Category: BANGLADESH

  • ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    গৌতম দাস

    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4fa

     

        আমেরিকান কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান – রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাবক

    সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত খুঁজছে বার্মা থেকে বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ার পিছনের ঘটনা কী? সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রধান দিকটা হল, এমনিতেই ডলার সংকট আর চরম মুদ্রাস্ফীতিতে ডুবে থাকা আমাদের অর্থনীতিতে তাদের নাভিশ্বাস উঠা জীবনে, বাংলাদেশ কী কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছে? আমরা কী এবার অন্যের যুদ্ধস্বার্থে বলি হতে যাচ্ছি? কারণ সাধারণভাবে বাংলাদেশের নুন্যতম অবস্থান হল যুদ্ধের বাইরে থাকা অর্থে যুদ্ধবিরোধিতা, শামিল না হওয়া। সেখানে বলাই বাহুল্য এসময়ের যেকোন যুদ্ধ যাতে জবরদস্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা হবে আত্মঘাতি বিশেষত তাতে যেখানে এখন অন্তত মারাত্মক খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষাবস্তা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা আছে!

    ঘটনাটা প্রথম প্রকাশ ছিল একটা পুরানা ঘটনা যার শুরু এক আমেরিকান উদ্যোগ থেকে। গত ২০১৯ সালের হাসিনা যেটাকে বলেছিলেন দুর্বৃত্বপনা; বা দুর্বৃত্বের প্রস্তাব [flagitious proposition]।  আমেরিকান বেনার নিউজের ভাষায়, আমেরিকার এক “গর্হিত কাজ”।


    সেই প্রস্তাবটা কী আর তা কোথা থেকে উদয় হয়েছিল?

    এটা উদয় হয়েছিল আকাবাকাঁ ভাবে; মানে প্রথম যুগে আমেরিকার বার্মার জেনারেলদের পক্ষ নিয়ে কথা বলা যেটা পরে জেনারেলদের নির্মুলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে।একালের বার্মার দিকে আমরা প্রথম খোঁজ নিতে আকৃষ্ট হই ২০১৭ সালে, রোহিঙ্গা উচ্ছেদ আর বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়প্রার্থিতা থেকে। কিন্তু একালের বার্মার পরিবর্তনের শুরু ২০০৭ সাল থেকে।
    ভারত সরকার যেন বার্মার জেনারেলদেরকে খুব সুবুদ্ধি দিচ্ছে এমন ভাব ধরে দেয়া উস্কানিতে জেনারেলেরা মুসলমান বলে বার্মার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে ২০১৭ সালে নিশৃংসভাবে হত্যা আর ভয়ের খেলা দেখিয়ে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মজার কথা হল রোহিঙ্গা খেদানোর পক্ষে জেনারেলেরা যে সাফাই ব্যাখ্যা দিয়েছিল তা আমেরিকা, ভারত, ও চীন কেউ বাদ যায় নাই, সকলের মেনে নিয়েছিল ও তাদেরও অবস্থানও সেটাই হয়ে দাড়িয়েছিল। সারকথায় সেই ভাষ্যটা হল, আরসা (ARSA, Arakan Rohingya Salvation Army) বলে এক ‘কল্পিত বাহিনীর’ কথা তুলেছিল। আরসা নাকি বার্মিজ নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে ৭০টা স্থানে হামলা করেছিল। আর তা প্রতিরোধ করতে ধাওয়া করতে গেলে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থলের বাসিন্দারা ভয়ে ডিসপ্লেসেড বা ঘর ছেড়ে আশ্রয়ে ভাগতে যাওয়াতেই নাকি বাংলাদেশ সীমান্তে রোগিঙ্গা ঢল উঠার কারণ। সারকথায়, দেখা যায় জেনারেলেরা তাদের যে সব দানবীয় আচরণের দায়স্বীকার করতে পারবে না তা এই “কল্পিত আরসার নামে” তারা হাজির করে থাকেন। পরিণতিতে এখন সংশ্লিষ্ট সবদেশেরই একটা করে আরসা আছে। আমেরিকান পাসপোর্টধারী আরসাও আছে বলে শুনতে পাই!!

    এককথায়, ২০০৭ সালের পর থেকে বার্মা গ্লোবাল লাইম লাইটের ইস্যু হয়ে আসার পিছনের মূল কারণ হল এর আগে মোটামুটি ১৯৮৯ সাল থেকেই ক্রমান্বয়ে বার্মা জাতিসংঘের অবরোধ আর পরে আমেরিকান বা পশ্চিমা অবরোধে পর্যদুস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মত চীন-বার্মা সীমান্ত এটাও শতছিদ্র [perforated] সীমান্ত বলা হয়। সেই সুযোগ এর ভিতর দিয়ে এটাই বার্মার বাহিরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের একমাত্র সীমান্ত বা উপায় হয়ে উঠে; কিন্তু এর সবটাই ইনফরমালি ফরমাল ধরণের বাণিজ্যের লেনদেন। ফলে অন্যভাবে দেখলে বার্মার উপর সব স্যাংশন বা অবরোধের ফলে পরিণতিতে এর মাখন গিয়ে উঠছিল একা চীনের ঘরে।

    এটা ভাঙতেই নেপথ্যে ভারত উদ্যোগ আহবানে সারা দিয়ে পশ্চিম সামিল হওয়াতে বার্মা  গ্লোবাল লাইম লাইটটে আস্সেতে শুরু করেছিল। এরই প্রকাশ্য চিহ্ন হল বা  এক রফার দলিল হল ২০০৮ সালের বার্মার কথিত নয়া কনষ্টিটিউশন ২০০৮। কিন্তু “কথিত” কারণ, বার্মা এরপরেও আসলে কোন রাষ্ট্র নয় – একটা আর্মি ক্লাবের মালিকানায় একটা ভুখন্ড মাত্র। এনিয়ে বিস্তারে দেখতে এখানে।   যা হোক এনিয়ে কথা আর বাড়াবো না কারণ, ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে জেনারেলেরা বুঝে যায় ও সিদ্ধান্ত নেয় যে এই পশ্চিমা-ফর্মুলায় বাইরের দুনিয়ায় আসাটা ভুল ও তা অকার্যকর,তাতে ব্যাপারটা ক্ষমতা জেনারেলদের হাতে রাখার দিক থেকে।

    কিন্তু ঘটনা এর আগেই দুনিয়ার অন্যান্য ঘটনায় অন্যদিকে রওনা দিয়েছে। আমেরিকা-চীনের গ্লোবাল পালাবদলের গোপন-প্রকাশ্যের লড়াইয়ে আমেরিকা আবিস্কার করেছিল যে বার্মার অবস্থান আসলে চীন-ভারতের দিকে ভারি ফলে বড় মাখন সব তাদের দিকে চলে যাচ্ছে। এমনকি সেটার মধ্যে আবার বার্মা না চাইলেও তার অতি চীন-নির্ভরতা যা সীমাহীন বলে আর লম্বা সময় ধরে তা চীনমুখি করে শুরু থেকেই দীর্ঘদিন সাজানো বলে সব মাখন এমনিতেই চীনের ঘরে উঠেই চলছে।

    তাই ২০১৯ সাল থেকেই এনিয়ে আমেরিকার বিকল্প ভিন্ন পরিকল্পনা উন্মোচিত হতে শুরু হয়েছিল। এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা সংক্ষিপ্ততম ভাষায় বললে তা হল,  ‘বার্মা দখল’। এটা হল, আমেরিকার ‘বার্মা দখল’ পরিকল্পনা।  কিন্তু এই ভাষায় নয়; বরং ভিন্নভাবে। তাহলে দখলের সেই সাফাই-ভাষ্যটা কী? সাফাইটা হল, আমেরিকা রোহিঙ্গা সমস্যা্র সমাধান করতে চায়, এই ছলে। সোজাসাপ্টা বললে, রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানের উছিলায় বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ( মোটা দাগে সম্ভাব্য আমেরিকান এয়ার কাভারে বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনী মুভ করিয়ে ধরণের কিছু করে) বার্মা দখল।

    কিন্তু এসব কথাগুলো আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছিল ভিন্নভাবে, ভিন্ন ভাষায়। কীভাবে এবং কোথায়?

    বলা হল এটা যেন রুটিন আমেরিকান কংগ্রেসের (সংসদ) এক ততপরতা। যেখানে সংসদীয় কমিটি তো থাকবেই। তেমনই ওর পররাষ্ট্র উপকমিটির এশিয়া অংশের নেতা বা কংগ্রেসম্যান হলেন ব্রাড শেরম্যান। একথা সর্বজন বিদিত যে রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বার্মিজ জেনারেলদের এথনিক ক্লিনজিং ঘটে চলছে।  আর তারা কখনই বাধ্য না হলে রোহিঙ্গাদের  আগামিতে ফেরত নিতেই চান না। তাই এই পরিস্থিতিকে উছিলা করে এইবার শেরম্যান সামনে এসে তিনি নিজ উপকমিটির এশিয়ার বাজেট প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বলছেন, বার্মার রাখাইন প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে।

    এশিয়ায় আমেরিকান রণকৌশলগত স্বার্থ রক্ষার্থে ও প্রভাবিত করতে দুইটা মিডিয়া ও ওয়েব সাইট খুলেছে। এর একটা হল বেনার নিউজ [BENAR News]  আরেকটা ডিজিটাল লাইব্রেরি ধরণের যার নাম ‘রোর বাংলা’ [roar.media]। এগুলো ২০১৭ সালের শেষের দিকে চোখে পড়তে শুরু করেছিল। ব্যানার নিউজের ক্যারেকটার হল অনেকটা সোভিয়েত-আমেরিকা রেষারেষির যুগের মত তখন আমেরিকা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে কোন প্রতিষ্ঠান খাড়া করলেই সেখানে একটা শব্দ কমন থাকতে দেখা যেত –  ফ্রি [Free] এই শব্দটা; যেমন ফ্রি নিউজ বা ফ্রি মিডিয়া। বুঝাতে চাইত যে রাশিয়া ফ্রি স্পিচ বা ফ্রি মিডিয়া বলে কিছু নাই। এর উল্টাটা তাই আমেরিকায় যেটা আছে। তাই অনেক সময় বেনার নিউজেও ফ্রি শব্দটা দেখা যায়। [কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ওয়েব বাংলাদেশের ভিতর থেকে হলে এখন বিআরটিএ তা আটকে রেখেছে। ফলে ভিপিএন [VPN] দিয়ে ঢুকতে হবে। তবে বিদেশ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ঢুকা যাবে।]

    সেই ব্যানার নিউজে ব্রাড শেরম্যান এর ‘রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনা” এই খবরটা কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল? গত ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত এর হুবহু সে রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা তুলে আনছি … “রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ধরনের প্রস্তাবনা একটি ‘গর্হিত কাজ’  ”। পরেরদিন ৯ জুলাই ২০১৯ একই খবর আমেরিকান ভোয়াবাংলার [VOA] নিউজও ছিল এরকমঃ ……“রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের দেয়া প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা”।

    রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাবঃ
    তাহলে এবার আমরা ২০১৭ সালের জেনারেলদের কোলে বসে থাকা তিনদেশের আমেরিকা, ভারত ও চীন – এখানে একটা বদল হতে দেখছি। এদের মধ্যে আমেরিকা সরে এসে যেন পল্টি মারতে চাইছে। বলছে বার্মাকে ভাগ করে “রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনতে হবে”। এখানে আরো একটু আলো ফেলব। পটভুমিটা হল,  এটা বার্মিজ জেনারেলদের বৈশিষ্ট যে তারা গ্রহিতা দেশকে অনুগ্রহ লাভের ভুমিকায় রেখে দিয়ে তাদের উপর নিজ কমান্ড বজায় রাখার ক্ষমতা রাখে, নিজ দাতা অবস্থান তারা সহসা হারায় না; যেভাবেই হোক তা ধরে রাখতেই সক্ষম হতে দেখি আমরা। তাহলে, আমেরিকা কী এই জেনারেলদের কমান্ড থেকেই বের হতে চাচ্ছে? না, ঠিক একদম তা নয়।  সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

    কখন ও কোথায় এবং  কোন ভাষায় আমেরিকা এটা প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিল? এটাই ২০১৯ সালের জুনের শেষে-আগষ্টের প্রথম সপ্তাহের দিকে, আমেরিকান কংগ্রেসে (আমেরিকান সংসদে) তা আমরা দেখলাম। আর এর চেয়েও বড় কথাটা হল, আজকের বার্মিজ গোলা এসে বাংলাদেশে কেন এসে পড়ছে এর পিছনের পোলারাইজেশনে মানে আমেরিকা, চীন ও ভারত এবং একালে যুক্ত হওয়া রাশিয়ার মধ্যে এখন  কোনদেশ কে কোন দিকে এখন আছে তা আসলে সেকালে ২০১৯ সালেই স্পষ্ট ছিল। সেটা কীভাবে??

    ২০১৯ সালের রোহিঙ্গা বা বার্মা ইস্যুতে ভারত-চীন একসাথে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানেঃ
    ঐ ২০১৯ সালেই ব্রাড শেরম্যান এর কথিত আমেরিকান প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল ভারত ও চীন একসাথে। এরই একটা ঝলক দেখেছিলাম তখন। যদিও তা তখন যথেষ্ট খোলাখুলি ছিল না বলে তত আমল হয় নাই।  সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় কীভাবে এই খবর আমাদের কাছে তখন এসেছিল তা ফিরে অনুসরণ করলেই।

    যেমন ব্রাড শেরম্যান প্রথমবারের মত আমেরিকান কংগ্রেসে রাখাইন প্রদেশ কেটে আনার কথা বলেছেন ১৩ জুন ২০১৯।  আর তা আমরা প্রথম জানতে পারি একমাত্র ভারতীয় টাইমস অব ইন্ডিয়ায় (TOI-ET) প্রকাশিত এক রিপোর্টের কল্যাণ্যে; তাও আবার সেই রিপোর্ট শেরম্যানের বক্তব্যের প্রায় ১৭ দিন পরে, ১ জুলাইয়ে। এবং দ্বিতীয় আর কোন মিডিয়ায় এই খবর ছাপা হয়েছে জানা যায় না।

    This proposal was made on June 13 during a hearing on the State Department’s budget for the South Asia, according to a US media report.

    এমনকি TOI-ET নিজের খবরের সোর্স হিসাবে জানাচ্ছে সেটা আমেরিকার স্থানীয় রিপোর্ট (according to a US media report)। অর্থাৎ খুব অস্পষ্ট; সুনির্দিষ্ট  করে কোন সোর্স এর কথা বলা নাই। কিন্তু তাই বলে খবরটা কী দুর্বল বা ভুয়া? না; অবশ্যই তা একেবারেই নয়। কেন, কী প্রমাণ আছে এর?

    প্রথম প্রমাণ হল,  এই খবরের প্রতিক্রিয়ায় যেসব খবর তৈরি হয়েছে, আমেরিকান দুই মিডিয়া বেনার নিউজ আর ভোয়া,  তা অবলীলায় নিজেরাই ছেপেছে। এভাবে এরা পরোক্ষে TOI-ET এর খবরের সত্যতার সাক্ষ্য দিয়ে ফেলেছে। মানে আমেরিকান কংগ্রেসে এমন আলোচনা হয়েছে তা স্বীকার করে নিচ্ছে।

    আর দ্বিতীয় প্রমাণ আরও অনেক বেশি সাক্ষ্য -প্রমাণ। এর সবচেয়ে বড় প্রভাবটা হল, TOI-ET তে ছাপা হওয়া ঐ রিপোর্টের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা খুবই কড়াভাবে আমেরিকাকে ধোলাই করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। আর তা বাংলাদেশে তো বটেই, ভারতে ব্যাপকভাবে এবং এশিয়ায় অনেকদেশের মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছিল। ফলে TOI-ET তে ছাপা হওয়া খবরের সত্যতা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন থাকে নাই। তবে এসব সত্বেও ভারত-চীন যে এক অবস্থান নিয়ে আমেরিকার বিরোধিতা করেছিল সে অংশটা ভারত কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণে হাজির রাখতে চায় নাই; তাই যাকিছু প্রমাণ তা পরোক্ষে প্রমাণ, এখানে তা লুকায় নাই।

    এমনকি আরেকটা তথ্য খুব গুরুত্বপুর্ণ ছিল সে সময়ে। ১ জুলাই ২০১৯ TOI-ET প্রথম খবরটা চাউর করেছিল। আর এর প্রায় এক সপ্তাহ পরে ৯ জুলাই হাসিনা এক সাংবাদিক সম্মেলনে হাসিনা আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান  ব্রাড শেরম্যানকে খুবই কড়া ্সমালোচনা করেছিলেন।
    তবে, সবচেয়ে বড় কথা হল ঐ সাংবাদিক সম্মেলন ছিল আসলে হাসিনার ২০১৯ সালের ৩-৮ জুলাই এই পাঁচদিনের চীন সফর শেষে দেশে ফিরার পরের দিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিং। আমরা জানি সাধারণত হাসিনার চীন সফরের সময়কালে ভারত টেনশনে থাকে যে কোন কোন নয়া চীনা প্রকল্পে না হাসিনা একমত হয়ে এলেন!!! যা হোক, সেবার ঘটেছিল উলটা। ভারত-চীন মিলে একসাথে হাসিনার মাধ্যমে আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের জবাব দিয়েছিল। যেমন বেনার নিউজের এর শিরোনাম করে ছিল, “রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে বলা অন্যায়ঃ শেখ হাসিনা”। ভোয়ার শিরোনাম ছিল, “কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের কড়া সমালোচনা করলেন হাসিনা”।

    এখন ২০১৯ সালের ঠিক এই পুরান জিনিষটাই আবার নতুন করে এখন উঠে আসছে।  যদিও আগে কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাবটা এসেছিল ট্রাম্পের আমলে। কিন্তু এবার (২০২২) সেটাই আরো সংগঠিতভাবে বাইডেনের প্রোগ্রাম হয়ে এসেছে। আর এতে বাংলাদেশের নিজ রাষ্ট্র-রাজনীতি ও  সাধারণ মানুষের দিক থেকে যদি বলি, তবে এটা এখন আমাদের ১৪ বছরের ফ্যাসিবাদি-কর্তৃত্ববাদী সরকার উতখাতেই বিষয়, যেটার স্বপক্ষে আমাদের মানুষেরা আশা করে যে আমেরিকা এতে সমর্থন দিবে।  আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট ফোরামগুলোতে আমাদের পাশে নিঃশর্তে দাঁড়াবে এটাই আশা করে। কিন্তু ক্রমশ যে ইঙ্গিত আমরা দেখছি সেটা হল,  ব্রডম্যানের “রাখাইন প্রদেশ কেটে আনা” – সেই ব্যাগেজ এটাই যেন  বাইডেনের শর্ত হিসাবে আমাদের কাধেঁ লটকে বসে যেতে চাইছে।

    একদম খাড়াভাবে বললে, বার্মা একটা স্বাধীন সার্বভৌম জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র তাতে সে আমাদের জন্য যতই রোহিঙ্গা সমস্যা তৈরি বা মুসলমান ক্লিনজিং এর নায়ক হোক না কেন!  তাই, “রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার আমেরিকার প্রস্তাব – এটা একটা ক্রিমিনাল প্রস্তাব। এটা কোনদিনই কোনভাবেই জাতিসংঘ টপকিয়ে পাশ হতে পারবে না। যেমন,  ইরাকের সাদ্দামের স্বাধীন কুয়েত রাষ্ট্রকে দখলের পরিণতিতে জাতিসংঘ নিন্দা প্রস্তাব যেমন প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হয়েছিল, সবকিছু সাদ্দামের বিরুদ্ধে গেছিল। এটাই সাদ্দামের প্রথমত বিশাল নৈতিক পরাজয় ঘটিয়েছিল আর এর সুযোগ নিয়ে বুশের ইরাক দখল সহজকেই ঘটে গিয়েছিল।

    আসলে বাইডেন বার্মা দখল করতে চান যাতে আমেরিকা-চীন এদের যে গ্লোবাল নেতৃত্বের ঝগড়া আছে তাতে আমেরিকার নিজের বিজয় ও স্বার্থ তাতে মিটে। মূলত এশিয়ায় বার্মা, যতই জেনারেলদের ক্লাব সেটা হোক, সেই জেনারেলেরা পরাজিত হয়ে সেটা “বাইডেনের বার্মা” হয়ে যাবে এটা পড়শি ভারত ও চীনের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
    বলা যেতে পারে পরিস্থিতি এখন ভারত-আমেরিকার গত ২০ বছরের ঘনিষ্ট সম্পর্কের সবচেয়ে ভাটার সময়, দূরে সরে যাবার সময়!! আমেরিকা ইতোমধ্যেই পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছে!!

    আমরা সবাই জানি যে,   গত কমপক্ষে প্রায় ২০ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর দাড়োয়ান হতে চেয়ে ভুমিকা রেখে গেছে। তবুও ভারতের নিজ কোরস্বার্থ  হল বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনফ্লিট নোঙর করার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অথবা ভারতের যেকোন পড়শিদেশে আমেরিকার গেড়ে বসার বিরোধিতা করা যেটাতে সে আপোষ করে নাই।  চীন হল ভারতের ন্যাচারাল পড়শি (যা বদলানো যাবে না) যার তুলনায় আমেরিকার নতুন করে এশিয়ার কোথাও কোন পড়শি দেশে গেড়ে বসতে দেয়া ভারতের জন্য আপত্তির। এই হল ভারতের কোরস্বার্থের সারকথা।

    কাজেই বার্মা প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এটা চীনা অবস্থানের পক্ষে সমর্থন হয়ে উঠবে; ন্যাচারাল কারণে।

    ওদিকে রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধ সাত মাস শেষ করেছে যা আগামি নভেম্বরের আগে কোন মোড় বদল বা মোচড় নিবার সম্ভাবনা নাই বলেই মনে হয়। এঅবস্থায় রাশিয়া না চাইতেই আমেরিকা বিরোধী জোট বা ফ্রন্টের সামনের স্থানের রাষ্ট্র। তাই ভারত ও চীনের সমর্থনে রাশিয়া বাইডনের বার্মার দখলের স্বপ্নের বিপরীতে তবে এই উসিলায় সরাসরি এশিয়ায় পা-রাখতে চাওয়া আমেরিকার বিরোধিদের প্রধান ভুমিকায় হাজির হচ্ছে।

    কিন্তু বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে এসবই তো গ্লোবাল নানা দেশেরস্বার্থ ও পরিস্থিতি।  আর বাংলাদেশের নিজস্ব চাওয়া যেখানে হাসিনার পতনে একটা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও রাজনীতি কায়েম; এভাবে কর্তৃত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ হটানো। এই কাজে আমরা আমেরিকাসহ দুনিয়া সকল রাষ্ট্রের সমর্থন চাই; সকল ফোরামে সমর্থন চাই। কিন্তু তাই বলে আমরা না আমেরিকা না চীন বা ভারতের স্বার্থের কোন যুদ্ধে সামিল হতে পারব না। আমরা কারো ব্যাগেজ বইতে পারব না, কোন সামরিক সংশ্লিষ্ঠতায় সামিল হতে চাই না, পারব না। এটা বাংলাদেশের কোরস্বার্থের বিরোধি!

    আমরা হাসিনার ক্ষমতা আকড়ে থাকার প্রবল বিরোধী; সরকারের কাঠামো, জবাবদিহিতা  ভেঙ্গে ফেলা এর চরমবিরোধী;  বিচার বিভাগ তো বটেই খোদ কনষ্টিটিউশনই এখন নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে। এসবই অগ্রহণযোগ্য যার আমুল পরিবর্তন এখন আমাদের নুন্যতম কাম্য। তাতে হাসিনা ২০১৯ সালে যতই  সঠিকভাবে আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান শেরম্যানের সমালোচনা করে থাকেন না কেন!

    আমরা কী শেষে আমেরিকা না চীনের পক্ষ নিবঃ
    এখন বাংলাদেশ বলতে দুটা প্রতিনিধিত্ব হতে দেখা যাচ্ছে। একটা হাসিনা-মোমেনের।  যেমন হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন, বার্মার বাংলাদেশে বোমার গোলা ফেলা প্রসঙ্গে বলছেন এটা নাকি বার্মার ‘অনিচ্ছাকৃত’। অর্থাৎ একদিকে বার্মার গোলা পড়তেছে এটা বাস্তবতা। কিন্তু সেটাকে  কৌশলে নরম করে দেখিয়ে কসরত করে মোমেন অস্বীকারের চেষ্টা করছেন; এটাকে প্রলেপ দিয়ে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। এটা হল আসলে হাসিনার বাইডেনবিরোধি রাশিয়া-চীন-ভারতের জোট বা মেরুতে বাংলাদেশকে ঢুকাতে, অবস্থান নিতে চাইছেন।  আর এজায়গায় বাংলাদেশের কমন স্বার্থ ও আকাঙ্খাকে হাসিনা প্রতিনিধিত্ব করেন না। মানে তিনি সেই আকাঙ্খাকে নিজের সাথে রাখতে পারেন নাই বলেই আমার ধারণা।  আসলে হাসিনার স্বার্থ আর আমাদের কমন স্বার্থ এক নয়। এককথায় বাংলাদেশের স্বার্থ হল, কোন দেশ বা ব্লকে না সামিল হওয়া। সেটা বাইডেনের বার্মা দখলের পক্ষে বা বিপক্ষে  কোন যুদ্ধেই সামিল না হওয়া।

    বাংলাদেশ শেষে বাস্তবে কোন সিদ্ধান্তের দিকে যায় সেটা আগামি বাংলাদেশের জন্য খুবই নির্ধারক!!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত

     

    বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত
    গৌতম দাস

    https://wp.me/p1sCvy-4eU

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০ঃ০১ রাত

    সীমান্তে মর্টারশেলের অবিস্ফোরিত গোলা

     

    চীনা নেতৃত্বে দল পাকানো বা জোট গঠন আর আমেরিকার নেতৃত্বে পুরানা ও নয়া জোট গঠন এদুই কাজ যেন সাম্প্রতিককালে ভীষণ দ্রুত আগানো শুরু হয়েছে। এরই এক প্রকাশ হল বার্মাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নড়াচড়া। দু-চারটা মর্টার বা গোলা বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে এসে পড়া বা এতে বাংলাদেশের দু-চারজন করে আহত-নিহত হওয়া – এসবই মূল ঘটনার খুবই ক্ষুদ্র কিছু বাইরের দিক।

    চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি ট্রাম্পের আমলে (২০১৭-২০) যেমন ছিল – একে যদি বলি আমেরিকার তার গ্লোবাল নেতৃত্বের ততপরতা বা দায়ভার ফেলে তা  ট্রাম্পের ঝেড়ে অস্বীকারের অবাস্তব পথ ধরে চীন ঠেকাতে আভ্যন্তরীণমুখি ও জাতিবাদি হয়ে উঠার চেষ্টা; তাহলে পরবর্তিতে মানে চলতি বাইডেনের আমলটা হল, প্রকাশ্যে চীনবিরোধী করে নানান গ্লোবাল জোট পাকানো ও তা দিয়ে আগ্রাসী হয়ে যুদ্ধ-সহ সব সক্রিয় ততপরতা করা্র যুগে তিনি দুনিয়ার সবাইকে টেনে নিতে চাইছেন।

    বিপরীতে চীনের দিক থেকে প্রতিক্রিয়ায় এসবের পালটা যেসব ততপরতা চীন ঘটিয়ে চলেছে সেসবের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বললে তা মূলত দুইটা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বা মাধ্যমেঃ এক. এসসিও [SCO] আর দুই.  ব্রিকস [BRICS] নামে ততপরতা।

    চীনা ততপরতাঃ
    এসসিও [SCO] – এটা এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-জোট যার নাম-সংক্ষেপ কে ভেঙ্গে বললে এর পুরা নাম ‘সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন’; তাই সংক্ষেপে SCO।  সাধারণত যেকোন আন্তর্জাতিক জোটকে মূল যে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; আর তা হল অর্থনৈতিক অথবা স্ট্রাটেজিক এভাবে। আর এই স্ট্রাটেজিক শব্দটাকে বাংলা করে বললে “কৌশলগত” এমন কোন জোট বলতে  বুঝতে হবে মূলত এটা সামরিক ও রাজনৈতিক (ছদ্ম-পলিটিক্যাল) বৈশিষ্ঠের জোট। এভাবেই তা হাজির হতে চেষ্টা করছে। যদিও বেশিরভাগ জোটই মূলত অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জোট হয়ে থাকে যেমন আসিয়ান, সার্ক ইত্যদি।

    নয়া ধারার জোটঃ
    কিন্তু যদি সুস্পষ্ট করে একালে বলি, ধরাধরি শুরু হয়ে গেছে মানে বলতে চাচ্ছি  কোন দেশ  – চীন না আমেরিকা – কার সাথে বিশেষ ঘনিষ্ট হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে গেছে এই অর্থে, আরেক ধরণের নয়া ধারার জোট হতে দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে চীনা না হয় আমেরিকান জোট।

    নয়া ধারার জোট, মানে কী বলতে চাচ্ছি। যেমন আগে মানে গত শতকের নব্বই দশক জুড়ে তখনও জোট হত মূলত অর্থনৈতিক। যা এরপর থেকে ক্রমশ মুল উদ্দেশ্য আড়ালে রেখে (চীনের দিক থেকে বললে) তা চীনের নেতৃত্বে নয়া ধারার জোট গঠন বা গঠনের ইঙ্গিত শুরু হয়েছিল। আর এতে ‘মুল উদ্দেশ্য আড়ালে’ বলতে বুঝিয়েছি তা যে আসলে আমেরিকাবিরোধী সেটা প্রকাশ্যে কোথাও উল্লেখ না রেখে ততপর হওয়া। তুলনায় যেমন – ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব জোট বা সব আন্তর্জাতিক ততপরতাই আসলে বাই ডিফল্ট হয়ে যেত কার্যত আমেরিকান উদ্যোগে বা আমেরিকান নেতৃত্বের জোট। আর ঠিক এর বিপরীতে সোভিয়েত যুগ শেষে একালে  নয়া ফেনোমেনা হিসাবে হাজির হয়ে চলছে চীনের উদ্যোগে বা নেতৃত্বে জোট গড়ে তোলা।
    তবে  চীনের দিক থেকে সেটাকে স্পষ্ট করে আমেরিকাবিরোধী সেটা উল্লেখ না করেই তা করা শুরু হয়েছিল যেমন এই এসসিও জোট গড়া থেকে। এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ২০০১ সালে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ২০০১ সালের হলেও তা ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা হামলার বেশ কয়েকমাস আগের ঘটনা। ফলে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এটা ছিল এক অঘোষিতভাবে আমেরিকাবিরোধী জোট।  যা মূলত চীন ও রাশিয়ার সেই প্রথম কাছাকাছি আসা।  আর এটা ছিল ১৯৫৮ সালের পরে সেই প্রথম চীন-রাশিয়ার কাছাকাছি আসা যখন ঐ ১৯৫৮ সালের আগে দুদেশই “স্টালিনবাদী কমিউনিস্ট” দেশ ছিল। আর এর চেয়েও বড় কথা ২০০১ সালে এসে তারা দুদেশের কেউই আর কমিউনিস্ট দেশ নয়।
    কেউ কোনদেশ আর কমিউনিস্ট কিনা এর একটা ভাল মাপকাঠি হতে পারে, সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য কিনা। সদস্য না হলে সে তখনও কমিউনিস্ট – এটা একটা ভাল মাপকাঠি। বিশেষ করে যদি আমরা এই ফ্যাক্টস মনে রাখি যে,  পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে ভেঙ্গে গেলে এরপরে রাশিয়াসহ মোট ১৫ রাষ্ট্রে তারা আলাদা বিভক্ত হয়ে যায়। আর এরপরেই রাশিয়াসহ ১৫ রাষ্ট্র সকলে এই প্রথম আবেদন করে আইএমএফের সদস্য হয়ে গেছিল। আর ওদিকে মাওয়ের নেতৃত্বের চীন (বা নয়া চীন) মানে চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনীতিক অস্বীকৃতির চীন ছিল সেটা – সেই চীনে  ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জারের প্রথম গোপন চীন সফরের পরে চীন-আমেরিকার ডিল শুরু করেছিল। আর পরে এথেকেই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনীতিক স্বীকৃতি ঘটে – ইত্যাদি এসব ঘটে যাবার পরে তখন ১৯৮০ সাল থেকেই নয়াচীনও প্রথম আইএমএফের সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    এসব কথাগুলো মনে রাখলে আমরা সহজেই মানব যে আইএমএফের সদস্যপদ নেওয়া মানে সে আর কমিউনিস্ট দেশ নয় হয়ে যাওয়া – এর একটা ভাল মাপকাঠি।
    এই বিচারে  চীন ও রাশিয়া প্রথম জোটবদ্ধ দেশ হচ্ছে এসসিও [SCO]-তে ২০০১ সালের শুরু থেকে আর যখন এদুই দেশ কিন্তু আর কমিউনিস্ট দেশ নয়। এরচেয়েও বড় কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে তারা কার্যত আমেরিকাবিরোধি হলেও এর কারণ তারা আগে ‘কমিউনিস্ট ছিল’  এমন কোনই কারণে নয়। মুলকথা এই শতকেও যারাই আমেরিকানবিরোধি ফলে  তারা নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট – এমন ভুল ধারণ অচল তাই এই ভুল অনুমানকে যেন আমরা জেনে-না জেনে আমাদের চিন্তার ভিত্তি না বানায় ফেলে থাকি, এই সতর্কতা দরকার।

    যদিও শুরুতে এসসিও এর জন্মানোর ভিত্তি ছিল যে – সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয়টা দেশকে নিরাপত্তার দিক থেকে পুরানা স্টাইলে রাশিয়া-নির্ভরই তারা যেন থেকে যায়, পশ্চিমা-প্রভাবে না চলে যায়। যেমনটা পোল্যান্ড, রুমানিয়া ইত্যাদি সোভিয়েতের বাইরের কিন্তু যারা কমিউনিস্ট দেশ – এদের বেলায় ঘটেছে এমন না হয়ে যায়।
    অন্যভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে পাঁচ দেশকে বুঝায় এর মধ্যে আবার যারা রাশিয়া অথবা চীন এদের কোন একটা দেশের সীমান্ত লাগোয়া দেশ এদেরকে নিয়েই এসসিও গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে চীন-রাশিয়া ছাড়া আরো তিন (কাজাখ, কিরঘিজ, তাজিক এই এথনিক-ভিত্তির দেশ) এভাবে পাঁচ দেশ; আর পরে  উজবেক এই এথনিক দেশ মিলে মোট ছয় দেশ নিয়ে এসসিও গঠিত হয়েছিল। যেটা থেকে রাশিয়া ক্রমশ একালে এসে ইউরোএশিয়া [euroasia] বলে একটা নয়া ধারণা চালু করেছে। অনেক পুরানা কমিউনিস্ট তাই ইউরোএশিয়া শব্দটা বেশি ব্যবহার করে কথা বলে। অথচ একালে পুতিনের রাশিয়ার কোন আমেরিকাবিরোধি পদক্ষেপকে কমিউনিস্ট বলে সহি মনে করে কথা বলা বা গর্ব করা অর্থহীন!

    তবে যেটা বলছিলাম, এই এসসিও জন্ম থেকেই তারা অনুল্লেখ রাখা আমেরিকাবিরোধী জোট অবশ্যই। তবে এরচেয়েও বড় কথা একালে মানে ধরা যাক গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের রাজধানী সমরখন্দে এবছরের এসসিও সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২; এই সম্মেলন বলছে তাদের সদস্য সংখ্যা ক্রমশ  বাড়ছে। যেমন শুরুতে ছয় দেশের এসসিও  ইতোমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান এদুই রাষ্ট্রকে একসাথে পুর্ণসদস্য করে নেয়া হয়ে গেছে। এবছর থেকে ইরানও পুর্ণসদস্য হওয়াতে মোট পুর্ণসদস্য নয় রাষ্ট্র। আর তুরস্কও সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করাতে ব্যাপারটা আর সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক অথবা যাদের চীন বা রাশিয়ার সাথে সীমান্ত আছে এমন কেন্দ্রিক বলে থাকছে না। কী হচ্ছে তাহলে?

