Category: BANGLADESH

  • আবদির প্রিয় ‘র’ এর ‘মরটাল ফিয়ারে’ জীবন

    আবদির প্রিয় ‘র’ এর ‘মরটাল ফিয়ারে’ জীবন

    গৌতম দাস

    ২৮ অক্টোবর ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3MI

     

    [সার-সংক্ষেপঃ ‘মরটাল ফিয়ারে’ [mortal fear] মানে র’ এর হাতে খুন হবার ভয়।  আমরা সবাই ভারতের র [RAW] এর হাতে মরার ভয়ে আছি, ‘র’ আমাদের তাড়া করছে। বলেছেন – ভারতীয় সাংবাদিক আবদি]

    তাঁর নাম এসএনএম আবদি [SNM ABDI]।  গত  আশির দশকে ইন্দিরা আমলে ভারতের বিহার পুলিশের এক কান্ড। তারা অপরাধ কমাতে এক সহজ পদক্ষেপ নিয়েছিল।  অপরাধীর চোখে এসিড ঢেলে দেওয়া যাতে তারা আর অপরাধ না করতে পারে। করা এই  নৃশংসতার বিরুদ্ধে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করে বিষয়টাকে মিডিয়ায় এনে বিখ্যাত হয়েছিলেন এই আবদি। এখনও আবদির পরিচয়ের সাথে তা সবজায়গায় এমন লেখা পাওয়া যাবে। জাতিসংঘের পুরস্কারও পেয়েছিলেন এজন্য। তিনি ভারতের আউটলুক পত্রিকার ডেপুটে এডিটর ছিলেন পরে আরেক ওয়েব মিডিয়া ফাস্ট পোস্ট এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। সেসময় গত ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর বাংলাদেশ সফরকালে (তিস্তার পানি দিবার চুক্তি করতে এসেও না দেয়ার সেই সফর) সফরসঙ্গী দলের সদস্য হয়ে আবদি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। স্মৃতি হাতড়ে সেখান থেকে বলছি।

    করোনাকালে বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ায় ভারতে প্রত্যেকটা মিডিয়াই টিকে থাকার জন্য এক  মুশকিলের লড়াইয়ে এখনও পড়ে আছে। সব প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াতেই তাদের রিপোর্টের শেষে অর্থ,অনুদান চাঁদা ইত্যাদির আবেদন সংযোজন করা হয়েছে দেখতে পাবেন। আর তাতে ফলাফলে আমরা দেখছি বেশির ভাগ প্রধান ধারার মিডিয়া মোদির দারস্থ হয়েছে।

    আরেক দেশে গিয়ে নিয়মিত নাশকতা কর্মকান্ড চালানোর ভারতের গোয়েন্দা এক প্রতিষ্ঠান হল ‘র’। এই  ‘র’ স্পনসরড বা অর্থ দিয়ে পরিচালিত এক প্রাইভেট সংবাদ সংস্থা বা এজেন্সি হল এএনআই [ANI]  যার প্রধান কাজ হল ফেক নিউজ ছাপা। অর্থাৎ এএনআই-এর কাজ হল ‘র’ স্পনসরড প্রপাগান্ডা বক্তব্যকে  নিউজ হিসাবে প্রান্তিক মিডিয়াতে সরবরাহ করা।  আর যে প্রান্তিক মিডিয়া এটা ছাপে সে এর বিনিময়েই মোদির ‘সাহায্য’ বা মিডিয়া ফান্ড পেয়ে থাকে। আর এমন নিউজ ছাপার মাধ্যমেই ভারতের মিডিয়াগুলো করোনাকালে তাদের আর্থিক সংকট সামলেছিল। বাংলাদেশের মিডিয়াজগত আরো দুর্বল,এখানে কেউই বাণিজ্যিকভাবে কোনকালেই  সফল নয়। তাই ‘র’ স্পনসরড এএনআই এর “নিউজের” আছর বাংলাদেশে আরো বেশি।

    তবু ভারতে এসবের বাইরে থেকে অর্থের লোভ সামলানে এই কষ্টের দিনে টিকে থাকা অল্প ওয়েব পত্রিকাও আছে। যদিও তারা খুবই ছোট ফলে  বাজার শেয়ার খুবই কম। তবু এরা অনেকেই যথেষ্ট প্রভাবশালী নিজ মেরিটে। আমার ধারণা এমনদের শীর্ষে আছে এখন সম্ভবত ওয়াইর[WIRE] –  এই মিডিয়া। যদিও মেরিটেড পত্রিকাও বছর দশেক আগে রেগুলার না,হঠাত করে কিছু ক্যাশের লোভে দু একটা ‘র’ স্পনসরড প্রপাগান্ডা বক্তব্য ছেপে দিত। আর করোনাকালে এটাই এখন রেগুলার ফেনোমেনা। তাই করোনাকালেও মোদির ফান্ডে আগ্রহ যারা দেখায় নাই বলে মনে হয় তেমনই এক ওয়েব পত্রিকা হল ‘দ্যা কুইন্ট’ [The QUINT]।

    এই ‘দ্যা কুইন্ট’ পত্রিকায় আবদি গতকাল বাংলাদেশ ও হাসিনাকে নিয়ে একটা ‘নিচা দেখানো’ [derogatory] লেখা লিখেছেন। তবে কিছু জায়গা খুবই আপত্তিজনক ও অপমানসুচক। এছাড়া ভুল তথ্য ও ভুল ব্যাখ্যায় তা মনগড়া ভাবে লেখা। এসব ছাড়াও লেখকের বাকি সমস্যাটা হিন্দুজাতিবাদের চোখ দিয়ে সব দেখলে যেমন হয় সেই সমস্যা। হিন্দুজাতিবাদের চোখে দেখার এই স্টাইল; এটার একটা ভাল নাম আছে যেটাকে বলে ‘সেকুলার প্রগতিশীল’। অর্থাৎ লেখক  আবদি আসলে এক ‘সেকুলার প্রগতিশীল’ সম্পাদক।

    হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদের চোখে ও চর্চায় ভারতের কোন মুসলমানকে তারা যেসব শর্তে তাদের সমাজে থাকতে চলতে বসবাস করতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা চাকরির প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে ও তাদের পাশে বসে তা করতে গেলে যে শর্তে এসব তারা করতে দেয় সেই শর্তেরই আনুষ্ঠানিক নাম হচ্ছে ‘সেকুলার ও প্রগতিশীল’। এই সেকুলার প্রগতিশীল রুল মানে হল হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সাজানো (orientation) ধর্মীয়-কালচারাল ভিত্তিতে সেট করা রীতিনীতির এক একচেটিয়া আধিপত্য নিশ্চিত করে এটা। ভারতের বা কলকাতার মুসলমানের সেকুলার প্রগতিশীল নিয়ম রুল ও শর্ত পালন সাপেক্ষেই একমাত্র ভারতীয় সমাজে থাকতে পারে। কাজেই সম্পাদক এসএনএম আবদিও এর বাইরে নন। এটাই তারও ছোট থেকে বেড়ে উঠার শর্ত ও স্মৃতি; যা এখন এই মোদি-যুগে তো আর বদলবার কোন সুযোগই নাই। আবদি সাহসী এবং ইনভেস্টিগেটিভ কাজ করা লোক।  মানে খুজে বের করে সামনে আনার মত সাহসী সাংবাদিক বটে। কিন্তু এখানে এসে তার সেই সাহসও অচল। কারণ এটা একার সাহসের প্রশ্ন নয়। এই উপমহাদেশ যেখানে কলুসিত করা হয়েছে সেই ১৮১৫ সাল থেকে। কিভাবে এটা এজায়গায় পৌছালো,এখান থেকে বের হবার পথ কী এনিয়ে কোন ইনভেস্টিগেশনে তিনি অচল অপারগ দেখা যাচ্ছে!

    বরং উলটা কারবার দেখা যাচ্ছে।যেমন  র [RAW] নিয়ে তিনি ভারতের হিন্দুত্ব -এই কট্টর জাতিবাদী ধারার সকলের মতই গর্বিত। বাংলাদেশে জবরদস্তিতে ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার প্রতিষ্ঠান হল এই র। তাই র এর কর্ম-পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের ততপরতা মানে তা বাংলাদেশের জন্য তা নাশকতা,স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ। দেশপ্রেমে বিগলিত আবদি এই র সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এমন ফুলা ফুলেছেন যে লিখছেন, “জাতিসংঘের ভেটোসদস্য-ওয়ালা পাঁচ রাষ্ট্রের শক্তি একসঙ্গে করলে যত বাংলাদেশে ভারতের শক্তি-সক্ষমতা এর চেয়েও বেশি” [India wields more influence in Bangladesh than the Security Council’s five permanent members put together.]। বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে উপর  র এর ক্ষমতার কথাই তিনি বলছেন আমরা দেখছি খুবই আহ্লাদিত হয়ে, হিন্দুত্ব জাতিবাদের জোসে, দেশপ্রেমিকতায়।

    “India wields more influence in Bangladesh than the Security Council’s five permanent members put together. The Research and Analysis Wing (RAW) is the most dreaded outfit in the neighbouring country surpassing even the brutally unforgiving RAB. Hasina lives in mortal fear of RAW. She knows that she will be toppled if she displeases India. So she has adopted the policy of pleasing India to retain power at any cost.”

    এরপরের বাক্যে এবার খোলাখুলি বলছেন, “ভারতের প্রতিবেশি দেশে রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং (RAW বা বাংলায় র) হল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের প্রতিষ্ঠান, যা এমনকি ক্ষমার অযোগ্য র‍্যাবের চেয়েও নৃশংস” [The Research and Analysis Wing (RAW) is the most dreaded outfit in the neighbouring country surpassing even the brutally unforgiving RAB]।

    এখানে এই সেকুলার ও প্রগতিশীল হিন্দুত্ববাদপ্রেমী আবদির কান্ড দেখেন। ভারতের র যদি বাংলাদেশের র‍্যাবের চেয়েও নৃশংসতায় ছাড়িয়ে যাওয়া সংগঠন হয় আর সেক্ষেত্রে তাতে  র‍্যাব ক্ষমার অযোগ্য [unforgiving] হলে দেশপ্রেমি আবদির কাছে র RAW কেমন প্রতিষ্ঠান হয়ে দাড়ালো? দেশপ্রেমে ডুবে আবদির এদিকটার কথা খেয়াল নাই। তার কাছে র হল প্রশংসার ও আদরণীয় প্রতিষ্ঠান।

    তাঁর এরপরের বাক্য তাঁর তো বটেই মোদী সরকারেরও অনেক কিছুর স্বীকারোক্তি। সব কথার এককথা এই বাক্য। আবদি বলছেন “হাসিনা র এর হাতে মরবার ভয়ে (মরটাল ফিয়ার) জীবন কাটাচ্ছেন” [Hasina lives in mortal fear of RAW.]। বুঝা যাচ্ছে আবদির এমন কেউ নাই খুবই বন্ধুহীন যে তাঁকে বলে দেয় যে এভাবে লেখা যায় না। এতে নিজের বিরুদ্ধেই লেখা হয়ে যায়।

    তামাশার কথা হচ্ছে আবদি এতই দেশপ্রেমে আপ্লুত, বীরত্বের কথা ভেবে মসগুল যে তিনি বুঝতেই পারছেন না যে তিনি এক অপরাধীর স্বদেশের-অপরাধের স্টেটমেন্ট বা আত্মস্বীকারোক্তি দিয়ে ফেলছেন। অথচ তাঁর সে খবরই নাই। এর মানে হল  র  আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হবু গুপ্তঘাতক আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই গুপ্তঘাতকের ভয়ে সিটিয়ে আছেন। আর জার্নালিস্ট আবদি আমাদেরকে নিজে লিখে এই স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন!  বা! থ্যাঙ্কু আবদি! খুব সুন্দর করে আমরা আবদির খুবই দেশপ্রেমিকতার কাহিনী জানলাম বটে!

    পরের দুই বাক্য আরো স্পষ্টিকরণ বক্তব্য। বলছেন “হাসিনা জানেন তিনি ভারতকে সন্তুষ্ট করে না রাখতে পারলে ক্ষমতাচ্যুত হবেন! তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে হাসিনা ভারতকে সন্তুষ্ট করে রাখার নীতি-পলিসি নিয়েছেন” [She knows that she will be toppled if she displeases India. So she has adopted the policy of pleasing India to retain power at any cost.] ।

    বুঝা গেল এক দগদগে হিন্দুত্ববাদের দেশপ্রেম ছাড়া তিনি জীবনে আর কিছু শিখেন নাই। আর তিনি তার ভারত সরকারের বাংলাদেশের প্রতি অপততপরতা-গুলো সম্পর্কে ভালই ওয়াকেবহাল!

    এক বিরাট জট খুলে গেলঃ
    তার মানে আমাদের জন্য এক বিরাট জট খুলে গেল। গত দুর্গাপুজায় কুমিল্লা কাহিনী, যেটা ইকবাল হোসেন এর কোরান শরীফ রেখে আসা, গদা কাধে বীরত্বে ফিরে আসা আর শেষে তার নিজেরই মুসলমান ভাইদেরকে প্রতিবাদে নেমে আসার উস্কানি – এসবটা নিয়ে ১২টা ক্যামেরা লাইভ ফুটেজ সংগ্রহ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রমাণিত স্টোরি, যেটা মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সবাই জেনে গেছি। এখন বাকি থেকে গেছে ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে এসাইনমেন্ট দাতা শক্তিটা কে? তা জানা।

    এখন আমরা সম্ভবত বলতে পারি আবদি আমাদের কে বলছেন এই শক্তিটা হল  ‘র’। এমন শক্তিধরই নাশকতা বা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করতে পারে, কারণ,১। এ’শক্তি বাংলাদেশে ভেটোসদস্য-ওয়ালা পাঁচ রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ২। এ’শক্তি বাংলাদেশে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম, এক প্রতিষ্ঠান। যা এমনকি ক্ষমার-অযোগ্য র‍্যাবের চেয়েও বেশি নৃশংস। ৩। হাসিনা র-এর হাতে মরবার ভয়ে মরটাল ফিয়ারে [mortal fear] দিন কাটাচ্ছেন। ৪। হাসিনা এই গুপ্তঘাতকের হাতে মরবার ভয়ে ভারতকে ক্রমাগত সন্তুষ্ট করেই টিকে আছেন ও চলেছেন।

     

    অতএব ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে এসাইনমেন্ট দাতা শক্তিটাই RAW বা বাংলায় ‘র’। এই অপততপরতা বা অ-কাজ সে করতে পেরেছে এক সহজ ফর্মুলায় যে মন্দিরে কোরান শরীফ মানেই তা হিন্দুদের কাজ বলে ভাড়াটে কিছু মুসলমানকে দিয়েই উস্কানি তোলা।  আবার এরাই এর মানে দিয়েছে এটাই হিন্দুদের হাতে কোরান শরীফের অবমাননা। অথচ এটা যে ‘হিন্দুদের কাজ’ না হয়ে, ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের কাজ হতে পারে এবং হয়েছে – এবং ইকবালদের পিছনের শক্তি যে আবার বিদেশি ‘হিন্দুরাই’ হতে পারে, র নিজেই হতে পারে, এসব নিয়ে চিন্তা করতে কেউ চায় নাই। মনে হতে পারে যারা রাস্তায় কথিত সাম্প্রদায়িকতা লড়েছে এরা “অশিক্ষিত” মুসলমান তাই এসব  বুঝেন নাই। না বভুঝেই করেছে। তাই কী? না তা একেবারেই মিথ্যা কথা।

    হিন্দুদের মন্দির বা মুর্তি ভাঙলে তা মুসলমানদের কাজ না হয়ে যায় না। এই হল গত দুশ বছরের অনুমান। অন্যের মুর্তি বা মসজিদ ভেঙ্গেও যে অন্যের উপর দোষ চাপানো সম্ভব অতএব আমাদের ফ্যাক্টসে যেতে হবে সবার আগে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনুমান যেটাকে এখনও সত্যি কিনা তা নিয়ে কেউ ভেঙ্গে খুলে দেখতে যাচাইয়ে রাজি না। তাই কুমিল্লার ঘটনায় শহুরে আর শিক্ষিত পড়ালেখাওয়ালারা আগাম মুখস্ত বলে গেছেন এটা “মৌলবাদীদের” কাজ। কেউ আরও আগেবাড়িয়ে এটা ‘জঙ্গীবাদের’ কাজ বলেছেন।

    এককথায়, এটা সংগঠিত মুসলমানের কাজ,আগাম এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করেছে শিক্ষিতরাই। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলো যেমন। সাথে বিবৃতিদাতারাও আছে। তাদের একটা মুখস্ত শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িকতা’, মানে হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল। এরা সেই ফর্মুলায় ফেলে চোখ বন্ধ করে মুসলমান বা ইসলামি রাজনীতিকদের দায়ী করছেন। অথচ এতে যে এই শিক্ষক সমিতির নেতাদের পছন্দের দল ও নেত্রী হাসিনাও দায়ী হচ্ছেন তাতেও তারা কেয়ার করছেন না। এতই তাদের হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীল পরিচয়ের প্রতি লোভ ও নেক।

    এমনকি আবদি যেখানে বলছেন হাসিনা ‘র’ এর ভয়ে পালিয়ে কাপতেছেন,যেকোনভাবে ভারতকে সন্তুষ্টি করতে লেগে আছেন! অথচ  তাতে বাংলাদেশের সেকুলার ও প্রগতিশীল পরিচয়ের জগতে কোন বিকার নাই। হাসিনার দুর্ভাগ্য এটাই! অন্তত আবদিও তো হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীলই! তাই না? যদিও এসব শিক্ষক সমিতি বা সাথে ৪৭ জনএর বিবৃতিবাজরা জেনে অথবা না জেনে কিন্তু ইতোমধ্যেই হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়ে ইকবাক হোসেন এন্ড গঙদের পিছনের নেতাদের হাত আকড়ে ধরে নিয়েছে।

    বেচারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই চিৎকার করে ভারতের বুঝবার মত ভাষায় বলছেন, Attack on Hindus not communal issue, but conspiracy, – যা ভারতের সব প্রধান পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তবু ভারতের কেউই হাসিনা ও তার মন্ত্রীদের কথা আমল করছে না। সবাই এটা হিন্দু-মুসলমানের কথিত সাম্প্রদায়িকতার ক্যাচাল, এমন মুখস্ত প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে যেতে রাজি হয় নাই। দেখা যাচ্ছে র’ এর এই ব্যাখ্যা হাসিনা ও মন্ত্রীদের হারিয়ে দিয়েছে। অবশ্য  বাংলাদেশেও হাসিনা ও মন্ত্রীদের বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব আছে অনেক আগে থেকেই। এরা এরই সুযোগটা নিয়েছে এমনকি আওয়ামি দলীয় শিক্ষক সমিতিও হাসিনা ও মন্ত্রীদের পক্ষে নাই; তারা র এর অবস্থানের পক্ষে দাড়িয়ে গেছে।

    আবদিও সেকাজটাই করেছেন। তিনি হাসিনাকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আর্ডেন্ট এর মত হতে পারেন নাই বলে সমালোচনা করেছেন। মানে আবদি বলতে চাইছেন, হাসিনারও ব্যাপারটাকে কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতার’ গল্পের ফ্রেমে ফেলে ইকবাক হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে যারা আছে,যাদেরকে ‘মৌলবাদী’ বা ‘জঙ্গি’ (যে শব্দগুলো একটা হিন্দুত্ববাদী সেকুলার ও প্রগতিশীল মন শুনতে পছন্দ করে) বলে হাসিনার এদের নিন্দা করা উচিত ছিল। অর্থাৎ হাসিনা যতই বলেন এটা not communal issue, but conspiracy সেটা আবদিও তা শুনতে রাজি না।

    অথচ এত সাহসী* সাংবাদিক আবদি কিন্তু দেখেনই নাই যে হাসিনা সরাসরি মোদীকে হুশিয়ারী দিয়েছেন অন্তত বিবিসি তা যতটা সম্ভব স্পষ্ট করে ছেপেছে? এটা আবদি এড়িয়ে গেছেন কেন? দেশপ্রেমে? হাসিনা মোদিকে দায়ী করেছে বলে? তাই আপনার জন্য রিস্ক হয়ে যায়? এর মানে আপনি মোদীকে সার্ভিস দিতেই কী এই লেখা লিখেছেন? এমন বহু প্রশ্ন উঠতে পারে।

    একারণেই একথাটাই আমি বলছি যে যতই সাহসী মেডেল পাওয়া হন না কেন, ভারতীয় মুসলমানদের হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীলই থাকতে হয়!

    সবশেষে একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। তাহল, আবদি বাংলাদেশের বা দুনিয়ার ইসলামি রাজনৈতিক ধারাগুলো সম্পর্কে ধারণায় সীমাহীন অজ্ঞানতা,এটা পীড়াদায়ক! এসম্পর্কে ভারতের একজন সাধারণ হিন্দুর যে ধারণা আপনার ধারণা এর উর্ধে না। আপনি সাহসী জার্ণালিস্ট আর অন্তত পারিবারিক পরিচয়ে মুসলমান  – অন্তত এটুকুর খাতিরে আপনার নুন্যতম জানাশুনা আছে মানুষ যেটাই আশা করবে। আপনি ভারতীয় “হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীল” বয়ানে আটকে থেকে নিজের কেরিয়ারের সীমা টানতে চাইলে কে ঠেকাবে। অন্তত একাদেমিক ভাবে হলেও তো আপনাকে জানতেই হবে। অথচ ইদানিং আপনার ট্রেন্ড হল এশিয়ান বিদেশি পত্রিকার সাথে কাজ করা, লেখা দেয়া। যেমন আমরা দেখছি আপনি অহরহ ব্যবহার করেছেন ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ এই শব্দটা। এটা না-বুঝ অবুঝ এক ঘৃণাবাচক শব্দ। অথচ কেরিয়ারে নুন্যতম সিরিয়াস কথিত সেকুলার ও প্রগতিশীলরাই  এখন বুঝে গেছে এই শব্দ দুহাজার সালের আগের, মানে গত শতকের। চলতি শতকে নাইন-ইলেভেনের পরে এনিয়ে নতুন শব্দ ধারণা পশ্চিমাজগতই এনেছে। যেগুলোও আবার এখন (২০২১ সালে এসে আফগান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরে) চ্যালেঞ্জের মুখে। যেমন আমেরিকান থিঙ্কট্যাংক ফেলোরাই এখন প্রকাশ্যে নিজের আর্টিকেলে ‘তথাকথিত ওয়ার অন টেরর’ বলছে। অর্থাত বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’ এর দায় নিচ্ছেন না;দায় আমেরিকান প্রশাসনকে দিয়ে সরে যেতে চাইছেন।

    আপনি আবদি আবার হেফাজত নিয়ে কথা তুলতে গেছেন। এতে আপনার অজ্ঞানতা আরও ফেটে প্রকাশিত হয়েছে। আগেই বল্লেছি আপনি বাংলাদেশের ইসলামি ধারাগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ। পলিটিক্যাল টার্ণগুলো সম্পর্কেও। ফলে আন্দাজে ভারতের হিন্দুমনের উপর দাঁড়িয়ে অনুমানে কিছু বললে তা আপনার বিরুদ্ধেই যাবে। ভারত সরকার হাসিনা হেফাজতের সাথে ডিলিং (আমি সম্পর্ক বলি নাই) একেবারেই পছন্দ করে নাই। এর মানে আপনাকেও মোদির পো ধরতে হবে? নাকি ইন্ডেরপেন্ডেন্টলি ব্যাপারটা বুঝতে হবে? প্রশ্নটা খারাপ ভালোর চেয়েও কেন এমন হয়েছে সেটা বুঝাই আপনার প্রফেশনের দিক থেকে উপযুক্ত করণীয় হতে পারত।

    শেষ কথাঃ
    ইতিহাস বলে, বিশ শতকে একটা মুসলিম জাতিবাদ অথবা  একালে “সারা দুনিয়াকে কেবল মুসলমানের দুনিয়া বানিয়ে”  রাজনীতিতে মুসলমানেরা নেমেছে নিজে নিজে নয়। বেকুব অন্যেরা তাদের এভাবে নামতে বাধ্য করেছে।  ইতিহাসে দুবার এমন ঘটেছে।

    একঃ ভারতের হিন্দুনেতারা নিজেদের খুবই বুদ্ধিমান আর চালাক মনে করে জবরদস্তিতে একটা হিন্দু জাতিবাদের ভারত কায়েম বা হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের ভারত কায়েমের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেটা ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্ম থেকেই। যদিও এর আদি উদ্যোগ চিহ্ন খুঁজতে আপনাকে ১৮১৫ সালে যেতে হবে। অথচ হিন্দুনেতারা কেউ বুঝেন নাই যে এটা আত্মঘাতি। তাদের এই হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের কায়েমের চিন্তা এই হিন্দুত্ববাদের ভিত্তি খাড়া করা – এটাই মুসলমানদেরকেও এক মুসলমান জাতিরাষ্ট্র গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করবে। হিন্দু জাতিরাষ্ট্র চিন্তা এক মুসলমান জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার জনক হবে; এথেকে মুসলমান মনে মুসলমান- জাতিরাষ্ট্র চিন্তা ডেকে আনবে। এবং ঠিক তাই হয়েছিল। আমরা জিন্নাহর হাত ধরে ও মুসলিম লীগ গড়ে নিয়ে পাকিস্তান কায়েম করে নিয়েছিলাম। এখন কমিউনিস্ট আর হিন্দুত্ববাদী মুসলমান-ঘৃণার মনগুলো জিন্নাহকে দোষারোপ করে নিজেকে বাচানোর চেষ্টা করে চলে।

    দুইঃ ঠিক প্রায় একইভাবে প্রেসিডেন্ট বুশ মনে করেছিলেন সোভিয়েত পতনের পরের দুনিয়া একমেরুর দেশ হয়ে গেছে। তিনি এক বিরাট কুতুব। ফলে কেউ তাকে বলার কিছু নাই। এমন ভেবে নাইন-ইলেভেনের হামলার প্রতিশোধের উছিলায় নিজেকে সীমাহীন ক্ষমতাধর ভেবে যা করলেন তা দেখতে আফগানিস্তানে হামলা। কিন্তু ইভেনজেলিক বুশ এর অর্থ দিলেন যে,আমেরিকান আপনারা মুসলমানদের সাথে আর আমেরিকায় থাকবেন না। আর পারলে অন্যান্য দেশেও। মুসলমান – এরা সবাই নাকি আমেরিকার জন্য সন্দেহজনক।  অথচ টেরও পেলেন না  এতে নিজের জন্য কী ক্ষতিটা করলেন। এতে বুশ আসলে প্রকারন্তরে মুসলমানদেরকে বলে দিলেন মুসলমান তোমরাও এমন একটা দুনিয়ার কথা কল্পনা কর যেখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ নাই। এটাই গ্লোবাল খলিফা-ইজম কায়েমের চিন্তা। অথচ এখন আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম বলছে এরা জঙ্গীবাদ, টেরর। এরা ইনক্লুসিভ না। আরও কত কী? দোষের শেষ নাই। আর ভারত ২০০২ সালে থেকে বুশের এই টেররিজমের সাথে হাত মিলিয়েছে। এতে বুশ  ভারতের সেই পুরান পাপ “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” সাথে যা ততদিনে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ হয়ে গেছে তার সাথে নিজের টেররিজমের বয়ানের মুসলমানবিদ্বেষ – এই দুই বয়ান গাটছাড়া বেধেছেন। এছাড়া কাশ্মীরের ভুল এবং অন্যায়ের উপর চাদর ঢাকতে এটাই বাজপেয়ি করেছিলেন। ফলাফল আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি।

    এজন্যই এক বাণী বা তত্ব বলে, তত্বটা হলঃ
    আপনার এনিমি কেমন হবে সেটা কিন্তু আপনিই আকার দেন! তাই নিজের আচার আচরণ চিন্তা সম্পর্কে সাবধান। কারণ, এগুলাই আপনার শত্রু কেমন হবে সেই আকার বৈশিষ্ঠের নির্মাতা!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    ২৮ অক্টোবর ২০২১
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [ আমার এই লেখাটা  আর কোথাও ছাপা হয় নাই।]

  • মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ

     

    মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ 

    গৌতম দাস

    ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    [সার-সংক্ষেপঃ  আরএসএস প্রধান এই মোহন ভাগবত, ইনার দাবি মুসলমানেরা নাকি বেশি পয়দা করে। এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে ধর্মীয় জনসংখ্যায়  ভারসাম্যহীনতা মানে কী? একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? দেশে হিন্দু-মুসলমান কী সমান থাকতেই হবে? কেন? ইহা কি বস্তু? যে না থাকলে কী ক্ষতি? যদি নাগরিক মাত্রই সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয় তো উনার সমস্যা কী?
    আর এই মোহন ভাগবত তিনি কে?  কোন নবাব বা দেশের কোন মালকিন উনি? তার অনুমতি নিয়ে কী মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে নাকি? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন?
    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে – এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? উনি কী দিয়ে বুঝেছেন, মেপেছেন যে কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন জনসংখ্যা বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার ভারসাম্য বলে কোন বস্তু পরিমাপ করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন? ইউজলেস লুজার সব!]

     

    There has been attempt to increase Muslim population and turn India into Pakistan: Mohan Bhagwat

     

     

    প্রধানমন্ত্রী মোদী কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন? ভারতের আগামী নির্বাচন মানে প্রধানমন্ত্রিত্ব নির্ধারণের নির্বাচন বা চলতি ভাষায় অনেকে একে ‘কেন্দ্রের’ নির্বাচন বলে। আর আনুষ্ঠানিক ভাষায় তা ১৮তম “লোকসভার” নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের শেষে ফলাফল হয়ে যাওয়ার কথা ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে, এই হলো শিডিউল।

    অনেকের মনে হতে পারে এখনো সে তো প্রায় আড়াই বছর মানে অনেক দূরে। না, ঠিক দূরে না। ভারতের ভোটের হিসাবে আগামী মার্চ মাস – সেটা হল অনেকটা আমেরিকার মিড-টার্মের মত। আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের চার বছর টার্মের মধ্যে মাঝামাঝি, ঠিক দুই বছরের সময় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংসদের সব আসনেরই নতুন নির্বাচন হয়। আর সাথে সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনেও নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ্টাই মিড-টার্ম নির্বাচন। এর ফলাফল যাই আসুক প্রেসিডেন্ট স্বপদেই থেকে যাবেন, কিছুই হবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে মানুষের মনোভাব বোঝা যাবে, যেটা পরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট বা তার দলের ভবিষ্যত কেমন এর ইঙ্গিত দিবে।

    ভারতের (এখনকার) ছোটবড় মিলিয়ে মোট ২৮ রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় হল উত্তরপ্রদেশ। এরাজ্য একাই কেন্দ্রের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৮০ আসনের; যেখানে এর পরের বড় বড় পাঁচ রাজ্যের আসন হল – ৪৮, ৪২, ৪০, ৩৯, ২৮ এরকম। মানে উত্তরপ্রদেশের পরে অন্য রাজ্যগুলো সবাই অনেক ছোট, প্রায় সবাই এর অর্ধেক আসনের নিচে। তাই উত্তরপ্রদেশের নিজ রাজ্য-নির্বাচন (যা প্রাদেশিক বা লেজিসলেটিভ) ভারতের মিড-টার্ম নির্বাচনের মত বলে মনে করা হয়।

    উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন আগামী বছর ২০২২ সালের মার্চে, ৪০৩ আসনের রাজ্য নির্বাচন হবে এটা। মনে করা হয় এ রাজ্যে মোদীর দল আগামী মার্চে এবারো জিতলে তা মোদীকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরতে সহায়তা করবে। এ ছাড়াও মনে করা হয়, ভারতের তথাকথিত কেন্দ্রের শাসন মানে হিন্দিভাষীর শাসন, উত্তরপ্রদেশের শাসন বা কালচারালি আর্য আধিপত্যের শাসন ইত্যাদি সব উত্তরপ্রদেশের সাথে যুক্ত।
    এখন উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ও শাসন বা আসলে নির্বাচন মানে হল যোগী আদিত্যনাথের দানবীয় নিপীড়নের মুখে দাঁড়ানো। তবুও উত্তরপ্রদেশে আগামী মার্চে কে জিতবে সেটা আজকের এলেখার কোনো ইস্যু নয়। এখানে আজ ইস্যু বা লেখার প্রসঙ্গ হল এখন থেকে সারা ভারতে আরএসএস-বিজেপির নির্বাচনী ইস্যু কী হতে যাচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা। কারণ সম্প্রতি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত “ভাস্ট ডিফারেন্স” বলে ফেটে পড়েছেন। তিনি গত শুক্রবার নাগপুরে (মহারাষ্ট্রে) বার্ষিক বিজয়াদশমী পালন উপলক্ষে বক্তৃতা রাখছিলেন।

    কিন্তু ‘ভাস্ট ডিফারেন্স’ মানে কী?
    ভাস্ট ডিফারেন্স বা ব্যাপক ফারাক বলতে কী কিসের ফারাক বুঝানো হয়েছে?  মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। এটা অনেক দিনের পুরানা এক  ইতরোচিত রেসিস্ট [racist] বা হিটলারি অভিযোগ; বিশেষত যখন আরএসএস-বিজেপির মনে হয় যুতসই অভিযোগের অভাব ঘটেছে, তখন এটা তারা আবার উঠায় আনে। স্বাধীন হওয়ার পর ভারতে এ’অভিযোগ প্রথম তুলেছিল ১৯৫১ সালে আসাম রাজ্য। সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে। তবে সারা অসমীয়া বা আসামিজ [Assamese] জনগোষ্ঠী করেছিল। সেই সময় থেকে (পূর্ব পাকিস্তান) বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষ বাঙালিরা মূলত তারা বুঝাত মুসলমানরা, আসামে অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ প্রথম জোরেশোরে ফোকাস উঠতে থাকে। পরে ট্রাইবাল বা পাহাড়িসহ সব অসমীয়া-জনগোষ্ঠী এক দিকে আর বাকিরা সবাই ‘বিদেশী’, এভাবে এক যুক্তিতে ভাগ করে সর্বাত্মক বিভেদ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা আর এদের কারো হাতে থাকেনি; অসমীয়া-জাতিবাদীদের চরম-উগ্র আন্দোলন হয়ে উঠেছিল। শেষে ১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক আপস-চুক্তি করেছিলেন এই শর্তে যে, তিনি “আসামে বিশেষ জনগণনা” ও প্রত্যেকের “নাগরিকত্ব চেক বা যাচাই” করে কথিত বিদেশী বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করে বের করার বন্দোবস্ত নেবেন। রাজীব গান্ধীর ভাষায় তিনি এই আপস না করলে আসাম ভারত থেকে আলাদা হয়ে যেত। তাই তিনি এমন আপস করেছিলেন। কিন্তু তিনি পরে এ নিয়ে কোনো বাস্তবায়নে যাননি। ফলে অসমীয়-জাতিবাদ আরো চরম উগ্র হয়ে উঠতে থাকে। আর তাদের এই উগ্রতার জোরে তারা একেবারেই নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আসামের “সব দুঃখের কারণ” হল বাংলাদেশের বাঙালি। (অথচ নেহেরুর  আসল ভয় হল আসাম ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চীনের অংশ হয়ে যেতে পারে অথবা অন্তত চীন আসামের উপর দিয়ে করিডোর নিতে পারলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এরপর বঙ্গোপসাগরকে বন্দর হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে যেতে পারে – এই ভয়ে তারা আসামকে সবসময়  যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল করে ফেলে রাখতে চেয়ে এসেছে। আর এটাই আসামের পিছিয়ে পড়া রাজ্য হয়ে থাকার মূল কারণ। ) তাই তাদের অসমীয়-জাতির জন্য জীবন দিয়ে ফেলতে পারে এমন চাওয়া অসমিজ ইন্টেলেকচুয়ালরা আদালতের মাধ্যমে ওই দাবি বাস্তবায়নে আগানোর বা বলা যায় এক সেমি-ষড়যন্ত্রের পথ ধরেন। এর এক কুতুব নেতা বলতে পারি আমরা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক রঞ্জন গোগই [Ranjan Gogoi], এই অসমিজের নাম করতে পারি। এক বেআইনি কাজকে তারা আইনি রূপ দিয়ে হালাল করেছেন বলা যায়।  বিচার বিভাগ গায়ের জোরে নির্বাহি বিভাগের কাজ হাতে তুলে নিয়েছিল। আসামের মাঠের নাগরিকত্ব যাচাই আদালতের কাজ ছিল না।  তবু তারা তাদের মুসলমান-ঘৃণা ও অনুপ্রবেশকারি তত্ব সত্য প্রমাণ করতে একাজ করেছিল। এবং তাতেও ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশীদের কথিত অনুপ্রবেশ তাদের সব দুঃখ ও সম্পদ হারানোর কারণ’ একথা তারা মাঠের গণনা ও শতভাগ নাগরিকত্ব পরীক্ষা করেও দেখেছেন – কথা সত্য নয়, প্রমাণ করতে পারেন নাই।
    বাস্তবে এই গণনা পরিচালিত হয়েছিল পুরোটাই আসামের কোনো প্রশাসন নয়, খোদ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। আর অন্য প্রদেশ (মধ্যপ্রদেশ) থেকে ক্যাডার অফিসার এনে আর মূলত বিচারক রঞ্জন গোগইয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং যখন এর শেষ ১৩ মাস তিনি  ভারতের চিফ জাস্টিস সেসময়ে। কিন্তু সব চেষ্টার পরও শোচনীয়ভাবে অসমীয়া-জাতিবাদীরা তাদের দাবির বাস্তবতা প্রমাণ করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতি ও ফলাফলে তারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বিজেপি (তখন রাজ্য সরকারে) প্রস্তাব করে মুখরক্ষার্থে আবার ১০-২০ শতাংশ বাংলাদেশসংলগ্ন আসাম সীমান্ত অংশে আবার গণনা করতে বিচারক রঞ্জন গোগই যেন এক আদালতের নির্দেশ জারি করে দেন। উদ্দেশ্য ছিল এবারের পুণঃগণনায় কারচুপি করে মুসলমানদের ‘অনাগরিক’ বলে বেছে বের করে দেয়া হবে। কিন্তু রঞ্জন গোগই  আর নোংরা  একাজে নিজেকে জড়াতে রাজি হননি। তিনি ওই প্রাপ্ত গণনাকেই ফাইনাল বলে রায় দেন। তাতে কিন্তু অসমীয় নেতা-পাবলিকেরাও এবার বিজেপি থেকে আলাদা হয়ে আন্দোলন শুরু করার চেষ্টা করে; কারণ তাদের বিভেদের পয়েন্ট হল, বিজেপি চাইছিল বাংলাদেশী সাধারণভাবে নয়, কেবল বাংলাদেশের কথিত মুসলমানদের বের করে দিতে নতুন কিছু করে। আর অসমিজরা বলছিল, তারা হিন্দু-মুসলমান সব বাংলাদেশীকে বের করতে চান, যা তাদের অরিজিনাল দাবি ছিল।

