হয়ে গেছে।

    কেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে এত পুরানা কথাঃ
    কেন একালের প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে ব্যাখ্যা করতে এত সব পুরানা কথাকে তুলে আনছি; এর কারণ হল ২০২১ সালে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হলে পড়ে সে নীতি-পলিসি নিয়ে তিনি এসেছিলেন সেটা আসলে এক আটল্যান্টিক ফর্মুলা। যার আরেক নাম ‘সাদা ককেশীয় শাসন’ চালু রাখার স্বার্থ।
    তাই বর্তমানের প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, বাইডেনের আমলে তিনি কার্যত যে ‘পশ্চিম’ এর সংজ্ঞার উপর নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন যেটা হল প্রধানত -হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট -, অথবা সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি এক ততপরতা। আর মূলত এসব পরিচয় খাড়া করার উদ্দেশ্য একটাই তা হল, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান যা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে যা, ১৯৪৫ সালের পর থেকে গত ৭৭ বছর ধরে রাজ [rule] করে এসেছে ও এখন ক্লান্ত হয়ে শেষ প্রান্তে ঠেকেছে – এই উত্থিত চীনা অর্থনৈতিক উত্থান-আগমনকে আর যতদিন সম্ভব ঠেকিয়ে দেয়া, অন্তত দেরি করিয়ে দেয়া সম্ভব – এরই এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
    তাই একালে পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে west শব্দের এক বিশেষ অর্থ হয়েছে যে যারা গত প্রায় ছয়শ ধরে দুনিয়াকে কলোনিদখল করে শাসন করে আসছিল আর সুনির্দিষ্ট করে ১৯৪৫ সাল থেকে  আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল ; যার প্রথম ও সবচেয়ে ইতিবাচক এক নয়া পদক্ষেপ ছিল  চলে আসা পুরানা সাড়ে তিনশ বছরের কলোনিদখল ব্যবস্থাকে আমেরিকা তুলে দিয়েছিল – এরাই সেই থেকে নয়া ‘পশ্চিমা ব্যবস্থা’।

    তবে একালে বাইডেন যে নয়া নীতি-পলিসি সাথে যোগ করেন এই ততপরতার পরিচয় হল এটা এখন ‘সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি’ পুনর্বার খাঁড়া করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ এর) সাথে গাটছাড়া বেধে সারা পশ্চিমাদের ‘ইউক্রেনের যুদ্ধে’ সারা দুনিয়াকে নামানো। তাদের অনুমান ছিল ইউক্রেনকে প্রক্সি বা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তারা পশ্চিমারাই ইউক্রেনের পিছনে থেকে পুতিনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে রাশিয়াকে ধংস করতে সক্ষম হবে। এছাড়াও তাদের সহ-অনুমান ছিল যে এতে রাশিয়ার সমর্থনে একসময় নিশ্চয় চীন রাশিয়াকে ‘সামরিক সমর্থন’ করে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এভাবেই তারা চীনকেও এই যুদ্ধে জড়িয়ে চীনা অর্থনৈতিক উত্থানকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারবে। যার ফলাফল হতে পারে, তাদের গত ছয়শ বছরের সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটির শাসন আরো অন্তত শ বছর চালিয়ে যেতে পারবে! এই ছিল আশা।

    কী করে বুঝব তিনি পরাজয় স্বীকার করছেন, তোওবা পড়া শুরু করেছেনঃ
    বাইডেনের শাসনের প্রথম দুবছরে মাপার আরেক সহজ উপায় হল আমেরিকান মিড-টার্ম ইলেকশন; যা গত সপ্তাহে ৮ নভেম্বর এই নির্বাচন হয়ে গেল। তবে বাইডেন এটাকে নিজ পরাজয় ঢাকার উপায় হিসাবে ব্যবহার করতে নেমে গেছেন, নভেম্বরের শুরু থেকেই। যদিও এমনিতেই যেকোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তার শাসনের মিড-টার্মে মানে চারবছর শাসনের দুবছর পুর্তিতে আগের দুবছরে গৃহিত নীতি-পলিসির রিভিউ বা পুনঃমুল্যায়নের সুযোগ নিয়ে থাকেন।  সেটা বাইডেনের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হয়ে যাচ্ছে একেবারে উলটা গান। মানে চীনবিরোধী একে পিষেমারার নীতির বিপরীতে একেবারে উলটা সহযোগিতামূলক সহ-অবস্থান; মানে পরস্পরকে বিকাশ-বৃদ্ধিতে জায়গা করে দেয়া; এরই প্রাইমারি আলাপ করতে যাচ্ছেন বাইডেন।    কিভাবে?

    এর পরের সপ্তাহ মানে আগামিকাল থেকে, ১৫-১৬ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে এবারের G20 সম্মেলন মানে, ১৭তম জি২০ [G20 Countries] বার্ষিক স্মমেলন অনুষ্ঠান শুরু হবে।  আর এই সম্মেলন উপলক্ষ্যে এরই আড়ালে মানে এই সম্মেলনের  সাইড লাইনে বসে বাইডেন সরাসরি চীনা প্রসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাথে বৈঠকে বসবেন তা ঠিক করেছেন। এই পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল জর্মান চ্যান্সেলার ওলাফ শলৎজ [Olaf Scholz] এর গত পাঁচ নভেম্বর ২০২২ এর চীন সফর থেকে; যেখানে তিনি বলেছিলেন তিনি G7 group দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসাবে প্রেসিডেন্ট শি এর সাথে কথা বলতে গিয়েছেন। কিন্তু G7 এর পক্ষ থেকে জর্মানিই কেন?  এর জবাব হবে সম্ভবত জর্মানিই হল G7 গ্রুপের একমাত্র দেশ যে তার আগের চ্যান্সেলার মার্কেল এর কৃতিত্ব হিসাবে ইউরোপের বাকি সবার আগে চীনবিরোধী না হয়ে উলটা চীনকে জর্মানির অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে ইন্ডাস্টিয়াল সহযোগিতা সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আর পরে সেটাই গত দুবছর ধরে বাইডেনের সাদা শাসন বাচিয়ে রাখার নীতি-পলিসির কারণে ভেঙ্গে পড়ার দশায়।  এখানে বলে রাখি যে, G7 বলতে Canada, France, Germany, Italy, Japan, UK, and US এসব রাষ্ট্রগুলোর জোট বুঝানো হয়।

    আমার এর আগের লেখায় শিরোনাম করেছিলাম – “মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু”। সেখানে পশ্চিমের তিনটা রেফারেন্সের কথা উল্লেখ করেছিলাম; যার একটা ছিল জর্মান চ্যান্সেলার শলৎজ এর চীন সফর। রয়টার্সের রিপোর্ট  প্রথম আলোতে অনুবাদ করে ছাপা রিপোর্টে শলৎজের এই সফরে আকাঙ্খা প্রসঙ্গে; যার শিরোনাম হল – ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে চাপ দিতে চীনকে পাশে চায় জার্মানি।
    দ্বিতীয় রেফারেন্স দিয়ে লিখেছিলাম বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর মন্তব্য যেটাতেও রয়টার্সের শিরোনাম হল, ব্লিঙ্কেন বলেন “চীনের সাথে সমন্বয়ে এক তালে [need to align] থাকাটা জরুরি এসম্পর্কে  G7 group পরিস্কার” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China]। অর্থাৎ বিগত দুবছরের অনুসরণ করা বাইডেনের নীতি-পলিসি  এখন ময়লার বাক্সে ফেলে বাইডেন-ব্লিঙ্কেন আপোষের জন্য তৈরি হচ্ছেন। অথচ এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দুবছর ধরে দেয়া চীনকে একঘরে করার আকাঙ্খায় দেয়া বক্তব্যের বিপরীত।
    তৃতীয় রেফারেন্স দিয়েছিলাম, এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]। অর্থাৎ সবমিলিয়ে এক পরিস্কার আপোষের বার্তা যে জি৭ গ্রুপ নামে “সাদা শাসন ওয়ালারা” তাদের চীনবিরোধিতা ত্যাগ করে আপোষের জন্য রেডি। তবু এত সত্য কথা বলা তাদের জন্য একটু অস্বস্তিকর। তাই যেন একটু আড়াল নেয়া যে এই আপোষের পথে তারা বাড়ছেন যেহেতু এক গ্লোবাল মহামন্দা (recession) আসন্ন সেই বিবেচনায়!
    তাই চতুর্থ রেফারেন্স হিসাবে বলেছিলাম যে,  বলেছিলাম যে “আল জাজিরা এবার এই প্রথম পশ্চিম থেকে
    তারা দুরত্ব রচনা করতে চাইছে। তাদের এ’প্রসঙ্গে  রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে …as inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!”।

    বাইডেন-শি বৈঠক, জি২০ গ্রুপের ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠকের উসিলায় সাইড লাইনেঃ
    এখন জি২০ গ্রুপের আসন্ন ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠক উপলক্ষ্যে বাইডেন আরো খোলাখুলিভাবে চীনের সাথে আপোষের কথা আগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।  যেমন, সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে বললেন বাইডেন – প্রথম আলো।  এই খবরটা অরিজিনালি এএফপি এর যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে। কিন্তু ঠিক কী প্রসঙ্গকে মাথায় রেখে বাইডেনের এমন অল্প আগের শত্রুর প্রতি এমন মধুর পিঠে হাত বুলানো ভাষণ?
    সেটা আমরা জানতে পারি রয়টার্সের আরেক রিপোর্ট থেকে। সেখানে শিরোনাম হল – “চীন-আমেরিকাঃ আসন্ন শি-বাইডেন বৈঠকের আগেই সবার চোখ “রেড লাইন” এর উপরে” [China-U.S. ‘red lines’ in focus ahead of expected Xi-Biden meet] ।  এখন এখানে  -রেড লাইন- সেটা আবার কী?
    আসলে তাদের আলোচনা অনেক দুর-ই আগিয়ে গেছে। আগে বাইডেন বলত চীন নাকি গ্লোবাল অর্ডারের আইন শৃঙ্খলা রীতিনীতি কিছু মানে না। না, বাইডেন এখন সেখান থেকে সরে গিয়েছেন। আর বাইডেনের নয়া অবস্থান হল, শি-বাইডেন এরা উভয়েই পরস্পরের কাছে বলে নিবেন কোথায় কতদুর অপর পক্ষ যেতে পারবে বা পারবে না, কথা তুলতে পারবে না ইত্যাদি – যেটা বিপক্ষের জন্য সেনসেটিভ। যেমন যদি ধরি তাইওয়ান ইস্যু। চীন বলবে, এক চীন নীতি মানতে হবে। যেটা আমেরিকা, ভারত সহ প্রায় সব দেশই ফরমালি মানে কারণ, তাদের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক  এর উপরে দাড়িয়েই অনেক আগেই স্থাপন হয়ে আছে। আর সেখানে তাদের চীনকে দেয়া স্বীকৃতি মতে তাইওয়ান চীনের অংশ বলে তারা মনে করে। কাজেই এখন তাইওয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে চীনকে বিরক্ত বা খোচাখুচি করা এসব বন্ধ করতে হবে। যার মানে তাইওয়ান নিয়ে ইচ্ছামত খোচাখুচি করা নতুন ইঙ্গিত দেয়া এইটা  – রেড লাইন এলাকা। তাই, রেড লাইন তালিকায় সেটা উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ অযথা একাজে খোচাখুচিতে সময় নষ্ট না করে পরস্পর উভয়ের গঠনমূলক কাজে ব্যায় করবে।   তবে কী কী রেড লাইন তালিকায় উঠবে মূলত তা নিয়ে আপোষ আলোচনায় সেটা সাব্যস্ত হবে মনে হচ্ছে!!

    তাহলে বুঝা যাচ্ছে চীন-আমেরিকা আপোষ আলোচনা আগিয়ে নিবার জন্য অনেক প্রস্তুতি ও ফর্মুলা নিয়ে কাজ আগিয়ে রেখেছে। হা ঠিক তাই।  তবে “ভুল বুঝাবুঝি” সরানো বা সরিয়ে ফেলা একথা  বা এই keyword ধরেই যে আপোষটা হবে তা প্রায় স্পষ্ট। যেমন বাইডেন একাই বলেন নাই যে  “সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি” রয়েছে। পালটা এমনকি চীনও একই কথা বলেছে।  যেমন চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আমেরিকার উচিত হবে চীনের সাথে এক্সঙ্গে কাজ করা যাতে ভুল বুঝাবুঝি ও ভুল বিচার-মুল্যায়ন এড়ানো যায়।
    চীনা মুখপাত্র আরো বলেন, “চীন আমেরিকার সাথে শান্তিপুর্ণ সহ-অবস্থান বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও তাইওয়ান প্রশ্ন আসলে চীনাস্বার্থের কেন্দ্রে এটা মনে রাখতে হবে”।

    The United States should work together with China to avoid misunderstandings and misjudgments, a Chinese foreign ministry spokesman said on Thursday, when asked about reports of the meeting. For his part, U.S. President Joe Biden said on Wednesday he was not willing to make any fundamental concessions when he meets with counterpart Xi Jinping.
    China is committed to realize peaceful co-existence with the United States, but the Taiwan question is at the core of its interests, the spokesman, Zhao Lijian, said at a regular briefing in Beijing.

    আসলে, বাইডেন ও তাঁর ইউরোপীয় বন্ধুরা “সাদাবাদি” হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে গিয়ে উলটা নিজেরাই এখন এমন ছেড়াবেড়া অবস্থায় পড়েছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার পুতিনকে মানানোর জন্য তাদের হাতে এখন একটাই শেষ অস্ত্র। তা হল,  চীনকে ছাড় দিয়ে হলেও  কিছুটা পক্ষে টানা। যাতে সেই চীনকে দিয়ে ক্ষুব্ধ পুতিনকে তারা ঠান্ডা করতে সক্ষম হতে পারে। যা দিয়ে একটা নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক যেন গড়ে তোলা যায়।  এব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, পুতিন অবশ্যই চীনের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করতেও পারে। কিন্তু সেটা আগামি জানুয়ারির ১৫ তারিখের পরেই। যেন -৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ইউরোপ বসবাসের জন্য কেমন স্থান সেটা দিয়ে তাদেকে শিক্ষা দেয়া যাতে আর কখনও পরিণতি না বুঝে কেউ এদিকে যেন পা না বাড়ায়!!

    তাহলে শি-বাইডেন  এর হবু বৈঠকের উপর আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচনের কী কোন প্রভাব নাইঃ
    অবশ্যই আছে। এখন পরররযন্ত প্রকাশিত ফল অনুযায়ী বাইদেনের ডেমোক্রাট দল কংগ্রেস বা সংসদে হেরে গেছে। মানে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে সিনেট বা সংসদের উচ্চকক্ষে শেষ পর্যন্ত নিজ ডেমোক্রাট দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০-৪৯) এভাবে  ফিরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও একটা আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয় নাই এখনও। তবু সেই আসনের ফলাফল যেদিকেই যাক সিনেটে ডেমোক্রাটেরা সংখ্যাগরিষ্ঠায় থেকে যাবে। এই খবরটা শোনার পরে বাইডেনের প্রতিক্রিয়া যা ছিল সেখানেই বাইডেনের সব মনোভাব লুকিয়ে আছে। তিনি বলেছেন তিনি শক্তিশালী বাইডেন বলে অনুভব করছেন।   দেখেন মিডিয়া রিপোর্ট।
    প্রেসিডেন্ট বাইডেন রবিবার বলেন, মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্রাট দলের আশা করা হয় নাই [unexpected] এমন জয়ে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে বৈঠকে তাকে এক শক্তিশালী হয়ে বসতে [stronger position] সাহায্য করবে [US President Joe Biden said Sunday that the Democrats’ unexpected midterm election successes sent him into crunch talks with China’s Xi Jinping in a stronger position. আর ওদিকে প্রায় একই ভাষ্য নিয়ে ব্লুমবার্গের (Bloomberg) রিপোর্টে শিরোনাম হল, Biden Says Senate Victory Gives Him ‘Stronger’ Hand with Xi।  মানে টা হলে এই সিনেটে বিজয় নাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আলোচনায় বসতেন ঠিকই কিন্তু নিজের মনে প্রশ্ন থাকত যে তিনি তো আমেরিকান সংসদের উচ্চ বা নিম্নকক্ষের সমর্থহীন এক প্রেসিডেন্ট। ফলে ছোট মনে হত নিজেকে।  আর সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনের সংসদের কোন কক্ষেই যে তিনি বিজয়ী হতে পারছেন না এটা তিনি মেনেই নিয়েছিলেন।

    তাহলে কীসের ভিত্তিতে বাইডেনের দল গোহারা হারতে যাচ্ছেন এই জল্পনা গড়ে উঠেছিল? এর জবাব দিয়ে এক বিশেষণ রিপোর্ট করেছে রয়টার্স যার বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে প্রথম আলোতে। যার সারকথা হল, এই সমস্যাটা তৈরি করেছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প-ই। মধ্যবিত্ত ভোটারের ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব বা তার রাজনীতি ও কাজ পছন্দ করেন না। তাই যেসব প্রার্থী ট্রাম্পের বেছে নেয়া বা দেয়া বলে ভোটারেরা জেনেছেন তারাই প্রার্থীরাই আসলে হেরে গেছেন। অর্থাৎ রিপাবলিকান দলের পক্ষে জনস্রোত থাকলেও (যেটা বাইডেনও মেনে নিয়েছিলেন আমরা দেখতে পাচ্ছি) ব্যক্তি ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব সবকিছু উলটে দিয়েছেন। এর মানে হল আগামি ২০২৪ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান নমিনেশন পাবার ক্ষেত্রে এঘটনা এক শক্ত রেফারেন্স হয়ে বাদা হয়ে সামনে উঠে আসবে। যার অর্থ হল, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বা বাইডেন কেউ না, বরং  নয়া কোন প্রার্থিরই সম্ভবত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে দেখব আমরা। আর সেই সাথে সাদাবাদিদের আন্দোলন হতে পারে বলে যে আশঙ্কা আমেরিকায় উঠেছিল তা এখন অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে যাবে। সারকথায়, আমেরিকান মধ্যবিত্তের পছন্দই ট্রাম্পের উত্থান বা সাদাবাদি সুপ্রিমিস্টদের উত্থান ঠেকায় দেবার ক্ষমতা রাখে, সেই ইঙ্গিত-ই আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি!!

    শেষ কথাঃ  স্থানীয় বা বাংলাদেশ প্রসঙ্গ;  বাইডেন-শি এর আপোষ আলাপ আর তা থেকে  ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আসা মোটেও আর অসম্ভব নয়। সেটাই ফুটে উঠছে। আবার আমেরিকার মিড-টার্মের ফলাফল যা এসেছে তা আর যাই হোক এথেকে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রভাবিত হবার কোন সম্ভাবনাই নাই। সরকারবিরোধী আন্দোলন থেমে যাওয়ারও কোন সম্ভাবনা নাই। মানবাধিকার প্রশ্নে, যেমন গুম খুন অপহরণ বা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর থেমে যাওয়া বা পথ পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনাই নাই।   বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেলে সরকারের এই যুদ্ধের আড়ালে নিজের সরকার পরিচালনার ব্যার্থতা আড়ালের যে চেষ্টা আছে তা আরো উন্মোচিত হয়ে পড়তে পারে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী এখন শুরু হবে

     

    মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু

    গৌতম দাস
    ০৯ নভেম্বর ২০২২  মধ্যরাত ০১ঃ০০

    https://wp.me/p1sCvy-4iM

     

                                                                                    Russia news: Rattled Putin warns US ‘entering Ukraine

     

    মঙ্গলবার, আট নভেম্বর ২০২২। আমেরিকার ৮ নভেম্বর শুরু হবে আজ আমাদের মধ্যরাত থেকে। এরপরেই আমেরিকায় শুরু হবে তাদের মধ্যবর্তি নির্বাচন মানে, মিডটার্ম ইলেকশনের ভোটাভুটি। যদিও মিডটার্ম বলতে তা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চারবছরের মেয়াদের এতে প্রথম দুবছর বা মধ্যমেয়াদ[midterm] তিনি পার করলেন, এটাই বুঝায়। এই অর্থে তাই মিড [mid] বা মধ্য। কিন্তু এদিন যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটা হল আসলে ৪৩৫ আসনের কংগ্রেস (আমেরিকান সংসদ) এর সব আসনেরই নির্বাচন। শুধু তাই না এটা একই সাথে আমেরিকান সিনেট বা উচ্চকক্ষেরও নির্বাচনও বটে। তবে সেখানে মোট ১০০ আসনের সিনেটের কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হবে; মোটা দাগের হিসাবে এবার মাত্র ৩৫ আসনে নির্বাচন হবে।

    এখন এই ভোটের ফলাফল কেমন হতে পারেঃ
    ফলাফল নিয়ে আগাম-অনুমানি পোল-সার্ভে, তা বহু আগে থেকেই অনেকগুলোই পরিচালিত হয়ে আসছে। সেই নির্বাচনি সার্ভে থেকে প্রকাশিত অনুমিত-ফলাফল বলছে বাইডেনের ডেমোক্রাট দল গোহারা হেরে যাবে। অর্থাৎ কংগ্রেস ও সিনেট দুই কক্ষেই বাইডেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে।  আর এমন পরিণতি, তা মূলত বাইডেনের অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের কারণে; অন্যভাবে বললে আমেরিকান মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবনমান বা লিভিং স্টান্ডার্ডকে বাইডেন নিচে থেকে আরো নিচে নিয়ে ফেলেছেন সেকারণে। তবে এটা ছাড়াও দ্বিতীয় কারণ আছে যে, আমেরিকান ডলারের মান বা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে ফেডারল রিজার্ভের চেয়ারম্যান, তাঁর একশনে সুদের হার টানা ছয়বার লাগাতর বাড়িয়েও এতে লাগাম টানা যায় নাই। বরং সবমিলিয়ে আগামি বছর (২০২৩) একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা [recession] একেবারেই আসন্ন – ওয়ার্ডব্যাংক এনিয়ে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সরব!  ওদিকে আগে ট্রাম্পের শেষ আমলে তাঁর খামোখা জাতিবাদি জিদের বশে আরোপিত চীনা পণ্যের উপর যে বাড়তি শুল্ক (২৫% – ৬৬%)  আরোপ করা হয়েছিল বাইডেনও সেটা পলিসিই চালু রেখেছিলেন। আর এরই কার্যকর ধাক্কার ফল আসতে শুরু করেছিল বাইডেনের ক্ষমতার প্রথম ছয়মাস থেকেই লাগাতরভাবে।

    হাউজহোল্ড এপ্লায়েন্স [household appliance] – একথার মানে, আমেরিকান মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে কেনা যায় এমন – ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, কুকার-ওভান বা মাইক্রোওভান ধরণের পণ্য। যেগুলো, মূলত চীন থেকে আমেরিকায় আমদানিকৃত পণ্য হয়ে থাকে। আর এসবের উপরেই ট্রাম্প আমলে মূলত এই বাড়তি শুল্ক লাগু করা হয়েছিল। আর তা থেকে বাইডেন প্রশাসনের ততপরতা শুরু হতেই বিমুখ হয়ে যায় আমেরিকান সব-ধরণের মধ্যবিত্ত। অথচ ভোটের বাজারে যারা ভোট দিতে আসেন তাদের এক বড় অংশই মানে ‘কার্যকর’ ভোটার হল এই মধ্যবিত্তই। কারণ অনেকবছর থেকেই আমেরিকান নির্বাচনি ট্রেন্ড হল, অন্যশ্রেণী থেকে ভোট দিতে আসা লোকের সংখ্যা আরো অনেক কম হয়ে থাকে।

    ইন্ডিপেন্ডেন্ট  বা স্বাধীন প্রভাবমুক্ত এনালিস্টদের অনুমান বাইডেনের ডেমোক্রাট দল এবার রেকর্ড তৈরি করে হারবে। তাই সিনেট বা কংগ্রেস এদুই কক্ষের কোথাও তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকবে না। যার সোজা ফলাফল হবে বাইডেন অবশ্যই তার মেয়াদের বাকি দুবছরই বিনাবাধায় প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন; কোন প্রভাব পড়বে না। এমনকি আগের মতই প্রেসিডেন্টে হিসাবে তাঁর নির্বাহি ক্ষমতাবলে যেকোন আইনও জারি করে যেতে পারবেন। কিন্তু যেখানে বিলে অংশত বা পুরাটাই অর্থবিল থাকবে মানে যেসব আইনের মধ্যে কোন অর্থবরাদ্দ সংক্রান্ত অংশ আছে সেসব ক্ষেত্রে আইন পাস করতে চাইলে তা আগে ঐ অংশের জন্য  সিনেট এবং কংগ্রেস এদুই জায়গা থেকেই তা পাস করিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ সেগুলো আর পাস হতে হলে এখন রিপাবলিকানদের ইচ্ছা মুখাপেক্ষি হতে হবে বাইডেনকে। ফলে পাস না হবার সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন চাইলেই ইউক্রেন যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কিকে (তার সীমাহীন আকাঙ্খা মিটাতে) দেয়া বাইডেনের অর্থবরাদ্দ এবার রুদ্ধ হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

    অর্থাৎ অন্যদিক থেকে বললে, এতে ইউক্রেন যুদ্ধ এবার বন্ধ হবার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে। অর্থাৎ ইউক্রেনে অর্থ ঢেলে বাইডেনের এই যুদ্ধ চাঙ্গা রাখার যুগের এবার একটা পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। এভাবে সবদিক থেকেই সব ফ্যাক্টরগুলো এই অভিমুখেই সচল হচ্ছে।  যদিও এমনিতেই একদিকে যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের নিজস্ব অর্থনীতিক ততপরতা স্থবির অবস্থায় ফলে সেজন্য ঘাটতির মুখ্য অর্থ সরবরাহগুলো করতে হচ্ছে বাইডেনকে; অন্যদিকে যুদ্ধের ব্যয়বহণ ও বিশেষ বিশেষ অস্ত্র সরবরাহ – সেটাও বাইডেনকেই করতে হচ্ছে। কিন্তু তবু তাতে প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকির মুখের হা বন্ধ বা চাহিদা কম হচ্ছে না, উলটে তিনি প্রকাশ্যে বাইডেনের উপর সমালোচনা ঝাড়ছেন । তাই এনিয়ে প্রায় প্রকাশ্যে এসে পড়া বাইডেনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি।