    এটাই চীন-কেন্দ্রিক আমেরিকাবিরোধি প্রধান জোটের আকার নিচ্ছে। যেমন ইতোমধ্যেই এসসিও-এর দাওয়াতি বা অবজারভার সদস্যদেশ হয়েছে আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মঙ্গোলিয়া। আর ওদিকে এক নয়া এক ক্যাটাগরি ‘ডায়লগ মেম্বার’ হয়ে যুক্ত হয়েছে  – আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, ইজিপ্ট, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক – এমন এরা আরো নয় দেশ।

    আলাপ আবার একটু পিছন থেকে শুরু করছি। চীন-কেন্দ্রিক বা আগামি গ্লোবাল নেতা চীন এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জোট ততপরতা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা যদি খুঁজতে যাই তবে এর প্রকাশ্য শুরু হল ২০০৯ সাল থেকে। যদিও তখনও চীন-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট  মানে খুবই সচল ইতিবাচক ও সক্রিয় ছিল যা উভয় দেশেরই মুখ্য-স্বার্থ বলে বিবেচিত হয়ে চলছিল। এছাড়া মনে যাই থাক, কোন প্রকাশ্যবিরোধ বা কারো মৌলিক ভিন্নস্বার্থের উপস্থিতি তখনও উদয় হয় নাই।
    এই বিচারে ইতিহাসের ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বললে, ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একরকম গভীর সহযোগিতামূলক ছিল যা আগের ত্রিশ বছর মানে  ১৯৭৮- সাল থেকে যা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রথম তা তাল কেটে যায়, ২০০৯ সাল থেকে। সেটা ছিল আগের মতই সম্পর্ক সহযোগিতামূলকভাবে একসাথে বেড়ে উঠা সত্বেও এবার বাড়তি আরেক উলটা ফেনোমেনা ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠা শুরু করেছিল – যেটাকে আমরা স্বার্থ যার যার – এমন এক নয়া ফেনোমেনার যুগের শুরু বলতে পারি।

    ২০০৯ সালের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছিল যার প্রধান ও মুখ্য ঘটনাটা হল চীনের ব্রিকস [BRICS] ব্যাঙ্কের ধারণা নিয়ে সামনে আগিয়ে যাওয়া, যেটা কার্যত সরাসরি আমেরিকাবিরোধি। তবে এটা ঘটবার কারণ আমেরিকা নিজেই। বলা যায় আমেরিকা নিজেই চেয়েছিল এভাবেই বিষয়টা আগে বাড়ুক। নইলে আমেরিকার জন্য তার দিক থেকে অন্য অপশনগুলো হত আরো নিজ স্বার্থবিরোধি হত। মানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা শেয়ার চীনকে ছেড়ে দিতে হত।
    তাই ঘটনাবিরোধের শুরু, চীনের বিশ্বব্যাংকের নিজের মালিকানা শেয়ার বাড়ানোর আবেদন, এখান থেকে।  যা আগেই সে করেছিল আর আমেরিকা সেটা ২০০৯ সালে কার্যত প্রত্যাখান করেছিল। এর অর্থ, এথেকে গ্লোবাল পুঁজিবাজার বুঝেছিল যে এটা যেন চীনকে বলা যে পারলে তুমি চীন আমেরিকার মতই সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ারধারী হতে  আরেকটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিতে পারলে কর। অর্থাৎ বর্তমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এ আমেরিকান শেয়ার মালিকানা সর্বোচ্চ; যার সোজা অর্থ আমেরিকাই ইচ্ছাই শেষ কথা। এদুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-মালিকানার কাঠামোর মত করেই তৈরি। তাই চীনকে উপস্থিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মধ্যে মালিকানার ভাগ বাড়াতে না দিয়াটাই আমেরিকার জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে, চীনকে নতুন করে বিকল্প আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমেরিকা।

    আর এখান থেকেই আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়।   তাই ওয়াল স্ট্রীটের লিডিং এক কোম্পানির (গোল্ডম্যান স্যাসে goldmansachs.com ) এর চীফ ইকোনমিষ্টের পাবলিক পরামর্শ রেখেছিলেন যাতে চীন এগিয়ে আসে। আর চীন যেন সেই পরামর্শকেই মুল্য দিতে এগিয়ে আসে। আর গড়ে নেয়া নয়া এমন চীনা-বিকল্প  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানই হল ‘ব্রিকস ব্যাংক’ [BRICS Bank]। মূলকথায়, বিগত ১৯৯০ সাল থেকেই দুনিয়ার এমন নতুন দিকে মোচড়ের পিছনের মূল কারণ মনে করা হয়, চীনা অর্থনীতির ব্যাপক উত্থান – রাইজিং ইকোনমির ধারণা এখান থেকেই শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনের অর্থনীতিতে ক্রমশ বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি (accumulated surplus capital)। যা নিজেই তখন থেকেই অন্যান্য দেশে মানে সারা দুনিয়ার সবদেশেই – ‘অবকাঠামো’ ও ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ হিসাবে হাজির হবার যোগ্যতা-সক্ষমতা নিয়ে হাজির হবেই। ঠিক যেমনটা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াতে আমেরিকা ঘটিয়েছিল।  এটাকেই আমরা অন্যদেশের উপর  “প্রভাব বিস্তারের” মুল উপাদান হিসাবে এককালে আমেরিকার আর একালে চীনের সক্ষমতায় দেখি। তাই, প্রভাব বিস্তারি ক্ষমতার পুর্বশর্ত হল নিজ অর্থনীতি যদি বিপুল পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি – গড়ে তুলতে শুরু করা। এটাই আসল কারণ বলে বুঝতে পারি।

    আরেক অর্থে এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা অথবা পরাশক্তি হয়ে হাজির হওয়ার মূল শর্ত। অনেকে এই ব্যাপারটাকে সামরিক সক্ষমতা ভেবে ভুল করি। যদিও মূল ফ্যাক্টর বা উপাদান হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো হবেই আর সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানে এবার তা নিজদেশে সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়ানোরও সক্ষমতা হয়ে উঠা স্বাভাবিক যা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

    আর এটাই একালের দুনিয়ায় ঘটে গিয়েছে বলে গ্লোবাল পরিবর্তনের আরেক পর্যায়ের মুখে এখন আমরা সকলে।  যখন চীন ও আমেরিকার উভয়েই জোট পাকানো বা নিজ নিজ পক্ষে প্রকাশ্যেই নানান দেশকে সামিল করার প্রচেষ্টা যুগের শুরু হয়ে গিয়েছে বলতে পারি। তাই এটাকেই ঠাট্টা করে বলেছি “ধরাধরি শুরু” হয়ে গিয়েছে।

    তবে খুবই সাবধান, এই নয়া ফেনোমেনা সাবজেকটিক না। মানে আমি সাবজেকটিভ ভাবে আমাদের দেশে এটা ব্যাখ্যা করে বলেছি বলে এটা তাই হয়েছে তা একেবারেই নয়।  বরং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বা  পুঁজির সারপ্লাস সঞ্চয় ব্যাপক হবে কিনা, হয়েছে কিনা এটা বলার ক্ষেত্রে আমার ভুমিকা আসলে এক আবহাওয়াবিদের মত দর্শক-অবজারভার মাত্র; যে বিভিন্ন লক্ষণ ও দাটা মেপে ঘুর্ণিঝড় আসতেছে একথা আগাম বলে; কিন্তু কোনভাবেই যে নিজে ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টকর্তা নয়।

    আবার আমি কমিউনিস্ট কিনা অথবা রশিয়া-চীন কমিউনিস্ট বলে হয়ত  এদের পক্ষ টেনে আমি একথা বলছি – এমন ধারণা প্রসঙ্গেঃ

    প্রথমত আমি একেবারেই কোন কমিউনিস্ট নই। সবকিছু সরকারি মালিকানাভিত্তিক যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ধারণা আছে আমি এই চিন্তার অনুসারি একেবারেই নই। এছাড়া উপরে বলেছি, চীন-রাশিয়া কেউই আজ আর কেন কমিউনিস্ট নয়। চলতি কমিউনিজম আমার ইডিওলজি নয়। এছাড়া বর্তমান চীন-রাশিয়ার সখ্যতা যা আমরা দেখছি সেটা তারা কমিউনিস্ট ছিল বলে এখন এমন দেখা দিয়েছে একথা মিথ্যা। মূলত তাদের কমন প্রতিদ্বন্দ্বি বা বাধা এক্টাই সেটা আমেরিকা; এটাই তাদের সহমর্মিতা ও সখ্যতার মূল ভিত্তি। এটাই তাদের যেকোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বা ফোরামে পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন করার চেষ্টায় কমন অবস্থান নিবার আসল কারণ। মনে রাখা দরকার আজ যা চীন করছে ঠিক সে কাজটাই এককালে আমেরিকা করেছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে নিজ ক্ষমতায় করে সাজিয়ে নিবার ক্ষেত্রে।  আর  আমেরিকার সেদিনের উত্থানের বর্ণনার সময় আমি অকাতরে আমেরিকাকে পজিটিভ ভাবেই ব্যাখ্যা করে থাকি। কারণ দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নায়ক অবশ্যই আমেরিকা, তা সে যে কারণেই করে থাকুক। আমেরিকার সেই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত দুনিয়ার আগিয়ে যাবার জন্য এক লম্বা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।   আসলে সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট ধারণা ও চিন্তায় দুনিয়ার সেই পরিবর্তনকে  আজও তাদের উপলব্দিতে আসেনি, নিতে পারে নাই। এটা তাদের চিন্তা ও পদ্ধতির দুর্বলতা।

    তাহলে এখন আমরা কে কিভাবে ব্যাপারটাকে দেখব? যেমন একটা খুব কমন ও পপুলার পথ হল, আমরা কে কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাকে সহি মনে করি সেই ভিত্তিতে কেউ চীন আর কেউ আমেরিকার পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করা। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা একটাই যে আমরা কে চীনকে ভালবাসি আর কে আমেরিকাকে সেই ভিত্তিতে দুনিয়ায় পরিবর্তনের ঘটনাবলিকে দেখা ও ব্যাখ্যা করা এটা তো কোন চিন্তার মেথডলজি হতে পারে না।

    সারকথায়, আমার এই কথাগুলো বুঝতে সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়া কিভাবে নতুন করে সাজানো হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের মোটা মোটা ফ্যাক্টসগুলো যদি আগাম মনে রাখি বা সুযোগ পেলেই তা পড়ে রপ্ত করে আসি।  কারণ, এটা যার যত সম্যক বিস্তারিক স্টাডি থাকবে তার পক্ষে একালকের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যায় তিনি আগিয়ে থাকবেন।

    এবার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কেঃ
    উপরে চীন-রাশিয়ার অভিমুখ নিয়ে কথা বললাম; তাহলে এরার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কে। তবে লক্ষণীয় যে উভয় পক্ষই যে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জোট পাকাচ্ছে এর দুটোই বৃহত্তর এশিয়াতেই। মানে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্টাল এশিয়ায় যে এশিয়ার ব্যপ্তি।  এই বিচারে আমেরিকার সাজানো নাট্যমঞ্চের নাম ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ বা ‘কোয়াড’।  কথাগুলো তাই শেষের দিকের আমেরিকান ততপরতাকে মাথায় রেখে ইঙ্গিতে বলব।

    বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছেঃ
    গত কয়েকদিন ধরে বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছে আর সম্প্রতি আমেরিকান  সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান জেনারেল চার্লস এ ফ্লিন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ফেসবুকে বাংলাদেশ আর্মির যে পেজ আছে সেখানে দেয়া তথ্য এটা। জেনারেল ফ্লিন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছেন এমন অনেক ছবিও সেখানে দেয়া হয়েছে। আর পিছনে টাঙ্গানো ব্যানারে লেখা আছে “৪৬তম ইন্দো-প্যাসেফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার,  IPAMS 2022”।
    এতে অন্তত যেসব কৌতুহল সৃষ্ট হয়েছে সেগুলো একেবারেই আমাদের আর্মিকে নিয়ে নয়। মূলত তা ঐ ব্যানারে লেখা  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দটাকে কেন্দ্র করে। আর তা থেকে “বাংলাদেশ কী কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে জয়েন করে ফেলেছি”? কবে থেকে? এসব।
    এগুলো নিয়ে যারা যতটুকু জানেন তাদের কেউ কেউ বলছেন,  না – বাংলাদেশ জয়েন করে নাই। কিন্তু তাহলে ব্যানারের কথাগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই কৌতুহল অবশ্য  কেউ মিটাতে পারে নাই। এটাকে কৌতুহল বলছি বটে তবে এটা আসলে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার ভয় মিশানোও বটে!

    আবার একথাও সত্য যে বাংলাদেশ আর্মির সাথে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ওয়ার্কিং রিলেশন হল জাতিসংঘ মিশনকে কেন্দ্র করে। আর ঐ ফেসবুক পেজে তাই যেমনটা লেখা আছে –  “……বৈঠকে “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি” বিষয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্যগণ “বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা মিশন ও এর করণীয়” শীর্ষক ব্রেক আউট সেশন এবং জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।  এটা খুবই স্বাভাবিক।
    তবে তারা কক্সবাজার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিজিট ও কথাও বলেছে।  আর এর সাথে জুড়ে তাই উঠে আসছে রোহিঙ্গা বা বার্মা নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনার কথা।  আমেরিকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চিন্তার সারকথা হল, বার্মার আরাকান প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে সমাধান টানা। এতে বলাই বাহুল্য এটা একটা সামরিক পরিকল্পনা।
    আর তাতে ব্যাপারটা দাড়াচ্ছে এমন যেন,  এখন আমরা ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেই আর না দেই বাংলাদেশের এই ‘সামরিক পরিকল্পনায়’ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কী আসন্ন?
    আর সেজন্যই কী বার্মিজ গোলা এসে পড়ছে? আসলে এনিয়ে সরকারি ভাষ্য-অবস্থান নিয়ে কোন ব্রিফিং খুবই কম। তাই, সবকিছু প্রশ্ন কৌতুহল হয়ে আছে যার জবাব নাই। এটা যতই উহ্য থাকবে কৌতুহলের ডালপালা তত বাড়বে। মূল কারন বাংলাদেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে কীনা এটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যু। কারণ সবাই জানে বর্তমান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি ইনফ্লেশনের মধ্যে আবার একটা যুদ্ধ কল্পনার মানে কী!

    আসলে বড় পিকচারের দিক থেকে বললে,  এখনকার সব  আলোচনায় প্রধান যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন ডোনাল্ড ল্যু [U.S. Assistant Secretary of State Donald Lu] যিনি  আমাদের অঞ্চলে বাইডেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। যিনি সম্প্রতি ‘বিক্ষুব্ধ’ ভারত সফরে এসেছিলেন। এর চেয়েও বড় হল, পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ফেলানোর মূল নায়ক বা এক্সিকিউটর তিনি বলে মনে করা হয়। সাথে আরো কথা হল, আমেরিকা পাকিস্তানকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করছে যার মধ্যে এফ-১৬ এর যন্ত্রপাতিও সংশ্লিষ্ট আছে। এবিষয়ে ভারতের মিডিয়ার খবর এখানে দেখা যেতে পারে।  তাই ঐ সফরে ভারত খুবই কড়াভাবে এতে “আপত্তি” জানিয়েছে।

    সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুমান হল, চীনের এসসিও-এর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত দুদেশই আছে। তাই আমেরিকার পরিকল্পনা হল, এফ-১৬ ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত এর দুরত্ব বা কথার যুদ্ধ অন্তত শুরু করে দেয়া যাক। আর এভাবে তাহলে পাকিস্তান ইস্যুতে ইঙ্গিত হল, ইমরানকে জেলে যেতে হচ্ছে, তা সম্ভবত আসন্ন! আর এভাবেই শাহবাজ সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিতভাবে ভারসাম্যহীন এক প্রো-আমেরিকান  করে সাজানোর পরিকল্পনা এই ডোনাল্ড ল্যু এর।
    এই সুযোগে  কিছু কথা বলে রাখার সুযোগ নেয়া যাক।  সাম্প্রতিককালে আমাদের মত দেশের নিজে বাঁচার পথ হচ্ছে চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত) কারও দিকে এককভাবে আমরা যেন কোনভাবেই না ঝুকে গিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো দাঁড়ানো। একটা ভারসাম্য তৈরি করা  – আর এর মূল সুত্র হচ্ছে একেবারে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে মেপে পথ চলা। যদিও তা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন নিজেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নিজের জনগণের সমর্থনের উপর শাসক দাড়ানোর মুরোদে থাকে। এটা একেবারে প্রাইমারি। যে-ই ক্ষমতায় থাকতে  চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত)ীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে সে নিজের তো বটেই বাংলাদেশকেও গর্তে ডুবাতে নিয়ে যাবে।
    তাই ফ্যাসিবাদ হটাতে চাইলে কি আমাদেরকে কারো যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ও সমর্থক হতেই হবে – সকল ভয় ও কৌতুহলি প্রশ্নের কেন্দ্র এটা!!!!

  • কেন ভারত সফর

    কেন ভারত সফর
    গৌতম দাস

    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২  0৮ঃ৫৫ সকাল

    https://wp.me/p1sCvy-4eE

     

    Bangladesh PM Sheikh Hasina Arrives In Delhi For 4-day Visit

    হাসিনার সদ্য সমাপ্ত ভারত-সফর নিয়ে সফরের আগে থেকেই দেশে হাইপ [hype] বা মিথ্যা উচ্ছ্বাস তোলার চেষ্টায় কমতি ছিল না। মনে করা হয় আওয়ামি যুগ্ম বা সহ-সম্পাদক এর নিচের নেতাকর্মিমহলে ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ট এটা দেখাতে পারলে, এরা বিরোধিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে  নির্দয় মারপিট করতে জোশ পায়, চাঙ্গা হয়ে উঠে। অনেকে তাই হাইপ তোলাটাকে এখান থেকে দেখেছে।  তবে এর আগে বাংলাদেশের কোন প্রধানমন্ত্রীর কোন সফর নিয়ে এমন হাইপ তোলার চেষ্টা আমরা দেখিনি। সেদিক থেকে একটা বাড়াবাড়ি ত অবশ্যই ছিল।

    অন্যদিকে, এই সফর কেন, কী এর মুখ্য উদ্দেশ্য এর একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সরকার বা দল হাজির করার ক্ষেত্রে ব্যাপক খামতি দেখা গেছিল।  এরা কেউ বলতেই পারে নাই বা চায় নাই যে এই সফরের উদ্দেশ্য কী বা মুখ্য ইস্যু কী?  এটা ঢাকতেই যেন হাইপ তোলা হচ্ছে তা মনে হয়েছে। কিন্তু মুল বিষয়,  দেশের সরকার প্রধান কোন সফরে কেন যাচ্ছেন এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে অসুবিধা হবে কেন – এটাই তো আসলে অকল্পনীয় এবং অবিশ্বাস্য! কিন্তু তাই হয়েছে।

    ভারত-বাংলাদেশের বর্তমান বা চলমান সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গত ১৪ বছরে ব্যাপক অস্বচ্ছতা ও নিরুত্তর সব প্রশ্ন ক্রমেই তৈরি করে ফেলা হয়েছে।  সরকার এদিকটা কোনই আমল করে নাই অথবা আমল করা অবস্থায় ছিল না। যেমন, “ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে” – পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন একথা বলে ১২ ঘন্টাও টিকতে পারে নাই। এই উদাহরণটা আমরা মনে রাখতে পারি। এছাড়া দিনকে দিন ভারতের সাথে আমাদের নানান পাওনা নিয়ে গত ১৪ বছরে (যেকালে ভারত আমাদের চরম বন্ধু সরকার বলে দাবি জারি আছে) অমীমাংসিত ইস্যুর সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমে নাই। আর পানির মত ন্যায্য পাওনার ইস্যুগুলোর সমাধান ভারত আরো জোর জবরদস্তিতে করে তা না দিয়ে চলতে চেয়েছে। আর আমাদের সরকার বরং সেগুলো পাশ কাটিয়ে সবসময় চেষ্টা করেছে উলটা ভারতের খাতিরদারি আর তোয়াজ করে চলতে।  তাই এটা আশা করা অস্বাভাবিক ছিল না যে যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ইন্ডিয়া সফর তাই এই সফরের অন্তত প্রধান ফোকাস ইস্যুটা কী এনিয়ে সরকার স্পষ্ট করে বলে রাখবে। কিন্তু তাও এবার সরকার করে নাই।

    তুলনায় এর আগে যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জটিলতা বা অস্বাভাবিকতা যাই থাক তা সত্বেও তো উভয় দেশ থেকেই  উভয় দিক থেকে সরকার প্রধানের সফর ঘটেছে। কিন্তু কখনই এবারের মত এই সফরে ইস্যু কী – তা উহ্য রাখা হয় নাই। অথচ এবার নুন্যতম ফোকাস ইস্যুটা কী তা কেউ জানে না। সরকার স্পষ্ট করে বলতে পারে নাই – এমনটা হয় নাই।

    তাই উপায় না পেয়ে এমনকি প্রো-সরকারি মিডিয়াগুলোও পাবলিককে সন্তুষ্ট করতে যাকে পেয়েছে তাকেই ধরে নিয়ে এসেছে কিছু বলার জন্য। আর তাতেও দেখা গিয়েছে বিশেষত সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা হিমশিম খেয়েছেন। প্রশ্নের জবাবের চেয়ে আরো নতুন নিরুত্তর প্রশ্নগুলো সামনে এসে হাজির হয়েছে।  আর এতে সব আলোচনাতেই মুখ্য প্রসঙ্গ হয়ে ছেয়ে গেছে যে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা একপক্ষীয় – বাংলাদেশের দিক থেকে কেবল দিয়ে যাওয়া অথচ বাংলাদেশের প্রতিটা ন্যায্য পাওনার যেখানে হদিস নাই। এক্ষেত্রে অবশ্য আমরা ২০১৮ সালের ৩০ মে হাসিনার নিজের মুখের আক্ষেপের কথা মনে রাখতে পারি যে তিনি বলেছিলেন,  “ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা সারাজীবন মনে রাখবে” – শেখ হাসিনা।

    ‘ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের’ উপরই নির্ভরশীলঃ
    এবার সফরে মূল ইস্যু না জানা থাকাতে দীর্ঘ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়েই আমাদের সমাজে আলোচনার চেয়ে সমালোচনা হয়েছে বেশি।  তাই শেষে এর একটাই ব্যাখ্যা আপনাতেই  সামনে হাজির গেছে যেন আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল তাই তার পক্ষে বাংলাদেশের পাওনা বা স্বার্থের দিকটা নিয়ে কথা বলার, তুলে ধরার সুযোগ ও সক্ষমতা তার নাই, সে হারিয়েছে।
    এছাড়া এমন আপনা হাজির ব্যাখ্যার পক্ষে আরো উস্কানি তোলা আগুন ধরিয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য। হাসিনার ভারত সফরের দু-সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে স্থানীয় হিন্দুদের এক জমায়েতে দেয়া , “বাংলাদেশের সরকারকে টিকানোর জন্য ভারতকে বলেছি” – এই বক্তব্য। মোমেনের বক্তব্যের কারণেই ‘ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল” আছে এই সরকার এরপক্ষে সরকারি অনুমোদন পোক্ত হয়েছে বলে সমাজ দেখেছে। যদিও ঐদিন সন্ধ্যা হতেই খারাপ প্রতিক্রিয়া টের পেয়ে সাধারণ সম্পাদক কাদেরকে দিয়ে ঐ বক্তব্য “দল বা সরকারের নয়” বলে অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু দলনেত্রীর হুকুমছাড়া  – মোমেন, কাদের বা পরবর্তিতে আব্দুর রহমান এর মত নেতারা কেউ কথা বলেছেন এটা বিশ্বাস করা কঠিন!!
    আর এথেকেই আগামি বছর নির্বাচনের কথা খেয়াল রেখে সাধারণ মানুষের অনুমান যে আসলেই আগামি নির্বাচনেও সরকার ভারতের সক্রিয় সমর্থন কামনা করছে। যেন ভারতের অবস্থান  হাসিনা সরকারের পক্ষেই থাকে, অন্যদলের দিকে না যায় – এটা নিশ্চয় এবারের হাসিনার ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য!!

    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা, কেনঃ
    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। অথচ এবার সরকার না চাইতেও তিস্তা নদীর না-পাওয়া পানি ইস্যু এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের গায়ের জোরের নীতি-পলিসি  আরো উন্মোচিত হয়েছে।  তাই, সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা এনিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পরেছে।  আর তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। কেন?
    গত ২০০৯ থেকে চলে আসা টানা ১৪ বছরের সরকার মূলত ভারতের নর্থ-ইস্ট বা আসামের সব চাহিদার ইস্যু বা দুঃখ ঘুচিয়ে দিবে যেন এই প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিল। এককথায় বললে, সারা নর্থ-ইস্ট বা আসাম, ত্রিপুরা ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরণের অবাধ করিডোর সুবিধা নিবে এর বিনিময়েই যেন তখন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। মনে হয়েছে যেন আমরা এখনও “অখন্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়ায় ১৯৪৭ সালের আগেই আছি”। এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাই ভারতের একক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অবাধে বাংলাদেশের ভুখন্ডের উপর দিয়ে সব করিডোর সুবিধা নেওয়া হয়েছে। আর তা যোগানোই যেন আমাদের সরকারের কর্তব্য!!

    এখন ২০০৭ সালের পরিকল্পনা মতে,  ভারত এভাবে একপক্ষীয় ভাবে সকল সুবিধা নিবে এটা দেখতে খারাপ লাগে তাই, ভারতের দিক থেকে দুইটা অমীমাংসিত ইস্যু তারা বাংলাদেশকে সমাধান করে দিবে বা ছাড় দিবে – এমন একটা ধারণা আমরা কার্যকর থাকতে দেখেছিলাম। এর একটা হল “ছিটমহল বিনিময়” যা সেই শেখ মুজিবের আমল থেকে চুক্তি করেও ফেলে রাখা ছিল।  যেটা সেই আমল থেকে আমরা আমাদের ভুমি ভারতকে ছেড়ে বসে আছি কিন্তু ভারতের খবর নাই – অবস্থায় ছিল; এই ছিটমহল প্রশ্নের সমাপ্তি টানবে। আর দ্বিতীয়টা ছিল, তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। এই কারণে বলা যায়, তিস্তা ইস্যু হল স্পেশাল যা ভারতের দিক থেকে নয়া হাসিনা সরকারকে আপোষে দেয়া প্রতিশ্রুতি।
    অথচ আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদি সশস্ত্র আন্দোলন সমস্যা মিটিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে আসামের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, আকাশ-স্থল-পানি ইত্যাদি সব মাধ্যমে করিডোর যোগাযোগ সুবিধা কী নয় – এমন সবকিছু ভারতকে দেওয়ার পরও আমাদের সরকারের হাত শুন্য – আশ্বাস ছাড়া সেখানে কিছুই নাই!!
    আর এখন এসব সত্বেও আমাদের বেচারা সাংবাদিক, কূটনীতিক বা অধ্যাপকেরা তবু আশার বাণী শুনাচ্ছেন যে এই সফরে তিস্তা ইস্যু নাকি আলোচনার বিষয় হবে – অথচ এনিয়ে কোথায় কোন আলাপ নাই।
    এমনকি কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে মোদি সরকার তো পানি দিতেই চায় কিন্তু মমতা চায় না তাইতেই  নাকি সব সমস্যা হয়েছে। আচ্ছা যদি সমস্যাটা তাই হয় এসব বক্তারা কী একবার ভেবে দেখেছেন এর অর্থ কী? এর অর্থ হল, তাদের মোদি-জী আসলে একটা খামোখা!!! মুরোদ নাই, অক্ষম; তাই তিনি কেউ নন। তাহলে ভারতের সরকার কাঠামো অনুসারে এখানে  মোদি সরকারের যদি মুখ্যমন্ত্রীর উপরে মুরোদ নাই হয়ে থাকেন মানে পানি দেওয়ার ক্ষমতা যদি মোদির না মমতার হাতে থাকে তাহলে আমরা মোদির সাথে কেন ডিল করতে বা চুক্তি করতে চাচ্ছি বা গিয়েছি কেন??? মোদি তাহলে কে আমাদের কাছে??? জয়শঙ্করের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা কথা বলছি বা বলব কেন??? কোন মুরোধীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের যাওয়ার দরকারই বা কী??

    একারণেই বাংলাদেশে একথার প্রতি বিশ্বাস বাড়ছে যে আমাদের সরকার ভাবছে তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের সমর্থন জরুরি আর একারণেই বলাই বাহুল্য ভারত তাই যেচে আমাদের কোন ন্যায্য পাওনা দিতে মনোযোগ দিবে কেন?

    ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা ছেড়ে, প্রসঙ্গে আসতে হবে – কেন ভারত সফরঃ
    উপরে এতক্ষণ ঘুরায় ফিরায় আমরা অনেক কথায় গেলাম। কিন্তু মূল বিষয় যে ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী তা জানা হল না। এককথায় বাংলাদেশে বা দেশের বাইরের মিডিয়ায় যাকিছু প্রকাশিত আলোচনা তারা কেউই সফরের উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট জানাতে পারে নাই। শেষে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়ে লিখেছে এই সফরের উদ্দেশ্য নাকি “রাজনৈতিক”। ‘রাজনৈতিক’ মানে?? সেটা আবার কী??  আসলে সেটা হল  মানুষ যখন বুঝে যায় তার কথার কোন মানে হচ্ছে না তখন কিছু অর্থহীন অবুঝ শব্দে (vague) মানে আন্দাজে অস্পষ্ট শব্দ নিয়ে আসে। এখানে ‘রাজনৈতিক’ শব্দের অর্থ তাই। ঠিক যেমন অনেকে নিজ বুদ্ধিতে না কলিয়ে দুনিয়ার নানান ফেনোমেনো ব্যাখ্যা না করতে পারলে বলে – এটা ‘ভূরাজনীতি’ বা ‘ভূরাজনৈতিক প্রভাব’। এই “রাজনৈতিক” শব্দের আমদানিও সেরকম। অর্থাৎ যেটা নিজেই বুঝে নাই, সেটা অন্যকে বুঝাতে লজ্জা ঢাকতে গিয়ে যে শব্দ তুলে আনা হয়।

    তাহলে আবার পুরানা প্রশ্ন, এই ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী? এবার আর রহস্য না করে বললে সোজা জবাবটা হল – ভারত সফরের উদ্দেশ্য ‘চীন’! সেটা আবার কী? যেখানে সফরে যাচ্ছে ভারতে তাহলে সেখানে উদ্দেশ্য চীন – একথার মানে কী?

    মানে হল, গত দুমাস ধরে বাংলাদেশের মিডিয়ায় লাগাতর যে প্রধান খবরে ডুবে ছিল ও আছে তা হল, রিজার্ভ সংকট। মানে সরকারের কোষাগারে দেশচালানোর মত  যথেষ্ট ডলার নাই। গড়ে প্রতি মাসে আমদানি আয় ও রপ্তানিতে ব্যয়ের ঘাটতিতে একে রেমিটেন্স ও ইত্যাদি আয় দিয়ে পূরণ করার পরও ব্যালেন্সে ঘাটতি গড়ে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। আর সামাজিক বাস্তবতার দিক দিয়ে যদি ব্যাপারটাকে বর্ণনা করি তা হল,  আমাদের নিয়মিত কমপক্ষে দুঘন্টা লোডশেডিং হয় আর সারা দেশের মানুষের সরকারি-বেসরকারি  ওয়ার্কিং আওয়ার  ৩ ঘন্টা কমানো হয়েছে, মূলত বিদ্যুতের চাহিদা কম রাখার জন্য। আর এদুটা হল আমাদের ডলার সঙ্কট কত তীব্র তা বুঝবার জন্য বাইরের মাত্র দুটা প্রকাশিত চিহ্ন। এছাড়া চারিদিকে মুদ্রাস্ফীতি যা মূলত উদ্ভুত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এতে বাজারে ডলার কেনাবেচার রেট ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এসবই হল মারাত্মক গভীর সব সংকটের বাইরের দুচারটা লক্ষণ। আবার সেই থেকে আইএমএফের কাছে বিশেষ ঋণের আবেদন করা হয়েছে, সে খবরের উদ্ভব। তবে আপাতত দেখা যাচ্ছে ডলার সংকট নিয়ে উদাম খবরগুলো আর বাইরে আসছে না। নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিছু লাগামও টানা হয়েছে। কিন্তু সংকট যে আগের মতই আছে সেটাও পরিস্কার!
    এসবের সারকথা হল, আমরা গভীরভাবে ডলার বা রিজার্ভের সংকটে আছি।

    আমাদের দেখা উদাহরণ বলছে, এমন ডলার সংকটে আইএমএফ সংকটের সুরাহা দেয় কিন্তু  তা প্রথমত, অন্তত ৪-৫ মাস লেগে যায় তাতে। আর, তবে এর আগেই বাছবিচারহীনভাবে খামোখা সব ভর্তুকি তুলে নেওয়ার দাবি করে আইএমএফ মুদ্রাস্ফীতি চরমে তুলে দেয়। (তবে আমাদের সরকার কেউ না বলতে আগাম নিজেই তেলের দাম দেড়্গুণ বাড়িয়ে সমস্যাকে ঘোলাটে করেছে।) দ্বিতীয়তঃ  সব চেয়ে বড় কথা আইএমএফ এক্ষেত্রে চলতি সরকারের সাথে চুক্তিই করে না। যদিও হবু নয়া ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা ও শর্তাবলি কী হবে তা নিয়ে আলোচনার সবই করে। কিন্তু শেষে চুক্তি করার আগে বলে থাকে চলতি সরকারের সাথে না, পরবর্তি সরকারের সাথে সে চুক্তি করবে। এর মানে যে যা বুঝার বুঝে নিতে পারেন। আর শ্রীলঙ্কায় ঠিক এই জিনিষটাই সম্প্রতি ঘটেছে।

    তাহলে এর থেকে সরকারের নুন্যতম বিকল্প বা পরিত্রাণ কি?  তা হল, চীনের মত দেশ থেকে বড় নগদ ঋণ নেয়া। চীনের নাম নেয়া এজন্য যে বাকি যারা দেশ তাদের সামর্থের প্রশ্ন আছে আর এরচেয়েও বড় হল, কোন ‘ক্যাম্পের’ তারা ইত্যাদি এসবের প্রশ্ন আছে। তবে আইডিয়ালি বললে, আইএমএফের লোন পাওয়া নিশ্চিতের বা পাওয়ার পরেও একই সাথে সাথে চীনা ঋণও পাওয়ার দরকার থাকে। আমাদেরও আছে। মূল কারণ, আইএমএফ লোনের পরিমাণ কম হলেও এর উদ্দেশ্য বা আমাদের লাভ ও দরকার হল দেশি-বিদেশি পুঁজি বাজার ও ব্যাংক ব্যাবসাকে আশ্বস্ত করা যে আইএমএফ (সে বাজারের চোখে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ) নিজে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চেক করেছে। আর চীনের ঋণ দরকার রিজার্ভের ঘাটতি পূরণে। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে সম্ভবত সরকার বেছে নেয়া লাইনটা হল, আইএমএফের  ঋণ পাওয়া যা হবে হোক, আগে চীনা লোন নিশ্চিত করা যাক!

    কিন্তু তাতে আবার সমস্যা কীঃ
    তাতে সমস্যা কী? নয়া চীনা লোন নিলেই তো হয়। আর এর সাথে আবার হাসিনার ভারত সফরে যাওয়ার কী সম্পর্ক?

    বিরাট সম্পর্ক। আর সেটা দশহাত শাড়ি পড়ার মত, যে ডানদিকটা ভালমত ঢাকলে তাতে বাদিকটা উদাম হয়ে যায়। সেটা আবার কী? এখন চীনেরও সদ্য পুরান  কিছু ক্ষোভ আছে। আর চীনের স্বভাব হল ক্ষুব্ধ হলে সে ঐ দেশ ছেড়ে চলে যায় না। বরং বিপদে পড়া দেশটাকে আরও সাহায্য করে ঠিকই কিন্তু এবার আরো কড়া সব শর্ত আরোপ করে।

    এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি গত ২০২১ সালে আমাদের করোনা টিকা পাওয়ার কাহিনী। আজ বাংলাদেশে দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার মধ্যে সবার চেয়ে আগিয়ে ৭৩.৭% সফল তিন ডোজ টিকাদান করা দেশ। কিন্তু এই মিরাকল কেমনে সম্ভব হল কেউ খবর নেই নাই। ভারত আমাদের সাথে শর্তভঙ্গ করে আমাদেরকে টিকা না দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পাপনের প্রকাশ্যে ভারতকে গালাগালি করা আমরা দেখেছি। এরপরও, এখন এই অর্জন সম্ভব করা গিয়েছে। কারণ, এখন আমাদের টিকা পাওয়ার মূল চালান চীনের দেয়া আর সেটা প্রায় বিনা পয়সায়। ঢাকা শহরের মধ্যে বিতরণ করা  (জাতিসংঘের হু এর দানে দেয়া কিছু টিকা) বাদে এর বাইরের সব টিকাই চীনা টিকা। কিন্তু কিসের বিনিময়ে সরকারকে এই টিকা পেতে হয়েছে আমরা সাধারণ্যে খবর নেই নাই।

    খুব সম্ভবত আজকের ডলার সংকটের ক্ষেত্রেও ক্ষুব্ধ চীনের শর্ত মেনে আমাদের লোন পেতে হবে। গত ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট এর ঢাকা সফরের পর থেকে আমরা প্রথম চীনা অবকাঠামো ঋণ পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই ছয়বছরে নিতে চাওয়া বহু অবকাঠামো প্রকল্প শেষে আমরা নিতে পারি নাই। কারণ, চলতি ১৪ বছরের টানা সরকারকে ভারতের সমর্থনের (ভারতের সমর্থনে সরকার বিষয়ক মন্তব্য করে মোমেন যেকারণে নিন্দিত) ব্যাপারটাকে সবার উপরে সবসময় আমল ও মনোযোগ দিতে হয়েছে। খুব সম্ভবত এবার চীনা নগদ ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আপত্তিতে আগে যেসব চীনা-প্রকল্প বাদ দিতে হয়েছে এর সিঙ্ঘভাগে এবার ফিরে গ্রহণ করতে বাংলাদেশকে রাজি হতে হবে।

    আর এতে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুমান করে আগেই ভারতের সাথে কথা বলে অন্তত যথাসম্ভব তা জানিয়েই কাজ করতে মনস্থ করেছে সরকার। অতএব সেখান থেকেই এই ভারত সফর। এনিয়ে একমাত্র সমকাল পত্রিকায় সঠিকভাবে সম্প্রতি কিছু রিপোর্ট এসেছে। স্বভাবতই খবরের সোর্সের নাম আড়াল করে ছাপানো  “তাসনিম মহসিন” এর লেখা সমকালের কিছু রিপোর্টে তা এসেছে। এর মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর   ‘ঢাকার মধ্যপন্থায় আশ্বস্ত দিল্লি’ শিরোনামে লেখাটা সবচেয়ে (তবে যতটা সম্ভব ইঙ্গিতে বলা) বিস্তারিত।  যদিও আসলেই কী ভারত এতে আশ্বস্ত হবে? এর জবাবটা ঘুরিয়ে দিতে হবে! বলতে হবে, কেউ আশ্বস্ত হবে কিনা সেটাই তো ওর নিজ যোগ্যতার উপর নির্ভর করে! তাই না!!

    যেমন ধরেন টিকা প্রসঙ্গে মানে, দিব বলে চুক্তি করে না দেওয়া এটা ভারতের ছেঁচরামো – এর পরিণতি কী হয়েছে? পরিণতি হল কক্সবাজারের কিছু স্থাপনা বাংলাদেশ চীনকে করতে দিয়েছে। মানে যেমন বিমানবন্দর-রানওয়ে ও ‘ইত্যাদি’ নির্মাণের কাজ দেয়া। এখন এতে ভারত অস্বস্তিবোধ করে তো লাভ নাই। এটাই তো টিকা না দেওয়ার  কাফফারা!! নয় কি? ভারতের নাই মুরোদ বা যোগ্যতা তবু তাকে চীন-বাংলাদেশ প্রথম টিকা-চুক্তিতে বা-হাত ঢুকাতেই হবে। চীনা টিকার  গবেষণায় থার্ড ফেজে বাংলাদেশ অংশ নেওয়ার বিনিময়ে  চীনা টিকা পাওয়া বন্ধ করে দিতে হবেই!!! এই ছিল অক্ষম মুরোদধীন ভারতের কূটনীতি! এতে পরিণতি কী হয়েছে সেটাই দেখব!

    অর্থাৎ সেই ভারত যোগ্য হয় নাই এখনও।  অন্যকে অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ হয় নাই। ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উন্নিত নয়। আর পছন্দের দেশকে ‘অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ” যখন হয়, এটাই কোন দেশের গ্লোবাল নেতা হবার বা কার্যত দাবি করার বা উঠে দাড়ানোর মুল লক্ষণ চাবিকাঠি।  এভাবেই  দাপটের সাথে গত পচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা এভাবেই মুরোদ দেখিয়ে এসেছে। যেটা এখন শীর্ণ প্রায়, বুড়া সিংহের মত।  এটাই অন্যদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের আসল  সক্ষমতা ও যোগ্যতা।  যা এখন আমেরিকার জায়গায় দেখাচ্ছে চীন। আর ভারতের সে মুরোদ হতে এখনো ধারে কাছেও নাই; তবে হয়ত হবে। অথচ এখনই বিরাট হা-করা আশার জিহবা বের করে ভারত বসে গিয়েছে। যেন কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ জেগেছে!!

    যেমন উপরে উল্লেখিত সমকালের তাসলিম মোহসিনের ঐ লেখার একটা অংশ হল এরকমঃ “…সাবমেরিন বিষয়ক সামরিক প্রশিক্ষণে বঙ্গোপসাগরে চীনা উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমুদ্রে নিরাপত্তা নজরদারি জোরদারের জন্য রাডার সিস্টেম দেবে ভারত।  এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে”।  এটাই হল, – কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ – এর পারফেক্ট উদাহরণ। ভারত যেন বলতে চাইছে – মাংস খেতে না পারলাম একটু ঝোল তো পেতে পারি।  আসলে যে মাংস পাবার যোগ্য নয়, হয়নি সে ঝোলও কেন পাবে???  আগে নিজের অবকাঠামো নির্মাণের সব প্রয়োজন পুর্ণ কর – এরপরেই না অন্যদেশে অবকাঠামো ঋণ দিতে শুরু করা!  মানে গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করতে, ছড়িয়ে দিতে শুরু করা এসব কাজের যোগ্য হওয়া আর এজন্য  ছেঁচরামো শুরু করা কি এককথা?? আর এসব করে শেষে লাভটা কী হয়?

    কাজেই এখন ভারতের মুরোদহীন আপত্তি উপেক্ষা করে চীন-বাংলাদেশের পুরানা বাদ-পড়া চীনা প্রকল্পগুলো আবার চালু করতে হাসিনার সামনের ভারতীয় বাধা কাটাতেই, মানে অন্তত মুখরক্ষা করতেই হাসিনার এবারের ভারত সফর ঘটেছে। এটাই মূল কারণ। আর লাভের লাভ যে ভারতীয় কোন আপত্তি যে হাসিনা আমল বা শোনার অবস্থায় নাই সেটা বলে দিয়ে এসে সব বাধা কাটিয়ে আনতে তিনি সফল – এই অর্থে তার সফর সফল বলে সরকার দাবি করছে। আর তা যাওয়ারই কথা। আর এর সাথে পাশাপাশি চীনা  কিছু নগদ ঋণের সংস্থানও হাসিনা করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে অবশ্যই যাতে তাঁর চেপে বসা ডলার সংকটের কিছু সুরাহা হয়।

    কিন্তু হাসিনার ভারত সফর সফল “হবারই কথা” বলছি কেন?
    বলছি কারণ ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে গেছে তা একেবারে ভেঙ্গে না গেলেও। ফলে ভারত যেন হাসিনার জন্য আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ নিয়ে যাক, এমন উদ্দেশ্য হাসিনার এই সফরে ছিল না।  কারণ, এখন আর আমেরিকার কাছে  ভারতের সেই মুল্য বা গুরুত্ব নাই।  একারণেই রাশিয়ান তেল বা জ্বালানি নিয়ে সেসব বকোয়াজি এটা শাহরিয়ার আলমের নিজের কল্পনা। যতদুর জানা যায় এটা আপার ফরমাইস ছিল না।

    কিন্তু  এখন কী দাড়ামো? এর মানে কী এই যে সরকারের ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাচ্ছে? না, এখনো অনেক সবুর করতে হবে। এছাড়া সবটা  না হলেও সরকার কিছু আলো দেখতে পাবে অবশ্যই। তাও যদি এখন চীনের সাথে নয়া কিছু চুক্তি সম্পন্ন-সহ সেসব কাজকে বাস্তবে করে দেখাতে পারে তা পরিকল্পনা-মত সফল হতে হবে আগে।

    পুরা ডলার সংকট সমাধান কী হবেঃ
    কিন্তু কেন পুরা ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা জাগাতে পারা যাচ্ছে না? মূল কারণ সংকটটা কৃত্রিম। মানে হল, গত ১৪ বছর যে পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ লোপাট হয়েছে এরা সবাই চাচ্ছে তাদের টাকা ডলারে রুপান্তর করে নিতে। এটা বাস্তবত অসম্ভব। কারণ, এই চাহিদা অস্বাভাবিক। এটা বাংলাদেশের স্বাভাবিক অর্থনীতি থেকে উঠে আসা কোন চাহিদা নয়। এটা আলটপকা এবং লুটেরাদের চাহিদা। যা স্বাভাবিক অর্থনীতিক চাহিদার বাইরের ঘটনা আর বাইরের লোকেদের। আমাদের স্বাভাবিক অর্থনীতি কখনও আমাদের অর্থনীতিতে সচল সব স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে ডলারে রুপান্তরিত করার কোনই চাহিদা তৈরি করে না।  কাজেই এখন দেখা দেওয়া সব চুরির টাকার ডলারে রুপান্তরের চাহিদা এটা স্বাভাবিক ও আমাদের অর্থনীতির পক্ষে তাদের চাহিদা মিটানো এবসার্ড! ফলে সোজা কথা,  চোরদের তৈরি করা “ডলার চাহিদার” উপর রাষ্ট্রের একশন লাগবে – সক্ষমতা লাগবে, একে কঠোর দমন করা লাগবে, যদি  সে মুরোদ থাকে!

