Category: BANGLADESH

  • প্রতিক্রিয়াঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকীতে 

    প্রতিক্রিয়াঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকীতে 

    গৌতম দাস

    ০৫ জুলাই ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3CM

     

    Celebrations for CPC’s centenary

    গত পয়লা জুলাই ২০২১, এদিন ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অর্থাৎ পার্টির বয়স এখন ১০০ বছর পার হল। আর এসময়ের মধ্যে এর  অন্তত দুটা বড় সাফল্য হল, পার্টি জন্ম নেয়ার ২৮ বছরের মধ্যেই চীনে বিপ্লব সম্পন্ন ও ক্ষমতা দখল করে আসীন হয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল, চীন ইতোমধ্যেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হওয়ার পথে। গ্লোবাল অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্টাডি রিপোর্টের পূর্বাভাস হল, আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হয়ে উঠতে যাচ্ছে [Chinese economy to overtake US ‘by 2028’ due to Covid…]।

    China will overtake the US to become the world’s largest economy by 2028, five years earlier than previously forecast, a report says.

    নিচে বৃটেনের এক লিডিং গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান কোম্পানি, CEBR ; তাদের এক তুলনামূলক গ্রাফ রিপোর্ট যা বিবিসি ছাপিয়েছে সেখান থেকে নেওয়া।

    US and Chinese economies 2010-2035. Gross domestic product in $US trillions (constant prices). Chart shows Chinese and US economic output over time with China overtaking the US around 2028 .

    এমনিতেই সাফল্য নিয়ে শত বছর পার হওয়া রাজনৈতিক দল হতে পারা খুব কম ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে থাকে। যেমন ১৯১৭ সালে রাশিয়ায়, দুনিয়ার প্রথম কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখলকারী  পার্টি হল লেনিনের (সোভিয়েত) রুশ কমিউনিস্ট পার্টি। কিন্তু ১৯৯১ এর আগস্টে এর সবকিছু শেষ হয়ে যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রই ভেঙে পড়ে, এতে সরকারীভাবে বিলুপ্ত  ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল। এরপরে সেই থেকে এখনও তা রাশিয়াসহ মোট ১৫টি আলাদা রাষ্ট্রে  বিভক্ত হয়ে যায় । এই বিচারে চীনা পার্টির সাফল্য অনেক বেশি অবশ্যই।

    আবার ওদিকে,  কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র বলতে যারা নিজেদের কমিউনিস্ট মনে করে এরা নিজেরা এবং দুনিয়ার বেশির ভাগ তাদের সহমর্মী চিন্তার মানুষেরা মনে করে যে, সেখানে সামাজিক উতপাদনের সমস্ত  “মালিকানা ব্যবস্থা সরকারি” কী না- এটাকেই তাঁরা মূল নির্ধারক মাপকাঠি  মনে করে আর এই ভিত্তিতেই তাঁরা কথা বলে থাকে। কিন্তু বাস্তবত দেখা যায়, ‘মালিকানা ব্যবস্থা সরকারি’ রেখে একটা সচল অর্থনীতি  হাজির রাখতে হিমশিম খাওয়ার পরে তারা এটাকে এক বড় বাধা হিসেবে আগে অনুভব করেছিল, আর তাতে সেটাই প্রথম ভাঙনের সুর বাজছে তারা টের পেয়েছিল । সে কারণে সংস্কারের প্রশ্নটা আমল করা হয়েছিল। সেখান থেকেই তত্ব ও কাজে একটা সংস্কার বা রিফর্ম করে নেয়ার চিন্তা আসে যাতে সংস্কার করে একটা সচল কার্যকর অর্থনীতি লাভ করার পথে যাওয়া যায়। এই প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন কার্যত ‘সংস্কারের পথে’ যাওয়ার সুযোগ নিতে পেরেছিল একেবারেই শেষের দিকে; মানে মাত্র ১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে। বা বলা যায় লিওনিদ ব্রেজনেভের মৃত্যু বা তার শাসনযুগ ১৯৮২ সালে শেষ হওয়ার পর থেকে। কিন্তু বলতে গেলে অচিরেই গর্বাচেভ বড় সংস্কার কিছু শুরু করার আগেই পুরান সোভিয়েত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে ১৯৯১ সালের আগষ্টে  গর্বাচেভকেই নিজের মুখে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘোষণা দিতে হয়েছিল।

    তুলনার চীনা পার্টি ‘সংস্কারের পথে’ নেমে যায় ক্ষমতা দখলের মাত্র ১০ বছরের মধ্যে; ১৯৪৯ সালে ক্ষমতা দখলের পরে ১৯৫৮ সাল থেকে। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে অনেক অনেক আগে; যদিও কৌশলগত কারণে, চীনা নেতা মাও এই সংস্কারকে বাইরে  নাম-পরিচিতি দিয়েছিলেন “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” বলে।  আর এর ব্যাখ্যাটা ছিল এরকম যে  – তাদের পার্টির নেতারা মন-মানসিকতায় বুর্জোয়া হয়ে যাচ্ছেন তাই নেতা বদলের এক উলটপালট বা ঢেলে সাজাচ্ছেন তিনি। অনেক ক্রিটিক বলে থাকেন,  সরাসরি বললে তিনি আসলে করতে চাইছিলেন – চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম আগে, পরে ‘সমাজতন্ত্র’।

    তবে লক্ষ্যণীয় যে এবারের শতবার্ষিকী পালনের বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন [যেভাবে বাংলা বিবিসি রিপোর্ট করেছে সেই ভাষায়],“একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে, এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে,” [ Only socialism can save China, and only socialism with Chinese characteristics can develop China,”]।

    এতে এর মানে দাড়ালো, ১। চীন এখনও মনে করে এটা তাদের পার্টি “সমাজতন্ত্রই” করতেছে। ২। তবে সমাজতন্ত্র বলতে তা অন্যকারো ধারণার সমাজতন্ত্র নয়। তাদের পার্টি যেটাকে “চীনা বৈশিষ্ঠের সমাজতন্ত্র” বলে মনে করে এটা সেই অর্থের  সমাজতন্ত্র। ৩। উপরের দুই সুত্র থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি যে অন্যকারো সমাজতন্ত্র বুঝাবুঝির বিচারে বা মাপকাঠিতে চীনে সমাজতন্ত্র হয় নাই এমন সিদ্ধান্তেও আসতে পারে। যেটা চীন আবার আমল করবে না।

    আমরা আবার চীন ও সোভিয়েত সংস্কারের একটা তুলনামুলক আলোচনায় ফিরে যাই।  সোভিয়েতের তুলনায় চীনারা তাদের সংস্কার  অনেক পরিকল্পিতভাবে করার সুযোগ পেয়েছিল; মানে একটা পরিকল্পনামাফিক আগাতে পেরেছিল।  সেটা আবার এই অর্থেও যে,  সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে যেমন  সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে আগিয়ে যাবার মুহুর্তেই সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাত থেকে ছুটে বের হয়ে গেছিল। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তারা এমনটা হতে দেয় নাই। মানে যাতে না হয়ে যায় সেদিকটা সামলাতে তারা সক্ষম হয়েছিল। যদিও চীনকে একাজে বহু চরাই-উৎরাইয়ের ধাক্কা তাকে কম সামলাতে হয়নি। এভাবে টানা ১০ বছরের মধ্যে নেতৃত্ব ও চিন্তায় বদলের মূলকাজটা শেষ করে মাও সেতুং পার্টির গঠন কাঠামো ও নেতৃত্ব একেবারে ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত ‘সংস্কারি চিন্তায়’ বদলে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।  যার ফসল আজকের চীন!

    এমন চিন্তায় সংস্কার করতে মাওয়ের সফলতা ও ক্ষমতায় টিকে যাওয়ার পেছনে প্রধান সাফল্যের কারণ  সম্ভবত – মাওয়ের উপর পার্টি ও জনগণের আস্থা ঢিলা হওয়ার আগেই তিনি সংস্কারের উদ্যোগ  নিতে এবং তা শুরু ও শেষ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তুলনায় সোভিয়েতের ক্ষেত্রে তারা সংস্কার করতে গেছেন একেবারের তাদের ক্ষমতা যুগের শেষের দিকে যখন  পার্টি ভেঙ্গে পড়ার খুব কাছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংস্কার কাজটা শুরুতেই শুরু না কড়ায় ততদিনে খোদ পার্টি ইতোমধ্যে  বহুবিধ অনাস্থার সংকটে পড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্র বা ভুখন্ড এতদিন সেই ১৯২২ সাল থেকে সোভিয়েত রাষত্রের ভিতরে জুড়ে নেওয়া হচ্ছিল মূলত তারাই তখন বের হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য গর্বাচেভের উপর  প্রবল চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়ে গেছিল।

    তবে চীনের ক্ষেত্রে আরেক বাড়তি সংকট ছিল। চীনের মাও সংস্কার শুরু করলে তাতে  আবার ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন আবার অসন্তুষ্ট হয়ে সৈন্য পাঠিয়ে মাওকে ক্ষমতাচ্যুত করে না ফেলে এবং তা অভ্যন্তরীণ কোনো চীনা নেতার সহযোগিতায়- সেদিকটা নিশ্চিত করতে আগেই সোভিয়েত পার্টির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে নিয়েছিলেন মাও। শুধু তাই নয়। এর কারণ হিসেবে, সোভিয়েত ইউনিয়নই  আমেরিকার মতই “আরেক সাম্রাজ্যবাদ” হয়ে গেছে বলে ব্যাখ্যা ও প্রচার করতে শুরু করেছিলেন তিনি। সোভিয়েত এর আগে সেকালের অন্য  কমিউনিস্ট দেশে [রোমানিয়া (১৯৪৪) ও চেকোশ্লোভাকিয়ায় (১৯৬৮) ] এমন জবর দখলদারি কাজ করেছিল। ঠিক একইভাবে যেমনটা পরে অকমিউনিস্ট  আফগানিস্তানে (১৯৭৯ ডিসেম্বরে) করা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে, মূলত ইরানি বিপ্লবের ভয়ে। এগুলো বুঝতে পারলে বুঝা যাবে মাও সাবধানতা কেন নিয়েছিলেন!

    তবে  “সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” এমন শব্দাবলিতে (এখন সাবেক) সোভিয়েত ইউনিয়নের গায়ে দাগ লাগিয়ে দেওয়ার কারণ হল  – আমেরিকাকে কমিউনিস্টরা “সাম্রাজ্যবাদ” বলে থাকে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নকেও তা বলতে চাইলে এর অসুবিধা হল, অন্তত মালিকানা প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের সবকিছুই রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকায়, যা আমেরিকার মত একেবারেই  নয়। তাই মাওয়ের চীনের চোখে, এই সোভিয়েত ইউনিয়ন হল ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ রাষ্ট্র। আর মাও এই মূল্যায়ন চালু করেছিলেন। এই বয়ান বা নামকরণ – এটা বাংলাদেশের চীনা কমিউনিস্টদের মধ্যে আশির দশকজুড়ে সক্রিয়ভাবে চালু ছিল। নব্বই দশক থেকে এটা ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করতে করতে এখন আর এই ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ মূল্যায়ন করতে কাউকে দেখা যায় না, দেয়াল-লিখনেও না। এর বড় কারণ ১৯৯১ আগষ্ট থেকে সোভিয়েত রাষ্টটাই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছিল।

    আবার চীনের বাইরের দেশে যেমন- বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে, সম্পদ বা উৎপাদন রাষ্ট্রীয় মালিকানাতে আছে বা চলছে কি না  – যদি চলে তবে এটাই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র – এই ‘প্রধান নির্ণায়ক চিহ্ন’ হয়ে আজো থাকতে দেখা যায়।  যদিও এর বাইরেও ব্যতিক্রম অনেক রূপই থাকতে পারে, কিন্তু এটাই প্রধান ধারা। এই ধারার ভেতরে যারা পড়েন তাদের মুখ্য অনুমান যে – রাষ্ট্রীয় মালিকানাই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। তবে একটা ডিসক্লেমার হল, এসবের সঠিক-বেঠিকতা নিয়ে আমি এখানে কথা বলছি না, সেটা আমার বক্তব্যও নয়। এর বাইরে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কাউকে নাকচ করা বা কাউকে সঠিক /বেঠিক বলার কোনোই উদ্দেশ্য এখানে নাই।

    তবে সাধারণভাবে এখন বাংলাদেশে যে প্রধান ধারণা বিরাজ করে বলে আমার অনুমান তা হল, এদের অনুমান বা অবস্থান হল, ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পরে চীন আর কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী দেশ নয়। যদিও মনে রাখতে হবে যে,  চীন আর কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী হোক আর না হোক, চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে চলেছে, এটা আরেক বাস্তবতা। আমি এই বাস্তবতা নিয়েই মূলত লিখছি।

    চীন কিভাবে বদলে আজকের জায়গায় এলোঃ
    পরে ১৯৬৮-৭৭ চীনের এই সময়কালকে বলা যায় চীনের নিজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, জাতিসঙ্ঘের ভেটোক্ষমতাসহ সদস্যপদ ফেরত পাওয়া নিশ্চিত করা আর বিনিময়ে মূলত আমেরিকাসহ বিদেশী পণ্য ও বিনিয়োগ পুঁজির চীনে প্রবেশের ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করতেই ব্যয় হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা তারা পরস্পরকে স্বীকৃতি দান শেষে এর প্রকাশ হিসেবে দুই দেশই অপরের রাজধানীতে অ্যাম্বাসির কার্যক্রম চালু করেছিল। এরপর থেকে চীন হয়ে উঠে আমেরিকার জন্য বিনিয়োগের স্বর্গ। তবে সাবধানতা হিসেবে আমেরিকার কারা আগে চীনে বিনিয়োগ নিয়ে যাবেন এর ক্রাইটেরিয়া হিসেবে, বহু আগে থেকেই যেসব চীনা অরিজিন ব্যবসায়ী আমেরিকায় আসন গেড়ে বাস করছিলেন চীন তাদেরই প্রায়োরিটি দিয়েছিল। কারণ এই বিনিয়োগ নিবার ভালো-মন্দের দিকগুলো বুঝে আইন-কানুন ও রেওয়াজ (গুড প্র্যাকটিস) চূড়ান্ত করার গুরুত্বপুর্ণ দিকের কাজ তখনও বাকি ছিল। এভাবেই চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে ব্যবহারিক আইন-কানুন ও গুড প্র্যাকটিসে হাজির দেখা শেষ করতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেগেছিল। এর পরেই কেবল ২০ বছর ধরে (১৯৯১-২০১০) টানা ভাইব্রেন্ট ডাবল ডিজিটের চীনা অর্থনীতির সূচনা হয়েছিল। অবশ্য শেষের দিকে মানে ২০০৮ সালের গ্লোবাল মহামন্দার কারণে তা কিছুটা ঝুলে গিয়েছিল।

    চীন ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কঃ
    এখানে চীনের সেকালে এসব পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কিছু অবজারভেশন এখানে তুলে আনা যেতে পারে। যেটা বিশ্বব্যাংকের এক সাইট থেকে নেয়া।  যেমন, বিশ্বব্যাংকের সাথে চীনের ব্যবহারিক সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭৮ সালের শুরুতে আভ্যন্তরীন সংস্কার শেষ করার পরে ১৯৮০ সাল থেকে। বিশ্বব্যাংক বলছে চীন তখন সম্পর্ক শুরু করেছিল বিশ্বব্যাংকের আইডিএ [IDA] লোন গ্রহিতা সদস্য হিসাবে। IDA মানে হল International Development Association, যেটা আসলে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে,  বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশের লোন পাবার যোগ্যতা তা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা থাকে; এরই সবচেয়ে নিচের ক্যাটাগরি যা গরীব দেশের জন্য এটাই IDA লোন। এর নিচেও আরেকটা ক্যাটাগরি আছে সেটা হল যারা কোন লোন নিলে তা ফেরত (সুদ বা আসল কোনটাই) দিবার যোগ্যতাও রাখে না  বা তৈরি হয়নাই তাদের ক্যাটাগরি। অর্থাৎ এদেরকে তাই গ্রান্ট বা অনুদান ক্যাটাগরির গ্রাহক বলা হয়। এদেরকে অনুদান দিয়ে অবস্থা একটু ভাল করে পরের ধাপ  IDA এর লোন পাবার যোগ্য করা হয়। IDA, এই ক্যাটাগরিতে  ১.০% এর নিচে (০.৭৫%) সুদসহ আসল খুবই লম্বা প্রায় ৪০ বছর ধরে সময় নিয়ে ফেরত দিবার সুযোগ দেয়া হয়। তবু এটা আসলে সুদ না, বলা যায় বিশ্বব্যাংকের স্থানীয় অফিস চালানোর খরচ তুলে আনা। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে লোন গ্রহিতা হওয়ার শুরু থেকেই এই ক্যাটাগরিতে ছিল। তবে একই সাথে অনুদানও পেয়েছে। সম্ভবত এখনও “সেফটি নেট” কর্মসুচিতে অনুদান এখনও পাশাপাশি চালু আছে।  চীনও IDA, এই ক্যাটাগরি থেকেই ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল। ব্যাংকের ভাষায় IDA হল … fund for the poorest। কিন্তু চীন অচিরেই বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এরপরের ক্যাটাগরি হল – “লোয়ার মিডিয়াম বা মধ্যম আয়ের দেশের” ক্যাটাগরি যেখানে সুদের হার ২% [Lower mid $1,036 and $4,045]। বাংলাদেশে এখন এই ক্যাটাগরিতে। আর চীন ১৯৯৭ সালের এসব অতিক্রম করে চলে যায়। আর ২০০৭ সাল থেকে উলটা ঋণদাতা বা ডোনার দেশ হিসাবে হাজির হয়েছিল। এতে চীনের ১৯৮০ সাল থেকে গড়ে প্রতিবছর জিডিপি বেড়েছিল ১০%  করে। বলাই বাহুল্য এটা খুবই উঁচু পর্যায়ের রাইজিং ইকোনমির দেশের বেলায় ঘটে থাকে। এভাবে ২০০৭ সালের মধ্যে চীন তার জনগোষ্ঠির ৮০ কোটি (বর্তমান জনসংখ্যা ১৪০ কোটি) লোককে প্রভার্টি বা দরিদ্র স্টেজ থেকে উঠিয়ে এনেছিল। উপরের এই তথ্যগুলো এই লিঙ্ক থেকে নেওয়া। আর বিশ্বব্যাংকের সাথে চীনের পার্টনার সম্পর্ক করার ত্রিশ বছরের মধ্যেই ২০১০ সালে চীন বিশ্বব্যাংকের তৃতীয় বড় মালিক হয়ে উঠেছিল। চীনের এর উপরের মালিক হতে আমেরিকা নাকচ করাতেই মূলত চীন নিজে আলাদা বিশ্বব্যাংক-তুল্য ব্যাংক [AIIB] ও BRICS ব্যাংক গড়ার দিকে রওয়া দেয়।

    তবুও এখনো পুরান কমিউনিস্ট ধারার অনেকেই চীনের এই গ্লোবালি রাইজিং অর্থনীতি, এটা ‘কিছুই হয় নাই’ বলে নাকচ করতেই পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে কী ভিত্তিতে তিনি তা বলছেন, তা বুঝার জন্য সেদিকে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। কারণ চীন সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্তের ফারাক হতেই পারে। তবে এই ফারাকগুলো মূলত কী ভিত্তিতে কথা বলছি মানে কোন কাঠিতে মাপছি, এগুলো আসলে সেই মাপকাঠির ফারাক। এটা বুঝলে বা জানতে পারলেও অনেক লাভ।
    এ দিকে দেখা যাচ্ছে এবার বিবিসি জানাচ্ছে, ‘একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে” – চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নাকি শতবার্ষিকী পালনে এমন  বক্তব্য দিয়েছেন।
    যদিও এখনও চীনে এটা সমাজতন্ত্র হয়েছে কিংবা হয়নি- এ নিয়ে কাউকে কাউকে আমরা বিতর্ক করতে দেখতে পারি। কিন্তু তাতে চীনের গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়ার অভিমুখ বদলাচ্ছে না।

    শতবার্ষিকীতে চীনের বাইরের দেশের প্রতিক্রিয়াগুলোঃ
    এবারের এই বার্ষিকী যতটা না চীনের অভ্যন্তরীণ এর চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া বিদেশের এবং তা এমনকি চীনের বন্ধু-শত্রু, অথবা চীনের প্রতি ঈর্ষাধারী কিংবা কৌশলগত কারণে যারা পছন্দ বা উচ্ছ্বাস-প্রকাশকারী নির্বিশেষে সবার মধ্যেই প্রতিক্রিয়া হতে দেখা গেছে।

    এসবের মধ্যে পশ্চিমের মিডিয়া রিপোর্ট আর তাতে প্রকাশিত মন্তব্য ও অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়াগুলো লক্ষণীয়। এসব লেখায় এবারই প্রথম দেখা গেল, চীন যে নিজেকে এখনো কমিউনিস্ট বলে দাবি করে একথা এরা মেনেই নিয়েছে। সেটা এই অর্থে যে এনিয়ে কোন বিরূপতার এবার আমরা দেখি নাই। আর এই ‘কমিউনিস্ট নামে রেখেই’ চীনের উঠে আসা সাফল্য বা চ্যালেঞ্জ পশ্চিমের সাথে চীন বরাবর বা সমান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যা পশ্চিমকে ছাড়িয়েও যেতে পারে, যেন তারা মেনে নিচ্ছে। কোনো প্রশ্ন তোলেনি তারা। এমনকি চলতি একুশ শতকের শুরু থেকে প্রথম ১৫ বছরও আমরা দেখেছিলাম চীন পশ্চিমের সাথে কম্পাটেবল বা তুলনীয় নয় বলে আমেরিকা সরকারি আপত্তি তুলছে। ওবামা আমলেও প্রায়ই এমন দাবি উঠতে দেখেছি আমরা। তাদের দাবি, চীন নিজের ‘মুদ্রার মান’ কমিয়ে রেখে সাফ। যদিও ২০০৮ সালের মন্দায় পরের বছরগুলো অন্তত একদশক জুড়ে জাপান তার ইয়েনের ‘মুদ্রার মান’ কমিয়ে রেখে চলেছিল। এক ডলার সমান ৯২-১০৮ ইয়েন এভাবে ভ্যারি করেছিল।  কিন্তু আমেরিকাকে আপত্তি তুলতে দেখা যায়নি।

    এখানে আমাদের পাঠকের অনেকের কাছে মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ব্যাপারটা পরিষ্কার নয় হয়ত। তাই কিছু সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়ে নিব। যদিও ভারতের জাতিবাদী রাজনীতির চোখে, ডলারের তুলনায় রুপির মান কমে যাওয়া (মানে বেশি রুপী দিতে হওয়া) দেশবিরোধী কাজ বা ঘটনা মনে করা হয়। অর্থাৎ ভারতের সরকার ও জনগণ সবার চোখেই এটা ভারত স্বার্থবিরোধী নেতিবাচক কাজ। কিন্তু এখানে আমরা দেখেছি আমেরিকা চীনকে অভিযুক্ত করছে যে, ইউয়ানের মুদ্রামান চীন ইচ্ছা করে কমিয়ে রেখেছে আর এটা অন্যায় কাজ বলে আমেরিকা দাবি করে যাচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন? আর এর মানে কী তাহলে?

    কারণ এটা গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ। মানে এটা আর তথাকথিত জাতিবাদী উৎপাদন বা জাতিবাদী অর্থনীতির যুগ নয়। অর্থাৎ যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের দিকে তাকিয়ে উৎপাদনের চেয়ে রফতানির জন্য উৎপাদন অর্থনীতিই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক তৎপরতা হয়ে ওঠে – সেটা দেখে বুঝা যায় এটাই গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ। এক কথায়, দেশীয় ভোক্তার জন্য উৎপাদনের তুলনায় রফতানির জন্য উৎপাদন তুলনায় বেশি সুবিধা ও মনোযোগপ্রাপ্ত সেক্টর হয় যখন। আর এ ক্ষেত্রে মুদ্রা মান কম করে রাখা বা আপনাতেই যদি কমে যাওয়া ঘটে কখনো তবে তা রফতানিকারক দেশের জন্য বেশি লাভ ও সুবিধাজনক হয় সাধারণত। কিভাবে?

    মুদ্রা মান কমে যাওয়া মানে যেমন (ধরা যাক) আগে, বাংলাদেশ থেকে এক ডলারে  একটা শার্ট কিনতে পাওয়া যেত এমন হলেও এখন দেড় ডলারে দুইটা পাওয়া যাবে এরকম হয়েছে। স্বভাবতই এখন বিক্রেতা হিসাবে আমরা  কম মূল্য পাব। কিন্তু এতে আবার বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যাবে। কারণ এখন প্রতিদ্বন্দ্বি ভিয়েতনামের ক্রেতারা কম দামের সুবিধা নিতে বাংলাদেশমুখী হবে। এতে বিক্রি বেশি হওয়াতে মুদ্রামান হারানোর লস কাভার হওয়ার পরও আমাদের বেশি লাভ হতে পারে। অর্থাৎ সময়ে নিজ মুদ্রার মান কমা, এটা নিজের জন্যই ইতিবাচক হতে পারে। আর ভারতের চিন্তাটা কুপমন্ডুক ও পুরানা (যখন রফতানির জন্য উৎপাদনের যুগ আসে নাই ) কথিত ‘দেশপ্রেমিক’ চিন্তা।

    ভারতের প্রতিক্রিয়াঃ
    পয়লা জুলাইয়ের ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা জানাচ্ছে এ বিষয়ে। বলছে, “কংগ্রেস বা বিজেপি এই দল দুটার কেউ চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে জন্ম-শতবর্ষ পার করানোতে কোনো শুভেচ্ছাও জানায়নি। তবে এক কমিউনিস্ট দল, সিপিএম জানিয়েছে”। আর কংগ্রেসের এক সিনিয়র নেতা এনিয়ে বলেছেন, “বর্তমান রাজনৈতিক আবহ আমাদের দুই পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের উপযোগী নয়”। আসলে তিনি সম্ভবত বলতে চাইছেন লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনার কথা। গত বছর সেখানে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা চীনাদের হাতে নিহত হয়েছেন। সে ঘটনাটাকে পাশে সরিয়ে রেখে সৌজন্য দেখাতে গেলে তাতে কংগ্রেস বা বিজেপি যেই দেখাতে যাক অপর দল তাতে ‘মাইলেজ’ নিতে অপরের বিরুদ্ধে পাবলিক সেন্টিমেন্ট উসকে সুবিধা নিতে চাইতে যাবে বলে তারা একে অপরের ভয়ে ভীত। তাই তারা দুই-পার্টি কেউ শুভেচ্ছা জানানোর ধারে কাছে যায়নি। যদিও এটা খুব ভাল যুক্তি বা অজুহাত তা মানা যাচ্ছে না। যেমন এক ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে ভারত ৯১% নির্ভরশীল। তা তো ঠিকই তবু চলছেই। আবার ভারতের মোবাইলের বাজারে সবগুলো ব্যান্ডই মূলত কোন না কোন চাইনিজ। তরুণেরা চীনা মোবাইল ব্যবহার ছাড়ার চিন্তা করছে এমনটাই গত দুবছরে কখনই শোনা যায় নাই। আর সামগ্রিকভাবে চীনা পণ্য আমদানি এসময়ে বেড়েছে বই কমে নাই। তাই এই সাফাই দুর্বল অবশ্যই। যদিও শেষ বিচারে এটা যার যার পারশেপশন নিয়ে আর কিছু বলার থাকে না!

    ওদিকে,  সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির চীনা পার্টিকে লিখিত শুভেচ্ছা দেয়ার কথা পত্রিকাটা আমাদের জানাচ্ছে। এই লিখিত শুভেচ্ছাকে বলা যায় – ইয়েচুরি নিজেও কমিউনিস্ট এবং তাদের কমিউনিস্ট পার্টির দিক থেকে এটা আলাপ ও খাতিরমূলক শুভেচ্ছা এটা – তাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “চীন কিভাবে নিজের ভুল চিহ্নিত ও সংশোধন করে তার পলিসিগুলো দাঁড় করিয়েছে গত শতক এর সাক্ষী হয়ে থাকবে”। ‘সিপিএম গুরুত্ব দিয়ে যেতে চায় যে, “মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এক সৃষ্টিশীল বিজ্ঞান। এটা শ্রেষ্ঠ ডগমাবিরোধী। তাই এটাকে কখনো কোনো আগাম সেট করা ফর্মুলা হিসেবে হাজির করা যাবে না”।  আবার তিনি বলছেন, “যদিও এক সৃষ্টিশীল বিজ্ঞান হওয়া সত্বেও এটা সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার সময় বিপ্লবী প্রিন্সিপল ও মুক্তিলাভের উদ্দেশ্য শক্ত করে আকড়ে থাকে”। তিনি লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেন, “সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ডায়লেক্টিক্সের জীবন্ত সারকথা”। এছাড়া ইয়েচুরি,  চীন যেভাবে করোনা মহামারীর সামলিয়েছে এর ভূয়সী প্রশংসা করেন।

    কথাটা এত দীর্ঘ করার মূলকথা হল, সিপিএম চীনের ‘বিস্তারিত সংস্কারের’ (১৯৫৮ সাল থেকে সম্ভবত সবই) সব কিছুকেই অনুমোদন দেয়, তাই ইয়েচুরি জানিয়ে রাখার সুযোগ নিয়েছেন। তবে এই কমিউনিস্টের বিজ্ঞানবাদীতা খুবই দৃষ্টিকটু এবং পুরান কমিউনিস্টের নিচু চিন্তা পদ্ধতির লক্ষণ।

    এর মধ্যে বড় বিপজ্জনক হল, বর্তমান ভারতের পরিস্থিতি হিন্দুত্ববাদী ভোটের জমানার। ভোটের সময় সিপিএম এই কমিউনিস্টেরা হিন্দুত্ববাদের  বিরোধিতার চেয়ে কিভাবে এর সাথে খাপখাইয়ে চললে কিছু ভোট বা ভোট পলিটিক্সে লাভ হবে সেটাই সিপিএম করে থাকে। এমনকি তৃণমূলকে হারাতে সে বিজেপির কোলে উঠে বিজেপি দলকে জিতাতে কাজ করতে দ্বিধা করে না। তাই এখন এমন বক্তব্য তাদের দলের বিরুদ্ধেই যেতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৩ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকী“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    গৌতম দাস

    ২৬  জুন ২০২১, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3BI

     

    –

    (গত সংখ্যার পরে শেষ পর্ব, বাইডেন জি৭ ইস্যুতে।)

    কলোনিদখলদারি (মোটামুটি ১৫০০-১৯৪৫) ব্যবসার যুগেই শেষের দিকে ১৮৮০ এর দশকে  আমেরিকা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে বড় অর্থনীতি হিসেবে কলোনি দখলদারদের সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল। তবে এক ঝাপটায় আমেরিকা সাথে  নেতা হয়নি। আর কারও নেতা হওয়া বা দুনিয়াতে অর্থনীতিতে কেউ নেতা হওয়া এসব বিষয়গুলো তখনও শুরুই হয় নাই। মূল কারণ গ্লোবাল পণ্যবিনিময় বাণিজ্য দূরে থাক দুটা কলোনি মালিক দেশের মধ্যে বিস্তর পণ্য বিনিময় বা অর্থনৈতিক নীর্ভরশীলতা বিষয়টাই তখনও সুনিয়াতে হাজির হয় নাই।  তাই সব মিলিয়ে  আমেরিকাকে  আরো প্রায় ৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেটাই  দুই দুটা বিশ্বযুদ্ধের কাল।  মূল কারণ দুনিয়া তখনও মূল একটিভিটি বলতে  কলোনি দখলের রামরাজত্বে মজেছিল, যার অবসান ঘটানো আগে  করে নেওয়ার দরকার ছিল আমেরিকার জন্য।
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তিগুলা যারা দুনিয়ার ওপর একচ্ছত্র খবরদারি চালিয়ে বেড়াত তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই (২০১৪) সবাই এক এক করে দেউলিয়া হয়ে গেছিল, মূলত যুদ্ধের খরচসামলাতে ফেল করাতে। আর এরই সবচেয়ে বড় চিহ্ন হল রথশিল্ড ব্যাংক [Rothschild Bank]  যেটা মূলত এবং একমাত্র সেকালের মুদ্রা কনভার্ট বা বিনিময় করে দিবার ব্যবসায়ে ছিল; এর বন্ধ হয়ে যাওয়া।  কারণ এই ব্যাংকটা কার্যকর ছিল সে সুত্রের ভিত্তিতে তা হল, ব্যাংকের ভল্টে সমতুল্য মানের সোনা রেখে কাগুজে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা তখন ওসব দেশে চালু আছে।  এটা চালু থাকলে ঐ ব্যাংকের কাছে কোন দেশের পণ্য আমদানি / রফতানির হিসাব রাখা মানে ঐদেশে সোনা এসে ঢুকেছে বা বেরিয়ে গেছে কতটা তা জানায় বিশ্বাসযোগ্য উপায়।  কিন্তু যুদ্ধের সময়  সোনাজমা না রেখে মুদ্রা ছাপানোর সস্তা পথে যুদ্ধের খরচ সামলাতে যাওয়াতে এইবার মুদ্রার মানের (অবমূল্যায়ন) ঢলে পড়ে যাওয়ায় রথশিল্ডের ব্যাবসা বন্ধ রাখতে হয়।

    প্রথম আমেরিকান ঋণগ্রহিতা ইউরোপঃ
    ফলে এইবার কলোনিমালিক ইউরোপের দেশগুলোর  কাছে ঋণ পাবার একমাত্র বিকল্প মনে হয় আমেরিকাকে। তবে মূলত এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালের পর থেকে। আর আমেরিকান থেকে বলতে আমেরিকান প্রাইভেট ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রগুলো যেমন বৃটেন সরকার এবং ব্যবসায়ীরাও – এরা  ঋণ পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।  যদিও এনিয়ে আবার আমেরিকায় আভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভক্তি শুরু হয়েছিল যে আদৌও ইউরোপকে  ঋণ দিতে যাওয়া ঠিক কিনা। কারণ এতে ক্রমশ ইউরোপের যুদ্ধে খোদ আমেরিকাই সামিল হয়ে পড়ে যেতে পারে। এটাই সেকালের আমেরিকার  বিচ্ছিন্নপন্থি বনাম আন্তুর্জাতিক-পন্থি বিতর্ক  [America’s isolationist Vs internationalist debate] বলে পরিচিত। এই বিতর্ক ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। যারা এনিয়ে বিস্তারে বুঝতে চান তারা রুজভেল্টের Cash & Carry Law 1939 এবং এবং সাথে এই আইনের আগের সব ভার্সান। আর সবমিলিয়ে – Neutrality Act of 1939, Lend-Lease সহ বহুকিছুর ভিতরে ঢুকতে পারেন বা ঢুকতে হবে।

    ওদিকে ১৯৩২ সালের পর থেকে হিটলারের উত্থান শুরু হয়েছিল। এতে ক্রমশ নেতা হিটলার সাথে মুসোলিনির ইতালি আর মার্শাল তেজো জাপানসহ অন্যদের মিলে গ্রুপ বড় হতে থাকে। কিন্তু এই গ্রুপের ঋণ বা বাজেট সংকটের কথা জানা যায় না।  ফলে একদিকে হিটলার ও তার সঙ্গিদের গ্রুপ  আর অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিরা এভাবে এক পোলারাইজেশন ঘটতে পেরেছিল।  আর মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খরচ বইবার ক্ষেত্রে আমেরিকান সক্ষম অর্থনীতি ও বিপুল উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে্র সক্ষমতার বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি আমেরিকার নেতৃত্বে আসে আর এই অংশই যার সেকালের ডাকনাম এলায়েড ফোর্স বা মিত্রশক্তিই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল।
    কিন্তু  এই যুদ্ধের আসল ফ্যাক্টর যে যুদ্ধে  আমেরিকান সক্ষমতার পোলারাইজেশন এবং তা এমন কেন হয়েছিল ও কিসের ভিত্তিতে; এসব কিছু আমাদেরকে  মানে বৃটিশ-ভারতের আমাদেরকে পরিষ্কার জানতে দেয়া হয়নি। তাই দুটো শক্তি বৃটিশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন – এরা  ঘটনা যেভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিল আমরা খাপছাড়াভাবে তাই জানতাম।
    এরই একটা হল, ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়রা  যেন এদের মত “ভাল মানুষদের” নেতৃত্বে মানে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের নেতৃত্বে তাঁরা বিপরীতে খারাপ মানুষ হিটলার আর তার বন্ধুদেরকে  চার্চিল  পরাজিত করেছিল। এই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প। এছাড়া ওদিকে আরেক ব্যাখ্যা চালু ছিল কলোনি-ভারতের কমিউনিস্টদেরও। এটিও আরেক ভালভালাইয়া; মানে চার দিকে সব খালি ভাল আর ভাল। ভাল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনের হাতে জর্মানির হিটলারের পরাজয় ঘটেছিল। তিনি ভাল লড়েছিলেন বলেই হিটলার পরাজিত হয়েছিলেন। কাজেই সব ক্রেডিট কমিউনিস্টদের, এটাই নাকি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল গল্প।  যেমন এই গল্পের প্রভাব এতই মারাত্মক যে এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কমিউনিস্ট – এখন এনজিও নেতা  মনে করে – পড়তি গ্লোবাল নেতা আমেরিকা নয়, এটা ইউকের বৃটিশেরা। এককথায় বৃটিশেরা আমেরিকার চেয়ে অর্থনীতির শক্তিতে সেরা। যাক, সেসব কথা। তবু  আমরা খুবই সরি, স্টালিন বা চার্চিল  বা তাদের সমর্থকদের একটারও বয়ানের ভিত্তি নাই। কারণ এদের বয়ানে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস – আমাদেরকে  যুদ্ধের পোলারাইজেশনে মুখ্য ফ্যাক্টর কী ছিল তা বলতে পারে না। কেন?

