Author: goutamdas

  • কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

    কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়
    গৌতম দাস
    ১০ নভেম্বর ২০২৩  ২১ঃ ৫৮ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-57i

               দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায় – স্টিফেন ইবেলি বলেন, রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ভারতে ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

    আবার শুরু হয়েছে। সেই পুরানা বানানো গল্প –  ভারত নাকি আমেরিকার সাথে দেন-দরবার করে হাসিনাকে বাঁচাবে। ফিরে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখবে ইত্যাদি! মানে সেই পুরানা “আনন্দবাজারি” ও  “অগ্নি রায়” আর তাঁদের ঢাকার সহযোগী – মার্কা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। আর তা শুনে কিছু না বুঝে হাহাকার করে উঠা লোকের সংখ্যাও কম নয় যারাই মূলত – ভারত আবার হাসিনাকে বোধহয় ক্ষমতায় রেখে দিল – এই প্রপাগান্ডাকে পরোক্ষে আয়ু দিচ্ছেন। আর তাতে মিথ্যা প্রপাগান্ডার অপ-সাংবাদিকতা করে হিট বাড়ানোর অসৎ ততপরতার জয়জয়কার শুরু হয়েছে। এবার একাজের লিড হল, বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ। তিনি নেমেছেন যে নিজে ভারতীয় আর ভারতীয় বলেই যেন এক আরএসএসের কর্মির মত আচরণ করে আসছেন তিনি। আর তাত এই আচরণের পিছনে আছে আরেক পরিচয়।

    কলকাতার আরএসএস এর এককালের (২০১৬) দায়ীত্বে থাকা নেতা তথাগত রায় এখানে দেখেন তার পরিচয়,
    এরই চ্যালা-শিষ্য ছিলেন এই শুভজ্যোতি ঘোষ! 
    তথাগতের আমলে (সে সময়
    জঙ্গীবাদের নামে যা খুশি লিখতে-করতে-চালাতে পারত এরা), তাতেই এই শুভজ্যোতির উত্থান!

    শুভজ্যোতি ঘোষ, তিনিই এবার প্রপাগান্ডা লিড-নেতা! বাংলা বিবিসি-তে তিনি সত্য-মিথ্যায় মিশানো এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করেছেন। আর তা থেকেই প্রধান প্রপাগান্ডাটা শুরু হয়েছে। আর এটাই বাংলাদেশে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ ইত্যাদি এরা বিবিসির নাম না নিয়েই ঐ মেটারিয়াল দিয়ে সুত্রবিহীন স্ব স্ব রিপোর্ট করেছে।  যদিও গতদিনটা শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এরও এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট দিয়ে। সেটা এখানে দেখতে পাবেন।

    মিথা প্রপাগান্ডার শিরোনাম কীঃ
    গতকাল ১০ নভেম্বর ছিল আভ্যন্তরীণ রুটিন ঘটনা হিশাবে ভারত-মার্কিন সংলাপের দিন। আর সে উপলক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তাঁদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে সাথে নিয়ে আগের দিনই ভারত সফরে পৌছে গেছিলেন। বলাই বাহুল্য এতে বাংলাদেশের কোনই সংশ্লিষ্টতা নাই; থাকার কোন কারণও নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই ইন্ডিয়ার হাসিনাকে দেয়া মিথ্যা মিডিয়া প্রপাগান্ডা সার্ভিস যে এই সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে! কেউ কেউ সাবধানী খাড়া মিথ্যা বলতে ভয় পেয়েছে।  যেমন কালের কন্ঠ লিখেছে  “ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ : উঠতে পারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও” ।  আবার প্রথম আলো তো খুবই সাহসী মিথ্যাবাজ। তাই সে বুক ফুলিয়ে শিরোনাম করেছে,দিল্লিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।  কিন্তু প্রকাশ করার পর বুঝেছে এত হারাম কাজ দুনিয়া সহ্য করবে না। রাত দশটার মধ্যেই ঢাকার মানুষ চোরামি জেনে গেছে। মানে প্রথম আলো – এরা এত নিচে নেমেছে যে প্রথম প্রপাগান্ডা নিউজটা গায়েব করে দিয়েছে। লক্ষ্য করবেন এর রেফারেন্স লিঙ্কটা প্রিয়.কম এর। এই ওয়েবে কারো অনেকের প্রকাশিত লেখাই অটো কপি করে রাখা থাকে। তাই আমি সেখান থেকে লিঙ্ক দিয়েছে। এছাড়া ফেসবুকে যারা স্ন্যাপ কপি করে স্টাটাস দিয়েছিল ততক্ষণাত তাঁদের স্টাটাসে প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্টটা এখনও লটকানো আছে।
    তাই এবার শিরোনাম সহ সবই বদল। বলা যায় এবার দিল্লির সৌমের বরাতে প্রথম আলোর একেবারে ভাল মানুষী এবং পুরা উলটা শিরোনাম – যুক্তরাষ্ট্রকে বলল ভারত নির্বাচন কীভাবে হবে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ।

    তাহলে শুভজ্যোতি কী করেছিলঃ
    শুভজ্যোতি একদিকে প্রায় তেরশ অক্ষরের প্রপাগান্ডা রিপোর্ট-টা করছেন, শিরোনামে কায়দা করে উস্কানি দিয়ে লিখছেন দিল্লিতে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে!!!  অপরদিকে লেখা সেই রিপোর্টের একেবারে শেষে ভারতীয় মুখখপাত্র অরিন্দম বাগচির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, “বাগচি বলেছেন, আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”। 

    “বাংলাদেশের নির্বাচন একান্তভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব
    নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”, -জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র। সেই সঙ্গেই তিনি যোগ
    করেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। ঘনিষ্ঠ মিত্র ও পার্টনার
    হিসেবে আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মর্যাদা দিই।”

    যার সোজা মানে হল, শুভজ্যোতির পুরা রিপোর্বটের বক্তব্যটাই ভুয়া প্রপাগান্ডা! কারণ, অরিন্দম বাগচির কথা সত্য হলে শুভজ্যোতির কথা যে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় – এটা মিথ্যা।  অদ্ভুত, এরপরেও এমন রিপোর্ট আবার বিবিসি বাংলায় ছাপা হয়েছে সাংবাদিকতা বলে!!!!

    ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেনঃ
    সকাল থেকেই বাংলাদেশে প্রপাগান্ডা শুরু যেখান থেকে যে ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেন! প্রপাগান্ডিস্ট কালবেলার কথাই ধরেন, তার এই রিপোর্ট দেখেন।  এরা পিটার হাসকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সকাল থেকেই এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার খারাপ  প্রভাব পড়েছে! কারণ পিটার হাস দিল্লি চলে গেছেন!

    তো – তাতে কী হবে? না, তাঁদের থামার সময় নাই। পিটার হাস ইন্ডিয়া গেছে মানেই যেন ফিরে এসে তিনি হাসিনা কে নির্বাচিত ঘোষণা করে দিবেন! তাই কান্নাকাটি???
    তাঁদের কে বলি – এখন থামেন, একটু শ্বাস নেন ভাল করে; এবার শুনেন!

    প্রথম কথা হল, আজ সন্ধ্যা সাতটায় সমকালে ছাপানো ছবি-সহ নিউজ বলছে, দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়। এখন বুঝেন প্রপাগান্ডার হাত-পা, ডালপালা কতদুর বিস্তৃত!

    দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

                                                                                     এটাই বিবিসির প্রপাগান্ডা রিপোর্ট 

     

     


    এমনকি হাস যদি ইন্ডিয়া যেতেন তবুও কিছুই মানে হত না কেনঃ

    কারণ, আজ দশ নভেম্বর দিল্লিতে ভারত-মার্কিন ২+২ সভা শুরু হবে আর তাই সেখানে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন আগের দিনই এসেছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও হাস যদি যেতেন তিনি মূলত বড় জোর ব্লিঙ্কেনের সাথেই দেখা করতে যেতেন। তবু কোনভাবেই পিটার হাস ভারত-মার্কিন ২+২ সভার কেউ হতেন না। কারণ তিনি এর কেউ নন।

    আর তাতেও কী কী ‘সত্য না’ থেকেই যেতঃ
    ১। পিটার হাস ২+২ সংলাপ-সভার কেউ নন, হবেনও না। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মাত্র!
    ২। এখানে ২+২ সংলাপ মানে আসলে কী? তা হল, ভারত-মার্কিন দুপক্ষেরই দুই পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে ভারতেরও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ( তাই, ২+২) – একসাথে ডাকা নিয়মিত সভা – এমন সভার কাঠামোর নাম হল  ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে; যা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এর উদ্দেশ্যে ছিল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করা কার্যত যা, ভারতকে আমেরিকান অস্ত্র বিক্রি এবং কী কী শর্তে বিক্রি সেসব নিয়ে আলোচনা। কারণ রাশিয়ার কী কী অস্ত্র ভারত কিনলে আমেরিকা অস্ত্র ভারত পাবে না সে তর্ক আছে। আর দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সামরিক রিসোর্স ও স্টোর-গুদাম শেয়ার করতে পারে কিনা যা পরে পূরণ করে দেয়া হবে এধরণের এক আলাপের সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয়েছিল।  সুতরাং বলাই বাহুল্য, এই সংলাপে বাংলাদেশে কোন ইস্যুই না। এটাই আমাদের জন্য মূল কথা।  একারণেই বলছি পিটার হাস  ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের কেউই নন।
    ৩। মনে রাখতে হবে ২০১৮ সাল মানে সেটা ট্রাম্পের আমল। আর এবার বাইডেনের আমলেই এই সভাতেও এবার যুক্ত করা হয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক ইস্যু। যা আসলে এশিয়ায় চীন ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করতে পারে কিনা, কতটুকু? এনিয়ে তাঁদের আলোচনা। অর্থাৎ, এখানে এটাতেও বাংলাদেশ কোন ইস্যু-ই না!

    মূল কিছু কথা হাতে গুনে মনে রাখতে হবেঃ
    এক. এশিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতকে নিয়ে আমেরিকা আর যৌথ কিছুই করবে না। যেটা ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটেছিল। সে সময় এক্ষেত্রে আমেরিকান লক্ষ্য ছিল ভারতকে চীন ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করার ঠিকা দেয়া। সেই ঠিকা দেয়া-নেয়া এখন ওভার! মানে শেষ বা ইতিটানা হয়েছে। যার প্রাথমিক কাজটা করে রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালেই। তিনি এই ঠিকার বিনিময়ের বস্তুগত সুবিধায় ভারতকে আমেরিকায় (কম বা না-শুল্কে) ১৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সুবিধা বাতিল করেছিলেন।  আর পুরা এসাইনমেন্ট-ঠিকা অবলুপ্তি ঘটিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। তবে এসাইনমেন্ট বা ঠিকা দেওয়াটাও যেমন আনুষ্ঠানিক ভাবে দেয়া যায় না (এসব কাজ পাবলিকলি করা হয় না) সম্ভব ছিল না; সেকারণে এই ঠিকা বাতিল টাও আনুষ্ঠানিকভাবে করার কিছু নাই। যদিও এতে ঠিক কি ঘটেছে সেটা আমরা জেনেওবুঝে নিতে পারি বাস্তবতা দেখে। এর আগে আমার পুরানা লেখায় বিরোধী কংগ্রেস নেতা শশী থারুর লেখা থেকে – এই ঠিকা দেওয়ার –  রেফারেন্স আছে আমি দেখিয়েছিলাম! আলী রিয়াজেরাও এটা স্বীকার করতে চায় নাই!

    তবুও এর স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, বাইডেনের নয়া নীতি-পলিসিগুলো যদি খেয়াল রাখি। যেমন বার্মা এক্ট, বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখার আগ্রহ কিংবা আন্দামান নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনা (ও আমেরিকান খায়েসও বলতে পারি) ইত্যাদি এসবের দিকে যদি নজর রাখি। এসব কোন ইস্যুতেই ভারত আমেরিকার খায়েসের সাথে চলতে পারবে না – ভারতেরও ঘোষিত নীতি-পলিসি এর বিরোধী। তাই এখানে এসে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক – এই কবি এখানে নীরব থাকবে। ভারত আমেরিকান খায়েস-কে আপন করে নিতে পারবে না শুধু না বরং ভারতের অবস্থান এর চরমতম-বিরোধী! এমনকি ২০২৪ সালে যদি মোদির পরাজয়ে রাহুল বা অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রেও আমেরিকান খায়েস সম্ভবত পূরণ হবে না! এককথায়, আমেরিকান খায়েস – এই ইস্যুটার ভাগ্য অনিশ্চিত!
    সুতরাই এককথায়, বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা থাকবে এই প্রশ্নে আমেরিকান অবস্থান আর কখনও ভারতের সাথে শেয়ার করে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকা আর গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ সেটা হবে আমেরিকার একক সিদ্ধান্ত।

    দুই.
    কিন্তু তাই বলে কী এশিয়ায় চীনবিরোধী অবস্থান, স্বার্থ ততপরতা প্রশ্নে ভারত-আমেরিকা  কমন স্বার্থেও কোন সম্পর্ক বা এক সাথে কমন স্ট্রাটেজিতে কাজ সব নাই হয়ে যাবে? অবশ্যই না। এটা থেকেই যাবে কারণ এটা আলাদা ইস্যু। এমনকি বাংলাদেশে হাসিনার সাথে চীন কী সম্পর্ক রচনা করছে তা নিয়েও ভারত-মার্কিন আলাপ হতে পারে কিন্তু সেটা হবে – বাংলাদেশের ক্ষমতায় কোন সরকার থাকবে সেই প্রশ্ন বাদ দিয়ে –  যেটা একান্তই আমেরিকার একক বিষয় হয়েই থেকে যাবে!
    আমাদের সমস্যা হল, কেন ভারত হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকছে সেটা আমরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের সংঘাত ও প্রেক্ষিত থেকে দেখা বুঝা করি। যেন এর বাইরে অন্য কোন কারণ থাকতেই পারে না। ব্যাপারটা যেন হিন্দু-মুসলমানের পুরানা বিরোধই! আমি সবাইকে অনুরোধ করব একটু অন্যদিক থেকেও দেখেন! প্লিজ!! 

     তিন.  তবে এক্ষেত্রে মানে ভারত-মার্কিন সংলাপে কিছুটা  গোলমাল পাকিয়ে ফেলতে পারেন ডোনাল্ড ল্যু (সবাই নয়)। তিনিই এবার   ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের মধ্যে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বা আইপিএস (IPS) ঢুকিয়ে ফেলার মূল কারিগর। বাইডেনের ইলেকশনী প্রচার স্ট্রাটেজি সাজানোর সময় থেকেই নির্ধারিত ল্যু-এর এই অবস্থান ও পদ। কিন্তু সরি ল্যু! সো ফার তার সাকসেস প্রায় জিরো!  পাকিস্তানে আর সর্বশেষ হাসিনার বাংলাদেশে ল্যু-এর আইপিএস স্ট্রাটেজির এর অর্জন শুন্যই বলা যায়। তবে এবার তিনি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আর খুব বেশি এটা আগাবে এমন সম্ভাবনা কম!

    চার. ভারত চাইবে এই আলাপের ছায়ায় এক ফাঁকে চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি-টা আবার পাওয়া যায় কিনা! সেদিকটা উস্কে তুলতে; আবার যদি লাইগ্যা যায় – আর কী!  একদম আগের মতই না হলেও ভিন্ন মোড়কে অথবা কিছু অংশের কাজ!
    কিন্তু না। আমেরিকা এদিকে ভারতকে আবার এই ইস্যুতে ছাড় বা ঠিকা দিবার জায়গা এবং পরিকল্পনা কোনটাই নাই। আর তা থেকেই আলোচনায় ভারত বিরোধাত্মক ইস্যুগুলোকে সামনে তুলতে শুরু করে ফেলতে পারে। তাহলে, ভারত-আমেরিকার এবারের সংলাপ মোদির শেষ জমানা খারাপ পরিণতি ফলাফলের দিকে রওনা দিবে!

    পাঁচ. অথচ বিবিসি লিখেছে, “বৈঠকে দুই দেশের চারজন মন্ত্রী মিলে সার্বিকভাবে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ডোনাল্ড লু নাকি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। আসলে দোনাল্ড ল্যু এর বরাতে যা যা বিবিসিতে শুভজ্যোতি লিখেছেন এর সবটাই মিথ্যা প্রপাগান্ডা! তাই কোন রেফারেন্স এখানে নাই যে ল্যু এসব কথা কোথায় বলেছেন???

    এসব কথা থেকে পরিস্কার যে বিবিসির এই কথিত রিপোর্ট একেবারেই ভুঁয়া। ঘরে বসে ইচ্ছামত বানানো! ভারত-মার্কিন সংলাপে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে কোন আলোচনা এমনিতেই হওয়ার সুযোগ নাই। কারণ, ১। তা সংলাপ কাঠামোর মধ্যে পরে না। ২। এসময়ে ভারত বা  বাংলাদেশের কারো ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েই আলোচনা তোলাটাই ভারতের জন্য রিস্কি। কারণ, তাতে ভারতের নিজের ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা উঠে যেতে পারে।‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ ইস্যুটাই মোদির জন্য সেনসেটিভ। সেই খবর যার নাই তিনি বিবিসির এই মনগড়া রিপোর্ট লিখতে গেছেন বলেই এই সমস্যা।

    তাহলে কী দাঁড়ালোঃ
    ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ নিয়ে আজ বাংলাদেশ প্রসঙ্গের নামে যা কিছু হয়েছে এর কোন বিশ্বাসযোগ্যতাই নাই। বিশেষ করে বিবিসি এনিয়ে অপরাধী-সাংবাদিকতা করেছে।
    কিছুক্ষণ আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার বয়ানে মানবজমিনে যা ছাপা হয়েছে সেটার উপর বিশ্বাস মানবজমিনও রাখে নাই; এমন না রেখেই মানবজমিন এই রিপোর্ট ছেপেছে।
    আবার ভারত-মার্কিন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার আবার বক্তব্য কেন? তিনি কিভাবে এটা দিতে পারেন? উনি কে এখানে? দুই পররাষ্ট্র-মন্ত্রীর যৌথ বক্তব্যের পরে তিনি কে?? কী তার প্রটোকল????
    ভারতের চেষ্যেটা হল, গায়ের কাপড় খুলে গেলেও ন্নযাংটা হয়েও যদি  হাসিনার ক্ষমতাকে যেকোন উপায়ে কিছু প্রাণ পাইয়ে দেয়া যায় কীনা – এরই এক মিথ্যা প্রাণান্তকর প্রয়াস!
    ভারতের এই খামোখা প্রচেষ্টা উলটা হাসিনা ও লীগের বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনাই বেশি! মানুষ বিরক্তবোধ করবে, যে এত মিথ্যা বলার কী দরকার!  মিথ্যা কারো সঙ্গি হয় না!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ১১ নভেম্বর  ২০২৩,   দুপুর ০১ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারতের পালিওয়াল গং – মুখে হারের সুর;

    ভারতের পালিওয়াল গং – মুখে হারের সুর;
    বাংলাদেশের ভারত সমালোচকদের সাথে আপোষের পরামর্শ!

    গৌতম দাস
    ০৭ নভেম্বর ২০২৩    ১৮ঃ ৫৭
    https://wp.me/p1sCvy-56t

     

              “The AL believes the use of force and mounting casualties in the Opposition camp will rupture party supremo Tarique Rahman’s command and control over the BNP.”

     

    ওরা ভয় পেয়েছে! কমরেড!
    সিপিবি-মার্কা স্টাইলে লিখলাম!

    কিন্তু ওরা কারা!
    অবিনাশ পালিওয়াল এন্ড গং; মনে হচ্ছে এরা ভয় পেয়েছে!  অবিনাশ পালিওয়াল [Avinash Paliwal]; তার নামটা ইংরাজিতে যেভাবে হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে তা উচ্চারণ করার সময়ে সেটা অনুসরণ না করে বরং, আমাদের  বাংলা শব্দে লিখলে যেমন হবে সেভাবে লিখলাম – অবিনাশ পালিওয়াল। এই অবিনাশ আবার একটা লেখা দিয়েছে; তাঁর লেখায় তিনি সাধারণত বাংলাদেশের আর্মি নিয়ে হালকা টাচ রেখে লিখে থাকেন, এবারও তাই করেছেন। তাঁর স্টাইলে তিনি ব্যাপারটাকে সবসময় তিনি লিখে থাকেন সিভিল-মিলিটারি রিলেশন [civil-military relations in Bangladesh] – এভাবে। এবারও ব্যতিক্রম হয় নাই।
    তাঁর লেখা হিন্দুস্তান টাইমসে ৪ নভেম্বর ছাপা হয়েছে। শিরোনাম Elections in sight, churn in Bangladesh politics , যার অনুবাদ মানবজমিন ছেপেছে গতকাল ৬ নভেম্বর; শিরোনাম নির্বাচন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি, ভারতের যা করা উচিত...। অনেকে বলেছেন মানজমিনের শিরোনামটা মূল লেখার শিরোনামের বাংলা অনুবাদ নয় কেন? প্রথমত বাংলা অনুবাদ দিতে মানবজমিন বাধ্য নয়। আর এর চেয়েও বড়কথা এই শিরোনামটা লেখাটার বিষয়বস্তু যা আছে এর সঠিক প্রতিফলন! অবিনাশ সত্যিই  ভারতের যা করা উচিত তাই নিয়েই লিখেছেন।

    কিন্তু অবিনাশ কে? কেমন লেখা তিনি লেখেন?
    অফিসিয়ালি তিনি লন্ডনের এইক বিশ্ববিদ্যালয় সোয়াস [SOAS University] এর সিনিয়র লেকচারার যেখাকনে তাঁর ফ্যাকাল্টি সাবজেক্ট হল ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস [IR]। লন্ডনের কিংস কলেজ আর এই সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাথে ( আমেরিকা বা পশ্চিমের অর্থে নয়) বরং ভারতের শীর্ষ ব্যাবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত এক থিঙ্কট্যাংক ORF [Observer Research Foundation] আর, এসবের সাথে জড়িয়ে থাকা ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান র’ – এভাবে সবটা মিলিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ততপরতা তারা চালিয়ে থাকে লন্ডন শহরে বসে। যেটা দেখে মনে হতে পারে যে এরা তো ভারতের বাইরের কেউ, আলাদা। কিন্তু আসলে এরা ভারত সরকার নিয়ন্ত্রিত ও সংগঠিত। অবিনাশ পালিওয়াল এদেরই নিয়োজিত [assigned] একজন! বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ (বিশেষত বাংলাদেশ আর্মি) তাঁর সাবজেক্ট! অনেক সময় তাঁর মাধ্যমেই ভারতের প্রতিক্রিয়া আমাদের কাছে পৌছানো হয় বা আমাদেরকে জানানো হয় – এভাবেও মনে করতে পারি।

    এবার অবিনাশ কী ভারতীয় ম্যাসেজ নিয়ে এসেছেনঃ 
    তিনি শুরুতেই বলছেন, “ঢাকায় সরকার ও বিরোধীদের অচলাবস্থা এটা নির্বাচনী গণতন্ত্রের উপর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, এমনকি সিভিল-মিলিটারী সম্পর্কের উপরও ছাপ ফেলবে [The Government-Opposition stand-off in Dhaka will have consequences for electoral democracy, may impact civil-military relations]”। এই বাক্যের নির্বাচনী-গণতন্ত্র না হয় বুঝলাম কিন্তু এতে  সিভিল-মিলিটারী সম্পর্কের উপর ছাপ কথাটা কোথা থেকে এলো আমরা জানি না। কারণ এটা একটা ইঙ্গিতপুর্ণ কিন্তু অস্পষ্ট করে রেখে দেয়া বাক্য! সাধারণত যার উদ্দেশ্য থাকে লেখক নিজে না বলে পাঠককে নিজ অনুমান করে নেয়া কোনহ অর্থ করে নিয়ে বুঝতে বাধ্য করা বা ঠেলে দেয়া।
    এটা তো পরিস্কার যে সরকার ও বিরোধীদের অচলাবস্থা বা সংঘাত যেটা লেখক ইঙ্গিত করছেন সেখানে বাংলাদেশের মিলিটারি তো কোন পক্ষই নয়।  বর্তমান দৃশ্যপটের কোথাও মিলিটারির কোন উপস্থিতিই নাই, কোন পক্ষ নয় সে! তাহলে, তা সত্বেও মিলিটারির প্রসঙ্গ তুলে উস্কানি দিচ্ছেন তিনি, এটাই আমরা দেখছি। কেন? এমন কোন ঘটনা মানে আরো গভীর ভারতীয় ধারার কোন ঘটনার মধ্যেই কী তিনি ভারতীয় স্বার্থ দেখতে পাচ্ছেন? এনিয়ে অবিনাশকে আমাদের একটা কথাই বলার আছে তা হল, এটা ২০০৭ সাল নয়! ফলে সেসময়ের মত আরো গভীরভাবে ভারতীয় স্বার্থের পক্ষে কোন ক্ষমতার উত্থান এবার ঘটবে না। মূল কারণ এবার বাংলাদেশকে আবার আরো ভারতীয় স্বার্থময় করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটতে দেয়া হবে না। আমাদের  আম-জনগণ এবার নিজ স্বার্থের পাহারাদার।

    শিয়াল যেমন মুরগি ধরতে পারলে খুশিতে লোভে চকমকে হয়ে উঠে তেমনি এক শব্দ ধুর্ততা বা ধুর্তামি শব্দ হল কানেকটিভিটি [connectivity]।  যার আসল মানে হল ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ইচ্ছামত এবং বিনা পয়সায় করিডোর ও পোর্ট সুবিধা নেয়া! তা এমন ভাবে নেয়া যেন এই সুবিধা নেয়াটা ভারতের বাপের সম্পত্তি। আর কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশ নিজ স্বার্থ খুইয়ে ভুলে গিয়ে ভারতের জন্য কাজ করাই যেন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাজ! এমনকি করিডোরের জন্য রাস্তাঘাট সহ সব অবকাঠামো বা পোর্ট অবকাঠামো বিনির্মাণের জন্য যে সরকারকে যে বিদেশি ঋণ নিতে হবে এটাও আমাদের জনগণের দায়! আর ভারত এখান থেকে বিনা পয়সায় এই সকল নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করবে – এর নামই কানেকটিভিটি!!!
    ঘটনা হল আসামসহ নর্থ-ইস্ট তো বাকি ভারতের সাথে শিলিগুড়ি দিয়ে এখনও ১৯৪৭ এর দেশভাগের  যুক্তই আছে।  সেকালে নেহেরু এসব সুবিধাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন বলেই তো তিনি নর্থ-ইস্টের আরোও কোন  করিডোর ও পোর্ট সুবিধা চান নাই। তিনি পুর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন বলেই তো আর কোন কথা তিনি নিজ তার কালে এমনকি পুরা গত শতকে কখনও খায়েজ করেন নাই, কাউকে জানান নাই! অরররথাত করিডোর ও পোর্ট ভারতের জন্য অত জরুরি কিছু নয়।
    কিন্তু একালে একটা বিশেষ সরকারকে জবরদস্তিতে ক্ষমতায় রাখার পক্ষে ভারতের সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশকে বিনা পয়সায় কানেকটিভিটির ব্যবস্থা করে দিতে হবে সেটা তো বাংলাদেশের সেই সরকারের দায় ও স্বার্থ! এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের আম-জনগণ এর স্বার্থ নয়! কাজেই কানেকটিভিটি শব্দটার আমাদের কাছে অর্থ হল রক্তচোষা-লুটেরা!  ।

    তামাসার কথা হল, এই রক্তচোষা-লুটেরা! শব্দ কানেকটিভিটি এর দোহাই দিয়েই অবিনাশ নিজের খুশি প্রকাশ করেছেন; আর ভারতের কোর স্বার্থও দেখেছেন। শুধু তাই না দাবি করেছেন যেহেতু বাংলাদেশের কানেকটিভিটি নিতে ভারতের স্বার্থ আছে তএব বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে ভারত শেয়ার হোল্ডার মহয়াজন! [Such deepening of infrastructural connectivity inevitably raises India’s stakes in Bangladesh’s politics.]
    অবিনাশ নিজেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর শিক্ষক বলে পরিচয় দেন। অথচ কান্ড দেখেন!  এর মানে হল ভারতের কোন বিদেশি ব্যবসায়ীর যদি বিনিয়োগ থাকে তবে ভারতের রাজনীতিতে আবার বলছি ভারতের রাজনীতিতে ঐ ব্যবসায়ীর ভাগীদারি বা স্টেক [stakes] আছে! সোজা কথা অর্থনীতিক বিনিয়োগে ভাগ থাকলে রাজনীতিতেও আপনি ভাগীদার? একথা একজন  ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর শিক্ষক বলেন কেমন করে????
    সবই আসলে মামার বাড়ীর আবদার! যা ইচ্ছা যা দরকার সবই তারা আবদার করতে পারে। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে এবারের রাজনীতিক অসন্তোষের পরিণতিতে  যদি হাসিনার ক্ষমতার যুগের অবসান ঘটে তবে ভারতের মামার বাড়ী উপভোগের অবসান ঘটবে!  অবিনাশ পালিওয়ালের  উচিত হবে সেসব পরিণতিতে কী করবেন তা নিয়ে মনোযোগী হওয়া!  সবচেয়ে বড়কথা এবারের আমেরিকান স্বার্থ শুধু হাসিনার বাংলাদেশের জন্য বৈরি তাই নয়। এটা মোদির ভারতের জন্যও সমান বৈরি! বাইডেন মোদিকে আবার নির্বাচিত দেখতে চায় না – এর ছায়া ইতোমধ্যেই ভারতের রাজনীতিতে পড়ে গেছে, সরগরম হয়েছে। তা এমনকি ফেসবুকের মজা-তামাসা করার বা ব্যক্তি-নিজেকে তুলে ধরার যে রিল [reel] স্টাটাস; সেখানেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। যার মূল ইস্যু মোদি গত প্রায় দশবছর ক্কোথায় কী মিথ্যা বলেছেন তা নিয়ে ভিডিও প্রমাণসহ ট্রল করা!  সেদিকে এত বড় একটা বিষয় থাকতে অবিনাশ খামোখা বাংলাদেশ নিয়ে পড়ে আছে!!! তাই নয় কী??

    অবিনাশ ইতোমধ্যেই হাসিনাবিরোধী অবস্থানেঃ
    কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে অবিনাশের এই লেখায় ইতোমধ্যেই তিনি হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছেন, এই অর্থে যে তিনি হাসিনার অসংখ্য ভুল ত্রুটি তুলে ধরেছেন আর তা করেছেন বিরোধী অবস্থানে বসে। যেমন তিনি হাসিনাকে ডায়লগ-বিরোধী বলে [Hasina refusing dialogue  দোষারোপ করেছেন। সরকারের পরিচালিত দানবীয় দমন [ State-led crackdowns] চলছে বলেছেন। এমনকি বিএনপির প্রশংসা করে লিখছেন [politics in Bangladesh has evolved along expected lines. ]। বিএনপি সক্ষমতা দেখিয়েছে demonstrated the capability ,  হাসিনাবিরোধীদের জড়ো করেছেন [capitalise politically on widespread discontent against Hasina], আর সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেটটা না দিয়ে পারেন নাই। বলেছেন, বিএনপি project itself as a secular-liberal actor by at least publicly disassociating from the Jamaat-e-Islami and mobilise considerable diplomatic support in the West।   যার সোজা মানে হল, অবিনাশ পালিওয়াল ঘুড়িয়ে স্বীকার করে নিছেন যে তার মত ভারতীয়রা হেরে গেছেন, তাঁদের প্রপাগান্ডা ফেল করেছে। তাঁরা এখন হাসিনার পতন দেখছেন টের পেয়েছেন তাই যত দ্রুত সম্ভব হাসিনার হাত ছেড়ে বিএনপির কোলে উঠতে কসরত শুরু করেছেন!

    বিএনপি এক শৃঙ্খলা মেনে চলা শক্তিঃ
    পালিওয়াল বিএনপিকে এই লেখায় এত বেশি সব সার্টিফিকেট দিয়েছেন যা ধরে রাখার পাত্রের অভাব দেখা দিয়েছে।   গত পনেরো বছর ধরে আমরা শুনে আসছে হাসিনা ছাড়া বিএনপি-জামাত সহ বাকি সবাই আমরা জঙ্গি! আমাদের চিন্তা-রাজনীতি সবই জঙ্গি; মানে হল বাস্কিরা আমরা ভারতের সাথে একই টেবিলে বা একই আসরে বসারই অযোগ্য মানুষ! যেন আমাদের চেহারাটা মা-কালির মত রুদ্র-মুর্তির,  হাতে কোপ-মেরে মাথা আলাদা করার খাঁড়া, আর গা-থেকে পোষাক থেকে রক্ত ঝড়ছে ইত্যাদি। ভারতের চোখে ফলে সেই সুত্রে বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদী প্রগতিবাদীদের চোখে বাংলাদেশের হাসিনা বাদে বাকি আমরা সবাই জামাত-বিএনপির দানব সব একেক জন!  গত প্রায় পনেরো বছর ধরে আমাদের এই চিত্র-কল্প, এই গল্প-গাথা এই ভিতরেই ছিল আমাদের বসবাস; কোন রকমে দিন গুজরান!

    কিন্তু অবিনাশ পালিওয়াল আজ আমাদের কী কথা শুনালেন?
    BNP’s image as being a disciplined force

    তিনি বড় বড় অক্ষরে লিখেছেন –  BNP’s image as being a disciplined force। বাংলায় বললে, বিএনপির আজ ইমেজ নাকি এক সুশৃঙ্খল শক্তির। শুধু তাই না, আরো সাংঘাতিক সব প্রশংসাবাণী! পরে যোগ করেছেন এই বিএনপি নাকি এতই অহিংস যে উলটা তারাই ভিকটিম যারা আওয়ামি ত্রাস গুপ্ত-হত্যাকারী এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষা করে টিকে আছে ...that is defending itself from AL henchmen and the police.।

    প্রথম কথা কথা হল, গত পনেরো বছর ধরে ভারতের কোন একাদেমিকের বয়ান মানেই ছিল তাঁরা জামাত-বিএনপি নাম করলেই বুঝতে হল এরপর তারা আমাদের সকল হাসিনা-বিরোধীদের বিরুদ্ধে কুতসা আর ঘৃণামূলক বাক্য বলবেন! এই ছিল রুল!! আর তাতে সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল যেন হয়ে থাকতে দেখা যেত তারেক রহমান-কে। কিন্তু আজ এই লেখায়, একেবারেই উলটা। এই আন্দোলনে “বিএনপির অর্জন” এভাবে না বলে, পালিওয়াল লিখছেন  From Rahman’s viewpoint, মানে রহমানের (তারেক রহমান) দৃষ্টিভঙ্গিতে… এভাবে।  যদিও এটা বলার পরের বাক্যে কিছু গড়বড় করেছেন যেটা নিচে সরাসরি কোট করে তুলে আনা হয়েছে আগ্রহিরা দেখতে পারেন। পালিওয়াল দেখছেন, হাসিনা যথেষ্ট কোনঠাসা হয়ে গেছেন। কিন্তু আবার লিখে ফেলেছেন বিএনপি সামরিক হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে পারে। যদিও পালিওয়াল বলেছেন, এই ডেকে আনাটা “বিএনপিকে সারবস্তুতে কোন সুবিধা দিবার সম্ভাবনা কম, কিন্তু এই বাহিনী যাই করুক তা রহমানের পক্ষেই যাবে”!
    প্রথমকথা বাহিনী নিয়ে এসব আলোচনা অস্বস্তিকর; তাও আবার বিদেশির মুখে! দ্বিতীয়ত, জল্পনা-কল্পনায় এমন যা খুশি লিখে দেওয়া আর আমাদের তাতে অংশ নেয়ার মানে হয় না, তাতে তা যতই পাঠকের আকাঙ্খার পক্ষের বক্তব্য মনে হোক না কেন! আর কিছু শব্দ ও বাক্য যেখানে বাস্তবতা-বর্জিত! কাজেই পালিওয়ালদের এই পল্টি-মারার দিকটা যে বিএনপি-জামাত এখন খুব ভাল সুশৃঙ্খল – এদিক্টা  দেখানো ছাড়া আর কোন দকে আমরা আলোচনা নিব না!

    From Rahman’s viewpoint, Hasina is cornered enough
    to either step down or engage in violence triggering
    wider civil strife. The former can enable the formation
    of a caretaker government,
    the latter could
    invite military intervention.
    The army’s re-entry into politics is unlikely
    to benefit the BNP substantially, but it could
    even the playing field in Rahman’s favour.

