Category: BANGLADESH

  • চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা

    চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা
    গৌতম দাস

    ১২ মে, ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4rH

     

         Top Pakistan court orders ex-PM Imran Khan’s release after deadly riots

     

    পাকিস্তানের পিটিআই [PTI] বা তেহরিকে ইনসাফ যার বাংলায় মানে “ইনসাফের জন্য আন্দোলন” – এই  দলের প্রধান ইমরান খান। তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা (যার স্বপক্ষে  ইতিবাচক রেটিং ৬১%) তাঁকে গত বুধবার ০৯ মে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করেছে। অ্যামেরিকান সিএনবিসি [CNBC] নিউজ এঘটনায় শিরোনাম লিখেছে, Former Pakistani Prime Minister Imran Khan arrested amid tensions with military.]  সেনাবাহিনীর সাথে উত্তেজনার মধ্যেই ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদিও আইনত দেখানো হয়েছে যে গ্রেফতার করা হয়েছে পাকিস্তানের NAB [National Accountability Bureau] আইনে ও মামলায় যেটা আমাদের “দুদুকের” মতই যেন এক প্রতিষ্ঠান তবে এটা দুদুকের চেয়ে আরও ক্ষমতাবান আর আমাদের মতই সরকার অনুগত। তবে সরকার গ্রেফতার করেছে বলছি  যে কারণে প্রথমত তা হল, ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে আমাদের র‍্যাব এর কাছাকাছি এক প্যারা-মিলিটারি বাহিনী [paramilitary Rangers] দিয়ে এবং তা ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে। বিশেষত যেখানে আদালত (হাইকোর্ট) আগে থেকেই কোন ধরণের গ্রেফতার না করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। এবং এর পরেও গ্রেফতারের করার বিরুদ্ধে আদালত প্রশাসনকে শো-কজ করেছে। দ্বিতীয়ত, তবে সবচেয়ে বড়  ঘটনাটা ঘটিয়েছে সেনাবাহিনী নিজেই এক উস্কানিমূলক বিবৃতি দিয়ে; এখানে দেখেন । ফলে এটা একটা শাহবাজ সরকার আর বর্তমান সেনাবাহিনী এভাবে নেতৃত্বের যৌথ-উদ্যোগের ফসল হয়ে দাড়িয়েছে, তা্রা চাক বা না-চাক!

    এতে সবমিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। সীমার বাইরে মানে তা সেনাবাহিনীরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে – বুঝতে হবে। কেন তা বলছি কারণ, এক. ইমরানকে গ্রেফতারের সাথে সাথে পাকিস্তানের চার প্রদেশেই ১৪৪ ধারা জারি করে চারজনের বেশি একসাথে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কোথাও “বিক্ষোভকারি জনগণ” তা মানে নাই। রাস্তায় নেমে গিয়েছে  – যা লক্ষণ হিশাবে একেবারেই কারও জন্য ভাল ইঙ্গিত নয়। সবচেয়ে বড় কথা সবপ্রদেশেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে, কোথাও তা সেনাব্যারাক-গেটের বাইরে। তবে লাহোরে পাশের এক সেনা-আবাসনে হামলা পর্যন্ত ঘটেছে।  তাই এর মধ্যে পরিস্থিতি সেনা নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে চলে যাবার উপাদান আছে। এবং এই অর্থে তা যেন পাকিস্তানে অ্যামেরিকান স্বার্থেরও বাইরে চলে যেতে চাইছে।  কারণ, এরই মধ্যে সবচেয়ে খারাপ কাজটা করে ফেলেছে সেনাবাহিনী।  সেনা-মিডিয়া আইএসপিআর [ISPR] এর বিবৃতির নামে তারা ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে। সেটা এমন ভঙ্গিমায় যেন তারা পাকিস্তানের সব আইনের উর্ধে। 

    একটু পিছনে থেকে বলা যাকঃ
    শুধু সেনার প্রসঙ্গটা একটু পিছন থেকে যদি বলি। গতবছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এক জনসমাবেশে যোগ দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে  ইমরান খানের উপর জান-হামলা ঘটেছিল। সৌভাগ্যবশত গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার পায়ে লেগেছিল ফলে তিনি জানে বেঁচে যান। কিন্তু প্রত্যক্ষ সেই আততায়ী বন্দুকধারী স্পটেই জনতার হাতে ধরাও পড়ে যায়। সেটার ভিডিও ক্লিপও ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমরান খান সবসময়ই ভোকাল; তিনি কোনহুমকিতেই ভিতু হন না, চোখে চোখে রেখে কথা বলতে পারেন। দীর্ঘদিন বৃটেনে বসবাসে থাকার কারণে পশ্চিমা ভ্যলুজ ও আচার-কালচার সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল যা থাকাটাই স্বাভাবিক। সর্বোপরি আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোতে সেটা খাটো কোন কাজ ছিল না – বিশেষত দেশকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার থেকে  তা কোন অংশ দূরে বা খুবই খাটো ছিল – এমনটা ভাল মন্তব্য হবে না। আবার এখনকার পাকিস্তানের বিচারে  ইমরান অবশ্যই একজন পাকিস্তানি বড় এলিট কিন্তু আজ তার সেসব অর্জন তাঁর সেসব এলিটজম সবই আজ পাকিস্তানের জনগণের সেবায় তাদের পদতলে সমর্পিত! কাজেই এরচেয়ে মধুর এলিটিজম আর কী হতে পারে!! আবার তিনিই বুকফুলিয়ে বলতে পারেন আমি বিদেশে ডলার পাচার করিনা, দরকার হয় না। বরং দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলে যেসব বিদেশি আয় জমিয়েছি তা সময়ে পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনি।

    তিনি তাই সরাসরি এই হত্যা প্রচেষ্টার জন্য সিনিয়র মিলিটারি অফিসার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সেটাকে “গুন্ডামির” কায়দায় প্রতিহত করার চেষ্টা করতে থাকে। কেন গুন্ডামি বলছি?
    আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় অভিযোগ আনা বা অ্যামেরিকান ভাষায় যেটা ইনডাইক্টমেন্ট (indictment) এর মানে হল “বিচারের জন্য যেসব অভিযোগ” আনা বা তোলা হয়েছে। এটা বিচার করে দেখার আগে [Pre-] করা অভিযোগ। যার সোজা মানে এগুলো অভিযোগ তবে অবশ্যই প্রমাণিত নয়। কেবল শুনানি-বিচার প্রক্রিয়া শেষেই জাজের রায়ে যা প্রমাণিত গণ্য হতে পারে, এর আগে নয়। এর আগে সবই অপ্রমাণিত এবং কিছু অভিযোগ মাত্র।
    সিএনবিসি লিখছে, “…this week for “highly irresponsible and baseless allegations against a serving senior military officer without any evidence,” to which Khan replied via video statement Tuesday: “This is my army and my Pakistan. I don’t need to lie.’ “। যার সারকথাটা বাংলায় বললে্‌, এক সেনা মুখপাত্র ইমরানকে বলেছেন যে ইমরান একজন সিনিয়র সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন। পরে এনিয়ে ইমরান যার এক ভিডিও জবাবে বলেছেন, ” ‘এই হল আমাদের আর্মি এবং আমাদের পকিস্তান! আমার কি আর মিথ্যা বলার দরকার আছে!’ ” অর্থাৎ সেনা ভাষ্যটা হচ্ছে এমন যেন আমাদের গুলশান-বারিধারার কোন এলিট কাউকে ধমকাচ্ছে আর বলছে তো এত বড় সাহস – তুই জানিষ কার বিরুদ্ধে তুই অভিযোগ করেছিস??????

    ফ্যাক্টস হল এটা আধুনিক রাষ্ট্র বা জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র গড়ার যুগ, রাজা-শাসনের যুগ নয়। রিপাবলিক আর রাজার যুগের ফারাক বুঝতে হবে। ফলে যেকোন কারও বিরুদ্ধেই মামলা করা ও অভিযোগ দাখিল এখন জায়েজ। এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক আজকের শাসন ব্যবস্থায়! অন্তত আইনে এটা স্বীকার করে নেয়া আছে!  আর তাতে কোন মামলা “…..প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন” ভাবে কেউ তুলেছে কিনা  সেটা দেখার জন্য তো আদালত ও বিচারক তো আছেই। এটা তো  জমিদারি কায়দায় ধমক দিয়ে কাউকে বসানোর কিছু নাই, এবং ও দিন গয়া! এছাড়া আপনি কথিত জমিদার চাইলে আপনার স্বার্থ দেখভালের জন্য আরও দশটা উকিল-ব্যারিস্টারও লাগাতে পারেন। কিন্তু ধমকানোর তো কোন সুযোগ নাই। এটাই তো গুন্ডামি!! আর সবচেয়ে বড় কথা, কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রে  আমরা কেউ-ই আদালত ও বিচারের উর্ধে নই।  আদালতই আমার বিরুদ্ধে যেকোন অভিযোগের বিচার করে দেখতে পারে; খালাস অথবা শাস্তি দিতে পারে।  এমনকি সেনাপ্রধানসহ যেকোন  সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে কোন সিভিলিয়ানের অভিযোগ যদি সেনাদের মনে হয় সেটা সেনা আদালতের ভিতরে হওয়া উচিত তাতেও কোন সমস্যা নাই। সিভিত আদালতে মামলা উঠার পর সেনারা আপীল দিতে পারেন এই যুক্তিতে যে কেন এই  মামলাটা সেনা আদালতে হতে হবে, সেনা প্রতিষ্ঠানও নিশ্চিত করুক যে তারা বিচারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে আর তা সিভিল বিচারক যদি তার রায়ে এব্যাপারে একমত হয় তাহলে তো হয়েই গেল। আর যদি সিভিল বিচারক নিজেই বিচারের ইক্তিয়ার দেখেন তিনি বিচার চালু রাখবেন আর সেনাদের তা মানতে হবে। এনিয়ে কারোরই নিজেকে সব আইনের উর্ধে বা কোন রাজা বা এলিট ভাববার তো কোন সুযোগ নাই, প্রয়োজন নাই।

    অ্যামেরিকান ভুমিকাঃ
    আমাদের অনুমান এখানেই আমেরিকার অন্তত কিছু  ইতি ভুমিকা আছে; কারণ, পাকিস্তানে অ্যামেরিকান অনেক বড় স্বার্থ জড়িত আছে। যদি শুধুমাত্র চলতি শতকের শুরু থেকেই দেখি সেদিকে তাকাই তবে বলতেই হয় যে  ২০০১ সালের ওয়ার অন টেররের লঞ্চিং প্যাড ছিল পাকিস্তানের ভুমি। এবং খামোখা বিনা কারণে জাস্ট অ্যামেরিকান স্বার্থে পাকিস্তানকে আমেরিকা তার লঞ্চিং প্যাড হয়ে থাকতে ২০ বছর ধরে বাধ্য করে গেছে। কোন আইন বা ন্যয্যতা ছাড়াই। লঞ্চিং প্যাড মানে যেমন আফগানিস্তানে মারা আমেরিকার প্রতিটা বোমা বা উড়ে যাওয়া প্রতিটা যুদ্ধযান পাকিস্তানের ভুমি ইচ্ছামত ব্যবহার করেই তা করেছিল। এমনকি আফগানিস্তান তো ল্যান্ড লকড দেশ; কাজেই সেখানে প্রবেশ করতে গেলে পাকিস্তানের উপর দিয়ে তাদের যাওয়াই ছিল একমাত্র উপায়, ভরসা ও সহজ। আর এতে পাকিস্তানের প্রতিটা সাধারণ মানুষের জনজীবন আমেরিকার প্রতিটা ততপরতায় একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। তাদের জীবনযাত্রা যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমেরিকা ভাবতে পারে পাকিস্তানের দুই পুরানা দলের  [নওয়াজের মুলসিল লীগ ও ভুট্টোর পরিবারের পিপিপি] নেতাদেরকে তো আমরা যথেষ্ট পয়সা খাইয়েছি তারা বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে – কিন্তু কে না জানে এসব করে এতে কিছুই শোধ হয় না বা এগুলো কোন প্রতিদানও নয় ঘুষ মাত্র!  এখন একালেও আমেরিকা যদি বুঝমান ও বুদ্ধিমান আচরণ করতে চায় তাহলে অন্তত নতুন করে আর অপরাধের মাত্র না বাড়িয়ে একালের যেকোন গণমানুষের স্বার্থের ইস্যুতে সহানুভুতি হয়ে থাকতে পারে। অন্তত কিছু পাপ ধুয়ে যাক এতে, একটু মন জয়ের চেষ্টা করুক!!! এটা কী খুব বেশি চাওয়া? যদি আমেরিকার তাই মনে হয় তবে বুঝতে হবে আমেরিকার গ্লোবাল নেতা থাকার দিন ফুরিয়েছে!

    নিশ্চয় আমেরিকার জানা আছে ইমরানের পিটিআই-ই একমাত্র পাকিস্তানি রাজনৈতিক দল যে আমেরিকার এই পাকিস্তানকে লঞ্চিং প্যাড হতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে কথা তুলে তৈরি হয়েছে। নিশ্চয় বুদ্ধিমান ও প্রাকটিক্যাল অ্যামেরিকান নীতিনির্ধারকেরা মানবেন যে এজন্য অ্যামেরিকার পাকিস্তানের পিটিআই দলকে আগাম এনিমি ঠাউড়ে রাখা কোন কাজের কথা নয়। এটা স্টুপিডিটি হবে।  বরং পিটিআই এর সাথে ইতিবাচকভাবে সহানুভুতির সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টার মধ্যেই সবার ভাল লুকিয়ে আছে – ইতিবাচক কোন কিছু শুরু হতে পারে সেখান থেকে।

    তাহলে কী করতে হতঃ
    একালের দুনিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা অভিমুখ হল গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের বিকাশ ঘটানো।
    মানে ব্যাপারটা যদি পাবলিকের স্বার্থের চোখে দেখেন তাহলে এটা হল যে কলোনিদখল যুগের শেষ বা ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত স্বাধীন আমাদের মত দেশগুলোতে – গ্রাম থেকে লোক জমি থেকে থেকে উচ্ছেদ হয়ে শহরে কাজ- ও নয়া জীবনের খোজে আসতেই থাকে এটা সব দেশেই স্বাভাবিক ঘটনা-ফেনোমেনা। কিন্তু শহরে এসে যে টেম্পর হেলপারির চাকরি জুটাতে পেরেছে তাযদি দেখা পরের পাঁচটা প্রজন্ম হয়ে গেছে কিন্তু জীবন মান একই জায়গায় থেকে গেছে – এটাই হল কমিউনিস্ট চিন্তার নেগেটিভ প্রভাব ও মারাত্মক নেগেটিভ অচলায়তন প্রভাব।  এটাই হল অর্থনীতিতে কোন দিকে বিকশিত হতে না দেওয়া। যেন চারি-তে কুকুরের শুয়ে থাকা। যেখানে চারি মানে হল মাটির বড় পাত্র যা গো-পালন ঘরে গরুকে খৈল-ভুসিতে মেখে দেয়া খাদ্যদানের মাটির পাত্র – যেখানে থেকে গৃহপালিত গরু আরামে খেতে পারে। কিন্তু সময়ে আবার এও দেখা যায় যে একটা গৃহপালিত কুকুর ঐ চারিতে আরামে শুয়ে আছে।  চারি কুকুরের খাদ্য-পাত্র নয় অথচ সেই পাত্র কুকুর দখল করে রেখেছে আর গরুকেও খেতে দিচ্ছে না। এটাই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামের অর্থনৈতিক চিন্তার জন্য খুবই প্রতিকী! তাদের অর্থনীতি-চিন্তা  এরকমই যে নিজে ঐ পাচ-প্রজন্মকে ঐভাবে টেম্পো হেল্পার করে আটকে রেখেছে বাড়তে দেয় নাই; নিজেরাও দেশের অর্থনীতিকে বাড়তে দেয় নাই – যেমন বিদেশি পুঁজি হারাম জাতীয় নানান আপ্ত বাক্যে।
    এই বিচারে একালের অভিমুখ হচ্ছে আর তথাকথিত কোন আদর্শ আর নয়, বরং গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের নুন্যতম বিকাশ ঘটানো – গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমার জন্য বিশেষ কী সুবিধা লুকিয়ে আছে তা তালাশ করে [Comparative advantage] বুদ্ধিমানের মত তা নিজ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে কাজে লাগানো। গরীবের জানগুলো একটু বাচুক, একটু শ্বাস নিতে দেন আগে পরে বাঁচলে কোন বাপের নাম আবার নিব না-হয়!!!!!।

    আসলে বলতে চেয়েছি পুরানা অচল স্থবির চিন্তা থেকে বের হতে হবে। আর তাই, একালেও পছন্দ না হলে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে গ্লোবাল নেতাদের ভিনদেশের অপছন্দের কোন প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট মেরে ফেলা এগুলা খুবই পুরানা ধারণা। অন্তত কোল্ডওয়ারের পরের যুগে এবার তাতে ক্ষান্ত দেয়ার সময় হয়েছে মানা উচিত।  একালে চীন-ভারত ঝগড়াও করে আবার ব্যবসায় করে সমান তালে। এটাই বর্তমান কাল তা বুঝতে হবে! এসব  খুনোখুনি কলোনি আমলে, কিংবা কোল্ড ওয়ারের যুগে এমনকি আশির দশকের ইউরোপেও হয়ত মানাত। কিন্তু নয়া শতকে সেটা আর নয়, তা একেবারেই বেমানান; অনেক হয়েছে আর নয়। যেই ঘটাক ইমরানকে আততায়ী দিয়ে হত্যা প্রচেষ্টা এটা খুবই নিম্নমানের চিন্তা, কাজ-আচরণ। এটা অগ্রহণযোগ্য। একালে যাকে শত্রু মনে হচ্ছে তার সাথেও বাণিজ্য- ব্যবসায়ীক সম্পর্ক রাখতে জানতে হবে। এটাই একালের ট্রেন্ড, ও নয়া বৈশিষ্ট।

    তাহলে আমেরিকার ভুমিকা কী হতে পারত?
    এসব আততায়ী-মার্কা ঘটনায় আমেরিকার কোনও সংশ্লিষ্টতা নাই ধরে নিয়েই বলা যায়, আমেরিকার অনেক কিছুই করণীয় ছিল, নিজ স্বার্থেই। তার উচিত ছিল অন্তত বিবদমানদের মধ্যে মধ্যস্ততার ভূমিকা নেয়া, এভাবে করে ব্যাপারটা বাড়তে না দেয়া।  প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত  হতে হত – আমেরিকাকে লিড নিতে হত –  সবপক্ষই যাতে মানে ও গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট তদন্ত ও বিচারের ভিতর দিয়ে ইস্যুটার সমাপ্তি টেনে মিটিয়ে দেওয়া।
    ওদিকে যদিও এটা ঠিক যে  ২০১৮ সালের পরে একালে আমেরিকাকে পাকিস্তানে জায়গা করে নিতে হয়েছে নওয়াজ-শাহবাজ (সেই সাথে ভুট্টো পরিবার) গংয়ের হাত ধরে, যারা চিহ্নিত সম্পদ লুটেরা। এভাবে স্টার্ট আপ – এটাই আমেরিকার কপালের দুর্ভাগ্য! বাইডেন প্রশাসনের জন্য এটা খুবই খারাপভাবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের শুরু! যে সম্পর্কের কোনই নুন্যতম স্টান্ডার্ড নাই। যেন কোন নীতি-পলিসির বালাই না থাকাটাই স্বাভাবিক!

    এখন এর শেষ হবে কোথায়?
    পাকিস্তানের শাহবাজ সরকার এক অদ্ভুত রেওয়াজ চালু করেছে; এতে এই সরকার কত অক্ষম অপারগ ও অযোগ্য আর আনফিট এরই প্রমাণ । তিনি প্রধানমন্ত্রী বলছেন তিনি চীফ জাস্টিসের রায় মানবেন না??????  কারণ চীফ জাস্টিস সমন্বয়ে গঠিত এক আদালত রায় দিয়েছিল যে মে ২০২৩ মাসের মধ্যে প্রাদেশিক নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এদিকে মিডিয়া আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে জেনারেল মোশাররফের পরের পাকিস্তানে  এপর্যন্ত আদালত  দুইটা প্রধানমন্ত্রীকে শ্রেফ রায় দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তা যেন আমরা মনে রাখি!!!

    তাহলে পাকিস্তানে সিভিল সরকারের ভবিষ্যত কই?
    সেনাবাহিনী কী তাহলে শাহবাজ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে ক্ষমতা নিবে?  আর তখনও কী আমেরিকা বসে দেখতেই থাকবে – কিছু না ছুয়ে বা না দেখে? আর কাউকে কী আমেরিকা বিশ্বাস করাতে পারবে যে সে কিছুই করে নাই?  আর তাতে কী তার ইজ্জত বাঁচবে?
    পাকিস্তানের সামরিক শাসন নিয়ে সেই অর্থে একটা মৌলিক ঘটনা জেনে রাখা ভাল হবে।  কোল্ডওয়ারের আমলে মানে সোভিয়েত আমলে বা ১৯৫৩-১৯৯২ এই সময়কালের এক কমন ফেনোমেনা ছিল, আমাদের মত গরীব দেশে পপুলার কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার কাছে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়ে আমেরিকাকে একমাত্র নির্ভর করতে হত কোন  সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে। আর এটাকেই যেন সামরিক বাহিনী ক্ষমতালোভী বলে তারা নিজ ইচ্ছায় এমন করে থাকে বলে প্রচার করে থাকে; তারা একদল সুশীল বা বাকশাল-পছন্দের লোক এমন করে থাকে যেমন প্রথম আলোর (মৃত) মিজানুর রহমান খান বা একালের সোহরাব হাসান। আবার প্রায় একই চিন্তার আরেক বৃটেন প্রবাসী পাকিস্তানির অধ্যাপক আছেন নাম আয়েশা সিদ্দিকা [Ayesha Siddiqa] । এটা আমাদের মত দেশের সেনাবাহিনী নিজে নয় বরং এর পিছনে আমেরিকার কাজ করার ধরণই তাদের এমন করেছে – এই অংশটা তারা অজানা রেখে দিতে চায়। এনিয়ে রান্ডের [RAND Corporation] এক গবেষণা রিপোর্ট আche.

    সংক্ষেপে ঘটনাটা হল – গত ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাওয়ার কালে সেসময় ১৯৯৩ জানুয়ারিতে ক্ষমতার শপথ নিয়েছিলেন বিল ক্লিনটন – সেটা তার প্রথম টার্ম ছিল আর তিনি দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  অ্যামেরিকান রাজনীতি নির্ধারিত হওয়ার একটা বড় সামাজিক জায়গা হচ্ছে ওর থিঙ্কট্যাংকগুলোর যে সমাজ সেখানে; কারণ তাদের থিঙ্কট্যাংকগুলোর ফান্ড সংগ্রহ ও ফান্ড ব্যবহারের কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয় হয়ে থাকে ইনফরমালি কিন্তু খুবই নিবিড়ভাবে – এসব সামাজিক ইনফরমাল আসরে বসে। র‍্যান্ডের ঐ রিপোর্টে আছে – এমনই এক ইনফর্মাল সভায় থিঙ্কট্যাংকগুলোর যুক্তি ছিল  – এতদিন আমেরিকান ধারাবাহিক সরকার- প্রশাসনগুলো সোভিয়েত উপস্থিতির যুক্তি দিয়ে বলত ওদের প্রপাগান্ডার জন্যই আমাদের মত দেশে আমেরিকা অজনপ্রিয় আর সেটা পূরণ করতেই আমেরিকাকে সামরিক আইন জারি করে ওসব দেশে ক্ষমতা ও প্রভাব চর্চা করতে হয়ে থাকে। অতএব সোভিয়েত পতনে যেহেতু দুনিয়া এক-মেরুর হয়ে গেছে, অ্যামেরিকান এক-মেরুর দুনিয়া – তাই এখন থেকে অ্যামেরিকান সরকার-প্রশাসকদের সামরিক শাসন থেকে সরে আসার নীতি নেয়া উচিত। এটা সবচেয়ে ভাল সময়। এই প্রেক্ষিতে তাই   ক্লিনটন বা ডেমোক্রাটদের  পক্ষ থেকে  থিঙ্কট্যাংকগুলোর কাছে প্রতিশ্রতি দেয়া হয়েছিল যে তারা আর আমাদের মত দেশকে সামরিক শাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে না।  এর পিছনে মূল আর্গুমেন্ট ছিল যে দুনিয়া যেহেতু আমেরিকাই এক  পরাশক্তির কাজেই আমেরিকার আর সেনা শাসন দরকার হবে না। [যদিও ভারত-পাকিস্তান কারগিল সীমিত যুদ্ধ (১৯৯৯) হয় আর এর সব দায় মোশাররফ এর বলে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী  নওয়াজ ভারতের কাছে মন্তব্য করেন, পরে তিনি মোশাররফকে ক্ষমতাচুত করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া আর শেষে কার্যত পালটা মোশাররফ এর নামেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্ষমতাদখল করেছিল –  শ্রীলঙ্কা থেকে মোশাররফকে বহনকারী  বাণিজ্যিক বিমানকে করাচীর মাটিতে নামতে জায়গা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল যা নওয়াজ সরকার কিছু সময় আটকে রেখে দিয়েছিল।] এই ঘটনার পরে ক্লিনটন তাই সামরিক ক্ষমতা বলেই মোশাররফ এর (১৯৯৯ সালের) এই ক্ষমতা দখলকে স্বীকৃতিই দেয় নাই। চলেছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। এরপরে, ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন বুশের আমলে টুইন টাওয়ার হামলার দিনের শেষভাগে  সেকালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোলিন পাওয়েঙ্কে সিএনএন-এ স্বীকার করে নিতে দেখা যায় যে তারা মোশাররফ সরকারের সাথে কাজের কথা বলেছেন – অর্থাৎ তখন থেকে কার্যত বুশের আমেরিকা পাকিস্তান সরকারকে স্বীকার নিচ্ছে। তবে এখন এতকথা বলার মূল বাক্যটা হল, এরপর থেকে পিছনের এই কারণেই  এতদিন পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতাদখল আর কখনও হয় নাই বলে মনে করা হয়।

    তাহলে স্বভাবতই প্রশ্নঃ  পাকিস্তান সেনাবাহিনী কী  এবার আবার ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে আবার ক্ষমতাদখলের পথে রওনা দিবে? আর তারপরেও এবার আমেরিকা  কাউকে কী বিশ্বাস করাতে পারবে যে সেকিছুই করে নাই, ভুমিকা নাই?

    একাল আর সেকাল অনেক ফারাকঃ
    এমনিতেই দুনিয়ার সব “একাল আর সেকালে”  এর মধ্যে  অনেক ফারাকই থাকে, থাকবেই। তাহলে আর এবারের আলাদা বিশেষত্ব কী? মানে এবার গ্লোবাল নেতা হিশাবে অ্যামেরিকার ক্ষেত্রে এর আর বিশেষত্ব কী?
    আগে একটু বলে নেই। গ্লোবাল নেতা কথাটার অর্থ কোল্ডওয়ারের আমলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া হত এর অর্থ পরাশক্তি  – মানে সামরিক পরাশক্তি বা পরাশক্তিগত সামর্থ। অথচ একালে মানে ১৯৯২ সালের পরে থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে ধারণাটা মোটেও  সামরিক নয়। এটা আসলে মূলত দুনিয়ায় মানে কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিসরে সামর্থ কতটা। অর্থাৎ নিজ অর্থনীতিতে এক বিপুল উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের নয়া এক নিরন্তর ধারাবাহিক সক্ষমতার দেশ হওয়া যা অন্তত পরের শতবছর ধরে এমনি টিকে থাকবে। যারা আরও আগ্রহী তারা “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” নামের একটা ধারণার তালাশ করতে পারেন। গত ১৯৪১ সালের অ্যামেরিকান টাইমস ম্যাগাজিনের এক নয়া সহযোগী পত্রিকার যার প্রচ্ছদ কাহিনীর নাম ছিল এই “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” । আমার কোন পুরা লেখায় এই আর্টিকেলটা সংযুক্ত আছে – সেটা এখানে দেখতে পারেন। কেন ওর নাম “দ্যা অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী”  হল তা বুঝতে হবে। আরেকভাবে বললে এটাই বিনিয়োগ করার সামর্থ বিশেষ করে সারা দুনিয়ার গরীবদেশগুলোকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঋণ [Infrastructure Dev. loan] এবং সাথে এফডিআই [FDI]  দেওয়ার সক্ষমতা আর তা রাষ্ট্রীয় ভাবে বা বিশ্বব্যাংকের মত নানান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা কথাটার অর্থ এটাই – এভাবে একালে বুঝতে হবে।

    এই সক্ষমতার বিচারেরই একালে আমেরিকা চীনের চেয়ে অনেক পিছনে পড়ে গেছে। এই উপলব্দি বা বুঝাবুঝিটা এমন না যে  আপনার পছন্দ  আমেরিকা, আর আমার পছন্দ চীন সেজন্য আমি প্রসঙ্গটা তুলছি আর তাই আমি আর আপনি ভিন্ন ভিন্ন কথা বলব।  এমন না।  যখনই কোন দেশে একালে অ্যামেরিকান এই ঋণ-বিনিয়োগ সক্ষমতায় ঢিলা পড়ছে – মানে সরাসরি জি-টু-জি বা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ-বিনিয়োগ দিতে পারছে না  – আর তখনই ঐ ফাঁক দিয়ে চীনা ঋণ-বিনিয়োগ বিপুল পরিমাণে ঢুকে পড়ছে।  আবার কোন দেশের  চীনের কাছে নেয়া ঋণ তা সময়কাল পুর্ণ হবার পর ফেরতদান যদি ডিউ [due] মানে বকেয়া হয়ে যাবার তারিখ পার হয়ে যায় তবে অনুরোধ করলে চীনের সেই তারিখ আরো দু এক বছর বাড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ প্রচুর – এটাও চীনের আরেক শক্তি অন্য গ্লোবাল নেতা  অথবা এর কাছাকাছি দাবিদার  যে কারো তুলনায়!

    যেমন ধরা যাক আমেরিকা সাপোর্টেড শাহবাজ-ভুট্টো সরকার ক্ষমতায় এলো ইমরানের সরকারকে সরিয়ে। এখন এমনিতেই অর্থনৈতিক চরম সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে জাগিয়ে তুলতে শাহবাজ সরকারকে চীনে দৌড়াতে হবে কেন? এটা অড! কেন আমেরিকা এই সহায়তা করার উপযুক্ত থাকবে না – এটাই একালের আমেরিকার সামর্থের প্রশ্ন! পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তারের রাজনৈতিক সামর্থ তার অটুট আছে কিন্তু অর্থনৈতিক সামর্থ ছাড়া রাজনৈতিক সামর্থ অকেজো – এটাই প্রমাণিত হচ্ছে! এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ আমেরিকাকে যদি কাজ করতে হয় তবে কোনভাবেই এসব সেনা গুন্ডামি সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না। সেনা বনাম জনগণের সংঘাতে নিশ্চুপ দর্শক হতে পারে না। এটা আত্মঘাতি!

    এককথায় বললে, আমেরিকান যেকোন ব্যর্থতা, বোকামি বা ভুল এর সুযোগ আপনাতেই বিপরীতে চীনের কোলে গিয়ে জড়ো হবেই। তাতে আমরা কে অ্যামেরিকান সমর্থক আর কে চীনের – সেটা অপ্রয়োজনীয়। তা চোখে আঙুল দিয়ে পাকিস্তানের পরিস্থিতি আমাদের দেখাচ্ছে!

    এর উপরে শাহবাজ সরকার এই কথিত বিরাট নায়ক NAB (মানে যেন আমাদের দুদুক), NAB – তারা শাহবাজকে অর্থ পাচার মামলায় নির্দোষ সার্টিফিকেট দিয়েছে। এটাও কী আমেরিকা বসে বসে দেখবে?
    এদিকে সর্বশেষ খবর হল সুপ্রিম কোর্ট গত ৯ মে, NAB [এটাই Al-Qadir Trust case] মামলায় ইমরানকে নাটকীয়তা করে গ্রেফতারকে অবৈধ ঘোষণা করে ইমিডেয়েট রিলিজ করে দিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে।  আর এসব সমস্ত ঘটনাবলীতে অ্যামেরিকান অবস্থান কোথায়, কোথাও প্রকাশ্য সে হদিস নাই। আর সেনাবাহিনীর অবস্থান তাহলে এখন কোথায় দাঁড়ালো? সেনাদের গণবিরোধী [anti-people] ইমেজ এটা অবশ্যই পাকিস্তানের আমজনতা পাবলিকের কাছে আমেরিকা-ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে।

    আর ওদিকে আগামিতে যে মেজর সংঘাতের ইমেজ বা আগমনিবার্তা এসবের ভিতর দিয়ে উঠে আসছে তাতে আদালত শাহবাজ সরকার  ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে  আদালত-নিজস্ব তার ক্ষমতাকে সংহত ও প্রো-পাবলিক এবং তা ন্যায্য বলে প্রতিভাত করে নেয়ার সুযোগ তৈরি করে ফেলল। আর সেনাবাহিনী এখানে দুধ-আম এক হয়ে যাবার পর নিজে শুকনা আঠি হয়ে পাত্রের বাইরে গড়াগড়ি দিচ্ছে.. এমন অবস্থায় চলে গেল।  আগামিতেও তা দিতে থাকবে। অর্থাৎ আদালতের পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের রায় ও নির্দেশ অমান্যের দায়য়ে এবার শাহবাজ  সরকার শজেই অভিযুক্ত হবে। এবার জনসমর্থন নিয়ে এখন সুপ্রিম কোর্ট  নিজ প্রাতিষ্ঠানিক অথরিটি  প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে যাবে – যার অর্থ শাহবাজ সরকারের জন্য খারাপ সময়ের দিন সামনে , এরই ইঙ্গিত!

    আমেরিকা মনে করতে পারে, দাবিও করতে পারে বা নিজেকে বুঝ দিতে পারে যে তারা পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এতে তাদের কিছু বলার নাই করার ছিল না; কাজেই তারা নিরপেক্ষ। কিন্তু সমস্যা হল পাকিস্তানের আম-পাবলিক মাইন্ডে এটা জায়গা পাবে না। পাকিস্তান আর্মি আর আমেরিকা যে আলাদা – আলাদা তাদের স্বার্থ ও উপস্থিতি তা যতটুকুই সত্য হোক না কেন পাবলিক মাইন্ডে – তারা আলাদা – এমন ধারনা তৈরি করার পক্ষে আমেরিকা এতদিন কোন কাজ করেছে বলে জানা যায় না।

    তবে এপর্যন্ত পুরা ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে লুজার – সবচেয়ে ইমেজ খুয়ানো ক্ষতিগ্রস্থ সংগঠনের নাম হল পাকিস্তান সেনাবাহিনী – সে এখন সত্যিই গণবিচ্ছিন্ন একটা বোঝা –  অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও! আভ্যন্তরীণ নিজ জনগণকে থ্রেট করা বা ধমকানো এ্টা দুনিয়ার কোন সেনাবাহিনীর কাজ হতে পারে না।  কিন্তু তাই ঘটেছে পাকিস্তানে – বর্তমান সেনা নেতৃত্ব এমনই বোকা আত্মভরি, উদ্ধত ও আন-সিভিল! তাহলে ইতিহাস বোধহীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইমরানের গ্রেফতারকে ও ততপরবর্তি জনবিক্ষোভকে কালো অধ্যায় [BLACK CHAPTER] বলে চিহ্নিত করেছিল – তার কী হবে এখন???
    যদিও পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি এখন ৩৬% এর উপরে। ফলে জীবনের উপর উঠে পড়া এই কঠোর সময়েও পাবলিকের রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ, এটা উদাহরণ হয়ে থাকবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

     

     

  • আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!

    আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!
    গৌতম দাস

    ০৫ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4pZ

     

     

     

    সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে! আজ ৫ এর ২০১৩ এর দশম বার্ষিকী!
    অনেকে যেটাকে শাহবাগ বনাম শাপলা, অথবা শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলার সমাবেশ বলে।
    জমিদার হিন্দুর জমিদারি বন্দোবস্ত ব্যবস্থা ১৯৫১ সালে উচ্ছেদ হয়ে গেলে একারণে, জমিদার হিন্দুর রাজনৈতিক ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেলেও এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক [Cultural] প্রভাব থেকেই যায়।
    সেই কালচারাল প্রভাব – যা মূলত ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান ঘৃণা চর্চার এক ভরপুর আধার – প্রগতিশীলতার নামে গড়ে উঠা শাহবাগের ততপরতার বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধের দিন!

    বৃটিশ আমলে জমিদারি হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর জমিদারি আইনের পরে মোটামুটি ১৮০০ সাল থেকে ক্রমাগত রাজত্ব করতে উঠে চলেছিল। এর বিরুদ্ধেই প্রথম সবল ধাক্কা ও আমাদের বিজয় হল ১৯৪৭ সালের আগষ্টে্র ভারতভাগ নামে যা পরিচিত যার অপর নাম পাকিস্তান কায়েমে সফল হওয়া।  পাকিস্তান কায়েমের অনেক অর্থ তাতপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নেতি ব্যাখ্যাও আছে দেখা যায়। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থ তাতপর্য হল, পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল – মানে কোন আপোষ হয় নাই বলেই দেশ ভাগ হয়ে গেছিল। আর তা হয়েছিল বলেই এরপরে সহজেই জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ সম্ভব হয়েছিল।
    এই ধারাবাহিকতায় ১৬ মে ১৯৫১ সালে আইনগতভাবে জমিদারি আইন উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছিল। আইনি ভাষায় যা “পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০” নামে পরিচিত দেখুন বাংলাপিডিয়াতে । আইনটা ইংরাজিতে দেখতে এখানে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act 1950 ক্লিক করেন।  পাকিস্তান কায়েমের ফলে এভাবে সবচেয়ে বড় অর্জন হল পুর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে বসে এই জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস করতে সক্ষম হওয়া। তাতে কমিউনিস্টেরা যতই জোরগলায় মিথ্যা-ব্যাখ্যায় বলুক না কেন যে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম করেই নাকি পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল।
    অথচ তারা স্বীকার করতে চায় না যে এই একই পাপ করার রাস্তা তো কংগ্রেসই আমাদের দেখিয়েছিল; যেটা কমিউনিস্টেরা চেপে যায়।  কংগ্রেস কী আমাদেরও আগে একই কাজ করে নাই?  আর আমাদেরও একই পথে যেতে বাধ্য করে নাই? তাঁরাই কী ১৮৮৫ সালে ধর্মের ভিত্তিতেই এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ভারত কায়েম করতে – “কংগ্রেস” [যার ফর্মাল নাম “ইন্ডিয়ান জাতীয় কংগ্রেস”] নামে দলের জন্ম দেয় নাই!  আর আমাদেরকে সেই উপেক্ষা থেকেই কী ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয় নাই!!! তবে পাকিস্তান কায়েমে যতটুকু যা আমাদের ভুল [যেমন ধর্ম, ভাষা বা যেকোন ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভুল] ছিল তাতে কংগ্রেসের ভারত কায়েমেও ততধিক ভূল। আর সেক্ষেত্রে মোদির হিন্দুত্ববাদের বিজেপির ভারত? তাকে কী বলবেন? এক্ষেত্রে প্রগতিবাদীরা বাকশুণ্য, কেন?  এটাকেই তো নিরেট ইসলামবিদ্বেষ আর দগদগে মুসলমান ঘৃণা বলছি!  জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল গতবছর অক্টোবরে আন্তোনিও গুতেরেজ ভারতে  এসে কঠোর ভাষায় প্রকাশ্যে ভারতের মুসলমান-ঘৃণা চর্চার বিরুদ্ধে সমালোচনা আর সাবধান করে গেলেন। প্রতিক্রিয়ায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিল নিজেই এক মামলা ডেকে নিয়ে। অথচ এখন বিকার নাই।  কিন্তু এখন কোথায় সেই প্রতিশ্রুতি? দ্যা কেরালা স্টোরি নামে বিদ্বেষমূলক ও মনগড়া কাহিনীতে গড়া সিনেমা রিলিজের বিরুদ্ধে বাধা দিতে সুপ্রিম কোর্ট ও কেরালা হাইকোর্ট নিঃশ্চুপ। তারা এখন সিনেমা বানানোর খরচ  যেন ঠিক মত উঠে আসে তোলা হয় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।  কোর্ট আসলে বলছে সিনেমার বাজার ঠিক করবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে কিনা। ‘Market will decide’ — SC, Madras HC refuse to stay release of ‘The Kerala Story’ অথবা বলতে চাইছে,  নির্বাচনের আগে মুসলমানবিরোধী হিংসা বিদ্বেষ এর ঝড় তুললে কোনই অসুবিধা নাই!

