Category: ইসলামবিদ্বেষ

  • ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

      ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

    গৌতম দাস

    ০১ নভেম্ববর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3MV

     

    আ.লীগ কি আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাচ্ছে— প্রশ্ন রানা দাশগুপ্তের

    গত বৃহস্পতিবার ২৮ অক্টোবর   চট্টগ্রামে ইসকনের এক জনসমাবেশ হয়েছে। পরদিনের প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে এ সমাবেশের আয়োজকদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে- “বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের নন্দনকানন চত্বরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি আয়োজিত এক সমাবেশ হয়েছে”।

    ‘ইসকন’ [ISCKON] ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড এক হিন্দুধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যা ‘কৃষ্ণনাম চর্চার এক বিশেষ ব্যাখ্যা’ প্রচারের সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তা সত্বেও চলতি শতকে এসে আমেরিকান সংসদে ও সিনেটে ভারত সরকারের পক্ষে আমেরিকান নীতি পলিসিকে প্রভাবিত বা লবি[lobby] করতে ভারত আমেরিকায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির মিলিত এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, ক্রমেই ইসকনও তার অংশ হয়ে যায়। এর নিট ফলাফল হল ইসকন আর নেহায়েতই ধর্মপ্রচারের সংগঠন থাকেনি। এর ফোকাস বদলে রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে যায়।

           চট্টগ্রামে সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার সমাবেশ

    আমেরিকা হল এমন সমাজ যেখানে বহু বছর আগে থেকেই মানুষের জীবনে থিওলজি [theology] মানে ধর্ম বা ধর্মতত্বের আর প্রয়োজন নেই; মানুষের থিওলজিক্যাল নিড বা ধর্ম-বিষয়ক কোন চাহিদা আর নেই – এমন মনে করা, রটিয়ে বা  ঘোষণা করে দেয়া এক সমাজ। এই অনুমান-ধারণাটা যে ভিত্তিহীন এবং যথেষ্ট ভেবেচিন্তা বলা ভাষ্য নয় এরই প্রমাণ হল সেকালের জন্মের শুরুতে ইসকনের টিকে যাওয়া। যেকোন থিওলজির সারকথাটা  হল এটা এক আন্তঃসম্পর্ক বোধ, যা আমাদের ভেতরে এক ‘সম্পর্কিত’ বা  কানেকটেড বোধ জাগিয়ে দেয় বা রাখে। আমার যায় আসে আমাকে টানে, এমন একটা টান-বোধ করা কাজ করে টের পাই। সে আন্তঃসম্পর্ক বলতে তা হতে পারে মানুষে-মানুষে অথবা প্রকৃতির (মানুষ বাদে) সব কিছুর সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্ক বোধ। আর এসব যেকোনো দুইয়ের সম্পর্কের মাঝে থাকে ‘আল্লাহ’ ধরনের এক ধারণা যার মাধ্যমে মধ্যস্থতায় আসলে আমরা সবাই সব কিছুর সাথে কানেকটেড বা সম্পর্কিত বোধ করতে থাকি। এতে মানুষের বেঁচে থাকাটা মিনিংফুল এবং উদ্দেশ্যসম্মত মনে হতে থাকে। কিন্তু মডার্নিটির সস্তা বা দায়দায়িত্বহীন ব্যাখ্যার কারণে নিজেরা থিওলজিক্যাল নিড শূন্য ঘোষণা করে দেয়াতে পশ্চিম নিজের ক্ষতি করে ফেলেছে; অথচ বাস্তবে মানুষমাত্রই কম-বেশি একটি থিওলজিক্যাল চাহিদা থেকেই যায়। আমেরিকান সমাজের থিওলজিক্যাল নিড নাই, দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা এই ধারণা  এতে তৈরি হওয়া যে শুণ্যতা বা গ্যাপটা পূরণ করতেই এশিয়ান থিওলজিগুলোর অনেকেই পশ্চিমে এসে পপুলারিটি পেয়ে যায়। কারণ মানুষ মাত্রই তার থিওলজিক্যাল নিড থাকে থাকবেই। কম অথবা বেশি; জীবনের শুরু থেকেই নয়ত শেষের দিকে, তরুণ জোঁসে নয়ত অবসর জীবনে – এসব খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া বুঝা যায় আরো বহু যূগ থিওলজিক্যাল নিড থাকবে। ফর্ম বা আকারে হয়ত বদল আসবে।  বহুবার দেখা গিয়েছে মানুষ মারাত্মক আত্মঘাতি ভুল করেছে, তাঁর জানা জ্ঞান কোনটাই তাকে সতর্ক বা সাহায্য করে নাই।  পরে আবার থিওলজি থেকে, পড়তে গিয়ে বুঝছে তাকে সাবধান করা হয়েছিল কিন্তু সে বুঝে নাই, মোল্লাদের কারবার বলে তুচ্ছ করে গেছিল। আবার সাথে বলে রাখা ভাল যে তাই বলে জীবনের বস্তুগত দিকটাও উদাসিন, নজর আন্দাজ বা বেখেয়ালি হওয়া বা থাকাটাও সমান বিপদের হবে।
    যা হোক আমেরিকার সমাজের থিওলজিক্যাল গ্যাপ আছে-ছিল বলেই  ইসকন আমেরিকায় হবার  প্রথম দিকে এ সূত্রেই ‘জায়গা’ করে নিতে না পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে ভারতের লবি প্রতিষ্ঠানগুলোর জোটের অংশ হয়ে যাওয়াতে ইসকনের ফোকাস সরে গেছে। এমনকি নেতৃত্বও বদলে যায়, পরিচালন ক্ষমতায় এমন এক ক্যু হয়ে গিয়েছিল। যারা ভারত সরকারের পক্ষে সরাসরি কাজ করতে চায় ইসকন সংগঠনের এই ধারা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। এতে আগের ধর্মপ্রচারের উছিলায় আমেরিকায় জন্মানো এশিয়ান থিওলজির প্রতিষ্ঠানটা এবার হয় ঘোরতর এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষত ভারত সরকারের বর্ধিত হাতের ভুমিকায় তার গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজ করার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ইসকন হল বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে ও কাছে ভারত সরকার ও তার গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়ার বা পৌঁছানোর হাতিয়ার। ইসকন এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিরোধী এক সংগঠন; যদিও পরিকল্পিতভাবেই ইসকনের আগের ধর্মীয় ভাব ও এর বাইরের আদল সবই বজায় রেখে দেয়া হয়েছে। আর ওদিকে এই নয়া ইসকন এখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশে নাশকতা ও অপতৎপরতার সংগঠন ‘র’-এর বর্ধিত হাত হয়ে নিজেকে সাজিয়ে হাজির করতে থাকে।

    শুধু তা-ই নয়, এতে অবস্থা এখন এমনই যে, একালের আরএসএস-মোদির যুগে বাংলাদেশের ইসকনের তৎপরতায় বাংলাদেশের হিন্দুরা যেন কালচারালি আর বাঙালি হিন্দু নয়; তারা যেন আরএসএসের যে উত্তর প্রদেশের হিন্দু ব্যাখ্যা আছে – তার অনুসারী করে নেয়ার এক প্রোগ্রাম। এটাই ইসকনের প্রধান কর্মসূচি এবং তা নিশ্চিত করাই এর কাজ। যেমন বাঙালি হিন্দুকে উত্তর প্রদেশের হিন্দুর স্টাইলে নিরামিশাষী হতে শেখাচ্ছে তারা, ইসকন মার্কা কৃষ্ণভক্ত হওয়ার নামে। অথচ এথনোলজিক্যাল [ethnological] জাতির বিচারে এটা  প্রতিষ্ঠিত যে  বাঙালির খাদ্যাভ্যাস হল সে আমিষ-ভোজী। আর সেখান থেকেই প্রবাদ তারা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সেও হিন্দু অবশ্যই কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত এথনিক প্রজাতি্তে এক নয়। মানে এরা নিরামিষের লোক নয়। সোজা কথায় এথনোলজির বিচারে আমরা বাঙালি হিন্দু, উত্তর প্রদেশের আর্য অনুসারী হিন্দু নই। এই পুরান কাহিনী হিসাবে আর্যদের ভারত দখল অভিযানে দুটো অংশে গিয়ে তাদের অভিযান আর আগে বাড়তে পারে নাও, মূলত প্রাকৃতিক গাহাড় বা নদীর কারণে। এক হল ভারতের দক্ষিণে যেখান থেকে ভারতের দাক্ষিণার্ত-এর শুরু ধরা হয় – অন্ধ্র-হায়দ্রাবাদের কিছু অংশ থেকে দক্ষিণের পুরাটাই। আর এদিকে ভারতের পুবদিকে মারাঠা-বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্তবেশের পরে পরেই। ভাষার স্টাইল, খাদ্যাভাস, দেবদেবীর ভিন্নতা এমন কী আর্টকালচার গানের সুর-রাগ, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি অনেক কিছুতেই এথনিক ভিন্নতাগুলো বেঁচে যায় টিকে যায়।
    অথচ বাংলাদেশে ইসকন এসেছে পুরো উল্টা-পাল্টা হয়ে, আরএসএস-হিন্দুর প্রতিনিধি হয়ে।  তারা বাংলাদেশে এসেছে হিন্দু বাঙালি  সবাইকে আরএসএস বর্ণিত হিন্দু সাজাতে। পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে মমতা (হিন্দু-মুসলমান) বাঙালি বনাম আরএসএসের হিন্দু এই প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের জয় নিজের পক্ষে এনে মোদিকে ঠেকিয়েছিল।
    আর এসব কারণের বাংলাদেশে ইসকন আবার এদিকে, হিন্দু বাঙালিকে বাইরে থেকে দেখে চেনার উপায় চিহ্ন হিসেবে গলায় ‘কাঠের মালা’ পরাচ্ছে। অথচ ফ্যাক্টস হল, গলায় কাঠের মালা মূলত যারা নদীয়ার গৌড় বা বৈষ্ণব অনুসারী তাদের রেওয়াজ; এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাঙালি হিন্দু মাত্রই সবাই নদীয়ার শ্রীচৈতন্যের অনুসারী বা বৈষ্ণব নয়। অর্থাৎ বাঙালি হিন্দু মাত্রই গলায় কাঠের মালা পরা তাদের রেওয়াজ নয়। অথচ ইসকনের আরএসএসের হিন্দু হল, তারা এটিকে এক ইউনিফর্ম ধারণায় (গলায় কাঠের মালা) সাজিয়ে নিতে চায়। তাই হিন্দু বাঙালি মাত্রই ইউনিফর্মের মতো সবাইকে কাঠের মালা পরার রেওয়াজে নিতে চায়; অর্থাৎ পুরোটাই রাজনৈতিক ও ভিন দেশের অসৎ রাজনৈতিক স্বার্থ তারা চাপিয়ে রাজত্ব করতে চায়। মূলত এর মূল উদ্দেশ্য হল আরএসএসের উত্তর প্রদেশকেন্দ্রিক যে হিন্দুত্ববাদী ব্যাখ্যা আছে, বাংলাদেশের হিন্দুদেরও বলপ্রয়োগ করে হলেও এর অংশ করে নেয়া – তাও খাঁটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

    কাজেই আরেক অর্থে বাংলাদেশে ইসকন হয়ে উঠেছে ‘র’-এর “ফুট সোলজার”; মোদি সরকারের ‘বাংলাদেশ দখল নীতি’ বাস্তবায়নের ভয়ঙ্কর হাতিয়ার। স্বাধীন দেশে এটা বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের কাছ থেকে ‘আশা’ করা যায় না। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক মোদির নীতির বাস্তবায়ক হতে পারেন না। কারো প্রভাবহীন নয় ও স্বাধীন থাকতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারও এসব দিকে কোন নাগরিককে কোন ছাড় দিতে পারে না; উলটা সরকারকে এসব দমন করতেই হবে। এটা তার কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়ীত্ব ও মুখ্য কাজ।  এটা রাষ্ট্রস্বার্থের গুরুতর প্রশ্ন।

    এসবের পটভুমিতে এটা হতবাক করার বিষয় যে, গত ২৮ অক্টোবর সেই ইসকন চট্টগ্রামে জনসমাবেশ ডেকেছে আর তাতে যোগ দিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে লেগেছে প্রতিযোগিতা যে, কে বেশি ইসকনের সুনজর ও অনুগ্রহ লাভ করবে! এর প্রতীকী অর্থও খুবই বিপদের ও লজ্জাজনক! অর্থাৎ কে বেশি ভারতের অনুগ্রহ লাভ করবে? আর তাতে আওয়ামী লীগ যদি ১৩ বছরের শাসন চালাতে পারে তবে বিএনপির ভাগ্যেও নিশ্চয় এর কাছাকাছিই কিছু একটা হবে! এমন অনুমান, তাই কি? ওদিকে মিডিয়া রিপোর্টের এনিয়ে ইঙ্গিতে উপস্থাপনটাই মারাত্মক। লিখেছে, ‘সমাবেশে চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ, নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি নগর বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন”। কিন্তু মজার কথা হল, ওখানে বিএনপির কেবল একটি নেতার নাম আছে। অথচ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ছোট নেতাটার নামও সেখানে দেয়া আছে। আর ভোরের কাগজ লিখেছে, “নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা: শাহাদাত হোসেন” সেখানে বক্তৃতা করেন।

    ‘সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, এটা ষড়যন্ত্র’
    গুগল সার্চে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে দেখা যায় “সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: “ এমন বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি রেফারড হয়েছেন আইনমন্ত্রী। আর ভারতের কিছু মিডিয়ায় দেখা গেছে একই বক্তব্য দিয়েছেন বলে কোট করা হয়েছে খোদ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এমনকি গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৃত্যু ও ধর্ষণের নানা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।’ অর্থাৎ সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা মানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে দাবি। অথচ এরপরও চট্টগ্রামের সমাবেশের নাম হল – ‘সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে’ এই সমাবেশ। কেউ সরছেনা; প্রচলিত শব্দ ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ কথাটা দিয়েই সব জায়গায় কুমিল্লার ঘটনাকে বর্ণনা করা হচ্ছে। অথচ ইকবাল হোসেন গং তারা এখনো রিমান্ডে আর তাদের পেছনে কে আছে? নিয়োগ বা অ্যাসাইনমেন্ট দাতা কারা? ‘র’ না ‘ইসকন’ না থার্ড কেউ? এখনো তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এই অংশটা ঢেকে দেয়ার প্রপাগান্ডা চলছেই! ইকবাল হোসেনেই যেন সবশেষ খোঁজাখুজি শেষ ধরা হয়, এর পিছনে আর কেউ নাই; ভারতীয় মিডিয়ায় এমন  আকাঙ্খাই প্রবল!

    এদিকে চট্টগ্রামে ইসকনের সমাবেশে প্রধান গুরুত্ব পায় দু’জন হিন্দু-ব্যক্তিত্বের বক্তব্য। এর প্রথমজন রানা দাসগুপ্ত, তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তাদের দেয়া ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দের বর্ণনা অনুযায়ী কি খোদ রানা দাসগুপ্তের সংগঠনের নামটাই তাদের কথিত ‘সাম্প্রদায়িক’ নয় কি? আর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের নাম ডঃ অনুপম সেন।

    আবার লক্ষণীয়, ওই সমাবেশে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ। সময়ে মনে হয়েছে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিকল্প এবার পেয়ে গেছে। যেন এবার তারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে। রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। কেউ কেউ এই দ্বিতীয় বাক্যটাকেই মিডিয়ায় শিরোনাম করেছে। কিন্তু রানা দাসগুপ্তের বক্তব্য স্ববিরোধী।
    রানা দাসগুপ্তই কড়া অভিযোগগুলো তুলেছেন। এমনকি এটাও বলেছেন, ভোরের কাগজ লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগ ক্রমেই ১৯৪৮ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে চলে যাচ্ছে”।  এর জবাব আওয়ামি লীগ কী দেয় আমরা দেখব।  তবে এটা বহু পুরনো দিন থেকেই মুসলিম লীগ নিয়ে হিন্দু নেতাদের অভিযোগের শেষ নেই। এসব অভিযোগ, রাগ বা ক্ষোভের আদি উৎস হল – ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কেন করা হল।  কারণ এতে পুর্ববঙ্গেও   হিন্দু জমিদারদের যে পলিটিক্যাল, কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য ছিল তা এক নিমিষেই নাই হয়ে  গিয়েছিল। তাই একালে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় তারা এখন কী চায় আর যদি তারা মনে্র কথা খুলে বলতে রাজি হয় তাহলে সম্ভবত এর জবাব আসবে তারা সেই পুরানা আধিপত্যটাই ফেরত চায়। এমনকি একালের প্রজন্ম যারা তারাও ঘুরেফিরে একালের ভারত না হলেও কলকাতাকে যেভাবে দেখে জানে তেমন একটা পলিটিক্যাল যদি নাও হয় তবে অন্তত একই কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য দেখতে চাইবে। কিন্তু খুবই দুঃখিত এটা এবসার্ড, এক অবাস্তব কল্পনা!   আবার আমরা খেয়াল করলে জানব  যদিও খোদ শেখ মুজিবও এর নিন্দা করেননি বা নিজে মুসলিম লীগার ছিলেন বলে কখনো অস্বীকার করেননি। এমনকি হাসিনা শেখ মুজিবের আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন তাকে মুসলিম লীগার হিসেবেই বর্ণনা বজায় রেখে এবং কোনো রাখঢাক না করেই। কিন্তু “মুসলীম লীগ” শব্দটা হিন্দু নেতাদের কাছে একটা গভীর পাপের নাম।

    অথচ ভারতের কংগ্রেস যেমন এক হিন্দু-জাতিবাদী দল; সমতুল্যভাবে (পূর্ব) পাকিস্তানে মুসলিম লীগ মুসলমান-জাতিবাদী দল।  বাংলাদেশের হিন্দু নেতারা কংগ্রেসের চোখ দিয়ে কংগ্রেস যেমন মুসলিম লীগকে তার মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বি-শত্রু  দল হিসেবে দেখে, সেভাবে ঐ চোখেই তারা দেখে গেছে। অথচ কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি কোনো সর্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড নয়, কারণ এটা তো হিন্দু-জাতিবাদী চোখ। বরং কোন সর্বজনীন, কোন সুনিদ্দিষ্ট পরিচয়হীন দৃষ্টিভঙ্গীর এক অবিভক্ত ভারতের কল্পনা করতে না পারার অযোগ্যতা আর ব্যর্থতা থেকেই তো তিনদেশে বিভক্ত হয়েও তো আমরা আজও মূল প্রশ্ন সমাধান করতে পারি নাই, হাতড়ে মরতেছি। য়ার এমনিতেই  পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ভারতের ওই দৃষ্টিভঙ্গি কখনো গ্রহণ করেনি, করার কথাও না। কারণ মূল ত্রুটি ওটা হিন্দু-জাতিবাদী বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী।  অথচ রানা দাসগুপ্তরা অযথা এই পণ্ডশ্রম করে গেছেন। এখানেও করেছেন। কংগ্রেস বা একালের বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদীর চোখ দিয়ে তারা আগের পূর্ব পাকিস্তান বা এখনকার বাংলাদেশকে দেখতে হবে এবং সাজানোর দাবি করতে হবে এই অদ্ভুত কল্পনা তারা করে গেছেন।  হিন্দু-জাতিবাদী ভারত বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী  ভারত এটাই এখনও তাদের চোখে সেকুলার রাষ্ট্রের মডেল। তাদের কল্পনা শুধু না দাবিও যে বাংলাদেশকে তাদের কল্পনা মত হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী “কথিত সেকুলার রাষ্ট্র” করে গড়ে দিতে হবে।  নইলে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেবে।
    অবশ্য এখানে আরেক  সূক্ষ্ম দিক আছে। লক্ষণীয়, আসলে রানা দাসগুপ্ত কিন্তু “মুসলিম লীগ” বলেনইনি। বলেছেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। দুটার অর্থ একেবারেই উলটা। অর্থাৎ যেটা আওয়ামী লীগেরই আগের নাম বা প্রথম জন্মকালীন নাম সেটাসি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মানে আজকের হাসিনা আওয়ামি লীগের  আগে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামেই জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন। সবচেয়ে বড় কথা তারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ ত্যাগ করে বেড়িয়ে এসেই নতুন এইদল খুলেছিলেন।  তা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাওয়া বলতে তিনি আজকের হাসিনা আওয়ামী লীগের জন্ম হওয়াটাই দোষ বলছেন যেন। এককথায় মুসলিম লীগের উলটা এবং শত্রুদল হল আওয়ামী মুসলিম লীগ। তাহলে রানা দাসগুপ্ত এতে আপত্তির দেখছেন কী বা তার বিশেষ অভিযোগটা কী? আসলে  পুরোটাই ভুয়া।  রানা দাসগুপ্ত কি তাহলে ভাসানী-শামসুল হকের ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের গায়ে হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের চোখে তাকিয়ে দাগ লাগিয়ে দিতে চাইছেন? নাকি কিছু ভেবেচিন্তে বলেননি?

    আসলে ব্যাপারটা হলো, কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের প্রবক্তা ও কায়েমকারী হয় তা হলে এই দলের বা সমর্থকের কি আর মুসলিম লীগকে বিরোধিতা বা নিন্দা করার সুযোগ থাকে?  কেন? কারণ কংগ্রেসই কি মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের জনক নয়? সেটা আবার কীভাবে? তাদের হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়তে বেপরোয়া হওয়াটাই কি অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়তে ঠেলে দেওয়া, বাধ্য করা ও উৎসাহ দেয়া নয়? অর্থাৎ হিন্দু-জাতিবাদী দল খাড়া করে একটা  কংগ্রেস দলের জন্মই কী সমস্ত বিপর্যয় ডেকে আনার মূল প্রতিষ্ঠান ছিল না বা ঘটনা নয়? ভারতকে কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র করে আকার দিতে চায়, তবে এটাই কি প্রকারান্তরে মুসলমানদের ঠেলে দেয়া নয় যে, মুসলমানেরা তোমরা শুনে রাখ – ভারত বা কংগ্রেসে তোমাদের জায়গা নেই তাই তোমরা একটি পাল্টা মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়ে নাও? নইলে আমাদের তৈরি ভারত বা কংগ্রেসে আমাদের আধিপত্য ও অধীনতা মেনে চেপে গিয়ে কোনার চিপায় পড়ে থাকতে পারো। কাজেই এই অবস্থায় অতএব – হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রধারী কংগ্রেসের মুসলিম লীগকে কোনো সমালোচনা বা আপত্তির জায়গা কই? করলে সেটা তো তাদের নিজেরই সমালোচনা হবে!

    আবার দেখেন,  মনে হচ্ছে সূর্য সেনদের রাজনীতি রানা দাসগুপ্ত এখনো করে যাচ্ছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা ১৯০০ সালের পরেও আগের শতবছরের (১৮০০-১৯০০) রামরাজত্ব  তাদের পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রভাব কলকাতাকে কেন্দ্র করে ধরে রাখতে চান। আবার এ-ও আবদার যে, ততদিনে ব্রিটিশদের প্রায় দেড়শ বছরের সব অবকাঠামোগত ব্যয় সব কলকাতাতেই হোক, থেকে যাক। কিন্তু ব্রিটিশরা তা মানেনি, সম্ভব ছিল না। তারা বাংলাকে ভাগ করে ঢাকাকে রাজধানী করে আলাদা নতুন অবকাঠামো গড়তে ব্যয় করতে চেয়েছিল। কেন? মূল কারণ ততদিনে আসাম চা উৎপাদন যোগ্যতার জন্য তৈরি ও সম্পন্ন হয়ে গেছিল। অথচ চা বিক্রি, বিতরণের জন্য সেই চা চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যেতে ঢাকা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে ছোট জাহাজে তুলে তা চট্টগ্রাম বন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিবার কোনো অবকাঠামোই ছিল না। না আসাম থেকে ঢাকা হয়ে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত। এ’কারণে ঢাকাকে রাজধানী করে আসাম ও পূর্ববঙ্গকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ করা হয়েছিল ১৯০৫ সালে। এটাই ‘বঙ্গভঙ্গ’।  মানে  ঢাকাকে কেন্দ্র করে আরেক বাংলা প্রদেশ বানানো।  আর এটাই সহ্য হয়নি কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের, চ্যালেঞ্জ বোধ করেছিলেন যে, ঢাকা তো তাহলে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে যাবে তাতে। সক্ষমতাতেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ এখানে বাণিজ্যিক দিক এখানে ভারী – চায়ের সাথে পাটও আছে; আর বিস্তীর্ণ ধানের জমিতো আছেই। যার উপর আসামের লোভ ছিল। কারণ পুর্ববঙ্গ এব্যাপারে আসামের চেয়ে এগিয়ে ও দক্ষ। এসব ছাড়াও আরো দিক আছে। পূর্ববঙ্গে জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা বেশি, সংখ্যাগরিষ্ট; ফলে কলকাতার ম একচেটিয়া কুক্ষিগত প্রভাব  হিন্দু জমিদারেরা ঢাকায় সামাজিক সাপোর্ট সমর্থনে  জমাতে নাও পারতে পারেন। এসবই ছিল হিন্দু জমিদারদের মূল ভীতি। আর এসব স্বার্থে তারা নতুন প্রদেশ করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। এবং এনিয়ে তারা এত মরণপণ সিরিয়াস হন যে যে জমিদারেরা একশ বছরে বৃটিশদের সমর্থন ও ঔরসে  জমিদারি কামাইলেন অবিভক্ত বাংলার একছত্র নেতা হলেন যেই বৃটিশদের বদৌলতে সেই বৃটিশদের তারা অস্ত্র হাতে বিরোধীতার করতে লোক নিয়োগ ও সন্ত্রাসী দল গড়ে  শাসকদের বিরোধিতা করেছিলেন। তা হলে সূর্য সেনরা ছিল মূলত হিন্দু জমিদারদের স্বার্থে কাজ করেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামের লোক হয়েও সূর্য সেনরা নিজ পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধী। কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের লেঠেল। আর তারা জমিদার স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো লোক হলেন। পূর্ববঙ্গের বা, বাংলাদেশের কেউ হতে পারেন না। বরং সরাসরি কলকাতার হিন্দু জমিদারের পক্ষের লোক। কাজেই পূর্ববঙ্গের চোখে তারা কোনো বীর নন,  না হতেই পারেন না।  বরং পূর্ববঙ্গের বা ঢাকার স্বার্থের বিরোধী।  মানে চট্টগ্রামের লোক হয়ে ঢাকার কথা ভুলে মাড়িয়ে কলকাতার পক্ষে অস্ত্র হাতে মাকালীর নাম নিয়ে দাড়িয়ে গেলেন। কাজেই আপনারা নাকি কথিত স্বদেশী এটা কাদের আন্দোলন? কোন স্বদেশ? কলকাতার এবং হিন্দু জমিদারদের জন্য স্বদেশী!  কিন্তু দেখা যাচ্ছে এটা তো পূর্ববঙ্গের কোন স্বার্থই নয়। অথচ জবরদস্তিতে কলকাতা বা কংগ্রেসের স্বার্থটা বারবার আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এখনও।

    দেখা যাচ্ছে, এখনো কংগ্রেসের স্বার্থ ও অবস্থানের চিন্তাটাই রানাদের মাথায় সবসময় ভর ও ডমিনেট করে এবং গাইড করে থাকে। ফলাফলে হিন্দু জমিদার স্বার্থ তাদের চোখে হয়ে যায় কথিত অসাম্প্রদায়িক আর কেউ এর বিরোধিতা করলেই হয় ‘সাম্প্রদায়িকতা’। এই মুখস্থ কথা আর কত দিন?

    একালে কিছু হলেই আরেক বক্তব্য হল রাষ্ট্রধর্ম বলে ইসলামের বিরোধিতা। আচ্ছা,  আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালতে কোনো হিন্দু নাগরিক কী মামলায় হেরে গেছে এজন্য যে, আদালত তাকে এক মুসলমান নাগরিকের মতই সমতুল্য ও  সমান অধিকারের সাথে সমান অধিকারের ট্রিটেড হননি বলে এবং শুধু তাই না  সেটা ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়ার কারণে এবং এমনটা চালু হবার পর থেকে? এমন রেকর্ড কোথাও আছে কি?

    অর্থাৎ আদালত  অধিকার ও ট্রিটমেন্টে এর দিক থেকে কখনও নাগরিক বৈষম্য করে নাই, কোনো অসাম্য হয়নি। তবে ডেকোরেটেড পিস হিসেবে  রাষ্ট্রধর্ম শব্দগুলো অবশ্যই আছে। যা না থাকলে ভাল হত। অর্থাৎ এটা একটি জেদ-ক্ষোভের  সিম্বল। ফলে একটু ভেদের সিম্বলও অবশ্যই। কিন্তু তা-ই-বা কেন থাকবে? কারণ ইন্দিরা গান্ধী প্রগতিশীলতার নামে, অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত এক অর্থহীন ‘সেকুলার’ শব্দ ও ধারণা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এবং বুঝা যাচ্ছিল কারণ তখন তিনি  একাত্তরের শেষের দিকে সম্ভবত অক্টোবরে পাঁচবার আমাদেরকে স্বীকৃতির অনুরোধের ফাইল ঘুরাচ্ছিলেন।  পরে আমাদেরকে পরোক্ষে জানানো হয় এটা না মানলে আমাদের অনেক ভোগান্তি হবে।  ফলে এতে আবার সেই ইসলামবিদ্বেষ ফোবিয়া হিন্দু-জাতিবোধের চিন্তা ও  ডোমিনেন্স যা ভারতে গড়ে উঠেছে তাই আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এটাই তো ইসলামবিদ্বেষ। যেন তাজউদ্দিন সাহেব যত নিজেকে ইন্দিরা গান্ধীর সামনে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় করান না কেন, ইন্দিরা ভুলতেই পারছিলেন না যে তাজুদ্দিন তো আসলে মুসলমান!  তাই তিনি যেন “সেকুলার” সাবধানতার জোরাজুরি্তে তাজুদ্দিনকে বলতে চাচ্ছিলেন তাজউদ্দিন তুমি মুসলমান নও, তুমি সেকুলার……।
    আবার সেকুলার মানে কী তা তো তিনি ইন্দিরা বা আজকের রাজনৈতিক ভারত জানে  এর প্রমাণ তাদের রচিত কনষ্টিটিউশনে আজও নাই। তাদের ধারণা একটা হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তা ভিত্তিক রাষ্ট্রে কোন সমস্যাই নাই। কেবল “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” একথা ঢুকিয়ে দিলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়!
    অথচ বাংলাদেশে আমরা তো সবাই হিন্দুও নই। আমরা সেসময় ছিলাম রাজনৈতিকভাবে “বাঙালি জাতিবাদী”। ফলে ফেলে আসা জমিদার আধিপত্যের ইমেজ আমাদের ক্ষুব্ধ আশংকিত করবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের নতুন বাংলাদেশ বলে কী হচ্ছে এনিয়ে সন্দেহ করবে। জনমনের মনে আবার  সাতচল্ভেলিশের আগের জমিদারি অত্যাচারের ছবি ভেসে  উঠবে  চালু হবে।  এসব ভেবেও   আমাদেরকে সব মেনে নিতে হয়েছিল। (এনিয়ে বিস্তারিত আরো অন্য অনেক বইয়ে আছে। এখানে সেদিক আর টানছিনা।
    আবার মজার গোলমেলে ফ্যাক্টস হল, ১৯৪৭ সালে ভারতকে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র (নেশন-স্টেট) বানালেও নেহরু-গান্ধী কখনোই ভারতের কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলার’ শব্দটা রাখেননি; বরং আমাদের ওপর ১৯৭১ সালে জবরদস্তি করার বহু পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৬ সালে এবার ভারতের কনস্টিটিউশনের ৪২তম সংশোধনী হিসেবে ‘সেকুলার’ শব্দটা অন্তর্ভুক্ত করেন। [ সংশোধনীর প্রথম পাতাতেই  STATEMENT OF OBJECTS AND REASONS এই শিরোনামের অধীনে তৃতীয় পয়েন্টে]। এই লিঙ্কে গিয়ে দেখুন। আর সেই থেকে অনেকের ভুল অনুমান হল, যেকোন রাষ্ট্রে এমনকি তা  হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত রাষ্ট্র হলেও এতে  আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল  ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দ থাকলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়। ফলে এভাবেই ইন্দিরা গান্ধী আগে আমাদের দেশে এমন নীতি ঘোষণা করতে বাধ্য করেওছেন ১৯৭১ সালে পরে ১৯৭৬ সালের ভারতেও তাই করেছেন। এসব এমনই রাষ্ট্রচিন্তায় নাজুক  অবস্থা, দুরবস্তা। আসলে  নিশ্চয় আমাদের কনস্টিটিউশনেও  এই সকুলারিজম এই শব্দ থাকতে পারলেই এদিয়ে তারা মুসলমানদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন আর তারা তাদের হিন্দুত্ববোধ বুদ্ধিকে সেকুলার বলে চালাতে পারবেন, রাষ্ট্রে ছেয়ে রাখতে পারবেন এতটুকুই তাদের লক্ষ্য।  অথচ যারা সেকুলার শব্দ কোথাও না লিখে কায়েম করা যায়। মূলকথা সবাই নাগরিক আর নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র হতে হয়ে যেখানে সবাই একমাত্র পরিচয় নাগরিক হতে হয় ও সমান অধিকারের নাগরিক  – এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে হয়।  এতে কে কী হিন্দু না মুসলমান না পাহাড়ি এটা এখন যা আছে তাই থাকি কিন্তু কনষ্টিটিউশন এই পরিচয় সামনে অধিকারে কোন কমবেশি বা ভাগাভাগি করে না। সবাই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে মুসলমানের দেশে সেকুলার লিখে রেখে ইসলামবিদ্বেষ জারি রাখার যে সন্দেহ আমাদের দেশের মুসলমান নাগরিকদের মনে ভাসে, সন্দেহ জাগে তা তো অমূলক নয়।
    এভাবেই আরেক সন্দেহযুক্ত শব্দ হল “অসাম্প্রদায়িক”। এটা ডিকশোনারিতেই নাই। হিন্দু জাতিবাদের সৃষ্টি এই অদ্ভুত শব্দ।  এটাও হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের বোধবুদ্ধিতে খাড়া করা শব্দ যা দিয়ে যেকোন অ-হিন্দুর উপর চাপ সৃষ্টি বা তাকে, কোনঠাসা করার হাতিয়ার হয়। য়ার তারা আরামে অসাম্প্রদায়িক এই শব্দের আড়ালে হিন্দু-জাতিবাদিতা বা হিন্দুত্ববাদ এর আধিপত্য কায়েম করে নিতে পারে। আবার এই আকামকে তারা সেকুলার বলেও সার্টিফাই বা সাফাই দিতে পারে। অথচ  নতুন বাংলাদেশ তো অন্তত ইন্দিরাদের হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই নয়। এ্টা ছিল মুজিবের “বাঙালি নেশন স্টেট”; ভারতের মতো ‘হিন্দু নেশন স্টেট’ও কোনোভাবেই নয়। ফলে ভারতকে কপি করতে হবে কেন আর তা ফিট করবে কেন? ফলে সেই থেকে রানা দাসগুপ্তরা তাদের ‘কল্পিত দুঃখে’ আমাদেরও মাথা খাচ্ছেন।
    ওদিকে ১৯৭১-৭২ সালের এই সেকুলারিজম চাপিয়ে দেয়ার বিরোধিতা সহজ বা সময়ের সাথে মানানসই ছিল না বা হতো না। এজন্য এমনকি শেখ মুজিবও দেশে ফেরত আসার পর পরিস্থিতি বুঝে তখনই তা বিরোধিতা করতে যাননি। তাই পঞ্চম সংশোধনী লেখার সময় সেই প্রথম আর পরে অষ্টম সংশোধনী লেখার সময় আমাদের হাতে সুযোগ এসেছিল। ফলে সেকুলারিজম উঠিয়ে ফেলে দিলেও ঐ জায়গা ফাকা ফেলে রাখতে চায় নাই। এছাড়া রাগ-জিদও ছিল। তাই সেই জিদ উসুল করা হয়েছিল।  যদিও ‘সেকুলারিজম’ বা ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ইত্যাদি যে অসৎ শব্দ, খারাপ উদ্দেশ্যের শব্দ সেটা চিনতে আমাদের আমজনতার কোন অসুবিধা হয় নাই।
    যেমন এই রাগ-জেদের দিকটা ভালো বোঝা যায় যখন পঞ্চম সংশোধনীতে সেকুলারিজম ফেলে দিয়ে লেখা হয়েছিল “আল্লার উপর অগাধ বিশ্বাস”। এটা তো লিখে কায়েমের কিছু না। কিন্তু দেয়া হয়েছিল অনেকটা হুশিয়ারি বা পাল্টাপাল্টি হিসাবে। অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে, ভারতের এক হিন্দু নেশন স্টেট রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত ‘সেকুলার’ শব্দটা বাংলাদেশে তোমরা চালু করতে চেয়েছো অযথাই, খারাপ উদ্দেশ্যে। কারণ বাংলাদেশ তো হিন্দু নেশন স্টেট কখনোই নয়। কাজেই ইসলাম বা মুসলমানদের কন্ট্রোল করা আবদ্ধ রাখা জাতীয় কোনো শব্দ ইসলামবিদ্বেষ ও ফোবিয়া থেকে জন্ম নেয়া বুদ্ধি। আর এর প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দিতেই ১৯৮৮ সালে আরো পোক্ত হবে ভেবে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করে দেয়া – এমন মনে করা যায়। অথচ এর কোনো ব্যবহারিক বা লিগ্যাল ইমপ্লিকেশন নেই, কারো কারো জন্য হয়ত কিছুটা অস্বস্তি ছাড়া। আর এটাই মুসলমান হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড গংদের ওপর শাস্তির মত বা প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দেয়া।