    এছাড়াও LG (retired) Hasan Sarawardi এর গ্রেফতার নিয়েও তিনি অনেক গল্প আর ইঙ্গিত রচনা করেছেন। যেসব অর্থহীন! এসব ভারতের পক্ষেও যায় নাই, পালিওয়াল অনেক করিতকর্মা ও জ্ঞানী বা অনেক জানেন ইত্যাদি এসবের কোনটাই মানে হয় নাই, প্রমাণ হয় নাই। বরং তার নাদানি-ই তুলে ধরেছে!  বুঝা গেছে তিনি প্রপাগান্ডা রচনার জন্যও কত আনফিট!

    সবশেষে, মোদি সরকারের জন্য পালিওয়ালের পরামর্শঃ
    হ্যা, পালিওয়ালের মোদিকে দেয়া পরামর্শটা বরং ইন্টারেস্টিং।  প্রথমত কথাগুলো তিনি ছোট করে এক বাক্যেই লিখেছেন।
    যার সারকথাটা হল, হাসিনার দিন শেষ – এটা পালিওয়াল এন্ড গং এরা বুঝে গেছে! যেমন তারা ভারতকে (মানে মোদি সরকারকে) বলছে ইতিবাচক হতে। কোন বলপ্রয়োগে দমনের রাস্তাকে সমর্থন করা ত্যাগ করতে। আর বরং একটা নিরপেক্ষ অবস্থান তৈরি করে নিতে। যাতে বাংলাদেশে যারা ভারতের সমালোচক আছে তাঁদের জন্য দুয়ার খুলে রাখা হয়। বাংলাদেশে যে ঝড় উঠেছে (হাসিনা পতনের লক্ষ্যে) তা পুরণ-সমাপ্ত হলে যেন তাঁদের সাথে একটা আপোষ করে নেয়া যায়!

    The best way to ensure that India preserves some positive equities,
    and is not compelled to explore high-cost coercive options, is to
    craft an impartial position that leaves the door open to
    reconciliation with the numerous India critics in
    Bangladesh after the storm passes.

    কিন্তু অবিনাশ পালিওয়াল এর আহবান ও ততপরতা কী বাংলাদেশের মানুষের মনে আগ্রহ জাগাবে?   সম্ভাবনা কম। কারণ , গত পনেরো বছর যারা লুটে-চুষে খেয়েছে তাদেরকে বাংলাদেশ কীভাবে ও কেন বিশ্বাস করবে? আর কাদেরকে করবে? ভারতের হিন্দুত্ববাদ-কে? আর আমরা তো অনেক দুরের! সবার আগে ভারতের মুসলমান বা মোদি-বিরোধিদের প্রতি যে বৈষম্য চলছে এর অবসান করে দেখান! তাদেরকে সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেখান! নাকি? সবার আগে এই পরীক্ষায় পাশ করে দেখান! এসব একাদেমিশিয়ানেরা এব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। আগে এরা নিজের অবস্থান জানাক!
    আর হাসিনা পরবর্তি (যদি হয়) বাংলাদেশের কাছে ভারত, এটা ক্রমশ ২০০৬ সালের ভারত হতে চলেছে। দিন একই রকম থাকে না, বদলে যায়; গুজর গেয়া!  তাই সেই আগামি দিন থিতু হয়ে উঠার পরে দেখা যাবে! এখন সব পতন আর ভাঙনের দিন! আর কত!
    আর আগামিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভাল হবার কোন কারণ দেখিনা। তাতে সেই ভারত ২০২৪ সালের মে মাসের নির্বাচন পরবর্তি যতই নয়া ভারত বা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধীই হোক না কেন! মূল কারণ, বাংলাদেশের আম-মানুষের ভারতের উপর নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস নাই!  আর বলাই বাহুল্য নয়া সবকিছু শুরু হতে পারে একটা ন্যায়-ইনসাফে পুরান ঘটনাবলীর বিচার থেকে যার কোন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না! তাই আপাতত ফুলস্টপ! সব ফেলে রাখেন!!!

    সর্বশেষ আপডেটঃ  রাত ০৯ঃ ৩৭, ০৭ নভেম্বর    ২০২৩,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • চন্দন নন্দী-রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!

    ওরা ইসলামি দল খুঁজেছে!
    চন্দন নন্দী, রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!
    গৌতম দাস

    ১৫ অক্টোবর ২০২৩    বিকেল ১৭ঃ ২৩

    https://wp.me/p1sCvy-55l

              কুমিল্লায় হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে অবস্থান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের

     

    এবার ২০২৩ সালের দুর্গাপুজা আগামি সাতদিনের মধ্যেই শুরু হবে। মানে পুজা শুরু বা সপ্তমী হবে সম্ভবত ২১ অক্টোবর শনিবার। কিন্তু ইতোমধ্যেই সেই চন্দন নন্দী বা “কংগ্রেসি ‘র’” কানেকটেড লেখক – তিনি এবার ‘র’ এর হয়ে, গত ২০২১ সালের দুর্গাপুজার সময়ে ঘটা ঘটনার (বসা মুর্তির কোলের উপর কোরান শরীফ রেখে আসা) মত করে আবার খুব সম্ভবত সেই কুমিল্লা থেকেই দাঙ্গা ও উত্তেজনা তৈরি করে এর দায় বিএনপি বা কোন ইসলামি দলের উপর চাপানোর প্রচেষ্টা নিয়েছে।  গত পরশু ১৩ অক্টোবর তিনি লিখেছেন, “কুমিল্লা শহরে নাকি হেফাজতে ইসলামিরা শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পরে কুমিল্লার হিন্দু মাইনরিটির আক্রমণ করেছে ও ধাওয়া দিয়েছে”।

    …another crowd of Islamists belong to the Hefazat-e-Islam,
    after offering Friday prayers, chased and attacked members
    of the minority Hindu community in Comilla district…

    অথচ বাংলাদেশের যেসব মিডিয়া ঘটনাটা কাভার করেছে তাতে উল্লেখিত বর্ণনায় ফ্যাক্টস হল,  এটা কুমিল্লা আওয়ামি লীগ বনাম রানা দাসগুপ্তের সংগঠন (হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ, HBCUC) – এদুই সংগঠনের মধ্যকার গত কয়েকদিনের ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক; আর তা থেকে কুমিল্লা শহরে গত শুক্রবার তাঁদের দুই মিছিল মুখোমুখি হয়ে গেলে শ্লোগান-পাল্টা শ্লোগানের পরে হাতাহাতিতে ‘ঐক্য পরিষদের’ চারজনের মাথা ফেটে যাবার মত আহত হয়েছে। অর্থাৎ সারকথায় ঘটনা আসলে আপন ঘরে ঘরের বিবাদ! মানে কোন ইসলামি সংশ্লিষ্টতা দূরে থাক কোন ইসলামি গন্ধও নাই! বরং এতা হল, আওয়ামি লীগের সাথে ভারতের তল্পীবাহক এক বাংলাদেশী হিন্দু সংগঠনের ‘ঐক্য পরিষদের’ বিবাদ। অথচ চন্দন নন্দী ঘটনাটার মধ্যে হেফাজতে ইসলামকে আবিস্কার করেছেন। বাংলাদেশের আজকের পত্রিকা, প্রথম আলো, সমকাল, যুগান্তর,  মানবজমিন, ডেইলি স্টার ইত্যাদি মিডিয়ায় এমনকি চন্দন নন্দীর প্রিয়  বিডিনিউজ২৪ অথবা ‘অসাম্প্রদায়িক’ দেশ রূপান্তর, প্রো-ইন্ডিয়ান কালের কন্ঠ এমন প্রত্যেকটা পত্রিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে বিবাদটা  আওয়ামী যুবলীগ ও রানা দাসগুপ্তের ঐক্য পরিষদের মধ্যে।  মানে হেফাজত-সহ কোন ইসলামি সংগঠন এর সাথে -পাঁচেই নাই। কোন ছায়াও নাই!  অথচ চন্দন নন্দী চারদিকে একাই কেবল ইসলামি দল দেখতে পেয়েছেন। কারণ, খোদ রানা দাসগুপ্তও কোন ইসলামি দলকে নয়, খোদ সরকারকে দায়ী করে শাহবাগে বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছেন, “কুমিল্লায় স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারীরা এই হামলা চালিয়েছেন” ।  প্রথম আলোর সোহরাব হাসানও এবার ছাত্রলীগ-যুবলীগের টার্গেট সংখ্যালঘুরা শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয় লিখেছে।
    অথচ, চন্দন নন্দীর লেখায় দাবি, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু মেরেছে। মানে হল, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু দেখলেই যেন খাবলিয়ে ছিঁড়ে খেতে তেড়ে আসছে নরেন্দ্র মোদির বজরং দলের গুন্ডাদের মত – এমন কাল্পনিক এক ছবি এঁকে নিজ গল্পগাথার কথা বলে গেছেন চন্দন নন্দী। লিখেছেন, …after offering Friday prayers, chased and attacked members of the minority Hindu community in Comilla district। মানে মিথ্যা কাল্পনিক বয়ানেরও একটা সীমা থাকে নন্দী সেটাও মানতে চান নাই। এখন এটা কী ‘র’ এর মরিয়া কোন  পুজা-এজেন্ডা নাকি অর্থের পাহাড় প্রমাণ চাপের কারণে ঘটেছে – তা জানা যায় নাই!
    আবার তিনি বাংলাদেশের সকল মিডিয়ায় প্রকাশিত বয়ান যেখানে বলা হয়েছে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের – সেটাও তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন আর আবার বলছেন আমাদের মিডিয়া নাকি ঢাকাঢাকি করে ভিন্ন লেবেল লাগিয়ে রিপোর্ট লিখেছে –  The Bangladeshi media labelled the attackers as men belonging to the Juba League and the Chhatra League.”। মানে হল নন্দীর দাবি,  বাংলাদেশের সকল মিডিয়াই নাকি মিথ্যা করে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের বলেছে বা চিহ্নিত (labelled) করা হয়েছে। অর্থাৎ চন্দন নন্দী-ই হলেন একমাত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির!  তিনি কোন এক গায়েবী চোখে দেখেছেন???

    চন্দন নন্দী ও ‘র’ এর এই ডেসপারেট বা মরিয়া হয়ে মিথ্যা বলা – এটাই
    আমাদের শঙ্কিত করে যে তারা এবারের দুর্গাপুজার সময়ে এরা আমাদেরকে
    শান্তিতে থাকতে দিবে না, এমন কোন পরিকল্পনা করেছে কিনা!
    তাই ইতোমধ্যেই কোন একটা ইসলামি সংগঠনের নাম হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে!

    চন্দন নন্দীর এমন ভয়ংকর দানব  হয়ে উঠার পিছনে আমাদের প্রগতিশীলদের দায় আছেঃ
    চন্দন নন্দী; ভেবেছিলাম একে নিয়ে আর লিখব না, বোধহয় লিখতে হবে না! কিন্তু না। যে এবার একবারে ভারতের গোয়েন্দা-অন্তর্ঘাতমূলক কাজ ও এমন সংস্থা [RAW] এর সাথে সরাসরি জড়িয়েছে। আসলে  যে জীবনে কখনও এমন জড়িয়েছে সে তা আর জীবনেও ছাড়তে পারে না। এই কথাটাই এখন আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে ভারতের চন্দন নন্দীর বাবা – তিনি ছিলেন মানে তিনি সাবেক ‘র’ এর কর্মকর্তা এজেন্ট। কিন্তু সেসব মোদি ২০১৪ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগের ঘটনা। তাই তিনি ‘কংগ্রেসি র’। পরে মোদির জমানায় এসে এরাই হয়ে গেছিলেন মোদির ‘র’ এর  ঢেলে সাজানো নয়া কর্তাদের সহকারী!  কাজেই সেই সুত্রে বাবার ‘র’ কলিগ, জুনিয়র বা কলিগের ছেলে ইত্যাদিদের সুত্রে চন্দন নন্দীও ‘কংগ্রেসি র’। আর এরাই এখন তার গুজব বা আধাসত্য বয়ান বা খবরের উৎস। আর একারণে, অনেক আগে লিখেছিলাম চন্দন নন্দী ‘কংগ্রেসি র’। এমনিতেই ১৯৬৮-৭০ সালের দিকে জন্ম নেয়া ‘র’  এর উত্থান, বিকাশ সবই কংগ্রেসের হাতে আর সেই সুত্রে, ‘কংগ্রেসি র’ মানে প্রায় ঘরের ছেলের অবস্থা ইত্যাদি । যা প্রায় ২০১৩ সালের শেষ পর্যন্ত কমবেশি প্রবল বহাল ছিল।  এছাড়া ‘কংগ্রেসি র’ এই নামকরণ আবার লক্ষ্য করেছি  চন্দনের মত কিন্তু ঢাকার বাসিন্দা এমন ‘কংগ্রেসি র’ যারা আছেন; যারা, বলাই বাহুল্য আওয়ামি জমানায় বহাল তবিয়তে থাকছেন, তারাই নিজেরা নিজেদের পরিচয় দেয় এভাবেই – ‘কংগ্রেসি র’ বলে, তা শুনেছি। এছাড়াও এমনকি এসব সুত্রে ঢাকার অনেক সরকারি অফিসও চন্দনের আধাসত্য বক্তব্যের স্কুপ সোর্স হওয়া বিচিত্র নয়, বরং স্বাভাবিক হয়ে গেছে!

    এবছর চন্দন নন্দীকে নিয়ে লিখেছিলাম আমিই প্রথম যখন তিনি বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় একটা লেখা ছাপেন  গত ২ সেপ্টেম্বর, যা হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই বিব্রত করেছিল। ফলে বিডিনিউজ২৪ ওয়েব পত্রিকাটা বন্ধ হয়ে গেছিল, যা সম্প্রতি আবার খুলেছে। এরপরে লক্ষ্যণীয় যে চন্দন তাঁর লেখার প্রসঙ্গ / বিষয় বদল করে মানে কার দিক থেকে লিখবে সেই এটিচ্যুডে বদল ঘটিয়েছেন। চন্দনের সাধারণ ঝোঁক হল, ‘র’ এর ঘরের তথ্য বাইরে প্রকাশ করে দিয়ে ক্রেডিট নেয়া। আর নন্দীর এমন করার পিছনের সাইকোলজিটা হল – চন্দনের বাবার সাথে চন্দনের বনিবনার অভাব। আবার এর পিছনে ঘটনা হল, চন্দন পশ্চিমে উচ্চশিক্ষা শেষ না করে ভারতে ফেরত আসা, টাইমস অব ইন্ডিয়ায় চাকরিরও সমাপ্তি ইত্যাদি এসব নিয়ে সম্ভবত ‘র’ এর এজেন্ট বাবার সাথে তার ব্যাপক ও গভীর মনোমালিন্য।  বর্তমানে সে কোথাও কোন চাকরিতে নাই। কিন্তু খেপ মারতে হয় ফ্রি-ল্যান্সার নামে আর পুরানা ‘র’ এর যোগাযোগ-গুলো ব্যবহার করে…।
    তাই এবার প্রথম বিডিনিউজে সে লেখা ছাপিয়েছিল  হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই জন্য বিব্রতকর হবে এমন বয়ান ছাপিয়ে। চিন্তা না করে কাজে ওস্তাদ চন্দন নন্দী এখানেও ভেবে দেখে কাজ করেব নাই যে এর পরিণতি কী হবে! তাই ঘরের ভিতর খারাপ প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক! সম্ভবত সেকারণে, আমরা দেখলাম পরের লেখা থেকে নন্দী এটিচ্যুড বদলে ফেলেছেন। তিনি হয়ে উঠেন আর হাসিনা-মোদি নয় এবার কেবলমাত্র হাসিনার বিরুদ্ধের সত্য-আধাসত্য প্রপাগান্ডা করা। যেগুলো অবশ্যই জার্নালিজমের বিচারে অপ-জার্নালিজম!
    সেই থেকে  চন্দন হয়ে যায় হাসিনা বা তাঁর ছেলে বা সরকার সম্পর্কে আধাসত্য বা কোন বিশ্বাসযোগ্য সোর্স ছাড়া গায়েবি সোর্সের নামে ছড়ানো্র এক প্রপাগান্ডা লেখক। এছাড়া তিনি তার লেখার জন্য ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চলের এক ইংরাজি ওয়েব সাইট NorthEast News কে আপাত স্থায়ীভাবে বেছে নি্য়েতে দেখেছিলাম আমরা। কেন এমন?
    ভারতের নর্থ-ইস্ট মানে আসাম-সহ  সাথে ছোট ছোট পাহাড়ি গোত্রভিত্তিক (ট্রাইবাল) মোট সাত রাজ্য। কিন্তু এগুলো ভারতের অবিরাম মাথাব্যাথ্যা যে এরা কে কখন না জানি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করে বসে। এই ভয় থেকেই এই এলাকায় ভারতের গোয়েন্দা ও ‘র’ ততপরতা ব্যাপক, অনেক বেশি। অনুমান করা হয় সেই সুত্রে সারা নর্থ-ইস্টের প্রায় সব ইংলিশ-ওয়েব পত্রিকা যা আছে তা  প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে ‘র’ এর ততপরতায় নিয়ন্ত্রিত। মূলকারণ, এসব মিডিয়া নিজে চলার আয় নিজে করতে পারে না। আর সেই সুত্রে ‘র’ এর অর্থ বা ভর্তুকিই তাঁদের একমাত্র সহায়! একারণে, সারা নর্থ-ইস্ট থেকে নাগাল্যান্ড হয়ে বার্মা – মানে একেবারে থাইল্যান্ড সীমান্ত পর্যন্ত সব ইংরাজি ওয়েব সাইটগুলো এই একই দশায়!  ফলে নন্দীর এবং সময়ে এমন একেকটা ওয়েব পত্রিকায় সুবীর ভৌমিকের আবির্ভাব একারণেই ঘটতে দেখেছি আমরা। আর  এমনই এক NorthEast News এ এবার নন্দীর আবির্ভাব ঘটেছিল।
    এদিকে উপরে বলেছি, হাসিনা বিরোধী এবারের প্রপাগান্ডা হাজির করাতে এখনকার বাংলাদেশে মাস-লেবেলে এমনকি বিদেশের বাংলাদেশিদের কাছেও নন্দী ক্রমশঃ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল। আমি ২০১৫ সাল থেকে নন্দীকে ফলো করি। আমার পুরানা লেখায় সেকারণে “নন্দী কে” তা লিখতে সহজ করে ধারাবাহিক বর্ণনা দিয়েছিলাম।  আর এই লেখা এখনও আমার সাইটে  প্রতিদিন কমপক্ষে পঞ্চাশজন বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নক করে থাকে, দেখতে পাই! অনুমান করি তাঁদের মূল বিষয় আসলে চন্দন নন্দী কে? এই কৌতুহল!

    সবচেয়ে খারাপ কাজ করেছে আমাদের প্রগতিশীল মহল! ফ্যাক্ট চেকিং-এর নামে একজন চন্দন নন্দীকে নাকচ করতে গেছেন। তাও সেটাও আবার (ইসরায়েল-ইন্ডিয়া কানেকটেড) সোয়েব চৌধুরীর আরেক প্রপাগান্ডা পত্রিকা দ্যা ব্লিটজ [The BLITZ] এর রেফারেন্স দিয়ে; মানে ভর করে!! মানে ব্লিটজ যেন এক নুন্যতম বিশ্বাসযোগ্য পত্রিকা এটা ধরে নেয়া হয়েছে সেখানে। মানে, গত শতকে বাংলাদেশের ইনকিলাব পত্রিকা থেকে উত্থিত সোয়েব চৌধুরি সম্পর্কে একালে যাদের কোন ধারণা নাই্‌ তাদেরই এক ছেলেখেলা হয়ে গেছে কাজটা! এককথায় বলা যায় যে ব্লিটজের কোন  পাঠক বিশ্বাসযোগ্যতা নাই, অথচ তার কাঁধে মাথা রেখে আরেক বিশ্বাসযোগ্যতা-হীন চন্দন নন্দীকে নাকচ করার কিছু কী আছে? না থাকতে পারে? এমন চন্দন নন্দীর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলা – দুটাই বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে!
    এদিকে অন্যান্য প্রগতিশীলদেরকে দেখা গেছে এই ফ্যাক্ট চেককে আপহোল্ড বা আপন করে  নিয়ে দেখেছেন কেউ!  আবার চন্দন নন্দী সম্প্রতিকালে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন আমেরিকা থেকে প্রচারিত কনক সারোয়ার এর ভিডিও ক্লিপে। এই সাক্ষাতকারকেও একই সাথে প্রগতিশীলদের অনেকেই প্রশংসা করেছেন, আপন করেছেন। এই সাক্ষাতকারের শুরুতে [০২ঃ ২৪ মিনিটে] চন্দন নন্দীর উপস্থিতিতে কনক চন্দনকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে চন্দনের বাবা  যে ‘র’ এর কর্মকর্তা অফিসার ছিলেন ও বাংলাদেশে পোস্টেড ছিলেন, তা কনক আমাদের জানিয়েছেন!  ]
    এদিকে প্রগতিশীলতার কাহিনীর শেষ নাই! সিপিডি এর মালিক  ডঃ রেহমান সোবহান আর সাথে ডঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মিলে এরা গত ২০০৭ সালে ভারতের আসামকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর দেওয়ার পক্ষে প্রপাগান্ডা করবেন, এই ঠিকা পেয়েছিলেন। এমনকি যারা তাঁর বিরোধিতা করছেন তাদেরকে তিনি অশিক্ষিতও বলেছিলেন। সেই রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের এবারের ঠিকা সম্ভবত রানা দাসগুপ্তের সংগঠন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ এর পরামর্শক হওয়া যাতে এই সংগঠন আওয়ামি লীগকে ছদ্ম তুলাধুনা করে আবহাওয়া তৈরি করে বিএনপির কাঁধে রানা দাসগুপ্তকে সওয়ার করানী! এরা গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা সরকার হিন্দুদের জন্য কিছু করেন নাই, অবস্থা নাকি আরো খারাপ হয়েছে বলে হাসিনাকে উঠতে বসতে গালাগালি শুরু করেছেন – উদ্দেশ্য বিএনপির কোলে উঠা বা রানা দাসগুপ্তকে তুলে দেওয়া!
    এই সকল প্রগতিশীল মহল এখন কুমিল্লার ঘটনায় কী করবেন? এটা তো প্রকাশ্য যে সেখানকার আওয়ামি এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনের বাহার “মদবিহীন পুজা” করতে আহবান করেছেন। আর সেটার বিরোধিতা করার উসিলায় রানা দাসগুপ্ত মাঠে নেমেছেন। সকল রিয়েল উত্তেজনার শুরু সেখান থেকে। আর কথা তো সত্য যে কলকাতায় পুজার সময় মদের বার বা বেচাবিক্রি বন্ধ রাখা হয়, কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা ঠিক রাখার সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে তাই। বাহার এমপি সেটার রেফারেন্স টেনেছেন!  অথচ চন্দন নন্দী এবার ‘র’ এর এজেন্ডা নিয়ে নেমে রানা দাসগুপ্ত দেরকে নাকি হেফাজত ইসলামি বা মুসলমানেরা আক্রমণ করেছে বলে মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছেন!। ইতোমধ্যেই প্রগতিশীলদের আদরণীয় হয়ে উঠে চন্দন নন্দীর ধারণা তিনি এবার সেই প্রগতির ইমেজ বিক্রি আর এর ক্যাশ ছিটিয়ে  – মুসলমানেরা হিন্দুদের আক্রমণ করেছে –  বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ফ্রেমে আওয়ামি বনাম রানা দাসগুপ্তের ঝগড়াকে লুকিয়ে তা ঢেলে সাজিয়ে- এটা হিন্দুদের উপর মুসলমানদের হামলা বলে চালিয়ে দিবেন! সেটা আবার এখন কিছু কাজের অগ্রগতি দেখাতে শুরু করেছে।

    যেমন ডেইলি স্টার ইতোমধ্যেই রানা দাসগুপ্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পাঠককেও নিতে উস্কানি তুলেছে। তাই এনিয়ে তাঁদের রিপোর্টে এমপি বাহারের   ‘এটা শুধু আমার কথা নয়, দিল্লি থেকেও এটা বলেছে।’ বলে উপ-শিরোনাম করেছে। সম্পাদক মাহফুজ আনাম এতদিন নিজে ‘র’ বা ভারতের দালালির লোক বলে পরিচিত হয়ে যাওয়াকে অসুবিধা নাই মনে করলেও তাঁর নিজের আওয়ামি লীগের সাথে সম্পর্ক নাই – সেতা প্রমাণ করে রাখতে নিজ আওয়ামি বিরোধিতাকে খুব সিরিয়াসলি নিতে দেখছি আমরা। তাই এর আগে ওবায়দুল কাদেরের আমরাও আছি দিল্লি­ও আছে, বক্তব্যের সমালোচনা করে উল্টা নিজেই এক কলাম লিখে ফেলেছেন। আর মাহফুজ সাহেব এখন কুমিল্লার আওয়ামি এমপি বাহারের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছেন। মানে এই এমপিকে নিচা করেছেন বা ভিলেন করে এঁক্কে দিয়েছে! এতে সার মানে দাঁড়িয়েছে যে রানা দাসগুপ্তকে সাপোর্ট করা মানেই তো চন্দন নন্দীকে সাপোর্ট করা! অর্থাৎ এখানে পরোক্ষে কায়দা করে ‘র’ এর পক্ষে দাঁড়িয়েছে ডেইলি স্টার।

    তাহলে রানা দাসগুপ্ত গত পনেরো বছর ধরে আওয়ামি মাখন লুটে এখন আওয়ামি-বিরোধী ঝান্ডা দেখানো কেনঃ
    হা এটাই ঘটনা কেন্দ্র! অল্পকথায় বললে, হাসিনার আওয়ামি লীগের ক্ষমতার অবস্থা ভাল নয়! কখন কী হয়ে যায় ঠিক নাই। এই হল এদের মূল উপলব্দি! সবচেয়ে সাড়ে সর্বনাশ হল, সেই আওয়ামি লীগ ছাড়া মোদির ভারত বাংলাদেশে বিএনপি বা আর অন্য কোন দলের দিকে এতদিন ফিরেও তাকায়ও নাই! তাই এ’বস্থায় বিএনপির কোলে উঠতে রানা দাসগুপ্তসহ মোদির ভারতের আগ্রহটাই মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে! আর তা থেকেই – সেটারই মরিয়া দশা দেখছি আমরা! রানা দাসগুপ্ত  চরম বেচাইন হয়ে উঠেছেন!  এরই গ্রাউন্ড সাজাতে সম্ভবত রানা দাসগুপ্ত মোদির ভারতের হয়ে প্রক্সি-যোদ্ধা বা এডভান্স পার্টি হয়ে উঠতে চাইছেন! যাতে বিএনপি এখন মোদির এডভান্স পার্টি রানা দাসগুপ্তের দিকে একট কোল দেয়! সেকারণেই রানা চরম আওয়ামি-বিরোধীতা শো করছে্ন – যা জরুরত সে জাদা – সেটা তো অবশ্যই!
    এটাই আমরা দেখছি।  আর এটা দেখে ততধিক জ্বলে উঠছে আওয়ামি লীগ মানে যুবলীগ-ছাত্রলীগ! আর মহড়াস্থল কুমিল্লা কারণ ২০২১ সালে ভারত এখানে সফল হয়েছিল! কোরান শরীফ রাখা ইকবাল কে?  সেটা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ভিডিও ক্লিপের প্রমাণ দাখিল করার পরও ইকবালের পিছনে কে তা আর হাজির না করে আওয়ামি লীগ বরং উলটা ভারতকে বাঁচিয়ে  দিয়ে সেই সুবিধায় নিজ ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে ভারত সহায়তা দিয়ে যাক – এভাবে ক্যাশ করতে কাজ করে গেছিল! এনিয়ে এখন হয়ত আপশোষ করছে! আর ইকবাল?
    ১৬ মাসের সাজা দেয়া ইকবাল এখন বেকসুর খালাসের পরে লাপাত্তা করে দিয়েছে সরকার!  আর ওদিকে রানা দাসগুপ্ত এখন বিরাট বিপ্লবী – এক বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে এখন ইকবাল খুঁজে ফিরছেন, তাঁর আরো শাস্তি দিতে চেয়ে উলটা সরকারের বিরুদ্ধেই তিনি সোচ্চার! বেচারা হাসিনা সরকার!!!
    আবার ওদিকে খেয়াল করেন, মোদির এডভান্স পার্টি বলতে সেটা কিন্তু ঠিক রানা দাসগুপ্ত নন। বরং মোদি-আরএসএস বেটার প্রতিনিধিত্বের পার্টি হল গোবিন্দ প্রামানিক এরটা। তাহলে রানা কেন এখন গুরুত্বপাবে? এনিয়ে প্রামানিককে রানাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তবু রানা দাসগুপ্তই এখন মোদির এক নম্বর আদরের দল কারণ, যেমন ধরেন রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের মত লোকদের পক্ষে সরাসরি আরএসএস এর গোবিন্দ প্রামানিক হল একটু অস্বস্তিকর, এর চেয়ে রানা দাসগুপ্ত এই গংদেরকে একটু আড়াল দেয়! তাই এই আয়োজন! নিঃসন্দেহে পরিকল্পিত আয়োজনই চলছে!

    নন্দী আর দাসগুপ্ত গং ওরা এখন হন্যে হয়ে যুতসই  ইসলামি দল খুজছে। যাতে সবমিলিয়ে হেফাজত-সহ ইসলামি দলগুলোর অন্তত কাউকে তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাদেরকে বলির বখড়া বানাতে রানা-নন্দীরা উঠেপড়ে লেগেছে! কিন্তু এবারের পরিকল্পনা আমরা বাস্তব হওয়া ঠেকাতে পারি এবং অবশ্যই ঠেকাতে হবে। সেজন্য আমাদেরকে সচেতন ও সাবধান হতে হবে। কারো সাজানী ফাঁদে বা উস্কানিতে পড়া যাবে না। আর এভাবে তাঁদের অসৎ পরিকল্পনা উন্মোচিত করে দিয়েই একমাত্র আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পারি! রানা-নন্দীদের পরিকল্পনাসহ সব ততপরতার নিন্দা জানাই!

     

     

    আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ১৭
    সর্বশেষ আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ৫০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • প্রগতিশীলতা, এবারেও কী গুম-খুনের রাষ্ট্রের পক্ষে সাফাইদাতা…

    প্রগতিশীলতা, এবারেও কী গুম-খুনের রাষ্ট্রের পক্ষে সাফাইদাতা…
    গৌতম দাস

    ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-53L

               গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কান্না

    প্রগতিশীলেরা [প্রগ্রেসিভ] ভোল বদলে এখন ভোটাধিকার ও কথাবলার স্বাধীনতার দাবিতে নব রূপে উঠে আসার চেষ্টা করছে। বলেছিলাম, প্রগতিশীলতা আর আধুনিকতা এক কথা নয়। সমগোত্রের ধারণা নয়, একই ঘরানার চিন্তা নয়। ফলে প্রগতিশীলতা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র চিন্তারই কেউ না। রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষের কোন চিন্তা ও অবস্থান প্রগতিশীলতা নয়; প্রগতিশীলদের এমন কোন চিন্তা ও অবস্থান নাই। তাই অধিকার, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ইত্যাদি এগুলোর একটাও প্রগতিশীল রাজনীতিই নয়। এমনকি এর আরো একেবারে গোড়ার কথা, ‘নাগরিক’ [citizen] ধারণা বা তা থেকে ‘নাগরিক প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টশন [representation] এর ধারণার সাথে ‘প্রগতিশীলতার’ কোন সম্পর্ক নাই। এককথায় কমিউনিষ্ট-প্রগতিশীল চিন্তায় ‘নাগরিক’ [citizen] বলেই কিছু নাই।

    যদিও প্রগতিশীলেরা বিপদে পড়লে যা তাদের নীতিগত চিন্তা বা অবস্থান নয় তা সত্বেও ওর পক্ষে ভেক ধরে দাঁড়িয়ে যায়; যেমন, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার রাজনীতির পক্ষে যেন সে একটা সৈনিক এভাবে, দাঁড়িয়ে যায়। তবে, চাপাচাপিতে পড়লে জিজ্ঞাসার জবাবে তখন তাঁরা একাজকে তাঁদের  কৌশলগত অবস্থান নেয়া বলেও স্বীকার করে নেয়। এমন এসব কৌশলগত কারণে নেয়ার সময়-সুযোগে তাঁরা নাগরিক, কনষ্টিটিউশন, অধিকার এমনকি “গণতন্ত্র ধারণার” পক্ষে দাঁড়িয়ে তাঁদের  ভেক ধরে  কথা বলার অবস্থান – সেটা তারা স্বীকার করে নেয়। এমনকি  একারণে, যে নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বলে মনে করে সেও আবার কনষ্টিটিউশন (প্রণয়ন বা রাষ্ট্রগঠন) নিয়ে বকোয়াজি বা বকাবাদ্য করে থাকে। যদিও কোঙ্কমিনিস্টের এমন আচরণ করা অর্থহীন, কোন মানে হয় না।  কারণ, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল মানে তো সে শ্রেণীর রাষ্ট্র এই বুঝের পক্ষের লোক;  মানে সে তো একই সাথে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষের লোক সে হতে পারে না। ঠিক যে কারণে, প্রাকটিসিং কমিউনিস্ট-ব্যারিস্টার বা কমিউনিস্ট এডভোকেট দেখা যায় না। দুটার একটা তাকে ব্যবহারিকভাবে ছেড়ে দিতেই হয়। যেমন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ব্যারিস্টার হয়ত কিন্তু নন-প্রাকটিসিং!  অনেকে অবশ্য ব্যাপারটা না বুঝে বা না উপলব্দি করে কার্যত একটা বাদ দিয়ে দেয়। কমিউনিজমে নাগরিকো নাই, নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের ধারণাও নাই; শ্রেণীর একনায়ক ক্ষমতার ধারণা আছে। অধিকারের ধারণাই যদি না থাকে তো কমিউনিস্ট আদালতে গিয়ে কী করবে??? এটা যে উপলব্দি করে তার আর আদালতে যাবার কোন কারণ থাকে না!   তবু অবশ্য এটা অনেকেই এভাবেই প্রগতিশীলও থেকে যেতে চায়, মনে মনে!  কিন্তু কেন অথবা অন্যভাবে বললে – কেন অধিকার, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ইত্যাদি এগুলো একটাও প্রগতিশীল চিন্তা ও রাজনীতিই নয় বলছি ও বারবার তুলে ধরছি?

    কারণটা অনেক লম্বা, একেবারে হিন্দুত্ববাদ পর্যন্ত! প্রগতিশীলতা [progressive] মানে যার গুরু হল কমিউনিজম; কমিউনিজমকে লিবারেল বা নরম করে হাজির করা ভার্সানই প্রগতিশীলতা। আর সবচেয়ে বড় কথা প্রগতিশীলতা মানে ধর্ম কোপানো যা মূলত ইসলাম কোপানো; এক চরম ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি চিন্তা – যা সে কমিউনিজম থেকে নিয়ে থাকে।  অনেকেই সেকারণে প্রগতিশীল অবস্থান সে কমিউনিজম থেকে নিয়েছে বা পেয়েছে দাবি করে ও সরাসরি এমন সাফাই-ই হাজির করে থাকে। আবার, প্রগতিশীলতার বড় ভাই কমিউনিজম বলেই তো প্রগতিশীলরা  নিজেকে কথিত ডানপন্থিদের [নিজেকে বামপন্থি মনে করলে কেউ সেই সাপেক্ষে অন্যকে বা নিজ বিরোধীদেরকে ডানপন্থি বলা সম্ভব]  চেয়ে উপরে নিজেকে এক অগ্রসর চিন্তা [শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামি] – প্রগ্রেসিভ চিন্তা বলে দাবি করে। এসব কারণে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চিন্তাই প্রগতিশীলদেরও রাষ্ট্রচিন্তা।  তাই প্রগতিশীলদের রাষ্ট্র চিন্তার স্বরূপও হল – এক গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক রাষ্ট্রচিন্তা। যা মূলত এক কমিউনিস্ট রাষ্ট্রচিন্তা।  আবার প্রগতিশীলতার ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি রূপ-বৈশিষ্ঠের কারণে এদের ঘাড়ে চড়েই – প্রগতিশীল সেজে হিন্দুত্ববাদ বাংলাদেশে প্রবেশ ও অবস্থান করতে থাকে।  প্রগতিশীলেরাও সেটা জেনে এবং কেউবা না-জেনে এমন প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। আর এমন হবার পিছনের কারণ, তারা হিন্দু আর হিন্দুত্ববাদ মাখায় ফেলে দুটাকে একই মনে করে। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশের হিন্দু মানেই যেন সে মুসলমানের হাতে ভিকটিম তা স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেয়! এখন প্রগতিশীলেরা আবার তাদের অনুমিত ভিকটিম হিন্দুর পক্ষে দাঁড়ানোটাই প্রগতিশীলতার প্রমাণ  দেখানোর সুযোগ মনে করে থাকে। তাতে, একাজটা হিন্দুত্ববাদকে ডেকে এনে জামাই আদরে আসন গেড়ে বসানো হলো কিনা অথবা হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি করা হলো কিনা সেসব দিকে এরা বেখবর থাকে! অথচ হিন্দুত্ববাদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এক বড় শত্রু! আর এসবের ফলেই প্রগতিশীলতা=হিন্দুত্ববাদ হয়ে দাড়িয়েছে!