    নিজেকে কমিউনিস্ট বলে দাবি করতে এদের ভাল লাগে মানে, যেটা লতিফ সিদ্দিকীর ভাষায় “কমিউনিস্ট মাড়ানি” তা এদের হতে খুব ভাল লাগে; অথচ জমিদার শ্রেণীকে উচ্ছেদের বিরোধীতা করা এরা কোন কমিউনিস্ট???  বাংলাদেশে এরাই বা এটাই প্রগতিশীলতা!!! এনিয়ে আমার আগের দুপর্বে লেখা আগ্রহিরা পড়তে পারেন।

     নুন্যতম অর্থনীতি জ্ঞান থাকলে এরা বুঝত জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ ছাড়া কোন দেশের অর্থনীতি গড়া, ভিত্তি স্থাপন সম্ভব নয়।  এবং সেটা অবশ্যই ক্যাপিটালিজমের প্রথম পদক্ষেপ। তাতে এই ক্যাপিটালিজম বলতে যেকোন ধরণের ক্যাপিটালিজমই হোক না কেন! তাতে কমিউনিস্টদের পছন্দের রাষ্ট্রীয় ক্যাপিটালিজম [State Capitalism; যেটাকে তারা সমাজতন্ত্র নামে ডাকে] সেটা হোক অথবা মালিকানা ভিত্তিক স্বাভাবিক ক্যাপিটালিজম – যেটাই বুঝেন না কেন – বটম লাইন হল, যে পথেই যান  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ আপনাকে করতেই হবে এটাই হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশে নিজ অর্থনীতি সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ। সমাজের সবাইকে কাজের সংস্থান দিবার মত একটা অর্থনীতি চাইলে আপনাকে  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ থেকে শুরু করতে হবে। অথচ জমিদার হিন্দুর স্বার্থ হল ঠিক এরই বিরুদ্ধে; তারা এর ঘোরতর বিরোধী। আর এই জমিদার হিন্দুর কায়েমিস্বার্থ ও আধিপত্যের সমাজ ও চিন্তাকেই প্রগতিশীলতা বলে এক কমিউনিস্ট রাজনীতি বাংলায় যাত্রা শুরু করেছিল। কেন জমিদারি উচ্ছেদ বাংলাদেশের  অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি গড়ার জন্য জরুরি ছিল তা জানতে প্রিয়া সাহা ইস্যুতে আমার পুরানা দুপর্বে লেখা এখানে  দেখতে পারেন। এতে বুঝা যাবে কেন কোন কৃষি সংস্কার মানে জমিদার মালিকানা  এই মালিকানার ধরণ উচ্ছেদ না করলে কোন শিল্পায়ন গড়ে উঠবে না। সকলকে কাজ দিবার মত অর্থনীতি হবে না।

    অথচ কমিউনিস্টেরা নাকি মুখ্যত শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন। তাহলে জমিদার হিন্দুর জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার কাজ কিভাবে কমিউনিস্টদের প্রগতিশীলতা হয়??? এই জমিদার হিন্দু একই সাথে তাল দিয়ে প্রজা-হিন্দুদেরও কালচারালি তাদের স্বার্থপক্ষ হতে বুঝিয়ে নিজ জমিদারি স্বার্থের পক্ষে সামিল করেছিল। এর ফলাফলে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রাও জমিদার হিন্দুর  (যা কার্যত জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার) পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। জমিদারি মালিকানা নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধাচারণকে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রা হিন্দু-বিরোধিতা জ্ঞান করত।  এটা ছিল আসলে,  প্রজা-মুসলমানদের উপর প্রজা-হিন্দুদেরকে কালচারাল শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া ও এই জাত-শ্রেষ্ঠত্বের ভাবনা মাথায় ঢুকানোতে প্রজা-হিন্দুরাও কালচারালি  জমিদার হিন্দুর  জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার পক্ষে লাঠিয়াল হয়ে যায়। আগ্রহীরা আরো পড়ে দেখতে পারেন আমারই ২০১৬ সালে লেখা – হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ। 

    এরই পরিণতি হল, দেশভাগের পরে মূলত ১৯৫০ সালের পরে দেশত্যাগের কালে  প্রজা-হিন্দুরা পুর্ব-পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) থেকে যেতে পারে নাই। সামাজিক এনিমিটি আগেই তৈরি হয়ে গেছিল। কারণ বহু আগেই তারা প্রজা-মুসলমানেদের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন [alien] মানে এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতা রচনা করে ফেলেছিল।   জমিদার হিন্দুর স্বার্থ আর সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দুর স্বার্থ যেনবা এক এই হুদাই ভাবনায় এমন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো লাঠিয়াল-গিরিতে তারা দেখিয়ে ফেলেছিল তারা যেন জমিদার স্বার্থেরই লোক – এমন মনোভাব আগ থেকেই বলে ও ভেবে ফেলার জন্য বাংলাদেশে তারা থেকে যেতে পারে নাই।

    সবচেয়ে বড় কথা জমিদারি উচ্ছেদ আইনে তো  কেবল প্রজা-মুসলমানদেরকেই  নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমির মালিক করে দেওয়া হয় নাই। বা ঐ আইনে কেবল মুসলমানেরাই সুবিধা পাবে, হিন্দুরা নয় একথা বলে তো লেখা নাই। সকল প্রজাই এই সুবিধা পেয়েছে বা পাবার যোগ্য ছিল। কাজেই হিন্দু-প্রজারাও একই সুযোগে  ‘নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে’ জমির মালিক হয়েছে। তবু কালচারালি তারা জমিদার হিন্দুর সাথে সংযুক্ত বা এটাচড [Cultural attachment] – এই বোধের কারণে এটা ক্রমশ তাদের জন্য দেশত্যাগই একমাত্র সত্য ও পরিণতিতে নিয়ে গেছে। এরই কাফফারা বা খেসারত হিশাবে বাংলাদেশের হিন্দুরা এখন ভিকটিম-হুড বা সংখ্যালঘু ইত্যাদি যা পায় সে বয়ান আকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করে চলছে আজও।

    তবে এখানে আমাদের সকলেরই কিছু গুরুত্বপুর্ণ করণীয় আছে। পুরানা প্রজা-হিন্দু ভুল করেছে বলে আমরা এখন তাদের প্রতি কোন বিদ্বেষ বা বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারিনা। তাতে তাঁরা একালে হিন্দুত্ববাদে উতসাহিত হোক কিংবা মোদির কোলে উঠে তাঁকেই ত্রাতা মনে করুক না কেন; আমাদের কাজ কর্তব্য আমাদের করে রাখতে হবে। তা হল, ধর্ম-নির্বিশেষে বা এমনকি শাঁওতাল বা পাহাড়ি ট্রাইব বা উপজাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকই একই এবং সমান অধিকারের নাগরিক এই ভিত্তিতে ব্যবহারিক রাষ্ট্র তাড় আইন প্রয়োগ ও চর্চায় তা বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রতিফলিত করতে হবে। এমন একটা ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে যেতে হবে। এ’দায় আমাদের সকলের; তাতে পুরানা বিবাদে আমাদের অবস্থান ভিন্নতা যাই থাক। তবেই একটা নয়া বাংলাদেশের স্থিতিশীল সমাজ আমরা পাব।  পুরানা কোন বিবাদ-বৈষম্য জিইয়ে রাখলে এটাই আগামিতে নানা দিকে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে অস্থিতিশীলতার বড় কারণ হবে।  এটাই সম-সুযোগের [Equal Opportunity], সকলকে নিয়ে [inclusive] এক বাংলাদেশ গড়ার শেষ সুযোগ – যা আমরা যেকোন মূল্যেই হারাতে পারি না।

    তাহলে আজ ৫ মে এর তাতপর্য কী?
    এদিন থেকেই আমাদের বুঝতে আর বাকি থাকে নাই প্রগতিশীলতা ও তাদের কথিত সেকুলারিজম আর কমিউনিজম কী জিনিষ। শাহবাগ আমাদের চিনিয়েছে প্রগতিশীলতা আর কমিনিজম এর নামের আড়ালে এটা ইসলামবিদ্বেষ আর মূসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর পরিকল্পিত কাজ। যা আমরা হয়ত আগে তত খেয়াল করি নাই। এটাই জমিদার হিন্দুর অসমাপ্ত আধিপত্যকে কালচারাল মোড়কের আড়ালে আবার প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ। এটাই একালে ভারতের রাজনৈতিক ও কালচারাল আধিপত্য যেটাকে বাংলাদেশের উপর আবার জেঁকে বসানোর আমেরিকার সহায়তার নয়া উদ্যোগ। তাই ৫মে এর প্রতিরোধ ছিল এর সম্মিলিত বিরোধিতার দিন, একে সমূলে উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টা – এই আত্ম-সচেতনতার দিন!
    জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থকে বিশেষত এর রাজনৈতিক দিকটাকে আমরা উতখাত করতে পেরেছিলাম পাকিস্তান আমলে, বিশেষ করে ১৯৫১ সালে। কিন্তু প্রগতিশীলতার নামে কমিউনিজমের নামের আড়ালে এর সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ও আধিপত্য আমাদের সমাজের উচ্চ-অংশ ও শিক্ষিত অংশের মধ্যে কালচারালি টিকেই ছিল, এখনও আছে। আর এভাবেই জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থ সব বিনষ্ট হয়ে গেলেও এটা কালচারালি-সাংস্কৃতিকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছে।

    আর এর বিরুদ্ধে প্রথম সফল ও সদর্প প্রতিবাদ ছিল শাপলা সমাবেশ। শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলা সফল কালচারাল প্রতিবাদ। এখান থেকেই আমরা প্রথম টের পাই এখনও আমাদের অসম্পুর্ণ কাজ কী এবং আমাদের অর্জন কী কী ছিল।
    এখন এর মূলনীতিটাকে এভাবে হয়ত বলা যায়, বাঙালি মুসলমান স্বাধীন। ১৯৭১ সালেও সে বাংলাদেশি হিন্দুর সাথে মিলে নয়া রিপাবলিক গড়েছে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে। কিন্তু কোনভাবেই এর অর্থ এমন নয় যে এখন বাঙালি মুসলমানকে (এবং সেই অর্থে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিকেও)  কলকাতার বাঙালিকে অনুসরণ করে বাঙালি হতে হবে বা বাঙালিত্ব শিখতে হবে; ইসলামবিদ্বেষ বা মুসলমান-ঘৃণা করতে শিখতে হবে।

    বাঙালি মুসলমান কেউ চাইলে মর্ডান জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে চাইলে হতেই পারে। কিন্তু কলকাতা এখানে বাঙালির মুসলমানের (বা সেই অর্থে বাঙালি হিন্দুরও) মডেল (কথিত সেকুলার বা ইসলামবিদ্বেষী) হতে পারবে না। এখানে সচেতনতা লাগবে।  এই নয়া সচেতনতা নিয়ে সামনে আগালে নয়া রাষ্ট্র-রিপাবলিকে ইসলামি-ওরিয়েন্টেড মানুষ [যাদেরকে সাধারণভাবে অনেকে ইসলামিস্ট বলে থাকে ]  এরাও মর্ডান বাঙালি মুসলমানকেও জায়গা করে দিবে।   বলাই বাহুল্য শর্ত একটাই যে সে কলকাতা-অনুসারি বাংলাদেশি মুসলমান বা ঘৃণা-বিদ্বেষী বাঙালিয়ানার চর্চা করবে না। এককথায়, কলকাতায় গড়ে উঠা বাঙালি কালচারাল চোখ ও অভ্যাসকে আমাদের সীমানার বাইরে রেখে আসতে হবে। তাতে কলকাতার প্রতি আমাদের কোন বিদ্বেষ নাই, তারা তাদের কালচার নিয়ে ভাল থাকুক, যা হতে চায় হোক। মোদির হিন্দুত্ববাদকে নিয়ে যা করতে চায় করবে। আমাদের বলার নাই। কেবল মনে রাখতে হবে তারা আমাদের অনুসরণীয় বাতিঘর নয়! তাদের “বিদ্যাসাগরেরা” কেবল তাদেরই থাকুক!

    ৫মে এর আত্মত্যাগ যেন ভুলে না যাই!  এর তাতপর্য আমাদের মধ্যে জিন্দা থাকুক! আরও বিকশিত, উদ্ভাসিত হোক!

    last Edit – 06:35am 06 May 2023


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি

    হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি
    গৌতম দাস

    ০২ মে ২০২৩  মধ্যরাত ০০ঃ০১
    https://wp.me/p1sCvy-4oK

     

    United Communist League of Bangla Desh

    দেশে না জেনে আন্দাজের উপর কথা বলা লোকের সংখ্যা বাড়তেছে। গত ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ত্রিদেশীয় জাপান-আমেরিকা-যুক্তরাজ্য সফর শুরু করেছিলেন। আর এরপরেই ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় সিপিবি-র এক জ্ঞানী বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি পরের দিনও তাদেরই “বাম গণতান্ত্রিক জোট” একই ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছিল। সরকারকে অভিযুক্ত করার ভাবে তেমনই টোনে এসব বিবৃতি। যেমন সিপিবির বিবৃতির শিরোনাম – ‘প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে যেন জাতীয় নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়া না হয়: সিপিবি’। আর জোটের বিবৃতির শিরোনাম – ‘তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চুক্তি প্রকাশ করার দাবি’।
    যারা এতদিন মানে, কম করে ধরলে গত পনেরো বছর ধরে ‘সরকারের বিকল্প দেখে নাই’ তারা আজ হঠাত এত কড়া অভিযোগে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে – এটা কেন?  তার মানে, বামেরা কী মনে করে সরকারের কী তবে আয়ু শেষ? তাই বিপ্লবীপনায় ফিরে যেতেই…!  সম্ভবত একারণেই, সবার আগে বামেরা তাই হাসিনার দায়দায়িত্ব আর এতদিনের সমর্থন ও ঘষাঘষি সম্পর্ক এখন থেকে  মুখে অস্বীকার করে ডিস্ট্যান্স তৈরি করে দূরে দাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে মনে হচ্ছে!

    তাই দেশে এখন একটা “হালকা, আবছার উপর ঝাপসা মারা বিবৃতি” ও তা নিয়ে পত্রিকা রিপোর্ট করা শুরু হয়েছে; যে ঘটনার  শুরু প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাপান সফর থেকে, সফর শুরুর দিন থেকে। সেদিন আবার দৈনিক যুগান্তরেও একটা খবর ছাপা হয়েছিল যার শিরোনাম, “গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে”। একইদিনে মাদারবাড়িতে জাপানের গভীর বন্দর নির্মাণ আর ভারতকে চট্টগ্রামের পরে এবার মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার রাজস্ব বিভাগের খুটিনাটির নির্দেশ জারি এবং বাংলাদেশেরও আগে ভারত প্রায়োরিটিতে যেন বন্দর ব্যবহার করতে পারে ইত্যাদি এসব বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। আর তা থেকে বাম-বিপ্লবীপনার জোয়ার ছড়িয়ে পরা শুরু হয়েছে। যা অন্যান্যদের রাজনীতিকেও বিভ্রান্ত-প্রভাবিত করেছে স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, মনিষীরা বলে গেছেন – বিভ্রান্তিই ছোঁয়াচে রোগের মত যা সহজেই ছড়িয়ে পরে; তুলনায় যা ‘জ্ঞানবুদ্ধির’ কথা তা সুস্বাস্থের মত। মানে যা ছোঁয়াচে নয় বলে মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ানো যায় না। আর তাতে বর্তমান রাজনৈতিক জ্ঞানগম্যি-তথ্য-পরিস্থিতি বুঝতে সবাই ছুটছে “তেল-গ্যাসের মধ্যে’।

    মানুষ মানে কী কেবল অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান? তাহলে রাজনৈতিকতা কীঃ
    কমিউনিস্টেরা আজও – রাজনীতি- এই শব্দের অর্থ আমল করতে চাইলো / পারলো না। মানুষের বৈষয়িক স্বার্থ আর রাজনৈতিক স্বার্থ যে দুটা আলাদা জিনিষ ও আলাদা চাহিদা তা তারা হদিশ জানলো না। মানুষের কেবল তাঁর তনু বা দেহ বাঁচায় রাখলেই, কেবল এতেই সতুষ্ট থাকলেই চলে না। প্রাণ শুধু জৈবিক না – এর স্পিরিচুয়ালিটি বা রাজনৈতিক দিকের মত বহু আরও দিকে এর উন্মেষ দরকার হয়। অথচ এরা মানুষকে কেবল বৈষয়িকতায় সীমাবদ্ধ [reduced] করে রাখতে চায়, এভাবে কল্পনা করতে চায়। অথচ আমাদের শুধু অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব বৈষয়িক চাহিদার দিক পূরণ হলেও মানুষের একেবারেই চলে না। কারণ, এসব ছাড়াও মানুষ তো অন্তত রাজনৈতিক মানুষ!  বৈষয়িকতা ছাড়িয়েও যে মানুষ আছে তাঁর  আরও যেসব চাহিদা আছে তা কমিউনিস্টেরা কখনও বুঝতে চাইলো না। আর এরই পরিণতি হল একালে; যেমন, তাঁর রাষ্ট্র কী তাকে গুম-খুন-অপহরণ ইত্যাদি করতে পারবে? রাষ্ট্রে জায়েজ আছে, থাকবে? কথিত শ্রেণী শাসনের একনায়কতন্ত্রের রাষ্ট্রে সব কী জায়েজ, এর নামে?  এসব প্রশ্ন, মানুষের ‘রাজনৈতিকতার’ প্রশ্ন – যা কমিউনিস্টেরা আমল করতে জানে না। অধিকার কী, নাগরিক কী – এসব ধারণা তাদের ভোকাবুলারিতেই নাই।  অথচ এদের জবাব  জানা না থাকা, এসব নাগরিক মানুষের ধারণা ও প্রশ্ন সম্ভবত একালে ভাতের প্রশ্নের চেয়েও বেশি জরুরি!

    কিন্তু তবু এরা “সরকারের বিকল্প দেখে” না। খুঁজে পায় না। আর  না পেয়ে সেজন্যই কী এরা “তেল-গ্যাসের বৈষয়িকতার মধ্যেই’ কেবল মানুষকে দেখতে চায়। এভাবে খুঁজতেই যেন মানুষকে আবার ঠেলতে শুরু করেছে কিছু বামেরা।
    তেল-গ্যাস বা মাটির নিচের সম্পদ নিয়ে কথা উঠলেই দেশের বামপন্থিরা মনে করে এটা তাদের একচেটিয়া এক সাবজেক্ট  আর তাঁরা নিজেকে এর বিষয়ের চ্যাম্পিয়ান মনে করে। আর তাতে তারা ইস্যু্টার অলিগলি বা রাজনীতি জিনিষটা বুঝুক আর নাই বুঝুক। তারা মনে করে তেলের খনির ইস্যু উঠলেই তারা একে এক মুখস্ত শব্দ ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে দিলেই বা ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বলে এক অর্থহীন ফতোয়া বিবৃতি দিয়ে দিলেই তারা এই ইস্যুতে চ্যাম্পিয়ান হয়ে যাবে। সব রাজনৈতিক দায় অবস্থান হাজির করে ফেলতে পারবে, আর এতেই তাদের কথিত “রাজনীতি-বোধ”  প্রকাশের কাজ হাসিল হবে? তাই কী?

    সরকার আমেরিকান ব্কেযক্তি কোম্পানিকে তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষঃ
    সরকার আমেরিকান কোন কোম্পানিকে  তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষ, মানে সরকার টিকে যাবে? কথিত কোন ডিল হয়ে যাবে?  দৈনিক যুগান্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে  ধরণের রিপোর্ট ছাপা হবার পর থেকেই বামপন্থিরা এমন অনুমান ও গুজব ছড়িয়েছে। যার মূল কারণ সম্ভবত, তারা মনে করে আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনীতিক স্বার্থ মানে কেবল বৈষয়িক স্বার্থ – কয়েকটা তেলের খনি হস্তান্তর।
    প্রথমত, এটা গত পনেরো বছরে লটকে থাকা একটা তেল অনুসন্ধানের কাজ বিতরণের ঘটনা যার কিছুই অন্ত নাই, দেখা যাচ্ছে না। কারণ, এটা “তেল আছেই” এমন জানা কোন ভুখন্ডের কোন অনুসন্ধান নয়। খুব সম্ভবত এর প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম বা অনিশ্চিত মানে একটা এমন ঘটনার নুন্যতম নিশ্চয়তা্র প্রাইমারি থ্রেসহোল্ড [Primary Threshold] যদি না থাকে তাতে ঐ কাজে অর্থ ঢালার আগ্রহ কম হবেই, সক্রিয় প্রতিযোগিতায় উতসাহ কমে যায় এটা তেমন।  তাই ব্লক বিতরণ পনেরো বছরে লটকে আছে।  এতে নয়া উতসাহ পেতে এবার কোম্পানি প্রস্তাব করছে যে ১৫টা ব্লক-ই তাকে দিতে হবে। অথবা নয়া উতসাহ দেখা যেতে পারে হয়ত আগামিতে কোন কারণে গ্লোবালি তেল-গ্যাসের দাম আকাশ্চুম্বি হলে, উতসাহ বাড়তে পারে। কিন্তু সেসব যাই হোক না কেন বেশিরভাগ ব্লকে এক্সপ্লোরশনে কিছু পাওয়া না গেলেও গড়ে তা লাভজনক হয়ে যায়। অর্থাৎ উতসাহের অভাব দূর না করতে পারলে কেউ আসতে চাইবে না।
    তবে সেসব যাই হোক ঘটনার মূল পয়েন্ট সেটা না। বরং ধরা যাক, এখানে তেল-গ্যাস পাওয়া একেবারে নিশ্চিত সেক্ষেত্রে কে “লাভবান” হবে? আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ নাকি এক্সন মবিল? যদি ধরে নেই ‘লাভবান” বলতে রাজনৈতিক স্বার্থ  বলে কিছু নাই সবটাই বৈষয়িক স্বার্থ তাহলে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এখানে কোন খাতক নয়। মূল সম্ভাব্য খাতক এক্সন মবিল [Exxon Mobil Corporation] কোম্পানি একা আর এর উচ্ছিষ্ট কুড়াবে বাইডেন প্রশাসনের কেউ কেউ বড় জোর। সোজা কথা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এতে কোন  লাভালাভ পাবে না।
    এর মানে হল – আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ কী – এটা যারা বুঝতেই পারে না, এটা হল সেই কমিউনিস্টদের বয়ান! অর্থাৎ ঐ ১৫টা ব্লকে যদি তেল উপচিয়ে পড়া নিশ্চিত ব্লকও হয় তবু আমেরিকা-হাসিনা সরকারের এখন এথেকে  সমঝোতার সংকট তা কাটার কোন সম্ভাবনা নাই।  অথচ এই শতকের শুরু থেকেই আমেরিকার প্রধান সংকট গ্লোবাল পালাবদলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতার নিজের আগের গ্লোবাল নেতৃত্ব ও প্রভাব আগের মতই পক্ষে ধরে রাখা। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ২০১৫ সালে ওবামা আমল থেকে এশিয়ায় চীনকে হারানো ও প্রভাব বাড়াতে না দেওয়া ইত্যাদি করতে যতগুলো কর্মসুচি আমেরিকা নিয়েছে তার কোনটাই ফলাফল আনে নাই। সাউথ চায়না সি – কে কেন্দ্র করে মালাক্কা প্রণালি বাধা তৈরির সম্ভাবনা থেকে শুরু করে কোয়াড আর সর্বশেষ ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্রাটেজি ইত্যাদি  কোনটাই আমেরিকাকে জুতমত চীনের উপরে কোন মাইলেজ দেয় নাই। সব উদ্যোগই ফেল করেছে বা করছে ক্রমশ। মূলত আশিয়ান দেশগুলোর [ASEAN] অনাগ্রহের জন্যই, তা বিশাল ফ্যাক্টর হয়ে থাকছে! আমেরিকান নীতিনির্ধারক ও থিঙ্কট্যাংকগুলো আশিয়ান দেশগুলোর স্বার্থ বা আগ্রহকে ছুতেই পারে নাই। তারা কেবল নিজ-রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে লাভালাভ আশিয়ান সদস্যেদের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। তাই  কোনভাবেই আমেরিকা তাদের হিলাতে পা্ররে নাই, পারার সম্ভাবনাও নাই।  ওতএব নয়া উদ্যোগে আমেরিকার জন্য নয়া কর্মসুচি হল বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ; আর এতে এবার যদি আমেরিকার কোন ভাগ্য খুলে…! এগুলোই হল আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ বা রাষ্ট্রস্বার্থ।  এখন কমিউনিস্টেরা যদি  দশ-পনেরোটা তেল-গ্যাসের উপচে পড়া খনি পাবার স্বার্থ দিয়ে আমাদেরকে ইস্যুটা ব্যাখ্যা করতে চায় বা বুঝতে বলে তাহলে আমরা কী বুঝব? এরা কী কোন রাজনৈতিক দল, কমিউনিস্ট ? এসব পেটি মধ্যবিত্ত, এরা কারা?
    যারা গ্লোবাল নেতৃত্বে –  প্রতিযোগিতা ও স্বার্থ-সংঘাত দিকটা আমল করার যোগ্যই নয় – বড় জোর তেলের খনি আর সবকিছুকেই বস্তুস্বার্থ দিয়ে বুঝে তাই সবকিছু তেলগ্যাসের বুঝ দিয়েই বুঁদ হয়ে থাকে তবে এদের লইয়া আমরা কী করিব!!

    সিপিবির এক ফাঁকা বিবৃতিঃ
    সিপিবির বিবৃতির এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ হল –

    বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ এশিয়াভিত্তিক সামরিক অভিলাষ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশলগত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রামের মাতারবাড়ীতে জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছিল, সেটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং এর সহায়ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইচ্ছানুযায়ী বাংলাদেশে একটি মার্কিন নৌঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি বিষয় জাপান সফরকালে আলোচিত হবে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এটি হলে তা হবে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

    প্রথমত এটা আমেরিকার নেহায়েতই কোন “সামরিক অভিলাষ” -মাত্র নয়।  ঠিক যেমনটা আমরা কোল্ড-ওয়ারের (১৯৫৩-৯১) আমলে সোভিয়েত-আমেরিকান ঝগড়ায় আমরা সবকিছুকেই ‘সামরিক’  বলে বয়ান করতে সোভিয়েত  বয়ানের মধ্যে দেখতাম। এছাড়া এমনকি সত্তর-আশির দশকের বয়ান দিয়েও বিশেষত,  কোল্ড-ওয়ারের চিন্তা ফ্রেমে একালে কিছুই ব্যাখ্যা বর্ণনা করা যাবে না। নিজেকে বোকা প্রমাণ করা ছাড়া ওতে আর কোন লাভ হবে না।
    দুই. ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি এটা কোন আমেরিকান প্রকল্পই নয়। বড়জোর একটা কনসেপ্ট মাত্র। আর তা হল,  চীন নাকি কোন আন্তর্জাতিক রুল, নিয়ম-কনভেনশন মানে না, রুল বেজড নয়। বিশেষ করে আড়ালে বলতে চায় চীন নাকি  জাতিসংঘের [UNCLOS – The United Nations Convention on the Law of the Sea] মানে, সমুদ্রসীমা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরবিট্রেশন (যা ঠিক বিচার নয় তবে সালিশীর মত জাতিসংঘের অধীনে এক  মিটমাট ব্যবস্হা) মানে না। এই অজুহাতে চীনকে একঘরে করে আমেরিকা – ভায়েরা আসেন একটা কনসেপ্ট তৈরি করি যার যার কনসেপ্ট অবস্থান বলি বললে যেমনটা হত – এটাই আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি বাতচিত।  এই লক্ষ্যে, সবদেশের একেকটা স্ট্রাটেজি প্রকাশিত হোক এটাই আমেরিকার ইচ্ছা। আর এর বিরুদ্ধে চীনা রাষ্ট্রদুতের অভিযোগ ওরা সুনিদির্ষ্ট করে একটা দেশকে (মানে চীন)  বাদ দিয়ে একটা কোন ইন্টারন্যাশনাল জোট কনভেনশন করতে পারেন না। তবে মূলকথাটা বা বটম অব দা ফ্যাক্টস হল, চীন কখনও এপর্যন্ত সে – জাতিসংঘ মানে না বা UNCLOS মানে না বা আইনের শাসন মানবে না ইত্যাদি বলে কোন বিবৃতি বা ধারণা দেয় নাই। ফলে এমন অভিযোগ গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে অ্যামেরিকান একটা চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন মাত্র। যদিও একথা ঠিক, সাউথ চায়না সি (যেটা চীন থেকে সমুদ্র পথে বের হলেই যে নৌ-অঞ্চল)  -তে চীন তার প্রায় সকল পড়শির সাথেই সমুদ্রসীমা বিতর্কে আছে।
    তিন. মাতারবাড়ি জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর এর সাথে “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত” -এসবকথা কোথায় পেল সিপিবি? হঠাত এনিয়ে মাঠে উদিত হল কোথা থেকে – এই কমিউনিস্টেরা ভারতের উত্তর পুর্বাঞ্চল রক্ষার দায়ীত্ব কাধে নিল কেন?  মাতারবাড়ি মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের (যা মাতারবাড়ি প্রকল্পের আরেক অংশ) জন্য বড় বাল্ক জাহাজে করে কয়লা (ছোট লাইটার জাহাজ না) সরাসরি বিদ্যুৎ প্রকল্প পর্যন্ত প্রবেশ সহজ করতে পারার এমন উপযোগী করে নির্মিতব্য এক গভীর সমুদ্রবন্দর। আর এতে আমেরিকার নৌঘাঁটি করার খায়েস এর পথে তা সাহায্য হতে পারে তাই এটা জাপানকে সামনে রেখে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তা করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আর এসবের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য মূল বা বাণিজ্যিক গভীর সমুদ্রবন্দর করার স্টাডি-পরিকল্পনা করা হয়েছিল পাশে মহেশখালির সোনাদিয়াতে। যেটা চীন (কুনমিং), বাংলাদেশ ও বার্মায় পণ্য আনা-নেওয়া জন্য ব্যবহার করা যায় – সাথে আর চাইলে ভারতও তা ব্যবহার করতে পারবে;  এতে তাহলে এর নির্মাণ খরচ সহজেই বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করে উঠে আসবে।  কিন্তু ভারতের আপত্তি ও ফুসলানিতে এই প্রকল্পই ২০১৫ সাল থেকেই বাগড়া, শেষে সরকার বাদ দিয়ে দেয়। আর আজকে পট উলটে যাওয়ায় সিপিবি  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য রক্ষার গল্প ও কান্নাকাটি নিয়ে এসেছে! এটাই ভাগ্যের পরিহাস! কিন্তু এখন কেন?  ভারতের পিঠে আমেরিকার হাত থাকাতেই এতদিন ভারত-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক বন্ধু  এই গর্বে মাটিতে পা না পড়া ভারত এতেই কী বাংলাদেশকে করদ রাজ্যের মত ব্যবহার করে আসে নাই???  তখন সিপিবি ও বামেরা কারদিকে কোথায় ছিল??? কোন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ছিল???
    চার. বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত তার “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি” পাবলিক করেছে। এনিয়ে বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম হল – “ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা: চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে ভারসাম্যের নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ”। মানে হাসিনার বাংলাদেশ চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে কোন পক্ষ নিবে না, বরং ভারসাম্যের নীতি বজায় রাখবে – যেকোন কারণেই হোক এটা সঠিক পদক্ষেপ। এটা ২০২০ সালে বা তারও আগে থেকেই হাসিনার একই অবস্থান – মানে এটাই হাসিনার নিজেকে ক্ষমতায় রাখার দিক থেকেও বরং উপযুক্ত বলে তাঁর নিজস্বার্থ ও  বিবেচিত। আর তা তিনি বজায় রেখেছেন। তাহলে হাসিনার এই চলতি ত্রিদেশীয় সফরে আমেরিকান সাথে আতাঁত আপোষ হয়ে যাচ্ছে বলে ভয় দেখানোর সুযোগ কই???
    অতএব,  হাসিনার এই ত্রিদেশীয় সফর নিয়ে আমরা বড়জোর বলতে পারি এটা হাসিনার শেষ চেষ্টা কোন “ওয়ার্কেবল রিলেশন” বের করার তবে সেটাও যদি লাইগা যায় ধরণের, তবে তুকতাকে বিশ্বাসের। তুকতাক বললাম এজন্য যে মানুষ সব হারালে তুকতাকে বিশ্বাস করতে চায়। মানে, মনে হয় না হাসিনা লজিক্যালি এমন কোন সম্ভাবনা দ্যাখেন।
    সারকথায় তাহলে, সিপিবির তরুণ নেতাদের নতুন করে পড়াশুনা করতে হবে। পুরানা সত্তর-আশির দশকের ভাবনা একেবারেই অচল, মুখস্থ কথা অচল হয়ে গেছে। কমিউনিস্ট চিন্তা একালে ঢেলে সাজাতেই হবে – মার্কস যাকে নিরন্তর পর্যালোচনা বা নিজেকেই ক্রিটিক [Critique] করতে বলতেন। রিভিউ [Review] বা ঢেলে সাজানো এটাই। এই মুরোদ ছাড়া সব পন্ডশ্রম, সময় নষ্ট – এই পথেই যাচ্ছে কমিউনিজম, যাবেই!