    প্রধান ধারা হিসাবে আমরা  চার্চিলকে দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বুঝতে গেছিলাম আর সেটা এজন্য যে তারাই তো আমাদের কলোনি মালিক।  আর তাই একমাত্র তাদের মাধ্যমেই তো সব তথ্য ও উতস। আমাদের ইউরোপকে চিনি-মানি আর বুঝাবুঝি ঘটেছিল। তারাই আমাদের প্রভু ছিল। ইউরোপের ভাষাগুলোর মধ্যে একমাত্র ইংরেজিই আমাদের এলিটরা বুঝত আর তারা কেবল ব্রিটিশ মিডিয়া পড়ে সেখান থেকে এগুলো অনুবাদ করত। এভাবে গ্লোবাল কাহিনীর যতটুকু বাংলার নাগালে আসত তা দিয়েই কেবল আমরা বিশ্বযুদ্ধ যতটুকু যা বুঝতাম। তাই আমেরিকা বলে কোনো দেশ আছে কি না বা কেমন তারা সেটাই তো তখনও আমরা ঠিকমত বুঝতাম না; অর্থাৎ চার্চিলের চোখ দিয়েই নিরুপায় আমরা  দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ বুঝেছিলাম। তাই আমাদের চোখ এই বীর চার্চিল যে আমেরিকার কাছে দাসখত দিয়েছে সেটা আমাদের চিন্তারও বাইরে ছিল। স্টালিনের সোভিয়েত দেশকেও যে অ্যামেরিকা যুদ্ধের খরচ ধার দিতে পারে এসব আমাদের কমিউনিস্ট মনে চিন্তার অতীত।  স্টালিনসহ বিপ্লবীদের চোখে কলোনি বা উপনিবেশ তো উঠেই নাই। তাই তো সেটা এখনও কমিউনিস্টদের চোখে “নয়া-উপনিবেশবাদ”।  যার মানে কী একমাত্র স্টালিনই জানে…।  যেখানে একালে আমাদের হাসিনাই বাইডেনকে চোখ উলটে তাকাতে পারে এটা সম্ভব (যদিও  হাসিনার ক্ষমতার স্বৈরাচারি বলতে পারেন তবু সে স্বাধীন আর এরপরেও এখনও তাঁর বড় বড় সীমাবদ্ধতা আছে )  – সেখানে দুনিয়াটা এখনও নয়া উপনিবেশের দুনিয়ায় আমরা আছে এই কথার অর্থ কী?

    অথচ হার্ডকোর সত্যটা এই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের মত কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো আর ইউরোপের কারো না কারো কলোনি  হয়ে শাসনে থাকবে কি না- এটাই ফয়সালা করে দিয়েছিল। কঠিন সত্যটা ছিল, চার্চিল আমাদের ত্রাতা বা মুক্তিদাতা ছিলেন না। কলোনি থেকে মুক্তি –  আমাদের আসল মুক্তিদাতা ছিল আমেরিকা, তাতে আমরা যতই তখন বা আজও আমেরিকাকে ঘৃণা বা অপছন্দ করি না কেন। এটাই ফ্যাক্টস।  যদিও তা আমেরিকার নিজ স্বার্থেই ঘটতে পেরেছিল। কীভাবে?

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দুনিয়ার সব কলোনি দখলদার চার্চিলসহ সব কুতুবকে দাসখত দিতে বাধ্য করেছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ে শেষ হলে পরে তাদের সবাইকে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা উঠিয়ে ফেলে দিতেই হবে। কেন? যাতে দুনিয়া কলোনিমুক্ত প্রায় শ দুয়েক স্বাধীন রাষ্ট্রের এক দুনিয়া হয়।  আসলে মূল কথাটা হল, আমাদের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চার্চিলও আসলে আমাদের জন্য ভিলেন ও এনিমি ছিল। কিন্তু হিটলারের মারের মুখে নিজের যুদ্ধের খরচ চালানোর মুরোদ ছিল না বলে সারা ইউরোপ আমেরিকান ঐ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। অতএব যুদ্ধ শেষে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন-আমেরিকায় ১৯৬৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে অসংখ্য দেশের কলোনিমুক্তি ঘটে গিয়েছিল। সর্বশেষটা দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৪ সালে। আর বলাই বাহুল্য ভারত বা পাকিস্তান কলোনিমুক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে।

    অখণ্ড ভারতের দিক থেকে দেখলে বিশ্বযুদ্ধের এটাই ছিল আসল বিশ্ব-ইতিহাস, আমাদের কলোনিমুক্তির ইতিহাস। গ্লোবাল ইতিহাসের দিক থেকে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল ও একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল আমেরিকার হাতে আর তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধশেষে প্রথম “গ্লোবাল অর্থনীতি” বলে কোন কিছুর নেতা হয়েছিল আমেরিকা। আর এই ইতিহাস জানার একমাত্র পথ হল সরাসরি  আমেরিকান হিস্ট্রি পড়া। তবে এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমেরিকা নিজেই সেসব ডকুমেন্ট অনলাইনে দিয়ে রেখেছে। তাই যে কেউ চাইলে আর পড়তে জানলে নিজেই জেনে নিতে পারে।

    এখন এই আমেরিকান নেতৃত্ব মানে কী? এর মানে আর আবছা রেখে লাভ নেই, যা স্টালিন বা চার্চিল আমাদেরকে সেকালে জানতে দেয়নি (কারণ তা নিজেদের অযোগ্যতা বিবেচিত হতে পারে) তা হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেতৃত্বে গঠিত মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে খরচের বড় অংশটি একাই [মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার আর একে ৫১গুণ করলে আজকের ডলার হবে] বহন করেছিল আমেরিকা। মানে ইউরোপ এমনি এমনি আমেরিকান নেতাগিরি মেনে নেয়নি।

    এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আরেক যে ব্যাখ্যা- আমাদের দেশের রাজনীতি ভাল  বুঝে এমন ভাব ধরে থাকা কমিউনিস্টদের মুখ থেকে যা জানি, সেটিও আসলে সোভিয়েত ভাষ্য। আর সেখানেও যুদ্ধের বড় খরচদাতা ঐ এক ও অদ্বিতীয় আমেরিকা হলেও কমিউনিস্টদের ইতিহাস ভাষ্যে সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়ে এসেছে।

    তবে অন্যদিকের ফ্যাক্টস হল, আমেরিকাও দাসখত বা ‘সহযোগিতা’ চুক্তিতে স্তালিন বা চার্চিলকে অপমানজনকভাবে শামিল হতে বাধ্য করেননি। এসব চুক্তিতে অপরপক্ষ হিসেবে প্রথম ও একক স্বাক্ষরদাতা ছিলেন চার্চিল আর সেটার নাম আটলান্টিক চুক্তি, ১৪ আগস্ট ১৯৪১। আর পরে সেই ড্রাফটটাই কিন্তু এবার চার রাষ্ট্র  – ব্রিটেন, আমেরিকা চীন ও সোভিয়েত মিলে আবার স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। তবে এবার ওই চুক্তির নাম দেয়া হয়েছিল “জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণায়” স্বাক্ষর এই নামের আড়ালে। সাথে একই দিনে আরো ২৬ দেশ ঐ একই ডকুমেন্টে প্রতি-স্বাক্ষর করেছিল। এটাই আমেরিকার নেতৃত্বে হিটলারবিরোধী জোটের মুলভিত্তি দলিল। কিন্তু তবু কোথাও “কলোনি শাসন ছেড়ে দিতে চলে যেতে হবে” – এই ভাষায় বা শব্দ কোথাও নেই। তবে  কথাটা ঘুরিয়ে বলা হয়েছে – “যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবে যে ওই ভূখণ্ডের শাসন কিভাবে চলবে; অর্থাৎ কলোনি করা নিষিদ্ধ হলেও তা এই ভাষায় বলা হয়ে আছে।

    এ’প্রসঙ্গকথা এবার গুছিয়ে সম্পর্ক-দেখিয়ে দিয়ে বলে শেষ করা যাক। তা হলে আমেরিকা কিভাবে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল সেটা আমাদের মতো দেশের কোন এলিট বা কুতুবরা কেউ সেকালে বা একালে জানতেন বা টের পেয়েছিল তা মনে হয় না। এর কাহিনী বা ঘটনার দিক এটাই। আর এটাই এখন আমাদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক।

    কারণ গত ১১-১৬ জুন ২০২১ সাল জুড়ে বাইডেন জি-৭ আর ন্যাটোর মিটিংয়ে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি বা হুমকি তুলেছিলেন। অথচ আসল কথাটা এই যুদ্ধের খরচ কে দেবে সেটা নিয়ে অন্তত প্রকাশ্যে কিছুই  বলেননি। আর আমরা উপরে দেখলাম যুদ্ধের খরচই যুদ্ধের হুমকি বা যুদ্ধ যেই করুক এর মুখ্য ও নির্ধারক  বিষয়।  আর এই খরচ  সেকালে ঐ পরিস্থিতিতে একমাত্র বহন করতে সক্ষম ছিল রুজভেল্টের আমেরিকা। তাই ইউরোপ হিটলারের হাতে দখল ও বিলীন হওয়ার বদলে আমেরিকান নেতৃত্বকেই মেনে ওর অধীনে পরিচালিত হওয়াটাকেই বেটার বিকল্প বোধ করেছিল সকলে। তাহলে একালে বাইডেনের স্বপ্ন্বের যুদ্ধ ও এই যুদ্ধের খরচ বইবার মত দাতাটা কে হবে?  এই ভাসুর বা স্বপ্নে দেখা দাতার নাম জানান না দিলে বাইডেনের হুঙ্কারের অর্থ কী?

    কেন আমেরিকার জন্য বিশ্বযুদ্ধ-২ এর নেতা হওয়া এত জরুরি ছিলঃ
    তবে কথা আরেকুটু আছে।  আমেরিকা এমনি ওমনি যুদ্ধে সবার নেতা হতে নিশ্চয় চায় নাই। কিন্তু সেটা কী?  তা হলে? আমেরিকার স্বার্থ শুধু গ্লোবাল নেতা হওয়া ছিল তা নয়, মূলত তার হাতে জমা থাকা বিপুল সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ তখন বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হয়ে উঠেছিল, অথচ ঋণ-খাতক বা গ্রহিতা দেশ আমেরিকা খুজে পাচ্ছিল না।  কারণ দুনিয়া তখন  কলোনিদখল হয়ে থাকা দুনিয়া। আর ১৯০৫ সালের এই হিসাবে দুনিয়ার কলোনি হতে  বাকি আছে এমন ভুমি বা কোন দেশ আর  খালি ছিল না। ফলে এটা ছিল আমেরিকান   স্বার্থ যে সে দুনিয়াকে এক কলোনি দখল বা শাসন মুক্ত এক স্বাধীন দেশের দুনিয়া হিসাবে যেন দেখতে পায়। যাতে স্বাধীন কলোনিমুক্ত দেশগুলো –  এরা সবাই তখন আমেরিকার ঋণের সরাসরি অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে খাতক হতে পারে। যাতে আমেরিকা এসব স্বাধীনমুক্ত দেশকে আমেরিকান ঋণের খাতক হিসেবে পেয়ে যায়।
    কাজেই একালে বাইডেনের ভাবি যুদ্ধের খরচের সংস্থান না করে চীনকে যুদ্ধের হুমকি দেখানো এগুলোকে কী বলা যায়? এর মানে কি আমেরিকা-চীনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ নামে যে বিরোধ প্রকাশ্যে বাজারে হাজির আছে, তা বাইডেন এখন যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান করতে চাইছেন? হ্যাঁ তাই। সে জন্যই এটাকে ছেলেমানুষি চিন্তা বলছি। কারণ এক তো খরচের ব্যাপার আছে; সেটি ছাড়াও চীনের সাথে আমেরিকান বিরোধ মূলত হাতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ না থাকা থেকে উদ্ভূত বিরোধ  – এমন বিরোধকে বাইডেন যুদ্ধে গিয়ে সেটাকে নিজের পক্ষে জিতে আনবেন কী করে?

    যেমন ধরা যাক, যুদ্ধ একটা হল আর আমেরিকা তাতে জিতেও গেল। কিন্তু তার পরে এতে কি আমেরিকার হাতে যথেষ্ট ‘সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ’ না থাকার সঙ্কট, যেটা এখনই প্রকট হয়ে আছেও তা আমেরিকার কেটে যাবে?  আর এই বিপুল সম্পদটা আসবে কোথা থেকে? কিভাবে?

    আসলে তখনো দুনিয়ায় সম্ভাব্য একমাত্র উদ্বৃত্ত সম্পদের উৎস দেশ হয়ে থাকবে এই চীনই। আর সেই চীনের কাছে হাত পেতে আমেরিকা তার জনগণকে খাওয়াবে, দুনিয়া রুল করবে – এমন কল্পনা এবসার্ড বলারও সুযোগ দেখি না। এ জন্য বলেছি, হাতে বিপুল সঞ্চিত সম্পদ থাকা না থাকার সঙ্কট এটাই মূল সংকট – অথচ এই সংকট  কী যুদ্ধে জিতেও কেটে যাওয়ার বিষয়???

    তা হলে অথর্ব ন্যাটোকে সামনে আনা কেন?
    বাইডেন ন্যাটোকে সামনে রেখে হুমকিটা দিয়েছেন। ন্যাটোকে দিয়ে তিনি আর্টিকেল পাঁচ চালু করার সামরিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার হাসির এক কথা হল, চীন-রাশিয়া নাকি পারমাণবিক অস্ত্রে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সমান হয়ে যাচ্ছে। আর  ন্যাটো সেক্রেটারি এটাকে আমেরিকার জন্য হুমকি দেখছেন। আচ্ছা খোদ পারমাণবিক অস্ত্রই যেখানে সবার জন্যই হুমকি, সে্টা  আপনার বন্ধু বা শত্রু   যার হাতেই থাকুক; সেখানে ওরা আমার সমান হয়ে যাচ্ছে কেন  – এটা কী নাকিকান্নাময় যুদ্ধের অজুহাত তোলা নয়!

    কিন্তু  ন্যাটো নিয়ে ঘরের কথাটা হল – সেই ওবামা আমল থেকে, চাক হেগেল [Chuck Hagel] যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (২০১৩-১৫), তখন থেকেই ন্যাটো যে একটি খরচের ডিব্বা, আর সেই খরচের বেশির ভাগ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) কেন আমেরিকা একা বইবে- এসব প্রশ্ন আর অজুহাত তুলে কি চাক হেগেল সেকালেই ইউরোপকে খরচের দায় নেয়না ওথচ বড় কথা বলে – এই বলে অপমান করেনি?   ট্রাম্পও তো একই প্রশ্ন তুলেছিলেন।  ইউরোপকে খরচের দায় নিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একালে ন্যাটো একটি অপ্রয়োজনীয় সংগঠন। আফগানিস্তানের পর ন্যাটোর আর দুনিয়ায় কোনো ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ কমে আসছে তাই – ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমন সব ঘোষণা দেয়নি কি? এমনকি তিনি ইউরোপে (জার্মানিতে) ও জাপানে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এখনো আমেরিকান সৈন্যের সামরিক ব্যারাক মেনটেন করে যাওয়ার খরচ এবার থেকে ইউরোপকে দিতে হবে বলে ট্রাম্প দাবি করেননি?
    তাহলে সেসব প্রশ্নের সদুত্তর কী? উঠে থাকা এসব প্রশ্ন যা ন্যাটোর ভবিষ্যতই এলোমেলো করে রেখেছে সেসব পাশ কাটিয়ে বাইডেন কতদুর কোথায় যেতে পারবেন?  বাইডেনের কাছে এসব খরচের ব্যয়ভার প্রসঙ্গে সমাধান কী আছে? অর্থাৎ খরচ বইবার প্রশ্নে ন্যাটো এখন একটি পর্যদুস্ত সংগঠন হয়ে আছে! অথচ এসব নিয়ে কোনো কথা না বলে, এক দিনের ন্যাটো বৈঠকে গিয়ে চীনকে হুমকি দিয়ে এলেন বাইডেন! এটি কি তামাশা না ছেলেখেলা?

    Bantonglaoatang

    অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতের বিতর্কও আছে গভীরেঃ
    তবে মনে হচ্ছে, ইউরোপের সবাই এখনো বোকা ধামাধরা নেতাদের দেশ হয়ে যায়নি। তাই খোদ সিএনএন খবর দিচ্ছে কানাডা বাদে ইতোমধ্যেই জি-৭ এর বাকি নেতাদের মধ্যে বাইডেনের চীনের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি ও আপত্তি দেখা দিয়েছে। গরম তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি প্রকাশ করেছে ইতালি। এ নিয়ে চীনা ব্যাখ্যা হল, ইতালিই ইইউর প্রথম দেশ যে চীনের বেল্ট-রোডে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে।  উপরের কার্টুনটা আমি নিয়েছি চীনা গ্লোবাল টাইমস ম্যাগাজিনের এক আর্টিকেল থেকে। ঐ আর্টিকেলে কার্টুনের চরিত্রগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে ইটালিকে কুমড়া নাম দেয়া হয়েছে যার আবার “শার্প টাং” মানে কাউকে কিছু বলতে যার মুখে কিছু আটকায় না এমন নির্দয়ভাবে ক্রিটিক্যাল। সেই ইটালি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে,   The grey wolf image shows Italy, the first European country that joined China’s Belt and Road Initiative (BRI), is reluctant to collaborate with the US in suppressing China, commented “sharp-tongued pumpkin.” 

    তবে সামগ্রিকভাবে বললে, চীনের বিরুদ্ধে কামান দাগানো যৌথ বিবৃতি ধরনের কাগজে চীনকে কী ভাষায় কতটা অভিযুক্ত করছে মূলত এই প্রশ্নেই ভিন্নতাগুলো দেখা দিয়েছে। স্বভাবতই সবচেয়ে শক্ত ভাষায় বাইডেন ওই সব ড্রাফট দেখতে চাচ্ছেন। কিন্তু কেউই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় ততটুকুতেই থাকতে চায়। যেমন জাপান টাইমস, যৌথ বিবৃতি ড্রাফট করতে গিয়ে বড় মতভেদের কথা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার প্রসঙ্গে চীনকে কতটা সমালোচনা করা হবে সে বিষয়ে [G7 …….to counter Chinese influence in the world may prove a daunting challenge… ]।

    এ দিকে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, [G-7 Split on Biden’s Anti-China Push]। ইতালি জার্মানি আর ইইউ প্রতিনিধিকে দেখা গেছে, চীনের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে এরা অনিচ্ছুক; বরং সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে থাকতে আগ্রহী। আবার এসব প্রশ্নে কানাডা, ফ্রান্স, ব্রিটেন আর আমেরিকা নিজে এভাবে এরা চারজন আবার চার মাত্রায় চীনের বিরোধিতা করতে চায়। আর জাপান যে কোন দিকে অবস্থান নেবে, তা সে সবচেয়ে অনিশ্চিত।

    “There were some interesting discussions and a little bit of a differentiation of opinion,” said a senior Biden administration official……Italy, Germany, and the European Union appear reluctant to take as tough a stance on China, and instead would rather focus on the “cooperative nature of the relationship.” …… The U.S., Britain, Canada, and France, on the other hand, want to be more “action-oriented” to different degrees. Japan appears to be the most ambivalent of the group.

    সিএনএন লিখছে, এক আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট তাদেরকে জানিয়েছেন, বিশেষ করে ইতালি ও জার্মানি খুবই অস্বস্তিতে ছিল বিবৃতির ভাষা নিয়ে [….US officials said Italy and Germany were uneasy with potential communique language that China might view as provocative. ]। যেন চীন এটিকে কোনোভাবেই উসকানিমূলক হিসেবে না দেখে। চ্যান্সেলর মার্কেল তো বলেই বসেছিলেন যে, চীন আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী বটে কিন্তু আবার অনেক ইস্যুতে আমাদের পার্টনারও তো বটে [Angela Merkel said that “China is our rival in many questions but also our partner in many aspects.” ]। ফরাসি নেতা ম্যাক্রোঁও যোগ করেছেন, জি-৭ কে তো ওই চীনের সাথেই আবার জলবায়ু, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও অন্য অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত থাকলেও একসাথে কাজ করতে হবে। তাই তিনি পরিষ্কার করে রাখার পক্ষে যে, তাদের জি-৭ কখনো চীনবিরোধী কোনো ক্লাব হতে পারে না. “I will be very clear: The G7 is not a club hostile to China,” the French President said।

    সারকথায়, ভেতরে বড় মাত্রায় বাইডেন বিরোধিতা বজায় আছে। তবে সবচেয়ে মজার অবস্থানে ভারত। ভারতের মিডিয়াই ভেতরের বিরোধের খবরগুলো বড় করে সামনে এনেছে। যেমন হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, জি৭ লিডারেরা কত শক্ত করে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এনিয়েই তাদের মধ্যে বড় তর্কবিতর্কটা শুরু হয়েছিল। [The leaders of Group of Seven (G7) debated how strongly they should respond to China’s growing clout around the world and alleged forced labour practices in the Xinjiang region.] আর উইঘুর ইস্যুতে আরো মারাত্মক কথা বলেছে ঐ একই রিপোর্টে, ……there was no immediate consensus on how forcefully they should call out Beijing over the alleged human rights abuses। অর্থাৎ কত জোর দিয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগ তুলবে তা নিয়ে এখনি নেতসাদের মধ্যে ঐক্যমত নাই। কিন্তু কেন এমন লিখল, কারণ, ভারতই চায় না এটা। কারণ সেক্ষেত্রে এখানে কাশ্মীরের প্রসঙ্গ না চলে আসে। এছাড়া চীনের নেজেরই লিক হয়ে যাওয়া রিপোর্ট রেফার করে হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে ঐ চীনা রিপোর্টে “struggle against terrorism, infiltration and separatism.” চীন লিখেছে তারা (উইঘুরের) সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হচ্ছে। মনে হচ্ছে একথাগুলো ভারতের মনে দাগ ফেলেছে।

    এছাড়া আরেক নিরপেক্ষ মিডিয়া ওয়াইর [WIRE]  লিখেছে,  ন্যাটো মিটিংয়ে একসময় এমন উত্তপ্ত ভাষায় বাইডেনের সাথে ইউরোপীয়দের বিতর্ক শুরু হয়েছিল যে কমিউনিকেশন সুইচ অব করে রাখতে হয়েছিল, যাতে বাইরে মিডিয়ার কাছে তা না পৌঁছায়। আবার আরেক ভারতীয় মিডিয়া খবর দিয়েছে, মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিবৃতিতে কিছু অবস্থান প্রসঙ্গে খোদ ভারতেরই অস্বস্তি দেখা দিতেছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির প্রশ্ন ছিল, উইঘুর বা ফোর্সড লেবার ইস্যুতে কতটা চাপ দিয়ে তা বলা হবে, এ নিয়ে বিতর্ক।

     বাংলাদেশের প্রসঙ্গঃ
    এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশেরও বলার আছে। প্রথমত, বাইডেন আমাদেরকে যে পটেনশিয়াল বিপদের মধ্যে হাজির করে ফেলেছেন তা হল, সত্যিই যদি তিনি চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধকে যুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দেন বা টেনে নিয়ে যান, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি হয়ে উঠতে পারে তাদের দুই দেশের যুদ্ধের রণভুমি। এছাড়া অনেকের মনে আশা যে বাংলাদেশে কেমন ধরনের সরকার থাকবে বা কে থাকবে- এ প্রশ্নে বাইডেন তাদেরকে সাহায্য করবে বা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে। যেমন করেছিল ১/১১ এর সময়ে। কিন্তু সে আশায় কী আমরা বাংলাদেশকে চীন-আমেরিকার রণক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চাইতে পারি? এমন আশার কোন মানে হয় না। এরা বাংলাদেশের হত্যাকারী।  ঠিক যেমন ১/১১ পরিণতি হয়েছিল আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  যার ফলে আজ প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেল আমরা ভোগ করছি কিন্তু বের হতে পারি নাই।  আমরা আমেরিকার স্বার্থের ওই যুদ্ধের বলি হতে পারি না। যেমন ভাবে বার্মা নিয়েও তাদের স্বার্থের লড়াইয়ের কোনো অংশ হয়ে যেতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের দেশেও নানা পক্ষ আছে স্বাভাবিক। তাদের সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে আমরা যাই করি আমরা কারো হাতিয়ারে যেন পরিণত না হই। একবার হওয়াতেই আমাদের শিক্ষা হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।  বিশেষত বাংলাদেশকেই না তাদের বার্মা-বিবাদের রণক্ষেত্রে বানিয়ে ফেলি সেটা আমাদের খেয়াল রাখতেই হবে।

    আর উইঘুর বা মানবাধিকার প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবে আমাদের অবস্থানটা হবে সবাইকেই হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স অবস্থানে যেতে হবে। আমরা কি উইঘুরে সত্যি মানবাধিকারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই? নাকি এ নিয়ে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ নিতে চাই, যাতে সেটি আমেরিকার বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়? এ দুয়ের মধ্যে ঠিক কোনটা চায় তা আমেরিকাকে স্পষ্ট করতে হবে।

    কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটঃ
    এবার দাবি করা হচ্ছে, এবারের জি-৭ মিটিং নাকি কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটের লড়াই। আচ্ছা এই জি-৭ এটি কী এককালে জি-৮ করে নেয়া হয়নি? রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে। পরে যদিও ইউক্রেন-ক্রিমিয়া প্রশ্নে এক বিবাদে ২০০৭ সালে আবার রাশিয়াকে বের করে দেয়া হয়েছিল এবং সেই থেকে রাশিয়ার ওপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হয়ে আছে আজও। তা হলে সেসব সময় রাশিয়া যখন ভেতরে ছিল, তখন সবাই জি-৮ এর সবাই ডেমোক্র্যাসির লোক হয়ে গেছিল?  তার মানে রাশিয়া ভিতরে থাকলে জি হল ডেমোক্রেসির উদাহরণ আর তারা বের করে দিলে  রাশিয়াই হয় অটোক্রাসি! হায়রে ডেমোক্র্যাসি!

    আবার  প্রনবল আমানবিকভাবে ইয়েমেন তছনছ করতে সৌদিদেরকে   আমেরিকান সমর্থন এটিও কি ডেমোক্র্যাসির তাণ্ডব অথবা ওদিকে দেখেন, দুই দিন পরে পরে নিয়মিত গাজায় ইসরাইলি হামলা এটাই বা কোন ডেমোক্র্যাসি? আমেরিকার এসব “ডেমোক্র্যাসি-বিক্রির” বক্তব্য আসলে  আমাদে্র  জন্য এক চরম বিরক্তিকর জায়গায় পৌঁছেছে।

    তবে চীনের প্রসঙ্গেও অন্তত দুটো কথা বলার আছে। বিশেষ করে বাইডেনের সমালোচনা করছি বলে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইট ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ও পরে ১৯৪৮ সালের সম্মেলনে উঠলেও এর অগ্রগতি খুবই হতাশজনক। অথচ এরই মধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্বে বদলের সময়কাল আসন্ন। এত দিন কমিউনিস্টদের রাজনীতি ও তাদের দেশ যেভাবেই চলুক, এখনকার প্রশ্ন আলাদা।

    অন্তত গ্লোবাল নেতা হওয়ার স্বার্থে  মানবাধিকার  রক্ষা প্রসঙ্গে চীনের ন্যূনতম একটি অবস্থান গ্রহণ পূর্বশর্ত। নইলে প্রতি পদে এই ইস্যুতে সঙ্ঘাতে গ্লোবাল সব কাজ বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। চীনকেই অযথা বিব্রত হতে হবে প্রায়ই।  চীন নিশ্চিত থাকতে পারে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে ন্যূনতম একটি অবস্থান ছাড়া চীনের নেতা থাকা খুবই কঠিন হবে। ফেলও করতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যুদ্ধের খরচ জরুরি, হিউম্যান রাইটও“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা কেন করতে হবেই

    ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা কেন করতে হবেই

    গৌতম দাস

    ৩১ মে ২০২১, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3zf

     

    Pro-Palestinian protesters seen on O’Connell Street, Dublin, 

    কেন আমরা ইসরাইলের বিরোধিতা করি এবং করে যাবো? বাংলাদেশে আমাদের প্রায় নব্বই ভাগ জনগোষ্ঠি মুসলমান আর ফিলিস্তিনিরাও মুসলমান। তাই আমাদের মুসলমান নাগরিকেরা ধর্মীয় দায়িত্ব অনুভব করে যে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর।  আর তাই ফিলিস্তিনিদেরই ঘাড়ের ওপর বসে তাদেরকে বঞ্চিত করে কেবল ইহুদিদের জন্য বানানো জুলুমবাজ ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা – এই হল আমাদের সাধারণ মানুষের ধর্মতাত্ত্বিক বোধ ও কর্তব্য। ফিলিস্তিনিদের লড়াই সংগ্রাম সমর্থন করে যাওয়া আমাদের কাজ। এটা ধর্মতাত্বিক দিক থেকে খুবই শক্ত এক পদক্ষেপ ও শক্ত আর্গুমেন্টও এবং সবার উপরে এটা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এক ব্যাপক জনসমর্থন জোগানোর দিক থেকে খুবই কার্যকর উপায়!