    আপনার ধর্ম মেনে চলতে বা পালন করতে অনীহা আছে বা আগ্রহ নাই, এটা হতেই পারে। সেটা একান্তই আপনার আল্লাহ-ভগবানের সাথে আপনার বুঝাবুঝির বা শাস্তি ভোগ করা না করার বোধের মামলা। সেটা নিয়ে কী করবেন, আদৌও কিছু নাও করতে পারেন এমন ইত্যাদি সব একান্তই আপনার! কিন্তু সেজন্য এটা আপনাকে কোন ধর্মবিদ্বেষ বা  চরম ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি ততপরতা করার সার্টিফিকেট দেয় না, তা নয়ও বা হতে পারে না। ধর্ম চর্চা-পালন করতে না চাওয়া আর ধর্মবিদ্বেষ রাখা – এদুইটার মধ্যে আকাশপাতালের  ফারাক। আপনি যেকোন ধরণের ইসলামিজম বা কোন ইসলামি ব্যাখ্যায় রাজনীতি খাড়া করার বিরোধী হতেই পারেন। এমন রাজনীতি আপনার অপছন্দের তা হলেই পারে।  কিন্তু সেজন্য আপনাকে প্রগতিবাদী হতে হবে কেন? বা আপনাতেই আপনি প্রগতিবাদী হয়ে যাবেন না। এমন কোন সম্পর্কই নাই। তাই  বাইনারী [binary] বানাবেন না যে হয় ইসলামি রাজনীতির লোক আর না হলে তো আপনি প্রগতিবাদী! ব্যাপারটা এমন নয় তাই এমন বানাবেন না, ধরে নিবেন না। বাস্তবত এরা বাইনারি নয়,  কারণ এদুইয়ের বাইরে বহুকিছু আছে। আবার নিজ ইসলামবিদ্বেষ আড়াল করতে প্রগতিবাদী সাজা সেটাও একটা অপরাধ!  ইসলামি রাজনীতি না হলে প্রগতিবাদ এমন, দুইটারই বাইরে আপনার জন্য একটা ভাল নুন্যতম অবস্থান হতে পারে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষে দাঁড়ানো!  আর কেবল তখনই আপনার ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশ বা কথাবলার স্বাধীনতা ইত্যাদির দাবিতে শুধু শাহবাগে না শাপলা চত্তরে দাড়ানোটাই গভীর অর্থপুর্ণ হবে। 

     

    প্রগতিশীলতা=হিন্দুতাবাদ বানাবেন না। আবার  যেকোন ইসলামি রাজনীতির বিরোধিতায় প্রগতিশীলতা –  এভাবে (ইসলাম বনাম প্রগতিশীলতা) এদের বাইনারী বানাবেন না। মানে যেন, হয় ইসলামি রাজনীতি না হলে প্রগতিবাদ! কারণ এদুইয়ের বাইরে বহুকিছু আছে। আর নিজ ইসলামবিদ্বেষ আড়াল করতে প্রগতিবাদী সাজাও একটা অপরাধ!  তবে একটা ভাল নুন্যতম অবস্থান হতে পারে ইসলামবিদ্বেষ ও প্রগতিশীলতা দুটাই ত্যাগ করে বুঝে শুনে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পক্ষে দাঁড়ানো!  আর কেবল তখনই আপনার ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশ বা কথাবলার স্বাধীনতা ইত্যাদির দাবিতে শুধু শাহবাগে না শাপলা চত্তরে দাড়ানোটাও গভীর অর্থপুর্ণ হবে। 

     

    আবার পরিস্কার করে বলি, পাঠক আঙুলে গুণে গুণে বুঝে নেন। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রচিন্তা আর আধুনিক রিপাবলিক (প্রজাতান্ত্রিক) রাষ্ট্র এক নয়। এদুটা এক ধারণা তো নয়ই বরং আকাশ-পাতাল ফারাক, এদুই রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে। যেমন, এক. কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চিন্তায় কোন নাগরিক রাষ্ট্র ধারণা নাই তা বারবার বলছি বরং এর বদলে আছে শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা।  এক শ্রেণীতে বিভক্ত রাষ্ট্র ধারণা তাদের আছে। তা থাক তাতে অসুবিধা নাই। সমাজে শ্রেণীবিভাগ আছে বলে কেবল একটা কথিত শ্রমিক শ্রেণীই  সব রুস্তমি করবে অন্যকে ইচ্ছামত খুন-অপহরণ- আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব করতে পারবে আর এভাবে বাকি অন্য কোন শ্রেণী মানুষের কোন রাজনৈতিক অধিকার থাকবে না? এটা কী কোন রাজনৈতিক চিন্তা হতে পারে???   কিন্তু এর বিপরীতে রিপাবলিক (প্রজাতান্ত্রিক) রাষ্ট্র এর বেলায় যেখানে বাসিন্দা মাত্রই সবাই নাগরিক এবং সবাই বৈষম্যহীন “সমান অধিকারের নাগরিক” ধারণা আছে । শুধু তাই না, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সেই নাগরিক অধিকার রক্ষা করা এবং সকল নাগরিকের নিরাপত্তা দেয়া।

    তাহলে দাঁড়ালো, কমিউনিস্ট শ্রেণী-রাষ্ট্র এর কাজ হল কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের রাষ্ট্র হয়ে কেবল কথিত এই শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার্থে সব ততপরতাকে সেই-মুখি করা।  এখানে কথিত বললাম এজন্য যে এই শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ জিনিষটা কী? এত পবিত্র এবং যেন আন-টাজেবল মানে ধরাছুয়ার বাইরে – এই শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ মানে কী?  এর মানে আর কিছু না – একছত্র ক্ষমতাধর কমিউনিস্ট পার্টি ও এর অলঙ্ঘণীয় অপার ক্ষমতা! এর সাথে কোন শ্রমিকের কোন সম্পর্ক নাই, বুঝানোও হয় নাই। এটা হল কোন জবাবদিহিতা বা সব প্রশ্নের উর্ধে এক কোটারি ক্ষমতা যা আর বৈ অন্য কিছু না!
    আর এটা বলাই বাহুল্য যে  সাধারণভাবে,  শ্রেণী নির্বিশেষে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা – এমন ধারণা কমিউনিস্ট ডিকশনারীতেই নাই। বরং  প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কেবল ক্ষমতাসীন বা শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষের রাষ্ট্র তারা ঐ সমাজের বাকি সব শ্রেণী – এদের সবাইকে কোপ দিবে, এরা নির্মুল হবে ও নিপীড়িত হবে – এটা তারা প্রকাশ্যেই বলে থাকে; রাষ্ট্রকে এমন রূপ তারা দিতে চায়।  এককথায়, রাষ্ট্রে শ্রেণী নির্বিশেষে বাসিন্দাদের সকলের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা – এই ধারণাটাই কমিউনিস্ট চিন্তায় কোথাও নাই। একারণে, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে কোন ক্ষমতা হাজির হলে তাতে ক্ষমতাসীনেরা অপর সবশ্রেণীকে দমন করার এক একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশাবেই তা তৈরি-হাজির হয়ে যায়। হবেই!
    আর এভাবে অপছন্দের অন্য সকল শ্রেণীর মানুষকে  দমন বা একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দেখানো আর কমিউনিস্টদের এর পক্ষে  সাফাই দেয়া – এসব কথার মানে কী?  এর সোজা মানে ও পরিণতি হল, কমিউনিস্ট- প্রগতিশীল রাষ্ট্রচিন্তা বা এর স্বরূপ হল এক গুম-খুন-অপহরণ- আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক রাষ্ট্রে পরিণতি পাওয়া!

    কমিউনিস্টদের শ্রমিকশ্রেণীর ক্ষমতার চোখে সামাজিক অপর শ্রেণী কারা তা কে সাব্যস্ত করেঃ
    কথা আরো আছে। কমিউনিস্টদের শ্রমিকশ্রেণীর ক্ষমতার চোখে সামাজিক অপর শ্রেণী বলতে তারা প্রধানত বা সাধারণভাবে এদেরকে ‘বুর্জোয়া শ্রেণী’ – তারা বলে থাকে। এখন কেউ বুর্জোয়া শ্রেণী কীনা এটা কে সাব্যস্ত করবে????
    কোন আইন-আদালত বিচার বিভাগ এমন কী কেউ? না, একেবারেই না।
    এই সিদ্ধান্ত নিবে পার্টি; মানে, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পার্টি। মানে পার্টির সর্বোচ্চ স্তর পলিটবুরো – এই কমিটি।
    তাহলে এতে কী দাঁড়ালো? দাঁড়ালো যে রাষ্ট্রের কোন বিচার বিভাগ নয়, কোন বিচার প্রক্রিয়াও নয়; ক্ষমতাসীন শাসক (মানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পার্টি) সিদ্ধান্ত নিলেই প্রগতিশীল রাষ্ট্র গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব করতে পারবে!!!! সব জায়েজ!

    তামাসার কথা হল, রাজা-বাদশার আমলেও মানে রাজতন্ত্রেও ক্ষমতাসীন শাসক কাউকে নিজে শাস্তি দেয় না। এমন নিয়ম বা চর্চা সেখানের নয়। তাই কোন ফাঁসির দন্ড মানে সেখানে বিচার করে সেই শাস্তির রায় ঘোষণা করে থাকে বিচার বিভাগের বিচারক বা কাজী!

    তাহলে রিপাবলিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে তাহলে কথাগুলোর মানে কী দাঁড়ালো?
    ১। কোন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে সামগ্রিক যে ক্ষমতা তা কয়েকটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান খাড়া করে তাদের মধ্যে ভাগ করে রাখা থাকে।
    ২। এর মধ্যে প্রধান ক্ষমতা যেটা সেটা আমরা চলতি কথায় বলি ক্ষমতাসীন শাসক-ক্ষমতা।  (মানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পার্টি, তাদের ভাষায় যেটা শাসক শ্রেণী) । এখন বই বা তত্বের ভাষায় আমরা এটাকে বলি রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চ। যেকারণে, কোন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি বলতে আমাদের বুঝতে হবে এটা নির্বাহী ক্ষমতা।

    এই নির্বাহী ক্ষমতা জিনিষটা কী?
    আগে বলেছি রাষ্ট্রের সামগ্রিক ক্ষমতাটা কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করে রাখা থাকে। যেমন,  পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ, সরকার (নির্বাহী) ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নানা বিভাগের হাতে।  যাদের মধ্যে আবার ক্ষমতাটা ভাগ করে রাখা থাকলেও একটা ব্যাপারে কোন ভাগাভাগি নাই। সেটা হল, ক্ষমতা এদের সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতেই নানা রূপ বা ধরণে আছে ও থাকে। কিন্তু ক্ষমতার প্রয়োগ এর ক্ষমতা আছে কেবল সরকার বা নির্বাহী বিভাগের হাতে। এজন্য এটা নির্বাহী ক্ষমতা বা প্রয়োগযোগ্য ক্ষমতার রূপ! এজন্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী (বা প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার হলে রাষ্ট্রপতি ) বলতে আমাদের বুঝতে হবে এটা নির্বাহী ক্ষমতা। তাঁর হাতেই একমাত্র ক্ষমতার প্রয়োগ এর ক্ষমতাটা রাখা থাকে। এখানেই ক্ষমতার প্রয়োগ মানে ক্ষমতার বাস্তবায়ন, ইংরাজিতে এক্সিকিউশন [execution]। আর সেখান থেকেই এটা এক্সিকিউটিভ পাওয়ার বা নির্বাহী ক্ষমতা – এমন নাম। মনে রাখতে হতে ক্ষমতার প্রয়োগ এর ক্ষমতাটা কেবল এই নির্বাহী বিভাগের হাতে  রাখা হয়েছে জেনেশুনেই। না হলে রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে সেটা আর একটা থাকবে না; সব বিভাগে ভাগ হয়ে যাবে যার মানে হবে রাষ্ট্র ততগুলো টুকরা হয়ে যাবে!

    তাহলে এখন সোজা প্রশ্নঃ  প্রধানমন্ত্রী কী বিচার বিভাগ দেখে, মানে তাঁর হুকুম-নির্দেশে বিচার চলে? না, অবশ্যই না। কিন্তু বিচারক কোন শাস্তির রায় দিয়েই তার কাজ-দায়িত্ব শেষ করে থাকে। এরপরে ঐ রায়ের বাস্তবায়ন এর দায়ীত্ব প্রধানমন্ত্রীর। মানে তার নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের; যা এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ডিআইজি(প্রিজন) আর তা থেকে জেলার এভাবে তা বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। এককথায়, শাস্তির বাস্তবায়ন বিচার বিভাগের দায়ীত্ব নয়। এটা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব।
    আবার পার্লামেন্ট বা এর সদস্যরা ( এখানে আগে থেকেই গঠিত ও লেখা হয়ে থাকা এক কনষ্টিটিউশন আছে, ধরে নিয়েছি) কনষ্টিটিউশনের সীমার মধ্যে নয়া সব আইন তৈরি করে থাকে – এটাই পার্লামেন্টের আইন বানানো বা প্রনয়নের ক্ষমতা – এবং এটাও রাষ্ট্র-ক্ষমতার আরেক রূপ, অবশ্যই। কিন্তু আইন প্রনয়নের পরে এর প্রয়োগ-এক্সিকিউশন? না এই ক্ষমতা প্রয়োগের-ক্ষমতা সংসদের হাতে নাই, রাখা হয় নাই। যেমন সংসদের তৈরি কোন আইন তৈরি হয়ে যাবার পরে কোন নাগরিক তা ভঙ্গ করলে তো সে অপরাধী। কিন্তু সংসদ তাকে ধরে আনবে না বা এরপরে বিচারও করবে না। সেসব ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর, মানে একমাত্র নির্বাহী বিভাগের অধীনের কোন মন্ত্রণালয়ের – আলোচ্য ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের!  এই হল নির্বাহী-এক্সিকিউটিভ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্টগত দিক!
    দুঃখের কথা হল, ককিউনিস্ট চিন্তা বা এর সাগরেদ প্রগতিশীল চিন্তায় ক্ষমতার এসব ভাগাভাগির ধারণাই নাই। শুধু তাই না, এমন ভাগাভাগিকেই ভুয়া মনে করা হয়। এর বদলে তাদের শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি মানে, ক্ষমতাসীন পার্টিই সব কিছু! কিসের আবার বিচার বিভাগ বা বিচার আচার?   পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওমুকে বুর্জোয়া তো সে বুর্জোয়া (যেমন যুদ্ধাপরাধী?) । এখন পার্টি বলে দিয়েছে তাই, তাকে ফাঁসি দিয়ে দেও।  কিংবা  গুম-খুন-অপহরণ-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি যা খুশি লাগে করে ফেলাও!! শ্রেণির রাষ্ট্রে সব জায়েজ! কোন বিচার লাগবে না!

    তবুও মূলকথাটা যেন ভুলে না যাই বা না হারিয়ে যায় যে, নির্বাহী ক্ষমতাকে থেকে বিচার বিভাগ আলাদা রাখতেই হবে – এই ইস্যুটা। মানে হল প্রধানমন্ত্রীর গোপন বা প্রকাশ্যে ইঙ্গিত বা নির্দেশে যেন কোন বিচার ও রায় না হয়। এই সেপারেশন অব পাওয়ার –  এটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য এক মুখ্য বৈশিষ্ট; বিশেষ করে যখন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রকে বুঝতে যাব। কারণ কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের কাছে বিচার বিভাগ বলেই কার্যকর তেমন কিছু নাই, রাখা হয় নাই। মানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তার শ্রেণীর রাষ্ট্রের কাছে এর বালাই-ই নাই। পার্টিই নির্বাহী ক্ষমতা আর পার্টিই বিচার বিভাগ – তাই একাই সে সব মানে, বিচারও শেষ করে দিয়েছে মনে করা হয়। মানে রায় ও সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়। যেটা পার্টির সিদ্ধান্ত সেটাই রায় – এই হল এর মূল জায়গাটা। কেবল একালের চীনে কিছু পেটি ইস্যু আদালত-বিচারকের হাতে ছেড়ে দেয়া শুরু হয়েছে। যেমন শহর ও আবাসিক এলাকায় পরিবেশ দুষণ (কয়লা বিদ্যুৎ বা এমন কিছু) ইস্যু। এসব ক্ষেত্রে আদালত অভিযোগ শুনে রায় নিতে পারবে, পার্টির নির্দেশের সীমার মধ্যে থেকে। যেটা আগে পার্টিই সিদ্ধান্ত দিয়ে সমাধান করত। কিন্তু সেই চীনেই আবার একালেও আমরা দেখছি কেউ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিংবা চীনা আন্তর্জাতিক বড় ব্যবসায়ী জ্যাক মা হলেও রক্ষা নাই!  কমিউনিস্ট ক্ষমতাসীন শ্রেণী আপনাকে একালেও কোন আয়নাঘরে আটকে রেখেই চলেছে! কোন বিকার নাই, পরিবর্তন নাই!  কেবল পার্টি যেভাবে চায় তেমন এক স্বীকারোক্তি দিলে সম্ভবত এরপর ছেড়ে দিবে! তাই আয়নাঘরে রেখেছে। না হলে তো খুন করে রেখে দিতে পারত!! এভাবে বুঝতে হবে!  আর এই আত্ম-স্বীকারোক্তি দেয়া যে আমি নিজেই অপরাধী – এটা সেই ১৯২৪-৩৩ সালের মধ্যে স্টালিনের হাতে তিনি ছাড়া বাকি সব পলিটবুরোর সদস্যদের হত্যা করার সময় থেকে এই একই রেওয়াজ চলে আসছে।  যার সোজা অর্থ কোন ধরণের বিচার প্রক্রিয়ায় [legal process] মানে আইন ও সেই আইনের ভিত্তিতে অভিযোগ এনে বিচার – এসবের উপর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের কখন আস্থা ছিল না, নাই। সেজন্যই এমন প্রতিষ্ঠান গড়তে তারা কখনও যায় নাই। তাদের শ্রেণীবোধ এর উপর আস্থা রাখে না!  অতএব আয়নাঘর – গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির উপর ভরসা!!!

    এবার সারাংশে বলিঃ কমিউনিস্ট চিন্তায়, রাষ্ট্রে শ্রেণী নির্বিশেষে বাসিন্দাদের সকলের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা – এই রাজনৈতিক অধিকার এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের রাজনৈতিক অধিকার এসব ধারণাই কমিউনিস্ট চিন্তায় কোথাও নাই। তথাকথিত শ্রেণীর রাষ্ট্র বুঝ আর  এই বুঝ দিয়ে এটাকে মাখায় ফেলা শুধু না শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের রাজনৈতিক অধিকার ধারনা এটা কমিউনিস্টদের মাথার উপর দিয়ে গেছে; ভিতরে ঢুকে নাই।  অথচ তারাও একটা রাষ্ট্র ধারণা করতে গেছে তাদের দরকারে!!  এখানে বলে রাখা যেতে পারে যে এর সমাধান হত এভাবে যে, পার্টির শ্রেণীবুঝ আছে থাক তা দিয়ে যে ক্ষমতাকেও বুঝুক অসুবিধা নাই।  ক্ষমতা শ্রেণীবুঝ দিয়েই বুঝা হোক কোন অসুবিধা নাই। এই ক্ষমতার অধীনেই সকল নাগরিকের মানে সকল শ্রেণীর মানুষের নুন্যতম কিছু রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা আর তাদের নিরাপত্তা সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিতে অসুবিধা কী? মানে রাজনৈতিক অধিকার (আবার এটাকে অন্য-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান বলে বুঝ দিয়ে মানুষকে কেবল বৈষয়িক মানুষ কল্পনা করার দরকার নাই। ) কারণ, আমি রাজনৈতিক মানুষের কথা বলছি!  এটা হলে কী পার্টির ক্ষমতা নাগরিকেরা কেড়ে নিত? তাহলে এখনও নিতে পারত!! এই হল শ্রেণীবোধের বুঝের সাথে রাজনৈতিক অধিকার – এই রাজনৈতিকতা [polity] এর ধারণাটাকে ধরতে পারে নাই।  মাখায় ফেলা হয়েছে!  

    এটা সত্যি  যে রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব থেকে মানে, আগে সোভিয়েত গড়ে – পরে তা দিয়ে ক্ষমতা দখল সম্পন্ন করে তোলা অবশ্যই এক আলাদা ধরণের রাষ্ট্রের ব্যবহারিক ধারণা এটা। কিন্তু এটা প্রশংসা করতে গিয়ে যেন এটা এক নয়া কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সেজন্য এর ভিতরের শ্রেণী নির্বিশেষে নাগরিক বা বাসিন্দা  সকলের রাজনৈতিক অধিকার আর লাগবে না – এমন একটা ভুল অনুমান তারা করেছিল, যাদের মধ্যে খোদ লেনিনও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আরেকটা চিহ্ন আছে যে লেনিনকেও রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ধারণা যথেষ্ট কামড় বা বিব্রত করেছিল – তাঁর মনে খচখচ প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল – সেটা অনুমান করা যায়!  মানে সোভিয়েত গড়া যে “রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ধারণার” কর্তব্য-কাজের  কোন বিকল্প  হাসিল করা ফেলা নয় – তা লেনিনও সম্ভবত মানতেন; এর প্রমাণ আছে।

    বিপ্লবটা রাশিয়াতে হলেও পরে, পুরানা পরাজিত জার সাম্রাজ্যের পুরা কলোনি ভূখন্ডগুলোকে রাশিয়ার সাথে জুড়ে নিয়ে লেনিন-স্টালিন ১৯২২ সালে  যে সোভিয়েত ইউনিয়ন বানিয়েছিলেন ওর ফরমাল নামের দিক লক্ষ্য করা যাক। ওর পুরা নাম বা আনুষ্ঠানিক নাম ইউনাইটেড সোভিয়েত সোসালিষ্ট রিপাবলিক [USSR]। এই নামের মধ্যে ইংরাজি ‘R’ এটাই রিপাবলিক শব্দের প্রতীক। এর মানে লেনিন সাহেব রিপাবলিক শব্দটা ত্যাগ করা সহি মনে করতে পারেন নাই, তাই সাথে রেখেছিলেন। কিন্তু রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার মুলকথা তো পাবলিক বা জনগণ ধারণা। মানে  শ্রেণী নির্বিশেষে নাগরিক বা বাসিন্দা  সকলের রাজনৈতিক অধিকার এই ধারণা!!  কিন্তু  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার এই বাকী পর্যায়টা মানে ততদুর আর লেনিন আমল করতে পারেন নাই বা  করতে চান নাই ও করেনও নাই। উলটা শ্রেণীর রাষ্ট্র বুঝের ধারণা দিয়ে সব মাখায় ফেলেছেন, শ্রেণী নির্বিশেষে নাগরিক বা বাসিন্দা সকলেরই রাজনৈতিক অধিকার এই ধারণা তিনি আমল উপলব্দি করতে একেবারেই ফেল করেছেন। এর উপর শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র ধারণার পক্ষে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় ব্লান্ডার করেছেন! যেটা আজ পরিস্কার!  অথচ এটাই তো গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর এর রাষ্ট্র ধারণা!   এটাই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চিন্তার আদি ক্ষত-খামতি আর অযোগ্যতা হয়ে থেকে গেছে।

    আর একারণের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তায় ভর করা যে কোন রাষ্ট্র মাত্রই তা এক গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক আখড়ায়, এক ফ্যাসিজমে পরিণত হয়েছে।  

    এককথায় বললে, কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চিন্তায় ভর করা যে কোন রাষ্ট্র মাত্রই তা এক গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির এক আখড়া, এই ফ্যাসিজমে পরিণত হয়েছে।

    এবার বাংলাদেশের গত ১৫ বছর হাসিনার ক্ষমতার সাফাই বয়ানটা কী ও কে দিয়েছিলঃ
    ক্ষমতা বা রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে আমরা ফিজিক্যাল ক্ষমতা বা গায়ের জোর ধরণের বলপ্রয়োগ যেটা সেটাকেই বুঝি। নিঃসন্দেহে এটাই ক্ষমতা যা দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হল, ক্ষমতায় থিতু হতে চাইলে এটা কী যথেষ্ট?
    এক শব্দে জবাব হল না, এটা যথেষ্ট নয়। আরও কিছু লাগবে। আর সেটা হল, দখল নেয়া এই ক্ষমতার স্বপক্ষে একটা শক্ত বয়ান মানে এই ক্ষমতার পক্ষে একটা জাস্টিফিকেশন  ও ন্যায্যতাও তুলে এর সাথে হাজির করতেই হবে। আর সেটাও আরেক ক্ষমতা অবশ্যই; যদিও তা ফিজিক্যাল নয়। এটাকে আমরা বলতে পারি, ক্ষমতার সাফাই বয়ান এর ক্ষমতার দিক। এই সাফাই বয়ান আর ফিজিক্যাল – ক্ষমতা – এমন এই দুইটা ক্ষমতাকেই হাজির থাকতে হবে তবেই সেটা এক থিতু ক্ষমতা হবে। নইলে না! কী হবে তাহলে?
    শুধু ফিজিক্যাল ক্ষমতা আছে যে ক্ষমতার সেটা ক্রমশ ফেল করে যাবে, পরাজিত ও ক্ষমতাচ্যুত হবে। এজন্য ক্ষমতার সাফাই বয়ান এর দিকটাকেই ফিজিক্যাল ক্ষমতার সমান গুরুত্বপুর্ণ মানা হয়।
    আ তা না হয় বুঝা গেল। কিন্তু হাসিনার গত ১৫ বছরের ক্ষমতার প্রসঙ্গে ক্ষমতার সাফাই বয়ান সেটা কী ছিল আর তা কে দিয়েছিল?

    গত ২০০৮ সাল জুন ১১ থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে আর সেই বাংলাদেশের প্রকাশ্য দেখা যাওয়া বাইরের অর্থে ক্ষমতাটা দেয়া হচ্ছে হাসিনাকে। এই দিনই সেকালের তত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাহী ক্ষমতায় (মানে আদালত থেকে জামিনে নয়) হাসিনা প্যারোলে মুক্তি নিয়ে তিনি আমেরিকা সফরে যান; অলিখিত উদ্দেশ্য স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে আগামি ক্ষমতা-করণীয় এর বোঝাপড়া ফাইনাল করা। এই বিচারে ২০০৯ সালে হাসিনার ক্ষমতারোহণ এটাই ছিল ক্ষমতার ফিজিক্যাল দিকটা, বলতে পারি।

    তাহলে বয়ানট কী আর তা কে দিয়েছিল?
    এই বয়ান সরবরাহ করেছিল কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল মুখগুলো। কী সেটা?
    যেমন, “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি” এই ধারণাটা হাজির করা। – এটা আসলে কী?
    ” এটাই আসলে কমিউনিস্টদের শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা দিয়ে হাসিনার ক্ষমতার পক্ষে সাফাই বয়ান তৈরি করে সরবরাহ করার প্রগতিশীলতা! কীভাবে?
    কমিউনিস্ট রাষ্ট্রচিন্তায় শ্রমিক শ্রেণীই ক্ষমতাসীন থাকে আর বাকি সব শ্রেণীর উপর সে যেকোন আধিপত্যসহ যথেচ্ছাচা্ররে দমন করে দাবিয়ে রাখে – আর একাজের জন্য কমিউনিস্ট ক্ষমতাসীনেরা গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব কিছু করার এক শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা হাজির ও চর্চা করে থাকে! এমনকি একালের চীনকে দেখেন তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী জ্যাক মা যেই হন, রাষ্ট্র আপনাকে আয়নাঘরে রাখতেই পারে! কোন সমস্যা নাই।  তবে ২০০৯ সালের বাংলাদেশে, এখানে কমিউনিস্টদের সাফাইটা হল, যে শ্রেণী ক্ষমতায় থাকে সে অপর সকল শ্রেণির সাথেই এমন  নিপীড়নমূলক ট্রিটমেন্ট বা নিপীড়ন করতেই পারে – এই দাবি। কারণ, এটা নাকি ক্ষমতাসীনের একক ইচ্ছা যা সে যেকারও সাথে করতে পারে। পার্টির ইচ্ছাই চুড়ান্ত, কোন বিচার প্রক্রিয়ার কথা ভুলে যান।
    কিন্তু  বাংলাদেশে ক্ষেত্রে একই ব্যাখ্যা প্রয়োগ করতে গেলে তা কিভাবে করা যাবে? কারণ,  হাসিনা তো নিজেকেও শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা বলে দাবি করে না?

    এখানেই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার কারিশমা! এজন্য তারা এই নয়া শব্দগুচ্ছ হাজির করে রেখেছে – “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি বা “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শ্রেণীশক্তি” – বলে। যেটা কমিউনিস্টদের শ্রমিক শ্রেণী শব্দগুলো বদলে সেই জায়গায় বসিয়ে দিবে, হাসিনার ক্ষমতার স্বপক্ষে সাফাই তৈরি করতে।   বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের সরবরাহ করা সেই গুছানো বয়ানটা ভেঙ্গে বললে তা হল,  ২০০৯ সাল থেকে বিজয়ী হাসিনা সরকার এরাই তো ১৯৭১ সালের বিজয়ী শক্তি সেই আওয়ামি লীগ মানে ২০০৯ সাল থেকে বিজয়ী হাসিনা সরকারই হল “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শ্রেণীর” ক্ষমতাসীন সরকার। কাজেই এই শ্রেণী তো তার বিরোধী সকল রাজনীতিক ব্যক্তি ও দলকে তাদের সকলকে – রাজনৈতিক অধিকার শুণ্য- করে রাখবে।  এদের উপর  গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব জায়েজ করবে! এসব গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি – এটাই তো (প্রগতিশীল)ফ্যাসিজম হয়ে হাজির হবে!!! 

    ঠিক একইভাবে আরেক শব্দ ও বয়ান হল “চেতনা” বা “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” – একটা পবিত্র ভাব ধরে এই শব্দগুচ্ছও অনেক বেশি করে গত ১৫ বছর শোনা গেছে। শাহবাগ আন্দোলন এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার – এই দাবিরই পিছনের কাহিনী!  কিন্তু কেন যুদ্ধাপরাধ? কারণ,  প্রগতিশীলতার সাফাই বয়ান হল, ১৯৭১ সালের শত্রু মানে “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির” বিরুদ্ধ শক্তি তো এরাই। আর একালে যা আমেরিকার কাছে ওয়ার অন টেরর তাই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির কাছে যারা যুদ্ধাপরাধী শক্তি – মানে এই শক্তিকে কোপাও মানে ইসলাম-মুসলমান কোপাও, ইসলামবিদ্বেষে ছেয়ে ফেলো! আর শুধু বিএনপি না বলে “জামাত-বিএনপি” এভাবে বলো!  আর সবার আগে জঙ্গীবাদ শব্দ লাগিয়ে দেও!  আর এতে বাস্তবত কী হবে? বাস্তবতা হবে যে,   হাসিনার  যেকোন (সংসদীয় বা তারা লিগাল দল হলেও) রাজনৈতিকবিরোধী যে রাজনৈতিক অধিকার চাইবে অথবা– এই দাবি করে কোন কথা বলবে তাকেই সরকার  জঙ্গীত্ব কাজ বলে চিহ্নিত করবে; বা জঙ্গি সাজিয়ে গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদি সব কিছুই করতে পারবে।  – কারণ প্রগতিশীলতার শ্রেণীবোধের রাষ্ট্রে এসব জায়েজ! শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘অপর’ শ্রেণী বলে যে কাউকে হত্যা করা জায়েজ! এর বিচারেরও দরকার নাই!

    শুরুর দিকে এসব বয়ান সবচেয়ে বেশি করে এনেছিল প্রায় সকল কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা বিশেষ করে সিপিবি। মানে মঞ্জুরুল আহসান খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম [সরকারী দল ও বিরোধী দল উভয়ই মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের শক্তি হবে।], এমএম আকাশ (মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারীরা নিরাপদ নন)  আবেদ খান (আবেদ খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আজ অটুট ও ঐক্যবদ্ধ আছে। ) ইত্যাদি এসব নাম। এখনও এর আরও প্রমাণ পাওয়া যাবে  গুগল সার্চে  মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি ও তাদের একেকজনের নাম দিয়ে খুজলে…। এমনকি দেখলাম গতকালকের বর্তমান রাষ্ট্রপতি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি যেন ক্ষমতায় না আসে: রাষ্ট্রপতি। আর সুলতানা কামাল এই ১২ সেপ্টেম্বরেই বলেছেন যে, “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি দাবি করলে তার পরীক্ষা দিতে হবে : সুলতানা কামাল” ।
    এমনকি  এখনও হাসিনা সরকারকে প্রগতিশীলদের দেয়া সেই জঙ্গীবাদের সাফাই বয়ানই চলছে; যদিও তা অনেক ঢিলা হয়ে গেছে আর এর উপর এখন আমেরিকান নানান স্যাংশন নিষেধাজ্ঞা এসে গেছে…।

    একটা মজার অবজারভেশনঃ
     তবে একটা মজার অবজারভেশন হল, হাসিনার ক্ষমতার প্রথম পাঁচবছর এমন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার সাফাই বয়ান দিয়েই আরামে চলেছিল। আর তা খুবই প্রভাব নিয়ে সরব ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচন ও এর হাল ও প্রক্রিয়া দেখার পর এক বিরাট সংখ্যক কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল পিছনে সরে যায়।  যদিও এদের মধ্যে যেসব নেতা  যারা তখন নতুন করে মন্ত্রী হবার ডাক পেয়েছিল কাকাবাবুর [প্রণব মুখার্জি তখন আবার রাষ্ট্রপতি] প্ররোচনা-উদ্যোগে, সেসব বাম-প্রগতিশীলেরা তখন আরো বেশি করে হাসিনার ক্ষমতার সাথে  সামিল হয়ে আরো বেশি করে জঙ্গিবাদ-বিরুদ্ধ বয়ান আউড়ানো শুরু করেছিল।  এদিকে ২০১৮ সালের পরে দেখা গেল সমর্থনে আরো বেশি করে ভাটা পড়েছে। যারা বাম-প্রগতিশীল বলে দলীয় সাইনবোর্ডে ছিল তারা একেবারেই দল-সহই গায়েব বা দূরে চলে গেছিল। যেন হাসিনা সরকারের তারা আর কেউ লাগে না। যদিও তাদের ব্যক্তি অবস্থান আগের মতই থেকে গেছিল। কিন্তু এবার ২০২৩ সালে এসে এরা একেবারেই উল্টা!  সেটা, কে কবে কত আগে শাহবাগ ছেড়েছেন তা বলার প্রতিযোগিতা যেন!!! আবার ওদিকে আরেক রূপ – বুঝা যাচ্ছে তারা অনুমান করছেন হাসিনার দিন শেষ। অতএব সমাজকে কথিত প্রগতিশীল আবহে রাখতে তাহলে বিএনপিকেই প্রগতিশীল করা্র উদ্যোগ নিয়েছে তারা; অন্তত যতটা পারা যায়!