    এদিকে গত ২০১৯ সালে আসামে আবার রাজ্য নির্বাচন হয় এবং বিজেপি আবার ‘কোন জাদুমন্ত্রে’ ক্ষমতায় আসে। কারণ এই নির্বাচনের আগে অসমীয় ন্যাশলালিজম এত উগ্র হয়ে উঠেছিল খোদ বিজেপির বিরুদ্ধে যে মোদী পাঁচবার এসেও মিটিং করতে পারেন নাই, ফিরে গেছিলেন।  আর এবার নতুন চালে নতুন করে এবারের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। আর এসেই  এরই মধ্যে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, “মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। তাই ওই কথায় গত জুলাই মাসে আনন্দবাজার লিখেছিল, “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ বিধান সভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এমনকি আনন্দবাজারও ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যে লিখেছে, ‘তবে মুসলিম জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে বলে দাবি করলেও, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে দেখা যায়নি হিমন্তকে।’

    “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী অসম সরকারও। তার জন্য ১ হাজার ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ সোমবার বিধানসভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।”  – আনন্দবাজার ২০ জুলাই ২০২১।

    আর ওদিকে অসমীয়া দেশপ্রেমী ভাইয়েরা, তাদের কী খবর? তারা ক্রমেই এখনো ‘অসমীয়া জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Assamese culture superior to RSS ideology] – এই জাতিবাদের ঝাণ্ডা সবখানে উঁচিয়ে চলেছেন। কিন্তু বিজেপির বয়ান ও বাক্সে ঢুকে গেছেন সেটা এখন ভুলে আছেন। গত মাসে আসামের বৈধ-মুসলমান নাগরিককে প্রায় ছয় হাজার একরেরও বেশি বৈধ নিজ জমি থেকে মুখ্যমন্ত্রী তাদের উৎখাত করে দিয়েছেন। প্রথমে বলা হল শিবমন্দির বানাতে মুসলমানদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে দেখেন বিবিসির রিপোর্ট  আসাম: শিবমন্দির বানাতে মুসলিম উচ্ছেদ, বিক্ষোভে পুলিশের গুলি। পরে বলা হল যে না একটা কৃষি খামার করবে হাজার একরের।

    “বেশ কয়েক মাস ধরেই আলোচনা হচ্ছিল এই উচ্ছেদ আর তার পরের পুনর্বাসন নিয়ে। সরকারের দাবি এই জমি তাদের। গ্রামবাসীরা দখলকারী। তাই তাদের সরে যেতে হবে। “কেন এটা সরকারি জমি হবে? আমাদের পূর্বপুরুষরা উচিত দাম দিয়ে এই জমি কিনেছিল। সেই দলিলও আমাদের কাছে আছে,” বলছিলেন আজিরুন্নেসা নামের এক নারী।

    সরাসরি সেই হত্যার ক্লিপ আর বিবিসির সরেজমিন রিপোর্ট আপনারা দেখেছেন, যেখানে নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর বক্তব্য যেটা শিরোনাম করা হয়েছে যে, আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: ‘আমাদের দোষ একটাই – আমরা মুসলমান’ বলছিলেন ধলপুরের এক গ্রামবাসী।

    এই হলো হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যার ‘ভাস্ট ডিফারেন্সের’ মানে, ব্যাপক ফারাকের গল্প। এত দিন ভাবা হয়েছিল, বিজেপি এমন করে আসামে বা বিক্ষিপ্তভাবে উত্তরপ্রদেশে যোগীর রাজ্যে জোর করে ভ্যাসেকটমি করা বা ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামানো হতে পারে।

    কিন্তু না। এটা আর শুধু বিজেপির না, এটা এখন একেবারে আরএসএসের কেন্দ্রীয় প্রোগ্রাম, মানে এটাই আরএসএস-বিজেপির প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির মূল কর্মসূচি। সে কথাই ঘোষণা করেছেন মোহন ভাগবত গত শুক্রবার।

    ‘Vast differences’ in growth rate of religions
    ভাস্ট ডিফারেন্স থিওরি।  ভাগবত গত ২০১৫ সালের তাদেরই এক পুরনো প্রস্তাব বের করে এনেছেন, বলেছেন এটি নাকি তাদের ‘পপুলেশন পলিসি’। তবে তিনি মোদি সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি’ বানাতে বলছেন। আর দাবি করছেন, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ জনগোষ্ঠীর জন্মহার বৃদ্ধির ব্যাপক ফারাক, অনুপ্রবেশ ও ধর্মান্তকরণের ফলে আমাদের ধর্মীয় জনসংখ্যার অনুপাত ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। বিশেষত সীমান্ত এলাকাগুলোতে, যা আমাদের দেশের ঐক্য, সংহতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে ‘অনুপ্রবেশ ও উচ্চ জন্মহার এমন দুভাবেই মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ভারতের ঐক্যের জন্য বিরাট হুমকি’। 

    Friday called for a National Register of Citizens (NRC) and a review of the population policy, pointing out “demographic imbalance” due to “vast differences” in the growth rate of different religions and infiltration in border areas.

    “আমাদের জনসংখ্যার মধ্যে ভারতীয় ধর্মীয় অরিজিন যারা এরা ছিল ৮৮ শতাংশ, যা ১৯৫১-২০১১ এ সময়ের মধ্যে নেমে এসেছে ৮৩.৮ শতাংশে। অথচ এর বিপরীতে মুসলিম জনসংখ্যা যা আগে ছিল ৯.৮ শতাংশ বেড়ে হয়ে গেছে ১৪.২৩ শতাংশ” । এ ছাড়াও শেষে মোহন ভাগবত যা বলেছেন, তাতে তারই মানসিক স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। তিনি বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনের পরে সে সহিংসতা শুরু হয়েছে এবং আর তাতে রাজ্য সরকার যে বর্বরতা ও জনসংখ্যার (হিন্দু-মুসলমান) ভারসাম্যহীনতাকে তোয়াজ করেছে, তাতে হিন্দুদের দুস্থ অবস্থা উঠেছে চরমে।’ এখানে উদ্ধৃতিগুলো নিতে হয়েছে শনিবারের ভারতের ওয়েব ম্যাগাজিন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে।

    This resolution says the share of religions of “Bharatiya origin” — including Hinduism, Buddhism, Jainism and Sikhism and excluding Islam and Christianity — came down to 83.8 per cent in 2011 census from 88 per cent in 1951 while the Muslim population increased to 14.23 per cent from 9.8 per cent during that period.

    বাংলাদেশে পুজাঃ
    এদিকে বাংলাদেশের  দুর্গাপূজার শেষ দুই দিন স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে পারেনি। আবার আমাদের মুসলমান জনগোষ্ঠীও প্রচণ্ড অস্বস্তিতে, তারাও ক্ষুব্ধ; তাদের জন্যও ধর্মীয় অবমাননাকর ঘটনার জন্য। আবার সরকারও খাচ্ছে হিমশিম; আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে তাদের নাজেহাল অবস্থা হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কোনোপক্ষই সন্তুষ্ট নয় একেবারেই। এক কথায় বললে, কোথাও একটা স্যাবোটাজ হয়েছে,আমাদের আন্তঃজনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা ছিটানো হয়েছে, যা সরকারের অনুমানের নিয়ন্ত্রণসীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই একটি লজ্জায় পড়ে গেছি। আমাদের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক সমসাময়িককালে এমন খারাপ হয়নি এবং দুর্দশায় কখনো পড়েনি। এরই মধ্যে আমরা দেখলাম বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারী একটা স্পষ্ট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি লিখিতভাবে (যে চিঠি বিবিসিতে প্রকাশিত) প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে বাংলাদেশে ‘হস্তক্ষেপ করতে’ আহ্বান রেখেছেন!  অর্থাৎ সকালে মন্দিরে কোরান শরীফ রেখে আসার ঘটনা আর সন্ধ্যায় মোদীকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের জন্য ডাক দেয়া?
    তার নিশ্চয় অজানা নয় যে, আরেকটা দেশে হস্তক্ষেপ করতে প্রকাশ্যে আহ্বান জানানোর অর্থ-তাৎপর্য ও এর দায়-দায়িত্ব কী? দেখা যাচ্ছে তিনি আগে থেকেই যেন সব জানতেন। তবে বিবিসি তার প্রপাগান্ডা করতে রাজি হয়নি না হলেও তাকে দুরেও ফেলে নাই। তার আহবানের চিঠি ঠিকই প্রচার করে দিয়েছে! তা হলে বাংলাদেশের সহিংসতায় তার সংশ্লিষ্টতা কী সেটি পুরাটা এখন খুলে বলার দায় বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারীর। আর বাংলাদেশের উচিত হবে এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করা।

    যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, মোদির আগামী নির্বাচনে জয় না পাওয়া নিয়ে তিনি কি নিশ্চিত? না হলে মুসলমানরা নাকি ‘বেশি বাচ্চা পয়দা’ করে অথবা জনসংখ্যা ‘ভারসাম্যহীন’- এসব কথা যে রেসিজম বর্ণবাদিতা, তা জেনেও এমন কথাগুলো তাদের র‌্যাংক অ্যান্ড ফাইল- আরএসএস থেকে বিজেপি সব নেতাকর্মী মুখ্যমন্ত্রী মরিয়া হয়ে উচ্চারণ করতে শুরু করেছে কেন? সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ এমন কথা বলতে পারে না।

    এই মোহন ভাগবত, এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা মানে কী? মানে একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? এটা কি বস্তু?

    মোহন ভাগবত তিনি কে? তার অনুমতি নিয়ে মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন? ইউজলেস লুজার সব!

    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে- এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? ইনি কী দিয়ে বুঝেছেন, কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার পরিমাপক করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন?

    ভারতের কনস্টিটিউশনে বা কোন আইন অনুযায়ী, মুসলমানরা কথিত কোন ভারসাম্য ভেঙেছে? আর সেটি তিনি ডিকটেট করার কে? তিনি কোন মহারাজা?
    মোহন ভাগবত কি জানেন ভারতের সরকারি ভাষ্য হলো, মুসলমানদের জনসংখ্যা বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক?

    আবার এসমস্ত বক্তব্যই তো এক রেসিস্ট বক্তব্য। তিনি নিজেই মনেও হচ্ছে, জলাতঙ্ক রোগীর মতো মুসলমান-আতঙ্কে ভুগছেন! এত ভয়াবহ অসুস্থতা! এটি তো হিটলারের অন্য জাতি-ঘৃণা বা অন্য জাতি-আতঙ্ক এসবেরই কপি। ভারতের কনস্টিটিউশনাল কোর্টের উচিত হবে এই দাঙ্গাবাজ অসুস্থ উসকানিদাতাকে থামানো, স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্তত কিছু পদক্ষেপ নেয়া। নইলে এসব অসুস্থ লোক এ অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেবে, নিজেরাও পুড়ে মরবে। াশা করি ভারতে কিছু সুস্থ লোক এখনো বেঁচে আছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৬ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বেশি পয়দার বিরুদ্ধে মোদির সংগ্রাম“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতের নিজেকে বিশেষ প্রিয়া দাবি, আমেরিকার অসহায়ত্ব

    ভারতের নিজেকে বিশেষ প্রিয়া দাবি, আমেরিকার অসহায়ত্ব

    গৌতম দাস

    ১১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3L8 

     

    State-Dept-No-2-to-visit-Pakistan-India-after-Taliban-takeover

    –
    সার-সংক্ষেপঃ ছবিতে মাঝখানে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা আমেরিকান ডেপুটে সেক্রেটারি অব স্টেট ওয়েন্ডি শেরমান যার দুপাশে দুজন, বায়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আর ডানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী। ওয়েন্ডি ভারত-পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন, বিশেষত আফগানিস্তান ইস্যু নিয়ে কথা বলতে। তাতে প্রথমে ভারত, পরে পাকিস্তানে গিয়ে এই ইস্যুতে কথা বলার পরে শেষে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের পরে এই প্রথম ওয়েন্ডি সরাসরি আফগানিস্তান সফরে চলে গেছেন যখন আমেরিকা একা নয় দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রই তা-লে-বা-ন সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন নাই। আবার তাদের নয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণও যখন ঘটে নাই, এমন সময় এটা।  তাই তা-লে-বা-ন-দের জন্য এটা মর্যাদার ও  আনন্দের যে খোদ আমেরিকা  আনুষ্ঠানিক  স্বীকৃতিদান সম্পন্ন না হলেও ওয়েন্ডি আফগানিস্তানে আসার তাগিদ বোধ করেছেন ও কথা বলেছেন। কিন্তু ভারত থেকে পাকিস্তান রওনা দিবার আগে, ভারত নিজেকে আমেরিকার “বিশেষ প্রিয়া” যেন এই গুরুত্ব দাবি করে বসেছিল। কী করে? যখন সে জানতে পারে ওয়েন্ডি ফেরার সময় পাকিস্তান যাচ্ছেন, তখন এটাকে দেখেছিল ভারত-পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপা মানে সমান গুরুত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে অনুযোগ করেছিল। শব্দটা হল, হাইফেনেশন মানে ভারত-পাকিস্তান মাঝখানে একটা ড্যাশ দিয়ে লেখা। স্বভাবতই এটার কো গুরুত্ব দেন নাই ওয়েন্ডি। আসলে এসম্পর্কেও একুটাই শব্দ প্রয়োগ করার আছে  “ফাজলামো” করে ভারত নিজেকে নিচে নামাচ্ছে! অপ্রয়োজনীয়!]

     

    কোনো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসাবে একজন প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রিন্টেড পত্রিকায় নিজের রাষ্ট্র-সরকারের মনোভাব-অনুভব নিয়ে কলাম লিখবেন তা সাধারণত আমরা দেখতে অভ্যস্ত নই। তবে তাই বলে তিনি লিখতে পারবেন না, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং এমন সরাসরি লেখার ভেতর দিয়ে একধরনের স্বচ্ছতা আর অনেককে বা অনেক ইস্যুকে কিভাবে তিনি দেখেন, দেখতে চান তা নিয়ে আর কোনো লুকোছাপা গোপন ডিলিং নয়, এর বদলে ইস্যুটাকে ওপেনহ্যান্ড ডিলিং করার সাহস দেখানো যায়, অবশ্যই।

    তেমনি একটা কাজ করেছেন পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি আমেরিকার “ওয়াশিংটন পোস্ট” পত্রিকায় একটা মতামত কলাম লিখেছেন গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। বলাবাহুল্য, তাতে প্রসঙ্গ হলো, এ সময়ের মুখ্য ইস্যু আফগানিস্তান এবং ২০ বছরের দখলমুক্তিতে একজন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পাকিস্তানির ফিলিং ও মূল্যায়ন। আর তার শিরোনাম হলঃ [Imran Khan: Don’t blame Pakistan for the outcome of the war in Afghanistan]।

    সেকালের পাকিস্তান আমলের এক পশতুন এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ার একরামুল্লাহ খান; এমন বাবার অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট ছেলেই হল ইমরান খান। প্রচলিত অর্থে ইমরান রাজনীতিবিদ নন, মূলত আন্তর্জাতিক লেভেলের ক্রিকেট প্লেয়ার বা দলের ক্যাপ্টেন। সেখান থেকে রিটায়ারমেন্টের পরে যেমনটা হয় আমরা দেখি, তিনি জীবন উপভোগকারী; কেউ কেউ যার ভেতর প্লেবয় ইমেজও খুঁজে পান। এরপরও তিনি সরাসরি রাজনীতিক হতে যাননি, বরং তার আগে সামাজিক চ্যারিটি বা দাতব্যমূলক কাজে নেমে গিয়েছিলেন; একেবারে এক ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ার কাজে। এরই মধ্যে একবার হঠাৎ তিনি ১৯৯৬ সালে এক নয়া রাজনীতিক দল খুলে বসেন, নাম তেহরিক-ই-ইনসাফ। বাংলা করলে অর্থ হয় ‘ইনসাফের জন্য আন্দোলন’। দলের সংক্ষিপ্ত নাম পিটিআই [PTI] (পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ)।

    আমেরিকা গত ৪০ বছর ধরে পাকিস্তানকে প্রথম নিজের পছন্দের ইসলামে সাজিয়েছে আর  যেভাবে খুশি পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছেঃ
    আফগানিস্তান থেকে ২০ বছরের দখলদারিত্ব সম্প্রতি শেষ টেনেছে আমেরিকা। তবে এই ২০ বছরেরও আগের (গত শতকে) ২০ বছরের ইতিহাসও কম লম্বা ছিল না। বলা যায় ১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিলের ইরান বিপ্লব ছিল এর সুইচ-অন বা স্টার্টিং ঘটনা। ইরান এক নয়া ‘ইসলামী রিপাবলিক’ বলে নিজেকে ঘোষণা করেছিল সেদিন। ইরানের ঐ “খোমেনি বিপ্লবের” সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হল, এই প্রথম ১৯০১ সাল থেকে ইরানের তেল চুষে খাওয়া ব্রিটিশ কোম্পানি আর পরে (১৯৫৩ সাল থেকে) আমেরিকান নেতৃত্বে ব্রিটেনসহ পশ্চিমা পাঁচ তেল কোম্পানির যৌথ লুটপাট বন্ধ ও উতখাত করতে সক্ষম হয় তারা। ইরান এখান থেকেই তাদের গুটিয়ে চলে যাওয়ার শেষ দিন ঘোষণা করতে পেরেছিল।
    কিন্তু তাতে আরেক নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয় ভীত সোভিয়েত ইউনিয়নের মনে। তার দুশ্চিন্তা হল সেন্ট্রাল এশিয়া নিয়ে। সেন্টাল এশিয়া বলতে যা এখন আলাদা পাঁচ দেশ, আর যাদের নামের শেষে ‘স্তান’ আছে যেমন কাজাখস্তান, কিরঘিজিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান; এরা। গত (১৭২১-১৯১৭) রাশিয়ান জার-সম্রাটের আমল জুড়ে সেন্ট্রাল এশিয়া রাশিয়ার দখলে ছিল; আবার পরেও লেনিন-স্টালিনের  বিপ্লব বা আমল থেকে তাঁরাও এদের নিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে নিয়েছিল। পিছনের মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ার জনগোষ্ঠী এরা একেবারে গোড়ায় এথনিক জনগোষ্ঠি হিসাবে হল চীনা-মঙ্গোলয়েড। তারা চীনের তাং রাজার [Tang dynasty (618–907 CE)] অধীনে ছিল। কিন্তু  আব্বাসীয় ডাইনেস্টির আমল (৭৫০-১২৫৮) এই তাং রাজা পরাজিত হয়ে যায়। আর তাতে বাসিন্দারা তখন থেকে মুসলমান বা ইসলাম অনুসারী হয়েছিল। ফলে ইরানের খোমেনি বিপ্লবের পরে ইরানের পড়শি এরা না “বিপ্লবী” প্রভাবে পড়ে যায় আর তাতে না তারা তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বের হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়। এই ভয়ে কমিউনিস্ট সোভিয়েতরা ইরান আর সেন্ট্রাল এশিয়ার মাঝখানে এক প্রাচীরতুল্য বাফার স্টেট হিসেবে অবস্থানে থাকা আফগানিস্তানকে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ সামরিকভাবে দখলে নিয়ে নিয়েছিলেন ওই বছরই, ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯।  যার কাভার দেয়া হয়েছিল যে  আফগান কমিউনিস্ট পার্টি নাকি আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে ব্রেজনেভ-এর দেশকে ডেকে নিয়ে এসেছে।  কিন্তু এতে হিতে বিপরীত ঘটে যায়।

    সেটা স্নায়ুযুদ্ধের আমল; ফলে সোভিয়েত “আগ্রাসনের” বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে আমেরিকা ফরজ জ্ঞান করে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করেছিল। বলা যায় পাকিস্তানকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে চরম অপব্যবহারটা করতে শুরু করেছিল।  এতে পাকিস্তানকে “আমেরিকান স্বার্থে ইসলামী” করে সাজিয়ে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে ‘মুজাহিদিন’ আন্দোলন শুরু করেছিল আমেরিকা। এতে পাকিস্তান নিজের স্বার্থের নিজের জন্য আর দেশ-রাষ্ট্র থাকেনি। পাকিস্তান হয়ে যায় একদিকে সিআইএর ঘাঁটি ও তৎপরতার কেন্দ্র; অন্যদিকে আফগান রিফুইজিদের আশ্রয় আর আফগান মুজাহিদিন যোদ্ধাদের সুরক্ষার দেশ যাতে, তারা সোভিয়েত উৎখাতে তারা লড়তে পারে – এমনই এক লঞ্চিং প্যাড বা ভুমি হয় পাকিস্তান। শেষে ১৯৮৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত বাহিনী হেরে যায়।  হার স্বীকার করে সোভিয়েত বাহিনী চোখের জলে কাবুল ত্যাগ করেছিল, ঠিক যেমন গত ১৫ আগস্ট ২০২১ আমেরিকা কাবুল ত্যাগ করেছে।

    ফিরে আসি একালে। “ওয়াশিংটন পোস্টে” ইমরানের ওই মতামত-কলামের মুখ্য তাৎপর্য হল তিনি আমেরিকাসহ পশ্চিমা মন ঠিকমত পড়তে পেরেছেন বলে তাদের ওপর ঠিকমত সওয়ার হয়ে এলেখাটা লিখতে পেরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকা কিভাবে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে একেবারে একান্ত নিজস্ব স্বার্থে বারবার পাকিস্তানকে ব্যবহার করে গেছে। যদিও সেটা বলার চেয়ে ‘ব্যবহৃত হতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে’ বলা সঠিক হবে। পশ্চিমা মন পড়ে তাদের মনের ভাষায় কথা বলাতেই ইমরানের এ’লেখা আকর্ষণীয় হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডাসহ পশ্চিমা মন যারা ওয়ার অন টেররের প্রপাগান্ডায় “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী”- এব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠায় ২০ বছর ধরে কসরত করে গেছেন; এদের মুখের উপরই ইমরান এক কড়া জবাব দিয়েছেন। কারণ পাকিস্তান শুধু এই শতকের ২০ বছর নয়, গত শতকেরও ২০ বছর ধরে আমেরিকার স্বার্থে বলি হয়ে গেছে বারবার। যেন আমেরিকা নয় (তার স্বার্থ বা নীতি নয়), পাকিস্তানই ‘সন্ত্রাসবাদ’ আবিষ্কার করেছে আর চর্চা করে গেছে।

    জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৯৭৭ সাল থেকে। এই জিয়াউল হক, আমেরিকা তাঁর ঘাড়ে সওয়ার হয়েই সোভিয়েত তাড়ানোর কৌশল হিসেবে এক ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন। আর তাতেই পাকিস্তানকে আরো কথিত ইসলামী করে গড়ে তুলতে পুরনো বৃটিশ আমলের পেনাল কোডের ২৯৫ ধারাকে নতুন করে ব্লাসফেমি আইন বলে একে ঢেলে সাজিয়ে প্রচারে আনা হয়েছিল। আর ওদিকে নতুন নতুন মাদরাসা খোলার জন্য অঢেল অর্থ দেয়ার এক কর্মসূচির পুরোটাই আমেরিকান কর্মসুচী ছিল যা সোভিয়েত তাড়ানোর  আমেরিকান ততপরতার অংশ। সৌদি আরব ও কিছু বিশেষ পাকিস্তানি মাওলানার তত্ত্বাবধানে তা বাস্তবায়িত হয়েছিল। অথচ এখন মুসলমান মানেই জঙ্গি আর পাকিস্তান তাদের আঁতুরঘর যেন- এটাই আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রধান বয়ান ও অভিযোগ। আর এখান থেকেই ভারতের কথিত জঙ্গিবাদের বয়ানও শুরু হয় [সাথে অবশ্য ভারতীয় কাশ্মীরের ভোটচুরি করে এই ব্যবস্থা অকেজো করে দেওয়ায় দায়ী]। বাংলাদেশেও এরা বলে, কথিত পশ্চাৎপদ বলে মুসলমানরা নাকি ব্লাসফেমি আইন চায়, মাদরাসাগুলো হলো জঙ্গি গড়ার আস্তানা প্রভৃতি প্রপাগান্ডা। ভারতকে সাথে নিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশ-ব্লেয়ার  আর আমেরিকান থিংকট্যাংকের এই যে বয়ান, একেই ইমরান খান চ্যালেঞ্জ করেছেন, ঐ লেখায়।

    কেন এসময়ে তিনি করতে গেলেন?
    সাম্প্রতিককালে আফগান সেনা প্রত্যাহার-উত্তরকালে আমেরিকান কংগ্রেসে (সংসদে) এনিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে শুনানি চলেছিল। আমেরিকা লবিংয়ের দেশ, লবিং করার কাজ বৈধ।  কংগ্রেস সদস্যের কাছে  খাতির জমিয়ে লবিং করে দিবে বলে কারো কাছে থেকে অর্থ নিতেও সমস্যা নেই। কেবল বিচার মন্ত্রণালয়ে রাখা একটি ফরম পূরণ করে রাখতে হবে। তা করার সময় স্ব-উদ্যোগে অর্থ নেওয়ার কথা আগাম তা উল্লেখ করে আসতে হবে। তবে এই লিখে স্বীকার করে নেয়া কোনোই অপরাধ নয়। তাই কোনো সমস্যা নেই। তবে ভবিষ্যতে এ কাজের ভেতরে অন্য কোনো আইনভঙ্গ করার বিষয় যুক্ত বলে প্রমাণিত হলে তখন সেই আইন ভঙ্গের কারণে এটা অপরাধ হতে পারে। নইলে না। এই কংগ্রেস বা সিনেটরদের লবিংয়ে ভারত লবিং খুবই শক্ত। কারণ তারা মেরিকান ব্যবসায়ীদেরকে নানান ব্যবসা দিয়ে কংগ্রেস্ম্যানদের সাথে সম্পর্ক গড়ে নিয়েছে। ফলে ভারতও এদের দিয়ে এই শুনানিতে পাকিস্তানের ওপর সব দায় চাপিয়ে বাইডেনকে মুক্ত করতে লেগে পড়েছে। আর এ কারণেই ইমরান নিজের হাতে ও নামে মতামত কলাম লিখেছেন।

    ইমরানের ওই লেখায় প্রথম প্যারাটা এরকমঃ “সাম্প্রতিককালের কংগ্রেসনাল শুনানি দেখে আমি আসলেই বিস্মিত হয়েছি। গত দিনগুলোতে (প্রায় ৪০ বছর, ইমরান কম করে কেবল চলতি শতকেরটা ধরে দুই দশক বলেছেন) আমেরিকার সহযোগী দেশ হিসেবে পাকিস্তানিরা আমেরিকার ওয়ার অন টেরর কর্মসূচিতে যে আত্মত্যাগ করেছে, এর কোনো উল্লেখ নেই দেখে বিস্মিত হয়েছি। অথচ এর বদলে আমরা দেখছি  আমেরিকার যেসব ক্ষতি হয়েছে, এই শুনানিতে এর কারণে আমাদেরকে দায়ী করা হয়েছে”।

    “Watching the recent Congressional hearings on Afghanistan, I was surprised to see that no mention was made of Pakistan’s sacrifices as a U.S. ally in the war on terror for more than two decades. Instead, we were blamed for America’s loss.” – Imran Khan

    অথচ “আমি বারবার বলে এসেছি আফগানিস্তানে বিজয়-সম্ভব-নয় [unwinnable], এটা এমন একটি যুদ্ধ। আফগানরা এমন এক লড়াকু জাতি, যারা কখনো নিজ ভূমিতে বিদেশী উপস্থিতি সহ্য করেনি। এমনকি সেই বিদেশী পাকিস্তান হলেও এই বাস্তবতা বদল হবে না”। এরপর ইমরান ওই সব বিগত বছর পাকিস্তানের কী কী ক্ষতি হয়েছে, আত্মত্যাগ করেছে, এসবের পরিসংখ্যানগত লম্বা বর্ণনা সাথে জুড়ে দেন।

    এসবের বর্ণনাযুক্ত বয়ান পাঠকরা ঐ  মতামতকলাম থেকে নিয়ে অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিতে পারে। ঘটনাচক্রে প্রথম এ’ব্যাপারটা  আমার নিজের নজরে এসেছিল পাকিস্তানের ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে। আমার হাতে আসে ইমরানের দলের ঘোষিত মেনিফেস্টো, যা সম্ভবত ২০১৬ সালে তৈরি করা; কারণ তাতে ওবামা আমলে ব্যাপক ড্রোন বোমা হামলা ঘটনার পরিসংখ্যান দিয়ে নিন্দা জানানো হয়েছিল। আমি ওবাক হয়েছিলাম এ জন্য যে, এই প্রথম আমেরিকান ওয়ার অন টেররকে একেবারে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে মানে পাকিস্তানকে কিভাবে বাধ্য করা হয়েছে আর এতে পাকিস্তানের স্বার্থে কিভাবে বিঘ্ন হয়েছে – এই বয়ান দাঁড় করানো হয়েছে।

    কিছু ব্যক্তি অভিজ্ঞতাঃ
    গত ২০১৩ সালের দিকে বিদেশে মানবাধিকার ইস্যুতে এক প্রোগ্রামে অংশ নেয়ায় অনেক দিন পর কিছু পাকিস্তানি নারী-পুরুষের সান্নিধ্যে সাথে দু-তিন দিনের সেশনে কাটাতে হয়েছিল। ফলে সেসময় একালের পাকিস্তানের তরুণ-যুবাদের সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল। এমনিতে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিদেশী চাকরি সূত্রে অনেক পাকিস্তানি আমার কলিগ ছিলেন, কখনো বাসা পাওয়ার সমস্যায় তাদের সাথে একই বাসায় বসবাস বা শেয়ার করেছি; স্বভাবতই অফিসরুমও শেয়ার করেছি।  বিশেষত সেটা আফ্রিকা বলে আমরা এশিয়ান পাকিস্তানি, আফগানি, ভারতীয় বা ভুটানিরা যেন আপন আত্মীয় হয়ে গেছিলাম।  দে্শিভাইয়েরা তো আছেই, সাথে ভারতীয় ব্যাটেলিয়ন আর বিশেষত পাকিস্তানি ব্যাটেলিয়ান অফিসারেরা; কারণ তারা  মাসে অন্তত দুদিন আসত আর খুব খাওয়াদাওয়া হত।  তবু পাকিস্তানের তারুণ্যে এসব লেটেস্ট পরিবর্তন তখনো তেমন জানা হয়নি। তবে ২০১৩ সাল থেকে আলজাজিরার কিছু রিপোর্ট থেকে প্রথম টের পাই আমাদের চেনা সেই পুরনো রক্ষণশীল পাকিস্তান বদলে যাচ্ছে। তরুণ বা নয়া প্রজন্ম আগের আমেরিকান বয়ানে আর আগ্রহী নয়। খুঁড়িয়ে হলেও পাকিস্তানে এক নয়া প্রজন্ম, এক নয়া এডুকেটেড মধ্যবিত্ত একালে হাজির হয়ে গেছে। আমার রিডিং ও অনুমান এই নয়া প্রজন্ম পাকিস্তানকে বদলে দিচ্ছে।  পাকিস্তানের জন্য তারাই সম্ভবত আগামী দিনের বিরাট ভরসা! যেমন আসলে আর কত? – দোষ মূলত আমেরিকার অথচ দেশ-বিদেশে প্রপাগান্ডা চলছে যে সব দোষ পাকিস্তানের, আর পাকিস্তানই জঙ্গি ইত্যাদি বয়ান শুনতে শুনতে তারা হতাশ ও বিরক্ত। ফলে আমার মনে হত ইমরান আগামিতে তাদের সম্ভাব্য নেতা হবেন হয়ত। আর এরই কিছু ২০১৩ সালের শেষের নির্বাচনে এর কিছু আলামত দেখেছিলাম। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে এসে এর সরাসরি ফল দেখলাম।

    পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বদলঃ
    ইমরানের সাথে তুলনা করলে অপর দুই দল ও নেতা ভুট্টো বা নওয়াজ শরিফের দল, এদের ব্যর্থতা হল – তারাও নিঃসন্দেহে প্রচণ্ডভাবে যা-ইচ্ছা তাই ভাবের আমেরিকান চাপ সয়েছেন আর পাকিস্তানের উপরেই ড্রোন-বোমাবাজিসহ যা ইচ্ছা আমেরিকা করতে চায়, তা সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তারা এখান থেকে বের হওয়ার পথ না খুঁজে বরং সে সময়-সুযোগটাতে আমেরিকার নামে দোষ চাপিয়ে রাষ্ট্রীয়-সম্পদ নিজের নামে দখল বাড়ানো  ও লুটের দিকে কাজে লাগাতে গেছেন। এটা অকল্পনীয় যে, আমাদের মত দেশের কোন নেতা দুই বিলিয়ন ডলার সম্পদ গড়েছেন। দুই বিলিয়ন কী ব্যক্তির একাউন্ট বা পকেটে থাকার মত অর্থ? অথচ এটাই পাকিস্তানে হয়েছে।
    আর ওদিকে সেনাবাহিনীও প্রচণ্ডভাবে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিল বিশেষ করে ট্রাম্প আমলের শুরু থেকেই।  ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানে প্রতিদিন গড়ে আমেরিকাকে নিয়মিত ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় থেকে আমেরিকায় নিজ প্রশাসনকে বাঁচানো; কিন্তু তিনিও  পাকিস্তানকে এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দায়ী বলে মনে করে তাতে ভারতকে সাথে নিয়ে প্ররোচনায় তার প্রপাগান্ডা শুরু করতে থাকেন।
    গত ২১ নভেম্বর ২০১৮ ট্রাম্প বলেন,  “ওরা (মানে পাকিস্তান) আমাদেরকে সাহ্যায্য করতে কিছু করে নাই” – আর এই অজুহাতে তিনি মোট প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রত্যাহার করেছিলেন [“Done Nothing To Help Us”: Trump On Stopping $1.3 Billion Aid To Pakistan]। এই প্রপাগান্ডা নিউজটা ভারতের। তবে সবচেয়ে বড় হৈচৈ পড়েছিল যে খবরে সেটা হল, ৩০০ মিলিয়ন ডলার যা Coalition Support Funds  হিসাবে যা পাক-আর্মিকে দেয়ার কথা তা প্রত্যাহার করে নেওয়ায়।  কিন্তু আমেরিকান [VOX News] ভক্স নিউজ জানায় ঘটনা কিছু অন্য। তারা লেখেছিল,  It’s all part of a broader strategy to have Pakistan help defeat regional militants — but it’s unclear if the strategy is working. কিন্তু এই কৌশল কেন নেয়া হয়েছে তা অস্পষ্ট।

    ফলে সারকথায় ট্রাম্প পাকিস্তানকে আরো ঠেকিয়ে ধরেছিলেন। কারণ ডলার আয়ের অভাব তখন এমনিতেই পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ছেয়ে বসেছিল। যদিও তাতে  ততদিনে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত সেনাবাহিনী আমেরিকান “অস্পষ্ট” অভিযোগ নিয়ে ট্রাম্পকে আর তোয়াজ করতে যায় নাই, সম্পর্ক এতই নিচে নেমে গেছিল। ফলে আর আমেরিকাকে আবার আপার হ্যান্ডে যাবার সুযোগ দেয় নাই বা আসে নাই। ফলে তখন থেকেই রাজনীতিবিদদেরও আগে পাকিস্তান সেনারা নতুন বন্ধু খুজতে গিয়ে চীনের কোলে গিয়ে উঠেছিল। চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক বহু আগের কমপক্ষে ১৯৬৮ সাল থেকে, তা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু তা সত্বেও পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা গুরুত্ব বা ঘণিষ্ঠতা চীনেওরও উপরে।  ফলে ভারত যতই প্রপাগান্ডা করুক প্রথমত চীন নয়, পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা গুরুত্ব বা ঘনিষ্ঠতা ছিল চীনের চেয়েও উপরের।  আর দুইঃ আমেরিকাই পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক একেবারেই দুর্বল করে ফেলেছিল।  বাধ্য হয়েও সে চীনকেই নিজ সম্পর্কের শীর্ষে নিয়েছিল। আসলে আফগানিস্তানে খরচ ও ব্যর্থতায় ডুবে আমেরিকার বেপরোয়া আচরণই সব সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। একেবারে ভাঙ্গে নাই, কিন্তু মর্ম দুর্বল হয়ে গেছে স্থায়ীভাবে।
    শেষে, ২০১৮ সালের শেষ থেকে ট্রাম্প বুঝতে পারেন, তাঁর এই মিথ্যা কৌশল অকাজের; এটা তাঁর নিজের স্বার্থের পক্ষেই কাজ করবে না।  মুল কারণ, আমেরিকাকে  আফগানিস্তান ফেলে বের হতে যেতে গেলে – কোন পুতুল গণি সরকার তাকে সাহায্য করতে পারবে না। আমেরিকার একমাত্র পথ ও ভরসা যদি তারা তালেবানদের সাথে একটি চুক্তি করতে পারে। কারণ যুদ্ধের ময়দান পরিত্যাক্ত ফেলে কারো ভেগে যাওয়ার পরিকল্পনার মানে হল পালানোর সময় কেউ আক্রমণ করলে সে্টা থেকে কাভার মানে ঐ হবু আক্রমণ থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করবে কে? এর ব্যবস্থা করতেই – টানা বিশ বছর যে তালেবান যোদ্ধাদের সাথে আমেরিকা যুদ্ধ করল  ট্রাম্প  বুঝে যান যে এই তালেবান যোদ্ধাদের সাথেই তাকে চুক্তিতে আসতে হবে। কিন্তু এই সমস্যা আরো জটিল কারণ ট্রাম্প টের পেলেন যে, পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যে  আমেরিকানদের সাথে একটা চুক্তি করতে তালেবানদেরকে রাজি করাতে আমেরিকাকে সাহায্য করতে পারে।

    তাই ট্রাম্প তালেবানদের সাথে আপসনামা রচনায় তাঁর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোমাট [Zalmay M. Khalilzad] জালমে খলিলজাদকে নিযুক্ত করার পরই ট্রাম্প পাকিস্তানের সাথে দ্রুত সব  বিবাদ মিটিয়ে ফেলেন। তবে ২০১৮ সালে ইমরান প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলে তালেবান আলোচনা গতি পায় যদিও;  কিন্তু ততদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমেরিকা থেকে বহু দূরে সরে গেছে। বলা যায়  মূলত গত প্রায় বিশ বছরের গভীর সামরিক সম্পর্ক, নির্ভরশীলতার  সম্পর্ক পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেকটাই গুটিয়ে ফেলেছিল।  আর ততই চীনের সাথে সম্পর্ক গভীর করে নিতে এগিয়ে যায়।  খুব সম্ভবত এটাই পাকিস্তান সেনা প্রশাসনের ইমরানের দলের সাথে  নয়া এক ওয়ার্কিং রিলেশন গড়ে তুলার ভিত্তি হয়ে যায়। যেটা একেবারেই মাঠে কার্যকর হয়ে যায় ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে।

    আমেরিকা যে সারাজীবন একান্ত নিজের স্বার্থে পাকিস্তান ব্যবহার করে গেছে অথচ এর সব আবর্জনার ও দায় উলটা পাকিস্তানের উপর ঢেলেছে – আর এর বিপরীতে ইমরানের দলের নয়া বয়ান পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে শুধু ছুঁয়ে যায় তাই না,  হুঁশের এই বয়ান পাকিস্তানে সবচেয়ে কার্যকর এক নয়াপথ হিসাবে হাজির হয়েছিল।  আসলে  অতি-নির্ভরশীলতা ত্যাগ না করলে, কষ্ট না করলে স্বাধীনতা ভোগের যোগ্য হওয়া যায় না – সেটাই ঘটেছিল।  আর তা পেরেছিল বলেই তারা ইমরানের সাথে সম্পর্ক গড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। বরং এখন উলটা পাকিস্তানের ওপর আমেরিকান নির্ভরশীলতা এখনো বর্তমান। আফগানবিষয়ক বা ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার ওই অঞ্চলে আমেরিকার সব ধরনের স্বার্থের জন্যই আমেরিকার পাকিস্তানকে দরকার। এ কারণে ভারত যতই চেষ্টা করুক, মার্কিন কংগ্রেসকে দিয়ে পাকিস্তানবিরোধী চাপ সৃষ্টি করবে ইত্যাদি যাই করুক; কিন্তু বাইডেন প্রশাসন জানে পাকিস্তানকে তার কেন দরকার।

    ওদিকে ভারতের হাহাকারঃ
    এরই মধ্যে দোহায় (২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০) দেড় বছর আগের আমেরিকান-তালেবান চুক্তিতে ভারত কী কী হারিয়েছে বা কী কী নেই, তাদেরকে জানানো হয়নি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভারত এখন আপত্তি তোলা শুরু করেছে। কোথায় আর এখন কেন?