    তবে আমার ধারণা একদিন পুর্ণ ও স্বাধীন জনগোষ্ঠির ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে নতুন কনষ্ঠিটিউশনে আমরা কোন বিভেদ চিহ্ন রাখব না।  জেদাজেদি করারও কিছু থাকবে না। সব মাফ করে দিয়ে পুরানা ভুলে জনগোষ্ঠি হিসাবে আমরা হয়ে দাড়াতে পারব। বৈষম্যহীন এক  সম-নাগরিক অধিকারের সমাজে আমরা জীবন গড়ব।

    উপরেও রানা দাসগুপ্ত বা অনুপম সেনদের চিন্তায় যে ফোবিয়ার কথা বলেছি এসব কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো সম্ভবত তারা এখন কী বলছেন তা যদি দেখি। ইসকনের ওই সভায় সারকথায় তারা বলছেন, তাঁরা বাহাত্তরে ফিরে যেতে চান। অথচ খোদ শেখ হাসিনাই তো ১৫তম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম আর সেকুলারিজম দুটোই রেখে  দিয়েছেন। যা এখনও লেটেস্ট ভাষ্য।  অথচ কায়দা করে রানা দাসগুপ্ত বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। অর্থাৎ কথার কোন তাল-ঠিকানা নাই।

    আসলে এসব কায়দা করে লাভ নেই। কিন্তু তারা এখন এসব কথা তুলছেন কেন? আমাদের দুই রাজনৈতিক দলই এখন ভারতের আনুগত্য লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এবং দেখা যাচ্ছে তা আবার সরাসরি ভারতের কাছেও না, তার ‘র’-এর কাছেও না। একেবারে ‘র’-এর হ্যান্ডলার ইসকনের কাছে হাত পেতেছে আর তা দেখে রানা দাসগুপ্তদের নিজেকে অনেক পাওয়ারফুল মনে হচ্ছে? তাই তো?  কিন্তু আর কত? ২০০ বছর হয়ে গেল এই মুসলমানদের দাবড়ে রাখতে হবে নাইলে নাকি মাথা চাড়া দিবে – এমন এই দাবড়ানোর চিন্তা এটাই তো ফ্যাসিজম, হিটলারি চিন্তা।  আপনার এই দাবড়ানির চিন্তার জন্যই তো আপনাকে বিশ্বাস করবে না কেউ, কোন আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে না। এটা এমনই ক্ষতিকর চিন্তা তা একবারও ভেবে দেখেন নাই। এজন্য হিন্দুত্ববাদি বা হিন্দুজাতিবাদ চিন্তাকে আমাদের এদিকের হিটলারিজম বলা হয়! এমন চিন্তার জন্যই আজ আমরা তিন দেশই বিচ্ছিন্ন, ধুঁকছি। হাতড়াচ্ছি।  খারাপ চিন্তাই প্রতিহিংসায় অন্য খারাপ চিন্তাকে ডেকে আনে। মানুষ নিজেই নিজের শত্রুর স্বভাব বৈশিষ্ট তৈরি করে।

    আসুন হিংসা পাশে ফেলে রাখি। আর আপনাদের চোখে ধর্মই যদি সব সমস্যার উৎস হয়ে থাকে তবে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজের কথা তো শুনেছেন। অবিভক্ত ভারতে রাষ্ট্র ধারণার গোড়া যেখান থেকে, সেই ১৮১৫ সালের রামমোহন রায় তাঁর আত্মীয় সভা আর যিনি আবার বেঙ্গল রেনেসাঁর নাকি আদিগুরু কমিউনিস্টরা দাবি করে, তা হলে তিনি রেঁনেসার আদিগুরু হয়ে নতুন করে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ চালু করেছিলেন কেন? করেন কী করে? রেনেসাঁর আদিগুরুর সাথে ধর্ম? কেমন মিলাবেন? এতো দুধ আর লেবুর চেয়েও খারাপ মিশ্রণ! হবে? তাই নয় কী এবং কেন?  আপনাদের উচিত হবে এর কারণ খুঁজে দেখা। ব্রাহ্মসমাজ জন্মের কারণ ধরতে পারলে বুঝে যাবেন, ধর্ম (আসলে ইসলাম ধর্ম) নিয়ে আপনাদের অনুমান কতটা ভিত্তিহীন, অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা!

    অথচ খুবই সহজ এসবের সমাধান। আমাদের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। বদলে তা অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র হতে হবে যেখানে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে হিন্দু বা মুসলমান (বা জুম্ম জাতি) জাতি পরিচয় নিয়ে লড়ার কিছু থাকবে না। তখন দেখবেন, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক ধরনের শব্দের আড়াল আর দরকার নেই, লাগছে না।

    শেষ কথা
    এত সেকুলারপ্রিয় আপনারা যারা সেকুলার ভারতের কনস্টিটিউশনকে আদর্শ মনে করেন,  তাহলে ভারতের এই কনস্টিটিউশনই আরএসএসের মোদিকে রাজত্ব করতে জায়গা করে দেয় কেমন করে? সেই প্রশ্ন করুন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনও বিজেপি দলকে অনুমোদন রেজিষ্ট্রেশন দিয়েছে কী করে? সহ্য করে কী করে? এতে কোনো সেকুলারিজমের সমস্যা দেখে না! কী অদ্ভুত? সহ-বাস! হিন্দুত্ববাদ আর সেকুলারিজম সহ-বাস করে কেমন করে? তাহলে কেবল মুসলমান-বাদ দেখলেই এবার ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ হাতে দৌড়ে আসেন কেন?

    এছাড়া  বাংলাদেশের হিন্দুনেতাকেই দেখি এই মোদির সাথে দেখা করে এসে বলশালী অনুভব করেন। আবার দেশে ফিরেই সেকুলার বাংলাদেশ নাই, কিংবা রাষ্ট্রধর্ম আছে বলে কান্নাকাটি করেন। কিভাবে করেন এগুলো? তা হলে আপনারা ঠিক কী চান? বাহাত্তরের কনস্টিটিউশন নামের আড়ালে মোদির ভারতের আধিপত্য ও অধীনস্থতা কায়েম? এসবের জন্য আপনারা বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার হতে পারেন না। পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা না বাড়ালে স্বল্প কিছু পরিবর্তনও কাজ করার কোন কারণ নাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩০ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ইসকনের মন পেতে প্রতিযোগিতা “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আবদির প্রিয় ‘র’ এর ‘মরটাল ফিয়ারে’ জীবন

    আবদির প্রিয় ‘র’ এর ‘মরটাল ফিয়ারে’ জীবন

    গৌতম দাস

    ২৮ অক্টোবর ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3MI

     

    [সার-সংক্ষেপঃ ‘মরটাল ফিয়ারে’ [mortal fear] মানে র’ এর হাতে খুন হবার ভয়।  আমরা সবাই ভারতের র [RAW] এর হাতে মরার ভয়ে আছি, ‘র’ আমাদের তাড়া করছে। বলেছেন – ভারতীয় সাংবাদিক আবদি]

    তাঁর নাম এসএনএম আবদি [SNM ABDI]।  গত  আশির দশকে ইন্দিরা আমলে ভারতের বিহার পুলিশের এক কান্ড। তারা অপরাধ কমাতে এক সহজ পদক্ষেপ নিয়েছিল।  অপরাধীর চোখে এসিড ঢেলে দেওয়া যাতে তারা আর অপরাধ না করতে পারে। করা এই  নৃশংসতার বিরুদ্ধে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করে বিষয়টাকে মিডিয়ায় এনে বিখ্যাত হয়েছিলেন এই আবদি। এখনও আবদির পরিচয়ের সাথে তা সবজায়গায় এমন লেখা পাওয়া যাবে। জাতিসংঘের পুরস্কারও পেয়েছিলেন এজন্য। তিনি ভারতের আউটলুক পত্রিকার ডেপুটে এডিটর ছিলেন পরে আরেক ওয়েব মিডিয়া ফাস্ট পোস্ট এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। সেসময় গত ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর বাংলাদেশ সফরকালে (তিস্তার পানি দিবার চুক্তি করতে এসেও না দেয়ার সেই সফর) সফরসঙ্গী দলের সদস্য হয়ে আবদি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। স্মৃতি হাতড়ে সেখান থেকে বলছি।

    করোনাকালে বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ায় ভারতে প্রত্যেকটা মিডিয়াই টিকে থাকার জন্য এক  মুশকিলের লড়াইয়ে এখনও পড়ে আছে। সব প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াতেই তাদের রিপোর্টের শেষে অর্থ,অনুদান চাঁদা ইত্যাদির আবেদন সংযোজন করা হয়েছে দেখতে পাবেন। আর তাতে ফলাফলে আমরা দেখছি বেশির ভাগ প্রধান ধারার মিডিয়া মোদির দারস্থ হয়েছে।

    আরেক দেশে গিয়ে নিয়মিত নাশকতা কর্মকান্ড চালানোর ভারতের গোয়েন্দা এক প্রতিষ্ঠান হল ‘র’। এই  ‘র’ স্পনসরড বা অর্থ দিয়ে পরিচালিত এক প্রাইভেট সংবাদ সংস্থা বা এজেন্সি হল এএনআই [ANI]  যার প্রধান কাজ হল ফেক নিউজ ছাপা। অর্থাৎ এএনআই-এর কাজ হল ‘র’ স্পনসরড প্রপাগান্ডা বক্তব্যকে  নিউজ হিসাবে প্রান্তিক মিডিয়াতে সরবরাহ করা।  আর যে প্রান্তিক মিডিয়া এটা ছাপে সে এর বিনিময়েই মোদির ‘সাহায্য’ বা মিডিয়া ফান্ড পেয়ে থাকে। আর এমন নিউজ ছাপার মাধ্যমেই ভারতের মিডিয়াগুলো করোনাকালে তাদের আর্থিক সংকট সামলেছিল। বাংলাদেশের মিডিয়াজগত আরো দুর্বল,এখানে কেউই বাণিজ্যিকভাবে কোনকালেই  সফল নয়। তাই ‘র’ স্পনসরড এএনআই এর “নিউজের” আছর বাংলাদেশে আরো বেশি।

    তবু ভারতে এসবের বাইরে থেকে অর্থের লোভ সামলানে এই কষ্টের দিনে টিকে থাকা অল্প ওয়েব পত্রিকাও আছে। যদিও তারা খুবই ছোট ফলে  বাজার শেয়ার খুবই কম। তবু এরা অনেকেই যথেষ্ট প্রভাবশালী নিজ মেরিটে। আমার ধারণা এমনদের শীর্ষে আছে এখন সম্ভবত ওয়াইর[WIRE] –  এই মিডিয়া। যদিও মেরিটেড পত্রিকাও বছর দশেক আগে রেগুলার না,হঠাত করে কিছু ক্যাশের লোভে দু একটা ‘র’ স্পনসরড প্রপাগান্ডা বক্তব্য ছেপে দিত। আর করোনাকালে এটাই এখন রেগুলার ফেনোমেনা। তাই করোনাকালেও মোদির ফান্ডে আগ্রহ যারা দেখায় নাই বলে মনে হয় তেমনই এক ওয়েব পত্রিকা হল ‘দ্যা কুইন্ট’ [The QUINT]।

    এই ‘দ্যা কুইন্ট’ পত্রিকায় আবদি গতকাল বাংলাদেশ ও হাসিনাকে নিয়ে একটা ‘নিচা দেখানো’ [derogatory] লেখা লিখেছেন। তবে কিছু জায়গা খুবই আপত্তিজনক ও অপমানসুচক। এছাড়া ভুল তথ্য ও ভুল ব্যাখ্যায় তা মনগড়া ভাবে লেখা। এসব ছাড়াও লেখকের বাকি সমস্যাটা হিন্দুজাতিবাদের চোখ দিয়ে সব দেখলে যেমন হয় সেই সমস্যা। হিন্দুজাতিবাদের চোখে দেখার এই স্টাইল; এটার একটা ভাল নাম আছে যেটাকে বলে ‘সেকুলার প্রগতিশীল’। অর্থাৎ লেখক  আবদি আসলে এক ‘সেকুলার প্রগতিশীল’ সম্পাদক।

    হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদের চোখে ও চর্চায় ভারতের কোন মুসলমানকে তারা যেসব শর্তে তাদের সমাজে থাকতে চলতে বসবাস করতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা চাকরির প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে ও তাদের পাশে বসে তা করতে গেলে যে শর্তে এসব তারা করতে দেয় সেই শর্তেরই আনুষ্ঠানিক নাম হচ্ছে ‘সেকুলার ও প্রগতিশীল’। এই সেকুলার প্রগতিশীল রুল মানে হল হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সাজানো (orientation) ধর্মীয়-কালচারাল ভিত্তিতে সেট করা রীতিনীতির এক একচেটিয়া আধিপত্য নিশ্চিত করে এটা। ভারতের বা কলকাতার মুসলমানের সেকুলার প্রগতিশীল নিয়ম রুল ও শর্ত পালন সাপেক্ষেই একমাত্র ভারতীয় সমাজে থাকতে পারে। কাজেই সম্পাদক এসএনএম আবদিও এর বাইরে নন। এটাই তারও ছোট থেকে বেড়ে উঠার শর্ত ও স্মৃতি; যা এখন এই মোদি-যুগে তো আর বদলবার কোন সুযোগই নাই। আবদি সাহসী এবং ইনভেস্টিগেটিভ কাজ করা লোক।  মানে খুজে বের করে সামনে আনার মত সাহসী সাংবাদিক বটে। কিন্তু এখানে এসে তার সেই সাহসও অচল। কারণ এটা একার সাহসের প্রশ্ন নয়। এই উপমহাদেশ যেখানে কলুসিত করা হয়েছে সেই ১৮১৫ সাল থেকে। কিভাবে এটা এজায়গায় পৌছালো,এখান থেকে বের হবার পথ কী এনিয়ে কোন ইনভেস্টিগেশনে তিনি অচল অপারগ দেখা যাচ্ছে!

    বরং উলটা কারবার দেখা যাচ্ছে।যেমন  র [RAW] নিয়ে তিনি ভারতের হিন্দুত্ব -এই কট্টর জাতিবাদী ধারার সকলের মতই গর্বিত। বাংলাদেশে জবরদস্তিতে ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার প্রতিষ্ঠান হল এই র। তাই র এর কর্ম-পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের ততপরতা মানে তা বাংলাদেশের জন্য তা নাশকতা,স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ। দেশপ্রেমে বিগলিত আবদি এই র সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এমন ফুলা ফুলেছেন যে লিখছেন, “জাতিসংঘের ভেটোসদস্য-ওয়ালা পাঁচ রাষ্ট্রের শক্তি একসঙ্গে করলে যত বাংলাদেশে ভারতের শক্তি-সক্ষমতা এর চেয়েও বেশি” [India wields more influence in Bangladesh than the Security Council’s five permanent members put together.]। বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে উপর  র এর ক্ষমতার কথাই তিনি বলছেন আমরা দেখছি খুবই আহ্লাদিত হয়ে, হিন্দুত্ব জাতিবাদের জোসে, দেশপ্রেমিকতায়।

    “India wields more influence in Bangladesh than the Security Council’s five permanent members put together. The Research and Analysis Wing (RAW) is the most dreaded outfit in the neighbouring country surpassing even the brutally unforgiving RAB. Hasina lives in mortal fear of RAW. She knows that she will be toppled if she displeases India. So she has adopted the policy of pleasing India to retain power at any cost.”

    এরপরের বাক্যে এবার খোলাখুলি বলছেন, “ভারতের প্রতিবেশি দেশে রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং (RAW বা বাংলায় র) হল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের প্রতিষ্ঠান, যা এমনকি ক্ষমার অযোগ্য র‍্যাবের চেয়েও নৃশংস” [The Research and Analysis Wing (RAW) is the most dreaded outfit in the neighbouring country surpassing even the brutally unforgiving RAB]।

    এখানে এই সেকুলার ও প্রগতিশীল হিন্দুত্ববাদপ্রেমী আবদির কান্ড দেখেন। ভারতের র যদি বাংলাদেশের র‍্যাবের চেয়েও নৃশংসতায় ছাড়িয়ে যাওয়া সংগঠন হয় আর সেক্ষেত্রে তাতে  র‍্যাব ক্ষমার অযোগ্য [unforgiving] হলে দেশপ্রেমি আবদির কাছে র RAW কেমন প্রতিষ্ঠান হয়ে দাড়ালো? দেশপ্রেমে ডুবে আবদির এদিকটার কথা খেয়াল নাই। তার কাছে র হল প্রশংসার ও আদরণীয় প্রতিষ্ঠান।

    তাঁর এরপরের বাক্য তাঁর তো বটেই মোদী সরকারেরও অনেক কিছুর স্বীকারোক্তি। সব কথার এককথা এই বাক্য। আবদি বলছেন “হাসিনা র এর হাতে মরবার ভয়ে (মরটাল ফিয়ার) জীবন কাটাচ্ছেন” [Hasina lives in mortal fear of RAW.]। বুঝা যাচ্ছে আবদির এমন কেউ নাই খুবই বন্ধুহীন যে তাঁকে বলে দেয় যে এভাবে লেখা যায় না। এতে নিজের বিরুদ্ধেই লেখা হয়ে যায়।

    তামাশার কথা হচ্ছে আবদি এতই দেশপ্রেমে আপ্লুত, বীরত্বের কথা ভেবে মসগুল যে তিনি বুঝতেই পারছেন না যে তিনি এক অপরাধীর স্বদেশের-অপরাধের স্টেটমেন্ট বা আত্মস্বীকারোক্তি দিয়ে ফেলছেন। অথচ তাঁর সে খবরই নাই। এর মানে হল  র  আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হবু গুপ্তঘাতক আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই গুপ্তঘাতকের ভয়ে সিটিয়ে আছেন। আর জার্নালিস্ট আবদি আমাদেরকে নিজে লিখে এই স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন!  বা! থ্যাঙ্কু আবদি! খুব সুন্দর করে আমরা আবদির খুবই দেশপ্রেমিকতার কাহিনী জানলাম বটে!

    পরের দুই বাক্য আরো স্পষ্টিকরণ বক্তব্য। বলছেন “হাসিনা জানেন তিনি ভারতকে সন্তুষ্ট করে না রাখতে পারলে ক্ষমতাচ্যুত হবেন! তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে হাসিনা ভারতকে সন্তুষ্ট করে রাখার নীতি-পলিসি নিয়েছেন” [She knows that she will be toppled if she displeases India. So she has adopted the policy of pleasing India to retain power at any cost.] ।

    বুঝা গেল এক দগদগে হিন্দুত্ববাদের দেশপ্রেম ছাড়া তিনি জীবনে আর কিছু শিখেন নাই। আর তিনি তার ভারত সরকারের বাংলাদেশের প্রতি অপততপরতা-গুলো সম্পর্কে ভালই ওয়াকেবহাল!

    এক বিরাট জট খুলে গেলঃ
    তার মানে আমাদের জন্য এক বিরাট জট খুলে গেল। গত দুর্গাপুজায় কুমিল্লা কাহিনী, যেটা ইকবাল হোসেন এর কোরান শরীফ রেখে আসা, গদা কাধে বীরত্বে ফিরে আসা আর শেষে তার নিজেরই মুসলমান ভাইদেরকে প্রতিবাদে নেমে আসার উস্কানি – এসবটা নিয়ে ১২টা ক্যামেরা লাইভ ফুটেজ সংগ্রহ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রমাণিত স্টোরি, যেটা মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সবাই জেনে গেছি। এখন বাকি থেকে গেছে ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে এসাইনমেন্ট দাতা শক্তিটা কে? তা জানা।

    এখন আমরা সম্ভবত বলতে পারি আবদি আমাদের কে বলছেন এই শক্তিটা হল  ‘র’। এমন শক্তিধরই নাশকতা বা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করতে পারে, কারণ,১। এ’শক্তি বাংলাদেশে ভেটোসদস্য-ওয়ালা পাঁচ রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ২। এ’শক্তি বাংলাদেশে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের নাম, এক প্রতিষ্ঠান। যা এমনকি ক্ষমার-অযোগ্য র‍্যাবের চেয়েও বেশি নৃশংস। ৩। হাসিনা র-এর হাতে মরবার ভয়ে মরটাল ফিয়ারে [mortal fear] দিন কাটাচ্ছেন। ৪। হাসিনা এই গুপ্তঘাতকের হাতে মরবার ভয়ে ভারতকে ক্রমাগত সন্তুষ্ট করেই টিকে আছেন ও চলেছেন।

     

    অতএব ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে এসাইনমেন্ট দাতা শক্তিটাই RAW বা বাংলায় ‘র’। এই অপততপরতা বা অ-কাজ সে করতে পেরেছে এক সহজ ফর্মুলায় যে মন্দিরে কোরান শরীফ মানেই তা হিন্দুদের কাজ বলে ভাড়াটে কিছু মুসলমানকে দিয়েই উস্কানি তোলা।  আবার এরাই এর মানে দিয়েছে এটাই হিন্দুদের হাতে কোরান শরীফের অবমাননা। অথচ এটা যে ‘হিন্দুদের কাজ’ না হয়ে, ইকবাল হোসেন এন্ড গঙদের কাজ হতে পারে এবং হয়েছে – এবং ইকবালদের পিছনের শক্তি যে আবার বিদেশি ‘হিন্দুরাই’ হতে পারে, র নিজেই হতে পারে, এসব নিয়ে চিন্তা করতে কেউ চায় নাই। মনে হতে পারে যারা রাস্তায় কথিত সাম্প্রদায়িকতা লড়েছে এরা “অশিক্ষিত” মুসলমান তাই এসব  বুঝেন নাই। না বভুঝেই করেছে। তাই কী? না তা একেবারেই মিথ্যা কথা।

    হিন্দুদের মন্দির বা মুর্তি ভাঙলে তা মুসলমানদের কাজ না হয়ে যায় না। এই হল গত দুশ বছরের অনুমান। অন্যের মুর্তি বা মসজিদ ভেঙ্গেও যে অন্যের উপর দোষ চাপানো সম্ভব অতএব আমাদের ফ্যাক্টসে যেতে হবে সবার আগে। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনুমান যেটাকে এখনও সত্যি কিনা তা নিয়ে কেউ ভেঙ্গে খুলে দেখতে যাচাইয়ে রাজি না। তাই কুমিল্লার ঘটনায় শহুরে আর শিক্ষিত পড়ালেখাওয়ালারা আগাম মুখস্ত বলে গেছেন এটা “মৌলবাদীদের” কাজ। কেউ আরও আগেবাড়িয়ে এটা ‘জঙ্গীবাদের’ কাজ বলেছেন।

    এককথায়, এটা সংগঠিত মুসলমানের কাজ,আগাম এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করেছে শিক্ষিতরাই। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলো যেমন। সাথে বিবৃতিদাতারাও আছে। তাদের একটা মুখস্ত শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িকতা’, মানে হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল। এরা সেই ফর্মুলায় ফেলে চোখ বন্ধ করে মুসলমান বা ইসলামি রাজনীতিকদের দায়ী করছেন। অথচ এতে যে এই শিক্ষক সমিতির নেতাদের পছন্দের দল ও নেত্রী হাসিনাও দায়ী হচ্ছেন তাতেও তারা কেয়ার করছেন না। এতই তাদের হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীল পরিচয়ের প্রতি লোভ ও নেক।

    এমনকি আবদি যেখানে বলছেন হাসিনা ‘র’ এর ভয়ে পালিয়ে কাপতেছেন,যেকোনভাবে ভারতকে সন্তুষ্টি করতে লেগে আছেন! অথচ  তাতে বাংলাদেশের সেকুলার ও প্রগতিশীল পরিচয়ের জগতে কোন বিকার নাই। হাসিনার দুর্ভাগ্য এটাই! অন্তত আবদিও তো হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীলই! তাই না? যদিও এসব শিক্ষক সমিতি বা সাথে ৪৭ জনএর বিবৃতিবাজরা জেনে অথবা না জেনে কিন্তু ইতোমধ্যেই হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়ে ইকবাক হোসেন এন্ড গঙদের পিছনের নেতাদের হাত আকড়ে ধরে নিয়েছে।

    বেচারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই চিৎকার করে ভারতের বুঝবার মত ভাষায় বলছেন, Attack on Hindus not communal issue, but conspiracy, – যা ভারতের সব প্রধান পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তবু ভারতের কেউই হাসিনা ও তার মন্ত্রীদের কথা আমল করছে না। সবাই এটা হিন্দু-মুসলমানের কথিত সাম্প্রদায়িকতার ক্যাচাল, এমন মুখস্ত প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে যেতে রাজি হয় নাই। দেখা যাচ্ছে র’ এর এই ব্যাখ্যা হাসিনা ও মন্ত্রীদের হারিয়ে দিয়েছে। অবশ্য  বাংলাদেশেও হাসিনা ও মন্ত্রীদের বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব আছে অনেক আগে থেকেই। এরা এরই সুযোগটা নিয়েছে এমনকি আওয়ামি দলীয় শিক্ষক সমিতিও হাসিনা ও মন্ত্রীদের পক্ষে নাই; তারা র এর অবস্থানের পক্ষে দাড়িয়ে গেছে।

    আবদিও সেকাজটাই করেছেন। তিনি হাসিনাকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আর্ডেন্ট এর মত হতে পারেন নাই বলে সমালোচনা করেছেন। মানে আবদি বলতে চাইছেন, হাসিনারও ব্যাপারটাকে কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতার’ গল্পের ফ্রেমে ফেলে ইকবাক হোসেন এন্ড গঙদের পিছনে যারা আছে,যাদেরকে ‘মৌলবাদী’ বা ‘জঙ্গি’ (যে শব্দগুলো একটা হিন্দুত্ববাদী সেকুলার ও প্রগতিশীল মন শুনতে পছন্দ করে) বলে হাসিনার এদের নিন্দা করা উচিত ছিল। অর্থাৎ হাসিনা যতই বলেন এটা not communal issue, but conspiracy সেটা আবদিও তা শুনতে রাজি না।

    অথচ এত সাহসী* সাংবাদিক আবদি কিন্তু দেখেনই নাই যে হাসিনা সরাসরি মোদীকে হুশিয়ারী দিয়েছেন অন্তত বিবিসি তা যতটা সম্ভব স্পষ্ট করে ছেপেছে? এটা আবদি এড়িয়ে গেছেন কেন? দেশপ্রেমে? হাসিনা মোদিকে দায়ী করেছে বলে? তাই আপনার জন্য রিস্ক হয়ে যায়? এর মানে আপনি মোদীকে সার্ভিস দিতেই কী এই লেখা লিখেছেন? এমন বহু প্রশ্ন উঠতে পারে।

    একারণেই একথাটাই আমি বলছি যে যতই সাহসী মেডেল পাওয়া হন না কেন, ভারতীয় মুসলমানদের হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীলই থাকতে হয়!

    সবশেষে একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। তাহল, আবদি বাংলাদেশের বা দুনিয়ার ইসলামি রাজনৈতিক ধারাগুলো সম্পর্কে ধারণায় সীমাহীন অজ্ঞানতা,এটা পীড়াদায়ক! এসম্পর্কে ভারতের একজন সাধারণ হিন্দুর যে ধারণা আপনার ধারণা এর উর্ধে না। আপনি সাহসী জার্ণালিস্ট আর অন্তত পারিবারিক পরিচয়ে মুসলমান  – অন্তত এটুকুর খাতিরে আপনার নুন্যতম জানাশুনা আছে মানুষ যেটাই আশা করবে। আপনি ভারতীয় “হিন্দুজাতিবাদি সেকুলার ও প্রগতিশীল” বয়ানে আটকে থেকে নিজের কেরিয়ারের সীমা টানতে চাইলে কে ঠেকাবে। অন্তত একাদেমিক ভাবে হলেও তো আপনাকে জানতেই হবে। অথচ ইদানিং আপনার ট্রেন্ড হল এশিয়ান বিদেশি পত্রিকার সাথে কাজ করা, লেখা দেয়া। যেমন আমরা দেখছি আপনি অহরহ ব্যবহার করেছেন ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ এই শব্দটা। এটা না-বুঝ অবুঝ এক ঘৃণাবাচক শব্দ। অথচ কেরিয়ারে নুন্যতম সিরিয়াস কথিত সেকুলার ও প্রগতিশীলরাই  এখন বুঝে গেছে এই শব্দ দুহাজার সালের আগের, মানে গত শতকের। চলতি শতকে নাইন-ইলেভেনের পরে এনিয়ে নতুন শব্দ ধারণা পশ্চিমাজগতই এনেছে। যেগুলোও আবার এখন (২০২১ সালে এসে আফগান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরে) চ্যালেঞ্জের মুখে। যেমন আমেরিকান থিঙ্কট্যাংক ফেলোরাই এখন প্রকাশ্যে নিজের আর্টিকেলে ‘তথাকথিত ওয়ার অন টেরর’ বলছে। অর্থাত বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’ এর দায় নিচ্ছেন না;দায় আমেরিকান প্রশাসনকে দিয়ে সরে যেতে চাইছেন।

    আপনি আবদি আবার হেফাজত নিয়ে কথা তুলতে গেছেন। এতে আপনার অজ্ঞানতা আরও ফেটে প্রকাশিত হয়েছে। আগেই বল্লেছি আপনি বাংলাদেশের ইসলামি ধারাগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ। পলিটিক্যাল টার্ণগুলো সম্পর্কেও। ফলে আন্দাজে ভারতের হিন্দুমনের উপর দাঁড়িয়ে অনুমানে কিছু বললে তা আপনার বিরুদ্ধেই যাবে। ভারত সরকার হাসিনা হেফাজতের সাথে ডিলিং (আমি সম্পর্ক বলি নাই) একেবারেই পছন্দ করে নাই। এর মানে আপনাকেও মোদির পো ধরতে হবে? নাকি ইন্ডেরপেন্ডেন্টলি ব্যাপারটা বুঝতে হবে? প্রশ্নটা খারাপ ভালোর চেয়েও কেন এমন হয়েছে সেটা বুঝাই আপনার প্রফেশনের দিক থেকে উপযুক্ত করণীয় হতে পারত।

    শেষ কথাঃ
    ইতিহাস বলে, বিশ শতকে একটা মুসলিম জাতিবাদ অথবা  একালে “সারা দুনিয়াকে কেবল মুসলমানের দুনিয়া বানিয়ে”  রাজনীতিতে মুসলমানেরা নেমেছে নিজে নিজে নয়। বেকুব অন্যেরা তাদের এভাবে নামতে বাধ্য করেছে।  ইতিহাসে দুবার এমন ঘটেছে।

    একঃ ভারতের হিন্দুনেতারা নিজেদের খুবই বুদ্ধিমান আর চালাক মনে করে জবরদস্তিতে একটা হিন্দু জাতিবাদের ভারত কায়েম বা হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের ভারত কায়েমের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেটা ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্ম থেকেই। যদিও এর আদি উদ্যোগ চিহ্ন খুঁজতে আপনাকে ১৮১৫ সালে যেতে হবে। অথচ হিন্দুনেতারা কেউ বুঝেন নাই যে এটা আত্মঘাতি। তাদের এই হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের কায়েমের চিন্তা এই হিন্দুত্ববাদের ভিত্তি খাড়া করা – এটাই মুসলমানদেরকেও এক মুসলমান জাতিরাষ্ট্র গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে বাধ্য করবে। হিন্দু জাতিরাষ্ট্র চিন্তা এক মুসলমান জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার জনক হবে; এথেকে মুসলমান মনে মুসলমান- জাতিরাষ্ট্র চিন্তা ডেকে আনবে। এবং ঠিক তাই হয়েছিল। আমরা জিন্নাহর হাত ধরে ও মুসলিম লীগ গড়ে নিয়ে পাকিস্তান কায়েম করে নিয়েছিলাম। এখন কমিউনিস্ট আর হিন্দুত্ববাদী মুসলমান-ঘৃণার মনগুলো জিন্নাহকে দোষারোপ করে নিজেকে বাচানোর চেষ্টা করে চলে।

    দুইঃ ঠিক প্রায় একইভাবে প্রেসিডেন্ট বুশ মনে করেছিলেন সোভিয়েত পতনের পরের দুনিয়া একমেরুর দেশ হয়ে গেছে। তিনি এক বিরাট কুতুব। ফলে কেউ তাকে বলার কিছু নাই। এমন ভেবে নাইন-ইলেভেনের হামলার প্রতিশোধের উছিলায় নিজেকে সীমাহীন ক্ষমতাধর ভেবে যা করলেন তা দেখতে আফগানিস্তানে হামলা। কিন্তু ইভেনজেলিক বুশ এর অর্থ দিলেন যে,আমেরিকান আপনারা মুসলমানদের সাথে আর আমেরিকায় থাকবেন না। আর পারলে অন্যান্য দেশেও। মুসলমান – এরা সবাই নাকি আমেরিকার জন্য সন্দেহজনক।  অথচ টেরও পেলেন না  এতে নিজের জন্য কী ক্ষতিটা করলেন। এতে বুশ আসলে প্রকারন্তরে মুসলমানদেরকে বলে দিলেন মুসলমান তোমরাও এমন একটা দুনিয়ার কথা কল্পনা কর যেখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ নাই। এটাই গ্লোবাল খলিফা-ইজম কায়েমের চিন্তা। অথচ এখন আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম বলছে এরা জঙ্গীবাদ, টেরর। এরা ইনক্লুসিভ না। আরও কত কী? দোষের শেষ নাই। আর ভারত ২০০২ সালে থেকে বুশের এই টেররিজমের সাথে হাত মিলিয়েছে। এতে বুশ  ভারতের সেই পুরান পাপ “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” সাথে যা ততদিনে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ হয়ে গেছে তার সাথে নিজের টেররিজমের বয়ানের মুসলমানবিদ্বেষ – এই দুই বয়ান গাটছাড়া বেধেছেন। এছাড়া কাশ্মীরের ভুল এবং অন্যায়ের উপর চাদর ঢাকতে এটাই বাজপেয়ি করেছিলেন। ফলাফল আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি।

    এজন্যই এক বাণী বা তত্ব বলে, তত্বটা হলঃ
    আপনার এনিমি কেমন হবে সেটা কিন্তু আপনিই আকার দেন! তাই নিজের আচার আচরণ চিন্তা সম্পর্কে সাবধান। কারণ, এগুলাই আপনার শত্রু কেমন হবে সেই আকার বৈশিষ্ঠের নির্মাতা!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    ২৮ অক্টোবর ২০২১
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [ আমার এই লেখাটা  আর কোথাও ছাপা হয় নাই।]

  • মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ

     

    মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ 

    গৌতম দাস

    ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    [সার-সংক্ষেপঃ  আরএসএস প্রধান এই মোহন ভাগবত, ইনার দাবি মুসলমানেরা নাকি বেশি পয়দা করে। এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে ধর্মীয় জনসংখ্যায়  ভারসাম্যহীনতা মানে কী? একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? দেশে হিন্দু-মুসলমান কী সমান থাকতেই হবে? কেন? ইহা কি বস্তু? যে না থাকলে কী ক্ষতি? যদি নাগরিক মাত্রই সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয় তো উনার সমস্যা কী?
    আর এই মোহন ভাগবত তিনি কে?  কোন নবাব বা দেশের কোন মালকিন উনি? তার অনুমতি নিয়ে কী মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে নাকি? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন?
    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে – এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? উনি কী দিয়ে বুঝেছেন, মেপেছেন যে কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন জনসংখ্যা বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার ভারসাম্য বলে কোন বস্তু পরিমাপ করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন? ইউজলেস লুজার সব!]

