Author: goutamdas

  • সেক্যুলারিজম নাকি জাতিরাষ্ট্রঃ দোলাচলের পরিণতি

    সেক্যুলারিজম নাকি জাতিরাষ্ট্রঃ দোলাচলের পরিণতি
    গৌতম দাস
    অক্টোবর ২০২০
    https://wp.me/p1sCvy-5MC

    [এই লেখাটা গত ২০২০ সালের পুনর্পাঠ নামে একটা সাময়িকী তে ছাপা হয়েছিল। এখানে সেটারই কপি তুলে আনা হয়েছে। আর কোন এডিট করা হয় নাই]


    সেক্যুলারিজম নাকি জাতিরাষ্ট্রঃ দোলাচলের পরিণতি

    গৌতম দাস

    অক্টোবর – ২০২০

    রাজনীতি

     

    আমাকে ‘পুনর্পাঠ’ থেকে কিছু প্রশ্ন দিয়ে বলা হলো—এগুলো নিয়ে আমি কী মনে করি তা যেন লিখি। প্রশ্নগুলো ছিল এরকম:

    ক) বাংলাদেশের সেক্যুলারিজম কেন ইসলামবিদ্বেষী?

    খ) ভারতের সেক্যুলারিজম কেন ভারতের দাঙ্গা বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারছে না?

    গ) ভারতে ধর্মীয় সম্প্রতি ছিল একসময়। সে ভারতে এখন এত সাম্প্রদায়িকতার কারণ কী?

     

    বলাই বাহুল্য, খুবই কমন সব প্রশ্ন যা সম্ভবত সাধারণ মানুষের মনে ঘোরাফেরা করে। আর প্রশ্নগুলোর একটা কমন দিক হলো, ‘সেক্যুলারিজম’ বলে একটা ধারণা, যা মানুষের মনে প্রপাগান্ডা করে একটা বিরাট আশার আলো হিসেবে হাজির করানো হয়েছিল। সাথে এটা যেন সব রোগ-হরণ বা রোগ তাড়ানোর ওষুধ—এমনই এক ‘ধনন্তরী’ ধারণা বলে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এর কোনও সত্যতা নাই বা কোনও প্রভাব মানুষ দেখছে না, আরও  বিশেষত, একালে মোদীর জমানায় এসে সেক্যুলারিজমের সব গোমর ফাঁস আর দাবি বেকার হয়ে গেছে। মজার কথা হলো এই হেরে যাওয়া অথবা এএক বিপরীত বাস্তবতা সত্ত্বেও অবশ্য এখনও অনেককে পাওয়া যাবে যারা অসহায় হলেও বুঝে না বুঝে সেক্যুলারিজম আগলে বসে থাকতে চাইছে। সম্ভবত এর চেয়ে ভালো উপায়/বিকল্প জানা নাই বলে।

     

    এককথায় বললে, আসলে মূল সমস্যাটা রাষ্ট্র-ধারণা সম্পর্কে ‘কনসেপচুয়াল’ মানে বোঝাবুঝির মৌলিক গলদ থেকে হাজির হওয়া সমস্যাজাত। রাষ্ট্র বলতে ‘জাতি’ বুঝেছে। রাষ্ট্র মানে জাতি না। কিন্তু তবু রাষ্ট্রকে জাতি বলেই বুঝেছি। এমনটা আবার হতে পেরেছে ‘জাতি’ (বা ইংরাজিতে নেশন) ধারণার কারণে।

    যদিও সেই সাথে এটাও সত্য যে আপনি কোন কনসেপ্টকে সেভাবে বুঝতেই পছন্দ ও আপন মনে করে থাকতে পারেন, মানে সেভাবে বুঝে বসতে পারেন যেভাবে বুঝলে আপনার স্বার্থ ভালোভাবে রক্ষা পাবে বলে একটা অনুমান আপনার মধ্যে কাজ করে। যার মানে দাঁড়াল একটা কনসেপ্টের বোঝাবুঝির শুরু থেকে ওর মধ্যে হাজির কিছু মারাত্মক ভুল থেকে গেছে। আবার সেই সাথে ঐ ভুলটাই আপনি পছন্দ করেছেন।—এই হল সমস্যার গোড়া।

     

    আমাদের অনেকের মনে করে রাষ্ট্র মানে ইংরাজিতে ‘স্টেট’ ধারণাটা বোধহয় দুনিয়ার সবকালেই ছিল। এটাও ভুল। আসলে এখানে ‘শাসন’ আর ‘রাষ্ট্র’—এ-দুই ধারণাকে মাখিয়ে ফেলার কারণে এটা হয়েছে। শাসন (বা ইংরাজিতে রুল) তো সবসময় অবশ্যই ছিল। কিন্তু সেটা রাষ্ট্র ধারণা তো না। তাই, শাসন থাকা মানেই রাষ্ট্র থাকা নয়। একইভাবে খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের পূর্ব-পাকিস্তানের আমলে পুরো ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনে এবং স্বাধীনের পরের সত্তর দশক জুড়েও আমরা বহুল ব্যবহার করতাম ‘জাতি’ শব্দটা। যদিও সেই ভাব-আলাপগুলো আসলে বোঝাতে চেয়েছি রাষ্ট্র শব্দ দিয়ে। এছাড়াও ‘জাতি’ শব্দে ‘আমার জাতি’ বলে আবেগটাকে ছুঁয়ে রাখতে সময়ে সময়ে আমরা ‘দেশ’ শব্দ ব্যবহার করেছি। যেমন— ‘দেশের জন্য লড়ছি’, ‘দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া’, ‘দেশ গড়ার’, ‘দেশপ্রেম’ ইত্যাদি। কিন্তু রাষ্ট্র নয়—অন্তত এই শব্দের ব্যবহার তেমন বা ততটা তো নয়ই।

    রাষ্ট্র ধারণার শুরু মনে করা হয় ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশ, আর আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম করার শুরু থেকে। অর্থাৎ, রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার বাস্তবায়নের শুরু থেকে। মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর বা ইংলিশ রেভেলিউশন বা ক্রমওয়েলের বিপ্লব বলা হয় যেটা—এর শুরু থেকে। কথাটার মানে দাঁড়াল, তাই ১৬৫০ সালেরও আগের যত মনার্কি বা রাজতন্ত্র কায়েম ছিল সেগুলোকে রাষ্ট্র গণ্য করব না। কোনও রাজতন্ত্রও  রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র নয়। বরং বিপরীত। আর তা রাষ্ট্রই নয়। কেন?

     

    কারণ রাষ্ট্র-ক্ষমতার প্রশ্ন। কোন শাসক শাসন ক্ষমতা কোথা থেকে পেয়েছে? কে তাঁকে দিয়েছে—এটা রাষ্ট্র ক্ষমতার ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন। কোনও রাজা বা সম্রাট মানে মনার্কির কাছে এই প্রশ্নের সদুত্তর নাই, দিতে পারে নাই। পরোক্ষে স্বীকার করেছেন তার বংশের কেউ অথবা তিনি নিজে জোর করে ক্ষমতা নিয়েছেন। কেউ কেউ যেটাকে ‘আল্লাহ দিয়েছেন’ ধরনের ব্যর্থ সাফাই গেয়েছেন।

    কিন্তু রাজতন্ত্রের বিপরীতে রিপাবলিক রাষ্ট্রে, এখানে ক্ষমতার ধারণাটা হলো রাষ্ট্রে ক্ষমতার উৎস জনগণ, নাগরিক জনগণ। এটাই রিপাবলিক বা বাংলায় গণ-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র-ধারণা। আর এখান থেকেই রাষ্ট্র ধারণার শুরু।

    এখানে মূলত স্বীকার করে নেওয়াও শুরু হয় যে, রাষ্ট্রক্ষমতা মূলত জনগণের, নাগরিক জনগণের। ক্ষমতার উৎস নাগরিকেরা। বলাবাহুল্য, এটা বহুবচন। নাগরিকেরা তাদের সেই ক্ষমতা তাদের “প্রতিনিধি”“নির্বাচনের” মাধ্যমে (রিপ্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে) সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে নিজের ক্ষমতা দান (ডেলিগেট) করে। আর সে-কারণে ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিরা’ রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগ ও পরিচালনার যোগ্য হয়।

     

    রাষ্ট্রচিন্তায় বিপথগামিতার উৎস ‘জাতি’ ধারণা

    করার কথা ছিল নাগরিক অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র ; যেখানে কোনও জাতি পরিচয়  (যেমন হিন্দু জাতি, মুসলমান জাতি, বাঙালি জাতি অথবা জুম্মু জাতি ইত্যাদি) নয় বরং হতে হবে সুনির্দিষ্ট কোনও জাতি-পরিচয়হীন, এক অবস্থায় সকলেরই একই পরিচয় যে, তারা রাষ্ট্রের নাগরিক। এবং সকলে সমান অধিকারের নাগরিক আর তাতে নাগরিক বৈষম্য থাকতে পারবে না। অর্থাৎ, সকলেই নাগরিক এবং সমান নাগরিক—এমন এক রাষ্ট্রগঠন করার কথা ছিল। কিন্তু তা তো করা হয় না; বরং রাষ্ট্র কথাটাকে ‘জাতি’ বলে বোঝা হয়েছে। আর তাতে রাষ্ট্র গঠন বা নির্মাণকে জাতিগঠন বলে বোঝা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। শুরুতে সারা ইউরোপ জুড়ে এই ধারণার পথ ধরে কথিত জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র মানে ‘নেশনস্টেটই’ গড়ে তোলা হয়েছিল। আর মনে করা হয়েছিল এটাই একমাত্র রিপাবলিক রাষ্ট্রের বাস্তব রূপ।

    আমাদের উপমহাদেশে সমস্যাটার শুরু হয়েছিল ব্রিটিশদের মানে ইউরোপের নেশনস্টেট ধারণার কপি থেকেই। রেনেসাঁর অনুষঙ্গ ছিল নেশনস্টেট ধারণা। কলোনি ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসেবে পরে তা আমাদের মধ্যেও এসে উপস্থিত হয়েছিল। আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে একটা ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণা আমাদের ভিতরে প্রবল ও একমাত্র হয়ে উঠেছিল।

    খুবই কম কথায় বললে, আমরা সকলেই যার যার মতো একটা ‘মহান’ জাতি, ‘হাজার বছরের’ পুরানা জাতি, আমাদের এই-সেই বিখ্যাত দিক আছে এমন জাতি, লড়াকু জাতি, বিজয়ী জাতি ইত্যাদি এমন ফুলিয়ে বলা কথাগুলো যার যার জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে, মূলত জাতি ধারণার মধ্যে পুষে রেখেছি। কাজেই সেভাবে এখন সবাই একেকটা ‘মহান’ জাতি। তবে খুঁজে দেখতে হবে, ইউরোপে শুরুটা এভাবে ‘জাতির’ বয়ান খাড়া করেই হয়েছিল কেন?

     

    মোটাদাগে ১৬৫০ সালের আশেপাশের যখন রিপাবলিক বলে জাতিরাষ্ট্র জন্ম নেওয়া শুরু হচ্ছিল সে-সময়টা আসলে একই সাথে ইউরোপ কলোনি দখলে বের হয়ে পড়ারও শুরু—এমনই একটা সময় ছিল। মানে যখন কলোনি দখল একটা ব্যবসা তাই যুদ্ধজাহাজে বিনিয়োগ করতে সক্ষমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আর সেই জাহাজ নিয়ে দেশ দখল ও লুট করতে এশিয়া-আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার দিকে বের হয়ে পড়া ছিল প্রধান ব্যবসা—সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যবসা। ব্যবসায় যেমন প্রতিযোগিতা থাকে আর সেটাই বড় অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে, তেমনি  কে বেশি দেশ দখল-লুট করতে পারে এটা হয়ে উঠেছিল প্রধান ফোকাস ও অভিমুখ। তাই দরকারও পড়েছিল এমন ফোকাসের পক্ষে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক সাফাই বয়ান তৈরি করার। একাজে সবচেয়ে উপযুক্ত পাওয়া গেছিল ‘জাতি’ ধারণাটাকে। অন্যের দেশ দখল ও লুট করা অন্যায় অন্যায্য কি না, তা নয়—বরং আমরা ‘মহান’ জাতি বা শ্রেষ্ঠ জাতি, এমন বয়ানের কদর বেশি হয়ে উঠেছিল। যেমন, ব্রিটিশেরা ফরাসিদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এমন ধারণা সারা হবু ব্রিটিশ রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মধ্যে মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ, কলোনি দখল ব্যবসায়ীরা যারা আসলে ছিল সমাজের একটা এলিট অংশমাত্র, অথচ তাদের স্বার্থটাই সমাজের সব অংশের স্বার্থ বলে, কথিত এক “ব্রিটিশ জাতির” স্বার্থ বলে হাজির করা হয়েছিল। আবার একই কাজ ফরাসিরাও করেছিল হয়ত ব্রিটিশ বা অন্য কলোনি-দখলদারদের বিরুদ্ধে তাদের বয়ান হিসেবে।

    এ-থেকে সেকালে রাষ্ট্রগঠন বলতে, মানে রাজতন্ত্র ধারণার বিপরীতে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা বলতে একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বুঝাবুঝি শুরু হয়েছিল। হওয়ার কথা ছিল প্রতিটা ব্রিটিশ নাগরিকের ‘নাগরিক অধিকার’ কীভাবে নিশ্চিত করা যায় এমন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন। অথচ সেটা বিপথগামী হয়ে সকলেই কথিত এক ‘ব্রিটিশজাতির’ স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক কথিত ফরাসিজাতির (বা অন্য কথিত জাতি) বিরুদ্ধে ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র গঠন বা খাড়া করার তৎপরতায় পর্যবসিত হয়ে যায়। এভাবেই প্রতিটা নাগরিকের অধিকার নিশ্চির করার হবু রাষ্ট্রগঠনটা পা পিছলায়ে হয়ে যায় এক জাতিরাষ্ট্র ধারণা। এমনকি ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব, যা নিয়ে এত সুনাম বা গর্বের ধারণা ইতিহাসপাঠে অনেককে মনে করতে দেখা যায়, সেটারও কালোদিক হলো এমন বয়ান যে, ফরাসি জাতিরা ‘মহান’ তাই তাদের জাতিরাষ্ট্র। আর এতে যতই সাম্য-মৈত্রীর কথার মহিমা বলা থাক, অর্থাৎ, যতই নাগরিক সাম্যের কথা বলা থাক অথবা বলা হয়েছে বলে গর্ব থাকুক সবকিছুই আসলে পর্যবসিত হয়ে গেছিল এক গারবেজে—একটা নেশন মানে ‘জাতি’ ধারণার কারবারে, কথিত অন্যান্য জাতির বিরুদ্ধে এক জাতিরাষ্ট্র কায়েমের লড়াইয়ে।

    এ-কারণে, ইউরোপের রেনেসাঁ ধারণা যেটা আমরা আমাদের কলোনি দখলদার মালিক ব্রিটিশদের কাছ থেকে বয়ান হিসেবে পাচ্ছি, সেটা আসলে ততদিনে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে এক জাতিরাষ্ট্র ধারণাই। ভারতের শিরোমনি রেঁনেসা চিন্তার আদিগুরু বলে প্রচার ও অনুমান করা রাজা রামমোহন রায়, তিনিও শাসক ব্রিটিশদের একটা ‘জাতি’ কল্পনা করে তার আদলে ভারতকেও ‘হিন্দুজাতির’ ভারত গঠন করতে হবে বলে বুঝেছিলেন।

    অর্থাৎ, এখানে তাঁর বুঝাবুঝিতে মূল কথা ছিল রিপাবলিক রাষ্ট্র মানে এক ‘জাতি’ ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র (নেশনস্টেট) গড়ে তোলা। আরও গুরুত্বপুর্ণ সেই সাথে এই অনুমান যে, কোনও জাতি মানেই সেটা একই ধর্মপরিচয় ভিত্তিতে এক জাতি। যেমন—ব্রিটিশ আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে ব্রিটিশ কলোনিপ্রভুর রাষ্ট্রটাকে তিনি দেখেছিলেন ও বুঝেছিলেন এভাবে যে, এটা একটা ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র। আর এই জাতি গড়ে উঠেছে তাদের একই ধর্ম—সকলেই মূলত এঙ্গলো-ক্যাথলিক ক্রিশ্চান—ভিত্তিক জাতির কারণে। এখানে এঙ্গলো ক্যাথলিক মানে এটাও ক্যাথলিসিজমই, তবে যারা এঙ্গলো বা ইংলিশ রাজবংশ মানে ও চর্চা করে থাকে। অর্থাৎ, এঙ্গলো-ক্যাথলিক ক্রিশ্চান—এই ধর্মের ভিত্তিতে গড়া হয়েছে এক ব্রিটিশ জাতি। আর এই ব্রিটিশ জাতিই গড়ে তুলেছে এক ব্রিটিশ-জাতিরাষ্ট্র। এঙ্গলো-ইংলিশ-ইংল্যান্ড রাষ্ট্র।

     

    তবে ভারতের ক্ষেত্রে রামমোহন এতে একটু বদল করতে চেয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের অনুকরণে এরই আদলে হিন্দুধর্মের একক ভিত্তিতে হিন্দু জাতির ভারতরাষ্ট্র হবে—এমনটা চাওয়ার বদলে তিনি আগে সারা ভারতকে একই ব্রাহ্মধর্মের ভিত্তিতে এক জাতি করা এবং তা থেকে রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কারণ, হিন্দুধর্ম অসংখ্য কাস্ট অর্থে জাতপাতে বিভক্ত এবং আবার হিন্দু ছাড়াও অন্যান্য ধর্মে ভারতে আছে বলে রামমোহন আগে সকল ভারতীয়কে একটা ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত করে নিতে চেয়েছিলেন। এরপর হবু সেই কমন ব্রাহ্মধর্মের ভিত্তিতে একটা হবু একক ভারতীয় জাতি গড়ে নিয়ে এর ভিত্তিতে এক ভারত-জাতিরাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করে মাঠে নেমেছিলেন। রামমোহন ব্রাহ্মধর্ম চালু করেন ১৮১৫ সালে। কিন্তু তিনি ১৮৩৩ সালে মারা যাবার পরে ১৮৬৬ সালের মধ্যে এটা নিজেই মতভেদে বিভক্ত হয়ে যায়। এরপর থেকে দুই অংশই ক্রমশ প্রভাব হারিয়ে আর কোনও আশা-ভরসার আলো হয়ে থাকতে পারে নাই।

    কিন্তু তাতে হিন্দু জাতিবাদীরা দমে নাই। তারা এবার সরাসরি হিন্দুধর্মের ভিত্তিতেই হিন্দুজাতির ভারতরাষ্ট্র গড়তে হবে বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এরপর থেকে খোলাখুলি যারা হিন্দুজাতির ভিত্তিতে ভারত জাতিরাষ্ট্র গড়তে আগিয়ে গিয়েছেন, নানান তত্ত্ব খাড়া করেছেন, এদের মধ্যে অন্যতম হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪), স্বামী বিবেকানন্দ [নরেন্দ্র দত্ত] (১৮৬৩-১৯০২), শ্রী অরবিন্দ [ঘোষ] (১৮৭২-১৯৫০) প্রমুখ। এদের বয়ানটাই ক্রমে ১৮৮৫ সালে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক হিসেবে কংগ্রেসের (পুরা নাম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল) বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। স্বভাবতই হিন্দু-জাতিবাদিতার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের মুসলমান সদস্যরা আপত্তি তুলতে থাকে। কিন্তু তাতে কংগ্রেসের মধ্যে কোনও বিকার না হওয়ায় পরিণতিতে ২০ বছর পরে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল। গান্ধী সাউথ আফ্রিকা থেকে ফিরে কংগ্রেসে সক্রিয় হন ১৯১৫ সালের দিকে। শুরুর দিকে নেহেরুর বাবা মতিলাল আর পরবর্তী সময়ে জওয়াহরলাল নিজে গান্ধীর সঙ্গে মিলে এই হিন্দু-জাতিবাদভিত্তিক ভারত জাতিরাষ্ট্র গড়ার জন্য কংগ্রেসের রাজনীতি করে গেছেন। আর এর বিরুদ্ধে সর্বশেষ বিরোধিতা করে গেছেন জিন্নাহ ১৯২৮ সাল পর্যন্ত, তাঁর বিখ্যাত ১৪ দফা দাবিনামা তুলে ধরে। যেখানে তিনি হবু স্বাধীন ভারতকে এর প্রদেশগুলোর সমন্বয়ে এক ফেডারেল ভারত রাষ্ট্র হিসেবে গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে প্রদেশগুলো সর্বোচ্চ স্বায়ত্বশাসিত হবে। এই শর্তে তিনি মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ভারত থেকে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের দাবি থেকে সরে আসতে পারেন বলে ধারণা দিয়েছিলেন। মনে রাখার বিষয় হবু পাকিস্তানের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রও ছিল কংগ্রেসের হিন্দুজাতির নেশনস্টেটের বদলে মুসলমান-জাতিভিত্তিক এক নেশনস্টেটের প্রস্তাব। এর বিপরীতে নেহেরু বা গান্ধী জিন্নাহর প্রস্তাবের কোনও কিছুই আমল করতে রাজি ছিল না। তাই এরপর থেকে জিন্নাহ চূড়ান্তভাবে কংগ্রেস ত্যাগ করে সরে যান।

    অতএব সময়টা আসলে ছিল রিপাবলিক ক্ষমতার রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্র বুঝবার কাল। এখানে ঐ সময় বলতে বুঝতে হবে প্রায় তিনশ (মোটাদাগে ১৬৫০-১৯৫০ সাল) বছরের কাল। এই সময়ে সারা ইউরোপই ব্যতিক্রমহীনভাবে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্রই বুঝতে চাইত ও বুঝেছিল। এতে প্রতিটা নাগরিক তার নিজের নাগরিক-স্বার্থ ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন রাষ্ট্র পারল কি না, সে যোগ্য কিনা, সব নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সমান বিবেচনা করা রাষ্ট্র নিশ্চিত করল কিনা—সেটা আর বিচার্য থাকে নাই। এর বদলে আমার কথিত ‘জাতি’ অন্য কোনও জাতির সাপেক্ষে শ্রেষ্ঠ হয়েছে বলে মানা হচ্ছে কি না এই খুশিতে আমাকে বরং এখন হাততালি দিতে হবে। জাতশ্রেষ্ঠত্বের উন্মাদনায় উৎফুল্ল হয়ে উঠতে হবে—এই ছিল সেকালের সাজেশন।

    এখন যেমন হিন্দু জাতশ্রেষ্ঠত্বের উন্মাদনা সারা ভারত জুড়ে জাগানো এখন বিজেপির লক্ষ্য। মুসলমান মাত্রই তাকে হত্যা বা নির্যাতন করা জায়েজ, হিন্দুজাতিই শ্রেষ্ঠ, তার অসংখ্য (একেকটা হাজার বছরের) ঐতিহ্য আছে, এক গরুপুজাকে কেন্দ্র করে তার কত কত ঐতিহ্য আছে। অতএব,  মুসলমানবিদ্বেষও খুবই জায়েজ কাজ। এমনকি অপ্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান-জাতির বিরোধিতার সুরসুরি তুলে ভোট চাওয়া ইত্যাদি সবই আসলে সেই জাতিরাষ্ট্র ধারণারই জয়জয়কার—এমন প্রকাশ।

     

    জাতিবাদী রাষ্ট্র ধারণায় তাই রাজনীতিতে তিনটা শব্দ পাওয়া যায়—স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাত (জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ)। অর্থাৎ, ঠিক এসব ধারণার বিপরীতে প্রতিটি মানুষকে নাগরিক গণ্য করা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, নাগরিকদের মধ্যে কোনও নাগরিক-বৈষম্য না করা ইত্যাদি নিশ্চিত করা এদের কোনও এজেন্ডাই হয়ে উঠতে পারে না, না হয়েই থেকে যায়। বরং উল্টা মুসলমানকে জয় শ্রীরাম বলানোর জন্য সে চাইলে মুসলমানকে নির্যাতন করে মেরেও ফেলতে পারে।—এটাই হিন্দু-জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ। আর এটার পক্ষে থাকাটাই দেশপ্রেম, নইলে গাদ্দার।

    সম্প্রতি দিল্লি ম্যাসাকারের সময় দেওয়া শ্লোগানের কথাগুলো মনে করে দেখেন : মুসলমান“ওরা গাদ্দার, তাই গোলি মারো”। আবার লক্ষ্য করেন, ঢাকার শাহবাগে যেটা বসেছিল ওটাও একই আরেক জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণা ও বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ। কথিত ‘বাঙালি জাতির’ জাতশ্রেষ্ঠত্ব। একাত্তর সালের পাকিস্তান জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গণহত্যা নির্যাতন করেছিল একথা সঠিক। কিন্তু সেকারণে একইভাবে আমাদের এখন বা কখনোই পাকিস্তানি শব্দের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানি নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো জায়েজ হতে পারে না। কারণ এটা এক জাতিধারণার বিরুদ্ধে আরেক জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। মূল কারণের দিকটা হলো যে, কারও যে-কোনও জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণাটাই ত্রুটিপুর্ণ, অগ্রহণযোগ্য। কারণ এই ঘৃণা জাগানোটা শেষ হবে এক গণহত্যায়, নতুন নতুন হিটলারি চরিত্রের উত্থানে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও শাস্তির নামে আমি বিনা বিচারে বা সাধারণ বিচারপ্রক্রিয়া ফলো না করে, ত্রুটিপুর্ণ বিচারপ্রক্রিয়ায় যেনতেনভাবে কাউকে ফাঁসি দিতে পারি না। কারণ সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করা আর এই খারাপ কাজকে সামাজিক ঘৃণা ছড়িয়ে উন্মাদনা তুলে আড়াল করা—এটাও আমার নিজেরই গায়ে এক কালোদাগ হয়ে আজীবন থেকে যাবে। ওদিকে এতে প্রকৃতই যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে তারা শাহবাগে বিচারের নামে অবিচার হয়েছে এই অজুহাতে নিজের অপরাধকে লঘু করে দেখানোর সুযোগ নেবে। কাজেই, নিজেই এক জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে অন্য জাতের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো—এটা জায়েজ হতে পারে না। আরেক জাতির বিরুদ্ধে (পাকিস্তানি বলে) ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো মানেই নিজের মধ্যে (বাঙালি জাতিবাদী) বলে এক জাতশ্রেষ্ঠত্ব জাগানো। এটাই রেসিজম, বর্ণবাদ বা হিটলারিজমের ঘৃণার চাষাবাদ। বলাই বাহুল্য, এটা ন্যায়-ইনসাফবিরোধী, ফলে অগ্রহণযোগ্য। পাকিস্তান গণহত্যা ঘটিয়েছে এর জবাব এখন আমাদেরও আরেক গণহত্যা করতে বা এনিয়ে উন্মাদনার ঘৃণা ছড়াতে হবে—এটা হতেই পারে না। খেয়াল রাখতে হবে : ন্যায়, ন্যায্যতা আর ইনসাফের ভিত্তি ছাড়া দুনিয়ার কোনও সমাজ টিকবে না, টিকতেই পারে না। কাজেই মুসলমানবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ যেমন নিন্দনীয়, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ঠিক তেমনি যে-কোনও জাতশ্রেষ্ঠত্ব বা জাতবিদ্বেষ জাগানোও নিন্দনীয়। এমনকি ইসলামের নামের আড়ালে করা যে-কোনও শ্রেষ্ঠত্ববোধ, ঘৃণাবিদ্বেষ ছড়ানো বা জাগানো—সেটাও অগ্রহণযোগ্য। যে-কারও বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো, জাতিবিদ্বেষ চালানো অথবা জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণা খাড়া করা—এর সবকিছুই বেইনসাফি, ফলে অগ্রহণযোগ্য এবং তা কোনও সমাধান নয়। এমনকি কেউ সেটা করে থাকলে সেটার পালটা জাতিরাষ্ট্র ধারণা আনা বা অন্যের জাতিবোধের (তা খারাপ হলেও) প্রতি বিদ্বেষ চালানো অথবা পালটা জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখানোও গ্রহনযোগ্য নয়। এতে অন্যকে আর দোষী বলে আঙুল তোলার নৈতিকশক্তি আপনার হারিয়ে যাবে। আপনি যা পালটা করতে পারেন, তা হলো হেদায়েত। একটা ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ। অন্যায়-অন্যায্যকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে ইনসাফের ওপর দাঁড়ানো। এভাবেই একমাত্র সমাধান আসতে পারে।