    জয়শংকর বলেছেন, দোহা চুক্তির বহু বিষয় নিয়ে ভারতকে অন্ধকারে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রঃ
    গত ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল ওয়াশিংটনে ভারত-আমেরিকা ‘কৌশলগত পার্টনার’ ফোরামের চতুর্থ বৈঠক [US-India Strategic Partnership Forum (USISPF)] । যদিও হিন্দুস্তান টাইমসের নিউজটা জয়শঙ্করের  ভনেকটা ঘুরিয়ে বলা ভাষ্যটা। বলা সেই ভাষ্যটা এরকম, ট্রাম্প-তালেবান কথা চালাচালির অনেকগুলো থেকেই ভারত বাইরে পড়ে গেছিল ‘India wasn’t fully in the loop on US-Taliban deal’: Jaishankar explains concerns]।
    সেখানে ভারতে আমেরিকার এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ফ্রাংক জি উইজনারের প্রশ্নে এসব মতভিন্নতা বাইরে চলে আসে [During the question and answer session, former US ambassador to India Frank G. Wisner quizzed him on the “dramatic” developments in India.]। ফলে যদিইও সেটা ভারত-আমেরিকার দুই সরকারি বৈঠক নয়। তবু উইজনারের প্রশ্নের জবাবে নিজের অনুযোগ জয়শঙ্করকে সেখানে হাজির করতেই হয়েছিল।  সেখানে ভারতের ক্ষোভ হল – “ভারতকে জানানো হয়েছিল যে, এক ইনক্লুসিভ সরকার হবে (ভারতের কাছে এর ব্যাখ্যা সম্ভবত, গণি সরকারেরও প্রতিনিধি তালেবান সরকারে থাকবেন)। এ ছাড়া নারীদের কী হবে? আর সর্বোপরি ভারতের প্রশ্ন, তালেবানের আমলে কি ভারতীয় কাশ্মিরের মুসলমানরা তালেবান সহায়তা পাবে?” তবে কথাটা অন্য ভাষ্যটা হল, যেমন বলা হচ্ছে যে, তালেবানের মাটি কি অন্য দেশে সন্ত্রাস চালানোর কাজে ব্যবহৃত হবে? কিন্তু এই একই প্রশ্নের অন্য দিক আছে, আগে যেভাবে গনি সরকারের আমলে আফগান মাটি ব্যবহার করে ভারত-আমেরিকার সমর্থনে  চীন ও পাকিস্তানে  অন্তর্ঘাতমূলক
    আক্রমণ চলত, প্রজেক্টে হামলা চলত, চীনা প্রকৌশলী নিহত হতেন, সেসবের কী হবে? অর্থাৎ সেই একই গান?  ভারত-আমেরিকার সমর্থনে যে চীন ও পাকিস্তানেও সন্ত্রাসী আক্রমণ চলছে তা নিয়ে তিনি চুপচাপ।  তবে ওই স্ট্র্যাটেজিক সভা শেষ হয়েছে ভারতের এ মর্মে অসন্তোষে যে, আংশিকভাবেই গনি সরকারের আমলের কোনো সুযোগ-সুবিধা ফেরত আসছে না কেন!

    এব্যাপারে আমেরিকান ব্যাখ্যা হল, আমরা ৩০ আগস্টের আগেই সব অস্ত্র ও রসদ নিয়ে ফিরে চলে আসব, কোনো কিছু আর আফগানিস্তানে ব্যবহার করব না – চুক্তিতে এমন কথা ঢুকিয়েই আমরা বিপদে পড়ে গেছিলাম।। চুক্তির এই ফেরে পড়েও তালেবানরা চুক্তির কোনো অংশ বাস্তবায়ন না করলেও আমরা চিপায় পড়ে গেছি। মানে এখন কিছুই করার নেই, ‘মাফ চাই’ ধরনের।

    আর ভারতের ততই গোসসা। এতদিন কংগ্রেসের শুনানি চলাবস্থায় বাইডেন প্রশাসন পাকিস্তানের সাথে তাদের অনেক কথা বলা দরকার হলেও তা করতে যাননি। অবশেষে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমানের ভারত সফরে গত ৬ অক্টোবর ফরমালি ভারতের গোসসা শোনা হয়। ভারত এবার সুযোগ পেয়ে আফগান হাক্কানি নেটওয়ার্কের আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি জানিয়েছে। দ্যাপ্রিন্টের নয়নিমা বসু তার আর্টিকেলের শিরোনাম করেন “India raises concerns over Haqqanis, ISI in Afghanistan with visiting US Deputy Secy of State”]। এই আর্টিকেল পাকিস্তানের মুন্ডপাত করা ভারতের আভ্যন্তরীণ দেশপ্রেমিক জনগণ তা পছন্দ করতে পারে। কিন্তু একাজ নিঃস্ফলা।

    ট্রাম্প কি জানতেন না যে তালেবান বলতে তাদের সাথে হাক্কানি গ্রুপও থাকবে?
    এ বিষয়ে আসলে কিছু কড়া কথা বলতেই হয়। বিয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার পর বাজনা বাজাতে দেখলে মানুষের বিরক্তই লাগবে। ট্রাম্প কি জানতেন না যে তালেবান বলতে তাদের সাথে হাক্কানি গ্রুপও থাকবে?  এমনকি ট্রাম্পের জানা না  থাকলেও নিজে থেকেই হাক্কানি গ্রুপ প্রসঙ্গে আগাম তাদের আপত্তির কথা বরে রাখা যেত। যা তিনি বলেন নাই। তা তিনি বলে নেননি কেন? এফবিআই কিংবা ইউএনের খাতায় হাক্কানি নেতা সিরাজুদ্দিনের মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে নাম আছে তো! তাতে কী?  কারণ, ট্রাম্প যখন দোহা চুক্তি করেই ফেলেছেন যেখানে সিরাজুদ্দিন বা ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ নেতাদের সম্পর্কে কী হবে এ নিয়ে আমেরিকার কোনো আপত্তি করে রাখা হয় নাই। তাহলে সিরাজুদ্দিন বা হাক্কানি প্রসঙ্গে এখন আমেরিকানদের কিছুই বলার নাই। আবার থাকলেও আমেরিকার কিছু করর থাকত না। কেন?  আমেরিকানদের পক্ষে কিছু লেখা থাকলেই তা বাস্তবায়নে তালেবানদের বাধ্য করার জন্য আমেরিকার হাতে কোনো উপায় রাখা হয়নি। তার সব উপায় ও অস্ত্র ৩০ আগষ্টের পরে প্রতাহার করে নিয়ে যেতে বাধ্য ছিল আর আমেরিকানেরা তাই করেছে। কাজেই হাত ধুয়ে ফেলা ছাড়া আমেরিকার কী করার আছে এখন! – এর সোজা অর্থ, এখন এসব ফালতু আলাপ। এখন আমেরিকা চুক্তি করেছে মানেই তারা তালেবানদের সরকারে থাকতে পরোক্ষে হলেও অ্যাপ্রুভাল দিয়ে দিয়েছে। কাজেই ভারতের এখন এখানে সেখানে হাক্কানিদের “তালিকায় নাম আছে’, তালেবান সরকারে হাক্কানিরা আছে – বলে এসব নিয়ে কিছু দিনের প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কোনো মূল্যই নেই।

    আর পাকিস্তান নিয়ে নালিশের ব্যাপারে মার্কিন উপপররাষ্ট্র-মন্ত্রী শেরমান ওয়েন্ডি ভারতকে বহু কিছু বলে দিয়েছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, তিনি বলছেন তা হল, সেই রাধাও নেই আর তার নাচের মন-মর্জিও নেই। মানে ওই সব বাদ দিতে হবে। তিনি সোজা করে বলেছেন, দেখুন  সেই আফগানিস্তান আর নাই এটাতো একুশ শতক আর গত ২০ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে [we live in the 21st century and that things have changed over the last 20 years. ]। এখন যতটুকু যা হতে পারে তা হলো, আমরা সবাই (ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি) যদি এক থাকতে পারি, একসাথে চেপে ধরতে পারি তা হলে কিছু হতে পারে। এরপর তিনি সরাসরি স্বীকার করে নেন যে, ‘সেই আফগানিস্তান আর নেই যেমনটি কেউ কেউ চাচ্ছে।’ মানে কথা সোজা, ও দিন গত, আমাদের সেই মুরোদও আর নেই। কাজেই বিরক্ত কইরেন না…।’

    “And I think what I hope is that everyone engaged with the Taliban, I have no problem, and the United States has no problem with people engaging with the Taliban, and telling them what needs to happen, that we live in the 21st century and that things have changed over the last 20 years. It is not the Afghanistan that they want to, and that it will be very hard to try to go all the way backwards and the international community has to stand as one,”

    শেষে ভারত বোবা হয়ে গিয়ে আর কিছু না পেয়ে এবার শেরমানকে চেপে ধরেছে। কেন? কী নিয়ে? কারণ ততক্ষণে আপনাতেই প্রকাশ পেয়েছে যে, তিনি ভারত থেকে পাকিস্তান যাচ্ছেন। এখন ভারতীয় ছেচড়ামো শুরু হয়েছে, আপনারা তা হলে ভারত-পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপছেন? এটি বলে ‘সে কী কান্না’! মানে ভারত বলতে চাচ্ছে আমরা তো পাকিস্তানের চেয়ে উঁচু জাতের ছিলাম তোমার কাছে। আর তার কী হলো?  কথাটা ইংরাজিতে তারা বলে বলে হাইফেনেটেড করা। মানে ভারত-পাকিস্তান শব্দ দুটো মাঝখানে একটা ড্যাশ দিয়ে লেখা!

    এখন সমস্যা হলো, এই কান্না দেখেও আমেরিকার হাতে কিছুই করার নেই! তবে একটি সান্তনা বাক্য দিয়েছেন ওয়েন্ডি, বলেছেনঃ বিশ্বাস করো বেশি মিশব না, খালি অল্প একটু করে মিশব [It’s for a very specific and narrow purpose]!

    তবে ভারতকে এখন ভান করেই যেতেই হবে যে, আমেরিকার কাছে অনেকের চেয়ে দামি সে!
    তবু খুশি থাকুক, এ আমাদের কামনা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৯ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ভারতের গোসসা, আমেরিকার অসহায়ত্ব“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

     অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

    গৌতম দাস

    ০৭ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৫৬ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3KC

     

     

    গত পনেরো আগস্ট ছিল এক আজব ঘটনার দিন। বিগত ২০ বছর ধরে  (তখন থেকে) এক মেরুর দুনিয়ায় মহাপরাক্রমশালী আমেরিকা, আফগানিস্তানে এক পুতুল সরকার গঠন করে শাসন করে আসছিল। প্রথমে কারজাই পরে গণি সরকার এভাবে। কিন্তু এবছর, যার প্রটেকশনে সেই পুতুল সরকার  ক্ষমতায় ছিল সেই আমেরিকা নিজেকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর তাতে, ‘”তালেবানেরা কাবুল দখলে আসছে’ এই আওয়াজ শুনেই গনি সরকার শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর সত্যিই তালেবান যোদ্ধারা শহর দখল করে এবং ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছিল ঐ ১৫ আগস্ট ২০২১।

    আসলে কোন সরকার যখন তাকে উৎখাত করতে কেউ এগিয়ে আসছে শুনে নিজ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং তার সেনাবাহিনীও কোনও প্রতিরোধে এগিয়ে আসে না, এটাই আসলে মুরোদহীন সরকারের উদাহরণ। কারণ, যার নিজেকে রক্ষার মুরোদ নাই সেটা তো কোন সরকারই নয়!

    সরকারের বৈধতার প্রথম ধাপ হল মুরোদ, যে মুরোদের খাঁড়া অর্থ গায়ের জোর, নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা। এরপরের ধাপ হল, জনসমর্থনে ঐ সরকারের পক্ষে জন-অনুমোদন নেয়া। তবেই সেটা পুরাপুরি এক বৈধ সরকার হয়। যদিও এরপরেও আরেকটা ধাপ থেকে যায় যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি বা জাতিসংঘের স্বীকৃতি। তবে সে পর্যায়ে যাবার আগেই, আশরাফ গনি সরকারের নিজেকে রক্ষার মুরোদ ছিল না, এই হলো গোড়ার সমস্যা।

    ট্রাম্পের আমলে এসে আমেরিকা আফগানিস্তান ‘ফেলে’ পালাতে চাচ্ছিল। তাই আফগানিস্তান থেকে পালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই (আপন ঘোষিত শত্রু) তালেবান গোষ্ঠির সাথেই এক আপোষনামা রচনার চেষ্টা করেছিল। আর তাতে সফল হলে এক চুক্তি সই করেছিলেন গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। কিন্তু ট্রাম্প এই চুক্তি করেছিলেন গনি সরকারকে উপেক্ষা করে, তাকে এই চুক্তির কোনও পক্ষই না করেই। কারণ  আফগান পুতুল সরকারকে এর মধ্যে আনা যাবে – এটাই ছিল তালেবানের ট্রাম্পকে দেয়া পুর্বশর্ত। আর অসহায় ট্রাম্প নিরুপায় হলে এই শর্ত মেনেই চুক্তিটা করেছিল।

    এই যে গনি সরকারকে উপেক্ষা করে তালেবানের সাথে চুক্তি সই করা – আসলে সেদিন থেকে এর সোজা মানে হয়ে গিয়েছিল; আমেরিকান প্রটেকশনে তারা আর পুতুল সরকারও থাকে না। সরাসরি বললে, বাস্তবত ওইদিন থেকে গনি সরকারকে আমেরিকাও আর কোন সরকার মানতে অস্বীকার ঘোষণা করে দিয়েছিল। যদিও এরপর থেকে কেউ গনি সরকারকে ঠেলে ফেলে দেয়া বা চ্যালেঞ্জ দেয়নি বলে বাইরে থেকে দেখে এটাকে আগের মতনই  এক সরকার মনে করেছিল। আর নিজস্বার্থ এই মোহে ছিল ভারত সরকারও।

    যদিও বাস্তবতা ছিল ট্রাম্প গনি সরকারকে এতিম করে ছেড়ে দিয়েছিল, কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল। গনি সরকারকে সাথে না রেখে কেবল তালেবানের সাথে চুক্তি করার মানেই তো হল ট্রাম্প স্বীকার করে নিয়েছিলেন গনি সরকার বলে কেউ নাই, তালেবান যোদ্ধারাই আফগান ক্ষমতার একমাত্র হকদার। অথচ ১৫ আগস্ট কাবুলে তালেবান যোদ্ধাদের প্রবেশের পরে  সবাই এমন ভান করতে থাকল যেন ঐদিনই বোধহয় প্রথম গনি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হল আর তালেবান ক্ষমতা পেল। এজন্য বলছি ১৫ আগস্ট হল এক আজব দিন! ভান আর ভনিতার দিন!

    এখন ভান করাদের মধ্যে ভারত সরকারকে আমরা শীর্ষে রাখতে পারি। কেন? কারণ তারাও আমেরিকান ক্ষমতার দিকে চেয়ে থাকা বা আমেরিকার আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখা পার্টি। অথচ এখন তারাও নিরুপায়। অতএব তারা ভান করছে বা মনে করছে যে গনি সরকারই “বৈধ সরকার”। তবে আমেরিকান ক্ষমতার আড়ালে বসে আফগানিস্তান থেকে যারা ব্যবসা আর প্রজেক্ট লুটছিল ভারত সরকার তাদের অন্যতম বলেই এই মিথ্যাকথার আড়ালে মুখ লুকানো ছাড়া এখন আর উপায় কী?

    কিন্তু আবার সাবধান! এখন সব অর্থেই কার্যত ‘গনি সরকার’ বলে আর কেউ নাই। কিন্তু এর মানে কি তাহলে আপনাতেই তালেবান বৈধ সরকার? অন্তত আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের বা জাতিসংঘের মেনে নেয়া অর্থে? অবশ্যই না। যদিও কার্যত তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায়।

    আর নিজেদেরকে বৈধ সরকার বলে খুঁটি গাড়তে বা অনুমোদন যোগাড় করতে যেসব বাধা তালেবানের সামনে এর তালিকাটাও ছোট না। যেমন-

    একঃ তালেবানেরা এখনও নিজেরাই ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক শপথ নিতে পারে নাই; শপথের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দেখাতে পারে নাই।

    দুইঃ সেই আনুষ্ঠানিকতায় আবার কাদের দাওয়াত দিবে, এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হল – দাওয়াত দিলেই সে দাওয়াতি আসবে এর নিশ্চয়তা এখনো নাই বলেই মনে হচ্ছে।

    তিনঃ দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ আছে এমন সত্য-মিথ্য অনুমান ছড়িয়েছে যেটা তাদের পক্ষে যাচ্ছে না। আর, ওদিকে শপথ অনুষ্ঠানও হতে দেখাতে পারছেনা বলে সেই অভ্যন্তরীণ আন্তঃ বিভেদের অনুমানই আরও পোক্ত হয়ে চলছে।

    চারঃ সর্বশেষ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো বা না-ভেটোসদস্য সবাই মিলে মোট ১৫ সদস্যের সমর্থনে জাতিসংঘের পাশ হওয়া এক প্রস্তাব যা আহবান রেখেছে,  আফগানিস্তানের সব পক্ষকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ[inclusive] ও মানবাধিকার রক্ষার পক্ষের এক সরকার গড়তে। এনিয়ে বিস্তারে আমার আগের লেখা এখানে।

    পাঁচঃ  অর্থাৎ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, বৃটেন ও ফ্রান্স – এই পাঁচ পরস্পরের স্বার্থবিরোধী ভেটোসদস্য একসাথে এই প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, যা খুব কম ঘটে থাকে, রেয়ার। আর বলা বাহুল্য এটা তাই তালেবানের  উপর খুবই শক্ত চাপ।

    ছয়ঃ আমাদের অনেকের ধারণা, কোন দেশে আমরা মুরোদে কুলালে যেমন ইচ্ছা তেমন কোনও সরকার গঠন করে বসতেই পারি, আর যেন যেমন ইচ্ছা তা চলতে চালাতেও পারি, আমারটাই ভাল, আমার ধর্মটাই বা শ্রেষ্ঠ মনে ঠাউরে সেই যুক্তিতে। কিন্তু এই অনুমান ভুল ও ভিত্তিহীন। একটা সমাজেও আমরা এভাবে টিকতে বা থাকতে পারব না। এছাড়া এটা উল্টা আমাদেরকেই একঘরে করে ফেলতে পারে। ফলে এমন চিন্তার কারণেও এনিয়ে একটা স্থবিরতা চলছে।

    সাত) মূল সমস্যা, তালেবান এক আমিরাত (আমীরের) সরকার-  অর্থাৎ আমিরাতে আফগান সরকার চাইছে। যদিও তারা জনপ্রতিনিধির সরকার না রাজা হবেন তা স্পষ্ট করতে পারছেন না। যদিও ঝোঁক রাজা বা আমীর হবার। [যদিও আমীর হলে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেবে না।]
    এই প্রসঙ্গ শেষ করার আগে  উপরের ছয় নম্বর পয়েন্টে যেটা ভুল অনুমান বলেছি সেটা কেন তা এখন নিচে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নিব।

    ঐ অনুমিত যুক্তি ভুল কেন?
    সমাজ মানেই আসলে পণ্য বিনিময়ের সমাজ। এই বিনিময় মানে আপনি যা উতপাদন করেছেন তা অন্য উতপাদকে দেওয়ার বিনিময়ে সেই উতপাদকের পণ্য পাওয়া-নেয়া ও ভোগ করা। এভাবে পরস্পর সকলে মিলেই এক পণ্য-বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো এটাই সমাজ। তাহলে সমাজ মানেই সেখানে পণ্য-বিনিময় আছে। আর এই পণ্য-বিনিময়ের ভিত্তিতে আমরা সমাজ হয়ে থাকি।
    এখন একটা নতুন কথা বলি।  এই যে আমরা পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় করতে রাজি হই বা জড়াই – এই বিশেষ কাজেরই আরেক অর্থ-তাতপর্য আছে।  যেমন মাইগ্রেশন [migration] মানে গ্রাম ছেড়ে কাজের খোঁজে কাছাকাছি শহর বা রাজধানীর দিকে বসবাসের জন্য রওনা দেয়া, এটাই মাইগ্রেশন।   এখন গরীব বা নদীভাঙনে পড়া লোক যখন কাছের কোন সমৃদ্ধ শহর বা রাজধানিতে প্রবেশ করে  তখন ঐ সমাজে সে বাইরের আর নতুন লোক। এমনকি হতে পারে সে হাতে কোন অর্থও নাই। তাহলে বিনিময় করবে কী করে?  আর বিনিময় না হওয়া মানে কিন্তু নতুন বা মাইগ্রেটেড হয়ে আসা লোকটা যে ঐ নতুন শহরে আছে এর অস্তিত্ব স্বীকৃত না হওয়া।  তাহলে কী হয় তখন?  কান খাড়া করে শুনেন তা হল, আমাদের সমাজে সাধারণত যা ঘটে,  কেউ নতুন আগত লোকটার কাহিনী শুনে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।  এভাবে এখন সম্পর্ক শুরু হবে। একজন সাহায্য করবে বা দিবে (ঠিক কোন সচেতন বিনিময়ে না হলেও) স্বেচ্ছায় আর গ্রহিতা লোকটাও স্বেচ্ছায় সবার জন্য দোয়া করবে। আর সারকথায় এভাবে পরস্পরকে সমাজে স্বীকার করে নিবে। এভাবেই আমাদের অলক্ষ্যে আমরা সমাজে পরস্পরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেই। তাহলে সমাজ মানে পণ্য বিনিময় সম্পর্ক। আর এমন বিনিময়ের ভিতর দিয়ে পরস্পরকে স্বীকার করে নেয়া। এ যেন স্বীকার করে নেয়া যে, হ্যা, তুমিও কিছু উতপাদন বা তৈরি করেছো মেনে নিলাম। এমনকি সময়ে বিনা বস্তুগত বিনিময়, সামাজিক দায় মিটাতে অন্যকে সাহায্য করা আর সর্বপরি সবার জন্য নিঃস্বার্থ দোয়া করা। এভাবেই সম্পর্ক তৈরি করা জড়ানো আর এর ভিতরেই মানুষের বসবাস। আর ঠিক এর উল্টাটাই হল কাউকে একঘরে করে।
    তাই কোন জনগোষ্ঠি নতুন করে রাষ্ট্র-সরকার মানে নতুন করে পারস্পরিক স্বীকৃতির আসর বসানো। আর এটারই সবচেয়ে বড় রূপ হল বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো। আর এর ট্রেন্ডটা হল, যতই দিন যাচ্ছে আমরা ততই আমরা চিনা-জানা তেমন নাই এমন দেশ-ভুমির মানুষের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি, নিজের স্বার্থেই।  তাই শুরু থেকেই যেমন ইচ্ছা তেমন করে চলতে চালাতেও পারি অবশ্যই তবে এটা আইডিয়েল [ideal]। মানে হল এটা  যতটা কল্পনার ততটাই তা বাস্তবে সুবিধার না, আর তা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন কল্পনা।
    সবশেষে, সার্ক নিয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব।

    সার্ক [SAARC]:
     এতদিন ভারত পাকিস্তানের ভয়ে সার্ককে অকেজো করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন তার ভয় এই অবস্থায় যদি ভারতকেই বাদ দিয়ে চীন সার্কে ঢুকে যায় আর সার্ককেই কার্যকর করে ফেলে! তাই ভারত এখন সার্ককেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়। তাই এখন প্রকৃত বাস্তবতাটা হল সার্ক নিয়ে ভারত যেদিকেই যাক, চীনেরই লাভ আর ভারতের ক্ষতিই হবে। মূল কারণ, ভারত চীনের সাথে তুলনাযোগ্যই নয়, কমপেটিবল নয়।
    সার্ক এই জোট নিয়ে কথা-আলোচনা যত দিন যাচ্ছে ততই কমে নাই হয়ে যাচ্ছে। অল্পকথায় একেবারেই এর মূল কারণ, ২০০১ সাল থেকে দুনিয়া নতুন অভিমুখ বা ঝোঁকে বইতে শুরু করানো হয়েছিল তাই।  ভারত বা আমেরিকার মত দেশের ভাষায় বললে এটাকে তারা শব্দে আকারে বলবে  “সন্ত্রাসবাদ” বা “ওয়ার অন টেরর”।  আসলে এসব দেশগুলো ভেবেছিল, “ওয়ার অন টেরর” এর নামে  “ইসলাম কোপানো” শুরু করলে তারা নিজেদের অপরাধ আড়ালে ফেলে দুনিয়াটাকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু আজ ২০ বছর পরের অভিজ্ঞতা বলছে সেটা ঘটেই নাই। উলটা সময়টা এখন ভারত ও আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের এখন কাফফারা দিবার সময়। কারণ তারা সমুলে হেরে  গেছে। আর আফগানিস্তান থেকে সেনা গুটিয়ে চলে আসা এর জলজ্যান্ত নমুনা।  এছাড়া  নতুন নতুন ক্ষত ও বিরোধ তৈরি করেছে তারা, সেসবের জন্য নতুন কাফফারা দিতে হবে। আর সবার উপরে এদের সবার সব ধরণের সক্ষমতাই এই প্রশ্নের সম্মুখীন ও পড়তির দিকে। তাই বুদ্ধিমানেরা কেউ কেউ আগেই পুণঃমুল্যায়নে বসে গেছে। কিন্তু না চাইতে যেসব নতুন ক্ষত তৈরি করেছে তার কী হবে?
    কথাটা বোধহয় এভাবে বলা যায়।  আগেই বলেছি এখানে “ইসলাম কোপানো” আর এর সুযোগ নেয়াটা দিয়ে শুরু হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল ইসলামি সমাজগুলোকে অস্বীকৃত আর চাপে মার্জিনালাইজ করে রাখলেই তারা জিতে যেতে পারবে। কিন্তু ২০ বছর পর দেখা যাচ্ছে ফল হয়েছে উলটা। আর তাতে দুটা ধারা তৈরি হয়েছে। একটা হল, গোণায় ধরা আর আপন করে নেয়া। পুর্ণ মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে সসম্মানে পাশে রাখা, পারস্পরিক সম-মর্যাদার গ্লোবাল সমাজ গড়ার পথে রওনা দেয়া। আর এর বিপরীতে আরেক ধারা হল, আমরা শ্রেষ্ঠ, এককালে সব আমাদেরই ছিল। তাই, ইসলামের নেতৃত্বে আগে আমাদের নয়া কিছু রাষ্ট্র গড়ে তোলা এরপর এর অধীনে দুনিয়াকে ঢেলে সাজানো।
    তবে ২০০১ সালের মূল পরিবর্তনের কৌশলগত কারণে আমেরিকা ভারতকে তোয়াজ করে একে চীনের বিরুদ্ধে খারা করেছে শুধু তাই না। পালটা পাকিস্তানকেই আমেরিকা নিজ সন্ত্রাসী হামলার লঞ্চিং প্যাড হিসাবে ব্যবহার করেছে আবার পাকিস্তানকেই সন্ত্রাসবাদী বলে দোষী দাবি করেছে। এই সুযোগে ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ক্ষমতায় উপরে এক সাধু রাষ্ট্রের ইমেজে বসার চেষ্টা করেছে। ফলে সেই থেকে এর প্রভাবে সার্কের ভিতরে ভারত আর পাকিস্তানকে নিজের সমান গণ্য করতে চায় নাই।  এটাই সার্কের অকার্যকর হয়ে পড়ার মূল কারণ।  সারকথায় সার্ক অকার্যকর হবার মুল কারণ  আমেরিকার নীতি। পাকিস্তানকে কোপের মধ্যে রাখা আর বিপরীতে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ভারতের তোয়াজে রাখা।
    এতে ভারত চেয়েছে সার্ক থেকে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাকিদেরকে নিয়ে নতুন জোট করা। সাথে অন্য নতুন কাউকে ঢুকানো। এতে ১৯৯৭ সালে গড়া সেটার নাম বিমসটেক [BIMSTEC] বা বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ, একেই ভারত সার্কের বিকল্প হিসাবে পুশ করতে শুরু করেছে। আসলে ২০০১ সাল থেকে “সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার” আড়ালে, মার্কিন সমর্থনে ভারতের মুসলমান ও পাকিস্তানবিদ্বেষ চরমে উঠাতে ভারত আর সার্ক টিকাতেই চায় নাই। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ, নয়াদিল্লিতে সরকারি আমন্ত্রণে ২০১৬ সালে ভারত সফররত একদল বাংলাদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাবেক রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী [বর্তমানে ঠিঙ্কট্যাঙ্ক ORF ফেলো] খোলাখুলি বলেই ফেলেছিলেন, [দেখুন সার্ক ভুলে যেতে বললেন পিনাক রঞ্জন;] আর ‘বিমসটেক জোটের’ ওপর বাংলাদেশ জোর দিক।
    কিন্তু ২০২১ সালে এসে আবার ভারত পল্টি দিচ্ছে।  এবার বলছে সার্ক আর অকেজো করে রাখা না, সার্কের বিলুপ্তি দরকার। কেন? ভারতের ভয় সার্ক অকেজো করে ফেলে রাখলে সার্কে ঢুকে চীন না সার্ক নিয়ে চলে যায়!  কিন্তু কাজটা সে করতে গেছে আফগানিস্তান প্রসঙ্গে নিউইয়র্কে সার্কের এক সভাকে কেন্দ্র করে।

    আফগানিস্তানকে নিয়ে সার্ক বৈঠকে হতে গিয়েঃ
    গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের বার্ষিক  সাধারণ পরিষদ বৈঠকের সাইড লাইনে। আফগানিস্তানকে সার্কে সর্বশেষ যুক্ত সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে নেয়া হয়েছিল আগেই। সংশ্লিষ্ট নেতারা সার্কের একটি বৈঠক করতে চেয়েছিলেন ঐ সাইড লাইনে। কিন্তু তা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি মূলত আফগানিস্তানকে সেখানে ডাকা হবে কি না বা হলে কীভাবে এনিয়ে অমীমাংসিত বিতর্কের কারণে।

    এমনিতেই গত ১৫ আগস্টের পরে ভারত আফগানিস্তান ইস্যুতে একা হয়ে এক আজিব অবস্থান নিয়েছে। তা হল অনেকটা যেন “আমাকে আগের গনি সরকার ফিরে এনে দাও। আমি এর অন্য কমকিছু হলে মানব না’- টাইপের।  সম্ভবত এর মূল কারণ এতদিন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার আড়ালে থেকে আফগান ইস্যুতে অবাধ বিচরণ ও সুবিধা খেয়েছে। আর এখন ঠিক উল্টা যুক্তরাষ্ট্রও কারও দিকে না কেবল নিজের একক  স্বার্থের দিক চেয়ে চলার কারণে ভারত একা বোধকরা এক এতিম যেন! তাই সার্কের ঐ হবু মিটিংয়ে ভারতের অবস্থান ছিল, আগের নাই হয়ে যাওয়া গনি সরকারেরই প্রতিনিধিত্ব আনতে হবে। তবে, ভারতের ব্যাখ্যা পাকিস্তান বরং তালেবানদেরকে ঐ আফগান প্রতিনিধিত্বের আসনে বসাতে চেয়েছে, তাই সব ভন্ডুল হয়ে গেছে। সারকথায় ওই বিতর্কে পড়ে, সার্কের সভা বসতেই পারেনি; বাতিল হয়ে গেছে।

    কিন্তু ভারতের মিডিয়া এ নিয়ে অস্থির অধৈর্য হয়ে উঠেছে। যেমন দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রার এক লেখা। [অনুমান করা হয় এটা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লেখানো।] তারা নিজেরাই এর সারাংশ সেখানে করেছে এভাবে: “চীন আর সার্ক রুমের মধ্যে ঢুকে পড়া হাতি নয়। বরং সে ওর পুরা ঘরবাড়িই দখল নিয়ে বসেছে। ভারতের বরং উচিত হবে তার পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইউকে, রাশিয়া প্রভৃতি অগ্রসর দেশ ও কোয়াডের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া” ।

    China is no longer the elephant in the SAARC room, it occupies the entire zoo. India would rather jump over its neighbourhood and build ties with US, France, UK, Russia, and the Quad.