    কিন্তু তবু অন্যান্য দিকেরও তৎপরতা এবং পালটা শক্ত বয়ান ও পয়েন্ট আমাদের দরকার আছে। কারণ এটা কলোনি যুগ পেরিয়ে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের যুগ এবং গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলতে যা আমরা সামনে দেখি তা এক অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাই – এমন এক গ্লোবাল সময়ে আমরা বসবাস করছি। এর কেন্দ্রে আছে কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রগুলোর এক প্রভাবশালী অ্যাসোসিয়েশন, নাম তার ‘জাতিসঙ্ঘ’। জাতিসঙ্ঘের অনেক দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অকর্মণ্যতা এবং সর্বোপরি, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার সমস্যা সবই আছে, কথা সত্য। কিন্তু এসব সত্ত্বেও জাতিসঙ্ঘই কমান্ড করে বলে দিতে পারে, কাউকে কলোনি দখল করে শাসন করা অবৈধ। সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাককে বুশের দখল করে নেয়া তাই জাতিসঙ্ঘের চোখে ‘অবৈধ দখল’ ছিল এবং কফি আনান তা পাবলিকলি ঘোষণা করে বলে দিয়েছিলেন।
    আবার, ১৯৪৭ সালে কাশ্মিরের রাজাও কাশ্মির ভারতের সঙ্গে যুক্ত ও বিলীন হতে চায় বলে কাগজে সই করেছিলেন। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ তা মানে নাই, অবৈধ মনে করেছিল। কারণ জাতিসংঘের জন্ম ম্যান্ডেট মনে করে, কাশ্মিরের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র বৈধ অধিকারী কাশ্মির-ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ, ফলে গণভোট করে তাদের রায় জেনে নিয়ে তা অনুসরণ করতে হবে। অতএব, আধুনিক রাষ্ট্র ও এর কাঠামোগুলোর গুরুত্বও বুঝতে হবে।
    আবার ধরা যাক হয়ত, আপনার মাথায় রাষ্ট্র বিষয়ে অনেক ভারী তত্ত্বকথা আছে বলে আপনি মনে করেন। কিন্তু দয়া করা উপস্থিত আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাটার কোনো অর্জন নেই, কিছু হয় নাই, কিচ্ছু না, বলে এর বিরুদ্ধে কামান দাগার কাজ হাতে নেবেন না। এটা অপ্রয়োজনীয়। আপনি নতুন যা করতে চান, যে নতুন ক্ষমতা কায়েম করতে চান তা করুন- সেজন্য এখন তা নিয়ে প্রচার, বুঝানো, হেদায়েত সব করতে থাকুন আর সে কাজে জাতিসঙ্ঘসহ এই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাটা আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব ব্যবহার করেই তা করতে থাকুন। পরে নিজে ক্ষমতাবান হয়ে গেলে পুরান সবকিছু বদলে ফেলতে এরা কেউ বাধা হবে না। সোজা কথা বর্তমানের অর্জনকে ফেলে দিয়ে পায়ে মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে চাইবেন না। বরং বলতে পারেন, এটা যথেষ্ট অর্জন হয়নি। আরোঅনেক কিছু করতে হবে। কিন্তু দয়া করে এটা বলবেন না যে, এটা কোনই অর্জন নয়।

    এখন আসুন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মোতাবেকই ইসরাইল রাষ্ট্র কেন ভেঙে দেয়া উচিত – সেসব বুঝে নেয়ার চেষ্টা করি। মনে রাখতে হবে, ইসরাইল টিকে আছে (যেভাবেই হোক) মূলত নিজের পক্ষে এক গ্লোবাল সমর্থন জোগাড় করতে সক্ষম হয়ে আছে বলে। কাজেই আমাদেরও ঐ গ্লোবাল সমর্থন ভাঙতে হবে, আর পালটা সমর্থন যোগাড় করতে হবে। কখন ও কিভাবে? আমেরিকার নেতৃত্বের এই গ্লোবাল সমর্থকদের দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করতে হবে যখন এরা নিজেই দুর্বল থাকবে। আর সেক্ষেত্রে ঠিক তার দুর্বলতার জায়গাটা হল – আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখেই ইসরাইল অন্যায্য রাষ্ট্র – এই কথা সর্বত্র তুলে ধরতে হবে এবং এমন এক সময়ে যখন আমেরিকা নিজেই তার গ্লোবাল নেতৃত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে হিমশিম বেকায়দায়। ফলে গ্লোবাল নতুন মেরুকরণ দুনিয়াজুড়ে আসন্ন হয়ে উঠছে যখন তখনই সে কাজের সবচেয়ে ভালো সময়।

    আধুনিক রাষ্ট্রের কী কী বৈশিষ্ট্য ইসরাইল লঙ্ঘন করেঃ
    আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে বলতে এক রিপাবলিকই বুঝায় আর তাকে  রিপাবলিকই হতে হয়। রিপাবলিক মানে যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ। অর্থাৎ এর পাল্টা হল রাজা-সম্রাটের দেশ মানে কোনো রাজতান্ত্রিক শাসন তা নয়। তাহলে জাতিসঙ্ঘ রাজতান্ত্রিক দেশকে কি সদস্যপদ দেয় না? দেয়, অবশ্যই দেয়। কিন্তু যখনই কোনো রাজার দেশের রাজক্ষমতা কখনো ওর নিজ জনগণের চোখে টালমাটাল বা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায় তখনই কেবল জাতিসঙ্ঘ ওকে টেকনিক্যাল সহায়তা করে যাতে সে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র হয়ে উঠে এমন সাহায্য করে। তবে সাবধান, যত দিন তা বাদশাহর দেশ থাকে তত দিন আবার তাকে বদলাবার কাজ জাতিসঙ্ঘের নয়। সেকাজ ওর আভ্যন্তরীণ জনগণের।  তাই রিপাবলিক রাষ্ট্র না হয়েও কোনো রাজশাসন জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ পেতে পারে। তবে রাজশাসনকেও রিপাবলিক সদস্য রাষ্ট্রের জন্য জাতিসঙ্ঘের সব আইন, নিয়ম ও কনভেনশন এবং মানবাধিকারসহ যা কিছু আছে সেগুলো মেনে চলতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। এই কারণেই দুবাইয়ের প্রিন্সেস লতিফাকে নিয়ে জাতিসঙ্ঘ তাঁর “অধিকার লঙ্ঘনের” জন্য বাদশা-আমীরদের সমালোচনা করছে ও উদ্বেগ জানাতে পারছে।

    অন্য দিকে আবার ঠিক বাদশাহদের মতই কমিউনিস্টরাও মনে করেন, অভ্যন্তরীণভাবে নিজ দেশে ‘হিউম্যান রাইট’ বজায় রাখা তাদের রাজনীতি নয়, এজেন্ডা বা পালনীয় নয়। তবে এমন রাষ্ট্রগুলোর কৌশল হয় (এটা অবশ্য স্বৈরাচারীদেরও কৌশল) সে কথা পাবলিকলি স্বীকার করে না-বলা।  আর  তবুও অমন পরিস্থিতিগুলোতে সরাসরি জাতিসঙ্ঘের ‘হিউম্যান রাইট’ মানি না তা অবশ্যই তারা কোথাও বলে না। বরং কৌশলগতভাবে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলে, যতদূর পারে।

     সেকালে  ইউরোপের ইহুদিরা কেন জায়নিস্ট রাষ্ট্রই চেয়েছিল?
    বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিদ্বেষ ও নৃশংসতার পর এর বিরুদ্ধে কেন মূলত জার্মান ইহুদিরা একটা “জায়নিস্ট” রাষ্ট্র গড়াকে তাদের জন্য রক্ষাকবজ বলে সাব্যস্ত করেছিল? মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণ ও ব্যবহার বড় অদ্ভুত। যেমন, বর্ণবাদিতার চরম অত্যাচার যে সয়েছে তাকে-ই আবার আমরা পাল্টা প্রতিহিংসায় সেই একই বর্ণবাদী হয়ে উঠতে দেখি! এখানে তাদের কাম্য ‘জায়নিস্ট রাষ্ট্র’ মানে কী তা গুরুত্ব দিয়ে আমাদের বুঝতে হবে। এর মানে হল, এটা ‘কেবল ইহুদিদের’ রক্ষার জন্যই একটা রাষ্ট্র হতে হবে। এই ছিল সেকালে তাদের প্রবল বিশ্বাস ও অনুমান। তাদের সেই অনুমানের ভিত্তি থাকুক আর না।

    ফলে স্বভাবতই কেবল ইহুদিদেরই সব ধরনের বাড়তি বা বিশেষ সুবিধা দেয়ার রাষ্ট্র এটাকে হতেই হবে। এই ছিল তাদের দাবি।   এর পক্ষে সাফাই হল, যেহেতু ইহুদিরা এতবড় এক ভিক্টিম তাই  তাদেরকেই বিশেষ সুবিধা দিতেই হবে। আর এখান থেকেই এক মিথ্যা দাবি তারা করে যে, এই জায়নিস্ট রাষ্ট্র এসব সুবিধাদির না পেয়ে থাকলে ইহুদিরা দুনিয়াতে আর কোথাও সুরক্ষিত হবে না, শান্তি পাবে না। অথচ এই দাবি শুধু ভিত্তিহীনই না এটা সম্পুর্ণ অর্থহীন।

    প্রথমত, এটা আসলে একটা মানসিক ট্রমা [trauma] বা আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের বক্তব্য। যখন অসুস্থ মানুষটা এমন স্তরে  থাকে তখনকার বক্তব্য। এটা এক ধরনের ট্রমা যা মানুষকে সবসময় নিরাপত্তার অভাববোধে পাগল করে তোলে। আর প্রথমে যা ছিল তাদের নিরাপত্তার অভাববোধে জন্ম নেয়া ট্রমা, পরে সময়ে এর কিছু থিতু হলে সম্ভবত এটাই রূপান্তরিত হয়ে যায় প্রতিহিংসা-স্পৃহায়। সেসময়ের এমন হিটলারি নৃশংসতার পরে সব মানুষের মনেই কমবেশি প্রতিহিংসা-স্পৃহা জেগে ওঠা হয়ত অস্বাভাবিক নয় যদিনা কেউ পরে  কোন সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট বা এক্সসারসাইজের ভেতর  দিয়ে না গিয়ে থাকে; বা আগাম ব্যবস্থা না নেয় এই বলে ও মেনে যে, সে-ই আবার ফিরে কোনো প্রতিহিংসা করতে পারে না, কারণ এটা তাকেও  আরো অসুস্থ বানিয়ে ছাড়বে।

    জায়নিস্ট এক রাষ্ট্রের কল্পনা ও দাবি তাই আসলে অনিরাপত্তা-বোধজনিত ট্রমা থেকে। কারণ কোনো আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কল্পনা ও করণীয় মানেই এর প্রধান কাজ হল, ওদেশের সব নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়া। কাজেই ঐ রাষ্ট্রে আলাদা করে জায়নিস্টদের  বিশেষ সুবিধা দেয়া ধরণের  রাষ্ট্রের স্বপ্ন-কামনা, এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু জায়নিজম বলতে চাচ্ছে সে এতে সন্তুষ্ট নয়; কারণ সে ট্রমাগ্রস্ত; তাই কেবল এই ট্রমাগ্রস্ত ইহুদিদের জন্য আলাদা করে নিরাপত্তাবোধ দেয়ার রাষ্ট্র, এক জায়নিস্ট রাষ্ট্রই, একমাত্র এতেই তাদের আস্থা। তাই এটাই গড়তে হবে।

    তাহলে তাদেরকে বিশেষ সুবিধার একটা রাষ্ট্র গড়তে দিলে অসুবিধা কী?
    অসুবিধা এক. তাদের ট্রমাগ্রস্ততা কাটানোর জন্য সর্বোত্তম উপায় কি একটা সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের দুনিয়া সেরা কোন হাসপাতালে তাদেরকে নেয়া? নাকি, একটা ইহুদিবাদী কথিত বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্র  গড়তে দেয়া? আশা করি পাঠকেরা বুঝেছেন, এখানে ট্রমাগ্রস্ততার চিকিৎসা একটা ভাল হাসপাতালই দরকার। কোনো জায়নিস্ট রাষ্ট্র নয়। কারণ সমস্যাটা  মানসিক অসুস্থতা, তাই প্রয়োজন ওর জন্য ট্রিটমেন্ট।

    অসুবিধা দুই. জায়নিস্টদেরকে দেয়া বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্রনির্মাণের কল্পনা আসলে নিজেই  আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার  বিরুদ্ধ চিন্তা! এটা মৌলিকভাবে বিরোধী। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক অবস্থান বা শর্ত হল, তাকে নাগরিকদের মধ্যে “রাজনৈতিক সাম্য” নিশ্চিত করতেই হয়। রাজনৈতিক অধিকারে সাম্য, যা কোনরকম বৈষম্যহীন এক সাম্য। এখানে কাউকে বিশেষসুবিধা দেয়ার কথাটা আনা মাত্রই তা আর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার থাকে না; মৌলিকভাবে বিরোধী হয়ে যায়। বরং আপনি নিজের গড়া যেকোন রাষ্ট্রে নিশ্চিত নিরাপত্তা অবশ্যই পেতে পারেন, যদি আপনার রাষ্ট্র ব্যতিক্রমহীনভাবে সবারই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আর এতাই রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ। কিন্তু আপনি চাচ্ছেন যে – না, আমাকে বিশেষ নিরাপত্তা দিতে হবে কারণ আমি ভিক্টিম। এই হল জায়নবাদিতা – এই অসুস্থ চিন্তার সমস্যার শুরু। আর এর ভিক্টিমহুড তৎপরতা মানে আমি এখন ভিক্টিম বলে ভিক্টিমের প্রতি সমাজের যে সহানুভূতি তৈরি হয় সেইটা বেচে ভিক্টিম এখন খেতে চায়! এটাকেই বলে ‘ভিক্টিমহুড’। অর্থাৎ, বাড়তি সুবিধা নিতে চায়। অন্যকে মারবে-ধরবে এমন যা খুশি করবে এটা চায়…।

    অতএব এখান থেকেই আসছে ইহুদিদের জন্য বিশেষ বাড়তি সুবিধা পাবার ইহুদিবাদী রাষ্ট্র, অথবা হিন্দুত্বের জন্য বিশেষ সুবিধার হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র অথবা এ রকম যেকোনো ধর্মের তা হতে পারে।  আবার ধর্ম ছাড়াও তা হতে পারে। যেমন- বাঙালি জাতিবাদীদের জন্য বিশেষ সুবিধার বাঙালিবাদী রাষ্ট্র। এরা হয়ত দাবি করবে যে সে নিজের জন্য নিরঙ্কুশ এক ক্ষমতা চায়, কম করে দুই যুগ বা বিয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায়।

    অসুবিধা তিন. জায়নবাদী চিন্তার আরেক বৈশিষ্ট্য হল, সে সর্বজনীনতাকে ভয় পায়, কারণ ভিক্টিমহুডের অজুহাতে ‘বিশেষ’ সুবিধা চায়।  আর বিশেষ বাড়তি সুবিধার উল্টাটা হল সার্বজনীনতা।  কাজেই আপাতত যে ইসরাইলের রাষ্ট্রসীমা আর ওর ভেতরেই যে অরিজিনাল আরব মুসলমানেরা বাস করছে যাদের বের করে দেয়া যায় নাই, তবে তাঁদের জমিসম্পত্তি দখল করে সরকারি পয়সায় সেখানে হাইরাইজ বানিয়ে এরপর তা নিজেরা ভাগ করে খেতে চাওয়ার “ভিক্টিমহুড” বা বাড়তি সুবিধা এটা। কাজেই সর্বজনীন আইন থাকলে তো ঐ আরব মুসলমানেরা ইসরায়েলের ভিতরে বসবাস করলেও জমি হারাবে না। কাজেই ভিক্টিমহুডের আওয়াজে ‘বাড়তি সুবিধা’ নেয়া মানেই হল, অন্যেরটা কেড়েও নেয়া এবং তাদেরকে এক বিচারহীনতায় দিন যাপনে ঠেলে দেওয়া। এ ছাড়া আরো আছে, একইভাবে ইসরাইলের রাষ্ট্রসীমার বাইরেও যেসব ফিলিস্তিনি ভূমি আছে সেগুলোও একইভাবে দখল করা এবং তা একেবারে গায়ের জোরে। এরও সাফাই সেই একই ভিক্টিমহুড, জায়নিস্ট রাষ্ট্রের বাড়তি সুযোগ…।

    আর এটাকেই বলে ‘কলোনি দখল’। সোজা ভাষায় ইসরাইলই একালে মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়াতে যে যাত্রা শুধু করেছিল কলোনি দখল অবৈধ এই আন্তর্জাতিক আইন রীতির ভিত্তিতে – সেই দুনিয়াটাতেই আবার  কলোনি দখলের ব্যবসা, করে খাওয়ার বুদ্ধি আবার শুরু করে দিয়েছে এই জায়নিজম। কেন এভাবে বললাম?

    কারণ আজও বেশির ভাগ মানুষ এমনকি একাদেমিক মানুষও – জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি ও এর ইতিহাস একেবারেই জানে না। ন্যূনতমটাও জানে না। এর জন্য প্রধানত দায়ী তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল যিনি আমাদের ‘কলোনি মালিক’ ছিলেন। তিনি চান নাই যে আমেরিকার কাছে তাঁর নাকেখত দেবার ইতিহাস ও এই  দুর্বলতার কথা জনে জনে জানুক। আর দ্বিতীয়ত দায়ী নেহরুর মত রাজনীতিবিদেরা যারা নিজেরাই এসব ইতিহাস জানেন না, যার অজস্র প্রমাণ দেয়া যায়। যেমন সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, কাশ্মীর ইস্যুটাকে  জাতিসংঘের নজরে নিয়ে গেছিলেন তিনিই। ভেবেছিলেন রাজা হরি সিং এর ভারতের সাথে যুক্ত ও বিলীন হবার  চিঠি (একসেশন ইন্সট্রুমেন্ট বা মনবাসনা) তার কাছে আছে অতএব জাতিসংঘ নিশ্চয় তার পক্ষে রায় দিবে! এর মানেই হল  জাতিসংঘের জন্মভিত্তি-মূলক বক্তব্য ও অবস্থান নেহেরুও জানেন না, কখনও খবর নেন নাই।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেলট ১৯৪১ সালের আগস্ট পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই সমর্থন না করে যুদ্ধের বাইরে নিজ যুক্তরাষ্ট্রকে রেখেছিলেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন সারা দুনিয়াকে কলোনি করে রাখা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে এই যুদ্ধ শেষে কলোনি দখল যুগের অবসান ঘটাতেই হবে। তারা ঘটাবেন –  এই প্রতিশ্রুতি দিলেই কেবল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসাবে তিনি তাদের পক্ষে হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবেন।

    এই শর্তে প্রথম যিনি এগিয়ে আসেন তিনি হলেন তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল; কারণ নইলে হিটলারের কাছে হেরে ও পাল্টা দখল হয়ে যেত তার দেশ-ভূমি। তাই ১৪ আগস্ট ১৯৪১ সালে চার্চিল ও রুজভেল্ট আট দফার এক চুক্তি [Atlantic charter] স্বাক্ষর করেছিলেন ; যার প্রথম দফাটাই হল – তারা দুই রাষ্ট্র প্রতিজ্ঞা করছে যে তারা নিজ নিজ মূল ভূখণ্ডের বাইরে কোনো ভূমি দখলে আর যাবে না। এটাই পরে হয়ে যায় কলোনিয়াল-দখল অবৈধ একথার ভিত্তি। কারণ এই চুক্তিটাই পরে আরো দুই রাষ্ট্র স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চিয়াং কাইশেকের চীন (মাওয়ের চীনের আগের রূপ) – এভাবে চার রাষ্ট্র মিলে আবার একসাথে স্বাক্ষরিত হয় ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। আর এটাকেই বলা হয় জাতিসঙ্ঘের ‘জন্ম ঘোষণা’ বা ভিত্তি। একই দিনে আরো প্রায় ২৬টা দেশও এতে স্বাক্ষর করেছিল। আর ওই দিনই আমেরিকা হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল এবং হিটলারের জোটসঙ্গী জাপানে আক্রমণ চালিয়েছিল। সেই থেকে এজন্য কলোনি দখল নিষিদ্ধ আর এটাই জাতিসঙ্ঘের প্রতীক। কাজেই জাতিসঙ্ঘের সদস্য থাকতে চাইলে ইসরাইল জায়নিস্ট হতে পারবে না। কারণ জায়নিজম মানেই হল বাড়তি সুবিধা, গায়ের জোরে অন্যের ঘরবাড়ি দখল আর এসবই এক ভিক্টিমহুডের সহানুভুতি উসিলা ও আড়ালে। এককথায় ইসরাইল নতুন করে কলোনি দখল শুরু করেছে।  অবশ্য এসব ছাড়াও অন্যের ভূমি দখলের কারণে ইতোমধ্যেই ইসরাইলের বিরুদ্ধেই নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া রেজুলেশন আছে।

    অসুবিধা চার. লক্ষ করলে দেখা যাবে যারাই জায়নিস্ট বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র কায়েম করেছে বা করতে চায় তারা নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণার অনুসারী। জাতিরাষ্ট্র হল প্রথম যুগের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা এ বিষয়ের মুখ্যচিন্তা। যেমন – আগের রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক গড়তে চাওয়া ইউরোপীয় চিন্তা বাস্তবায়নের শুরু বলা যায় ১৬৪৯ সালের ইংলিশ (ক্রমওয়েলের) রেভিলিউশনকে। এই নতুন রিপাবলিক ধারাই নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে থিতু হয়েছিল আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইউরোপ হিসাবে আর পরে তা চলেছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। সে সময়ের (১৬০৭-১৯৪৫) ইউরোপীয় বিপ্লবে স্থাপিত নতুন রাষ্ট্রগুলোই রিপাবলিক বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার শুরু বলা যায়। অর্থাৎ রাজা নয়, জনপ্রতিনিধিরাই ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন এমন রিপাবলিক সেগুলো।

    তবু এরা সবগুলোই ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ (নেশন-স্টেট বা Nation State) ধরনের রিপাবলিক। মানে আমরা প্রত্যেকে নাগরিক কি না, রাষ্ট্রে আমাদের রাজনৈতিক সাম্য থাকবে কি না, বৈষম্যহীন অধিকার থাকবে কি না- এসব সেখানে উহ্য থাকে এমন রাষ্ট্র। এর বদলে আমরা একটা ‘জাতি’ এই উদগ্র ধারণার প্রাবল্য যেখানে প্রচণ্ড। এই ধারণারই সবচেয়ে বিকশিত ফসল হলো হিটলারের নাৎসিবাদ। এককথায় বললে এই রূপটা ছিল কলোনিদখলের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ রাষ্ট্র-রূপ। মূল কারণ, কম্পাস আর বারুদ আবিস্কারের পরের ইউরোপের প্রধান ব্যবসা ছিল বড় জাহাজ কিনে যুদ্ধ সাজিয়ে কলোনিদখলে বেরিয়ে পড়া।  তেমনই (১৬০০ সালের) এক বড় কোম্পানির নাম হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যা ভারতে এসেছিল। ইংল্যান্ডে এরই রাজনৈতিক রূপ হল নেশন স্টেট।

    আর আধুনিক রাষ্ট্রের জাতিরাষ্ট্ররূপে এই আদি ধারায় তিনশ’ বছর পরে তা থেকে হিটলারের উত্থান দেখে এর সব  দায়দায়িত্ব ত্যাগ করে বাকিরা নিজ নিজ রাষ্ট্র আমূলে বদলে নেয়। সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সালে ৪৭ রাষ্ট্রের এক সম্মেলনের (Council of Europe) মাধ্যমে সবার নিজ রাষ্ট্রভিত্তি বদল করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নেয়া হয়। সেই থেকে ইউরোপে ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা পরিত্যাজ্য ও ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এদিকে নেহরুর ভারতসহ বাংলাদেশ এখনো জাতিরাষ্ট্র। এই ধারাতেই জায়নবাদী ইসরাইলও এক জাতিরাষ্ট্র। মূল কারণ উগ্র জাতিবাদী চিন্তা ভালো খোলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ এর মধ্যে। আমরা এক ওমুক গর্বের ধর্মীয় বা ভাষার বা জাত-এথিনিসিটির “জাতি” বলে গালগল্প, মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ববোধের সুপ্রীমিস্ট আবেগী সুড়সুড়ি তুলতে পারা যায় সহজেই।  অথচ আমাদের সবার জন্যই এটা ত্যাগ করার সময় পেরিয়ে গেছে সেই পঞ্চাশের দশকেই।

    ইদানিংকালের কিছু মারাত্মক লক্ষণঃ
    ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের সময়ে যারা কিশোর বা টিনএজে ছিল তাদেরই সন্তান পেরিয়ে টিনএজ নাতিদের কাল এটা।  ফলে এমনিতেই কেন ইসরায়েল রাষ্ট্র অগ্রহণযোগ্য তা যথেষ্ট স্পষ্ট ছিলনা। ফলে এটা কমিউনিস্টদের সমর্থনের আরব জাতিয়তাবাদ ও হাল্কা ইসলামের কারণে আমরা বুঝতাম যে আমাদের ফিলিস্তিনিদের পক্ষে থাকতে হবে। রাষ্ট্র হিসাবে ইস্রায়েলের মারাত্মক ত্রুটি কী তা চর্চা হতে দেখা যায় নাই কোথাও। অতেব একালে টিনএজ নাতিদের কালে স্রেটা আরও কত দুরবস্তায় যাবে তা অনুমেয়। আমাদের পাসপোর্টে  ইসরায়েলে  যাওয়া যাবে কিনা সেটা ঢাকায় এখন বড় আলোচনার বিষয়। আর ততই ইসরায়েল যাওয়াটাই ঠিক হবে কিনা, ন্যায়-অন্যায়বোধে উচিত হবে কিনা – সেদিকটা ততই ম্লান হয়ে আছে দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে এক টকশোতে অংশগ্রহণকারি ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ অধ্যাপকের বক্তব্য ছিল খুবই বিপদজনক। তবে উপরে যা বলেছিল এর ভাল উদাহরণ। তিনি বলছিলেন ইসরায়েল দেশ ঘুরে ফিরে আমাদের দেখার জন্য আমাদের পাসপোর্ট উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। বলা বাহুল্য তা কেউ বিরোরোধিতা করেন নাই, তবে সামাজিক অস্বস্তির কথা খেয়াল রেখে কেউ প্রশংসায় করেন নাই।  আমরা বুঝলাম অধ্যাপক পদ বাগিয়ে ফেললেও জ্জানবুদ্ধি পাকে নাই।  কৌতুহলি টিনএজ পেরিয়ে আমাদেরকে ন্যায়-অন্যায়বোধের শিক্ষা নিতে হয় সেদিকে তিনি বড় হন নাই।

    কুখ্যাত আব্রাহাম একর্ড-এর চাতুরিঃ
    আমার গতবারের লেখায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প- প্রধানমন্ত্রী নেতানেয়াহুর কুখ্যাত আব্রাহাম একর্ড [Abraham Accords ] বা চুক্তির কথা বলেছিলাম। যেটা আসলে ফিলিস্তনিদের স্বার্থ উপেক্ষা করে আরব বাদশা দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের স্বীকৃতি ও সম্পর্ককে কথিত স্বাভাবিকীকরণ উদ্যোগ। তবে আরেকটু বেশি দিকটায় তাকালে দেখা যাবে এটা আসলে চীনের উত্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য বদলে যেমন ইরানের উত্থান ঘটার সম্ভাবনা সেই কারণে ট্রাম্প-নেতানেয়াহু এবং বাদশা এরা সকলেই ভীত। তাই এরই একজোটবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া এটা।
    কিন্তু আমাদের এখনকার প্রসঙ্গ এটা নিয়ে ঠিক আপত্তি তোলা নয়, অন্যকিছু। এমনকি এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে কী হবে তাও না। বরং খুবই সহজ। এখানে যে চুক্তিটা স্বাক্ষরিত হয়েছে কোন পয়েন্টে সেই চুক্তিটা কেন গ্রহণযোগ্য নয়, করা যাবে না – সেটা আপনাদেরকে দেখানো।  সেখান থেকেই জানা যাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও ইহুদীবাদ চিন্তার বিরুদ্ধে আমাদের মুল আপত্তিটা কী!

    The Abraham Accords Declaration:
    We, the undersigned, recognize the importance of maintaining and strengthening peace in the Middle East and around the world based on mutual understanding and coexistence, as well as respect for human dignity and freedom, including religious freedom.
    We encourage efforts to promote interfaith and intercultural dialogue to advance a culture of peace among the three Abrahamic religions and all humanity.
    We believe that the best way to address challenges is through cooperation and dialogue and that developing friendly relations among States advances the interests of lasting peace in the Middle East and around the world.
    We seek tolerance and respect for every person in order to make this world a place where all can enjoy a life of dignity and hope, no matter their race, faith or ethnicity.
    We support science, art, medicine, and commerce to inspire humankind, maximize human potential and bring nations closer together.
    We seek to end radicalization and conflict to provide all children a better future.
    We pursue a vision of peace, security, and prosperity in the Middle East and around the world.
    In this spirit, we warmly welcome and are encouraged by the progress already made in establishing diplomatic relations between Israel and its neighbors in the region under the principles of the Abraham Accords. We are encouraged by the ongoing efforts to consolidate and expand such friendly relations based on shared interests and a shared commitment to a better future.

    উপরের এই চুক্তিতে কেন আরব-ইসরায়েলি বন্ধুত্ব দরকার এর জন্য আবেগী প্রচুর শব্দ ও বাক্য এখানে আছে। এমন কী আব্রাহামিক সুত্রে আরব-ইসরায়ল কেন ভাই বা বন্ধু  সেকথা তুলে আবেগ তৈরি করতে সেটাকেই এই চুক্তির শিরোনাম বানায় ফেলা হয়েছে। একেবারে আবেগে কেন্দে ফেলার অবস্থা!  এই চুক্তি  মাত্র ২৪০ শব্দে তৈরি। আর চুক্তিতে এমন যেসব ভারী শব্দ আছে সেগুলোর নমুনা হল যেমন  ………for human dignity and freedom …… including religious freedom.  all humanity   cooperation and dialogue……… friendly relations   ………no matter their race, faith or ethnicity.  support science, art, medicine, and commerce to inspire humankind ………  a vision of peace, security, and prosperity ………এমনকি শেষে সশস্ত্রতার ও সংঘাত বিরোধিতার কথা আছে। অর্থাত …… to end radicalization and conflict – এমন সবকিছুর রেফারেন্স আছে।  বলা যায় দুনিয়ার সব ভাল কথার কিছু বাদ নাই।

    কিন্তু যা নাই তা হল রাজনৈতিক সাম্য, অধিকারের সাম্যতার কোন কথা নাই। কেন নাই?

    কারণ, এটা স্বীকার করে নিলে জায়নিজম আর থাকে না, ইহুদি-ফিলিস্তিনির মধ্যে রাজনৈতিক সাম্যে অধিকারে সমান হয়ে যায়। আর এমন সমান হয়ে গেলে আর ইহুদির জন্য বাড়তি সুবিধা, শ্রেষ্ঠত্ববাদ কিংবা পক্ষপাতিত্বের বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি সবই অচল হয়ে যায়। ভিক্টিমহুড বিক্রি করা খাওয়ার সুযোগ থাকে না।  অথচ এভাবেই রাজনৈতিক অসাম্য রেখেই  জায়নিজম টিকে থাকতে চায়। আর ভাব ধরে ইহুদিবাদীরা সকলের সাথের সম্পর্ক চায়, মিলেজুলে থাকতে চায়। যেন মনে হয় ফিলিস্তিনিরাই সব গল্ডগোলে উতস, অশান্তি করা মানুষ তারা, যারা কেবল  সশস্ত্রতা চায়। অতএব ফিলিস্তিনিরাই জঙ্গী ও টেরর………।

    সবশেষে তামাশার দিকটা হল, যে ইউরোপীয় ইহুদিরা হিটলারি নাৎসিবাদের শিকার হয়েছিল তারাই এরপরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সওয়ার হয়ে শুধু নয়, সেই হিটলারকেই কপি করে জায়নবাদিতা চর্চায় ইসরাইল রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে।
    আমরা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিচারেও ইসরাইলের বিরোধিতা করে যাবো কারণ, এই জায়নবাদী রাষ্ট্র আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ন্যূনতম শর্তও পূরণ করেনি। এই রাষ্ট্র নাগরিক বৈষম্যপূর্ণ, রাজনৈতিক অসাম্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা, পক্ষপাতমূলক বিচারব্যবস্থার, সর্বোপরি কলোনি দখল করা ফিরিয়ে আনতে চাওয়া রাষ্ট্র। কাজেই এখানে এসে জায়নিজম=ইসরায়েল এর বিরোধিতা স্রেফ কোনো মুসলিম ইস্যু বলে সীমাবদ্ধ তা আর নয়। এটা যারা দুনিয়ায় রাজনৈতিক সাম্যের প্রতিষ্ঠা দেখতে চান তাদের সবার ইস্যু!
    জায়নিজমের বৈষম্যের প্রতিকার হওয়ার আগে পর্যন্ত ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা তাই আমরা করি এবং করে যাবো!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৯ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “কেন ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ বাইডেনের গাজা কারেকশন

    বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ
    বাইডেনের গাজা কারেকশন ও প্রায়োরিটির প্রেক্ষিতে

    গৌতম দাস

    ২৬ মে ২০২১, ২১:৪৮  বুধবার

    https://wp.me/p1sCvy-3yF

    US President Joe Biden speaks with Representative Rashida Taib (D-Mich), and Representative Debbie Dingell (D-Mich)(R), as he arrives at Detroit, Metropolitan Wayne County Airport in Detroit, Michigan on May 18, 2021. (AFP)

    বাংলাদেশ কী ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে? এটা এখন বাংলাদেশে সর্বত্র আলোচনার বিষয়। আলোচনা যেভাবে হচ্ছে, তাকে খারাপ সংবাদই বলতে হয়। আর  বিষয়ের ঠিক এদিকটাই  আমল করতে সরকার মারাত্মক ভুল করছে।

    বাংলাদেশে এই ইস্যুতে প্রথম নিউজ করে ‘শেয়ার বিজ’ এই ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ পত্রিকা। এটি তাদের ক্রেডিট অবশ্যই। কিন্তু একইসাথে ডিসক্রেডিটও। কেন? কারণ এ ইস্যুটায় প্রধান খবর জড়িয়ে আছে মুখ্যত দুটি আলাদা বাক্য। এক, নতুন পাসপোর্টে “এক্সসেপ্ট ইসরাইল” শব্দ দুটা লেখা নাই। আর দ্বিতীয় বাক্যটা হল, নতুন ই-পাসপোর্টে লেখা রয়েছে “দিস ই-পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড”।  মানে যার বাংলা করলে হয় – এই ই-পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ”।
    এখন এনিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা যেটা তারা সাথে ছেপেছে সেখানে আছে, “… তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আমরা পাসপোর্টে এক্সসেপ্ট ইসরাইল শব্দ দুটি তুলে দিচ্ছি”। এভাবে ব্যাখ্যা ছাপাটা বিভ্রান্তিকর কাজ হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য তো হয়ইনি। কারণ এখন ‘এক্সসেপ্ট ইসরাইল’ শব্দ দুটি বাদ দেয়াতে অবশিষ্ট বাক্যটা হয়ে গেছে ‘এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ – অথচ এটা নিয়ে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করে মন্ত্রীকে সচেতন করে দেয়া যে সেক্ষেত্রে – এখন কথা রয়ে গেছে তাহলে এভাবে যে, “এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ” –  মন্ত্রী কী তাই বুঝাতে চেয়েছেন? এই কথাটাতে মন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানা দরকার ছিল। কিন্তু শেয়ার বিজ বা অন্য কোনো মিডিয়ার দিক থেকে এই প্রশ্নটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে করা হয়নি। আসলে সাংবাদিকেরাই যেন চেয়েছে যে মন্ত্রীরা যেমন দাবি করছেন যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দ তুলে নিয়েছেন। ব্যাপারটা তা নয়। কথা ঠিক যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দই তুলে নিয়েছে। কিন্তু তাতে বাকি বাক্যের অর্থ একই থাকে নাই।    একথা বলতেই হচ্ছে যে এতে থেকে যাওয়া বাকি শব্দ যে  – “এই ই-পাসপোর্ট সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ কথাটার সোজা মানে হয়ে গিয়েছে যে বাংলাদেশীদের জন্য ইসরাইল ভ্রমণও বৈধ। অথচ এটাই হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক বক্তব্য।

    আরো টু দা পয়েন্টে বললে এখন মানে হয়েছে, বাংলাদেশের ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত আছে, না নেই – সেটা যাই থাক – আমাদের পাশপোর্টে ইসরাইল ভ্রমণও আমাদের জন্য বৈধ হতে পারে।  এ কথাটাই আমাদের পাসপোর্ট এখন বলছে।

    অতএব,  ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দ দুটা এখন নেই – তাতে আসলে কী হয়েছে, তা বুঝতে হবে। এখন স্পষ্ট করে বলা হয়ে গেছে যে আমাদের পাসপোর্ট ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’- এটাই মুখ্য স্টেটমেন্ট। সব দেশ ভ্রমণ বৈধ হওয়ার অর্থ হল ইসরাইল সফরও বৈধ। তাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন মুখে যতই ব্যাখ্যা দেন না কেন যে – ‘এই পরিবর্তনে ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পরিবর্তনের কিছু নেই’ অথবা ‘আমরা তো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিই না’ – তাতে কিছুই হেরফের হবে না। এর মূল কারণ, মোমেনের এই বাড়তি ব্যাখ্যার ‘আইনি ভিত্তি নেই’ বা এটা সরকারের ‘আইনি অবস্থান’ নয়।  কারণ, ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’– এটাই পাসপোর্টে লেখাগুলো অনুসারে পাশপোর্ট অফিসের আইনগত অবস্থান।

    কেন এমন হলোঃ
    এখন আসি, কেন এমন হল বা সরকার এমন সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেল? সেটা নিয়ে কথা বলার আগে আরেকটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। পাসপোর্টে পরিবর্তনের এই প্রস্তাব সরকারের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তির কাছে যে-ই নিয়ে এসেছেন আর তা যতই লোভনীয় করে লাভালাভ দেখিয়ে তিনি পেশ করে থাকেন না কেন এটা সরকারের জন্য নীতিনির্ধারকদের নেয়া এক আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হয়েছে। বরং সরকারের উচিত ছিল দুনিয়ার কোন কর্নার থেকে এই প্রস্তাব-উদ্যোগটা উঠেছে বা এসেছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে খোঁজ নেয়া, আর সে সম্পর্কে আগে এর পুরা পটভুমিটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়া। সরকার খুব সম্ভবত যথেষ্টভাবে ওই কাজটা না করে ‘এমন দুই শব্দ’ তুলে দিলে সরকারের কী কী লাভালাভ হবে – এর মধ্যেই বুঁদ হয়ে থেকে সিদ্ধান্তটা নিতে গেছে। সব বিপর্যয় ঘটেছে সেখান থেকে।

    বলা হচ্ছে আমাদের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছয় মাস আগে। হা মোটা মুটি ব্যাপারটা তাই। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা সেই আগের পরিস্থিতিটাও এখন আর বজায় নাই। অনেক কিছুই এখন বদলে গেছে। বিশেষ করে সদ্য ১১ দিনের গাজায় ইসরাইলি হামলাকে কেন্দ্র করে।

    ঘটনাটা তাই শেষের দিক থেকে যদি বলি, এটা এক গভীর গোপন পরিকল্পনা যা রচিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে আর তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে বুদ্ধি করে। আসলে এই পুরো বিষয়টাই নেতানিয়াহুর উদ্যোগে করা এক জায়নিস্ট পরিকল্পনা।

