Category: ইসলামবিদ্বেষ

  • ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ

    ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
    প্রথম পর্ব

    গৌতম দাস

    ২৫ মার্চ ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3n4

    সাতচল্লিশের দেশভাগ মানে যখন নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল আর সেকথার সোজা মানে হল এমন রাষ্ট্রজন্ম হওয়াতে বৃটিশ জমিদারি ব্যবস্থাটাই উচ্ছেদ হয়ে যায়।  আর এথেকেই সারা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রজারা জমির ভোগদখল (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) লাভ করে। ফলে বাস্তবত পুর্ববঙ্গ আলাদা নিজেই (এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ অর্থে)  এক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে আগের জমিদারদের হাতে জমিদারী থাকার কাগজপত্র থেকে গেলেও কার্যত তারা সব জমিই হারিয়ে ফেলেছিল। মূল কারণ, এবার  জমিদারেরা আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেউ নয়। মুসলীম লীগ এর ক্ষমতায়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই এটা জমিদারী-উচ্ছেদের এক বিপ্লব ছিল।  যদিও আইনিভাবে এই জমিদারি উচ্ছেদ হয় পরে ১৯৫১ সালের ১৬ মে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950 এই আইনে, পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে তা পাশ হওয়াতে। সবচেয়ে মনে রাখার মত ঘটনাটা হল এই বিপ্লব ঘটেছিল তথাকথিত কোন কমিউনিস্ট পার্টির হাতে নয়। বরং যাকে প্রগতিবাদীরা উঠতে বসতে “সাম্প্রদায়িক দল বলে গালাগালি করে”, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল বলে নিন্দা ও তুচ্ছ করে  সেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। তবে মুল কথা আজকের বাংলাদেশের সারা ভুখন্ডের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে (ততকালীন প্রজারা যারা আমাদের দাদা নানা বা পুর্বপুরুষ) জমির মালিক হয়েছিল যারা যে যেই জমি প্রজা হিসাবে চাষাবাদ করত সেই জমির খাজনা নতুন পাকিস্তান সরকারকে পরিশোধ করা সাপেক্ষে সেই সেই জমির মালিক এবং ভোগ-দখল ও উত্তরাধিকারিকে হস্তান্তরকারি মালিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঐ ১৯৫১ সালের আইন এখন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ গণ্য করা হয়।

    কিন্তু বিরাট ট্রাজেডিটা হল, এভাবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জমি পেয়েছিল কিন্তু কেউ অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি, গ্রুপ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম যে সঠিক হয়েছিল অন্তত জমিদারি উচ্ছেদের ফলে যে তারা বাসিন্দারা জমির মালিক হয়েছিল এই কারণে অথবা, এই কৃষি-বিপ্লবের তাতপর্যকে স্মরণ করে – এমন সাফাই-বয়ানের ভিত্তিতে কোন ইতিহাস, কেউ লেখে নাই। স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রচনা করে নাই। এর বদলে স্কুলে পড়ানো হয়েছে প্রগতিশীলতা, জমিদারদের বয়ানে লেখা  ইতিহাস ইত্যাদির যা কলকাতায় পড়ানো হত সেই ইতিহাস বই। 

    উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ;  মানে কলোনি ‘বৃটিশ-ইন্ডিয়া’ ত্যাগ করে চলে যাবার সময় বৃটিশ শাসকদের এই কলোনিকে ভারত ও পাকিস্তান এ’দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এঘটনাই সাধারণ্যের মুখের ভাষায় ‘দেশভাগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের জর্মানের পক্ষশক্তি,  কিন্তু যুদ্ধে তারা উভয়ে (সাথে মুসোলিনি-সহ)) মিলে হয় পরাজিত শক্তি। আর ঐ  পরাজয়ের পর জাপানের ফাইনাল সারেন্ডারের দিন ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫। তাই এঘটনার সাথে মিল রেখে, এর দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭, এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস বা ক্ষমতা হস্তান্তর দিবস হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।

    দেশভাগ কী খারাপ কাজ, নেতি ঘটনাঃ
    দেশভাগ মানে সেটা একদিক থেকে বিচারে বৃটিশ “ভাইসরয়” এর ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাওয়াও বটে। ইংরাজিতে ব্যবহৃত Viceroy বা Vice-roy শব্দটা ফরাসি “vice-king” থেকে এসেছে। কিন্তু ভাইস-রয় আমাদের প্রেক্ষিতে অর্থ কি?
    ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম প্রায় একশ বছর (১৭৫৭-১৮৫৮) আমরা ছিলাম “বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির” দখল-শাসনে। আর পরে ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট, থেকে ঐ দখল-শাসন শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৃটিশ রাজসরকারের শাসনের অধীনে চলে যায়। শেষের সেই শাসন ছিল আরও প্রায় নব্বই বছরের, ১৯৪৭ এর আগষ্ট পর্যন্ত। আর ঐ বৃটিশ-শাসকপক্ষের সর্বোচ্চপদ বা রাজা/রানীর মুখ্য প্রতিনিধির পদকে বলা হত “ভাইসরয়”। কথাটা আসলে ভাইস-রয় (রয়েল শব্দকে ছোট করে নেয়া অংশ হল ‘রয়’ সম্ভবত সেজন্য; অথবা অনেকে মনে করেন ফরাসি ভাষায় আরওআই (roi) – এই ‘রয়’ মানে রাজা;  সেখান থেকে) অথবা বাংলা করে বললে, ভাইসরয় মানে রাজা/রানীর প্রতিনিধি। ভারতের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটন। তিনি চেয়েছিলেন নতুন দুই স্বাধীনদেশেরই ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। তাই একই দিনে অনুষ্ঠান না করে একদিন আগে ১৪ আগষ্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয়েছিল। আর পরদিন ১৫ আগষ্ট ভারতে তা করা হয়েছিল।
    এরপর ভারত ও পাকিস্তান নামে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দুইদেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকেও প্রচলিত জনপ্রিয় ডাকনাম হিসাবে ‘দেশভাগ’ বলে ডাকার চল শুরুও হয়। অনেক সময় একাদেমিকভাষাতেও “দেশভাগ’ শব্দটা ব্যবহার হতে দেখা যায়। যদিও এর সাথে এক অনুষঙ্গ অনুমানও থাকতে দেখা যায়।  অল্পকিছু  ব্যতিক্রমে সেই অনুমানটা হল, “দেশভাগ” জিনিষটা একটা খুবই নেগেটিভ ঘটনা বা খারাপ কাজ। মানে দেশভাগ শব্দ ব্যবহারকারি বক্তা যেন বলতে চান যে দেশভাগ হওয়াটা ভাল হয় নাই, না হলে ভাল হত। ফলে যাদের কারণে দেশভাগ হয়েছে তারা যেন খারাপ লোক। এদিকটা আমরা এখানে পরখ করে দেখব আসলে তা  সত্য কিনা বা কতটা সত্য।

    কিন্তু দেশভাগ ঘটনাটা কেন ঘটল আর ঘটনাটা খারাপ বা নেতিনাচক ঘটনা কিনা সে আলাপে একটু পরে যাব। এর আগে, দেশভাগ খারাপ – একথার মানে কী? এটা বলে ঠিক কী বুঝাতে চায়? ব্যাপারটা কী এরকম যে এই দেশভাগ কেউ চায় নাই, চাওয়ার পক্ষে কেউ ছিল না, এমন? কিন্তু না, এটা তো হতেই পারে না!  কারণ চাহানেওয়ালা পক্ষ কেউ যদি নাই থাকে তবে দেশভাগ বা বৃটিশ-ইন্ডিয়া ভাগ হল কেন? তাই ভাগ যেহেতু হয়েছে অতএব চেয়েছে এমন জনগোষ্ঠিও অবশ্যই ছিল এবং তারা উপেক্ষিত হবার মত অল্প জনসংখ্যার তা মনে হবারও কোন কারণই নাই। তাহলে এরা কারা? এখান থেকেই আমরা কথা শুরু করব।

    কথাটা উলটা করে বললে, কারা মনে করেন দেশভাগ ইতিবাচক এবং কী নির্ণায়ক-বৈশিষ্ট দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা বা চিনা যাবে? অনেকের মনে অনুমান হতে পারে অন্তত যারা নবগঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন নিশ্চয় তারা সকলে দেশভাগ হওয়াকে সঠিক ও আপন ভাবতেন! না খুবই সরি। এই অনুমানও ভিত্তিহীন, অন্তত পুরা না আংশিক সত্য। যদিও একেবারে জন্মের পরপরই পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে দেশভাগ আপন ঘটনা ছিল অবশ্যই। তবে, এটা পুর্ব পাকিস্তানে যতটা না পশ্চিম পাকিস্তানে তার চেয়ে শতগুণই  আপন মনে করা হয়েছিল।  পশ্চিম পাকিস্তানের যারা বাসিন্দা হলেন তারা ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হওয়াটাকে নিজেদের জন্য একটা বড় অর্জন বলে মনে করে এসেছে, এখনও করে। যে কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাইরে যারা আমরা, এই আমরা যাই মনে করি না কেন ঐ পাকিস্তানের ভিতরে সর্বত্র আজও তাদের পাকিস্তান রাষ্ট্রলাভের প্রতীক হয়ে আছেন জিন্নাহ। এবং তা অবিতর্কিত “জাতির পিতা” পরিচয়ে; তিনি পাকিস্তানের সকল দলের রাজনীতিতে ও দলের কাছে এক অবিতর্কিত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পুর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপারটা একবারেই ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে ধাপে ধাপে আসছি।

    পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের জমির মালিকানা ধরণ একেবারেই ভিন্ন ছিলঃ
    এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। পুর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশভাগ ব্যাপারটা নিয়ে অনুভব-অনুভুতির প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেও একটা বড় ভিন্নতা ছিল। যে ভিন্নতার মূল কারণ হল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থার দিক থেকে পুব ও পশ্চিমের অবস্থা একই ছিল না। দুশ বছরের বৃটিশ শাসনামল জুড়েই পুর্ববঙ্গ (মানে আসলে এখনকার পশ্চিমবঙ্গসহ সারা-বঙ্গও) ছিল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা্র দিক থেকে বৃটিশ শাসনের প্রবর্তিত “জমিদারি” মালিকানা ব্যবস্থা । যার আবার  বেশিরভাগ জমিদার মালিকেরা ছিল হিন্দু। মানে মুসলমান জমিদার কিছু ছিল বটে;  কিন্তু সেটা যেন ব্যতিক্রম। যেমন এভাবে বলা যায় জমিদারদের নিজেদের ‘কমন স্বার্থ’ কী হবে তা নির্ধারণে মুসলমান জমিদারদের কখনও কোন ভুমিকা বা বক্তব্য ছিল এমন জানা যায় না। আর এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুমি মালিকানা ব্যবস্থাটা ছিল ট্রাডিশনাল;  যেটা মোগল আমল থেকে চলে আসছিল। যেটার মূল বৈশিষ্ট হল,  মোগল শাসক অথবা তার প্রতিনিধিকে আপন  ভোগদখলে থাকা জমির খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আপনিই জমির মালিক। আর মালিক বলতে, খাজনাদাতার নামেই জমির টাইটেল জারি হত। তাতে কোথাও কোথাও বিশাল বিশাল জোতদার যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘জাঠ’ এথনিক গোষ্ঠি বলা হয়, এদের দখলি জমির পরিমাণ আকাশ ছোয়া। যেমন পাকিস্তানের ৬৪% জমি ৫% জোতদারের মালিকানায়, এমন ইউটিউব বর্ণনা দেখতে পারেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম জমির সিলিং [ceiling, জমির মালিকানা থাকার পরিমাণ]  বেধে দেয়া হয়েছিল। আয়ুবের হাত ধরে ১৯৫৯ সালে সেখানে আরোপিত সিলিং দেয়া হয়েছিল সেচ সুবিধার জমির বেলায় ৫০০ একর আর না থাকলে ১০০০ একর পর্যন্ত জমির মালিকানা বৈধ। এর মানে এই সিলিং আরোপের আগে কেমন জোতদারি ছিল তা অনুমেয়। সারকথায় জমির মালিকানার প্রশ্নে  এসবই ছিল পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক। তবে জমিদারি ব্যবস্থা থাকা আর না থাকা ছিল এক বড় রাজনৈতিক ফারাকের কারণ। তবে আমাদের এখানকার আলোচনার জন্য মুল কথা পুর্ব পাকিস্তানে জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থা।

    কাদের কাছে দেশভাগ কাম্য ছিলঃ
    আমরা কথা বলছিলাম, দেশভাগকে ইতিবাচক বা কাম্য – এভাবে দেখার লোক কারা ছিল তা নিয়ে। সারা ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দু জনসংখ্যা সেকালে সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। যেমন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পর্যন্ত সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫%।  তাই সব মিলিয়ে এসবের কারণে বৃটিশ আমলে – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকি কেবল পুর্ববঙ্গকে বিচারে নিলে হিসাবে মুসলমানেরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলেও এখানেও সেই একই – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পুর্ববঙ্গেও বজায় ছিল। এর পিছনের আরও কারণ  – যেভাবে বৃটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্থান ঘটেছিল, সেদিকে তাকাতে হবে।

    তত্বগত কথা হল,আধুনিককালের যেকোন রাজধানী মানেই যেখানে তুলনায় তা অন্যান্য প্রদেশ বা জেলাগুলো রাজধানীর চেয়ে অবকাঠামোর দিক থেকে হয় কম উন্নত বা পিছিয়ে পড়া। তাই পিছিয়ে পড়া এলাকার রাজধানীমুখি হওয়া খুবই কমন ঝোঁক। গ্রামে জমি থেকে উতখাত হওয়া লোকেরা রাজধানীতে কাজ-পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা নিতে ও ভাগ্য-অন্বেষণে রাজধানীতেই এসে ভীড় করে থাকে। ফলাফলে রাজধানী এক নতুন ধরণের মিশ্র জনগোষ্ঠির নতুন (আধুনিক) ভাষা্র শহর হয়ে উঠে। কিন্তু কলকাতা সেদিক থেকে বেশ ব্য্যতিক্রম। কলকাতা বৃটিশ সংস্পর্শে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা প্রথম প্রহরের ঘটনা এমন রাজধানী কলকাতা বলে সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আবার এর বাইরে আরেক দিক হল, কলিকাতার সাথে বাকি ভারত তো বটেই এমনকি বাকি বঙ্গের সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও অবিকশিত। এমনটা বজায় থাকার কারণে কেবল মূলত স্থানীয় বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসক শ্রেণীই এখানে রাজধানীতে প্রভাব-আধিপত্য জমিয়ে বসার সুযোগটা নিয়েছিল। কিন্তু এরাই বা কারা?

    সারা বাংলা সমাজের প্রধান উতপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষিকাজ আর পরে (১৭৯৩ থেকে) ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা জমিদারি বলে, জমিদার হিন্দুরাই বৃটিশ-কলোনি ক্ষমতার কোলে বসে ও ঔরসে কলকাতার শাসক শ্রেণী হয়েছিল। আর সেখান থেকেই কলকাতা মানে তা হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায় ভারত মানে সবসময় বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথার [cast system] শাসনটাই যেন আবার “জমিদার হিন্দু” এই নতুন নামে ও জমিদার-প্রজা সম্পর্কের ঢংয়ে চেপে বসেছিল। যদিও আবার এর ভিতরেও আরেক ভাগাভাগি বজায় থাকতে দেখা যেত। প্রজা বলতে সারা বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধরণেরই প্রজা থাকলেও তাঁদের মধ্যে আরেক বড় ভাগাভাগি ছিল। সেটা কেমন বা কেন?

    প্রজাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকলেও হিন্দু প্রজারা জমিদার হিন্দুদের সাথে ‘কালচারাল নৈকট্য’ অনুভব করত। মানে জমিদারদের কালচারাল হেজিমনি বা আধিপত্য আছে তা হিন্দু-প্রজাদেরও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে অনুভব করত। ফলে তাদেরও মুসলমান প্রজাদের উপর (অর্থনৈতিক স্টাটাসে সমগোত্রীয় হলেও) আধিপত্য আছে –  জমিদারদের এই কালচারাল ক্ষমতার শেয়ার হোল্ডার তাঁরাও এবং তাঁরা সম্বন্ধযুক্ত বলে অনুভব করত। তারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় উপরের বলে স্থান ও বিবেচনা নিজেরা মনে করত এবং তা দাবি ও চর্চা করত। জমিদারের বৈঠকখানায় আগত হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজাদের তুলনায় আলাদা ভাল ট্রিটমেন্ট পেত বলে এমন অনুভবের পিছনে এটা একটা কারণ মনে করা যায়। যেমন মুলমান-প্রজাদের মাটিতে বসানোর বন্দোবস্তের বদলে হিন্দুপ্রজাদের আলাদা শতরঞ্জিপাতা আসন, মুসলমান প্রজাদের দেয়া সস্তা নারকেলের মালার হুকার বদলে পিতলের হুকা,ভাল তামাক ইত্যাদি পেত। অর্থাৎ জাতপ্রথার প্রবল বলবত থাকার প্রভাব ও অজুহাতে মুসলমান প্রজাদের সামাজিক মর্যাদা-অবস্থান হিন্দু নমশুদ্র বা চর্মকারেরও চেয়েও অন্তত আরেক ধাপ নিচে বিবেচনা করা হত।
    আর এভাবেই কেবল জমিদার হিন্দুর দাপট ও পরিচয়ে সে একমাত্র শাসক ও শ্রেণীর আধিপত্য, এই ধারণা বলবত রেখেছিল। যদিও   কলকাতার জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মূল ইংরাজি বই “Bengal Divided” [Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947] , যার অনুবাদ বইয়ের নাম  “বাঙলা ভাগ হল”,সেখানে এদেরকেই “বাংলার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ বা এলিট” বলে তিনি চিনিয়েছেন। এপ্রসঙ্গে লেখা আমার ক্রিটিক এখানে পাবেন।

    কেন কলকাতা ব্যতিক্রম কী অর্থেঃ
    কিন্তু কেন কলকাতা ব্যতিক্রম হতে পেরেছিল? এর আরেকটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এখানে জমিদার হিন্দু যাদেরে বলছি ইংরাজী [race] রেস এবং [ethnic] এথনিক এই দুই অর্থেই জাতি বুঝলে এই জমিদার এরা কোন ‘জাতি’? এর জবাব হল, জমিদারি ব্যবস্থা চালু হওয়াতে যে শাসক-ক্ষমতা সে ক্ষমতার বলে এরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে এক নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছিল ও পরিচয় দিত। কথাটাকে ‘তারা বাঙালি ছিল’ এতটুকু না বলে, এভাবে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলার কারণ আছে। পুব-পশ্চিম বঙ্গ এবং এই সারা ভুখন্ডের হিন্দু ও মুসলমান মিলে যে সারা বঙ্গ অঞ্চল, তারা সকলে মিলেই যে ‘বাঙালি রেস’, সারা দুনিয়া বাঙালি বলতে এদেরকেই চিনে, তাই একথাটাতে অস্বীকার করার কিছু নাই। তাই তো হবারই কথা।

    কিন্তু কলোনি-ক্ষমতা্র ঔরসে উত্থিত কলকাতা, জমিদারের কলকাতা সেটা মেনে উত্থিত হয় নাই। প্রথমত,আগেই বলেছি কলকাতা – সমাজের ক্লাসিক্যাল ডেভেলবমেন্ট যেমন কোন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও পরিণতির অর্থে যেমন বলা হয় – ‘একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা সারপ্লাস যেখানে সঞ্চিত হয় এমন নদীতীরের কোন গঞ্জ বা শহর অর্থে কলকাতা কোন শহর নয়, ছিল না। যে অর্থে কলকাতা কলোনি প্রভাব ও সংস্পর্শের বাইরে গড়ে উঠা অর্থে ভারতেরই কোন শহর নয়। যেমন মোগল আমলেই  মানে প্রাচীন ভারত কলোনি মাস্টারের হাতে পড়বার আগেই – হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি বড় মোগল শহর হিসাবে হাজির ছিল। কিন্তু কলকাতা তা ছিল না। মানে  কোন কলোনিদখলকারির ছোঁয়া লাগার ছাড়াই, সুনির্দিষ্ট করে বৃটিশেরা ভারতদখলের আগে থেকেই ভারতে অনেক বড় শহরের জন্ম হয়ে গেলেও কলকাতা সে তালিকার কেউ নয় বা তালিকায় ছিল না। তাই হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি মোগল আমলেই বড় শহর, এগুলোকেই স্বাভাবিক পরিণতির শহর বলছি। আর বিপরীতে  কলকাতা এসবের বাইরে ছিল বৃটিশের হাতে গড়ে উঠা শহর। অর্থাৎ যেমন আফ্রিকায় কলোনিদখলের ফেনোমেনা। ওখানে কলোনিদখলের আগে আফ্রিকায় নিজ শহর বলতে যা বুঝায় এমন কিছু কোন আফ্রিকান দেশে ছিল না। বরং প্রায় সবদেশের বেলায় তারা কলোনি মাস্টারের হাত ধরে আফ্রিকানেরা প্রথম শহর কি তা  গড়েছিল ও চিনেছিল। আমাদের কলকাতার বেলায় তার অনেকটাই সত্য।

    এই সুবিধাটাই কলকাতার জমিদার হিন্দুরা নিয়েছিল। এই শহরের স্থানীয় শাসক শ্রেণী হিসাবে নতুন উত্থিতরা হল এই জমিদারেরা । যেটাকে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের (জমিদারি আইন ) ফলাফল বলা যায়। এছাড়াও এতে দুটা জিনিষ এই জমিদার হিন্দুরা নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল। তা হল, একটা হিন্দুস্বার্থের চোখে কারা বাঙালি? আর কারা নয়? আর বাংলা ভাষা কোনটা বলতে কোনটা বুঝাবে? এদুটাই তারা একক হাতে ও সংকীর্ণ স্বার্থের চোখে  নির্ধারণ করে নিয়েছিল।

    না একথা বলা বাতুলতা হবে যে বৃটিশেরা আসার আগে অতীতে বাংলার কোন কোণে ভাষা কী কী কতদুর বিকশিত হয়েছিল সেটা কেমন, আর্কিলজি বা প্রাচীন ইতিহাসে কী পাওয়া গেছে অথবা চাই কী চর্যাপদ কী ইত্যাদি। না, আমি এসবের কথা  এখানে তুলছি না, তোলা হচ্ছে না। বরং আগেই বলেছি জমিদার হিন্দু শাসকেরা এরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার আগে বাংলায় কি ছিল সেটা যাই থাক সেটা এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আসলে তাদের কলকাতায় তাঁরা মূলত বাঙালি কারা এর এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল, তাতে বৃটিশেরা আসার আগে আমরা কী, কেমন ছিলাম বলে যে যাই বুঝি না কেন। আর এখান থেকে জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে নির্ধারিত ও নির্মাণ হয়েছিল এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা যে, বাঙালি কারা, বাংলাভাষা কোনটা। আর এদেরই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল –  “মুসলমানেরা বাঙালিই নয়”। এটাই কলোনি-কলকাতার বাঙালির সংজ্ঞার মৌলিক দিক। আর সংস্কৃত ঘেঁষা করে আর সংস্কৃত-ব্যকরণ-সম্মত করে (সাথে ইংরেজ পাদ্রী ধর্মপ্ররচারকদের স্বার্থে ও তাদের হাতে) যে বাংলা গদ্যভাষা খাঁড়া করা হয়েছিল তা নিয়ে এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আপত্তি ছিল।

    —–“মুসলমানেরা বাঙালিই নয়” – কথাটা কী সত্য? —-

    আধুনিক শব্দটা অদ্ভুত, এটা সবচেয়ে ভাল অপ-ব্যবহার হয় কাউকে আধুনিক নয় বলে দাবি করে খালি একবার কোন ফতোয়া দিয়ে দেয়া। এরপর অতএব সে নিশ্চয় “পশ্চাতপদ” [মুসলমানেরা পশ্চাতপদ], এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি করা যাতে বিপরীতে, বক্তা নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে প্রমাণ করতে ও তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে যায়। এসব বদ-মতলবের বাইরে বর্ণনা অর্থে “আধুনিক ভাষা” বলে একটা ধারণা-শব্দ ব্যবহার করব। বলাই বাহুল্য এটা রেনেসাঁর পরিণতি অর্থে যে আধুনিক ধারণা,  সে অর্থেও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

    আইডিয়েল [ideal] চোখে যখন আমাদের ভুখন্ডের সকল অংশের, সকল জেলা বা অঞ্চলের প্রতিনিধি সকলকে রাজধানিতে হাজির রেখে কমবেশি সকলের প্রভাব ও মিশ্রণে একটা ভাষা উত্থিত করার চেষ্টা করা হয় সেটাকে আধুনিক বাংলা ভাষা। তবে এর সাথে  আরেকটা বড় ফ্যাক্টর অর্থনৈতিক বিকাশ; মানে  কিভাবে ও তখন পর্যন্ত কতদুর সেটা বিকশিত ছিল বা হবার সুযগ ছিল – সেটাই। যে অর্থে শহর বা নগর মানে  হাঁটুরে গঞ্জের চেয়েও উপরে আরো বড় ‘গঞ্জ’ মানে accumulation of Capital  বা উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের কেন্দ্র যেটা বা যেখানে এটা ঘটে বা হয়ে উঠে সেটাই শহর বা নগর। এটাই বুর্জোয়া [bourgeois] সিভিল সোসাইটি জন্মাবার বৈষয়িক পুর্বশর্ত। (বুর্জোয়া শব্দটা এখানে গালি বা নেতিবাচক অর্থ করা ভুল হবে।) যা এরপর নগর রাষ্ট্র, রিপাবলিক ইত্যাদির হওয়ার দিকে রওনা দিতে পারে যদি না তা বিদেশি কলোনিদখলদারদের হস্তক্ষেপের খপ্পরে না পড়ে।
    এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এই পিঙ্ক কালারে লেখা অংশটা এটা আমিই বাক্য সাজিয়ে লিখেছে অবশ্যই।  কিন্তু এর আইডিয়াটা আমি পেয়েছি আমার – কার্ল মার্কসের জার্মান ভাবাদর্শ (পার্ট ওয়ান) – পাঠ থেকে। অর্থাৎ পাঠ ও এখানে উপস্থাপন এর সব দায় আমার কিন্তু মূল আইডিয়াটা অবশ্যই ওস্তাদের। যার কাছে যা নিয়েছি সে ঋণ আগে স্বীকার করে নেয়া ভাল। কেউ আমার একথায় একমত না হলে ক্ষতি নাই, আমি আমারটা স্বীকার করে রাখলাম।  আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের চোখে ও বিচারে – ‘শহর বা নগর’ মানে আসলে কী তা বুঝবার ক্ষেত্রে এটা মার্কসের দুর্দান্ত অবদান, বেস্ট জায়গা হচ্ছে এটা। 

    তবে এখানে আলোচনায় এটাকে আধুনিক বলার সুত্র এটাই যে সারা বাংলাদেশের সব জেলা অঞ্চলকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে বসবাস শুরু করানোটা চাট্টিখানি কথা নয় যে এটা চাইলেই করা যায় এমন নয়। যেমন এখনকার ঢাকাকে বলা যায় তুলনামূলক পারফেক্ট রাজধানী। কারণ অন্তত ১৯৮২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের (উপজেলা) সাথেই এর যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই ভাল বলে সব অঞ্চলের লোক এখন ঢাকায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় একাদেমিক ও কালচারাল পাড়াগুলোর অলিগলি পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে লোকেদের একসেস বা যাতাযাত আছে; পৌছাতে পারে। ফলে সব আঞ্চলিক ভাষারই ঢাকায় প্রবেশ ও পৌছানো এখন অনেক সহজ। ফলে ঢাকায় বাংলা ভাষা বলে যেটা ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে তাকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভাষার হাতের কাছে আছে। এখন যেকোন অঞ্চলের ভাষার বা কোন একটা অঞ্চলের শব্দে এর ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা যত প্রবল  বা তা যত ‘কমিউনিকেটিং’ (এক্সপ্রেসিভ অর্থে) সেই ভাষা বা শব্দ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে তত বেশী। অন্য সকলে  সেই ভিন-আঞ্চলিক শব্দও এখানে আপন করে নিবার সম্ভাবনা তত বেশি। এমন এই আদর্শ সুযোগটা ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশে ছিলই না। এরপর ইকোনমিক বা কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে আস্তে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে আজ  এই জায়গায় এসেছে। এখানে একালের ঢাকার প্রসঙ্গ আনলাম তুলনা করে জমিদার আমলের একেবারে শুরুর দিকের কলকাতাকে পরিচয় পরিয়ে দিবার জন্য।

    যেমন এখন বলব,  আর ঠিক এর উল্টাটা ঘটেছিল কলকাতায় মোটাদাগে সেই ১৮০০ সালের আশেপাশের সময় থেকেই। সেসময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পুরাটাই যেন এমন প্রিমিটিভ স্তরে ছিল যে ফলে অব্যবস্থার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জমিদার হিন্দু শ্রেণী যাকে ইচ্ছা তাকে বাঙালি বলা থেকে বাদ দিয়েছে, মুসলমানেরা বাঙালি নয় বলতে পেরেছিল আর বাঙালি জাত ও ভাষা যেকোনটাকে তা জমিদারের নিজের একক ইচ্ছা ও খেয়ালে হস্তক্ষেপ ও নির্ধারণ করে নিতে পেরেছিল।

    সারকথায় যার পরিণতিতে, এটাকে আমরা বলতে পারি বাংলার সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশকে শাসক জমিদার-হিন্দু “মুসলমানেরা বাঙালি নয়” বলে তাদেরকে জমিদার-হিন্দুর মার্জিনালাইড প্রজা [যার অবস্থান হিন্দু-প্রজারও নিচে] মাত্র করে (চাপানো ব্যাখ্যায়) ফেলে রাখার সুযোগ নিয়েছিল।

    মানুষের রেস (race বা জাতি) পরিচয় বিষয়টা ডিএনএ সংশ্লিষ্ট যাকে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের সম্পর্ক বলি’ সেই সম্পর্কিত ও জাত। তুলনায় ধর্মীয় পরিচয় যেটা এথনলজিক্যাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে যুগ যুগে তৈরি ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়। কারোরই রেসিয়াল পরিচয় কেউ বদলানো যায় না পারে না, তবে তুলনায় ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়গুলোর খুবই স্বল্প কিছু অংশ বদলে যেতে পারে। কাজেই (রেসিয়াল ও এথনিক) জাত পরিচয়ে যে বাঙালি সে আবার মুসলমান ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের কারণে রেসিয়াল বাঙালি থেকেও মুসলমান মানে বাঙালি-মুসলমান অবশ্যই হতে পারে। অবিভক্ত বাংলায় এর পুরা বাঙালি জনগোষ্ঠির এই অর্ধেক  ছিল মুসলমান-বাঙালি আর আবার পুর্ব বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। অথচ এদেরই কোনঠাসা করতে ও আধিপত্যের ছড়ি ঘুরাতে ও দাবিয়ে রাখতে, জমিদার-হিন্দুরা তাদেরকে বাঙালি রেসের (race) অংশ মানতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু কী এসে যায় যেখানে কোন রেস পরিচয় যা আসলে মূলত বদলানো বা অস্বীকারেরই অযোগ্য! সেই জবাব তারা জমিদার হিন্দু বা এইচিন্তার উত্তরসুরিদের পরবর্তিতে দিয়েছিল। পুর্ববঙ্গ বা একালে বাংলাদেশে এরাই ১৯৭১ এক সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই মুসলমানেরা  নিজেদের “বাঙালি” এবং একই সাথে মুসলমান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, ব্যাপকভাবে নাড়া ফেলে দিয়ে। কারণ মা আর সন্তানের প্রথম কথোপকথন কোন ভাষায় শুরু হবে সেটা যেমন বদলানো যায় না – সেটা জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়েই থাকে – এটা তেমনই, বদলানো যায় না। কলোনি-জমিদার আমল থেকেই মুসলমানদেরকে বাঙালি বলতে অস্বীকৃতি যতটা তীব্র হয়েছিল ১৯৭১ সালে এটাই ততোধিক বেগে – মুসলমানেরাই সেই প্রকৃত বাঙালি যারা ভাষার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে তা প্রমাণ করে ছেড়েছিল। ফলে তারা রেসিয়াল ও এথনোলজিক্যালি বাঙালি কীনা এই স্বীকৃতি কারও থেকে চায় না্‌ কারও থেকে নিবার দরকার ফুরিয়ে গেছিল। তা রক্ত দিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল।

    কিন্তু তবু, একালে আরএসএসের উত্থান, গায়ের জোর খাটিয়ে সব ইচ্ছামত করে ফেলবে এমন এক জবরদস্তির হিন্দুত্বের বা হিন্দুত্ববাদের নয়া উত্থানের যুগ। তেমনই সময়কালে এবছর ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মশতবার্ষিকী। তাই নিচে এদিকে ‘হিন্দু সংহতি’ বলে আরএসএসের এক অঙ্গসংগঠন এর ততপরতাকে দেখেন, উপরে বলা আমার কথাগুলোর মিল পাবেন।  যারা গত অন্তত চার বছর ধরে প্রকাশ্যে জনসভা করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাম ধরে উস্কানি তৈরি করে চলেছে। ফেসবুক পেজে তাঁদের ভারচুয়াল উপস্থিতি দিয়ে তারা এবার সেপ্টেম্বরের ২০২০ এর শেষে বাংলাদেশিদের কাছে পৌছে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল। তাঁদের শ্লোগান ও বক্তব্য ছিল এমন যেন তা সেই কলোনিযুগে জমিদার হিন্দুর বয়ানেরই পুনঃআবির্ভাব। বক্তব্য গুলো এমনঃ
    ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হ‌ওয়ার পরে এই পশ্চিমবঙ্গ হল বাঙ্গালী হিন্দুর ন্যাচারাল হোমল্যান্ড। অর্থাৎ এই মাটির মালিক হল হিন্দু বাঙ্গালীরা। তাই পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সম্পদের উপরে অধিকার সর্বপ্রথমে হিন্দু বাঙ্গালীর। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হিন্দু বাঙ্গালীর”।
    “বাংলাদেশী ভাষা পৃথক করো, সনাতনী বাংলা রক্ষা করো।
    বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়?”

                                                                                         হিন্দু সংহতি ফেসবুক

    আরএসএস-এর  অঙ্গসংগঠন “হিন্দু সংহতি”  নামে এই সামাজিক সংগঠন, উপরে এই সংগঠনেরই ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে। তাদের এসব কথার জবাব একটাই, যে পুর্ববঙ্গ বা একালে মুসলমান অধ্যুসিত বাংলাদেশ একে,  কলকাতার জমিদার হিন্দুরা কোন কালেই তারাও “বাঙালি” এই স্বীকৃতি দেয় নাই; আমরা তা চাইও না, অপেক্ষাও করে নাই। বরং আমরা তাদের কেয়ার করি নাই কখনও, এখনও করি না। আমরাই আমাদের রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে যে বাংলাদেশ নিজেই এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা তো বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এর থেকে বাইরে এবং তাদের চোখে অছ্যুত (untouchable)। আর আমরাও কী কলকাতার স্বীকৃতি কখনই চেয়েছি? বরং আমরা নিজেই প্রজা-বাঙালির বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছি। [যদিও শাহবাগের কিছু  কবি-সাহিত্যিক এখনও প্রবল আছে এরা নিজেদের লেখা কবিতা বা সাহিত্য হয়েছে কিনা তা নিজেরা নিজেকে মুল্যায়ন করতেও অক্ষম তাই উত্থানরহিত। এদের অযোগ্যতা ক্ষমাহীন যখন দেখি এরা কলকাতার পদতলে নিজেদের সঁপে দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে চায় যে তাদের সাহিত্য হয়েছে কিনা; এরা এমনই সেলফ-লেস বা মর্যাদা বোধহীন স্টুপিড।] অতএব বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে আরএসএস এর কোন প্রকল্প যা আছে আমরা একে কেয়ার করি না, পাত্তা দেই না। বরং পরামর্শ থাকবে দূরে থাকেন। দাদাগিরি করতে এসেন না। চাইলে হিন্দুগিরি করেন কিন্তু কেবল কলকাতার ভিতরে সীমাবদ্ধ থেকে, যদি কলকাতার তা সহ্য হয়। এদিকে আমরা নিজেকে নিয়ে খুবই ভাল আছি। পুর্ববঙ্গকে মর্ডানিটি শিখাতে এসেন – এটা আপনাদের কাজ বা আপনারা এই যোগ্যতা নিজের জন্য রেখে দেন, প্লিজ। আর ভারতীয় হিসাবে  কলকাতার সমস্ত দায় এবং আবর্জনা সবই তো কলকাতারই! আমাদের তাতে ভাগীদারি বা দাবি নাই। ডিজ-ওনড এন্ড ফুলস্টপ!

    ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বা ভিকটিমহুডঃ
    সব ক্রিয়ারই নাকি প্রতিক্রিয়া থাকে, থেকে যায়। তবে আসলে কথাটা হল ফোলানো বেলুন টিপাটিপির মত! ফোলানো বেগুনের কোন  একদিকটা চাপ দিয়ে ধরলে তাতে প্রতিক্রিয়ায় অন্যদিকটা বেশি ফুলে যাবে। প্রতিক্রিয়া ঘটতে অনেক সময় হয়ত তা ‘ফেবারেবল’ সুযোগের অপেক্ষা করেন। আপনি কাউকে যেমন ট্রিট করবেন, নিচা দেখাবেন কী পায়ের নিচে পিষবেন, অপমানে কোনঠাসা বা মার্জিনালাইজ করবেন তার পুরাটা না হলেও এরই বড় কিছু প্রতিক্রিয়া এরপরে আপনার উপর পালটা আসবেই। সেটা চিন্তা করে তাই এর মুখোমুখি হতে আগেই তৈরি থাকতে পারেন! আপনি হয়ত তখন নাকিকান্না করবেন, কী ভিকটিম হিসাবে পুরান সেই দাপুটে জমিদারের ছাতার নিচের আপনি এবার নিজেকে ভিকটিম হিসাবে ভিকটিমহুড দেখিয়ে তুলে ধরে দেখিয়ে উলটা সহানুভুতি তৈরির চেষ্টা করবেন, এমনটাই সাধারণত দেখা যায়। ঠিক এই জিনিষটাই যেন ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পরে। কারণ পাকিস্তান মানে তার পুর্ব-পাকিস্তান অংশে মানে, আগের পুর্ব-বঙ্গে স্থানীয় শাসক যে জমিদার-হিন্দু ছিল, পরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে বলাই বাহুল্য এবার আগের ঐ জমিদার হিন্দুদেরই এতদিনের আয়েস ও লালিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য যুগের অবসান ঘটেছিল, অন্তত পুর্ববঙ্গে বা পুর্ব-পাকিস্তানে। আরও এতে বিশাল রাজনৈতিক এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পুর্ববঙ্গীয় বাসিন্দাকে উল্টপালট প্রভাবিত করেছিল। তবে পরিবর্তন মূলত সবই পুর্ববঙ্গে। দেশভাগে পুর্ববঙ্গে যখন জমিদার-হিন্দু শাসন ক্ষমতা ও আধিপত্য হারিয়েছিল তখনও বাংলার অপর অংশ পশ্চিমবাংলায় তাঁদের আধিপত্য কিন্তু আগেরর মতই অটুট ছিল। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে জমিদার-হিন্দু ও তার মাখনের স্বাদ চাখনা প্রজা-হিন্দু এবার পুর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এটাই তাদের সেই দুঃখে হু হু করে উঠা মনে দেশভাগ – আর অভিশাপ, শাপান্ত! অর্থাৎ সেটা আর শুধু জমিদার-হিন্দু বা এলিট হিন্দুরাই নয় বরং জমিদারেরই আদরের ব্যাপক প্রজা-হিন্দুরাও এথেকে বাদ পরে নাই। আর তা মূলত এতদিন  প্রজা-হিন্দুরা যারা জমিদার-হিন্দুর সাথে “কালচারাল নৈকট্য” অনুভব করে  মুসলমান-প্রজার উপরের স্তরের জাতবিভাগের অবস্থান দাবি করে সেই অজুহাতে মুসলমান প্রজার উপর আধিপত্যের স্বাদ নিত, সব সুবিধা নিয়ে এসেছিল সেসব – বলা যায় এবার কাফফারা হিসারে সেই অপকর্ম যেন সুদে-আসলে উসুল হয়ে এসেছিল।

    যেকোন ফোর্স মাইগ্রেশন অবশ্যই খারাপ, কখনই তা কাম্য নয়। কিন্তু পুর্ববঙ্গের প্রজা-হিন্দুরা সাময়িক “কালচারাল নৈকট্য” এর আধিপত্যের মজা খেতে গিয়ে লং-টার্মে নিজেদের জন্য নিজেকেই এর ভিকটিমে পরিণত করেছিল।  এরপর  আজও যে ৮-১০% হিন্দু বাংলাদেশ অবশিষ্ট আছে তারা সেই থেকে নিজের দুঃস্থ অবস্থা এই ভিকটিমহুডকে বিক্রি করে যতটা প্রভাব তৈরি করা যায় এর উপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। এই বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞ এসবেরই মূল বা ফোকাস দল হল সিপিবি। আর এরপরে ন্যাপ, আওয়ামি লীগ থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সকল প্রগতিশীল – এরা এখনও সেই হেরে যাওয়া ঝান্ডা আকড়ে আছে!!!  সত্যি এক দুর্দান্ত অপচয় বটে!!! যাদের সাহসও নাই যে তারা গত দু’শ বছরের বেশি জমিদার-হিন্দুর অসম্পুর্ণ সন্তুষ্টির এক আকাঙ্খা  -ভটক তে হুয়ে আকাঙ্খা – তারা কেন বয়ে বেড়াচ্ছে, কী করে আসছে তা উল্টে-পাল্টে দেখে! এটাই এখন এক তীব্র ইসলামোফোব ঘৃণা ও বিদ্বেষ!!!

    পাকিস্তান পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র – এটাও নেহেরু-গান্ধীর ভারতের মতই আরেক নেশন স্টেট যার সারকথা হল, ব্যাপক নাগরিক বৈষম্য। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে এই চরম অসাম্য চর্চা হতে দেখা যায়।  যার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান জাতি-রাষ্ট্র উপড়ে ফেলা আর এর বদলে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়ে পুণর্গঠন। রামমোহন রায়ের (১৮১৫ সালের ব্রাহ্ম-সমাজ এর নেশন-বোধ) এই আদি পাপ বা আদি ভুল থেকে বেরিয়ে আসা।  যদিও রাষ্ট্রগঠনের এসব দিক নিয়ে সচেতনতা এখনও রাজনীতিতে এমনকি একাদেমিক পাড়াতেই নাই, কোথাও নাই।  এবং বিশেষত এই না থাকার আসল কারণ  “ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তার” ক্ষতিকর আধিপত্য। বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত (কারণ এরপর নিজেই মারা যায়) কমিউনিস্ট আধিপত্য। যারা আজও রাষ্ট্রগঠনের এদিক নিয়ে আলোচনা বা বুঝাবুঝি করতে অযোগ্য। কারণ তারা এসব আলোচনাকে “বুর্জোয়া” বা “ডানপন্থি” বলে দেখিয়ে এসেছিল। সেসব এক অবুঝ ও নাদানদের  দুর্দশা হয়ে আছে এখনও।  আর মূলত “শ্রেণী রাষ্ট্রের” বা রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের কথা জোর দিয়ে তুলতে গিয়ে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মৌলিক দিক – নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠার  কাজটাই তুচ্ছজ্ঞানে বাদ দিয়ে গেছে। কেবল রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের বুঝের খোদ রাষ্ট্রচিন্তা বলতেই তা এক দানবীয় স্বৈর এমনকি কখনও অবলীলায় এক ফাসিজমের ধারণায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টরা জনপ্রতিনিধিত্ব বা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন ধারনাটাো কখনও গ্রহণ করে নাই বরং তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয়-জ্ঞান করে ফেলে দিয়েছে ও হারিয়ে ফেলেছে।  বাস্তবে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে এরাই আজ অচল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

    এভাবে এরপর কী হতে হবে সে আলাপে আপাতত ছেদ দিয়ে একটু পিছনে ফিরা যাক। আসলে ১৯৪৭ এর দেশভাগ বলে যা পরিচিত, এতে পুর্ববঙ্গের জমিদারি ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়াতে তার ফেলে আসা জমিদারি বা জমি সেটা তো তখন আরেক রাষ্ট্র বা ওর অংশ হয়ে গেছে। সারকথায় যার উপর পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতেরও আর কোন owning বা কর্তৃত্ব বা এক্তিয়ারই নাই হয়ে গেছিল। ইতোমধ্যে কালক্রমে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালের পুরানা জমিদারি আইন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন) বাতিল করে ১৯৫১ সালের ১৬ মে নতুন প্রজাস্বত্ব আইন (ল্যান্ড একুজেশন এন্ড টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫০) পাশ হয়ে যায়। সেই ‘জমিদার উচ্ছেদ আইন’ এখনও বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ হয়ে আছে। আর এতে জমিদারির শেষ ক্ষমতাটুকু অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা বাতিল ও চিরসমাপ্তি লাভ করেছিল। আর এরই ফলাফলে পুর্ববঙ্গে আগে যারা প্রজা বা ভাগচাষী ছিল তারা তখন থেকে সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আগের চাষাবাদের জমিরই মালিক বলে আইনি স্বীকৃতি পায়, তাঁদের নামেই টাইটেল জারি হয়। ১৭৯৩ সালের জমিদারি ব্যবস্থা চালুর আগে যে টাইটেল প্রজাদের নামেই ছিল। আর এই আইনটা তৈরির সময় যে সাধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করে তৈরি বা মেনে করা হয় তা হল, (এখনও বাংলাদেশের জমি অধিগ্রহণ আইন আছে এটা সেটাই) জমি অধিগ্রহণ আইন  অনুসারে পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে, পুর্ব-পাকিস্তান সরকার যেকোন জমি “অধিগ্রহণ করা হল” বলে ঘোষণা দিতে পারে। সেই আইন দিয়েই প্রথমে সারা পুর্ব-পাকিস্তানের সব জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড একুজেশন) করে নেয়া হল বলে ঘোষণা জারি করা হয়। আর এর ফলে আগের সব জমিদারি মানে, জমিদারের মালিকানা টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবার যে প্রজা যে জমি চাষাবাদ করত এবার সেই প্রজাই ঐ জমির জন্য সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে তাকেই মানে তার নামেই জমির নয়া মালিকানা টাইটেল জারি করে দেয়া হয়েছিল। আর এই হল আজকের বাংলাদেশের সকল ভুমি মালিক যাদের পুর্বপুরুষের জমির টাইটেল কেড়ে নিয়ে বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে জমিদার নামে নতুন একটা শ্রেণীর কাছে তাঁদের জমি নতুন টাইটেল করে দেয়া হয়েছিল, দুশবছর পরে হলেও এই জবরদস্তির অবসান ঘটেছিল। পুর্ব পাকিস্তানের ‘প্রজারা’ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমির মালিকানা টাইটেল ফেরত পেয়েছিল তখন থেকে। সোজা কথায় পাকিস্তানের জন্ম মানে পুর্ব-পাকিস্তানের আগের প্রজাদের এবার নিজের নামে জমি ফিরে পাওয়া। অন্তত এই একটা কারণে পুর্ব্বঙ্গের সকল প্রজারা পাকিস্তান আন্দোলনের সুবিধাভোগী বেনিফিশারি বলে পাকিস্তান কায়েমকে অন করা উচিত!   অতএব সারা পুর্ববঙ্গের প্রজা-কৃষকেরা (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে এখান থেকেই ডাইরেক্ট বেনিফিশারি হয়ে যায়, কারণ তারা জমি পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তান কায়েমের সরাসরি বেনিফিসিয়ারী ফলে নিট সমর্থক হওয়ার কথা! কিন্তু না! যদিও এই অবস্থাটা পরবর্তিতে দুএক বছরের মধ্যে একই রকম আর থাকে নাই। কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত ও উলটে যায়। এবার পয়সা হাতে পেয়ে কৃষকেরা নিজ সন্তানকে যতই শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছিল ততই তারা মাথা কামিয়ে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট হতে পথ ধরেছিল। এটাই নাকি আধুনিকতা!!! কেউ যা উল্টে-পাল্টে চেক করে দেখে নাই – সেই পুরানা জমিদার-হিন্দুর স্বার্থবয়ানের চোখে লেখা মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদির চক্করে পড়ে গেছিল তা আজও তারা টের পায় নাই যে ভুলটা কোথায় হয়েছিল!!!  জমিদার-হিন্দুর মূল বয়ান হল ধর্মই সব নষ্টের গোড়া। তবে সাবধান!  এখানে ধর্ম মানে কেবল ইসলাম বা মুসলমানদের কারণেই তার জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। একারণে ১৯৪৫ সালের পরে জমিদার ও অনুসারিরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। তাই মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদি  আধুনিকতার ধারণাগুলোকে তারা ইসলাম-উচ্ছেদের প্রকল্পের দিক থেকে ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছিল।  অতৃপ্ত আত্মা নাকি মারাত্মক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়। জমিদারি-হারানোর অতৃপ্ত আত্মার তাই হয়েছিল।  তাই তামাসাটা দেখেন, সে নিজে কিন্তু নিজধর্ম পালন করেও আধুনিক-প্রগতিশীল হয়ে আছে!  কেন?  [দ্বিতীয় পর্বে দেখেন আগামী কাল শুক্রবার]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    সর্বশেষ এডিট আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩ ভোর-রাত  দুইটা চল্লিশ

    [সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল এই পত্রিকা গ্রুপেরই এক ভগ্নি, আরেক ত্রৈমাসিক সাময়িকী পত্রিকাও আছে।  কিন্তু মূলত সেটা প্রিন্টেড পত্রিকা, যার  সাথে কেবল এক ই-পেপার ভার্সান আছে।  এই লেখাটা ঐ ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার গত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২০  সংখ্যায়, “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাতপর্য ও  অতঃপর ……” এই নামে ছাপা হয়েছিল।  তা প্রায় পাঁচ হাজার অক্ষরের অনেক বড় লেখা  ছিল। সেই লেখাটাকে এবার আবার এডিট করে আরো সংযোজন-বিয়োজন করে তিনপর্বে তা  এবার নতুন নামে  নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।

    ওদিকে ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার  ই-পেপার পাঠক ফেন্ডলি নয়।  তাই আগের লেখাটার এক পিডিএফ ভার্সান এখানে পেতে পারেন। নামিয়ে নিতে হবে। ]

  • নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    গৌতম দাস

    ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gD

    ব্যাপারটা একটু পুরনো। কিন্তু বারবার ফিরে আসে এমন পুরনো রোগ। বীনা সিক্রি [Veena Sikri ] বাংলাদেশে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত। গত ২০০৩-০৬ সময়কালে তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ভারতের প্রায় সকলের সব কিছুতে শো-আপ বা বাড়িয়ে বলা বা দেখানো – এটা এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে তো বটেই সরকারি পর্যায়েও অভ্যাসের মত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে সম্ভবত শো-আপ করাদের শীর্ষ আছেন বীণা। আর বাংলাদেশে তিনি এটা করার আরো সুযোগ নিয়ে থাকেন কারণ তিনি সরকারি আমলা হিসেবে চাকরি শেষ করলেও এখন সাউথ এশিয়ান উইমেন্স নেটওয়ার্কের (South Asia Women’s Network, SWAN)) আহ্বায়ক বলে জানা যায়, এর সুযোগে।

    সিক্রির সেকুলারিজম-বোধঃ
    দেখা যায়, তিনি সবসময় আমাদের যেচে ‘হেদায়েত’ করতে ভালোবাসেন আর ইদানীং তা সবচেয়ে বেশি যা নিয়ে, সেই সাবজেক্ট হচ্ছে  সেকুলারিজম। আবার তাঁর সেকুলারিজম ভাবনাটা ‘বিশেষ’। সেটা যেন উল্টো মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু মুসলমান। তাই যেন বলতে চান, এরা তো একটু খাটো (!), সেটা এখন এঁরা সেকুলার হলে  সমান পক্ষ হতেও পারে!। যদিও এই সাবজেক্ট নিয়ে তাঁর জানা-বুঝা ঠিক বা যথেষ্ট কি না তা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ আছে। এ ছাড়াও অন্য যেসব প্রসঙ্গ তিনি সাধারণত আনেন ও কথা বলেন সেগুলো যেমন – ভারত নাকি পড়শিদের জন্য ‘বড়ভাই’, সে কথাটা আবার উনি নিজমুখেই বলছেন। এমনই ডেস্পারেট এবং যেন  মুল্যবোধের ঘাটতিতে থাকা ও অপ্রয়োজনীয় সংঘাত শো করা মানুষ তিনি। গত ২০১৫ সালে ভারতের এক ওয়েব মিডিয়ায় [livemint] তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন যেটা ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকও পরদিন অনুবাদ করে ছেপেছিল। ওর বাংলা শিরোনাম ছিল- “ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ‘এলডার ব্রাদার’ : বীনা সিক্রি”। আবার ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মুসলমান ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে আটকে গেছে” [Bangladesh is caught between Bengali and Muslim identities: Veena Sikri]। এ ছাড়াও শাহবাগ আন্দোলনের আমলে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলছেন, সেটা নাকি “৭১-এর প্রজন্মের জেগে উঠা ছিল” – ইত্যাদি ধরনের ভারতীয় ব্যাখ্যা যার সার কথা হতে দেখা যায় যেটাকে আমরা প্রচলিত ভাষায় বলি, ইসলাম ‘কোপানো’র সুযোগ নেয়া আর উচ্ছ্বাস দেখানো। তখন প্রশ্নকর্তা অবশ্য শাহবাগের মধ্যে যা দেখেছিলেন সেটা হল এক না- বুঝা অবুঝ চোখে এক “আরব স্প্রিং” বলে একে ভ্রম। অথচ আরব স্প্রিং (নামেও বোঝা যাচ্ছে) সেকালে ঘটেছিল সাধারণত মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রে। আর আমেরিকান এই প্রোগ্রামের লক্ষ্যও ছিল সেটা।  কিন্তু বাংলাদেশের শাহবাগ তো ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত কথিত “সেকুলারদের” আন্দোলন!

    এমনিতেই যারা বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন এঁদের মধ্যে একটা ‘কলোনি দখলদার মাস্টার’ ভাব কমবেশি থাকতে দেখা যায়; যেন তারা ভারত সরকারের ভাইস-রয় বা ‘কলোনি রাজপ্রতিনিধি, আমাদের দেখভাল বা দেখেশুনে রাখতে ও হেদায়েত করতে এসেছেন। ঠিক যে জিনিসটা ১৯৪৭ সালে আগস্টে কলোনিমুক্ত ও স্বাধীন ভারত হয়ে গেলে নেহরুর মধ্যে দেখা গিয়েছিল বা যেত। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তিনি নিজেকে ‘ব্রিটিশ ভাইসরয়’ ভাবতেন যার সবচেয়ে ভাল ও বিস্তারিত প্রমাণ আমরা দেখতে পাই নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষায়। কলোনিদখলি চোখ মনে করে দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌম সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে পারে না। কোন সম্পর্ক হলে তা হতেই হয় দখলদার ও অধস্তনের, এই বিশ্বাস তাঁর প্রখর ছিল। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেহরু যেন ব্রিটিশের উত্তরসূরি; তাই তিনি কলোনি মাস্টারের সেই ভূমিকায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এমন চিন্তার সমস্যার গোড়া হল – নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার মধ্যে; যেখানে দুই রাষ্ট্রের সমমর্যাদার নাগরিক সম্পর্ক বলে কোনো ধারণা বা ইমাজিনেশন থাকে না, কাজ করে না। সব কিছুকেই এরা মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু আর গোলামঅধস্তন বানিয়ে ফেলেন এবং সেভাবে দেখে থাকেন। এর বাইরে ভাবতে পারেন না। অথচ মজার কথা এরাই আসেন আমাদেরকে সেকুলারিজম শিখাতে; আর এতে যদিও আমরা তাঁদের ক্লাস-সেন্স দেখি আর প্রীত হই!।

    বীণা সিক্রির সেকুলারিজম আসলে একজন হিন্দু জাতিরাষ্ট্রবাদীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো বৈ আর কিছু নয়। এটি সবচেয়ে সহজে ধরা পড়ে যখন আমরা দেখি আরএসএস-বিজেপির মতো পাঁড় হিন্দুত্ববাদী দলের মোদী সরকার প্রায় সাত বছর ধরে ভারতে ক্ষমতায়; অথচ বীণা সিক্রির মোদীর বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি বা সমালোচনাই নাই; বরং ভাবটা হল একেবারে সব ঠিকঠাক সুন্দরভাবে চলছে। অথচ “জয় শ্রীরাম” বলানোর জবরদস্তি অত্যাচার নিপীড়নে টেকা দায়, মুসলমান নাগরিকের বুকের খাঁচার ওপর লাফিয়ে উঠছে তাঁরা। কিন্তু বীণা সিক্রির তাতে কোন বিকার আছে আমরা দেখি নাই! তার মানে, সিক্রির সেকুলারিজম ভাবনার ফিল্টারেও আরএসএস বা মোদী পার হতে যেতে পারেন। এর চেয়ে তামাশা আর কী হতে পারে! আবার দেখি – বীনা সিক্রি মোদী-অমিতের ভারতের পড়শি দেশের থেকে কেবল ‘না-মুসলমানদেরই নাগরিকত্ব দেয়া’ হবে এই চরম বৈষম্যমূলক আইন গ্রহণ করেছেন বলে প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন। এমনকি বীণা সিক্রি মোদীর এই আইনের পক্ষে তিনি নিজে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটা ‘ন্যায্য’। এখানে তাকে “বাহ রে সেকুলারিস্ট” ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখি না।

    সিক্রির ভারত ‘এলডার ব্রাদার’ তত্ত্বঃ
    ভারতের বাইরের মানুষ ভারতের বড় ভাই সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে আপত্তি ও নিন্দা জানিয়ে থাকে। অথচ বীণা ভারতের এই অশিষ্ট ও আন-ওয়েলকাম আচরণ এটাকেই ভারতের জন্য গৌরবের বলে মনে করেন বা তুলে ধরে থাকেন।   বীনা সিক্রির এমন বুঝাবুঝির দৌড় দেখে জানা যায়, তার চিন্তা কত স্থুল। আর তিনি মনে করেন, বাকচাতুরি দিয়ে তিনি কথা বলবেন আর এটাকে কূটনৈতিক কথা বলে সবাই তা গ্রহণ করবে বা মেনে নিবে।

    বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জবরদস্তির তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করে আমেরিকা বাংলাদেশকে ক্রমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল; যাতে ভারত যেমন ইচ্ছা আসামসহ নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিটের নামে পুরো একটা করিডোর এবং তা বিনাপয়সায় এবং প্রায়রিটিতে আমাদের দুই বন্দরও প্রায় বিনাপয়সায় ব্যবহার করতে পারে। অবশ্য আসাম নিয়ে ভারতের জন্মের সময় (১৯৪৭) থেকেই নেহরুসহ ভারতের শাসকদের দ্বিধা ছিল যে, আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর মাগনা পেলেও সেটা দরকার কি না, নেয়া ঠিক হবে কি না! এ কথাটা শুনতেই আজব ও অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু কথা সত্য।

    আসামের অসুস্থ দ্বৈততাঃ বাংলাদেশের করিডোর ভোগ করে কিন্তু মুসলমান খেদাও চায়
    ভৌগলিকভাবে, আসামসহ ভারতের পুরা নর্থ-ইস্ট কিন্তু বাকি ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা ল্যান্ডলকড নয় একেবারেই। অন্তত ১৮ কিলোমিটার সংযোগ-ভূমির (চিকেন নেক) দ্বারা এটি সরাসরি ভুমিসংযুক্ত। আবার দেশভাগের সময়ের আগে বা পরে কখনোই নর্থ-ইস্টের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট দরকার বলে ভারত কখনো এমন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা বা আগ্রহই প্রকাশ করেনি। এটাই প্রমাণ করে, ভারত আসামের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট চায় না, অন্তত এই প্রশ্নে তাদের বিরাট দ্বিধা আছে। কেন?

    কথাটা বুঝা খুবই সহজ। আসাম যে যুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে, বাংলাদেশের অগভীর ফিডার বন্দর বা কোন গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা-নেয়ার সুবিধা চাইবে, এরই সাথে সাথে ঠিক একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টের ওপারে আরো উত্তরে আছে চীন। চীনের ঐ ভূখন্ডের বাসিন্দারা তাঁরা পুরোপুরিই ল্যান্ডলকড বলে, তারাও আসামের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে আর একইভাবে অসমীয়দের মত বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া সব করিডোর ফ্যাসিলিটিই পেতে চাইবে। এর সোজা মানে হবে, ভারতকেও আসামের ওপর দিয়ে চীনকে করিডোর সুবিধা পেতে দিতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু এটাই ভারত কখনো চায় না। এতে নাকি ভারতের আসামের ‘পবিত্রতা ও শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে’- এই হল ভারতের প্রকাশ্য যুক্তি।  এটা আসলে নিজ সন্তানকে হাত-পা নুলা করে দিয়ে এবার তাকে দেখিয়ে রাস্তায় বসে ভিক্ষা করানো – এভাবে আয়-ইনকাম করার মত। আসাম ডেভেলপড হয়ে গেলে তা দেখে চীনের সাথে আসামের সীমান্তে লাগোয়া অংশ আসামের উপর দিয়ে করিডোর চেয়ে বসতে পারে তাই, আসামকে নুলা করে রাখতে হবে, এই মনোভাব!
    এ জন্যই আমরা দেখি স্থানীয় (অসমীয়, বোড়ো বা অন্যান্যরা) আসামের বাসিন্দারা কথিত ‘বাঙালিদের বহিষ্কার’ চাইত সেই ১৯৫১ সাল থেকে। কিন্তু কখনো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চায়নি। অথচ আবার ভারতের শাসকরা পিছিয়ে পড়া আসামে (১৯৭২ সালের আগে পুরো নর্থ-ইস্টকে আসাম রাজ্যের অংশ গণ্য করা হত) কখনো অবকাঠামো বিনিয়োগই ঠিকমতো দিতে রাজি হয়নি; সম্পদ নাই বা ঘাটতি বলে এড়িয়ে গেছে। আর তাতে আসামই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবল সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জেগে উঠেছে (এখনও উঠে আছে), তবু ভারত কিছুই করতে রাজি হয়নি, নির্বিকার।
    আমরা নাকি “মাগনা পেলে আলকাতরাও খেতে চাই”- এখন সেই অবস্থা হয়েছে ভারতের। মাগনায় করিডোর পাচ্ছে বলে যেন এখন ভারতের আগ্রহ হয়েছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং হল – বাংলাদেশ বিনাপয়সার পোর্টসহ করিডোর দিচ্ছে; এটা বিজেপির পক্ষ থেকে আসামের বাসিন্দাদের জন্য কোনো উপহার মোদী সরকার এনে দিয়েছে – এটা প্রকাশ্য সত্য হলেও এটা আসামে কোন দলের নির্বাচনী ইস্যু নয়। এখনও এমন মানে বা মনে করা হয়নি। মূল কথা, আসামের এ পাওয়াটা লোপ্রোফাইলে রেখে দিতে চায় ভারত সরকার। কারণ সম্ভবত বাংলাদেশ যে এত বিশাল সুবিধা দিয়েছে এটা বেশি প্রচার করা হলে না বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশ বা মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আন্দোলন বন্ধ (আসামের বাঙালি খেদাও বা এখনকার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে অসমীয় মুসলমানদের খেদানো) করার দাবি বের হতে পারে। এ ছাড়া এর প্রচার বেশি হলে কখন আবার চীন না একই সুবিধা দাবি করে ভারতের কাছে চেয়ে বসে আর বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেয়। এটা অবশ্যই বিরাট এক তামাশা যে, পোর্টসহ করিডোর সুবিধা পাওয়া আসামের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের কোনো দলের নির্বাচনে এটা কোনো ইস্যুই কেউ করতে রাজি না…।

    করিডোর নেয়ার পালটা কী, বাংলাদেশকে কী দিয়ে বুঝ দিবেঃ
    কিন্তু সমস্যা আরেক জায়গায়। আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিলেও ভারতের জন্য এটা কিছু চক্ষুলজ্জার যে, কোন কিছু পাল্টা সুবিধা বাংলাদেশকে না দিয়ে করিডোর নেয়াটা কেমন দেখাবে! তাই এই অস্বস্তিটা কাটাতেই ঠিক করা হয়, বাংলাদেশকে “দুধ-ভাত খেলোয়াড়” বানিয়ে খেলায় নিবে। সেটা কী?
    মরহুম শেখ মুজিব সেই ১৯৭৪ সালে ভারতকে বেরুবাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন, বিনিময়ে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আমাদের ছিটমহলে যাওয়ার করিডোর ভারত দিয়ে দেবে – এই ভূমিবিনিময় চুক্তি হয়েছিল ওই সময়। তাই আমাদের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে শেখ মুজিব আমাদের কর্তব্য করেছিলেন তখনই। কিন্তু ভারত তার দায় কখনো গত ৪১ বছরে পূরণ করেনি। অর্থাৎ এটা আমাদের পাওনা অধিকার হলেও ভারত আটকে রেখেছিল। এ ছাড়া তিস্তার পানি পাওয়াও ছিল আমাদের ভাটির দেশের পাওনা ও অধিকার। আর যা কোনো রাষ্ট্রের পাওনা অধিকার সেটি পেতে আবার নতুন করে ভারতকে কোন কিছু দিয়ে ভারতের সাথে বিনিময় করার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা হবে অনেকটা যেন সেই ঠগের কারবার যে, আমার থেকে ধার নেয়া টাকা ফেরত দেয় না। কিন্তু একবার যে ফেরত দিবার আগ্রহের নামে এবার আমার থেকেই আবার নতুন করে ধার নিয়ে সেই টাকা দিয়েই আমার আগের ধার শোধ করল বলে দাবি করছে; ঠগের বাটপাড়ি যেমন হয়। ভারত সেই ছিটমহল ভূমিবিনিময়ের আইন এবার ৪১ বছর পরে ২০১৫ সালের মে মাসে পার্লামেন্টে পাস করা হয়েছে। আর তিস্তার পানি? সেটাও আমাদের পাওনা হলেও তা আর কখনোই পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

    কিন্তু এই ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে আইন পাস হওয়াটাকে নিয়ে বীণা সিক্রির মন্তব্য সাক্ষাৎকারে দেখেন।  “এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত তার বড় ভাই (বিগ ব্রাদার) পরিচিতি মুছে দক্ষিণ এশিয়ায় জ্যেষ্ঠ ভাই (এলডার ব্রাদার) হিসেবে সম্মান অর্জন করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি” [……By approving implementation of LBA, India has shed its “big brother” tag and acquired an “elder brother” status in South Asia, says Veena Sikri ]। দেখেন কারবার! আসলে টাউটারিতেও তো কিছু সীমা থাকে। সিক্রি সেটাও ছড়িয়ে গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, সিক্রির আরো চাপাবাজি হল, তিনি বলছেন – সংসদে এই আইন পাস করে দিয়ে নাকি মোদী তাঁর “প্রতিবেশী প্রথম” [neighbourhood first] মতবাদ কাজে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন”। এ ছাড়া আরো আছে। সিক্রি বলেছেন, এই আইন পাস হওয়াতে নাকি, “ভারতের জন্য ভূখণ্ডগত জাতীয় ক্ষতি হয়েছে” [for India, it’s a notional loss of territory]।  এটা কলোনিদখলবাজ ইংরেজদের চেয়েও শঠতাপূর্ণ কথা। কারণ এটা ছিল ভূমির বিনিময়ে ভূমি নেয়ার চুক্তি। তাই তথাকথিত কোন আত্মত্যাগের বালাই নাই এবং নয় এটা। এটা কারো জন্যই একপক্ষীয় কোন ভূমি হারানোই নয়। আমরাও সমতুল্য ভূমি হারিয়েছি। অথচ সিক্রি এটা এখানে তুলে ধরছেন ‘ভারতের দয়া’ বলে, “একপক্ষীয় ভূমি হারানো” বলে। ফলে সত্যিই আমরা ঠগের পাল্লায় পড়েছি দেখা যাচ্ছে। এটাই হলো, টিপিকাল ছেচরামো! আমরা নির্বাক!