     

    There has been attempt to increase Muslim population and turn India into Pakistan: Mohan Bhagwat

     

     

    প্রধানমন্ত্রী মোদী কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন? ভারতের আগামী নির্বাচন মানে প্রধানমন্ত্রিত্ব নির্ধারণের নির্বাচন বা চলতি ভাষায় অনেকে একে ‘কেন্দ্রের’ নির্বাচন বলে। আর আনুষ্ঠানিক ভাষায় তা ১৮তম “লোকসভার” নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের শেষে ফলাফল হয়ে যাওয়ার কথা ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে, এই হলো শিডিউল।

    অনেকের মনে হতে পারে এখনো সে তো প্রায় আড়াই বছর মানে অনেক দূরে। না, ঠিক দূরে না। ভারতের ভোটের হিসাবে আগামী মার্চ মাস – সেটা হল অনেকটা আমেরিকার মিড-টার্মের মত। আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের চার বছর টার্মের মধ্যে মাঝামাঝি, ঠিক দুই বছরের সময় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংসদের সব আসনেরই নতুন নির্বাচন হয়। আর সাথে সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনেও নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ্টাই মিড-টার্ম নির্বাচন। এর ফলাফল যাই আসুক প্রেসিডেন্ট স্বপদেই থেকে যাবেন, কিছুই হবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে মানুষের মনোভাব বোঝা যাবে, যেটা পরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট বা তার দলের ভবিষ্যত কেমন এর ইঙ্গিত দিবে।

    ভারতের (এখনকার) ছোটবড় মিলিয়ে মোট ২৮ রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় হল উত্তরপ্রদেশ। এরাজ্য একাই কেন্দ্রের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৮০ আসনের; যেখানে এর পরের বড় বড় পাঁচ রাজ্যের আসন হল – ৪৮, ৪২, ৪০, ৩৯, ২৮ এরকম। মানে উত্তরপ্রদেশের পরে অন্য রাজ্যগুলো সবাই অনেক ছোট, প্রায় সবাই এর অর্ধেক আসনের নিচে। তাই উত্তরপ্রদেশের নিজ রাজ্য-নির্বাচন (যা প্রাদেশিক বা লেজিসলেটিভ) ভারতের মিড-টার্ম নির্বাচনের মত বলে মনে করা হয়।

    উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন আগামী বছর ২০২২ সালের মার্চে, ৪০৩ আসনের রাজ্য নির্বাচন হবে এটা। মনে করা হয় এ রাজ্যে মোদীর দল আগামী মার্চে এবারো জিতলে তা মোদীকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরতে সহায়তা করবে। এ ছাড়াও মনে করা হয়, ভারতের তথাকথিত কেন্দ্রের শাসন মানে হিন্দিভাষীর শাসন, উত্তরপ্রদেশের শাসন বা কালচারালি আর্য আধিপত্যের শাসন ইত্যাদি সব উত্তরপ্রদেশের সাথে যুক্ত।
    এখন উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ও শাসন বা আসলে নির্বাচন মানে হল যোগী আদিত্যনাথের দানবীয় নিপীড়নের মুখে দাঁড়ানো। তবুও উত্তরপ্রদেশে আগামী মার্চে কে জিতবে সেটা আজকের এলেখার কোনো ইস্যু নয়। এখানে আজ ইস্যু বা লেখার প্রসঙ্গ হল এখন থেকে সারা ভারতে আরএসএস-বিজেপির নির্বাচনী ইস্যু কী হতে যাচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা। কারণ সম্প্রতি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত “ভাস্ট ডিফারেন্স” বলে ফেটে পড়েছেন। তিনি গত শুক্রবার নাগপুরে (মহারাষ্ট্রে) বার্ষিক বিজয়াদশমী পালন উপলক্ষে বক্তৃতা রাখছিলেন।

    কিন্তু ‘ভাস্ট ডিফারেন্স’ মানে কী?
    ভাস্ট ডিফারেন্স বা ব্যাপক ফারাক বলতে কী কিসের ফারাক বুঝানো হয়েছে?  মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। এটা অনেক দিনের পুরানা এক  ইতরোচিত রেসিস্ট [racist] বা হিটলারি অভিযোগ; বিশেষত যখন আরএসএস-বিজেপির মনে হয় যুতসই অভিযোগের অভাব ঘটেছে, তখন এটা তারা আবার উঠায় আনে। স্বাধীন হওয়ার পর ভারতে এ’অভিযোগ প্রথম তুলেছিল ১৯৫১ সালে আসাম রাজ্য। সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে। তবে সারা অসমীয়া বা আসামিজ [Assamese] জনগোষ্ঠী করেছিল। সেই সময় থেকে (পূর্ব পাকিস্তান) বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষ বাঙালিরা মূলত তারা বুঝাত মুসলমানরা, আসামে অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ প্রথম জোরেশোরে ফোকাস উঠতে থাকে। পরে ট্রাইবাল বা পাহাড়িসহ সব অসমীয়া-জনগোষ্ঠী এক দিকে আর বাকিরা সবাই ‘বিদেশী’, এভাবে এক যুক্তিতে ভাগ করে সর্বাত্মক বিভেদ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা আর এদের কারো হাতে থাকেনি; অসমীয়া-জাতিবাদীদের চরম-উগ্র আন্দোলন হয়ে উঠেছিল। শেষে ১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক আপস-চুক্তি করেছিলেন এই শর্তে যে, তিনি “আসামে বিশেষ জনগণনা” ও প্রত্যেকের “নাগরিকত্ব চেক বা যাচাই” করে কথিত বিদেশী বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করে বের করার বন্দোবস্ত নেবেন। রাজীব গান্ধীর ভাষায় তিনি এই আপস না করলে আসাম ভারত থেকে আলাদা হয়ে যেত। তাই তিনি এমন আপস করেছিলেন। কিন্তু তিনি পরে এ নিয়ে কোনো বাস্তবায়নে যাননি। ফলে অসমীয়-জাতিবাদ আরো চরম উগ্র হয়ে উঠতে থাকে। আর তাদের এই উগ্রতার জোরে তারা একেবারেই নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আসামের “সব দুঃখের কারণ” হল বাংলাদেশের বাঙালি। (অথচ নেহেরুর  আসল ভয় হল আসাম ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চীনের অংশ হয়ে যেতে পারে অথবা অন্তত চীন আসামের উপর দিয়ে করিডোর নিতে পারলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এরপর বঙ্গোপসাগরকে বন্দর হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে যেতে পারে – এই ভয়ে তারা আসামকে সবসময়  যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল করে ফেলে রাখতে চেয়ে এসেছে। আর এটাই আসামের পিছিয়ে পড়া রাজ্য হয়ে থাকার মূল কারণ। ) তাই তাদের অসমীয়-জাতির জন্য জীবন দিয়ে ফেলতে পারে এমন চাওয়া অসমিজ ইন্টেলেকচুয়ালরা আদালতের মাধ্যমে ওই দাবি বাস্তবায়নে আগানোর বা বলা যায় এক সেমি-ষড়যন্ত্রের পথ ধরেন। এর এক কুতুব নেতা বলতে পারি আমরা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক রঞ্জন গোগই [Ranjan Gogoi], এই অসমিজের নাম করতে পারি। এক বেআইনি কাজকে তারা আইনি রূপ দিয়ে হালাল করেছেন বলা যায়।  বিচার বিভাগ গায়ের জোরে নির্বাহি বিভাগের কাজ হাতে তুলে নিয়েছিল। আসামের মাঠের নাগরিকত্ব যাচাই আদালতের কাজ ছিল না।  তবু তারা তাদের মুসলমান-ঘৃণা ও অনুপ্রবেশকারি তত্ব সত্য প্রমাণ করতে একাজ করেছিল। এবং তাতেও ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশীদের কথিত অনুপ্রবেশ তাদের সব দুঃখ ও সম্পদ হারানোর কারণ’ একথা তারা মাঠের গণনা ও শতভাগ নাগরিকত্ব পরীক্ষা করেও দেখেছেন – কথা সত্য নয়, প্রমাণ করতে পারেন নাই।
    বাস্তবে এই গণনা পরিচালিত হয়েছিল পুরোটাই আসামের কোনো প্রশাসন নয়, খোদ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। আর অন্য প্রদেশ (মধ্যপ্রদেশ) থেকে ক্যাডার অফিসার এনে আর মূলত বিচারক রঞ্জন গোগইয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং যখন এর শেষ ১৩ মাস তিনি  ভারতের চিফ জাস্টিস সেসময়ে। কিন্তু সব চেষ্টার পরও শোচনীয়ভাবে অসমীয়া-জাতিবাদীরা তাদের দাবির বাস্তবতা প্রমাণ করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতি ও ফলাফলে তারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বিজেপি (তখন রাজ্য সরকারে) প্রস্তাব করে মুখরক্ষার্থে আবার ১০-২০ শতাংশ বাংলাদেশসংলগ্ন আসাম সীমান্ত অংশে আবার গণনা করতে বিচারক রঞ্জন গোগই যেন এক আদালতের নির্দেশ জারি করে দেন। উদ্দেশ্য ছিল এবারের পুণঃগণনায় কারচুপি করে মুসলমানদের ‘অনাগরিক’ বলে বেছে বের করে দেয়া হবে। কিন্তু রঞ্জন গোগই  আর নোংরা  একাজে নিজেকে জড়াতে রাজি হননি। তিনি ওই প্রাপ্ত গণনাকেই ফাইনাল বলে রায় দেন। তাতে কিন্তু অসমীয় নেতা-পাবলিকেরাও এবার বিজেপি থেকে আলাদা হয়ে আন্দোলন শুরু করার চেষ্টা করে; কারণ তাদের বিভেদের পয়েন্ট হল, বিজেপি চাইছিল বাংলাদেশী সাধারণভাবে নয়, কেবল বাংলাদেশের কথিত মুসলমানদের বের করে দিতে নতুন কিছু করে। আর অসমিজরা বলছিল, তারা হিন্দু-মুসলমান সব বাংলাদেশীকে বের করতে চান, যা তাদের অরিজিনাল দাবি ছিল।

    এদিকে গত ২০১৯ সালে আসামে আবার রাজ্য নির্বাচন হয় এবং বিজেপি আবার ‘কোন জাদুমন্ত্রে’ ক্ষমতায় আসে। কারণ এই নির্বাচনের আগে অসমীয় ন্যাশলালিজম এত উগ্র হয়ে উঠেছিল খোদ বিজেপির বিরুদ্ধে যে মোদী পাঁচবার এসেও মিটিং করতে পারেন নাই, ফিরে গেছিলেন।  আর এবার নতুন চালে নতুন করে এবারের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। আর এসেই  এরই মধ্যে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, “মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। তাই ওই কথায় গত জুলাই মাসে আনন্দবাজার লিখেছিল, “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ বিধান সভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এমনকি আনন্দবাজারও ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যে লিখেছে, ‘তবে মুসলিম জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে বলে দাবি করলেও, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে দেখা যায়নি হিমন্তকে।’

    “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী অসম সরকারও। তার জন্য ১ হাজার ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ সোমবার বিধানসভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।”  – আনন্দবাজার ২০ জুলাই ২০২১।

    আর ওদিকে অসমীয়া দেশপ্রেমী ভাইয়েরা, তাদের কী খবর? তারা ক্রমেই এখনো ‘অসমীয়া জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Assamese culture superior to RSS ideology] – এই জাতিবাদের ঝাণ্ডা সবখানে উঁচিয়ে চলেছেন। কিন্তু বিজেপির বয়ান ও বাক্সে ঢুকে গেছেন সেটা এখন ভুলে আছেন। গত মাসে আসামের বৈধ-মুসলমান নাগরিককে প্রায় ছয় হাজার একরেরও বেশি বৈধ নিজ জমি থেকে মুখ্যমন্ত্রী তাদের উৎখাত করে দিয়েছেন। প্রথমে বলা হল শিবমন্দির বানাতে মুসলমানদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে দেখেন বিবিসির রিপোর্ট  আসাম: শিবমন্দির বানাতে মুসলিম উচ্ছেদ, বিক্ষোভে পুলিশের গুলি। পরে বলা হল যে না একটা কৃষি খামার করবে হাজার একরের।

    “বেশ কয়েক মাস ধরেই আলোচনা হচ্ছিল এই উচ্ছেদ আর তার পরের পুনর্বাসন নিয়ে। সরকারের দাবি এই জমি তাদের। গ্রামবাসীরা দখলকারী। তাই তাদের সরে যেতে হবে। “কেন এটা সরকারি জমি হবে? আমাদের পূর্বপুরুষরা উচিত দাম দিয়ে এই জমি কিনেছিল। সেই দলিলও আমাদের কাছে আছে,” বলছিলেন আজিরুন্নেসা নামের এক নারী।

    সরাসরি সেই হত্যার ক্লিপ আর বিবিসির সরেজমিন রিপোর্ট আপনারা দেখেছেন, যেখানে নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর বক্তব্য যেটা শিরোনাম করা হয়েছে যে, আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: ‘আমাদের দোষ একটাই – আমরা মুসলমান’ বলছিলেন ধলপুরের এক গ্রামবাসী।

    এই হলো হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যার ‘ভাস্ট ডিফারেন্সের’ মানে, ব্যাপক ফারাকের গল্প। এত দিন ভাবা হয়েছিল, বিজেপি এমন করে আসামে বা বিক্ষিপ্তভাবে উত্তরপ্রদেশে যোগীর রাজ্যে জোর করে ভ্যাসেকটমি করা বা ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামানো হতে পারে।

    কিন্তু না। এটা আর শুধু বিজেপির না, এটা এখন একেবারে আরএসএসের কেন্দ্রীয় প্রোগ্রাম, মানে এটাই আরএসএস-বিজেপির প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির মূল কর্মসূচি। সে কথাই ঘোষণা করেছেন মোহন ভাগবত গত শুক্রবার।

    ‘Vast differences’ in growth rate of religions
    ভাস্ট ডিফারেন্স থিওরি।  ভাগবত গত ২০১৫ সালের তাদেরই এক পুরনো প্রস্তাব বের করে এনেছেন, বলেছেন এটি নাকি তাদের ‘পপুলেশন পলিসি’। তবে তিনি মোদি সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি’ বানাতে বলছেন। আর দাবি করছেন, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ জনগোষ্ঠীর জন্মহার বৃদ্ধির ব্যাপক ফারাক, অনুপ্রবেশ ও ধর্মান্তকরণের ফলে আমাদের ধর্মীয় জনসংখ্যার অনুপাত ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। বিশেষত সীমান্ত এলাকাগুলোতে, যা আমাদের দেশের ঐক্য, সংহতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে ‘অনুপ্রবেশ ও উচ্চ জন্মহার এমন দুভাবেই মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ভারতের ঐক্যের জন্য বিরাট হুমকি’। 

    Friday called for a National Register of Citizens (NRC) and a review of the population policy, pointing out “demographic imbalance” due to “vast differences” in the growth rate of different religions and infiltration in border areas.

    “আমাদের জনসংখ্যার মধ্যে ভারতীয় ধর্মীয় অরিজিন যারা এরা ছিল ৮৮ শতাংশ, যা ১৯৫১-২০১১ এ সময়ের মধ্যে নেমে এসেছে ৮৩.৮ শতাংশে। অথচ এর বিপরীতে মুসলিম জনসংখ্যা যা আগে ছিল ৯.৮ শতাংশ বেড়ে হয়ে গেছে ১৪.২৩ শতাংশ” । এ ছাড়াও শেষে মোহন ভাগবত যা বলেছেন, তাতে তারই মানসিক স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। তিনি বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনের পরে সে সহিংসতা শুরু হয়েছে এবং আর তাতে রাজ্য সরকার যে বর্বরতা ও জনসংখ্যার (হিন্দু-মুসলমান) ভারসাম্যহীনতাকে তোয়াজ করেছে, তাতে হিন্দুদের দুস্থ অবস্থা উঠেছে চরমে।’ এখানে উদ্ধৃতিগুলো নিতে হয়েছে শনিবারের ভারতের ওয়েব ম্যাগাজিন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে।

    This resolution says the share of religions of “Bharatiya origin” — including Hinduism, Buddhism, Jainism and Sikhism and excluding Islam and Christianity — came down to 83.8 per cent in 2011 census from 88 per cent in 1951 while the Muslim population increased to 14.23 per cent from 9.8 per cent during that period.

    বাংলাদেশে পুজাঃ
    এদিকে বাংলাদেশের  দুর্গাপূজার শেষ দুই দিন স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে পারেনি। আবার আমাদের মুসলমান জনগোষ্ঠীও প্রচণ্ড অস্বস্তিতে, তারাও ক্ষুব্ধ; তাদের জন্যও ধর্মীয় অবমাননাকর ঘটনার জন্য। আবার সরকারও খাচ্ছে হিমশিম; আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে তাদের নাজেহাল অবস্থা হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কোনোপক্ষই সন্তুষ্ট নয় একেবারেই। এক কথায় বললে, কোথাও একটা স্যাবোটাজ হয়েছে,আমাদের আন্তঃজনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা ছিটানো হয়েছে, যা সরকারের অনুমানের নিয়ন্ত্রণসীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই একটি লজ্জায় পড়ে গেছি। আমাদের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক সমসাময়িককালে এমন খারাপ হয়নি এবং দুর্দশায় কখনো পড়েনি। এরই মধ্যে আমরা দেখলাম বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারী একটা স্পষ্ট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি লিখিতভাবে (যে চিঠি বিবিসিতে প্রকাশিত) প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে বাংলাদেশে ‘হস্তক্ষেপ করতে’ আহ্বান রেখেছেন!  অর্থাৎ সকালে মন্দিরে কোরান শরীফ রেখে আসার ঘটনা আর সন্ধ্যায় মোদীকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের জন্য ডাক দেয়া?
    তার নিশ্চয় অজানা নয় যে, আরেকটা দেশে হস্তক্ষেপ করতে প্রকাশ্যে আহ্বান জানানোর অর্থ-তাৎপর্য ও এর দায়-দায়িত্ব কী? দেখা যাচ্ছে তিনি আগে থেকেই যেন সব জানতেন। তবে বিবিসি তার প্রপাগান্ডা করতে রাজি হয়নি না হলেও তাকে দুরেও ফেলে নাই। তার আহবানের চিঠি ঠিকই প্রচার করে দিয়েছে! তা হলে বাংলাদেশের সহিংসতায় তার সংশ্লিষ্টতা কী সেটি পুরাটা এখন খুলে বলার দায় বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারীর। আর বাংলাদেশের উচিত হবে এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করা।

    যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, মোদির আগামী নির্বাচনে জয় না পাওয়া নিয়ে তিনি কি নিশ্চিত? না হলে মুসলমানরা নাকি ‘বেশি বাচ্চা পয়দা’ করে অথবা জনসংখ্যা ‘ভারসাম্যহীন’- এসব কথা যে রেসিজম বর্ণবাদিতা, তা জেনেও এমন কথাগুলো তাদের র‌্যাংক অ্যান্ড ফাইল- আরএসএস থেকে বিজেপি সব নেতাকর্মী মুখ্যমন্ত্রী মরিয়া হয়ে উচ্চারণ করতে শুরু করেছে কেন? সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ এমন কথা বলতে পারে না।

    এই মোহন ভাগবত, এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা মানে কী? মানে একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? এটা কি বস্তু?

    মোহন ভাগবত তিনি কে? তার অনুমতি নিয়ে মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন? ইউজলেস লুজার সব!

    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে- এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? ইনি কী দিয়ে বুঝেছেন, কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার পরিমাপক করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন?

    ভারতের কনস্টিটিউশনে বা কোন আইন অনুযায়ী, মুসলমানরা কথিত কোন ভারসাম্য ভেঙেছে? আর সেটি তিনি ডিকটেট করার কে? তিনি কোন মহারাজা?
    মোহন ভাগবত কি জানেন ভারতের সরকারি ভাষ্য হলো, মুসলমানদের জনসংখ্যা বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক?

    আবার এসমস্ত বক্তব্যই তো এক রেসিস্ট বক্তব্য। তিনি নিজেই মনেও হচ্ছে, জলাতঙ্ক রোগীর মতো মুসলমান-আতঙ্কে ভুগছেন! এত ভয়াবহ অসুস্থতা! এটি তো হিটলারের অন্য জাতি-ঘৃণা বা অন্য জাতি-আতঙ্ক এসবেরই কপি। ভারতের কনস্টিটিউশনাল কোর্টের উচিত হবে এই দাঙ্গাবাজ অসুস্থ উসকানিদাতাকে থামানো, স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্তত কিছু পদক্ষেপ নেয়া। নইলে এসব অসুস্থ লোক এ অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেবে, নিজেরাও পুড়ে মরবে। াশা করি ভারতে কিছু সুস্থ লোক এখনো বেঁচে আছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৬ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বেশি পয়দার বিরুদ্ধে মোদির সংগ্রাম“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

     অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

    গৌতম দাস

    ০৭ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৫৬ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3KC

     

     

    গত পনেরো আগস্ট ছিল এক আজব ঘটনার দিন। বিগত ২০ বছর ধরে  (তখন থেকে) এক মেরুর দুনিয়ায় মহাপরাক্রমশালী আমেরিকা, আফগানিস্তানে এক পুতুল সরকার গঠন করে শাসন করে আসছিল। প্রথমে কারজাই পরে গণি সরকার এভাবে। কিন্তু এবছর, যার প্রটেকশনে সেই পুতুল সরকার  ক্ষমতায় ছিল সেই আমেরিকা নিজেকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর তাতে, ‘”তালেবানেরা কাবুল দখলে আসছে’ এই আওয়াজ শুনেই গনি সরকার শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর সত্যিই তালেবান যোদ্ধারা শহর দখল করে এবং ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছিল ঐ ১৫ আগস্ট ২০২১।

    আসলে কোন সরকার যখন তাকে উৎখাত করতে কেউ এগিয়ে আসছে শুনে নিজ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং তার সেনাবাহিনীও কোনও প্রতিরোধে এগিয়ে আসে না, এটাই আসলে মুরোদহীন সরকারের উদাহরণ। কারণ, যার নিজেকে রক্ষার মুরোদ নাই সেটা তো কোন সরকারই নয়!

    সরকারের বৈধতার প্রথম ধাপ হল মুরোদ, যে মুরোদের খাঁড়া অর্থ গায়ের জোর, নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা। এরপরের ধাপ হল, জনসমর্থনে ঐ সরকারের পক্ষে জন-অনুমোদন নেয়া। তবেই সেটা পুরাপুরি এক বৈধ সরকার হয়। যদিও এরপরেও আরেকটা ধাপ থেকে যায় যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি বা জাতিসংঘের স্বীকৃতি। তবে সে পর্যায়ে যাবার আগেই, আশরাফ গনি সরকারের নিজেকে রক্ষার মুরোদ ছিল না, এই হলো গোড়ার সমস্যা।

    ট্রাম্পের আমলে এসে আমেরিকা আফগানিস্তান ‘ফেলে’ পালাতে চাচ্ছিল। তাই আফগানিস্তান থেকে পালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই (আপন ঘোষিত শত্রু) তালেবান গোষ্ঠির সাথেই এক আপোষনামা রচনার চেষ্টা করেছিল। আর তাতে সফল হলে এক চুক্তি সই করেছিলেন গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। কিন্তু ট্রাম্প এই চুক্তি করেছিলেন গনি সরকারকে উপেক্ষা করে, তাকে এই চুক্তির কোনও পক্ষই না করেই। কারণ  আফগান পুতুল সরকারকে এর মধ্যে আনা যাবে – এটাই ছিল তালেবানের ট্রাম্পকে দেয়া পুর্বশর্ত। আর অসহায় ট্রাম্প নিরুপায় হলে এই শর্ত মেনেই চুক্তিটা করেছিল।

    এই যে গনি সরকারকে উপেক্ষা করে তালেবানের সাথে চুক্তি সই করা – আসলে সেদিন থেকে এর সোজা মানে হয়ে গিয়েছিল; আমেরিকান প্রটেকশনে তারা আর পুতুল সরকারও থাকে না। সরাসরি বললে, বাস্তবত ওইদিন থেকে গনি সরকারকে আমেরিকাও আর কোন সরকার মানতে অস্বীকার ঘোষণা করে দিয়েছিল। যদিও এরপর থেকে কেউ গনি সরকারকে ঠেলে ফেলে দেয়া বা চ্যালেঞ্জ দেয়নি বলে বাইরে থেকে দেখে এটাকে আগের মতনই  এক সরকার মনে করেছিল। আর নিজস্বার্থ এই মোহে ছিল ভারত সরকারও।

    যদিও বাস্তবতা ছিল ট্রাম্প গনি সরকারকে এতিম করে ছেড়ে দিয়েছিল, কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল। গনি সরকারকে সাথে না রেখে কেবল তালেবানের সাথে চুক্তি করার মানেই তো হল ট্রাম্প স্বীকার করে নিয়েছিলেন গনি সরকার বলে কেউ নাই, তালেবান যোদ্ধারাই আফগান ক্ষমতার একমাত্র হকদার। অথচ ১৫ আগস্ট কাবুলে তালেবান যোদ্ধাদের প্রবেশের পরে  সবাই এমন ভান করতে থাকল যেন ঐদিনই বোধহয় প্রথম গনি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হল আর তালেবান ক্ষমতা পেল। এজন্য বলছি ১৫ আগস্ট হল এক আজব দিন! ভান আর ভনিতার দিন!

    এখন ভান করাদের মধ্যে ভারত সরকারকে আমরা শীর্ষে রাখতে পারি। কেন? কারণ তারাও আমেরিকান ক্ষমতার দিকে চেয়ে থাকা বা আমেরিকার আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখা পার্টি। অথচ এখন তারাও নিরুপায়। অতএব তারা ভান করছে বা মনে করছে যে গনি সরকারই “বৈধ সরকার”। তবে আমেরিকান ক্ষমতার আড়ালে বসে আফগানিস্তান থেকে যারা ব্যবসা আর প্রজেক্ট লুটছিল ভারত সরকার তাদের অন্যতম বলেই এই মিথ্যাকথার আড়ালে মুখ লুকানো ছাড়া এখন আর উপায় কী?

    কিন্তু আবার সাবধান! এখন সব অর্থেই কার্যত ‘গনি সরকার’ বলে আর কেউ নাই। কিন্তু এর মানে কি তাহলে আপনাতেই তালেবান বৈধ সরকার? অন্তত আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের বা জাতিসংঘের মেনে নেয়া অর্থে? অবশ্যই না। যদিও কার্যত তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায়।

    আর নিজেদেরকে বৈধ সরকার বলে খুঁটি গাড়তে বা অনুমোদন যোগাড় করতে যেসব বাধা তালেবানের সামনে এর তালিকাটাও ছোট না। যেমন-

    একঃ তালেবানেরা এখনও নিজেরাই ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক শপথ নিতে পারে নাই; শপথের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দেখাতে পারে নাই।

    দুইঃ সেই আনুষ্ঠানিকতায় আবার কাদের দাওয়াত দিবে, এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হল – দাওয়াত দিলেই সে দাওয়াতি আসবে এর নিশ্চয়তা এখনো নাই বলেই মনে হচ্ছে।

    তিনঃ দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ আছে এমন সত্য-মিথ্য অনুমান ছড়িয়েছে যেটা তাদের পক্ষে যাচ্ছে না। আর, ওদিকে শপথ অনুষ্ঠানও হতে দেখাতে পারছেনা বলে সেই অভ্যন্তরীণ আন্তঃ বিভেদের অনুমানই আরও পোক্ত হয়ে চলছে।

    চারঃ সর্বশেষ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো বা না-ভেটোসদস্য সবাই মিলে মোট ১৫ সদস্যের সমর্থনে জাতিসংঘের পাশ হওয়া এক প্রস্তাব যা আহবান রেখেছে,  আফগানিস্তানের সব পক্ষকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ[inclusive] ও মানবাধিকার রক্ষার পক্ষের এক সরকার গড়তে। এনিয়ে বিস্তারে আমার আগের লেখা এখানে।

    পাঁচঃ  অর্থাৎ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, বৃটেন ও ফ্রান্স – এই পাঁচ পরস্পরের স্বার্থবিরোধী ভেটোসদস্য একসাথে এই প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, যা খুব কম ঘটে থাকে, রেয়ার। আর বলা বাহুল্য এটা তাই তালেবানের  উপর খুবই শক্ত চাপ।

    ছয়ঃ আমাদের অনেকের ধারণা, কোন দেশে আমরা মুরোদে কুলালে যেমন ইচ্ছা তেমন কোনও সরকার গঠন করে বসতেই পারি, আর যেন যেমন ইচ্ছা তা চলতে চালাতেও পারি, আমারটাই ভাল, আমার ধর্মটাই বা শ্রেষ্ঠ মনে ঠাউরে সেই যুক্তিতে। কিন্তু এই অনুমান ভুল ও ভিত্তিহীন। একটা সমাজেও আমরা এভাবে টিকতে বা থাকতে পারব না। এছাড়া এটা উল্টা আমাদেরকেই একঘরে করে ফেলতে পারে। ফলে এমন চিন্তার কারণেও এনিয়ে একটা স্থবিরতা চলছে।

    সাত) মূল সমস্যা, তালেবান এক আমিরাত (আমীরের) সরকার-  অর্থাৎ আমিরাতে আফগান সরকার চাইছে। যদিও তারা জনপ্রতিনিধির সরকার না রাজা হবেন তা স্পষ্ট করতে পারছেন না। যদিও ঝোঁক রাজা বা আমীর হবার। [যদিও আমীর হলে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেবে না।]
    এই প্রসঙ্গ শেষ করার আগে  উপরের ছয় নম্বর পয়েন্টে যেটা ভুল অনুমান বলেছি সেটা কেন তা এখন নিচে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নিব।

    ঐ অনুমিত যুক্তি ভুল কেন?
    সমাজ মানেই আসলে পণ্য বিনিময়ের সমাজ। এই বিনিময় মানে আপনি যা উতপাদন করেছেন তা অন্য উতপাদকে দেওয়ার বিনিময়ে সেই উতপাদকের পণ্য পাওয়া-নেয়া ও ভোগ করা। এভাবে পরস্পর সকলে মিলেই এক পণ্য-বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো এটাই সমাজ। তাহলে সমাজ মানেই সেখানে পণ্য-বিনিময় আছে। আর এই পণ্য-বিনিময়ের ভিত্তিতে আমরা সমাজ হয়ে থাকি।
    এখন একটা নতুন কথা বলি।  এই যে আমরা পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় করতে রাজি হই বা জড়াই – এই বিশেষ কাজেরই আরেক অর্থ-তাতপর্য আছে।  যেমন মাইগ্রেশন [migration] মানে গ্রাম ছেড়ে কাজের খোঁজে কাছাকাছি শহর বা রাজধানীর দিকে বসবাসের জন্য রওনা দেয়া, এটাই মাইগ্রেশন।   এখন গরীব বা নদীভাঙনে পড়া লোক যখন কাছের কোন সমৃদ্ধ শহর বা রাজধানিতে প্রবেশ করে  তখন ঐ সমাজে সে বাইরের আর নতুন লোক। এমনকি হতে পারে সে হাতে কোন অর্থও নাই। তাহলে বিনিময় করবে কী করে?  আর বিনিময় না হওয়া মানে কিন্তু নতুন বা মাইগ্রেটেড হয়ে আসা লোকটা যে ঐ নতুন শহরে আছে এর অস্তিত্ব স্বীকৃত না হওয়া।  তাহলে কী হয় তখন?  কান খাড়া করে শুনেন তা হল, আমাদের সমাজে সাধারণত যা ঘটে,  কেউ নতুন আগত লোকটার কাহিনী শুনে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।  এভাবে এখন সম্পর্ক শুরু হবে। একজন সাহায্য করবে বা দিবে (ঠিক কোন সচেতন বিনিময়ে না হলেও) স্বেচ্ছায় আর গ্রহিতা লোকটাও স্বেচ্ছায় সবার জন্য দোয়া করবে। আর সারকথায় এভাবে পরস্পরকে সমাজে স্বীকার করে নিবে। এভাবেই আমাদের অলক্ষ্যে আমরা সমাজে পরস্পরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেই। তাহলে সমাজ মানে পণ্য বিনিময় সম্পর্ক। আর এমন বিনিময়ের ভিতর দিয়ে পরস্পরকে স্বীকার করে নেয়া। এ যেন স্বীকার করে নেয়া যে, হ্যা, তুমিও কিছু উতপাদন বা তৈরি করেছো মেনে নিলাম। এমনকি সময়ে বিনা বস্তুগত বিনিময়, সামাজিক দায় মিটাতে অন্যকে সাহায্য করা আর সর্বপরি সবার জন্য নিঃস্বার্থ দোয়া করা। এভাবেই সম্পর্ক তৈরি করা জড়ানো আর এর ভিতরেই মানুষের বসবাস। আর ঠিক এর উল্টাটাই হল কাউকে একঘরে করে।
    তাই কোন জনগোষ্ঠি নতুন করে রাষ্ট্র-সরকার মানে নতুন করে পারস্পরিক স্বীকৃতির আসর বসানো। আর এটারই সবচেয়ে বড় রূপ হল বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো। আর এর ট্রেন্ডটা হল, যতই দিন যাচ্ছে আমরা ততই আমরা চিনা-জানা তেমন নাই এমন দেশ-ভুমির মানুষের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি, নিজের স্বার্থেই।  তাই শুরু থেকেই যেমন ইচ্ছা তেমন করে চলতে চালাতেও পারি অবশ্যই তবে এটা আইডিয়েল [ideal]। মানে হল এটা  যতটা কল্পনার ততটাই তা বাস্তবে সুবিধার না, আর তা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন কল্পনা।
    সবশেষে, সার্ক নিয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব।