    এখানে ইহুদিবাদী বা জায়নিস্ট [Zionist] শব্দের অর্থ যা বুঝতে হবে তা হল ১. জায়নিস্ট রাষ্ট্র মানে এটা কেবল ইহুদিদের জন্য একক ও  বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্র, ২. সেখানে অন্য কেউ যদি নাগরিক থাকেও সে ইহুদিদের সাথে সমান অধিকারের নাগরিক নয়। ৩. এই জায়নিস্ট রাষ্ট্রের কোন ইহুদি সদস্য যদি অন্য নাগরিকের জায়গা-জমি সম্পত্তি দখল করে সেক্ষেত্রে জায়নিস্ট রাষ্ট্র সেটাকে শুধু বৈধ মনেই করবে তাই নয়; উলটা ঐ দখলদারদেরকে সব ধরণের সহায়তা দিবে। ৪. এমনকি জায়নিস্ট রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে ঐ দখলদারদের রক্ষা করবে। আর একাজকে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার বলে চালিয়ে দিতে চাইবে। ৫. যেহেতু তারা হিটলারের নৃশংসতার ভিক্টিম অতএব কেবল তাদের বেলায় এসব কিছু করা জায়েজ আছে।  ভিক্টিমহুড – এই বোধের জন্য এই মনকষ্টের জন্য এখন উলটা তাদের এই হিটলারবাদি আচরণ দুনিয়াকেই সহ্য করে নিতে হবে।  ৬. আর সর্বশেষটা হল, যদি আপনি জায়নিস্ট রাষ্ট্রের এসব কাজ ও ততপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন তাহলে এই রাষ্ট্র উলটা আপনার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলবে যে  আপনি এন্টি-সেমেটিক। আপনি ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন! এর আবার মানে কী আর সেটা কী করে? মানে হল, সেমেটিক=ইহুদি, এই সমীকরণ অনুসারে আপনি ইহুদিদেরকে ইহুদি বলে নিচা দেখিয়েছেন, ঘৃণা করেছেন ছড়িয়েছেন, তুচ্ছ করে দেখিয়েছেন ঠিক যেমন এসব করে জর্মানির হিটলার সেদেশের ইহুদি নাগরিকদেরকে বিভিন্ন নির্যাতন ও পুড়িয়ে মেরে ফেলার আগে করেছিল। তাই তাঁরা এখন জায়নিস্ট (হিটলারের কপি) হবেন বলে আবদার।  সবমিলিয়ে এই হল জায়নিস্ট আচরণ ও তাদের সচেতন মনোবৈকল্য চর্চা।

    আগে যেকথা বলছিলাম নেতানিয়াহু  তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজি করানোর কাজটা করে নিয়েছিলেন ট্রাম্পের জামাই কুজনারের [ Jared Corey Kushner]  তিনিও সেমেটিক=ইহুদি তবে আমেরিকান] মাধ্যমে ট্রাম্পকে কব্জা করে। এদিকে আরবদের দিক থেকে একাজে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন দুই প্রধান হলেন দুবাই ও সৌদির দুই প্রভাবশালী যুবরাজ। আনুষ্ঠানিকভাবে এই অসৎ পরিকল্পনাটার নাম হল ‘আব্রাহাম চুক্তি’ [আব্রাহাম একর্ড বা The Abraham Accords । এটি অবয়ব পায় হোয়াইট হাউজে বসে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু আর সাথে দুবাইয়ের ও বাহারাইনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী- এই চারজনের এক চুক্তি স্বাক্ষরে। এটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।
    অনেকের মনে হতে পারে এসব কী সত্যি নাকি আমার “মনে হয়” টাইপের কিছু? যেহেতু আমি হয়ত ইহুদি দেখতে পারি না সেজন্য? তাই কী? কারণ কঠিন সত্যি অনেক সময় বিশ্বাস হতে চায় না।

    আজকাল আবার অনেকে আছেন যারা নিজেরাই মনে মনে মানেন সে তার তত জানাশুনা নাই কিন্তু আবার সেজন্য কেমনে ফস করে   জিজ্ঞাসা করে যে একথা যে সত্যি এর প্রমাণ কী? এমন সবার জন্য কাজটা সহজ আর স্বাধীন করে দেই। The Abraham Accords 2020 – এই কথা কয়টা এখান থেকে কপি করে গুগলে গিয়ে পেস্ট করে সার্চ দেন। এতটুকুই যথেষ্ট হবে। এবার যা ফল পাবেন তা হল – না হলেও ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ দিনের  শ’খানেকবিভিন্ন দেশের ইংরাজি দৈনিকের এই চুক্তি করা বিষয়ক খবরের লিঙ্ক। আর এরই ভিতর একটা লিঙ্ক পাবেন আমেরিকান সরকারি দলিল।  এর শিরোনাম হবে The Abraham Accords Declaration আর চিনবেন কী করে যে এটা আমেরিকার? দেখবেন লিঙ্কে লেখা আছে  state.gov – এই কথা কয়টা। আর এটাই অরিজিনাল চুক্তির কপিটা। ওখানেই সাথে পিডিএফ কপিও নামিতে নিতে পারবেন।
    আবুধাবি থেকে প্রকাশিত একটা দৈনিক দ্যা ন্যাশনাল, এদের করা ঐদিনের একটা রিপোর্ট হল যে কে কে উপস্থিত ছিল [ Who attended the Abraham Accord signing] । আবার আমেরিকার বোস্টনভিত্তিক দ্যা আটল্যান্টিক[The Atlantic] এর সম্পাদক  পরের দিন ১৬ সেপ্টেম্বর নিজেই এক আর্টিকেল লিখেছিলেন এই চুক্তিতে কার লাভ কার ক্ষতি বিষয়ে শিরোনাম দিয়েছিলেন – Iran and the Palestinians Lose Out in the Abraham Accords.। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, এটা কোন শান্তি চুক্তিওও হয় নাই। কারণ দুবাই বা বাহারাইন কখনই ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ করে নাই। আবার তিনি বলছেন, এর পিছনে সৌদি আরব আছে এর বড় প্রমাণ হল বাহারাইনের উপস্থিতি। বলেছেন সৌদি যুবরাজ, Bin Salman, without whom these Gulf states, Bahrain in particular, would not dare make such a bold and public move,…।

    আসলে এই চুক্তিকে আব্রাহাম চুক্তি বলার উদেশ্য হল মনোথিওজমের জনক আব্রাহামের নামে নিয়ে একটা জাঁকজমক আবহ তৈরি করা।  অথচ এর আসল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদেরকেই কোণঠাসা ও উপেক্ষা করে জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা এক হয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধেই একসাথে কাজ করা। ফলে এটাকেই তারা “আব্রাহাম চুক্তি” বলে চালাতে চেয়েছেন। এছাড়া যদিও এখানে স্বাক্ষরকারিদের মধ্যে আমেরিকা মানে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আছেন কিন্তু তিনি আসলে ঠিক কোন পক্ষ নন;  বড় জোড় মধ্যস্থতাকারি। অথচ সেখানেও জোড়াতালি দেয়া হয়েছে। কারণ আসল সংঘাত জায়নিস্টেরা তৈরি করে রেখেছে তো প্যালেস্টাইনিদের সাথে। অথচ প্যালেস্টাইনিরা এই চুক্তির কোন পক্ষই নয়।

    তবে ছয় মাস আগের পরিস্থিতি এখন নেইঃ
    ২০২০ সালের আমেরিকান নির্বাচনের দুমাস আগে করা ঐ চুক্তি এখন ট্রাম্প পেরিয়ে বাইডেনের আমলে পৌঁছেছে। কিন্তু বাইডেন এত দিন এই চুক্তিতে যে যালেস্টাইনিদের উপর চাপ সৃষ্টি ও বঞ্চিত করা হয়ে আছে সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফেলে রেখেছিলেন। এর বাস্তব অর্থ হয়েছিল যে বাইডেনও যেন ট্রাম্পের অনুসারি।

    কিন্তু এবারের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বাইডেনের চোখ খুলেছে; তিনি  ইতোমধ্যেই তাঁর কাজের প্রায়োরিটি বদল নিয়েছেন। এখন তিনি ওই চুক্তির কারণে যেসব ক্ষতি হয়ে গেছে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে ওইসবের ক্ষত সারাতে উঠে পড়ে লেগেছেন। সে কাজেরই এক প্রধান অংশ ছিল এবারের গাজায় ইসরাইলি হামলায় ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করা। তাছাড়া আমেরিকার আগের প্রতিশ্রুত যেসব ত্রাণ ও পুনর্বাসনের তহবিল আমেরিকা গাজায় দিত, যার পুরোটাই ট্রাম্প বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেসব আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন বাইডেন। আর মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কগুলো যা ট্রাম্পের কথিত আব্রাহাম চুক্তির কারণে এলোমেলো হয়ে গেছিল – সেগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার জন্য সেক্রেটারি অব স্টেট বিল্কেনের এক লম্বা সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

    আর বাইডেনের এই নতুন অবস্থানে আসা বা আমেরিকাকে হুঁশে ফিরিয়ে আনার কাজটি মূলত কারা করলেন? এনিয়ে বিবিসি বাংলাতে এক বিশেষ করা হয়েছে যার শিরোনাম, “ইসরায়েল ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমেরিকায় ডেমোক্র্যাট শিবিরে গভীর পরিবর্তন“। তাতে বলা হচ্ছে, এরা হলেন ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে নতুন যারা তুলনামূলক তাদের ভাষায় ‘প্রগ্রেসিভ’ (আমেরিকান অর্থে প্রগ্রেসিভ যারা রক্ষণশীলের উল্টা, আমাদের মতো দেশের অর্থে প্রগেসিভ মানে কমিউনিস্ট তারা নন)। বিবিসির উপরে উল্লেখিত এই রিপোর্টের ভাষায়,……

    “কিন্তু কংগ্রেসের ভেতর দিনকে দিন বৈচিত্র্য আসছে, আর সেই সাথে ইসরায়েলের প্রশ্নে আমেরিকার প্রচলিত নীতি চাপের মধ্যে পড়েছে।
    জরিপ সংস্থা পিউ ফাউন্ডেশন স্টাডি বলছে ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেটে নির্বাচিত সদস্যদের ২৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক, এশীয় এবং আদি আমেরিকান বংশোদ্ভূত । এটি একটি রেকর্ড। বিশ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ১৯৪৫ সালে ছিল মাত্র ১ শতাংশ”।

    এরা আসলে বাকি ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বেশি প্রো-অ্যাকটিভ। আর এদের প্রতিনিধি বলতে তিন নারীর কথা বেশি সামনে এসেছে।  বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর ভাষায়, “এরাই সেই প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রাটস যারা বাইডেনকে গত প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জিততে শুধু সাহায্য করেছিল তাই না, বাইডেন নমিনেশনও পেয়েছিলেন এদের শক্ত  সমর্থনের জন্য …progressive Democrats, a group that helped Biden win the Democratic nomination and the presidency……]।

    বিবিসি লিখেছে, কংগ্রেসে তরুণ, প্রগতিশীল কয়েকজন সদস্যের একটি জোট – যেটি স্কোয়াড নামে পরিচিতি পেয়েছে -, তার মধ্যে রয়েছেন মিশিগান থেকে নির্বাচিত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব এবং মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর।]

    এদের একজনের সাথে বাইডেন-কমলা বিমানে উঠার আগে টারম্যাকে আন্তরিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলাপ করছেন, এমন একটা ছবি অনেক জায়গায় ঘুরছে।

    মূল কথাটা হল, এনিয়ে রয়টার্সের একমাত্র এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২১ মে। সেখানে বহু প্রসঙ্গে ডিটেইলড বর্ণনা আছে। যার শিরোনাম হলো, গাজা কনফ্লিক্ট ফোর্সেস রিঅর্ডারিং অব বাইডেন’স পলিসি প্রায়োরিটিস প্রশ্নে ব্যাখ্যা [Analysis: Gaza conflict forces reordering of Biden’s policy priorities]। এককথায় বললে, বাইডেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর শয়তানি পরিকল্পনার ‘আব্রাহাম একর্ড’ ভেঙে আমেরিকাকে বের করে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন।

    কিন্তু এর সাথে আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুর কী সম্পর্ক?
    হ্যাঁ, সেটাই সবচেয়ে মজার। আব্রাহাম একর্ড ২০২০ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরের পরে ঐ সময় এর বাস্তবায়নের দায় পড়ে মূলত দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) উপর। এই চুক্তিতে দৃশ্যত সৌদি আরব নেই। কিন্তু পশ্চাদ-পটভূমিতে সর্বত্র আছে। এনিয়ে আটল্যান্টিকের আরেক রিপোর্ট Why the UAE Made Peace With Israel দেখা যেতে পারে। এছাড়া ঐ চুক্তিস্বক্ষরের সময় আরও পাইপলাইনে ছিল (আছে বলতে পারছি না) আরো দুই দেশ ওমান, সুদান ইত্যাদি।

    আব্রাহাম একর্ড করার মূল লক্ষ্য কী ছিলঃ
    কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রশ্ন হলো, এই আব্রাহাম একর্ড কেন তারা করেছিলেন? কেন পক্ষগুলো এর দরকার অনুভব করেছিল? সেটাই মূল ঘটনার আরেকটা দিক। ওই মূল ঘটনা হলো, ইরান; মানে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি বাস্তবে হাজির হওয়া। আর এর বিরুদ্ধেই জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা মিলে এক হয়ে কাজ করা জোট পাকানো আর একারণেই রিপাবলিকান ট্রাম্প তাতে মদদ নিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য,  ইরানের এই নব উত্থানে ইসরাইল ভীত। আবার জিসিসির বাদশাহ-দেশগুলো মধ্যে সম্ভবত কাতার ছাড়া সব বাদশাহ-রাষ্ট্র ও বিশেষ করে দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) – তারাও ভীত। এখানে ইসরাইলের ভয় হল যে এই (চীনের বলে বলিয়ান) ইরান এখন আরো বড় ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়াবে। হামাস-হিজবুল্লাহ এর সাহায্যে। এছাড়া আমেরিকার সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান আর ফিরে কোন চুক্তিতে বাধা পড়তেও সম্ভবত চাইবে না। এগুলোই ইসরাইলের মাথা খারাপ করে দেয়া তাদের মূল শঙ্কা।

    ওদিকে ইরানের প্রভাব যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে আর তাতে সে মধ্যপ্রাচ্যে কোন বাদশাগিরিই আর রাখবে না – এই অবস্থান নিতে পারে এই হল  জিসিসির [GCC] বাদশা-আমীরদের মূল শঙ্কা। আর চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে গেলে, তাতে আমেরিকান প্রভাবের পতন ঘটবে, আর তাতে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সৌদিদের মুখ্য ভূমিকাটা নিয়ে বসবে ইরান। এটাও তাদের শঙ্কা। একারণে, নেতানিয়াহু জামাই কুজনারের মাধ্যমে শ্বশুর ট্রাম্প (ও তার দল রিপাবলিকানদের) কব্জা করে আমেরিকান মধ্যস্থতায় এই আব্রাহাম একর্ড করে নিয়েছিলেন তারা সকলে মিলে যেন এই চুক্তি একটা তাদের জন্য প্রতিরক্ষা। তা আসলে ইরান-চীনবিরোধী এবং ইরানি উত্থানে ভীত আরব বাদশাহ আর ইসরাইলিদের কমন এনিমি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের জোট। অতএব এই যুবরাজদের চোখে ভরসা হয়ে দেখা দিয়েছিল  ইসরাইল। তাদের ভীত মনের অনুমানে, ইসরাইলই একমাত্র তাদেরকে ইরানের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। এই মনোভাবটা টের পেয়েই নেতানেয়াহু “আব্রাহাম একর্ড” পরিকল্পনা নিয়ে আগানো শুরু করেছিল।

    একারণে আবার আব্রাহাম অ্যাকর্ডের বাস্তবায়ন মানে ইসরাইল দাবি করেছিল  যে তাহলে  যুবরাজ-দ্বয়ের কাজ হল, তারা মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্রগুলো থেকে ইসরাইলকে স্বীকৃতি এনে দিক। আর ওই কাজে যুবরাজের অন্য অনেকের মত পাকিস্তানের (এবং বাংলাদেশও) ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইমরান যেকোনো মূল্যে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে বসে। আর তাতে দুবাই পাল্টা ব্যবস্থায় সমস্ত পাকিস্তানি (মূলত মাইগ্রেন্ট লেবারদেরকে) দুবাই থেকে বের করে দেয় বা প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু করোনা আমল বলেও অনেকে ধরে নেয়, এটা বোধহয় করোনা-পদক্ষেপের কারণে হচ্ছে। যেমন এই রিপোর্টে কারণ কী তা ব্যাখ্যা দেয়া বা উল্লেখ করা হয় নাই। এই প্রসঙ্গে সৌদি আচরণের রিপোর্ট এখানে ।  আর এনিয়ে ভারতের খুশি লক্ষ্য করেন এখানে।মজার কথা হল, বাংলাদেশের নাম ওই সময় দুবাইয়ের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় উঠেনি। এখান থেকেই অনুমান যে আমরা স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধকে পালটে নিয়ে আপাতত – এভাবে পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ পর্যন্ত শব্দগুলো উঠিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য, এটা ভাল সিদ্ধান্ত হয়নি যা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

    তবে এই প্রসঙ্গে এখন সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে পাসপোর্ট ইস্যুতে সব সিদ্ধান্ত স্থগিত করে পুর্বাবস্থায় ফিরে রেখে দেয়া আর পুরো ইস্যুটা যেসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা এক কমিটি করে রিভিউ করতে বসানো। মনে রাখতে হবে এখনকার বাইডেন, তিনিই যেখানে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর অবস্থানে থাকতে চাইছেন না। নিজের প্রায়োরিটি বদলে ফেলার পথে রওনা দিয়েছেন তাহলে অন্ততপক্ষে এই সুযোগে আমরাও আমাদের ভুল সংশোধন করে নিতে পারি।

    এছাড়া আরো দিক আছে। ইতোমধ্যে দুবাইয়ের সাথে চীনের সম্পর্ক কিছু উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। আর এর প্রকাশ হল দুবাই করোনা টিকা ইস্যুতে পুরোপুরি চীনা টিকা-নির্ভর। সম্ভবত এটাতে তাদের কথা বলার পথ খুলেছে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নীতির পক্ষে আমাদের দাড়াতে হবে তা হল, ইরানের পিছনে চীনের সমর্থন আছে বলে এই নতুন ইরান সে আর যাই করুক মধ্যপ্রাচ্যে বাদশাদের রাষ্ট্র-এর ওপর হস্তক্ষেপ করবে, বা-হাত ঢুকাবে, সরকার বদলাবে কী রাষ্ট্রপদ্ধতি বদলে দিবে – এটা একেবারেই কাম্য নয় ও অগ্রহণযোগ্য। এটা হতে পারে না। দুবাই বা সৌদি আরবে আভ্যন্তরীণভাবে সরকারে কে বসবে রা সরকার পদ্ধতি কী হবে তা একমাত্র তার অভ্যন্তরীণ জনগণই নির্ধারণ করবে – এই নীতির বাইরে আমরা কেউ যেতে পারি না। আমরা ওয়ার অন টেররের জুনিয়র বুশ হয়ে যেতে পারি না।

    কাজেই দুবাইয়ের সাথে চীনের কত দূর কী আলাপ হয়েছে আমরা জানি না। তবে দুবাই অন্তত এখন অনেক আশ্বস্ত তাই আমরা লক্ষ্য করছি। কারণ অন্তত  ইসরাইলকে ত্রাতা জ্ঞান করার আগের  দুবাই অনেকটাই এখন শীতল বলে মনে হয়।

    তবে চীনকেও অবশ্যই নীতিগত অবস্থানে শক্ত হতে হবে, আর চীন-ইরান চুক্তি হয়েছে বলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আরেক বিশৃঙ্খলা কাম্য নয়। তা চীনেরও পক্ষে যাবে না। একমাত্র নীতিগত অবস্থান ধরে দাঁড়ানোই চীন দায়িত্ববান গ্লোবাল নেতার ভূমিকায় স্বাগত লাভ করতে পারে।

    সারকথায় আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুতে আরো বড় ক্ষতি হয়ে যাবার আগেই অবিলম্বে সিদ্ধান্ত স্থগিত ও রিভিউয়ের অবস্থানে চলে যাওয়াই কাম্য। এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সারা জীবন আমরা ফিলিস্তিনের পক্ষে থেকে এখন তাদের হাত ন্যূনতম শিথিল করার কোনো অর্থ নেই, এটা হতেই পারে না! আশা করি, আমাদের সরকার  বদলাবার সুযোগটা নিবেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৫ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে    “বাংলাদেশের পাসপোর্ট : প্রেক্ষাপট বাইডেনের প্রায়োরিটি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জায়নবাদ ‘এন্টি-সেমেটিক’ বলে ভয় দেখায়

    জায়নবাদ ‘এন্টি-সেমেটিক’ বলে ভয় দেখায়

    গৌতম দাস

     ২৪ মে ২০২১, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3yk

     

    Roarmedia

    কারো দিন একই রকম যায় না। দিন বদলায়। তবু দেখা যায়, ন্যায়-অন্যায় ইনসাফবোধ ভুলে গিয়ে কেউ কেউ সাময়িক সুখে বুঁদ হয়ে থাকতে চায়। আবার জুলুম করার সুযোগ পেলে সেটাকেও চিরদিনের মনে করে বসে। যে কারণেই সম্ভবত ওই প্রবাদ যে, ‘মানুষ সুখ পেয়ে আল্লাহ’ ভুলে যায়। ১৯৪৮ সালে ১৪ মে ইসরাইল তার জন্ম থেকে নিয়মিত ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, হত্যা আর চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে যাচ্ছে। আর প্রত্যেকবার নতুন হামলার পেছনে অন্যান্য ঘটনা বা ইস্যুর সাথে নতুন করে কোথাও না কোথাও ভূমি দখলের উপাদানও সংশ্লিষ্ট থাকেই। যেমন- অন্য কিছুর সাথে এবার সংশ্লিষ্ট ছিল ‘শেখ জাররাহ’ এলাকার ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে নতুন করে তাদের ভূমি জবরদখল।

    এবারের সঙ্ঘাতের মাঝামাঝি সময়ে  লিখেছিলাম, “ফিলিস্তিনিদেরও দিন বদলাবেই“। জুলুম চিরস্থায়ী হতে পারে না। কথাটা বলেছিলাম অবশ্যই ‘স্পিরিচুয়াল’ অর্থে। কারণ মনে হয়েছিল, সময়ে স্পিরিচুয়ালিটিই মানুষকে যৌথভাবে দ্রুত ন্যায়ের পক্ষে শক্তি ও সাহস নিয়ে উঠে দাঁড়াতে উপযুক্ত উপায় হয়ে দাঁড়ায়। অতএব, আমারও তাই করা উচিত। সে কারণে স্পিরিচুয়াল অর্থে এমন কয়েকটা বাক্যের একটা প্যারাগ্রাফ কখনো আগে লিখিনি, এমন হলেও তা করেছি। যদিও ওখানে পরে ‘বস্তুগত’ অর্থে মানে, ‘আধুনিক’ অর্থে রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেও দেখিয়েছিলাম, কেন ইসরাইল হেরে যাবেই।

    ইসরাইল হারবেই আর দিন বদলে যাবেই:
    কেন ইসরাইল হারবে আর দিন বদলে যাবেই? কারণ আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাচ্ছে ক্রমশ চীনের কাছে। আমেরিকান স্টাডি-গবেষণা রিপোর্টও বলছে যে এটা আসন্ন। এ সংক্রান্ত যে প্রথম রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। তাদের ভাষায় ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব পশ্চিম থেকে পুবে এশিয়ায় চলে যাচ্ছে এবং তা স্থায়ীভাবেই।

    আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের পতনের পূর্বাভাস দেয়া শুরু তখন থেকে আর তা তাদের নিজেদেরই স্টাডি রিপোর্টে। এ বছরও একই মূল পূর্বাভাস দিয়েছে। কিন্তু মজার কথা, পরে ২০১১ সালেও ওবামা আয়ারল্যান্ড সফরে পূর্বপুরুষের ঘরবাড়ি দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে, টাউনহল পাবলিক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমরাই (পশ্চিমারা) দুনিয়াকে শাসন করে যাবো – মিথ্যা হলেও এমন আশ্বাস দিয়ে তিনি বক্তৃতা করেছিলেন।

    তবে প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, নিয়মিত অত্যাচারী আর ভূমি দখলকারী ইসরাইলকেই এই আমেরিকা সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে; তাতে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যে দলের প্রেসিডেন্টই ক্ষমতায় থাকুন। গত ১৯৪৮ সালে ইসরাইলের জন্ম ও জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ প্রাপ্তিসহ সব কিছুতে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া হয়েছিল প্রধানত আমেরিকার কারণে, যখন সে ইতোমধ্যেই গ্লোবাল নেতা।  এবং  রুজভেল্টের উপযুক্ত উত্তরসুরী উদার ইমেজের হ্যারি ট্রুম্যান  সেসময়ের প্রেসিডেন্ট আর যার সবচেয়ে কালো কাজ ছিল এটা।। আর সেই থেকে আমেরিকান প্রেসিডেন্টেরা নিয়মিতভাবে ইসরায়েল সমর্থন করে যাচ্ছে – যে অন্যের ঘরবাড়ি লুট ও হত্যাকারী, তারই আবার ‘আত্মরক্ষার অধিকার’- এই নির্লজ্জ কথার ওপর দাঁড়িয়ে আমেরিকা ইসরাইলের পক্ষে সাফাই জোগাড় করে গেছে ও যাচ্ছে।

    অতএব, একালে গ্লোবাল নেতৃত্ব অবস্থান থেকে আমেরিকার পতন এঘটনার অন্যতম মানেই ইসরাইলের পতন। মানে জায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের পতন বা ভেঙে পড়া। বলাই বাহুল্য, এতেই ফিলিস্তিনিদের জীবনের ওপর জুলুমের-অবসান ঘটবে। প্রায় নিয়মিত নির্যাতন অত্যাচার আর ভূমি দখল হয়ে যাওয়ার অবসানের দিন ফিরে পেতে পারে ফিলিস্তিনিরা।

    এদিকে ইতোমধ্যে এবারের সঙ্ঘাতের পর আপাতত এক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, এর পর থেকেই আরেক তথ্য বিশ্লেষণে গ্লোবাল মিডিয়া উপচে উঠেছে। আর তাতে এর চেয়েও বেশি খুশির খবর হলো, এবারের সঙ্ঘাত ও আত্মত্যাগ থেকে বিনিময়ে বেশ কিছু ইতিবাচক উন্নতির কথা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যেটা বলেছিলাম, চীনের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে খুব নির্ধারক হবে।

    চীনের নির্ধারক ভুমিকার ছায়া উঠে আসছেঃ
    জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ [UN Security Council], রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ ফোরাম। এর মোট ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচ স্থায়ী ও ১০ অস্থায়ী। মানে, অস্থায়ীরা দুই বছরের রোটেশনাল যা পাঁচ মহাদেশ থেকে ঘুরে ঘুরে বাকি জাতিসঙ্ঘ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিতদের নেয়া হয়। কিন্তু তাদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সবাই এক মাস করে ঘুরে ঘুরে এই পরিষদের সভাপতিত্ব করেন, এভাবেই এটা চলে। সেই বিচারে, চীন এবারের মে মাসের সভাপতি। না, সভাপতি হয়েছে বলে তাতে বিশেষ উত্তেজনা অনুভব করার কিছু নেই। কারণ সভাপতি হিসেবে (চীনা স্থায়ী প্রতিনিধি অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে) তিনি কী বলবেন, তা আগেই স্ক্রিপ্ট করে এবং প্রয়োজনীয় সময় বরাদ্দসহ সবকিছুই সব সদস্য মিলে আগাম নির্ধারিত করে রেখে থাকেন। তবে কেবল নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরার জন্য আলাদা যে, সবার সমান বরাদ্দ সময় তখন প্রত্যেকে নিজের কথা বলতে পারেন; যার যা কারিশমা তা কেবল তখনই।

    চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Wang Yi] এবার নিজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি উপস্থিত থেকে এবার দু’টি প্রসঙ্গে আমেরিকানদের খুবই কঠিন দুরবস্থায় ফেলেছিলেন। প্রথমত, পরিষদের সদস্যদের যৌথবিবৃতি পাস করাতে চেয়েছিল চীন যেটা হলে, ইসরাইলের নিন্দা থাকত তাই আমেরিকা এতে ভেটো দেয়। কারণ গ্লোবাল পাবলিক সেন্টিমেন্ট এখন প্রধানত আমেরিকার বিপক্ষে ছিল। তার ওপর আবার এমন সময়ই ইসরাইলকে অস্ত্র বিক্রির পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।
    দ্বিতীয়ত, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের প্রস্তাব ও অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তার দু’টা বাক্য আমেরিকা তো বটেই, ইসরাইলকেই খুবই বেকায়দায় ফেলেছিল। সেটাতে চীনা ভাষ্য ছিল, “টু-স্টেট সলিউশনের[two-state solution]” এর মাধ্যমে এক শান্তিপূর্ণ সমাধানে যেতে হবে। যার সোজা ব্যবহারিক মানে হল – বর্তমান ইসরাইল স্টেট, এটা তো ঘোষিত এক জায়নিস্ট (Zionist বা ইহুদিবাদী ) স্টেট; এই জায়নিস্ট রাষ্ট্র ভেঙে দিয়ে দু’টি সম-অধিকারভিত্তিক আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম দিতে হবে। মানে কেবল ইহুদিদের জন্য একটা রাষ্ট্র (তাতে অন্যদের দুর্দশার শেষ নেই) রয়েছে যা চরম বৈষম্যমূলকভাবে তৈরি হয়েছে। কারণ অন্য কোনো ধর্মের লোকের উপরে ইহুদি নাগরিকের বিশেষ সুবিধা বা কথিত ‘অধিকার’ দিয়ে তৈরি করা এটা। এ ছাড়া অনবরত এটা ফিলিস্তিনিদের জায়গাজমি দখল করে তাতে সরকারি অনুদানে আবাসিক এলাকা বানিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে বা অভ্যন্তর থেকেই ইহুদি হলেই তাকে ঐ বাড়ি বরাদ্দ দেয়া – এভাবে জবরদস্তি বসতি গড়ে তোলা চলছেই। অথচ ইসরাইল জায়নিস্ট রাষ্ট্র এভাবে ভূমি দখলের অথবা, রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে তো নয়ই বরং পক্ষে ও প্রত্যক্ষ সহায়ক। আর তাদের এ দানবীয় কাজের পক্ষে সাফাই হল, বিভিন্ন ধর্মীয় স্ক্রিপ্ট ও সেটা নিয়ে ‘রাব্বি’দের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা যে, একটা জায়নবাদী রাষ্ট্র গড়তেই হবে। সেটা নাকি এখানে বা ওখানে লেখা আছে! এমনিতেই কোনো ইচ্ছা মত  পুরান স্ক্রিপ্টের তাফসির জমির আইনি দলিলের উৎস হতে পারে না। এটা ভয়ঙ্কর!

    তাই চীনের সরাসরি টু-স্টেট সলিউশনের কথা তোলার মানে হল, প্রথমত এটা বর্তমান ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের ভেঙে দেয়ার প্রস্তাব। ফলে তা ইহুদিবাদ ধারণার বিরুদ্ধেই সরাসরি আঘাত। এ ছাড়া অন্যের হক মেরে এনে সেটা ইহুদিদের দেয়ার এই বিশেষ ও চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র – ইহুদিবাদের প্রাণভোমরাকেই বিনাশ করে দেয়া হবে এতে। দেখা গেছে, যে লোকটা ইহুদি ধর্ম বা তা পালন নিয়েও সিরিয়াস নয়; অথচ সেও কিন্তু এই ইহুদিবাদ বা জায়নিস্ট রাষ্ট্রটাকেই টিকিয়ে রাখার প্রবলভাবে পক্ষে।

    বলাই বাহুল্য এটা সবার চোখে পড়বেইঃ
    বাইডেনের দেয়া ইসরায়েলকে প্রশ্রয়ের বিপরীতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর Wang Yi এর অবস্থান……
    “especially Israel.” Wang elaborated that “in particular, Israel should exercise restraint, and … put an end to violence, threats, and provocations against Muslims, and maintain and respect the historical status quo of the holy sights in Jerusalem.”

    এ ছাড়া চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আরেকটা বক্তব্য জায়নিস্টদের মনে খুবই চোট দিয়েছে বা বলা উচিত, তাদের ভীত করেছে। তা হল, বক্তব্যের শুরুতেই তার প্রথম বাক্য হল, “ফিলিস্তিন প্রশ্ন হল, সারা মধ্যপ্রাচ্যের সব সমস্যার মূল ইস্যু” [“the Palestinian question has always been the core of the Middle East issue.”]।

    আর এ কথাতেই বহু সাধারণ ইহুদিবাদীও বিরাট বিপদ দেখেছেন। কেন? তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সমস্যা নাকি ‘শিয়া-সুন্নি বিরোধ’। যেমন- সৌদি আরব আর ইরান ঝগড়া [cold war between Iran and Saudi Arabia]। আসলে তারা চাচ্ছেন, মুসলমানদের মধ্যকার স্বাভাবিক ভিন্নতাগুলোকে যত প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখানো যাবে ততই এ কারণে নিজেদের – এক দগদ্গে ঘায়ের মত – জায়নিস্ট রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের নজর তত কম যাবে। গত দু’দিনে এমন যত লেখা পড়েছি, তাতে এই ব্যক্তির লেখাটাই তুলনায় সবচেয়ে নরম ভাষায় লেখা। উনার নাম DALE ALUF। এই লেখার বেশিরভাগ উদ্ধৃতি তার লেখা থেকে নিয়েছি।  অথচ তার লেখাটাই প্রবল জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদী আর রেসিজমে ভরপুর।

    যেমন- তাঁর আরো বক্তব্যে আছে যেমন, আমেরিকা যে মধ্যপ্রাচ্যে আরব স্প্রিংয়ের আন্দোলন চালিয়েছিল (বুঝাচ্ছেন বিশেষত মিসর, তিউনিশিয়ায়) সেটা আরো চালানো উচিত[Arab spring of 2011 had more to do with the internal social and political issues…]। কেন? কারণ সেটাই নাকি মধ্যপ্রাচ্যের ‘মূল’ সমস্যা। কী সেটা? তারা নরম ভাষায় ইঙ্গিতে বুঝাচ্ছেন, মুসলমানরা হলো জঙ্গি, এরা খালি মানুষ মারে। এ জন্যই নাকি আমেরিকা ‘আরব স্প্র্রিং’ শিখিয়ে তাদের শান্তির পথে এনেছিল [……that slipped into chaos than it did with the Israel-Palestine conflict…….]”। অথচ পাঠক লক্ষ্য করুন, এই ভাষ্যের মাধ্যমে লেখক যে ভরপুর বিদ্বেষে মুসলমানরা সব “জঙ্গি” বলতেছেন ফলে এরা “নিচা” – এই ধরে নেয়া নিচু-মানুষ বলে ঘৃণা ছড়িয়ে ফেলছেন, সেদিকে খবরই নেই।

    সোজা কথা হল, কোন জনগোষ্ঠিকে নিজেদের মুক্তির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা পেতে হলে তাদের সশস্ত্রতাই একমাত্র উপায়।  তাই ক্ষমতা=সশস্ত্রতা। কাজেই এর উপর পর্দা টেনে দিয়ে লুকানোর কিছু নাই।  আমরাও তাই-ই করেছিলাম। ১৯০৫ সালে জমিদার-হিন্দুরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্রভাবেই খুনাখুনি শুরু করেছিল। এটা নাকি ছিল বিপ্লবীপনা! কিন্তু এমন বিপ্লবীপনা মুসলমানেরা করলে তা ‘জঙ্গী’। এই ভাষাবদলটা লক্ষণীয়! প্যালেস্টাইনিরা নাকি জঙ্গী।  এই হল জায়নবাদীসহ সব ধরনের জাতবাদী, জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং কমন ‘অসুখ’ ও অসুস্থতা।

    লক্ষ করেন হাতে অস্ত্র ধরা মানেই জঙ্গি – তা-ও চরম নেতিবাচক ও খারাপ জাতের লোক তারা! এই হল তাদের বিদ্বেষের মূল কথা। এর মানে, বাংলাদেশে আমরা খুবই খারাপ লোক ও খারাপ জাতের মানুষ তাহলে। কারণ আমরা তো একাত্তরে অস্ত্র হাতে নিয়েই যুদ্ধ করেছিলাম! সূক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলে মুসলমানবিদ্বেষী বা জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদীদের কারবার ধরতে পারা খুব কঠিন।

    “দুনিয়ার এই শিক্ষা
    নেয়া পরিবর্তনটা সম্পর্কে একেবারেই বেখবর আরেকটা
    বড় রাষ্ট্র- ভারত। সম্ভবত সে কারণেই কংগ্রেসের ‘ছুপা’
    হিন্দু নেশন-স্টেট পরে মোদির জন্য হিন্দুত্ববাদী ভারত,
    এই নেশন স্টেট হওয়ার জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে।
    এখন আসন্ন চীনা নতুন নেতৃত্বের দুনিয়া কি
    জায়নবাদসহ সব শ্রেষ্ঠত্ববাদকে কবর
    দিতে পারবে?”