    এই পরিস্থিতিতে জীবন নাভিস্বাসে উঠে যাওয়া মানুষের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সাথে এখন থেকে অর্থনীতি ক্রমশ স্থবির হতে চাইবে – এমন দশা স্পষ্ট হইয়ে উঠবে। যা ব্যাপক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে ঠিকমত কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনীতির সামনে চলে আসা, প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠা  – এটা এক খুবই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে তাদের আমেরিকান সমর্থনও পাওয়ার কথা।  বাকিটা আগামিতে…।

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • নাসিরুদ্দিন শাহরা ‘কথিত সেকুলার’ ভাঁড়ে পরিণত 

    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা “কথিত সেকুলার” ভাঁড়ে পরিণত 

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০৫ পিএম  

    https://wp.me/p1sCvy-3LG

     

    Had great faith when Modi ascended to power in 2014: Naseeruddin Shah

    [সার-সংক্ষেপঃ  ভারতের নাসিরুদ্দিন শাহরা অবুঝের মত কথা বলছেন। তারা ভারতের রাজনীতি নাকি নিজের ধর্ম – কোনটার সংস্কার চান, সেটাই পরিষ্কার নন বা পরিস্কার করছেন না। তিনি যে ধারণার উপর ফিরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন তা কংগ্রেসের কথিত-‘প্রগতিবাদী’ রাজনীতি; যা এখন নিজগুণেই পরাজিত ও মৃত।  আমরা তিন দেশ ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে এটাই জন্ম থেকেই আজও অশান্ত ও দুর্বল করে রেখেছে। এবং এখনও সমাধান করতে সক্ষম না হলে আগামিতেও আরও অশান্ত থাকতে বাধ্য হবে।  অথচ নাসিরুদ্দিন শাহরা তা বুঝতে পারছেন মনে হয় না।]

    কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের রাজনীতি ভারতেই আজ মৃত। কংগ্রেসের ক্রমে নিঃশেষ, মুছে যাওয়া আর বিজেপির দু’বার বিজয়ই এর প্রমাণ। হিন্দুত্ববাদের বিজেপি হয়ত আবার জিতবে বা জিতবে না, কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতি শেষ ও বিলুপ্ত, এটা আর ফিরে আসবে না, তা আমার কথা নয়। গত নির্বাচনে রাহুল গান্ধী নিজেই “সফট হিন্দুত্ববাদের” ভিত্তিতে ও পক্ষে ভোট চেয়ে তা প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ ভারতে প্রধান দুই দলের এখন একটাই রাজনীতি – হিন্দুত্ববাদ। সাথে এখানে বলে রাখা ভাল অনেকের হয়ত খেয়াল করে দেখাই হয় নাই যে “হিন্দুত্ববাদ” জিনিষটা কী!

    আগে বলে নেয়া যাক হিন্দুত্ববাদ কী নয়! এর মানে, কেউ হিন্দু (বা সনাতন) হলে সে হিন্দুত্ববাদী বা খারাপ তা এখানে বলা হচ্ছে না, হয় না। হিন্দু হওয়া খারাপ তাও না। এককথায়, হিন্দুত্ববাদ আর হিন্দু মানে একই কথা একেবারেই নয়। কেউ হিন্দু হয়েও হিন্দুত্ববাদি নাও হতে পারেন। তবে হিন্দুত্ববাদি সকলেই হিন্দুও।   ব্যাপারটা হল আজও কংগ্রেস এবং বিজেপি – প্রথমটা সফট [soft]  আর পরেরটা ভারি হিন্দুত্ববাদী হলেও এদুই দলের বাইরে এখনও অনেকেই হিন্দু থাকতে পারেন এবং তারা আছেনও।

    আবার, কেউ হিন্দুত্ববাদী হলে সেটা খারাপ এজন্য যে এটা উগ্র হিন্দু জাতিবাদ বা ন্যাশনালিজম। তবে উগ্র বা নরম যেটাই হোক এটা খারাপ। চিন্তা হিসাবে বিপদজনক। কারণ এগুলো “আমার জাতি শ্রেষ্ঠ” ফলে অন্যদের উপরে আমার স্থান – এধরণের জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর ধারণা; বলাই বাহুল্য সব জাত শ্রেষ্ঠত্ব ধারণাই বিপদজনক ও ক্ষতিকর। হিটলারের মত অন্য-সব জাতিগোষ্ঠিকে পুড়িয়ে মারার মত ধারণা –  এথনিক ক্লিনজিং ধারণা।  কোন ধর্ম বা কোন জনগোষ্ঠির মনের গহীনে “নিজ-জাত-শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা দুনিয়ার বাকি সব জাতিগোষ্ঠির জন্য বিপদজনক এবং পাশাপাশি অন্য কোন জাতিগোষ্ঠির সাথে বসবাস-অযোগ্য এক “জাতিবোধ।  তাতে এই জাত বলতে তা ইংরাজিতে race অথবা ethnic যাই বুঝাক বা যে অর্থেই জাত বা জাতি বুঝাক না কেন। সবার বেলাতেই সত্য। হিন্দুত্ববাদ একটা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারণা।

    আসলে, যেকোন  ধরণের জাতি-ধারণা মধ্যেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণা সুপ্ত বা লুকানো থাকেই।  আর তাই যেকোন সময় তা বের হয়ে এসে আমরাও একেকটা জাতি হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলারের মত “আমরা দেহে নীল চোখের এরিয়ান রক্ত বা ব্লাড, আমরা হলাম দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আমরা জাত-শ্রেষ্ঠ। এই ছিল হিটলারের মুখ্য বয়ান। আর এটাই সব রেসিস্ট (বর্ণবাদী racist) – এদের কমন ডায়লগ আর চরম ক্ষতিকর বয়ান। দুটা শব্দ দিয়ে এদের চিনা বা চিনানো সম্ভব। আমরা চেক করতে পারি তারা রক্ত  অথবা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলছে কিনা!  অথবা আমরা মহান বা  আমরা মহান জাতি; আমার ভারত মহান বা আমার জর্মানি মহান ইত্যাদি ধরণের বয়ান দেয় কিনা! আর এখানে  রক্ত মানে তাদের রক্ত নাকি সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ, এই তাদের দাবি।  একারণে কংগ্রেস বা বিজেপির “হিন্দুজাতি রাষ্ট্র” গড়তে চাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ গড়া একই কথা।  অনেক সময় আমরা অজানায় আরেকটা জনগোষ্ঠিকে  নিচা দেখানো যায় এভাবে শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে ফেলি – তাই এটা অবশ্যই রেসিজম এবং ক্ষতিকর । [যেমন পাকিস্তানিদের আমরা ‘পাকি’ বললাম।] আর এভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিক হল, এতে একটা রাষ্ট্রের ভিতরে আর সকলেই সম-নাগরিক অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ বা সম্ভাবনা থাকে না। নাই হয়ে যায়।  কাজেই মূলকথা কারও হিন্দু নাগরিক হওয়া (যেটা কোন সমস্যা নয়) আর হিন্দুত্ববাদী নাগরিক হওয়া এক কথা নয়।

    ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রভাব অর্থে বা ট্রেন্ড অর্থে বলতে পারি কংগ্রেসের রাজনীতির পতন হয়েছে।  অর্থাৎ উগ্র-হিন্দুবাদকে লুকানো রেখে আড়াল নেয়া হিন্দুত্ববাদ পরাজিত হয়েছে। আর এতে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দুজাতিবাদ উদাম হয়ে বিজেপি নামে ক্ষমতাসীন। অথচ নাসিরুদ্দিনরা যা নাই, যা মৃত, সেই কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের অলীক সেক্যুলার ভারতে ফেরার দাবি করছেন! গত বছর (২০২১) সেপ্টেম্বরে তার ফেসবুক ইউটিউবে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু বক্তব্য প্রচার করছেন সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    মনে রাখতে হবে, রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজেরই পরিণতি হল – এক হিন্দুজাতি রাষ্ট্র, হিন্দু নেশন স্টেটের ধারণা-কল্পনা। আর শেষে এরই বাস্তব রূপ হল ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া  ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া অনুমোদিত প্রথম রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ বা সংক্ষেপে কংগ্রেস। হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র কায়েম যার লক্ষ্য। বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে উস্কে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে পরিণতিতে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের আরেক রাষ্ট্র গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হবে। তাই হয়েছে …

    নাসিরউদ্দিন শাহ এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ
    নাসির উদ্দিন শাহ এর মূল পাবলিক পরিচয় তিনি দক্ষ শক্তিমান অভিনেতা ও পরিচালক তো বটেই; তিনি তিনবারের “ফিল্মফেয়ার” পুরস্কার প্রাপ্ত, তিনবার ভারতীয় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং একজন “পদ্মভূষণ” পুরস্কারপ্রাপ্ত। দিল্লির স্বনামে পরিচিত, “ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা” [NSD] এই ইন্সটিটিউটের ১৯৭৩ সালের গ্রাজুয়েট। আমার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতায় বললে, আমাদের তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়  জীবনে আশির দশকে আমরা তাঁর বিখ্যাত অভিনয় ও সিনেমাগুলো দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। নিঃসন্দেহে তিনি একজন ভাল পারফর্মার। হাতে গোনা কিছু সফল লোকেদের একজন একজন তিনি। যদিও সেকালের এক অর্থহীন আবেগী ভাষ্য অনুসারে বললে, আমরা “পুঁজিবাদবিরোধী সিনেমা” দেখতে চাই এমন ভাষ্যের কথা চালু হয়েছিল। এরই অধীন   কথিত “প্যারালাল সিনেমা” আন্দোলন এক ব্যর্থ অভিজ্ঞতা ছিল সেগুলা, তা অবশ্যই। কিন্তু এখানে আমাদের আলোচনার  বিষয় এসবের একেবারেই বাইরে। তাই এখন আর সেদিকে যাচ্ছি না।

    বলা যায় মোদির আমলের ভারত (২০১৪-এখনও) এইকালে চরম অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ নাসিরউদ্দিন শাহ এর ক্ষোভ আর তা থেকে তোলা হিন্দুত্ববাদী বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ে নাই। বিশেষ করে গত বছর থেকে। যার মূল কারণ হল, চরমতম মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন মোদি বিজেপি ও তার দলবল। যার পিছনে আছে ভারতের কোভিড দুরবস্থায় মোদি প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ফেল করা থেকে। সেখান থেকে অর্থনৈতিক সংকট, কাজ হারানো, চিকিতসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া ইত্যাদি। আর এত হারিয়ে ফেলা জনমত যা মোদিকে কোনঠাসা করে তুলেছে আর এই সংকট মোকাবিলায় মোদি নিয়মিত চলমান মুসলমানবিদ্বেষকে আরো চরমে তুলে এথেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হিসাবে একে হাজির করেছেন।
    যেমন, আফগানিস্থানে তালেবান-উত্থানে ভারতীয় মুসলমানদের উচ্ছাস প্রকাশ – এর বিরুদ্ধে নাসিরউদ্দিন শাহ  নিজের কথিত “সেকুলার অবস্থান” দিয়ে মোকাবিলা করতে গেছিলেন। আর এতে পরিণতিতে তিনি না ঘরের না ঘাটের অবস্থান পড়েছেন। এতে না ভারতীয় মুসলমানদের আম প্রধানধারা তাকে আপন করতে পেরেছে না এখনকার হিন্দুত্ববাদ প্রভাবিত ভারতের প্রধানধারা তাদেরঅও অন্তত এলিট বা সেলিব্রেটি বলে নাসিরউদ্দিনকে জায়গা করে দিয়ে পেরেছে। অথচ সবখানেই নাসিরউদ্দিন শাহ তার কাম্য তবে মৃত ও কথিত সেকুলারিজম খুজে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।
    কাশ্মীরের মুসলমান হত্যা-নিপীড়ন এর পক্ষে হিন্দুত্ববাদী সাফাই বয়ান তৈরির সিনেমা “কাশ্মীর ফাইলস নিয়েও নাসিরউদ্দিন শাহ কড়া প্রতিবাদ করেছেন। করেছেন তার কথিত সেকুলারিজম এর উপর দাঁড়িয়ে। অথচ এই কংগ্রেসি সেকুলারিজম (১৯৪৭-৯০ এর দশক) সেকালেও কিছুর সমাধান করতে পারে নাই। গান্ধী নিজেই খুন হয়ে গেছেন তাও না! আর নব্বই এর দশক থেকে ভারতে  কথিত সেকুলারিজম ক্রমেই শেষ প্রভাবটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। আর এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদের জমানা।
    মূলকথাটা হল, স্বাধীন ভারত জন্মের আগে থেকেই “কংগ্রেসি সেকুলারিজম” – এটা ছিল এক মিথ্যা অবলম্বন। অকেজো রাষ্ট্রনীতি। কারণ খোদ কংগ্রেসের জন্মই হয়েছে খোদ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়ার খায়েসে। যার সুপ্ত ও মৌলিক লক্ষ্য হল “হিন্দু আধিপত্য” কায়েম। এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র-সমাজ গড়তে হবে।
    অথচ কোন আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার চিন্তার মধ্যে যেকোন জনগোষ্ঠির যদি অন্যের উপর “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনা থেকে যায় তবে নিয়মিত সামাজিক সংঘাত তো চলারই কথা! এবং তাই ঘটে চলেছে। সারা কংগ্রেসি আমল এটা এভাবেই চলেছে। আর এই নোংরা চেহারা ঢাকতেই মিথ্যা-প্রলেপ হিসাবে আনা হয়েছিল কথিত ও অর্থহীন সেকুলারিজম ধারণা। অথচ সারা কংগ্রেসি আমলে হিন্দু “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনায় কোন বদল আনা হয় নাই। তাই, এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। তা সত্বেও নাসিরউদ্দিন শাহ এর মত ভারতীয় মুসলমানেরা নিজের সাথেই প্রতারণা করে নিজেকে বুঝ দিয়েছে যে না – কংগ্রেসি সেকুলারিজম ভাল ও তাদের কাম্য। তাদের সুরক্ষা দিবে!! এটা দিতে পারবে না। কারণ, হিন্দু “আধিপত্য” কায়েম কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য – তাই এটা জারি রেখে এরপর আর মুসলমানদের জন্য এটা আর রক্ষাকবজ হতে পারতে না।

    এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণাঃ
    অথচ এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল  এর সাথে আরেকটা শব্দ আছে “অসাম্প্রদায়িক”। মুল শব্দটা তারা বানিয়েছে – সাম্প্রদায়িক বা কমুনাল (communal)। এখন কমুনাল বা সাম্প্রদায়িক শব্দের মানে কী?
    সাম্প্রদায়িক শব্দটা আসলে “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের যে বাসনা তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এরই এক্সটেনশন বা বিস্তার করতে গিয়ে তৈরি এক ধারণা। যেমন এই প্রশ্নের জবাব কী যে, “হিন্দু আধিপত্যের সমাজ গড়ার যে বাসনা তাহলে মুসলমান বা অন্যধর্মের লোকেরা  সেখানে কীভাবে বসবাস করবে? এর জবাবে “হিন্দু আধিপত্য” আগ্রহিরা বলবে, আমার সমাজে তুমি মুসলমান থাকতে চাইলে আমি কিছু শর্ত দিব যা তোমাকে মেনে চলতে হবে বা সে অনুযায়ী তোমার নিজেকে সাজিয়ে নিতে হবে। আর সেসব শর্তগুলো মানলে তোমাকে আমি যে খেতাব দিব তার নামই হল “অসাম্প্রদায়য়িক”। মানে হল আমি হিন্দু আমি আমার আধিপত্যের সমাজ কায়েম করব, আমার ধর্মিয় আধিপত্য বা শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্নগুলো প্রদর্শন করব। কিন্তু তুমি মুসলমান তোমার চিহ্ন – টুপি বা পাঞ্জাবি ধরণের ইসলামি চিহ্ন প্রদর্শন করতে পারবা না। বরং আমার নির্দেশিত কালচারাল আইকন বা চিহ্নে নিজেকে সাজিয়ে নিবা। একমাত্র তাহলেই আমি তোমাকে আমার পাশে বসতে দিব। আমার স্কুল-কলেজে আমার পাশে বা একই সুবিধায় চাকরি-কাজের স্থলেও আমার পাশে তোমাকে বসতে দিব। যাতে তুমি যে আমার অধীনে তা জ্বলজ্বল করে প্রকাশ্য থাকে। সারকথায় বললে, অসাম্প্রদায়িক হলে মানে  নিজেকে ভুলে আমার শর্তে নিজেকে সাজালে কেবল তবেই আমি তোমাকে আমার সমাজে জায়গা দিব।
    এই কারণে বলা যায়, সাম্প্রদায়িক শব্দটার উপস্থিতি আর ধারণা থেকেই বুঝা যায়  “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের মুল  বাসনার বাস্তবায়ক শর্ত হল “অসাম্প্রদায়িকতা”।

    ভারতীয় মুসলমানদের উপর এই “অসাম্প্রদায়িকতার” শর্ত আজও চাপিয়ে রাখা আছে। আর নাসিরুদ্দিন শা বা কবি গীতিকার জাভেদ আখতার এর মত ভারতের কালচারাল জগতের লোকেরা  এই ভিত্তিতে নিজেদেরকে সেকুলার বলে পরিচয় দিয়ে বেদম খুশি ছিল। তারা মানতেই চায় নাই যে এট অধীনস্ততা!
    তারা এটাও মানতে চায় নাই যে কংগ্রেসের সেকুলারিজম আসলে ইসলাম কোপানোর আর ইসলামবিদ্বেষের সেকুলারিজম!

    যারা হিন্দুত্ববাদ বিরুদ্ধে লড়তে চান তাদের উচিত অসাম্প্রদায়িকতা বা কমুনাল শব্দগুলো একেবারে পরিত্যাগ করা।
    এগুলো হিন্দু আধিপত্য কায়েমের শব্দ ও চিহ্ন। আমাদের যেকোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন সেকুলারিজমই নয়। তাহলে এখন মুল সমস্যাটা কী? সেটা হল, না তারা হিন্দুত্ববাদের প্রতিবাদকারি না তারা অন্য মূসলমানদের সাথে একাত্ম। বরং তারা আজ একা! আর সর্বপরি তাদের পেয়ারের কংগ্রেস নিজেই আজ নিজেকে সফট হিন্দুত্ববাদী বলে নিজেদেরকে তুলে ধরছে।

    বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের দিকে ঠেলে দেয়া হবে। হয়েছেও তাই। কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগ বলে আলাদা দল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। যা পরে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল। পববর্তীতে কংগ্রেস তো বটেই বিশেষত কমিউনিস্টরা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার জন্য জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের ওপর সবদোষ চাপিয়ে প্রপাগান্ডা করে চলেছে। অথচ সবার আগে হিন্দুজাতি রাষ্ট্রের ভারতের কল্পনা ও এর ভিত্তিতে কংগ্রেসের জন্ম তারা দিয়েছে, এই খবর তারা লুকিয়ে রাখে।

    তাহলে একালে নাসিরুদ্দিনরা কী চাইছেন? তারা বলছেন তাদেরকে ওই হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেসের সরকার বা জমানাটা ফিরে এনে দিতে, যে হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেস চেহারা লুকাতে ‘সেক্যুলার’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ জামা গায়ে দিয়ে ঘুরত। আমরা নাসিরুদ্দিনদের খুশি করতে এখন চাইলেও সেই কংগ্রেসকে ফিরে আনতে পারব না। কারণ সে মৃত আর সে জায়গায় স্বরূপে আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদ কায়েম হয়েছে। কংগ্রেস আর জাগবে না। সে ইতিমধ্যে সফট হিন্দুত্ববাদে চলে গেছে।

    আসলে নাসিরুদ্দিনদের খেয়াল করলে দেখতেন তারা আসলে কংগ্রেসের হিন্দুজাতি ধারণার ভেতরে যে মার্জিনালাইজও চাপা পরে থাকা (কথিত সেক্যুলার) ‘মুসলমান’ ধারণা তৈরি হয়েছিল সেখানে ফেরত যেতে চাইছেন। কিন্তু সেটা তো নিজগুণেই এখন মৃত!

    নাসিরুদ্দিন শাহদের অনেক আগেই বুঝে নেওয়া দরকার ছিল যে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে টাইপের বৃটিশ শয়তানি ব্যাখ্যার সেকুলারিজম যা ভারতীয় কথিত সেকুলারিজম – এর সাথে ক্লাসিক সেকুলারিজমের কোন সম্পর্ক নাই। ক্লাসিক সেকুলারিজমের মুল বৈশিষ্ট ও তাতপর্য হল ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকই সম- অধিকারের নাগরিক।   ফলে এর ভিতরে “রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে বলাটাই শয়তানি”, হিন্দু আধিপত্য নিশ্চিত করার ছুপা খায়েস।
    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা এসব মৌলিক ধারণা থেকে বহুগুণ দূরে…।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা   গত  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “নাসিরুদ্দিন শাহরা ভাঁড়ে পরিণত হবেন“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    বাংলাদেশে মোদির এজেন্ট নাকি কিছু নিজ-বিকল্প

    গৌতম দাস
    ২৯ আগষ্ট ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4dT

     

    এক কাল্পনিক আড্ডার আলাপঃ বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা বাক পরিবর্তন নিয়ে যেখানে কথা উঠেছিল।   বক্তা নিজেই প্রশ্নটা জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন ভারতমুখি হয়ে থাকে? মানে তিনি এই প্রশ্নের একটা সাফাই নিজেই দিতে চান তাই নিজেই কথাটা তুলেছেন। আর ভারতমুখি বলতে কেউ বাংলাদেশে থেকে আবার ভারতের স্বার্থকেই নিরন্তর নিজের স্বার্থজ্ঞান করে কথা বলে,এভাবে যে নিজেকে তুলে ধরতে চায় এমন কাল্পনিক একজনকে এখানে ধরে নেয়া হয়েছে।
    সব রাষ্ট্রেরই নিজ একান্ত কিছু স্বার্থ থাকে যা অবশ্যই অন্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা হবেই আর এনিয়ে  প্রশ্ন তোলার কিছু নাই। তবে এটা আবার যখন সীমা ক্রশ করে বাড়তে চায় মানে নাগরিক একদেশের কিন্তু আনুগত্য করে বসে অন্যদেশের এবং ভিন্ন দেশস্বার্থের তখন এটা বারবার বাকি সকলের কাছেই খুবই অস্বস্তিকর মনে হবে; এজন্য যে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিক-আনুগত্যের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে।  এটা অমান্য করতে চায় বলেই এই সীমাছাড়ানির কথাটা আসে। যেমন, কোন দুই ব্যক্তি একবার স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাবার পর স্ত্রীর স্বামীর প্রতি বা স্বামীর স্ত্রীর প্রতি এক লয়াল বা আনুগত্যের সম্পর্কের থাকতে বাধ্য। এই বস্তুগত আনুগত্য কোন কারণে যদি কখনও অনুপস্থিত হয়ে যায়, না থাকতে দেখা যায় তবে বুঝতে হবে ঐ সম্পর্ক কার্যত এরা আর স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কিত নয়; বা ভান করছে।  আর বাস্তবে এথেকেই পরকিয়ার মত কঠিন অমীমাংসিত জটিলতাগুলো তৈরি হয়।
    আবার এই ভারতমুখিতার ধরণের ভিতরেও গত বিশবছরে একটা কোয়ালিটিটিভ মানে গুনগত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। যেমন আগে, পাকিস্তান আমলে বা বাংলাদেশের আমলে কিন্তু ১৯৯২ সালের আগে দেখা যেত বাংলাদেশি হিন্দুদের বড় অংশই নিজেদেরকে কমিউনিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিশীল বলে পরিচয় তুলে ধরত। আর এই সাথে সেকালের ভারতের হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ বা যাদের একালের নতুন নাম বিজেপি-আরএসএস – এদের থেকে দূরে থাকত।  অথচ একালে মোদির আমলে বাংলাদেশের হিন্দুরা বিশেষত তরুণেরা মোদিকে তাদের নেতা ও ত্রাতা মনে করে থাকে। এটা এক তাতপর্যপুর্ণ পরিবর্তন সন্দেহ নাই।

    কিন্তু এই পটভুমিতে বক্তা চেষ্টা করছিলেন কেন এমন আনুগত্য সমস্যা তা নিয়ে এর স্বপক্ষে কিছু সাফাই তুলে ধরার। তিনি জানাচ্ছিলেন যে, একটা দেশের কোন কোন জনগোষ্ঠি তো অনেক রকম ভিন্নতায় অনেক কিছু চাইতেই পারে। সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই। তারা তো পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকতে চেয়েছিল। কথা বাস্তব সত্য এবং কথা তাদের মনের কথা সন্দেহ নাই। কিন্তু এই চাওয়া কী সঠিক ছিল? তাদের স্বার্থের পক্ষে ছিল?

    এককথায় বললে, আপাত দৃষ্টিতে সঠিক ও নির্দোষ এবং ইনোসেন্ট  মনে হলেও এটাই ছিল তার আত্মঘাতি চাওয়া। আজপর্যন্ত বাংলাদেশের হিন্দুদের সমস্ত দুর্দশার মুল ও ভুল এই চাওয়া। সবভুলের উতস এটা। যদিও ১৯৪৭ সালের আশেপাশের প্রেক্ষিতের দিক থেকে বললে, ততদিনে এটা বড় ধরণের ভুল অবস্থান।

    কিন্তু কিভাবে এটা বুঝব? তা কী দিয়ে বিচার করব?
    সবশেষে এই হলো এই তর্কের মূল প্রসঙ্গ!

    একঃ এটা যেকোন রাষ্ট্রগঠনের দিক থেকে এক মৌলিক সমস্যা যে সব নাগরিককে একমত হয়ে চাইতে হয় যে তারা কেমন রাষ্ট্র চায়। মানে কিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চায় এনিয়ে একমত থাকতে হয় বা হতেই হয়। তবেই এক মৌলিক বিষয়ের সমাধান পাওয়া যেতে পারে।  আর সেজন্য কেমন কী  ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে চাচ্ছি তা প্রস্তাবের সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন তা সবার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয় – কেবল এমন কিছুই যেন প্রস্তাব করা হয়। আর এতে ব্যর্থ হলে আগামিতে সব বিরোধে ও ব্যর্থতার শুরু হবে এখান থেকে।  ের কিছু সুত্র নির্দেশ করা যেতে পারেঃ –
    ১। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বা দাবিতে কোন কিছু চাওয়া জায়েজ  – এমন মনে করা সবার আগে ত্যাগ করতে হবে।

    ২। এরই আরেক ভার্সান বা মূলসুত্র হল, সমাজের কেউ অন্যের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ – সেটা গোপনে বা প্রকাশ্যে – এটাই যেকোন রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া বা কার্যকর না থাকার মূল কারণ হয়।
    ৩। তাই এরই উলটা পিঠের মানে ইতিবাচকভাবে বলা কথাটা হল – রাষ্ট্রে হতে হবে বৈষম্যহীন নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র এমন ভিত্তিতে।  মানে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠের কারণে বেশি ক্ষমতা ও আধিপত্যের অথবা কেউ সংখ্যালঘিষ্ঠের কারণে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের, কেউ পাহাড়ি বলে বা সাঁওতাল বলে কম ক্ষমতা ও আধিপত্যের আইনি এবং সামাজিক চর্চার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করতেই হবে ইত্যাদি এগুলো বন্ধ করতেই হবে। তাই মুল কথা, নাগরিক অধিকারেরর দিক থেকে নাগরিক সকলেই সমান – এই ভিত্তিতে। এই সাম্য-নীতি সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান করতে হবে।

    এটাই সংক্ষেপে “নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি” রাষ্ট্র বলা হয়। আরো সংক্ষেপ করতে ‘নাগরিক সাম্য নীতিও’ বলা যেতে পারে।

     

    এখন তাহলে বিচার করা যাক – সেকালের পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা তো ‘পাকিস্তান’ চায় নাই – এই বক্তব্যকে যারা বাংলাদেশের হিন্দুদের পক্ষের সাফাই মনে করছিল সেটা কী ঠিক ছিল? বাংলাদেশের হিন্দুরা কী নাগরিক অধিকারের সাম্য নীতি মেনে তাদের প্রস্তাব বা চাওয়া তুলে ধরে ছিল? অবশ্যই না। তাই হিন্দুদের সাফাই সঠিক না, তাদের পক্ষে গেছে বা কাজের হয়েছে তাও না, তাদের কাজে লেগেছে তাও না।
    এককথায় বললে, এর মানে, বাংলাদেশের হিন্দুদের পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক থাকার দাবি বা যে বাসনা সেটা আসলে মুসলিম লীগের আত্মরক্ষামূলকভাবে “পাকিস্তান” নামে আলাদা রাষ্ট্র কায়েম করার যে দাবি -তারই হিন্দু ভার্সান।
    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় ঐক্যমত।

    তবে এখানে একটা কথা পরিস্কার থাকা দরকার। অরিজিনালি পাকিস্তান হওয়ার প্রস্তাবটা হিন্দু আর মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ হতে হবে – এমন ছিলই না। সেটা আরো অবাস্তবও হত, সেটাও ঠিক। তাই প্রস্তাবটা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিস্ট জেলাগুলোকে নিয়ে পাকিস্তান আলাদা হওয়া। অর্থাৎ দেশভাগের পরে উভয় পক্ষেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়া অন্য ধর্মের জনগোষ্ঠি থাকবে এটা অলক্ষ্যে ধরে নেয়াই ছিল।  কিন্তু কেবল ছিল না দুই হবু স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠনের জন্য রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি প্রসঙ্গে যথেষ্ট প্রয়োজনীয় ঐক্যমত। 

    একথা শুনে হিন্দুদের পক্ষের সাফাই যারা দিতে এসেছিল তারা প্রসঙ্গটা কিছুটা বদলে এবার বলে বসল – এজন্যই তো ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বাংলাদেশের (পুর্ববঙ্গের) হিন্দুরা করেছিল।  এতে ঐ আসরে তারা ভেবেছিল নিশ্চয়  এবার বেশ শক্ত পয়েন্ট তুলতে পেরেছে! তাদের পয়েন্টকে আরো শক্ত-পোক্ত করতে তারা এবার  আরো কিছু কথা সাথে জুড়ে দিয়ে বলল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করার চিন্তা তো খুবই বিভেদমূলক ও পশ্চাতপদ চিন্তা! এই বক্তব্য অবশ্য আমাদের তি্নদেশে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা হিসাবে পরিচিত। কিন্তু তা আসলেই কী???  না বাংলাদেশের হিন্দুদের আসলেই  কপালই খারাপ!  কেন?

    এতদিন মনে করা হত, ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ার কাজটা সব খারাপ কাজের গোড়ার খারাপ কাজটা। এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করে থাকেন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তা এমন এক মোক্ষম কথা তুলে মুসলিম লীগের মুখ বন্ধ করে দিতে পেরেছিল। আর এদের চোখে একাজটা ভারতের কংগ্রেসের চেয়েও ভাল ভাবে করেছিল  কমিউনিস্ট পার্টি।  কিন্তু ঘটনা আসলে উলটা যা উল্টেপাল্টে  বিচার করে দেখাই হয় নাই। কিভাবে?

    ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা যদি ধরে নেই খুবই খারাপ কাজ এমনকি জঘন্য কাজ তবে মুসলিম লীগ বা পাকিস্তান কায়েম করাই এধরণের প্রথম কাজ নয়।  ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজটা অখন্ড ভারতে সবার আগে করেছে, সবার আগে তুলেছে এবং এই ভিত্তিতে  নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্র সাজিয়েছে মুসলিম লীগ নয় – কংগ্রেস – যার পুরা নাম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল। কিভাবে?

    ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌল্লাকে পরাজিত করতে পারলেও নানা সমস্যার কারণে ১৭৬২-৬৪ সাল লেগে যায় ক্লাইভের বৃটিশ ইস্ট -ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে দেওয়ানি লাভ করতে বা প্রশাসন নিজের হাতে উঠিয়ে নিতে। পরে ঐ কোম্পানি আবার একই সময়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়াতে আর বৃটিশ রাণীর সহায়তায় কিছুটা উঠে দাড়ানোর পরে কোম্পানির প্রধান কাজ হয়েছিল যেভাবেই হোক তাতক্ষণিক রাজস্ব আদায় বা সংগ্রহ। একারণেই বাংলায় ব্যতিক্রমি জমিদার প্রথা (আগাম নগদ রাজস্ব জমা দিয়ে জমিদারি কেনা আর পরে প্রজার কাজ থেকে বছরান্তে খাজনা আদায় করে নেয়া) চালু হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির সেই প্রধান রাজস্ব আয়ের উতস জমিদারি ব্যবস্থাটা থিতু করতেই ১৮০০ সাল লেগে যায়। আর দেখা গেল, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জমিদারি কিনেছিল হিন্দু জমিদারেরা।  ফলে এরপরেই এই হিন্দু জমিদারদের মাথায় আসে হিন্দু আধিপত্য কায়েম করার।

    মনে রাখতে হবে সেকালে প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বলতে কৃষি তাও আবার সেটা জমিদারি মালিকানায় জমিদার-প্রজা ভিত্তিক সম্পর্কের কৃষি অর্থনীতি। ফলে সবার উপরে বৃটিশ কোম্পানি আর এর নীচে জমিদার হিন্দুর আধিপত্য কায়েমের সমাজ প্রতিষ্ঠা এটাই  বাস্তবে কায়েম হয়েছিল। যদিও পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কলকাতা সারা ভারতের বৃটিশ রাজধানী বলে অন্তত সারা বঙ্গে জমিদার হিন্দুর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম সহজ হয়েছিল।
    কিন্তু তবু এসবই ছিল অর্থনৈতিক বা মাঠের নয়া শ্রেণীর ক্ষমতা-আধিপত্য কায়েম। কেন এভাবে বলছি?
    বলতে চাচ্ছি রাজনৈতিক অংশ এটা নয় তা বুঝাতে। নয়া শ্রেণীর  রাজনৈতিক অংশটা তৈরি হয়েছিল আলাদাকরে। তবে অবশ্যই এটা তৈরি হয়েছিল সমকালীন ভাবে। বা বলা যায় অল্প কিছুটা আগে। আর তা ঘটেছিল রাজা রামমোহন রায়ের হাতে তার আত্মীয়সভার আসর থেকে।  রামমোহন এর পরিচয় লম্বা না করে এখানে কমিউনিস্ট ইতিহাসে যেভাবে তাঁকে পরিচয় করানো হয়েছে কেবল সেটুকুই তুলে আনছি।

    আসলে রামমোহন রায়ের হাতে এক নয়া ধর্মের প্রবর্তন ঘটেছিল ১৮১৫ সালে, এটাই ব্রাহ্ম (ব্রাহ্মণ শব্দ বা ধারণার সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই) ধর্ম । ফলে সেই থেকে এখনও যারাই  ব্রাহ্ম ধর্ম বা সমাজ এর অনুসারি এরা সকলেই সেসময় থেকেই পারিবারিকভাবে রামমোহন প্রবর্তিত ব্রাহ্ম অনুসারি। সেটা রবীন্দ্রনাথের দাদামশায় (গ্রান্ডফাদার) দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে এখনও পুরা ঠাকুর পরিবার। আবার এদিকে ১৯৩৫ সালে পুনগঠিত প্রথম ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যপক সুশোভন সরকার তার সারা পরিবারও ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি হয়েছিলেন। আর এই সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে পরিচয় করানো হয়েছে।

    কিন্তু তাঁর এভাবে বলার মধ্যে সমস্যা কী হয়েছে তা হয়ত অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয় নাই। এছাড়া রামমোহন রায়ের কথা কেন তুললাম তা নিয়ে কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক। আর এর সাথে ধর্মের ভিত্তিতে দল গড়ার প্রসঙ্গে কে প্রথম এটা করেছিল সেকথাই এখন স্ইপষ্ট করে বলব।

    আমাদের এদিকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানে (এই তিনদেশে) কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের কাছে রেনেসাঁ বেশ আদরণীয় শব্দ ও ধারণা। রেনেসাঁ অনেকটা বড় মৌল ধারণা বা উতস ধারণার মত বলে  ধারণাটাকে মনে করেন তাঁরা। যদিও খোদ কার্ল মার্কস রেনেসাঁ  ধারণা দূরে থাক, আধুনিক রাষ্ট্র বা মর্ডার্ন স্টেট (তার ভাষায় ‘বুর্জোয়া রাষ্ট্র’ ) নিয়েও  তিনি কোন আগ্রহই দেখান নাই। ভাল-মন্দ বড় কিছুই লেখেন নাই।  তাহলে কেন আদরণীয় হল? এর মূল কারণ প্রগতিশীলেরা মনে করেন, রেনেসাঁ ধারণার জপতে থাকলে মানে রেনেসাঁর আড়ালে থাকলে তাতেই অনেক উপকার হবে। তাদের প্রকল্প ধর্ম মানে, ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে খুবই ভাল সাফাই আনা যায় এখান থেকে।

    আর এধারণার নগদ খদ্দের হল জমিদার হিন্দু যারা যেন এই ধারণা কিনে নিবার জন্য অপেক্ষা করছিল।

    এখন প্রথম প্রশ্নে আসা যাক। শব্দাবলীতে বাক্যটাই লক্ষ্য করা যাক, লিখেছি “সুশোভন সরকারের ইতিহাস বইয়ে রামমোহন রায়কে “বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু” বলে দেখানো হয়েছে। আবার রামমোহন হচ্ছেন ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক এবং সুশোভনের নিজ ও পরিবার ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারি। তাহলে “রেনেসাঁ আর ব্রাহ্ম” এখানে একসাথে উচ্চারিত হচ্ছে কেমন করে? তাহলে জানা যাচ্ছে একমাত্র কমিউনিস্ট সার্টিফায়েড ধর্ম হচ্ছে তাহলে ব্রাহ্ম। যেটা সত্যিই এক আজীব ব্যতিক্রম বটে!

    এনিয়ে সরাসরি কথা বললে, আসলে রামমোহন রায়ই বৃটিশ ভারতে প্রথম জাতিরাষ্ট্র বা মর্ডান রাষ্ট্র ধারণা আনেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে এই কল্পনাটা ছিল-  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র। অর্থাৎ ভারতের সবাইকে আগে আগে ব্রাহ্ম অনুসারি করে নিয়ে এবার –  ব্রাহ্মধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র – এমন ভারত ছিল রামমোহনের প্রজেক্ট। সারকথায়, ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের (নেশন স্টেটের) প্রথম ইমাজিনেশনটা আনেন রামমোহন। পরে তার মৃত্যু (১৮৩৩) আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অনুসারিরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে অচল অথর্ব হয়ে পড়লে এবার সেই প্রকল্পটাকে এবার ব্রাহ্মধর্মের বদলে ‘হিন্দুধর্ম-ভিত্তিক এক জাতিরাষ্ট্র’ – এভাবে বদলে নেয়া হয়। আর এটাই ১৮৮৫ সালে এটাই কংগ্রেস দল নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
    কাজেই দল হিসাবে প্রথম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হল কংগ্রেস।  আর এভাবেই প্রকল্প সুনির্দিষ্ট করে হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে এর বিশবছর পরে ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান ধর্ম-ভিত্তিক আরেক জাতিরাষ্ট্র’ পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য নয়া দল হয় মুসলিম লীগ।
    কাজেই মুসলিম লীগের পাকিস্তান কায়েমের বিরুদ্ধে কথা বলে   বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থান নেয়া কিন্তু আবার নিজেরা হিন্দু ধর্ম-ভিত্তিক ভারতে যুক্ত হওয়ার বাসনা  -এটাই তো আসলে কংগ্রেসি অবস্থান~!!!! ফলে এনিয়ে কোন সাফাই দিতে বা করতে তারা পারে না। এর মানে হয় না।

    তাহলে মূল সমস্যা ও সমাধান ছিল, ধর্মভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা সমূলে ত্যাগ করা। সকলকে নিয়ে “অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রের” প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা প্রস্তাব এর কথা বিবেচনা করা এবং সেভাবে আগানো।
    স্বভাবতই, নইলে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে সারাজীবন ইসকনের মাধ্যমে ‘মোদির দলের ভাড়াটে বাংলাদেশি’ উইংয়ের সদস্য হয়েই কাটাতে হবে।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    গৌতম দাস

    ১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4cM

     

         Chinese loans: Developing countries must ‘think twice’

    গ্রামদেশে একটা শব্দ চালু আছে “ভাঙরি” দেয়া; মানে বিয়ে ভাঙরি দেয়া বা বিয়ে ভেঙে দেয়া। এর মানে, গ্রামের কোনো দুই পরিবারে হয়ত বিয়ে ঠিক হয়েছে; প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সব গ্রামে কিছু লোক থাকে যাদের কাজ হল, বিয়ে ভাঙরি দেওয়া। হতে পারে, তাদের বেশির ভাগ নিজের জীবন নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ। হতে পারে তারা অবিবাহিত বা চিরকুমার ধরনের যাদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, তাই জীবনের আশা দুর্বল। এরা ছেলের পরিবারে গিয়ে রটায় মেয়ের চরিত্র খারাপ অথবা মেয়ের পরিবারে গিয়ে বলে, ছেলের আগে একবার বিয়ে হতে গিয়েছিল বা হয়েছিল – এ ধরনের গল্প-গুজব ছড়ানো এদের কাজ!