    প্রগতিশীলরা নিকট আগামিতে কোন দিকে যাবেঃ
    ঘটনা হল প্রগতিশীলরা কিন্তু কষ্ট কম করে না, তাদেরও সব সামাজিক রাজনৈতিক ততপরতা সহজও নয়! তাতে তাদের রাজনীতির ধারালো হওয়া সেটা  যতই ভাল-খারাপ যাই হোক!  সমস্যা তাদের একটাই আর তা গোড়ার সমস্যা যে এরা নিজ রাজনৈতিক চিন্তা-অবস্থানের রিভিউ [review]  করা – ঢেলে সাজানো এর দরকার মনে করে না বা ব্যাপারটা বুঝেই না। বেখেয়াল! তবে সেটা করার মুরোদের সমস্যা আছে সত্য কিন্তু সবটা তা নয়! আগ্রহ আর উদ্যোগ থাকলে মুরোদ বা চিন্তার ক্ষমতা – সেটার পথ তারা পেয়ে যেতেন বা বের করতেন!  এমনকি এখনও যদি তারা অন্তত সন্দেহ শুরু করতেন যে প্রগতিবাদ বলে যেটাকে ধ্যানজ্ঞান করে জেনেছেন. এটা আসলে খাটো মানে অগ্রগামি নয়, আর  আধুনিক তো নয়ই! তাই এনলাইটেনমেন্ট বা মডান রিপাবলিক ইত্যাদি এসবের কোনটাই নয়। অথচ এরা তো সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নিজেদের মর্ডান বলেই দাবি করেন, আধুনিকতা মানে নিজেরা আধুনিক সাহিত্য  করে বলে মনে করেন, আর এটা নিজেদের  অবস্থান বলে জানান দিয়ে থাকেন! তাহলে?

    কিন্তু মর্ডানিটি ফেলে “প্রগতিশীল সাহিত্য” সে তো একটা ফেটিস [fetish], অর্থহীনতা ! এসব নিয়ে সক্রিয় থাকলেও তা এতদিনে টের পেতে পেলেন না! তবে একটা কথা; তারা মনে রাখতে পারেন চলতি শতক – এটা একেবারেই এক নয়া শতক। ইতোমধ্যে পরিচিত গত শতকের মেজর সবকিছুই ঢেলে সাজানো শুরু হয়ে গেছে আমরা তা চাই বা না চাই – সেটা গ্লোবাল রাজনীতি বা গ্লোবাল অর্থনীতি সহ সব জগতে। গত শতক থেকে যারাই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা কে আঁকড়ে ধরে ছিলেন আছেন সেটা এই ভেবে যে তারা নাকি সবচেয়ে অগ্রসর প্রগতির চিন্তার সাথেই আছেন –  এবার সবার আগে এরাই অস্তিত্বের সংকটে পড়বেন। এব্যাপারে সবার আগে নিজের পিছিয়ে পড়া, অন্ধকারে হাতড়ানো আবিস্কার করবেন যারা এরাই একেবারে অপ্রস্তুত ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্সিয়া, একদেমিক জগতের লোকেরা!   সোভিয়েত পতন, ওয়ার অন টেরর, ওয়ার অন টেররের বয়ানের পতন – ইসলাম ফেনোমেনা – এমনকি অন্তত অর্থনৈতিকভাবে চীনের উত্থান (এমন চীন যার রাজনৈতিক চোখ নাই) আর ততধিক আমেরিকার অর্থনৈতিকভাবে পতন ইত্যাদি মিলিয়ে  যে নয়া শতক জাহির হতে শুরু করেছে এই  নয়া পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও দিতে পারতে হবে। এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ!  কারণ, সেকাজের জন্য এবার উপযুক্ত চিন্তা ও এর নয়া টুলস ও যোগ্যতা লাগবে।  তবে এসব বৃহত্তর দিক এখানেই থাক, আপাতত আর যাব না! বাংলাদেশের দিকে ফিরে আসি।

    প্রগতিশীলতা আবার নিজেকে গুছাতে শুরু করেছে, যদিও চিন্তা-অবস্থান তাদের পুরানাটাই! তাই, তারা কী আবার নয়া (মানে কোন পোস্ট-হাসিনা) শাসকের বেলাতেও এসব গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির সাফাই সরবরাহ করার ভুমিকায়  আবার নেমে পড়বেন ????? এভাবে (প্রগতিশীল) ফ্যাসিজমকে আর কত দুর টেনে নিয়ে যাবেন? পোস্ট হাসিনা যুগেও মত এবারও কী নতুন করে আরো ১৫ বছরের জন্য প্রগতিশীলতার সাফাই নিয়ে নয়া সরকারের পক্ষেও  গুম-খুন-অপহরণ-আয়নাঘর-আইনবহির্ভুত কিলিং ইত্যাদির রাষ্ট্র হয়ে উঠতে সহায়তা নিয়ে হাজির হবেন????     

    [একটা আবেদনঃ এই লেখা ব্যক্তি হিশাবে কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়। আমি যা বলতে চেয়েছি তা মেনে নিবার কোন প্রয়োজনই নাই। কেবল ঠিকঠাক বুঝলে নিলেই আমি কৃতজ্ঞ হব! এসব প্রসঙ্গ হাজির করার একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে যে নয়া প্রসঙ্গগুলোকে আলাপ-আলোচনায় নিয়ে তোলা।]

     

     

    আপডেটঃ   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩; সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৬
    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০১ অক্টোবর ২০২৩, সকাল ১১ঃ ১৫

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    কানাডায় ‘র’-এর খুনঃ
    মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    গৌতম দাস
    ২৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৯
    https://wp.me/p1sCvy-52J

     

            …Canada row wake-up call on rival India

    কানাডায় নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাসকারি এক শিখ নেতাকে খুন করতে মোদির ভারত রাষ্ট্রের এক অন্তর্ঘাতমুলক খুনাখুনির প্রতিষ্ঠান ‘র’ [RAW] কানাডায় গিয়ে একাজ করে এসেছে। কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ, যিনি নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে মিথ্যা ‘তিনি যেন কূটনীতিক’ এই ছুপা পরিচয় নিয়ে কানাডায় ছিলেন। তিনি এই খুনের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে ইন্টেলিজেন্স তথ্য থেকে ধারণা করা  ও অভিযোগ উঠেছে। তাই তাকে, কানাডা সরকার ‘বহিস্কার’ [‘অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি ঘোষণা’ বা persona non grata] করে দিয়েছে।
    এই ঘটনা নিয়ে খোদ  আমেরিকা থেকেই বহু মিডিয়া রিপোর্ট  প্রকাশিত হয়েই চলেছে। এখনও আসছে। বিশেষ করে শুরুর দিকে রয়টার্সের খবরগুলো আর পরে  নিউ ইর্য়ক টাইমসে এই রিপোর্টটা সারা ফেলেছে। এতে প্রকাশিত ভাষ্য থেকে এর স্টোরির সারাংশটা এরকম যে, আমেরিকা প্রতিদিনই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অসংখ্য বিদেশি দুব্যক্তির কথোপকথনের মধ্যে বা-হাত-ঢুকিয়ে [intercept]  তা শুনে থাকে। কিন্তু এত তথ্যের ভিড়ে এক কথোপকথন (যেটার এক প্রান্তে ছিলেন এখন বহিস্কৃত কানাডায় কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ বলে অনুমান করা হচ্ছে) আমেরিকার হাতে এসে যায়। সেই তথ্যসহ আরো অনেক কিছুই আমেরিকা কানাডা সরকারের সাথে শেয়ার করেছিল। এমনিতেই সাধারণভাবে এদুই রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অনেক কিছুই তারা শেয়ার করে, পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে, যেন একই রাষ্ট্র এর দুই অংশ তারা।
    খুনের ঘটনাটায় ভুক্তভোগীর নাম [Hardeep Singh Nijjar] হরদীপ সিং নির্জ্জার,  যিনি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন এক শিখ রাষ্ট্র কায়েমের  – মানে খালিস্তান আন্দোলনের কর্মী; এই অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের রাজনীতির অনুসারী।
    অনেকের ধারণা হতে পারে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মানেই তা টেররিজম বা একালে জঙ্গীবাদের ক্যাটাগরিতে ফেলে একে নিন্দা করা যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আপনি যদি দাবি তুলেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য আমি রেফারেন্ডাম চাই – আর এটাই আমার দাবী সেক্ষেত্রে নেতিভাবে দেখিয়ে কোন শাসকেরই এথেকে  সুবিধা খাবার সুযোগ থাকে না। কানাডায় বসে শিখ কমিউনিটি এভাবে তাদের দাবি পরিচালিত করছে। যা সম্পুর্ণ আইনিভাবেও বৈধ আন্দোলন!
    হরদীপ সিং তিনি কানাডায় খুন হন চলতি বছরের গত জুন মাসে। এরপর পরেই ব্যাপারটা ভারত-কানাডার মধ্যে সরকারি পর্যায়েই আলোচনা হয়েছিল, তবে তা মিডিয়া থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি সদ্য সমাপ্ত গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত জি২০ এর সম্মেলন চলার কালেই কূটনৈতিক চক্রে কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রের মধ্যে একসাথে এবং সাথে মোদিকে নিয়েও কিন্তু গোপনে আলোচনাও হয়েছিল। (যেটা এখন জানা যাচ্ছে এমন সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তা মিডিয়ায় স্বীকার করছে)। বিশেষ করে ইন্টেলিজেন্স তথ্য শেয়ার করার  আরেক অপ্রকাশ্য গ্রুপ ‘৫ আই’ [5 EYE] – এই গ্রুপ যার নাম বাংলা করলে হয় পাঁচ চোখের গ্রুপ। আর এর সদস্যরা হল, আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। সোভিয়েতের সাথে কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আমলে এটা আমেরিকা, ইউকে এর মধ্যে এক গোপন চুক্তিতে প্রথম এর জন্ম হয়েছিল যার সাথে কালক্রমে অন্য তিন দেশ যুক্ত হয়েছিল। কেবল ২০১০ সালে এমন জোটের তথ্য প্রকাশ্যে এনে উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার জি২০ সম্মেলনে এই জোটও তা গোপনে বিস্তর আলোচনা করলেও  এ’থেকে কোন অগ্রগতি, দিশা বা পরের পদক্ষেপ কী তা বের না হওয়াতে এখন খোলাখুলি একে-অপরের  কূটনীতিক বহিস্কার-সহ, এখন আমেরিকা খোলাখুলি ভারতকে – খুনী কে তা বের করতে – কানাডিয়ান তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য প্রকাশ্যে শক্ত আহবানে এসে ঠেকেছে। যার মানে হল, ভারতকেই এখন ‘র’ এর দিক থেকে যারা যারাই এই খুনের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের জন্য কানাডার হাতে তুলে দিতে হতে হবে – এই হল সারা পশ্চিমের হয়ে ভারতকে আমেরিকান পরামর্শ ও অনুরোধ।  আর আমেরিকান অনুরোধ মানে এখন এটা ক্রমশ ভারতের জন্য বাধ্যবাধকতা হতে থাকবে!  আর বলাই বাহুল্য যে এটা হল আপোষে ব্যাপারটা সবচেয়ে কম আন্দোলিত করে সমাপ্তি টানার প্রস্তাব। এখন মোদি এতে একমত না হলে ক্রমশ ভারতের উপর চাপ বাড়বে এবং অবশ্যই এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদেশের সাথে ভারতের শত্রুতার চরমে যেতে থাকবে – এতে কোনই সন্দেহ নাই।
    আপনি একটা রাষ্ট্র মানে একটা রাষ্ট্রস্বার্থ হলেও অপর এক রাষ্ট্রের ভিতরে ঢুকে গোপনে সেদেশের নাগরিক কাউকে খুন করে আসতে পারেন না। এটা আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনেও ক্রিমিনাল অপরাধ। তাতে ঐ খুন হওয়া ব্যক্তি আপনার কাছে আপনার রাষ্ট্রের যতবড়ই শত্রু বিবেচিত থাক না কেন! এই যে অপর দেশ-ভুমিতে ঢুকে ঐ দেশের নাগরিককে হত্যা এটা সেই অন্যদেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!  এতে আইনি পথ ছিল মানে হতে পারত যে ভারত কানাডা সরকারের কাছে হরদীপ সিং এর নামে ভারতে মামলা আছে তাই তাঁকে ভারত সরকারের হাতে হস্তান্তরের দাবি করা। কিন্তু এখন যা হয়েছে তা হল কানাডার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলার মত এক্ট করে ফেলার কুটনীতিক-সামরিক দিক তো আছেই এছাড়াও হরদীপ সিং কে নিয়ে ভারত কোন বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণের আগেই  মানে ভারতে চোখেও তো  বিচার-প্রমাণ প্রক্রিয়া শেষে প্রমাণিত কোন  অপরাধী নয় তাহলে তাকে আগেই খুন করা হল কেন? মানে ভারত হরদীপ সিং কে কোন বিচার প্রক্রিয়ায় আনতেই চায় না যুদ্ধের এনিমি যেন এমন বিবেচনায় খুন করেছে!!!  অর্থাৎ বলা যায় মোদি সরকার তাঁকে নিয়েই বিচারের পথে না গিয়ে আইন বহির্ভুত [extra judicial] খুন বা কিলিং ঘটিয়েছে !! এটা তো ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি নির্দেশে এক কিলিং!!!! আর না হলে যুদ্ধের এনিমি হিশাবে ট্রিট করেছে – এর দুটোতেই মোদির ভারত অপরাধী!

    অন্তর্ঘাতমুলক [subversive] মানে কীঃ
    ভারতের বিদেশে গোয়েন্দাগিরি ও অপততপরতার সংগঠন হল ‘র’ [RAW]। এসব অপততপরতাকে বাংলায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা বলাই সঠিক! যদিও অনেকে এটাকে স্যাবোটাজ [sabotage] শব্দে ব্যাপারটাকে ধরতে চেষ্টা করেন।
    অন্তর্ঘাত শব্দটা ডিকশনারী মানে দেখলেই বুঝা যায় এটা কত ভয়ঙ্কর। এর ডিকশনারি মানে হল, ভিতরে থেকে বসবাস করেও গোপনে কারো ক্ষতি করা। এখানে ভিতরে বলতে যাকে খুন করবে বা ক্ষতি করবে তার দেশে কিংবা খোদ তাঁর বাড়িতেই মেহমান হয়েও এবং বন্ধু সেজে এমন খুন বা ক্ষতি করবে। অর্থাৎ শব্দটা নিজ থেকেই এক ক্ষতিকর শব্দ। এর উপর আছে এর বিশ্বাসঘাতক দিকটা।  এখানেই শেষ না, আরো আছে। সব মিলিয়ে সেটা মানে, মানুষের এমন কাজ হল চরম অনৈতিক ও অসৎ[immoral] কাজ। তাহলে  এটা তো এমনিতেই অধঃপতিত এক ধারণা  তবু, মানুষের সমাজেই তো এমন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের প্রতিষ্ঠান যেমন ‘র’-কে লুকিয়ে থাকতে/আছে পাওয়া যায়!!! হ্যা একথা সত্য তবে কেবল একটা জায়গায় অন্তর্ঘাত ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকও পাওয়া যায়। সেখানে আসছি পরে, এর আগে…।

    এর মূল ইংরাজি  শব্দটা হল সাবভারসিভ [subversive] যারই সংস্কৃত ঘেঁষা এক বাংলা করা হয় অন্তর্ঘাতমুলক; বা এমন কাজ বা ততপরতা। সাবভারসিভ এর আক্ষরিক মানে হল ‘উপড়ে ফেলা’ [overthrow something]।  আর এই উপড়ে ফেলার অর্থ সরকার উপড়ে ফেলা, ব্যক্তিকে উপড়ে ফেলা মানে খুন করা এবং তার বাসায় গিয়ে খুন করা সহ কোন সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠানকেই দমন করা, দাবড়ে দেয়া ইত্যাদি। ভারতের ‘র’ হল তেমনই এক সাবভারসিভ প্রতিষ্ঠান।
    সবচেয়ে বড়কথা যে কোন রাষ্ট্রের আইনের বিচারে ও চোখে সাবভারসিভ কাজটা সবসময়ই ‘অবৈধ’। তাতে এটাও সম্ভব যে, সাবভারসিভ কাজ মানেই প্রো-একটিভ মানে নিজেই আগাম “আইন নিজের হাতে তুলে” নিয়ে – উপড়ে ফেলার খুন জখম বলতে যা যা বুঝায় এর সবই করে আসা। আর মনে রাখতে হবে,  ‘র’ ভারতের হলেও সেই  ভারতেরই আইনেও ভিনদেশের কোন  ‘র’  সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ও এর ততপরতাও চলে তবে সেটাও অবৈধ। শুধু তাই না, ভিনদেশে গিয়ে ‘র’ এর মত প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা সে দেশের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!!  একারণে, ধরা যাক বাংলাদেশে কোন ‘র’ এর এজেন্ট এসে প্রকাশ্যে বলতেই পারবে না যে সে ‘র’ এর এজেন্ট। কারণ, ‘র’ সাবভারসিভ কাজের প্রতিষ্ঠান বলেই তা এক অবৈধ প্রতিষ্ঠান।  আপনি ‘র’ – এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এই পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের (বা যেকোন দেশের) ভিসা পাবার প্রশ্নই আসে না!  আর এই অনৈতিক ও অসৎ সংগঠন বলেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে আপনার অফিস বা বাসার ড্রয়িং রুমে প্রবেশ-বসবাস অনুমতি পাবে না!

    কোথায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকঃ
    উপরের পুরা প্যারাগ্রাফটাই অন্তর্ঘাত শব্দটার নেতি ও বিশ্বাসঘাতক দিকটা উন্মোচন করা হয়েছে এর প্রতিটা বাক্যে। তাহলে অন্তর্ঘাত কাজের এর পক্ষে এর সমর্থক কারা? কারা হয় এমন সমর্থক?

    এককথায় এর জবাব উগ্র জাতিবাদি চিন্তার লোকেরা!
    লক্ষ্য করলে দেখা যাবে উগ্র জাতিবাদি চিন্তা বা রাজনীতির যেখানে রমরমা বা ইতিহাসের যেসব যুগে তা রমারমা ছিল সেসব কালে উগ্র জাতিবাদি চিন্তার পাশে বসে থাকতে আমরা পেয়েছিলাম সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ও প্রতিষ্ঠানকে। ১৯৫০ সালের আগের সাড়ে তিনশ বছর ছিল পশ্চিমাদেশে বিশেষত ইউরোপ ছিল জাতিরাষ্ট্র বা উগ্র জাতিবাদি চিন্তার যুগ। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নানান কারণে এর অনেক কিছুই একেবারেই বদলে যায়। সবচেয়ে বড় কারণ, খোদ ইউরোপই জাতিরাষ্ট্র ধারণার রাষ্ট্র চর্চা বন্ধ করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়েছিল। এছাড়া আরও  পরে কোল্ড ওয়ারের আমলে তা কিছুটা দেখা দিলেও তা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতই থেকে যায়। এককথায় এর মূলকারণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু ও এর বিস্তার। কারণ, রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সাথে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতাও চালাবে আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও চালাবে এটা কঠিন। মানে এদুটো একসাথে চালানো খুবই মুশকিল। যেমন ইতোমধ্যেই কানাডা-ভারত আবার কানাডা-ইউকে যে বাণিজ্য আলোচনা চলছিল তা এখন পিছনে পরে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।    তাই যেমন,  সোভিয়েত ব্লক আর পশ্চিমাদেশ এদের মধ্যে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ছিল না, সম্ভবও ছিল। একারণে এদের – পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পর অন্তর্ঘাত্মূলক ততপরতা  চলতে পেরেছিল কোল্ড ওয়ার আমলে। তাই পশ্চিমাদেশে এটা কমে গেলেও এশিয়ায় বিশেষত ভারতে তা ব্যতিক্রম। দুটা কারণে। এক .  ভারতে এটা হিন্দুত্ববাদ এই উগ্রজাতিবাদে আচ্ছন্ন এক জাতিরাষ্ট্র। আর দ্বিতীয় কারণ, জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তান রেষারেষি সম্পর্ক। যদিও সাধারণভাবে সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত প্রতিষ্ঠান অনেক রাষ্ট্রই সক্ষম থাকে। কিন্তু  তা করে না, কেবল গোয়েন্দা ততপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ সে সক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখে। আর ভারত-পাকিস্তান এদের মধ্যেই এর ব্যাপক ব্যবহার – এটাই গুরুত্বপুর্ণ জায়গা। এর উপর এসব প্রতিষ্ঠানের অন্য দেশে গিয়ে অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ঘটানোর পরে দেখা যাবে কেবলমাত্র উগ্র জাতিবাদি দেশেই দেখা যাবে যে শাসক একাজকে গৌরবের বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বা ওদেশের মিডিয়া প্রকাশ্যে এটা গৌরবের কাজ বলছে।

    তাই উগ্র জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদ- হিন্দুত্ববাদী ভারত আর এই ভারতের প্রতিষ্ঠান র-এর কোন ততপরতা পাকিস্তানে ঘটিয়ে এলে তা ভারতের মিডিয়া প্রকাশ্যে তাতে উতযাপনের বিষয় হিশাবে তুলে ধরে থাকে।
    কানাডায় হরদীপ সিং-কে খুন করা আসার প্রেক্ষিতে কলকাতার আনন্দবাজার ঠিক একাজটাই করেছে।

    কলকাতার আনন্দবাজারের র-এর অন্তর্ঘাতি ততপরতার পক্ষে প্রকাশ্য উতযাপনঃ
    উপরে বলেছি, অনেক রাষ্ট্রেরই  সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত সক্ষম প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন ততপরতায় তারা যায় না বা এনিয়ে কথিত দেশপ্রেমি উতযাপন তারা করে না। সম্ভবত কাজটার মধ্যে অনৈতিক, অসততার দিক আছে তা খেয়াল রাখে বলে। কিন্তু মফস্বলী কলকাতার কাছে এই খারাপ দিকটার কথা খেয়াল রেখে বা ভেবে এথেকে দূরে থাকার মত কোন ক্রিটিক্যাল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে নাই। এর উপর ক্ষমতায় যখন মোদি তখন সে আরেক হিন্দুত্ববাদী রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলের র-এরও আবার বিশেষ অন্তর্ঘাত-বাহিনী (‘টিম জে’) বানিয়ে কী করে পাকিস্তানে অপ-ততপরতা চালিয়ে এসেছিল সেই কথিত গর্বের কাহিনী এখন ছেপেছে আনন্দবাজার। অন্তর্ঘাত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজটা যেন খুবই গর্বের তা একালেও এই পত্রিকা পাঠকের মনে এখন হরদীপ হত্যার সময় যাতে জনমত কানাডার হত্যাকে গৌরবের মনে করে সে উস্কানি তুলতেই আনন্দবাজারের এই উদ্যোগ। এর শিরোনামেই ব্যাপারটা খুবই গৌরবের এমন উস্কানি তুলতে লেখা হয়েছে – “পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে শত্রু নিধন, খলিস্তানিদের ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর গোপন তাস ছিল ‘টিম জে’ “। এই ‘টিম জে’ হল র-এর ভিতরেই আরেক বিশেষ বাহিনী যা রাজীব গান্ধী তৈরি করিয়েছিলেন। মনে রাখতে পারি ইন্দিরা গান্ধী খুন হয়েছিলেন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে শিখদের কাছে পবিত্র “স্বর্ণমন্দিরে হামলা ও তছনছ করে সেখানে আশ্রয় নেয়া সকল আন্দোলনকারীদেরকে হয় হত্যা করেছিল বা বের করে গ্রেফতার করেছিলেন। আর স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশনের বদলা নিতেই ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর তারা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। রাজীব গান্ধীও প্রায় একইভাবে শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে খুন হয়ে গেছিলেন। এমনকি খোদ দিল্লিতেই ইন্দিরার হত্যা হয়ে যাবার কয়েকদিন পরে শিখ-জাতির বাসিন্দা পেলেই তাদের উপর কংগ্রেসিরা এথনিক ক্লিনজিং করেছিল!

    সাধারণভাবে বললে, ভারতে বারবার বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যা হাজির হচ্ছে জন্মের সময়ে ভারত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রগঠনে কিছু মারাত্মক ত্রুটির কারণে। নেহেরুর রাজনৈতিক চিন্তার বৈশিষ্ট হল ১। এটা কলোনিশাসক মডেল। জবরদস্তিতে ঘাড়ে চড়তে হবে আর শুষে নিতে থাকতে হবে  তাতে সেটা আভ্যন্তরীণভাবে কেন্দ্রিভুত ক্ষমতার নামে অথবা পড়শির উপরে চড়াও ধরণের হলেও একই ফর্মুলা। ২। ভারতের রাজ্যগুলোর উপরে একমাত্র তথাকথিত কেন্দ্রের কড়া নিয়ন্ত্রণেই ভারতকে এক রাখা সম্ভব। এটা নেহেরু বিশ্বাস করতেন। আর এরই প্রতিফলন তিনি ঘটিয়ে রেখেছেন যা এখনও বর্তমান ভারত রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে।   আর একারণেই পালটা প্রতিক্রিয়ায় সব সময় কোন না কোন রাজ্যে ভারত ভেঙ্গে রাজ্যগুলোর আলাদা হবার উপক্রম!! উল্টোদিক থেকে পড়লে অন্যভাষায় বললে, এটাই বিচ্ছিন্নতাবাদ। আর তা ঠেকাতে উগ্র জাতিবাদী প্রপাগান্ডা যে বিচ্ছিন্নতাবাদ মানেই অপরাধ! সোজা ভাষায় বললে, নেহেরুর কাছে শাসন বলতে কলোনিশাসক যেভাবে ভারতকে অধীনস্ত রেখে শাসন করেছিল, সেটাই মডেল। এর বাইরে ১৭৭৬ সাল থেকে স্বাধীন আমেরিকা যে ফেডারল বলে আরেক রাষ্ট্র ধারনার হাজির ও সবচেয়ে স্টেবল-থিতু ধারণা বলে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে এটা তিনি বেখবর। বরং বৃটিশেরা চলে গেলেও তিনি নেহেরুই যেন তখনও বৃটিশ রানীর ভাইসরয় এই মনে করে তিনি ভারত রাষ্ট্র কাঠামো ও শাসন সাজিয়েছেন।
    আবার এর সাথে ছিল উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী ও এর কথিত অর্থহীন দেশপ্রেম!!! আর সেটাই তবে আরো উগ্র উপস্থাপনায় একালে মোদির আমলে তা হয়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদী শাসনের প্রধান হাতিয়ার। আর তা থেকেই কথিত হিন্দুত্বের দেশপ্রেম এর আবেগ তুলে ভোটের বাক্স ভরা। তাই শিখ কমিউনিটির উপর যে নিরবিচ্ছিন্ন নিপীড়ন এটাকেই মিথ্যা করে ইতিবাচকভাবে হাজির করতে উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেম ছড়িয়ে দেয়া উস্কে তোলা – একাজটাই করেছে আনন্দবাজার। তাতে আরেক দেশে গিয়ে গোপন ও গুপ্ত হত্যা করে আসা যে আন্তর্জাতিক অপরাধ এমন কোন বোধ তাদের নাই। অথচ ভারতে  ২০০৮ সালে পাকিস্তানের ২৬/১১ মুম্বাই হামলা সেই একই ঘটনার উলটা পিঠ। মানে একই জিনিষ ভারত করলে তা দেশপ্রেম ও বীরত্ব; কিন্তু পাকিস্তান করলে সেটা অন্যায় আর মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ দিয়ে একে প্রতিবাদ ও বিচার করে দেখাতে হবে!!! এই হলো উগ্র জাতিবাদের মূলনীতি।  সেটা অনুসরণ করেই আনন্দবাজার বলতে চাচ্ছে কানাডায় গিয়ে হরদীপ সিং-কে হত্যা এই অন্তর্ঘাতি ততপরতা এটা ভারতীয় দেশপ্রেম এবং এটা যেন বৈধ এবং ভারতীয় দেশপ্রেম ও বীরত্বের নজির! জনমনে এই উগ্র হিন্দুত্বের জাতিবাদ এবং এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেছে আনন্দবাজার যাতে তারা কানাডায় গিয়ে হত্যা করাটাকে অন্যায়-অবৈধ না একেবারে উলটা দেশপ্রেমের বীরত্ব হিশাবে দেখে!

    মফস্বলি আনন্দবাজারের বেকুবিটা হল, তারা ভেবেছে সারা দুনিয়াটাই যেন মুসলমানের পাকিস্তান তাই মুসলমানদেরকে তো যা খুশি শাস্তি দেয়া যায় এই হলো অনুমান! তাই পাকিস্তানে ভারতের র-এর ‘টিম জে’ যেটা করতে পেরেছে সেটা যেন সে কানাডাতেও করতে পারবে!! এটা যেন কোন ব্যাপারই না!!! এই হলো তাদের হিন্দুত্ববাদের গাধামি! তারা বুঝেই নাই যে কানাডার গায়ে হাত মানে এটা অলিখিতভাবে আমেরিকার [সাদা ককেশীয়] গায়ে হাত তোলার সামিল! এর উপর কানাডা আমেরিকার সাথে জি৭ জোটের সদস্য! শুধু তাই নয় কানাডা ন্যাটোর সদস্য এবং ইন্টেলিজেন্স শেয়ার গ্রুপ ফাইব আই [Five EYE]  এর সদস্যও বটে! তাই মোদি যদি আমেরিকান “সহযোগিতার প্রস্তাবে” রাজি না হন তবে এই বিরোধ ক্রমশ চরমে না উঠে উপায় থাকবে না।

    ওদিকে মোদি হরদীপ সিং হত্যার পথে পা বাড়িয়েছেন আরেক কারণে! শুধু ভারত দেশের বাইরের হিসাবের কথাটা হল, পশ্চিমাদের চীন-ঠেকানোর কাজে ভারত গুরুত্বপুর্ণ পিলার ও বন্ধু তাই সেই ভারত এক্ষেত্রে কানাডায় গিয়ে খুন করেও পার পেয়ে যাবে; এছাড়া এতটুকুই না। মোদি আসন্ন আগামি নির্বাচনে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে শায়েস্তার পদক্ষেপ নিয়ে বীরত্ব আর গর্ব প্রকাশ করে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জজবা উঠাবে -ভোটারদের আবেগী করেও তুলবে যাতে এর প্রভাব মোদি-বিজেপির ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়!  কাজেই আমেরিকার দাবি যে “কানাডার সাথে  তদন্তে ভারতকে সহযোগিতা” এই আহবান – মোদির এতে সায় দেয়া এটা প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব একটা ঘটনা হয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি! আর সেক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিমের কাছে ভারত যতই চীন-ঠেকানোর দেয়াল- এই গুরুত্বের দেশ হোক না কেন মোদির ভারতকে পশ্চিম এক্ষেত্রে তারা পাচ্ছে না!!! সে সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি!

    আবার অন্যদিকে; আগামি বছরের শুরুতেই এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন, তাতে কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম; যা কানাডায় খুনের ঘটনার বহু আগে থেকেই একটিভ হয়ে ছিল। মোদির হিন্দুত্ববাদের এক ব্যবহারিক রূপ হল মুসলমানের উপর চরমতম বৈষম্য ও পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখার নানান বেআইনি পদক্ষেপ নেয়া – অন্যদিকে ভয় আর প্রলোভন দেখিয়ে  বিচার বিভাগকেই নিস্ক্রিয় রাখা, বদলি বা ডিপার্টমেন্ট বদল পর্যন্ত ঘটিয়ে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনকে স্থবির রাখা -সহ সবকিছু করে মোদি এক রামরাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন। আর এসব করেই আবার বাড়তি হিশাবে মুসলমান ঘৃণা বা শিখদের প্রতি ঘৃণা উস্কে তা বিক্রি মানে, এভাবে ভোটের বাক্স ভরার নীতিতেই মোদি গত দশবছর ধরে ক্ষমতায় টিকে আছে।
    কিন্তু এখন মোদির সেসব পরিকল্পনা ও ছকের কী হবে, কী প্রভাব পড়বে সেসবও দেখার বিষয়!  আসন্ন নির্বাচনের সময়ে, কানাডায় অন্তর্ঘাত কাজ যে যুদ্ধ ঘোষণার সমান কাজ তা হলেও – সেটা করা মোদির ঠিক আছে এমন জোশ তুলে আনা  – এটামোদির বিজেপি করতে যাবে আর টিকাতে পারবে?  আবার মোদি যদি পেরে যায় তাহলে এই মোদিকে বাইডেনের নেতৃত্বের পশ্চিম কী বোকার মত দাঁড়িয়ে দেখবে??? এসবই হয়ে উঠবেই আগামির ঘটনাবলীতে মুখ্য নির্ধারক সব প্রশ্ন!!!