     

    তাহলে ইউরোপ কি এখনও ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণায় আটকে আছে? না, অবশ্যই না। তারা একযোগে সকলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৫৩ সালে তাদের জাতিরাষ্ট্রগুলো পুনর্গঠন করেছে। যদিও জাতি, জাতিবিদ্বেষ, জাতশ্রেষ্ঠত্ব  ইত্যাদি ধারণা তাদের সমাজ থেকে চলে না যাবারই কথা। কারণ এটা সাড়ে তিন শ বছরে ধরে (আমাদে মত দেশে এখনও) চর্চা করা হয়েছে। তবে অবশ্যই প্রভাব কমেছে। তাদের রাষ্ট্রগুলো জাতিবিদ্বেষবিরোধী অবস্থান ব্যক্ত করছে।

    কিন্তু আমরা আমাদের রাষ্ট্রচিন্তা থেকে জাতিরাষ্ট্র ভাবনা এখনও ত্যাগ করি নাই। এটাই জাতিচিন্তার মূল উৎস। এ ছাড়াও, এই জাতিচিন্তা (জাতিরাষ্ট্র, জাতিবিদ্বেষ, জাতশ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি) আমাদের কখনও যাবে না যদি সচেতনে নিজের বিরুদ্ধে ক্রিটিক্যাল না হই, প্রতিদিন নিজেকে পরীক্ষা না করি। আর রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বোঝা, যা আমরা এখনও করে যাচ্ছি, এটাও দ্রুত ত্যাগ করতে হবে।

    যদিও ইউরোপ এটা সাড়ে তিনশ বছর ধরে চর্চা করে এরপর এখন বাদ দিয়েছে, কিন্তু দিয়েছে বাধ্য হয়ে এক চরম শিক্ষা পাওয়ার পরে। এজন্যই ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে’ কথাটা সাথে জুড়ে দিয়ে কথা বলছি। কারণ জাতিচিন্তা মানে জাতিরাষ্ট্র, জাতিবিদ্বেষ, জাতশ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি চিন্তা ইউরোপে চরমে উঠেছিল হিটলারের হাত ধরে জর্মান জাতিরাষ্ট্রে। নিজেদের তারা নীলচোখের জর্মান জাতি, আর্য জাতি—এসব ব্যাখ্যার ‘জাতশ্রেষ্ঠত্ব’ ধারণা তারা কায়েম করেছিল। ইহুদি নির্মূল করতে যাওয়ার সাফাই বয়ান এখান থেকেই এসেছিল। কেবল জর্মানিতে নয় বরং সারা ইউরোপের বহু দেশেই আপন ‘জাতশ্রেষ্ঠত্ব’র ধারণায় অপর জাতনির্মূল ক্লিনজিং চলেছিল, আর এর ভয়াবহ পরিণতি দেখে নিজেদের জাতিরাষ্ট্র চিন্তার পরিণতি তারা বুঝে গিয়েছিল। তাই ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র সবাই মিলে এক ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’ (Council of Europe) গঠন করার মধ্য দিয়ে প্রত্যেক রাষ্ট্রই নাগরিক মানবিক অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের বদলে নিয়েছিল। কোনও সদস্য রাষ্ট্রে নাগরিকদের মানবিক অধিকার লঙ্ঘন হলে এর প্রতিকার চাওয়া যাবে এমন একটা কমন আদালত ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’র অধীনে গঠন করে নেওয়া হয়। এই আদালতের রায় সব সদস্য রাষ্ট্রের ওপর প্রযোজ্য করা হয়।

    তবে সাবধান হতে হবে, রাষ্ট্রগুলো জাতিরাষ্ট্র ভিত্তির বদলে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে বদলে যাওয়া মানে এই নয় যে, এরপর থেকে ইউরোপের সমাজ থেকে জাতিচিন্তা বা জাতিবিদ্বেষ ধারণা চলে গেছে। বরং এটা আবার ভিন্ন নামে জাগানোর চেষ্টা চলছে। এ-কারণেই একালে আমরা ‘হোয়াইট-সুপ্রিমিস্ট’ বা সাদা-শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের উত্থান দেখছি। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলা করে ৫০জনের বেশি হত্যা করা তাদেরই কাজ ছিল। ট্রাম্পেরও এই চিন্তাধারীদের প্রতি সমর্থন থাকা বা ট্রাম্পের ঘাড়ে চড়ে থাকা তাঁর এক প্রাক্তন উপদেষ্টা স্টিভ বেনন (Steve Bannon) জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদীদের উত্থানের উদাহরণ। আবার ফ্রান্সের মুসলমানদের সেখানে বসবাস করতে হলে ফরাসী কালচারকে প্রধান মেনে তার আধিপত্যে উলটা তার মতো করে চলতে হবে, মাল্টিকালচার বা অন্যের কালচারকে পাশাপাশি থেকে যাওয়ার কোনও ছাড় বরদাস্ত করা হবে না। এটাও আরেক ধরনের জাতিবিদ্বেষ বা জাতশ্রেষ্ঠত্বের আরেক নমুনা।

    ব্রিটিশের হাত ধরে আমাদের সেই রেনেসাঁর বুঝ নেওয়া, যেটা তাদের আদলে ছিল একটা জাতিরাষ্ট্র চিন্তা, আমাদের তিন রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশে জাতিচিন্তার সমস্ত আবর্জনা এখান থেকেই উৎপত্তি। কখনও হিন্দুজাতি, মুসলমান-জাতি বা কখনও বাঙালি-জাতি হিসেবে। বলাই বাহুল্য নাগরিক অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠন এগুলো নয়।

     

    সেক্যুলারিজমের ধারণা এলো কোত্থেকে

    আগেই বলেছি, রেনেসাঁ বুঝ থেকে আমরা “রাষ্ট্র মাত্রই জাতিরাষ্ট্র” এই বোধ আর ধারণায় আপ্লুত হয়েছিলাম। একালের বিজেপি (মানে সেকালের হিন্দুমহাসভা) বা আরএসএস এই ধারণা থেকেই পুষ্টি সংগ্রহ করেছে। আর মহাসভার বিরুদ্ধে গান্ধী-নেহেরুরাও কম যায় নাই। তারা ভেবেছে হিন্দুজাতিরাষ্ট্রই তারাও গড়বেন; তবে একটু সফটলি (sofly), মানে গরম না, নরমভাবে। আর তাঁদের এর সপক্ষে সাফাইটা ছিল এরকম যে, ‘হিন্দুজাতির’ ভারতে হিন্দুজাতিরাষ্ট্রই তো স্বাভাবিক! রামমোহনের এক ব্রাহ্মজাতি গড়ে এরপর ব্রাহ্মজাতিরাষ্ট্র ভারত গড়ার প্রকল্প ফেল করলে বঙ্কিম-বিবেকানন্দ-অরবিন্দের উৎসাহে ‘হিন্দুজাতিরাষ্ট্র’ গড়াটাই একমাত্র বিকল্প হিসেবে উঠে আসে, আর এটাই নেহেরু-গান্ধীর জন্য সাফাই-যোগানদাতা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বুদ্ধিমান গান্ধী সম্ভবত বুঝতেন এটা জবরদস্তি ; তাই তিনি কখনও স্বীকার করেন নাই যে, সাতচল্লিশের স্বাধীন ভারতকে আসলে একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই গড়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর মনের কথার প্রমাণ হলো, একজন রাজনীতিবিদ হয়েও তিনি হিন্দু ধর্ম শ্রেষ্ঠ বলে বক্তৃতা দিয়ে গেছেন (অন্তত ৪২ টা)। আর এটা করতে তাঁর মনে বাধে নাই। সারাজীবন গীতার একখণ্ড পকেটে নিয়ে ঘুরেছেন আর গীতার ‘সত্য ধারণা’ নিজে আহাজারি করে গেছেন খামোখা। আবার এমনকি নিজ দলেরই  নিচুজাতের নেতা ভীম অম্বেদকারকে তিরস্কার করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে বর্ণহিন্দুর পক্ষে জাতের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, নিজের বর্ণ-হিন্দুত্ব দেখিয়ে হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য লড়াই লড়েছেন। এভাবে সাতচল্ললিশ সালে ‘হিন্দু জাতিরাষ্ট্র’ ভারত বানানোর পর মাত্র শোয়া বছরের মধ্যে হিন্দু মহাসভার কর্মীর গুলি খেয়ে মরে তিনি মহান ‘মহাত্মা’ গান্ধী হয়ে বেঁচে গিয়েছেন। অথচ এই সোয়া বছরে স্বাধীন ভারতের অসংখ্য দাঙ্গার কোনওটাই তিনি রোধ করতে পারেন নাই। পারার কথাও না। কারণ তিনিই তো এই ‘হিন্দু জাতিরাষ্ট্র’ ভারতের জন্ম দিয়েছেন। দাঙ্গা সামলাতে না পেরে একসময় হয়রান হয়ে বোকার সাজেশন দিয়েছেন—হিন্দুকে মুসলমানের শ্লোগান দিতে, আর মুসলমানকে হিন্দুর শ্লোগান দিতে। যেটা এবসার্ড মানে যেটা কোনও কল্পনার ফ্যান্টাসিও না, এতই অবাস্তব। কারণ এটা যেন হিন্দুকে মুসলমান হয়ে যেতে বলা আর মুসলমানকে হিন্দু হতে বলারই নামান্তর। যেন সমস্যাটা হিন্দু-মুসলমানের বা তাদের ধর্মীয় ভিন্নতার। কে না জানে হিন্দু আর মুসলমান দুইটা ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম। অথচ যেন তাঁরা দুই ধর্মের লোক মিলে একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে বা একটা রাষ্ট্রে থাকতে গেলে আপনাদের সবাইকে একই ধর্মের হতেই হবে। এসব চিন্তাকে নাদান বললেও কমই বলা হয়।

    এই নাদানি চিন্তা ঢেকে চলতে বা চিন্তার ঘটতি পূরণ করতেই এদের অকর্মণ্য মনের নতুন এক শব্দ হলো সেক্যুলারিজম। শব্দটা আসলে অসহায়ত্বের প্রকাশ চিহ্ন। তবে গান্ধী বেঁচে থাকতেই এই শব্দ নিজেদের মধ্যে চালু হয়েছিল। কারণ, নিজেদের কানে “হিন্দুজাতির এক জাতিরাষ্ট্র ভারত” এমন সত্য কথা শুনতে ভালো লাগে না। তাই এর গায়ে সেক্যুলারিজম নামের জামা চড়িয়ে একে আড়াল দেওয়া শুরু হয়েছিল। ফ্যাক্টস হলো, ১৯৪৯ সালে গৃহীত ভারতের মূল কনস্টিটিউশনে সেক্যুলারিজমকে রাষ্ট্রের কোনও ‘নীতি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই। কেবল মুখবন্ধ লেখাতে নেহায়তই একটা শব্দ হিসেবে জায়গা পেয়েছিল। আর তা দিয়েই ভারতকে একটা সেক্যুলার রাষ্ট্র বলে প্রপাগান্ডা চালিয়ে ‘হিন্দু জাতিরাষ্ট্র’ হওয়ার সত্যকে আড়ালে ফেলা হতো।

     

    যা হোক, সবকিছুর আগে একটা বাক্যে সব বলে নেই। কোনও কনস্টিটিউশনে যদি দেখা যায় সেক্যুলারিজম তার নীতি, তাহলে বুঝতে হরে রাষ্ট্র ধারণা তাদের খুব দুর্বল। এক নাবুঝ-অবুঝ অবস্থা। অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে এর প্রণেতাদের কোনও ধারনাই নাই। মূল কথাটা হলো,  কনস্টিটিউশনের কোথাও ‘সেক্যুলারিজম’ (অনেকে এটাকে বাংলায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ লিখে থাকে) লেখা আছে বলেই যারা রাষ্ট্রটাকে সেক্যুলার বলে দাবি করছে, তারা রাষ্ট্রই বুঝে না, এটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। এককথায় সেক্যুলার লিখে রেখে কোনও রাষ্ট্রকে সেক্যুলার করা যাবে না, যায় না। করার জিনিসই না। তাহলে?

     

    প্রথমত: রাষ্ট্রে কোনও জাতিবাদী নাগরিক পরিচয় রাখা যাবে না, বরং পরিচয়বিহীন সকলেই ‘নাগরিক’—এমন হতে হয়।

    দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রকে জাতিবাদী নয়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হতে হয়।

    তৃতীয়ত: সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক—এমন নাগরিক-বৈষম্যহীন নাগরিক-রাষ্ট্র হতে হয়। কেউ হিন্দু বা মুসলমান অথবা পুরুষ-নারী বা পাহাড়ি-সমতলী ইত্যাদি যাই হোক, নির্বিশেষে এদের মধ্যে কোনও বৈষম্য করা যাবে না। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা, সমান সুযোগ সুবিধা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

     

    এতো গেল কনস্টিটিউশনে লিখে রাখার প্রসঙ্গ। এরপর প্রয়োগ-চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এই নীতি বাস্তব করে তোলার প্রক্রিয়ায় লিপ্ত হতে হয়, শুধু লিখে রেখে কিছু হবে না তাই। উপরের তিনটা নীতি—বিশেষ করে তৃতীয়টা—আসলে সাম্যের নীতি। নাগরিক-সাম্যের নীতি। যে রাষ্ট্র এটা কঠোরভাবে মেনে চলে এবং বাস্তবায়ন করে দেখায়, সেই রাষ্ট্রকেই আমরা সেক্যুলার রাষ্ট্র বলে বুঝতে পারি। এজন্যই বলা হয় সেক্যুলারিজম—আমার রাষ্ট্র সেক্যুলার বলে কনস্টিটিউশনে লিখে রেখে দাবি করার বিষয়ই এটা নয়। সাম্যের নীতি অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে কি না তা দেখেই বুঝা যায় সেটা সেক্যুলার কি না। সমান নাগরিক বিবেচনা কার্যকর কি না। নাগরিক-বৈষম্যহীনতার চর্চাই সেক্যুলারিজম। জাতিরাষ্ট্র করবেন বা মুসলমানবিদ্বেষ চর্চা করবেন আর দাবি করবেন রাষ্ট্র সেক্যুলার—এটা হাস্যকর।

    অথচ আমাদের এখানে বাস্তবে এই উল্টোটাই হয়েছে।  ইন্দিরা গান্ধী নিজের ভারত রাষ্ট্রটা এক হিন্দুজাতিরাষ্ট্র করে গড়ে রেখে নিজের হিন্দুমনকে সান্ত্বনা দিতে এবার ৭১ সালে আমাদের হবু রাষ্ট্রকে কাগজে সেক্যুলার রাষ্ট্র লিখতে বাধ্য করেছেন। আর এরপর নিজে এক আত্মশ্লাঘায় ভুগেছেন যে কাজটা ঠিক করেন নাই। কেন? ভারতের কনস্টিটিউশনে তো এমন তথাকথিত সেক্যুলারিজম ‘নীতি হিসেবে’ লেখা নাই। (যদিও লেখা না-লেখায় কিছুই যায় আসে না। এটা যে অর্থহীন তা ১৯৮৪ সালে মারা যারার আগে পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধী জানাবুঝা করে যেতে পারেন নাই।) তবে নিজের মনের অপরাধবোধ তাড়াতে ১৯৭৬ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন সংশোধনের সুযোগ যখন পেয়েছিলেন তখন নিজ অবুঝ চিন্তার ‘সেক্যুলারিজমকে নীতি’ ঢুকিয়ে নিয়েছিলেন। অথচ এই সেক্যুলারিজম শব্দের আড়ালে সেই থেকে ভারত-রাষ্ট্র নির্বিচারে এখনও এই মোদীর আমল পর্যন্ত ইসলামবিদ্বেষের চর্চা করে যাচ্ছে।

     

    প্রশ্নগুলো সম্পর্কে ফাইনাল কথা হলো—

     

    ক) বাংলাদেশের সেক্যুলারিজম কেন ইসলামবিদ্বেষী? 

     

    কারণ, ১। বাংলাদেশও একটি ‘বাঙালি জাতিবাদী’ জাতিরাষ্ট্র।

    ২। এই বাঙালি জাতিবাদীদের মধ্যে অনেকে এক ভিত্তিহীন ধারণা পোষণ করেন যে, তারা একাত্তরে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বা ইসলাম তাদের অপনেন্ট ছিল। মানে যেন ‘ইসলামকে তারা পরাজিত’ করেছিলেন। অর্থাৎ, যেন পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সেই সময়ের পাকিস্তান সরকার ও তাদের নীতি এর জন্য দায়ী বা আমাদের এনিমি নয় ; বরং শেখ মুজিব ও আওয়ামীলীগ যেন ইসলাম বা মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যই নেমেছিল। মূলত এই ব্যাখ্যাদাতাদের প্রধান পরিচয় তারা ইসলামবিদ্বেষী। আসলে এরা বুঝা-না-বুঝা জমিদারী-হারানো বর্ণহিন্দুর অনুসারী। জমিদারীহারানোর দুঃখে দুখী সমব্যথী কিছু নাদান।

    ৩। খোদ ইন্দিরা গান্ধী নিজেই ছিলেন নিজের মুরুব্বি-স্থানীয় নেহেরু-গান্ধীদের মতো রাষ্ট্র প্রসঙ্গে একজন বিভ্রান্ত ব্যক্তি। ফলে তিনিও রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্রই বুঝতেন এবং বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র গড়ার কথা বলা বা ‘সাম্যনীতির রাষ্ট্’ কথার অর্থ-তাৎপর্যের ব্যাপারে বোধশূন্য ছিলেন।

    এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো : সে-কারণের একাত্তরের আগষ্ট মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক এলায়েন্সে কারা কারা হবু বাংলাদেশের পক্ষে সামরিকভাবে থাকছে তা নির্ধারিত হয়ে যাবার পরও ইন্দিরার মাথায় খেয়াল আসে না যে, তিনি কোন হবু বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে যাচ্ছেন?—কারণ সেটা ছিল সামরিকসহ সব অর্থেই ভারতের সহযোগিতা—যেই হবু বাংলাদেশের নব্বইভাগ মানুষ মুসলমান, অর্থাৎ, এক মুসলমানে ভরা বাংলাদেশকে! যারা দুদিন আগেও ভারতের জাতশত্রু পাকিস্তানই ছিল! তাই তাঁর মাথার অনিরসিত প্রশ্ন এমনই মারাত্মক ছিল যে, তিনি যেন পারলে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে বলেন আপনারা অ-মুসলমান হয়ে যান ; নিজেদের এমন ঘোষণা দেন। কিন্তু ইন্দিরা আবার এটাও পরিস্কার বুঝতে পারলেন যে, এটা সম্ভব না—অবাস্তব। কেননা, সেটা তাঁর জন্যও কম বিব্রতকর নয়। তাই তিনি চতুর্থবার বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি দেওয়ার তাজউদ্দিনের লিখিত অনুরোধ সত্ত্বেও নিরুত্তর থেকে বিষয়টা উপেক্ষা করার পর এক নিগোশিয়েশনে তাজউদ্দিন-গান্ধী একমত হন যে, হবু বাংলাদেশকে সেক্যুলার বলে ঘোষণা দিতে হবে। অর্থাৎ, এতে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে তাজউদ্দিন প্রকারন্তরে কবুল করছেন যে, আমি মুসলমান নই—সেক্যুলার!

    ৪। এখান থেকেই বাংলাদেশ সেক্যুলার রাষ্ট্র বলে ঢোল বাজানো শুরু হয়। আসলে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ভারত আর বিশেষ করে এই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট—যারা বাই ডিফল্ট ইসলামবিদ্বেষী—তারা হাততালি দিয়ে উঠে যে, বাংলাদেশ এক সেক্যুলার রাষ্ট্র। অথচ ফ্যাক্টস হলো এক. কমিউনিস্টরা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রই বোঝে না এবং মানেও না। দুই. বরং তারাও জাতিরাষ্ট্র ধারণার সমর্থক। তিন. উপমহাদেশের হিন্দু কমিউনিস্টেরা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ধারণার মধ্যেই স্বস্তিবোধ করে। অথচ তাদের রাষ্ট্রচিন্তা যে এক হিন্দুজাতি ধারণা তাতেও তাঁরা কোনও অস্বস্তি অনুভব করে না। চার. কোনও রাষ্ট্র সেক্যুলার কি না তা বুঝবার যোগ্যতা অথবা কী ক্রাইটেরিয়া দেখে এটা বুঝতে হয় সে-ব্যাপারে এই কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীরা পুরা অন্ধকারে ও অজ্ঞ। পাঁচ. ইতিবাচকভাবে তাঁদের ভুল ধরিয়ে দিলেও ব্যাপারটি দাঁড়ায় এমন : অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র ধারণায় যে ‘সাম্য’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, এর স্পষ্ট অর্থ নাগরিক-বৈষম্যহীনতা অর্থে সমান বা সাম্য ধারণা। যেমন কোনও নাগরিক হিন্দু হলে তাঁকে কম বা বেশি খাতির বা বিশেষ সুযোগ দেওয়া অথবা কোথাও নাগরিক মুসলমান বলে সেখানে অসাম্য করা—এর কোনটাই না করা—এটাই মূলত ‘সাম্য’ প্রতিষ্ঠার নীতি। এই নীতি অনুসারে কোনও রাষ্ট্র ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠায় সফল হলে সে আর সেক্যুলার কি না সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর তাতে এরপর ঐ রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশনেও ‘সেক্যুলার নীতি’ আছে কি না তা লিখে রাখারও বালাই থাকে না। ছয়. কিন্তু আপনি যদি ইসলামবিদ্বেষী হন, তাহলেই কেবল রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশনে সেক্যুলার লেখা আছে কি না সেই তর্ক তুলবেন। কারণ আপনার ইসলামবিদ্বেষ লুকিয়ে রাখার কাভারই হলো এই আজাইরা ‘সেক্যুলার’ লিখে রাখা। তখন রাষ্ট্র বলতে জাতি-রাষ্ট্র বুঝবেন আর সেটা হিন্দুজাতিরাষ্ট্র হলেও আপনার কোনও অস্বস্তিবোধ হবে না। সাত. এই কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীরা আমেরিকান রাষ্ট্রের সেক্যুলার বা ধর্মের ধারণা কেন ইউরোপের মতো নয় তাও খেয়াল করে না। অথচ আমেরিকাই সবার আগে নাগরিক ‘সাম্য’ ধারণা দিয়ে এসব সমাধান করেছে। আর তাই আমেরিকা-রাষ্ট্র  উলটা মনে করে যে, নাগরিকের ‘ধর্মপালনের স্বাধীনতা’ এটাই নাগরিক মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের দায় ও প্রতিশ্রুতি হচ্ছে নাগরিকের সেই অধিকার সুরক্ষা করা।

     

    খ) ভারতের সেক্যুলারিজম কেন ভারতের দাঙ্গা বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারছে না?

     

    ১। ভারত একটি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র। মানে ‘রাষ্ট্র মানেই তা জাতিরাষ্ট্র’ এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

    ২। অথচ জাতিরাষ্ট্র ধারণার সাথে সেক্যুলারিজম ধারণা আনফিট। আপনি যখন অবলীলায় ভারতে হিন্দুজাতিরাষ্ট্রই কায়েম করে ফেলছেন তখন এর মধ্যে আবার সেক্যুলারিজম খুঁজবেন কোথায়? খুঁজবেনই কেন?

    ৩। জন্ম থেকেই বরং একটা ভাগ ছিল যে, আপনি হিন্দু-মহাসভা বা আর.এস.এস.’র মতো প্রকাশ্যে মুসলমান-কোপানো হিন্দুত্ববাদের ও হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের চর্চা করবেন, নাকি গান্ধী-নেহেরুর কংগ্রেসের মতো ছুপানো বা সফট হিন্ধুত্বের মানে সেক্যুলার জামা গায়ে চড়িয়ে আড়াল করে সেই একই হিন্দুজাতিরাষ্ট্রের চর্চা করবেন?

    ৪। একটা অবজারভেশন হলো, ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সত্যমিথ্যার লুকোচুরি দিয়ে ভারত কংগ্রেসের-রূপবৈশিষ্ট্যের হিন্দুজাতিরাষ্ট্র হিসেবে চলতে পেরেছিল। এরপর থেকে তা ভাঙতে শুরু করে। যত ভাঙ্গে ততই বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুজাতিরাষ্ট্র ধারণা প্রভাব বাড়িয়ে চলে। শেষে একালে মোদী দ্বিতীয়বার এসে এবার পূর্ণভাবে হিন্দুজাতিরাষ্ট্র কায়েম ও চর্চা শুরু করেছেন। কাজেই যে-দাঙ্গা খোদ মহাত্মা গান্ধীই রুখতে পারেন নাই, নিজেই শিকার হয়েছেন সেখানে এক সেক্যুলারিজমের ফাঁকাবুলি দিয়ে কিছুই ঠেকানোর কোনও সম্ভাবনাই নাই। ঠেকাবার কোনও কারণও নাই। সেক্যুলারিজম সব সময়ই ফাঁকাবুলি। বড়জোর এটা হিন্দুত্ব আড়ালে রাখার জামা। নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠা থেকে ভারতের সকল হিন্দুমন অনেক অনেক দূরে।

     

    গ) ভারতে ধর্মীয় সম্প্রতি ছিল এক সময়। এখন এত সাম্প্রদায়িকতার কারণ কী?