    কেন বাইডেনের কাছে মিডটার্ম বা ৮ নভেম্বর গুরুত্বপুর্ণঃ
    প্রেসিডেন্ট বুশের শেষ জমানায় এবং  ওবামা জমানা (২০০৯-২০১৬) থেকেই আমেরিকার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যে দুনিয়ায় পালাবদল আসন্ন; অর্থাৎ গ্লোবাল নেতৃত্ব ক্রমশ  আমেরিকার হাত ছাড়া হয়ে চীনের হাতে যেতে নিয়েছে। ওবামার যুগে এনিয়ে তাঁর প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে বলা যায় অনেকটা “বড়-ভাইয়ের চাঁদা তোলার” মত। ওবামা বারবার চীনের কাছে দাবি করে নানান ব্যবসায়িক সুবিধা  বা ছাড় আদায় করে গেছিলেন। চীনও তা দিয়ে গেছিল, কো সংঘাত তখনই মুখোমুখি না করে এড়াতে পারলে নিজের জন্য ভাল হবে বিবেচনা থেকে। আর এদিকে, এশিয়ান পিভোট [Pivot to Asia] বলে হাল্কা চুলকানির মত একটা কিছু চীনবিরোধীদের জোট খাড়া করতে যা কল্পনা করেছিলেন তা বাস্তবে কোন পা ফেলতেই পারে নাই। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগ শুরু হয়। তিনিও প্রথম বছরটা (২০১৭) ওবামার চাঁদা তোলার মতই ‘হপ্তা’ আদায়ের পথেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে সরাসরি চীনবিরোধী তবে  তা আসলে এক আমেরিকান জাতিবাদি-অর্থনীতি কায়েম করতে এক পরিকল্পনা করেছেন মনে করে আদতে একটা ফ্যান্টাসি করেছিলেন। সেটারই এক পরিণতি ছিল যে আমেরিকায় চীনাপণ্যের উপর শাস্তিমূলক আমদানি শুল্ক বসানো। যেটা কার্যত লাগু হয়েছিল, সরকার-প্রশাসনের উপর নয়; বরং নাগরিক মধ্যবিত্ত অংশকেই ঐ বাড়তি শুল্ক যোগাতে হয়েছিল। যেটার প্রতিক্রিয়া পরিণতি এখন বাইডেন দেখবে।
    তবু এতে মূল সংকটটা এখানে নয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যদিয়ে  সুনির্দিষ্ট করে ১৯৮০ সাল থেকেই এক “গ্লোবালাইজেশন” – মানে এক পরিকল্পিত গ্লোবাল প্রডাকশন ও সাথে, এক্সচেঞ্জ [exchange] এরই গ্লোবাল বাজার বিনিময় ব্যবস্থা শুরু বা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হল,  “গ্লোবালাইজেশন” শব্দটা অনেকে অনেক অর্থে ব্যবহার করে থাকে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অর্থটার বাইরেও। সেটা সমস্যা হত না; কিন্তু তাদের সেই “গ্লোবালাইজেশন” ধারণাটা নেগেটিভ। তবে ১৯৮০ সালের পর থেকে খুবই দ্রুত গ্লোবাল প্রডাকশন, এক্সচেঞ্জ বাজার ব্যবস্থা খাড়া হতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশে এর প্রকাশটা কী ছিল এভাবে প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় আমাদের গার্মেন্টস (RMG) কারখানার দ্রুত বিস্তার লাভঃ “মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট” ইত্যাদিতে এটাই ছিল সেই গ্লোবাল ফেনোমেনার লোকাল প্রকাশ। তবে মূলত আমাদের সমাজের কোন অংশই পলিটিক্যালি এর তাতপর্য আমরা বুঝি নাই;  আমাদের সমাজের যারা অর্থনীতি-রাজনীতি বুঝার দিক থেকে ওস্তাদ-হাফেজ বলে  নিজেদের ইমেজ তৈরি করেছে সেই প্রগতিবাদি বামপন্থিরাও আসলে কিছুই বুঝে নাই। তাই ছিল তাদের চোখবন্ধ বিরোধিতা – নিপাত যাক!!  তবু তাদের অবস্থান ছিল “গ্লোবালাইজেশন” এক নেতিবাচক ফেনোমেনা; তাতে “গ্লোবালাইজেশন” জিনিষটাই মূলত কী তারা না বুঝলেও; তবে তাদের মত করে যেটুক আধাখেচড়া বুঝা তা ছিল খুবই নেগেটিভ। সম্ভবত এটাই কারণ কেন এখনও সমাজে “গ্লোবালাইজেশন” এর বুঝ  বলতে নেগেটিভ কিছু বুঝা হয়। যেটা কার্যত কিছুই না বুঝে ফেলে রেখে দেয়া।

    তবে একটা সিরিয়াস কারণ হল কমিউনিস্টরা যারা অর্থনীতি খুবই ভাল বুঝেন বলে মনে করেন, ক্যাপিটালিজমের সারপ্লাস ভ্যালু (surplus value) চুরি হয়ে যাওয়া  যেহেতু তারা বুঝেন বলে মনে করেন; যেটা তাদের শোষণ তত্বের ভিত্তি। ফলে তাদের ধারণা তারা অর্থনীতির বুঝ তাদের একচেটিয়া ও সবচেয়ে ভাল বুঝের লোক তারা। কিন্তু দুঃখের কথা হল, কার্যত ও প্রকৃত অর্থে (in reality) তারা আসলে এক জাতিবাদি-অর্থনীতির বুঝের অনুসারি। যার মৌলিক বৈশিষ্ট হল নিজ রাষ্ট্রসীমার বাইরে কোন পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য একতা ব্যবস্থা থাকা তাদের অনুমানে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়। কারণ,  নিজ কামাবো, নিজেই সবকিছু উতপাদন করব আর নিজেই খাবো বা ভোক্তা হব – তাই নিজ মুদ্রায় যতদুর বিনিময় বাণিজ্য হয় এর বাইরে যেমন কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আর দরকার কী? এই হল তাদের কোর ভাবনা! অর্থাৎ এরা মনে করে কার্ল মার্কসও যেন এক্সচেঞ্জ (exchange) প্রসঙ্গটা নিয়ে যত কথা খরচ করেছেন তা যেন কেবল একটা রাষ্ট্রের ভিতরের ব্যাপার। যেটা যেন আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোন পণ্য বিনিময় নয়। যদিও মার্কস শুধু পণ্য বিনিময় নয়,  বিনিময় বলতে  তিনি মানুষে মানুষের সবকিছুর বিনিময় বুঝাতে যে এক্সচেঞ্জ বিষয়টা নিয়ে এত পাতা খরচ করেছেন এই অর্থে যেন মার্কসের এক্সচেঞ্জ ধারণা যেন এটা একটা রাষ্ট্র বা জাতিসীমায় কাজ করে এমন একটা ধারণা!! তাই কী? আসলে ব্যবহারিক কমিউনিজমে সবচেয়ে অগুরুত্বপুর্ণ ধারনা হয়ে আছে এই  “এক্সচেঞ্জ”  ধারনা। আর জাতিবাদি-অর্থনীতির বুঝে মাত্রই সেই জায়গা যেখানে “এক্সচেঞ্জ”  ধারণাটার প্রায় গুরুত্ব নাই বললেই চলে।
    সম্ভবত একারণেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক গ্লোবাল বানিজ্য ব্যবস্থা যেটা দাঁড়িয়ে আছে তা কমিউনিস্টদের চোখে “নিপাত যাক” প্রতিষ্ঠান। আসলে না জানার সুবিধা অনেক!!! কোন প্রতিষ্ঠান সীমাবদ্ধতা বা কারও দিকে কান্নি মেরে থাকাটা আপনার চোখে বা বুঝে পরিস্কার থাকার মানেই এমন নয় যে আপনি ঐ প্রতিষ্ঠান নিপাত যাক বলতে পারেন। অথবা এমন বলাটা আপনার স্বার্থের পক্ষে যাবেই!!
    কাজেই গ্লোবালাইজেশন মানে গ্লোবালি পণ্যসহ সবকিছুর বিনিময়-বাণিজ্যের কল্পনা – সেটা মূলত স্তালিনসহ সব ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তায় একেবারেই অনুপস্থিত; এবং বলাই বাহুল্য এটাই স্বাভাবিক।  এই কারণেই সম্ভবত  গ্লোবাইলাইজেশন সম্পর্কে তাদের বুঝ নেতিবাচক ও অস্পষ্ট। অথচ দুনিয়া এখন শেয়ার্ড ভ্যালু এডেড (shared value added) প্রডাক্ট এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব দেশ তো বটেই সকলের তা ভোক্তা ও ব্যবহারকারি হবেন উতপাদন এমনই গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে উঠছে। চীনের নেতৃত্বে  RCEP (Regional Comprehensive Economic Partnership, RCEP)  যা মূলত আশিয়ান ও চীনের উদ্যোগে তেমনই এক নয়া জোট। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয়  ফেনোমেনা হল,  এই জোটে অষ্ট্রেলিয়া ও জাপানও এর অংশীদার পার্টনার হয়ে ঢুকে গেছে। অথচ এরা তো আমেরিকান ইন্দো-প্যাসেফিক বা কোয়াডের (QUAD) সদস্য।  যাই হোক, আমাদের মূল প্রসঙ্গে মনোযোগী হই।
    তাই এসব আসলেই বিস্ময়কর যে কেবল রাষ্ট্রসীমার মধ্যে কার্যকর থাকা কোন অর্থনৈতিক ধারণা-চিন্তা এমন চিন্তা কী একটা  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বা গ্লোবালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-বিনিময় ব্যবস্থাকে কী ব্যাখ্যা করতে পারে? কিভাবে?

    গ্লোবালাইজেশন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পঃ
    আশির দশকে গ্লোবালাইজেশন চালু হয়েছিল মূলত আমেরিকান উদ্যোগে। অথচ সেই আমেরিকার এক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই এবার ২০১৮ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি আমেরিকাকে ফিরে এক জাতিবাদি-অর্থনীতিতে নিয়ে যাবেন। বলা যায় তার মূল উদ্দেশ্য চীনের হাতে গ্লোবাল নেতৃত্বে হারানোর বদলে যেন  – তাইলে যুদ্ধেই যাব না যেন এমন এক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প।  তবে চীনের কাছে হার এড়ানোর এই ফ্যান্টাসি – এক জাতিবাদি-অর্থনীতির দিকে চলে যাবার হুঙ্কার এটা কেবল আমরা ট্রাম্পের বেলায়ই দেখিনি। প্রেসিডেন্ট বাইডেন এর মধ্যে তা আছে, কিন্তু অন্যভাবে।  যেমন ট্রাম্প শুধু অর্থনৈতিক অর্থেই জাতিবাদি হতে যান তাই নন। তিনি রাজনৈতিক অর্থেই জাতিবাদি হতে চান। এটাই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white Supremist] (সাদাবাদি, ককেশীয় উগ্র জাতিবাদি আরেক হিটলারিজম) মুভমেন্ট।  বাইডেন প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি। এর আগেই আমেরিকান প্রথা্তমোতাবেক – জয়েন্ট কংগ্রেস  (সিনেট ও কংগ্রেসের একসাথে) জয়েন্ট সেশন সম্মেলন হয় ৬ জানুয়ারি ২০২১। আর এদিনই ঐ “মুভমেন্টের” সমথর্কেরা মিছিল করে গিয়ে বাইডেনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পক্ষে সংহতি জানিয়ে ঐ কংগ্রেস হলই সারাটা দখল করে বসেছিলেন, আমরা দেখেছিলেচিলাম মিডিয়ায়। সাদাবাদিদের মূল কথা হল, বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই তাদের সব দুঃখের কারণ। এভাবে চামড়ার কথা তোলা মানে, আরেক এথনিক জনগোষ্ঠিকে ঘৃণা করা; ঘৃণা ছড়ানো নিচা দেখানো আর নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবা ইত্যাদি এসবই হিটলারিজম – এথনিক ঘৃণা ছড়ানো চরমতম ক্ষতিকর এক জাতবাদ। তাদের ভাষ্য হল, বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই পশ্চিমাদেশে ছড়িয়ে পড়ে সাদাদের কাজ চাকরি ছোট ব্যবসারইত্যাদির সব সুযোগ সুবিধা সব খেয়ে ফেলছে। এই বয়ান ভিত্তিহীন যদিও। কারণ সাদারা আমাদের কলোনি দখল ও লুটেরা শাসন করেছিল। অনেক পরে সেই সুত্রেই কেবল সস্তা শ্রমিকের লোভে ব্যবসা ভাল চলার সময় সাদারা বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেদের তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছিল।  কাজেই এখন তাদের অর্থনীতি খারাপ বলে,   তাই বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই সাদাদের দেশ থেকে বের করে দিতে হবে এটা কোন সাফাই হল না!! হতে পারে না।। অর্থাৎ চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় আজ ক্রমশ আমেরিকার অর্থনীতিতে সারপ্লাস সঞ্চয় (যা ফিরে পন্য-পুজির বিনিয়োগ ক্ষমতা হয়ে এতদিন হাজির হয়ে আসছিল ) আগের তুলনায় তা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই খারাপ সময়ে বহু পেশা বা কাজকে ঢেলে সাজানোর দরকার পড়ছে; এটাই এসব শ্রেণীর জন্য চীনবিরোধী হয়ে উঠা। আর আজ ব্যাপারটাকে তাদের নেতারা দেখে যে,  গত প্রায় ছয়শ বছর ধরে এই সাদা ককেশীরাই দুনিয়াকে কলোনি দখল ও শেষে আমেরিকান নেতৃত্বে শাসন ও শাসক হয়ে থেকেছে। কিন্তু আজ আর সেটা আর বজায় রাখতে পারছে না। কারণ, আজকের চীনা উত্থানের প্রথম অর্থ- তাতপর্য হল সেই সাদা সাম্রাজ্যের পতন।  এজন্যই তারা  হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট  মুভমেন্ট শুরু করেছিল   ট্রাম্প-কে মাথায় উপরে  উঠিয়ে রেখে যদিও সেটা  ট্রাম্পের অধীনেই এক এলায়েন্স গড়ে নিয়ে।

    মজার কথাটা হল, বাইডেনও আসলে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট  মুভমেন্ট – এর মধ্যেই সমাধান দেখেন। যদিও ট্রাম্পের থেকে তার অনেক জায়গায় তফাত আছে। যেমন ট্রাম্প জাতিবাদি-অর্থনীতির দিকে এক অলীক চিন্তা নিয়ে এক ফ্যান্টাসি করতে চান। কিন্তু এখানে বাইডেনের চিন্তাটা হল, চীনের উত্থান ঠেকাতে সারা ইউরোপকে সাথে জোট গড়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ানো। সেখানে ঐ ঐক্যবদ্ধতা হতে হবে আসলে সাদাবাদের ভিত্তিতে; ছয়শ বছর ধরে চলে আসা দুনিয়াকে যে সাদা ককেশীরাই এতদিন শাসন করে আসছে, ফলে তাকে এখন হারতে না দেয়া। দরকার হলে চীন-রাশিয়াকে একঘরে করে নিজেদের এক আলাদা জগত নির্মাণ করতেও তারা রাজি; এবং তা গ্লোবাল অর্থনীতির একটা ভগ্নাংশ হলেও সাদাদের নেতৃত্বে বাকি যারা আসে কেবল তাদের নিয়ে এক ভগ্ন-গ্লোবাল অর্থনীতি করে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হবে। মূলত ক্ষমতায় আসার আগে  থেকেই এটাই বাইডেনের মূল পরিকল্পনা।
    এই লক্ষ্যে তার হাতিয়ার রাষ্ট্র বা বলি হয়ে যাওয়ার মত রাষ্ট্রটাই হল ইউক্রেন। শুরুটা হবে ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্ধুক রেখে রাশিয়াকে একঘরে করার উদ্যোগ নিয়ে। আর এতে চীন রাশিয়ার সমর্থনে এসে দাড়ালেই বাইডেন নিজ পরিকল্পনা মাফিক আগিয়ে যেতে পারবেন; এই ছিল অনুমান। কিন্তু হায়, বাইডেনের শাসনের আরো দুবছর বাকি থাকতেই, প্রথম দুবছরের মধ্যেই বাইডেন এখন হার স্বীকার করে পিছু হতে যেন উদ্যত তা দেখা যাচ্ছে। আলামত হল, বাইডেন পিছু হটতে একেবারে রেডি হচ্ছেন।

    ইতোমধ্যেই জর্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শুলৎজ [Olaf Scholz] এর চীনা সফর ছিল এর বড় ইঙ্গিত। তিনি এমাসেই ৪ নভেম্বর গত শুক্রবার চীনে গেছিলেন আর তার দাবি তিনি জি৭ ব্লক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছেন। জি৭ (G7 Group) যা আসলে এক পশ্চিমা এককালের ধনীরাষ্ট্র জোট যা জাপানকে সাথে নিয়ে থাকলেও কার্যত তা এখন সাদা ককেশীয় জোট হয়ে গেছে। চ্যান্সেলরের  সার-প্রস্তাব হল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা। আর সেকাজে তিনি চান চীন একটু রাশিয়া থেকে দুরত্ব- নিরেপেক্ষতা তৈরি করুক যাতে জি৭ – চীনের মাধ্যমে (পাগলা ও ক্ষিপ্ত পুতিনকে ঠান্ডা করতে) একসাথে কাজ করতে পারে। যদিও রয়টার্স লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি যদিও তাদের দুজনের সাক্ষাতে প্রতিউত্তরে – রাশিয়ার কোন সমালোচনা করেন নাই; অথবা রাশিয়ান সেনা প্রত্যাহার নিয়েও কোন মন্তব্য করেন নাই [……though he refrained from criticising Russia or calling on Moscow to withdraw its troops.]। তার মানে শুলৎজ এর এটা ছিল মিডিয়া প্রপাগান্ডা নিবার জন্য কাভারেজ।

    এখানে এনিয়ে এক এক করে  দুইটা রয়টার্সের নিউজ আগ্রহিরা দেখে নিতে পারেন।  একই সাথে এনিয়ে বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর ঘোষণা নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টও সাথে পাবেন। তিনি বলছেন যার খবরের শিরোনামঃ “জি৭ এখন পরিস্কার যে চীনের সাথে তাদের সমন্বয়-সমঝোতা করতে হবে এটা বুঝে গেছে” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China। 

    মজার কথা হল এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দেয়া চীনকে একঘরে করার বক্তব্যের বিপরীত।  শুধু তাই না ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইতোমধ্যে আমেরিকা ইউক্রেন সরকারকে পরামর্শমূলক বার্তা পাঠিয়েছে। এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]।

    ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে করুণ অবস্থান নেয়া মিডিয়া হল আজ-জাজিরা। আল-জাজিরা ২০০৫ সালে জন্মের সময় থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে একে ফলো করি। এটা অকল্পনীয় যে সে এই যুদ্ধে এক আমেরিকান পাপেট মিডিয়া হয়ে যাবে। যেমন রয়টার্স সেও তো এক পশ্চিমের সংবাদ সংস্থাই, তাই না। অথচ নিরপেক্ষ এবং জার্নালিজম বলতে যা হওয়া উচিত সেটাই রয়টার্স হয়ে থেকেছে। কিন্তু আলজাজিরার অবস্থা খুবই দুঃখজনক  ও করুণ। সেই আলজাজিরা এবার ইউক্রেন যুদ্ধকে রিপোর্ট করতে গিয়ে যেন ত্যার কাজ হল আমেরিকা বা পশ্চিমের করার ঠিকা পেয়েছে। যেন আল-জাজিরা এক ঠিকাদারের নাই যে আর “জার্নালিজম” করে না। অথচ এই প্রথম তারা পশ্চিম থেকে দুরত্ব তৈরি করতে চাইছে। তাদের রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে As inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!

    কেন আগামি শীতে কীঃ
    আপাতত বাইডেনের সব পরিকল্পনা ফেল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে নিয়েছে। সেটা যে কারণে তা হল সারা ইউরোপই আসলে জ্বালানির প্রশ্নে মারাত্মকভাবে রাশিয়ান তেল-গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। বলা যায় ইউরোপ আসলে কার্যত রাশিয়ান জ্বালানির নির্ভর এক অর্থব্যবস্থা। এমন সবচেয়ে প্রভাবশালী ও কঠিন সত্যিটাই  আসলে বাইডেন এতদিন অস্বীকার করেছেন, তারমত করে নেয়া সাদা শ্রষ্ঠত্ববাদি কেন্দ্রিক এক পরিকল্পনায়। তিনি ভেবেছিলেন আমেরিকার ইউরোপের সাথে সাদা ককেশীয় ঐক্য আর সমস্বার্থ দিয়েই তিনি ইউরোপের  জ্বালানির নির্ভরতা-সহ সব বাধা পার হয়ে যেতে পারবেন। অথচ এটা ছিল চরমতম আবেগী কথা। হয়ত আবেগী বলেই তা ককেশীয় জাতিবাদি সুরসুরিতে  তারা জেগে উঠতে চাইছে সেটা জ্ঞাত থাকা ইউরোপকেও বাইডেনের মিথ্যা পরিকল্পনার পক্ষে থাকতে আগ্রহি করেও তুলেছিল। আর এই অবাস্তব দগদ্গে জাতিগত-আবেগেই পশ্চিমের মৃত্য ও পতনের কারণ হবে সম্ভবত!

    তাহলে বাইডেনের পশ্চাদ অপসারণ, পুতিনকে রাজি করানো কী সম্ভব হবে?
    তাতক্ষণিক জবাব হল, অবশ্যই না। পুতিন রাজি হবেন না। কিন্তু কতদিন ও কেন?

    পুতিন মোটা দাগে বললে,  জানুয়ারির ১৫ তারিখের আগে কিছুই থামাবেন না। কেন?

    সাধারণত ইউরোপের ক্ষেত্র গড় হিসাবে বললে, ১৫ ডিসেম্বর-১৫ জানুয়ারিতে অঞ্চলের তাপমাত্রা চরমে উঠে, সেটা মাইনাস ৪০ ডিগ্রির দিকেও চলে যায়। কাজেই বলাই বাহুল্য জ্বালানিহীন ঘর গরম রাখার ব্যবস্থাহীন ঘরবাড়ি  – এই ইউরোপের ইউরোপিয়ানেরা দেশ ছাড়বেন। বিশেষত কিয়েভবাসীরা [Kiev] তাদের দেশঘর ছেড়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে ছুটবে। তখন পুতিন ইউরোপকে  এক পরীক্ষায় ফেলে দিতে চান। এটা দেখাতে যে তারা কেউই আসলে ইউক্রেনকে পছন্দই করেন না। তাই এই শীতে তারা মাইগ্রেট করতে ইউরোপের পড়শি বাকি দেশে ঢুকতে চাইলেও পারবেন না। প্রথমত তারা মাইগ্রেসনের জন্য উপযুক্ত ভিসা অনুমতি অন্তত সীমিত করে দিবে। ইতোমধ্যেই যা শুরু হয়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যেই কিয়েভ-কে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলা হয়েছে। কারণ, রাশিয়ান বোমায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র  (৩০%) অচল হয়ে অন্ধকার হয়ে গেছে। ইউক্রেনের বাইরের ইউরোপ যে ইউক্রেনের সাথে নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে অভিনয় করে গেছে –  এই করুণ দৃশ্য সবার সামনে উন্মোচন করে না দিয়ে পুতিন যুদ্ধ থামাতে চান না। যদিও যুদ্ধ তিনি থামাবেন অবশ্যই তবে এর পরে।

    ওদিকে জাপানসহ  জি৭ গোষ্ঠি  চীনের কাছে আবেদনে যে যুক্তি তুলে ধরেছে তা হল, গ্লোবাল মহামন্দা ধেয়ে আসছে। যেটা অনেক আগে থেকেই বিশ্বব্যাংকের ফোরকাস্ট যে ২০২৩ সাল মহামন্দার বছর হবে। বহু দেশেরই খাদ্য যোগাড়ের অবস্থাই থাকবে না। আর ইতোমধ্যে ৯% এর আশেপাশে উঠে যাওয়া মুদ্রাস্ফীতি সহসাই কমছে না। বরং আসন্ন মহামন্দাটাই হয়ত  মুদ্রাস্ফীতি কমার একমাত্র উপায় হয়ে হাজির হবে!! কাজেই তা ঠেকাতে বা প্রভাব কমাতে, চীনসহ রাষ্ট্রগুলো একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিবার আবেদন করতে চাইছেন তারা।

    কথা সত্য অবশ্যই। তবে আসলে এই উছিলাতেই বাইডেন তাঁর ব্যর্থতার দায় আড়াল ও হাল্কা  করার সুযোগ নিতে চান। কারণ গত ছয় মাস ধরেই তো এটা সবার জানাই যাচ্ছিল যে এসব বিপদ দুনিয়াতে আসন্ন; তাহলে এখন এত দেরিতে একশন কেন? কারণ ৮ নভেম্বর মিডটার্ম! মিডটার্মের নির্বাচনে মানে এর ফলাফলে যেন বাইডেনের ব্যর্থতা যেন নয়া চাপ না হয়ে যায় – এই ছিল বাইডেনের সংকীর্ণ বিবেচনা।  কাজেই আটই নভেম্বরের পর থেকে বাইডেন এখন পুরাপুরি রিভিউ এর মুডে মানে গত দুবছর যে সব পলিসির মুডে ছিলেন সেসবেরই পুনঃ মুল্যায়ন  চলে যাবেন তিনি, বা ইতোমধ্যেই গেছেন। এসব কারণের ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এতিম হয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • পাকিস্তান সেনাবাহিনী জনগণের মুখোমুখি 

    পাকিস্তান সেনাবাহিনী জনগণের মুখোমুখি

    গৌতম দাস

    ০৭ নভেম্বর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4hH

     

              COAS General Bajwa approached US after taking authorisation from PM Shahbaz Sharif

    [সারকথাঃ  একটা মনার্কি (monarchy) বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে যেকোন রিপাবলিক রাষ্ট্র; এর ক্ষমতার একমাত্র উতস হল জনগণ। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা-আকাঙ্খাই হল রাষ্ট্রক্ষমতার উতস! তাই, এমন রাষ্ট্র মাত্রই ওর যেকোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আর সাথে এর নির্বাহি ক্ষমতার প্রশাসন বা বিচার বিভাগ বা সেনা প্রতিষ্ঠান সকলেই তাদের সকল নির্বাহী ক্ষমতা অবশ্যই সেই গণক্ষমতার অধীন। এই বিচারে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকেও জনগণের ক্ষমতার অধীনস্ততা মানতেই হবে। জনগণের কাছে,  গণক্ষমতার কাছে জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততায় থেকে কাজ করতেই হবে। কিন্তু বর্তমান পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেনাকর্তারা যেন মনে করতে চান যে তাদের কোন সদস্য বা জেনারেলের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সিভিল আদালতে মামলা করা যাবে না।
    এটা সত্যি যে সেনাসদস্যরা দেশ সুরক্ষা করার কাজে (যেমন কোন বিদেশি মানুষ খুনের মত) কোন অপরাধ করে বসলে যেটা সিভিল আইন আদালতের চোখে  ক্রিমিনাল অপরাধ হলেও এর জন্য তাদের কোন সদস্যের বিচার সিভিল আদালতে হবে না। এধরণের পেশাগত অপরাধের ক্ষেত্রে মনে করা হয় এমন বিষয়াদি সেনাদের “নিজস্ব কোর্ট মার্শাল” এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আইন-অপরাধগত দিক পরীক্ষা করে দেখা হবে।  কিন্তু সাবধান এর মানে এই নয় যে সেনাসদস্যদের যেকোন অপরাধ দেশের প্রচলিত আইন-আদালতের উর্ধে ।  কোন সেনাসদস্য যদি কোন সিভিলিয়ান যেমন কোন রাজনীতিবিদকে খুন করে সেক্ষেত্রে কী তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ সিভিল প্রসাশন ও বিচার বিভাগের কাছে চাওয়া যাবে না! তাদের জন্য কী পুলিশ আদালত সব মাফ – এসব সিভিল প্রতিষ্ঠানগুলো সেনা সদস্যদের কোন সিভিল নাগরিকের বিরুদ্ধে করা অপরাধ আমল করতে পারবে না? সেনারা কী সবধরণের আইন-আদালতের উর্ধে???? এটা হতে পারে না।
    বর্তমান সেনাপ্রধান ও সেনাগোয়েন্দা (ISI) প্রধান নিজেদেরকে এমন সবকিছুর উর্ধে গণ্য করে ধমকিয়ে চলতে চাইছেন। এটা অগ্রহণযোগ্য; তারা কোন স্বয়ম্ভু ক্ষমতার অধিকারী নন। তারা এক মুহুর্তের জন্যও ভুলে যেতে পারেন না যে  রাষ্ট্র এর ক্ষমতার একমাত্র উতস জনগণ।  ফলে শেষ বিচারে কোন না কোন জনপ্রতিনিধি বা জনপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততায় থেকে কাজ করতেই হবে। জেনারেলদের এমন অনুমান যে তারা গণক্ষমতার উর্ধে, এই অনুমানে আচরণ – আর সেখান থেকেই সব সংকট এবং তা এক গভীর সংকট পাকিস্তানের আকাশে অন্ধকার হয়ে নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে। ]

    ঘটনা সংক্ষেপ হলঃ
    পাকিস্তানের অন্যতম রাজনৈতিক দল ইমরান খানের পিটিআই দলের এক রাজনৈতিক কর্মসুচীতে মিছিলের উপরে আততায়ীর বড় রাইফেলসহ গোলাগুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে।  এতে অন্তত একজন কর্মী নিহত হয়েছে সাথে সাতজন আহত। আর মুল লক্ষ্যবস্তু ছিল খোদ ইমরান খান। তাঁর উপর ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তাঁর পায়ে লেগেছে। তাও লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কারণ এক পিটিআই কর্মী সময়মত পিস্তলের উপর থাবা দিয়ে ওর অভিমুখ বদলে দিয়েছিল – এর ভিডিও এখন দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে। এদিকে এটা রুটিন যে  প্রত্যেক গোলাগুলি ও খুনের ক্রিমিনাল ঘটনা পরবর্তিতে যে মামলা হয় (FIR)  তাতে ক্ষতিগ্রস্থ ও ভিকটিমেরা তাদের সন্দেহ যাদের উপর তাদের নাম উল্লেখ করে থাকে।  আততায়ীর এই জানের উপর হামলা থেকে বেচে যাওয়া ইমরান খান তিনজনকে মূল সন্দেহভাজন বলে চিহ্নিত করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এই বন্দুক হামলার পেছনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফয়সাল দায়ী” ।  এটা যেকোন মামলায় সাধারণ প্রাকটিস যে ভিকটিমদের দেয়া সন্দেহভাজনদের নাম এফআইআরে লেখা হয়। আর এফআইআর মানেই প্রমাণিত অপরাধী নয়। ভিকটিমের সন্দেহ মাত্র। যা পরে ইনভেস্টিগেশনে পরিস্কার হবে ও এনিয়ে পরে বিচার শুরু হবে। অথচ সেনাপ্রধান ও সেনাগোয়েন্দা (ISI) প্রধান প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে  নানান ন্যাস্টি চাপ সৃষ্ট করে যাচ্ছেন যেন ঐ  এফআইআর গৃহিত না হয়। যেন সেনাবাহিনী সবকিছুর উর্ধে – তারা পাবলিকের জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততাতেও নয়। রাষ্ট্র সরকার প্রশাসন কিছুই তাদের উপরে কার্যকর নয়।  এই মনোভাব একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
    উলটা করে বললে যেন সেনাসদস্যরা কেবল নিজেরা নিজেদের পরিচালিত কোর্ট মার্শালের অধীনে আর কোর্ট মার্শাল হয়ত সেনা প্রধানের অধীনে হলেও খোদ সেনাপ্রধান যেন নিজে আর কোন জনপ্রতিনিধির অধীনে নয়!!!
    প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে এই প্রথম পাকিস্তানের আম-পাবলিক সেনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলে গেছে। এখানে এই টুইটারে দেখা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ পাবলিক কিভাবে এক পাকিস্তানি ট্যাংকের উপরে উঠে তাঁর ক্ষোভপ্রকাশ করছে। বলাই বাহুল্য এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইমেজ কোথায় নেমেছে সেই খারাপ ইঙ্গিতও ফুটে উঠেছে। অথচ সেনাকর্তাদের মধ্যে এই গণবিচ্ছিন্নতার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন এর কোন প্রমাণ দেখা যায় নাই!

