Category: ইসলামবিদ্বেষ

  •  “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” – সুমিত গাঙ্গুলী 

     “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” – সুমিত গাঙ্গুলী
    গৌতম দাস
    ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪  সকাল ১০ঃ ৪১
    https://wp.me/p1sCvy-67F

     

    Sumit Ganguly

     

    চলতি বাইডেন প্রশাসন মানে যার ক্ষমতার আয়ু আগামি ২০ জানুয়ারি ২০২৫,  ট্রাম্পের শপথের মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে – সেই বাইডেন প্রশাসনের ফেভরিট মিডিয়া ছিল আমেরিকার “ফরেন পলিসি” পত্রিকাটা; বাইডেন প্রশাসনের গৃহিত নীতি-পলিসি বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে এশিয়ায় আমাদের মত দেশে কী প্রতিক্রিয়া আনছে তা বুঝা ও বাইডেন প্রশাসনের কাছে পক্ষের লোকজনকে পৌছে দেওয়ার জন্য এখানে লেখালেখি করতেন। এই ছিল “ফরেন পলিসি”  এর সাথে এরেঞ্জমেন্ট। আবার এর মাধ্যমে যদি এশিয়ান স্থানীয় জনমতও প্রভাবিত করা যায় সেটাও বাড়তি। যেমন ধরেন এমনই এক থিঙ্কট্যাংক ফেলো কুগেলম্যান; তিনি এখানে প্রতি সপ্তাহে এশিয়াতে বাইডেন প্রশাসনের স্বার্থগুলো কোন দিকে হাঁটছে বা লাইনে আছে কিনা এর আগাম ইঙ্গিত প্রশাসনকে জানাতে নিয়মিত লেখা ছাপতেন তিনি এই ফরেন পলিসি পত্রিকায়।  আরো সুনির্দিষ্ট করে যেমন ধরেন, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ বিএনপি এক কালজয়ী সমাবেশ করেছিল সায়েদাবাদ-গোলাপবাগ মাঠে; হাসিনার শত বাধা সত্বেও তা উপেক্ষা করে। অথচ এই কুগেলম্যান লিখলেন এটা তেমন কোন সমাবেশই নয়! কারণ, কুগেলম্যান সম্ভবত জানতেন, পরের সাত মাসের মধ্যেই মানে সেপ্টে. ২০২৩ বাইডেন-লু পল্টি মারবেন। বিরোধীদলকে রাস্তায় নামানোর পরে হঠাত তাদের হাত ছেড়ে দিবেন। আর উলটা হাসিনার হাত ধরেই “আমরা একসাথে কাজ করব” বলে হাসিনাকে চিঠি (৫ ফেব্রু.২০২৪) লিখবেন!  আর এসবের আগে, আরেকবার হাসিনাকে (৭ জানু.২০২৪) ভোটচুরির ক্ষমতায় হাসিনাকে আসীনে সহায়তা করবেন। ভোটচুরি দেখেন নাই ভান করবেন!  আশা করি পাঠক এখন বুঝতে পারছেন “ফরেন পলিসি”  কী ও কত প্রকার! তো সেরকমই “ফরেন পলিসি”  তে এমন আরেকজনও  প্রায়ই লিখেন এমন কলামিস্ট ব্যক্তিত্ব হলেন সুমিত গাঙ্গুলী।

    [যারা বিস্তারিত পড়তে চান না তারা নিচের প্যারাটা বাদ দিয়ে পরের প্যারায় চলে যেতে পারেন।]
    সুমিত গাঙ্গুলী নামটা শুনে মনে হতে পারে তিনি ইন্ডিয়ার মানে অন্তত কলকাতায় জন্ম ও বড় হয়েছেন নিশ্চয়! কথাটা আংশিক সত্য! যদিও হ্যা, তাঁর নাম থেকে বুঝা যায় তিনি মানে তাঁর ফ্যামিলি কলকাতার ব্রাহ্মণ কোন পরিবার। কিন্তু  সুমিত গাঙ্গুলীর জন্ম ও বেড়ে উঠা ঠিক কী কলকাতায় বা ইন্ডিয়ায়? না, নেটে খুঁজে তা কোথাও পাওয়া যায় না।  বরং জানলাম তিনি আমেরিকার কেন্টাকি রাজ্যের খুবই সস্তা টিউশন ফি [দানের চাঁদা তুলে চলা বলে] এর এক কলেজ হল Berea College । আর সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন-অনার্স  দিয়ে তাঁর একাদেমিক লাইফ শুরু করেছিলেন। আর এখন? এখন তিনি পুরা দস্তুর এক আমেরিকান (ভারতীয় নয়) একাদেমিসিয়ান; আর অন্তত দুডজন ইন্সটিটিউট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তিনি জড়িত।  শুধু আমেরিকান হুভার [Hoover Institution] ইন্সটিটিউট মানে প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডালিসা রাইস যার ডিরেকটর সেই হুভার ইন্সটিটিউট থেকে সুমিত গাঙ্গুলির যে পরিচয়টা হুভার দিয়েছে সে তথ্য প্রায় আধা পাতা জুড়ে ঠাসা বিশ্ববিদ্যালয় আর ইন্সটিটিউটের নামে। সেই লিঙ্ক এখানে দিলাম আগ্রহিদের জন্য।  তবে সবচেয়ে মজার কথা হল, উইকি যা লিখছে -“Sumit Ganguly is an American political scientist. He is a senior fellow at the Hoover Institution and a professor of political science at Indiana University … “। অর্থাৎ সুমিতের পড়াশুনার ভিত্তি হল পলিটিক্যাল সাইন্স কিন্তু তিনি আমেরিকান (কোন ভারতীয় নন) পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হুভার ইন্সটিটিউটে হান্টিংটন প্রোগ্রাম এর পরিচালক তিনি। আসলে ক্যালিফোর্নিয়ার স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে (খরচ-বাজেটের দিক থেকে নিজস্ব পরিচালনা বোর্ড আছে) এমন যে “হুভার ইন্সটিটিউশন”  যা মূলত এক কনজারভেটিভ থিঙ্কট্যাংক। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, হুভারে তিনি এখানে ইন্ডিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক খুবই শক্ত করা যায় কী করলে [Huntington Program on Strengthening US-India Relations] তেমন এক প্রোগ্রাম চালান।
    তবে সম্ভবত আরো বিষ্ময়কর হল ব্লুমিংটন শহরে  যে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি আছে সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার এক টেগোর চেয়ার [নামেই রবীন্দ্র গবেষণা ফান্ড বলতে পারি] এরও বড় কর্তা তিনি।

     

    কেন সুমিত গাঙ্গুলীঃ
    এতক্ষণ ধরে কেন সুমিত গাঙ্গুলীর পরিচয় নিয়ে এত কথা বললাম! এক নম্বর কারণ, তিনি আমেরিকা-ইন্ডিয়ার সম্পর্ক শক্ত রাখার এক গবেষণার বড় কর্তা। আর দুই নম্বর কারণ হল, তিনি ঐ “ফরেন পলিসি”তে গত ১৬ ডিসে. ২০২৪ এক কলাম লিখেছেন যার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” [India’s Fortunes Shift in Bangladesh]। এই একই লেখার বাংলা অনুবাদ করে অবশ্য ছেপেছে আমাদের মানবজমিন ২০ ডিসে. ২০২৪ শিরোনাম, “ঢাকা প্রসঙ্গে বদলাতে পারে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি“।

    এখন আমাদের অনেকের নিশ্চয় মনে আছে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে মোদির বিজেপি শুধু না খোদ শেখ হাসিনাও খুশিতে নেচে আমাদের ভয় দেখাচ্ছিলেন যে এইবার তাদের ট্রাম্প-ভাইয়া এসে পড়েছেন; আর চিন্তা নাই; তিনি নিশ্চয় এবার মোদিকে দিয়ে বাংলাদেশে হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় বসায়ে দিবেন???
    সাথে আরো আছে যে আর চিন্তা কইরেন না তুলসি গাবার্ড [Tulsi Gabbard, এককালে ইসকনের চেলা ও দুবছরের জন্য কংগ্রেস মেম্বার ও ‘র’-এর সাথে কাজ করা]  ট্রাম্প বাবাজি তাঁর নির্বাচনি প্রচার কালে হঠাত করেই তুলসিকে তাঁর দলে ভিড়িয়ে নিয়ে স্টেজে তুলেছিলেন।  দলে ভিড়িয়ে নেয়া বললাম এজন্য যে মোদি যে তুলসি কে চিনতেন তিনি ডেমোক্রাট দলীয়। পরে তিনি ডেমোক্রাট দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। এবং এরপর থেকে ইন্ডিয়া বা র-এর সাথে  তুলসির আর সম্পর্ক আছে কিনা তা জানা যায় না। কিন্তু তবু কর্মিদের চাঙ্গা রাখতে বিজেপি মা মোদি তুলসি আসছে বলে প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে।

    বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে – কথার অর্থ তাতপর্য কীঃ
    এমনিতেই মোদির ট্রাম্প ভাইয়া আসতেছে প্রপাগান্ডায় ট্রাম্প আসলে – কী ইন্ডিয়া নীতি – নিয়ে এবার ক্ষমতাসীন হচ্ছেন সেদিকটা মোদি সামনে বা আমাদের জানতে আগ্রহী নন। কিন্তু কঠিন সত্যিটা হল আগামি ২০ জানু ২০২৫ শপথের পরের দিনগুলোতেই ট্রাম্পের ডিপোর্টেশন [deporation] মানে বিদেশি অভিবাসী (শ্রমিক, হোয়াইট কালার সব) খেদানো প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাবে। ইন্ডিয়ার দৈনিকগুলোর শিরোনাম হল প্রথম পর্যায়েই “18,000 Indians At Risk Of Deportation……”  মানে প্রাথমিক ধাক্কায় ১৮ হাজার ইন্ডিয়ানক্র বের করে দেয়া হবে। এটা গত ১৪ ডিসেম্বরের ইন্ডিয়ার প্রধান নিউজ ছিল। তবে এটা মনে করা ভুল যে এটা কেবল ইন্ডিয়ার বেলায়; বরং এটা কমবেশি সব দেশের বেলাতেই সত্য; এমনকি বাংলাদেশি যারা হাসিনার আমল দেখায় এই অজুহাতে আমেরিকা ঢুকেছে তারাও ডিপোর্টেশনের আওতায় আসবেন। আর ওদিকে ল্যাটিন আমেরিকা মেক্সিকো ইত্যাদি তো বটেই এমনকি কানাডার বিশেষ সুবিধা যা ছিল তাতে টান পড়বে (কানাডাকে আমেরিকান রাজ্য হয়ে যেতে বলা) ইত্যাদি এসব কিছু।
    এর সাথে আছে যারা এর আগে আমেরিকায় মাইগ্রেন্ট হয়ে পরে একটা (নাগরিকত্ব নয়) রেসিডেন্ট পারমিট হাতে পেলেই (মানে বসবাস ও কাজে যোগ  দেওয়ার অনুমতি প্রাপ্ত হয়েছে), এরপর এদের কোন সন্তান আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করলেই তারা আমেরিকান নাগরিক হয়ে যেত; এই শর্ত এখন ২০ জানু. ২০২৫ থেকে প্রত্যাহার করা হবে।  ফলে বাংলাদেশের যারা আগেভাগে দেশে ছুটে এসে এরা (বিএনপির খেদমতে বিশেষত মিডিয়া জগতে ঢুকে পড়ার জন্য) ডেনপারেট তারা ঠিক হাসিনা পতনের জন্য না ট্রাম্প এসে পড়ছে বলেই তাদের এই আমেরিকা ত্যাগের মরিয়া অবস্থা আর বিএনপির নেতাদের পিছনে লাইন দিয়ে খাড়া হয়ে যাওয়া।  এমনকি H-1B ভিসায় (টেকনোলজি জ্ঞান থাকাদের জন্য যেমন আইটি টেকনোলজি) বিশেষ করে ভারতীয়রা যেমন এতদিন ধরে নিত যে এই H-1B ভিসা থেকে তাদেরকে আমেরিকা সহজে বের করে দিতে পারবে না;  এমন ভিসাধারীরাও এখন একই ভাবে অনিশ্চিত নড়বড়ে হবে। একাজে ট্রাম্পকে বুদ্ধিদাতা আর সবচেয়ে ঘনিষ্ট দোস্ত হল ইলন মাস্ক [Elon Musk] যিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা [AI Tech] টেকনোলজিতে বড় বিনিয়োগকারি।  মানে হল। আইটি প্রোগ্রামার বলে যে পেশাটা আমাদের মত দেশগুলা চিনি এই পেশা বা এরা হল তাদের কাজে প্রোডাক্ট তৈরিতে সবচেয়ে শ্রমঘন লেবার অংশটা  – মানে কোড বসানোর কাজ হল এদের।  আর এটাই এলন মাস্ক মনে করেন AI Tech দিয়ে করানো সম্ভব।   ফলে H-1B ভিসায় টেকনোলজিস্টদের ভারত থেকে আনা আর তত জরুতি থাকবে না।  এই হল ইলন মাসকের দাবি!

    আর এবারের ট্রাম্প প্রশাসনে সবার উপরে  যে মূল নীতি-পলিসি হতে যাচ্ছে এর কেন্দ্রটা হল – টেকনিক্যাল ভাষায় ইকোনমিক ন্যাশনালিজম। [এনিয়ে আমার প্রথম পর্বের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। পরে আরও দুই ডিটেল পর্ব আসতেছে] । সোজা বাংলায় আমদানি-রপ্তানি কমানো; বিশেষ করে আমদানি; আর সেজন্য অন্য যেকোন দেশের পণ্যের উপরেই নুন্যতম ১০% আমদানি ট্যাক্স বাড়ানো আর চীনের মত দেশের বেলায় নুন্যতম ৬০% ট্যাক্স আরোপের এক অর্থনীতি তিনি চালু করবেন। এক কথায় যাই নিজ দেশের মানুষ ভোগ-ব্যবহার করবে এমন সব পণ্য দেশেই যেন হয় সেই মুখি এক অর্থনীতি! তবে একটা হল সেই কল্পিত আকাঙ্খাটার [imagined aspiration] কথা বললাম। বাস্তবে তা কতদূর কী করা যাবে সেটা আলাদা প্রশ্ন!

    কথাটা শুনে এলেখার বেশির ভাগ পাঠক নীতি হিসাবে এটাকে খুবই ভাল মনে করবেন হয়ত; কারণ আমরা বেশির ভাগ পাঠক আসলে জাতিবাদি – নিজেই কামাবো আর নিজেই খাব এর চেয়ে ভাল আর কী নীতি হতে পারে। ধারণাটা মোটা দাগে এধরণের।  আমরা, আমরা আর আমরাই! কিন্তু আমি সরি; এই নীতি এখন যতই শুনতে ভাল লাগুক না কেন এটা এখন অকেজোই শুধু না বাস্তবায়নও অসম্ভব। স্রেফ এককালের কাগুজে কল্পনা।  বিশেষ করে ১৯৮০ সালের পরে দুনিয়ার অর্থনীতি এ্টা ত্যাগ করে অন্যদিকে চলে গেছে।  এমনই অন্যদিকে যে সেটা আর পুরানা দিনে বা চেহারায় ফেরানো অসম্ভব, ফলে অ-বাস্তবানযোগ্য এক কল্পনা মাত্র।
    কেবল একটা মন্তব্য করব এখানে বিস্তারে যাব না,  কমিউনিজম এর (মার্কসের নয় স্টালিনের বুঝের মার্ক্সবাদি) অর্থনীতি এর বুঝও ছিল ঠিক এটাই। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যেটা করতে চাইছেন এটা সেটাই। যদিও মিলটা কাকতলীয় মানে, ট্রাম্প কমিউনিস্ট হতে চলেছেন ব্যাপারটা  ঠিক তা নয়। তবে সারকথাটা হল আন্ত-রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য অদরকারি জিনিষ!  মনে করা – এমন এই বোকা বোধ! আর একটা লাইনে বলিঃ এর মানে হল, কল্পনা করেন বাংলাদেশ থেকে সব গার্মেন্টস বা লেদার প্রডাক্ট রফতানি বন্ধ ফলে কারখানাও বন্ধ; কিংবা আপনাদের গর্বের পাট রপ্তানি অপ্রয়োজনীয় – এমনটা মবনে করলে যা হবে এটা তাই! বিস্তারে পরে অন্য কোথাও আনবো ইস্যুটা। আর এটাই টেকনিক্যাল ভাষায় ইকোনমিক ন্যাশনালিজম; যেটা ট্রাম্প প্রশাসনের মুখ্য নীতি পলিসি হতে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদেরেকে এই লেখার মূল প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হবে, ফলে নিচে সেদিকে যাচ্ছি…।

    অর্থাৎ  ইন্ডিয়া -আমেরিকা সম্পর্ক যেটা মুখ্যত ক্রম-উত্থিত গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হয়ে উঠতে চাওয়া চীন, এই চীনকে ঠেকাতে ভারতকে ব্যবহার করা (বিনিময়ে বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দেয়া) – এটাই ছিল এই নয়া শতক ২০০১ সাল থেকে আমেরিকান নীতি। যার আয়ু এখন প্রায় ২৪ বছর; আর এতদিনে এখন আমেরিকান নীতি-নির্ধারণী মহলের অনুভব হল এই নীতি-পলিসি আকামের; এতে কোনই লাভ হয় নাই; সব পন্ডশ্রমে গেছে। তাই ২০০০ সালেরও আগের ইন্ডিয়াবিরোধী (বঙ্গোপসাগর, আন্দামান বা উপরের নর্থ-ইস্ট বা বার্মা ইত্যাদি কেন্দ্রিক) যা কিছু স্ট্রাটেজি আমেরিকার ভাবনায় ছিল (কিন্তু ভারতকে জড়িত করে চীন ঠেকানোর লোভে) পরে  সেসব নীতি কার্পেটের নিচে লুকায় ফেলে রেখেছিল এতদিন আমেরিকা। সেসব নীতি-ইচ্ছা-খায়েশগুলো আমেরিকার এখন বের করে আনছে।

    দুঃখ আর হতাশার কথা সুমিত এখনও কলকাতার হিন্দুত্ববাদী জমিদার ব্রাহ্মণের দৃষ্টিভঙ্গিতেঃ
    উপরে ইন্ডিয়া-আমেরিকা সম্পর্কে যে ব্যাপক পরিবর্তন ট্রাম্প আনতে যাচ্ছেন সে সম্পর্কে সুমিত গাঙ্গুলী টের পেয়েছেন বা জানেন এমন কোন বাক্য বা ধারণার ইঙ্গিত তার পুরা লেখার মধ্যে কোথাও নাই! মূলত াজকের নয়া পরিস্থতিতে মোদি বাংলাদেশের উপর আগের মত আধিপত্য এর কিছুই পাবেন না; সব সে খুইয়েছে। আর এটার কারণেই সুমিতের দেয়া শিরোনাম “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” এর আসল অর্থ; যদিও তা বুঝে সুমিত এই শিরোনাম দেন নাই। তিনি মূলত বলতেছেনঃ  হাসিনা ইন্ডিয়ার বসানো পুতুল-ক্ষমতা ছিল ফলে ইন্ডিয়ার তাতে সব সুবিধা ছিল কিন্তু হাসিনা এখন উতখাত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না যে হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন – অতএব একারণেই ভারতের কপাল পুড়েছে।

    সুমিত যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমেরিকায় একাদেমিক জীবনে আছেন এবং বিরাট পদবী ও ক্ষমতায় আমেরিকা-ইন্ডিয়া সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত; অথচ ট্রাম্পের হাত ধরে  আমেরিকা-ইন্ডিয়া সম্পর্ক যে নয়া মোড় উলটা যাত্রা নিচ্ছে; ইন্ডিয়া আর আমেরিকার জন্য অত গুরুত্বপুর্ণ থাকছেনা – (কারণ চায়না কনটেইনমেন্ট  বা গত ২০১০ সাল থেকে নেয়া “চীন ঠেকানোর” আমেরিকান নীতি আজ অকেজো প্রমাণিত) অথচ এদিকটা নিয়ে সুমিত একেবারেই বেখবর? এটা অবিশ্বাস্য এবং এতে তাঁর চিন্তার স্টুপিডিটি বা সীমাবদ্ধতা বাইরে প্রকাশিত! আর এতে ফাইনালি তিনি যে এক ইসলামবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী জমিদারি আধিপত্যের মধ্যেই আছেন তাও প্রতিভাত!  পঞ্চাশ বছর আমেরিকায় কাটানো একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একাদেমিক  আর  উনার পাশাপাশি একজন যে এই পুরাটা সময় কলকাতা নিবাসী আম-হিন্দুত্ববাদী বাসিন্দা ছিলেন – এমন দুজনকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে দেখা যাবে  এদের মধ্যে আসলে কোন ফারাকই জন্ম নেয় নাই!!!! অবিশ্বাস্য! ছোট থেকে মা, দাদি-নানির কোলে শুয়ে যে মুসলমানবিদ্বেষী গল্প শুনেছে সেগুলোও একজন আমেরিকা নিবাসী লাগাতর পঞ্চাশবছর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একাদেমিককে কী এখনও তাড়া করে? কীভাবে? তিনি কীভাবে এসব আবর্জনাকে এখনও তাঁর চিন্তার মূল কাঠামো বানিয়ে রাখতে পারেন???

     পঞ্চাশ বছরের আমেরিকান একাদেমিক লাইফ কাটানো সুমিত বেচারার দুঃখঃ 
    এক. সুমিত লিখছেন, “যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্য করেছিল তাদের মধ্যে ইসলামপন্থী এবং ভারতবিরোধী দল রয়েছে” ????? আচ্ছা এর মধ্যে অস্বাভাবিক জিনিষটা কী? হাসিনা আর মোদি মিলে যদি বাংলাদেশকে গুম-খুন-অপহরণের আয়নাঘর বানায় রেখে  ১৫ বছর ধরে দেশটা চালায় তো তাতে তো  হাসিনা উতখাতে বাংলাদেশের সব অংশের জনগণের অংশগ্রহণ থাকাটাই স্বাভাবিক; নাকি? ইসলামপন্থি মানে ইসলামি রাজনৈতিক দল হলে এটা অপরাধ হবে? – এটা কেমন বোধ উনার? এটাই তো গভীর মুসলমান ঘৃণা!  কিন্তু উত্তরপ্রদেশের বুলডোজার মুখ্যমন্ত্রী যোগী যাকে ভারতের সুপ্রীমকোর্ট তিরস্কার করেছেন, কাজকে অপরাধের ঘটনা বলে সাব্যস্ত করেছেন অথবা বজরং দলের ততপরতা হলে এসব কী সুনিত দেখতেই পান না?  সব মাফ হাততালি দিবেন উনি? মানুষ হিসাবে নিজের সব ইন্দ্রিয়-বোধ সব ভোতা করে রেখে দিয়েছেন উনি? তাইকি?

    আবার তার আরেক নয়া আবিস্কার দেখেন।
    দুই. তিনি লিখেছেন, “ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশ থেকে অনিয়মিত অভিবাসন সর্বদাই একটি জটিল সমস্যা ছিল-যে সরকারই অফিসে থাকুক না কেন……“।  আমি খুবই সরি, এটা আসলে একটা গাধার বক্তব্য।  অভিবাসন বা মাইগ্রেশন শব্দের  অর্থ উনি বুঝেন না এটা ভাবা আমাদের জন্য কঠিন। কোন একটা দেশ যেমন ইন্ডিয়া তাদের বাড়তি লেবারের চাহিদা থাক আর না থাক সেখানে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের হিন্দুরা প্রবেশ করে বসবাস করে। এখন ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা ভারতে বা মুসলমানেরা বাংলাদেশে আসা – এটা কী কারও শখের অভিবাসন? এটা কে কী অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন বলছেন উনি কোন বুদ্ধিতে?  নাকি এটা ফোর্সড বা বাধ্য করার এক সামাজিক অবস্থা।  – যা ১৮১৫ সালের রাজা রাম মোহনের চিন্তাততপরতা থেকে শুরু করে কংগ্রেসের জন্ম ও হিন্দুত্ববাদী ভারত বানানোর ইমাজিনেশন পরিকল্পনারই এক করুণ পরিণতি!!! দ্বিতীয়ত ও সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল,  বাংলাদেশ থেকে মূলত তুলনামূলক অবস্থাপন্ন  হিন্দুরাই ভারতে গিয়েছে অর্থাৎ তারা তাদের সঞ্চিত সম্পদও সাথে নিয়েই গিয়েছে যেটা কলকাতার অর্থনীতিতে বাড়তি পুঁজির সরবরাহের উতস হিসাবে কাজ করেছে। ফলে কোন সংজ্ঞায় – বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের যাওয়া – এটাকে তিনি অভিবাসন বলছেন? আসলে গাধা-গরুর ধরনের চিন্তারও একটা ক্লাস থাকে! আবার ১৯৪৭ এর পরে কলকাতার অর্থনৈতিক পতন হয়েছে পুর্ববাংলা হাতছাড়া হওয়াতে। কারণ পুর্ববাংলার জমিদারেরা তাদের কালেকশন কী ঢাকায় রাখতেন???  না কলকাতায়? এটা বুঝতে কী ডক্টরেট ডিগ্রি লাগে?  আর সেটাই মানে সেই জমিদারিই তো উচ্ছেদ হয়ে যায় পুর্ববাংলা থেকে  পাচার হওয়া সেই বাড়তি সঞ্চিত পুঁজি থেকে বঞ্চিত হয় কলকাতা!!! এখন সুমিত আপনি বলেন, আপনি এজন্য কাকে দায়ী করবেন? এর জন্য দায়ী যারা হিন্দুত্বভিত্তিক অখন্ড ভারত বানাতে চেয়েছিল সেই কংগ্রেস নয় কী? সাহস আছে আপনার? থাকলে চিল্লায় বলেন দেখি?  বুঝা যাচ্ছে যা উনার সাবজেক্ট না, দখল নাই তা নিয়ে তিনি কথা বলছেন!!!

    তিন. তিনি লিখছেন, “…কিছু ভারতীয় প্রতিবেদন বাংলাদেশের মাটিতে পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে, কিছু ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে”!  অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন মোদির এই বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ – এটাকে তিনি ঠিক মনে করছেন না। ভালো, এটা তিনি বুঝছেন! তাই বলছেন এটা তারা  ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে, তাই কিছু ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসাবে চিত্রিত দেখানোটা ভুল মনে করছেন।

    কিন্তু আবার সেই ঘৃণার লাইনঃ
    লিখেছেন,  “হাসিনা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন,
    ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে আশ্রয় দেননি এবং ভারতীয় বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে এসেছেন। প্রতিক্রিয়ায়, নয়াদিল্লি হাসিনার অধীনে ঢাকায়  গণতন্ত্রের অভাব উপেক্ষা করতে, ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার প্রদান করতে এবং আন্তঃসীমান্ত রেল ও সড়ক যোগাযোগ বাড়াতে ইচ্ছুক ছিল।”
    এর মানে কী এখন বাংলাদেশের “ইসলামপন্থী বাহিনীকে” তাহলে নিয়ন্ত্রণ করছে কে? মোদি??? দেখেন এই লোকের কথার কোন তাল আছে? আবার দেখেন আগে লিখতেছিলেন শুধু ইসলামপন্থী, আর এখন সাথে লিখতেছেন ইসলামপন্থী বাহিনী? সারা দুনিয়াতেই বুশ যদি ওয়ার অন টেরর এর নামে সন্ত্রাস চালায় তো এর প্রতিক্রিয়ায় সারা দুনিয়ায় ইসলামপন্থী বাহিনী বা ইসলামপন্থী  হওয়া ছাড়া আর কী হবে? মানে বাংলাদেশের কেউ বুশের প্রতিবাদ করবে না?   আর বাংলাদেশ কী দুনিয়ার বাইরে?
    এছাড়া আরেকটা মারাত্মক দিক আছে। সুনিত নিজেই বলছেন বাংলাদেশে হাসিনা মোদির সাথে মিলে ঢাকায়  গণতন্ত্রের অভাব উপেক্ষা করেছে – তাহলে এই দোষ কার? আবার মোদি বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার একচেটিয়া বাজার বানিয়েছে আর বিনা পয়সায় করিডোর সুবিধা নিয়ে গেছে – এসব কথা সুমিত নিজেই স্বীকার করছেন। তাহলে বাংলাদেশের মানুষ যেকোন পন্থি হয়ে হাসিনাকে উতখাত তো করবেই, নাকী? তো তাহলে ইসলামপন্থী হওয়াটা অস্বাভাবিক কীভাবে???

    হাসিনা তার শাসন আমলে যত কী তার রাজনৈতিক বিরোধী ছিল তাদেরকে তিনি গুম-খুন আয়নাঘর করেছেন – তাদের গায়ে মিথ্যা ইসলামি জঙ্গীর ট্যাগ লাগিয়ে তাদেরকে নিচা দেখায়ছেন।। মজার কথা হল এটা আমার কথা না। এবার মানে ২০২৩ সালের আমেরিকান সন্ত্রাস বাদ ও প্রতিরোধ রিপোর্ট ২০২৩ যা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে  এতে বাংলাদেশ চাপ্টারে আমেরিকাই একথা লিখে স্বীকার করেছে।  কিন্তু আমেরিকায় বসে থেকে এই হিন্দুত্ববাদের চেলা কলকাতা বামুন সুমিত গাঙ্গুলী সেটা টের পান নাই; খবর করে নাই! নেন প্রথম আলোর বাংলা করা অংশটাই দিলাম। শিরোনাম দেখেন, …“রাজনৈতিক বিরোধিতাকে সন্ত্রাসবাদ বলে চালিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার“।  আবার এখানে ইংরাজি মূল রিপোর্টটাও দিয়ে রাখলাম সুমিত গাঙ্গুলীর জন্য [Country Reports on Terrorism 2023: Bangladesh] – আমেরিকায় বসে উনি এটা নাও খুঁজে পেতে পারেন!!!

    আসলে এসব সুমিত গাঙ্গুলীরা আমেরিকার জন্যও  কলঙ্ক! এরা এখনও কুয়ার ব্যাঙ হয়ে জমিদার-হিন্দুর বয়ান আগলে ওর উপরে বসে আছে। অথচ সুমিত খোদ আমেরিকান সরকারের বয়ান না পড়ে, আমেরিকাতেই বসে আছে্ন।  আর তীব্র মুসলমানবিদ্বেষী হয়ে আমাদেরকেই ইসলামপন্থী (যারা হাসিনাকে উতখাত করেছে) বলে ট্যাগ লাগাইতেছেন; এছাড়া আমরা নাকি সশস্ত্র এর ইঙ্গিত দিতে  ইসলামপন্থী বাহিনী লিখেছে!!!

    আবার কত নিচা মনের কলকাতার কোন স্টেশনের এক  ফেরিওয়ালা যেন তিনি!!! তাই তার এই লেখা শুরু করেছেন,  কেন বাংলাদেশে পাকিস্তান থেকে বাণিজ্যের মালবাহী জাহাজ কেন বাংলাদেশে ভিড়ল। আবার লিখেছেন …Dhaka has also boosted its acquisition of arms and ammunition from Islamabad। মানে ইউনুস সাহেব পাকিস্তান থেকে নাকি অস্ত্র আমদানি করেছেন। অথচ এই তথ্যের কোন সোর্স কোথাও নাই।  কলকাতার কোন বস্তিবাসীও এমন নাইভ বা ভোতা চিন্তার মানুষও এমন বক্তব্য দিবে না।  অথচ তীব্র মুসলমান ঘৃণা মনে পুষে রেখে স্মিত গাঙ্গুলী –   মুসলমান মানেই খারাপ, মুসলমান মানেই জঙ্গী, মানেই অস্ত্রবাজ এসব হচ্ছে তার বমি!!!! …… সুমিত গাঙ্গুলী একজন স্কলার পেশার লোক এত ঘৃণা আর এত মিথ্যা লিখতে গিয়ে টায়ার্ড হয় না?????

    তবে শেষকথাটা হল, বাংলাদেশে মোদির খবর আছে এইটা যেদিক দিয়েই তিনি বুঝছেন বলে আমাদের জানাইছেন! তাই শিরোনাম দিছেন  [India’s Fortunes Shift in Bangladesh]।

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  বিকাল ৪ঃ ৩২    ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪

  • বেনজীর-আজিজদের ‘প্রটেকশন’ দেয়া বা না দেয়ার তর্কের ফাঁকে আলী রীয়াজ!

    বেনজীর-আজিজদের ‘প্রটেকশন’ দেয়া বা না দেয়ার তর্কের ফাঁকে আলী রীয়াজ!
    গৌতম দাস
    ৩০ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5E3

    ‘বেনজীর-আজিজকে সরকার প্রটেকশন দেবে না’

    তামাসাটা বেশ ভাল জমেছে! বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে একটা নতুন পপুলার শব্দ চালু হয়েছে আজিজ-বেনজীর। এমন এই খবরের শিরোনাম হল আজিজ-বেনজীর এর “প্রটেকশন”! আবার পাঠকও ধরে ফেলেছে এই নয়া শব্দের অর্থ কী; যদিও এখনও বিশ্বাস করে নাই। এমনিতেই, “প্রটেকশন” – এটা সঠিক শব্দ একেবারেই নয়। তবু সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টা যারাই “প্রটেকশন” শব্দটা ব্যবহার করছেন। আর এতে তাদের ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছে যেন এই সরকারের স্বাভাবিক কাজ হচ্ছে অসৎ, দুর্নীতিবাজ, পাবলিক মানি লুটেরা সরকারী কর্মচারীদেরকে “প্রটেকশন” দেয়া। যার মানে হল, আদালতসহ রাষ্ট্র-সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান অসৎ, দুর্নীতিবাজ, পাবলিক মানি লুটেরাদের আইনের আওতায় আনার জন্য বিচারের দায়ীত্বপ্রাপ্ত এবং স্টাডিং অর্ডারে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় অফিসগুলো – এরা যেন ততপর না হয়, দেখেও না দেখে বা কেউ “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” এই পক্ষের সদস্য বলে অজুহাতে ছাড় দেয় বা এড়িয়ে যায়; এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে  খামোশ করে রাখাই যেন সরকারের কাজ। আর তাই এইবার আজিজ-বেনজিরের কেসে তারা ব্যতিক্রম করবে। তারা আজিজ-বেনজিরকে এবার বাঁচাতে যাবে না। যার সোজা অর্থ হল, গত ১৬ বছর সরকার এভাবে চলেছে বলেই  এই “প্রটেকশন” শব্দের উতপত্তি। নইলে দুদক বা আদালত ধরণের প্রতিষ্ঠান এরা তো কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী ‘চোর’ ধরার স্টাডিং অর্ডারে দায়িত্বপ্রাপ্ত; মানে এরা এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ততপর হতে চাইলে তো কোন মন্ত্রী বা সরকার আদেশ-নির্দেশ দিছেন কিনা সেজন্য অপেক্ষার দরকার নাই। অর্থাৎ এখানে কাউকে অপরাধ থেকে বাঁচাবে, আড়াল করবে যেটাকে “প্রটেকশন” শব্দ ব্যবহার করে তারা বুঝিয়েছেন, কথা বলছেন – এই শব্দ ব্যবহারের তো কোন জায়গাই নাই। কিন্তু গত ১৬ বছর সরকার এভাবেই মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বা চেতনা শ্রেণী নামে অথবা এই শ্রেণীকে রক্ষার নামে আজিজ-বেনজীর টাইপের লোকেরা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি – এরা যেন কার্যত আইনের উর্ধে – এই ধারণাই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে!  আর তা হয়েছে বলেই এই “প্রটেকশন” শব্দের উতপত্তি হয়েছে। গত ১৬ বছর যে সরকার এমন প্রাকটিস চালু রেখেছে – ত যেন সরকার এভাবে “প্রটেকশন” শব্দ ব্যবহার করে সরকার তার সেই অসৎ প্রাকটিসকেই স্বীকার করে নিল! সরকারের কাজের স্টাইল ও অভ্যাসই আছে বলেই এবার, আজিজ-বেনজির কেসে বলছে তারা “প্রটেকশন” দিবে না! তাই এককথায় সরকারের “প্রটেকশন” শব্দ ব্যবহার  করে সরকারের অসৎ প্রাকটিসকেই যে স্বাভাবিক গণ্য করে ফেলেছে সেটা পরোক্ষে-অজান্তে বলে ফেলেছে। সারকথায় এবারের আজিজ-বেনজির কেসে সরকার যে – অসৎ প্রাকটিসকেই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে চলেছে- সেটা করবে না। মানে ব্যতিক্রম করবে, এই হল সরকারের “প্রটেকশন” শব্দের অর্থ ও ম্যাসেজ!