    আসলে ধর্মীয় সম্প্রীতি ভারতে কখনওই ছিল না। স্থানীয় নানান পকেটে, স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে বিচ্ছিন্নভা যতটুকু যা কিছু দেখা গেছে, তা-ই সার। এছাড়া সবসময় আমরা দেখেছি একটা ভয়াবহ দাঙ্গা ঘটে যাবার পর কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীরা, মানে কিছু সামাজিক বিচ্ছিন্ন এলিটেরা হাত ধরাধরির মিছিল বের করে চলেছে, যারা আসলে পুরা সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন। তাই এটা কোনও ইমপ্যাক্ট ফেলা ঘটনা না। ভারতে খোদ রাষ্ট্রগঠনটাই হলো একটা জাতিরাষ্ট্র এবং হিন্দুজাতিভিত্তিক চিন্তার নির্মাণ। সেখানে কোনও ‘সম্প্রীতি’ আশা করার সুযোগ কই? এটাতো আম গাছের কাছে জাম আশা করা মতো।

     

    এককথায়, আগে ইমান ঠিক করতে হবে যে, ঠিক কী চাইতেছি। এরপর, রাষ্ট্র বলতে কী বুঝেছি বা বুঝতে চাইছি? আর জাতি ধারণা বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে সবার আগে। জাতি-পরিচয়বিহীন সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের নাগরিক—এমন রাষ্ট্রের বুঝ লাগবে। ‘নাগরিক সাম্য’ প্রতিষ্ঠা যার অন্যতম লক্ষ্য হতে হবে। কোনও ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ বাইরে ফেলে রেখে আসতে হবে। তাতে সবার আগে সেক্যুলারিজম শব্দটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। ফলে এর শয়তানি থেকে আমরা আপনাতেই রক্ষা পাব।

     

    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ২৩ মার্চ ২০২০

    goutamdas1958@hotmail.com

    https://punorpath.com/journal/65364f4c4f469e8971bc6afd

     

    গৌতম দাস

    I

     

  • সংসদে সংখ্যালঘুদের আলাদা আসন মানেই আরেকবার দেশভাগ

    সংসদে সংখ্যালঘুদের আলাদা আসন মানেই আরেকবার দেশভাগ
    গৌতম দাস
    ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪  রাত ০৯ঃ ৫১
    https://wp.me/p1sCvy-62P

     

     

    সংসদে সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা আসন দাবি করা বা দিতে রাজি হয়ে যাওয়া মানেই আরেকবার দেশভাগ বা ১৯৪৭ সালের অভিজ্ঞতা। না-বুঝে, যথেষ্ট পড়াশুনা না করে ফটাফট এমন লুজ মন্তব্য করে অনেকে এটাকে নিজেকে উদারতা ও ভারতপ্রিয় হিসাবে তুলে ধরতে চাওয়া মনে করছেন – এটা একটা চিন্তার স্টুপিডিটি। এটা বাংলাদেশের সকল জনগোষ্ঠিকেই আরেকবার বিশাল রক্তপাতের মধ্যে ফেলে দেয়াই হবে।
    বিস্তারিত বলার আগে কেবল সংক্ষেপে মনে করিয়ে দেই যে  বৃটিশ-ইন্ডিয়াতে বেঙ্গলে দুবারই কেবল প্রাদেশিক নির্বাচন হয়েছিল ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে; বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় প্রাদেশিক নির্বাচনটা হয় নাই। ঠেলতে ঠলতে সেটাই হয়েছিল ১৯৪৬ সালে। আর ১৯৪৭ সালে দেশভাগ। পাকিস্তানে মানে পুর্ব-পাকিস্তানে মুসলমান ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্য এদেরকে নিয়েই পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক সংসদ বসেছিল [এখনকার জগন্নাথ হল ঢাবিতে; যদিও সেই বিল্ডিং বা প্রাক্তন সংসদ ভবন অংশ এরশাদের আমলে ১৯৮৫ সালে ভেঙ্গে পড়ে প্রচুর ছাত্রের মৃত্য হয়েছিল। যেটা এখন অক্টোবর স্মৃতি ভবন।]

    ধর্মভিত্তিক প্রার্থী ও ভোটার  নির্বাচন ব্যবস্থাঃ    
    প্রশ্ন হল, কিসের ভিত্তিতে এত সহজে  ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ীদেরকে নিয়ে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক সংসদ বসানো গেছিল?
    এর মূল কারণ, ঐ দুই প্রাদেশিক নির্বাচন (১৯৩৭ ও ১৯৪৬) দুটাই হয়েছিল হিন্দু ভোটারেরা হিন্দুদের আর মুসলমান ভোটারেরা মুসলমান প্রার্থীদেরকেই কেবল ভোট দিতে পারবে – এই নিয়মেই নির্বাচন দুটাই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

    এই ইতিহাস একালের প্রজন্মের জানা নাই বা খুব কম মানুষই জানেন। পুরানা যারা সেকালের তারাও যারা পাকিস্তান হওয়ার পরে জন্ম তারাও জানেন কিনা সন্দেহ; যদিনা তিনি ইতিহাস ঘেটে জেনে থাকেন!  সরাসরি বললে এটাই, ধর্মভিত্তিক প্রার্থী ও ভোটার নির্বাচন ব্যবস্থা  । আর এটা চালু হয়েছিল মুসলিম লীগের প্রস্তাবে, বৃটিশ শাসকদের কাছে দেয়া প্রস্তাবে। আর তা হয়েছিল ব্যাপক আলোচনার পরে ১৯৩০ সালের দিকে বৃটিশ শাসকেরা সহ হিন্দু-এথনিক জনগোষ্ঠিরা সহ মিলিত সভায় রাজি হয়েছিল।

    ভারত শাসন আইনঃ
    “ভারত শাসন আইন” মানে হল, বৃটেনের বৃটিশ সরকার ১৮৫৮ সালে প্রথম নিজেরাই বৃটিশ-ইন্ডিয়া এই কলোনির উপর সরাসরি শাসন কক্তৃত্ব তুলে নিয়েছিল। মানে হল প্রথম ১০০ বছর বৃটিশ-ইন্ডিয়া শাসিত হয়েছিল বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। হা ঠিক তাই!  সিপাই বিদ্রোহ (১৮৫৭) সামলাতে না পারার জন্য সেবার বৃটিশ সরকার তা অধিগ্রহণ করেছিল।  আর তা আইন সম্মত করতেই জারি করেছিল প্রথম ভারত শাসন আইন ১৮৫৮ ভারত । এরপরে এতে সংশোধনী এসেছিল ভারত শাসন আইন ১৯১৯।  আর এরপর সর্বশেষ সংশোধনী এসেছিল ১৯৩৫ সালে।  এই ১৯৩৫ সালের সংশোধনীতেই ধর্মভিত্তিক প্রার্থী ও ভোটার নির্বাচন ব্যবস্থা পাস হয়।
    এতো গেল ইতিহাস আইনের কথা।  একবাক্যে শেষ করে দেই। যেকোন দেশ-রাষ্ট্রে যদি এমন ধর্ম বা কোন এথনিক ভিত্তিতে প্রার্থী-ভোটার আলাদা করে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয় তবে  সেদিন থেকেই ধরে নিতে হবে যে ঐ দেশ ঐ এথনিক ভিত্তিতেই দেশটা ভাগ হয়ে যাবে ক্রমশঃ।  আর সেতাই হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। তবে এটা দ্বিতীয় বোকা (দেশ ভেঙ্গে যাবে তা না বুঝে) পদক্ষেপ। প্রথম পদক্ষেপ ছিল রামমোহন রায়ের – অখন্ড ভারতের সবাইকে আগে ব্রাহ্মে ধর্মান্তর করে নিয়ে পরে ধর্মীয় জাতিবাদ রাষ্ট্র কায়েমের বোকা চিন্তা। যেটা ১৮৭২ সালের আর সকলকে ব্রাহ্মে ধর্মান্তর প্রকল্প ব্যর্থ হয়ে গেলে হিন্দুত্বদের ভিত্তিতেই ভারত কায়েমের দিকে রওয়া দিয়েছিল কংগ্রে দল ১৮৮৫ সালে যার জন্ম!

    সারকথায়, এই হল  ধর্মভিত্তিক প্রার্থী ও ভোটার নির্বাচন ব্যবস্থা  নির্ধারিত পরিণতি! রাজনীতি ও  ইতিহাস আগে জানেন বুঝেন এরপর মুখ খুলেন!

    বাংলাদেশকে আরেকবার দেশভাগের বিভিক্তির পথে – বিএনপি ও জামায়াতঃ 
    বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ দেরকে রাজনীতির মৌলিক দিক ও ইতিহাস বিষয়ে পড়াশুনা করার আহবান রাখছি অনেকদিন থেকে। কিন্তু কে শুনে কার কথা!
    এমনকি এটাও বলেছি ভাল একাদেমিশিয়ান বা কনসালটেন্ট  (এক বা একাধিক) রেখে নেন। একেবারেই গোপনে আড়ালে তিনি থাকেন কোন অসুবিধাই নাই। অন্তত কেবল সর্বোচ্চ নেতা ও নীতি নির্ধারকদের কয়েকজন এমন কিছু তিন-চার জন কিংবা একা সর্বোচ্চ নেতাকে তিনি পরামর্শ দিবেন  এমন করলেই তো হয়।  কিন্তু কী আর বলব হতাশ হওয়া ছাড়া?

    বাংলাদেশে সংখ্যালঘু এক আজিব শব্দ। এটা ষোল আনা এক হীনমন্যতা -মূলক শব্দ। না, যাদেরকে বলা হয় তারা নন। বরং যারা বলেন এটা তাদেরই হীনমন্যতার প্রকাশ। গত ১৯৪৭ সাল বা তারও আগে থেকে মুসলমানদের মনে এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য, এই অত্যাচার চাপিয়ে দিয়ে রেখেছে জমিদার-হিন্দু শাসক! কোন ইস্যুতেই হিন্দুরা যত যাই করুক তারা একেবারে পবিত্র ও নির্দোষ অনুমান করে নিতেই হবে!! কেন?
    না তারা হল ভিকটিম! কিসের ভিকটিম বা মজলুম? এবার এক কল্পিত বয়ান তারা তৈরি করে রেখেছে যার বৈশিষ্টগুলোঃ
    ১। হিন্দুরাই নাকি মুসলমানদের পুর্বপুরুষ, অতএব মুসলমান তোমরা নিচে পায়ের নিচে যাও! অতএব হিন্দু এই এথনিক জনগোষ্ঠির সব অপরাধই মাফ! মাফের চোখে দেখতেই হবে; পরদাদা-দেরকে যেভাবে দেখা হয়! মোদির সংসদের এমপি এমন কথা তুলেই মুসলমান এমপি দের উপর নিজ জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ জাহির ও প্রতিষ্ঠা করে থাকে যে, পাবলিকলি হিন্দু এমপি সেটা প্রতিষ্ঠার তর্ক করছেন!   অনেক ভিডিও ক্লিপ বা রিপোর্টিং নেটে পাওয়া যায়।
    ২। পুর্ব-পাকিস্তান থেকে হিন্দু এথনিক জনগোষ্ঠির এই অংশ ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগ করে ইন্ডিয়া চলে গেছেন। এতে একইভাবে ইন্ডিয়া মানে পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বঙালি মুসলমানেরাও এসেছেন। কিন্তু দেশত্যাগ ইস্যুটাকে এই উভয় দিকটা না দেখে পাকিস্তান থেকে হিন্দু এথনিক জনগোষ্ঠির চলে যাওয়াটার জন্য পুর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানেরাই দায়ী – এই বয়ান তারা প্রতিষ্ঠা করেছে। আর এটা ম্নিয়ে প্রশ্ন তুললেই আপনি সাম্প্রদায়িক!
    ৩। সাম্প্রদায়িক এই শব্দের সারকথাটা হল মুসলমান আপনার এত বড় সাহস, আপনি পায়ের নিচে থেকে জমিদার-হিন্দুর বয়ান অস্বীকার করেন?
    ৪। একচুয়ালি আমরা জমিদার মানে জমিদার-হিন্দু কথা খুবই পরিস্কারভাবে অই সত্য, ইতিহাসো তাই বলে। আসলে এটাকেই তারা প্রতিশোধমূলক বয়ান একটা খাড়া করেছে যে আম-হিন্দুদের আমরা উচ্ছেদ করেছি। মানে জমিদার-হিন্দু আম-হিন্দু সেজে নিজেকে লুকিয়েছি। অথচ জমিদারি উচ্ছেদের পরে প্রজা মুসলমানের মতই প্রজা হিন্দুও নিজ চাষের সেই জমিরই মালিক হয়েছে সরকারকে খাজনা দেওয়া সাপেক্ষে!
    সারকথাটা হলে, মিথ্যা বয়ানের জোরে প্ররবপাকিস্তানের হিন্দু মাত্রই সে মুসলমানদের ভিকটিম বা মজলুম যেন!

    তাই, এই পাপবোধ মুসলমানের মনে এমন ভাবে গেথে দেয়া হয়েছে যে সবখানে সে হীনমন্যতায় ভুগে।
    যেমন নিজেই শামসুর রহমান এর মত কবি নিজে কবিতা লিখেই স্বস্তি পায় না যে কবিতাটা হয়েছে কিনা যতক্ষণ কোন কলকাতার কবি এর প্রশংসা বা সার্টীফিকেট না দিচ্ছে – এই হীনমন্যতা এতটাই তীব্র ও সর্বত্র!
    আর এখান থেকেই সংখ্যালঘু শব্দটা শুনলেই মুসলমান কুকড়ে যায়, নিজের ভিতরে এক বিশাল অপরাধ বোধ নিজেই নিজ মনে ডেকে নিয়ে এসে থাকে! আর এটারই ফয়দা তুলে হিন্দুত্ববাদ!

    ১। বাংলাদেশের হিন্দু  এথনিক জনগোষ্ঠিকে সংসদে ৬০টা আসন দিতে হবে।
    ২। সংসদে হিন্দু এথনিক জনগোষ্ঠিকে আলাদা আসন দিতে হবে! এমন আসন দিলে অসুবিধা কী?

    রাজনীতি ও  ইতিহাস না বুঝা জামায়াত সবার আগে এই আত্মঘাতি বোকা চিন্তার নেতা। তাদের ধারণা তারা এভাবে উদারতা দেখাচ্ছে। কিন্তু এটা যে তাদের স্টুপিড চিন্তা বাইরে এসে পড়ছে তা আজও বুঝতে পারে নাই। এনিয়ে জামায়াতের নেতা শাহজাহান চৌধুরির ভিডিও বক্তব্য একটা দেখা যায়।
    আর আজ একই পথে বিএনপি কে দেখলাম আমরা। হয়ত তারা ভেবেছে তারা বোধহয় পিছিয়ে পড়ছে। তো তারা কেন জামায়াত থেকে পিছনে পরে যাবে। আমি কমবেশি নিশ্চিত এই দুই দলকে গভীর নদিতে ফেলে দিবার জন্য খুবই নরম ও ইনোসেন্ট কিছু বুঝে না নাদানভাবে প্রম্পট করেছে বৃহত্তর মোদি সরকার মানে র-এর লোক বা চিন্ময়-ইসকন পর্যন্ত যারা ছড়িয়ে আছে এরাই। নিজেরা এই ইনোসেন্সি নাদান-অজ্ঞতার মুখোশ পড়ে নিয়ে! নিচে আরটিভি এর রিপোর্ট ও লিঙ্কটা দিলাম!!!

    ভারতকে রক্ষাকর্তার খেলা খেলতে দেবেন না, সংখ্যালঘুদেরকে রুমিন ফারহানা

    [প্লিজ ভুল করেন না। নিচের লেখাটা লেখকের নয়। আরটিভি তে ছাপা হওয়া বক্তব্য। এটা বুঝাতেই এই প্যারাগ্রাফ অংশ বাদিকে ছোট করেছি।]
    “ভারত যেন রক্ষাকর্তার খেলা খেলতে না পারে, সেজন্য দেশের হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
    দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, কিছু কিছু দেশ মনে করে ভারত সারা পৃথিবীর হিন্দুদের রক্ষাকর্তা। এই রক্ষাকর্তার খেলা আপনারা খেলতে দেবেন না। সংবিধান আমাদের সমান অধিকার দেয়।
    শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের আয়োজনে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষায় করণীয় শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক।
    রুমিন ফারহানা বলেন, সংখ্যালঘুদের নিজস্ব কিছু সমস্যা রয়েছে। সেজন্য সমস্যা সমাধানে সংখ্যালঘু কমিশন এবং সংসদে আলাদা আসনের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

    তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় ছিল, সংখ্যালঘুদের ওপর সবচেয়ে বেশি অত্যাচার চালিয়েছে। গত ১৫ বছর দেশে কেউ নিরাপদ ছিল না। নীরবে এই অত্যাচার সহ্য করেছে সংখ্যালঘুরা। এই মাটিতে সংখ্যালঘুদের ওপরে অত্যাচার আমরা মেনে নেবো না। ভারতের সঙ্গে মিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলেও এসময় দাবি করেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।  বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে, সংকটের সময় কীভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়। চার-ছয়মাসে কিছুই পরিবর্তন করা যাবে না। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে পুরনো বাংলাদেশ ফিরে আসবে।
    তিনি বলেন, ধর্মের কারণে নয় বরং রাজনৈতিক কারণে অনেকের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। ভারতের সরকারের পক্ষ থেকে চরম বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মানুষ কখনো উগ্র হন না। মেজরিটি আর মাইনরিটি; এই তুলনা আমরা ভুলে যেতে চাই।”

    আমার মুল বলাবলি এখানেই শেষ!
    আসলে এটাই হল, মোদি বা আরএসএস ও বিজেপির অখন্ড ভারত বানানোর পরিকল্পনা। যেমন দেখেন খুবই বোকাবোকা উপস্থাপনে সংসদে হিন্দুদের জন্য আলাদা আসন করা হল, মোদির যত চেলা আছে র-সহ সবার মাধ্যমে মোদির উপস্থাপনা। দেখেন হাসিনা পর্যন্ত সংসদে ৬০ আসন নিয়ে কোন সাড়া দেয় নাই কখনও। অথচ বিএনপি এবং জামায়াত দুই দলই ইতোমধ্যে মোদির অখন্ড ভারতের পরিকল্পনা খেয়ে বসে আছে। ভেবেছে এতে তাদের কথিত মুসলিম জাতিবাদ পছন্দ করাতে যে গন্ধ লেগে গেছে তা ধুয়ে সাফ হয়ে যাবে। এরা ভারতের মোদির কাছে নিজ গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য পায়ে গড়াগড়ি করা শুরু করেছে। আমি বুঝিনা এই যদি তাদের ইমান তাহলে তাদের এই কথিত মুসলিম জাতিবাদ  আকড়ে ধরতে কে বলেছিল? তারা তো কোনটাই বুঝে না, পড়াশুনা করেনা।  ভারতের মোদির এক চালেই এরা কুপোকাত, পায়ে লুটিয়ে পড়েছে…????
    আর এরপর সংসদে আসন আলাদা না করা পর্যন্ত বাংলাদেশকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার শ্লোগান তুলতেই থাকবে একথা বলে যে হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে!!!!  এসবের কোঙ্খবরই রাখে না বিএনপি-জামায়াত!
    ভারতের হাত ধরে ক্ষমতায় যেতেই হবে তাদের এতই মরিয়া! এসব দিকে তাকাবার সময় নাই তাদের!!!!!

    এককথায়, মোদি বা আরএসএস ও বিজেপির অখন্ড ভারত বানানোর পরিকল্পনা – এরই প্রথম পদক্ষেপ হল সংসদে হিন্দুদের আলাদা আসন!!!
    যারা এটা এখন বুঝতেছে না অথবা আসন্ন ক্ষমতার লোভে কোনদিকে তাকাবার সময় নাই,  এরা বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলই না।  

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   রাত ১১ঃ ২৫   ১৪ ডিসেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ   ডিসেম্বর  ২০২৪

     

     

     

     

  • চোর নিজেই দাবি করছে চুরি বেড়ে গেছে!!

    চোর নিজেই দাবি করছে চুরি বেড়ে গেছে!!
    গৌতম দাস
    ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪   বিকাল ০৪ঃ ১২
    https://wp.me/p1sCvy-62g

     

     

    এ’এক অদ্ভুত বাংলাদেশে প্রবেশ করেছি আমরা! এখানে চোর নিজেই দাবি করেছে যে চুরি খুবই বাইরা গেছে! এই বলে ভাল সাজতেছে! কিন্তু এভাবে কী পাপ ধুয়ে ফেলা যাবে? না যায়?
    ইংরাজি ডিপ্লোম্যাট, জাপানি ফাইনান্স আমেরিকা থেকে প্রকাশিত এক ম্যাগাজিন; যা মাঝে চীন ঠেকাও এর ঠিকা ভারতকে আমেরিকা দেওয়ার কালে জাপান থেকেও বের হত। সেই ডিপ্লোম্যাটে কলকাতার এক সাংবাদিক নাম স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য  (প্রাক্তন হিন্দুস্তান টাইমসের লেখক) এক লেখা ছাপানো হয়েছে শিরোনামঃ  বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শের উত্থান ঘটছে বাংলাদেশে [The Rise of the BJP’s Hindutva Ideology in Bangladesh]।

    বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শের উত্থান ঘটছে বাংলাদেশে

    আর সেই লেখাটার বাংলা অনুবাদ করে ছাপিয়েছে প্রথম আলো; বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শের উত্থান ঘটছে বাংলাদেশে।  শিরোনাম দেখে অনেকের মনে হতে পারে যে দেখেছো – প্রথম আলো কত ভাল হয়ে গেছে – একেবারে বিজেপির বিরুদ্ধে শুধু না এমনকি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধেও লিখছে…!  এমনকি একটা ফেসবুক স্টাটাস দেখলাম ইতোমধ্যেই লিখেছে – প্রথম আলোর একটি সিগনিফিক্যান্ট নিউজ কাভার! তিনি দেখেছেন।   ফলে চাই কী এখন আমাদের প্রেস সচিব শফিকুল সাহেবও  এসব দেখে ভেবে বসতে পারেন যে তাঁর প্রথম আলো কে ভালবাসাটা কতটাই না সঠিক ও নিখাদ ছিল; কেবল বাঙালি মুসলমানেরাই তা বুঝল না! ওরা ‘ভারতীয় সেকুলার’ নয় বলে বুঝল না!!!!

    তাদের জন্য এবার একটু ভান্ড ফাটাতেই হবে।

    তাদের জন্য এবার একটু ভান্ড ফাটাতেই হবে।

    “On August 9, the day after Nobel Laureate Muhammad Yunus took charge as the head of Bangladesh’s interim government, Hindus, a religious minority making up 8 percent of the Bangladeshi population, started hitting the streets in different parts of the country, including the Shahbag Square in the national capital, Dhaka.

    They protested a series of attacks targeting Hindu homes, businesses, and places of worship during August 5-8, when the country descended into lawlessness following Prime Minister Sheikh Hasina’s resignation and hurried exit from the country.”

    উপরের লেখার অংশটা স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য এর, উনার ডিপ্লোমেটে লেখা থেকে নেয়া। এখন স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য  এর লেখায় attacks বলে যে শব্দটা ওর পছনের লিঙ্ক – সেটাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক রিপোর্ট, সেটাকেই উদ্বৃত করে আনা হয়েছে।  যার সোজা মানে হল They protested a series of attacks targeting Hindu homes, businesses, বা বাংলদেশে হিন্দু নির্যাতন চলছে সেই প্রপাগান্ডা বক্তব্যটারই মূল উতস প্রথম আলোর রিপোর্ট।  নিচে  প্রথম আলোর (ইংরাজি) রিপোর্টই সেটা।

    আর তা পড়ে পিছনের ঘটনা কাহিনী না জেনে আমরাই আবার ফেসবুকে লিখছি  প্রথম আলোর একটি সিগনিফিক্যান্ট নিউজ কাভার!-আজকের!!!!

    চোর নিজেই দাবি করছে চুরি সত্যিই বেড়ে গেছে!!
    আসলেই তাই!!!!!  কী তামসা!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   বিকাল ০৫ঃ ৪৮    ১৪ ডিসেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ   ডিসেম্বর  ২০২৪

  • দ্বিতীয় পর্বঃ সিরিয়ায় কী হচ্ছে; আবার ওবামা-হিলারির নাটক?

    দ্বিতীয় পর্বঃ সিরিয়ায় কী হচ্ছে; আবার ওবামা-হিলারির নাটক?
    গৌতম দাস
    ১২ ডিসেম্বর ২০২৪   বিকাল ০৪ঃ ১৭
    https://wp.me/p1sCvy-61D

    HILARY, OBAMA & Joe Biden 

    দ্বিতীয় পর্বঃ সিরিয়ায় কী হচ্ছে; আবার ওবামা-হিলারির নাটক?

    সবার আগে খবরের সোর্স নিয়ে দুটাকথা বলে নেইঃ
    সিরিয়ায় ক্ষমতায় পালাবদল এসেছে এতে সবপক্ষকেই আমাদের সবার পছন্দ-অপছন্দ যাই থাক একে বাস্তব বা রিয়েলিটি বলে না মানার আর সুযোগ নাই।
    কিন্তু  সিরিয়ায় তাহলে হলটা কী তা বুঝার জন্য আমি আসলে অপেক্ষা করছিলাম মুখ্যত দুইটা ভাষ্য পাবার এক. ইরান মানে আসলে খামেনী [Ali Khamenei] এর বক্তব্য-ব্যাখ্যার জন্য । কারণ, ক্ষমতার এই পালাবদলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ইরানের গ্লোবাল স্ট্রাটেজি। আর দুই. এরদোয়ান (যে লাভবান হয়েছে সবচেয়ে বেশি; অন্তত আপাতত চোখে) অথবা এর বিকল্প আমেরিকান প্রশাসনের কোন বক্তব্য পাবার জন্য। ইতোমধ্যে রাশিয়ারটা জানা গেছে।

    গতকাল বুধবার খামেনীর বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল তিনি দিয়েছেন। যেখানে তিনি এরদোয়ান বা তুরস্ক সরকারকে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দিয়েছেন, যদিও দেশের নাম নেন নাই, সিরিয়ার পড়শি দেশ বলেছেন।  এপ্রসঙ্গ ভাল কাভারেজ আছে রয়টার্সে আর একেবারে গভীরের  কিছু খবর আছে লন্ডন টেলিগ্রাফে। আর সাথে বাড়তি কিছু আছে লন্ডন গার্ডিয়ানে। আসলে আমি অন্তত ইরান বা খামেনীর বক্তব্য পাবার জন্য সিরিয়া নিয়ে লিখতে দেরি করছিলাম। আর আরেকটা অসুবিধা ছিল ইরানের ক্ষতি হল (যেটা উলটে বললে তুরস্ক-আমেরিকা লাভবান) বলে এই প্রসঙ্গে আমেরিকান (বা সাধারণভাবে পশ্চিমা) নিউজ এজেন্সি খবর দিতে পারবে না বা চাইবে না; তা বুঝতে পারছিলাম। সেজন্যই সিরিয়ান খবর মানে তা হয়ে উঠেছিল  বিদ্রোহি এলায়েন্স [কেউ অবশ্য আগ্রহি না যে এরাই নয়া নামে পুরান আই এস] কে বিজয়ী দেখানো  হিরোগিরি যেন তারাই বীর, ঘটনার আসল নায়ক বলে প্রচারের খবর। সেটাকে আমি প্রথম পর্বে বাংলাদেশে এরশাদের পতনে কথিত বিজয়ীদের দাবির সাথে তুলনা করেছি। এসব মিলিয়েই এককথায় বললে কোন আমেরিকান নিউজ এজেন্সির কাছে কোন মিনিংফুল খবর নাই; বা অন্যভাবে বলা যায়, সব খবরের সোর্স হয়ে উঠেছে লন্ডন। ওদিকে ফাঁকে, আল জাজিরা থাকলেও তারা [মানে আসলে কাতার সরকার] ইরান বা তুরস্ক কারো বিরুদ্ধেই যেতে চায় না  প্লাস কাতারে আমেরিকার বড় সামরিক ঘাটি বলে বাসারের সিরিয়াবিরোধী অনেক কাজ তাদের এতদিন করে দিতে হয়েছে। অতএব নয়া ঝামেলা এড়ানো লাইনে তাদের খবরের ফোকাস হল, ঘন্টায় ঘন্টায় দামাস্কাস শহরে কী হল বা নতুন সরকারে কে এল – এসব সাধারণ বর্ণনার নিউজ!
    রয়টার্স লিখেছে, আসাদ চলে যাবার পরে তারই নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রী [With Syria’s Assad gone, his PM agrees to hand power to rebel administration] ক্ষমতা হস্তান্তরে আগ্রহি ও রাজি, এটা ১০ ডিসেম্বরে। মানে হল, আসাদ একাজে রাজি; এই সুত্রে তাহলে রাশিয়াও রাজি!  এখান থেকেই এটা একটা পর্দার আড়ালে বিরোধের আপোষ-সমাধান। সে খবর এখান থেকে ডালপালা ছড়াবে স্বাভাবিক। আর এই গল্পটা তুলে ধরতে গিয়েই  বিদ্রোহি কোয়ালিশন [rebel-led Salvation] ধারণাটার আমদানি। আর এটাই সিরিয়ার বর্তমান পরিবর্তনে হাতঢুকানোর হাতিয়ার বা টুলস যার সামনের দেশ হিসাবে আছে তুরস্ক আর এরও পিছনে আছে আমেরিকা; ফলে আরও পিছনে ইসরায়েল!
    আর খামেনীর বুধবারের বক্তব্য নিয়ে বোমা ফেলেছে লন্ডন টেলিগ্রাফ ও গার্ডিয়ান। গার্ডিয়ান এর শিরোনাম খামেনীর দাবিঃ “আসাদের ক্ষমতাচ্যুতি আমেরিকা ও ইসরায়েলের পরিকল্পনায় ঘটেছে”  [Assad downfall was planned by US and Israel, claims Iran’s supreme leader]।  আসলে তিনি মুখ্য বা ফ্রন্টাল প্রতিনিধি মেনে নাম করতে চেয়েছেন তুরস্কের। তুরস্ক বুঝাতে বলেছেন, “Yes, a neighbouring government” – এভাবে আরো বলেছেন, এই পড়শী সরকার… in Syria plays an obvious role in this regard, and is still playing it – everyone sees this…সকলেই এর ততপরতা দেখেছে। এরই বাংলা অনুবাদ আমাদের ইত্তেফাক ছেপেছে।

    সংক্ষিপ্ত ঘটনা বর্ণনাঃ
    যাদেরকে বিদ্রোহি কোয়ালিশন [এইচ-টি-এস Hayat Tahrir al-Sham.] নাম বলা হচ্ছে  হঠাত তাদের ততপরতার গল্প প্রেসিডেন্ট আসাদের কানে দেয়া হয়। এই ইন্টেলিজেন্স তথ্য যাদের সমন্বয়ে তৈরি হয় তার মধ্যে ইরানের কুদস ফোর্সের লোক ও রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্স এর লোকও। সেটা এতই ভয়ার্তভাবে আসাদের সামনে তারা তুলে ধরেছিল যে আসাদ দেশত্যাগে রাজি হয়ে যায়। বলা হয়েছিল, এই HTS বাহিনী এসে গেল বলে আর ওরা এলে আসাদ আটকে পড়বেন তাই তাঁর আগে থেকে দেশত্যাগ করা ভাল। এতে এরপরে আসাদ পুতিনের সাথে ফোনে পরামর্শ করলে পুতিন জানান আপনি দেশত্যাগ করতে চাইলে সে সিদ্ধান্ত আপনার তবে আমরা আপনাকে এটা বাস্তবায়নে আপনাকে আশ্রয় দিব সাহায্য করব।  এরপরে আসাদ নিজ জেট বিমানে দেশত্যাগ করেন – আর সেটা সিরিয়াতেই এক রাশিয়ান মিলিটারি ঘাঁটির উদ্দেশ্যে। মনে করা হচ্ছে সেখান থেকে বিমান বদল করে রাশিয়ান সামরিক বিমানে তিনি রাশিয়া পৌছান সপরিবারে।

     লন্ডন টেলিগ্রাফ ১১ ডিসেম্বর লিখছে, “According to Sergey Markov, a pro-Kremlin commentator on Telegram, Moscow’s rescue of Assad proved that its government had already been successfully negotiating with the Syrian rebels. বাংলা করে বললে, রাশিয়ান সরকার প্রসঙ্গে মন্তব্য করে থাকেন এমন কমেন্টটেটর বলেছেন মস্কোর আসাদ কে উদ্ধার করে আনা – এর অর্থ হল, রাশিয়া ইতোমধ্যেই সিরিয়া বিদ্রোহি গোষ্ঠির সাথে কোন আপোষ-রফায় এক মীমাংসা করে ফেলেছে!”