     

    কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদঃ
    সিপিবি’র বিবৃতির একটা বাক্য হল এরকম, “সিপিবি মনে করে, শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কখনো শুভ হবে না” ।
    এখন একথার মানে কী?  তাহলে বাংলাদেশে গত পনেরো বছরে কী হয়েছে? এসময়ে “ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেয়া” – বলতে কিছুই ঘটে নাই? এটাই কী সিপিবি মনে করছে? তাহলে এতদিনে হাসিনার বিকল্প নাই কথা এখন ফেলে ত্যাগ করে সরকারের সমালোচনায় আসার ভাব দেখানোর দরকার কী?
    ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটা কমিউনিস্ট ভোকাবুলারিতে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে চালু হয়েছিল কমিউনিস্টদের এক গুরু-নেতা লেনিন এর ১৯১৬ সালে লেখা বা প্রকাশিত ‘সাম্রাজ্যবাদ’ নামের বই থেকে। আর ওর পরের বছরই ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় রুশবিপ্লব বা দুনিয়ায় প্রথম এক কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল। যেটা পরে  ১৯২২ সালের পর থেকে – সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই নয়া নামে ১৫টা আলাদা মোটা জাত-ভুখন্ডের এক সমাহার রাষ্ট্র হিশাবে তা পুণর্গঠিত হয়েছিল। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়তে গিয়ে তা ১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত তাতে নয়া দেশ যুক্ত করা তখনও চালু ছিল। সবচেয়ে বড় কথা কবে থেকে কমিউনিস্টেরা আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ট্যাগিং বা নাম দেওয়া বা নিচা দেখানি শুরু হয়েছিল এর হদিস খুব কম কমিউনিস্ট দিতে পারবে। তাদের বেশির ভাগেরই এনিয়ে ধারণাটা আবছা, তবে তারা সারকথায় বলবে হয়ত কমিউনিজমের জন্ম থেকে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবা্দী” বলে কমিউনিস্টেরা ডাকে, যা একেবারেই ভুল। ফ্যাক্টস হল লেনিন সাম্রাজ্যবাদ নামে নয়া ধারণা আনতে বই লিখলেও ঐ বইয়ের ভিতরে অন্তত আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয় নাই। বরং ওখানে প্রসঙ্গ ছিল সেকালের জর্মানি। লেনিন ১৯১৭ অক্টোবরের রুশবিপ্লবের পরে বেঁচেছিলেন মাত্র আরো প্রায় ছয় বছর, ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। আর ওদিকে আমেরিকা ১৯৪৫ সালে মানে বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির আগে গোনায় ধরার মত কেউ কিছু ছিল না, মানে গ্লোবাল নেতা বলেও কিছু ছিল না। যখন সারা দুনিয়া ছিল কেবল ইউরোপ-কেন্দ্রিক কলোনি দখলদারদের হাতে বা নেতৃত্বে। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যে কোন বিশেষ বিরোধ-সংঘাত বা শত্রুতা কিছুই ছিল না।

    তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদি দেশ বলা শুরু করেছিল কবে থেকে? স্বভাবতই সেটা ১৯৪৫ সালের পরের পঞ্চাশের দশকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৫৩ সাল থেকে জব্বর ভাবে। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে স্তালিন তো প্রেসিডেন্ট রুজভেন্টের ঘনিষ্ট বন্ধু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ্যামেরিকান নেতা রুজভেল্টের ডানে-বায়ে থাকা আরো দুই ঘনিষ্ট দেশবন্ধুর একজন ছিলেন খোদ স্তালিন, আর তাতে অপরজন ছিলেন  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। এই তিন নেতা ১৯৪২ সালের পর থেকে একসাথেই বিভিন্ন দেশ নানান ইস্যুতে নেতৃত্ব দিতে ভ্রমণ করতেন। পরে ১৯৪৫ সালে রুজভেল্ট এর হঠাত স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান যিনি রুজভেল্টের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন ও একই নীতি অনুসরণ করতেন। ফলে তাঁর সাথে স্তালিনের সম্পর্কও প্রায় একই ছিল – সো নো সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগিং!
    পরের রিপাবলিকান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিলে সোভিয়েতের সাথে আমেরিকান সম্পর্ক একেবারেই বদলে এনিমি হয়ে যায় যা যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। যেমন, সিআইএ দল পাঠিয়ে আইসেনহাওয়ার এর ইরানের সরকার বা রেজিম চেঞ্জ, যেটা ইরানে মোসাদ্দেক সরকারকে  উপড়ে ফেলা ও তেলের খনির দখল নেয়া এমনকি আবার ওদিকে, চীনের তিব্বতে নেহেরুর ভারতের সাহায্যে ভারতে সিআইএ ঘাটি করে একই কাজ করা এর আরেক উদাহরণ। এখান থেকেই দালাইলামাদের তিব্বত ত্যাগ, ভারতে আশ্রয় আর পরিণতিতে শাস্তি হিশাবে চীন কয়েকদিনের জন্য সারা আসাম দখলে রেখে দেয়া ঘটিয়েছিল যা ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ বলে বাইরে থেকে বিবেচিত।  ভারত-চীনের সম্পর্ক তিতা সেই থেকে আর যা এনিমি হয়ে যায়।

    অন্যদিকে মনে রাখতে হবে লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা ও প্রসঙ্গ এর সাথে ১৯৫৩ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের আমেরিকাকে ট্যাগ লাগানো সাম্রাজ্যবাদ ধারণা – এদুটো ঠিক একই নয়।  মনে রাখতে হবে,  এমনিতেই রাষ্ট্র মাত্রই তা এক একান্ত স্বার্থ। এবং যা বাকি সব রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে আলাদা ও অপর [Other] গণ্য করা; এবং সবকিছুর উর্ধের নিজস্বার্থ – এক স্বার্থপর স্বার্থ। এবং এমন এক একান্ত স্বার্থ এটা যে অন্য কোন অপর রাষ্ট্রকে নিজ স্বার্থে অবলীলায় ব্যবহার করে ফেলতে পারে।  তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যতই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হোক না কেন অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্র বা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি  যতই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে নিজেদের আদর্শগত মিল আর হরিহরাত্মা এক দেহ-বোধ দেখাক না কেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থের প্রশ্নে সে সবকিছুর উর্ধে এক নিরঙ্কুশ আত্মস্বার্থ দিয়েই পরিচালিত স্বার্থ। কাজেই আইসেনহাওয়ারের আমল থেকে আমেরিকা-সোভিয়েতের যে বৈরিতা তাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজের সেই একান্ত চোখেই দুনিয়ার সকল কমিউনিস্ট দেশ ও পার্টি আমেরিকাকে দেখুক সেটাই হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি। আর এই পররাষ্ট্রনীতি,  আবার এর ভিতরে যদি আরেক কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র তার নিজস্বার্থের বেলায় তারও একান্ত স্বার্থ বের করে তাহলে?? তাতে অন্তত আমারও একান্ত স্বার্থ বইলা সেটা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে একটু আলাদা তো হতেই পারে। কিন্তু সেই ভিন্নতা কী সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি এলাও করবে বা শ্বাস নিতে দিবে???  তাই একই কমিউনিস্ট আদর্শের হওয়া সত্বেও দুই কমিউনিস্ট রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতার বিরোধ কমিউনিজমে কখনও রিসলভড বা সমাধা করা হয় নাই বা যায় নাই। মূল কারণ, দুই রাষ্ট্রের আদর্শ একই – এর মানে তাদের রাষ্টস্বার্থও এক  – এই অনুমান ভিত্তিহীন। মূলত দুই রাষ্ট্রস্বার্থ কখনও এক হতেই পারে না। এমন হওয়া মানে তারা তো এক-রাষ্ট্র হয়ে যেত!!!  তাই সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগ কতটা কমিউনিস্ট  আদর্শগত ধারণা আর কতটা সোভিয়েত রাষ্ট্রস্বার্থের একান্ত পররাষ্ট্র নীতি তা ভেদজ্ঞানে আলাদা করতে জানতে হবে। একারণে ১৯৫৮ সালের মাওয়ের  চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব এই নয়া ধারা  ডাকার কারণে পরে চীনও সোভিয়েত হামলার ভয়ে উলটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে  সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বলে ট্যাগ দিয়েছিল; যেটা পরে ১৯৯২ সালে  সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙ্গে যায় বলে এই ট্যাগিংয়ের সমাপ্তি ঘটে আর দরকার থাকে নাই।

    তাহলে একালে কে সাম্রাজ্যবাদ?
    কাকে কে, কেন সাম্রাজ্যবাদ বলবে সে ব্যাপারটা  নতুন করে পরিস্কার ঝালাই করে নিবার সময় এটা। যেমন ধরেন আজকের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে শুরু করা চীন-কে সিপিবি বা কোন কমিউনিস্ট পার্টি কী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগে ডাকার মত চীনকেও সাম্রাজ্যবাদ বলে ডাকবে? কেন ডাকবে আর কেন ডাকবে না এর ব্যাখ্যা-বুঝ একালের বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের লাগবে। নয়া পক্ষে বা বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক সে সাফাই লাগবে। কোল্ডওয়ার আমলের বুঝ ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার রিভিউ ঢেলের সাজানো আগে করে নিতে হবে। এই বুঝাবুঝির আবার যোগ্য হতে হবে।  সত্তর-আশির দশকের মুখস্ত ধারণা দিয়ে চলবে না। সোভিয়েত ভেঙ্গে গড়া ১৫ দেশই এখন আইএমএফের সদস্য, বলা ভাল যে দুনিয়ায় কে এখন আর আইএমএফের সদস্য নয় তাই এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার আনরিয়েলিস্টিক [অবাস্তব] ও আইডিয়েল [আদর্শগত] ধারণা আঁকড়ে কথা বলার মানে হবে না। তাহলে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা বুঝতে হবে আগে, বুঝাবুঝিতে ভুল কী ছিল  এর জানাবুঝা শুরু করতে হবে সেখান থেকে।   ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানটা জন্ম নেওয়ার সম্মেলনে তখন জীবিত স্তালিন; তিনি সেই জন্মসভায় সোভিয়েত প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। যদিও পরে যখন চাঁদা পরিশোধ করে আইএমএফের সদস্যপদ নিবার কথা তখন যোগাযোগ ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ঠিক কী কারণে? স্তালিনের বুঝ কী ছিল তা নিয়ে কোথাও তিনি কিছুই লেখেন নাই।  আজকের আধা-বুঝের কমিউনিস্টেরা অবশ্য মনে করেন তারা এই প্রতিষ্ঠানটা বুঝেন? যেন তারা স্টাডি করেছেন? অথচ তারা বলতেই পারবেন না যে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান এটা, ম্যান্ডেট কী? যেমন তারা কী বলতে পারবেন – বাংলাদেশ যদি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে বাংলাদেশের  লাভ বা ক্ষতি কী কী হবে? বাংলাদেশ বা যেকোন দেশ আইএমএফ এর সদস্য না হয়ে অর্থনীতিতে টিকে থাকতে পারবে কিনা, এনিয়ে কমিউনিস্টদের বক্তব্য কী??
    ক্যাপিটালিজমকে কমিউনিস্টরা যদি পাপ মনে করে সেক্ষেত্রে এটা তো এক এথিক্যাল বিবেচনা মাত্র – সে বোধ কী  কমিউনিস্টদের আছে – যদিও তাদের এই বিচারে বাংলাদেশের বা সেই অর্থে দুনিয়ার সব মানুষই পাপী। এমনকি যেসব অর্থনীতির শিক্ষক ও কমিউনিস্ট  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তারাও সমান পাপী। কারণ তারাও ক্যাপিটালিজমের বাংলাদেশ সরকার ও সমাজের থেকে বেতন নিচ্ছেন – তাদের  ভাত গলার নিচে যাওয়া এমন প্রতিটা ভাত – এর সবই ক্যাপিটালিজম পাপের ভাত। তাহলে পাপের বাইরে কে?

    “জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করলেই” এসব পাপের মুক্তি ঘটবে – এই অনুমানও এক স্বপ্ন-কল্পনা। কারণ এগুলাও আর বাস্তবে রিয়েলিজমে নাই।

     

    আরেক বিপদ কমিউনিস্টদের সার্বভৌমত্ব ধারণাঃ
    সবশেষের এক প্রসঙ্গ; বাংলাদেশে আরেক  বয়ান তৈরি করছেন  সিপিডি [CPD] এই প্রতিষ্ঠানের ডিস্টিঙ্গুইশুড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। যা খুবই বিপদজনক ও এথিক্সের ভয় সৃষ্টিমূলক।
    সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটি [Sovereignty] নিয়ে এথিক্যাল বুঝকে রাজনীতি বানিয়েছে কমিউনিস্টেরা। আমাদের মত রাষ্ট্রগুলো কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ফলে সার্বভৌম হয়ে গেল কেমনে আর তা থেকে একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার বা জাতিসংঘ দুনিয়াতে কোথা থেকে হাজির হল যারা এর কিছুই জানে না – এরাই আবার কিছু হলেই দেশের সার্বভৌমত্বের বুঝ হাজির করবে। যেমন দাবি করবে বাংলাদেশে সার্বভৌম তাই বাংলাদেশ নিজ ইচ্ছায় এটা সেটা কত কী করতে পারে। মনে মনে ভাব নিবে প্রবোদ দিবে যে এসব প্রশ্ন তোলা বুদ্ধিমানেরা যেন আমেরিকাকে কত্তবড়ই না বিপদে ফেলতে পারছে!
    না ভাই সরি, আপনারা পারেন নাই। আসলে বাংলাদেশের মত দেশগুলো কী করে কী অর্থে সভরেন তা আপনি আজও জানেন না। মানে কী? মানে হল, এটা আমেরিকারই অবদান যে সে দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রের অন্যদেশকে কলোনিদখল করে রাখা এই কাজটা অন্যায়, অবৈধ বলে – এই ভিত্তিতে এক জাতিসংঘ বানিয়েছিল – এটা অ্যামেরিকান আইডিয়া ও তাদের একক অবদান। এতে আমাদের মত দেশগুলো তাই ১৯৪৫ সালের পর থেকে কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ও জাতিসংঘের সদস্যদেশ হয়েছে; তাই এই অর্থে সে সভরেনও। কলোনিদখল হারাম কাজ –  এটাই দুনিয়াতে প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার তৈরি করেছিল, আর তারই রায় এটা। যদিও এর আর অনেক কিছুই এখনও পূরণ হয় নাই, খামতিতে আছে অনেক; কথা সত্য কিন্তু দয়া করে এই অর্জন টুকুকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না।  কারণ, সার্বভৌমত্ব এটা আসলে কী ও কতটুকু হয়েছে তা নিয়ে কমিউনিস্টেরা এখনও বেখবর।

    এখন আরো একটা কথা মনোযোগে শুনেন।
    এরপরেও যে  সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটির ধারণা যা তবুও আপনি শুনে ফেলেছেন তা কোথা থেকে  এলো বাংলাদেশ সভরেন দেশ বলে বিবেচিত হল তা না জানা সত্বেও –  একথা সত্য যে এই সার্বভৌম ধারণাটা আসলে এক আইডিয়াল [IDEAL] ধারণা। মানে তা রিয়েল [REAL] বা বাস্তবে দেখানো যাবে, এমন সত্য করে দেখানো যাবে – এমন ধারণা নয়।এটাই আইডিয়েল ধারণা। আর আইডিয়েল বলতে বুঝতে হবে – হওয়া উচিত – ধরণের ধারণা যেটা কাগজে বা খাতায় থাকা ধারণা মাত্র। সেকালে জন্ম নেয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডারটা অতটুকুই আপনাকে দিতে পেরেছে। এখন আপনি কতটুকু বাস্তবে সভরেন সেটা তো আপনার রাষ্ট্রকে  -হয়ে উঠে  মানে, মুরোদ অর্জন করে দেখিয়ে দিতে হবে।  অর্থাৎ আপনার রাষ্ট্রকে রিয়েলি [really] -ই সত্য করে দেখাতে হবে যে এটা সার্বভৌম। চীন বা ভারত যেমন আজকাল – রাশিয়াল তেল বুক ফুলিয়ে আমদানি করে দেখাচ্ছে, আমেরিকাকে অবজ্ঞা করছে। আমরা অবশ্যই তা পারি না। এমনকি  রুপপুরের রাশিয়ান প্রকল্পের পেমেন্ট রাশিয়াকে বাংলাদেশ ইউয়ানে শোধ করতে পারব কিনা তা নিয়েও আমেরিকারআপত্তি শোনা যাচ্ছে। এসব শুনতে বা আমাদের রাষ্ট্রকে আমল করতে হচ্ছেই। মানে হল রিয়েল সার্বভৌমত্ব বা মুরোদ দেখানোর মত সভরেনিটি হতে পারি নাই। কারণ, এটাও না-বুঝার কারণ নাই যে এসব জায়গায় – আমরা সভরেন দেশ – বলে বোকার মত বীরত্ব দেখাতে যাওয়ার মানে হয় না, অবশ্যই!

    কিন্তু দেবব্রত ভট্টাচার্য বিজ্ঞের মত বলেছেন,  “আইএমএফ ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে আমরা অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করেছি। আমরা তাদের শর্তাবলি মেনে নিয়েছি”। আচ্ছা কারও ঋণ শর্ত মেনে নিয়ে ঋণ নিলেই তাহলে আমাদের সার্বভৌত্ব চলে যাবে, ঢিলা হয়ে যায়। তাহলে মানুষের ব্যক্তি বা ব্যবসার জন্য ব্যাংক ঋণ নিলেই ইজ্জতের মত আমাদের সার্বভৌমত্ব চলে যাবে! কেন?  আইএমএফ এর ঋণ নিলে সার্বভৌমত্ব চলে যাবে কেন?   আইএমএফ কী তাহলে কোন পাপী সংগঠন।  দেবব্রত কী জানেন খোদ আমেরিকান রাষ্ট্র মানে যেটাকে আমেরিকা রাষ্ট্রের নেয়া  সভরেন লোন বলে, সেটা ৩১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে [দেখুন, On December 16, 2021, lawmakers raised the debt limit by $2.5 trillion to a total of $31.4 trillion.1 ] ; এবছর আরো ঋণসীমা বাড়ায়ে  নিতে হবে? আবার ওদিকে জাপান নিজ রাষ্ট্রের সভরেণ লোন (দেশি-বিদেশি বাজার থেকে খোদ রাষ্ট্রের  নেয়া ঋণ এটাই সভরেন ঋণ)  হল তা ইতোমধ্যেই ঐদেশের বাৎসরিক জিডিপির ২০০% এর বেশি?  তাহলে এদুই দেশের সভরেনিটিও কী নাই ধরতে হবে?? আর যারা ঋণ দিয়েছে তারা আমেরিকা বা জাপানকে কী বিনাশর্তে এসব লোন দিয়েছে? তাই কী? দেবব্রত ভট্টাচার্য কী বলেন!!

    আবার,  আচ্ছা দেখেন; আইএমএফ কী  হাসিনার বাংলাদেশকে বাধ্য করেছিল যথেচ্ছারে রিজার্ভ খরচ করতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ এর দেশ হতে, ডলারে সম্পদ পাচার করতে – রিজার্ভ ভেঙ্গে সঙ্কটে পড়তে? এমনকি শেষে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতেও কী আইএমএফ আমাদের সরকারকে বাধ্য করেছিল? এমন তো কোন সরকারি বা খাতক ভাষ্য জানা যায় না। তাহলে রিজার্ভ খুইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতে গেলে সেটা আইএমএফেরই দায় ও দোষ জ্ঞান করে কমিউনিস্টেরা কেন?  নিজেই দেশকে বিপদে ফেলে এরপরে নিজেই আইএমএফের কাছে আমাদের শাসকেরা যায় কেন, এমন তো কোন বাধ্যবাধকতা নাই! কিন্তু কমিউনিস্টেরা এমন প্রপাগান্ডায় বিশাল জ্ঞানী সাজতে চায় কেন???
    সাধারণ ফেনোমেনা হল, যেখান থেকেই কোন লোন নেন না কেন, তা আপন ভাই হলেও – সেই ভাইয়েরও কিছু সুবিধা-অসুবিধা বা স্বার্থ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যেমন কবের মধ্যে ভাইয়ের থেকে নেয়া ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে অন্তত এমন কথা তো থাকবেই। এখন এমন শর্ত দিলে কী সেটা নিজ ভাইয়ের কাছে আমার সারর্ভৌমত্ব চলে যাবে? কেন এই আজিব ভাবনা?
    তাহলে “শর্তাবলি মেনে নিয়েছি” একারণে, “আইএমএফ এর কাছে কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ” – মনে করছেন কেন দেবব্রত?? এত পাপবোধের অতিশুদ্ধতা কেন? অতিভক্তি কেন? রাজনীতিতে পাপপুণ্যের ধারণা মানে এই এথিক্স রাজনীতিতে নাই। তবে ধর্মতত্বে আছে। দেশীয়  কমিউনিস্ট কাছে ক্যাপিটালিজম বা সেই সুত্রে আইএমএফ এর ধারণা একেবারেই এমন ভুতুড়ে ধারণা! এর চেয়েও তা পাপ আর ছুয়াছুয়িতে শুদ্ধ-অশুদ্ধতার ধারণায় ভরপুর। এজন্যই তাদের কাছে  আইএমএফ ঋণ   মানে যেন শুদ্ধতা খুইয়ে আত্মসমর্পণ করা!  কমিউনিস্ট  মস্কোর পিএইচডি হলে কী এমন ভেট দেয়া বয়ান দিতেই হয়?  মা কালীর ভোগ চড়ানোর মত!!!

    আচ্ছা গত ওয়ান ইলেভেনের সময় ভারতের নর্থ-ইস্টকে সব ধরণের করিভোর দিয়ে দেওয়ার পক্ষে সিপিডি আদাজল খেয়ে লাগা ততপরতা দেখেছিলাম আমরা; সেটা কী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য করা হয়েছিল??  এমনকি যারা সিপিডির বিরোধিতা করবে তারা মুর্খ অশিক্ষিত বলতেও সিপিডির মালিক মহাজনদের সেসময় মুখে আটকায় নাই। আর ভারতকে করিডোর দিলে এর আয়ে নাকি আমরা সিঙ্গাপুর হয়ে যাবার কথা কারা বলেছিল?  এসব গুলো কী ছিল? ভারত-স্বার্থের পক্ষে ওপেন  দালালি নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষার উদাহরণ?   এগুলো কী আমাদের “অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ধরে রাখার” কাজ? কোন ধরণের “আত্মসমর্পণ না করার” উদাহরণ এগুলো?? বাহরে নন্দলাল…!! মারহাবা!

    সর্বশেষ এডিটঃ সকাল ০৯ঃ৫৭, ৩মে ২০২৩
    ____
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

  • আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    গৌতম দাস

    ২৬ জানুয়ারি ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4mg

     

     

    Fact Sheet: Indo-Pacific Strategy of the United States – U.S. Embassy in the Philippines

    বাইডেনের আমেরিকা সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। বেচারা হয়ে গেছে! তাঁর কোন নীতি-পলিসিই কাজের না, ফলে আনতে পারছে না। তাতে সেটা হোক ইউক্রেন ইস্যু অথবা বাংলাদেশের মত ছোটদেশের উপর আমেরিকান প্রভাবের ক্ষেত্রে; সব অকার্যকর। ফলে শেষে কেবল বকোয়াজ আর বোলচালে ভরপুর এক আড়াল তুলে দাঁড়িয়ে থাকছে তাঁর প্রশাসন। ব্যাপারটা হল কেবল ফাঁকা দাবি না,  ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় তিনি ভাল বিকল্প – সেটা নিজ আমেরিকান জনগণের কাছে তো  অন্তত প্রমাণ করতে হত; এখন এশিয়ায় বা বাংলাদেশের মত দেশের ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে  মূলত যেন এক ‘খামোখা’ বলেই পরিচিতি তুলে ধরছেন। বাংলাদেশের যারা হাসিনার শাসন এই ফ্যাসিজম থেকে মুক্ত হবার স্বপ্ন দেখছিলেন যেখানে আমেরিকার একটা ভুমিকা থাকার সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে, তারাও সমুলে হতাশ হয়েছেন।

    যেমন ধরা যাক, বাইডেন তাঁর শাসনের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘হিউম্যান রাইট’ বা মানবাধিকার নাকি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গ। যারা পোড় খাওয়া ‘আমেরিকা অবজারভার’ তারা বিশ্বাস করেন নাই; কিন্তু এটাই পরিণতি তা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন। যেমন বাইডেনের শাসনকে বলা যায় “স্যাংশনের রেজিম’ বলা যায়। যা কিছুই বাইডেনের অপছন্দের বা আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে তিনি মনে করেছেন তাতে সেখানেই তিনি যেন এক স্যাংশন আরোপের রাজা বনে গিয়ে অবিরাম সেসবের উপর স্যাংশন আরোপ করে গেছেন। এসবের মধ্যে কোথাও সত্যিই হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ঘটনাবলীও মাখামাখি করে আছে, অবশ্যই। যেমন বাংলাদেশের গুম, খুন হত্যা, অপহরণ, গায়েব, ‘ক্রশফায়ারের’ নামে হত্যা ইত্যাদি যতধরণের অপরাধ আছে তা গত পনেরো বছরে ঘটে চলেছে। নিঃসন্দেহে এগুলো হিউম্যান রাইট চরম ভায়োলেশনের ঘটনা। যেসবের উপর আমেরিকা স্যাংশন আরোপ করেছে। আবার একই নিঃশ্বাসে যেমন, রাশিয়া তার জ্বালানি তেল বিদেশে বেচতে পারবে না – এজন্য সে একই স্যাংশনও যথেচ্ছাচারে আরোপ করে চলেছে। যা মানবাধিকারের ইস্যুওই নয়; বরং খাসা একান্তই আমেরিকান ব্যবসা-বাণিজ্যিক স্বার্থ বৈ আর কিছু না – এমনটাও আছে।

    ঠিক যেমনি বাংলাদেশে হাসিনা রেজিমের তার রাজনৈতিকবিরোধীদের নির্বিচার দমনকে জঙ্গীবাদ দমনের নামে চালিয়ে দেয়াতে –  এর বিরুদ্ধে হাসিনার র‍্যাবসহ নানা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের উপর স্যাংশন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইতিবাচক বলে দেখে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু না – পরিশেষে আমেরিকা সবকিছুকেই তার চীনবিরোধী বাণিজ্যিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বলে যে মনে করে সেকথা আর লুকায়ে রাখল না বা পারল না!

    এককথায় বললে, ঢাকার শাহীনবাগে গুন-খুনের ভিকটিমদের সাথে দেখা করতে রাষ্ট্রদুত পিটারহাস উপস্থিতের সাথে সাথে হাসিনা যে মৃদ্যু পরোক্ষ বাধার পালটা অবস্থান দেখিয়েছিল তাতেই আমেরিকার নিজের আগানোর পথ নিয়ে রিভিউ-এ বসেছিল। এই আদ্যোপ্রান্ত পর্যালোচনা থেকেই আমেরিকার পথ চলায় গিয়ার বদল! মানে যেটারই পরিণতি আমরা দেখলাম ডোনাল্ড ল্যু এর বাংলাদেশ সফর। আর সেখান থেকে বাইডেনের মতিগতির ল্যাংটা হয়ে পড়া! কেমন সেটা?
    সেটা হল ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এসব বাইডেন প্রশাসনের কাছে কিছু না! তারা এসবের আসল ভক্ত না। সিনসিয়ার বা সিরিয়াস কোনটাই না! বকোয়াজ মাত্র!! বাইডেনের আসল স্বার্থ সারা দুনিয়ায় যেমন, তেমন এশিয়াতেও তার প্রতিযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বি নয়া উত্থিত হতে থাকা চীন; এই চীনবিরোধীতায় নিজ স্বার্থ উদ্ধার এটাই বাইডেনের মুখ্য নীতি-পলিসি। আর সেকাজ তার বাকি সব ততপরতা বিক্রিযোগ্য! যেমন এসময়ের এশিয়ায় বাইডেনের স্বার্থ সোজা  ভাষায় যা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) নামে পরিচিত।

    একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাঃ
    এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, এই আইপিএস (IPS) বা আগের কোয়াড (QUAD) গঠন – এদুইয়ের সম্পর্কই বা কী? প্রথম সমস্যা আমাদের মিডিয়া রিপোর্টার লেবেলেই ব্যাপারটা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। এর উপর আবার ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF) বলে আরেক ফেকড়া বা বাড়তি দিক (এক্সটেনশন) বা নয়া খাতা আছে।
    খুবই অল্প কথায় বললে, কোয়াড [QUAD] বা চারদেশীয় জোট (আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া)  যেটা ছিল তা কার্যত অকেজো। হাত লাগলেই ভেঙ্গে যাবে, সম্ভবত ভারত বেরিয়ে যাবে; এরকম! মূলত, একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাকে না বুঝা থেকে এই সমস্যা। আমেরিকা বরাবর এব্যাপারে ফেল করছে এজন্য যে তাদের মাথায় জোট বলতে সবসময় কোল্ডওয়ার কালের (১৯৫৩-৯১) সোভিয়েত (ব্লক) বনাম আমেরিকা (পশ্চিমা জোট) এর স্বপ্ন মাথায় ঘুরে থাকে। এই স্বপ্নকল্পনার কারণে আমেরিকার মনে ইচ্ছা করে আগের সোভিয়েতের মত যদি একালে চীনবিরোধী এক পশ্চিমাজোট (মূলত আমেরিকা ও ইইউ এর সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট) গড়তে পারা যায়।
    অথচ এই স্বপ্নটা একেবারেই অবাস্তব, অথচ সেটা আমেরিকার ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদলের কোন প্রেসিডেন্ট যারা হয়ে আসছেন তাদের  নীতি-পলিসিতে এটা প্রতিফলিত নাই। কিন্তু কেন অবাস্তব বলছি? সেকথা বললেই বাকি সব কথা পরিস্কার হয়ে যাবে। যাকে সোভিয়েত ব্লক বলছি এদের মূল ও কমন পরিচয় এটা না যে তারা কমিউনিস্ট অর্থনীতির চক্করে আটকে থাকা দেশ ছিল তাই। তাদের মুল পরিচয় আসলে তারা কেউই আইএমএফের [IMF] সদস্য ছিল না; তবে সেটা দু’এক রাষ্ট্র হতে চেয়েও সদস্যপদ পায় নাই বলে, আর বাদ বাকিরা, বেশির ভাগই রাশিয়ার স্টালিনের  অবস্থানের কারণে নিজেরাও সদস্য হতেও চায় নাই, একারণে। কিন্তু সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো আইএমএফের সদস্য ছিল না তাতে কী?

    এর এককথায় উত্তর হল, আইএমএফের সদসদ্য নয় একথার ব্যবহারিক মানে হল এসব রাষ্ট্র অন্যকোন রাষ্ট্রের সাথে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে পারবে না বা পারত না। এই কারণে তখনকার মানে কোল্ডওয়ারের  [Cold War]আমলে যেকোন জোট মানে কার্যত তা সামরিক-স্ট্রাটেজি অথবা রাজনীতিক আদর্শ কেন্দ্রিক জোট হত।  এর চেয়েও বড় কথা সেকালের ‘জোট ধারণা’ একালের ‘জোট ধারণা’ একেবারেই এক নয়। মানে কী?

    মানে হল একালের জোটে যার সাথে সামরিক-স্ট্রাটেজিক অথবা এমনকি অর্থনৈতিক স্বার্থের গভীর বিরোধ আছে তারই সাথে আবার একালে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘটে আছে। ফলে সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ গভীরবিরোধ থাকলেও তারই সাথে আবার গভীর বাণিজ্যিক লেনদেন ও পরস্পর গভীর নির্ভরতা তা শুধু সম্ভবই নয় একেবারে প্রধান বাস্তবতা। চীনের সাথে আমেরিকা, চীনের সাথে ভারত, চীনের সাথে জাপান, চীনের সাথে অষ্ট্রেলিয়া এমন প্রায় সকলের সাথেই চীনের যে  গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং এতে পণ্য-পুঁজির গভীরতম বিনিময় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা – এটাই বাস্তবতা। এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক এতই প্রধান যে একই সাথে চীনবিরোধী কোন সামরিক-স্ট্রটেজিক বা রাজনৈতিক জোট গড়া তা প্রায় অসম্ভব হয়ে আছে; এতে হয়ত তা গড়া হয়েছে ঠিকই, কার্যত যা অকেজো! যেমন সর্বশেষটা হল, অষ্ট্রেলিয়া বা জাপান। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় স্কট মরিসনকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন অ্যান্থনি আলবানিজ। স্কট মরিসনের দল লিবারেল পার্টি। আর নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন লেবার পার্টির অ্যান্থনি আলবানিজ। অষ্ট্রলিয়া-চীন বিরোধে চীনে অষ্ট্রেলিয়ার সব রপ্তানি সুবিধা  প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল।  অষ্ট্রেলিয়ায় নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী এখন আগের দলের উপর দোষচাপিয়ে আগের মতই চীনে রপ্তানির সুযোগ কতটা পুনরুদ্ধার করা যায়, চীনের সাথে সেসব সম্পর্ক ও চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গভীরভাবে ব্যস্ত।  আবার ওদিকে জাপান; চীনে কোভিডের কারণে চীনের অর্থনীতির অনেক খাত ঝুলে পড়াতে জাপানের র্অথনীতি সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ও এর ধাক্কার শিকার দেশ হয়ে উঠেছে। আবার কোয়াডকে আমেরিকা সামরিক অভিমুখী করে ঘুড়িয়ে দিতে চাইলে সবার আগে পিছটান দিয়েছে ভারত; ভারত কারও সাথে সামরিক জোট করতে চায় না, তাই। তাই বাইডেন আর কোয়াড নিয়ে সমস্ত নাড়াচাড়া স্তব্দ করে রেখেছেন।

    আর তাতেই আইপিএস (IPS) নামে আমেরিকা নয়া এক খাতা খুলেছেন বা এদিকে জোর দিয়েছেন। কিন্তু আইপিএস কী কেন? বলা হচ্ছে এটা কোয়াড থেকে আলাদা। জিজ্ঞাসা করলে বলে এটা কোন রাষ্ট্রজোট নয়, ডোনাল্ড ল্যু এবারের বাংলাদেশ সফরে যেমন পাবলিকলি বলেছেন। তাহলে এটা কী? বলছেন এতে নাকি সবদেশই ইন্দো-প্যাসেজিক জোন প্রসঙ্গে নিজের নিজের স্ট্রাটেজি জানাবে। কিন্তু কেন বা কী উদ্দদেশ্য? এখানেই কবি একটু নিরব! মানে প্রথমত এটা কী কোন একটা দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য স্ট্রাটেজি বা কৌশল? নাকি যুদ্ধ কৌশল, না সামরিক স্বার্থের কৌশল, নাকি রাজনৈতিক, না অর্থনৈতিক – এসব এই প্রশ্ন আছে। তা কেউই প্রকাশ্যে পরিস্কার করছে না। দ্বিতীয়ত, এখানে শত্রুদেশটা কে? এটা সবচেয়ে নির্ধারক প্রশ্ন! এটা লিখিত ভাষায় বা রেকর্ডে না বলে চর্চায় তারা বলে থাকে; ফলে মনে মনে ধরে নেয়া সেই শত্রুদেশ হল চীন!

    তাহলে কী দাড়ালো এটা?  যেখানে আমেরিকাসহ সকল দেশই চীনের সাথে বাণিজ্য- অর্থনীতিতে পুঁজি-পণ্য বিনিময়ে গভীরভাবে সম্পর্কিত সেখানে একই সাথে চীনবিরোধী আইপিএস (!) এটা কেমন স্ট্রাটেজিক জোটের কল্পনা???  আমেরিকা ঠিক চাইছেটা কী???  এর বাস্তব দিকটা তো খোদ আমেরিকার কাছেই অপরিস্কার!! তবু আমেরিকা চাইছে এশিয়ার সবদেশ তো বটেই কানাডাকেও কার্ড দেখাতে হবে! বা কানাডার কাম্য ইন্দো-প্যাসেজিক স্ট্রাটেজি কী তা লিখে জানাতে হবে। মানে হল কতটা সে চীনবিরোধী তা দেখাতে বলতে হবে! আর ঠিক এর মতই হাসিনার বাংলাদেশেকেও মূলত সেকথা বলতেই এসেছিলেন ডোনাল্ড ল্যু। তিনমাস মানে মার্চ মাসের মধ্যেই তা আমেরিকাকে জানাতে হবে। এদিকে আরও প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

     

    ওদিকে আইপিএস, এর আরেক বাড়তি ঝালড় আছে – সেটা হল, ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF)। মানে এটাই আসল অর্থনৈতিক জোটের কল্পনা। কিন্তু সমস্যা হল, এটা টু লেট (too late)!! কেন?

    কারণ ইতোমধ্যেই চীনা আগ্রহের আরেক এবং আরো গুছানো এক অর্থনৈতিক জোটের জন্ম ও ততপরতা গত ২০২০ সাল থেকে শুরু হয়েই আছে যার নাম RCEP। বাংলা লিখলে, রিজিওনাল কম্প্রিহেন্সশীপ ইকোনমিক পার্টনারশীপ [RCEP]। যেটা আসলে কালজয়ী; কারণ এটা জোটদেশগুলোর যেকোন উতপাদিত পণ্যে সদস্য সবদেশেরই শ্রম যুক্ত করার সুযোগ (shared value addition) রাখা হয় ও তাতে সকলেই এই পণ্যের ভোক্তা-ক্রেতা। যেমন জাপান, অষ্ট্রেলিয়া দুই কোয়াড সদস্য এমনকি আমেরিকা প্রভাবিত দক্ষিণ কোরিয়াও এই জোটের সদস্য হতে মিস করে নাই। জন্ম থেকে এরা সবাই সদস্য, তাতে কোয়াড বা IPS বলে কিছু গঠিত থাকুক আর নাই থাকুক!

    তাহলে এতদিনে  IPEF খাড়া করার আমেরিকান নয়া বাসনা কেন আর কতটুকু এটা নতুন কিছু করতে পারবে? যদিও এটা RCEP এর নকল করে তার চার বৈশিষ্টের একটা হিশাবে supply chains বলে একটা ধারণা রেখেছে যেটা shared value addition ধারণার ধারেকাছের নয় বলেই অনুমান। কারণ, shared value addition এটা আমেরিকান কনসেপ্ট নয়। বরং উঠতি অর্থনীতি বা ‘প্রাক্তন কমিউনিস্ট’ দেশ হলে এনিয়ে তাদের নিরীক্ষায় আগ্রহী দেশ হতে দেখা যায়। কারণ এখানে লেবার মানে ভ্যালু এডিশন“ভাগাভাগির” প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
    কিন্তু সেটাই মূল ইস্যু বা প্রধান বাধার দিক নয়। প্রধান বাধার দিক হল, আমরা যদি IPEF-এ যোগ দেই তবে আমাদের  কারখানা পুঁজি (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ) এবং  অবকাঠামো পুঁজির উতস কে হবে?

    একাজে আমেরিকা বুড়া সিংহ, আর বিপরীতে চীনকে উঠতি বাঘ বলা যায়। উদাহরণ, এই বুড়া বয়সে বাইডেনের আমেরিকা উঠে দাড়ানোর সখ করেছিলেন। বর্তমানের চীন দুনিয়ার আমাদের মত সবদেশের জন্যই অবকাঠামো পুঁজির ঋণদাতা ভুমিকায় একছত্র হয়ে উঠে আছে। এমন এক অর্থনীতিকে আমেরিকার বাইডেন এই বুড়া বয়সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। দেখা গেলে এতে তারা সবাই মিলে মাত্র ৬০০ বিলিয়ন ডলারের কমিটমেন্টের জোগাড় করতেই তাদের হিসশিম। এছাড়া এখনও এই সংগ্রহ হাতে আসা ও কাজে নেমে পড়ার ততপরতার কোন কিছুই শুরু করতে পারেন নাই। তাই খুব সম্ভবত ২০২৪ সালে বাইডেন ক্ষমতা ত্যাগের পরে এই উদ্যোগ্রটারও মৃত্য সংবাদ আমরা পাব!!!  তাহলে IPEF-এ যোগদানে আমাদের কী হবে????

    আসলে, কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক এসব শব্দ দিয়ে এপর্যন্ত আমেরিকান পেসিডেন্টেরা পিসমিল একমুঠো করে যা কিছু করে যাচ্ছেন এসবের কিছুই টিকবে না, শুরুতে কার্যকরই হতে পারবে না। তবুও  RCEP এর সমান্তরাল আরেকটা IPEF বলে জোট অবশ্যই খাড়াতে পারে তবে এর অন্যতম শর্ত হতে হবে যে এসব কোন অর্থনৈতিক জোটই বিশেষে দেশের (যেমন চীন অথবা আমেরিকা্র বিরোধী হতে পারবে না। ফলে একই দেশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সাপেক্ষে ইচ্ছা মত একই সাথে দুইটা জোটের মধ্যেই থাকতে ও সদস্য হতে পারবে, এমন জট হতে হবে। একটা জোটের মধ্যে সবাই থাকবে তাও হতে পারবে। কিন্তু কোন ভাবেই প্রকাশ্যে বা গোপনে আমরা চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক জোট করতে চাই, এমন করা যাবে না – এসব চিন্তা অবাস্তব, অকেজো। ঘৃণা ছড়াতে পারবে কিন্তু নিজে কার্যকর কিছুই হতে পারবে না। মুল কারণ আমরা সবাই একই [IMF] আইএমএফের সদস্য। মানে আমরা সকল রাষ্ট্র একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ ফলত আমরা মূলত একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ।  ক্যাপিটালিজমে “কোটারি” হয় না; সব ক্যাপিটালিজমই পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে  যাবেই; এভাবেই সে টিকে থাকে যা এর মৌল স্বভাব!

    চীন একারণের এটাকে নিন্দা করতে বলে, বাইডেনের ‘কোল্ডওয়ার মানসিকতা’।  এমনকি বাংলাদেশের চীনা নয়া রাষ্ট্রদুতই এসব ধারণা আড়াল নিয়ে বলেছেন “কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে: চীনের রাষ্ট্রদূত”। ওথবা “কোনো দেশকে বাদ দিয়ে গড়া জোটে যোগদানে সতর্ক থাকতে হবে”।

    এখনও তিনটা কথাঃ
    প্রথমত, আমেরিকা ল্যু এর সফরে মার্চের মধ্যে হাসিনা সরকারকে নিজদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরি করে তাদের জানাতে বলে গেছে বলে জানা যায়। কিন্তু এটা কেন?
    ল্যু যেটা বলতে চাইছেন এর সারকথা হল, বাংলাদেশ যেন চীনের সাথে সম্পর্ক বিশেষত অর্থনৈতিক যেটা যেমন প্রধানত, চীনা অবকাঠামো ঋণ ও চীনের উপর নির্ভরশীলতা না করে চলা। এছাড়া চীনা অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামও মানে করে থাকতে পারে। এছাড়া সাউথ চায়না সি নিয়ে আমেরিকা যে গায়ে পড়া ঝগড়া-বিরোধ বানিয়ে রেখেছে তাতে আমেরিকার পক্ষ নেয়। বাংলাদেশ যেন এমন অবস্থান নেয়!

    আমরা উপরে দেখেছি, আমেরিকান এই আকাঙ্খাটা আনরিয়েলিস্টিক; বাস্তবে তা সংঘটন বা করে দেখানোর কারও কোন সম্ভাবনা নাই বা সম্ভাবনাচ্যুত! তাহল এটা নিয়ে এই জিদ ধরার অর্থ কী?