    এভাবে সর্বশেষ যে মিথ্যা বলা আর চাপাবাজিটা বীনা সিক্রি করেছেন আর আবার এদেশে লেখা ছাপিয়েছেন, সেটা গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, বাংলা-ইংরেজি দুভাবেই ছাপিয়েছিল [তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত]।

    এ ছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে গত ২৯ আগস্ট এক ভার্চুয়াল ওয়েবনিয়ার আলোচনায় তিনি আবার আরো মিথ্যা ও চাপাবাজি করতে গেছেন। এটাই তাঁর তথাকথিত নষ্টা-সেকুলারিজম নিয়ে। এর আয়োজক ছিল Indian Council for International Cooperation নামে কেউ। সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন, “বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন বঙ্গবন্ধুর লিগ্যাসি এবং ওর মধ্যে সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে কিছু বৈশিষ্ট্য আছে – যেগুলো ইন্ডিয়ান কনস্টিটিউশনের সাথে কমন”।   ……….. “ঢাকার ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন আমাদের দুই দেশের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক শুরু করতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে”।

    ইসলাম-কুপানি নষ্টা-সেকুলারিজমঃ
    লক্ষ্য করা যাচ্ছে বীনা সিক্রি ইদানীং সুযোগ পেলেই ‘জ্ঞানী’ লোক হওয়ার আর বাংলাদেশকে সেকুলার হতে জ্ঞান দেয়ার উৎস হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চাইছেন। কিন্তু আমরা সত্যিই খুব দুঃখিত! আমরা মনে করি, তার কনস্টিটিউশন বা সেকুলারিজম বিষয়গুলো নিয়ে নুন্যতম কোন জ্ঞান বা ধারণাই নেই। সাথে কিছু ফ্যাক্টস প্রসঙ্গেও একেবারেই জানা নাই। কিন্তু এজ ইউজুয়াল আন্দাজে বলা ঠিকই আছে। বীণা সিক্রি চাইলে  একেবারেই কান খুলে শুনে রাখতে পারেন, নিচের বাক্যটাঃ

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি আমরা তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোন পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে।

    মানুষ মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত শিখে এবং চাইলে শিখতেও পারে। সিক্রি, আপনার উচিত হবে এ বিষয়ে পড়তে বসা, স্টাডি করা। দুঃখজনক হল – নেহরু, গান্ধীসহ যারা আগের ভারতের নেতা ছিলেন এমনকি ইন্দিরা গান্ধী এরা কেউই উপরে যে প্যারাটা লিখেছি, সে কথাগুলো জানতেন তা মনে হয় না। সে কারণে ভারতের কনস্টিটিউশনেও সেকুলারিজম শব্দটা আগে ছিল না। এরা সবাই সেকুলারিজম কী করলে একমাত্র হয় সে বিষয়ে জানাজানি শেষ না করেই মারা গেছেন। সেটা তাঁদের এজেন্ডাও ছিল না মনে করার কারণ আছে। কারণ কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে জন্মের পর থেকে যে রাষ্ট্রের ধারণা রপ্ত ও বাস্তব করেছে সেটার মূল বৈশিষ্ট হল –  এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র।

    তাই একটা সত্য আগে জেনে রাখুন। সেকুলারিজম লিখে রাখা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের দুই কনস্টিটিউশনে এটি কমন কথা এবং কমন ভিত্তি এবং এই কমন ভিত্তির বলে যে নতুন ধরনের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক কথা বীনা বলেছেন তাও অর্থহীন এবং ভিত্তিহীন – অসত্য ও ভুল।

    ফ্যাক্টসটা হল – বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সময় রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন নীতি লেখা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ১১ বা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১।  এরপরে ১৯৭১ সালের অক্টোবরেও – ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেক এই অনুরোধ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার থেকে তত দিনে তিনবার চাওয়া হলেও ভারত তা দেয়নি। কারণ ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্র বিষয়ক ধারনায় অস্পষ্টতা ছিল। কিন্তু যেটা তাকে তাড়া করছিল তা হল,  ভারত মানে মূলত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ভারত যার জন্মের শত্রু পাকিস্তান যে পাকিস্তানের পুর্ব অংশ যা বাংলাদেশ নামে সাধীন হতে চাইছে কিন্তু সব ছাপিয়ে ইন্দিরাকে যা খোঁচা দিচ্ছে এরা তো নব্বই ভাগই মুসলমান – এই মুসলমানদের স্বাধীন হতে তিনি কেন গাটছাড়া বাধবেন? তাই তিনি একটা নিশ্চয়তা চাচ্ছিলেন, একটা রক্ষাকবচ চাইছিলেন। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সবগুলো পক্ষই এলাইয়েন হয়ে যাবার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে সবাই সক্রিয় হবেনই এটা নির্ধারিত হয়ে গেছিল একাত্তরের আগষ্টেই। যেমন বাস্তবত সুযোগ ছি না নাহলে ইন্দিরাই মন শান্তির জন্য তিনি হয়ত অনুরোধ রাখতেন তোরাও ভারতের মত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে যা। তাই এরই বিকল্প শব্দ যা সম্ভবত তার পরামর্শকেরা তাকে দেয় সেটা হল “সেকুলারিজম”।  কিন্তু একটা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন কী করে সেকুলার গণ্য হয়, কী করে তা নিশ্চিত করতে হয় তা তারা কেউ জানতেন না।  জানতেন না এত কঠিন শব্দ উচ্চারণ করে বলছি এজন্য যে  – এই কাজটা অন্তত “আমরা সেকুলার” অথবা “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” এভাবে  তা কনষ্টিটিশনের প্রতিটা পাতায় লিখে রাখলেও তা হবে না। ফলে ইন্দিরার “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” – লিখে রাখা দেখেই নিশ্চিত বলা যায় যে তাঁরা এটা কেউই জানতেন না। ইন্দিরার ভয় যে বাংলাদেশ না কথিত ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে যায় – এটাই ছিল তাঁর আসল ভয়। কিন্তু তিনি জানেনই না এই ভয় তাড়ানোর পথ কী। তাই পুরা আনাড়ী হয়ে সেকুলারিজম শব্দটা তিনি আকড়ে ধরেন।  এতে তখনকার মত বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারকে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর যে  ড্রাফট বা পরামর্শটা পাঠান যাতে তিনি সররত আছেন জানান  সেখানে – সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতির কথা উল্লেখ করে- এটাই ভিত্তিতে বাংলাদেশ যেন নতুন করে অনুরোধ পাঠায় ইনফরমালি তাই বলা হয়েছিল।

    আরেকটু বলে রাখা ভাল, হিন্দু-ভারত ও প্রগতিধারীরা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়ে গেল কিনা এনিয়ে প্রবল শঙ্কায় থাকে যদিও ভারত নিজেই যে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে জন্ম হয়ে আছে সে খবর তাঁদের নাই। তারা প্রায়ই আপত্তি তুলে পাকিস্তান একটা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়েছিল। কিন্তু কেউই বলতে পারবে না কি দেখে তারা তা বুঝেছিল তাও বলতে পারবে না। কেবল আপাত জ্ঞানীরা দাবি করবে পাকিস্তানের ফরমাল নাম দেখে – সেটা হল ইসলামি রিপাবলিক অফ পাকিস্তান। এই নামের মধ্যে ‘ইসলাম” লেখা থাকার কারণে। কিন্তু শব্দটা আসলে ডেকোরেটিভ বা নেহায়তই সাজানোর জন্য।  পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টমূলক শব্দ হল রিপাবলিক, একমাত্র যা দিয়ে ওর ক্যারেকটর প্রকাশ পায়। এর অর্থ হল, এটা নাগরিকের ভোটে প্রতিনিধিত্বে নির্বাচিত ক্ষমতার রাষ্ট্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা হল, এই নাগরিক হিন্দু এবং মুসলমান দুধরণের যেকেউই হতে পারে। মানে হিন্দু নাগরিকের ভোটটা অর্ধেক বলে গণনা হবে তা নয়। একজন মুসলমান নাগরিকের ভোটের মত সমান হিন্দুর ভোটটাও ঐ এক ভোট বলেই গণনা হবে। যদিও পাকিস্তান রাষ্ট্রে নাগরিক বৈষম্যমূলক কিছুই ছিল না এমন দাবি এখানে করা হচ্ছে না।

    জাতিরাষ্ট্রের ভুল নয়, দরকার বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক রাষ্ট্রঃ
    যাহোক কথা শেষ করতে এখন সংক্ষেপ করব। আসলে বাই ডেফিনেশন রিপাবলিক শব্দের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত যে আরেক অর্থ আছে তা হল এখানে নাগরিক বলতে সবাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক হতেই হবে ধরে নেয়া হয়েছে। তাতে নাগরিকদের মধ্যে  ধর্মীয় বা গায়ের রঙ, বা পাহাড়ি-সমতলি ধরনের ইত্যাদি যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন। আইডিয়েলি এটাই হল রিপাবলিক ধারণা। সেটাকে আরও স্পষ্ট রাখার জন্য “সাম্য নীতির” কথা অনেকে আলাদা করে উল্লেখ করে রাখে অনেক কনষ্টিটিশন। আর যে কনষ্টটিউশন সাম্যনীতি মানবে বলে পাবলিককে প্রতিশ্রুতি দেয় সেটাই (কোন ধর্মবিদ্বেষী নয়) সত্যিকার সেকুলার রাষ্ট্র বলে বিবেচিত হবার জন্য যথেষ্ট। তাই মূলকথা ” নাগরিক সাম্যনীতি মানবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়াই – যথেষ্ট। এরপরে ঐ রাষ্ট্র আর সেকুলার কিনা এটা বোকার প্রশ্ন। ধর্ম কুপানোর বদ-চিন্তার সাথে নষ্টা-সেকুলারিজম এতে বিদায় হতে পারে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র আলাদা করা এটাও আরেক বদ-চিন্তা, মূলত অপ্রয়োজনীয় চিন্তা।

    কিন্তু সাবধান লেখাই যথেষ্ট না। সামাজিক রাজনৈতিক প্রাকটিস বা চর্চায় সেকথাকে বাস্তব করে দেখানো এটা আলাদা কাজ। সেটা আলাদা করে অর্জনের বিষয়। কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার প্রায় দুশ বছর পরেও আমেরিকায় – “ব্লাক লাইফ ম্যাটারস” বলে আন্দোলন করে মানুষে হুশ ফিরাতে হয়।

    যারা সেকুলারিজম জিনিষটাই খায় না মাথায় দেয় বুঝে না তারাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলারিজম লিখে এবার প্রবল্ভাবে ইসলামবিদ্বেষী চর্চায় মেতে উঠে।

    বীণা সিক্রির কথায় ফিরি আবার। এখন সার করলে, এর মানে- ১. সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতি করার শর্তেই নিরুপায় বাংলাদেশকে ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে হয়েছে। ২. তখনও ভারতের কনস্টিটিউশনে এই চার নীতির কোনো শব্দই ছিল না। তা অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে আমাদেরও ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে, নতুন করে ভারতের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে নিবার সময় [THE CONSTITUTION (FORTY-SECOND AMENDMENT) ACT, 1976]। এবং বলা বাহুল্য ভারতের সমাজ রাজনীতিতে যার কোন ইম্প্যাক্ট বা ভুমিকা নাই। কারণ, থাকলে আরএসএস বা মোদী সরকারের জন্ম হবার কথা না। তাই মূলত কাজটা ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতের যারাই এই কথিত ও নষ্টা-সেকুলারিজমের ভক্ত অথবা যারা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার হয় কিভাবে বুঝেন না তাদের সবার চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করে এবং এ অজ্ঞতা চিহ্ন হয়ে থেকে গেছে – সেকুলারিজম লিখে রাখা না রাখা পর্যন্তই এদের জ্ঞান।

    এক দিকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার সময়ে কী কী বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যথেষ্ট ধারণা না রাখা, অন্য দিকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার পরিণতিই হলো আমাদের তিন দেশে (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সব অসাম্যের সবচেয়ে বড় কারণ।  কারও মনের দগদগে ধর্মবিদ্বেষ ও ঘৃণা যেন সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে এজন্য সেকুলারিজম ধারণাটাকেই এর সাফাই-হাতিয়ার করে হয়েছে। নষ্টা-সেকুলারিজমকে – সেভাবে ব্যবহার করা হয়ে এসেছে এত দিন।

    আবার তাজউদ্দিন যা লিখতেই বাধ্য হয়ে থাকেন, বাংলাদেশের মানুষরা সচেতন, তাই তাদের প্রতি এই বিদ্বেষ ও ঘৃণা তারা টের পেয়েছে। তাই তারাও কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলারিজম’ বলে এক শব্দ লিখে রেখে সকল নষ্টামি চিন্তাকে প্রতিরোধ ও শায়েস্তা করতে, কিছুটা রাগে ক্ষোভে পাল্টা – আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস বা রাষ্ট্রধর্ম ধরনের শব্দ বা ধারণা ঢুকিয়ে রেখেছে। যদিও তারা ভালোই জানে, এগুলো লিখে রাখা বা না রাখার সাথে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নড়াচড়া হবে না, হওয়ার কোনোই সম্পর্ক নেই।

    যারা নষ্টা-সেকুলারিজমের শয়তানি থেকে বেরিয়ে শুদ্ধ হতে চান, তারা আরেকটু একটু খোঁজখবর করতে পারেন। রাজা রামমোহন রায় যাকে ভারতের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলরা ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় ‘রেনেসাঁর আদিগুরু’ বলে সবাই জানেন ও মানেন, তিনিই তো ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন, ১৮১৫ সালে। তা হলে এখানে রেনেসাঁর আদিগুরু ধর্ম চালু করেন কেমনে? আর সেই ধর্ম এখানে ইতিবাচক হয় কেমনে?

    প্রগতিশীলদের এক প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী ছিলেন। কারণ তার দাদা দ্বারকানাথ শুধু রামমোহনের অনুসারী ছিলেন না, ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা গেলে তিনিই ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ১৯১১-১৫ সময়কালে ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র ‘তত্ত্ববোধিণী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

    কিন্তু তবু সেকুলারিজম বলি আর নাই বলি, বৈষম্যহীন সার্বজনীন সম-নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র কেন কায়েম হয় নাই আমাদের তিন রাষ্ট্রে – আমাদের সেই আদি-পাপ অন্যখানে – সেকথা এখনও বলা হয় নাই। রামমোহন ভাবতেন ১. রাষ্ট্র মানেই তা নেশন-স্টেট, ২. আর নেশন বা জাতি মানেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি।

    এই বোধটাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক ধারণা বা রিপাবলিক ধারণা বুঝতে না পারা বা পৌছাতে না পারার প্রধান বাধা, মুল কারণ – যেটা রামমোহন রায়ের আদি-পাপ। আমরা তিন রাষ্ট্র যার ভুক্তভোগী সাফারার!

    আর এসব ধারণা মূলত কলোনিবৃটিশ রাজের আমলের জাতি বা জাতিরাষ্ট্র এর ধারণাজাত। কিন্তু হিটলারের উত্থান ভয়াবহতা দেখার পরে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে নিজেদের ভূল সংশোধন অরে নিয়েছিল। আমরা যার খবর জানি না।

    তবু রামমোহন উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমন করেছিলেন সেটা মনে করা ভুল হবে।  আসলে ভারতের সবাইকে ব্রাহ্মধর্মে নিয়ে গিয়ে এরপর সবাইকে নিয়ে এক ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্র গড়তে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন বলেই এই ধর্ম চালু করেছিলেন। তবে তা সফল হয়নি। যদি সফল হত তবুও এটা রাষ্ট্র বিষয়ে ভুল ধারণা ।  আর প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনাকারী এই রামমোহন রায়। তা হলে ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগ গঠন এবং জিন্নাহকে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দায়ে অভিযোগ আনা কিভাবে সঠিক হয়? সর্বোপরি ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস দল সেটা তো এই রামমোহন রায়ের উদ্যোগেরই শেষ পরিণতি।

    তবু একজনের কথা এখানে উল্লেখ করে রাখি যার “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার” ইচ্ছাটা উদ্দেশ্যমূলক। বাকিটা পাঠকেরা আরও খোঁজ করেন। তিনি হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধায়। ১৮৭৯ সালে তাঁর লিখিত এক প্রবন্ধপুস্তক – নাম ছিল ‘সাম্য’। কিন্তু বইটার দ্বিতীয় মুদ্রণের সময় তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন, আর ছাপান নাই। রামমোহন বলা যায় অকালেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। কিন্তু এরপরেও যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না এটা সকলেই বুঝতে পারছিলেন। শেষে ১৮৭২-৭৮ সালের মধ্যে এটা তিন টুকরা ভেঙ্গে যায়। এরপর যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে বলে এটাকে সাফাই হিসাবে ব্যবহার করে হিন্দু প্রকল্প মানে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প করে আগিয়ে যান তাঁদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম। এসবেরই পরিণতি ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস। কিন্তু মুসলমানেরা কেউ একটা হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পকে নিজের মনে করে নিবে সেকথার কোন জবাব দেয় নাই। বরং এদের স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র চিন্তা যে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প চিন্তা তা ক্রমশ লুকিয়ে চলার কৌশল নিয়েছে। সামনের হিন্দু শব্দটা উচ্চারণ এড়িয়ে চলেছে। তবু প্রধান চিন্তার ভুল বা আদি-পাপ হল রাষ্ট্র মানেই ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র এই রাষ্ট্র-বুঝ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২১ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বীনা সিক্রির নষ্ট সেকুলারিজম” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • দশক আগেরটা নয়, সংশোধিত আমেরিকায় কিছু সম্ভাবনা

    দশক আগেরটা নয়, সংশোধিত আমেরিকায় কিছু সম্ভাবনা

    গৌতম দাস

      ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:৩৮

    https://wp.me/p1sCvy-3ce

    Bangladesh-US political relationship

    গ্লোবাল নেতৃত্ব বিশেষত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের নেতা হওয়ার লড়াই এবার সম্ভবত তুঙ্গে উঠতে যাচ্ছে। এটা ফাইনাল লড়াইও হয়ে উঠার লক্ষণ সম্পন্ন। আমেরিকার আসন্ন নভেম্বর নির্বাচনের জন্যই যেন সবাই অপেক্ষা করছে; রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকাও মরণপণ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে এই লড়াই হবে বাই-পার্টিজান। মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দু’দলই এমন লড়াইয়ের পক্ষে। যদিও ফারাক শুধু এখানেই যে নির্বাচনে যে জিতবে সে নিজের কায়দায় ও কৌশলে এ লড়াইয়ে নামবে, নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু তবু দু’দলে অনেকগুলো মিলও আছে। এর একটা হল যেমন,  এ’দুই দল যেন চাইলেই খোদ আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতৃত্বের আসনে ধরে রাখতে পারবে, এই মিথ্যা কথাটা দুদলই সত্যি ধরে নিয়েছে। “আমি সরব না” বললেই যেন গ্লোবাল এম্পায়ারের নেতার আসন ধরে রাখা যায়। যেমন অনেককে আবার দেখছি সামরিক শক্তির বিচারে চীন আমেরিকার কত পেছনে সেটা মেপে দেখিয়ে আর্টিকেল লিখে দাবি করছে, আমেরিকাকে কেউ নেতাচ্যুত করতে পারবে না। তাহলে সোজা আরেক কমন দিক হল, এ দু’দলই মনে করে  – গ্লোবাল এম্পেরা’র (সাম্রাজ্যশাসক) নেতা থাকার ব্যাপারটা আমেরিকার ইচ্ছাধীন।

    অথচ কেউ আর চাইলেও গ্লোবাল লিডার বা এম্পেরা’র ভূমিকায় আমেরিকাকে রাখতে পারছে না বা পারবে না, এটাই বাস্তবতা।  আবার সেই আমেরিকা আজ কোথায় – যে আমেরিকা আগে গত সত্তর বছর ধরে নিজেই ছিল গ্লোবাল নেতা, অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশনের লিডার, পণ্য বিনিময় ব্যাপকভাবে দুনিয়ার কোণে কোণে ছড়িয়ে এক গ্লোবাল বিনিময় লেনদেনের ব্যবস্থা বা অর্ডার গড়ে তোলার কাজে ছিল যার লক্ষ্য ও যে ছিল নেতা? সেই আমেরিকা তো এখন এখন ফিরে গ্লোবালাইজেশনের লিডার হওয়া ছেড়ে বুড়ো বয়সে এসে কেবল ‘আমেরিকান জাতির’ নেতা হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে! তা সত্বেও আবার এটা অবশ্যই ব্যর্থ হবে। কারণ যে দুনিয়া একবার কথিত ‘জাতি’ থেকে গ্লোবালাইজড বিনিময়ের এক ব্যবস্থা বা অর্ডারে ঢুকে গেছে সে আর ফিরে ঘরোয়া একা একা নিজ সীমানার ‘জাতি ব্যবস্থায়’ ফিরে যাবে না, চাইলেও পারবে না। গত ২০১৪ থেকে অনেককে বলার চেষ্টা করেছিলাম দুনিয়াতে আবার ভুয়া “জাতি” হবার একটা জোয়ার উঠানো আনার চেষ্টা হচ্ছে ও উঠবে। এরা বাস্তবতা না বুঝে মনে করেন জোর করে বা জোয়ার তুলে হলেও আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার ভুমিকায় রাখা যাবে এবং এটা সম্ভব। এটা অনেকটা যেন সেই স্বপ্ন যে দুনিয়াটাকে আবার যদি কলোনিদখল ব্যবসা ও ব্যবস্থার যুগে ফেরত নেয়া সম্ভব হত! সেই আলোকে এবার তাই আমরা দেখছি ট্রাম্পের এডভাইজার স্টিভ ব্যাননদের [Steve Bannon] আবির্ভাব কিংবা হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান; এসবই কিছু সেই নমুনা। তবু বলাই বাহুল্য এরা সমূলে ব্যর্থ ও নির্মুল বা উন্মুল হয়ে যাবেই।  তবে এর আগে আরো বহুবিধ ধ্বংস ঘটিয়ে এরপরে তা বিলীন হবে হয়ত। নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান বা ‘বিদেশি’ হত্যার ঘটনাগুলো আমরা এখানে মনে করতে পারি। গত সপ্তাহে আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান – মানে যে প্রতিষ্ঠান মুসলমানেরাই আমেরিকান প্রধান শত্রুজ্ঞান করে জন্ম দেয়া হয়েছিল – তিনি  আমেরিকান কংগ্রেসের (বা সংসদীয় কমিটির) এক শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন  আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য এখনকার সবচেয়ে বড় হুমকি হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিয়মিত চরমপন্থা বা এক্সিমিজম। এসব ততপরতা এখন বাড়ার আরেক বড় কারণ অবশ্য খোদ ট্রাম্পেরই পেটি-ক্ষুদ্র স্বার্থ বা লাভালাভে এসব গোষ্ঠিকে পরোক্ষে বা কখনও প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া বা নেয়া।

    তবু ‘জাতি ব্যবস্থায়’ ফিরে যাওয়ার চেষ্টা ট্রাম্পের গত চার বছরের ধরে তৎপরতা হয়েই ছিল। আজকের আমেরিকান প্রশাসন সেই আকার পেয়েছে বা দেয়া হয়ে গেছে যা ট্রাম্পের ততপরতার কিছু প্রত্যক্ষ ফসল। শুধু তাই নয়, এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবস্থা এমন জায়গায় চলে গেছে যে, বাইডেন জিতলেও ট্রাম্পের এক্সিকিউটিভ অর্ডার বা পলিসিগুলো আর বদলাতে বা পুরনো ট্রাম্প-পুর্ব জায়গায়  নিতে পারবেন না। বাইডেনকে ট্রাম্পের কাম-আকাম বহুকিছুই অনুসরণ করে যেতে হবে। আর এভাবেই যেন আমেরিকা ক্রমশ শেষ হয়ে যেতে চাওয়ার রাস্তায় উঠে গেছে; শেষ দিনগুলোতে যতদিন না গ্লোবাল নেতা আমেরিকা এভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিজেকে বিলীন হওয়ার দিকে নিয়ে চলে যায়। চলতি সপ্তাহের (১৯ সেপ্টেম্বর) ‘ইকোনমিস্ট’ ট্রাম্পের এমন নীতিগুলোর একটা তালিকা তৈরি করে রেখেছে, যার শিরোনামঃ How would Joe Biden change America’s trade policy?। আগ্রহিরা তা পড়তে এই লিঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন।

    কিন্তু এব্যাপারে আমেরিকার জন্য বাস্তব অসুবিধা হল, কেউ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হবে কি না এটা তার নিজের খেয়ালে নেয়া ইচ্ছায় সিদ্ধান্তের বিষয়ই নয়। অন্যভাবে সরাসরি বললে, মূল কথাটা হল- অর্থনৈতিক কারণে কোনো রাষ্ট্র যখন গ্লোবাল সারপ্লাস সঞ্চয় বা পুঞ্জীভবনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়, এটাই সেই পূর্বশর্ত যে, সে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হচ্ছে বা হবে কি না।

    এক্ষেত্রে চিন্তার জগতের বাস্তব সমস্যটা হল, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গ্লোবাল অর্থনীতি বিষয়টা নাড়াচাড়া করার জন্য যাদেরকে একাদেমিক বা প্রফেশনাল দিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব মনে করা হয় এরা হল মূলত যাদের “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” বিষয়ে ডিগ্রী আছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে বুঝা আর সাথে গ্লোবাল রাজনীতিতে এর প্রভাবকে বুঝতে পারার জন্য অর্থনীতির নুন্যতম ধারণা দরকার হলেও এটা তাদের জানা বা পড়ার সিলেবাসেই নাই। ভরসা একমাত্র কেউ যদি আলাদা করে অর্থনীতিও পড়ে নেন বা ডিগ্রী থাকে।  একারণে কেউ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা থাকবে কিনা এটাও যেন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কারো আছে কিনা আর সাথে ইচ্ছা থাকলেই এটা সম্ভব বলে মনে করতে থাকেন এরা। অথচ ঘটনার অবজেকটিভ দিক বা বাস্তব দশা পরিস্থিতিটা তাদের নাগালের বাইরেই থেকে যায়।

    ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে গ্লোবাল অর্থনীতির প্রভাবঃ
    যেমন ধরা যাক, আমেরিকা এখন খুবই আগ্রাসী হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের কথা তুলে এগিয়ে আসছে। সম্ভবত তাতে ভারত যতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে মাঠে আমেরিকাকে পাশে পেতে আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে তা এর চেয়েও বেশি আগ্রাসী। কিন্তু তবু আমরা দেখছি ফাইনালি মোদী চীনের সাথে আপস করতেই ছুটে চলে গেলেন। কেন?

    কারণ নরেন্দ্র মোদীর জন্য আবার ঠিক এর উলটা আরেক ফ্যাক্টস হল, তিনি জানেন তাঁর দরকার এখন বিপুল  বিনিয়োগ। করোনা শুরুর আগেও এ সমস্যা ছিল আর করোনার প্রভাবে পরে ভারতের অর্থনীতি এখন একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। অথচ এখনও করোনায়  প্রতিদিন নতুন একলাখ জনসংখ্যা আত্রান্ত হচ্ছে আর এক হাজার মারা যাচ্ছে। কাজেই মোদীর ভারতের এখন দরকার বিনিয়োগ – সেটা অবকাঠামো আর এফডিআই (বা সরাসরি প্রাইভেট ব্যবসায়িক বিনিয়োগ) এদুটো অর্থেই। যার একটা – এফডিআই, এটা আমেরিকা এক বিশেষ শর্ত (যা ভারতের স্বার্থের জন্য খারাপ) সাপেক্ষে হয়ত দিতে সক্ষম। সেই এমন বিশেষ সুবিধার শর্ত হল যে, আমেরিকান ব্যবসায়ীদেরই সরাসরি ব্যবসা, কারখানা নিয়ে ভারতে বসতে দিতে হবে। আর অন্যটা মানে, অবকাঠামো বিনিয়োগ, সেটা এখন আর আমেরিকা দিতে অপারগ।  কাজেই এই আমেরিকাকে নিয়ে মোদি কী করবেন? কোন কাজে আসবে? আর এটাই হল, যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল সারপ্লাস এখনও জমছে আর যে রাষ্ট্র এখন সেসব দিন পার হয়ে ফুরিয়ে এসেছে – এদুইয়ের সিরিয়াস ফারাক।

    কাজেই সোজা ভাষায় বললে,  আমেরিকার কোন প্রশাসন কত আন্তরিকতা আর মানসিক দৃঢ়তার শক্তিতে ইন্দো-প্যাসিফিক জোট নিয়ে এগিয়ে আসছে – কত জোরে দৌড়ে ভারতের দিকে ছুটছে – এতে মোদীর কোন দুঃখ আমেরিকা ঘুচাতে পারবে না। আবার এটা মোদীও জেনে গেছেন। অথচ এই সক্ষমতাটার সবই চীনের আছে।ঙ্কিন্তু ভারতের অন্যান্য চীনা-ভীতি বা সীমান্ত বা নেহাতই ঈর্ষা ইত্যাদি চীনকে নিয়ে ভারতের  মনে মনে যাই থাক, মোদীসহ ভারতের সিরিয়াস যেকোন ব্যক্তিত্বই অস্বীকার করে না চীন ভারতের জন্য কত দরকারি ও উপযুক্ত। এবং পারফেক্ট চয়েস।  এমনকি ভারতের এই প্রয়োজনের কাছে চীনের বদলি জাপানও ন্‌ তাও ভারত টের পায়। এটাই ভারতের জন্য এক উভমুখি বা কন্ট্রাডিকটরি সমস্যা ও বাস্তবতা। এর পিছনের মূলকথাটা হল, আমেরিকা ভারতের কাছে এক অতীত আর চীন হল আগামি। আর তা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা অর্থেও। কিন্তু তবু ভারতের সকল রাজনৈতিক নেতার চোখে অর্থনৈতিক অর্থে চীন খুবই কাম্য হলেও (যেটা মোদীর চোখে চীন সবার চেয়ে বেশি কাম্য। মোদীই প্রথম চীনকে ভারতের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে ডেকে এনেছিলেন। ) কিন্তু ঠিক এর উল্টাভাবে গ্লোবাল রাজনৈতিক অর্থে ভারতের চীনা ভীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে ট্রমার কারণে আমেরিকা তার এক নম্বর কাম্য। এছাড়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিষয়টাকে দেখা ও বুঝার মত কোন নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কেউ আছেন তা জানা যায় না।  কারণ উগ্র বিধ্বংসী হিন্দু ‘জাতি’ বোধ আর অকার্যকর স্বদেশিপনা ভারতের সংকট থেকে বের হয়ে আসার সব সম্ভাবনাকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলছে।

    অর্থাৎ বলাই বাহুল্য এই আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতার ভুমিকা নয়। অন্তত দৃশ্যত ভারতের কাছে। কিন্তু তা নয় বলে তাতে আমেরিকা মুখে যতই দাবি করুক করলেও কিছু হচ্ছে না, কিছু এসে যাচ্ছে না। এমনকি আমেরিকার সা্থে মোদীর ভারতের মিলন আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা কাজ করতে পারছে না। বরং আর আমাদের সবার মাথার উপরে টিকটিক করা ঘটনাটা হল,  আমেরিকায় যারা এটা মানছে না এরা এই অসম্ভব জিনিসটা মেনে নিতে না পেরে পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের ও দুনিয়াকে আরো দুস্থ অবস্থায় ফেলে দিতে পারে।

    আমেরিকান গ্লোবাল ভুমিকার পরে এবার আমেরিকান লোকালঃ
    লন্ডন ইকোনমিস্ট সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বাংলাদেশ নিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর এক আর্টিকেল ছেপেছে। এর একটা অনুবাদ এখানে পাওয়া যেতে পারে। যার শিরোনাম – “ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক দুর্বল বলে চীনের সাথে বন্ধন শক্তিশালী হচ্ছে”। ইকোনমিস্টের লেখাটায় কোনো লেখকের নাম নেই, কোন ছদ্মনামও নাই। যদিও লেখা পড়ে মনে হয়, প্রো-ইন্ডিয়ান মনের বাংলাদেশের কোন সাংবাদিকের সহযোগিতায় কোন ইন্ডিয়ান বা পশ্চিমা সাংবাদিক এটা লিখেছেন। তবে লেখক যেই হন, তিনি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কেন দুর্বল হল অথবা চীনের সাথেই বা কেন সবল হল এর কোন ব্যাখ্যা দেননি। এমনকি তিনি ধরে নিয়েছেন, ভারতের সাথে এখন যে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে বলছেন তা আগে এটা সবল ছিল। কিন্তু আগেই বা এটা সবল ছিল কেন অথবা কবে থেকে সবল ছিল এরও কোনো ধারণা বা ব্যাখ্যা দেয়া নেই এখানে। তবে পুরো রিপোর্টে একটা দুঃখবোধ চারদিকে ছড়িয়ে আছে যে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা ঢিলা হয়ে গেছে।

    আবার  শুরুর প্যারায় লেখার প্রসঙ্গ হল, সিলেটের এয়ারপোর্ট নির্মাণের টেন্ডারে ভারতের এক কোম্পানি হেরে গেছে, আর চীনের এক কোম্পানি কাজ পেয়েছে। কিন্তু এটা কী করে চীন বা ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের দুর্বল বা সবল হওয়ার উদাহরণ হয়? এটা লেখক বলেননি। একটা টেন্ডারে ভারত হেরে গেলে কার কী করার আছে? এটা তো বাংলাদেশের কারো সাথে সম্পর্ক সবল নাকি দুর্বল এর প্রমাণ হতে পারে না। ফলে পাঠকদের মনে এই প্রশ্ন উঠতেই থাকবে বা থেকেই যাবে।

    আবার বলা হয়েছে, গত জুন মাসে চীন বাংলাদেশের চীনাপণ্য আমদানিতে ৯৭ ভাগ পণ্যে ডিউটি ফ্রি সুযোগ দিয়েছে। অথচ বটম লাইন ফ্যাক্টস হল, এটাও ঠিক এখন কোন দেয়া সুবিধা নয়। এসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল ২০১০ সালে ‘কম্প্রিহেনসিভ কোঅপারেশন’ নামে যে আলাপ শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার প্রথম চীন সফরের সেই সময় থেকে। আর পরে, এতে ২০১২ সালে এ নিয়ে ডেইলি স্টারে চীনা রাষ্ট্রদূতের বিস্তারিত সাক্ষাতকার ও রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। সেসব চীনা প্রস্তাব এই প্রথম এখন কিছুটা কার্যকর করা হয়েছে দেখা যাচ্ছে, এই আর কি।  এ ছাড়াও ইকোনমিস্টের  লেখায় বলা হয়েছে – বাংলাদেশে কিভাবে ভারতের দখলদারসুলভ দম্ভ ও খারাপ আচরণে বাংলাদেশীদের মধ্যে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বাড়ছে।

    মজার দিকটা হল, আসলে ইকোনমিস্টের ওই রিপোর্ট অনেক জায়গাতেই নানাবিধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আর তা যে যার মত করে নিজের কাজে লাগাচ্ছে। যেমন বিবিসি বাংলা পরোক্ষে ওই রিপোর্ট নিয়ে আরেকটি রিপোর্ট করেছে। যেন ইকোনমিস্টের ঐ রিপোর্ট নিয়ে কংগ্রেসের কী প্রতিক্রিয়া সেটা জানা এর উছিলা। সেখানে ফোকাস বক্তব্যটা হল – আসলে ভারত না – আবার কংগ্রেসও না, মোদী সরকারের কারণেই বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক ঢিলা হয়ে গেছে। আর সম্পর্ক যে ঢিলা হয়েছে এর প্রমাণ হল ইকোনমিস্টের ঐ রিপোর্ট। রাহুল গান্ধীও ইকোনমিস্টের ওই রিপোর্টের বরাতে মোদীর বিরুদ্ধে লম্বা টুইট করেছেন।

    তবে এখানে লেখকের প্রো-ইন্ডিয়ান ঝোঁক-অবস্থান সবচেয়ে ভালোভাবে ধরা পড়েছে। যেমন তিনি লিখছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াটাকে বলেছেন, “ভারতের অবদান”। আর দাবি করছেন সেই থেকে নাকি “দুই দেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে”। অথচ এটাই সবচেয়ে ধুর্ত ভারতীয় বয়ান। যদিও এ’কথাটা কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বুঝেন, এমন লেখক বলতে পারেন না। তবে রাস্তার ধারে টংয়ের চা দোকানে বসে গুলতানির আলাপ হতে পারে হয়ত। কারণ দুই রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পর্কের ভিতরে কখনও দয়া বা দান-ধ্যান ধরনের আলাপ-ধারণা থাকে না। দুই রাষ্ট্র দু’পক্ষের কোনো বিষয়ের মধ্যে উভয়েই নিজের নিজের স্বার্থ দেখতে পেলে একমাত্র তখনই তারা ঐ প্রসঙ্গে একসাথে কাজ করে, পদক্ষেপ নেয়। পরস্পরের পক্ষে খাড়া হতে সম্মত হয়। স্বার্থ কমন না হলে এটা করতেই পারে না, ঘটেও না। তাই এখানে কেউ কাউকে ‘দয়া’ করার কিছু নেই। বাংলাদেশকে সহায়তা করতে ভারতেরও স্বার্থ ছিল। আর থাকলেই একমাত্র এমন করা সম্ভব। বিশেষত এতে ভারতের অবস্থান পাকিস্তানের উপর আরো শক্ত হবে, সীমান্ত ইস্যু এবং কূটনীতিক সভা ও ফোরামগুলোতে ভালো অবস্থান সৃষ্টি হবে – এসব স্বার্থেই ভারত বাংলাদেশকে সেসময় সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তখনকার পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশি সীমান্তে পাহারার দায় ও টেনশন কমে যায়। এটাও ভারতের এক বিরাট লাভ, যা বাংলাদেশের অবদান! তাই তো হয় নাকি? কাজেই দয়া করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে দিলাম টাইপের কথা এগুলো হীন মানুষের বাংলাদেশকে নিচা দেখানোর চেষ্টা মাত্র।

    আবার এরপরে,  ১৯৭২ থেকে “দুই দেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে” এটা অবাস্তব ও অমূলক কথা। অন্তত যদি তাই হত তবে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরে আমাদের পাহাড়িদেরকে ফুসলায়ে ভারতে নিয়ে এরপর তাদেরই হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সীমান্তে হামলা করতে পাঠিয়েছিলেন কেন? এটা কোন মনগড়া ক্যাম্পেইন নয়। এ্টাই সুবীর ভৌমিকের পিএইচডি থিসিস এর কনক্লুশন বা উপসংহার; যা পরে বই আকারেও প্রকাশিত।

    এছাড়াও হার্ড ফ্যাক্টস হল, ২০০৭ সালে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে “তুলে দিয়েছিল”; আমেরিকার পক্ষে চীন ঠেকানোর জন্য ভারতের কাজ করে দেয়ার বিনিময়ে ‘উপহার’ হিসেবে। কাজেই ২০০৯ থেকে ২০১৯ মোটামুটি এই সময়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের নিজের জন্য তা স্বর্ণযুগ বিবেচনা করা হয়, যেটা এর আগে কখনো বা ১৯৭২ সালেও ছিল না। আর ফাইনালি এখন সেটাই নানান কারণে চলতি বছর থেকে নানান সমীকরণে ক্ষমতাসীন সরকার আবার অনেক বেশি চীনমুখী হয়ে থাকাটা পাবলিকের স্বার্থ হোক আর নাই হোক, সরকারের ক্ষমতায় থাকার জন্য জরুরি মনে করা হচ্ছে।

    কিন্তু এ নিয়ে কোন রিপোর্ট লিখতে বসে, ভারতমুখী করে যা ইচ্ছা ব্যাখ্যা দেয়া তো অর্থহীন। বরং এতে ইকোনমিস্ট গ্রুপের সম্মান ইজ্জত ও ইন্টিগ্রিটি বা সততাকে ধুলায় লুটাবে। আমাদের কী মনে নেই, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে, যেটাকে দেশের মানুষ ‘নৈশভোটের নির্বাচন’ বলে চিনে, তাকে ইকোনমিস্ট গ্রুপের ‘ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ প্রেডিকশন দিয়েছিল যে ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ ‘লীগ সরকার পুনর্নির্বাচিত হবে’ বলে। অথচ এটা কেমন নির্বাচনী পূর্বাভাস বা ইন্টেলিজেন্স? এর মানে কি ইকোনমিস্ট জানত যে, এটা নৈশভোট হবে? তাই কী? ইকোনমিস্ট গ্রুপ কখনো এ নিয়ে অন্তত লজ্জা পেয়েছিল বলে শুনিনি।
    আবার লেখকের কাণ্ডজ্ঞান দেখে আমাদের অজ্ঞান হওয়ার দশা। তিনি আরো ঐ রিপোর্টের সাথে বাংলাদেশে চীনা ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের এক তুলনামূলক গ্রাফ দিয়েছেন। আচ্ছা, দুনিয়ার কোনো দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কি খুব নামডাক? তারা কি খুবই যোগ্য আর অতুলনীয়? তাও আবার প্রবল উঠতি অর্থনীতির হবু নেতা চীনের সাথে তুলনায়? আবার তামাসাটা হল, তাতে ফলাফল কী দেখানো হয়েছে? বলা হয়েছে যে, এটি ১:১২ অনুপাতে। মানে, ভারতের এক হলে চীন এর ১২গুণ বিনিয়োগকারী, চীনের আধিপত্যে। তাহলে এটা দিয়ে কী বুঝানো গেল? আর এতে কি উল্টা ভারতকে তুচ্ছ দেখানো হয়ে গেল না?
    লেখক বলছেন “চীনা মুগ্ধতা দেখানো অশোভন ইঙ্গিত” [Cue a Chinese charm offensive]। কেন, তা কিছুই বোঝা গেল না। কেবল পরের বাক্যে তিনি বলছেন, চীন বাংলাদেশকে সাম্প্রতিককালে সাতটি ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ বানিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ দিয়েছে, এগুলাই বুডিগঙ্গা ফ্রেন্ডশীপ ব্রিজ। আর এর সাথে একটি আধুনিক অডিটোরিয়ামও তৈরি করে দিয়েছে (আগারগাঁওয়ে যা বঙ্গবন্ধু অডিটরিয়াম), আর সবই বিনা পয়সায়। প্রথমে চীনারা তা বানিয়ে দিয়েছিল ঋণের অর্থে, পরে সব ঋণ তারা মাফ করে দিয়েছে অনুদান হিসেবে।

    সর্বসাকুল্যে এর খরচ সেকালের হিসাবে মাত্র কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার। আর এছাড়া তা সাম্প্রতিককালের ব্যাপার নয় আর বাংলাদেশের দুই দলের সরকারের আমলেই ঘটেছে এমন পুরনো ঘটনা এগুলা। কিন্তু মূল কথাটা হল, যে চীন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল এম্পায়ারের আসনে বসতে যাচ্ছে তার জন্য বাংলাদেশেও প্রভাববিস্তারের দরকার, এটাই স্বাভাবিক। আর সেজন্য কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা কি বেশি ব্যয়? গত ৭২ বছরের নেতা আমেরিকা কি এমন কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে পরে মাফ করেনি, অনুদান দেয়নি? এশিয়া আফ্রিকায় এমন কতগুলো দেশের নাম চান? গুগলে (HIPC) heavily indebted poor countries  লিখে সার্চ দিলেই টের পাবেন। এখনও অন্তত ৩৯ টা দেশের নাম পাবেন।  গ্লোবাল আম্পায়ার হতে গেলে এমন অনেক খরচ করতেই হয়। গত সত্তর বছর ধরে এটাই আমেরিকান প্রাকটিস, তাই নয় কী?