    লন্ডনের গার্ডিয়ান সহ অনেকেই বলেছে, আসাদের দেশত্যাগ ইরানের জন্য এক বিরাট ধাক্কা।
    তবে লন্ডন টেলিগ্রাফের গভীরে গিয়ে রিপোর্টিং রিপোর্ট সেটা হল, ইরানের Islamic Revolutionary Guard Corps (IRGC) এর দুই সিনিয়র কর্তার বরাতে এক রিপোর্ট। যেখানে ওদুই কর্তা আলাদা আলাদা করে অনেক তথ্য জানিয়েছেন। যার সারকথা হল, ইরানি এই গার্ড বাহিনীর ভিতরে আসাদের পতন কে কেন্দ্র করে একে অপরকে দোষারোপ আর হতাশায় নিজের মাথার চুল ছিড়ে ফেলার দশায় পরেছে। নেতা খামেনী তা নিয়ন্ত্রণ ও ঠান্ডা করার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমন খবরের লন্ডন টেলিগ্রাফ এর ৯ ডিসেম্বরের শিরোনাম দেয়া হয়েছে,Iran’s armed forces ‘at war with themselves’ over fall of Assad। বলা হয়েছে ইরানের কাছে ঠিক আসাদ নয়, মূলত লেবাননের হিজবুল্লাহকে সামরিক রসদ ইত্যাদি [main route for supplying Hezbollah] সরবরাহ আর অন্যদিকে ইসরায়েল এর পৌছানোর সুযোগ নেয়া – এবং সে ভিত্তিতে ইরানের নিজেকে সাজানো এই ছিল বিপ্লবী ইরানের কাছে আসাদের গুরুত্ব!

    “No one ever imagined seeing Assad fleeing, as the focus for 10 years had been only on keeping him in power. And it was not because we were in love with him, it was because we wanted to maintain proximity to Israel and Hezbollah.”

    কিন্তু ট্রাজিক কথাটা হল, লন্ডন গার্ডিয়ান খবর দিচ্ছে – আসাদের পতনে হামাস এই পতনের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছে – .…..Hamas, the leaders of the Palestinian resistance in Gaza, has welcomed the fall of Iran’s ally Assad. ওদিকে আবার কাতার সেও – কাতার নয়া সিরিয়াতে এখন এমবেসি খোলার কথা জানিয়েছে। .…..Qatar, a country that refused to recognise Assad, is due to reopen its embassy shortly, and is likely to be a key player in trying to persuade the Sunni HTS …।

    HTS সম্পর্কে তথ্যঃ 
    এই তথ্য দিচ্ছে রয়টার্স তার আর্কাইভ থেকে। লিখেছে, জাতিসংঘের চোখে HTS এখনো এক টেররিস্ট গ্রুপ! মূল অকারণ, এর ইরাকে প্রথমে আল কায়েদার হয়ে পরে আইএস এর হয়ে টেররিস্ট ততপরতা। এর নেতা গোলানি [Golani] দীর্ঘদিন আমেরিকান কারাগারে আটক ছিলেন। HTS is still designated as a terrorist group by the United Nations, but has spent years trying to soften its image to reassure foreign states and minority groups within Syria. The group’s leader Golani, who spent years in U.S. custody as an insurgent in Iraq but later broke with al Qaeda and Islamic State, has vowed to rebuild Syria.
    সেখান থেকেই কী তাঁর আমেরিকার সাথে সম্পর্ক যোগাযোগ ও বিকাশে আজকের অবস্থায়?

    আমেরিকার এই কালো অধ্যায়েরঃ
    আমেরিকার এই কালো অধ্যায়ের নাম ও কালপর্ব হল, ২০০৯-১২ সালের ওবামা-হিলারি প্রশাসন; তাদের হাতে আসলে আইএস এর জন্ম। তিনারাই  Abu Musab al-Zarqawi [আবু মুসাব আল-জারকাউই] কে নিয়োগ দিছিলেন। সেটা আল-কায়েদা অনেক দেরিতে টের পায় বলে এর আগে তাকে (জারকাউই মূলত জর্দানি, আলকায়েদা তার ঘরানা নয়, গুরুও নয়) রীতিমত বায়াত নিয়ে পরে ইরাকে আল-কায়েদা, ইরাক এভাবে সংগঠন খুলতে দেয়া হয়েছিল। তার গ্রুপ কে ওবামা প্রথম নিয়োগ দিয়েছিলেন ইরাকে; মূলত শিয়া-সুন্নি বিভক্তি আনতে ঘটাতে। যদিও এর আগেই  আমেরিকা জারকাউই কে বিমান থেকে গুলি করে মেরে ফেলেছিল; খুব সম্ভবত আলকায়েদা ঘটনা সব জেনে ফেলেছিল বলে। পরের ঘটনা সংক্ষেপ করে বললে, পরে (জারকাউই বাদে) এই গ্রুপকেই ওবামা-হিলারি নিয়োগ দিছিলেন লিবিয়ার বেনাগাজিতে বসে গাদ্দাফি কে বধ করার জন্য। তারা কাজ করে দিয়েছিল ঠিকই। পরে এই গ্রুপকেই সিরিয়ার আসাদকে উতখাত হত্যার এসাইমেন্ট দিয়েছিল। এবার ততদিনে তারা বিট্রে করে বা নিজের পথে নিজ নামে (আইএস) নিজেরা আত্মবিকাশ ঘটিয়ে রওনা দিয়েছিল। আর তখনই কেবল তারা নিজেরা যে নাম নিয়েছিল সেটাই আইএস বা (ISIL)।  সেসময় যা যা ঘটিয়েছিল ১। গাদ্দাফিকে হত্যা করার পরে তাদের একটা গ্রুপ লম্বা গাড়িবহরে লিবিয়ান অস্রত্র বোঝাই করে আফ্রিকার মালি তে চলে যায়। ২। বেনগাজিতে আমেরিকান রাষ্ট্রদুতের অফিসেই রাষ্ট্রদুত সহ সকল স্টাফকেই মেরে ফেলে যায় তাঁরা। ৩। কিন্তু এর আগেই আমেরিকাই এই গ্রুপকেই সিরিয়ায় আসাদকে উতখাতে এসাইমেন্ট দিয়ে বিমানে করে অস্ত্রসহ পৌছানোর  ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ৪। আসলে সিরিয়ায় পৌছানোর পরে নিজেরা সংহত হয়ে নিয়ে এরপরেই প্রথম আইওএস নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল । আর এর চেয়েও বড় কাজ ও কথা হল, তারা সিরিয়া থেকে রওনা দিয়ে ইরাকে আইএস নামে সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পরছিল।

    সেটাও ওবামার দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্টের আমল। তিনি ততদিনে ইরাক-আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে নিয়ে গেছিলেন (২০১৪ সালের ডিসেম্বরে) আমেরিকান অর্থনৈতিক সামর্থ যুদ্ধের খরচ বইবার মত আর না থাকার কারণে। কাজেই ওবামার নিজের হাতেই জন্ম দেয়া সশস্ত্র গ্রুপ যাদের তিনি সিরিয়ায় এনেছিলেন তারাই বোগদাদি খলিফা প্রতিষ্ঠা করে  ইরাকী আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করে ফেলেছে।  কী তামসা!!!
    আর ওবামা বোকা হয়ে গেছেন তার আমেরিকান সৈন্য তিনি ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন সেই ২০১৪ সালের আগেই!!!  অতএব এখান থেকেই এবার ইরাকী আইএস  খেদাতে ইরানের সরকারের শরণাপন্ন হন; যদি তারা ইরাকী আইএস খেদায়ে দেয়। ফলে ইরানের সরকারের সাথ ওবামার আমেরিকা প্রশাসন এক চুক্তিতে আসে এটাই ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি! নামে খ্যাত। ঠাট্টা করে বললে এটাই ওবামা-হিলারির বেশি বুদ্ধিমান হতে চাওয়া আই-এস এর জন্ম দান আর এর অন্তত  ইরাকী আইএস অংশটাকে হত্যা করা। ইরান ওবামার সাথে চুক্তি মোতাবেক  নিজের IRGC বাহিনী দিয়ে ইরাকী আইএস কে ইরাক থেকে নির্মুল করে দিয়েছিল।

    তাহলে এখন সিরিয়ায় যেটা হচ্ছে, সেটা কী?
    এটাই কী আবার প্রাক্তন আইএস দেরই প্রতিশোধ? তবে নতুন নামে! ইরানের উপর প্রতিশোধ? 
    কিন্তু সেটা আবার পুরান আইএস – তাদেরই নয়া নামে কিন্তু সেই পুরানা দোস্ত আমেরিকারই হাত ধরে?
    তাদেরই এখন নয়া নাম বিদ্রোহি কোয়ালিশন বা  এইচ-টি-এস [ Hayat Tahrir al-Sham]। আমেরিকান এখনকার কী হবে?  শ্লোগান হবে জয় হোক HTS, এভাবে!!!! নাকি জয় হোক ISIL, এভাবে!!!!
    আবার তুরস্কও তাদের পক্ষে, রাশিয়ায় পাইপ লাইনে???  

    হেব্বি সব মজার কাহিনী, তাই না!!!!

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ    ১৪ ডিসেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ   ডিসেম্বর  ২০২৪

  • সিরিয়ায় কী হচ্ছে; এ’ক্ষমতাবদলের অর্থ-তাতপর্য

    সিরিয়ায় কী হচ্ছে; এ’ক্ষমতাবদলের অর্থ-তাতপর্য
    গৌতম দাস
    ১১ ডিসেম্বর ২০২৪  রাত ০৯ঃ ৩৮
    https://wp.me/p1sCvy-61c

     

    মস্কোয় সিরিয়ার দূতাবাসে উড়ল বিরোধীদের পতাকা

    [সিরিয়ায় কী হচ্ছে; এ’ক্ষমতাবদলের অর্থ-তাতপর্য। এই লেখা অবশ্যই এক প্রাথমিক বুঝাপড়া থেকে। এতক্ষণ পর্যন্ত যতটুকু পর্দা উন্মোচিত হয়েছে; যার বেশির ভাহটাই ঘটে গেছে পর্দার অন্তরালে। যেখানে অতি অবশ্যই বাইডেন-পুতিন এর বুঝাপড়া আছে। সাথে কিছুটা  বলা বাহুল্য  বাইডেন-নেতানেহায়ু এরাও আছেন। গোলান-হাইট দখল এর ইঙ্গিত। 
    এক্ষণ এর সাথে কী ইউক্রেন-ও একই ডিলের অংশ!  এরকম একটা ভাষ্য ভেসে বেড়াচ্ছে যে ট্রাম্প বলছেন সিরিয়ার পর তাহলে ইউক্রেন ইস্যুও দ্রুত সামনে আনা উচিত! আমার অনুমান এমন অনেক কিছুই এখনও হিডেন বা পর্দার আরালেই রয়ে আছে বা রাখা আছে। তবে একটা মূলসুত্র বলে দেই যে কীভাবে দেখতে হবে এই অর্থে, আগামি ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ট্রাম্পের ক্ষমতা আরোহনের শপথের দিন। এর আগে পর্যন্ত বাইডেন এমন অনেক কিছুই করে নিবেন। যার মধ্যে কতগুলো থাকবে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিপদে ফেলে দিয়ে যাবার জন্য। আবার কতগুলো থাকবে বাই পার্টিজান মানে আমেরিকান সংসদগুলোর দুপার্টির মিলিত সিদ্ধান্তে নেয়া যা বাস্তবায়িত করে দিয়ে যাবেন এখনও যে আছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন!]

     

    সিরিয়ায় কী হচ্ছে, কী চলছে এনিয়ে একটা বাংলাদেশের উদাহরণ মনে পড়ল। ঘটনাটা হল বাংলাদেশে এরশাদের পতন। বাসার আসাদের পতন এর সাথে এরশাদের পতনের অনেক মিল আছে।   আচ্ছা, এরশাদের পতন কবে হয়েছিল?
    এটা শুনলে আমাদেরকে পুরান কাগজপত্র ওয়েবে বা কাগজের গাট্টিতে খুঁজতে বসতে হবে।  তারিখ হিসাবে সেটা হল, ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। সেকালের মিডিয়া বলতে (মূলত ইত্তেফাক আর সংবাদ; এর বাইরে ইনকিলাব এসেছে কেবল আর ওদিকে দৈনিক খবর ছিল এরশাদের হাত ধরে তবে সবই মূলত খুচরা প্রপাগান্ডা পত্রিকা)। আর টিভি বলতে একমাত্র বিটিভি। ওয়েব বা নেট বলতে কী বুঝায় আমরা তখনও কেউ জানিই না, চিনতাম না।  সম্ভবত আমরা ছুটছিলাম ৬ ডিসেম্বর সকালে প্রেসক্লাব-পল্টনের দিকে, কারণ খবর যা কিছুই ঘটে বা হয় তা ওখানেই। যেন আমাদের কথিত “বিপ্লবের স্কয়ার”! আমিও বাসা থেকে রওনা দিয়েছিলাম। যদিও বাসা ভর্তি আমরা সকাল থেকেই কথা শুনেও নিশ্চিত বিশ্বাস করছিলাম না।
    এর আগে (ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের না), বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সম্মীলিত সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয়ে গেছিল সেটাই ছিল “১০ নভেম্বর ১৯৮৭ ঢাকা ঘেরাও”। যে  কর্মসুচিতে গ্রেফতার হয়ে আমি ছয় মাস ডিটেনশনে জেল খেটেছিলাম। বের হয়ে (১০ মে ১৯৮৮) দেখি পুরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি এরশাদের নিয়ন্ত্রণে।  ফলে এরশাদ বিরোধীদলকে কোন পাত্তাই না দিয়ে আর বিরোধীদল ঘরে বউ-বাচ্চা নিয়ে সবাই শান্তিতে এই ছিল পরিস্থিতি।  আর সেরকমই বজায় ছিল ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরেও।
    তাহলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হল কী করে। সেদিন বা আশেপাশের সময়ে বিরোধীদলের কোন ঘরোয়া সভাও ডাকা ছিল না। তাহলে? কার হুমকি-তে এরশাদের পতন ঘটেছিল? এখনও কেউ বলতে পারবে? একেবারেই হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া?

    আর ঠিক একই রকম প্রশ্ন  ঘটনা হল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের বেলায়। আসাদের পতন হল কেন? কে করলো? ঠিক কোন ঘটনাটা এখানে স্পার্ক করলো, আগুন টা লাগলো? কোন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াতেও এর সমন্বিত কোন ব্যাখ্যা নাই। ঘটনাটা ঘটে যাবার পরে রাজধানীর দিকে সশস্ত্র কোন গ্রুপ কারা এগিয়ে আসছ্বে এসে কী করছে – এগুলোই নিউজ। আর সাথে আছে ওদের আয়নাঘরগুলো কেমন ও কোথায় কোথায় ছিল এগুলোকেই প্রধান করে নিয়ে খবর বিক্রি!
    ঠিক যেমন এরশাদের পতনের পরে বিজয়নগর নাংটিঙ্গেল রেস্তোরা সহ কী কী ভাঙ্গা হয়েছিল সেই বীরত্বগাথা গল্য়প নিয়ে মিডিয়ায় হৈ চৈ মাতম!
    সাম্প্রতিকালের কালে বাসারের বিরুদ্ধে বড় কোন চোখপড়ার মত বিদ্রোহি সশস্ত্র যুদ্ধের কথা জানা যায় না। যা ছিল তা সবই নিয়মিত হয়ে পড়েছিল যা। গত ২০১১ সালের মার্চ থেকে সিরিয়ার অভ্যন্তরে চারদিকেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় এক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে থাকা দেশ ছিল। প্রতিটা পড়শি বর্ডারে অসংখ্য বিভক্তিতে ছোট ছোট সশস্ত্র গ্রুপ একে অপরের বিরুদ্ধে – পড়শি দেশের সমর্থনে আর বিপক্ষে। আর আসাদ কেবল রাজধানী দামাসকাসে সামলে সেখানে ক্ষমতায়, মোটাদাগে এই ছিল চিত্র।
    তাহলে আসাদ কেন দেশত্যাগ করে উড়াল দিলেন???

    এখানেই এরশাদের সাথে আসাদের গভীর মিলঃ
    এরশাদের পতন ঘটেছিল আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতের কারনে একেবারেই নয়! বাইরের বা গ্লোবাল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ঘটনায় – শিরোনামে বললে, ইরাকের প্রেসিডেন্টের সাদ্দামের কারণে। যদিও সাদ্দামের সাথে এরশাদ সাদাচোখে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়! তবু এটা ঘটেছিল।
    সাদ্দাম ১৯৯০ সালের ২ আগষ্টে পড়শি দেশ কুয়েত দখল করে নিয়েছিল। বোকা কমিউনিস্টদের মতনই। যেমন বাংলাদেশের অনেক কমিউনিস্টো আছে যে মনে করে ওয়ার অন টেররে আমলে নির্বাচিত সরকারের সাথে যদি সশস্ত্র ইসলামি গ্রুপকে মিলিয়ে দিয়ে ততপরতায় নামিয়ে দেয়া যায় তাহলে সেটা নাকি বাংলাদেশে আমেরিকাবিরোধী (তাদের ভাষায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী) একটা হেব্বি কাজ হবে সেটা!  আসলে জাতিসংঘ বা গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম ব্যবস্থা টা সম্পর্কে কোনই ধারণা না থাকলে যা হয় এখানে তাই হয়েছে। এরা সত্যি একেবারেই জানে না এই গ্লোবাল ব্যবস্থাটা কী? এটা কী কী পারে আর কী এর সীমাবদ্ধতা! ইদানিং অনেক ময়ুখ নামের ইন্ডিয়ান লোক এমন সাদ্দাম হতে চাচ্ছে – চট্টগ্রাম দখল করে নিবে – খায়েশ করেছে কারণ, এটা ইন্ডিয়ার নাকি দরকার তাই!
    এরা (কমিউনিস্ট এন্ড গং) এখনও জানে না এরপর সাদ্দামের কী হয়েছিল? পতন হল কেন? কোন সুবিধাটা আমেরিকা নিয়েছিল……!
    কুয়েত দখলের পরের ঘটনা-সংক্ষেপ হল, জাতিসংঘ এই দখলকে কঠোরভাবে নিন্দা করে প্রস্তাব এনেছিল। আর তাতে প্রবলভাবে ভোট দিয়েছিল বিশেষ করে ছোট দেশগুলো। কারণ তারা ছোট বলে কুয়েতের মধ্যে নিজ নিজ দেশ ও ভাগ্যকে দেখে ফেলেছিল। জাতিসংঘের সদস্য দেশের দখল বা স্বীকৃত ম্যাপ চেঞ্জ করা যায় না এটা অনেকেই জানে না। মনে করে সবকিছুরই প্রধান নির্ণায়ক নিজ নিজ সামরিক শক্তি! আবার জাতিসংঘের এই নিন্দার মানে কিন্তু এই নয় যে এর ফলে কুয়েতের বাদশাদের কুয়েত ফেরত পেয়ে যাওয়া অবশ্যইনা! তাহলে এই নিন্দার গুরুত্ব কী, লাভালাভ কী? মনে রাখতে হবে তখনও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় নাই অথবা সেটা ওয়ার অন টেররের আমল বা ওর প্রথম যুগ (২০০১-১৪) নয়। ফলে গ্লোবাল ভারসাম্য সোভিয়েত-আমেরিকা ব্লকে বিভক্ত আর ইরাক সোভিয়েত ব্লকে।

    জাতিসংঘের কোন নিন্দাতে কুয়েত তখনই দখলমুক্ত হয়ে যায় নাই। কিন্তু  এতে এমন একটা পরিস্থতি তৈরি হয়ে যায় যে কোন পরাশক্তি দেশ আমেরিকা লিড নিয়ে ইরাকের সাদ্দামের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে  সাদ্দদামের পিছন হটা ঘটতে বাধ্য হয়ে যায়। এর একেবারে মূল কারণ, সাদ্দামের নৈতিকভাবে জাতিসংঘের আসরে হেরে যাওয়া!  বাস্তবে তাই ঘটেছিল, আমেরিকা ইরাকের উপর নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা [মানে হল ওদেশের যতই সামরিক-বিমানের সক্ষমতা থাকুক একটা হেলিকপ্টার উড়লেও তা আমেরিকার বোমা খেয়ে লুটায়ে পড়বে এই শর্ত, চাপ বা হুমকি আরোপ।] আরোপ করেছিল কোন ব্লক এর বিরোধিতা করতে আগায় আসে নাই।  পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে কুয়েত মুক্ত স্বাধীন হয় আবার।
    কিন্তু আমাদের প্রসঙ্গে আসি। সাদ্দামের কুয়েত দখলের সাথে শাসক এরশাদের সম্পর্ক হল, ঐ দখলের কারণে তেলের দাম ডাবল হয়ে যায়। আর এতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক আঘাতে গরীব-বড়লোক নির্বিশেষে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল আর স্বভাবতই কোন দেশের সব ক্ষোভ নিশ্চিতভাবে শাসকের বিরুদ্ধে যাবে, যায়।
    আর প্রগতিশীল প্রভাবিত রাজনীতি ও দল এই ক্ষোভকে দেশে দেশে আমেরিকার বিরুদ্ধে পরিচালিত করে দেওয়াতে আমেরিকার টনক নড়ে। তারা আমাদের মত সব দেশে বিশেষ কূটনীতিক প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। তিনি ঢাকায় এসে আবিস্কার করেন নয়বছর এরশাদ ক্ষমতায় একছত্র ওদিকে বিরোধিরা সংসদেও নাই।  কাজেই আমেরিকান স্বার্থ হয়ে উঠে এরশাদকে বিদায় করে খোলা নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দিকে চলে যাওয়া; আর আর্মিকেও এরশাদের হাত-নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়া যাতে তিনি নিজ রাজনৈতিক শাসনক্ষমতায় একে আর ব্যবহার না করতে পারেন। আর আমেরিকা সেটা বাস্তবায়ন করেছিল নুরুদ্দিনের নেতৃত্বের  আর্মিকে (এরশাদের নিয়ন্ত্রণ-নেতৃত্বে আর নয়) নিয়ে যাওয়া আর তাদেরকে জাতিসংঘ মিশনে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে। সেই থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের আর্মির জাতিসংঘ মিশন; প্রথম মিশন ছিল – কুয়েত মিশন ১৯৯১!   আর এরশাদ??? তিনি আর কারও কোন কাজে লাগে এমন কেউ রইলেন না!  মূলত পর্দার অন্তরালের এসব ঘটনার কারণেই ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের ক্ষমতাচ্যুত-পদত্যাগ ঘটেছিল। এর চেয়েও বড় চিহ্ন হল, তখন মানে, ১৯৮৮ মে মাসের পর থেকে ১৯৯০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক পাড়া একেবারে নিশ্চুপ ছিল তা সত্বেও বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আশেপাশে কোন রাজনৈতিক দল বা জোটের কোনই কর্মসুচী না থাকা সত্বেও হঠাত ছয় ডিসেম্বর সকালে এরশাদের পদত্যাগের খবর ভেসে উঠেছিল। মূল কারণ, তেলের দামের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যেন প্রবল আমেরিকাবিরোধী না হয়ে উঠে (বিরোধিরা যার সুবিধা নিয়ে ফেলতে পারে) তাই আমেরিকা আমাদেরকে বিনা আন্দোলনেই এরশাদের পতন ঘটিয়ে দিয়েছিল।

    তাহলে সিরিয়া প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ হঠাত উড়াল দিলেন পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে যেখানে মাঠে বড় কোন সশস্ত্রতা বা কোন মুভমেন্ট ক্রিয়াশীল নাই তখন আসাদ এমন করলেন কেন?
    অর্থাৎ পর্দার অন্যরালের আয়োজনে এরেঞ্জমেন্ট যখন ঘটে তখন এরশাদ বা আসাদের এভাবেই পদত্যাগ করে থাকে! এর আরেক বড় লক্ষণ হল – শান্তিপুর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর!

    তাই সিদ্ধান্তগুলো দেখেন শিরোনাম আকারেঃ
    ১। আসাদেরই নিজ নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রীই ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
    ২। শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যারা এদেরকে বলা হচ্ছে বিদ্রোহি কোয়ালিশন এইচ-টি-এস [The main rebel coalition is led by Hayat Tahrir al-Sham.]
    ৩। এটা খুবই মজার না যে আপনি দলেবলে সশস্ত্র হলে একটা রাজধানী শহরে ঢুকছেন বিনা বাধা-প্রতিরোধে; শুধু তাই না উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ক্ষমতা হস্তান্তরে তৈরি হয়ে অপেক্ষায়।.
    ৪। এবার মিলিয়ে দেখেন ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ আমরাও প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে এরশাদের গুষ্ঠি-উদ্ধার করে শ্লোগান দিলাম আর পরে শুনতেছি এটাই নাকি ছিল “এরশাদবিরোধী নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান”।  মজা না!!
    ৫। ছাত্র জনতার নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান  এই যে বিনা মেঘের নয়া নামকরণ হয়েছিল আমাদের বেলায়, সেটাই কী সিরিয়ার বেলায় বিদ্রোহি কোয়ালিশন এইচ-টি-এস!!! এই নামকরণ!
    ৬। আমি মনে করি সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ চিহ্ন হল, পুতিনের রাশিয়ার মানে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ [sergey lavrov] এর সহযোগিতা।  ১। প্রথম ঘোষণা আসাদ নিজ প্লেন উড়ায়ে দেশত্যাগ করে অজানা গন্তব্যে রওনা দিয়েছে। ২। ৭-৮ ঘন্টা পরে লাভরভ জানাচ্ছেন আসাদ রাশিয়ার আশ্রয় নিয়েছেন।
    ৭। এই  বিদ্রোহি কোয়ালিশন এইচ-টি-এস [–এর মধ্যকার সবচেয়ে বড় গোষ্ঠি যেটা  তারা রাশিয়ার মস্কোতে অফিসে দলীয় পতাকা উড়াচ্ছেন।  এই ঘটনা এটা সবচেয়ে তাতপর্যময় ও ইঙ্গিতপুর্ণ।
    ৮। এটা ফরমাল বক্তব্যঃ  “রাশিয়া সব সময় সিরিয়া সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিল এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে”।

    [এই হল, মোটা দাগে ঘটনাবলীকে আমি যেভাবে দেখছি।
    এছারা আরও কিছু বাড়তি অংশ বা বাড়তি প্রসঙ্গ এতে যোগ করব। সেটা আজ রাতেই নয়ত কাল সকালে, ঘোষণা দিয়ে সবাইকে তা জানানো হবে। আপাতত এতটুকুই এই পর্বে!]

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   রাত ১০ঃ ৪৯   ১১  ডিসেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ   ডিসেম্বর  ২০২৪

     

     

     

  • ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর!

    ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর!
    গৌতম দাস
    ১০ ডিসেম্বর ২০২৪  সকাল ১১ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5ZV

     

    ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব

    ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর!

    ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি [Vikram Misri] একদিনের জন্য গতকাল ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। হাসিনার পতনের ঠিক চার মাস পরে মোদি সরকার সরকারিভাবে কোন প্রতিনিধি এই প্রথম বাংলাদেশে পাঠালেন। হাসিনা উতখাতের পরে এই চার মাস মোদি যে বাংলাদেশ নীতি-পলিসি নিয়ে চালিয়ে গেছেল সেটাকে বলা যায় নয়া ইউনুস সরকারকে
    ১। স্বীকার না করতে চাওয়া, বা-হাতে ফুল দিবার মত করে যতটুকু স্বীকার ও ব্যবহার না করলে নয় সেভাবে থাকা।
    ২। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে বলে আকাশ-বাতাস কাঁপায় ফেলা; সেটা এমনই চড়া মিথ্যাভাবে যে সেটা আন্তর্জাতিক জরিপেও মিথ্যা প্রপাগান্ডায় ইন্ডিয়াকে একনম্বর বানায় ফেল। তবু মোদি বেপরোয়া…
    ৩।  বাংলাদেশের ইতিহাসে হিন্দুরা সবসময়ই শুধু হিন্দু হিসাবে মিছিল করে নাই, নিজেকে হাজির করে নাই। করেছে আওয়ামি লীগ পরিচয়ে নয়ত কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল, নয়ত সংখ্যালঘু বা (মুসলমান বাদে) হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ইত্যাদি বলে ধর্মীয় জোটের মধ্যে থেকে, শাহবাগী বলে এরকম একটা না একটা আড়ালে, অন্য কারো সাথে অন্যের ব্যানারে মিশে থেকে এভাবে। কিন্তু এবারই প্রথম শুধুই হিন্দু পরিচয়ে বাংলাদেশের হিন্দুরা শাহবাগ পর্যন্ত গিয়েছে, জমায়েত করেছে।  শুধু তাই না, বাংলাদেশে এবার আসলে একেবারে পিওর বিজেপির উদ্যোগে তাই ইসকনের (র-এর ভ্যানগার্ড বা আগাম পার্টি) নেতৃত্বেও বা সেজে মিছিল করেছে – বাংলাদেশের মানুষ তা দেখেছে এবার।
    [বিজেপি-আরএসএস এভাবে একসাথে বলতে পারলে ভাল হত। কিন্তু গত মে ২০২৪ ইন্ডিয়ান নির্বাচনের সময় থেকে বিজেপি-আরএসএস এর মধ্যে কড়া মনোমালিন্য চলছে এখনও; ঘটনা এতদুর যে আরএসএস গত নির্বাচনে বিজেপিকে সাহায্য করতে সাথে কোন কাজে অংশ নেয় নাই, বিজেপিকে সহযোগিতা করে নাই, কোন ভুমিকা নেয় নাই, প্রভাবও রাখে নাই। তাই মোদির ফলাফল খারাপ বলে সকলের অনুমান এবং তা আরো গোপন রাখা। কিন্তু  বাংলাদেশে আরএসএসের মুল নেতা গোবিন্দ প্রামানিকও তাই বাদ – মোদির বাংলাদেশে  হিন্দু নির্যাতনের গল্প-প্রপাগান্ডার কাজ থেকে।  শুধু তাই না প্রামাণিক এতে আবার কয়েকটা এর বিরোধী বয়ানের ভিডিও-ও করে ছেড়ে দিয়ে বলেছেন বাংলাদেশে কোন হিন্দু নির্যাতন হয় নাই বলে। এনিয়ে একটা বিস্তারিত লেখা দিবার ছিল কিন্তু এত বেশি ইস্যুর ভীড় জমেছে যে তা আমি পারি নাই। দেখি সামনে পারি কিনা ]

    এসবের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    এক. শেষ থেকে যদি বলি, বাংলাদেশে  মোদির হিন্দু নির্যাতনের গল্প-প্রপাগান্ডার কাজটা এটা মোদি পরিচালনা করতেছেন এককভাবে। মানে হল এটা শুধু খোদ বিজেপি পরিচালিত।  আরএসএস এর সাথে নাই। ওদিকে এমনকি প্রত্যক্ষভাবে আওয়ামি লীগকেও সাথে নেয় নাই। যেমন, হাসিনার ১০ নভেম্বর জিরো পয়েন্টের জমায়েতের হুঙ্কার আর শাহবাগে হিন্দু নির্যাতনের গল্প-প্রপাগান্ডার মিছিল ঠিক একই আয়োজক না। প্রথমটা একা হাসিনার আর পরেরটা একা মোদির মানে বিজেপি পরিচালিত বাংলাদেশি হিন্দুদের।
    দুই. এর অর্থ হল, হাসিনারা বিনা ব্যানারে বিজেপি পরিচালিত প্রোগ্রামে থাকলে থাকুক! নাইলে না এই ভিত্তিতে।  অন্যভাবে বললে, ৫ আগষ্টের পরে বাংলাদেশে যা কিছু হৈ চৈ উত্তেজনা ছড়ানো তা একক হিন্দুদের নামে করা হয়েছিল; কারণ এর পুরাটাই ঠিক হাসিনার যতটা না এর চেয়ে এটা খোদ মোদির বা বিজেপির এজেন্ডা।
    তিন. তাহলে কী চায় প্রধানমন্ত্রী মোদি?
    হাসিনার উতখাত হয়ে যাওয়াতে লীগ বা হাসিনার যত দুঃখ ব্যাথা এর চেয়েও বেশি  দুঃখ ব্যাথা আসলে ইন্ডিয়া বা মোদির রাষ্ট্রস্বার্থের। যেমন, বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দখলের সুবিধা যা ছিল তা তো ছিলই। বাংলাদেশের (মানে হাসিনার) উপর প্রভাব যেটা দেখিয়ে তার কলোনি আচরণের পররাষ্ট্রনীতি খুব সফল বলে মোদি দাবী করতেন; আর সেটাই ইন্ডিয়াতেই তার বিরোধিদলের কাছে যা আবার ভোট পেতে বিজেপির জন্য একটা বাড়তি দেখানোর ইস্যু হত। আবার চীনের সমান না হলেও মোদি দাবী করতেন বাংলাদেশে তিনি প্রভাব কায়েম করতে চীনের চেয়েও পারদর্শী তাতে ভিতরের ঘটনা যাই হোক!  আর সবার উপরে ছিল বাংলাদেশের উপর দিয়ে চারদিক থেকে বিনা পয়সার করিডোর ও বন্দর ব্যবহারের সুবিধা আদায়।
    এসব কারণেই হাসিনার উতখাতে লীগ বা হাসিনার ক্ষতির চেয়েও খোদ ইন্ডিয়ার বা মোদির রাষ্ট্রস্বার্থের ক্ষতি অনেক বেশি – অন্তত তা মোদির চোখে। একেবারে বড় মাছটা বড়শি ছিড়ে আবার পানিতে ফিরে চলে যাবার মত হাত কামড়ানো মোদির ক্ষতি! মোদি যা চিন্তাও করেন নাই।
    অতএব গত চার মাস মোদি একাই মাঠে নেমে গেছিলেন (লীগ বা হাসিনার পরোয়া না করে) এই ভেবে যাতে হাসিনা নাই তো কী? তার তো হাত গুটিয়ে শোকগ্রস্থ হয়ে বসে থাকা চলে না! বরং নয়া রাস্তা খুঁজে কতটা আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা যায়, একটা “নয়া হাসিনাও” খুজে বের করা যায় কিনা! আর এই কাজে বাংলাদেশের উপর চাপ প্রয়োগ করলে তাতে কী সে কাঙ্খিত এক ‘নয়া হাসিনা’ খুজে পেতে পারে? এর সম্ভাবনা কী ও কেমন? যাতে এরপরের ইউনুস সরকার বা কোন হবু নির্বাচিত সরকার কতটা হাসিনার মতই হবে হওয়া / পাওয়া সম্ভব; যাতে সে দলকেও ভারতের হাতের পুতুল করে ও অনুগত দালাল বানিয়ে রাখা যাবে; এসবেরই যাচাই করতে তিনি মাঠে নেমেছিলেন।
    এর রিস্কও অনেক। যেমন, ইতোমধ্যেই গেট খুলে বাংলাদেশকে ডুবাতে গিতে মানে বাংলাদেশের ভারতের অনুগত হওয়া ছাড়া উপায় নাই – এটাই দেখাতে গেছিলেন মোদি। এদিকে হিতে-বিপরীত হয়ে যায়। কারণ, প্রথমে ইউনুস সাহেব বলতে গেছিলেন – ভাই ভারত ভাইয়েরা আপনার গেট খুলার আগে আমাদের একটু বইলেন এভাবে বলে – এই আবদার করে শেষ করতে। কিন্তু ভাটির দেশেরও কমন নদীতে সমান অধিকার এর আন্তর্জাতিক আইন আছে এটা জানতে পেয়ে ইউনুস সাহেব এমন শক্ত ভাবে ইন্ডিয়ার চোখে চোখ রেখে সম- মর্যাদা ও সম অধিকারের কথা তুলে বসলেন যে মোদি বুঝে গেলেন এ’তিনি কাকে লাড়তে এসেছেন!! সেখান থেকেই মোদির বিএনপি ও জামায়াতকে কাছে টানার ততপরতা শুরু; এদের দিকে হাত বাড়ানো আর  সবার আগে “রোড ম্যাপ” চাই বলে ইউনুসের কাছে হুঙ্কার ছাড়া!

    আর এটাই ছিল আসলে ইন্ডিয়ারও ইউনুসের কাছে দাবী। এনিয়ে বিবিসির রিপোর্ট দেখেন।

    এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুত, ইউনুস সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলছেন – “ড. ইউনূসকে বলব, আপনার সরকারের সাংবিধানিক ভিত্তি কী, সেটাই তো স্পষ্ট নয়! আর আদৌ যদি কোনও বৈধতা থেকে থাকে –সেটানব্বইদিনেরবেশিনয়,আর তাও শুধু নির্বাচন আয়োজনের জন্য!”
    “সেই জায়গায় আমরা কী দেখছি, নব্বই দিন কেটে গেছে আর আপনারা দেশ সংস্কারে নেমেছেন! 
    ” (উনি) ইন্টারভিউ দিয়ে বলছেন, তিস্তা সহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন হতে হবে সমতা আর ন্যায্যতার ভিত্তিতে।” “আরে বাবা, ভারত আপনাদের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে কথা বলতে যাবে কোন দুঃখে?”

    এটাই হল উপরে যা বলেছি সে প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান বা মোদির খাস বা মৌলিক অবস্থান। যার অর্থ হল, মোদি ইউনুস সাহেবের সাথে ডিল করবেন না, কথা বলবেন না। স্বীকার করে না বলে ভাব দেখাবে। পাঠকের মনে হতে পারে এমন অর্থ আমি নিজেই বের করে আনছি। না, এমন পাঠকদের অনুমান ভুল। বিবিসির ঐ একই রিপোর্টের আগের প্যারা থেকে এবার তাহলে উদ্ধৃতি দেই। এই একই সাবেক রাষ্ট্রদুত বলছেন,

    “……মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী সরকার পূর্ণ মর্যাদায় ও সমানে-সমানে ডিল করবে ‘এটা আসলে আশা করা উচিতই নয়!’। 

    বাংলাদেশকে নিয়ে ইন্ডিয়ার অপমানসুচক খারাপ মন্তব্য আর কী হতে পারে?? তবু বাংলাদেশের হবু নির্বাচনের বড় দুটা দলের ভারত-প্রীতি যাচ্ছে না।
    আর ইউনুস সরকার বা সারা বাংলাদেশের উপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ মোদির এমন পাগলপ্রায় হবার মূল কারণ – গত ০৫ সেপ্টেম্বরে  ইউনুস সাহেবের পিটিআই কে সাক্ষাতকার, এটা ইউনুস সাহেবের আমেরিকা সফর (২৪ সেপ্টেম্বর) ও বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে সাক্ষ্যাতেরও আগের। এই ব্যাপারটাকে মোদি-জয়শঙ্কর দেখেন খুবই ঈর্ষাকতর ও ঘিনঘিনে ঘৃণা থেকে। তা এই মনে করে যে আমরা ইন্ডিয়া এতদিন আমেরিকার কোলে বসে ছিলাম থাকতে পারতাম। কিন্তু এই ইউনুস সাহেব এসে তাঁর পুরান পরিচিতি দিয়ে আমেরিকার উপর আমাদের প্রভাব-খাতির সব নাল বা ম্লান করে দিয়েছেন। একারণেই মোদি-জয়শঙ্করের এটা নিয়ে আরেকটা শব্দ হল মেগাফোন-কূটনীতি। এনিয়ে বিবিসির  (১৩ সেপ্টেম্বর) আরেকটা রিপোর্ট দেখেন,

    ইউনূসের ‘মেগাফোন কূটনীতি’ ভারতের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে

    এখান থেকেই মোদি-জয়শঙ্করের ক্ষোভ একেবারে তুঙ্গে উঠেছিল।  আর ততই বিএনপি (সাথে জামায়াতও) ভারতের ঘনিষ্ট অংশীদার বা নতুন হাসিনা পাওয়া গেছে এই তোড়জোরের শুরু।  আর ততই বাংলাদেশের উপর ইঙ্কন-চিন্ময় দিয়ে চাপ সৃষ্টি এটাই এতদিন চলছিল। কিন্তু কতদিন আর মোদি এমনটা চালাবেন?

    এটা “গ্লোবাল বাণিজ্য” চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার যুগ; এতে যুক্ত হয়ে থাকার যুগ। প্রতি দুই দেশ-রাষ্ট্র তাদের মাঝে রাজনৈতিক যতই ঝগড়া-বিবাদ যাই থাক তাদের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য থাকবে এবং তা চালু রাখতেই হবে। যার আদর্শ উদাহরণ, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য অথবা তাইওয়ান-চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক।  কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, এসব বন্ধ রাখলে সেটা একপক্ষীয় কোন একটা দেশের শুধু ক্ষতি তা হবে না। কমবেশি দুদেশেরই ক্ষতি হবে। মোদির ইন্ডিয়া রাজনৈতিক পরিসবে বৈরীতা ছড়িয়ে রেখেছে। সাথে অর্থনৈতিকও। শুরু করেছে ভিসা কমাতে কমাতে না দেয়া অবস্থায়। ফলাফল? প্রথমে হিন্দুত্ববাদী আবেগ তুলে মিডিয়ায় লোক দেখানো বক্তব্য আমরা হোটেল দিব না, হাসপাতাল সার্ভিস থেকে শুরু করে কোন কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে কিছু বাদ রাখে নাই যে এগুলো আর বাংলাদেশিদের ভোগ-ব্যবহার করতে দিব!  আবেগী হিন্দুত্ববাদের জোশ দেখানো তো সহজ কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পেটে টান পড়লে ক্ষুধার বাস্তবতা সবাইকেই ধাওয়া করে!  ফলে এখন বাংলাদেশিরা ইন্ডিয়ায় আসেনা কেন সেই হাহাকার!  আনন্দবাজারের ভয়-শঙ্কিত রিপোর্ট  শিরোনাম ভারতের উপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে বাংলাদেশ! আলু-পেঁয়াজ আমদানির জন্য বিকল্প ৬ দেশে নজর ; ফলে বুঝতেই পারছেন ক্ষুধার বাস্তবতা কত কঠিন! একই রকম আরেকটা রিপোর্ট, ‘ব্যান্ডউইথ ট্রানজিট’নয়ভারতকে, হাসিনা জমানার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিল ইউনূসের সরকার;  দেখেন এখানে এতে ওরা নিজেই খোড়াখুড়ি করে রক্ত বের করা রিপোর্ট করে শেষে নিজেরাই হতাশা দুঃখে ডুবে যাচ্ছে। এই সুরে প্রত্যেকটা রিপোর্ট।

    তাহলে আমাদের উপর চাপ সৃষ্ট করতে গিয়ে নিজেইযে প্রশ্নের মুখোমুখি তা হল পালটা যে চাপ অথবা বাংলাদেশের বাজার হারানো বা ক্ষুধার বাস্তবতা ইত্যাদি এসবর সমাধান কই?  আর সেখান থেকেই পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি তার এই বাংলাদেশ সফর। মূল উদ্দেশ্য বুঝার চেষ্টা করা – ইউনুস সরকারের উপর কতটা চাপ পড়লো? নাকি কোনই লাভ নাই, এফেক্ট নাই অথবা উলটা ইন্ডিয়ারই বাজার হারানোর এফেক্ট আসতেছে? অথবা আচ্ছা কিভাবে আগালে দ্রুত একটা রফার রাস্তা পাওয়া যাবে?  এককথায় কাউকে চাপ দিতে গিয়ে নিজেই উলটা চাপে পড়া দশা!  সব জায়গায় হিন্দুত্ববাদ –  বাংলাদেশে এদিকে ইঙ্কন-চিন্ময় আর ওদিকে ভারতে সকল দল ও মিডিয়ায় একই গান – হিন্দু নির্যাতন – তারা নাকি মোদির হিন্দু নির্যাতনের গল্প-প্রপাগান্ডার ভিত্তিতে এসব করছেন। অথচ বাস্তবতাটা হল ক্ষুধার বাস্তবতা, পেট চিনচিন করছে মিথ্যা হিন্দুত্ববাদের আবেগের উপরে! আর বাংলাদেশে পাবলিক লেবেলে (কিছু সিংগঠিত হিন্দু জনগোষ্ঠিও ভারতের এই প্রচারের বিরোধি হয়ে উঠেছে) মোদির হিন্দু নির্যাতনে প্রপাগান্ডা ফিকে উপেক্ষিত হয়ে পড়ছে!

    তাহলে, মোদি তাড়াতাড়ি এখন কী পেতে চাচ্ছেনঃ
    এনিয়ে আনন্দবাজারের লেটেস্ট গতকালের আরেক রিপোর্টের শিরোনাম ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গেও আগের মতোই সুসম্পর্ক চাই’, ঢাকায় দাঁড়িয়ে দিল্লির বার্তায় সংখ্যালঘু-সুরক্ষাও – এখানে খায়েস একদম পরিস্কার।  “আগের মতোই সুসম্পর্ক চাই” –  আনন্দবাজার মনে করে বিক্রম মিশ্রি নাকি গতকালকে এত ম্যাসেজটাই দিয়ে গেছেন!!!! মানে মোদির অর্থনীতি বা কলকাতার আর সহ্য হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা সেটা কিছু “আগের মতই” মত তাকে “নয়া হাসিনা” সরকার হতেই হবে [সেজন্যই কী ফকরুলের এই মুর্তি দেখছিলাম আমরা, নয়া হাসিনা / ওকা???]; কে জানে!!

    কিন্তু না ইন্ডিয়া না বিএনপি বা হবু কেউ সহযোগী “নয়া হাসিনা” কারো ভাগ্যে এত সহজে শিঁকা ছিড়ে পড়ছে না। কিছু ইঙ্গিত বা ম্যাসেজের দিকে আপনাদের চোখ ফিরাই।
    দুই পরারাষ্ট্র সচিব দেখা করেছে কথা বলেছেন – অনানুষ্ঠানিক একান্ত বা আনুষ্ঠানিক বা সৌজন্য সাক্ষাত ইত্যাদি সবই। এরপর যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন প্রেস মিটিং করে সব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এখানে দেখেন একটা বিরাট ব্যতিক্রম। সংক্ষিপ্ত যৌথ প্রেসের পরে আবার আলাদা আলাদা প্রেস মিটিং!  কী সাংঘাতিক! এই শেষের অংশ এটা তো আগে বাংলাদেশে দেখি নাই কখনও।
    এসবের সোজা মানে হল, দুই পরাওরাষ্ট্র সচিব আসলে সব না হোক কিছু বিষয়ে একমত হতে সভা করেন নাই।  তারা আসলে দুই দেশ পরস্পরের সাথে পরস্পরের অবস্থানের পর্থক্যগুলো কী কী তাই আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড ও রেজিস্টার্ড করে নিতে এসেছিলেন।  মানে একমত হতেই তো আসেন নাই। তাই একমতের কারবার নাই। তাই  যৌথ প্রেস মিটিং সেটাও তত গুরুত্বপুর্ণ হয় নাই!
    এখন তাহলে, ঠিক কতদুর অবস্থান পার্থক্য বিক্রম মিশ্রি  রেকর্ড করে গেলেন? এর জবাবটা যদি আনন্ন্দবাজারি আকঙ্খা যে একটা “নয়া হাসিনা” চাই বা আগের মতোই সুসম্পর্ক চাই তবে –নয়া পরিস্থিতিটা এর ধারেকাছেও নয়। বরং  দিল্লি তো আসলেই দূর অস্ত!!

    আরেকতা জিনিষ কেউ লক্ষ্য করেছেন কিনা!
    গতকাল সমাজের ঢাকার কোনায় কোনায় কান খাড়া করা আম আদমি ছিল যে আত্মসম্মান সচেতন রেখে কথা বলা হচ্ছে ত? আমার এ’এক নতুন অভিজ্ঞতা আমার রাজনৈতিক জীবনে! সারাদিনটা সরকারী অফিস ও কর্তারা জন-দায়বদ্ধতা কথা মনে রেখে দিন পার করেছেন; জনগণ তাদের মনিটরিং করছে এমন অনুভুতি আমি কখনও আগে দেখি নাই!

    “ভারতের বরফ গলানো” বিএনপি এর ফকরুল সাহেবঃ
    তাহলে এখন “ভারতের বরফ গলানো” বিএনপি এর ফকরুল সাহেব কই এখন? ভারতীয় গলা বরফ খাবেন না? লন্ডনে কেন?  বিএনপি নিজের গণবিরোধী কাজ-সিদ্ধান্ত-বক্তব্য এই ফকরুল লোকটাকে দিয়ে হাজির করে বিএনপি দল ও এর সেক্রেটারি ফকরুল উভয়কেই ন্যাংটা করে ফেলেছে – ইমেজ সব শেষ করে ফেলেছে! তাই এখন তাঁকে লন্ডনে তুলে নিয়ে যাওয়া আর দেশে  পালটা বিপ্লবী বক্তা এখন রিজভি – যিনি বিএনপি-ফকরুলের গায়ের ময়সা সাফ করবেন? তাই লোক দেখানো ভারতবিরোধিতা ঘেরাও???  আর অদিকে ফকরুল সাহেবেরও আর লন্ডনেই ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগছে না। তাই লন্ডনেই শুরু করে দিয়েছেন – কেউ কনষ্টিটিউশন বা সংস্কারের কথা তুললেই তিনি ধমক দিয়ে উঠা শুরু করেছেন আপনারা কারা? আচ্ছা আপনি ফকরুল আপনি “ভারতের বরফ গলানো”দেখে খুশিতে লুটায়ে পরা ফকরুল – আপনি কে? সারা বাংলাদেশ যখন দেশের আত্মমর্যাদা রক্ষার কথা ভাবছে তখন আপনি কে? ভারতের ওড়না ধরে দাঁড়িয়ে আছেন থাকলেন? ওকা হয়ে গেছেন, নাকি আরো কিছু?
    একই সাথে দুই ধরনের কথা বলা এর চেয়ে বোকা-চিন্তা আর হয় না – এটা চালাকি, কোন রাজনীতি নয়!  তবু দুই ধরনের ম্যাসেজ দেয়া বিএনপি – এটা নিয়ে কতদুর যাবেন – যেতে পারবেন? সবাইকে বোকা ভাবা, কেউ কিছুই ধরতে বুঝতে পারবে না এসব পোলাপানি ভাবনা! আজ মুসলীম লীগ বা ভাসানি ন্যাপ কোথাও নাই বললেই চলে, কেন? দুদন্ড একটু চিন্তা করে দেখেন!
    আবার যে আপনাকে এসব কথা বলে সতর্ক করবো বা যে করবে তাকেই তো আক্রমণ করাবেন, করবেন?   আপনারা কেউই নিজের অর্থ সম্পত্তি বা  দল – ভারতের হয়ে ক্ষমতায় যেতে চাওয়া দল হয়ে থাকলে এসবের – কিছুই রক্ষা করতে পারবেন না। চোখের সামনে সব বিলীন হয়ে যাবে! গিয়েছেও আগে! ১৯৪৭ সালের সর্বচ্চ পপুলার দল মুসলীম লীগ  পরে মাত্র সাত বছর লেগেছিল ১৯৫৪ সালের মধ্যেই [যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে] তাদের বিলীন হয়ে যেতে!! ভারতের অন্যায় অত্যাচার লুটপাটের দালালকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া, এভাবে পুনরায় আধিপত্য কায়েমের কদর্য ততপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যেখানে রুষ্ট, বিরক্ত ঐক্যবদ্ধ তখন আপনারা জাস্ট এর উল্টাদিকে হাল বাইতেছেন!!!!

    যেকথা বলছিলাম, দুই দেশের সচিব পর্যায়ে দেখা সাক্ষাতেও,  তবু ভুল যে হয় নাই তা নয়!
    আবার ভাবি এটাই তো সেই ৮ আগষ্টের ইউনুস সরকার! যখন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রি. শাখাওয়াত কিংবা পররাষ্ট্রের তৌহিদ সাব সহ অনেকেই যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন কে কিভাবে ভারত বা হাসিনার লীগ প্রসঙ্গে তেল মেরে তোষামোদে কথা বলতে হয় বা বলতে পারেন! অথচ এখন কত কত বদল!  উপদেষ্টারা চাইলেও তোষামোদিতে থাকতে পারছেন না। যদিও একটা খারাপ কথা বলে রাখি!  মোদির বিরুদ্ধে মিনমিন থাকা উঠে দাঁড়াতে না পেরেও যারা ভাবছেন বা কেউ যদি ভেবে থাকএন যে এভাবে আপনারা উপদেষ্টার চাকরি ধরে রাখতে পারবেন তারাও ভুল এটাও আরেক স্টুপিড চিন্তা। সবাইকেই উপরে ফেলে দেয়া হয়ে যেতে পারে, সবাই-ই উতখাত হয়ে, বাদ পরে যেতে পারেন [ইউনুসসহ বা ইউনুস বাদ দিয়ে]; যদি মোদির ভারত প্রসঙ্গে দেশ-মানুষের মান-মর্যাদাও ধরে রাখতে না পারেন। বিষয়টা এতই সিরিয়াস আর সময়টা খুবই খারাপ!

    আসলে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে (আমাদের জনসংখ্যা বেশি বলে) আমরা বিক্রেতার চেয়ে ক্রেতা (ভলিউম আকারে) হিসাবে বড়। তাই শুধু আমেরিকা নয় ইইউ-ও আমাদের বাজার চায়!  আর ভারত এমনকি চীনও কেউই তো আমাদের মায়ের পেটের ভাই না যে আমাদের কারো প্রতি কোন বিশেষ প্রীতি রাখার দায় আছে। বাণিজ্য অর্থে আমরা সবার – চীন, ভারত (যদি যোগ্য হয়), ইইউ বা আমেরিকা সবার সাথে সম্পর্কিত থাকব। এটা তো কোন পন্থি হবার সময় বা জায়গা নয় এবং তা নাইও! চীনা ঋণ প্রবল দরকারি তা হলেও!  একথাটাই  ইউনুস সাহেব আগে বাইডেনের সাথে সাক্ষাতে তাদের ব্যাখ্যা করেছিলেন যাতারা আগে শুনেন নাই – বোকার মত অচল ইন্দো-প্যাসেফিক বলে খামোখা দুই ক্যাম্প বানিয়ে ঠেলাঠেলি করে গেছিলেন।   আমার ধারণা সেই একই পথে তিনি ইউ-কেও সে ম্যাসেজ দিতে সফল বলেই ইইউ ভুক্ত প্রায় কুড়ি টা দেশের সিরিয়াস ও উচু প্রতিনিধিদের তিনি ঢাকায় এই প্রথম নিয়ে এসে সম্মেলন-বৈঠক করেছেন। আর সেখান থেকেই এই ব্যবসা-কেন্দ্রিক রূট সম্পর্ক থেকেই এই সরকারকে রাজনৈতিক সমর্থন এর বিষয়টা তারাই উচ্চারণ করেছেন।  যদিও কুকের মত দু-একজন এখনও বেপথে আছে, ভারতের দালালি এজেন্সি হয়ে দিনযাপন করার পথে আছেন। এরা অচিরেই হবে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশ! যদি না তারা লাইনে আসেন!
    এর সোজা মানে হল, হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে আগানো  মোদির বাংলাদেশে চাপ সৃষ্টি এটা কোন কূটনৈতিক পথই না। একদিকে পেটে ক্ষুধা তার অথচ আচরণে ছেচড়ামী!!!  আমি তো সত্যিই চাই এই ছেচড়ামো মোদির ভারতের সাথে আমাদের কোন লেনদেনই না থাকুক! যদি রাখতেই চায় তবে তা হতে হবে সম মর্যাদার আর সবক্ষেত্রে সমান অধিকারের! নইলে এই ভারত আমাদের দরকার কী, কোন কাজের???