    আবার শব্দের আরো মারপ্যাচ আছে। যেমন উপরে যা লিখলাম সেখানে “প্রটেকশন” শব্দটা নেগেটিভ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে “প্রটেকশন” খুবই ইতিবাচক শব্দ। রাষ্ট্র নাগরিককে সুরক্ষা বা “প্রটেকশন”[protection] দিবে এটাই তো রাষ্ট্রের কাজ। এই মুখ্য উদ্দেশ্যেই তো নাগরিকেরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থাৎ লক্ষ্যের দিক থেকে “প্রটেকশন ইজ ফান্ডামেন্টাল” – চাওয়াটা এমন। অথচ বাস্তবে এখানে “প্রটেকশন” শব্দটা নেগেটিভ অর্থে ব্যবহার করেছে – অসৎ প্রাকটিসকেই স্বাভাবিক – মনে করা সরকার।  আর তাই, এবার এখান থেকেই  অনেকে দাবি তুলেছে যে অসৎ প্রাকটিস বাদ রেখে ফেলে দিয়ে নাগরিক সুরক্ষাই বরং সরকারের কাজ। এমনকি একটা ব্যক্তি-নাগরিকের নামে বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগ এসেছে এমন যদি হয়ও সেক্ষেত্রেও, ঐ অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও “প্রটেকশন” দেয়াই সরকারের কাজ! আর এটাই “প্রটেকশন” শব্দের ইতিবাচক, সঠিক ও উপযুক্ত ব্যবহার। নাহলে কী হবে?
    সরকার যদি সেক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তিকে কোন ফিজিক্যাল আক্রমণ থেকে প্রটেকশন দিয়েই ঐ ব্যক্তিকে আদালতে বিচারের মুখোমুখি না করে তবে তো আবার পাবলিক বিক্ষুব্ধ হবে। আর এক পর্যায়ে পাবলিক হয়ত  নিজেই ঐ অপরাধী-অত্যাচারীকে শাস্তি দিবার জন্য প্রকাশ্যে নিজ হাতে পাবলিক লিঞ্চিং [public lynching]. যাকে আমরা হাটুরে মার বা গণপিটুনি বলি তেমন একটা কিছুতে কথিত অপরাধীর মৃত্যু হয়ে যেতে পারে; যেটা একেবারেই কাম্য নয়।

    আবার একটু পিছনে ফিরব। নয়া মিডিয়া শব্দ আজিজ-বেনজীর এর অর্থ অনেকেই জানলেও এখানে সব পরিস্কার রাখাই ভাল। এখানে আজিজ মানে হল, ২০১৮ সালের হাসিনাকে বিজয়ী ঘোষণার নির্বাচন ঘটানোর নায়ক সাবেক এই সেনাপ্রধান, জেনারেল আজিজ আহমেদ আর, বেনজির মানে হল সাবেক র‍্যাব প্রধান ও পরে পুলিশ প্রধান হয়ে অবসরে যাওয়া বেনজির আহমেদ।  আর এই আজিজ-বেনজীর শব্দযুগল মানে যেন এক দড়িতে ফাঁসি চাওয়া হচ্ছে এমন এক ইঙ্গিতও আছে!  এদুই নামের বিরুদ্ধে কমন অভিযোগটা হল এরা সীমাহীন দুর্নীতি, অবৈধ আয় লুটপাট ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকারী। যেন এরা, হাসিনার জন্য কিছু বিরাট কাজ করে দিয়েছে আর এরই কিছু “বিনিময়-মুল্য” নিয়েছে তাঁরা!  আজিজের বেলায়, তিনি সেনা প্রধানের পদ-পদবী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজ সব অপরাধী ভাইদেরকে  নিজ বাপ-মায়ের নামসহ একেবারেই সব ডাহা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ন্যাশনাল আইডি আর পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন যা, কোন ছোটখাট না মারাত্মক অপরাধের অভিযোগ। এছাড়া পদ-পদবির জোরে যদি এমন করাই যায় তবে আর কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের আইডি আর পাসপোর্ট প্রকল্প করার দরকার কী ছিল? আর এর চেয়েও বড় কথা আজকাল আমাদের গ্রামগুলোর যেকোন মানুষও সম্ভাব্য বিদেশগামী প্রবাসী। এই অর্থে দেশ-বিদেশে এর ফারাক অনেক কমে গেছে। মানে হল, “আইডেনটিফিকেশন” – আপনি দেশ বা বিদেশে যেখানেই থাকেন না কেন – আপনি কে, পরিচয় বা রাষ্ট্রীয় আইডেনটিটি কী? এটা এখন একালে খুবই গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের রাষ্ট্র যদি নাগরিক-ব্যক্তির আইডেনটিটির নিশ্চয়তার দিবার অথরিটির ভুমিকার ক্ষেত্রে শৈথিল্য  মানে  ন্যাশনাল আইডি আর পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে দেশ-প্রশাসনেরই বিশ্বাসযোগ্যতাই নিচে নামিয়ে ফেলে ধুলায় মিশায়ে নষ্ট করে ফেলেন তবে যেকোন বিদেশি রাষ্ট্রই আমাদেরকে আর গ্রহণ করবে কেন? তারা তো প্রবেশ করতেই দিবে না। সন্দেহ করবে আর সেখান থেকে শুরু হবে আমাদেরকে আরো নিচা চোখে দেখা! আমি নিশ্চিত জেনারেল আজিজ এসব গভীর দিকের নজর করেন নাই; বরং সারা দেশের প্রতিটা মানুষের মৌলিক স্বার্থ পায়ে দলেই কেবলমাত্র নিজ অপরাধী ভাইদের রক্ষাই তাঁর একমাত্র স্বার্থ-জ্ঞান করে সেনাপ্রধান হয়েও এসব কাজ করেছেন।
    আর ওদিকে বেনজির এর কথা বলে শেষ হবে না। কেবল এবার দুদকের আদালতে যে মামলা তাতে অবৈধ অর্থে ৬২১ বিঘার জমির মালিকানার কথা আছে; সাথে অন্যান্য প্রায় সব ধরণের দেশে-বিদেশে সম্পদের কথাও!

    বিবিসি লিখেছে, “আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত আদালত বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের যে সব সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজকরার নির্দেশ দিয়েছেন তার মধ্যে আছে ঢাকার গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসেব, তিনটি শেয়ার ব্যবসার বিও অ্যাকাউন্ট, প্রায় ৬২১ বিঘা জমি, উনিশটি কোম্পানির শেয়ার এবং ত্রিশ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র”।

    আবার, এছাড়া আদালতের মুল আবেদনে বলা হয়েছে, বেনজির তার সারা চাকরি জীবনের বেতন ও সুবিধাদি সব মিলিয়ে কোন ব্যয় ছাড়াই মোট আয়ের মুল্যমান ২ কোটি টাকার নীচে। অথচ তাঁর যে সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে এর মুল্য কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকারও বেশী। এটা কিভাবে সম্ভব?

    সেখানে বলা হয়, অথচ ৩৪ বছর সাত মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবনে বেনজীর আহমেদ বেতন-ভাতা বাবদ মোট
    আয় করেছেন
    এক কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা। এর বাইরে পদবি অনুযায়ী পেয়েছেন আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা।

    বেনজীর ও আজিজদের বিচারের মুখোমুখি করছে আওয়ামী লীগঃ
    এবিষয়ে গতকাল ছিল খুবই এক সিরিয়াস দিন, তা বলা যায়। কেন তা বলছি?
    বেনজিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে রিপোর্ট করেছিল বসুন্ধরা গ্রুপের কালের কন্ঠ, সেই গত ৩১ মার্চ ২০২৪।  তখনও কিছুই জানা যায় নাই যে এই রিপোর্ট থই পাবে কিনা!! এরকম হাইকোর্টের নির্দেশ এস আলমের নামেও এসেছিল। কিন্তু দুসপ্তাহ পরে তা উর্ধতন কোর্টে খারিজ করে দিয়েছিল। কাজেই এসব যে আস্থা বিশ্বাস রাখার মত ঘটনাবলী নয়, আম-পাবলিকের অনুমান এরকমই। এককথায় তারা এটাকে বলে আই-ওয়াস!  কিন্তু এরপরেই এলো জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান পদক্ষেপ এর নিউজ। আর তা থেকেই এক-পা দুই-পা করে আগাতে আগাতে  ওবায়দুল কাদেরের বিবৃতি আসল যে এতে লীগের কোন দায় নাই কারণ তারা অবসরপ্রাপ্ত। কিন্তু সপ্তাহ দুই পরে দেখা গেল অন্যকিছুর ইঙ্গিত! সেটা এলো আবার নয়া অর্থমন্ত্রীর মুখ দিয়ে। এবারের অর্থমন্ত্রী পেশাগত ভাবে কূটনীতিক ক্যাডার, পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু এবার তিনি অর্থমন্ত্রী কারণ সরকার ডলার বা বৈদেশিক মদ্রা সংকটে। তাই সারাদিন কাটে তাঁর আমরা পাবলিকলি তাকে দেখি একটা সোফায় তিনি বসে আছেন বা কথা বলছেন দেশি-বিদেশিদের সাথে। অর্থাৎ ডলার আনার কূটনীতি ততপরতায় আছেন তিনি।   এদিকে বাজেটসহ অর্থ-মন্ত্রণালয়ের বাকি কাজে আমরা দেখছি একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তিনিই সামলাইতেছেন। মানে কাজ ভাগ করা হয়েছে। তা হোক, কিন্তু আমাদের আগ্রহ অন্য জায়গায়। গত ২৬ মে এই অর্থমন্ত্রী একটা কথা বলেছেন বাজ পড়ার মত। কিন্তু মন্ত্রীর লো প্রফাইল, অরাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্টডের জন্য সম্ভবত সেটা আম-পাবলিক লেবেল আমল করতে রাজি হয় নাই।
    এমনিতে, অর্থমন্ত্রী হিসাবে তাঁর জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান নিষধাজ্ঞা বা পদক্ষেপ যা নিয়েছে তাতে এর অর্থ তাতপর্য কী – এটা ঠিক অর্থমন্ত্রীর ইস্যু না। আর জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিক অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ এক্তিয়ার না। বরং দুদক ও আদালত ধরণের অফিসের ইস্যু। কিংবা বড় জোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু যদি নিজের ইস্যু আছে মনে করে। অথচ তিনি বলেছেন – ‘সরকার কিছু করেনি মানে সেনাবাহিনী কিছু করবে’, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ সম্পর্কে  এটা ছিল অর্থমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া এবং এটাই মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছিল!
    সত্যি বলতে কী খবরটা পড়ার পর কিছুটা বিরক্ত লেগেছিল।  কারণ খবরের শুরুর নাইনটা হল, “অবসরে যাওয়ার পরও বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ব্যবস্থা নেবে”। কথা হল, সেনাবাহিনী যদি ব্যবস্থা নেয়ও তো এই সেনাবাহিনী কী অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীনে? অবশ্যই না। তাহলে?
    এর মানে অর্থমন্ত্রীর কথা এরপরেও যদি সত্যি হতে হয় তবে এর একটাই অন্য সুযোগ আছে। তা হল, প্রধানমন্ত্রী আর সাথে পুরা ক্যাবিনেট অথবা বিশেষ দু-চারজন মিনিষ্টার মিলে (অর্থমন্ত্রী যাদের একজন) কোন আসরে বসে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেটার মুখপাত্র অর্থমন্ত্রী হলে বা না হলেও অর্থমন্ত্রীই সেসব কথার উপর দাঁড়িয়ে হয়ত একথাগুলো বলছেন। এমন কথা মনে হবার পিছনে আরেকটা কারণ আছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টের পরের বাক্য দেখেন। বলছে, “ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে” অর্থমন্ত্রী আজ রোববার দুপুরে সচিবালয়ে … কথা বলছিলেন। এছাড়া ঐ একই রিপোর্ট আরেক স্থানে অর্থমন্ত্রী বলছেন,  ‘এখন ঋণখেলাপিদের ধরতে হবে”।

    অর্থমন্ত্রী নিজেই হঠাৎ বলেন, ‘এখন ঋণখেলাপিদের ধরতে হবে।’ এ বাক্য শেষ করার পর চুপ থাকলে সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘পারবেন? ঋণখেলাপিরা তো অনেক শক্তিশালী।’ তখন তিনি বলেন, ‘দেখা যাক পারি কি না।
    আপনারা দেখছেন, সাবেক পুলিশপ্রধানের (বেনজীর আহমেদ) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর কি ক্ষমতা কম ছিল?’

    এমনকি তিনি বেনজিরের বিরুদ্ধেও একই ধরণের কথা বলেছেন যে “…সাবেক পুলিশপ্রধানের (বেনজীর আহমেদ) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর কি ক্ষমতা কম ছিল?”।
    এথেকে একটা অনুমান হচ্ছিল যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তত প্রধানমন্ত্রী নিজে বা না হলে ওয়ায়দুল কাদের এনিয়ে একই ধরণের কিছু বলেন কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখা! হা ঠিক তাই! গতকাল বুধবার ছিল সেই দিন। ওবায়দুল কাদের বলেন,.”..বেনজীর ও আজিজদের বিচারের মুখোমুখি করছে আওয়ামী লীগ: ওবায়দুল কাদের” । আওয়ামী লীগ বিচারের মুখোমুখি করছে – এটা তো একেবারেই নতুন ডায়লগ। কারণ সপ্তাহ-দশদিন আগে এনিয়ে কাদেরের বক্তব্য ছিল, ওরা দুজন এখন অবসরে যাওয়া ফলে সরকারের দায়দায়িত্ব নাই – ধরণের।
    এবং একই দিনে একটিভ আরেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানও একই কথা বলেছেন; আরো তিন মন্ত্রীর সাথে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সভা শেষে মিডিয়ার কাছে। সালমান বলেছেন, (তিনি কাদেরের রেফারেন্সেও কিছু কথা বলেছেন), “বেনজীর আহমেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদকে সরকার কোনো ধরনের প্রটেকশন [সুরক্ষা] দেবে না এবং দেশের আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে“।

    সালমান রহমানের গুরুত্ব কী ও কেনঃ
    সুনির্দিষ্ট এক্ষেত্রে সালমান রহমানের গুরুত্ব কী? যেখানে বাকি আরো অনেক সালমানের মত উপদেষ্টারা পাবলিক ডিল কমই করেন? এক্ষেত্রে সম্ভাব্য জবাবটা হল, যেকোন কারণেই হোক আমেরিকার সাথে হাসিনার যেকোন ডিল বা কী দিলে কী পাব ধরণের প্রস্তাব চালাচালিটা দৃশ্যতঃ সালমানের মাধ্যমেই করার একটা চর্চা তৈরি হয়েছে। এবং উভয়দেশ বা পক্ষই এটা ব্যবহার করতে আগ্রহী তা দেখা যায়। এটাই সালমনের গুরুত্ব অনেক মন্ত্রী বা ওবায়দুল কাদেরের থেকেও অনেক সময় বেশী ওজনদার হতে দেখা যায়। তাহলে কী দাঁড়ালো?

    দাঁড়ালো যে আজিজ-বেনজীর  এর পক্ষে “নো প্রটেকশন” এর আওয়াজ – এটা খুব সম্ভবত এদেরকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফাঁসিয়ে বা ডুবিয়ে দিয়ে সরকার ভেসে উঠতে চায়, নিজের ক্রেডিবিলিটি বা বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা দেখাতে চায়। আর এটার বিনিময়ে আমেরিকার কাছে তাদের কিছু চাওয়ার আছে সম্ভবত!
    যেমন এবার ল্যু এলে পরে সরকার র‍্যাবের [RAB] নিষেধাজ্ঞা তুলতে কী একশন সরকারকে করে বা নিয়ে দেখাতে হবে যেন তাই জানার মহড়া হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বেনজিরের বিরুদ্ধে একশন এবং সরকার একেবারেই যদি তাঁর হাত ছেড়ে দেয় – এটা তো একটা ভাল পদক্ষেপ হিসাবে সরকার আমেরিকার কাছে তখন এটা বেচতে বা তুলে ধরতে পারে। ওদিকে আবার র‍্যাবের প্রধান বদলাতে আগ্রহ হয়েছে সরকারের। আর কাকে করা হবে তাতে দেখা যাচ্ছে যে আমেরিকার স্যাংশনে খেয়ে বড় দাগী যে সেই-ই যেন বড় ক্যান্ডিডেট – এই নীতি এবার ব্যত্যয় ঘটেছে। নিষেধাজ্ঞা খাওয়া (তখন তিনি পুলিশ প্রধান) বেনজিরকে জাতিসংঘ ভিজিটে যাচ্ছে এই উসিলায় সরকার স্যাংশন খাওয়া বেনজিরকে আমেরিকা ঘুরিয়ে এনে তাতে নিজের সাফল্য দেখেছিল। যার নিট লাভ হলো স্থানীয় আওয়ামী লীগারদের নিয়ে তাঁর এক হোটেল-সভা করা। অথচ তিনি তো তখনও সরকারী কর্মচারি!!! অবশ্য সাথে আর সাথে দাবি করা যে সরকার আমেরিকান স্যাংশন কেয়ার করে না। আমেরিকাকে উপেক্ষা এই ছিল এতদিন সরকারের মূলনীতি! সেজন্যই কী এবার এক ব্যারিষ্টারকে র‍্যাবের প্রধান করা? সংস্কার করা বলে দেখানো?? আমেরিকার সাথে নুন্যতম একটা ওয়ার্কিং রিলেশনে পৌছানো যার লক্ষ্য? তাই কী?  আমরা এটা নিশ্চিত না; তবে এদিকে কী হচ্ছে তাতে চোখ রাখতে পারি।

    এনিয়ে কিছু সহায়ক তথ্য দেইঃ
    আমেরিকান ফরেন পলিসি পত্রিকায় এশিয়া নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের পক্ষে সব ঠিকঠাক চলছে কিনা এনিয়ে এক সাপ্তাহিক রিপোর্ট লিখে থাকেন মাইকেল কুগেলম্যান। তিনিও বর্তমানে আলী রিয়াজের জায়গায় তবে বেশী গুরুত্ববাহী আরেক থিঙ্কট্যাংক ফেলো!  তিনি আজ মানে গত ২৯ মের রিপোর্ট শুরুই করেছেন এমন কিছু তথ্য দিয়ে। যেমন তাঁর প্রথম লাইনটা হল, Hasina makes pitch for U.S. investment. হাসিনা আরো আমেরিকান বিনিয়োগ [FDI] চান! তিনি লিখছেন, হাসিনা যতই আমেরিকার উপর সবসময় রাগ ঝারেন না কেন, তিনি আমেরিকান ব্যবসায়ীদের চান, commercial partnership with Washington এর পক্ষে তিনি এখন; দেশের আগামি সত্তর বছরের বার্ষিকী (২০৪১ সালে) আমেরিকান ব্যবসায়ীদের হাত ধরে উঠে উতযাপন করতে চান! [এটাই কী গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালের ইন্ডিয়া-আমেরিকান পরিকল্পনা ছিল? ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ এর পরের বাইডেনের প্রস্তাব ছিল? ]
    তবে কুগেলম্যান লিখছেন, হাসিনা আমেরিকান ব্যবসায়িক বিনিয়োগ সহায়তা [ এতে ডলার আসবে অন্তত] চান বিশেষত রিনিউএবল এনার্জি, শিপবিল্ডিং, ফার্মাসিউটিক্যাল ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি উতপাদনের খাতে! “হাসিনার এই আবেদনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আবেদন আছে বলে মনে করছেন কুগেলম্যান! হাসিনা বাংলাদেশের রপ্তানিতে গার্মেন্টেসের ভিত্তি আবার ফিরিয়ে আনতে চান। আমেরিকান বাজার ধরতে চান আগের মত করে ট্যাক্স মুক্ত বা ছাড়দেয়া কিছু ট্যাক্সে রফতানি সুবিধা চান! যেন এটা বড় রপ্তানি খাত হিসাবে আবার উঠে দাঁড়ায়। [আগ্রহিরা বিস্তারিত দেখে নিতে ফরেন পলিসির সাইথ এশিয়া ব্রিফ থেকে।]

    From South Asia Brief:
    “However, Hasina has always strongly backed commercial partnership with Washington, and on Monday she made a strong pitch for greater investment to a visiting delegation of the U.S.-Bangladesh Business Council. Hasina called on U.S. business leaders to help make Bangladesh a “smart nation” by 2041, referring to a developed country driven by innovation and competition. (The year will commemorate 70 years since Bangladesh’s independence.)”
    “Hasina seeks to expand Bangladesh’s export base, and she singled out investment-ready “high-potential sectors,” including renewable energy, shipbuilding, pharmaceuticals, and medical equipment. Such appeals have both economic and political motivations. One of South Asia’s economic success stories, Bangladesh has suffered a slowdown in the past few years, and economists warn that it’s not sustainable to rely so heavily on garment exports.”

    এখানে বলে রাখা ভাল, হাসিনা সরকার বেনজির-আজিজ নিয়ে ঠিক কী করতে চাইছেন, কেন এবং ঠিক কী লক্ষ্যে তা সুনির্দিষ্ট করে আমরা জানি না। আমি কেবল সম্ভাব্য কিছু তথ্য দিলাম এখানে।

    শুধু ডলার সংকটই নয়, আরেক বড় সংকট হল খেলাপী ঋণ সংকট কীভাবে মিটবেঃ
    দুইটা আলাদা ইস্যু – মানে সরকারের ডলার সংকট কোন একশনে মিটে গেলে তাতেও খেলাপি ঋণ সংকট মিটাবে না। কারণ দুটা সংকট আলাদা। সরাসরি ব্যাপারটা ঝেড়ে বলে ফেলতে হবে। খেলাপি ঋণের একমাত্র সমাধান হচ্ছে খেলাপি ঋণ গ্রহিতাকেই ধরে এনে ঋণ আদায় করা। তাঁর যা সম্পত্তি পাওয়া যায় তা আদালতের মাধ্যমে ক্রোক করা – এরপর অর্থঋণ আদালতের কাছ থেকে নির্দেশ ও রায় নিয়ে সম্পত্তি নিলামে তুলে অর্থ আদায় করতে হবে। যারা বিদেশে পাচার করেছে সেসব দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে নিয়ে সেসব নিয়োজিত অর্থ দেশে ফিরানোও সম্ভব। একমাত্র এটাই উপযুক্ত পথ।
    যদি এপথে না যাওয়া হয় তবে এর দায় খেলাপী ঋণের অর্থ এই দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘাড়ে উঠবে। যার অর্থ আরো টাকা ছাপানো যার সোজা মানে আরো মুদ্রাস্ফীতি। যেটা ১৫% ছাড়ায় কোথায় যায় তা অকল্পণীয়। যার পরিণতি হতে পারে গরীব মানুষের খাদ্য কেনার মত সামর্থ বা অর্থ না থাকা, মানে দুর্ভিক্ষ!!! আর ওদিকে অনিয়ন্ত্রিত গণ ক্ষোভ বিক্ষোভ, বিদ্রোহ ইত্যাদির সম্ভাবনা -শ্রীলঙ্কান পরিস্থিতি্র মত ইত্যাদি!!
    কাজেই দুএকটা  আজিজ-বেনজির নয় সবার বিরুদ্ধেই কোনরূপ ফেবার বা ব্যতিক্রম ছাড়াই ব্যবস্থায় নিতে যেতে হবেই। আবার এটা হাসিনার জন্য উভয় সংকট অবশ্যই! যাদের “বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ” ধ্বনি শুনে হাসিনা ও তাঁর দল আত্মতৃপ্তি নিয়েছেন এরাই তো সেই ঋণ খেলাপী! যতবড় ঋণ খেলাপী তত তার গলায় জোর, উচ্চস্বর!!! কাজেই ঋণ খেলাপীর বিরুদ্ধে একশন মানে এক অর্থে নিজ দলের বিরুদ্ধে হয়ত একশন হবে সেটা!! তাহলে এখন হাসিনা কী এমন একশনে যেতে পারবেন? আমরা কিছুই জানি না। তিনি হয়ত বেছে বেছে আগানোর পথ নিতে পারেন; যেমন বেছে বেছে কিছু লোকের উপরে একশন। কিন্তু এটা একেবারেই ফল দিবে না। কারণ এটা আই-ওয়াশের ইস্যু নয়; মেজর খেলাপী বা পাচারকারিদের অর্থ ফেরত এনে দেখানোর বিষয় এটা। আর এর উপর নির্ভর করছে অর্থনীতি আবার ফিরবে কীনা, কী সে? নাকি এটা মুদ্রাস্ফীতি আকাশ্চুম্বি করবে!!
    অনেক শক্ত হাতে, লম্বা হাতের ডিসিশন লাগবে – হতে হবে এটা!!!

    সব শেষে আলী রিয়াজ প্রসঙ্গঃ
    আলী রিয়াজ আরেক আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো; যিনি স্পষ্ট করতে চান না যে তিনি বাংলাদেশ নয়, বরং আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, কথা বলেন। তিনি গত ২৬ মে দেশে এই বেনজির-আজিজ ইস্যুর মুখে কিছু মন্তব্যসুচক বক্তব্য রেখেছেন যেটা প্রথম আলো মতামত-কলামের ঢংয়ে ছেপেছে। পাওয়া যাবে এখানে, আওয়ামী লীগকেই দায় নিতে হবে – এই শিরোনামে।আলী রীয়াজের কথা ঠিকই আছে, এনিয়ে আপত্তির কিছু নাই। কিন্তু তাঁর কথাটা অসম্পুর্ণ। ঘটনার জন্য কী কেবল আওয়ামি লীগই দায়ী? নাকি থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো আলী রীয়াজ-সহ ২০০৭ সাল থেকে সকল আমেরিকান প্রশাসন ও প্রেসিডেন্ট সকলেই দায়ী?   এর উত্তর না দেওয়াতে বা বিবেচনায় না নেওয়াতে যেন তিনি নিজেকে ও আমেরিকাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন এই লেখা দিয়ে এমন দাড়িয়েছে ব্যাপারটা।
    আলো রীয়াজ যদি বুঝে থাকেন এর দায় আওয়ামী লীগেরই তবে তিনি তো বহু আগে থেকেই জানতেন বা না জানার কোন কারণ নাই যে এর দায় তাঁর এবং আমেরিকান প্রশাসনেরও!
    আবার যেহেতু সেসময় থেকেই তিনি জানতেন তাহলে এনিয়ে কী কিছু লিখেছেন তিনি? জানিয়েছেন তার পাঠককে আজকের মত যে কে  কে দায়ী?
    বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটা গভীর গুম,খুন, অপহরণ এর রাষ্ট্র হিসাবে হাজির করা ; সরকারবিরোধী যেকোন ব্যক্তি নাগরিক ও রাজনীতিককে গুম, খুন করা, ভয় দেখানো আর এসবই করা হয়েছে সেই ২০০৭ সাল থেকে; এদের সকলকে কোন প্রমাণ ছাড়াই বাচবিচারহীন এরা সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির লোক অথবা জঙ্গী সন্ত্রাসী বলে ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে। আর হাসিনা যে ২০০৯ সাল থেকে এটাই করবে এই নীতিতে চলবে তাতো আমেরিকা ২০০৮ সালেই হাসিনার স্টেট ডিপার্টমেন্ট সফরের সময় থেকেই জানত। এমনকি হাসিনার ক্ষমতা চর্চার সবঘটনাই তো আমেরিকা প্রশাসন দেখেছে, জানে ও ওয়াকিবহাল থেকেছে কিন্তু মুখে কুলুপ এটে চলেছে। বাংলাদেশের আমেরিকান রাষ্ট্রদুতের আমেরিকার বদলে ২০১৩ সালে ভারতে গিয়ে ব্রিফ নিয়ে আসার কথা কে না জানে? এই ভারত প্রীতির কাফফারা আমেরিকা আজ এড়াবে কী করে?  পরে ঐ ২০১৩ সালের শেষের দিকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফর আর এরশাদকে বিরোধি দল বানিয়ে দিয়ে যাওয়া ইত্যাদি করে প্রত্যক্ষ্য ভারতীয় হস্তক্ষেপ এটাক কী তখন আমেরিকার চোখের সামনে ঘটে নাই? এসব সময়ের ঘটনাবলীতে বেনজির-আজিজদের ভুমিকা কী ছিল? এরা কারা ছিল তা কী আমেরিকা প্রশাসন তখন দেখে নাই জানে না? সব আমেরিকান প্রশাসন হাসিনা সরকারের এসব কাজকে – জঙ্গী দমন- বলে কী জায়েজ করে নাই? এসবই কী অর্থহীন ও আত্মঘাতি ইসলামবিরোধীতা, ইসলামবিদ্বেষের ততপরতা আর নয়া ঘৃণা ছড়ানোর ততপরতা ছিল না?  সবচেয়ে বড় কথা এর কোনকিছুই হাসিনা একা করে নাই। সব সময় সে পশ্চিমা অনুমোদন পেয়ে গিয়েছে।  কথিত থিঙ্কট্যাঙ্ক ও আমেরিকান প্রশাসনের এর সবকাজেই প্রকাশ্যে বা গোপনে অনুমোদন ছিল না কী? ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে অংশগ্রহণে প্রলুব্ধ করে টেনে আনা অথচ হাসিনার সাথে তাদের কী গোপন ডিলে আমেরিকান রণে ভঙ্গ ঘটলো? কী কারণে? কেন আমেরিকান রাষ্ট্রদুত অসময়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন,  ঐ নির্বাচনের আগে  আচমকা রাষ্ট্রদুত বদল ঘটেছিল কেন?  সেকথা আমেরিকার চেয়ে ভাল কে জানে?
    কাজেই আলী রিয়াজ যেটা বলছেন, আওয়ামী লীগকেই দায় নিতে হবে – সেটা ঠক আছে হয়ত কিন্তু  থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো গং এবং সব আমেরিকান প্রশাসন এর দায় থেকে দূরে থাকবেন কীভাবে, কেন?

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মে ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ   ০২ জুন মে ২০২৪, সকাল ১০ঃ ৫৭

  • ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!
    গৌতম দাস

    ৯ জুলাই ২০২৩  ভোর ০৩ঃ  ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Hx

     

     

     

     

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কথাটা ভেঙ্গে সরাসরি উদোম করে দেখালে এর মানে হল, নাগরিক রাষ্ট্রে কোন ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা রাখাই যাবে না। বিশেষ করে ইসলামি বিয়ে। এর বদলে ধর্ম নির্বিশেষে সকলকের জন্য একই (তাই ইউনিফর্ম বা সার্বজনীন বলা) এবং একমাত্র ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইনেই’ বিয়ে করতে হবে। এই হোল সিভিল কোড বুঝনেওয়ালাদের দাবি।   তাদের সার্বজনীন ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ মানে হল, কোন  বিয়েকে ধর্মের সংশ্লিষ্টতাহীন করে সাজাতে হবে; যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এবং ধর্মীয় বিয়ে আর রাষ্ট্র আমল করবে না; এর বদলে নাগরিক হিশাবে দুই পুরুষ-নারী নাগরিকের মধ্যে বিয়ের আইন করা হবে।
    একথা শুনে অনেকের মনে হতে পারে বা ভালই তো!!! ধর্ম বা হিন্দু-মুসলমান নিয়ে ক্যাচালের চেয়ে এই ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ তো খুবই ভালো!!! এর মধ্যে বেশ প্রগতিশীলতা আর এডভ্যান্সমেন্টও দেখে ফেলতে পারে কেউ!!! ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশংসায় আমরা কাউকে খুশিতে উত্তেজিতও হয়ে উঠতে দেখতে পারি। আর পোগতিশিল=হিন্দুত্ববাদীরা খুশিতে নেচে উঠতে পারে এই বলে যে এবার ‘মুসলমান কোপানির’ একটা ভাল অস্ত্র পাওয়া গেছে!!
    হ্যা ঠিকই তাই। ‘ইউনিভার্সাল সিভিল কোড’ এর দাবিদারেরা অসৎ মনে ও উদ্দেশ্যে ইসলামের সাথে রাষ্ট্রের একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিরোধ খাড়া করতে, মুসলমান কোপাতেই এই দাবি করে থাকে। তাই এনিয়ে একটা মজার দিক বা মিলের দিক দেখিয়ে দেই তাহলে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে।
    বাংলাদেশে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর দাবি সবচেয়ে উচ্চকন্ঠে করে থাকে কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিবি। এর খাস প্রমাণ  পাওয়া যাবে এখানে  ২০২৩ সালে সমাপ্ত সিপিবি এর দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত ও প্রকাশিত প্রস্তাব যা সাপ্তাহিক একতা  পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সেখান থেকে। তাতে ১২ নম্বরে যার উপশিরোনাম [১২. নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে] এর অধীনে চার নম্বর দাবিতে লেখা আছে দেখেন  [৪.      ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।] ।    এবং বলাই বাহুল্য তার নারী (এনজিও) সংগঠন মহিলা পরিষদও এই দাবি করে থাকে। অন্যদিকে,  আগামি বছরে মানে ভারতের আবার কেন্দ্র সংসদ নির্বাচন আসন্ন। তাই মোদি বা বিজেপির এবারেরও মুসলমানদেরকে কোনঠাসা করে রাখার সফল নেতা হিশাবে মোদির  অন্যতম নির্বাচনী ইস্যুও হল এই ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কায়েম।

    তাহলে সিপিবি আর মোদির মধ্যে মিলটা কোথায় আর কেনইবা এই মিল দেখছি আমরা???   বলাই বাহুল্য এই মিল হল একই ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান কোপানির খায়েসজাত – এটাই তাদের মধ্যে কমন;  তাই এই লক্ষ্যের ঐক্য!!
    তবে যারা এখনও প্রগতিশীল আর সাথে বাড়তি হিশাবে যাদের কেউ কেউ হয়ত নারীবাদিও তাদের জন্য বলে রাখি যদি তারা সাদা মনে – শ্রেফ বুঝবার জন্য মানার জন্য না – যারা জানতে চান যে কেন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ দাবিটা ভুল তাহলে তা এলেখার শেষের দিকে “আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ”  – এই উপ-শিরোনামে লেখাটা পাবেন; পড়ে নিতে পারেন।

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ যখন হাতিয়ারঃ
    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই শব্দ কয়টা শুনলে অনেকের কাছে পবিত্র বা উচ্চমার্গীয় মনে হতে পারে, তাই অনেকের ক্ষেত্রে কিছুটা ভক্তিতে অজান্তে মাথা ঝুঁকেও যেতে পারে; সেটা এই বলে যে এটা একটা খুবই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ কোন পরম জ্ঞান হবে নিশ্চয় যা কোন প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় খুবই কাজের ও উপাদেয়!!!