    আসল ঘটনা  বা কথা অন্য জায়গায়। এককথায় বললে,  আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক করার কৌশলেও চীনের কাছে হেরে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার তথাকথিত ‘বাংলাদেশী এক্সপার্টদের’ ভুয়া আকামের পরামর্শের কারণে।

    আমেরিকা একে তো বিনিময়ে কিছু না পেয়ে বাংলাদেশকে তারা ভারতের হাতে “তুলে দিয়েছে”। আর শুধুমাত্র এ’জন্যই আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে চির-বিতাড়িত হয়ে যেতে পারে। সেজন্য অন্তত কারেকশন হিসেবে আমেরিকার একবার মাফ চেয়ে আবার শুরু করা উচিত। দেখানো উচিত, আশস্ত করা উচিত সে শিক্ষা নিয়েছে – সংশোধিত হয়েছে। এখনো বাংলাদেশে তার পজিটিভ রাজনৈতিক ভূমিকা রাখার সুযোগ সম্ভবত সব শেষ হয়নি, যদিও ইতোমধ্যেই তা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমেরিকা নিজেই নিজেকে ডুবিয়েছে। আর বাকিটা তার কথিত  “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” আর ইউএসএইড ফান্ডেড দেশী ‘বোকা’ এনজিও কর্তাদের কারণে। এরা এখন দাবি করেন, চীন-ভারত নাকি বাংলাদেশের সব ক্ষতি করে ফেলছে। এরা এখন টের পেয়েছেন, ভারতই নাকি বাংলাদেশে পাকিস্তানের চেয়েও বড় শোষক ইত্যাদি…। আসলে এরা না বাংলাদেশের জন্য না আমেরিকার জন্য প্রয়োজনীয়, বা কোনো কাজের ভূমিকা রাখতে পারছেন।

    চীন নিজের কাজ ও লক্ষ্য ঠিকমতোই বুঝে। কাজেই চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও টেলিকম ইত্যাদি সব খাত দখলে নিয়েছে বলে এখন আপসোস করার কী আছে? যেটা ঐ রিপোর্টে করা হয়েছে। চীন যে বাংলাদেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ-বাণিজ্য ও প্রভাব চায়, আর তা কী করে নিজে পেতে হয় – প্রতিযোগিতার এই যুগে চীন তা ভালোই জানে আর প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্কসহ সবকিছু তারা করে এসেছে। চীনের দিক থেকে এটাই তো স্বাভাবিক। এনিয়ে চোখ টাটানোর কী আছে? হবু গ্লোবাল ইকোনমিক এম্পায়ার চীনকে তো এমনই তো হতে হবে। ঠিক আমেরিকা যেমন তার উত্থানের কালে গ্লোবাল এমপের’র (Emperor) হয়েই গত ৭২ বছর ধরে রাজত্ব করেছে, আমেরিকা তো এমনি এমনিতে টিকে ছিল না! কিন্তু ‘শেষ বয়সে’ তার বাংলাদেশে নেয়া পদক্ষেপগুলো ছিল ধারাবাহিকভাবে ভুল আর ভুল। যেমন দেখেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ইস্যুতে বিশ্বব্যাংক যদি প্রশ্নই তুলে থাকে, তবে প্রশ্নের মীমাংসা করল না কেন, শেষ করল না কেন? প্রমাণ করল না কেন? উল্টা মামলাটাই প্রত্যাহার করে সব ছেড়ে পালাল কেন? আর এমনভাবে ও এমন সময়ে পালাল যাতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগী ও বিকল্প হিসেবে চীনের নিজেকে হাজির করা যেন তাতে সবচেয়ে সহজ হয়ে গেল। এটা তো হাস্যকর ভাবে “করিয়া ভাবিবার” আদর্শ লক্ষণ হয়ে গেল!

    আজকের চীন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও অনেক বড় ও সক্ষম বিনিয়োগ বা অনুদান দাতা। সেই সাথে সে উদীয়মান, পরিকল্পিত ও স্ট্র্যাটেজিক এবং সর্বোপরি তার প্রকল্পে লোকাল এজেন্ট বা কমিশন ব্যবস্থা সে রাখে। যে গ্রহীতা সরকার যেভাবে সন্তুষ্ট হয় সেটাই সে অনুসরণ করে। এটা কি ২০১৩ সালের আগে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা বিশ্ব ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিস্টরা বুঝেন নাই যে, প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন এসে যাচ্ছে? যদি না বুঝে থাকেন এটাই তো প্রমাণ, চীন উত্তম ও যোগ্য গ্লোবাল ইকোনমিক এমপেরর হয়ে উঠেছে, যার সাথে তুলনায় আমেরিকার দিন ফুরিয়ে গেছে।

    আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক দিক, যে খাতে চীনের দেয়ার কিছুই নেই বরং আমেরিকান রাজত্ব আছে। অথচ আমেরিকার কথিত এক্সপার্টদের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে আজ আমেরিকার কোনো আবেদন নেই। এর এক নম্বর কারণ খোদ আমেরিকায় – মুসলমানদের সাথে তার বিদ্বেষী আচরণ। আমেরিকান রাষ্ট্র আর তার বেকুব প্রশাসন – বুশ থেকে ট্রাম্প পর্যন্ত – এরা সকলে ভুলে গিয়েছিল আমেরিকান রাষ্ট্রের মানবাধিকারের প্রতি কিছু প্রতিশ্রুতি আছে যা রক্ষা করতে পারলেই কেবল সে আমেরিকা রাষ্ট্র আর, গ্লোবাল পলিটিক্যাল লিডার হয়ে টিকে থাকতে পারে। নইলে সব মিথ্যা আর ফাঁকা আওয়াজ হয়ে যায়!

    মূল কথাটা হল, যারা আমেরিকান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয় কেবল সেই ব্যক্তিরাই আমেরিকান রাষ্ট্রের শত্রু। এটা খুবই কমন কথা। দুনিয়ার সব ধরণের রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে এই একই কথাটাই লেখা থাকে ও থাকতেই হয়। কিন্তু আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এর অর্থ করেছে – না “মুসলমানরা” আমেরিকার শত্রু। অথচ কনষ্টিটিউশনের মতে তারা মুসলমান বলে আমেরিকার শত্রু নয়, একেবারেই নয়। কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার জন্য তারা এনিমি অব দা স্টেট। সেজন্য যা বিচার হয় তারা করুক। কিন্তু মুসলমানবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা কেন? এটা তো রাষ্ট্রের কাজ না। অথচ হোমল্যান্ড এটা ছড়িয়েছে যে  ‘মুসলমানরা’ আমেরিকার শত্রু। আর এতে কোনপক্ষই আবার এটাকে ভুল বলে আপত্তিও তুলে নাই।  এভাবে যেখানেই মুসলমান পেয়েছে তারা কিছু করুক আর নাই করুক সবাইকে হোমল্যান্ড উঠিয়ে এনেছে। নির্যাতন, কথা আদায় সবই করেছে। অথচ আর সবার মত দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের ও পেশার মুসলমানেরা ভাগ্য অন্বেষনে আমেরিকায় এসেছিল ন্যাচারালাইজড আমেরিকান সিটিজেন হয়ে যেতে। তাদের সকলের স্বপ্ন গুড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র দানব হয়ে হাজির হয়েছে, তাতে দাড়িয়েছে যেন মুসলমান হওয়াটাই তাদের অপরাধ।  এভাবে বুশের আমল থেকে এ পর্যন্ত ভুল পথে আমেরিকা হাঁটছে। এতে আমেরিকান রাষ্ট্রের ‘কবর’ ঐদিন থেকেই দেয়া হয়ে গেছে। এটা হয়ে গেছে, কারণ মুসলিমবিদ্বেষী আর নাগরিক বৈষম্যের কোন রাষ্ট্র যে নিজের প্রতিশ্রুতি বা কনস্টিটিউশনই ধরে রাখতে পারে না, মানে না; সে তো আসলে মৃত।

    আবার আমাদের এদিকে এশিয়াতে তারা ভারতের সাথে কৌশলগত মিত্রতা করেছে। এই ঐক্যের ভিত্তিও এ’দুই রাষ্ট্রের মুসলিমবিদ্বেষ, যারা মুসলমানদের নিজের রাষ্ট্রের শত্রু মনে করে থাকে। এটা তো হতেই পারে না। যা সবার জন্য সমান রাষ্ট্র নয়, সেটা আদতে কোন রাষ্ট্র নামে ডাকার যোগ্য নয়। কারণ, রাষ্ট্র নিয়ে মৌলিক বোঝাবুঝিটা হচ্ছে, যেকোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বা অসাম্য করা, এটা নিজ রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করে ফেলার সামিল। তাই আমেরিকা বা ভারত মুসলিমবিদ্বেষী রাষ্ট্র বলে নিজ বিলুপ্তির পথে কয়েক ধাপ আগিয়ে যেতে বাধ্য, হয়েছেও তাই।
    আমেরিকার আত্মস্বার্থও যারা বুঝে না আর মনভর্তি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে আছে যারা; এমন কিছু আমেরিকান প্রজন্ম চলতি শতকের শুরু থেকেই আমেরিকার প্রশাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

    এবার, যারা আমেরিকার চোখে “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” বা আমেরিকার বন্ধু ও কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেন তাদের দিকে দেখি। তারা মনে করেন, একজন ইসলামিস্ট কতদূর সেক্যুলার বা আধুনিকতা থেকে দূরে আছে তা মেপে রায় দেয়াটা তার কাজ। এর অর্থ, তাহলে একজন আল্লামা আহমদ শফী হুজুরকেও যেন তিনি মেপে বলতে আহ্বান জানাচ্ছেন যে, দেখুন তো, আমি আমেরিকান এক্সপার্ট কতটুকু ইসলামিস্ট হয়েছি। তাই নয় কী? বলাই বাহুল্য, এতে শফী হুজুরের মত কোনো আলেমকে দাওয়াত দিয়ে আনা আর তাকে দিয়ে বলানো যে, আমি তো আপনার মতো কওমি মাদরাসায় পড়িনি তাই আমি আধুনিক বলে আমাকে নাকচ করে দেন। অথচ এটাও কোনো ইসলামিস্টের কাজ নয়।
    ব্যাপারটা হল, আমরা কেউ আরেকজনকে তার ইডিওলজি মেনে নিতে বা নিয়ে চলার দাওয়াত দিতে বা দাবি করতে পারি না। কারণ এগুলো একটাও আমাদের কারোই কাজ নয়। হতেই পারে না। বরং সব ইডিওলজির লোকেরা যেন পাশাপাশি বৈষম্যহীনভাবে সমান ও একই সুযোগসুবিধাসহ বসবাস করতে পারি এমন নীতি ও অধিকারভিত্তিক একটা রাষ্ট্রের জন্য সবাই ঐক্যমত্য হওয়া, কাজ করা ও গড়ে তোলা, এটাই আমাদের সবার কাজ। এতে এরপর থেকে সবাই ঐ  রাষ্ট্রের কমন নীতিগুলো মেনে চলা সাপেক্ষে সবার নিজ মতাদর্শ সবাই কারো সাথে একমত না হয়েই বাধাহীনভাবে চর্চা করতে পারব।

    অথচ তারা খুঁজতে গেছে কওমিরা কীংবা ইসলামিস্টরা কত খারাপ, কত পশ্চাদপদ, কতটা তাদের মত নয় এইসব। বরং নুন্যতম কী না হলে সকল ইডিওলজি বা ধারা একই রাষ্ট্রে থাকতে সমস্যা হবে, আর তা কেন হবে, এর সমাধান কী ইত্যাদি সেসব নিয়ে আলোচনা তর্ক এবং মীমাংসায় পৌছানোর চেষ্টার চেয়ে ইসলামিস্টদের কথিত ‘সেকুলার’ বানানো যেন তাদের কাজ এমন গোঁ ধরে তারা।

    মানে কথিত এক্সপার্টরা আসলে নিজের আসল কাজটা কী তাই তো বুঝেননি। তারা ভেবেছেন, একজন ইসলামিস্ট যে প্রগতিশীল নয়, কথিত সেকুলার নয় হতেও চায় না এই ফতোয়া দেয়া ও জারি রাখাই তার কাজ। ইসলামিস্টরা কত পশ্চাদপদ তা দেখিয়ে প্রপাগান্ডা করাই যেন তার কাজ। ফলে এরই পরিণতি হল ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণার চর্চা বাড়িয়ে চলা।

    আয়না-ছবিঃ
    আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি যে মুসলমান সেগরিগেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ ও বিদ্বেষী ততপরতা শুরু করে দিয়েছিল এরই আরেক অর্থ হল, আমেরিকানদের মনে দুনিয়ায় কোন মুসলমান নাই বা না থাকে যেন – এমন এক অবাস্তব দুনিয়ার আকাঙ্খা জাগিয়ে তোলা।  এর তামশার দিকটা হল আমেরিকায় আঁকা আকাঙ্খিত সেই দুনিয়াটাই যখন পরে সে বাংলাদেশের মত মুসলমান-অধ্যুসিত দেশে দেখতে পায়, [তবে বাংলাদেশেরটা আসলে আমেরিকারই এক ‘আয়না-ছবি’ – মানে ঠিক আপনি না তবে, আপনি আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে ছবিটা আয়নায় ফুটে উঠে সেটাই আপনার আয়না-ছবি] – বাংলাদেশে সেই ছবিটাই ফুটে উঠলে এবার আমেরিকা আঁতকে উঠেছে।

    কারণ বাংলাদেশের ছবিটা হল এবার কেবল মুসলমানেরাই আছে এমন এক দুনিয়া পাবার আকাঙ্ক্ষার ছবি। এটা বাংলাদেশে এখন অনেক বেড়েছে আপনি আমেরিকা দাবি করবেন বা দেখাতে পারবেন হয়ত। আপনি আমেরিকান শাসক – এটা দেখে হয়ত ভাববেন দেখেছো তারা কত খারাপ। তারা প্লুরাল (plural) না, এই ইসলামিস্টরা এদের স্বভাব হল যারা তাদের মত না এমন কাউকে তারা সাথে নিতে একসাথে বসবাস করতে চায় না। বরং নির্মুল করতে চায়, তারা inclusive না; তারা সেকুলার না। ইত্যাদি এমন কতকিছু অভিযোগ আপনার থাকবে হয়ত।

    এখন বুঝেন আপনি যদি মুসলমান-ছাড়া এমন কোন দুনিয়ার কল্পনা করতে পারেন তাহলে এটা পরিণতিতে কেবল মুসলমানেরা আছে এমন এক দুনিয়া পাবার আকাঙ্ক্ষা যাদের আপনি ইসলামিস্ট বলছেন, তাদেরই হাতে আপনার এমন এক আয়না-ছবিই কী আপনি দেখবেন না? এটা তো আসলেই আপনারই আয়না-ছবি! কাজেই এদের দেখে আপনি আঁতকে উঠেন কেন? বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন সাহস থাকলে যে, আপনি নিজে কেন এমন? অধঃপতিত! কেন হয়েছিলেন? তাই, কারও দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন ব্যাপারটা আপনারই তৈরি বা এক ‘আয়না ছবি’ নয়ত?

    কাজেই এখন দেখেন আপনি আসলে ঠিক কী হতে চান? এবার জেনেশুনেই ঠিক তাই হতে চান, না উলটা তওবা পড়বেন! মাফ চেয়ে নিয়ে নতুন কিছু করার শপথ নিবেন? সিদ্ধান্ত আপনার!

    আমেরিকা আবার উঠে আসার চেষ্টা করছে আমরা টের পাচ্ছি। হিউম্যান রাইটের উপর শক্তভাবে হয়ত দাঁড়াতে ইচ্ছা করবে, পারব কতটুকু সেটাই প্রশ্ন ! বাংলাদেশে আমেরিকা তার প্রভাব ফিরুক, এটা সে চাইবে সম্ভবত, অনুমান করি। কিন্তু সেটা কী ফিরবে?  কিন্তু এর আগে আমেরিকা কি নিজেদের সংশোধন করে হাজির করতে সক্ষম হবেন? আমরা অপেক্ষা করব দেখার জন্য! তবে তারা কিছু মাত্রায় সংশোধন হয়েছেন কিনা এর একটা চিহ্ন হবে মনে হয় যে তারা তাদের এক্সপার্ট ও এনজিও ব্যক্তিত্ব বদলে নিইয়েছেন কিনা! যারা বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া ও স্বার্থটাই বুঝেন না তারা আপনাদের পরামর্শক হবেন কী করে?

    তবে ইকনোমিস্ট ঐ লেখায় সব শেষে তাদেরই এক রিডিং জানিয়েছে। বলেছে, “চীনের কাছে খুব বেশি দায়বদ্ধ হয়ে যাওয়া নয়, আবার ভারতের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ না করা নিয়ে সতর্ক বাংলাদেশ” [It is wary of becoming too indebted to China, and is careful not to snub India. ]।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “সংশোধিত আমেরিকা দেখব কি? ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

    “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

    গৌতম দাস

    ১৮ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-30x


    গত ১৪ মে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ঢাকার একটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে করা পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে তিনি করোনাভাইরাসেও আক্রান্ত ছিলেন। তবে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও ভুগছিলেন। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পাওয়া বাংলাদেশী একজন একাডেমিক। যে কোনো মৃত্যুই শোকের। আমরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।

    তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের প্রথমেই যে কথাটা বলতে হয় তা হল বাংলাদেশ সরকারের যত সর্বোচ্চ পদক বা সম্মাননা আছে তার সম্ভবত কোনো কিছুই লাভ বা অর্জন করা থেকে তিনি বাদ যাননি। তাই বর্তমান সরকারের ‘ইডিওলজিক্যাল আইকন’ মনে করা যেতে পারে তাকে। শুধু তাই না, তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা – ‘পদ্মভূষণ’ পদকও লাভ করেছেন।

    গত বারো বছরের নানান রাজনৈতিক উলটপালটে বাংলাদেশের সমাজ এখন মতভিন্নতার এক বিপদজনক জায়গায় পৌছে গেছে। যদিও কোন দেশের সমাজে রাজনৈতিক মতামতে নানাবিধ ভিন্নতা থাকে, এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় এটা আর এখন নিছক মতভিন্নতা নয় বরং তীব্র এক সামাজিক পোলারাইজেশনের পর্যায়ে চলে গেছে। ড. আনিসুজ্জামান এই মেরুকরণে একটা পক্ষের অন্যতম আইকন ছিলেন, এটা তার ভূমিকায় প্রমাণিত।

    পাকিস্তান কায়েমের সুবিধাভোগী কে নয় কিন্তু, ঘটনা ইতিহাসে স্বীকার নাইঃ
    ১৯৪৭ সালের আগষ্টে পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান  আর কোন আইডিয়েল [ideal] বা কল্পনা থাকে না, ছুয়ে-ছেনে দেখা ও স্পর্শ করা যায় এমন রিয়েল [real] বা বাস্তব সত্য হয়েছিল। কিন্তু তবু সেই থেকে বুঝে না বুঝে পাকিস্তান এক নিন্দার জিনিষ, খারাপ কাজ হয়ে আছে আমাদেরই অনেকের কাছে। সে সময় থেকেই আমরা পাকিস্তান পছন্দ করি আর না করি এমন নির্বিশেষে আমাদের জন্য কঠিন সত্যটা হল, পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা প্রত্যেকেই পাকিস্তান জন্মের বেনিফিসিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়েছিলাম।  এতে ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল কেবল জমিদার ও জমিদার হিন্দুরস্বার্থ ও হেজিমনি বজায় থাকলে ওরই ভিতরে যারা নিজের স্বার্থ দেখতেন, এরাই সেই ব্যতিক্রম।  জুলুম অত্যাচার ও লুন্ঠনকারীরা তো সংখ্যাল্প ও ব্যতিক্রম হবেনই। এতদিন এভাবে রাজত্ব ও রুস্তমি করা এই গোষ্ঠি – এদেরকে বাদে একজনও কেউ সুবিধাভোগের বাইরে ছিল না। বিশেষ করে এই মহাসত্যের কারণে যে, সাতচল্লিশের আগে এই বাসিন্দারাই যেখানে ছিলেন জমিদারের প্রজা অথচ পাকিস্তান কায়েমের পরে তাদের সেই প্রজা- মুক্তি ঘটে গিয়েছিল। প্রজা-পরিচয় থেকে মুক্তি বলতে শুধু জমিদারি উচ্ছেদই নয়, ১৯৫১ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950  ইংরাজিতে মুল আইনটা  [The State Acquisition And Tenancy Act, 1950] গৃহিত হইয়ে যাওয়াতে স্বাধীন পাকিস্তানে আগে প্রজা হিসাবে  চাষাবাদের জমির ভোগদখলের দলিল ‘চাষা’রা এবার নিজের নামে পেয়ে গেছিলেন।  ধর্ম বা দল নির্বিশেষে মূলত সবাই প্রত্যেকেই এতে লাভবান। এমনকি যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেননি, করা পছন্দ করেন নাই অথবা পাকিস্তান কায়েম হওয়া পছন্দ করেননি তারাও হয়েছেন লাভবান। এককথায়, অতএব আপনি-আমি স্বাধীন পূর্ব-পাকিস্তানের বাসিন্দা, নাগরিক হওয়াতে, পাকিস্তান কায়েমের বাস্তবতায় এদের চেয়ে বড় লাভবান হওয়া বেনিফিসিয়ারি আর কেউ নাই।
    কিন্তু আজব ঘটনাটা হল, স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হবার পরবর্তী কালের বাস্তব পাকিস্তানে ‘সাতচল্লিশের দেশভাগ’ যে সঠিক কাজ হয়েছিল এমন কোনো বয়ান ইতিহাসে দেখা যায় না। পাকিস্তান কায়েম ‘সঠিক’ বলে ইতিহাসে তা লিখতে তাদের দ্বিধা ছিল। তাই টেক্সটবুকে পাকিস্তান কায়েমের পক্ষে সাফাই বক্তব্যের দেখা মেলে না। সেটা এখনো এমনই আছে।  যেমন এটা কী সম্ভব যে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পরের লিখিত ইতিহাসে টেক্সটবইতে এই স্বাধীনতার পক্ষে সাফাই থাকবে না! কিন্তু পাকিস্তানের বেলায় তাই হয়েছিল।  যেন পাকিস্তানের জন্ম ‘অবৈধ’, আর অবৈধ  সন্তান বলে যেন এর দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না । অথচ এর বাসিন্দারাই  এর আসল সুবিধাভোগী। জমিদারি আইন উচ্ছেদের সুবিধা আমাদের বাপ-দাদা পুর্বসূরিরা প্রত্যেকে ভোগ করে গেছেন, এখনো করছে। তবুও ১৯৪৭-১৯৭১ এ সময়টা আমাদের ইতিহাসে যেন একটা ভ্যাকুয়াম, ফাঁকা কিছু ঘটেনি। অথবা যা ঘটেছে তা ঘটা উচিত ছিল না। তার মানে কী এরও আগের জমিদারি শাসনটাই (১৭৯৩-১৯৪৭) কী সঠিক ও বৈধ ছিল, কাম্য ছিল?

    অথচ এ্মনকি পাকিস্তান আমলের (১৯৪৭-৭১) এই পঁচিশ বছরের মধ্যে  চুয়ান্ন সাল পর্যন্ত না হলেও অন্ততপক্ষে যেখানে একান্ন সালের জমিদার উচ্ছেদ আইন পাস এই অর্জনকে যদি আমরা আপন না করে নেই, তবে এর মানে হবে আমাদের আত্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়া। পাকিস্তানের জন্ম যদি আমাদের কাছে অগ্রহণীয় হয়, কাম্য নয় ও অবৈধ মনে হয় আমাদেরকে তাহলে এই উত্তর দিতে হবে যে আমাদের বাপ-দাদারা সকলে জমি কোথা থেকে পেয়েছেন? কারণ ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের নিরানব্বই ভাগই ত জমিদারের প্রজা ছিলেন?

    আমাদের প্রগতিবাদীসহ সকলের চিন্তায় অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি হল আমরা যদি পাকিস্তান জন্মানোকে আপন মনে না করি তবে এটা  তখন কী ছিল? অথবা কী হয়েছিল সেটা কী আমরা কেউ বলতে স্বীকার করতে চাই না! তাহলে এককালে জমিদারের প্রজা চাষা  ‘এরা’ জমির মালিকানা পেলেন কী করে? কেউ বলতে চান না। তারা সম্ভবত বলতে চান, পাকিস্তান কায়েম হওয়াটাই ভুল ছিল।  সেক্ষেত্রে প্রকারন্তরে এর মানে নয় তাহলে জমিদারি শাসনটাই ভাল ছিল। অথচ পাকিস্তান জন্মানোর পরে আমাদের অন্যান্য নতুন রাজনৈতিক চাহিদা বা অভিমুখ তৈরি হতেই পারে। এই আমরাই আবার খোদ পাকিস্তানই ভাঙতেও চাইতে পারি। কিন্তু সে জন্য তো পাকিস্তান কায়েম হবার ঘটনাটা মিথ্যা নয়। তা মিথ্যা একথা বলার কোন দরকারও পড়ে না। আসলে আগের সেই জমিদার হিন্দুর স্বার্থ ও হেজিমনি – সামাজিক কালচারাল আধিপত্য সেটাকেই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে কেউ অলক্ষ্যে।
    ইতিহাস জিনিসটা এমন যে নানান দেশ, রাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপটে, এর ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য তৈরি হবেই। এমনকি একই দেশের ভেতরেও কমপক্ষে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্য সাধারণত দেখা যায়। সব দেশেই এমন হয়ে থাকে।  ঐতিহাসিকদের মধ্যে তা নিয়ে বিভক্তি ও বিতর্কও চলতে থাকে।  যেকথা বলছিলাম বুদ্ধিমান হলে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্যই টিকে থাকতে পারে আর সেক্ষেত্রে সবগুলো ভাষ্যেরই মৌলিক গল্পকাঠামোটা মোটামুটি একই থাকে, আর কিছু অংশ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে। আর ঐতিহাসিকেরা সতিকারের পেশাদার হলে বুঝমান ও দায়ীত্ববান হলে একসময় ভাষ্য-ভিন্নতা নিরসিত হয়ে কোন ইতিবাচক ব্যাখ্যা বয়ানে পৌছাতে পারি, নইলে দেশ ইতর-বয়ানে শার্প বিভক্ত হোয়ার দিকেও যেতে পারে।  আদালতকে দিয়ে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করার ঘটনাও দেখা যেতে পারে।  যদিও আবার দুটো ভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই পুরা বয়ানই ভিন্ন হয়ে যাবে। যেমন ১৯৭১ নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভাষ্য-বয়ান ভিন্ন তো হবেই। ১৯৭১ সাল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাষ্যও হবে ভিন্ন। যেমন ভারত  ১৯৭১ কে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ বলে তাদের সরকারি ইতিহাস লিখেছে।

    বাস্তব পাকিস্তান কায়েমের পরে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজের লিখিত ভাষ্য-বয়ান না থাকায়, মানে পূর্ব পাকিস্তানিরা আপন করে নেয় এমন কোনই বয়ানভাষ্য না থাকায় এর পরিণতি কী হয়েছে? এমন লিখিত ইতিহাস ভাষ্য না থাকলে যেটা হবার কথা, কলকাতায় প্রচলিত টেক্সটবুকের ভাষ্যবয়ান কিছু দিন পরে এখানে চালু হয়ে গেছে। কারণ, বয়ান তো খালি থাকে না। একপর্যায়ে বাংলাদেশেরই কেউ হয়ত কলকাতার সেসব বই পড়ে তা থেকে নিজেই কলকাতার বয়ানে বাংলাদেশের ইতিহাস লিখে বসেছে। আর তা চালু হয়ে গেছে। এসব শুনে এখন কেউ বোকাবোকা উদার বুঝ থেকে জানতে চাইতে পারে আমরা কলকাতার বয়ানে ইতিহাস পড়লে অসুবিধা কী?  ক্ষতি কী?  আমরা একই বাংলা, একই দেশ তো ছিলাম? তাহলে? আসলে কথাটা হল এমন যেন বলা যে ১৯৭১ সালের আগে তো পাকিস্তান আর বাংলাদেশ  “তো একই দেশ ছিলাম” কাজেই একাত্তরের পরেও আমরা পাকিস্তানের পাঠ্য ইতিহাসটাই গ্রহণ করে নিয়ে আমাদের পাঠ্য করে নিলে অসুবিধা কী? এখন নিশ্চয় এই জবাব প্রশ্নকর্তার ভাল লাগবে না।
    কলকাতার বয়ানে ইতিহাস নিয়ে আমাদের অসুবিধাটা হল, ওটা আসলে কলকাতার জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে এক সাফাই-ভাষ্য হবে।  আরও স্পষ্ট করে বললে ভারত বা কলকাতা যেটাকে বলে “স্বদেশি আন্দোলন –  সোজা সাপ্টা জমিদারি স্বার্থবয়ানের উপর আধারিত ইতিহাস হবে সেটা। কাজেই এটা আমরা প্রজাদের নিজের স্বার্থবয়ান করে লেখা ইতিহাস হতেই পারে না। দুঃখের কথা আর কারে বলব, পাকিস্তান কায়েমের পর থেকে সাতচল্লিশের আগের শাসক জমিদারহিন্দুরা  শাসন আধিপত্য হারিয়ে কমিউনিস্ট রূপ ও রাজনীতি ধারণ করে সমাজে হাজির থেকেছে। ফলে আগের জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে সাফাই-ভাষ্যটাই  এবার নব্য প্রগতিবাদী কমিউনিস্টরা গ্রহণ ও প্রচার শুরু করেছিল। আমাদের ইসলামবিদ্বেষের শুরু এখান থেকেই। কমিউনিজমের নামে তারা ইসলামবিদ্বেষ করে পাকিস্তানের জমিদার উচ্ছেদের প্রতিশোধ নিয়েছে।
    আরও কঠিন সত্য মানে ফ্যাক্টস হল, ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ আইন  অর্থাৎ বড় হয়ে যাওয়া আগের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রশাসনের নজর প্রধাণত কেবল কলকাতা ও এর আশেপাশে আটকে পড়েছিল, এতে ওদিকে পুর্ববঙ্গ অংশে বা এরও বাইরে আসাম পর্যন্ত এলাকায় প্রশাসন আরো শিথিল হয়ে পড়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিকশিত হয় নাই।  তাই প্রশাসন চালানোতে দক্ষতা আনতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বাংলা প্রদেশ আর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বলে ভাগ করাকে কেন্দ্র করে হিন্দু জমিদারেরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।  কারণ এতে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়াত ঢাকা।  আবার জনসংখ্যার দিক থেকে পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট ছিল।  অর্থাৎ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কায়েমের পর থেকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থ আর কলকাতার অধীনস্ততায় না থেকে  বের হয়ে নিজেই কলকাতার সমান্তরাল ক্ষমতা ও শাসন হয়ে উঠতে সুযোগ পেয়ে গেছিল। এটাই  জমিদার হিন্দু আধিপত্যের কলকাতা সহ্য করতে পারে নাই, চায় নাই।  এই দ্বন্দ্ব খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়।  এখানে জমিদারহিন্দু শাসন আধিপত্য এতই বড় ক্ষুন্ন হয়েছিল যে তারা বৃটিশদের বা বঙ্গভঙ্গ করার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার ফ্যান্টাসিও করতে গিয়েছিল – যেটা অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুটা গ্রুপের কথা জানা যায়।  কাজেই অনুশীলন ও যুগান্তর ছিল জমিদার স্বার্থেরই সশস্ত্র উদ্যোগ। অথচ কোন সশস্ত্র উদ্যোগ মানে তা “বিপ্লবী” এমন ধরে নেওয়ার কিছু নাই। কিন্তু প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ঢেকে দেয়া হয়েছিল। কারণ অনুশীলন ও যুগান্তর পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে বিলিন হয়েছিল। এমন তামাসা সম্ভবত দুনিয়ার কোথায় দেখা যাবে না যে  বাংলার জুলুমবাজ  খোদ জমিদারেরাই এখানে সশস্ত্র।  এরাই কমিউনিস্ট নামে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই জুলুম নিপীড়নে অত্যাচারি  জমিদারদের সশস্ত্র স্বার্থ-ততপরতাকেই বলা হয়েছে এটা নাকি “স্বদেশি আন্দোলন” – এটা নাকি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা?  জমিদারের স্বার্থহানি ঘটেছে কলোনি প্রশাসনিক পরিবর্তনে। অতএব এটাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা বলে চালায় দিতে হবে – কি ফকফকা তামসা! পুর্ববঙ্গের স্বার্থ  এমন জমিদারদের স্বার্থ ও তাদের সশস্ত্র ততপরতার বিপক্ষে ছিল বলে তারা এটাকে কোন “স্বদেশি আন্দোলন” বলে মানে নাই। অতএব তারা কলকাতার লিখিত ইতিহাস পড়তে পারে না। এত কড়া সত্য কথা অনেকের মানতে কষ্ট হতে পারে। অথচ কড়া সত্য হল, দুই দুবারই বাংলা ভাগ হলে (১৯০৫ ও ১৯৪৭ সালে) এটাকে পুর্ববঙ্গ তাদের জন্য ভাল হয়েছেই মনে করেছিল। যেটা জমিদারদের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ছিল। আমরা জমিদার আর প্রজার স্বার্থ দৃষ্টিভঙ্গি এক হলনা কেন এমন আবদার বা জবরদস্তি তুলতে পারি না! কিন্তু তাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। পুর্ববঙ্গ অবশ্যই চাইবে ঢাকা কলকাতার মত ও কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি এক শহর হোক, সমান হোক, কাছাকাছি হোক। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাতই সব গল্পের মুখ্য বিষয় যেখানে সবসময় আমাদেরকে দাবড়িয়ে অধস্থন করে রাখার অপচেষ্টা আছে।

    কিন্তু আনিসুজ্জামানের মুল্যায়ন প্রসঙ্গে এসে জমিদার স্বার্থবিরোধী পুর্ববঙ্গের কথা উদাম করছি কেন?
    ড. আনিসুজ্জামান আমাদের কাজ কিছুটা সহজ করে দিয়েছেন প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ২০১৪ সালে, যা আসলে তার লিখিত বই তিনটারই কিছু সারকথা।  আর সেলেখা  উনার মৃত্যুদিনেই বিকেলে নতুন শিরোনামে প্রথম আলোতে পুনঃমুদ্রিত হয়েছে।  ড. আনিসুজ্জামানের প্রকাশিত তিনটা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা ধরণের বইয়ে তাঁর সবকথাই ছড়িয়ে আছে । প্রথম আলোতে ২০১৪ সালে যার পুরানা শিরোনাম ছিল, “বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার“;  আর এরই পুনঃমুদ্রিত ১৪ এপ্রিল ২০২০ এর শিরোনাম হল, মানুষের ভালোবাসা যথেষ্ট পেয়েছি: আনিসুজ্জামান। এই সাক্ষাতকারে যা তিনি বলছেন এর সারাংশ হল, বাবা-মাসহ তার পরিবার কলকাতায় থাকার সময় তারা সকলে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষেই ছিলেন, স্লোগান দিয়েছেন। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পরে পরে পশ্চিমবাংলার ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও পুরা পরিবারই নতুন পাকিস্তানে এসে পড়েছিলেন। নতুন পাকিস্তানের নানা সুযোগ- সুবিধা নিতে খুলনায় পুরা পরিবার মোহাজের হয়ে বসবাস শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে আসার পর এবার মুসলিম লীগের সমর্থন ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। মেরু বদল করে নেন তিনি। কেন?