    দ্বিতীয়ত, আমেরিকা বা এমনকি সে বগলে জাপানকে নিয়েও যে আমেরিকা সে আমাদের অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটানোর যোগ্য কোন দেশ নয়। যদিও এটা ঠিক ওয়ার্ল্ডব্যাংকের যেকোন ঋণপ্রকল্পে ওপেন টেন্ডার হতেই হয়।  যমুনা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের তরফে সিংহভাগ লোন দিয়েছিল জাপান। অথচ ১৯৯৭ সালে এই সেতু নির্মানে জাপান কোন অংশের কাজই পায় নাই। আর একালে, বাংলাদেশে চীনাঋণের প্রকল্পের কমিশন সরাসরি সিঙ্গাপুরে জমা হয়ে যায়, এটা এক বিরাট সমস্যা হয়ে আছে। কাজেই তরুণ উঠতি আকাঙ্খার ঋণ আকাঙ্খার বাংলাদেশকে আমেরিকা নিজ বাহুডোরে আটকে রাখার খায়েস; অর্থহীন!  তবে বাংলাদেশে নয়া এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ভিত্তিক নুন্যতম কিছু সংস্কার করতে পারলে এর অনুষঙ্গ হিশাবে চীনাঋণের কমিশন সমস্যার সমাধান সম্ভব। কারণ, চীনা সরকার আমাদের মত দেশে নুন্যতম সাধু বা সীমাহীন চরম চোর নির্বিশেষে সব ধরণের সরকারের সাথে কাজ করে থাকে।

    তৃতীয়ত,
    আমেরিকা কেন ডোনাল্ড ল্যু পাঠিয়ে এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) যোগদানের জন্য হাসিনা সরকারকে জোরাজুড়ি করছে?
    প্রায় ছয় মাস আগে থেকে বিএনপির এবারের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এবারের আন্দোলন শুরুর পিছনে গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১০ তারিখে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর আমেরিকান স্যাংশন আরোপের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে।  কারণ এবারের আন্দোলন শুরুর প্রথম দিকে সরকার আগের মত অভ্যাসে গুম-খুনের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারে যে এতে আগে থেকেই দেয়া স্যাংশনের চাপ আরো বাড়ছে ও বাড়বে। আর সরকারের এমন ততপরতা সব মনিটরিংয়ের অধীনে। তাই বলা যায় আমেরিকান অপ্রত্যক্ষ ইঙ্গিত ছিল এই আন্দোলন শুরু করার। শুধু তাই না, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ঢাকায় গোলাপবাগে বিএনপির লাখো সমাবেশের পরে প্রথম দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়  যে হাসিনা সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে এবার সত্যিই গণভিত্তি পেয়ে এক আন্দোলন উঠে দাড়িয়েছে। এরপর আসে পিটার হাসের আরেক স্টেপ আগানো। তিনি হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ভিমটিমদের ভিজিট করতে শুরু করে সরকারের দিক থেকে কিছু পরোক্ষ বাধার সম্মুখীন হন। আর এরপরেই আমরা দেখি পরিস্থিতি ক্রমশ আমেরিকার সাথে সরকারের “বাতচিত, ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর” ইত্যাদির দিকে যাচ্ছে। স্যাংশন আরোপের দিক থেকে বললে এটা নিঃসন্দেহে আমেরিকার পিছনে হাটা। কারণ, হাসিনা সরকারের সাথে যা যা ডায়লগ প্রয়োজন আমেরিকা মনে করে সেরকম  “বাতচিত ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর ইত্যাদি শেষ হবার পরই তা থেকে আমেরিকার প্তেরাপ্তি মনে করা যায় এমন  “কোন রফা” বা ভদ্র ভাষায় কোন অগ্রগতি না হলে এরপরই তো আমেরিকার স্যাংশন আরোপের দিকে যাবার কথা! এটাই অনুমান করা যায়!
    তার মানে আমেরিকা এই উলটাপালটা করে আগে-পিছে মানে এক-পা আগে পরে দুই-পা পিছের কূটনীতি করতে গিয়েছে! কেন? অনুমান করা যায় তাদের ধারণা এতে হাসিনার উপর  চাপের প্রভাবটা বেশি হবে!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা আমেরিকাকে বেশি চাপের সুবিধা দিবেঃ
    প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সেকথায় যাবার আগে অন্য কিছু কথা।
    তাহলো এর মানে বাইডেনের মানবাধিকার ও স্যাংশন তার পররাষ্ট্রনীতির কোন পলিসি তা একেবারেই নয়। বাইডেন মূলত মানবাধিকার ব্যবসায়ী হিশাবে নিজেকে হাজির করেছেন।
    এর মূল কারণ,  হাসিনা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি পেশ করবেন কিনা বা আমেরিকার নেতৃত্বে চীনবিরোধী কোন এক কমন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির অংশ হবেন কিনা অথবা ক্রমশ  ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক(IPEF) এ যোগ দিবেন কিনা অথবা চীনের সাথে অবকাঠামো ঋণসহ অন্যান্য প্রকল্প সুবিধা ও সম্পর্ক করা সব গুটিয়ে নিবেন কিনা ইত্যাদি এসবের সাথে  সমান্তরালে হাসিনার মানবাধিকার ভায়োলেশনের রেকর্ডের কী সম্পর্ক??? মানে হাসিনা চীনের থেকে সরে আসলে তার সব মানবাধিকার অপরাধ আর অপরাধ মনে করা হবে না???? তাই কী?
    ধরা যাক হাসিনা-সরকারের কাছে আমেরিকার যা কিছু খায়েস এর প্রায় সবকিছুতেই হাসিনা একমত হলেন। তাহলে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের  অভিযোগ এর রেকর্ড কী সব তখন থেকে ইতিবাচক বলে বিবেচিত হবে??? আমাদের জানা মতে, ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি হতে পারে একমাত্র উপযুক্ত আদালতে এর বিচারের পরে। এরপরেই কেবল অভিযোগ বা স্যাংশন উঠিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন!  তাহলে???

    তাহলে এই পরিস্থিতিতে এখন সরকারের সাথে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি ইস্যুতে আমেরিকার কথা বলা, সময় দেয়া কেন? আবার আমেরিকান সব প্রস্তাবে যদি সরকার একমত হয় তবে তাতে দেশে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সেই সাথে সেই নির্বাচনে এই সরকারকে পুনরায় জিতবার নুন্যতম নিশ্চয়তাও তাতে ব্যবস্থা কী থাকবে?? আমেরিকা কীভাবে হাজির করবে তা? নাকি তা সম্ভব? আর এসব নিশ্চয়তা না থাকলে সরকার কেন আমেরিকার এত কথা শুনবে, বা মান্য করবে? এমনিতেই হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ঘটানো – এমন সমীকরণ অসম্ভব। এর উপর হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কোন নির্বাচনে বিএনপিকে সামিল করা আরেক  অসম্ভব।

    অর্থাৎ বাংলাদেশের এক্ষণকার বাস্তবতা হল আগামি নির্বাচন পার হবে কীকরে আর  সাথে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি এদুইয়ের কোনটাকে বগলে নিয়ে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি-তে বাংলাদেশের এলাইনমেন্ট করে নেয়া নিয়ে কথা তোলা – এটা একদিকে আন-এথিক্যাল অন্যদিকে এমনটা ঘটবার কোন বাস্তবতাই নাই। আর সবার উপরে এসব ডিল বা সমঝোতা-অযোগ্য আইটেম। সেটা আমেরিকা বা হাসিনা সরকার দুদিক থেকে এটা ডিল অযোগ্য ইস্যু।
    যেমন গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার ভায়োলেশন চরমে উঠে আছে।  আর ওদিকে এই লম্বা সময়কালগুলোতে অভিযোগ সবকিছু জানা সত্বেও আমেরিকা এনিয়ে নিঃশ্চুপই ছিল। তাই বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিবার পরেও যদি এনিয়ে ধারাবাহিক নিশ্চুপ থাকত তাহলে একরকমের পরিস্থিতি হত। কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিজের পররাষ্ট্রনীতির নীতি-পলিসি বানানোর ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্য আচরনের পথে আর বাইডেন প্রশাসন যে নাই তাই তো উন্মোচিত!!  এককথায় “মানবাধিকার ও স্যাংশন”  এর পলিসি ঘোষণা ও স্যাংশন আরোপের পরে এটা  ডিল অযোগ্য ইস্যু হয়ে গেছে।
    আবার একটা মজার তথ্য হল, এখন ভারতও চায় না যে হাসিনা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তে সামিল হয়। প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদুত একথা বলেছেন বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে!

    আবার হাসিনার দিক থেকে যদি দেখি, কোন কিছু পাবার বিনিময়েও হাসিনার চীনের হাত ছেড়ে দেওয়ার যোগ্য থাকবে না। কারণ, সরকারের উন্নয়নের ঢোল পিটানোর সঙ্গে সামনজস্যপুর্ণ কাজ হল এই ধরণের ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা ও তা থেকে চুরির অব্যবস্থাপনা জারি রাখতে হবে। কারণ নাহলে দলের যারা এর বেনিফিসিয়ারী এরা কেউ আর দলের সাথে থাকবে না। অথচ সরকার চীনের হাত ছেড়ে দিলে  আমেরিকা-জাপানের পক্ষে হাসিনা সরকারকে ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা একই লেভেলে জারি রাখা অসম্ভব।
    মূলত এই প্রধান কারণেই আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে হাসিনা সরকারের চীনবিরোধী কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরির ততপরতায় সামিল হওয়ার বাস্তবতা নাই। এছাড়া আবার এটাই ছিল ২০২১ সালে হাসিনা সরকারের চীনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি; আর সেই সৌজন্যেই আমরা সে সময় বিনা পয়সায় আমাদের সমস্ত চীনা টিকা প্রাপ্তি ঘটেছিল!

    কাজেই সব ব্যাপারেই অবজেক্টিভিটি বা কঠিন বাস্তবতাই হয়ে উঠেছে একমাত্র নির্ধারক! আমেরিকা বা হাসিনা সরকার ডিল অযোগ্য বা সমঝোতায় আসা অযোগ্য এসব বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে আছে!
    তাই, আইপিএস (ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি) বা এর সংশ্লিষ্ট কোনও ততপরতায় হাসিনা সরকারের যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ! এছাড়া, বাংলাদেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছে; এতে একমাত্র রাস্তার আন্দোলনের দিকেই এই পরিস্থিতি থেকে বের হবার অভিমুখ রাস্তা!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

     

    ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

    গৌতম দাস

    ১৮ জানুয়ারী  ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4m2

     

        What is the message Donald Lu left for Bangladesh? Daily Star

    ডোনাল্ড ল্যু ঢাকা সফর শেষে চলে যাবার পরে আমাদের সমাজের প্রায় সব কোণে বিস্তর আলাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা শুরু হয়েছে এই বলে যে হলো-টা কী বা ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়ালো – এধরণের!
    তবুও এটা এখন কমবেশি পরিস্কার – যেটা সোজাসাপ্টা বললে, ডোনাল্ড ল্যু কিছুটা  পিছু হটাছেন অথবা এক দিশা হারানো বাইডেন প্রশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এবং সেই অনুসারে তাদের এখনকার অবস্থানই যেন জানাতে এসেছিলেন।  তারা যে তাদের আগের অবস্থান থেকে অন্তত কিছুটা সরে গেছেন সেই পিছু হটা অবস্থান অনুসারে বাকি সবকিছু এডজাস্ট করে নিতে বা সে অনুযায়ী একটু ঢেলে সাজিয়ে নিতে এসেছিলেন তিনি।  যদিও মনে রাখতে হবে এই “পিছু হটা’ – এটা সাময়িক হতে বাধ্য! আমার বিচারে এটা স্থায়ী অবস্থা হবে না, বরং সাময়িক হতে বাধ্য।  মানে বলতে চাচ্ছি ল্যু ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা তাদের এই পিছু হটা অবস্থানও ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে; ফলে আবার আগের জায়গায় যেতে তাদের চেষ্টা করতে হবে! এজন্যই এটাকে ‘সাময়িক’ বলছি। কিন্তু এখন অবশ্যই এটা কিছুটা হলেও পিছু হটা !

    কথাটা সম্ভবত আরেকভাবে বলা যায়। যদি অনুমান করে নেয়া যায়, বাইডেন প্রশাসনের ভিতরে দুটা ধারা আছে বা হয়ে গেছে।  যার একটা ধারা যেটাকে আমরা এতদিন একমাত্র জ্ঞান করেই এসেছি সেটা হলঃ বাইডেন প্রশাসন ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এই অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে আর এভাবেই এশিয়ায় চীনবিরোধি আমেরিকান স্বার্থগুলো ভাল আদায় হবে বলে এতদিন মনে করে এসেছে এরা। এই ধারারই বাংলাদেশে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের গুম-খুন-অপহরণ-গায়েবের যেসব ভিকটিম আছে তাদের সাথে দেখা করার প্রোগ্রামে শাহীনবাগে যাওয়া। আর তা থেকেই হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সরাসরি কিছুটা সংঘাতময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

    অন্যদিকে, প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারাকে চিনাতে বলা যায়, এরা মনে করে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে হাসিনা সরকারের উতখাতের ঝামেলায় যাবার দরকার নাই। অন্যভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে…।

    সেক্ষেত্রে তাহলে জানতে হবে বা শুরু করতে হবে যে তাহলে বাইডেনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখান থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এমন চিন্তা করা বা পিছু হটার কথা সহজেই  বলতে পারছে কেন? আর কীইবা সেই উদ্দদেশ্য??
    বাইডেন প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে “মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা’ একেবারেই নয়। বরং সে জায়গায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘বার্মা দখল’! কিন্তু  সেক্ষেত্রে  ‘বার্মা দখল’ করতে চাইলে হাসিনা উতখাতের দায় সাথে নিয়ে আগানো কেন? সেকথায় পরে আসছি।

    আসলে প্রথম ধারার পথে চলতে গিয়ে এটা এখন অনুমানে বলাই যায় যে বাইডেনের আমেরিকার নিজ ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজি” ধরে আগাতে গিয়ে এমনভাবে হাসিনা সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে যাবে এটা তাদের কল্পনায় ছিল না। আগের দিনের মত সবই চুপচাপ পাড়িয়ে যেতে পারবে! কারণ, বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হবার পর থেকে প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল – সেই অভ্যাস মতে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকান প্রভাবে তারা যা করতে চেয়েছে মোটামুটি তাই হয়েছে ও পেয়েছে।

    কিন্তু বারে বারে বলেছি এটা “পালা-বদলের কাল” যখন আমেরিকাকে চীনা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতায় মোকাবিলা করতে হবেই ও হচ্ছে। পালা-বদল” মানে যেটা গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব বদলের এটা সময়কাল। যেটাকে অনেকেই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারে না অক্ষম বলে তারা তাদের চিন্তার অসক্ষমতা, দুর্বলতা ঢাকতে “ভূরাজনীতিক” বলে একটা আবছা অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে নিজের অস্পষ্ট চিন্তার প্রকাশ ঘটায়ে থাকে। এই পালাবদলে “ভূ-” বা কোন দেশের বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” জন্য এসব ঘটছে তা একেবারেই নয়; তা ভাবার কোন সুযোগও নাই। ভুরাজনীতি শব্দটার ব্যবহার ও আবির্ভাব প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে তবে এর শেষের দিকে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল ১৯৪৪-৫ সালে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও উত্থান ঘটে যাবার পরে  মানে এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও উদিত প্রভাবের পরে  ‘ভুরাজনীতি’ শব্দটা সেবার হারিয়েই যায়। এর মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কেন আমেরিকা এর একছত্র নেতা হিশাবে উঠে আসবে আর এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়া এক গ্লোবাল অর্ডার [new Global Order] বা বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা চালু হবে সেটা কোন দেশেরই বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” কারণে-পরিণতিতে এমনটা  ঘটে নাই। সে জন্য যারাই এই তিন প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও এদের সেকাল থেকে নয়া ভুমিকা ও তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে অপারগ তারাই geo- বা ভ্যু- বলে একটা পরাজিত ধারণাকে ধুয়ে মুছে আবার একালে খাড়া করে নিজেদের অকর্মণ্যতা আড়াল করে থাকে।

    তবে এখন যেটাকে পালাবদল  বলছি এতেও এমন অনুমান ভুল হবে যে, এতে আমেরিকা যেভাবে সেকালে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল চীনও একইভাবে একই ধরণের নেতা হবে। এই অনুমান অতি সরলিকরণও হবে। তাই সাবধান থাকতে হবে। তবে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক যে বিশ্ব ব্যবস্থা তখন জন্ম নিয়েছিল ও এখনও ধুকে হলেও চলছে – এখন পালাবদলে যেটা কেবল আমেরিকার জায়গায় চীনা নেতৃত্ব হয়ে যাবে এমনটা হল এক কপি-পেস্ট ধারণা। দুনিয়ায় কোন ঘটনাই একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ঘটে না। যদিও জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত আবার পুনর্গঠিত হবেই।

    আবার, এসব পালাবদল প্রসঙ্গে খোদ আমেরিকানদের কোন স্টাডি নাই বা ফেনোমেনাটা জানা নাই তা একেবারেই নয়। তবু তারা যেন নানার আমলে খাঁটি ঘি খাবার অভ্যাসে এখনও সহজেই আগের মতই তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করে ও ফেল মারতে থাকবে। কারণ পরিস্থিতি যে আর আগের মত একই রকম নাই তাই তারা সময়ে ভুলে যায়। আর বার বার পরাজিত হয়। এধরণের উদাহরণের অভাব নাই। যেমন ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটা ঘটনা। সে সময় আমেরিকা-বিশ্বব্যাংকের আগ্রহে তারা হাসিনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা। এই দুর্নীতির মামলা সত্যি হোক বা না হোক, এটা মনে করা ভুল হবে না যে এমন মামলা করার পিছনের তাদের অপর উদ্দেশ্যের দিক ছিল। সম্ভবত তা হল, যাতে আরো ভাল করে আমেরিকার অধীনস্ততায় আনা যায় যাতে হাসিনা আরো অনুগত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আমেরিকান বেকুবিটা হল দুর্নীতি মামলাটা যখন আনলই তখন কয়েক বছর পরেই আবার শেষে আদালত থেকে ঐ মামলাটাই বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কেন? অথচ তাতে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নয়া এক হারুপার্টিতে পরিণতি পেল!  সেটা কিভাবে?

    বিশ্বব্যাংক মানে হল নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে কম সুদে যে ঋণদাতা – তা ছোট বড় সব প্রকল্পে সে এমন ঋণ দিয়ে থাকে। আর এথেকেই “পড়ে পাওয়া বাড়তি চার আনার মত ঘটনাটা হল – আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বেড়ে যাওয়া।
    তাহলে দুর্নীতির মামলা এনে পরে পিছু হটে যাওয়ার আমেরিকানদের পরিণতি কী হয়েছিল? হয়েছিল এই যে নয়া ঋণদাতা উতস হিশাবে ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণদাতা’ হতে অপেক্ষা করছিল চীন বা প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চেয়ে অপেক্ষা করা চীন এই ফাঁকে সে বাংলাদেশে প্রবেশ ও নিজের হাজিরা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। যেটা এরপর হাসিনার চীন-সফর আর পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট  সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর শেষে ২০ বিলিয়ন ডলারের অধিক (যেটা পরে ঠেকেছিল ২৬ বিলিয়নে) প্রকল্পের বন্যা বাংলাদেশে বয়ে গেছিল।

    তাহলে চীনকে অবকাঠামো ঋণদাতা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে রাস্তা করে দিয়েছিল কে??? এটাই আমেরিকান বেকুবি!!   অথচ ঋণদাতা মানেই ওর ঋণগ্রহিতা দেশের উপর দাতার প্রভাব হাজির হওয়া বা বেড়ে যাওয়া। অনেকে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বলতে পরাশক্তির ‘সামরিক ক্ষমতা’ বলে বুঝে থাকে। এটা ভুল মিথ্যা। গ্লোবাল নেতা দেশের প্রভাব-আধিপত্য বলতে সেটা প্রধাণত নেতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানে যেমন তার ব্যাপক ‘ঋণদানের সক্ষমতা’ একেই বুঝায়।  তাহলে দাড়ালো যে আমেরিকা সেই বার নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল আর তাতে চীন উত্থান বা চীনা প্রভাব কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এবারও দ্বিতীয়বারও এমন কিছু একটা ঘটতে পারে সে ইঙ্গিত ফুটে উঠছে!!

    এবার বাইডেন প্রশাসন শপথ নিবার পর থেকে আমরা দেখছি তিনি আরেক “বাংলাদেশ প্রকল্প” খুলতে চাচ্ছেন – যেটাকে আমরা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প বলে চিনাতে পারি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ অবস্থায় উঠেছে এব্যাপারে সন্দেহ নাই।  কিন্তু প্রশ্ন হল বাইডেন কী আসলেই বাংলাদেশের মানবাধিকার চরম লঙ্ঘণ নিয়ে উদ্বিঘ্ন? মিন করেন? ঠিক তাই বুঝাতে চান???

    না একেবারেই না। তা সরাসরিই বলা যায়। যেমন এবার বাংলাদেশের বা হাসিনার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার পিছনে আমেরিকার দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি উদ্দেশ্যটা কী সেদিকে মনোযোগ দেই।  বাইডেনের আরেক উদ্দেশ্য বা মুল উদ্দেশ্য ছিল ও এখনও আছে – তা হল ‘বার্মা দখল”। এটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এটাকে পরোক্ষে বা পিছনে লুকিয়ে রেখে বাইরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্যটা বাইডেন মিথ্যা করে জানিয়ে চলছিলেন যে বাংলাদেশের হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য। আবার হাসিনার গুম-খুন-অপহরণ উঠায়ে নেয়া- ক্রসফায়ার ইত্যাদিতে মহামারি লাগিয়ে দেয়া এগুলোও বাস্তব ও সত্য। অর্থাৎ বাইডেনের “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প তো বাস্তবতার উপরেই দাঁড়ানো। হা অবশ্যই তাও সত্য । কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন গত পনেরো বছরের যেগুলো হাসিনা গুম-খুনের মহামারি হয়ে চলছিল তা তো আমেরিকা অজানা ছিল না। তবুও তখন কোন আমেরিকান প্রশাসন এদিকে মনোযোগ দেয় নাই – আসে নাই বা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিয়ে তাদের কোন কথা ছিল না কেন? যেটা আসলে অন্ধ ও নিশ্চুপ হয়ে পরোক্ষে হাসিনাকে সমর্থন দেয়া – তা করে গেছিল কেন? এর জবাব মিলে না!  কবি নীরব এখানে!
    এর জবাব হল, ডোনাল্ড ল্যু যতই বলুক যে আমেরিকার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্টে [1st amendment of US constitution, 1791] যে পাঁচ মৌলিক অধিকারের কথা দেয়া বা বলা আছে এনিয়ে আমেরিকা দেশে দেশে কথা বলবেই – সেকথা সবটা সত্যি না। সত্যিটা হল, ঐ পাঁচ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ হলেই হবে না সাথে ঐ লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে তখনই প্রশাসন কিছু বলবার পক্ষ নিবে যখন আমেরিকান রাষ্ট্র নিজের গভীর স্বার্থ ওর মধ্যে দেখবে বা থাকতে হবে তবেই আমেরিকা আগাবে এবং “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আগাবে।  আর আমেরিকান রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থগুলোকে আড়ালে ও পরোক্ষে রেখে দিবে। তাহল বাংলাদেশেও  হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড নিয়ে এগিয়ে আসার পিছনের আমেরিকান গভীর স্বার্থটা কী?

    গোড়ার স্বার্থ আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতেঃ
    হা, আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতে আর এটাই তার গোড়ার গভীর স্বার্থ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশকে জড়ানো কেন? বা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা পর্যন্ত উঁকি মারা কেন? কী দরকারে?

    আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো।

    কিন্তু বার্মা দখল মানে তো নুন্যতম একটা সেনা সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপার। হা তাই। তবে দখল কাজটা কম পয়সা খরচে, নিজ সেনা কম করে জড়িয়ে ও আয়েসে এই দখল ঘটাতে গেলে আমেরিকান স্টাইলটা হল, নিজ দেশের “এরিয়াল সাপোর্ট”[aerial support] দেয়া আর এই ছায়ায় সম্ভাব্য কোন দেশের (বাংলাদেশের!) একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল নেয়া।  তাই হাসিনাকে সরানো দরকার – এইছিল এতদিনের বাইডেনের গৃহিত লাইন এবং মূল স্বার্থ। কারণ তাহলে  সহজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সময়ের পদাতিক বাহিনীকে দিয়ে বার্মা দখল সহজ!  যেটা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে বাইডেন সেরে ফেলতে চেয়েছিল।

    এরিয়াল সাপোর্ট মানে কী?
    আরেক ভাষায় বললে এর অর্থ বার্মার নিজের আকাশ সীমানার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সেটা এই বলে যে, বার্মিজ বিমান বাহিনী যেন কোন উড়া-নড়াচড়া না করতে পারে এই মর্মে বার্মিজ বিমান বাহিনীর উপর এক  ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে দেয়া। সেটা আবার কী? মানে হল, বার্মার আকাশ-সীমার উপর আমেরিকার ‘নো ফ্লাই জোন’ঘোষণা বা দাবি জানিয়ে দেয়া।  আর তাতে এরপরে বার্মীজ কোন আকাশযান মানে কোন সামরিক-এয়ারফোর্স সক্ষমতা যাই থাক – বার্মার কোন হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান বার্মার নিজ আকাশের উপর দিয়ে উড়তে চাইলেও সেই বিমানের উপর আমেরিকান কোন জেট সেটার উপর বোমা ফেলে  গুড়িয়ে দিবে এই হুশিয়ারি আগাম দিয়ে রাখা।

    এতে সুবিধা হল, যেহেতু বিমান সক্ষমতা বার্মার থাকলেও সে ব্যবহার করতে পারবে না বা করলে তা মোকাবিলা করবে কোন আমেরিকান জেট ফলে সেই আড়ালে একেবারে সহজেই কেবল একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল করে নেয়া সহজ। এই কারণে “বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনীই” বাইডেনের আকাঙ্খা ও মূল কাম্য এবং টার্গেট। আর সে প্রয়োজনেই মূলত হাসিনার অপসারণ বা না-অপসারণের ‘এদুই লাইনের’ মাঝে দোল খাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

    আর বরং হাসিনাই যদি বাইডেনের বার্মা দখল আকাঙ্খায় পদাতিক বাহিনী সরবরাহকারি হিশাবে সামিল হতে রাজি হয়ে যায়??? এরাই হল সেকেন্ড অপিনিয়নধারী!!!! বা দ্বিতীয় ধারা!
    কিন্তু “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এর আড়ালে তো বাইডেন ভালই আগাচ্ছিল, এখন নয়া এপথের উত্থান হল কেন? দুইটা কারণে।

    কী সেই দুই কারণঃ
    এক. মূলত বার্মা দখলের আমেরিকার এই আকাঙ্খাটাই অবাস্তব। মনে হচ্ছে এনিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক আগে করে নেওয়ার দিক থেকে আমেরিকার ঘাটতি আছে!  যেমন যেটা আমেরিকার প্রাথমিক অনুমান যে সরাসরি “বার্মা দখল” এই ভাষায় না বলে ‘আরাকান ভুখন্ড’ দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া – এমন মানে জুড়ে দিয়ে কথাটা তারা বাংলাদেশকে বলতে চেয়েছিল। মনে করেছিল – এভাবে বললে নিশ্চয় বাংলাদেশ খুব খুশি হয়ে সামিল হতে চাইবে! বা পদাতিক বাহিনী নিয়ে সামিল হবে!!!  সেই কূটচাল এই হাসিনাই বহু আগেই (২০১৯ সালেই) প্রত্যাখান করে দিয়েছিলেন খুবই সঠিক ও কঠোর ভাষায়।
    কারণ কোন দেশের ভুখন্ড আমেরিকা অপর দেশের সাথে জুড়ে দিবার ক্ষেত্রে কে??  কেউই নয়! আমেরিকার কোন এক্তিয়ারই নাই। কোন দেশই একাজ করতে পারে না, ক্ষমতা রাখে না। জাতিসংঘের চোখে এটা গর্হিত ও অপরাধ্মূলক কাজ।

    একারণেই বার্মার ক্ষমতাসীন জেনারেলদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আড়ালে আমেরিকা আমাদেরকে বলতে চায় এতে আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা মিটিবে বলে আমেরিকার ধারণা আমরা খুশি হব এতে। অথচ এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও ২০১৯ সালে হাসিনার এই আমেরিকান প্রস্তাব প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে  মুল চালিকা ছিল চীনের এব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া; শুধু তাই না ভারতও আমেরিকার এই খায়েশের বিরুদ্ধে ছিল। ওদিকে আমেরিকানদের ধারনা তারা বার্মার দখল নিয়ে কোন এক পছন্দের জেনারেলকে বা সুচি-কে বসিয়ে নয়া বার্মা সরকার চালু করতে পারলে সেটা এক প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকারই হবে! কিন্তু বলাই বাহুল্য ঠিক এই দিকটার কারণের ভারত ও চীন ঘোরতরভাবেই এই ইস্যুতে আমেরিকার চরমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। বার্মাদেশের সাথে চীন ও ভারতের লম্বা সীমান্ত আছে তাই এদুই দেশ কিছুতেই বার্মায় এক  প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকার দেখতে চাইতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক!

    শুধু তাই না বাইডেন এমন এক সময়য়ে তার বার্মা দখলের খায়েশের পিছনে ছুটছে যখন আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে শুধু চীন-ভারতই না রাশিয়াও (ইউক্রেন যুদ্ধের পুটভুমিতে) খুবই সবল বিরোধীতা করতে আসবে। গত ২০১৯ সালের দিকে পরিস্থিতি ছিল একরকম কিন্তু এখনকার পটভুমিতে আমেরিকান নো ফ্লাই ছত্রছায়ায় যেকোন দেশের পদাতিক বাহিনী সীমানা অতিক্রম করে বার্মায় প্রবেশ মানে সেটা এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত যুদ্ধের ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হবে; বলে আমেরিকা এতই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
    মানে হল, আমেরিকার বার্মা দখলের উদ্দেশ্য হল চীনকে দুর্বল করা, চীনের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলা মত কাজ। অথচ এখন এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মাত্রই চীন দুর্বল হবার পরিবর্তে উলটা আমেরিকার তিন শত্রুদেশ (চীন-ভারত-রাশিয়া) একজোট হয়ে যাবে। একেবারে হিতে-বিপরীত অবস্থা। একারণের পিটার হাসের শাহীনবাগ ততপরতায় কিছুটা বাধা পেয়ে আমেরিকান প্রশাসন আভ্যন্তরীণ রিভিউয়ে বসলে সেই উসিলায় প্রশাসনের এসব দুর্বলতার দিক সামনে চলে এসেছিল বলে অনুমান করা যায়। আর তাতেই এই ডামাডোলে দ্বিতীয় ধারা যারা হাসিনাকে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অপসারণের পক্ষে কাজ করতে চায় না – এই ধারা উপরে উঠে বা সামনে চলে আসে।

    পরে তাদের প্রস্তাব হল, তাহলে বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো।  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে।

    আদর্শ উদাহরণ মাইকেল কুগেলম্যানঃ
    এই প্রসঙ্গে আগ্রহিরা কুগেলম্যানের লেখা ও আরেক সাক্ষাতকার পড়ে দেখতে পারেন।  মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] হচ্ছেন মূলত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের [WILSON Centre] ফেলো। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর। কিন্তু অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কের চেয়ে এই সেন্টারের ফারাক হল এই প্রতিষ্ঠানটা সেমি-গভর্মেন্ট। মানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফান্ড সরকারের দেয়া। এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের অনেক কথা বলার সুযোগ বা পছন্দ প্রকাশের সুযোগ আছে। ফলে কুগেলম্যান-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার পরে পরেই; আর তা এই চিন্তা করে যে কুগেলম্যান সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাইডেনের চোখের দেখে তাঁর অবজারভেশন ফরেন পলিসি [Foreign Policy] পত্রিকায় নিয়মিত লিখবেন। যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক ভাল ফিডব্যাক। এককথায় কুগেলম্যান অনেক বেশি বাইডেন প্রশাসন ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এখন আসল কথাটা হল যে কুগেলম্যান গত তিনমাসের বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নাখোস! বিএনপির জনসমাবেশকে তাই তিনি লাখে নয় হাজারে গুনে বলা উচিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আসলে প্রায় একজন – বাইডেনের ওবায়দুল কাদের। মানে হাসিনার জন্য একটা ওবায়দুল কাদের অবশ্যই সামঞ্জ্যপুর্ণ যেটা বাইডেনের জন্য বা এক্ষেত্রে একটা ভাঁড় অবশ্যই। তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are people who see reasons to support it. বাংলাদেশে এই লেখা ইংলিশ এবং বাংলায় ছাপা হয়েছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

    তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে,
    ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are

    people who see reasons to support it.।

    কুগেলম্যান এর এই অবস্থান এটাই বাইডেন প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারা। এটা প্রমাণ করে “মানবাধিকার” বাইডেনের ইস্যুই না; এটা কেবল  হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটাকে পুঁজি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা বাইডেনের লক্ষ্য।

     


    তাহলে  আইলিন লা বাকারকে পাঠিয়ে তাদের কী লাভ বা অগ্রগতি হলঃ

    মূলত তিনি এসেছিলেন দুটা সমর বিষয়ক চুক্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা যায় কিনা, তা দেখতে। নাম হিশাবে এরা হল General Security of Military Information Agreement (GSOMIA) and the Acquisition Cross-Servicing Agreement (ACSA)। তবে প্রথমটার ব্যাপারে আমেরিকা খুবই আগ্রহি, এটা সামরিক তথ্য সুরক্ষা ও শেয়ার বিষয়ক। যেটা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে এর আগেও বাংলাদেশের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। আর এবার এনিয়ে আলোচনার ফাঁকে হাসিনা সরকার বার্মায় পদাতিক বাহিনী পাঠানোতে আগ্রহি হতে পারে কিনা সে চেষ্টাও বাজিয়ে দেখা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    আবার অনুমান করা হয় যে এই একই অনুমানের কারণেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভোর রাতে এসে হাজির  হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় যে সরকার চীনের সাথে কোন প্রতিশ্রুতিতে যায় নাই। এতে বলা যায় অসন্তুষ্ট হয়েই চীনা মন্ত্রী মাত্র আধাঘন্টা মিটিং করে ঐ রাতেই চলে যান। কিন্তু এর মানে আবার আমাদের সরকার আইলিন লা বাকার-কেও কোনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা করেছেন তাও না। কিন্তু তাতে পুরা আসরের সব পক্ষগুলো পরস্পরের প্রতি পরস্পর সন্দেহ করে গেছেন, তা এড়ানো যায় নাই।
    বাংলাদেশের যেকোন রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ তাতে সে সরকার বা বিরোধী যাই হোক এদের সবার জন্য যেটা নো-গো এরিয়া [no-go area] তা হল, সামরিকভাবে কোন দেশের পক্ষে বা বিপক্ষের সাথেই না জড়ানো; এটা করাই যাবে না। এমন ভিমরতি যেন কাউকে না ধরে। আর একটা দিক হচ্ছে চীন ও আমেরিকা প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্যাচালে আমাদের (লীগ বা বিএনপি) কোন দলই যেন এদুই দেশের মধ্যে একেকটা দেশের পক্ষে একেকটা দল তাদের এজেন্ট এর ভুমিকা না নিয়ে বসে। যেমন লীগ যদি এই সীমারেখা না মেনে আমেরিকার এজেন্ট হয়ে বসে তবে সিওর বিএনপি তখন চীনের এজেন্ট হয়ে বসবে – অথবা ঠিক এর উলটা বা ভাইস-ভারসা! তাই সীমারেখা লঙ্ঘনের পরিণতি কী হবে তা সবার আগে থেকে জানা থাকতে হবে; কেউ যেন না বলে আমি আগে বুঝি নাই। এই সুযোগ নাই।  আজকের শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ক্ষমতায় থাকার লোভে তারা এই সীমারেখা ভেঙ্গে এখন পস্তাচ্ছে! এই সীমা ভাঙ্গার কাজ করা যাবে না।

    তাহলে ডোনাল্ড ল্যু এর ভারত সফরের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    আসলে পিটার হাসের শাহীনভাগ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর  পরে হোয়াইট হাউজের রিভিউ মিটিংয় থেকে সবাই বুঝে যায় বার্মা দখল বা হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ততপরতার কথা তাদের যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেভাবে আগায় নাই। মূল কারণ, বার্মা দখল এর চিন্তাটাই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে করা হয় নাই। তাই বার্মা দখলের খায়েসে তা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এক মোক্ষম জবাব হবার পরিবর্তে তা উলটা হয়ে গেছে; তা হয়ে গেছে আমেরিকার তিন শত্রু চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছাকাছি ঘনিষ্ঠতায় এনে দেওয়া। যা বার্মা দখল নিয়ে ফারদার চিন্তা পরিকল্পনাটাকে অসম্ভব, অকেজো করে তুলেছে।
    এই কারণে,  ডোনাল্ড ল্যু ভারত এসেছিলেন ভারতকে ঐ ‘ঘনিষ্ঠতা’ থেকে আলাদা করা যায় কিনা তা যাচাই করতে। ডোনাল্ড ল্যু এর সাথে NDTV এর এক সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে ল্যু ব্যাখ্যা করছিলেন তার সফরে আসার কারণ ও কী তিনি ভারতকে অফার করতে চান।
    বুশ ২০০৬ সালের মার্চে প্রথম ভারত সফরে এসেছিলেন। গত ২০০১ সাল থেকে ওয়ার অন টেররের প্রধান এলায়েন্স পার্টনার হিশাবে ভারতকে আরও কাছে টেনে চীনের উত্থান ঠেকানোর কাজে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চাওয়ার খায়েস থেকে। তখন থেকে বুশ অফার করেছিলেন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার জিএসপি এক্সপোর্ট সুবিধা ভারত পাবে তাতে। যে সুবিধাটা ট্রাম্পের আমলে ২০১৭ সাল থেকে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরই এক্সটেনডেড অংশ হল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকেও   ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  ল্যু বলছিলেন আগের দেয়া ঐ এক্সপোর্ট সুবিধা আবার ভাববার কথা। ল্যু এর কথাবলার স্টাইলও ছিল এপিজিং [appeasing] বা তেলানোর…। ওদিকে ল্যু এর সারকথা ছিল ভারত যদি আমেরিকার বার্মা দখলে আমেরিকার পক্ষে থাকে তাহলে সে কৃতার্থ হয়……।

    এনিয়ে সুবীর ভৌমিক কী বলেছেনঃ
    সেকথারই আরো বিস্তার পাওয়া গেছে সুবীর ভৌমিকের লেখায়। বলা যায় এই লেখায় সুবীর আমাদের অনুমানগুলোকেই যেন বাস্তবতা দিয়েছে।
    উপরে বার্মা দখল প্রশ্নে বাইডেনের যে এরিয়াল সাপোর্টের কথা বা নো ফ্লাই জোন বানানোর কথা বলেছিলাম,  সুবীরও সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সুবীরের লেখার শিরোনাম – “ আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারত সামিল হবে” [Will US do a Bosnia on Myanmar? No-fly-zone move may involve India]? ক্লিনটনের আমলে বসনিয়াকে রক্ষার জন্য তিনি বসনিয়ার আকাশের উপর এমন “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা করেছিলেন। বাবা অথবা সিনিয়র বুশ এবং ক্লিনটনও ততকালীন সাদ্দামের ইরাকের উপরে “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা দিয়ে সাদ্দামকে অকেজো করে দিয়েছিলেন।  তো বুঝা যাচ্ছে যে ল্যু এর ভারত সফরের উদ্দেশ্য হল, ভারতকে নো ফ্লাই জোন আরোপে আমেরিকার সাথে সামিল করে বার্মা দখল পরিকল্পনায় সম্ভাব্য জোটবদ্ধ করে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই। যাতে “চীন-রাশিয়া-ভারত” এই জোট থেকে ভারতকে আলাদা করার চেষ্টা করে দেখা যায়। যদিও দিনকে দিন এটা পরিস্কার হচ্ছে যে বার্মা দখল পরিকল্পনা নিয়ে দুর্বল হোমওয়ার্কের কারণে এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা পরিত্যক্ত হবার দিকে আগাচ্ছে!