    কিন্তু  আমি দুঃখিত পাঠক। এই অনুমান একেবারেই মিথ্যা শুধু না বরং উলটা। এটা আসলে মন ভর্তি যাদের ইসলাম বিদ্বেষ, যারা তক্কে তক্কে থাকে কিভাবে মুসলমানদেরকে সমাজে নিচা দেখাবে –  মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানি বা জাগানি কিছু প্রগতিশীল ভাব ধরাদের কারবার এটা; যারা আসলে হিন্দুত্ববাদী। তাদের কাছেই – মুসলমান কোপানির এক ভাল হাতিয়ার হল এই শব্দগুচ্ছে – ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’।

    শব্দগুলো ইংরাজিতে যার বাংলায় ইতিবাচক অর্থে সারকথা হল,  একটা রাষ্ট্রে ধর্মের বাইরে বিয়ে সংক্রান্ত আইনী ধারা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই কী তা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’এর পরিণত হবেঃ
    না একেবারেই না। তবে মুসলমানবিদ্বেষ যদি আপনার গোপন খায়েস হয় তবে এমন জাতিরাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে আপনি মুসলমান কোপানি বা বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে হাজির করবেনই। আর সেজন্য  ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই হাতিয়ার তুলবেনই। ফলে এই অসততার এমন আউটকামই আমরা হয়ত দেখব। তাই এককথায় বললে, রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই তা গড়ার মূল উদ্দেশ্যই তো হল নাগরিক বৈষম্য দূরে রাখা। ধর্মীয় বা যে কোন পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক অধিকারে সকলেই সমান – এই নীতির বাস্তবায়ন। কাজেই মুসলমান বা ধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অবস্থান নেয়া অপ্রয়োজনীয়; আর তাতে এতে  বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে যে কোন রাষ্ট্র গড়া বা রূপ দেয়া হবে যেটা অগ্রহণযোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য হ্যে দাঁড়াবে যা কাম্য নয়।   

    একথা সত্য যে, একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ধর্ম বা অন্যকোন পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন ভাবে তার সকল নাগরিকের সকল ‘মৌলিক নাগরিক অধিকার’ সুরক্ষা দিবার প্রতিশ্রুতিতেই কেবল জন্ম নিতে পারে বা হওয়ার কথা।
    কিন্তু বাংলাদেশ মানে যে পুরাতন অখন্ড ভারত ভেঙ্গে আজ যে তিন রাষ্ট্র হয়েছে  এর একটা রাষ্ট্র – এই বাংলাদেশে (সাথে হিন্দুত্ববাদি ভারতেও) কিছু পোগতিশিল কমিউনিস্টের এই ধারণা যে – না এভাবে চলবে না। রাষ্ট্রকে ইসলাম কোপাতেই হবে। মুসলমান বিদ্বেষী ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানি ইত্যাদি এমন বৈশিষ্ট তাদের “কল্পিত আধুনিক রাষ্ট্রের” থাকতেই হবে। নাইলে আর সেটা তাদের জাতিরাষ্ট্র হয় কী করে – এতে তো “মজা” নাই। অথচ এটা আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ বা এক্তিয়ারই নয়; বা উদ্দেশ্যই নয়। কারণ এমন রাষ্ট্রে মুসলমান নাগরিককে যদি চিন্তায় খাটো আর নিচা সংস্কৃতির বলে মিথ্যা হলেও তুলে ধরতে করে তবে তা এক চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই হবে!  তবে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই যদি তাদের মজা পাবার উপাদান হয় তো বলার কিছু নাই!  অতএব একারণেই ভারতে ১৯৪৭ সালের পরে সম-নাগরিক অধিকারের নয় বরং হিন্দু আধিপত্যের ভারতবর্ষ মানে হিন্দু জাতশ্রেষ্ঠত্বের এক ভারত জাতিরাষ্ট্র সেখানে গড়ে উঠেছে। আর তাই-ই হয়েছে আমাদের বাস্তবের ভারত! আর এর প্রভাবে অন্য দুই রাষ্ট্রও তাই একই!

    তবে বিশেষ করে পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাশ হবার পরে জমিদারি হারানো জমিদার হিন্দুরা প্রতিশোধ নিতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। এই ভেবে যে এই পার্টি ধর্মবিরোধী; কাজেই এদের ধর্মবিরোধী রাজনৈতিক ধারার আড়ালে বসে তারা মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণাছড়ানি বয়ান প্রগতির বয়ান বলে হাজির করতে পারবেন। প্রগতিবাদিতার আড়ালে এরা রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইসলামের সাথে সংঘাত বাধাতে আর রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপাতে বা এভাবে রাষ্ট্রকে সাজাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যদিও এতে কারও লাভ হয় নাই। কারণ, প্রতিশোধ নেয়া মানুষের করণীয় কাজ হতে পারে না। তবু এই ততপরতাকেই আমরা  এই অঞ্চলে চিনি পোগতিশিলতা-কমিউনিস্ট বলে। তারা আমাদেরকে ধর্মচিন্তা-মুক্ত বিশেষত ইসলাম-চিন্তা মুক্ত এক সমাজ-রাষ্ট্র হাজির করতে চায়; আর এভাবে তারা তাদের জমিদারি হারানির ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে তারা কায়েম করতে বদ্ধপরিকর! তাই তাদের এক নম্বর কৌশল হল আধুনিক রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় বা গায়ে পড়ে ভাবে হলেও ইসলামের বিরুদ্ধে খাড়া করে হাজির করা।

    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথাঃ
    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তেমনই এক ইস্যু যা দিয়ে পোগতিশিল-কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রকে মুসলমান কোপানোর কাজে ব্যবহার করতে চায়; আর তা পারবে বলে তারা মনে করে। তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা বিশেষত ইসলামি ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা ভেঙ্গে চুরমার করতে চায়।
    আর এটাকেই তারা ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ তাদের কথিত উচ্চমার্গীয় জ্ঞান জাত ততপরতা বলে আড়াল নিয়ে দাবি করে থাকে! কিন্তু আড়ালে কেন?
    কারণ, প্রগতিবাদীদের ৯৯.৯৯% এর ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট” জিনিষটা কী এসম্পর্কে পড়াশুনা-বুঝাবুঝি একেবারেই নাই। বেশির ভাগই এর নাম শুনে নাই।  তবে এর অন্তত একটা কারণ হল, মার্কসের কোন রচনায় রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট বা আধুনিকতা বা রিপাবলিক রাষ্ট্র ইত্যাদি সেখানে কোন প্রসঙ্গই নয়, হয় নাই। আবার এমনকি তাদের মধ্যে যারা অতি দিগগজ  মানে ধরেন যারা লন্ডনে গিয়ে ইংরাজী সাহিত্যে পিএইচডি করে এসেছেন – এরাও অন্তর্ভুক্ত মানে একই অবস্থা তাদের! তাই এরা কখনও ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে দুপাতা লিখেছেন জানা যায় না। ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ কে প্রগতিশীলতা-কমিউনিস্ট এর সাথে রিলেট করে কিছু ব্যাখ্যা করেছেন জানা যায় না।  অর্থাৎ কার্যত যেহেতু তাদের চিন্তার মুরোদ নাই – অক্ষম উত্থানরহিত; তাই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে তাদের হাউশ তাদের খায়েসের বাতচিত তারা কেবল তাদের মধ্যেই এক আড়ালের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। এবং অলিখিত আলোচনাতেই আটকে রাখেন!
    অথচ এরা প্রত্যেকে আধুনিক রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপানির অগ্রসেনানী সৈনিক! রাষ্ট্রকে তারা তাদের ইসলামবিদ্বেষ এর খায়েস পূরণের হাতিয়ার করে অপব্যবহার করতে চায়!

    ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও রিপাবলিক রাষ্ট্রঃ
    আপন ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে একটা নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিশাবে দেখা এটা ইউরোপের কোন দেশে নাই; কিন্তু একমাত্র কেবল আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে এটা পাওয়া যাবে। পিছনের অনেক কারণের মধ্যে মূল কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান বা ওসমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে এই সাম্রাজ্য-ভুখন্ডকে কার্যত বৃটিশ ও ফরাসীরা  নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া থেকে। এরপর এরা ওসব ভুখন্ডের মুসলমান বাসিন্দাদেরকে শাসন করতে গিয়ে – পুরানা ক্রুসেডে ইউরোপের হারের কথা না মনে পড়ে যায় – এটা একটা ভয়ের কথা ছিল। এজন্য যে নতুন শাসন-তত্ব শাসক বৃটিশ ও ফরাসীরা ১৯১৮ সালের পরে ওসমান সাম্রাজ্য ভুখন্ডে  চালু করেছিল তা হল, কথিত নয়া রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করা নামে এক অদ্ভুত বায়না সেখানে তারা হাজির করেছিল। গত ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফিলিয়া সম্মেলনের কখনও অথবা ক্লাসিক্যাল ইউরোপীয় রাষ্ট্র-চিন্তায় কখনও এমন কথা শুনা যায় নাই।  বরং উল্টা আমেরিকা নিজে ১৭৭৬ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশ হবার পরে পনেরো বছরের মধ্যে ১৭৯১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হলে সেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো কী কী তা বর্ণনা করতে গিয়ে সেখানে এই প্রথম কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার বলতে তাতে ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – এটাকেও এক নাগরিক অধিকারের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আর এথেকে এটা প্রমাণ করেছে যে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারনার সাথে ধর্ম পালনের কোন বিরোধ নাই। তাই রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করার কথা বুজরুকি ও শয়তানি!
    কিন্তু এই শয়তানিটাই আপন হয়ে দাড়ায় আমাদের এই অঞ্চলে হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের অনুসারি, হিন্দুত্ববাদিদের কাছে।   ফলে তা প্রগতিশীল ও কমিউনিস্টদের কাছেও।

    সব সিভিলাইজেশনই ধর্মতত্বের হাত ধরেই আগিয়েছেঃ
    কিছু কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। সারা দুনিয়াতে মানব সভ্যতার বয়স  ধরা হয় প্রায় ছয় হাজার বছরের বেশি। ইতিবাচক অর্থে মানব সভ্যতা (human Civilization) এর সোজাসাপ্টা মানে হল যখন থেকে মানুষ যাযাবর জীবন, ফলমূল খাবার টোকায়া খাওয়ার জীবন ছেড়ে এবার কৃষিকাজ শিখে চাষাবাদ শুরু করেছিল। আর চাষাবাদের জীবনের পুর্বশর্ত হল, থিতু হয়ে কোন এক নদীবিধৌত উর্বর ভুখন্ডে বসতি স্থাপন করে বসে যাওয়া  – আগের কোন যাযাবর জীবনের বিপরীতে।  যেটাকে আমরা একালে এমন একেক ভুখন্ডে গড়ে উঠা বসবাস যা থেকে আসলে নানান এথনিক [ethnic] বৈশিষ্টে ভিন্নতায় আমাদের নিজ সভ্যতায় বসবাস শুরু হয়েছিল – আর এটাকেই আমরা সিভিলাইজেশন অর্থে সভ্যতা বলছি।  যা আসলে মূলত এথনিক অর্থে জাত-সভ্যতা! আর  এই এথনিক পরিচয় বলতে যার ভিতরের এক প্রভাবশালী উপাদান হল ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়!  আর প্রগতিশীলতার নামে আমাদের অনেকের মনে বৈষম্যহীন অধিকারের রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চেয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এরা  ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এর সাথে সংঘাত বাধানোকে অনিবার্য মনে করে থাকে। আর এখান থেকেই সব বিরোধের উতপত্তি।
    এখন এই ছয় হাজার বছরের মধ্যে প্রায়  দুহাজার বছর আগে যীশুর জন্ম।  এর মধ্যে নবীর যুগও এসেছে। আর এই সময়কালে সবসময়ই আমরা অনেকগুলো মানে কোন না কোন একটা ধর্মতত্বের হাত ধরেই হেটেছি। আমাদের হাত খালি থাকে নাই। আর ইতিবাচক অর্থে দুনিয়ায় আমাদের সকল সভ্যতা ধর্মতত্বের হাত ধরেই এপর্যন্ত হেটে এসেছে। পরবর্তিতে ১৪৫০-১৫৫০ এই সময়কালকে বলা হয় বিজ্ঞানের যুগ শতবর্ষ – যখন একনাগাড়ে বিজ্ঞানের গুরুত্বপুর্ণ আবিস্কার গুলো ঘটেছিল। কিন্তু এরপরেও এসময়ে “বিজ্ঞান” এসে যাওয়াতে দুনিয়া থেকে কোন ধর্মতত্ব  তো নাই হয়ে যায় নাই! বরং বলা যায় বিজ্ঞানকে পাশে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ধর্মতত্ব তার জায়গাতেই আছে। মাঝে একটু কেবল সময় লেগেছে এডজাস্ট হতে পরস্পরকে জায়গা করে দিতে।  তাই শেষ বিচারে  মানুষের এখনকার চিন্তা-চর্চার রূপ যেখানে গিয়েই ঠেকুক চিন্তা-চর্চার শুরুর দিকে সবকিছুই ছিল ধর্মতাত্বিক বৈশিষ্ঠের। কাজেই ধর্মতত্ব জিনিষটা গায়ের জোরে ত্যাগ করার বিষয়ই নয়! আর কাকে ত্যাগ করব আমাদের সকলের আদি না হলেও পুরাতন সব প্রজন্মকে??? এটা কী সম্ভব?? কাজেই  ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিশাবে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রেখে দেওয়া একটা খুবই উপযুক্ত এপ্রোচ বা আগানোর উপায়। কিন্তু কাজ আরও আছে আর তা করতে হবে বুদ্ধিমান হয়ে!

     

    তাহলে আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ
    খুবই সহজ!
    ১। সবার আগে আমাদের মনের ভিতরের যেকোন ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি বাইরে বের করে ফেলে দিতে হবে; তাতে আমরা যার যার ধর্মপালনের লোক হই আর নাই হই না কেন! ধর্মপালন বা মানা না মানা আপনার নিজস্ব বিষয়। কিন্তু ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি ত্যাগ করতেই হবে! নাগরিক যার যার ইচ্ছা হবে তাকে তার ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে। আর আমরা তার ফেলো বা পাশের নাগরিকেরা আমাদের দায়িত্ব হবে আমরা নিজেরা যেই ধর্মই পালন করি অথবা কোন ধর্মই পালন না করলেও ফেলো নাগরিকের অধিকার রক্ষায় আমাদের সহযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে হবেই।
    ২।  আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা মানেই যেগুলো বহু পুরানা ট্রাডিশন হিশাবে কোন না কোন ধর্মতত্বের ঘরে বসে, হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। ধর্মীয়-কালচারাল ও সামাজিকতায় মাখামাখি হয়ে থাকা এই ট্রাডিশনে হস্তক্ষেপ বা ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়; আর এটা রাষ্ট্রের কোন কাজ বা এক্তিয়ারই নয়। বিশেষত এক হিশাবে দেখলে এসব ট্রাডিশন মানা না মানা তো পারসোনাল ইস্যু।  তবে রাষ্ট্রের দায় আছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষা দেওয়ার। তাই সেই কর্তব্য পালন করার প্রয়োজনে ট্রাডিশনাল বিয়ের প্রথায় কোন হাত না লাগিয়ে রাষ্ট্র বরং কিছু বাড়তি কাজ করণীয় বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে। যেমন বিয়ে ধর্মীয়-সামাজিক রীতিতেই ট্রাডিশন মেনেই চলবে। তবে এর আর বাড়তি দিকটা হতে পারে হলঃ ক. এই বিয়েটা সরকারি লাইসেন্স নেয়া কাজি বা রেজিষ্টার্ড কাজির কাছে লিপিবদ্ধ (রেজিষ্ট্রেশন) করাতেই হবে। যেই কাজিই আবার বিয়ের সাতদিন বা একমাসের মধ্যে (যেভাবে বলা থাকবে) সরকারি ডাটাবেজে এই বিয়ের সব তথ্য ফিড করা হয়েছে তা নিশ্চিত করবে – ঐ বিয়ের ডকুমেন্টে বা কাবিনে ডাটাবেজ সংরক্ষকের প্রতিস্বাক্ষর যুক্ত করে দিবে। এতাই মূলত রেজিস্টার্ড কাজির রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূল করণীয় কাজ হবে।
    একচুয়ালি, এটাই বাংলাদেশের বর্তমান কাজি অফিসের কাজের প্রচলিত নিয়ম; যেটা ইতোমধ্যেই চালু হয়ে আছে ১৯৮৮ সাল থেকে মানে, এরশাদের আমলে। এবং সেসময় আমাদের রাষ্ট্রের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তো ভেঙ্গে ফেলতে বা হস্তক্ষেপ করতে হয় নাই। বরং সেসময় মূল কনসার্ণ ছিল পুরুষেরা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আর যেকোন মনের দশা খেয়ালে থাকা অবস্থায় তাঁর নারীকে তালাক দিয়ে দিচ্ছিল। এই দায়িত্বহীন কাজগুলোকে শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে দেখা গেল ১৯৮৮ সালের আগে বিয়ে হত পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জিন কে ডেকে এনে দুজন দোস্তকে সাক্ষী রেখেই বিয়ে সম্পন্ন মনে করা হত। কিন্তু কোথাও এই বিয়ের তথ্য সংরক্ষণ করার কোন সিস্টেমই ছিল না।  আর তাই দায়িত্বহীন তালাক তখনই শৃঙ্খলে আনা সম্ভব হবে যখন বিয়েটা যে হয়েছিল এর ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে ও সার্টিফাই বা সার্টিফিকেট দেবার ব্যবস্থা থাকবে। এসব কারণেই ১৯৮৮ সাল থেকে বিয়ের ডাটাবেজ সংরক্ষণ ভিত্তিক কাজি-রেজিষ্টার্ড বিয়ে ব্যবস্থা চালু করা গেছিল। তবুওও এতে এখনও  যেটা অসম্পুর্ণ অংশ তা হল, মুসলমান বাদে অন্য নাগরিকদের  বেলায় এমন কোন রেজিষ্ট্রশনের সহজ ব্যবস্থাটা এখনও নাই।  অথচ রাষ্ট্রের দিক থেকে দরকারি হল, কোন ধর্মীয় ট্র্বেডিশনের বিয়ে সেটা হোক বা না হোক – সমান্তরালভাবে সকল নাগরিক মাত্রই সবার বিয়ে রেজিষ্টেশনেরে ব্যবস্থা থাকতেই হবে। কারণ, এটা না থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে নারী নাগরিকেরা। নিশ্চয় আমরা সকলে মানব যে বিয়ের পরে সামাজিক পারিবারিক দায়ীত্ব ফেলে পুরুষেরা সোজা হেটে চলে যেতে খুবই ওস্তাদ!

    অতএব, কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ ব্যবস্থা চালু একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। সকল নাগরককে একই খুড়ে মাথা কামিয়ে দিতে হবে কেন? মানে ধর্মবিহীন বিয়ের ব্যবস্থা কায়েমই একমাত্র রাষ্ট্রের করণীয় এটা ভিত্তিহীন কথাই শুধু নয়, এই বক্তব্য ধর্মবিদ্বেষী যা মূলত ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাজীবীদের অসৎ কাজ হবে। এককথায় ‘ইউনি্ফর্ম সিভিল কোড’ এর উদ্দেশ্য মুসলমান কোপানি আর ঘৃণাচর্চার দোকান খুলে বসার সামিল! আর  মূলত  ধর্মপালনের কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রের কাজ তাতে ধর্ম তার এক্তিয়ারের মধ্যে কাজ করবে আর রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে তার এক্তিয়ার ও দায়ীত্ব পালন করে যাবে। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসততায় ইসুলাম বা মূসলমান এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে খাড়া করা শুধু অন্যায় নয়, এটা অপরাধও!

    তাহলে মোদি এখন কী করছেনঃ
    মোদি গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরেক বৈষম্য চালু করতে পায়ে পারা দিয়ে হলেও জবরদস্তিতে  ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ চালু করার হুমকি দিয়ে চলেছেন। তাঁর এই ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করতে এখানে এসে তিনি মর্ডানিস্ট হবার ভান করছেন। যাতে মুসলমানেরা আরও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়।  কিন্তু ভারতের অনেক পুরানা রাষ্ট্র বলে এর কিছু সুবিধাও আছে।  তাই তাদের বিচার বিভাগের অংশ প্রতিষ্ঠান ‘আইন কমিশন’ এর মতামত যথেষ্ট শক্তিশালী।  এমনকি কোন আইন বদলাতে গেলে সেবিষয়ে আইন কমিশনের মতামত ভালই গুরুত্ব পায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

    কলকাতার আনন্দবাজার ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর বাংলা করেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। ইলেকশনের আগে আর পিছনে অ্যামেরিকান সমর্থনে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদল এখন একজোট হচ্ছে বলে  অনেক কিছুতেই আর মোদির টাকা খেয়ে মিডিয়া কাজ করছে না। তাই আনন্দবাজার নিজেই জানাচ্ছে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ নিয়ে ভারতের আইন কমিশনের মতামত কী? নিচের সেই পুরা প্যারাগ্রাফটাই আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা হয়েছে দেখেন।

    “কী বলেছিল ২১-তম আইন কমিশন?”
    সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলবীর সিংহ চৌহানের নেতৃত্বাধীন ২১-তম আইন কমিশনের মত ছিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকারের মতো পারিবারিক বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান, পার্সি, জৈন সকলের একই আইন চালু করার প্রয়োজন নেই। পারিবারিক আইনে সংস্কার নিয়ে কমিশনের বক্তব্য ছিল,“সংঘাতের সমাধান ফারাক মুছে ফেলা নয়। অধিকাংশ দেশ এখন ফারাককে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফারাক থাকাটাই মজবুত গণতন্ত্রের প্রতীক। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এখন কাঙ্ক্ষিত নয়, প্রয়োজনও নেই। তার বদলে যেখানে বৈষম্য রয়েছে, সেগুলো দূর করা উচিত।”

    অর্থাৎ এককথায় বললে আইন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সাথে নাই। তবু মোদি ডেসপারেট ভাবে আগাচ্ছেন। আর ওদিকে এতদিন কংগ্রেস-কমিউনিস্টেরা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কে মুসলমানেদেরকে প্রগতিশীলতায় শিক্ষিত করার আইন মনে করত। কিন্তু এখন?
    এখন এরা মোদিবিরোধী প্রায় সকলেই অবস্থান বদলে নিয়েছে। তারা এখন আইন কমিশনের বক্তব্যকেই নিজেদের বক্তব্য বলে প্রচার করতে নেমেছে। সিপিএম এর পরিবর্তিত অবস্থান পাওয়া গেছে তাদের গণশক্তি পত্রিকায়। নিচে সে অংশ তুলে আনা হয়েছেঃ

     সিপিএম এর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি 
    বিবৃতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে তৎপরতার বিরোধিতা করে পলিট ব্যুরো বলেছে, এই বিষয়ে ফের আলোচনা শুরু করেছে বর্তমান (২২তম) আইন কমিশন। অথচ এর আগের আইন কমিশন (২১তম) বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা করে ২০১৮ সালেই বলেছিল, ‘‘এখন অভিন্ন দেওয়ানি বিধির না প্রয়োজন আছে, না এই বিধি কাম্য।’’ সিপিআই(এম) এই অবস্থানকে সমর্থন করে। অভিন্নতা আর সমতা এক নয়। পার্টি সমস্ত সম্প্রদায়ের মহিলাদের সমানাধিকারের পক্ষে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত ও প্রথাগত আইনগুলিকে সংস্কারের মাধ্যমেই সেই লক্ষ্যে সব থেকে ভালভাবে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে, যে প্রক্রিয়ায় সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ থাকবে ওই সম্প্রদায়গুলির সমস্ত মহিলা ও পুরুষের।

    কংগ্রেসের অবস্থান এখানে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের অবস্থান আগে যাই থাক তাদের উচিত হবে ভেবে চিন্তে তাদের আপডেটেড অবস্থান দেখানো।
    আশা করব সমাজের সকল অংশ ইতিবাচকভাবে নিজ নিজ দায়-অবস্থান দায়ীত্বের সাথে তুলে ধরবেন; তাতে আগে আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন! ঘৃণা-বিদ্বেষ আমাদের কারও জন্যই কোন সমাধান-অবস্থান নয় হতে পারে না! এটুকু আমাদের না বুঝার কিছু নাই!

    আপডেটেডঃ ০৯ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ১২ঃ ৫৮
    আপডেটেডঃ ১০ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ০৩ঃ ৩৩

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ২৩ জুন পালন

    ২৩ জুন পালন
    গৌতম দাস

    ২৭ জুন ২০২৩    দুপুর ০২ঃ ৪৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Gi

    আমাদের সমস্যার শেষ নাই।
    এবারের ২৩ জুন পার হয়ে গেল; আজ ২৭ জুন।
    এই ২৩ জুন এদিন কেউ লেখেন ‘পলাশী দিবস’ কেউ ঐতিহাসিক ‘পলাশী দিবস’। এমনকি প্রথম আলোও লেখেছে – ‘ইতিহাসের এই দিনে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন’ হয়েছিল। আর বেশির ভাগ উতযাপন কর্ণারে দেখা যায় নবাব সিরাজুদ্দৌলার একটা ছবি।
    হা কথা ঠিক, এদিন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনে বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয় ঘটেছিল। আমাদের কলোনিদেশ হওয়ার পথ সুগম হয়েছিল।
    তবে ইদানিং এদিন পালনে যেটা বাড়ছে তা হল, নবাবের বন্দনা। নবাব সিরাজকে এক ধরণের হিরো-ভাবে দেখানো – ঠিক আছে এমনটা তো হবেই। কিন্তু এখানে কিছু “অতিরিক্ত” হয়ে যাচ্ছে। অসতর্কে হয়ত মানে যথেষ্ট ভেবেচিন্তে তা করা হচ্ছে না বলে।
    যেমন ধরেন এই ২৩ জুন ১৭৫৭ – এটা প্রায় তিনশ বা পোনে তিনশ বছর আগের ঘটনা। আর সেটা ছিল নবাবের আমল আর আজ হাসিনার আমল। হাসিনার নামে যতই ভটচোরের প্রমাণ বা অভিযোগ থাক হাসিনাকে কিন্তু স্বীকার করতে হয় যে তাঁর ক্ষমতার উৎস জনগণ। যেটা নবাব সিরাজের বেলায় তার সম্পর্কে যতই ইতিবাচকভাবে লিখি তাঁর ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়।
    হাসিনাকে মিথ্যা করে হলেও দাবি করতে হয় “জনগণ তাকে ভোট দিয়েছে” – সেজন্যই তিনি নাকি ক্ষমতায়! বিপরীতে নবাব সিরাজের বেলায় “জনগণ তাকে ভোট দিয়েছে” এরকম কোন ধারণাই তখন ছিল না। কারণ তখন না জনগণ বলে ধারণার জন্ম হয়েছিল, না ভোট বা রিপ্রেজেন্টেশন বলে কোন ধারণা। আমরা বড়জোর ছিলাম নবাবের প্রজা। কোন নবাবী বা নবাবগিরি আমাদের ফেরত আনবার ব্যবস্থাই নয়। আমাদের কাজও নয় – এটা যেন না ভুলি!
    মানে এক রিপাবলিক দুরত্বে এ’দুই শাসন ব্যবস্থা। আমরা আগামিতে হাসিনাকে সরিয়ে বা পরাজিত করে এক নয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জনগণের শাসন বা জনশাসন ব্যবস্থা চালু করব। আর নিশ্চয় সেটা কোন “নবাবী শাসন ব্যবস্থা” হবে না। আর মূলকথা হল কোন নবাবী শাসন ব্যবস্থা কায়েম নবাবের প্রজাদের কাজই নয়। এজন্যই তা নবাবী শাসন মানে এক মনার্কি বা রাজ-শাসন ব্যবস্থা। আর প্রজা সে তো নবাব বা রাজার অধীনস্ত প্রজা-ই। আর বিপরীতে জনগণ মানে স্বাধীন জনগণ, যা নবাবের আমলে কেউই নয় – অস্তিত্বই নাই; হয়ে উঠতে পারে নাই।
    কোন ২৩ জুন দিবস পালনের সময় – এই “নবাবী সীমাবদ্ধতা” -এটা যেন আমারা খেয়াল রাখি। সবার আগে নাগরিক, সিটিজেন, পাবলিক ইত্যাদি শব্দগুলোর অর্থ বুঝেন – ঠিক বুঝেছেন কিনা নিশ্চিত হন – নিজেকে ঝাকায় জিজ্ঞাসা করেন!
    নিচে একটা পুরানা লেখার লিঙ্ক দিলাম। সাপ্তাহিক দেশকাল এরা কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল ম্যানেজমেন্ট ও স্টাফ দিয়ে পরিচালিত। কিন্তু তারা আমার একটা লেখা দুদুবার ছেপেছিল কি বুঝ থেকে দুই ভিন্ন প্রায় বছর খানেকের ফারাকে; আর দুই ফর্মে তা আমার জানা নাই। দ্বিতীয়বার সেটা আবার বড় করে লেখার পরে। কেন তাদের এলেখা এত পছন্দের তা আমি বলতে পারবে না। সেই লেখার শিরোনাম “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাৎপর্য, অতঃপর …” । নিচে লিঙ্ক……।
    এর বড় ভার্সানটাই এখানে আবার পাঠককে পড়তে দিলাম। তবে জানিয়ে রাখা ভাল এই লেখাটারই আরো বিস্তার ঘটিয়েছিলাম আরো পরে – তবে সেটা দুই পর্বে, ছাপা হয়েছিল আমার নিজস্ব ওয়েব সাইটে তখন আবার এই শিরোনামে “ ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ”।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!

    কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!
    গৌতম দাস

    ১৮ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4t2

     

             India: Congress victory strong message against majoritarian politics

     

    দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্য সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১০ মে যার, ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ১৩ মে এবং  এই ফলাফল হয়েছে মোদির জন্য একালের খুবই বিপর্যয়কর এক আঘাত। অনেকটা যেন ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভাগ্যে নেমে এসেছিল এক কঠিন নেতি ফলাফল বিপর্যয় হিশাবে যখন, বিজেপি ঐ নির্বাচনে বিরাট মার্জিনে জিতে আসতেছেই বলে ব্যাপক প্রপাগান্ডা  আওয়াজ তোলার পরে বাস্তব ফলাফল দেখা গিয়েছিল একেবারে উলটা; বিজেপি সেবার তার গত ২০১৯ সালের সফলতাটাই ধরে রাখতে পারে নাই; বরং আরও নিচে নেমে গেছিল। এবার কর্ণাটকের ফলাফল বিজেপির জন্য অনেকটা সেরকম তো বটেই তবে এর চেয়েও বেশি নেতি প্রভাব ফেলেছে। এর বড় কারণ হল প্রথমত, আগামি কেন্দ্রীয় নির্বাচন আসন্ন। মানে হল, আগামি বছর মে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন ততদিনে শেষ হয়ে ফলাফলও প্রকাশিত হয়ে যাবে।

    এছাড়াও, অন্যান্য বড় ফ্যাক্টরগুলো হলঃ এতদিন গত ২৩ বছরেরও বেশি যে ভারত ছিল এশিয়ায় অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজিক পার্টনারই শুধু না, ভারত ছিল আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর বরকন্দাজ। আর এর বিনিময়ে মানে বরকন্দাজির নামে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার চলতি বছর থেকে বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা অনুসৃত নীতি থেকে সরে এসেছে। যদিও সরকারি আনুষ্ঠানিকভাবে   আমেরিকা বা ভারত দুই সরকারের কোন পক্ষ থেকেই কোন ঘোষণা  দেওয়া হয় নাই কৌশলগত কারণে কিন্তু, দুপক্ষই নিজ নিজ সরকারের পথচলা ও আচার আচরণে এমনকি ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রকাশিত করে ফেলছে যে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। তবুও যেটা অনেকটা একটা বিয়ে ভেঙ্গে গেছে কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স হয় নাই – এর মত। তাই আচার-আচরণ বসবাসে তা প্রতিফলিত হবেই, সেরকম। সেই নয়া  গতি-প্রকৃতি কেমন এনিয়ে ভারতের মনোভাব যেভাবে প্রকাশিত তা নিয়ে একটা লেখা আসবে আগামিতে।

    এতদিন বাইডেন সরকার বিভিন্নদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে   মানবাধিকার লঙ্ঘণের এর অভিযোগ আনা আর স্যাংশন আরোপ – অন্তত এই দুই নীতি নিয়ে সামনে আগিয়েছে। তাসত্বেও এর কোনটাই এতদিন মোদি সরকারের উপর প্রয়োগ করে নাই। ছাড় দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলেছিল। কিন্তু এবার সবকিছুই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর সংসদ সদস্যপদ খারিজ ও সাজা দান ইস্যুতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট(পররাষ্ট্র বিভাগ) এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল জানিয়েছিল তারা সব লক্ষ্য করছে [we r Watching], নোট নিচ্ছে। তাই, আমার আগেরই এক লেখায় কিছু বিস্তারিত বাক্যে লিখেছিলাম। সেই গত লেখায় এখানে, যার সারকথাটা হলঃ
    “যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, মোদির দোস্ত আদানির শেয়ার বাজারে করা কারসাজির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার পরোক্ষ আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ]  যেটাকে প্রত্যক্ষ আহবান বলে দাবি করে মোদির অভিযোগ, আদালতে মোদির কারসাজি করে রাহুলকে শাস্তির রায় ঘোষণা ও প্রভাব বিস্তার; এছাড়া, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে গাথা ও যুক্ত।”
    অর্থাৎ মোদির ভারত থেকে অ্যামেরিকার আলাদা হয়ে যাওয়া রাস্তাটা হল এই যে, বাইডেন এখন দেখতে চান ২০২৪ সালে্র নির্বাচনে মোদি সরকার যেন ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়; আর এর স্বপক্ষে “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে”  আইন বাঁচিয়ে যতটা সহায়তা করা যায় এর সবটা করতে নেমে পড়েছে আমেরিকা। তাই কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির গোহারা হার “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নতুন উতসাহে আগিয়ে যেতে উতসাহিত করবে আর ঠিক ততটাই যেন তা বিজেপি-কে হতাশ ও নিরুতসাহিত করবে! এটাই হল কর্ণাটক নির্বাচনের একতা বড় তাতপর্য, যা একেবারেই ভারতের একটা আঞ্চলিক হিশাবেও যায় না কর্ণাটক এমন এক রাজ্য নির্বাচন মাত্র হওয়া সত্বেও, এর মধ্য দিয়ে এক  গ্লোবাল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দিক ফুটে উঠেছে! এনিয়ে সবচেয়ে বড় করে ভোটের হার-জিত দুপক্ষই পরস্পরকে টিটকারি করেছে টুইটারে।  যেমন তেমনই একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক মোটা ভাই কর্ণাটক নির্বাচনের ফলাফল আসতেই ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে অমিত শাহ প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করেছেন আর সকল প্রার্থীই ভোট ছেয়েছেন মোদির নামে। তাই ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক “মোটা ভাই” পালাচ্ছে। আর গুজরাতি ভাষায় মোটা ভাই মানে বড় ভাই যার মাথায় আবার প্রতীকিভাবে অমিত শাহের মত বিশাল টাক আছে।

    ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটক কোথায়, কেন আর এর গুরুত্বই বা কীঃ
    শুরুতে একবাক্যে কর্ণাটকের এই নির্বাচনের ফলাফল একটু বলে নেই। এই নির্বাচনে মোট আসন ছিল ২২৪ যার মধ্যে এবার কংগ্রেস একাই জিতেছে ১৩৯ আসনে, যেখানে সরকার গঠনের জন্য নুন্যতম প্রয়োজনীয় হল ১১৩ আসন। এখানে গত রাজ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে আর সেবারই প্রথম বিজেপি দল ১০৪ আসন পেয়েছিল যা এককভাবে সরকার  গঠন করার মত যথেষ্ট আসন নয়। কিন্তু এদিয়েই বিজেপি ষড়যন্ত্র এঁটে বাকি আসন সেবার বিরোধীদের থেকে ভাগিয়ে এনে গত পাঁচ বছর রাজ্য সরকার গঠন করতে সক্ষম ও তা চালিয়ে এসেছিল। কারা সেই ভাগিয়ে আনা লোক তা নিয়ে এলেখার শেষে কথা বলব।

    এবার, ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটকের পরিচিতি প্রসঙ্গে। উত্তর-ভারতের আর্য-প্রভাবিত সব রাজ্যগুলোর বিপরীতে ভারতের দক্ষিণের চারটা প্রদেশকে   ‘দ্রাবিড়ীয়ান’ রাজ্য বলা হয়। অনেক সময় এই রাজ্যগুলোকে ‘দাক্ষিণার্ত’ [DECCAN] অঞ্চলও  বলতে দেখা হয়। আসলে ভূ-গঠনশৈলী হিশাবে এই পুরা অঞ্চলটাকেই (সংস্কৃতঘেঁষা বাংলায়) বলে মালভুমি, ইংরাজিতে যা  Plateau বলে পরিচিত। আর গ্রামের সাধারণ বাংলায় যেটা পাহাড়ের উপরের এক ব্যাপক বিস্তীর্ণ সমতলভুমি – এমন ভুখন্ডকে বুঝায়।  যার নাম বাংলা উচ্চারণে লিখলে হবে  ডেকান প্লাটো [DECCAN Plateau]। 

    মিথিওলজি বা প্রচলিত ধারণায়ঃ
    মিথিওলজি [mythology] মানে বলা যায় কিংবদন্তি ধারণা; বহু পুরানা প্রচলিত থাকা ধারণায় যা আছে বা থাকে কিন্তু যার প্রমাণ নিয়ে কেউ আগ্রহ করে না বা মাথা ঘামায় না।  সব এথনলজি [ethnology] বা জাতির ধারণার মধ্যেই এমন নানান মিথ [myth] থাকতে দেখা যায়। সেকথা একটু পরে আসছি।   ভারতের উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে ধর্মীয় ও কালচারাল ঝগড়ার মূল ইস্যুটা প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একারণে যে ভারতের বাইরে থেকে এসে আর্যরা যেখানে প্রথম খুঁটি গেড়ে বসেছিল সেটা সারা ভারত না বরং,  কেবল উত্তর ভারত মাত্র। পরে সেখান থেকে এর আশেপাশের প্রদেশ যেমন মহারাষ্ট্র (মারাঠি) এর উপর অংশ, মধ্যপ্রদেশ আর পুবে বিহার পর্যন্ত সহজেই প্রভাব বিস্তার ও ভাষার দিক থেকে এসব রাজ্যের উপর সংস্কৃত ভাষার প্রভাব-আধিপত্য ছড়াতে পেরেছিল। কিন্তু কখনই দাক্ষিণার্থে প্রবেশ করতে পারে নাই। আর প্রায় একইভাবে ওদিকে পুবে বিহারে – ভোজপুরি ভাষার বিহার পেরিয়ে বাংলায় পুরাটা দখল নিতে পারে নাই আর্যরা।  আর্যরা মহারাষ্ট্র পেরিয়ে আরও দক্ষিণে দাক্ষিণার্থের কোথায় প্রবেশ না করতে পারার মূল কারণ মনে করা হয় এই ডেকান প্লাটো মানে পাহাড়ের উপরের সমতলভুমি, এটাকে তারা সদলে পার হতে পারে নাই।
    এমনকি মিথিওলজিতে [এথনিক মিথের ধারণায়] দেখা যায় আর্যদের দেবতা ও তাদের আবাস স্বর্গের ধারণায় – সেখানে সুরালোক বলতে স্বর্গ বুঝানো হয়ে থাকে অর্থাৎ স্বর্গ মানে সুর বা দেবতা-দের আবাস যেখানে।  আর বিপরীতে যারা দেবতাদেরকেই স্বর্গচ্যুত করতে চায় এরাই হল তাদের চোখে অসুর। যেন দেবতাদের দিক থেকে দেখলে সুর হল তারা নিজেরা; তারা নায়ক সেখানে আর অসুর হল ভিলেন বা বিপরীত।  দুর্গাপুজার মুর্তিতে দেখা যাবে ওটা হল, দুর্গা লড়ছেন এক অসুরের সাথে। আর কেমনে চিনব যে এটা অসুর? দেখা যাবে মহিষের পেট চিড়ে যে বেরিয়ে এসেছে আর দেখতে কুচকুচে কালো – এই হল আর্যদের ভিলেন-বোধ। আর তাতে এটাই মহিষাসুর!
    সারকথায় মিথিক্যাল বর্ণনাগুলোতে সেটা কার দিক থেকে দেখা বর্ণনা – এটাই খুবই নির্ধারক। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই একদল সাঁওতাল ট্রাইব আছে যারা দুর্গাকেই উলটা ভিলেন মনে করে থাকে; আর মেনে বিপরীতে মহিষাসুর এরই পুজা করে থাকে। এনিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক নিউজ এখানে। আবার মহিষাসুর নিয়ে কলকাতার বাঙালির আলাদা ভার্সান এখানে দেখা যেতে পারে।

    দাক্ষিণার্ত – ভারতের এই অঞ্চলটা হল এই উচু পাহাড়-মালভুমি তা আগেই বলেছি; কিন্তু যার আবার দুই দিকেই দুই সাগর। মানে বামে বা পশ্চিমে হল আরব সাগর আর ডানে বা পুবে হল বঙ্গোপসাগর। ভূ-প্রাকৃতিক এসব কারণে এই অঞ্চলের মানুষেরা প্রচন্ড খাঁড়া রোদের মধ্যে বসবাস করতে হয় আর তাতে রোদে পোড়া বলে তাদের গায়ের রঙ খুবই কালো হয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা যত বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকুলে ও মাছধরা পেশায় তারা ততই কালো। কাজেই এই কালো রং-ই হয়েছে আর্যদের চোখে নিচা মানুষ; মানে,  যাদের আর্যরা ঘৃণা ছিটিয়ে নিচা দেখাতে চায় যাদের সেই আম জনগণ – এরাই নাকি  আর্যদের চোখে অসুর! এরা অসুরের জাত! কেউ কেউ তাদের দ্রাবিড়ীয়-ও [DraviDian] বলে থাকে।  তামিলনাড়ূর সবচেয়ে বড় দলের নাম ডিএমকে [DMK -Dravida Munnetra Kazhagam ] যেখানে ডি [D] মানে দ্রাবিড়। [ভারতের নামগুলোর মধ্যে তাই কখনও ইংরাজিতে ‘ডি’ অক্ষর দেখা গেলে এর উচ্চারণ বাংলায় “ড়” করতে হবে]।
    আর একটা কথা বলার সুযোগ নেই। কর্ণাটক এর ভাষার নাম কানাড়া যা দ্রাবিড়ীয় চারটা ভাষার একটা।  কর্ণাটকিরা নিজেদের কন্নড় জাতির লোক মনে করে থাকে, তাই তাদের ভাষার নাম কানাড়া। কর্ণাটকের কন্নড় ভাষা পাশের মানে উপরের সীমান্ত সংলগ্ন মহারাষ্ট্র (মুম্বাই) এর দক্ষিণ সীমান্ত বা পুবে বা ডানপাশে অন্ধ্রপ্রদেশ ও নিচের তামিলনাড়ুতেও কন্নড় ভাষা বলার চল আছে।

    দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্যের কর্ণাটকঃ
    দ্রাবিড় শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঘন কালো চামড়ার মানুষ যাদের দক্ষিণ ভারতে দেখা যায় [a member of an ancient dark-skinned people of southern India.]  । এদিকে ১৯১৬ সাল থেকেই তামিল বা দ্রাবিড়ীয়রা তাদের দলীয় প্রতীক ছিল এক দাড়িপাল্লার ছবি যা হিন্দুধর্মীয়  জাত-বিভাজন ও বৈষম্যের বিপরীতে সাম্যের প্রতীক। আর এদের সাথে ছিল একটা ফ্লাগ – যা ছিল একটা পুরাটাই কালো ফ্লাগ; আর এর কেন্দ্রে কেবল একটা লাল সার্কেল চিহ্ন থাকত। যেখানে এই কালো হল তাদের নিচা করে রাখা মর্যাদার ও নিপীড়নের প্রতীকি বিরুদ্ধতা যার বিরুদ্ধে উঠে দাড়ানোর  প্রতীক হল লালচক্র চিহ্ন।

    The party at its inception retained the flag of the South Indian Liberal Federation, which had a picture of a traditional type of balance signifying the idea of equality.[26] Its central theme was to remove the degraded status imposed on Dravidians. 

    ভারতে দ্রাবিড়ীয়ান বলতে এরা পুরানা হিশাবে চার রাজ্য ছড়িয়ে আছে – কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু আর কেরালা।
    কর্ণাটকঃ কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর (নতুন নাম ব্যাঙ্গালুরু)। আর এই ব্যাঙ্গালোর রাজধানী থেকে ১২০ কিমির ভিতরে পশ্চিম দিকে টিপু সুলতানের মহীসুর বা ইংরাজিতে মাইসোর [Mysore] অবস্থিত। আর মাইসোর শব্দটা আবার অনেকে দাবি করেন যে মহিষাসুর শব্দের নাকি অপভ্রংশ যেখানে এর অর্থ  ‘মহিষের মত তুচ্ছ প্রাণীর গর্ভে জন্মানো অসুর’।
    আর অন্ধ্রপ্রদেশ – এই নয়া রাজ্য গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবার পরে এবং এই অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী করা হয়েছিল বৃটিশ আমলের নিজামের হায়দ্রাবাদকে। এছাড়া মোগল আমল থেকেই বিকশিত লক্ষ্ণৌ এর পরের দ্বিতীয় বড় শহর ছিল হায়দ্রাবাদ – এই সেই হায়দ্রাবাদ। অর্থাৎ পুরানা হায়দ্রাবাদ রাজ-রাজ্যকে এর রাজধানী করে নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠিত হয়েছিল।
    তেলেঙ্গনা  – এটা বাড়তি; মানে হল আগের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের এক অংশ এখন তেলেঙ্গনা হয়েছে। ভেঙ্গে গেলেও  বাকি অন্ধ্রপ্রদেশ এখন আগের নামেই তবে আলাদা রাজ্য।
    তামিলনাড়ু – এই নামেই বুঝা যাচ্ছে এটা দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী তামিল এথনিক জাতি-রাজ্য, আগের নাম মাদ্রাজ।
    আর সর্বদক্ষিণে হল কেরালা রাজ্য। এভাবেই পুরানা হিশাবে ভারতের দক্ষিণী চার রাজ্য (নতুন হিশাবে পাঁচ রাজ্য) মিলিয়ে দাক্ষিণার্ত। সমুদ্র সংযোগের দিক থেকে ভারতের নিচের দিকের বা দক্ষিণী অংশ এটা। যার আবার পশ্চিম দিকে আরব সাগর কিন্তু দক্ষিণ দিকটা তখনও বঙ্গোপসাগর বা এর সর্ব-পশ্চিম প্রান্ত – এভাবে বিভক্ত। আর দক্ষিণের আরব সাগরের সংযোগ দিয়েই আরব দেশ থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে ধর্মপ্রচারকেরা আরবদেশ থেকে ১০০০-১১০০ সালের দিকে প্রধানত এই কেরালা দিয়েই প্রবেশ করেছিল। এভাবে প্রথম ব্যাপক মুসলমান সংযোগ ও ভারতে ইসলামের প্রসার শুরু হয়েছিল।  এমনকি খ্রীশ্চানিটিও বিশেষত পর্তুগীজেরাও এই দাক্ষিণার্ত দিয়েই ভারতে এসেছিল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে।

    মোদির হিন্দুত্ববাদের এযুগে এসেও আর্যদের অসমাপ্ত কাজ করার খায়েসঃ 
    এখন,  একালে মোদির হিন্দুত্ব হিন্দিভাষাভাষি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব-আধিপত্য ছড়িয়ে বসেছে। তাই এক অর্থে হিন্দুত্ববাদ যেন আর্যদেরই নয়া অনুসারি এবং ব্রাক্ষ্মণ-ইজম এর ধারা হয়েই থাকতে চায়। যদিও আবার সাধারণভাবে সব হিন্দুভোট তাকে পেতে ও নিতেই হবে। তাই আর্য-ভাব ও ব্রাক্ষ্মণ-ভাব সে প্রকাশ্যে আনে না; অন্তরে চর্চা করে।  আবার জায়গামত জাত-পাত ভেদের বা উচ্চ-বংশের ঠাকুর এর সুবিধাও পেলে উঠিয়ে নিবে। তাই মোদির হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হল তার মানে – এটা পুরানা আর্য-শ্রেষ্ঠত্ব ধারণারই যেন আর এর একালের রূপ  হল আরএসএস-বিজেপি;  পুরানা আর্য কারবারিদেরই যেন একালের এক নয়া উত্থান!  তাই উত্তর ভারতের দিক থেকে দেখলে কর্ণাটক হচ্ছে দাক্ষিণার্তে প্রবেশের এক প্রবেশদ্বার যেন!
    তবে মোদির বিজেপি-আরএসএস এদের খায়েসস হল আর্যদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা। মানে হল দাক্ষিণার্তকেও হিন্দি বলয়ের অধীনে ও প্রভাব প্রতিপত্যিতে নিয়ে আসা। এজন্য গত ২০১৮ সালের সরকার গঠন করার পর থেকে  বিজেপি-আরএসএস এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করতে থাকে যে তারা দাক্ষিণার্ত প্রায় দখল কর্বে ফেলেছে! যদিও বাস্তবে ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়!

    মোদির বিজেপি-আরএসএসের এমন যত স্বপ্ন বা খায়েসই থাক এনিয়ে দুটা বড় ঘটনার কথা বলব।
    এক হলঃ সরাসরি এন্টি-ব্রাহ্মণ আন্দোলন যা প্রথমে সংগঠিতভাবে শুরু হয়েছিল  ১৯১৬ সালে তামিলনাড়ুতে। পরে ১৯৩৭, ১৯৪০ সহ অনেক বারই।  সেবার জাস্টিস পার্টি নামে দল গঠন করে তা শুরু হয়েছিল। পরবর্তিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতে আবার সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল তামিলনাড়ুতে পেরিয়ার রামস্বামী [ E. V. Ramasamy (Periyar)] নামে নেতার হাতে। সেসময় দ্রাবিড়ীয় সমাজে বিয়ে করতে গেলে যেন ব্রাহ্মণ-কে ডাকতে বা নির্ভরশীল হতে না হয় তাই এই আন্দোলন। তারা স্বাধীন ভারতের তামিল রাজ্য সরকারের হাত দিয়ে সংসদে এক সিভিল ম্যারেজের আইন পাশ করিয়ে নেন। যেহেতু রাজ্য সরকারের আইন ফলে ব্রাহ্মণ ডেকে এনে বিয়ে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা এতে নাই হয়ে যায়।  পরবর্তিকালে রামস্বামীর এই আন্দোলনই ১৬৬৪-৬৫ সালের দিকে [এর আগে ১৯৬৩ সালে নেহরু  Official Languages Act in 1963 চালু করেছিলেন – এর বিরুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ও বাধা হিশাবে উঠে এসেছিল। হিন্দি চাপানোর প্রতিবাদে সারা দাক্ষিণার্তে জুড়ে তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। তামিলনাড়ুতে কিছু মানুষ গায়ে আগুন ধরিয়েও প্রতিবাদ করেছিল। এই আইনে সারা ভারতের সব রাজ্যের স্কুলে হিন্দি ভাষা শিখা বাধ্যতামূলক করা হয়। যা দ্রাবিড়ীয় অঞ্চলে কোথাও গ্রহণযোগ্য হয়  নাই।

    আবার ওদিকে, অনেকে মনে করেন এরপরেই নেহরু মারা যান ১৯৬৪ সালে হার্ট এটাকে। তাই অনেকের ধারণা সেসময়ের দুটা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের শক নেহরু শারীরিক-মানসিক ভাবে অসহ্য হয়ে যায় বলে অনেকে মনে করেন।  সে দুই রাজনৈতিক ঘটনার এক হল, নেহেরুর হিন্দি-ভাষার ভারত-সাম্রাজ্য বা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে ভারত গড়ার খায়েস মার খেয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ এবং আসাম দখলসহ (সাথে লাদাখের অনেক অংশ-ভুখন্ড ও জম্মুকাশ্মীরের বর্তমান আকসাই চীন) এর ঘটনা; যেটা  ২১ নভেম্বর ১৯৬২ তে চীন একমাস একদিন পরে স্বেচ্ছায় সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে গেছিল।
    আর নেহেরুর হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার জোড়জবরদস্তির প্রতিক্রিয়ায়, এতে দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্য আরও বেশি করে এন্টি-হিন্দি রাজ্য হয়ে উঠেছিল এবং এখনও সেই সেন্টিমেন্ট বর্তমান যা সবচেয়ে বেশি তামিলনাড়ুতে। সেখানকার ডিএমকে পার্টি এরপর থেকে তামিলনাড়ুতে প্রধান দল হয়ে উঠে আছে। পরবর্তিতে অবশ্য কেবল ডিএমকে দলটাকে ছেড়ে বেরিয়ে আরেকটা আন্না-ডিএমকে দল হয়েছে। যারা দুই দল অদলবদল করে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসে – অন্য কোন দল নাই। ওদিকে নেহেরুর মৃত্যুর পরের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী কম্প্রোমাইজ হিশাবে হিন্দি-কে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারটা কনষ্টিটিউশনে উহ্য করে রাখেন। যেটা পরবর্তিকালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এক অবজারভেশন-রায়ে ঘোষণা করে যে ভারতে রাষ্ট্র-ভাষা বলতে কিছু নাই, ভাষার বাধ্যবাধকতাও নাই। তবে অফিসিয়াল ভাষা বলে অনেক কিছু আছে যা সব মিলিয়ে এখন ইংরাজি ও হিন্দিসহ মোট ২২টার মত।

    গত ১৯১৮ সালের মানে আগের বারের কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল ঘাটতিতে থাকা নয়্টা আসন কিনে নিয়ে। আর তা জুগিয়েছিল কর্ণাটকের আরেক ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী সামাজিক-ধর্মীয় গোষ্ঠি যাদেরকে লিঙ্গায়েত [Lingayat or  Lingayatism] নামে ডাকা হয়।   যারা লিঙ্গায়েত নিয়ে আর একটু পড়াশুনা করতে চান তারা এখানে লেখাটা পড়তে পারেন।  এরা বলাই বাহুল্য হিন্দুত্ববাদের বিরোধী।  এছাড়া  ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব লিঙ্গায়েত রাজ্য-সংসদ সদস্য বিজেপিতে বা কংগ্রেসেই সবাই এমন ছিল না। অর্থাৎ দুদলের মধ্যেই লিঙ্গায়েত সদস্য ছিল। লিঙ্গায়েত-রা কর্ণাটক ভোটারদের মধ্যে ১৭% জনগোষ্ঠি। তা হলেও তারা দুই দলের মধ্ইযে নির্বাচিত সদস্য হয়ে ছিল। কিন্তু মোদি সেবার লিঙ্গায়েতদের জজবা তুলে তাদের সব রাজ্য-সংসদ সদস্যকে দলছুট করে নিজ দলে ভিড়ান। এভাবেই তার নয় আসনের খামতি তিনি পূরণ করে সেবার সরকার গঠনে সফল হয়েছিল।  কিন্তু এবার নির্বাচনের আগে লিঙ্গায়েত হবু রাজ্য-সংসদ সদস্যদের কংগ্রেসে যোগ দিবার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু পরে ফলাফল প্রকাশের পরে একটা রিপোর্ট এমন ফলাফলের ব্যাখ্যা করে বলেছে যে এতে কংগ্রেসের পক্ষ্যে সব লিঙ্গায়েত সদস্যের আসন যায় নাই সত্য। তবুও তা এমন হয় নাই যে কংগ্রেস এতে তেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ শেষ বিচারে ভোট ব্যালেন্স হয়ে গেছে।

    ওদিকে ভোটারদের আরেক বড় চাঙ্ক হল মুসলিম ভোট। কর্ণাটকে মুসলমান ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটারের ১২% এর মত।  আর এতে মোদির সেই পুরানা কৌশল -ইসলামোফোবিয়া আর ঘৃণা ছড়ানী চালু করেছিল। আপনাদের অনেকেরই গত ২০২২ ফেব্রুয়ারিতে মুসকান নামের এক কলেজ তরুণীর সাহসী প্রতিবাদের ভিডিওদেখেছেন; এখানে টুইটারে দেখেন, মনে আছে নিশ্চয়। হা সেটাই ছিল মোদির নোংরা পুরানা কৌশল যে তরুণদের মাঝে হিজাব তর্ক তুললে তাতে ইসলাম-ঘৃণা জোরদার হবে আর হিন্দু-ভোটারদের মুসলমান-বিদ্বেষী করতে পারলে তাতে বেশির ভাগ হিন্দুভোট বিজেপির পক্ষে আসবে – এই ছিল মোদির অনুমান। কিন্তু ভাগ্যের ফের মুসলমান-বিদ্বেষী জজবা তেমন করে কর্ণাটকে উঠে নাই।  মোদি মুসলমান ঘৃণা এতই তুঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন যে তার ২২৪ আসলে প্রার্থীদের মধ্যে একটা আসনেও মুসলমান প্রার্থীকেই রাখেন নাই।  তাই ফলাফল দেখে এখন মনে করা হচ্ছে মুসলমানেরা হিজাব মামলায় আদালতে তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হলেও নির্বাচনের আগে তারা সংগঠিত হয়ে কংগ্রেসের পক্ষে একযোগে ভোট দিতে পেরেছেন।

    এব্যাপারে এটা মনে করা অমুলক হবে না যে  এক্ষেত্রে আমেরিকার সমর্থন মানে মোদিবিরোধী  “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নৈতিক সমর্থন দিয়ে যতটা সম্ভব সহায়তা দেয়া – এটা যথেষ্ট কাজ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিরোধীদলের সবাইকে আস্থা দিয়েছে যে তারা চাইলে মোদির বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে পারে, মোদিকে হারাতেও পারে।  আসলে বিরোধী জোটের পক্ষে অ্যামেরিকান সংসর্গ সম্পর্কে আগেই বলেছি এটা সাবধানী ও পরোক্ষ পদক্ষেপ হলেও গ্লোবাল মহলে মোদি সরকারের আভ্যন্তরীণ পরিচালনায় কতটা সে স্বৈরাচারী আর মূলত মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা প্রচারক – মোদির এই পরিচয়কে বাইরের দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা এক বড় সহায়ক।
    যদিও ভারতের রাজনীতি এপর্যন্ত ভিতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কখনই বিরোধীদলকে বাইরে নিতে দেয়া হয় নাই। এটা সম্ভব হয়ে এসেছে কারণ বেশির ভাগ দ্বন্দ্ব পাকিস্তান বা কাশ্মীর-কেন্দ্রিক। অথবা কখনও পাঞ্জাব বা আসামের মত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমস্যাকে দেশের স্বার্থ বলে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করা হয়ে এসেছে।  এছাড়া জন্ম থেকেই ভারত এত উগ্র জাতিবাদ (যা মূলত হিন্দু-জাতিবাদ) দিয়ে শাসিত- পরিচালিত হয়ে এসেছে যে এটা মূলত শেষবিচারে এক “এন্টি-পাকিস্তানি জাতি” ধারণা; তাই এটা সহজেই এক উগ্র-হিন্দুজাতিবাদ ধারণা হতে পেরেছে। [অনেকে অবশ্য  পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর উল্টাটাও বলবেন।]
    ভারতে কখনই  রাজনৈতিক অধিকারের ইস্যুকে অথবা জনগণের নাগরিক অধিকারের অথবা বাক ও ব্যক্তির অধিকারের ইস্যুকে  যেকোন রাষ্ট্রের গঠনে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখতে দেয়া হয় নাই। এবং সবচেয়ে বড়কথা রাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে সেই রাজনীতিক চিন্তার অভ্যাস বা চর্চাই হতে দেয়া হয় নাই। প্রতিটা উগ্র-জাতিবাদী জাতিরাষ্ট্রে এমনটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক; আর বিপরীতে শাসকের প্রথম পছন্দও [নেহেরু সহ সকল ভারতীয় শাসক] তাই একটাই –উগ্র জাতিরাষ্ট্র– যেখানে জাতিবাদ, দেশপ্রেম, দেশ মাতৃকা ইত্যাদি এসব শব্দের আবেগ-সুরসুরি তৈরি করে জনগণকে দাবায় রাখাটাই শাসকদের কমন কৌশল হয়ে থাকে।
    তৃতীয় বিশ্বের দেশে এমন হওয়ার পিছনে আরেক দায়ী ফ্যাক্টর হচ্ছে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট। আসলে এদের রাষ্ট্র- সম্পর্কিত অস্পষ্ট ও অপুষ্ট ধারণাই  [শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণাই] এজন্য দায়ী।  যেটা অন্যভাষায় মনে করিয়ে দিলে কমিউনিস্ট চিন্তায় অধিকারের ধারণা নাই শুধু না এটা হারাম – এমন হওয়াটাই সেই দায়ী ফ্যাক্টর। নয়া চলতি শতকের শুরু থেকে আবার সেটা জঙ্গীবাদ দমনের নামে বিরোধী রাজনীতিকের নির্মুলকরণ কর্মসুচি হয়ে দাড়িয়েছে।  যদিও আমেরিকা আজ মোদির চাপে দাবিয়ে রাখা ভারতের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে বের করে  মুক্ত  করে আনার পক্ষে কাজ করছে কিন্তু এই  জঙ্গীবাদ দমনের নামে জনগণের অধিকার ও বিরোধী রাজনীতিকে কোনঠাসা করে রাখার পক্ষে শাসকের এই নয়া চর্চার জন্য খোদ আমেরিকার ওয়ার অন টেরর নীতিও কম দায়ী নয়!  আবার, মোদির ক্যাশিয়ার আদানির শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি ও তাতে ধস নামানোর পিছনে এতে পরিবেশ তৈরি করে দিতে অ্যামেরিকার কিছু সহায়ক ভুমিকা থাকায় এর সুবিধা ভারতের বিরোধী দলেরা পেয়েছে। যেমন আদানির পতনের পরে গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটের উতসাহীদের সাথে নিয়ে আরেক শেঠ শেয়ার ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস, তিনি এক আসরে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে আদানিকে সমালোচনা করে শুইয়ে দেয়া – এটা শেষবিচারে ভারতের বিরোধিদের পক্ষে গিয়েছে।  যদিও ভারতের বিরোধী রাজনীতিকদের  আজকে আমেরিকার এই সমর্থন নেওয়ার কিছু নেগেটিভ এফেক্টও আছে যা কার্যকর হতে পারে। তবুও বর্তমানে সতর্কভাবে অ্যামেরিকান এই সমর্থন নেয়াটা খুবই সঠিক ও হালাল কাজ-ই হবে।

     Temple run: Hard lessons for Rahul Gandhi’s ‘soft Hindutva’

    এর পিছনের মূল কারণ হল ভারতের এক বাস্তবতা। সেটা হল আমেরিকা আজ আছে বলেই “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দল” বলে কোন কিছুই ভারতে সম্ভব হচ্ছে যা এতদিন সম্ভব ছিল না। কংগ্রেস বা রাহুল গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক চিন্তায় বড় খামতি এজন্য দায়ী।
    যেমন ২০১৮ সালে থেকেই মোদী বিরোধী রাজনীতি বিশেষত মোদির হিন্দুত্ববাদ বিরোধীরা কিভাবে মোকাবিলা করবেন – এনিয়ে রাহুল ও কংগ্রেস চরম অযোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল মোদির তখন প্রায় পাঁচবছরের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি ছেয়ে ফেলাতে পেরেছিলেন। আর এতে কংগ্রেস ধরেই নিয়েছিল  যে এরপর থেকে ভারতে বোধহয় আর কংগ্রেস নিজের রাজনীতিও হিন্দুত্ববাদকে আপন ও অনুসরণ করে গড়ে নেয়া দিক এসে গেছে। তাই ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের আগে্র বছর গত কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচনে রাহুল নিজে এক মন্দিরে পুজা দিয়ে কংগ্রেসের সফট হিন্দুত্ববাদ চালু করেছিলেন উপরের ছবি ও লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন কংগ্রেসও হিন্দুত্ববাদের নামে ভোট না চাইলে ভারতের হিন্দুরা তাদেরকে আর ভোট দিবে না! এই মিথ্যা অনুমানের পিছনে ছূটতে যাওয়া কংগ্রেস এটাই ইঙ্গিত করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এটা তো হিন্দু জাতিরাষ্ট্র এর ভারত কায়েমেরই প্রথম রাজনৈতিক দল হয়েই গড়ে উঠেছিল।

    অথচ এর বেকুবিপনার পাল্টা উদাহরণ কিন্তু তখনও রাহুলের সামনে ছিল।
    কলকাতার রাজনীতিতে তৃণমূল সেই ২০১১ সাল থেকে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসছে। আর সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় হল যে তৃণমূলের মমতা কখনই কোন ব্রান্ডের কোন হিন্দুত্ব এর নামে হিন্দুদের কাছে ভোট চাইতে হয় নাই, তবু যথেষ্ট হিন্দুভোট তার দল পেয়েছে।   কোন হিন্দুত্ব বয়ান ছাড়াই তিনি লাগাতর তিন তিনবার হিন্দুদের ভোট পেয়ে রাজ্যে সরকার গড়ে চলেছেন। কোন সমস্যা হয় নাই! কেন? তার মানে একবারও এদিকে রাহুল বা কংগ্রেস একবারও চোখ মেলে তাকায়নি! এটাই কংগ্রেস দলের ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাবার পিছনের অন্যতম মূল কারণ, যেন এটা কংগ্রেসের নিজেই নিজেকে যেন বলা যে এই দলের আয়ূ শেষ!!! আজকে রাহুল “ভারত জোড়ো” [ মুসলমান ঘৃনাবিদ্বেষে জনগণ বিভক্ত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে জনগণের একত্র হওয়া বা জোড়া লাগানো পক্ষে এক প্রচারণা] নামে পদযাত্রা কর্মসুচিতে এসেছে।  এটা তখনই কংগ্রেস শুরু করেছে যখন পিছনে অ্যামেরিকান ফ্যাক্টর উপস্থিত হয়ে কংগ্রেস রাজনীতিকে নয়া সাহস ও দিশা দিয়েছে!  অর্থাৎ মোদি যুগের ভারতে সবাইকেই একমাত্র হিন্দুত্ববাদের নামেই ভোট চাইতে হবে – এই মিথ্যা অনুমান থেকে রাহুল ও কংগ্রেস এখন বের হয়ে এসেছে। যেটা না করে স্ফট হিন্দুত্বের পক্ষে দাড়ানোটা শুধু আত্মঘাতিই তা না; কংগ্রেস দল যে মূলত জন্ম থেকেই হিন্দু-ইজমের [গান্ধীর Hinduism -তাও বলা চলে] দল হিশাবে গড়ে তোলা হয়েছিল এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ!

    সবশেষে একটা কথাঃ যদিও কর্ণাটকের নির্বাচনে মোদিবিরোধীরা বিরাট জয় পেয়েছে এরপরেও খুবই শক্তভাবে পাঠক সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এই নির্বাচনের দুটা কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান যারা আইনীভাবে দায়ীত্বপ্রাপ্ত ছিল এই নির্বাচনকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার – এমন দুই প্রতিষ্ঠান হল সুপ্রীম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন।  যাতে এমনকী সরকার বা সরকারি দলের বিরুদ্ধেও নির্বাচনি আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেন। কিন্তু আগের নির্বাচনেওর মতই এখানে এওদুই প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধি দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অপব্যবহার ও হয়রানি করে যাচ্ছে। এমন প্রতিষ্ঠান গুলো যেমন সিবিআই [CBI – Central Investigation boreau), ইডি ED [Enforcement Directorate, For Economic Law], আয়কর অধিদপ্তর ইত্যাদি এগুলো প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিরোধীদের হয়্রানি করা হচ্ছে যাতে চাপে ফেলে বিরোধীদলের নেতাদেরকে সরকারের সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করা যায়। মোদির চাপের কাছে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান নত হয়েছে, মোদির খাম খেয়ালির অধীনস্ত হয়েছে।
    এরকম দশটা ফ্যাক্টর মোদি বিরোধিদলের বিরুদ্ধে এখনও খাড়া করে রেখেছে। The WIRE পত্রিকা এমন দশটা ফ্যাক্টরের কথা উল্লেখ করে রিপোর্ছেট করেছে যার শিরোনাম Ten Factors to Remember Amidst the Congress’s Win and BJP’s Defeat in Karnataka। পাঠকের উচিত হবে এই দশ বাধার কথাও যেন তারা জেনে রাখে।

    কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচন ভারতের সকল বিরোধিকেই সাহস যোগাক যে তাদের একত্রে উঠে দাঁড়াতেই হবে। যদিও সামনে অনেক পথ আর তাতে অনেক যদি-কিন্তু আছে! আপাতত তাদের জন্য শুভ কামনার বেশি আগানোটা আমার জন্য প্রয়োজনীয় নয়!  তাই শুভ কামনা জানিয়ে শেষ করছি!

    +++++++
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!

    ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!
    গৌতম দাস
    ২০ এপ্রিল ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4mT

    ‘The next few months are a crucial test of our democracy’   ‘The next few months are a crucial test of our democracy’ | Photo Credit: AP

    রাজনৈতিকভাবে গ্লোবাল ইস্যুতে  এশিয়া উত্তাল হয়ে উঠছে।  বিশেষ করে সাউথ-ইস্ট এশিয়া সামনের দুবছরে আরও বড় করে উত্তাল হবে। লঙ্খণগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে।   ঘটনার মূল ফেনোমেনাটা হল অর্থনৈতিকভাবে  রাইজিং চীনের দুনিয়া জুড়ে প্রবল  গ্লোবাল প্রভাবের প্ক্ষেটভুমিতে  ব্যাপারটা উঠতি চীন আর নামতি আমেরিকা এরই উত্থান-পতনের ঘটনাবলী ও প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে । যেটাকে অনেক সময় আমি “গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল” বলে ব্যাখ্যা করেছি। চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা আর তা থেকে জেগে উঠা কোন হবু সংঘাত – এই ঘটল বলে, লাগল বলে ধরণের পরিস্থিতিতে যা গত অন্তত দশবছর ধরে ক্রমশ বাড়ছে বা অস্থির হয়ে উঠছে – এটা হল সেই দৃশ্যপট।

    এর আগে আমরা দেখেছি ওবামা আমলের সেকেন্ড টার্ম (২০১৩-১৬) থেকে এই পালাবদলের ফেনোমেনা সাধারণ চোখে মোটামুটি  দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। তাতে তা বড়জোড় শ্রীলঙ্কা, বা মালদ্বীপ বা নেপালের নির্বাচনে ওসব দেশের দলগুলো একেকটা হয় ভারত বা চীনের সমর্থক হয়ে এমন ‘পালাপদলের’ প্রক্সি খেলে  চলছিল – এতটুকুই দেখা যেত। এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও  তখনকার ভারত মানে? সেকালের ভারত ছিল মূলত এশিয়ায় – এঅঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থের প্রতিনিধি ফলে ভারতের উপস্থিতি যেন এক বরকন্দাজি “যৌথ” উপস্থিতি। আমেরিকা তখন ব্যাপারটাকে আমাদের বুঝাতে এক বয়ান ভাষ্যে বলত – ভারত হল “এশিয়ায় আমেরিকার চীন ঠেকানো এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্ট”। তাই এশিয়ায় ভারতকে আমেরিকার এই চাঙ্গে তোলা!

    কিন্তু এখন এশিয়া উত্তাল হবার কথা যেটা বলছি, তাতে কথিত সেই যৌথ উপস্থিতি জিনিষটাই নাই, উধাও! তা একেবারে বদলে গিয়েছে। এককথায় বললে – যৌথ উপস্থিতি দূরে থাক বরং এশিয়ার ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যেকোন স্ট্রেটেজিক ইস্যুতে আলাদা; যার যার তার তার। তবে এমন আলাদা অবস্থান যত গভীরে ততই আরো বেশি করে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে; তবে ততদুর তা প্রকাশিত করা হয় না; তবে সেটা দুপক্ষেরই নিজ নিজ স্বার্থের আলাদা কারণে।

    যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান একবারেই আমেরিকার চেয়ে আলাদা। ভারত এখন রাশিয়ান তেল রপ্তানির  প্রধান পার্টনার। কিভাবে  নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া সরাসরি তেল রপ্তানি করতে পারে না। তাই ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি করে এরপর, রিফাইন করে পরে আবার বিদেশে বিক্রির সবচেয়ে বড় দেশ। ভারত তার আট-নয়টা রিফাইনারির সবগুলাই এখন কেবল একাজেই ব্যস্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেলের সেকেন্ডারি উতস হিশাবে ভারত ঐ তেল আবার বিভিন্ন পশ্চিমা দেশেই  রপ্তানি করছে।
    কাজেই সরকথাটা হল ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত রাশিয়ার পক্ষে আর বিপরীতে আমেরিকা রাশিয়ার বিপক্ষে তা সবাই জানেন।

    আমেরিকার বার্মায় রেজিম চেঞ্জে আগ্রহঃ
    তবে ভারত আর আমেরিকা  স্ব স্ব স্ট্রাটেজিক স্বার্থে কত দূরদুরান্তে আলাদা এর মোক্ষম উদাহরণ হল আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” [Regime Change] বা সরকার বদলের আগ্রহ – এই ইস্যু। এই ইস্যুতে বরং ভারত-চীন-রাশিয়া এই তিন দেশ যৌথভাবে আমেরিকার বিরোধী অবস্থানে।  ভারতে আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিডিয়া এনালাইসিসে রিক [RIC] বলে একটা শব্দ ব্যবহার শুরু হয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। [আগ্রহীরা এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন।] যেটা আসলে যথাক্রমে রাশিয়া, ভারত ও চীন এই তিনদেশের ইংরাজি নামে  প্রথম অক্ষর  নিয়ে তৈরি।  তবে আবার সাবধান এজন্য যে  এটা আর ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ (১৯৫৩-৯২) নয়। দুনিয়াতে কোথাও আর কোল্ড-ওয়ার এর নীতি ও অভ্যাস নাই। মানে হল, কোল্ড-ওয়ারের কালে কোন দুই দেশ স্ট্রাটেজিক বন্ধু হলে তারা এতে বাকি অন্য সব ইস্যুতে আপনাতেই ‘বন্ধু’ হয়ে যেতই। কিন্তু একালে সব উলটা। একালে দুই রাষ্ট্রের যেকোন শত্রুতা বা বন্ধুত্ব হল মূলত ইস্যু ভিত্তিক। তাই একালে দুইটা রাষ্ট্র এক ইস্যুতে চরম শত্রু হলেও অন্য ইস্যুতে কিছুটা ‘বন্ধু’ থাকতে দেখতে পাওয়া সম্ভব। চীন-ভারত এখনও বিভিন্ন স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ইস্যুতে যথেষ্ট শত্রুতা বজায় রাখে, আর ভারতের মিডিয়া এখনও এন্টি-চায়না টোনে যেকোন কিছু বয়ান করে থাকে। কিন্তু  আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” ইস্যুতে  ভারত-চীন একসাথে আমেরিকা বিরোধিতায় ও অবস্থানে;  আর তা রাশিয়াকে সাথে নিয়ে। আর একথাও সত্য যে এই ইস্যু খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশাল বলেই অন্য অনেক ইস্যুর উপরে  – তা খুবই নির্ধারক। যেমন “বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ” ইস্যু ভারতের কাছে খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশালী ইস্যু বলতে বুঝতে হবে এই ইস্যু ভারতের অন্যান্য ইস্যুতেও যা প্রভাব রাখবেই। যেমন, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে নোঙর করে উপস্থিত থাকুক এটা আমেরিকার বহুদিনের খায়েস। আর ঠিক এর উলটা অবস্থানটাই ভারতের। মরে গেলেও আমেরিকান এই খায়েসে একমত হবে না ভারত।
    ‘বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ’ ইস্যু বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান নৌ-উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। যদিও এর চেয়েও বড় কথা বার্মা আর ভারতের বিস্তির্ণ সীমান্ত আছে যা বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেলে এর ব্যাপক প্রভাব ভারতের উপর পড়তে বাধ্য। শুধু তাই নয়, এঘটনা ভারতের আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট অঞ্চল এর উপরেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। যদিও  এতদিন ভারত ভেবে এসেছে তার আসামসহ নর্থ-ইস্ট অঞ্চল রক্ষার স্বার্থ  এর প্রধান বাধা ও বিরোধি হল নর্থ-ইস্ট সীমান্তেরওপারে চীনের উপস্থিতি বা চীনের তিব্বত সীমান্ত। আর এটাকে বিক্রি করেই ভারত এতদিন বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর আদায়, বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ আর ফেনী-অঞ্চলকে যত রকমভাবে সম্ভব কব্জা করে নেয়া ও রাখা তা করে গিয়েছে। কিন্তু এখন টের পাচ্ছে আমেরিকা ভারতের জন্য প্রকৃতপক্ষে কে ও কী???

    কিন্তু কাকে ঘিরে এশিয়া উত্তাল হচ্ছেঃ
    এলেখায় কথা শুরু করেছিলাম ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলে। কিন্তু কাকে ঘিরে তা হবে? মানে এর কেন্দ্র বা ফোকাস হতে যাচ্ছে কোন ভুগোল? সোজা জবাব হল,  সেই মূল ফোকাস হতে যাচ্ছে সম্ভবত বার্মা। তবে এটা সেখানেই একমাত্র বা ঘনীভুত থাকবে তা না। এর সরাসরি ভৌগলিক কেন্দ্র হবে চীনের তিব্বত-কুনমিং সীমান্তের নীচের অংশ থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট ও সংলগ্ন সব অংশ আর বলাই বাহুল্য বাংলাদেশও; ইত্যাদি সব ভূখন্ডই। তবে এসব কথা ভুগোল হিশাবে বলা, রাজনৈতিক প্রভাব বা বলয়ের দিক থেকে নয়, সেটা আরও বড় ও ব্যাপক।

    তাই  ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলতে এসবের বাইরেও নানান জায়গায় ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থে পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠছে ও উঠবে। যেমন উপরে ভারতের কিছু ভৌগলিক অঞ্চলের কথা বললেও রাজনৈতিক দিক থেকে সারা ভারতের উপরেই ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠতে পারে। আর ভারতে এসব কিছুই ইতোমধ্যে নড়াচড়া করা শুরু করে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। যদিও তা বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে তা বোধহয় আগামি “২০২৪ সালের আসন্ন কেন্দ্রিয় নির্বাচনকে” কেন্দ্র করেই।  আসলে, কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর কাছে  ২০২৪ সালের নির্বাচনে   মোদি ও বিজেপির ভরাডুবি ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে এই আমেরিকান পরিকল্পনা আগাচ্ছে।
    যেমন একটা ঘটনার কথা বলি।
    রাহুলের কংগ্রেসের সাথে মমতার তৃণমূলের সম্পর্ক খুবই খারাপ, বিশেষেত মোদিবিরোধি জোটের নেতা হিশাবে কংগ্রেস অথবা রাহুল গান্ধী কোনটাকে মানতে তৃণমূল রাজী নয় বলে। আবার, কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস  বিজেপিকে শত্রু মনে করে না বরং গোপনে বা প্রকাশ্যে বিজেপির সাথে মমতাবিরোধী এলায়েন্স করে।  একারণে গত ২ মার্চ ২০২৩ মমতা জানিয়ে দেন যে আগামি  “২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিরোধী জোটে যাচ্ছে না তৃণমূল, লড়বে একলাই, জানিয়ে দিলেন মমতা“। কোন জোটে যাবেন না।  কিনতু বেশি না ঐ মাসের তিন সপ্তাহের মাথায় একেবারে বিরোধি জোটের নেতা হিশাবে রাহুলের পক্ষে নিজে টুইট করলেন খোদ মমতাই। তিনি সব “তিক্ততা ভুলে কার্যত রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে … “রাহুলের পক্ষে মমতার টুইট: আমাদের গণতন্ত্র আজ নতুন নীচতায় পৌঁছাল। কেন?
    কারণ, ততদিনে মমতা জেনে গেছেন এই বিরোধি জোট নেতা রাহুল আগের জন নন। এটা সর্বাত্মক! তার মানে আমেরিকা ভারতে মোদির বিরোধিদের একাত্ম করতে পেরেছে এই মাঝের সময়ের মধ্যে।

    এখন এতে কী হতে পারে? সারা ভারতরাষ্ট্র মূলত এতে শেষে এমন এক যুগে প্রবেশ করতে পারে তাতে তা এই প্রথম হিন্দুত্ববাদ-সহ  মোদির বিজেপি-আরএসএস সমূলে উপড়ে পড়তে পারে। পুরানা গান্ধী-নেহরুর সফট বা লুকানো হিন্দুত্ববাদ ( মানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদ) যা একালে (২০১৪) মোদির প্রধানমন্ত্রী হবার আগে ঢলে পড়ে বিলীন হবার যুগে হাজির হবার পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনি বিজয় থেকে মোদির বিজেপি-আরএসএস একে আরো উগ্রভাবে  আর নরমের বদলে উগ্র-হিন্দুত্ব হয়ে হাজির হয়েছিল। তাতে ভারত চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও  চরম মুসলমান নিপীড়নমূলক এক চরম বৈষম্যমূলক  রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল, এবার এই পর্যায়ের একটা অবসান ঘটতে পারে।

     

    ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার সম্পর্কঃ
    কিন্তু ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার কী সম্পর্ক? বিশেষ করে যেখানে গতবার মানে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে তো আমরা তেমন কিছু দেখি নাই!
    হা সেকথা সত্যি; তবে সেবার আর এবার এক নয়; আর তেমন থাকছে না। মানে কী?
    আমাদের দেশেও আজকাল রাজনীতিক দল ক্ষমতায় বা বাইরে যেখানেই থাকুক এরা বলা শুরু করেছে “আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে, করার ক্ষমতা রাখে ইত্যাদি. যেমন এখানে দেখেন,  ….. যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোনও দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে।

    তবে এটা বলতে তামাসার মত শোনাচ্ছে যদিও তবু কথাটা হল – আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে বলতে মনে করা হয় এটা কেবল বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের বেলায় সত্যি। তবে, যেখানে ভারত অবশ্যই একালে আর যেন তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলে বুঝানো যাবে না। কেন?
    কারণ, মোদির প্রপাগান্ডায় ভারতের সারা মিডিয়া এক উগ্র-হিন্দুজাতি-বোধ থেকে সময়য়ে নিজ পত্রিকায় লিখেছে ও বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে ভারত তৃতীয় বিশের দেশ থেকে একলাফে কবে যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে। দ্যা-হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দারও একথা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু মোহভঙ্গের পরে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন।
    মোদির সেই ‘পরাশক্তি ভারতকে’ বাইডেনের আমেরিকা এখন মোদি রেজিম চেঞ্জের জন্য উঠে-পড়ে লেগে গিয়েছে – যদিও পুরা ঘটনাটা দেখে আগামি ২০২৪ সামের মে মাসের ফলাফলে জনগন দেখবে মোদি সেই নির্বাচনেই হেরে গেছে – এমনই মনে হবে হয়ত।
    তাই এশিয়া উত্তাল হচ্ছে বলতে যদি ভারতের দিকে তাকিয়ে বলি তবে, বলতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে আগামি বছর ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এই নির্বাচন শুরু হতে এখন থেকে এক বছরেরও কম সময় আর বাকি আছে বুঝতে হবে। কারণ গতবারের (২০১৯ সালের নির্বাচন) কথা মনে রেখে বললে ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন শুরু হয়ে যাবার কথা। আর আমেরিকা ও রাহুলের নেতৃত্বের বিরোধী দলের টার্গেট হল ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি ( ফলে সাথে তার হিন্দুত্ববাদও) উপড়ে উঠিয়ে ফেলে দেওয়া। আর আমেরিকান টার্গেট হল, এভাবে ভারত থেকে প্রো-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক নীতি-পলিসির এক ভারতকে পাওয়া।

    মোদি-উপড়ানোতে উতসাহিদের বয়ান দাবি করে যে ভারতে ধারাবাহিক একশন শুরু হয়ে গেছে। যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, শেয়ার বাজারে মোদির দোস্ত আদানির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুলের ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ] বলে মোদির অভিযোগ, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে যুক্ত।

    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্টঃ
    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট মানে হল আমাদের ভাষায় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় এর মুখপাত্র ছাড়াও আরেকজন উপ-মুখপাত্র আছেন যার নাম বেদান্ত প্যাটেল। তাকে আগে আমরা খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু তিনি এখন খুব এক্টিভ। ভারতের কেন্দ্রিয় সংসদের স্পিকার কংগ্রেসের রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করে দিয়েছেন।  আর এর অজুহাত হল গুজরাতের এক মেজিষ্টেট কোর্টে দুবছর আগের মামলা যে রাহুল মোদির মানহানি করেছেন, তার তাকে দুবছরের সাজা দিয়েছেন। তবে কোর্ট নিজেই তাকে আগাম জামিন দিয়েছেন উচ্চ আদালতে যাবার জন্য, এর আগে সাজা বলবত স্থগিত রেখেছেন ইত্যাদি। এমনিতেই বহু আইনি ত্রুটিতে ভরা এক সাজা আদেশ আর এছাড়া ঐ আইনেই বলা আছে চলতি সংসদ সদস্যের বেলায় আপিলের আগে এই সাজা বলবত করা যাবে না তবু স্পিকার  রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করেছেন। এরপর ঐ বেদান্ত প্যাটেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন আমেরিকা রাহুলকে নিয়ে আদালতের ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখছেন। ‘Importance of freedom of expression’: US says it’s watching Rahul Gandhi’s case – এই শিরোনাম দেখুন।
    অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে এখানে এসে ভারত আর বাংলাদেশ যেন একাকার – এক তৃতীয় বিশ্বের দেশ নিয়ে আমেরিকান বিবৃতি যেমন হয়ে থাকে।

    হিউম্যান রাইট নিয়ে আমেরিকাঃ
    আমাদের মত দেশে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ কী কাম্য? স্বাগত জানানোর মত? নাকি আমাদের আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপের উসিলা?
    এককথায় বলা যায়, কমিউনিস্টেরা মনে করে এটা হস্তক্ষেপ। কোন দেশ উত্তর কোরিয়া হয়ে গেলেও ভিন্ন কোনদেশের তা একেবারেই আমল করা উচিত না। কারণ, এটা তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়।

    এ সম্পর্কে একটা কথা বলাই যথেষ্ট যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক বলে কোন ধারণা নাই, অনুপস্থিত। অতএব সে অবস্থায় আবার নাগরিক অধিকার বা অধিকার [Citizen’s right] বলে কোন ধারণা সেরখানে থাকার আশা করা অর্থহীন। তবে রাষ্ট্রে শ্রেণী [Class] বলে ধারণার প্রাবল্য আছে। কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে বাসিন্দারা সকলে নাগরিক এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলে সমান নাগরিক অধিকারের নাগরিক। কমিউনিজমের রাষ্ট্র চিন্তায় নাগরিক বলে ধারণাটাই নাই, তাই সমান অসমানের বালাই নাই। তবে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা শ্রেণী ধারণা আছে।  আর তাদের ওই রাষ্ট্র কেবল প্রলেতারিয়েটের পক্ষের রাষ্ট্র, এর পক্ষে সগর্ব ঘোষণা আছে। সুতরাই এখানে সমান নাগরিক, সমান অধিকারের মানুষ বা নাগরিক বলে কিছু নাই। বরং মারাত্মক অসম ক্ষমতার বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা ও অসম শ্রেণী ধারণা আছে।
    অতএব কমিউনিস্টেরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা বলে, আভ্যন্তরীণ ইস্যুর কথা তুলে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকবে বা লুকাবে স্বাভাবিক!

    কিন্তু তাই বলে কী  হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে কথা তুলে আমরা আমেরিকাকে ডেকে আনবো? হস্তক্ষেপের উসিলা করে দিব?
    সেটাও অবশ্যই না।  এককথায় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘণ বা হস্তক্ষেপ না করতে দিয়েও অধিকার দিয়ে কথা বলতে দেয়া সম্ভব ও তা যায়।  এছাড়া মনে রাখতে হবে হিউম্যান রাইট তো জাতিসংঘের ঘোষিত ম্যান্ডেট এবং ইস্যু তাই এনিয়ে জাতিসংঘের ফোরামে তো কথা উঠবেই।  আর এখানেও কোন কথা না তোলার মানে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিতরে  সরকারবিরোধী সবাইকে গুম-খুন অপহরণ বা পিটায়ে মেরে ফেললেও তা নিয়ে বাইরের কাউকে কথা বলতে না দেয়া হবে।
    আসলে মূল তর্কটা অন্যখানে, সেখানে সরাসরি যাওয়া যাক।
    আমেরিকান সরকারি ফরেন পলিসিতে, আমেরিকান সরকার যদি কোন দেশ ও সরকারের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন এর বিরুদ্ধে কথা বললে আমেরিকারর নিজের স্বার্থ আছে বলে না দেখে তবে আমেরিকা সেক্ষেত্রে নিঃশ্চুপ থাকবে। অর্থাৎ ভায়োলেশন হলেই তা নিয়ে আমেরিকা মুখ খুলবে না। যদি তাতে আমেরিকান স্বার্থও না থাকে বা আমেরিকান সরকার না দেখে।

    তাহলে কনক্লুশন কীঃ
    ওয়ান-এলেভেনের হস্তক্ষেপ এর সুবিধা  যাদের পক্ষে গেছিল স্বভাবতই তারা এই হস্তক্ষেপকে ভাল বলবে। অন্যেরা সমালোচক হবে। বর্তমানে বা আগামিতেও এই নিয়মে সব হিসাব মিলবে দেখা যাবে। এর বাইরে আপাতত কোন কমন সুত্র বা সমাধান দেখছি না।

    সবশেষে ভারত প্রসঙ্গে আরেকটা তথ্যা দেই। সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও রাহুলের মা। দলের এক শীর্ষ বা প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি মোদির দুটার্মের প্রায় দশ বছরে রাজনৈতিক অপরাধ ও অন্যায়গুলোর একটা তালিকা করেছেন। অন্যভাবে বলা যায় মোদির নাগরিক অধিকার লঙ্ঘণ-গুলোর এক গ্রহ্নিত তালিকা এটা।  সিরিয়াস ও ভাল তালিকা সন্দেহ নাই। শিরোনাম করেছেন,  “An enforced silence cannot solve India’s problems.” জবরদস্তিতে চুপ করিয়ে দেয়া ভারতের সমস্যার কোন সমাধান নয়।  কিন্তু একটা অসুবিধা হল তিনি এটা কেবল দ্যা হিন্দু পত্রিকাকে দিয়েছেন আর তারা পাঠক এটা পুরাটা পড়তে চাইলে পয়সা চাচ্ছেন। যা খুবই অন্যায়। কংগ্রেসের দিক থেকেও বড় অন্যায়।  তবে অর্ধেকটা বিনা পয়সাতে পড়া যায়।
    একটা ভিন্ন বিকল্প আছে। আরো কয়েকটা পত্রিকা এনিয়ে পর্যালোচনার ছলে প্রায় অনেকটাই ছাপিয়ে দিয়েছে, যাদের একটা হল ইন্ডিয়া টুডে – সেটা এখানে দেখা যেতে পারে।  এমন করে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা এর টা এখানে।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়? (২য় ও শেষ পর্ব)

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?
    (২য় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩  ০০ঃ২২ রবিবার

    https://wp.me/p1sCvy-4lO

     

    প্রথম পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4l1
    দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব এখান থেকে শুরু। continued………

    যেমন মানুষের সম্পর্কগুলো কোন ধরণের?
    মূলকথায় এটা ‘রিলেশনাল’ (relational) মানুষে মানুষের সম্পর্কিয় দিকটা সে লালন করে থাকে। সে কেবল লজিক্যাল সম্পর্ক করে না।  সেটা কেমন?
    দোকানদারের সাথে ক্রেতার সম্পর্ক এটা লজিক্যাল। (যদিও এটা মানুষে মানুষেরই এক সম্পর্ক, তবুও)।  এখানে দোকানদারকে দশ টাকা দিলে দোকানদার ঠিক দশটাকার পণ্যই বিনিময়ে তুলে দেয়।  কিন্তু পিতার সাথে সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অথবা আমাদের যে কারো পিতামাতার সাথে সম্পর্ক এটা রিলেশনাল, মানুষে মানুষের সাথে সম্পর্কিত বোধ করা এক সম্পর্ক। যদি হয় এমন যে কোন পুত্র বা কন্যা  পিতার রাশনাল আকাঙ্খা মানছে না। পড়ালেখা করছে না, ঠিকমত খাওয়া যা নিজ যত্ন নেয়া করছে না, পারিবারিক বা সামাজিক ডিসিপ্লিন অনুসরণ করছে না। এখন ব্যাপারটা রাশন্যালি দেখলে পুত্র-কন্যার পিতার অনুগত হবার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। এজন্য পিতা ক্রমশ চাপসৃষ্টি জন্য শাস্তি দেওয়ার দিকে যেতে পারে। বকাঝকা থেকে খাওয়া পরা বন্ধ চাইকি বাসা থেকে বের করে দেয়া বা খোদ সন্তানই বের হয়ে যাওয়াও ঘটতে পারে। রাশনালি এটাই হবার কথা!
    কিন্তু তা ঘটছে না। কারণ, পিতা ব্যাপারটাকে দেখছে রিলেশনাল জায়গায় বসে। পিতা একই সাথে ভাবছে সন্তান তো তার নিজেরই, যাকে সে প্রচন্ড ভালবাসে। তাই এমন পথে সমাধান করতে গেলে পিতার নিজেরই তা আরো কষ্ট পাবার কারণ হবে সেটা। তাই, এটা কোন সমাধান নয়। তাই পিতা হয়ে গেলেন হেদায়েতি লাইনে। বা পারসুয়েশিভ (persuasive) মানে  তিনি কোন ভাল ফল পাক আর নাই পাক পিতা হয়ে গেল নিয়মিত ‘বুঝানোর’ লাইনে। কন্যার হয়ত এক দুর্বল জায়গা হল ওর নানী অথবা বড় ভাই অথবা এক বড় বোন। তাই তাদেরকে দিয়ে পিতা নিয়মিত বুঝানোর লাইনে গেলেন। এটাকে আমরা হেদায়েতি লাইনও বলতে পারি। হয়ত দেখা গেল ২৫-৩০ বছর বয়সের আশেপাশের কালে কন্যার ভিতর হঠাত পরিবর্তন দেখা গেল। নিজে নিজেই তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল এমন হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা রিলেশনাল; মানে বিয়ন্ড লজিক্যাল – বা যুক্তিবুদ্ধির সম্পর্ক ছাড়িয়ে চলে যাওয়া এক দশা।

    আবার আরেকটা উদাহরণ স্বামী-স্ত্রী নিয়ে। দুজনেই চাকরি করে। কিন্তু স্ত্রী দাবি প্রতিদিন অফিস শেষে বাসায় এসে আমাকেই চা বানাতে হয়। কেন? স্ত্রী বলছে তুমি কিছুই না করে আরামে কেবল আমার দেয়া সেসব সেবা উপভোগ কর! এটা তো সাম্যের সম্পর্ক নয়। তাই তারা সমাধান ঠিক করল যে এরপর গুনে গুনে একেকজন পনেরোদিন করে চা বানাবে। কিন্তু তাতে দেখা গেল স্ত্রীর এক (কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল) বান্ধবী ব্যাপারটা শুনে ব্যাপারটাতে বান্ধবিকে একটা র‍্যাশনাল বোকা বলে সাব্যস্ত করল।  স্ত্রী ব্যাপারটা কীভাবে তা বুঝতে চাইলে তার বান্ধবী বলল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা শুধুই রাশনাল নয়, এটা র‍্যাশনাল এন্ড বিয়ন্ড। এভাবে দেখতে হয়! কিভাবে সেটা?

    বান্ধবি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলল, নিজেদের দম্পতি সম্পর্কের বেলায় সে লক্ষ্য করেছে প্রতিদিনই সে নিজেই চা-নাস্তা সব বানায়। আর সে সময়ে সে যখন উপাচার সাজিয়ে স্বামীর সাথে বসে কথা বলে গল্প করে সেসময়ই তার স্বামী সবচেয়ে উতফুল্ল থাকে, সবচেয়ে কেয়ারিং স্বামী হয়ে উঠে যা স্বামীর প্রতিটা কথায় আচরণে প্রকাশ পেতে থাকে। এটা তাকে ভীষণ সুখ দেয়। এথেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা সে ভাবতেই পারে না! আর এটা তাঁর বেচে থাকার জন্য খুবই প্রশান্তিময় এক উপাদান হয়ে আছে জীবনে।  তাই এই সুখের লোভে কোন বোকা চা-নাস্তা বানানোর কাজ ভাগের কথা তুলবে আর এভাবে ‘সাম্য’ খুজতে যাবে? এখানে সাম্য অবশ্যই রেশনাল কিন্তু তুলনায় অকেজো; কাজেই রিলেশনাল পথ ধরাই উত্তম!! এই হল বান্ধবীর সিদ্ধান্ত!

    তাহলে দাড়ালো যা – সব জানা বুঝাবুঝিই কী কেবল  বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে পাওয়া??? মানুষ কী কেবল লজিক, রিজন বা র‍্যাশনালিটি দিয়েই চিন্তা করে? এর জবাব হবে মানুষ শুধুই কেবল লজিক্যাল বা র‍্যাশন্যাল হয় না। সে একই সাথে রিলেশনাল হয়েও চিন্তা করে থাকে।

    আরেকটা কথা বলে এই প্রসঙ্গটা এখানে শেষ করব তবে সেটা আবার আসবে পরে।
    ১৪৫০-১৫৫০ সাল এসময়টা এজ অব সাইন্স [Age of Science] বা বিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট অর্জনের যুগ মনে করা হয়। যেটা পরবর্তিতেো ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
    আর ঠিক এরপরেই বা পাশাপাশি যে রেনেসাঁ নামে আরেক আন্দোলনের কথা বলেছি তা ইউরোপীয় ইতিহাসে ছড়িয়ে পড়েছিল, ব্যাপক নাড়া দিয়েছিল। সারকথার দিক থেকে বললে এই রেনেসাঁ  ছিল আসলে পরবর্তিতে যাকে এনলাইনটেনমেন্ট বলে বা র‍্যাশনালিটি আবির্ভাবের যুগ বলে এরই প্রাথমিক দিক বা শুরুর রূপ। রেনেসাঁ থেকে  এনলাইনটেনমেন্ট-এ পৌছাতে মোটাদাগে প্রায় চারশ বছর লেগেছিল। তাই রেনেসাঁ বলে ভাল-মন্দে যা শুরু এরই পরিণত রূপ এনলাইটেনমেন্ট। যেখান থেকে আবার মর্ডানিটির ধারণা; রাজনৈতিকভাবে যেখান থেকে মর্ডান স্টেট (আধুনিক রাষ্ট্র) ও ব্যবস্থার ধারণা। তবে এগুলো র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানের যুগ অবশ্যই তবে অচিরেই যা থেকে নেতি অর্থে অতি-বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানবাদিতার তা শুরুও বটে।
    তাহলে বিজ্ঞান ও থিওলজির লড়াইটা কী রূপ নিয়েছিল ও কেন?
    বিজ্ঞান কেন ঐ সময়ে মানে রেনেসাঁ একটু আগে আগে বিকশিত হয়েছিল? এই প্রশ্নটা গুরুত্বপুর্ণ।

    এরিস্টোটলের কথা শুনেছি কমবেশি  আমরা, একটা প্রাথমিক ধারণাও আছে। তাঁর সময়কাল ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২)। মানে পুরাটাই যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা। তিনি দার্শনিক না রাজনীতিবিদ নাকি আবার বিজ্ঞানী বা জোর্তিবিদ এককথায় বলা মুশকিল তাই সেকালে এমন গুণীদের বলা হত বহুবিদ্যাগুণী; (polymath) বলা হত। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ লক্ষ্যনীয় হল, তাহলে তখন বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বা থিওলজিস্ট  এভাবে সবকিছু আলাদ আলাদা মানুষের কাজ হয়ে যায় নাই।  একই লোক একই সাথে বিজ্ঞানী ও  থিওলজিস্ট  হতে পারত। আর তা অবলীলায়!
    কিন্তু পরবর্তিতে রেনেসাঁ আন্দোলনের একটু আগে বা প্রায় সমসাময়িক ঘটনা হয়েছিল বিজ্ঞান বিকাশের শতবর্ষ। কিন্তু এবার  সেই বিজ্ঞান কিন্তু এরিস্টোটল যুগের বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক আলাদা। কারণ সে তখন যে মূলত রাশনালিস্ট, রিজন (reason) তার মন্ত্র বা চিন্তা পদ্ধতি্র।
    তাহলে এবার এই বিজ্ঞান আসলে কী, কোথায় সে আগের চেয়ে আলাদা হয়ে গেল? এতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন!

    সেকথাগুলো  বুঝাবার জন্য সহজ করে বললে, আগে জোতির্বিদ, দার্শনিক বা থিওলজিস্ট একই চিন্তা পদ্ধতি অনুসরণ করতে চলত ও পারত। অর্থাৎ দুনিয়াটা ফিজিক্যাল বা বস্তুগত এবং একই সঙ্গে স্পিরিচুয়াল; মানে ফেনোমেনা আকারে বললে এটা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা এবং একই সাথে তা স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা হিসাবে দেখা হত।  কিন্তু এখনকার মূল আগাম অনুমান (assumption) হল এই ধরে নিয়ে আগানো যে দুনিয়াটা কেবলই সব ফিজিক্যাল ফেনোমেনা।
    অর্থাৎ ইউরোপের রেনেসাঁ বা বিজ্ঞানের যুগের বিজ্ঞানচর্চায় মূল আগাম অনুমান বা সেই ভিত্তি হল সব ফেনোমেনাই কেবল ফিজিক্যাল বা বস্তুগত। কোন স্পিরিচুয়াল দিক নাই। এজন্যই এটা র‍্যাশনাল, রিজন-বেজ বা লজিক্যাল হয়ে উঠেছিল।
    একারণের তাদের মহা আবিস্কার হিউম্যানিজম (Humanism) – এই ধারণাটা স্পিরিচুয়াল ধারণার ছিটেফো্টাকেও এড়িয়ে তা কেবল এক “বস্তুগত মানুষের” ধারণা। মানে এর মধ্যে  মানুষের রিলেশনাল দিকের বুঝাবুঝি অনুপস্থিত। যা এখন এক হিউম্যান কোয়ালিটির কথা তুলে ধরা যা স্পিরিচুয়াল দিক নাই, রিলেশনাল দিক নাই। কানেকটেড বোধ নাই।  এই  হিউম্যানিজম (Humanism) কথার সোজা মানে হল, কথিত মানবতাবাদী। মানে যে ব্যক্তি – মানুষের সব হিউম্যান কোয়ালিটির কথা বুঝে ও মানে। কিন্তু তার চোখে এই মানুষের মধ্যে কোন স্পিরিচুয়ালিটির বোধ ধারণার বালাই নাই।
    সারকথায় এমন এক বৈষয়িক ভোগী মানুষ যার স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা বা আকাঙ্খা নাই। তাই, “রিলেশনাল” নয়, বোধ নাই।  তাই যেমন কেউ যদি বলে, নবী মানবতাবাদী ছিলেন? তাহলে কেমন হবে? এটা কথা হল না, মানে হয় না! কারণ এখানে এমন এক নবীর কথা কল্পনা করা হয়েছে যার মধ্যে স্পিরিচুয়ালিটির ক্ষুধা বা আকাঙ্খা অথবা বোধ ইত্যাদি এসবের কোনটাই নাই। মানে যেটা এক উদ্ভট, এব্সার্ড বা অলীক ধারণা। যার কোন নবী ধারণাই নাই!
    দুনিয়ার বস্ত-অবস্তু ও গ্রহ-নক্ষত্র সহ সকল কিছুর সাথে আমরা মানুষ কানেকটেড, যুক্ত বা সম্পর্কিত। আর এই সম্পর্ক তৈরি করেছে এমনভাবে যেখানে প্রতি দুই সত্বার (being) মাঝখানে আছে আল্লাহ, গড বা ঈশ্বর ধরণের কিছু ধারণা যে আমাদের যেকোন দুই সত্বাকে কানেক্ট বা সম্পর্কযুক্ত করে তুলে,  সম্পর্কিত করে এক বন্ধনের মধ্যে রেখেছে।  যেকোন থিওলজির কমন ভিত্তিমূলক ধারণা এটাই। এভাবে আমরা সবাই “আল্লাহ ধরণের ধারণা” যার মধ্যে দিয়ে সবাই সবকিছুর সাথে কানেকটেড – যেকোন থিওলজির মূলকথা এটাই। তবে  হয়ত কোন কোনটা থিওলজিতে ব্যাখ্যা বেশি স্পষ্ট করে সাজানো, এভাবে ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারে।
    সরাসরি বললে বিজ্ঞান বা রাশনালিটি এই কানেকটেড দিকটা উপেক্ষা করে চলে, আমল করে না। তবে যেমন নিউটনের গতিসুত্র এটার (ফিজিক্যাল ফেনমেনাকে ব্যাখ্যা করার বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি) উপর মানুষের স্পিরিচুয়াল দিকের তেমন প্রভাব নাই। কিন্তু সাবধান। যখনও আমাদের যাকে ব্যাখ্যা করছি তার ভিতর যদি “মানুষ” থাকে তবে  বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি সেখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ মানুষের উপর প্রয়োগ মানেই ধরে নিতে হত ওখানে স্পিরিচুয়াল দিক আছে,  মানুষ কানেকটেড বা সম্পর্কিত বিষয়াবলী আছে। তাই বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি বা লজিক্যাল বা রেশনাল দিক যথেষ্ট নয়। কিন্তু তবু বিজ্ঞানবাদিতা বিশ্বাস করে তারা সর্বগামি তারা হিউম্যান ফেনোমেনা (যা কেবলই ফিজিক্যাল নয়) গুলোকেও ব্যাখ্যা করতে সমর্থ; তাদের চিন্তা পদ্ধতি সমর্থ!! অথচ এই অনুমান ও দাবি অসত্য!!