    তিনি বলছেন, কলকাতার “১৯৪৬ সালে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার সময়” থেকে “আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল”। তিনি বলছেন, “হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু, এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়”। এর পরের প্যারায় আরেকটু পরিষ্কার করে বলছেন, “একদিকে সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি”। তার মানে, পাকিস্তানের টিকে থাকাটাকে তিনি নেতিবাচক বলছেন আর দাবি করছেন এই টিকে থাকাটা এক “সাম্প্র্রদায়িকতা”। আর শেষে বলছেন, “তখন সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে”। অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি তার চিন্তা ও মনের হিসাবে ‘শত্রু’ বলে তিনি যাকে চিনেছেন তা হলো ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা বলে তিনি কি আসলেই কিছু চিনেছেন? জবাব হল, একেবারেই না। মনে হয় না। তিনি বরং সাম্প্র্রদায়িকতা বলে আবছা এক আড়ালে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। কেন?

    আনিসুজ্জামানের ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’ মানে কী?
    বুঝা যাচ্ছে সেটাই বুঝতে হবে আগে।
    তিনি কী বলতে চাইছেন ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা থেকে আজ পর্যন্ত যত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঘটেছে, তার সবগুলোর জন্য দায়ী একেচেটিয়াভাবে মুসলমানরাই? হা, আনিসুজ্জামান হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘটা দাঙ্গাকেই ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ বলতে ভালোবাসেন এবং কেবল মুসলমানদেরকেই এই দাঙ্গার দায়ী জন্য করেন। এটাই তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে অভিযোগে তোলা।
    প্রথমত, সমাজে দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট পাড়া বা এলাকায় যে আগে থেকেই আধিপত্য ও বড় প্রভাব অবস্থানে থাকে, সেই ‘অপরপক্ষ’কে উৎখাত ও বিনাশ করে তাকে ঐ এলাকা ছাড়া করার উদ্যোগ নিতেই আমরা সব জায়গায় দেখে থাকি, প্রায় অবশ্যম্ভাবী ঘটনার মত। এটাই সাধারণ ঝোঁক হতে দেখা গেছে।  এর কারণ হল, সমাজ দুটো সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানে, তারা তখন উভয়েই পরস্পরের কাছে থাকা অনিরাপদ বোধ করা শুরু করে। এই নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে যারা শক্তির আধিপত্যে আছে, তারা বিপক্ষকে প্রথমে নির্মূল করে এলাকায় কেবল নিজেরা, নিজেদের একক হুকুমে এলাকা চলবে এই ভিত্তিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা – এটা একমাত্র পথ বলে সাব্যস্থ করে থাকে। আর এতেই  তারা আগে দাঙ্গার সুত্রপাত করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনেও ভয় থাকে যদি দুর্বল হলেও অপরপক্ষে আগে আক্রমণ করে বসে। এই অজানা টেনশন দ্বিমুখি নিরাপত্তাবোধের অভাব থেকেই সাধারণত বলশালিরাই আগে হামলা করে থাকে যদিও  তাতে শেষে কে মরবে-বাঁচবে তা অন্য কথা। কাজেই দাঙ্গা হলেই তাতে হিন্দু অথবা মুসলমান কোনো একটা সম্প্রদায়কে আগাম ও একচেটিয়াভাবে দায়ী করা ভিত্তিহীন ও ভুল। আমরা  আগেই যেকোন একটা সম্প্রদায়কে দায়ী বলে প্রিজুডিস হয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে পারি না। এমন চিন্তা করতে থাকলে একসময় এমন চিন্তাই এক রেসিজমে পৌছাবেই যে ঐ জাতটাই খারাপ, ওদের রক্তের দোষ ইত্যাদি এসব। সারকথায়  এটা আগাম নির্ধারিত পক্ষপাতিত্ব। আর কোথায় একটা দাঙ্গা হয়ে গেলে পরস্পর পরস্পরকে দায়ী করবে এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের মধ্যে মুল কথা এটা না যে কে দায়ী – এটা জানলে আমরা কোনদিকে আগাতে পারব। কারণ মূল কথাটা হল পরস্পর থেকে পরস্পর নিজ নিজ নিরাপত্তার অভাববোধ করার অবস্থায় চলে গেছে – এই সামাজিক পরাজয়  আগে ঠেকাতে হবে বা রিপেয়ার করতে হবে।
    কিন্তু এসবেরও আগে আরেক কথা মনে রাখতে হবে। দাঙ্গার মত অবস্থা কেন তৈরি হচ্ছে  সেটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।  যেমন এক্ষেত্রে দাঙ্গার পিছনের কারণ হল আগের ২০০ বছর ধরে জমিদারি জুলুম অত্যাচার নির্যাতনে ফলে যে ক্ষোভগুলোর জন্ম ও এর নানান মাত্রা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছিল তা গ্রাহ্য না করে জমিদারি চালিয়ে যাওয়াতে  একদিন এমন পরিণতিই তো হবে। আমরা এটা আমল করি নাই।  তা কেন কেউ ভাবেনি? এখন কোন একটা পক্ষের প্রতি ভিকটিমহুড দেখিয়ে সহানুভূতি পাইয়ে দিতে চাইলে তা কতটা কাজের হবে? কাজেই ডঃ আনিসুজ্জামানের সাম্প্রদায়িকতা এই বয়ান মারাত্মক মুসলমানবিদ্বেষী ও  সুক্ষভাবে জমিদারের পক্ষপাতিত্ব করা। ভিকটিমহুডের নেকাব চড়িয়ে। কিন্তু তবু নিশ্চয় কোন দাঙ্গাই পবিত্র নয় হতে পারে না। আমাদের অবস্থান হতে পারে না।  কোন পক্ষকে জিতিয়ে দেয়ার দাঙ্গাই কাম্য নয় হতে পারে না, জায়েজ নয়  এবং সাফাই অযোগ্য।

    বুঝা যাচ্ছে এই দাঙ্গার পুরা ঘটনায় এক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের কাছে তার কয়েন করা শব্দ  ‘সাম্প্রদায়িকতার’ অর্থ হল, তার চোখে “সাম্প্রদায়িকতা” মানেই মুসলমানরা দায়ী। অথচ হিন্দু ডোমিনেটিং এলাকায় সে মুসলমানকে কোপাবে- এটাও স্বাভাবিক। আর যদি কোন মুসলমানেরা বেশি এমন এলাকা হয় তবে এর ঠিক উল্টাটাই হবে – স্বাভাবিক।   ঐ একই পরস্পরকে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধের অভাব। তাই আগাম আক্রমণ – সেই একই ফর্মুলা। অনেকে আবার এসব মেনে নিয়েও এবার কায়দা করে কে কম কে বেশি, এসব কূট তর্ক শুরু করতে পারে। তবে দেখা গেছে প্রশাসনের ভুমিকা গুরুত্বপুর্ণ। আদর্শ হল, কোন দাঙ্গা সংগঠিত হতে দেয়া ছাড়াই প্রশাসন যদি উত্তেজনা নিরসন করতে পারে।   এভাবে সব ক্ষোভ নিরসন করতে পারা একটা সাফল্য হতে পারে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি প্রশাসনের ইতি ভুমিকার কারণ দুই সম্প্রদায় নিজ নিজ নিরাপত্তাবোধ ফিরে পেয়েছে – এটাও হতে পারে।
    দ্বিতীয়ত, অতএব আনিসুজ্জামানের এই ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বুঝ কোন ভাল বা কার্যকর কিছু আনতে পারে না। শুধু তাই না এটা একপেশেও তাই অর্থহীন।  এছাড়া এর আরেক মস্ত ভ্রান্তির দিক আছে।  আমাদের জ্বর হওয়া হল রোগের লক্ষণ,  তা  আসলে রোগ নয়। জ্বর হলে বুঝতে হবে আমার অন্য কোন রোগ হয়েছে। শরীরের কোন ইন্টারনাল অঙ্গ ডিসওর্ডার আছে, ঠিক্ মত কাজ করছে না। সেটা খুজে বের করতে হবে আগে ও সেরে উঠতে হবে। শুধু প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর তারানো যাবে রোগ তাড়ানোর কিছু হবে না।  ঠিক তেমনি কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ সমাজের কোন মূল সমস্যা নয়, এটা কোন গভীর সমস্যার বাইরের লক্ষণ। তাই কেন দাঙ্গা লেগেছে সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বলে হিন্দু অথবা মুসলমানকে অভিযুক্ত করা নিরর্থক। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করেই একমাত্র স্থায়ী সমাধান পেতে হবে।
    তৃতীয়ত, এটা একটু বড় আর সিরিয়াস। কলোনিমুক্ত স্বাধীন অখণ্ড ভারত গড়তে ১৮১৫ সাল থেকেই রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগ আর সেখান থেকে শুরু করে  মাঝে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম পেরিয়ে ১৯৪৭ পর্যন্ত –  ভারতের ‘সকলকে’ নিয়ে কখনও নেহরু-গান্ধীসহ কেউই একটা ভারত গড়ার কোনো কার্যকর প্রস্তাব তারা করতেই পারেন নাই। কারণ তাদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটির দিকটা হল, তারা মনে করেন ধর্মই তাদের কথিত জাতি ধারণার মূল ভিত্তি, আর এটা ধরে নিয়ে একটা হিন্দু-নেশন স্টেট গড়তে প্রস্তাব করে যাচ্ছিলেন তারা। কারণ তাদের সকলের কাছেই রাষ্ট্র গড়া বলতে তা এক জাতি-রাষ্ট্র গড়াই একমাত্র তারা বুঝতেন। রামমোহনের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রবর্তনের চিন্তাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। কিন্তু পরবর্তিতে ব্রাহ্মধর্ম প্রকল্প পরের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই ব্যর্থ ও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে হাজির যায়।  এই ব্যর্থতাই তাদের মনে এক সাফাই হিসাবে হাজির হয় যে কথিত ব্রাহ্মধর্ম ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র যেহেতু চেষ্টা করে তারা পারেন নাই, তাই নিরুপায় হয়েই এবার এক “হিন্দু নেশন স্টেট” করতেই তারা এগিয়ে গেছেন। একাজটাই পরবর্তিতে করে গেছেন বঙ্গিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রমুখ সকলেই।  যদিও কংগ্রেসের জন্ম হয়েছেও যতটা সম্ভব এই “হিন্দু নেশন স্টেট” কামনা আড়াল করে, কিন্তু কার্যন্ত তা প্রকাশিত থেকেই গেছে। কিন্তু এই ঝুটা সাফাইয়ের উপর  যে আমরা বিকল্প চেষ্টা করেছিলাম পারি নাই।  কিন্তু মুখ্য প্রশ্ন, অন্য ধর্মের লোকেরা কেন “হিন্দু নেশন স্টেট” এর কল্পনা মানবে এর স্বপক্ষে কোন জবাব কোন সাফাই দেওয়ারও চেষ্টাই করে নাই কংগ্রেসের কোন নেতা। যার সোজা অর্থ হল  তারা জবরদস্তিতে এটা করবেন, চাপিয়ে দিবেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  এখানেই কংগ্রেসের সাথে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের দারুন মিল। অতএব কলকাতাসহ সারা ভারত জানত  বাস্তবে তাদের “হিন্দু নেশন স্টেট” চিন্তা আর এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।  আর এরই পরিণতিতে কংগ্রেসের দেখানো পথে এখান থেকেই আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দাবি ওঠে এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল মুসলিম লীগের হাতে। “হিন্দু নেশন স্টেট” এই চিন্তা ও কামনার কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে দেখানো পথেই তাই মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

    মজার কথা হল রাষ্ট্র বলতে যে “হিন্দু নেশন স্টেট” মানে ধর্ম ছাড়া নেশন হয় না আর নেশন স্টেট ছাড়া আর রাষ্ট্র ধারণা হয় না – এই দুই ভুল চিন্তা আমাদের উপমহাদেশের রূট সমস্যা। কিন্তু এটা  চিন্তা করে ধরতে ও বুঝবার অসমর্থতা আজও যায় নাই।  কংগ্রেস নেতারা হয়ত সীমাবদ্ধতাটা বুঝত কিন্তু তারা আবার নিজেদের নিরুপায়ও মনে করে মিথ্যা  সাফাই খাড়া করতেন। আর সবচেয়ে বড় কথা তাদের “কথিত হিন্দুস্বার্থ” – এর বাইরে তারা যেতে পারেন না এটাই মনে করতেন। আর কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা “নেশন স্টেট” চিন্তাটাই যে সমস্যার আর তা যে মারাত্মক ভুল তা ই বুঝতে সক্ষম তা কোথাও প্রমাণ রাখেন নাই।  তামসার কথা হল তাদের দাবি অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্র-বুঝ নাকি “শ্রেণীরাষ্ট্র” বুঝের। যদি তাই হয় তবে “নেশন স্টেট” এর পক্ষে চলে যাওয়া আর তার উপর আবার তলে তলে সেটা “হিন্দু নেশন স্টেট”  – এই ধারণা তারা হজম করেন কী করে?   অর্থাৎ “শ্রেণীরাষ্ট্র” কথাটা বইয়ের ভিতর তাত্বিক রেখে দিয়েছেন আর বাস্তবের ভারতে কার্যত “হিন্দু নেশন স্টেট” ধারণা কাঁধে নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির সাথে পেস মিলিয়ে এখনও হাটছেন।

    ওদিকে এসব প্রগতিবাদী দাবি করেন তারা নাকি সবার আগে ও উপরে রেনেসাঁ-বুঝের প্রগতিপন্থি। যদি তাই হয় তবে তাদের ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু রাজা রামমোহন কেন এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন?  এদিকটা কোন বামপন্থি বা কমিউনিস্ট কখনও টের পেয়েছেন, ঝামেলাটা ধরতে পেরেছেন তাই জানা যায় না। অথচ কমিউনিস্টদের মধ্যে  ইসলামবিদ্বেষ তাদের মজ্জাগত। আর এই সুত্রে এরা উলটা জিন্নাহকে দায়ী করে যে তিনি “ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান’ কায়েম করেছে বলে।

    কমিউনিস্টদের মাথায় আরেক আজব চিন্তা লক্ষ্য করা যায় ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ বলে একটা ধারণা।  তারা “নেশন স্টেট” কথাটা শুনলেও এর সাথে জাতীয়তাবাদ ধারণাকে মিলায় না। বরং জাতীয়তাবাদ ধারণাটা নেশন-স্টেট ধারণা থেকা আলাদা এবং তাদের কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বন্ধু মনে করে।  অনেক মনে করে জাতিয়তাবাদ হল  কমিউজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বাস্তবায়নে যাবার আগের ধাপ তাই এটা বন্ধু ধারণা।  অথচ ইউরোপের তিনশ বছরের মর্ডানিটি ও রাষ্ট্র ধারণাটা বলতে তা সব সময়ই নেশন স্টেট ধারণা। জাতীয়তাবাদ শব্দটা ইউরোপে তেমন ব্যবহার নাই তবে কেউ তা করলে সেটাও নেশন স্টেট ধারণা অর্থেই। খুব সম্ভবত এর কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলোনি্মুক্তির যুগে এরা সোভিয়েত ব্লকে গিয়ে ঢুকলে তাদেরকে ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে প্রশ্রয়ের খেতাব ও বন্ধু মানা হত।  তারা সমাজতন্ত্রে পৌছানোর আগের ধাপে থাকা রাষ্ট্র বলে সার্টিফিকেট দেয়া হত। এই সার্টিফিকেট অনুসারে নেহেরু-গান্ধীর কংগ্রেস হল ‘জাতীয়তাবাদী’  কিন্তু জিন্নাহর পাকিস্তান? না না। এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, তাই অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়।

    তবু মনে রাখতে হবে  সব সম্ভাবনা শেষ হবার এর আগে ১৯২৮ সালে সর্বশেষ একটা প্রস্তাব ছিল।  সেটা জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’। বাংলাদেশের একমাত্র বদরুদ্দিন উমরকে দেখা যায় এর জিকির করেছেন। ওর প্রথম দফা ছিল যে প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে এরপর ফেডারেল আমেরিকার মত প্রদেশগুলোর এক অখণ্ড ‘কনফেডারেটেট ইন্ডিয়া’ গড়ার দাবি তুলেছিলেন। বলাই বাহুল্য, নেহরু-গান্ধীরা জিন্নাহর এহেন প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। প্রস্তাব বাতিল করে দেয়া সহজ কাজ। কিন্তু এর অর্থ যে, পরিস্থিতিকে দাঙ্গার দিকে ঠেলে দেয়া, এ দিকটা কেউ ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না।
    এত দূর পর্যন্ত চিন্তা করতে পারেননি ড. আনিসুজ্জামানরা।  ডঃ আনিসুজ্জামানদের মত যারা চিন্তা করেন তাদের সমস্যা হল,তারা মুসলমানদের উপর সব দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চান। “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা” শব্দটা তাদের কাছে ভাল ওজনদার ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডার এক শব্দ। ্তাই দাঙ্গার পিছনের কারণ কী সেদিকে এরা কোনভাবেই যাবেন না।  অথচ “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা”  বলতে যদি সব মুসলমানরাই দায়ী হয় তাহলে ভারতের সব দাঙ্গাগুলোর জন্যও মুসলমানরাই দায়ী এটাই কী আনিসুজ্জামান মনে করতেন!

    তবে দাঙ্গার পিছনের কারণ কী এতদুরে আনিসুজ্জামান যাবেন ক্ষতিয়ে দেখতে সক্ষম হবেন এটা আশা করাও ঠিক হবে না। কারণ তিনি রাজনীতিবিদ তো নন বা এ বিষয়ে ভাবার উপযুক্ত কোন একাদেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিও তিনি এমন ধারণা আমাদের নাই। যদিও  এটা ব্যক্তি আনিসুজ্জামানের জন্য দোষেরও নয়। কিন্তু এটা  অবশ্যই এক বিরাট সমস্যা হয়ে হাজির হল, যখন তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে রোগের এক লক্ষণকেই রোগ বলে ঠাউরে বসতে চাইছেন। বরং ‘সাম্প্রদায়িকতা’ কে সব সমস্যার গোড়া বলে প্রপাগান্ডা দিয়ে হারানো জমিদার হিন্দুর রাজনীতি ও স্বার্থের পক্ষে থাকা – এভাবে খাড়া হয়ে যাওয়া তাঁর অনুচিত।

    কিন্তু এত শব্দ থাকতে “সাম্প্রদায়িকতা”, এই শব্দটাকেই তাঁরা এত পছন্দের বিষয় করলেন কেন? এছাড়া অবশ্য তাঁরা সময়ে আরো সামনে বাড়েন। যেমন তাদের আরেক শব্দ আছে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ (অথবা সময়ে বলেন ‘সেকুলারিজম’), যেটা আরেক ভুয়া শব্দ এবং তা জমিদারের রাজনীতি ও স্বার্থ লুকানোর এক কৌশল।

    সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’। জমিদারেরা বেশির ভাগ বর্ণহিন্দু ছিলেন বলে জমিদারি সামাজিক ব্যবস্থাটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপ্রথারও ধারাবাহিকতা হয়ে উঠেছিল সহজেই। মুসলমানেরা বাঙালি নয় সেটা না হয় ফতোয়া দেয়া গেল। কিন্তু এদিকে মুসলমানরা তো হিন্দু বাঙালি সমাজেই পাশাপাশি বসবাস করত, তাই চাইলেই ফেলে দিতেও পারেনি। তবে বর্ণহিন্দুর জাতিভেদপ্রথায় মুসলমানদের জন্যও তাদের জাত-অবস্থান ঠিক করে দেয়া হয়। আর সেটা বলাই বাহুল্য তা ছিল নমঃশূদ্র, চর্মকারদেরও দু’ধাপ নিচে। এভাবেই জমিদারি ক্ষমতার হাতেই কথিত “বাঙালিয়ানা” যাত্রা শুরু করেছিল, মুসলমানদের বাইরে উপেক্ষিত রেখে। এওখন এই কলকাতার বাঙালিয়ানা এরা কেমন করে আশা করে যে, তাদের এই সাজানো বাগানে আগুন লাগবে না , ব্যাকফায়ার করবে না? এসব তৎপরতার কোনো চরম ব্যাকফায়ার লন্ডভন্ড প্রতিক্রিয়া হবে না? তাহলে দাঙ্গা জিনিষটা কী যেন?

    তাহলে সেই থেকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এই যে সাজানো মনোরম বাগান মানে জমিদার বাবুর “বাঙালি সমাজ”, এতে প্রবেশ করতে গেলে মুসলমানদের “অনুমতি” নিতে হবে। ঘটনাচক্রে কোনো মুসলমানকে যদি এই ‘বাঙালি সমাজ বসতে উঠতে জায়গা পেতে হত, অফিসে বা ক্লাসরুমে যেমন ততদিনে আবার বৃটিশ ইন্ডিয়াতে মডার্ন এডুকেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরি এসে গেছিল, মাস্টারি ওকালতি পেশকার ধরণের নানান কাজও। এসব কিছুর সুযোগ যদি পেতে হত তবে মুসলমানদের প্যান্ট বা ধুতি পরতে হত, মাথায় টুপি চাপাতে পারতেন না। এই ইতিহাস আমাদের সকলের জানা  অন্তত ষাটের উপরে যাদের বয়স।  এটা কি এনাফ নয় সে সময়টাকে ধরবার জন্য! মডার্নিটি নামের আড়ালে জমিদার হিন্দুর কালচার বা তাদের ঠিক করে দেয়া বৈশিষ্ট্য মুসলমানদের অনুসরণ করতেই হবে, কেন? নইলে? নইলে আপনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ডাকা হবে। আর মনে রাখবেন, একবার সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগিয়ে দিলে ‘বাঙালি সমাজে’ আপনার প্রবেশ নিষিদ্ধ, অচল হয়ে যাবেন সেখানে। শিক্ষা, চাকরি কিছুই জোগাড় করতে না পেরে এখন না খেয়ে মরবেন, আপনি! আর যারা এখনকার ২০-৩০ বছর বয়সের তাদেরও দুঃশ্চিন্তার কারণ নাই। মমতার আমলে কিছু হয়ত বদলাতে চাইছে। তবু এখনও কলকাতা চলে যান, দেখে আসেন মনোযোগ দিয়ে। তাহলে আনিসুজ্জামান আমাদের কী অসাম্প্রদায়িকতা শিখাতে এসেছেন?

    আর  ‘অসাম্প্রদায়িক’ হওয়া মানে কী? জমিদারির আধিপত্যে সাজানো ‘বাঙালি সমাজে’ প্রবেশ ওঠা-বসার সুযোগ ও অধিকার পেতে হলে শাসক জমিদার বাবুর নির্ধারিত যে কোড আপনাকে মেনে চলতে হবে, অভ্যস্ত হতে হবে, এটাই “অসাম্প্রদায়িকতা”। আবার অসাম্প্রদায়িকতার ট্রেনিং ও ওরিয়েন্টেশন শেষে ওই সমাজে প্রবেশ করতে পারলে ভেবেন না আপনি তখন বাঙালিও হয়েছেন। আপনি সেই তখন বড় জোর হিন্দু বাঙালির এক পড়শি কেবল।

    অনেকের মনে আছে হয়ত ২০১৩ সালের আগষ্টে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের একাত্তর টিভির এক টকশো ক্লিপ পাওয়া যায় ইউটিউবে, সেখানে “বাঙালি মেয়ে কারা” তা নিয়ে মিতা হকের দেয়া এর বর্ণনা আছে। তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর ঐ বক্তব্যের টেক্সট পাবেন এখানে। সেটি মিলিয়ে দেখতে পারেন, তাতে আমার কথা আরো ভাল বাস্তব উদাহরণে বুঝা যেতে পারে। মিতা হকের বক্তব্য আমে দেখতে বলছি আমি যা বলতে চাইছি এর রেফারেন্স বা উদাহরণ হিসাবে।  তার বক্তব্যের পক্ষ নেয়া বা নিন্দা করা কোনটাই এখানে উদ্দেশ্য নয়। ওথচ কেউ বাঙালি কি না এর সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা হল, সে তার মায়ের সাথে কী ভাষায় কথা বলে, কিভাবে ডাকে ইত্যাদি। অথচ আনিসুজ্জামানের মত যারা চিন্তা করেন তারা ধর্ম বা পোশাক ইত্যাদির একধরনের লাইন টেনে দিতে চায় জমিদার কর্তৃক নির্ধারিত অসাম্প্রদায়িকতার কোড বলে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে।এটাও কি ব্যাকফায়ার করবে না? আসলে ‘মাদার টাঙ’ তো লুকানো যায় না, ভুলা যায় না।

    কিন্তু তা না হয় বুঝা গেল, তবু কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক বা সম্প্রদায়, এসব ডাকাডাকির ট্যাগ দেয়া কেন? কারণ খুব সহজ। জমিদারির হিন্দু কালচার বলতে চায় তারা তাদের বাঙালি সমাজ বলে এক বাগান সাজিয়েছে। সেখানে তাদের কোডের বাইরে আলাদা পোষাক বা আচার অথবা কোন চিহ্ন হাজির করা মানে হল তাদের সম্প্রদায়ের সেট আপের মধ্যে আমি আমার মুসলমান সম্প্রদায়েরও  চিহ্ন দেখিয়ে মাথা তুলতে চাচ্ছি। অতএব তাদেরটা নয় আমারটাই কেবল ‘সম্প্রদায়গত বিভক্তি’ চিহ্ন, যা আমি শো করছি বলে তারা দাবি করবে। কারণ রাজত্ব তো তাদের, আমরা তো প্রজা। তাদের সাজানো বাগানে আমরাই যেন হস্তক্ষেপ করছি! এটাকে তারা তাদের সাজানো বাগানে অন্যরাই যেন হস্তক্ষেপ করছে – এভাবে দেখতে চাচ্ছে। অতএব আমরা সাম্প্রদায়িক! এই হল ডঃ আনিসুজ্জামানের রপ্ত করে নেয়া ভাষ্য।
    সেই জমিদার শ্রেণীর আধিপত্যে ও নেতার হাতে চালু করা সমাজ আজও একইভাবে চলছে। আর পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা আজো ‘অসাম্প্রদায়িক’ চিহ্ন রপ্ত করতে করতে একেবারে ট্রেইন্ড। কারণ সে জানে এটাই এখনো তার পাসপোর্ট, না হলে বাঙালি সমাজে উঠতে দেয়া হবে না।

    আনিসুজ্জামান সম্ভবত আমরা অনুমান করতে পারি “কলকাতার মুসলমান” হিসেবে ছোট থেকেই কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠতে ট্রেইন্ড হয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর মনে অজানা ভয় কাজ করেছে যে, গোষ্ঠী বিশেষের আধিপত্যের তৈরি করা কোনো গাইড লাইন বা কোড ভঙ্গ করলে সমাজের কোথায় না আবার অপমানিত হতে হয়। মজার কথা হল, কলকাতার মুসলমান যখন পূর্ব-পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে আসেন, তখনও তাদের ‘ট্রমা’ যায় না। পিছু ছাড়ে না। কারণ ব্যাপারটা অভ্যাসের গভীরে ঢুকে গেছে – গভীর ট্রমা আর ভয়ে।  উল্টো তারা বাংলাদেশের মুসলমানদেরও ঐ একই ধরনের তথাকথিত মাই ফুট “অসাম্প্রদায়িক” হতে সবক দিয়ে বসেন।

    ঠিক এটাই প্রবলভাবে ঘটেছিল বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের দিকে আওয়ামি লীগের জন্মের সময়। কলকাতায় পড়ালেখা করে ফেরত শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত হয়ে যায় লীগের বুদ্ধিজীবী অথবা কালচারাল ভ্যানগার্ড। একারণেই সেকাল থেকেই লীগের অসাম্প্রদায়িক বা কথিত ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার অহেতুক কসরত দেখেছিলাম আমরা।

    ব্যাপারটা হল কোন মডার্ন ভ্যালু বা সরাসরি ইন্ডিভিজুয়ালিজম যদি চর্চা করতেই হয় তো করেন না? সমস্যার তো কিছু নাই।  তবে বুঝে শুনে করেন, মন লাগিয়ে। কিন্তু পুরানা জমিদার বা সামন্ত আধিপত্যের ভ্যালুর জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘোরা তো একেবারেই অপ্রয়োজনীয় আর হাস্যকর! কেবল খেয়াল রাখবেন, সহনাগরিক কারো অধিকার লঙ্ঘন করে যেন না বসেন, পায়ে মাড়াবেন না কাউকে। কারণ তারাও আপনারই সমান অধিকার; তাদেরও বৈষম্যহীন অধিকার আছে। এটা খুবই শক্তভাবে মেনে চললে দেখেন ভুয়া কথাবার্তার কবল থেকে বহু আগেই আর সহজেই রেহাই পেয়ে যেতে পারেন। খেয়াল রাখবেন কারণ সাবর্ডিনেট হওয়া যাবে না, মানা যাবে না।

    এবার কিছু সারকথা। বাঙালি মুসলমান তা সে যেখানকারই হোক, তার আর কারো কাছ থেকে সে ‘বাঙালি’ কি না, এই স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট অপ্রয়োজনীয়। পুরানা জমিদার গোষ্ঠীর আধিপত্যের কোনো কিছুকে সে আর গুরুত্ব দেয় না বিশেষত ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। দিলে তো সে সেই থেকে কলকাতার অধীনেই থেকে যেত। প্রধান কারণ পাকিস্তান কায়েমের পরই পুরা পুর্ব-পাকিস্তান থেকেই জমিদারি উৎখাত করে হয়েছিল। তাই এই জমিদারি-হারানি পরাস্ত স্ট্যাটাস আর তাকে কাউকে বাঙালি সনদ দেবার-না- দেবার কোনো মুরোদ রাখে না। তবে ওই জমিদার ও তার স্বধর্মী সঙ্গীরাই এখন সব ক্ষমতা আর আধিপত্য হারালেও বাম ভেক নিয়ে নতুন করে হাজির আছে। তারা মাঝে মাঝে বাঙালি মুসলমানকে এইবার কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িকতা শেখানোর চেষ্টা করে।

    কিন্তু বাঙালিয়ানা? না সে মুরোদ বা বাস্তবতা আর নেই। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে প্রধানত মুসলমান বাঙালি প্রমাণ করে রেখেছে যে, নিজের বাঙালি স্বীকৃতি আর অপরের কাছে নয়, নিজেই নিজের বাঙালি স্বীকৃতি, নিজেই তা হাসিল করে নিয়েছে। এরজন্য এই জায়গায় এসে শেখ মুজিব আমাদের একটা প্রশংসার দাবি রাখেন। দেখেন তিনিও কলকাতায় বড় হওয়া, পড়তে যাওয়া তাদেরই আরেকজন। কিন্তু কোয়ালিটি একেবারে উলটা। জেনুইন কোর মুসলিম লীগার। ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ কাহিনী তিনি গুমোর ফাঁক করে বুঝতেন। তাই মোহ ছিল না।

    তাহলে ডঃ আনিসুজ্জামান তিনি আসলে কে?
    তিনি হলেন পতিত কিন্তু হার স্বীকার না করা জমিদার হিন্দুর রিয়েল রিপ্রেজেন্টেটিভ।  কলকাতায় জমিদারি এখন আর নাই। আমাদের দেখাদেখি ১৯৫৫ সালের তারাও উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কলকাতার হিন্দুমনের ফাউন্ডেশন  ও মেজাজ এই জমিদারের হাতে শুরুর দিকে তার রমরমা আমলেই এর নির্ধারক টাচগুলো হস্তান্তর করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের উপর থেকে চরম ও প্রাকটিক্যাল অর্থে হারানি জমিদার হিন্দুর আধিপত্য বা সমস্ত ধরণের প্রতিপত্তির কিছু অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু কলকাতা (বৃহত্তর অর্থে এটা এখন সারা ভারত) হাল ছেড়ে দেয় নাই , হার স্বীকার করে নাই।  চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে হারানি জমিদারের খাসিলতের কথা বললাম ডঃ আনিসুজ্জামান আধিপত্য প্রতিপত্তি হারানো হিন্দু মনের প্রতিটা রক্তফোটার গতিবিধি আকাঙ্খা তিনি বুঝতেন। একারণে বাংলাদেশের কেউ যদি একালে ভারতের সাথে গাটছাড়া বেধে চলতে চান তাহলে তাকে দেখাতে হত যে তিনি ডঃ আনিসুজ্জামানকে আদর খাতির কেমন করেন, কোথায় রাখেন।  আবার ডঃ আনিসুজ্জামান এর দিক থেকে দেখলে তিনিও এসব জানতেন, বুঝতেন তার কোয়ালিটির বাজারদর কোথায় ও কত। ফলে তিনি সে মোতাবেক দাম চাইতেন ও পেতেন। ডঃ আনিসুজ্জামানের মৃত্যতে এই যুগের সমাপ্তি ঘটল।

    কিন্তু কলকাতায় বড় হওয়া মুসলমানরা এখনো এক ট্রমায় ভুগছেন। যেমন মনে করুন, ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের অনেক বন্ধু মিলে কোনো আলাপ করছেন। সেখানে নিজেদের মনের মধ্যে কারো কোনো অসাম্য বা নিচু বোধ নেই। ফলে  যা বলতে ও লিখতে ইচ্ছা করছে, তাই করতে তারা অভ্যস্থ অর্থে মুক্ত। কিন্তু যদি আপনারই কোনো কলকাতার মুসলমান বন্ধু এসে গেছে সেখানে এমন হয়! লক্ষ্য করবেন, সে আপনার সাহস ও মর্যাদাবোধ দেখে তো কাঁপছে আর হয়তো বারবার আপনাকে, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে, জামা টেনে ধরছে। তাহলে বুঝতে হবে, কলকাতায় থাকতে থাকতে এটা আপনার বন্ধুর ট্রমা, কোড মেনে চলার তাগিদের ট্রমা।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “ডঃ আনিসুজ্জামান ও “সাম্প্রদায়িকতা” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব 

    ভারতে হচ্ছেটা কী?
    প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব!

    গৌতম দাস

    ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯ বৃহস্পতিবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Tr

     

    ‘Are you Hindu or Muslim?’: TOI photojournalist

    সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু কেউ আমল করে নাই। সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
    ঘটনা হল, টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিউটিরত এক ফটোসাংবাদিক অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে দিল্লিতে বজরং দলের গুন্ডারা প্যান্ট খুলিয়ে তাঁর “নাগরিকত্ব  টেস্ট” করেছে। এরপর সে “মুসলমান নয়” এটা নিশ্চিত হয়ে তবেই ছেড়ে দিয়েছে।

    গত সোমবার থেকে  রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর হামলার আগুন লেগেছে  দিল্লিতে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী বা তাদেরকে দেয়া কাজের ব্রিফিং কী ছিল তানিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়ার ভাষ্যে ইতোমধ্যে ছবি প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ পুলিশের দিকে আঙুল উঠানো হয়ে গেছে।  এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?

    ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনার দায় রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়।

    কিন্তু দিল্লি এসব কিছুর ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে এর সাফাইটা হল, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’ [NCT] মানে, কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে বা অবস্থিত।  এই বিশেষ আইনের কারণে দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা অপেক্ষায় আদালতে মুলতবি আছে।
    বিজেপি চলতি মাসেই শোচনীয়ভাবে দিল্লিতে হেরেছে । দিল্লি এই রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় বলছি  এজন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা কৃতিত্বের(!) রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের মুসলমান-টার্গেট করে করা হামলা ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। এক জিঘাংসা। এই বিশ্বাসে কঠিন অকল্পনীয় নির্যাতন আর চাপের মধ্যে ফেলতে পারলে বিজেপি-বিরোধিতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে।  মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
    গত তিনদিনের ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ঐ রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
    ইতোমধ্যে অবশ্য লক্ষণীয় ভাবে ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। [যা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার সরকারবিরোধী হইয়ে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ] দিল্লির এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই বলে। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে ‘মোদি মোদি’ বলে স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
    ফটো জার্নালিস্ট হলেন কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি। সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে দিতে তার কেটেছিল। বা বলা যায় বিজেপির ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তাঁর কপালে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা সেই হিন্দুসেনার ডায়লগ ছিল, “তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে… আপনিও তো হিন্দু; কাজেই এতে ক্ষতি কী?”।
    সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, “আপনিও তো হিন্দু, কেন তবে ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল তাদের একজন বলে ওঠে “তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান?” এরপরই তাঁরা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
    এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার ঐ এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভার এক গরীব ছাপোষা বলে মন গলিয়ে তবেই সে যাত্রায় তারা পার পায়।
    উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়া – এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলো সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।

    এই রিপোর্টের শুরুতে, লেখক ওসব বিজেপি-সেনা কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে গেছে। এরা “মিসগাইডেড ইয়ুথ”। “আইন হাতে তুলে” নিয়ে “ভায়োলেন্স” ছড়াচ্ছে। এরা “ধর্মীয় আইডেনটিটি” ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে। ইত্যাদি।

    কিন্তু প্রশ্ন হল, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কী মোদীর ভারতে চালু ছিল না? কেউ মুসলমান হলে নিপীড়ন করে “জয় শ্রীরাম” বলানোতে বাধ্য করা,  গরু ব্যবসায়ী হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা, এমন যে কাউকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথি মারার অজস্র ক্লিপ কী আমরা সোশাল মিডিয়ায় দেখিনাই?  অথচ সামাজিক প্রতিবাদ দূরে থাকে ঐ ঘটনাস্থলের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মজা দেখা এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে “এধরণের ঘটনাগুলো সব গুজব বলে” – এগুলোর কোন অস্তিত্ব নাই বলে মোদীর সংখ্যালঘু মন্ত্রীর বয়ান কী ভারতের মিডিয়া ছাপেনি? কোন মিডিয়াই কী মন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে একটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেছিল? নাকি তখন কি কেবল মনে হয়েছিল “আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর!  কাজেই সমস্যাটা আমার না” – এমন মনে হয়েছিল তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা জানাতে চাচ্ছে কেন?  কে শুনবে? মোদী না অমিত শাহ? কী আশা করেছিলেন আপনি?

    বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন? কেন এতদিন চুপ ছিলেন? মুসলমানদের উপর হচ্ছিল বলে? তুচ্ছ করে? তাহলে আপনি কী?

    সারা ভারত আর সাথে এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই মুসলমান মারা বা নির্যাতন করার নষ্ট “মেরুকরণের” বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি?  এটা ভারতের কনষ্টিটিউশন-বিরোধী ততপরতা – এই দায়ে বিজেপির উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দিয়ে গেছে? তাই, আজ আঁতকে উঠে লাভ কী, অনিন্দ্য?  সবই তো শেষ!

    বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে তা আবিস্কার হয়েছিল এমন নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া ধরণের আবিস্কার সেগুলো।। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনাতে এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই “নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ”। কারণ কে মুসলমান কেবল এটা জানতেই তো বিজেপির এত আয়োজন। তাই নয় কী? তাহলে এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে “‘নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!” – এই শিরোনামে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • দিল্লিতে নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

    দিল্লি নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

    গৌতম দাস

    ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2SL

     

    দিল্লি প্রাদেশিক বা রাজ্য নির্বাচনে মোদী-অমিতের বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। আম আদমি পার্টি (আপ বা AAP) দলের আগের ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মতই এবারো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে তারা ৭০ আসনের দিল্লির ৬০-এর বেশি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জার্মান সরকারের ডয়েচে ভেলে [Deutsche Welle] গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে অত জনপ্রিয় না হলেও ফেলনা গুরুত্বের নয়। সেই ডয়েচে ভেলের (ইংরেজি সংস্করণ) এক রিপোর্টের শিরোনাম, “দিল্লির নির্বাচনী হার : প্রধানমন্ত্রী মোদীর শেষ দিনের শুরু?” [Delhi election losses: The beginning of the end for PM Modi?]।

    এটা ঠিক যে, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA) প্রায় সব প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশে এক ব্যাপক নাড়াচাড়া দিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতের লোকসংখ্যা বা ভোক্তা বাজার প্রায় ১৩৬ কোটির; সে কথা পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় খুবই মনে রাখে। তারা তাই এমন কিছুই বলতে চায় না পাছে তা এই বাজার হাতছাড়া হওয়ার কারণ হাজির করে ফেলে। কিন্তু মোদী-অমিতের বৈষম্যমূলক ও মুসলমানবিদ্বেষী করে সাজানো নতুন নাগরিকত্ব আইন পশ্চিমাদেশের জন্য ঐ ভোক্তা বাজারের লোভের চেয়েও আরো বড় বিপদের। সাধারণভাবে তারা আতঙ্কিত এ জন্য যে, তাদের আশঙ্কা এই আইন দুনিয়াতে বিপুল রিফিউজির ঢল তৈরি করতে পারে যারা আবার রাষ্ট্রচ্যুত। মোদীর এই আইন আগামীতে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন রিফিউজির সারিবদ্ধ ঢল নামাতে পারে, যেটা সদ্য মোকাবিলা করা সিরিয়ান রিফিউজিদের চেয়েও হবে ভয়ঙ্কর। কারণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি বৈশিষ্ট্য হল, এরা হবে রাষ্ট্রহীন; ‘থেকেও নাই’ এমন রাষ্ট্রচ্যুত বলে তাড়ানো এক জনগোষ্ঠী।
    ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘এই আশঙ্কার’ ওপর দাঁড়ানো এক নিন্দা প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আনা হয়েছিল আর যা এখন আগামি মধ্য মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করে রাখা আছে। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এনিয়ে কী রায় দেয় মূলত সেটা দেখতে আর মার্চে মোদী ইইউ সামিটে এসে কী প্রতিশ্রুতি দেন না দেখার জন্য। নতুন রিফিউজির ঢলের উদ্ভব বা মানবাধিকার রক্ষার দায় হিসেবে এর ভাগ বা দায়ভার গ্রহণ প্রশ্নে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও বেশি ভীত, বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতির স্থবিরতা দুনিয়াতে যখন প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়া দশা সেই পরিপ্রেক্ষিতে। ডয়েচে ভেলের এই শিরোনাম এসব আশঙ্কায় আক্রান্ত বলে এমন হয়ে থাকতে পারে। তা আমরা অনুমান করতে করি।

    দিল্লির রাজ্যনির্বাচন শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজেপিবিরোধী মূলত দিল্লির এক আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি (আপ) এবারের নির্বাচনে ৬২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতেছে। আর সেই থেকে অসংখ্য কর্নার থেকে কেন ফলাফল এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মিডিয়াগুলো ভরপুর হয়ে উঠেছে। রাজ্য হিসেবে দিল্লি খুবই ছোট; যেখানে ভারতের পুরনো মাঝারি সাইজের রাজ্যগুলোতে ২০০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে আসন থাকে। সেই বিচারে এগুলোর তিন ভাগের একভাগ সাইজের রাজ্য হল দিল্লি। তবুও দিল্লির এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ অনেক বেশি। কেন?
    মূল কারণ, মোদী-অমিতের নাগরিক বৈষম্যমূলক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ পাস করার পরের ভারতজুড়ে আপত্তি ও প্রতিক্রিয়া; আর তা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এটা ছিল কোন রাজ্যে অমিত শাহের প্রথম নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া। এছাড়া এমনিতেও দিল্লির নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্বে ছিলেন অমিত। যেমন শুরুতে বিজেপির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক ভোটে কী হয়েছিল সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ভাষায়, “কিন্তু নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংহ, জগৎপ্রকাশ নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহই আস্থা জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দিল্লি বার করে নেবেন। মেরুকরণই হবে প্রধান অস্ত্র। তখনই স্থির হয়, শাহিন বাগই হবে প্রধান ‘প্রতিপক্ষ’। আর প্রচারে শাহ বলেছিলেন, ‘‘ইভিএমের বোতাম এত জোরে টিপুন যেন শাহিন বাগে কারেন্ট লাগে। “। তাই তখন থেকেই দিল্লি নির্বাচনে ঠিক কী বলে, কোন কৌশলে বিজেপি ভোটে অংশ নেয় আর তাতে ভোট প্রদানের ধরনের মধ্যে কী মেসেজ ফুটে ওঠে – এসব জানার জন্য সব মহলের ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর তা থেকেই এত বিশ্লেষণ।
    এসব বিশ্লেষণগুলোতে কমন ব্যাখ্যার ধারাটা হল, এটা ‘উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু’ – এরই লড়াই যেখানে ‘উন্নয়ন’ জিতেছে। কিন্তু এখানে ‘উন্নয়ন’ মানে কী? আমাদের দেশের মতই, হাসিনার ‘উন্নয়ন’ বনাম নাগরিক অধিকার, এর কোনটা চান- এর মত? না, ঠিক তা নয়। তবে হয়ত কিছু কাছাকাছি। দিল্লির বেলায় এর মানে হল, নাগরিক মিউনিসিপ্যাল সুবিধা ও সার্ভিসগুলো; যেমন পানি, বিদ্যুৎ, নিষ্কাশন, বাসভাড়া, শিক্ষা ইত্যাদিতে সার্ভিস ব্যবস্থাপনা আর এর স্বল্প চার্জ বা মওকুফ করা চার্জ- এভাবে আপ দলের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গত পাঁচ বছর কাজ করে সাফল্য এনেছেন। এটাকেই এখানে ডাকা হচ্ছে “উন্নয়ন” বলে। আর এর বিপরীতে ‘কেন্দ্রের ইস্যু’ জিনিষটা কী?
    এখানে কেন্দ্রের ইস্যু হল যেমন, সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু সিএএ বা এর সাথে এনআরসি; এ ছাড়া ধীরগতির ধসে পড়া অর্থনীতি, কাজ সৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরেকভাবে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা আছে। যেমন নির্বাচনী ফলাফল কী হতে পারে সেই আগাম অনুমিত ফলাফল জানার লক্ষ্যে করা সার্ভেতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হল, “জাতীয় নিরাপত্তা”। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই প্রলেপ লাগানো শব্দ। আসলে কদর্য কিছু ধারণাকে লুকিয়ে রাখতে বলা এক ‘ভদ্র শব্দ’। কারণ এর পেছনের মূল কথাটা হল, ‘মুসলমানবিদ্বেষী উসকানি দিয়ে প্রচারণার” পক্ষে কারা। এটাকে আবার বিজেপি নিজেও আরেকটা শব্দ – ‘পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ’ বলে প্রকাশ করে থাকে। যেমন এই নির্বাচনে অমিত শাহ ও তার দলের বিদ্বেষী ভাষ্য হল, কেজরিওয়াল একজন ‘জঙ্গি’ নেতা, সে পাকিস্তানের বন্ধু, মুসলমান তোষণকারী ইত্যাদি। দিল্লির এক মুসলমান-প্রধান এলাকা শাহীনবাগ, এখানকার সিএএ-বিরোধীদের মূলত নারীদের একটা স্থায়ী প্রতিবাদ মঞ্চ আছে। এ সম্পর্কে অমিতের মন্তব্য এটা নাকি এক ‘মিনি-পাকিস্তান’। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কথাটার আসল মানে হল মানে, এই ক্যাটাগরিটা আসল অর্থ হল – বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও এর প্রপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিয়ে কারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – তাদের কথা বুঝানো হচ্ছে। এরাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে দেয়া ভোটার। এমনকি আনন্দবাজারের ভাষাতেও – এটা হলো “বিজেপির (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং হিন্দু ভোট একাট্টা করার কৌশল”। অর্থাৎ হিন্দুত্বের জোশ তুলে সব হিন্দু ভোট যেন বিজেপির বাক্সে আসে, বিজেপির নেয়া এই কৌশল । এটাও অনেকসময় আরেকটা সার শব্দে প্রকাশ করা হয় – পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। “হিন্দুর হিন্দুকে ভোট দিতে হবে আর সেটা কেবল বিজেপিকেই” – এটাই হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা কৌশলের সারকথা। এটাকেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদ নিজেদের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ অথবা এটা “বিজেপির কৌশল” বলে প্রকাশ্যেই দাবি করে থাকে।
    দিল্লির নির্বাচনের পরে ভারতের টিভির এক টকশোতে এসেছিলেন শেষাদ্রি চারি [SESHADRI CHARI]। তিনি হচ্ছেন, আরএসএসের ভাবাদর্শী পর্যায়ের এক নেতা , তিনি আবার আরএসএসের মুখপত্র এক প্রাচীন পত্রিকা ‘অরগানাইজার’-এর সাবেক সম্পাদক। তিনি বিজেপির এই ‘ঘৃণা তৈরির’ নিন্দনীয় কাজ ও ততপরতাকেও “অনৈতিক” বলে মানতে রাজি হননি। বরং দাবি করেছেন এটাই ‘বিজেপি রাজনীতির কৌশল’। দেখুন, “not hate politics but strategy”.।
    ভারতের কনস্টিটিউশন এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া বেআইনি। কিন্তু যেখানে সারা ভারতই এখন ‘হিন্দুত্বে’ ভাসছে সেখানে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলবে কে? আর নির্বাচন কমিশন সেখানে কোনো প্রশ্ন না তুলে আরামে কাজ করার পথ ধরবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
    ঠিক এ’কারণে বিজেপির অমিত শাহের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ এবার কিভাবে কাজ করে, আদৌ করে কিনা, সেটি সবাই দেখতে চেয়েছিল। কঠিন বাস্তবতা হল, এবারই এটা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, খোদ অমিত শাহ এবার তা নিজ মুখে প্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন।
    “ভারতে হিন্দুরাই রাজত্ব করবে, অন্য কারও কথা চলবে না। যারা অমান্য করবে তারা ‘দেশকে গদ্দারকো, গোলি মারো শালো কো’।  এভাবে বিজেপির সমাবেশ মঞ্চ থেকে স্লোগান দেয়া শুধু নয়, লিখিত বিবৃতি মানে ঠাণ্ডা মাথায় লেখা এমন এক বিবৃতি পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে দুদিন ধরে অমিত শাহের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ থেকে গায়েব ছিলেন। বেচারা অমিত “খুব শরমিন্দা আর শোকে” ভুগছে মনে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসেও যান নাই। দু’দিন পরে ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রেসের সামনে তিনি বলেন, “গোলি মারো বলে বিবৃতি দেয়া অথবা ‘ইন্দো-পাক ম্যাচ’ ধরনের মন্তব্য করাটা আমাদের ঠিক হয়নি। আমাদের দল এসব মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়”। এছাড়াও, তিনি স্বীকার করে নেন যে, খুব সম্ভবত এমন মন্তব্যের জন্যই “দিল্লিতে আমাদের পরাজয় ঘটেছে”। এর সাথে তিনি এটাও স্বীকার করে নেন যে, দিল্লি নির্বাচন সম্পর্কে “তার আগাম অনুমানে ভুল ছিল”। “ভেবেছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। আমার বেশির ভাগ মূল্যায়ন ঠিক হয়,এ বার ভুল হল”। সাথে সাথেই অবশ্য বড় ধূর্ততার সাথে নিজেই বলে রাখেন – “কিন্তু তাই বলে ‘দিল্লিতে বিরোধীদের বিজয় সিএএ-এনআরসি বিরোধী কোনো গণরায় নয়”।

    এটা সে গণরায় কি না তা সামনে স্পষ্টই বুঝা যাবে। এখনই বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে দিল্লি রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা যেখানে ১৩% সেখানে মুসলমান ভোটারদের ৭৫% (আর এরই সাথে শিখ ভোটের ৪২%) আপ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। [The AAP got the lion’s share of the Muslim vote, significant in a city-state with 13 per cent Muslims.] শাহীনবাগ যে কনস্টিটিউয়েন্সিতে পড়েছে এর নাম ‘ওখলা’ [Okhla]। সেখানে এবার ভোটারের উপস্থিতি রেকর্ডসংখ্যক। মোট উপস্থিত ভোটারের হার যেখানে ৬২% এর মতো সেখানে ওখলাতে তা ৬৬%-এর মত। আর ‘আপ’ দলের আমানতুল্লাহ খান এখানে জিতেছেন (1,30,367 votes) প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর (Braham Singh  58,540 votes) চেয়ে ডাবলের বেশি ভোটে।  এমনিতেও দেখা গেছে বেশির ভাগ আসনে ভোটাভুটির ফয়সালা হয়েছেও ষাট হাজার ভোটের কাছাকাছি।

    উত্তরপ্রদেশের ‘গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী’ যোগী আদিত্যনাথ যার একমাত্র যোগ্যতা মুসলমানদের মারব-ধরব বলে গালিগালাজ করা, তাকে উওরপ্রদেশ রাজ্যের পড়শি রাজ্য দিল্লিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল প্রায় ১৩টা বিজেপি কনস্টিটিউয়েন্সিতে প্রধান সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তিনি কেজরিওয়ালকে “জঙ্গি মদদদাতা, দেশদ্রোহী গাদ্দার, পাকিস্তানের বন্ধু ইত্যাদি বলে বক্তৃতা করেছিলেন। ফলাফল নিম্ন চাপ!  ঐ ১৩ আসনের ১১টাতেই বিজেপি অনেক ব্যবধানেই পরাজিত হয়েছে।
    অনেকেই অমিত শাহের স্বীকারোক্তিকে তার দলের এই হারের ফলাফল পাঠ করে, করা মন্তব্য বলে দেখেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এখন থেকে তাহলে ভালো হয়ে গেলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি?

    অমিত শাহকে নিজ দলে “ম্যাজিসিয়ান” বলা হয়। গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গাতেই তার জয়জয়কার। তিনি নাকি যেটা চান তাই করে আনতে পারেন। দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত আহত-নিহত হন, তাদেরও ভোট তিনি ব্যাগে ভরতে জানেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরবাদের দাঙ্গায় তিনি তাই ঘটিয়েছিলেন।  সেই ‘দাঙ্গা-ওস্তাদ’ তিনিই এবার দিল্লিতে হেরে গেছেন। না, তবু এর পরেও তাঁর স্বভাব বদলাবে না। কারণ তিনি কেবল এই ‘দাঙ্গা’ কাজটাই ভালো পারেন।
    এ ছাড়া আরো বড় ফ্যাক্টর হল, ২০১৬ সালের নোট বাতিলের পর থেকে ডুবে যাওয়া অর্থনীতির চিহ্নগুলো মোদী লুকিয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ এর প্রথমার্ধ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাই সেই থেকে “মোদী-ম্যাজিক” বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতএব, আগামী সব নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে “হিন্দুত্ববাদ” এর জজবা বা মেরুকরণ। কাজেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েই তাকে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। হয়তো পরের বার আরো ভাল ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঘৃণা ছড়াবেন। এক কংগ্রেস নেতা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, তার কাছে নাকি গোপন সংবাদ আছে, ‘‘পাকিস্তান এ বারে দিল্লি থেকে বিহারের পথে রওনা হয়েছে’’। কেন?  আগামী অক্টোবরে বিহারে রাজ্য নির্বাচন। দেখুন মেরুকরণের ভবিষ্যত।

    তাহলে, কেজরিলালের উন্নয়নের বিজয় কী জিনিষ ও তা কতটা সত্য?
    বড় সত্যটা হল, কোন রাজ্য নির্বাচনেই ভারতের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলো ভোটার-মানুষ ভুলে যায় না, যেতেই পারে না। যদিও এর পরেও এক্ষেত্রে একটা কিন্তু আছে। সেটা হল দিল্লির “গঠন প্রকৃতির” বিশেষত্ব। যেমন দিল্লি ছিল এক রাজধানী শহর কিন্তু আসলে ছিল এক জেলা শহর মাত্র। পরবর্তিতে তার পড়শি রাজ্য একদিকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা (মানে মুল ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য ভেঙে হরিয়ানা বলে আলাদা রাজ্য করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর হরিয়ানাই দিল্লির লাগোয়া পড়শি। ) আর অন্য দিকে উত্তর প্রদেশ – এদুই রাজ্য থেকে কেটে আনা জেলা শহর নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে আজ দিল্লি রাজ্য হয়েছে – ১১ জেলা শহরের। এভাবে অন্তর্ভুক্তি আবার এক দিনে হয়নি, ১৯৯৭ থেকে সর্বশেষে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে। এর সোজা অর্থ, এই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া জেলাগুলোতে  একটা রাজধানী শহরে  যেমন থাকা উচিত সেই পানি-বিদ্যুৎ-বাস-স্কুল টাইপের নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলোর কিছুই ছিল না। এসব অভাব চরমে  উঠা আর নাগরিক ক্ষোভ থেকেই একে পুঁজি করে আম আদমি পার্টির জন্ম ২০১২ সালে। আর গুছিয়ে ক্ষমতায় থেকে গত পাঁচ বছরে এই ব্যবস্থার চরম উন্নতি ঘটিয়েছে কেজরিলালের আপ দলটা। এই সময়ে রাজ্যের রাজস্ব আয় তিনি বাড়িয়েছেন ৩১%। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লির তথ্য নিয়ে লিখেছে,

    ভারতের মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপাত্ত বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দিল্লির রাজস্ব আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আর এ আয় গেছে স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নে। যদিও এ সময়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৭ শতাংশ কমেছে। দিল্লি ভারতের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

    কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এর নেতা কেজরিওয়াল আদর্শ মুখ্যমন্ত্রী। পদত্যাগী এই সাবেক আমলা ম্যানেজমেন্ট বোঝেন ভালোই। তিনি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বড়লোকদের বিদ্যুতের রেট তুলনায় বেশি ধরে সে আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের ভর্তুকির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। একই ব্যবস্থা পানি ব্যবহারেও। আবার নারী বাসযাত্রীর ভাড়া ফ্রি। স্কুল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তাতে ইংলিশ স্কুল ছেড়ে অবস্থাপন্নরাও সরকারি স্কুলে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন। আজ আনন্দবাজার লিখেছে, মহিলা ভোটেই কুর্সিতে কেজরী, বলছে ফল-পরবর্তী সমীক্ষা। একারণে মূলত নারীরা তুলনায় আপ পার্টিকে ভোট দিয়েছে বেশি। এমনকি নাকি স্বামীরা বিজেপি-কংগ্রেসের সমর্থক হলেও স্ত্রীরা আপ দলকে ভোট দিয়েছে।  আর এসব ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্বের মূল সুফলভোগী হল সরাসরি স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে আপ দলের মূল ক্ষমতার ভিত্তি হয়েছে এই স্বল্প আয়ের লোকেরা।  নির্বাচনে কেজরিওয়াল নিজের এই সফলতাকেই তুলে ধরেছেন, আর প্রতিদান চেয়েছেন। এমনকি ভোটারদের বলেছেন, আপনি বিজেপি বা কংগ্রেসের সদস্য বা সমর্থক হয়েও থাকেন তবে দল ত্যাগ না করে আমার কাজের প্রতিদান ও আমাকে উৎসাহ দিতে আমার দলকে একটা ভোট দিন। আসলেই তো তিনি ‘স্বল্প আয়ের মানুষের বন্ধু’। না হলে দিল্লির মত ব্যয়বহুল রাজধানী শহরে গরীবদের বসবাস করা আরো কঠিন হয়ে যেত। কাজেই দিল্লির এই বিশেষ গঠন প্রকৃতি – এটা উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু – এই নাম দিয়ে ডাকা ও দেখা সবটা সত্যি নয়। আর এর মানে এই নয় যে, সিএএ-এনআরসি ইস্যু বা কাজ সৃষ্টির ইস্যুতে তাদের কিছু এসে যায় না।

    তবে সার কথা হল, দিল্লিই প্রথম কথিত ম্যাজিসিয়ান অমিত শাহ ও তার দলের যে সারা ভারতে “অপরাজেয়” ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই দর্প এবার চূর্ণ করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ভাঙা আত্মবিশ্বাস কতটা অমিতরা ফেরত আনতে পারেন তা এখন দেখার বিষয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “‘দিল্লিতে পরাজয়ের তাৎপর্য” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

    প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

    গৌতম দাস

     ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2RG

    ‘Don’t worry about NRC’, Modi tells Hasina – New York, Sept 27 (UNB)

    ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছেই, তাতে যতই এটাকে সুপ্ত করে ফেলে রাখা অথবা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন! এটা লুকিয়ে থাকছে না। এর চেয়ে বড় কথা, সব হারানো মরিয়া মোদীর হাতে আমাদের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দরজায় কড়া নাড়ছে। বিগত ২০০৯ সালে এই সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ‘বন্ধু-রাষ্ট্র’ বলে সোনার-পাথরের বাটি ধরনের এক অর্থহীন শব্দ দিয়ে। অথচ যা সোনার তৈরি তা আবার পাথরেরও, এমন হওয়ার সুযোগ কোথায়? অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ মাত্রই তো তা আপনা-আপনা। যদি না দলীয় বা ক্ষমতায় থাকার স্বার্থের সাথে একে মাখিয়ে ফেলা হয়। একালে এসে যেটা আবার হয়েছে ‘স্বামী-স্ত্রী’ বলে আরেক ফালতু শব্দে। কূটনীতির জগৎ সম্পর্কে মন্ত্রীদের ন্যূনতম ধারণা থাকলে এসব শব্দ ব্যবহার আমাদের শুনতে পাওয়ার কথা নয়। সরকারকে কৌশলগত কাভার দেয়ার জন্য অনেক শব্দ অনেকসময় ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তাই বলে এভাবে এসব শব্দ দিয়ে নিজেই নিজেকে খাটো নিচা করে দেখানো, বেইজ্জত করা কাম্য নয়। তবে কথিত স্বামী-স্ত্রীর অধস্তনতার সম্পর্ক যে এখন বড় ধরণের সঙ্কটে মুখোমুখি হয়েছে আর মতবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে যাচ্ছে এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল দুবাই থেকে প্রকাশিত এক ইংরাজি দৈনিক গালফ নিউজ পত্রিকায়  সম্প্রতি দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতকার [শিরোনাম “Citizenship Amendment Act is India’s internal matter, Sheikh Hasina says”]। বলতে গেলে তিনি সেখানে সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন [Citizens Amendment Act, CAA] বা সিএএ-কে সমালোচনা করে “অপ্রয়োজনীয়” বলেছেন, “We don’t understand why [the Indian government] did it. It was not necessary,” । এটা আমাদের জন্য খুবই কৌতুহলের যে গত দশ বছরে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সম্ভবত এই প্রথম ভারতের বা মোদী সরকারের খোলাখুলি ও প্রকাশ্য এমন সমালোচনা করলেন, নিজের অসম্মতি অপছন্দের দিক প্রকাশ করলেন। নিঃসন্দেহে এটা প্রকাশ্য মতবিরোধ বা স্বার্থবিরোধে। তবে এটাকে তিনি এখন কোথায় কোনদিকে কতদুর নিতে চান তা বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে ও চোখ খোলা রাখতে হবে।
    প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই সাক্ষাতকারকে একই সাথে আন্তর্জাতিকভাবে আম-পাবলিকের কাছে মোদীর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে বিচার দেয়া হিসাবেও পড়া যেতে পারে। ব্যাপারটা হল, ভারত সরকারের সিএএ বা এনআরসির কারণে ভারতের সম্ভাব্য বিতারিত মুসলমানেরা বাংলাদেশ অভিমুখে লাইন লাগিয়ে রওনা দিবে না। কারণ সিএওএ বা এনআরসি এগুলো ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। একথাগুলোই হাসিনার গত অক্টোবর ২০১৯ সালে ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন [… Modi has in person assured me]। এই কথাগুলো গালফ নিউজে সাক্ষাতকারের মুখ্য ফোকাস হয়ে হাজির করা হয়েছে। তাই এটা মোদীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ নালিশ অবশ্যই, কিন্তু নিজ সরকার টিকানোর ফ্যাক্টর ভারত – এই অধস্থন ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের দশ বছর পার হবার পর এখন এর কোন মুল্য তাতপর্য কী আছে? নাকি তাতপর্য বা সব মানে হারিয়েছে বলেই এটা এখন আম-পাবলিকের দ্বারস্ত – আমরা কি এভাবে পড়ব?

    সিএএ বাস্তবায়নঃ
    ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ অফিসিয়ালি গত ১০ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গেজেট হয়েছে। আর এদিকে কঠিন বাস্তবতা এমন যে বিজেপি বা মোদী সরকারকে এই সিএএ বাস্তবায়ন করতে যেতেই হবে। মোদী এমনই কোণের এক চিপায় পড়েছে। বিজেপির জন্য মরি আর বাঁচি ধরনের এক মরিয়া নিরুপায় অবস্থা এটা। কেন? কারণ, ভারতের অর্থনীতির নিম্নগতির মুখে আর বিশেষ করে সহসা এর রিকভারির সম্ভাবনা কম বলে, সরকারের ইমেজের প্রশ্নে আর সরকার চালানো ও লাগাতার আগামি রাজ্য নির্বাচনগুলোতে পাবলিকের মুখোমুখি হতে হলে বিজেপির কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। ফলে এমনিতেই চরম হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির হাতে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সামাজিক পোলারাইজেশন উসকে তুলে টিকে যেতে পারলে তবেই হয়ত তার রক্ষা – এখন সে এই অনুমানে গিয়ে ঠেকেছে। নইলে জন্ম থেকেই বিজেপি-আরএসএস যেমন সারা জীবনে ক্ষমতার ধারে কাছে যেতে পারেনি সেই রকমের দিনগুলোতে তাকে চিরদিনের মত আবার ফিরে যেতে হবে।
    তাহলে অবজেকটিভ বাস্তবতাটা হল, বিজেপি বা মোদী সরকারকে মরিয়া হয়ে যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়ন করতেই হবে, হিন্দুত্বের হুজুগ তুলতে পারতে হবে।

    কিন্তু সিএএ বাস্তবায়ন মানে আসলে কী? ঠিক কী হবে এতে এখানে? ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছে এমনকি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাও। তারা সরাসরি কথাগুলো নিজের পত্রিকার কোনো রিপোর্ট হিসেবে নয়, সম্পাদকীয় হিসেবে মানে নিজেদের কথা হিসেবে দায়িত্ব নেয়া ভাষ্য হিসেবে প্রকাশ করেছে। সেখানে বলেছে, “নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ ১০ জানুয়ারি গেজেটে বিজ্ঞাপিত হল অর্থাৎ সরকারিভাবে চালু হল। কৌতুহলের বিষয়, তার পাঁচ দিন আগেই উত্তরপ্রদেশ সরকার ঘোষণা করে, তারা আইনটি কার্যকর করতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসকদের বলা হয়েছে (একটি রিপোর্ট অনুসারে কেবল মৌখিকভাবে) এই আইনে উপকৃত ব্যক্তিদের, অর্থাৎ নির্দিষ্ট তিন দেশ থেকে আগত ছয়টি ধর্মের ‘শরণার্থী’দের, শনাক্ত করতে; সেই সঙ্গে সপ্তম যে ধর্মটি ছাড় পাচ্ছে না, তার ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ চিহ্নিত করতে”। আনন্দবাজারও ব্যাপারটা টের পেয়ে সহ্য করতে না পেরে সরাসরি লিখেছে – তবে কি দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটাই প্রধান,অর্থাৎ ‘বেআইনি’ মুসলিম বাসিন্দাদের চিহ্নিত করা?

    তাহলে এটা হল, ভারতের ‘মুসলমান খেদানোর’ প্রোগ্রাম। অর্থাৎ সরাসরি বললে, ভারতের মুসলমান বিতাড়নের প্রোগ্রামে নেমে পড়েছে বিজেপি সরকার আর আশা করছে এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতে সামাজিক-রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে, পরিণতিতে ব্যাপকভাবে হিন্দুত্বের উত্থান-জাগরণে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে। তাতে ওই বিতাড়িত মুসলমানদের কী হবে, তারা কোথায় যাবে, তাতে বাংলাদেশের কী হবে ইত্যাদি দিক নিয়ে ভাবার দায় নেয়ার অবস্থায় বিজেপি বা মোদি-অমিতেরা নেই। মনে হচ্ছে, তাদের এখন আপনি বাঁচলে বাপের নাম অবস্থা!

    এই অবস্থার বিপরীতে বাংলাদেশের সরকারের হাতে কী আছে? আছে এক ‘আশ্বাস’। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রধানমন্ত্রীর দু’বারের সাক্ষাতে ‘মোদী আশ্বাস’ দিয়েছিলেন বলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।  উপরে গালফ নিউজে ছাপা সাক্ষাতকারেও আমরা একই রেফারেন্স দেখলাম। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই আশ্বাস কী এখন কার্যকর আছে অথবা থাকবে? এর বাস্তব মূল্য কী? প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সমালোচনা দেখে মনে হচ্ছে তিনিও ভরসা পাচ্ছেন না!

    আসলে, কঠিন বাস্তবতাটা হল, এটা “ভরসা অযোগ্য” হয়ে গেছে। আমরা যখন দেখতে পাই ও বুঝি যে বিজেপি বা মোদী সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া দশায়, অর্থাৎ আমাদের আশ্বাসদাতারই মরি-বাঁচি অবস্থা – তখন আশ্বাসের মূল্য অনুমেয়! উত্তরপ্রদেশে সিএএ বাস্তবায়ন নিয়ে কী হচ্ছে তা আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে আমরা দেখলাম। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রীর সরকার ক্ষমতায়। আর উত্তরপ্রদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ২০%।

    এছাড়া, মোদীর আশ্বাসের ভাষ্যের একটা টেকনিক্যাল দিক আছে। ‘মোদীর আশ্বাস’ ছিল এই বক্তব্য যে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু” হয়ে থাকবে। তাই মোদী এখন কি বলে বসতে পারেন যে, তিনি এনআরসি ইস্যুতে আশ্বাস দিয়েছিলেন কিন্তু সিএএ ইস্যুতে দেননি? তা অবশ্য আমরা এখনো জানি না। তবে ভারতেই অভ্যন্তরীণভাবে মোদী সরকার তার বিরোধীদের সাথে এখন একটা বড় বিতর্ক করছে যে, “এনআরসি আর সিএএ আলাদা” ইস্যু। আর এনআরসি নিয়ে মোদী সরকার নাকি এখনো কোনো ‘কাজই শুরু’ করেনি। আরও পয়েন্ট তুলে বলতে পারেন, বাংলাদেশকে দেয়া কথিত আশ্বাস যখন দেয়া হয়েছিল তখনো ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী (সিএএ) তাদের সংসদে আনাই হয়নি।

    আর এখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মোদি সরকার যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া হবে তা আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি। কারণ মোদী এটাকে তার দলের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে ফেলেছে। কাজেই ‘আশ্বাসের’ ওপর যে ভরসা রাখা যাচ্ছে না অথবা যায় না সেটা বাংলাদেশ সরকারের কাজ-কারবারেও স্পষ্ট যে সে এটা ওয়াকিবহাল। যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উত্তেজনা যে আছে ও বাড়ছে তা নিয়ে প্রকাশ্যে যতই আড়ালে রাখা হোক তা আড়ালে থাকছে না। দেশে-বিদেশে তা চর্চার বিষয় হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের সাক্ষাৎ সব একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তত এই তথ্যকে কেন্দ্র করে এটা এখন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ইস্যু। এ নিয়ে ভারতের মিডিয়াতেই বেশি প্রকাশিত রিপোর্ট এটা, যার সর্বশেষ হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের ভারত সফর বাতিল। যদিও এখানে কারণ বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্য সফরে সঙ্গী হতে গিয়ে সেই প্রায়োরিটিতে প্রতিমন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হয়েছে।

    এখন বলাই বাহুল্য, সিএএ বাস্তবায়নের পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া কী হতে যাচ্ছে বা হতে পারে তা নিয়ে গ্লোবাল পরিসরে রাজনৈতিক (হিউম্যান রাইট) দিক ছাড়িয়ে তা এখন অর্থনৈতিক দিক থেকেও শঙ্কা সৃষ্টি করবে, এটাও স্বাভাবিক। কারণ কোন ইকোনমিই আর লোকাল নয়, ইকোনমি মাত্রই তা গ্লোবাল ও কানেকটেড। যেমন এত দিন জাপান ছিল অবকাঠামো খাতে কম সুদে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় ঋণদাতা- সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বা এশিয়ান-দাতা আইডিবির মাধ্যমে ঋণদাতা। গত তিন বছরের ফেনোমেনা হল, এর সাথে আরও যোগ হয়েছে – ব্যাপক ‘ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট’ মানে বাংলাদেশে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ নিয়ে জাপান এখন হাজির।

    বাংলাদেশে তুলনামূলক সস্তা আর ভাল মানের শ্রমের লোভে জাপানি ম্যানুফ্যাকচারিং এখন স্থানান্তর হচ্ছে এখানে। তাই সোজা ভাষায় বললে, স্বাভাবিকভাবেই মোদীর এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন অধিকার-লঙ্ঘনের তৎপরতার খবরে যা সবাংলাদেশকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল করে ফেলার ইঙ্গিত – এটা নিয়ে, এসব বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত। এরই একটা ঝলক আমরা দেখতে পাই জাপানি মিডিয়ায়। বিনিয়োগকারীদের পছন্দের এমন এক মিডিয়া হল – ‘নিক্কি এশিয়ান রিভিউ [Nikkei Asian Review ]। সেখানেই প্রকাশিত এক রিপোর্টে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে – এটা কী বাংলাদেশে ‘আরেক রোহিঙ্গা সঙ্কট’ তৈরি করতে যাচ্ছে? ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, “আরেকটি রোহিঙ্গা-সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে ভারতের নাগরিকত্ব আইন, আশঙ্কা বাংলাদেশের”।
    ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার মাহমুদের কিছু বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে যে আশ্বাস দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মনে করেন যে ভারতের এনআরসি বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না”। তবে শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।’
    নিক্কি রিভিউয়ে যদিও লেখা হয়েছে যে, এর মানে হল ওই মহাপরিচালক “এই আশঙ্কাকে পাত্তা দিচ্ছেন না”। হ্যাঁ, সে কথা সত্য। কিন্তু বুঝতে হবে মহাপরিচালকের ভাষ্যটা বাংলাদেশের ‘অফিসিয়াল’ কূটনীতিক ভাষ্য। অফিসিয়ালি বাংলাদেশ সরকার এখনও ‘মনের শঙ্কার’ কথা অফিসিয়ালি বাইরে আনার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে নিক্কির ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের এক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৈহিদ হোসেনের বক্তব্যও এনেছে। সেটা হল, তৈহিদ হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, “বাংলাদেশের মাথার ওপর সিএএ একটি খাঁড়ার মতো ঝুলে আছে। যেকোনো সময় এটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে”। আসলে এটাই জেনুইন ভাষ্য। আমাদের সরকার এই ‘প্রাক্তন’ মুখগুলোকেই অ্যাক্টিভ করে মনের কথাগুলো আরো বেশি করে ইনফরমালি বাইরে আনার চেষ্টা করতে পারে।