    যদিও ভারতীয়দের মধ্যে এমন ধরণের একটা ভ্যানিটি ভেসে থাকতে দেখা যায় যেন লেখক (সুবীর) বলছে চান যে “দেখেছো চীন-আমেরিকার আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়িয়ে আমার দাম কত উপরে উঠেছে?” – সুবীরের আলোচ্য লেখাটাও আসলে এদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। আসলে ভারতের ইন্টেলেক্ট বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই বলে একটা ভাবনা কার্যকর থাকতে দেখা যায় যে সে আর চীন বা আমেরিকা কোন একটার পক্ষে সহসা ঝুকবে না। কেবল নিজের দাম বাড়িয়েই চলবে যাতে এক পর্যায়ে এই উত্থিত দামকে ব্যবহার করে সে চীন-আমেরিকারও উপরে উঠে যেতে পারে!! এমন ভাবনার বিষয়টা অবশ্যই আবেগে টইটম্বুর বা স্বপ্নে পোলাও খাওয়ার মত, বিশেষত যখন আমার জানাই নাই যে পোলাও কী করে পেতে হয়, রান্না করতে হয় ইত্যাদি। গত ২০১৩ সালে চীনা বেল্টরোড উদ্যোগ প্ররকল্পের প্রথম সম্মেলনের সময়ে ভারতকে চীনা দাওয়াত দেওয়ার পরে ভারত এভাবে বলেই তা প্রত্যাখান করেছিল।

    তবে সেসব যাই হোক ভারত এখন একালে বাইডেন আর পুতিনের তুলনায় অনেক বেশি পুতিনের দিকে থাকতে মন বেধে ফেলেছে। যদিও মুখে বলছে রাশিয়ার উপরে ভারতের গোলাবারুদে ৬০% নির্ভরশীলতার কারণে সে এই পথ সে নিয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার সস্তা তেলের সরবরাহ পাওয়া এর পিছনের কারণ। এমন কী তৃতীয় দেশে তা পাচার করার সুবিধাও ভারত পাচ্ছে। যেমন খোদ বৃটেনের ঋষি সুনাক তিনিও গোপনে রাশিয়ার তেল কিনছে ভারতের মাধ্যমে। আসলে খারাপ গ্লোবাল অর্থনীতি অ এতে ধস নামার সময়ে সস্তায় রাশিয়ান তেল পাওয়াকে সকলেই বিশাল রিলিফ বলে গণ্য করছে!! আর সাধারণভাবে ভারত আবার  আমেরিকার ঘনিষ্ট হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত ভারত তলে রেখেছে – ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের পরে, দেখে শুনে তখন তারা সিদ্ধান্ত নিবে!

    সবশেষে বলি, লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই সংক্ষেপে।
    তাহলে কী ল্যু এর পিছু হটা বা  বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকার হাসিনাকে টলাতে ফেল করার পর ল্যু যা প্রলেপ দিয়ে গেলেন যেটাকে অনেকেরই কল্পনায় ধরা আছে দেখা যাচ্ছে। যে কল্পিত  হাসিনা ও ল্যু এর মধ্যে কোন রফা হোক আর নাই হোক আর তাতে আমেরিকার সাথে বিএনপির সম্পর্কের মধ্যে এখন কোন দুরত্ব বোধ আমরা কেউ দেখতে পাই আর নাই পাই  – আগামিতে সম্ভবত মাস খানেকের মধ্যে ল্যু বা বাইডেন প্রশাসনে আবার পল্টি আসবে। প্রথম ধারা আবার জেগে উঠার সম্ভাবনাই বেশি নানান কারণে।  মানে মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে নিয়ে আগের মতই বাইডেন প্রশাসন আবার স্পষ্ট করে সোচ্চার হবে, এমন অনুমান করছেন অনেকেই!!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকালঃ ০৭ঃ৩০

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়? (২য় ও শেষ পর্ব)

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?
    (২য় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩  ০০ঃ২২ রবিবার

    https://wp.me/p1sCvy-4lO

     

    প্রথম পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4l1
    দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব এখান থেকে শুরু। continued………

    যেমন মানুষের সম্পর্কগুলো কোন ধরণের?
    মূলকথায় এটা ‘রিলেশনাল’ (relational) মানুষে মানুষের সম্পর্কিয় দিকটা সে লালন করে থাকে। সে কেবল লজিক্যাল সম্পর্ক করে না।  সেটা কেমন?
    দোকানদারের সাথে ক্রেতার সম্পর্ক এটা লজিক্যাল। (যদিও এটা মানুষে মানুষেরই এক সম্পর্ক, তবুও)।  এখানে দোকানদারকে দশ টাকা দিলে দোকানদার ঠিক দশটাকার পণ্যই বিনিময়ে তুলে দেয়।  কিন্তু পিতার সাথে সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অথবা আমাদের যে কারো পিতামাতার সাথে সম্পর্ক এটা রিলেশনাল, মানুষে মানুষের সাথে সম্পর্কিত বোধ করা এক সম্পর্ক। যদি হয় এমন যে কোন পুত্র বা কন্যা  পিতার রাশনাল আকাঙ্খা মানছে না। পড়ালেখা করছে না, ঠিকমত খাওয়া যা নিজ যত্ন নেয়া করছে না, পারিবারিক বা সামাজিক ডিসিপ্লিন অনুসরণ করছে না। এখন ব্যাপারটা রাশন্যালি দেখলে পুত্র-কন্যার পিতার অনুগত হবার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। এজন্য পিতা ক্রমশ চাপসৃষ্টি জন্য শাস্তি দেওয়ার দিকে যেতে পারে। বকাঝকা থেকে খাওয়া পরা বন্ধ চাইকি বাসা থেকে বের করে দেয়া বা খোদ সন্তানই বের হয়ে যাওয়াও ঘটতে পারে। রাশনালি এটাই হবার কথা!
    কিন্তু তা ঘটছে না। কারণ, পিতা ব্যাপারটাকে দেখছে রিলেশনাল জায়গায় বসে। পিতা একই সাথে ভাবছে সন্তান তো তার নিজেরই, যাকে সে প্রচন্ড ভালবাসে। তাই এমন পথে সমাধান করতে গেলে পিতার নিজেরই তা আরো কষ্ট পাবার কারণ হবে সেটা। তাই, এটা কোন সমাধান নয়। তাই পিতা হয়ে গেলেন হেদায়েতি লাইনে। বা পারসুয়েশিভ (persuasive) মানে  তিনি কোন ভাল ফল পাক আর নাই পাক পিতা হয়ে গেল নিয়মিত ‘বুঝানোর’ লাইনে। কন্যার হয়ত এক দুর্বল জায়গা হল ওর নানী অথবা বড় ভাই অথবা এক বড় বোন। তাই তাদেরকে দিয়ে পিতা নিয়মিত বুঝানোর লাইনে গেলেন। এটাকে আমরা হেদায়েতি লাইনও বলতে পারি। হয়ত দেখা গেল ২৫-৩০ বছর বয়সের আশেপাশের কালে কন্যার ভিতর হঠাত পরিবর্তন দেখা গেল। নিজে নিজেই তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল এমন হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা রিলেশনাল; মানে বিয়ন্ড লজিক্যাল – বা যুক্তিবুদ্ধির সম্পর্ক ছাড়িয়ে চলে যাওয়া এক দশা।

    আবার আরেকটা উদাহরণ স্বামী-স্ত্রী নিয়ে। দুজনেই চাকরি করে। কিন্তু স্ত্রী দাবি প্রতিদিন অফিস শেষে বাসায় এসে আমাকেই চা বানাতে হয়। কেন? স্ত্রী বলছে তুমি কিছুই না করে আরামে কেবল আমার দেয়া সেসব সেবা উপভোগ কর! এটা তো সাম্যের সম্পর্ক নয়। তাই তারা সমাধান ঠিক করল যে এরপর গুনে গুনে একেকজন পনেরোদিন করে চা বানাবে। কিন্তু তাতে দেখা গেল স্ত্রীর এক (কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল) বান্ধবী ব্যাপারটা শুনে ব্যাপারটাতে বান্ধবিকে একটা র‍্যাশনাল বোকা বলে সাব্যস্ত করল।  স্ত্রী ব্যাপারটা কীভাবে তা বুঝতে চাইলে তার বান্ধবী বলল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা শুধুই রাশনাল নয়, এটা র‍্যাশনাল এন্ড বিয়ন্ড। এভাবে দেখতে হয়! কিভাবে সেটা?

    বান্ধবি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলল, নিজেদের দম্পতি সম্পর্কের বেলায় সে লক্ষ্য করেছে প্রতিদিনই সে নিজেই চা-নাস্তা সব বানায়। আর সে সময়ে সে যখন উপাচার সাজিয়ে স্বামীর সাথে বসে কথা বলে গল্প করে সেসময়ই তার স্বামী সবচেয়ে উতফুল্ল থাকে, সবচেয়ে কেয়ারিং স্বামী হয়ে উঠে যা স্বামীর প্রতিটা কথায় আচরণে প্রকাশ পেতে থাকে। এটা তাকে ভীষণ সুখ দেয়। এথেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা সে ভাবতেই পারে না! আর এটা তাঁর বেচে থাকার জন্য খুবই প্রশান্তিময় এক উপাদান হয়ে আছে জীবনে।  তাই এই সুখের লোভে কোন বোকা চা-নাস্তা বানানোর কাজ ভাগের কথা তুলবে আর এভাবে ‘সাম্য’ খুজতে যাবে? এখানে সাম্য অবশ্যই রেশনাল কিন্তু তুলনায় অকেজো; কাজেই রিলেশনাল পথ ধরাই উত্তম!! এই হল বান্ধবীর সিদ্ধান্ত!

    তাহলে দাড়ালো যা – সব জানা বুঝাবুঝিই কী কেবল  বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে পাওয়া??? মানুষ কী কেবল লজিক, রিজন বা র‍্যাশনালিটি দিয়েই চিন্তা করে? এর জবাব হবে মানুষ শুধুই কেবল লজিক্যাল বা র‍্যাশন্যাল হয় না। সে একই সাথে রিলেশনাল হয়েও চিন্তা করে থাকে।

    আরেকটা কথা বলে এই প্রসঙ্গটা এখানে শেষ করব তবে সেটা আবার আসবে পরে।
    ১৪৫০-১৫৫০ সাল এসময়টা এজ অব সাইন্স [Age of Science] বা বিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট অর্জনের যুগ মনে করা হয়। যেটা পরবর্তিতেো ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
    আর ঠিক এরপরেই বা পাশাপাশি যে রেনেসাঁ নামে আরেক আন্দোলনের কথা বলেছি তা ইউরোপীয় ইতিহাসে ছড়িয়ে পড়েছিল, ব্যাপক নাড়া দিয়েছিল। সারকথার দিক থেকে বললে এই রেনেসাঁ  ছিল আসলে পরবর্তিতে যাকে এনলাইনটেনমেন্ট বলে বা র‍্যাশনালিটি আবির্ভাবের যুগ বলে এরই প্রাথমিক দিক বা শুরুর রূপ। রেনেসাঁ থেকে  এনলাইনটেনমেন্ট-এ পৌছাতে মোটাদাগে প্রায় চারশ বছর লেগেছিল। তাই রেনেসাঁ বলে ভাল-মন্দে যা শুরু এরই পরিণত রূপ এনলাইটেনমেন্ট। যেখান থেকে আবার মর্ডানিটির ধারণা; রাজনৈতিকভাবে যেখান থেকে মর্ডান স্টেট (আধুনিক রাষ্ট্র) ও ব্যবস্থার ধারণা। তবে এগুলো র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানের যুগ অবশ্যই তবে অচিরেই যা থেকে নেতি অর্থে অতি-বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানবাদিতার তা শুরুও বটে।
    তাহলে বিজ্ঞান ও থিওলজির লড়াইটা কী রূপ নিয়েছিল ও কেন?
    বিজ্ঞান কেন ঐ সময়ে মানে রেনেসাঁ একটু আগে আগে বিকশিত হয়েছিল? এই প্রশ্নটা গুরুত্বপুর্ণ।

    এরিস্টোটলের কথা শুনেছি কমবেশি  আমরা, একটা প্রাথমিক ধারণাও আছে। তাঁর সময়কাল ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২)। মানে পুরাটাই যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা। তিনি দার্শনিক না রাজনীতিবিদ নাকি আবার বিজ্ঞানী বা জোর্তিবিদ এককথায় বলা মুশকিল তাই সেকালে এমন গুণীদের বলা হত বহুবিদ্যাগুণী; (polymath) বলা হত। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ লক্ষ্যনীয় হল, তাহলে তখন বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বা থিওলজিস্ট  এভাবে সবকিছু আলাদ আলাদা মানুষের কাজ হয়ে যায় নাই।  একই লোক একই সাথে বিজ্ঞানী ও  থিওলজিস্ট  হতে পারত। আর তা অবলীলায়!
    কিন্তু পরবর্তিতে রেনেসাঁ আন্দোলনের একটু আগে বা প্রায় সমসাময়িক ঘটনা হয়েছিল বিজ্ঞান বিকাশের শতবর্ষ। কিন্তু এবার  সেই বিজ্ঞান কিন্তু এরিস্টোটল যুগের বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক আলাদা। কারণ সে তখন যে মূলত রাশনালিস্ট, রিজন (reason) তার মন্ত্র বা চিন্তা পদ্ধতি্র।
    তাহলে এবার এই বিজ্ঞান আসলে কী, কোথায় সে আগের চেয়ে আলাদা হয়ে গেল? এতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন!

    সেকথাগুলো  বুঝাবার জন্য সহজ করে বললে, আগে জোতির্বিদ, দার্শনিক বা থিওলজিস্ট একই চিন্তা পদ্ধতি অনুসরণ করতে চলত ও পারত। অর্থাৎ দুনিয়াটা ফিজিক্যাল বা বস্তুগত এবং একই সঙ্গে স্পিরিচুয়াল; মানে ফেনোমেনা আকারে বললে এটা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা এবং একই সাথে তা স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা হিসাবে দেখা হত।  কিন্তু এখনকার মূল আগাম অনুমান (assumption) হল এই ধরে নিয়ে আগানো যে দুনিয়াটা কেবলই সব ফিজিক্যাল ফেনোমেনা।
    অর্থাৎ ইউরোপের রেনেসাঁ বা বিজ্ঞানের যুগের বিজ্ঞানচর্চায় মূল আগাম অনুমান বা সেই ভিত্তি হল সব ফেনোমেনাই কেবল ফিজিক্যাল বা বস্তুগত। কোন স্পিরিচুয়াল দিক নাই। এজন্যই এটা র‍্যাশনাল, রিজন-বেজ বা লজিক্যাল হয়ে উঠেছিল।
    একারণের তাদের মহা আবিস্কার হিউম্যানিজম (Humanism) – এই ধারণাটা স্পিরিচুয়াল ধারণার ছিটেফো্টাকেও এড়িয়ে তা কেবল এক “বস্তুগত মানুষের” ধারণা। মানে এর মধ্যে  মানুষের রিলেশনাল দিকের বুঝাবুঝি অনুপস্থিত। যা এখন এক হিউম্যান কোয়ালিটির কথা তুলে ধরা যা স্পিরিচুয়াল দিক নাই, রিলেশনাল দিক নাই। কানেকটেড বোধ নাই।  এই  হিউম্যানিজম (Humanism) কথার সোজা মানে হল, কথিত মানবতাবাদী। মানে যে ব্যক্তি – মানুষের সব হিউম্যান কোয়ালিটির কথা বুঝে ও মানে। কিন্তু তার চোখে এই মানুষের মধ্যে কোন স্পিরিচুয়ালিটির বোধ ধারণার বালাই নাই।
    সারকথায় এমন এক বৈষয়িক ভোগী মানুষ যার স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা বা আকাঙ্খা নাই। তাই, “রিলেশনাল” নয়, বোধ নাই।  তাই যেমন কেউ যদি বলে, নবী মানবতাবাদী ছিলেন? তাহলে কেমন হবে? এটা কথা হল না, মানে হয় না! কারণ এখানে এমন এক নবীর কথা কল্পনা করা হয়েছে যার মধ্যে স্পিরিচুয়ালিটির ক্ষুধা বা আকাঙ্খা অথবা বোধ ইত্যাদি এসবের কোনটাই নাই। মানে যেটা এক উদ্ভট, এব্সার্ড বা অলীক ধারণা। যার কোন নবী ধারণাই নাই!
    দুনিয়ার বস্ত-অবস্তু ও গ্রহ-নক্ষত্র সহ সকল কিছুর সাথে আমরা মানুষ কানেকটেড, যুক্ত বা সম্পর্কিত। আর এই সম্পর্ক তৈরি করেছে এমনভাবে যেখানে প্রতি দুই সত্বার (being) মাঝখানে আছে আল্লাহ, গড বা ঈশ্বর ধরণের কিছু ধারণা যে আমাদের যেকোন দুই সত্বাকে কানেক্ট বা সম্পর্কযুক্ত করে তুলে,  সম্পর্কিত করে এক বন্ধনের মধ্যে রেখেছে।  যেকোন থিওলজির কমন ভিত্তিমূলক ধারণা এটাই। এভাবে আমরা সবাই “আল্লাহ ধরণের ধারণা” যার মধ্যে দিয়ে সবাই সবকিছুর সাথে কানেকটেড – যেকোন থিওলজির মূলকথা এটাই। তবে  হয়ত কোন কোনটা থিওলজিতে ব্যাখ্যা বেশি স্পষ্ট করে সাজানো, এভাবে ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারে।
    সরাসরি বললে বিজ্ঞান বা রাশনালিটি এই কানেকটেড দিকটা উপেক্ষা করে চলে, আমল করে না। তবে যেমন নিউটনের গতিসুত্র এটার (ফিজিক্যাল ফেনমেনাকে ব্যাখ্যা করার বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি) উপর মানুষের স্পিরিচুয়াল দিকের তেমন প্রভাব নাই। কিন্তু সাবধান। যখনও আমাদের যাকে ব্যাখ্যা করছি তার ভিতর যদি “মানুষ” থাকে তবে  বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি সেখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ মানুষের উপর প্রয়োগ মানেই ধরে নিতে হত ওখানে স্পিরিচুয়াল দিক আছে,  মানুষ কানেকটেড বা সম্পর্কিত বিষয়াবলী আছে। তাই বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি বা লজিক্যাল বা রেশনাল দিক যথেষ্ট নয়। কিন্তু তবু বিজ্ঞানবাদিতা বিশ্বাস করে তারা সর্বগামি তারা হিউম্যান ফেনোমেনা (যা কেবলই ফিজিক্যাল নয়) গুলোকেও ব্যাখ্যা করতে সমর্থ; তাদের চিন্তা পদ্ধতি সমর্থ!! অথচ এই অনুমান ও দাবি অসত্য!!

    আবার পুরানা কথায় একটু ফিরে যাই।
    কথিত “প্রগতিশীলতার” যে মৌলিক বৈশিষ্ট – ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা, এর পক্ষে যে সাফাই বা তাদের মূল আড়াল যার পিছনে দাঁড়ায়ে তারা নিজের ডিফেন্স সাধারণত নিয়ে থাকে বলে বুঝি সেটা হল এই রেনেসাঁ (renaissance) ধারণা; যদিও রেনেসাঁ কী জিনিষ এটা জিজ্ঞাসা করা যায় তবে দেখা যাবে খুবই আবছা কিছু না-বুঝা মুখস্ত কথা তারা বলছে।
    তবে তাদের এক সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে, বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ বলে যে তর্ক তারা তুলে থাকে। ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে সেটা হল – বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দিয়েছে। অথচ ব্যাপারটা কী তাই? আর এতই সিম্পল?মোটেই তা নয়। তাহলে কী?
    প্রথম কথা হল বিজ্ঞান ও থিওলজি (ধর্মতত্ব) এদুইয়ের সাবজেক্ট ম্যাটার বা কথা বলার প্রসঙ্গই এক নয়। এরা একই বিষয় নিয়ে কাজ করে না।

    রেনেসাঁ জিনিসটা কীঃ
    রেনেসাঁ শব্দের প্রাথমিক ধারণা করতে, যদি এর আক্ষরিক বাংলা করি তবে এর অর্থ পুনঃজন্ম (re-birth) । তবে এটা যতটা না জন্ম এর চেয়ে বেশি আবার ফিরে পাওয়া (re-found) এমন অর্থ করলে তা এর আসল অর্থের বেশি কাছাকাছি হবে।
    এটা মূলত এখনকার ইটালির রাজধানী রোম এবং ফ্লোরেন্স শহরে বিকশিত হওয়া এক প্রগাঢ় আবেগ উচ্ছ্বাসের কাল (১৪ শতক থেকে ১৭ শতক জুড়ে মানে ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী। কী নিয়ে? এটা ছিল ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে শিল্পকলার নানা ধরণে এবং রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। তবে এই বয়ানের মধ্যে যেটা বাদ পরে গেল তা হল সাইন্স বা বিজ্ঞানের বিস্তারে মানে শতবর্ষ জুড়ে (১৪৫০-১৫৫০) নানা বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের যুগ। তবে পরে ১৪৯৯ সাল থেকে এই আন্দোলন এবার আর রোম বা ফ্লোরেন্সে আবদ্ধ থাকে নাই; বরং নর্থ ইউরোপ বা ফ্রান্স দিয়ে ঢুকে সারা ইউরোপকে আন্দোলিত করে ফেলেছিল।

    একাদেমিসিয়ানদের মধ্যে বলা হয়ে থাকে, প্রায় চারশ বছরের রেনেসাঁ আন্দোলন ধারাবাহিকতায় বিকশিত হলেও এর বিকাশের তিনটা আলাদা পর্ব বা স্তরে বলে চিহ্নিত করা যায় – শুরুর দিক, চরম বিকাশের দিক আর শেষের দিক এভাবে। বিস্তারে দেখতে দেখুন এখানে। তবে আমরা সেই বিস্তারের দিকে এখান থেকে আর এখন যাব না।

    The Renaissance was a fervent period of European cultural, artistic, political and economic “rebirth” following the Middle Ages.
    Generally described as taking place from the 14th century to the 17th century, the Renaissance promoted the rediscovery of classical philosophy, literature and art.
    Although the evolution of Italian Renaissance art was a continuous process, it is traditionally divided into three major phases: Early, High, and Late Renaissance.

    বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে যে বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দেয় – আমি এমন ধারণ-অনুমানের সমর্থক-খাদক নই। মূল কারণ এরা মূলত মানুষের চিন্তার ইতিহাস বিশেষ করে ‘চিন্তার পদ্ধতি’ সম্পর্কেই বেখবর। তবু তারা কেবল রেনেসাঁ বলতে বুঝেছে বা আগ্রহী যেন এজন্য যে তারা মনে করে রেনেসাঁ পাওয়া মানে ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম কোপানোর একটা অস্ত্র পাওয়া গেছে!

    রেনেসাঁ মানে পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদঃ
    রেনেসাঁ মানে  আগে বলেছি পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদ করতে হবে সবার আগে। তবেই প্রগতিবাদীদের ইসলাম কোপানোর আকাঙ্খা ও গোমড় ফাঁক হবে।  তাই সেকাজে সবার আগে ‘মধ্যযুগ’ (middle age) এই ধারণাটা নিয়ে কথা শুরু করা যাক। মধ্যযুগ বলতে মোটাদাগে ৫০০ থেকে ১৫০০ সাল; মাঝের এই হাজার বছরটাকে কী বুঝানো হয়ে থাকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, এটা প্রাচীন রোমের (ancient Rome) সাথে সংযুক্ত ঘটনা। বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য রোম নিয়ে স্বল্পে কিছু কথা এখানেই যোগ করে রাখি। প্রাচীন রোম বলতে একেবারে শুরুতে এক ছোট নগর রাষ্ট্র যা পরে রোমান রাজার রাজ্য (৭৫৩-৫০৯ খ্রীষ্ট্রপুর্ব) হয়ে যায়। আর পরে তা এক রোমান রিপাবলিকে পরিণত হয়েছিল (৫০৯-২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব)। এভাবে সবশেষে তা পরিণত হয়েছিল এক রোমান সাম্রাজ্যে (২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্ট্রাব্দ বা যিশুর জন্মের পরে)। আর এই ৪৭৬ সালে রোম সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। একালের ইউরোপের বড় অংশ জুড়েই তা এই রোম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।

    কিন্তু পরে ৮০০ সাল থেকে আরেক রোমান সাম্রাজ্য জন্ম নিয়েছিল। যদিও দুই রোমান সাম্রাজের মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই, একই সাম্রাজের পুনঃ-আবির্ভাবও নয়। তাই পরের রোমান সাম্রাজ্যের পুরা নাম ছিল হলি রোমান এম্পায়ার যা বাংলায় বললে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ হয়। তাই মধ্যযুগ বলতে আসলে রোমান সাম্রাজ্যের পতন (৪৭৬ সাল) বুঝা বা ধরা হয়। আর ওদিকে ১৫০০ সাল বলতে আসলে চোদ্দ শতকে রেনেসাঁর জন্মকে বুঝানো হয়। মধ্যযুগ মানে দাঁড়ালো প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের পতন আর রেনেসাঁর জন্ম এদুই এর মাঝের সময়কে। কিন্তু কেন?

    আসলে ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে রেনেসাঁ আন্দোলন শুরু হওয়ার পিছনে্র কারণ হিশাবে বলা হয় এ’শহর দুটা শিল্পকলা সংশ্লিষ্ট চিত্রকর, আর্কিটেক্ট, ভাস্কর্য-শিল্পী ইত্যাদিতে ও তাদের কাজে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ছিল। তারাই এরা টের পেতে শুরু করেছিল যে তখনও রোমের প্রাচীন যেসব শিল্পকলার নিদর্শন তখনও টিকে ছিল সেগুলো তাদের সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অগ্রসর ছিল। অর্থাৎ  সেকালে রেনেসাঁ শুরুর জমানা চোদ্দ শতকের চেয়ে প্রাচীন রোম অনেক অগ্রসর ছিল। তাই তাদের উচিত হবে প্রাচীন রোমের  শিল্পকলার নিদর্শনগুলোকে আবার খুঁজে নিয়ে সেগুলোর অনুসারি হয়ে সেসবের পুনজন্ম ও ব্যবহার ঘটিয়ে নিজের সময়কালকে আপডেট করে নেয়া। ক্রমশ একই জিনিষ দেখা যেতে লাগলে রাজনীতি বা অর্থনীতি বিষয়ক ধারনাগুলোতেও। কিন্তু এমন দেখা যাওয়ার পিছনের কারণ কী???
    এর কারণ হিসাবে অনেকে ধারণা করতে থাকে যে খ্রীষ্টধর্মের বন্ধন-ই এমন পিছিয়ে যাবার কারণ। এর মানে কী? আর  কী দেখে তাদের কেন এমন মনে হল?

    প্রাচীন রোম কী খ্রীশ্চান ধর্ম অনুসারি ছিলঃ
    উত্তর টা হ্যা। কিন্তু সাথে আরেক প্রশ্ন হল, প্রাচীন রোমের মোট সময়কাল মানে এর শুরুটা হল যিশুর জন্মেরও ৭৫৩ বছর আগে বা যেটাকে আমরা  খ্রীষ্টপুর্ব বলি, তখন। সে সময় থেকে শুরু করে এই সাম্রাজ্যের পতন হয়ে যায় যিশুর জন্ম পরবর্তি ৪৭৬ সাল পর্যন্ত। মোট কথা যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা হল রোম সাম্রাজ্যের জন্ম। তাহলে? কবে থেকে সেই রোম ক্যাথোলিক খ্রীশ্চান ধর্মকে গ্রহণ ও অনুসারি হয়েছিল?

    আসলে ৩১৩ খৃষ্টাব্দ বা সাল থেকে সম্রাট কনষ্টানটিন (Constantine) এর আমলে রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট-সহ প্রজারাও খ্রীশ্চান হয়ে যায়। তাই আরো সুনির্দিষ্ট করে মধ্যযুগ বলতে অনেকে বলে থাকেন আসলে ৪৭৬ সালে রোমের পতন থেকে নয় বরং আরও আগে এই ৩১৩ সালে পুরা সাম্রাজ্যের খ্রীশ্চান হবার পর থেকেই – রোমের শিল্পকলা-সহ  জ্ঞানবুদ্ধির সবকিছুতে তারা আগেকার সময় থেকে পিছিয়ে যাওয়ার শুরু মনে করে থাকে। সরাসরি বললে, খ্রীশ্চান হওয়ার কারণেই তাদের এরপরের জীবনে জ্ঞানবুদ্ধি কমতে শুরু করেছিল।  অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ ধর্মবিরোধী এক ধারণা হয়ে উঠার শুরু এখান থেকেই। কিন্তু আসলেই কী তাই?

    কেন এমন প্রশ্ন করছিঃ
    কারণ ৩১৩ সালে এসে রোমের সবাই খ্রীশ্চান হয়ে যাবার আগে কী তাহলে রোমের সমাজ ধর্মহীন ছিল??? রোমের বাসিন্দারা অন্যকোন ধর্মের অনুসারী  ছিল না?  এর জবাব হল ৩১৩ সালের আগে তারা অবশ্যই অন্যধর্মের অনুসারী ছিল। কোন ধর্মহীন ছিল না! কারণ এথেন্স বা গ্রীক সভ্যতার দেবতা বা বহুঈশ্বরবাদী ধারণা-বৈশিষ্টের গ্রীক থিওলজি-ই ছিল রোমের পুর্বপুরুষ-সকল। তাই গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবীই ছিল  ও রোমের বাসিন্দাদের উপাস্য ও অনুসৃত ধর্ম। অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ সাধারণভাবে সব ধর্মের বিরোধী এক ধারণা ছিল না। বরং ছিল ৩১৩ সাল থেকে প্রচরণ শুরু হওয়া ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের বিরোধী। এবং গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবী কেন্দ্রিক ধর্মচর্চার প্রতি সহানুভুতিশীল! একালের কমিউনিস্টদের আকাঙ্খায় যে নাস্তিকতা বা ধর্মহীনতা – তার সাথে রেনেসাঁ আন্দোলনের  গ্রীক ধর্মের প্রতি যে মনোভাব তা কোনভাবেই এক নয়।  এককথায় বললে, অন্তত শিল্পকলার বিচারে  রোমে গ্রীক থিওলজির প্রভাব ও অবদান ৩১৩ সাল থেকে অনুসৃত ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের  প্রভাব ও অবদান নেতিবাচক – তাদের ভাষায় পিছিয়ে থাকা।
    তবে আমাদের জন্য যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল,  ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে শুরু হওয়া রেনেসাঁ আন্দোলনের রেনেসাঁ-বাদীরা তারা ধর্মবিরোধী নয়। একালের কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীরা আকার-ইঙ্গিতে আমাদের যা বুঝিয়ে থাকে, সেটা একেবারেই মিথ্যা। – “ধর্ম মানেই কালো যুগ, অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ” এসব অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন!!
    তবুও যে প্রশ্নটা থেকে যায় যে গ্রীক থিওলজি আর ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের তুলনা – যে তুলনাতে ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের অবদান “পশ্চাদপদতা” সেই অনুমানও কতটা সঠিক? আর সবচেয়ে বড় কথা কেন এমন অনুমানের জন্ম??

    দুনিয়ায় মোটাদাগে দুই বৈশিষ্ঠের থিওলজিঃ 
    এসব প্রশ্নের জবাব খুজতে আমাদেরকে প্রসঙ্গের আরেকটু গভীরে যেতে হবে। দুনিয়াতে যত ধরণের ধর্মচর্চা (থিওলজি) আছে সেগুলো মোটা দুভাগে ভাগ করা যায়। যেমন আসমানি কিতাব বা কিতাবি ধর্ম – এর একটা ধরণ। যেখানে নাজেল হওয়া কিতাবি ধর্ম সেটা, বলে মনে করা হয়। আবার নন-কিতাবি ধর্মও আছে। যেমন ভারতের হিন্দু সভ্যতা থেকে বিজেপি-আরএসএস পর্যন্ত এসে তা হিন্দু-ধর্ম হয়ে উঠা। অথবা আরেক উদাহরণ হল, গ্রীক দেবদেবী ভিত্তিক অনুসৃত গ্রীকদের ধর্মচর্চা। ফলে এটাই গ্রীকদের রোমের আসার পরে তখনও তাদের অনুসৃত ধর্ম ছিল যাকে নন-কিতাবি থিওলজি বলা যায়।
    মোটা দাগে কিতাবি আর নন-কিতাবি ধর্মের বড় ফারাকটা হল, কিতাবি ধারার মধ্যে, স্ব স্ব মূল কিতাব একবারই আসে বা নাজেল হয় আর তাদের নবী-জন্মের পরে তাতে কিছু কালাম যোগ হয় বড়জোর। তুলনায় নন-কিতাবির বেলায় এখানে এক লম্বা সময় ধরে ইভলভিং (evolving) বা ক্রমশ প্রকাশিত এমন ধারায় উদ্ভব বা বিকশিত এভাবে নয়া দেবতা-সহ নয়া বাণী এখানে এসে থাকে। এখানে একাধিক দেব-দেবির ধারণাও দেখা যায়।  অবশ্যই এখানে এদুইয়ের মধ্যে কোনটা ভাল এজাতীয় কথা বলার মানে হয় না। সেটা অন্তত আমার কাজ না। এলেখার উদ্দেশ্যও না।  বরং যে যেটা অনুসরণ করে তার কাছে সেটাই সবচেয়ে ভাল – এমনটাই দেখতে পাওয়া যায়।  তবে আরেক ফারাক-বৈশিষ্ট হল, কিতাবি ধর্ম কম্প্রিহেন্সিভ (comprehensive) হয়ে থাকে। মানে সর্ব-বিষয়ে ব্যাপকভাবে বক্তব্য এড্রেস করা হয়ে থাকে যেন কোন প্রসঙ্গই স্পর্শ করতে বাদ রাখে নাই সাধারণত এমন হয়ে থাকে। এছাড়া কিতাবি ধর্ম যেটা সবচেয়ে পুরানা পরে নাজেল হওয়া সেটা তত বেশি ডিটেল হয়ে থাকতে দেখা যায়।
    এসব বিচারে বলা যায়, প্রাচীন রোম আসলে প্রায় হাজার বছর ধরে নন-কিতাবি গ্রীক দেবতাভিত্তিক ধর্ম অনুসরণ করে চলার পরে, ৩১৩ সাল থেকে কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্মের অনুসারি হয়ে উঠেছিল। আর কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্ম ইনক্লুসিভ ও কম্প্রিহেনসিভ হওয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের (মানে ফিজিক্যাল ফেনোমেনা গুলা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে) চর্চায় অনেক বেশি নয়া বিধিনিষেধ তখন থেকে তাদের মেনে চলতে হয়েছিল।
    এতদুর বলার পরও মৌলিক কথার আরো কিছু অংশ বাকি থেকে গেছে। এখন সেদিকে যাব।

    রেনেসাঁ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এর বিকাশের তিন পর্ব বা স্তরের দিক আছে তা বলেছি। কিন্তু এভাবে সতেরো শতকে (১৬০১-১৭০০) এসে রেনেসাঁ স্তব্দ হয়ে যায় বা থেকে যায়। একাদেমিকভাবে এর সাতটা কারণ বা সাতটা উপাদানের সম্মীলিত প্রভাবের কথা জানা যায়। যেমন পনেরো শতকের দিকে রোমের ভুমি দখলে মেতে উঠেছিল  স্পেন, ফ্রান্স ও জর্মানী। ফলে রোম বা ফ্লোরেন্স অস্থিতিশীল উঠতে শুরু করেছিল। আবার প্রতিযোগিতায় পড়ে যাবার কারণে ফ্লোরেন্স ও রোমে আসা-যাওয়ার নৌবাণিজ্যের রুট বদলে গিয়েছিল । ফলে আয় বিশেষত সমৃদ্ধ ফ্লোরেন্সের সম্পদ-ধারীরা আর আগের মত রেনেসাঁ আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা চালিয়ে যেতে পেরে উঠছিল না। ইত্যাদি কারণগুলো ছাড়াও আরেক নির্ধারক কারণও উঠে এসেছিল। এতদিন রেনেসাঁ আন্দোলন ক্রীশ্চানিটিকে কোনঠাসা করে চলে আসছিল। কিন্তু এই রেনেসাঁই এবার পালটা আক্রমণ ও চাপের মুখে পড়ে যায়। কারণ ততদিনে ততকালীন প্রশাসন নয়া আইনি বাধা তৈরি করতে সমর্থ হয়ে যায়। তাই সেকাজে নয়া আইনের নাম রোমান ইনকুইজেশন (Roman Inquisition) বলে  আইন চালু করেছিল তাদের কাউন্সিল অব ট্রেন্ট (Council of Trent) । সহজ ভাষায়, এই ট্রেন্ট মানে হল রোমান ক্যাথলিক অথরিটি যারা “ধর্ম-অবমাননার” শাস্তি আরোপ করার ক্ষমতাধারী কর্তাগোষ্ঠি। আসলে মূলকথাটা হল, রোমের ক্যাথলিক ক্রিশ্চান চার্চ মূলত প্রটেষ্টেন্ট (Protestent) খ্রীশ্চানিটি ধারার হাতে ক্রমান্বয়ে আগে থেকেই  চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছিল। যার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-কারী হয়ে উঠেছিল প্রটেস্ট্যান্টেরা।  হওয়াতে আর সাথে প্রকারন্তরে রেনেসাঁর অবস্থান প্রটেসটেন্ট দের পক্ষে যাওয়াতে সবমিলিয়ে ক্ষমতাসীন ক্যথলিকেরা “নিজ ধর্মীয় আইন লঙ্ঘন ও নিষিদ্ধ পুস্তক চর্চার বিরুদ্ধে  ও এই অজুহাতে  মৃত্যুদন্ডের শাস্তি চালু করেছিল।

    মিলিত ফলাফলে রেনেসাঁ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে যায় সতেরো শতকেই। আর এখান থেকেই পরের মানে আঠারো শতকে এরই পরিপূরক আরেক আন্দোলন এনলাইটেনমেন্ট (enlightenment) আন্দোলন বিকশিত হয়ে উঠেছিল।  তবে এখানে প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির ধারা সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক।
    এনলাইটেনমেন্ট  নিয়ে কথা  কথা আগানোর আগে রেনেসাঁ নিয়ে গুরুত্বপুর্ণ আরো কিছু কথা আগে শেষ করে নেয়া যাক।
    তবে বিদ্রোহি প্রটেস্টেন্ট খ্রীশ্চান ধারার সাথে রেনেসাঁবাদীদের সখ্যতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। খুবই সংক্ষেপে বললে,  প্রটেস্টেন্ট ধারার উত্থান তাদের মূল নেতা মার্টিন লুথারের হাতে। জর্মানিতে জন্ম লুথারের জীবনকাল (১৪৮৩-১৫৪৬); যার পরিচয় সম্পর্কে বলা হয় তিনি এক জর্মান থিওলজিষ্ট, প্রফেসর, যাজক ও চার্চ সংস্কারক ইত্যাদি।  আসলে তিনি ছিলেন ধর্মতত্বে একাদেমিক গ্রাজুয়েট। গত ১৫০০ সালের পরে রেনেসাঁ যখন নর্থ ইউরোপে হানা দিয়েছে ঘটনাচক্রে শহরের সিনিয়র পাদ্রীদের সাথে বাইবেলের ব্যাখ্যা নিয়ে গভীর ঝগড়ায় লিপ্ত। রেনেসাঁ আন্দোলনের অন্যতম এক ইতিবাচক অবদান হচ্ছে মানুষকে সবকিছু নিজে দেখেশুনে পড়ে বুঝাবুঝি করে নিতে আগ্রহী করে তোলার যুগের সুচনা করেছিল। যেমন এর আগে বাইবেলে কী আছে তা পাদ্রীরাই ব্যাখ্যা করার এক্তিয়ারধারী। এমন হবার পিছনের টেকনিক্যাল কারণ হল শুকানো চামড়ার উপর বাইবেল হাতে লেখা। ফলে তা জনে জনে বিতরণ বা সহজেই পাওয়া যায় এমন বস্তু ছিল না। বলা হয়ে থাকে রেনেসাঁ উদয় পিছনে তিনটা জিনিষ আর আগে আবিস্কৃত হতে হয়েছিল। তাহল গোলাবারুদ, কম্পাস আর প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানা। এর প্রথম দুটা হল বাকি ইউরোপ থেকে নৌপথে ফ্লোরেন্স বা রোম পৌছানো বাস্তব ও সহজেই সম্ভব করে তুলতে ভুমিকা রেখেছিল। এমনিতেই  ফ্লোরেন্স বা রোম থেকে রেনেসাঁ নর্থ ইউরোপ পৌছাতে লেগেছিল প্রায় একশ বছর।  কেবল ছাপাখানা আবিস্কৃত হয়েছিল বলেই এরপরে তা অসংখ্য কপি ছাপা হয়ে  ইউরোপে রেনেসাঁ ছড়িয়ে পড়তে তা সাহায্য করেছিল। বাইবেলও এরপরে জন-নজরে উন্মোচিত হতে সাহায্য করেছিল। যারা বাইবেলের ব্যাখ্যা নিজে কুক্ষিগত করে এতদিন রাখতে পেরেছিল  সেই পাদ্রিগোষ্ঠি  এরাই সেকালের ক্ষমতাসীন এলিট ক্লাসের সহযোগী ছিল। ঝগড়া শুরু হয়েছিল এক আন্ডার কনষ্ট্রাকশনে থাকা চার্চে নোটিশ টাঙানো ছিল যে এই দানবাক্সে অর্থে দিলে সহজেই বেহস্ত মিলব – ধরনের গ্যারান্টি।  লুথার এই বক্তব্য বাইবেল সমর্থিত নয় বলে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আর তা থেকে বড় রাজ-পাদ্রি পর্যন্ত সকলের সালে তার বিতর্ক – শেষে পালিয়ে থাকা, রাজ নীটিশ ইত্যাদি। আর ততই তিনি লুথার প্রতিদিন এসব সরকারি পাদ্রিদের বিরুদ্ধে তাঁর গরীব মানুষের স্বার্থের পক্ষে বাইবেলের ব্যাখ্যা দান। শেষে রাজ-পাদ্রিদের পশ্চাদ-অপসারণ। আর তা থেকেই প্রটেস্টটানিজম (Protestant Reformation) হাজির হয়েছিল। যেখান থেকে প্রটেস্টটানিজম (Protestantism, Reformation of Catholic) বা বলা যায় প্রটেস্টেন্ট নামে নয়া ফ্যাকড়ার খ্রীশ্চানিটির জন্ম। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হল, রেনেসাঁর আগমন প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির আগমন ও উদ্ভবকে সাহায্য করেছিল। ফলে আমাদের এদিকের ইসলাম কোপানি খায়েসের কথিত সেকুলার যারা নাকি  রেনেসাঁ পাঠ করে রায় দিয়ে থাকেন যে রেনেসাঁ ধর্মের প্রয়োজনীয়তা শে করেছে তারা আদৌ কোন রেনেসাঁ পাঠ করেছে কিনা তা সন্দেহজনক!