    এসব কিছু আসলে ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের এলায়েন্স গড়ে তোলা, যার ভিত্তি হল কথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ইস্যু। আর এতে এর নামে ভারতের অদ্ভুত এক মুসলমানবিদ্বেষী মন আর সেই মনের তৈরি করা ঘৃণা হাজির হয়েছে! যুক্তরাষ্ট্রও প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে ভারতের এই আচরণ সমর্থন করে গেছে আর আজ এরই পরিণতি দেখছে সবাই।
    আসলে একালের আফগান থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের পরে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে তার গত ২০ বছরের সম্পর্ককে পুনঃমুল্যায়নে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া শুরু করাতে ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়া।
    বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়ার এখন লক্ষ্য ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে লেখা ছেপে নিজের ভাগ্য গুছানো। যেমন মানবজমিনের এক লেখার শিরোনাম “আফগান সংকট খাদের কিনারায় সার্ক”।

    এটা প্রমাণ করে ভারতের বিদ্বেষী আচরণ কোন মাত্রা ছুঁয়েছে। একালে এর উপর যুক্ত হয়েছে আমেরিকা আর আগের মতো ভারতকে সমর্থন করতে পারছে না, সম্পর্ক আর আগের মতো নাই। আমেরিকা নিজের স্বার্থ নিয়েই ডুবে আছে। আর সে ভিত্তিতেই ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক ঢেলে সাজাতে চাইছে। আর এতেই ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠছে অনিয়ন্ত্রিত ও ভয়াবহ!

    চীন থাকলে ভারত-পাকিস্তান কোনই সমস্যা নাই, কেন এমন??
    কথাটা আসলেই সত্য, অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আমেরিকাই ভারতকে তোয়াজ করে গাছে তুলে তার পাকিস্তান-চুলকানি বা সময়ে চীন চুলকানি তৈরি করেছে। সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানেইজেশন [SCO] মূলত চীনের নেতৃত্বে এক জোট। এর উপর সাথে আছে পুতিনের রাশিয়া। এবং সেন্ট্রাল এশিয়ার কিছু দেশ।  সম্প্রতি এই জোটে  ভারত ও পাকিস্তান দুদেশকেই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আফগান বা তালেবান নিয়ে অস্থিরতা এই সময়ে  SCO তে ভারত ও পাকিস্তান একসাথে সুন্দ্রভাবে মিটিংয়েও বসেছিল। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হল?  এখানেই শেষ না।  পাকিস্তানে যাচ্ছে ভারত! কেন? এই SCO এর পক্ষ থেকে এক সন্ত্রাসবিরোধী ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে। না আপনারা ভুল শুনেন নাই। আচ্ছা, ভারতের বিশ্বস্ত মিডিয়া ভোরের কাগজের রিপোর্টের লিঙ্কটা দিচ্ছি দেখেন যার শিরোনামঃ পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী মহড়ায় যাচ্ছে ভারত।  অথবা ভারতের জি-নিউজের খবর শিরোনাম “পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ভারতীয় সেনা, এবার সঙ্গী চিনও”। এর অর্থ কী ?
    অর্থ একটাই। আমেরিকাই ভারতকে বিগড়েছে, উস্কানি দিয়ে গেছে। যে কারণে চীনের নেতৃত্বে থাকলে ভারত ঠিক থাকে এবং ভারত-পাকিস্তান একসাথে কাজ করতে পারে, অবলীলায়।
    ঠিক একই সময়ে যখন আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমান এখন ভারত সফরে আছেন।  আর ভারত শেরমানের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নালিশ দিচ্ছে পাকিস্তানকে শায়েস্তা করা, কনট্রোল করার জন্য; [ India Wednesday raised concerns over … Haqqani Network in Afghanistan along with the active role being played by Pakistan there…]। আর জবাবে শেরমান বলছেন, আফগান ইস্যুতে আমরা ভারত-আমেরিকা এক দেহ এক প্রাণ; US-India ‘one mind, one approach’ on Afghan-related issues. কেন? মনের দুঃখে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রা যেন “পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে”  বনবাসে চলে যেতে চেয়েছেন!
    অথচ এটা অপ্রয়োজনীয়! চীন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে পাশে নিয়ে এক ওয়ার্কিং জোট গড়ে নিয়েছেন। আপাতত যেখানে বাংলাদেশ হল ওয়ার হাউজ! আপাতত টিকার ওয়ার হাউজ!


    লেখক : 
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ অক্টোবর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “সার্ক এখন কারও না“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    গৌতম দাস

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3IU

     

              AUKUS : security pact leaves Australia exposed

    [সার-সংক্ষেপঃ আমেরিকা এশিয়ায় এবার এক নতুন জোট খুলেছে। এটা সামরিক জোট নাম AUKUS। অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – এই তিন দেশের ইংরাজি নামের আদ্যক্ষর দিয়ে, ত্রিদেশীয় এই নয়াজোটের নাম ঠিক করা হয়েছে।  এটা যতটা না সামরিক জোট তার চেয়ে বেশি অষ্ট্রেলিয়াকে চীনের মুখে ফেলে দিয়ে আমেরিকা-বৃটেনের ওর ঘাড়ে চড়ে পিছনে দুরে বসে থেকে পরমাণূ অস্ত্রের ব্যবসা করে নেয়া। এছাড়া আবার এটা এমনই অষ্ট্রেলিয়া যার ভৌগলিক অবস্থান চীনের হাতের নাগালেই আর তার চেয়েও বেশি বিপদের হল অষ্ট্রেলিয়ার ইকনমি দাঁড়িয়ে আছে চীনে রপ্তানি করতে পারার উপরে। তবে গত ২০১১ সাল থেকে আমেরিকার এটা চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে খামোখা লড়বার তৃতীয় উদ্যোগ।  আগের ‘পিভোট এশিয়া’ আর ‘কোভিড’ এর ব্যর্থতার পরে এটা আরেক নয়া উদ্যোগ। এটাও ব্যর্থ হবে, কারণ এশিয়ার চীনের সাথে সীমান্তবিরোধ যাদের আছে তারাই যুদ্ধ চায় না, সমাধান মনে করে না। কাজেই চীনের সাথে সীমান্তবিরোধের কথা তুলে এর আড়ালে আমেরিকান যেকোন স্বার্থ আদায় করা অসম্ভব। এর উপর তা যদি যুদ্ধ-কেন্দ্রিক আমেরিকান বুদ্ধি হয় তবে এর কোনই ভবিষ্যত নাই।
    এবার সরাসরি যদি প্রশ্নটা করা হয় এই জোট মানে অর্থনৈতিকভাবে, এটা ৫০-৯০ বিলিয়ন ডলারের এক ঋণশোধের দায় যা একা অষ্ট্রেলিয়ার উপর চাপিয়ে  দেওয়া হল। তাহলে এই অর্থনৈতিক দায়ের রিটার্ণটা কোথা থেকে আসবে? সেপ্রশ্ন এখনও উহ্য থেকে গেছে। এছাড়াও উলটা এই জোট নুন্যতম ফাংশনাল হলেই চীনে যতটুকু রপ্তানি বাজার অষ্ট্রেলিয়ার এখনও যা আছে সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে বা অন্য কেউ তা দখলে নিবে। এতে অষ্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি আরো দ্বিগুণ চাপে পড়বে। তখন অষ্টেলিয়াকে উদ্ধার করবে কে? কেউ জানে না। অর্থাৎ মাটিতে পা রেখে এসব দায় অষ্ট্রেলিয়া প্রধানমন্ত্রী মাথায় নিয়েছে মনে হয় না।
    অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধ বা প্রভাব সামরিক সক্ষমতা দিয়ে জিতে যাওয়া বা টপকে গিয়ে সমাধান করা যায় না। এছাড়া পারমাণবিক টেকনোলজি মানবজগত থেকে প্রত্যাহার করে ফেলার যুগে নতুন করে এশিয়ায় পারমাণবিক সাবমেরিন দিয়ে যুদ্ধ সাজানোর প্রচেষ্টা একেবারেই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন। একদিন এজন্য বাইডেন আর বরিস কাঠগড়ায় উঠবেন, অবশ্যই! ]

    _

    মূল লেখা শুরু এখান থেকেঃ

    ইংরেজি ওভারল্যাপ [overlap] মানে একজনের কোলে আরেকজন। মানে যেমন একটা জোটে থাকা অবস্থায় সেখানেই আরেকটা আরো কিছু অন্যদের সাথে জোট খুলে বসাটা হবে ওভারল্যাপিং জোট। হ্যাঁ, ঠিক তাই ঘটিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এশিয়ায় আগের কোয়াড জোটের বাইরে আরেকটা ত্রিদেশীয় জোট খুলেছেন। আর এই ঘটনাটা আমাদের দিক থেকে দেখলে,  এতদিনে এনিয়ে আগ্রহীরা যখন জানল, কোয়াড জোট মানে কী ও কারা এরা। এ ছাড়া সবাই যখন ভাবছিল তারা এশিয়ার গ্লোবাল মেরুকরণ বুঝতে শুরু করেছে। ওদিকে আমেরিকা যখন আমাদের বাংলাদেশকে কোয়াডে ঢুকানোর জন্য চাপাচাপি করছিল এরই মাঝে ঠিক এমন সময় আরেক ফ্যাসাদ হাজির হয়েছে। বাইডেন নতুন আরেক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন গত বুধবার ১৫ সেপ্টেম্বর যার বিস্তারিত ঘোষণা এবং তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া দেয়া এখনো শেষ হয়নি। এরপর বিস্তারিত তথ্য আর বুঝাবুঝি শেষে তাৎপর্য বর্ণনা পশ্চিমেই এখনো তেমন শুরুই হয়নি। এমনই প্রাথমিক অবস্থায় এখন আমরা।

     AUKUS বা এইউকেইউএসঃ
    AUKUS এই হলো নয়া জোটের নাম। যে নামটা ভেঙে ভেঙে লিখলে হয় A-UK-US; মানে হল অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – হল সেই ত্রিদেশীয় এক নয়াজোট। সবচেয়ে বড় কথা, জন্ম-ঘোষণার শুরু থেকেই এরা পরিষ্কার যে, এটা সামরিক জোট।  মানে যেমন অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইন্ডিয়া আর আমেরিকা – এই চার দেশীয় ‘কোয়াড’ নামের জোটের মত – এবার নতুনটা সামরিক নাকি বাণিজ্যিক জোট এ নিয়ে কোনো তর্কই নেই। কোয়াড নাকি কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক কোনোটাই নয়, এমন না  না করতে করতে এখন বলে এটা এক স্ট্র্যাটেজিক জোট। এসব ধানাই-পানাইয়ে এই নয়া জোটের বেলায় নাই। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিনে সমৃদ্ধ করতে  নয়াজোটের বাকি দু’দেশ বৃটেন-আমেরিকা  ভুমিকা নিবে; এমন করে যাত্রা শুরু করার এক জোট হবে এটা; এমনটাই তাদের আপাতত বলতে শোনা যাচ্ছে। তবে তাও আবার ডিজেলে চলা ও ধোঁয়া ছাড়া সাবমেরিন নয়, এটা নাকি একেবারে পরমাণু অস্ত্র ও জ্বালানিতে চালানো এমন সমৃদ্ধ সাবমেরিন বহর হবে। অর্থাৎ এটা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন (n-sub) হতে যাচ্ছে যেটা আবার নিউক্লিয়ার বোমা বিবার অপশন থাকলেও আপাতত তেমন কোন বোমা থাকবে না অষ্টেলিয়া জানিয়েছে।   SSBN বা নিউক্লিয়ার ব্যালেস্টিক অস্ত্র বহণকারি গোত্রের।

    ইতোমধ্যেই পশ্চিমা এক্সপার্টেরা অল্প ক’জন যারা এই জোট নিয়ে মুখ খুলেছেন তারা বলা শুরু করেছেন যে এতে এশিয়াতে এখন আগের অন্যান্য জোট উদ্যোগগুলো মিলিয়ে যাবে আর এই নয়া জোটকে কেন্দ্র করে এশিয়ামুখী পশ্চিমা দেশেরও ব্যাপক মেরুকরণ শুরু হবে; যদিও যারাই ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাতে লক্ষণ তেমন নয়।

    এর প্রথম তাৎপর্য হল, যে ওভারল্যাপিং-এর কথা বলছিলাম, আগের কোয়াড যা এখনো বেঁচে আছে বলে জানি, তা থাকা সত্বেও পুরান কোয়াডের দুই সদস্য অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা এই নয়া সামরিক জোট খুলেছে দেখা যাচ্ছে তবে সাথে ব্রিটেনকে নিয়ে। তাতে এখন বাকি দু’জন কোয়াড সদস্যের কী হবে?

    কৌতুকের কথা হলো, কোয়াড এমন এক জোট যার সদস্য দেশের চার প্রধান কখনো একসাথে মুখোমুখি মিটিংয়ে বসেননি। কেবল এই গত মার্চ ২০২১ তে একবারই বসেছিলেন অন-লাইনে, মানে ভার্চুয়ালি। তবে এবার  আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মানে এ’মাসেই  আমেরিকায় হোয়াইট হাউজে প্রথম মুখোমুখি কোয়াড রাষ্ট্রপ্রধানরা বসতে যাচ্ছেন। এই মিটিংয়ের সেই অভাব সম্ভবত পূরণ হতে যাচ্ছে। তবে সেটা কারো কারো জন্য শেষ মিটিংও হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন সেখানে বৃটেনসহ তাদের গড়া নয়া জোটে যোগ দিতে কোয়াডের বাকি দু’দেশকে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দেবেন। তবে জাপানের কনস্টিটিউশনে ও ১৯৬০ সালের আমেরিকার সাথে করা এক সিকিউরিটি চুক্তি অনুসারে জাপানের পারমাণবিক তৎপরতায় যুক্ত হতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে বলে সম্ভবত জাপান এমন জোটের সদস্য হতে বাধা পাবে। তাহলে আর ভারতের বেলায় কী হবে?

    ভারত কী করবে?
    কিন্তু আগেই এ নিয়ে আমাদের বোঝাবুঝির কাজ কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে এক রাশিয়ান মিডিয়া স্পুটনিক [SPUTNIK] । স্পুটনিকের সে নিউজের শিরোনামটাই অনেক সাংঘাতিক। শিরোনাম হল – “ভারতের জন্য বার্তা? নয়া জোটের ঘোষণায় কোয়াডের অস্তিত্ব আর আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে” [Message for India? AUKUS Announcement Sparks Debate About Relevance of Quad, Reliability of US]।  কিন্তু স্পুটনিক কেন এমন শিরোনাম করল? কারণ, স্পুটনিক লিখেছে এই নয়া জোটের খবর ভারতের বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোড়ন ও তর্ক তুলেছে। তারা ভালোভাবে নেননি। কিন্তু এত তর্ক উঠছে কেন?

    কারণ তাঁরা সবাই ভারতের মনের আসল ইচ্ছাটা আগে থেকেই জানেন। আর তা হল, যতই মুচড়ামুচড়ি করুক, শেষে ভারত কারো সামরিক জোটে কখনো যাবে না। তাই তারা বলছেন, এই  “অনিচ্ছুক” [New Delhi’s “reluctance”] ভারতের খবর তো বাইডেনের আমেরিকার অজানা নয়। তাহলে বাইডেনের এই নয়া জোটের ঘোষণার অর্থ তাঁরা করছেন এভাবে যে, বাইডেন তাহলে ভারতকে ছেড়ে অন্যান্য সম্ভাব্যদের নিয়ে এশিয়ায় অন্য কিছু খুঁজতে নেমে গেলেন। তবে, স্পুটনিক এখানেই না থেমে আরেক ধাপ এগিয়েছে। ভারতের এক সাবেক নেভি অফিসার শেষাদ্রি ভাসান [Seshadri Vasan] যিনি এখন চেন্নাইভিত্তিক এক থিংকট্যাংক [Chennai Centre for China Studies (C3S)] পরিচালনা করেন, তার সাথে এ নিয়ে কথা বলে তাঁর বয়ান সংগ্রহ করেছে। শেষাদ্রি স্পুটনিককে বলছেন, “ভারত বারবার জানিয়েছে, সে কোয়াডকে কোনো সামরিক জোট হিসাবে দেখে না, বড় জোর এক নিরাপত্তা স্বার্থবিষয়ক গ্রুপ হিসাবে ভারত দেখতে চায়”। এছাড়া তিনি বর্ণনা করে বলেছেন যে যেমন “তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কোনো সামরিক সঙ্ঘাত দেখা দিলে ভারত সেক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে কোনোরকম সামরিকভাবে জড়িত হতে অনিচ্ছুক” […also shown its reluctance to get militarily involved on the side of the US in case there is any conflict in the Taiwan Strait or the South China Sea for that matter]। তাই তাঁর ধারণা আমেরিকা নিশ্চয় (ভারতকে ছাড়া) অন্য আগ্রহী পার্টনার খুঁজছিল।

    আসলে সত্যিকারভাবে বললে, ‘ভারতের অবস্থান সবসময়ই ছিল এমন যে “মাংসের ঝোল খাবো কিন্তু মাংস খাবো না” ধরণের। অর্থাৎ নিরাপত্তাবিষয়ক গ্রুপ- জোটে থাকব কিন্তু ‘সামরিক অ্যালায়েন্স’ এমন জোটে থাকব না। তাহলে নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো গ্রুপের জোটেই বা ভারতের থাকার দরকারটা কী? আবার বাস্তবে  তাহলে কোয়াডের অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ায় ভারতের অংশ নেয়ারইবা দরকার কী? এর অর্থই বা কী? এটা কি সামরিক তৎপরতায় যোগ দেয়া হয়ে যায়নি?

    এমনকি সাউথ চায়না সি-কেন্দ্রিক কোয়াড জোট যে এলাকার সমুদ্রসীমা বিতর্ককে উসিলা করে গড়ে তোলা হয়েছে সেটা ভারতের কোনো সীমান্ত বা ভুমির কাছাকাছিও নয়, কোনো স্বার্থও নাই সেখানে। সেই কোয়াড জোটে তাহলে ভারত যোগ দিতে দৌড়াল কেন? আসলে কোয়াডকে একটা চীনবিরোধী জোট দেখেই ভারত ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু ওদিকে এবার ‘শুধু ঝোল খাবার পণ’ করে রাখাতে এখন ভারতের মনে যা ছিল-আছে তা বাইরে উদাম হয়ে বের হয়ে আসছে।

    তবে শেষাদ্রি আরেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারত কোয়াডে থাকবে না। তাই তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াড ত্রিদেশীয় নয়া জোটে বিলীন হচ্ছে তাহলে ভারত সেখানে থাকতে পারছেই না। তবে তিনি কথাটা ঘুরিয়ে বলেছেন, “কোয়াড আগামীতেও হয়তো নিজেকে দরকারি করে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। কারণ নতুন ত্রিদেশীয় জোট তো প্রতিরক্ষাভিত্তিক”। অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াডই ত্রিদেশীয় জোটে রূপ নিতে যাচ্ছে।

    তবে ঐ একই স্পুটনিক রিপোর্টে  আরেক প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বয়ান এসেছে যার নাম অনিল ত্রিগুণায়াত [Anil Trigunayat]। এছাড়া এমনকি বর্তমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করসহ আরো অনেকের উদ্ধৃতি তুলে এনেছে স্পুটনিক। তবে তাদের সবার মূল কথাটা হল আসলে ভারতের কোয়াড  জোটে থাকতে পারছে না বলে তা নিয়ে নিজেদেরকে দেয়া “সান্ত্বনা”। ভারতের ‘মন খারাপের কিছু নেই’ ধরনের বা ‘হতাশ হবার কিছু নেই’ এরকম [I don’t think New Delhi needs to feel threatened or disenchanted…… ]। যেমন একজন বলছেন, এখন থেকে ভারতের আলাদা আলাদা করে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত।

    ওই সাবেক রাষ্ট্রদূত কথা বলতে গিয়ে তিনি যেসব সংগঠনে ভারতের কদর আছে বলে গৌরব করে তা জানিয়েছেন যেমন ব্রিকস [BRICS] এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান আর এসসিও [SCO] (সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন) এর কথা। কিন্তু এখানে ব্যাপার হল ভারত যে এক অকর্মণ্য “বেচারা” তাই প্রমাণ হল। কারণ, এদুটো প্রতিষ্ঠানই আসলে চীনা উদ্যোগের জোট যেখানে চীনের মূলত প্রধান পার্টনার হলো রাশিয়া। আর ভারতকে চীন দয়া করে রেখেছে, নিজের উদারতায়; প্রতিদ্বন্দ্বি বা শত্রু হিসাবে দেখলে জোটে নিত না।  একটা ফেয়ার এপ্রোচ বা ন্যায্যতাবোধে নেয়া চীনের এই সিদ্ধান্ত, যে লম্বাদুর পর্যন্ত চিন্তা করতে সক্ষমতা ও সাহস রাখে। এর সোজা অর্থ হল, রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুণায়াত এরই কথা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ায় ভারতের ভাত নেই, পাত্তাই নাই। তারা নিজেকে নিয়ে আছে। আর ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার তালে আছে কেবল। এর বাইরে ভারতের কোথাও পাত্তা নাই। তাই অন্য জায়গা ভারতের গুরুত্বের কথা বলতে গেলে যতটুকু যা আছে তা নয়া নেতা চীনেরই উদ্যোগের ভিতরের কথাই উল্লেখ করতে হচ্ছে। যে চীনকে আবার আপাতত দেখা যাচ্ছে, ভারত শত্রু মনে করছে। কিন্তু চীন ব্যাপারটাকে দেখছে এক অবজেকটিভ ফেনোমেনা আকারে। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে গেলে সেই দুনিয়াতে নেতা থাকবে চীন আর চীনের পিছনে উঠে আসতে পারে ইন্ডিয়া (যদি সে অপ্রয়োজনীয় মুসলমান ঘৃণা চিরদিনের জন্য ত্যাগ করে সরে আসে, এই অঞ্চলকে শান্তি দেয়, অর্থনীতিতে মন দেয়)।  আর চীনের দিক থেকে, চীন আগেভাগেই ভারতের সব সম্ভাবনাগুলোকে নিজের ইচ্ছায় নাকচ করতে পারে না। এই অসততা উলটা চীনকেই একসময় ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অবজেকটিভ ফেনোমেনাকে রুখে দেয়া যায় না। রুখে দিবার চিন্তা করে বোকা-হিংসুক আর গর্দভেরা। বুদ্ধিমানেরা সাগরে ঘুর্ণিঝড় দেখা দিলে ওর সাথে লড়তে যায় না, খাপ খাইয়ে নেয়া আর কম ক্ষতি কিসে হবে সেই পথে ঝড়ের সামনে যায়।

    তবু বহুবার লিখেছি ভারতের ন্যাচারাল ফ্রেন্ড মানে বিষয়-আশয় বা অর্থনৈতিক স্বার্থবিষয়ক কমন ও প্রধান পার্টনার হবে চীন। এটাই অবজেকটিভ নিয়তি।  (অবজেকটিভ [objective] বলতে যেটা কোন কর্তা-মানুষ ঠিক করে নাই। ন্যাচারাল ভাবে হয়েছে। যেটাকে আমরা অনেক সময় বলি আল্লায় ঠিক করেছে।) আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে ‘মুই কি হনু রে’ অবস্থা করে এই নিয়তি থেকে দূরে ঠেলে সরিয়ে রাখা নিশ্চিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে; সেটা এই শতক মানে গত বিশ বছর ধরে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই ফলাফল আমেরিকা আ ভারতের জন্য শুণ্য। তবু, ভারত আমেরিকান আকাঙ্খা মোতাবেক নিজেকে সেই বাক্সে ঢুকিয়েছে। ভেবেছে, সে পরাশক্তি হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বা জয়শঙ্কর ইত্যাদি এরা “কথিত পরাশক্তি হয়ে যাবার” এই মিথ্যা কল্পনা ইলিউশন মায়ায় ভারতের মিডিয়াকে (প্রতীকীভাবে দৈনিক দাহিন্দু এর সুহাসিনী হায়দারের কথা ভাবা যায়) প্রভাবিত করে চলেছিল দশক ধরে। কিন্তু এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সব ন্যাংটা হয়ে যায়। এই ভারত তার নাগরিককে করোনায় বেড দূরে থাক অক্সিজেন দিতে পারে নাই। মরলে সৎকার বা সাধারণ মাটি দিবার ব্যবস্থাটুকুও করতে পারে নাই, ব্রীজের উপরে নিয়ে বা নদীতে নিয়ে ফেলে দিয়ে নুন্যতম মানুষের মর্যাদা নষ্ট ও অপমান করেছে। তাই সুহাসিনী আর তাকে দেখানো পরাশক্তির স্বপ্ন তিনি বইতে রাজী হয় নাই। সে উলটা এখন ঐ মিথ্যা স্বপ্নকে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন করে থাকে। তবু কারো কারো হুশজ্ঞান কখনই হয় না। যেমন দ্যাপ্রিন্টের ফরেন ডেক্সের নয়নিমা বসু [NAYANIMA BASU]।  তালেবানদের কাবুল  দখলের আগে তাকে ভারতীয় সামরিক বিমানে এমবেডেড জার্নালিজম করতে আফগানিস্তানে নেয়া হয়েছিল। সে এখন  তালেবান ইস্যুতে মোদী সরকারের পারফরমেন্সের পক্ষে প্রধান ভক্ত-প্রচারক; একেবারে – ফ্লায়িং হাই মানে আকাশে উড়ছেন অবস্থা!। অথচ খোদ জয়শঙ্করই এখনই বুঝে গেছে কত ধানে বড় জোর কত চাল হয়। সে ইতোমধ্যেই জানান দিচ্ছে ভারত কোন যুদ্ধে-টুদ্ধে নাই। জয়শঙ্কর এখন গ্লোবালাইজেশন ও গ্লোবাল বাণিজ্যের ভক্ত। বলছেন, সব দেশই একালে একসাথে (বাণিজ্য নিয়ে) কাজ করতে বাধ্য [……  globalisation. It reflects the compulsions of countries to work together. ]।  কিন্তু নয়নিমাদেরকে কে এসব বুঝাবে।

    এটাই গত বিশবছর ধরে চলে আসছে। প্রণব বা মোদি কারো আমলেই ভিন্ন কিছু হয়নি। বুশ-ওবামা আমলে এই ব্যক্তিত্বরা ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান রফতানির বাজার সুবিধা ভারতকে দিয়েছিলেন আর তাতেই এটা আমেরিকান বিদেশনীতির অঙ্গ অংশ হয়ে গেছিল। আর তাতেই জাতিবাদী ভারত কেঁচো হয়ে, চীনের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপরের জন্য ভারতীয় শের হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেই সেসব রপ্তানি সুবিধা বাতিল করে দিলেও ভারত আর আমেরিকার হাত ছাড়তে পারেনি। অথচ এখন দাবি করছে তারা আমেরিকার সাথে সামরিক জোটে যাবে না! এ জন্যই এটাকে মাংস খাব না কিন্তু ঝোল খাবার লোভ বলেছি। ফলে এখনো আমরা আসলেই জানি না যে যদি বাইডেন ১৬ না হোক ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সুবিধা ভারতকে এখন দেন সেক্ষেত্রে ভারত কি বাইডেনের সামরিক জোটে যাবে না বলতে পারবে? আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই হল পরাশক্তি ভাবধরা ভারতের নিজ সম্পর্কে  বিবেচনাবোধ!

    বুদ্ধিমানরা জানে একসাথে সব দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে যাওয়া যায় না। কারণ এটা কার্যকর পদ্ধতি নয় আর, তা সফল করাও যায় না। প্রত্যেকবারে নতুন জেগে থিতু হয়ে উঠা প্রধান দ্বন্দ্বটারই কেবল মীমাংসা করে করে আগাতে হয়; যেমন এখনকার মূল দ্বন্দ্ব চীন-আমেরিকার। ফলে ভারতের দিক থেকে তা মোকাবিলার এটিচুড হতে হবে চীন-ভারত এক দিকে বনাম আমেরিকা, এভাবে দ্বন্দ্বের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানো। এরপর তা সমাধান হয়ে গেলে বা এই দ্বন্দ্ব-নিরসন বা বিনাশ হয়ে গেলে তখন আবার মুখ্য দ্বন্দ্ব হিসেবে তা চীন-ভারত দ্বন্দ্ব হতে পারে। ততদিনে ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ অন্যকে বলার মতো করে বাড়িয়ে নেয়া যাবে আর তা দরকারও; যদিও এমনটা অর্জনের আগে দুটা আরো অভ্যন্তরীণ সংস্কার ভারতকে করতেই হবে। এক. হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করে দেশের সবাই নাগরিক ও সমান অধিকারের – এমন এই পরিচয়ে নাগরিক অধিকারভিত্তিক এক নয়া ভারতরাষ্ট্র তাকে গড়ে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয়টা প্রথমটারই অনুষঙ্গ। তা হল নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা সমুলে ত্যাগ করা। ফলে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতিবাদ বাদ দিতে হবে। এমনকি নাদান অবুঝ ট্রাম্পের মত অর্থনৈতিক জাতিবাদও বাদ দিতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে আমরা সবাই এক গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেনের যুগে একেবারে ঢুকে গেছি। আর এটা ‘ওয়ান ওয়ে’।

    এই ‘পুলসিরাত’ পার হতে পারলে ভারত পরে সবকিছু হতে পারবে। নইলে ‘কিছুই নয়’। এর আগে আগামি ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে নতুন যারাই কোয়ালিশনে ক্ষমতায় আসুক তারা সম্ভবত চীনের অর্থনৈতিক পার্টনার হওয়ার পথ ধরবে। আর তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত আরো দ্রুত সক্ষম হওয়ার পথ ধরবে। কিন্তু তবু আমেরিকার থেকেই ভারত সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। কারণ ভারতের পারসেপশন হল তার সম্ভাব্য প্রধান শত্রু চীন। তাই ভারত চীনের থেকে অনেক কিছু কিনলেও অস্ত্র কিনতে পারে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা চীনের সাথে সম্পর্ক ক্ষতি করবে না।  কাজেই ভারতে এমনটা ঘটার সম্ভাবনার দিকে এখন পরিস্থিতি যাবে বলে অনুমান করছে অনেকে। আর সেক্ষেত্রে আপাতত ভারতকে কোয়াড থেকে বের করে দিলেও আমেরিকার সাথে মোদীর ঘনিষ্ঠতা থেকে যেতেই আমরা দেখব। আমেরিকার ভারতকে দরকারের চেয়ে মোদীর ভারতের আমেরিকাকে বেশি দরকার, পারসেপশন এমনই নানান কারণে। তবে বর্তমান হিন্দুত্ববাদের ভারতের নেতৃত্বের উপর আমেরিকারও তেমন আস্থা নেই।  অর্থাৎ চাইলে ভারতের জন্য বিকল্প পথ  আছে, এটার রেকর্ড  থাকল এতে!

    ‘আটলান্টিক’ আওয়াজটা আবার বেশি উঠছেঃ
    আটলান্টিক [Atlantic] এক মহাসাগরের নাম, যা মূলত আমেরিকাকে ইউরোপ থেকে আলাদা করেছে মনে করে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সেদিকে তাল রেখে ‘আটলান্টিক’ অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনই প্রতীক বা ইঙ্গিত অর্থে ‘আটলান্টিক-এর একটা মানে হল – যা কিছু আমেরিকা ও ব্রিটেন (ইউরোপ) মিলে অন্যদের বিরুদ্ধে তাই ‘আটলান্টিক’। এখন এখানে আলোচ্য ইস্যুতে, আমেরিকা ও ব্রিটেন দু’দেশ মিলে অস্ট্রেলিয়াকে জাপটে ধরে তাকে এশিয়ায় সামরিক কেন্দ্র বানাতে চাচ্ছে। তাও আবার পরমাণুকেন্দ্রিক সামরিকতা। ফলে এটাও যেন এক আটলান্টিক সামরিকতা! এই হল আমেরিকার এই নয়াজোটের তাতপর্য।

    কিন্তু বাইডেন বেখবর হয়ে আবার  নিজেকে পুরানা  স্টাইলে প্রভাবশালী  ক্ষমতাবান  ‘বীর’ সাজতে চাইছে।  কারণ মূলত দুনিয়াতে ইতোমধ্যে সামরিক অস্ত্রে পরমাণু টেকনোলজির ব্যবহার বন্ধ করা, নাহলে নুন্যতম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাই নানান রিজিওনাল চুক্তি করছে। এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যেমন জ্বালানি ও বিদ্যুতের উৎস হিসেবে পরমাণু টেকের ব্যবহার কমানোর দিকে সারা দুনিয়া ঝুঁকে পড়েছে, জনমতও সেদিকে। অথচ এমনকালেই বাইডেন-বাবাজি পরমাণু-সাবমেরিন (SSBN) দিয়ে কী করে এশিয়ার যুদ্ধের নাট্যমঞ্চ সাজাতে আসে? সে কেমন কথিত এই আটলান্টিক শক্তি?

    এ পেছনের মুল কারণ সম্ভবত এটাই যে কথিত এই আটলান্টিক শক্তির উদ্যোগ আসলে অন্যের ঘাড়ে মানে ও অষ্ট্রেলিয়ার উপর দিয়ে যাবে। বাইডেনের “আটলান্টিক শক্তি” এশিয়াতে আসছে একারণে যে, এর যুদ্ধের নাট্যশালা থেকে আমেরিকা-বৃটেন থেকে অনেক দূরে? তাই কী? আপাতত বাইডেনদের তাই মনে হচ্ছে বটে কিন্তু তাই কি? না। অচিরেই বাইডেন এর বিরোধিতা সামলাতে হয়রান হয়ে যাবেন!

    ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কেন?
    এই ত্রিদেশীয় সামরিক চুক্তি ও জোট খুলে বসাতে ইউরোপের দ্বিতীয় শক্তি ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে। কেন? এর কারণও সাবমেরিন। যে সাবমেরিনভিত্তিক জোটের কথা আমরা এখন শুনছি – আমেরিকা-ব্রিটেনের  আর সাথে আলাপ আলোচনার কালে সমান্তরালে তবে অনেক আগে থেকে অস্ট্রেলিয়া ফ্রান্সের সাথেও তাদের থেকে সাবমেরিন কিনবে বলে আলোচনা প্রায় সমাপ্ত করে এনেছিল। ত্রিদেশীয় চুক্তিতে যেটা  আছে তাতে আগামি ১৮ মাসের মধ্যে কয়েকটা নয়া পরমাণু-সাবমেরিন আমেরিকা-ব্রিটেন বানিয়ে দিবে। আর এজন্যই ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়েছে, এটাই ওর মুলকথা। কিন্তু বেশি বুদ্ধিমান বলে অষ্ট্রেলিয়া আসলে সে ভীষণ বোকা আর লোভী। তার স্বপ্ন যে সে ঐ অঞ্চল সাম্রাজ্য খুলে বসবে আর আমেরিকা-বৃটেন তাকে দূরে বসে সহায়তা দিবে আর লভ্যাংশ গুণবে। এই লোভীর খবরই নাই যে  “সাম্রাজ্যরূপে দোকান” খুলে বসার দিন ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেছে। দুনিয়াতে কেউ কারো আর  এখন সাম্রাজ্য খুলা বাস্তবতা নাই, সব দোকান বন্ধ। অটোমান, জার কিংবা বৃটিশ বা ফরাসী ইত্যাদি সব কলোনি সাম্রাজ্য একালে নাজায়েজ, আর এটাই জাতিসংঘের জন্মভিত্তি।  যদি সাম্রাজ্য ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেখতে চান তো দুনিয়াকে ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়ায় ফিরাতে হবে। পারবেন?