    ঘটনা বিস্তারেঃ
    পাকিস্তানের রাজনীতি আবার চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কার্যত এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্লোবাল চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বের এক  লোকাল তবে নোংরা নাট্যমঞ্চ। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কেলেংকারির ঘটনাটা হল, পাকিস্তান আর্মি যেভাবে মরিয়া হয়ে নিজেকে ন্যাংটা করে মেলে ধরেছে। অনেকে বলেন পাকিস্তানের আর্মি হল, উপরে আল্লাহ’র পরেই যার স্থান। পরিণতিতে এবার এই প্রথম দেখা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ পাকিস্তানি জনগণ নিজ আর্মির গাড়ি ভাংচুর করেছে, লাথি মেরেছে। যা কোনভাবেই কোন ভাল ঘটনা নয়! অর্থাৎ অন্যভাবে বললে, পাকিস্তানের আর্মির উপর  আমেরিকান চাপ ও তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার পক্ষে খেদমতে নামতে গিয়ে জেনারেল বাজওয়া ও অন্য জেনারেলেরা আবার গণবিরোধী অবস্থান  নিয়েছেন। গণ-ইচ্ছাকে পায়ে দলে আমেরিকান ইচ্ছার সাথে শাহবাজ ও জেনারেলদের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া শাসকদের ইচ্ছা মাখিয়ে নিয়ে এক দাগী-আসামির মত দাগী-ক্ষমতা [despotic power] হয়ে জনগণের উপর চড়াও হয়েছে।

    পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকে এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে “সেনাবাহিনী” নামে ডাকার রেওয়াজ নাই। খোদ সরকার বা বিরোধীদল একে স্টাবলিসমেন্ট (প্রতিষ্ঠান) বা ইন্সটিটিউশন বলে ডাকে ও এসব শব্দ ব্যবহার করে মিডিয়ায় সেনাবাহিনী শব্দটা বুঝানো ও লেখা হয়। যেন এটা একটা non-person তবে একটা প্রতিষ্ঠান মাত্র।   এতদিন এভাবেই সেনাবাহিনী ভয় উতপাদন করে চললেও মানুষজন এনিয়ে আর ঘাটাত না। কিন্তু এবার সেই সীমাটাও খোদ জেনারেল বাজওয়া এন্ড গং বিশেষ করে, তাদের সেনাগোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আইএসআই [ISI] নিজেই ভেঙ্গে দিল।

    আমাদের মত দেশে সব সেনাগোয়েন্দা সংস্থা কেন্দ্রিক এক কমন প্রবলেম হল যেখানে প্রতিষ্ঠানটার ঘোষিত কাজ হল রাষ্ট্রকে বাইরের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার পক্ষে কাজ করা আর এজন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, তা বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে তা ব্যবহার করা। মূলকথা এর কাজ বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে ততপরতা। মানে ধরে নেয়া আছে দেশের ভিতরের আপন জনগণ অবশ্যই কোন রাষ্ট্র-শত্রু নয় বরং আভ্যন্তরীণ জনগণ শত্রু হবে কেন?  তা হওয়ার কারণ থাকতে পারে না। তবে দেশের ভিতরে অপরাধী থাকতে পারে যাদেরকে সামলানোর জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে  আভ্যন্তরীণ নানা বাহিনীর পুলিশ প্রশাসন আছেই।
    কিন্তু না এই আদর্শ ধারণা বা কেমন হওয়া উচিত ধারণা আমাদের ম৫ত দেশে থাকে না। দেখা যায় সেনাগোয়েন্দা সংস্থা আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ঢুকে পরে আর আভ্যন্তরীণ সমাজও তার কাজের ক্ষেত্র; এমন মনে করতে শুরু করে থাকে। আর একাজে সাধারণত এই সমস্যাটা তৈরি করে থাকেন ক্ষমতার প্রধান নির্বাহি হিসাবে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট যেই থাকেন তিনি। কারণ তিনি দেশে তাঁর সরকারের রাজনৈতিকবিরোধীকে খোদ দেশেরই বিরোধী যেন এভাবে  তারা  রাষ্ট্রবিরোধী বলে চালিয়ে দিতে চান। এখান থেকেই সব সমস্যার শুরু হয়। সব স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের জন্ম হয় এখান থেকে।  অথচ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক-বিরোধীতা তা কোনভাবেই রাষ্ট্রবিরোধীতা নয়।
    আইএস এর ততপরতার যুগে সেনাগোয়েন্দা সংস্থা বড়জোর আভ্যন্তরীণ সিভিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে নিজ সংগৃহিত তথ্য শেয়ার করতে পারে, ব্রিজ-রিলেশন বা সমন্বয় করতে পারে।  কিন্তু সেই তথ্য সিভিল গোয়েন্দারা কিভাবে সিভিল জবাবদিহিতার সাথে ব্যবহার করবে এটা তাদের হাতেই ছেড়ে রাখতে  হবে। কিন্তু  সেনাগোয়েন্দা সংস্থা এখানে সিভিল নাগরিকদের সমাজেও ততপর থাকতে চায়। আর এখান থেকেই সমস্যা কঠিন ও জটিলতর সমস্যা হয়ে যায় যেটা তো হবেই; এতে প্রশাসনিক কাঠামো আর আইন ও বিধি (বিজনেস রুল) নির্ভর থাকবে না। ব্যক্তিইচ্ছা নির্ভর অপেশাদারিত্বে সব ভরে উঠবে।

    এই কমন সমস্যা আমাদের মত দেশগুলোতে কমবেশি সকল দেশেই বর্তমান। মূল সংকটটা হল, সিভিল প্রশাসনের অধীনের পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার জবাবদিহিতা আলাদা হলেও আইডিয়ালি বা কি এর হওয়া উচিত এই অর্থে বললে, সিভিল জবাবদিহিতার ভিত্তি হল কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক অধিকার রক্ষামুখি হয়ে ততপরতা ও তা মান্য করা এবং এই মান্যতায় এরা চলতে বাধ্য। অথচ সেনাগোয়েন্দা সংস্থার কাঠামো এমন নয়। কারণ তাদের প্রকৃত “ডিল করার সাবজেক্ট” তো আভ্যন্তরীণ জনগণই নয়; বরং দেশের বাইরের শত্রু। তাই উলটা বরং তাদের আভ্যন্তরীণ জনগণকে নিয়ে টানা-হেচড়া করাটাই অপরাধ। এটা তার নো গো [no go] এরিয়া। অথচ এই নো গো এরিয়াতে গিয়েই বারবার সেনাগোয়েন্দা সংস্থা ক্ষমতা অপব্যবহার করে আর হোঁচট খায়।

    পুরান তর্ক রাজনীতিতে সেনাবাহিনীঃ
    এই প্রসঙ্গটাকে অনেকে সামরিক শাসন অবৈধ আর বেসামরিক হলেই তা বৈধ – এমনই এক সামরিক-বেসামরিক তত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করত আমরা দেখেছি। যেমন শেখ মুজিবের বাকশাল ঘোষণা – তিনি নিজেই  আগে প্রধানমন্ত্রী থেকে পরে আপনাতেই এক প্রেসিডেন্ট হওয়াটাকে বৈধ বলা হয়েছিল; কারণ নাকি তিনি সিভিলিয়ান। আর ওদিকে ১৫ আগষ্টের ১৯৭৫ সালের পর থেকে যত সামরিক শাসন কায়েম সব অবৈধ – এই তত্বের জনক ছিল প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান। তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা যাচ্ছে এনিয়ে প্রবক্তাও এখন কম। যদিও রাষ্ট্র নিয়ে সিরিয়াস আলোচনার মুরোদ না থাকাতেই এধরণের নিম্নমানের আলোচনা চালু হয়েছিল। আসলে  রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ কিভাবে বিচার করতে হয় কেমন করে এই বোধের মারাত্মক অভাব। বলা যায় এক শুন্যতা বিরাজ করে এখানে। যেমন কনষ্টুটিউশনে সংশোধনী এনে বাকশাল ঘোষণা করে দেওয়াতে মূল যে অঙ্গ-হানি যা করা হয়েছিল সেটা হল, আগের কনষ্টিটিউশনে দেয়া থাকা নাগরিকের রিট করার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল বাকশাল সংশোধনী ঘোষণাতে। সাথে আদালতেরও মানে বিচারকদেরও নাগরিকের রিট আবেদন শোনার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আর নাগরিকের রিট করার অধিকার না থাকা মানে কার্যত সেটা আর কোন রাষ্ট্রই থাকে না। কারণ তাতে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আগে তা আইনতই আর কার্যকর না থাকা।  যার সোজা মানে ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রগঠন ও কনষ্টিটিউশনের সমাপ্তি টেনে দেওয়া হয়েছিল ঐ বাকশাল সংশোধনী এনে। অথচ বাকশাল –সমর্থকেরা আজও গলাবাজি করে। আর সমস্ত ক্ষোভ গিয়ে উগড়ে দেয় সেনাবাহিনীর উপর। যেন সেনাবাহিনীই বাকশাল কায়েম করেছিল। তবে লক্ষণীয় যে ২০০৭ সালের সেনাশাসনের সুবিধাভোগী বর্তমান সরকার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখন সেনাবাহিনী নিয়ে একেবারে চুপ হয়ে গেছে।

    তাহলে আমাদের মত দেশে সেনাশাসন ঘটার মূল কর্তা কে?
    এককথায় এর উত্তর আমেরিকা; যেটা মূলত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন। ইউজুয়ালি  এবং এখনো আমেরিকা সেনাশাসনের প্রধান পৃষ্টপোষক!  গ্লোবাল রাজনীতিতে সেকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর একালে চীনের বিপরীতে আমাদের মত দেশে প্রভাব-বিস্তারের ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য সহজ পথ এটা। তবে একটা মজার উদাহরণ হল, পাকিস্তানে ১৯৯৯ সালে জেনারেল মোশাররফের ক্ষমতা দখল। সেটাই প্রথম আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাকিস্তানে সেনা ক্ষমতাদখল। যদিও এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য দায়ী ততকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যার আসকারায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সেনা বিভাজনের নীতি-পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঘটেছিল সেই ক্ষমতা দখল। তবে  ২০০১ সালের নাইন ইলেভেনে টুইনটাওয়ার হামলার পরে আমেরিকা আগের মতই সেনাশাসনকে আপন করে নিয়েছিল।

    সেনা প্রতিক্রিয়া অপেশাদারি,  অগ্রহণযোগ্যঃ
    বর্তমানের পরিস্থিতিতে  পিটিআই দলের নেতারা সরাসরি জেনারেলদেরকে অভিযুক্ত করছেন দেখা যাচ্ছে।  কিন্তু এর মানে কী এখন জবাবে জেনারেলদেরকে রাজনীতিকদের উপর প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে উঠতে হবে? তাদেরকে পালটা নিজহাতে শাস্তি দিতে দন্ড নিজ হাতে নিতে হবে?  এটা হতে পারে না। কিন্তু ঠিক এজিনিষটাই ঘটে গেছে।  “এই হামলাকে ইমরান খানের ‘তৎপরতার কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়া’ পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ‘চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ইমরানের লং মার্চ ও জনসমাবেশ ক্ষমতাসীনদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে তাঁর সমর্থকেরা ‘স্টাবলিশমেন্টের’ বিরুদ্ধে ইমরানকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, এদের ষড়যন্ত্রের কারণেই ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। ফলে ইমরান খানের ওপর এই হামলায় তার সমর্থকেরা আরও বিক্ষুব্ধ হবেন”।

    অথচ আইএসআইয়ের প্রধান নাদিম আনজুম, তিনি ইমরানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে অপেশাদারি কাজ করেছেন। এমনিতেই অতীত রেকর্ড বলছে এমন বক্তব্য সবসময় আইএসপিআর [ISPR] এর তরফ থেকে দেয়া হয় না। তাহলে এবার আইএসআই-এর প্রধানকে তা দিতে হল কেন? কোন দায়ীত্ববান মানুষের কাজ এটা হলে পারে না যে তিনি টেনশন বাড়ানো জন্য কোন কাজ করেন! তিনি সরকারি কর্তা অন্তত এটুকু তাঁর মনে রাখা উচিত ছিল।  তবে সবচেয়ে অন্যায় করেছেন তিনি পাবলিকের বোধবু্দ্বিতে আস্থা রাখেন নাই। তিনি কোন রাজনীতিকের সাথে সরাসরি অহেতুক বাকবিতন্ডায় গিয়েছেন। তিনি কোন অন্যায় অপরা্ধ না করে থাকলে তো নিজের উপর আস্থা রাখা উচিত ছিল।
                                                                                          আইএসআইয়ের প্রধান নাদিম আনজুম; তিনি প্রথা ভেঙে ইমরানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

     

    এই প্রতিহিংসা অগ্রহণযোগ্য ও জেনারেলদের অসদাচরণের প্রমাণঃ
    পাকিস্তানের রাজনীতিতে মূল তর্ক মানে এর পিছনে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক লড়াই – তাতে তা চীন-আমেরিকার লড়াই হয়ে আছে। যেমন সেটা হল, সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] এর এবছরের সম্মেলন চীন-রাশিয়া-ভারত এই জোট মেরুকরণ হয়ে যায় যা বলাই বাহুল্য বাইডেনের চলতি ততপরতাগুলোরই প্রতিক্রিয়া। আর এখানেই পাকিস্তান ও ভারত (যারা দুই রাষ্ট্রই SCO এর সদস্য সেই সুত্রে)   দুই রাষ্ট্রই একসাথে ঐ মেরুকরণে সামিল হয়ে যায়।  ফলে এই মেরুকরণকে দুর্বল করতে বাইডেন প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে খাড়া করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে অন্তত ও আপাতত বাইডেন সফলতা দেখতে পাচ্ছে। কারণ, মুসলিম লীগ (নওয়াজ) আর পিপিপি বা ভূট্টোর দল যারা আবার ইমরানের দলের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ এরা, আগে থেকেই আমেরিকান সমর্থনে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার অপ-ততপরতায় লিপ্ত ছিল। সেই এপিসোডে ইমরান খান সরাসরি দক্ষিণ-পুর্বএশিয়ার আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড ল্যু এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নাক-গলানোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুলেই ক্ষমতা ত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ (নওয়াজ) আর ভূটোর দল যারা মূলত উভয়েই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আর নাহলে পেন্ডিং দুর্নীতির মামলার আসামি – অথচ আমেরিকাকে এই দুনীতিবাজ দুই দলকেই সঙ্গ দিয়ে তাদেরকেই বেছে নিতে হয়েছিল নিজস্বার্থ হাসিলের পথে আগাতে হয়েছিল।  সারকথায় আমেরিকাকে অনৈতিকতা সাথে নিয়ে হেটেছে আর সাথে সেনা প্রতিষ্ঠানকেই নিয়েছে নিজের অসৎ উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে। অথচ সেটা এমন এক সময়ে যেখানে সারা পাকিস্তানে ইমরান খান জনস্বার্থের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আসলে বাইডেনের আমেরিকার রাজনীতি এতই দেউলিয়া দশা যে তাকে পাকিস্তানকে প্রভাবিত করতে হচ্ছে খারাপ রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে যাদের পাবলিক রেটিং সর্বনিম্ন!!! সেকারণে, প্রতি মুহুর্তে ক্ষমতাসীনেরা যত ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ বা ততপরতা করছে এর দায়ভার  আমেরিকার উপরও বর্তাচ্ছে। এভাবে চলে পাকিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ কতদুর কী হাসিল হতে পারে???

    ওদিকে সেনা প্রতিষ্ঠান যে অসদাচরণ ও প্রতিহিংসায় জড়িয়েছে এর একটা বড় প্রমাণ হল সিনেটর আজম সোয়াতি [Azam Swati ] এর সাথে জেনারেলদের আচরণ। আজম পিটিআই দলের সিনেটর। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ ও তার ছেলে অর্থপাচার মামলার আসামি ছিলেন। এর বিচার আদালতের শুরু হবার মুহুর্তে তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন। এবং বিরোধীদের অনুমান ও অভিযোগ যে, ক্ষমতায় এসেই তিনি আমাদের দুদকের মত তাদের প্রতিষ্ঠান [FIA] কে প্রভাবিত করে নিজেরা বাপ-ছেলে ঐ মামলা থেকে নিজেদের মুক্ত বা জড়িত নয় বলে এফআইএ এর তরফ থেকে সার্টিফিকেট যোগাড় করে নিয়েছেন।
    ঘটনার শুরু এরপর থেকে এটা নিয়ে!  কারণ, সেনাপ্রধান বাজওয়া শাহবাজ বাপ-বেটার দায়মুক্তিতে তাদের কে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। আর এটা নিয়ে বাকা কথায় টুইটারে স্টাটাস দিয়েছিলেন এই  সিনেটর আজম সোয়াতি। আর এর প্রতিক্রিয়ায় সেনাপ্রধান বাজওয়া প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠেন। তিনি আমাদের দেশের মত সাইবার মামলা দায়ের করান আজমের বিরুদ্ধে, শুধু তাই না। তিনি তাকে গ্রেপ্তার করান যেখানে “নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগও করেছেন সোয়াতি। অথচ মামলা যে তেমন সিরিয়াস কিছু নয় তা বুঝা যায় আদালত আজমকে প্রথমদিনই জামিন দিয়ে দেয়।

    কিন্তু প্রতিহিংসার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইতোমধ্যেই হাজির হয়ে গেছেঃ
    গত ৫ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সিনেটর আজম সোয়াতি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কেন?
    তিনি কয়েকদিন আগে অন্য এক শহরে (কোয়েটা) গেছিলেন সস্ত্রীক। সেখানে এক সরকারি গেস্ট হাউজে ছিলেন।  আজম সোয়াতি জানাচ্ছেন তার স্ত্রীর কাছে  কেউ এক ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে। কেন? আর সেই ক্লিপ হল, তাদের স্বামী-স্ত্রীর অন্তরঙ্গ মুহুর্তের এক ভিডিও। আর এটা হল সেই গেষ্ট হাউজে থাকার রাতের ছবি। কোন দম্পতির রাতের সজ্জার অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি গোপনে রেকর্ড করা – এটা কোন সভ্যতা? কোন বাহাদুরি?

    তাহলে এখন এটা কেমন প্রতিহিংসামূলক আচরণ? এটা কী কোন দায়ীত্ববান ও নুন্যতম সেনসেটিভ ব্যক্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ? জেনারেলেরা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের উর্ধে এক ব্যক্তিত্ব হিসাবে দেখতে চান! তাই সে প্রয়োজনে তারা পাকিস্তানের রাজনীতিকে আর কত নিচে নিবেন!  আর সবমিলিয়ে এতে আমেরিকা নিজ দায় ও সংশ্লিষ্ঠতা থেকে কী দূরে থাকতে পারবে!!!

    ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন তিনি প্রধান বিচারপতিকে লিখবেন এই জুডিশিয়াল এনকোয়ারির জন্য! কিন্তু এটা কী ক্ষমতাবানদের এই অসভ্যতা থেকে পাকিস্তান সমাজকে বের করে আনতে পারবে!!!!


    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • ‘হেফাজতের মত বিএনপিকে’ দমন!

     

    ‘হেফাজতের মত বিএনপিকে’ দমন!

    গৌতম দাস

    ৩১ অক্টোবর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4h4

     

    .   ডলার–সংকটের…… প্রথম আলো

    ইস্যুটা হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারা না পারা নিয়ে। দুদিন আগে ২৯ অক্টোবর বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সমাবেশ হয়ে গেল, এটা ছিল তাদের চলমান আন্দোলনের চতুর্থ এমন সিরিজ সমাবেশ। অনেকের মনে হতে পারে এটা কী হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার বিরুদ্ধের বিএনপি কোন শক্তি হয়ে উঠতে যাচ্ছে বা পারবে?  এমন অনুমাননির্ভর অনেক প্রশ্নই করা যায়। তা সত্বেও নতুন আরেক ফেনোমেনা অন্যদিকে হাজির হচ্ছে যা আরও বেশি প্রভাবশালী। সেদিকে তাকিয়ে বলা যায়,  হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিএনপির এই আন্দোলন সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ নয়। যদিও ইতোমধ্যে হাসিনা  “হেফাজতের মত বিএনপিকে” দমন ধরণের একটা ম্যাসাকার করে ফেলতে পারেন এমন ইঙ্গিত-হুমকি দিয়েছেন। এসব সত্বেও বরং হাসিনার ক্ষমতায় থাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হয়েছে দেশের অর্থনীতি! একেবারে সুনির্দিষ্ট করে বললে সরকারের কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ডলার সংকট। উপদেষ্টা তৌফিক এলাহির ভাষায় টাকা নাই বা জ্বালানি “কেনার পয়সা নাই…”। অথবা বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ভাষায়  – আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে গ্যাসের দাম বেশি তাই কেনা হয় নাই – এসবই হল, ডলার সংকটের বাইরের চেহারা।

    সারকথায় বললে, আসলে হাসিনার ক্ষমতায় থাকার জন্য বিএনপির আন্দোলনের চেয়েও আরো বড় চ্যালেঞ্জ হল রিজার্ভে ডলার না থাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে যথেষ্ট ডলার সঞ্চিত না-হওয়া বা থাকা। এখন সরকার নগদ ডলার যোগাড় করতে না পারলে বিএনপির কোন আন্দোলন হোক আর নাই হোক, সেসব ছাড়াও সরকার ভেঙ্গে পড়তে পারে!
    যেমন ধরা যাক, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এর ঠিক কারণ নয় তবে ঐ দুর্ভিক্ষকে ঠেকাতে না পারার শেষ কারণ ছিল তখনো রিজার্ভে এমন ডলার ছিল না যে দেশজুড়ে খাদ্য সংকটে পড়া দেশের সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্য কিনে আনবে – এমন সক্ষমতা ছিল না। এর সাথে তুলনা করতে পারি তত্ত্বাবধায়ক আমলে ২০০৭ সালের শেষে আইলা ঘুর্ণিঝড়ের পরের খাদ্য সংকট সামলে ফেলতে সক্ষম হতে পারাকে। তখন কেন সফল হয়েছিল?  কারণ, তখন মূল ফ্যাক্টর ছিল সরকারের হাতে যথেষ্টে ডলার মজুদ থাকা। তাই সহজেই সেসময় দেশের যেই-ই চাল আমদানির এলসি খুলতে চেয়েছিল তাকেই তা খুলতে দিতে পেরেছিল সরকার। ফলে ভারতের চাল বেচতে না চেয়ে তৈরি আইনি বাধা সত্বেও আমাদের আমদানিকারকেরা ভারতসহ যেদেশ থেকেই পেরেছে চাল আমদানি করে সংকট সামলে ফেলেছিল। আর তিন-চার মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠে যাওয়াতে সব সংকট কেটে গেছিল।

    দুনিয়ার যেকোন কথিত কমিউনিজমে থাকা অর্থনীতির কমন লক্ষণ হল সারা বছর আকন্ঠ ডলার সংকটে থাকা – এটা ব্যতিক্রমহীন একটা মারাত্মক ও কমন সংকট। ফলে তাজউদ্দিনের “কমিউনিস্ট ফ্যান্টাসিও” এই অলীক কল্পনাও এথেকে বাইরে ছিল না। সেকারণে,  ১৯৭৪ সালে রিজার্ভের মারাত্মক সংকটে ছিলাম আমরা। ফলে তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া শেখ মুজিবের কিছু করার ছিল না। অপরিনামদর্শী ও কমিউনিস্ট সাজতে চাওয়া ফ্যান্টাসীর তাজউদ্দিন এন্ড গংদের মন্ত্রীসভা ও নানান কমিশন-কমিটি থেকে তিনি বাদ দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সেটা অনেক দেরি হয়ে গেছে তাই দেশ বাঁচাতে পারেন না। আর এঘটনারই লেজ ধরে শেষে তিনি  নিজেই ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গেছিলেন। বাকশাল ইত্যাদি করে সব ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করে সব সামলাবেন ভেবেছিলেন। খেয়াল করতে হবে, কিন্তু মূলপ্রশ্নটা তো টাকা নয় ডলার সংকট; যা তাঁকে ক্ষমতা সংহত বা কুক্ষিগত করতে পারা না পারার সাথে একেবারেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু তাতে দলের ভিতরেই এটা একটা অংশকে উতসাহিত করেছিল আর সাথে বিদেশিস্বার্থ প্রভাবকেই পরিস্থিতিকে তাদের নিজ দখলে নিতে সুবিধা করে দিয়েছিল।  তাই  দেখাই যাচ্ছে বিএনপিকে “হেফাজত দমনের মত” একটা ম্যাসাকার করে ডলার সংকট মিটবে না। তবু সরকার এটা নিয়েই সিরিয়াস বলে মনে হচ্ছে। যেমন আওয়ামি লীগের অন্যান্য নেতা ও হাসিনার পরিবারের সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেছেন, [প্রথম আলো লিখছে] দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তাতে রাজনৈতিক শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন করা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    আবার খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, “বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধীদের পৃষ্ঠপোষক দল। তারা এখনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করে। বাংলার মানুষ দেশবিরোধী শক্তিকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না”।
    অর্থাৎ আওয়ামি লীগ এবার স্বাধীনতাবিরোধী বলে শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন করে বিরোধীদের দমনে মাঠে নামতে চাইছে? তাই কী???