    কথা শুরু করেছিলাম মধ্যযুগ (medieval period) নিয়ে। এই শব্দটা উচ্চারণ করাই হয় একটা তুচ্ছতাতুচ্ছ অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে যে এটা নাকি ধর্মের যুগ তাই এটা পশ্চাদপদ। যদিও রেনেসাঁর উদ্গাতা প্রভাবশালী সামনের সারির দশজন কর্তার নাম নিলে দেখা যাবে ওর মধ্যে মাত্র একজন মধ্যযুগ-কে অন্ধকার যুগ (Dark Ages) বলে চিহ্নিত করেছেন [Francesco Petrarca (known as Petrarch) was the first person to coin the term ‘Dark Ages’. He was an Italian scholar of the 14th century.] ।

    তা ভাল! কিন্তু বিপরীতে তারা কী কামনা করতেন? সেটা এখন আমরা বিচার করে দেখব আর এভাবেই তাদের ‘অন্ধকারের ধারণা’ বুঝব।

    হিউম্যানিজম (Humanism) এই শব্দটার বাংলা অনেকে করেন। মানবতাবাদ। ইন্টারেস্টিং ঘটনা হল শব্দটাকে খুবই ইতিবাচক শব্দ বলে আমরা মনে করি। এমনকি কেউ কেউ বলে বসেন যে নবীও খুবই মানবতাবাদী ছিলেন।  কিন্তু দুঃখের কথা হল এই “মানবতাবাদ” হল রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট। আর এটা একটা এন্টি-রিলিজিয়াস শব্দ।   দুনিয়াতে যারা হিউম্যানিস্ট গ্রুপ আছে তারা নিজের সম্পর্ক মনে করে তাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হল, তারা হলেন রিজন (reason) যুক্তিবুদ্ধিতে চলা উচ্চমানের ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া তারা যেসব মুল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন যা আল্লাহ-ভগমানের মত কোন অতিপ্রাকৃত (super-natural) ধারণায় আস্থাবিশ্বাস রাখেন না। বরং যা মানুষের প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতালব্ধ ধারনায় কেবল এর উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন। [Humanism is an approach to life based on reason and our common humanity, recognizing that moral values are properly founded on human nature and experience alone.]।
    কথাগুলোকে আরো সরাসরি বললে তাদের ধারণা হল, আল্লাহ-খোদা বলে কিছু নাই। মানুষই সব। এভাবে বলাতে অনেকের মনে হতে পারে এটা আর এমন কি? এটা তো আল্লাহ বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীর মধ্যকার পুরানা বিবাদ বৈ আর কিছু না!  হা আপাত চোখে তা মনে হতে পারে কিন্তু তা নয়।  কেন?

    মানুষ কী কেবল কোন বস্তুগত সত্বা (physical being) মানে ফিজিক্যাল বিয়িং। নাকি এটা একই সাথে এক স্পিরিচুয়াল বিয়িং (spiritual being) -ও; এটাও বটে!  রক্ত-মাংসের মানুষের অসংখ্য বস্তুগত চাহিদা আছে; তাই মানুষ কেবলই এক বস্তুগত সত্বা বা ফিজিক্যাল বিয়িং নয়। তাই এতেই সে শেষ না, মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদাও সাথে আছে।
    হিউম্যানিজম  স্পিরিচুয়াল চাহিদাকে অস্বীকার করে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু এই স্পিরিচুয়াল জিনিষটা কী?
    সারকথায় মূল প্রশ্ন হল আমরা মানুষ কিভাবে দুনিয়াতে অন্যান্য বস্তু, অবস্তু, অন্যান্য প্রাণী- অপ্রাণী বা উদ্ভিদ এমনকি গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি অথবা আরেকটা মানুষ ও অন্যান্য অস্তিত্ব ইত্যাদি সবকিছুর সাথে কানেকটেড বা সংযুক্ত – এই বিষয় নিয়ে যে কথা বলে বা যার সাবজেক্ট ম্যাটার এটাই থিওলজি। কি করে মানুষ বাকি সবকিছু অন্যান্যের সাথে কানেকটেড এটাই  থিওলজি ব্যাখ্যা করে থাকে।  মানুষের কোন বিষয়ে একটা ধারণা যেমন যুগে যুগে বিকশিত হয়ে পরে পোক্ত হয় তেমনই এটাও। যত পরবর্তিকালের থিওলজি ততই আরেকটু স্পষ্ট তার ব্যাখ্যা। তবে ব্যাখ্যা সঠিক কিনা অথবা কোন থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যাটা ভাল এটা এখানকার আলোচনার বিষয় না। বরং বুঝাতে চেয়েছি কানেকশন, কি করে আমরা সম্পর্কিত সেদিকটা বুঝাবার চেষ্টা করছি। আর আমরা কী করে সকলে কানেকটেড এটা জানা-বুঝার যে আকুতি – সম্পর্কিত বোধ করার আকুতি এটাই স্পিরিচুয়াল চাহিদা। আমি দুনিয়াতে কেন, এর দরকার কী অথবা এর অর্থ তাতপর্য কী এগুলোকে জানা এটাই মানুষকে তাড়া করে। এছাড়া মানুষ তার পরিবারের সদস্য অথবা কোন কোন ঘনিষ্ঠজন এদের প্রতি একটা “টান” অনুভব করে কেন?
    মূল কথাটা হল, এই অনুভবগুলো আর মানুষের কেবল ‘ফিজিক্যাল বিয়িং’ ধারণার মধ্যে আটকে থাকতে দেয় না। মানে হল মানুষ কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা ও বাসস্তানের চাহিদা-ধারী নয়, তার স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে।

    এজন্যই আমরা লক্ষ্য করলে দেখল ১৪শতকের রেনেসাঁ থেকে শুরু করে ১৮ শতকের এনলাইটেনমেন্ট এই পুরা সময়কাল জুড়েই কেবল বিজ্ঞানবাদিতা আর সাথে রিজন, লজিক্যাল বা রেশনালিটি ধারণার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা।

    কাজেই রেনেসাঁ অথবা ওর চারশবছরের সফর শেষে এনলাইটমেন্ট পর্যায়ে আসা, এক পড়তে হবে ক্রিটিক্যালি। শুধু সবই ভাল বা সবই খারাপ এমন কোনটার করেও নয়। বিশেষ করে আমাদের এদিকের প্রপাগান্ডা ধারণা –  রেনেসাঁ নাকি এসেছে ধর্মের ইতি টানতে,  এমন ভিত্তিহীন অনুমানও এড়িয়ে চলতে হবে। আসলে মূলত বিজ্ঞান ও রেশনালিটি ধারণাকে এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধতা এর নো গো [No Go] এরিয়া সম্পর্কে জেনে তবেই এটা আমল করতে হবে।

    সমাপ্ত

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ 
    ০০ঃ০২  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4l1

     

                  What is Enlightenment and Perpetual Peace by Immanuel Kant – Book Review

     

    এই লেখা শুরুতে এর শিরোনাম সম্পর্কে আগাম পরিচয় করিয়ে দিতে এই শিরোনাম কেন ও কী ধরণের এনিয়ে কিছু বাক্য দিয়ে শুরু করব।
    এই লেখার মূল বিষয়বস্তু “এনলাইটেনমেন্ট” (enlightenment)। আর শব্দটা দেখাই যাচ্ছে এক ইংরাজি শব্দ। “এনলাইটেনমেন্ট” শব্দটা ও এই ধারণার খুবই ইতিবাচক অনুসারি এমন অনেকে সম্ভবত এর বাংলা করবেন যে “এনলাইটেনমেন্ট” মানে, মানুষ বা জনগোষ্ঠিকে “অজ্ঞতামুক্ত” করা বা  “আলোকপ্রাপ্ত” করা। তবে পরিস্কার থাকার দরকার যে এই অর্থ আমার করা নয় বরং “এনলাইটেনমেন্ট” এর অনুসারিদের করা; মানে বলতে চাচ্ছি যে,  আমি এনলাইটেনমেন্ট-এর অনুসারি নই। বরং বলা যায় আমি ক্রিটিক্যাল বা পর্যালোচক অবস্থানের। আমি  বরং এই শব্দটার যা অর্থ নয় অথচ অনুসারিরা দাবি করে এদিকটা সামনে তুলে ধরতে চাইব এখানে।  সরাসরি বললে, এই শব্দের অর্থ-সীমা কোথায় সেদিক থেকে শব্দটাকে বরং সবাইকে পুরাপুরি ও খুটিয়ে জেনে ও চিনে নিতে আহবান জানাবো।

    এনলাইটেনমেন্ট শব্দটার প্রায় সমার্থক [synonymous] বা সহ-শব্দ হিসাবে উঠে আসে – বিজ্ঞান (science) বা র‍্যাশনালিটি (rationality) – এসব শব্দ। যে শব্দগুলোর অর্থ যদি সম্যক জানি তবে এসব শব্দের অর্থের সীমা জানা থাকবে। শব্দের অর্থসীমা জানা মানে কোন শব্দ কতদুর কী শব্দার্থ বহন করে ও কার পরে আর করে না সে সম্পর্কে সচেতন থাকা। এই অর্থে এই লেখার একটা উদ্দেশ্য বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দের অর্থের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করা, পাঠককে সচেতন করা।  বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দগুলো আমরা মূলত ব্যবহৃত হতে দেখি যে  ধর্ম-কে (বিশেষ করে ইসলাম) কোপানো বা ধর্মকে তুচ্ছ, নাকচ ইত্যাদি করার কাজে।

    যেমন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কথিত “বিজ্ঞান চর্চাবাদিদের” কার্যত মুল উদ্দেশ্য হল ধর্ম বা মূলত ইসলাম সম্পর্কে ঘৃণা বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিচা ধারণা প্রচার করা। অথচ বিজ্ঞান ও ধর্ম ধারণা দুটো একে অপরের সমতুল্য ক্যাটাগরি বা প্রসঙ্গই নয়। এছাড়া এরা মুখে বলে থাকে তারা সমাজে ইসলাম ধর্মের প্রভাব কমাতেই বিজ্ঞানচর্চা করতে বা বাড়াতে চায়; এতে যা কার্যত এক গভীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোই হয়ে দাড়ায়। শেষে ব্যাপারটা দাড়ায় সুনির্দিষ্টভাবে একটা ধর্ম ইসলাম – ইসলাম কোপাতে চাওয়া এর উদ্দেশ্য। এই রাজনৈতিক লক্ষ্যটা আসলে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বা বিজেপি-আরএসএসের মত এক উগ্র হিন্দু জাতিরাষ্ট্রীয় ধারণা। এটাই ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই চলে আসা হিন্দুত্ববাদ – উগ্র বা নরম “হিন্দু জাতিবাদই শ্রেষ্ঠ” এমন ধারণা।  অর্থাৎ কার্যত বাংলাদেশের কথিত বিজ্ঞানচর্চাগুলো আসলে হয়ে দাড়ায় হিন্দুত্ববাদের সমর্থক ও হিন্দুত্ববাদের প্রচার-প্রসার ঘটানো;  বা বাংলাদেশে প্রগতিবাদের নামে হিন্দুত্ববাদকে সহনশীল করে হাজির করার ততপরতা। এটাই ফলাফলে বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য জন্মানোর সাফাই বয়ান তৈরি করে। সারকথায় এনিয়ে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী বয়ানটা হল, মুসলমান মানেই যেহেতু জঙ্গী তাই, যেন জঙ্গীবাদকে দুর্বল করতে চাওয়ার কর্মী তারা? তাই যেন বাংলাদেশকে কথিত জঙ্গীবাদের কবল থেকে মুক্ত থাকতে আমাদেরকে ভারতীয় আধিপত্যের আড়াল আশ্রয়ে যেতেই হবে – এই হল তাদের প্রচ্ছন্ন সাজেশন……!

    জাত বা জাতি ধারণায় পরিচয়-আইডেনটিটি খাড়া করতে চেয়ে যেকোন ধর্ম বা বর্ণ, কালচারাল ভিন্নতা অথবা  সাধারণভাবে যেকোন এথনিসিটি [ethnicity] বা জাতপরিচয় এর পক্ষে দাঁড়িয়ে – “এটাই শ্রেষ্ঠ ” – ধরণের প্রচার করতে আমরা সকল ধারাকেই করতে দেখি যা খুবই কমন ফেনোমেনা; এটাই যেকোন রাষ্ট্র বা সমাজের কোন-না-কোন জাতির পরিচয় আঁকড়ে দাঁড়ানো – এটাই দেশের অস্থিতিশীলতার উতস হয়ে দাড়ায় আছে যা প্রকারন্তরে সমাজের জন্য গভীর ক্ষত ও বড় ক্ষতিকর ততপরতাতা। এটা মূলত যা আমার জাত-পরিচয়ের প্রেক্ষিতে “অপর” [others] এমন সকল এথনিক চিহ্ন-পরিচয়ের জনগোষ্ঠিকে জাত-নির্মুলের আকাঙ্খা রূপেই শেষে হাজির হয়ে যায়। যাকে আমরা “সব অপরকে” নির্মুলের এক এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর আকাঙ্খা বা পোড়ামাটির নীতি বলেও চিনি! কারণ,  শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা মাত্রই এর মৌলিক স্বভাব হল নিজের সকল “অপরকে” এই উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা; যার সবচেয়ে বড় ও এক প্রভাবশালী প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইউরোপ-জুড়ে হিটলার বা হিটলারিজমে। আবার ঐসময়ের হিটলারের হাতে নির্মুলের শিকার হওয়া জর্মান ইহুদি জনগোষ্ঠি, তারাও এখন পালটা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল নামে এক “হিটলারী”  রাষ্ট্র বানিয়ে নিজেই হয়ে গেছে মোদী-আরএসএসের মতই আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদী – ইহুদিবাদ যার নাম। অর্থাৎ মনে সেই একই শ্রেষ্ঠত্ববোধ আর ‘অপর’ সকল এথনিক জনগোষ্ঠিকে উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা মনে পুষে রেখে এরাও বড় হচ্ছে, এগিয়ে চলেছে। অথচ কারো শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে – নিজে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাড়া করা এটা কোন প্রতিকার নয় – কারও শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা  নিজেও আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাঁড়া করার মানে হয় না; হতে পারে না।
    দুনিয়ার কোন রাষ্ট্র বা সমাজ এককাট্টা শতভাগ একই এথনিক আইডেনটিটির হয়না। নুন্যতম এক থেকে দশভাগ ভিন্ন এথনিক আইডেনটিটির জনগোষ্ঠি সে সমাজে থেকে যায়। ফলে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার উদ্ভব ও অত্যাচার শুরু হতে দেখা যায়।  অথবা কখনও হয়ত দেখা যায় মোটামুটি একই আইডেনটিটির জনগোষ্ঠির কিন্তু একদল চায় ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব, তো অন্যদল চায় ধর্মভিত্তিক আরেক জাতিবাদী শ্রেষ্ঠত্ব। এরাই নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ববাদের সবচেয়ে বড় সংকট ও স্থায়ী তৈরি করে। অথচ একই সমাজে থাকতে হলে সবার আগে নির্মুল আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হবে; “আমার অপর” যাকে মনে করছি তাকেও পাশাপাশি সমান অধিকার ও মর্যাদায় স্বীকার করে নিতে হবে। তবে সবার আগের প্রধান কাজ হতে হবে যেকোন ধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধ ত্যাগ করতেহবে। ধর্ম-নির্বিশেষে জনগোষ্ঠির সকলকে বাইরে  জুতা খুলে ঘরে প্রবেশের মত করে নিজ নিজ সবধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধকে সমাজ-ঘরে প্রবেশের আগে বাইরে খুলে রেখে আসতে হবে। আমরা নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান রাজনৈতিক অধিকারের – এই নীতিতে দাঁড়ালে শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তির এক রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব।
    যদিও আরেক মুলকথায়, বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটি শব্দগুলো ব্যবহার করে আজীব এক কথিত সেকুলার নামের প্রগতিবাদ এই আড়ালে তারা এথনিক ঘৃণায় তারা “ইসলাম কোপাতে” চাইছে। ইসলাম ঘৃণায় সব ছেয়ে ফেলতে চাচ্ছে; কার্যত যা হিন্দুত্ববাদ। এবং ভারতীয় আধিপত্যের বিস্তারের সহায়ক। ‘জঙ্গীবাদের’ কথা তুলে ভয় দেখিয়ে এরাও হিন্দুত্ববাদের শ্রেষ্ঠত্ব – যা আরেকভাবে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধের ধারক, তাই কায়েম করতে চায়। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য কায়েম ও বাংলাদেশকে তার বাজারে পরিণত করার আরেক কলোনি-চিন্তা!!। বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটির নামে প্রগতিবাদের এভাবে শব্দ ব্যবহার বা এমন মানে করা যে মারাত্মক ভুল ও অন্যায় সেদিকটাই তুলে ধরা এলেখার উদ্দেশ্য।

    র‍্যাশনাল[rational] বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তাঃ
    এখানে এখন প্রাথমিকভাবে র‍্যাশনাল [rational] শব্দের অর্থ কিছুটা বলে রাখা যাক। এই শব্দটাও ইংরাজি দেখাই যাচ্ছে। এর খাস বা সার অর্থ হল – “বুদ্ধি”। মানে বুদ্ধি বলতে বা এমন ধারণাকে কেন্দ্র করে যা বুঝি, তাই!  যেমন রেশনাল শব্দের একটা অর্থ করা হয় – বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন বিচার বা বিচারকারি মানুষ। অর্থাৎ দুটাতেই “বুদ্ধি” ব্যবহার করে যে “বিচারটা” করা হয় তাই বলা হয়েছে। সেই সুত্রে তাহলে এখানে এতে ‘কী’ বলা হয় নাই? বা বাদ রাখা হয়েছে??  সেদিকে যাওয়া যাক, তাহলে র‍্যাশনাল শব্দের অর্থ আরেকটু খুলবে!
    যেমন বললাম, মন আর মগজের লড়াই চলছে!  এখানে মগজ মানে আসলে বুঝানো হয়েছে বুদ্ধি। মগজের ব্যবহার মানে বুদ্ধির ব্যবহার। আর বুদ্ধির বিপরীতে তাহলে কী ধারণা থেকে গেল? বা কী সংশ্লিষ্ট নয়, বাদ পড়ল?? সে প্রশ্নের দিকে আগানো  যাক! এখানে, বুদ্ধির বিপরীতে যা বাদ পড়ে থাকে তা হল মন বা মানুষের আবেগ অনুভুতি।  মানে মানুষের অন্য মানুষের সাথে অথবা মানুষে-মানুষের মধ্যে সম্পর্ক – এই মৌলিক দিক যাকে অনেক সময় বলি আমাদের মানবিক সম্পর্ক। মানুষের রিলেশনাল দিক বা বোধের দিক এটা। এটা বাদ বা বুদ্ধির বাইরে থেকে গেল। এদিকটা আর রেশনাল শব্দটা কাভার করে না বা অন্তর্ভুক্ত নয়। মানুষের আবেগ অনুভুতি বা “সম্পর্কিত বোধ” যেকারণে বুদ্ধির আমলই করে না; করতে পারে না। মানে এটা বুদ্ধি দিয়ে বুঝার বাইরে!

    তাই, শুধুই লজিক, যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে মানবিক সম্পর্ক [human relation] বা মন-কে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে।  আর বাস্তবে আমরা তা করিও না। তাহলে সারকথায়,  র‍্যাশনাল মানে যা কেবল লজিক [logic], রিজন [reason], যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে চলে। মন বা মনের ফিলিং [Feeling] অনুভব ইত্যাদি এসব একদিকে সরিয়ে রেখে এই বিচার করা হয়। [Reason বা রিজন বলতে form judgements logically বুঝতে হবে। মানে “যুক্তিবুদ্ধিতে ভর করে পৌছানো রায়” বুঝলেই আপাতত চলবে।] একারণেই যা লজিক্যাল মানে র‍্যাশনাল তা  রিলেশনাল (মন বা মানবিক সম্পর্ক) দিককে সাথে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে করা কোন বিচার নয়। মানে হিউম্যান বা রিলেশনাল দিক এখানে বাদ থেকে যায়। যেমন যদি বলি, সাধারণত এটাই মানুষের স্পিরিচুয়াল [spiritual] দিক আমলে না নেয়া বা বাদ রেখে চিন্তা করা।  স্পিরিচুয়াল মানে মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে; বস্তগত নানা কিছু ভোগের চাহিদার মত এবং বস্তুগত ভোগের চাহিদা থাকা সত্বেও।  অন্যভাবেও বলা যায়, মানুষের অন্য সকল মানুষ ও প্রকৃতির (কসমিক বা গ্রহ-নক্ষত্র সহ) সবকিছুর সাথে কিভাবে সম্পর্কিত সেই সম্পর্ককে জানা ও অনুভব করার আকাঙ্খাও আছে যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা! কারণ মানুষ দুনিয়ার তাঁর আগমন-আবির্ভাবেই কারণ উদ্দেশ্য কী আর এরপরে তাঁর জীবনের করণীয় কর্তব্য কী তাও এখান থেকেই সে সংগ্রহ (derive) করে বুঝে নিতে  চায়! এভাবে নিজ জীবনকে সামঞ্জস্যপুর্ণ করে সাজিয়ে নিতে চায়। আর এখান থেকেই এই আকাঙ্খা, যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা!!  অর্থাৎ এটা বৈষয়িক বা বস্তুগত আকাঙ্খা নয় বরং বস্তগতগুলোকে ছাড়িয়ে বা transcend করে গেলে তবেই এই আকাঙ্খার হদিস জানা যায়।  এর কারণ সে লক্ষ্য করেছে সম্ভবত এভাবে জীবন না সাজিয়ে নিলে এক গভীর “একাকিত্ববোধ” বা উদ্দেশ্যহীনতাবোধ জীবনকে গ্রাস করে থাকে। এসরের সমাধান পাওয়া থেকেই স্পিরিচুয়াল চাহিদা্কের উদ্ভব ও তা জাগিয়ে রাখা। এথেকেই মানুষের উপলব্দি যে মানুষ মাত্রই রিলেশনাল [relational] বা অজস্র আরো প্রাণ-অপ্রাণ ও প্রকৃতির সাথে সে রিলেশনে আছে সে বা গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছে – এই বোধ তাকে এমন ইঙ্গিত দেয়। এটাকেই আমি বলছি মানুষ “রিলেশনাল” বা relational element। মানুষ মাত্রই সম্পর্কিত বোধে [relational] এর মানুষ।   কিন্তু লজিক বা রেশনালিটি এই রিলেশনাল দিকটা ধরতে পারে না, ছুতে পারে না।
    অন্যভাষায়, তাই আমাদেরকে লজিক বা র‍্যাশনালিটির বিচার ছাড়িয়ে ছাপিয়ে বা ইংরাজিতে ট্রানসেন্ড [transcend] করতে পারলে তবেই মানুষের রিলেশনাল দিক সম্পর্কে জানা যায়, চর্চা করা সম্ভব।

    কিন্তু ষোল শতকে নতুন কী ঘটেছিলঃ
    আবার যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝতে বসে সেখানে মন বা মনের ফিলিং বা অনুভব-কেও খাটাতে চাওয়া তা কোন কাজে আসে না। মানে রিলেশনাল দিকটা সংযুক্ত রাখা বা না-রেখে গতিসুত্রকে বুঝতে গেলে দুই ফলাফলে কোন ভিন্নতা আসে না।  তাতে রেজাল্ট ভিন্ন হবে না। তবে এটা কেবল বস্তগত ফেনোমেনাকে বুঝার ক্ষেত্রে খাটবে। তাই কথা ছিল যে কেবল  বস্তগত ফেনোমেনাকে ব্যাখ্যা বা বুঝবার ক্ষেত্রেই কেবল র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানবুদ্ধিতা, এই চিন্তা পদ্ধতি সীমাবদ্ধ থাকবে। যদিও তা তারা থাকে নাই। কাজেই সংক্ষেপে বললে, র‍্যাশনাল [rational] মানে হল, মগজ বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার। রিলেশনাল দিক থেকেও বিচার নয় এটা।  যার সবকিছু “বুদ্ধি” এই কেন্দ্রিয় ধারণার উপর দাঁড়ানো! এই অর্থে যা র‍্যাশনাল তা আসলে কেবল বুদ্ধি দিয়ে বুঝাবুঝির পথ ও প্রসঙ্গ!

    দুনিয়াতে মানুষের আগমন শুরু থেকেই সে ছিল যাযাবর, মানে দুনিয়ার কোথাও শুরু থেকে কোন ভুমিতে সে থিতু হয়ে বাস করেনি, করে নাই। আর মূলত, খাবার সংগ্রহ ও শিকারের তাগিদে যে এভাবে একেবারেই যাযাবর (Pastoral) ছিল।  আর  কয়েক দশ-লাখ বছরের সেই যাযাবর জীবন শেষে এক সময় মানুষের জীবন থিতু হয়ে এসেছিল। আরেক ভাষায় এটাকেই বলে মানুষের প্রথম কৃষিকাজের জীবনের শুরু বা বলা যায় মাটি কামড়ে কোন ভুমিতে থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক বসবাসের শুরু হয়েছিল যেখান থেকে। একারণেই যাযাবর আর কৃষিকাজ পরস্পর ভিন্ন বা বিপরীত ধারণা! আর শেষের এই থিতু হয়ে বসবাস – এটাকেই মোটামুটি গত ছয় হাজার বছরের মানুষের ইতিহাস বলা হয়। এটাকেই মানুষ এথনিক জীবন-যাপনের ইতিহাস বলে। জাত-পরিচয় বোধের শুরু এমনকি তাই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণার শুরুও একই – এই এথনিক জীবনের শেষের দিক থেকে। আমরা এখন যার বর্তমান প্রান্তে।
    এবার আসেন, এই ছয়হাজার বছরের মানুষ-জীবনের সফরে প্রায় পুরাটা পথই আমরা হেঁটেছি ধর্মতত্বের [theology] হাত ধরে।  অর্থাৎ আমাদের জীবনকে পুরাপুরি গাইড করে গেছে-হেঁটেছে নানা ধর্ম বা ধর্মবোধ থিওলজি। [ইংরাজি থি বা [ The] এর অর্থ হল দ্যা গড বা সমতুল্য আল্লাহ বা ঈশ্বর ধরণের ধারণা। তাই থিওলজি মানে গড বা আল্লাহ-বিষয়ক তত্ত্ব বা জ্ঞান।] তবে এই থিওলজিতে জীবন চলতে চলতে কেবল গত প্রায় পাঁচশ বছর আগের নয়া ঘটনা আসে; যখন নতুন করে এক বিজ্ঞান ও টেকনোলজির চর্চার রূপ দেখা গিয়েছিল – বিজ্ঞানের যুগ বলে! যে যুগে নয়া এক চিন্তার পদ্ধতির রূপ দেখেছিলাম আমরা। সারাংশে বললে সেটা একটা এজাম্পশন (assumption) এর উপর দাঁড়ানো বা আগাম ধরে নেয়া এক ভিত্তিতে যে কিছু ফেনোমেনা বা ঘটনা যা একেবারেই বস্তুগত বা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; আর এনিয়ে চিন্তা চর্চার পদ্ধতি ও এর ভিত্তি লজিক্যাল বা রেশনাল পদ্ধতিতে করা হবে। যেহেতু এগুলো ফিজিক্যাল ফেনোমেনা মানে নিউটনের গতির গতিসুত্র বুঝতে চাওয়ার মত ঘটনা তাই, মানুষের রিলেশনাল দিক বিচার এখানে স্থগিত বা বাদ দিয়ে আগানো যাক।   বা নিউটনের মোশন থিওরি (Laws of motion) বা গতিসুত্রের মত  ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; মানে যার উপর হিউম্যান ফেনোমেনার প্রভাব নাই (তা স্পিরিচুয়ালও নয়) বা এর প্রভাব প্রায় নাই বলে উপেক্ষাযোগ্য। অন্যভাষায় এটাই বিজ্ঞানের যুগ বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিন্তার যুগ। সেই থেকে রেশনাল পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হওয়া এই চিন্তা পদ্ধতিই সাইন্টিফিক, লজিক্যাল বা রেশনাল ইত্যাদি নানান নামে শনাক্ত হতে থাকে। কারণ পরবর্তিতে ইম্মানুয়াল কান্ট [Immanuel Kant] এই চিন্তা পদ্ধতি-কেই তত্বায়িত করেন। মানে আগে ব্যবহার শুরু হয়ে যাওয়া আর পরে কী হয়েছিল তাকে তত্বায়িত (Theorized) করে বলা। মানে এখানে চর্চা থেকে তত্ব এসেছিল, তত্ব থেকে চর্চা নয়। আর শেষে তার লেখা বিখ্যাত আর্টিকেল What is Enlightenment যা ১৭৮৪ সালে লেখা।

    Immanuel Kant: What is Enlightenment?,  1784

    যদিও অর্ধ-শিক্ষিত ও মুসলমান-কোপানিতে ও ঘৃণা ছড়াতে আগ্রহীদের মাঝে এটা বেশ গেথে বসা অনুমান এবং তা ভুল অনুমান যে এনলাইটেনমেন্ট এর ধারণা – এটা নাকি জোঁকের মুখে নুনের মত; যা ধর্ম-কে নাকচ করতে হাজির হয়েছে। তাই যেকোন ধর্ম বা ধর্মতত্বের সামনে এনলাইটেনমেন্ট অথবা  বিজ্ঞান-কে তুলে ধরলেই যেন ধর্ম নাকচ হয়ে যায় তাতে। একারণেই জাফর ইকবালেরা বিজ্ঞানবাদি। বলা বাহুল্য  বলাই বাহুল্য বিজ্ঞানবাদিতা একটা নেতি ধারণা। বুঝে-না-বুঝে ও সীমাবদ্ধতা না জেনে যারা অসৎ উদ্দেশ্যে যত্রতত্র “বিজ্ঞান” মারাতে যায় এরাই “বিজ্ঞানবাদি”। চিন্তার যে পদ্ধতি আছে; পদ্ধতি মেনে চিন্তা চর্চা করতে হয়। এরা তা জানে কখনও শুনেছে মনে হয় না।  বিজ্ঞান মূলত একটা চিন্তা পদ্ধতি; এটাকে র‍্যাশনাল চিন্তা পদ্ধতিও বলা হয়। আর গুরুত্বপুর্ণ কথা হল থিওলজির উপর র‍্যাশনাল চিন্তা-পদ্ধতি প্রযোজ্য নয়।  কারণ থিওলজি মূলত মানুষের সম্পর্ক (যাকে উপরে রিলেশনাল বলে বুঝিয়েছি) বিষয়ক জ্ঞানচর্চা। এই অনুমান ভিত্তিহীন হলেও এটা গভীরে  গেথে বসা সেই ভুল অনুমান। এসব নিয়েই এখানে কথা বলব।

    এই ভুল অনুমানের শুরু হয়েছিল রেনেঁসা আন্দোলন থেকে। এটা আজকের ইটালি তখন যা রোম-কেন্দ্রিক এবং প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের (-৭৫৮ খ্রীষ্টপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দ) লেজ ছাড়ার পরের ঘটনা এবং সেকালে ফ্লোরেন্স ও রোমে বিস্তৃত হওয়া ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী।  ততদিনে (৩১৩ খ্রীষ্টাব্দে) প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য এর সম্রাটসহ সকলেই  ক্যাথলিক খ্রীশ্চান হয়ে গিয়েছে। আর পরে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য ৪৭৬ সাল থেকে ধবংসও হয়ে গেছিল। তবে পরবর্তিতে, হলি রোমান এম্পায়ার (Holy Roman Empire) নামে তবে আজকের ফ্রান্স-জর্মানের মাঝের শার্মেগেলন [Charlemagne] এর সম্রাটের নেতৃত্বে ৮০০ সালের শেষ সপ্তাহে এই নয়া সাম্রাজ্যের শুরু বা পত্তন হয়। কালক্রমে সারা ইউরোপ যার অধীনস্ত হয়, টিকেছিল (কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে) ১৮০৬ সাল পর্যন্ত। যদিও প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সাসথে এর কোনই সম্পর্ক নাই। তবে  সেকালে রেনেসাঁ [Renaissance] আন্দোলন ফ্লোরেন্স ও রোম থেকে শুরু হওয়া হলেও তা ছিল আসলে হলি রোমান এম্পায়ারের আমলে; মানে যেটা কোনভাবেই প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের আমলে নয়। কিন্তু মানুষে দুটা সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভ্রান্ত সাধারণত হয়ে থাকে বলে পুরা ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত করলাম। সারকথায়, রেনেঁসা আন্দোলন যা ১৩০০ থেকে ১৬০০ সালের মাঝের ঘটনাবলী এবং যার সাথে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের কোন সম্পর্ক নাই। যে রোমের অধীনে ছিল স্রা ইউরোপ। কিন্তু রেনেঁসা আন্দোলন প্রাচীন  ফ্লোরেন্স ও রোম শহরে শুরু হলেও পরে ১৪৯৯ সাল থেকে ফ্রান্সের ভিতর দিয়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পরেছিল।  আর ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল সহ সব ধরণের পরিবর্তন আবর্তিত হয়েছিল এই আন্দোলনের কারনে। একারণে অনেকের মনে এটাকে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যেরই কোন ঘটনা মনে করে ভুল করে থাকে। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এর বহু আগেই ৪৭৬ সালেই  প্রাচীন রোম সাম্রাজ্য ধবংস হয়ে গেছিল।

    এখন রেনেঁসা আন্দোলন এর বিচারে ইউরোপে এক “ধর্মের যুগ” ছিল। যেটাকে মোটাদাগে ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ বলে তারা মনে করে আর এটাকেই তাদের কোন কোন ধারা কালো যুগ (Dark age) অথবা  মধ্যযুগ বলে (Middle Ages or medieval period) পরিচিত করায়, এটাকে তারা অতিউতসাহীরা  অন্ধকার যুগ  (dark age period) বলেও মানে করে থাকে। আমরা এই আলোচনায় দেখব কেন তাদের এই ভুল অনুমান; এছাড়া এই অনুমিত ভুল ধারণার কোন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো! যদিও ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল এটা সারা দুনিয়াব্যাপী কোন  অন্ধকারের সময়কাল ধারণা নয়; বরং পুরানা রোম-কেন্দ্রিক শাসিত (বা পরের হলি রোমান এম্পায়ার শাসিত) যে ইউরোপ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটা ধারণা। এবং এর চেয়েও বড় কথা এটা সব ধর্মের বেলায় নয় বরং কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের – মানে সেকালে রোম-শাসিত ইউরোপের ও যা কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের বেলায় এই অর্থে এটা ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল বুঝানো হয়েছে। তবু ইউরোপ পরে এটা সব ধর্মের বেলাতেই যেন প্রযোজ্য এমন অর্থ করে থাকে। এমনকি পুর্ব-ইউরোপ যার বেশিরভাগ অংশ শাসিত হয়েছিল রাশিয়ান জার (১৫৪৭-১৯১৭ সাল) এর অধীনে, এরা থেকে গেছিল অর্থডক্স ক্রিশ্চান। অন্ধকার যুগ-ওয়ালারা এদেরকেও গোনায় ধরে নাই। আমরা এশিয়ার মুসলমানেরা তো আরো দূরে…।

    আর  এই অন্ধকারের ধারণা – এরই বিপরীতে আলোর ধারণা এনে  মানে অন্ধকার কারও উপর “আলো ঢেলে” যেন কিছুকে আলোকিত করে তোলা – এই অর্থেই এর নামকরণ হয়েছে এনলাইটমেন্ট বা en-light-en-ment ।

    এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানোঃ  
    ওদিকে আবার এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানো। এমনকি বিজ্ঞান ধারণাটারও সারকথা হচ্ছে লজিক (logic) আর সেই অর্থে এর আরেক শব্দ হল র‍্যাশনাল (rational) বা বাংলা করে একে যুক্তিবুদ্ধি-সম্মত, এভাবেও বলা যায়। এনিয়ে আলাপ বিস্তারে নিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখা ভাল যে বিজ্ঞান নিজে কোন জ্ঞানের শাখা নয় বরং মানুষের এক চিন্তা পদ্ধতি বা ম্যাথডলজি (methodology)। আর এই চিন্তা পদ্ধতিটাইকেই (বৈশিষ্ট হিসাবে) বলে লজিক্যাল বা র‍্যাশনাল। তবে এই আলোচনার মূল ফোকাস হল বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি এই ধারণাগুলোর ব্যবহার সীমা কোথায় সে সম্পর্কে পাঠককে জানানো। কোথায় কতদুর যাবার পরে বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি ধারণা দিয়ে সেই প্রসঙ্গ আর ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে সেই সীমাকে বুঝা ও বুঝে নেওয়া।  যেমন বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটির জ্ঞান দিয়ে ধর্ম ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে।

    অষ্টাদশ শতকে যুক্তি (reason) ও বিজ্ঞানের বিকাশের সেকালে ইউরোপীয় ইতিহাস যে নয়া রূপ-পদ্ধতিতে হেঁটেছিল একেই এনলাইটেনমেন্ট (আলোকপ্রাপ্ত ) বলে চেনানো হয়েছিল। ইম্মানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant (1724-1804)) তিনি এক জর্মান দার্শনিক তিনিই এনলাইটেনমেন্ট ধারণাকে তত্বায়িত করে সামনে নিয়ে আনেন। এখান থেকেই কান্ট শব্দটা থেকে কানশিয়ান (Kantian মানে যেমন, ইম্মানুয়াল কান্টের লজিক অর্থে) কানশিয়ান লজিক (logic); বা র‍্যাশনালিটি (rationality) ধারণাগুলো প্রচলিত বা ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছিল। তবে এভাবে “তত্বায়িত করেন” বললাম এজন্য যে “থিওরি ও প্রাকটিস” এদুইয়ের সম্পর্ক মানে তত্ব ও তার চর্চা নিয়ে  এদুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটা কথা চালু আছে সেটা এরকম যে কোন তত্ব আগে না ওর ব্যবহার বা চর্চা আগে ঘটেছিল। এই তর্কের সমাধান হল, দার্শনিকেরা আগে তত্ব তৈরি করেন, এরপর ওর ব্যবহারিক রূপ তৈরি হয় ঠিকই। এরপরে আবার ঐ চর্চিত রূপ থেকে পুনরায় নয়া তত্ব-ও তৈরি হতে পারে। কান্টের ক্ষেত্রে তাঁর তত্বের আগেই এর ব্যবহার শুরু হয়েছিল। পরে কান্ট সেসব ব্যবহারিক ধারণা থেকে সেগুলোকে তত্বায়িত করে সাজিয়ে যা এনেছিলেন সেটাই কানশিয়ান লজিক ও  রাশন্যালিটি ধারণা।

    “বিজ্ঞান” কী কোন জ্ঞানের শাখাঃ
    এদিকে বিজ্ঞান ধারণাটা নিয়ে আমাদের মধ্যে আবার এটা সবরোগের ওষুধ যেন এমন ধারণা আছে।  বিশেষ করে আপনি যদি ধর্ম কোপানোর বা নাকচ করার হাতিয়ার বুঝা ও ফেরি করা লোক হয়ে থাকেন। তাদের ধারণা হয়ে থাকে বিজ্ঞান দিয়ে ধর্ম বা ধর্মতত্ব-কে (Theology) পরাস্ত করা সম্ভব। কিন্তু আসলেই কী তাই???