    সর্বশেষঃ একটু আগে প্রথম আলো জানাচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পালটা কানাডাকে অপরাধীদের আশ্রয় দিবার অভিযোগ করেছেন। এর অর্থ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমের সাথে কোন আপোষের পথ বের করার পথে মোদির ভারত হাটবে না, যাচ্ছে না।

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; দুপুর ০১ঃ ৪৫
    সর্বশেষ আপডেটঃ  

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়

    প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়
    গৌতম দাস
    ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৩১
    https://wp.me/p1sCvy-51v

     

     

     

                         PROGRESSIVE LOGO

    শুধু প্রগতি [progress] শব্দটার একটা অর্থ অগ্রগতি। মানে, কোন একটা কিছু আগাচ্ছে কিনা, ভাল হচ্ছে কিনা, উন্নত হচ্ছে কিনা, ইতিবাচক রূপান্তর হচ্ছে কিনা ইত্যাদি এমন অর্থে।  এছাড়া শব্দটা মানুষের উপর প্রয়োগ-ব্যবহার করতে চাইলে মানে মানুষের গুণ-বৈশিষ্ট হিশাবে ব্যবহার করতে চাইলে রুট শব্দটা একটু বদলে লিখি প্রগতিশীল [progressive]।  এর একটা সাধারণ অর্থ হতে দেখা যায় যে যিনি সংস্কার চান মানে, রক্ষণশীল [conservative] নন বা পুরানাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান না, এমন অর্থে। তবুও আমরা যে প্রগতিশীলতা খুঁজছি এগুলো তা না।   কারণ, আমরা এখানে খুঁজছি রাজনীতির মাঠে বা পাড়ায় প্রগতিশীল বা প্রগ্রেসিভ চিন্তা বা দল বলতে ঠিক কী বুঝায় তা বুঝতে।
    সবার আগে জানিয়ে রাখি প্রগতিশীল শব্দটা আবার একেক ভৌগলিক ইতিহাস ভেদে অর্থের ভিন্নতাও আছে। আমাদের অনুসন্ধান ভারতীয় উপমহাদেশ বা অখন্ড বিবেচনায় ভারতের ভুগোলে মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে আলোচনা।  এর বাইরে বৃটিশ কালচারে একালের আলোচনায় রক্ষণশীলেরাও প্রগতিশীল হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। যেমন, বিবিসির তবে (ইংরাজি বিবিসি) এর এক রচনার শিরোনাম হল, So, what exactly is ‘progressive’ in politics? এরকম! আর সেখানে …while the Lib Dem/Conservative coalition were “new progressives”. এমন বাক্যও পাওয়া যাবে। [এখানে Lib বলতে Liberal এর সংক্ষিপ্ত রূপ আর Dem বলতে Democrat বুঝতে হবে ]। স্বভাবতই এগুলো ব্যতিক্রম বা সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রকাশিত অর্থ, এভাবে বুঝতে হবে। তবে আমরা এত জটিলতায় না গিয়ে প্রগতিশীল এর অর্থ আমাদের অঞ্চল মানে বৃটিশ-ভারতে সীমাবদ্ধ থেকে কথা বলব। আবার আমেরিকান প্রগেসিভ বলেও ধারণা আছে। এতসব দিকে আমরা এখন যাব না।

    প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়ঃ
    এর আগের লেখায় যেকথা দিয়ে শুরু করেছিলাম যে  – আজকাল অনেকে “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” নিয়ে বক্তৃতা হচ্ছে, করছেন। এটা কীসের ফেনোমেনা??
    সরাসরি বললে এটা “প্রগতিশীলতা”। যা ঠিক আধুনিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের আলাপ নয়। কিন্তু এখন কেন?
    অনুমান করা ধারণাটা হল, প্রথমত প্রগতিশীলেরা হল আওয়ামী লীগ বা হাসিনার ক্ষমতার, গত ১৫ বছরের ক্ষমতার পক্ষে মূল সাফাইদাতা। ক্ষমতা মানে অবশ্যই ফিজিক্যাল বলপ্রয়োগর সক্ষমতা। এমন সক্ষমতায় যে ক্ষমতায় আসীন। কিন্তু এর বাইরে আরেকটা ক্ষমতাও দরকার, যেটা আবার ঠিক ফিজিক্যাল বলপ্রয়োগ নয়।  সেটা হল ক্ষমতায় যে আছে তার ক্ষমতাটা জায়েজ বা জাস্টিফায়েড [justified] তা দাবি করা, সাফাই দেয়া; ফলে এটা ন্যায্য এমন কথা বলা – এটাকে আমরা সাফাই ক্ষমতা বলতে পারি। সাফাই ক্ষমতা মানে ক্ষমতাসীনের পক্ষে শক্ত সাফাই-ও থাকতেই হবে।  এমন শক্ত সাফাই কথাও ক্ষমতাসীনের জন্য খুবই দরকারি। বলপ্রয়োগের সক্ষমতার মতই সমান দরকারি।  ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে যে কেউ ক্ষমতা ঠিকই পেয়েছিল কিন্তু ক্ষমতায় থাকতেই পারে নাই, রাখতে পারে নাই। কারণ এই ক্ষমতাটা যে ন্যায্য বা একটা ইনসাফের ক্ষমতা এমন কোন সাফাই সে তৈরি করে নেয় নাই বা তুলে ধরে দেখাতে পদক্ষেপ নেয় নাই। হয়তবা খেয়ালই করে নাই। তাই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। অতএব যেকোন বলপ্রয়োগের সক্ষমতার সাথে সাথে একটা সাফাই ক্ষমতা পাশাপাশি থাকাও সমান জরুরি বিষয়। হাসিনার গত ১৫ বছরের ক্ষমতাটাকে সমাজের যারা সাফাই ক্ষমতা-ও হয়ে তা সরবরাহ করে টিকিয়ে রেখেছে এরাই প্রগতিশীল, রাজনৈতিক পরিচয় প্রগতিশীলতা।
    তবে এখানে সেসব কথা তোলা তাদেরকে অভিযুক্ত করা যতটা না এর চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক অনুভবে [social realization] তা নিয়ে আনার জন্য এবং তা অবশ্যই খুবই ইতিবাচকভাবেও হতে হবে।

    কিন্তু এতে প্রগতিশীলেরাই জায়গা পেয়েছিল কেন?
    কারণ সেটা ওয়ার অন টেররের আমল, হাসিনার ম্যান্ডেটে ছিল তাদের ‘টেররিজম’ সামলানো। হাসিনা্র ক্ষমতা তাই এর একটা আজীব বাংলাদেশি ভার্সান বের করে নিয়েছিল। সেটা হল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে এর আড়াল নিয়ে এই ক্ষমতাটা যেন এই বুড়াকালেও বসে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও বিরোধিতা করছে – এই ঝুটা ভাব ও সাফাইয়ের আড়ালে কাজটা করতে চেয়েছিল। এতে আরাম হবে আর এছাড়া এই স্টাইলটা ইউনিক হবে;  কারণ এতে প্রতিদ্বন্দ্বি বিএনপির চেয়ে হাসিনার লীগকে আমেরিকার কাছে আগিয়ে রাখবে – এমন ইচ্ছা-অনুমানও ছিল। তবে একটা জিনিষ পরিস্কার ছিল যে  এই আড়ালে বসে এই ক্ষমতাটা সাধারণভাবে ইসলাম কোপাবে। আর সেটা করবে “জঙ্গীবাদ দমনের” নামে।  বলা বাহুল্য এটাকে  “ওয়ার অন টেররের কাজ” মনে করে আমেরিকা এতে সমর্থন দিবে বা বাধ্য হবে সে অনুমানও ছিল। তবে পরিণতিতে এখন যেটা পরিস্কার যে এতে একটা দানব ক্ষমতা হিশাবে হাসিনার উত্থান হয়েছে। যাকে অনেকে ফ্যাসিজম-সহ অনেক নামেও ডাকছেন। কিন্তু এটা আসলে এক একচেটিয়া জবাবদিহিতা-হীন ভয়ঙ্কর ক্ষমতা।  তাই হাসিনা প্রথম থেকেই দানব ক্ষমতা হয়ে উঠার পর থেকেই সে এরপর থেকে আরেক ভুমিকাতেও হাজির হয়ে আছে। তা হল তাঁর এমন ক্ষমতার যত রাজনৈতিক বিরোধী বা প্রতিদ্বন্দ্বি আছে, তারা ইসলাম সম্পর্কিত হোক বা হা হোক, তারাও জঙ্গি এই অজুহাত তুলে তাদের উপরেও গুম, খুন অপহরণ ইত্যাদি অবাধে করে গেছেন হাসিনা। যাতে নিজ ক্ষমতা নিষ্কন্টক বা কাঁটাহীন ভাবে পাওয়া যায়!!!
    আর ওদিকে এতে প্রগতিবাদের ভুমিকাটা হল,  যেহেতু এটা  “জঙ্গীবাদ দমনের” নামে  সাধারণভাবে ধর্ম কিন্তু আসলে কেবল ইসলাম কোপানো – তাই এর পক্ষে সবচেয়ে ভাল সাফাইদাতা হিশাবে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদেরকেই  একাজে হাসিনা তাদের বেছে নিয়েছিল। এককথায় বললে, কাজটা হাসিনা করেছিলেন তাদের নানা ধরণের ফেবার করে – অর্থ, সুযোগ সুবিধা, গুরুত্ব ও সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব দিয়ে। এদের ততপরতার প্রতীক বলা যায় “শাহবাগ আন্দোলন” বা যা থেকে এরা “শাহবাগী” এই ধারণা সমাজে আছে। যদিও শুরুতে এরা হাসিনার পোষ মানতে অস্বীকার করেছিল; কিন্তু তাদেরকে নিরাপত্তাহীনতা শঙ্কা বা খুন হয়ে যাবার ভয় দেখিয়ে ক্রমশ নিজ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এনেছিল।

    আমাদের এদিকের প্রগতিশীলতার প্রধান বৈশিষ্ট হল এরা ইসলাম কোপাতে সিদ্ধহস্ত; যদিও মুখে বলে তারা যেকোন ধর্মবিরোধী। যেটার কার্যকর রূপটা হল এরা চরম ইসলামবিদ্বেষী ও ঘৃণা ছড়ানি; যেটা কে একটা রেসিজমের পর্যায়ে তারা নিয়ে গেছে, সে খবর রাখেনি। তবে এই প্ররগতিশীলতার মূল উৎস কী – মানে কী গ্তারাউন্ড ওয়ার্ক ছিল যেকারণে এরা এমন প্রগতিশীল বলে সহজে হাজর হতে পেরেছিল তা খুঁজলে,  ১৭৯৩ সালের জমিদারি আইন বা এক নয়া ‘ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা’ চালুর পরে যেটা মোটামুটি ১৮০০ সালের পর থেকেই ক্রমশ এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণীর গড়ে উঠেছিল এরাই বৃটিশ সরকারের অধীনস্ত থেকেও লোকাল অর্থে  সামাজিক-অর্থনৈতিক-কালচারাল দিকনির্দেশনার প্রধান নির্ণায়ক ক্ষমতা হয়ে উঠেছিল। মূলত এই জমিদার-হিন্দুর কালচারাল আধিপত্য ও নির্দেশনা, মানে তাদের হুকুম চর্চার প্রতীক হয়ে উঠেছিল সাম্প্রদায়িকতা বলে এক ধারণা।   প্রথম কথা হল, জমিদার শাসনে মুসলমানেরা হিন্দুদের ( উভয়েই প্রজা হলেও) সমান না – এই হল জমিদার শাসনের প্রথম ভিত্তি। সমান না কারণ, মুসলমানেরা নাকি বাঙালি নয় – এই ফতোয়া। যে এখনো কলকাতার সবচেয়ে ডমিনেটিং প্রায় একছত্র বয়ান; আর সেটার খাতক বিজেপির তো বটেই তবে শুধু বিজেপি নয়, অনেক তৃণমুল সমর্থক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকও এমন বয়ানের আজও অনুসারী।  এমনকি সরকারী স্কুলের শিক্ষক কিন্তু মুসলমান শিক্ষক বলে সে কলকাতায় হোটেলে থাকতে পারে নাই – এমন পত্রিকা রিপোর্টো আছে।  তবে মুসলমানেরা নাকি বাঙালি নয় এই বৈষম্যপুর্ণ অবস্থান এটাই ছিল জমিদার হিন্দুর মূল সাফাই।  তাহলে সাম্প্রদায়িকতা এই সাইনবোর্ডের তলে কী আছে? এটা বুঝাতে চায় যে  মুসলমাত্রই সে সামাজিক অবস্থানের বিচারে যেকোন হিন্দূর নিচে, সবচেয়ে নিচাজাতের হিন্দুরও নিচে। এখন এদের তো পাতে তোলা যায় না -অপাংক্তেয় করে রাখলেও তাদের বিপদ হবে ভেবে জমিদার-হিন্দুরা নয়া কিছু শর্ত তৈরি করেছিল – এটারই সাইনবোর্ড শব্দ হল অ-সাম্প্রদায়িকতা! মানে মুসলমানদেরকে অ-সাম্প্রদায়িক হতে হবে এই হল সেই শর্ত।।  তাদেরকেও স্কুল-কলেজে শিক্ষা বা চাকরি ইত্যাদি সামাজিক সুবিধা দেয়া যেতে পারে, হিন্দুদের পাশে বসতে, একই ঘরের ভিতর বসে চাকরি করতে দেয়া যেতে পারে যে শর্ত সেটাই কথিত অ-সাম্প্রদায়িকতা। তবে দেশভাগের পরে ব্যাপারটাতে লজ্জায় পরে প্রগতিশীলেরা এর অর্থ কিছুটা এক্সটেন্ড করে নেয় যে হিন্দু-মুসলমানের ভিন্নতা অসমান এরা এনিয়ে যে কথা বলে সেই সাম্প্রদায়িক। যেটা কার্যত বাংলাদেশের উপরেই প্রযোজ্য হয়েছে, কলকাতায় যার কোন আছর বা ইম্প্যাক্ট নাই। এককথায় কালচারাল দিক থেকে মুসলমানদেরকে হিন্দুদের সামাজিক সব অভ্যাস-রীতি রেওয়াজের ভিতরেই মুসলমানদেরকে থাকতে হবে। এই হল অসাম্প্রদায়িকতা যার সার কথা দাড়িয়েছে এখন জমিদারি থাক না থাক, জমিদার-হিন্দুর বয়ান ও দাবি যে তাদের আধিপত্যের মধ্যে মুসলমানদের থাকতে হবে।  কোন মুসলমানি চিহ্ন প্রদর্শন করা যাবে না। একটু ভেঙ্গে বললে দুটা ধর্মীয় অভ্যাস পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধার সাথে থাকলেও তারা একে অপরকে প্রভাবিত করবে কিন্তু তা ন্যাচারালি ন্যাচারাল – এটা হতেই পারে। কিন্তু এটা তা নয়। এটা একের উপরে অন্যের ঘোষিত আধিপত্য যে, মুসলমান (তুমি বাঙালি না) তুমি আমার (আমি হিন্দু) সমান নও, অধস্তন। এই চরমতম বৈষম্যের সমাজ ও এর চর্চার ভিতর দিয়েই জমিদার হিন্দুর আধিপত্য ও শাসন চলেছিল, অন্তত একেবারে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ ও পাকিস্তান কায়েমের আগে পর্যন্ত। এরপরে ১৯৫১ সাল থেকে জমিদারী ব্যবস্থা উচ্ছেদ হয়ে গেলে।

    কিন্তু তবু এরা হেরেও হারতে চায় নাঃ
    কিন্তু তবু জমিদার হিন্দুর কালচারাল বয়ান এটা হেরেও হার স্বীকার করতে চায় না। সে ভোল বদলায়, সে কমিউনিস্ট হয়ে যায়, দলে যোগ দিয়েছিল। কেন?
    কারণ, ততদিনে জমিদা্ররি হারানোর পরে জমিদার-হিন্দুর কালচারাল ধারা জেনে যায় টের পায় যে  ১৯১৭ সালে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম কমিউনিস্ট, রাশিয়া (পরে ১৯২২ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন) এরা ধর্ম [অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটি] কোপায় ক্ষমতায় এসেছিল। ফলে এই কমিউনিস্ট রাজনীতি তাদের খুব পছন্দ হয়ে যায়। তাই কমিউনিস্ট ভেক ধরলে সে এর আড়ালে বসে ইসলাম কোপাতে পারবে। তাতে যতটুকু হারানো আধিপত্য ফেরত আসে।
    এখানে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে – না ১৮০০ সালের পরে উত্থিত জমিদার হিন্দু শ্রেণী অথবা না ১৯১৭ সালের কমিউনিজম – এরা কেউই রাজনৈতিক অধিকারে, সামাজিক মর্যাদায় সবাই সমান – এই রাজনীতির খাতক বা গ্রাহক তারা নয়।  স্পষ্ট বললে, নাগরিক মাত্রই সবাই সমান – সমান অধিকারের এমন চিন্তা এদুই রাজনৈতিক শক্তির কাছে এটা তাদের কোন এজেন্ডাই নয়। এরা বেখবর  শুধু না, এরা খাতক নয়, এটাই হওয়া উচিত মনে করে। এককথায় বৈষম্যহীন কোন রাজনৈতিক সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা তাদের কাম্যই না।

    কিন্তু আমরা দেখি, জমিদার হিন্দুর কালচারাল বয়ান আকড়ে যারা ১৯৪৭ সালের পরের সমাজে নতুন করে কমিউনিস্ট পার্টির নামে সংগঠিত হয়েছিল – এদের প্রথম সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি হলেও, ১৯৫১ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের আমলেই সেই কমিউনিস্ট দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কারণ, তারা অবিভক্ত পাকিস্তানে সর্বপ্রথম এক সামরিক ক্যু – এভাবে ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে ব্যার্থ হয়েছিল। যদিও এই ততপরতার কেন্দ্রটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে পুবে নয় আর তা ছিল মূলত সেকালের কাশ্মীর রক্ষা করতে  যাওয়া পাকিস্তানের সামরিক অংশ।  তাই তারা আবার দল পাল্টায়। তখন এরা এর আগেই ১৯৪৯ সালে গঠিত হওয়া আওয়ামী লীগে তবে ১৯৫১ সালের পর থেকে তাতে যোগ  দেয়া শুরু করেছিল। এরাই তখন থেকে কমিউনিজমের একটা সফট ভার্সান এবং শিথিল ও বৃহত্তর রূপ হিশাবে যে নয়া শব্দ ও ধারণাটা চালু করেছিল, মোটাদাগে সেটাই হল প্রগতিবাদ বা প্রগ্রেসিভ চিন্তা।
    পরে ১৯৫৭ সালের প্রধানমন্ত্রী সোহরওয়ার্দির (সংক্ষিপ্ত এক বছরের শাসন আমলে) কমিউনিস্টেরা আওয়ামি লীগ ছেড়ে এবার (আওয়ামি লীগের সভাপতি) ভাসানীর নেতৃত্বে আলাদা দল করে ভাগ হয়ে যায় যেখানে নয়া দল হয় – ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি এটাই সংক্ষেপে ন্যাপ [NAP]।  আরো পরে কমিউনিস্টেরা মস্কো-পিকিংয়ে ভাগ হয়ে গেলে ১৯৬৪ সালে (পুর্ব-পাকিস্তান) বাংলাদেশের মস্কো সমর্থিত অংশটার নাম হল ন্যাপ (মোজাফফর); পিকিং সমর্থিত অংশটা ভাসা্নী ন্যাপ।

    কমিউনিজম ও প্রগতিবাদঃ
    উপরে বলেছি,কমিউনিজমের একটা সফট ভার্সান এবং শিথিল ও বৃহত্তর রূপ হিশাবে নয়া শব্দ ও ধারণাটা হল প্রগতিবাদ বা প্রগ্রেসিভ চিন্তা।  এছাড়া আরেকটা দরকারি দিক ছিল।  শুরুতেই বলেছি, কমিউনিজমের সাথে মর্ডানিজম বা আধুনিকতার কোন সম্পর্কও নাই। কার্ল মার্কস আধুনিকতা নিয়ে দু’লাইনও লিখেন নাই। এবং আধুনিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কেও। বরং আমরা মনে রাখতে পারি,  মার্কসের কাছে রাষ্ট্র হল শ্রেণীর রাষ্ট্র।  যার সোজাসাপ্টা মানে হল, একটা আধুনিক রাষ্ট্রে সবাই নাগরিক, বৈষম্যহীন সমান নাগরিক, সমান অধিকারের নাগরিক এসব কথা তিনি আমল করেন নাই।  তাই মার্কসের চিন্তায় নাগরিক, অধিকার, স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা -ইত্যাদি কোন ধারণাই নাই। তাই কমিউনিস্ট চিন্তায় এমনকি রাষ্ট্রগঠন, কনষ্টিটিউশন, কনষ্টিটুয়েন্ট, জনপ্রতিনিধি ইত্যাদি কোন ধারনার বালাই নাই; দরকার হয় নাই। আছে কেবল, ক্ষমতাসীন “শ্রমিক শ্রেণী” – আর এর এক পার্টি ধারণা যা দিয়ে পার্টি যাকেই বুর্জোয়া আখ্যা দিবে তাকে (আর কোন বিচার-আদালত লাগবে না) গুম, খুন, অপহরণ বা কোন ‘আয়নাঘরে’ বন্দি করে রাখা, গায়েব (disappeared) করে দেয়া, পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া ইত্যাদি সব জায়েজ।
    তবে এতে আরেক সমস্যায় পড়েছিল তারা মানে, ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা (মানে এটা মার্কস নয় এমনকি ঠিক লেনিনও নয় ব্যবহারিক কমিউনিস্ট মুখ্য নেতা হলেন স্তালিন) তাই দুনিয়াতে ছেয়ে থাকা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের উপস্থিতি ও ততপরতার সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে, বিশেষ করে আমাদের মত দেশে,  মূল কমিউনিস্ট পার্টি কে সাথে নিয়ে তো  সমাজে হাজির হওয়া মুশকিল ফলে কাজে আসবে না। এছাড়া কমিউনিস্ট হলে নাকি সাধারণ মানুষের সব সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে যাবে এধারণাও যথেষ্ট প্রবল ফলে ভীতিকর ছিল। সব মিলিয়ে এসব ক্ষেত্রে তাই (কমিউনিজমের লিবারেল ভার্সান) নরম করে বলা বা হাজির হওয়া – এটাই প্রগ্রেসিভ পার্টি ও প্রগতিবাদ খুব কাজ দিবে এখানে মনে করা হয়েছিল। মোটাদাগে এসব থেকেই প্রগতিবাদের উত্থান। এই অর্থে ন্যাপ এক প্রগেসিভ পার্টি। 

    কিন্তু তাতে কী? এর ফলে আধুনিকতার সাথে প্রগতিবাদের সম্পর্ক কী – এর জবাব মিলেছে বা দেয়া গেছে কী? অবশ্যই না, একেবারেই না। কারণ প্রগতিবাদী চিন্তার উৎস থেকে গেছে কমিউনিজম এবং বিশেষ করে কমিউনিজমের ধর্মবিরোধিতার বৈশিষ্ট। আর বিপরীতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের ধারণা এর মূল ভিত্তি ব্যক্তিবোধের উত্থান থেকে – পরে নাগরিক-বোধ, জনগণ, জনপ্রতিনিধি, মানুষের মর্যাদা, ইনসাফ, অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি মৌলিক ধারণাগুলোতে সে ধারণার বিস্তার।  অতএব এককথায় প্রগতিবাদ বা প্রগতিশীলতা কোন অর্থেই আধুনিকতা নয়।

     কিছু কথা সকলের জন্য, বিশেষত প্রগতিশীলদের জন্য জরুরীঃ
    এখন আসব
    সকলের জন্য কিছু কথায়, যা বিশেষত প্রগতিশীলদের জন্য খুবই জরুরী। আধুনিকতা, আধুনিক রিপাবলিক ধারণার উৎস কীভাবে – চিন্তার কোন পথ-পরিক্রমায়?  প্রথমত বলে নেই আমার একথাগুলো মেনে নিবার কোনই দরকার নাই। তবে কেবল আপাতত যা এখানে বলেছি ঠিক-ঠাক সেটাই বুঝে নিলে হবে। বুঝা আর মানা এককথা নয়।  সেটা মানলেই চলবে। আমরা রিপাবলিক (রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠা নিয়ে কথা বলছি, এর আগের লেখায়। এটাও বলেছি  রিপাবলিক মানে এটাই  আধুনিক (মর্ডান) রাষ্ট্র ধারণাও। কিন্তু কোন মর্ডানিটি?  সেই মর্তাডানিটি বলতে কী বুঝব? তা নিয়েই এখানে স্বল্পে কথা বলব!

    রেনেসাঁ [Renaissance] থেকে যার শুরু, পরে এনলাইটেনমেন্ট [enlightenment]
    হয়ে
    রেশনালিটি [rationality] বা বিজ্ঞান [science] – মানে যেটা মানুষের চিন্তার
    পদ্ধতি সম্পর্কে
    প্রথম আত্ম-সচেতনতা; সে পর্যন্ত পৌছানো [ তবে আত্ম-সচেতনতা এর কথা
    বললেও তা
     হেগেল নয় বড়জোর কান্ট পর্যন্ত]। আর এই পুরা রাস্তায় ভিতরে ক্রমশ
    ব্যাক্তিবোধের উন্মেষ ঘটে যাওয়া।
    আর এতে সবকিছুই পরিণতি পায় ‘আধুনিকতায়’। রেনেসাঁ
    এক ইতিবাচক গন্তব্য পায় যেখানে। আর সেখান থেকে
    মর্ডান রিপাবলিক স্টেট বা আধুনিক
    রিপাবলিক রাষ্ট্রের
    আবির্ভাব।

    এখন লক্ষ্য করবেন উপরের ছোট প্যারায়, চিন্তার পথ পরিক্রমার একটা সংক্ষেপ হাজির করেছি। আর  এই পুরা যাত্রা পথে প্রগতিশীলতা কোথাও নাই। কারণ প্রগতিশীলতার বড়-ভাই কমিউনিজম তখনও আসে নাই।  আর সেটা আসতে গেলে আগে চিন্তা পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচেতনতার [self conciousness] আরেক ধাপ (কান্টের পরের ধাপ) পার হতে হবে; তবে সেটা আবার কান্টের হাত ধরে নয়, এবার হেগেলের হাত ধরে। তাতে আমরা ফেনোমেনা বুঝতে শুরু করব। পরে এসব কথার ব্যবহারিক রূপ দানকারি কার্ল মার্কস-কে জানতে চাইলে  জানতে পারব! তবেই না এরও আরো কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর পরে মার্কসের কমিউনিজমের ছায়ায় স্তালিনের সমাজতন্ত্র পর্যন্ত আসতে পারব!  সেটা কায়েম হতে হবে আগে; কেবল এরপরেই কমিউনিজম লিবারেল বা স্মল ভার্সান হয়ে প্রগতিশীলতা [progressive] বলে কিছু হাজির হবে। যদিও মনে রাখতে হবে, প্রগতিশীলতা দরকার হয়েছিল ধর্মকে কোপাইতে। বিশেষ করে এর ভারতীয় ভার্সান হল – ইসলাম-মুসলমান কোপাইতে।

    কিন্তু তামসাটা হল, প্রগতিবাদীরা তবুও একই গোঁ ধরে থাকে। আধুনিকতাই যেন প্রগতিশীলতা এই ভাব ও ভান ধরে থাকতে চায় তারা। তবে এটা একদিকে না জানা থাকা অন্যদিকে দরকারের তীব্রতাতেই এই পরিণতি!  এমনকি অনেকে মনে করে আকড়ে থাকতে চায় যেন প্রগতিশীলতা আধুনিকতার  সাথে সম্পর্কিত কোন পুর্বসুরি বা উত্তরসুরি না হলেও ভাইরাভাই!  আর এর স্বপক্ষে রেফারেন্স হিশাবে ব্যবহার করতে চায় রেনেসাঁকে বা অনেকে আধুনিকতাকেও। বিশেষত এটা আবার কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রবল; এমনটা প্রগতিশীল রাজনীতিকের বেলায় নয় বা কম। দেখা যায় এমন কবি-সাহিত্যিকদের আধো রেনেসাঁ-বোধের ভিত্তি রোম তো নয়ই পশ্চিমকে পাঠ নয় – এমনকি যারা ইংরাজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন তারাও নয়, এদের রেনেসাঁ বুঝাবুঝির উৎসও কলকাতা অন্নদা শঙ্কর রায় টাইপের!! যারা আগেই ইসলাম কোপানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে এখন এসেছেন এর পক্ষে রেনেসাঁকে সাফাই হিশাবে ব্যবহার করতে গিয়ে যেসব লিখেছেন।
    কিন্তু এখানকার জন্য বেজ ফ্যাক্টস হল,  উপরে  চিন্তার যে একটা খসড়া গতিপথ দেখালাম সে প্রসঙ্গে,  মার্কস এর কোন লেখায়  – না রেনেসাঁ সম্পর্কে না এর শেষের রূপ আধুনিকতা বা রিপাবলিক রাষ্ট্র ইত্যাদি এসবের কোনটাকেই রেফারেন্স হিশাবে – মার্কস নিজ চিন্তাকে হাজির  করার ক্ষেত্রে এজন্য জরুরি মনে করেন নাই। এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, মার্কসের (১৮১৮-৮৩) আয়ুর সক্রিয়তার কাল যেটা তখন রিপাবলিক রাষ্ট্রের ধারণা ইউরোপে বাস্তবায়িত ও প্রতিষ্ঠিত-থিতু হয়ে গেছে ভালভাবেই। কিন্তু আমরা দেখছি এর প্রভাব মার্কস নিজের উপর নেন নাই।   তাই এসবের একটার সম্পর্কেও মার্কসের রচনায় কোন বক্তব্য নাই। দু’লাইন লেখা নাই। রিপাবলিক রাষ্ট্রের চেয়ে তার কাছে ও চোখে সারপ্লাস ভ্যলু থিওরি সবার উপরে গুরুত্বপুর্ণ। সেকারণে সম্ভবত আধুনিকতা বা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে তিনি কিছুই বলেন নাই। এছাড়ার তাঁর শ্রেণীর রাষ্ট্র চিন্তা – এটা কোন আধুনিক রাষ্ট্র চিন্তা তো একেবারেই নয়। বরং একেবারেই ভিন্ন কিছু ও আলাদা।  আধুনিক রিপাবলিক যেখানে সকল নাগরিককে অধিকার ও নিরাপত্তাদান এর দায়ীত্ব নিচ্ছে বলতে চায়; শ্রেণীর রাষ্ট্র সেখানে এক ক্ষমতাসীন শ্রেণী অন্য সকল শ্রেণীকে খোলাখুলি কোপায় মারবে। গুম, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি সব এই শ্রেণীযুদ্ধে নাকি জায়েজ। শুধু তাই না এর মধ্যে আবার কোন বিচার ব্যাবস্থা, কোন লিগাল প্রসেস বা আইন-আদালত প্রক্রিয়া ও ভুমিকা ইত্যাদি কিছুই লাগবে না।

    কিন্তু প্রগতিবাদের এর মধ্য থেকে কেবল ঐ কোপাকুপিটা দরকার; তার ইসলাম কোপানোর দরকার!  তাই তারা কমিউনিজমের কাছে গিয়েছেন। আর যা যা ধার করে এনেছেন সেটাই প্রগতিবাদ। যার সোজা অর্থ হল,   প্রগতিশীলতার সাথে কোনভাবেই আধুনিকতা সম্পর্কিত  ধারণা নয়! তাহলে কী প্রগতিবাদিরা কার্ল মার্কসের কমিউনিজমের কাছে ধর্ম কোপানোর তত্ব আনতে গেছিলেন?
    না ঠিক তাও নয়। প্রথমত একটু কারেকশন লাগবে। প্রগতিশীলেরা কার্লমার্কসের কাছে নয় তারা গেছিলেন স্তালিনের কাছে। তবে সেটা স্তালিন বেশি খারাপ লোক সেজন্যও না। বরং একটা ব্যবহারিক কারণে। অন্যদিকে, মার্কসের চিন্তা কখনই ঠিক ধর্মবিরোধী নয়।  বা সেটা অন্য কোন ধর্ম বা ইসলাম কোপানো মার্কসের চিন্তা-কাজের কোন লক্ষ্যই নয়। তাহলে?

    ব্যাপারটা হল ধর্ম কোপানো মার্কসের কমিউনিজম ধারণার অংশ না হলেও স্তালিনের সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে ও এই সুত্রে ব্যবহারিকভাবে তাই হয়ে গেছিল। যদিও ধর্ম কোপানো কমিউনিজমের জন্য ঠিক এসেনশিয়াল (essencial) অর্থে জরুরি না।

    এনিয়ে ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধারণা ও কথাঃ
    ঘটনা হল, রাশিয়া মানে সারা পুর্ব-ইউরোপে জুড়ে এই জনগোষ্ঠি অর্থডক্স [orthodox] ক্রিশ্চানিটির অনুসারী; ফলে এই ধর্ম ও এর বিশেষ চর্চার প্রভাব ছড়িয়ে আছে ঐ’অঞ্চলে। আর সেই বিশেষত্বটা হল যেমন, অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটিতে,  মূল পাদ্রী বা প্যাট্রিয়াক [patriarch] এর ধারণা আছে যা খুবই সেন্ট্রাল। তিনি এসব  অর্থডক্ম সমাজেই খুবই প্রভাবশালী ও একক ক্ষমতাবান। প্যাট্রিয়াকের কথায় পুরা অর্থডক্স সমাজ উঠে আর বসে – এটা অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটির বিশেষ বৈশিষ্ট; যেটা ক্রিশ্চানিটির অন্যান্য ধারা বা ফ্যাকরায় পাওয়া যাবে না;  অন্য ফ্যাকড়ায়, সেন্ট্রাল ব্যক্তিত্ব বলে কেউ আছে এমন না।  [ব্যক্তিগতভাবে আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় প্রায় তিনবছর বসবাস আমাকে অর্থডক্স বৈশিষ্ট সম্পর্কে সচেতন করেছিল। একেবারে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছিল। ]  আমার ধারণায়, কোন অর্থডক্স সমাজে কমিউনিস্ট-সহ যেকোন বিপ্লবী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন এর চেয়ে ডাবল কঠিন। কারণ, সেখানে প্যাট্রিয়াক একজন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি না হলেও প্রায় সমান ক্ষমতাশালী। তফাত কেবল একটাইঃ এর একটা হল রাজনৈতিক ক্ষমতা আর অন্যটা ধর্ম-সামাজিক ক্ষমতা।  অর্থডক্সে ইস্টারের উপাস পালন টানা কমপক্ষে ৪০ দিনের; গভীরভাবে পালন ওয়ালারাদের কাছে  তা বছরের ১৮০ দিনেরও। যেটা অন্য খ্রীশ্চানিটি ফ্যাকড়ার বেলায় বড় জোর তিন দিন। এসময়ে এর পালনে সকাল থেকে তিনটা পর্যন্ত না খেয়ে প্রেয়ারেই কেটে যায়। পালনকালে এসময়ে কোন প্রাণীজ প্রোটিন খাওয়া নিষেধ। রাজধানী আদ্দিস-আবাবায় এসময়কালে কোন বেকারীতে কেক খাওয়া মানে শাস্তি পাওয়া। কারণ, কেকে ক্রিম নাই, ডিমও দেয়া হয় নাই। বাজারে মাছ-মাংসের দোকানই বন্ধ। তবে ইথিওপিয়ায় আগের প্যাট্রিয়াক যখন ক্ষমতায় অভিসিক্ত ছিলেন তখন তবু মাছ খাওয়া চলত। কিন্তু আমার বসবাসের সেসময়ের প্যাট্রিয়াক (তেলাপিয়া) মাছও খাওয়া নিষিদ্ধ করে ফতোয়া দিয়েছেন। এখন এমন ক্ষমতা ও প্রভাবের প্যাট্রিয়াক যদি কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে কোন ফতোয়া দিয়ে দেন, যদি মনোমালিন্য অপছন্দ শুরু হয়ে যায় তাহলে কমিউনিস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা মাথায় উঠবে, তা কায়েম রাখা অসম্ভব হয়ে যাবে। ইথিওপিয়াতেও ১৯৯১ সালের দ্বিতীয় কমিউনিস্ট বিপ্লবের পরে সবার আগেই পার্টি কৌশল-কায়দা করে ফেবারেবল ও পছন্দের এক প্যাট্রিয়াক বসিয়ে নেয়া হয়েছিল। প্যাট্রিয়াক বানানোর যে বোর্ড আছে সেখানেও যখন তখন প্যাট্রিয়াক বদলানোর সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না, আগের জনের স্বাভাবিক মৃত্য না হলে।
    অর্থডক্স বৈশিষ্টের এসব ব্যবহারিক কারণে, আমার ধারণা অনুমান হল, বিশেষত স্তালিন  অর্থডক্স ক্রিশ্চানিটি ব্যবস্থা বা সাধারণভাবে ধর্মের বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করার দিকে গিয়েছিলেন। তাতে কমিউনিজম ধর্মবিরোধিতা থাক আর নাই থাক!  যদিও পরবর্তিতে সমাজতন্ত্র মানেই ধর্ম কোপানোই এটাই প্রতিষ্ঠিত ধারণা হয়ে যায়। তাই শুরুতেই বলে রাখা ভাল আমার এই ধারণা প্রকাশ তাই কমিউনিজমকে মোলায়েম ভাবে হাজির করা একেবারেই নয়। অথবা এই উপস্থাপনের পরে তা মোলায়েম হয়ে যাবে না। বাস্তব সমাজের ধারণাতে, কমিউনিজমের শরীর থেকে ধর্ম কোপানোরপরিচিতি বা বৈশিষ্ট যা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তা আগামিতেও কাটবে না।
    আসল কথাটা হল,  অন্যান্য দেশে যারা যারা নিজ দেশে ধর্ম কোপাতে দরকার মনে করেছে সে কমিউনিস্ট না হলেও প্রগতিশীল সেজে সেই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল সাফাইয়ে ধর্ম কুপিয়েছে। এই হল আসল কথাটা।
    দুনিয়াতে এমন প্রমিন্যান্ট তিনটা দেশ দেখা যায়; ভারতীয় উপমহাদেশে, বৃটিশ ও ফরাসী দেশে। উপরে লেখায় দেখিয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে কিভাবে জমিদার-হিন্দুরা কিভাবে ক্রমশ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল হয়ে গেছিল। আর সেই থেকে মুসলমান কোপানি আর তাদের উপর সব ধরণের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতেই  হিন্দুত্ববাদ=প্রগতিশীলতা হয়ে আছে।
    এছাড়া বৃটিশ ও ফরাসীরাও প্রায় এমনই হয়েছে। তবে একটু ভিন্ন কারণে যদিও এর মুখ্য ব্যবহার এদের বেলায় তারা ভিন্নভাবে শুরু করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে পরে এই সাম্রাজ্যভুমি  বৃটিশ ও ফরাসীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা একটু ভিন্ন আগেই বলেছি। তা হল, শাসক হিশাবে তারা ক্রিশ্চান কিন্তু শাসিতেরা মুসলমান।  সাধারণ ক্ষেত্রে এটা হয়ত তেমন সমস্যার নাও হতে পারত। কিন্তু ইউরোপের সাথে তুরস্ক মানে হল ক্রসেড যুদ্ধের সম্পর্ক, ইউরোপের ক্রিশ্চানিটির হেরে যাবার সম্পর্ক।  পরে যদিও ইউরোপ তাদের চার্চকে পিছনে ফেলে রাজনৈতিক ক্ষমতা হিশাবে তারা মর্ডান রিপাবলিক হয়ে গেছে। ওদিকে তুরস্ক তখন এই প্রথম অটোমান (পরাজিত বলে) থেকে বের হয়েছে। কিন্তু এরা হল সেই অটোমান তুরস্ক যারা আট থেকে বারো ক্রুসেডেও বিজয় লাভের পরে অটোমান সাম্রাজ্য শাসন শুরু করেছিল। ফলে পরাজিত অটোমান রাজতন্ত্র  বলে সেখান থেকে বের হওয়া তুরস্কের বাসিন্দারা কিভাবে নয়া ক্রিশ্চিয় বৃটিশ ও ফরাসী শাসন কে নিবে – এই ছিল বৃটিশ ও ফরাসীদের টেনশন ও শঙ্কা। সেকারনে আমরা দেখেছিলাম বৃটিশ ও ফরাসী নিজেকে প্রটেকশন এর চিন্তা। আর সেটাই ছিল কামাল তুনে কামাল কিয়া ফেনোমেনা মানে কেমেলিয়ান চর্চায় শয়তানির কথিত সেকুলারিজম আর রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার বকোয়াজি! অন্যভাষায় এটাই বৃটিশ ও ফরাসীদের ইসলাম কোপানো!  খেয়াল রাখতে হবে, ইংল্যান্দের রাজা যখন এঙ্গলিকান [anglican বা ইংলিশ] চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান – সেটা থাকা অবস্থায় ( আর যেটা এখনও তাই) অবস্থায় বৃটিশেরা রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার বকোয়াজি! তখনও শুরু করেছিল এখনও জারি রেখেছে!! 