    আবার পুরানা কথায় একটু ফিরে যাই।
    কথিত “প্রগতিশীলতার” যে মৌলিক বৈশিষ্ট – ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা, এর পক্ষে যে সাফাই বা তাদের মূল আড়াল যার পিছনে দাঁড়ায়ে তারা নিজের ডিফেন্স সাধারণত নিয়ে থাকে বলে বুঝি সেটা হল এই রেনেসাঁ (renaissance) ধারণা; যদিও রেনেসাঁ কী জিনিষ এটা জিজ্ঞাসা করা যায় তবে দেখা যাবে খুবই আবছা কিছু না-বুঝা মুখস্ত কথা তারা বলছে।
    তবে তাদের এক সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে, বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ বলে যে তর্ক তারা তুলে থাকে। ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে সেটা হল – বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দিয়েছে। অথচ ব্যাপারটা কী তাই? আর এতই সিম্পল?মোটেই তা নয়। তাহলে কী?
    প্রথম কথা হল বিজ্ঞান ও থিওলজি (ধর্মতত্ব) এদুইয়ের সাবজেক্ট ম্যাটার বা কথা বলার প্রসঙ্গই এক নয়। এরা একই বিষয় নিয়ে কাজ করে না।

    রেনেসাঁ জিনিসটা কীঃ
    রেনেসাঁ শব্দের প্রাথমিক ধারণা করতে, যদি এর আক্ষরিক বাংলা করি তবে এর অর্থ পুনঃজন্ম (re-birth) । তবে এটা যতটা না জন্ম এর চেয়ে বেশি আবার ফিরে পাওয়া (re-found) এমন অর্থ করলে তা এর আসল অর্থের বেশি কাছাকাছি হবে।
    এটা মূলত এখনকার ইটালির রাজধানী রোম এবং ফ্লোরেন্স শহরে বিকশিত হওয়া এক প্রগাঢ় আবেগ উচ্ছ্বাসের কাল (১৪ শতক থেকে ১৭ শতক জুড়ে মানে ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী। কী নিয়ে? এটা ছিল ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে শিল্পকলার নানা ধরণে এবং রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। তবে এই বয়ানের মধ্যে যেটা বাদ পরে গেল তা হল সাইন্স বা বিজ্ঞানের বিস্তারে মানে শতবর্ষ জুড়ে (১৪৫০-১৫৫০) নানা বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের যুগ। তবে পরে ১৪৯৯ সাল থেকে এই আন্দোলন এবার আর রোম বা ফ্লোরেন্সে আবদ্ধ থাকে নাই; বরং নর্থ ইউরোপ বা ফ্রান্স দিয়ে ঢুকে সারা ইউরোপকে আন্দোলিত করে ফেলেছিল।

    একাদেমিসিয়ানদের মধ্যে বলা হয়ে থাকে, প্রায় চারশ বছরের রেনেসাঁ আন্দোলন ধারাবাহিকতায় বিকশিত হলেও এর বিকাশের তিনটা আলাদা পর্ব বা স্তরে বলে চিহ্নিত করা যায় – শুরুর দিক, চরম বিকাশের দিক আর শেষের দিক এভাবে। বিস্তারে দেখতে দেখুন এখানে। তবে আমরা সেই বিস্তারের দিকে এখান থেকে আর এখন যাব না।

    The Renaissance was a fervent period of European cultural, artistic, political and economic “rebirth” following the Middle Ages.
    Generally described as taking place from the 14th century to the 17th century, the Renaissance promoted the rediscovery of classical philosophy, literature and art.
    Although the evolution of Italian Renaissance art was a continuous process, it is traditionally divided into three major phases: Early, High, and Late Renaissance.

    বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে যে বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দেয় – আমি এমন ধারণ-অনুমানের সমর্থক-খাদক নই। মূল কারণ এরা মূলত মানুষের চিন্তার ইতিহাস বিশেষ করে ‘চিন্তার পদ্ধতি’ সম্পর্কেই বেখবর। তবু তারা কেবল রেনেসাঁ বলতে বুঝেছে বা আগ্রহী যেন এজন্য যে তারা মনে করে রেনেসাঁ পাওয়া মানে ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম কোপানোর একটা অস্ত্র পাওয়া গেছে!

    রেনেসাঁ মানে পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদঃ
    রেনেসাঁ মানে  আগে বলেছি পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদ করতে হবে সবার আগে। তবেই প্রগতিবাদীদের ইসলাম কোপানোর আকাঙ্খা ও গোমড় ফাঁক হবে।  তাই সেকাজে সবার আগে ‘মধ্যযুগ’ (middle age) এই ধারণাটা নিয়ে কথা শুরু করা যাক। মধ্যযুগ বলতে মোটাদাগে ৫০০ থেকে ১৫০০ সাল; মাঝের এই হাজার বছরটাকে কী বুঝানো হয়ে থাকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, এটা প্রাচীন রোমের (ancient Rome) সাথে সংযুক্ত ঘটনা। বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য রোম নিয়ে স্বল্পে কিছু কথা এখানেই যোগ করে রাখি। প্রাচীন রোম বলতে একেবারে শুরুতে এক ছোট নগর রাষ্ট্র যা পরে রোমান রাজার রাজ্য (৭৫৩-৫০৯ খ্রীষ্ট্রপুর্ব) হয়ে যায়। আর পরে তা এক রোমান রিপাবলিকে পরিণত হয়েছিল (৫০৯-২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব)। এভাবে সবশেষে তা পরিণত হয়েছিল এক রোমান সাম্রাজ্যে (২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্ট্রাব্দ বা যিশুর জন্মের পরে)। আর এই ৪৭৬ সালে রোম সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। একালের ইউরোপের বড় অংশ জুড়েই তা এই রোম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।

    কিন্তু পরে ৮০০ সাল থেকে আরেক রোমান সাম্রাজ্য জন্ম নিয়েছিল। যদিও দুই রোমান সাম্রাজের মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই, একই সাম্রাজের পুনঃ-আবির্ভাবও নয়। তাই পরের রোমান সাম্রাজ্যের পুরা নাম ছিল হলি রোমান এম্পায়ার যা বাংলায় বললে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ হয়। তাই মধ্যযুগ বলতে আসলে রোমান সাম্রাজ্যের পতন (৪৭৬ সাল) বুঝা বা ধরা হয়। আর ওদিকে ১৫০০ সাল বলতে আসলে চোদ্দ শতকে রেনেসাঁর জন্মকে বুঝানো হয়। মধ্যযুগ মানে দাঁড়ালো প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের পতন আর রেনেসাঁর জন্ম এদুই এর মাঝের সময়কে। কিন্তু কেন?

    আসলে ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে রেনেসাঁ আন্দোলন শুরু হওয়ার পিছনে্র কারণ হিশাবে বলা হয় এ’শহর দুটা শিল্পকলা সংশ্লিষ্ট চিত্রকর, আর্কিটেক্ট, ভাস্কর্য-শিল্পী ইত্যাদিতে ও তাদের কাজে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ছিল। তারাই এরা টের পেতে শুরু করেছিল যে তখনও রোমের প্রাচীন যেসব শিল্পকলার নিদর্শন তখনও টিকে ছিল সেগুলো তাদের সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অগ্রসর ছিল। অর্থাৎ  সেকালে রেনেসাঁ শুরুর জমানা চোদ্দ শতকের চেয়ে প্রাচীন রোম অনেক অগ্রসর ছিল। তাই তাদের উচিত হবে প্রাচীন রোমের  শিল্পকলার নিদর্শনগুলোকে আবার খুঁজে নিয়ে সেগুলোর অনুসারি হয়ে সেসবের পুনজন্ম ও ব্যবহার ঘটিয়ে নিজের সময়কালকে আপডেট করে নেয়া। ক্রমশ একই জিনিষ দেখা যেতে লাগলে রাজনীতি বা অর্থনীতি বিষয়ক ধারনাগুলোতেও। কিন্তু এমন দেখা যাওয়ার পিছনের কারণ কী???
    এর কারণ হিসাবে অনেকে ধারণা করতে থাকে যে খ্রীষ্টধর্মের বন্ধন-ই এমন পিছিয়ে যাবার কারণ। এর মানে কী? আর  কী দেখে তাদের কেন এমন মনে হল?

    প্রাচীন রোম কী খ্রীশ্চান ধর্ম অনুসারি ছিলঃ
    উত্তর টা হ্যা। কিন্তু সাথে আরেক প্রশ্ন হল, প্রাচীন রোমের মোট সময়কাল মানে এর শুরুটা হল যিশুর জন্মেরও ৭৫৩ বছর আগে বা যেটাকে আমরা  খ্রীষ্টপুর্ব বলি, তখন। সে সময় থেকে শুরু করে এই সাম্রাজ্যের পতন হয়ে যায় যিশুর জন্ম পরবর্তি ৪৭৬ সাল পর্যন্ত। মোট কথা যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা হল রোম সাম্রাজ্যের জন্ম। তাহলে? কবে থেকে সেই রোম ক্যাথোলিক খ্রীশ্চান ধর্মকে গ্রহণ ও অনুসারি হয়েছিল?

    আসলে ৩১৩ খৃষ্টাব্দ বা সাল থেকে সম্রাট কনষ্টানটিন (Constantine) এর আমলে রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট-সহ প্রজারাও খ্রীশ্চান হয়ে যায়। তাই আরো সুনির্দিষ্ট করে মধ্যযুগ বলতে অনেকে বলে থাকেন আসলে ৪৭৬ সালে রোমের পতন থেকে নয় বরং আরও আগে এই ৩১৩ সালে পুরা সাম্রাজ্যের খ্রীশ্চান হবার পর থেকেই – রোমের শিল্পকলা-সহ  জ্ঞানবুদ্ধির সবকিছুতে তারা আগেকার সময় থেকে পিছিয়ে যাওয়ার শুরু মনে করে থাকে। সরাসরি বললে, খ্রীশ্চান হওয়ার কারণেই তাদের এরপরের জীবনে জ্ঞানবুদ্ধি কমতে শুরু করেছিল।  অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ ধর্মবিরোধী এক ধারণা হয়ে উঠার শুরু এখান থেকেই। কিন্তু আসলেই কী তাই?

    কেন এমন প্রশ্ন করছিঃ
    কারণ ৩১৩ সালে এসে রোমের সবাই খ্রীশ্চান হয়ে যাবার আগে কী তাহলে রোমের সমাজ ধর্মহীন ছিল??? রোমের বাসিন্দারা অন্যকোন ধর্মের অনুসারী  ছিল না?  এর জবাব হল ৩১৩ সালের আগে তারা অবশ্যই অন্যধর্মের অনুসারী ছিল। কোন ধর্মহীন ছিল না! কারণ এথেন্স বা গ্রীক সভ্যতার দেবতা বা বহুঈশ্বরবাদী ধারণা-বৈশিষ্টের গ্রীক থিওলজি-ই ছিল রোমের পুর্বপুরুষ-সকল। তাই গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবীই ছিল  ও রোমের বাসিন্দাদের উপাস্য ও অনুসৃত ধর্ম। অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ সাধারণভাবে সব ধর্মের বিরোধী এক ধারণা ছিল না। বরং ছিল ৩১৩ সাল থেকে প্রচরণ শুরু হওয়া ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের বিরোধী। এবং গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবী কেন্দ্রিক ধর্মচর্চার প্রতি সহানুভুতিশীল! একালের কমিউনিস্টদের আকাঙ্খায় যে নাস্তিকতা বা ধর্মহীনতা – তার সাথে রেনেসাঁ আন্দোলনের  গ্রীক ধর্মের প্রতি যে মনোভাব তা কোনভাবেই এক নয়।  এককথায় বললে, অন্তত শিল্পকলার বিচারে  রোমে গ্রীক থিওলজির প্রভাব ও অবদান ৩১৩ সাল থেকে অনুসৃত ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের  প্রভাব ও অবদান নেতিবাচক – তাদের ভাষায় পিছিয়ে থাকা।
    তবে আমাদের জন্য যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল,  ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে শুরু হওয়া রেনেসাঁ আন্দোলনের রেনেসাঁ-বাদীরা তারা ধর্মবিরোধী নয়। একালের কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীরা আকার-ইঙ্গিতে আমাদের যা বুঝিয়ে থাকে, সেটা একেবারেই মিথ্যা। – “ধর্ম মানেই কালো যুগ, অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ” এসব অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন!!
    তবুও যে প্রশ্নটা থেকে যায় যে গ্রীক থিওলজি আর ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের তুলনা – যে তুলনাতে ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের অবদান “পশ্চাদপদতা” সেই অনুমানও কতটা সঠিক? আর সবচেয়ে বড় কথা কেন এমন অনুমানের জন্ম??

    দুনিয়ায় মোটাদাগে দুই বৈশিষ্ঠের থিওলজিঃ 
    এসব প্রশ্নের জবাব খুজতে আমাদেরকে প্রসঙ্গের আরেকটু গভীরে যেতে হবে। দুনিয়াতে যত ধরণের ধর্মচর্চা (থিওলজি) আছে সেগুলো মোটা দুভাগে ভাগ করা যায়। যেমন আসমানি কিতাব বা কিতাবি ধর্ম – এর একটা ধরণ। যেখানে নাজেল হওয়া কিতাবি ধর্ম সেটা, বলে মনে করা হয়। আবার নন-কিতাবি ধর্মও আছে। যেমন ভারতের হিন্দু সভ্যতা থেকে বিজেপি-আরএসএস পর্যন্ত এসে তা হিন্দু-ধর্ম হয়ে উঠা। অথবা আরেক উদাহরণ হল, গ্রীক দেবদেবী ভিত্তিক অনুসৃত গ্রীকদের ধর্মচর্চা। ফলে এটাই গ্রীকদের রোমের আসার পরে তখনও তাদের অনুসৃত ধর্ম ছিল যাকে নন-কিতাবি থিওলজি বলা যায়।
    মোটা দাগে কিতাবি আর নন-কিতাবি ধর্মের বড় ফারাকটা হল, কিতাবি ধারার মধ্যে, স্ব স্ব মূল কিতাব একবারই আসে বা নাজেল হয় আর তাদের নবী-জন্মের পরে তাতে কিছু কালাম যোগ হয় বড়জোর। তুলনায় নন-কিতাবির বেলায় এখানে এক লম্বা সময় ধরে ইভলভিং (evolving) বা ক্রমশ প্রকাশিত এমন ধারায় উদ্ভব বা বিকশিত এভাবে নয়া দেবতা-সহ নয়া বাণী এখানে এসে থাকে। এখানে একাধিক দেব-দেবির ধারণাও দেখা যায়।  অবশ্যই এখানে এদুইয়ের মধ্যে কোনটা ভাল এজাতীয় কথা বলার মানে হয় না। সেটা অন্তত আমার কাজ না। এলেখার উদ্দেশ্যও না।  বরং যে যেটা অনুসরণ করে তার কাছে সেটাই সবচেয়ে ভাল – এমনটাই দেখতে পাওয়া যায়।  তবে আরেক ফারাক-বৈশিষ্ট হল, কিতাবি ধর্ম কম্প্রিহেন্সিভ (comprehensive) হয়ে থাকে। মানে সর্ব-বিষয়ে ব্যাপকভাবে বক্তব্য এড্রেস করা হয়ে থাকে যেন কোন প্রসঙ্গই স্পর্শ করতে বাদ রাখে নাই সাধারণত এমন হয়ে থাকে। এছাড়া কিতাবি ধর্ম যেটা সবচেয়ে পুরানা পরে নাজেল হওয়া সেটা তত বেশি ডিটেল হয়ে থাকতে দেখা যায়।
    এসব বিচারে বলা যায়, প্রাচীন রোম আসলে প্রায় হাজার বছর ধরে নন-কিতাবি গ্রীক দেবতাভিত্তিক ধর্ম অনুসরণ করে চলার পরে, ৩১৩ সাল থেকে কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্মের অনুসারি হয়ে উঠেছিল। আর কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্ম ইনক্লুসিভ ও কম্প্রিহেনসিভ হওয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের (মানে ফিজিক্যাল ফেনোমেনা গুলা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে) চর্চায় অনেক বেশি নয়া বিধিনিষেধ তখন থেকে তাদের মেনে চলতে হয়েছিল।
    এতদুর বলার পরও মৌলিক কথার আরো কিছু অংশ বাকি থেকে গেছে। এখন সেদিকে যাব।

    রেনেসাঁ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এর বিকাশের তিন পর্ব বা স্তরের দিক আছে তা বলেছি। কিন্তু এভাবে সতেরো শতকে (১৬০১-১৭০০) এসে রেনেসাঁ স্তব্দ হয়ে যায় বা থেকে যায়। একাদেমিকভাবে এর সাতটা কারণ বা সাতটা উপাদানের সম্মীলিত প্রভাবের কথা জানা যায়। যেমন পনেরো শতকের দিকে রোমের ভুমি দখলে মেতে উঠেছিল  স্পেন, ফ্রান্স ও জর্মানী। ফলে রোম বা ফ্লোরেন্স অস্থিতিশীল উঠতে শুরু করেছিল। আবার প্রতিযোগিতায় পড়ে যাবার কারণে ফ্লোরেন্স ও রোমে আসা-যাওয়ার নৌবাণিজ্যের রুট বদলে গিয়েছিল । ফলে আয় বিশেষত সমৃদ্ধ ফ্লোরেন্সের সম্পদ-ধারীরা আর আগের মত রেনেসাঁ আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা চালিয়ে যেতে পেরে উঠছিল না। ইত্যাদি কারণগুলো ছাড়াও আরেক নির্ধারক কারণও উঠে এসেছিল। এতদিন রেনেসাঁ আন্দোলন ক্রীশ্চানিটিকে কোনঠাসা করে চলে আসছিল। কিন্তু এই রেনেসাঁই এবার পালটা আক্রমণ ও চাপের মুখে পড়ে যায়। কারণ ততদিনে ততকালীন প্রশাসন নয়া আইনি বাধা তৈরি করতে সমর্থ হয়ে যায়। তাই সেকাজে নয়া আইনের নাম রোমান ইনকুইজেশন (Roman Inquisition) বলে  আইন চালু করেছিল তাদের কাউন্সিল অব ট্রেন্ট (Council of Trent) । সহজ ভাষায়, এই ট্রেন্ট মানে হল রোমান ক্যাথলিক অথরিটি যারা “ধর্ম-অবমাননার” শাস্তি আরোপ করার ক্ষমতাধারী কর্তাগোষ্ঠি। আসলে মূলকথাটা হল, রোমের ক্যাথলিক ক্রিশ্চান চার্চ মূলত প্রটেষ্টেন্ট (Protestent) খ্রীশ্চানিটি ধারার হাতে ক্রমান্বয়ে আগে থেকেই  চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছিল। যার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-কারী হয়ে উঠেছিল প্রটেস্ট্যান্টেরা।  হওয়াতে আর সাথে প্রকারন্তরে রেনেসাঁর অবস্থান প্রটেসটেন্ট দের পক্ষে যাওয়াতে সবমিলিয়ে ক্ষমতাসীন ক্যথলিকেরা “নিজ ধর্মীয় আইন লঙ্ঘন ও নিষিদ্ধ পুস্তক চর্চার বিরুদ্ধে  ও এই অজুহাতে  মৃত্যুদন্ডের শাস্তি চালু করেছিল।

    মিলিত ফলাফলে রেনেসাঁ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে যায় সতেরো শতকেই। আর এখান থেকেই পরের মানে আঠারো শতকে এরই পরিপূরক আরেক আন্দোলন এনলাইটেনমেন্ট (enlightenment) আন্দোলন বিকশিত হয়ে উঠেছিল।  তবে এখানে প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির ধারা সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক।
    এনলাইটেনমেন্ট  নিয়ে কথা  কথা আগানোর আগে রেনেসাঁ নিয়ে গুরুত্বপুর্ণ আরো কিছু কথা আগে শেষ করে নেয়া যাক।
    তবে বিদ্রোহি প্রটেস্টেন্ট খ্রীশ্চান ধারার সাথে রেনেসাঁবাদীদের সখ্যতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। খুবই সংক্ষেপে বললে,  প্রটেস্টেন্ট ধারার উত্থান তাদের মূল নেতা মার্টিন লুথারের হাতে। জর্মানিতে জন্ম লুথারের জীবনকাল (১৪৮৩-১৫৪৬); যার পরিচয় সম্পর্কে বলা হয় তিনি এক জর্মান থিওলজিষ্ট, প্রফেসর, যাজক ও চার্চ সংস্কারক ইত্যাদি।  আসলে তিনি ছিলেন ধর্মতত্বে একাদেমিক গ্রাজুয়েট। গত ১৫০০ সালের পরে রেনেসাঁ যখন নর্থ ইউরোপে হানা দিয়েছে ঘটনাচক্রে শহরের সিনিয়র পাদ্রীদের সাথে বাইবেলের ব্যাখ্যা নিয়ে গভীর ঝগড়ায় লিপ্ত। রেনেসাঁ আন্দোলনের অন্যতম এক ইতিবাচক অবদান হচ্ছে মানুষকে সবকিছু নিজে দেখেশুনে পড়ে বুঝাবুঝি করে নিতে আগ্রহী করে তোলার যুগের সুচনা করেছিল। যেমন এর আগে বাইবেলে কী আছে তা পাদ্রীরাই ব্যাখ্যা করার এক্তিয়ারধারী। এমন হবার পিছনের টেকনিক্যাল কারণ হল শুকানো চামড়ার উপর বাইবেল হাতে লেখা। ফলে তা জনে জনে বিতরণ বা সহজেই পাওয়া যায় এমন বস্তু ছিল না। বলা হয়ে থাকে রেনেসাঁ উদয় পিছনে তিনটা জিনিষ আর আগে আবিস্কৃত হতে হয়েছিল। তাহল গোলাবারুদ, কম্পাস আর প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানা। এর প্রথম দুটা হল বাকি ইউরোপ থেকে নৌপথে ফ্লোরেন্স বা রোম পৌছানো বাস্তব ও সহজেই সম্ভব করে তুলতে ভুমিকা রেখেছিল। এমনিতেই  ফ্লোরেন্স বা রোম থেকে রেনেসাঁ নর্থ ইউরোপ পৌছাতে লেগেছিল প্রায় একশ বছর।  কেবল ছাপাখানা আবিস্কৃত হয়েছিল বলেই এরপরে তা অসংখ্য কপি ছাপা হয়ে  ইউরোপে রেনেসাঁ ছড়িয়ে পড়তে তা সাহায্য করেছিল। বাইবেলও এরপরে জন-নজরে উন্মোচিত হতে সাহায্য করেছিল। যারা বাইবেলের ব্যাখ্যা নিজে কুক্ষিগত করে এতদিন রাখতে পেরেছিল  সেই পাদ্রিগোষ্ঠি  এরাই সেকালের ক্ষমতাসীন এলিট ক্লাসের সহযোগী ছিল। ঝগড়া শুরু হয়েছিল এক আন্ডার কনষ্ট্রাকশনে থাকা চার্চে নোটিশ টাঙানো ছিল যে এই দানবাক্সে অর্থে দিলে সহজেই বেহস্ত মিলব – ধরনের গ্যারান্টি।  লুথার এই বক্তব্য বাইবেল সমর্থিত নয় বলে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আর তা থেকে বড় রাজ-পাদ্রি পর্যন্ত সকলের সালে তার বিতর্ক – শেষে পালিয়ে থাকা, রাজ নীটিশ ইত্যাদি। আর ততই তিনি লুথার প্রতিদিন এসব সরকারি পাদ্রিদের বিরুদ্ধে তাঁর গরীব মানুষের স্বার্থের পক্ষে বাইবেলের ব্যাখ্যা দান। শেষে রাজ-পাদ্রিদের পশ্চাদ-অপসারণ। আর তা থেকেই প্রটেস্টটানিজম (Protestant Reformation) হাজির হয়েছিল। যেখান থেকে প্রটেস্টটানিজম (Protestantism, Reformation of Catholic) বা বলা যায় প্রটেস্টেন্ট নামে নয়া ফ্যাকড়ার খ্রীশ্চানিটির জন্ম। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হল, রেনেসাঁর আগমন প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির আগমন ও উদ্ভবকে সাহায্য করেছিল। ফলে আমাদের এদিকের ইসলাম কোপানি খায়েসের কথিত সেকুলার যারা নাকি  রেনেসাঁ পাঠ করে রায় দিয়ে থাকেন যে রেনেসাঁ ধর্মের প্রয়োজনীয়তা শে করেছে তারা আদৌ কোন রেনেসাঁ পাঠ করেছে কিনা তা সন্দেহজনক!

    কথা শুরু করেছিলাম মধ্যযুগ (medieval period) নিয়ে। এই শব্দটা উচ্চারণ করাই হয় একটা তুচ্ছতাতুচ্ছ অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে যে এটা নাকি ধর্মের যুগ তাই এটা পশ্চাদপদ। যদিও রেনেসাঁর উদ্গাতা প্রভাবশালী সামনের সারির দশজন কর্তার নাম নিলে দেখা যাবে ওর মধ্যে মাত্র একজন মধ্যযুগ-কে অন্ধকার যুগ (Dark Ages) বলে চিহ্নিত করেছেন [Francesco Petrarca (known as Petrarch) was the first person to coin the term ‘Dark Ages’. He was an Italian scholar of the 14th century.] ।

    তা ভাল! কিন্তু বিপরীতে তারা কী কামনা করতেন? সেটা এখন আমরা বিচার করে দেখব আর এভাবেই তাদের ‘অন্ধকারের ধারণা’ বুঝব।

    হিউম্যানিজম (Humanism) এই শব্দটার বাংলা অনেকে করেন। মানবতাবাদ। ইন্টারেস্টিং ঘটনা হল শব্দটাকে খুবই ইতিবাচক শব্দ বলে আমরা মনে করি। এমনকি কেউ কেউ বলে বসেন যে নবীও খুবই মানবতাবাদী ছিলেন।  কিন্তু দুঃখের কথা হল এই “মানবতাবাদ” হল রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট। আর এটা একটা এন্টি-রিলিজিয়াস শব্দ।   দুনিয়াতে যারা হিউম্যানিস্ট গ্রুপ আছে তারা নিজের সম্পর্ক মনে করে তাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হল, তারা হলেন রিজন (reason) যুক্তিবুদ্ধিতে চলা উচ্চমানের ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া তারা যেসব মুল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন যা আল্লাহ-ভগমানের মত কোন অতিপ্রাকৃত (super-natural) ধারণায় আস্থাবিশ্বাস রাখেন না। বরং যা মানুষের প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতালব্ধ ধারনায় কেবল এর উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন। [Humanism is an approach to life based on reason and our common humanity, recognizing that moral values are properly founded on human nature and experience alone.]।
    কথাগুলোকে আরো সরাসরি বললে তাদের ধারণা হল, আল্লাহ-খোদা বলে কিছু নাই। মানুষই সব। এভাবে বলাতে অনেকের মনে হতে পারে এটা আর এমন কি? এটা তো আল্লাহ বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীর মধ্যকার পুরানা বিবাদ বৈ আর কিছু না!  হা আপাত চোখে তা মনে হতে পারে কিন্তু তা নয়।  কেন?

    মানুষ কী কেবল কোন বস্তুগত সত্বা (physical being) মানে ফিজিক্যাল বিয়িং। নাকি এটা একই সাথে এক স্পিরিচুয়াল বিয়িং (spiritual being) -ও; এটাও বটে!  রক্ত-মাংসের মানুষের অসংখ্য বস্তুগত চাহিদা আছে; তাই মানুষ কেবলই এক বস্তুগত সত্বা বা ফিজিক্যাল বিয়িং নয়। তাই এতেই সে শেষ না, মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদাও সাথে আছে।
    হিউম্যানিজম  স্পিরিচুয়াল চাহিদাকে অস্বীকার করে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু এই স্পিরিচুয়াল জিনিষটা কী?
    সারকথায় মূল প্রশ্ন হল আমরা মানুষ কিভাবে দুনিয়াতে অন্যান্য বস্তু, অবস্তু, অন্যান্য প্রাণী- অপ্রাণী বা উদ্ভিদ এমনকি গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি অথবা আরেকটা মানুষ ও অন্যান্য অস্তিত্ব ইত্যাদি সবকিছুর সাথে কানেকটেড বা সংযুক্ত – এই বিষয় নিয়ে যে কথা বলে বা যার সাবজেক্ট ম্যাটার এটাই থিওলজি। কি করে মানুষ বাকি সবকিছু অন্যান্যের সাথে কানেকটেড এটাই  থিওলজি ব্যাখ্যা করে থাকে।  মানুষের কোন বিষয়ে একটা ধারণা যেমন যুগে যুগে বিকশিত হয়ে পরে পোক্ত হয় তেমনই এটাও। যত পরবর্তিকালের থিওলজি ততই আরেকটু স্পষ্ট তার ব্যাখ্যা। তবে ব্যাখ্যা সঠিক কিনা অথবা কোন থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যাটা ভাল এটা এখানকার আলোচনার বিষয় না। বরং বুঝাতে চেয়েছি কানেকশন, কি করে আমরা সম্পর্কিত সেদিকটা বুঝাবার চেষ্টা করছি। আর আমরা কী করে সকলে কানেকটেড এটা জানা-বুঝার যে আকুতি – সম্পর্কিত বোধ করার আকুতি এটাই স্পিরিচুয়াল চাহিদা। আমি দুনিয়াতে কেন, এর দরকার কী অথবা এর অর্থ তাতপর্য কী এগুলোকে জানা এটাই মানুষকে তাড়া করে। এছাড়া মানুষ তার পরিবারের সদস্য অথবা কোন কোন ঘনিষ্ঠজন এদের প্রতি একটা “টান” অনুভব করে কেন?
    মূল কথাটা হল, এই অনুভবগুলো আর মানুষের কেবল ‘ফিজিক্যাল বিয়িং’ ধারণার মধ্যে আটকে থাকতে দেয় না। মানে হল মানুষ কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা ও বাসস্তানের চাহিদা-ধারী নয়, তার স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে।

    এজন্যই আমরা লক্ষ্য করলে দেখল ১৪শতকের রেনেসাঁ থেকে শুরু করে ১৮ শতকের এনলাইটেনমেন্ট এই পুরা সময়কাল জুড়েই কেবল বিজ্ঞানবাদিতা আর সাথে রিজন, লজিক্যাল বা রেশনালিটি ধারণার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা।

    কাজেই রেনেসাঁ অথবা ওর চারশবছরের সফর শেষে এনলাইটমেন্ট পর্যায়ে আসা, এক পড়তে হবে ক্রিটিক্যালি। শুধু সবই ভাল বা সবই খারাপ এমন কোনটার করেও নয়। বিশেষ করে আমাদের এদিকের প্রপাগান্ডা ধারণা –  রেনেসাঁ নাকি এসেছে ধর্মের ইতি টানতে,  এমন ভিত্তিহীন অনুমানও এড়িয়ে চলতে হবে। আসলে মূলত বিজ্ঞান ও রেশনালিটি ধারণাকে এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধতা এর নো গো [No Go] এরিয়া সম্পর্কে জেনে তবেই এটা আমল করতে হবে।

    সমাপ্ত

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ 
    ০০ঃ০২  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4l1

     

                  What is Enlightenment and Perpetual Peace by Immanuel Kant – Book Review

     

    এই লেখা শুরুতে এর শিরোনাম সম্পর্কে আগাম পরিচয় করিয়ে দিতে এই শিরোনাম কেন ও কী ধরণের এনিয়ে কিছু বাক্য দিয়ে শুরু করব।
    এই লেখার মূল বিষয়বস্তু “এনলাইটেনমেন্ট” (enlightenment)। আর শব্দটা দেখাই যাচ্ছে এক ইংরাজি শব্দ। “এনলাইটেনমেন্ট” শব্দটা ও এই ধারণার খুবই ইতিবাচক অনুসারি এমন অনেকে সম্ভবত এর বাংলা করবেন যে “এনলাইটেনমেন্ট” মানে, মানুষ বা জনগোষ্ঠিকে “অজ্ঞতামুক্ত” করা বা  “আলোকপ্রাপ্ত” করা। তবে পরিস্কার থাকার দরকার যে এই অর্থ আমার করা নয় বরং “এনলাইটেনমেন্ট” এর অনুসারিদের করা; মানে বলতে চাচ্ছি যে,  আমি এনলাইটেনমেন্ট-এর অনুসারি নই। বরং বলা যায় আমি ক্রিটিক্যাল বা পর্যালোচক অবস্থানের। আমি  বরং এই শব্দটার যা অর্থ নয় অথচ অনুসারিরা দাবি করে এদিকটা সামনে তুলে ধরতে চাইব এখানে।  সরাসরি বললে, এই শব্দের অর্থ-সীমা কোথায় সেদিক থেকে শব্দটাকে বরং সবাইকে পুরাপুরি ও খুটিয়ে জেনে ও চিনে নিতে আহবান জানাবো।

    এনলাইটেনমেন্ট শব্দটার প্রায় সমার্থক [synonymous] বা সহ-শব্দ হিসাবে উঠে আসে – বিজ্ঞান (science) বা র‍্যাশনালিটি (rationality) – এসব শব্দ। যে শব্দগুলোর অর্থ যদি সম্যক জানি তবে এসব শব্দের অর্থের সীমা জানা থাকবে। শব্দের অর্থসীমা জানা মানে কোন শব্দ কতদুর কী শব্দার্থ বহন করে ও কার পরে আর করে না সে সম্পর্কে সচেতন থাকা। এই অর্থে এই লেখার একটা উদ্দেশ্য বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দের অর্থের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করা, পাঠককে সচেতন করা।  বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দগুলো আমরা মূলত ব্যবহৃত হতে দেখি যে  ধর্ম-কে (বিশেষ করে ইসলাম) কোপানো বা ধর্মকে তুচ্ছ, নাকচ ইত্যাদি করার কাজে।

    যেমন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কথিত “বিজ্ঞান চর্চাবাদিদের” কার্যত মুল উদ্দেশ্য হল ধর্ম বা মূলত ইসলাম সম্পর্কে ঘৃণা বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিচা ধারণা প্রচার করা। অথচ বিজ্ঞান ও ধর্ম ধারণা দুটো একে অপরের সমতুল্য ক্যাটাগরি বা প্রসঙ্গই নয়। এছাড়া এরা মুখে বলে থাকে তারা সমাজে ইসলাম ধর্মের প্রভাব কমাতেই বিজ্ঞানচর্চা করতে বা বাড়াতে চায়; এতে যা কার্যত এক গভীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোই হয়ে দাড়ায়। শেষে ব্যাপারটা দাড়ায় সুনির্দিষ্টভাবে একটা ধর্ম ইসলাম – ইসলাম কোপাতে চাওয়া এর উদ্দেশ্য। এই রাজনৈতিক লক্ষ্যটা আসলে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বা বিজেপি-আরএসএসের মত এক উগ্র হিন্দু জাতিরাষ্ট্রীয় ধারণা। এটাই ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই চলে আসা হিন্দুত্ববাদ – উগ্র বা নরম “হিন্দু জাতিবাদই শ্রেষ্ঠ” এমন ধারণা।  অর্থাৎ কার্যত বাংলাদেশের কথিত বিজ্ঞানচর্চাগুলো আসলে হয়ে দাড়ায় হিন্দুত্ববাদের সমর্থক ও হিন্দুত্ববাদের প্রচার-প্রসার ঘটানো;  বা বাংলাদেশে প্রগতিবাদের নামে হিন্দুত্ববাদকে সহনশীল করে হাজির করার ততপরতা। এটাই ফলাফলে বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য জন্মানোর সাফাই বয়ান তৈরি করে। সারকথায় এনিয়ে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী বয়ানটা হল, মুসলমান মানেই যেহেতু জঙ্গী তাই, যেন জঙ্গীবাদকে দুর্বল করতে চাওয়ার কর্মী তারা? তাই যেন বাংলাদেশকে কথিত জঙ্গীবাদের কবল থেকে মুক্ত থাকতে আমাদেরকে ভারতীয় আধিপত্যের আড়াল আশ্রয়ে যেতেই হবে – এই হল তাদের প্রচ্ছন্ন সাজেশন……!