    দুঃখিত, তা অবশ্যই না।
    এমনিতেই থিওলজি ও বিজ্ঞান দুটা সমতুল্য ক্যাটাগরি নয়। থিওলজিকে যে অর্থে জ্ঞানের একটা ব্রাঞ্চ বা শাখা বলা যায়। তাহলে বিজ্ঞান কী কোন জ্ঞানের শাখা???  আমরা যেমন ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বাইলজি বা ইতিহাস, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন জ্ঞানের শাখা সম্পর্কে সম্পর্কে জানি; তাহলে বিজ্ঞানও কি তেমন আরেক জ্ঞানের শাখা? অবশ্যই না। আবার সাইন্স, আর্টিস, কমার্স সমাজ-বিজ্ঞান কিংবা শিল্পকলার কোন শাখায় পড়াশুনা করি তেমনই আর্টস বা শিল্পকলাতেও কী বিজ্ঞান থাকে? এর জবাব কি হবে??
    আপাতত দ্রুত জবাবে চলে যাব, কারণ কম কথা বা মূল কথায় এর জবাব হল – বিজ্ঞান নিজে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বা ইতিহাস এর মত কোন জ্ঞানের শাখা নয়। তাহলে বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞান হল জ্ঞানের পদ্ধতি বা  এক চিন্তা পদ্ধতি। আর সেকারণে শিল্পকলাতেও বিজ্ঞান থাকা সম্ভব আর তা সত্যিই আছে। মানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে।  সব জ্ঞানের শাখাই বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া বা জানা হয়ে থাকে।  মানুষ মাত্রই আবার রাশনাল এন্ড বিয়ন্ড (rational & beyond) । মানুষ রাশনাল অবশ্যই কিন্তু একই সাথে একে ছাড়িয়েও (Beyond) আরও অনেক কিছু। এই ছাপিয়ে যাওয়া বা ট্রান্সশিয়েন্ট (transient) – এটাও র‍্যাশনালিটির উপরে মানুষের আরেক স্বভাব বৈশিষ্ট।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    অসমাপ্ত, বাকিটা দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে দেখুন।
    দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4lO

    [এই লেখার একটা প্রথম ভার্সান আগে  একটা ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। পুরানা সেই লেখার লিঙ্ক দেখেন এখানে।   আর তা ছাপা হয়েছিল গতমাসে মানে গতবছর, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ও তা হয়েছিল ইসলামি ছাত্র আন্দোলন এর কেন্দ্রীয় সম্মেলনের স্মারকে প্রকাশিত প্রকাশনায়। স্বভাবতই সেটা প্রথম ভার্সান বলে তা এখানে এই সর্বশেষ ফাইনাল ভার্সান এর চেয়ে আকারে অনেক ছোট ছিল। আমার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত  বর্তমান এই রচনা ফাইনাল ভার্সান বলে বিবেচিত হবে। যদিও দু ভার্সানের লেখার নামে  অনেক ফারাক করে দিয়েছি, গুহুবহু একই নাম রাখি নাই। আশা করি লেখাটা উপভোগ্য হবে। এই ই-মেল ঠিকানায় প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।]

  • দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া, চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে 

    দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া,
    চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে

    গৌতম দাস
    ১৫ নভেম্বর ২০২২  রাত ০০ঃ১৫

    https://wp.me/p1sCvy-4k2

        কয়েক ঘন্টা আগের ছবিঃ US President Joe Biden, left, arrives with Chinese President Xi Jinping for a meeting on the sidelines of the G20 summit meeting, November 14, 2022, in Bali, Indonesia [Alex Brandon/AP Photo]

    আগে কিছু বিষয়ের সংজ্ঞা দিতে দিতে আজকের কথা শুরু করব। পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে West – এসব শব্দ বলতে একালে বুঝতে হবে সারা ইউরোপ ও সাথে আমেরিকাও। সাধারণত, কালচারাল অর্থে অবশ্য এনিয়ে আরেকটা শব্দও আছে – ‘পাশ্চাত্য’। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতা বলতে যেমন ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’ শব্দটা এভাবে, ব্যবহার করে অনেকে। ঠিক পশ্চিম এর বিপরীত শব্দ পূব তেমন, পূর্ব বা এশিয়ান কালচার বা সংস্কৃতি বুঝাতে অরিয়েন্টাল [oriental] বা বাংলায় ‘প্রাচ্য’ সভ্যতা বলার চল আছে। মানে পশ্চিম বা ইউরোপের বিপরীতে পুব-কে প্রাচ্য বা এশিয়া বলে বুঝানো।
    ওদিকে ভৌগলিকভাবে আটল্যান্টিক মহাসাগর ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে অবস্থিত  হয়ে থেকে এদেরকে দুই পাড়ে বিভক্ত করে রেখেছে। এমনভাবেও অনেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। এই অর্থে তাই ট্রান্স-আটল্যান্টিক মানেও পশ্চিম; যার অর্থ হল ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে আটলান্টিক মহাসাগরটা যেন অবস্থিত নাই বরং তারা লাগোয়া বা পাশাপাশি – এই কল্পনাতে তৈরি শব্দটা হল ট্রান্স-আটল্যান্টিক [trans-atlantic]। তাই ইউরোপ আর আমেরিকাকে অন্তত এথনিক কালচারাল অর্থে তারা এক, এভাবে একসাথে বুঝাতে অনেকে “আটল্যান্টিক” শব্দ দিয়ে সেটা বলে বুঝাতে চায় অনেকে। যেমন, সামরিক জোট ন্যাটো [NATO] এর ভিতরের ক্যাপিটাল  ‘A’ এই অক্ষরটা আটল্যান্টিক বুঝাতে ব্যবহার হয়। মানে ন্যাটো হল ইউরোপ আর আমেরিকার মিলিত সামরিক জোট; তাই এটা এক আটল্যান্টিক জোট। আবার ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ বলে অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়; যেমন এ’নামে এক থিঙ্ক ট্যাংক আছে। আবার একইভাবে, সারা দুনিয়ার জন্য নির্ধারক ও সবচেয়ে বিখ্যাত হিটলারবিরোধী ১৯৪১ সালের হবু জোটের পক্ষে প্রথম যে চুক্তি হল সেটার নাম আটল্যান্টিক চার্টার ট্রিটি বা ইংরাজিতে Atlantic charter Treaty । যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে বিরোধী এলাইড ফোর্স বা ‘পক্ষ শক্তি’ নামে জোট গড়ে তোলার লক্ষ্যের পিছনের ভিত্তি, এমন এক প্রধান চুক্তি। এটাই ছিল হিটলারের ‘এক্সিস ফোর্স’ নামে জোটের বিরোধী জোট।

    আবার আমেরিকান ভুমির মূল এথনিক  জনগোষ্ঠি অর্থে  জাতি [নেশন], এই অর্থে বিচার করে বললে, এখনকার আমেরিকা এটা ইউরোপের কোন এথনিক জনগোষ্ঠিরই জন্মভুমি ছিল না। বরং ১৬০৭ সাল থেকে বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ ইত্যাদি কলোনিদখলদারেরা তাদের জন্মভূমি ইউরোপ থেকে গিয়ে আমেরিকাকে কলোনিদখল করে নিজেদের ভুমি হিসাবে দাবি করে সেখানেই থেকে যাওয়া ও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়েছিল। আর এতে সেখানকার মূল আদিবাসিদের উতখাত বা তাদের আরো গহীন বনে চলে যেতে ঠেলে বাধ্য করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই ওসব আদিবাসিদেরকে পশ্চিমারা নাম দিয়েছিল “রেড ইন্ডিয়ান” বা  তাদেরকে এই নামে ডাকা চালু হয়েছিল। সেই থেকে ইউরোপের বা পশ্চিমা দেশান্তরি বা মাইগ্রেন্টরা [migrants], এরাই যেন আমেরিকার মূল বাসিন্দা এমন হয়ে বসবাস শুরু করেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকা কার্যত ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের শহর হয়ে যায়। একইভাবে ঠিক যেমন অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড অথবা কানাডা এই দেশগুলো ইউরোপীয়দের হাতে কলোনিদখলের পরে এখন এরা মাইগ্রেট করা ইউরোপীয়দেরই শহর -যেন নিজস্ব দেশ- এমন হয়ে গেছে।

    কেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে এত পুরানা কথাঃ
    কেন একালের প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে ব্যাখ্যা করতে এত সব পুরানা কথাকে তুলে আনছি; এর কারণ হল ২০২১ সালে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হলে পড়ে সে নীতি-পলিসি নিয়ে তিনি এসেছিলেন সেটা আসলে এক আটল্যান্টিক ফর্মুলা। যার আরেক নাম ‘সাদা ককেশীয় শাসন’ চালু রাখার স্বার্থ।
    তাই বর্তমানের প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, বাইডেনের আমলে তিনি কার্যত যে ‘পশ্চিম’ এর সংজ্ঞার উপর নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন যেটা হল প্রধানত -হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট -, অথবা সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি এক ততপরতা। আর মূলত এসব পরিচয় খাড়া করার উদ্দেশ্য একটাই তা হল, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান যা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে যা, ১৯৪৫ সালের পর থেকে গত ৭৭ বছর ধরে রাজ [rule] করে এসেছে ও এখন ক্লান্ত হয়ে শেষ প্রান্তে ঠেকেছে – এই উত্থিত চীনা অর্থনৈতিক উত্থান-আগমনকে আর যতদিন সম্ভব ঠেকিয়ে দেয়া, অন্তত দেরি করিয়ে দেয়া সম্ভব – এরই এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
    তাই একালে পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে west শব্দের এক বিশেষ অর্থ হয়েছে যে যারা গত প্রায় ছয়শ ধরে দুনিয়াকে কলোনিদখল করে শাসন করে আসছিল আর সুনির্দিষ্ট করে ১৯৪৫ সাল থেকে  আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল ; যার প্রথম ও সবচেয়ে ইতিবাচক এক নয়া পদক্ষেপ ছিল  চলে আসা পুরানা সাড়ে তিনশ বছরের কলোনিদখল ব্যবস্থাকে আমেরিকা তুলে দিয়েছিল – এরাই সেই থেকে নয়া ‘পশ্চিমা ব্যবস্থা’।

    তবে একালে বাইডেন যে নয়া নীতি-পলিসি সাথে যোগ করেন এই ততপরতার পরিচয় হল এটা এখন ‘সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি’ পুনর্বার খাঁড়া করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ এর) সাথে গাটছাড়া বেধে সারা পশ্চিমাদের ‘ইউক্রেনের যুদ্ধে’ সারা দুনিয়াকে নামানো। তাদের অনুমান ছিল ইউক্রেনকে প্রক্সি বা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তারা পশ্চিমারাই ইউক্রেনের পিছনে থেকে পুতিনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে রাশিয়াকে ধংস করতে সক্ষম হবে। এছাড়াও তাদের সহ-অনুমান ছিল যে এতে রাশিয়ার সমর্থনে একসময় নিশ্চয় চীন রাশিয়াকে ‘সামরিক সমর্থন’ করে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এভাবেই তারা চীনকেও এই যুদ্ধে জড়িয়ে চীনা অর্থনৈতিক উত্থানকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারবে। যার ফলাফল হতে পারে, তাদের গত ছয়শ বছরের সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটির শাসন আরো অন্তত শ বছর চালিয়ে যেতে পারবে! এই ছিল আশা।

    কী করে বুঝব তিনি পরাজয় স্বীকার করছেন, তোওবা পড়া শুরু করেছেনঃ
    বাইডেনের শাসনের প্রথম দুবছরে মাপার আরেক সহজ উপায় হল আমেরিকান মিড-টার্ম ইলেকশন; যা গত সপ্তাহে ৮ নভেম্বর এই নির্বাচন হয়ে গেল। তবে বাইডেন এটাকে নিজ পরাজয় ঢাকার উপায় হিসাবে ব্যবহার করতে নেমে গেছেন, নভেম্বরের শুরু থেকেই। যদিও এমনিতেই যেকোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তার শাসনের মিড-টার্মে মানে চারবছর শাসনের দুবছর পুর্তিতে আগের দুবছরে গৃহিত নীতি-পলিসির রিভিউ বা পুনঃমুল্যায়নের সুযোগ নিয়ে থাকেন।  সেটা বাইডেনের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হয়ে যাচ্ছে একেবারে উলটা গান। মানে চীনবিরোধী একে পিষেমারার নীতির বিপরীতে একেবারে উলটা সহযোগিতামূলক সহ-অবস্থান; মানে পরস্পরকে বিকাশ-বৃদ্ধিতে জায়গা করে দেয়া; এরই প্রাইমারি আলাপ করতে যাচ্ছেন বাইডেন।    কিভাবে?

    এর পরের সপ্তাহ মানে আগামিকাল থেকে, ১৫-১৬ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে এবারের G20 সম্মেলন মানে, ১৭তম জি২০ [G20 Countries] বার্ষিক স্মমেলন অনুষ্ঠান শুরু হবে।  আর এই সম্মেলন উপলক্ষ্যে এরই আড়ালে মানে এই সম্মেলনের  সাইড লাইনে বসে বাইডেন সরাসরি চীনা প্রসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাথে বৈঠকে বসবেন তা ঠিক করেছেন। এই পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল জর্মান চ্যান্সেলার ওলাফ শলৎজ [Olaf Scholz] এর গত পাঁচ নভেম্বর ২০২২ এর চীন সফর থেকে; যেখানে তিনি বলেছিলেন তিনি G7 group দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসাবে প্রেসিডেন্ট শি এর সাথে কথা বলতে গিয়েছেন। কিন্তু G7 এর পক্ষ থেকে জর্মানিই কেন?  এর জবাব হবে সম্ভবত জর্মানিই হল G7 গ্রুপের একমাত্র দেশ যে তার আগের চ্যান্সেলার মার্কেল এর কৃতিত্ব হিসাবে ইউরোপের বাকি সবার আগে চীনবিরোধী না হয়ে উলটা চীনকে জর্মানির অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে ইন্ডাস্টিয়াল সহযোগিতা সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আর পরে সেটাই গত দুবছর ধরে বাইডেনের সাদা শাসন বাচিয়ে রাখার নীতি-পলিসির কারণে ভেঙ্গে পড়ার দশায়।  এখানে বলে রাখি যে, G7 বলতে Canada, France, Germany, Italy, Japan, UK, and US এসব রাষ্ট্রগুলোর জোট বুঝানো হয়।

    আমার এর আগের লেখায় শিরোনাম করেছিলাম – “মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু”। সেখানে পশ্চিমের তিনটা রেফারেন্সের কথা উল্লেখ করেছিলাম; যার একটা ছিল জর্মান চ্যান্সেলার শলৎজ এর চীন সফর। রয়টার্সের রিপোর্ট  প্রথম আলোতে অনুবাদ করে ছাপা রিপোর্টে শলৎজের এই সফরে আকাঙ্খা প্রসঙ্গে; যার শিরোনাম হল – ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে চাপ দিতে চীনকে পাশে চায় জার্মানি।
    দ্বিতীয় রেফারেন্স দিয়ে লিখেছিলাম বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর মন্তব্য যেটাতেও রয়টার্সের শিরোনাম হল, ব্লিঙ্কেন বলেন “চীনের সাথে সমন্বয়ে এক তালে [need to align] থাকাটা জরুরি এসম্পর্কে  G7 group পরিস্কার” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China]। অর্থাৎ বিগত দুবছরের অনুসরণ করা বাইডেনের নীতি-পলিসি  এখন ময়লার বাক্সে ফেলে বাইডেন-ব্লিঙ্কেন আপোষের জন্য তৈরি হচ্ছেন। অথচ এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দুবছর ধরে দেয়া চীনকে একঘরে করার আকাঙ্খায় দেয়া বক্তব্যের বিপরীত।
    তৃতীয় রেফারেন্স দিয়েছিলাম, এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]। অর্থাৎ সবমিলিয়ে এক পরিস্কার আপোষের বার্তা যে জি৭ গ্রুপ নামে “সাদা শাসন ওয়ালারা” তাদের চীনবিরোধিতা ত্যাগ করে আপোষের জন্য রেডি। তবু এত সত্য কথা বলা তাদের জন্য একটু অস্বস্তিকর। তাই যেন একটু আড়াল নেয়া যে এই আপোষের পথে তারা বাড়ছেন যেহেতু এক গ্লোবাল মহামন্দা (recession) আসন্ন সেই বিবেচনায়!
    তাই চতুর্থ রেফারেন্স হিসাবে বলেছিলাম যে,  বলেছিলাম যে “আল জাজিরা এবার এই প্রথম পশ্চিম থেকে
    তারা দুরত্ব রচনা করতে চাইছে। তাদের এ’প্রসঙ্গে  রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে …as inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!”।

    বাইডেন-শি বৈঠক, জি২০ গ্রুপের ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠকের উসিলায় সাইড লাইনেঃ
    এখন জি২০ গ্রুপের আসন্ন ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠক উপলক্ষ্যে বাইডেন আরো খোলাখুলিভাবে চীনের সাথে আপোষের কথা আগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।  যেমন, সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে বললেন বাইডেন – প্রথম আলো।  এই খবরটা অরিজিনালি এএফপি এর যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে। কিন্তু ঠিক কী প্রসঙ্গকে মাথায় রেখে বাইডেনের এমন অল্প আগের শত্রুর প্রতি এমন মধুর পিঠে হাত বুলানো ভাষণ?
    সেটা আমরা জানতে পারি রয়টার্সের আরেক রিপোর্ট থেকে। সেখানে শিরোনাম হল – “চীন-আমেরিকাঃ আসন্ন শি-বাইডেন বৈঠকের আগেই সবার চোখ “রেড লাইন” এর উপরে” [China-U.S. ‘red lines’ in focus ahead of expected Xi-Biden meet] ।  এখন এখানে  -রেড লাইন- সেটা আবার কী?
    আসলে তাদের আলোচনা অনেক দুর-ই আগিয়ে গেছে। আগে বাইডেন বলত চীন নাকি গ্লোবাল অর্ডারের আইন শৃঙ্খলা রীতিনীতি কিছু মানে না। না, বাইডেন এখন সেখান থেকে সরে গিয়েছেন। আর বাইডেনের নয়া অবস্থান হল, শি-বাইডেন এরা উভয়েই পরস্পরের কাছে বলে নিবেন কোথায় কতদুর অপর পক্ষ যেতে পারবে বা পারবে না, কথা তুলতে পারবে না ইত্যাদি – যেটা বিপক্ষের জন্য সেনসেটিভ। যেমন যদি ধরি তাইওয়ান ইস্যু। চীন বলবে, এক চীন নীতি মানতে হবে। যেটা আমেরিকা, ভারত সহ প্রায় সব দেশই ফরমালি মানে কারণ, তাদের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক  এর উপরে দাড়িয়েই অনেক আগেই স্থাপন হয়ে আছে। আর সেখানে তাদের চীনকে দেয়া স্বীকৃতি মতে তাইওয়ান চীনের অংশ বলে তারা মনে করে। কাজেই এখন তাইওয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে চীনকে বিরক্ত বা খোচাখুচি করা এসব বন্ধ করতে হবে। যার মানে তাইওয়ান নিয়ে ইচ্ছামত খোচাখুচি করা নতুন ইঙ্গিত দেয়া এইটা  – রেড লাইন এলাকা। তাই, রেড লাইন তালিকায় সেটা উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ অযথা একাজে খোচাখুচিতে সময় নষ্ট না করে পরস্পর উভয়ের গঠনমূলক কাজে ব্যায় করবে।   তবে কী কী রেড লাইন তালিকায় উঠবে মূলত তা নিয়ে আপোষ আলোচনায় সেটা সাব্যস্ত হবে মনে হচ্ছে!!

    তাহলে বুঝা যাচ্ছে চীন-আমেরিকা আপোষ আলোচনা আগিয়ে নিবার জন্য অনেক প্রস্তুতি ও ফর্মুলা নিয়ে কাজ আগিয়ে রেখেছে। হা ঠিক তাই।  তবে “ভুল বুঝাবুঝি” সরানো বা সরিয়ে ফেলা একথা  বা এই keyword ধরেই যে আপোষটা হবে তা প্রায় স্পষ্ট। যেমন বাইডেন একাই বলেন নাই যে  “সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি” রয়েছে। পালটা এমনকি চীনও একই কথা বলেছে।  যেমন চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আমেরিকার উচিত হবে চীনের সাথে এক্সঙ্গে কাজ করা যাতে ভুল বুঝাবুঝি ও ভুল বিচার-মুল্যায়ন এড়ানো যায়।
    চীনা মুখপাত্র আরো বলেন, “চীন আমেরিকার সাথে শান্তিপুর্ণ সহ-অবস্থান বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও তাইওয়ান প্রশ্ন আসলে চীনাস্বার্থের কেন্দ্রে এটা মনে রাখতে হবে”।

    The United States should work together with China to avoid misunderstandings and misjudgments, a Chinese foreign ministry spokesman said on Thursday, when asked about reports of the meeting. For his part, U.S. President Joe Biden said on Wednesday he was not willing to make any fundamental concessions when he meets with counterpart Xi Jinping.
    China is committed to realize peaceful co-existence with the United States, but the Taiwan question is at the core of its interests, the spokesman, Zhao Lijian, said at a regular briefing in Beijing.

    আসলে, বাইডেন ও তাঁর ইউরোপীয় বন্ধুরা “সাদাবাদি” হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে গিয়ে উলটা নিজেরাই এখন এমন ছেড়াবেড়া অবস্থায় পড়েছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার পুতিনকে মানানোর জন্য তাদের হাতে এখন একটাই শেষ অস্ত্র। তা হল,  চীনকে ছাড় দিয়ে হলেও  কিছুটা পক্ষে টানা। যাতে সেই চীনকে দিয়ে ক্ষুব্ধ পুতিনকে তারা ঠান্ডা করতে সক্ষম হতে পারে। যা দিয়ে একটা নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক যেন গড়ে তোলা যায়।  এব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, পুতিন অবশ্যই চীনের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করতেও পারে। কিন্তু সেটা আগামি জানুয়ারির ১৫ তারিখের পরেই। যেন -৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ইউরোপ বসবাসের জন্য কেমন স্থান সেটা দিয়ে তাদেকে শিক্ষা দেয়া যাতে আর কখনও পরিণতি না বুঝে কেউ এদিকে যেন পা না বাড়ায়!!

    তাহলে শি-বাইডেন  এর হবু বৈঠকের উপর আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচনের কী কোন প্রভাব নাইঃ
    অবশ্যই আছে। এখন পরররযন্ত প্রকাশিত ফল অনুযায়ী বাইদেনের ডেমোক্রাট দল কংগ্রেস বা সংসদে হেরে গেছে। মানে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে সিনেট বা সংসদের উচ্চকক্ষে শেষ পর্যন্ত নিজ ডেমোক্রাট দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০-৪৯) এভাবে  ফিরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও একটা আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয় নাই এখনও। তবু সেই আসনের ফলাফল যেদিকেই যাক সিনেটে ডেমোক্রাটেরা সংখ্যাগরিষ্ঠায় থেকে যাবে। এই খবরটা শোনার পরে বাইডেনের প্রতিক্রিয়া যা ছিল সেখানেই বাইডেনের সব মনোভাব লুকিয়ে আছে। তিনি বলেছেন তিনি শক্তিশালী বাইডেন বলে অনুভব করছেন।   দেখেন মিডিয়া রিপোর্ট।
    প্রেসিডেন্ট বাইডেন রবিবার বলেন, মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্রাট দলের আশা করা হয় নাই [unexpected] এমন জয়ে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে বৈঠকে তাকে এক শক্তিশালী হয়ে বসতে [stronger position] সাহায্য করবে [US President Joe Biden said Sunday that the Democrats’ unexpected midterm election successes sent him into crunch talks with China’s Xi Jinping in a stronger position. আর ওদিকে প্রায় একই ভাষ্য নিয়ে ব্লুমবার্গের (Bloomberg) রিপোর্টে শিরোনাম হল, Biden Says Senate Victory Gives Him ‘Stronger’ Hand with Xi।  মানে টা হলে এই সিনেটে বিজয় নাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আলোচনায় বসতেন ঠিকই কিন্তু নিজের মনে প্রশ্ন থাকত যে তিনি তো আমেরিকান সংসদের উচ্চ বা নিম্নকক্ষের সমর্থহীন এক প্রেসিডেন্ট। ফলে ছোট মনে হত নিজেকে।  আর সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনের সংসদের কোন কক্ষেই যে তিনি বিজয়ী হতে পারছেন না এটা তিনি মেনেই নিয়েছিলেন।

    তাহলে কীসের ভিত্তিতে বাইডেনের দল গোহারা হারতে যাচ্ছেন এই জল্পনা গড়ে উঠেছিল? এর জবাব দিয়ে এক বিশেষণ রিপোর্ট করেছে রয়টার্স যার বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে প্রথম আলোতে। যার সারকথা হল, এই সমস্যাটা তৈরি করেছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প-ই। মধ্যবিত্ত ভোটারের ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব বা তার রাজনীতি ও কাজ পছন্দ করেন না। তাই যেসব প্রার্থী ট্রাম্পের বেছে নেয়া বা দেয়া বলে ভোটারেরা জেনেছেন তারাই প্রার্থীরাই আসলে হেরে গেছেন। অর্থাৎ রিপাবলিকান দলের পক্ষে জনস্রোত থাকলেও (যেটা বাইডেনও মেনে নিয়েছিলেন আমরা দেখতে পাচ্ছি) ব্যক্তি ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব সবকিছু উলটে দিয়েছেন। এর মানে হল আগামি ২০২৪ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান নমিনেশন পাবার ক্ষেত্রে এঘটনা এক শক্ত রেফারেন্স হয়ে বাদা হয়ে সামনে উঠে আসবে। যার অর্থ হল, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বা বাইডেন কেউ না, বরং  নয়া কোন প্রার্থিরই সম্ভবত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে দেখব আমরা। আর সেই সাথে সাদাবাদিদের আন্দোলন হতে পারে বলে যে আশঙ্কা আমেরিকায় উঠেছিল তা এখন অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে যাবে। সারকথায়, আমেরিকান মধ্যবিত্তের পছন্দই ট্রাম্পের উত্থান বা সাদাবাদি সুপ্রিমিস্টদের উত্থান ঠেকায় দেবার ক্ষমতা রাখে, সেই ইঙ্গিত-ই আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি!!

    শেষ কথাঃ  স্থানীয় বা বাংলাদেশ প্রসঙ্গ;  বাইডেন-শি এর আপোষ আলাপ আর তা থেকে  ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আসা মোটেও আর অসম্ভব নয়। সেটাই ফুটে উঠছে। আবার আমেরিকার মিড-টার্মের ফলাফল যা এসেছে তা আর যাই হোক এথেকে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রভাবিত হবার কোন সম্ভাবনাই নাই। সরকারবিরোধী আন্দোলন থেমে যাওয়ারও কোন সম্ভাবনা নাই। মানবাধিকার প্রশ্নে, যেমন গুম খুন অপহরণ বা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর থেমে যাওয়া বা পথ পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনাই নাই।   বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেলে সরকারের এই যুদ্ধের আড়ালে নিজের সরকার পরিচালনার ব্যার্থতা আড়ালের যে চেষ্টা আছে তা আরো উন্মোচিত হয়ে পড়তে পারে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ‘হেফাজতের মত বিএনপিকে’ দমন!

     

    ‘হেফাজতের মত বিএনপিকে’ দমন!

    গৌতম দাস

    ৩১ অক্টোবর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4h4

     

    .   ডলার–সংকটের…… প্রথম আলো

    ইস্যুটা হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারা না পারা নিয়ে। দুদিন আগে ২৯ অক্টোবর বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সমাবেশ হয়ে গেল, এটা ছিল তাদের চলমান আন্দোলনের চতুর্থ এমন সিরিজ সমাবেশ। অনেকের মনে হতে পারে এটা কী হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার বিরুদ্ধের বিএনপি কোন শক্তি হয়ে উঠতে যাচ্ছে বা পারবে?  এমন অনুমাননির্ভর অনেক প্রশ্নই করা যায়। তা সত্বেও নতুন আরেক ফেনোমেনা অন্যদিকে হাজির হচ্ছে যা আরও বেশি প্রভাবশালী। সেদিকে তাকিয়ে বলা যায়,  হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিএনপির এই আন্দোলন সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ নয়। যদিও ইতোমধ্যে হাসিনা  “হেফাজতের মত বিএনপিকে” দমন ধরণের একটা ম্যাসাকার করে ফেলতে পারেন এমন ইঙ্গিত-হুমকি দিয়েছেন। এসব সত্বেও বরং হাসিনার ক্ষমতায় থাকার প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হয়েছে দেশের অর্থনীতি! একেবারে সুনির্দিষ্ট করে বললে সরকারের কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ডলার সংকট। উপদেষ্টা তৌফিক এলাহির ভাষায় টাকা নাই বা জ্বালানি “কেনার পয়সা নাই…”। অথবা বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ভাষায়  – আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে গ্যাসের দাম বেশি তাই কেনা হয় নাই – এসবই হল, ডলার সংকটের বাইরের চেহারা।

    সারকথায় বললে, আসলে হাসিনার ক্ষমতায় থাকার জন্য বিএনপির আন্দোলনের চেয়েও আরো বড় চ্যালেঞ্জ হল রিজার্ভে ডলার না থাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকে যথেষ্ট ডলার সঞ্চিত না-হওয়া বা থাকা। এখন সরকার নগদ ডলার যোগাড় করতে না পারলে বিএনপির কোন আন্দোলন হোক আর নাই হোক, সেসব ছাড়াও সরকার ভেঙ্গে পড়তে পারে!
    যেমন ধরা যাক, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এর ঠিক কারণ নয় তবে ঐ দুর্ভিক্ষকে ঠেকাতে না পারার শেষ কারণ ছিল তখনো রিজার্ভে এমন ডলার ছিল না যে দেশজুড়ে খাদ্য সংকটে পড়া দেশের সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্য কিনে আনবে – এমন সক্ষমতা ছিল না। এর সাথে তুলনা করতে পারি তত্ত্বাবধায়ক আমলে ২০০৭ সালের শেষে আইলা ঘুর্ণিঝড়ের পরের খাদ্য সংকট সামলে ফেলতে সক্ষম হতে পারাকে। তখন কেন সফল হয়েছিল?  কারণ, তখন মূল ফ্যাক্টর ছিল সরকারের হাতে যথেষ্টে ডলার মজুদ থাকা। তাই সহজেই সেসময় দেশের যেই-ই চাল আমদানির এলসি খুলতে চেয়েছিল তাকেই তা খুলতে দিতে পেরেছিল সরকার। ফলে ভারতের চাল বেচতে না চেয়ে তৈরি আইনি বাধা সত্বেও আমাদের আমদানিকারকেরা ভারতসহ যেদেশ থেকেই পেরেছে চাল আমদানি করে সংকট সামলে ফেলেছিল। আর তিন-চার মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠে যাওয়াতে সব সংকট কেটে গেছিল।

    দুনিয়ার যেকোন কথিত কমিউনিজমে থাকা অর্থনীতির কমন লক্ষণ হল সারা বছর আকন্ঠ ডলার সংকটে থাকা – এটা ব্যতিক্রমহীন একটা মারাত্মক ও কমন সংকট। ফলে তাজউদ্দিনের “কমিউনিস্ট ফ্যান্টাসিও” এই অলীক কল্পনাও এথেকে বাইরে ছিল না। সেকারণে,  ১৯৭৪ সালে রিজার্ভের মারাত্মক সংকটে ছিলাম আমরা। ফলে তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া শেখ মুজিবের কিছু করার ছিল না। অপরিনামদর্শী ও কমিউনিস্ট সাজতে চাওয়া ফ্যান্টাসীর তাজউদ্দিন এন্ড গংদের মন্ত্রীসভা ও নানান কমিশন-কমিটি থেকে তিনি বাদ দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সেটা অনেক দেরি হয়ে গেছে তাই দেশ বাঁচাতে পারেন না। আর এঘটনারই লেজ ধরে শেষে তিনি  নিজেই ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গেছিলেন। বাকশাল ইত্যাদি করে সব ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করে সব সামলাবেন ভেবেছিলেন। খেয়াল করতে হবে, কিন্তু মূলপ্রশ্নটা তো টাকা নয় ডলার সংকট; যা তাঁকে ক্ষমতা সংহত বা কুক্ষিগত করতে পারা না পারার সাথে একেবারেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু তাতে দলের ভিতরেই এটা একটা অংশকে উতসাহিত করেছিল আর সাথে বিদেশিস্বার্থ প্রভাবকেই পরিস্থিতিকে তাদের নিজ দখলে নিতে সুবিধা করে দিয়েছিল।  তাই  দেখাই যাচ্ছে বিএনপিকে “হেফাজত দমনের মত” একটা ম্যাসাকার করে ডলার সংকট মিটবে না। তবু সরকার এটা নিয়েই সিরিয়াস বলে মনে হচ্ছে। যেমন আওয়ামি লীগের অন্যান্য নেতা ও হাসিনার পরিবারের সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্য মুজিবর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেছেন, [প্রথম আলো লিখছে] দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তাতে রাজনৈতিক শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন করা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    আবার খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, “বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধীদের পৃষ্ঠপোষক দল। তারা এখনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করে। বাংলার মানুষ দেশবিরোধী শক্তিকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না”।
    অর্থাৎ আওয়ামি লীগ এবার স্বাধীনতাবিরোধী বলে শক্তি ও সামর্থ্য প্রদর্শন করে বিরোধীদের দমনে মাঠে নামতে চাইছে? তাই কী???

     

    আইএমএফ, এই আশার বাতি জ্বালানোঃ
    সরকার এনিয়ে সব শেষে একটা আশার আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছে; সেটা হল দাতা আইএমএফের টিমের বাংলাদেশ সফর। প্রথম আলো লিখেছে, “৩০ ও ৩১ অক্টোবর এবং আগামী ২ ও ৮ নভেম্বর আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সভার সূচি রয়েছে। ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে গত জুলাইয়ে আইএমএফের কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ, সে ব্যাপারে আলোচনা করতেই দলটি এখন ঢাকায়। আইএমএফের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংস্থাটির এশীয় ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ”।
    আসলে  গত জুলাই মাস থেকেই বাংলাদেশে এটা একেবারে উদাম হয়ে পড়েছিল যে ডলারের অভাব বা একটা রিজার্ভ সংকটে আমরা পড়ে গেছি যেটা আর লুকানো থাকছে না। তখনও অর্থমন্ত্রী ও সরকার অর্থহীনভাবে তা লুকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল যে  না তারা নাকি আইএমএফের কাছে যায়নি। আবার যখন সরকারের আইএমএফ-কে দেয়া চিঠিটাই প্রকাশ হয়ে পড়ল তখন খবরটা স্বীকার করে নিলেও সরকারের আবার লুকোচুরি যে কোন আইএমএফের টিম আসে নাই।  যারা তখন এসেছিল তারা অন্য রুটিন ভিজিটে এসেছে। অথচ এরকম বলে আড়াল করার চেষ্টাটাও ছিল একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া ঐ টিমর সফর থেকে শেষে অর্থনীতি সংস্কারের প্রশ্ন উঠলে মানে এই  প্রস্তাব দিবে আইএমএফ, এটা জানতে পেরে সরকার বলার চেষ্টা করেছিল তারা এখন কোন সংস্কারের পক্ষে নয়। ফলে আইএমএফ ইস্যু চাপা পড়ে যেতে দেখেছিলাম আমরা।

    সেই চাপা পড়া ইস্যু দেখা যাচ্ছে এখন আবার বড় আশার আলো হিসাবে সরকার তুলে ধরতে চাইছে। যেমন  মিডিয়া লিখছে, “…… জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জি এম আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইএমএফ অর্থনীতি ও ব্যাংকের বিভিন্ন সূচক নিয়ে তথ্য জানতে চেয়েছে। তারা কিছু বিষয়ে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত মিলবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সংস্থাটির আরও সভা হবে।’
    এতে শেষের দিকের বাক্য,… “আশা করছি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত মিলবে”। এটা বলাই বাহুল্য অতি আশাবাদ।

    প্রগতিশীলতা ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকঃ
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর প্রসঙ্গ-কথা উঠলেই আমাদের প্রগতিশীলেরা খুব সরব হয়ে উঠেন। ভাব করেন যেন তারা প্রতিষ্ঠানটা বুঝেন। যদিও কেউ সত্যি সত্যিই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর জেনুইন ও কঠোর সমালোচক হতেই পারেন। কিন্তু তিনি যদি প্রতিষ্ঠানটার গ্লোবাল (নেতি বা ইতি) ভুমিকা দূরে থাক ফাংশনারিজ-ই না বুঝেন  এর কাজ ও উদ্দেশ্য বুঝেন তো এই সমালোচক আসলে একজন খামোখা। তারা আসলে  এক আইডিয়াল (ideal) সমালোচক মাত্র। এরা আসলে বাস্তব বা real নয়। হয়ত এথিক্যাল সমালোচক!  সবচেয়ে বড় কথা যেন তারা “গ্লোবাল অর্থনীতি” বুঝেন, এই ভান করেন। একই কারণে এরা কিন্তু ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়াতে যে “গ্লোবাল সিস্টেম” – মানে একটা পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে উঠেছে তা টেরই পান নাই।   আবার অবশ্যই একথা মনে করিয়ে দেয়া মানে গ্লোবাল সিস্টেমটাকে আদর্শ বলা নয় বা মেনে নেয়া নয়। এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন অবশ্যই তোলা যায় এবং সবগুলোই জেনুইন। মানে আরো বদলে নেয়া দরকার আছে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা তখনই বলা সম্ভব বা আপনি বলতে পারেন যখন আপনি জানেন এই সিস্টেমটা আসলে কী ও কেন ইত্যাদি!