    বাংলাদেশের সরকার বিষয়টা নিয়ে ওয়াকিবহাল। কিছু প্রস্তুতির প্রকাশ্য দিকটাও আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই। যেমন সীমান্তের এক কিলোমিটার এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক চাইলে যেন বন্ধ করে রাখা যায়, এর কার্যকারিতা ইতোমধ্যে এক মহড়ায় টেস্ট করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কিছু সঙ্কীর্ণ নির্বুদ্ধিতাও আছে। এ ছাড়া সরকারের কিছু স্থায়ী নিজ দুর্বলতা আছে, যা ফলাফলে সরকারকে ভারতের সাথে তোষামোদকারীর ভুমিকায় হাজির করে রাখে বা রেখেছে। এটাই স্থায়ী সমস্যা, যা সমালোচকরা অনেকসময় বাংলাদেশকে ভারতের বাঁদী-রাষ্ট্র বা ভেসেল রাষ্ট্র বলে মূল্যায়ন করে দেখিয়ে থাকে।

    নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ- এই আইনটা দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মূলত হিন্দুরা সরকার বা রাষ্ট্রের নিপীড়নে বা ‘পারসিকিউশনে’ [Persecution] আছে – এটা স্পষ্ট করে লিখে দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই দাবির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হল, “এটা বিএনপি আমলে হয়েছে”। আর শাহরিয়ার কবিরকে দিয়ে বলানো হয়েছিল যে, বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা নাকি ২% বেড়েছে। কারণ তারা ভারত থেকে ফিরে এসেছে। সরকারের এসব প্রতিক্রিয়াকে নির্বুদ্ধিতা বললেও কম বলা হবে।
    প্রথমত, ভারত সিএএ আইনে অভিযোগ করছে বাংলাদেশ হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’। তাহলে, ভারত ফেরত পাঠানোর সময় সেই হিন্দুদের না পাঠিয়ে কেবল এবং একমাত্র মুসলমানদেরই আনছে কেন? এই প্রশ্ন ওদের মুখে ছুড়ে দেয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া ভারত যদি নিশ্চিত চিহ্নিত করেই হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’ কথা জানে তাহলে তো কাজটা সহজ। তাহলে এর প্রমাণগুলো বাংলাদেশের কাছে বুঝিয়ে দিলে বাংলাদেশ বিনাবাক্যে তাদের ফিরিয়ে নেবে, পুনর্বাসিত করবে এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ দিতে পারে, প্রতিকার হিসাবে দেয়া উচিতও। ফলে দিয়ে দিক। আর যে নিপীড়িত হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছে এখন আগেই তাদের সীমান্তে পাঠিয়ে হয়রানি না করে তাদের সেসব ‘নিশ্চিত চিহ্নিত’ ডকুমেন্ট আগেই বাংলাদেশের কাছে পেশ করে তাদের ফেরত নেয়ার একটা মেকানিজম তৈরিতে বাংলাদেশ রাজি আছে সে প্রস্তাব দিলেই তো হয়।
    এখানে ‘গায়েবি’ অভিযোগের সুযোগ বন্ধ করাই হতে পারে বাংলাদেশের মূল স্বার্থ। সেখানে বাংলাদেশও ‘বিএনপি আমলে হয়েছে’ আর ‘২% ফেরত’- এসব গায়েবিভাবে বক্তব্যে তুলে ধরেছে। এটা আত্মঘাতী ও নির্বুদ্ধিতা। আবার দেখা যাচ্ছে,  সরকার ধরেই নিয়েছে এই ইস্যুতে যাদের শুনানোর জন্য এই ভাষ্য সরকার দিচ্ছে, তারা যেনবা বাংলাদেশের পাবলিক। অথচ সরকার বাস্তবে এই ভাষ্যের খাতক হবার কথা ভারতের মোদী-অমিত। কিন্তু আবার এর মানে কি সরকার ভারতের কাছে বিএনপির নামে বিচার দিচ্ছে? সে ক্ষেত্রে এটা কি কোনো সরকারের কাজ হতে পারে, না সাজে? সরকার চালানো কি খেলাপাতি খেলা! যে কীছু হলেই আমি না বিএনপি! বলতে হবে?
    উল্টোদিকে, বাংলাদেশে ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে পরে ‘আওয়ামী লীগকে কেন হিন্দুরা ভোট দেয়’ এই অজুহাতে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ সেকালেরই অনেক লিডিং মিডিয়ায় এসেছিল। কিন্তু আমাদের অনেকের ধারণা সরকারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের তদন্ত করালে এবং একেবারে বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করালে সেটা বোধহয় সরকারের বিরুদ্ধেই যায়!  এটা স্বল্পবুদ্ধি ও কূটচিন্তার মানুষের ধারণা।  বিএনপিও এটাই বুঝেছিল। অথচ বিএনপি সরকার যদি সেকালে ওই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করে রাখত, তাহলে আজ না ভারত না বর্তমান সরকারের পক্ষে ইচ্ছামত কোনো অভিযোগ তোলা সম্ভব হত। কাজেই তদন্ত না করাটা সবসময় কোন সরকারের পক্ষেই যাবেই এই অনুমান ভিত্তিহীন।
    নিরপেক্ষ তদন্ত করা সেকালে হয়ে থাকলে সেই ভাষ্যটাই এখন সব আটকে দিতে পারত। মূল কথাটা হল, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে পালালে তো হবে না, মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দায় নিতে হবে। উপযুক্ত প্রতিকার দিতে হবে। এতে কমপক্ষে পুরা দল নিজেকে পরিষ্কার আর অভিযোগমুক্ত রাখতে পারবে। যেটা আসলে একটা দলের জন্য বিরাট অ্যাসেট। বিএনপি নিশ্চয়ই আজ মানবে সে কথা। সেকালে দলের বিশেষ কিছু লোকের কুস্বার্থে আজ অন্যের সব আবর্জনা আর খারাপ উদ্দেশ্যের দায় বিএনপির মাথায় আসছে।

    দ্বিতীয়ত, ভারতের সংসদের বক্তৃতায় অমিত শাহ্ দাবি করেছিল বাংলাদেশে নাকি ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ স্বাধীনতার পর থেকেই হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো সরকারের আমলকেই তিনি বাদ দেননি। এমনকি বিজেপি-আরএসএসের প্রতিনিধি বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক বা প্রিয়া সাহার অভিযোগও তো তাই। কাজেই মোদী-অমিতের কাছে বিএনপির নামে অভিযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সরকার কোথায় পালাতে চায়? সরকার চালানো খেলাপাতি না যে সব মুখে অস্বীকার করে অন্যের ওপর দায় দিতে হবে- এসব কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়। আজ অবস্থা তৈরি হয়েছে এমন যে মোদী-অমিত আমাদের সরকারের ‘আমরা না, বিএনপি’ টাইপের ছেলেখেলাকেই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে বলবে যে, বাংলাদেশের সরকার বলেছে যে ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ হয়েছে। অর্থাৎ অমিত শাহরা চাইলে বলতে পারবে যে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ বিলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে রাখা জায়েজ আছে।
    এ কারণেই আমাদেরকে অন্য সরকারের অভিযোগ সিরিয়াসলি নিতে হবে, প্রমাণ চাইতে হবে। প্রমাণিত হলে দায় নিতে হবে। প্রতিকার দিতে হবে। আর প্রমাণ না দিতে পারলে মাফ চাইতে বাধ্য করতে হবে।

    সরকারের স্থায়ী দুর্বলতাঃ
    সাধারণভাবে আমরা সবাই বুঝতে পারি ভারতের মোদী-অমিতের এসব ন্যুইসেন্স আর ইসলামবিদ্বেষ জাগিয়ে ভারতের ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, মেজরিটি মানুষ খুবই বিক্ষুব্ধ। অথচ এটাকে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে নিতে বা এই বিক্ষোভের ভয়েস ও প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে হাজির করতে সরকার অপারগ। কারণ গত ১০ বছর এর উল্টা লাইনেই হেঁটেছে সরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের গণভিত্তি তৈরি করে নেবে সে পথেও সরকার নেই। সম্ভবত সে পথে ফেরার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে, সরকারের অনুমান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলতে পারার ক্ষেত্রে বিদেশীরা (মূলত আমেরিকা) বিরাট হুমকি। ঠিক যেমন করে ২০০৭ সালে বিদেশীরা এক সরকার এনেছিল। পরিণতিতে এই সরকার বসেছিল। অতএব এই হুমকি কাউন্টার করতে ভারতকে পাশে রাখতে হবে, তোষামোদ করতে হবে – ভারত নির্ভরশীলতা এখান থেকেই – সরকারের অনুমান এমন বলে মনে হয়। ফলাফলে, মোদী-অমিতের সব ন্যুইসেন্সের বিরুদ্ধে জনগণ তৈরি হলেও সরকার তা ব্যবহার করার ‘জনপ্রতিনিধি’ হওয়ার সুযোগ নিতে পারছে না। এই হলো বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সঙ্কট।
    আজ এটা পরিষ্কার মোদী-অমিতের এখন আর নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু হাতে নেই। মোদি-অমিতের বিচারে ‘মুসলমান খেদানো’র প্রোগ্রাম এখন তাদের একমাত্র সম্ভাবনা -আয়ু ও বাঁচোয়া! বাকি সব হারিয়েছে তারা। এখন জায়গা মত সুযোগ পেলে বাংলাদেশের সরকারকেও তাদের লক্ষ্যে বেচে দেয়ার চেষ্টা করবে, এমনই তলানিতে ঠেকেছে তারা! একারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এনআরসি বা সিএএ ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসাবে রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্বেও অমিত শাহ্‌ ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত যে কোন নির্বাচন এলেই  “অনুপ্রবেশকারী” মানে “মুসলমান খেদানো”, আর তেলাপোকা বা উইপোকা বলে গালি দিয়ে তুচ্ছ করে তাদের পিষে মারার কথাই বেপরোয়া বলে চলেছেন। এটাই প্রমাণ যে কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষার অবস্থায় বিজেপি বা মোদী-অমিতেরা নাই। অসুস্থ, বর্ণবাদী এরা এমনই বেপরোয়া!

    কিন্তু আমাদের সরকার নিজে বা খোদ বাংলাদেশ কী মোদী-অমিতের ন্যুইসেন্স থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? আমরা আশঙ্কিত! কারণ, সরকার ভুল রাস্তায় হাঁটছে। এছাড়া, আমাদের সরকারগুলো স্বাধীনতার পর থেকেই ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ করে থাকলে নির্যাতনের শিকার সেই হিন্দুদের বদলে মুসলমানদের সীমান্তে জড়ো করা হচ্ছে কেন? এই সাধারণ স্ববিরোধিতাটাকেও প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে আমাদের সরকার!

    এরই ভিতরে সরকারের মুজিববর্ষ পালনের গুরুত্বপুর্ণ  “মুলবক্তা” অতিথি হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  মুসলমানবিদ্বেষী এত ঘৃণার চাষাবাদ যার মনের কোণে কোণে তিনি আরও প্রায় তিন মাস সিএএ বাস্তবায়ন করে কত কিছু যে করে আসবেন কে জানে? আবার আসার পর বাংলাদেশে তার কেমন লাগবে, কাটবে; আর আমরাই বা তাকে কীভাবে নিব? ভাববার আছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ১৮ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “ মোদির নিজ সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

    মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

    গৌতম দাস

     ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Rl

    –

    অমিত শাহ্ যে গুজরাটের দাঙ্গাবাজ পুরান গুণ্ডা, দিল্লিতে এসেও তিনি সে প্রমাণ আবার রাখলেন।
    ভারতের একাডেমিক জগতের ও হবু শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কোনটা? ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচার ও চোখে নামকরা, উঁচু প্রেস্টিজের বিশ্ববিদ্যালয় বলতে সম্ভবত সবাই বলবে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে জেএনইউ [JNU]।

    সেই জেএনইউতে গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যার অন্ধকারে রাস্তার আলো নিভিয়ে সব গেটে পুলিশি সহযোগিতায় পাহারা বসিয়ে কেবল বিজেপি সমর্থকদের লাঠিসোটা নিয়ে প্রবেশ ঘটানো হয়েছিল। এরপর তাদের দিয়ে হলে হলে ঢুকে বিরোধী শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতাদের নির্বিচারে হামলা করে পিটানো হয়েছে। আবার কয়েক ঘণ্টা পর হামলাকারীদের অবাধে জেএনইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করে, সব রাস্তার বাতি জ্বেলে দিয়ে সব গেট থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তিতে এসব হামলাকারীর কিছু ছবি মিডিয়াতে দেখা গেছে। তাতে হামলাকারী সবারই মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা দেখা ছিল। এই হামলায় ছাত্র সংসদের ভিপি ঐশী ঘোষ ও কয়েকজন শিক্ষকসহ প্রায় ৩০ জন গুরুতর আঘাতের শিকার হয়েছেন। আনন্দবাজার লিখেছে, ‘প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জন পড়ুয়াকে (পিজি) এমস-এ ভর্তি করা হয়েছে। অন্তত দু’জনের অবস্থা গুরুতর। শুধু হস্টেল নয়, ক্যাম্পাসে গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পাথর ছোড়া হয়। মেয়েদের হস্টেলে এসিড নিয়েও হামলার চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ” [গেরুয়া’ হামলায় রক্তাক্ত জেএনইউ]। “প্রতিবাদ করতে গিয়ে মার খেতে হয় জেএনইউয়ের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট’-এর অধ্যাপিকা সুচরিতা সেন-সহ একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে। সুচরিতাকে এমস-এ [AIIMS] ভর্তি করতে হয়েছে”। এখানে লক্ষণীয়, হামলাকারীরা এসিডও বহন করছিল আর তা নিয়ে হামলা হয়েছে।

    ইংরেজি ওয়েব মিডিয়া ‘দ্য স্ক্রল [THE SCROLL]’ চারটি প্রশ্ন তুলে এক আর্টিকেল লিখেছে। এক. ফুটপাথের আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছিল কেন? দুই. কেন গেটের পুলিশ বেছে কাউকে ঢুকতে দিয়েছিল, আর কাউকে দেয়নি? তিন. যারা আগ্রাসীভাবে ও সশস্ত্র হয়ে ঢুকছিল পুলিশ কেন তাদের আটক করে রাখেনি? চার. গেটেই সন্ত্রাসী গ্যাংটাকে পুলিশ কেন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি?

    বলা বাহুল্য, এই চার প্রশ্নেই সব জবাব ও পুলিশের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ আছে।

    তবে মূল কথা, মুখ ঢেকে মুখোশ পরে হামলা করলেও মিডিয়ায় বা সামাজিক স্তরে হামলাকারীরা আর ‘অজ্ঞাত’ নয়। মিডিয়াতেই এটা প্রতিষ্ঠিত যে হামলাকারীরা আরএসএসের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি (অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, ABVP), তাদের নেতৃত্বই এই হামলা হয়েছে। আনন্দবাজার লিখেছে, “বিকেল থেকেই ক্যাম্পাসে ভিড় জমতে শুরু করে। মুখোশধারী গুণ্ডারা প্রথমে সাবরমতী ধাবার বাইরে জড়ো হয়। পড়ুয়াদের অভিযোগ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপি নেতা-নেত্রীরা ভাড়াটে গুণ্ডাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে। রড, লাঠি, বাঁশ নিয়ে পড়ুয়াদের ওপর চড়াও হয় তারা। হস্টেলের আলো নিভিয়ে দিয়ে হামলার পাশাপাশি সাবরমতী, কাবেরী, পরিয়ার হস্টেলে ভাঙচুরও চলে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন”। ……”ভিতরে যখন হামলা চলছে, তখন গেটের বাইরে স্লোগান ওঠে ‘গোলি মারো শালো কো’, ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘জয় শ্রী রাম’ “।   এছাড়া আর এক রিপোর্টে লেখা হয়েছে, “বিরোধীদের অভিযোগ, মোদী-অমিতের তত্ত্বাবধানেই হামলাকারীরা বাইরে থেকে জেএনইউয়ে ঢুকেছিল। হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে বিজেপি ও সঙ্ঘের স্থানীয় নেতাদের চিহ্নিত করে নাম প্রকাশ করে দিয়েছে কংগ্রেস। প্রকাশ্যে আসা ভিডিয়োগুলো সঙ্ঘের অস্বস্তি বাড়িয়েছে”।

    জেএনইউ নিয়ে গর্ব বা একে নামকরা বলার পেছনে অনেক কারণ বা বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এর সাবেক ছাত্ররা ভারতের একাডেমিক বা কর্মজগতে বড় বড় জায়গা নিয়ে আছেন। আবার অনেক গরিব বা সামাজিক স্ট্যাটাসের বিচারে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীও এখানে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে থাকেন। মূলত মেধাবী হওয়ার কারণে এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে গড়ে নিতে পেরেছেন। বলা যায় চেপে বসা সামাজিক স্ট্যাটাস বা স্তরভেদ তারা উলটে দিয়েছেন তাতে, তিনি মুসলমান বা দলিত অথবা গরিব যাই হোন না কেন! এসব মিলিত কারণে জেএনইউতে সাবেক স্টুডেন্ট বা সাবেকি শব্দটাও বেশ গর্বের। কিন্তু সেটা এই হামলার ঘটনায় বিজেপির বিরুদ্ধে গেছে। হামলা চলাকালীন বা পরে বা দূরে থেকেও এই সাবেকরাই ঘটনার নিন্দা করে পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আর তাতে এমনকি মোদি সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নিজের সাবেকি পরিচয়ের গৌরব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে হামলার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়ে বসেন। এমনকি কেন্দ্র সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ হামলার নিন্দা করেন। যেটা অন্য অনেক মন্ত্রী আর সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছকাছি বা পক্ষের মতো শোনায় এমন বিবৃতি দিয়েও ভারসাম্য আনা সম্ভব হয়নি। হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ এমন প্রাক্তন স্টুডেন্টদের কিছু প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে একটা রিপোর্ট [মনোবল চুরমার করতেই কি হস্টেলে হামলা] এখানে আছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

    কেন  জেএনইউ’র বিরুদ্ধে অমিত শাহের এত রাগ ক্ষোভঃ
    সাধারণভাবে জেএনইউতে কমিউনিস্ট চিন্তা এখনো তুলনায় প্রভাবশালী ও ডমিনেটিং ধারা। সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি তার আমলে জেএনইউ স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (সংসদ) প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গত তিন সেশনে এখানে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কমিউনিস্ট। এমনিতেও শাসক-চিন্তা বা শাসক-বয়ান বিরোধিতা করে চলার এক ঐতিহ্য জেএনইউতে ছিলই। তবে এটা সম্ভব হয়েছে জেএনইউ “স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়” আইনে চলা ও শুরু থেকেই তা চর্চা করা হয়ে আসছে বলে। তাই এটা কমিউনিস্ট চিন্তা-চর্চারও এক সেন্টার হতে সুযোগ পেয়েছিল, এমনকি এর কমিউনিস্ট নকশালী অপর ধারাও। তবে এমন কমিউনিস্ট প্রভাব কেবল ছাত্রছাত্রীদের কারণে নয়, মূলত ফ্যাকাল্টি মেম্বাররাও অনেকে “প্রগতিশীল ও বামপন্থার” অনুসারী বলে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু গত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সারা দুনিয়াতেই ‘প্রগতিশীলতা’ বা ‘বামপন্থা’ সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তাধারা মনে করার এই ভ্যানিটি ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। ফলে দুনিয়াজুড়ে এই চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়ার শুরু এঘটনা থেকে। এছাড়াও পরে তা আবার আরেক বড় ধাক্কা খেয়েছিল। নতুন শতাব্দীতে ২০০১ সালের পর আল কায়েদা ফেনোমেনার কারণে গ্লোবাল নতুন মস্ত ইস্যু হাজির হয়ে যায় – ‘ইসলাম প্রশ্ন’। ‘ইসলাম ইস্যু’ এমন অজস্র গুরুত্বপূর্ণ ও সিরিয়াস প্রশ্ন তুলে এনেছিল যেমন ধরা যাক, স্পিরিচুয়ালিটি কী? শুধু তাই নয়, আরো দিক হল এই প্রশ্নের জবাব পাওয়াটা কী খুব এসেনসিয়াল মানে অনিবার্য প্রয়োজন? এসব গুরুতর প্রশ্নের জবাব কোনো প্রগতিশীলের কাছে তৈরি ছিল না। বরং এগুলো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন মনে করে তারা ফেলে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু সমসাময়িক প্রধান প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে না পারলে, তৈরি না থাকলে যেকোনো চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়তে বাধ্য। আসলে, শুধু তাই নয়, এক ধর্মবিদ্বেষ বিশেষত ইসলামবিদ্বেষ দিয়ে এই জবাবহীনতার খামতি ঢেকে রাখা হয়েছিল এতদিন। তবে অবশ্যই আবার ব্যাপারটা এমন নয় যে, প্রশ্নকর্তাদের কাছেও জবাবটা আছে বা ছিল। তাই সার-অবস্থাটা হল, যে বুঝতে বা আমল করতে চায় সে বুঝবে চিন্তা-জগতের বিরাট ঘাটতির গর্তটা কোথায় লুকিয়ে আছে! কারণ এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আসলে ঘাটতি লুকাতে চাইলে এই দুর্দশাকে ‘টেরর বা সন্ত্রাসীদের’ কারবার বলে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের কোলে উঠে পড়ার রাস্তা খোলা ছিল। তাই অনেকে সেকালের ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ বুশের কোলে উঠেও নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবি করছিল।

    আর যারা নিজেকেই ফিরে দেখা – মানে রিভিউ আর ক্রিটিক্যাল চোখ ফেলে মানে নিজেরই পর্যালোচক হয়ে নিজেকে ঢেলে সাজিয়ে নেয়ার সাহস রাখে তারা নিজেকে পুনর্গঠনের পথ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই পথে বাংলাদেশও যতটা এগিয়েছে ভারত এর ধারেকাছেও আসেনি। খুব সম্ভবত এর একটা কারণ ভারতের রুলিং বা শাসক শ্রেণীর বয়ান। নিজের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন কম্বিনেশন ও বিকাশের কারণে ভারতের একাডেমিক জগতও এখানে স্বাধীনভাবে না বরং শাসক-বয়ানের নিরিখে সমস্যাটাকে দেখেছিল। এই বড় গুরুত্বপুর্ণ দিকটা আমল না করে পাস কাটাতে চেয়েছিল। তাই নিজ চিন্তার খামতি নয় বরং ব্যাপারটাকে ‘টেররিজম’ হিসেবে দেখার বয়ান মেনে নিয়েছিল। তাই ‘ইসলাম প্রশ্ন’ ভারতের  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ কোনো একাডেমিক দুনিয়ায়, এখনো তেমন জবাব না জানা প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে – স্টাডি খোঁজাখুঁজি গবেষণা চলছে এমন জানা যায় না। যদিও ভারতের স্ট্রাটেজিক ইনস্টিটিউট অনেকগুলোই আছে যেখানে রাষ্ট্রের ডিফেন্সের চোখে ক্ষমতাকে রক্ষার আলাপ সেখানে চলে, তা দরকারিও হয়ত। কিন্তু নিজ চিন্তার দোষত্রুটি, নিজ ইসলামবিদ্বেষের বোঝা বা নিজ চিন্তায় ঘাটতি বুঝার বিষয়টা সেখানে ইস্যু হওয়ার সুযোগ পায় নাই। তা না হওয়ারই কথা, অবশ্য। এক কথায় এসবের মিলিত কারণে ভারতের একাডেমিক ভ্যানিটি এখনো প্রগতিশীল ও বামপন্থার অনুসারী হয়েই আটকে আছে। তবু ভারতের অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন প্রগতিশীলতা ও বামপন্থার প্রভাব দেখা যায়- জেএনইউ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। তবে জেএনইউ তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী।

    কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের চোখে, তাদের হিন্দুত্ববাদের চোখে তাকে বধ করতে, তার বয়ান ফুটো করে দিতে, তাকে প্রভাবহীন করতে প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলার এখনো ক্ষমতা রাখে ও পারে এই প্রগতিশীল ও বামপন্থার বয়ান। তাই বয়ানের সক্ষমতা এ’প্রসঙ্গে বিজেপি তাকে চ্যালেঞ্জ করা প্রতিপক্ষ হিসাবে কংগ্রেসের চেয়েও কমিউনিস্টদের প্রধান শত্রু মনে করে। এর অবশ্য অন্য একটা বড় কারণ আছে। বিষয়টা ভোট বাক্সের, বয়ানের তত নয়।

    ভারতের প্রধান ধারার সব রাজনৈতিক দলই একটা পর্যায় পর্যন্ত কমবেশি মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী। তা চিনার উপায় হল, যারা-ই ‘জাতি’ ধারণাটা অনিবার্য ভেবে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে গ্রহণ করেছে মানে রাজনীতিকে রাষ্ট্র-নাগরিক-অধিকার এই ফ্রেমে না ভাবতে পারে না। বুঝে না বা বুঝতে চায় না বা বুঝেনি, বরং  ব্যাপারটাকে রাষ্ট্র নয় “জাতি” হিসেবে বুঝেছে। যেমন ভারতীয় “জাতি” বা হিন্দু “জাতি”  হিসেবে- এমন এরা সবাই এই দলের এই ধারার। যে অর্থে কমিউনিস্টরাও জাতীয়তাবাদকে সহযোগী মনে করে ও পাশে রেখেই হাঁটে। তুলনায় কংগ্রেস মূলত হিন্দুইজমের জাতি-বাদী রাজনীতির ধারক এবং আগের তুলনায় কম প্রকাশ্য এই অবস্থান একালে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের সাথে মোকাবিলা করতে  গিয়ে রাহুল গান্ধী হিন্দু ভোট হারাবার ভয়ে বিজেপিকে “হিন্দুত্ববাদকে সমালোচনা করতে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। বরং নিজেই নিজেকে “সফট হিন্দুত্ববাদী” বলে লেভেল দেয়। এর বিপরীতে কেউ হিন্দু বলে কমিউনিস্টদের ভোট দেবে তা অবশ্য কমিউনিস্টদের মনে আশা নাই বলে তাদের পরোয়াও নাই। এ কারণে বিজেপির হিন্দুত্বের সমালোচনায় কমিউনিস্টরা তুলনায় অন্তত কংগ্রেসের চেয়ে এগিয়ে ও বেপরোয়া। এ কারণেই কমিউনিস্ট প্রভাব অমিত শাহের বিশেষভাবে চক্ষুশূল। এ জন্যই কমিউনিস্টদের “টুকরে টুকরে গ্যাং” বলে নাম দিয়ে তুচ্ছ করা শুরু করেছেন অমিত শাহ্। বিজেপির চোখে ‘হিন্দু-জাতির’ জন্য ‘দেশপ্রেম’ একটা আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য আর যাদের তা নেই তারা দেশদ্রোহী- এই বিচারে কমিউনিস্টরা নাকি “দেশদ্রোহী”। মুখ ঢেকে অন্ধকারে হামলার সময় তাই বিজেপি কর্মীদের স্লোগান ছিল- এই “দেশদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে। এই প্রতিহিংসা এটা নাকি তাদের আসলে ‘মরাল-শক্তি’ যোগানদার উৎস।

    অমিত শাহের দৃঢ়বিশ্বাস ভারতে মোদী-অমিতের যে বাধাহীন তাণ্ডব বা প্রভাব বাড়ছিল তা হঠাৎ নাগরিকত্ব ইস্যুতে পা-হড়কে পড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ এই কমিউনিস্টরা, অন্যেরা ততটা না। সংখ্যায় এরা কিছুই না কিন্তু ‘এরা গ্যাং’। বিরাট উসকানিদাতা, যা হিন্দুত্ববাদের সুড়সুড়ি বা বিজেপির তৈরি পোলারাইজেশন উল্টে দিতে পারে। অতএব, এদের দৈহিকভাবে হামলা করো, ভয় দেখাও, যেভাবে পারো দমাও।

    অমিত শাহের এই হিসাবটাও ভুল। বর্তমানে নাগরিকত্ব ইস্যুতে বিজেপিবিরোধী এই আন্দোলনের আসলে এখন পর্যন্ত মূল শক্তি ঠিক কমিউনিস্টরা নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরা যাদের মধ্যে কমিউনিস্টরাও আছে অবশ্য। একজন মানুষ কেবল মুসলমান বলে তাকে অধিকারবঞ্চিত করতে হবে, আর এর দায় বিজেপি ঐ শিক্ষার্থীদেরও নিতে ও সমর্থন করতে বলবে – এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে শিক্ষার্থী তরুণদের কাছে।  বিজেপির এই ঘৃণার মূল্যবোধ তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম (নর্থ-ইস্ট) বাদে (এদুটো স্ব স্ব সমাজের মেজরিটি অংশ বলে ফোরফ্রন্টে) বাকি রাজ্যে এবারের আন্দোলনের মূল শক্তি কিন্তু এই তরুণ শিক্ষার্থীরাই। সম্ভবত এটা বলা সেফ হবে যে, গত প্রায় ছয় বছর মোদী-অমিতেরা মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলানোর বল প্রয়োগ বা লিঞ্চিং-এর হুজুগে যে তরুণদের সংগঠিত করেছিল তারা আলাদা, তারা অন্য সেটের তরুণ। লিঞ্চিংয়ের তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় সমাজের কম শিক্ষিত ও কম শহুরে অংশের। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীরা এখনো কম শিক্ষিত ও কম শহুরে তরুণদের রিপ্লেস করে নিজের ডমিনেটিং জায়গা ধরে রাখতে পারছে, লিঞ্চিংয়ের তরুণদের মাঠছাড়া করে রাখতে পারছে।

    তবে কম শিক্ষিত ও কম শহুরে আগের তরুণদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের সমর্থক ও পাশে এসে দাঁড়ানোর মত জনগোষ্ঠী সমাজে সংখ্যাগরিস্ট মনে হচ্ছে। যেমন এমন জনগোষ্ঠির মধ্যে সমাজের মুসলমানরা তো আছেই সেই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে যারা বিজেপিবিরোধী এমন সবাই এদের সাথে শামিল হয়েছে।

    কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যুতে যারা মোদী-অমিতের সরকারের বিরোধী, যারা প্রতিবাদের সংগঠক বা পালটা বয়ানদাতা তারা সবাই-ই কমিউনিস্ট এমন ধারণা সত্য নয়। তবে মূল গোষ্ঠিটা যারা – সাধারণভাবে বললে এরা “আধুনিক মনের ফ্রিডম”’ পছন্দের তরুণ বলা যায়। যাদের সাথে বিজেপির মূল্যবোধের ফারাক বা গ্যাপ অনেক বড়।

    তবে কেউ শাসক হিসেবে সামনে গণপ্রতিরোধ দেখলে তাদের পিটিয়ে, ভয় দেখিয়ে ঠাণ্ডা করতে হবে – এই চিন্তা, এটা হিটলারি চিন্তা চর্চা করার পথ। এতে মনের প্রতিহিংসা কিছু মিটে বা কমে হয়ত, এছাড়া আরও কোন লাভ নাই লাভ হয়নি কোনদিন, লাভ হয় না। তাই নিরাপদেই বলা যায়, বিজেপির মুল্যবোধ আসলে প্রতিহিংসা মাখানো মানে প্রতিহিংসা-সম্পন্ন। বিজেপির ভবিষ্যত আটকে আছে অন্তত এখানেই।  কিন্তু আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি একারণে বিজেপি এখন জবরদস্তি মানে বল্প্রয়োগের রাস্তা ধরার সম্ভাবনা বাড়বে। তাহলে সব মিলিয়ে অমিত শাহের চোখে এসব কিসের ইঙ্গিত?

    পরিকল্পিত দাঙ্গা করে সেখান থেকে নিজেই নিজের লক্ষ্য বের করে আনাতে অমিত শাহ্ নিজেকে সিদ্ধহস্ত মনে করেন। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলমান মেরে হাত পাকিয়ে তার এই গভীর আস্থা অর্জনের শুরু। সেই অমিত শাহ্ এখন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর ওদিকে জেএনইউ দিল্লির কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্তর্গত। অর্থাৎ জেএনইউ দিল্লির রাজ্য সরকারের এখতিয়ারের এলাকা নয়। এই সুযোগ নিয়ে অমিত শাহ্ দিল্লির পুলিশ কমিশনার অমূল্য পট্টনায়কের অধীনে জেএনইউয়ের তাণ্ডব ঘটিয়েছেন। ক্যাম্পাসে এবিভিপিকে ঢুকিয়ে গুণ্ডামি করে আবার তাদের সেফ এক্সিটের ব্যবস্থাও করে দিয়ে পুলিশ ফিরে গেছে। কিন্তু তবু অমিত শাহ্ এখানে পরাজিত। এখনও জেএনইউয়ে ছাত্র-শিক্ষক পেটানো নিয়ে টুঁ শব্দ করেন নাই প্রধানমন্ত্রী মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত। তবুওও তারা পরাজিত এবং এই হামলার কিছুই লুকানো থাকবে না। কেন?

    কারণ ইতোমধ্যেই পরের দিন মানে সাত জানুয়ারির এক টিভি টকশোতেই সব ফাঁস হয়ে যায়। ভারতের টকশো বাংলাদেশের টকশোর মতো নয়, ভয়ের কোন খাঁড়া ঘাড়ের ওপর ঝুলছে- ঠিক এ রকম নয়, তুলনামূলক অর্থে স্বাধীন। আর ভাল টকশো মানে ভার টিআরপি- এটা প্রতিযোগিতামূলক টিভি-মিডিয়ার ভারতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

    ঐ কথিত টকশোতে, এক টিভি চ্যানেলে বিজেপির পক্ষ থেকে ছিলেন এবিভিপির দিল্লি শাখার এক যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর। টকশোতে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে চাপ সামলাতে না পেরে একপর্যায়ে ওই মুখোশ-হামলার পক্ষে সাফাই দিতে গিয়ে তিনি সব স্বীকার করে ফেলেন। তিনি বলেন, “সেদিন এমনই ‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি হয় যে, ‘আত্মরক্ষায়’ রড, লাঠি এমনকি এসিড সাথে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। নির্দেশও তেমনই ছিল-” এটা আনন্দবাজার লিখেছে। আরো লিখেছে, “অনিমার দাবি, বামপন্থী পড়ুয়াদের ‘লাগাতার আক্রমণের’ মুখে এবিভিপির সদস্য ও নেতারা এত ‘ভীত-সন্ত্রস্ত্র’ ছিলেন যে, ঘর থেকে বাইরে বেরোলে সাথে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম রাখতে বলা হয়েছিল প্রত্যেককে। লাঠি, রড, গোলমরিচ গুঁড়ার স্প্রে, এসিড – যে যা হাতে পেয়েছেন, তা-ই সাথে নিয়ে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি। টিভি চ্যানেলে তিনি এ-ও মেনে নিয়েছেন যে, বিকাশ এবিভিপির কর্মী [যাকে বিভিন্ন মিডিয়ায় ছবিতে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল।] বেফাঁস বলছেন বুঝতে পেরেই অবশ্য বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাঠি হাতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনিই বিকাশ কি না, তা নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বলেন, ‘কোনো হস্টেলে এসিড আক্রমণের ঘটনাও তার জানা নেই”।

    এক কথায় বললে, অমিত শাহ্ এখন পুরা ধরা খেয়েছেন। সব কিছুই এখন ওপেন সিক্রেট। ঘটনা এখন আদালত পর্যন্ত যদি যায় বা যখন যাবে তাতে পুলিশ অফিসারসহ অনেকেই নিজেকে শাস্তি বা চাকরিচ্যুতি থেকে বাঁচাতে পারবেন মনে হয় না। তাতে পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট এখন অমিত শাহ্ যেভাবেই লেখান না কেন!

    তাহলে এখন অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেবেন? এটা বলাই বাহুল্য, মুখোশ পরে এমন বেধড়ক মারের দেয়ার উদ্যোক্তা অমিত শাহকে সামনে আরও অনেকবার করতে হবে, বুঝাই যাচ্ছে। এছাড়া তার পক্ষে আরো চার বছর ক্ষমতায় থাকা মুশকিল হবে। তাহলে উপায়?