     

    আইএমএফ, এই আশার বাতি জ্বালানোঃ
    সরকার এনিয়ে সব শেষে একটা আশার আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছে; সেটা হল দাতা আইএমএফের টিমের বাংলাদেশ সফর। প্রথম আলো লিখেছে, “৩০ ও ৩১ অক্টোবর এবং আগামী ২ ও ৮ নভেম্বর আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সভার সূচি রয়েছে। ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে গত জুলাইয়ে আইএমএফের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ, সে ব্যাপারে আলোচনা করতেই দলটি এখন ঢাকায়। আইএমএফের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংস্থাটির এশীয় ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ”।
    আসলে  গত জুলাই মাস থেকেই বাংলাদেশে এটা একেবারে উদাম হয়ে পড়েছিল যে ডলারের অভাব বা একটা রিজার্ভ সংকটে আমরা পড়ে গেছি যেটা আর লুকানো থাকছে না। তখনও অর্থমন্ত্রী ও সরকার অর্থহীনভাবে তা লুকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল যে  না তারা নাকি আইএমএফের কাছে যায়নি। আবার যখন সরকারের আইএমএফ-কে দেয়া চিঠিটাই প্রকাশ হয়ে পড়ল তখন খবরটা স্বীকার করে নিলেও সরকারের আবার লুকোচুরি যে কোন আইএমএফের টিম আসে নাই।  যারা তখন এসেছিল তারা অন্য রুটিন ভিজিটে এসেছে। অথচ এরকম বলে আড়াল করার চেষ্টাটাও ছিল একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া ঐ টিমর সফর থেকে শেষে অর্থনীতি সংস্কারের প্রশ্ন উঠলে মানে এই  প্রস্তাব দিবে আইএমএফ, এটা জানতে পেরে সরকার বলার চেষ্টা করেছিল তারা এখন কোন সংস্কারের পক্ষে নয়। ফলে আইএমএফ ইস্যু চাপা পড়ে যেতে দেখেছিলাম আমরা।

    সেই চাপা পড়া ইস্যু দেখা যাচ্ছে এখন আবার বড় আশার আলো হিসাবে সরকার তুলে ধরতে চাইছে। যেমন  মিডিয়া লিখছে, “…… জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইএমএফ অর্থনীতি ও ব্যাংকের বিভিন্ন সূচক নিয়ে তথ্য জানতে চেয়েছে। তারা কিছু বিষয়ে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত মিলবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সংস্থাটির আরও সভা হবে।’
    এতে শেষের দিকের বাক্য,… “আশা করছি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত মিলবে”। এটা বলাই বাহুল্য অতি আশাবাদ।

    প্রগতিশীলতা ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকঃ
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর প্রসঙ্গ-কথা উঠলেই আমাদের প্রগতিশীলেরা খুব সরব হয়ে উঠেন। ভাব করেন যেন তারা প্রতিষ্ঠানটা বুঝেন। যদিও কেউ সত্যি সত্যিই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর জেনুইন ও কঠোর সমালোচক হতেই পারেন। কিন্তু তিনি যদি প্রতিষ্ঠানটার গ্লোবাল (নেতি বা ইতি) ভুমিকা দূরে থাক ফাংশনারিজ-ই না বুঝেন  এর কাজ ও উদ্দেশ্য বুঝেন তো এই সমালোচক আসলে একজন খামোখা। তারা আসলে  এক আইডিয়াল (ideal) সমালোচক মাত্র। এরা আসলে বাস্তব বা real নয়। হয়ত এথিক্যাল সমালোচক!  সবচেয়ে বড় কথা যেন তারা “গ্লোবাল অর্থনীতি” বুঝেন, এই ভান করেন। একই কারণে এরা কিন্তু ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়াতে যে “গ্লোবাল সিস্টেম” – মানে একটা পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে উঠেছে তা টেরই পান নাই।   আবার অবশ্যই একথা মনে করিয়ে দেয়া মানে গ্লোবাল সিস্টেমটাকে আদর্শ বলা নয় বা মেনে নেয়া নয়। এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন অবশ্যই তোলা যায় এবং সবগুলোই জেনুইন। মানে আরো বদলে নেয়া দরকার আছে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা তখনই বলা সম্ভব বা আপনি বলতে পারেন যখন আপনি জানেন এই সিস্টেমটা আসলে কী ও কেন ইত্যাদি!

    যদিও সবকিছু ছাড়িয়ে তাদের প্রগতিবাদের যে অজ্ঞতা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য তাহল তারা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য জিনিষটাই আজও বুঝতে পারেন নাই। যেন, “দরকার কী” এমন মনে করেন! ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য তো আরো দুরের; তাদের বুঝাবুঝির দুরস্ত! তাদের সাবজেক্টই নয় সেটা।  কারণ আদৌ বাণিজ্য করাই হারাম না হালাল এই প্রশ্নে তারা এখনো বোবা। কিছুই নিশ্চিত নয়।  যদিও তারা শুনেছে ফলে তাদের মন বলতে চায় বা সাহসীরা বলবে  – বাণিজ্য করা হারাম। কারণ এরা বলবে এখানে মুনাফা আছে। আর মুনাফা মানেই তো ‘শোষণ’, সারপ্লাস ভ্যালু ইত্যাদি ইত্যাদি……।
    এখন কেউ যদি গ্লোবাল বাণিজ্য এর গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা বুঝুক বা না বুঝুক তবু স্বীকার করে নেয় তবে এবার আরেক মুখ্য প্রশ্ন সামনে আসবে যে গ্লোবাল বাণিজ্য চাইলে তো একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম – একটা গ্লোবাল ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান সেটা তো লাগবেই! সেটার কী হবে??? বাস্তবে ১৯৪৫ সালের এই প্রতিষ্ঠানটাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সেকালের কমিউনিস্ট গুরু  সোভিয়েত রাষ্ট্রের স্তালিন মূলত এনিয়ে সিদ্ধান্ত-ই নিতে পারেন নাই। আর তা থেকেই আজকের কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদের এই দুর্দশা! তারা আন্দাজে কথা বলে চলছেন। আসলে অর্থনীতির দিক থেকে বিচারে বললে “স্তালিনিস্ট কমিউনিজম চিন্তা” এটা এক উগ্র ন্যাশনাল ইকোনমি চিন্তা।  কিন্তু কী অর্থে ন্যাশনাল বলছি? এই চিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট হল এটা একটা নিজ রাষ্ট্রসীমার মধ্যেই অর্থনীতি ও বিনিময় এই সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে এমন কল্পনা। সোজা করে বললে, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যাপারটাই দরকার হবে না বা নাই। সেকারণে ও এভাবেই স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের ‘ব্রিটনউড সম্মেলনে’ যোগ দিয়েও পরে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ আর নেন নাই। আর স্তালিন সবচেয়ে বড় অন্যায় করেছেন তিনি তার এই সিদ্ধান্তের কারণ কোথাও ব্যাখ্যা করেছেন জানা যায় না। পরিণতিতে  ১৯৯১ সালে এসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে ভাঙ্গা ১৫ রাষ্ট্রের টুকরা (রাশিয়াসহ) সকলেই আই-এমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল। এবং সেটাও কোন কারণ ব্যাখ্যা করা ছাড়াই। সেই থেকে বুঝি আর নাই বুঝি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিপাত যাক – এটাই হয়ে আছে প্রগতিবাদি শ্লোগান।

    কিন্তু এসব আলাপ তুলছি কেন?
    উপরের প্রসঙ্গ এনিয়ে বিস্তারিত আলাপ করতে হবে। এত ছোট পরিসরে তা অবশ্যই  হবে না। কিন্তু এখানে এখন বাংলাদেশের রিজার্ভ বা ডলার সংকটের আলাপের সাথে এসব আলাপের প্রাসঙ্গিকতা কী?
    প্রাসঙ্গিকতা হল, হাসিনা সরকারের “আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাবার” যে আশাবাদ রেখেছে তা বাস্তবে দেখতে পাবার সম্ভাবনা খুবই কম।  ফলে আওয়ামি ঘরানা থেকে এনিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  এর  ছোট বা বড় সমালোচনা উঠা সম্ভবত আমরা দেখতে যাচ্ছি। কিন্তু এটা যদি হয় তখন এই সুযোগে অবুঝ প্রগতিবাদের একটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমালোচনা ইতোমধ্যেই উঠেছে সেটা আরো বড় হবার সম্ভাবনা। তাই আগাম সাবধান করা। আর সেখান থেকে “বিকল্প দেখাও” এর দিকে আলাপ চলে যাবার সম্ভাবনা, আওয়ামি-প্রগতিবাদি এমন সাফাই দেখব হয়ত। দেখা যাক!

    তবু একটু অন্য প্রসঙ্গেঃ  এখানে আমরা লক্ষ্য করছি যে আইএমএফ নিয়ে সরকারে যে আশাবাদ তৈরি করা হচ্ছে তাতে বহু ভুল বুঝাবুঝি আছে। যেমন, আসলে আইএমএফ যদি সরকারের সাথে সব ব্যাপারে একমত হয়ও তাহলেও বাংলাদেশ যা পাবে তা হল বছরে মাত্র দেড় বিলিয়ন ডলার, এভাবে তিনবছরে মোট সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার। এটা পরিমাণে খুবই কম। আমাদের এক মাসের ঘাটতি পূরণের দিক থেকে যদি বিচার করি তো এটা তারও অর্ধেকও না!
    সারকথায় এটা বাংলাদেশের ডলার সংকট মিটানোর পরিমাণের দিক থেকে অপ্রতুল অবশ্যই। কিন্তু আইএমএফ টিমের এই সফরের মুল্য অন্যখানে। সেটা হল আইএমএফের এই সফর প্রক্রিয়াটা হল,  গ্লোবালি সারা বিনিয়োগ-পুঁজি বাজারকে আশ্বস্ত করা যে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অবস্থাটা ঠিক কী কেমন তা একটা বিস্বস্ত ও বাজারের আস্থার  প্রতিষ্ঠান আইএমএফ পরীক্ষা করেছে। তাই এই প্রতিষ্ঠানের রেকমন্ডেশন থেকে যেন বাজার আস্থার সাথে বুঝে নেয়, নিতে পারে যে নতুন করে বাংলাদেশকে বিনিয়োগ বা ঋণ দেয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ কতটা যোগ্য। সেখানে দাতাদের কী কী সতর্কতা লাগবে।  তাই আইওএমএফের এই সফর আসলে গ্লোবাল বাজারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে পরীক্ষা যে সংকটের ধরণ ও গভীরতা পরীক্ষা করে নেয়া আর সে অনুযায়ী নতুন করে যে চায় সে অর্থনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর সুযোগ নেয়া বা নিতে পারে।

    চিবিয়ে খাইনিঃ
    কালচারাল অর্থে এটা হাসিনার দিক থেকে খুবই আনফেয়ার প্রতিক্রিয়া। জনগণের জানার অধিকার আছে, একথা মনে রাখলে কোন সরকারের এমন প্রতিক্রিয়া অগ্রহণযোগ্য। এখন কালচারাল আর অধিকারের দিক ছেড়ে অন্যদিকে আসি।  এখানে প্রসঙ্গ দুইটা।
    একঃ রিজার্ভে ডলার কত আছে তা দেখানোর যে ফরমাট আইএমএফ-এর স্টান্ডার্ড ফরমাট – তা আইএমএফের সদস্য যেকোন রাষ্ট্র বা সরকার অনুসরণ করে চলতে বাধ্য। এটা সদস্যপদ লাভের পুর্বশর্ত ছিল। সদস্য হবার আগেই তা বুঝতে পেরেছি বা বুঝে নিয়েছি কিনা তা স্বীকারপত্র দিতে হয়েছিল। কাজেই এখন “আমার স্টাইল আলাদা” বলে কোন অজুহাত তোলা মানে সরকার নিজেকে নাদান ও সাব-স্টান্ডার্ড করে হাজির করা হবে। এটা কাম্য নয়।
    দুইঃ “নিজের টাকায় করব”। জাতিবাদি শুরশুরি খুবই ভয়ঙ্কর জিনিষ। তাই নিজের টাকায় ব্রীজ করব – এটা খুবই আত্মঘাতি জাতিবাদি শুরশুরি। আমাদের মত দেশ কেবল এই প্রথম, কোন কোন মাসে বাড়তি কিছু ডলার (টাকা নয়) ইতি ব্যালেন্স জমাতে পারি এমন অবস্থা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এর মানে এই না যে আমরা একটা পায়রা বন্দর নিজের জমাকরা ডলার দিয়ে বানাতে পারি – এমন অবস্থায় পৌছিয়েছি। এটাই এখন প্রমাণিত। আমরা আমাদের সঞ্চিত রিজার্ভ থেকে ডলার নিয়ে (এটা বাংলাদেশি টাকা না)  অবকাঠামো নির্মাণে যাবার মত সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পৌছিয়েছি – এটা সত্য না। অথচ আমাদের সরকার একাজই করেছে। এছাড়া সরকার বারবার এটা ডলার না বলে নিজের টাকায় করেছি বলে একটা জাতিবাদি শুরশুরি তৈরির চেষ্টা করছে। কেন?
    প্রশ্ন আরো আছে। পায়রা বন্দর নির্মাণ কেন জরুরি? না নির্মাণ করলে আমাদের কী ক্ষতি হত? আমাদের জানা নাই। সরকার বলতে পারে নাই। এছাড়া আরো বড় প্রশ্ন এর ভায়াবিলিটি বা এই প্রকল্প নেয়া সঠিক হয়েছে কিনা!!! জায়গা ঠিক কিনা? প্রকল্পের বিনিয়োগ আয় থেকে ফিরে আসবে কিনা? ইত্যাদি নানান উত্তর পজিটিভ কিনা।
    এই বন্দর নির্মাণ আসলে ছিল অনুচিত। এর ইকনমিক ভায়াবিলিটি ছিল কী? যেখানে এ্টার টেকনিক্যালিই ভায়াবিলিটি নাই। মূল কারণ এর নাব্যতা নাই। মানে স্থান নির্বাচনই সঠিক নয়। কারণ একে চালু রাখতে গেলে সারাবছর পলি সরানো ড্রেজিং ব্যাপকভাবে চালু রাখতে হবে। স্থান নির্বাচনই সঠিক হয় নাই। এসব নিয়ে খোদ ততকালীন অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত নিজেই নিজের আপত্তির কথা তুলেছিলেন।
    অবস্থা এখন দাড়িয়েছে এই যে আমাদের তেল-গ্যাস আমদানির ডলার নাই অথচ আমরা এই অচল পায়রা বন্দরে টাকা নয় ডলার ঢেলে চলেছি, কেন?  আজ কোথায় ভারতীয় বিনিয়োগ? নেদারল্যান্ডের বিনিয়োগ? এটা নাকি সোনাদিয়ার বিকল্প হবে? অথচ পায়রা বন্দরের গভীরতা মানে কত বড় জাহাজ নোঙর করতে পারবে – তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরের নিচে। আমরা জানি না এই নন-ভায়াবল এক প্রকল্প কেন?  কেন এটা এসেনশিয়াল অতি জরুরি? সবচেয়ে বড় কথা এই প্রথম কেন আমরা মজুদ থেকে এই প্রকল্প খরচ করব?

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • কিছু দেশি-বিদেশি নিউজ নিয়ে মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া

    কিছু দেশি-বিদেশি নিউজ নিয়ে মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া
    গৌতম দাস

    ২৬ অক্টোবর ২০২২
    https://wp.me/p1sCvy-4gR

     

    .        প্রয়োজনে দিনের বেলা বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ রাখব: তৌফিক-ই-ইলাহী

    ১। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, ‘…কেনার পয়সা নাই  তো। কী দামে বিক্রি করব সেটা পরের বিষয়।’ – ডেইলি স্টার

    আর ওদিকে একই প্রসঙ্গে অন্যান্যদের মত  বণিক বার্তার প্রায় কাছাকাছি শিরোনাম হলঃ 
    বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে ব্যবসায়ীরা শঙ্কিত,
    রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা, দিনে বিদ্যুৎ কম ব্যবহারের পরামর্শ জ্বালানি উপদেষ্টার –

    এই ছিল শিল্প মালিকদের সাথে জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর সাথে এক ডায়লগ-সভার ফলাফল। ঘটনা সারসংক্ষেপে হল, দেশের ডলার বা রিজার্ভ সংকটে মানে জ্বালানি সংকটে  কারখানা চালানোর জন্য শিল্প মালিকেরা গ্যাস সরবরাহ চান। তারা এজন্য মুল্য বেশি হলেও বেশি মুল্যে দিয়ে হলেও গ্যাস চান। জবাবে,   উপদেষ্টা বললেন আমার রিজার্ভে ডলার নাই (“কেনার পয়সা নাই  ……”।)

    কথাগুলো কেবল শিল্পমালিকদের মুখ দিয়ে এলেও এটা আসলে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সব ধরণের ভোক্তা -সহ সাথে ছোট-বড় সবধরণের উতপাদনে উতপাদকেরও কথা। মূল কারণ, একালের মানুষের জীবন শতভাগ জ্বালানি-নির্ভর; মাটির নিচের তেল, গ্যাস বা কয়লা ইত্যাদি কোন না কোন ধরণের। ফলে জ্বালানি নাই মানে জীবন স্থবির শুধু নয়; জীবন অচল যা প্রায় না থাকার সমান!

    অতএব একালের সরকার ও পাবলিকঃ
    দুনিয়ার সবদেশেই সরকার, তা যে আদর্শেরই হোক – সরকার ও পাবলিকের সম্পর্ক হল – পাবলিক মুরোদ-ওয়ালা সরকার দেখতে চাই। মুরোদ নাই অথবা কম মুরোদের কোন সরকার মাত্রই তারা পাবলিকের কেউ না। একবাক্যে পাবলিক এমন কোন কিছুই শুনতে চায় না; আমলই করতে চায় না। সকলেরই তা অপছন্দ, অ-অনুমোদিত। ব্যাপারটা অনেকটা যেন আপনি ক্রেতা এক বাজারে গিয়েছেন ঠিকই কিন্তু যা কিনতে রাজি না, নানা কারণে অপছন্দ এমন সবপণ্যের ক্ষেত্রে বাজারে তাখুব ভাল করে সাজানো থাকলেও আপনি যেমন সেপথে হাটেন না, সময় নষ্ট করেন না  – এটা অনেকটা সেরকম! তখন এসবই আজাইরা মনে হয়!
    কারণ, কার্যত সরকারের মুরোদ নাই বলেই তো জ্বালানি নাই, আনতে পারে নাই। যেকোন অজুহাতে বাস্তবতা হল, সরকার জ্বালানি আনতে বা ব্যবস্থা করতে পারে নাই! এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং বিদায়যোগ্য হবে। তাতে সরকার যে দলেরই হোক!
    এমনকি আওয়ামি কর্মি-সমর্থকদের কাছেও এমন সরকার বা জ্বালানি উপদেষ্টা অগ্রহণযোগ্য হবেন। কাজেই দল নির্বিশেষে বাংলাদেশের সার রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য এটাই। জ্বালানি প্রসঙ্গে দেশের সকলেই একমাত্র এক  মুরোদ-ওয়ালা সরকার-ই দেখতে চায়ই চায়!  এটা এমনই বিরক্তির যে মুরোদহীন সরকার এতে ক্ষমতাচ্যুত হল কিনা, হবে কিনা তা কেউ ফিরেও তাকাবে না…!

    তাই এই বাস্তবতায় মানে ডলার সংকটকেই কেন্দ্র করেই এখন রাজনীতি আবর্তিত হবে।

    ২। চীনে ক্ষমতাসীন পার্টি কংগ্রেস সম্পন্ন হয়ে গেল। সবচেয়ে বড় কথা বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই কংগ্রেসে ক্ষমতার লড়াই শেষে নিজেকে বিজয়ী করে আনতে সক্ষম হলেন। এখন আগামি মার্চে তিনি সহজেই তৃতীয়বারের (প্রতিটা পাঁচবছরের টার্ম) জন্য প্রেসিডেন্টের শপথ নিবেন।
    পুরব-পশ্চিম দেশ অথবা রাজনৈতিক আদর্শ নির্বিশেষে সবদলেই ক্ষমতার লড়াই একটা বাস্তবতা, তা সে যে নামেই করা হোক। তবে বটম লাইন হল, তা জনসমক্ষে বা নোংরা লড়াই ভাবে না করা এবং তা যতটা সম্ভব জনসম্পৃক্তির মধ্যে, আইনি কাঠামোর মধ্যে ঘটানোটাই কাম্য।
    সারকথায় চীনের এই সম্মেলন নুন্যতম এসব কামনা বা আকাঙ্খাকে সন্তুষ্ট করতে পারে নাই। আগামিতে গ্লোবাল নেতা হতে চীন যদি সুযোগ পায় তবে সেক্ষেত্রে চীনের বিরুদ্ধে যাবে এমন এক নম্বর রেফেরেন্স পয়েন্ট হবে এটা। 

  • মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    গৌতম দাস

    ২৪ অক্টোবর ২০২২  ০০ঃ০৬ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-4gr

     

          ..condemning hate speech unequivocally: U.N. Secretary-General António Guterres

    ‘ইউনাইটেড নেশনস’[United Nations] শব্দটার বাংলা হিসাবে ‘জাতিসংঘ’ শব্দটার ব্যবহার সম্ভবত বেশিরভাগ বাঙালি করে থাকেন। তবে কলকাতার আনন্দবাজার অনুবাদ করে ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ’ লিখে থাকে।  আনন্দবাজারের বেশির ভাগ ততপরতা অপছন্দের হলেও এই অনুবাদটা বেশি সঠিক ও অনেক অর্থপুর্ণ। কারণ ‘জাতি’ শব্দ ও ধারণা-টা মানে কোনভাবেই তা রাষ্ট্র নয়; যদিও না জেনে আমরা অনেকেই এই ভুল করে থাকি। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জ (বা জাতিসংঘ) – এই প্রতিষ্ঠানই জন্মের সময় থেকে নিজেকে ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আসছে। তবে এর স্বপক্ষে একটাই সাফাই-যুক্তি এবং তা খুবই দুর্বল সেই যুক্তিটা হল – সেসময় বেশির ভাগ রাষ্ট্র মানে মর্ডার্ণ রাষ্ট্র বলতে সেটা এক ‘জাতিরাষ্ট্র’ বা Nation State ধারণা বলে বুঝবার প্রাবল্য ছিল। যেটা পরের আট বছরের মধ্যে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের বেশির ভাগ রাষ্ট্র এই ভুল সংশোধন করে নিয়েছিল। যার পর থেকে ইউরোপের অন্তত ৪৬ টা রাষ্ট্র  আর নেশন স্টেট নয়, অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র হয়ে যায়। [ এনিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন কাউন্সিল অফ ইউরোপ [COE]।   রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল হলেন আন্তোনিও গুতেরেস (Antonio Guterres)। এই সেক্রেটারি জেনারেল-ই হলেন রাষ্ট্রপুঞ্জ-এর সর্বোচ্চ নির্বাহি প্রধান।

    এখন আজকের প্রসঙ্গে আসি। ঘটনা হল, ভারত বিশেষ করে এর প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্ভবত আর কোনদিন যাতে গুতেরেস ভারত সফরে না আসতে পারেন এর সব বন্দোবস্ত করবেন; তা অবশ্যই নিশ্চিত করবেন! কেন?
    গুতেরেস ভারত সফরে এসেছিলেন গত বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর সরকারি আমন্ত্রণে। গত ২০০৮ সালের ভারতের ভাষ্যমতে মুম্বাইয়ে “টেররিস্ট আক্রমণের বার্ষিকী” পালনের অনুষ্ঠানে, ঐ হামলার আহত-নিহতের প্রতিশ্রদ্ধা জানাতে। আর ঐ হামলা ছিল কাশ্মীর-কেন্দ্রিক কিছু সশস্ত্র প্রতিবাদী গ্রুপের যারা পাকিস্তান থেকে ভারতের মুম্বাইয়ে এসে ২০০৮ সালে “তাজমহল প্যালেস হোটেল” দখল করে ঐ হামলা চালিয়েছিল।

    তবে এবার, মোদি সম্ভবত চেয়েছিলেন গুতেরেসের এই সফর থেকে তিনি গ্লোবাল মিডিয়া মনোযোগ হাসিল করতে পারবেন যাতে তিনি ভারত সরকারের কাশ্মীর নির্যাতন নিপীড়ন দমনের অভিযোগ আড়াল করে এর উপরে বা বিরুদ্ধে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রসবাদী আক্রমণের কথা তুলে সেটা ঢেকে ফেলতে বা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিপীড়ন-কে জায়েজ করতে পারবেন।
    নেহেরুর আমল থেকে ভারত চেষ্টা করে যাচ্ছে এটা দেখাতে যে ভারতের কাশ্মীরের সমস্যা যেনবা কাশ্মীরীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে হাজির হয়েছে। এটা যেন এক “সন্ত্রাসবাদি” সমস্যা! এবং তা যেন সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছে! অথচ এটা শতভাগ মিথ্যা। ভারতের কাশ্মীরে সশস্ত্র ততপরতার শুরু ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের রাজ্য নির্বাচনে কেন্দ্রসরকারের ব্যাপক কারচুপির ঘটনা থেকে। কারণ ঐ কারচুপির পরে ক্ষুব্ধ ও হতাশায় পড়া কাশ্মীরীদের প্রতিক্রিয়া থেকে তারা সশস্ত্র ততপরতার দিকে ঝুঁকে যায়; আপন করে নেয়। অর্থাৎ (১৯৪৭ সালের পর থেকে) ১৯৮৭ সালের আগে পর্যন্ত এর আগে ভারতের কাশ্মীরে যত বিবাদ বা ক্ষোভই থাক না কেন; সেখানে একটা রাজ্য-নির্বাচনী ব্যবস্থাই চালু ছিল আর এই নিরস্ত্র ব্যবস্থাটাই ছিল ক্ষুব্ধ কাশ্মীরীদের প্রধান রাজনৈতিক ততপরতা। সারকথায়, ভারত সরকারই রাজ্য নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপি করে ফলাফল উলটে দিয়ে কাশ্মীরীদেরকে সশস্ত্রতার পথে ঠেলে দিয়েছিল।

    মোদি ভেবেছিলেন এবার গুতেরেসকে অতিথি করে এনে তিনি কথিত সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে জনমত যোগাড় করে নিজ আকামের পক্ষে মিডিয়া মাইলেজ যোগাড় করে নিবেন। কিন্তু এখন ফল হয়েছে উলটা। মোদি ও তাঁর সরকার আত্মঘাতি গোল খেয়ে গেছেন। কারণ,  গুতেরেস উলটা মোদি সরকারের হিউমান রাইট লঙ্ঘণ ও মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন বৈষম্যের কথা তুলে বক্তৃতা করেছেন আর  মোদি সরকারকে তা সংশোধনের আহবান রেখে গেছিল। তবে এই আহবান তিনি মূল অনুষ্ঠানে নয় বরং পরে, মুম্বাইয়েরই আরেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
    সেখানে, একাজে তিনি শব্দ হিসাবে ব্যবহার করেছেন ডাইভারসিটি [Diversity] ও প্লুরালিজম [Pluralism] । মানে গুতেরেস বলতে চাচ্ছেন, একটা রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ভিত্তিতে –  বহু ধর্ম ও বহু মত ও পথ কে পাশাপাশি কার্যকর থাকতে পারে এমন ভিত্তির একটা রাষ্ট্রগড়ে তুলতে পারলে একমাত্র তাতেই একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব হতে পারে। এভাবে বৈচিত্র ও ভিন্নতায় নাগরিকেরা সকলে পাশাপাশি কার্যকর থাকা ও পরস্পরকে জায়গা করে দেওয়া নিশ্চিত করতে পারলে সেটাই হবে রাষ্ট্রের শক্তি।
    ভারতের দ্যা হিন্দু লিখছে তিনি বলেছেন,   “রাষ্ট্রে জনবৈচিত্র থাকলে সেটাই সমৃদ্ধি আনবে যা একটা দেশকে শক্তিশালী করে। এই বোধ-অনুভবকে লালন ও শক্তিশালী করা এবং প্রতিদিনের চর্চায় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা উর্ধে তুলে ধরে তা শক্তিশালী ও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত যারা দুঃস্থ অবস্থায় আছে তাদেরকে সাথে নিতে বহু-সংস্কৃতি, বহু ধর্ম ও এথনিক জনগোষ্ঠির এক সমাজ গড়তে হবে; যেখানের সকলে একসাথে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তব্যকে একস্বরে নিন্দা জানাতে হবে”।
    আর এখান থেকেই মূল শব্দ উঠে এসেছে “হেট স্পিচ” [Hate Speech] বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তৃতা – এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহবান।

    “Diversity is a richness that makes your country stronger. That understanding…must be nurtured, strengthened and renewed every day by practising the values of Gandhi; by securing and upholding the rights and dignity of all people, especially the most vulnerable; by taking concrete action for inclusion, recognising the enormous value and contributions of multi-cultural, multi-religious and multi-ethnic societies; by condemning hate speech unequivocally,” Mr. Guterres said

    স্বভাবতই এতে পুরা ব্যাপারটাই মোদির হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে শক্ত সমালোচনা ও নিন্দা হয়ে উঠে এসেছে। ফলে তা হয়ে উঠেছে মোদির হিন্দুতেবাদেরই কঠোর সমালোচনা। কারণ, গত অন্তত তিন বছরে মোদি এই হেট স্পিচের উপরে ভর করে যাচ্ছেন; মোদি যেকোন নির্বাচনে জিতবার উপায় হিসাবে একে হিন্দু-ভোট মেরুকরণ ও ভোটবাক্স ভর্তি করার কৌশল ব্যবহার করে চলেছেন।