    ভারতের এখনকার অবস্থা এই হতাশ ভাঙরি দেয়া মানুষের মত। উঠেপড়ে লেগেছে ‘চীন কত খারাপ’- সত্য-মিথ্যা যেভাবে পারে, তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কান ভারী করতে। আর ভারতীয় মিডিয়া এই প্রপাগান্ডার উপর ভর করেই দেশ এক দেশপ্রেম-জাগরণের জোশ রচনায় অস্থির হয়ে উঠেছে।  আবার আমাদের সরকারও সময়ে প্রলোভনে পড়ে ভারতের প্রপাগান্ডা শুনতে চাওয়ার ভান করতে গেছে – “যদি কিছু লাইগা যায়” ভেবে। মূলত চুরির অর্থ ডলারে পাচার করতে গিয়েই এই ডলার সঙ্কট যা থেকে এক চরম অস্থির-অনিশ্চয়তা আমাদের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে। আর তাতে অসহায় বোধ করে সরকার কোথায় কী পাওয়া যায় যেন সব উলটা দেখতে চাইছে; অথচ আগেই জানে ওখানে কিছু পাওয়া যাবে না।

    ঘটনা হল, আমাদের সরকারের অর্থমন্ত্রী এ এইচ এম মুস্তফা কামাল কথিত এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ফাইনান্সিয়াল টাইমস [Financial Times, (FT)] পত্রিকাকে। সেখানে তিনি চীনা ঋণ কত খারাপ ও কেন বিপজ্জনক, তা বর্ণনা করেছেন বলে দাবি করেছে পত্রিকাটা। FT বা এফটি-এর গত ৯ আগস্ট প্রকাশিত ওই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী চীনা বেল্ট ও রোড ঋণ নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন’ [Bangladesh’s Finance minister warns on Belt and Road loans from China]। এটা মনে করার ‘যথেষ্ট’ কারণ আছে যে, এই কথিত রিপোর্টের সাথে ভারতের ইন্টেলিজেন্সের সংশ্লিষ্টতা আছে। কারণ পরের দু’দিন ধরে ভারত এই কথিত রিপোর্ট-কে দিয়ে দিনরাত তার চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। যেটা একটা দেশের পরিচালকদের যারা মানসিকভাবে সুস্থ তাদের পরিচালিত কোন কাজ ও তার নীতি-পলিসি হতে পারে না।

    ভারতে অন্তত দশটা পত্রিকায় [ economic Times India ,  AsiaFinancial ,   Swarajyamag , Hindustantimes ,  market.businessinsider , Newsonair , Theweek , Wionews ,  Sentinelassam , NewsBharati , Statecraft , News18 , OWSA , ANI  ……….. আরও আছে] ছেপে মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাতম তুলে ফেলেছে।

    সবগুলো নিউজই একই Financial Times  এর বরাতে ছাপা হয়েছে যদিও সেসবের ভাষ্য, নতুন আরো শব্দ ঢুকানো বা লেখার ভলিউম ছোটবড় করা অথবা শিরোনাম আলাদা করা বা নয়া শব্দ ঢুকানো ইত্যাদি করা হয়েছে; যার মূলকথা হল, রিপোর্টটা স্পষ্ট করে চীন কত খারাপ, চীন বিভিন্ন দেশকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলে আয় করে চলা একটা দেশ যেন এই টাউটারি-ই চীনের প্রধান আয়ের উতস আর এছাড়া , শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে চীন দায়ী – এসব অর্থ করে এভাবে সাজিয়ে লেখা।
    এভাবে পরবর্তীতে ভাষ্যগুলোর লিড আসে হিন্দুস্তান টাইমস থেকে [Bangladesh minister warns against China’s BRI lending, cites Sri Lanka’s example]। যেখানে শিরোনামের সাথে এবার বাড়তি শব্দ যোগ করা হয়, ‘শ্রীলঙ্কার উদাহরণের পরিপ্রক্ষিতে’ বা cites Sri Lanka’s example – এ বাড়তি শব্দগুলো। আর দশ তারিখ বিকালে বাংলাদেশের ‘মানবজমিন’ পত্রিকাও হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার বাংলা অনুবাদ করে ছাপে। মানে যেন ঘর পোড়ায় আলু পোড়া দিয়ে কিছু পয়সা কামানোর সুযোগ কেউ ছাড়ে নাই।

    এফটি [FT]-এর রিপোর্ট ছাপা হওয়ার পরে, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পরে অর্থমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয় এবার এক রিজয়েন্ডার [rejoinder] বা প্রতিবাদলিপি পাঠান; যা এমরা ১১ আগস্ট সন্ধ্যার পরে একমাত্র টের পাই। কিন্তু মন্ত্রীর প্রতিবাদলিপির ঠিক-ভাষ্যটা কী তা তখনও জানা যায় নাই। কেবল বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস পত্রিকা একটা সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পাওয়া গেছিল। ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস ওই রিপোর্টে জানায়, মন্ত্রী এক প্রতিবাদ দিয়েছেন যা তারা জেনেছে, “এক অফিস-কর্তার (অনুমান করছি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউকে বুঝিয়েছে) কাছ থেকে যে বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল [‘the official aware of the rejoinder told the FE.’]“। অর্থাৎ এর সোর্স তখনও খুবই দুর্বল।

    তবে এর পরের দিন ১২ আগস্ট ভোরবেলা বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টার একটু আগে, FT এবার অর্থমন্ত্রীর ওই প্রতিবাদলিপির মূল ভাষ্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ আরো প্রায় ১২ ঘন্টা পরে, এর আগে পাবলিকলি কেউ জানতে পারে নাই যে প্রতিবাদলিপিতে কী ছিল। ্কিন্তু এতেই ভারতীয় সকল মিডিয়া আন-মুভড থাকে। মানে কেউই তাদের মিথ্যা প্রপাগান্ডা বন্ধ করে নাই। মানে  ১২ আগস্ট সারা দিন ভারতীয় পত্রিকাগুলো যারা এফটি-এর বরাতের নামে খবর ছেপেছিল এই প্রতিবাদলিপির কথা তারা সবাই চেপে গিয়েছে। এমনকি প্রভাবশালী দ্য প্রিন্ট; যার প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত যিনি নিজে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন আর সাথে ঐ লেখার এক ভিডিও ক্লিপ-ভাষ্য তিনি নিজে তৈরি করে ইউটিউবে প্রচার করে থাকেন। তিনিও এফটি বরাতে কিন্তু হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার ওপর ভিত্তি করে তার ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছেন। সেটা চালিয়ে গেলেন প্রতিবাদ আসার পরেও; যা একটি খাসা চীনবিরোধী “দেশপ্রেমিক” ভারতের প্রপাগান্ডা হয়েছে অবশ্য। অর্থমন্ত্রীর প্রতিবাদলিপিটা ছাপানোর বদলে শেখর গুপ্ত বরং তার প্রপাগান্ডা ক্লিপটাই ১২ আগস্ট সারা দিন প্রচার করে গিয়েছেন, এমনই দেশপ্রেমিক তিনি!!!

    কী ছিল মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতেঃ
    সার কথায় তিনি লিখেছেন, এরিপোর্টে “মন্ত্রীর প্রকৃত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেনি” [does not properly reflect the minister’s actual position.]। কিন্তু মন্ত্রীর ‘প্রকৃত’ অবস্থানটা কী ছিল তাহলে? পরের প্যারায় মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতে লিখছেন, ‘The report mentioned Sri Lanka’। মানে যেন তিনি না রিপোর্টটা শ্রীলঙ্কার কথা এনেছে!! তাই কী? এমরা নিশ্চিত নই। যদিও এরপর মন্ত্রী শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ উল্লেখ করেছেন।    উল্লেখ করে বলেছেন – যে (মূলত) “সভরেন লোন নেয়ার কারণে গত মে মাসে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে গেছে এবং পরে আইএমএফ এর সাথে চুক্তিতে গিয়েছে”। মন্ত্রীর এই দাবিটা সত্য। আর মন্ত্রী তাই এখন দাবি করেছেন এই রিপোর্ট লিখেছে, বিআরআই (চীনা বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ লোন) লোনের কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম খারাপ হয়ে গেছে’- এটা তিনি বলেন নাই। অর্থাৎ চীনা লোনের কারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়েছে এটা বলেন নাই; বরং আসলে ‘সভরেন ঋণের কারণে সমস্যা হয়েছে’।

    পরের প্যারায় মন্ত্রী বলছেন, ‘ চীনা লোন নেওয়ার ব্যাপারে (কাউকে) তিনি সতর্ক করেন নাই”। এ ছাড়া সবশেষে তিনি একটা তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘২০২১ সালের হিসেবে আমাদের মোট বিদেশী ঋণ ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ৪ বিলিয়ন হচ্ছে চীনা লোন।’

    অর্থাৎ মন্ত্রী বলতে চাইছেন, বাংলাদেশের কোনো অর্থনৈতিক ক্রাইসিস চীনা লোনের কারণে নয়।
    তবে বাংলাদেশের টিবিএস পত্রিকা তারাও মনে করে মন্ত্রীর বক্তব্য  বদলানো (ডিস্টোর্ট distort) করা হয়েছে। তারা লিখেছে, “London-based daily Financial Times (FT) published a report recently distorting statements made by Finance Minster“। তাদের রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল এটা। 

    মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপিতে আমাদের প্রাথমিক মন্তব্যঃ
    দেখা যাচ্ছে এফটির রিপোর্টার হেরেও হার মানতে রাজি নয়। তিনি প্রতিবাদলিপিটা ছাপবার সময় একটা নয়া শিরোনাম দিয়েছেন, Letter: Why Bangladesh minister is phlegmatic on BRI loans , যেখানে একটা বাঁকা শব্দ তিনি ঢুকিয়েছেন – phlegmatic। অক্সফোর্ড যে শব্দের অর্থ করে আবেগশুন্য unemotional, মানে এক উচ্ছ্বাসশুন্য অবস্থা।  মানে বিআরআই ঋণ নিয়ে মন্ত্রী আবেগশুন্য কেন? এধরণের একটা ভাব বা বক্তব্য এর লেখক বেঞ্জামিন পারকিন দিচ্ছেন। এটা অন্যায় ও অসততা। কারণ প্রথমত একজন মন্ত্রী বলছেন তার কথা বিকৃত বা ডিস্টোর্ট করা হয়েছে। যেটা Financial Times (FT) ও এর রিপোর্টারের জন্য খুবই অসম্মানজনক অভিযোগ। যেটা আসলে বলা হচ্ছে এই পত্রিকা ও এর রিপোর্টার অসৎ ও বিশ্বাস করা যায় না- ইন্টিগ্রিটির অভাব আছে। যেটা একটা মারাত্মক অভিযোগ। অথচ রিপোর্টার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফাজলামো করছেন। কেন? এইক রিপোর্ট-টা ইংল্যান্ডের এই অর্থনৈতিক দুর্দিনে কেউ পয়সা দিয়ে করিয়েছে??? তাই মন্ত্রীর এত মারাত্মক অভিযোগ শুনেও এক ইউরোপীয় মন অনড়, প্রতিক্রিয়াশুন্য??? তিনি তো অন্তত বলবেন যে মন্ত্রীর অভিযোগ সত্য না!!! নাকি??? সত্যি এটা এক অদ্ভুত সাংবাদিকতা!!!

    কিন্তু মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপি-ও যেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেঃ
    ১। প্রথমত এ প্রতিবাদলিপিতে এটা এখন সন্দেহতীতভাবে পরিষ্কার যে, মন্ত্রী এফটি-এর সাথে কথা বলেছেন যেটাকে তারা ইন্টারভিউ বলছে।

    ২. কিন্তু কোন দেশের মন্ত্রী সাক্ষাৎকারে বা সাংবাদিকের সাথে আলাপে কোনো একাডেমিক বা ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ কথোপকথনে লিপ্ত হন না, হওয়ার কথা না। এটা তার করণীয় কাজ বা সাবজেক্ট না, এখতিয়ারও না। ফলে শ্রীলঙ্কা কেন সঙ্কটে ডুবেছে এ প্রসঙ্গে তিনি কথা বলবেন কেন? শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের মন্ত্রীর এক্তিয়ারের বাইরে – এটাও কী মন্ত্রী জানা নাই? শ্রীলঙ্কা এনিয়ে কোন আপত্তি বা ব্যাখ্যা চেয়ে বসলে তো আমাদের সরকার কঠিন বিব্রত হবে, মাফ চাইতে হবে??   মন্ত্রী বড়জোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কথা বলবেন। এটাই তার এখতিয়ার। বাংলাদেশে চীনা লোন নিয়েও কথা বলবেন যতটুকু একটা বিদেশি মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় মন্ত্রী হিসেবে তাঁর এখতিয়ার। তবুও সাবধান যে সেটাও – শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণ নিয়ে ডুবেছে কিনা – এ বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে, এড়িয়ে যাওয়া বক্তব্য হতে হবে। শ্রীলঙ্কায় তাদের সমস্যা কার জন্য কী হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দেয়ার কাজ আমাদের মন্ত্রীর কোনভাবেই নয়। কোন বিদেশী সাংবাদিক তাকে তবু যদি উস্কানিতে শ্রীলঙ্কা চীনের লোনে ডুবেছে কিনা – এনিয়ে মন্তব্য জানতে চায় তাহলে, অর্থমন্ত্রীর উচিত হবে, ঠাণ্ডা মাথায় ভদ্রভাবে ঐ সাংবাদিককে বিদায় করে দেয়া। আর সাংবাদিককে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, তিনি অর্থমন্ত্রী –  বাংলাদেশের কোনো পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল না; তাই রিপোর্টার যদি আরও  প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করতে পারেন বা প্রশ্ন না থাকলে তিনি কথোপকথন শেষ করবেন। কিন্তু জানা যাচ্ছে, মন্ত্রী সেটা করেননি, সাংবাদিকের সাথে মেতেছিলেন। আর রিপোর্টার নির্লজ্জের মত তাঁকে বিক্রি করে দিয়েছে!!

    ৩। বাংলাদেশের চলতি সরকারের একটি নিয়মিত সমস্যা দেখা গিয়েছে যে, কেন সে চীনের সাথেও সম্পর্ক রাখছে তা ভারতকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া। তবু এই কান্ড যদি সরকার টু সরকার পর্যায়ে হয় যেখানে ফরমাল-ইনফরমাল বহু দিকেই আলাপ হয়ে থাকে যা স্বাভাবিক, সেখানে এমন কিছু হতে পারে। কিন্তু পাবলিকলি বা প্রকাশ্যে মিডিয়া-সাংবাদিকতায় এ্টা একেবারেই কাম্য নয়। কেননা তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতকে ট্যাক্স দিয়ে আমাদের যেন চলতে হচ্ছে!!!

    ভারতও প্রায়ই এমন দাবি করে থাকে যে, তার পড়শি দেশগুলো যেন ভারতের নিজ বাসার পিছনের বাগানবাড়ি সে দেশগুলো যেখানে ভারত ইচ্ছামতো হাত ঢুকাতে পারে, ফুল তুলে আনতে পারে ইত্যাদি। [এনিয়ে আমার পুরানা কয়েকটা লেখা আছে যার একটা লেখা “এক মফস্বলী জেনারেল” দেখা যেতে পারে।] এই ধারণার আদিগুরু হলেন জওয়াহের লাল নেহরু। তিনি মনে করতেন মানে ভাব করতেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে ফিরে গেলেও ওর বদলে তখন থেকে নেহরু হলেন রানীর নয়া ‘ভাইসরয়’ বা প্রতিনিধি। ফলে ভারতের পড়শি দেশ যারাও ভারতের সাথে বা অংশ হয়ে ব্রিটিশ কলোনির অংশ ছিল, কিন্তু এখন এসব স্বাধীন দেশ হলেও সেই সূত্রে নেহরুর নয়া “কলোনি-অধীনস্থতা” তাদের মানতে হবে।

    ভারত এ কথাগুলোই রিপিট করা শুরু করেছিল যখন চলতি শতকে চীনা অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়ে যাওয়াতে এশিয়া-আফ্রিকা সবখানেই এর চীনা প্রভাব বাড়ছিল। ফলে  ভারতের পড়শি দেশগুলোর উপরও চীনা প্রভাব স্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল। কিন্তু ভারত চীনের মতই পালটা নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে না, যে মুরোদ তার এখনো হয় নাই তাই, বরং নেহরুর সামন্ত-কলোনি স্টাইল দিয়ে কিছু করার খামোখা চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর আমাদের সরকারের নিজ দুর্বলতার কারণে বিদেশী সাংবাদিক বা ভারতীয় সাংবাদিক পেলেই তাকে তোষামোদ করতে চেষ্টা করা থেকে এসব সমস্যা তৈরি হয় বলে অনেকে অনুমান করে। খুব সম্ভবত এমন কিছুর ফ্যারে পড়েই মন্ত্রীর এই বিপর্যয়!

    ৪।  তবে কোন সূত্রে (FT)এফটির প্রতিনিধি অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে অ্যাকসেস বা প্রবেশ-অনুমতি পায় ও কথা বলতে পেরেছিল সেটা এক বিরাট কৌতুহল ও রহস্য। অবশ্যই। কারণ মন্ত্রী এই সাংবাদিকের সাথেই চীন কেমন, শ্রীলঙ্কার সঙ্কটে চীনা ঋণের স্বভাব খাসলত কেমন ইত্যাদি যেন এটা তাদের খোশগল্প-আলাপের সাবজেক্ট ছিল, মন্ত্রী সে আলাপ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে করেছেন! আর এমন বিশেষ আগ্রহ বিচার করলে এটা তো ভারতের পলিসি যে চীনকে এক দানব বলে তুলে ধরতে চায়। এছাড়া যেন এই চীন এমন যে, যার বাসার ভাত চড়ে অন্যদেশকে ‘ঋণের ফাঁদে ফেলে – বিভিন্ন দেশ থেকে লুটে আনা পয়সায়’!
    কাজেই Financial Times (FT) সাথে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ দেয়ার পেছনের ঘটনার সাথে ভারত আছে, তার ইন্টেলিজেন্স আছে এমন অনুমান প্রবল। বিশেষ করে, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর মুখ দিয়ে চীনা ঋণের বিরুদ্ধে বলানো, আর এরপর সেটাকে আরেক দফায় ভারতের আরো দশটা পত্রিকায় আরো কঠোর চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ভাষ্য হিসাবে দ্রুত উপস্থাপন যেখানে আবার সেন্ট্রাল রোলে হিন্দুস্তান টাইমসকে রাখা- এ এক বিরাট খবর ম্যানিপুলেশন, প্রপাগান্ডা-হিন্দুত্বের জাতিবাদী চীনবিরোধী জোশ তৈরি করে ভারতের এক মহা-প্রপাগান্ডা তৎপরতা অবশ্যই!  সেটা ভারত করলে করুক যা ভারত আর চীনের ব্যাপার; কিন্তু ভারত এই প্রপাগান্ডা করেছে আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাঁধে বন্ধুক রেখে। যেটা অবশ্যই আমাদের সবার জন্য বদারিং পয়েন্ট! এটা ইনসাল্টিং; বিব্রতকর! তাতে এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, তিনি চীনা ঋণের নিন্দা করেন আর নাই করেন তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, তিনি ভারতের হাতে ব্যবহৃত হয়ে গেছেন। এবং সেটা জেনে বা না-জেনে!

    ৫। এফটির রিপোর্টের শিরোনামে একটি শব্দ হল, ‘বিআরআই’ [BRI] লোন মানে বেল্ট-রোড প্রকল্পের লোন। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে চীনা লোন মানেই যেন তা বিআরআই!  না, তা একেবারেই না। এটা ভারতীয় অনুমান এবং এটা মিথ্যা অনুমান। এর কারণ যখন বেল্ট-রোড প্রকল্প যার শুরুতে ২০১৩ সালে নাম ছিল ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড; আগে কয়েক বছর তা চলার পরে ২০১৭ সালে বিআরআই [Belt road Initiative] নাম দিয়ে সম্মেলন ডাকা হয়েছিল কেবল তখনি ভারত বিআরআই প্রকল্পের প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছিল। ভারতকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছিল আর তাতে অপারগতা প্রকাশ করতে গিয়ে ভারত প্রথম তার বিরোধিতা প্রকাশ্যে এনেছিল। কাজেই সবকিছুকে  ‘বিআরআই’ বলে হাজির করা নিজের ঘৃণা-বিরোধিতা প্রকাশ এটাই তো ভারতের অবস্থান!
    আরেক মজার দিক হল, মোদির ভারতে কি চীনা অবকাঠামো ঋণ নেই? মোদি মূলত ২০১৪ সালের আগে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই চীনা সখ্যতা, চীনা অবকাঠামো ঋণের পথ খুলেছিলেন। আর সেটাই তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার পরে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। কাজেই চীনা অবকাঠামো ঋণ  অবশ্যই আছে; মোদির প্রথম পাঁচ বছরে এ সখ্যতা ছিল ঘোরতর। ভারতের রেলওয়ে আধুনিকায়ন (স্টাফ ট্রেনিংসহ), এছাড়া ভারতের অন্তত পাঁচটা শহর আধুনিক অবকাঠামো নতুন করে গড়ে দেয়াসহ আরো অনেক অবকাঠামো প্রকল্প সেখানে নেয়া ছিল। কিন্তু বিআরআই বিরোধিতার পর থেকে ভারতে চীনা ঋণ বিষয়ে সব পাবলিক ইনফরমেশন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এখানের জন্য সার কথা হল, চীনা ঋণ মানে বিআরআই নয়। যেমন বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোন বরং নন-বিআরআই।  যদিও কোনো নন-বিআরআই লোন পরে বিআরআই হিসেবে উভয়পক্ষ মেনে নিয়েছে এমনও হয়েছে। আবার পদ্মা সেতুকে বিআরআই বলে দেখাতে রাজি হননি হাসিনা।
    আবার যদি আরেকটু আগাই তবে  চার দেশীয় চীনের কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা-কলকাতা [BCIM] যে রেলপথ পরিকল্পনা ছিল সেটা এখন সেভাবে নাই, পরিত্যক্ত। এর বদলে সেটা এখন কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা বলে কাজ চলছে। তাতে ভারত সরে গেছে মানে ঢাকা-কলকাতা পদ্মার রেলপথ হলে সেটা দিয়ে কানেক্ট করার কথা ছিল; তা আবার আলাদাভাবে শুধু ঢাকা-কলকাতা হয়ে আছে। ফলে চার দেশীয় ঐ প্রকল্প ছিল সত্যিকার বিআরআই। কারণ কোন প্রকল্পকে BRI বলার প্রধান নির্ণায়ক হল যে মূল বিআরআই এর সাথে তা যুক্ত হবে কীনা!!  যেকোনো অবকাঠামো যা ইউরোপ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে চীন হয়ে (সাথে অবশ্য সমুদ্রপথে আফ্রিকা যুক্ত) এরপর এশিয়ায় ছড়িয়ে বিভিন্ন দেশে – এটা হল সেই মূল বিআরআই। এমন মূল বিআরআইয়ে যুক্ত নয় তেমন চীনা প্রকল্পও বাংলাদেশে অনেক আছে। কাজেই সাধারণভাবে চীনা ঋণ না বলে সব ঋণ কে বিআরআই বলার মানে হল যেটা  একমাত্র ভারতই যার সুনির্দিষ্ট করে বিরোধিতা করে!

    কেন এসময়ে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডাঃ
    আগে যেমনই হোক, গত প্রায় দুই মাস ধরে ভারত বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা  বাড়িয়েছে। এর প্রধান দুটা কারণ মনে করা হয়। প্রথমটা হল, গত এক দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি; এটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ডাটা থেকে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই ফিগার নিয়ে ভারতে মোদিবিরোধীরা মোদির অর্থনীতি খারাপ চলছে, ফেল করেছে এর প্রমাণ বলে পাবলিক পর্যায়ের সমালোচনা তুলে ধরে এসেছে। সেটা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বা আরো ফেলবে বলে মোদির আশঙ্কা। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ডলার সঙ্কটে বা আইএমএফের কাছে হাত পেতেছে – এ তথ্য ব্যবহার করে ও ব্যাপক প্রচার করে মোদি তার অভ্যন্তরীণ ভোট-কাটা বিরোধীদের সোজা বা শায়েস্তা করতে চান, এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে ভারত ব্যাপক প্রপাগান্ডা করে তুলে ধরছে।

    দ্বিতীয় কারণটাও ভারত এর সাথে যুক্ত করেছে। সেটা হল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ হল চীনা ঋণ – এই কথাটা মিথ্যা হলেও ভারতের খায়েস – মিথ্যা প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ছেয়ে ফেলা যাতে ভারত তার চীনবিরোধী প্রচারের সব কাজ সেরে ফেলতে পারে।

                                   Chinese naval Hi-tech Tracking Ship Yuan Wang 5 docking at Sri Lanka’s Hambantota Port

    এদিকে আমাদের সরকারের এখনকার চাওয়া হল, আমেরিকান অবরোধের চাপের সাথে সে এখন ডলার-অর্থনীতির সঙ্কটে পড়েছে, এখানে ভারত তাকে সহায়তা করুক। চাইছে গত ২০১৩-১৪ সালের মত, বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান চাপ ভারত সামলে দিক। কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারত আর আমেরিকা বা বাইডেনের সম্পর্ক আর সেখানেই নাই; ভারত আর সেই প্রিয়পাত্র নাই। আসলে আমেরিকা আর ভারত, এদের উভয়ের স্বার্থ উভয়ের মৌলিক বিরোধী হয়ে দেখা দেয়া শুরু হয়ে গেছে। যদিও তাই বলে এখনই সম্পর্কচ্যুতির ঘোষণা দিলে তা আরো ক্ষতিকর হবে, তাই এটা রুটিন সম্পর্ক করে ফেলে রাখা হয়েছে; যদিও এখনকার পরিস্থিতিটা এমন যেমন,  মূল ফ্যাক্টর ভারত যতই রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে যাবে তত দ্রুত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক সব ভেঙে পড়বে। যেমন সর্বশেষ উদাহরণটাই দেয়া যাক। গতকাল রয়টার্সের নিউজ হল – ভারত রাশিয়ার অশোধিত তেল গোপনে এনে শোধন করে অন্যদেশকে সরবরাহ করছে – U.S. says India hid Russian origin of fuel shipped to U.S.,] এতে স্বভাবতই বাইডেন ক্ষুব্ধ।
    কাজেই এঅবস্থায় আমাদের সরকারের আকাঙ্খা মোতাবেক ২০১৩-১৪ সালের সুখস্মৃতিতে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সব জেনেও এবাস্তবতা মানতে সরকারের মন সায় দেয় না। বিশেষ করে তার ভয়, সে একেবারে একা হয়ে যাচ্ছে। তাই বারবার হাত বাড়ায় আর একটা করে ভারতের ঝাপ্টা খাচ্ছে।
    বাংলাদেশ সরকারের এ’আকাঙ্খা ন্যূনতম কোন বাস্তব রূপ দিতে ভারত অক্ষম বটে কিন্তু তাতে কী বাংলাদেশকে লুটে খাওয়া, অপব্যবহার করা এটা এখন ভারতের একটা বড় সুযোগ ও কাজে দাঁড়িয়ে গেছে।

    তাহলে অপর কাজটা কী?
    পুরানা কাহিনী হল,  চীন-আমেরিকার সম্পর্ক ২০১০ সালের পর থেকে প্রথম তিতা হতে শুরু করেছিল। অন্যভাবে বললে, প্রেসিডেন্ট ওবামা যতই এটা টের পাচ্ছিলেন, ততই বেশি করে চীনকে – বাণিজ্যিক সুবিধায় ছাড় দিতে হবে – ওবামার এদাবিকে জায়গা করে দিয়ে চীন আমেরিকাকে ম্যানেজ করছিল। কিন্তু এটাও অকার্যকর হতে শুরু করে পরে স্পষ্টত ট্রাম্পের দ্বিতীয় বছর থেকে। তবু চীন যেটা মেইন্টেন করে গেছে তা হল – সে দ্বিপাক্ষিক ডায়লগের রাস্তা শক্ত মনোযোগে খোলা রেখে চলতে পেরেছিল। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্পীকার পেলোসির তাইওয়ান উত্তেজনা সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। তাতে চীন এখন বাইডেনের ওপর এত ক্ষুব্ধ যে, পাবলিকের ভাষায় বললে, চীন আমেরিকার ফোন ধরছে না। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকাও, সেকালে কখনো দু’পক্ষ এমন ফোনের নাগালের বাইরে থাকেনি। কারণ এমন বাইরে থাকা মানে তাতে অনিচ্ছাতে বড় সামরিক সঙ্ঘাত যেকোনো সময় টার্ন নিতে পারে, যখন দু’পক্ষের হাতেই কঠিন মারণাস্ত্র মজুদ!

    এদিকে এ’পরিস্থিতিতে চীনের একটা হাই-টেক ট্র্যাকিং জাহাজ হাম্বানটোটা বন্দরের দিকে আগাচ্ছিল বন্দর থেকে রিফুয়েলিং ইত্যাদি রুটিন সুবিধা গ্রহণের জন্য। এটা অসামরিক গবেষণা মনিটরিং-এর  এক হাইটেক জাহাজ নাম “ইউয়ান ওয়াং ৫“। রয়টার্স লিখেছে, ” Foreign security analysts describe the Yuan Wang 5 as one of China’s latest generation space-tracking ships, used to monitor satellite, rocket and intercontinental ballistic missile launches.”
    কিন্তু চীন নিয়ে মানসিকভাবে ম্যানিয়াক ভারত তবু এটা নিয়ে হাইপ বা হৈচৈ তুলবেই। তাই ভারত ততই আমেরিকার মনোযোগ আকর্ষণে যেন এনিয়ে তীব্র আপত্তি হইচই ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ায় তুলেছিল; যদিও ভারতের শেষ লক্ষ্য এসবের কোন কিছু নয়।  আসলে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভারত নিজের ক্ষুদ্র সক্ষমতার ব্যবহার করে (নগদ বৈদেশিক মুদ্রায় লোন দেয়া নয়); তবে ভারতের ভেতরের বাজার থেকে যা যা রুপিতে কেনা যায় এমন প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চাল-গম ধরনের খাদ্য আর তেল-গ্যাস জ্বালানি ইত্যাদি লোন হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে পাঠিয়েছিল। এখন শ্রীলঙ্কায় আপাতত ভারত বা ভারতের সাথে চীনের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিমূলক এন্ট্রি নেই; বরং আমেরিকা একা মাতবরি করছে আর সেই খুশিতে ভারত মেটেরিয়াল লোন-সহায়তা নিয়ে এগিয়েছিল। কিন্তু রনিল বিক্রমাসিং নয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে গেলে ভারতের ভাগে অন্তত সাহায্য-সমতুল্য কর্তৃত্ব-প্রভাব কোন কিছুই আসেনি। কিন্তু এ্টা ভারত আশা করছে। সেই  মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আমেরিকার চেয়েও উচ্চৈঃস্বরে চীনা জাহাজের এসফরের বিরোধিতা ও আপত্তি দায়ের করেছিল শ্রীলঙ্কার কাছে। কিন্তু আমেরিকা ভারতের সাথে মিলে শ্রীলঙ্কার সাথে দেনদরবার কিছু করতে যায় নাই। যা করেছে একাই।  ফলাফলে গতকাল সকালেও ভারতের মিডিয়া ভারত কত শক্তিশালী আর চীন কত দুর্বিনীত তার ঢাক পিটাচ্ছিল যেন, ভারত চীনকে ঠেকিয়ে দিয়েছে আর পারলে সে চীনা জাহাজ আর বন্দরের মাঝে ভারতীয়-নৌবাহিনী দাঁড় করিয়ে চীনকে ভাগিয়ে দেয়।
    আসলে এনিয়ে গত তিন দিন ধরে ভারতীয় মিডিয়ায় মোদি সরকারের চীনবিরোধী ‘দেশপ্রেম’ আর দেশের কত স্বার্থসচেতন তারা এরই মহিমা প্রদর্শিত হচ্ছিল। এজন্য এর সাথে মিলিয়ে, বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ব্যবহার করে “চীন কত খারাপ” এটা তুলে ধরাটা এক বিরাট প্রপাগান্ডা মিডিয়া উচ্ছাস ঘটিয়েছিল।

    কিন্তু হায়! ভারতের এক পত্রিকা WIRE গত ১২ আগষ্ট সন্ধ্যায় ভারতের সব উত্তেজনায় ঠান্ডা পানি ঢেলে লিখেছে, শ্রীলঙ্কা সরকার চীন জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে অনুমতি দিয়েছে। কারণ, চীন ও আমেরিকার এ বিরোধিতা কেন তারা করছে এর সপক্ষে  যুক্তিগ্রাহ্য যথেষ্ট কারণ তারা দেখাতে পারেনি। আসলে এই ঘটনায় শ্রীলঙ্কা দেখিয়ে দিল এখনও সে ভাত-আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম!!!

    সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক, কেবল একটাই বেছে নিতে হবেঃ
    এটা এক তত্বকথার ‘হেদায়েত’ বাণী! কী হতে চান, সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক? তার মানে হল যেকোন একটা নিতে হবে। দুটোই এক সাথে হওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ঠিক তাই। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রবাদী উগ্র দেশপ্রেমিকরা হিন্দুত্ববাদীদের মতই ব্যাপারটা বুঝতে নারাজ। আসুন,  তা নিয়ে আলাপ করি। সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হল, ফ্যাক্টস। এতা ফ্যাক্টস বেসজড হতে হবে! একেবারে অবিকৃত বা এদিক-সেদিক মানে করা নয় বা ইঙ্গিত করে বলিয়েছেন, ফেবার করেছেন ইত্যাদি, এমন করা যাবে না। ফ্যাক্টের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে হবে।

    এখন এভাবে চললে এর অনেক কিছু আপনার দেশের স্বার্থের বিপক্ষে যেতেও পারে। তবু, বাস্তব-সত্য তো সত্যই তা ময়ানতেই হবে। এখন তাহলে আপনি কী চান? যদি সাংবাদিকতা চান তাহলে দেশপ্রেম প্রদর্শন তা হোক না-হোক তা পাশে ফেলে রেখে আপনাকে সাংবাদিকতা বা সাংবাদিক স্বার্থকে উপরে তুলে ধরতে হবে। জার্নালিজমকে ফাংশন করতে দিতেই হবে।
    কিন্তু ভারতীয় বর্ষীয়ান সম্পাদক শেখর গুপ্তা সাংবাদিকের আগে দেশপ্রেমিক হতে চান। তাই বাংলাদেশের এই মন্ত্রী-উপাখ্যান নিয়ে ভারতের  তার নির্মিত ভিডিও ক্লিপে তিনি কড়া দেশপ্রেমিক সেজেছেন। অথচ ভারতের পাঁচজন সিনিয়র সাংবাদিকের নাম নিলে তিনি নিজে একজন হবেন। এই হল, ভারতের সাংবাদিক দুর্দশা! সাংবাদিকতাকে চিপায় ফেলে দেশপ্রেমিকের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় নেমেছেন তিনি! দেখুন তার ইউটিউব! 

    তিনি শেখর গুপ্তা এখানে দুইটা বড় মিথ্যা বলেছেনঃ
    এক। হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নিয়ে, এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে এখন শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর এই পয়সাও ঋণের বোঝা নাই। কারণ, চীনা সরকারি ঋণের অর্থে এটা নির্মাণের পরেই শ্রীলঙ্কায় এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার এসেছিল।  তারা দাবি করতে থাকে যে সরকারের পক্ষে এর ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। এটাই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সরকারকে জানায়। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়ায় এমন যেন চীনক্বে এখন শ্রীলঙ্কাকে দেয়া ঋণ ফেরত নিয়ে নিতে হবে। ফলে দুপক্ষের আলাপ-আলোচনায় এটা সাব্যস্ত হয় যে তাহলে চীনা সরকার এক প্রাইভেট চীনা কোম্পানী যোগাড় করে দিবে যে নির্মিত হাম্বানটোটা বন্দর কিনে নিবে আর এই বন্দরের আয় থেকে নিজের এই বিনিয়োগ ধীরে ধীরে তুলে নিবে। এটা সাব্যাস্তের পরে নতুন বিতর্ক উঠে বন্দরের কতভাগের মালিক হবে নয়া ক্রেতা। যেহেতু সব প্রকল্পেই অন্তত প্রকল্পের জায়গা-জমি দেয়া বা যাদেরকে সরিয়ে ঐ জায়গায় বন্দর নির্মাণ হয়েছে তাদের পুণর্বাসন ইত্যাদিতে সরকার খরচ করে বলে যেকোন বড় প্রকল্পের ৩০% এর শেয়ার মালিকানা সরকারের হয়-ই। তাই ঐ চীনা প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার মালিকানা এখন প্রকল্পমূল্যের ৭০%।  আর ঠিক একারণের শ্রীলঙ্কা সরকার  হাম্বানটোটা বন্দরের মালিকও নয়, এনিয়ে কোন চীনা ঋণপরিশোধের দায়ও সরকারের নাই। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা সরকার অর্থনীতি ফেল করার পিছনে হাম্বানটোটা বন্দরের কোন ভুমিকাই নাই। অথচ শেখরগুপ্তা হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়েই যাচ্ছে।
    দুইঃ অন্যান্য চীনা ঋণ শ্রীলঙ্কাকে গছিয়ে দেওয়ার ভারেই ওদেশের অর্থনীতি ঢুবে গেছে?
    এটাও শতভাগ মিথ্যা।  এনিয়ে আমার আগের  ১৬ মে ২০২২ তারিখে লেখা শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’ এখানে বিস্তারিত আছে। শেখর গুপ্তা দাবি করছেন চীনা ঋণই শ্রীলঙ্কার অর্থনঈতি ফেল করার কারণ। অথচ তিনি ফ্যাক্টস অনুসরণ করতে রাজি না। ্তিনি শ্রীলঙ্কা সরকারের দেয়া কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কত ঋণ এই ফ্যাক্টস শীট অনুসরণ করে কথা বলতে চান না। সেটাই নিচে আবার তুলে এনেছি।

    এখানে শ্রীলঙ্কার সরকারের দেয়া তথ্য মতে, দেখা যাচ্ছে তাদের নেয়া মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ১০% হল চীনা লোন। এজন্য যদি চীনকে দায়ী করা হয় তাহলে শ্রীলঙ্কায় জাপানের ঋণও ১০%, বিশ্বব্যাংকের আরেকটু কম ৯% এছাড়া এডিবিও আরেকটু বেশি ১৩% – এদের সকলকেও দায়ী করতে হয় সমানে!!!। কিন্তু তা না করে কেবল চীনকে দায়ী করা মিথ্যা ও খারাপ উদ্দেশ্যমূলক অবশ্যই, সেটাই শেখর গুপ্তা ও ভারত করে চলেছে।
    আর বাস্তবে শ্রীলঙ্কার দুর্দশা বা ডিফল্ট হবার মূল কারণ, নেয়া মোট ঋণের ৪৭%, এক বিশেষ ঋণ। যেটাকে বলে সভরেন ঋণ [Sovereign loan ] যার মানে হল শ্রীলঙ্কা সরকারের ডলার বন্ড বাজারে ছেড়ে বিদেশ (যারা মূলত ব্যক্তি বিনিয়োগকারি) থেকে ডলার সংগ্রহ করেছিল। [সভরেন লোন মানে সরাসরি রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে ডলার বন্ড ছেড়ে নেয়া লোন।] আমাদের মত দেশের কিছু অতিচালাক নেতা-মন্ত্রীর কাছে এভাবে ডলার বন্ড ছেড়ে ডলার সংগ্রহকে খুব লোভনীয় খুব আরাম ও মজার মনে হয়। কিন্তু তা সব সময়ই ভীষণ রিস্কি এদিকটা তারা ভুলে থাকতে চায়। কারণ এই ঋণ ফেরত দেওয়ার যে কিস্তি তা প্রায়ই সরকার সময়ে ফেরত দিতে পারে না ফলে ডিফল্টার হয়ে যায়। যা থেকে গ্লোবাল ঋণ-বাজারে বদনাম ছড়ায় ব্যাপকভাবে! আর এটাই হয়েছে শ্রীলঙ্কার বেলায়। আর শ্রীলঙ্কার সভরেন বন্ড ছেড়ে নেয়া ঋণ সবচেয়ে বেশি ৪৭%। আর একারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে আইএমএফের কাছে সারেন্ডার করে লোন চাইতে গেছে। যা বাংলাদেশের বেলায়, সে এখনও কোন ডিফল্টার নয় তবে আইএমএফের কাছে আগেই সারেন্ডার করে লোন চেয়েছে। মন্ত্রী নিজেও তাঁর প্রতিবাদলিপিতে ঠিক এদিকটায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এদিকটা  অর্থাৎ শেখর গুপ্তা একজন মিথ্যা প্রপাগান্ডার লোক যিনি নিজেকে কোন সম্পাদকের দাবি দূরে থাকে তিনি নিজেকে কোন সাংবাদিকই দাবি করতে পারেন না।

    সবশেষের কথা হল, বাংলাদেশের আইএমএফের কাছে চাওয়া ঋণ পেলেও আমাদের আরো ঋণ লাগবে যার সম্ভাব্য দাতা এক চীন ছাড়া সরকার কারো কথা ভাবতে পারছে না। এমনকি আইএমএফ দেরি করলেও এ ঋণ প্রয়োজনীয় বেশি। কিন্তু এ ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সম্ভবত চীনের শর্ত হতে যাচ্ছে, যেসব চীনা প্রকল্প আগে ভারতের আপত্তিতে বাদ পড়েছে বা ঠেকিয়ে রাখা আছে – সেসব এবার আমাদের সরকারকে অনুমোদন দিতে হবে। ভারত সম্ভবত সে জন্য এমন আগ্রাসী! কিন্তু অক্ষম ডেস্পারেট! তাহলে, অর্থমন্ত্রী কী বুঝে এফটি-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন? যা তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিতে হয়!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা দৈনিক “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার ১৩ আগষ্ট ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে “অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার“ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি কী এই শীতের আগে-পরেই!

    ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি কী এই শীতের আগে-পরেই!  

    গৌতম দাস

    ২৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4ba

     

    How Will the Ukraine War End? 10 Experts Weigh In

    ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আর বাইডেনের অপ্রয়োজনীয় বাহাদুরি দেখানোর নীতি-পলিসির পতন – এসব ব্যর্থতা কি আসন্ন? অবস্থা যেন ক্রমেই সেই অভিমুখেই হাঁটছে! ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি স্টেজে নাটক করতে করতে স্বপ্ন-কল্পনা দেখিয়ে তাদের পপুলার ভোটে ক্ষমতায় এসে পড়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে এখনও নাটক করছেন। ভেবে নিয়েছেন মানুষের জীবন রক্ত-মাংসের বাস্তব মানুষের নয়। এদিকে সাতাশ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ),  তাদেরকেও সাদা এথনিক-জাতের দুনিয়া শাসনের “শ্রেষ্ঠত্ববাদ” পেয়ে বসেছে। জেলেনেস্কি আর ইইউ-কে বাস্তবতা ফেলে চটকদার স্বপ্ন-কল্পনা দেখানোর নায়ক যাদুগর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সকলেই এক ব্রেকডাইন পয়েন্টের দিকে চলেছেন যেটা সম্ভবত চলতি বছরের শেষভাগে!!   গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল আসন্ন, কঠিন ভাবেই আসন্ন!! বাইডেনের “ওয়েস্টার্ণ ফোর্স” তা স্বীকার করুক আর নাই করুক কিছু যায় আসে না! বাস্তবতা অস্বীকার করে কেউ টিকে নাই। আপনার-আমার পছন্দ-অপছন্দের উর্ধে থাকে যেটা সেটাই বাস্তবতা!

        Biden’s Dangerous New Ukraine Endgame: No Endgame   – Foreign Policy

    ওয়্যার অন টেরর কুখ্যাত বুশের সাগরেদ টনি ব্লেয়ার সবার আগেই ভেঙ্গে পড়েছেনঃ
    ইউক্রেন যুদ্ধকে, ইইউ-এর নেতারা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এটা শুরু হওয়ার পর থেকে একে “রাশিয়ান আগ্রাসনের যুদ্ধ” বলে আসছেন। কিন্তু টনি ব্লেয়ারের কথা আমরা নিশ্চয় ভুলে যাইনি। এককালে যার প্রধান পরিচয় হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-৮) জুনিয়র বুশের কুখ্যাত ওয়্যার অন টেররের কালে ইনি তার ঘনিষ্ঠতম সাগরেদ; সহযোগী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৭-২০০৭) ছিলেন এই টনি ব্লেয়ার। তারা যৌথভাবে ইরাকে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে মিথ্যা অস্ত্র মজুদের কথা বলে “রেজিম চেঞ্জ” তত্ত্বে ইরাকে হামলা ও দখল করেন; পরে সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করেন ও ফাঁসিতে ঝোলান।

    “After Ukraine, What Lessons Now for Western Leadership?” –  Tony Blair

    পশ্চিমা আধিপত্যের দিন শেষ হওয়ার পথেঃ
    সম্প্রতি সেই টনি ব্লেয়ার এবার আবার রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। তাঁর এক নয়া বক্তৃতামালার  “‘ইউক্রেনের পরে, পশ্চিমা নেতৃত্বের জন্য কী শিক্ষা হলো?’ [“After Ukraine, What Lessons Now for Western Leadership?” ]; এই শিরোনামে ব্রিটেনে আহূত এক সভার বক্তৃতায় টনি ব্লেয়ার বলেছেন, “ইউক্রেন যুদ্ধ দেখাল দুনিয়ার ওপর পশ্চিমা আধিপত্যের দিন শেষ হওয়ার পথে যেহেতু দুনিয়াতে নয়া সুপার পাওয়ার হিসেবে চীনের উত্থান ও আসীন হওয়া ঘটছে; এই চীনের পার্টনার হলো রাশিয়া। তবে এই শতাব্দীর এটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মোড় পরিবর্তন” [ “The Ukraine war shows that the West’s dominance is coming to an end as China rises to superpower status in partnership with Russia at one of the most significant inflection points in centuries”, former British Prime Minister Tony Blair said.]।
    টনি ব্লেয়ারের বক্তৃতার ইউটিউব লিঙ্ক এখানে।

    তিনি যেন সব খোলাখুলি বলে ফেলতে চাইছেন, আর মিথ্যার টেনশন নিতে পারছেন না। তাই স্বীকার করে বলছেন, “দুনিয়ার ইতিহাস এক মোড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গেছে যা একমাত্র তুলনা করা সম্ভব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার সাথে। শুধু ফারাকটা এই যে, পশ্চিম আর এবার উপরে উঠছে না, বরং পরিষ্কারভাবেই পতিত, নিচে নামছে। পরিষ্কারভাবেই আমরা পশ্চিমারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পতনের প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছি” [The world, Blair said, was at a turning point in history comparable with the end of World War Two or the collapse of the Soviet Union: but this time the West is clearly not in the ascendant.]।

    সেই ২০১৪ সাল থেকে এই কথাগুলোই আমি এতদিন আমার লেখায় বলে আসছি। আর বলেছি, ‘এই মোড় পরিবর্তন ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান যেমন ঘটেছিল কেবল তার সাথেই তুলনীয়। তবে টনি ব্লেয়ার একে বাড়তি ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার সাথেও তুলনা টেনেছেন। এই তুলনা ভুল, সমতুল্য ঘটনা নয় বলে।  তাই এটা তিনি না তুললে তাঁর জ্ঞানবদ্ধি সম্পর্কে পাঠকের ধারণা ভাল থাকত। যাই হোক, আজ আমেরিকান নেতৃত্ব লাভের ৭৫ বছর পরের এঘটনা; এর সাথে পার্থক্য কেবল আমেরিকার জায়গায় এবারে চীনের উত্থান ঘটছে। সাথে এটাও বলেছিলাম, এসবের মূল কথাগুলো আমার কথা একেবারেই নয়। বরং আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে-স্টাডি রিপোর্টের ফাইন্ডিংস থেকে পাওয়া।

    লক্ষণীয়, এখানে আমি ‘চীনের ফাইন্ডিংস’ বলিনি। তবু আমেরিকান-প্রীতিতে থাকা লোকেরা এর অর্থ করেছিল যে, আমি  নিশ্চয় আমেরিকাকে দেখতে পারি না আর ওদিকে, কমিউনিস্ট বলে চীনকে পছন্দ করি, তাই আমি এসব বলেছি।

    তাই আমি আবার এও বলেছিলাম, কোনো রাষ্ট্রের এমন গ্লোবাল নেতৃত্বে অর্থনৈতিক উন্নতি; এটা একেবারেই অবজেকটিভ (objective) ঘটনা। মানে, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্প যেমন অবজেকটিভ ঘটনা, এগুলো কর্তা-মানুষের ইচ্ছায় ঘটে না।  যুদ্ধ লাগাব বা লড়ব বলে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন সাবজেকটিভ বা কর্তা মানুষের কাজের ঘটনা- এটা তেমন নয়। কোনো দেশের শাসককুল আগ্রহ করে যুদ্ধ লাগাতে পারে কিন্তু বাস্তব সুযোগ থাকাসহ অনেক কিছুই আলোচ্য ঘটনাবলিতে অবজেকটিভ বাস্তবতা হয়ে থেকে যায়। তাই সবকিছুই মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়া এটা কোন মানুষের ইচ্ছায় তার  সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার নয় বরং ‘বাস্তব করে দেখানোর’ ব্যাপার মানে কষ্ট করে বাস্তবে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হয়ে দেখানোর ব্যাপার।

    সে যাই হোক, আমরা দেখছি বুশের সহযোগী ব্লেয়ার, এখন আগেভাগেই সব স্বীকার করে নিলেন (তার পুরা বক্তৃতা এখানে)। বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন এখনও তাঁর জিদ আর সাদা শাসন চালিয়ে যাবার স্বপ্নে বিভোর আছেন! ওদিকে পরিচিত আর বড় নেতাদের মধ্যে যারা এর আগে ব্লেয়ারের মতই স্বীকার করে নিয়েছিলেন তিনি হলেন – জিমি কার্টারের আমলের আমেরিকান এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সেক্রেটারি অব স্টেট (১৯৭৭-৮১) ব্রেজনেস্কি (Zbigniew Brzezinski)। আমার জানা মতে তিনিও প্রথম এমন স্বীকারোক্তি করেছিলেন।  কারণ তাঁর জমানাতেই চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান ঘটেছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরের দেশে অফিস চালু হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ থেকে।   আগ্রহিরা দেখতে পারেন Surveying a Global Power Shift নামে তাঁর বইতে, নিউইয়র্ক টাইমস এর রিভিউ দেখা যাবে এখানে। 

    মনে হচ্ছে, টনি ব্লেয়ার এক্ষেত্রে সমসাময়িকদের চেয়ে এগিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন? তিনি ব্লেয়ারের উল্টা! জিদ ধরলেন; আর যদিও ইতিহাস বলে এগুলো একেবারেই জেদাজেদি বা প্রতিহিংসার বিষয়ই নয়। বাইডেনের ক্ষমতায় আসার আগের তাঁর বোকা ও অবাস্তব সাফাই-যুক্তি ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প (তাঁর চেয়েও) বোকা, গোঁয়ার ও আরেক জেদি, তাই ট্রাম্প নাকি  চীনসহ অন্যান্যদের শায়েস্তা করতে এখনো আমেরিকার হাতে কী কী অস্ত্র মজুদ আছে তাই-ই জানেন না। বিপরীতে, বাইডেন যেন তা জানেন। আর সেগুলো ব্যবহার করে বাইডেন দুনিয়াকে দেখিয়ে দিতে চান ও পারবেন যে, আমেরিকার দিন শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু আমেরিকার হাতের কী বিশেষ অস্ত্র যা তাকে এখনো গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন করে রাখবেই বলে তার নিজের অনুমান?

    বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে (যদিও মনে খায়েশ ছিল যদি রাশিয়াকে বাঁচাতে চেয়ে চীনও সাথে নেমে যায়) নামিয়ে এরপর আমাদের দেখালেন তার চোখে আমেরিকার সঞ্চয়ে থাকা বিশেষ অস্ত্রগুলো কী কী? তিনি খুলে দেখালেন ‘ডলার অবরোধ’ আর মানবাধিকার– এই দুটো আমেরিকার হাতের অস্ত্র বলে মনে করেন বাইডেন; যা আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর (অবশ্যই তা অপব্যবহার, তাহলেও) তিনি তা প্রয়োগ করে তাদের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাবু করে ফেলে, সারেন্ডার করতে বাধ্য করে জিতে যাবেন। মোটামুটি এই হল তার মূল তত্ব!!!

    এখানে ‘ডলার অবরোধ’ মানে হল, বাইডেন মনে করেন তিনি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ দেশকে মার্কিন ডলারে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে না দেয়া বা ওসব দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবেও ডলারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই বাইডেন সহজেই ধসিয়ে দিতে পারেন। যেহেতু ডলার গ্লোবাল বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও চালু মুদ্রা, তাই তিনিই সফল হবেন।’ এই ছিল বাইডেনের মূল অনুমান!

    অন্য দিকে, মানবাধিকার বলতে, বাইডেন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবেন। ভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ কারো জেনুইন  মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলতেই পারে। এর উপযুক্ত ফোরামও আছে, সেটা হল জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার অফিস। কিন্তু এখানে বাইডেন তা তুলবেন নিজ রাষ্ট্রের তরফে আর মানবাধিকারকে নিজ পররাষ্ট্রনীতির অংশ করে নিয়ে, আর এর শাস্তিও দেবেন নিজেই। তাই সত্যিই ওই রাষ্ট্র মানবাধিকার চরম লঙ্ঘনের দেশ হলেও- আমেরিকার এই অভিযোগ তোলার স্বচ্ছতায় সমস্যা তাতে থেকেই যায়। মানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ জেনুইন হলেও এই অভিযোগ তুলে একে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে ফায়দা তোলা – বাইডেন এই অপব্যবহারের দিকটাই এখানে প্রধান।

    এছাড়া বাইডেন তো পরিষ্কার করেই জানাচ্ছেন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও গ্লোবাল লিডারশিপ ক্রমেই আসন্ন হয়ে উঠলেও তিনি তা মানবেন না। উল্টা, চীনা উত্থান  ঠেকানোর জন্য লড়বেন।

    অর্থাৎ তিনি অপব্যবহার করবেন। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও গ্লোবাল লিডারশিপে বদল আসন্ন হয়ে উঠা – এই বিষয়গুলো কী কোন আমেরিকার সরকারি দলিলে স্বীকার করা হয়েছে? কোনো আমেরিকান সরকারই বা কি এটি স্বীকার করেছে?

    বাস্তবতা হল, হ্যা অবশ্যই স্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে সার্ভে-স্টাডি রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে গত ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে। গ্লোবাল ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস নামে যেমন শুরু হয়েছিল গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০০৮ নামে ২০২৫ [Global Trends 2025: A Transformed World] সালের দুনিয়া কেমন দেখতে হবে এ নিয়ে, এটা আমেরিকান প্রথম সরকারি দলিল। আবার, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০১২ নামে ২০৩০ সালের দুনিয়া কেমন, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০১৭ নামে ২০৩৫ সালের দুনিয়া কেমন এভাবে নিয়মিত রিপোর্ট বের হয়ে এসেছে। আর মজার কথা হল, এসব কোনো রিপোর্টেই, এই ট্রেন্ড বা গ্লোবাল অভিমুখগুলোকে গায়ের জোরে কোন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কি রোধ করতে বা ঠেকাতে যাওয়া উচিত অথবা যাওয়া সম্ভব?

    না, তা একেবারেই ওসব রিপোর্টে উৎসাহিত করা হয়নি। বরং অবজেকটিভ ঘটনা হিসেবে সেগুলো উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও বুশের আমল থেকে শুরু করে শেষে ট্রাম্প এবং বাইডেন পর্যন্ত এই আসন্ন বদল বা চীনা উত্থানকে উল্টে দিতে সব প্রেসিডেন্টেই চেষ্টা-পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছেন, আমরা দেখছি। যেমন বুশের আমল ২০০৬ সাল থেকে চীনের উত্থান ঠেকাতে ভারতকে সুবিধা, পিঠ চাপড়ানি দিয়ে ভারতকে ব্যবহার করার পলিসি বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। চীন ঠেকাতে ভারতকে ঠিকা দাও, এই নীতিকে বুশসহ পরবর্তী সব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অনুসরণ করে চলে এসেছেন। কিন্তু তাতে আবার কোন ফলাফল না দেখে ভারতকে সুবিধাদি দেয়া বন্ধ করেছিলেন (২০১৭) একমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পই। আর বাইডেন এসে ভারতের বিরুদ্ধে নানাবিধ মানবাধিকারের লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তা মুখেই কিন্তু কোন অবরোধ আরোপ কখনোই করেননি এখনও।

    সারকথায়, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান কোন কিছুতেই ঠেকবে না- তা জেনেও সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই কমবেশি ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে লেলানো-সহ নিজেই চীনের বিরুদ্ধে নানা কিছুই করে গেছেন, যাচ্ছেন যার আবার বিশেষ একটা হল, বাংলাদেশকেও ভারতের হাতে তুলে দেয়া যাতে ভারত আরামে আমাদের ছিঁড়ে খেতে পারে এমন সরকারও বসিয়ে দিয়েছে। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে নামিয়ে এরপর আমাদের দেখাতে চেয়েছিলেন রাশিয়ার ওপর ইউরোপের ইউরো আর আমেরিকান ডলার অবরোধ করে কত সহজেই তিনি রাশিয়াকে পরাস্ত করে ও মাফ চাওয়াতে বাধ্য, তারা ঘটাতে পারেন। কিন্তু হায়! রাশিয়ান অর্থনীতি সস্তায় সহজেই ডুবে যাওয়ার বদলে রাশিয়ান মুদ্রা রুবল এখন উল্টা শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ ইইউ-আমেরিকা এদের মিলিতভাবে, বাইডেনের ভাষায় তারা ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’, বিজয়ের বেশে হাজির হবেন- এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন দূরে থাক এখন নিজেদের ইজ্জত বাঁচানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

    ইইউর এই ব্যর্থতার মূল কারণ হল – সারা ইউরোপের রাশিয়ার উপর তেল-গ্যাসের জ্বালানিনির্ভরতা, যা  সীমাহীন এবং অন্তত আপাতত বিকল্প-হীন এক দশায় তারা । এটা এক কঠিন বাস্তবতা। আর এটাই তারা স্বীকার না করে গায়ের জোর দেখাতে গেছেন। এই কঠোর বাস্তবতার কারণেই বাইডেনের সব বাহাদুরি এক ফাজলামিতে পরিণত হয়েছে। বহুবার বহুভাবে ইইউ নিজে এই নির্ভরতার দিকটা বাইডেনের সামনে তুলে ধরে দেখিয়েছেন। বলেছেন, এখন এই নির্ভরতা কাটাতে উদ্যোগ নেয়া শুরু করলেও ২০২৭ এর শেষেই একমাত্র ফল পাওয়া মানে ইইউর রাশিয়ানির্ভরতা কাটতে পারে। যদিও তেল-গ্যাস জ্বালানি জিনিষটা এমন প্রাচুর্যের না যে “আরেক দোকান থেকে কিনলাম”।  কিন্তু বাইডেনের জিদের কাছে ইইউও হার মেনেছে, অসহায় হয়ে থেকেছে। ইইউ জোটের ২৭টা রাষ্ট্র ঠিক কী কারণে কোন জাদুতে বাইডেনের কথার উপরে কথা বলার ‘ভয়েজ নাই’ হয়ে গিয়েছিল ও আছে তা সত্যিই বিস্ময়কর লাগে!!!

    অনুমান করা হয়, চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে গেলে দুনিয়া থেকে গত পাঁচ-ছয় শ’ বছরের টানা সাদা চামড়ার শাসন আধিপত্য ও দখল এবং অন্যদিকে যা এক সাদা ককেশীয় শাসন, এমন এথনিক বর্ণবাদের আধিপত্য লোপ যাতে না পায় এই লোভ দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছেন বাইডেন। ফলে ইইউকে বাইডেনের আমেরিকার সাথে বেঁধে নিয়ে জিদের ঝড় তোলেন – মানে ইইউর এসব রাষ্ট্র এথনিক বর্ণবাদ (তাদের সাদা ককেশীয় জাত শ্রেষ্ঠত্ব) এই আধিপত্য দেখানোর লকলকে লোভে পড়েছিলেন! আর এটা এতই তীব্র যে, ২৭ রাষ্ট্রের ইইউর সবাই লোভে পড়ে বোকা আর বোবা হয়ে গেল – এটা ভাবতেও হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়! অথচ এরাই এই কথিত ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ গত মাসেও তাদের মূল্যবোধ নাকি শ্রেষ্ঠ; (আর চীন-সহ আমরা বাকি এথনিক দুনিয়ার বাসিন্দারা যেন নিচা) এই বলে খুব গর্ব দেখিয়েছে! অথচ আগামী শীতে ইউরোপ জ্বালানি কোথা থেকে পাবে এর কোনো সংস্থান কথিত ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ এখনো করতে পারেনি। অর্থাৎ আগামী উইন্টারে [Winter] প্রতিটা ইউরোপবাসীকে ঘর গরম রাখার সংস্থান হয়নি বলে ঠাণ্ডায় ঠকঠকিয়ে কাঁপতে হবে নয়তো ঘরবাড়ি ছেড়ে গরমের সন্ধানে ভেগে যেতে হবে।

    বাইডেনের গত সপ্তাহের মধ্যপ্রাচ্য সফর থেকে শুণ্য হাতে ফেরাঃ
    বড় হামবড়া মুখের বাইডেন তাই জ্বালানি যোগাড়ে নিজেই মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়েছিলেন গত ১৬ জুলাই। সৌদি আরবের জেদ্দাতে আরব দেশসহ মোট দশ দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ছিল বাইডেনের সেই বৈঠক। ১০ আরব দেশ বলতে সৌদি, ইউএই [UAE]সহ ছয় গালফ স্টেট আর সাথে মিসর, জর্দান ও ইরাক এবং বাইডেনের আমেরিকা তো ছিলই যার আবার সাথে ফেউ এর মত দ্বিপাক্ষিকভাবে আমেরিকা-ইসরাইল আলাপ হয়েছে।

    বাইডেনের মুল উদ্দেশ্য ছিল দুটা। এক. মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের জন্য বাড়তি তেল-গ্যাস জ্বালানির ব্যবস্থা করা যায় কি না! আর সাথে দুই. গ্লোবাল জ্বালানি তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম দেয়া যাতে দুনিয়াব্যাপী যে মুদ্রাস্ফীতি জাগিয়ে বাইডেন ‘কৃতিত্ব’ রেখেছেন এর দায়দায়িত্ব তিনি এখন কিছু লাঘব করতে পারেন কিনা; যাতে তাঁর জিদ্দি অবিবেচক সিদ্ধান্তের দায়ভার কিছুটা কমে। কিন্তু হায়, সেটাই ব্যাক-ফায়ার করেছে। সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা বেঁচে থাকলেও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (সংক্ষেপে এমবিএস বা MBS ডাকা হয়) কার্যত তিনিই সৌদি আরবকে এখন নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এখানে নিচে সেই সভায় এমবিএস যে জবাবটা দিয়েছিলেন সেই বক্তৃতার সারাংশ নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের, আমার নিজের করা অনুবাদ তুলে এনেছি। ভুল অনুবাদের দায় আমার তবে পাঠকের কোনখানে সন্দেহ হলে মূল টেক্সট দেখে নিতে পারেন।

    গত ১৬ জুলাইয়ে রয়টার্স লিখছে : “সৌদি যুবরাজ ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান শনিবার বলেছেন, ফসিল ফুয়েল (মাটির নিচের তেল) খাতে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন ও গ্লোবাল চাহিদা মেটানোর মত শুদ্ধ (clean) জ্বালানি টেকনোলজি দরকার এবং বলাই বাহুল্য কোন, অবাস্তব জ্বালানি নিঃসরণ পলিসি নিলে তা আমাদের অকল্পনীয় পর্যায়ের মুদ্রাস্ফীতির দিকে নিবে; জ্বালানির মূল্য বাড়িয়ে দিবে, বেকারত্ব বাড়াবে এবং সমাজ ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরো দুর্বল (vulnerable) করে ছাড়বে”।

    এরপর ” সৌদি যুবরাজ তাঁর দেশের তেল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেন, এটা ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত বাড়বে যা এখন ১২ বিলিয়ন সক্ষমতায় আছে। আর এরপর আমাদের কিংডমের আর বাড়ানোর কোনো সক্ষমতা অবশিষ্ট থাকবে না”।

    তিনি এসব কথা বলছিলেন জেদ্দায় আমেরিকা ও আরবদের নিয়ে এক শীর্ষ সম্মেলনে যেখানে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উপস্থিত ছিলেন। বাইডেন আসলে আশা করে এসেছিলেন, সৌদি আরব ও তার ওপেক পার্টনাররা বাজারে আরো বেশি তেল ছাড়ুক যাতে জ্বালানি তেলের মূল্য নেমে আসে, যাতে এর প্রতিক্রিয়ায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে উপরে উঠে যাওয়া আমেরিকান-সহ সারা দুনিয়ার মুদ্রাস্ফীতি নেমে আসে, জীবন সহজ হয়। এমবিএস স্পষ্টতই দুনিয়াব্যাপী চরম মুদ্রাস্ফীতির জন্য বাইডেনকেই দায়ী করেছেন। আর তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আপনাদের সেই ভুল নীতির দায় আপনারা কেন আরবদের ওপর চাপাতে এসেছেন?

    এক কথায় বললে, এই রিপোর্টের মূলকথা হল, খুবই নরম উপস্থাপনায় কিন্তু কঠোর কূটনৈতিক ভাষায় তিনি বাইডেনের পলিসিকে বোকা জিদ্দি বলেছেন। বলেছেন, বাইডেনের চিন্তা-পলিসি অবাস্তব ফলে অকেজো! অর্থাৎ, আসলে একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের এটাও দেখতে বাকি ছিল!!!

    সেকালে ১৯৪৫ সালের বিচারে গ্লোবাল নেতা আমেরিকা আর সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের সূচনা করেছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ৭৫ বছর আগে বাদশাহ আবদুল আজিজের সাথে সাক্ষাৎ দিয়ে। আর সেই সাক্ষাৎটা ঘটেছিল মিসরে। আজ যেমন মিসর সৌদিতে এসে দেখা করেছে বাইডেনের সাথে। সেকালে ১৯৪৫ সালে বাদশাহ আজিজ উজিয়ে মিসর গিয়ে রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন । সে বছরই রুজভেল্ট গ্লোবাল নেতা হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হন। আর আজ প্রেসিডেন্ট বাইডেন সৌদি সফর করে আমেরিকান মুকুট ধুলায় লুটিয়ে দিয়ে গেলেন। কারণ, সব আলাপ শেষে, এমবিএস বাইডেনকে কোনো কিছুরই প্রতিশ্রুতি দেয়নি ।

    রয়টার্স তাই শেষে লিখছে, বাইডেনের ওই সফর শেষে “কোনো আশ্বাস বা সৌদি প্রতিশ্রুতির কোনো যৌথ ঘোষণা ছাড়াই আলাপ শেষ’ হয়েছে […but there was unlikely to be any bilateral announcements from the talks.] । তাতে সারা দুনিয়া দেখেছে এমবিএসের যেটুকু বাস্তবতা জ্ঞান আছে এই বিচারে বয়োবৃদ্ধ বাইডেন হেরে গেছেন; জিদ্দি গোঁয়ার বয়স্ক মানুষ কেউ দেখতে পছন্দ করে না। বরং আশা করে, আমাদের মুরুব্বিরা অবশ্যই আমাদের চেয়ে ধৈর্যশীল স্থির এবং অভিজ্ঞতাব্ধতায় আমাদের ছাড়িয়ে যাবেন, সর্বোপরি আমাদের সবার চেয়ে বড় বিবেচক হবেন। কিন্তু হায়! বাইডেন সবাইকেই হতাশ করেছেন! একারণে বেশির ভাগ মিডিয়ার এ নিয়ে রিপোর্টের শিরোনামের সাধারণ সুরটা হলঃ  “আরব শীর্ষ সম্মেলনে তেল চুক্তিতে ব্যর্থ বাইডেন, ফিরলেন ‘শূন্য হাতে’।”

    তাহলে কি আগামী নভেম্বরে আমেরিকান মিড টার্ম নির্বাচনে বাইডেনের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি শুধু গো-হারা হারবে? তাই নয়। আরো অনেক ব্যর্থতাও বাইডেনকে সম্ভবত আঁকড়ে ধরবে, পিষে ফেলবে!! ফলে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে আপস করার মুখে ফেলে কী বাইডেন হয়ত পালিয়ে যাবেন? আর সব দিকের বিপদ টের পেয়ে সবার আগে ইইউ কী বাইডেনের হাত ছেড়ে এবারের শীতকাল শুরুর আগেই রাশিয়ার দিকে হাত বাড়াবেন? সবাইকেই বাস্তবতার সামনে মাথা নামাতেই হয়, এই বাণী দিতে দিতে?

    এদিকে ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইউক্রেন যুদ্ধ লাগানো এটাকে মিসক্যালকুলেশনে ব্যর্থ উচ্চাশা বলা শুরু হয়েছে; ওয়াল স্ট্রিট এর দিক থেকে [President Joe Biden’s administration faces a double disaster after its Ukraine miscalculation, namely a US recession and a second strategic humiliation……] । এমনকি এটা তার স্ট্রাটেজিক মানহানিকর নাকানি বলছে। 

    কেন এমন কড়া কথা বলছিঃ
    গত ১৯ জুলাইয়ের খবর হল ইইউ ইতোমধ্যেই ‘অধোমুখ’ মানে মাথা নিচু করে ফেলেছে। অর্থাৎ ‘রাশিয়ার সাতটি ব্যাংকের উপর অবরোধের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ইইউ’– এই হল সংবাদ শিরোনাম। এটাও রয়টার্সের খবর যে এক ‘ বৈঠকে রাশিয়ার সাতটি ব্যাংকের ফ্রিজ করা অর্থ ছাড় দেয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন তারা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিটিবি, সোভকোম ব্যাংক, নোভিকোম ব্যাংক, অটক্রিটি ব্যাংক, প্রমসভায়াস ব্যাংক ও ব্যাংক রাশিয়া। তবে রুশ বৃহত্তম ব্যাংক সেবার ব্যাংকের সম্পদ ছাড়ের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক ইইউ কর্মকর্তা।

    আবার আরেক হট নিউজ দিচ্ছে রয়টার্স। সৌদি আরব নিজের তেলের বিশাল রফতানিকারক হওয়া সত্ত্বেও উল্টা রাশিয়ান তেল আমদানি শুরু করেছে কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল। কেন?

    কারণ, রাশিয়া সৌদি আরবকে ডিসকাউন্ট মূল্যে তেল বিক্রি করছে [Russia has been selling fuel at discounted prices after international sanctions over its invasion of Ukraine left it with fewer buyers. ]  বলে সৌদি আরব এই তেল আমদানি দ্বিগুণ করেছে যে তেল দিয়ে সে আসন্ন শীতে নিজের পাওয়ার স্টেশনের জ্বালানি চাহিদা মিটাবে। এতে তার নিজের বেঁচে যাওয়া জ্বালানি তেলও যার দাম বেশি তা তাকে বাড়তি সুবিধা দেবে।

    এসব খবর বাইডেনের দিক থেকে দেখলে তার জন্য আত্মহত্যামূলক বলতেই হয়! গত দুই বছরে তার নেয়া সব সিদ্ধান্ত, সব পলিসিই কি তাহলে মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে? ইউক্রেন যুদ্ধ  কী তবে থেমে যাচ্ছে!!!

    সর্বশেষ, গতদিনের খবর হল, বাইডেন ইউক্রেনের উপর কড়া শর্ত আরোপ করে রেখেছেন এই বলে যে, তারা যেন রাশিয়ার সাথে কোনো বিষয়ে আপসের কোনো আলাপই না করে। অথচ ইউক্রেন খাদ্য রফতানির দেশ হওয়া সত্বেও যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ান বাধায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য গুদামে আটকে আছে। গত এক মাস ধরে জাতিসঙ্ঘ আর তুরস্কের মধ্যস্থতায় এবং ফাইনালি এবার সেক্রেটারি জেনারেল গুতেরেস ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের উপস্থিতিতে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে যাতে আটকে থাকা খাদ্য ইউক্রেনের ওডেসা বন্দর দিয়ে বের হতে পারে। এটাও কি বাইডেনের জন্য ভালো লক্ষণ? সম্ভবত তার কপালই ভালো জানে!

    আর আজকের খবর হল, যুদ্ধে ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে রাশিয়ান এক গোলা গিয়ে পড়েছে (যদিও রাশিয়া আজ তা অস্বীকার করেছে)। ফলে কার্যত রপ্তানি কার্যক্রম থমকে দাড়িয়েছে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি মন্তব্য করেছে তারা জানতেন পুতিন এমন একটা অজুহাত বের করবেন!!! যুদ্ধে কোনপক্ষই এথিক্যাল যুদ্ধ করে না, বরং সুযোগ পেলেই ভাঙ্গে। তবে কষ্ট করে যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে চেষ্টা করে। আসলে কেউই প্রতিপক্ষের উপর সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। কাজেই জেলেনেস্কির উচিত হবে বাইডেনের পুতুল হয়ে থাকার দিন শেষ করা। কারণ, শেষে বাইডেন তাকে ফেলে পালাবেই!!! তাই, বেটার আগেই নিজের ভাগ্য গুছানো!!   ওদিকে ইউরোপিও ইউনিয়নও মুচরানো শুরু করেছে [নিজেদের আর্থিক সংকটের অজুহাতে ইউক্রেনকে সাহায্য পাঠানো বন্ধ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন]।

    সবশেষে লেটেস্ট বিদ্রোহের খবরঃ বিদ্রোহীর নাম ইটালি সাথে আছে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি যারা ইইউ এর গ্যাস ব্যবহার ১৫% কমানোর বিপক্ষে। ওদিকে পর্তুগাল ও স্পেন পাবলিকলি এই পরিকল্পনার বিরোধিতা শুরু করেছে। ইটালির প্রেসিডেন্ট বক্তৃতা দিয়ে বিরোধীতা করছে। যেটা দুদিন আগে আমাদের সময় টিভিতে দেখানো একটা নিউজ ক্লিপে প্রচারিত হয়েছে। এদিকে আজ আমাদের এনটিভি এই একই নিউজ টেলপে প্রচার করেছে। এখনই হাতের কাছে নাই তাই লিঙ্ক দিতে পারলাম না। পরে পারব। আর বিদ্রোহের মূল খবরটা আছে ব্লুমবার্গ নিউজে এখানে শিরোনাম Italy, Poland Raise Concerns About EU Proposal to Cut Gas Use.।

    ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটছে?” এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৫ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-49S

     

    Ignoring BRICS is ignoring turn of history

     

    শশী থারুর [SHASHI THAROOR] একজন ভারতীয়, কংগ্রেস দলীয় রাজনীতিবিদ। মূলত, তিনি রাজনীতিকের চেয়ে বরং একজন কেরিয়ারিস্ট; তিনি প্রফেশনাল কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি এবং গ্রাজুয়েশন করেছেন আমেরিকার স্বনামধন্য ফ্লেশ্চার স্কুল [The Fletcher School of Law and Diplomacy] থেকে। এই অর্থে তাঁর এক নামী একাডেমিক ইনস্টিটিউশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদিও তিনি ততটুকুই রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন বা চেয়েছেন যতটুকু  কেরিয়ার বাড়াতে তাঁর দরকার মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এতে তিনি যতটা যোগ্য হয়েছেন তার চেয়ে বেশি  নিজ একাডেমিক (ফ্লেশ্চার) বড়াই বা গর্ব করে থাকেন এবং তা বাড়াবাড়ি রকম। তার সমসাময়িক বা এল্যুমনিদের [alumni] মধ্যে যারা এমনকি বাংলাদেশী (ফ্লেশ্চার) তাদেরকেও এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।

    মোদির ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার আগের টানা দুই টার্ম (২০০৪-১৪) কংগ্রেসের মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় ছিল; সেই সময়কালে থারুরের কেরিয়ার ও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল। সে সময়টা ছিল কংগ্রেস সরকারের – তাই তিনি কংগ্রেস দলের (কেরালা থেকে) এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন। মানে সে সময় অন্য দলের সরকার হলে তিনি সেই দল করতেন হয়ত, এ রকম কেরিয়ারিস্ট তিনি। কেন এমন বলছি?

    বলছি, সেকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই যেমন এতদিন তিনি ছিলেন এক মোদিবিরোধী কংগ্রেসী। কিন্তু গত ৭ জুলাই ২০২২ তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate] এক আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে – অবস্থান বদলে নিতে চাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি  বাইডেনের মহাউদ্যোগে নবগঠিত বা চলতি যে ‘পশ্চিমা জোট’ শক্তি তৈরি হচ্ছে (সাম্প্রতিকালে জি-৭ আর মাদ্রিদে ন্যাটোর সম্মেলন ডেকে বাইডেন হইচই ফেলতে চেয়েছেন, ইউরোপের সাথে আমেরিকার জোটকে তিনি  ‘পশ্চিমা ব্লক জোট’  [Western bloc’s] বলে পরিচয় করিয়েছেন সেখানেই) শশী থারুর বাইডেনের এই উন্মাদনা দেখে  আর বসে থাকতে পারেননি। একেবারে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকালতি শুরু করেছেন। যেখানে এতদিন তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকার ভারত পলিসির ক্রিটিক।

    শশী থারুর নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।  সেখানে তার ব্যক্তি অবস্থান হিসেবে যে লাইন তিনি পারসু করতেন বা পক্ষে কথা বলে থাকেন তা হল যেমন – কেন আমেরিকা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেনমেন্টের [China Containment] এ’কাজের ঠিকা দিয়েছে; এর সমালোচক ছিলেন তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই চীন ঠেকানোর পুরস্কার বা মজুরি হিসেবেই ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল।

    এই ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ প্রশ্নেই থারুর  মোদির প্রো-আমেরিকান হয়ে লেপ্টে থাকার নীতির সমালোচক ছিলেন। ফলে যেন কংগ্রেসি হিসেবেই মোদির সমালোচক তিনি, এ’পরিচয় লটকে চলতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি পাশ ফিরছেন; মোদির সমালোচক হয়ে বাইডেনকে অতি আপন করে নিতে চাইছেন। যেটা অনেকে পাল্টিমারাও বলতে পারেন। কিন্তু কী প্রসঙ্গে ছিল থারুরের সেই লেখা?

    আলোচ্য সেই লেখার শিরোনাম হল  – ‘ব্রিকস থেকে ভারত কি বেরিয়ে যাবে?’ এটা বাংলাদেশে অনেকে এভাবে বাংলা করে ছেপেছে – যেটা ভালো বাংলা হয়নি। কারণ, মূল ইংরাজি ভাষ্যটা ছিল Are the BRICS Breaking Up?  বা – ‘ব্রিকস কী ভেঙে পড়বে’-এরকম।

    প্রতি বছর ব্রিকস জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার গতমাসে ২৩-২৪ জুন তা হয়েছিল চীনে। একইসাথে তা বিশেষ গুরুত্বে ‘বেইজিং ঘোষণা’ [XIV BRICS Summit Beijing Declaration] বলে এক ঐক্যমতের দলিলে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। আর এবার ব্রিকস সম্মেলন হয়েছে এমন পটভূমিতে যখন বাইডেনের ‘পশ্চিমা-শক্তি’ আগেই ঘোষণা দিয়ে যা যা বলেছে এর অর্থ হয় যে, মূলত চীন ও সাথে রাশিয়া এবং এদের সহযোগী সব রাষ্ট্রকে তারা একঘরে করবে, কোনো অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কও রাখবে না; ভিন্ন করে দিবে; যেন অ-জাত বা নিচা-জাত তারা। সেটা অনেকটা ১৯৯২ সালের আগে সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই-ব্লকে দুনিয়া ভাগ হয়ে থাকার সময়কালে দুনিয়া যেমন ছিল তেমনি।
    সেখানে আবার দুনিয়াটাকে ফিরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাইডেনের এটা এক অবাস্তব খায়েস-কল্পনা মাত্র। যেটাকে ‘কোল্ড ওয়্যার’ [cold war]-এর সেকাল বলে অনেকে চিনে থাকে যার মূল অমন বৈশিষ্ঠ যে ব্লকে ভাগ হতে পেরেছিল যে, তাতে সোভিয়েত-আমেরিকা বলে এ দুই ব্লকের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্য-পুঁজিবিনিয়োগ বিষয়ক (ফলে  জ্ঞান বা স্বাভাবিক বাতচিত-সহ সবকিছুও) মানে ভাব বা ব্যবসা কোনোকিছুরই বিনিময় সম্পর্ক ছিল না।

    ঐ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ, খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের কোনো দেশ কেউই – ১৯৪৪ সালে আইএমএফ প্রথম  জন্ম ও গঠন হওয়ার পর থেকেই – এরা কেউ  সদস্যপদ নেয়নি। আর যে সুযোগে পরে আমেরিকাও সদস্যপদ না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাইডেনের নয়া-কল্পনার খায়েস অনেকটা সেকালের মতই যা একালে আবার সেখানে পৌঁছানো যায় কি না; এই তাঁর আকাঙ্খা বা মনোবাঞ্ছা। যদিও একালে সে বাস্তবতাটাই নাই ভেঙে গেছে, মানে বাস্তবে তা আর উপস্থিতিও নেই। তবু এ জায়গায় বাইডেন নির্বিকার। কিন্তু জিদ ধরেছেন সেকালেই ফিরতে চান! বাইডেনের ভাষায় বললে, তার নেতৃত্ব গড়ে তোলা ‘পশ্চিমা শক্তির’ সাথে চীন ও এর বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নাকি ‘মূল্যবোধে’ [Beijing…. challenges the Western bloc’s ‘interests, security and values’] এক বিশাল ফারাক আছে; তাই তিনি যেন অবাস্তব জেনেও এমন জিদ ধরেছেন।

    এ ছাড়া এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেক তাৎপর্য ছিল, এতদিন এতে পাঁচসদস্য রাষ্ট্র শুধু অংশ নিয়েএসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম অতিথি হিসেবে আরো ১৩টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। যে দেশগুলো হল – আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, সেনেগাল, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আমরা বলতে পারি, এর মানে, এদের কাছে বাইডেনের উদ্যোগে নবগঠিত যে ‘পশ্চিমা ব্লক’ করেছে, চীনকে একঘরে করবে বলে হুমকি দিয়েছে- সেসব দিকগুলো এসব দেশের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। কেন এভাবে বলছি?

    গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস (BRICS) আসলে কীঃ
    এক কথায় বললে, এখনো আমেরিকা গ্লোবাল ইকোনমির নেতা হয়ে থাকলেও এর অবস্থা পড়তি শেষ পর্যায়ে। বিপরীতে চীনের নেতৃত্ব উত্থিত হয়ে তা সেই জায়গা নিতে চাইছে। আ্মাদের অর্থ-বাণিজ্যের দুনিয়া এখন এরই জংশনে আছি। আর এতে গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; যেটা নিজে আছে আবার আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণে।
    কারণ, নিয়ন্ত্রক আইএমএফ এর বড় শেয়ার মালিকানা একা আমেরিকার নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। এমনকি চীন উঠে এলেও তার সাথে শেয়ার শেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। আর তা থেকেই ওয়াল স্টিটের পরামর্শে ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম! তাহলে ব্রিকস হল সেই আগামী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান; যখন গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল ঘটবে তখন যা কার্যকরি হবে। কিন্তু তা সক্রিয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে যখন চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে তখন। কেন? এখন নয় কেন?

    ইকোনমিক-টেকনিক্যাল কারণে একই দুনিয়াতে দুইটা ‘আইএমএফ’ ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে একটা দেশে একই সাথে দুটা সরকার থাকতে পারে না। তাই ২০০৯ সাল থেকে ব্রিকসের জন্ম হলেও এখনই তা দুনিয়াজুড়ে ‘আইএমএফ’-এর সমান্তরালে সক্রিয় হয়নি, ইচ্ছা করেই।
    চীন, ভারত, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল – এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস গঠিত। যদি অনুমান করে নেই আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে কেবল এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে সমান্তরাল আরেকটা দুনিয়া যেন আছে; তবে এখন অস্থায়ীভাবে এই পাঁচ রাষ্ট্রের জন্যই শুধু ব্রিকস যেন, আর সেই দুনিয়ায় আরেক আইএমএফ হিসেবে তা আপাতত হাজির আছে।
    এভাবে মনে করা যেতে পারে। যেদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে চীন আসীন হবে সেদিন ব্রিকস আর আইএমএফ মিলিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। তবে তা আজকের আমেরিকান প্রভাবের (মানে লায়ন শেয়ার) আইএমএফ যেমন, সেই রকম তখন সেটা চীনের প্রভাবের একটা নয়া আইএমএফ প্রতিষ্ঠান হবে, তাতে নতুন নাম কিছু একটা হবে হয়ত বা পুরনোটাই থাকবে। কিন্তু নয়া মালিকানা শেয়ারে বড় ভাগটা চীনের পক্ষে পুনর্গঠিত হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। কাজেই চীনকে উপেক্ষা করে নয়া দুনিয়া সাজানো বাইডেনের আমেরিকার এক মরণ খায়েশ মাত্র। অথচ বাইডেনের এ’অবস্থানের পরোয়া না করে ১৩ রাষ্ট্রের এবার ব্রিকসের অতিথি হয়েছে – নিজেদের স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটা ঘটিয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাইডেন যেখানে চীনকে গ্লোবাল বাণিজ্য থেকে বের করে একঘরে করার জিদ ধরেছেন; সেখানে এই ১৩ রাষ্ট্র উল্টা বাইছে – এমন পদক্ষেপ নজর-আমল করার মতই বলতে হবে!

    তবে ওদিকে একই দুনিয়াতে বিশ্বব্যাংক টাইপের প্রতিষ্ঠান একাধিক হতে পারে। টেকনিক্যাল অসুবিধা নাই। যেমন ইতোমধ্যেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এডিবি ADB) অথবা ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি IDB) আসলে এরা বিশ্ব ব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছে। এছাড়া চীনা প্রভাবাধীন নয়া এআইআইবি [AIIB] অথবা ব্রিকসের ভেতরেই আরেকটা ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক [NDB]’ নামে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে আছে।

    সার কথায় এতক্ষণের কথাগুলো সারকরে বললে, ব্যাপারটি হল, শশী থারুরকে এতদিন ব্রিকস নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। বরং ভারত-আমেরিকার চীন ঠেকানো নিয়ে কথা বলতেন। সেই তিনি এখন “ব্রিকস ভেঙে যাবে কি না” তা নিয়ে কথা বলছেন!
    আসলে আগেও অনেকবার বলেছিলাম যে গ্লোবাল ইকোনমি বা আইএমএফ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় কূটনীতিকদের সাবধান হওয়াই ভাল; এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির ইস্যু বলে ঠাওরে নিয়ে কথা বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের বিদ্যের দৌড় প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে – তাই অসাবধানে এ ইস্যুর সাথে আচরণ না করা ভুল। আর ঠিক সেই ভুল ও ফাঁদে আটকে গেছেন শশী থারুর!
    আগে বলে নেয়া যাক – কেন এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ‘বেইজিং ঘোষণা’ জিনিসটা কী যার ওপরই মূলত শশী থারুর এত ক্ষোভ বা আপত্তি!

    পাকিস্তানি আবদুল রহমান মক্কিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা নিয়ে তিন পর্যায় :
    প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগের সপ্তাহে ১৭ জুন, একজন পাকিস্তানি কিন্তু আইএস সদস্য আবদুল রহমান মক্কির নাম জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকায় তোলা হবে কি না এ নিয়ে ভারত-আমেরিকার এক যৌথ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন এটা আরো ছয় মাস দেরি করার পক্ষে নিজ ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে, পরের সপ্তাহে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের ভারতের মোদি নিজ বক্তৃতায় সরাসরি এ প্রসঙ্গটা উচ্চারণ না করে তবে প্রসঙ্গটা মাথায় রেখে বলেন, ‘আমাদের (ব্রিকসের সদস্যরা) একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝা উচিত, সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা দেয়া উচিত; যাতে এমন ইস্যুর রাজনীতিকরণ না হয়ে যায়।’

    Modi has said that the BRICS member nations should understand each other’s security concerns and provide mutual support in the designation of terrorists, asserting that this sensitive issue should not be “politicised”.

    আর এতে তৃতীয় ঘটনাটা হল, ব্রিকস সম্মেলন শেষে ‘বেইজিং ঘোষণা’ নামে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আর এই প্রস্তাবের  বিষয়টা সারকথায় বললে – আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যুতে ব্রিকস সদস্যরা  যখনই একসাথে জাতিসঙ্ঘে অবস্থান  নিতে পেরেছে তাতে কত ভাল কিছু ফলাফল এসেছে -সেসবের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখন থেকে আবার পরস্পরের সহযোগী হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

    কেন এসব বলেও বারবার চীন-ভারত একসাথে থাকতে পারেনি :
    এর মুলকথা হিসাবে বলা যায়, গ্লোবাল নেতৃত্বের পরিবর্তনের একালে গত ২০ বছর ধরে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে তাতে মৌলিক বোঝাবুঝিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেছে বা রাখা হয়েছে বলে এর উল্টো ফলই ভারত বারবার পেয়েছে। যেমন- ভারত মনে করে এসেছে, এযুগে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভারত এদের দুজনের মাথার উপরে উঠে যেতে পারবে। নিজ ভাগ্য গুছিয়ে নিতে পারবে, কারণ ভারতের কূটনীতি খুবই চতুর!!  কিন্তু এটা এতটাই উচ্চাশা যে, এ নিয়ে কথা বলাই সময় নষ্ট। কারণ, এখানে মূল বিষয়টা – কূটনীতিক দক্ষতা দেখানোর নয়- বরং ‘নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ও তা দেখানোর’। নিজেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করে দেখানোর।
    এতে মোদি ভাল নেতা কি না, বা দেশপ্রেমিক জাতিবাদী কি না কেবল তা দিয়ে বা এই কর্তাসত্তা দেখিয়ে দাবি করা অর্থহীন যে- ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’ অর্জন হয়ে গেছে। ফলে এখন চীন-আমেরিকাকে কূটনীতিক চাতুরি দিয়ে টেক্কা মেরে দিলেই সব অর্জন হয়ে যাবে?  না, তা হওয়ার কারণ নাই। বরং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে দেখাতে হয়। তার আগেই নিজেকে পরাশক্তি দাবি করা অর্থহীন। বাগাড়ম্বর! আর কিছু হওয়ার আগেই আমি বিরাট কিছু এই বাগড়ম্বরতাই ভারতের কিছু না হতে পারার কারণ। সর্বোপরি আছে হিন্দুত্ববাদ, এই ভুল শুধু না বিরাট ক্ষতিকর রাজনীতি।
    যেমন ধরেন, সম্প্রতি ভারতের জনসংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়েছে। বিবিসি বাংলা খবরটা ছেপেছে যেন এটা নিজেই এক অর্জনের ঘটনা।   গ্লোবাল অর্থনীতির প্রধান কেউ হতে হলে বড় জনসংখ্যা এর অর্জনের জন্য অবশ্য একটা ইতিবাচক উপায় (ফ্যাক্টর) ও সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বড় জনসংখ্যার কোনো দেশ হয়ে যাওয়া মানেই সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কারণ, ওই বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতিতে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বানাতে রূপান্তর করতে সক্ষম হতে হবে আগে – তবেই বড় জনসংখ্যা ইতিবাচক; না হলে ওই বিপুল জনসংখ্যাই হবে তখন বড় বোঝা বা ভার।

    আর এই ভারতীয় ভুল মনোভাবকেই ফুসলিয়ে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে দিল্লিকে নিয়ে গেছে, ঠিকা দিয়েছে; মানে উল্টা ভারতকে ব্যবহার করেছে। চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়েছে। অথচ আমেরিকা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘পতিত শক্তি’। অর্থাৎ ভারতসহ উদীয়মান যেকোন অর্থনীতির জন্য বিপরীত শক্তি। কাজেই আমেরিকা ভারতের দোস্ত বা এলাই হতে পারে না!!

    এবার সুনির্দিষ্ট করে জঙ্গি ইস্যু :
    চীনের উইঘুর ইস্যু। আপনি উইঘুর বাসিন্দাদের পক্ষে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন এবং যাওয়া উচিতও। কিন্তু এক শর্তে! তা হল – উইঘুররা আবার আফগানিস্তানে আইএসের সহযোগী হয়ে সশস্ত্র তৎপরতা করে বেড়াতে পারবে না। আসলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানেরাও উইঘুর [ETIM]  এদের এমন তৎপরতা করতে আপত্তি ও বাধা জানিয়েছে। এইখানে দেখেন এনিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট।
    কিন্তু তারা তবু ভারত ও আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কাজে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচরাও থাকছে।

    পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা ইনস্টিটিউটে হামলা বা পাকিস্তানে গোয়াদর ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী মারতে বেলুচদের সাথে মিলে উইঘুরের বাসিন্দারা যদি তৎপরতা চালায় তবে এরপর আপনি আর একই সাথে তাদের প্রতি চীনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরেক বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, গত ২০০১ সাল থেকে উইঘুররা আমেরিকা সরকারের “সন্ত্রাসী দলের তালিকায়” অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগ-দিয়ে  ট্রাম্প প্রশাসন এই [ETIM] গ্রুপকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে মুক্ত করে দেয়। আর পরে বাইডেন উইঘুর বাসিন্দাদের উপর চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেইজিংয়ের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। রফতানিতে চীনা তুলা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে বাইডেন আসলে কী চায়?

    সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবান গ্রুপ টিটিপির [Tehrik-i-Taliban Pakistan] সাথে এদের মিলিত তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্রয় অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তাদের তৎপরতা স্তিমিত করেছে। আসলে বটমলাইন হল – আপনি আরেক দেশে সন্ত্রাস উসকে দিয়ে নিজ দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারবেন না। আমেরিকার সাথে মিলে ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস উসকে তোলার নীতিতে চলে তারা স্ব স্ব নিজ দেশ সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে পারবে না। ভারত-আমেরিকা মিলে পাকিস্তানে [চীনা স্থাপনা বা প্রকল্পে] সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দিয়ে নিজেরা ভাল থাকতে পারবে না। সন্ত্রাস প্রসঙ্গে সবখানেই সব ফোরামেই একই নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। এটাই একমাত্র এথেকে মুক্তির উপায়। পিস-মিল করে একেক সন্ত্রাসের ঘটনায় একেক অবস্থান নিবেন কোনটা কাছে টেনে কোল দিবেন আবার কোনটাকে জাতিসংঘের তালিকায় তুলবেন – এগুলো কোনটাই কাজ করবে না। শেষ বিচারে এসব কোন কাজের অবস্থান হবে না।  কেবল নুইসেন্স সৃষ্টি করা যাবে।

    যেমন যদি প্রশ্ন করি, ভারত মুক্কি ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে আমেরিকার সাথে মিলে ভারত জাতিসঙ্ঘে যৌথ প্রস্তাব উত্থাপনে গেল কেন? একই সাথে এ ইস্যুতে চীনের সাথে কথা বলা ও একই নীতি তৈরি করে উভয়েই তাতে চলতে চাইল না কেন? সমস্যা তো এখানেই! ভারত তো আসলে মুক্কি ইস্যুতে মানে সন্ত্রাস ইস্যুতে চীনের সাথেও এক অবস্থানে যেতে চায় না। চাইলে এই পথ ধরত। ভারত চেয়েছিল আমেরিকার সাথে গলা মিলিয়ে চীনকে জাতিসঙ্ঘের আসরে বিব্রত করতে। ভারত সমাধান চাইলে আগেই চীনের সাথেও একই অবস্থান নিয়ে কথা বলত। যেটা মোদি ব্রিকসের সভায় নিজ বক্তৃতায় বলেছেন যে, “ব্রিকসের পাঁচ সদস্যের সবাই অন্যের সন্ত্রাস নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আমল করা উচিত”। কিন্তু ভারত নিজেই তো তা অনুসরণ না করার নীতিতে চলেছে। না হলে পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে মিলে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, উইঘুর বা আইএস সশস্ত্র তৎপরতাকে ক্রমাগত সাহায্য সমর্থন না করে তা থেকে দূরে সরে আসত! কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়ে কোন সশস্ত্র হামলা হয় নাই। কিন্তু সেজন্য ইমরানের সাথে মোদি সরকারের কোন ঘনিষ্ঠতা, কাজের আলাপ বা সম্পর্কের উন্নতিতে কোন পরিবর্তন আসে নাই। বরং পাকিস্তান-মুসলমান বলে বিদ্বেষ-ঘৃণা আরো বেড়েছে। মুসলমান কোপানো এখন আরো প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটা ভারতীয় নির্বাচনি প্রধান ইস্যু। এরই শেষপ্রান্তে আমরা নুপুর শর্মা-কে দেখতে পাচ্ছি!!!

    আগেই বলেছি, মূল কথা্টা হল – ভারত মনে করে চীন-মার্কিন বিরোধে ভারতকে আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকতে হবে, আর এরপর এ থেকে ফয়দা তোলার কূটনীতিতে চলতে হবে। চীন-আমেরিকার বিরোধ কাজে লাগিয়ে এভাবেই নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। যেন ভারতের কূটনীতিই খুবই বুদ্ধিমান তাই এটাই জিততে থাকবে সবস্ময়!!!  কিন্তু বাস্তবতা কী?? সময়ে তা ধরা যাক কিছুটা আদায় হলেও হতে পারে হয়ত, কিন্তু এথেকে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কীভাবে? অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সাথে কূটনীতিতে ওস্তাদ হওয়া বা না থাকার কী সম্পর্ক? চালাকি কূটনীতি আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী এক জিনিস? না কি এটা উলটা ক্ষতি করবে? করছে!! এখানে কবি নীরব! অথচ এসব নিয়ে  নুপুর শর্মা ইস্যুতে ডুবে যাওয়া দিনে শশী থারুর এ নিয়েই আমেরিকার পক্ষে তৎপর হতে উঠে দাঁড়ানোর সঠিক সময় ভাবলেন।

    ভারত কিসে ডুবে যাচ্ছে?
    মূলত মুসলমান নির্যাতন ও কোপানো। অথচ একমাত্র  মুসলমান নিধন করেই মোদি নির্বাচনে বাক্স ভরার নীতিতে তাকে চলতে হবে বলে মনে করেন। কারণ অর্থনীতির পারফরম্যান্স আগামিতে আর ভাল করার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সর্বশেষ ফরেন কারেন্সী্তে বিপর্যয়ের ধাক্কা আরো বিশাল। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাহার করে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার-  সবদেশের উপর প্রয়োগ করা ছাড়া তার অস্ত্র ভোঁতা – তাই বাইডেনের পক্ষে ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাওয়া আবার দিল্লির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রয়োগ না করা স্ববিরোধী।

    অথচ থারুর ভাবছেন মোদি তার মত বুদ্ধিমান নন। সেজন্যই নাকি সমস্যা!! তাই তিনি ভেবেছেন বাইডেনের এ নয়া উদ্যমে চীনের বিরোধিতা করার সময়গুলোতে একে ভারতের নিজের কাজে লাগাতে বাইডেনের বন্ধু হতে হবে ও আমেরিকার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ ভাব দেখাতে হবে। অথচ এসব অবস্থান মোদি-জয়শঙ্কর সব উল্টে-পাল্টে যতদুর ব্যবহার করা যায় করেছেন । এরপরেই সব অকেজো অবস্থায় তারা। ভারতের উপত লাগাতর তিনবছর ধরে  মুসলমানদের উপর আক্রমণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শুণ্যের কোঠায় আনার জন্য অবরোধ আরোপের সুপারিশ ঝুলছে। অথচ সেদিকে শশী থারুর খবর নাই। কেবল নিজেকে মোদির চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবা ছাড়া……!!!

    ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা- একথা দিয়ে শিরোনাম লেখা কেনঃ
    শশী থারুর তার লেখার শিরোনাম করেছেন ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে। কেন?
    এনিয়ে লেখায় একটাই কারণ জানা যায় যে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ঐক্যমত না দেখাতে পারা। প্রশ্ন হল, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে তা তো না। এনিয়ে ভিন্নতা ব্রিকসের জন্মের আগে ছিল। মাঝে ছিল এখনও আছে। তাহলে এখন সেকথা তুলে এই প্রশ্ন কেন? এটাই সন্দেহজনক। এমনকি মোদি  নিজে বা  সরকারের কেউ এমন “ভেঙ্গে যাওয়া” ধরণের মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন দেখা যায় নাই।  তাহলে “ভেঙ্গে যাওয়া” নিয়ে যেন আলোচনা উঠে এর কৃতিত্ব একা থারুরের। কেন? তিনি এই ইঙ্গিত তুলে মোদির আগে বা উপরে আমেরিকার প্রিয় হতে চান? আমেরিকার নয়া এজেন্সি নিতে মোদির সাথে টক্কর দিয়ে আগায় থাকতে চান? যদিও কংগ্রেস এখনও কোথাও চীন ফেলে প্রো- আমেরিকান অবস্থান নিবে এমন ইঙ্গিত এখনও কোথাও কোন ইস্যুতে দেখায় নাই। বরং একাদেমিক বা সোশাল পর্যায়ের ঘরোয়া আলোচনায়, মোদি জমানা শেষ হলে চীন-ভারত সম্পর্ক ভাল হবে এমন ইঙ্গিত নন-পার্টিজানদের দিয়ে অনেক সময় দেয়া হয়েছে।
    তো সেটা হতেই পারে। শশী থারুর তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি অবস্থান নেন, বদলান।
    কিন্তু ২০১৬ অক্টোবরের এক সংবাদ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শশী থারুর  ব্রিকস সম্পর্কে বলছেন, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ নেয়া উচিত, তাই ব্রিকস কে উপেক্ষা করলে এমন মোড় পরিবর্তন থেকে নিজেকে উপেক্ষিত করা হয়ে যেতে পারে [Ignoring BRICS is ignoring turn of history: Shashi Tharoor]। তাহলে, মিস্টার থারুর, কী দাড়ালো ব্যাপারটা?
    মনে হচ্ছে খোদ শশী থারুরেরই মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যাহোক, সেটা হতেও পারে। কিন্তু এনিয়ে তার একটা ব্যাখ্যা পেলে আমাদের জন্য সব বুঝাবুঝি সহজ হতে পারত।  তা শশী থারুর কী এখন অবলীলায় “ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকেও উপেক্ষার” পক্ষপাতি হতে বলছেন!!!! কোথায় গেল তার সে ইতিহাসবোধ!!  কেন?

    শশী থারুর গ্লোবাল অর্থনীতির ব্যবস্থাটাই বুঝেন না তা উদামঃ
    তাই শেষ কথাটা হল – শশী থারুর যে গ্লোবাল অর্থনীতি বুঝেন না সেটাই এতে উদাম হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন “ব্রিকসকে আরও চীনকেন্দ্রিক করা হোক, সেটা ভারত চায় না।’। আসলে এই হল হাজার কথার এক কথা। গোপেন এবার ধরা পড়েছে!!!! শশী থারুর যে ব্রিকস কী ধরনের প্রতিষ্ঠান এটাই বুঝেন না, তার এক শক্ত প্রমাণ এটা।

    প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে আইএমএফ কী এবং – এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ও গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ছাড়া দুনিয়াতে কোন দেশ আরেক দেশের সাথে পণ্য-বিনিময়, পুঁজিবিনিয়োগ বিনিময় ইত্যাদি চলতেই পারত না কেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা ও যুদ্ধের খরচ একক বহণকর্তা হিসাবে আমেরিকার উঠে আসা ও পরবর্তিতে আবার অর্থনীতির পুণর্বাসনে রিপেয়ারে অর্থ ঢেলেছে ঐ আমেরিকাই। এরসাথে সেই উদ্যোগ নিয়ে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  ব্যবস্থা জন্ম দিয়ে গিয়েছে বলে আজও দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা বলে একটা কিছু চলছে। তবে এটা মন্দের ভাল। আর এই ব্যবস্থা আমেরিকার দিকে কান্নিমারা ভাবেই তৈরি হয়েছে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে এই শতকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আর চীনের হাতে নয়া ও বিপুল সঞ্চিত সম্পদের কারণে একা চীনের হাতেই সবার চেয়ে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা পুঞ্জিভুত হচ্ছে। এটাই চীনের সব ধরণের ক্ষমতা বা সক্ষমতার উতস।  এই কারণেই মূলত চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সবখানে বেশি উঠছে। কিন্তু ঐ ১৯৪৫ সালের দিকে যদি আওয়াজ তোলা হত যে  (ঐকালের ব্রিকস মানে) আইএমএফ এই প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না, তাহলে কেমন হত?  এককথায় এর উত্তর হত তাহলে আজও দুনিয়ায় কোন বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুই হত না।

    উদ্বৃত সম্পদ  বা সারপ্লাস কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকাই ছিল সেকালে (মোটামুটি  ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া শতক জুড়ে)  একমাত্র রাষ্ট্র যার হাতে বা যার অর্থনীতি হচ্ছিল উদ্বৃত সম্পদে ভরপুর। সেকালের কলোনি সাম্রাজ্যের নেতা বৃটিশ বা ফরাসীদেরকে ছাড়িয়ে।  ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতাই ছিল সেকালের একমাত্র ভরসা যে যুদ্ধের পরেও এই আমেরিকার ভরসাতেই, সেই প্রথম দুনিয়াতে একটা গ্লোবাল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন গড়ে উঠে। এবং তাই হয়েছিল। তাই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। তাই আমেরিকা ছাড়া বা আমেরিকা-কেন্দ্রিক নয় এমন এক আইএমএফ গড়ার কথা কেউ যদি বলে তাহলে বুঝতে হবে তিনি আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা কী ও কেন এর দরকার সেটাই আসলে বুঝেন নাই।
    এখন সেকালে কী শশী থারুর মত টেরা কিন্তু বোকা চিন্তার কেউই ছিল না যে বলে নয়া আইএমএফ কে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না ???
    হা অবশ্যই ছিল।  আর সেটা হল ফ্রান্স।  ফ্রান্স আপত্তি তুলেছিল যে একমাত্র আমেরিকান ডলার-কেন্দ্রিক  এক আইএমএফ বাণিজ্য-অর্থনৈতিক  এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। ফ্রান্সের যুক্তি ছিল অনেকটা কথিত ‘গণতন্ত্রি’ বা রাষ্ট্রের সাম্য ধারণার মত যে একা আমেরিকা কেন সব খাবে? সব কর্তৃত্ব নিবে!!
    কিন্তু  বলাইবাহুল্য ফ্রান্সের আপত্তি সবাই নাদান বালকের আপত্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ সেকালে আমেরিকাই ছিল একমাত্র উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশ। আর উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশের মুদ্রা ছাড়া  (এটাই মূল টেকনিক্যাল যুক্তি বা কারণ) ঐ একই ন্যাশনাল মুদ্রাকে একই সাথে গ্লোবাল বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। তাই সদস্য সকল দেশই একমাত্র ডলারকেই পছন্দ না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।   

    এখন একালে, চীনকে নিয়েও প্রায় একই আচরণ দেখাচ্ছে বাইডেনের আমেরিকা। নাদান আচরণ করছে।  আওয়াজ তুলছে বাইডেন। যেমন একটা তুলনা চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পকে নিয়ে। বাইডেন এই প্রথম এই চীনা প্রকল্পকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বলে আওয়াজ উঠিয়েছে। যদিও সবাই জানে ও বুঝছে এটা অবুঝ বাচ্চার আকাশের চাঁদ পাবার জিদের মত!
    বাইডেন বহুকষ্ট পশ্চিমের সবদাতা মিলে কুথে-কাথে ছয়শ বিলিয়ন ডলার যোগাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেবল। যদিও এখনও সে অর্থ দিয়ে কাজে নামে নাই। এর ভিতর আমেরিকা দিয়েছে মাত্র দুইশ, সারা ইইউ মিলে দুইশ আর জাপান ও অন্যেরা মিলে বাকি দুইশ বিলিয়ন এভাবে। আর  এভাবে তারা সবাই মিলে বিনিয়োগ সক্ষমতা যোগাড় করেছে ছয়শ বিলিয়ন ডলার। ভাল, খুব ভাল!!

    কিন্তু চীনের বেল্ট-রোডে বিনিয়োগ কত?  
    চীন মনে করে, বেল্ট-রোড এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর স্বপ্ন। সে যা হয় হোক, এর যাত্রাশুরু মাত্র এই ২০১৩ সাল থেকে।   ইতোমধ্যেই এর বিনিয়োগ চার ট্রিলিয়ন (মানে চারহাজার বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে [China Belt And Road Projects Value Now Exceeds US$4 Trillion]।
    ব্যাপারটা সোজা। আমেরিকাও ওর অর্থনৈতিক উত্থানে যখন ওর যৌবনকালে ছিল তখন বেশির ভাগ এমন বিনিয়োগ প্রকল্প একা আমেরিকাই চালিয়েছে। সেটাই এখন শিফট করে গেছে, চীনের উত্থান ঘটছে একালে।

     তাহলে, এটা চীনা উদ্বৃত সম্পদে উত্থানের যুগঃ
    তাই সেকালে আমেরিকার নেতৃত্বে আইএমএফের বদলে একালে আমরা চীনের নেতৃত্বে হবু আইএমএফ এর ভ্রুণ হিসাবে যেন – ব্রিকসকে দেখছি। কাজেই একালে চীন ছাড়া তো ব্রিকস দাড়াবেই না। আর এতে বড় বিনিয়োগ-মালিকানাও চীনেরই হবে। যেমন এখনও আইএমএফের শেয়ার মালিকানা আমেরিকার সবার চেয়ে বেশি; তা আমেরিকা জবরদস্তিতে হলেও ধরে রেখেছে।

    তাহলে, বটম লাইন ফ্যাক্টস হল – চীন নাই এবং প্রধান ভূমিকায় নেই এটা যদি কল্পনা করি, তবে ব্রিকস বলে কোনো প্রতিষ্ঠানই হবে না, দাঁড়াবেই না। দাঁড়ানোর দরকারও হবে না।

    আসলে ব্রিকস প্রতিষ্ঠান দরকার কেন? এটা নিয়ে শশী থারুর নিজেই প্রশ্ন তুলে নিজেই যেসব জবাব দিয়েছেন তাতেই তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধির খামতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন- প্রথমত, ব্রিকস বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক নাকি ভূরাজনৈতিক জোট?

    এর জবাব হল – ব্রিকস না অর্থনৈতিক না ‘ভূরাজনৈতিক’ জোট। না বুঝে প্রশ্ন তুলতে গেলে এভাবেই ধরা খেতে হবে!!!! যেমন যদি প্রশ্ন তোলা হয় – আচ্ছা আইএমএফ কী কোন জোট? অর্থনৈতিক না ভূরাজনৈতিক জোট? এটা তেমনই এক বোকা প্রশ্ন হয়েছে।  আইএমএফ মূলত এক “গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম’ খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে  আর এই সিস্টেমের মুল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ, সাথে সহযোগী বিশ্বব্যাংক।

    আর নয়া ব্রিকস [BRICS],  এটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তবে পুর্ণ প্রস্ফুটিত নয় বা করা হয় নাই ইচ্ছা করেই। এক ঘরে দুই পীর থাকে না তাই।  এখন আইএমএফ কেমন প্রতিষ্ঠান এটা যখন শশী থারুর, আপনার ধারণায় নাই তখন ব্রিকসও আপনি বুঝবেন না। কেবল প্রশ্ন করবেন আর নিজের বোকামিটাই তুলে ধরবেন!

    কাজেই মুখ খোলার আগে শশী থারুরের উচিত হবে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটি কী – এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ফ্লেশ্চার স্কুল কিন্তু আইন আর কূটনীতি বিষয়ে জোর দেয় সত্ত্বেও এটা মান্টিশেডের সাবজেক্ট এমন প্রতিষ্ঠান। একথা বারবার বলা হয়েছে। তবে এর বাকি শেডগুলো স্টুডেন্টদেরকে নিজ যোগ্যতায় পূরণ করে নিতে হবে। থারুর সেদিকে মনোযোগ দেন নাই দেখা যাচ্ছে। অতএব তার এখন এসব ব্যাপারে দ্রুত মুখ খুলা এড়ায় চলা উচিত! এটা অপ্রয়োজনীয়! এজন্যই বারবার বলেছি এই যুগের কূটনীতিতে মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা আইআর [আন্তর্জাতিক রিলেশন] এবিষয়ে পড়ুয়াদের ক্লাসের পাঠ্য না হলেও নিজ উদ্যোগে অর্থনীতি পড়ে নিতেই হবে।

    একারণে শশী থারুর নিজে বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে, ভারত ব্রিকসের সদস্য ঠিকই হতে চান। কিন্তু তার দাবি, “চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না”। এর মানে কি?  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফে কী ভারতের জন্য কোন জায়গা আছে? আইএমএফে ভারতের উল্লেখ করার মত কোন মালিকানা নাই কেন? আর সেটা কী আমেরিকা একালে ভারতকে দেওয়ার জন্য বসে আছে? দিবে? আমেরিকার প্রিয়বান্দা হতে চাওয়া  শশী থারুর কাছে এর কী কোন জবাব আছে? অতএব তাঁর না বুঝে কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয় কী!!!

    তাহলে নবগঠিত বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান AIIB, আসেন এখানে দেখিঃ
    এটা চীনা উদ্যোগের একালের বিশ্বব্যাংক যেন। ব্রিকস (বা আইএমএফ) গড়তে গিয়ে আগেই নিজস্ব বিশ্বব্যাংকটা যেন গড়ে নিয়েছে।  ফলে চীনা প্রভাব ও সিদ্ধান্ত এখানে প্রধান ভুমিকায়। চীনের নিজের মালিকানা শেয়ার এখানে ৩০% এর মত। এটাই সবার চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হল, ভারত যার, শেয়ার মালিকানা ১০% এর মত। আমেরিকার নাই, ইউরোপের খুব কিছু উল্লেখ করার মত নয়। অর্থাৎ আর কাউকে তেমন নয়, তবে ভারতকে  চীন ঠিকই গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে পাশে রেখেছে। তাতে ভারতের সাথে চীনের যতই রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকুক।  এটা স্বাভাবিক!

    তাহলে শশী থারুর কীবুঝে বলছেন – চীনকেন্দ্রিক  ব্রিকস তিনি চাননা?? 

    ভারী কথাবার্তা থাক একটা গল্প বলে শেষ করব।
    শশী থারুর ব্রিকস চান কিন্তু চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না। আর বাস্তবতা হল, চীন না থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে উদ্বৃত্ব সম্পদ – বিনিয়োগ দিবে কে? বুঝা যাচ্ছে এদিকটা নিয়ে তিনি ভাবেনই নাই। তাহলে আইএমএফ অথবা ব্রিকস বলতে তিনি কী বুঝছেন? কেমন প্রতিষ্ঠান এর কিছুই বুঝেন নাই। আবার  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফ নিয়েও তার আপত্তি দেখি না। তাই সবমিলিয়ে, তাঁর এই অবস্থানেরই প্রতীক যেন নিচের এই গল্প!
    শ্রাদ্ধঃ  কোন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সৎকারের নানা অনুষ্ঠান হয়। এই  ক্রিয়াকর্মাদি যা কিছু করা হয় একে শ্রাদ্ধ বা শ্রাদ্ধাদির নানা অনুষ্ঠান বলে। আর কয়েকদিন ব্যাপী এমন অনুষ্ঠান শেষে সাধারণত একটা নিরামিষ ভোজ বা খাওয়াদাওয়া ভিতর দিয়ে এসবের সমাপ্তি ঘটে থাকে। এখন এক ব্যক্তি দাওয়াতে এমন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।  কিন্তু উপস্থিত হয়ে তিনি সৌজন্য আলাপ জমাতে গিয়ে  ঐ বাড়ির কর্তাগোছের এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আচ্ছা যার শ্রাদ্ধ খেতে এলাম তাঁকে দেখছিনা? তিনি কোথায়???” 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “শশী থারুরের ব্রিকস বুঝ!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন বন্ড’

    শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’

    গৌতম দাস

    ১৬ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46k

    Sri Lanka To Default on Dollar Bonds.  GOTA GOTA YOU FAILED!  GOTA GOTA YOU FAILED!

     

    উপরের প্রথম ছবিটা বিবিসির এক ভিডিওও ক্লিপ রিপোর্ট থেকে নেয়া। যেখানে নারী বিক্ষোভকারিরা শ্লোগান তুলছে GOTA মানে “প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া – তুমি ব্যর্থ!”   শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া, তাঁর সরকার পরিচালনা বা ম্যানেজমেন্ট চরমভাবে ফেল করেছে। এক কথায় বললে তা মূলত ‘ইকোনমিক মিসম্যানেজমেন্ট’-এর কারণে। বাংলায় বলা যায়, অর্থনীতি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক দ্রুটি ও ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে এখানে। আর এতে এর ইমপ্যাক্ট মানে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এর যা প্রভাব সেটা কড়া মানসিক আঘাতের পর্যায়ের! কিন্তু কেন মানসিক অবস্থার দিকটা এত গুরুত্ব দিচ্ছি?

    সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন মানেই সবসময় তা একটি স্ট্রাগল; এক নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্যে থাকে এমন জীবন। সমাজের যত নিচের বর্গে মানুষে লড়াই ততই যেন নির্মম সে লড়াই! কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে এটাই এক প্রধান ও মারাত্মক প্রসঙ্গ! কেন?

    মানুষ তার জীবন-সংগ্রামের লড়াইগুলো কী হাসিমুখেই লড়তে পারে?? এটাই হচ্ছে মূখ্য প্রশ্ন! মানুষ অবশ্যই হাসিমুখেই তা লড়তের পারে কিন্তু কেবল এক শর্তে; সেটা হল এই যে, তাঁর এই লড়াকু জীবনের একটি শেষ আছে, এর অবসান আছে এবং তাহতে পারে এমন আশা আছে, ভবিষ্যৎ আছে – এই ইঙ্গিত চলতি লড়াকু জীবনে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। অর্থাৎ কষ্টকর জীবন-সংগ্রামে আশা আছে কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা? নাকি কোন শেষ নাই ফলে ভবিষ্যতই নাই – এমন নয় তো!!! একদিন এই কষ্টকর জীবন শেষ হবে এক নয়া ভোর আসবে – এটুকু দেখতে পেলেও কেবল মানুষ সব কষ্টের জীবন বাইতে রাজি থেকে যায় – না থাকলে অবশ্যই আত্মহত্যার কথা ভাববে! এমনকি চরম কষ্টের জীবন যার আরেক বটম লাইন হল, নিজ প্রজন্ম তো গেছেই – লড়তে লড়তেই এটা শেষ হয়ে যাবে দেখা যাচ্ছে; মানুষ নিজের সেই জীবন ও প্রজন্মও বাজি ধরে লড়তে লড়তেই শেষ করে ফেলতেও রাজি হয় – কিন্তু কেবল এক শর্তে। সেটা হল, এই নিজ প্রজন্ম বিলিয়ে দেয়ার বিনিময়ে হলেও যেন তার পরের প্রজন্ম থেকে, মানে নিজ সন্তানদের প্রজন্ম থেকে তাদের যেন আর অন্তত আর না খেয়ে থাকতে হয়। এই হলো সেই ন্যূনতম আশা; আর এটাকেই সে নিজ লড়াকু জীবনের ভবিষ্যৎ আছে বলে মানে। ইংরেজিতে এটাকে সাবসিস্টেন্স লেভেল [subsistence level] মানে কেবল বেঁচে থাকা ও অস্তিত্ব ধরে রাখার লড়াই হিসেবে দেখা হয়; অর্থাৎ ন্যূনতম অস্তিত্ব ধরে থাকতে পারবে, এ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আর অন্তত এটা ক্রমশ ভালর দিকে পরিবর্তিত হতেই হবে – এটাই সেই প্রণোদনা বা এই বোঝাবুঝির মৌলিক-বুঝ। নিম্নবর্গের মানুষকে এ নিশ্চয়তাটুকু দিতে হয়, এই আশার বাতিটুকু যেন না নিভিয়ে দেয়া হয় সে দিকে রাজনীতি ও সরকারকে খেয়াল রাখতে হয় – এটাই সাধারণ মানুষের এজীবন সমাপ্ত করে এথেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ। সেটাই  একটা ন্যূনতম বুদ্ধিমান সরকারের লক্ষণ যে এদিকটা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল এবং বাস্তব বোধবুদ্ধিসম্পন্ন! তাই নিচের ছবিতে আমরা দেখব এই মেয়েতা বলছে আজ আমার জীবনের আর কোন কোন ভবিষ্যত নাই [……at this point I don’t see any future]। অর্থাৎ যেন আত্মহত্যার পুর্বাবস্থায় পৌছে গিয়েছে তরুণী মেয়েটা! তাঁর পুরা বক্তব্য হল,

    “As a young person may be about seven months ago, I would have said I have a future here but at this point I don’t see any future here” – নিচের ছবির তরুণী মেয়েটার বক্তব্য এটা। যারা ভিডিওও লিঙ্ক চান, এখানে খুলে দেখতে পারেন। 


    দুঃখের বিষয়, শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার সরকার এই ন্যূনতম যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। তাই নিজেই হেরে গেছেন। আর এতে স্বভাবতই ফলাফলে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষকেও তাদের নিজ নিজ জীবন সম্পর্কে পুরোপুরি হতাশ করে দিয়েছে। বেঁচে থেকে জীবন সংগ্রামের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। এ নিয়ে বিবিসির এই শিরোনাম এক টিনএজ তরুণী বলছে, ‘আমি অল্পবয়সী তবু এখন এখানে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখি না।’ অথবা রান্নার গ্যাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো মানুষ হঠাৎ আর্তনাদ করে বলছে, ‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের চাইলে বাঁচাতে পারে।’ এসবই হল – জীবনের আশার বাতি নিভিয়ে দেয়ায়  কঠিন সব খেদোক্তি!!