    তবু পররাষ্ট্র সচিব যে বড় ভুলটা কালকে করেছেন তা হল,

     “….আমাদের পররাষ্ট্রসচিব আরও বলেন, ‘আমরা বলেছি, তিনি (শেখ হাসিনা) ভারতে বসে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, সেটা আমাদের পছন্দ হচ্ছে না।…এটা তাঁকে (শেখ হাসিনাকে) যেন জানানো হয়। তাঁরা (বিক্রম মিশ্রি) বিষয়টিকে আমলে নিয়েছেন”।” আর ভারত বলেছে, Sheikh Hasina’s presence has no impact on relations যার খাস মানে হল হাসিনাকে আমরা রাখবই!

    এটাতে বা এখানে পারফরমেন্স ভাল হয় নাই; হীনমন্যতা প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমকথা বাংলাদেশ সরকার কেন হাসিনার কাছে ম্যাসেজ পাঠাবে তাও আবার ইন্ডিয়ান পররাষ্ট সচিব কে দিয়ে? কেন?  কূটনীতিক আদব-কায়দা স্তাইল রীতি তো আপনাদের জানা থাকারই কথা! হাসিনাকে ইন্ডিয়া “রাজনৈতিক আশ্রয়” বা “আশ্রয়” দিয়েছে! এখন আমার রাষ্টড়স্বার্থ বিরোধী যে ব্যক্তি তাকে আমার পড়শি যদি আশ্রয় দিতেই চাই তবে তা হতে পারে কেবল এক শর্তে। যে আশ্রয় প্রার্থী এড়ওয়ার্ড স্নোডেন! সে আমেরিকা সরকারের অন্যায় কাজ ফাঁস করে দিয়েছিল সে হুইসেল ব্লোয়ার মানে বাশিতে ফু দিয়ে লোক জড়ো করে সব ফাঁস করে দেয়া। পরে তিনি পুতিনের রাশিয়াতে আশ্রয় পেতে হয়েছিল একটাই শর্তে যে রাশিয়ার নসে সে আর কোন হুইসেল মারা নয় বা আমেরিকার সাথে বাকবিতন্ডায় জড়ানো যাবে না!  এবিষয়ে স্বেচ্ছায় মুখ বন্ধ রাখতে হবে! কারণ এটা এতটাই সিরিয়াস বিষয় যে এথেকেই হয়ত আমেরিকা-রাশিয়ার যুদ্ধই লেগে যেতে পারে!
    তাহলে এই আলোকে বিচার করেন, হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে ইন্ডিয়া। তাই সেই হাসিনা সেখানে বসে বাংলাদেশেরবিরোধী ততপরতা চালাতে পারে না!  এটা বন্ধ করার দায়ীত্ব সবার আগে খোদ ইন্ডিয়ার! এটা তো ইন্ডিয়া ভুখন্ডে বসে কাউকে বাংলাদেশের দিকে গুলি ছুড়তে দিবার মত অপরাধের ঘটনা! কাজেই আমরা এটা আমাদের পছন্দ করছি না বলেই থেমে যাওয়া যেত। তাহলেও হত। কিন্তু সেটা না করে – এটা তাঁকে (শেখ হাসিনাকে) যেন জানানো হয় – এটা করে নিজেদেরকেই ছোট করা হয়েছে। ভারতের একটা আচরণ আমাদের পছন্দ করি না, এই অবস্থানের সাথে একমত নই – শুধু একথাটাও যদি ভারতকে কূটনৈতিক  ভাবে জানানো না যায় তো এমন পরারাষ্ট্রের দোকান খুলার দরকার কী? আমরা তো ইন্ডিয়াকে কোন হুমকি আকারে বলতে বলছি না। আবার আরেকটা খুব খারাপ দিক হল,  এর মানে কী? যে (শেখ হাসিনাকে) যেন জানানো হয় বলে আমরা কী বুঝায় দিলাম যে আমরা ভারতকে বলি নাই হাসিনাকে বলেছি তাই বুঝায় দেওয়া? যাতে ইন্ডিয়া আমাদের উপর যেন ক্ষেপে না যায়?  ইন্ডিয়ার একটা কথা বা আমাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তাদের সাথে আমাদের অবস্থান ভিন্নতা আছে। এটা কেবল নোটিফাই বা উচ্ছারণ করতেই পারব না? কী সমস্যা? এটাই হীনমন্যতা যা অগ্রহণযোগ্য!
    এমনকি এই ইস্যুতেই আবার প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস সাহেব কিভাবে সামলেছেন। নিচে প্রথম আলো থেকে পুরাটাই তুলে আনছি।

    আলোচনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি এখন ভারতে অবস্থান করছেন, তাঁর প্রসঙ্গও উঠে আসে। গত ১৫ বছরের নির্মম ও দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসনের বর্ণনা করে ভারতের পররাষ্ট্রসচিবকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের লোকজন উদ্বিগ্ন; কারণ, তিনি সেখান (ভারত) থেকে অনেক বক্তব্য দিচ্ছেন। এটা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।’

    দুটার ফারাক বুঝার চেষ্টা করেন; পররাষ্ট্র মন্ত্রণালোয়ের সকলের উচিত এখান থেকে শিখা!  যাতে জানা যায় আরো কতরকমভাবে  সম্মান বজায় রেখে একটা কাজ করা যায়!  মানে এভাবেই ইস্যুটা আনা যেত এবং যায়!

    • মোদি বা হবু “নয়া হাসিনা” সবাই এখন এই সৃষ্ট ইস্যুতে ক্রমশ ডুবে যাবে!
    • যে গভীর ঘৃণার সাগর মোদি তৈরি করেছেন, সেখানেই সকলে ডুবে যাবেন!
    • সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের যে দলই যারা মোদির হাত ধরে ‘নয়া হাসিনা’ হতে গিয়েছিল!
    • সহসা কোন “মেঘ” কাটবে না, দূর হচ্ছে না।  হিন্দুত্ববাদ ভারতকে ঘৃণার সিড়িতে তুলে দিয়েছে সেখান থেকে নামা কঠিন, অথচ পেটে ক্ষুধার বাস্তবতা! “বিক্রম মিশ্রি সাংবাদিকদের সামনে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। তিনি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি”। কেন? নিজের আকাম ও মিথ্যার সব বেলুন ফুটে যাবে, খুলে যাবে? এটা হচ্ছে সেই ইঙ্গিত! মোদি অস্বচ্ছ!
    • গতকাল টিআইবি’র ইফতেখারুজ্জামান এর মন্তব্য – “যারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের ম্যান্ডেড নেই বছেন এ ধারণা ভুল”। এই মন্তব্য খুবই তাতপর্যপুর্ণ!
    • বাংলাদেশ ভারতকে নিয়ে কোন “বাংলাদেশ ক্রাইসিসে” নাই, পড়ে নাই। বরং মোদি এক “বাংলাদেশ ক্রাইসিসে” পড়ে গেছেন!

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  দুপুর ১২ঃ ০৬      ১০ ডিসেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ  বিকাল ০৫ঃ ৩২      ১০ ডিসেম্বর  ২০২৪

     

     

  • আমাদের প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বেচারা!

    সবার আগে সেকুলার শব্দটা কবর দিয়ে নেন; এটা অপ্রয়োজনীয়!
    আমাদের প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বেচারা!
    গৌতম দাস
    ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5Zk

     

     

     

     

    সবার আগে সেকুলার শব্দটা কবর দিয়ে নেন; এটা অপ্রয়োজনীয়!
    আমাদের প্রেস সচিব শফিকুল আলম কোন বেচারা নন, অবশ্যই। কিন্তু না হলেও তিনি তাই হয়ে পড়েছেন। মানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এর কথাই বলছি। তাকে এখন বেচারা-ই মনে হয়! গ্রাম দেশের এক প্রবাদে আছে, তাঁতি তাঁত বুনে দিব্বি সেই আয়র উপর আরামে খাইতেছিল; কিন্তু কাল হল মানে সর্বোনাশ হল তাঁর জমি কিনার পরে!  শফিক সাহেব ঢাকায় ‘বার্তা সংস্থা এএফপির বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ’ হিসাবে হেসে খেলে তার সময় আরামেই যাচ্ছিল। কিন্তু তিনিও তাঁতির মত জিমি কিনলেন!  আর এখন? এর পরে!!!!

    এখন তিনি বুঝতেছেন কী ভুলটাই না করেছেন!! কথিত সেকুলারিজম কেই বাপ ডাকতেছেন! অথচ কোন লাভ হচ্ছে না; তবু কোন কুল্কিনারা বনাই। তিনি সেক্যুলার সংবাদপত্র ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আহবান বা আশ্রয় করে   উঠে দাঁড়াতে চাইছেন।
    এমনকি কোন কোন সংগঠন সেক্যুলার সেই সার্টিফিকেটও বিতিরণ শুরু করে দিয়েছেন তিনি।

    “…আসক একটি সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) গ্রুপ, বছরের পর বছর ধরে যেটির নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন অপরাধ স্বীকারকারী। এর বর্তমান চেয়ারম্যান হলেন মানবাধিকারবাদী আইনজীবী জেড আই খান পান্না। যিনি স্থানীয় মিডিয়াকে বলেছেন যে তিনি বিচারে গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে আগ্রহী হবেন।”
    “….The ASK is a secular group, which for years was headed by an Awami League apologist. Its current chairman is lawyer ZI Khan Panna, a human rights defender who has told local media that he would be interested in defending mass murderer Sheikh Hasina in trials.”

    এই হল সার্টিফিকেট বিতরণ। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, আইন ও সালিশী কেন্দ্র (আসক) এটা কামাল হোসেন এন্ড গং মূলত এই পরিবারের গড়ে তোলা এক এনজিও। খাঁড়া ভাবে টেক্কা কে টেক্কাই বললে এটা হল, হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশের হিন্দুদের স্বার্থ [কথিত ভিকটিমের স্বার্থ] দেখতে হবে – এমন চিন্তা কাঠামোতে তৈরি করা  বা দাঁড়ানো এক এনজিও প্রতিষ্ঠান। একে সফট হিন্দুত্ববাদের এক আওয়ামি লীগ প্রতিষ্ঠানও বলা যেতে পারে। অথচ শফিকুল আলম এটাকেই সেক্যুলার  গ্রুপ বলেসার্টিফিকেট দিচ্ছেন আমরা দেখছি। আসলে সেই সেকুলারিজমই হল হিন্দুত্ববাদ চিন্তা কাঠামোর উপরে দাঁড়ানো এক চিন্তা!   আর সেকারণেই এই সেক্যুলার আর হিন্দুত্ববাদের মধ্যে কোন ফারাক নাই!

    কিন্তু তামাসাটা হল, প্রেস সচিব শফিকুল আলম এখন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিপদের মুখোমুখি। কারণ খোদ মোদি সরকার তাঁর হিন্দুত্ববাদ কান্ধে নিয়া জীবনের একবড় বাজিতে নেমেছেন যে চরম মিথ্যা বয়ান দিয়ে হলেও মোদি চাইছেন – “বাংলাদেশে কথিত হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে” – এই ডাহামিথ্যা বয়ানটাকে যেভাবেই হোক প্রতিষ্ঠা করবেনই!!! [এই মিথ্যা বয়ানটা প্রতিষ্ঠা করতেই মোদি চিন্ময়- ইসকন নাটক বাংলাদেশে নামিয়েছেন। ]  আর এদিকে চিন্ময়কে বিসদৃশ্যভাবে কোলাকুলি করে থ্যাঙ্ক জানায় (পরে চিন্ময় গ্রেফতার হলে পরে) সে ভান ও ভনিতার  প্রতারক (imposter) এবার দাবী করছে যে চিন্ময়েরও এমন মিথ্যা বয়ান হাজির করার অধিকার আছে!  হিন্দুত্ববাদের জজবা তুলে আঙুন লাগানোর অধিকার তো মোদির অবশ্যই আছে তাই না???? কী বলেন?
    আর এখন শফিকুলের দায় হয়ে উঠেছে কথিত বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতন নিয়ে  মোদির ডাহা প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লড়াই করে ইউনুস সরকারকে রক্ষা করা।

    আমি নিশ্চিত শফিকুল আলম সাহেব জীবনেও চিন্তা করেন নাই যে কথিত এই সেক্যুলারিজম টা কী? এটা খায় না মাথায় দেয় – এনিয়ে কখনও গভীর ভাবে উল্টাপাল্টে দেখতে গেছিলেন!  এমনকি হিন্দুত্ববাদ এটাই বা কী জিনিষ? এটাই তেমন গভীরে নেমে তাঁর দেখা হয় নাই! এএফপির ব্যুরো প্রধান হতে বা সে জীবনে এসব কখনও এত গুরুত্বপুর্ণ হয়ে আসেই নাই!
    যেমন ধরেন এই কথিত সেকুলারিজম এটা আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে নাই। বরং উলটা ধর্ম পালনকে নাগরিক অধিকার মনে করে রাষ্ট্র। দুনিয়ার তিনটা রাষ্ট্র এমন শয়তানি সেক্যুলারের কথা বলে। বৃটিশ, ফরাসী রাষ্ট্র আর ইন্ডিয়াতেই এই শয়তানি আছে। তিনটারই উদ্দেশ্য মুসলমান কোপানো!  তাই এথেকে অর্থহীন দাবী রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে!  যে শয়তানির চিহ্নটাই হল ১৯২৩ সালের পরে তুরস্কের কামাল তুলে কামাল কিয়ার সেকুলার!
    অথচ খো বৃটিশ রাষ্ট্রটাকেই দেখেন, এটা এংলো-ক্যাথলিক ধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র। ক্যাথলিক মানে ক্রিশ্চানিটির মূল অর্থডক্স ভার্সানের পরের বড় মাজহাব হল ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ধারা। এখন যে সে ক্যাথলিক হলে হবে না।  বৃটিশ রাজ-পরিবার যে ধারা বা ব্যাখ্যার ক্যাথলিসিজম মানেন অনুসরণ করেন সেই ক্যাথলিক মানে এংলো বা ইংলিশ রাজার অনুসৃত ক্যাথলিকই হতে হবে। আর এই এংলো-ক্যাথলিক ক্রিশ্চানিটি ধারার ধর্মের প্রধান বা গুরু হলেন বৃটিশ রাজপরিবারের প্রধান (রাজা বা রাণী)। আবার এই রাজা-রাণীই হলেই বৃটিশ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বা সাংবিধানিক প্রধান! তাহলে এবার বৃটিশ রাষ্ট্রটা আসলে কী দাড়ালো?
    আর এই বৃটিশ রাষ্ট্রটাই সেকুলারিজম ফেরি করতে এসেছে? দাবী করছে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করতে হবে?????
    আমার মনে হয় না শফিকুল আলম কখনও এতদুর তলায় হাত দিয়ে দেখেন নাই যযে সেকুলার জনিষটা কী??
    আবার দেখেন ভারতের বেলায়। এতা মনে করার কারণ আছে যে ১৯৪৯ সালে ভারতের কনষ্টিটুশন রচনার সময় নেহেরু-গান্ধী জানতেন তারা হিন্দুত্ববাদ – এর উপরে একটা টোপর পরিয়ে ঢেকে ঢুকে একটা ভারত রাষ্ট্র খাড়া করতে যাচ্ছেন। যেটা আসলে হিন্দু-ধর্মীয় জাতবা নেশন বোধ এর উপর দাঁড়ানো এক হিন্দুধর্ম ভিত্তিক জাত-রাষ্ট্র। এক হিন্দু রিপাবলিক! তাই সযত্নে সেক্যলার শব্দটা কোথাও কনষ্টিটিউশনে আনেন নাই।  এটা আসলে ধুর্ত কিন্তু বোকা ইন্দিরা গান্ধীর কাজ। তিনি ১৯৭৬ সালে এই সেকুল্যার শব্দ ভারতের কনষ্টিটিউশনে প্রথম ঢুকিয়েছেন – বাংলাদেশ স্বাধীনহবার পরে মানে বাংলাদেশকে সেকুলার বলে ল্যাজ কেটে দিবার পরে!

    তাহলে সেকুলারিজম ধারণাটাই সৎ নয়? সদ -নয়? কোন সদ-অর্থ কীঃ
    এই নকল বা ইসলাম কোপানী সেকুলার ধারণার বাইরে অবশ্যই একটা সদ-অর্থ এমন ধারণা আছে।
    যারা এনিয়ে একাদেমিক গভীরে নামতে চান তাদের জন্যঃ 1648 westphalia  ended the 30 years war  – এধরণের শব্দগুলা লিখে গুগল সার্চ দিতে পারেন।
    এতে যা যা আসে সে সব আপনার সামর্থ ও সময়ে যা কুলায় পড়ে বুঝবার চেষ্টা করতে পারেন।
    ইউরোপে এক গৃহযুদ্ধ বা ধর্মযুদ্ধ বা যা আসলে খ্রিশ্চানিটির ভিতরেরই নানান ব্যাখ্যা বা ফেকড়ার যুদ্ধ হয়েছিল চলেছিল ১৬১৮-১৬৪৮ এই ত্রিশ বছর; কোথাও কোথাও যা আশি বছর ধরে চলেছিল। আর  ওয়েস্টফিলিয়া জার্মানির এক শহরের নাম যেখানে ১৬৪৮ সালে বসে এই গৃহযুদ্ধের পরিসমাপ্তি টানা হয়েছিল বা খুজে পাওয়া গেছিল। কিন্তু কী সেই ফর্মুলা???

    ধরা যাক কোন মুসলমান রাজা তিনি যে ফেকড়া-মজহাব বা ব্যাখ্যা-ধারার [interpretation] অনুসারি সেই রাজা কী কেবল তার মতই অনুসারি মুসলমান প্রজাকেই বেশি ফেবার করবেন, বেশি সুবিধাদি দিবেন? মানে বাকি প্রজাদের তুলনায়? ফেকড়া-মজহাব এর ভিত্তিতে প্রজাদের মধ্যে বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করবেন?

    এই হচ্ছে মূল তর্কটা।
    আর “ওয়েস্টফিলিয়া ১৬৪৮” সম্মেলন কীসের ভিত্তিতে সব গৃহযুদ্ধের অবসান করেছিল?
    সেতা বুঝে নেওয়া খুবই জরুরি।
    সমাধানটা ছিল আসলে খুবই সহজ। আমি উদাহরণে মুসলমান রাজা বললেও ইউরোপে এটা ছিল খ্রিশ্চানিটি। তবে সবার ক্ষেত্রেই এক। সমাধানটা ছিল, রাজা বা শাসক যে ধর্মের যে ফেকড়া-মজহাব এরই অনুসারি হন না কেন যেকোন ফেকড়া-মজহাব অনুসারি সব প্রজাকেই তিনি বৈষম্যহীন ভাবে দেখবেন বা সুবিধাদি দিবেন বা আইন করবেন।  ফেকড়া-মজহাব নির্বিশেষেই শাসন পরিচালনা করবেন।  এটাই বৈষম্যহীন শাসন – এটাই যেকোন অধিকার ভিত্তিক (মানে ধর্ম বা জাতভিত্তিক জাতিবাদি নয়) রিপাবলিকেরও মৌলিক কথা!

    কাজেই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন কথাটার তাতপর্য এখন জুলাই-আগষ্ট বিপ্লব বা ৫ আগষ্ট বিপ্লবের মধ্যেই উঠে এলেও এর তাতপর্য অনেক গভীরে!
    যেমন ধরেন ওয়েস্টফিলিয়ার ঐ সমাধান বাইরে থেকে ওতা শুধু খ্রিশ্চনিটির সমাজের মধ্যে প্রযোজ্য তা একেবারেই নয়।
    যেমন রাজা,শাসক বা প্রধানমন্ত্রী শুধু খ্রিশ্চানিটির ফেকড়া-মজহাব এর প্রশ্ন নয় যেকোন ধর্মের যেকোন পরিচয়ের নাগরিকের প্রতি বৈষম্যহীন আচরণ করবেন এমন সমাধান তো এখান থেকে টানা যায়। এজন্যই আমি বলি এটা অধিকার ভিত্তিক রিপাবলিক; জাত-ধর্ম ভিত্তিক নয়। এতা সম্ভব। এটাকেই ক্লাসিক্যাল অর্থে রাষ্ট্রে নাগরিক সাম্যতা (অনেক সময় এটা শুধু ‘সাম্য’ লিখা হয়) বা রাজনৈতিক সাম্যের রিপাবলিক – বলে বুঝতে হবে। মজার কথা এটাই হল বাস্তব ও ক্লাসিক্যাল সেকুলার ধারণা।   আরও তাতপর্য হল এটা এই রাজনৈতিক সাম্য  বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে সেকুলার বলে (আসলে মুসলমানবিদ্বেষী) কোন শব্দ রাখারও দরকারই নাই।

    আমি নিশ্চিত এত গভীর জায়গা থেকে শফিকুল আলম চিন্তা করেন নাই আগে!
    অসুবিধা নাই। এখন থেকে যেটা জেনে রাখলেন, অবশ্যই তা আগামিতে কাজ লাগবে!

    সেক্যুলার মিডিয়া বলে কিছু নাইঃ
    আসলেই নাই, সেকুলার মিডিয়া সেটা আবার কী?

    কিন্তু তিনি লিখেছেনঃ

    প্রেস সচিব বলেন, ‘আমরা আশা করি, শীর্ষস্থানীয় সেক্যুলার ও উদারপন্থী সংবাদপত্রগুলো সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কথিত সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে তাদের নিজস্ব তদন্ত করবে……”।

    এমন বাক্য লিখে তিনি আসলে নিজেকেই বোকা বানিয়েছেন। তিনি যা বলতে ছেয়েছেন তা হল বৈষম্যহীনতা; বৈষম্যহীন সাম্য এভাবে সকলের রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু তার এই সেকুলার এর অর্থ হয়েছে বৃটিশ, ফরাসি বা ভারত রাষ্ট্রগুলোর বিশেষ করে ভারতীয় ইসলামবিদ্বেষ এর হিন্দুত্ববাদ যেটাকে এরা সেকুলার বলে ঢাকা দিয়ে চলতে চায় সেই সেকুলারিজম হয়ে দাড়িয়েছে। বা দাড়াবেই। তাই সোজা পথ এই কথিত শব্দটাই ব্যবহার না করা। রাজনৈতিক অধিকারে সাম্য বা শুধু ছোট করে সাম্য – এই শব্দে প্রকাশ করাটাই অনেক ভাল। যাতে হিন্দুত্ববাডেড় খপ্পরে না পড়তে হয়। আর হিন্দুত্ববাদের বিরোধী লড়াইয়ে “রাজনৈতিক সাম্য” এর পক্ষের লোক হওয়া, এটাই তো হতেই হবে।  বৈষম্যহীনতার পক্ষে ধারণা স্বচ্ছ রাখতে হবে!
    যারা মোদির পক্ষের মিডিয়া বা প্রতিষ্ঠান তারা হিন্দুত্ববাদী এভাবে তাদেরকে চিহ্নিত করাই ভাল নয় কী!  মানুষের সমান অধিকারের পক্ষের মিডিয়াও বলতে পারেন; এটাই তো “রাজনৈতিক সাম্য” এর পক্ষের মিডিয়া!  ধর্ম, এথনিক পরিচয়, পাহাড়ী-সমতলি, নারী-পুরুষ, সাদা-কালো চামড়া ইত্যাদি যেকোন বিভাজন ও বৈষম্যমূলক চিন্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অধিকারে সাম্য! এটাই আপনি সম্ভবত বলতে চেয়েছিলেন!
    কিন্তু অসতর্কতায় বারবার এটা হিন্দুত্ববাদের কবলে ও তাদের পকেটে চলে যাচ্ছিল! কনসেপ্ট পরিস্কার রাখা এজন্য সব পেশার লোকের জন্যই খুব গুরুত্বপুর্ণ!
    প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম কে জানাই 
    তাঁর সকল লড়াইয়ে সফলতা, এই  শুভ কামনা!  হিন্দুত্ববাদ – এই হিটলারিজমের বিরুদ্ধে লড়াই অবশ্যই কঠিন!

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    শেষ আপডেটঃ  দুপুর   ডিসেম্বর  ২০২৪    

     

  • হিন্দুত্ববাদের বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে যেকোন বিবৃতিই অর্থহীন

    হিন্দুত্ববাদের বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে যেকোন বিবৃতিই অর্থহীন
    গৌতম দাস
    ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪  দুপুর ০১ঃ ০৮
    https://wp.me/p1sCvy-5Yx

     

    ভারতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বিবৃতি অর্থহীন

    হিন্দুত্ববাদের বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে ভারতের কারো উদ্দেশ্যেই দেয়া বিবৃতি অর্থহীন; মানে হল সবার আগে মুখ্যত খেয়াল করতে হবে আপনি কার বয়ানে কথা বলবেন? নিজস্ব নাকি ভারতের হিন্দুত্ববাদের?
    এ’সম্পর্কে আপনার সচেতনতা লাগবে। যে বয়ান-পরিভাষা আপনার জনগণের বিরুদ্ধে সেই পরিভাষাই ব্যবহার করে এবং সেই চিন্তা-কাঠামোই ব্যবহার করে আপনি এই শয়তানি ও অসৎ ততপরতার বিরুদ্ধে লড়তে পারবেন না।

    আমি একটু দেরিতে, ইতোমধ্যে গত ৬ ডিসেম্বর ২০২৪  “ভারতের জনগণের উদ্দেশে ১৪৫ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি শিরোনামে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে মিডিয়ায়।
    বাইরের চেহারায় এটা সিপিবি ঘরানার চেয়ে আলাদা মনে হতে পারে কারণ মোদি সরকারের বদলে এখানে “ভারতের জনগণের উদ্দেশ্যে” – বলে বলা হয়েছে। কিন্তু এরপরেও এটা যে কার সেই। কারণ, এক. এটা যারা লিখছে তাদের আলাদা কিছু করার প্রয়াস হয়ত কিন্তু তা মর্ম বদল ঘটাতে পারে নাই। আর দ্বিতীয় কারণ, ইতোমধ্যেই ‘ভারতের জনগণ’ আর ‘সরকার’ বলে একটা ছুপা ভাগ তৈরি করেই কিন্তু র-এর পক্ষে কাজ-ততপরতা করতে আরেক প্রতারক-মানব [imposter] ইতোমধ্যেই নিজেকে ধুর্তভাবে হাজির করে রেখেছে। চিন্ময়ের সাথে প্রকাশ্যে বিসদৃশ্য গলাগলি দেখিয়েছে আর চিন্ময়ের পক্ষে বেপরোয়া সাফাই নিয়ে হাজির হয়ে গেছে।  আবার ‘ভারতের জনগণ’  বলে কী কেউ বিজেপি-মোদির হিন্দুত্ববাদী বয়ানের বাইরে কেউ আছে? বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতন হচ্ছে, শাখা সিন্দুর পড়তে পারছে না ইত্যাদি ডাহা মিথ্যা যে বয়ান মোদি দাঁড় করিয়েছে তা কী খোদ সিপিএম, কংগ্রেস, মমতা ইত্যাদি এরা কী এর বাইরে? নাকি মিথ্যাভাবে একই নির্যাতনের গল্পের বিবৃতিতে সবদলগুলোও ইতোমধ্যেই দিয়েছে? এককথায় ভারতের কোন দলই নাই যে মোদির মিথ্যা ভাষ্যের বাইরে! তাহলে এসবের বাইরে কারা এখন “ভারতের জনগণ” আছেন যাদের কাছে পৌছাতে এই বিবৃতি চেষ্টা করছে? অর্থাৎ এককথায় বিজেপি-মোদির বয়ানের বাইরে ভারতের এখন মোটামুটি কেউই আর অবশিষ্ট নাই। কাজে ফাঁকা কল্পনা করে লাভ কী?