    তবে গুতেরেসের হেট স্পিচের কঠোর সমালোচনা দিয়েই প্রসঙ্গটা শেষ হয়ে যায় নাই। বরং বলা যায়, এতে সরকার প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ন্যাংটা করে ছেড়েছে। যদিও সেটা ছিল প্রথম পর্যায়। এবার এর দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে লিখছি।

    ঘৃণা-ভাষণের বিরুদ্ধে কঠোর না-হলে অবমাননার মামলা, প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

    হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলিঃ
    আসলে এখন শুরু হয়েছে এই হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলি! এখানে আসামি বা পার্টি আসলে তিনটা! কথাটা অন্যভাবে বললে,  একটা রাষ্ট্র ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যায় মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠানের নিস্ক্রিয়তায়। যার প্রথমটা হয়ে থাকে সরকার বা ক্ষমতার নির্বাহি বিভাগ’ অর্থাৎ এর বৈষম্যমূলক আচরণ ততপরতা থেকে। এদের নিজ বিশেষ দল ও শ্রেণীর নাগরিককে ফেবার করা ও অন্যান্যদেরকে নিগৃহিত করা থেকে এর শুরু হয়ে থাকে।
    এখন  নির্বাহি ক্ষমতার এই গর্হিত কাজকে যদি বিচার ব্যবস্থা আমল না করে এবং ক্ষতিগ্রস্থ নাগরিককে প্রতিকার না দেয় এখান থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়। এমনকি যেখানে বিচার ব্যবস্থার হাতে স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবার ক্ষমতা দিয়েই রাখা থাকে; তবুও দেশের বিচার বিভাগ সেই ক্ষমতাকে প্রয়োগ-ব্যবহার না করে পাশ কাটিয়ে  যাওয়া থেকেই সংকট শুরু হয়ে থাকে। আর তৃতীয় পর্যায়টা হল নির্বাচন কমিশনের, এদের অকেজো হয়ে বয়াসে থাকা থেকে। কারণ তাদেরকেও ক্ষমতা দেয়া থাকে যে ক্ষমতাসীন বা বিরোধি দল যখন নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করতে ডুবে যাচ্ছে অথচ কমিশন এনিয়ে কোন ব্যবস্থা না নেয়। অথচ কমিশন যেকোন রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে শুনানি শেষে অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রতিকার হিসাবে ঐ দলের রেজিষ্টেশন বাতিল করে দিতে পারে।

    সারকথায় বললে,  এখন শুরু হয়েছে এই তিন পর্যায়ের তিনটা প্রতিষ্ঠান যাদের দায় ছিল ক্ষমতাসীনদের হিন্দুত্ববাদের ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; অথচ এই তিন প্রতিষ্ঠানের কেউই তা করে নাই। অর্থাৎ  নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে থাকা প্রশাসন এর দায়ীত্ব ছিল মানে আমাদের ভাষায় ডিসি-এসপির দায়ীত্ব ছিল হেট স্পিচের বিরুদ্ধে একশনে যাওয়ার। কিন্তু তারা কেন্দ্র সরকার বা রাজ্যের হিন্দুত্ববাদি দলীয় আচরণের পক্ষে চুপ করে থেকে তাদের সহায়তা করে গেছে। যেমন,  পশ্চিম দিল্লির বিজেপি সাংসদ পারভেশ ভার্মা হিন্দু সভার একটি বৈঠকে মুসলিম সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে বয়কটের ডাক দেন। তিনি বলেন, “ওদের সবজি কিনবেন না। ওরা মাছ-মাংসের দোকান খুলে বসবে। ওদের সোজা করতে সামাজিক বয়কট করুন”। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন একশন হয় নাই। সবচেয়ে বেশি ঘটনা উদাহরণ ঘটেছে যোগীর উত্তর প্রদেশে। এছাড়া, ত্রিপুরা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ বা কর্ণাটক রাজ্যে হিজাব ইস্যুসহ নানান মুসলমান নিপীড়ন-মূলক সরকারি সিদ্ধান্ত বা একশন ঘটেছে।  দিল্লিতে পরিকল্পিত দাঙ্গায় সব তছনছ করে দেয়া হয়েছে।  দিল্লিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক সভায় বক্তা হিসেবে ছিলেন জগৎ গুরু যোগেশ্বর আচার্য। তিনি বলেন, ‘যদি দরকার হয়, হাত কেটে নাও। গলা নামিয়ে দাও। সবচেয়ে বেশি তোমার জেল হবে। কিন্তু এই সমস্ত লোককে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। বেছে বেছে মারো।’
    কিন্তু বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন এসব ঘটনা আমলই করে নাই; পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে।

     

    কিন্তু এখন ঘুম ভাঙ্গে নাই, বরং দায় অন্যের ঘাড়ে ঠেলে ফেলার দৌড়াদুড়ি শুরু হয়েছে। গুতেরেস বক্তব্য রেখেছিলেন ১৯ অক্টোবর ২০২২। আর ২১ তারখেই ভারতের সুপ্রিমকোটে প্রধান বিচারপতি যেন জেগে গেছেন। আনন্দবাজার লিখেছেঃ ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।

    ভারতে ঘৃণা-ভাষণের প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে দিন দুয়েক আগে সরব হয়েছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস। এবার সেই প্রসঙ্গেই কড়া মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।  …… শুক্রবার সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে। ঘৃণা-ভাষণ সংক্রান্ত ওই মামলায় বিচারপতিদের মন্তব্য, ‘‘আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ধর্মের নামে কোথায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা?’’

    তার মানে দেখা যাচ্ছে – ” ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে – সুপ্রীম কোর্টের এই ক্ষমতা তো আগেও ছিল কিন্তু তা এতদিন ব্য৭বহার করা হয় নাই কেন?
    সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশের সুপ্রীম কোর্ট কে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের সমালোচনার পরে জেগে উঠতে হয়, নিজ ক্ষমতা নিয়ে সে জেগে উঠে – সেদি রাষ্ট্র আসলে অনেক আগেই মৃত! আর এতে এখন আমরা যা দেখছে সেটা ব্যক্তির দায় নিয়ে ঠেলাঠেলি বৈ আর অন্য কিছু নয়!

    বরং সুপ্রীম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করে যে ভারতের এই বিচার বিভাগ আসলে মৃত! হিন্দুত্ববাদ পুরা রাষ্ট্র আর তার আসব অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সবকিছুকে আসলে খেয়ে ফেলেছে…। 

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    গৌতম দাস

    ১৭ অক্টোবর ২০২২  রাত ০১ঃ১৮

    https://wp.me/p1sCvy-4gb

     

           Pakistan’s Foreign Minister Bilawal Bhutto-Zardari speaks following his meeting with U.S. Secretary of State…..

     

    একটা দৃশ্যমান স্ববিরোধ বা পরস্পরবিরোধী ঘটনা আজকের লেখার বিষয়। কোথায় ঘটেছে এটা? বাইডেনের আমেরিকার বিদেশ নীতি-পলিসিতে বা তাঁর সাম্প্রতিক কিছু ততপরতায়।  কী সেই পরস্পরবিরোধী দুই ঘটনা?
    এক. মূল বিরোধের স্থান হল,  গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের যুগে চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের পটভুমি। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটনা গড়াতে গড়াতে এখন চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে আমেরিকাবিরোধী এক মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলেছে। বিশেষত সর্বশেষ গতমাসে ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর চীনের সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও বা SCO) এর বার্ষিক সভা থেকে এই মেরুকরণ আরো দৃশ্যমান করে দেখানোর সুযোগ হিসাবে চীন-রাশিয়া-ভারত নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ভারত ও পাকিস্তান এর জন্মবিরো্‌ধ – এই প্রাচীনবিরোধকে উস্কে দিয়ে যেন আমেরিকা সেখান থেকে কোন নিজ সুবিধা বের করতে না পারে তাই ২০০১ সালে জন্ম নেয়া চীন-রাশিয়ার জোট এসসিও-তে ভারত-পাকিস্তান এদুইদেশকে একসাথে ২০১৫ সালে এসে একই দিনে SCO এর সদস্য করে নেয়া হয়েছিল। তা সত্বেও, বাইডেন ঐ মেরুকরণের পালটা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের উপর সওয়ার হয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ উস্কে তুলে দিল।
    সারকথায় বললে,  আমেরিকাবিরোধী চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে তাদের নয়া মেরুকরণ-কে দুর্বল করতে সাম্প্রতিককালে আমেরিকা ভারত-পাকিস্তানের বিভেদ উস্কে তোলার কৌশল নিয়েছে। যেমন এর শুরুটা হল, পাকিস্তানকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য প্রায় আধা বিলিয়ন ডলারের সহায়তার জন্য বাইডেনের হাত বাড়ানো। স্বভাবতই এটা ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষি উস্কে তুলতে যথেষ্ট। যদিও জয়শঙ্কর চেষ্টা করেছেন বিরোধটাকে ঠিক পাকিস্তান-ভারত নয় বরং  ভারত-আমেরিকার বিরোধ হিসাবে কেন্দ্রীভুত রাখতে। তিনি ভারতে বসে বা আমেরিকা সফরে গিয়ে এনিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে  খুবই কড়া মন্তব্য বা অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন। [এখানে বিস্তারিত ] যদিও তাতে পাকিস্তানে ইমরানকে হটিয়ে আমেরিকার বর্তমান ক্ষমতাসীন শাহবাজ সরকারকে ক্ষমতায় আনা-কেন্দ্রিক ততপরতা অথবা তাতে যে আমেরিকা-ঘনিষ্টতা শুরু হয়েছিল তা এখন আপত্তিকর ‘অতি ঘনিষ্ঠতা’ হয়ে গেছে, যা আন-এথিক্যাল। কারণ এটা আর এখন পাকিস্তানের স্বার্থে যতটা নয়, তার চেয়ে আমেরিকার স্বার্থে শাহবাজ সরকারকে জবেহ দেওয়ার সামিল হয়ে গেছে। ভারতের সাথে পাকিস্তানের অমীমাংসিত বিরোধ আছে এটা সত্য। কিন্তু তাই বলে সেটাকে অপব্যবহার ঘটানো আর তাকেই আমেরিকা যেন একমাত্র, মুখ্য ও চোখা করে উঠিয়েছে এবং নিজ বাজে স্বার্থে!

    কিন্তু আসলেই কী আমরা বাইডেনের পদক্ষেপ-গুলো বুঝেছিলামঃ
    বাইরের আমরাও ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় ঘটনা, মেরুকরণ ইত্যাদির গতিপ্রকৃতি বুঝেতেছি। কিন্তু না আবার কিছু নতুন ঘটনা হাজির হয়েছে যাতে আমাদের ঘটনা বুঝতে এখনো অনেক বাকি – এটাই সবার উপরে ভেসে উঠেছে।
    কিন্তু কী সেটা? সে ঘটনা আবার দুইটা। এক, শাহবাজের পাকিস্তান তো এখন থেকে বাইডেনকে ভালই সার্ভিস দিতে থাকবে, এটাই ধরে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু না। আমরা দেখলাম, বাইডেন হঠাৎ গত পরশু (১৪ অক্টোবর) পাকিস্তান সম্পর্কে খুবই কঠোর, কটু ও অমর্যাদাকর মন্তব্য করেছে। যার ফলে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদুতকে শাহবাজ সরকার ডেকে এনে তাঁর হাতে পাকিস্তানের কড়া আপত্তি ধরিয়ে দিয়েছে। তাহলে কী দাঁড়ালো এটা?  পাকিস্তান সম্পর্কে বাইডেন বলেছেন, “পাকিস্তান হচ্ছে সম্ভবত দুনিয়ার সেসব মারাত্মক ক্ষতিকর বিপদজনক রাষ্ট্রগুলোর একটা যার হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে কিন্তু দায়ীত্ববান নিয়ন্ত্রণ নাই”। “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”. …।।

    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে তাইঃ
    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে – একথার মানে কী বা বলতে কী বুঝব? অথবা কতটুকুর বেশি বুঝলে ভুল হবে?
    একালের বিচারে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বলতে বুঝতে হবে, কোন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও রুটিন কিছু সম্পর্ক তবুও থেকেও যাওয়া।  অর্থাৎ  ভেঙ্গে যাওয়ার আগে যে  সম্পর্কে ‘বিশেষ ঘনিষ্ঠতার’ জায়গাগুলো ছিল কেবল সেসব ক্ষেত্রগুলোর তাতে পরিসমাপ্তি ঘটা। কিন্তু এরপরেও কূটনৈতিক সম্পর্কসহ রুটিন যেসব সম্পর্কে ঐ দুই দেশের মধ্যে আগেও ছিল যেমন, এসবের মধ্যে পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেগুলো ছিল সেগুলো সবই তা চলতে থাকবে। এটাকে বলছি ‘একালের বিচারের’ ঘটনা। কেন? কারণ,  এর আগে মানে ১৯৯২ সালের আগে আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ক এর কথাই যদি ধরি – এটাই মুখ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা ধরণ এবং এতাই স্টান্ডার্ড বলে মনে করা হত। আর এর মূল বৈশিষ্ট ছিল আমেরিকা-সোভিয়েত এ’দুই ব্লক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন – পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ই ছিল না –  এমনকি ভাষা, কালচার বা শিল্পকলার বিনিময় বলতেও তেমন কিছুই ছিল না। যার সারকথাটা হল – ‘নো এক্সচেঞ্জ’। এটাই ছিল সেকালের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের স্টান্ডার্ড রূপ। আর এর ঠিক উলটা হল একালের বিচারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যেখানে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বললেও বুঝতে হবে তবু একধরণের রুটিন সম্পর্ক যেমন সাধারণ বাণিজ্য সম্পর্ক তবু থেকে যাবে। বিস্তারে যাব না কেবল সংক্ষেপে বলব, একালের সম্পর্ক মানে সকলেই একই আইওএমএফের সদস্য তাই বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে যাবেই। আর তাছাড়া একবার বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি ও শুরু করে ফেললে কিছু কিছু পণ্যে পারাস্পরিক ও আন্তঃনির্ভরতা তৈরি হয়ে যাবেই। এটাই মনে রেখে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া ধারণাকে একালে বুঝতে হবে।
    তাহলে একালের বিচারে  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে বলতে কি বুঝায়, এর অন্তত কিছু বুঝলাম। আর তাতে ভারত যেসব সুবিধা হারিয়েছে সেগুলো হল যেমনঃ ১। আমেরিকার-ভারত একসাথে হয়ে আগে পাকিস্তান কোপাতে পারত। মানে আমেরিকার-ভারতের ইসলাম-বিদ্বেষকে তারা পাকিস্তানেরই দোষ বলে উলটা চাপিয়ে দিতে পারত। তাতে দাবি করত, পাকিস্তান একটা ‘নিচা’ দেশ – এরা পশ্চাদপদ, এরা জঙ্গী, আনকালচার্ড কিংবা এদের ধর্মটাই অপুষ্ট বা দুষ্ট ধরণের ঘৃণামূলক অবুঝ বা না-বুঝের কথাবার্তা  ইত্যাদি; এই ভাষ্যের উপর দাঁড়িয়ে এরা পাকিস্তানকে ডিকটেট করতেও সেকালে চাইতে পারত। বাস্তবত  আমেরিকার-ভারতই যে মূলত স্ব স্ব দেশে মুসলমানদের সাথে সীমাহীন বৈষম্য করে চলেছে, বৈষম্যের জাল ফেলে রেখেছে সেটাকে আড়ালে রেখে তাদের সব যৌথ ততপরতাই হল জঙ্গি, ইসলামি রাডিক্যালিজম নামে চালানো সব ঘটনার আদি উতস!
    সেটা যাক হোক,  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে আর এতেই ভারত আর যে পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ‘বয়ানের জায়গা নাই হয়ে গেছে  পাচ্ছে না, চালু থাকতে পারছে না। এর এক সরাসরি ক্ষতি হয়েছে মোদি সরকারের। তিনি ভারত “পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ” এই  ভুয়া বয়ানের উপর দাড়িয়েই ভারতের মুসলমানেরাই খারাপ বা যেন এজন্যই  এরা নিপীড়িত হবার যোগ্য এই সাফাই তৈরি করেই হিন্দুত্ববাদের জজবা তুলে সেই জোশগুলোকে ভোটের বাক্সে জড়ো করে নিজ ক্ষমতা টিকায় রাখতে ব্যবহার করে চলতে পারত। এটা মোদির এক সরাসরি ক্ষতি।

    তেমনই ভারতের আরেক ক্ষতি হল বাংলাদেশেঃ
    আমেরিকা আর বাংলাদেশ – এরা সরাসরি নিজেরা দুই দেশের স্বার্থের ভাল-মন্দ বা পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে নিজেরাই ডিল করুক – এভাবেই আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে উঠুক?? তাতে ভালবাসা বা শত্রুতা করুক এটা ভারতের কাম্য নয়! না তা নয়। ভারতের ইচ্ছা বাংলাদেশ আমেরিকা-বাংলাদেশ এর সম্পর্কটাকে সরাসরি নিজেরা নয়; বরং ভারতের মাধ্যমে ডিল করুক। মানে আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক – এর লেনদেন, সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি সবটা ভারতের মাধ্যমে ঘটুক। আর এভাবে ভারতকে একটা আলগা মাতবরি বা কুতুবি করতে দেক। যেটা আদতে বাংলাদেশের উপর ভারত একটা আলগা দালালি ও খামখা অভিভাবকগিরি হয়ে উঠুক। বিনিময়ে যেটা বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বলে যেন ভারত দাবি ও উপভোগ করতে পারে!! গত ২০০৭ সাল থেকে এটাই কায়েম হয়ে ভারতের রুস্তমি রাজত্বের ভিত্তি হয়ে থাকা শুরু হয়েছিল। হাসিনা নিজ ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে এটা মেনে নিয়েছিল বলেই এটা চালু হতে পেরেছিল।

    কিন্তু  আমেরিকার ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে যাওয়াতে এসব কিছুই একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। এতে বাস্তবতা হল খুব সহসাই আবার  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক নুন্যতম জেগে উঠুক বা উঠবে এর কোন সম্ভাবনাই নাই, বরং আরো শত্রুতামূলক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। তাই এই পরিস্থিতিতে ভারত নতুন কিছু করে বাংলাদেশের সরকারের উপর প্রভাব সামান্যও যদি ফেরত পায় এমন সব চেষ্টা জারি রেখেছে। এরই একটা রিপোর্ট হল, “বাংলাদেশের ১৯৭১ সালে ঘটা নৃশংসতাগুলোকে আমেরিকান কংগ্রেসে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করে প্রস্তাব পাশ”  ‘Resolution in US house to recognise 1971 atrocities in Bangladesh as genocide’ ।

    ঘটনা পুরানা একাত্তর সালের কিন্তু এটা এখন শাহবাগী রাজনীতি।  সংক্ষেপে বললে বিষয়টা হল, কোন রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার ঘটনাকে জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ও সীমানায় জেনোসাইড বা ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করানো ও স্বীকৃতির ইন্টারন্যাশনাল লিগাল মুল্য অনেক। এছারা এতে ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার অনেক কাছে চলে যাওয়াও হয়। কিন্তু নানান টেকনিক্যাল কারণে, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ঘটনা জাতিসংঘের চোখে গণহত্যা বলে স্বীকৃত নয়। এখন এই আলোকে আমেরিকান কংগ্রেস যদি  এমন গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দেয় তবু সেটা অবশ্যই সমতুল্য কোন ঘটনাই নয়। তবুও এর কেবল কিছুটা ক্যাম্পেইন, প্রপাগান্ডা মুল্য মাত্র এতে থাকবে। এছাড়া এটা লিগাল রায় নয়। পক্ষ-বিপক্ষেরের রাজনৈতিক জোটের মতামত মাত্র।

    কিন্তু তা হলেও এমন মতামত আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস থেকে উদিত হতে পারল কেন?  এটা তো সত্তরের দশকেও হয় নাই। তাহলে এখন কেন?

    আমেরিকা লবির দেশ, লবি করা বৈধঃ
    বহু দেশের নাগরিকই পরবর্তিতে মাইগ্রেটেড হয়ে আমেরিকার নাগরিক হয়। আমেরিকান নাগরিক মানে এটাই। এটাই আমেরিকান নাগরিক হওয়াদের প্রধান ধারা। ফলে কেউ পুর্ণ নাগরিক হয়ে গেলেও তারা স্ব স্ব অরিজিন দেশের স্বার্থের প্রেশার গ্রুপের ভুমিকার ভোটার-নাগরিক হয়ে যেতে পারে। তবে সেটা একমাত্র একই অরিজিন দেশের আমেরিকানেরা সংগঠিত হতে পারলে তবেই এরা সম্মিলিতভাবে ফেলে আসা দেশের পক্ষে বিশাল লবি গ্রুপ হয়ে উঠতে পারে।  বাংলাদেশেরও বহু মানুষ একালে আমেরিকার নাগরিক হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এখনো বাংলাদেশ লবি গ্রুপ হবার পরিবর্তে  বরং দেশের মতই দ্বিদলীয় ভাগ হয়ে দলদাস হতেই আগ্রহি।

    কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে, তারা অনেক জনসংখ্যার বলে, সরকারের দিক থেকে আমেরিকায় এমবেশি থেকে পরিচালিত এটা সংগঠিত করে নেয়া বলে এটা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের হয়ে তবে বিশাল লবি গ্রুপ – এক র‍্যাকেট হয়ে ততপরতা করে থাকে। কংগ্রেস সদস্যও নির্বাচন করে থাকে। কোন সিনেটরের পিছনের সাপোর্ট গ্রুপ হয়েও কাজ করে থাকে সময়ে। তবে কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর এসব জনপ্রতিনিধি সবসময় সরাসরি ভারতীয় অরিজিনের এমন ব্যক্তি নাও হতে পারেন। তবে অবশ্যই তাদের কনষ্টিটুয়েন্সি ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান ভোটাররাই হয়ে থাকেন। এছাড়া আরেক ধরণের জনপ্রতিনিধিকে দেখা যায় যারা আমেরিকায় ভারতের স্বার্থের পক্ষে কাজ করে থাকেন। এরা হল, আসলে কোন এক বা একদল হোয়াইট আমেরিকান ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি যাদেরকে ভারত তাদের দেশের ব্যবসা পাইয়ে দিয়েছে, সহজ করে দিয়েছে। আর বিনিময়ে তারা ভারতের পক্ষে ও স্বার্থে কাজ করবে এমন এক বা একাধিক জনপ্রতিনিধি জুটিয়ে দিয়েছে হয়ত।

    আলোচ্য ক্ষেত্রেও আমেরিকান কংগ্রেসে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে,  দুই কংগ্রেসম্যান এই প্রস্তাবটা তুলে এসে পাশ করিয়েছেন –  স্টিভ শ্যাবট [Steve Chabot ] ও আরও খান্না [Ro Khanna ] নামের দুই আমেরিকান কংগ্রেসম্যান। স্বভাবতই খান্না  এই পাঞ্জাবি টাইটেল এর  মানে তিনি ভারতীয় অরিজিন।

    তাহলে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট “এই প্রস্তাব” তাদের এত আগ্রহ করে আনার কারণ কী? কারণ এটাই মোদি সরকারের আগ্রহ। কিন্তু সরকারের আগ্রহ কেন? কারণ, এই প্রস্তাব মানে হল,  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক সরাসরি না হয়ে সেটা ভারতের মাধ্যমে  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক করার বা হবার লাইনের প্রস্তাব – এরই আকুতি। আর এটাই এতদিন হাসিনা সরকারের স্বার্থ ছিল। বা স্বার্থের গৃহিত লাইন ছিল। যেটা এখন অকার্যকর। হাসিনা মনে করে ভারত এব্যাপারে এখন মুরোদহীন; যার নিজেরই আমেরিকার কাছে বেইল নাই। আর খোদ আমেরিকাই এখন হাসিনা সরকারের উপর বিলা! কিন্তু তবু ভারত নাছোড়বান্দা। যেন দেখাতে চায় এখনো আমার কিছু আমেরিকান জনপ্রতিনিধির উপর প্রভাব আছে আর সেটা আমরাই বাংলাদেশে বেচতে চাই!!

    তাহলে এখন এই লেখার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেটা হল, বাইডেন কেন চীন-আমেরিকার বিরোধ প্রসঙ্গে এখন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার কাজে লাগানো সম্পন্ন করেও আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই পারমানবিক বোমার অধিকারি দেশ প্রশ্নে অযোগ্য [without any cohesion] রাষ্ট্র বললো?

    Biden in a speech said Pakistan “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”.

    আসলে এর মূল কারণ, দুটা দুই কনটেকস্ট (context) বা পটভুমিতে। প্রথমটা ভারতের চীন-রাশিয়ার পক্ষে চলে যাওয়ার শাস্তি হিসাবে যেটা আগেই অনেক বলেছি। আর দ্বিতীয়টার হল, আমেরিকায় নির্বাচন আগামি ৮ নভেম্বর ২০২২, সেই প্রসঙ্গে ও পটভুমিতে। নির্বাচন মানে?

    বাইডেনের চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার দুইবছর বা অর্ধ-আয়ু পার হবার দিন হল আগামি ৮ নভেম্বর। আর ঐদিনই আবার আমেরিকান সিস্টেম অনুসারে এক-তৃতীয়াংশ সিনেট ও পুরা কংগ্রেসের সদস্যদের আসনে মেয়াদ শেষ ও নয়া-নির্বাচনের দিন। আরেকটু ভেঙ্গে বললে, আমেরিকার কংগ্রেসে (আমাদের ভাষায় সংসদে) সদস্যরা মাত্র দুবছরের জন্য নির্বাচিত হন। তাই প্রতিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ও ওর সাথে একবার আর আরেকবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দুবছর পার হলে পরে (যেটাকে মিড-টার্ম বলে) – এভাবে দুই সময়ে দুবছর পরপর আমেরিকান কংগ্রেস সব সদস্যদের (মোট ৪৩৫+২ ) আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

    আর আমেরিকান কংগ্রেসের নির্বাচনের সাথে একই সময়ে এভাবে সিনেটরদেরও নির্বাচন হইয়ে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে এক জায়গায় শুধু একটু ফারাক আছে।   তা হল, সিনেটরেরা কংগ্রেসের মত দুবছরের মেয়াদে নয়, বরং টানা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তবে প্রতি দুই বছর পরপর মোট আসনে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

    তাহলে সারকথায় মিড টার্ম নির্বাচন মানে কী দাড়ালো? তা হল, একঃ  সব কংগ্রেসের আসনেই (৪৩৫+২) নয়া নির্বাচন এর দিন সেটা। দুইঃ  সিনেটের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচনের দিন সেটা। আর তিনঃ প্রতি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মেয়াদের অর্ধ-মেয়াদ বা দুবছর পার করার দিন সেটা। যদিও এই মিড-টার্মের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের (বাইডেনের ডেমক্রাট) দলের জনপ্রতিনিধিরা কংগ্রেস ও সিনেটের যেকোন এক জায়গায় বা দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তাতে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা হারাতে হবে না। মানে ডেমক্রাটেরা আগামি এই মিড টার্মে কংগ্রেস ও সিনেটের সবজায়গায় হেরে গেলেও বাইডেনই প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন। চারবছর পুর্ণ প্রেসিডেন্টই থেকে যাবেন।

    এবার আমাদের প্রাসঙ্গিক কথা হল, আসন্ন মিড-টার্মের নির্বাচনে ডেমোক্রাট কংগ্রেসম্যান যারা ভারত-প্রভাবিত তাদেরকে জিতাবার জন্যই বাইডেন পাকিস্তান-বিরোধী অমন কথা বলেছেন। অর্থাৎ এর সাথে ভারতের আমেরিকাকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার সাথে তাদের জোটে চলে যাবার কোন সম্পর্ক নাই।
    আমার একথা সবচেয়ে ভাল বুঝা যাবে বাইডেন কোথায় গিয়ে এইকথাগুলো বলছেন সেদিকে যদি খেয়াল করেন। লেখা আছে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচন উপলক্ষ্যে ডেমোক্রাট কংগ্রেস প্রার্থীদের পক্ষে ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে [……Biden made the comments during a reception of the Democratic Congressional Campaign Committee on Thursday ]। ঐ ক্যাম্পেইন শুরুর আগে ক্যাম্পেইন কমিটির সভায় তাদেরকে উতসাহ দিতে  বাইডেন সেখানে গিয়েছিলেন।  ঐ বক্তৃতাতেই তিনি পাকিস্তানকে ক্ষেপিয়ে ঐকথা বলেছেন।
    এককথায় বললে, যেমন  ডেমোক্রাট Ro Khanna [ROHIT KHANNA] এর মত ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান কংগ্রেসম্যানদেরকে মিডটার্মে আবার জিতাবার জন্য বাইডেন পাকিস্তানকে ঠেস দেয়া বা নিচা দেখানো ঐ বক্তব্য দিয়েছেন। আবার যেমন Ro Khanna কে জিতাবার জন্য বাইডেন কাজ করছেন বলে এর মানে এমন নয় যে বাইডেন আমেরিকা-ভারতের ঘনিষ্ট আগেকার সম্পর্কটাই আবার ফিরিয়ে আনার পক্ষে কাজ করছেন। এমন বুঝা ভুল হবে!