    সার্ক [SAARC]:
     এতদিন ভারত পাকিস্তানের ভয়ে সার্ককে অকেজো করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন তার ভয় এই অবস্থায় যদি ভারতকেই বাদ দিয়ে চীন সার্কে ঢুকে যায় আর সার্ককেই কার্যকর করে ফেলে! তাই ভারত এখন সার্ককেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়। তাই এখন প্রকৃত বাস্তবতাটা হল সার্ক নিয়ে ভারত যেদিকেই যাক, চীনেরই লাভ আর ভারতের ক্ষতিই হবে। মূল কারণ, ভারত চীনের সাথে তুলনাযোগ্যই নয়, কমপেটিবল নয়।
    সার্ক এই জোট নিয়ে কথা-আলোচনা যত দিন যাচ্ছে ততই কমে নাই হয়ে যাচ্ছে। অল্পকথায় একেবারেই এর মূল কারণ, ২০০১ সাল থেকে দুনিয়া নতুন অভিমুখ বা ঝোঁকে বইতে শুরু করানো হয়েছিল তাই।  ভারত বা আমেরিকার মত দেশের ভাষায় বললে এটাকে তারা শব্দে আকারে বলবে  “সন্ত্রাসবাদ” বা “ওয়ার অন টেরর”।  আসলে এসব দেশগুলো ভেবেছিল, “ওয়ার অন টেরর” এর নামে  “ইসলাম কোপানো” শুরু করলে তারা নিজেদের অপরাধ আড়ালে ফেলে দুনিয়াটাকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু আজ ২০ বছর পরের অভিজ্ঞতা বলছে সেটা ঘটেই নাই। উলটা সময়টা এখন ভারত ও আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের এখন কাফফারা দিবার সময়। কারণ তারা সমুলে হেরে  গেছে। আর আফগানিস্তান থেকে সেনা গুটিয়ে চলে আসা এর জলজ্যান্ত নমুনা।  এছাড়া  নতুন নতুন ক্ষত ও বিরোধ তৈরি করেছে তারা, সেসবের জন্য নতুন কাফফারা দিতে হবে। আর সবার উপরে এদের সবার সব ধরণের সক্ষমতাই এই প্রশ্নের সম্মুখীন ও পড়তির দিকে। তাই বুদ্ধিমানেরা কেউ কেউ আগেই পুণঃমুল্যায়নে বসে গেছে। কিন্তু না চাইতে যেসব নতুন ক্ষত তৈরি করেছে তার কী হবে?
    কথাটা বোধহয় এভাবে বলা যায়।  আগেই বলেছি এখানে “ইসলাম কোপানো” আর এর সুযোগ নেয়াটা দিয়ে শুরু হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল ইসলামি সমাজগুলোকে অস্বীকৃত আর চাপে মার্জিনালাইজ করে রাখলেই তারা জিতে যেতে পারবে। কিন্তু ২০ বছর পর দেখা যাচ্ছে ফল হয়েছে উলটা। আর তাতে দুটা ধারা তৈরি হয়েছে। একটা হল, গোণায় ধরা আর আপন করে নেয়া। পুর্ণ মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে সসম্মানে পাশে রাখা, পারস্পরিক সম-মর্যাদার গ্লোবাল সমাজ গড়ার পথে রওনা দেয়া। আর এর বিপরীতে আরেক ধারা হল, আমরা শ্রেষ্ঠ, এককালে সব আমাদেরই ছিল। তাই, ইসলামের নেতৃত্বে আগে আমাদের নয়া কিছু রাষ্ট্র গড়ে তোলা এরপর এর অধীনে দুনিয়াকে ঢেলে সাজানো।
    তবে ২০০১ সালের মূল পরিবর্তনের কৌশলগত কারণে আমেরিকা ভারতকে তোয়াজ করে একে চীনের বিরুদ্ধে খারা করেছে শুধু তাই না। পালটা পাকিস্তানকেই আমেরিকা নিজ সন্ত্রাসী হামলার লঞ্চিং প্যাড হিসাবে ব্যবহার করেছে আবার পাকিস্তানকেই সন্ত্রাসবাদী বলে দোষী দাবি করেছে। এই সুযোগে ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ক্ষমতায় উপরে এক সাধু রাষ্ট্রের ইমেজে বসার চেষ্টা করেছে। ফলে সেই থেকে এর প্রভাবে সার্কের ভিতরে ভারত আর পাকিস্তানকে নিজের সমান গণ্য করতে চায় নাই।  এটাই সার্কের অকার্যকর হয়ে পড়ার মূল কারণ।  সারকথায় সার্ক অকার্যকর হবার মুল কারণ  আমেরিকার নীতি। পাকিস্তানকে কোপের মধ্যে রাখা আর বিপরীতে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ভারতের তোয়াজে রাখা।
    এতে ভারত চেয়েছে সার্ক থেকে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাকিদেরকে নিয়ে নতুন জোট করা। সাথে অন্য নতুন কাউকে ঢুকানো। এতে ১৯৯৭ সালে গড়া সেটার নাম বিমসটেক [BIMSTEC] বা বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ, একেই ভারত সার্কের বিকল্প হিসাবে পুশ করতে শুরু করেছে। আসলে ২০০১ সাল থেকে “সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার” আড়ালে, মার্কিন সমর্থনে ভারতের মুসলমান ও পাকিস্তানবিদ্বেষ চরমে উঠাতে ভারত আর সার্ক টিকাতেই চায় নাই। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ, নয়াদিল্লিতে সরকারি আমন্ত্রণে ২০১৬ সালে ভারত সফররত একদল বাংলাদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাবেক রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী [বর্তমানে ঠিঙ্কট্যাঙ্ক ORF ফেলো] খোলাখুলি বলেই ফেলেছিলেন, [দেখুন সার্ক ভুলে যেতে বললেন পিনাক রঞ্জন;] আর ‘বিমসটেক জোটের’ ওপর বাংলাদেশ জোর দিক।
    কিন্তু ২০২১ সালে এসে আবার ভারত পল্টি দিচ্ছে।  এবার বলছে সার্ক আর অকেজো করে রাখা না, সার্কের বিলুপ্তি দরকার। কেন? ভারতের ভয় সার্ক অকেজো করে ফেলে রাখলে সার্কে ঢুকে চীন না সার্ক নিয়ে চলে যায়!  কিন্তু কাজটা সে করতে গেছে আফগানিস্তান প্রসঙ্গে নিউইয়র্কে সার্কের এক সভাকে কেন্দ্র করে।

    আফগানিস্তানকে নিয়ে সার্ক বৈঠকে হতে গিয়েঃ
    গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের বার্ষিক  সাধারণ পরিষদ বৈঠকের সাইড লাইনে। আফগানিস্তানকে সার্কে সর্বশেষ যুক্ত সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে নেয়া হয়েছিল আগেই। সংশ্লিষ্ট নেতারা সার্কের একটি বৈঠক করতে চেয়েছিলেন ঐ সাইড লাইনে। কিন্তু তা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি মূলত আফগানিস্তানকে সেখানে ডাকা হবে কি না বা হলে কীভাবে এনিয়ে অমীমাংসিত বিতর্কের কারণে।

    এমনিতেই গত ১৫ আগস্টের পরে ভারত আফগানিস্তান ইস্যুতে একা হয়ে এক আজিব অবস্থান নিয়েছে। তা হল অনেকটা যেন “আমাকে আগের গনি সরকার ফিরে এনে দাও। আমি এর অন্য কমকিছু হলে মানব না’- টাইপের।  সম্ভবত এর মূল কারণ এতদিন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার আড়ালে থেকে আফগান ইস্যুতে অবাধ বিচরণ ও সুবিধা খেয়েছে। আর এখন ঠিক উল্টা যুক্তরাষ্ট্রও কারও দিকে না কেবল নিজের একক  স্বার্থের দিক চেয়ে চলার কারণে ভারত একা বোধকরা এক এতিম যেন! তাই সার্কের ঐ হবু মিটিংয়ে ভারতের অবস্থান ছিল, আগের নাই হয়ে যাওয়া গনি সরকারেরই প্রতিনিধিত্ব আনতে হবে। তবে, ভারতের ব্যাখ্যা পাকিস্তান বরং তালেবানদেরকে ঐ আফগান প্রতিনিধিত্বের আসনে বসাতে চেয়েছে, তাই সব ভন্ডুল হয়ে গেছে। সারকথায় ওই বিতর্কে পড়ে, সার্কের সভা বসতেই পারেনি; বাতিল হয়ে গেছে।

    কিন্তু ভারতের মিডিয়া এ নিয়ে অস্থির অধৈর্য হয়ে উঠেছে। যেমন দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রার এক লেখা। [অনুমান করা হয় এটা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লেখানো।] তারা নিজেরাই এর সারাংশ সেখানে করেছে এভাবে: “চীন আর সার্ক রুমের মধ্যে ঢুকে পড়া হাতি নয়। বরং সে ওর পুরা ঘরবাড়িই দখল নিয়ে বসেছে। ভারতের বরং উচিত হবে তার পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইউকে, রাশিয়া প্রভৃতি অগ্রসর দেশ ও কোয়াডের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া” ।

    China is no longer the elephant in the SAARC room, it occupies the entire zoo. India would rather jump over its neighbourhood and build ties with US, France, UK, Russia, and the Quad.

    এসব কিছু আসলে ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের এলায়েন্স গড়ে তোলা, যার ভিত্তি হল কথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ইস্যু। আর এতে এর নামে ভারতের অদ্ভুত এক মুসলমানবিদ্বেষী মন আর সেই মনের তৈরি করা ঘৃণা হাজির হয়েছে! যুক্তরাষ্ট্রও প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে ভারতের এই আচরণ সমর্থন করে গেছে আর আজ এরই পরিণতি দেখছে সবাই।
    আসলে একালের আফগান থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের পরে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে তার গত ২০ বছরের সম্পর্ককে পুনঃমুল্যায়নে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া শুরু করাতে ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়া।
    বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়ার এখন লক্ষ্য ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে লেখা ছেপে নিজের ভাগ্য গুছানো। যেমন মানবজমিনের এক লেখার শিরোনাম “আফগান সংকট খাদের কিনারায় সার্ক”।

    এটা প্রমাণ করে ভারতের বিদ্বেষী আচরণ কোন মাত্রা ছুঁয়েছে। একালে এর উপর যুক্ত হয়েছে আমেরিকা আর আগের মতো ভারতকে সমর্থন করতে পারছে না, সম্পর্ক আর আগের মতো নাই। আমেরিকা নিজের স্বার্থ নিয়েই ডুবে আছে। আর সে ভিত্তিতেই ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক ঢেলে সাজাতে চাইছে। আর এতেই ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠছে অনিয়ন্ত্রিত ও ভয়াবহ!

    চীন থাকলে ভারত-পাকিস্তান কোনই সমস্যা নাই, কেন এমন??
    কথাটা আসলেই সত্য, অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আমেরিকাই ভারতকে তোয়াজ করে গাছে তুলে তার পাকিস্তান-চুলকানি বা সময়ে চীন চুলকানি তৈরি করেছে। সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানেইজেশন [SCO] মূলত চীনের নেতৃত্বে এক জোট। এর উপর সাথে আছে পুতিনের রাশিয়া। এবং সেন্ট্রাল এশিয়ার কিছু দেশ।  সম্প্রতি এই জোটে  ভারত ও পাকিস্তান দুদেশকেই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আফগান বা তালেবান নিয়ে অস্থিরতা এই সময়ে  SCO তে ভারত ও পাকিস্তান একসাথে সুন্দ্রভাবে মিটিংয়েও বসেছিল। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হল?  এখানেই শেষ না।  পাকিস্তানে যাচ্ছে ভারত! কেন? এই SCO এর পক্ষ থেকে এক সন্ত্রাসবিরোধী ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে। না আপনারা ভুল শুনেন নাই। আচ্ছা, ভারতের বিশ্বস্ত মিডিয়া ভোরের কাগজের রিপোর্টের লিঙ্কটা দিচ্ছি দেখেন যার শিরোনামঃ পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী মহড়ায় যাচ্ছে ভারত।  অথবা ভারতের জি-নিউজের খবর শিরোনাম “পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ভারতীয় সেনা, এবার সঙ্গী চিনও”। এর অর্থ কী ?
    অর্থ একটাই। আমেরিকাই ভারতকে বিগড়েছে, উস্কানি দিয়ে গেছে। যে কারণে চীনের নেতৃত্বে থাকলে ভারত ঠিক থাকে এবং ভারত-পাকিস্তান একসাথে কাজ করতে পারে, অবলীলায়।
    ঠিক একই সময়ে যখন আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমান এখন ভারত সফরে আছেন।  আর ভারত শেরমানের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নালিশ দিচ্ছে পাকিস্তানকে শায়েস্তা করা, কনট্রোল করার জন্য; [ India Wednesday raised concerns over … Haqqani Network in Afghanistan along with the active role being played by Pakistan there…]। আর জবাবে শেরমান বলছেন, আফগান ইস্যুতে আমরা ভারত-আমেরিকা এক দেহ এক প্রাণ; US-India ‘one mind, one approach’ on Afghan-related issues. কেন? মনের দুঃখে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রা যেন “পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে”  বনবাসে চলে যেতে চেয়েছেন!
    অথচ এটা অপ্রয়োজনীয়! চীন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে পাশে নিয়ে এক ওয়ার্কিং জোট গড়ে নিয়েছেন। আপাতত যেখানে বাংলাদেশ হল ওয়ার হাউজ! আপাতত টিকার ওয়ার হাউজ!


    লেখক : 
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ অক্টোবর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “সার্ক এখন কারও না“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.” –Josep Borrell, ইইউর ফরেন পলিসি চিফ, the European Union’s top diplomat;

     

    গত ৩১ আগষ্টের দুদিন আগেই শেষ পর্যন্ত আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গুটিয়ে চলেই গেল; আর তা পক্ষ-বিপক্ষের সবাইকে অবাক করে। বিশেষ করে পক্ষের লোকেরা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, আমেরিকারও দিন শেষ হয় তাহলে! এবার এতে সবাই বুঝে গিয়েছিল এটা শুধু আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকার গুটিয়ে চলে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নয়। এটা শুরু। এটা শুধু আমেরিকার আগফানিস্তান ছেড়ে যাওয়া নয়, এটা গত কমপক্ষে ৫০০ বছরে ধরে অন্যের দেশে গিয়ে সে দেশ দখল, লুটপাট, ক্ষমতার রুস্তমি দেখানো আর সভ্যতা শেখানোর যে ভণ্ডামি চলেছিল, এখন থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটারই গোটানো, বন্ধ বা সমাপ্তির ইঙ্গিত করছে এটা। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের দিন শেষ – মানে পশ্চিমের নেতৃত্বের দিনও শেষ! এটাই হল সেই অবিশ্বাসের ঘটনা যা এখানে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে!

    “রাষ্ট্র আর রাজনীতি” সাধারণত আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্র আর রাজনীতির দেশীয় দিকের চেয়ে বৈদেশিক বা গ্লোবাল দিকটা এ লেখায় অনেকসময় ভারী থাকে বলে অনেকে আমাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুর লেখক বলে মনে করে; যদিও আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ রাষ্ট্র আর রাজনীতিই।

    গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাব’ নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন আমি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে লিখছি। আসলে তখন থেকেই মূলত যে কথা বলতে চেষ্টা করেছি তা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ায় প্রথম একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হতে সুযোগ পেয়েছিল, আমেরিকা যার প্রথম নেতা। যদিও এই সিস্টেমে কে নেতৃত্ব দেবে তা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে সেসময়ের যে দেশ শীর্ষে থাকে তার ওপর। আবার যতই এই শীর্ষ অবস্থান ঢলে পড়ার দিকে যেতে থাকবে ততই তার নেতাগিরির দিনও শেষ হবে। আবার ওই ঢলে পড়া শীর্ষ অবস্থান বিপরীতে ক্রমেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে, যার দখলে যাবে, সেই-ই নতুন গ্লোবাল নেতার আসন নেবে। তবে সাবধান, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির ব্যাপারটা সামরিক ক্ষমতার বলে অর্জনের বিষয়ই নয়। আমার লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলও নয়। বরং জানা যে, এই পালাবদলের কালে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অথবা নতুন কী কী ফ্যাক্টরের আবির্ভাব হয়ে থাকবে, এসব।

    ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ কথাগুলোই আমি বলে আসছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষের পুরনো চিন্তার ফ্রেম তাকে আমার কথাগুলো বুঝতে বাধা দিয়ে গেছে। বিশেষত যেমন এক প্রধান বাধা হল কমিউনিস্ট চিন্তার ফ্রেমে ফেলে আমার কথা বুঝতে চাওয়া। দুই. যারা আবার নিজেদের কমিউনিস্ট ফ্রেমের বাইরের চিন্তার লোক মনে করেন তারাও আমার কথা মানতে চাননি। কারণ আমি বারবার দেখিয়েছি, এখনকার পালাবদলে আমেরিকার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ওদিকে তাদের আমেরিকা-প্রীতি বা শক্ত আস্থা ততই দুর্বল হলেও তারা আমার কথা অস্বীকার করে থেকেছে। যদিও সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হয়েছে এক প্রপাগান্ডা যে, আমি ‘চীনের পক্ষের লোক’; অতএব এ কারণে নাকি আমি আমেরিকাবিরোধী। আমি যতই বলি, আমি অবজেকটিভ দর্শক-পূর্বাভাসদাতা মাত্র। তারা মানেনি। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডা যে, আমারটা নাকি চীনা ভাষ্য।

    অথচ একমাত্র আমিই গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার ইতিহাসটা প্রসঙ্গ করে সবার সামনে এনেছি। এভাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব ব্যবস্থা, আবার এই নেতৃত্বের পালাবদলের প্রসঙ্গটাও এনেছি। ইতিহাসে এ ঘটনাটা প্রথমে ঘটেছে আমেরিকার নেতৃত্বেই। ফলে অকৃপণভাবে বাস্তবের সেই আমেরিকান গৌরবের কথাই আমাকে সতভাবে তুলে ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশি সেই ইতিহাসের আমেরিকান গৌরবের কথা আর কেউ তুলে আনেনি, তাদের এটা অজানা থাকার কারণে। কলোনিয়াল কারণে আমরা ইউরোপিয়ান-ব্রিটিশ ইতিহাস পড়ে ও ফলো করে অভ্যস্ত, আমাদের একাডেমিগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচিও তাতেই ভারাক্রান্ত। যেমন অনেক কমিউনিস্টকে দেখেছি, যারা এখনও মনে করেন গ্লোবাল নেতা বা  এক নম্বর পরাশক্তি হল নাকি ব্রিটিশ রাষ্ট্র, আমেরিকা নয়।

    যাই হোক, আমার দিক থেকে সেটা ছিল গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমটা (ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাসহ) তৈরির পেছনে আমেরিকান অবদানটাকে তুলে এনে ওর জন্ম ইতিহাসের দিকটা দেখানো। কিন্তু সেটা আমেরিকান-প্রীতি দেখানো জন্য অবশ্যই নয়। ইতিহাসের ফ্যাক্টস বলার জন্য বলতেই হয়েছিল। আবার উল্টো দিকে পালাবদলে চীনের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা-সহ বড় অযোগ্যতাগুলো কী – এর তালিকা আমিই সবার আগে ও বিস্তারে লিখেছি। কারণ মূল বিষয়টা আমেরিকা বা চীন এর কোনটাই একেবারেই না। ব্যাপারটা হল – আমাদের সময়কালকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারছি কি না! এটাই মূল বিষয়। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ এখানে আবার কথা তুলেছি কেন?

    ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এর সাক্ষাৎকারঃ
    বাইডেনের আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে পালানো দেখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস [Ben Wallace ]  দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের পরে এই প্রথম  সবদায় আমেরিকা ঘাড়ে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন।  অথচ ওয়ার অন টেররের শয়তানির প্রথম যুগে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে এক নিশ্বাসে যার নাম উচ্চারণ হত তিনি হলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার! মিঃ ওয়ালেস কী এখন এই মিথ্যাবাদী [সাদ্দামের ইরাকের কাছে weapon of mass destruction (WMD) আছে এই মিথ্যা কথা ] প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর দায় নিতে চাচ্ছেন না।  ঐ  সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ওয়ালেস  বলেছেন, তিনি “আমেরিকাকে আর কোনো পরাশক্তি মনে করেন না” [It is certainly not a global force, it’s just a big power,]। কেন? আসলে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিল ব্রিটিশ ‘স্পেকটেটর’ নামে ম্যাগাজিন। সেটি নিয়ে লন্ডন ‘গার্ডিয়ান’ পরে এক রিপোর্ট করেছে। মূল সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গ্লোবাল রঙ্গমঞ্চে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানটা ব্রিটিশ শক্তিরও সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে কি”? [whether the exit from Afghanistan demonstrated the limits of British power on the world stage] মন্ত্রী এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমে স্বীকার করে নেন যে, ‘ব্রিটেন স্পষ্টতই একটি পরাশক্তি নয়”। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মনোযোগ দিয়ে চেপে ধরেন। ওয়ালেস বলেন, ‘যে দেশ বা শক্তি যেকোনো একটা কিছু করব বলার পরে আর সেটি করবেই বলে আঁকড়ে থাকার মুরোদ রাখে না সে আসলে পরাশক্তিই নয়।’
    কিন্তু এত কঠিন করে আমেরিকাকে নিচু দেখানো কথা মন্ত্রী বললেন কেন?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪২ সাল থেকে ওই যুদ্ধসহ গ্লোবাল নেতৃত্বই আমেরিকার হাতে চলে গিয়েছিল। আমেরিকা-পরাশক্তি হওয়ার দিকে যাত্রা তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগের টানা ৩০০ বছর সারা দুনিয়া ছিল ইউরোপের কলোনি; ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্রের অধীনে কলোনি দখলে চলে যাওয়া দেশ। আর এই পাঁচের মধ্যে ব্রিটিশ-ফরাসি ছিল সেরা – যে দুয়ের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা সবার সেরা। আর বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপকে স্বেচ্ছায় কলোনি শাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

    তবু বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাশক্তি  আমেরিকার আড়ালে থেকে তারই ছোট পার্টনার হিসেবে অন্তত ব্রিটিশ-ফরাসি ভাব ধরে চলেছে। কিংবা ন্যাটো-জোটের সদস্য হিসেবে থাকার কারণে তারাও পরাশক্তি ভান করার সুযোগ পেয়ে এসেছে। করে গেছে। অথচ এসব কমন বাহিনী (যেমন- ন্যাটো) অথবা জার্মানি, জাপানে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যারাক গড়ে সেখানে আমেরিকান সেনাবাহিনী পেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এসবের খরচের বেশির ভাগ এখনো একা আমেরিকা বহন করে আসছে। খুব সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পরে এখন আমেরিকা এসব খরচ বইতে অপারগতা দেখাবে, ফলে ইউরোপের যে ক্ষমতার জৌলুস সেসব কিছুতে এখন টান পড়বে।

    ইইউর ফরেন পলিসি চিফঃ
    তাই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি ও নিরাপত্তা পলিসি ইস্যুতে প্রধান প্রতিনিধি জোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বাইডেনের দুর্বল পরিকল্পনায় আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর সারা মহাদেশজুড়ে এ নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এটা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বিরাট পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে খেলা বদলে দেয়ার মতো এক ঘটনা। “ইইউ’র এখন ‘আপন স্বার্থ বুঝে নিতে সক্ষম হতে নিজেই এগিয়ে আসা ও সক্ষম হওয়া উচিত, বিশেষত যখন আমেরিকা আর সংশ্লিষ্ট থাকতেই চাচ্ছে না” [The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.]”।

    But after Biden’s ill-planned exit from Afghanistan, criticism exploded across the continent. “It’s a failure of the Western world and it’s a game-changer for international relations,” said Josep Borrell, the European Union’s top diplomat. “The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.”

    আর ওদিকে বাইডেন সম্ভবত ভাবছেন, ‘গত ৭৫ বছর ধরে তোমরা কেউ খরচের দেও নাই। কাজেই যেখানে আমেরিকার একার পক্ষেই আর খরচ বইবার ক্ষমতা নেই সেখানে তোমাদের সাথে কথা বলে আমার কী লাভ?’
    কথাগুলো সত্য বটে! কিন্তু ট্রাম্প যখন আগে একইভাবে ও ভঙ্গিতে ইইউ এবং ন্যাটো পর্যায়ে কথা বলেছিলেন; আর ট্রাম্পের আমল থেকেই ইতালি-জার্মানি ও পরে ফরাসিদের উদ্যোগে সারা ইইউ-ই চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছিল। আর তাতে ইইউ-চীনের কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট [EU – China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষর শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাইডেন শপথ নেয়ার পরই ইইউ’র সাথে ট্রাম্প সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন – একথা বলে অভিযোগ তুলে এরপর দাবি করেছিলেন, তিনি ২০০১ সালের আগের আমেরিকা-ইইউ পারস্পরিক সম্পর্কের সবকিছুই তিনি আবার গড়বেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন? আর ইইউ এই প্রতিশ্রুতিতে এতই আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিল যে, চীনের সাথে তাবত চুক্তি ও কথাবার্তা সবকিছু [(CAI) চুক্তিসহ] সেই মুহুর্ত থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল ; তারা এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল চীনকে! এখন সেসবের তাহলে কী হবে?

    অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, ইইউ-আমেরিকা  সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা কত নিচে নেমে গেছে। আসলে মূল ঘটনা হল  – বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একাই। ব্রিটেন বা ন্যাটোকেও সাথে নেননি, একবার জিজ্ঞাসাও করে নাই। কেবল প্রত্যাহারের শেষদিন, ৩১ আগস্টের কদিন আগে জি-৭ পর্যায়ে একটা নামকাওয়াস্তে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। যেখানে ইউরোপের কোন সদস্যের কারো কোনো অনুরোধ-পরামর্শ বাইডেন একেবারেই আমল করেননি।

    এক কথায় বললে, কার্যত দু’দিন আগেই আমেরিকা সব ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার পর সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ নেমে আসে এবং সর্বগ্রাসী এক ‘লস্ট’ [LOST] মানে সব হারানো অনুভব তাদের সবাইকে একেবারে ‘খেয়ে ফেলেছিল’। ফলে এসব চরম হতাশামূলক বক্তব্য-মন্তব্য সেসবেরই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস কত চেষ্টা করেছিলেন,এসময়ে তার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সফরকে বিরাট হাইলাইট করবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পরাজয়সম প্রত্যাহার সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল, আর তাতে গ্লোবাল মিডিয়া থেকেই এই সফর আউট হয়ে গেছে। গ্লোবালি বাহাদুরি করে বেড়ানো আমেরিকা এমন হতাশায় হারিয়ে যেতে পারে এটা এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

    সবার নিচে খারাপ অবস্থায় ইন্ডিয়াঃ
    “অবশেষে সব দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানার অবসান। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ঘোমটা সরিয়ে গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবানের মুখোমুখি হলেন রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল এবং ভারতের ‘উইশ লিস্ট’ বা ইচ্ছা তালিকা তিনি পেশ করলেন। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ সরিয়ে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রচারও করল। সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হলো। ‘আগামী দিনে এই গতিপথের চরিত্র কী হবে, এখনই অনুমান করা কঠিন”।

    উপরের প্যারাটা – না এটা কোন অ-ভারতীয়ের লেখা নয়। বরং, বাংলাদেশী প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর পাঠানো রিপোর্ট এটা। যিনি সব সময় ভারতীয় উগ্র দেশপ্রেমের রঙে লেখা লেখা পাঠিয়ে থাকেন। অথচ এই লেখায় তিনি মোদির ভারতের দেউলিয়া হয়ে পড়া “আফগান নীতি” থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে, এরপর লিখেছেন। তার সব চেয়ে কড়া সমালোচনার বাক্য ওই “সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হল” [ভারতকে নীতি বদলাতে বাধ্য করল তালেবান]।

    সৌম্য এমন করে কেন লিখেছেন? কারণ আট বছরে পা দেয়া মোদি সরকারের পাকিস্তান-আফগানিস্তান নীতি হল – মুসলমানবিদ্বেষ; একে ততই চরমে নাও আর মুসলমান ঘৃণা ছড়াও যত বেশি সম্ভব। কারণ এতে ততই হিন্দুত্ববাদ ফলবতী হয়ে ভোটবাক্স ভরাবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ভারত-রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও সে্টা সেকেন্ডারি ও তুচ্ছ। কারণ সহজে ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই মোক্ষ!

    এখান থেকেই সাজানো মোদি-নীতি নাকি হল, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা ব্যক্তি বলে ভারত সরকার যাদেরকে ঘোষণা করেছে তাদের সাথে কোনো কথা বা যোগাযোগ করা যাবে না”।  কিন্তু এই নীতিই মোদির গলায় এখন ফাঁস হয়েছে। মোদী সরকার এতদিন এই নীতির কারণে, তালেবানের সাথে কোনো ফরমাল ডায়ালগ করতে পারছিল না। কারণ তারা আগেই তালেবানকে “সন্ত্রাসবাদী” বলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সেই ২০১৪ সালে সুষমা স্বরাজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

    কিন্তু গত আগস্টের শুরুতে বা তারও আগের দু-একবার তাই ভারত কাতারে তালেবানের সাথে কথা বলার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা কখনো স্বীকার করেনি। ফলে ডায়ালগের বড় কোনো কার্যকর ফল ভারত পায়নি। আবার গত ১৫ আগস্ট তালেবানদের কাবুল দখলের পর এয়ারপোর্ট পার হতে গিয়ে আটকেপড়া ভারতীয়রা বুঝে যায়, ভারতে‘মোদিকে ফোন করে কান্নাকাটি করেও কোনই লাভ হচ্ছে না। এর চেয়ে কাছের তালেবান কমান্ডারই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসল ভরসা।’ তা ইতোমধ্যে  আমরা কলকাতার বাঙালি তমালের ভাইরাল হওয়া বয়ানে দেখেছি। কাজেই এখানেও প্রমাণিত যে, ইসলামবিদ্বেষ বা তালেবান-ঘৃণা ভারতেরই নিজস্বার্থের বিরোধী। কাজেই চরম নিরুপায় হয়ে আর নিজের পায়ে দেয়া নিজের বেড়ি ভেঙে এবার কাতারে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল তালেবান নেতা শের মোহাম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাইয়ের সাথে বৈঠক করেছেন, প্রকাশ্যেই। তবে যে উসিলায় বৈঠক করেছেন তা ঝুটা। কারণ ঐ রিপোর্টার লিখেছেন, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে…’, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাজানো হয়ে আছে এভাবে যে  এর পাঁচ ভেটো সদস্যের যেকোনো এক সদস্য যদি ভেটো দেয় তো ওই যেকোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা না-ভেটো ভোটই সভার সবকিছু উলটে দিবার জন্য যথেষ্ট। সোজা কথা, চার ভেটো সদস্য একদিকে ভোট দিয়েও  বিপক্ষে এক না-ভোট কে উল্টাতে পারবে না। এমনকি তাতে মোট ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য কোন প্রস্তাবের পক্ষে আর এক ভেটো-সদস্য বিপক্ষে থাকলেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হবে না। এটাই তো ‘ভেটো’র অর্থ। অথচ লেখা হয়েছে ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে’, অর্থাৎ যেন পাঁচ ভেটো সদস্যের তিন সদস্য পক্ষে আর দুই সদস্য বিপক্ষে থাকলেই প্রস্তাব পাস করা যায়; যেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রস্তাব পাস হয়। আসলে এ কথাটাই ভিত্তিহীন। কাজেই দীপক মিত্তাল নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা ভারতের কোনো দাবিনামা নিয়ে তালেবান নেতার সাথে দেখা করতে যাননি। দেখা করেছেন, ভারতের নিজের এক কামনা-নামা নিয়ে।

    তবে জেনে না জেনে ওই রিপোর্টার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থ একেবারেই আলাদা। তাই আমেরিকা তালেবানের সাথে ডিল করেছে এবং চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। অথচ ভারতের সামনে কোনো দিশা নেই। আসলে ভারতই এখনো তালেবানদের সাথে সম্পর্ক করবে কি না, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

    আর ভারতের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রধান কারণ ইসলামবিদ্বেষ ও গভীর মুসলমান- ঘৃণা। কারণ এ দু’টাকে মোদি ও তার দল, হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট জোগাড়ের চাবি বলে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সহসাই এখান থেকে সরে আসতে পারবে না, তা চায় না।

    যদিও মুখে বলছে তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপে তার আপত্তি, কারণ এরা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবতা হল – তালেবান মূল লিডারের তিন ডেপুটি আছেন যার একজন হাক্কানি গ্রুপের প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। আর ভারত দাবি করছে যে, তাকে মানে ওই গ্রুপকেই বাদ দিতে হবে! অর্থাৎ ভারত নিজেকে তালেবানদের কাছে নিজেকে এতই ওজনদার মনে করে?
    আসলে ঘটনাটা উল্টো। ভারত তালেবানদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে কোনো গ্রুপ-কে বাদ দেয়ার কথা তালেবানদেরও ভাবতেই হবে না।

    তালেবানের নিজের সমস্যাঃ
    ‘তালেবানের নিজের সমস্যা অন্যখানে এবং সেটা হল, আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান কেউ থাকল নাকি ১০ জনের কোন কমিটি ক্ষমতায় থাকল তা একেবারে নয়। মূল কারণ, এগুলো তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে, কেমন হবে সেনিয়ে প্রশ্ন। এমন সরকার গঠিত হলে সেটা  সাময়িক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে তা তো এক-দু’বছর ক্ষমতায় থাকতেই পারে – তাতে কোনটা একা প্রেসিডেন্ট  কেউ অথবা একটা কমিটি যাই হোক। মূল সমস্যাটা হল – এরপর স্থায়ী সরকার যেটা হবে সেটা কেমন হবে ব- এটা আগে বলতে পারতে হবে!

    এ পর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে, শাসনক্ষমতা হয় মূলত দু-ধরণের, হয় রাজতন্ত্রের না হয় রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)। সাধারণত রাজতন্ত্রগুলো তাকে শাসনক্ষমতা কে দিয়েছে তা বলতে পারবে না, এমন ধরনের হয়। যেমন কোন আমিরের আমিরাত তেমনই এক শাসনক্ষমতা যা আসলে এক ‘রাজতন্ত্র’, যদিও শব্দটা ব্যবহার করেনি। তবু এটা রাজতন্ত্র বা মনার্কিই। এমনকি সমাজের কিছু এলিট যেমন ধরুন গুলশান-বারিধারার বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে ঠিক করা এক শাসনক্ষমতা বা সরকার – এরাও কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে তা বলতে পারবে না বা ফলে চায় না।

    আসলে কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে বা দিবে- এই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে থাকতে হবে। নিজেকেই নিজে দিতে পারতে হবে। এর জবাব যার কাছে নেই, দিতে চায় না; এর মানে হবে এটা রাজতন্ত্র অথবা একটা এলিট গ্রুপ এদের রাজতন্ত্র।

    তবে এই প্রশ্নটারই আরেকভাবে জবাব দেয়া যেতে পারে। তা হল, শাসন ক্ষমতায় ঐ দেশে পাবলিক বা জনগণের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে পাবলিকের সম্পর্ক কী হবে কিভাবে হবে? পাবলিক কি ভোট দিতে পারবে? ভোটের ব্যবস্থা কি আদৌ  ঐদেশে থাকবে? (কারণ, রাজার দেশে ভোট দেয়া থাকে না।) এসব প্রশ্নের জবাব থাকতেই হবে।

    নিজেকেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের দেশে রাতের ভোটের সরকার হলে আমরা এতে আপত্তি দেখাই কেন? সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে, ইচ্ছামতো গুম-খুন করা হলে আপত্তি করি কেন?