    আসলে মূলকথাটা হল সারা ভারত এখন হিন্দুত্ববাদের বয়ানে ইসলামবিদ্বেষী নেকড়ে হয়ে কাঁপতেছে, যেন ঝাপিয়ে পড়বে বাংলাদেশের উপরে!  আর সেই সময়ে আমরা দেখছি ১৪৫ জনের ভাষ্য বলে এক বিবৃতি যার প্রথম কয়েকটা শব্দ হল  ভারতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে – নাকি তারা এই বিবৃতি দিচ্ছে????
    কিন্তু এই সাম্প্রদায়িকতা জিনিষটা কী? কাদের বয়ান ভাষ্য ন্যারেটিভের পরিভাষা এটা? এটা তো হিন্দুত্ববাদেরই পুরানা পরিভাষা!!! তার মানে হিন্দুত্ববাদী পরিভাষা –সাম্প্রদায়িকতা, অসাম্প্রদায়িক ইত্যাদি – এসব  ব্যবহার করে এই বিবৃতিদাতারা হিন্দুত্ববাদ এর বিরুদ্ধে লড়তে চাইছেন!!!!
    এখানে লড়া মানে ফিজিক্যাল লড়াই না বরং বয়ান ভাষ্য সামনে রেখে লড়াই। তাহলে আপনি কার বয়ানে নিজের কথা বলবেন ও লড়বেন? নিজস্ব নাকি ভারতের হিন্দুত্ববাদের?

    ভারতের জনগণের উদ্দেশে ১৪৫ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি


    অবশ্য কথাটা এভাবে লেখায় আমাদের ‘দেশি’ বুঝের  জাতিবাদি মন বলে উঠবে অবশ্যই নিজস্ব!! কিন্তু কীভাবে বুঝবেন বয়ান-ভাষ্য আপনাদের নিজস্ব? এর জবাব অত তড়িৎ কারো মুখ দিয়ে আসবে না।
    কারণ, সেক্ষেত্রে মুখ্য বাস্তবতা ও ফ্যাক্টস হল, আপনার কোন আলাদা বয়ানই নাই। মূলত হিন্দুত্ববাদের বয়ানটাকেই আপনি এতদিন প্রগতিবাদী বয়ান মনে করে এসেছেন আর সেটাই আউরাইতেছেন! এছাড়া বিবৃতিতে এই যে হিন্দুত্ববাদ বলে শব্দ লিখেছেন এটাও তো আপনাদের পরিভাষা শব্দ নয়।
    আপনাদের শিখা পরিভাষা হল সাম্প্রদায়িকতা বা অসাম্প্রদায়িক এগুলা যেগুলা চালু করেছিল প্রথমে জমিদার-হিন্দুরা (১৮০০ সালের পর থেকেই) পরে ছুপা কংগ্রেসিরা (১৮৮৫ সালে)! আর আপনারা হিন্দুত্ববাদ এই শব্দটা শিখতে বাধ্য হয়েছেন শাহবাগের পরে [আগে নয়] অন্তত ২০১৪ সালের পরবর্তী বাংলাদেশ। এখন সমস্যা কী হয়েছে দেখেন! আপনারা বিবৃতিতে একইসাথে “ভারতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি” আর “সাম্প্রদায়িকতার” এমন দুটার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অথচ এদুটা একসাথে ব্যবহারযোগ্য শব্দ নয়।  আপনি যদি সত্যিই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধ কিছু হতে চান বুঝেশুনে ফিল করে তবে আপনাকে সাম্প্রদায়িক শব্দের ব্যবহার ত্যাগ করতে হবে। কারণ সাম্প্রদায়িক শব্দটা তো জমিদার-হিন্দুদের চালু বয়ানের শব্দ যা পরে ছুপা (সফট হিন্দুত্ববাদী) কংগ্রেসিরা তুলে নিয়ে তাদের বয়ানে স্থাপন করেছে। যেখান থেকে আপনারা এটা পবিত্র জ্ঞান করে তুলে নিয়েছেন! কোন বয়ান নির্মানে কিছু মার্কামারা বয়ান ভাষ্যের প্রতিনিধি চিহ্নমূলক শব্দ থাকে। সাম্প্রদায়িক এই শব্দ ও পিছনের ধারণাটাতে তা আছে – সাম্প্রদায়িক নিজেই এক হিন্দুত্ববাদি বয়ানের মার্কামারা শব্দ!  আপনি চাইলেই  তাই একই সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীবিরোধীতা আবার সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী হতে পারেন না, পারবেন না। 

    এখানে হিন্দুত্ববাদের বয়ান কোনটা?
    মুখ্যত  অসাম্প্রদায়িকতা বা সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি এসম্পর্কিত যত শব্দ আছে সবগুলোই – হিন্দুত্ববাদের বয়ান-ভাষ্যের চিহ্ন। বহুবার আমি লিখেছি এটা বাংলাদেশের কারও বয়ান বক্তব্যের শব্দ, ভাষ্য হতে পারে না। জমিদারহিন্দু যারপর নাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে। কারণ পাকিস্তান হওয়ার সোজা মানে হল তার জমিদারি উচ্ছেদ। যদিও কথিত শ্রেণী-বোদ্ধা কমিউনিস্টেরা আজও ভান করে যে তারা এই জমিদার শ্রেণির (শ্রেণীস্বার্থের) উচ্ছেদের দিকটা দেখতে পান নাই! ার খাঁড়া কথাটা হল, জমিদারি ব্যবস্থার উচ্ছেদ মানে হল জমিদারি কেন্দ্রিক হিন্দুত্ববাদি সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, কালচারাল ক্ষমতা ও আধিপত্যের অবসান।  তাই সেই থেকে জমিদার-হিন্দুর সংগ্রাম হয়ে উঠেছিল, চরম মুসলমান বিদ্বেষ জারি করে এমন বয়ান তৈরি। এর প্রথম পদক্ষেপ তাদের পাক্কা ছলনার এক বয়ান যে এটা যেন মূলত জমিদারি উচ্ছেদ ছিল না, এটা যেন পুর্ব-বঙ্গের সকল হিন্দুদের উচ্ছেদ এভাবে ঘটনাকে উপস্থাপন করেছিল তারা।
    অথচ দেশভাগ ঘটে যাওয়াতে, এরপর যে হিন্দু এবং মুসলমান উভয়কেই – দুদিক থেকে দেশান্তর হতে হয়েছিল। হিন্দু হলে ভারতমুখি মুসলমান হলে পাকিস্তান মুখি এটাই তো হয়ে উঠেছিল সবার ভাগ্যেই! নাকি?

    এভাবে সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের ভারত অথবা পাকিস্তানের দিকে যাত্রা এর সাথে পুর্ব-পাকিস্তানে জমিদার উচ্ছেদের সরাসরি কোনই সম্পর্ক নাই। তা সত্বেও জমিদারের স্বার্থ উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এটাকে সকল হিন্দুদের স্বার্থ হিসাবে হাজির করা এটাই জমিদার হিন্দুর শঠতাপুর্ণ বয়ানের সাফল্য! জমিদার হিন্দুর নিজ জমিদারি স্বার্থকে প্রজা হিন্দুরও যেন এটা একই স্বার্থ এভাবে হাজির করে ফেলেছিল। তা কোন বিপ্লবী, কোন শ্রেণীবোধের প্রগতিশীল কেউ খেয়াল করে নাই। বরং পুর্ব-পাকিস্তানের (জমিদার-প্রজা নির্বিশেষে) এমন সকল হিন্দুর স্বার্থ যেন এক  কাজেই পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু মাত্রই ভিকটিম এই নয়া ভিকটিকহুড এর বয়ানই হল – হিন্দুরা তাহলে ‘সাম্প্রদায়িকতার’ শিকার। আর সাম্প্রদায়িকতা মানেই এর জন্য  অরিজিনাল অভিযুক্ত ও দায়ী হল পুর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানেরা…! এটাই তো হিন্দুত্ববাদের বয়ান – সাম্প্রদায়িকতা বয়ানের ভিতরের আসল রহস্য বয়ান এবং  পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু মাত্রই ভিকটিম এই মিথ্যা ভিকটিমহুড এর বয়ান!
    এসব যে মিথ্যা এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, পুর্ব-পাকিস্তানে জমিদারি উচ্ছেদ আইনে কী জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের পরে পুর্ব-পাকিস্তানের মুসলমান প্রজারা যেমন নিজ নিজ চাষের জমির মালিকানা পেয়েছিল একইভাবে সমান সুযোগে  পুর্ব-পাকিস্তানে হিন্দু প্রজারাও কী সমান সুযোগে পায় নাই???
    তাহলে, পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু মাত্রই ভিকটিম এই নয়া ভিকটিকহুড এই বয়ান ভাষ্য বা এই মিথ্যা অনুমানের ভিত্তি কী? 

    আবার যেমন ধরেন, এক ভারতরত্ন মানে পদ্মভূষণ খ্যাত ডঃ আনিসুজ্জামান তিনি পুর্ব-পাকিস্তানে দেশান্তর হয়ে এসেছিলেন, কেন? পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান হিসাবে পুরানা এতদিনের আবাস ছেড়ে পরিবারসহ তাঁদের এদেশে আসার ক্ষেত্রে পুর্ব-পাকিস্তানে জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ বা না-উচ্ছেদ এর কোন সম্পর্কই নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা তিনি কী কেন তাঁকে কলকাতা ত্যাগ করে আসতে হয়েছিল সেজন্য কী কখনো কলকাতার হিন্দুদের দোষারোপ বা দায়ী মনে করেন বা করেছেন??? কখনই না; বরং ব্যাপারটাকে কপাল বা ভবিতব্য হিসাবে দেখে থাকেন!  অথচ পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দুরা পুর্বপাকিস্তানের মুসলমানদেরকে দেশভাগের জন্য আজও কঠোরভাবে দায়ী করে থাকেন। আবার বদরুদ্দিন উমরের কথাও ধরতে পারেন! তিনি কী বর্ধমান ছেড়ে ঢাকায় এসেছেন বলে বর্ধমানের হিন্দু জনগোষ্ঠিকে দায়ী করেন?

    মজার কথা হল, আনিসুজ্জামান কিন্তু সাথে মাথায় করে হিন্দুত্ববাদি অসাম্প্রদায়িকতার বয়ানই নিয়ে এসেছিলেন! মুসলমান হিসাবে কলকাতার জমিদার-হিন্দু তাঁকে তার পরিবারকে শিখিয়েছিল হিন্দুদের পাশে বসতে চলতে হলে তাদেরকে অসাম্প্রদায়িক হতে হবে। সারকথায় যা জমিদার-হিন্দুর আধিপত্য এটা মানতে হবে; তাদের সেই বয়ান ভাষ্যমতে মুসলমানদের নিজেকে সাজাতে হবে; তবেই মুসলমানেরা হিন্দুদের পাশে তিনি বসবাস শিক্ষা-চাকরির সুযোগ ইত্যাদি পেতে পারেন!

    আর এই সাম্প্রদায়িকতা কী তাহলে? কে কার উপরে করলো?
    সেটা কী আর বলার অপেক্ষায় আছে? সেটা বলাই বাহুল্য যেহেতু হিন্দু মাত্রই (জমিদার-প্রজা নির্বিশেষে) দেশভাগের ভিকটিম! – এই হল মিথ্যা মূল বয়ান!  যে বয়ানে তার মানে দাবী করা হল, পুর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানেরাই যেন (জমিদার-প্রজা নির্বিশেষে) এমন সকল হিন্দুকে ভিকটিম বানিয়েছে ও বানানোর জন্য দায়ী????   তাহলে সাম্প্রদায়িক  -এই শব্দের উতপত্তি বয়ান ভাষ্য কার চালু করা কোথা থেকে? এটা কী প্রথমে জমিদার-হিন্দুরা (১৮০০ সালের পর থেকেই) পরে ছুপা কংগ্রেসিরা (১৮৮৫ সালে) হয়ে এখন মোদির হিন্দুত্ববাদের মুখ্য এক বয়ান ভাষ্য নয়!! আর কোন ফাঁকে এই হিন্দুত্ববাদ-ই আবার সকল কমিউনিস্টদেরও বয়ান ভাষ্য হয়ে গেছে??? ভারত (ফলে বাংলাদেশের) সকল কমিউনিস্টদের !!!  তাহলে সেক্ষেত্রে, এই বিবৃতিদাতারা একইসাথে ভারতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সরব হবেন বা হলেন কী করে?? এটা কী সম্ভব???
    সব বিবেচনা তাদের হাতেই তুলে রাখলাম!!!

    শেষে আরেকটা কথা দেশভাগঃ

    যদি আপনাদের চিন্তার মুরোদে কুলায় তাহলে দেশভাগ এর জন্য কাকে দায়ী করতে চান সেদিকে আসেন। যারা দেশভাগে ব্যাথ্যা পেয়েছেন তাদেরকে সাহসের সাথে রাজা রামমোহন রায় পড়তে হবে! এখান থেকেই পড়াশুনা শুরু করতে হবে। সেই ১৮১৫ সালে ফিরতে হবে। কেন রামমোহন ১৮১৫ সালে “আত্মীয় সভা” খুলেছিলেন? কেন সেই ১৮১৫ সালেই তিনি এক ব্রাহ্ম সমাজ বলে নতুন ধর্ম চালু করেছিলেন?
    রামমোহনই প্রথম ব্যক্তি যিনি সেকালে বৃটিশদের রিপাবলিক রাষ্ট্র একে চিনেছিলেন, এক এংলো-ক্যাথলিক বৃটিশ রিপাবলিক বলে।   অর্থাৎ জাতিরাষ্ট্র [নেশন স্টেট বা nation State] মানে আদতে তা কোন না কোন ধর্মের ভিত্তিতে জাত এমন রিপাবলিক রাষ্ট্র-ই হতে হবে, হয়। ফলে সেসময়ের চোখ আগামির অখন্ড ভারত – সেটাও আসলে কোন না কোন ধর্মের ভিত্তিতে জাত এমন রিপাবলিক রাষ্ট্র-ই করতে হবে এই ছিল তাঁর বুঝ ও সিদ্ধান্ত! আর সেখান থেকে অসংখ্য জাতভেদে বিভক্ত হিন্দু সমাজ সহ ভারতের সবাইকেই সবার আগে এক নয়া ধর্ম ‘ব্রাহ্ম’ এই নয়া একেশ্বরবাদি ধর্মে দীক্ষিত করে নিয়ে আগানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একাজে রামমোহনের সবচেয়ে ঘনিষ্টজনেরা যেমন রবীন্দ্রনাথে দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর সহ ঢাকার সুশোভন সরকারের (বেঙ্গল রেনেসাঁর লেখক) দাদা ইত্যাদি সকলেই পরিবারসহ সবার আগে ব্রাহ্ম হয়ে নিয়েছিলেন। যদিও রামমোহনের এই উদ্যোগ – এটাই পরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ বিবেকানন্দ ইত্যাদি হাত ঘুরে হিন্দুত্ববাদ হয়েছিল – আর এটাই হল ভারতে হিন্দুত্ববাদের আদি ভিত্তি ও বয়ান ভাষ্য!   কাজেই হিন্দুত্ববাদী বয়ানে জিন্নাহ কে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ বলে সব দায় তাঁর এমনকি এই একালেও বিএনপির মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর ভারত-হিন্দুত্ববাদের স্বার্থে নয়া দালাল হতে প্রথম আলো গং কে বাঁচাতে মির্জার – “চিন্তা করতে পারেন ধর্মের ভিত্তিতে……” বলে মিথ্যা আবেগ তুলে অভিনয় করা এসবই আমাদের ত্যাগ করতে হবে। সবার আগে রাজা রামমোহন রায় পড়েন।
    এর আগেই জমিদার-হিন্দু অথবা হিন্দুত্ববাদের সফট বা কড়া ভার্সান
    এর ভক্ত দালাল নিজ মস্তক-বিক্রি এগুলা আর কইরেন না। এবার ছাড়ান দেন!  দেশভাগ আমাদের ভাগ্যে ছিল অথবা সবদোষ হল জিন্নাহ-র এসব হিন্দুত্ববাদের বয়ান আর কতদিন বইবেন???

    একালে যারা রাজা রামমোহন রায় নিয়ে নতুন করে হিন্দুত্ববাদের বিয়ান ভাষ্যের বাইরে এসে পড়তে চান তাদের সবার জন্য প্রথম চয়েজ হল ইন্টারনেট সার্চ করা – সার্চ করতে শিখেন। এখন এতেও আবার গাইড পেতে গেলে আমার নিজের ওয়েব সাইটে দেখতে পারেন।

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    শেষ আপডেটঃ  দুপুর   ডিসেম্বর  ২০২৪    

     

  • মোদির মুসলমান-ঘৃণা ছড়ানো হিটলারিজমের পরিণতি

    মোদির মুসলমান-ঘৃণা ছড়ানো হিটলারিজমের পরিণতি
    গৌতম দাস
    ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪  দুপুর ১৩ঃ ০৮
    https://wp.me/p1sCvy-5XN

     

    Protesting residents raised slogans against the former owner Dr Ashok Bajaj, asking him to take the house back – pic- AK Mishra BBC

    ব্যানারে যা লেখা এর বাংলাটা হবে সম্ভবত এরকমঃ
    ডাঃ অশোক বজাজ হায় হায়
    নিজ বাড়ী (মকান) ফেরত নেন
    নিজ বাড়ী ফেরত নেন
    নিবেদকঃ সমস্ত টি.ডি.আই. নিবাসী

    এই পুরা রিপোর্ট এটা বিবিসি ইংলিশ থেকে নেওয়া। লিঙ্ক এখানে নিচে শিরোনা্মের সাথেঃ

    Muslim couple forced to sell house after protests by Hindu neighbours

    ভারতের উত্তর প্রদেশ!  হা ঠিকই ধরেছেন, মুখ্যমন্ত্রী ‘বুলডোজার যোগীর’ উত্তর প্রদেশ!  ভারতের এই রাজ্য বা প্রদেশের পশ্চিম-দিকে এক শহর এর নাম মুরাদাবাদ [Moradabad is an industrial city; Moradabad district] আর এখানেই ঢাকার বারিধারার মত পশ হিন্দু [posh TDI City] মানে উচ্চ আয়ের শহুরে হিন্দুদের বসতবাড়ি এলাকা বা এক কলোনি যার নাম টি.ডি.আই. সিটি।
    উপরের এই ছবিতেই আপনারা দেখছেন কিছু এর বাসিন্দা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
    তাদের এক পড়শি ছিলেন ডাঃ অশোক বাজাজ [Dr Ashok Bajaj] যার চোখ অপারেশনের হাসপাতাল আছে শহরে।  তাঁর প্রায় চল্লিশ বছরের পুরানা কলিগ আরেক ডাক্তার বন্ধু যারা আবার স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ডাক্তার [কিন্তু ধর্ম পরিচয়ে তাঁরা মুসলমান]তাদের কাছে টিডিআই কলোনির বাড়িটা বাজাজ সাহেব বিক্রি করেছেন।  এঘটনাকে কেন্দ্র করে ছবির এই হিন্দু বাসিন্দাদের ক্ষোভ হল যে মুসলমানের পাশে তারা বসবাস করতে পারেন না।  তাই তাদের একজন যেমন  […residents Megha Arora saying that Dr Ashok Bajaj, a resident, had sold his house to a Muslim family without consulting them.] মেঘনা অরোরা-র মুখ দিয়ে আসা দাবী হল, বাড়ি বিক্রির আগে বাজাজ সাহেবের এনিয়ে আলোচনা-অনুমতি নেয়া উচিত ছিল। আর তাই তাদের এখনকার দাবী হল যেহেতু ডাঃ বাজাজ সাহেব তা করেন নাই অতএব তাঁর মুসলমান কে বাড়ি বিক্রি এটা ডাঃ বাজাজ-কে এখন বাতিল করতে হবে। তাই ব্যানার টাঙিয়ে তাদের প্রতিবাদ। এরা কিন্তু আম আদমি না। রীতিমত উচ্চ আয়ের পস নাগরিক, পড়ালেখা করে প্রফেশনে আসা তারা ভারতীয়!! পরবতিতে তাই আপোষ। ওয়ার্ড কাউন্সিলারের কথিত মধ্যস্থতায় মুসলমান ডাক্তার দম্পত্তিও তাঁদের কেনা বাড়ি ফেরত-বিক্রির সুযোগ নিতে পেরে যেন জানে বেঁচে গেছেন!!! এই হল, বিবিসি্র এই রিপোর্টার সারকথা!

    এখন মুরাদাবাদ ধরনের ঘটনাগুলো এগুলোই কী আরএসএস-বিজেপির মোদিকে এখনকার বাংলাদেশে মুসলমানবিদ্বেষী মিথ্যা হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে প্রপাগান্ডা করায় নাই? একই চলমান প্রক্রিয়া নয়? দুই ধর্মীয়-এথনিক জাত, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাঙ্গা [পাঠক দয়া করে এটাকে কথিত সাম্প্রদায়িক শব্দে বলবেন না। কারণ,  সাম্প্রদায়িক শব্দটাও হিন্দুত্ববাদের বয়ান ও এর ভাষ্য। যেমন, ভারত সরকারি ভাষ্যে বলেছিল OIC নাকি ‘সাম্প্রদায়িক’ সংগঠন! সেই কান্ড দেখেন এখানে।  এটাই এথনিক-জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ; [মানে আমার ধর্মীয়-এথনিক জাত এটাই শ্রেষ্ঠ – এমন দাবী করা ] এভাবে, এটাই ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের রাজনীতির মুল ধারা বানিয়ে ফেলেছেন মোদি। এখন পড়শি দেশেও সেই বয়ান তা ছড়াচ্ছেন। এভাবেই পুরা অঞ্চল মানে সব পড়শি হয়ে এশিয়ায় ছড়াবেন তিনি – এশিয়ান হিটলার হয়ে উঠতে চাইছেন মোদি!   কাজেই আপনারা যার যার অবস্থান স্পষ্ট করেন যে, কে কোনদিকে অবস্থান নিবেন!  কেবল আমরা হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই এক থাকতে চাই – এই সুশীল নরম হিন্দুত্ববাদি অবস্থানে আর কুলাবে না। মুলকথাটা হল, এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ; আপনি এর পক্ষে না বিপক্ষে থাকবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।    


    “আমরা হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই, এক থাকতে চাই” – এটাও সুশীল নরম হিন্দুত্ববাদি বয়ান; একে “কংগ্রেসি হিন্দুত্ববাদ” বলেও বুঝতে পারেন। এটা একালের ছলনার বয়ান! একালের বিচারে। কারণ মোদি হিটলারিজমের ড্রাম বাজাচ্ছে এ’যুগে; আর আপনি সেকালের প্রগতিশীলতা=হিন্দুত্ববাদের বয়ান এখন আকঁড়ে ধরে ভাবছেন এটা বোধহয় মোদি মোকাবিলার বয়ান! এছাড়া, আপনারা ভাল মানুষ – তা বুঝানো যাবে ভেবে এই সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন! আসলে আপনি বোকা ও সরল তাই আপনি এখন প্রতারিত হবেন।  কারণ আপনি জানেনই না শুধু মোদি-ই না দেশীয় প্রতারক (imposter) এরাও সর্বোচ্চ ততপর। ব্ল্যাকমেল হয়ে এরা এখন র-এর হাতে বাধা পুতুল বা দাসী; এদের সব জ্ঞানবুদ্ধি তাই এখন র-এর সেবায় তাদের চরণে নিবেদিত!  এমন লেবাসে যারা – হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই – শ্লোগান দিয়েই কথা বলে আর, এরা চিন্ময়ের গলা জড়িয়ে ধরছে বা কোলে উঠে পড়ছে – অথবা চিন্ময়ের মত  হিটলারি 
    দাঙ্গাবাজদেরও নাকি অধিকার আছে বলে ইউনুসকেও পটিয়ে ফেলতেছে – আপনাকে একালে এদেরকে সবার আগে চিনতে হবে! নাইলে এদের হাতের পুতুল হয়ে থাকবেন আপনি। যখন বুঝবেন তখন অনেক দেরি, সব শেষ হয়ে যাবে হয়ত! 

     

    ঘটনা বিচারে খুবই কমন আমাদের আশপাস এর ঘটনা মনে হবেঃ
    মোদি হতে যাচ্ছেন এশিয়ার হিটলার! এখন আপনি কী এটা চেয়ে চেয়ে দেখবেন? আরেক এথনিক জাত ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের জোশে পালটা বেরিয়ে পড়বেন? নাকি সব ধরনের এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ – এর বিরুদ্ধে মানে, নয়া হিটলারিজমের বিরুদ্ধে দাড়াবেন?  এটাই আপনার সচেতন সিদ্ধান্ত হতে হবে, নিতে হবে!
    আমরা একাদেমিক শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে খুব কম লোকেই জানি হিটলার কেন কুখ্যাত! বড় জোর আবছা করে আমরা জানি হিটলার একটা খারাপ লোক। তাও তিনি আমাদের এ-অঞ্চলের না ঐ দুরের পশ্চিমা বা ইউরোপের দেশে বোধহয় কিছু একটা করেছে বলে শুনি – এই হল আমাদের শিক্ষিতদের জানাশুনা।  অনেকে ওদেরকে “ইহুদি-খৃশ্চান” অথবা চাইকি “সাদাচামড়াদের” কারবার বলে মনে করে ফেলতে দেখেতে চাইতে পারেন!  সরি, এগুলো এত দুরের কেউ বা কোন ঘটনা না। এটাই মোদি, এশিয়ান হিটলার – হিটলারিজমে আপনাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারতে আগিয়ে আসছে!  জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর গর্ব বা এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর সুরসুরি খুবই ভয়ঙ্কর! আপনি এর শিকার হয়ে যেতেও পারেন যদি আপনিওও কোন না কোন জাতিবাদের ঝান্ডাধারী হন!!!    মোদি আপনাকে ডেকে, টেনে হিচড়ে ওর নিয়মের খেলায় কখন সামিল করে ফেলেছে তা বুঝবার আগেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে!

    খুবই কম কথায় বললে, হিটলার অবশ্যই আরেক ‘জাতিবাদি’ ছিলেন। তাতে অনেকের মনে হতে পারে তাতে অসুবিধা কী আমরাও তো বাঙালি জাতিবাদি না হয় বাংলাদেশি জাতিবাদি, ইসলামি জাতিবাদি কিংবা জুম্মু জাতিবাদি ইত্যাদি অনেক কিছুর জাতিবাদি! তবে, এবার যদি বলি হিটলার উগ্র জাতিবাদি তো এবার তারা বলবেন হয়ত – ওমন একটু আধটু উগ্রতা অনেকের (অনেক জাতিবাদির) মধ্যে থাকে!
    তবে এরপর এসবের বিস্তারি জবাব হবে – এসবই আসলে শাহরিয়ারের নির্মুল কমিটি মানে জাত নির্মুল বা এথনিক ক্লিনজিং [ethnic Cleansing] এর কথা। এককথায়, উগ্র জাতিবাদিরা আসলে এটাই!   পড়শি বা অন্য ধর্মের লোকজনকে তাদের গুষ্ঠিসহ ঝেটিয়ে কচুকাটা নির্মুল বা উপড়ে ফেলে দেওয়া – এটাই হিটলারিজম! ।  আর এর শুরুটা সব সময় হয় এভাবেই হিন্দু-মুসলমান, একই ধর্মের দুই মজহাব, কিংবা গায়ের রঙ সাদা বনাম কালো-বাদামি আর এটাই হিটলারের বেলায় ছিল ইহুদি-ঘৃণা ইত্যাদি। শুরুতে হিটলার ছড়িয়েছিলেন যে আমরা জর্মান জাতি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি এজন্যই আমাদের চোখ নীল রংয়ের যা সারা ইউরোপেও অন্য কারও নাই। এজন্য বাকি সবাইকে আমাদের কথাই মানতে হবে।  আমরাই শ্রেষ্ঠ – তাই! এই জর্মান জাত শ্রেষ্টত্ববোধ বা শ্রেষ্ঠত্ববাদ – সেকালের হিটলারের জর্মানিতে তিনি এই বয়ানে জর্মানিদের সকলকে কখন আপ্লুত করে করে অন্ধ-ঘৃণায় সামিল করেছিলেন তা পালটা বুঝে বা হুশে ফেরত আসবার  আগেই সব শেষ! যুদ্ধ শেষ! ম্যাসাকার ঘটাসহ সব শেষ! ১৯৪৫ সালের আগষ্ট এসে পড়েছিল!