    এক কথায় বললে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ঐ দুই পয়েন্টে, এতে জায়নবাদী মন ভীষণ বিপদ দেখেছে ও ভয় পেয়েছে। কারণ জন্ম থেকেই জায়নবাদকে ভিত্তি করে তৈরি করা ইসরাইলকে আমেরিকা সুরক্ষা দিয়ে গেছে। কখনোই জায়নবাদের গায়ে ফুলের টোকাও লাগতে দেয়নি। অথচ আমেরিকার দিন গিয়ে চীন উঠে আসছে ক্রমশ; যাতে, আমেরিকান কর্তৃত্ব যা এতদিন জায়নবাদকে প্রটেক্ট করে রেখেছিল, তা নিজেই ভেঙে পড়ছে। আর এতেও জায়নবাদ বা ইহুদিবাদ প্রমাদ গোনা শুরু করেছে। এ জন্যই তারা চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পছন্দ করেননি।

    কিন্তু সাবধান! এতক্ষণ বর্ণনা যেভাবে করা হয়েছে তাতে কি চীন আমাদের ত্রাতা, তাই চীনকে আমাদের ‘দেবতার আসনে’ বসাতে হবে? দয়া করে এই অর্থ করে কেউ আত্মঘাতী হবেন না। তাহলে, কিভাবে দেখব?

    অবশ্যই চীনের এই অবস্থান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এবং তা খুবই জরুরি আর তা তাদের জন্য এক বিরাট সুবাতাস আনার ইঙ্গিত। কিন্তু কোনোভাবেই এটা চীনের ফিলিস্তিনি ভালোবাসা অথবা চীন মহান, চীন অমুক তমুক বিশাল বীর- না। এসব করা অপ্রয়োজনীয়।অকারণ, এটা চীনের নিজের স্বার্থেই এটা তার অবস্থান; আর তা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে। এখানে ফিলিস্তিনিরা মজলুম না কোনো জুলুমবাজ সে বিচারের ভিত্তিতে এখানে চীন অবস্থান নিতে হয় নাই।

    ব্যাপারটা হল, আমেরিকা বনাম চীন, এই গ্লোবাল পুরান আর নতুন নেতার দ্বন্দ্বে চীন নিজের অবস্থান নিলে তাতে চীনের নিজেকে স্বাভাবিকভাবে দেখাতে হবে যে সে আমেরিকার চেয়ে বেটার।  আর এটা কী কোন নতুন কথা যে আমেরিকার বিরোধীদের সাথেই তো চীনের হাত মিলবে! আর এতে এতদিন ধরে যারা চাপা পড়ে থাকা সব কণ্ঠ ও জনগোষ্ঠী এই প্রথম ৭৫ বছর পরে তারা নতুন সম্ভাব্য পরিস্থিতির কারণে সুযোগ পাবেই, পরিস্থিতিটা সে চাক বা নাচেয়ে থাকুক – না চাইলেও তার পক্ষেই আসবে। আর এই সুযোগ তাকে বুদ্ধিমানের মতো উঠিয়ে নিতে হবে।

    কিন্তু তাই বলে চীন কি এতই খারাপ অথবা চীনের কোন ক্রেডিট নাই? যার কোনো ইতিবাচক নৈতিক অবস্থান একেবারেই নেই? না, এমন বলাটাও বিরাট অবিচার হবে। এখানে যে ইহুদি টেকনিক্যাল এক্সপার্ট DALE ALUF – তাঁর এক লেখার বরাতে অনেক কথা বলেছি, তিনি আসলে চীনের সাথে কাজ করা একজন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট। তিনি সাক্ষ্য দিয়ে লিখছেন, “ইসরাইল মাওয়ের বিপ্লবের আগেই, ১৯৪৮ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছে। তাই সে আগের চিয়াং কাইশেকের চীনকে এবং পরে আবার মাও সেতুংয়ের বিপ্লবের (১৯৪৯) চীনকেও স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও মাওসেতুং  ইসরাইলকে পালটা স্বীকৃতি দেননি। বরং সোভিয়েত সহায়তায় ইসরাইল বিরোধী যে আরব জোট তৈরি করা হয়েছিল সেসময় তাদেরকেই সাহায্য সমর্থন দিয়ে গেছেন। তবে, ১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরই কেবল চীন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাও এর কারণ ঐ এক্সপার্ট ব্যাখ্যা করছেন। তিনি বলছেন, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পরে, আর সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশ (১৯৮৯-৯৩) ১৯৯১ সালে ‘মাদ্রিদ সম্মেলন’ [The Madrid Conference, 1991] ডেকেছিলেন আরব-ইসরাইলের জন্য এবং ফিলিস্তিনি নেতাদেরকেও দাওয়াত দিয়ে সবাইকে হাতমিলিয়ে দেয়ার জন্য। মূলত এই কারণেই চীনের এর পরে ইসরাইলকে আর স্বীকৃতি না দিয়ে আটকে রাখা – একাজের পক্ষে চীনের হাতে কোনো কারণ ছিল না। তবে এরপরে আজও দুই দেশের সম্পর্ক কেবল অর্থনীতির ভেতরেই সীমাবদ্ধ, কোনো রাজনৈতিক দিকে যা গড়ায়নি। এমনকি ইসরাইল চীনের “বেল্ট-রোড প্রোগ্রামের” সদস্য হলেও নয়। অর্থাৎ সার কথায়, তার ঐ  লেখাটাকে বলা যায়  চীনকে বুঝিয়ে বলা ধরনের পারসুয়েসিভ। যদিও তার জায়নিস্ট রেসিজমের ইসলামবিদ্বেষ তিনি না আনলে তা অনেক ভাল হত!

    CGTN-এ কথোপকথনঃ
    উপরে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের দুটা পয়েন্ট উল্লেখ করে দেখিয়েছি; যা জায়নিস্টদের আঘাত করেছে। কিন্তু এসবের চেয়েও আরেক বড় আঘাতের আরেক পয়েন্ট তৈরি হয়েছিল যেটা তৈরি হয়েছিল চীনের সরকারি সিসিটিভি চ্যানেলের অধীনে পরিচালিত আরেক সরকারি টিভি নেটওয়ার্ক ‘সিজিটিএন’ [CGTN] টিভিতে। সেখানে এঙ্কর এক ব্যক্তির সাথে তার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। আমার করা সেটার বাংলা অনুবাদ অংশটা নিচে দিচ্ছি। তবে আমি বাংলা করছি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ছাপা হওয়া ভাষ্যটা থেকে।

    “গত ১৮ মে সিজিটিএন টিভিতে প্রচারের হোস্ট ছিলেন ঝেং জুনফেং। তিনি প্রশ্ন করেন, ইসরাইলকে আমেরিকার সমর্থন করে যাওয়া, এটা কি সত্যিকারের (পশ্চিমা) গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার উপরে দাঁড়ানো- বিষয়টাকে প্রশ্ন করে এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, আমেরিকার প্রো-ইসরাইলি এই পলিসি আসলে তৈরি হয়েছে ধনী আমেরিকান ইহুদিদের প্রভাবে এবং আমেরিকার বিদেশনীতি যারা তৈরি করেন তাদের ওপর ইহুদি লবির প্রভাবে”। এরপরে ঝেং আরো স্পষ্ট করে ইংরাজিতে বলেন, “আমেরিকার ফাইন্যান্স ও ইন্টারনেট সেক্টর ইহুদি আধিপত্যে আছে”। তাই অনেকে বলেন, শক্তিশালী লবি এখানে আছে, ‘এটা সম্ভব’!”

    এই হলো মোটামুটি মূল কথাগুলো। কিন্তু এতেই পিকিংয়ে ইসরাইলি দূতাবাস এবং ভারতসহ বহু দেশের পত্রিকা যারা ইসরাইলকে ফেভার করে বা ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত এমন দেশের বিভিন্ন মিডিয়া চীনকে ‘অ্যান্টি সেমেটিক’ বলে নিন্দার ঝড় তুলে ফেলেছিল।

    অ্যান্টি সেমেটিক মানে কীঃ
    এখন অ্যান্টি সেমেটিক মানে কী? প্রথমত এই শব্দটা তৈরিই হয়েছে জায়নিস্ট বিশেষ চোখ দিয়ে দেখে তৈরি কিছু শব্দ থেকে। আক্ষরিক অর্থে সেমেটিক মানে আভিধানিক অর্থে, হিব্রু, আরবি, আরামিক, আমহারিক ইত্যাদি ভাষা অথবা এই ভাষাগুলোর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কালচার – একে সেমেটিক ভাষা বা সেমেটিক কালচার বলা হয়। আরেক অর্থে বাইবেলে যেসব ভাষা বা কালচারের রেফারেন্স বা উল্লেখ আছে বা পাওয়া যায়, ‘সেমেটিক’ বলতে সে সবই বুঝায়।

    কিন্তু এটা তো সেমেটিক শব্দের সাধারণ অর্থ। তবে এটাকেই জায়নবাদীরা আরেক বিশেষ মানে দিয়েছে শুধু তাই না সেটা আর সবাইকে সেই মানে মানতে বাধ্য করতে চায়। তাদের সে মূলকথা হল, যেন আমি ভিকটিম; অতএব আমাকে বিশেষ খাতির করো। এই দাবি করা।

    আমেরিকান সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা মোদির হিন্দুত্ববাদ যেমন- এ রকম এরা সবাই বাদে সবাই জার্মানির হিটলারকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জাতিবাদী, শ্রেষ্ঠত্ববাদী, রেসিজমের নায়ক মনে করে। কারণ তিনি জার্মান নীল চোখের আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ববাদের অধীনে সবাইকে নিতে চেয়েছিলেন। আর এতে সবচেয়ে বেশি হিংসা ও আর ঘৃণার চর্চা তিনি করেছেন জার্মানি ইহুদিদের ওপর। গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারাসহ সম্ভবত সব ধরণের নৃশংসতা, গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করাসহ সব।

    এছাড়া বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের যেসব দেশে ইহুদিরা বাস করত সেসব দেশে হিটলার বা তার যুদ্ধজোট লড়তে গেলে সেখানেই ইহুদিরা নৃশংসভাবে খুন হয়ে গেছে। তাই এতে এক বড় স্বাভাবিক  প্রতিক্রিয়া হল, আমরা ভিকটিম।  কিন্তু পরবর্তিতে এই দাবি বা এই সহানুভূতিকে অস্ত্র হিসেবে পাল্টা সবার উপর ব্যবহারের প্রচেষ্টা হয়েছে। এই হল ভিকটিমহুড।  মানে তৈরি সহানুভুতিকে বিক্রি করে সুবিধা আদায় – ফয়দা বের করা।

    কিন্তু  জায়নবাদের ক্ষেত্রে এরই পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। হিটলার যে কারণে শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিভিন্ন দেশের ইহুদিরা ইসরাইলে জড়ো হয়ে সেটাই এবার তারা রপ্ত করেছে, এটাই জায়নবাদিতা।

    তবে এটা অরিজিনালি সরাসরি হিটলারকে কপি করতে তারা গিয়েছিল ঠিক তা নয়।  বরং যখন তারা আবার উঠে দাঁড়ানোর জন্য বর্তমান রাষ্ট্রে জড়ো হয় – এবার তারা ভিকটিম, এই সহানুভূতি বিক্রি করে দাঁড়াতে চাইল তখনই সেটাই আরো ভয়াবহ এক হিটলারি চিন্তা – এই প্রতিহিংসাটাই তাদেরকে পেয়ে বসেছিল। এই পা পিছলানো তাদের সীমাহীন ক্ষতি করেছে। কামনা করব তারা এটা দ্রুত রিয়েলাইজ করবে। দুনিয়াকে মুক্তি দিবে!

    তাদের পা পিছলানো কাজের মূল দিকটা হল, এই ভুল ভাবনা যে  আবার উঠে দাঁড়াতে চাইলে তাদেরকে- ১. ভিকটিমহুড বিক্রি করতে জানতে হবে; ২. অন্য সব জাতি-জনগোষ্ঠীর ওপরে চড়ে তাদের শাসন মানাতে হবে, কারণ তারা ভিকটিম।
    আরো আছে। এবার এর সাথে তাদের প্রত্যেকের মনে চাপা পড়ে থাকা হিটলারি নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার আগ্রহ যা বিভিন্ন সময় জেগেছিল সেসবকে তারা প্রশ্রয় দেয়া শুরু করেছিল। ব্যতিক্রম বা সচেতন যারা তাদের কথা বাদ দিলে মূলত তারাই জায়নবাদী – যারা হিটলারের আরেক কপি যা অবচেতনে তারা হয়ে উঠেছিল প্রতিহিংসার নেশায়। তারা জানত এটা খারাপ কাজ ভুল রাস্তা। কিন্তু তবু মনকে তারা সান্ত্বনা দিয়েছিল সম্ভবত এই বলে যে বিরূপ দুনিয়ায় আবার টিকে, বেঁচে উঠতে গেলে তাদের এমন নিষ্ঠুর আরেক -হিটলার কপি হয়ে উঠতে হবেই। তাই কী করা… আর সে কারণে যে  হিটলারিজমের শিকার ইহুদিদের প্রতি  সহানুভূতি দেখাতে আসবে তাকেও তারা বধ করবে, শিকার বানিয়ে ফেলবে।

    এ কারণে তাদের কেউ যদি ইহুদি বলে (যেমন মুসলমানকে কেউ বা সে নিজেও অবলীলায় ‘মুসলমান’ বলেই ডাকে) তবে সে ক্ষেত্রে সে মনে করবে যে, এটা হিটলার মনোভাব যেভাবে তিনি তাদের ‘ঘৃণার মুডে’ ইহুদি বলে ডেকেছিল, এটা তাই। কাজেই একালে হলেও তারাও ইহুদিদেরকে ‘নীচা’ দেখানো লোক। অথচ ব্যাপারটা মোটেও তা নয়।  কিন্তু কী অভিযোগ দেবে, যে ওরা আমাকে “ইহুদি” বলেছে? না এটা ভালো জমবে না। তাই এক অদ্ভুত শব্দ চালু করে যে, আমাকে ‘সেমেটিক’ বলেছে। যেখানে তাদের বানানো বিশেষ অর্থ সেমেটিক=ইহুদি এবং তা খুবই নিচা অর্থ তা বুঝতে হবে।

    এখন যদিও সেমেটিক কোনো খারাপ বা নেতিবাচক শব্দই নয়। আর সেমেটিক বলতে আরবদেরও তো বুঝায়। ইথিওপিয়ান আমহারা প্রদেশের আমহারিক, এদেরকেও বুঝায়। কেবল ইহুদিদের একচেটিয়া নয়। তবু এটাই জিদ করে মানে যে, ইহুদি = সেমেটিক, আর সেমেটিক মানে যেন কেবল ইহুদিদের জন্য এই অর্থ চালু করা হয়েছে। এটাই আসলে যে সহানুভূতি দেখাতে আসবে তাকেও তারা অভিযুক্ত করার কৌশল চালু করে। আর সাফাইটা হলো, তাদের বাঁচতে হবে তো! অন্য কেউ তো তাদের দেখবে না।

    তাহলে বলতে হয়, হিটলার তো মুসলমান ছিল না, দুরতম অর্থও নাই। অথচ ইউরোপ বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইহুদিদেরকে কৌশলে মুসলমানদের ওপর ডাম্প করে দিলে তখন নিস্পেষিত ইহুদিরা বুঝে যায় এই মুসলমানেরা কোনভাবেই দায়ী না হলেও মুসলমানদের দাবড়েই তাদের নিজেকে টিকে থাকতে হবে। ফলে একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় হিটলারি চিন্তা লোপ করতে  এবং তা রোধ করতে দুনিয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন তৈরি করা হয়েছে। অথচ  ততই যেন জায়নবাদী চিন্তা পাল্লা দিয়ে তারা পুরানা হিটলারি শ্রেষ্ঠত্ববাদ চুন্তাকেই আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়াতে চেয়েছে।

    সবচেয়ে খারাপ কাজটা হল, জায়নবাদ বুঝেই নাই যে, সারা ইউরোপ এক হিটলারের কারণে তা যেন ফিরে নিজ নিজ দেশে কোথায় না জাগে, তাই তারা পুরানা তাদের সবদেশের ‘নেশন স্টেট’-এর কাঠামো ভেঙে দিয়ে, অধিকারভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছিল, একসাথে এক সম্মেলনের [Council of Europe] মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে। অথচ দুনিয়ার এই শিক্ষা নেয়া পরিবর্তনটা সম্পর্কে একেবারেই বেখবর আরেকটা বড় রাষ্ট্র হল ভারত। সম্ভবত সে কারণেই কংগ্রেসের ‘ছুপা’ হিন্দু নেশন-স্টেট পরে মোদীর জন্য হিন্দুত্ববাদী ভারত, এটা এমন এই নেশন স্টেট হওয়ার জন্যই আরো উপযোগী হয়ে উঠেছে। এখন আসন্ন চীনা নতুন নেতৃত্বের দুনিয়া কি জায়নবাদসহ সব শ্রেষ্ঠত্ববাদকে কবর দিতে পারবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২২ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “‘সেমেটিক’ বলে ভয় দেখানো জায়নবাদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে আর  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলোর এমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা বুঝবার তরিকা

    প্রথম আলোর এমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা বুঝবার তরিকা

    গৌতম দাস

    ১৯ মে ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3y8

    সোমবার ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে বৈঠকে টিকা নিয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ছবি: পিআইডি

     

    “গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার” – এই শিরোনামে আমি আমার গত লেখায় – “এম্পায়ার” [empire] বলে একটা ধারণা এনেছিলাম। পাঠকের বুঝাবুঝিতে তা ছুতে কতদুর পেরেছি জানি না। তবে ধারণাটা গুরুত্বপুর্ণ। বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকে আমি আমার প্রায় সব লেখাতেই “গ্লোবাল নেতা” বলে একটা ধারণা ব্যবহার করেছি। তা বুঝাতে কখনও “গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা” বা কখনও “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা” বলে শব্দ ব্যবহার করেছি। “গ্লোবাল এম্পায়ার” ধারণাটা সেই সংশ্লিষ্ট তবে আরেক অফসুট ধারণা।

    নিউইয়র্ক থেকে পাঠানো প্রথম আলো গত পরশু একটা রিপোর্ট ছেপেছে শিরোনাম, “টিকা কূটনীতিতে পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র”। আসেন একটু সে খবর পাঠ করতেও শিখি।

    রিপোর্ট শুরুতেই কয়েকটা বাক্য লিখেছে, “টিকায় সহযোগিতার মাধ্যমে রাশিয়া ও চীন আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে টিকা সরবরাহ নিয়ে মার্কিন সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফলে কূটনৈতিক মহলে হতাশা বিরাজ করছে।
    ৪৮টির বেশি দেশ টিকা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি আবেদন জানিয়েছে। বাইডেন প্রশাসন কীভাবে টিকা সরবরাহ করবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি”।

    আসলে এটাই সাত কথার এক কথা যে আমেরিকা আর “গ্লোবাল এম্পায়ার” নাই, ঢলে পড়ছে। মূলত সেকারণেই কারও টিকার চাহিদা মিটানোতে দান-অনুদান দেয়া দূরে থাক একটা সেন্টাল ম্যানেজমেন্টে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর টিকা পাবার ব্যবস্থা করার মুরোদও বাইডেনের নাই, তাই তিনি লেস বা নট ইন্টারেস্টেড।  এখন উলটা করে বললে, এই সেন্টাল ম্যানেজমেন্টে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর টিকা পাবার ব্যবস্থা করার মুরোদ যার থাকে সেই ঐকালের ‘গ্লোবাল এম্পায়ার’। অর্থাৎ মূলত এক গ্লোবাল বাণিজ্য (বাণিজ্য মানেই সেই সুত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, স্ট্রাটেজিক সবকিছু) ব্যবস্থাপনার যিনি নেতা তারই বেনোভোলেন্ট (গরীব প্রজা দেখেশুনে রাখার মত) বা লিল্লাহ-দাতব্য কাজ এগুলো। এটাকেই আমি বলেছি, ইতিবাচক এম্পায়ার ভুমিকা।

    আরেকটা উদাহরণ দেই। গত পরশু ঢাকার আমেরিকান রাষ্টদুত আমাদের প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুতে অ্যামেরিকার যা বার্ষিক চাঁদাদান করার কথা সেই প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের ফরেন মিনিস্ট্রির ফেসবুক পেজ থেকে জানা যাচ্ছে রাষ্ট্রদুত মিলার জানিয়েছেন্‌, “He also informed that the US Government is exploring the possibilities to produce US vaccines in Bangladeshi pharmaceutical companies”.

    নিঃসন্দেহে খুবই ক্যালকুলেটিভ কথাবার্তা। মানে আমেরিকান প্রাইভেট টিকা উতপাদক কোম্পানির সাথে ্কথা বলে দেখবেন, বাংলাদেশে টিকা উতপাদন নিয়ে কথা বলায় দেয়া যায় কিনা। আবার আসলে ঠিক সেটাও না বরং এর সম্ভাবনা যাচাই করে দেখবেন তিনি।

    যদিও এখানে বলে রাখা ভাল আমেরিকান টিকা – এদের দাম ২০ থেকে ৩৩ ডলারের মধ্যে। আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা (-১৫) থেকে (-৮০) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। যেখানে গরিব গোত্রের টিকাগুলোর প্রায় সবই ৪ ডলারের নিচে আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। ফলে যেখানে নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা বিচারে বাংলাদেশে টিকা বিতরণ করতে হবে বিনা পয়সায় সেখানে ৪ ডলারের উপর প্রতিটা ডলারের মুল্যের পীড়ন সইতে সরকারের অবস্থা খারাপ হবে তা বলাই বাহুল্য। আর ঐ তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণ যখন দেশের তাপমাত্রা এখন ৪০ ডিগ্রী ছুতে চায় তখন ঐ টিকা বহন করে গ্রাম-মফস্বলে ঘুরে বেড়ানো এটা প্রায় অবাস্তব।

    তবু এটাকে একটা বিরাট সম্ভাবনা যেন এই ভাব ধরে মিলারের ঐদুই কথা নিয়ে প্রথম আলো একটা রিপোর্ট করেছে, “যুক্তরাষ্ট্রের টিকা নিয়ে ‘দু–এক দিনের মধ্যে’ জবাব আসছে”। অর্থাত যেন এই এলো বলে আর চিন্তা নাই। অথচ টিকা আসবে না, কথা আগানো সম্ভব কিনা সেই খবর আসবে।

    গত প্রায় ১৫ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমেরিকান ফরেন পলিসির এজেন্ট অবস্থান নিয়ে চলতে চাইছে প্রথম আলো।  এখন কেউ এমন নিতে চাইলে আর আমাদের কী করার আছে। ফলে টিকা ইস্যুতে প্রথম আলোর এমন অবস্থান হয়ত অসংগত না, হবেই। কিন্তু নিশ্চয় জবরদস্তিতে আমেরিকাকে একটা বিকল্প উতস বলে চালায় দেয়া এটা কোন কাজের কথা নয়। যা সম্ভব নয়, অবাস্তব এবং আমেরিকাও ইঙ্গিত দিচ্ছে না আগ্রহী নয় তা নিয়ে আগাম আশাবাদ তৈরি করা কী ঠিক! এই বিবেচনাবোধের অভাব লক্ষ্য করছি যেন এখানে আমরা।

    এখন কথা আসলে আরেকটু আগায়ে যেতে পারি আমরা।
    প্রথম আলোর নিউইয়র্কের রিপোর্টারের সিদ্ধান্ত হল, “আমেরিকা টিকা কূটনীতিতেই পিছিয়ে” পড়েছে। মানে আর  তারা এম্পায়ার নাই। লিখেছে, “শুধু বাংলাদেশই না আরো প্রায় ৪৮ টা রাষ্ট্রের অবস্থা এরকম যাদের আমেরিকা হতাশ করেছে”।  বলেছে, যেখানে “রাশিয়া ও চীন আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে”।

    এই কথাগুলো বুঝবার জন্য যথেষ্ট যদি আপনি মানে করতে জানেন। এগুলোই আসলে গ্লোবাল এম্পায়ার ভুমিকা কী তা নিয়ে কথা বলা। এদিকে যেমন আমরা আমেরিকার গ্লোবাল অযোগ্যতা অপারগতা তৈরি হতে ও হেরে যেতে দেখছি। আর  পালটা চীন যে (এটা কেবল টিকা উতপাদনের ক্ষেত্রে) রাশিয়াকে সাথে নিয়ে গ্লোবাল এম্পায়ার ভুমিকায় তৈরি হওয়া গ্যাপটা পূরণ করতে ধেয়ে আসছে, নিজেকে তৈরি করে নিয়ে – এই হল গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল।

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল মানেই তাই গ্লোবাল এম্পায়ারের ভুমিকাতেও পালাবদল ঘটে যাওয়া। একদিকে ক্রমশ অপারগ আমেরিকা আর অন্যদিকে উত্থিত ও তৈরি চীন, এই ফেনোমেনা।

    এখানে প্রথম আলো চীন না আমেরিকা কাকে পছন্দ করে এটা সেই বিষয়ই না একেবারেই। বরং যে যোগ্য মুরোদ আছে সেই উঠে আসতেছে, এটাই অবজেকটিভ ঘটনা।

    অর্থাৎ প্রথম আলো আমেরিকান এজেন্সি নিবে কেন কারণ সে তাকে ভালবাসে। অর্থাৎ বুদ্ধি খাটিয়ে বুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত না এটা। একটা অবজেকটিভ ফেনমেনাকে আমল করে নেয়া নয়।কর্তা হিসাবে তার ভাল লেগেছে তাই।

    এমনকি নিউইয়র্কের ইর্বাহীম চৌধুরি যা বুঝে খবরটা দিয়েছেন। পরিস্কার করে বলছেন যে আমেরিকা “টিকা কূটনীতিতেই” নাই। এই টিকা কূটনীতি এটা যদিও ভুল শব্দ। কিন্তু এরই আসল অর্থ হল, গ্লোবাল এম্পায়রের ভুমিকা পালন করে যাওয়ার মুরোদ। ইর্বাহীম বাস্তবতা দেখে যে রায় দিচ্ছে  প্রথম আলোই সেই রিপোর্ট ছেপে দিচ্ছে কিন্তু নিজেই এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে পারছে না। এই হল প্রথম আলোর বুঝার মুরোদের সমস্যা বা শর্টেজ। এজন্যই আমেরিকা সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত ভালবাসা দিয়ে, বুদ্ধি-চিন্তার যেখানে ভুমিকা নাই।
    অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়ার বুঝলে অনেক কিছু বুঝা সহজ হয়ে যায়।

    আর এখানেই পরিস্কার কেন চীনা টিকা আমাদের গন্তব্য হয়ে যাচ্ছে।  আমাদের দেশে টিকা উতপাদনের ব্যবস্থা করে দেয়া চীনের জন্য  সেটা বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি সহ সব অর্থেই – এই ভুমিকা নেওয়ার জন্য সে তৈরি। এজন্য চীন আসন্ন গ্লোবাল এম্পায়ার!

  • গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার

    গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার

    গৌতম দাস

    ১৭ মে ২০২১, ২২:১৯, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3xu

     

    চীন না আমেরিকা, আমাদের জন্য কে ভাল বা আমাদের কার পক্ষে থাকা উচিত বা আমার কাকে পছন্দ – এনিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত আগ্রহ, লাভালাভ অথবা ভালো-মন্দ বিচারবোধ থাকতে পারে। কিন্তু এটা ব্যক্তিগত বা সাবজেকটিভ [subjective] বোধবিচার। কিন্তু এই ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ [objective] ভাবে  বিচার ও বুঝতে হবে, মানে সাবজেক্ট বা কর্তাসত্বা ভাবে নয়।  কর্তা-মানুষের কাকে পছন্দ সে ভিত্তিতে ও দিক থেকে বিচার করে নয়।  একটা ঘুর্ণিঝড় যেমন বাংলাদেশে কখন  ও কোথায় আঘাত হানবে তা মানুষ জানে না। মানুষের হাতে তা নির্ধারিতও না।  এমন ঘটনাগুলোকে অবজেকটিভ ঘটনা বলে। মানে সাবজেক্ট এর ইচ্ছার ভিত্তিতে না। আমাদের ইচ্ছার বাইরে প্রাকৃতিক ঘটনা দিয়ে বুঝতে হবে।

    গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীন বা আমেরিকার নেতৃত্ব অবস্থান কী হবে তা কোথায় দাড়াবে সেটা তাদের নিজেদের নেয়া স্ব স্ব নীতি-পলিসি অবশ্যই দায়ী। তবুও ব্যাপারটা এমন না যে আমেরিকা নিজের নেতৃত্ব অবস্থান ফাইনালি কী হবে কতটা স্থান কী ধরে রাখতে পারবে সেটা আমেরিকা চাইলেই রক্ষা করে ধরে রাখতে পারে। আবার চীন চাইলেই আমেরিকাকে নেতার অবস্থান থেকে ফেলে দিতে পারে তাও না। কারণ সবদেশেরই নীতি-পলিসি যাই নেয়া হোক না কেন এসবের বাইরে কিছু অবজেকটিভ ঘটনা উপাদান থেকেই যাবে যার প্রভাবে ফাইনালি সবকিছু নির্ধারিত হয় ও হবে যে কোন দেশের নেতাগিরি কতদিন ধরে সে ধরে রাখতে পারব আর কে নতুন উঠে আসবে। এই কারণে আমরা চীন বা আমেরিকা কাকে আমরা পছন্দ করব সেটা না। বরং  চীন বা আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব অবস্থান কতটা ধরে রাখবে বা পারবে তা নির্ধারণ হয় সেসব অবজেকটিভ ফ্যাক্টর দিয়ে সেগুলোকে আমলে নিতে ও খেয়াল করতে হতে হবে।  তাই আমরা চীন পছন্দ করি নাকি আমেরিকা এই ভিত্তিতে কোন একটার পক্ষে ঝাপিয়ে পড়ার মানে হবে না। তবে স্বভাবতই কেউ যদি নিজেকে ভাড়াটে বা দালাল হিসাবে কারও পক্ষে নামতে চায় সেটা অন্য আলাপ আর তা তো ঠেকানো যাবে না।
    তবে এ’প্রসঙ্গে বাংলায় “ভগ্নদুত” বলে একটা শব্দের সাথে পরিচিত  করে দেয়া যাক।  রাজার আমলে কোন যুদ্ধে  পরাজয়ের খবর তো কাউকে না কাউকে বয়ে রাজধানীতে রাজার কাছে আনতেই হয়, হত। যে বয়ে আনে তাকে বাংলায় “ভগ্নদুত” বলে। পরাজয়ের খবরের বাহক বলে। কিন্তু রাজাসহ  প্রায়ই মানুষ যা ভুল করে বসে তা হল  যেন ভগ্নদুতই যুদ্ধে রাজার পরাজয়ের জন্য দায়ী!  অথচ তা একেবারেই নয়। অনেকটা টিভি রেডিও তে যখন কোন আবহাওয়াবিদ এসে বিশাল দুর্যোগের পুর্বাভাস দেয় আর আমাদের শ্রোতাদের কেউ কেউ যখন ভেবে বসে ঐ দুর্যোগটাই নিশ্চয় ঐ আবহাওয়াবিদের তৈরি বা বানানো! কাজেই আবহাওয়াবিদকে গালমন্দ শুরু করে, এটা সেরকম! তবু ইতিহাসে ভগ্নদুতেরা অনেকেই খুন হয়েছেন রাজার ক্ষোভে!

    কাজেই দেশে প্রো-আমেরিকান বা প্রো-ইন্ডিয়ানদের চোখে আমি ভগ্নদুত অবশ্যই। তাদের চোখে আমি যেহেতু গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা প্রায়শই তুলি ও বলি পুর্বাভাস দেই; আবার বলি যে অ্যামেরিকার পতন আর চীনের উত্থানের কথার নানান দিক…। যদিও আমি পুর্বাভাস দাতা, নেহাতই  এক পলিটিক্যাল এনালিস্ট মাত্র।

    আবার যেমন দেখেন আমি আমেরিকাকে হয়ত পছন্দ করি না তাই অ্যামেরিকার নেতৃত্ব হারাচ্ছে তা বলি এমন তো নয়। বরং নেতৃত্ব বা সক্ষমতা  হারানো এগুলোই তো অবজেকটিভ ফ্যাক্টস।  আর এর চেয়েও বড় কথা এই ফ্যাক্টস বা রিপোর্টগুলোর ৯০ ভাগ হল আমেরিকারই সরকারি স্টাডি গবেষণায় পাওয়া  ও তাদেরই প্রকাশিত রিপোর্ট। কারণ আমেরিকান খোলা সমাজের কিছু সুবিধা তো আছেই, সেগুলো সহজেই পাওয়া যায়। আর চীনের সরকারি তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়।  যেটুকু পাওয়া যায় তা হংকং-কেন্দ্রিক বিভিন্ন ওপেন মিডিয়া। যা পশ্চিমা মিডিয়ার বিরুদ্ধে নিজেরা আগেই নতুন গ্লোবাল জগতে নাম কামিয়ে বসে পরতে চাইছে এরা।

    কাজেই বাংলাদেশে বসে চীন বা আমেরিকানদের নীতির বিচার করতে হবে আমাদের আর তা অবশ্যই অবজেকটিভ চোখে, আমরা কাকে পছন্দ করি সে ভিত্তিতে একেবারেই নয়। একমাত্র তবেই আমরা চীন-আমেরিকা নিয়ে বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সহজ সমাধান পাওয়া যেতে পারি।  আর যারা নিজেকে ভাড়াটে বা দালাল হিসাবে কারও পক্ষে নামতে চায়, তাদের নিয়ে এখানে বলার কী আছে!