    আর আরেক বড় সমস্যা হল, নিজেকে  রিপাবলিক রাষ্ট্র ও সরকার বলে নিজেকে ঘোষণা না করলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব। তাতে ‘ইসলামী রিপাবলিক’ ঘোষণা দিলেও ওসুবিধা হবার কথা না।  ইরান বহাল তবিয়তে এক ইসলামি রিপাবলিক যে জাতিসঙ্ঘের সদস্যও।  এটা না হলে, ক্রমশ উঠে যাওয়া অজস্র প্রশ্নের ঠেলায় বিভেদ শুরু হবে। যারা আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে তালেবানদেরকে চীন-রাশিয়াসহ  যারা স্ট্রং সমর্থন জানিয়ে আসছে, তারাও দুর্বল হয়ে যাবে একপর্যায়ে।

    আসলে ব্যাপারটা হল,  আ্মরা যেমন ইচ্ছা তেমন শাসনক্ষমতার রাষ্ট্র ও সরকার গড়তে পারি না। এর আরেক মূল কারণ, একালের গ্লোবাল বাণিজ্য। আপনার দেশকে গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়া সদস্য হতে হবে। না হয়ে দেশ চালানো একালে খুবই কঠিন। অনেকটা অবরোধে পড়ে থাকা ইরানের তেল আছে; কিন্তু তা অন্যদেশে বেচে আরেক অন্য দেশ থেকে অন্য পণ্য কিনতে পারবে না – এ ধরনের সমস্যা হবে; যেটা মারাত্মক। এটা অনেকটা গ্রামে আপনাকে একঘরে করে ফেলে রেখে দেয়ার মতো হবে। আপনার দেশের মাটির নিচে বহু কিন্তু হবু  মুল্যবান সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আপনি তা কাউকে বেচতে পারেন না, তখন আর সেটা সম্পদ নয়। ওটা আর মুল্যবান নয়।

    তবে এরপরেও যদি এতে আপনার কোনো সমস্যা না হয়, সহ্য হয়, তবে ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে কিছুই কিনতে বেচতে পারবেন না যার সোজা মানে, গ্লোবাল পণ্যবিনিময় মানে মুদ্রাব্যবস্থায় আপনি সদস্য না হয়েই থাকতে চাওয়ার পথ বেছে নিলেন। একবার করে দেখতে পারেন, জীবন যাপনের কষ্টটা জানা থাকা খারাপ না, খারাপ কেন হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৪ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান নিয়ে সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা কী নিজ-ভুল রিভিউয়ের সাহসী হবে!

    আমেরিকা কী নিজ-ভুল রিভিউয়ের সাহসী হবে!

    গৌতম দাস

    ৩০ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    Biden sticks to Aug 31st deadline for Afghanistan exit; 

     

    এটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে, বাইডেনের আমেরিকা এবার আফগানিস্তান ছাড়তে মন বেঁধে ফেলেছে যদিও যাদের জানার তাদের জানা ছিল যে, বাইডেনের হাতে এদেশ ছেড়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো বিকল্প শুধু না, ফেলে পালিয়ে যাবার এক বিরাট সুযোগ। আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যাই হন, ২০০৫ সালের পর থেকে সবাই জেনে গিয়েছিলেন যে, ভুল হয়ে গেছে, পা দেবে গেছে, বিকল্প নেই। সবটাই লস। কিন্তু কিভাবে ফিরে আসবেন, কী করে ফিরে আসবেন এটাই জানা ছিল না। শেষে পাগলা আর গোঁয়াড় যে ট্রাম্প তিনি নির্ধারক সিদ্ধান্তে তালেবানদের সাথে চুক্তি করে ফেলেছিলেন আর বাইডেন খরচ কমানোর এই শেষ সুযোগটা ছাড়তে চাননি।

    সারা দুনিয়াতেই দেখা গেছে রাজার চেয়ে রাজার বন্ধু-পারিষদেরাই সমস্যা। তারা রাজার স্টোর-টাঁকশালে কী আছে এর খবর না রেখে বোলচালের দুর্বুদ্ধি-হামবড়া করে গেছেন। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কথিত উন্নত সাত-রাষ্ট্রের গ্রুপ ‘জি-৭’  [What Is the Group of Seven (G-7)?], এরা সেই বন্ধু-পারিষদ। নিজ মুরোদ নাই, এরা বাইডেনের ঘাড়ে চড়তে গেছিলেন। তারা বাইডেনকে ৩১ আগস্টের পরেও আফগানিস্তানে থাকার ‘বুদ্ধি’ বের করতে বলেছিলেন। কিন্তু বাইডেন এসব ‘বাজে পরামর্শ’ ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। কারও কারও মতে বাইডেন জি৭-এর সাথে ভাল করে আলাপ না করেই এককভাবে তালেবানদের সাথে সমঝোতা চুক্তি ফাইনাল করেছেন [US abruptly withdrew from Afghanistan and left a mess behind]।   লক্ষণীয়, পশ্চিমের একমাত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সূত্রে বাইডেন ছাড়া এর বাইরে পশ্চিম বা ইউরোপের আর কারো সাথে তালেবানদের কোনো আলাপ-সম্পর্ক, কথা বা চুক্তি হয়নি। ইউরোপ বরং এটাকে সুবিধা হিসেবে নিয়েছে যে তালেবান-ইউরোপ কোনো চুক্তি নেই ফলে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ দায়দায়িত্বও নাই। আর এই সুযোগে ইউরোপ বাইডেনের ঘাড়ে চড়তে চাওয়া!

    দুনিয়ার কোনো রাজাই চিরকাল রাজা থাকেননি। গ্লোবাল নেতা আমেরিকাও অনন্তকাল নেতা থাকবেন না। এটা বুঝতে না পারা তো কোন ব্যাপার নয় যদি গভীর ‘আমেরিকা প্রেম-আবেগ’ কোন বাধা না হয়।
    আঙ্কেল আমেরিকার সঙ্কট অর্থের টানাটানি। সেটা অস্বাভাবিক অবশ্য নয়। আফগানিস্তান ছেড়ে গিয়ে অর্থ সাশ্রয় করা ছোটখাটো অর্থ না। মূলত এ জন্যই তিনি এই এক সিদ্ধান্তে ফোকাসড। বক্তৃতা দিয়ে সোজা বলছেন- ‘কোনো অনুশোচনা নাই [: ‘I Do Not Regret My Decision’ To Withdraw ]”। কারণ খরচ কমিয়ে সরকার-দেশ কিছু বাঁচাতে পারলে বাপের নাম! পেন্টাগনের জেনারেলেরাও ৩১ আগস্টের পরে আফগানিস্তানে আরো কিছু দিন থেকে যাবার আবদার না করে বরং বাইডেনকে বিরাট সাপোর্ট দিয়েছেন [Biden sticking to Aug. 31 Afghan pullout ]। খরচের পরিমাণও বিশাল! আফগানিস্তানে আমেরিকার প্রতিদিনের গড়ে খরচ বলা হচ্ছে, প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার এবং তা টানা ২০ বছর ধরে। ৩০০ মিলিয়ন ডলার মানে কত? এর একটা ধারণা দেয়া যাক। এরশাদ পরবর্তি  নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশে যে নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা শুরু হয়েছিল তখন প্রতিটা সরকার কামনা করত, প্রতি বছর (এখানে দিন নয়, বছরের কথা বলা হচ্ছে) প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে (তিন বছরে এক বিলিয়ন) আইএমএফ লোন পেলে সরকার চালানোটা আরামের হয়; আমদানি ব্যয় মিটাতে টানাটানিতে চলতে হয় না।

    House Democrats and Republicans held news conferences and pushed for the Biden administration to extend the withdrawal of troops in Afghanistan past the Aug. 31 extension deadline, citing the need for a slow exit in order to not escalate the current situation with the Taliban.CreditCredit…Sarabeth Maney/The New York Times   কংগ্রেসের দুই দলই বাইডেন কে সেনা প্রত্যাহারের তারিখ পিছাতে চাপ দিয়েছিল।

    কেউ প্রভাবশালী গ্লোবাল নেতা অথবা দেশ  –  এই কথাটার পেছনের আসল অর্থ হল যে, ঐ দেশের অর্থনীতিতে ঐকালে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় সর্বাধিক। আমেরিকা এমন নেতা হিসেবে টানা পঁচাত্তর বছর ধরে দুনিয়ায় মাতব্বরি চা্লালিয়ে যেতে পেরেছে। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতা নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই কোনো রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি হওয়া ও থাকার মূল চাবিকাঠি। কারণ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই একবার হাতে এলে তখন সামরিক সক্ষমতা অর্জন হাতের মুঠোর জিনিস, মাত্র কয়েক বছরের ব্যাপার হয়ে যায়।

    এই কথাটাই অনেকে সহজে মানতে বা বুঝতে চায় না। আপনি আমি আমেরিকা বা ব্রিটেনের ভক্ত হতেই পারি, কেউ কেউ শেষ জীবনে সেখানে সেটেলড হবার কথাও সামর্থ্য থাকলে ভাবতে পারি। মানে নিজ ব্যক্তিস্বার্থ ওর মধ্যে দেখতেই পারি। কিন্তু তাই বলে কেউ যখন কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার উত্থানের সাথে ওর গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা পতন সম্পর্কিত এটা সে দেখতে পাচ্ছে, অথবা নির্দেশ করে দেখায়- কিন্তু তা বলে এর মানে, সে আমেরিকাবিরোধী বা সে চীনভক্ত তা বুঝায় না। তাই এমন ট্যাগ লাগিয়ে বুঝাবুঝির চেষ্টা অর্থহীন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতা তো ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস আনার কর্তা নন!

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্সে’ আত্মোপলব্দিঃ
    তবে আফগানিস্তানে সর্বশেষ ক্ষমতায় পরিবর্তন এবার অনেককেই ‘ন্যাংটা’ করে দিয়েছে; অনেক মিথ্যা স্বীকার করিয়ে ছাড়ছে। আত্মসমালোচনা বা রিভিউ যা আমেরিকা বহু দিন দেখেনি তা এবার কেঁপে কেঁপে বাইরে বের হয়ে আসছে। এমনই এক রচনা প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে। মূলত এটা এক দ্বিমাসিক ম্যাগাজিন। যদিও এশিয়াকে প্রভাবিত করার প্রবল প্রতিযোগিতার একালে পশ্চিম আর মাতবর-ভাব নিয়ে বসে না থেকে মাঠে নামতে হচ্ছে। তাই একালে দ্বিমাসিক হয়ে তাতে আটকে থাকতে পারছে না। অতএব দ্বিমাসিকের বাইরে, এখন প্রতিদিন অনলাইনে বাড়তি এটা ডেইলি ব্রিফিং পাঠাচ্ছে তারা। মানে পুরানা কাস্টমার হিসেবে প্রতিদিন একটা আর্টিকেল ফ্রি পড়তে পাচ্ছি। বলাই বাহুল্য, এটা এক এলিট পত্রিকা। প্রায় ১০০ বছরের পুরানা, ১৯২২ সালে এটা প্রথম প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভাল একটা গুণ হল – প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গুরুত্ব তারা সবচেয়ে ভাল বুঝে। থিংকট্যাংক নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তারা  দাতব্য  (নন-প্রফিট বা এনজিও) প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুলে চালিয়ে থাকে।  আর এর মাধ্যমে একটা নীতি-পলিসির পক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক জনমত তৈরির প্রক্রিয়া সমাজে জারি রাখে। জনমত তৈরির এই স্টাইলটা এতই কার্যকর যে একালে বুড়া বয়সে পুতিনের রাশিয়াতেও এমন নীতি-গবেষণার থিঙ্কট্যাংক   প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তেমনই আমেরিকান এক প্রতিষ্ঠান হল “কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর  CFR)। এরাই ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনের প্রকাশক। দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে যারা বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের আমলে মন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেট অথবা ডিফেন্স) বা এর ডেপুটি ছিলেন তারাই আমেরিকার ফরেন পলিসি বিষয়ে এখানে লিখে থাকেন। এখানে এখন যার লেখার কথা তুলব তিনি – বেন রোডস [Ben Rhodes]। ওবামা আমলে ওই প্রশাসনে তিনি ডেপুটি-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন।

    তার লেখার ছোট শিরোনাম তিনি দিয়েছেন- ‘ওরা আর আমরা’ [Them and Us]।’ আর “কী করে আমেরিকা নিজ-শত্রুর হাতে তারই ফরেন পলিসি হাইজ্যাক হতে দিয়েছে” [How America Lets Its Enemies Hijack Its Foreign Policy] – এই ছিল ওর বড় শিরোনাম। এরপর তিনি লিখতে শুরু করেছেন এভাবে, “নাইন-ইলেভেন বা টুইন-টাওয়ার হামলার ঘটনার চেয়ে বেশি একুশ শতকের আর কোনো ঘটনা আমেরিকাকে এত আকার দেয়নি ও এর ভুমিকা ঠিক করে দেয়নি। কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী যুগে (মানে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত- ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় আমেরিকাই একক পরাশক্তি ভেবে) আমাদের মধ্যে যে সন্তুষ্টি ভাব তৈরি হয়েছিল এই আক্রমণ তাকে একেবারেই ফুটা করে দিয়ে যায়। সাথে আমাদের মধ্যে ‘আমেরিকার নেতৃত্বের এক গ্লোবালাইজেশনের বিজয়ের ভেতর দিয়েই ইতিহাস শেষ হবে’ বলে যে মিথ্যা ধারণা তৈরি হয়েছিল এটা তাও ভেঙে তছনছ করে দিয়ে গেছে”।

    তিনি বলে চলেছেন, ” ‘ওয়ার অন টেরর’ বলতে আমেরিকার সরকারের কাজের ধরণ, মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি এমনকি মানুষের প্রতিদিনের জীবনে যেমন – ভ্রমণ, ব্যাংকের কাজ বা আইডেনটিটি-সংশ্লিষ্ট যেকোনো ইস্যুতে সবার জীবন একেবারেই বদলে গিয়েছিল। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিপাইন, সোমালিয়া, ইয়েমেনসহ অনেক রাষ্ট্রের উপর আমেরিকা সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছিল। বিভিন্ন দেশের সাথে ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের উপরে টেররিজম সবক্ষেত্রে এক মুখ্য ইস্যু হয়ে থেকেছিল। আসলে ‘৯/১১’-এর পরে প্রেসিডেন্ট বুশ আমেরিকান পরিচয়কে সংহত করে নয়া প্রজন্মের লড়াইকে সামরিক নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এই যুগের লড়াই ফ্যাসিজম ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াই হিসাবে চলবে”।

    অর্থাৎ বেন রোডস এখানে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকার একক পরাশক্তি ভাব ও অহংকার এসেছিল যা ভেঙে চূরমার করে দেয় ৯/১১-এর হামলা। পরিণতিতে বুশ ক্ষোভে ফ্যাসিজম ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা তুলে বিভিন্ন দেশে সামরিক হস্তক্ষেপে সরকার দখল (বাংলাদেশের ‘১/১১’-এর ক্ষমতা দখল যেমন) এর চল শুরু করেছিল। আর তাতে যাকে খুশি ক্ষমতায় আনা এবং ইচ্ছামত সরকার বদলে দেয়ার মত উন্মত্ততায় কাজে তারা নেমে পড়েছিলেন।

    তাই এবার স্বীকার করে বলছেন, “গ্লোবাল ওই যুদ্ধকে ঠেকানো দুঃসাধ্য ছিল হয়ত; তবে তা আমেরিকার জন্য অনাকাঙ্খিত সব পরিণতি ডেকে এনেছিল। আমেরিকা সরকার শিগগিরই তার ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে সার্ভিলেন্স, ডিটেনশন ও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছিল। আলকায়েদা উৎখাতে লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ”।

    ‘‘সামরিক হস্তক্ষেপে সরকার বদলানোর ‘রেজিম চেঞ্জ’- এটা দেশে ও বিদেশে আমেরিকান গণতন্ত্রের কী হাল করছে সেটা খেয়াল করেনি। যেসব বিজয় অর্জনের কথা প্রেসিডেন্ট বুশ অর্জিত হবে বলে দাবি করে গেছেন যা রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মিডিয়া নিরন্তর প্রচার করেছে, তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তাতে নিজ সরকারের ওপর আমেরিকার আস্থা নষ্ট করে আর তাতে নতুন করে অভ্যন্তরীণ অজুহাত খুঁজতে থেকেছে।’’

    বেন রোডসের এরপরের লেখা অংশটা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। বেন রোডস এবার ট্রাম্পের মতো চরিত্রের উত্থান কেন আমেরিকায় ঘটেছে এর একটা ব্যাখ্যায় গিয়ে বলছেন, “৯/১১ পরবর্তী-যুগের আমেরিকা যে  যুদ্ধবাজ ন্যাশনালিজম [Jingoistic nationalism ] দেখেছিল তা আসলে মূলত মানুষের মনের এক অজানা শঙ্কা আর বিদেশভীতির ককটেল থেকে তৈরি – যা ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে এই প্রেসিডেন্টের জন্ম দিয়েছিল। ট্রাম্প আসলে বাকচাতুরিতে দেশের ভিতর শত্রুর ইঙ্গিত করে তাদের উপর দায় চাপিয়ে গেছেন”।

    বেন রোডস-এর এই শেষাংশটা তাদের দেশের দুই দলের কামড়াকামড়ি দোষ চাপিয়ে কেটে পড়া – তাই এতে জড়ানো আমাদের কোনো কাজ নাই। তবে এরপর রোডস বাইডেনের পক্ষে ঢোল পিটিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, এইবার নাকি বাইডেন “আফগানিস্তান থেকে গুটিয়ে সমস্ত শক্তি চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করবেন, দুনিয়ায় আমেরিকার হাজির থাকার লক্ষ্য দুনিয়াকে দেখাবেন”।

    সরি বেন রোডস! আমরা একটুও নড়লাম না, আপনি আমাদের ন্যূনতম আকৃষ্ট করতে পারেননি এসব বলে। এখানে বেন রোডসের দেয়া ২০ বছরের যুদ্ধের খতিয়ানে তিনি বলেছেন, মোট খরচ (দুই ট্রিলিয়ন নয়) নাকি সাত ট্রিলিয়ন ডলার। আর আফগানিস্তান ও ইরাকে মৃত মোট  সেনা সার্ভিস মেম্বার বলছেন (দুই হাজার নয়) সাত হাজার। তবে তারা এই খরচ বেশি আর কম যাই দেখাক তাতে এতে বাইডেন সরকারের আয় বাড়বে না, কিছু খরচ কমবে। এটাই মূল কথা।

    তা ছাড়া, বিয়ে শেষ হয়ে যাবার পরে ব্যান্ড পার্টির মধুর সুরও কারোই ভালো লাগবে না। যেমন ধরেন আফগানিস্তান এবং এরপরে পরেই ইরাক থেকে আমেরিকা ও ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহারের পর সেন্ট্রাল এশিয়া, ইরান, মধ্যপ্রাচ্যসহ (সাউথ চায়না সি এলাকা আর ভারত বাদে) বাইডেনের আমেরিকা ক্রমশ বাকি এশিয়ায় আর কোথাও নাই হয়ে যাবে। আর সাউথ চায়না সি-তে ওর চারপাশ তো ওবামার আমলেই তার ‘পিভোট এশিয়া’ পলিসি ফেল করার পর থেকে ওখানে কিছুই আর জাগেনি। আগ্রহিরা তাদের ব্লকের ম্যাগাজিন ডিপ্লোম্যাটের কিছু রিপোর্ট যেমন [The Pivot to Asia Was Obama’s Biggest Mistake] দেখে নিতে পারেন।]   সবমিলিয়ে গত পঁচাত্তর বছর  এশিয়াতেও আমেরিকার রুস্তমি চলেছিল কিন্তু এখনকার মত কখনো এভাবে এশিয়া থেকে উৎখাত হয়নি।

    কেন আফগানিস্তান থেকে ফিরলেও আমেরিকান শক্তির রকমফের হবে নাঃ

    মূল যে কথাটা, তা হল, আফগানিস্তান থেকে বাইডেন ফিরে গেলে আমেরিকান অর্থনীতিতে সারপ্লাস অ্যাকুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বেড়ে যাবার কোনো ঘটনা তো সেটা নয়, তাই সেটা ঘটার কারণ নাই। ফলে এতে আমেরিকার চীনের সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রশ্নে আমেরিকার প্রতিযোগী হয়ে ওঠার বাড়তি কোনো কারণ নেই,  কারণ ঘটনাই তা নয় তাই। আসলে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি কখনো ডুববে না বলে গর্ব করা হত, যে ব্রিটিশরা গর্ব করত, তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কোথায় মুখ লুকালো? কোথায় সেই উইন্সটন চার্চিল? এরপরের একচ্ছত্র বিজয়ী আমেরিকার সামনে কেন আর তারা কখনো আসেনি? কারণ সবকিছু ফিরে আসে না!  একালে  ব্লোয়ারকে কেন বুশের ছোট-তরফের মিথ্যাবাদী গুণ্ডা-রংবাজই হতে হয়? কারণ একালে এই দালাল-ভাড়ামো ভুমিকাই তার জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই ১৯৪১ সালের আগষ্টের আটল্যান্টিক চার্টার চুক্তিতে!

    সব যুদ্ধবাজি জিঙ্গোইজমের দায় বুশের নয়, পরের ওবামা-হিলারিও দায়ীঃ
    আবার আমরা লক্ষ করেছি, লেখার শেষে বেন রোডস নিজ-পরিচয় দিয়েই বলেছেন তিনি ওবামার দুই টার্মেই ডেপুটি মন্ত্রী ছিলেন। অথচ তার মন্ত্রীত্বের সরকারের আমলে, মানে  ওবামা-হিলারির আমেরিকা যেসব দেশে গিয়ে আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপে সে দেশের সরকার ফেলানোর হিসাব দিয়েছেন – সেগুলোও আগের বুশের আমলে দায় বলে চাপিয়েছেন। যেমন ইরাকের সাদ্দামের সরকার ফেল্মলানোর দায় বুশের অবশ্যই কিন্তু এরপরের – লিবিয়ার গাদ্দাফি, সিরিয়ার আসাদ (ব্যর্থ) ইত্যাদি এসব অন্যায় তো বুশের দায় নয়। এটা তো ‘ভিজা বেড়াল’ ওবামা-হিলারির ‘মহান’ কাজ। তাদের অতি আত্মবিশ্বাসের কারণে বেনগাজির আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ সব স্টাফ নিহত হয়েছেন। যাদেরকে দিয়ে গাদ্দাফিকে মারা হয়েছে তারাই একাজ করেছে।  আর এ নিয়ে সিনেটে-কংগ্রেসে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন হিলারি। আর এই হত্যাকান্ড ঘটাবার পর থেকেই এরা নতুন নামে ‘আইএসের’ উত্থান ঘটেছিল। এই উত্থানে ওবামা-হিলারির দায় আছে। সবকিছু বুশের উপর চাপিয়ে ডেমোক্র্যাটরা হাত ধুয়ে ফেলতে চাইলে কী হবে? ওয়ার অন টেররে ২০ বছরে আমেরিকার দুই পার্টির কারো অবদান কি কম?

    তবে এ’দুই পার্টির সবচেয়ে বড় অপরাধ হল – আমেরিকার চোখে দুনিয়ার মুসলমান মানেই তারা আমেরিকার সম্ভাব্য এনিমি – এই মনোভাবে সেই থেকে তারা পরিচালিত হতে শুরু করেছে।  অথচ এই অ্যাটিচুড নেয়া, আমেরিকান কনস্টিটিউশন ও আইনেরই বরখেলাপ। টুইন টাওয়ারে হামলা চালায় যারা এমন মোট ১৯ জনের ১৫ জন সৌদি, দু’জন দুবাই, একজন লেবানন ও একজন মিসরের ছিল। অর্থাৎ কেউ আফগানি নয়। তাহলে টুইন টাওয়ারে হামলার অজুহাতে সারা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করা কেন?   অথচ আইনি অপরাধের চোখে দেখলে যারা হামলাকারি ও সংশ্লিষ্ট তারাই তো কেবল অপরাধী।  এমনকি, আমেরিকা চাইলে এদের যারা বা যেসব গ্রুপ জড়িত কেবল তাদের পুরোটাকেই উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আমেরিকার ছিল; কিন্তু তা না করে একটা সর্বাত্মক ও লাগাতার যুদ্ধ যাওয়া কেন? মুসলমানেই সবাই হামলাকারি এই মনোভাবের ভিত্তি কী? এই প্রশ্ন উঠেছিল সেকালেই এবং আমেরিকার ভিতর থেকেই। এর জবাব দেয়া হয়নি, কারণ তাদের কাছে জবাব ছিল না। আর উদ্দেশ্য খারাপ ছিল।

    আবার টুইন টাওয়ারে হামলাকারীরা মুসলমান তাই মুসলমানমাত্রই ‘আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকুরিটি’ তাদের ধরে এনে শাস্তি দেয়া বা সন্দেহ করা, রিমান্ডে এনে টর্চার করা ও রেনডিশন [rendition] কেন? এটা তো আমেরিকান কনস্টিটিউশন ও আইনেরই বরখেলাপ। এছাড়া এই চিন্তা গোত্রবাদী, সঙ্কীর্ণ ট্রাইবাল চিন্তা। আমেরিকান রাষ্ট্রেরই এই কাজের এখতিয়ার নেই। হামলাকারিরা মুসলমান বলে সারা দুনিয়ার মুসলমানেরা এতে অপরাধী – এটা হতে পারে না।  এটা কোনো চুরির জন্য চোরের বাপ-মাকে ধরে এনে শাস্তি দেয়ার মত।

    RENDITION: (especially in the US) the practice of sending a foreign criminal or terrorist suspect covertly to be interrogated in a country with less rigorous regulations for the humane treatment of prisoners.

    এখানেই শেষ নয়। এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে গেছে। আপনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, আপনার মুসলমান-মুক্ত আমেরিকা কায়েম করতে চাওয়ার পথে নেমে যাওয়া মানে, আপনি উসকালেন যেন এখন মুসলমানরা পাল্টা পশ্চিমা বা আমেরিকান-ছাড়া নিজেদের দুনিয়া কায়েমের রাস্তায় যায়। এখন এতে আপনি অবশ্যই দেখাতে পারবেন যে, মুসলমানেরা কত খারাপ, তাদের চিন্তা সঙ্কীর্ণ, তারাই কারো সাথে থাকতে পারে না, চায় না, ইনক্লুসিভ না ইত্যাদি বহু কিছু! কিন্তু দুনিয়া তো আগেই ভাগ করে ফেলেছেন! এর কী হবে? মুসলমানেরা নতুন আফগানিস্তানে আমেরিকানদের নেবে না, দেখতে চায় না –  এমন একটা দুনিয়া এখন তাদের কল্পনায় হাজির হয়েছে। অনেকে হয়ত স্বপ্ন দেখছে আমেরিকান ছাড়া এক বাংলাদেশ গড়বে! এখন এর কী সমাধা করবেন?

    জানি, আমেরিকান-মুক্ত নতুন আফগানিস্তান কিংবা বাংলাদেশ-এসব একেবারেই অবাস্তব এবং এটা তাদের চরম রাগ-ক্ষোভের প্রকাশ! অত্যাচার, নির্যাতন অপমান ‘রেনডিশন’ … ইত্যাদি ! কিন্তু  এসব কি সহজে মুছে যাবে…। কী দিয়ে মুঝবেন? পরাশক্তির বড়াই? বেন রোডস, আপনি নিজেই বলছেন, লাদেন নয়, তাকে গ্রেফতার  ছাড়িয়ে বুশ ও তার বন্ধুদের ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে ইত্যাদি…।

    তাহলে আবার মিথ্যা আশ্বাসের কথা কেন বলছেন? কেন বলছেন, বাইডেন আমেরিকাকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বি করে আবার যোগ্য করে হাজির করতে পারবেন? সমস্যা তো চীনের সাথে প্রতিযোগিতা নয়। এটা কোন বড় সমস্যা নয়।  আসল সমস্যা দুনিয়ার দ্বিবিভাগ – আমেরিকান ছাড়া মুসলমানের দুনিয়ার কল্পনা হাজির হয়ে গেছে, এর সমাধান কী? মুরোদ দেখান। সবার আগে নিজেদের এসব অপ-ততপরতা এবং এক্ট আবার ফিরে চেক করেন, পুনঃমূল্যায়ন করেন। কোথায় ভুল হয়েছে, উপলব্ধি ও স্বীকার করেন সবার আগে। এসব ছোট ছোট কিন্তু পাওয়ারফুল পদক্ষেপ ছাড়া মুসলমান বা ইসলাম ইস্যু আমেরিকার পিছু ছাড়বে না। আপনি ভান করতে পারেন যে, আফগানিস্তান বা ইরাক ছেড়ে এসেছেন মানে সব পাপ ধুয়ে গেছে। না, তা একবিন্ধু ধুয়ে যায় নাই, যাবে না। অন্তত অপরাধী মন নিজেই নিজেকে তাড়া করে ফিরবে!   ইতোমধ্যে পশ্চিম বা আমেরিকার বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতক’ শব্দটা অনেক কর্নার থেকে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়েছে। তা নিশ্চয় আমেরিকার জন্য ভালো কিছু নয়!

    আমেরিকা গ্লোবাল নেতা আর না থাকলে কী? সেই আমেরিকার এর পরেও দুনিয়াকে বহুকিছু দেবার যোগ্যতা থাকবে। এখনো লন্ডন বা প্যারিস বহু মানুষকে সেটেলমেন্টের শহর হিসেবে আকৃষ্ট করে। ফলে এসব কোনো বড় ফ্যাক্টর নয়। কিন্তু মানুষের দ্বিবিভাগ! আমেরিকা-মুক্ত মুসলমান অথবা মুসলমান-মুক্ত আমেরিকা? এটা মানুষের জন্য কোনো ভালো বার্তা নয়! আপনি শাহরুখ খান হলেও বা এক সাধারণ এশিয়ান মুসলমান হলেও আপনাকে পশ্চিমা বা আমেরিকান ইমিগ্রেশনে অপমানজনকভাবে আটকে থাকতে হতে পারে। আফগানিস্তান বা ইরাক বাইডেন ছেড়ে গেলেও এসব বিভক্তির শেষ হবে না!

    অথচ এই বিভক্তি দূর করা, চীনের ওপর প্রতিযোগিতায় বাইডেনের বিজয়ী হওয়ার চেয়েও অনেক বড় ও গুরুত্বপুর্ণ কাজ!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৮ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কানে কি পানি ঢুকেছে? মনে হচ্ছে!“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    গৌতম দাস

    ২৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬

    AFTER   AFGANISTAN,THE  PAX  AMERICA  IS  OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    PAX AMERICA IS OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    সব ভেঙে গেছে, ভেঙে পড়ছে। খসে খসে পড়ছে, এক এক করে! আমেরিকান ক্ষমতার সাজানো বাগান। আর লুকানো যাচ্ছে না। শুধু আমার কথা নয় এটা। দেখা যাচ্ছে যারা এতদিন শুধু আমেরিকান সমর্থক না আমেরিকা তাদের জীবন, ভরণপোষণ, পেশা ইত্যাদিতে ডেইলি-লাইফের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এমন ব্যক্তিরাও এখন আমেরিকার সাথে নিজের দুরত্ব তৈরি করছে। এরাও আমেরিকার কোন দায় আর নিতে চাইছে না। দুনিয়া এখন এমন নতুন চেহারায় পৌছেছে।
    কোনো  পরাশক্তি এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেখা যায়নি। এটা ওর জন্য বিশাল সঙ্কটের একটা যুগে প্রবেশ। এর গভীর সংকটের বড় লক্ষণ ও প্রধান  প্রমাণ হল যখন, এই দেশের অভ্যন্তরীণ সব বিরোধ-মতান্তর খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়। আমেরিকান সমাজে অসংখ্য বিভক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আরেক বড় লক্ষণ হাজির হয়েছে, সবার গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়া। তাই এখন আফগান-রিলেটেড প্রায় সবাই হতাশায় হাত-পা ছুড়ছে। কে যে কাকে গালাগাল করছে তার কোনো তাল-ঠিকানা নেই। অনেক সময় রাগে ক্ষোভে বা গভীর হতাশায় অথবা নিজেদের আর ভবিষ্যৎ নেই দেখে ফেললে – বড় মানুষও শিশুদের মতো আচরণ শুরু করে; নিজের বাবা-মাকেই গালাগালি শুরু করে; এটা তেমন অবস্থা যেন! কিন্তু  কোন ঘটনাটা এমন এত বড় প্রভাব ফেলতে পারল? আফগানিস্তানে তালেবান ২.০ এর উত্থান ঘটেছে! এরই প্রতিক্রিয়া এগুলো!

    প্রতীকীভাবে কিছু ব্যক্তিত্বের প্রতিক্রিয়া এখানে জড়ো করব।  রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশ (২০০১-০৯) থেকে শুরু করি। তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে মিথ্যা অভিযোগে হানাদার দখলদারি ঘটানোর প্রধান নায়ক। এবার তিনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে বকাবকি শুরু করছিলেন গত মাস (জুলাই) থেকেই যে বকাবকিটা ১৫ আগস্টের ( আমেরিকান কাবুলের পতনের দিন ) পরে আবার শুরু করেছেন। বুশের অবস্থান হল, তিনি আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের একেবারেই বিপক্ষে। তিনি আফগানিস্তান ছাড়তে চান না। বেচারা! কেন? কী যুক্তি তার? তিনি গত মাসে ১৪ জুলাইয়ে জার্মান ডয়েচে ভেলে’কে বলেছেন, সেনা প্রত্যাহার এক ‘ভুল কাজ’ [George W. Bush: Afghanistan troop withdrawal ‘a mistake‘]। তিনি আরো বলেন, ‘আফগান নারী ও মেয়েদের বর্ণনাতীত কষ্টের কথা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন” [I’m afraid Afghan women and girls are going to suffer unspeakable harm,” Bush said.(২০ জুলাই)]।’ আচ্ছা, তার মানে কি তিনি আফগান নারীদের দুর্দশামুক্তির নায়ক হতেই আফগানিস্তান দখল করেছিলেন? তাই কী?   না, তা কেউ বলছে না, তিনিও তা দাবি করছেন না। তা হলে, এমন ভুয়া উদ্বিগ্ন কেন তিনি?

    পিছনের বিশাল কারণটা হল, আফগানিস্তানে ও ইরাকে জাতিসঙ্ঘের চোখেই আমেরিকা হানাদার ও দখলদার বাহিনী, আর এই কাজের প্রধান নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ও কর্তা তিনি নিজেই। বুশের এই একচুয়াল লিগ্যাল স্ট্যাটাস লজ্জাজনক, এটা তিনি জানেন। একবার জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান তা পাবলিকলি উচ্চারণ করেছিলেন। তাই বুশ জানেন, বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে আমেরিকান সমাজে এখন প্রশ্ন উঠবে যে আমেরিকার তাহলে লাভ হলো কী? ২০ বছরে মার খেয়ে? দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে? এবং সবাই প্রেসিডেন্ট বুশের বিরুদ্ধে আঙুল তুলবে? তাই অন্য কারো তাকে বিব্রত করে ফেলার আগেই তার ভান হল, নারীর জন্য ‘প্রাণ কান্দা’। এজন্যই তার মুখরক্ষার বয়ান-দর্শন এখন একটাই, ‘নারীর-দুর্দশামুক্তি’। ভাবখানা এমন যেন নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারেন নাই। তা রক্ষা করতে বুশ বা আমেরিকা আফগানিস্তান দখলে এসে ২০ বছর কাটিয়ে গেল! কী তামশা!