    একটাই সহজ উপায় আছে। আর অমিত শাহ্ ধীরে ধীরে তাই গ্রহণ করতে যাচ্ছেন সম্ভবত!
    সেটা হল – জরুরি আইনকরে দেওয়ার ‘ঘোষণা দেয়া। না, ভারতে জরুরি আইন কোন অপ্রচলিত বা নতুন তা নয়। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের জুনে এর নমুনা রেখে গিয়েছেন। জরুরি আইন মানে এতে বিরাট সুবিধা হল, সমস্ত “নাগরিক মানবিক অধিকার” স্থগিত করে রেখে দিতে পারে রাষ্ট্র ও সরকার। তাতে মিডিয়াসহ বহু কিছুই এখানে নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া যায়। যেমন, মিডিয়ায় টকশো চালু রেখে জেএনইউ’র মত মুখোশ-হামলা ঘটনা চালাতে যাওয়াতেই তো সব সমস্যা, অমিতের বিরাট ভুল হয়েছে।   আগেই যদি জরুরি আইন জারি কথা থাকত তাহলে মিডিয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখা যেত। কাজেই যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকরকে টিভি টকশোতে জবাবদীহীতা করতে আসতে হত না।  কাজেই জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ করতে চাইলে ‘জরুরি আইন’ জারি করে নেয়ার চেয়ে ভালো বিকল্প নেই। যেমন এছাড়া এবার সবই তো ঠিক ছিল কিন্তু যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর টকশোতে কথা বলতে গিয়েই সব কেঁচে গিয়েছে। কাজেই এই টকশোটা বন্ধ থাকলে এসবের ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগই থাকত না। তাহলে নিশ্চয় অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাখবেন।
    অতএব মোদী-অমিত কী এখন জরুরি আইন ঘোষণার গন্তব্যের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “ মোদি-অমিত কি জরুরি আইনের দিকে?” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    গৌতম দাস

    ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Qz

    _

    চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

    বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

    কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

    আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

    এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

    বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

    এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
    তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

    দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

    না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

    নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

    নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

    এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

    কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

    নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

    ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

    শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

    মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

    তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

    আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

    গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

    আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

    তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

    স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

    তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

    মোদী-অমিতের হারের চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে

    গৌতম দাস

    ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2PW

    Modi-Amit from swarajyamag.com

    অনেক হয়েছে। এই অঞ্চলকে অনেকদূর বেপথে নিয়েছেন। এবার মোদী-অমিত, আপনাদের হার শুরু। আপনাদের হারের  চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠতে শুরু করেছে! আপনি পেছন ফিরে পালাতে চাচ্ছেন, নরেন্দ্র মোদী! মোদি-অমিতের সেই পিছু হটে পালানোর চিহ্ন চারদিকে ফুটে উঠছে, মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেয়া শুরু করেছে। আপনারা হার মানছেন এমন সব চিহ্ন ফুটে উঠছে। বুঝব কিভাবে?

    চিহ্ন একঃ মোদী-অমিতের সরকার এবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসে.) সকালে অনেকগুলো উর্দু ও হিন্দি পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপানো হয়েছে – শিরোনামে “গুজব ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে” (“rumours and incorrect information being spread”.) । কিন্তু কোনটা গুজব আর অসত্য? বলতে পারছে না।  দাবি করছে যে, ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে – এমন কোন সরকারি ঘোষণা নাকি এখনও দেয়া হয়নি।  এই ডিটেইলটা ছাপা হয়েছে  ভারতের ইংরাজি ওয়েব পত্রিকা scroll.in. লিখেছে, [On Thursday morning, the Modi government put out advertisements in multiple Hindi and Urdu papers alerting people about “rumours and incorrect information being spread”.]

    এতে মিডিয়াজুড়ে তোলপাড়ে প্রায় প্রত্যেক মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে, আগে কবে কোথায় অমিত শাহ ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করা হবে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন সেসবের রেফারেন্স প্রমাণ তুলে এনে রিপোর্ট ছাপানো শুরু হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বরাত দেয়া হয়েছে অমিত শাহের নিজের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে করা টুইটকে। সেখানে বলা হয়েছিল, “ভারতজুড়ে এনআরসি আমরা নিশ্চিত করব”।
    এরপরও ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আবার অমিত শাহরা আরও বড় করে নিজেদের বেইজ্জতি ডেকে আনতে তাঁরা এবার সেই পুরান ১১ এপ্রিলের টুইটই মুছে ফেলেছে। আসলে বিরাট এক কেলেঙ্কারির অবস্থায় এখন বিজেপি। আনন্দবাজার থেকে টুকে আনা সেই টুইটটা [নিচে স্কান কপি দেখেন] ছিল এরকমঃ “We will ensure implementation of NRC in the entire country. We will remove every single infiltrator from the country, except Buddha, Hindu and Sikhs: @Amitshah #NaMoForNewIndia

    চিহ্ন দুইঃ মমতার তৃণমূল কংগ্রেস দলের হয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের নেতা হিসাবে সংসদে দলের স্বার্থে লিড ভুমিকা নেন আর ইস্যুগুলো দেখাশোনা করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক ও ব্রায়েন। তিনি টুইট করে লিখেছেন, “বিজেপির আইটি সেল টুইট মুছে দিতেই পারে। কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সব রাজ্যে এনআরসি হবেই। তা মুছতে পারবে না ওরা”। কথা সত্য, সংসদের রেকর্ড মুছবার ক্ষমতা কোনো একটা দলের নেই।

    উপরের এই টুইট-টাই এখন মুছে দেয়া হয়েছে যা ছিল গত ১১ এপ্রিলে লেখা।   আর প্রায় কাছাকাছি একই ভাষ্যের ২২ এপ্রিল লেখা অমিতের আর এক টুইট  এর কপি বরাত দিয়ে  স্ক্রোল [scroll.in] পত্রিকা দেখাচ্ছে সেখানেও অমিত শাহ সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করার কথা বলছেন। যেমন নিচে  দেখেন তা হল,
    First, we will bring Citizenship Amendment Bill and will give citizenship to the Hindu, Buddhist, Sikh, Jain and Christian refugees, the religious minorities from the neighboring nations.
    Then, we will implement NRC to flush out the infiltrators from our country.

    এছাড়া গত অক্টোবরের ১ তারিখে কলকাতায় বক্তৃতা দিতে এসে অমিত শাহ বলেছিলেন, সারা ভারতে এনআরসি করে খুঁজে খুঁজে কিভাবে তেলাপোকা উইপোকা অনুপ্রবেশকারী (মুসলমান) মেরে তিনি  তাড়িয়ে দিবেন। সেই বর্ণনা দিয়ে ভোটার উত্তেজিত করার সহজ পথ নিয়েছিলেন। আজ মিডিয়াগুলো সেই রেফারেন্সটাই বের করে সরকারকে আরও বেইজ্জতি করেছে।

    তাহলে এত জায়গায় রেফারেন্স থাকা সত্ত্বেও এবং এমন রেফারেন্স যা লুকানো বা মুছে ফেললেও, তা জানাজানি হয়ে যাবে – এসব জানা সত্ত্বেও মোদী-অমিতের সরকার এমন মিথ্যা কথা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বলতে গেল কেন?

    এর সোজা মানে হলে মোদী-অমিতেরা এমন বিপদের জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাদের হাতে কিছুই নাই। তাই “যদি লাইগা যায়” ধরণের কামকাজ শুরু করেছে – এমনই দশা।  খড় কুটো আঁকড়ে ধরছে।  বিশেষ করে এনআরসির সাথে নাগরিক বিলের কোন সম্পর্ক নাই একথা যদি পাবলিককে বিশ্বাস করাতে পারে আর তাতে যদি একথা মেনে নিয়ে রাস্তার আন্দোলন কিছু থিতু হয় এই হল অমিতদের শেষ আশা।
    অর্থাৎ পাবলিক ঠান্ডা করার এর চেয়ে ভাল ও আস্থাবাচক কোনো বক্তব্য-হাতিয়ার বিজেপির কাছে নেই। আর এটাই মোদী-অমিতের হেরে যাবার সবচেয়ে বড় চিহ্ন। মোদি-অমিত এতই ফেঁসে গেছেন যে, এর চেয়ে ভাল বা বেশি বিশ্বাসযোগ্য বক্তব্য তাদের হাতে নেই। এ ছাড়া সরাসরি মিথ্যা বলা বা প্রপাগান্ডা করে সদর্পে মিথ্যা বলার দিকে বিজেপির ঝোঁক আগেও ছিল আমরা দেখেছি। তারা মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে অনেকদূর যাওয়া যায়, কেবল পাক্কা ব্যবহারকারি হতে হয়। যেমন সেই অর্থে ভারতের মুসলমানেরা বিজেপির আসলে কোনো শত্রু না, তা তারা জানে। বরং অ্যাসেট। কিভাবে? কারণ মুসলমানদের নামে ঘৃণা ছড়িয়েই তো কেবল হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে ঢুকাতে পারে! মুসলমানেরা না থাকলে সে কার ভয় দেখাত বা কার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াত। আর এটাই তো বিজেপির রাজনীতির কৌশল।

    বোকা অমিতের স্ববিরোধী দাবি
    সবাই জানি বিজেপির চোখে আমরা মুসলমানেরা সব উইপোকা তেলাপোকা, তুচ্ছকিট; তাই সারা ভারত জুড়ে এনআরসি করে মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দিবে। বিশেষ করে কেন তাড়িয়ে দিবে? কারণ নাকি মুসলমানেরা স্থানীয়দের কাজ বা চাকরি সুযোগ নিয়ে নিচ্ছি। তা ভাল, কী আর বলা। এনআরসির সপক্ষে আপাত চোখে যুক্তির বিচারে সবচেয়ে ভাল যুক্তির বক্তব্য মনে হয় এটাই।
    কিন্তু অমিত শাহ আপনার কপাল খারাপ। কারণ আপনার দিল সাফ নাই। অনৈতিক ও অসততার উপর দাঁড়ানো আপনার কথা। তাই আজ না হলে কাল আপনি ধরা পড়ে যাবেন। এবং গেলেন। কীভাবে?
    আপনি এখন বলছেন বাংলাদেশসহ আরও তিন দেশ থেকে মূলত হিন্দুদের নিয়ে এসে আপনি ভারতের নাগরিকত্ব দিবেন এজন্য নতুন বিল এনেছেন। যদিও ঐ তিন দেশ থেকে কোন মুসলমান আসলে এই সুবিধা আপনি তাদের দিবেন না। মুসলমানবিদ্বেষী আপনি আমরা জানি তাই এনিয়ে এখানে কোন কথাই তুললাম না।
    কিন্তু লক্ষ্য করেন আপনাদের দাবি হল কেউ মুসলমান হলেই সে ভারতের বাইরের লোক, আর এবার দাবি করতে থাকা যে এরা ভারতের বাসিন্দাদের চাকরি বা কাজ নিয়ে নিচ্ছে বলে আপনারা এনআরসি করছেন তাদের তেলাপোকার মত তাদের ভাগাবেন বলে তোলপাড় করে তুলছেন। তাহলে আবার বাংলাদেশসহ তিন দেশ থেকে সেখানকার হিন্দুদের নিতে চাইছেন কেন? হিন্দুরা কী ভারতে গিয়ে মূলত হিন্দুদের কাজ চাকরিতে ভাগ বসাবে না? তাহলে এনআরসিতে লোক খেদানো আবার নাগরিকত্ব বিলে লোক আমদানি এদুইয়ের রহস্য কী বা এই স্ববিরোধীতা কেন? তাহলে অন্তুত এতটুকু সৎ হয়ে বলেন যে “বিদেশিরা কাজ-চাকরি নিয়ে নিচ্ছে” একথা সত্য না। সত্যিই, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক মাহাত্ব সাংঘাতিক!

    আসলে এখনকার ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপির ভিতরের মূল্যায়ন হল, একটু কৌশলে ভুল হয়ে গেছে, সেটা সংশোধন করে নিতে পারলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ভুলটা হল, সারা ভারতে এনআরসি করার কথা আগে না বলে আগে কেবল নাগরিকত্ব সংশোধিত বিল পাস করে নিতে হত, বিজেপিকে। এতে মুসলমান বাদে সব ধর্মের বললেও মূলত অন্যদেশের হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে নিলে এরপরেই কেবল সারা ভারতে এনআরসি করার কথা তুলতে হত। তাহলে আজ যেভাবে ভারতের শহরের পর শহর নাগরিকত্ব বিল নিয়ে উত্থাল হয়ে উঠছে সব উপড়ে ফেলতে শুরু করেছে, সেটা নাকি হত না। এই হল তাদের মুল্যায়ন। কিন্তু  এটা অবশ্যই তাদের মন-সান্ত্বনা!
    বাস্তবতা অনেক গভীরে চলে গেছে, যার খবর আর বিজেপি নিতে পারবে না। কেন? ভারতের সাধারণ মানুষই বা মোদী-অমিতের উপর এত খেপে গেল কেন?

    সমাজতন্ত্র নিয়ে আমরা জানি অথবা আমাদের অনেক প্রত্যক্ষ আছে। এর গালগল্প শুনিয়ে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বিশেষ করে একেবারে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ হয়েছিল এর সবচেয়ে ভুক্তভোগী, কষ্টভোগী এবং ভিকটিমও বলা চলে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে বললে, উনিশশ ষাট সালের মধ্যেই যাদের জন্ম বা চুয়াত্তর সালের মধ্যেই যাদের টিনএজে প্রবেশ ঘটেছিল এদের সরাসরি সচেতন অভিজ্ঞতা আছে কিছু শব্দের যেমন রেশন, টিসিবি, আর কিছু স্মৃতি – ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের হাহাকার। এক পিস সাধারণ লাইফবয়  সাবান কিনতে পারার জন্য কয়েক ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। আর তাতে রেশন, লাইনে দাঁড়ানো আর সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল প্রায় সমার্থক শব্দ। আর মানুষের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়ে তাকে হতাশ করে ফেলার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর হয় না।  মানুষ ভাত জোগাড়ের চেষ্টা করবে না লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে? জীবনের উদ্দেশ্যই বা আসলে কী? কোন কিছুর সদুত্তর কারও জানা ছিল না।
    সৌভাগ্যবশত মোটামুটি পঁয়ষট্টি সালের পরে যাদের জন্ম এরা টিনএজে এসে এদের আর রেশন, লাইন দেখতে হয়নি। জিয়ার আমল প্রায় শেষ করে এসে এটা আস্তে আস্তে এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। এতে অন্তত  রাষ্ট্র  পরিচালনাকারি সরকার আর সাথে গরিব জনগণও সবারই বুঝাবুঝিতে আক্কেল হয়ে যায় যে রেশন-সমাজতন্ত্রে দেশ চালানো কী জিনিস! আর একালে এসে ট্রাকে করে চালবিক্রির চাল কেনাতে মানুষ উৎসাহী হয় তখনই যখন এতে যে পরিমাণ পয়সা বাঁচে তা অতিরিক্ত সময় ব্যায়ের তুলনায় লাভজনক বিবেচিত হয়, কেবল তখন। আসলে সেকালে পরিবারে বাড়তি সদস্য থাকত যাদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে অফুরন্ত সময়ও সম্ভবত থাকত ফলে পোষাত; কিন্তু এমন দিন আর এখন সমাজের ভিতরেই তেমন নেই। কিন্তু লক্ষ করা গেছে যে, কোনকালের নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই কষ্টের দিকটা আমল করেছেন, গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছেন – না, কোনোকালেই এমনটা দেখা যায় নাই।
    বরং দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে ভারতের মোদীর সরকার সবচেয়ে গোঁয়াড় আর দানব। একালে এই ২০১৬ সালে নোট বাতিলের ঘটনাটাকেই দেখেন। এই নোট বাতিলকে কেন্দ্র করে মোদী মানুষকে বাধ্য করেছিল – কাজকাম ধান্ধা ফেলে সকলে ছুটেছিল নোট বদলাবার জন্য ব্যাংকে লাইন ধরতে। মানুষের মুল ওয়ার্কিং আওয়ার নষ্ট করে দেয়া মানেই গরীব মানুষের সরাসরি আয়-ইনকামে ক্ষতি করে দেয়া। অথচ এই ক্ষতিটাই অবলীলায় করা হয়েছে। বিশেষ করে গরিব-মেহনতি মানুষের যে আয়ে ক্ষতি এর কোনোই ক্ষতিপূরণ নিয়ে কারও কোন বিকার নাই – ব্যাপারটা মোদী বা তাঁর নীতিনির্ধারকদের আমলেই নেই। অথচ কথাটা হল, সরকার যা দিতে পারে না, মুরোদ নেই, তা সরকার অন্তত কেড়েও নিতে পারে না। যোগ্যতা থাকতে পারে না। চাকরি বা আয়ের সুযোগ দেয়ার কথা সরকারের। তা না দিতে পারলে অন্তত আয়ের সুযোগ কেড়ে নেয়া সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাজ হতে পারে না। অথচ মোদীর সরকার-প্রশাসন এদিকটা আমল না করেই, কোন বিকল্প বা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা না করেই  নোট বাতিলের পথে গেছিল।
    আর ঠিক একই সেই জিনিস ঘটিয়েছে  আসামের প্রশাসন ও মোদী । এনআরসির নামে দীর্ঘ ছয় বছর (২০১৩-১৯) ধরে মানুষকে প্রায়শই তাদের জীবন লাইনে দাঁড় করিয়ে পার করেছে। এখনও যা শেষ হয় নাই, সমাধান নাই। আর এর চেয়েও বেশি কষ্টকর অমানবিক অবস্থায় ফেলেছে ডকুমেন্ট জোগাড়ের ছোটাছুটি আর মানসিক অনিশ্চয়তা – যদি তালিকায় নাম না উঠে? একে তো গরিব মানুষ ভাত জোগাড়ে সব সময় হিমশিম খায়, সেখানে তাঁদের কোনমতে বেচে থাকা জীবনে এর চেয়েও প্রধান শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তালিকায় নাম ঊঠানো বা, নাগরিকত্ব হাসিল করা!  ভাতের অভাবের চেয়ে এ’এক কঠিনতর শাস্তি! অথচ যে এই শাস্তির আয়োজক সে একেবারেই নির্বিকার!

    সারকথাটা হল, এনআরসির বেলাতেও এরা গরিব মেহনতিদের কষ্ট  – দিনভর লাইনে দাঁড়ানো, অনিশ্চয়তা, ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ভয় ও শঙ্কা, আয়-ইনকাম বন্ধ ইত্যাদি কোন কিছুর দিকটাই নীতিনির্ধারকরা আমল করেনি। বরং বিজেপির ভোটের বাক্সে হিন্দুভোট পোলারাইজেশন ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য। তাই নির্বিকার লক্ষ্য।

    তাহলে কেন এবার সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বিলের পক্ষে থাকবে? কেন এর ভেতর দিয়ে প্রতিবাদের সুযোগ পেলে সেটাকে প্রবলে সে কাজে লাগাবে না? মোদী-অমিত তাঁদের সীমাহীন কষ্টের দিকটা দেখেননি, দলের স্বার্থ আর ভোট ও ক্ষমতার লালসায়  সবকিছুকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে গেছে।  আজকে পাবলিক মোদী-অমিতকে উপেক্ষা করার একটু সুযোগ দেখেছে। সেটা তুলে নিয়ে কাজে লাগাবে না কেন? এটাই তো সব দানব সিদ্ধান্তগুলো উপড়ে ফেলার ভাল সুযোগ!
    আবার এতদিন সবকিছুতে সর্বক্ষণ হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা হয়েছে। সেটা গরীব মানুষকে ভাল না লাগলেও খারাপ লাগেনি হয়ত, তাই পাশ কাটিয়ে থাকা শ্রেয় ভেবেছে। হয়ত ভেবেছে এটা আমার কী, এটা কেবল মুসলমানের সমস্যা হয়ত। কিন্তু এবার আসামের এনআরসিতে? এবার এতদিনে সকলেই বুঝে গেছে ব্যাপারটা স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে আরামে বসে বসে কেবল মুসলমানের কষ্ট দেখার ব্যাপার নয়। বরং ব্যাপারটা সবারই। ডকুমেন্ট, আধার কার্ড [AADHAAR card, আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সমতুল্য] ইত্যাদি জোগাড়ের অসম্ভব ছোটাছুটির অনিশ্চয়তা। আবার ভারতের আধার কার্ড মানে এই ন্যাশনাল আইডি দেয়া ও দেখাশুনা করা হয় তাদের পোস্ট-অফিসগুলো থেকে। ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব বা এনআরসির ক্যাচালে সবাই ছুটছে পোস্ট-অফিসে অথচ, পোস্ট অফিসে সেজন্য মোদী-অমিতেরা স্টাফ বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করেনি, হয়নি। হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে বিজেপি নিজের বাক্সে আনার কাজের বাইরে অন্য কোন দিকে মনোযোগ দিবার সময় কই তাদের? এনিয়ে আনন্দবাজার একটা ভাল বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন এখানে। লিখেছে, প্রায় সকলেই জানিয়েছেন, এনআরসি-র ভয়েই আধার কার্ড ঠিক করার জন্য লোকজন মরিয়া। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কারও তারিখ দু-তিন মাস পরে, কারও আবার বছরখানেক পরে। অর্থাৎ অমিত শাহের নিজনিজ ভোটের বাক্সের স্বার্থে মানুষকে সীমাহীন কষ্ট ও ভোগান্তিতে ফেলছে অথচ স্টাফ বাড়ানো, কাজটা সহজ করতে বাড়তি স্টাফ দেয়ার আগ্রহ তাদের নেই। ব্যাপারটা তাঁদের মনোযোগের ভিতরেই আসে নাই। তাহলে কেন সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেলে তা উপড়ে ফেলে দিতে চাইবে না? এছাড়া এতদিতে তাঁরা বুঝে গেছে বিজেপির হিন্দুত্ব জিনিষটা এত মিঠা না!

    সার কথায় বললে, পাবলিক পারসেপশন এখন আগের তুলনায় পরিপক্ব রূপ নিয়েছে মনে হচ্ছে।  একারণে, হিন্দুত্বের রুস্তমিতে হিন্দুগিরি বা হিন্দু-সুরসুরি তুললেই তা আর সমাজে তেমন কাজ করছে না সম্ভবত, ঢিলা দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থের দেনাপাওনার চোখ দিয়ে নাগরিকত্ব বা এনআরসি ইস্যুতে সরাসরি নিজের লাভক্ষতি দিতে বুঝতে চাচ্ছে মানুষ; বিশেষ করে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ।  আর এর সাথে এসে যোগ দিয়েছে  স্টুডেন্ট আর সাধারণ মানুষ। তাই তাঁরা নাগরিকত্ব বা এনআরসি বিরোধিতার সুযোগ পেয়ে পুরা ষোল আনা কাজে লাগাচ্ছে, বলে মনে হচ্ছে। জীবন এমনিতেই প্রচন্ড ভারী, সেই ভারকে আর বাড়তি ভারী না করে নাগরিকত্ব বা এনআরসি থেকে মুক্ত করতে চাইছে সবাই!

    অতএব প্রশ্নটা এনআরসির বাস্তবায়ন এটা মোদী-অমিতেরা  হিন্দুত্বের ক্ষমতার লালসায় নাগরিকত্ব বিলের আগে না পরে হবে সেটা তাদের কাছে এখানে কোনো ইস্যুই নয়। পাবলিক পারসেপশনের লেবেলে এর কোনো ফারাক নেই। বিজেপি সম্ভবত মুখরক্ষার জন্য এমন “সারা ভারতে এনআরসি বিজেপি চায়নি” বলে ক্ষিপ্ত পাবলিকের মনোযোগ সরানোর অজুহাত খুঁজছে। কিন্তু বিজেপির মুল সমস্যা হল মোদী-অমিতের উপর পাবলিক বিলা হয়ে গেছে। আস্থা হারিয়ে গেছে বা বিশ্বাস তুলে নিয়েছে মনে হচ্ছে। কাজেই এনআরসি না নাগরিকত্ব বিল কোনো ইস্যুতেই পাবলিক আর সরকারকে বিশ্বাস করছে না। যার সোজা মানে হল, মোদী-অমিতের বিজেপি সরকারকে – এনআরসি আর নাগরিকত্ব বিল – এদুটোকেই প্রত্যাহার  করা হয়েছে এই ঘোষণা করানোর দিকেই আগাচ্ছে।

    বাংলাদেশের চলতি সরকারকেও বিজেপি বিক্রি করেছে
    ইদানীং লক্ষণীয় যে, ভারতের মিডিয়া এবার প্রকাশ্যেই লিখছে বাংলাদেশের সরকার নাকি ‘খোলাখুলিভাবে কাজে ও বাক্যে বছর দশেক ধরে প্রো-ইন্ডিয়ান’ [Prime Minister Sheikh Hasina, who has been openly pro-India in word and deed since coming to power a decade ago]। কথাটা দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছে একজন এমন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ সরকারকেও অমিত শাহ অপব্যবহার করেছে তা বুঝাবার জন্য। কথা সত্য। অমিত শাহ ভারতের সংসদে  নতুন নাগরিকত্ব সংশোধিত বিলের পক্ষে সাফাই দেয়ার জন্য বাংলাদেশে সরকার হিন্দুদের ‘নির্যাতন করছে’, ‘সুরক্ষা করে নাই’  – এসব কথা সরাসরি বিলের ভাষায় অথবা সংসদে অমিত শাহের কথায় এই অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের নাম সরাসরি বিলের ভাষায় পর্যন্ত উঠে এসেছে। সেটা আসায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে ভারত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করছে। তাহলে এর তথ্য ও প্রমাণাদি কই?   একথা খুবই সত্য যে অমিত শাহের নাগরিকত্ব বিল দাঁড়িয়ে আছে “বাংলাদেশ সরকারের হিন্দুদের উপর ধর্মীয় নির্যাতন করে চলেছে” একথা যদি নিশ্চিত ভাবে ধরে নেই একমাত্র তাহলেই।
    অথচ কূটনৈতিক করণীয় অর্থের দিক থেকে বললে, এ নিয়ে আগে কোন আলোচনার এজেন্ডা সেট করা, কোনো আলাপ আলোচনা অথবা কোনো প্রমাণ পেশ ইত্যাদির কিছুই করা হয়নি। আবার বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করার বিনিময়েই এমন ভাষ্যের উপরের এই বল আনার যৌক্তিকতা ও সাফাই দাঁড়িয়ে আছে। আবার এটাই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে বিজেপির এর ফলাফলে হিন্দুভোট পোলারাইজেশনে বাক্স বোঝাইয়ের পরিকল্পনা ও উপায়। মানে হল ভারতের বিজেপি সরকার নিজের ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ সরকারকে বেঁচে দিয়ে একে নিজের ভোটের ক্ষমতা পোক্ত করার উপায় হিসেবে হাজির করেছে। এটা পানির মতই পরিস্কার।
    আবার ওদিকে আসামের রাজ্য সরকার সেটাও বিজেপি দলের সরকার। আসাম সেই দেশ ভাগের সময় থেকে বাংলাদেশের কথিত  ‘অনুপ্রবেশকারী’ মুসলমানদেরকে  তাঁদের সব দুঃখের জন্য দায়ী করে আসছে। তাঁরা নাকি স্থানীয়দের চেয়ে সংখ্যায় বেড়ে অসমীয়দের সমাজ-সংস্কৃতি সব ধবংস করে দিচ্ছে। অথচ এনআরসি তালিকাতে দেখা গেল তাদের এই অসমীয় পারসেপশন ভিত্তিহীন। ছিটেফোঁটাও সত্যি নয়। এনআরসিঢ় ফাইনাল তালিকা প্রকাশের পর এখন জানা যাচ্ছে  আসামের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার ১%-এর (প্রায় পাঁচ লাখ মাত্র) মত মুসলমান জনগোষ্ঠী তালিকায় নাম তুলতে পারেনি। অর্থাৎ একটা মিথ্যা পারসেপশনের উপরে তারা এখনো চলছে আর মুসলমানবিরোধী ঘৃণা ছড়িয়ে চলছে।  [আমরা যেন না ভুলে যাই অরিজিনাল মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানোর শুরুকর্তা কিন্তু এই অসমীয়রা যারা তাদের মথ্যা পারসেপশন প্রমাণ করতে না পারলেও এখনও তা জারি রেখেছে। আর বিজেপি পরে এই দাবিটা কুড়িয়ে নিয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে রাজনীতি করছে।] আর এবার নাগরিকত্ব বিলের পরে অসমীয়দের ফোকাস গেছে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর যে, তারা এবার নাগরিকত্বের লোভে আসাম দৌড়াবে হয়ত। তবে এটা অবশ্যই মোদি-অমিত সরকারের ভোটবাক্স ভরবার ইস্যু। এই অর্থে  সেটা সত্যি সত্যিই ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু।
    কিন্তু তামাসাটা হল,  বিজেপির এই আসাম সরকারকেই আবার বাংলাদেশ সরকার ফ্রিচার্জে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বের হতে ট্রানজিট আর বন্দর ব্যবহার সুবিধা দিতে যাচ্ছে। আসামের সরকার ও জনগণ কোন ন্যায্যতার ভিত্তিতে ও সাফাইয়ের বলে এই সুবিধাগুলো নেবে? সম্প্রতি নাগরিক বিলবিরোধী জনঅসন্তোষ চলার সময় আসামে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর অফিসের সাইনবোর্ড ভাঙচুর ও গাড়িতে হামলা হয়েছে। এগুলো কী বিনা পয়সায় বাণিজ্যিক সুবিধা সহযোগিতা নিবার ও পাবার নমুনা?
    আসলে বলাই বাহুল্য, অসমীয় জনগণ ও তাদের সরকার আসলে বাংলাদেশ থেকে ঠিক কী চায়, কেমন সম্পর্ক চায় সেটা স্পষ্ট করে বলার হাই-টাইম চলে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ থেকে যেকোনো ট্রানজিটসহ, পোর্ট ফেসিলিটি ব্যবহার নিয়ে কোনো কথা শুরুর আগে ‘বাঙালি খেদাও’-এর ঘৃণাচর্চা নিয়ে তাদের মনোভাব স্পষ্ট করা উচিত নয় কী? যার প্রতি এত ঘৃণা তার কাছ থেকে কিছু নিবে্ন কেমন করে আর সে দিবেই-বা কেন, এমনকি আপনারা সঠিক চার্জ পুরাটা দিলেও দিবে কেন? সেও এক জেনুইন প্রশ্ন!

    তাহলে মো্দী-অমিত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ক্রমেই উইকেট পতন চলছে। আগামী সাত-দশ দিনে আর কয়টা রাজ্য বা শহরে আন্দোলনে প্রভাবিত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে- এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বলা হচ্ছে ইতোমধ্যে বড়ছোট মিলিয়ে ভারতের ২৮ রাজ্যের মধ্যে ১৬ রাজ্য আন্দোলন ছড়িয়েছে। অন্তু একবার সরকারবিরোধী মিছিল হয়েছে। এমনকি বিজেপি রাজ্য সরকারে আছে এমন রাজ্যেও তা হয়েছে।  অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যে বামেজর রাজ্যে বিক্ষুব্দ আন্দোলন হতে দেখলে সেক্ষেত্রে মোদী-অমিতের জন্য সেটা খুবই বিপদের কিছু হবে। কিন্তু সাবধান। কারণ বিশেষ করে মোদী-অমিতরা যত অসহায় হবেন ততই তাদের পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধাবার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। এছাড়া পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘাত বাধানোর সম্ভাবনাও বাড়বে। যেমন আমরা হাতে নাতে দেখেছিলাম নির্বাচনের আগে। এছাড়া সবার উপরে আমেরিকান জেনোসাইড ওয়াচের ভাষায়, ভারত ধাপে ধাপে সেদিকেই আগাচ্ছে, ‘ভারতে গণহত্যার প্রস্তুতি চলছে” – সেটা তো আছেই!’

    শেষে বাড়তি কিছুঃ
    এখানে একটা ছোট তথ্য ও রিপোর্টের খবর দিয়ে রাখি। আজ মানে ২২ ডিসেম্বর আনন্দবাজারের অগ্নি মিত্রের লেখা একটা রিপোর্ট আছে, শিরোনাম – “প্রিয়ঙ্কা নিয়েই ক্ষোভের শুরু ঢাকা-দিল্লিতে”। সেখানে সারকথাটা যা বলা হয়েছে তা হল, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর সাথে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা গত অক্টোবরে ভারত সফরের সময় দেখা  করা থেকেই মনোমালিন্য “ক্ষোভের” শুরু হয়েছিল। প্রথমত, এই রিপোর্টে যতটা অতিনাটকীয়তা আছে ততটাই সত্যতা নাই। আনন্দবাজারি রিপোর্ট অবশ্য এমনই ঝোঁকের সাধারণত হয়।  তবে গান্ধী পরিবারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা দেখাতে যাওয়াটা – ঠিক সেটা এখানে ইস্যু না। মূল ইস্যু বা শুরুর ইস্যু হল, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিজেপি-আরএসএস করুক বা সেদিকে ঝুকুক এব্যাপারে  ভারতের আরএসএস আমাদের সরকারের কাছে সহযোগিতা চাইলে অন্তত ২০১৮ সালে বা তারও  আগের কালে সরকার সম্মতি দিয়েছিল। কিছু কাজ ও প্রশ্রয় দেওয়া করেছিল। যার খেসারত হল প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছ পর্যন্ত গিয়ে অভিযোগ তোলা। গোবিন্দ প্রামাণিকের ঢাকায়  “আরএসএস” খুলে বসা, সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কথা বলা। রানা দাসগুপ্তের বেচাইন হয়ে খোদ মোদীর কাছে নালিশ পরে অস্বীকার ইত্যাদি। এছাড়া আগে থেকেই আবুল বারাকাতকে সরকারি তেল ঘি খাইয়ে পেলেপুষে তাঁর যে “ঐকিক নিয়মের বিশেষ পরিসংখ্যান” বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল তাই এখন বিজেপির পক্ষের অস্ত্র য়ার আমাদের বিরুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে হাজির হয়েছে। এসব কিছু বুঝতে বুঝতে হাসিনা সরকার বেশ কিছু ক্ষতি করে ফেললেও সবছিন্ন করে শেষমেশে শক্ত সিদ্ধান্তের কথাটা তিনি অক্টোবর সফরে পরিস্কার করে এসেছিলেন।
    ঐ অক্টোবর সফরকালে তাই বলে বা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল হাসিনা সরকার আগে যা কথাই হোক সেখান থেকে এই বিষয়ে নো কমিট্মেন্টে” ফিরে যাচ্ছে। সরকার যে একথা বুঝিয়ে দিয়েছিল এর দুটা চিহ্ন আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই।  এক. শাহরিয়ার কবিরের কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকা সাক্ষাতকারে সে ইঙ্গিত রেখেছেন। [এনিয়ে সেকালে আমার লেখাটার লিংক এখানে। ] তার দাবি করে বলা  -বাংলাদেশে আরএসএস বলে কিছু নাই, “তাদের কোন ততপরতা নাই” ইত্যাদি – সে প্রমাণ।  আর দুই. রানা দাসগুপ্ত সেই থেকে এখন অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে হিন্দু নেতা হিসাবে “সরকারের অবস্থান” বহন করেন। কোন বেচাইনি রাখেন না। তিনি গত মাসদুয়েক আগে ভোলার ঘটনার সময় হেফাজতের শফি হুজুরের সাথে দেখা করে এসেছেন যেটা ফলাও করে প্রচার পেয়েছিল – সম্প্রীতির প্রতীক হিসাবে। এককথায় সরকারের অবস্থান হল – “আরএসএস-কে আর পৃষ্টপোষণ নয়”।  আর এখান থেকেই মোদী-আরএসএসের আমাদের সরকার প্রধানকে অসহযোগিতা , প্রকাশ্য অসম্মান করা ইত্যাদি। এক শুস্ক টেনশ্নের শুরু।

    এদিকে এসবের মাঝেই মোদী-অমিতেরা এনআরসি-নাগরিকত্ব নিয়ে নিজেরাই নিজের জনগণের কাছে গ্যাড়াকলে পরে গেছেন। আর এই সুযোগটা ভাল্ভাবেই নিতে পেরেছে হাসিনা সরকার। নেওয়াটাই স্বাভাবিক ও উচিত। নড়বড়েরা যে এটা পারছে সেটাই শুকরিয়া। আবার এনিয়ে মোদী-অমিতের বলারও বিশেষ কিছু নাই। কেবল ভারতের মাস-পাবলিকের মুডের উঠানামার দিকে খেয়াল করে চললে, সে অনুসারে কখন মোদীকে আবার গুরুত্ব দিবে বা দিবেনা  তা  আগা-পিছা করলে আমাদের সরকারের অসুবিধা হবার কথা নয়। কাজেই সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক। কেবল একটাই সমস্যা, আমাদের নেতারা ভুলে থাকতে চায় যে তারা নিজেকে সম্পুর্ণ দান করে দিয়ে ভারতের সাথে  বিশাল ব্যক্তিগত সম্পর্কের জগত গড়তে ভারতের পায়ের কাছে শুয়ে থাকলেও ওদের চোখ আমরা কেবল নিচা “মুসলমান” – এটাই থাকব।  তারা তুচ্ছ করবে। যেন এখনও আমরা জমিদারের প্রজা যারা কখনই বন্ধু বা সমান হতে পারবে না। এই কথাগুলো আমাদের মনে থাকে না।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “মোদি-অমিতের হারের চিহ্ন “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]