    তাহলে এযুগে কী সম্ভব? অর্থনৈতিক শক্তি জোট হওয়া সম্ভব। চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প যেমন এমন জোট সহজে সম্ভব। এমনকি বিনিয়োগের মুরোদে দেখাতে পারলে বাইডেনও পালটা আরেক কোন মহাপ্রকল্প জোট খাড়া করতে পারেন। [যদিও বাইডেনের সক্ষমতায় ঐ বিনিয়োগের মুরোদটাই অনিশ্চিত]। তো অষ্ট্রেলিয়া নিজ কোন মুরোদ দেখিয়ে ঐ অঞ্চলে সবার উপরের এক ‘সাম্রাজ্য’ নেতা হবেন?  বিপুল কোন বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে তাঁর? নাকি লেটেস্ট পরমাণু-সাবমেরিন? এই অসারবস্তু চিন্তাটা বুঝবার মত কেউ কী অষ্টেলিয়ায় নাই? অবিশ্বাস্য! ঘটনা আরো আছে।

    কিন্তু ফরাসিদের হারিয়ে কথিত আটলান্টিক জোটের আমেরিকা ও ব্রিটেন কোন কারণে এগিয়ে গেল? কারণ বাইডেনও তো খুবই বুদ্ধিমান। তার এখন নিজেকে বাঁচাতে অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে চান, অর্থাৎ নিজরাষ্ট্রের দায় ও পরিচালন ব্যয় কমানোই মুল লক্ষ্য। তাই অষ্ট্রেলিয়ার এই দিবাস্বপ্ন জানলেও পরমাণু-সাবমেরিন বেচাই তার একমাত্র লক্ষ্য। অষ্ট্রেলিয়া বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে আমেরিকার পাশাপাশি ফ্রান্সের কাছ থেকে বিকল্প হিসাবে রেডিমেড তৈরি থাকা সাবমেরিন কিনবার সম্ভাবনা যাচাই করেছিলেন। যার মুল্য ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন (ভারতীয় ঐ নেভি অফিসারের মতে)। আর এখানেই দাও মারেন বাইডেন আর আরেক চাপাবাজ প্রধানমন্ত্রী বরিস। তারা অষ্টেলিয়াকে বুঝান যে এটা তারা অষ্টেলিয়াকে নতুন বানিয়ে দিলে অনেক কম খরচে হবে। আর এতেই ফরাসী ম্যাঁক্রোর কাস্টমার ছুটে যায়। বলা যায় বাইডেন লোভ দেখিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছেন বলে ফ্রান্স মনে করে।

    ফলে মুলকথা আমেরিকা-বৃটেন অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের কোলে তুলে নিতে সক্ষম হয়। আর এতে ক্ষুব্ধ ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া হয় দেখার মত। ফ্রান্সের ক্ষুব্ধ কূটনৈতিক মন্তব্য- ওরা ‘পিঠে ছুরি মেরেছে’ [“It’s a stab in the back. We had established a trusting relationship with Australia, and this trust was betrayed,” ],  মানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইউরোপীয় মিডিয়া বলছে এটা ৫০ বিলিয়নের বেশি ইউরোর ডিল […France-slams-australia-us-e50b-submarine-deal…]। ভারতের ঐ থিঙ্কট্যাংক বলেছে এতা ৯০ বিলিয়ন ডলারের ডিল [Australia’s decision to scrap its $90 billion nuclear submarine contract with France’s Naval Group ]।
    আর ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রোর এমন প্রতিক্রিয়া বলছে এটা আসলে যতটা সামরিক জোটের ঘটনা বলে দেখানো হচ্ছে এটা এর চেয়েও বেশী অস্ত্র ব্যাবসায়িক। 

    তাই ঘটনার আসল দিক অন্যখানে।  ফ্রান্সের এই প্রতিক্রিয়া থেকে পরিষ্কার যে, এটা নেহাত সামরিক জোটের মামলা নয়। কারণ এটা আসলে যুদ্ধজোট নয়, ৯০ বিলিয়ন ডলারের এক বিনিয়োগ ও লাভালাভের প্রকল্প! তাই তো নাকি? এটা অর্থনৈতিক লাভালাভেরই জোট। অন্য দেশকে লুটে যে অর্থনৈতিক লাভালাভ হবে, এরও ভাগাভাগি করে খাওয়ার জোট। ভারতীয় নেভি অফিসারও এই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। অতএব ফরাসিদের তাড়িয়ে এটা তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সে প্রকল্প নিয়ে নিয়েছে এর ঝগড়া। সেটা হোক! কিন্তু কথা হল, এটা এখন কী ধরনের আটলান্টিক জোট হল? ফরাসিরা নিশ্চয় ভেসে আসেনি, ভেসে যাবেও না! তবে অবিলম্বে এখানে ন্যাটোকে ভেঙে নতুন পরিস্থিতির উপযোগী করে সাজানোর ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। আটলান্টিক শব্দটা বেশি উঠে আসার কারণ এসবেরই পেছনে লুকানো। ওদিকে ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রো অষ্টেলিয়া ও আমেরিকা থেকে রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ ব্যাপারটা খুব সহজে মিটছে না।

    চীনের প্রতিক্রিয়া:
    নতুন AUKUS জোট, দক্ষিণ চীনসাগর ঘিরে এশিয়ায় এই আরেকটা সামরিক জোট হচ্ছে, এতে চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হবে তা স্বাভাবিক। তবু চীনের প্রতিক্রিয়া অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, চীন এক শব্দের এক ছোট মন্তব্য করেছে – ‘ইরেসপন্সিবল’ মানে দায়িত্বজ্ঞানহীন [‘Aukus’  security pact irresponsible]। খুবই গভীর অর্থবোধক মন্তব্য সন্দেহ নেই। কেন?

    চীন-আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতাই মূল দ্বন্দ্ব বা বিরোধ; মানে গ্লোবাল সিস্টেমের নেতৃত্ব হল বিরোধের কেন্দ্র। যা মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা কেন্দ্রিক- আর সেই নেতৃত্বের অবস্থান থেকে আমেরিকা ক্রমেই ঢলে পড়ছে; বিপরীতে চীন উঠে আসছে। এই হলো বাস্তবতা। তার একটা বড় প্রকাশ হল, ইন্ডেপেন্ডেন্ট স্টাডি রিপোর্টগুলো থেকে পাওয়া –BBC REPORT অথবা  REUTERS  বলছে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে  খুবই খেয়াল করে লক্ষ্য করার ব্যাপারটা হল, এখানে অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছে, কোনো সামরিক সক্ষমতা নয়, কোনো রাজনৈতিক চিন্তার বিরোধ বা সক্ষমতাও নয়। অর্থাৎ এটা একেবারেই অবজেকটিভ সক্ষমতা, সাবজেকটিভ একেবারেই নয়। এর মানে হল, আমেরিকা এই যুদ্ধ করে এই যুদ্ধে জয়লাভ করলেও তাতে চীনের চেয়ে আমেরিকা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সমান হতে পারবে না।

    অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুদ্ধে অর্জনের বিষয়ই নয়। তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সাথে এক অস্ট্রেলিয়াকে – এভাবে নিয়ে তারা যুদ্ধজোট সাজাচ্ছে কেন? যুদ্ধে জিতলে অস্ট্রেলিয়াও কি চীনের সমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবে? কোনই সম্ভাবনা নাই। এছাড়া এটা কলোনিদখলের যুগ আর নয় যে অষ্ট্রেলিয়া বাইডেনের সহায়তা কোন দেশকে দখল করে তার সম্পদ বৈধ বলে নিজের দাবি করতে পারবে। অথবা যারা সাবমেরিন সাপ্লাই দিয়েছে তাদেরকে চুরি লুটের কোন ভাগ দিতে পারবে।

    এছাড়া আরো মারাত্মক দিক হল,  এই সামরিক জোট চুক্তিটা করা হল আবার একটা পরমাণু-যুদ্ধের হুমকি তৈরি করে। এটার সাফাই ন্যায্যতা কী? এবার এমনকি যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া বিজয়ী হলেও কি সে নিজ অষ্ট্রেলিয় বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে? তারা পরমাণুর রেডিয়েশনের মধ্যে বেঁচে থাকবে কী করে? যারা চুক্তিটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত এই শাসক রাজনৈতিক নেতারা তাদের বাঁচাবেন কী করে? এবার আমেরিকা-ব্রিটেনের কি এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়াকে ঠে্লে দেওয়ায় ওসব নাগরিকদের প্রতি তাদের কোনো দায় নেই?

    কেউ  নিজেকে “মানুষ” বলে দাবি করলে, তাঁর ন্যূনতম দায়িত্বজ্ঞান বোধ থাকলে এমন সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারে না; যেখানে পরমাণু শক্তির বাণিজ্যিক বা সামরিক সর্ববিধ ব্যবহার বন্ধ করা, ন্যূনপক্ষে একেবারে কমানো – এটাই এখনকার মুখ্য গ্লোবাল ট্রেন্ড এবং প্রবল গ্লোবাল জনমতও বটে।

    চীনের সাথে কোন দেশের বিরোধ করার, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধিতা করার জন্য পশ্চিমের বহুবিধ জেনুইন বিষয় আছে। আর তা দোষের কিছুওও নয়। তাই সেগুলো নিয়ে সদর্পে লড়া তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক ফোরামে বাধা দেয়া দরকারও সম্ভবত যাতে চীন তা অন্তত অনেকটাই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কেবল ব্যাপারটাকে ডায়লগের মধ্যে রাখতে পারতে হবে। তা অবশ্যই আমেরিকা করতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এই বাধা দেয়া আমেরিকার AUKUS জোট করবে পারমাণবিকভাবে? এরা হিটলারের চেয়েও ঘৃণিত ব্যক্তিত্ব হবে!  তাও আবার একটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধে? এতে এমনকি পশ্চিম বা আটলান্টিকের বাসিন্দাদেরকেও দায় নিতে হবে! তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে ঠেকানোর দায়িত্ব তাদেরও আছে। এই ইস্যুতে আজীবন তাদের জবাবদিহিতা করতে হবে।

    এশিয়ায় বাংলাদেশসহ আমরা কেউ অবশ্যই কোনো অর্থনৈতিক জোটের বাইরে অন্য কোনো সামরিক বা যুদ্ধজোটে যুক্ত হতে পারি না। কমবেশী আমাদের সবার মনোভাব যুদ্ধজোট বিরোধী। ওবামার ‘এশিয়া পিভোট নীতি’ ফেল করেছিল একারণেই। পরের কোয়াডও প্রায় ফেলের পথে একই কারণে। সাউথ চায়না সি-এর আশপাশের (অস্ট্রেলিয়া জাপান ছাড়া) যেমন আসিয়ানভুক্ত কোনো দেশ এসব কোন উদ্যোগ না জোটে অংশ নেয়নি। অর্থাৎ যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিরোধ আছে এমন কোনো দেশ আমেরিকার কোন জোটে কখনো অংশ নেয়নি, আশ্রয় নেয় নাই। অর্থাৎ তারা ন্যায্যভাবে তাদের চীনের সাথে বিরোধের অবশ্যই মীমাংসা চায়; কিন্তু আমেরিকার কোলে চড়ে নয়, কিংবা আমেরিকার পাতা কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দিয়ে নয়।  একারণের আমেরিকান সব উদ্যোগ মূলত ফেল করছে একের পর এক। আমেরিকার এই ব্যর্থতাই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, ঐ অঞ্চলের কেউ ওখানে কোনো যুদ্ধজোট গড়ার দরকার মনে করে না?  এর পরেও আমেরিকা ছাড়েনি। এবার পারমাণবিক  যুদ্ধের দামামা নিয়ে ব্যবসা করতে এগিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে আবার এশিয়ার জন্য এক মহাদুর্যোগ সামনে! এটাও আমাদেরকে অবশ্যই পার হতেই হবে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৮ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ভারত নয়, আমেরিকার ত্রিদেশীয় সামরিক জোট “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলো কী নিজেই নিজেকে মৃত ঘোষণা করতে চাইছে?

    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১০.৫৬ সকাল
    প্রথম আলো চরমতম বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমাদের জানামতে এর অফিস কাওরানবাজারেই ছিল। কিন্তু গত দুমাসের রিপোর্টিং মান, ধরণ ও ততপরতায় তাতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মনে হচ্ছে এটা বোধহয় কোন ভারতীয় পত্রিকা। যার অফিস ভারতের কোন শহরে!
    এমনিতেই ভারতীয় পত্রিকায় জার্নালিজম থাকে না। থাকে জাতিবাদ-দেশপ্রেমিকতা। মানে খবর যেভাবে পেশ করলে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি দেশপ্রেম প্রকাশ পাবে সেটাই করতে হবে। তাতে নিউজ মিথ্যা হলেও অসুবিধা নাই। অর্থাৎ জার্নালিজমের নীতি ও সততা এর গাইডলাইন নয়, বড়জোর সেকেন্ডারি। অর্থাৎ দেশপ্রেমের নামে খাড়া মিথ্যা প্রপাগান্ডাও জায়েজ। আর কথিত এই দেশপ্রেমের নিচে যদি কিছু জায়গা ত্থাকে তো সেখানে জার্নালিজমকে ফেলে রাখা যেতে পারে। এককথায় কথিত তাদের ‘ন্যাশনাল ইন্টারে্স্টটের’ সাংবাদিকতা। ফলে এরপর আর খবরের সত্য-মিথ্যা জাহান্নামে!
    কথা এখানেই শেষ না। দল বিজেপি যেহেতু এখন ক্ষমতায়। তাই মোদীর
    আরএসএস –বিজেপির রাজনীতি এবং স্বার্থটাই ভারত দেশপ্রেমের মাপকাঠি এবং তাদের কথা-ই ভারতের ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’। তাই শেষে এটাই প্রথম আলোরও খবর প্রকাশের গাইড লাইন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ প্রথম আলোর খবরের সোর্স বলা হচ্ছে ভারতে প্রকাশিত কোন পত্রিকার খবর।
    আগেও বলেছিলাম “ডেস্ক নিউজের” নামে প্রথম আলোতে আরেক চাতুরি চলে। তা হল, খবরের উতস-এর পরোয়া না করে অনুবাদের নামে যা ইচ্ছা তাই রিপোর্ট করা। যেন ‘অনুবাদক’ বলে আরেক ক্যাটাগরির কর্মী প্রথম আলো নিয়োগ দিয়েছে বা দেখতে পাওয়া যাবে। যারা সাংবাদিকতার সব দায় কর্তব্যের উর্ধে। খবরের উৎসে কোন কথা বা শব্দ থাক আর নাই থাক তিনি যেকোন শব্দ খবরের মধ্যে ঢুকাতে পারেন, বেপরোয়া। কারণ ওটা নাকি ‘ডেস্ক নিউজ’। ফলে যেন খবরের সত্যতার দায় প্রথম আলোর নাই।
    এর উপর আবার গতমাস থেকে এখন শুরু হয়েছে ‘বান-তালে’ (শব্দ উলটে নিয়ে পড়তে হবে) জার্নালিজম’। মানে যারা কা=বু=লে ক্ষমতা দখল করেছে। তাদের নিয়ে ভারতের জার্নালিজম। খবরের সোর্স না থাকলেও বানিয়ে এই নতুন শাসকদের বিরুদ্ধে লিখতে হবে ও সেটাই জার্নালিজম বলে মানতে হবে। নয়া শাসক আসাতে ভারতের স্বার্থের ক্ষতি হয়েছে। তাই এই ইস্যুতে ভারতের জার্নানিজম বাপ-মা হারা বেপরোয়া হয়ে গেছে। বেঁচে আছে কেবল কথিত ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের সাংবাদিকতা, তাই দেশপ্রেমের ভারে, উৎস না থাকলেও যা খুশি লিখে দিবার স্বাধীনতা।
    আর এতে প্রথম আলো হয়েছে আরো স্বাধীন বেপরোয়া। ভারতের যেকোন মিডিয়ায় প্রকাশিত এসব প্রপাগান্ডা গারবেজকে প্রথম আলো তার প্রকাশিত নিজ খবরের সোর্স বলে দাবি করছে। পেগাসাস এই ইসরায়েলি আড়িপাতা সফটওয়ার মোদী কিনেছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে, আর বিরোধী রাজনীতিক এমনকি নিজ সরকারের সচিব ইত্যাদির উপর তিনি তা ব্যবহার করে আসছেন। এটা নিয়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে মামলা চলছে। সংসদে হৈ চৈ চলছে। অথচ এখনও না সরকার বা সফটওয়ার কোম্পানী (এনএসও) স্বীকার করেছে যে মোদী এই সফটওয়ার কিনেছে। আদালতে দেওয়া সরকারের এফিডেফিট ইতোমধ্যে দুবার বদলিয়েছে। এমনকি কিনে নাই সেটাও বলছে না। পিছলে বেড়াচ্ছে। অথচ এনিয়ে যে রিপোর্ট প্রথম আলো ২৪ জুলাই ছেপেছে তা আসলে কোম্পানী এনএসও এর পক্ষের এক সাফাই। সেজন্য শিরোনাম হল এই আড়িপাতা সফটওয়ারের কারণে নাকি “লাখ লাখ মানুষ রাতে ভালো ঘুমাতে পারে”।
    এএনআই – এটা নিজেকে ভারতের এক প্রাইভেট নিউজ এজেন্সী বলে দাবি করে। বস্তুত এটা ফেক নিউজের একটা আড়ত। ইইউ এর এক গবেষণাালব্দ ফল থেকে পাওয়া অভিযোগ এটা। (EU DisinfoLab report) গুগল সার্চ দিয়ে আগ্রহিরা খুজে নিতে পারেন। আর এই কথিত এজেন্সীর উপরে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের হয়ে যেসব ফেক নিউজ করার দরকার হয় তা করে দেওয়ার বা হালাল করে দেওয়াই এই এজেন্সীর কাজ। অথচ এই এএনআই এর নিউজকেই উৎস মেনে পিআলো তা ছেপে চলেছে।
    যেটা গত পরশু একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে সেটা হল, একটা কথিত নিউজ;
    এতে উল্লেখিত খবরের সোর্সগুলো এরকমঃ
    ১। ……বলে সরকারি সংস্থাগুলো মনে করছে
    ২।…… বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে।
    ৩……… বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
    ৪।……… বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,
    ৫। ……… পাকিস্তানের নাম জড়িয়ে পড়ার কথা শোনা যায়।
    ৬।………… পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রচার রয়েছে।

    ৭।………… ঢাকার বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী

    ৭৫০ অক্ষরের এই কথিত নিউজে খবরের সোর্স এই সাতভাবে বলা আছে। এটা কী জার্নালিজম? তাও প্রথম আলোর?
    প্রথম আলো এভাবে নিজেকে নিচা করে নামিয়ে কথিত খবর ছাপছে কেন?
    অর্থ সংকট? পাকিস্তান আমাদের কারও অপছন্দের দেশ হতেও পারে। কিন্তু সেজন্য এর বিরুদ্ধে এমন প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে নিজের অর্থ সংকট মিটাতে হবে? ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ বা নয়াদিল্লির অর্থ নিয়ে? তাই কী?
    এমন গারবেজ অসততার জিনিষগুলো প্রথম আলোতে ছাপার আগে এই পত্রিকার সম্পাদকের আত্মহত্যা করাই অনেক সম্মানের হত!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    গৌতম দাস

    ২৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬

    AFTER   AFGANISTAN,THE  PAX  AMERICA  IS  OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    PAX AMERICA IS OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    সব ভেঙে গেছে, ভেঙে পড়ছে। খসে খসে পড়ছে, এক এক করে! আমেরিকান ক্ষমতার সাজানো বাগান। আর লুকানো যাচ্ছে না। শুধু আমার কথা নয় এটা। দেখা যাচ্ছে যারা এতদিন শুধু আমেরিকান সমর্থক না আমেরিকা তাদের জীবন, ভরণপোষণ, পেশা ইত্যাদিতে ডেইলি-লাইফের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এমন ব্যক্তিরাও এখন আমেরিকার সাথে নিজের দুরত্ব তৈরি করছে। এরাও আমেরিকার কোন দায় আর নিতে চাইছে না। দুনিয়া এখন এমন নতুন চেহারায় পৌছেছে।
    কোনো  পরাশক্তি এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেখা যায়নি। এটা ওর জন্য বিশাল সঙ্কটের একটা যুগে প্রবেশ। এর গভীর সংকটের বড় লক্ষণ ও প্রধান  প্রমাণ হল যখন, এই দেশের অভ্যন্তরীণ সব বিরোধ-মতান্তর খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়। আমেরিকান সমাজে অসংখ্য বিভক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আরেক বড় লক্ষণ হাজির হয়েছে, সবার গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়া। তাই এখন আফগান-রিলেটেড প্রায় সবাই হতাশায় হাত-পা ছুড়ছে। কে যে কাকে গালাগাল করছে তার কোনো তাল-ঠিকানা নেই। অনেক সময় রাগে ক্ষোভে বা গভীর হতাশায় অথবা নিজেদের আর ভবিষ্যৎ নেই দেখে ফেললে – বড় মানুষও শিশুদের মতো আচরণ শুরু করে; নিজের বাবা-মাকেই গালাগালি শুরু করে; এটা তেমন অবস্থা যেন! কিন্তু  কোন ঘটনাটা এমন এত বড় প্রভাব ফেলতে পারল? আফগানিস্তানে তালেবান ২.০ এর উত্থান ঘটেছে! এরই প্রতিক্রিয়া এগুলো!

    প্রতীকীভাবে কিছু ব্যক্তিত্বের প্রতিক্রিয়া এখানে জড়ো করব।  রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশ (২০০১-০৯) থেকে শুরু করি। তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে মিথ্যা অভিযোগে হানাদার দখলদারি ঘটানোর প্রধান নায়ক। এবার তিনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে বকাবকি শুরু করছিলেন গত মাস (জুলাই) থেকেই যে বকাবকিটা ১৫ আগস্টের ( আমেরিকান কাবুলের পতনের দিন ) পরে আবার শুরু করেছেন। বুশের অবস্থান হল, তিনি আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের একেবারেই বিপক্ষে। তিনি আফগানিস্তান ছাড়তে চান না। বেচারা! কেন? কী যুক্তি তার? তিনি গত মাসে ১৪ জুলাইয়ে জার্মান ডয়েচে ভেলে’কে বলেছেন, সেনা প্রত্যাহার এক ‘ভুল কাজ’ [George W. Bush: Afghanistan troop withdrawal ‘a mistake‘]। তিনি আরো বলেন, ‘আফগান নারী ও মেয়েদের বর্ণনাতীত কষ্টের কথা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন” [I’m afraid Afghan women and girls are going to suffer unspeakable harm,” Bush said.(২০ জুলাই)]।’ আচ্ছা, তার মানে কি তিনি আফগান নারীদের দুর্দশামুক্তির নায়ক হতেই আফগানিস্তান দখল করেছিলেন? তাই কী?   না, তা কেউ বলছে না, তিনিও তা দাবি করছেন না। তা হলে, এমন ভুয়া উদ্বিগ্ন কেন তিনি?

    পিছনের বিশাল কারণটা হল, আফগানিস্তানে ও ইরাকে জাতিসঙ্ঘের চোখেই আমেরিকা হানাদার ও দখলদার বাহিনী, আর এই কাজের প্রধান নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ও কর্তা তিনি নিজেই। বুশের এই একচুয়াল লিগ্যাল স্ট্যাটাস লজ্জাজনক, এটা তিনি জানেন। একবার জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান তা পাবলিকলি উচ্চারণ করেছিলেন। তাই বুশ জানেন, বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে আমেরিকান সমাজে এখন প্রশ্ন উঠবে যে আমেরিকার তাহলে লাভ হলো কী? ২০ বছরে মার খেয়ে? দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে? এবং সবাই প্রেসিডেন্ট বুশের বিরুদ্ধে আঙুল তুলবে? তাই অন্য কারো তাকে বিব্রত করে ফেলার আগেই তার ভান হল, নারীর জন্য ‘প্রাণ কান্দা’। এজন্যই তার মুখরক্ষার বয়ান-দর্শন এখন একটাই, ‘নারীর-দুর্দশামুক্তি’। ভাবখানা এমন যেন নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারেন নাই। তা রক্ষা করতে বুশ বা আমেরিকা আফগানিস্তান দখলে এসে ২০ বছর কাটিয়ে গেল! কী তামশা!

    আমেরিকার এক পপুলার মিডিয়া হল ‘এনপিআর’ [NPR, National Public Radio] রেডিও। এরই ওয়েবসাইট লিখছে, আমেরিকা নাকি ‘আফগানিস্তানে গণতন্ত্র এনে দিতে গিয়েছিল []। তবে এটা করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত খোদ আমেরিকাতেই গণতন্ত্রের অভাব ঘটিয়ে ফেলেছিল, [The U.S. involvement in Afghanistan is a story of democracy and its shortcomings. ]।’ এদেখি বিরাট এক আঁতলামো! ইদানীং আমেরিকান মিডিয়ার এমন লেখা দেখে মনে হয় তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে, তাই কথার আর সেই ওজন থাকছে না। কখন কী বলে ঠিক থাকছে না।

    এ ছাড়া এ কথাটাও সত্য নয়। যেমন, বুশ দুই টার্মে ক্ষমতায় ছিলেন। প্রথম টার্মে যদি ধরে নেই পাবলিক জোশে তিনি আফগানদের কড়া শাস্তি দেয়ার জন্য বোমা ফেলতে গিয়েছিলেন, মানে নাইন-ইলেভেনে টুইনটাওয়ারে হামলার শাস্তি দিচ্ছিলেন। কিন্তু এরপরে কী? প্রশ্ন উঠবে, তাহলে এর পরও যুদ্ধ চালু রাখতে ভোটাররা তাকে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত করলেন কেন? এর দায় তো তখন অবশ্যই (লোভী) ভোটারদেরও নয় কি?  আসলে এসব ভোটারেরা কখনই দায়িত্ব নিতে চায়নি, বুশ বা তাদের প্রেসিডেন্ট কী করে বিদেশ থেকে দেশে টাকা আনছেন? আর বুশের পদক্ষেপ তাদের পক্ষে যাচ্ছে বলে তারা মেপেছিলেন ও আর উৎসাহ দিতে বুশকে আবার নির্বাচিত করে দিয়েছিলেন তাদের ওসব বৈষয়িক লাভ দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তাদের বিচারে আমেরিকান সমাজে “কাজ-কাম” আর ‘মানি সার্কুলেশন’ বাড়া দেখেই তো তারা সিদ্ধান্তে গিয়েছিলেন… “কাজেই বুশকেই আবার জিতিয়ে দাও”। তাতে আফগানিস্তানে কী হচ্ছে তাতে ভোটারদের কী – এভাবেই  তারা জিতিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধে আমেরিকান জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিকে জড়ানোর কারণে এই মানি সার্কুলেশন বৃদ্ধি পেয়েছিল- যেটা ছিল এক জবরদস্তি বৃদ্ধি। আর যুদ্ধ তো ঠিক কোনো ব্যবসা বা বাণিজ্য নয়। তাই যুদ্ধ শেষে কিছু রিটার্ন এলে আসতেও পারে, এই রিটার্ণের উপর ভরসা করে কেউ যুদ্ধে যেতে পারে না।
    যুদ্ধ দেশকে বিশেষ কোনো সুবিধা (অ-মানিটারি সুবিধা) কখনো কখনো এনে দিতে পারে। যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সবার উপরে সাবধান থাকতে হয়, কারণ, কোনো যুদ্ধের খরচ যেন দেশের বইবার সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি দাবি না করে বসে। সে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ করেও টিকে গিয়েছিল। আমেরিকা ইউরোপ (এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ) ও  এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন
    আমেরিকার উপর একই গ্লোবাল কর্তৃত্ব সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান-ইরাকের যুদ্ধের ব্যয় ছিল লাগামছাড়া আর বিপুল খরচের তুলনায় রিটার্ন এমন বড় কিছু নয়। ততদিনে যুদ্ধের সাত বছর পেরোতেই বেহিসাবি খরচের ভারে শুধু ‘আমেরিকান ইকোনমি’ নয় এর নেতৃত্বে ও সাথে থাকা ইউরোপসহ সারা গ্লোবাল ইকোনমিও মহামন্দার (২০০৮) কবলে পড়ে যায়। এভাবে এঘটনাই আমেরিকান কর্পোরেট হাউজ, ব্যবসাদার ও ভোটার সবপক্ষেরই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিয়েছিল। কারণ, গ্লোবাল মন্দার মধ্যে আর আফগান-ইরাক যুদ্ধও তো এক সাথে দুনিয়াতে কখনো চলতে পারেনি।

    এরপরের ওবামা দু-টার্ম বা পরে ট্রাম্প- দু’জনেই তাদের কালের যুদ্ধের উল্টা এরা – যুদ্ধের খরচ কমানোর নায়ক সাজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখকর খুব কিছু হয়নি। তবে দায়ীত্ব ও  বিবেচনাহীনভাবে যুদ্ধের দায় ফেলে পালিয়ে যাবেন – এই সস্তা শর্টকাট বেকুবির পথ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি তালেবানদের সাথে আমেরিকানদের চুক্তিও সম্পন্ন করেছিলেন একা ট্রাম্প নিজেই। ফলে তালেবান-চুক্তি করার মূল দায়ভার এককভাবে ট্রাম্পের। কিন্তু বাইডেন তা বাস্তবায়নে গেছেন বলে সব দায় এখন তিনি বাইডেনের ওপর চাপাচ্ছেন। এটাই বড় তামাশার।

    আবার বাইডেন আসলে  তালেবানদের ক্ষমতায় এনে নিজের সেনা-প্রত্যাহার নিশ্চিত করবেন এমন বাস্তবায়ক প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছেন।  যদিও এই দায় নেয়া যে খুবই রিস্কি তা তাঁরও অজানা ছিল না। কিন্তু তবু তিনি রাজি হয়েছিলেন; কারণ সেনা প্রত্যাহার তার সরকারের পরিচালনা খরচ কমাবে, এই ছিল লোভ। কারণ, আফগানিস্তানে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩০ কোটি ডলারের বেশি – । এখনকার আমেরিকা মানে অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব, সেই প্রাচুর্যের আমেরিকা আজ আর নেই। কিন্তু তার অর্থ দরকার। কারণ, এদিকে অর্থের সংস্থান ও সোর্সের খবর না রেখে বাইডেন  সারা ইউরোপ আর জাপানের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন [বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)] যে, চীনের পাল্টা ব্যাপক বিনিয়োগ সক্ষমতা, পাল্টা বেল্ট-রোড খাড়া করার সক্ষমতা হাজির করবেনই। এখন আফগান ফ্রন্ট থেকে সেনা প্রত্যাহার যদি বাইডেনকে কিছু খরচ সেভ করাতে সে অর্থই বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস হয়ে দেখায় – যদিও শেষে এসবই  সুখের গল্প হয়েই থেকে যাবে! সে সম্ভাবনাই প্রবল!

    কিন্তু এর আগেই (বাইডেনের উপর দিয়ে) ট্রাম্প দান মারার চেষ্টা করেছেন। তিনিও আগামী নির্বাচনের হিসাব মোতাবেক এখন উল্টা বাইডেনের ওপর নিজেরই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সব দায় চাপিয়ে নিজে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। তাই বলা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্টরা মাত্রই আসলে দায়দায়িত্ব নিতে না চাওয়া অপরচুনিস্ট, সুবিধাবাদী। তাই শেষে সব ভার বাইডেনের উপর। যেমন,  বাইডেন ইতোমধ্যেই তালেবান ক্ষমতা দখল নিয়ে নেয়ায় নৈতিক দিক থেকে ঘায়েল হয়ে গেছেন; আমেরিকানদের মানসিক-নৈতিক দিক দুর্বল করে ফেলেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের একগুঁয়ে নীতিটাই বাইডেন চুপেচাপে অনুসরণ করে যেতে চেয়েছিলেন। চীনা পণ্যের আমেরিকায় আমদানিতে বাধা দিতে ট্রাম্প ওসব পণ্যের উপর বাড়তি ২৫ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করেছিলেন। সেটা সযত্নে চালু রেখেছেন বাইডেন। আর সেটাই এখন বাইডেনের উপরই শাস্তি হিসেবে আসা শুরু করেছে। ঐ ট্যাক্স আরোপ বাইডেন আগে বদল করতে যাননি, ‘কম দেশপ্রেমী’ হতে চাননি বলে হয়ত। কিন্তু সেটাই বাইডেনকে আমেরিকার আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ দিতে উদ্যত হচ্ছে বলে খবর চাউর হয়েছে। একই কায়দায় এটাও ট্রাম্পের আরেক ফায়দা।

    তালেবান-ক্ষমতারকালে বাইডেনের ভারতঃ
    ওদিকে বাইডেনের তালেবান উত্থান পলিসি ভারতের জন্য একেবারেই অসহ্য হয়ে উঠেছে। ভারত আর নিতে পারছে না কিন্তু পালানোর পথ নাই। আর সবচেয়ে অসহ্য হয়েছে  মূলত, পাকিস্তানের কাছে ভারতের নৈতিক পরাজয়। পাকিস্তানকে আর ‘জঙ্গি দেশ’ প্রচার করে ভারতের সুবিধা হচ্ছে না, জমছে না। (যদিও ভারত তাতে ক্ষান্ত দেয় নাই।) গত ২০ বছর ধরে প্রপাগান্ডায়  – যেন পাকিস্তানই আফগানিস্তানের মা-বাপ; সব ইসলামী রাজনীতিক বা সশস্ত্র ধারার উৎস। এই ছিল ভারতের মুখ্য প্রপাগান্ডা বয়ান।  গত ২০ বছর আমেরিকার ওয়ার-অন-টেরর যেন আফগানিস্তানের তালেবানসহ অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপের  বিরুদ্ধে ছিল না, যেন আমেরিকার যুদ্ধ চলছিল (জঙ্গি) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আমেরিকা যেন  পাকিস্তানি ইসলামী জঙ্গি থেকে ভারতকে মুক্ত করতে লড়ছিল। বিশেষ করে এত দিনের আফগানিস্তান যেন ছিল এক নারীমুক্তির ঘাঁটি  – এমন এক বিরাট কারখানা। আর এখন যা হয়েছে তা যেন, তালেবানদের আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল নয় –  বরং “পাকিস্তানের কারণেই” এই নারীমুক্তির কারখানা -টা এখন যেন বন্ধ হয়ে যাবে। আফগান নারীরা বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে  আমেরিকান স্কলারশিপে পড়তে গিয়েছে।  ফ্যাক্টস হল, কাবুলে আমেরিকান পুতুল গণি সরকার পালানোর কারণে এখন  এসব নারীদের পড়াশুনা  অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। কিছু না হলেও তা একটা সাময়িক ধাক্কা খাবে।  কিন্তু  আমেরিকান প্রশাসন সতর্ক ব্যবস্থা নিলে কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। মূল কারণ, পড়াশুনার কেন্দ্রটা  আফগানের বাইরে আর, সেসব দেশেই স্কলারশীপের অর্থ পাঠাতে কোন সমস্যা নাই। তবে উদ্বিগ্নতা থাকবে আর নতুন করে ছাত্রীরা এই সুযোগ পাবে না, এটা অনিশ্চিত। কিন্তু ভারত ইতোমধ্যেই প্রচার চালিয়েছে যে  তা তালেবানদের দ্বারা নয়, পাকিস্তানের কারণে যেন বন্ধ হয়ে যাবে। এই ক্যাম্পেইন এতদিন কানে কানে বলার মতো করে চালিয়েছিল ভারত। বিশেষ করে ইউরোপের স্কানডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা বেশি  করে ঢাকায় আমাদের কানে পর্যন্ত পৌছিয়েছে।

    ভারত এই ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার কাজ হাতে নিয়েছিল আরেক কারণে। রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাকে সাথে নিয়ে তালেবানের ওপর শক্ত গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমের মধ্যে তাদেরকে আসতে বাধ্য করার জন্য ত্রয়কা গঠন [দেখুন ট্রয়কা নিয়ে  আমার আগের লেখায়] করেছিল যাতে এই তিন দেশের বিরল কমন ও শক্ত অবস্থান তালেবানদের দেখানো এবং মানতে চাপ দেয়া যে তাদের কমন অবস্থান ও বক্তব্য আবার নিরাপত্তা পরিষদেরই প্রস্তাব। এর বাইরের কারো বা কোনো প্রস্তাব নয়। আর এ কাজ বাস্তবায়ন করতেই তারা পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল, যার নয়া নাম দিয়েছিল ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতেই ভারতের সব পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডা পানি হয়ে গিয়েছিল। এসবেরই প্রতিশোধ হিসেবে ভারত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আফগান নারীদের মধ্যে প্রপাগান্ডা চালিয়েছে যে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ পাকিস্তান। পাকিস্তানই তালেবানদের পরিচালক। অতএব আফগান নারীরা যেন পাকিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসঙ্ঘে “পিটিশন” লিখে আবেদন জানায়। অথচ বাস্তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুনিয়ার কোনো সরকারের এমন কোনো অভিযোগই নাই। জাতিসঙ্ঘসহ কোনো ফোরামেই এমন কিছু নাই। কিন্তু ভারত ইউরোপের ক্যাম্পাসগুলোতে আফগান নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন পিটিশন স্বাক্ষর ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছেই।

    গতকালের আনন্দবাজার পত্রিকা এক মজার খবর দিয়েছে, ভারতীয় অ্যাম্বাসির সর্বশেষ দেড় শ’ জনের যে দলটা কাবুল থেকে ফেরত এসেছেন তারা ফিরে এসেছেন তালেবানের দেয়া সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহায়তায়। ঘটনা হল, তারা দেশে নিরাপদে ফিরতে চান বলে স্থানীয় তালেবান কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করলে কমান্ডার ভারতীয় অ্যাম্বাসির ২২টি গাড়ির কনভয়-বহর পাহারা দিয়ে এয়ারপোর্টে নিরাপদে পৌঁছে দেন। আনন্দবাজার লিজেই লিখছে, “সকলকে তাজ্জব করে ভারতীয় দূতাবাসের ১৫০ কর্মীকে বিমানবন্দরের পৌঁছে দিল ওই তালিবান বাহিনীই”। যার মানে ভারতের নিজের ছড়ানো তালেবানদের নেগেটিভ ইমেজ তারা নিজেরাই পরিস্কার করে তবেই ভারতে ফিরে আসতে পেরেছে।

    ‘কাউন্টার হিরো’ ব্রহ্ম চেলানিঃ
     ব্রহ্ম চেলানি (Brahma Chellaney) একজন ভারতীয়; তিনি অনেক বাংলাদেশীর মতই আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো। তিনি দিল্লিতে বসে আমেরিকান ফান্ডে এক এনজিও / থিংকট্যাংক চালান, নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ  [Centre for Policy Research ]। তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate]  কলাম লেখেন আর সে লেখা বাংলাদেশের ‘প্রো-আমেরিকান’ পত্রিকাগুলো অনুবাদ করে ছাপে। কিন্তু তিনি বাইডেনের তালেবানদের সাথে রফা-ডিল করা  নিয়ে ক্ষিপ্ত এবং পরে  তালেবানরা নিজ মুরোদে আফগানিস্তানে  ক্ষমতা দখল করলে, এরপর তিনি একেবারে ক্ষেপে আগুন হয়ে যান। এতে তিনি এমনই হতাশ আর ক্ষুব্ধ হয়ে গেছেন, যাকে বলে ‘রাগে অন্ধ’। এর আগে তিনি কখনও  আমেরিকার উপরে এমন পরিপুর্ণ হতাশ হয়ে পড়েন নাই, অন্তত আমরা দেখিনি। যেমন তার একেবারে ভেঙ্গে পড়া বুঝা যাবে যদি দেখি  তার এবারের লেখার শিরোনাম – ‘কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বনেতৃত্বের অবসান হলো’ [Pax Americana Died in Kabul]। এটাই এর প্রমাণ। এই লেখার শুরুতে তার কথা মনে করেই লিখছিলাম।

     

  • বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3GN

     

    Xinjiang – China’s Uighur Problem

     

    এতদিন কথিত যে জঙ্গীপনা আমেরিকার চক্ষুশুল ছিল এখন প্রেসিডেন্ট  বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী নিজেই সেই “জঙ্গীনেতা” হতে চলেছেন? এই প্রশ্নটা ক্রমে ধেয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প বা ইকোনমিক তৎপরতার প্রতি আমেরিকা-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোখ দিয়ে তাকানো – এই দেখা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু  কোন ঈর্ষা বা অন্তর্ঘাতমূলক চোখ?  না, এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। শুধু তাই নয় এটা আত্মঘাতীও। মানে বোকা বোকা চোখমুখের কিছু স্টুপিড চিন্তা ছাড়া আর কীইবা বলা যায়! তবে প্রতিহিংসাপরায়ন মানসিক অসুস্থ মানুষ তো আত্মঘাতিই! অপরের যাত্রাভঙ্গ করে যেখানে যারা সুখ, অন্যকে কষ্ট দেওয়ার ভিতরের মিথ্যা-সুখ পেতে চায় আর হয়রান হয়!
    বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প থাকলেই এর উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে অন্তর্ঘাতমূলক [sabotage] হামলা করা বা এমন হামলাকে সমর্থন করা [Chinese Projects in Pakistan Prove Tempting Targets for Terrorist Groups………]  – এসবই আমেরিকা ও ভারতের চীন মোকাবিলার কৌশল ও ততপরতা হয়ে উঠছে।  অথচ এটা যেকোন বিচারেই অগ্রহণযোগ্য। এমনকি তা এদুই দেশের স্টান্ডার্ডেও অগ্রহণযোগ্য।  বলাই বাহুল্য এসব আসলে দেউলিয়াত্বের লক্ষণ, নিজ দেশ-রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সক্ষমতা যখন নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে বলে শাসকেরা অনুভব করে তখন এমন বেদিশ হবার লক্ষণ এগুলো!  সম্ভবত এটাই এর সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা!