    এই হলো এখনকার শ্রীলঙ্কান জীবনের সাধারণ ও কঠোর বাস্তবতা! গত সোমবার ৯ মে এর সারা দিনে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত গণসন্তোষ-বিক্ষোভে এক সিটিং সরকারি এমপিসহ মোট আটজন নিহত হলেন। সিএনএনের ভাষ্যমতে, ৩৮ জন রাজনীতিবিদের বাড়ি তারা পুড়িয়ে দিয়েছে। আর স্থানীয় লাইভ টেলিভিশনে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে যে, ‘সরকারি দলের সংগঠিত গুণ্ডারা লাঠিসোটা আর বুলেটের অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাজধানীর কয়েকটি স্থানে প্রথমে চড়াও হয়েছিল। সরকারের অনুমান ছিল, এসব বিক্ষোভ শক্তহাতে দমন না করে সামলালে তাদের জন্য বিপদ হবে। কিন্তু এতেই ঘটনা ঘটে উল্টা অর্থাৎ সরকার যে মানুষের জীবনের সব আশা কেড়ে নিয়েছে, এসব দিকে সরকারের খেয়াল ছিল না। আর এতেই আরো বিক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষেরা প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি নেতাদের বাসায় বাসায় গিয়ে হামলা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসা ছেড়ে এক নৌঘাঁটিতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। আর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের করার চেষ্টা করেন।

    তামিল-সিংহলি দ্বন্দ্বঃ
    শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক বড় দীর্ঘ দিনের অসন্তোষের ইস্যু হল, দেশের প্রধান এথনিক জনগোষ্ঠী সিংহলিদের সাথে জনসংখ্যার প্রায় ১৮%  [২০১২ সালের সরকারি গণনার হিসাবে, যা বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে তবে ১৯৮১ সালের হিসাবে যা ১৫% ছিল]। এই তামিল এথনিক জনগোষ্ঠী যাদের প্রায় ১১% শ্রীলঙ্কার স্থানিয় আর বাকিরা ভারত থেকে মাইগ্রেটেড তামিল।   স্থানীয়ভাবে তামিলেরা  মূলত শ্রীলঙ্কার উত্তরে ও পুবে বসবাস করে। মনে করা হয়, যারা মাইগ্রেটেড ব্রিটিশ আমলে এরা চাবাগান ইত্যাদিতে অগ্রসর ও দক্ষ শ্রমিক বলে তাদের ভারতের তামিলনাড় (পুরানা মাদ্রাজ) – থেকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলেও  তামিলনাড়–র থেকে আসা তামিলরা স্থায়ী হয়ে শ্রীলঙ্কায় থেকে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সিংহলিদের সাথে চেয়ে তামিলদের সাথে নাগরিকবৈষম্য বেড়ে গেলে সশস্ত্র রাজনীতির এলটিটিই [LTTE] গোষ্ঠীর জন্ম হয়। কিন্তু লম্বা ২৬ বছরেও কোনো আপস-সমাধান না আসায় বা অনেকের চোখে এ আন্দোলন সশস্ত্রতাতেই থেকে যাওয়ার আগ্রহ সীমাহীন ছিল বলে এটা কোনো সমাধানের চেয়ে যেন আজীবন সঙ্ঘাত চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত তৈরি করেছিল। ফলাফলে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনী সশস্ত্র বলপ্রয়োগে আক্রমণ শুরু করলে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছারখার হয়ে যায়। আর সেটা ছিল মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারের আমল। তাই অনেক মনে করেন, সেই থেকে জাতিবাদী বীরের অহং তৈরি হয়েছিল মহেন্দ্র রাজাপাকসের পরিবারকে কেন্দ্র করে। যেমন এখন যিনি শ্রীলঙ্কা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে তিনি পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র-এর আপন ছোট ভাই। এই পরিবারের মহেন্দ্র-ই প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ২০০৯ সালে, যার বাবা কেবল একজন এমপি ছিলেন।   আর পরে এভাবে ২০১৯ সাল থেকে  নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন মাহিন্দার ছোটভাই গোটাবায়া। আর এরপর থেকে আস্তে আস্তে তাঁর সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের অন্তত ২০ জন সদস্য মন্ত্রী বা এমপি হয়ে নানা পদে জড়িয়ে ছিলেন। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কান রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি, তা অনুমান করা কঠিন নয়; যদিও এদিকটা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবিসির এক রিপোর্টের শিরোনাম হলঃ  শ্রীলঙ্কার সঙ্কট : যুদ্ধবিজয়ী বীরেরা কী করে ভিলেন হয়ে গেলেন [Sri Lanka crisis: How war heroes became villains]??

    এখান থেকে আরেকটু অনুসিদ্ধান্ত টানা যাক। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা গণ-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করার পরে আগেই উঠা প্রেসিডেন্ট ও ছোট ভাই গোটাবায়ার পদত্যাগের পাবলিক ডিম্যান্ড বা দাবি এখন আরো জোরদার হয়েছে। এরই মধ্যে গোটাবায়া তাদের দলীয়, আগে পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। যদিও তিনি বিরোধী দলীয়  এখন এক এমপি মাত্র ছিলেন কিন্তু তাকে রাজাপক্ষে পরিবারের ঘনিষ্ট মনে করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হয়েই বিবিসিকে তিনি বলেছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে গেছে [……PM described the Sri Lankan economy as “broken]। তাই তিনি পাবলিকের কাছে আহবান রেখেছেন “ধৈর্য ধরতে, তিনি সব কিছু ভালো জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন” [“be patient, I will bring things back”.]”। কিন্তু তিনি কি সেই সুযোগ পাবেন?

    ওই সাক্ষাৎকারে তিনি কোনো আশা জাগাতে পারেননি। নিজেই এমন শঙ্কা ব্যক্তও করেছেন। বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক অবস্থা আবার ভালো হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই না আরো বেশি খারাপ হয়ে যায়” […… misery and unrest is “going to get worse before it gets better”.]”। এরই প্রতিধ্বনি যেন পাবলিক ডিম্যান্ডে যে গোটাবায়াকেও পদত্যাগ করতে হবে।

    শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বাস্তব অবস্থাটা কীঃ
    এক কথায় এর জবাব, এই অর্থনীতির এক ব্যাপক সংস্কার করতে হবে এবং কমবেশি সবাই মানেন যে, আইএমএফের [IMF] হাতেই এই সংস্কার হলেই ভাল। অনেক এটাকে নয়া ঋণ গ্রহণের সাথে পরিশোধেরও কাঠামোতে বদল আনা বলছেন। এক পেছনে মূল কারণ হল, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (প্রধান পণ্য উৎপাদন চা-সহ) কোম্পানিগুলোর বড় একটা অংশ বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানায়। মানে পুরানা দিন থেকেই স্থানীয় ব্যবসায় বিদেশী নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। সোজা কথায় এতে অর্থনীতির বৈশিষ্ঠ হবে – শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে প্রডাকটিভ ক্যাপিটালের (উতপাদক পুঁজি) চেয়ে বিনিয়োগ ক্যাপিটালের ()ইনভেস্টমেন্ট বা সুদী পুঁজির) ভুমিকা ও এর প্রভাব অনেক বেশি ও তা ডমিনেটিং হয়ে আছে। এছাড়া এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক বড় ফ্যাক্টর – সভরেন বন্ড [Sovereign Bond] !!

    সভরেন বন্ড কীঃ
    ইংরেজি সভরেন [sovereign] শব্দের আক্ষরিক অর্থ সার্বভৌম। কিন্তু অর্থনীতিতে সভরেন শব্দ ব্যবহার হয় একটু ভিন্ন অর্থে। এখানে সভরেন মানে ‘রাষ্ট্র নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছে’ এ ধরনের। কিন্তু ঠিক কিসের গ্যারান্টি? সে প্রসঙ্গে যাবো।

    সাধারণত ‘বন্ড’ বলতে তা সরকারি সিল-ছাপ্পড় মারা এবং যা এক কাগুজে “নোট” [note] লিখে দেয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর এই শব্দের মূল অর্থ একটা নোট লিখে দিয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়া।  কিন্তু সভরেন বন্ড, একসাথে শব্দদুটা কথার মানে হল, কেউ নিজ অর্থ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের সভরেন বন্ড কিনতে পারে। এর বিশেষত্ব হলো এর ম্যাচুরিটি মানে পাঁচ বছরের বন্ড হলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া শেষে এর সুদসহ আসল অর্থটা ঐ রাষ্ট্র বন্ড ক্রেতাকে ফেরত দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আর স্বভাবতই এই সভরেন বন্ডের বেলায়, এটা কোনো ব্যক্তি বা প্রাইভেট কোম্পানির ইস্যুকৃত ও বিক্রি করা কোন বন্ডে দেয়া গ্যারান্টির চেয়ে খোদ রাষ্ট্রের নিজের দেয়া গ্যারান্টির ওজন ও আস্থা পাবলিকের কাছে অনেক বেশিই হবে।

    এই বিচারে কোনো সরকারের ইস্যু করা ‘ডলার সভরেন বন্ড’ (International Sovereign Bond – ISB) মানে, বৈধ আমেরিকান ডলার খরচ করে যে বন্ড কিনতে হবে – এমন বন্ড (ইস্যু করে) ছেড়ে সরকার নিজ প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড়ের এক সহজ উপায় বলে একালে মনে করা হয়। যদিও এটা অনেক রিস্কি একটা পদক্ষেপ। তবে এটা আমেরিকার মত বড় ও প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির দেশের বেলায় গ্লোবাল পুঁজিবাজারে আমেরিকান সভরেন বন্ড যথেষ্ট আস্থাবাচক – এক বন্ড কেনা ও বেচার ব্যবস্থা – তা বুঝা যায়। যেমন জাপান ও চীন এদের একেক দেশ, এখন আমেরিকার এমন এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সভরেন বন্ড এখনো কিনে রেখেছে। কিন্তু বলাবাহুল্য বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সরকার যদি অমন সভরেন বন্ড ইস্যু করে থাকে তবে তা একই মাত্রার আস্থাবাচক  বা ওজনদার হবে না।

    তবে বাস্তবে বাংলাদেশ কখনোই এমন সভরেন বন্ড ইস্যু বা চালু করেছে বলে জানা নেই যদিও চলতি সরকারের আমলেই সময়ে এমন কিছু বিক্ষিপ্ত আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর প্রতিশ্রুত সুদাসল  পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকারের অপারগতা। বলে, অনেক ইন্ডিপেনডেন্ট রিপোর্ট অথবা সিএনএন, বিবিসিসহ শ্রীলঙ্কার স্থানীয় মিডিয়াতেই মানা হয় যে, শ্রীলঙ্কান সভরেন বন্ডের সর্বশেষ সুদ ফেরত দেয়ার তারিখ ছিল গত ১২ এপ্রিল ২০২২।

    কিন্তু  শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর দেয়া প্রতিশ্রুত সুদাসল পরিশোধে শ্রীলঙ্কান অর্থনীতির  অপারগতা!

    সরকার নিজেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে তারা এই অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে; পারছে না – রেডি নয় বলে অপারগতা জানায়। আর তখন থেকে গ্লোবাল পুঁজি বাজারে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ও সরকার ডুবে যাচ্ছে এখবর আর লুকানো না থেকে চাউর হয়ে যায়। তবে এসব কথা কেবল গত এপ্রিল ২০২২ এর নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসেও একইভাবে (ISB) এর পাওনা পরিশোধ করতে শ্রীলঙ্কা সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও তখন শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি যে সংকটের কথা স্বীকার করা হয় নাই।এনিয়ে তখনকার আলজাজিরার রিপোর্ট এখানে।

    The government is due to make a $36 million interest payment on a 2023 dollar bond April 18, as well as $42.2 million on a 2028 note, Bloomberg-compiled data show. A $1 billion sovereign bond was maturing July 25.

    এটা ছিল ভারতের এক মিডিয়া  বিজনেস স্টান্ডার্ড এর রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু অংশ।
    আর সেবার এপ্রিলের ব্যর্থতায় আরো বলা হয়েছিল জরুরি খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ ইত্যাদি আমদানির অর্থ না থাকাতে তারা তখনই আর নিজ বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার খালি করতে চাইছেন না। কিন্তু কার্যত এটা দাঁড়িয়ে যায় যে, সরকার একদিকে আইএসবি বন্ডের পাওনা শোধ করেনি আবার প্রয়োজনীয় জরুরি দ্রব্যাদিও সব আমদানি করতে পারেনি। ফলে জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও খাদ্যশস্য এমনকি স্কুলের পড়ালেখার কাগজ ও ওষুধও পর্যাপ্ত আমদানি করতে পারেনি বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে। মুল কারণ চাহিদার তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রা ছিল অনেক কম।  আর একবার এমন সাপ্লাইয়ের অভাবের কথা বাজারে রটে গেলে আমদানি-সাপ্লাই দ্বিগুণ করেও বাজার থিতুতে আনা যায় না। কালোবাজারি-মজুতদারি হয়ে যায় বাজারের মূল ফেনোমেনা। আর এথেকেই সেটাই শ্রীলঙ্কার সমাজ ও অর্থনীতিতে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠার অবস্থা সৃষ্টি করেছিল।

    বৈদেশিক বন্ড বা ISB প্রসঙ্গে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমাদের মত দেশে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক বা চীনা বা অন্য কোনো দেশের ঋণ নেয়ার চেয়ে ISB  ইস্যু করে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ডলার জোগাড় করা – এদুটার মধ্যে কোনটা ভাল? অথবা দুটোর ভালো-মন্দ কী? বিশেষজ্ঞরা আমাদের মত দেশের বেলায় বন্ড বা ISB ইস্যু করাকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, তুলনায় অবকাঠামো (বিশ্বব্যাংক বা চীনের মতো দেশ থেকে) ঋণ নেয়াকে ভাল মনে করে। এর পিছনের কারণ বলা হয়, অবকাঠামো প্রকল্প বাজেটে বরাদ্দ (ডলার মুল্যে) যেসব অর্থ অন্তত স্থানীয়ভাবে কিনতে বা ব্যয় করতে হবে; যেমন, স্থানীয় শ্রম কিনতে হবে হয়ত অথবা সিমেন্ট বা রড ধরনের কাঁচামাল ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য বা প্রকল্পের জন্য একোয়ার [acquire] করা জমির মূল্য পরিশোধ – এসবের তুল্য সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যা বাজেটে বরাদ্দ থাকে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রাপ্ত  স্থানীয় মুদ্রা ওই প্রকল্প নিজ অ্যাকাউন্টে তা জমা করে নেয়। এরপর সেখান থেকে ঐ টাকা স্থনীয় ক্রয়ে ব্যয় করা হয়। এতে ব্যয়িত ঐ বৈদেশিক মুদ্রাকে রাষ্ট্রের অর্থনীতি রাষ্ট্রের  বৈদেশিক মুদ্আরা আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকে। আর তুলনায় বন্ড- ISB ইস্যু করে বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করলে তা সুদসহ আসল এর সবটাই আবার ডলারে ফিরে পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে বন্ড- ISB ইস্যুর চেয়ে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে প্রকল্প উৎসাহের বিষয় বলে গণ্য করা হয়। দেখা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কা এসব বাছবিচার বিবেচনাকে আমল না করে এগিয়ে চলতে গিয়ে বন্ড- ISB ইস্যু করা অনেক সহজ কাজ মনে করতে গিয়ে আজ বিপদে পড়েছে! এটা অবশ্যই বেপরোয়া আচরণ!

    আসলে যারা বন্ড- ISB কিনেছিলেন তাদেরকে প্রদেয় এপ্রিল ২০২২ এর কিস্তির অর্থ দিতে ব্যর্থতা ছিল সবচেয়ে বড় ঘন্টা বেজে যাওয়া যে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি বিশাল সংকটে পড়ে গেছে। অথচ এথেকে দেশকে বের করার মত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে গোটাবায়া সরকার ছিল ততোধিক উদাসীন। যেন সরকার আরামে অপেক্ষা করছিল যেন এক মিরাকল ঘটবে আর অর্থনীতির এই মারাত্মক সংকট মুহুর্তেই সমাধান হয়ে যাবে। অথচ ব্যাপারটা মোটেই তা ছিল না। ফলে সরকার এসব সংকটকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে নাই বা সংকটটারই গুরুত্ব আমল করতে সক্ষম ও যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। আর এটাই মূল ব্যর্থতা।

    সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে এথেকে উদ্ধার পেতে গেলে সেই সমাধানের ব্যাপারে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর গ্লোবাল বাজারের আস্থা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি মনে করা হয়। যেমন গত ফেব্রুয়ারি থেকেই শ্রীলঙ্কান অর্থনৈতিক রেটিংয়ের ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এমন অন্তত দু’টি প্রতিষ্ঠান শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে খারাপ রেটিং দেয় বা রেটিং নামিয়ে দিয়েছিল। এর সোজা ফলাফল হল, বিদেশীরা এই রেটিং দেখেই কিন্তু বন্ড-ISB  বা কোনো দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে আসে। এসব কারণে, যখন গ্লোবাল বাজার দেখে যে, একটা দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটে ফাইনালি আইএমএফ এসে ঐ দেশকে উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করছে কীনা??? এটাই গ্লোবাল পুঁজি বাজারে সবার কাছে এক আস্থার চিহ্ন ছড়িয়ে দেয়। অতএব, সে কারণেই সবাই এখন তাকিয়ে আছে আইএমএফের সাথে শ্রীলঙ্কা সরকারের যে কথা-নেগোশিয়েশন চলছে গত ফেব্রুয়ারি থেকে, তা কবে এথেকে তা একটা চুক্তিতে তা পরিণতি ও সম্পন্ন হতে সমর্থ হয়!!  যার ব্যবহারিক অর্থ, শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি উদ্ধারে আইএমএফ তার কাজ শুরু করে!

    উপরে যে সভরেন বন্ডের কথা বললাম, যা পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকার এখন বিনিয়োগকারিদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারি [defaulter] হয়ে আছে – এই অর্থ পরিশোধ করবে কী করে? কার থেকে আবার অর্থ ঋণ করে এনে? এই বাস্তবতাটা এতই কঠিন যে একমাত্র আইএমএফ-ই [IMF] হতে পারে সেই সম্ভাব্য উতস।  এক রিপোর্ট ধারণা দিচ্ছে যে শ্রীলঙ্কাকে এক্ষণি পরিশোধ করতে হবে এমন অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার [……Sri Lanka’s external debt servicing obligations were thought to be over USD 6 billion.]।  আর এত বিশাল পরিমাণ অর্থ একমাত্র  আইএমএফ-ই যোগাতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা বাজারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে!

    যদিও এসবের মধ্যে আরেক বড় জটিলতা হল, ঐ দেশের চলতি রাজনৈতিক অবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া, তাঁরও পদত্যাগ বিনা কোন নুন্যতম রাজনৈতিক স্থিরতা আসছে না। যার অর্থ আইএমএফ তা হলে কি পরবর্তি নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে? সোজা কথা, গোতাবায়া যতই নিজের পদত্যাগে দেরি করবেন ততই আইএমএফ সংস্কার কাজে নামতেই দেরি করবে! বলাবাহুল্য এর মানে শ্রীলঙ্কা আরো দীর্ঘসময় ধরে চলবে চরম বিশৃঙ্খলা!! অথচ ঘটনা সে দিকেই যাচ্ছে। একদিকে বাজারে খবর হল, নতুন শপথ নেয়া প্রধানমন্ত্রী রনিলকে গোতাবায়ার লোক মনে করা হয়। অর্থাৎ তাই দেশের মানুষেরই আস্থা নাই। ফলে এদের সবার পদত্যাগ না দেখলে নয়া রাজনৈতিক ঐক্য আনা ও সংস্কার কার্যকর করতে এগিয়ে আসা সব পিছিয়ে অনিশ্চিত হয়ে যেতে থাকবে!!!।

    চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার কী খবরঃ
    শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থা নিয়ে যেসব সিরিয়াস মিডিয়া রিপোর্ট করছে এদের মধ্যে যেমন ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা বিজনেস স্টান্ডার্ড ইত্যাদি আছে – সব মিলিয়ে এরা কেউই এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্য শ্রীলঙ্কা ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ পড়েছে বলে কোন কারণ দেখায় নাই। মানে এসব মিথ্যা তথ্যের প্রপাগান্ডা করেনি। বরং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা ব্যাখ্যামূলক [Explained] রিপোর্ট করেছে। এখানে দেখেন,……Explained: What led to Sri Lanka’s economic crisis, and who’s is helping?। তাতে স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণের (সেটা নাকি ৫১ বিলিয়ন ডলার বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে – Sri Lanka announces default on all of its $51 billion external debt )। কিন্তু এই কথাটা সবটা সত্য না। ৫১ বিলিয়ন ডলার – এটা সবটাই প্রতিশ্রুতি ফেল করা ঋণ যেটাক্বে ডিফল্টার (default) বলে টঝিক তা না। একটা দেশের নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণ আর  সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডলার যোগাড় একই জিনিষ নয়। মূলত সভরেন বন্ড জিনিষটা ঋণ নেয়াই নয়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বা চীন জাপান থেকে নেয়া ঋণের বেলায় সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে পারার পরিণতি হল – পুনরায় পরিশোধের সময় দেয়া [রিসিডিউল বা reshedule] তবে সাথে আরো কিছু কড়া শর্তে। কিন্তু ডিফল্টার করে বাজারে খবর রটিয়ে ঐদেশের রেটিং বা অর্থনীতির মান ফেলে দিয়ে নয়।  আর সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি ফেল করা অন্য জিনিষ। এখানে রিসিডিউলের কিছু নাই। যতদ্রুত সম্ভব সব পাওনা দেরির সুদ-সহ পরিশোধ করা। নইলে গ্লোবাল পুঁজি বাজারের বদনামে রেটিং আরো নিচে নেমে না দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়।
    কিন্তু এই ৫১ বিলিয়ন ঋণ দেখানো এটা সবটাই সভরেন বন্ডের ডিফল্টার বা প্রতিশ্রুতির অর্থ নয়। এটা শ্রীলঙ্কার পরিশোধযোগ্য মোট বৈদেশিক দায়। দায় মানেই তা ঋণ নয়। আর এই মোট ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের হল সভরেন বন্ড-ISB ইস্যু করে নেয়া বৈদেশিক দায়। তাই টাইমস অব ইন্ডিয়া পরোক্ষে এমন মানে করে রেখেছে (যেটা আসলে একটা প্রপাগান্ডা) যেন এই ৫১ বিলিয়ন ডলারের পুরোটার ওপর ডিফল্টার হওয়াতেই যেন শ্রীলঙ্কার ক্রাইসিস। এ কথা সত্য নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, বন্ডের ক্রেতার দায় মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের আর এসব বন্ড যারা কিনেছে এরা হলো প্রধানত জাপান, চীন ও এডিবি সাথে কিছু খুচরা বিনিয়োগকারী [ISBs make up the largest share of Sri Lanka’s foreign debt at $12.55 billion, with the Asian Development Bank, Japan and China among the other major lenders.]।

    এর সোজা মানে হল, চীনের কোনো ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদে পড়ার গল্প এটি নয়। এটা সোজাসাপ্টা বন্ড-আইএসবি ইস্যু করার বাজার থেকে অর্থ তুলে আনার বোকামি, এটাই মিস-ম্যানেজমেন্ট এবং বন্ড ক্রেতাদের কিস্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতায় বাজারে খারাপ ইমেজ আর খারাপ অর্থনীতি আর তা মিস-ম্যানেজ বা ভুল পরিচালনাজনিত সমস্যা।

    কিন্তু তবুও ভারতেরই আরেক দল মিডিয়া (যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম আলো বা নিউএজ যারা হয়ত না বুঝে প্রপাগান্ডার শিকার) – এরা শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকটকে চীনের ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদ বলে পুরোনা স্টাইলের প্রপাগান্ডার মধ্যে এখনো আছে ও চালিয়ে যাচ্ছে। আর এদের মিথ্যা প্রপাগান্ডার ভিত্তি এএফপির নামে চালানো এক রিপোর্ট। যে একই রিপোর্ট টাইমস অব ইন্ডিয়া,  ভারতের   এনডিটিভি,     আমাদের প্রথম আলোর অনুবাদ আর নিউ এজ সহ আরো অনেকে তুলে এনেছে। মজার কথা হল শিরোনাম এবং খবরের একই সোর্স হলেও তাতে ভিতরে বডিতে কনটেন্ট সবার এক না।   আর এদের সবার মধ্যে কেবল এনডিটিভি একটা ডিসক্লেমার জুড়ে দিয়ে শেষে জানিয়েছে (This story has not been edited by NDTV staff and is auto-generated from a syndicated feed.)।অর্থাৎ তারা কোন শব্দও এতে ঢুকায় নাই।

    এ ছাড়া একই প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে ভারতের আইপি টিভি (প্রথম কলকাতা) বা সোশ্যাল মিডিয়া টিভি অথবা ফেসবুক ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি, এসব জায়গায় গেঁথে বসা প্রপাগান্ডা ধারণাটা হল, সেই পুরানা গল্প – চীনা ঋণের কারণেই শ্রীলঙ্কা অর্থনীতির আজ এ দুর্গতি। অথচ এটা ভিত্তিহীন।
    আর সবচেয়ে বড় কথা, ওই হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরের মালিকই এখন আর শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। তাই ওটা নির্মাণের ব্যয় পরিশোধের কোনো দায় বা ঋণের বোঝা শ্রীলঙ্কান সরকারের নয় ও নাই। সোজা কথায়,  এখন বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। ওর মালিক এখন চীনের এক প্রাইভেট কোম্পানি যারা বন্দর চালিয়ে নিজের আয় থেকে দায় তুলে নেবে ও নিচ্ছে। ফলে ওই বন্দর নির্মাণ খাতের কোনো ঋণ শ্রীলঙ্কা সরকারকে বইতে হচ্ছে না ও নাই; ওই বালাই-ই নেই এই হলো বাস্তবতা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৪ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জীবনের ভবিষ্যৎ আছে, এ আশা কেড়ে নিতে নেই“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

    –

     

  • সভ্যতা মানে কী

    সভ্যতা মানে কী
    সিন্ধু সভ্যতাঃ এই প্রেক্ষিতে

    গৌতম দাস
    ১২ মে, ২০২২  ১৪ঃ৫২ বৃহস্পতিবার

    https://wp.me/p1sCvy-44A

    দ্বিতীয় পর্ব পেতে এখানে https://wp.me/p1sCvy-47s

     

    Machu Picchu is an ancient city from the Inca civilization.

    Ancient ruins of Karnak temple in Luxor. Egypt. Image credit: Zbigniew Guzowski/Shutterstock.com

    দুনিয়াতে একেকজন মানুষ বিচ্ছিন্ন কেউ নয়, বিচ্ছিন্নভাবে একা একা তারা আসেনি বা দুনিয়াতে বসবাস শুরু করে নাই। দল বা গোষ্ঠিবদ্ধ ভাবে এসেছিল। জৈবপ্রাণ প্রজাতির টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত হিসাবে শুরুতেই এক পর্যায়ে তাদের হাজিরা হয়ে ইঠেছিল দলবদ্ধ, একথা বলা যায়। কারণ জৈবপ্রাণ প্রজাতিগুলো দুনিয়াতে টিকে যাওয়ার পিছনে এটা একটা গুরুত্বপুর্ণ শর্ত কাজ করেছে বলে অনুমান করা যায়। এছাড়া দুনিয়ায় সবকালেই  মানুষের উপস্থিতির যতগুলো রূপ-ধরণ আমরা এখন পর্যন্ত দেখি তাতে সবকালেই মানুষ মাত্রই তারা যৌথ মানে, তাকে দল বা গোষ্ঠিবদ্ধ ভাবেই দেখি। অর্থাৎ মানুষ একা জন্মায় হয়ত ঠিকই কিন্তু জন্মানোর পর থেকে বসবাস তার গোষ্ঠিবদ্ধতায় অথবা সেই থেকে গোষ্ঠির ভিতরেই তার সব প্রজন্ম ও তাদের বড় হওয়া ঘটেছে দেখি আমরা। তবে কথাটা এভাবে বলায় অন্য এক  লক্ষ্যণীয় দিক হল এখানে ব্যাপারটাকে পেশ করবার চেষ্টাটা হল দুনিয়াতে একেবারে শুরুর দিক থেকে মানুষ প্রজাতির কবে কখন এসেছে বা যুক্ত হয়েছে সেদিক থেকে কথা বলবার চেষ্টা করা হল।

    তা সত্বেও এভাবে “শুরু” থেকে বলার অসুবিধা হল, এক্ষেত্রে বেশিরভাগ তথ্যই কোন প্রমাণিত উৎস থেকে সংগ্রহ করা সহজ নয়। যদিও ইন্টারনেটের যুগে অনেক কিছুই আমাদের কাছে এখন লেখাপড়া বা স্টাডির জন্য সহজ লভ্য হয়ে উঠেছে। তবু অনেক উৎস আমাদের এখনও নাগালে নাই।

    এছাড়া এক্ষেত্রে আর সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল এরপরেও মানুষের ইতিহাসের সব মানুষের জানা হয়ে গেছে, খুঁড়ে দেখা ও খোঁজাখুজি করা হয়ে গেছে আবার পাওয়াও গেছে ব্যাপারটা তা তো নয়। ফলে  বহু প্রসঙ্গই একেবারেই অজানা বা জানার মাঝেও অনেক অজানা পকেট বা ফাঁকা থেকে গেছে হয়ত।  এমনটাই স্বাভাবিক।

    লিখিত ইতিহাসঃ
    মূল কারণ হিসাবে বলা যায়, আমরা যে আদি মানব রূপ নিয়ে কথা তুলেছি এসব ঘটনা প্রসঙ্গগুলো হল কমপক্ষে কয়েক মিলিয়ন (এক মিলিয়ন মানে দশ লাখ) বছর আগের ঘটনা [One of the earliest known humans is Homo habilis, or “handy man,” who lived about 2.4 million to 1.4 million years ago in Eastern and Southern Africa.]। আবার অন্যদিকে,  যেমন দুনিয়ায় মানুষ-সহ অনেক জৈবপ্রাণ প্রজাতি আছে। এর মধ্য মানুষ এই প্রজাতির বয়স ধরা হয় (গুগলের বিচারে)  যতগুলো তত্বগত ধারণা আছে এর কোনটাই দুই লাখ বছরের কম না। কাজেই এমন প্রসঙ্গের সব তথ্য সহজ লভ্য হবার কোনই কারণ নাই। এটাই স্বাভাবিক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায় একালে আমাদের জানা আছে ততটুকুই যখন থেকে কিছু  লিখিত ইতিহাস আছে। তাহলে লিখিত ইতিহাস কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।

    তবে তাহলে আবার আরেকটা কথা এসে গেল যে  যদি লিখিত ইতিহাসের কথা ধরে বলি, লিখিত ইতিহাস? এর মানে কী বুঝব? যখন থেকে ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে? তা বলতে পারি হয়ত তবে তাও একেবারেই এত সহজ কথা নয়। কেন?
    যেমন শুধু ‘লিখিত’ শব্দটার অর্থ প্রচলিত বা চালু হওয়ার আগেই অন্তত কয়েক হাজার হাজার বছরের মনুষ্য-জীবন এবং তা দলবদ্ধ  ধরণের বিশেষ জীবন পার হয়ে যেতে হয়েছে। মানেই এর আগে বহু বহু কিছু ঘটে যেতে হয়েছে এবং তা অবশ্যই আবার কয়েক হাজার বছরের ফেকড়া। কেমন সেটা?

    সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনঃ
    বড় হেড লাইনে বললে, একটা নতুন শব্দ এই আসরে আনব – শব্দটা হল সভ্যতা।  সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন (civilization) যখন থেকে শুরু। অর্থাৎ দুনিয়াতে অন্য অনেক জৈবপ্রাণ প্রজাতির মত মনুষ্য-প্রজাতির আগমন – এটা একটা কয়েক লক্ষ বছরের পুরানা ঘটনা। কিন্তু তা সত্বেও অপর আর একটা  রেফারেন্সের দিক থেকে আমরা কথা বলতে অভ্যস্ত – সেটাই “সভ্যতার” রেফারেন্সে কথা বলা। এই সভ্যতা মানে কী? শারারণভাবে বললে,  তখন কথাটা এভাবে বলা যায় যে যেখানে  মানুষের খোঁজ পাওয়া যায় এমন পুরানা সভ্যতাগুলোও মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরানা। এছাড়াও কথাটা এভাবে সম্ভবত বলা যায় যে সব মানুষের জনগোষ্ঠিই কোন না কোন এক সভ্যতার অংশ; যেমন এই বিচারে আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ।
    আর সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, উপরে যে লিখিত ইতিহাসের কথা বলছি সেটা ঘটেছিল কেবল ‘মানুষের সভ্যতা’ শুরুর পরেই। এটাই এর অপরিহার্য শর্ত, তা বলা যেতে পারে। তাহলে আবার ফিরে প্রশ্ন থেকে গেল যে সভ্যতা তাহলে কী?
    এর খুবই সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞাটা হল, মানুষ আদি মানব রূপ [homo sapiens] – এভাবে  কয়েক লাখ বছর আগে দুনিয়াতে হাজির হলেও মানুষের কৃষিকাজের জীবন যাপন শুরু বড়জোর ছয় হাজার বছরের বছরের পুরানা। মানুষের কৃষিকাজ শুরু খুবই গুরুত্বপুর্ণ হদিস। কারণ কৃষিকাজ মানে আর যাযাবর জীবন নয়। থিতু হয়ে যেখানে তাঁর চাষের জমি তারই সংলগ্ন হয়ে বসবাস করতে সে বাধ্য হয়েছে। মানুষের এই জোবনের শুরু মাত্র কয়েক হাজার বছরের পুরানা। তুলনায় মানুষের দুনিয়ায় আদি মানব রূপে আগমন হিশাব করতে হয় লাখে।   অর্থাৎ লাখ নয় কয়েক হাজার বছরের আগে যে মানুষের কৃষিকাজ-ভিত্তিক জীবন-যাপন শুরু হয়েছিল এটাকে আমি একেকটা মানুষের সভ্যতার জীবন বলি। এর আরো বিস্তারিত পরে আসবে।

    “লিখিত ইতিহাস” এর আবশ্যিক পুর্বশর্তঃ
    এমনিতে লিখিত ইতিহাস বলতে সেটা আসলে একালে বসে পুরানা ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহ। যদিও আবার ইতিহাস মানে ‘শ্রেফ অতীত প্রসঙ্গে তথ্য সংগ্রহ ও এর সমাহার নয়’। কারণ ইতিহাসের জন্য আরেক বড় অধ্যায় হল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটাই শুধু না, এর শেষে মূলত আত্মসচেতনতার [self-consciousness] জগতে প্রবেশ করা এবং আরো এগিয়ে যাওয়া। চিন্তা যে চিন্তা করে তা জেনে বুঝে যাওয়া। চিন্তারও বিভিন্ন পর্যায়, বিশেষত চিন্তারও যে পদ্ধতি আছে তা সম্যক জানাশুনা করে নেওয়া। এরই প্রথম পর্যায়টা হল  র‍্যাশনালিটি [rationality] মানে যুক্তি-তর্ক করতে শিখে ফেলা – এই অর্জনটা লিখিত ইতিহাসের আগে থাকা জরুরি [essential pre-condition]। মানুষের চিন্তার এই নুন্যতম পর্যায়টা পার হলে তবেই “লিখিত ইতিহাস” সম্ভব হয়। অর্থাৎ কত লাখ বছর আগে মানুষ হোমো সেপিয়ান যুগে তার আদিরূপ ছেড়ে এসেছে সেটা যথেষ্ট নয়; পরবর্তিতে সে তাঁর লম্বা যাযাবর [nomad বা  Pastoral] জীবন ছেড়ে কৃষিকাজের লোভে বা এই নয়া জীবনকে তুলনায় সহজ মনে হওয়াতে কোন মাটিতে থিতু হয়েছিল – সে ঘটনা এই তো মাত্র তিন-ছয় হাজার বছর আগে। এই স্থির হয়ে কোন নিদির্ষ্ট ভুমিতে বসে পড়া আর কৃষিকাজ যেখানে তার পেশা এখান থেকে সভ্যতার শুরু। দুনিয়ায় মানুষের সব সভ্যতাগুলো কমবেশি শুরু হয়েছিল এরপর থেকে এবং তারা পরস্পর পরস্পরকে জানাশুনা না রেখেই বিভিন্ন সময়কালে শুরু হয়েছিল।  এই সভ্যতার জীবনেরই আবার শেষের দিকে মোটামুটি হাজার বছরের অগ্রগতি হল – তবেই মানুষের এই লিখিত ইতিহাসের যুগ প্রবেশ ও পেরোনো। এভাবে শেষে আজকের জায়গায় আসা।
    এসবের পিছনের মূল কারণ, এটা মানুষের চিন্তাজগতের এক বড় অর্জন এবং তার নুন্যতম চিন্তায় পরিপক্ক হওয়া বা ম্যাচিউরিটি [maturity]। এমন ঘটবার পরেই মানুষ পুরানা সেসব সময়কালের কী কী ডকুমেন্ট সংগ্রহ করবে বা রাখবে, সাংস্কৃতিক কী কী চিহ্ন-বৈশিষ্ঠ খুঁজবার ও বুঝবার দিকে নজর-মনোযোগ নিবদ্ধ করবে আর এছাড়া মুখে মুখে মানে, মুখ আর কানে বয়ে চলা প্রজাতি পরম্পরায় ধরে রাখা তথ্যকেও যতটা সম্ভব  “ডকুমেন্ট” করে রাখার কথা ভাববে ইত্যাদি  – কেন গুরুত্বপুর্ণ তা বুঝেছে। অর্থাৎ মানুষের পক্ষে এই গুরুত্ব অনুভব করার যোগ্য হতে হতেই হয়ত আরো হাজার বছর কেটে গেছে। আর পরিস্কার মনে রাখতে হবে মানুষের লিখিত ইতিহাস কেবল অন্তত কোন একটা জনগোষ্ঠির এক সভ্যতার যাত্রা শুরু করতে পেরেছিল কিছু অপরিহার্য শর্ত পূরণের পরেই তা সম্ভব হয়েছিল। অন্যভাবে বললে, নিজের একটা সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনের কোলে কোন জনগোষ্ঠি থিতু হয়ে বসতে পারলে এরও বহু্বছর পরে একটা লিখিত ইতিহাস শুরু হওয়া সম্ভব হয়েছিল।

    সুমেরীয় সভ্যতাঃ
    আগে বলেছি দুনিয়াতে সব সভ্যতা একই সময়ে যাত্রা শুরু করে নাই। অর্থাৎ সভ্যতাগুলো বিভিন্ন সময়কালে যাত্রা শুরু করেছিল এছাড়া সেকালের দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে তারা পরস্পরের কাছে অজানাই ছিল। তবুও দুনিয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে  সভ্যতাগুলোর কোনটাই মোটামুটি ছয় হাজার বছরের বেশি বয়সী নয়। এছাড়া আগে বলেছি আমরা বৃহত্তর বাঙালি অর্থে এই এথনিক জনগোষ্ঠি আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ।  আমাদের কাছাকাছি ভুগোলে আরো অনেক সভ্যতার কথা জানা যায়। এদের মধ্যে কাছাকাছি ভুগোলে প্রভাবশালী সভ্যতা হল সুমের সভ্যতা।
    সুমের (Sumer)বা সুমেরীয় সভ্যতা  এর ভৌগলিক অবস্থান হল আজকের ইরাক, কুয়েত ও  অংশত সিরিয়া যেখানে। অন্যভাবে বললে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মাঝের ভুমিতে এই অববাহিকায় গড়ে উঠে সভ্যতা। আর সুমের হল আসলে মেসোপটমীয়া এই সভ্যতা-ভুমির প্রধান নগরের নাম। ফলে অনেক সময় সুমেরীয় সভ্যতাকে মেসোপটমীয় [Mesopotamia] সভ্যতাও বলা হয়।

    এই সভ্যতার বিশেষ এক বৈশিষ্ঠ হল এর লিখিত ইতিহাস বা ইতিহাসের উপাদান এখানে পাওয়া গিয়েছে। ফলে এই সভ্যতার অনেক কিছুই ডকুমেন্টেড।  এর সেই লিখিত ধারার নাম আবার কিউনিওফর্ম (Cuneiform)। এই শব্দের অর্থ বাংলায় গোঁজ বা খুটা (গরু বাধা দড়ির যার প্রান্তে আটকানো থাকে)। ইংরাজিতে (wedge)বা গোঁজ দিয়ে নরম কাঁদামাটির স্লেটের উপর চিহ্ন এঁকে লেখা,যা পরে শুকিয়ে-পুড়িয়ে স্থায়ী করে নেয়া – এই হল এর লেখা ও সংরক্ষণের পদ্ধতি। সেখান থেকে এটা ‘সুমেরীয় কিউনিওফর্ম স্ক্রীপ্ট’ এই নামের এক প্রাচীন লিখিত ইতিহাস রাখার পদ্ধতি বলে পরিচিত আছে।

    আবার মেসোপটমীয়াকে সব সভ্যতার সুতিকাগার বা দোলনাঘর (cradle of civilization) বলা হয়। অর্থাৎ এটা সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা। এছাড়াও, কোথাও সভ্যতা গড়ে উঠতে গেলে যেসব উপাদান সেখানে থাকলে তা গড়ে উঠার জন্য সবচেয়ে সহায়ক বলে মনে করা হয় সে বিচারে  মেসোপটমীয়া সভ্যতা সবার চেয়ে  আগিয়ে মানে তাতে সহায়ক উপাদান সবচেয়ে বেশি ও আদর্শভাবে উপস্থিতি পর্যাপ্ত বা বেশি।

    সেসব উপাদানকে সহায়ক শর্ত ধরা হয় সেপ্রসঙ্গে যাবার আগে কিছু সাধারণ কথা। যেমন সভ্যতা বিষয়ে আমরা কয়েকটা কথা একেবারে মুখস্ত রাখতে পারি। সভ্যতা শব্দটার প্রায় সমান্তরাল আরেকটা শব্দ হল ডমেস্টিক (domestic) বা গৃহপালিত। এটা প্রচলিতভাবে ডোমেস্টিক শব্দটা আমরা ব্যবহারে যেভাবে অভ্যস্ত তার চেয়ে একটু ভিন্ন। কেন?