    জাত বা জাতি ধারণায় পরিচয়-আইডেনটিটি খাড়া করতে চেয়ে যেকোন ধর্ম বা বর্ণ, কালচারাল ভিন্নতা অথবা  সাধারণভাবে যেকোন এথনিসিটি [ethnicity] বা জাতপরিচয় এর পক্ষে দাঁড়িয়ে – “এটাই শ্রেষ্ঠ ” – ধরণের প্রচার করতে আমরা সকল ধারাকেই করতে দেখি যা খুবই কমন ফেনোমেনা; এটাই যেকোন রাষ্ট্র বা সমাজের কোন-না-কোন জাতির পরিচয় আঁকড়ে দাঁড়ানো – এটাই দেশের অস্থিতিশীলতার উতস হয়ে দাড়ায় আছে যা প্রকারন্তরে সমাজের জন্য গভীর ক্ষত ও বড় ক্ষতিকর ততপরতাতা। এটা মূলত যা আমার জাত-পরিচয়ের প্রেক্ষিতে “অপর” [others] এমন সকল এথনিক চিহ্ন-পরিচয়ের জনগোষ্ঠিকে জাত-নির্মুলের আকাঙ্খা রূপেই শেষে হাজির হয়ে যায়। যাকে আমরা “সব অপরকে” নির্মুলের এক এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর আকাঙ্খা বা পোড়ামাটির নীতি বলেও চিনি! কারণ,  শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা মাত্রই এর মৌলিক স্বভাব হল নিজের সকল “অপরকে” এই উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা; যার সবচেয়ে বড় ও এক প্রভাবশালী প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইউরোপ-জুড়ে হিটলার বা হিটলারিজমে। আবার ঐসময়ের হিটলারের হাতে নির্মুলের শিকার হওয়া জর্মান ইহুদি জনগোষ্ঠি, তারাও এখন পালটা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল নামে এক “হিটলারী”  রাষ্ট্র বানিয়ে নিজেই হয়ে গেছে মোদী-আরএসএসের মতই আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদী – ইহুদিবাদ যার নাম। অর্থাৎ মনে সেই একই শ্রেষ্ঠত্ববোধ আর ‘অপর’ সকল এথনিক জনগোষ্ঠিকে উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা মনে পুষে রেখে এরাও বড় হচ্ছে, এগিয়ে চলেছে। অথচ কারো শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে – নিজে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাড়া করা এটা কোন প্রতিকার নয় – কারও শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা  নিজেও আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাঁড়া করার মানে হয় না; হতে পারে না।
    দুনিয়ার কোন রাষ্ট্র বা সমাজ এককাট্টা শতভাগ একই এথনিক আইডেনটিটির হয়না। নুন্যতম এক থেকে দশভাগ ভিন্ন এথনিক আইডেনটিটির জনগোষ্ঠি সে সমাজে থেকে যায়। ফলে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার উদ্ভব ও অত্যাচার শুরু হতে দেখা যায়।  অথবা কখনও হয়ত দেখা যায় মোটামুটি একই আইডেনটিটির জনগোষ্ঠির কিন্তু একদল চায় ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব, তো অন্যদল চায় ধর্মভিত্তিক আরেক জাতিবাদী শ্রেষ্ঠত্ব। এরাই নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ববাদের সবচেয়ে বড় সংকট ও স্থায়ী তৈরি করে। অথচ একই সমাজে থাকতে হলে সবার আগে নির্মুল আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হবে; “আমার অপর” যাকে মনে করছি তাকেও পাশাপাশি সমান অধিকার ও মর্যাদায় স্বীকার করে নিতে হবে। তবে সবার আগের প্রধান কাজ হতে হবে যেকোন ধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধ ত্যাগ করতেহবে। ধর্ম-নির্বিশেষে জনগোষ্ঠির সকলকে বাইরে  জুতা খুলে ঘরে প্রবেশের মত করে নিজ নিজ সবধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধকে সমাজ-ঘরে প্রবেশের আগে বাইরে খুলে রেখে আসতে হবে। আমরা নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান রাজনৈতিক অধিকারের – এই নীতিতে দাঁড়ালে শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তির এক রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব।
    যদিও আরেক মুলকথায়, বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটি শব্দগুলো ব্যবহার করে আজীব এক কথিত সেকুলার নামের প্রগতিবাদ এই আড়ালে তারা এথনিক ঘৃণায় তারা “ইসলাম কোপাতে” চাইছে। ইসলাম ঘৃণায় সব ছেয়ে ফেলতে চাচ্ছে; কার্যত যা হিন্দুত্ববাদ। এবং ভারতীয় আধিপত্যের বিস্তারের সহায়ক। ‘জঙ্গীবাদের’ কথা তুলে ভয় দেখিয়ে এরাও হিন্দুত্ববাদের শ্রেষ্ঠত্ব – যা আরেকভাবে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধের ধারক, তাই কায়েম করতে চায়। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য কায়েম ও বাংলাদেশকে তার বাজারে পরিণত করার আরেক কলোনি-চিন্তা!!। বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটির নামে প্রগতিবাদের এভাবে শব্দ ব্যবহার বা এমন মানে করা যে মারাত্মক ভুল ও অন্যায় সেদিকটাই তুলে ধরা এলেখার উদ্দেশ্য।

    র‍্যাশনাল[rational] বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তাঃ
    এখানে এখন প্রাথমিকভাবে র‍্যাশনাল [rational] শব্দের অর্থ কিছুটা বলে রাখা যাক। এই শব্দটাও ইংরাজি দেখাই যাচ্ছে। এর খাস বা সার অর্থ হল – “বুদ্ধি”। মানে বুদ্ধি বলতে বা এমন ধারণাকে কেন্দ্র করে যা বুঝি, তাই!  যেমন রেশনাল শব্দের একটা অর্থ করা হয় – বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন বিচার বা বিচারকারি মানুষ। অর্থাৎ দুটাতেই “বুদ্ধি” ব্যবহার করে যে “বিচারটা” করা হয় তাই বলা হয়েছে। সেই সুত্রে তাহলে এখানে এতে ‘কী’ বলা হয় নাই? বা বাদ রাখা হয়েছে??  সেদিকে যাওয়া যাক, তাহলে র‍্যাশনাল শব্দের অর্থ আরেকটু খুলবে!
    যেমন বললাম, মন আর মগজের লড়াই চলছে!  এখানে মগজ মানে আসলে বুঝানো হয়েছে বুদ্ধি। মগজের ব্যবহার মানে বুদ্ধির ব্যবহার। আর বুদ্ধির বিপরীতে তাহলে কী ধারণা থেকে গেল? বা কী সংশ্লিষ্ট নয়, বাদ পড়ল?? সে প্রশ্নের দিকে আগানো  যাক! এখানে, বুদ্ধির বিপরীতে যা বাদ পড়ে থাকে তা হল মন বা মানুষের আবেগ অনুভুতি।  মানে মানুষের অন্য মানুষের সাথে অথবা মানুষে-মানুষের মধ্যে সম্পর্ক – এই মৌলিক দিক যাকে অনেক সময় বলি আমাদের মানবিক সম্পর্ক। মানুষের রিলেশনাল দিক বা বোধের দিক এটা। এটা বাদ বা বুদ্ধির বাইরে থেকে গেল। এদিকটা আর রেশনাল শব্দটা কাভার করে না বা অন্তর্ভুক্ত নয়। মানুষের আবেগ অনুভুতি বা “সম্পর্কিত বোধ” যেকারণে বুদ্ধির আমলই করে না; করতে পারে না। মানে এটা বুদ্ধি দিয়ে বুঝার বাইরে!

    তাই, শুধুই লজিক, যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে মানবিক সম্পর্ক [human relation] বা মন-কে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে।  আর বাস্তবে আমরা তা করিও না। তাহলে সারকথায়,  র‍্যাশনাল মানে যা কেবল লজিক [logic], রিজন [reason], যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে চলে। মন বা মনের ফিলিং [Feeling] অনুভব ইত্যাদি এসব একদিকে সরিয়ে রেখে এই বিচার করা হয়। [Reason বা রিজন বলতে form judgements logically বুঝতে হবে। মানে “যুক্তিবুদ্ধিতে ভর করে পৌছানো রায়” বুঝলেই আপাতত চলবে।] একারণেই যা লজিক্যাল মানে র‍্যাশনাল তা  রিলেশনাল (মন বা মানবিক সম্পর্ক) দিককে সাথে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে করা কোন বিচার নয়। মানে হিউম্যান বা রিলেশনাল দিক এখানে বাদ থেকে যায়। যেমন যদি বলি, সাধারণত এটাই মানুষের স্পিরিচুয়াল [spiritual] দিক আমলে না নেয়া বা বাদ রেখে চিন্তা করা।  স্পিরিচুয়াল মানে মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে; বস্তগত নানা কিছু ভোগের চাহিদার মত এবং বস্তুগত ভোগের চাহিদা থাকা সত্বেও।  অন্যভাবেও বলা যায়, মানুষের অন্য সকল মানুষ ও প্রকৃতির (কসমিক বা গ্রহ-নক্ষত্র সহ) সবকিছুর সাথে কিভাবে সম্পর্কিত সেই সম্পর্ককে জানা ও অনুভব করার আকাঙ্খাও আছে যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা! কারণ মানুষ দুনিয়ার তাঁর আগমন-আবির্ভাবেই কারণ উদ্দেশ্য কী আর এরপরে তাঁর জীবনের করণীয় কর্তব্য কী তাও এখান থেকেই সে সংগ্রহ (derive) করে বুঝে নিতে  চায়! এভাবে নিজ জীবনকে সামঞ্জস্যপুর্ণ করে সাজিয়ে নিতে চায়। আর এখান থেকেই এই আকাঙ্খা, যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা!!  অর্থাৎ এটা বৈষয়িক বা বস্তুগত আকাঙ্খা নয় বরং বস্তগতগুলোকে ছাড়িয়ে বা transcend করে গেলে তবেই এই আকাঙ্খার হদিস জানা যায়।  এর কারণ সে লক্ষ্য করেছে সম্ভবত এভাবে জীবন না সাজিয়ে নিলে এক গভীর “একাকিত্ববোধ” বা উদ্দেশ্যহীনতাবোধ জীবনকে গ্রাস করে থাকে। এসরের সমাধান পাওয়া থেকেই স্পিরিচুয়াল চাহিদা্কের উদ্ভব ও তা জাগিয়ে রাখা। এথেকেই মানুষের উপলব্দি যে মানুষ মাত্রই রিলেশনাল [relational] বা অজস্র আরো প্রাণ-অপ্রাণ ও প্রকৃতির সাথে সে রিলেশনে আছে সে বা গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছে – এই বোধ তাকে এমন ইঙ্গিত দেয়। এটাকেই আমি বলছি মানুষ “রিলেশনাল” বা relational element। মানুষ মাত্রই সম্পর্কিত বোধে [relational] এর মানুষ।   কিন্তু লজিক বা রেশনালিটি এই রিলেশনাল দিকটা ধরতে পারে না, ছুতে পারে না।
    অন্যভাষায়, তাই আমাদেরকে লজিক বা র‍্যাশনালিটির বিচার ছাড়িয়ে ছাপিয়ে বা ইংরাজিতে ট্রানসেন্ড [transcend] করতে পারলে তবেই মানুষের রিলেশনাল দিক সম্পর্কে জানা যায়, চর্চা করা সম্ভব।

    কিন্তু ষোল শতকে নতুন কী ঘটেছিলঃ
    আবার যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝতে বসে সেখানে মন বা মনের ফিলিং বা অনুভব-কেও খাটাতে চাওয়া তা কোন কাজে আসে না। মানে রিলেশনাল দিকটা সংযুক্ত রাখা বা না-রেখে গতিসুত্রকে বুঝতে গেলে দুই ফলাফলে কোন ভিন্নতা আসে না।  তাতে রেজাল্ট ভিন্ন হবে না। তবে এটা কেবল বস্তগত ফেনোমেনাকে বুঝার ক্ষেত্রে খাটবে। তাই কথা ছিল যে কেবল  বস্তগত ফেনোমেনাকে ব্যাখ্যা বা বুঝবার ক্ষেত্রেই কেবল র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানবুদ্ধিতা, এই চিন্তা পদ্ধতি সীমাবদ্ধ থাকবে। যদিও তা তারা থাকে নাই। কাজেই সংক্ষেপে বললে, র‍্যাশনাল [rational] মানে হল, মগজ বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার। রিলেশনাল দিক থেকেও বিচার নয় এটা।  যার সবকিছু “বুদ্ধি” এই কেন্দ্রিয় ধারণার উপর দাঁড়ানো! এই অর্থে যা র‍্যাশনাল তা আসলে কেবল বুদ্ধি দিয়ে বুঝাবুঝির পথ ও প্রসঙ্গ!

    দুনিয়াতে মানুষের আগমন শুরু থেকেই সে ছিল যাযাবর, মানে দুনিয়ার কোথাও শুরু থেকে কোন ভুমিতে সে থিতু হয়ে বাস করেনি, করে নাই। আর মূলত, খাবার সংগ্রহ ও শিকারের তাগিদে যে এভাবে একেবারেই যাযাবর (Pastoral) ছিল।  আর  কয়েক দশ-লাখ বছরের সেই যাযাবর জীবন শেষে এক সময় মানুষের জীবন থিতু হয়ে এসেছিল। আরেক ভাষায় এটাকেই বলে মানুষের প্রথম কৃষিকাজের জীবনের শুরু বা বলা যায় মাটি কামড়ে কোন ভুমিতে থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক বসবাসের শুরু হয়েছিল যেখান থেকে। একারণেই যাযাবর আর কৃষিকাজ পরস্পর ভিন্ন বা বিপরীত ধারণা! আর শেষের এই থিতু হয়ে বসবাস – এটাকেই মোটামুটি গত ছয় হাজার বছরের মানুষের ইতিহাস বলা হয়। এটাকেই মানুষ এথনিক জীবন-যাপনের ইতিহাস বলে। জাত-পরিচয় বোধের শুরু এমনকি তাই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণার শুরুও একই – এই এথনিক জীবনের শেষের দিক থেকে। আমরা এখন যার বর্তমান প্রান্তে।
    এবার আসেন, এই ছয়হাজার বছরের মানুষ-জীবনের সফরে প্রায় পুরাটা পথই আমরা হেঁটেছি ধর্মতত্বের [theology] হাত ধরে।  অর্থাৎ আমাদের জীবনকে পুরাপুরি গাইড করে গেছে-হেঁটেছে নানা ধর্ম বা ধর্মবোধ থিওলজি। [ইংরাজি থি বা [ The] এর অর্থ হল দ্যা গড বা সমতুল্য আল্লাহ বা ঈশ্বর ধরণের ধারণা। তাই থিওলজি মানে গড বা আল্লাহ-বিষয়ক তত্ত্ব বা জ্ঞান।] তবে এই থিওলজিতে জীবন চলতে চলতে কেবল গত প্রায় পাঁচশ বছর আগের নয়া ঘটনা আসে; যখন নতুন করে এক বিজ্ঞান ও টেকনোলজির চর্চার রূপ দেখা গিয়েছিল – বিজ্ঞানের যুগ বলে! যে যুগে নয়া এক চিন্তার পদ্ধতির রূপ দেখেছিলাম আমরা। সারাংশে বললে সেটা একটা এজাম্পশন (assumption) এর উপর দাঁড়ানো বা আগাম ধরে নেয়া এক ভিত্তিতে যে কিছু ফেনোমেনা বা ঘটনা যা একেবারেই বস্তুগত বা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; আর এনিয়ে চিন্তা চর্চার পদ্ধতি ও এর ভিত্তি লজিক্যাল বা রেশনাল পদ্ধতিতে করা হবে। যেহেতু এগুলো ফিজিক্যাল ফেনোমেনা মানে নিউটনের গতির গতিসুত্র বুঝতে চাওয়ার মত ঘটনা তাই, মানুষের রিলেশনাল দিক বিচার এখানে স্থগিত বা বাদ দিয়ে আগানো যাক।   বা নিউটনের মোশন থিওরি (Laws of motion) বা গতিসুত্রের মত  ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; মানে যার উপর হিউম্যান ফেনোমেনার প্রভাব নাই (তা স্পিরিচুয়ালও নয়) বা এর প্রভাব প্রায় নাই বলে উপেক্ষাযোগ্য। অন্যভাষায় এটাই বিজ্ঞানের যুগ বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিন্তার যুগ। সেই থেকে রেশনাল পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হওয়া এই চিন্তা পদ্ধতিই সাইন্টিফিক, লজিক্যাল বা রেশনাল ইত্যাদি নানান নামে শনাক্ত হতে থাকে। কারণ পরবর্তিতে ইম্মানুয়াল কান্ট [Immanuel Kant] এই চিন্তা পদ্ধতি-কেই তত্বায়িত করেন। মানে আগে ব্যবহার শুরু হয়ে যাওয়া আর পরে কী হয়েছিল তাকে তত্বায়িত (Theorized) করে বলা। মানে এখানে চর্চা থেকে তত্ব এসেছিল, তত্ব থেকে চর্চা নয়। আর শেষে তার লেখা বিখ্যাত আর্টিকেল What is Enlightenment যা ১৭৮৪ সালে লেখা।

    Immanuel Kant: What is Enlightenment?,  1784

    যদিও অর্ধ-শিক্ষিত ও মুসলমান-কোপানিতে ও ঘৃণা ছড়াতে আগ্রহীদের মাঝে এটা বেশ গেথে বসা অনুমান এবং তা ভুল অনুমান যে এনলাইটেনমেন্ট এর ধারণা – এটা নাকি জোঁকের মুখে নুনের মত; যা ধর্ম-কে নাকচ করতে হাজির হয়েছে। তাই যেকোন ধর্ম বা ধর্মতত্বের সামনে এনলাইটেনমেন্ট অথবা  বিজ্ঞান-কে তুলে ধরলেই যেন ধর্ম নাকচ হয়ে যায় তাতে। একারণেই জাফর ইকবালেরা বিজ্ঞানবাদি। বলা বাহুল্য  বলাই বাহুল্য বিজ্ঞানবাদিতা একটা নেতি ধারণা। বুঝে-না-বুঝে ও সীমাবদ্ধতা না জেনে যারা অসৎ উদ্দেশ্যে যত্রতত্র “বিজ্ঞান” মারাতে যায় এরাই “বিজ্ঞানবাদি”। চিন্তার যে পদ্ধতি আছে; পদ্ধতি মেনে চিন্তা চর্চা করতে হয়। এরা তা জানে কখনও শুনেছে মনে হয় না।  বিজ্ঞান মূলত একটা চিন্তা পদ্ধতি; এটাকে র‍্যাশনাল চিন্তা পদ্ধতিও বলা হয়। আর গুরুত্বপুর্ণ কথা হল থিওলজির উপর র‍্যাশনাল চিন্তা-পদ্ধতি প্রযোজ্য নয়।  কারণ থিওলজি মূলত মানুষের সম্পর্ক (যাকে উপরে রিলেশনাল বলে বুঝিয়েছি) বিষয়ক জ্ঞানচর্চা। এই অনুমান ভিত্তিহীন হলেও এটা গভীরে  গেথে বসা সেই ভুল অনুমান। এসব নিয়েই এখানে কথা বলব।

    এই ভুল অনুমানের শুরু হয়েছিল রেনেঁসা আন্দোলন থেকে। এটা আজকের ইটালি তখন যা রোম-কেন্দ্রিক এবং প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের (-৭৫৮ খ্রীষ্টপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দ) লেজ ছাড়ার পরের ঘটনা এবং সেকালে ফ্লোরেন্স ও রোমে বিস্তৃত হওয়া ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী।  ততদিনে (৩১৩ খ্রীষ্টাব্দে) প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য এর সম্রাটসহ সকলেই  ক্যাথলিক খ্রীশ্চান হয়ে গিয়েছে। আর পরে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য ৪৭৬ সাল থেকে ধবংসও হয়ে গেছিল। তবে পরবর্তিতে, হলি রোমান এম্পায়ার (Holy Roman Empire) নামে তবে আজকের ফ্রান্স-জর্মানের মাঝের শার্মেগেলন [Charlemagne] এর সম্রাটের নেতৃত্বে ৮০০ সালের শেষ সপ্তাহে এই নয়া সাম্রাজ্যের শুরু বা পত্তন হয়। কালক্রমে সারা ইউরোপ যার অধীনস্ত হয়, টিকেছিল (কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে) ১৮০৬ সাল পর্যন্ত। যদিও প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সাসথে এর কোনই সম্পর্ক নাই। তবে  সেকালে রেনেসাঁ [Renaissance] আন্দোলন ফ্লোরেন্স ও রোম থেকে শুরু হওয়া হলেও তা ছিল আসলে হলি রোমান এম্পায়ারের আমলে; মানে যেটা কোনভাবেই প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের আমলে নয়। কিন্তু মানুষে দুটা সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভ্রান্ত সাধারণত হয়ে থাকে বলে পুরা ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত করলাম। সারকথায়, রেনেঁসা আন্দোলন যা ১৩০০ থেকে ১৬০০ সালের মাঝের ঘটনাবলী এবং যার সাথে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের কোন সম্পর্ক নাই। যে রোমের অধীনে ছিল স্রা ইউরোপ। কিন্তু রেনেঁসা আন্দোলন প্রাচীন  ফ্লোরেন্স ও রোম শহরে শুরু হলেও পরে ১৪৯৯ সাল থেকে ফ্রান্সের ভিতর দিয়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পরেছিল।  আর ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল সহ সব ধরণের পরিবর্তন আবর্তিত হয়েছিল এই আন্দোলনের কারনে। একারণে অনেকের মনে এটাকে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যেরই কোন ঘটনা মনে করে ভুল করে থাকে। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এর বহু আগেই ৪৭৬ সালেই  প্রাচীন রোম সাম্রাজ্য ধবংস হয়ে গেছিল।

    এখন রেনেঁসা আন্দোলন এর বিচারে ইউরোপে এক “ধর্মের যুগ” ছিল। যেটাকে মোটাদাগে ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ বলে তারা মনে করে আর এটাকেই তাদের কোন কোন ধারা কালো যুগ (Dark age) অথবা  মধ্যযুগ বলে (Middle Ages or medieval period) পরিচিত করায়, এটাকে তারা অতিউতসাহীরা  অন্ধকার যুগ  (dark age period) বলেও মানে করে থাকে। আমরা এই আলোচনায় দেখব কেন তাদের এই ভুল অনুমান; এছাড়া এই অনুমিত ভুল ধারণার কোন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো! যদিও ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল এটা সারা দুনিয়াব্যাপী কোন  অন্ধকারের সময়কাল ধারণা নয়; বরং পুরানা রোম-কেন্দ্রিক শাসিত (বা পরের হলি রোমান এম্পায়ার শাসিত) যে ইউরোপ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটা ধারণা। এবং এর চেয়েও বড় কথা এটা সব ধর্মের বেলায় নয় বরং কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের – মানে সেকালে রোম-শাসিত ইউরোপের ও যা কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের বেলায় এই অর্থে এটা ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল বুঝানো হয়েছে। তবু ইউরোপ পরে এটা সব ধর্মের বেলাতেই যেন প্রযোজ্য এমন অর্থ করে থাকে। এমনকি পুর্ব-ইউরোপ যার বেশিরভাগ অংশ শাসিত হয়েছিল রাশিয়ান জার (১৫৪৭-১৯১৭ সাল) এর অধীনে, এরা থেকে গেছিল অর্থডক্স ক্রিশ্চান। অন্ধকার যুগ-ওয়ালারা এদেরকেও গোনায় ধরে নাই। আমরা এশিয়ার মুসলমানেরা তো আরো দূরে…।

    আর  এই অন্ধকারের ধারণা – এরই বিপরীতে আলোর ধারণা এনে  মানে অন্ধকার কারও উপর “আলো ঢেলে” যেন কিছুকে আলোকিত করে তোলা – এই অর্থেই এর নামকরণ হয়েছে এনলাইটমেন্ট বা en-light-en-ment ।

    এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানোঃ  
    ওদিকে আবার এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানো। এমনকি বিজ্ঞান ধারণাটারও সারকথা হচ্ছে লজিক (logic) আর সেই অর্থে এর আরেক শব্দ হল র‍্যাশনাল (rational) বা বাংলা করে একে যুক্তিবুদ্ধি-সম্মত, এভাবেও বলা যায়। এনিয়ে আলাপ বিস্তারে নিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখা ভাল যে বিজ্ঞান নিজে কোন জ্ঞানের শাখা নয় বরং মানুষের এক চিন্তা পদ্ধতি বা ম্যাথডলজি (methodology)। আর এই চিন্তা পদ্ধতিটাইকেই (বৈশিষ্ট হিসাবে) বলে লজিক্যাল বা র‍্যাশনাল। তবে এই আলোচনার মূল ফোকাস হল বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি এই ধারণাগুলোর ব্যবহার সীমা কোথায় সে সম্পর্কে পাঠককে জানানো। কোথায় কতদুর যাবার পরে বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি ধারণা দিয়ে সেই প্রসঙ্গ আর ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে সেই সীমাকে বুঝা ও বুঝে নেওয়া।  যেমন বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটির জ্ঞান দিয়ে ধর্ম ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে।

    অষ্টাদশ শতকে যুক্তি (reason) ও বিজ্ঞানের বিকাশের সেকালে ইউরোপীয় ইতিহাস যে নয়া রূপ-পদ্ধতিতে হেঁটেছিল একেই এনলাইটেনমেন্ট (আলোকপ্রাপ্ত ) বলে চেনানো হয়েছিল। ইম্মানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant (1724-1804)) তিনি এক জর্মান দার্শনিক তিনিই এনলাইটেনমেন্ট ধারণাকে তত্বায়িত করে সামনে নিয়ে আনেন। এখান থেকেই কান্ট শব্দটা থেকে কানশিয়ান (Kantian মানে যেমন, ইম্মানুয়াল কান্টের লজিক অর্থে) কানশিয়ান লজিক (logic); বা র‍্যাশনালিটি (rationality) ধারণাগুলো প্রচলিত বা ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছিল। তবে এভাবে “তত্বায়িত করেন” বললাম এজন্য যে “থিওরি ও প্রাকটিস” এদুইয়ের সম্পর্ক মানে তত্ব ও তার চর্চা নিয়ে  এদুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটা কথা চালু আছে সেটা এরকম যে কোন তত্ব আগে না ওর ব্যবহার বা চর্চা আগে ঘটেছিল। এই তর্কের সমাধান হল, দার্শনিকেরা আগে তত্ব তৈরি করেন, এরপর ওর ব্যবহারিক রূপ তৈরি হয় ঠিকই। এরপরে আবার ঐ চর্চিত রূপ থেকে পুনরায় নয়া তত্ব-ও তৈরি হতে পারে। কান্টের ক্ষেত্রে তাঁর তত্বের আগেই এর ব্যবহার শুরু হয়েছিল। পরে কান্ট সেসব ব্যবহারিক ধারণা থেকে সেগুলোকে তত্বায়িত করে সাজিয়ে যা এনেছিলেন সেটাই কানশিয়ান লজিক ও  রাশন্যালিটি ধারণা।

    “বিজ্ঞান” কী কোন জ্ঞানের শাখাঃ
    এদিকে বিজ্ঞান ধারণাটা নিয়ে আমাদের মধ্যে আবার এটা সবরোগের ওষুধ যেন এমন ধারণা আছে।  বিশেষ করে আপনি যদি ধর্ম কোপানোর বা নাকচ করার হাতিয়ার বুঝা ও ফেরি করা লোক হয়ে থাকেন। তাদের ধারণা হয়ে থাকে বিজ্ঞান দিয়ে ধর্ম বা ধর্মতত্ব-কে (Theology) পরাস্ত করা সম্ভব। কিন্তু আসলেই কী তাই???