    এটাকেই আমি বহুবার এথনিক-জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদি চিন্তা বলে চিনিয়েছি আপনাদের কাছে।  যা শুরুতে খুবই সাধারণ থাকে আর শেষ হয় একটা নির্মুল বা এথনিক ক্লিনজিং [ethnic Cleansing] এর বিশাল ঘটনা হিসাবে। যখন তাকে আমরা হিটলারিজম বা জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা বলে দেখতে পাই। সার কথাটা হল, আমার জাত বা আমার ধর্ম, আমার গায়ের রঙ, আমার ভৌগলিক অবস্থান (পাহাড়ি না সমতলি) ইত্যাদি কোন একটার প্রসঙ্গ তুলে আমিই শ্রেষ্ঠ, আমার এথনিক-জাতই শ্রেষ্ঠ, আমিই শ্রেষ্ঠ – এই বয়ানগুলোর জন্ম হয়! অতএব আমার আধিপত্য, তোমাদের উপর আমার রুস্তমি তোমরা সকলে মেনে নেও – নাইলে আমি তোমাদের নির্মুল করে দিব। এই হল হিটলারিজমের বয়ান, এর মূল লক্ষ্য বা টার্গেট! আমাদের ওমুক যুদ্ধে আমাদের ওমুক ধর্মীয় নেতা কীভাবে বিজয় এনেছিলেন জানো? আমরা সেই  শ্রেষ্ঠ জাত! অথবা শ্রেষ্ঠ ধর্মের লোক! উত্তরসুরী, একালের শ্রেষ্ঠত্ববাদি! সব জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদি খুঁজলে তাদের পুরানাকালের ইতিহাসে এমন অনেক গল্পকাহিনী খুঁজে পেতেই পারে। আর সেগুলাই তারা তাদের  নির্মুল কমিটির নামে হাজির করে থাকে। যেমন ধরা যাক খুবই সাদাসিধা মনে হবে এই বয়ান টা যেমন –  আমাদের আছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বহমান ভূমির শেখ মুজিব!! লও লও লও সালাম শেখ মুজিব  ইত্যাদি ইত্যাদি – দেখেন তো মিলে কিনা!
    মোদির উস্কানি-সুরসুরিতে পা দিয়েন না! গত ২৭ নভেম্বরের [পিপি সাইফুল ইসলাম এর হত্যার পরের দিন] চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের মত শক্ত নিয়ন্ত্রিত ও পরিস্কার হুশে থাকা মানুষ থাকেন!

    পাঠকদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন, এলেখা পড়ার পরে দুদন্ড সবাই নিজের সাথে যেন বসবেন! নিজের সাথে একান্তে কথা বলেন! পরে যা হয় সিদ্ধান্ত নিয়েন!!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    শেষ আপডেটঃ  দুপুর ০২ঃ ৩২   ০৭  ডিসেম্বর  ২০২৪    

     

  • বগলে মোদিকে নিয়ে বাংলাদেশে জাপান যে ফাঁদে

    বগলে মোদিকে নিয়ে বাংলাদেশে জাপান যে ফাঁদে
    গৌতম দাস
    ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪ রাত ২১ঃ ১৮
    https://wp.me/p1sCvy-5WO

     

    Bangladesh-India-Japan conclave discusses path……

     

     

     

     

    আজ বণিক বার্তায় একটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, “বাংলাদেশ-ভারত এর উত্তেজনা” শব্দ ব্যবহার করে। আশা করি এলেখা নিয়ে কিছু আলোচনা করব বলে বণিক বার্তা মাইন্ড করবে না। কারণ আমি কোন  “প্রগতিবাদী” আলোচক নই। এই রিপোর্টে একটা প্রচ্ছন্ন ম্যাসেজ হচ্ছে বাংলাদেশ জাপান এর এডিবি এর নেহায়েতই একটা একটা উন্নয়ন প্রকল্প আছে। কিন্তু “বাংলাদেশ-ভারত এর উত্তেজনায়” সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাই আমরা যেব “বাংলাদেশ-ভারত এর উত্তেজনা” কমাই – উন্নয়ন প্রকল্পের খাতিরে।
    সরি, জাপান সরকার লেখক এবং বনিকবার্তাও। আপনাদের এই পারসেপশন অনুমান এবং বর্তমান ঘটনাকে “বাংলাদেশ-ভারত এর উত্তেজনা” হিসাবে দেখা ও দেখানো সঠিক নয়। একেবারে মূল কারণ, জাপান মোদির মতই বাংলাদেশকে চুষতে একটা তথাকথিত কানেকটিভিটি প্রকল্পে ঢুকেছিল। কানেকটিভিটি শব্দটা দেখলেই আমাদের বুঝতে হবে এটা ভারতকে বিনা পয়সায় করিডোর দেয়া আর সাথে এজন্য ভারতকে অবকাঠামো সুবিধা দিতে বাংলাদেশের মানুষের কাঁন্ধে বিদেশি অবকাঠামোঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে বিনা পয়সায় ভারতকে করিডোর দেওয়ার খেলাতার নামই হচ্ছে কানেকটিভিটি।
    এবার জাপান হয়েছিল সেই অবকাঠামো ঋণদাতা যে ভারতের মতই কানেকটিভিটি  এর নামে বাংলাদেশকে চুষবে।  এক্ষেত্রে ভারত ও জাপান দুই সরকারই ধরে নিয়েছিল আসলে বলা উচিত জুয়া-বাজি ধরেছিল যে মোদির বসানো হাসিনা আরো টিকে যাবে ফলে তাদের কানেকটিভিটি ব্যবসাও।  কিন্তু আল্লাহ মেহেরবান বলতেই হবে!
    সব জুয়ার বোর্ড উলটা দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা জাপান-ভারতের চোখে অবিশ্বাস্যভাবে হাসিনা কেই উপরে ফেলে দিয়েছে। আর এখন এতে জাপান বণিকবার্তা কিনে নিয়ে নাকি কান্না গাইতে এসেছে নেহায়েতই একটা একটা উন্নয়ন প্রকল্প এর খাতিরে যেন আমরা বাংলাদেশ-ভারত এর উত্তেজনা থামাই…।

    বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনায় দুশ্চিন্তায় জাইকা ও এডিবি

    এলেখা ছাপা হওয়াতে এটা হল সেই চিহ্ন যে, বাংলাদেশ-ভারত এর সম্পর্কটা তৃতীয় দেশের স্বীকার করার মত উত্তেজনা হয়ে হাজির হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই।  আর দ্বিতীয়ত, এই তৃতীয় দেশ হল, মোদির প্রিয় জাপান ভাইয়া! কোন জাপান ভাইয়া? নিচে দেখেন।

    মোদির ভাইয়া কেন?  মানে হুদাই চীনবিরোধী সেজে বা দেখায়ে সেইটা বেঁচে আমেরিকার কাছ থেকে কিছু বাড়তি সুবিধা ও আমেরিকান ক্ষমতার এঁটো-উচ্ছিষ্ট লেগে থাকা পাত্রে (মানে খাওয়া হয়ে গেলে সে পাত্রকে এঁটো বা ঝুটা পাত্র জ্ঞান করা হয়) একটু চাটা দিবার সুযোগ পেতেই – এটা হল মোদির ভারতের আমেরিকা প্রীতির লালচামি আর সেটা দেখায়,  নিজ মুরোদ থাক না-থাক, এখান থেকেই বাংলাদেশের উপর আধিপত্য, এটার মোদির রুস্তমির খায়েশ!
    অথচ মোদির ভারত সস্তা বিদেশি ঋণচাহিদার দেশ বা “বিনিয়োগ দরকারের ভারত” এই অর্থে ভারত কিন্তু আমাদের পর্যায়ের বা মানেরই ঋণ চাহিদার দেশ। কাজেই আমেরিকার কাছে ভারতকে চীনবিরোধী দেখায়ে সেই মিথ্যা-চেহারা বেচতে গিয়ে মোদির ভারতের চীনের কাছে থেকে দূর থেকে দূরে মানে তুলনামূলক অনেক সস্তায় যে ঋণ পাবার সুযোগ ছিল চীনের কাছ থেকে  – কিন্তু সেই পথ ভারত নিজেরাই বন্ধ করে ফেলেছে। [যদিও ২০১৪ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হবার পর কয়েক বছরে বড় বড় চীনা ঋণপ্রকল্প মোদি নিয়েছিলেন।] কিন্তু এরপর থেকেই  চীনের চেয়ে তুলনামূলক কম সুবিধাদি ও উচ্চসুদের জাপানি ঋণ হয়ে পড়েছে ভারতের একমাত্র ভরসা! এখন মোদির ভারতের  জাপানি ঋণ নিবার অভিমুখ করে পররাষ্ট্রনীতি সাজাতেই পারে – এতে গাড্ডায় পরা বা না-পরা সবই তাদের ইচ্ছা। তাহলে বাংলাদেশে আমরা কেন কথা বলছি?

    করিডোর একটা চরমতম বিতর্কিত শুধু নয় ক্ষতিকর প্রকল্পঃ
    এটা এমনই চরমতম বিতর্কিত প্রকল্প যে কলোনি আমলেও বৃটিশেরা এভাবে আমাদের চুষে নাই। করিডোর নামে যেকোন প্রকল্প এটা ভারতের বাংলাদেশকে খোলাখুলি চুষে নেয়া, খাবলে খাওয়া এক প্রকল্প। বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতকে অবাধে সবকিছু পরিবহণের তা মাটির নিচে, সড়ক, রেললাইন, পানিপথে  – এভাবে সবধরণের যানবাহনে, যেকোন সীমান্ত দিয়ে যতখুশি এবং সবই বিনা পয়সায় বা নামমাত্র (সময়ে বাংলাদেশিদের চেয়েও কম) মুল্যে নিয়ে এসব করিডোর আমাদের ভারতকে দিতেই হবে – এজন্য এটা ক্ষতিকর প্রকল্প।

    অথচ জাপান এই প্রকল্পে নিজেকে ঘোরতরভাবে জড়িয়েছে, অর্থ ঢেলেছে – বলা হয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। এতে জাপান যে ক্ষমার অযোগ্য কাজ করেছে তা হল,
    এক. একেবারেই ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশের জনগণের নামে ঋণপ্রকল্প নিবে  বাংলাদেশের হাসিনা চোর-সরকার; আর জাপান সরকার সে প্রকল্পে প্রধান ঋণদাতা হয়ে জড়িয়ে যাবে?  মানে ভারতের স্বার্থে কোন ঋণ প্রকল্পে ঋণ নেয়া আর বাংলাদেশের মানুষকে এই ঋণ এর বোঝা টানতে, পরিশোধ করতে হবে। জাপানের তাতে পরোয়া নাই?  শুধু তাই না ভারত এতে নির্মিত সব অবকাঠামোর মুল ব্যবহারকারি, সকল সুবিধাভোগী হবে; অথচ এমনকি এর যে টোল আসবে সেটাও ভারত বইবে না। টোল দিবেই না বা ভারতের জন্য বিশেষ ছাড় নামমাত্র কিছু একটা হবে। হাসিনার উপদেষ্টা বলেছিলেন ভারতের কাছে টোল বা ট্যাক্স চাওয়াটাই নাকি অভদ্রতা!!!  অথচ  নেয়া ঋণ পরিশোধের দায় ভারত সরকারের না। এমনকি এর সুবিধা ব্যবহারকারি বাংলাদেশি হলেও যে টোল নির্ধারিত হবে সেটাও ভারত পরিশোধ করবে না। চাইলে নাকি সেটা অসভ্যতা হবে! অথচ এসব লুটপাটের খবর চোখের সামনে ঘটবে ঘটেছে সেটা দেখে-জেনেও জাপান এই প্রকল্পে বিনিয়োগ বা ঋণ দিতে এসেছিল।

    কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশের ঘাড়ে  মোদির জাপান ভাইয়া প্রকল্প লটকায়ে দিবে?  বিশেষ করে যখন একদিকে, এটা অর্থনৈতিক স্বার্থে দেখে নেয়া প্রকল্প নয়, কথিত স্ট্রাটেজিক স্বার্থ মুখ্য করে দেখে নেয়া মোদির প্রকল্প! আর তাতে জাপান নিজেই নিজেকে সংশ্লিষ্ট করেছে? এর মানে ঋণের অর্থ ভেরত পাবে কী করে সেটা বিবেচনা করে এসব প্রকল্প জাপান নেয় হয় নাই। অন্যদিকে জাপান কী দেখে নাই জানে বরং দেখেও না দেখা করে ফেলে রেখেছে যে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এর মূল সুবিধাভোগী ভারত অথচ ঋণ পরিশোধের ভার বাংলাদেশের জনগণের! এধরণের একটা প্রকল্পে জাপান নিজেকে জড়িয়েছে কেন? আর এখন কান্নাকাটি কেন? 
    এমনকি আরেকটা তথ্য এখানে জানায় রাখি। একটা অবকাঠামো হিসাবে গড়া রাস্তা বা ব্রিজ এর টোল একজন বাংলাদেশির বেলায় যা চার্জ করা হবে একজন বিদেশির বেলায় সবচেয়ে বৈধভাবেই তা হতে হবে এর চেয়ে অনেক বেশি। মূল কারণটা বুঝে রাখেন। কেউ বাংলাদেশি মানেই হল, যুগ যুগ ধরে আমাদের পাবলিকের দেয়া ট্যাক্স এটাই সরকারের সকল আয়-সম্পদের উতস যেখানে ঐ  রাস্তা বা ব্রিজ এই অবকাঠামো সেটাও সরকারের সম্পদ মানে পাবলিকের। তাই বাংলাদেশিরা যাদের দেয়া ট্যাক্সের অর্থ থেকেই সরকার চালানো টিকানো ইত্যাদি সব ব্যয় নির্বাহ করা হয় বলে ঐ সরকার চালানোর অর্থের যে অংশ এই টোল নির্ধারণে যুক্ত হওয়ার কথা তা যুক্ত করা হয় না।বা কম করা হয়। কিন্তু একজন বিদেশি যখন এর ব্যবহারকারী যারা সরকার পরিচালন কাঠামো খাড়া করা ও এর দৈনিন্দিন ব্যয় সেসব খরচের দায় তো তার নয় বা তাঁর থেকে নেয়া হয় নাই। তাই একজন বাংলাদেশি যে তার বাপ-চোদ্দপুরুষ সরকারকে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে ট্যাক্স দিয়ে আসছে যেটা আসলে সব রাষ্ট্রীয় সম্পদের উতস – তার অবদান আর একজন বিদেশির অবদান এক নয় বলেই – অবকাঠামোর টোল বিদেশির বেলায় বেশি ও ভিন্ন হবে।
    আবার সাবধান আপনি ব্যাংককে গিয়ে স্থানীয়দের রেটেই টোল পরিশোধ করতে পারেন। কিন্তু আপনার ভুখন্ড পেরিয়ে যখন একটা বিদেশি-পড়শিদেশের ট্রাক বা ট্রেন পরিচালিত হবে উদাহরণ গুলো এক্ষেত্রে চিন্তা করতে হবে।

    আরেকটা আরও বড় পয়েন্ট হল,  ভারত বাংলাদেশ থেকে এই করিডোর পেলে ওর যা সুবিধা ও অর্থ সাশ্রয় হবে (যেমন নর্থ ইস্ট থেকে কলকাতা যেতে যেখানে পুরাটাই ভারতের ভুখন্ড এর উপর দিয়ে যাত্রা হলে সেক্ষেত্রে যাত্রাপথ হল প্রায় ১৭৫০কিমি আর বাংলাদেশের বুক চিরে গেলে এইপথ নেমে আসবে প্রায় ৩৫০ কিমি।) এই সুবিধা সবটাই একা ভারত নিবে [এর অর্থনৈতিক বেনিফিট এর কিছুই সে বাংলাদেশকে দিবে না]। আবার ভারতকে এই সুবিধা দিতে হলে নয়া পথ-অবকাঠামো তৈরির যে ঋণ নিবে বাংলাদেশ আর তা পরিশোধের দায়ও নিবে বাংলাদেশের জনগণ! কী মজা তাই না? ভারতের জন্য সবই লাভ আর লাভ! আর জাপান এখানে এসেছে এরই মাখনের ভাগ খেতে!
    এখন জাপান কী – এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী কে আর দায় পরিশোধ করবে কে এসবের কোন কিছু জানে না?  নাদান সে?  না জেনেই এই প্রকল্পে একেবারে শুধু জাইকা না একেবারে তার প্রভাবিত এডিবি ঋণ এনে জাপান ঝাপিয়ে পড়েছে কী এমনি? এমন ভাবার কোন কারণ নাই!
    এখন কথাটা আসলে খুব সোজা।  জাপান যদি এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটির [viable বা দায় বইবার যোগ্যতা] যাচাই না করে থাকে বা উপেক্ষা করে থাকে তবে এর দায় কী বাংলাদেশের বা অন্য কারো? নাকি তা সরাসরি জাইকা ও এডিবির হবে; তাই নয় কী? 

    আরো বড় কথা হল, এই পুরা প্রকল্পটা হল,  ভারতে বাংলাদেশের উপর অবৈধ প্রভাব এর উপর দাঁড়ানো হয়ে শুরু হয়েছিল। ভারত বাংলাদেশে জবরদস্তিতে একজন হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিবে আর এই সরকারের উপর দেশি-আন্তর্জাতিক সব ধরণের সমর্থন যোগাড় করে এনে দিবে আর এর বিনিময়ে হাসিনা ভারতকে বৈষয়িক সব ধরণের সুবিধা ও মারাত্মক সব অসম চুক্তি করে সুবিধা দিবে – এই ছিল অবৈধ প্রভাবে ভারতের বসানো এক হাসিনা সরকার।  আর এটা তো জাপান সরকারের অজানা ছিল না। এর আগের যে জাপানি রাষ্ট্রদুত বাংলাদেশে ছিলেন তিনি তো ২০২৩ সালে বাংলাদেশে রাজনীতিতে – অনির্বাচিত অবস্থা নিয়ে – প্রকাশ্যে মুখ খুলেও ফেলেছিলেন একবার।  তাহলে বৈধতার খবর না থাকা অথবা নড়বড়ে থাকা – মোদির বসানো পুতুল হাসিনা সরকারের সাথেই জাপান সরকার কেন ঋণ চুক্তি করেছিল?  এর দায় কী জাপান সরকারের নিজেরই নয়?

    এবার এর রিপোর্টের লেখকের প্রসঙ্গেঃ
    বণিকবার্তায় এই রিপোর্টটা লেখা হয়েছে ভারতের চোখে বা ভারত-জাপানের মিলিত চোখে দেখে লেখা। যেমন কানেকটিভিটি [connectivity] এই একটা বিশেষ শব্দই অনেক কিছু এটা প্রকাশ করে।  এই বিশেষ কানেকটিভিটি শব্দটা ব্যবহার করে কেউ কথা বলে বা লিখলে এর অর্থ হল, তিনি জেনে না-জেনে জবরদস্তিতে ভারতের বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর সুবিধা নেওয়ার এক সাফাইমূলক শব্দ ব্যবহার করে কথা বলছেন।    ভারত জানে বিনা পয়সার করিডোর সুবিধার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কথা উঠবে। তাই আগেভাগে এটাকে শব্দের মারপ্যাচে যেটুকু শুশীল ভদ্র ফেয়ার একটা ইমেজ  – যে বিনা পয়সায় করিডোর নেয়াটা কোন অন্যায্য কাজ হয় নাই – এটা দেখাতেই এই শব্দ। এই শব্দ দিয়ে ভারত (বা তার হাইকমিশনার) বুঝাতে চায় যে আমরা এই অঞ্চলের দেশগুলো একসাথে পারস্পরিক বাণিজ্যিক সুবিধা দেয়ার জন্য যেন এসব করছি – আমরা যেন এক কথিত বাণিজ্যিক কানেকটিভিটি যোগাযোগের বাণিজ্য ব্যবস্থা করতে মেতে উঠেছি।   আসলে ব্যাপারটা এর উলটা। এটা কেবলমাত্র ভারত সরকারকে সুবিধা দিতেই ক্থা হয়েছে। ফলে এতে কোন আঞ্চলিক  বা অনেক রাষ্ট্রের মিলিত উদ্যোগ নয়, এমনকি এটা সবার কোন বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়। কেবলমাত্র  একমুখি  – ভারতের সুবিধা মুখি এই ততপরতা।  বিনিময়ে বাংলাদেশের একজনই এর সুবিধা পেতেন তিনি শেখ হাসিনা। সেটা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার নিশ্চয়তা!!!

    কী হতে পারত কোন বাণিজ্যিক করিডোর ব্যবস্থাঃ
    আসেন কল্পনা করি; বাংলাদেশের উপর দিয়ে গড়া একেবারেই বাণিজ্যিক করিডোর ব্যবস্থাটা কী হতে পারত। ভারতের নর্থ ইস্ট এটাই দুনিয়ার শেষ সীমানা নয়। এর ওপারে বা আরো উত্তরে আছে চীনের তিব্বতের একাংশ; এছাড়াও আছে ভারত পেরিয়ে নেপাল ও ভুটান এর ভুখন্ড ইত্যাদি।  এসব ভুখন্ড বা এদিকগুলো একেবারেই ল্যান্ডলকড। কাজেই আসেন ভারতও এসব দেশ-ভুখন্ডকে ভারতের উপর দিয়ে করিডোর দিয়ে দেক। যাতে ভারতের নর্থ ইস্ট সহ যেকোন দেশই বাংলাদেশের উপর দিয়ে তৈরি সব অবকাঠামোই ব্যবহার করতে পারে। তাতে সেটা মাটির নিচে, উপরে রেল সড়ক, নদিতে পোর্ট এমনকি মংলা বন্দর এমনকি আরো বড় আমাদের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ইত্যাদি সব ধরণের অবকাঠাম ব্যবহারকারি যেকোন দেশকেই বাংলাদেশ এই সুবিধা দিতে পারে। আর সকলকে সতর্ক ও সাবধান করে দেই। সোনাদিয়া সহ বাংলাদেশের এমন সব অবকাঠামোই হবে একেবারেই বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক বৈশিষ্ঠের। মানে কোন সামরিক-স্ট্রাটেজিক কোন কিছু তাতে থাকবে না, রাখা হবে না। সামরিক ব্যবহার থাকবে না তা বাংলাদেশ প্রতিশ্রুত থাকবে ব্যবহারকারি সবদেশের কাছে।
    এতে ভারত বা জাপান কী রাজি? এদিকটা ভারত বা জাপানের সরকার বা তাদের বিখ্যাত সব এক্সপার্ট এরাকেউই কী চোখ দিয়ে কী দেখেছিল? দেখে নাই কেন?

    উত্তর খুব সহজ। দেখে নাই। বরং জাপানের লোভি চোখ যদি মদির মত হয় –  ভারত যেভাবে হাসিনাকে জবরদস্তিতে ক্ষমতায় বসিয়ে অবৈধ অনির্বাচিত ও গুম-খুনের রাজত্বের এক সরকার রেখে বাংলাদেশের সব লুটতে পারে তবে জাপানও কেন এর ভাগ নিবে না – এটাই ছিল জাপানের চোখ ও অবস্থান। শুধু তাই না, বলা যায় জাপান এই ঋণচুক্তি টা করেছিল এটা ধরেই নিয়ে যে  হাসিনা যেন চিরদিন বাংলাদেশের ক্ষমতায় থেকে যাবে – বাংলাদেশের জনগন চিরদিন যেন এই অবৈধ ভারতের চর হাসিনার ক্ষমতাকে সহ্য করবেই – উপরে ফেলবে না। এটাই ধরে নেয়া ছিল!  যার সোজা অর্থ জাপান সরকার তো কোন ঋণ দানের চুক্তি করে নাই আসলে যেন জুয়া খেলতে বসেছিল। জুয়ার রিস্ক নিয়েছিল যে ভারতের পুতুল হাসিনা ক্ষমতায় থেকেই যাবে.…..!!!  কিন্তু জুয়াখেলার জাপান হেরে গেছে। সেই হার এটা। জাপান সেই জুয়া খেলায় হেরে গেছে। কাজেই বিশ বিলিয়নের ঋণ এর দায় কী কেবল এবং কেবলমাত্র  ভারত-জাপানের নয়? বাংলাদেশের জনগণ এর কোন দায় কেন নিবে?

    এখানে সবচেয়ে ইতরোচিত শব্দ হল ইন্দো-প্যাসেফিকঃ
    লেখক বলছেন এ বিষয়ে জাইকার ওয়েবসাইটে বলা আছে, ‘এ বিষয়ে জাইকার ওয়েবসাইটে বলা আছে, ‘অবাধ ও মুক্ত ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়ে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার পরিকল্পনার ভিত্তিতে দ্য বে অব বেঙ্গল-নর্থইস্ট ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন ধারণাটিকে সামনে নিয়ে এসেছে জাপান।

    “এ বিষয়ে জাইকার ওয়েবসাইটে বলা আছে, ‘অবাধ ও মুক্ত ইন্দোপ্যাসিফিক নিয়ে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার পরিকল্পনার ভিত্তিতে দ্য বে অব বেঙ্গল-নর্থইস্ট ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন ধারণাটিকে সামনে নিয়ে এসেছে জাপান।”

    যার সারার্থ হল, এটা ভারত-জাপান করেছে তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক স্বার্থ বাস্তবায়নের কারনে। আর এটাই নাকি তাদের – অবাধ ও মুক্ত ইন্দোপ্যাসিফিক এর ধারণা ও নমুনা!!!
    আমরা উপরে দেখলাম এটা আসলে ছিল জাপান সরকারের এক জুয়া খেলা যে হাসিনা ক্ষমতায় থেকে যাবে আর ভারত-জাপান যোথভাবে বাংলাদেশকে চুষতেই থাকবে……!এখানে হা হা হা করে এক লম্বা হাসি হবে।

    বণিকবার্তা ও এর লেখক এটাকেই অবাধ ও মুক্ত ইন্দোপ্যাসিফিক এর ধারণা ও নমুনা বলে চালিয়ে দিতে এসেছেন?
    উপরে আমরা দেখেছি লেখক এটাকে কানেকটিভিটি বলে চালাতে এসেছিলেন।
    এর সাথে লিখার ভিতর পাবেন ভারতের কথিত লুকইস্ট জাতীয় প্রপাগান্ডা।  আবার দেখেন লেখকও আমাদের বিশ্বাস করতে বলেছে এসব নাকি কোন -“উপ-আঞ্চলিক জোট সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশনের (সাসেক)” এর অধীনস্ত প্রকল্প! তো ভারত ছাড়া আর বাকি দেশ কারা ওখানে? মানে কানেকটিভিটা একা ভারতের স্বার্থ নয় এটা সবসময় ভারত তুলে ধরবে এতা অঞ্চলিক আরো অনেক দেশের যেন! অথচ খুজে সুবিধাভোগী হিসাবে ভারত ছাড়া কেউ নাই!
    এর মানে এই রিপোর্টের লেখক (বা হতে পারে খোদ বনিকবার্তাও) জাপান-ভারতের স্বার্থের পক্ষে এক প্রপাগান্ডা করতে এই রিপোর্ট হরেছে। আর নয়ত এরা একেবারেই ন্যাকা-বোকা সরল! সেজন্য জাপানের ওয়েব সাইট খুজে সাফফাই খুজে নিয়ে আসতে গেছে!

    মূল বিষয়টা কিঃ
    শুরুতে ও শিরোনামে – “বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনায়…” বলে যেশব্দ কয়টা লিখেছেন সেটাই মুল বিষয়।  হাসিনাকে পুতুল সরকার বসিয়ে আগে থেকে ভারত পরে তাতে যোগ দেয়া জাপান যাতে তারা বাংলাদেশকে লুটতে পারে। ফলে এখন যেটাকে তারা বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনা বলছেন সেটা আসলে আরো বড় কিছু। এতা আসলে আগামিত্এ মোদির ভারত আবার লুটের ব্যবস্থা চালু করতে একটা সরকার বসাতে পারবে কংবা পারবেই না – এখনকার লট=ড়াই যেটাকে তারা শুধু উত্তেজনা বলছেন  এরই মুল লড়াই। বাংলাদেশে আবার ভারতের আধিপত্যের কোন ১৬ বছরের সরকার কায়েম হবে কি হবেই না এরই লড়াই চলছে। তাতে এটাকে লেখক বাংলাদেশ-ভারত উত্তেজনা বলে লঘু করতে চেয়ে লাভ নাই। এর প্রথম পর্যায়ে জাপান সরকার জুয়ায় হেরেই গেছে! তাই কোন রিপোর্টার এথেকে জাপানকে আর জিতাতে পারবে না!!! সরি জাপান!! হাসিনার বেনিফিসারি লোভি জাপান, সরি!!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ৬ ডিসেম্বর  ২০২৪    রাত ১১ঃ ১৭
    শেষ আপডেটঃ      ২০২৪