    আমেরিকার এক পপুলার মিডিয়া হল ‘এনপিআর’ [NPR, National Public Radio] রেডিও। এরই ওয়েবসাইট লিখছে, আমেরিকা নাকি ‘আফগানিস্তানে গণতন্ত্র এনে দিতে গিয়েছিল []। তবে এটা করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত খোদ আমেরিকাতেই গণতন্ত্রের অভাব ঘটিয়ে ফেলেছিল, [The U.S. involvement in Afghanistan is a story of democracy and its shortcomings. ]।’ এদেখি বিরাট এক আঁতলামো! ইদানীং আমেরিকান মিডিয়ার এমন লেখা দেখে মনে হয় তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে, তাই কথার আর সেই ওজন থাকছে না। কখন কী বলে ঠিক থাকছে না।

    এ ছাড়া এ কথাটাও সত্য নয়। যেমন, বুশ দুই টার্মে ক্ষমতায় ছিলেন। প্রথম টার্মে যদি ধরে নেই পাবলিক জোশে তিনি আফগানদের কড়া শাস্তি দেয়ার জন্য বোমা ফেলতে গিয়েছিলেন, মানে নাইন-ইলেভেনে টুইনটাওয়ারে হামলার শাস্তি দিচ্ছিলেন। কিন্তু এরপরে কী? প্রশ্ন উঠবে, তাহলে এর পরও যুদ্ধ চালু রাখতে ভোটাররা তাকে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত করলেন কেন? এর দায় তো তখন অবশ্যই (লোভী) ভোটারদেরও নয় কি?  আসলে এসব ভোটারেরা কখনই দায়িত্ব নিতে চায়নি, বুশ বা তাদের প্রেসিডেন্ট কী করে বিদেশ থেকে দেশে টাকা আনছেন? আর বুশের পদক্ষেপ তাদের পক্ষে যাচ্ছে বলে তারা মেপেছিলেন ও আর উৎসাহ দিতে বুশকে আবার নির্বাচিত করে দিয়েছিলেন তাদের ওসব বৈষয়িক লাভ দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তাদের বিচারে আমেরিকান সমাজে “কাজ-কাম” আর ‘মানি সার্কুলেশন’ বাড়া দেখেই তো তারা সিদ্ধান্তে গিয়েছিলেন… “কাজেই বুশকেই আবার জিতিয়ে দাও”। তাতে আফগানিস্তানে কী হচ্ছে তাতে ভোটারদের কী – এভাবেই  তারা জিতিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধে আমেরিকান জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিকে জড়ানোর কারণে এই মানি সার্কুলেশন বৃদ্ধি পেয়েছিল- যেটা ছিল এক জবরদস্তি বৃদ্ধি। আর যুদ্ধ তো ঠিক কোনো ব্যবসা বা বাণিজ্য নয়। তাই যুদ্ধ শেষে কিছু রিটার্ন এলে আসতেও পারে, এই রিটার্ণের উপর ভরসা করে কেউ যুদ্ধে যেতে পারে না।
    যুদ্ধ দেশকে বিশেষ কোনো সুবিধা (অ-মানিটারি সুবিধা) কখনো কখনো এনে দিতে পারে। যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সবার উপরে সাবধান থাকতে হয়, কারণ, কোনো যুদ্ধের খরচ যেন দেশের বইবার সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি দাবি না করে বসে। সে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ করেও টিকে গিয়েছিল। আমেরিকা ইউরোপ (এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ) ও  এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন
    আমেরিকার উপর একই গ্লোবাল কর্তৃত্ব সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান-ইরাকের যুদ্ধের ব্যয় ছিল লাগামছাড়া আর বিপুল খরচের তুলনায় রিটার্ন এমন বড় কিছু নয়। ততদিনে যুদ্ধের সাত বছর পেরোতেই বেহিসাবি খরচের ভারে শুধু ‘আমেরিকান ইকোনমি’ নয় এর নেতৃত্বে ও সাথে থাকা ইউরোপসহ সারা গ্লোবাল ইকোনমিও মহামন্দার (২০০৮) কবলে পড়ে যায়। এভাবে এঘটনাই আমেরিকান কর্পোরেট হাউজ, ব্যবসাদার ও ভোটার সবপক্ষেরই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিয়েছিল। কারণ, গ্লোবাল মন্দার মধ্যে আর আফগান-ইরাক যুদ্ধও তো এক সাথে দুনিয়াতে কখনো চলতে পারেনি।

    এরপরের ওবামা দু-টার্ম বা পরে ট্রাম্প- দু’জনেই তাদের কালের যুদ্ধের উল্টা এরা – যুদ্ধের খরচ কমানোর নায়ক সাজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখকর খুব কিছু হয়নি। তবে দায়ীত্ব ও  বিবেচনাহীনভাবে যুদ্ধের দায় ফেলে পালিয়ে যাবেন – এই সস্তা শর্টকাট বেকুবির পথ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি তালেবানদের সাথে আমেরিকানদের চুক্তিও সম্পন্ন করেছিলেন একা ট্রাম্প নিজেই। ফলে তালেবান-চুক্তি করার মূল দায়ভার এককভাবে ট্রাম্পের। কিন্তু বাইডেন তা বাস্তবায়নে গেছেন বলে সব দায় এখন তিনি বাইডেনের ওপর চাপাচ্ছেন। এটাই বড় তামাশার।

    আবার বাইডেন আসলে  তালেবানদের ক্ষমতায় এনে নিজের সেনা-প্রত্যাহার নিশ্চিত করবেন এমন বাস্তবায়ক প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছেন।  যদিও এই দায় নেয়া যে খুবই রিস্কি তা তাঁরও অজানা ছিল না। কিন্তু তবু তিনি রাজি হয়েছিলেন; কারণ সেনা প্রত্যাহার তার সরকারের পরিচালনা খরচ কমাবে, এই ছিল লোভ। কারণ, আফগানিস্তানে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩০ কোটি ডলারের বেশি – । এখনকার আমেরিকা মানে অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব, সেই প্রাচুর্যের আমেরিকা আজ আর নেই। কিন্তু তার অর্থ দরকার। কারণ, এদিকে অর্থের সংস্থান ও সোর্সের খবর না রেখে বাইডেন  সারা ইউরোপ আর জাপানের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন [বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)] যে, চীনের পাল্টা ব্যাপক বিনিয়োগ সক্ষমতা, পাল্টা বেল্ট-রোড খাড়া করার সক্ষমতা হাজির করবেনই। এখন আফগান ফ্রন্ট থেকে সেনা প্রত্যাহার যদি বাইডেনকে কিছু খরচ সেভ করাতে সে অর্থই বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস হয়ে দেখায় – যদিও শেষে এসবই  সুখের গল্প হয়েই থেকে যাবে! সে সম্ভাবনাই প্রবল!

    কিন্তু এর আগেই (বাইডেনের উপর দিয়ে) ট্রাম্প দান মারার চেষ্টা করেছেন। তিনিও আগামী নির্বাচনের হিসাব মোতাবেক এখন উল্টা বাইডেনের ওপর নিজেরই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সব দায় চাপিয়ে নিজে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। তাই বলা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্টরা মাত্রই আসলে দায়দায়িত্ব নিতে না চাওয়া অপরচুনিস্ট, সুবিধাবাদী। তাই শেষে সব ভার বাইডেনের উপর। যেমন,  বাইডেন ইতোমধ্যেই তালেবান ক্ষমতা দখল নিয়ে নেয়ায় নৈতিক দিক থেকে ঘায়েল হয়ে গেছেন; আমেরিকানদের মানসিক-নৈতিক দিক দুর্বল করে ফেলেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের একগুঁয়ে নীতিটাই বাইডেন চুপেচাপে অনুসরণ করে যেতে চেয়েছিলেন। চীনা পণ্যের আমেরিকায় আমদানিতে বাধা দিতে ট্রাম্প ওসব পণ্যের উপর বাড়তি ২৫ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করেছিলেন। সেটা সযত্নে চালু রেখেছেন বাইডেন। আর সেটাই এখন বাইডেনের উপরই শাস্তি হিসেবে আসা শুরু করেছে। ঐ ট্যাক্স আরোপ বাইডেন আগে বদল করতে যাননি, ‘কম দেশপ্রেমী’ হতে চাননি বলে হয়ত। কিন্তু সেটাই বাইডেনকে আমেরিকার আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ দিতে উদ্যত হচ্ছে বলে খবর চাউর হয়েছে। একই কায়দায় এটাও ট্রাম্পের আরেক ফায়দা।

    তালেবান-ক্ষমতারকালে বাইডেনের ভারতঃ
    ওদিকে বাইডেনের তালেবান উত্থান পলিসি ভারতের জন্য একেবারেই অসহ্য হয়ে উঠেছে। ভারত আর নিতে পারছে না কিন্তু পালানোর পথ নাই। আর সবচেয়ে অসহ্য হয়েছে  মূলত, পাকিস্তানের কাছে ভারতের নৈতিক পরাজয়। পাকিস্তানকে আর ‘জঙ্গি দেশ’ প্রচার করে ভারতের সুবিধা হচ্ছে না, জমছে না। (যদিও ভারত তাতে ক্ষান্ত দেয় নাই।) গত ২০ বছর ধরে প্রপাগান্ডায়  – যেন পাকিস্তানই আফগানিস্তানের মা-বাপ; সব ইসলামী রাজনীতিক বা সশস্ত্র ধারার উৎস। এই ছিল ভারতের মুখ্য প্রপাগান্ডা বয়ান।  গত ২০ বছর আমেরিকার ওয়ার-অন-টেরর যেন আফগানিস্তানের তালেবানসহ অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপের  বিরুদ্ধে ছিল না, যেন আমেরিকার যুদ্ধ চলছিল (জঙ্গি) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আমেরিকা যেন  পাকিস্তানি ইসলামী জঙ্গি থেকে ভারতকে মুক্ত করতে লড়ছিল। বিশেষ করে এত দিনের আফগানিস্তান যেন ছিল এক নারীমুক্তির ঘাঁটি  – এমন এক বিরাট কারখানা। আর এখন যা হয়েছে তা যেন, তালেবানদের আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল নয় –  বরং “পাকিস্তানের কারণেই” এই নারীমুক্তির কারখানা -টা এখন যেন বন্ধ হয়ে যাবে। আফগান নারীরা বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে  আমেরিকান স্কলারশিপে পড়তে গিয়েছে।  ফ্যাক্টস হল, কাবুলে আমেরিকান পুতুল গণি সরকার পালানোর কারণে এখন  এসব নারীদের পড়াশুনা  অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। কিছু না হলেও তা একটা সাময়িক ধাক্কা খাবে।  কিন্তু  আমেরিকান প্রশাসন সতর্ক ব্যবস্থা নিলে কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। মূল কারণ, পড়াশুনার কেন্দ্রটা  আফগানের বাইরে আর, সেসব দেশেই স্কলারশীপের অর্থ পাঠাতে কোন সমস্যা নাই। তবে উদ্বিগ্নতা থাকবে আর নতুন করে ছাত্রীরা এই সুযোগ পাবে না, এটা অনিশ্চিত। কিন্তু ভারত ইতোমধ্যেই প্রচার চালিয়েছে যে  তা তালেবানদের দ্বারা নয়, পাকিস্তানের কারণে যেন বন্ধ হয়ে যাবে। এই ক্যাম্পেইন এতদিন কানে কানে বলার মতো করে চালিয়েছিল ভারত। বিশেষ করে ইউরোপের স্কানডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা বেশি  করে ঢাকায় আমাদের কানে পর্যন্ত পৌছিয়েছে।

    ভারত এই ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার কাজ হাতে নিয়েছিল আরেক কারণে। রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাকে সাথে নিয়ে তালেবানের ওপর শক্ত গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমের মধ্যে তাদেরকে আসতে বাধ্য করার জন্য ত্রয়কা গঠন [দেখুন ট্রয়কা নিয়ে  আমার আগের লেখায়] করেছিল যাতে এই তিন দেশের বিরল কমন ও শক্ত অবস্থান তালেবানদের দেখানো এবং মানতে চাপ দেয়া যে তাদের কমন অবস্থান ও বক্তব্য আবার নিরাপত্তা পরিষদেরই প্রস্তাব। এর বাইরের কারো বা কোনো প্রস্তাব নয়। আর এ কাজ বাস্তবায়ন করতেই তারা পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল, যার নয়া নাম দিয়েছিল ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতেই ভারতের সব পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডা পানি হয়ে গিয়েছিল। এসবেরই প্রতিশোধ হিসেবে ভারত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আফগান নারীদের মধ্যে প্রপাগান্ডা চালিয়েছে যে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ পাকিস্তান। পাকিস্তানই তালেবানদের পরিচালক। অতএব আফগান নারীরা যেন পাকিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসঙ্ঘে “পিটিশন” লিখে আবেদন জানায়। অথচ বাস্তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুনিয়ার কোনো সরকারের এমন কোনো অভিযোগই নাই। জাতিসঙ্ঘসহ কোনো ফোরামেই এমন কিছু নাই। কিন্তু ভারত ইউরোপের ক্যাম্পাসগুলোতে আফগান নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন পিটিশন স্বাক্ষর ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছেই।

    গতকালের আনন্দবাজার পত্রিকা এক মজার খবর দিয়েছে, ভারতীয় অ্যাম্বাসির সর্বশেষ দেড় শ’ জনের যে দলটা কাবুল থেকে ফেরত এসেছেন তারা ফিরে এসেছেন তালেবানের দেয়া সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহায়তায়। ঘটনা হল, তারা দেশে নিরাপদে ফিরতে চান বলে স্থানীয় তালেবান কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করলে কমান্ডার ভারতীয় অ্যাম্বাসির ২২টি গাড়ির কনভয়-বহর পাহারা দিয়ে এয়ারপোর্টে নিরাপদে পৌঁছে দেন। আনন্দবাজার লিজেই লিখছে, “সকলকে তাজ্জব করে ভারতীয় দূতাবাসের ১৫০ কর্মীকে বিমানবন্দরের পৌঁছে দিল ওই তালিবান বাহিনীই”। যার মানে ভারতের নিজের ছড়ানো তালেবানদের নেগেটিভ ইমেজ তারা নিজেরাই পরিস্কার করে তবেই ভারতে ফিরে আসতে পেরেছে।

    ‘কাউন্টার হিরো’ ব্রহ্ম চেলানিঃ
     ব্রহ্ম চেলানি (Brahma Chellaney) একজন ভারতীয়; তিনি অনেক বাংলাদেশীর মতই আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো। তিনি দিল্লিতে বসে আমেরিকান ফান্ডে এক এনজিও / থিংকট্যাংক চালান, নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ  [Centre for Policy Research ]। তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate]  কলাম লেখেন আর সে লেখা বাংলাদেশের ‘প্রো-আমেরিকান’ পত্রিকাগুলো অনুবাদ করে ছাপে। কিন্তু তিনি বাইডেনের তালেবানদের সাথে রফা-ডিল করা  নিয়ে ক্ষিপ্ত এবং পরে  তালেবানরা নিজ মুরোদে আফগানিস্তানে  ক্ষমতা দখল করলে, এরপর তিনি একেবারে ক্ষেপে আগুন হয়ে যান। এতে তিনি এমনই হতাশ আর ক্ষুব্ধ হয়ে গেছেন, যাকে বলে ‘রাগে অন্ধ’। এর আগে তিনি কখনও  আমেরিকার উপরে এমন পরিপুর্ণ হতাশ হয়ে পড়েন নাই, অন্তত আমরা দেখিনি। যেমন তার একেবারে ভেঙ্গে পড়া বুঝা যাবে যদি দেখি  তার এবারের লেখার শিরোনাম – ‘কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বনেতৃত্বের অবসান হলো’ [Pax Americana Died in Kabul]। এটাই এর প্রমাণ। এই লেখার শুরুতে তার কথা মনে করেই লিখছিলাম।

     

  • না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    গৌতম দাস

    ২৬ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৮

    https://wp.me/p1sCvy-3vl


    সরকার সঙ্কটে। মোদী সরকারের  নির্বাচন কমিশন, সুপ্রীমকোর্ট , মিডিয়া ইত্যাদি এমন প্রধান সব ইনস্টিটিউশনগুলো কোভিড ক্রাইসিসের সময় ভারতকে নিচে নামিয়ে, অকার্যকর করেছে। এক সাক্ষাতকারে এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক এক প্রেসিডেন্ট, দুষ্মন্ত দুবে।
    আর নিচের ছবিতে, ডঃ রামচন্দ্র গুহ একজন স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ তিনিও এক সাক্ষাতকারে বলছেন, মোদী ক্ষমতা-লোভী অসুস্থ [megalomaniac]; আর এটাই  কোভিডকালে ভারতের প্রশাসনিক মিস-হ্যান্ডিলিং পিছনে মোদীর নেতৃত্বের স্টাইল, এটাই প্রধান কারণ। এখানে সাথে দেয়া লিঙ্কগুলো আসলে সাক্ষাতকারের ইউটিউব লিঙ্ক, পাঠক খুলে দেখতে পারেন।

    চারদিকে “হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব” – এই সুরসুরি  বেচে ক্ষমতা দখল আর এভাবেই ২০১৪ সাল থেকে এতদিন করে খেয়ে আসছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  কোন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা এমন ধর্ম-ভাষা ইত্যাদির সুরসুরি তুলে নানা কিসিমের জাতিবাদগুলো এভাবেই মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজত্ব করে থাকে। তবে আগে ছিল সেটা মোদীর উত্থানের সময়। আর এখন পতনের সময় এর চেয়েও ভয়াবহভাবে তিনি হঠাত পড়তে শুরু করেছেন। ভারতের কোভিড ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে এই দ্বিতীয় ঢেউ [মাল্টিপল  বংশ-প্রজাতির ভাইরাস [variant] একসাথে আবির্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে] এর কালে মোদী সরকারের হিন্দুত্বের চাপাবাজি ও উন্মাদনা তুলে  এবার আর কিছুই ঢাকতে পারছে না। সব ম্যানেজমেন্ট অক্ষমতা আর ব্যর্থতা উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। উপরের সাক্ষাতকারের বক্তাদের বক্তাদের বক্তব্যের সারকথা এটাই।

    A Naga Sadhu, or a Hindu holy man, waves the Indian flag as he takes a dip in the Ganges river during the first Shahi Snan at “Kumbh Mela”, or the Pitcher Festival, in Haridwar, India, March 11, 2021. REUTERS/Anushree Fadnavis

    এদিকে, এটা উত্তরাখন্ড প্রদেশের (আগের উত্তর প্রদেশের অংশ) “হরিদ্বারে কুম্ভমেলা্র” ছবি। এসব ধর্মীয়-স্নান জাতীয় ততপরতার সাথে  [সাধু আর পতাকা এদুই এর মিলন এটা খুবই তালমিল-হীন ] ভারতীয় পতাকার কোন সম্পর্ক এর আগে কখনও দেখা গেছে বলে মনে পড়ে না। সম্ভবত, এটা বিদেশিদেরকেও দেখানো [এই ছবিদুটা আলজাজিরা ও জাকার্তাপোস্ট পত্রিকা থেকে নেয়া] যেন এর উদ্দেশ্য।  এছাড়াও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্বের জোশ-জজবা তুলে ভোট আদায়ের সাথে, মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সাথে সাধুগিরির সামাজিক ততপরতা একে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে বলে এমন; যা আগে পুরানা দিনে কখনও দেখা যায় নাই। এখন হচ্ছে এটাই  হিন্দুত্বের ভারতের মোদীর বিরাট নেতি অবদান।  মোদীর আরো বড় অবদান হল কোভিড দ্বিতীয় ঢেউ এর মধ্যেই অভয়দান করে এমন লাখ লাখ লোকের জমায়েতের আয়োজন করতে উতসাহ দেয়া। এই মেলায় এমনকি, এখানে কোন লালার স্যাম্পেল না দিয়েই আপনি কোভিড নেগেটিভ বলে সার্টিফিকেট পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা আছে [Testing negative without even giving a sample]। মোদী এখন বুঝতেছেন নিশ্চয়, এখানে কে কাকে আসলেই ফাঁকি দিতে পেরেছিল!

    আবার এর বিপরীতও আছে। কিছু আনন্দবাজারি মাথাব্যাথাও দেখে গিয়েছিল যে,  এক সাধু অভয় দিচ্ছিলেন – ভগবান আছে সব নাকি তিনিই রক্ষা করবেন……“It’s the voice of god, who says nothing will happen. God won’t let anything happen to us. I have full faith,” said Baba Prakash Puri Maharaj।
    আবার মেলার আয়োজক প্রধান  বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেছেন, “আমাদের কাছে বিশ্বাস সবথেকে বড়। মা গঙ্গার উপর মানুষের বিশ্বাস রয়েছে বলেই তো এত মানুষ এখানে স্নান করতে এসেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন মা গঙ্গা তাঁদের এই অতিমারির হাত থেকে বাঁচাবেন”। এমনকি উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়াতও বলেছিলেন, ‘‘মানুষের স্বাস্থ্য অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। তাই বলে ধর্মকে অবহেলা করতে পারব না”। ভোটের বাজার এতই চড়া।  কারণ, এবার হিন্দুত্বকে পিছনে ফেলে ছাপিয়ে উঠেছে কোভিড পরাক্রমশালী। মানে কোভিডে মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ফেল করায় আবার গরীবের কাজ ও পেটের বন্দোবস্ত করতে মোদী সরকার ফেল করায়।   অথচ ঠিক উলটা হয়েছিল গতবছর লকডাউনের আগে মারকাজের ইসলামি জমায়েতের বিরুদ্ধে সরকারি একশনে। বিবিসি লিখছে “প্রসঙ্গত, গত বছরের মার্চে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলীগ জামাতের যে মারকাজে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুসুল্লী জড়ো হয়েছিলেন, সেটিকে করোনা সংক্রমণের একটি ‘সুপার স্প্রেডার’ ইভেন্ট হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাই চিহ্নিত করেছিলেন”। যা মুসল্লিদেরকে সাজা খাটতে হয়েছিল, আদালতে দারস্ত হয়ে কোনমতে বাঁচতে হয়েছিল।  যদিও ইসলামবিদ্বেষ উঠানো হয়েছিল চরমে এই বলে যে প্রজাতি হিসাবে মুসলমান মাত্রই তাঁরা নিম্নস্তরের জীবন-অভ্যাসের মানুষ এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ও ঘৃণা ছড়িয়ে ।

    এটা এক প্রভাবশালী সাংবাদিক-সম্পাদক রাজদীপ সারদেশাই এর ভাবনা বলা যায়। তিনি বলতে চাইছেন, “অনুপযুক্ত শাসকের [inappropriate Governance] জন্যই কী ভারতের এই পরিণতি হল?

    এসব নিয়ে এখন সারকথায় বললে, এতদিন মোদী ও তার হিন্দুত্ব নাকি খুবই পপুলার, মারাত্মক জনপ্রিয়, এসব শুনতে শুনতে কাল ঝালাপালা অবস্থায় ছিলাম আমরা। কিন্তু এবার হঠাত করে মনে হচ্ছে সবার কানে পানি ঢুকে গেছে। কারণ, একেবারে উলটা গান শুরু হয়ে গেছে। মোদী আর হিন্দুত্ব নিয়ে নাকি ভারত আর ভাল নাই। মোদীর জনপ্রিয়তা হঠাত করে ব্যাপক ধ্বসের মুখে!  ভারতে এখন প্রতিদিনে কোভিডে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখের উপরে। আর সাথে মৃত্যুর সংখা ২৬০০ এর উপরে। কোন কোন রিপোর্ট দাবি করছে টুইটারে  হ্যাশটাগ #ResignModi এখন ক্রমশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।  অর্থাৎ ঠিকমত চিকিতসা না পাওয়া – যেমন টিকা বা অক্সিজেনের অভাবে থাকা চিকিতসালয়  আর কাজ না পাওয়ায় মানুষ প্রত্যেকের পেটে টান দেওয়াতে এবার মোদী আর আর তাঁর হিন্দুত্বকে পরাজিত করে সবার উপরে জোয়ার বা প্রভাব বিস্তার করেছে মানুষের বৈষয়িক জীবন  – যেমন স্বাস্থ্যসেবা আর কাজ পাওয়া। এই বেসিক বাস্তবতা। এতদিন মোদী ও তার বন্ধুরা ভেবেছিল তাঁরা হিন্দুত্ব এই জোশ বা আবেগ দিয়েই বাকি দিনও চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু এই প্রথম  হিন্দুত্বের উপর কোভিড ক্রাইসিসে মোদীর ব্যর্থতা প্রধান ইস্যু হিসাবে উঠে আসছে। মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না হওয়া – এটাই হিন্দুত্বের মোদীকে ধাওয়া করে পরাজিত করতে চাইছে।

    হিন্দুত্ব ফেল করেছে কেন?
    আগে বলেছি মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না করেও মোদীর হিন্দুত্ব বিজেপিকে গত সাতবছর ধরে কেবল সার্ভিসই দিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু সম্ভবত আর না। সেই রাতারাতি নোট বাতিল (পাঁচশ ও হাজারের নোট বাতিল) সিদ্ধান্তের সময় থেকেও যদি ধরি। মানুষের সহ্যক্ষমতা অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য।  আজ রিপোর্টারেরা লিখছে, তারা ভেবেছিল, মোদী এটা বেচতে সক্ষম হয়েছিল  যে হিন্দুত্বের ঐক্য – এই জাতিবাদ মানুষের জন্য অনেক কিছু এনে দেবে, অনেক সমস্যার সমাধান আনবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য  সাধারণ মানুষের। তারা তখনও প্রতারিত, এখনও। এটা তখনও সত্যি ছিল এখনও সত্যি যে মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ করতে যেমন এক নুন্যতম দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন প্রয়োজন, মোদী এর কখনই উপযুক্ত নয়, ছিল না। কিন্তু কোভিড ক্রাইসিস এখন চরমে উঠার মাধ্যমে এই ম্যাসেজ কী পাবলিকের কাছে পৌছাবে? আমরা এখনও নিশ্চিত নই।  তবে গণহারে পাবলিক যে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে, এটা প্রায় নিশ্চিত।  যেটা আরও ভয়াবহ ঘটনা হবে, দরজায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করছে তা হল, কোভিডে ঢলে পড়া অর্থনীতি যা নেগেটিভ প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে ও আছে দেড় বছর ধরে তা কী এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় আদৌও সামলাতে পারবে? এটাই হয়ে উঠতে পারে হিন্দুত্বের উপর প্রধান নির্ধারক ধাক্কা।  ভারতের বাজেট-বর্ষ শু্রু হবার মাস বা কাল হল ১ এপ্রিল। অথচ ভারতের উভয় সঙ্কটটা হল যে, এখনই লকডাউন আরোপ না করলে কোভিড একেবারেই আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আবার উল্টা দিকটা হল, এখন লকডাউনের দিলে এর ধাক্কা সামলানোর মত অর্থনীতি আর চালু থাকবনে না। এছাড়া, মানুষের সুস্থ থাকা ও কাজ থাকার বাস্তবতা আরও শুকিয়ে মরবে। এমন বাস্তবতায় গত সাতবছরে মোদীর হিন্দুত্ব ভারতের জন্য আরো কী কী হারানোর কারণ হয়েছে তা নিয়ে কিছু কথা বলব।

    ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কঃ
    রাজনীতিবিদ অপেক্ষাকৃত তরুণ কেউ হলে একটা বাড়তি সুবিধা কখনো পেতে বা নিতে দেখা যায়। সেই হল, এপ্রোচ বা আগানোর ধরণ। মানে কোন মনোভাব থেকে বসে একটি সমস্যাকে নেতা দেখবে? তাঁর আগের রাজনীতিক নেতারা যেভাবে দেখে এসেছেন সেভাবেই? নাকি নয়া উদ্যোগে? কোনো নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিকল্প পথ খুঁজে দেখে তাতে সমাধান বা অবস্থা বদলের চেষ্টা করবেন? দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা বা প্রধানমন্ত্রী নতুন বা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হলে তিনি অনেক ভিন্ন দিক থেকে সমাধান খুঁজতে চাইছেন, যা আগে ভাবা হয়নি। সমস্যা বা বিরোধগুলোকে বিপক্ষ অংশের সাথে বসে মানে তাদের চোখেও দেখে এক নয়া এপ্রোচে নতুন পথে সমাধান বা বিপক্ষকে মানানোর বা পরস্পরের সমস্যাটা ঠিক কোথায় তা ঠিকঠাক বুঝে এগোনোর পথ এক্ষেত্রে খুঁজে থাকেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব!

    ইমরান যখন ২০১৮ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন, তখন ভারতে বিজেপির মোদীর প্রথম টার্মে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে চার বছর পার করে ফেলেছেন তিনি। মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের মে মাস থেকে। মানে পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদী আবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা তখন। মোদী দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনিই ‘বিজয়ী’ বলে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ইমরান খান পাকিস্তানের আগের যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নয়া এপ্রোচ, নয়া উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই। কিন্তু সার কথাটা বললে, নয়া উদ্যোগের প্রধানমন্ত্রী ইমরানের থেকে মোদীর ভারত নয়া উদ্যোগ বা অ্যাপ্রোচের কোন সুবিধা পেতে বা নিতে চান বা নিয়েছেন; এমন আমরা দেখিনি। কেন?

    প্রথমত, এটা ঠিক মোদীর বিরুদ্ধে যতটা অভিযোগ, এর চেয়ে বরং বলতে হবে মোদির পক্ষে আসলে এমন কোনো আশা দেখতে পাওয়া বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নয়া উদ্যোগর পথে আগোনো অথবা ইমরানকে উৎসাহ দেয়া ইত্যাদি কোনটাই আসলে মোদির পক্ষে সম্ভবই ছিল না। সেই প্রসঙ্গেই এখানে বলব।

    তবে এর আগে সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এই তিন দেশের দুর্ভাগ্য যেখানে আটকে গেছে ও আটকানো শুরু হয়েছিল তা নিয়ে দু’টি সাদা কথা বলে নেব।

    ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ইস্যুগুলো এমন যে, এর অন্তত কিছু গূঢ়-ইস্যু নিয়েই অনন্তকাল বিবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। মানে কোন সমাধানের দেখা পেতে এখানে কতগুলো প্রজন্ম লাগবে এর হদিস কেউ জানে না। কাশ্মির ছাড়াও জন্ম থেকেই বিরোধের সূত্রপাত এমন অনেক ইস্যু আছে।

    কিন্তু এসব বিরোধের আসল উৎস কী তা স্বল্প কথায় বললে – এর প্রধান উৎস হলো ব্রিটিশরা কলোনি-ইন্ডিয়া ত্যাগ করে চলে গেলে কলোনিমুক্ত ভারত কেমন রাষ্ট্র হবে এ নিয়ে অপরিপক্ব জবাব দেয়ার চেষ্টা এবং রাষ্ট্র নিয়ে খাটো চিন্তা-ধারণা হাজির করা থেকেই আজকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান- এ তিন দেশ সেই থেকে সাফার করে আসছে, ধুঁকে মরছে।

    সমাজের কোন একদল নিজ ধর্মীয় বা যেকোনো আইডেনটিটিরই এক জাতি-রাষ্ট্র করবে বলে, বুঝে বা না বুঝে যদি গোঁ ধরে তবে এর পরিণতিতে তা বাকি সব পক্ষই আরেকটা করে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা অথবা অন্য যেকোনো ভিন্নতার আইডেনটিটির ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র গড়তেই তো চাইবেই। সব বিবাদের শুরু এখান থেকে, আর এথেকে নানান দিকে তা যাবেই। এটাই অনিবার্য আর তাই হয়েছিল। এই সরল সত্য ও বাস্তবতা বোঝার যোগ্যতা যারা প্রধান নেতৃত্ব দাবি করেছিল তাদের কারো ছিল না; বরং সবাইকে একটা আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রে আনতেই হবে আর সেটা হতে হবে এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই; এভাবে তা বাকি সবার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে হলেও যেন ‘এটাই হতে হবে’। কংগ্রেসের এই জবরদস্তি, এ থেকেই সব বিরোধের আরো ডালপালায় বিস্তার এখনো চলছে। এর শুরু বা আদিপাপের রচয়িতা-কর্তা মুসলিম লীগ বা জিন্নাহ একেবারেই নয়। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডাও চালু আছে। তবে এরা অবশ্যই নিরুপায় হয়ে অনুসারী মাত্র। সেই মূল রচয়িতা-কর্তা হলেন রাজা রামমোহন রায়;  এবং বিগত ১৮১৫ সাল থেকে শুরু করা তাঁর ব্রাহ্মসমাজ গড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এই ব্যর্থতা থেকেই পরে বঙ্কিম-প্রমুখেরা এক “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” জন্ম দেয়া বা গড়াই কংগ্রেসের লক্ষ্য সেট করেন।  আর তাতে সব বিবাদের শুরু হয় এখান থেকে।  রামমোহন, তিনি বোকা নাকি ইসলামবিদ্বেষী? সে যাই হোক, পাঠক বিচার করবেন, তবে কমিউনিস্টদের চোখে রামমোহনকে তারা মানেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু’ হিসাবে! এখন তাহলে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরাই ব্যাখ্যা করে দেন যে, কমিউনিস্টদের চোখে ধর্মচর্চা তো এখনোও খুবই খারাপ কাজ। অথচ এই বহু কথিত রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন, তিনি কী করে নতুন একটা আস্ত ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন? এ কোন বিপ্লবীপনা? আবার এটা নিয়েইবা সব রেনেসাঁবাদী কমিউনিস্টরা আজও বেমালুম চুপচাপ নির্বিকার কেন? কিভাবে? এর সাফাই কী এবং কৈ? তারা কেউ বলেন না! কেন?

    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, ভারত-পাকিস্তানের ক্যাঁচাল থেকে বাংলাদেশ এখন স্বাধীন হয়ে অনেক দূরে গিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু তা একেবারেই না। এমন মনে হলেও এটা সত্য নয়। কারণ অখণ্ড ভারতে আমাদের মূল বিবাদ ছিল, ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতিরাষ্ট্র খাড়া করে সমাধা পাওয়ার খায়েশ থেকে শুরু হওয়া নানা লড়াই থেকে বিভক্তি। তাতে বাংলাদেশে আমরা এখন ভৌগোলিকভাবে ভারত-পাকিস্তানের কেউ না বলে তাদের ক্যাঁচালের কেউ না – এই আত্মপ্রসাদ পেতে চাইলেও যা আমরাও সাথে নিয়েই হাঁটছি তা হল, বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই না? মূল কারণ যেকোনো আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র। এ কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যায়।

    বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষাভিত্তিক  আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে বা বের হতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই বা বিবাদের বাইরে না? মূল কারণ যেকোন আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে – এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র চাইবে। এসব কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যাবে। অথচ দরকার ছিল নন-আইডেনটিটি ও এক; সবাই সমান নাগরিক এই ভিত্তিতে এক “রাজনৈতিক সাম্য”; মানে সমঅধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র।

    এখন আমাদের প্রসঙ্গ মোদী-ইমরানের মধ্যে সীমিত করব। ভারত-পাকিস্তানের অবস্থা এখন এমন যে, সবাই ন্যূনতম এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায় হয়ত; সব পক্ষেরই কাম্য।  কিন্তু একই সাথে এর সমস্যা অন্যখানে। কারণ এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এমনকি বিজেপি-আরএসএসের মোদীরও হয়ত অকাম্য নয়। শান্তি পেয়ে গেলে তা মোদীর জন্য খারাপ কিছু হতো না। কিন্তু সমস্যা হল প্রায়োরিটির, অর্থাৎ মোদীও পাকিস্তানের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চান না অথবা কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন তার সাথে নতুন উদ্যোগ নিতে চাইবেন, তা করতেও মোদির কোনো আপত্তি আছে – ব্যাপারটা তা নয়, তা একেবারেই নয়। সমস্যা হলো প্রায়োরিটির।

    মোদির প্রায়োরিটি হল মানে এসবের আগে আরেকটা কাম্য জিনিষ আছে। সেটা হল,  ভারতের নির্বাচনে ‘হিন্দু-ভোটের মেরুকরণ’ হতে হবে, পরিস্থিতিকে এমন হতে বাধ্য করতে হবে, যাতে সব হিন্দু-ভোট বিজেপির বাক্সমুখী হয়, এমন এক জজবা-উত্তেজনা সৃষ্টি করা। কারণ ইমরান ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদীকে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্বাচনে জিততে হবে। তাই পাকিস্তানের সাথে মিথ্যা করে হলেও সীমান্ত-উত্তেজনা সৃষ্টি করা, সেভাবেই ভারতের সেনা ও সিভিল প্রশাসনকে সাজানো আর ঠিক নির্বাচনের আগে এই সীমান্ত বিবাদকে কোন একটা উসিলায় চরমে তোলা- এটাই হয়ে পড়েছিল মোদীর প্রায়োরিটি। যার মূল্কথা, পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ভাল সম্পর্কের খারাপ সম্পর্কই মোদীর জন্য বেশি ফলফায়ক। এমনকি সম্পর্কখারাপ এতা দেখানোতেই বেশি ফলদায়ক হবে – এই ছিল মোদীর চাওয়া। অর্থাৎ ভোটের বাক্সে হিন্দু মেরুকরণের ভোট, এটাই মোদির সবার উপরের প্রায়োরিটি হয়ে পড়েছিল। তাই ছদ্মযুদ্ধ লাগানো, পাকিস্তানে ভারতের মিথ্যা বোমা ফেলে আসার দাবি বা ছলনা তৈরি, ইত্যাদিই খুবই টপ প্রয়োরিটি ছিল মোদির কাছে। আর ৩৬ ইঞ্চি ছাতি দেখিয়ে মোদীই একমাত্র ভারত রক্ষাকারী নায়ক – এই ইমেজ ছিল নাকি ভোটে মোদীর ‘তুরুপের তাস’!