     গরিব-বড়লোকের  টিকা বলে ভাগঃ
    করোনার টিকা জিনিসটা শেষ পর্যন্ত গরিব-বড়লোকের টিকা হয়েই হাজির হয়ে গেল। আবার একই সাথে তা গ্লোবালি এক ভুয়া এম্পায়ার আর উপযুক্ত এম্পায়ারের দাবি হিসাবে হাজির হয়ে গেল।

    গরিব-বড়লোকের টিকা বলতে সবমিলিয়ে দুনিয়ায় ব্যবহৃত টিকাগুলো হল, একদিকে ফাইজার [Pfizer], মর্ডানা [Moderna] আর জনসন [J&J]। অন্যদিকে – এস্টোজেনিকা [Oxford-AstraZeneca] , সিনোভ্যাক, Sinovac, সিনোফার্মা [Sinopharm], স্পুটনিক [Sputnik V] , কোভ্যাক্সিন [Covaxin] ইত্যাদি।

    এর মধ্যে প্রথম তিনটা – মানে ফাইজার, মর্ডানা, জনসন হল বড়লোকের টিকা। কারণ এর দাম অনেক বেশি আর এর চেয়েও বড় কথা হল এর সংরক্ষণের তাপমাত্রা আমাদের মত দেশে বজায় রাখা খুবই কঠিন। এদের দাম ২০ থেকে ৩৩ ডলারের মধ্যে। আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা (-১৫) থেকে (-৮০) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। যেখানে গরিব গোত্রের টিকাগুলোর প্রায় সবই ৪ ডলারের নিচে আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।
    সাধারণের বুঝার ভাষায় বললে, বাসায় আমরা যে ধরণের কমন ফ্রিজ ব্যবহার করি (ডিপফ্রিজ না) সেটাই গরীবের ভ্যাকসিনগুলো সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট। আর বড়লোকের ভ্যাকসিন আমাদের মত দেশে যেখানে গরমের সময় তাপমাত্রা +৪০ ডিগ্রি[] পর্যন্ত উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা সেখানে সংরক্ষণ কঠিন। তাই বড়লোকের কোন ভ্যাকসিন আমরা বিনা-পয়সায় পেলেও তা ঢাকাতেই ব্যবহার প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। [এখানে ভ্যাকসিন বিষয়ে তথ্যগুলো বিবিসি বাংলার ১০ এপ্রিলের আর ১৪ জানুয়ারির দুটি রিপোর্ট থেকে নেয়া ]।
    তাহলে এটা পরিস্কার যে, আমাদের মত দেশকে এস্টোজেনিকা, সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা, স্পুটনিক, কোভ্যাক্সিন – এসব গরীবদের টিকার মধ্যেই থাকতে হবে। এর মধ্যে এস্টোজেনিকা যুক্তরাজ্যে আবিস্কার হলেও এর ফর্মুলা ভারতে এনে তৈরির ফলে এর সস্তা ভার্সান কোভিশিল্ড পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশকে বিক্রি করেছিল ভারত এবং এজন্য তারা আগাম বিনিয়োগ হিসাবে টাকা নিয়েও এখন আর টিকা দিচ্ছে না। আগামিতেও দেয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
    এখানে স্বভাবতই ভারতে উতপাদিত এস্টোজেনিকা [Oxford-AstraZeneca] অথবা কোভ্যাক্সিন [Covaxin] কে প্রাপ্যতার তালিকা থেকে বাইরে রাখতে হল কারণ ভারতের পক্ষে বিদেশে কাউকে  টিকা সাপ্লাই অসম্ভব। এখন তারা উলটা বাইরে থেকে টিকা আনার প্রচেষ্টা শুরু করেছে।

    এরপরে,  সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা এ’দুই টিকা চীনের তৈরি। দুটোই  হু-এর [WHO] নোটিশ বোর্ডে ৭৮-৯০% পর্যন্ত কার্যকর দেখা যায়। যার মধ্যে সিনোভ্যাক এর কার্যকারিতা পরে ব্রাজিলে কমে গিয়ে ৫০.৪% হয়েছিল দেখা গেছে, তবে ব্লুমবার্গ ইন্দোনেশিয়ায় দেখা গেছে ফলাফল ৯৪-৯৮%, চিলিতে ৬৭% কার্যকারিতার কথা জানায়। আর সিনোফার্মা [WHO] হু-এর তালিকায় ৭৯% কার্যকর হিসাবে উল্লেখ আছে এখনো। আবার, ল্যানসেটে রাশিয়ান স্পুটনিক এখনো ৯১% কার্যকর বলে উল্লেখ রয়েছে।
    খারাপ খবর হল ভারতের অপর টিকা কোভ্যাক্সিন ৭৮% পর্যন্ত কার্যকর দেখালেও এটা তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শেষ হবার আগেই বাজারজাত শুরু করেছে বলে অভিযোগ আছে বিবিসির রিপোর্টে। দেখেন [What was the controversy around Covaxin?] এই শিরোনামের অংশটা পড়তে পারেন।

    তার মানে দাঁড়ালো দুনিয়াতে অন্য যত ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়ে থাকুক না কেন, বাংলাদেশের জন্য “পাওয়া সম্ভব” এবং “উপযুক্ত” ভ্যাকসিন বলতে বাকি থাকল চীনা সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা (এটা বেশি উপযুক্ত) আর রাশিয়ান স্পুটনিক।

    এদিকে আবার ‘পাওয়া সম্ভব’ আর ‘উপযুক্ত’ হলেও আরো কথা আছে। তা হল, কিনতে আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ আছে কিনা? কতটুকু? এছাড়া যদি নিজে দেশে উৎপাদন করে নিতে হয় সে মুরোদ (বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি) কতটা? এসব ক্ষেত্রে তাহলে কী হবে? সে প্রসঙ্গের আগে একটা কথা।

    এম্পায়ার (empire):
    এম্পায়ার (empire) ধারণাটা এ প্রসঙ্গে বুঝা জরুরি। ইংরাজিতে এম্পায়ার (empire) বলে একটা শব্দ আছে যার মূল বা রুট অর্থ হল  – এক বিরাট ভুখণ্ড বা কয়েকটা দেশজুড়ে ভুখণ্ড তবে যা কোন একক শাসকের অধীনে পরিচালিত। বাংলায় এটাকেই আমরা ‘সাম্রাজ্য’ শব্দ দিয়ে চিনি। তবে এই শব্দ দিয়ে যেমন অটোমান সাম্রাজ্য (১২৯৯-১৯১৮) থেকে শুরু করে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্য (১৭২১-১৯১৭), ব্রিটিশ সাম্রাজ্য (১৬০০-১৯৪৫) ইত্যাদি চিহ্নিত করার পাশাপাশি অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা আজকের আমেরিকাকে (১৯৪২-চলমান) ‘সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা’ বলে থাকে। যেখানে সাম্রাজ্য শব্দের সবখানেই মুল কমন বৈশিষ্ট্য বা মানে হল, কয়েকটা দেশজুড়ে বা বিরাট ভুখণ্ড যাতে পরিচালিত হয় একক শাসন কর্তৃত্বে। যদিও কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদ মানে এসবের উপরে আরো অনেক কিছু। আমাদের মত দেশে ক্যাপিটালিজম আর স্বাধীন মত হবে না; যারা আগে যেসব দেশ ক্যাপিটালিজম স্বাধীনভাবে বিস্তার করে নিবার সুযোগ নিয়েছে তাদের বাধার কারণে  – ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। তবে ১৯৪২ সালের পর থেকে দুনিয়ায় সাম্রাজ্য বলতে কমন ধারণাটায় বদল আসতে থাকে। জাতিসংঘ জন্ম নিবার পরের জমানায় পুরান সাম্রাজ্যগুলোর কেউ নিজেকেই আর সাম্রাজ্য বলে দাবি করে না বা ডাকে না। কেবল কমিউনিস্ট নথিপত্রে আভ্যন্তরীণভাবে আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী ডাকার দলিল থাকতে পারে।   বর্তমানে কেউ অন্তত আর সরাসরি অন্য দেশ গিয়ে বসে সাম্রাজ্য (বা সাম্রাজ্যবাদী) শাসক বলে দাবি করে উপস্থিত হয়ে শাসন করা বন্ধ হতে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন রাজনৈতিক ভিত্তির উপরেই লড়া হয়েছিল তাই।
    যেমন ১৯৪২ সালের (জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা ১জানুয়ারি ১৯৪২) আগের শাসনগুলো ছিল মূলত কলোনি-দখলি শাসন আর ওদেশের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ব সম্পদ ওদেশ থেকে লুট করে শাসকের দেশে পাচার করা বুঝাত। ১৯৪২ এর পর থেকে বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পর সেই সুযোগই আর বাস্তবে থাকেনি। কারণ কলোনি- দখলি শাসন আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
    তবে ১৯৪৫ সালের পরে মূলত প্রত্যেকটা দেশ কলোনিমুক্ত ইন্ডেপেন্ডেন্ট  স্বাধীন রাষ্ট্র ধরে নিয়ে তাদের পরস্পরের মধ্যে দুনিয়াজুড়ে এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যেটা একেবারেই নতুন এক দুনিয়া তৈরি করে আর এরই এক “গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার” বা নিয়ম শৃঙ্খলা চালু হয়েছিল। এটা আমেরিকার নেতৃত্বেই চালু হয়েছিল এবং এখনও আছে প্রায় ৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকার নেতৃত্বে আধিপত্য কিন্তু এখন যা আবার ঢলে পড়ার শেষের দিকে। কারণ আমেরিকার হারানো প্রভাবের জায়গা দখল করার উপযুক্ত হয়ে উঠে আসছে চীন।
    সে যাক, কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরের আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে গরিব দেশগুলো কলোনিমুক্ত অর্থে স্বাধীন হয়ে যায় বটে কিন্তু নিজ নিজ অর্থনীতি কার্যকরভাবে চালানোর উপযুক্ত অর্থে স্বাধীনভাবে তারা টিকে থাকতে পারছিল না। যোগ্য ছিল না। এর মূল কারণ, আগের দু’শ’ বছর ধরে যেমন বাংলাদেশের মত দেশ থেকে এমন সম্পদ লুট আর পাচার হয়েছে যে তার কিছু অংশ অন্তত কোনো শর্তে আবার ফিরিয়ে না আনতে পারলে এসব স্বাধীন দেশ  অর্থনীতি জাগবে না; বরং না খেয়ে মরার অর্থনৈতিক দশায় পড়েছিল।  সেসব শর্তেরই সাধারণ দিক হল কিছু সুদে আগের পাচার হওয়া অর্থই যেন ফেরত এনেছিলাম আমরা। আমরা একা নই এটাই নতুন গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার। এছাড়া আমরা যতটুকু তাদের / আমাদের জন্য অর্থনৈতিক ভাবে সচল হব যতটা তাদের পণ্য ও বিনিয়োগ কিনতে চাহিদা তৈরি হবে ততটাই তাদেরও বিরাট লাভ।  ফলে আমাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ তাদেরও বা তাদেরই কম ছিল না। আর এ কাজেই ওসব অনুদান বা প্রায় না সুদের ঋণের আয়োজন। আর এতে প্রধান ও প্রায় একক বিরাট ভূমিকা রেখে এসেছে আমেরিকা।

    গ্লোবাল এম্পায়ার আমেরিকাঃ
    আমেরিকার এই ভূমিকাটা্র একটা মন্দের ভাল দিক আছে। ফলে আমরা একে মন্দের ভাল বলতে পারি। তবে কথাটাকে এভাবে বলতে হবে যে, এটা গরিব দেশকে সাহায্য করতে, তাদের একটা ভায়াবল অর্থনীতির গড়ে দিবার জন্য করা আমেরিকান বিনিয়োগ – না ঠিক এতটুকু তা নয়। এটা উলটা, মূলত আমেরিকার হাতে জমে যাওয়া বিনিয়োগহীন বিপুল উদ্বৃত্ব সম্পদের হিল্লা করার জন্য, গরিব দেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বের করা হয়েছিল। আর সেটা করতে গিয়ে আগে গরীব দেকে মুক্তি আর এরপর প্রায় না সুদে বা অনুদানে (আসলও ফেরত দিতে হয় না যেখানে) অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। যাতে আমাদের অর্থনীতি যত সচল হবে ততই আমরা তাদের পণ্যের ক্রেতা হব। আমরা চাহিদাহীন বন্ধ্যা এক অর্থনীতি হয়ে থাকলে এতে আমেরিকা বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিরাট ক্ষতি। এছাড়া, অর্থনীতি যত বড় হতে হতে আরও সমৃদ্ধ হবে যাতে ন্যুনতম চার পার্সেন্টের উপরে সুদে বিনিয়োগ পাওয়ার যতই যোগ্য হব আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ততই সব বন্ধ করে দিবে। সুতরাং অ্যামেরিকার লক্ষ্য যেন আমরা আরও বড় বড় বিনিয়োগ নেবার যোগ্য হই। তাদেরকে সরাসরি ব্যবসা বিনিয়োগ করতে দিতে পারি এমন যোগ্য অর্থনীতির দেশ হই। এভাবে সারা দুনিয়া জুড়ে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়, দুনিয়ার আরো কোণে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই অর্থে আমেরিকার এই ভূমিকাটা মন্দের ভাল। কারণ আমাদের অর্থনীতি ক্রমশ তুলনামূলকভাবে ভাল হবার কিছু সম্ভাবনা এর ভিতর আছে। ফকির হয়ে থেকে ধুকে মরার চেয়ে। কমিউনিস্টদের শোষণতত্ব অনুসারে আমেরিকা যে শোষক এটা অবশ্যই এজন্য ভুলে যাবার দরকার নেই। কিন্তু আমরা কী সেজন্য আমেরিকাকে গালমন্দ করে, পেটে খিদা নিয়ে না খেয়ে বসে থাকব? ধুকে মরব? এটাও কোন কাজের কথা না। এতটুকু প্রাকটিক্যাল হওয়ার কথা বলছি। যাতে আমরা এই গ্লোবাল অর্থনীতির ভিতরে প্রবেশ করে অংশ হয়ে এর ভিতরেই আমাদের জন্য যেসব তুলনামূলক সুবিধা জেগে উঠতে দেখা যাবে সেগুলোর সুযোগ নিয়ে স্ট্রাগল করে উঠে এক ভায়াবল অর্থনীতিতে  আসার চেষ্টা করব? এই হল সেই লড়াই। আর অবশ্যই আমেরিকান সম্পর্কে কমিউনিস্টদের শোষণতত্ব অস্বীকার বা না ভুলেই তা করা সম্ভব।  দুর্ভিক্ষে না খেয়ে আটকে থাকা কোন কাজের কথা না!  এককালের গরীব চীন আজকে দেবারেবল কিন্তু অবজেকটিভ সুযোগ পেয়ে কী অ্যামেরিকার উপর উঠে যেতে রুল করতে চাইছে না!
    এখন এই যে আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে আমেরিকার (তার নিজের স্বার্থে) সাহায্য আমরা পাচ্ছি বা আমেরিকা সাহায্য করছে – এটাই আমেরিকার ‘ইতিবাচক এম্পায়ার ভূমিকা’। এই যে ১৯৭১ সালের পরে আমরা বিশ্বখাদ্য কর্মসুচি (WFP) খাদ্য সাহায্য নিয়ে টিকে বেচে ছিলাম এটা নিশ্চয় খারাপ হয় নাই। এখন WFP কে ফান্ড দিয়েছিল কে?  এসব লিল্লাহ ফান্ডের প্রায় ৭০ ভাগ এখনও আমেরিকা যুগিয়ে থাকে। কেন? কারণ আপনি আমেরিকা গ্লোবাল নেতা মানে, আপনি অ্যামেরিকার উপর এক এম্পায়ারের দায়িত্ব আপনাতেই বর্তায়, বর্তাবেই। আপনি আমেরিকা তো নিজের জন্য প্রবল প্রভাবের সুবিধা তো নিবেনই। আমরা ঠেকাতে পারব না। কাজেই গ্লোবাল এম্পায়ারের দায় ভুমিকা – রোল প্লে করাই আপনার কাজ। আর আমাদের দিক থেকে এটাই মন্দের ভাল, গ্লোবাল নেতা ইতি ভুমিকা।
    আবার দেখেন যেমন, আমাদের ১৯৮৮ সালের বন্যা। আমেরিকা প্রায় না সুদে বা কোনটা কম সুদে বা অনুদানে অবকাঠামো খাতে আরো ঋণ-বিনিয়োগ না করলে আমরা হয়ত সেই সময় বন্যার ক্ষতি থেকে উঠে আসতেই পারতাম না বা বিরাট কষ্ট হত, অথবা ঘুরে দাঁড়াতে দেরি হত। আবার আমেরিকার দিক থেকে ঐ নতুন অবকাঠামো খাতে ঋণ-বিনিয়োগটা সেসময় আরো না যোগালে তাদেরই আগের দেয়া কোন ঋণ-বিনিয়োগ আমরা ফেরত দেবার যোগ্য থাকতাম না হয়ত। তাই এটা ছিল আমাদের আগে তাদেরই বিরাট মৌলিক স্বার্থ।

    এই হলো সেই “এম্পায়ারঃ কথাটার বিশেষ মানে। এম্পায়ার এর ভুমিকা কথাটা বুঝতে হবে ভাল করে। মানে অ্যামেরিকার সাথে সামগ্রিক নেতিবাচক সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক ভূমিকা, তবে সেটাও এম্পায়ারের স্বার্থেই। এটাই গত প্রায় ৭৫ বছরের আমেরিকার কিছু ইতিবাচক ভূমিকাও রেখে গেছে। এবং পরের গ্লোবাল নেতাকেই এই দায় নিতেই হবে। মানে এটাই আবার গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্বে যখন পালাবদল ঘটে আর তাতে নতুন যে নেতা আসে তাকেই এই দান-অনুদানে খরচের দায় নিতে হয়। অর্থাৎ ইতিবাচক এম্পায়ার রোল নিতে হয়। চীন এখন সে রোল নিচ্ছে ক্রমশ।

    ঠিক যেমন শুরুতে রাজাও খাজনা, ট্যাক্স, সেলামি বা পুণার্হ ইত্যাদি নানান নামে চাঁদা তোলে। কিন্তু প্রজাদের জন্য এর কোন অংশই রাজা ফিরে খরচ করে না। কিন্তু কোন সাম্রাজ্যের সম্রাট তিনিও আরও বেশি চাঁদা তুলেন হয়ত। কিন্তু ওর বিরাট অংশ তিনি সিভিল ইউটিলিটি মানে পাবলিকের জন্য রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা বা পানির ব্যবস্থা নির্মাণ ইত্যাদিতে ব্যয় করেন। এজন্য এম্পায়ার রাজার চেয়ে অনেক বেশি কাম্য – তারা দু’জনেই জোর করে বসা শাসন ক্ষমতা হলেও এর মধ্যে মাত্রার পার্থক্য রয়েছে।

    সার কথা হলো, পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা বলে একটা ব্যাপার আছে। গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা আমেরিকা এতদিন সে দায় ও ভূমিকা পালন করেছে, অকাতরে অর্থ ব্যয় করেছে আরও সুবিধা পাবার জন্য। এখন তার গ্লোবাল নেতাগিরি ঢলে পড়লে নেতার সবার আগে যে সামর্থে টান পড়ে তা হল – এই ‘পজিটিভ এম্পায়ারের খরচ করার ভূমিকা’। আর ঠিক ততটাই যেন নতুন বা আসন্ন গ্লোবাল নেতাও ঐ ভূমিকাটা পালনের জায়গা নিতে যোগ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ চীন সেই ‘পজিটিভ এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা’ নেবার অনেক যোগ্য এখন!

    কেন এম্পায়ারের কথা তুললামঃ
    সারকথায় আমরা কেউ সাবজেকটিভ বা ব্যক্তি অর্থে আমেরিকাকে না চীনকে পছন্দ করি তাতে কিছুই যায় আসে না। আমেরিকাকে না চীন কাকে কার উপরে বেশি ভালোবাসি সেই সাবজেকটিভ বিচার এখন প্রসঙ্গের বাইরে তুলে রাখতে হবে, অপ্রাসঙ্গিক বলে। বরং এদের মধ্যে কে এখন ‘পজিটিভ এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা’ নেবার যোগ্য – এই ব্যাপারটা অবজেকটিভভাবে নির্ধারিত হচ্ছে। সেদিকটায় তাকাতে হবে। কে বেশি যোগ্য বা উপযুক্ত সেই অবজেকটিভ বাস্তবতাকে মানতে হবে, একমাত্র সেদিকে দিয়েই বাস্তবতা নির্ধারিত হবে। আমরা তা না করতে পারলে সেটা ভাঁড়ামো মানে আমাদের আমেরিকান (বগলে ভারতীয়) ভাঁড়ের দালালের ভূমিকায় নামা হবে।

    তাহলে?  বাংলাদেশে  আমরা ব্যাপারটাকে কিভাবে বিচার করব?
    দুনিয়া এখন কোভিড-১৯ ভাইরাসের কবলে পড়ে হাসপাস করছে। কে কতদিন আর কীভাবে বাঁচে তা অজানা। গ্লোবাল অর্থনীতি ক্রমশ দেবে গিয়ে ঢলে পড়ছে। গ্লোবাল অবকাঠামো ব্যাংকগুলো তা ঠেকাতে চেষ্টায় নানান উদ্যোগ নিয়েই যাচ্ছে। সবারই একই লক্ষ্য রিকভারি- মানে ক্ষতি সামলে আবার জেগে উঠার চেষ্টা। অর্থাৎ উল্টা ভাইরাসের উপরে আধিপত্য বিস্তার করা, অন্তত কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা খাড়া করা।

    এই কাজে প্রধান পদক্ষেপ, হা সেই পদক্ষেপ হতে পারে সোজা কথায় ব্যাপক হারে উপযুক্ত টিকা বিতরণ হতে পারে একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য প্রধান কাজ। কিন্তু গাফিলতি, অযোগ্যতা, পরিকল্পনায় মারাত্মক ত্রুটির কারণে বাংলাদেশে টিকাকরণে যতই দেরি হচ্ছে ভাইরাস ততই নিজেকে আরেক রূপ বা ভেরিয়েন্টে হাজির করার সুযোগে দুর্দমনীয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ দ্রুত ও একসাথে সবাইকে (অন্তত ৭০ ভাগ) টিকা দিয়ে শেষ করাই একমাত্র জিতবার পথ।
    আর এখানেই গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়ার আছে, যা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আবার তা আসলে একটা মাপক, কে দুনিয়ার যোগ্য নেতা। আর কার দিন ফুরিয়েছে। কারণ, প্রচুর পরিকল্পনার ব্যাপার এখানে আছে। আগে বিনিয়োগের প্রয়োজন। যেমন গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপার তো আছেই। সেই সাথে এরপর ঐ লাইসেন্স নিয়ে উৎপাদন এবং সুষ্ঠুভাবে টিকা বিতরণে বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটির একটা ব্যাপার আছে। এখন একটা ওপেন কোশ্চেন করা যাক! একাজে গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়াতে কে বেশি যোগ্য?
    প্রথমত, আগের ডোনান্ড ট্রাম্প তো নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে স্বীকারই করেননি যে এটা করোনা একটা মহামারি ও সমস্যা। মাত্র এবছরের শুরুতে বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এটা আমেরিকানদের জন্যই প্রথম ও উপযুক্ত মনোযোগ পায়। মানে গ্লোবাল রোল দূরে থাক আমেরিকা আগে নিজ জনগণের প্রতিই ঠিকমতো মনোযোগ দেয়নি। বরং ভাইরাসকে দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করতে যেন পরোক্ষে সাহায্য করেছে যেন!
    এরপর বাইডেন, তিনি কথিত কোয়াডের মিটিং ডাকলেন। সদস্যরা সবাই বিশেষ করে ভারত লাফিয়ে উঠে এখানে কর্তা বা প্রধান নায়কের ভাব ধরল। চীনের বিপরীতে ভারত যেন গ্লোবাল নতুন নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেওয়ার বেশি যোগ্য – খামোখা এই ভন্ড হামবড়া ভাব নিয়েছিল ভারত।  যে কখনও ক্যালকুলেটরই টিপে দেখে নাই  ভারতের মোট জনসংখ্যাকে টীকাকরণ করতে  সে নিজে কতটা মুরোদে সামর্থবান, যোগ্য।  সে সভার শুরুর দিকে বাইডেন যতই পরিষ্কার করে বলার চেষ্টা করছিলেন তিনি মূলত দ্রুত কেবল আমেরিকান নাগরিকদেরকে টিকাকরণের জন্যই এসেছিলেন যাতে এখাতে জাপানি বাড়তি বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা তিনি আমেরিকানদের জন্য কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু ততই চীনকে পরাজিত দেখানোর লোভে আর বাস্তব হোক না হোক চীনের চেয়ে ভারত যোগ্য দেখানোতেই দিল্লি চাপাচাপি শুরু করে। আর ভারত এর এক মুখরোচক নাম দেয় – ‘টিকা কূটনীতি’। যা অবাস্তব তো বটেই প্রয়োজনীয়ও ছিল না। শেষে বাইডেন মিথ্যা হলেও কোয়াডের হয়ে “এশিয়াকে টিকাদাতা” হিসাবে হাজির হবার মিথ্যা কথা দিয়ে রাজি বলার পরই কেবল ঐ সভা শেষ করতে পারেন।
    অথচ আজকের বাস্তবতা হল, আমেরিকা ভারতের টিকা পায়নি বা নেয়নি। তবে বাইডেন নিজেই অন্যান্য উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ বাড়াতে সক্ষম হন। আর এদিকে ভারত আমাদের দেশের বেক্সিমকোর মাধ্যমে ভারতীয় টিকা পেয়ে যাচ্ছে সাথে নগদ লাভও হচ্ছে এই মিথ্যা বাস্তবতা খাড়া করে। এতে আমাদের চীনা টিকা ও লাইসেন্স পাওয়া ভন্ডুল করে দিতে তারা সমর্থ হয়। কারণ আমরা লোভি হয়ে পড়েছিলাম। সময়মতো চীনকে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।  ভারত আমাদের টিকার সব সমাধান দিয়ে দিয়েছে আবার পকেটও ভরবে এই অবাস্তব চিন্তায় আমরা বাস্তব দুনিয়াটা উপেক্ষা করেছিলাম।
    আর ওদিকে এখন ভারতের জন্য কঠিন বাস্তবতা হল, বিদেশের কাউকেই তার টিকা দেয়ার সামর্থ নেই। সেটা দূরে থাক। তারপরেও ভারতের নিজ জনগোষ্ঠির সবাইকে টিকা দিতে আগামি  দু’বছরে পারবে কিনা সন্দেহ। যার মানে নিজ জনগোষ্ঠীকেই টিকাকরণ করতে ভারতের সামর্থ নেই। তাই ভারত ইতোমধ্যেই বাইরে থেকে টিকা আমদানির অনুমতি দিয়েছে। তাহলে এই ভারত আমেরিকা এবং বাংলাদেশসহ সারা এশিয়াকে টিকা কূটনীতিতে ছেয়ে ফেলার যে হুঙ্কার- এটা কেন দিয়েছিল? এতেই প্রমাণ হয়, গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেওয়ার কাজটা ভারত কোনদিন  বুঝেছে বলে আমাদের মনে করার কোন কারণ নেই। কেবল দুচোখ ভরে জ্বলজ্বল করা লোভ ছাড়া তাদের কোন মুরোদই নাই যেন!

    তাহলে ওরকম  পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কী করতে পারত? মানে টিকা বা টাকা ফেরত কোনোটাই না পেয়ে বাংলাদেশের তখন কোথায় যাওয়ার বাকি ছিল? আমেরিকার কাছে?

    আগেই বলেছি, টিকা উৎপাদন গরিব-বড়লোক বলে ভাগ হয়ে আছে। আমেরিকায় উৎপাদিত টিকা বিনা পয়সায় দিলেও আমাদের কাজে লাগানো কঠিন। তবু, আমাদের প্রায় ১৩ লাখ একডোজ নেয়া গ্রহিতা বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। কারণ ভারত তাদের জন্য দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেয়নি, আবার কখনও দিবে সে সম্ভাবনাও নেই। আবার অন্য উৎস থেকে আমেরিকার হাতে প্রায় ৫ কোটি এস্টোজনিকা মানে আমাদের মত একই টিকা থাকার কথা জানা গেছে। তাই সেখান থেকে মাত্র ঐ ১৩ লাখ ডোজ আমরা চেয়ে আমরা অনুরোধ করেছিলাম কিন্তু আমেরিকাও এখনও কোনো সাড়া শব্দ করেনি।

    তাহলে এখন চীন ভরসা ছাড়া আমাদের টিকা পাবার উপায় কী? এটাই সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। আর এই দুরাবস্থায় আমাদেরকে ফেলে গেছে ভারত ও তার হামবড়া ভাব! অতএব টিকা পেতে হলে আমাদের আগের লোভ ও ভুল সিদ্ধান্তের জন্য চীনের কাছে গিয়ে সরি বলে আবার তাকে রাজি করানো ছাড়া উপায় কী ছিল? এছাড়া বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি ইত্যাদি সবকিছুতেই আমাদের ঘাটতি আছে। অর্থাৎ আমাদের এক  মুরোদ ওয়ালা এম্পায়ার দরকার! আর ঠিক বিপরীতে চীনের সেই এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা নেয়ার সামর্থ আছে। এটাই বাস্তবতা।
    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, আমরা স্পুটনিক টিকা পাবার চেষ্টা করতে পারি। এটাও বাস্তবতার খবর না নিয়ে কথা বলা। রাশিয়ার আর কাউকে টিকা উৎপাদন করে সাপ্লাই দিবার সক্ষমতা নেই। তাদের কারখানা ওভার অকুপায়েড মানে সক্ষমতা সব পূরণ হয়ে গেছে। এছাড়া  ঐ টিকা দিতে পারলেও সে টিকার দাম পড়বে ১৫ ডলারেরও বেশি কারণ তাদের উৎপাদন খরচ বেশি। ভারতে দিতে চেয়েছে হাজার রুপিতে। এছাড়া কৌশলগত দিক থেকে চীন কোন দেশকে না করে দেয় তবে তাকে টিকা দিবার সিদ্ধান্ত রাশিয়া আর নিবে না। তাদের কৌশলগত পারস্পরিক  সম্পর্ক এরকমই। আর রিয়েলিটি হল, আমাদের স্পুটনিক টিকা উতপাদনের লাইসেন্স পাবার নিশ্চয়তার প্রসঙ্গে, চীনের হাতে (চীনা সরকারি নিয়ন্ত্রণে চীনা প্রাইভেট কোম্পানি) বাংলাদেশে উৎপাদনের জন্য রাশিয়া সহজেই লাইসেন্স দিতে রাজি হবে। নইলে নয়। কাজেই আগামী চার মাস নিয়মিত চীনে তৈরি টিকার সাপ্লাই পাওয়া আর ঐ চার মাসের মধ্যে বাংলাদেশে নিজেদের অন্তত দু/তিনটা প্রাইভেট কোম্পানিকে টিকা উৎপাদনে যোগ্য করে সাজিয়ে দিয়ে তাদের দিয়ে বাংলাদেশের নিজ উৎপাদন যোগাড় ইত্যাদিতে চীনকে রাজি করতে পারলেই একমাত্র টিকা দ্রুত পাওয়া সম্ভব।

    তাহলে সোজা কথা চীনের এই গ্লোবাল এম্পায়ার ভূমিকাটাই আমাদের জন্য কাম্য ও মুখ্য। এখন চীন যদি আমাদের কাছে বিনিময়ে নিশ্চয়তা চায় যে আগের মত আমাদের আবার পা পিছলাবে না? ভারত বা আমেরিকার কাছে লোভে ফাঁসবো না আমরা – চীন সেই গ্যারান্টি যদি চায় তাহলে কী হবে? এমনিতেই সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে চীন সে নিশ্চয়তা আমাদের কাছে চাইতেই পারে। এটা তার অধিকার।

    এখন প্রথমত, বিচার করেন আমাদেরকে চীনের কাছে ফিরে হাত জোড় করে অনুরোধ করার ভূমিকায় দাঁড় করালো কে? ভারতে মিথ্যা আশ্বাস ও প্রফিটের শেয়ারের লোভ। আর সেই সাথে কোয়াড, টিকা কূটনীতি এসব মিথ্যা বোলচাল। অথচ গ্লোবাল নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়া- এই মুরোদ তো আমেরিকাসহ কোয়াডের কিছু করার নাই,  আমরা দেখলাম না!

    জাস্ট কল্পনা করেন। ঈদের পরের ঢাকায় আক্রান্ত লোকের সংখ্যা যদি বেড়ে যায়, সেইসাথে ভারতীয় ধরণের ভাইরাস যদি ছড়িয়ে যায়? এদিকে দেশে ইতোমধ্যে আমাদের টিকা পাওয়া লোকের সংখ্যা এখন যেখানে মাত্র দু-তিন পার্সেন্টের মত তখন ঐ পরিস্থিতিতে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?

    গত ১০ মে বিবিসি রিপোর্ট করেছে ‘কোয়াড’ এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে যথেষ্ট খারাপ করবে বলে চীন মন্তব্য করেছে। আমাদের অতিউৎসাহী প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকান লোকজন এনিয়ে আমেরিকার কাছে নালিশ নিয়ে গিয়েছিল।  আর এতে আমেরিকান প্রতিক্রিয়া হলো ‘চীনের রাষ্ট্রদূত যে মন্তব্য করেছেন, তার ওপর নজর আছে যুক্তরাষ্ট্রের’। বাস এখানেই শেষ। মনে হচ্ছে না   অ্যামেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা দেখানোর কোন মুরোদ বা ইচ্ছা আছে।  এতো দেখি নালিশ করে বালিশ পাবার মত ঘটনা!  কাজের কাজ কিছু নাই।  আমরা দেখতে চাই অ্যামেরিকার ইতি এম্পায়ার ভুমিকা? কোথায় সেটা?  তাহলে আমরা টিকা পাব কী করে? সেটাব জবাব কী আমেরিকা বা ভারত অথবা দেশের এই অতিউৎসাহী প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকানদের আছে? এনিয়ে তাদের বক্তব্য কি? আমরা শুনি না।

    ব্যাপারটা খেয়াল করেন!  বাংলাদেশ চীনের কাছে ফিরে টিকা চাইতে যেতে হচ্ছে এমনই খারাপ অবস্থায় যখন চীনের কাছে আমাদের কোনো পজিটিভ ইমেজ নেই। কারণ আমরা চীনের আগের অফার কোন সদুত্তর ছাড়াই এর অবজ্ঞা, অপব্যবহার করেছি। কাজেই চীন আমাদের আগের আচরণের বিরুদ্ধে এবার নিশ্চয়তা তো চাইতেই পারে! একই ভুল কাজ করব না এর গ্যারান্টি তো চাইবেই!
    আর এ ঘটনাকে চীনের রাষ্ট্রদুতের মন্তব্য  বিবিসি রিপোর্ট করেছে এভাবে,
    “এ ধরনের ছোট গোষ্ঠী বা ক্লাবে যুক্ত হওয়াটা ভালো না।
    বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে তা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যথেষ্ট খারাপ করবে”।

    আর প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকান লবিস্টরা এটাকে ব্যাখ্যা করছে ‘চীনা হুমকি’ হিসেবে। অথচ বিবিসির পুরা রিপোর্টে ‘হুমকি’ বলে কোনো শব্দই নেই। এর মানে এটা লবিস্টদের উস্কানি দেবার জন্য কিছু মিডিয়ার  ব্যবহৃত নিজস্ব শব্দ ও ব্যাখ্যা। এবং কিছু বিশেষ মিডিয়া কোন রেফারেন্স ছাড়াই ইচ্ছামত ব্যাখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথা বলে তা রিপোর্ট করে চলেছে।

    আবার দেখি কেউ কেউ লিখছেন তারা নাকি বিস্মিত হয়েছেন। আর  আসলে আমরা তাদের আচরণ দেখে বিস্মিত হচ্ছি। তারা টিকা পাবার কোনো পাল্টা উৎস বা প্রপোজাল কি দিয়েছে?