    দুঃখিত, তা অবশ্যই না।
    এমনিতেই থিওলজি ও বিজ্ঞান দুটা সমতুল্য ক্যাটাগরি নয়। থিওলজিকে যে অর্থে জ্ঞানের একটা ব্রাঞ্চ বা শাখা বলা যায়। তাহলে বিজ্ঞান কী কোন জ্ঞানের শাখা???  আমরা যেমন ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বাইলজি বা ইতিহাস, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন জ্ঞানের শাখা সম্পর্কে সম্পর্কে জানি; তাহলে বিজ্ঞানও কি তেমন আরেক জ্ঞানের শাখা? অবশ্যই না। আবার সাইন্স, আর্টিস, কমার্স সমাজ-বিজ্ঞান কিংবা শিল্পকলার কোন শাখায় পড়াশুনা করি তেমনই আর্টস বা শিল্পকলাতেও কী বিজ্ঞান থাকে? এর জবাব কি হবে??
    আপাতত দ্রুত জবাবে চলে যাব, কারণ কম কথা বা মূল কথায় এর জবাব হল – বিজ্ঞান নিজে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বা ইতিহাস এর মত কোন জ্ঞানের শাখা নয়। তাহলে বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞান হল জ্ঞানের পদ্ধতি বা  এক চিন্তা পদ্ধতি। আর সেকারণে শিল্পকলাতেও বিজ্ঞান থাকা সম্ভব আর তা সত্যিই আছে। মানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে।  সব জ্ঞানের শাখাই বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া বা জানা হয়ে থাকে।  মানুষ মাত্রই আবার রাশনাল এন্ড বিয়ন্ড (rational & beyond) । মানুষ রাশনাল অবশ্যই কিন্তু একই সাথে একে ছাড়িয়েও (Beyond) আরও অনেক কিছু। এই ছাপিয়ে যাওয়া বা ট্রান্সশিয়েন্ট (transient) – এটাও র‍্যাশনালিটির উপরে মানুষের আরেক স্বভাব বৈশিষ্ট।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    অসমাপ্ত, বাকিটা দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে দেখুন।
    দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4lO

    [এই লেখার একটা প্রথম ভার্সান আগে  একটা ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। পুরানা সেই লেখার লিঙ্ক দেখেন এখানে।   আর তা ছাপা হয়েছিল গতমাসে মানে গতবছর, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ও তা হয়েছিল ইসলামি ছাত্র আন্দোলন এর কেন্দ্রীয় সম্মেলনের স্মারকে প্রকাশিত প্রকাশনায়। স্বভাবতই সেটা প্রথম ভার্সান বলে তা এখানে এই সর্বশেষ ফাইনাল ভার্সান এর চেয়ে আকারে অনেক ছোট ছিল। আমার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত  বর্তমান এই রচনা ফাইনাল ভার্সান বলে বিবেচিত হবে। যদিও দু ভার্সানের লেখার নামে  অনেক ফারাক করে দিয়েছি, গুহুবহু একই নাম রাখি নাই। আশা করি লেখাটা উপভোগ্য হবে। এই ই-মেল ঠিকানায় প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।]

  • মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    মোদির আত্মঘাতি গোল খাওয়া ও তারপর……

    গৌতম দাস

    ২৪ অক্টোবর ২০২২  ০০ঃ০৬ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-4gr

     

          ..condemning hate speech unequivocally: U.N. Secretary-General António Guterres

    ‘ইউনাইটেড নেশনস’[United Nations] শব্দটার বাংলা হিসাবে ‘জাতিসংঘ’ শব্দটার ব্যবহার সম্ভবত বেশিরভাগ বাঙালি করে থাকেন। তবে কলকাতার আনন্দবাজার অনুবাদ করে ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ’ লিখে থাকে।  আনন্দবাজারের বেশির ভাগ ততপরতা অপছন্দের হলেও এই অনুবাদটা বেশি সঠিক ও অনেক অর্থপুর্ণ। কারণ ‘জাতি’ শব্দ ও ধারণা-টা মানে কোনভাবেই তা রাষ্ট্র নয়; যদিও না জেনে আমরা অনেকেই এই ভুল করে থাকি। খোদ রাষ্ট্রপুঞ্জ (বা জাতিসংঘ) – এই প্রতিষ্ঠানই জন্মের সময় থেকে নিজেকে ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বলে নিজেকে পরিচয় দিয়ে আসছে। তবে এর স্বপক্ষে একটাই সাফাই-যুক্তি এবং তা খুবই দুর্বল সেই যুক্তিটা হল – সেসময় বেশির ভাগ রাষ্ট্র মানে মর্ডার্ণ রাষ্ট্র বলতে সেটা এক ‘জাতিরাষ্ট্র’ বা Nation State ধারণা বলে বুঝবার প্রাবল্য ছিল। যেটা পরের আট বছরের মধ্যে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের বেশির ভাগ রাষ্ট্র এই ভুল সংশোধন করে নিয়েছিল। যার পর থেকে ইউরোপের অন্তত ৪৬ টা রাষ্ট্র  আর নেশন স্টেট নয়, অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র হয়ে যায়। [ এনিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন কাউন্সিল অফ ইউরোপ [COE]।   রাষ্ট্রসংঘের বর্তমান মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল হলেন আন্তোনিও গুতেরেস (Antonio Guterres)। এই সেক্রেটারি জেনারেল-ই হলেন রাষ্ট্রপুঞ্জ-এর সর্বোচ্চ নির্বাহি প্রধান।

    এখন আজকের প্রসঙ্গে আসি। ঘটনা হল, ভারত বিশেষ করে এর প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্ভবত আর কোনদিন যাতে গুতেরেস ভারত সফরে না আসতে পারেন এর সব বন্দোবস্ত করবেন; তা অবশ্যই নিশ্চিত করবেন! কেন?
    গুতেরেস ভারত সফরে এসেছিলেন গত বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর সরকারি আমন্ত্রণে। গত ২০০৮ সালের ভারতের ভাষ্যমতে মুম্বাইয়ে “টেররিস্ট আক্রমণের বার্ষিকী” পালনের অনুষ্ঠানে, ঐ হামলার আহত-নিহতের প্রতিশ্রদ্ধা জানাতে। আর ঐ হামলা ছিল কাশ্মীর-কেন্দ্রিক কিছু সশস্ত্র প্রতিবাদী গ্রুপের যারা পাকিস্তান থেকে ভারতের মুম্বাইয়ে এসে ২০০৮ সালে “তাজমহল প্যালেস হোটেল” দখল করে ঐ হামলা চালিয়েছিল।

    তবে এবার, মোদি সম্ভবত চেয়েছিলেন গুতেরেসের এই সফর থেকে তিনি গ্লোবাল মিডিয়া মনোযোগ হাসিল করতে পারবেন যাতে তিনি ভারত সরকারের কাশ্মীর নির্যাতন নিপীড়ন দমনের অভিযোগ আড়াল করে এর উপরে বা বিরুদ্ধে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রসবাদী আক্রমণের কথা তুলে সেটা ঢেকে ফেলতে বা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিপীড়ন-কে জায়েজ করতে পারবেন।
    নেহেরুর আমল থেকে ভারত চেষ্টা করে যাচ্ছে এটা দেখাতে যে ভারতের কাশ্মীরের সমস্যা যেনবা কাশ্মীরীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে হাজির হয়েছে। এটা যেন এক “সন্ত্রাসবাদি” সমস্যা! এবং তা যেন সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয়েছে! অথচ এটা শতভাগ মিথ্যা। ভারতের কাশ্মীরে সশস্ত্র ততপরতার শুরু ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের রাজ্য নির্বাচনে কেন্দ্রসরকারের ব্যাপক কারচুপির ঘটনা থেকে। কারণ ঐ কারচুপির পরে ক্ষুব্ধ ও হতাশায় পড়া কাশ্মীরীদের প্রতিক্রিয়া থেকে তারা সশস্ত্র ততপরতার দিকে ঝুঁকে যায়; আপন করে নেয়। অর্থাৎ (১৯৪৭ সালের পর থেকে) ১৯৮৭ সালের আগে পর্যন্ত এর আগে ভারতের কাশ্মীরে যত বিবাদ বা ক্ষোভই থাক না কেন; সেখানে একটা রাজ্য-নির্বাচনী ব্যবস্থাই চালু ছিল আর এই নিরস্ত্র ব্যবস্থাটাই ছিল ক্ষুব্ধ কাশ্মীরীদের প্রধান রাজনৈতিক ততপরতা। সারকথায়, ভারত সরকারই রাজ্য নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপি করে ফলাফল উলটে দিয়ে কাশ্মীরীদেরকে সশস্ত্রতার পথে ঠেলে দিয়েছিল।

    মোদি ভেবেছিলেন এবার গুতেরেসকে অতিথি করে এনে তিনি কথিত সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে জনমত যোগাড় করে নিজ আকামের পক্ষে মিডিয়া মাইলেজ যোগাড় করে নিবেন। কিন্তু এখন ফল হয়েছে উলটা। মোদি ও তাঁর সরকার আত্মঘাতি গোল খেয়ে গেছেন। কারণ,  গুতেরেস উলটা মোদি সরকারের হিউমান রাইট লঙ্ঘণ ও মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন বৈষম্যের কথা তুলে বক্তৃতা করেছেন আর  মোদি সরকারকে তা সংশোধনের আহবান রেখে গেছিল। তবে এই আহবান তিনি মূল অনুষ্ঠানে নয় বরং পরে, মুম্বাইয়েরই আরেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
    সেখানে, একাজে তিনি শব্দ হিসাবে ব্যবহার করেছেন ডাইভারসিটি [Diversity] ও প্লুরালিজম [Pluralism] । মানে গুতেরেস বলতে চাচ্ছেন, একটা রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের ভিত্তিতে –  বহু ধর্ম ও বহু মত ও পথ কে পাশাপাশি কার্যকর থাকতে পারে এমন ভিত্তির একটা রাষ্ট্রগড়ে তুলতে পারলে একমাত্র তাতেই একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব হতে পারে। এভাবে বৈচিত্র ও ভিন্নতায় নাগরিকেরা সকলে পাশাপাশি কার্যকর থাকা ও পরস্পরকে জায়গা করে দেওয়া নিশ্চিত করতে পারলে সেটাই হবে রাষ্ট্রের শক্তি।
    ভারতের দ্যা হিন্দু লিখছে তিনি বলেছেন,   “রাষ্ট্রে জনবৈচিত্র থাকলে সেটাই সমৃদ্ধি আনবে যা একটা দেশকে শক্তিশালী করে। এই বোধ-অনুভবকে লালন ও শক্তিশালী করা এবং প্রতিদিনের চর্চায় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা উর্ধে তুলে ধরে তা শক্তিশালী ও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত যারা দুঃস্থ অবস্থায় আছে তাদেরকে সাথে নিতে বহু-সংস্কৃতি, বহু ধর্ম ও এথনিক জনগোষ্ঠির এক সমাজ গড়তে হবে; যেখানের সকলে একসাথে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তব্যকে একস্বরে নিন্দা জানাতে হবে”।
    আর এখান থেকেই মূল শব্দ উঠে এসেছে “হেট স্পিচ” [Hate Speech] বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায় এমন বক্তৃতা – এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহবান।

    “Diversity is a richness that makes your country stronger. That understanding…must be nurtured, strengthened and renewed every day by practising the values of Gandhi; by securing and upholding the rights and dignity of all people, especially the most vulnerable; by taking concrete action for inclusion, recognising the enormous value and contributions of multi-cultural, multi-religious and multi-ethnic societies; by condemning hate speech unequivocally,” Mr. Guterres said

    স্বভাবতই এতে পুরা ব্যাপারটাই মোদির হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে শক্ত সমালোচনা ও নিন্দা হয়ে উঠে এসেছে। ফলে তা হয়ে উঠেছে মোদির হিন্দুতেবাদেরই কঠোর সমালোচনা। কারণ, গত অন্তত তিন বছরে মোদি এই হেট স্পিচের উপরে ভর করে যাচ্ছেন; মোদি যেকোন নির্বাচনে জিতবার উপায় হিসাবে একে হিন্দু-ভোট মেরুকরণ ও ভোটবাক্স ভর্তি করার কৌশল ব্যবহার করে চলেছেন।

    তবে গুতেরেসের হেট স্পিচের কঠোর সমালোচনা দিয়েই প্রসঙ্গটা শেষ হয়ে যায় নাই। বরং বলা যায়, এতে সরকার প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ন্যাংটা করে ছেড়েছে। যদিও সেটা ছিল প্রথম পর্যায়। এবার এর দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে লিখছি।

    ঘৃণা-ভাষণের বিরুদ্ধে কঠোর না-হলে অবমাননার মামলা, প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

    হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলিঃ
    আসলে এখন শুরু হয়েছে এই হেট স্পিচের দায় কে নিবে তা নিয়ে ঠেলাঠেলি! এখানে আসামি বা পার্টি আসলে তিনটা! কথাটা অন্যভাবে বললে,  একটা রাষ্ট্র ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যায় মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠানের নিস্ক্রিয়তায়। যার প্রথমটা হয়ে থাকে সরকার বা ক্ষমতার নির্বাহি বিভাগ’ অর্থাৎ এর বৈষম্যমূলক আচরণ ততপরতা থেকে। এদের নিজ বিশেষ দল ও শ্রেণীর নাগরিককে ফেবার করা ও অন্যান্যদেরকে নিগৃহিত করা থেকে এর শুরু হয়ে থাকে।
    এখন  নির্বাহি ক্ষমতার এই গর্হিত কাজকে যদি বিচার ব্যবস্থা আমল না করে এবং ক্ষতিগ্রস্থ নাগরিককে প্রতিকার না দেয় এখান থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়। এমনকি যেখানে বিচার ব্যবস্থার হাতে স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবার ক্ষমতা দিয়েই রাখা থাকে; তবুও দেশের বিচার বিভাগ সেই ক্ষমতাকে প্রয়োগ-ব্যবহার না করে পাশ কাটিয়ে  যাওয়া থেকেই সংকট শুরু হয়ে থাকে। আর তৃতীয় পর্যায়টা হল নির্বাচন কমিশনের, এদের অকেজো হয়ে বয়াসে থাকা থেকে। কারণ তাদেরকেও ক্ষমতা দেয়া থাকে যে ক্ষমতাসীন বা বিরোধি দল যখন নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করতে ডুবে যাচ্ছে অথচ কমিশন এনিয়ে কোন ব্যবস্থা না নেয়। অথচ কমিশন যেকোন রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে শুনানি শেষে অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রতিকার হিসাবে ঐ দলের রেজিষ্টেশন বাতিল করে দিতে পারে।

    সারকথায় বললে,  এখন শুরু হয়েছে এই তিন পর্যায়ের তিনটা প্রতিষ্ঠান যাদের দায় ছিল ক্ষমতাসীনদের হিন্দুত্ববাদের ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; অথচ এই তিন প্রতিষ্ঠানের কেউই তা করে নাই। অর্থাৎ  নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে থাকা প্রশাসন এর দায়ীত্ব ছিল মানে আমাদের ভাষায় ডিসি-এসপির দায়ীত্ব ছিল হেট স্পিচের বিরুদ্ধে একশনে যাওয়ার। কিন্তু তারা কেন্দ্র সরকার বা রাজ্যের হিন্দুত্ববাদি দলীয় আচরণের পক্ষে চুপ করে থেকে তাদের সহায়তা করে গেছে। যেমন,  পশ্চিম দিল্লির বিজেপি সাংসদ পারভেশ ভার্মা হিন্দু সভার একটি বৈঠকে মুসলিম সম্প্রদায়কে সামাজিকভাবে বয়কটের ডাক দেন। তিনি বলেন, “ওদের সবজি কিনবেন না। ওরা মাছ-মাংসের দোকান খুলে বসবে। ওদের সোজা করতে সামাজিক বয়কট করুন”। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন একশন হয় নাই। সবচেয়ে বেশি ঘটনা উদাহরণ ঘটেছে যোগীর উত্তর প্রদেশে। এছাড়া, ত্রিপুরা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ বা কর্ণাটক রাজ্যে হিজাব ইস্যুসহ নানান মুসলমান নিপীড়ন-মূলক সরকারি সিদ্ধান্ত বা একশন ঘটেছে।  দিল্লিতে পরিকল্পিত দাঙ্গায় সব তছনছ করে দেয়া হয়েছে।  দিল্লিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক সভায় বক্তা হিসেবে ছিলেন জগৎ গুরু যোগেশ্বর আচার্য। তিনি বলেন, ‘যদি দরকার হয়, হাত কেটে নাও। গলা নামিয়ে দাও। সবচেয়ে বেশি তোমার জেল হবে। কিন্তু এই সমস্ত লোককে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। বেছে বেছে মারো।’
    কিন্তু বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন এসব ঘটনা আমলই করে নাই; পাশ কাটিয়ে চলে এসেছে।

     

    কিন্তু এখন ঘুম ভাঙ্গে নাই, বরং দায় অন্যের ঘাড়ে ঠেলে ফেলার দৌড়াদুড়ি শুরু হয়েছে। গুতেরেস বক্তব্য রেখেছিলেন ১৯ অক্টোবর ২০২২। আর ২১ তারখেই ভারতের সুপ্রিমকোটে প্রধান বিচারপতি যেন জেগে গেছেন। আনন্দবাজার লিখেছেঃ ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।

    ভারতে ঘৃণা-ভাষণের প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে দিন দুয়েক আগে সরব হয়েছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেস। এবার সেই প্রসঙ্গেই কড়া মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। ঘৃণা-ভাষণের ঘটনায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত।  …… শুক্রবার সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে। ঘৃণা-ভাষণ সংক্রান্ত ওই মামলায় বিচারপতিদের মন্তব্য, ‘‘আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ধর্মের নামে কোথায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা?’’

    তার মানে দেখা যাচ্ছে – ” ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনায় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে আদালত অবমাননার মামলা রুজু করা হবে – সুপ্রীম কোর্টের এই ক্ষমতা তো আগেও ছিল কিন্তু তা এতদিন ব্য৭বহার করা হয় নাই কেন?
    সবচেয়ে বড় কথা, যে দেশের সুপ্রীম কোর্ট কে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের সমালোচনার পরে জেগে উঠতে হয়, নিজ ক্ষমতা নিয়ে সে জেগে উঠে – সেদি রাষ্ট্র আসলে অনেক আগেই মৃত! আর এতে এখন আমরা যা দেখছে সেটা ব্যক্তির দায় নিয়ে ঠেলাঠেলি বৈ আর অন্য কিছু নয়!

    বরং সুপ্রীম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করে যে ভারতের এই বিচার বিভাগ আসলে মৃত! হিন্দুত্ববাদ পুরা রাষ্ট্র আর তার আসব অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সবকিছুকে আসলে খেয়ে ফেলেছে…। 

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • নাসিরুদ্দিন শাহরা ‘কথিত সেকুলার’ ভাঁড়ে পরিণত 

    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা “কথিত সেকুলার” ভাঁড়ে পরিণত 

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০৫ পিএম  

    https://wp.me/p1sCvy-3LG

     

    Had great faith when Modi ascended to power in 2014: Naseeruddin Shah

    [সার-সংক্ষেপঃ  ভারতের নাসিরুদ্দিন শাহরা অবুঝের মত কথা বলছেন। তারা ভারতের রাজনীতি নাকি নিজের ধর্ম – কোনটার সংস্কার চান, সেটাই পরিষ্কার নন বা পরিস্কার করছেন না। তিনি যে ধারণার উপর ফিরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন তা কংগ্রেসের কথিত-‘প্রগতিবাদী’ রাজনীতি; যা এখন নিজগুণেই পরাজিত ও মৃত।  আমরা তিন দেশ ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে এটাই জন্ম থেকেই আজও অশান্ত ও দুর্বল করে রেখেছে। এবং এখনও সমাধান করতে সক্ষম না হলে আগামিতেও আরও অশান্ত থাকতে বাধ্য হবে।  অথচ নাসিরুদ্দিন শাহরা তা বুঝতে পারছেন মনে হয় না।]

    কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের রাজনীতি ভারতেই আজ মৃত। কংগ্রেসের ক্রমে নিঃশেষ, মুছে যাওয়া আর বিজেপির দু’বার বিজয়ই এর প্রমাণ। হিন্দুত্ববাদের বিজেপি হয়ত আবার জিতবে বা জিতবে না, কিন্তু কংগ্রেসের রাজনীতি শেষ ও বিলুপ্ত, এটা আর ফিরে আসবে না, তা আমার কথা নয়। গত নির্বাচনে রাহুল গান্ধী নিজেই “সফট হিন্দুত্ববাদের” ভিত্তিতে ও পক্ষে ভোট চেয়ে তা প্রমাণ করেছেন। অর্থাৎ ভারতে প্রধান দুই দলের এখন একটাই রাজনীতি – হিন্দুত্ববাদ। সাথে এখানে বলে রাখা ভাল অনেকের হয়ত খেয়াল করে দেখাই হয় নাই যে “হিন্দুত্ববাদ” জিনিষটা কী!

    আগে বলে নেয়া যাক হিন্দুত্ববাদ কী নয়! এর মানে, কেউ হিন্দু (বা সনাতন) হলে সে হিন্দুত্ববাদী বা খারাপ তা এখানে বলা হচ্ছে না, হয় না। হিন্দু হওয়া খারাপ তাও না। এককথায়, হিন্দুত্ববাদ আর হিন্দু মানে একই কথা একেবারেই নয়। কেউ হিন্দু হয়েও হিন্দুত্ববাদি নাও হতে পারেন। তবে হিন্দুত্ববাদি সকলেই হিন্দুও।   ব্যাপারটা হল আজও কংগ্রেস এবং বিজেপি – প্রথমটা সফট [soft]  আর পরেরটা ভারি হিন্দুত্ববাদী হলেও এদুই দলের বাইরে এখনও অনেকেই হিন্দু থাকতে পারেন এবং তারা আছেনও।

    আবার, কেউ হিন্দুত্ববাদী হলে সেটা খারাপ এজন্য যে এটা উগ্র হিন্দু জাতিবাদ বা ন্যাশনালিজম। তবে উগ্র বা নরম যেটাই হোক এটা খারাপ। চিন্তা হিসাবে বিপদজনক। কারণ এগুলো “আমার জাতি শ্রেষ্ঠ” ফলে অন্যদের উপরে আমার স্থান – এধরণের জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর ধারণা; বলাই বাহুল্য সব জাত শ্রেষ্ঠত্ব ধারণাই বিপদজনক ও ক্ষতিকর। হিটলারের মত অন্য-সব জাতিগোষ্ঠিকে পুড়িয়ে মারার মত ধারণা –  এথনিক ক্লিনজিং ধারণা।  কোন ধর্ম বা কোন জনগোষ্ঠির মনের গহীনে “নিজ-জাত-শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা দুনিয়ার বাকি সব জাতিগোষ্ঠির জন্য বিপদজনক এবং পাশাপাশি অন্য কোন জাতিগোষ্ঠির সাথে বসবাস-অযোগ্য এক “জাতিবোধ।  তাতে এই জাত বলতে তা ইংরাজিতে race অথবা ethnic যাই বুঝাক বা যে অর্থেই জাত বা জাতি বুঝাক না কেন। সবার বেলাতেই সত্য। হিন্দুত্ববাদ একটা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারণা।

    আসলে, যেকোন  ধরণের জাতি-ধারণা মধ্যেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণা সুপ্ত বা লুকানো থাকেই।  আর তাই যেকোন সময় তা বের হয়ে এসে আমরাও একেকটা জাতি হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলার হয়ে উঠতে পারি। হিটলারের মত “আমরা দেহে নীল চোখের এরিয়ান রক্ত বা ব্লাড, আমরা হলাম দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আমরা জাত-শ্রেষ্ঠ। এই ছিল হিটলারের মুখ্য বয়ান। আর এটাই সব রেসিস্ট (বর্ণবাদী racist) – এদের কমন ডায়লগ আর চরম ক্ষতিকর বয়ান। দুটা শব্দ দিয়ে এদের চিনা বা চিনানো সম্ভব। আমরা চেক করতে পারি তারা রক্ত  অথবা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলছে কিনা!  অথবা আমরা মহান বা  আমরা মহান জাতি; আমার ভারত মহান বা আমার জর্মানি মহান ইত্যাদি ধরণের বয়ান দেয় কিনা! আর এখানে  রক্ত মানে তাদের রক্ত নাকি সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ, এই তাদের দাবি।  একারণে কংগ্রেস বা বিজেপির “হিন্দুজাতি রাষ্ট্র” গড়তে চাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ গড়া একই কথা।  অনেক সময় আমরা অজানায় আরেকটা জনগোষ্ঠিকে  নিচা দেখানো যায় এভাবে শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে ফেলি – তাই এটা অবশ্যই রেসিজম এবং ক্ষতিকর । [যেমন পাকিস্তানিদের আমরা ‘পাকি’ বললাম।] আর এভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিক হল, এতে একটা রাষ্ট্রের ভিতরে আর সকলেই সম-নাগরিক অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ বা সম্ভাবনা থাকে না। নাই হয়ে যায়।  কাজেই মূলকথা কারও হিন্দু নাগরিক হওয়া (যেটা কোন সমস্যা নয়) আর হিন্দুত্ববাদী নাগরিক হওয়া এক কথা নয়।

    ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রভাব অর্থে বা ট্রেন্ড অর্থে বলতে পারি কংগ্রেসের রাজনীতির পতন হয়েছে।  অর্থাৎ উগ্র-হিন্দুবাদকে লুকানো রেখে আড়াল নেয়া হিন্দুত্ববাদ পরাজিত হয়েছে। আর এতে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দুজাতিবাদ উদাম হয়ে বিজেপি নামে ক্ষমতাসীন। অথচ নাসিরুদ্দিনরা যা নাই, যা মৃত, সেই কংগ্রেস-প্রগতিবাদীদের অলীক সেক্যুলার ভারতে ফেরার দাবি করছেন! গত বছর (২০২১) সেপ্টেম্বরে তার ফেসবুক ইউটিউবে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু বক্তব্য প্রচার করছেন সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    মনে রাখতে হবে, রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজেরই পরিণতি হল – এক হিন্দুজাতি রাষ্ট্র, হিন্দু নেশন স্টেটের ধারণা-কল্পনা। আর শেষে এরই বাস্তব রূপ হল ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া  ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া অনুমোদিত প্রথম রাজনৈতিক দল ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’ বা সংক্ষেপে কংগ্রেস। হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র কায়েম যার লক্ষ্য। বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে উস্কে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে পরিণতিতে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের আরেক রাষ্ট্র গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হবে। তাই হয়েছে …

    নাসিরউদ্দিন শাহ এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ
    নাসির উদ্দিন শাহ এর মূল পাবলিক পরিচয় তিনি দক্ষ শক্তিমান অভিনেতা ও পরিচালক তো বটেই; তিনি তিনবারের “ফিল্মফেয়ার” পুরস্কার প্রাপ্ত, তিনবার ভারতীয় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং একজন “পদ্মভূষণ” পুরস্কারপ্রাপ্ত। দিল্লির স্বনামে পরিচিত, “ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা” [NSD] এই ইন্সটিটিউটের ১৯৭৩ সালের গ্রাজুয়েট। আমার ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতায় বললে, আমাদের তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়  জীবনে আশির দশকে আমরা তাঁর বিখ্যাত অভিনয় ও সিনেমাগুলো দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। নিঃসন্দেহে তিনি একজন ভাল পারফর্মার। হাতে গোনা কিছু সফল লোকেদের একজন একজন তিনি। যদিও সেকালের এক অর্থহীন আবেগী ভাষ্য অনুসারে বললে, আমরা “পুঁজিবাদবিরোধী সিনেমা” দেখতে চাই এমন ভাষ্যের কথা চালু হয়েছিল। এরই অধীন   কথিত “প্যারালাল সিনেমা” আন্দোলন এক ব্যর্থ অভিজ্ঞতা ছিল সেগুলা, তা অবশ্যই। কিন্তু এখানে আমাদের আলোচনার  বিষয় এসবের একেবারেই বাইরে। তাই এখন আর সেদিকে যাচ্ছি না।

    বলা যায় মোদির আমলের ভারত (২০১৪-এখনও) এইকালে চরম অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ নাসিরউদ্দিন শাহ এর ক্ষোভ আর তা থেকে তোলা হিন্দুত্ববাদী বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ে নাই। বিশেষ করে গত বছর থেকে। যার মূল কারণ হল, চরমতম মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন মোদি বিজেপি ও তার দলবল। যার পিছনে আছে ভারতের কোভিড দুরবস্থায় মোদি প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ফেল করা থেকে। সেখান থেকে অর্থনৈতিক সংকট, কাজ হারানো, চিকিতসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া ইত্যাদি। আর এত হারিয়ে ফেলা জনমত যা মোদিকে কোনঠাসা করে তুলেছে আর এই সংকট মোকাবিলায় মোদি নিয়মিত চলমান মুসলমানবিদ্বেষকে আরো চরমে তুলে এথেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হিসাবে একে হাজির করেছেন।
    যেমন, আফগানিস্থানে তালেবান-উত্থানে ভারতীয় মুসলমানদের উচ্ছাস প্রকাশ – এর বিরুদ্ধে নাসিরউদ্দিন শাহ  নিজের কথিত “সেকুলার অবস্থান” দিয়ে মোকাবিলা করতে গেছিলেন। আর এতে পরিণতিতে তিনি না ঘরের না ঘাটের অবস্থান পড়েছেন। এতে না ভারতীয় মুসলমানদের আম প্রধানধারা তাকে আপন করতে পেরেছে না এখনকার হিন্দুত্ববাদ প্রভাবিত ভারতের প্রধানধারা তাদেরঅও অন্তত এলিট বা সেলিব্রেটি বলে নাসিরউদ্দিনকে জায়গা করে দিয়ে পেরেছে। অথচ সবখানেই নাসিরউদ্দিন শাহ তার কাম্য তবে মৃত ও কথিত সেকুলারিজম খুজে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।
    কাশ্মীরের মুসলমান হত্যা-নিপীড়ন এর পক্ষে হিন্দুত্ববাদী সাফাই বয়ান তৈরির সিনেমা “কাশ্মীর ফাইলস নিয়েও নাসিরউদ্দিন শাহ কড়া প্রতিবাদ করেছেন। করেছেন তার কথিত সেকুলারিজম এর উপর দাঁড়িয়ে। অথচ এই কংগ্রেসি সেকুলারিজম (১৯৪৭-৯০ এর দশক) সেকালেও কিছুর সমাধান করতে পারে নাই। গান্ধী নিজেই খুন হয়ে গেছেন তাও না! আর নব্বই এর দশক থেকে ভারতে  কথিত সেকুলারিজম ক্রমেই শেষ প্রভাবটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল। আর এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদের জমানা।
    মূলকথাটা হল, স্বাধীন ভারত জন্মের আগে থেকেই “কংগ্রেসি সেকুলারিজম” – এটা ছিল এক মিথ্যা অবলম্বন। অকেজো রাষ্ট্রনীতি। কারণ খোদ কংগ্রেসের জন্মই হয়েছে খোদ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়ার খায়েসে। যার সুপ্ত ও মৌলিক লক্ষ্য হল “হিন্দু আধিপত্য” কায়েম। এর ভিত্তিতে রাষ্ট্র-সমাজ গড়তে হবে।
    অথচ কোন আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার চিন্তার মধ্যে যেকোন জনগোষ্ঠির যদি অন্যের উপর “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনা থেকে যায় তবে নিয়মিত সামাজিক সংঘাত তো চলারই কথা! এবং তাই ঘটে চলেছে। সারা কংগ্রেসি আমল এটা এভাবেই চলেছে। আর এই নোংরা চেহারা ঢাকতেই মিথ্যা-প্রলেপ হিসাবে আনা হয়েছিল কথিত ও অর্থহীন সেকুলারিজম ধারণা। অথচ সারা কংগ্রেসি আমলে হিন্দু “আধিপত্য” কায়েমের স্বপ্ন-কল্পনায় কোন বদল আনা হয় নাই। তাই, এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। তা সত্বেও নাসিরউদ্দিন শাহ এর মত ভারতীয় মুসলমানেরা নিজের সাথেই প্রতারণা করে নিজেকে বুঝ দিয়েছে যে না – কংগ্রেসি সেকুলারিজম ভাল ও তাদের কাম্য। তাদের সুরক্ষা দিবে!! এটা দিতে পারবে না। কারণ, হিন্দু “আধিপত্য” কায়েম কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য – তাই এটা জারি রেখে এরপর আর মুসলমানদের জন্য এটা আর রক্ষাকবজ হতে পারতে না।

    এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণাঃ
    অথচ এই সেকুলারিজম ধারণাটাই প্রতারণা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল  এর সাথে আরেকটা শব্দ আছে “অসাম্প্রদায়িক”। মুল শব্দটা তারা বানিয়েছে – সাম্প্রদায়িক বা কমুনাল (communal)। এখন কমুনাল বা সাম্প্রদায়িক শব্দের মানে কী?
    সাম্প্রদায়িক শব্দটা আসলে “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের যে বাসনা তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এরই এক্সটেনশন বা বিস্তার করতে গিয়ে তৈরি এক ধারণা। যেমন এই প্রশ্নের জবাব কী যে, “হিন্দু আধিপত্যের সমাজ গড়ার যে বাসনা তাহলে মুসলমান বা অন্যধর্মের লোকেরা  সেখানে কীভাবে বসবাস করবে? এর জবাবে “হিন্দু আধিপত্য” আগ্রহিরা বলবে, আমার সমাজে তুমি মুসলমান থাকতে চাইলে আমি কিছু শর্ত দিব যা তোমাকে মেনে চলতে হবে বা সে অনুযায়ী তোমার নিজেকে সাজিয়ে নিতে হবে। আর সেসব শর্তগুলো মানলে তোমাকে আমি যে খেতাব দিব তার নামই হল “অসাম্প্রদায়য়িক”। মানে হল আমি হিন্দু আমি আমার আধিপত্যের সমাজ কায়েম করব, আমার ধর্মিয় আধিপত্য বা শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্নগুলো প্রদর্শন করব। কিন্তু তুমি মুসলমান তোমার চিহ্ন – টুপি বা পাঞ্জাবি ধরণের ইসলামি চিহ্ন প্রদর্শন করতে পারবা না। বরং আমার নির্দেশিত কালচারাল আইকন বা চিহ্নে নিজেকে সাজিয়ে নিবা। একমাত্র তাহলেই আমি তোমাকে আমার পাশে বসতে দিব। আমার স্কুল-কলেজে আমার পাশে বা একই সুবিধায় চাকরি-কাজের স্থলেও আমার পাশে তোমাকে বসতে দিব। যাতে তুমি যে আমার অধীনে তা জ্বলজ্বল করে প্রকাশ্য থাকে। সারকথায় বললে, অসাম্প্রদায়িক হলে মানে  নিজেকে ভুলে আমার শর্তে নিজেকে সাজালে কেবল তবেই আমি তোমাকে আমার সমাজে জায়গা দিব।
    এই কারণে বলা যায়, সাম্প্রদায়িক শব্দটার উপস্থিতি আর ধারণা থেকেই বুঝা যায়  “হিন্দু আধিপত্য” কায়েমের মুল  বাসনার বাস্তবায়ক শর্ত হল “অসাম্প্রদায়িকতা”।

    ভারতীয় মুসলমানদের উপর এই “অসাম্প্রদায়িকতার” শর্ত আজও চাপিয়ে রাখা আছে। আর নাসিরুদ্দিন শা বা কবি গীতিকার জাভেদ আখতার এর মত ভারতের কালচারাল জগতের লোকেরা  এই ভিত্তিতে নিজেদেরকে সেকুলার বলে পরিচয় দিয়ে বেদম খুশি ছিল। তারা মানতেই চায় নাই যে এট অধীনস্ততা!
    তারা এটাও মানতে চায় নাই যে কংগ্রেসের সেকুলারিজম আসলে ইসলাম কোপানোর আর ইসলামবিদ্বেষের সেকুলারিজম!

    যারা হিন্দুত্ববাদ বিরুদ্ধে লড়তে চান তাদের উচিত অসাম্প্রদায়িকতা বা কমুনাল শব্দগুলো একেবারে পরিত্যাগ করা।
    এগুলো হিন্দু আধিপত্য কায়েমের শব্দ ও চিহ্ন। আমাদের যেকোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন সেকুলারিজমই নয়। তাহলে এখন মুল সমস্যাটা কী? সেটা হল, না তারা হিন্দুত্ববাদের প্রতিবাদকারি না তারা অন্য মূসলমানদের সাথে একাত্ম। বরং তারা আজ একা! আর সর্বপরি তাদের পেয়ারের কংগ্রেস নিজেই আজ নিজেকে সফট হিন্দুত্ববাদী বলে নিজেদেরকে তুলে ধরছে।

    বলাই বাহুল্য অবিভক্ত ভারতে হিন্দুদের যদি হিন্দুজাতি রাষ্ট্র বা হিন্দুত্ববাদ গড়ার দিকে ঠেলে দেয়া হয়, তবে এটাই আসলে মুসলমানদেরকেও তাদের জাতিবাদের দিকে ঠেলে দেয়া হবে। হয়েছেও তাই। কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগ বলে আলাদা দল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। যা পরে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল। পববর্তীতে কংগ্রেস তো বটেই বিশেষত কমিউনিস্টরা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার জন্য জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের ওপর সবদোষ চাপিয়ে প্রপাগান্ডা করে চলেছে। অথচ সবার আগে হিন্দুজাতি রাষ্ট্রের ভারতের কল্পনা ও এর ভিত্তিতে কংগ্রেসের জন্ম তারা দিয়েছে, এই খবর তারা লুকিয়ে রাখে।

    তাহলে একালে নাসিরুদ্দিনরা কী চাইছেন? তারা বলছেন তাদেরকে ওই হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেসের সরকার বা জমানাটা ফিরে এনে দিতে, যে হিন্দুজাতিবাদের কংগ্রেস চেহারা লুকাতে ‘সেক্যুলার’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ জামা গায়ে দিয়ে ঘুরত। আমরা নাসিরুদ্দিনদের খুশি করতে এখন চাইলেও সেই কংগ্রেসকে ফিরে আনতে পারব না। কারণ সে মৃত আর সে জায়গায় স্বরূপে আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদ কায়েম হয়েছে। কংগ্রেস আর জাগবে না। সে ইতিমধ্যে সফট হিন্দুত্ববাদে চলে গেছে।

    আসলে নাসিরুদ্দিনদের খেয়াল করলে দেখতেন তারা আসলে কংগ্রেসের হিন্দুজাতি ধারণার ভেতরে যে মার্জিনালাইজও চাপা পরে থাকা (কথিত সেক্যুলার) ‘মুসলমান’ ধারণা তৈরি হয়েছিল সেখানে ফেরত যেতে চাইছেন। কিন্তু সেটা তো নিজগুণেই এখন মৃত!

    নাসিরুদ্দিন শাহদের অনেক আগেই বুঝে নেওয়া দরকার ছিল যে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে টাইপের বৃটিশ শয়তানি ব্যাখ্যার সেকুলারিজম যা ভারতীয় কথিত সেকুলারিজম – এর সাথে ক্লাসিক সেকুলারিজমের কোন সম্পর্ক নাই। ক্লাসিক সেকুলারিজমের মুল বৈশিষ্ট ও তাতপর্য হল ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকই সম- অধিকারের নাগরিক।   ফলে এর ভিতরে “রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে বলাটাই শয়তানি”, হিন্দু আধিপত্য নিশ্চিত করার ছুপা খায়েস।
    নাসিরুদ্দিন শাহ’রা এসব মৌলিক ধারণা থেকে বহুগুণ দূরে…।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা   গত  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “নাসিরুদ্দিন শাহরা ভাঁড়ে পরিণত হবেন“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]