    এই হল মূল কথা। আর এখন একটু বাড়তি কথা বলে নেই এই সুযোগে। এই মিড-টার্মে বাইডেনের দল ডেমোক্রাটেরা গোহারা হারবে বলে পুর্বাভাস বলছে। কারণ প্রায় ৯% মুদ্রাস্ফীতি আর এতে মিডল-ক্লাস ও নিম্ন মধ্যবিত্ত এরা প্রচন্ড ক্ষেপে ক্ষুব্ধ। এছারা প্রায় দেড় বছর ধরেই তাদের পছন্দের ও নাগালের মধ্যে মুল্যের চীনের তৈরি গৃহস্থলিতে ব্যবহার হয় এমন ওয়াসিং মেসিন বা এসি ইত্যাদি আমদানি পণ্যের উপর ২৫% বা এর উপরে কোথাও ৬৬% পর্যন্ত অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানোতে ক্ষুব্ধ ছিল তারা। যদিও এই বাড়তি ট্যাক্স বসিয়েছিলেন ট্রাম্প তাঁর ক্ষতা ছাড়ার আগে কিন্তু এর এফেক্ট শুরু হয় বাইডেনের আমলে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ট ভোটারেরা বাইদেনের দলের বিরুদ্ধে যাবে বলে অনুমান। এতে যদিও বাইডেন ক্ষমতাচ্যুত হবেন না। তবে, যেগুলো অর্থ-বিল মানে যেখানে প্রেসিডেন্ট কোথাও কোন দেশে অর্থ বরাদ্দ দিতে চান এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চান সেগুলো আগে তাকে সংসদ-সিনেটে অনুমোদন নিতে হবে। আর এই অনুমোদন নিতে গিয়েই তিনি বাধার সম্মুখীন হবেন।

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

     

  • বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    গৌতম দাস
    ০৪ অক্টোবর ২০২২;  Published on: Oct 4, 2022 at 00:03

    https://wp.me/p1sCvy-4fr

     

      External Affairs Minister S Jaishankar with United States Secretary of State Antony Blinken in Washington DC on Tuesday | ANI

    সরাসরি বললে, এতদিন এশিয়ায় এক মুখ্য (পুরানা) মেরুকরণ বিরাজ করছিল যেটার শুরু মোটাদাগে বললে চলতি শতকের শুরু থেকে। কিন্তু চিনব কী করে?  বাংলাদেশের গত ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু হওয়া আর পরিণতিতে ভারত-আমেরিকার বসিয়ে দেয়া হাসিনা সরকারকে আমরা অনেকে যেভাবে চিনি আর এটাই হল সেই মেরুকরণের ফলাফল বা ফসল। তাই পুরানা সেই মেরুকরণ বলতে বুঝিয়েছি বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকারকে। অর্থাৎ এই মেরুকরণে মূল বৈশিষ্ট ছিল যে পরিণতিতে এতে ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা জায়গা নিয়েছিল একই মেরুতে।  আজ সেই মেরুকরণ এখন ভেঙ্গে পড়ার মুখে; অন্তত আজ ৩ অক্টোবরের সকালের খবর পর্যন্ত; তা খুবই দ্রুত আগিয়ে যাচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষগুলোরই ভাষা ও ভাষ্যও ক্রমশ বদলে যাচ্ছে!  তবে অবশ্যই এটা তা ভেঙ্গে-গড়া ধরণের। তাই আবার গড়তে বড় আরেক নয়া মেরুকরণ ঘটা শুরু হয়েছে; সেটা ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। যদিও এর বড় ও স্পষ্ট প্রকাশটা ঘটতে আরেকটু সময় নিচ্ছে।

    মুখ্য তবে পুরানা মেরুকরণ এর বৈশিষ্ট কী ছিলঃ
    ঘটনার পিছনের দিক থেকে তাকিয়ে বললে, এর জন্ম জর্জ ডব্লিউ বুশ [George Walker Bush] বা জুনিয়র বুশের হাতে যার দুই টার্মের প্রেসিডেন্সি হল ২০০১-২০০৯, এই সময়কালে। তাতে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের নয়া যুগের সুচনা করেছিল। দু-এক বাক্যে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার (১৯৫৩-৬১) [Dwight D. Eisenhower] এর আমলে (১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে তাঁর প্রথম ভারত সফর), ততদিনে যিনি “সিআইও পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশে সরকার ফেলানো” কুখ্যাত অভ্যাস চালুর নায়ক; এভাবে প্রথম “ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক” শুরু হয়েছিল সেই ১৯৫৯ সাল থেকে। যদিও ১৯৬২ সালের পর থেকে তা আর ভারতের জন্য সুখকর থাকে নাই। মুল কারণ দুটা।  একদিকে আমেরিকার হয়ে নেহেরুর ভারতের চীনে (তীব্বতের দালাইলামার দেশছেড়ে পলায়ন ও ভারতে আশ্রয় ইস্যুতে) ততপরতা ও আমেরিকার খেদমত করতে গিয়েছিলেন বলে (মনে করা হয় এটাই আইসেনহাওয়ার-নেহেরুর ১৯৫৯ সালের গোপন চুক্তি ); আর তাতে ক্ষুব্ধ চীনের হাতে ১৯৬২ সালে আসাম বেদখল ও মার খাওয়া ছিল ভারতের জন্য খুবই খারাপ অভিজ্ঞতা।
    আর এছাড়া অন্যদিকে পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে  মূলত, ভারত-পাকিস্তানসহ ছোট দেশগুলো যাতে নিজেরাই পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ বা তৈরিতে না আগাতে পারে তাই, আমেরিকা-সোভিয়েত এই ইস্যুতে এক এলায়েন্স করেছিল; আর তাতে যৌথভাবে নানান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল (যা শেষে NPT বা নন প্রিলিফারেশন চুক্তি পর্যন্ত হয়েছিল। এই NPT  চুক্তি ছিল আসলে, UN এর অধীনে এই চুক্তি সদস্যদের স্বাক্ষরের জন্য ওপেন করা হয় ১৯৬৮ সালে আর কার্যকর হয়েছিল ১৯৭০ সাল থেকে।) – আর এদুই ঘটনা থেকে পরবর্তিতে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই ঝুলে যায়, প্রায় ভেঙ্গে পড়ে। যা আর সতেজ থাকে নাই।
    তাই এর প্রায় ত্রিশবছর পরে  আর ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতোমধ্যে (১৯৯১ সালে) ভেঙ্গে যাবার সুবিধা নিতে, একমাত্র গত শতকের নব্বইয়ের দশকেরও শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার চালু করতে এবার দুপক্ষ আগ্রহি হয়েছিল। যদিও তা ২০০০ সালের জানুয়ারিতে বিল ক্লিনটনের ভারত সফরে ও তাঁর হাতে তবে ‘সুশীলভাবে’ ঘটেছিল;  আর ক্লিনটনের বিপরীতে তখন ভারতের বিজেপির বাজপেয়ীর প্রথম পুর্ণ প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৯-২০০৪) জমানা ছিল সেটা।

    তবে ভারত-আমেরিকার সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল  পরস্পরের পিঠচুলকানোঃ
    আর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ২০০১ সেপ্টেম্বর নাইন-ইলেভেনের পরে তা মূলত উভয়ের  “মুসলমান কোপানো” সুবিধা নিতে তারা ‘জঙ্গী’ বয়ান খাড়া করে এরই মারামারি যুদ্ধের সম্পর্ক হিসাবে। আর তা প্রথম রূপান্তরিত হয়েছিল বুশের হাতে ওয়ার অন টেরর এর পলিসির অধীনে।  অর্থাত নয়া চলতি শতকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এর মুখ্য দিক বা ফোকাস ছিল আসলে এক ‘মুসলমান কোপানো্র’ এলায়েন্স। যেটা তাদের উভয়ের জন্য দরকারি ছিল এজন্য যে ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে ভোটে কারচুপি করে এথেকে সৃষ্ঠ ক্ষোভে কাশ্মিরের মুসলমান জনগোষ্ঠিকে প্রথমে কংগ্রেস পরে বিজেপির বাজপেয়ী আরও সুচারুভাবে সেই প্রথম সশস্ত্রতার দিকে ঠেকে দেওয়াতে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলা। আর ওদিকে আমেরিকার দিক থেকে দরকার তাদের “ওয়ার অন টেররের পলিসির” পক্ষে ভারতের সম্মতি আদায় – এদুই স্বার্থের এলায়েন্স ছিল সেটা। পরবর্তিতে, আরো এগিয়ে ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফরের ফলে, তা হয়ে দাঁড়ায় এমন যেটাকে বলা যায়,  ভারত আমেরিকার হয়ে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ বা ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেওয়া সম্পর্ক। এটাই ভারত-আমেরিকার প্রথম ঘোরতর চীনবিরোধি এক স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স ছিল। যা এবার সম্পুর্ণ উলটা দিকে টার্ণ নিতে শুরু করেছে আর এবার এই ২০২২ সালের শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার ভাঙ্গাচুড়ে, এক নয়া মেরুকরণ হতে যাচ্ছে। কোন কোন ইস্যু বা ক্ষেত্রে তা ইতোমধ্যেই  প্রবলভাবে শুরু হয়ে গেছে।

    ভারতের উপর আমেরিকার এবার প্রথম স্যাংশন জারি শুরু হয়েছেঃ
    ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এবারের প্রকাশ্যে  ঢলে পড়ার ঘটনাটা হল, এই প্রথম ভারতের উপর আমেরিকার স্যাংশন জারি। যেমন, ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া দ্যা প্রিন্ট এর এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে – লিখেছে  “জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরের পরেই, আমেরিকার প্রথম এক ভারতীয় কোম্পানির উপর, ইরানি তেল আমদানির সম্পর্ক করার জন্য, স্যাংশন আরোপ” [Days after Jaishankar visit, US imposes first-ever sanction on Indian firm for oil trade with Iran]।

    অর্থাৎ এর আগে ভারতকে দেয়া আমেরিকার বাণিজ্যিক সুবিধাসহ বিভিন্ন ফেবার পরে ছাটাই হতে হতে ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছিল সেই ট্রাম্পের আমল (২০১৭) থেকেই। তবু ভারতের কোর কিছু স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক  সে আমেরিকার সাথে বজায় রেখে চলছিল। এমনকি ট্রাম্প আমলের (২০১৯) শেষে যখন ইরান-আমেরিকান পারমানবিক চুক্তি সে [Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA)] ভেঙ্গে দিলে এরপরে ইরানের উপর নতুন করে স্যাংশন আরোপ করা হয়েছিল। আর তাতে ট্রাম্প ২০১৯ সালে ভারতকে ইরান থেকে সেবার তেল আমদানি বন্ধ করতে বাধ্যও করতে পেরেছিল। এছাড়াও একালে কোয়াডের ভিতর নানা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নিয়ে বাইডেন প্রকাশ্যেই সমালোচনা করে যাচ্ছিল। ভারতে মোদির “মুসলমান কুপিয়ে নির্বাচনে জিতার” কৌশল নিয়ে বাইডেনের ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন’ স্যাংশন আরোপের সুপারিশ করে চলছিল লাগাতর। বাইডেন সেটা নিয়ে সাবধান করেছেন এমনকি, কাশ্মীরে মোদির নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু স্যাংশন আরোপ করতে পারেন এমন ধারণা দিলেও বাইডেন এর আগে কখনও তা বাস্তবায়ন করেন নাই। অর্থাৎ প্রকাশ্য মুখে সমালোচনা করলেও বাইডেন প্রশাসন কখনও চরম পদক্ষেপ হিসাবে ভারতের উপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোন স্যংশন আরোপের মত ঘটনা ঘটান নাই।

    ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরও আমেরিকান স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা খাওয়া রাশিয়া থেকে এতদিন ভারত তেল ও অন্যান্ত পণ্য আমদানি করে চলেছিল। তাদের গরীব অর্থনীতির দোহাই দিয়ে। এসব নিয়ে প্রকাশ্যে আমেরিকা আপত্তি বা অসন্তোষ জানালেও কখনই আমেরিকান পদক্ষেপ স্যাংশন আরোপ পর্যন্ত  গড়ায় নাই। কিন্তু এবার একই কাজ মানে ইরানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এবং তা একটা ভারতীয় বেসরকারি কোম্পানি আমদানি করাতে আমেরিকা এবার সেই কোম্পানির উপর প্রথম আমেরিকা সরাসরি স্যাংশন আরোপ করেছে।

    আমেরিকার এই এক্টের মধ্যে দিয়ে একটা নিশ্চিত ম্যাসেজ হল, আমেরিকা তার আপত্তিসহ-ই রাশিয়া থেকে ভারতকে তেল আমদানি এলাও করলেও ইরান থেকে একই কাজ ভারত করতে চাইলে কঠোরভাবে তা দমন করবে তা বুঝিয়ে দিল।

    ওদিকে এনিয়ে মিডিয়া রিপোর্ট হল, এত পরেপরেই এবার জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরে গত সপ্তাহের ২৭ সেপ্টেম্বরে ব্লিঙ্কের সাথে তাঁর বৈঠকে এসব বিরোধ নিয়ে ঠিক কী আলাপ হয়েছিল এর বিস্তারিত সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে, ভারতীয় মুখপাত্র জানান নাই। তাঁর “জানা নাই”, অজুহাতে। অর্থাৎ অনুমান করা হচ্ছে ভারতের মোদি সরকারকে এখন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক নিয়ে” কিছু তিতা সিদ্ধান্ত আর না নিলেই নয় – এমন অবস্থায় পৌছেছে। আগামি দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে এর চিহ্ন-ইঙ্গিত আর অপ্রকাশ্য থাকবে না।  আসলে এবারের জয়শঙ্করের সফরের পরে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক যে আর  অপ্রকাশ্য-বিরোধ হয়ে হাজির না হয়ে থাকবে না, এরই প্রবল অনুমান করা হচ্ছে। কারণ, কোন সম্পর্ক আরো কিছুদিন ইতিবাচক থাকার সম্ভাবনা থাকলে সেটা এতদিন প্রকাশ্যে এসে পড়ত।

    সম্পর্কবিরোধটা শুধু তেল আমদানি, অনেক গভীরেরঃ
    আসলে সম্পর্কবিরোধটা তো শুধু তেল আমদানি নিয়ে নয়; বরং সর্বত্র ও সব ইস্যুতেই। যার আরেক বড় প্রকাশ হল, আমেরিকান বার্মা দখলের খায়েস-পরিকল্পনা। যেটা নিয়ে আগের সপ্তাহে লিখেছি। বলেছিলাম ভারতের কোরস্বার্থ হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনথ ফ্লিট নোঙর না করতে দেয়া আর এরই সাথে সর্বোতভাবে ” হবু “আমেরিকান বার্মা দখলের” বিরোধিতা করা। মানে কোন ‘বাইডেনের বার্মা’ দেখতে ভারতের না চাওয়া, এমনকি চীনের কোলে উঠে হলেও এর যতটা সম্ভব সরাসরি প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা।
    আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি, তিন সপ্তাহ আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর লাদাখ সিমান্তে চীন-ভারত ২০২০ সাল থেকে উভয় পক্ষ যে সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে রেখে ছিল এর অবসান ঘটিয়েছে উভয় পক্ষ। ভোজবাজির মত উভয়ের সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।  এমনকি চীন-ভারত কতটা কাছাকাছি চলে গিয়েছে আর তাতে ভারত কত মরিয়া হয়ে ছাড় দিচ্ছে এর এক প্রমাণও হাজির হয়েছে। এরপরেই গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ছিল এসসিও (SCO) বার্ষিক সভা; সেখানে চীন এক আলোচনায় বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে এমন এক ম্যাপ দেখিয়েছে যেখানে ভারতের দাবির খোদ লাদাখ ও অরুনাচল প্রদেশকে চীনের অংশ বলে দেখানো হয়েছে তবু মোদির ভারত কোন আপত্তি তুলে নাই – ভারতে বসে এনিয়ে অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। এনিয়ে ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনামঃ
    “ভারতের মানচিত্র থেকে বাদ অরুণাচল, লাদাখ! এসসিও-তে ‘চিনা–কীর্তি’ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে” [লিঙ্ক পেতে এখানে ক্লিক করেন]

    আসলে, এখন যেভাবে আমেরিকার এমন খায়েস-পরিকল্পনা প্রকাশিত হচ্ছে এসবই চলতি শতকের শুরুতেও আগে থেকেই আমেরিকার ছিল। কিন্তু শতকের শুরুতে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক কাজ করতে শুরু করাতে, বিশেষত – ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা’ কাজ করছিল বলে আমেরিকার সেইসব খায়েস লুকিয়ে বা তুলে রাখা হয়েছিল তখন।  কিন্তু বর্তমানে  আমেরিকান বার্মা দখলের পরিকল্পনা আমেরিকা আর লুকিয়ে রাখতে চাইছে না। আর ওদিকে এই পরিকল্পনার পালটা পদক্ষেপ হিসাবে রাশিয়া-চীন-ভারত এক অঘোষিত মেরুকরণে রাশিয়াকে সামনে রাখতে ভারত-চীন আগ্রহি বলে আর রাশিয়ার বার্মার শাসকদের সাথে এলায়েন্স গড়াতেই বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ছিল।

    আসলে কার্যত সবমিলিয়ে এতেই ‘নয়া মেরুকরণ’ আর অপ্রকাশ্যে রাখাতে সবপক্ষই অক্ষম হয়ে পড়ছে। আর এরই প্রথম বলি হয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক। সে কারণেই এসব আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে এসব আর আলামত হয়ে থাকবে না। প্রকাশ্য চিহ্ন-ইঙ্গিতেও নয়, বরং প্রকাশ্য নয়া মেরুকরণ, নয়া জোট হিসাবেই তা হাজির হতে যাচ্ছে।
    আর তা দেখার জন্য আমাদেরকে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। আসলে ইতোমধ্যেই মূল আমেরিকা-চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের পালা বদলের লড়াই – এরই অংশ হিসাবে চীনা পক্ষের সম্ভাব্য মেরুকরণের মহড়াটা হয়ে গেছে এসসিও (SCO) বা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন এর  গত-মাসের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন থেকেই।

    তা সত্বেও এর বিপরীতে বাইডেনের আমেরিকা আর কোন দেশকে নিজের পক্ষে পেতে যাচ্ছে – বিশেষত ইইউ বা ইউরোপ কী বাইডেনের পক্ষে থাকতে পারবে কিনা এবং খোদ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বাইডেনের কী নিয়ন্ত্রণ থাকছে না বাইডেনের হাত গলে তা বাইরে চলে যাচ্ছে – এসব কিছুই তা আগামি ডিসেম্বরেরই ফয়সালা হয়ে যাবে। খুব সম্ভবত নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তা ফুটে উটতে শুরু করবে।  আর তা অবশ্যই প্রকশ্যে; মানে গ্লোবাল মেরুকরণের আর কোন কিছুই অপ্রকাশ্য থাকবে না। যেমন,  ইউক্রেন যুদ্ধ এবার (নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে) শেষ হবে কিনা এবং তা, কোন মেরুকরণে তাও এবার নির্ধারিত হয়ে যাবে প্রকাশ্যেই, নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে।

    কিন্তু এতে বাংলাদেশে কীঃ
    বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনাটা হল, গ্লোবাল রাজনৈতিক এই ঘটনাগুলোর পরিণতি বা ফলাফলে, বিশেষ করে নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ তা বাংলাদেশে বড় প্রভাব ফেলবে। যদিও বাংলাদেশের চলতি ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠা রাজনৈতিক মোচড় ও গত পনেরা বছরের শাসন ঘটনাবলির একটা বড় অংশই মূলত লোকাল ঘটনা। তবু এই লোকাল ঘটনা্য়র মধ্যে এতদিন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ছিল এক বড় নির্ধারক উপাদান। তাই আমেরিকা-ভারত “সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” একেবারে ভেঙ্গে পড়া ও নয়া মেরুকরণের দিকে রওনা এর নিট ফলাফল হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের আলগা মাতবরি ও প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। এবং তা ইতোমধ্যেই সেদিকে রওনা দিয়েছে। সেটা সম্ভবত ২০০৭ সালের ১/১১ এর আগের বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের জায়গায় ফিরে যাবে। অনেকে তাই দোরাইস্বামীর গতমাসের বিদায় ভাষণ কে স্মরণ করছেন; যেখানে তিনি বলছেন, বাংলাদেশে “ভারত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পাশে নেই” বা সাথে ছিল না। এর গুমোর ‘অর্থ’ বের করার চেষ্টা করছেন অনেকে।  সারকথায় বললে, আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা শুন্য হয়ে গেলে আর বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বা গুরুত্বমূল্য আর কই থাকে?

    তবু শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারত চেষ্টা করবে পুরানা কায়দা বজায় রাখতেঃ
    কিন্তু সাবধান শেষদিন পর্যন্ত ভারতের চেষ্টা বজায় থাকবে। কিন্তু কি করে বুঝব সেটা বজায় থাকার চেষ্টা করছে? সর্বশেষ সুলতানা কামালের লেখা যা প্রথম আলো ছেপে দিয়েছে – এটাই ঢলে পড়া পুরাতন ভারতের শেষ উঠার চেষ্টা। আমেরিকার স্যাংশন আরোপ আগামি ১০ ডিসেম্বর ২০২২ একবছর হবে। আর আলামত হচ্ছে সম্প্রতিকালে হাসিনার ক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আর একাজে সম্মুখ সারির মিডিয়ার ভুমিকায় আগের মতই প্রথম আলো। এমনকি এই ততপরতা ইউক্রেন যুদ্ধের আমেরিকান প্রপাগান্ডা পর্যন্ত বিস্তৃত করে রেখেছে; অনেকে এটাকে প্রথম আলোর একেবারে উদাম হয়ে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া হয়ে উঠার লক্ষণ হিসাবে দেখছে।
    যদিও মিডিয়া হিসাবে নিজের বেছে নেওয়া প্রথম আলোর কোর-ভুমিকা হচ্ছে ইন্ডিয়ান স্বার্থরক্ষা যেটাকে, সে আবার প্রগতিশীলতা, সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা বা অসাম্প্রদায়িকতা এসব শব্দের আড়ালে করে থাকে। কিন্তু  এখন সে যেন প্রো-আমেরিকান ভুমিকাটাকে এর উপরে রেখে চলছিল। এসব কথাগুলো গোয়েন্দা-পরিভাষায় বলা হয়, এতবছর সিআইএ র-কে আপারহ্যান্ডে রেখে নিজের কাজ চালাচ্ছিল। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২১ স্যাংশন ঘোষণা দিয়ে সিআইএ নিজেই যেন নিজেকে আপারহ্যান্ডে উঠিয়ে নিয়েছিল। আর এখন? fall apart ! অর্থাৎ এক বছর না যেতেই এটা এখন ধর্ম ও স্বার্থ যার যার অবস্থায়!!  “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়া যেটা এতক্ষণ উপরে আলচনা করেছি তা যেন সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়ে পড়েছে “এখানে”।  আর এর ঢলে পড়া বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাব – এথেকেই পালটা আবার উঠে দারানোরই এক উদ্যোগ প্রচেষ্টা হল সুলতানা কামালের ততপরতা, আর প্রথম আলোর এর পক্ষে দাঁড়িয়ে মরিয়া হয়ে সহায়তা দেয়া।
    মূলত ইডেনের “সেক্স  স্লেভারির ঘটনা” হাসিনা ও লীগের মরাল ভিত্তিতে প্রবল আঘাত হেনেছে। যেটা ক্ষমতাচ্যুত হবার আগেই যেন লীগের মরালি-চ্যুত হয়ে পড়া। আর একাজে লীগকে সহায়তা দিয়ে বিনিময়ে ভারত নিজের ঢিলা হয়ে পড়া ক্ষমতা আবার খাড়া করতেই এই সুলতানার প্রচেষ্টা। তিনি প্রবল চেষ্টা করেছেন ঘটনার দায় বিওএনপির উপর যতটা সম্ভব চাপিয়ে দিতে। এমনকি সুলতানার কাছাখোলা  সর্বশেষ প্রচেষ্টাটা এবার আর প্রথম আলোর পক্ষ কাঁধ দেয়া সম্ভব হয় নাই। তাই ভারতের প্রো-মোদি এক মিডিয়া ইন্ডিয়া টুডে সে দায় নিয়েছে। যাতে আমেরিকার কাছে বাংলাদেশে হারানো ভারতের প্রভাবেই অন্তত কিছুটা ভারত ফিরে পায়! কিন্তু এর পরিণতি হল সুলতানাকে এখন থেকে বাকি জীবন পাবলিক লাইফে নেপথ্যে বা বাইরে কাটাতে হবে। আর তিনি হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কেউ না, আসলে ছিলেনও না এটাই এখন উদাম হয়ে গেল!! এত দ্রুত, অবিশ্বাস্য!!!
    তবে এই পতনের মূল জায়গাটা হল, “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়াকে পড়তে ব্যার্থ হওয়া। সুলতানা যে একজন ‘পুর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’ ছিলেন তা তাঁর জীবন সায়হ্নে এসে উদাম হয়ে গেল!

    মূল সমস্যা “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” পড়তে ব্যার্থতাঃ
    এমনই আরেক চরম ব্যর্থতার ঘটনা দেশের ভিতরেই ঘটেছে। দেশের ভিতরেই আমরা দেখছি হাসিনার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় যারা তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আর সেকথাটাকে প্রথম আলোর রিপোর্টের ভাষায় বললে, “বিএনপিকে থামানোর পথ খুঁজছে আ.লীগ”। এই হল বাস্তবতা। অথচ দেখা যাচ্ছে অনেক তুলনামূলক ছোট রাজনৈতিক দল এই ফেনোমেনাটা পড়তে জানে না।  বলে এখন  এই শেষ জীবনে এসে আবার এদের অনেকে ভারতের সহায়তা পেতে চেষ্টারত; লিঙ্ক যোগাড়ের চেষ্টায় রত। তাদের বোকা আকাঙ্খাটা হল, ভারত যদি তাদের দলীয় রেজিষ্টেশন ইত্যাদি কোন সরকারি ফেবার পেতে সহায়তা করে তাহলে এটাই তাদের নিজদলের স্বার্থ হবে।  আগামি হবু নির্বাচনে এভাবেই তারা নিজ স্বার্থটা  বলে বিশ্বাস করছে। এদেরকে নিয়ে কী বলা যায়??
    তার মানে লীগ যেখানে নিজ ক্ষমতা ধরে রাখার অন্তত চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে এই দলগুলো সেখানে তা দেখতেই পাচ্ছে না। শুধু তাই না, ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভাটাতে হওয়া সত্বেও এরা হাসিনার বাংলাদেশের উপর মোদির প্রভাব অটুট দেখতে পাচ্ছে!! তাদের প্রাণপণে ভারত লবি খুঁজার কথা জেনে-দেখে  বুঝা যাচ্ছে তাদের নাদানি কত গভীর!!! তারা শেষে এই ২০২২ সালে এসে প্রাণপণে ভারতের দালালি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তারা জানেই না যে কোন সম্পর্কই আর আগের জায়গায় নাই; তা না থাকারই কথা! না গ্লোবাল রাজনীতির মেরুকরণের দিক না এটা একান্তই এর স্থানীয় রাজনীতির দিক। সে কেবল ভাল লবি খুজে ভারতের সেবা করে নিজের স্বার্থ অর্জন করতে নেমেছে!!! অদ্ভুত তাদের বুঝাবুঝির ভিত্তি!!
    রাস্তার আন্দোলন বা উদ্যোগ কোথায় পরিণতি বা ফলাফলে পৌচাচ্ছে তা দেখতে একটু অপেক্ষা করতেও তারা রাজি না। আবার ভারতের কাছে যা চাইতে নেমেছে তা মিনিংফুলি ভারতের দেওয়ার ক্ষমতা আছে কিনা তা চেক করতেও তারা রাজি না!! এই হল বাংলাদেশের কিছু রাজনীতিক!