    His Majesty the King is the Supreme Governor of the Church of England.
    The King appoints archbishops, bishops and deans of cathedrals on the advice of the Prime Minister.

    ওয়ের চেয়ে বড় নখড়ামি আর কী হতে পারে?? আবার ওদিকে ফ্রান্সের এসিমিলেশন [assimilation] যার সোজা বাংলা হল, “তোমাকে আমার মতই হতে হবে“। আমার ধর্ম-কালচার সামাজিক অভ্যাস যা আছে হুবহুই তোমাকে মেনে নিতে হবে, তুমি নিজেকে বদলিয়ে আমার মত হয়ে যাও।  হতেই হবে। এই হল ফরাসি ফাজলামি! এনিয়ে আমার পুরানা লেখা দেখতে পারেন।

    ৩০ বছরের ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধঃ
    আসল প্রসঙ্গটা হল, বৃটিশ-ফরাসিদের কথিত ‘সেকুলারিজমের’ ধান্দাপানি। উপরে দেখিয়েছি রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার বকোয়াজিটা কী ও কেন।  আর এখন বলব, ক্লাসিক্যাল তবে পরোক্ষ এক সেকুলারিজমের ধারণা (যেটাকে আমি ক্লাসিক্যাল সেকুলারিজমও বলি) ইউরোপেই ছিল ও আছে তবে তা চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। সে প্রসঙ্গে যেতে কথা শুরু করতে হবে উলটা করে। আর সেকাজেই ৩০ বছরের ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধ কথাটা। তবে সাবধান কথাগুলো আমি বানাই নাই। আপনারা নেটে Thirty Years’ War – এটা লিখে সার্চ দেন এরপর নিজেই পড়ে দেখেন। আমার কোন পুরানা লেখাতেও পাবেন। আরেকভাবে পেতে পারেন যারা ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফিলিয়া সম্মেলনের [Treaty of Westphalia] বা সমঝোতা সম্পর্কে জানেন। যারা  ইসলামবিদ্বেষ থেকে দুূরে সৎভাবে মন ও চিন্তা সাজাতে চান তারা চিন্তা বাধাহীন উন্মুক্ত করতে চাইলে ইউরোপের ইতিহাস বুঝতে চাইতে পারেন। মনগড়া জমিদার-হিন্দু বয়ানের খপ্পর থেকে তাদের বের হতে হবে। ইউরোপীয় রাজারা তাদের আমলে ইউরোপীয় ধর্মযুদ্ধ (যেটা আসলে খ্রীশ্চানিটির নানা ফ্যাকড়া বা ইন্টারপিটেশনের মধ্যের ঝগড়া ও যুদ্ধ) যা তারা ধর্মযুদ্ধ না বলে গৃহযুদ্ধ বলে মোলায়েম রাখতে চায় এরই কাহিনী। তবে মুখ্যত সেকালের শাসন ব্যবস্থায় এর সমাধান তারা কী বের করেছিল, যা আজও শিক্ষণীয়, তা জানা দরকার। যার সেই সমাধানের সারকথাটা হল, নাগরিককে সমান অধিকার ও মর্যাদায় রাখতে হবে। রাজাদের বেলায়, রাজার পালিত খ্রীশ্চানিটির ধারার লোক প্রজা না হলে, রাজা কী সেই প্রজাকে একঘরে করবেন, বৈষম্য করবেন, শাস্তি দিবেন? আর তাতে দুই প্রজা দুই ধারার খ্রীশ্চানিটির অনুসারী হলে কী তারা একে অপরকে খুন করে সমাধান আনবেন?
    এরই সহজ সমাধান করা হয়েছিল ১৬৪৮ সালে জর্মানির এক শহর ওয়েস্টফিলিয়া-তে বসে এক সমঝোতা সম্মেলনে।  আর সেটা ছিল ১৬১৮-৪৮  এই ত্রিশ বছর ধরে ধর্মযুদ্ধ করার পরে র সমাধান হিশাবে। কি সেই সমাধান?
    খুবই সহজ রাজা ফ্যাকড়া নির্বিশেষে সকল ধারার খ্রীশ্চনিটির অনুসারী প্রজার সাথেই কোন বৈষম্যহীন, সমান ব্যবহার ও সুযোগ সুবিধা দিবে – এই নীতি অনুসরণ করে। এটাই মর্ডান রিপাবলিকের মূল নীতি। সকল নাগরিকের সাথে বৈষম্যহীন সমান অধিকার ও মর্যাদাদান। এটাই বাই ডিফল্ট যে কোন মর্দান রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করলে সাথে আসা প্যাকেজের মত এক সেকুলারিজম। এটা শয়তানি ইসলামবিদ্বেষ আর কোপানি নয়। এটা করতে, সেকুলার বলে কোন কিছু কনষ্টটিউশনে লেখে রাখার শয়তানি বা ইসলাম-মুসলমান ঘৃণা ছড়ানির হিন্দুত্ববাদ নয়, প্রগতিশীলতা বলে আড়াল নেয়াও নয়!
    লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই এখানে এখন শেষ করছি। নিজের উপর শয়তানকে ভর করতে দিয়েন না। দয়া করে নিজে বুঝে শুনে প্রগতিবাদ ছাড়েন!  সবাইকেই নিয়ে এক সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাসের রাস্তা খুঁজেন!
    সবচেয়ে ক্ষতিকর আত্মঘাতি ধারণা প্রগতিবাদ যার হিন্দুত্ববাদের বাহক বা ক্যারিয়ারও। তাই হিন্দুত্ববাদ=প্রগতিবাদ। প্রগতিবাদ থেকে পরিস্কার ভিন্ন রাস্তা হল আধুনিকতা।

    আধুনিকতা আপনাকে আধুনিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার দিকে সদর রাস্তায় নিতে পারে।

    আপডেটঃ  ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩; ভোররাত ০৩ঃ ৫৪ 
    সর্বশেষ আপডেটঃ  সেপ্টেম্বর ২০২৩; ভোর 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • এখন ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার মানে কী?

    এখন ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার মানে কী?
    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩    রাত ০৭ঃ ৫৮
    https://wp.me/p1sCvy-507

    Civil Rights Movement Concept Pro Vector

    আমরা আজকাল অনেকে “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” নিয়ে মানে, এসব শব্দ ব্যবহার করে কথা বলছেন বা বক্তৃতা করছেন – দেখছি আমরা। শাহবাগে বসে মিটিং-বক্তৃতা করছেন তারা – এসব খুবই কমন দৃশ্যাবলী ইদানিং আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানে এখন আর এসব কোন নয়া জিনিষ না। আসলে হাসিনার ১৫ বছরের শাসন আমলে ভোট দেয়া জিনিষটার আর বালাই নাই; সব উঠে গেছে বলে – এজন্যই “ভোটাধিকার” শব্দটা আমরা কোন কোন কর্ণার থেকে উঠছে – এমনই মোটামুটি অনুমান করছি।

    এখানে ‘ভোটাধিকার’ বলতে ‘ভোট দেওয়ার অধিকার’ – আমার ধারণা, শব্দের ব্যবহারকারীরা এটাই বুঝাতে চেয়েছেন। আর এতে মনে পড়ল ‘অধিকার’ শব্দটাও আমাদের রাজনৈতিক সাহিত্যে অত প্রচলিত কোন শব্দটা নয়। যতটা ধরা যাক, ‘প্রগতিশীল’ শব্দটা – এটা যতটা প্রচলিত। প্রগতিশীল শব্দটা বরং ‘একটা রাজনৈতিক ধারার” মধ্যে অনবরতই ব্যবহার হয় এমন শব্দ। সে প্রসঙ্গে আসব।

    ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা মানে কী ও কেনঃ
    এখন “ভোট” বা “ভোট দেয়া” -এই ভোট ব্যাপারটা কী আসলে? আমরা কে কবে থেকে ভোট ব্যাপারটা শুনেছি অর্থে কিছু জানি বা জেনেছি? আমার কথা দিয়েই শুরু করলে বলতে হয়, তখন আমি সম্ভবত আট বছর বয়সের আর আমার মা আর দাদি ভোট দিতে গেছিলেন পাড়ারই আরেক কোণের এক স্কুলে, এটুকু মনে করতে পারি। কারণ কিছু গোলযোগ হয়েছিল আর মা-দাদি সেটা বাসায় ফিরে এসে বিশাল আসর জমিয়ে তা বর্ণনা করেছিল আর আমরা ছোটরা আশেপাশের কৌতুহলী ঘোরাঘুরিতে যতটুকু বুঝেছিলাম আর তা আবার এখনও যতটুকু মনে আছে সেই বর্ণনা; এছাড়া তখনকার আধো আধো ধারণায় জেনেছিলাম মানে, একটা নাম শুনেছিলাম ফাতেমা জিন্নাহ। আমার মা-দাদি তাঁকেই ভোট দিয়ে এসেছিলেন। পরে একালে বইপত্র-নেট ঘেটে নিশ্চিত হয়েছি সেটা ছিল পাকিস্তানের জেনারেল আয়ুব খানের প্রথম নির্বাচন ১৯৬৪-৬৫, তবে সেটাও পরোক্ষ নির্বাচন – মানে ইলেকটোরাল কলেজ নির্বাচন যা আমাদের দেশি-ভাষায় (৮০,০০০ ডেলিগেটের) বেসিক ডেমোক্রাসির নির্বাচন। আর সে নির্বাচনেই বিরোধী রাজনৈতিক দলের দিক থেকে সম্মিলিত প্রার্থী ছিলেন ফাতেমা জিন্নাহ। মানে যিনি হলেন সম্পর্কে – পাকিস্তান জন্মের নায়ক, মূল ব্যক্তিত্ব মোহম্মদ আলী জিন্নাহ এর ছোট বোন।
    বাংলাদেশ মানে সেকালের পুর্ব-পাকিস্তানের ইতিহাস ধরে এভাবে আরো পিছনে গেলে যে নির্বাচন পাই তা হল ১৯৫৪ সালে, পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। আরো পিছনে গেলে বৃটিশ-ভারতে ১৯৩৭ ও  ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন। মানে আমরা কলোনি-দখলদারের অধীনে থাকলেও প্রাদেশিক (রাজ্য বা প্রদেশ ওয়ারী) স্তরে নির্বাচন এর সুযোগ ঘটেছিল।  অথবা অন্যভাবে বললে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা – এই মূল ক্ষমতাটাকে বাদ দিয়ে নিচের বড় জোর প্রাদেশিক সরকারগুলো পর্যন্ত ভোট-নির্বাচনের এক সীমিত ব্যবস্থা চালু হয়েছিল – সেটার কথাই বলছি। তাও এটুকু পেতেই অনেক কাঠখড় লেগেছিল মানে ১৮৫৭ সালের একটা সিপাই বিদ্রোহ লেগেছিল। আর তাতে হাজার হাজার সিপাই ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ লেগেছিল। যদি আমরা ১৭৫৭ সালের কলোনি-দখলদারদের হাতে নবাব সিরাজদৌল্লার পতনের বছরকে মনে রাখি তবে এর প্রথম ১০০ বছরে কোন ভোট-নির্বাচন কী জিনিষ আমরা অখন্ড ভারতের কেউই জানতামই না। আমাদের জানার সুযোগ হয় নাই। তবে সেই প্রথম একশ বছর এক বাণিজ্যিক (বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া) কোম্পানির দখলে থাকা যে বৃটিশ- ভারত তা পেরিয়ে, ১৮৫৮ সালের বৃটিশ-ভারত যখন কোম্পাস্নি শাসন ছেড়ে সরাসরি বৃটিশ সরকারের শাসনের অধীনে চলে যায় এরপরেই ক্রমশ ধীরে ধীরে পরিবর্তনের এক পর্যায়ে  “রাজনীতি” শব্দটার সঙ্গে আমরা প্রথম পরিচিত হতে থাকি। এখানে সরাসরি একটা অনুসিদ্ধান্ত টেনে দেয়া যায় যে, সবার আগে একটা সমাজ-ভুখন্ডের বাসিন্দাদেরকে “রাজনীতি”  শব্দটার সাথে পরিচিত হতে হয়। আর এরপরেই কেবল ক্রমশ ভোট-নির্বাচন ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক শব্দ ও ধারণার সাথে সেই সমাজ পরিচিত হতে পারে , আগে নয়। যেমন ১৮৮৫ সালে বৃটিশ-ভারত সরকার প্রথম কোন ভারতীয় রাজনৈতিক দল খুলার অনুমতি দিয়েছিল। মানে ১৮৫৮ সাল থেকে সরাসরি ইংল্যান্ডের বৃটিশ সরকারের অধীনে ভারত শাসিত হতে শুরু করার পরে – এবং এরপরেও আরো ২৮ বছর পরে নেটিভ ভারতীয়রা নিজের রাজনৈতিক দল খুলার অনুমতি পেয়েছিল। আর মাঝের এই ২৮ বছরে আমরা আরো কিছু ছাড় পেয়েছিলাম যেমন, পাড়ার ক্লাব, সংঘ, দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা সাধারণভাবে যেকোন ধরণের সামাজিক প্রতিষ্ঠান (রাজনৈতিক দল বাদে) খুলবার অনুমতি দেয়া শুরু করেছিল বৃটিশ শাসকেরা।

    আর বলাই বাহুল্য “রাজনীতি” এই শব্দটার ফলে অনুষঙ্গী হিশাবে ভোট-নির্বাচন শব্দ ও ধারণাটা আমরা পেয়েছিলাম। আর তা পেয়েছিলাম, ইংল্যান্ডে বৃটিশ শাসন ব্যবস্থাটা কেমন তা জেনে-দেখে, মানে আমাদের মধ্যে একেবারেই এলিট, সমাজের উপরের মাখন অংশ যারা ইংল্যান্ডে ঘুরবার সুযোগ ও ব্যয়নির্বাহের সক্ষমতা রাখতেন তারাই সরার আগে শিখেছিলেন যে, “রাজনীতি” রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভোট-নির্বাচন ইত্যাদি মিলিয়ে ব্যাপারটা কী ও কেমন। কেন এমন বলছি? আর এত নিশ্চিত ভাবে বলছি কী করে?

    আমাদের মোগল শাসনামলে রাজনীতি, পাবলিক-জনগণ বা ভোট ইত্যাদি শব্দ ও ধারণা ছিল না, কেনঃ 
    রাজার রাজ্য বা সম্রাটের সাম্রাজ্য বলতে কী বুঝব? কেমন শাসন ব্যবস্থা এটা? এনিয়ে আরও মুখ্য প্রশ্ন মানে, আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন!  কথাটা হল, রাজা-বাদশা বা সম্রাটকে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে? 
    এককথায় উত্তর হল, আমরা বৃটিশ দখল ও শাসনের অধীনে যাবার আগে আমরা ছিলাম মোগল শাসনে। মানে যা ছিল একটা মনার্কি [monerchy] বা রাজতন্ত্র মানে, যেটাকে আমরা রাজা, বাদশা, সম্রাট, খলিফা, আমীর ইত্যাদি যে নামেই ডাকি এমন রাজার রাজ্য বা সম্রাটের সাম্রাজ্য – সেটা ছিল এমনই এক “রাজতান্ত্রিক” শাসন ব্যবস্থা।
    এখানে একটা কথা পরিস্কার রাখার সুযোগ নিতে চাই। দুনিয়াতে কোন-না-কোন শাসন ব্যবস্থা হাজির থাকা শুরু করা মোটামুটিভাবে মানুষের সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের শুরু থেকেই। মানে যেমন শুরুতে গোত্রভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা থেকেই যদি ধারাবাহিকভাবে বলি তাহলে ওর পর থেকে পরে ব্যক্তিবোধ এই ধারণার উদয় (তবে শুরুতে অসচেতন উদয় হলেও পরে সেটা অনেক সচেতন উদয়) হবার পর থেকে ক্রমশ ব্যক্তিভিত্তিক শাসন শুরু হয়েছিল।  অবশ্য এর শুরুটা ছিল সাধারণত ছোটখাট রাজার রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা দিয়ে। এভাবে একটা না একটা ধরণের শাসন ব্যবস্থা আমরা তখন থেকেই সবকালের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাব। কিন্তু কোন একটা শাসন ব্যবস্থা থাকা মানেই তা রাষ্ট্র নয় মানে,  একে “রাষ্ট্র গড়ে শাসন ব্যবস্থা” কায়েম হিশাবে গণ্য করা ভুল হবে। কারণ রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এর আগে সমাজে পাবলিক-জনগণ ধারণা হাজির থাকতেই হবে, যা রাজার সমাজে গরহাজির, মানে থাকে না।   সারকথায়, সমাজে একটা শাসন ব্যবস্থা থাকা মানেই সেখানে তখনও তা এক রাষ্ট্র ছিল – এভাবে এই অনুমান ভুল ও ভিত্তিহীন!  আসলে “শাসন ব্যবস্থা” মানে হল একটা শাসকের রুল [rule বা শাসন] ও রুলার[ruler বা শাসক] থাকা।   কিন্তু কোন রাজতান্ত্রিকতা [monerchy] শাসন ব্যবস্থা হলেও তা রাষ্ট্র ব্যবস্থা নয়। কাজেই শাসন ব্যবস্থা মানেই তা রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা তা মোটেও নয়। আর কোন শাসন ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র-শাসন ব্যবস্থা হতে হলে সেখানে পাবলিক (public বা জনগণ) ধারণাটা থাকতে হবে। আর এরই পিছনের রুট ধারণা হল “রাজনীতি” ( politics বা পলিটিক্স) এই শব্দ ও ধারণাটাই সমাজে আবির্ভাব ও চালু থাকতে হবে। মানে রাজনীতি ধারণাটা সমাজে পরিচিত থাকলে তবেই সেখানে “পাবলিক” ধারণাটাও পাওয়া যাবে; এর আগে নয়।

    লক্ষ্য করবেন কোন রাজা, বাদশা আমীর খলিফার দেশে তাই তারা শাসক কিন্তু সেখানে ‘রাজনীতি’ বলে শব্দ নাই। তাই পাবলিক বলেও কোন শব্দ-ধারণা নাই। যে কারণে মোগল শাসনের ভারতেও ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি এসব শব্দ-ধারনাগুলো শব্দ নাই। মধ্যপ্রাচ্যের কোন বাদশা-আমীরের দেশে ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি নাই –  মানুষ আছে, বাসিন্দারা আছে কিন্তু পাবলিক নাই; তাই কোন রাজনৈতিক দলও নাই।

    মনার্কি আর রিপাবলিক শাসনব্যবস্থার তুলনা ও ফারাকঃ
    ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি এসব শব্দ নাই তা না হয় বুঝলাম কিন্তু  একটা মনার্কি (রাজতন্ত্র) আর রিপাবলিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে মূল ফারাকটা কী?
    আগে বলে নেই আমি উপরে যে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলে যা লিখেছে সেটা বলতে আসলে “রিপাবলিক রাষ্ট্রে শাসন ব্যবস্থা” বুঝিয়েছিল।
    এই বাক্যে লক্ষ্য করবেন re-public মানে পাবলিক ধারণাটা পরোক্ষে এনেছি আর সাথে আছে “শাসন ব্যবস্থা” শব্দটা। বহু পুরান কাল মানে, ধরেন যীশুর জন্মের আগে থেকেই সে আমলেরও আগে থেকেই একটা না একটা ‘শাসন ব্যবস্থা’ [রুল বা রুলার] আমরা দেখতে পাব। কিন্তু “পাবলিকের শাসন ব্যবস্থা” সেই প্রথম সমাজ দেখেছিল তখন। তাই এটাকে রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা নামে আলাদা বৈশিষ্টে ডাকা হয়।

    তাহলে কোন একটা শাসন ব্যবস্থা সেটা একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলে নিশ্চিত বুঝবার উপায় কী?
    কেউ রিপাবলিক কিনা তা বুঝবার সহজ উপায় হল একে রাজতান্ত্রিক বা মনার্কি ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে বুঝতে হবে। তবেই ভাল ভাবে বুঝা যাবে।
    একটা রাজতন্ত্রে থাকে রাজা আর প্রজা (বা বাসিন্দা)। লক্ষণীয় যে যেকোন রাজার প্রজা মানে কিন্তু “পাবলিক” নয়। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রজাই স্বাধীন ব্যক্তি নয়। কারণ, প্রজা মানেই তো সাবঅর্ডিনেট [sub-ordinate] বা অধীনস্ত;  অথবা টেনেন্ট [tenant] বা যে শাসককে খাজনা দেওয়ার বিনিময়ে চাষাবাদের রাইট পায়; তাই সে রাজার অধস্তন। এছাড়া আরেক মূলকথা হল, রাজার সমান বা মতনই আরেক ব্যক্তি তো কোনভাবেই সে নয়ই।  বরং  রাজা-সম্রাট এরা হল শাসক আর, প্রজা হল রাজার অধস্তন ও শাসিত। অধীনস্ত কেউ মানেই সে স্বাধীন  ব্যক্তি নয়, স্বাধীন অস্তিত্ব তার নাই;  freedom, free – ধারণাগুলো তার জন্য নয়। বরং রাজার ইচ্ছাই প্রজার ইচ্ছা।
    বিপরীতে রিপাবলিকেও শাসক-শাসিত থাকলেও  – মৌলিক ফারাক হল, শাসনের ক্ষমতায়। শাসককে শাসন করার ক্ষমতা কে দিয়েছে? এই হল ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন। যেটা উপরে কিছুটা বলেছি।
    এই প্রশ্নের জবাবে রাজা মাত্রই নিরুত্তর থাকবে। জবাব দিতে পারবে না। আর নয়ত শেষে হয়ত বলে ফেলবে যে, গায়ের জোরে তিনি নিজেই  বা তাঁর পুর্বপুরুষ একসময় ক্ষমতা নিয়েছিল আর এরপর থেকে এটা ডায়নেস্টি [dynasty] মানে,  রাজার সন্তান বলে সেই রাজার মৃত্যুর পরের রাজা। অথবা আরেকটু বুদ্ধিমান কোন রাজা হলে সে দাবি করবে গড বা ভগবান তাকে ক্ষমতা দিয়েছেন – এই অর্থে তা গড় গিফটেড। আর এই মিথ্যার স্বপক্ষে স্বাক্ষ্য দিতে সে কোন পুরোহিত বা পাদ্রী ধরণের কাউকে হাজির করবে।
    সারকথায় যে শাসক নিজ ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে এর সদুত্তর, ব্যাখ্যা করতে পারে না সেই রাজা-সম্রাট।

    আর এর বিপরীতে রিপাবলিকে ক্ষেত্রে এমন রাষ্ট্র মাত্রই সে বলতে পারবে আমার ক্ষমতার উৎস আমার ভুখন্ডের বাসিন্দা জনগণ বা পাবলিক। তারা আমাকে তাদের জনপ্রতিনিধি মেনেছে, নির্বাচিত করেছে; কিছু সুনির্দিষ্ট কথার উপর ভিত্তি করে ম্যান্ডেট দিয়েছে।    তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর (যেমন পাঁচ বছর) যাকে সম্মতি দিয়ে মানে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে আমিই সেই জনগণের শাসক এবং আমি তাদের সেই ম্যান্ডেট প্রাপ্ত প্রতিনিধি হিশাবে ক্ষমতার প্রধান নির্বাহী; তা প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী। অতএব আমার ক্ষমতার উৎস জনগণ। কথাগুলো আইডিয়ালি [ideally]  মানে কী হওয়া উচিত সেই অর্থে বললাম।
    আর বাস্তবের শাসক আমরা হয়ত কোথাও হাসিনা সরকারকে দেখব; সে অন্যকথা। কিন্তু অবু একটা মজার কথা হল হাসিনা অনেক চোখ উল্টানো মিছা কথা বললেও তিনি কখনও এটা বলেন  না যে তার বাবা তাঁকে শাসন ক্ষমতা দিয়ে গেছে – একটা ডায়নেস্টিক রাজতন্ত্রে যেমন হয়। অর্থাৎ এজায়গাটাই তিনি মেনে নিচ্ছেন যে শাসন ক্ষমতার উৎস জনগণ হওয়া উচিত বা হতে হবে। রাজার সন্তান রাজা এমন রাজতান্ত্রিক শাসন অন্তত তাঁর টা নয়। কিন্তু কেবল একটা জায়গায় তিনি  মিছা কথা বলতেছেন যে জনগণ তাকে জনপ্রতিনিধি বানায়েছে, তাঁর দলকে ভোট দিয়েছে – সে “রাতের ভোট” করে নাই ইত্যাদি; এগুলোই তিনি চোখ উলটানো মিছাকথা বলতেছেন।

    তাই এখানে জনপ্রতিনিধি বা নির্বাচিত পাবলিক রিপ্রেজেন্টেটিভ খুবই গুরুত্বপুর্ণ ধারণা। আর এখানে আরেকটা সাবধানতা দরকার আছে। অনেকের মনে হতে পারে, জনপ্রতিনিধি বলতে সমাজের এলিটদের থেকে এলিটদের দ্বারা বেছে নেওয়া ব্যক্তিকে এমন জনপ্রতিনিধি বলে চালিয়ে দিলেই তো হয়; বিশেষ করে কোন ‘জ্ঞানী’ কিন্তু অনির্বাচিত ব্যক্তিকে!  সরি এটা অগ্রহণযোগ্য। এটা মারাত্মক ভুল। যেমন ব্যবহারিকভাবে কল্পনা করা যাক, ধরেন এটা হল কেবল ঢাকার তাও আবার গুলশান-বারিধারার এলিট লোকেরা, তারা তাদের মধ্য থেকে এমন যাকে ভোট না, হুদাই বেছে নিবেন – প্রধানমন্ত্রী ঠিক করবেন তাহলেই তো হয় – এমনই এক ধারণা। কিন্তু না , সরি। এটা ভুল। এটা এলিটের বেছে নেয়া কেউ হলে হবে না।  কারণ,  এর সঙ্গে “পাবলিক” বা ‘রিপাবলিক’ ধারণার কোন সম্পর্ক নাই। পাবলিক আর একমুঠো এলিট কখনও এককথা নয়। এছাড়া, ওপেন অবাধ নির্বাচনে তাকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হতে হবে।
    রিপাবলিকে পাবলিক এই ধারণা আর পাবলিকের ক্ষমতা তাই এই সেন্ট্রাল ধারণা।  সেটা একেবারেই আম-আদমিকে-সহ সকল নাগরিককে আমল করে আর সবচেয়ে মারজিনালাইজড ব্যক্তিকেও তিনি কী বলেন তা শুনতে হবে, শোনা নিশ্চিত করতেই হবে। এই পাবলিক বা জনগণ ধারণা – এখান থেকেই যেমন, জন-প্রশাসন [public admin] মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য [public health], জন-পরিবহণ (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট), জনস্বার্থ (পাবলিক ইন্টারেস্ট) ইত্যাদি ধারণাগুলো। যেমন “জনস্বার্থে” আদালতে রীট করা সম্ভব যেটাকে পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (PIL) বলা হয়। জনস্বার্থ রক্ষার্থে কোন ব্যক্তির জমি অধীগ্রহণ বা একোয়ার [acquire] করে তাকে বাজার দরে দাম শোধ করে দিয়ে ঐ ভুমিতে যেকোন পাবলিক অবকাঠামো (রাস্তা, ব্রিজ, স্টেশন ইত্যাদি) যেকোন কিছু গড়ে তোলা সম্ভব। এটাই প্রতীকীভাবে সাধারণ ইচ্ছা বা কমন ইন্টারেস্ট।

    তাহলে এর সারকথাটা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাটা বুঝতে গেলে তা কখনই বুঝা পুর্ণ হবে না যদি না তা এর আগের শাসন ব্যবস্থা-  মানে, আমরা কোন রাজতন্ত্রের শাসনের সাথে তুলনা করে একে না বুঝি। বিশেষ করে একালে্র প্রজন্ম যারা আমরা কোন রাজা-সম্রাটের শাসন দেখি নাই। আবার এমনও হতে পারে নাটক-সিনেমায় কোন কোন সম্রাটের শাসনের কিছু একটা দেখে তাঁর ভাল লেগে যায়। অর্থাৎ এরা কোন মনার্কি শাসন ব্যবস্থা দেখেই নাই। এমনকি এরপরের কলোনিদখল ওয়ালাদের শাসন সেটাও দেখে নাই। তা সত্বেও! কিন্তু  কেবল বড়জোর হয়ত ভোটে দেয়া দেখেছে। আবার রাজনীতি বলে কী জানি একটা আছে দেখেছে। আর ধরে নিয়েছে ওমন একটা সম্রাটের শাসন ফিরিয়ে আনলে সমস্যা কী???  তাদের জন্য কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে বুঝাবুঝি এবং পাবলিক  – এই ধারণাটাকে বুঝা  কেন গুরুত্বপুর্ণ তা উপলব্দি করা খুবই জরুরি এবং তা করতে হবে রিপাবলিক ধারণা বা স্বাধীন ব্যক্তি ও তার অধিকারের ধারণার আলোকে।  তবে  এমন তরুনেরা আবার ভেবেও দেখতে পারেনযে  একটা রাতের ভোটের সরকারই আপনার কাছে অসহ্য লাগছে, প্রতিবাদ করছেন! তাহলে একটা মনার্কি সহ্য করবেন কী করে???

    এবার ইতিহাসের সময়কালের দিক থেকে কথা বলি, দুনিয়াতে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে এর বিপরীতে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাটা এসেছিল। তবে এটা ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা। আর আমেরিকার অভিজ্ঞতাটা  আরেকটু আলাদা। কমন আমেরিকান তারাও  তাদের কলোনি শাসক যারা তাদের মত সাদা ককেশিয় হলেও মূলত বৃটিশ কলোনি মাস্টারদের বিরুদ্ধে তাদেরকে লড়তে হয়েছিল সশস্ত্রভাবে আর তাতেই ১৭৭৬ সালে বিজয়ী হয়ে তবেই তাঁরা তাদের স্বাধীন রিপাবলিক গড়েছিল। আর তাদের অভিজ্ঞতার বাইরে এশিয়ার আরেক কোনের আমরা, আমাদের মত দেশগুলো কলোনিদখলদার শাসকদের কাছ থেকেই প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে জেনেছিল। তবে সেক্ষেত্রে এটাকে রিপাবলিক রাষ্ট্র এই নামের চেয়ে একে নেশন স্টেট বা এক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা হিশাবে তাঁরা জেনেছিল। তবে এটাকেই অনেকে আধুনিক রাষ্ট্র বলেও চিনে থাকে।
    এখন থেকে আমি বেশি বিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে মূলকথাগুলো বলে এলেখা শেষ করতে চাইব। লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে তাই; তবে পরে লেখা আরো বিস্তার করব কেমন সাড়া পাওয়া যায় সেই সাপেক্ষে!

    ইউরোপে প্রথম রিপাবলিক প্রতিষ্ঠাঃ
    সময়কাল হিশাবে বললে ইংল্যান্ডের ক্রমওয়েলের বিপ্লব [Cromwellian revolution] যেটাকে ইংলিশ সিভিল ওয়ার (১৬৪২-৫১) বলা হয়; তা সংগঠিত হয়েছিল রাজাকে উতখাত করে একটা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিশাবে। যদিও ক্ষমতাদখল সম্পন্ন হলেও একটা থিতু ব্যবস্থা হয়ে তা টিকতে পারে নাই; ফেল করেছিল।  সাধারণভাবে সারা ইউরোপের রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার সবগুলো প্রথম প্রচেষ্টার মত এটাও ফেল করেছিল। মানে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করেই টিকাতে বা থিতু হতে পারে নাই। রাজতন্ত্র আবার ফিরে এসেছিল। ফরাসী দেশে এসেছিল ১৭৮৯ সালের বিপ্লবের পরে। আর আগেই বলেছি আমেরিকার ক্ষেত্রে সেটা ১৭৭৬ সালে। যদিও ইউরোপ জুড়ে, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার চিন্তা তা দানা বাধা, পোক্ত হওয়ার সামাজিক তর্কাতর্কি মোটাদাগে সেটা ১৬০০ সালের পর থেকেই শুরু হয়েছিল। আর একটা নোক্তা দিয়ে রাখি (বিস্তারে যাব না এখন) যেটাকে আমরা কলোনিদখল বলে চিনি মানে যেটা আসলে সেকালের মত কোম্পানি বানিয়ে জাহাজ ( যুদ্ধজাহাজ ও দেশ দখলের উপযোগী) কিনে এরপর  কলোনিদখল ব্যবসায় নেমে যাওয়া – সেটাও শুরু হবারও কাল। প্রথম এমন দখল অভিযান ছিল ১৬০৭ সালে, আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia]। কিন্তু কেন  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার আলাপের মধ্যে এসব কথা কেন তুললাম?

    কারণ, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা নিশ্চয় খুবই ভাল কাজ একটা, অন্তত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধ বিবেচনায়। কিন্তু ওর সবচেয়ে কালো দিকটা হল নিজে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই করছে ঠিকই কিন্তু বিপরীতে আমাদের মত দেশগুলোকে একই সাথে জাহাজ কোম্পানি খুলে কলোনিদখল শুরু করেছে। এটাই ছিল সেকালের ইংল্যান্ডের প্রধান ও সবচেয়ে প্রফিটেবল ব্যবসা। কথাটা আরো সোজা করে বললে, ইউরোপের এমন আসন্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল কলোনিদখল ব্যবসা – একথাটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। তবু এভাবেই পশ্চিমাদেশে প্রথম রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল। পরে অখন্ড ভারত কলোনিদখল হয়ে গেলে রাজা রামমোহন রায় এর গুরুত্ব প্রথম আমল করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

    কিন্তু পরাজয়ের একটা কালো দাগঃ
    রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা কথাটা যত মহান কিছু মনে হয় এর প্রথম রূপটা তেমন মহান থাকে নাই। মানে হিন্দু দেবতা শিব গড়তে গিয়ে কারিগর বানর বানিয়ে ফেলা যেন!  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা ধারণার ব্যবহারিক রূপ হয়ে গেছিল  – আমরা একটা জাতি এমন একটা নেশন স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কাজ যেন তা। অথচ আমরা কেউ কোন এথনিক জাতি কিনা সেটা তো রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল না। কেন এমন হয়েছিল সেসব বিস্তারে এখন যাব না; তা আরেকটা পরের ভার্সানে বা বিস্তারিত লিখব। এই পরিণতির সারকথাটা হল রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা মানে হয়ে যায় জাতিরাষ্ট্র। মানে বাঘ হয়ে যায় বিড়াল!! তবে আমার এই কথার স্বপক্ষে এখন কেবল একটা ক্লু বা কিছু চিহ্ন দিয়ে যাব। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এর নাম অনেকেই শুনেছেন; যাকে শিক্ষকদের শিক্ষক বলেন অনেকে।  যত প্রগতিবাদী কুতুব আছেন – রেহমান সোবহান , আনিসুজ্জামান থেকে  যারা ১৯৮০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে ছিলেন এই অর্থে যারা কমবয়েসী কিন্তু একালে বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলেন এমন সকলেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে যার প্রভাবে গড়ে উঠেছেন। আর আহমদ ছফা যাকে নিয়ে যদ্যাপি আমার গুরু রচনা করেছেন। তবে আমার নিজের কানে শোনা আশির দশকে প্রগতিশীল জগত তাঁকে একজন মুসলিম লীগার বলে তুচ্ছ করতেন।  সেই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক সবসময় নেশন স্টেট বলতেন, তার রচনা পড়ে দেখতে পারেন। যা অবশ্যই ঠিক কোন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা তো নয়ই!
    আসলে আমার কথা সেদিকেও নয় তাই সেদিকে আর এখন যাব না। আমি আসলে নজরে আনতে চাচ্ছি যে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এর সেটা জাতিরাষ্ট্র ধারণা মানে,  সেটা কোন জাতীয়তাবাদ বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ধারণা কিন্তু নয় কিন্তু তা আমাদের মনে রাখতে হবে। কেন?

    জাতিরাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র এদুইয়ের ফারাক কীঃ
     অনেকেরই ধারণা জাতিরাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র  হয়ত একই কথা। চাইকি অনেকে মনে করতে পারেন  – জাতীয়তাবাদ শব্দ এটা তো অগ্রসর মানে প্রগেসিভ ধারণা!!! তাই এটা আরো ভাল!! কিন্তু  কারা এরা?
    বলাই বাহুল্য এই প্রগেসিভ [Progressive] এরাই মূলত প্রগতিশীল! যাদেরকে আরেকভাবে কমিউনিস্টদের লিবারেল ভার্সান বা আগমনি গান গাওয়া ছোটভাই মনে করা যেতে পারে।  তবে জাতিরাষ্ট্র ধারণাটা কেন বদলে গিয়ে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হলে গেছিল সে বিস্তারে এখন যাব না। কেবল বলব এটা প্রগতিবাদী চিন্তার দৌরাত্ম বা দুর্দশা! পাঠক নিজেও খুঁজে দেখতে পারেন।

    তবে কথা এখন অন্যদিক থেকে শুরু করব। উপরে বলেছি কবে ইউরোপের সকল রাষ্ট্র রিপাবলিক রাষ্ট্র হতে চেয়ে বাস্তবে তা জাতিরাষ্ট্র হয়ে গেছিল? আর এভাবে জাতিরাষ্ট্র -কেই যেন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা একই বলে মনে করা শুরু করেছিল? কিন্তু এরও তো একটা শেষ আছে। অর্থাৎ কখন সারা পশ্চিম ইউরোপ জাতিরাষ্ট্র গড়া শেষ বা একাজকে ফুলস্টপ বলে দিয়েছিল??  এর জবাবঃ  সেটা কে বলা যায় ১৯৪৫ সালের পরে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৫০ সালে ইউরোপের ৪৭টা রাষ্ট্রের এক সম্মেলন ডেকেছিল। সেটার নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ [Council of Europe – CoE].। আগ্রহীরা বিশেষ করে আইনের ছাত্রেরা এটা নিয়ে ঘাটাঘাটিতে গভীরে যেতে পারেন!  তবে সাবধান এর সাথে ইইউ [EU] বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই, একই নয়। সেই সম্মেলন থেকেই ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্র নিজেদের জাতিরাষ্ট্র এই জাতি-ভিত্তি থেকে সরে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রকে নয়া এক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র করে গড়ে নিয়েছিল। আর তা কার্যকর হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। কিন্তু তামাশার কথা হল যখন ইউরোপ অতিষ্ঠ হয়ে ওদের জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে ছুড়ে ফেলে দিল আর সেসময়েই তাদের সেই ছুড়ে ফেলে দেয়া  ধারণাকেই আমরা কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। অথচ আমরা কলোনি-মুক্ত হয়ে নিজেদেরকেই সেই জাতিরাষ্ট্র  হিশাবে গড়তে গর্তে ঢুকে গেছিলাম – যে গাড্ডার মধ্যে আমরা এখনও আছি। কোন ধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র শ্রেষ্ঠ নাকি উগ্র হিন্দুত্ববাদ-ই আনপ্যারালাল সবার উপরে এর তান্ডবকালে আছি আমরা

    প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়ঃ 
    কেন আধুনিকতার মধ্যে প্রগতিশীলতার কোন স্থান নাই, সম্পর্কিত চিন্তাই নয় – এনিয়ে কালকে আরেকুটা লেখা আলাদা করে দিবে। তাই এখানে সেদিকে যাচ্ছি না। কেবল সিদ্ধান্তটা ব্যবহার করব।
    তাই স্পষ্ট করে বললে, প্রগতিবাদিরা ঠিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার আগ্রহ নয়।  এদের কী করে চেনা যাবে?  একেবারেই সোজা। যারা রাষ্ট্র কী বা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা কী তা বুঝতে বা বুঝাতে একেবারেই আগ্রহী নয় – এরাই প্রগতিশীল।   এরা সম্পর্কটাও ধরতে পারে মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা এদের আরেক প্রিয় কিন্তু অর্থহীন শব্দ ও ধারণা আছে সেকুলার। তামাসাটা হল, এটা রিপাবলিক  এই মুখ্য লক্ষ্যের ধারণাই বুঝল না, নিজে এর আমল-যোগ্য হল না । অথচ অবুঝ-নাবুঝ সেকুলার আর  জাতিয়তাবাদ শব্দের জপ শুরু করে দিল।
    কেন এমন হয়ে গেল তারা? কারণ এরা মূলত প্রথমে ছিল হিন্দু জাতিবাদের সমর্থক যারা সত্তর দশকে এসে নিজের হিন্দুত্ব আড়াল করতে সেকুলার আর জাতিয়তাবাদ নিয়ে এসেছিল। এরা ক্লাসিক সেকুলারিজমের (১৬৪৮) কেউ নয়, এরা উপরে পালক লাগানো সেকুলার। এদেরকে চিনবার সবচেয়ে সহজ উপায় হল, এরা মনে করে কনষ্টিটিউশনে সেকুলার শব্দটা লিখে সেকুলার হতে হয়। যেটা কার্যত মুসলমান বিদ্বেষ। কথ্য ভাষায় বললে মুসলমান কোপানোর স্পৃহা! আর পরে এদেরই আড়াল ভাঙ্গা রূপ্টাই হচ্ছে মোদির বিজেপি – উগ্র হিন্দুত্ববাদ। বাংলাদেশে এটাই প্রগতিশীলতা! যা ইউরোপের প্রগতিশীলতা থেকে অল্প ফারাকের হয়ত!

    কথা আরো আছেঃ

    কমিউনিস্ট চিন্তা বা তাদের ভোকাবুলারিতে
    অধিকার [right] বলে কোন ধারণা নাই।

    যারা এখন ভোটাধিকার বা বাক-স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছেন এদের অনেকেই নিজেকে পরিচয় করাচ্ছেন যে ” আমি প্রগতিশীল লেখক” এই বলে!  আগে বলেছি প্রগতিশীলতা কমিউনিস্টদের সাথে সম্পর্কিত ছোট বা ভাইরাভাই!
    তামাসার কথা হল এরা একালে অধিকার নিয়েও কথা বলছে।  যেমন “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” এসবের কথা বলছেন। কিন্তু একেবারে পরিস্কার করে দেই, কমিউনিস্ট চিন্তা বা তাদের ভোকাবুলারিতে অধিকার [right] বলে কোন ধারণা নাই। “স্বাধীনতা” [freedom] বলে ধারণাও নাই।  এসব শব্দ ও ধারণা রিপাবলিক ধারণার অনুষঙ্গি ধারনা। সমাজে ব্যক্তিবোধ এর উত্থানের পরে এ’থেকেই অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি ধারণা উঠে এসেছে। তবে পাঁড় কমিউনিস্ট বা রিয়েল প্রগতিশীল যারা এরা বুঝেন ব্যক্তিবোধ এর উত্থান –  এটাও তাদের শব্দ-ধারণা নয়।  আসলে কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল রাষ্ট্র ধারণা হল রাষ্ট্র মানে  শ্রেণীর রাষ্ট্র। আর তারা কেবল শ্রমিক শ্রেণীর এক একনায়ক রাষ্ট্র গড়ার সৈনিক। যার সোজা মানে তাদের চোখের বাকি সব শ্রেণী (যাদেরকে বুর্জোয়া খেতাব দিয়ে) তারা এদেরকে গুম, খুন, উঠায় নিয়ে যাওয়া, গায়েব অপহরণ, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং সবকিছু করাই জায়েজ। [চীনে এখনও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রীরও  ভাগ্যে এমনটা একালেও হচ্ছে আর হওয়াটা এই চিন্তারই পরিণতি।]
    এজন্য অনেক বুদ্ধিমান কমিউনিস্ট নিরন্তর এক বিরাট দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেন এই বলে যে, একজন কমিউনিস্ট হিশাবে তিনি ১৯৭১ সালের এপ্রিলের রাষ্ট্রঘোষণায় থাকা তিন নীতি – সাম্য, ইনসাফ আর মানবিক মর্যাদা –  এটা সমর্থন করবেন কী করে? শ্রেণীর রাষ্ট্রবোধের কোন কমিউনিস্ট তো একাজ করতে পারে না।  শেষে এরা নিজের বিরুদ্ধে নিজেই চাতুরি করে তিন নীতিও ফেরি  হয়ে হাজির হয়ে থাকেন। অথচ এদের মন পড়ে থাকে তিন নীতির বিরোধিতায়!!

    আসলে মূল কথাটা হল গ্লোবাল পরিসরে ১৯৪৫ সালের পরে (আমাদের এদিকে) ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন ও দুই রাষ্ট্র হয়ে যাবার পর থেকে আগের  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ধারণাটাকে প্রথম জবেহ করেছিল কমিউনিস্টেরা, তাদের শ্রেণীর রাষ্ট্র-বোধ দিয়ে। এখানে একটা কথা মনে করিয়ে দেই তাহলে সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। খেয়াল করবেন ১৯৪৭ সালের পর থেকে কমিউনিস্ট জোয়ার উঠেছিল – বিশেষ করে ১৯৫৩ সাল থেকে –  যারাই  অধিকার, স্বাধীনতা, ভোট বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা তখনও বলত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চোখে এদের সকলকে তারা বলত ডানপন্থী বা রাইটিস্ট।  মানে তারা হল তারা নিজেদের বামপন্থি মনে করে তাই এই সাপেক্ষে এরা ডানপন্থী। তাই রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা বা স্বাধীনতা, অধিকারের কথা যারা বলে এরাই ডানপন্থি। আর বলাই বাহুল্য  বামপন্থী চোখে এরা নিচা চিন্তার মানুষ।  অতএব ডানপন্থিরা হল প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল।  এমনকি একালে বিডিনিউজ২৪, এরা “অধিকার” এই মানবাধিকার সংগঠনের আদিলুর রহমানের নাম লিখার আগে বিশেষণ যোগ করে তারা লিখেছে ডানপন্থি  আদিলুর রহমান শুভ্র। কারণ সম্ভবত মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা লোক তো প্রগতিশীলদের চোখে ডানপন্থী-ই!!!

    তাহলে এই লেখার সারকথাটা কী? সারকথাটা হল – যারা ‘ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা শব্দ ব্যবহার করতে চান তারা অবশ্যই তা করেন যত বেশি পারেন, অবশ্যই বক্তৃতা করেন। সেটা কড়ারই সময় এটা। কিন্তু যদি এটাই আপনার এখনকার রাজনীতিক অবস্থা হয়ে থাকেন তবে আর আপনি আর প্রগতিশীল নন। থাকেন না। একথাটা ভাল করে বুঝে নেন। আর যদি প্রগতিশীল থাকতেই চান,  ইউ আর ওপেন – তবে সেক্ষেত্রে আর  ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার বন্ধ করেন।

    আসলে একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা যদি বুঝে থাকেন তবে প্রগতিশীলতার হাত ছাড়তে হবে আপনাকে। কারণ, প্রগতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য ধারণা হল শ্রেণীর রাষ্ট্র । আর সেটা কেমন তা তো আপনারা বানিয়েই দেখিয়েছেন। গত পনেরো বছরে বাংলাদেশ যে গুম-খুন অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে হাজির হয়েছে সেটাই তো প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থনে গড়ে উঠা  শ্রেণীর রাষ্ট্র – এক মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর রাষ্ট্র – চেতনার রাষ্ট্র!  বাংলাদেশের বাকি অ-মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীকে গুম, খন, অপহরণ এর জন্য পারফেক্ট এক রাষ্ট্র – হয়ে আছে সেই থেকে। আর এটাই কী প্রগতিশীলতার সমর্থনে হাসিনার বর্তমান রাষ্ট্র-টা নয়?
    এজন্যই কী ২০১৪ বা ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে আমরা কোন  “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে সমাবেশ বক্তৃতা দেখি নাই…??????

    শেষ কথাঃ
    আমাদের কোন জাতিবাদ নয়, অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র এর পক্ষে দাড়াতে হবে। এটাই হবে আমরা সবাই নাগরিক এই একমাত্র পরিচয় – যেখানে আপনি আর কোন জাতিবাদের সমর্থক নন; অথবা কোন পাহাড়ি জুম্মু জাতিবাদ কিনা তাও  আর নন। সব ফেলে এই ভুখন্ডের সকলেই এক পরিচয় তারা সকলেই নাগরিক। শুধু তাই না। এর চেয়েও বড় কথা  নাগরিক অধিকার এর দিক থেকে সকলের তারা সমান। কেউ সংখ্যাগরিষ্ট বলে সে একটু বেশি অধিকারের বা সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য যাতে সে ফেলো নাগরিক এর উপর করতে পারবেন না – এমন বৈষম্যহীন ফলে সমান অধিকারের রাষ্ট্র হতে হবে সেটাকে। সেকুলার বলে কোন ধান্দাবাজিতে হিন্দুত্ববাদ বা এর আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা এখানে নিষেধ। এই সুযোগে ভারতের দালালিও নিষেধ।  রাষ্ট্র প্রসঙ্গে  ইত্যাদি এসব খুটিনাটি দিক নিয়ে আমাদের বিস্তর চিন্তা করতে হবে।

    এটা গণতন্ত্র শব্দটাও নয়। এটা অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের কাজ।  প্রশ্ন করতে পারেন করে দেখেন, ১৭৭৬ সাথে আমেরিকায় রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার (এক ফেডারল রিপাবলিক আমেরিকা রাষ্ট্র সেটা) পরে আরো পনেরো বছর পার হয়ে গেছিল। এরপরে আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে ফাস্ট এমেন্ডমেন্ট  এর মাধ্যমে কেন অধিকারের প্রসঙ্গগুলো আনা হলো? সেসব নিয়ে চিন্তা করে দেখেন।  আগেই কেন ছিল না? কার্যত সেই থেকে রিপাবলিক মানে যে তথাকথিত গণতন্ত্র নয় তা অন্তত পরিস্কার হয়ে গেছিল। কাজের রিপাবলিক ধারণাতে মনোযোগ দেন, গণতন্ত্র এই বিদ্ঘুটে ধারণাটা্র সাথে একে মাখায় ফেলবেন না, প্লিজ!

    এমন রাষ্ট্র যেখানে নাগরিক অধিকার বা মানবাধিকারের প্রশ্নে নাগরিকেরা সকলে সমান। এটাই হল আমরা যে যে ধরণের রাজনীতিই  অনুসরণ-চর্চা করিনা কেন সকলে এই রাষ্ট্রে সমান অধিকারের এবং আমরা প্রত্যেকের কাজেই  তাঁর যে অপর তারও আমার সমান অধিকার স্বীকার করে নেওয়া ও  প্রতিশ্রুতিবদ্ধতায় আসলে  সকলে আমরা সকলের কাছে আবদ্হধ থাকব এমন হতে হবে। এটাই আমাদের আমাদের কমন পয়েন্ট, তাতে আমাদের রাজনীতি ভিন্ন হলেও! অর্থাৎ মুসলমানদের মানবাধিকার নাই, মুসলমানে তো জঙ্গি – এসব ইতরোচিত ভাষ্যকে আমাদের পিছনে ফেলে সামনে আগাতে হবে!!! কারণ, জঙ্গি মানে অপরাধী কেউ হতেই পারে। এর জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় অনুসরণে যা হবে তা হতেই পারে। কিন্তু তা বলে রাষ্ট্র বা আদালতের চোখে তার মানবাধিকার নাই এটা মিথ্যা। আর এটাই মুসলমানবিদ্বেষ! এখান থেকে বের হতে হবে আমাদেরকে! আমাদের কমন পয়েন্ট আমরা সকলেই নাগরিক, সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক!  আমরা অপরের সমান অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে এক রাষ্ট্রগঠন করতে সক্ষম হলে অনেক মেজর সমস্যা থেকে সবপক্ষই মুক্তি পাব!!!

    আপডেটঃ  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; রাত ০৮ঃ ২৮
    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩; ভোর ০৬ঃ ৩৮

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…

    দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…
    গৌতম দাস
    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Zu

     

     

                         President Biden Holds a Press Conference

     

     

    শিরোনামটাই কত সুন্দর! “দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ……!”
    মানে ভারত ছেড়ে ভিয়েতনামে পালিয়ে -এরপর বাইডেন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন! সেখানে হোটেলে পৌচ্ছে যেন দশ মিনিট ভাল করে শ্বাস নিয়ে এরপরে সাংবাদিক ডেকে নিয়ে আসা হয় বাইডেনের সামনে! তাইতেই বাইডেন জানান ভারতে মোদি তাঁকে কথা বলতে দেন নাই। [কনফারেন্সের ভিডিও ক্লিপ এখানে – 4:04 থেকে মোদির প্রসঙ্গ] মানে  যেন একদম যাকে বলে চোকিং [choking] – একেবারে টুঁটি চেপে শ্বাসকষ্ট উঠিয়ে দিয়ে ছেড়েছেন!  হয়ত এতে প্রমাণ হয়েছে বাইডেন না, একেবারেই না! বরং, মোদি-ই বাইডেনের চেয়ে  বেশি পাওয়ার ফুল অন্ততঃঃ নিজ দেশে!!! ব্যাপারটা এরকমই কিছু একটা হয়ে মিডিয়ায় হাজির হয়েছে।

    আসলে হয়ত, মোদি যার নাম তামাসা না করে তিনি কী কোন কাজ করতে পারেন না? বোধহয় না! হলোও তাই!  এটা এখন পরিস্কার যে মোদি তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে জি২০ সম্মেলন চলার ফাঁকে সাইড লাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। যেটা খুবই স্বাভাবিক! কিন্তু যেটা মারাত্মক অস্বাভাবিক তা হল যে ঐ দ্বিপাক্ষিক সভার পরে – না যৌথভাবে, না মোদি নিজে একা অথবা বাইডেনকে – কোন সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেন নাই। আর এটাকে, মোদি তাঁর সাফল্য মনে করতে পারেন! তবে এটাই পারফেক্ট স্বৈরশাসকের আচরণ! কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বা এর শাসকের আচরণ না!  যারা পাবলিক শব্দের অর্থ বুঝে নাই তারাই প্রধানমন্ত্রী; এরই চিহ্ন এসব! অথচ পাবলিক শব্দ না বুঝলে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের অর্থ তিনি কী বুঝেন? বুঝতে পারবেন?

    কোন দুই সরকার প্রধান নিজেদের মধ্যে কোন বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলন করেন, করতে হয়। এই রেওয়াজ তাঁরা মানেন এজন্য যে তাঁরা কী আলাপ করেছেন এর একটা সারাংশ অন্তত – নিজ নিজ ‘পাবলিক’ বা জনগণকে জানানো তাদের দায়িত্ব আর এটা জনগণের দিক থেকেও সেটা জানা তাদের মৌলিক অধিকার! আর সেই ‘পাবলিক বা জন-অধিকার’ পূরণ করতেই বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়ে থাকে। কারণ, একমাত্র সাংবাদিকেরাই পেশাদারি ভাবে ঐ বক্তব্য জনগণের কাছে নিয়ে যাবেন। এই অর্থে এখানে সাংবাদিক মানেই জন আকাঙ্খার এক ধরণের প্রতিনিধি। কাজেই মিডিয়া মানে কেবল মিডিয়ার মালিক আর মিডিয়ার শান-সৈকতের সাথে মিডিয়ার আয়ের হিসাবের বড়াই মাত্র নয়!  পাবলিক ধারণাটাকে সার্ভ করা বা সেবা দেওয়াটাই মিডিয়ার প্রধান কাজ!  তবে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য না জানলে এসবের কিছুই বুঝা যাবে না। আর তখনই মনে হবে সাংবাদিক সম্মেলন করা না -করা প্রধানমন্ত্রীর বাপের ইচ্ছা অথবা এসবই প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল ও তাঁরই একক এক্তিয়ারের এলাকা যেন! কিন্তু কে কাকে বুঝাবে যে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য কী??? 

    তবে ঘটনা্টা মোদিকে বাইডেনের ভারত ত্যাগ করার ২৪ ঘন্টার  মধ্যে ভীষণ বিপদ আর বিব্রতকর অবস্থায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কারণ, ভিয়েতনামে পৌছেই বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলন করার কারণে সবকিছুই দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।  প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা লিখছেন, 

    “বাইডেনের সফরে সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল মোদি-বাইডেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর সে দেশের প্রথা অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে। যেকোনো দেশের নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করা যুক্তরাষ্ট্রের রীতি। সেই রীতি মেনেই গত জুন মাসে মোদির সফরের সময় হোয়াইট হাউস কাভার করা সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও সংক্ষিপ্ত, তবু সেই সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভারতীয় গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু সমাজের অবস্থান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়েছিল। গত ৯ বছরে মোদির শাসনামলে সেটাই ছিল প্রথম ঘটনা। দেশে-বিদেশে কোথাও তাঁকে প্রশ্ন করার যে অধিকার কাউকে দেননি, সেই প্রথম তা দিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সেটাই ছিল সফরের শর্ত।
    সেই শর্তের কথাই এবার যুক্তরাষ্ট্র মনে করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর কোনো রকম প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখোমুখি হতে মোদি রাজি হননি। ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রশ্নোত্তর পর্ব বা সংবাদ সম্মেলন—কোনোটাই করা হবে না। এমনকি প্রেসিডেন্ট বাইডেন আলাদাভাবেও কোনো সংবাদ সম্মেলন করতে পারবেন না। সিএনএন তা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রচার করেছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে না হলেও বাইডেন ভিয়েতনাম গিয়ে সফররত সাংবাদিকদের সেই অধিকার দেবেন”।

    আসলে বেচারা মোদি! তারও যে কী কষ্ট আর ঝামেলায় দিন কাটছে সেট মোদি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না!!!  তিনি গত একমাস ধরে হরিয়ানায় মুসলমান কোপানোর এক জরুরী কাজে, এসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত আছেন, সামনে নির্বাচন। হরিয়ানার গুরগাঁও এর নুহ [Haryana’s Nuh] এলাকাটা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী যোগী সেখান থেকে মুসলমান নিশ্চিন্ন করার “বুলডোজার পলিসি” নিয়েছেন বলা হচ্ছে। তা যেন কম কম দেখা যায় এজন্য এখানে প্রগতির পত্রিকাত দিক থেকে থেকে দেখেন, হরিয়ানায় মুসলমান অঞ্চলে এবার উচ্ছেদের হুমকি। এখন আপনারাই বলেন যে, অন্তত এই অবস্থায় সাংবাদিক কেউ যদি মোদিকে জিজ্ঞাসা করে বসে যে হরিয়ানার নুহ এলাকায় কী হচ্ছে? তখন মোদি কী বলতেন?? তখন হিন্দুত্ববাদকে এমন দেশি-বিদেশির সামনে পরা ইজ্জত কে বাঁচাতো? কাজেই এটা তো ‘হিন্দুত্ববাদের জাতীয় স্বার্থ’, প্রগতিবাদের স্বার্থ; তাই না? কাজেই কীসের সাংবাদিকতা আর পাবলিক? ফেলায় রাখেন সব!

    আর বাইডেন হাতের কাছে বা পাশে মোদিকে – সাংবাদিকের সামনে পেলে কী করতেন এর এক সহজ ভাষ্য বা চিত্রকল্প আমরা পাই ভিয়েতনাম থেকে। সেখানে মানে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পৌছে বাইডেন বলেছেন, “‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব আরও জোরদার কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যা আমি সব সময় করে থাকি, এবারও তা–ই করেছি। শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তুলতে মানবাধিকারকে সম্মান করা, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকা যে গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরেছি”। অর্থাৎ খুবই ভদ্রভাবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মোদি কেমন “দায়ীত্ববান জনপ্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রী”!
    কথাগুলো যত মোলায়েমভাবে বলা তাতে এর প্রতিটা শব্দ দিয়েই বাইডেন আসলে মোদিকে ছিড়ে ফালা-ফালা করে দিয়েছেন! মানে বাইডেনের পলিসি তো এখন আসলে সবার জন্যই এক।  আর সংক্ষেপে তা হল – মানবাধিকার রক্ষা করে চলেন, নাগরিক বৈষম্য করা ত্যাগ করেন নাহলে উনি স্যাংশন দিবেন।  বাইডেনের এই ওষুধ হাসিনার জন্য যা  তা এখন শক্তিমান ভারতের মোদির জন্যও তাই! এতে হাসিনা-মোদি সাক্ষাত হলে তারা একই নিঃস্পেষক বাইডেনকে বদ-দোয়া দিতে পারেন কিংবা নিজেরা পারস্পরিক সহমর্মিতায় গলা জড়াজড়ি করে কাঁদতে পারেন! কিন্তু বাইডেনের হাত থেকে তাঁরা কেউই ছাড় পাচ্ছেন না; কারণ, তাঁরা দুজনই বাইডেনের বন্দী যেন!

    ঘটনা হল অনেক কিন্তু তা্মাসা তবু আমাদের পিছু ছাড়ছে না! তাহলে হাসিনা-মোদি এরা দুজনেই যদি এভাবে একই বাইডেনের বন্দিশালার বন্দি হয়ে থাকেন তাহলে হাসিনার বন্দীমুক্তির সুপারিশ মোদী বয়ে নিয়ে বাইডেনের কাছে যাবেন – এই যে গল্প গত কমপক্ষে দুমাস ধরে এই সৌম বন্দোপাধ্যায়,  প্রথম আলো আর ওদিকে অগ্নি রায় আর ডয়েচ ভেলে, ডেইলি স্টার চালিয়ে গেল, তার কী হবে???? যেমন গত ১৮ জুন মোদির আমেরিকা সফরের চারদিন আগে সৌম্য প্রথম আলোতে লিখেছিলেন বাইডেন-মোদি বৈঠক, মোদির আলোচনায় থাকছে বাংলাদেশ । আর এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ডাহা মিথ্যাগুলো প্রথম আলোর সাথে মিলে প্রপাগান্ডা করা।  মানে এতদিন মোদির গোয়েন্দা বিভাগের ফান্ডের অধীনে থেকে এসব প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এবার সৌম্য লিখে গেছেন আর প্রথম আলো তা ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু এবার? এবার আর মোদির খিদমতের ফান্ড এর অধীনে না। এবার বাইডেন-রাহুলের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে মোদির আকাম ফাঁস করে দেয়া। তাই এবারে সৌম্যের লেখা ও প্রথম আলোর ছাপা বক্তব্যের শিরোনামঃ দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ভারত নিয়ে যা বললেন বাইডেন। মানে মোদিকে কবর দিয়ে সৌম্য আর প্রথম আলো এখন বাইডেন-রাহুল গান্ধী ক্যাম্পে গিয়ে উঠলেন! এতে ওদিকে, মাঝখান থেকে মোদি-হাসিনা দুজনেই ক্ষতিগ্রস্থ – তাতে কেউ কারও হয়ে একই বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবে বা মিথ্যা আশ্বাস পরস্পরকে দিবে সে মূরোদ আর কারো নাই!! কারণ, মোদির সুপারিশের ভান্ড ফুটা হয়ে, সব মিথ্যা উদাম হয়ে পড়েছে!!! এটাই তো হওয়ার কথা,  আর কত? আর তাই হয়েছে!!

    এনিয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্টই ভারতের মিডিয়ায় যা ছাপা হয়েছে, তা। যেমন ইন্ডিয়া  টুডে যেটা মূলত প্রো-মোদি সেটাও কংগ্রেসের জয়রাম রমেশের এক টুইট বা এক্স বার্তাকে উদ্ধৃত করে রিপোর্ট করেছেঃ “Na karunga, na karne dunga…’: Congress mocks PM over Biden’s speech in Vietnam”। মানে  মোদির হয়ে যেন জয়্রাম রমেশ বলছেন যে,  “মোদি নিজেও প্রেসের সাথে কথা বলবেন , না বাইডেনকেও বলতে দিবেন”।
    এই রিপোর্টাই বাংলা করে আমাদের TBS ছেপেছে। শিরোনামঃ ভিয়েতনাম গিয়ে বাইডেন জানালেন, নরেন্দ্র মোদিকে মানবাধিকার ও মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলেছেন। এক কথায় বললে, প্রায় পনেরো বছর ধরে প্রেস এড়িয়ে চলা মোদি এবার একেবারে বাইডেনের হাতে ধরা খেয়ে গেলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রেসের সাথে সম্পর্ক-মুলাকাত-বাতচিত থাকবে না এটা ছোট-বড় যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ইমেজের জন্য, তিনি কেমন শাসক তা বুঝবার জন্য – একটা সবচেয়ে কালো দাগ অবশ্যই! সেটাই মোদির গায়ে লেগে গেছে!

    একইভাবে কলকাতা থেকে কলকাতা টিভি-ও মোদির বিরুদ্ধে কড়া এক রিপোর্ট লিখে বলেছেঃ “……ভিয়েতনামে গিয়ে বৈঠকের বিষয় নিয়ে হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট”, যে লেখার শিরোনাম হলঃ মোদিকে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেছি: বাইডেন। এই রিপোর্টটা আসলে সাজানো হয়েছে – যত কড়াভাবে সম্পাদক মোদিকে বধ করতে পারবেন ততই পাবলিকের দৃষ্টি আকর্ষণ তথা কাভারেজ ভাল হবে মিডিয়ার – এই সুত্রে!

    তাহলে, মোদির শাসনের সমস্ত সঞ্চয় ইতি-ইমেজ সব কালো কালিতে ঢেকে গেছে – যেটার দেশের ভিতরে প্রভাব হয়ত ইজ্জত একটু ‘কম ডুবে যাবে’ ধরণের কিন্তু দেশের বাইরে মোদির ইজ্জত একেবারেই ম্লান হয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা মুল্যবোধের নুন্যতম চর্চা আছে এমন যেকোন দেশে। আর আমাদের দেশে মোদি ও হাসিনার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হল, মোদি হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ করে দিবে এই বকোয়াজ সেটা আর এখন লীগের কর্মি বাহিনীও বিশ্বাস করবে না। তারা শকড হয়ে যাবে! – সেটাই এখন এতই উদাম হয়ে গেল!

    বাইডেনের কাছে যে মোদির নিজের বেইল নাই সে করবে হাসিনার জন্য সুপারিশ? কিভাবে?

     

    আপডেটঃ   ২০২৩;

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    ।

     

     

     

     

     

     

     

     

  • মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা

    মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা;
    আবার জি২০-ও তাই যদিও ভিন্ন কারণে

    গৌতম দাস
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩   সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Yr

     

                         G20 summit ends with India, Brazil and Russia boasting success

     

    মোদি এখন আর বিতর্কিত ভুখন্ড নিয়ে, উগ্র হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোশে ‘লড়কে লেঙ্গে’ বলে জবর দখলকারি হতে চান না। তাই তিনি এখন আর যুদ্ধ না। যেন,  ডায়লগে বিশ্বাসী। আপোষ আলোচনার ডিপ্লোমেসিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিতর্ক-বিবাদ সমাধানের পক্ষের এক গভীর বিশ্বাসী লোক হতে চান তিনি! এমনকি এব্যাপারে আন্তর্জাতিক রুল ও আইনের সহায়তাতেও এবং এসবের অধীনে যেতেও ইচ্ছুক!

    তাহলে মোদিকে একটু মনে করিয়ে দেয়া যাক, গত ২০১৯ সালে মানে মোদি ভারতে দ্বিতীয় সরকার গঠনের পরের প্রথম সংসদে ৫ আগষ্ট, মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে সারা কাশ্মীরই ভারতের, তা বলেছিলেন কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন কেন? যেখানে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত বলে যে দাবি তা অবৈধ, অগ্রহনযোগ্য বলে বাতিল  করে জাতিসংঘ রেকমন্ড করেছিল – কোন রাজা কী বলেন সেটা না, কাশ্মীরের বাসিন্দাদের সম্মতিই একমাত্র নির্ধারক মানে এক রেফারেন্ডাম বা গণভোট করে নিতে হবে; আর এটাই হবে ব্যাপারটা ফয়সালার ভিত্তি।  কিন্তু নেহেরু তা অমান্য করে সেই জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। আর এই অবৈধ কাজ করে আবার সম্ভবত মনের অস্বস্তি মিটাতে সান্ত্বণা হিশাবে  নেহেরু ভারতের কনষ্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা এনেছিলেন। যার সারকথা হল, কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদার রাজ্য করা কিন্তু সেটা আবার ভারতেরই যেন থাকে – এই ইচ্ছামত সংযোজনী আনা। যেটা বিবদমান কোন পক্ষের কেউ চায় নাই।  এমনকি ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায় হল, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।  অথচ এসবই অমান্য করে  মোদি-অমিত জোর করে সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন; এবার দাবি করছেন পুরা কাশ্মীর ভুখন্ডই ভারতের। এই হল ২০১৯ সালের মোদি-শাহের সংযোজন। যদিও আবার এখানে কেন কাশ্মীর ভারতের হবে এনিয়ে কোন কারণ-যুক্তি বা দলিল কোন কিছুরই উল্লেখ করেন নাই!!  যা অনেকটা –  আমি বলেছি তাই ওটা আমার ধরণের গোয়ার্তুমি!!! অথচ সেই মোদি এখন ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি এর অনুসারী হতে চাইছেন??? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি এক আন্তর্জাতিক সভার বন্তৃতায় এসব নয়া খায়েস নয়া ভান-ভনিতার কথা বলেছেন!!!

    তাহলে এই যে কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকেই এক বিতর্কিত ভুখন্ডই থেকে যাওয়া, আর একে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট থেকে মোদি-শাহ এর জবরদস্তিতে পুরা কাশ্মীরই ভারতের অংশ-ভুখন্ড বলে দাবি করা এটা কোন বা কার সাথে ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি করার পরে অথবা কোন “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলে  বিতর্ক মিটানো হয়েছিল????

    “Speaking at the East Asia Summit in the Indonesian capital Jakarta, Modi reiterated that “today’s era is not of war” and “dialogue and diplomacy” form “the only path to resolution” – a theme he has advocated for an end to the war in Ukraine ever since its invasion by Russia in February 2022.” – Indian Express September 8, 2023 

    উপরের এই উধৃতিটা নিয়েছি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এক সম্মেলনে ভারতের মোদির বক্তৃতা নিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। দুদিন আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সেখানে “ইস্ট এশিয়া সামিট” এর সম্মেলন ২০২৩’ [18th East Asia Summit (EAS)] এর ১৮তম অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।  “ইস্ট এশিয়া সামিট” বলতে বুঝতে হবে মূলত আশিয়ান দশ রাষ্ট্র আর এরপরেও আরো প্রায় আট রাষ্ট্রের এই সম্মেলন। সেই আট রাষ্ট্র হল – চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান।  এই সামিটে গিয়ে মোদি যে বক্তব্য রেখেছেন – সেটাতে চীনকে উদ্দেশ্য করে কিন্তু নাম না নিয়ে দেয়া মোদির এই স্ববিরোধী বক্তব্য। এখন ভিজা বিড়াল সাজা প্রধানমন্ত্রী মোদি বলতে চেয়েছেন – যে সে হল দুনিয়ায় আইনের শাসন দেখতে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী’ আর চীন হল যে আইনের শাসন মানে না এমন রাষ্ট্র। আর যে বিতর্কিত ভুমি যা ভারতের চোখে অরুনাচল আর চীনের চেখে তা ঝাঙনান ‘Zangnan’ সেই বিতর্কিত ভুমি নিয়ে  চীনকে খোঁচা মারতেই মাদি এমন [ সরাসরি না এমন ফ্রি কিক] বক্তৃতা মেরেছেন।

    আর এভাবে ভাব ধরেছেন যেন সন্ন্যাসী ভারতের এটা খুবই পবিত্র এক সাধু অবস্থান যে কারো ভুমির দিকে তাকায় না পর্যন্ত এমনই যোগী এই মোদি!!! অতএব এটাই ইউক্রেন ইস্যুতেও মোদির অবস্থান যেন তিনি পুতিন-জেলেনেস্কিকে বলছেন – ভায়েরা আমার তোমরা ডায়লগের মাধ্যমে সব মিটসাট করে নেও”।  তবে ভুলে যাওয়া যাবে না যে এই বক্তব্য হল মোদির সাইনবোর্ড – যা লটকানো থাকে কেবল দেখানোর জন্য। আর কার্যত মোদি বলতে চেয়েছেন,  ভাই পুতিন তুমি আমাকে ৬০ ডলারেরও নিচে [বাজারের গড় দাম যেখানে ৮০ ডলার বা উপরে] সস্তায় তেল পাঠাতেই থাকো যাতে আমার আটটা রিফাইনারিতেই দিন রাত আমি তেল শোধনাগার চালিয়ে সেই তেল রফতানির পবিত্র সুবিধা খেয়ে যেতে পারি! ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসির খেদমতগার আমি মোদি তো – আছিই তোমাদের সাথে!!!