    বুদ্ধিমানরা পড়শির উন্নতি দেখে ঈর্ষার পথে যাওয়ার আত্মঘাতী ভুলের দিকটা আগেই দেখে ফেলতে পারেন। তাই তারা এপথ পছন্দ করবেন না। এর চেয়ে পড়শির ঐ ‘উন্নতির’ সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খুঁজে পেলে তা থেকে নিজের জন্য কোনো রাস্তা বের করতে পারেন কি না সেই চোখে তারা ঘটনাকে দেখে থাকেন। নয়তো পড়শির তৎপরতা দেখে সেখান থেকে আগ্রহ পেয়ে নিজেই পাশে তেমনই কিছু খাড়া করেন। এসবই হল গুরুত্বপুর্ণ পজিটিভ চোখ খুলে ঘটনার দিকে তাকানো ও বুঝার পথ।
    তবে আরেক বিকল্পও আছে, স্বভাবতই তা নেতি ও ঈর্ষার পথ। পড়শির উন্নতির বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে প্রপাগান্ডা শুরু করা আর তাতে এক রংচঙ্গা দুনিয়া বানানো আর সেটা দেখিয়ে প্রতারণা ইত্যাদি। কিন্তু এই প্রপাগান্ডা করে বেনিফিট মানে এর লক্ষ্য কী?

    সবচেয়ে বড় কথা, খোদ নিজের বেনিফিট কী? ঈর্ষায় ডুবে থাকা মনে এর খবর থাকে না। বরং বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আমেরিকাই এমন প্রপাগান্ডা ভারতকে গিলিয়েছে। একপর্যায়ে দেখা যায়, ভারত তা মিথ্যা জেনেও বিশ্বাস করেছে। অথচ উদ্দেশ্য কী, বেনিফিট কী তবু সে খবর ভারত নেয়নি; যদিও এসব ক্ষেত্রে আমেরিকার নিজ উদ্দেশ্য নিজের কাছে স্পষ্টই থাকে যে, সে ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, চীন-ভারতের গঠনমূলক বা পরস্পর নির্ভরশীল কোন সম্পর্ক যেন না খাড়ায় যায়। কারণ এমন হতে না দেয়াটাই আমেরিকার স্পষ্ট স্বার্থ। বিশেষত এশিয়ায় দু’টি বড় অর্থনীতি চীন-ভারত যেন আমেরিকার স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজেরাই পারস্পরিক সহযোগিতার কোন আসর না বসিয়ে ফেলে।

    ভারত-আমেরিকা এমন সম্পর্ক বানানো নিয়েও হয়ত বাইরে থেকে খুব কিছু বলার নেই। কারণ সিদ্ধান্ত মানেই তো তা যার যার নিজের। এছাড়াও আর কারণ, গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের এই কালে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার দুনিয়া। যে যেখানে স্বার্থ ঠিক বা ভুলভাবে বুঝবে সে দায় শেষবিচারে তারই। আর এটা তার নিজেই চয়েজ – তাতো বটেই।  তবু ঈর্ষার আরেক চরম অবস্থার পথ ও পর্যায় আছেঃ স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। প্রতিদ্বন্দ্বীর স্থাপনা, সম্পত্তি অথবা ব্যক্তির ওপর হামলা আর ধ্বংসাত্মক কাজে নেমে যাবার ভূমিকা নেয়া।  বাইডেন বগলে ভারতকে নিয়ে সে পথের চয়েজে যাবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন!

    প্রথম কথা ও এককথায় বললে, এই পথ আত্মঘাতী। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে হতাশায় এসব কাজে জড়িয়ে  নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান ও সফল মনে হতে পারে। কিন্তু এটা ভুল। বাস্তবত এটা হল, প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই যদি সবার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ-তৎপরতায় জড়িয়ে যায় এতে সবারই ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। যেন শহরের সবাই সবার বিরুদ্ধে ছিনতাইকারী-লুটেরা হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা করছে, এমনটা কল্পনা করা যায় বড় জোর বাস্তবে  তা হতে পারে না।
    যদি সাময়িক লাভের চোখে না-ই দেখি, তবে জীবন মানেই কিন্তু এক ইতিবাচক লক্ষ্যের জীবনই বুঝায়। তবে যে আসলে নিজ জীবন-তৎপরতার কোনো ভবিষ্যৎ দেখে না, হতাশ, সেই অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা, আত্মঘাতী দিকটা দেখতে পায় না। বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের ‘জঙ্গিনেতা’র মত হতে চলেছেন?

    The Karakoram Highway, also known as the China-Pakistan Friendship Highway, is part of China’s Belt and Road Initiative. Image: AFP Forum

    পাকিস্তানের সিপিইসিঃ
    ‘সিপিইসি’ প্রকল্পে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ আর কোন সীমায় থাকতে পারছে না। চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর বা সংক্ষেপে ‘সিপিইসি’[CPEC] , এটা হল পাকিস্তানে চীনের এক সর্ববৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্প যেখানে মোট ৬২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে। এর শুরু হয়েছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান জলসীমায় গোয়াদরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে নেয়া থেকে। এরপরে বন্দরের সাথে যুক্ত ডাঙ্গা ভূখণ্ডে পাকিস্তানের চার প্রদেশকেই উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বুকচিরে যাওয়া হাইওয়ে, এটি পাকিস্তানের উত্তরের সীমান্ত শেষ হয়ে পরে চীনের জিনজিয়াং (উইঘুর) প্রদেশের কাশগড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধে হেরে যাওয়া হিটলারের জার্মানি বা ইতালিসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপকে পুনর্গঠনে (রিকনস্ট্রাকশন ও ডেভেলপমেন্ট) আমেরিকা এক বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়েছিল যা “মার্শাল প্ল্যান” নামে পরিচিত ছিল। অনেকে একালের সিপিইসি প্রকল্পকে পাকিস্তানে নেয়া চীনের ‘মার্শাল প্ল্যান’ বলেও তুলনা করে থাকে।

    তবে এ তো গেল ইতিবাচক চোখে দেখে বর্ণনা। আমেরিকা বা ভারতের স্বার্থ দেখা যারা নিজেদের কাজ মনে করবে বা এ জন্য নিয়োজিত তাদের এর চেয়ে ভিন্ন চোখে দেখাই স্বাভাবিক, অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে দেখবে সেটা তো ঠিকই আছে। কিন্তু তাই বলে ‘সিপিইসি’ শব্দ বা ধারণাটা কোথাও দেখা পাওয়া মাত্রই ঈর্ষায় জ্বলে উঠতে হবে, এটা সুস্থ লক্ষণ নয়। অথচ এটা কি অপ্রয়োজনীয় নয়? কিন্তু এরপরেও এমন ভয়াবহ কিছুর দিকে পরিস্থিতিকে কেউ কেউ জেনে না জেনে টানছে।

    ‘সিপিইসি’ যদিও চীনা ঋণ-বিনিয়োগে নেয়া পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প এবং এতে ওনারশিপ, লাভালাভ ও দায়সংশ্লিষ্টতা অনুভবে রাখার জন্য সে দেশের চার প্রাদেশিক সংসদেও আলাদা আলাদা করে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। তবু এই প্রকল্প পাকিস্তানের মতই প্রায় সমান ব্যবহারকারী এবং সুবিধাভোগী হল চীনও। অর্থাৎ চীন কেবল বিনিয়োগকারী নয়। সিপিইসি-এর হাইওয়ে চার প্রদেশের ওপর দিয়েই গিয়ে চীনে প্রবেশ করেছে। ফলে চীনেরসহ পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক ভূখণ্ড থেকেই রওনা দিয়ে নিজ উতপাদিত অথবা আমদানিকৃত কাচামাল –  এমন সকল আমদানি-রফতানির পণ্য নিয়ে গভীর বন্দরে আসা যাওয়া করা সবচেয়ে সহজ। তাই সবাই এর বেনিফিসিয়ারি।

    কথাটা আরো ভালো বুঝা যাবে যদি চীনের ভূগোল মনে রাখি। চীন আসলে সাড়ে তিন দিক থেকে পাহাড়ে ঘেরা ল্যান্ডলকড এক ভূখণ্ড যার কেবল মাত্র পুব দিকেরও আবার একাংশ খোলা। এর মধ্যে পশ্চিম দিক আবার হিমালয় পর্বতমালার মতো পাহাড়ে ঘেরা যেখানে চাইলেও উচ্চতা আর দুর্গমতার কারণে যোগাযোগের রেল বা সড়ক নির্মাণ খুবই কঠিন।

    সেই আশির দশক থেকে  চীন আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ নিয়েই আজকের জায়গায় এসেছে, কোন সন্দেহ নাই। আমেরিকাকে বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে চীনের অর্থনীতি আজকের জায়গায় আসতে রওনা দিয়েছিল বলা যায় সেই ১৯৭৮ সাল থেকে। পরের ৩০ বছরে ক্রমে লাগাতার ডাবল-ডিজিটের পথে উন্নতি করে সেই চীন আজকের যে চীন হয়েছে সে আসলে এখন আবার খোদ আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, গ্লোবাল নেতার জায়গা নিতে চায়। তাই সেই সময়কালটাকে (১৯৭৮-২০১০) আমেরিকার দিক থেকে বলা যায়, এক দিকে বিপুল বিনিয়োগের বাজার পাওয়ার সুযোগ, সুখ ও লোভ অন্য দিকে চীনের উন্নতিতে চীন আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে এই টেনশন – এমন এক মিশ্র অনুভব নিয়ে পার করতে হয়েছে।

    The Strait of Malacca

    তাই শেষের দিকে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীতা খোলাখুলি হয়ে ওঠেছিল। ওতএব  এই  “উন্নত- চীনের” দুর্বলতা খুঁজে সেটাকে চেপে ধরে রাখার উপায় বের করতে গিয়েছিল ওয়াশিংটন। পেয়েছিল এক ‘মালাক্কা প্রণালী’ [Strait of Malacca]। এটা হল সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পথের এক রূট। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আনা চীনের অনিবার্য প্রয়োজন। কিন্তু তা চীনা বন্দরে নিতে গেলে এই মালাক্কা প্রণালী পার হয়েই যেতে হবে। সেই সমুদ্রপথে মালাক্কা প্রণালী হল সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর আগে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার ভূখণ্ডের মাঝখান দিয়ে গেছে এমন আধা কিলোমিটার চওড়া চিকন এক জলপথ বা প্রণালী। সমুদ্রপথে এই প্রণালীতে কয়েকটা জাহাজ আড়াআড়ি ফেলে রেখে চীনকে এই পথে চলাচলে বাধা তৈরি করা যায় ও সম্ভব, এই হল আমেরিকান পরিকল্পনা। এমন সামরিক পরিকল্পনা যে নিস্তরঙ্গ পানিতে আমেরিকাই সবার আগে এঁটেছে, সেটা আমেরিকার বিরুদ্ধে কোন কাল্পনিক অভিযোগ একেবারেই নয়।

    আমেরিকার সরকার-প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটা ভাল (বা কারো দিক থেকে খারাপ) রাজনীতি-চর্চা ও রেওয়াজ হল যে, আমেরিকান সরকার তার নীতি-পলিসির বহুকিছুই বা পুরোটাই গোপন রেখে দিতে পারে – দিয়ে থাকে ও দেয়। কিন্তু যে ইস্যুটা আমেরিকান সিনেট-সংসদে একবার যাচাই বা নিরীক্ষার জন্য উঠে আসা বা এসে যায় সেই ইস্যু সংশ্লিষ্ট সব তথ্য পাবলিকলি ওপেন করে দেয়া হয় বা হয়ে যায়। এমনকি তা (রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা না হলে) লাইভ টেলিকাস্টে সিনেটের ঐ ডেস্ক থেকে সরাসরি দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তেও প্রচারিত হতে পারে, সম্ভব। ২০০৮ সালের এমনই এক সিনেট-শুনানিতে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, চীনকে বাধা দেয়ার জন্য আমেরিকাই প্রথম ‘মালাক্কা প্রণালী’ নিয়ে স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা করেছিল আর তাতে ভারতকে কাছে টেনে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহারের তথ্য আছে।


    এখন মালাক্কা প্রণালীর কথা এখানে আনলাম এজন্য যে, ঐ প্রণালীকেন্দ্রিক আমেরিকান যুদ্ধ কৌশলেরই পালটা চীনের জবাব এবং একটা পদক্ষেপ হল  চীনের পাকিস্তানের সাথে সিপিইসি প্রকল্প নেয়া। কারণ চীন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না যে, তাকে আমেরিকা ঘিরে ধরছে, ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। তাই চীন গোয়াদর বন্দর নির্মাণে আগ্রহী হয়েছিল। তবে চীনের ভুখন্ড থেকে সমুদ্রে প্রবেশের প্রধান ফটক পূর্ব দিকের বন্দরগুলো ফেলে ঠিক উল্টো দিকে চীনের পশ্চিমের সীমান্তকে সরাসরি গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত করতেই সিপিইসি প্রকল্প নিয়েছিল। গত ২০১৩ সালে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল আর যা ২০১৫ সালেই চীন ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পের চুক্তি সই করা হয়। চীনের এই পশ্চিম সীমান্তই দুর্গম জিনজিয়াং (উইঘুর Xinjiang Uyghur Autonomous Region) প্রদেশ, যার কাশগড় পর্যন্ত সিপিইসি যোগাযোগ প্রকল্প  বিস্তৃত।


    সিপিইসি প্রকল্পে ‘
    জঙ্গি’ হামলাঃ
    খবরটা খুব সিম্পল। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে [পুরান নাম North-West Frontier Province] একটা বাসে বিস্ফোরণ-হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জনই চীনের প্রকৌশলী, যারা একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করছিলেন। সিপিইসি প্রকল্পের বড় বড় অংশই হল নানা বিদ্যুৎ প্রকল্প। আর ‘প্রকল্প’ বলতে এটা আসলে চার প্রদেশে বিভিন্ন ইপিজেড ফ্যাসিলিটি যেমন- গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, বিভিন্ন শোধনাগার ইত্যাদির সুবিধা স্থাপনা গড়ে তোলা যাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়ে আসে আর ওই হাইওয়ে ও বন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রফতানির তৎপরতা জমে ওঠে।

    কিন্তু সাবধান! এখানে বাসে হামলা বলতে কোন শহরে টাউন সার্ভিস বাসে হামলা নয়। এটা কয়েক কিলোমিটার জুড়ে এক প্রকল্প এলাকার ভেতরেই প্রকল্পের নিজেদের বাস ব্যবস্থা- বিদেশী প্রকৌশলী টেকনিক্যাল লোক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা প্ল্যান্টের শ্রমিকদের কাজে আনা-নেয়ার বাস। এই বাসের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাগুলো ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান আর তাতে বাস নদীর তীরে খাদে ফেলে দেয়া হয়েছে।

    Rescue workers and onlookers gather around a wreck after a bus plunged into a ravine following a bomb explosion, which killed 12 people including 9 Chinese workers, in Kohistan district of Khyber Pakhtunkhwa province on July 14, 2021. (Photo by STRINGER / AFP)

    এশিয়া টাইমসে পাকিস্তানের সাকিলের রিপোর্টঃ
    এফএম সাকিল [FM Shakil] হংকং থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়া টাইমসে’ নিয়মিত লেখেন। আমেরিকান স্বার্থের পারস্পেকটিভ থেকেই তিনি সাধারণত লিখে থাকেন। যেমন – এবারেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন তিনি, “ইমরান সিপিইসি বিস্ফোরণ ইস্যুতে চীনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন” । আসলে ব্যাপারটা হল, চীন স্বভাবতই এই চীনা নাগরিক হত্যায় খুবই কড়া মনোভাব নিয়েছে। চীনা তদন্তকারী স্টাফ গ্রহণে পাকিস্তান রাজি হয়েছে এবং চীন ঘটনায় ‘কেস সলভ করে’ জড়িতদের কড়া শাস্তি দিতে চীন-পাকিস্তান একসাথে কাজ করবে জানিয়েছে [China sends expert criminal investigators to Pakistan, urges severe punishment for perpetrators……]। এফএম সাকিল আরো লিখছেন, ‘পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে প্রথম থেকেই ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ইটিআইএম) নোংরা কাজ বলে বর্ণনা করছিলেন” [Pakistani officials have since indicated it was the dirty work of the East Turkestan Islamic Movement (ETIM), ……]।’ তা এখন বিরাট ঘটনা হিসেবে হাজির হয়ে গেছে।
    অবস্থা সামলাতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কড়া কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন- সিপিইসি প্রকল্প পরিচালিত হয় সিপিইসিএ [CPEC-A] নামে এক সরকারি অথরিটি বা কর্তৃপক্ষের অধীনে। গত দুবছর ধরে [ending the military’s de facto two-year control…] এই অথরিটির চেয়ারম্যান ছিলেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া। অনুমান করা হয়, প্রকল্পের নিরাপত্তার দিকে গুরুত্ব দেয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার গত সপ্তাহে ইমরান এক স্বনামধন্য এক ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর  যিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও যার বড় প্রকল্পের ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা আছে, নিজের মালিকানাধীন ও সরকারি প্রজেক্ট ম্যানেজ অভিজ্ঞতা রাখেন – সেই খালেদ মনসুরকে “প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী” [SAPM] হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি প্রধানমন্ত্রীকে সিপিইসি প্রকল্প প্রসঙ্গে সহায়তা করবেন। আর এই নিয়োগের পরপরই জেনারেল বাজওয়া নিজেই সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিয়েছেন। তাই পাকিস্তানের রেওয়াজ অনুসারে, সংশ্লিষ্টদের অনুমান যে অচিরেই ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন। আর লেখক সাকিল প্রধানমন্ত্রী ইমরানের এই ব্যাপারটাকেই ক্ষুব্ধ চীনকে তার ঠাণ্ডা করার প্রয়াস বলে দেখেছেন। তবে ঘটনা আরো আছে।

    US President Donald Trump (L) listens to US Secretary of State Mike Pompeo during a Cabinet Meeting at the White House in Washington,DC. -(Photo by Brendan Smialowski / AFP)

    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টঃ
    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ETIM বা ইটিআইএম); কারা এরা? ভয়েজ অব আমেরিকা জানাচ্ছে, [US Removes Anti-China Militant Group From Terror List] ২০০৩ সাল থেকে ইটিআইএম চীনা উইঘুর সশস্ত্র সংগঠন যারা আমেরিকার জঙ্গি সংগঠনের তালিকায় ছিল [Washington listed ETIM as terrorist group in 2003. ]। মানে? এটা আগে ছিল এখন নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, তিনিই এক সকালে ETIM এর নাম আমেরিকার অফিশিয়াল “জঙ্গি সংগঠনের তালিকা” থেকে কেটে দেন। ৭ নভেম্বর ২০২০ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল। এর আগের দিন তিনি এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেন?

    ট্রাম্পের অনেক বদনাম, ‘ভদ্রলোকেরা’ তাকে দেখতে পারেন না। তিনি গাড়োল গাঁইয়া ধরনের মানুষ এবং সর্বোপরি তিনি জাতিবাদী; সে জন্যই নাকি? এটা শতভাগ মিছা কথা। এমনিতেই ডেমোক্র্যাটরা মোমের পালিশ করা মুখ নিয়ে ঘোরেন বা থাকেন; তাদের মনের কথা সহজে পড়া যায় না। এর বিপরীতে গোঁয়ার ট্রাম্প সবার সামনে ও চোখেই উন্মুক্ত ব্যক্তিত্ব। তাই তার বদনাম বেশি। তার বিপরীতে বাইডেন ‘ছুপা’। চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের জাতিবাদী লড়াই, চীনাপণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের লড়াই   – এক কথায় ‘ট্রেড ওয়ারের’ বা বাণিজ্যযুদ্ধের কথা সবাই জানে। অথচ বাইডেন এখন ট্রাম্পের সেই নীতিই বাইডেন এখন অনুসরণ করে চলেন।

    ট্রাম্প সেই প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধের ভেতর প্রথম এক “ইতর পদক্ষেপ” এনেছিলেন। সেটাই হল, চীনকে তিনি দেখতে পারেন না, শত্রু মনে করেন – সেই চীনের বিরুদ্ধেই ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলার ব্যবস্থা করেন তিনি। তিনি “অসতভাবে” এই খেলা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কীভাবে?

    এতে বিপর্যয় কী ঘটে গিয়েছিল?
    চীনের সাথে ট্রাম্পের আমেরিকার  স্বার্থবিরোধ আছে, স্বাভাবিক! কিন্তু চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে কী সেই (রাজনৈতিক) স্বার্থের ভিত্তিতে ট্রাম্প ঠিক করবেন যে উইঘুরের ইটিআইএম [ETIM]  এই সশস্ত্র গ্রুপটাকে জঙ্গি বলবেন কী বলবেন না, জঙ্গী তালিকায় রাখবেন কিংবা বের করবেন?  তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও সন্দেহবশত আমেরিকা তাকে টর্চার করলে এবার চীন কি তার পক্ষে কোনো মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? অর্থাৎ কারও মানবাধিকার লঙ্ঘণ হয়েছে – একথা আমেরিকা বলবে কিনা তা নির্ভর করবে সেটা আমেরিকার শত্রুর বিরুদ্ধে যাবে কীনা; যদি যায় তাহলে আমেরিকা মানবাধিকার লঙ্ঘণ বলে হৈ চৈ তুলবে? এটা কী কোন রাস্ট্রের মানবাধিকার বোধ হতে পারে? নাকি এটা মানবাধিকার বেচা-বিক্রি এটা?

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেনঃ
    উইঘুরের ETIM কে আমেরিকা ১৮ বছর ধরে নিজের জঙ্গী সংগঠন তালিকায় রেখেও ট্রাম্প চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধে ব্যবহারের জন্য এটা আর জঙ্গী নয় বলে রায় দিয়েছিলেন।  আর এই অনৈতিক সিদ্ধান্তই পরে বাইডেন পরে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসাবে নিয়ে আসেন, কারণ ট্রাম্প মাত্র পরে আড়াই মাস ক্ষমতায় ছিলেন।
    আমেরিকা ইসলামী সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি তালিকা’ বানায়। জাতিসঙ্ঘেরও এমন নিজের আলাদা একটা ‘জঙ্গি’ তালিকা আছে। তবে জন্ম থেকেই তালিকার সমস্যা হলো, টেররিজম বা জঙ্গি কাজের সংজ্ঞা কী ও কোনটা- তা আজও না পশ্চিমা কোনো দেশের কাছে, না জাতিসঙ্ঘের কাছে আছে। তবু এ নিয়ে কাজ করার মত একটা ঐকমত্য তাদের মধ্যে দেখা যেত সেকালে। যেমন  – চীন বা রাশিয়ার চোখে যারা জঙ্গি তারা পশ্চিমা অন্যান্য দেশ বা ইউএন এদের চোখেও জঙ্গি বলে তালিকায় উঠতে বড় কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। অন্যভাবে বললে, চীন বা রাশিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশের মত নয়, বরং পরিষ্কার আলাদা। তাদের স্বার্থও অনেক জায়গায় অনেক আলাদা হলেও চীন বা রাশিয়ার তালিকায় থাকা জঙ্গিদের আমেরিকা নিজ বাণিজ্য স্বার্থে নিজেদের তালিকার বাইরে রাখবেন এমন চল – এই জুয়াচুরি তখন চালু ছিল না।

    এ কারণে উইঘুর ETIM সংগঠন ২০০৩ সাল থেকেই আমেরিকার ও জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় কোনো  নড়াচড়া ছাড়াই বজায় ছিল। পম্পেও যেই নামটাই তালিকাচ্যুত করেছিলেন আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থে, অনৈতিকভাবে।
    ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে তার বাণিজ্য লড়াইয়ের উপাদান হিসেবে কার নাম জঙ্গি তালিকায় ঢুকাবেন বা বের করবেন এমন কাজ একেবারে প্রত্যক্ষভাবেই ক্ষমতার অপব্যবহার। আর এমনটা শুরু করেন প্রথমে তিনিই। তবে সেটা গত ৭ নভেম্বর মানে ট্রাম্পের ক্ষমতা ত্যাগের মাত্র আড়াই মাস আগে। তাই ট্রাম্প এর ব্যবহারকারী হতে সময় পাননি। পরে এর প্রধান অপব্যবহারকারী প্রেসিডেন্ট হন বাইডেন।

    আরেকটা টেকনিক্যাল ও রেওয়াজের সমস্যা ছিল।
    এমনিতেই ব্যাপারটাকে আগে টেকনিক্যাল প্রবলেম মনে করা হত। যেমন – ধরা যাক বেলুচ কোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক গ্রুপ। এই সংগঠনের ওপর নির্যাতন করে ধরা যাক, পাকিস্তান মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে – এমন অভিযোগ আনতে আমরা পাকিস্তানের বাইরের কোনো মানবাধিকার সংগঠনকে দেখিনি। বিশেষত পাকিস্তানের তালিকায় যদি ওরা সশস্ত্র ও নিষিদ্ধ সংগঠন হয়। ফলে এতদিনের রেওয়াজ ছিল, কোন গ্রুপ সশস্ত্র হলে আর মানবাধিকার গ্রুপ তার পক্ষে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করত না।   এড়িয়ে যেত। সোজা কথা কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের সমর্থিত কোনো সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষে কেউ মানবাধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত না। বাইডেন সেই রেওয়াজ ভেঙেছেন এবং ভেঙেছেন রাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থে, চীনের সাথে পেরে উঠতে!

    অর্থাৎ আগে ভারতের আসামের উলফাকে বাংলাদেশ যদি অস্ত্র আনতে সহায়তা দিত তাহলে আর বাংলাদেশের কোন মানবাধিকার গ্রুপ  উলফার মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে দাড়াত না।  এড়িয়ে যেত। ট্রাম্প- পম্পেও-বাইডেন এই রেওয়াজ ভেঙ্গেছে শুধু না। কার মানবাধিকার রক্ষা বলে তারা আওয়াজ তুলবে তা নির্ভর করবে সেই ইস্যুটা তুলে আমেরিকার বাণিজ্যিক লড়াইয়ে ফয়দা আছে কিনা!  যার সোজা মানে কারও মানবাধিকার আসলেই লঙ্ঘণ হয়েছে কি না তাতে কিছুই এসে যায় না!

    কেউ স্রেফ মুসলমান বলে কারণে আমেরিকা রাষ্ট্রের সন্দেহের শিকার হতে পারে।সন্দেহবশত, তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া বা কমপক্ষে রিমান্ড সহ্য করতে হওয়া কিংবা  রেনডিশন [rendition] (অন্য দেশে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে টর্চারে কথা বের করা) ইত্যাদি অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়েছে, এমন উদাহরণ হয়ত কম নয়। [দেখুন ওবামার রেনডিশন প্রগ্রাম প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ।]

    এখন ট্রাম্প ও বাইডেন তাদের চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে তারা সেই রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে ঠিক করবেন উইঘুরের ETIM জঙ্গি কি জঙ্গি নয়? তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও, সন্দেহবশত তাকে টর্চার করা হলে চীন কি তার পক্ষে মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? বাইডেন এই অনৈতিকতা চালু করেছে!

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেন!
    তাই আগে ট্রাম্প ‘রায়’ দিলেন উইঘুর ETIM-এরা আর চীনের জঙ্গি সংগঠন নয়। আর বাইডেন এসে এরপর যোগ করলেন – চীন উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে।
    অথচ বাইডেনকে মনে রাখতে হবে মানবাধিকার নিজ বাণিজ্যস্বার্থের হাতিয়ার বা টুলস নয়। এটা অপব্যবহার! হেনরি কিসিঞ্জার বাইডেনদের এই সস্তা বাণিজ্য-বুদ্ধিতে ‘মানবাধিকার’ বুঝতে বলেননি।

    শুধু তাই নয়। পম্পেও চাতুরিতে ETIM-এর নাম জঙ্গী তালিকা থেকে বাদ দিলেও তখনও জাতিসংঘের তালিকায় এটা তখনও আগের মতনই জঙ্গী সংগঠন। ফলে সেটা রক্ষার দায় তখনও আছে। একারণের চীন এই প্রসঙ্গটা তুলে তার আপত্তি জানিয়েছিল কিন্তু সেকথা শুনে নাই।

    আরো বিপজ্জনক ব্যক্তিত্ব
    তাও বাইডেন এখানে আটকে সীমাবদ্ধ থাকলেও চলত। বিদেশে চীনা প্রকল্প মানেই সেখানে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ চালাতে হবে; বা উইঘুর ETIM-কে দিয়ে সে কাজ করাতে হবে – বাইডেন এখন এমন জায়গায় চলে যাচ্ছেন! এটা কি কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ? না কোনো মানবাধিকার রক্ষা? অথবা এটা কোনো ‘জঙ্গিবাদ’? বাইডেন কি নিজেই ভারতকে বগলে নিয়ে এই নয়া ‘জঙ্গিবাদের’ নেতা হতে চলেছেন না?

    কেন ভারতের নাম?
    বাংলাদেশের চীনা প্রকল্প মানে অন্তর্ঘাত, চীনা প্রকৌশলীর অপমৃত্যু! কিংবা ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার!  “সর্ষের মধ্যে ভূত আছে কি না, দেখতে হবে” – বলে বাংলাদেশের সেতুমন্ত্রীর মন্তব্য।’ এসব কিসের আলামত? এটা কী কোনো বাণিজ্যযুদ্ধ না প্রতিযোগিতা? এর মানে বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন ‘কোন ধরনের নেতা’ হতে চলেছেন?

    ETIM-কে মানুষ খুন করতে উৎসাহ বা পথ করতে দেয়া কি একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে মানায়? নাকি এটা দেউলিয়াত্বের লক্ষণ!