    মিলিয়ন বছরের মানুষ এই প্রজাতি (spacies) ছয়হাজার বছরের সভ্যতার যুগে প্রবেশেরও আগে অবশ্যই অনেক কিছুর বিপরীত স্রোতের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া যেখানে মাঝের এই সময়গুলোর মানে, মিলিয়ন থেকে হাজার বছরে নেমে আসার বড় একটা অংশই কেটেছে – প্রকৃতির সাথে ভাল “খাপ খাইয়ে নেয়া” প্রজাতি হয়ে উঠতে। অর্থাৎ মানুষের স্বভাব ও শরীরের যেসব বৈশিষ্ঠ বাস্তবের প্রকৃতিতে টিকে থাকার উপযোগী ছিল না এটা বলা অতুক্তি হবে না যে হয় তা মানুষ তার নিজের বাইরের প্রকৃতির সাথে প্রকৃতির উপযোগী হতে বা খাপে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে নিজেকে নিজের শারীরিক গঠন সহ বহু কিছুতে ব্যপক ভাবে বদলে নিতেই হয়েছে, বদলে গিয়েছে। আর নয়ত টিকতে না পেরে ঐ বিশেষ মানুষ-প্রজাতিটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে এর জবাব সোজা বলে দেয়া যায় যে যা তার পরিচিত ও গমনযোগ্য [accessable] ভূমিতে ঐকালে প্রচুর পাওয়া যেত তারই কোন একটাই তার খাদ্য হয়েছিল; তবে অবশ্যই যা তার খাদ্য হবার উপযুক্ত কেবল সেগুলোই। আর একটা দীর্ঘ সময় মানুষের গড়ন-বৈশিষ্ঠের এই ভাঙ্গা গড়ার ভিতর দিয়েই কেটেছে তা আমরা নিশ্চিত ধরে নিতে পারি।

    তবে একটা কথা পরিস্কার মনে রাখতে বলা যায় যে দুনিয়ার ভুগোলের কোন ভুমিতে সভ্যতা গড়তে বসা শুরু হবে তা শুরুর আগের মানুষের যে রূপ ও জীবন – সেটাই ছিল এক ব্যাপক যাযাবর (nomads) জীবন। অর্থাৎ মিলিয়ন বছর থেকে মানুষের বয়স যখন কয়েক হাজারে নেমে এসেছিল এই মাঝের দীর্ঘ সময়কাল এটাই মানূষের যাযাবর জীবনকাল। যাযাবর মানে হল খাবার টোকায় খেয়ে বা গাছ থেকে পেড়ে খেয়ে এক লম্বা শিকার ও সংগ্রহের জীবন মানুষকে পাড়ি দিতে হয়েছিল। মানে, হান্টিং এন্ড গ্যাদারিং [hanting & gathering]  জীবন ছিল সেটা!

    এখানে যাযাবর বা নোমাড জীবন আর পশুপালক (pastoral)এদুইয়ের জীবনের মধ্যে মধ্যে একটা ফারাক মনে রাখা যেতে পারে। পশুপালকেরা সাধারণত যাযাবর হয় কিন্তু যাযাবরেরা পশুপালক নাও হতে পারে। কারণ হয়ত খাদ্যের প্রাপ্যতা [availability] জন্য, যে ভুমিতে সে ছিল তাতে কিছুদিন পর পর খাদ্য ফুরিয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তখনকার মানুষ কৃষিকাজ কী তা জানত না। অর্তঝাত প্রকৃতি নিজের খেয়ালে যা কিছু ফল-ফলারি গাছে জন্মাত তা পেড়ে সংগ্রহ করেই পাওয়া এমন খাদ্য দিয়েই কেবল ঐ ভুমির মানুষদেরকে চলতে হত। তাই খাদ্যাভাব মানে চাষাবাদ জ্ঞানহীন জীবনের মানুষ গাছের ফল-মূল সংগ্রহ করে খেয়ে চলতে। তাই কোন ভুগোলের ভুমিতে খাদ্যের প্রাচুর্য আছে সেই খোজ রেখে তাকে যাযাবরের জীবন যাপন করতে সে বাধ্য ছিল। এমন অস্থিরতার জন্যও মানুষ যাযাবর হতে হত। যদিও যাযাবর এর সাধারণ সংজ্ঞা হল যে এক দেশ-ভুগোলের ভূমিতে বেশিদিন বসবাস করে না। কারণ খাদ্য প্রাপ্যতার অভাবেও (একই ভুমিতে খাদ্য ফুরায়ে গেলে) তার  যাযাবর হওয়া প্রয়োজন হয়েছে।

    তবে আবার এই একটা কথায় অনেক কথা বলা হয়ে গেছে। যেমন এর মানে হল সে সময়ের মানুষ বা নোমাড মানুষ মানে এরা ১। তখনও এমন মানুষ যারা কৃষিকাজ জানে না বা তা করতে শুরু করে নাই। ২।  তখনও অর্থাৎ এটাকে বলে সংগ্রহ বা গেদারিং সমাজ (gathering society)- এমন সমাজ হয়েই তারা ছিল কেবল। যেমন কোন কোন গাছের ফল পাওয়া যায়, তা পেড়ে আনা বা সংগ্রহ করা যায়, কোথাও তা প্রচুর পাওয়া যায় ইত্যাদি সবকিছু সভ্যতা-পুর্ব কালের মানুষের ভাল জানা ছিল। এটা সভ্যতা শুরুর পুর্ব সমাজ কেন বললাম?

    সভ্যতা শুরুর পুর্ব সমাজঃ
    কারণ, সভ্যতা শুরু হতে গেলে এক অপরিহার্য শর্ত হল, মানুষকে সেক্ষেত্রে থিতু হয়ে কোন ভুগোল-ভুমিতে এর আগেই বসবাস শুরু করতে হবে। আর স্বভাবতই এর আগে পর্যন্ত মানুষ যে যাযাবর ছিল  সেই যাযাবর জীবনযাত্রায় তার আগে ইতি টানতে হয়েছিল। সোজা কথায় যাযাবর জীবনের মানে সভ্যতা শুরুর হয়েছিল যেখান থেকে এমন  জীবন সেটা। 

    কারণ যাযাবর জীবন কালও অনেক লম্বা ছিল যা লাখে হিসাব করতে হবে। সাধারণত এর শেষের কালটা হল পশুপালক-যাযাবর (pastoral) জীবন। অর্থাৎ যখন পশু চড়িয়ে বেড়ানো তাঁর পেশা। তবে সাবধান এটা আমাদের এখনকার কল্পনায় দেখা বা বইয়ে পড়া কোন রাখাল বালকের গরু চড়ানো মত কোন গল্প নয়, এমন সরলও নয়। কারণ তখনও সে নোমাড বা যাযাবর। ফলে তারা “গৃহস্থ” হয়ে উঠে নাই তখনও। অর্থাৎ ‘বাসা’ বা আবাসস্থল বলে কোন ধারণা তখনও তাদের নাই। অর্থাৎ যেখানে সে রাত কাটায় সবটাই অস্থায়ী। তাই বাড়ি বা বাসা ধারণাটা তখনও মানুষের মধ্যে আসে নাই। এমন পশুপালক ((pastoral)) জীবন এখনও দেখতে পাওয়া  যেতে পারে আফ্রিকার কোথাও কোথাও।  যেমন কেনিয়ায় মাসাইমারা ট্রাইবে [Maasai mara Tribe & culture], ইথিওপিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে [Gambella Region] [In Ethiopia, about 10 million pastoralists rely on animal husbandry as a key source of wealth and subsistence.] বা  ইথিওপিয়ারই সোমালি অঞ্চলে। এদের কমন ফিচার হচ্ছে তারা ট্রাইব (Tribe) গোত্রবাদি সমাজে বসবাস করে। অর্থাৎ এরা একটা বৃহত অঞ্চলে একালের রাজনৈতিক ভুগোলে বসবাস করলেও  এরা গোত্র সমাজের লোক – মানে ঠিক হান্টিং-গেদারিং সমাজের যাযাবর বলতে যা বুঝায় তা নয়। আবার মনে রাখতে হবে কোন ভুমিতে থিতু হয়ে বসা মানুষের জীবন-সমাজেরও আবার দুটা পর্যায় দেখা যায় কোথাও কোথাও। যেমন এর প্রথম রূপ হল গোত্র-সমাজ। যেটার আরেক রূপ  ব্যক্তিভিত্তিক সমাজ।  আর অবশ্যই “ব্যক্তিভিত্তিক সমাজের” আগের রূপ হল গোত্রভিত্তিক সমাজ।

    এই সুযোগে গোত্র সমাজ নিয়ে কিছু কথাঃ
    মূলকথা, গোত্রসমাজ আর ব্যক্তি সমাজ দুটাই সমাজ মনে হলেও দুটা একেবারেই এক নয়।  আবার “সমাজ” বলছি যখন তখন এটা অবশ্যই আগের মানুষের নিরন্তর যাযাবর জীবনের পরিসমাপ্তিতেই তা এসেছে আমরা ধরে নিতে পারি।  তবে হান্টিং এন্ড গেদারিংয়ের যাযাবর জীবন ধারা শেষে  সরাসরি কোন ভুমিতে থিতু হয়ে যারা কৃষিকাজের জীবন সমাজ শুরু করে নাই – ফিরে আবার পশুপালক (pastoral) জীবন যারা শুরু করেছিল এদের মধ্যেই গোত্রসমাজ সবচেয়ে দীর্ঘসময় টিকে যেতে দেখা যায়। সাধারণভাবে বলা যায় এশিয়ার সমতল-ভুমি অঞ্চলে গোত্রসমাজ সবার আগে উঠে গেছে মানে ক্ষণস্থায়ী ছিল। এর বাইরে যত হাইল্যান্ডার বা মরুভুমি অঞ্চল বা সংলগ্ন অঞ্চল – সেখানে গোত্রসমাজ দীর্ঘকাল টিকে থাকতে দেখা যায়।

    গোত্রসমাজে ব্যক্তিবোধ নাই বা তখনও আসে নাই। ফলে ব্যক্তি সম্পত্তি নাই, গোত্র সম্পত্তি আছে। গোত্রসমাজে গোত্র-প্রধানই সব। তিনিই গোত্রের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেন বা দেন। আর এটাক ভেঙ্গে পড়লেই ব্যক্তি-সমাজ গড়ে উঠে। আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠি তাদের এখনও গোত্রপ্রধান বলে পদ আছে। যদিও তার কর্তৃত্ব নাই। এদিকে তারা এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনত নাগরিক। আর যে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র মানেই তা ব্যক্তিভিত্তিক। এছাড়া পাহাড়িদের পাশের বড় ও প্রভাবশালী বাঙালিরা ব্যক্তিসমাজ এর পর্যায়ে উঠে গেছে। সব মিলিয়ে তাই তাদের গোত্র সমাজ মূলত ভেঙ্গে গেছে, ব্যক্তি সমাজের দিকে রওয়ানা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক ভাবে পুরানা গোত্রসমাজের সংস্কৃতির চর্চা-অভ্যাসগুলো রয়ে গেছে – যা বার বার উঠে আসছে আর সেগুলো তাদের “নিজস্ব কালচার” এই যুক্তিতে; যদিও সেগুলো আসলে তাদের পুরানা গোত্র (ব্যক্তিবোধ না জাগার কালের) কালচার।
    গোত্রসমাজের বৈশিষ্ট বা কালচারাল ধরণ দেখে সহজেই চেনা সম্ভব। যেমন, পাকিস্তানের উত্তর সীমান্তের ভিতর থেকেই আরো উপরে দিকে যতই আফগানিস্তানের দিকে যাওয়া যাবে ততই ঐ অঞ্চলটাই গোত্রসমাজের প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট গোত্র কালচারের আধিপত্য দেখতে পাওয়া যায়। যেমন শহুরে জীবনের চোখে তাদের সম্পর্কের আমরা দেখি মিডিয়ায় লেখা হয়েছে – “অনার কিলিং” (honour killing) এর কথা।  এটা কী জিনিষ?
    শহুরে চোখে তা খুব আজিব লাগে, আধা বুঝ বা না-বুঝা লাগে হয়ত। ঘটনা বর্ণনা হয়ত শুনব এভাবে যে ওমুক গোষ্ঠির এক টিন-এজ মেয়ে নিজের পছন্দের কোন ছেলেকে বিয়ে করতে গেছে বলে ঐ মেয়ের ভাই নিজ বোনকে খুন করেছে। বর্ণনা শুনে এটাকে আমাদের মতই কোন ব্যক্তিসমাজের ঘটনা বলে ভেবে সে বিচারে  ব্যাপারটা”একটু উগ্র” মনে হবে হয়ত।  কিন্লেতু কেন তাদের সমাজ ওরকম? আর এই খন করার মধ্যে “অনার” মানে সম্মান রক্ষা করার ঘটনা কোনটা? কারই বা সম্মান??
    আসলে এখানে এটা পুরাটাই এক গোত্রবাদী কালচারের চর্চা ও এর প্রভাব বা ওরই প্রাকটিস ওখানে করা হয়েছে। কেন ও কীভাবে?

    গোত্র সমাজে ব্যক্তিবোধ নাই, থাকে না বা কাজ করে না। গোত্র সমাজে গোত্রপ্রধান থাকে আর তার হুকুমেই চলে। সেখানে তাই গোত্রপ্রধানের সিদ্ধান্তই সবার পালনীয়।  গোত্র পরিবারের কে কার সাথে বিয়েতে বসবে সেটাও গোত্রপ্রধানের বা তাঁর মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অর্থাৎ গোত্রের সদস্যরা ব্যক্তি বলে গণ্য হয় না; নিজেদের তারা ব্যক্তি গণ্য করে না। এমন গোত্র সদস্য তারা। অতএব কোন ব্যক্তিবোধের চর্চা সেখানে থাকত না। আসলে ব্যক্তি নাই মানে সেখানে প্রেম বলে কোন নাই। কারণ প্রেমের পুর্বশর্ত হচ্ছে – দুজনাই স্বাধীন ব্যক্তিবোধ হাজিরা আর তা তাদের স্বজ্ঞানে বা অজ্ঞানে। (যদিও সেটা প্রেমের পরে বাস্তব পরিবার চর্চায় সেটা আর ততটা বাস্তবে ক্রিয়াশীল নাও থাকতে পারে।)  কাজেই কোন গোত্র পরিবারের সদস্য কোন ছেলে বা মেয়ে নিজ পছন্দের বিয়ের পথে যেতেই পারে না। এটা গোত্রপ্রথারই বা গোত্রপ্রধানেরই বিরুদ্ধাচারণ।
    কিন্তু একালে এসে হয়ত কোন পুরানা গোত্রসমাজ ঠিক ভেঙ্গে যায় নি; ফলে নয়া ব্যক্তিসমাজও উদয় হয় নাই। কিন্তু একটা মাঝামাঝি দশায় আছে। ফলে সেটা ঠিক গোত্র কালচারের ভেঙ্গে পড়া কিন্তু আধাখেচড়া অবস্থা। ফলে গোত্রপ্রধানের নিয়ন্ত্রণও  ঢিলা তবে তা একেবারে ভেঙ্গে না পড়ে নাই হয়ত। এছাড়া পাশে হয়ত আছে কোন বড় ও ভিন্ন ব্যক্তিভিত্তিক সমাজের উপস্থিতি আছে। ঠিক যেমন, আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠির পাশে আমরা বাঙালি জনগোষ্ঠি যারা। আমরা পাহাড়িদের অনেক আগেই আমাদেরও হয়ত কোন গোত্রজীবন যা আগে ছিল তা শেষ ও ত্যাগ করে এসে গেছি। পাহাড়িদের তুলনায় আমরা সংখ্যাতেও অনেক বড়। তাই সব মিলিয়ে এসব কারণে আমাদের প্রভাবই ওদের উপরে পড়তে ও কাজ করতে বাধ্য।  এরকম পরিস্থিতেই অনার কিলিং ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। যার শাস্তি হল পরিবারের তরফ থেকে (পুরুষ ডোমিনেটেড পরিবার বলে) মেয়ে সদস্যকেই আগে হত্যা করে ফেলা, সাজা দেয়া হতে দেখা যায়। অর্থাৎ গোত্র-পরিবারেরর সম্মান রক্ষার্থে হত্যা এটাই “অনার কিলিং” (honour killing)। একালের পরিভাষায় হয়ত ভাই বলবে “এটা পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে হত্যা”। কিন্তু পিছনের কারণ এটা গোত্রসমাজের মুল্যবোধ ও প্রথা অনুসরণ করে করা হয়েছে। এছাড়াও, যেমন চোখের বদলে চোখ তুলে নেয়ার প্রথা অথবা যাকে অপরাধী মনে করা তাকে নিজের হাতে শাস্তি দিয়ে চাওয়া – এগুলো গোত্রসমাজ কালচারেরই পুরানা জের ও এর প্রভাব। যেমন ব্যক্তিসমাজের দৃষ্টিতে কেউ যদি প্রেমের কারণে  নিজ বোনকে হত্যা করে তবে নাগরিক রাষ্ট্রের আদালত পুরানা গোত্রপ্রথার যুক্তি-সাফাই মানবে না, গ্রহণ করবে না।  বরং ভাইকে সোজা হত্যাকারি বলে উলটা ফাঁসির সাজা দিবে এই বলে যে ঐ ভাই তাঁর আপন বোন যে ঐ রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক তাকে খুন করেছে – আর কোন স্বাধীন নাগরিককে আরেক ব্যক্তি খুন করতে পারে না – এই অপরাধে ব্যক্তি-ভাই মৃত্যুদন্ড সাজা পাবে।
    আবার এর উল্টাও হতে পারে। যেমন ব্যক্তিসমাজ হলেও কখনও সেখানে গণপিটুনির (মব লঞ্চিং বা Mob lynching) ধারণা দেখতে পাওয়া যায়। যার সোজা মানে হল ব্যক্তিসমাজে বিচারবিভাগ বলে আলাদা কিছু একটা আইন-বিচার আদালত চালু হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু দুর্নীতি আর স্বৈর হস্তক্ষেপের কারণ বিচার ব্যবস্থা গণ-মানুষ মানে পাবলিকের আস্থা পায় নাই। এই অবস্থায় ঐ ব্যক্তিসমাজে “গণপিটুনির ধারণা” ক্রিয়াশীল দেখা যেতে পারে। আমরা এখন আবার একটূ পিছনে ফিরে শুরু করব!

    সংগ্রহ বা গেদারিং (gathering) সোসাইটিঃ
    আরেকটা গুরুত্বপুর্ণ দিক নিয়েও আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি – কী সেটা? আগে উল্লেখ করেছিলাম গেদারিং (gathering)) সোসাইটি। মানে তখন মানুষ বড় জোর গাছের ফলফলারি সংগ্রহ করে খাওয়া ও এ৪ভাবে দুনিয়াতে নিজেকে টিকিয়ে রাখা শিখেছে – ঐ সময়কালের মানুষ। কিন্তু কী করে তা আমরা জানলাম? কারণ গেদারিংয়ের পাশে বা সাথে আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করা হয় –  যেমন হান্টিং (hunting) এন্ড গেদারিং সোসাইটি। অর্থাৎ শিকার ও সংগ্রহকারী সমাজ। অর্থাৎ সাথে পশু শিকার -এর কথা বলে হচ্ছে। পশু খাওয়া যায় কীনা এটা মানুষের জানা ও খেতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে  অবশ্যই মানুষের কাছে আগুন আবিস্কার হয়ে থাকতেই হবে।  কারণ মানুষের পক্ষে অন্য পশুর মাংস সরাসরি খাওয়া যায় না বলে তা প্রক্রিয়াজাতকরণ বা আগুনে রান্নার কালচারাল অভ্যাস মানুষের রপ্ত বা জানা থাকতে হবে। মানে আগুনে সিদ্ধ বা ভাজা-পোড়া করা না জানলেও অন্তত ঝলসিয়েই কেবল পশু খাওয়া যায় – একাজে আগুন আবিস্কার আগেই জানা হয়ে থাকলে তবেই পশুর মাংস মানুষের খাদ্য হয়েছে। অর্থাৎ আগুনের ব্যবহার জানা আগে; এরপরে পশু মানুষের খাদ্য হতে পারে। সারকথায় তাই হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটি মানে হল পরের কৃষিকাজ ভিত্তিক থিতু সমাজের পৌছানোর বহু আগের এবং তা এক অবশ্যই নোমাড ও পশুপালক সমাজ পার হয়ে আসতে হবে। তবে শুধু গেদারিং সোসাইটি  মানে হল এটা যাযাবর জীবনের লক্ষণ; অন্তত আগুন আবিস্কারের আগের মনুষ্য-জীবন সেটা!!

    তাই সোজা সিদ্ধান্ত হল, মানুষের কৃষিকাজ ভিত্তিক সমাজে পৌছানো মানে এই থিতু সমাজে পৌছানোর আগে মানুষকে বহুকিছুতে জীবন-অভিজ্ঞতার পর্ব শেষ  করে আসতে হয়েছে। সেগুলো, ফলমুল খাদ্যের কিন্তু নোমাড সমাজ, এরপর হান্টিং শিখা কিন্তু এর আগে আগুনের আবিস্কার জেনে রাখা। এরপর হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটিতে বসবাস যেটা তখনও নোমাড। এরপর সবশেষে পশুপালক (pastoral)জীবন। আর পশুর খাদ্য পাওয়া সহজ করতে যেদিকে পশুর খাদ্য ধরণের গাছপালা বেশি পাওয়া সেদিকে ক্রমান্বয়ে নোমাড মানুষের যেতেই থাকতে হবে। তাই এটাও সেই লম্বা নোমাডিক বা যাযাবর জীবন এর সম্ভবত শেষ ভাগ। আর এসবের সমাপ্তি ঘটলে তবে আসতে পারে  মানুষের কোন কৃষিকাজ জীবন। এটা আসলে আরো অনেক কিছু  যেমন, যেমন এখান থেকেই মানুষের গৃহস্থ হওয়ার শুরু। আর সর্বোপরি এটাকেই আমরা মানুষের সভ্যতার শুরুর যুগ বলছি!!

    সভ্যতার শুরু মানে মানুষের কৃষিজীবনের শুরুঃ
    হান্টিং এন্ড গেদারিং সোসাইটির জীবন এরও বহু পরে কৃষিকাজের জীবনে পৌছানো মানুষের জীবন-ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। যেমন  মানুষের কৃষিকাজের জীবনে পৌছানো  এর এক নম্বর লক্ষণ হল নোমাড পশুপালক জীবনসহ পিছনের পুরা যাযাবর জীবন পার হয়ে সেসবের ইতি টানা। কিন্তু এটাকে থিতু জীবন বলা হচ্ছে কেন? কারণ, খুব সহজ! সেটা এজন্যই যে এটা আগের যাযাবর জীবনের ইতি অথবা অন্যভাবে বললে কৃষিকাজ মানে তখন থেকে কৃষির জমির সাথে মানুষের জীবনযাপন বসবাসের জীবন আটকে যাওয়া। তখন মানুষ চাইলেও আর পুরানা যাযাবর জীবন যাপনে ছেদ পড়তে বাধ্য। কৃষিকাজ মানে ঐ জমির সাথে মানুষের গাটছাড়া বেধে যাওয়া।  জোবঙ্ঘুরেফিরে ঐ জমিতেই বা আশে[পাশে ফিরে আসতেই হবে এক-মন দশায় আটকে যাওয়া। সব সময় মনে রাখতে পারি মানুষের আগের জীবনের যেকোন স্বভাব তখনই বদলাবে বা বদলিয়ে যেতে পারে যখন আগের চেয়ে সেটা সহজ  ও বেটার জীবনযাপনের উপায় – এই বুদ্ধিশুদ্ধি সে জেনে গেছে এবং সেটা আগের জীবনযাপনের ভিতরেই কিন্তু হঠাৎ করে ঘটনা-দুর্ঘটনায় সে জেনে গেছে মানে তা বেশিরভাগ সময় এক্সিডেন্টালি ঘটে থাকে!

    নয়া এক কৃষিকাজের জীবনে আসতে গেলে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধিতে একটা বড় উল্লম্ফন ঘটাতে, মানে এক গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছিল। সেটা হল জ্ঞানবুদ্ধির অনেক পরিশীলিত ব্যবহারের জগতেও প্রবেশ করতে হয়েছিল;  অর্থাৎ  গায়ে-গতরে বলপ্রয়োগের জীবন থেকে বাদ দেয়া অবশ্যই নয়, তবে এবার আর এশুধু গায়ে-গতরে বলপ্রয়োগ করে জীবন কাটানো আর নয়।
    যদিও কৃষিকাজ মানে প্রথমত মানুষের নিজ জ্ঞানবুদ্ধিতে আগের জীবনের চেয়ে অনেকানেক বেশি ব্যবহারে অভ্যস্থতা। এতা অবশ্যই জ্ঞানবুদ্ধিতে মানুষের এক নয়া পরিশীলিত অবস্থা। কেন? কারণ এই জীবনের পুর্বশর্ত হল বিপুল পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারি আগে হতে হবে।  যেমন ছোট-বড় সব গাছগাছালির প্রকৃতি – অর্থাৎ এখন যাকে আমরা উদ্ভিদ বলতে অভ্যস্ত এর জীবন প্রণালী খুবই মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছিল। অর্থাৎ এর আগে পর্যবেক্ষণ কী জিনিষ সেটাই বুঝে ফেলতে হয়েছিল। কোনটা ধান বা গমের বীজ বা কাকে বীজ বলে তা বুঝেসুজে আর কেমন মাটিতে কী করে ফেললে তা থেকে আবার নয়া গাছ হয় ইত্যাদি সেসব “উদ্ভিদ জীবনচক্র” বুঝে ফেলতে হয়েছিল।

    আবার এর আগেই আরেক পর্ব অবশ্যই ছিল। যেমন মানুষের শরীর টিকাতে গেলে দু’বৈশিষ্ঠের দুটা খাদ্য লাগবেই। বিজ্ঞানের ভাষায় কার্বোহাইডেট আর প্রোটিন, এছাড়াও সাথে অবশ্যই আরো অনেক কিছু বাড়তি খাবার কথাও ছিল। আর ঠিক উপাদানের উপযুক্ত নাম জানা নয় কোন ধরণের খাদ্যে তা থাকে এটা জানার কথা বলছি।   তাই সম্ভবত সব সভ্যতার মানুষেরা শুরুতেই মানুষই বুঝে ফেলেছিল তার অন্তত একটা কার্বোহাইডেড বা স্টার্চ (starch)এই উপাদানের কোন একটা উতস খাদ্য হিসাবে লাগবেই। কমন ভাষায় যাকে আমরা প্রধান খাদ্য বা স্টেপল ফুড (staple food) বলি। যেমন, চাল, গম, ভুট্টা, বা মাটির নিচে জন্মানো মিস্টি আলু অথবা তেফ (teff, এক ইথিওপিয়ান স্টার্চ যা গমের আটার মত পিষিয়ে নিয়ে তা খাওয়া যায় এমন খাদ্য) ইত্যাদি এসবগুলো বিভিন্ন সভ্যতায় প্রধান খাদ্য কার্বোহাইডেট-এর উৎস। বলাই বাহুল্য এমন গাছ বা খাদ্য কে চিনে নেওয়া ও বেছে নেওয়া এটাই হিউম্যান প্রজাতির এক বড় অগ্র-পদক্ষেপ –  এক বিরাট পর্যবেক্ষণ শক্তির অধিকারি হয়ে উঠা।
    যেটার কারণে, আর হান্টিং এন্ড গেদারিং সমাজে অভ্যস্ত পুরানা যাযাবর মনুষ্য-জীবন  আর নয় বা একে বাই বলা সম্ভব হয়েছিল।
    তাই আসলে কৃষিকাজ মানে  – এটা মানুষের শুধু বিশাল এক  পর্যবেক্ষণ শক্তি গুণই নয়, আরও বহু বহু কিছুর এক নব অধ্যায়!!

    যেমন আগে যে কথা বলছিলাম মানুষের কৃষিকাজের জীবনে প্রবেশ ঘটা – এটা তার জীবনে এক বিরাট নতুন শর্ত তার অজান্তে জুড়ে দিয়েছিল।  যেমন যে কৃষিকাজে অভ্যস্ত সে আর নোমাড থাকা সম্ভব না। আল্লাহর দুনিয়ায় কোন না কোন ভুগোল-ভুমিতে তখন থেকে তাঁকে  থিতু হয়ে গেড়ে বসতেই হবে। কারণ চাষাবাদ একেক দিন একেক জায়গায় করার জিনিষ তো নয়ই  বা একেক বছরে আরেকটা পাড়াতে বা আরেক দেশে গিয়ে করতে বসা তো আর  যাবেই না। কৃষিকাজ মানেই একই জমি একই পদ্ধতি ফলে একই ভুমিতে তা হতেই হবে। অতএব, এই প্রথম যাযাবর স্বভাব ত্যাগ করে, মানুষের থিতু হওয়া অর্থাৎ মানুষ মাত্রই সুনির্দিষ্ট কোন ভুমির মানুষ হতেই হবে – এমন হয়ে যাওয়া শুরু হয়ে যায়। মানুষ মানেই তখন থেকে গোপালগঞ্জের মানুষ কিংবা ছাগলনাইয়ার মানুষ কিংবা মানুষ তখন বাবুনগর গ্রামের বলে “বাবুনগরী” হয়ে যাবে। এমন করেই সে তখন  এশিয়ার বা আফ্রিকার মানুষ হতেই হবে – এমন এই ভুগোলের শর্তযুক্ত হয়ে গিয়েছিল মানুষ।

    এখন এই জীবনের সাথে আরেকটা শব্দ উচ্চারণ করব তাতে আমি যা বলতে চাচ্ছি  তা বুঝতে আরেকটু সহজ হয়ে যাবে। শব্দটা হল ডমেস্টিক (domestic) বা গৃহপালিত। শব্দটা আমাদের খুব কম মানুষের কাছেই অপরিচিত। তবু আমি কিছু বিশেষ দিক থেকে শব্দটাকে পরিচিত করাব। যেমন, কী গৃহপালিত নয়? এই প্রশ্ন থেকে তা বুঝা যেতে পারে। সংক্ষেপে জবাব হল যা বন্য [wild] তা আর গৃহপালিত নয়।  আসলে মানুষের কৃষিকাজভিত্তিক ভৌগলিক-ভুমিতে স্থিতির যে  জীবন, যা কিছু এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ তাই গৃহপালিত। এটাই হল এর বৃহত্তর সংজ্ঞা! যেমন, গৃহ শব্দটা খেয়াল করেন। যাযাবরের একেবারেই উলটা শব্দ এটা। যেমন সন্ধ্যাবেলায় যে পশু নিজ স্বভাবে ‘বাসায়’ (এখানে শুরও বাসা থাকে) ফিরে না (মানে নিরাপদ জীবনে) সেটা গৃহপালিত নয়। যে তখনও ‘বন্যই’ মানে পুরানা প্রাকৃতিক স্বভাবেই থেকে গেছে।  মানুষের সভ্যতার জীবন বা কৃষিজীবন শুরুর সাথে সাথে  প্রকৃতিতে প্রধান যে বাঁক বদল ঘটে গেছে শব্দ হিসাবে সেটাকেই আমরা বলে গৃহপালিত করে নেওয়া (domestication)। অন্য আরেকটা শব্দ আছে যেটা (tame)বা স্থিতিজীবনের উপযোগী করে নেওয়া। অর্থাৎ দুনিয়াতে মানুষই কেবল একা কোন গৃহে কোন ভুমিতে নিজেকে আবদ্ধ করে নাই। বরং যতটুকু তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতা বিস্তৃত সবটাকেই নিজের জীভবনের সাথে বদলে নিয়েছে। কিছু পশু গাছপালা ইত্যাদি সবকিছুকেই সে বদলে পোষ-মানিয়ে মানে নিজের নয়া কৃষিজীবনের উপযোগী করে নিয়েছে। নইলে সেই প্রজাতিকে লোপাট করে দিয়েছে।  যেমন বিছুটি পাতা, যারা গ্রাম-জীবনের সাথে এখনো সম্পর্কে রাখেন তারা চিনবেন; তবে হয়ত ভিন্ন নামে। এই পাতা মানুষের গায়ে লাগলে ঐ জায়গা চিলকায় ফুলে উঠে, লাল হয়ে যায়। আর এর প্রভাব অন্তত আর্ধেক দিন পর্যন্ত থাকে। সাধারণত মাঠে মানুষের  হেঁটেচলার পথের ধারে তা জন্মায়। কিছু সমাজে এই গাছ দেখলে তা উপড়ে ফেলে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কেন?
    এরা বলতে যায় এই গাছের “ডমেস্টিক স্বভাব” নাই। মানে এই গাছ tame হয় না। মানুষের থিতুজীবনের সাথে যায় না। তাই এরা যে বনে মানুষ যায় না বা কম যায় কেবল সেখানেই থাকুক। তাই এই গাছে দেখা মাত্র তা উপড়ে ফেলে দেওয়ার সামাজিক অভ্যাস রপ্ত করেছে।

    গৃহপালিত শব্দের আসল মানে কীঃ
    মজার কথা হল, সভ্যতা কোথায় বসে, কোন ভুমিতে? এই প্রশ্ন যদি করেন তাহলে এর জবাব হল, যেই মাটি ডোমেস্টিক বা যেটা (tame)বা স্থিতিজীবনের উপযোগী করে নেয়া যায়; মানে ‘পোষ মানানো’ বলে যে শব্দটা আছে সেরকম! যেমন যে মাটি সফট নয় পাথুড়ে, নাঙল দিয়েও ভাল নরম করে নেয়া যায় না, একেবারেই পানি ধারণ করে না ইত্যাদি এমন হলে হবে না। গৃহপালিত বা  কৃষিকাজভিত্তিক থিতু জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ হতে হবে এককথায় বললে  যেন উদ্ভি্দের  চারা মাটি  ভেদ করে সহজেই উঠার উপযোগী হয় – কারণ এটা এক অন্য ধরণের জীবনযাপন ব্যবস্থা। এটাই সবচেয়ে বড় শর্ত। এটাই গৃহ বা গৃহপালিত শব্দের আসল মানে।

    আর সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী শর্ত বা ঘটনাটার কথা এখন বলব। মানূষের চাষাবাদ কৃষিকাজ শিখে-জেনে ফেলার তাতপর্য কী?  জবাব হল, আগে প্রকৃতি যেভাবে যে রূপে তার সামনে হাজির হত মানুষ কেবল সেভাবেই ঐ রূপের সাথে নিজেকেই খাপখাইয়ে বদলে নিয়ে তবেই একে ব্যবহার করতে পারত। নিজের ভরণপোষণের উপায় হিসাবে তা কাজে লাগাত। কিন্তু মানুষের কৃষিকাজ-চাষাবাদের জীবন সব বদলে দিয়েছে।

    যেমন  কৃষিজীবন শুরুর আগের সেই প্রাকৃতিক ধানগাছটাই এখনও হবে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে হবে না। মানুষ কেবল মাঝে একটু হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে। কথাটা এভাবে বলা যায়  – সেটাই এখনও হবে তবে যেভাবে হলে মানুষের জন্য একটু সুবিধা হয় সেভাবে বা সেদিক একটু ঘুরে হলেও এরপরে আবার আগের প্রক্রিয়া প্রণালিটাই চালু রেখেছে মানুষ। ধরা যাক, কোন কোন মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে আগে ধান হয়ত হত না, এখন মানুষ হওয়াইতেছে। এছাড়া যেমন পরিমাণেও কম-বেশি করতেছে। কোন মাটিতে বন্য (মানে আগের প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত যেমন সেটাই) না গৃহপালিত চাষাবাদ হবে তা মানুষ ঠিক করে দিচ্ছে।

    এতে আগের পুরা প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত উদ্ভিদ-প্রকৃতিটা যা ছিল তা জন্মানো ঠিক বন্ধ করা নয়, তবে আগের মতই কিন্তু একটু মানুষের স্বার্থের দিক-ঘুরে প্রবাহিত এক উদ্ভিদ-প্রকৃতির দুনিয়া হয়ে প্রাকৃতিকতা বজায় রাখছে। এটাকেই আমরা বলতে পারি – গৃহপালিত মানুষের স্বার্থের দিক-ঘুরে প্রবাহিত হচ্ছে – এটাকেই আমরা কৃষিকাজ বলছি মানে, নতুন শর্তযুক্ত করে নেওয়া বলছি।

    এখান থেকেই সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনাটা দুনিয়া ঘটে গেছে। কীভাবে?
    এতে দুনিয়া আগের মতই দুনিয়াটা থাকবে তবে একটা কিন্তু সহ। আগে প্রকৃতি আমার জন্য প্রাকৃতিক ভাবে বা স্ব স্বভাবে এখন খাদ্য উতপাদন নাও করতে পারত। এই হাত ঢুকানোর কারণে মানুষ তা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রকৃতি এখন মানুষের খাদ্য উতপাদন করেই – এমন পরিবর্তনের ভিতর দিয়েই যেন গাছের জীবনচক্র বদলায় – এই শর্ত ঢুকিয়ে দেয়া হয়ে গেছে।

    তবে এটা হল, আমরা প্রকৃতিকে একটা সীমার মধ্যে থেকে বদলে নিয়েছি। আগে প্রাকৃতিক ভাবে ঠিক হত সারা দুনিয়ায় ধান উতপাদন আর হবে নাকি প্রকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা প্রকৃতির মৌলিক স্বভাবের নিয়ম মান্য করে ওর শর্ত-সীমার মধ্যে থেকে ধান উতপাদন চালু থাকা নিশ্চিত করেছি। সারকথায় প্রকৃতিতে আগের মতই বদল ঘটছে তবে এই বদল মানুষের স্বার্থের বাড়ীর পাশ দিয়ে যাচ্ছে – এটাই বাড়তি। তবে এই বাড়তি ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য ও সঠিক হবে যদি না এটা প্রকৃতির মৌলিক কোন স্বভাব বা শর্ত-সীমা লঙ্খন না করে।  কতটা বাড়ানো বা বদল হলেও ভারসাম্য ঠিক থাকবে সেটা মেনে চলার মধ্যে থাকা এটাই অন্যভাষায় পরিবেশসম্মত বসবাস। যদিও লোভী মানুষদের খপ্পরে পরে প্রায়শই এই ভারসাম্য ভাঙছে।

    কিন্তু সেজন্য সাবধান; প্রকৃতির মৌলিক স্বভাব-ধরণ বুঝতে হবে। আবার খোদ মানুষই তো প্রকৃতির অংশ একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না। প্রকৃতির স্বভাব  থেকে মানুষ নিজের মৌলিক স্বভাবও ঠাহর করতে পারে। অতএব খুব সাবধান প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম বা স্বভাবে হাত দেয়া যাবে না, ভাঙ্গা যাবে না। না ভেঙ্গে মানে মৌলিক স্বভাবে হাত না দিয়ে যতটা ছোট বা সীমিত শর্তযুক্ত করে বদল ঘটানো যায় মানুষকে ওর মধ্যে ঐ সীমার মধ্যে থাকতেই হবে। যদি মানুষ নিজেরর সীমা না বুঝে ভেঙ্গে ফেলে তবে খোদ প্রকৃতিই ধবংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ তাতে প্রকৃতি বা নেচারের উপর নির্ভরশীল মানুষও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
    এটাকে আরেক ভাষায় পরিবেশসম্মত বসবাস, এনভায়রণমেন্ট সেনসেটিভ, প্রাণ পরিবেশের জ্ঞানসম্মত বসবাস ইত্যাদি কথাগুলো বলা হচ্ছে।

    লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    দ্বিতীয় পর্ব পেতে এখানে https://wp.me/p1sCvy-47s

     

    [এই লেখাটা এর আগে এক প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ছাপা হয়েছিল “ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন” – এই নামের ছাত্র সংগঠনের এক সংকলনে। সেটা ছিল গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, তাদের কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত “সভ্যতা ও সংস্কৃতি” এই শিরোনামে এক প্রকাশনায়। সেই প্রিন্টেড সংকলনে এ’লেখার শিরোনাম ছিল  “সিন্ধু সভ্যতায়ঃ সভ্যতা মানে কী”।   যদিও দুঃখের বিষয় ঐ প্রিন্টেড সাময়িকীর কোন অনলাইন ভার্সান এখনও তাঁরা বের করে নাই।  হয়ত পরে করবে। তবে সেই পুরানা ছাপা লেখার একটা পিডিএফ কপি এখানে পাওয়া যাবে।  এছাড়া  সেই লেখাটারই আরেক ফাইনাল ভার্সান যেখানে এখন প্রচুর সংযোজন-বিয়োজন ও এডিট করে নয়া ভার্সান হিসাবে এখানে প্রকাশ করা হল। তাতে আগের শিরোনাম যেটা ছিল তা একটু বদল করা হয়েছে।  আর এবার লেখাটা বড় হয়ে যাওয়াতে তা দুই পর্ব করে, এখানে আজ কেবল প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হল।  দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আগামি সপ্তাহে প্রকাশিত হবে। ]