    একমাত্র অবজেক্টিভ চোখেই কোয়াড, টিকা পাওয়া বিষয়ের ভালো-মন্দ বিচার করার মত যদি আমাদের অবশিষ্ট কিছু যোগ্যতা থেকে থাকে তবেই হয়ত আমরা এ যাত্রায় পার পেয়ে যেতেও পারি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৫ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে   “কোয়াড-টিকার ভালো-মন্দ বিচার” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে আর  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোমেন শতভাগ ঠিক বলছেন

    মোমেন শতভাগ ঠিক বলছেন

    গৌতম দাস

    ১১ মে ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3xc

     

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন-সহ আমাদের হাসিনা সরকারের নিশীথ ভোট বিষয়ক সমস্যা আছে সবাই জানি। এছাড়া এমনই আরো অনেক সমস্যা ছাড়াও এর উপর এসে পড়েছে লাভে টিকা কিনতে গিয়ে ঠগের পাল্লায় পড়ে  পাবলিকের সামনে সরকারের ইজ্জত খোয়ানো! ভারতের টিকা নিলে নাকি রথ দেখা কলা বেচা দুটাই হবে, ঠগের দেখানো নগদ এমন লাভের লোভে পড়ে এখানে সরকারের চরম বেইজ্জতি অবস্থায় পড়েছিল।

    মূল বেইজ্জতিটা অবশ্য ছিল এই যে, এরপর সরকারের হাতে কোন ব্রান্ডেরই কোন টিকা নাই, কোন উতপাদনকারি-দাতা নাই।   যদিও ক্ষুন্ধ চীন আছে কিন্তু ‘সরি’ বলে তার গালমন্দ শুনে হলেও রাগ ভাঙাতে পারতে হবে! এককথায় কোন ভায়াবল সোর্সই নাই, ছিল না দুনিয়াতে যে নতুন করে সরকারের টিকা সরবরাহকারি হতে পারে। তাও যখন আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে গেছে। বিরাট গল্পে গগন ফাটিয়ে দেয়া ভারত গ্লোবালি সবাইকে টিকা দিবে, টিকা কূটনীতি করবে – কিন্তু শেষে গোমুত্র এর উপর ভরসাকারি ভারত হয়ে গেল সে।

    এই ভন্ড ভারত, দেখা গেল আমাদেরকে দূরে থাক, শুধু ভারতের সব পাবলিক সবার জন্য টিকা উতপাদনেরই অযোগ্য। কারণ তার কারখানার সেই উতপাদন ক্যাপাসিটিই শুরু থেকেই নাই ছিল না। অথচ সবাই মোদীর চাপাবাজিতে বিশ্বাস করেছিল। সেরাম কোম্পানির মূল ও মোট উতপাদন ক্যাপাসিটি কত তা কেউ চেক করে নাই। ফলে তারা আগাম বাংলাদেশের টাকা নিয়ে নিজ কারখানার উতপাদন ক্যাপাসিটি বাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু আমাদেরকে টিকাও দেয় নাই,  আমাদের টিকা নিজেরা ব্যবহার করেছে।  আবার টাকাও ফেরত দেয় নি। আমাদের সরকার কমপ্লিট প্রতারিত অবস্থায়!

    বলা যায়, হাসিনাকে গত ১৪ বছরে বহুবার চীনের সাথে নানান ইস্যুতে ডিল করতে হয়েছে, করতে পেরেছেন কিন্তু কখনও এত নিচা নামতে হয় নাই। নিচে ঝুকে কথা বলতে হয় নাই। এবার হয়েছে। কারণ বাস্তবত দুনিয়াতে বাংলাদেশের জন্য চীনই একমাত্র সমাধানদাতা অবশিষ্ট ছিল । চীন নিশ্চিত করেছে আমাদের টিকার প্রাপ্যতা ও সাথে বিনিয়োগ, টেকনিক্যালিটি ইত্যাদি যা যা লাগে সব যোগাড় করে দিবে। মনে হচ্ছে হাসিনার ইজ্জত চীন রক্ষা করে দিতে যাচ্ছে। হাসিনার কাছে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কী!

    তবু সর্বশেষ, ঘটনার শেষের দিক থেকে বলা শুরু করলে বলতে হয়, কয়েক ঘন্টা আগে সাংবাদিক সম্মেলনে মোমেন বাংলাদেশের মিডিয়া্র কূটনীতিক জগতকে একটা ভাল শিক্ষা দিয়েছে। একেবারে তুলে আছাড় মেরে দিয়েছেন। কারণ কেউ কোন দেশ কোনদিনই বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দিতে অফার করে নাই। কোয়াড নিজেই যে ম্যাচুরিটিতেই এখনও যায় নাই, তাই।  এই কঠিন সত্যির খবর না নিয়েই আমরা ……।

    অতএব এসব কথিত সাংবাদিক-কূল তার সামনে  কতটা নাদান তাই তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।  হয়ত এই শিক্ষা তাদের জন্য পাওনা ছিল। এটা ইতিবাচক হবে। এখন তিনি যদি দয়া করে একটা ইস্কুল খুলেন আর মিডিয়ার সম্পাদকেরা যদি তাদের কথিত কূটনীতিক কর্মিদের সেখানে পড়তে পাঠান তাহলে মনে হয় আমরা সবাই একটা রাস্তা খুজে পাব! পেতেও পারি!

    খুব অল্প কথায় বললে, প্রথম আলো ও তার রিপোর্টার প্রথম থেকেই দাবি করেছিল, “যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ভারতসহ চারটি দেশের কৌশলগত অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সংলাপ বা কোয়াড নিয়ে চীন তার উদ্বেগের কথা” – এটাই নাকি বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন জানাতে এসেছিল। চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ২৭ এপ্রিলে বাংলাদেশে কয়েক ঘন্টার সফরে নাকি তাই ঘটেছিল।
    যদিও প্রথম আলোর ঐ রিপোর্ট পড়ে মনে হয় নাই যে “কোয়াড কী” সে সম্পর্কে রিপোর্টার  জানেন বা খবর রাখেন।
    যেমন ধরেন, ১। কোয়াড নিজেই কী এতটুকু সংগঠিত যার অন্তত একটা নিজস্ব ফাংশনাল সেক্রেটারিয়েট আছে?.জবাব হল – এটা অতদুরে সংগঠিত পারে নাই এখনও। কেবল বাইডেন আসার পর এই প্রথমবার কোয়াড এক যৌথ বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়েছিল। অথচ কোয়াডের জন্ম নাকি ২০০৭ সালে, কেউ বলে এরও আগে।
    ২। কোয়াড কী সামরিক জোট না বাণিজ্যিক না স্টাটেজিক – না কি সবকিছু? এই ব্যাপারটা কী চাররাষ্ট্রের মধ্যে সেটেল্ড? তারা নিজেরা কথা শেষ করতে পেরেছেন নিজেদের মধ্যে?  না, বরং এটা একেবারেই অনালোচিত। ফলে একটা সিদ্ধান্তে আসা দূর কা বাত। আর এটা সামরিক জোট হতে চাইলে ভারত সম্ভবত সবার আগে বের হয়ে যাবে, সেই সম্ভাবনা আছে।
    ৩। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোয়াড রাষ্ট্রগুলো কী নিশ্চিত তারা এই জোটকে বাড়াবে, মানে পঞ্চম কোন রাষ্ট্রকে ভিতরে নিবে? জবাব হল, তারা নিজেরা চারজনই যেখানে নড়বড়ে কে কতটুর থাকে ঠিক নাই, আবার কোয়াড নিজেই অস্পষ্ট যে সে কতদুর যেতে চায় সেখানে পঞ্চম রাষ্ট্রের যোগদান নিয়ে আলাপ কোথা থেকে হবে? এমন কথা বলার মানে এরা তো মফস্বলি সাংবাদিক হওয়ারও যোগ্য না।
    তাহলে একেবারেই কী বাংলাদেশকে কেউ কোয়াড নিয়ে অফারই করে নাই? হা ঠিক তাই। মোমেন শতভাগ ঠিক বলছেন। “যে প্রতিষ্ঠানের (কোয়াড) কথা বলেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের লোকজন আমাদের কাছে এখনও অ্যাপ্রোচই করে নাই”। তাহলে?

    কোয়াড নাকি ইন্দো-প্যসেফিকঃ
    এমনিতেই ইন্দো-প্যসেফিক নিয়ে জোট বা আরেক উদ্যোগ যেটা আছে ওর সাথে আবার এই কোয়াডের সম্পর্ক কী তা স্পষ্ট নয়। এখনও পরিস্কার করে নাই তারা কেউ। আর গত বছর ট্রাম্পের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্তিফান বিগান অক্টোবরে যে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তখন ইন্দো-প্যসেফিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার জন্য অফার করতে পারে বলে কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু বিগান ঢাকার পৌছানোর আগের দুদিন ধরে মন্ত্রী মোমেন মিডিয়ায় যে কামান দেগেছিলেন সেটা থেকে সবকিছু আমাদের বুঝতে পেরে যাওয়া উচিত। তিনি আমেরিকাকে উদ্দেশ্য করে মিডিয়ায় বলেছিলেন – (অ্যামেরিকার স্তিফান এসে অফার দিলেও) আমরা কোন সামরিক জোটে যেতে পারব না, অস্ত্র কিনতে পারব না। কেবল অবকাঠামো খাতে যদি ঋণ দিবার মুরোদ থাকে (যা অ্যামেরিকার নাই) তাহলে কিছু আলাপ হতে পারে। এই ছিল তার সার কথা। আমার পুরান লেখায় দেখতে পারেন।  এভাবে সরাসরি আর ফ্লাট এক অবস্থান আর প্রকাশ্যে তা মুখের উপর টাঙিয়ে রেখেছিলেন তিনি।

    তাহলে কী অ্যামেরিকার সাথে “ব্যাপারস্যাপার” বলে বাংলাদেশের কী কিছুই ছিল না, নাই? হা, অবশ্যই আছে। মূল কথায় তা হল,  বাস্তবতা হল গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হিসাবে আমেরিকা হেরে যাচ্ছে চীন উঠে আসছে। এই পটভুমিতে আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্বে কোন কোন রাষ্ট্র চীনকে ফেলে আমেরিকার পক্ষে যাবে এরই একটা ভাসা ভাসা জোটের ধারণা অবশ্যই আছে। ভাসা ভাসা বলছি এজন্য যে জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত এই তিন রাষ্ট্রই এখনও চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের ইস্যুতে চীনকে একেবারেই ত্যাগ করে ফেলে আসতে রাজী তা একেবারেই না। তারা কেউ সিদ্ধান্ত নেয় নাই, নেওয়াটা বাস্তবেও খুবই কঠিন। বরং বলা যায় “অ্যামেরিকার দিকে চললাম” এমন সম্ভাবনার কথা ঝুলিয়ে রেখে এটাকে প্রচ্চন্ন হুমকির মত ব্যবহার করে তারা চীনের বিরুদ্ধে অ্যামেরিকার দিকে বা ভাইসভারসা উলটা আমেরিকার থেকে আরো বাণিজ্য বা অন্য-সুবিধা আদায়ের পক্ষপাতি। এবং তা পেলে একেবারেই অ্যামেরিকাকে হাত ছেড়ে চীনের সাথেও জুড়তে পারে। সে সম্ভাবনাও বাদ দেয়া যায় না।

    আবার কোয়াড সামরিক জোটে রূপ নিতে গেলে সবার আগে ভারত বের হয়ে যাবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে এখন আমেরিকা, চীন আর ভারত তিনপক্ষ যার যার নিজের অবস্থানের পক্ষে একা দাড়ানোর দিকে পরিস্থিতি যাচ্ছে। মূল কারণ আমেরিকান   সেভেন্থ ফ্লিট বঙ্গোপসাগরে মোতায়েনের ইচ্ছা। তাহলে ইন্দো-প্যসেফিক বা কোয়াড – কিসের কী? তা আর থাকে বা টিকে থাকে কোথায়?

    এছাড়া আরো কিছু মুখ্য তথ্য হল, শেখ হাসিনার অবস্থান তো লুকানো নয়। ২০১২ সালের পর থেকে হাসিনা আর কখনও অ্যামেরিকার প্রশাসনের সাথে কোন ডিল বা বিশেষ সম্পর্কে যান নাই এবং সম্ভবত কখনও যাবেন না। কারণ তিনি তাদের উপর আস্থা রাখেন না, বিশ্বাসভঙ্গকারি মনে করেন। তবে অবশ্যই হাসিনা এসব কথা লিখে  উচ্চারণ করে বলেন নাই, কাজে বুঝিয়েছেন। যেমন স্তিফান বিগানের সফরে!

    এখন উপরে ধারাবাহিকভাবে যেসব খবরের কিছু লিখলাম সেসব খবরগুলো যিনি রাখেন নাই, যা লুকানোও নয়, – এখন আপনারাই বলেন তার কী কূটনীতিক পাড়ায় থাকা উচিত। এককথায় বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দিবার প্রসঙ্গই যেখানে নাই, আতাপাতাও নাই সেখানে প্রথম আলোর চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বরাতে এতসব দাবি করার অর্থ কী? যদিও আপনারা বাংলাদেশ,  আমেরিকা-ভারতের দিকে চলে যায়েন না – টাইপের  আবছা কথাবার্তা তো হতেই পারে। যদিও মনে হয় না, তা আনুষ্ঠানিক কিছু হবে না। কারণ মূলকথা এর কিছুই  এখনও ম্যাচুইরিটি পায় নাই।

    তাহলে চীনা রাষ্ট্রদুত কোয়াড নিয়ে এত কড়া কথা বললেন কেন?
    বলেছেন এজন্য যে পড়ে পাওয়া সুযোগ দেখেছেন, তাই। আর তার তা এবার তুলে নিলে চীনের  লাভ দেখেছেন, তাই।
    যেমন আমাদের সাংবাদিকেরাই নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ নাকি কোয়াডে ঢুকার অফার-দাওয়াত পেয়েছে। এটা ধরে নিয়ে তারা সব কথা বলে গেছেন। যদিও বাস্তবত আসলে এটা যদি টাইপের কথা।  কথাটা বায়োবীয় হয়, মানে যদির কথা নদির পাড়ের হয় তাহলে এই সুযোগে দুটা কথা বলার সুযোগ চিনা রাষ্ট্রদুত দেখবেন তো  নিবেনই না কেন! যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত বলল ধরেন, দেখেন টিকা নিয়ে ভারত আপনাদের প্রতারিত করেছে। কাজেই  আপনারা বাংলাদেশ  কিন্তু, আমেরিকা-ভারতের দিকে যায়েন না – এটাইপের আবছা কথাটা যদি তিনি এই সুযোগে স্পষ্ট করে বেটার বলতে পারেন যে – কোয়াডে যোগ দিলে বাংলাদেশের সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে (কথাটা সত্যিও বটে); তো রাষ্ট্রদুত সেসুযোগ নিবেন না কেন?  কারণ, মনে রাখবেন চীনা রাষ্টদুত নিশ্চিত করছেন না যে আমরা কোয়াদে ঢুবার অফার পেয়েছি কী না। এটা নিশ্চভিত করছি আমাদের সাংবাদিকেরা……; রাইট! কাজেই এতে রাষ্ট্রদুতের দায় কী?
    এককথায় বোকা সাংবাদিকেরা অজান্তে চীনা রাষ্টদুতকে সুবিধা করে দিয়েছেন আর তিনি তা নিয়েছেন!

    আবার সাংবাদিকেরা যদি মনে করেন চীনা রাষ্ট্রদুতের মুখ থেকে এইকথা বের করে দিয়ে অ্যামেরিকার কোন বিশাল লাভ করে দিয়েছেন তারা তাহলে সেটাও ভিত্তিহীন ধারণা। কারণ আমেরিকানদের এসব কথা অজানা থাকার কোন কারণ নাই!

    তাহলে?

    তাহলে ইস্কুলে যান!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    গৌতম দাস

    ২৬ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৮

    https://wp.me/p1sCvy-3vl


    সরকার সঙ্কটে। মোদী সরকারের  নির্বাচন কমিশন, সুপ্রীমকোর্ট , মিডিয়া ইত্যাদি এমন প্রধান সব ইনস্টিটিউশনগুলো কোভিড ক্রাইসিসের সময় ভারতকে নিচে নামিয়ে, অকার্যকর করেছে। এক সাক্ষাতকারে এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক এক প্রেসিডেন্ট, দুষ্মন্ত দুবে।
    আর নিচের ছবিতে, ডঃ রামচন্দ্র গুহ একজন স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ তিনিও এক সাক্ষাতকারে বলছেন, মোদী ক্ষমতা-লোভী অসুস্থ [megalomaniac]; আর এটাই  কোভিডকালে ভারতের প্রশাসনিক মিস-হ্যান্ডিলিং পিছনে মোদীর নেতৃত্বের স্টাইল, এটাই প্রধান কারণ। এখানে সাথে দেয়া লিঙ্কগুলো আসলে সাক্ষাতকারের ইউটিউব লিঙ্ক, পাঠক খুলে দেখতে পারেন।

    চারদিকে “হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব” – এই সুরসুরি  বেচে ক্ষমতা দখল আর এভাবেই ২০১৪ সাল থেকে এতদিন করে খেয়ে আসছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  কোন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা এমন ধর্ম-ভাষা ইত্যাদির সুরসুরি তুলে নানা কিসিমের জাতিবাদগুলো এভাবেই মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজত্ব করে থাকে। তবে আগে ছিল সেটা মোদীর উত্থানের সময়। আর এখন পতনের সময় এর চেয়েও ভয়াবহভাবে তিনি হঠাত পড়তে শুরু করেছেন। ভারতের কোভিড ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে এই দ্বিতীয় ঢেউ [মাল্টিপল  বংশ-প্রজাতির ভাইরাস [variant] একসাথে আবির্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে] এর কালে মোদী সরকারের হিন্দুত্বের চাপাবাজি ও উন্মাদনা তুলে  এবার আর কিছুই ঢাকতে পারছে না। সব ম্যানেজমেন্ট অক্ষমতা আর ব্যর্থতা উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। উপরের সাক্ষাতকারের বক্তাদের বক্তাদের বক্তব্যের সারকথা এটাই।

    A Naga Sadhu, or a Hindu holy man, waves the Indian flag as he takes a dip in the Ganges river during the first Shahi Snan at “Kumbh Mela”, or the Pitcher Festival, in Haridwar, India, March 11, 2021. REUTERS/Anushree Fadnavis

    এদিকে, এটা উত্তরাখন্ড প্রদেশের (আগের উত্তর প্রদেশের অংশ) “হরিদ্বারে কুম্ভমেলা্র” ছবি। এসব ধর্মীয়-স্নান জাতীয় ততপরতার সাথে  [সাধু আর পতাকা এদুই এর মিলন এটা খুবই তালমিল-হীন ] ভারতীয় পতাকার কোন সম্পর্ক এর আগে কখনও দেখা গেছে বলে মনে পড়ে না। সম্ভবত, এটা বিদেশিদেরকেও দেখানো [এই ছবিদুটা আলজাজিরা ও জাকার্তাপোস্ট পত্রিকা থেকে নেয়া] যেন এর উদ্দেশ্য।  এছাড়াও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্বের জোশ-জজবা তুলে ভোট আদায়ের সাথে, মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সাথে সাধুগিরির সামাজিক ততপরতা একে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে বলে এমন; যা আগে পুরানা দিনে কখনও দেখা যায় নাই। এখন হচ্ছে এটাই  হিন্দুত্বের ভারতের মোদীর বিরাট নেতি অবদান।  মোদীর আরো বড় অবদান হল কোভিড দ্বিতীয় ঢেউ এর মধ্যেই অভয়দান করে এমন লাখ লাখ লোকের জমায়েতের আয়োজন করতে উতসাহ দেয়া। এই মেলায় এমনকি, এখানে কোন লালার স্যাম্পেল না দিয়েই আপনি কোভিড নেগেটিভ বলে সার্টিফিকেট পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা আছে [Testing negative without even giving a sample]। মোদী এখন বুঝতেছেন নিশ্চয়, এখানে কে কাকে আসলেই ফাঁকি দিতে পেরেছিল!

    আবার এর বিপরীতও আছে। কিছু আনন্দবাজারি মাথাব্যাথাও দেখে গিয়েছিল যে,  এক সাধু অভয় দিচ্ছিলেন – ভগবান আছে সব নাকি তিনিই রক্ষা করবেন……“It’s the voice of god, who says nothing will happen. God won’t let anything happen to us. I have full faith,” said Baba Prakash Puri Maharaj।
    আবার মেলার আয়োজক প্রধান  বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেছেন, “আমাদের কাছে বিশ্বাস সবথেকে বড়। মা গঙ্গার উপর মানুষের বিশ্বাস রয়েছে বলেই তো এত মানুষ এখানে স্নান করতে এসেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন মা গঙ্গা তাঁদের এই অতিমারির হাত থেকে বাঁচাবেন”। এমনকি উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়াতও বলেছিলেন, ‘‘মানুষের স্বাস্থ্য অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। তাই বলে ধর্মকে অবহেলা করতে পারব না”। ভোটের বাজার এতই চড়া।  কারণ, এবার হিন্দুত্বকে পিছনে ফেলে ছাপিয়ে উঠেছে কোভিড পরাক্রমশালী। মানে কোভিডে মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ফেল করায় আবার গরীবের কাজ ও পেটের বন্দোবস্ত করতে মোদী সরকার ফেল করায়।   অথচ ঠিক উলটা হয়েছিল গতবছর লকডাউনের আগে মারকাজের ইসলামি জমায়েতের বিরুদ্ধে সরকারি একশনে। বিবিসি লিখছে “প্রসঙ্গত, গত বছরের মার্চে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলীগ জামাতের যে মারকাজে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুসুল্লী জড়ো হয়েছিলেন, সেটিকে করোনা সংক্রমণের একটি ‘সুপার স্প্রেডার’ ইভেন্ট হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাই চিহ্নিত করেছিলেন”। যা মুসল্লিদেরকে সাজা খাটতে হয়েছিল, আদালতে দারস্ত হয়ে কোনমতে বাঁচতে হয়েছিল।  যদিও ইসলামবিদ্বেষ উঠানো হয়েছিল চরমে এই বলে যে প্রজাতি হিসাবে মুসলমান মাত্রই তাঁরা নিম্নস্তরের জীবন-অভ্যাসের মানুষ এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ও ঘৃণা ছড়িয়ে ।

    এটা এক প্রভাবশালী সাংবাদিক-সম্পাদক রাজদীপ সারদেশাই এর ভাবনা বলা যায়। তিনি বলতে চাইছেন, “অনুপযুক্ত শাসকের [inappropriate Governance] জন্যই কী ভারতের এই পরিণতি হল?

    এসব নিয়ে এখন সারকথায় বললে, এতদিন মোদী ও তার হিন্দুত্ব নাকি খুবই পপুলার, মারাত্মক জনপ্রিয়, এসব শুনতে শুনতে কাল ঝালাপালা অবস্থায় ছিলাম আমরা। কিন্তু এবার হঠাত করে মনে হচ্ছে সবার কানে পানি ঢুকে গেছে। কারণ, একেবারে উলটা গান শুরু হয়ে গেছে। মোদী আর হিন্দুত্ব নিয়ে নাকি ভারত আর ভাল নাই। মোদীর জনপ্রিয়তা হঠাত করে ব্যাপক ধ্বসের মুখে!  ভারতে এখন প্রতিদিনে কোভিডে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখের উপরে। আর সাথে মৃত্যুর সংখা ২৬০০ এর উপরে। কোন কোন রিপোর্ট দাবি করছে টুইটারে  হ্যাশটাগ #ResignModi এখন ক্রমশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।  অর্থাৎ ঠিকমত চিকিতসা না পাওয়া – যেমন টিকা বা অক্সিজেনের অভাবে থাকা চিকিতসালয়  আর কাজ না পাওয়ায় মানুষ প্রত্যেকের পেটে টান দেওয়াতে এবার মোদী আর আর তাঁর হিন্দুত্বকে পরাজিত করে সবার উপরে জোয়ার বা প্রভাব বিস্তার করেছে মানুষের বৈষয়িক জীবন  – যেমন স্বাস্থ্যসেবা আর কাজ পাওয়া। এই বেসিক বাস্তবতা। এতদিন মোদী ও তার বন্ধুরা ভেবেছিল তাঁরা হিন্দুত্ব এই জোশ বা আবেগ দিয়েই বাকি দিনও চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু এই প্রথম  হিন্দুত্বের উপর কোভিড ক্রাইসিসে মোদীর ব্যর্থতা প্রধান ইস্যু হিসাবে উঠে আসছে। মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না হওয়া – এটাই হিন্দুত্বের মোদীকে ধাওয়া করে পরাজিত করতে চাইছে।

    হিন্দুত্ব ফেল করেছে কেন?
    আগে বলেছি মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না করেও মোদীর হিন্দুত্ব বিজেপিকে গত সাতবছর ধরে কেবল সার্ভিসই দিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু সম্ভবত আর না। সেই রাতারাতি নোট বাতিল (পাঁচশ ও হাজারের নোট বাতিল) সিদ্ধান্তের সময় থেকেও যদি ধরি। মানুষের সহ্যক্ষমতা অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য।  আজ রিপোর্টারেরা লিখছে, তারা ভেবেছিল, মোদী এটা বেচতে সক্ষম হয়েছিল  যে হিন্দুত্বের ঐক্য – এই জাতিবাদ মানুষের জন্য অনেক কিছু এনে দেবে, অনেক সমস্যার সমাধান আনবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য  সাধারণ মানুষের। তারা তখনও প্রতারিত, এখনও। এটা তখনও সত্যি ছিল এখনও সত্যি যে মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ করতে যেমন এক নুন্যতম দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন প্রয়োজন, মোদী এর কখনই উপযুক্ত নয়, ছিল না। কিন্তু কোভিড ক্রাইসিস এখন চরমে উঠার মাধ্যমে এই ম্যাসেজ কী পাবলিকের কাছে পৌছাবে? আমরা এখনও নিশ্চিত নই।  তবে গণহারে পাবলিক যে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে, এটা প্রায় নিশ্চিত।  যেটা আরও ভয়াবহ ঘটনা হবে, দরজায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করছে তা হল, কোভিডে ঢলে পড়া অর্থনীতি যা নেগেটিভ প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে ও আছে দেড় বছর ধরে তা কী এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় আদৌও সামলাতে পারবে? এটাই হয়ে উঠতে পারে হিন্দুত্বের উপর প্রধান নির্ধারক ধাক্কা।  ভারতের বাজেট-বর্ষ শু্রু হবার মাস বা কাল হল ১ এপ্রিল। অথচ ভারতের উভয় সঙ্কটটা হল যে, এখনই লকডাউন আরোপ না করলে কোভিড একেবারেই আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আবার উল্টা দিকটা হল, এখন লকডাউনের দিলে এর ধাক্কা সামলানোর মত অর্থনীতি আর চালু থাকবনে না। এছাড়া, মানুষের সুস্থ থাকা ও কাজ থাকার বাস্তবতা আরও শুকিয়ে মরবে। এমন বাস্তবতায় গত সাতবছরে মোদীর হিন্দুত্ব ভারতের জন্য আরো কী কী হারানোর কারণ হয়েছে তা নিয়ে কিছু কথা বলব।

    ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কঃ
    রাজনীতিবিদ অপেক্ষাকৃত তরুণ কেউ হলে একটা বাড়তি সুবিধা কখনো পেতে বা নিতে দেখা যায়। সেই হল, এপ্রোচ বা আগানোর ধরণ। মানে কোন মনোভাব থেকে বসে একটি সমস্যাকে নেতা দেখবে? তাঁর আগের রাজনীতিক নেতারা যেভাবে দেখে এসেছেন সেভাবেই? নাকি নয়া উদ্যোগে? কোনো নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিকল্প পথ খুঁজে দেখে তাতে সমাধান বা অবস্থা বদলের চেষ্টা করবেন? দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা বা প্রধানমন্ত্রী নতুন বা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হলে তিনি অনেক ভিন্ন দিক থেকে সমাধান খুঁজতে চাইছেন, যা আগে ভাবা হয়নি। সমস্যা বা বিরোধগুলোকে বিপক্ষ অংশের সাথে বসে মানে তাদের চোখেও দেখে এক নয়া এপ্রোচে নতুন পথে সমাধান বা বিপক্ষকে মানানোর বা পরস্পরের সমস্যাটা ঠিক কোথায় তা ঠিকঠাক বুঝে এগোনোর পথ এক্ষেত্রে খুঁজে থাকেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব!

    ইমরান যখন ২০১৮ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন, তখন ভারতে বিজেপির মোদীর প্রথম টার্মে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে চার বছর পার করে ফেলেছেন তিনি। মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের মে মাস থেকে। মানে পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদী আবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা তখন। মোদী দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনিই ‘বিজয়ী’ বলে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ইমরান খান পাকিস্তানের আগের যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নয়া এপ্রোচ, নয়া উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই। কিন্তু সার কথাটা বললে, নয়া উদ্যোগের প্রধানমন্ত্রী ইমরানের থেকে মোদীর ভারত নয়া উদ্যোগ বা অ্যাপ্রোচের কোন সুবিধা পেতে বা নিতে চান বা নিয়েছেন; এমন আমরা দেখিনি। কেন?

    প্রথমত, এটা ঠিক মোদীর বিরুদ্ধে যতটা অভিযোগ, এর চেয়ে বরং বলতে হবে মোদির পক্ষে আসলে এমন কোনো আশা দেখতে পাওয়া বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নয়া উদ্যোগর পথে আগোনো অথবা ইমরানকে উৎসাহ দেয়া ইত্যাদি কোনটাই আসলে মোদির পক্ষে সম্ভবই ছিল না। সেই প্রসঙ্গেই এখানে বলব।

    তবে এর আগে সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এই তিন দেশের দুর্ভাগ্য যেখানে আটকে গেছে ও আটকানো শুরু হয়েছিল তা নিয়ে দু’টি সাদা কথা বলে নেব।

    ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ইস্যুগুলো এমন যে, এর অন্তত কিছু গূঢ়-ইস্যু নিয়েই অনন্তকাল বিবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। মানে কোন সমাধানের দেখা পেতে এখানে কতগুলো প্রজন্ম লাগবে এর হদিস কেউ জানে না। কাশ্মির ছাড়াও জন্ম থেকেই বিরোধের সূত্রপাত এমন অনেক ইস্যু আছে।

    কিন্তু এসব বিরোধের আসল উৎস কী তা স্বল্প কথায় বললে – এর প্রধান উৎস হলো ব্রিটিশরা কলোনি-ইন্ডিয়া ত্যাগ করে চলে গেলে কলোনিমুক্ত ভারত কেমন রাষ্ট্র হবে এ নিয়ে অপরিপক্ব জবাব দেয়ার চেষ্টা এবং রাষ্ট্র নিয়ে খাটো চিন্তা-ধারণা হাজির করা থেকেই আজকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান- এ তিন দেশ সেই থেকে সাফার করে আসছে, ধুঁকে মরছে।

    সমাজের কোন একদল নিজ ধর্মীয় বা যেকোনো আইডেনটিটিরই এক জাতি-রাষ্ট্র করবে বলে, বুঝে বা না বুঝে যদি গোঁ ধরে তবে এর পরিণতিতে তা বাকি সব পক্ষই আরেকটা করে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা অথবা অন্য যেকোনো ভিন্নতার আইডেনটিটির ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র গড়তেই তো চাইবেই। সব বিবাদের শুরু এখান থেকে, আর এথেকে নানান দিকে তা যাবেই। এটাই অনিবার্য আর তাই হয়েছিল। এই সরল সত্য ও বাস্তবতা বোঝার যোগ্যতা যারা প্রধান নেতৃত্ব দাবি করেছিল তাদের কারো ছিল না; বরং সবাইকে একটা আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রে আনতেই হবে আর সেটা হতে হবে এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই; এভাবে তা বাকি সবার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে হলেও যেন ‘এটাই হতে হবে’। কংগ্রেসের এই জবরদস্তি, এ থেকেই সব বিরোধের আরো ডালপালায় বিস্তার এখনো চলছে। এর শুরু বা আদিপাপের রচয়িতা-কর্তা মুসলিম লীগ বা জিন্নাহ একেবারেই নয়। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডাও চালু আছে। তবে এরা অবশ্যই নিরুপায় হয়ে অনুসারী মাত্র। সেই মূল রচয়িতা-কর্তা হলেন রাজা রামমোহন রায়;  এবং বিগত ১৮১৫ সাল থেকে শুরু করা তাঁর ব্রাহ্মসমাজ গড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এই ব্যর্থতা থেকেই পরে বঙ্কিম-প্রমুখেরা এক “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” জন্ম দেয়া বা গড়াই কংগ্রেসের লক্ষ্য সেট করেন।  আর তাতে সব বিবাদের শুরু হয় এখান থেকে।  রামমোহন, তিনি বোকা নাকি ইসলামবিদ্বেষী? সে যাই হোক, পাঠক বিচার করবেন, তবে কমিউনিস্টদের চোখে রামমোহনকে তারা মানেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু’ হিসাবে! এখন তাহলে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরাই ব্যাখ্যা করে দেন যে, কমিউনিস্টদের চোখে ধর্মচর্চা তো এখনোও খুবই খারাপ কাজ। অথচ এই বহু কথিত রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন, তিনি কী করে নতুন একটা আস্ত ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন? এ কোন বিপ্লবীপনা? আবার এটা নিয়েইবা সব রেনেসাঁবাদী কমিউনিস্টরা আজও বেমালুম চুপচাপ নির্বিকার কেন? কিভাবে? এর সাফাই কী এবং কৈ? তারা কেউ বলেন না! কেন?