    অন্য ভাষায় বললে, মোদির হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাত-ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব- এমন দাবি করে যে রাজনীতি মোদী খাড়া করতে চান, অর্থাৎ কেউ হিন্দু হলেও বাস্তবত বরং সে হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার নাও হতে পারে, এমন হিন্দুত্বের রাজনীতির বাহক তিনি নাও হতে চাইতে পারেন – কিন্তু এটাই মোদী কখনোই এটা হতে দিতেই চান না, পারেন না। পরিষ্কার করে, মোদী মানে দিতে চান উল্টা। বলতে চান, কেউ হিন্দু মানেই সে মোদীর হিন্দুত্ব রাজনীতির বাহকও। এই একমাত্র অর্থ এবং ব্যাখ্যা ও বয়ানে মোদী পুরা ব্যাপারটাকে  আটকে রাখতে চান। এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি এবং এটা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদ। এটাই হিটলারের জার্মানি আর্য-নীল চোখের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ – এদের সবারই আরেক ভাই হিসেবে মোদী হিন্দুত্বের এক উত্থান ঘটাতে চেয়ে এসেছেন।

    মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইমরান খানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী – যিনি পাকিস্তানের তরুণ; নতুন করে যারা পাকিস্তানকে নিয়ে চিন্তা করতে চান এরই প্রতীক হলেন ইমরান। ইমরানই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, পাকিস্তানি নাগরিক সে যে ধর্মেরই হোক – পাকিস্তানের সব নাগরিকের মতই সবার সমান অধিকার আছে। ব্লাসফেমি আইন – যেটা মূলত এতদিন  জমিজমার দখলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ উদ্ধারের কাজে করা মামলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, এমন আসামিদের মামলার বিচারে সুপ্রিম আদালত যাকে খালাস দিয়েছে, নির্বাহী সরকারপ্রধান হিসেবে ইমরান তার মুক্তি নিশ্চিত করেছেন ; ইচ্ছামতো দেশ-বিদেশ যাওয়া বা চলাচলের অধিকার। ইমরান এটাকেই তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য কর্তব্যজ্ঞান করেছেন।

    অথচ চরম সঙ্কীর্ণ ও হিন্দুত্বের ভোট জোগাড়ে ব্যস্ত বিজেপির মোদী এমন ইমরানের কাছ থেকে ভারতের জন্য কোনো সুবিধাই চাইতে বা নিতেই পারেননি। কারণ মোদীর লক্ষ্য অন্য সংকীর্ণ কিছু। মোদীর লক্ষ্য মুসলমান-পাকিস্তানের সাথে টেনশন তুলে বা জিইয়ে রেখে সেই ইত্তেজনা নিজ দেশের নির্বাচনে হিন্দুভোট পোলারাইজ করতে ব্যবহার করা।  তাই ভারত-পাকিস্তানের বিবাদের ইস্যুগুলোর কোনো একটার বেলায় কিছু হাল করতে বা উদ্যোগী হতে পারেননি মোদী।  মোদীর সবার আগে দরকার বা প্রায়োরিটি হল, ইমরানকে মুসলমান দেশের নেতা ফলে শত্রু হিসাবে চিত্রিত করণ। এতেই মোদী তার সব ফয়দা দেখেছিলেন। যেমন এই আমলে,  ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানে পড়েছে যে কার্তারপুর-এর শিখ গুরুদুয়ারা, তা ভারতের পাঞ্জাবের শিখরা এখন যেকোন ভ্রমণকারীর মত মাত্র ২০ ডলার ফি দিয়ে ভ্রমণ করে আসতে পারেন। মানে গুরুদুয়ারা তীর্থ করে আসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরানের কারণে এটি সহজেই বাস্তব হয়ে গেছে।

    পরাক্রমশালী করোনার সামনে মোদীর হিন্দুত্বও খাটোঃ
    কিন্তু পরাক্রমশালী করোনাভাইরাস মোদীর মত যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক তাদেরকেও সোজা করতে পারে। অনেক কিছুই করতে বাধ্য করতে পারে, তাই মনে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় মুখে স্বীকার না করেও মিডিয়া রিপোর্ট হাজির হতে দিচ্ছিল যে ভারত-পাকিস্তান আলোচনা চলছে কখনো গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর ‘র’-এর মধ্যে। অথবা প্রশাসনিক কর্তা পর্যায়ে এবং মিডিয়া থেকে দূরে থেকে। এমন আলাপ আগের কংগ্রেস বা বিজেপি আমলেও হয়েছে, আর সেসব হয়েছিল মূলত ব্যাংককে। এবারো তা ব্যাংককে বা দুবাইয়ে হচ্ছে বলে মিডিয়া রিপোর্ট দিচ্ছে।

    কিন্তু কেন তারা এত লুকোচুপি করে আবার দেখাও করছে? এবং তা নিজ নিজ দেশের বাইরে করছে? কেন?

    একমাত্র কারণ মোদীর ‘ভোটবাক্স’ প্রায়োরিটি, যা আগে বলেছি। ভারতের কল্পিত বিরাট শত্রু মুসলমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোদী একাই লড়ে ভারতের হিন্দুস্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন, এই ইমেজ মোদীর ভোটবাক্সের জন্য খুবই দরকারি। কিন্তু এর অবস্থা এখন খুবই সঙ্গীন। যেমন কাশ্মিরে লাদাখ সীমান্তে যখন চীনের সাথে ভারতের সামরিক টেনশন চলছিল তখন মোদীর-সেনাদের টেনশন বাড়ছিল যে, কখনো যেন ভারতকে চীনের পাশাপাশি পাকিস্তান – এই দুই দেশের সাথে না তাদের নিজ নিজ সীমান্ত দুটা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে না হয় এটাই নিশ্চিত করা। তাই সে সময় চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথেও কথা বলে ভারত ধারণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভারত পাকিস্তানের সাথেও সঙ্ঘাত চায় না। এটা অবশ্যই ভারত পাকিস্তান দুই দেশের জন্যই লাভজনক ছিল। কারণ যুদ্ধের ফ্রন্ট খুললে তা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য কোনো ইতিবাচক ঘটনা ভাবার কারণ নেই। আর এ বাস্তবতার সুবিধাটাই ভারত উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পাবলিকলি দেখা করলে মোদীর ভোটবাক্সে টান পড়বে। আর সে কারণেই এত লুকোচুরি।

    এখানে কোভিডের আরেক সুবিধা বা অসুবিধার কথাও বলা দরকার। গত দেড় দুই বছরে মিডিয়া প্রশ্নে মোদী সরকার বিরাট সুবিধা ভোগ করে চলেছে। ভারতের লিডিং প্রায় সব মিডিয়া এখন মোদীর অনুগত, পায়ের কাছে ঘুরঘুর করার অবস্থা! কেন? কোন মন্ত্র বলে? কারণ প্রতিটি মিডিয়া কোভিডের ঠেলায় বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে এক অর্থনৈতিক টানাটানিতে ডুবে গেছে। ফলে কর্মীদের ৪০ শতাংশ বেতন দেয়ার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থাটাই বোঝা যাবে এটা দেখলে যে, ধনী-গরিব প্রতিটি মিডিয়াই এখন পাবলিক ডোনেশনের চাঁদা চেয়ে নোটিশ টাঙ্গিয়ে রেখেছে। কাজেই সবাই এখন একমাত্র ও সহজ উপায় হিসেবে দেখছে বিজেপির রাজনীতির পক্ষে সাফাই দেয়ার কাজকে। এমন মিডিয়া হয়ে যাওয়ার বিনিময়, সরকারি দল বা সরকারি ফান্ড হাতিয়ে নেয়া – এভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টাই এখন সব মিডিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা ধারা। তবে মিডিয়াগুলো আরেক নয়া কৌশল ধরেছে। তারা বলতে চাচ্ছে, তারা আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ঠিক প্রমোটর নয়। কিন্তু তারাই আবার দাবি করছে, তারা আসলে সেটা করেনি। তারা বরং হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের সরকার, সরকার যেই হোক তাকে সমর্থন দেয়া এটাই দ্য হিন্দুর সুহাসিনী হায়দারের কর্তব্য, অথবা দ্য প্রিন্টের শেখর গুপ্তের কর্তব্য – এরা এই আড়াল টেনে কাজটা করে যাচ্ছে।

    কিন্তু তবু সম্প্রতি আরো কিছু উইকেটের পতন ঘটেছে। এটা শ্রুতি কপিলা [SHRUTI KAPILA] নামে এক লেখকের দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় এক মন্তব্য-রিপোর্ট। তিনি বলছেন, টুইটারে ‘রিজাইন মোদি’ এই হ্যাশট্যাগ পপুলার ভিত্তি পেয়ে উঠছে [The trending of #ResignModi on Indian Twitter…… ]। তিনি দাবি করেছেন, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোভিড মহামারী এবার এই প্রথম ‘রাজনৈতিক’ হয়ে উঠছে। [It finally signalled that the Covid pandemic had become political.] মানে, রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

    তিনি লিখছেন, “গত বছরের এনিয়ে বিপর্যয়ের সময়ও মহামারী ছাপিয়ে উঠা সত্ত্বেও নিজ পপুলারিটি নিয়ে ‘চির-স্ট্রং’ মোদী এসবের ঊপরে থাকতে চেয়েছিলেন। বহু সার্ভেতেই দেখা গেছে, তিনি উপরে আছেন”। মিস কপিলা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলতে চান, গত বছরের কোভিড পরিস্থিতি কোনোভাবেই কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না। কিন্তু জনগণ এরপরও সম্মিলিতভাবে মোদীর উপর (তাঁর হিন্দুত্বের উপর) আস্থা রেখেছিলেন যে, তাদের হিন্দুত্বের ঐক্যবদ্ধতার কারণে মোদী সবাইকে রক্ষা করে নেবেন।

    মিস কপিলা আরো লিখছেন, ‘ভারতে এখন প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত কোভিড-রোগী ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ জনের; এমন সংখ্যা এটাই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আর মাফ করতে পারছে না। কমতেছে। টুইটারে প্রকাশিত ট্রেন্ড, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া হতাশা, এগুলোই সম্ভবত মোদীর হিন্দুত্বের সমর্থন হারিয়ে ফেলার প্রথম ইঙ্গিত! এখন ক্রমেই তাদেকে দেখা যাচ্ছে ভয়ের  বদলে ‘বিক্ষুব্ধ’ হয়ে উঠাকে প্রাধান্য দিতে। সম্ভবত এদিকটা খেয়াল করেই, মোদি সম্প্রতি পাবলিককে ডিসিপ্লিন থাকার জন্য আকুল আবেদন করেছেন”।’

    তাহলে দেখা যাচ্ছে এবারে মোদীর হিন্দুত্ব – এটা আর মহামারীর কারণে সরকারের উপর পাবলিকের আস্থার সঙ্কট কমে যাবার  বিপর্যয় ঠেকাতে পারছে না? কোভিডের মহামারীতে চিকিৎসার অভাব আর পেটের টানের বিরুদ্ধে এবার ‘হিন্দুত্ব’ আর কিছুই ঢেকে ফেলতে পারছে না! হিন্দুত্বের জোশ আর কি কাজ করছে না? মোদী এবার সব লুকিয়ে আগলে রাখতে কি ফেল করবেন! মোদি কী পাবলিকের আস্থাহীন নেতা হয়ে যাবেন? দেখা যাক! পানি কতদুর গড়ায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “হিন্দুত্ব ফেল, কোভিডে চিকিৎসাস্বল্পতা ও পেটের টানে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    গৌতম দাস

    ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০ঃ০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3uj

    বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পার করেছে। আর এ’বছরেরই ২০ জানুয়ারি মানে মাত্র দুমাস আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার শপথ নিয়েছেন। আমরা অনেকেই দেখার জন্য উদ্গ্রীব ও আগ্রহি ছিলাম যে ট্রাম্পের পাগলামি-উত্তর বাইডেন নতুন কী রাজনীতি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে এর কী প্রভাব পরে ইত্যাদি। অপেক্ষার পালা একটু দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মন-সংযোগ একটু ঢিলা পড়ে গিয়েছিল হয়ত আর এই ফাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত বা ঘটনার প্রকাশ ঘটে গিয়েছে। এই বিচারে গত ২৬ মার্চ মোদীর মত আরএসএসের ক্যাডার তিনি বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির প্রধান অতিথি হয়েছেন বলে নয়, এর চেয়েও বড় তাতপর্যপুর্ণ ছিল মোদীর এই সফর। যেটা বাইডেনের ২০ জানুয়ারিতে শপথের সময় কেন ২০ ফেব্রুয়ারিতেও আগাম বুঝা যায় নাই যে পরের মাসে ২৬ মার্চ এত তাতপর্যপুর্ণ হয়ে যাবে। যেমন এখন হয়ত আমাদের মনে পড়বে,  আমরা মনে করতে পারি, এবার ২৬ মার্চের প্রধান অতিথি কে হবেন ভারতের কসাই মোদী না তুরস্কের এরদোয়ান, এই আলাপ উঠতেও আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু বরং মার্চ মাস শুরু হবার পর ক্রমশই মোদীরই প্রধান অতিথি হওয়া ক্রমশ এক বিরাট গুরুত্ব নিয়ে হাজির হতে শুরু করেছিল। কেন?

    নতুন করে গ্লোবাল পোলারাইজেশনঃ আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুতগতিতে এটা আগাচ্ছে। আর বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের আমল পর্যন্ত আমরা কোয়াড (চীনবিরোধী চার রাষ্ট্রীয় জোট- আমেরিকা-ইন্ডিয়া-অষ্ট্রেলিয়া-জাপান) আর  সাউথ চায়না সি কেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাটেজি (উদ্যোগ) – এদুটার কথা জোরেশোরে শুনে আসছিলাম। ফলে “কোয়াড” ও “ইন্দো-প্যাসিফিক” কেন্দ্রিক পোলারাইজেশনই আগামিতে প্রধান হবে ও বাড়বে এমনটা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। এই ইঙ্গিত এখন পরিস্কার। বাইডেনের শপথ নেয়ার দুমাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বহু উলট-পালট হতে শুরু করেছে। আর এরই মাঝে বাইডেনের নিজের ফরেন পলিসির প্রায়োরিটি এর নিজের নতুন বৈশিষ্টগুলো নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসা মাত্র পালটা প্রতিক্রিয়াও শুরু এবং তা থেকেই নতুন করে নতুন পোলারাইজেশন এবং তা ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া আবার  এককথায় মেরুকরণ যা ভাবা হয়েছিল বাইডেলের আমলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইচ্ছা আকাঙ্খার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেমন, কোয়াড থেকে ভারতকে বেরিয়ে যেতে হবে – এটা ধরে নিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই আগানো শুরু করে দিয়েছে।

     এবার পোলারাইজেশনের রঙ্গমঞ্চ বঙ্গোপসাগরঃ আগের অনুমিত সাউথ চায়না সি,যেটা সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশমুখ, ঠিক সেটা এখানে আর মূল রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার থাকছে না। নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। এর উপর আবার এতে ভারত, বাংলাদেশ বা মায়ানমারের – এভাবে বঙ্গোপসাগর এই তিনদেশের  মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে ফোকাস।  অন্তত আমেরিকান ফোকাস। কেন এমনটা ঘুরে গেল?

    দুটা কারণে এই পরিবর্তন। পরপর বলে যাব। তবে পাঠক চাইলে নিজের মত আগেপিছে করেও পড়তে ও বুঝতে পারেন।

    প্রথমটাঃ  এখানে পরপর দুটা ট্রিগার টিপা হয়েছে। প্রথম ট্রিগার টানার ঘটনাটাই প্রথমে রেখে বলছি। এশিয়ায় আমেরিকা নতুন রূপে হাজির হয়েছে, এটাই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের হানিমুনের সমাপ্তি ঘোষণার ট্রিগার হতে যাচ্ছে। চীনবিরোধী আমেরিকা-ভারত এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক পুরানা, তৈরি শুরু ২০০৪ সালে। অবশ্য এরও আগেই বিজেপির বাজপেয়ির আমলে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নৌকায় ভারত নিজ কিছু শর্ত দিয়েছিল যে তাদের আতঙ্কবাদের (মানে পাকিস্তানকে টেরর-কান্ট্রি ধরে নিয়ে সেই চোখে দেখতে হবে) উঠে গিয়েছিল। পরে ভারতের ২০০৪ সালের মে মাসে মনমোহন সিংয়ের প্রথম টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্ব শুরু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের মার্চে বুশ প্রথম ভারত সফরে আসেন। আর তাতে যুগান্তকারি ঘটনা ছিল প্রথম আমেরিকান অস্ত্র এমনকি পারমানবিক কাঁচামালও ভারতকে বিক্রি এবং ভারতকে চীনবিরোধী করে (বয়ান মুখে তুলে দেয়াসহ) আকার-প্রকার দেয়া সবই এই সফর থেকে শুরু হয়েছিল। এরই ফরমা্ল নাম ছিল চায়না কনটেইনমেন্ট মানে চীন ঠেকানোর কাজটা ভারতকে ঠিকা দেওয়া।
    আমেরিকার এতে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইজিং ভারতকেও চীনেরবিরুদ্ধে ব্যবহার। কিন্তু মুদ্রার এপিঠের উল্টোদিক মানে তাতে আমেরিকান উলটা আরেক ফরেন পলিসিও ছিল, যেটা তখন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেটা হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ীভাবে নোঙর করার ইচ্ছা। যেটাকে ভারত জেনে সবসময়ই দেখে এসেছে গরীবের একতলা বাডির পাশেই বড়লোকের সাততলা বাড়ি বানানো আর ভারতের ঘরের ভিতরে কী ঘটছে সেদিকে নজরদারির চোখ ফেলা। আমেরিকা তার এই লুকিয়ে ফেলে রাখা জিনিষটা এতদিন লুকিয়ে রেখেই চীনবিরোধী নানাকিসিমের “ভারত-আমেরিকান সহযোগিতা” বলে ভারতকে দিয়ে কাজ করিয়ে চলছিল। সেটাই এবার স্থগিত, একাবারেই শুকিয়ে যাবে।

    কারণ, বাইডেনের আমলে তিনি এখন চায়না কনটেনমেন্টের চেয়েও বঙ্গোপসাগরে পড়শি সকলের ঘরে নজরদারি ফেলা – এটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ মনে করে আগানো শুরু করেছে। মানে এতদিন এশিয়ায় ভারতের পড়শিদেশগুলোতে (বা ভারতের কথিত নিজ-প্রভাবাধীন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর) সবখানে চীন ঢুকে পড়তেছে বলে অনবরত খামোখা ভারতের ন্যাগিং দেখছিলাম আমরা। যার ভিতর আমেরিকা ভারতকে আরো তাল দিত, আর বলত চীন ভারতকে নাকি মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন? সেখানে এখন চীন-ভারতের কথিত প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাইডেনের আমেরিকা নিজেও এক প্রার্থী হিসাবে মঞ্চে হাজির হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এনিয়ে হাতের কাছে ভাল ইঙ্গিত-প্রমাণ হল, আলী রীয়াজের প্রস্তাব বাংলাদেশ যেন আমেরিকার সাথে মিলে “বঙ্গোপসাগরকে হাব” বানায় অথবা “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”……।

    আমেরিকান এমন অবস্থান থেকেই আসলে ট্রিগার পয়েন্ট হল বাইডেনের আমেরিকার “বঙ্গোপসাগরের খায়েস” প্রকাশ হয়ে পড়া। কিন্ত এথেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় তাতে এরচেয়েও বড় ট্রিগার টিপতে প্রস্তুত এখন ভারত। কি সেটা?

    দ্বিতীয়টাঃ আগেই বলেছি আমেরিকার এতদিন লুকিয়ে রাখা এই খায়েস যেকোন সময়ের জন্যই ছিল ভারত-আমেরিকার মাঝে চরমতম শত্রুতা শুরু করার সুপ্ত পয়েন্ট। ভারত এতই কঠোরভাবে সবসময় আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে ছিল ও আছে। ভারতের এত শত্রুতা-জ্ঞানবোধ চীনের বিরুদ্ধেও সম্ভবত নাই। ভারতের সব সরকারই এবং ইল্টেলেক্টরাও মনে করে এসেছে এটা ভারতের জন্য এতই ক্ষতিকর যে আমেরিকা এতে ভারতের সব উত্থান সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিবে। তাই বাইডেন যতটা না ট্রিগার টেনেছেন এর চেয়েও প্রকাশ্যে ট্রিগার ইতোমধ্যেই ছোড়া শুরু করে দিয়েছে ভারত। এরই একটা পর্ব ছিল ২৬ মার্চ মোদীর বাংলাদেশ সফর। সেটা কী রকম?

    কমন এনিমির বিরুদ্ধে এক হওয়াঃ  অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি যে  এতদিনের ভারত-আমেরিকার চীনবিরোধী যে গভীর আত্মীয়তা চলেছিল এর দিন শেষ হয়েছে। আমেরিকাই এখন ভারতের প্রধান এনিমি। এদিকে আমরাও অনেকবার দেখেছি ও বলে এসেছি যে, আমাদের সরকার গত চৌদ্দবছরের চড়াই-উত্রাইয়ে  সবচেয়ে কম আস্থা রেখে এসেছে আমেরিকার উপর; তা সে ওবামা,  ট্রাম্প বা বাইডেন যারই আমেরিকা হোক। এমনকি সরকারের আয়ু বাড়ানো প্রস্তাব বা আলী রীয়াজের প্রস্তাব যতই লোভনীয়ভাবে হাজির করা হোক না কেন এথেকে দূরে থাকলেই তা সরকারের আয়ুর স্বার্থে যাবে বলে আমাদের সরকার মনে করে এসেছে।  এই সুত্রেই  এবার মাঠে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের এক কমন এনিমির আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রশ্নে ঘনিষ্ট হওয়া ও পরস্পরকে রক্ষায় সহায়তা করার এক বাস্তবতা হাজির হয়েছে, মনে হচ্ছে। প্রায় ঠিক যেমনটা এর আগে সুজাতা সিংয়ের সফর থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন ওর প্রাক্কালে যেটা হয়েছিল। অনুমান করা যায় গত ২৬ মার্চ ছিল এই গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গে তাদের সিরিয়াস আলোচনার এক ভাল সময়। এটাই স্বাভাবিক।

    তাহলে বাইডেন কী বোকা মানুষ, তিনি কেন বঙ্গোপসাগর সেভেন্থ-ফ্লিট মোতায়েনের আকাঙ্খার ইঙ্গিত এসময় হাজির করতে এলেন? না; অবশ্যই তিনি বোকা নন। মূল কারণ ইতোমধ্যেই  আমেরিকা ভারতকে কোয়াড থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে এর সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। যেমন ব্যাপারটা দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষ্য হল, US Will ‘Expel’ India From Quad।   আবার ভারত নিজেই নিজেকে কোয়াড থেকে বের করে নিতে যাচ্ছে তা আসন্ন  – এটা ভারত-আমেরিকা দুপক্ষের কাছেই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কিভাবে?

    দুই ইস্যু এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইটঃ
    এস-৪০০ এটা রাশিয়ার তৈরি এক এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম যা আমেরিকার এফ-৩৫ এর মত যত বোমারু বিমান আছে সেসবের ‘যম’ মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার ভাষায়, “এস-৪০০ এর কাছাকাছি স্থানে এফ-৩৫ চালানো অনুচিত”। কারণ, তা ঐ বোমারু বিমানকে নামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এনিয়ে আমেরিকার মূল নীতি অবস্থানটা হল আরো কঠিন। তা হল, একই দেশের হাতে একসঙ্গে এস-৪০০ আর এফ-৩৫ এর মত কোন বোমারু বিমান থাকতে পারবে না। তাই সোজা সিদ্ধান্ত যে দেশ এস-৪০০ কিনবে আমেরিকা তার উপর বাছবিচার ছাড়াই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কেবল পাগলা ট্রাম্পের কথা। কিন্তু এখন সবাই পরিস্কার যে এটা বাইপার্টিজান – খোদ পেন্টাগনের অবস্থান। তাই যে এস-৪০০  কেনাটা শুরু হয়েছিল তুরস্ককে দিয়ে তা এখন পাকিস্তান, ভারতসহ যারা যারা এমন যে কেউ কিনবে ভেবেছে, তারা সবাই আবার সাথে ভেবেছিল যে কেবল তার বেলায় অনুরোধ করলে আমেরিকান প্রশাসন বিশেষ ছাড় দিবে – কিন্তু এখন সবাই বুঝে গেছে, এটা সবার ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
    শুধু তাই না, ব্যাপারটা আরো এগিয়ে কঠিন হয়েছে ভারতের বেলায়। এপ্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক শক্ত ও আগাম নির্ধারিত। এতদিন  ভারত মনে করে এসেছিল ভারতকে আমেরিকারই নিজ স্বার্থে দরকার আর ভারতও রাইজিং। ফলে আমেরিকা যদি বিশেষ ছাড় না দেয় তবে ভারত আমেরিকাকেই ত্যাগ করে হলেও এস-৪০০ কিনে নিজের সামরিক বহর সাজাবেই। এই প্রসঙ্গে সর্বশেষে দেনদরবার হয়ে গেল গত ১৯ মার্চ থেকে তিনদিনের বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ভারত সফরে [Russian Arms Sale Clouds U.S.-India Ties]। এতে দুপক্ষই কড়া শেষকথা শুনে বুঝে যায় কোন পক্ষই সরতে পারছে না।
    ওদিকে ইতোমধ্যে বহু আগে মানে নির্বাচনে প্রচারণার সময় থেকেই বাইডেন পরিস্কার করে উল্লেখ করে আসছেন কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের উপর হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ইস্যুতে তিনি ক্ষমতাসীন হলে সরব অবস্থান নিবেন।  কিন্তু এদুটাই মোদীর ভারতের নির্বাচনে হিন্দু মেরুকরণ করে তাদের ভোট বিজেপি-বাক্সে তোলার গুরুত্বপুর্ণ কৌশল যা তিনি কোনভাবেই ত্যাগ করতে চান না বা পারবেন না। অতএব এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইট – এদুই বড় সংঘাতের ইস্যুতে আমেরিকা-ভারত বিচ্ছেদের ঘোষণা এখন  যেকোন সময়ের ব্যাপার।

    ইতোমধ্যেই প্রথম প্রকাশঃ বার্মা
    গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল বার্মার সামরিক বাহিনী দিবস। মায়ানমার যা কার্যত সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন এক রাষ্ট্র সেখানে এই দিবসের তাতপর্য আমরা অনুমান করতে পারি। এক রিপোর্ট বলছে, বার্মায় ৪২ বিদেশি মিশন আছে যাদের এমবেসিতে “মিলিটারি এটাসে” পদ আছে আর তাতে কেউ আসীন হয়ে বার্মায়  উপস্থিত  আছেন। এদের মধ্যে আটজন এটাসে [attaché] ঐ প্যারেড অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।  জাপানি নিক্কি পত্রিকা বলছে ঐ দেশগুলো হল, Russia, China, India, Pakistan, Bangladesh, Vietnam, Laos and Thailand ।  মানে ঐ আট রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গুরুত্বপুর্ণ এক রাষ্ট্র। এর মানে  যে ভারত  তার কোয়াডের সব বন্ধুদের  ত্যাগ করেছে যা পক্ষ বদল করেছে বলা যায়, আর এভাবে প্রকাশ্যে তার মিলিটারি এটাচে হিসাবে একজন ঐ প্যারেডে যোগ দিয়েছিল। এমনকি  বাংলাদেশও রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমান তাসত্বেও “ব্যবহারিক কারণে”, [pragmatic attitude]ভারত-চীন-রাশিয়াকে অনুসরণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা এতে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অতিথি ছিলেন রাশিয়ার ডেপুটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন।
    মূলকথা,বাইডেন তার নিজের পলিসি-স্বার্থগুলো খুলে বসাতে এবার নতুন করে এক ব্যাপক গ্লোবাল পোলারাইজেশন এর বাস্তবতা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এই আট দেশের মিলিটারি এটাসে দের একসাথে অংশগ্রহণ এটা যেন বাইডেনের বিপরীতে চীন-রাশিয়া পক্ষ দেখাতে চেয়েছে যে তাদের পক্ষে কে কে আছে। আসলে ভারত পক্ষ বদলিয়েছে এটাই পুরা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর যেন বাইডেনকে দেখানো যে তোমার পক্ষের ভারত আর তোমার সাথে নাই।

    কে কোন পক্ষে থাকছেঃ
    জিনজিয়াং-উইঘুরে মানবাধিকার ভায়োলেশন ইস্যুতে বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সাথে পেয়েছিল। একসাথে তারা এই ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে আবার বড় ক্ষত ও বাইডেনের দুর্বলতার দিকটা সব সময় আছে যে, উইঘুরে মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে চীনবরোধী জোট পাকায়ে চীনের থেকে বৈষয়িক সুবিধা হাসিল করা এতদিন পশ্চিমের মূল উদ্দেশ্য  হয়ে এসেছে।  সোজা কথায়,  পশ্চিম এখন পর্যন্ত সবসময় এভাবে মানবাধিকার ইস্যু তুলেছে কিন্তু শেষে তা বিক্রি করেই খেয়েছে। কাজেই পশ্চিম এই নৈতিকতার সংকট খুবই মারাত্মক থেকেছে। যেমন বার্মার ২০০৮ সালের গঠিত কনস্টিটিউশনে  আর্মি রাজনীতিতে অংশ নিবে সহ সব নির্বাহী ক্ষমতার ভাগীদার থাকবে  – সেকথা লেখাই আছে। আর সেসব কথা থাকা সত্বেও কি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জেনারেলদের প্রশংসা করে গো এহেড অনুমোদন দেয় নাই, জেনারেলেরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু কল বলে সার্টিফিকেট দেয় নাই? তাহলে আজ প্রতিদিন বার্মায় প্রতিবাদকারিরা হত্যার শিকার হলে এখন সহানুভুতির নাকিকান্নার উদ্দেশ্য কী? ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা খেদানো যখন চলছিল তখন আমেরিকা চীন-ভারতের সাথেও গলা মিলিয়ে কথিত আরসা আক্রমনের গল্প ফেঁদেছিল যেটা ছিল বার্মার জেনারেলদের হল্প আর সেটাই আমেরিকানেরা আমাদের কাছে সাফাই দিয়েছিল যে আরসার কথিত আক্রমণের কারণেই নাকি পাল্টা রোহিঙ্গা খেদানোর শুরু।
    সোজা কথায় মানবাধিকারের ইস্যু বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে সুবিধা আদায় – এদিকটাই প্রধান পশ্চিমা স্বার্থ, সেটাই অনেকদিন থেকেই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।  ফলে বাইডেনের যে মেরুকরণ দাড়াচ্ছে চীন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে – এই বাইডেন জোট এখনও বড় বড়  নৈতিকতা সংকটে আছে এবং থাকবে।

    ফলে বাইডেনের জোট -কোন নৈতিক বা নীতি-পলিসিগত ভিত্তির সমস্যায় আছে  ও এমন ইমেজ সংকটে হাজির হয়েছে। আর এমন মিস-ফায়ার হওয়াতে এর সুযোগ নিয়ে পালটা চীন-রাশিয়ার জোটে আর তাতে (কোয়াড ভেঙ্গে) ভারতের যোগ দেয়া আর তাতে হবু বাংলাদেশ বা বার্মার যোগদান – এটাই বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নতুন রঙ্গমঞ্চ।

    সবমিলিয়ে বাইডেন যা করলেন তাতে তার পক্ষীয় জোটের নৈতিক বা গ্লোবাল কমন পলিসিগত শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর প্রশ্নে তিনি মারাত্মক খাটো হয়ে হাজির হলেন। শুধু তাই না, আবার একই সাথে তারা দুপক্ষজোটের সামরিক ঝোঁকগুলোকে তিনি জেনে অথবা না-জেনে উসকিয়ে দিলেন যা খুবই অবিবেচক অবশ্যই!