    তাহলে এখন শুরুর  কিছু কথা আবার মনে করিয়ে শেষ করব।  বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকার এর অর্থ হল এতে যে গ্লোবাল মেরুকরণের ইঙ্গিতটা ছিল তা হল – ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা একই মেরুতে জায়গা নিয়েছিল। এখন বাংলাদেশের রাজনীতিক যারা  “এই মেরুকরণ”কে একেবারে স্থায়ী বলে মনে করবে; তারা রাজনীতি করার অযোগ্য যারা ধরে নিবে যে শুধু তাই না,  যারা মনে করবে ভারতের সাথে লবি করলে তবেই আমাদের সরকারের থেকে কিছু সুবিধা পাবার পথ এবং এই পথ স্থায়ী!!!সবশেষে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কটা কত দ্রুত গতিতে ভেঙ্গে পড়ছে তা বুঝতে সহায়ক এই রিপোর্টটা আগ্রহিদের পড়ে দেখতে রেফার করব। এটা ভারতের দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখা। তিন অক্টোবর সকাল আটটায় তা প্রকাশিত, ফলে তা লেটেষ্ট। বাংলাদেশের ভাষায় বললে তিনি ফরেন বিটের সাংবাদিক। তবে আমি নয়নিমাকে গণ্য করি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যেন সেই অ-সরকারি মুখপাত্র যার মুখ দিয়ে মন্ত্রণালয় নিজের মনের খায়েসের কথাগুলো বলে থাকে, যা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিজমুখে প্রকাশ্যে নানা সীমাবদ্ধতায় বলা সম্ভব নয়। তবে, এখানে নয়নীমা যেন ধরে নিয়েছেন ভারত-আমেরিকার পুরান সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে!! এভাবেই লেখা!! আর এলেখা থেকে  পরিস্কার যে ভারত আর দুইনৌকায় পা-দিয়ে চলতে পারছে না। তাকে কোন একদিকে অবস্থান নিতেই হবে; মূলত আমেরিকা তাকে এঅবস্থায় দিকে ঠেলে দিয়েছে। এবং ইঙ্গিতে বলা অবস্থান হল চীন-রাশিয়ার দিকেই ভারতের সম্ভাব্য অবস্থান, যেমন এই রিপোর্ট লিখছে, এরকমঃ

    .…..well set the tone for the next meeting of Quad, but India — a neighbour of Beijing
    and a strategic partner of Moscow.….. 

    আমরা চীনকে ভারতের এই “পড়শি” বলে সম্বোধন এর আগে দেখেছি বলে মনে পরে না। এটাই কী এখন থেকে ভারতের চীন-ঘনিষ্ট হবার ইঙ্গিত!! কারণ, এতদিন তো চীনকে  ভারতের মিডিয়া ভারতের শত্রু বলেই আমাদের কাছে পরিচিত করিয়ে গেছে! যেকারনে, এখনো ভারতের পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে চীন তাদের শত্রু দেশ। চীনের যেকোন কিছুই তাই ভারতের পাবলিক মাইন্ডে এখনো ঠাট্টার বস্তুই। তাহলে দাড়াচ্ছে যা তা হল, এটা ভারতের জন্য – কে ফ্রেন্ড আর কে এনিমি – তা রি-ডিফাইন করার জটিল বা উভয় সঙ্কটের সময়!  আর এর সাথে যায় এমন নতুন সেসব কিছু নয়া বয়ান তৈরি সহজ কাজ না হলেও সম্ভব বটে!

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    গৌতম দাস

    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4fa

     

        আমেরিকান কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান – রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাবক

    সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত খুঁজছে বার্মা থেকে বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ার পিছনের ঘটনা কী? সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রধান দিকটা হল, এমনিতেই ডলার সংকট আর চরম মুদ্রাস্ফীতিতে ডুবে থাকা আমাদের অর্থনীতিতে তাদের নাভিশ্বাস উঠা জীবনে, বাংলাদেশ কী কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছে? আমরা কী এবার অন্যের যুদ্ধস্বার্থে বলি হতে যাচ্ছি? কারণ সাধারণভাবে বাংলাদেশের নুন্যতম অবস্থান হল যুদ্ধের বাইরে থাকা অর্থে যুদ্ধবিরোধিতা, শামিল না হওয়া। সেখানে বলাই বাহুল্য এসময়ের যেকোন যুদ্ধ যাতে জবরদস্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা হবে আত্মঘাতি বিশেষত তাতে যেখানে এখন অন্তত মারাত্মক খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষাবস্তা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা আছে!

    ঘটনাটা প্রথম প্রকাশ ছিল একটা পুরানা ঘটনা যার শুরু এক আমেরিকান উদ্যোগ থেকে। গত ২০১৯ সালের হাসিনা যেটাকে বলেছিলেন দুর্বৃত্বপনা; বা দুর্বৃত্বের প্রস্তাব [flagitious proposition]।  আমেরিকান বেনার নিউজের ভাষায়, আমেরিকার এক “গর্হিত কাজ”।


    সেই প্রস্তাবটা কী আর তা কোথা থেকে উদয় হয়েছিল?

    এটা উদয় হয়েছিল আকাবাকাঁ ভাবে; মানে প্রথম যুগে আমেরিকার বার্মার জেনারেলদের পক্ষ নিয়ে কথা বলা যেটা পরে জেনারেলদের নির্মুলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে।একালের বার্মার দিকে আমরা প্রথম খোঁজ নিতে আকৃষ্ট হই ২০১৭ সালে, রোহিঙ্গা উচ্ছেদ আর বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়প্রার্থিতা থেকে। কিন্তু একালের বার্মার পরিবর্তনের শুরু ২০০৭ সাল থেকে।
    ভারত সরকার যেন বার্মার জেনারেলদেরকে খুব সুবুদ্ধি দিচ্ছে এমন ভাব ধরে দেয়া উস্কানিতে জেনারেলেরা মুসলমান বলে বার্মার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে ২০১৭ সালে নিশৃংসভাবে হত্যা আর ভয়ের খেলা দেখিয়ে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মজার কথা হল রোহিঙ্গা খেদানোর পক্ষে জেনারেলেরা যে সাফাই ব্যাখ্যা দিয়েছিল তা আমেরিকা, ভারত, ও চীন কেউ বাদ যায় নাই, সকলের মেনে নিয়েছিল ও তাদেরও অবস্থানও সেটাই হয়ে দাড়িয়েছিল। সারকথায় সেই ভাষ্যটা হল, আরসা (ARSA, Arakan Rohingya Salvation Army) বলে এক ‘কল্পিত বাহিনীর’ কথা তুলেছিল। আরসা নাকি বার্মিজ নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে ৭০টা স্থানে হামলা করেছিল। আর তা প্রতিরোধ করতে ধাওয়া করতে গেলে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থলের বাসিন্দারা ভয়ে ডিসপ্লেসেড বা ঘর ছেড়ে আশ্রয়ে ভাগতে যাওয়াতেই নাকি বাংলাদেশ সীমান্তে রোগিঙ্গা ঢল উঠার কারণ। সারকথায়, দেখা যায় জেনারেলেরা তাদের যে সব দানবীয় আচরণের দায়স্বীকার করতে পারবে না তা এই “কল্পিত আরসার নামে” তারা হাজির করে থাকেন। পরিণতিতে এখন সংশ্লিষ্ট সবদেশেরই একটা করে আরসা আছে। আমেরিকান পাসপোর্টধারী আরসাও আছে বলে শুনতে পাই!!

    এককথায়, ২০০৭ সালের পর থেকে বার্মা গ্লোবাল লাইম লাইটের ইস্যু হয়ে আসার পিছনের মূল কারণ হল এর আগে মোটামুটি ১৯৮৯ সাল থেকেই ক্রমান্বয়ে বার্মা জাতিসংঘের অবরোধ আর পরে আমেরিকান বা পশ্চিমা অবরোধে পর্যদুস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মত চীন-বার্মা সীমান্ত এটাও শতছিদ্র [perforated] সীমান্ত বলা হয়। সেই সুযোগ এর ভিতর দিয়ে এটাই বার্মার বাহিরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের একমাত্র সীমান্ত বা উপায় হয়ে উঠে; কিন্তু এর সবটাই ইনফরমালি ফরমাল ধরণের বাণিজ্যের লেনদেন। ফলে অন্যভাবে দেখলে বার্মার উপর সব স্যাংশন বা অবরোধের ফলে পরিণতিতে এর মাখন গিয়ে উঠছিল একা চীনের ঘরে।

    এটা ভাঙতেই নেপথ্যে ভারত উদ্যোগ আহবানে সারা দিয়ে পশ্চিম সামিল হওয়াতে বার্মা  গ্লোবাল লাইম লাইটটে আস্সেতে শুরু করেছিল। এরই প্রকাশ্য চিহ্ন হল বা  এক রফার দলিল হল ২০০৮ সালের বার্মার কথিত নয়া কনষ্টিটিউশন ২০০৮। কিন্তু “কথিত” কারণ, বার্মা এরপরেও আসলে কোন রাষ্ট্র নয় – একটা আর্মি ক্লাবের মালিকানায় একটা ভুখন্ড মাত্র। এনিয়ে বিস্তারে দেখতে এখানে।   যা হোক এনিয়ে কথা আর বাড়াবো না কারণ, ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে জেনারেলেরা বুঝে যায় ও সিদ্ধান্ত নেয় যে এই পশ্চিমা-ফর্মুলায় বাইরের দুনিয়ায় আসাটা ভুল ও তা অকার্যকর,তাতে ব্যাপারটা ক্ষমতা জেনারেলদের হাতে রাখার দিক থেকে।

    কিন্তু ঘটনা এর আগেই দুনিয়ার অন্যান্য ঘটনায় অন্যদিকে রওনা দিয়েছে। আমেরিকা-চীনের গ্লোবাল পালাবদলের গোপন-প্রকাশ্যের লড়াইয়ে আমেরিকা আবিস্কার করেছিল যে বার্মার অবস্থান আসলে চীন-ভারতের দিকে ভারি ফলে বড় মাখন সব তাদের দিকে চলে যাচ্ছে। এমনকি সেটার মধ্যে আবার বার্মা না চাইলেও তার অতি চীন-নির্ভরতা যা সীমাহীন বলে আর লম্বা সময় ধরে তা চীনমুখি করে শুরু থেকেই দীর্ঘদিন সাজানো বলে সব মাখন এমনিতেই চীনের ঘরে উঠেই চলছে।

    তাই ২০১৯ সাল থেকেই এনিয়ে আমেরিকার বিকল্প ভিন্ন পরিকল্পনা উন্মোচিত হতে শুরু হয়েছিল। এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা সংক্ষিপ্ততম ভাষায় বললে তা হল,  ‘বার্মা দখল’। এটা হল, আমেরিকার ‘বার্মা দখল’ পরিকল্পনা।  কিন্তু এই ভাষায় নয়; বরং ভিন্নভাবে। তাহলে দখলের সেই সাফাই-ভাষ্যটা কী? সাফাইটা হল, আমেরিকা রোহিঙ্গা সমস্যা্র সমাধান করতে চায়, এই ছলে। সোজাসাপ্টা বললে, রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানের উছিলায় বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ( মোটা দাগে সম্ভাব্য আমেরিকান এয়ার কাভারে বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনী মুভ করিয়ে ধরণের কিছু করে) বার্মা দখল।

    কিন্তু এসব কথাগুলো আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছিল ভিন্নভাবে, ভিন্ন ভাষায়। কীভাবে এবং কোথায়?

    বলা হল এটা যেন রুটিন আমেরিকান কংগ্রেসের (সংসদ) এক ততপরতা। যেখানে সংসদীয় কমিটি তো থাকবেই। তেমনই ওর পররাষ্ট্র উপকমিটির এশিয়া অংশের নেতা বা কংগ্রেসম্যান হলেন ব্রাড শেরম্যান। একথা সর্বজন বিদিত যে রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বার্মিজ জেনারেলদের এথনিক ক্লিনজিং ঘটে চলছে।  আর তারা কখনই বাধ্য না হলে রোহিঙ্গাদের  আগামিতে ফেরত নিতেই চান না। তাই এই পরিস্থিতিকে উছিলা করে এইবার শেরম্যান সামনে এসে তিনি নিজ উপকমিটির এশিয়ার বাজেট প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বলছেন, বার্মার রাখাইন প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে।

    এশিয়ায় আমেরিকান রণকৌশলগত স্বার্থ রক্ষার্থে ও প্রভাবিত করতে দুইটা মিডিয়া ও ওয়েব সাইট খুলেছে। এর একটা হল বেনার নিউজ [BENAR News]  আরেকটা ডিজিটাল লাইব্রেরি ধরণের যার নাম ‘রোর বাংলা’ [roar.media]। এগুলো ২০১৭ সালের শেষের দিকে চোখে পড়তে শুরু করেছিল। ব্যানার নিউজের ক্যারেকটার হল অনেকটা সোভিয়েত-আমেরিকা রেষারেষির যুগের মত তখন আমেরিকা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে কোন প্রতিষ্ঠান খাড়া করলেই সেখানে একটা শব্দ কমন থাকতে দেখা যেত –  ফ্রি [Free] এই শব্দটা; যেমন ফ্রি নিউজ বা ফ্রি মিডিয়া। বুঝাতে চাইত যে রাশিয়া ফ্রি স্পিচ বা ফ্রি মিডিয়া বলে কিছু নাই। এর উল্টাটা তাই আমেরিকায় যেটা আছে। তাই অনেক সময় বেনার নিউজেও ফ্রি শব্দটা দেখা যায়। [কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ওয়েব বাংলাদেশের ভিতর থেকে হলে এখন বিআরটিএ তা আটকে রেখেছে। ফলে ভিপিএন [VPN] দিয়ে ঢুকতে হবে। তবে বিদেশ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ঢুকা যাবে।]

    সেই ব্যানার নিউজে ব্রাড শেরম্যান এর ‘রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনা” এই খবরটা কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল? গত ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত এর হুবহু সে রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা তুলে আনছি … “রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ধরনের প্রস্তাবনা একটি ‘গর্হিত কাজ’  ”। পরেরদিন ৯ জুলাই ২০১৯ একই খবর আমেরিকান ভোয়াবাংলার [VOA] নিউজও ছিল এরকমঃ ……“রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের দেয়া প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা”।

    রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাবঃ
    তাহলে এবার আমরা ২০১৭ সালের জেনারেলদের কোলে বসে থাকা তিনদেশের আমেরিকা, ভারত ও চীন – এখানে একটা বদল হতে দেখছি। এদের মধ্যে আমেরিকা সরে এসে যেন পল্টি মারতে চাইছে। বলছে বার্মাকে ভাগ করে “রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনতে হবে”। এখানে আরো একটু আলো ফেলব। পটভুমিটা হল,  এটা বার্মিজ জেনারেলদের বৈশিষ্ট যে তারা গ্রহিতা দেশকে অনুগ্রহ লাভের ভুমিকায় রেখে দিয়ে তাদের উপর নিজ কমান্ড বজায় রাখার ক্ষমতা রাখে, নিজ দাতা অবস্থান তারা সহসা হারায় না; যেভাবেই হোক তা ধরে রাখতেই সক্ষম হতে দেখি আমরা। তাহলে, আমেরিকা কী এই জেনারেলদের কমান্ড থেকেই বের হতে চাচ্ছে? না, ঠিক একদম তা নয়।  সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

    কখন ও কোথায় এবং  কোন ভাষায় আমেরিকা এটা প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিল? এটাই ২০১৯ সালের জুনের শেষে-আগষ্টের প্রথম সপ্তাহের দিকে, আমেরিকান কংগ্রেসে (আমেরিকান সংসদে) তা আমরা দেখলাম। আর এর চেয়েও বড় কথাটা হল, আজকের বার্মিজ গোলা এসে বাংলাদেশে কেন এসে পড়ছে এর পিছনের পোলারাইজেশনে মানে আমেরিকা, চীন ও ভারত এবং একালে যুক্ত হওয়া রাশিয়ার মধ্যে এখন  কোনদেশ কে কোন দিকে এখন আছে তা আসলে সেকালে ২০১৯ সালেই স্পষ্ট ছিল। সেটা কীভাবে??

    ২০১৯ সালের রোহিঙ্গা বা বার্মা ইস্যুতে ভারত-চীন একসাথে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানেঃ
    ঐ ২০১৯ সালেই ব্রাড শেরম্যান এর কথিত আমেরিকান প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল ভারত ও চীন একসাথে। এরই একটা ঝলক দেখেছিলাম তখন। যদিও তা তখন যথেষ্ট খোলাখুলি ছিল না বলে তত আমল হয় নাই।  সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় কীভাবে এই খবর আমাদের কাছে তখন এসেছিল তা ফিরে অনুসরণ করলেই।

    যেমন ব্রাড শেরম্যান প্রথমবারের মত আমেরিকান কংগ্রেসে রাখাইন প্রদেশ কেটে আনার কথা বলেছেন ১৩ জুন ২০১৯।  আর তা আমরা প্রথম জানতে পারি একমাত্র ভারতীয় টাইমস অব ইন্ডিয়ায় (TOI-ET) প্রকাশিত এক রিপোর্টের কল্যাণ্যে; তাও আবার সেই রিপোর্ট শেরম্যানের বক্তব্যের প্রায় ১৭ দিন পরে, ১ জুলাইয়ে। এবং দ্বিতীয় আর কোন মিডিয়ায় এই খবর ছাপা হয়েছে জানা যায় না।

    This proposal was made on June 13 during a hearing on the State Department’s budget for the South Asia, according to a US media report.

    এমনকি TOI-ET নিজের খবরের সোর্স হিসাবে জানাচ্ছে সেটা আমেরিকার স্থানীয় রিপোর্ট (according to a US media report)। অর্থাৎ খুব অস্পষ্ট; সুনির্দিষ্ট  করে কোন সোর্স এর কথা বলা নাই। কিন্তু তাই বলে খবরটা কী দুর্বল বা ভুয়া? না; অবশ্যই তা একেবারেই নয়। কেন, কী প্রমাণ আছে এর?

    প্রথম প্রমাণ হল,  এই খবরের প্রতিক্রিয়ায় যেসব খবর তৈরি হয়েছে, আমেরিকান দুই মিডিয়া বেনার নিউজ আর ভোয়া,  তা অবলীলায় নিজেরাই ছেপেছে। এভাবে এরা পরোক্ষে TOI-ET এর খবরের সত্যতার সাক্ষ্য দিয়ে ফেলেছে। মানে আমেরিকান কংগ্রেসে এমন আলোচনা হয়েছে তা স্বীকার করে নিচ্ছে।

    আর দ্বিতীয় প্রমাণ আরও অনেক বেশি সাক্ষ্য -প্রমাণ। এর সবচেয়ে বড় প্রভাবটা হল, TOI-ET তে ছাপা হওয়া ঐ রিপোর্টের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা খুবই কড়াভাবে আমেরিকাকে ধোলাই করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। আর তা বাংলাদেশে তো বটেই, ভারতে ব্যাপকভাবে এবং এশিয়ায় অনেকদেশের মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছিল। ফলে TOI-ET তে ছাপা হওয়া খবরের সত্যতা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন থাকে নাই। তবে এসব সত্বেও ভারত-চীন যে এক অবস্থান নিয়ে আমেরিকার বিরোধিতা করেছিল সে অংশটা ভারত কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণে হাজির রাখতে চায় নাই; তাই যাকিছু প্রমাণ তা পরোক্ষে প্রমাণ, এখানে তা লুকায় নাই।

    এমনকি আরেকটা তথ্য খুব গুরুত্বপুর্ণ ছিল সে সময়ে। ১ জুলাই ২০১৯ TOI-ET প্রথম খবরটা চাউর করেছিল। আর এর প্রায় এক সপ্তাহ পরে ৯ জুলাই হাসিনা এক সাংবাদিক সম্মেলনে হাসিনা আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান  ব্রাড শেরম্যানকে খুবই কড়া ্সমালোচনা করেছিলেন।
    তবে, সবচেয়ে বড় কথা হল ঐ সাংবাদিক সম্মেলন ছিল আসলে হাসিনার ২০১৯ সালের ৩-৮ জুলাই এই পাঁচদিনের চীন সফর শেষে দেশে ফিরার পরের দিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিং। আমরা জানি সাধারণত হাসিনার চীন সফরের সময়কালে ভারত টেনশনে থাকে যে কোন কোন নয়া চীনা প্রকল্পে না হাসিনা একমত হয়ে এলেন!!! যা হোক, সেবার ঘটেছিল উলটা। ভারত-চীন মিলে একসাথে হাসিনার মাধ্যমে আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের জবাব দিয়েছিল। যেমন বেনার নিউজের এর শিরোনাম করে ছিল, “রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে বলা অন্যায়ঃ শেখ হাসিনা”। ভোয়ার শিরোনাম ছিল, “কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের কড়া সমালোচনা করলেন হাসিনা”।

    এখন ২০১৯ সালের ঠিক এই পুরান জিনিষটাই আবার নতুন করে এখন উঠে আসছে।  যদিও আগে কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাবটা এসেছিল ট্রাম্পের আমলে। কিন্তু এবার (২০২২) সেটাই আরো সংগঠিতভাবে বাইডেনের প্রোগ্রাম হয়ে এসেছে। আর এতে বাংলাদেশের নিজ রাষ্ট্র-রাজনীতি ও  সাধারণ মানুষের দিক থেকে যদি বলি, তবে এটা এখন আমাদের ১৪ বছরের ফ্যাসিবাদি-কর্তৃত্ববাদী সরকার উতখাতেই বিষয়, যেটার স্বপক্ষে আমাদের মানুষেরা আশা করে যে আমেরিকা এতে সমর্থন দিবে।  আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট ফোরামগুলোতে আমাদের পাশে নিঃশর্তে দাঁড়াবে এটাই আশা করে। কিন্তু ক্রমশ যে ইঙ্গিত আমরা দেখছি সেটা হল,  ব্রডম্যানের “রাখাইন প্রদেশ কেটে আনা” – সেই ব্যাগেজ এটাই যেন  বাইডেনের শর্ত হিসাবে আমাদের কাধেঁ লটকে বসে যেতে চাইছে।

    একদম খাড়াভাবে বললে, বার্মা একটা স্বাধীন সার্বভৌম জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র তাতে সে আমাদের জন্য যতই রোহিঙ্গা সমস্যা তৈরি বা মুসলমান ক্লিনজিং এর নায়ক হোক না কেন!  তাই, “রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার আমেরিকার প্রস্তাব – এটা একটা ক্রিমিনাল প্রস্তাব। এটা কোনদিনই কোনভাবেই জাতিসংঘ টপকিয়ে পাশ হতে পারবে না। যেমন,  ইরাকের সাদ্দামের স্বাধীন কুয়েত রাষ্ট্রকে দখলের পরিণতিতে জাতিসংঘ নিন্দা প্রস্তাব যেমন প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হয়েছিল, সবকিছু সাদ্দামের বিরুদ্ধে গেছিল। এটাই সাদ্দামের প্রথমত বিশাল নৈতিক পরাজয় ঘটিয়েছিল আর এর সুযোগ নিয়ে বুশের ইরাক দখল সহজকেই ঘটে গিয়েছিল।

    আসলে বাইডেন বার্মা দখল করতে চান যাতে আমেরিকা-চীন এদের যে গ্লোবাল নেতৃত্বের ঝগড়া আছে তাতে আমেরিকার নিজের বিজয় ও স্বার্থ তাতে মিটে। মূলত এশিয়ায় বার্মা, যতই জেনারেলদের ক্লাব সেটা হোক, সেই জেনারেলেরা পরাজিত হয়ে সেটা “বাইডেনের বার্মা” হয়ে যাবে এটা পড়শি ভারত ও চীনের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
    বলা যেতে পারে পরিস্থিতি এখন ভারত-আমেরিকার গত ২০ বছরের ঘনিষ্ট সম্পর্কের সবচেয়ে ভাটার সময়, দূরে সরে যাবার সময়!! আমেরিকা ইতোমধ্যেই পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছে!!

    আমরা সবাই জানি যে,   গত কমপক্ষে প্রায় ২০ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর দাড়োয়ান হতে চেয়ে ভুমিকা রেখে গেছে। তবুও ভারতের নিজ কোরস্বার্থ  হল বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনফ্লিট নোঙর করার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অথবা ভারতের যেকোন পড়শিদেশে আমেরিকার গেড়ে বসার বিরোধিতা করা যেটাতে সে আপোষ করে নাই।  চীন হল ভারতের ন্যাচারাল পড়শি (যা বদলানো যাবে না) যার তুলনায় আমেরিকার নতুন করে এশিয়ার কোথাও কোন পড়শি দেশে গেড়ে বসতে দেয়া ভারতের জন্য আপত্তির। এই হল ভারতের কোরস্বার্থের সারকথা।

    কাজেই বার্মা প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এটা চীনা অবস্থানের পক্ষে সমর্থন হয়ে উঠবে; ন্যাচারাল কারণে।

    ওদিকে রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধ সাত মাস শেষ করেছে যা আগামি নভেম্বরের আগে কোন মোড় বদল বা মোচড় নিবার সম্ভাবনা নাই বলেই মনে হয়। এঅবস্থায় রাশিয়া না চাইতেই আমেরিকা বিরোধী জোট বা ফ্রন্টের সামনের স্থানের রাষ্ট্র। তাই ভারত ও চীনের সমর্থনে রাশিয়া বাইডনের বার্মার দখলের স্বপ্নের বিপরীতে তবে এই উসিলায় সরাসরি এশিয়ায় পা-রাখতে চাওয়া আমেরিকার বিরোধিদের প্রধান ভুমিকায় হাজির হচ্ছে।

    কিন্তু বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে এসবই তো গ্লোবাল নানা দেশেরস্বার্থ ও পরিস্থিতি।  আর বাংলাদেশের নিজস্ব চাওয়া যেখানে হাসিনার পতনে একটা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও রাজনীতি কায়েম; এভাবে কর্তৃত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ হটানো। এই কাজে আমরা আমেরিকাসহ দুনিয়া সকল রাষ্ট্রের সমর্থন চাই; সকল ফোরামে সমর্থন চাই। কিন্তু তাই বলে আমরা না আমেরিকা না চীন বা ভারতের স্বার্থের কোন যুদ্ধে সামিল হতে পারব না। আমরা কারো ব্যাগেজ বইতে পারব না, কোন সামরিক সংশ্লিষ্ঠতায় সামিল হতে চাই না, পারব না। এটা বাংলাদেশের কোরস্বার্থের বিরোধি!

    আমরা হাসিনার ক্ষমতা আকড়ে থাকার প্রবল বিরোধী; সরকারের কাঠামো, জবাবদিহিতা  ভেঙ্গে ফেলা এর চরমবিরোধী;  বিচার বিভাগ তো বটেই খোদ কনষ্টিটিউশনই এখন নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে। এসবই অগ্রহণযোগ্য যার আমুল পরিবর্তন এখন আমাদের নুন্যতম কাম্য। তাতে হাসিনা ২০১৯ সালে যতই  সঠিকভাবে আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান শেরম্যানের সমালোচনা করে থাকেন না কেন!