    [ উইঘুরে চীনের দায়দায়ীত্বও কম নয়। সেটা সে পালন করেছে তা বলা যাবে না। নুন্যতম প্লুরাজিম বা একাধিক মত অবস্থানের পাশাপাশি থাকার কোন সুযোগ চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এখনও নাই। এটা সবসমস্যার গোড়ার সমস্যা এটা। এমনকি এটাই যেকোন সমাধান না পাবার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। তবে সে প্রসঙ্গ নিয়ে আলা্দা করে লিখতে হবে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৫ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী হলেন?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • হুমায়ূন, রাজনীতি ও ‘মানবিক সম্পর্ক’

    হুমায়ূন, রাজনীতি ও ‘মানবিক সম্পর্ক’

    গৌতম দাস
    Sunday 29 July 2012
    আজ আবার প্রকাশের তারিখ ২১ জুলাই ২০২১

     

    “আমার কাছে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়” – হুমায়ুন আহমেদ

     

    [নতুন নোটঃ এই লেখাটা লেখা হয়েছিল হুমায়ন আহমেদের মৃত্যুর ১০ দিন পরে ২৯ জুলাই ২০১২ সালে। সন্ধ্যায় একটা আলোচনা সভায় আমার বক্তব্যের পরে সেই রাতেই এ’লেখা লিখেছিলাম।  সেটাই এখানে আবার আজ হবহু ছাপানো হল। ফলে এটা সেই ২০১২ সালের মানে নয়বছর আগের লেখা হিসাবে পড়লেই ভাল হবে।]

    হুমায়ূন ‘জনপ্রিয়’। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাটা কিভাবে ব্যাখ্যা করব? জনপ্রিয়তার সুবিধাটা হুমায়ূনের পুঁজি হতে পেরেছে। তাকে নিয়ে বই ও মিডিয়া ব্যবসায়ী ব্যবসা করে গেছে; হুমায়ূনের মৃত্যুর ফলে মৃত হুমায়ূন নিয়েও আরও ব্যবসায়িক ফায়দা তোলার সুযোগ তৈরী হয়েছে। তার জন্য ব্যবসায়ীরা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেটা শুরুও হয়ে গিয়েছে। হুমায়ূন কর্কট বা ক্যান্সার রোগে মারা গেছেন। ক্যান্সারে মারা যাবার কারনে যে মানবিক সহানুভূতি তৈরী হয় সেটাও ব্যবসার কাজে লাগবে। বাজার এইভাবেই কাজ করে।

    আবার এই জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক পুঁজিও বটে।  তরুন ও মধ্যবিত্তের মধ্যে হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা এবং প্রভাবকে অতএব রাজনৈতিক পুঁজি করার  চেষ্টা চলবে তাতেও অবাক হবার কিছ্ব নাই। তার প্রবল চেষ্টা ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এই রাজনীতির দুইটা ধারা আছে। একটা ধারা মুক্তিযুদ্ধ বেচাবিক্রি করে টিকে থাকতে চেষ্টা করেঃ বাঙালী জাতীয়তাবাদীর দলবাজি ধারা। অপরটা সুশীল ধারা। সুশীল রাজনীতিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিশাবেই নিজেদের হাজির করে কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্যেকুলারিজমের পিঠে চড়ার আরাম আছে। এতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তির স্থানীয় বরকন্দাজ হয়ে কাজ করতে সুবিধা। তাছাড়া দলবাজ জাতীয়তাবাদকে দেশের কথা বলতে হয়, জনগণের কাছে দেশের প্রতি আনুগত্য আছে কি নাই তার পরীক্ষা দিতে হয়। সুশীল রাজনীতির সেটা দরকার নাই। তাকে রক্ষা করতে হয় কর্পোরেট স্বার্থ। দেশ নয়, তার কাজ হচ্ছে পরদেশের স্বার্থ হাসিল করা। জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহিতার জায়গা থাকলেও সুশীলদের নাই। হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর খেয়োখেয়ির বাইরে মধ্যবিত্তের উপর যে প্রভাব তৈরি করে আছে তাকে তারা সবসময়ই ব্যবহার করে এসেছে। এখন আরও জোরেসোরেই করবে।  মধ্যবিত্তকে হিলারির গ্লোবাল সুশীল প্রজেক্টের “স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচের” অধীনে এনে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সাথে মিলিয়ে দেওয়া তাদের এখনকার রাজনৈতিক কাজ। নতুন ক্লাস এলায়েন্সে নতুন করে ১/১১ ধরনের রাজনীতির এক কুশন তৈরি করার প্রক্রিয়া জারি রয়েছে। হুমায়ূন তরুনদের কাছে জনপ্রিয়, কিন্তু এটাও ঠিক তাদের জন্য কোন রাজনীতি তৈরী করতে পারে না হূমায়ূন। অর্থাৎ সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র, বর্তমান দুনিয়া, এখনকার সংকট ইত্যাদি কোন বিষয়ে নিবিষ্ট ভাবে ভাববার কোন তাগিদ বা  প্রেরণা হূমায়ূন তৈরী করে না। সাহিত্য ও শিল্পকলাকে এই কাজ করতে হবে সেই দাবি আমরা করছি না। কেন হুমায়ূন সুশীল সমাজের জন্য মূল্যবান সেটা বোঝা দরকার। অন্যদিকে হুমায়ূন মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বাইরে্র কেউ নয়। সুশীলদের জন্য হুমায়ূন খুবই মূল্যবান জিনিস। ফলে তাদের পত্রপত্রিকায় টেলিভিশনে জনপ্রিয়তাকে আরও হাওয়া দিয়ে ফুলিয়ে হুমায়ূনকে অতিমানব করে তোলার অক্লান্ত চেষ্টা থাকবে এটাই স্বাভাবিক।  এই চেষ্টা প্রবল ভাবেই জারি থাকবে, চলে যাবে না। এই দুই ধারার মিলের দিকটা হলো, হুমায়নের জনপ্রিয়তার বিষয়টা তাদের কাছে বুঝাবুঝির চেষ্টা বা  তার কাজ নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার বিষয় নয় বরং হুমায়ূনকে সামনে রেখে মধ্যবিত্ত তরুণদের ওপর প্রভাব জারি রাখার প্রতিযোগিতা করছে তারা। একটি ধারা চাইছে তরুণদের ওপর তাদের দলীয় প্রভাবের বিস্তৃতি ঘটুক, অন্য ধারা চাইছে বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করার ক্ষেত্রে তরুণদের কাছে হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা কাজে লাগুক।


    হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর খেয়োখেয়ির বাইরে মধ্যবিত্তের উপর যে প্রভাব তৈরি করে আছে তাকে  সুশীল সমাজ সবসময়ই ব্যবহার করে এসেছে। এখন আরও জোরেসোরেই করবে।  মধ্যবিত্তকে হিলারির গ্লোবাল সুশীল প্রজেক্টের “স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচের” অধীনে এনে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সাথে মিলিয়ে দেওয়া তাদের এখনকার রাজনৈতিক কাজ। নতুন ক্লাস এলায়েন্সে নতুন করে ১/১১ ধরনের রাজনীতির এক কুশন তৈরি করার প্রক্রিয়া জারি রয়েছে।


    এর বাইরে হুমায়ূনকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করবার একটা করুণ চেষ্টা বিএনপিপন্থীদের মধ্যেও লক্ষ্য করা গেছে। হুমায়ূন বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকার সময় উপকৃত হয়েছেন সন্দেহ নাই। তিনি ‘আগুনের পরশমনি’ ছবিটি বানাতে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রত্যক্ষ আনুকুল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১০ সালে ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করবার যে অভিযোগ মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া তুলেছিলেন হুমায়ূন তাকে আক্ষরিক অর্থে ধরে নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। আর, মৃত্যুর আগে ‘দেয়াল’ উপন্যাস লিখে তিনি দলবাজির যে-কাতারে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেটা বিএনপির বিরুদ্ধে। আমাদের আলোচনার জন্য এইসব প্রাসঙ্গিক নয় বলে এখন সেদিকে সময়ক্ষেপ কবার দরকার নাই।

    বরং প্রশ্ন হচ্ছে, যারা বাংলাদেশে  নিজেদের রাজনীতি সচেতন, প্রগতিশীল বা কমিউনিস্ট মনে করেন তারা হুমায়ূনকে কিভাবে দেখে এসেছেন? হুমায়ূন আহমেদের বিরুদ্ধে এদের অনেক অভিযোগের একটা হচ্ছে তিনি ‘হাল্কা’ লেখেন। এই অভিযোগটা কম করে হলেও ত্রিশ বছরের পুরানো। হুমায়ূন সাহিত্যিক হয়ে উঠবার কালে পুরা আশির দশক জুড়েই এই অভিযোগ চলেছিল। এই অভিযোগকে অন্তত এখনকার মত  পরাজিত বলা যায়। এদের অভিযোগ পাশে ফেলে মাড়িয়ে উপর দিয়ে হেঁটে নিজের সাহিত্যিক-উপন্যাসিক পরিচয়টা তিনি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেকালেই। আমরা মানি না মানি তখন থেকেই তিনি সাহিত্যিক-উপন্যাসিক;এটা ফ্যাক্টস। নব্বই দশকের শুরুতে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এক মেন ষ্টোরি ছিল – শাহরিয়ার কবিরের নেয়া হুমায়ূন আহমেদের এক সুদীর্ঘ সাক্ষাতকার। পরে সেটা আলাদা বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে, বাজারে পাওয়াও যায় বলে জানি। বিচিত্রার  মুল কপি আমি এখন হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু ঐ বইয়ের ভুমিকার প্রথম বাক্যে শাহরিয়ার কবির লিখছেন, “হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হিসাবে সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচ্ছদে এসেছিলেন সাত মাস আগে”। আর শাহরিয়ার এই ভুমিকা লিখে নীচে তারিখ লিখেছেন ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৯২। তার মানে বিচিত্রায় হুমায়ন ঐ প্রচ্ছদ সাক্ষাতকার হয়েছিলেন ১৯৯১ সালের আগষ্টের কোন এক সংখ্যায়। ঐ ভুমিকায় শাহরিয়ারের আরেকটি মন্তব্য-বাক্য হলো, “নিজেকে তিনি অঙ্গিকারবদ্ধ লেখক না বললেও মানুষের প্রতি গভীর মমতা তাঁর যেকোন লেখায় গভীরভাবে প্রকাশিত”। শাহরিয়ারের এই কথন থেকে বুঝা যায় যেসব কমিউনিস্ট আকাঙ্খা থেকে অভিযোগ সে আমলে উঠেছিল তা ততদিনে হুমায়ন আহমেদ পরাস্ত করতে পেরেছিলেন। তাই শাহরিয়ার তাকে “সবচেয়ে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক” মানছেন আর কমিউনিস্ট প্রশ্ন বা বিচারবোধ থেকে তোলা ‘অঙ্গিকারবদ্ধতা” সংক্রান্ত প্রশ্নে একটা ফয়সালা নিজেই করে নিচ্ছেন। বলছেন, হুমায়ূনের লেখায় “মানুষের প্রতি গভীর মমতা” প্রকাশিত। ফলে আমরা বলতে পারি সেকালেই এসব অভিযোগকে হুমায়ূন ঠেলে ফেলে নিজের সাহিত্যিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যদিও তাঁর মৃত্যুর পর অভিযোগটা আবার কোথাও কোথাও উঁকি মারতে দেখা যাচ্ছে।

    সত্তর-আশির দশকে সৈয়দ হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী (অথবা ওপার বাংলার মহাশ্বেতা দেবী) এদের মত উপন্যাসিকদের প্রবল প্রভাব প্রতিপত্তির মধ্যে বাংলাদেশের সাহিত্যের দিন কাটছিল। চিন্তার দিক থেকে এরা সকলেই ছিলেন কমিউনিস্ট ওরিয়েন্টেশনের লেখক। অন্যভাবে বললে, সাহিত্য-উপন্যাস কেমন হবে,কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে একটা পূর্ব নির্ধারিত কাঠামো কাজ করেছে তাদের প্রায় সকল লেখায়।  লেখার অভিমুখ ও গতিমুখ কমিউনিস্ট চিন্তার হেজমনিতে নির্ধারিত ছিল। সাহিত্যিক-উপন্যাসিকদের ঠিক কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য হতে হবে তা না, তবে কমিউনিষ্টদের সাথে ওঠাবসা, বন্ধুত্ব হওয়া  বা সোজাকথায় কমিউনিস্ট চিন্তার প্রভাব পরিমণ্ডলে থেকে চিন্তা করতে শেখা এবং সেই সাথে নিজের সাহিত্যিক গুণ-মন-ক্ষমতাটা কমিউনিষ্ট করে নিতে না পারলে সেকালে সাহিত্যিক-উপন্যাসিক হওয়া, স্বীকৃতি  জুটানো এককথায় অসম্ভব ছিল – ঐ যুগে। এটা শুধু সাহিত্যিক-উপন্যাসিক না, শিল্পের যে কোন ক্রিয়েটিভ জগতের কাজের বেলায় একথা সত্য ছিল। কমিউনিস্ট ওরিয়েন্টেশনের বাইরে থেকে যারাই শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়েছিল তারা কতল হয়ে গেছিল, কেউ নিস্তার পায়নি। এদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে, অভিযোগ তুলে কমিউনিস্টরা তাদের উত্থান রহিত করে দেবার ক্ষমতা রাখত। কমিউনিস্টদের দিক থেকে সবচেয়ে কমন যে অভিযোগগুলো তোলা হত তা ছিল – হাল্কা লেখা, গভীরতা নাই, জীবন ঘনিষ্ঠ নয়, মধ্যবিত্তের লেখক, সোশাল কমিটমেন্ট বা অঙ্গিকার নাই, মানুষকে সংগ্রাম করতে শেখায় না, কোন আদর্শ নাই, চরিত্রগুলো বাস্তব না ইত্যাদি। তো এরকমের এক পরিস্থিতির মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব ঘটেছিল।

    এই যে ছকবাঁধা কিছু পূর্বানুমান মাথায় নিয়ে সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড তাকে আমরা আদৌ ‘কমিউনিস্ট’ বলব কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। মার্কস, এমনকি লেনিনেরও সাহিত্য বিচারের পদ্ধতির সঙ্গে এই ধরনের ছককাটা ধারণার বিবাদ আছে। তবে ‘প্রগতিশীল’ সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হিশাবে বাংলাদেশে কমবেশী যা বদ্ধমূল হয়ে হাজির ছিল তার মধ্যেই হুমায়ূনকে নিজের জায়গা করে নিতে হয়েছে।


    ছকবাঁধা কিছু পূর্বানুমান মাথায় নিয়ে সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড তাকে আমরা আদৌ ‘কমিউনিস্ট’ বলব কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। মার্কস, এমনকি লেনিনেরও সাহিত্য বিচারের পদ্ধতির সঙ্গে এই ধরনের ছককাটা ধারণার বিবাদ আছে। তবে ‘প্রগতিশীল’ সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হিশাবে বাংলাদেশে কমবেশী যা বদ্ধমূল হয়ে হাজির ছিল তার মধ্যেই হুমায়ূনকে নিজের জায়গা করে নিতে হয়েছে।


    অর্থাৎ হমায়ূন এই ছকবাঁধা সাহিত্যের ধারণাকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন। হুমায়ূনের আগে হুমায়ূনের  মত যাদের চিন্তার কমিউনিস্ট ওরিয়েন্টেশন ঘটে নাই, ছিল না, যারা বশ্যতা মানে নাই – তাদের সবাইকে সাহিত্যে গৌণ জ্ঞান করা –সদর্পে তাদের সব সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়া অসম্ভব ছিল না; কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয় নি। ‘নন্দিত নরকে’ হুমায়ূনের প্রথম উপন্যাস হলেও প্রকাশের শুরুতে এটা তেমন খ্যাতি লাভ করে নি। পাঠকদের চোখ পড়ে নি। সাহিত্য আলোচনায় আসেনি। অনেকটা এরকম যে অনেকেই একটা উপন্যাস লিখেছেন, এটাও তেমন।  পরে সেইসব হারিয়ে গেছে বা চাপা পড়ে গেছে, এরও এই দশা ঘটবে – ‘নন্দিত নরক’ উপন্যাস এর বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায় নি।  কিন্তু পর পর কয়েক বছর বইমেলায় হুমায়নের নতুন উপন্যাস আসা বুঝিয়ে দিল, হুমায়ূন লিখতে এসেছেন। বই প্রকাশও আগের চেয়েও আরও চালু ও লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠতে শুরু করে হুমায়ূনের হাত ধরেই।

    ভাল বিক্রি হওয়া বা সাধারণ পাঠকদের মন জয় করাকেই  সাহিত্যের প্রধান গুণ আকারে স্বীকার না করার পেছনে নানান সাহিত্যিক ও নান্দনিক যুক্তি থাকতেই পারে। এমন কি সেটা আদৌ কোন সাহিত্যিক গুণ কিনা তা নিয়েও বিস্তর কথা খরচ হতে পারে। কিন্তু ভাল সাহিত্য মানে বাজার না পাওয়া অর্থাৎ পাঠক না পাওয়া, তার কোন যুক্তি নাই। থাকতেও পারে না। বাজার ব্যবস্থায় বইয়ের বিপণন কিভাবে সাহিত্য ও সাহিত্যিককে বদলায়, কিভাবে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাহিত্যের আঙ্গিক ও মর্মবস্তুর মধ্যে মৌলিক রূপান্তর ঘটায় ও নিরন্তর ঘটাতে থাক্‌ সেই সবের বিচার ও বিশ্লেষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু জনপ্রিয় সাহিত্য  সাহিত্যের মানদণ্ডের বিচারে সর্বদাই নিম্ন মানের হবে এই বদ্ধমূল ধারণার কোন ভিত্তি নাই। জনপ্রিয় লেখা বাজারের মন জুগিয়ে তৈয়ার হয়, ঠিক, কিন্তু বাজার কোন বিমূর্ত ব্যপার নয়। জনপ্রিয় হওয়া মানে একই সঙ্গে ভোক্তা বা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া। পাঠকের কোন না কোন চাহিদা মেটানো, পাঠকের কাছে পৌঁছানো। সে চাহিদা সাহিত্যের নাকি অন্য কিছুর তার বিচারের দরকার আছে। কিন্তু সেটা সাহিত্যের চাহিদা মেটায় না সেটা ঢালাও ভাবে দাবি করা কঠিন।

    পাঠক তৈরীর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে বাজার। কিন্তু সাহিত্য নিজেও নিজের শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে পাঠক তৈরীর প্রক্রিয়া জারি রাখে। বাজার ব্যবস্থার মধ্যে সাহিত্য তার নিজের গুণে কিভাবে পাঠক তৈরী করে এবং ওর মধ্য দিয়ে সাহিত্য কিভাবে নিজের জগৎ তৈরী করতে সফল বা ব্যর্থ হয় সেই সব দিকে নজর রাখা জরুরী।  হুমায়ূন সেই দিকে আমাদের নজর ফেরাতে বাধ্য করে। হুমায়ূনের বই ভাল বিক্রি হওয়ার অর্থ পাঠকদের সঙ্গে হুমায়ূন একটা সম্পর্ক তৈরী করেছে তারই জানান  দেওয়া। সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা সমালোচনা এড়িয়ে সরাসরি পাঠকের সাথে হুমায়ূনের সম্পর্ক ঘটে গিয়েছিল। যখন পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় এই সম্পর্ক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে যায় তখন হুমায়নের বিরুদ্ধে ছক বাঁধা সমালোচনাগুলোও সরব হতে থাকে।এক পর্যায়ে হুমায়ন আর সাহিত্য পাতার সাংবাদিকের সাথে কোন কথা বলা বা সাক্ষাতকার দিতেন না। একেবারে দায়ে পড়ে গেলে তিনি অভিযোগ পাশ কাটানোর জন্য অভিযোগ মেনে নিতেন। যেমন বলতেন, হ্যাঁ, আমি মধ্যবিত্তের লেখক, এই জীবনটাই আমার দেখা জানা আছে, তো আর কি করব সেটাই লিখি – এমন। এইসব প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে মনযোগ দিয়ে নিজেকে লেখায় তুলে ধরা আর পাঠকের সাথে, বিশেষত অল্প পড়া সাহিত্যে নবীন তরুণ পাঠকদের সঙ্গে, সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলা ছিল তাঁর কৌশল বা লড়াইয়ের পথ। হুমায়ূনের উপন্যাসের খ্যাতি,কিম্বা সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা ওরিয়েন্টেশন বাইরে থেকেও গ্রহণযোগ্যতা পাবার ফলে হুমায়ূনের সামাজিক স্বীকৃতি অনেকের জন্যই বিড়ম্বনার কারন হয়ে উঠল। বিশেষত যারা নিজেদের উন্নাসিক নন্দনতত্ত্বের উঁচুতলা থেকে কিম্বা প্রগতিশীল বা কমিউনিস্ট নীতিনৈতিকতা রক্ষার দায়ে হুমায়ূনকে গ্রহন করতে পারছিলেন না । এই দিক থেকে শাহরিয়ার কবিরের সাক্ষাতকারকে এদের পক্ষ থেকে সর্বশেষ কামড় বলতে পারি আমরা। জনপ্রিয় সাহিত্যবিরোধী উঁচু মানের সাহিত্যওয়ালা কিম্বা কমিউনিস্ট নীতিবাদীদের তরফে  শাহরিয়ার কবির ছিলেন অভিযোগকর্তা বা প্রশ্নকর্তা। ঐ সাক্ষাতকারটা বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসের জন্য এই দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট যিনি নিজে চিন্তায় কমিউনিস্ট বা বামপন্থী নন, ওরিয়েন্টেশন তার নাই। সামাজিক স্বীকৃতির জন্য কারও কাছে তাকে আনুগত্য স্বীকার করতে হয় নি। ছক বাঁধা সাহিত্য বিচারের বৃত্ত স্রেফ জনপ্রিয়তা দিয়ে ভেঙ্গে নিজের জন্য সাহিত্যিক হিশাবে সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করে টিকে গিয়েছিলেন।

    মহৎ সাহিত্যের স্বাদ নেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাঠক সমাজ উপযুক্ত কিনা সেই কূটতর্ক করা যেতে পারে। তবে বলে রাখা দরকার প্রগতিশীল সাহিত্য সংক্রান্ত ছকবাঁধা বৃত্ত যে হুমায়ূনই প্রথম ভেঙ্গেছিলেন তা নয়, বরং আরও গভীর অর্থে ভাঙচুর করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। কিন্তু ইলিয়াস চিন্তা চেতনায় তো বটেই, তার সাহিত্য জীবনের শুরু থেকেই বামপন্থীদের কুক্ষিগত হয়ে রয়েছেন, এখনও একটা সামাজিক-রাজনৈতিক বৃত্তের মধ্যে তাকে আটকে রাখার চেষ্টা রয়েছে। তাছাড়া ইলিয়াসের সাহিত্য কর্মের স্বাদ নেবার জন্য পাঠকের একটি সাহিত্যিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার কারনে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও অর্জন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ তরুন পাঠকদের মন ইলিয়াসের পক্ষে জয় করা সম্ভব ছিল না।   তুলনায় হুমায়ূন সম্পর্কে এককথায় বললে বলা যায় হুমায়ূন  রাজনৈতিক নন বা রাজনীতি বুঝনেওয়ালা লোকও হতে যান নি,নিজের কাজের রাজনৈতিক-দার্শনিক তাৎপর্য বোঝাকে তিনি তার দায় বা কর্তব্য হিসাবে নেননি। কেবল উপন্যাসিক বা শিল্পকলার লোক হিসাবেই থাকতে চেয়েছিলেন এবং শেষ অবধি তাই ছিলেন।


    হুমায়ূনের উপন্যাসের খ্যাতি,কিম্বা সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা ওরিয়েন্টেশন বাইরে থেকেও গ্রহণযোগ্যতা পাবার ফলে হুমায়ূনের সামাজিক স্বীকৃতি অনেকের জন্যই বিড়ম্বনার কারন হয়ে উঠল। বিশেষত যারা নিজেদের উন্নাসিক নন্দনতত্ত্বের উঁচুতলা থেকে কিম্বা প্রগতিশীল বা কমিউনিস্ট নীতিনৈতিকতা রক্ষার দায়ে হুমায়ূনকে গ্রহন করতে পারছিলেন না । এই দিক থেকে শাহরিয়ার কবিরের সাক্ষাতকারকে এদের পক্ষ থেকে সর্বশেষ কামড় বলতে পারি আমরা। জনপ্রিয় সাহিত্যবিরোধী উঁচু মানের সাহিত্যওয়ালা কিম্বা কমিউনিস্ট নীতিবাদীদের তরফে  শাহরিয়ার কবির ছিলেন অভিযোগকর্তা বা প্রশ্নকর্তা।


    দার্শনিক-রাজনৈতিক বিষয়াবিষয়ের প্রতি হুমায়ূনের  মনোভাব বোঝার জন্য সম্প্রতি প্রকাশিত তার এক পুরানা এক সাক্ষাতকার বা কথোপকথনের আশ্রয় নেব।  প্রকাশিত এই লেখা থেকে আমরা জেনেছি গত বছর ২২ মে ২০১১ এটা নেয়া হয়েছে, http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-07-27/news/277119 । সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে আনছি,

    প্রশ্ন: লাতিন আমেরিকার মতো ভাবা যায়? লাতিন আমেরিকার লেখকেরা একটা চরিত্র খাড়া করে প্রতীকী উপস্থাপনের দিকে চলে যান। মানে, সরাসরি কথাটা না বলে, রূপকের মধ্য দিয়ে বলা। যেমন, মার্কেস লিখেছেন অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক। মানে, ওই সময়টাকে ঠিকই ধরেছেন উনি। কিন্তু চরিত্রগুলো তাঁর মতো করে বদলে নিচ্ছেন। আপনার হাত দিয়ে এ ধরনের একটা কাজ কি হতে পারত না?

    হুমায়ূন: হ্যাঁ, নানাভাবেই ভাবা যায়। কিন্তু এতে যথার্থতার একটা সমস্যা থেকে যায়। যিনি যখনই কিছু বলছেন বা লিখছেন, তাঁর রাজনৈতিক পছন্দের বাইরে সাধারণত যেতে পারেন না। মার্কেসও পারেননি।

    হুমায়ুনের মুখ্য বক্তব্য আমি বোল্ড করেছি। সার কথা হলো, হুমায়ূন কোন একটা দার্শনিক-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সেই রাজনৈতিক পছন্দের পক্ষে কলম নিয়ে বসতে চান না। এটাকে তিনি লেখকের জন্য সমস্যা মনে করেন। অনেকের মনে হতে পারে এটা তার এন্টি-পলিটিক্যাল বা এপলিটিক্যাল অবস্থান। আমার মনে হয় আমরা এটা ভিন্ন দিক থেকে দেখতে পারি। সেকাজে পরের প্রশ্নোত্তরে যাই।

    প্রশ্ন: আপনার রাজনীতির ব্যাপারে অনাগ্রহ, রাজনৈতিক লেখালেখিতে খুব সরব না, এর কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?
    হুমায়ূন: আসলে, আমার দেখা প্রথম মানুষ তো আমার বাবা। উনি ইত্তেফাক-এর নাম দিছিলেন মিথ্যা-ফাঁক।
    প্রশ্ন: আপনার ওপর বাবার যতটা প্রভাব, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর কিন্তু প্রভাব ততটা না।
    হুমায়ূন: সে তো বাবাকে কম দিন দেখেছে, এটা একটা কারণ হতে পারে। তবে আমার কাছে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়।

    এই কথোপকথনে প্রশ্নকর্তা এবং সেই সুত্রে হুমায়ন নিজে রাজনীতি বলতে দলীয় রাজনীতি বুঝেছেন।  সাহিত্যের পিছনে বা আড়ালে, সাহিত্যিকের সচেতনে অথবা অসচেতনে জীবন-জগতের যে রাজনৈতিক অর্থ, অবস্থান বুঝাবুঝি থাকে –  বা জীবন মাত্রই যে কারণে রাজনৈতিক এই কথোপকথনে তার কোন উপলব্ধি নাই। ইত্তেফাক বিষয়ক আলাপটা পুরাপুরি অরাজনৈতিক এবং বিপজ্জনক।  তবে  নজর দিতে বলব আমার করা বোল্ড অংশটাতে। এখানে হুমায়ূনের কাছে রাজনীতির এন্টিথিসিস হলো মানবিক সম্পর্ক। তিনি কোন দার্শনিক-রাজনৈতিক তত্ত্ব থেকে যাত্রা শুরু করে সাহিত্যে তা ট্রান্সলেট করতেও চান না, বাস্তবে তা পরখ করতেও চাইছেন না।  বরং লেখক হিশাবে মানুষ ও মানুষের নানান সম্পর্ক দেখবার প্রখর ক্ষমতা ব্যবহার তার লেখার বিষয় বানাতে চান। তিনি যেভাবে দেখছেন সেখান থেকে  কোন রাজনীতি তৈরী হবে কিনা,  ওর মধ্য দিয়ে কোন তত্ত্ব দাঁড়াবে কিনা সেই সব বিষয়ে তাঁর কোন মাথাব্যাথা নাই। তিনি তার মতো করে দেখছেন, দেখে যেতে চাইছেন। কী দেখলেন বা কিভাবে দেখলেন সেটা পাঠকের ওপর ছেড়ে দেবার তিনি পক্ষপাতী। তার এই রাজনৈতিক নির্লিপ্ততাকে রাজনীতি বিরোধী বলা যাবে কিনা সেটা তর্ক সাপেক্ষ, তবে  মানবিক সম্পর্ক যেহেতু তার অনুসন্ধানের বিষয় বিষয়, তাই মানুষের মন তার লেখার বিষয় হয়ে উঠেছে।

    বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও অর্জনের বিচারে হুমায়ূন কোথায় স্থান পাবেন সেটা বিচার করবার আলোচনা এটা নয়। এই বিষয়ে এতো তাড়াতাড়ি কিছু বলা সমীচিন নয়। হুমায়ূন আমাদের সহজ সরল ভাবে গল্প বলতে চেয়েছেন, যাতে গল্পগুলো আমাদের মনে দাগ কাটে। যেন আমাদের ভাল লাগে এবং  হুমায়ূনের মুখে আরও গল্প শুনতে আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও অর্জনের দিক থেকে তার গল্প বলার বিষয় ও ধরণ নতুন কোন সাহিত্যিক ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়েছে কিনা সেটা বিচারের সময় এখনও আসে নি। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক ঘটনা, যাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে আমাদের নিজেদেরকেই হয়তো আমরা নতুন ভাবে চিনতে পারব। অতএব তাকে আরও ঘনিষ্ট ভাবে ও মনোযোগের সঙ্গে বোঝা ও ব্যাখ্যার দরকার আছে। তাঁর জনপ্রিয়তার কথা বলতে গিয়ে নাক উঁচু করে রাখা সাহিত্যক উন্নাসিকতার চর্চা ভুল হবে। হুমায়ুন সমাজের স্বতঃস্ফুর্ত চিন্তা হয়েই থাকতে চেয়েছেন। বলছেন, “লেখাটা কীভাবে তৈরি হয় আমি সেটার ব্যাখা করতে পারবো না। তৈরি হবার পদ্ধতিটি আমি নিজেও পরিষ্কারভাবে জানি না” [ভোরের কাগজ সাজ্জাদ শরীফ ও ব্রাত্য রাইসুর সাথে কথোপকথন, মার্চ ১৯৯৪]।  সেই প্রক্রিয়াটা হুমায়নকে বুঝতে গয়ে আমরা ঠিকমত বুঝতে পারছি কিনা সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

    হুমায়ূন তাঁর লেখার সাবজেক্ট-ম্যাটার বা ফোকাস হিসাবে হাজির করেছেন মানুষের মন। ফলে গল্প বলার ধরণটাও আলাদা এবং নতুন। ছক বাঁধা কমিউনিস্ট চিন্তা কাঠামো যেখানে “শ্রেণী সংগ্রাম”কে লেখার সাবজেক্ট ম্যাটার করতে নির্দেশ করে সেখানে হুমায়ুন হাজির হচ্ছেন মানুষের মন নিয়ে। রাজনীতির বিপরীতে নিজস্ব অস্বস্তির তাড়ায় হুমায়ূন ‘মানবিক সম্পর্ক” তালাশ করে ফিরেছেন, তার গল্প লিখছেন। “শ্রেণী সংগ্রাম” এর সাহিত্য করতে গিয়ে এক আদর্শবাদী নায়ক কে কেন্দ্র করে গল্পের বাদ বাকি চরিত্র সাজাতেই হয়; আর ভিলেন সহ সেসব চরিত্রের ততটুকুই ভুমিকা থাকে ঠিক যতটুকু বা যেভাবে হলে আদর্শ নায়ক চরিত্র ফুটিয়ে তুলে ধরতে দরকার। আর এতে গল্প বলার একটা একঘেয়ে প্যাটার্ন তৈরি হয়ে যায়। এভাবে গল্প লেখার আরও নানান সমস্যা আছে; যেমন, বাস্তব রক্ত-মাংসের মানুষ তো বাস্তবই, আদর্শের বিপরীতে সে দোষেগুণে মানুষ। “শ্রেণী সংগ্রাম” এর সাহিত্য এমন হয় যে সে নায়ক না, একেবারে বিপ্লবী নায়ক হয়ে ওঠে। উপরে আবার ন্যাংটা করে শ্রেণীদ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক সংগ্রাম ইত্যাদি দেখাতে হয়।


    হুমায়ূন তাঁর লেখার সাবজেক্ট-ম্যাটার বা ফোকাস হিসাবে হাজির করেছেন মানুষের মন। ফলে গল্প বলার ধরণটাও আলাদা এবং নতুন। ছক বাঁধা কমিউনিস্ট চিন্তা কাঠামো যেখানে “শ্রেণী সংগ্রাম”কে লেখার সাবজেক্ট ম্যাটার করতে নির্দেশ করে সেখানে হুমায়ুন হাজির হচ্ছেন মানুষের মন নিয়ে। রাজনীতির বিপরীতে নিজস্ব অস্বস্তির তাড়ায় হুমায়ূন ‘মানবিক সম্পর্ক” তালাশ করে ফিরেছেন, তার গল্প লিখছেন।


    কিন্তু বাস্তব জীবন দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় আর  শ্রেণী সংগ্রাম  নানান পর্দার আড়ালের নিচে থাকে, ঘটে চলে। বাইরে থেকে দেখলে যাকে জীবনের দৈনন্দিন আটপৌরে ঘটনা মনে হয়। তবে যে দেখতে জানে সে সাত পরতের পর্দার আড়ালের শ্রেণী সংগ্রামের দিকটাও বুঝতে পারে। বাস্তব জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেশির ভাগ সময়েই ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রামের মত সরল সোজাসাপ্টা নয় বরং জটিল। এমনকি তা দুটো ন্যায়বোধের লড়াই হতে পারে, দুটো ভ্যলু বা মুল্যবোধের লড়াই হতে পারে যেটাকে ছকে বাঁধা শ্রেণী সংগ্রাম হিসাবে দেখানোর কোন মানে হয় না। আবার গরীব মানুষ মানেই সৎ নয়, বা তাকেই নায়ক বানাতে হবে এমন কোন মানে নাই। মানুষের লোভ, হিংসা, শঠতা উদারতা এইসব দোষ বা গুণ আছে। এমনকি আবার মানবিক মানুষ হবার আকুতি, প্রেমের আকুতি সবই থাকে। এবং শ্রেণী নির্বিশেষেই তা থাকে।  মানুষের জীবন যত জটিল একে সরল ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রামের মত করে রিডিউস করে হাজির করা যায় না। করা হলে বরং এক মেকি ক্যাম্পেইন ম্যাসেজ তৈরি করে। অন্যদিকে, মানুষের মন যদি সাহিত্যের বিষয় হয়  তবে  সেই সাহিত্যে মানুষের, সব শ্রেণীর মানুষেরই — দোষগুণ ভালমন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া তাতে ধরা পড়বার কথা। সবই সেখানে ধরা পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা প্রতিটা চরিত্রের মন নিজেই এক গুরুত্বপুর্ণ চরিত্রের মধ্যস্থতায় হাজির হতে পারে। প্রতিটা ধরণের মানুষকে নিয়েই বাস্তবে  নাড়াচাড়া করা যায়। এতে গল্প বলার ধরণ বদলে যায়। যেভাবেই গল্প বলা হোক তা পরিচিত বাস্তব জীবন মনে হয়। আবার ব্যাকগ্রাউন্ডে বাস্তব জীবনের দ্বন্দ্ব সংঘাতও ছায়া হয়ে লুকিয়ে থাকে। মানবিক সম্পর্কের তালাশে থাকার কারণ মানবিক সমাজের একটা আকুতি লক্ষ্য হিসাবে না চাইতেও থেকে যায়। পাঠক দর্শকের সাথে সহজেই একটা কমিউনিকেশন তৈরি করে ফেলে। আমার বিচারে হুমায়ুনের মানবিক সম্পর্কের তালাশ বা মানুষের মনের খবরের কারবারি হওয়া এই দিকটাই সম্ভবত তার জনপ্রিয় হবার কারণ। ইতিহাস মাত্রই যদি শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস হয়ে থাকে তবে মধ্যবিত্তের সুখ দুঃখের ভালমন্দের মনের কাহিনী যেভাবেই লেখা হোক না কেন তার ভিতরেও শ্রেণী সংগ্রাম লুকিয়ে থাকারই কথা। হুমায়ুন আহমেদ চাইলেও তো তা বাদ দিয়ে কিছু লেখা সম্ভব না। তবে এটা অভিযোগ হতে পারে যে সেটা খোলে আম সরল ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রামের মত না। সেক্ষেত্রে একথার জবাব দিতে হবে, রক্ত-মাংসের বাস্তব জীবনের সবকিছুকে সরল ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম হিসাবে রিডিউস করা সম্ভব কি না? আবার সম্ভব হলেও তা করা জরুরি কি না? সেই পুরানা তর্কে আমাদের ফিরে যেতে হবে যে শ্রেণি সংগ্রাম ধারণ করা সাহিত্য বুঝতে কি আমরা রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র বুঝব?  যদি আমরা তা না চাই সেক্ষেত্রে  ‘আমার কাছে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয় ‘ হুমায়ূনের এই বক্তব্য আমাদের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। এটা আমাদের মানতে হবে।

    সবমিলিয়ে বলা যায় সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে একটা ছক বাঁধা প্রত্যাশা আমাদের উপর চেপে বসে আছে। এটা আমাদের সাহিত্যের এক বিশেষ বিচার ধারা তৈরি করেছে। যার কারনে শুধু হুমায়ূনই নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের আরেক সাম্প্রতিক দিকপাল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বুঝতেও বাধা তৈরি হয়ে আছে। আমার দাবি হুমায়ূন এই ছক বাঁধা চিন্তা থেকে আমাদের মুক্ত করতে কাজে আসবে। এই সমাজেই হুমায়ুনের সাহিত্যিক আবির্ভাব। এই সোশাল ফেনোমেনা কে যদি আমরা বুঝতে চাই তবে আমাদের সাহিত্য আকাঙ্খা ও সাহিত্যের  বিচারবোধ কী সমস্যা তৈরি করে তা আমরা খানিক বুঝতে পারব।

    হুমায়ুন আহমেদ এর জীবনের শেষ ১৫-২০ বছরের দিকে কিছু আলোকপাত করে শেষ করব। হুমায়ূন কি তার শেষ জীবনে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়  করে রাখতে পেরেছিলেন? এর সোজা জবাব, না, পারেননি একেবারেই না। নিজের কথায় তিনি অটল থাকতে পারেননি। এমনকি ২০১১ সালেও যখন তিনি একথা বলছেন তখনও না। কথাটাকে বোধহয় এভাবে বলা যায়, আমাদের কেউ কেউ তাঁর জীবনের শেষ ১৫-২০ বছরে তাকে সেভাবে থাকতে দেইনি। লোভ দেখিয়েছি। তিনি লোভে পড়েছেন। যারা এককালে হুমায়ূনের  খ্যাতি,সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা চিন্তার বাইরে বসবাসের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, শাসনের আঙ্গুল দেখিয়েছেন তাদেরই এক অংশ তাঁর জীবনের শেষ ১৫-২০ বছরে তাঁকে “বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের” নির্মাতা হিসাবে পেতে পরিবেশ আবহের চাপে ও লোভে তাকে প্রলুব্ধ করেছে। মানেটা দাঁড়িয়েছে এক সময় হুমায়ূন রাজনৈতিক নন এই ছিল মুল অভিযোগ। আবার সেই হুমায়ূনকেই  এযুগের “বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের” রাজনীতিতে তাঁকে খতনা দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা হতে দেখছি। এই ক্ষেত্রে প্রথম আলো আর চ্যানেল আইয়ের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এবার কিন্তু হুমায়ূন  উল্টা মানবিক সম্পর্কের চেয়ে এই রাজনীতি বেশি উপভোগ করছেন।  ততই আশির দশকের হুমায়ূন আহমেদ আর তিনি নন। নিজেই নিজেকে ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তাতে সব রক্ষা হয় নাই। উপন্যাসিক হুমায়ূন এই রাজনীতির ধামাধরা হতে গিয়ে দলবাজির সর্বস্বতার পড়ে তার এই সময়ের লেখালিখিতে নিজের সব শিল্পগুণ ও বিশেষত্ব খুইয়েছেন। শেষ উপন্যাস “দেয়াল’ লিখতে গিয়ে বুঝেছেন কি না জানি না, কিন্তু ঘটনা তাই ঘটেছে। তিনি বুঝতেই পারেননি যে “বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের” দলবাজরা তাদের বয়ানে তাকে উপন্যাস লেখানোর জন্য কোর্টকাচারি পর্যন্ত করবে। তারা কেবল তাকে হাতকড়া পড়ায়নি, জেলের ভাত খাওয়ায় নি। তার ‘দেয়াল’ উপন্যাস আজও প্রকাশিত হয়নি। আর তিনি মরবার আগে অসুস্থ অবস্থায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনোযোগ সহকারে কোর্টের পেপারবুক পড়েছেন, আর এর তারিফ করেছেন। বলা যায়, এই শেষ ১৫-২০ বছর এক ডিজেনারেটেড হুমায়ূন আহমেদকে দেখে আমরা ভীত হয়েছিলাম। আর এর শেষ পরিণতি — আদালতের হুকুমেই উপন্যাসিক হুমায়ূনের যা অবশিষ্ট ছিল তার মৃত্যু ঘটেছে, বলা যায়। এই শেষাবশেষের তিরোধানের মধ্য দিয়ে তাঁর সত্যিকারের অবদান নিয়ে ভাববার সুযোগ তৈরী করে গিয়েছেন তিনি। তাকে নিয়ে আবেগ, উচ্ছ্বাস ও দলবাজির আড়ম্বর কমলে সেই কাজ শুরু হবে, আশা করা যায়।

    [এই লেখাটা  গত ২৯ জুলাই  ২০১২ সালে,  ‘চিন্তা’  – এই ওয়েব পত্রিকায়  এই একই নামে  হুমায়ূন, রাজনীতি ও ‘মানবিক সম্পর্ক’    এই শিরোনামেই  ছাপা হয়েছিল।
    আজ এখানে কোন পরিবর্তন ছাড়াই আবার তা এখানে ছাপা হল।  ]

     

  • চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    গৌতম দাস

    ১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3E6

    …a bilateral meeting in the Uzbek capital of Tashkent on the sideline. PICTURE SOURCE

    [সার সংক্ষেপঃ  দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে এক “ও-সার্কেল” তৈরি করে এবার সম্ভবত ঘিরে বসতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে চীন। আর একাজে পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে চীন সবচেয়ে কাছে পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে।  আর এর প্রতিক্রিয়ায়, গ্লোবাল  সম্ভাব্য ঘটনার কেন্দ্র ‘সাউথ চায়না সি’ নয়, বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠার সম্ভাবনা বেড়ে গেল!   এতে আমাদের আঙিনা কী যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠবে?  সেটা যাই হোক, ঘটনা যুদ্ধের দিকে যদি যায়ও সেই সম্ভাব্য যুদ্ধ হতে পারে  – ১। যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে কারো পলায়ন, ২। বলল যুদ্ধ করবে কিন্তু পৌছে গেল সবচেয়ে বড় এক আপোষে এমন হতে পারে ৩। অথবা বোকার মত যুদ্ধ কী তা বুঝাবুঝির আগেই সত্যিকার যুদ্ধ লাগিয়ে ফেলল। ৪। যুদ্ধের প্রশ্নে বাইডেন নিজেকে  ট্রাম্পের চেয়েও  যেন  নাদান প্রমাণ করতেই চাইছে।  হয়ত সেকারণেই  জাপান বাইডেনকে  ভুলপাঠ করেই পা ফেলছে। এভাবেই “বোকার যুদ্ধটা” অপ্রস্তুতে হঠাত শুরু হয়ে যেতেও পারে।
    আমার এই কথাগুলো বুঝবার সবচেয়ে ভাল তুল্য আর প্রতীকী ইঙ্গিত হল  – টিকা! মানে আগামি মাসের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নুন্যতম দুই কোটি টিকার সংগ্রহ পেতে যাচ্ছে সেদিকে তাকালেই বুঝা যাবে!]