    যদিও সবকিছু ছাড়িয়ে তাদের প্রগতিবাদের যে অজ্ঞতা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য তাহল তারা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য জিনিষটাই আজও বুঝতে পারেন নাই। যেন, “দরকার কী” এমন মনে করেন! ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য তো আরো দুরের; তাদের বুঝাবুঝির দুরস্ত! তাদের সাবজেক্টই নয় সেটা।  কারণ আদৌ বাণিজ্য করাই হারাম না হালাল এই প্রশ্নে তারা এখনো বোবা। কিছুই নিশ্চিত নয়।  যদিও তারা শুনেছে ফলে তাদের মন বলতে চায় বা সাহসীরা বলবে  – বাণিজ্য করা হারাম। কারণ এরা বলবে এখানে মুনাফা আছে। আর মুনাফা মানেই তো ‘শোষণ’, সারপ্লাস ভ্যালু ইত্যাদি ইত্যাদি……।
    এখন কেউ যদি গ্লোবাল বাণিজ্য এর গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা বুঝুক বা না বুঝুক তবু স্বীকার করে নেয় তবে এবার আরেক মুখ্য প্রশ্ন সামনে আসবে যে গ্লোবাল বাণিজ্য চাইলে তো একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম – একটা গ্লোবাল ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান সেটা তো লাগবেই! সেটার কী হবে??? বাস্তবে ১৯৪৫ সালের এই প্রতিষ্ঠানটাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। কিন্তু সেকালের কমিউনিস্ট গুরু  সোভিয়েত রাষ্ট্রের স্তালিন মূলত এনিয়ে সিদ্ধান্ত-ই নিতে পারেন নাই। আর তা থেকেই আজকের কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদের এই দুর্দশা! তারা আন্দাজে কথা বলে চলছেন। আসলে অর্থনীতির দিক থেকে বিচারে বললে “স্তালিনিস্ট কমিউনিজম চিন্তা” এটা এক উগ্র ন্যাশনাল ইকোনমি চিন্তা।  কিন্তু কী অর্থে ন্যাশনাল বলছি? এই চিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট হল এটা একটা নিজ রাষ্ট্রসীমার মধ্যেই অর্থনীতি ও বিনিময় এই সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে এমন কল্পনা। সোজা করে বললে, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যাপারটাই দরকার হবে না বা নাই। সেকারণে ও এভাবেই স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের ‘ব্রিটনউড সম্মেলনে’ যোগ দিয়েও পরে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ আর নেন নাই। আর স্তালিন সবচেয়ে বড় অন্যায় করেছেন তিনি তার এই সিদ্ধান্তের কারণ কোথাও ব্যাখ্যা করেছেন জানা যায় না। পরিণতিতে  ১৯৯১ সালে এসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে ভাঙ্গা ১৫ রাষ্ট্রের টুকরা (রাশিয়াসহ) সকলেই আই-এমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল। এবং সেটাও কোন কারণ ব্যাখ্যা করা ছাড়াই। সেই থেকে বুঝি আর নাই বুঝি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিপাত যাক – এটাই হয়ে আছে প্রগতিবাদি শ্লোগান।

    কিন্তু এসব আলাপ তুলছি কেন?
    উপরের প্রসঙ্গ এনিয়ে বিস্তারিত আলাপ করতে হবে। এত ছোট পরিসরে তা অবশ্যই  হবে না। কিন্তু এখানে এখন বাংলাদেশের রিজার্ভ বা ডলার সংকটের আলাপের সাথে এসব আলাপের প্রাসঙ্গিকতা কী?
    প্রাসঙ্গিকতা হল, হাসিনা সরকারের “আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাবার” যে আশাবাদ রেখেছে তা বাস্তবে দেখতে পাবার সম্ভাবনা খুবই কম।  ফলে আওয়ামি ঘরানা থেকে এনিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  এর  ছোট বা বড় সমালোচনা উঠা সম্ভবত আমরা দেখতে যাচ্ছি। কিন্তু এটা যদি হয় তখন এই সুযোগে অবুঝ প্রগতিবাদের একটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমালোচনা ইতোমধ্যেই উঠেছে সেটা আরো বড় হবার সম্ভাবনা। তাই আগাম সাবধান করা। আর সেখান থেকে “বিকল্প দেখাও” এর দিকে আলাপ চলে যাবার সম্ভাবনা, আওয়ামি-প্রগতিবাদি এমন সাফাই দেখব হয়ত। দেখা যাক!

    তবু একটু অন্য প্রসঙ্গেঃ  এখানে আমরা লক্ষ্য করছি যে আইএমএফ নিয়ে সরকারে যে আশাবাদ তৈরি করা হচ্ছে তাতে বহু ভুল বুঝাবুঝি আছে। যেমন, আসলে আইএমএফ যদি সরকারের সাথে সব ব্যাপারে একমত হয়ও তাহলেও বাংলাদেশ যা পাবে তা হল বছরে মাত্র দেড় বিলিয়ন ডলার, এভাবে তিনবছরে মোট সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার। এটা পরিমাণে খুবই কম। আমাদের এক মাসের ঘাটতি পূরণের দিক থেকে যদি বিচার করি তো এটা তারও অর্ধেকও না!
    সারকথায় এটা বাংলাদেশের ডলার সংকট মিটানোর পরিমাণের দিক থেকে অপ্রতুল অবশ্যই। কিন্তু আইএমএফ টিমের এই সফরের মুল্য অন্যখানে। সেটা হল আইএমএফের এই সফর প্রক্রিয়াটা হল,  গ্লোবালি সারা বিনিয়োগ-পুঁজি বাজারকে আশ্বস্ত করা যে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অবস্থাটা ঠিক কী কেমন তা একটা বিস্বস্ত ও বাজারের আস্থার  প্রতিষ্ঠান আইএমএফ পরীক্ষা করেছে। তাই এই প্রতিষ্ঠানের রেকমন্ডেশন থেকে যেন বাজার আস্থার সাথে বুঝে নেয়, নিতে পারে যে নতুন করে বাংলাদেশকে বিনিয়োগ বা ঋণ দেয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ কতটা যোগ্য। সেখানে দাতাদের কী কী সতর্কতা লাগবে।  তাই আইওএমএফের এই সফর আসলে গ্লোবাল বাজারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে পরীক্ষা যে সংকটের ধরণ ও গভীরতা পরীক্ষা করে নেয়া আর সে অনুযায়ী নতুন করে যে চায় সে অর্থনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর সুযোগ নেয়া বা নিতে পারে।

    চিবিয়ে খাইনিঃ
    কালচারাল অর্থে এটা হাসিনার দিক থেকে খুবই আনফেয়ার প্রতিক্রিয়া। জনগণের জানার অধিকার আছে, একথা মনে রাখলে কোন সরকারের এমন প্রতিক্রিয়া অগ্রহণযোগ্য। এখন কালচারাল আর অধিকারের দিক ছেড়ে অন্যদিকে আসি।  এখানে প্রসঙ্গ দুইটা।
    একঃ রিজার্ভে ডলার কত আছে তা দেখানোর যে ফরমাট আইএমএফ-এর স্টান্ডার্ড ফরমাট – তা আইএমএফের সদস্য যেকোন রাষ্ট্র বা সরকার অনুসরণ করে চলতে বাধ্য। এটা সদস্যপদ লাভের পুর্বশর্ত ছিল। সদস্য হবার আগেই তা বুঝতে পেরেছি বা বুঝে নিয়েছি কিনা তা স্বীকারপত্র দিতে হয়েছিল। কাজেই এখন “আমার স্টাইল আলাদা” বলে কোন অজুহাত তোলা মানে সরকার নিজেকে নাদান ও সাব-স্টান্ডার্ড করে হাজির করা হবে। এটা কাম্য নয়।
    দুইঃ “নিজের টাকায় করব”। জাতিবাদি শুরশুরি খুবই ভয়ঙ্কর জিনিষ। তাই নিজের টাকায় ব্রীজ করব – এটা খুবই আত্মঘাতি জাতিবাদি শুরশুরি। আমাদের মত দেশ কেবল এই প্রথম, কোন কোন মাসে বাড়তি কিছু ডলার (টাকা নয়) ইতি ব্যালেন্স জমাতে পারি এমন অবস্থা তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এর মানে এই না যে আমরা একটা পায়রা বন্দর নিজের জমাকরা ডলার দিয়ে বানাতে পারি – এমন অবস্থায় পৌছিয়েছি। এটাই এখন প্রমাণিত। আমরা আমাদের সঞ্চিত রিজার্ভ থেকে ডলার নিয়ে (এটা বাংলাদেশি টাকা না)  অবকাঠামো নির্মাণে যাবার মত সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পৌছিয়েছি – এটা সত্য না। অথচ আমাদের সরকার একাজই করেছে। এছাড়া সরকার বারবার এটা ডলার না বলে নিজের টাকায় করেছি বলে একটা জাতিবাদি শুরশুরি তৈরির চেষ্টা করছে। কেন?
    প্রশ্ন আরো আছে। পায়রা বন্দর নির্মাণ কেন জরুরি? না নির্মাণ করলে আমাদের কী ক্ষতি হত? আমাদের জানা নাই। সরকার বলতে পারে নাই। এছাড়া আরো বড় প্রশ্ন এর ভায়াবিলিটি বা এই প্রকল্প নেয়া সঠিক হয়েছে কিনা!!! জায়গা ঠিক কিনা? প্রকল্পের বিনিয়োগ আয় থেকে ফিরে আসবে কিনা? ইত্যাদি নানান উত্তর পজিটিভ কিনা।
    এই বন্দর নির্মাণ আসলে ছিল অনুচিত। এর ইকনমিক ভায়াবিলিটি ছিল কী? যেখানে এ্টার টেকনিক্যালিই ভায়াবিলিটি নাই। মূল কারণ এর নাব্যতা নাই। মানে স্থান নির্বাচনই সঠিক নয়। কারণ একে চালু রাখতে গেলে সারাবছর পলি সরানো ড্রেজিং ব্যাপকভাবে চালু রাখতে হবে। স্থান নির্বাচনই সঠিক হয় নাই। এসব নিয়ে খোদ ততকালীন অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত নিজেই নিজের আপত্তির কথা তুলেছিলেন।
    অবস্থা এখন দাড়িয়েছে এই যে আমাদের তেল-গ্যাস আমদানির ডলার নাই অথচ আমরা এই অচল পায়রা বন্দরে টাকা নয় ডলার ঢেলে চলেছি, কেন?  আজ কোথায় ভারতীয় বিনিয়োগ? নেদারল্যান্ডের বিনিয়োগ? এটা নাকি সোনাদিয়ার বিকল্প হবে? অথচ পায়রা বন্দরের গভীরতা মানে কত বড় জাহাজ নোঙর করতে পারবে – তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরের নিচে। আমরা জানি না এই নন-ভায়াবল এক প্রকল্প কেন?  কেন এটা এসেনশিয়াল অতি জরুরি? সবচেয়ে বড় কথা এই প্রথম কেন আমরা মজুদ থেকে এই প্রকল্প খরচ করব?

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    গৌতম দাস
    ০৪ অক্টোবর ২০২২;  Published on: Oct 4, 2022 at 00:03

    https://wp.me/p1sCvy-4fr

     

      External Affairs Minister S Jaishankar with United States Secretary of State Antony Blinken in Washington DC on Tuesday | ANI

    সরাসরি বললে, এতদিন এশিয়ায় এক মুখ্য (পুরানা) মেরুকরণ বিরাজ করছিল যেটার শুরু মোটাদাগে বললে চলতি শতকের শুরু থেকে। কিন্তু চিনব কী করে?  বাংলাদেশের গত ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু হওয়া আর পরিণতিতে ভারত-আমেরিকার বসিয়ে দেয়া হাসিনা সরকারকে আমরা অনেকে যেভাবে চিনি আর এটাই হল সেই মেরুকরণের ফলাফল বা ফসল। তাই পুরানা সেই মেরুকরণ বলতে বুঝিয়েছি বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকারকে। অর্থাৎ এই মেরুকরণে মূল বৈশিষ্ট ছিল যে পরিণতিতে এতে ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা জায়গা নিয়েছিল একই মেরুতে।  আজ সেই মেরুকরণ এখন ভেঙ্গে পড়ার মুখে; অন্তত আজ ৩ অক্টোবরের সকালের খবর পর্যন্ত; তা খুবই দ্রুত আগিয়ে যাচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষগুলোরই ভাষা ও ভাষ্যও ক্রমশ বদলে যাচ্ছে!  তবে অবশ্যই এটা তা ভেঙ্গে-গড়া ধরণের। তাই আবার গড়তে বড় আরেক নয়া মেরুকরণ ঘটা শুরু হয়েছে; সেটা ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। যদিও এর বড় ও স্পষ্ট প্রকাশটা ঘটতে আরেকটু সময় নিচ্ছে।

    মুখ্য তবে পুরানা মেরুকরণ এর বৈশিষ্ট কী ছিলঃ
    ঘটনার পিছনের দিক থেকে তাকিয়ে বললে, এর জন্ম জর্জ ডব্লিউ বুশ [George Walker Bush] বা জুনিয়র বুশের হাতে যার দুই টার্মের প্রেসিডেন্সি হল ২০০১-২০০৯, এই সময়কালে। তাতে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের নয়া যুগের সুচনা করেছিল। দু-এক বাক্যে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার (১৯৫৩-৬১) [Dwight D. Eisenhower] এর আমলে (১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে তাঁর প্রথম ভারত সফর), ততদিনে যিনি “সিআইও পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশে সরকার ফেলানো” কুখ্যাত অভ্যাস চালুর নায়ক; এভাবে প্রথম “ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক” শুরু হয়েছিল সেই ১৯৫৯ সাল থেকে। যদিও ১৯৬২ সালের পর থেকে তা আর ভারতের জন্য সুখকর থাকে নাই। মুল কারণ দুটা।  একদিকে আমেরিকার হয়ে নেহেরুর ভারতের চীনে (তীব্বতের দালাইলামার দেশছেড়ে পলায়ন ও ভারতে আশ্রয় ইস্যুতে) ততপরতা ও আমেরিকার খেদমত করতে গিয়েছিলেন বলে (মনে করা হয় এটাই আইসেনহাওয়ার-নেহেরুর ১৯৫৯ সালের গোপন চুক্তি ); আর তাতে ক্ষুব্ধ চীনের হাতে ১৯৬২ সালে আসাম বেদখল ও মার খাওয়া ছিল ভারতের জন্য খুবই খারাপ অভিজ্ঞতা।
    আর এছাড়া অন্যদিকে পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে  মূলত, ভারত-পাকিস্তানসহ ছোট দেশগুলো যাতে নিজেরাই পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ বা তৈরিতে না আগাতে পারে তাই, আমেরিকা-সোভিয়েত এই ইস্যুতে এক এলায়েন্স করেছিল; আর তাতে যৌথভাবে নানান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল (যা শেষে NPT বা নন প্রিলিফারেশন চুক্তি পর্যন্ত হয়েছিল। এই NPT  চুক্তি ছিল আসলে, UN এর অধীনে এই চুক্তি সদস্যদের স্বাক্ষরের জন্য ওপেন করা হয় ১৯৬৮ সালে আর কার্যকর হয়েছিল ১৯৭০ সাল থেকে।) – আর এদুই ঘটনা থেকে পরবর্তিতে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই ঝুলে যায়, প্রায় ভেঙ্গে পড়ে। যা আর সতেজ থাকে নাই।
    তাই এর প্রায় ত্রিশবছর পরে  আর ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতোমধ্যে (১৯৯১ সালে) ভেঙ্গে যাবার সুবিধা নিতে, একমাত্র গত শতকের নব্বইয়ের দশকেরও শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার চালু করতে এবার দুপক্ষ আগ্রহি হয়েছিল। যদিও তা ২০০০ সালের জানুয়ারিতে বিল ক্লিনটনের ভারত সফরে ও তাঁর হাতে তবে ‘সুশীলভাবে’ ঘটেছিল;  আর ক্লিনটনের বিপরীতে তখন ভারতের বিজেপির বাজপেয়ীর প্রথম পুর্ণ প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৯-২০০৪) জমানা ছিল সেটা।

    তবে ভারত-আমেরিকার সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল  পরস্পরের পিঠচুলকানোঃ
    আর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ২০০১ সেপ্টেম্বর নাইন-ইলেভেনের পরে তা মূলত উভয়ের  “মুসলমান কোপানো” সুবিধা নিতে তারা ‘জঙ্গী’ বয়ান খাড়া করে এরই মারামারি যুদ্ধের সম্পর্ক হিসাবে। আর তা প্রথম রূপান্তরিত হয়েছিল বুশের হাতে ওয়ার অন টেরর এর পলিসির অধীনে।  অর্থাত নয়া চলতি শতকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এর মুখ্য দিক বা ফোকাস ছিল আসলে এক ‘মুসলমান কোপানো্র’ এলায়েন্স। যেটা তাদের উভয়ের জন্য দরকারি ছিল এজন্য যে ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে ভোটে কারচুপি করে এথেকে সৃষ্ঠ ক্ষোভে কাশ্মিরের মুসলমান জনগোষ্ঠিকে প্রথমে কংগ্রেস পরে বিজেপির বাজপেয়ী আরও সুচারুভাবে সেই প্রথম সশস্ত্রতার দিকে ঠেকে দেওয়াতে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলা। আর ওদিকে আমেরিকার দিক থেকে দরকার তাদের “ওয়ার অন টেররের পলিসির” পক্ষে ভারতের সম্মতি আদায় – এদুই স্বার্থের এলায়েন্স ছিল সেটা। পরবর্তিতে, আরো এগিয়ে ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফরের ফলে, তা হয়ে দাঁড়ায় এমন যেটাকে বলা যায়,  ভারত আমেরিকার হয়ে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ বা ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেওয়া সম্পর্ক। এটাই ভারত-আমেরিকার প্রথম ঘোরতর চীনবিরোধি এক স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স ছিল। যা এবার সম্পুর্ণ উলটা দিকে টার্ণ নিতে শুরু করেছে আর এবার এই ২০২২ সালের শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার ভাঙ্গাচুড়ে, এক নয়া মেরুকরণ হতে যাচ্ছে। কোন কোন ইস্যু বা ক্ষেত্রে তা ইতোমধ্যেই  প্রবলভাবে শুরু হয়ে গেছে।

    ভারতের উপর আমেরিকার এবার প্রথম স্যাংশন জারি শুরু হয়েছেঃ
    ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এবারের প্রকাশ্যে  ঢলে পড়ার ঘটনাটা হল, এই প্রথম ভারতের উপর আমেরিকার স্যাংশন জারি। যেমন, ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া দ্যা প্রিন্ট এর এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে – লিখেছে  “জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরের পরেই, আমেরিকার প্রথম এক ভারতীয় কোম্পানির উপর, ইরানি তেল আমদানির সম্পর্ক করার জন্য, স্যাংশন আরোপ” [Days after Jaishankar visit, US imposes first-ever sanction on Indian firm for oil trade with Iran]।

    অর্থাৎ এর আগে ভারতকে দেয়া আমেরিকার বাণিজ্যিক সুবিধাসহ বিভিন্ন ফেবার পরে ছাটাই হতে হতে ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছিল সেই ট্রাম্পের আমল (২০১৭) থেকেই। তবু ভারতের কোর কিছু স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক  সে আমেরিকার সাথে বজায় রেখে চলছিল। এমনকি ট্রাম্প আমলের (২০১৯) শেষে যখন ইরান-আমেরিকান পারমানবিক চুক্তি সে [Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA)] ভেঙ্গে দিলে এরপরে ইরানের উপর নতুন করে স্যাংশন আরোপ করা হয়েছিল। আর তাতে ট্রাম্প ২০১৯ সালে ভারতকে ইরান থেকে সেবার তেল আমদানি বন্ধ করতে বাধ্যও করতে পেরেছিল। এছাড়াও একালে কোয়াডের ভিতর নানা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নিয়ে বাইডেন প্রকাশ্যেই সমালোচনা করে যাচ্ছিল। ভারতে মোদির “মুসলমান কুপিয়ে নির্বাচনে জিতার” কৌশল নিয়ে বাইডেনের ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন’ স্যাংশন আরোপের সুপারিশ করে চলছিল লাগাতর। বাইডেন সেটা নিয়ে সাবধান করেছেন এমনকি, কাশ্মীরে মোদির নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু স্যাংশন আরোপ করতে পারেন এমন ধারণা দিলেও বাইডেন এর আগে কখনও তা বাস্তবায়ন করেন নাই। অর্থাৎ প্রকাশ্য মুখে সমালোচনা করলেও বাইডেন প্রশাসন কখনও চরম পদক্ষেপ হিসাবে ভারতের উপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোন স্যংশন আরোপের মত ঘটনা ঘটান নাই।

    ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরও আমেরিকান স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা খাওয়া রাশিয়া থেকে এতদিন ভারত তেল ও অন্যান্ত পণ্য আমদানি করে চলেছিল। তাদের গরীব অর্থনীতির দোহাই দিয়ে। এসব নিয়ে প্রকাশ্যে আমেরিকা আপত্তি বা অসন্তোষ জানালেও কখনই আমেরিকান পদক্ষেপ স্যাংশন আরোপ পর্যন্ত  গড়ায় নাই। কিন্তু এবার একই কাজ মানে ইরানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এবং তা একটা ভারতীয় বেসরকারি কোম্পানি আমদানি করাতে আমেরিকা এবার সেই কোম্পানির উপর প্রথম আমেরিকা সরাসরি স্যাংশন আরোপ করেছে।

    আমেরিকার এই এক্টের মধ্যে দিয়ে একটা নিশ্চিত ম্যাসেজ হল, আমেরিকা তার আপত্তিসহ-ই রাশিয়া থেকে ভারতকে তেল আমদানি এলাও করলেও ইরান থেকে একই কাজ ভারত করতে চাইলে কঠোরভাবে তা দমন করবে তা বুঝিয়ে দিল।

    ওদিকে এনিয়ে মিডিয়া রিপোর্ট হল, এত পরেপরেই এবার জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরে গত সপ্তাহের ২৭ সেপ্টেম্বরে ব্লিঙ্কের সাথে তাঁর বৈঠকে এসব বিরোধ নিয়ে ঠিক কী আলাপ হয়েছিল এর বিস্তারিত সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে, ভারতীয় মুখপাত্র জানান নাই। তাঁর “জানা নাই”, অজুহাতে। অর্থাৎ অনুমান করা হচ্ছে ভারতের মোদি সরকারকে এখন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক নিয়ে” কিছু তিতা সিদ্ধান্ত আর না নিলেই নয় – এমন অবস্থায় পৌছেছে। আগামি দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে এর চিহ্ন-ইঙ্গিত আর অপ্রকাশ্য থাকবে না।  আসলে এবারের জয়শঙ্করের সফরের পরে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক যে আর  অপ্রকাশ্য-বিরোধ হয়ে হাজির না হয়ে থাকবে না, এরই প্রবল অনুমান করা হচ্ছে। কারণ, কোন সম্পর্ক আরো কিছুদিন ইতিবাচক থাকার সম্ভাবনা থাকলে সেটা এতদিন প্রকাশ্যে এসে পড়ত।

    সম্পর্কবিরোধটা শুধু তেল আমদানি, অনেক গভীরেরঃ
    আসলে সম্পর্কবিরোধটা তো শুধু তেল আমদানি নিয়ে নয়; বরং সর্বত্র ও সব ইস্যুতেই। যার আরেক বড় প্রকাশ হল, আমেরিকান বার্মা দখলের খায়েস-পরিকল্পনা। যেটা নিয়ে আগের সপ্তাহে লিখেছি। বলেছিলাম ভারতের কোরস্বার্থ হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনথ ফ্লিট নোঙর না করতে দেয়া আর এরই সাথে সর্বোতভাবে ” হবু “আমেরিকান বার্মা দখলের” বিরোধিতা করা। মানে কোন ‘বাইডেনের বার্মা’ দেখতে ভারতের না চাওয়া, এমনকি চীনের কোলে উঠে হলেও এর যতটা সম্ভব সরাসরি প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা।
    আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি, তিন সপ্তাহ আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর লাদাখ সিমান্তে চীন-ভারত ২০২০ সাল থেকে উভয় পক্ষ যে সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে রেখে ছিল এর অবসান ঘটিয়েছে উভয় পক্ষ। ভোজবাজির মত উভয়ের সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।  এমনকি চীন-ভারত কতটা কাছাকাছি চলে গিয়েছে আর তাতে ভারত কত মরিয়া হয়ে ছাড় দিচ্ছে এর এক প্রমাণও হাজির হয়েছে। এরপরেই গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ছিল এসসিও (SCO) বার্ষিক সভা; সেখানে চীন এক আলোচনায় বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে এমন এক ম্যাপ দেখিয়েছে যেখানে ভারতের দাবির খোদ লাদাখ ও অরুনাচল প্রদেশকে চীনের অংশ বলে দেখানো হয়েছে তবু মোদির ভারত কোন আপত্তি তুলে নাই – ভারতে বসে এনিয়ে অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। এনিয়ে ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনামঃ
    “ভারতের মানচিত্র থেকে বাদ অরুণাচল, লাদাখ! এসসিও-তে ‘চিনা–কীর্তি’ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে” [লিঙ্ক পেতে এখানে ক্লিক করেন]

    আসলে, এখন যেভাবে আমেরিকার এমন খায়েস-পরিকল্পনা প্রকাশিত হচ্ছে এসবই চলতি শতকের শুরুতেও আগে থেকেই আমেরিকার ছিল। কিন্তু শতকের শুরুতে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক কাজ করতে শুরু করাতে, বিশেষত – ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা’ কাজ করছিল বলে আমেরিকার সেইসব খায়েস লুকিয়ে বা তুলে রাখা হয়েছিল তখন।  কিন্তু বর্তমানে  আমেরিকান বার্মা দখলের পরিকল্পনা আমেরিকা আর লুকিয়ে রাখতে চাইছে না। আর ওদিকে এই পরিকল্পনার পালটা পদক্ষেপ হিসাবে রাশিয়া-চীন-ভারত এক অঘোষিত মেরুকরণে রাশিয়াকে সামনে রাখতে ভারত-চীন আগ্রহি বলে আর রাশিয়ার বার্মার শাসকদের সাথে এলায়েন্স গড়াতেই বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ছিল।

    আসলে কার্যত সবমিলিয়ে এতেই ‘নয়া মেরুকরণ’ আর অপ্রকাশ্যে রাখাতে সবপক্ষই অক্ষম হয়ে পড়ছে। আর এরই প্রথম বলি হয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক। সে কারণেই এসব আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে এসব আর আলামত হয়ে থাকবে না। প্রকাশ্য চিহ্ন-ইঙ্গিতেও নয়, বরং প্রকাশ্য নয়া মেরুকরণ, নয়া জোট হিসাবেই তা হাজির হতে যাচ্ছে।
    আর তা দেখার জন্য আমাদেরকে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। আসলে ইতোমধ্যেই মূল আমেরিকা-চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের পালা বদলের লড়াই – এরই অংশ হিসাবে চীনা পক্ষের সম্ভাব্য মেরুকরণের মহড়াটা হয়ে গেছে এসসিও (SCO) বা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন এর  গত-মাসের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন থেকেই।

    তা সত্বেও এর বিপরীতে বাইডেনের আমেরিকা আর কোন দেশকে নিজের পক্ষে পেতে যাচ্ছে – বিশেষত ইইউ বা ইউরোপ কী বাইডেনের পক্ষে থাকতে পারবে কিনা এবং খোদ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বাইডেনের কী নিয়ন্ত্রণ থাকছে না বাইডেনের হাত গলে তা বাইরে চলে যাচ্ছে – এসব কিছুই তা আগামি ডিসেম্বরেরই ফয়সালা হয়ে যাবে। খুব সম্ভবত নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তা ফুটে উটতে শুরু করবে।  আর তা অবশ্যই প্রকশ্যে; মানে গ্লোবাল মেরুকরণের আর কোন কিছুই অপ্রকাশ্য থাকবে না। যেমন,  ইউক্রেন যুদ্ধ এবার (নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে) শেষ হবে কিনা এবং তা, কোন মেরুকরণে তাও এবার নির্ধারিত হয়ে যাবে প্রকাশ্যেই, নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে।

    কিন্তু এতে বাংলাদেশে কীঃ
    বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনাটা হল, গ্লোবাল রাজনৈতিক এই ঘটনাগুলোর পরিণতি বা ফলাফলে, বিশেষ করে নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ তা বাংলাদেশে বড় প্রভাব ফেলবে। যদিও বাংলাদেশের চলতি ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠা রাজনৈতিক মোচড় ও গত পনেরা বছরের শাসন ঘটনাবলির একটা বড় অংশই মূলত লোকাল ঘটনা। তবু এই লোকাল ঘটনা্য়র মধ্যে এতদিন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ছিল এক বড় নির্ধারক উপাদান। তাই আমেরিকা-ভারত “সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” একেবারে ভেঙ্গে পড়া ও নয়া মেরুকরণের দিকে রওনা এর নিট ফলাফল হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের আলগা মাতবরি ও প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। এবং তা ইতোমধ্যেই সেদিকে রওনা দিয়েছে। সেটা সম্ভবত ২০০৭ সালের ১/১১ এর আগের বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের জায়গায় ফিরে যাবে। অনেকে তাই দোরাইস্বামীর গতমাসের বিদায় ভাষণ কে স্মরণ করছেন; যেখানে তিনি বলছেন, বাংলাদেশে “ভারত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পাশে নেই” বা সাথে ছিল না। এর গুমোর ‘অর্থ’ বের করার চেষ্টা করছেন অনেকে।  সারকথায় বললে, আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা শুন্য হয়ে গেলে আর বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বা গুরুত্বমূল্য আর কই থাকে?

    তবু শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারত চেষ্টা করবে পুরানা কায়দা বজায় রাখতেঃ
    কিন্তু সাবধান শেষদিন পর্যন্ত ভারতের চেষ্টা বজায় থাকবে। কিন্তু কি করে বুঝব সেটা বজায় থাকার চেষ্টা করছে? সর্বশেষ সুলতানা কামালের লেখা যা প্রথম আলো ছেপে দিয়েছে – এটাই ঢলে পড়া পুরাতন ভারতের শেষ উঠার চেষ্টা। আমেরিকার স্যাংশন আরোপ আগামি ১০ ডিসেম্বর ২০২২ একবছর হবে। আর আলামত হচ্ছে সম্প্রতিকালে হাসিনার ক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আর একাজে সম্মুখ সারির মিডিয়ার ভুমিকায় আগের মতই প্রথম আলো। এমনকি এই ততপরতা ইউক্রেন যুদ্ধের আমেরিকান প্রপাগান্ডা পর্যন্ত বিস্তৃত করে রেখেছে; অনেকে এটাকে প্রথম আলোর একেবারে উদাম হয়ে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া হয়ে উঠার লক্ষণ হিসাবে দেখছে।
    যদিও মিডিয়া হিসাবে নিজের বেছে নেওয়া প্রথম আলোর কোর-ভুমিকা হচ্ছে ইন্ডিয়ান স্বার্থরক্ষা যেটাকে, সে আবার প্রগতিশীলতা, সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা বা অসাম্প্রদায়িকতা এসব শব্দের আড়ালে করে থাকে। কিন্তু  এখন সে যেন প্রো-আমেরিকান ভুমিকাটাকে এর উপরে রেখে চলছিল। এসব কথাগুলো গোয়েন্দা-পরিভাষায় বলা হয়, এতবছর সিআইএ র-কে আপারহ্যান্ডে রেখে নিজের কাজ চালাচ্ছিল। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২১ স্যাংশন ঘোষণা দিয়ে সিআইএ নিজেই যেন নিজেকে আপারহ্যান্ডে উঠিয়ে নিয়েছিল। আর এখন? fall apart ! অর্থাৎ এক বছর না যেতেই এটা এখন ধর্ম ও স্বার্থ যার যার অবস্থায়!!  “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়া যেটা এতক্ষণ উপরে আলচনা করেছি তা যেন সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়ে পড়েছে “এখানে”।  আর এর ঢলে পড়া বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাব – এথেকেই পালটা আবার উঠে দারানোরই এক উদ্যোগ প্রচেষ্টা হল সুলতানা কামালের ততপরতা, আর প্রথম আলোর এর পক্ষে দাঁড়িয়ে মরিয়া হয়ে সহায়তা দেয়া।
    মূলত ইডেনের “সেক্স  স্লেভারির ঘটনা” হাসিনা ও লীগের মরাল ভিত্তিতে প্রবল আঘাত হেনেছে। যেটা ক্ষমতাচ্যুত হবার আগেই যেন লীগের মরালি-চ্যুত হয়ে পড়া। আর একাজে লীগকে সহায়তা দিয়ে বিনিময়ে ভারত নিজের ঢিলা হয়ে পড়া ক্ষমতা আবার খাড়া করতেই এই সুলতানার প্রচেষ্টা। তিনি প্রবল চেষ্টা করেছেন ঘটনার দায় বিওএনপির উপর যতটা সম্ভব চাপিয়ে দিতে। এমনকি সুলতানার কাছাখোলা  সর্বশেষ প্রচেষ্টাটা এবার আর প্রথম আলোর পক্ষ কাঁধ দেয়া সম্ভব হয় নাই। তাই ভারতের প্রো-মোদি এক মিডিয়া ইন্ডিয়া টুডে সে দায় নিয়েছে। যাতে আমেরিকার কাছে বাংলাদেশে হারানো ভারতের প্রভাবেই অন্তত কিছুটা ভারত ফিরে পায়! কিন্তু এর পরিণতি হল সুলতানাকে এখন থেকে বাকি জীবন পাবলিক লাইফে নেপথ্যে বা বাইরে কাটাতে হবে। আর তিনি হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কেউ না, আসলে ছিলেনও না এটাই এখন উদাম হয়ে গেল!! এত দ্রুত, অবিশ্বাস্য!!!
    তবে এই পতনের মূল জায়গাটা হল, “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়াকে পড়তে ব্যার্থ হওয়া। সুলতানা যে একজন ‘পুর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’ ছিলেন তা তাঁর জীবন সায়হ্নে এসে উদাম হয়ে গেল!

    মূল সমস্যা “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” পড়তে ব্যার্থতাঃ
    এমনই আরেক চরম ব্যর্থতার ঘটনা দেশের ভিতরেই ঘটেছে। দেশের ভিতরেই আমরা দেখছি হাসিনার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় যারা তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আর সেকথাটাকে প্রথম আলোর রিপোর্টের ভাষায় বললে, “বিএনপিকে থামানোর পথ খুঁজছে আ.লীগ”। এই হল বাস্তবতা। অথচ দেখা যাচ্ছে অনেক তুলনামূলক ছোট রাজনৈতিক দল এই ফেনোমেনাটা পড়তে জানে না।  বলে এখন  এই শেষ জীবনে এসে আবার এদের অনেকে ভারতের সহায়তা পেতে চেষ্টারত; লিঙ্ক যোগাড়ের চেষ্টায় রত। তাদের বোকা আকাঙ্খাটা হল, ভারত যদি তাদের দলীয় রেজিষ্টেশন ইত্যাদি কোন সরকারি ফেবার পেতে সহায়তা করে তাহলে এটাই তাদের নিজদলের স্বার্থ হবে।  আগামি হবু নির্বাচনে এভাবেই তারা নিজ স্বার্থটা  বলে বিশ্বাস করছে। এদেরকে নিয়ে কী বলা যায়??
    তার মানে লীগ যেখানে নিজ ক্ষমতা ধরে রাখার অন্তত চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে এই দলগুলো সেখানে তা দেখতেই পাচ্ছে না। শুধু তাই না, ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভাটাতে হওয়া সত্বেও এরা হাসিনার বাংলাদেশের উপর মোদির প্রভাব অটুট দেখতে পাচ্ছে!! তাদের প্রাণপণে ভারত লবি খুঁজার কথা জেনে-দেখে  বুঝা যাচ্ছে তাদের নাদানি কত গভীর!!! তারা শেষে এই ২০২২ সালে এসে প্রাণপণে ভারতের দালালি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তারা জানেই না যে কোন সম্পর্কই আর আগের জায়গায় নাই; তা না থাকারই কথা! না গ্লোবাল রাজনীতির মেরুকরণের দিক না এটা একান্তই এর স্থানীয় রাজনীতির দিক। সে কেবল ভাল লবি খুজে ভারতের সেবা করে নিজের স্বার্থ অর্জন করতে নেমেছে!!! অদ্ভুত তাদের বুঝাবুঝির ভিত্তি!!
    রাস্তার আন্দোলন বা উদ্যোগ কোথায় পরিণতি বা ফলাফলে পৌচাচ্ছে তা দেখতে একটু অপেক্ষা করতেও তারা রাজি না। আবার ভারতের কাছে যা চাইতে নেমেছে তা মিনিংফুলি ভারতের দেওয়ার ক্ষমতা আছে কিনা তা চেক করতেও তারা রাজি না!! এই হল বাংলাদেশের কিছু রাজনীতিক!

    তাহলে এখন শুরুর  কিছু কথা আবার মনে করিয়ে শেষ করব।  বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকার এর অর্থ হল এতে যে গ্লোবাল মেরুকরণের ইঙ্গিতটা ছিল তা হল – ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা একই মেরুতে জায়গা নিয়েছিল। এখন বাংলাদেশের রাজনীতিক যারা  “এই মেরুকরণ”কে একেবারে স্থায়ী বলে মনে করবে; তারা রাজনীতি করার অযোগ্য যারা ধরে নিবে যে শুধু তাই না,  যারা মনে করবে ভারতের সাথে লবি করলে তবেই আমাদের সরকারের থেকে কিছু সুবিধা পাবার পথ এবং এই পথ স্থায়ী!!!সবশেষে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কটা কত দ্রুত গতিতে ভেঙ্গে পড়ছে তা বুঝতে সহায়ক এই রিপোর্টটা আগ্রহিদের পড়ে দেখতে রেফার করব। এটা ভারতের দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখা। তিন অক্টোবর সকাল আটটায় তা প্রকাশিত, ফলে তা লেটেষ্ট। বাংলাদেশের ভাষায় বললে তিনি ফরেন বিটের সাংবাদিক। তবে আমি নয়নিমাকে গণ্য করি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যেন সেই অ-সরকারি মুখপাত্র যার মুখ দিয়ে মন্ত্রণালয় নিজের মনের খায়েসের কথাগুলো বলে থাকে, যা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিজমুখে প্রকাশ্যে নানা সীমাবদ্ধতায় বলা সম্ভব নয়। তবে, এখানে নয়নীমা যেন ধরে নিয়েছেন ভারত-আমেরিকার পুরান সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে!! এভাবেই লেখা!! আর এলেখা থেকে  পরিস্কার যে ভারত আর দুইনৌকায় পা-দিয়ে চলতে পারছে না। তাকে কোন একদিকে অবস্থান নিতেই হবে; মূলত আমেরিকা তাকে এঅবস্থায় দিকে ঠেলে দিয়েছে। এবং ইঙ্গিতে বলা অবস্থান হল চীন-রাশিয়ার দিকেই ভারতের সম্ভাব্য অবস্থান, যেমন এই রিপোর্ট লিখছে, এরকমঃ

    .…..well set the tone for the next meeting of Quad, but India — a neighbour of Beijing
    and a strategic partner of Moscow.….. 

    আমরা চীনকে ভারতের এই “পড়শি” বলে সম্বোধন এর আগে দেখেছি বলে মনে পরে না। এটাই কী এখন থেকে ভারতের চীন-ঘনিষ্ট হবার ইঙ্গিত!! কারণ, এতদিন তো চীনকে  ভারতের মিডিয়া ভারতের শত্রু বলেই আমাদের কাছে পরিচিত করিয়ে গেছে! যেকারনে, এখনো ভারতের পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে চীন তাদের শত্রু দেশ। চীনের যেকোন কিছুই তাই ভারতের পাবলিক মাইন্ডে এখনো ঠাট্টার বস্তুই। তাহলে দাড়াচ্ছে যা তা হল, এটা ভারতের জন্য – কে ফ্রেন্ড আর কে এনিমি – তা রি-ডিফাইন করার জটিল বা উভয় সঙ্কটের সময়!  আর এর সাথে যায় এমন নতুন সেসব কিছু নয়া বয়ান তৈরি সহজ কাজ না হলেও সম্ভব বটে!

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com