    আমরা কী শেষে আমেরিকা না চীনের পক্ষ নিবঃ
    এখন বাংলাদেশ বলতে দুটা প্রতিনিধিত্ব হতে দেখা যাচ্ছে। একটা হাসিনা-মোমেনের।  যেমন হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন, বার্মার বাংলাদেশে বোমার গোলা ফেলা প্রসঙ্গে বলছেন এটা নাকি বার্মার ‘অনিচ্ছাকৃত’। অর্থাৎ একদিকে বার্মার গোলা পড়তেছে এটা বাস্তবতা। কিন্তু সেটাকে  কৌশলে নরম করে দেখিয়ে কসরত করে মোমেন অস্বীকারের চেষ্টা করছেন; এটাকে প্রলেপ দিয়ে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। এটা হল আসলে হাসিনার বাইডেনবিরোধি রাশিয়া-চীন-ভারতের জোট বা মেরুতে বাংলাদেশকে ঢুকাতে, অবস্থান নিতে চাইছেন।  আর এজায়গায় বাংলাদেশের কমন স্বার্থ ও আকাঙ্খাকে হাসিনা প্রতিনিধিত্ব করেন না। মানে তিনি সেই আকাঙ্খাকে নিজের সাথে রাখতে পারেন নাই বলেই আমার ধারণা।  আসলে হাসিনার স্বার্থ আর আমাদের কমন স্বার্থ এক নয়। এককথায় বাংলাদেশের স্বার্থ হল, কোন দেশ বা ব্লকে না সামিল হওয়া। সেটা বাইডেনের বার্মা দখলের পক্ষে বা বিপক্ষে  কোন যুদ্ধেই সামিল না হওয়া।

    বাংলাদেশ শেষে বাস্তবে কোন সিদ্ধান্তের দিকে যায় সেটা আগামি বাংলাদেশের জন্য খুবই নির্ধারক!!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত

     

    বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত
    গৌতম দাস

    https://wp.me/p1sCvy-4eU

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০ঃ০১ রাত

    সীমান্তে মর্টারশেলের অবিস্ফোরিত গোলা

     

    চীনা নেতৃত্বে দল পাকানো বা জোট গঠন আর আমেরিকার নেতৃত্বে পুরানা ও নয়া জোট গঠন এদুই কাজ যেন সাম্প্রতিককালে ভীষণ দ্রুত আগানো শুরু হয়েছে। এরই এক প্রকাশ হল বার্মাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নড়াচড়া। দু-চারটা মর্টার বা গোলা বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে এসে পড়া বা এতে বাংলাদেশের দু-চারজন করে আহত-নিহত হওয়া – এসবই মূল ঘটনার খুবই ক্ষুদ্র কিছু বাইরের দিক।

    চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি ট্রাম্পের আমলে (২০১৭-২০) যেমন ছিল – একে যদি বলি আমেরিকার তার গ্লোবাল নেতৃত্বের ততপরতা বা দায়ভার ফেলে তা  ট্রাম্পের ঝেড়ে অস্বীকারের অবাস্তব পথ ধরে চীন ঠেকাতে আভ্যন্তরীণমুখি ও জাতিবাদি হয়ে উঠার চেষ্টা; তাহলে পরবর্তিতে মানে চলতি বাইডেনের আমলটা হল, প্রকাশ্যে চীনবিরোধী করে নানান গ্লোবাল জোট পাকানো ও তা দিয়ে আগ্রাসী হয়ে যুদ্ধ-সহ সব সক্রিয় ততপরতা করা্র যুগে তিনি দুনিয়ার সবাইকে টেনে নিতে চাইছেন।

    বিপরীতে চীনের দিক থেকে প্রতিক্রিয়ায় এসবের পালটা যেসব ততপরতা চীন ঘটিয়ে চলেছে সেসবের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বললে তা মূলত দুইটা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বা মাধ্যমেঃ এক. এসসিও [SCO] আর দুই.  ব্রিকস [BRICS] নামে ততপরতা।

    চীনা ততপরতাঃ
    এসসিও [SCO] – এটা এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-জোট যার নাম-সংক্ষেপ কে ভেঙ্গে বললে এর পুরা নাম ‘সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন’; তাই সংক্ষেপে SCO।  সাধারণত যেকোন আন্তর্জাতিক জোটকে মূল যে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; আর তা হল অর্থনৈতিক অথবা স্ট্রাটেজিক এভাবে। আর এই স্ট্রাটেজিক শব্দটাকে বাংলা করে বললে “কৌশলগত” এমন কোন জোট বলতে  বুঝতে হবে মূলত এটা সামরিক ও রাজনৈতিক (ছদ্ম-পলিটিক্যাল) বৈশিষ্ঠের জোট। এভাবেই তা হাজির হতে চেষ্টা করছে। যদিও বেশিরভাগ জোটই মূলত অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জোট হয়ে থাকে যেমন আসিয়ান, সার্ক ইত্যদি।

    নয়া ধারার জোটঃ
    কিন্তু যদি সুস্পষ্ট করে একালে বলি, ধরাধরি শুরু হয়ে গেছে মানে বলতে চাচ্ছি  কোন দেশ  – চীন না আমেরিকা – কার সাথে বিশেষ ঘনিষ্ট হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে গেছে এই অর্থে, আরেক ধরণের নয়া ধারার জোট হতে দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে চীনা না হয় আমেরিকান জোট।

    নয়া ধারার জোট, মানে কী বলতে চাচ্ছি। যেমন আগে মানে গত শতকের নব্বই দশক জুড়ে তখনও জোট হত মূলত অর্থনৈতিক। যা এরপর থেকে ক্রমশ মুল উদ্দেশ্য আড়ালে রেখে (চীনের দিক থেকে বললে) তা চীনের নেতৃত্বে নয়া ধারার জোট গঠন বা গঠনের ইঙ্গিত শুরু হয়েছিল। আর এতে ‘মুল উদ্দেশ্য আড়ালে’ বলতে বুঝিয়েছি তা যে আসলে আমেরিকাবিরোধী সেটা প্রকাশ্যে কোথাও উল্লেখ না রেখে ততপর হওয়া। তুলনায় যেমন – ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব জোট বা সব আন্তর্জাতিক ততপরতাই আসলে বাই ডিফল্ট হয়ে যেত কার্যত আমেরিকান উদ্যোগে বা আমেরিকান নেতৃত্বের জোট। আর ঠিক এর বিপরীতে সোভিয়েত যুগ শেষে একালে  নয়া ফেনোমেনা হিসাবে হাজির হয়ে চলছে চীনের উদ্যোগে বা নেতৃত্বে জোট গড়ে তোলা।
    তবে  চীনের দিক থেকে সেটাকে স্পষ্ট করে আমেরিকাবিরোধী সেটা উল্লেখ না করেই তা করা শুরু হয়েছিল যেমন এই এসসিও জোট গড়া থেকে। এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ২০০১ সালে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ২০০১ সালের হলেও তা ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা হামলার বেশ কয়েকমাস আগের ঘটনা। ফলে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এটা ছিল এক অঘোষিতভাবে আমেরিকাবিরোধী জোট।  যা মূলত চীন ও রাশিয়ার সেই প্রথম কাছাকাছি আসা।  আর এটা ছিল ১৯৫৮ সালের পরে সেই প্রথম চীন-রাশিয়ার কাছাকাছি আসা যখন ঐ ১৯৫৮ সালের আগে দুদেশই “স্টালিনবাদী কমিউনিস্ট” দেশ ছিল। আর এর চেয়েও বড় কথা ২০০১ সালে এসে তারা দুদেশের কেউই আর কমিউনিস্ট দেশ নয়।
    কেউ কোনদেশ আর কমিউনিস্ট কিনা এর একটা ভাল মাপকাঠি হতে পারে, সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য কিনা। সদস্য না হলে সে তখনও কমিউনিস্ট – এটা একটা ভাল মাপকাঠি। বিশেষ করে যদি আমরা এই ফ্যাক্টস মনে রাখি যে,  পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে ভেঙ্গে গেলে এরপরে রাশিয়াসহ মোট ১৫ রাষ্ট্রে তারা আলাদা বিভক্ত হয়ে যায়। আর এরপরেই রাশিয়াসহ ১৫ রাষ্ট্র সকলে এই প্রথম আবেদন করে আইএমএফের সদস্য হয়ে গেছিল। আর ওদিকে মাওয়ের নেতৃত্বের চীন (বা নয়া চীন) মানে চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনীতিক অস্বীকৃতির চীন ছিল সেটা – সেই চীনে  ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জারের প্রথম গোপন চীন সফরের পরে চীন-আমেরিকার ডিল শুরু করেছিল। আর পরে এথেকেই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনীতিক স্বীকৃতি ঘটে – ইত্যাদি এসব ঘটে যাবার পরে তখন ১৯৮০ সাল থেকেই নয়াচীনও প্রথম আইএমএফের সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    এসব কথাগুলো মনে রাখলে আমরা সহজেই মানব যে আইএমএফের সদস্যপদ নেওয়া মানে সে আর কমিউনিস্ট দেশ নয় হয়ে যাওয়া – এর একটা ভাল মাপকাঠি।
    এই বিচারে  চীন ও রাশিয়া প্রথম জোটবদ্ধ দেশ হচ্ছে এসসিও [SCO]-তে ২০০১ সালের শুরু থেকে আর যখন এদুই দেশ কিন্তু আর কমিউনিস্ট দেশ নয়। এরচেয়েও বড় কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে তারা কার্যত আমেরিকাবিরোধি হলেও এর কারণ তারা আগে ‘কমিউনিস্ট ছিল’  এমন কোনই কারণে নয়। মুলকথা এই শতকেও যারাই আমেরিকানবিরোধি ফলে  তারা নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট – এমন ভুল ধারণ অচল তাই এই ভুল অনুমানকে যেন আমরা জেনে-না জেনে আমাদের চিন্তার ভিত্তি না বানায় ফেলে থাকি, এই সতর্কতা দরকার।

    যদিও শুরুতে এসসিও এর জন্মানোর ভিত্তি ছিল যে – সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয়টা দেশকে নিরাপত্তার দিক থেকে পুরানা স্টাইলে রাশিয়া-নির্ভরই তারা যেন থেকে যায়, পশ্চিমা-প্রভাবে না চলে যায়। যেমনটা পোল্যান্ড, রুমানিয়া ইত্যাদি সোভিয়েতের বাইরের কিন্তু যারা কমিউনিস্ট দেশ – এদের বেলায় ঘটেছে এমন না হয়ে যায়।
    অন্যভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে পাঁচ দেশকে বুঝায় এর মধ্যে আবার যারা রাশিয়া অথবা চীন এদের কোন একটা দেশের সীমান্ত লাগোয়া দেশ এদেরকে নিয়েই এসসিও গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে চীন-রাশিয়া ছাড়া আরো তিন (কাজাখ, কিরঘিজ, তাজিক এই এথনিক-ভিত্তির দেশ) এভাবে পাঁচ দেশ; আর পরে  উজবেক এই এথনিক দেশ মিলে মোট ছয় দেশ নিয়ে এসসিও গঠিত হয়েছিল। যেটা থেকে রাশিয়া ক্রমশ একালে এসে ইউরোএশিয়া [euroasia] বলে একটা নয়া ধারণা চালু করেছে। অনেক পুরানা কমিউনিস্ট তাই ইউরোএশিয়া শব্দটা বেশি ব্যবহার করে কথা বলে। অথচ একালে পুতিনের রাশিয়ার কোন আমেরিকাবিরোধি পদক্ষেপকে কমিউনিস্ট বলে সহি মনে করে কথা বলা বা গর্ব করা অর্থহীন!

    তবে যেটা বলছিলাম, এই এসসিও জন্ম থেকেই তারা অনুল্লেখ রাখা আমেরিকাবিরোধী জোট অবশ্যই। তবে এরচেয়েও বড় কথা একালে মানে ধরা যাক গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের রাজধানী সমরখন্দে এবছরের এসসিও সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২; এই সম্মেলন বলছে তাদের সদস্য সংখ্যা ক্রমশ  বাড়ছে। যেমন শুরুতে ছয় দেশের এসসিও  ইতোমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান এদুই রাষ্ট্রকে একসাথে পুর্ণসদস্য করে নেয়া হয়ে গেছে। এবছর থেকে ইরানও পুর্ণসদস্য হওয়াতে মোট পুর্ণসদস্য নয় রাষ্ট্র। আর তুরস্কও সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করাতে ব্যাপারটা আর সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক অথবা যাদের চীন বা রাশিয়ার সাথে সীমান্ত আছে এমন কেন্দ্রিক বলে থাকছে না। কী হচ্ছে তাহলে?

    এটাই চীন-কেন্দ্রিক আমেরিকাবিরোধি প্রধান জোটের আকার নিচ্ছে। যেমন ইতোমধ্যেই এসসিও-এর দাওয়াতি বা অবজারভার সদস্যদেশ হয়েছে আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মঙ্গোলিয়া। আর ওদিকে এক নয়া এক ক্যাটাগরি ‘ডায়লগ মেম্বার’ হয়ে যুক্ত হয়েছে  – আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, ইজিপ্ট, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক – এমন এরা আরো নয় দেশ।

    আলাপ আবার একটু পিছন থেকে শুরু করছি। চীন-কেন্দ্রিক বা আগামি গ্লোবাল নেতা চীন এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জোট ততপরতা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা যদি খুঁজতে যাই তবে এর প্রকাশ্য শুরু হল ২০০৯ সাল থেকে। যদিও তখনও চীন-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট  মানে খুবই সচল ইতিবাচক ও সক্রিয় ছিল যা উভয় দেশেরই মুখ্য-স্বার্থ বলে বিবেচিত হয়ে চলছিল। এছাড়া মনে যাই থাক, কোন প্রকাশ্যবিরোধ বা কারো মৌলিক ভিন্নস্বার্থের উপস্থিতি তখনও উদয় হয় নাই।
    এই বিচারে ইতিহাসের ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বললে, ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একরকম গভীর সহযোগিতামূলক ছিল যা আগের ত্রিশ বছর মানে  ১৯৭৮- সাল থেকে যা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রথম তা তাল কেটে যায়, ২০০৯ সাল থেকে। সেটা ছিল আগের মতই সম্পর্ক সহযোগিতামূলকভাবে একসাথে বেড়ে উঠা সত্বেও এবার বাড়তি আরেক উলটা ফেনোমেনা ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠা শুরু করেছিল – যেটাকে আমরা স্বার্থ যার যার – এমন এক নয়া ফেনোমেনার যুগের শুরু বলতে পারি।

    ২০০৯ সালের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছিল যার প্রধান ও মুখ্য ঘটনাটা হল চীনের ব্রিকস [BRICS] ব্যাঙ্কের ধারণা নিয়ে সামনে আগিয়ে যাওয়া, যেটা কার্যত সরাসরি আমেরিকাবিরোধি। তবে এটা ঘটবার কারণ আমেরিকা নিজেই। বলা যায় আমেরিকা নিজেই চেয়েছিল এভাবেই বিষয়টা আগে বাড়ুক। নইলে আমেরিকার জন্য তার দিক থেকে অন্য অপশনগুলো হত আরো নিজ স্বার্থবিরোধি হত। মানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা শেয়ার চীনকে ছেড়ে দিতে হত।
    তাই ঘটনাবিরোধের শুরু, চীনের বিশ্বব্যাংকের নিজের মালিকানা শেয়ার বাড়ানোর আবেদন, এখান থেকে।  যা আগেই সে করেছিল আর আমেরিকা সেটা ২০০৯ সালে কার্যত প্রত্যাখান করেছিল। এর অর্থ, এথেকে গ্লোবাল পুঁজিবাজার বুঝেছিল যে এটা যেন চীনকে বলা যে পারলে তুমি চীন আমেরিকার মতই সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ারধারী হতে  আরেকটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিতে পারলে কর। অর্থাৎ বর্তমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এ আমেরিকান শেয়ার মালিকানা সর্বোচ্চ; যার সোজা অর্থ আমেরিকাই ইচ্ছাই শেষ কথা। এদুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-মালিকানার কাঠামোর মত করেই তৈরি। তাই চীনকে উপস্থিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মধ্যে মালিকানার ভাগ বাড়াতে না দিয়াটাই আমেরিকার জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে, চীনকে নতুন করে বিকল্প আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমেরিকা।

    আর এখান থেকেই আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়।   তাই ওয়াল স্ট্রীটের লিডিং এক কোম্পানির (গোল্ডম্যান স্যাসে goldmansachs.com ) এর চীফ ইকোনমিষ্টের পাবলিক পরামর্শ রেখেছিলেন যাতে চীন এগিয়ে আসে। আর চীন যেন সেই পরামর্শকেই মুল্য দিতে এগিয়ে আসে। আর গড়ে নেয়া নয়া এমন চীনা-বিকল্প  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানই হল ‘ব্রিকস ব্যাংক’ [BRICS Bank]। মূলকথায়, বিগত ১৯৯০ সাল থেকেই দুনিয়ার এমন নতুন দিকে মোচড়ের পিছনের মূল কারণ মনে করা হয়, চীনা অর্থনীতির ব্যাপক উত্থান – রাইজিং ইকোনমির ধারণা এখান থেকেই শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনের অর্থনীতিতে ক্রমশ বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি (accumulated surplus capital)। যা নিজেই তখন থেকেই অন্যান্য দেশে মানে সারা দুনিয়ার সবদেশেই – ‘অবকাঠামো’ ও ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ হিসাবে হাজির হবার যোগ্যতা-সক্ষমতা নিয়ে হাজির হবেই। ঠিক যেমনটা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াতে আমেরিকা ঘটিয়েছিল।  এটাকেই আমরা অন্যদেশের উপর  “প্রভাব বিস্তারের” মুল উপাদান হিসাবে এককালে আমেরিকার আর একালে চীনের সক্ষমতায় দেখি। তাই, প্রভাব বিস্তারি ক্ষমতার পুর্বশর্ত হল নিজ অর্থনীতি যদি বিপুল পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি – গড়ে তুলতে শুরু করা। এটাই আসল কারণ বলে বুঝতে পারি।

    আরেক অর্থে এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা অথবা পরাশক্তি হয়ে হাজির হওয়ার মূল শর্ত। অনেকে এই ব্যাপারটাকে সামরিক সক্ষমতা ভেবে ভুল করি। যদিও মূল ফ্যাক্টর বা উপাদান হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো হবেই আর সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানে এবার তা নিজদেশে সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়ানোরও সক্ষমতা হয়ে উঠা স্বাভাবিক যা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

    আর এটাই একালের দুনিয়ায় ঘটে গিয়েছে বলে গ্লোবাল পরিবর্তনের আরেক পর্যায়ের মুখে এখন আমরা সকলে।  যখন চীন ও আমেরিকার উভয়েই জোট পাকানো বা নিজ নিজ পক্ষে প্রকাশ্যেই নানান দেশকে সামিল করার প্রচেষ্টা যুগের শুরু হয়ে গিয়েছে বলতে পারি। তাই এটাকেই ঠাট্টা করে বলেছি “ধরাধরি শুরু” হয়ে গিয়েছে।

    তবে খুবই সাবধান, এই নয়া ফেনোমেনা সাবজেকটিক না। মানে আমি সাবজেকটিভ ভাবে আমাদের দেশে এটা ব্যাখ্যা করে বলেছি বলে এটা তাই হয়েছে তা একেবারেই নয়।  বরং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বা  পুঁজির সারপ্লাস সঞ্চয় ব্যাপক হবে কিনা, হয়েছে কিনা এটা বলার ক্ষেত্রে আমার ভুমিকা আসলে এক আবহাওয়াবিদের মত দর্শক-অবজারভার মাত্র; যে বিভিন্ন লক্ষণ ও দাটা মেপে ঘুর্ণিঝড় আসতেছে একথা আগাম বলে; কিন্তু কোনভাবেই যে নিজে ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টকর্তা নয়।

    আবার আমি কমিউনিস্ট কিনা অথবা রশিয়া-চীন কমিউনিস্ট বলে হয়ত  এদের পক্ষ টেনে আমি একথা বলছি – এমন ধারণা প্রসঙ্গেঃ

    প্রথমত আমি একেবারেই কোন কমিউনিস্ট নই। সবকিছু সরকারি মালিকানাভিত্তিক যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ধারণা আছে আমি এই চিন্তার অনুসারি একেবারেই নই। এছাড়া উপরে বলেছি, চীন-রাশিয়া কেউই আজ আর কেন কমিউনিস্ট নয়। চলতি কমিউনিজম আমার ইডিওলজি নয়। এছাড়া বর্তমান চীন-রাশিয়ার সখ্যতা যা আমরা দেখছি সেটা তারা কমিউনিস্ট ছিল বলে এখন এমন দেখা দিয়েছে একথা মিথ্যা। মূলত তাদের কমন প্রতিদ্বন্দ্বি বা বাধা এক্টাই সেটা আমেরিকা; এটাই তাদের সহমর্মিতা ও সখ্যতার মূল ভিত্তি। এটাই তাদের যেকোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বা ফোরামে পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন করার চেষ্টায় কমন অবস্থান নিবার আসল কারণ। মনে রাখা দরকার আজ যা চীন করছে ঠিক সে কাজটাই এককালে আমেরিকা করেছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে নিজ ক্ষমতায় করে সাজিয়ে নিবার ক্ষেত্রে।  আর  আমেরিকার সেদিনের উত্থানের বর্ণনার সময় আমি অকাতরে আমেরিকাকে পজিটিভ ভাবেই ব্যাখ্যা করে থাকি। কারণ দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নায়ক অবশ্যই আমেরিকা, তা সে যে কারণেই করে থাকুক। আমেরিকার সেই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত দুনিয়ার আগিয়ে যাবার জন্য এক লম্বা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।   আসলে সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট ধারণা ও চিন্তায় দুনিয়ার সেই পরিবর্তনকে  আজও তাদের উপলব্দিতে আসেনি, নিতে পারে নাই। এটা তাদের চিন্তা ও পদ্ধতির দুর্বলতা।

    তাহলে এখন আমরা কে কিভাবে ব্যাপারটাকে দেখব? যেমন একটা খুব কমন ও পপুলার পথ হল, আমরা কে কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাকে সহি মনে করি সেই ভিত্তিতে কেউ চীন আর কেউ আমেরিকার পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করা। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা একটাই যে আমরা কে চীনকে ভালবাসি আর কে আমেরিকাকে সেই ভিত্তিতে দুনিয়ায় পরিবর্তনের ঘটনাবলিকে দেখা ও ব্যাখ্যা করা এটা তো কোন চিন্তার মেথডলজি হতে পারে না।

    সারকথায়, আমার এই কথাগুলো বুঝতে সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়া কিভাবে নতুন করে সাজানো হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের মোটা মোটা ফ্যাক্টসগুলো যদি আগাম মনে রাখি বা সুযোগ পেলেই তা পড়ে রপ্ত করে আসি।  কারণ, এটা যার যত সম্যক বিস্তারিক স্টাডি থাকবে তার পক্ষে একালকের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যায় তিনি আগিয়ে থাকবেন।

    এবার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কেঃ
    উপরে চীন-রাশিয়ার অভিমুখ নিয়ে কথা বললাম; তাহলে এরার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কে। তবে লক্ষণীয় যে উভয় পক্ষই যে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জোট পাকাচ্ছে এর দুটোই বৃহত্তর এশিয়াতেই। মানে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্টাল এশিয়ায় যে এশিয়ার ব্যপ্তি।  এই বিচারে আমেরিকার সাজানো নাট্যমঞ্চের নাম ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ বা ‘কোয়াড’।  কথাগুলো তাই শেষের দিকের আমেরিকান ততপরতাকে মাথায় রেখে ইঙ্গিতে বলব।

    বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছেঃ
    গত কয়েকদিন ধরে বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছে আর সম্প্রতি আমেরিকান  সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান জেনারেল চার্লস এ ফ্লিন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ফেসবুকে বাংলাদেশ আর্মির যে পেজ আছে সেখানে দেয়া তথ্য এটা। জেনারেল ফ্লিন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছেন এমন অনেক ছবিও সেখানে দেয়া হয়েছে। আর পিছনে টাঙ্গানো ব্যানারে লেখা আছে “৪৬তম ইন্দো-প্যাসেফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার,  IPAMS 2022”।
    এতে অন্তত যেসব কৌতুহল সৃষ্ট হয়েছে সেগুলো একেবারেই আমাদের আর্মিকে নিয়ে নয়। মূলত তা ঐ ব্যানারে লেখা  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দটাকে কেন্দ্র করে। আর তা থেকে “বাংলাদেশ কী কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে জয়েন করে ফেলেছি”? কবে থেকে? এসব।
    এগুলো নিয়ে যারা যতটুকু জানেন তাদের কেউ কেউ বলছেন,  না – বাংলাদেশ জয়েন করে নাই। কিন্তু তাহলে ব্যানারের কথাগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই কৌতুহল অবশ্য  কেউ মিটাতে পারে নাই। এটাকে কৌতুহল বলছি বটে তবে এটা আসলে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার ভয় মিশানোও বটে!

    আবার একথাও সত্য যে বাংলাদেশ আর্মির সাথে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ওয়ার্কিং রিলেশন হল জাতিসংঘ মিশনকে কেন্দ্র করে। আর ঐ ফেসবুক পেজে তাই যেমনটা লেখা আছে –  “……বৈঠকে “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি” বিষয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্যগণ “বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা মিশন ও এর করণীয়” শীর্ষক ব্রেক আউট সেশন এবং জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।  এটা খুবই স্বাভাবিক।
    তবে তারা কক্সবাজার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিজিট ও কথাও বলেছে।  আর এর সাথে জুড়ে তাই উঠে আসছে রোহিঙ্গা বা বার্মা নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনার কথা।  আমেরিকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চিন্তার সারকথা হল, বার্মার আরাকান প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে সমাধান টানা। এতে বলাই বাহুল্য এটা একটা সামরিক পরিকল্পনা।
    আর তাতে ব্যাপারটা দাড়াচ্ছে এমন যেন,  এখন আমরা ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেই আর না দেই বাংলাদেশের এই ‘সামরিক পরিকল্পনায়’ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কী আসন্ন?
    আর সেজন্যই কী বার্মিজ গোলা এসে পড়ছে? আসলে এনিয়ে সরকারি ভাষ্য-অবস্থান নিয়ে কোন ব্রিফিং খুবই কম। তাই, সবকিছু প্রশ্ন কৌতুহল হয়ে আছে যার জবাব নাই। এটা যতই উহ্য থাকবে কৌতুহলের ডালপালা তত বাড়বে। মূল কারন বাংলাদেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে কীনা এটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যু। কারণ সবাই জানে বর্তমান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি ইনফ্লেশনের মধ্যে আবার একটা যুদ্ধ কল্পনার মানে কী!

    আসলে বড় পিকচারের দিক থেকে বললে,  এখনকার সব  আলোচনায় প্রধান যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন ডোনাল্ড ল্যু [U.S. Assistant Secretary of State Donald Lu] যিনি  আমাদের অঞ্চলে বাইডেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। যিনি সম্প্রতি ‘বিক্ষুব্ধ’ ভারত সফরে এসেছিলেন। এর চেয়েও বড় হল, পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ফেলানোর মূল নায়ক বা এক্সিকিউটর তিনি বলে মনে করা হয়। সাথে আরো কথা হল, আমেরিকা পাকিস্তানকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করছে যার মধ্যে এফ-১৬ এর যন্ত্রপাতিও সংশ্লিষ্ট আছে। এবিষয়ে ভারতের মিডিয়ার খবর এখানে দেখা যেতে পারে।  তাই ঐ সফরে ভারত খুবই কড়াভাবে এতে “আপত্তি” জানিয়েছে।

    সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুমান হল, চীনের এসসিও-এর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত দুদেশই আছে। তাই আমেরিকার পরিকল্পনা হল, এফ-১৬ ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত এর দুরত্ব বা কথার যুদ্ধ অন্তত শুরু করে দেয়া যাক। আর এভাবে তাহলে পাকিস্তান ইস্যুতে ইঙ্গিত হল, ইমরানকে জেলে যেতে হচ্ছে, তা সম্ভবত আসন্ন! আর এভাবেই শাহবাজ সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিতভাবে ভারসাম্যহীন এক প্রো-আমেরিকান  করে সাজানোর পরিকল্পনা এই ডোনাল্ড ল্যু এর।
    এই সুযোগে  কিছু কথা বলে রাখার সুযোগ নেয়া যাক।  সাম্প্রতিককালে আমাদের মত দেশের নিজে বাঁচার পথ হচ্ছে চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত) কারও দিকে এককভাবে আমরা যেন কোনভাবেই না ঝুকে গিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো দাঁড়ানো। একটা ভারসাম্য তৈরি করা  – আর এর মূল সুত্র হচ্ছে একেবারে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে মেপে পথ চলা। যদিও তা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন নিজেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নিজের জনগণের সমর্থনের উপর শাসক দাড়ানোর মুরোদে থাকে। এটা একেবারে প্রাইমারি। যে-ই ক্ষমতায় থাকতে  চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত)ীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে সে নিজের তো বটেই বাংলাদেশকেও গর্তে ডুবাতে নিয়ে যাবে।
    তাই ফ্যাসিবাদ হটাতে চাইলে কি আমাদেরকে কারো যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ও সমর্থক হতেই হবে – সকল ভয় ও কৌতুহলি প্রশ্নের কেন্দ্র এটা!!!!