    তাসখন্দ থেকে ঘটনা শুরু হচ্ছে কেনঃ
    মধ্য এশিয়ায় দেশ উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ। এই তাসখন্দে গত ১৫-১৬ জুলাই এক বিশাল সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সম্মেলনের নেপথ্যে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সামনে তাসখন্দ; যারা চেয়েছিল এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরিবর্তনকে সামনে রেখে একটা আঞ্চলিক সম্মেলন। ‘মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া : আঞ্চলিক যোগাযোগ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন গত বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে, এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আর বাংলাদেশ, ভারত, রাশিয়া ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আর ইইউ প্রতিনিধি মিলিয়ে [According to EURACTIV, the EU foreign affairs chief Josep Borrell will lead a strong delegation.] প্রায় ৪০ দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়ে ছিলেন। আমেরিকার নিচু লেভেলের প্রতিনিধিও এতে উপস্থিত ছিলেন [US representatives at a lower level]। কিন্তু মিটিংয়ের আসল গুরুত্ব অন্তত আমাদের দিক থেকে তা সরে যায় অন্য দিকে –  তাসখন্দ-এর মূল বৈঠক ফেলে ওর সাইডলাইন বৈঠকে।

    কিন্তু  মূল বৈঠক নয়, সাইড লাইনের আলাপই যেন মুখ্যঃ
    কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে দেশের মিডিয়ায় যা হেডলাইন সে দিক তাকিয়ে যদি বলি তা হল – ঐ সম্মেলনের সাইড লাইনে ছিল আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে একই দিনে বৈঠকের খবর। যেমন কেউ শিরোনাম করেছেন,  “একই দিনে ভারত-চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে মোমেন”।
    সাইড লাইনের আলাপই মুখ্য – এমন হওয়ার পেছনে অন্য কারণও ছিল। যেমন, কয়েক দিন ধরে দেশে আরেকটা খবর খুব আলোচ্য হয়ে উঠেছিল। বাংলা ভয়েজ অফ আমেরিকায় ছাপানো এক রিপোর্ট  – “বিকল্প সার্ক গঠন করতে উৎসাহী চীন” অথবা টাইমস অব ইন্ডিয়ার তাদের ঈর্ষায় চোখ টাটানো ও আক্ষেপ করা নিউজ : “চীনা-সাউথ এশিয়ান টিকা কূটনীতির জোটের পরে চীন এখন  দারিদ্র্য দূরীকরণের ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ আনতে চায় [After vaxplomacy in Indian neighborhood, China now brings in development Centre]”। উপরের এ’দুই রিপোর্টে এরা আকার-ইঙ্গিতে বলেছে যে, চীনের নেতৃত্বে ভারতকে বাদ রেখে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানকে নিয়ে এ’জোট [এক ছয় দেশীয় জোট] হতে যাচ্ছে, যাকে কেউ এটাকে চীনের “উন্নয়ন সেন্টার” গঠন করা বলছেন।

    কোন বাণিজ্য জোট সফল হবার কিছু সুত্রঃ 
    এমনিতে বিভিন্ন সময় দুনিয়াতে নানান আঞ্চলিক জোট গঠন হতে আমরা দেখে থাকি। সেসবের মধ্যে বাস্তবে খুবই সক্রিয় ও সচল হতে দেখা যায় অল্প কিছু উদ্যোগকেই; বিশেষ করে যেখানে কিছু গঠন-শর্ত মেনে চলা হয়। যেমন জোটে একটা বড় অর্থনীতির দেশ, সাথে অন্যান্যদেরকে যার একটা ভালই বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা থাকে – অন্তত এমন একটা দেশ থাকতে হয়। আর আগাম মেনে নিতে হয় যে,  সদস্য দেশগুলো এ’জোটে যোগ দিবে তখনই, যখন ছোট-বড় সদস্য  প্রত্যেকেরই বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটি খেয়াল রেখে তা সাজানো হবে। আর এমনটা বাস্তব করতে পারার কমন ফর্মুলা হল – বড় অর্থনীতির দেশ বলতে ধরা যাক চীন, যার অন্যকে শেয়ার দেয়ার মতো নিজের বড় বাজার (জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি) আছে আর সাথে আছে অন্যকে বিপুল বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা; অবকাঠামো আর ‘ডাইরেক্ট বিদেশী [FDI] শিল্প বিনিয়োগ’- দু’টাই। ফলে শুরুতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছোট অর্থনীতির সদস্য দেশগুলো মুখ্যত চীনে রফতানির সুযোগ পাবে, সাথে চীনা বিনিয়োগও পাবে। এতে পরের দিকে ক্রমেই হাই-এন্ড বা হাইটেকের পণ্য চীন থেকে আমদানি আর লো-এন্ড বা লো-টেক পণ্য চীনে রফতানি এই ভিত্তিতে ওই জোটের মধ্যে খুবই সক্রিয় একটি উভয়মুখী বাণিজ্য চালু হতে দেখা যেতে পারে।

    এসব পরিকল্পনামাফিক চললে, মূলকথা- সবারই এতে কিছু লাভের দিক থাকতে হবে, যে দিকটা গুরুত্বপুর্ণভাবে খেয়াল রাখতে হবে; মানে সুযোগ পেলে অল্পতেই অন্যের বিরুদ্ধে ‘লোভী’ হয়ে ওঠা যাবে না; লং টার্ম ভাবতে হবে। চীনারা এটাকেই “উইন-উইন” সিচুয়েশন বলে বুঝায়ে থাকে। আর তা হলেই এটা মূলত এক গ্লোবাল বাণিজ্যের আঞ্চলিক রূপ বা ভার্সন হয়ে উঠতে পারে। ফলে এখানে অন্যকে বাজার যেমন ছাড়তে হবে, তেমনি আবার অন্যের বাজারে ঢোকার সুযোগও নেয়া যাবে। এককথায় সবাইকেই নিজ নিজ বাজার অন্যের সাথে শেয়ার করতে রেডি থাকতে হবে। তাই নিয়মিত নিজেদের মধ্যে  প্রচুর কথা বলতে হবে, বলার ব্যবস্থা রাখতে হবে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতার নানান টেকনিক্যাল কমিটি ও উপযুক্ত প্রফেশনাল লোকজন থাকতে হবে, যাতে সদস্য-দেশ দুইয়ের পরস্পরের সংঘাতপুর্ণ স্বার্থ উদয় হলে এর  সুবিধা-অসুবিধার সমাধান করে দেয়ার রাস্তা বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কোনোভাবে কোথাও একপক্ষীয় লাভের কথা ভেবে থাকলে এমন জোট দাঁড়াবেই না। আর বলাবাহুল্য, “জাতিবাদী রক্ষণশীল” অর্থনীতির কোনো দেশ এর সদস্য থাকতে পারবে না।  মনে রাখতে হবে  জাতিবাদী অর্থনীতি আর (আঞ্চলিক বা গ্লোবাল) বাণিজ্য জোটের ধারণা পরস্পরবিরোধী।  মানে “আমার দেশ যা যা পণ্য ভোগ-ব্যবহার করে এমন সব ভোগ্যপণ্য আমি নিজেই উৎপাদন করে নিব” অথবা “বিদেশী পণ্য হারাম” ধরনের জাতবাদী চিন্তা এখানে মনের গোপনে পুষে রাখাও নিষিদ্ধ। বরং বাজার দিব আর বাজার নিব এটাই হবে এর নীতি।

    গ্লোবাল বা আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে জাতিবাদি অর্থনীতি অচলঃ
    ভারত অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী এমন পুরনো চিন্তার এক কট্টর জাতিবাদী দেশ। জাতিবাদ মানে যেমন হিন্দুত্ববাদ দিয়ে রাজনীতি করা খুব  আরামের।  এতে মানুষের সেন্টিমেন্ট আবেগকে কচলিয়ে উন্মত্ত করে তার ভোটটা নিজের বাক্সে ঢুকানো যায় বলে  জাতিবাদ ক্ষতিকর তা বুঝলেও কেউ ছাড়তে চায় না। হিন্দুত্ববাদ ধরনের সব  ধর্মীয় জাতিবাদের এত ছড়াছড়ি একারণে।  আসলে একারণেই  সব জাতিবাদী চিন্তাই বলতে চায়, “আমি কোনো বাণিজ্য জোটে বিশ্বাসী নই”। কিন্তু আবার ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারও বেশ বড় (১৩০ কোটির), তাই ভারত নিজের এই ১৩০ কোটির বাজারের লোভ দেখিয়ে সে কোন বাণিজ্য জোটের ভিতর দামি ও আকর্ষণীয় সদস্য হয়ে ঢুকতে চেয়ে থাকে। আর ভেতরে ঢুকে সে চেষ্টা করতে থাকে কেবল অন্যদের থেকে বাজার সুবিধা নিয়ে চলবে – এই হল ভারতের আদিম খাসলত। এ’কারণে ভারত যে জোটে থাকে সে জোট ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হবেই। এর বিপরীতে এখনকার চীন বিকশিত বলে এর অন্যকে দেয়ার মতো সুবিধা ও সক্ষমতা বেশি।  কিন্তু সাবধান, এটাকে চীন ভাল আর ভারত খারাপ  বলে চালায় দেয়া বিরাট ভুল হবে।  এমনকি  চীনের উদারতা বলে বুঝাও ভুল হবে, বরং এটা চীনের অর্থনীতির শক্তি ও সক্ষমতা  এখন হয়েছে তাই সে দিতে পারে – এভাবে অবজেকটিভ ভাবে বুঝতে হবে। কালকে চীন এমন নাও থাকতে পারে। চীন মানেই সে ভাল দেশ – এটা খুবই ভিত্তিহীন ও ভুল পদ্ধতির চিন্তা।  চীনের অর্থনীতির উত্থানটা এখন এই লেভেলে উঠেছে যে ওর পক্ষে এখন অন্য পার্টনারদের দিকেও তাকালেই সেটাই হবে চীনের সমৃদ্ধির সঠিক পথ। তাই সে অবলীলায় আমাদের মত দেশকে বাজার ছাড় দিতে পারে, বিনিয়োগও দিতে পারে।

    এছাড়া আরেক নতুন আইডিয়া, ভ্যালু-অ্যাডিশন শেয়ার প্রডাক্টও – মানে জোটের সব সদস্যই একটা পণ্য উতপাদনে কিছু না কিছু শ্রম জোগাবে – এমন শেয়ার করা ভ্যালু বা শ্রমে উৎপাদিত পণ্য- এমন উৎপাদন সম্পর্কও চালু করতে চীন সক্ষম। আর চীনের সে অফারের সুবিধা নিয়ে সবাই বাজারে প্রবেশ করতে চাইলে তাতে চীনসহ সবারই লাভ বলে তা দিতে আগ্রহী হয়। RECP  সে ধরণের এক জোট।

    টাইমস অব ইন্ডিয়া তার রিপোর্টে – চীনের বর্তমান এই  ছয়-দেশীয় জোট বা ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ গঠনের ব্যাপারটাকে  মুখস্তের মত পাল্টা  – ‘ভারতের সবই ভাল বা আমরাই শ্রেষ্ঠ বা আমরা বিরাট কিছু’- টাইপের মন্তব্য ঢুকিয়েছে তাদের রিপোর্টে। যেমন সে লিখেছে “এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য [to challenge ‘Indian dominance’ in the region] আছে”। চীন সেটা নষ্ট করতেই এ’কাজে এসেছে। এ’ছাড়া আরো বলেছে, ভারত এই ছয় দেশের সবার সাথে আগে থেকেই ‘টপ উন্নয়ন পার্টনার হয়েই আছে’ [However, India remains top development partner for Bangladesh, Bhutan, Nepal and Sri Lanka and has extended grants and soft loans for various projects……] ফলে ভারত তাদেরকে ‘বিপুল অনুদান’ তো বটেই সাথে অবকাঠামো ‘সফট লোনও’ নাকি দিয়ে থাকে।  তা থাক। আসলে এরা এমনই স্বপ্নের পোলাও খাওয়া লোক, এরা খেতে থাকুক অসুবিধা কী!

    কিন্তু বাস্তবত ভারতের না নিজ বাজার ছাড় দেয়ার সক্ষমতা আছে, না পার্টনারদেরকে অবকাঠামো ঋণ বা বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা। বরং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারত আমেরিকার কোলে চড়ে বসে ওয়্যার অন টেররের উছিলায় আর সর্বোপরি, আমেরিকার ‘চায়না ঠেকানো’ ঠিকা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। কব্জায় নিয়েছে। আমেরিকা  ১/১১ এ আমাদেরকে দখলে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল, তাই। এটা ভারতের নিজের কোন ক্রেডিট নয়, তার অর্থনীতির কোন উন্নতি বা সক্ষমতা বেড়ে যাবার কারণে ভারত আমাদেরকে এমন কব্জায় নিতে পারে নাই। আর এই সুযোগে সে বিনা পয়সায় বাংলাদেশ থেকে সমস্ত করিডোর  সুবিধা নিয়ে তা ভোগ করা শুরু করেছে। ‘সমস্ত করিডোর’ বলতে মাটির নিচে পাইপ লাইনে, মাটির উপরে সড়কপথে, আকাশে ও পানিপথ ও বন্দরে, সব কিছুতে এবং তা বিনা পয়সায়। এই হলো বাস্তবতা।

    তবে এবারের এক কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’য়ে সে যে কী পরিমাণে অক্ষম ও উদাম, তা  একেবারে উন্মোচিত হয়ে গেছে। নিজ মানুষদের সবার জন্য টিকা উৎপাদন ক্ষমতাই যার নাই, বা টিকা কিনবার অর্থের সংস্থান ক্ষমতা নেই, সে বাংলাদেশেসহ সারা দক্ষিণ এশিয়ায় টিকা সরবরাহকারী টিকা কূটনীতিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আর নিজের  সক্ষম দাবি করে এসেছে। আর এখন খোদ আমেরিকার কাছে ভিক্ষার  হাত পেতেছে।  গত দুমাসেই জয়শঙ্করের প্রায় সপ্তাহবাপী আমেরিকার সফর থেকে নিট লাভালাভ হল – ভিক্ষা অনুদানে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের ফ্রি টিকা ও স্বাস্থ্য উপকরণ লাভ করেছে ভারত।

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার বাংলাদেশবিরোধী রিপোর্ট নিয়মিত লিখে চলেছেন এর রিপোর্টার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি নাকি ওই পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর, এটা তার দাবি। যদিও তার লেখার কোয়ালিটি তা বলে না। যা হোক, এর আগে তখনো  বেক্সিমকো কোম্পানির প্ররোচনা প্রলোভনে পা দিয়ে ভারতে উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কেনার কমিশনের লোভ  সরকারকে দেখানো শুরু হয়নি – কিন্তু সেসময় আমরা চীনা টিকার তৃতীয় পর্যায়ের টেস্টে অংশগ্রহণের অফার পেয়েছি আর ঐ টেস্ট সফল হলে যার বিনিময়ে আমরা নিজেরাও টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স পাবো। সে সময় এই দীপাঞ্জন লিখেছিলেন ‘চীন বাংলাদেশকে গিনিপিগ বানাতে চায় বলে ওই টিকা নিয়ে আসছে [China in a startling move plans to use the population of Bangladesh as ‘guinea pigs’ to conduct Phase III trials of its Covid vaccine.]।’ অথচ এর কোন প্রমাণ বা কেন তিনি গিনিপিগ বলছেন এর কোন সাফাই দেন নাই। আসলে  টিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম দুই পর্যায় হল ওর আসল পরীক্ষা। ঐ দু’টা পার হওয়ার পরই মাস পাবলিকের উপর র‌্যানডম ব্যবহার বা গ্রহণকারীদের ওপর এর প্রয়োগ প্রতিক্রিয়া জানার ও প্রয়োজনীয় কারেকশনের জন্য তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার স্তরে যাওয়া হয়। অর্থাৎ তথ্য-প্রমাণ কিছু না হাজির করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করাই দীপাঞ্জনদের ‘যোগ্যতা’, যেটা জার্নালিজমই নয়। অথচ তারা সে কাজই করে চলেছেন।

    তবুও চীন ঠিক কী করতে চায় তা অনেক অস্পষ্টঃ
    গত এপ্রিলে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশ– বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তান আর সাথে চীনসহ মোট ছয়টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই প্রথম এই জোট গঠনের ধারণাটি তুলে ধরেন।
    From REUTERS news:
    – China hosts video-conference with 5 South Asian nations
    – India was invited to meet, China says, but didn’t attend
    – India-China tensions high over Himalayan border dispute

    এটা সেই সময়, বিশেষ করে ভারত যখন টাকা নিয়েও আমাদের দেশের পাওনা টিকা দেয়া বন্ধ করে দিল আর অতিকষ্টে হাসিনা সরকার ফিরে চীনকে আমাদের টিকা সরবরাহের উৎস হতে রাজি করাতে পেরেছিল তখনই চীন এই জোটের ধারণাটা হাজির করেছিল। বলেছিল, চীন দক্ষিণ এশিয়ায় একটি কমন টিকা স্টোরেজ গঠন করতে চায়, যেখান থেকে এ অঞ্চলে সবাই টিকা সংগ্রহ করতে পারবে। তাই আরো এগিয়ে পরে গত এপ্রিলে একে জোটের ধারণা দেয় চীন। এখন সেই ধারণাকে আরেকটু বিস্তার করে বলা হয়েছে, ‘চায়না-সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিজ প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন অ্যান্ড কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ (China-South Asian Countries Poverty Alleviation and Co-operative Development Center) তারা গড়তে চায়।

    কিন্তু এই নামের মধ্যেই – এখানে তিনটি শব্দ আছে – প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ আর, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার;  আর এই তিন শব্দ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটার যে বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত করেছে; তাতে এটা আর যে কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই-ই এটা বলছে। যদিও মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলা-ভোয়া-তে প্রথম বাক্যে লিখেছেন এভাবে, “অবিকল সার্ক নয়। তবে এর আদলে ‘বিকল্প সার্ক’ গঠন করতে যাচ্ছে চীন। এতে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থাকবে”। তাঁর এসব কথার সাথে চীনের কথার বা প্রতিষ্ঠানটার নামেরই মিল নাই।

    কারণ ওই তিন শব্দের মাঝের “কো-অপারেটিভ” শব্দটা যদি ধরি  – এটা এক আদি কমিউনিস্টদের শব্দ; তবে চীন এটা কমিউনিস্ট হিসাবে আনে নাই। এনেছে সম্ভবত ‘সদস্যদের সবার’ বা চীনের একার স্বার্থের এই সংগঠন নয়, এটা সকলের, সবাই সহযোগিতায় বুঝাতে কো-অপারেটিভ বা সমবায়িক শব্দটা এনেছে। কিন্তু এটি খুবই অপ্রয়োজনীয়। ঠিক যে কারণে কিছু রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোটের নামে সাথে দুনিয়ার কোথাও কো-অপারেটিভ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, হয় না।  বিভিন্ন  স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানেই যেখানে সবাই সমান মর্যাদার, সে কারণে এখানে আর কো-অপারেটিভ  – খুবই বেমানান ও অপ্রয়োজনীয় শব্দ।

    ওদিকে বাকি যে দুই শব্দ “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” (দারিদ্র্য দূরীকরণ) ও “ডেভেলপমেন্ট সেন্টার” – এ দুই শব্দ নিজেই পরিষ্কার বলছে এরা  উন্নয়নবাচক বা সম্পর্কিত ধারণা। কিন্তু “উন্নয়ন” মানে কী?

    উন্নয়ন বা ইংরেজিতে ডেভেলপমেন্ট – এগুলো আমেরিকার দিক থেকে চালু করা, যেন প্রায় প্যাটেন্ট করা শব্দ। আমেরিকার হাতেই এই কনসেপ্টের জন্ম এবং এর ব্যবহার শুরু ও এখনো চালু রয়েছে। আমেরিকার হাতে নাহয় বুঝলাম; কিন্তু কবে থেকে? যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অথবা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের দুনিয়া শুরুর আগে “উন্নয়ন” বলে কোনো শব্দ ও ধারণা ছিল না। মানে তা অন্য অর্থে ব্যবহৃত হত, আমেরিকার দেয়া অর্থে নয়।

    আসলে ডেভেলপমেন্ট – এই পুরো পরিভাষার আসল অর্থ হল  বা পুরা শব্দটা হল – ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। বাংলায়, অবকাঠামো উন্নয়ন। এখন এটা অনেক বড় শব্দ বলে সংক্ষেপে শুধু ‘উন্নয়ন’ বলা শুরু করেছিল আমেরিকা। তা হলে এর আসল ও গুরুত্বের শব্দটা হল – অবকাঠামো, ফলে সেখান থেকেই অবকাঠামোর উন্নতি। কিন্তু তাহলে আবার,  ‘অবকাঠামো’ মানেই বা কী?

    এখন আমরা এবার অন্যদিক থেকে আগাই।  এদিকে, ‘বিনিয়োগ’ মানে পুঁজি বিনিয়োগ কথাটা ক্যাপিটালিজমের ধারণার সমান পুরনো। কারখানা বা ব্যবসা শুরু করতে গেলে অর্থ বা পুঁজি বিনিয়োগ লাগবেই। তবে ১৯৪৪ সালে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান দুটা জন্মের সময়ে বিনিয়োগ ধারণা ও শব্দটাকেই দুই ভাগ করে নেয়া হয়েছিল। একটি প্রি-বিনিয়োগ আর অন্যটি সাধারণ (যেমন- আগে বলতাম সেই) বিনিয়োগ। প্রি-বিনিয়োগ মানে বোঝাই যাচ্ছে, মূল বিনিয়োগেরও আগেই আরেক ধরণের বিনিয়োগ এটা। মানে কারখানা বা ব্যবসায় মূল বিনিয়োগ শুরু করার আগে ‘বিনিয়োগ পরিবেশ’ সৃষ্টির জন্য আরেকটা ধরণের বিনিয়োগ করা এটা। যেমন, যেখানে কারখানা-বিনিয়োগ এসে বসবে সেই দেশ-স্থান-শহরের ভূখণ্ডটার জলাভুমি থেকে শুরুর নানার কাজ – মাটি ফেলা বা ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সুব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, এয়ারপোর্ট, বন্দর পর্যন্ত এবার সাথে, দক্ষ প্রশাসন ইত্যাদি যদি সেখানে না থাকে, তবে বিনিয়োগকারী সেখানে আসবে না। পুঁজি সেখান থেকে চলে যাবে। তাই যে ভূখন্ডের প্রধানমন্ত্রী/মেয়র বুদ্ধিমান শাসক তিনি কিন্তু এসব ব্যবস্থা আগেই করে ফেলেছেন।  কারণ, বিনিয়োগ না আসলে মানে নতুন নতুন কাজ সৃষ্টি না হলে দেশের লোক না খেয়ে মরবে। এটা তো বুদ্ধিমান  শাসক হতে দিতে পারেন না। এজন্য এগুলো প্রি-বিনিয়োগ বলছি আর এটা অবকাঠামো তৈরিতে বলে যেটাকে  এজন্য অবকাঠামো-বিনিয়োগ বলে। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ মূল কথা হল, অবকাঠামো-বিনিয়োগে সুদের হার সবচেয়ে কম, প্রায় ‘নাই’ করে রাখতে হবে, যাতে পরে কারখানা বিনিয়োগের ফলে উতপাদিত পণ্যের উপরে মানে এই মূল বিনিয়োগের উতপাদিত ফিনিস প্রোডাক্টের মুল্যের উপর  এর চাপ-প্রভাব খুবই কম হয়। ফিনিসড প্রডাক্টের বিক্রি মূল্য যেন কম থাকে।

    তাহলে  অবকাঠামো-বিনিয়োগের পুঁজি্র সুদ হার কম  রাখতেই হয়। এমন – এটারই বিলিয়ন ডলার ধার দেয়ারই  উপযুক্ত সংগঠন হল বিশ্বব্যাংক। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া বিশ্বব্যাংক, এই নামটা এটা সংক্ষিপ্ত করে নেয়া নাম। মূল নাম IBRD (International Bank for Reconstruction & Development ); ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্র্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট  – এর উদ্দেশ্য কম সুদে বা ‘না’ সুদে অবকাঠামো গড়তে লোন দেয়া যাতে এরপর সহজেই ঐ দেশে স্থানীয় বা বিদেশি বাণিজ্যিক (কারখানা) বিনিয়োগ এসে হাজির হতে পারে।

    আবার, অবকাঠামো বিনিয়োগও দুই ধরনের হয় – ফিজিক্যাল ও হিউম্যান।  ফিজিক্যাল মানে বস্তুগত অবকাঠামো। যেমন উপরে যেটা বলেছি মানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট সুব্যবস্থা প্রভৃতি। অন্যটা হল – হিউম্যান বা শ্রমের অবকাঠামো। সাধারণত কারখানা খুললে যেন ভালো এডুকেটেড স্কিলড লেবার বা নন-এডুকেটেড স্বাস্থ্যবান শ্রমিক পাওয়া যায়। তাই সাধারণত শিক্ষা আর ন্যূনতম স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে এভাবে দুই খাতে অবকাঠামো ব্যয়টা মূলত করা হয়। দুনিয়াতে ১৯৪৪ সালের আগে এই “অবকাঠামো উন্নয়ন” বলে কোনো ধারণাই ছিল না; অর্থাৎ কলোনি আমলে “অবকাঠামো” বলতে কোন ধারণা কাজ করত না। আর একালে অবকাঠামো বলে যাকিছু করা হয়েছে এর ভালো-মন্দসহ যা কিছু দুনিয়াতে হয়েছে, এর (ইতি- বা নেতি-) দায় সবটাই গ্লোবাল নেতা আমেরিকার।

    তবে এখন দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতার পালাবদলের এই কালে চীন কি কেবল আমেরিকাকে কপি করবে? নাকি আমেরিকার উন্নয়নের চেয়ে খারাপ কিছু অবশ্যই না, বেটার কিছু কনসেপ্ট  নতুন আনবে? অথবা আগেরগুলোর  সাথে আরও সংশোধিত নতুন কিছু আসবে?’ এটাই আমরা নিশ্চিত হতে চাই। চীন কি যথেষ্ট চিন্তা করে “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” বা ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, শব্দগুলো ব্যবহার করেছে? আমরা জানি না।

    আরো বড় প্রশ্নঃ
    তাহলে চীনের নতুন এই ছয় রাষ্ট্রীয় ‘ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’- আমরা এখন অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে, এটা মতিউর রহমান চৌধুরী যেভাবে কল্পনা করেছেন… ‘অবিকল সার্ক নয়, তবে এর আদলে বিকল্প সার্ক’- এ কথাটি ভিত্তিহীন। কারণ আমাদের বাস্তবের সার্ক ধরনের সংগঠন তো আসলে তা এক রাষ্ট্রজোট-ই।  মানে কোনো অবকাঠামো-দাতা প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্বব্যাংক সেটা, তা নয়। বিশ্বব্যাংক তো কোনো রাষ্ট্রজোট নয়। তা হলে সমস্যা ঠিক কোথায়? খুব সম্ভবত সমস্যাটি চীনের নীতিনির্ধারকদের মাথায়; সেখানে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বা ইচ্ছা করেই রেখে দেয়া হয়েছে।  অর্থাৎ এখনই স্পষ্ট করতে তারা চাচ্ছে না; সময় হয় নাই। ফলে আপাতত ব্যাপারটা তাই দেখতে অনেকটা বাঘের মত হায়েনা চাওয়া ধরণের হয়ে আছে!

    তবুও চীনারা কী আসলে এশিয়ায় কোয়াডের মত কিছু চাচ্ছে? যেটা বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী? প্রথমত, সেটা বুঝাতে  হলে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ধরণের শব্দের ব্যবহার চীনকে আগে ত্যাগ করতে হবে।  তবে আমরা সবাই আগেই নিশ্চিত থাকতে পারি, সবার ওপরে কোয়াডের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কিছু পেতে চাইলে তা প্রকাশ হয়ে গেলেই এই পাঁচ রাষ্ট্র সাথে সাথে ভেগে যাবে। কারণ তেমন জোট মানেই এটা সামরিক চরিত্রের দিকে টার্ন নেবে। আর এ মুহূর্তে আমেরিকা-চীনসহ কারোই যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ জাগা বা জাগানোর কথা না; যদি না বাইডেন জেনে বা না জেনে কোনো বোকামি করেন।

    আবার চীন যদি আসলেই একটি বিকল্প সার্ক টাইপের জোট চায়, তবে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এসব শব্দ ফেলে দিতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত বা অমুক রাষ্ট্রকে নেয়া যাবে না- এটি বলাই যাবে না। এমনকি দাওয়াতপত্রও ভারতকে পাঠাতে হবে। যদিও উপরের রিপোর্টে আমরা দেখেছে ভারত ইনভাইটেড ছিল। কিন্তু নিজেই সাড়া দেয় নাই। আবার ভারত এলেও চীনের তাতে লাভ, আবার না হলেও আরেক ধরণের লাভ। কাজেই আগাম কে আসতে পারবে না, এভাবে কথা বলার কোনোই প্রয়োজন নাই, তা শোভনও না। তবে চীনের উপর দাওয়াত না করার দায় হবু গ্লোবাল নেতা হিসাবে নেয়া ভাল উদাহরণ নয়।

    শেষে তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু কথাঃ
    জাপান বার্ষিক ডিফেন্স রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে আর তাতে জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী [Deputy Prime Minister Taro Aso]  বলে ফেলেছেন যে “জাপানের আমেরিকার সাথে মিলে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে যাওয়া উচিত”।  বলাই বাহুল্য এটা উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পরে তিনি পালটা ব্যাখ্যা দিয়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে চেয়েছেন। কিন্তু মূলকথা, আমেরিকা বা জাপান সকলেই এক চীন নীতি মেনে নিয়েই  চীনের সাথে সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। ফলে ডায়লগের বাইরে “পাশে দাঁড়ানো” টাইপের কথা বলা তাদের কথা নয় এটা মারাত্মকভাবে গ্লোবাল স্থিতি ভেঙ্গে ফেলবে। চীনেরও বলপ্রয়োগ ভিন্ন অন্য সবকিছুতে তাইওয়ান ইস্যু সমাধানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত। এখন কে এসব শুরু করেছে জাপানের মন্ত্রীরা নাকি বাইডেনের আগ্রহে  সেটা যাই হোক, সারকথাটা হল যেখানে যুদ্ধের উস্কানি সবার সামলে চলা উচিত সেখানে উস্কানি তোলা হচ্ছে।
    শেষে একটা রেফারেন্স দিয়ে শেষ করব।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবাই জানেন পক্ষ দুইটা ছিল হিটলার-মুসোলিনি-জাপানের তেজো ও তাদের বন্ধুরা একদিকে। অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপের বাকি সবাই। যুদ্ধে আমেরিকার মিত্র বাহিনীর বিজয়ের পরে দুপক্ষের বহুদেশেই খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ দেয়া দিয়েছিল। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা ছিল মুসোলিনির ইটালিতে। কিন্তু পক্ষ-বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক  একমাত্র সক্ষম আমেরিকা সকলকেই সাহায্য এবং পুনর্বাসন দিয়েছিল। ইটালিবাসিও আগে থেকেই লাজলজ্জা ভুলে প্রকাশ্যে সাহায্য কামনা জানিয়েছিল।

    যুদ্ধের সোজা অর্থ হল, সম্পদ ও রিসোর্সের সরাসরি ধবংস ও অপচয়। আবার খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ মানে মানুষ আর মানুষের মর্যাদায় থাকে না! তাই যুদ্ধ শেষে যার সামর্থ থাকে সেই বাকি সবাইকে পক্ষবিভেদ ভুলে সকলকেই খাওয়ায় আবার পুনর্বাসনের অর্থ যোগানোর সক্ষমতাও দেখায়।  কাজেই একালেও দায়দায়িত্ব ভুলে যুদ্ধের পক্ষে পরিস্থিতিকে ঠেলে দোয়ার আগে আমাদের এসব পুরান কথা স্মরণ থাকবেনা কেন?

    আপাতত এখানেই ইতি টানছি। তবে চীনকে অবশ্যই ভেবে পরিষ্কার করে বলতে পারতেই হবে যে, সে স্পষ্ট করে কী চায়? আর এবারের তাসখন্দ  সাক্ষাতে চীন বাংলাদেশকে এক বড় স্তরের আস্থায় নিয়ে রেখেছে দেখা যাচ্ছে, এটা তাৎপর্যপূর্ণ। এই সাক্ষাতটাকে আগামি দিনে দেখা হবে একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে।  তবে সেটা চীন-বাংলাদেশের সম্পর্কের দিকের চেয়েও বড় কিছু। আগামি দিনে বাংলাদেশে যা যা ঘটবে  সেসবের প্রেক্ষিতে এটাকে টার্নিং পয়েন্ট বলে দেখা হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “চীন দক্ষিণ এশিয়ায় কী চায়“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]