    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, ভারত-পাকিস্তানের ক্যাঁচাল থেকে বাংলাদেশ এখন স্বাধীন হয়ে অনেক দূরে গিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু তা একেবারেই না। এমন মনে হলেও এটা সত্য নয়। কারণ অখণ্ড ভারতে আমাদের মূল বিবাদ ছিল, ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতিরাষ্ট্র খাড়া করে সমাধা পাওয়ার খায়েশ থেকে শুরু হওয়া নানা লড়াই থেকে বিভক্তি। তাতে বাংলাদেশে আমরা এখন ভৌগোলিকভাবে ভারত-পাকিস্তানের কেউ না বলে তাদের ক্যাঁচালের কেউ না – এই আত্মপ্রসাদ পেতে চাইলেও যা আমরাও সাথে নিয়েই হাঁটছি তা হল, বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই না? মূল কারণ যেকোনো আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র। এ কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যায়।

    বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষাভিত্তিক  আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে বা বের হতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই বা বিবাদের বাইরে না? মূল কারণ যেকোন আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে – এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র চাইবে। এসব কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যাবে। অথচ দরকার ছিল নন-আইডেনটিটি ও এক; সবাই সমান নাগরিক এই ভিত্তিতে এক “রাজনৈতিক সাম্য”; মানে সমঅধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র।

    এখন আমাদের প্রসঙ্গ মোদী-ইমরানের মধ্যে সীমিত করব। ভারত-পাকিস্তানের অবস্থা এখন এমন যে, সবাই ন্যূনতম এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায় হয়ত; সব পক্ষেরই কাম্য।  কিন্তু একই সাথে এর সমস্যা অন্যখানে। কারণ এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এমনকি বিজেপি-আরএসএসের মোদীরও হয়ত অকাম্য নয়। শান্তি পেয়ে গেলে তা মোদীর জন্য খারাপ কিছু হতো না। কিন্তু সমস্যা হল প্রায়োরিটির, অর্থাৎ মোদীও পাকিস্তানের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চান না অথবা কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন তার সাথে নতুন উদ্যোগ নিতে চাইবেন, তা করতেও মোদির কোনো আপত্তি আছে – ব্যাপারটা তা নয়, তা একেবারেই নয়। সমস্যা হলো প্রায়োরিটির।

    মোদির প্রায়োরিটি হল মানে এসবের আগে আরেকটা কাম্য জিনিষ আছে। সেটা হল,  ভারতের নির্বাচনে ‘হিন্দু-ভোটের মেরুকরণ’ হতে হবে, পরিস্থিতিকে এমন হতে বাধ্য করতে হবে, যাতে সব হিন্দু-ভোট বিজেপির বাক্সমুখী হয়, এমন এক জজবা-উত্তেজনা সৃষ্টি করা। কারণ ইমরান ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদীকে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্বাচনে জিততে হবে। তাই পাকিস্তানের সাথে মিথ্যা করে হলেও সীমান্ত-উত্তেজনা সৃষ্টি করা, সেভাবেই ভারতের সেনা ও সিভিল প্রশাসনকে সাজানো আর ঠিক নির্বাচনের আগে এই সীমান্ত বিবাদকে কোন একটা উসিলায় চরমে তোলা- এটাই হয়ে পড়েছিল মোদীর প্রায়োরিটি। যার মূল্কথা, পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ভাল সম্পর্কের খারাপ সম্পর্কই মোদীর জন্য বেশি ফলফায়ক। এমনকি সম্পর্কখারাপ এতা দেখানোতেই বেশি ফলদায়ক হবে – এই ছিল মোদীর চাওয়া। অর্থাৎ ভোটের বাক্সে হিন্দু মেরুকরণের ভোট, এটাই মোদির সবার উপরের প্রায়োরিটি হয়ে পড়েছিল। তাই ছদ্মযুদ্ধ লাগানো, পাকিস্তানে ভারতের মিথ্যা বোমা ফেলে আসার দাবি বা ছলনা তৈরি, ইত্যাদিই খুবই টপ প্রয়োরিটি ছিল মোদির কাছে। আর ৩৬ ইঞ্চি ছাতি দেখিয়ে মোদীই একমাত্র ভারত রক্ষাকারী নায়ক – এই ইমেজ ছিল নাকি ভোটে মোদীর ‘তুরুপের তাস’!

    অন্য ভাষায় বললে, মোদির হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাত-ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব- এমন দাবি করে যে রাজনীতি মোদী খাড়া করতে চান, অর্থাৎ কেউ হিন্দু হলেও বাস্তবত বরং সে হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার নাও হতে পারে, এমন হিন্দুত্বের রাজনীতির বাহক তিনি নাও হতে চাইতে পারেন – কিন্তু এটাই মোদী কখনোই এটা হতে দিতেই চান না, পারেন না। পরিষ্কার করে, মোদী মানে দিতে চান উল্টা। বলতে চান, কেউ হিন্দু মানেই সে মোদীর হিন্দুত্ব রাজনীতির বাহকও। এই একমাত্র অর্থ এবং ব্যাখ্যা ও বয়ানে মোদী পুরা ব্যাপারটাকে  আটকে রাখতে চান। এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি এবং এটা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদ। এটাই হিটলারের জার্মানি আর্য-নীল চোখের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ – এদের সবারই আরেক ভাই হিসেবে মোদী হিন্দুত্বের এক উত্থান ঘটাতে চেয়ে এসেছেন।

    মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইমরান খানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী – যিনি পাকিস্তানের তরুণ; নতুন করে যারা পাকিস্তানকে নিয়ে চিন্তা করতে চান এরই প্রতীক হলেন ইমরান। ইমরানই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, পাকিস্তানি নাগরিক সে যে ধর্মেরই হোক – পাকিস্তানের সব নাগরিকের মতই সবার সমান অধিকার আছে। ব্লাসফেমি আইন – যেটা মূলত এতদিন  জমিজমার দখলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ উদ্ধারের কাজে করা মামলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, এমন আসামিদের মামলার বিচারে সুপ্রিম আদালত যাকে খালাস দিয়েছে, নির্বাহী সরকারপ্রধান হিসেবে ইমরান তার মুক্তি নিশ্চিত করেছেন ; ইচ্ছামতো দেশ-বিদেশ যাওয়া বা চলাচলের অধিকার। ইমরান এটাকেই তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য কর্তব্যজ্ঞান করেছেন।

    অথচ চরম সঙ্কীর্ণ ও হিন্দুত্বের ভোট জোগাড়ে ব্যস্ত বিজেপির মোদী এমন ইমরানের কাছ থেকে ভারতের জন্য কোনো সুবিধাই চাইতে বা নিতেই পারেননি। কারণ মোদীর লক্ষ্য অন্য সংকীর্ণ কিছু। মোদীর লক্ষ্য মুসলমান-পাকিস্তানের সাথে টেনশন তুলে বা জিইয়ে রেখে সেই ইত্তেজনা নিজ দেশের নির্বাচনে হিন্দুভোট পোলারাইজ করতে ব্যবহার করা।  তাই ভারত-পাকিস্তানের বিবাদের ইস্যুগুলোর কোনো একটার বেলায় কিছু হাল করতে বা উদ্যোগী হতে পারেননি মোদী।  মোদীর সবার আগে দরকার বা প্রায়োরিটি হল, ইমরানকে মুসলমান দেশের নেতা ফলে শত্রু হিসাবে চিত্রিত করণ। এতেই মোদী তার সব ফয়দা দেখেছিলেন। যেমন এই আমলে,  ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানে পড়েছে যে কার্তারপুর-এর শিখ গুরুদুয়ারা, তা ভারতের পাঞ্জাবের শিখরা এখন যেকোন ভ্রমণকারীর মত মাত্র ২০ ডলার ফি দিয়ে ভ্রমণ করে আসতে পারেন। মানে গুরুদুয়ারা তীর্থ করে আসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরানের কারণে এটি সহজেই বাস্তব হয়ে গেছে।

    পরাক্রমশালী করোনার সামনে মোদীর হিন্দুত্বও খাটোঃ
    কিন্তু পরাক্রমশালী করোনাভাইরাস মোদীর মত যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক তাদেরকেও সোজা করতে পারে। অনেক কিছুই করতে বাধ্য করতে পারে, তাই মনে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় মুখে স্বীকার না করেও মিডিয়া রিপোর্ট হাজির হতে দিচ্ছিল যে ভারত-পাকিস্তান আলোচনা চলছে কখনো গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর ‘র’-এর মধ্যে। অথবা প্রশাসনিক কর্তা পর্যায়ে এবং মিডিয়া থেকে দূরে থেকে। এমন আলাপ আগের কংগ্রেস বা বিজেপি আমলেও হয়েছে, আর সেসব হয়েছিল মূলত ব্যাংককে। এবারো তা ব্যাংককে বা দুবাইয়ে হচ্ছে বলে মিডিয়া রিপোর্ট দিচ্ছে।

    কিন্তু কেন তারা এত লুকোচুপি করে আবার দেখাও করছে? এবং তা নিজ নিজ দেশের বাইরে করছে? কেন?

    একমাত্র কারণ মোদীর ‘ভোটবাক্স’ প্রায়োরিটি, যা আগে বলেছি। ভারতের কল্পিত বিরাট শত্রু মুসলমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোদী একাই লড়ে ভারতের হিন্দুস্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন, এই ইমেজ মোদীর ভোটবাক্সের জন্য খুবই দরকারি। কিন্তু এর অবস্থা এখন খুবই সঙ্গীন। যেমন কাশ্মিরে লাদাখ সীমান্তে যখন চীনের সাথে ভারতের সামরিক টেনশন চলছিল তখন মোদীর-সেনাদের টেনশন বাড়ছিল যে, কখনো যেন ভারতকে চীনের পাশাপাশি পাকিস্তান – এই দুই দেশের সাথে না তাদের নিজ নিজ সীমান্ত দুটা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে না হয় এটাই নিশ্চিত করা। তাই সে সময় চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথেও কথা বলে ভারত ধারণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভারত পাকিস্তানের সাথেও সঙ্ঘাত চায় না। এটা অবশ্যই ভারত পাকিস্তান দুই দেশের জন্যই লাভজনক ছিল। কারণ যুদ্ধের ফ্রন্ট খুললে তা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য কোনো ইতিবাচক ঘটনা ভাবার কারণ নেই। আর এ বাস্তবতার সুবিধাটাই ভারত উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পাবলিকলি দেখা করলে মোদীর ভোটবাক্সে টান পড়বে। আর সে কারণেই এত লুকোচুরি।

    এখানে কোভিডের আরেক সুবিধা বা অসুবিধার কথাও বলা দরকার। গত দেড় দুই বছরে মিডিয়া প্রশ্নে মোদী সরকার বিরাট সুবিধা ভোগ করে চলেছে। ভারতের লিডিং প্রায় সব মিডিয়া এখন মোদীর অনুগত, পায়ের কাছে ঘুরঘুর করার অবস্থা! কেন? কোন মন্ত্র বলে? কারণ প্রতিটি মিডিয়া কোভিডের ঠেলায় বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে এক অর্থনৈতিক টানাটানিতে ডুবে গেছে। ফলে কর্মীদের ৪০ শতাংশ বেতন দেয়ার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থাটাই বোঝা যাবে এটা দেখলে যে, ধনী-গরিব প্রতিটি মিডিয়াই এখন পাবলিক ডোনেশনের চাঁদা চেয়ে নোটিশ টাঙ্গিয়ে রেখেছে। কাজেই সবাই এখন একমাত্র ও সহজ উপায় হিসেবে দেখছে বিজেপির রাজনীতির পক্ষে সাফাই দেয়ার কাজকে। এমন মিডিয়া হয়ে যাওয়ার বিনিময়, সরকারি দল বা সরকারি ফান্ড হাতিয়ে নেয়া – এভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টাই এখন সব মিডিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা ধারা। তবে মিডিয়াগুলো আরেক নয়া কৌশল ধরেছে। তারা বলতে চাচ্ছে, তারা আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ঠিক প্রমোটর নয়। কিন্তু তারাই আবার দাবি করছে, তারা আসলে সেটা করেনি। তারা বরং হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের সরকার, সরকার যেই হোক তাকে সমর্থন দেয়া এটাই দ্য হিন্দুর সুহাসিনী হায়দারের কর্তব্য, অথবা দ্য প্রিন্টের শেখর গুপ্তের কর্তব্য – এরা এই আড়াল টেনে কাজটা করে যাচ্ছে।

    কিন্তু তবু সম্প্রতি আরো কিছু উইকেটের পতন ঘটেছে। এটা শ্রুতি কপিলা [SHRUTI KAPILA] নামে এক লেখকের দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় এক মন্তব্য-রিপোর্ট। তিনি বলছেন, টুইটারে ‘রিজাইন মোদি’ এই হ্যাশট্যাগ পপুলার ভিত্তি পেয়ে উঠছে [The trending of #ResignModi on Indian Twitter…… ]। তিনি দাবি করেছেন, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোভিড মহামারী এবার এই প্রথম ‘রাজনৈতিক’ হয়ে উঠছে। [It finally signalled that the Covid pandemic had become political.] মানে, রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

    তিনি লিখছেন, “গত বছরের এনিয়ে বিপর্যয়ের সময়ও মহামারী ছাপিয়ে উঠা সত্ত্বেও নিজ পপুলারিটি নিয়ে ‘চির-স্ট্রং’ মোদী এসবের ঊপরে থাকতে চেয়েছিলেন। বহু সার্ভেতেই দেখা গেছে, তিনি উপরে আছেন”। মিস কপিলা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলতে চান, গত বছরের কোভিড পরিস্থিতি কোনোভাবেই কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না। কিন্তু জনগণ এরপরও সম্মিলিতভাবে মোদীর উপর (তাঁর হিন্দুত্বের উপর) আস্থা রেখেছিলেন যে, তাদের হিন্দুত্বের ঐক্যবদ্ধতার কারণে মোদী সবাইকে রক্ষা করে নেবেন।

    মিস কপিলা আরো লিখছেন, ‘ভারতে এখন প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত কোভিড-রোগী ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ জনের; এমন সংখ্যা এটাই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আর মাফ করতে পারছে না। কমতেছে। টুইটারে প্রকাশিত ট্রেন্ড, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া হতাশা, এগুলোই সম্ভবত মোদীর হিন্দুত্বের সমর্থন হারিয়ে ফেলার প্রথম ইঙ্গিত! এখন ক্রমেই তাদেকে দেখা যাচ্ছে ভয়ের  বদলে ‘বিক্ষুব্ধ’ হয়ে উঠাকে প্রাধান্য দিতে। সম্ভবত এদিকটা খেয়াল করেই, মোদি সম্প্রতি পাবলিককে ডিসিপ্লিন থাকার জন্য আকুল আবেদন করেছেন”।’

    তাহলে দেখা যাচ্ছে এবারে মোদীর হিন্দুত্ব – এটা আর মহামারীর কারণে সরকারের উপর পাবলিকের আস্থার সঙ্কট কমে যাবার  বিপর্যয় ঠেকাতে পারছে না? কোভিডের মহামারীতে চিকিৎসার অভাব আর পেটের টানের বিরুদ্ধে এবার ‘হিন্দুত্ব’ আর কিছুই ঢেকে ফেলতে পারছে না! হিন্দুত্বের জোশ আর কি কাজ করছে না? মোদী এবার সব লুকিয়ে আগলে রাখতে কি ফেল করবেন! মোদি কী পাবলিকের আস্থাহীন নেতা হয়ে যাবেন? দেখা যাক! পানি কতদুর গড়ায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “হিন্দুত্ব ফেল, কোভিডে চিকিৎসাস্বল্পতা ও পেটের টানে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    গৌতম দাস

    ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০ঃ০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3uj

    বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পার করেছে। আর এ’বছরেরই ২০ জানুয়ারি মানে মাত্র দুমাস আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার শপথ নিয়েছেন। আমরা অনেকেই দেখার জন্য উদ্গ্রীব ও আগ্রহি ছিলাম যে ট্রাম্পের পাগলামি-উত্তর বাইডেন নতুন কী রাজনীতি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে এর কী প্রভাব পরে ইত্যাদি। অপেক্ষার পালা একটু দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মন-সংযোগ একটু ঢিলা পড়ে গিয়েছিল হয়ত আর এই ফাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত বা ঘটনার প্রকাশ ঘটে গিয়েছে। এই বিচারে গত ২৬ মার্চ মোদীর মত আরএসএসের ক্যাডার তিনি বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির প্রধান অতিথি হয়েছেন বলে নয়, এর চেয়েও বড় তাতপর্যপুর্ণ ছিল মোদীর এই সফর। যেটা বাইডেনের ২০ জানুয়ারিতে শপথের সময় কেন ২০ ফেব্রুয়ারিতেও আগাম বুঝা যায় নাই যে পরের মাসে ২৬ মার্চ এত তাতপর্যপুর্ণ হয়ে যাবে। যেমন এখন হয়ত আমাদের মনে পড়বে,  আমরা মনে করতে পারি, এবার ২৬ মার্চের প্রধান অতিথি কে হবেন ভারতের কসাই মোদী না তুরস্কের এরদোয়ান, এই আলাপ উঠতেও আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু বরং মার্চ মাস শুরু হবার পর ক্রমশই মোদীরই প্রধান অতিথি হওয়া ক্রমশ এক বিরাট গুরুত্ব নিয়ে হাজির হতে শুরু করেছিল। কেন?

    নতুন করে গ্লোবাল পোলারাইজেশনঃ আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুতগতিতে এটা আগাচ্ছে। আর বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের আমল পর্যন্ত আমরা কোয়াড (চীনবিরোধী চার রাষ্ট্রীয় জোট- আমেরিকা-ইন্ডিয়া-অষ্ট্রেলিয়া-জাপান) আর  সাউথ চায়না সি কেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাটেজি (উদ্যোগ) – এদুটার কথা জোরেশোরে শুনে আসছিলাম। ফলে “কোয়াড” ও “ইন্দো-প্যাসিফিক” কেন্দ্রিক পোলারাইজেশনই আগামিতে প্রধান হবে ও বাড়বে এমনটা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। এই ইঙ্গিত এখন পরিস্কার। বাইডেনের শপথ নেয়ার দুমাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বহু উলট-পালট হতে শুরু করেছে। আর এরই মাঝে বাইডেনের নিজের ফরেন পলিসির প্রায়োরিটি এর নিজের নতুন বৈশিষ্টগুলো নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসা মাত্র পালটা প্রতিক্রিয়াও শুরু এবং তা থেকেই নতুন করে নতুন পোলারাইজেশন এবং তা ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া আবার  এককথায় মেরুকরণ যা ভাবা হয়েছিল বাইডেলের আমলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইচ্ছা আকাঙ্খার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেমন, কোয়াড থেকে ভারতকে বেরিয়ে যেতে হবে – এটা ধরে নিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই আগানো শুরু করে দিয়েছে।

     এবার পোলারাইজেশনের রঙ্গমঞ্চ বঙ্গোপসাগরঃ আগের অনুমিত সাউথ চায়না সি,যেটা সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশমুখ, ঠিক সেটা এখানে আর মূল রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার থাকছে না। নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। এর উপর আবার এতে ভারত, বাংলাদেশ বা মায়ানমারের – এভাবে বঙ্গোপসাগর এই তিনদেশের  মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে ফোকাস।  অন্তত আমেরিকান ফোকাস। কেন এমনটা ঘুরে গেল?

    দুটা কারণে এই পরিবর্তন। পরপর বলে যাব। তবে পাঠক চাইলে নিজের মত আগেপিছে করেও পড়তে ও বুঝতে পারেন।

    প্রথমটাঃ  এখানে পরপর দুটা ট্রিগার টিপা হয়েছে। প্রথম ট্রিগার টানার ঘটনাটাই প্রথমে রেখে বলছি। এশিয়ায় আমেরিকা নতুন রূপে হাজির হয়েছে, এটাই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের হানিমুনের সমাপ্তি ঘোষণার ট্রিগার হতে যাচ্ছে। চীনবিরোধী আমেরিকা-ভারত এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক পুরানা, তৈরি শুরু ২০০৪ সালে। অবশ্য এরও আগেই বিজেপির বাজপেয়ির আমলে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নৌকায় ভারত নিজ কিছু শর্ত দিয়েছিল যে তাদের আতঙ্কবাদের (মানে পাকিস্তানকে টেরর-কান্ট্রি ধরে নিয়ে সেই চোখে দেখতে হবে) উঠে গিয়েছিল। পরে ভারতের ২০০৪ সালের মে মাসে মনমোহন সিংয়ের প্রথম টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্ব শুরু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের মার্চে বুশ প্রথম ভারত সফরে আসেন। আর তাতে যুগান্তকারি ঘটনা ছিল প্রথম আমেরিকান অস্ত্র এমনকি পারমানবিক কাঁচামালও ভারতকে বিক্রি এবং ভারতকে চীনবিরোধী করে (বয়ান মুখে তুলে দেয়াসহ) আকার-প্রকার দেয়া সবই এই সফর থেকে শুরু হয়েছিল। এরই ফরমা্ল নাম ছিল চায়না কনটেইনমেন্ট মানে চীন ঠেকানোর কাজটা ভারতকে ঠিকা দেওয়া।
    আমেরিকার এতে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইজিং ভারতকেও চীনেরবিরুদ্ধে ব্যবহার। কিন্তু মুদ্রার এপিঠের উল্টোদিক মানে তাতে আমেরিকান উলটা আরেক ফরেন পলিসিও ছিল, যেটা তখন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেটা হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ীভাবে নোঙর করার ইচ্ছা। যেটাকে ভারত জেনে সবসময়ই দেখে এসেছে গরীবের একতলা বাডির পাশেই বড়লোকের সাততলা বাড়ি বানানো আর ভারতের ঘরের ভিতরে কী ঘটছে সেদিকে নজরদারির চোখ ফেলা। আমেরিকা তার এই লুকিয়ে ফেলে রাখা জিনিষটা এতদিন লুকিয়ে রেখেই চীনবিরোধী নানাকিসিমের “ভারত-আমেরিকান সহযোগিতা” বলে ভারতকে দিয়ে কাজ করিয়ে চলছিল। সেটাই এবার স্থগিত, একাবারেই শুকিয়ে যাবে।

    কারণ, বাইডেনের আমলে তিনি এখন চায়না কনটেনমেন্টের চেয়েও বঙ্গোপসাগরে পড়শি সকলের ঘরে নজরদারি ফেলা – এটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ মনে করে আগানো শুরু করেছে। মানে এতদিন এশিয়ায় ভারতের পড়শিদেশগুলোতে (বা ভারতের কথিত নিজ-প্রভাবাধীন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর) সবখানে চীন ঢুকে পড়তেছে বলে অনবরত খামোখা ভারতের ন্যাগিং দেখছিলাম আমরা। যার ভিতর আমেরিকা ভারতকে আরো তাল দিত, আর বলত চীন ভারতকে নাকি মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন? সেখানে এখন চীন-ভারতের কথিত প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাইডেনের আমেরিকা নিজেও এক প্রার্থী হিসাবে মঞ্চে হাজির হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এনিয়ে হাতের কাছে ভাল ইঙ্গিত-প্রমাণ হল, আলী রীয়াজের প্রস্তাব বাংলাদেশ যেন আমেরিকার সাথে মিলে “বঙ্গোপসাগরকে হাব” বানায় অথবা “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”……।

    আমেরিকান এমন অবস্থান থেকেই আসলে ট্রিগার পয়েন্ট হল বাইডেনের আমেরিকার “বঙ্গোপসাগরের খায়েস” প্রকাশ হয়ে পড়া। কিন্ত এথেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় তাতে এরচেয়েও বড় ট্রিগার টিপতে প্রস্তুত এখন ভারত। কি সেটা?

    দ্বিতীয়টাঃ আগেই বলেছি আমেরিকার এতদিন লুকিয়ে রাখা এই খায়েস যেকোন সময়ের জন্যই ছিল ভারত-আমেরিকার মাঝে চরমতম শত্রুতা শুরু করার সুপ্ত পয়েন্ট। ভারত এতই কঠোরভাবে সবসময় আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে ছিল ও আছে। ভারতের এত শত্রুতা-জ্ঞানবোধ চীনের বিরুদ্ধেও সম্ভবত নাই। ভারতের সব সরকারই এবং ইল্টেলেক্টরাও মনে করে এসেছে এটা ভারতের জন্য এতই ক্ষতিকর যে আমেরিকা এতে ভারতের সব উত্থান সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিবে। তাই বাইডেন যতটা না ট্রিগার টেনেছেন এর চেয়েও প্রকাশ্যে ট্রিগার ইতোমধ্যেই ছোড়া শুরু করে দিয়েছে ভারত। এরই একটা পর্ব ছিল ২৬ মার্চ মোদীর বাংলাদেশ সফর। সেটা কী রকম?

    কমন এনিমির বিরুদ্ধে এক হওয়াঃ  অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি যে  এতদিনের ভারত-আমেরিকার চীনবিরোধী যে গভীর আত্মীয়তা চলেছিল এর দিন শেষ হয়েছে। আমেরিকাই এখন ভারতের প্রধান এনিমি। এদিকে আমরাও অনেকবার দেখেছি ও বলে এসেছি যে, আমাদের সরকার গত চৌদ্দবছরের চড়াই-উত্রাইয়ে  সবচেয়ে কম আস্থা রেখে এসেছে আমেরিকার উপর; তা সে ওবামা,  ট্রাম্প বা বাইডেন যারই আমেরিকা হোক। এমনকি সরকারের আয়ু বাড়ানো প্রস্তাব বা আলী রীয়াজের প্রস্তাব যতই লোভনীয়ভাবে হাজির করা হোক না কেন এথেকে দূরে থাকলেই তা সরকারের আয়ুর স্বার্থে যাবে বলে আমাদের সরকার মনে করে এসেছে।  এই সুত্রেই  এবার মাঠে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের এক কমন এনিমির আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রশ্নে ঘনিষ্ট হওয়া ও পরস্পরকে রক্ষায় সহায়তা করার এক বাস্তবতা হাজির হয়েছে, মনে হচ্ছে। প্রায় ঠিক যেমনটা এর আগে সুজাতা সিংয়ের সফর থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন ওর প্রাক্কালে যেটা হয়েছিল। অনুমান করা যায় গত ২৬ মার্চ ছিল এই গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গে তাদের সিরিয়াস আলোচনার এক ভাল সময়। এটাই স্বাভাবিক।

    তাহলে বাইডেন কী বোকা মানুষ, তিনি কেন বঙ্গোপসাগর সেভেন্থ-ফ্লিট মোতায়েনের আকাঙ্খার ইঙ্গিত এসময় হাজির করতে এলেন? না; অবশ্যই তিনি বোকা নন। মূল কারণ ইতোমধ্যেই  আমেরিকা ভারতকে কোয়াড থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে এর সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। যেমন ব্যাপারটা দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষ্য হল, US Will ‘Expel’ India From Quad।   আবার ভারত নিজেই নিজেকে কোয়াড থেকে বের করে নিতে যাচ্ছে তা আসন্ন  – এটা ভারত-আমেরিকা দুপক্ষের কাছেই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কিভাবে?

    দুই ইস্যু এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইটঃ
    এস-৪০০ এটা রাশিয়ার তৈরি এক এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম যা আমেরিকার এফ-৩৫ এর মত যত বোমারু বিমান আছে সেসবের ‘যম’ মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার ভাষায়, “এস-৪০০ এর কাছাকাছি স্থানে এফ-৩৫ চালানো অনুচিত”। কারণ, তা ঐ বোমারু বিমানকে নামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এনিয়ে আমেরিকার মূল নীতি অবস্থানটা হল আরো কঠিন। তা হল, একই দেশের হাতে একসঙ্গে এস-৪০০ আর এফ-৩৫ এর মত কোন বোমারু বিমান থাকতে পারবে না। তাই সোজা সিদ্ধান্ত যে দেশ এস-৪০০ কিনবে আমেরিকা তার উপর বাছবিচার ছাড়াই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কেবল পাগলা ট্রাম্পের কথা। কিন্তু এখন সবাই পরিস্কার যে এটা বাইপার্টিজান – খোদ পেন্টাগনের অবস্থান। তাই যে এস-৪০০  কেনাটা শুরু হয়েছিল তুরস্ককে দিয়ে তা এখন পাকিস্তান, ভারতসহ যারা যারা এমন যে কেউ কিনবে ভেবেছে, তারা সবাই আবার সাথে ভেবেছিল যে কেবল তার বেলায় অনুরোধ করলে আমেরিকান প্রশাসন বিশেষ ছাড় দিবে – কিন্তু এখন সবাই বুঝে গেছে, এটা সবার ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
    শুধু তাই না, ব্যাপারটা আরো এগিয়ে কঠিন হয়েছে ভারতের বেলায়। এপ্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক শক্ত ও আগাম নির্ধারিত। এতদিন  ভারত মনে করে এসেছিল ভারতকে আমেরিকারই নিজ স্বার্থে দরকার আর ভারতও রাইজিং। ফলে আমেরিকা যদি বিশেষ ছাড় না দেয় তবে ভারত আমেরিকাকেই ত্যাগ করে হলেও এস-৪০০ কিনে নিজের সামরিক বহর সাজাবেই। এই প্রসঙ্গে সর্বশেষে দেনদরবার হয়ে গেল গত ১৯ মার্চ থেকে তিনদিনের বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ভারত সফরে [Russian Arms Sale Clouds U.S.-India Ties]। এতে দুপক্ষই কড়া শেষকথা শুনে বুঝে যায় কোন পক্ষই সরতে পারছে না।
    ওদিকে ইতোমধ্যে বহু আগে মানে নির্বাচনে প্রচারণার সময় থেকেই বাইডেন পরিস্কার করে উল্লেখ করে আসছেন কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের উপর হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ইস্যুতে তিনি ক্ষমতাসীন হলে সরব অবস্থান নিবেন।  কিন্তু এদুটাই মোদীর ভারতের নির্বাচনে হিন্দু মেরুকরণ করে তাদের ভোট বিজেপি-বাক্সে তোলার গুরুত্বপুর্ণ কৌশল যা তিনি কোনভাবেই ত্যাগ করতে চান না বা পারবেন না। অতএব এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইট – এদুই বড় সংঘাতের ইস্যুতে আমেরিকা-ভারত বিচ্ছেদের ঘোষণা এখন  যেকোন সময়ের ব্যাপার।

    ইতোমধ্যেই প্রথম প্রকাশঃ বার্মা
    গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল বার্মার সামরিক বাহিনী দিবস। মায়ানমার যা কার্যত সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন এক রাষ্ট্র সেখানে এই দিবসের তাতপর্য আমরা অনুমান করতে পারি। এক রিপোর্ট বলছে, বার্মায় ৪২ বিদেশি মিশন আছে যাদের এমবেসিতে “মিলিটারি এটাসে” পদ আছে আর তাতে কেউ আসীন হয়ে বার্মায়  উপস্থিত  আছেন। এদের মধ্যে আটজন এটাসে [attaché] ঐ প্যারেড অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।  জাপানি নিক্কি পত্রিকা বলছে ঐ দেশগুলো হল, Russia, China, India, Pakistan, Bangladesh, Vietnam, Laos and Thailand ।  মানে ঐ আট রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গুরুত্বপুর্ণ এক রাষ্ট্র। এর মানে  যে ভারত  তার কোয়াডের সব বন্ধুদের  ত্যাগ করেছে যা পক্ষ বদল করেছে বলা যায়, আর এভাবে প্রকাশ্যে তার মিলিটারি এটাচে হিসাবে একজন ঐ প্যারেডে যোগ দিয়েছিল। এমনকি  বাংলাদেশও রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমান তাসত্বেও “ব্যবহারিক কারণে”, [pragmatic attitude]ভারত-চীন-রাশিয়াকে অনুসরণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা এতে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অতিথি ছিলেন রাশিয়ার ডেপুটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন।
    মূলকথা,বাইডেন তার নিজের পলিসি-স্বার্থগুলো খুলে বসাতে এবার নতুন করে এক ব্যাপক গ্লোবাল পোলারাইজেশন এর বাস্তবতা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এই আট দেশের মিলিটারি এটাসে দের একসাথে অংশগ্রহণ এটা যেন বাইডেনের বিপরীতে চীন-রাশিয়া পক্ষ দেখাতে চেয়েছে যে তাদের পক্ষে কে কে আছে। আসলে ভারত পক্ষ বদলিয়েছে এটাই পুরা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর যেন বাইডেনকে দেখানো যে তোমার পক্ষের ভারত আর তোমার সাথে নাই।

    কে কোন পক্ষে থাকছেঃ
    জিনজিয়াং-উইঘুরে মানবাধিকার ভায়োলেশন ইস্যুতে বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সাথে পেয়েছিল। একসাথে তারা এই ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে আবার বড় ক্ষত ও বাইডেনের দুর্বলতার দিকটা সব সময় আছে যে, উইঘুরে মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে চীনবরোধী জোট পাকায়ে চীনের থেকে বৈষয়িক সুবিধা হাসিল করা এতদিন পশ্চিমের মূল উদ্দেশ্য  হয়ে এসেছে।  সোজা কথায়,  পশ্চিম এখন পর্যন্ত সবসময় এভাবে মানবাধিকার ইস্যু তুলেছে কিন্তু শেষে তা বিক্রি করেই খেয়েছে। কাজেই পশ্চিম এই নৈতিকতার সংকট খুবই মারাত্মক থেকেছে। যেমন বার্মার ২০০৮ সালের গঠিত কনস্টিটিউশনে  আর্মি রাজনীতিতে অংশ নিবে সহ সব নির্বাহী ক্ষমতার ভাগীদার থাকবে  – সেকথা লেখাই আছে। আর সেসব কথা থাকা সত্বেও কি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জেনারেলদের প্রশংসা করে গো এহেড অনুমোদন দেয় নাই, জেনারেলেরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু কল বলে সার্টিফিকেট দেয় নাই? তাহলে আজ প্রতিদিন বার্মায় প্রতিবাদকারিরা হত্যার শিকার হলে এখন সহানুভুতির নাকিকান্নার উদ্দেশ্য কী? ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা খেদানো যখন চলছিল তখন আমেরিকা চীন-ভারতের সাথেও গলা মিলিয়ে কথিত আরসা আক্রমনের গল্প ফেঁদেছিল যেটা ছিল বার্মার জেনারেলদের হল্প আর সেটাই আমেরিকানেরা আমাদের কাছে সাফাই দিয়েছিল যে আরসার কথিত আক্রমণের কারণেই নাকি পাল্টা রোহিঙ্গা খেদানোর শুরু।
    সোজা কথায় মানবাধিকারের ইস্যু বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে সুবিধা আদায় – এদিকটাই প্রধান পশ্চিমা স্বার্থ, সেটাই অনেকদিন থেকেই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।  ফলে বাইডেনের যে মেরুকরণ দাড়াচ্ছে চীন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে – এই বাইডেন জোট এখনও বড় বড়  নৈতিকতা সংকটে আছে এবং থাকবে।

    ফলে বাইডেনের জোট -কোন নৈতিক বা নীতি-পলিসিগত ভিত্তির সমস্যায় আছে  ও এমন ইমেজ সংকটে হাজির হয়েছে। আর এমন মিস-ফায়ার হওয়াতে এর সুযোগ নিয়ে পালটা চীন-রাশিয়ার জোটে আর তাতে (কোয়াড ভেঙ্গে) ভারতের যোগ দেয়া আর তাতে হবু বাংলাদেশ বা বার্মার যোগদান – এটাই বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নতুন রঙ্গমঞ্চ।

    সবমিলিয়ে বাইডেন যা করলেন তাতে তার পক্ষীয় জোটের নৈতিক বা গ্লোবাল কমন পলিসিগত শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর প্রশ্নে তিনি মারাত্মক খাটো হয়ে হাজির হলেন। শুধু তাই না, আবার একই সাথে তারা দুপক্ষজোটের সামরিক ঝোঁকগুলোকে তিনি জেনে অথবা না-জেনে উসকিয়ে দিলেন যা খুবই অবিবেচক অবশ্যই!

    সর্বশেষ জন কেরিঃ
    জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে বাইডেনের বিশেষ দুত। তিনি আগামি ৯ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন। সম্ভবত আগামি ২২ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যে ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এর দাওয়াত দিতে। আর সেখানে কী সাইড লাইনে আলী রীয়াজ যেভাবে বলেছিলেন “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা  আর অর্থনৈতিক করিডরের একটি ‘হাবে’ পরিণত করার আলাপ প্রস্তাব – সেটাই কী সেরে নেয়া হবে? মনে হচ্ছে সেটাই এজেন্ডা। যদি তাই হয় তাহলে একদিকে বাংলাদেশ নিয়ে মানবাধিকার অবণতির রিপোর্ট আর এদিকে এমন বঙ্গোপসাগর এজেন্ডা – ঠিক এটাই বাইডেনের জোটের সংকট, এই চরম নৈতিক সংকটের কারণের তার জোট ও তিনি ঠুঠো আর ধান্দাবাজ বলেই মানুষ দেখবে!
    বাইডেনকে একটা বেছে নিতে হবে – বঙ্গোপসাগর না হলে মানবাধিকার!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com