    সর্বশেষ জন কেরিঃ
    জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে বাইডেনের বিশেষ দুত। তিনি আগামি ৯ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন। সম্ভবত আগামি ২২ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যে ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এর দাওয়াত দিতে। আর সেখানে কী সাইড লাইনে আলী রীয়াজ যেভাবে বলেছিলেন “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা  আর অর্থনৈতিক করিডরের একটি ‘হাবে’ পরিণত করার আলাপ প্রস্তাব – সেটাই কী সেরে নেয়া হবে? মনে হচ্ছে সেটাই এজেন্ডা। যদি তাই হয় তাহলে একদিকে বাংলাদেশ নিয়ে মানবাধিকার অবণতির রিপোর্ট আর এদিকে এমন বঙ্গোপসাগর এজেন্ডা – ঠিক এটাই বাইডেনের জোটের সংকট, এই চরম নৈতিক সংকটের কারণের তার জোট ও তিনি ঠুঠো আর ধান্দাবাজ বলেই মানুষ দেখবে!
    বাইডেনকে একটা বেছে নিতে হবে – বঙ্গোপসাগর না হলে মানবাধিকার!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    গৌতম দাস

    ২৯ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3tW

    SOURCE

    আলী রীয়াজ আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। ঢাকার আরেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে যৌথভাবে তিনি এক রচনা লিখেছেন প্রথম আলো পত্রিকায়। তারই তৃতীয় পর্বে যে লেখাটা ছাপা হয়েছে, এর শিরোনাম “রাজনীতিতে ধর্মের ফিরে আসা”।

    রাজনীতিতে ধর্ম আসতে পারবে না বা ফিরে আসতে পারবে না ইত্যাদি এসব খুবই একঘেঁয়ে ধারণা, অতি ব্যবহারে জীর্ণ ফলে ক্লিশে [cliché] আর ভুল; এছাড়া সর্বোপরি বহু আগেই চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া এই ধারণা। এএসব কথা ন্যাগিং-এর পর্যায়ে পৌছানোয় তা আর নুন্যতম আগ্রহ তৈরি করে না। সিরিয়াস কোন আলোচনা এখান থেকে শুরু করা যায় না। এছাড়া কেন এই তর্ক কেউ তুলছে এর উদ্দেশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সৎ বা পরিস্কার রাখা হয় না। এছাড়া পলিটিক্যাল বায়াসনেস তো আছেই। যেমন যেই ভারতকে “সেকুলারিজমের পিতৃভুমি” হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে এতদিন একে তুলনা করা হয়েছে এক বিশাল তুচ্ছতার চোখে যে কথিত ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান বা মুসলমানের বাংলাদেশ বলে – যেসব গর্বের ঠেলায় আমাদের প্রাণ যায় অবস্থা। অথচ “সেকুলারিজমের” নামে হাজির এই শক্তি মোদী বা আরএসএসের উত্থানে নির্বিকার। আবার মোদী তাদের ঘরের লোক এবং গ্লোবাল লিডারদের ক্ষমতার গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার হয়ে উঠেছে।  অথচ গুজরাট, দিল্লি কী উত্তরপ্রদেশের মুসলমানের রক্তে তার হাত রঞ্জিত হয়ে উঠেছে; এমন রাজ্যের সংখ্যা বাড়ছে তবু মোদীর রাজনীতি তাদের চোখে তেমন ‘ধর্মের রাজনীতি” নয়। এদের অনেকেই, “রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” নীতিগত অবস্থানের লোক – এই বলে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সারকথায়, রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” কথা যারাই তুলে তাদের উদ্দেশ্য এমনই গভীরভাবে অস্বচ্ছ থাকতে দেখা যায়। ফলে এদের কারণেই কোন সিরিয়াস আলোচনা সম্ভব হয় না। আর উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ থাকলে কোনদিকেই আগানো সম্ভব হবার কোন কারণ নাই। তবে সব জায়গায় দেখা যায় যে ইসলামি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে যারা আসছে বা ইসলামিস্টরা খারাপ  আর কথিত সেকুলারিস্টরা ভাল – এটাই একমাত্র এপ্রোচই।

    এদিকে রাজনীতি আর ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে যদি শুধু নাইন-ইলেভেনের পরই ধরি, তাতেও গত ২০ বছরে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। একেবারে উল্টে-পাল্টে অনেক দিক থেকে দেখে আলোচনা সমালোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রভাব এমন লেখকদের উপর পড়েছে তেমন মনে হয়নি।  যেমন এখানে দেখে যাচ্ছে  তিনি সত্তর দশকের মধ্যে থেকেই কথা শুরু করতে চেয়েছেন।

    যেমন আলী রিয়াজ শুরুতেই লিখেছেন, “১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলায় একে বলা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ “। এর মানে, কথিত সেকুলারিজম একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে নেওয়ার বিষয়। কিন্তু এই অনুমানটাই ভিত্তিহীন।  এছাড়া কেন এটাকে নীতি হিসাবে নিতেই হবে?  আর কী উদ্দেশ্যে?  ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখতে হবে তাই?  আবার পরিস্কার হয়ে কী তারা কথা বলছেন?  যেমন, ব্যাপারটা কী সাধারণভাবে ধর্ম নাকি নির্দিষ্ট করে ইসলাম? মানে ধর্মটা ইসলাম হলে এটাকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখার প্রশ্ন তুলতে হবে? ব্যাপারটা কী এমন? এর জবাব সব সময় কথিত সেকুলারিস্টদেরকে অস্বচ্ছ রাখতে দেখেছি।  কখনও রিভিজিট করে নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন জানা যায় না!

    মূলত প্রশ্নটা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করারই নয়। একেবারেই না।  প্রশ্নটা নাগরিকদের মধ্যে কোন ধরণের বৈষম্য না করার। এটা নিশ্চিত করা, এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের প্রধান শর্ত ও উদ্দেশ্য। তথাকথিত সেকুলারিজম যেখানে কোন ইস্যুই নয়। কারণ বৈষম্যহীন না থাকলে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সকলে সমান এমন সাম্যে থাকবে না। ধর্মীয়সহ সব পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সকলে সমান অধিকারের এটা চর্চায় নিশ্চিত করতে গেলে ব্যবহারিক দিক থেকে সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র আর ঠিক আর কোন একটা ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হবে না আবার কোন এক ধর্মবিরোধী তাও হবে না। এই অর্থে এটা ব্যবহারিকভাবে যতটুকু যা আলাদা। এর বাইরে যারাই নাগরিক-বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নয়, রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করতে হবে – এমন উদ্দেশ্যের কথা বলবে এরাই ইসলামবিদ্বেষী উদ্দেশ্যে কথা বলছে বুঝতে হবে। ইসলাম-কোপানি এদের উদ্দেশ্য।

    ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজম নীতি এসেছিল ইন্দিরার আত্ম-সংকটেঃ
    আসলে ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজমের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন ইন্ধিরা গান্ধী নিজেই, আত্মসঙ্কটে। এছাড়া সেটা ছিল  তাঁর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার শর্ত হিসেবে। অর্থাৎ অরিজিনালি সমস্যাটা তাঁর নিজের। কী সমস্যা? তা হল, সাতচল্লিশের দেশভাগ হয়েছিল নেহরুর স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে;  আর তা ভারতের মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র বানানোর মধ্য দিয়ে। ফলে নেহেরুর চোখে পাকিস্তান ভারতের স্বার্থের শত্রু, তা মেনেই এর জন্ম। তা হলে এই ভাষ্য অনুযায়ী ইন্দিরার চোখে ১৯৭১ সালেও শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীন তো মূলত সেই মুসলমানই যারা স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙ্গেছিল। তা হলে একাত্তর সালে এসে ইন্দিরা গান্ধী ঐ মুসলমানদেরই সহায়তা করবেন কেন? তাই আমাদের নয়, ইন্দিরার মন ভাল করতে পারে এ প্রশ্নের এমন একটা যুৎসই  সাফাই জবাব দরকার ছিল ইন্দিরার। সেই প্রশ্নটা যেন ইন্দিরার মনে উঠেছিল ১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে; যখন ভারত বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে কি না সেটা আর বাস্তবে অমীমাংসিত ছিল না। তবে ‘কী পরিচয়ের’ বাংলাদেশক্ব স্বীকৃতি ঘোষণা দিবেন, ইন্দিরা নামবেন তাই তিনি খুঁজে ফিরছিলেন।

    যেমন, আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন,  কোল্ডওয়্যারের ঝগড়ায় দুই ব্লক-রাষ্ট্রজোটে বিভক্তির সেই যুগে যখন পাকিস্তান-আমেরিকা-চীন এই  ব্লক-গ্রুপের বিপরীতে বাংলাদেশ-ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অ্যালাইনমেন্ট তৈরি সম্পন্ন হয়ে গেছিল ও এভাবে যুদ্ধ হতে যাচ্ছে তা মুখ্যত নির্ধারিত হয়ে গেছিল, এটা ছিল সেই সময়। কিন্তু তখনই ইন্দিরার মাথায় যেন উদিত হয়েছিল, কেন এই মুসলমানের বাংলাদেশকেই তিনি সমর্থন করতে যাচ্ছেন এর এক সাফাই-জবাব তাঁর হাতে থাকতেই হবে।  তাকে সুরাহা দিতে মুজিব বা তাজউদ্দীন যদি বলতেন যে তারা আর মুসলমান নয় তাহলে হয়ত ইন্দিরার মনষ্কামনা পুর্ণ হত। কিন্তু হায়! এমনটা সম্ভব নয়!  অবাস্তব স্বপ্ন বলে, এর বিকল্প হিসেবে যেন ইন্দিরার মাথায় আসে ‘সেকুলারিজম’ শব্দটা। অর্থাৎ বাংলাদেশ যেন নিজেকে সেকুলার রাষ্ট্র বলে স্বীকার করে নেয়, এমনটা করার পরই অষ্টম চিঠি চালাচালিতে ইন্দিরা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মানে ইন্দিরার ইচ্ছা পূরণ হয় এতেই যে, তিনি ‘মুসলমান বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি দেননি, ‘সেকুলার’ বাংলাদেশকে দিয়েছিলেন। এভাবেই  তাঁর অস্থির-মন কিছুটা শান্তি পায়!
    কিন্তু একাজ করেও ইন্দিরার সব দ্বিধা-সন্দেহ তবু চলে যায়নি। কারণ যেমনটা আলী রীয়াজের ভাষ্য, ‘সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ’ করা হয়েছিল – ব্যাপারটা ঠিক তা নয় আবার ওমনটা ফ্যাক্টসও নয়। অন্তত আমরা মানে বাংলাদেশ এটা নিজে যেচে কখনও গ্রহণ করেননি, বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া ছিল – তাই এখন প্রমাণিত।
    এছাড়া পাল্টা একটা বড় প্রশ্ন করা যায়, কথিত সেকুলার নীতি নেয়া ইন্দিরার চোখে যদি এতই কাম্য ও জরুরি হয়ে থাকে এমনকি ধরা যাক পবিত্র হয়ে থাকে তবে খোদ ভারতই ১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে (ওর কনষ্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে রচিত/গৃহিত) কথিত ‘সেকুলার’নীতির রাষ্ট্র ছিল না কেন? এই মহান সুযোগ ইন্দিরার বাবারা নেহরু বা গান্ধী খুঁইয়েছিলেন কেন? তাহলে তখনো ইন্দিরার ভারত নিজেই সেকুলার না হওয়া সত্বেও উলটা বাংলাদেশকে জবরদস্তিতে সেকুলার বানানো কেন? আলী রিয়াজের উচিত হবে এদিকটা খুঁজে দেখতে পারেন আগে। ইন্দিরার কাছেও এর জবাব ছিল না। বরং এনিয়ে আত্ম-অস্বস্তি ছিল, অনুমান করতে পারি। তাই এর ফায়সালা করতে ১৯৭৬ সালে (অর্থাৎ কথিত সেকুলার বাংলাদেশের জন্মেরই চার বছর পরে) ভারতের কনস্টিটিউশন বদলানোর সুযোগ পেয়ে খোদ ভারতকে কথিত সেকুলার ঘোষণা করিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হিসাবে দেখতে পারেন, The Constitution (Forty-Second Amendment) Act, 1976.

    কেন আওয়ামি লীগের পক্ষে নিজেকে কথিত সেকুলার বলা সম্ভবই ছিল নাঃ
    আবার বাংলাদেশের আওয়ামি লীগের  কাছে “তারা সেকুলার” এমন কথা মুখে আনাই সেকালে ক্ষতিকর ছিল – এটাই সেকালের ইতিহাস ও বাস্তবতা ছিল। এভাবেই আওয়ামী লীগ তৈরি হয়েছিল। সেটা কেমন?  কারণ, অন্তত ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দেওয়ার পরে আওয়ামী লীগের বিরোধীরা (মানে মূলত ইসলামী দলগুলো ও আর্মি সরকারের ভাষ্য যেটা)  ছয় দফার বিপরীতে তারা  অভিযোগ তুলে বলে চলত যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও ইসলামকে দুর্বল করতে চায় বলে ছয় দফা বা স্বায়ত্তশাসনের কথা তুলেছে। অর্থাৎ মূলকথা তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে “ইসলামকে দুর্বল ও ক্ষতি” করার অভিযোগ তুলত। এর অর্থ যেই আওয়ামী লীগের কাঁধে এমন অভিযোগ সেই দল তো যেচে বলতেই পারে না যে, সেকুলারিজম তার কোন হবু-রাষ্ট্রনীতি হবে! কারণ এতে ঐ অভিযোগকেই মেনে নেয়া বা প্রমাণ করে দেয়া হবে! এ কারণে কথিত “সেকুলারিজম” আওয়ামী লীগের দলে বা কোন নেতার মুখে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত থাকবার কোন সুযোগই ছিল না। এটাই আরেকটা খাস প্রমাণ যে “কথিত সেকুলারিজম” আওয়ামি লীগের নীতি ছিল না।
    অতএব, ১৯৭১ সালে আমাদের কথিত সেকুলার হওয়ার কথা যা আলী রীয়াজ দাবি করছেন তা  ভিত্তিহীন। তবে এটা পরিষ্কার যে, এটা ছিল ইন্দিরার ছুপা-মনোবাসনা! তাঁর মনের ‘খচখচি’ মিটানো! যা আমাদের উপর চাপানো হয়েছিল। অর্থাৎ উল্টো করে বলা যায়, এক অন্যায় মনোবাসনা যে, যে যে মুসলমানদের কারণে অখণ্ড ভারত  হতে পারেনি, সেই মুসলমানদেরই ইন্দিরা সহায়তা করেন কিভাবে? এই খচখচানি দূর করতেই আমাদের সেকুলার হতে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে ইন্দিরার মনোস্তুষ্টি রিয়াজ নিজের কর্তব্য বলে হয়ত অজান্তে গ্রহণ করে নিয়েছেন; যদিও একাদেমিকদের কাজ হওয়া উচিত কোন বক্তব্যের পক্ষ-বিপক্ষ দুই দিকেরই সাফাই পয়েন্টগুলো নির্মোহ যাচাই করা এবং তা, খুলে ও মেলে ধরা।

    কোন রাষ্ট্রকে  কথিত এই সেকুলার হতেই হবে কেন; আর তা হওয়ার উপায়ইবা কী ও দরকার কেনঃ
    সেকুলারিজম নাকি এক ‘পবিত্র’ রাষ্ট্রীয় নীতি- এ কথাটা হল সবচেয়ে অর্থহীন এবং নিজেকেই ফাঁকি দেয়া এক বয়ান। অর্থাৎ এটা আসলে বুঝে বা না বুঝেই বলা কিন্তু মূলত অসৎ উদ্দেশ্যের এক বয়ান। আসলে এখানে মূল প্রশ্ন, কেন কোন রাষ্ট্রকে ‘সেকুলার’ হতেই হবে, দরকার কী? আবার তা হওয়ার উপায় কী? আর ‘সেকুলার’ হওয়া মানেই বা কী?
    আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সেকুলারিজম এক পবিত্র রাষ্ট্রীয় নীতি এ কথা বলে যারা রাষ্ট্রের গায়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে আমরা দেখেছি, এরা কার্যত মুসলমানবিদ্বেষী। এই বিদ্বেষ চর্চা করতেই তারা ঐ সাইনবোর্ড ব্যবহার করেছে। কেন বারবার এই বিদ্বেষের দিকে আঙুল উঠাচ্ছি বা উদ্দেশ্যকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছি?
    কারণ, কোন কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    তা হলে প্রথমত এটা কোন রাষ্ট্রীয় নীতি বলে সাইনবোর্ড টাঙানোর কাজই না যে, এটা সেকুলার রাষ্ট্র। তা হলে ‘অসততা বা উদ্দেশ্যের কথা’ তোলা হচ্ছে কেন? কারণ অনেক পুরনো ও প্রথম কথা হল, আপনি একটা একচেটিয়া ক্ষমতার আধিপত্যে থেকে এরপর অন্য ধর্মের লোককে ডিকটেট করতে পারেন না যে, তাঁর সেকুলার হওয়া উচিত। সবসময় এই ব্যাপার ঘটেছে এইভাবে।  ঠিক যেমনটাকে আলী রিয়াজ এখন সমস্যা হিসেবে হাজির করছেন। যেমন, আমরা দেখেছি ১৯০ বছরের জমিদার আমলে, দুই বাংলার সেই জীবন জমিদার-হিন্দুর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যে কেটেছে। আর সেই আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে তারা মনে করত যেমন ইসলামী টুপি মাথায় দেয়া বা ইসলামী লেবাস পড়ে শহরে ঘোরা যাবে না। করলে নাকি তা সেকুলার নীতি ভঙ্গ হবে। তবে ব্রিটিশ আমলে  জমিদাররা এটাকে ঠিক সেকুলার না,  বলতেন “সাম্প্রদায়িকতা”। আর একালে সেটাকেই গুছিয়ে বলা হয়, কথিত “সেকুলার রাষ্ট্রীয়নীতি”। অথচ উদ্দেশ্যটাই অসৎ! একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখা!
    তাহলে সেকালের সাম্প্রদায়িকতার মানে হল, জমিদার-হিন্দুর যে আধিপত্য কায়েম ছিল সেটাকে কোনো চ্যালেঞ্জ করা যাতে না হয়ে যায়, এমন হতে না দেয়া। অর্থাৎ হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের নিজ সম্প্রদায়েরও চিহ্ন প্রদর্শন করতে না দেয়াই সেকুলারিজম। এমন না করা যেন অ-সাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলারিজম বলে সেকালে জমিদার-হিন্দু আর একালে ইন্দিরা বা মোদি সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছেন।
    আর তাই মুসলমান বা কোনো ধরনের ইসলামিজমের কাছে সেকুলারিজম শব্দের অর্থ দাঁড়িয়েছে, এটাই ইসলামবিরোধীতার ও বিদ্বেষের এক হাতিয়ার এবং এটা তাদের সাথে বৈষম্য করার জন্য এসেছে।
    তা হলে মূল কথা, আগে থেকে থাকা কোনো মুসলমান বা হিন্দু আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আশ্রয় নেয়া বা এটাকে রাষ্ট্রীয়নীতি বলে চালিয়ে দেয়া- এগুলোই অসততা ও খারাপ উদ্দেশ্য বলছি। তাদের হাত পরিস্কার নয় তাই।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য বৈষম্যহীনতা, নাগরিক অধিকারে সাম্যঃ
    তা হলে, মূলকথাটা হলো বৈষম্যহীনতা। আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল- বৈশিষ্ট হিসেবে তার নাগরিকদের মধ্যে সাম্য, সব নাগরিকের অধিকার সমান- এই নাগরিক বৈষম্যহীন নীতির ভিত্তিতে দাঁড়ানো। যেখানে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকদের পরিচয় একটাই যে, সে নাগরিক এবং সবার সাথে বৈষম্যহীনভাবে সমান অধিকারের নাগরিক। তাতে নিজস্ব আইডেনটিটি (যেমন ধর্মীয় বা ভাষা বা পাহাড়ি-সমতলী, নারী-পুরুষ প্রভৃতি) আগের মতোই আছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইডেনটিটি একটাই যে, সে রাষ্ট্রের নাগরিক। অর্থাৎ নাগরিকের অন্যসব আইডেনটিটি আগের মতই নানান ভিন্নতা নিয়ে আছে; কিন্তু সেসবের ভিত্তিকে কাউকে কারো উপরে অধিপতি না বানানো, কাউকে নাগরিক বৈষম্যের শিকার না বানানো – এসব কঠোরভাবে চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকারে সাম্য নিশ্চিত করা, এটাই মূল দরকারি কাজ। খেয়াল করেন, এই পুরো প্যারাটায় কোথাও সেকুলার শব্দটাই লিখতে হয় নাই। অথচ অর্থ পরিষ্কার। নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের এটাই মূল-বৈশিষ্ট্য হতে হবে এবং তা কোনো ‘সেকুলারিজম আমার রাষ্ট্রীয় নীতি’ এমন কথার চাতুরি বা আড়াল না নিয়েও বলা যায়। এটা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই হয়ত আর কোনো মুসলমান বা যে কোন ধারার  ইসলামিজমের পুঞ্জীভূত অনাস্থা ও ক্ষোভ আমরা কাটাতে পারি। বাংলাদেশের হিন্দুরাও অনাস্থা কাটিয়ে তেমন বৈষম্যহীন বাংলাদেশকেই আপন মনে করে আস্থা খুজতে পারেন।
    অর্থাৎ মূল কথা, সেকুলারিজম শব্দের উচ্চারণই অপ্রয়োজনীয়। ফলে এ শব্দের আড়ালে কোনো চাতুরীও চলবে না। নাগরিক সাম্য-নীতি অনুসরণ করবেন এবং কোন সাইনবোর্ডে না – চর্চায় তা প্রতিষ্ঠা করবেন, এটাই এর মূল ফোকাস হতে হবে।

    রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন – বৃটিশ অসততাঃ
    আলী রিয়াজ লিখেছেন, ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকার কথা ছিল, রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ ছিল। এই শব্দ ও বাক্যগুলোই আড়ালেই প্রবল অপ-ব্যবহার ঘটানো হয়েছে। ইসলাম কোপানোর পারফেক্ট সুযোগ করে নেয়া হয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, এতে এক বিরাট অনাস্থা তৈরি হয়ে গেছে বিশেষ করে মুসলমান বা কোন ধরনের ইসলামিজমের জনগোষ্ঠীর মনে। মূলত ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ এর নামে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করা হয়েছিল। এই অসততার ‘গুরু’ ব্রিটিশ সরকার। বিশেষত ১৯২৩ সালের নেশন স্টেট ব্রিটিশ রিপাবলিক। এর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া তুরস্ক বা অটোমান এম্পায়ার দখল করে ব্রিটেনের নিজ ইচ্ছায় একে সাজানো। ‘কামাল তুনে কামাল কিয়া’- এই কামালকে ক্ষমতায় বসিয়ে ব্রিটিশরা ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ কথাগুলো সাজিয়েছিল।
    আগেই বলেছি সাম্য-নীতিকে চর্চার বাস্তবায়ন, নাগরিক বৈষম্যহীনতা বাস্তব করে তোলা – এসব কাজ সম্পন্ন করতে পারলে “জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক” কী হবে, কোথায় তা ভারসাম্য আনবে সেটা আপনাতেই ঠিক হয়ে যাবে। আর সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও বাস্তব সমাধান হবে। কিন্তু যার উদ্দেশ্য ইসলাম-কোপানি আর মনে বিদ্বেষ, ক্রুসেদে হারার পুরান রাগ তার মুখে এসব রুচবে না!
    যেমন, সুলতানি তুরস্ক ছিল ডমিনেটিংভাবে ইসলামী। তা এক সাম্রাজ্যরাষ্ট্র ছিল। আবার তুরস্ক মানেই, একই সাথে বারবার ক্রুসেড হেরে যাওয়ার ইউরোপীয় খ্রিশ্চীয়-মনের ক্ষোভ ও অভিজ্ঞতাও। কিন্তু যেটাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের হেরে যাওয়ার পরের ১৯২৩ সালের সেকালের মডার্ন তবে জাতিরাষ্ট্রের ব্রিটেন চায়নি যে, ১৯২৩ সালের তুরস্কের কারণে ব্রিটেনে্র নিজ আভ্যন্তরীণ   খ্রিশ্চীয় থিওলজি আবার রাজনীতির চেয়ে  প্রবল হয়ে উঠুক বা রাজনীতিকদের পাশাপাশি ক্ষমতার ভাগীদার হয়ে উঠুক। তাই ব্রিটিশ শাসকেরা  ব্যাপারটাকে ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন” থাকা জরুরি এভাবে সাজিয়ে কথা তুলেছিল, ‘রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ কথাগুলো এনেছিল।  যাতে বৃটেনেও  খ্রিশ্চীয় থিওলজির সত্ত্বা আগের মতই রাজনীতিক সত্ত্বার অধীনস্ত হয়ে নিচে চাপা থাকে। এছাড়া বাস্তবে পেয়ে যাওয়া তাদের বসিয়ে দেয়া শাসক কামাল আতাতুর্ক  জবরদস্তিতে খাড়া হতে পারেন বা কোন ধরণের ইসলামিজমের হাতে আক্রান্ত না হন। কামালকে রক্ষা করতেই এই নীতি। কথিত সেকুলারিজম মানেই রাষ্ট্র আর ধর্মের বিভাজন, এমন কথা সত্য নয়। এককথায় এটা ছিল তুরস্ক বা বৃটেন স্পেসিফিক তাদের আভ্যন্তরীণ হবু কোন সংকট যে উদয় না হয় এর জন্য সাবধাণতা। রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকতেই হবে এভাবে সেকুলারিজমকে উপস্থাপন করা একটা চিহ্ন হিসাবে একে দেখানো এমন কোন কথা কোনকালেই ছিল না।

    কাজেই মোদ্দা কথা ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’-এর তত্ত্ব কামালের তুরস্ককে বৃটেনের নিয়ন্ত্রণে সামলানোর এক আলাপ মাত্র।  এটা কোনোভাবে নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের আলাপই নয়। কাজেই রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের এই আলাপ এক কথায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ইউরোপে এটা যার যেভাবে কাজে লাগে সে সেভাবে এটা ব্যবহার করে, মানার ভান করে। এমনকি আমেরিকান রাষ্ট্রও এটা মানে না। আমেরিকা মনে করে, নাগরিকের ধর্মপালনের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষাই রাষ্ট্রের কাজ। তবে মুখ্য বিষয়টি হল – তুরস্কে রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের কথা নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের কথা নয় বা সেদিক থেকে তোলাই হয়নি। তাই এটি উপেক্ষাযোগ্য। এই সারকথাটা আমাদের মনে রাখতেই হবে।
    সোজা কথাটা বললে, লেখক যদি বেড়ে চলা ইসলামিজমের দিকে তাকিয়ে তা ঠেকানোর উপায় খুঁজতে থাকা কেউ হন, তা হলে তিনি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক – এ আলাপে আমাদের কেউ নন। তার এজেন্ডা ও প্রসঙ্গও তাই আলাদা। ১৯২৩ সালে তুরস্ক থেকে ব্রিটিশদের হাতে তৈরি করা ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দের আড়ালে আরো কত কিছু যে আমাদের দেখতে হবে সেটি তাদের ব্যাপার। এভাবে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করতে থাকুন। কিন্তু আমরা তাদের সাথে একই নৌকায় নাই। উই আর নট ইন্টারেস্টেড! কারণ ওটা নষ্টা রাস্তা! এই সেকুলারিজম আমাদের রাস্তা নয়। এটি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক চিন্তারও কোন অংশ বা আত্মীয় কিছু নয়।
    আবার কলোনি জমিদার আমলে, যা আগেও বলেছি, যে এমনটাই জমিদার-হিন্দুর আকাঙ্খা ও বয়ান ছিল যাকে তার অলীক বাসনাও বলতে পারি। যে মুসলমানকে ‘বাঙালি’ বলে মনে করা হতো না, বাংলা ভাষাটা কেবল বাঙালি হিন্দুর ভাষা মনে করা হত। তাই এর শ্রীবৃদ্ধি ও বিকাশে যা বলার সেটাও বাঙালি হিন্দুরই একচেটিয়া মনে করা হত। এরাই এখন ‘হিন্দুত্ববাদের “হিন্দু সংহতি“র নামে আরএসএসের ছায়াতলে অঙ্গসংগঠন হয়ে আছে।

    আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’ হল মূল আসামীঃ
    বেড়ে চলা নানান ধরণের ইসলামিজম ও পশ্চিমের উপর তাদের জেনুইন অনাস্থার জন্য মূল দায়ী আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকার ‘হোম ল্যান্ড সিকিউরিটি’ নামে ডিপার্টমেন্ট খোলা (Nov 2002) এবং তার ইসলামবিদ্বেষী নীতির চর্চা করা। সচেতনে অথবা অচেতনে এই চর্চার ফলে যে মেসেজ তারা হাজির করেছিল তা হল, আমেরিকানরা কথিত সন্দেহভাজন “মুসলমান-মুক্ত” এক দুনিয়া গড়তে চায় আর সেখানেই বসবাস করতে চায়। অথচ এটি ছিল আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজ ভিত্তিমূলক বক্তব্য – নাগরিক বৈষম্যহীন রিপাবলিক ধারণার বিরোধী। আসলে এটাই ছিল ইভানজেলিক-খ্রীশ্চান বুশের শর্টকাট পথ।
    আর এর ফলাফলে ও পরিণতিতে ঠিক এরই উল্টো প্রতিক্রিয়াই হল – এরই নাম বেড়ে চলা নানা ধরনের ইসলামিজম। ইসলামিজম তাই স্বভাবতই আমেরিকাকে পাল্টা বলছে, তারাও এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করে যেখানে কেবল মুসলমানরা আছে। কাজেই বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার আগে উচিত আমেরিকা খোদ নিজ-নীতির দিকে তাকানো। বাইরে বাঘ খুজার আগে নিজ মনে যে বাঘের ভয় ও সীমাহীন ঘৃণা-বিদ্বেষ তাঁরা জন্ম দিয়েছিল এর পরিণতি তো এমনই হবার কথা!  সবার আগে নিজ ভুলগুলো তাদের বুঝতে হবে। বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার চেয়ে আমরা কামনা করব, আগে আমেরিকা নিজেই আত্মসমালোচনার যোগ্য হয়ে উঠুক। তবেই হয়ত তার চরম ইসলামবিদ্বেষ ভালো হয়ে যাক: তাহলেই তো হয়। কিন্তু সে কথা বলার মুরোদ কি অনেকেরই হবে? সন্দেহ আছে!

    ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপনের অভিযোগঃ
    ৯/১১ এ আলকায়েদা আমেরিকা-রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দুনিয়ার সব ধরণের রাষ্ট্রের উপরই কোন সশস্ত্র হামলার শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা সর্বোচ্চ শাস্তি।  লিগাল পয়েন্টে এই শাস্তি নিয়ে তর্কের কিছু নাই। কিন্তু সাবধান। আপনি যদি বলেন ঠিক আক্রমণকারী এখানে অপরাধী না।  ইসলাম এখানে অপরাধী? অর্থাৎ অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় তুলে আপনি প্রপাগান্ডা বিদ্বেষ তৈরির এক আসর চাইতেছেন। এবার আপনি তাহলে ইসলামবিদ্বেষ করলেন। অর্থাৎ আমেরিকান রাষ্ট্রের যা করা উচিত না, করণীয় ছিল না তাই করা হয়েছে এখানে।
    যেমন আলী রীয়াজ আরো লিখেছেন, “ইসলাম ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপন করে শাসনের হাতিয়ারে” পরিণত করেছে। সার কথায় তিনি বলতে চাচ্ছেন, “ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ” বলে ব্যবহার করা যাবে না। কেন যাবে না?  কোন কথিত সেকুলারিজম এটা না করতে চায়?  কিন্তু এ’ব্যাপারে আমাদের সবার পথ প্রদর্শক কি সাবেক মার্কিন  প্রেসিডেন্ট খোদ বুশ (জুনিয়র) নন? তিনি কি নাইন-ইলেভেনের দিনেই হামলার কয়েকঘন্টা পরে তাঁর প্রথম টেলিভিশনে হাজির হওয়ার বক্তব্যে আমাদের ইভানজেলিক খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডের হুমকি, আর আবার ক্রুসেড লড়ার হুমকি শোনাননি?  তাহলে ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ হিসাবে ব্যবহারের দায়ে  রিয়াজ ঠিক কাকে এ জন্য অভিযুক্ত করতে চান? আমরা জানি না। আগে রিয়াজের এটা আমাদেরকে জানানো উচিত!
    তবে এগুলো অবশ্যই এর বাইরের দিক। ভেতরের কথা হল, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকবে না – এটা বাস্তবত এক অলীক কল্পনা। অবশ্যই ধর্মতত্ত্ব (Theology) আর রাজনীতি আলাদা বিষয়। বিশেষ করে দুটোর ভাষাই তো আলাদা। এমনকি প্রেজেন্টেশন ও বলার স্টাইল এবং পূর্ব-অনুমানগুলোতে তারা একেবারেই আলাদা। কিন্তু আবার এমন ঘোরতর মিলও আছে যে আলাদা করাই মুশকিল। যেমন আপনি আজ বলছেন, ধরা যাক, আপনার পার্টির কোন এক রাজনৈতিক ‘রেজুলেশনের’ [resolution বা সিদ্ধান্ত প্রস্তাব] কথা। তাতে মনে হতে পারে, আপনি বিরাট জ্ঞানী রাজনীতিক রাজনীতির আলাপ করছেন। কিন্তু তলায় হাত দেন। পারবেন? মুরোদ থাকলে প্রশ্ন করেন এই ‘রেজুলেশন’ শব্দটি কই পাইলেন? এই শব্দটা শতভাগই এক ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ ও ধারণা যার অর্থ খ্রিশ্চীয় বছর শুরুর প্রথম দিনে খ্রিশ্চীয় মানুষ নতুন বছরে কী কী করবে বলে তাঁর গডের কাছে প্রতিজ্ঞা করে, এটাই তাঁর নতুন বছরের ‘রেজুলেশন’ বলে। ঐ দিন শেষে তাঁরা একে অপরের কাছে তার তার রেজুলেশন কী, জানতে চাইবে, ‘উইশ’ করবে ইত্যাদি। তাহলে এখন বলেন রেজুলেশন কী রাজনীতির না ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ?
    সারা দুনিয়াতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস বা এর চিহ্ন পাওয়া অনুসারে, এটা সর্বোচ্চ ছয় হাজার বছরের পুরানা মনে করা হয়। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি চিহ্ন পাওয়া যায় এই বিচারে তা তিন হাজার বছরের পুরানা। এই তিন হাজার বছরের প্রায় পুরাটা সময় কোন না কোন বা একটা না একটা “ধর্মতত্ব” তাঁর সাথে ছিল, মানুষকে সাথে নিয়ে যে পথ হেঁটে চলছে। আর এসবের বিপরীতে মাত্র দেড় হাজার বছর আগের এক নতুন ফেনোমেনা হল – দুনিয়াতে ধর্মতত্ব বা এর প্রভাব বলে কিছুই নাই, না চাইকি ধর্মতত্ব বলেই কিছু নাই এমন ধরে নেয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে দুনিয়ার সব ফেনোমেনাকে দেখার পদ্ধতির নাম হল বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির এনলাইটেনমেন্ট। অর্থাৎ সোজা বললে,  দুনিয়ার যেন সব ঘটনা-ফেনোমেনাই ফিজিক্যাল, এই অনুমান। মানে স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা বলে কিছুই নাই। আবার এর ফলাফল কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই খুবই ভাল। তা হওয়ারই কথা।  বিশেষত যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝবার ক্ষেত্রে এর উপর থিওলজির কোন প্রভাব নাই বলে এটা নাই তা ধরে নিতেই পারি। তাতে সুত্রে কোন হেরফের আসে না।  কিন্তু সাবধান যেখানে রক্তমাংসের মানুষের জীবন জড়িয়ে  আছে বা থাকে সেসব ক্ষেত্রে সেখানে বিজ্ঞান বা র‍্যাশনাল চিন্তার পদ্ধতি যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে না। এছাড়া থিওলজি এখনও তার মত করেই প্রভাব ফেলে থাকে।মানুষের চিন্তা বিষয়ক সব শব্দের আদিতে ধর্মতত্বের গর্ভ থেকে উতসারিত।

    তাই মূলকথাটা হল, মানুষের চিন্তায় বিশেষত যেসব শব্দ সে  ব্যবহার ও ধারণ করে এমন প্রতিটা শব্দের উতপত্তি ধর্মতত্বের হাতে ও ঘরে।  যদিও শব্দের উতস বা রূট ধর্মতত্বের তা হলেও সেসবের অর্থ অবশ্যই বদলে যেতে পারে, বদলে নিতেই পারি। secularize বা ধর্মতত্বীয় আগ্রহের বাইরের  সিভিল লাইভে ব্যবহার ধরণের এর অর্থ করে নিতেই পারি।
    দুনিয়াতে শব্দের অর্থের বিবর্তন হয়, নতুন অর্থে পুরনো শব্দের ব্যবহার দেখা যায় যদিও শব্দের রুট একই থাকে। যে ডিকশনারি শব্দের রূটের হদিস দিতে পারে না সেটা ভাল ডিকশনারি নয় বলে মানা হয়। অতএব, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির বন্ধন ও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তা হলে ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো পাকা দেয়াল তোলাও অসম্ভব। যদিও আবার বলছি ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির ভাষ্য ও প্রেজেন্টেশন আলাদা, বলার ঢঙ, গদ্যরূপ আলাদা; উদ্দেশ্যও আলাদা। সেটাও মেনে চলা উচিত।

    অতএব সাবধান। বুঝহ সুজন! আর মূলকথা, অমন সেকুলারিজমকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেও আমাদের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]