    সারকথায়, মোদির হিন্দুত্ববাদের ভারত যদি মনে করে সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড আর এব্যাপারটা হল ভারত রাষ্ট্র কী মনে করে একান্ত তার ব্যাপার – তাই এনিয়ে অন্যের কিছুই বলার নাই। েখন একই ফর্মুলা মেনে, চীন যদি বলে ঝাঙনান ‘Zangnan’ চীনা রাষ্ট্রের ভুখন্ড – তাহলে তো আর এখানে মোদির এটা “যুদ্ধের যুগ নয়” অথবা এটা “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন যুগ” অথবা  এটা “ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসিতে সমাধান” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলার আর তো কোন সুযোগ নাই; খোদ মোদিরও না।  মানে মোদি নিজেই নিজের অবস্থানকে ব্লক করছেন – অবস্থা! মোদির সব কথাই তাই অর্থহীন প্রলাপ মাত্র হয়ে গেছে!

    ওদিকে, আনন্দবাজার মোদির এই বক্তৃতাটাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদি জোশ আর দেশপ্রেমের উথলায়ে উঠেছে বলে ব্যবহার করেছে; তাই তারা জোশ তোলা এক শিরোনাম করেছেঃ জি২০ বৈঠকের আগে জকার্তায় চিনকে কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – এভাবে। আর তাতে পাঠককুল যেন বলে উঠেছিল জিতে রহ মোদি!!!
    এছাড়াও আনন্দবাজার জানাচ্ছে মোদি সেখানে আরো বলেছেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ কিছুই উল্লেখ করতে বাদ রাখেন নাই।

    “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ,
    মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
    এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

    এর মানে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি যাই তার কাছে তার শত্রু মনে হয়েছে এমন কিছুকেউ উল্লেখ রাখতে পিছুপা হন নাই। কিন্তু তিনি কী জানেন এসবের উদ্গাতা আসলে তিনি নিজেই??? কারণ, তিনি  যতবার তাঁর হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আমাদের তাড়া করেন, আক্রমণ করেন ততবারই আমরা বাংলাদেশ থেকে যারা এটা প্রতিরোধ করি, রেজিস্ট [resistance] করি  এসব কিছুকেই ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা নামকরণ করে মৌলবাদ হিশাবে। আমাদের প্রতিরোধ বা resistance – এটাই হিন্দুত্ববাদি চোখে মৌলবাদ!!!  বাংলাদেশে আমাদের অস্তিস্ত রক্ষার জন্য আমাদেরকে হিন্দুত্ববাদি সকল ততপরতাকে প্রতিরোধ করতেই হয় ও হবেই!! 

     

    জি২০ সম্মেলনের আজ শেষ দিনঃ
    তবে আগে সেলফির দিন নিয়ে অল্প কথাঃ

    ইতোমধ্যে এবারের জি২০ সম্মেলন ২০২৩ আয়োজন করা হয়েছিল ভারতে, ৯-১০ সেপ্টেম্বর। আজ তার শেষ দিন। গতকাল প্রথমদিনের বিকালে ছিল শো-অফ বা রাষ্ট্রপ্রধান নেতাদের ব্যক্তি ইমেজ বাড়ানো যেটাকে বলে “পাবলিক ইমেজ” ক্রিয়েট বা তৈরি করে নেওয়ার এক শান্ত বিকেল। যেটা বাংলাদেশে বসেও আমরা টের পেয়েছিলাম এক সেলফি-ময় হয়ে উঠা সর্বত্র!!  বাইডেনের লক্ষ্য ছিল এক উদার মনের প্রেসিডেন্টের ইমেজ তৈরি করা।  বিশেষ যে প্রধানমন্ত্রী তাকে উঠতে বসতে গালাগালি, তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী, আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপকারি অথবা ২০ ঘন্টার লম্বা জার্নি করে দেখতে যাওয়ার মত আরও মহাদেশ আছে (মানে আমেরিকা আর যাবেন না বা পড়োয়া করেন না) ইত্যাদি এতসব বক্তব্য দেয়ার পরে তাঁকেই বাইডেনের সময় দেওয়ার দিক থেকে। ফলে এই বিচারে বাইডেন বাংলাদেশের সরকার নিয়ে যা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অবস্থান ও অসন্তোষ-ই থাক না কেন তিনি সেকারণে, মানবিক-সামাজিক সৌজন্য ভদ্রতা দেখানো আর নিজ উদার মনের পরিচয় অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি-ই আগিয়েছেন এটাই তিনি প্রমাণ করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বিপরীতে হাসিনা এই বিচারে তিনি ততটাই ইমেজ হারিয়েছেন।  যা বলেছেন তা তিনি মিন করেন এমনটা তিনি প্রমাণ রাখতে পারেন নাই। তিনি এজায়গায় শোচণীয় হেরেছেন।  যদিও এনিয়ে সাধারণ সম্পাদক ও. কাদের তার এক সেলফিতে বিএনপি নেতাদের ঘুম হারাম: ওবায়দুল কাদের বক্তব্যে এতে আওয়ামি দলীয় নেতা-কর্মির মনোবল চাঙ্গা করতে হয়ত কাজ করেছে কিন্তু এটা ততটাই হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়েছে যে তাহলে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ-কে আনার অর্থ কী দাড়ালো??? গতকাল বিকেলে লক্ষ্য করেছি প্রগতিশীল মানে  [প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ] চিন্তার ব্যক্তি বা লেখকেরা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে যে তাহলে কী তাদের হাসিনাই টিকে গেল – বাইডেনের সাথে রফা হয়ে গেল!!! এই খুশি তারা আর লুকাতে পারেন নাই বা লুকিয়ে রাখার টেনশন সহ্য করতে চান নাই যে তারা ভারতপন্থি বা র-পন্থি!! তারা সরাসরি বা পরোক্ষে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাহলে তো হাসিনা টিকেই গেল, তাই না!!!
    আমি অবশ্য তাদেরকে আর মানসিক যাতনা দিতে চাই নাই!  কারও অসুস্থতা কখনও কাম্য হতে পারে না! তবে অবাক হয়েছি তাদের চিন্তা করবার অক্ষ্মতাস দেখে যে তারা একটা সৌজন্য-ইমেজের স্বার্থ আর একই লোকের রাজনৈতিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ  এদুটার ফারাক করতে শিখেন নাই। আপনার এনিমি-কে তার মেয়ের সামনেই খুন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা (essential-ness) কী আছে বা থাকতে পারে??? নাকি এমন চিন্তা এটাকেই তো গাধামি, এক মফস্বলি চিন্তা বলে!  কারণ, সেকাজটা অন্ততপক্ষে বাচ্চাটাকে চকলেট দিয়ে দূরে পাঠিয়ে করতে হবে  – আর এটাই স্বাভাবিক!  আর বাইডেন এক্ষেত্রে চকলেট-ই এস্তেমাল করেছেন!!!   আর তাতে শত্রুতা তো ভোতা হয়ে যায় নাই। শত্রুতা শত্রুতার জায়গাতেই বহাল আছে!!!

    সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা প্রসঙ্গেঃ
    যেকোন দুই রাষ্ট্র অথবা বহুরাষ্ট্রীয় মোলাকাত বা সম্মেলন থেকে কোন যৌথ ঘোষণা আসাটা নুন্যতম তাদের মধ্যে কিছু ঐক্যমত্য আছে তা প্রকাশ করে। সেজন্য এটা খুবই কাম্য – সে কোন সামিট  মানে শীর্ষ দুই বা ততোধিক সরকারপ্রধান এর সাক্ষাত যাকে আমরা Summit বলে বুঝি; এমন সামিট মানেই এর সফলতার নুন্যতম মাপকাঠি হল যৌথ ঘোষণা – মনে করা হয় কূটনীতি চর্চায়! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গতবছর জি২০ সামিট থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুতে রাশিয়াকে টার্গেট করে, দায়ী করে সমস্ত বক্তব্য সাজানো হয়েছিল। লন্ডন গার্ডিয়ানের ভাষায়  “.…..All references to Russia, Russian aggression and Russia’s withdrawal in relation to the war in Ukraine that featured in last year’s joint statement at the G20 summit in Bali” । 

    কিন্তু এবার আক্কেল হয়েছে। ঐ সমস্ত লিখে কী কী অর্জন হয়েছে তা তো আজ এক বছরের মধ্যে সব পক্ষই পরিস্কার বুঝতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় কথা সারা পশ্চিম – মানে বাইডেন্সহ ইউরপের সব কুতুব রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের নিজ নিজ ইলেকশব ফেস করতে হবে। আর তাতে এরা কেউই নিজ নিজ জনগণের কাছে যুদ্ধের পক্ষে তাদের সাফাই অনুমোদন করিয়ে নেয়া মানে তাদের স্ব স্ব রাষ্ট্রের জনজীবন যুদ্ধের ফলে ভাল আছে আরামে বা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে তা একেবারেই নয়। কাজেই অন্তত বাইডেনের কথা যদি বলি আহামি ২০২৪ নভেম্বর তাকে আমেরিকান নির্বাচনের মুখোমুখি দাড়াতে হবে।  অনেকবার যুদ্ধ চালানোর প্রার্থী জিতেছে যেমন বুশের দ্বিতীয় বা সেকেন্ড টার্মের জয়। কিন্তু আবার ওবামার দুবারের জয়  যুদ্ধ থেকে ফেরত আনবার প্রার্থী ছিলেন বলে! অনুমান করা হচ্ছে এবার যুদ্ধ থেকে ফেরত আনার প্রার্থির পক্ষে রায় যাব। তাই আগামি বছরের শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাতে হবে বা বন্ধ দেখব বলে অনেকের অনুমান। ইত্যাদি এসব জল্পনা-কল্পনার ফলাফল হল এবার জ২০ এর যোথ ঘোষণায় আপোষের ভাষা চলে এসেছে।

    তাই গত বারের বালি সম্মেলন সেসব-ই বাদ রাখা হয়েছে এবার। রাশিয়াকে এবার দায়ী করা আর নয়।   সেটা তাদেরবি বিভক্তি আরো বাড়াবে আর এবার ভয় কাজ করছিল এ ঐ যুদ্তেধ তাদের যে কোন আসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে […alleviating fears that disagreements over the Russia-Ukraine war would prevent a consensus for the first time.]। আর একারণের এর বদলে নতুন যেসব শব্দাবলির উপর জোর দিয়ে ঐক্যমত্য আনা হয়েছে তা হলো …।Instead, the declaration emphasised that states must “refrain from the threat or use of force to seek territorial acquisition” and that “the use or threat of use of nuclear weapons is inadmissible”.
    অর্থাৎ এমন প্রধান দুইটা ভাষ্য যা বাংলা করে লিখলে হবে – ১। কোন ভুখন্ড বিতর্কে কোন হুমকি দেয়া বা শক্তি ব্যবহার না করার আহবান জানানো হয়েছে। 
    এছাড়াও  ২। কোন পক্ষের কোন পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহার করার হুমকি অনুমোদন-অযোগ্য বলা হয়েছে ঐ যৌথ সর্বসম্মতির ঘোষণায়।

    এককথায় বললে, কাউকে হেয় করার উপরে এটা ইতিবাচকতার জয় – এই লাইনে কথা বলার ধারার জয়লাভ!

    তবে একটা মন্তব্য এখানে করাই যায়ঃ
    সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে ইউক্রেন ইস্যুতে সব দায় রাশিয়ার উপর চাপানোর যে কূটনীতি সেটাই কিন্তু আসলে জি২০ এর যৌথ ঘোষণা লিখতে গিয়ে পিছু হঠেছে বা আপোষী হতে বাধ্য হয়েছে। আর তা হয়েছে এবারের ব্রিকস সম্মেলন (২২-২৩ আগষ্টে) আগে হওয়া আর এবার তারা নিজেরা ডালপালা বিস্তার করে বড় প্রভাব ও বড় আশা নিয়ে হাজির হয়েছে – বলে সেই জোটবদ্ধ প্রভাব জি২০ তে পিছন থেকে  ক্রিয়াশীল ছিল। আর তাদের চাপেই মূলত এই আপোষী যৌথ ঘোষণা ২০২৩। যেখানে রাশিয়াকে আগের বছরের মত অভিযুক্ত করা দূরে থাক – এবার যৌথ ঘোষণায় রাশিয়া শব্দটাই নাই, অনুপস্থিত!
    মজার কথা হল, এই পিছনের ঘটনাটা আমেরিকা প্রভাবিত মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয় নাই। হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী এএফপি-ফ্রান্স২৪ তে মানে, AFP এই গ্লোবাল মিডিয়া এজেন্সিতে আর তা প্রকাশিত হয়েছে FRANCE24  এই টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকায়। এরা নাম প্রকাশ না করে লিখেছে,   ” আমরা পুরা জি২০ সম্মেলনকে ইউক্রেনাইজড করে ফেলার পশ্চিমা  প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সম্মেলন সফল করেছি।

    “We were able to prevent the West’s attempts
    to ‘Ukrainize’ the summit agenda,” the veteran
    diplomat said, dubbing the two-day gathering a “success”.

     এদিকে এই সুযোগে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভও সুযোগ নিয়েছেন – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানাচ্ছে তিনি বলেছেন, এক ইউক্রেন ইস্যু দিয়ে যেন যাতে এবার জি২০ সম্মেলনকে ঢেকে ফেলা না যায় সেব্যাপারে মূল কাজটা করেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ গ্রুপ [Global South helped avoid Ukraine issue overshadowing G20 agenda: Russia]।  গ্লোবাল সাউথ বলতে ব্রিকস-কে বুঝানো হয়ে থাকে।  আর এই সুযোগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা আর সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা ভোকাল হয়ে উঠতে শুরু করেন।
    লুলা বলেন, জি২০ এর এজেন্ডাকে কোন বাইরের ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভক্তি ঘটায় তা হতে দিতে পারি না। বাইরের ঘটনা বলতে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যু বুঝিয়েছেন। আরো বলেছেন, জি২০ কে বিভক্ত করার কোন শখ নাই আমাদের। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বদলে আমাদের দরকার শান্তি ও সহযোগিতা!

    “We cannot let geopolitical issues sequester the G20 agenda
    of discussions,” Lula said, an implicit reference to wrangling over the Ukraine war.
    “We have no interest in a divided G20. We need peace and cooperation instead of conflict.”

     এদিকে আগামি বছরের জি২০ এর সভাপতি হচ্ছেন ব্রাজিলের লুলা। তাই তিনি এখনই ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি যদি আগামি বছরও প্রেসিডেন্ট থাকেন (যদিও না থাকার কোন কারণ নাই) পুতিন ঐ সম্মেলনে আসবেন কারণ তিনি (পুতিনকে) গ্রেফতার হওয়ার কোন সুযোগ রাখবেন না [ If I’m the president of Brazil and if he comes to Brazil, there‘s no way that he will be arrested,” he told Indian news network Firstpost on Saturday.]। 

    আর এই সুযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভারভ এক মন্তব্য করে নিয়েছেন – এবারের জি২০ সম্মেলন এক “বাঁধভাঙ্গা সম্মেলন” – …  Calling it a “breakthrough summit”, Lavrov said 

    এই ছিল মোটাদাগে সম্মেলনে পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য বা মনের কথাগুলো!! এথেকে অন্তত একটা জিনিষ পরিস্কার যে দুনিয়ার নেতৃত্ব অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব প্রবলভাবে পরিবর্তিত, বদলে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে।  এবছরের ব্রিকস আর জি২০ সম্মেলন এর দুই ঐতিহাসিক চিহ্ন হয়ে থাকল। 

    শেষ কিছু কথাঃ
    কিন্তু জি২০ জিনিষটা কী? কারা এমন সম্মেলনের চাহিদা দাতা? কারণ, এই টপ জিডিপি-ওয়ালা দুনিয়ার ২০ রাষ্ট্র  এরা তো বিশেষ আমেরিকা-চীনা বলে মূল দুই পক্ষ-বিপক্ষে পরস্পরের চরম বিরোধী! তাহলে দুনিয়ায় এমন আ

    র কে আছে যে এমন ২০ দেশকে এই সম্মেলন প্রতি বছর জড়ো হতে বাধ্য করছে??? সেসব জানলে হয়তো এবারের সম্মেলনের ঘটনাগুলো আরো পরিস্কার বুঝতে তা সহায়ক হত!!

    হ্যা ঠিক তাই!  সেজন্য আগামিতে জি২০ গ্রুপ এরা কে কারা কী এদের উদ্দেশ্যে আর কে এর পরিচালক সে নিয়ে আগামিতে লেখা আনব; সেকথা বলে শেষ করছি!

     

    আপডেটেডঃ   আপডেট ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩  রাত ০৯ঃ ৪৮

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি

    ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি
    গৌতম দাস
    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩   ১৯ঃ ৪৭ সন্ধ্যা
    https://wp.me/p1sCvy-4XV

     

           ‘চীনের উত্থান : উদ্বিগ্ন প্রতিবেশী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

    শাহরিয়ার কবীর এবার একেবারে ধরা খেয়ে গেছেন। এটা টু মাচ[too much] হয়ে গেছে; তিনি সীমা ছাড়িয়েছেন। এছাড়া, আরেকটু বারাবাড়ি করলে এবার হয়ত দেখব তাকে উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।হয়ত দেখব তিনি নিজেই লিখে দাবি করছেন যে তিনি বোবা হয়ে গেছেন!!! হা ব্যাপারটা আসলেই এতই সিরিয়াস!!
    বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন কী করে পার হবে, হাসিনা সরকার টিকে যেতে পারবেন কীনা এটা একটা অনিশ্চয়তা যা কেউই কী দাঁড়াবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারে; তাতে আপনি যে-পক্ষেরই লোক হন। তবে আপনি আত্মবি্শ্বাস দেখাতে পারেন, প্রপাগান্ডা করতে পারেন বা এমন পক্ষ-বিপক্ষ অনেক কিছুই! কিন্তু অন্তত পরবর্তি ছয়-সাত মাসের পরেই একমাত্র নিশ্চিত জানা যাবে যে ঠিক কী ঘটল। এর আগে দুপক্ষই প্রাণপণ নিজের পক্ষে চেষ্টা করে যাবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতি্তের কোন আন্দাজ ছাড়াই এমন সময়ে শাহরিয়ার ভারতের এক দালালির ঠিকাদারি নিয়ে এসেছেন। সেটা হল হাসিনা যেন চীন-ঘনিষ্ট না হন – ভারতকে ফেলে চীনা ঘোরতর সহযোগিতা নিতে না যান ইত্যাদি এমন সেসব প্রপাগান্ডা!
    এটা কে না জানে যে হাসিনা এই সংকটে নিজে যেকোনভাবে ক্ষমতায় টিকে যাবার চেষ্টা করবেন।  তাতে চীনের কোলে না কার কোলে উঠে এটা পার হবেন সেটা তো সেকেন্ডারি বিবেচনা!  প্রাইমারি বিবেচনা হল, সংকট পার হওয়া!  অথচ মামার বাড়ীর আবদারের মত ভারত বলছে  যে না তুমি চীনের কোলে উঠতে পারবা না!!!  আর শাহরিয়ারকে লাগিয়েছে ঠিকা দিয়ে এনিয়ে প্রপাগান্দা করতে! সব বিচারেই এটা অর্থহীন!  কারণ হাসিনার এক নম্বর বিবেচনা হল, ক্ষমতায় টিকে যাওয়া। আগেও তাকে টিকতে হবে। টিকে গেলে এরপরে যে হয়ত ভারতের জন্য কিছু করতেও পারে। অথচ ভারতের পোলাপানি আবদার হল যে না, হাসিনাকে সবার আগে ভারতের স্বার্থ মানতে হবে, বুঝতে হবে??? কোন সুস্থ মানুষ এভাবে চিন্তা করে না! আর এই অসুস্থ আর অবাস্তব চিন্তাটাকে বাংলাদেশে ফেরি করার ঠিকা নিয়ে এসেছে শাহরিয়ার কবীর! যেন ভারতের এই ঠিকা টা না পেলে বা নিলে আগামি বছর সে না খেয়ে থাকবে যেন এমন মরণপণ অবস্থ দশা তার!  যেন এক রেলওয়ে কুলি যে লাগেজটা বহন অযোগ্য কিনা তা বুঝবার অবস্থা নাই; বাসায় অভাব এত বেশি!!

    বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ানদের এক প্রকাশ্যে মহড়া হয়েছে গতকাল। এরা সরকারের ঘরে উঠে বসে থাকা লোকজন এবং এরা সরকারের ঘরে বসেই সরকারের বিরোধীতা করতে চাইছেন।
    এরা সরকারের ঘরেই বসে থাকা লোক এবং বাংলাদেশিই; কিন্তু প্রো-ইন্ডিয়ান এলিমেন্ট। ভারতের বাংলাদেশ নীতি দেখভাল করার ঠিকাদার বলা যায় সম্ভবত এদেরকে!
    গতকাল, এক পুস্তক প্রকাশনী বা “মোড়ক উন্মোচন” অনুষ্ঠান হয়েছে – পত্রিকার ভাষায় বললে, “মঙ্গলবার বিকালে প্রেস ক্লাবে “চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি” শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান” হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর (মানিক) রচিত এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় মূখ্য আলোচকের বক্তব্য দেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির”।

    বইয়ের নাম এর মধ্যে “উদ্বিগ্ন” শব্দটা আছে – আর সেই উদ্বিগ্ন প্রতিবেশিটা হচ্ছে বাংলাদেশ নয়, সেটা আসলে ভারত। কিন্তু সে তার সেই উদ্বিগ্নতা – এটা সে চালিয়ে দিতে চায় বাংলাদেশের নামে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বর্তমান হাসিনা সরকারের নামে।

    শাহরিয়ারের সারকথা হল – চীন খারাপঃ
    কিন্তু কেন খারাপ?
    ১। শাহরিয়ার বলেছেন,  … “এই বইয়ে  (চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি) প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে কীভাবে চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান রেখেছে। তখন স্লোগান ছিলো হিন্দি-চীনি ভাই ভাই। সেই সৌহার্দ্য থেকে কীভাবে সংঘাতে পৌঁছল…”।

    উপরে কথিত, চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান – এই তথ্য ভুল।  অন্তত গত ২০২২ ডিসেম্বরে কলকাতার প্রাক্তন সাংবাদিক ও গোয়েন্দার সংস্থার লোক সুখরঞ্জন দাসগুপ্তের এক লেখা ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় শিরোনামঃ চীন-ভারত সম্পর্ক কোন পথে। সেই লেখার ভাষ্য শাহরিয়ারের এই তথ্য সাপোর্ট করে না।

    আর খুবই অল্পকথায় বলতে ঘটনাটা আসলে, ১৯৬০ সালে  চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ট করতে নেহেরু চৌএনলাইকে কলকাতায় এনেছিলেন। আর সেখানকার শ্লোগান ছিল হিন্দি-চীনি ভাই ভাই অথবা নেহেরুর পঞ্চশীলা নীতি ইত্যাদি। তাই এটা না চীন (১৯৪৯) না ভারত (১৯৪৭) এমন কারো স্বাধীনতায় কারো অবদানের ঘটনাই নয়।   আর সেটা আবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (1953 to 1961) আইসেনহাওয়ারের আমল। যিনি বিখ্যাত বা কুখ্যাত – সিআইএ পাঠিয়ে দেশ দখল- এর কারণে। তিনি নেহেরুকে পটিয়ে তিব্বতের দালাইলামাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদেরকে মাও-বিরোধী ততপরতায় সহায়তা দিতে সি আইএ পাঠিয়েছিলেন ভারতের মাধ্যমে – যারা ভারতে থেকে এই ততপরতা করবে। কিন্তু মাও এর সরকার এসব টের পেয়ে যখন সামরিকভাবে ধাওয়া দেন তখন সিআইএ দালাইলামাকে সাথে নিয়ে তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে পর্যন্ত তুলে দিয়ে গেছিল। কিন্তু  তাদের ভারতে প্রবেশ,  সেটা ভারতের হিমাচল প্রদেশ দিয়ে নয় যেখানে এখন দালাইলামা আশ্রিত। সিআইএ অনেক ঘুর পথে আসামের দিশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল। আর চীনারা সেই ধাওয়া করতে এসেই তারা পুরা আসাম দখল করেছিল আর একমাস একদিন পরে নিজেরাই তা ছেড়ে দিয়ে চীনে ফিরে যায়।
    কাজেই শাহরিয়ারের উচিত একটু কষ্ট করা নেট ঘেটে দেখা সস্তা ভারতীয় যা মনে চায় লিখাগুলোর ফাঁদে না পরা!

    ২।  শাহরিয়ার ঐ সভায় বলেছেন, “…এদিকে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে চীন কাউকে সাহায্য করেনি। তাই চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে”।
    এখানে হঠাত করে চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব – এর কথা বললেন কেন? বললেন কারণ “শাহরিয়ার ভারতের স্বার্থপন্থী” হয়ে এবার উলটা হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছেন। আর তা বলছেন যেন ভারতের মুখপাত্র হয়ে যে, হাসিনা আপনি – “চীন ও ভারত দুদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন – এটা বাংলাদেশের জন্য বিপদ আনবে। তাই হাসিনা,  সেটা না করে আপনি কেবল ভারতের সাথে লেগে থাকেন”। ভারতের এমন খায়েসটা ভারত শাহরিয়ারকে দিয়ে অভিযোগের আকারে তুলিয়েছে।

    এতা বলাই বাহুল্য আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে হাসিনা ভীষণ আমেরিকান চাপে আছেন। কোনভাবে একটা নির্বাচন হয়েছে আর তিনি আবার জিতেছেন – এটা ঘোষণা দিতে পারলে এরপর বাকিটা মানে আমেরিকান পরের চাপ ডিঙিয়ে টিকে থাকার ব্যপারে চীন তাকে সাহায্য করবে – এমন একটা ঝাপসা বয়ান বাজারে চালু আছে।
    এটা আদৌ সত্য কিনা তেমন ডকুমেন্ট অর্থে তা কেউ দেখেছে জানা যায় না। কিন্তু মোদির ভারত এই ঝাপসা বয়ানের ভিত্তিতেই হাসিনা বিরোধিতা শুরু করেছে বা প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। আর এটাই এসব কথা ঢাকায় চালু হবার পিছনের কারণ।  আর এসব প্রপাগান্ডাই বাংলাদেশে চীন-হাসিনা বিশেষ সম্পর্কের রহস্য হয়ে ঝাপসা বয়ান হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।  শাহরিয়ারের এই বক্তৃতা সেই (ঝাপসা বয়ান ছড়ানোর) ততপরতারই একটা অংশ! তবে মোদি এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে এর কারণেই, বাংলাদেশকে ব্রিকসে উঠতে দেয় নাই – মনে করা সম্ভবত ভুল হবে না!। যদিও মুখে মুখে বা প্রকাশ্যে হাসিনা-মোদির মধ্যে এখনও অনেক ভাব – সেটাও জারি আছে। হাসিনা জি২০ এর সভায় যাচ্ছেন। অতএব সারকথায় ভারতের চোখে চীন খারাপ – একথাটাই এখানে শাহরিয়ার বলছেন। অথচ শাহরিয়ারের এই ততপরতাই বলে দিচ্ছে ঝাপসা বয়ান ভাষ্যটা ভারতের। যেটা শাহরিয়ার ফেরি করতে এনেছেন।

    ৩। শাহরিয়ার আরো বলছেন, চীনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে শ্রীলঙ্কা, এর আগে একইভাবে পাকিস্তানও ঋণের ফাঁদে পড়েছিল। অথবা আরও সার করে অন্য জায়গায় বলেছেন, “চীন ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার আগে ভাবতে হবে”।
    শাহরিয়ারের প্রথম মন্তব্য ঋণের ফাঁদে প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বেলায় সত্যি নয়। পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রশ্নে চীনের ঋণ তৃতীয় বড় ঋণ। তা এনিয়ে আর কথা বাড়াবো না। তবে পরের কথা যেটা বলেছেন এটাই সঠিক আর এটাই মুখ্য সুত্র যে “ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা” । তবে আমি কেবল ‘ভূরাজনৈতিক’ এই আধো-বোলের আন্দাজি শব্দটা ফেলে দিব। বদলে “গ্লোবাল ইকনমি” বলব।  আর পরের আধিপত্য শব্দটা ফেলতে বলব না তবে অর্থ আরো খুলবার জন্য সাথে প্রভাব বিস্তার শব্দটা লাগিয়ে নিতে বলব। আর কথাটাকে এবার সাজিয়ে বলব – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ঋণ দেয়া ঠিক তা নয় বরং, এটা সারা দুনিয়াকে ব্যাপক অবকাঠামো ঋণ দিবার মুরোদ – এটা এসে গেলে একটা দেশ এটা দিয়েই এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়ে উঠে – এভাবে বলব।
    যেমন ধরেন ভারত একই চীনের পথে হাটে না কেন? কারণ ভারতের অর্থনীতির সেই মুরোদ নাই, এখনও হয় নাই। আবার তাহলে এর আগে আমেরিকা কী করেছিল? হা ঠিক আজ চীন যা করে নেতা হতে চাইছে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকা ঠিক সেকাজ করেই গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। এমনকি মোদির ক্ষমতার প্রথম পাঁচ বছরে ভারতেও চীনা ঋণ কত অথবা এমনকি মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালিন গুজরাতে চীনা ঋণ কত ছিল – সেসব তথ্য মোদি লুকিয়ে রেখেছে কেন? পারলে তা বের করেন!!!!
    ভারত চীনা প্রভাবের বিরোধী হতেই পারে। কিন্তু তা বলে শাহরিয়ার চীনা ঋণ খারাপ বা অনৈতিক ধরণের বাজে কথা – এসব তার না করাই ভাল!
    মনে রাখবেন হাসিনা যে সর্বক্ষণ উন্নয়নের গল্প শুনাচ্ছে এই ‘উন্নয়ন’ আর (চীনের দেয়া) অবকাঠামো ‘ঋণ’ – এদুটা একই কথা – দুদিক থেকে দেখে বলা। হাসিনা চীনা-ঋণ না পেলে বা নিলে কী করত???  ভারতের ঋণ নিত? ভারতের সে মুরোদ আছে????? একারণে, শাহরিয়ারের এসব কথা ফালতু কথা!!! আজাইরা ভারতকে চীনের উপরে – যেন বিশাল মুরোদের এমন গল্প ছড়াতে এসেছেন। অথচ এসব অর্থহীন!!!

    ৪। শাহরিয়ার আরো বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের ব্যবহৃত সব বুলেট চীনের: শাহরিয়ার কবির”। শাহরিয়ারের  এসব শুরশুরি উস্কানে আবেগ আওয়ামি লীগারেরাও খাবে না; প্রগতিবাদীরাও না। শাহরিয়ারের এটা হয়েছে আসলে পোপের চেয়েও বেশি খ্রীশ্চান হতে চাওয়া যেন! অনেক দেশেরই স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রু-মিত্র অনেক রকম ছিল, থাকে। ছিল বলছে মানে হল সেটা ধরে আজীবন বসে থাকা অবাস্তব চিন্তা। যেমন ধরেন ভিয়েতনামের (স্বাধীনতার যুদ্ধে) চেয়ে বড় আমেরিকান নিষ্পেষণ খুব কম দেশের ইতিহাসে আছে। এজেন্ট অরেঞ্জ (Agent Orange) শব্দটা গুগলে যেকেউ সার্চ দেন দেখেন কী বের হয়, কী এটা! এই কেমিক্যাল উড়োজাহাজ থেকে ছিটিয়ে ভিয়েতনামের গভীর বনজঙ্গল সব সাফ করা হয়েছিল যাতে বিদ্রোহিরা বনে লুকাতে না পারে; কারণ এই কেমিক্যাল toxic, plant-killing chemical (herbicide)।
    কিন্তু মানুষের জীবনের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ, যেদিকটা সকলেই উপেক্ষা ক্করেছিল। ভিয়েতনামিজদেরকে আমেরিকা মানুষ মনে করে নাই! এতই তীব্র ছিল তাদের নিজ স্বার্থবোধ। কারণ এটা মানুষের জীবনে cancer, congenital (birth) disorders and life-threatening health complications. নিয়ে আসে। আজও ভিয়েতনামের কোন দম্পতি জানে না যে তাদের বাচ্চা জন্ম নিতে গেলে কেমন বিকলাঙ্গ হবে – হাত স্বাভাবিক কিন্তু হঠাত করে কবজি থেকে  বা কনুই এর পর থেকে তা আর নাই, একইভাবে পা নাই – সারকথায় ডিফেক্টিভ বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে এখনও যার কোন প্রতিকার নাই।  কিন্তু এই ভিয়েতনামেরই আজ সবচেয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক ভাল আমেরিকার সাথে; অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য!  এখন এর মানে কী ভিয়েৎনামিজরা খুব খারাপ!
    শাহরিয়ার  আপনি ভারতের স্বার্থে দালালির ঠিকাদারিতে বাংলাদেশের মানুষকে আবেগ-ইমোশনাল করে শুড়শুড়ি তুলার চেষ্টা করছেন? এখন বলেন কোনটা খারাপ? ভারতের কাছে আবার বেচবেন?  বাংলাদেশের  মানুষের আবেগ চটকাচ্ছেন কেন???

    ৫। শাহরিয়ারদের এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ফ্লপই হবে। ভারতের অর্থের অপচয়ই হবে। কারণ শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতার ঠিক নাই।
    এটা বলাই বাহুল্য যে যারা বাংলাদেশে এখন হাসিনাবিরোধী তারা শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ নয়। আর এমনিতেও বাংলাদেশের আম-মানুষ তারা খোদ শাহরিয়ার এন্ড গং এমন যেকারো বিরোধী সেই শাহবাগের দিন গুলো থেকেই। তাহলে শাহরিয়ারের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ কারা? যারা হাসিনার পক্ষের হাসিনার দলীয় লোক এরা? অথবা যারা ঠিক দলের নয় তবে লীগের সুবিধাভোগী? এরা?

    এরা শাহরিয়ারের কোন কথাতেই কান দিবে না তাতে তা যতই খোদ ভারতের স্বার্থকে প্রগতিবাদী জামা পড়িয়ে হাজির করলেও। এর মূল কারণ, এরা কেউই  ভারত ছেড়ে চীনের কোলে (হাসিনার) উঠাকে খারাপ ভাববে কেন? কোন কারণ নাই। এটা সারভাইবাল বা মরিয়া আত্মরক্ষার পর্যায়! এছাড়া এটা খারাপ ভাবার মধ্যে তো তাদের কোন স্বার্থই নাই!!! বরং হাসিনা টিকে গেলেই তাদের স্বার্থ!
    এছাড়া হাসিনার নেক নজরে যে আছে, পড়েছে একবার – সেই আবার এখন হাসিনাবিরোধীতা দেখাবে????? কেন? বরং হাসিনা এযাত্রায় টিকে গেলে তারা খুশি হবে। আর সেটা চীনের হাত ধরে কিনা তাতে তাদের কী এসে যায়? – সেটা কী তাদের জন্য কোন আপত্তি হবার কিছু????
    সারকথায় শাহরিয়ার গংদের পক্ষে এখন দাঁড়াবার কেউ নাই।তাদের বয়ান শুনবার মত কোন সামাজিক গ্রুপই এখন আমাদের সমাজে নাই।  এটা তো ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাইয়ের যুগ  একেবারেই নয়! যে প্রগতি-ওয়ালারা ঝাপিয়ে পড়বে!   আসলে শাহরিয়ার গংয়েরা সবাই   তারা এমন এক ভারতীয় ইচ্ছা-স্বার্থ ফেরি করার ঠিকা নিয়ে আসছেন যেটা এখন বাংলাদেশের কেউ খাবে না। আর বেশি বারাবাড়ি করলে হাসিনার উপর দিয়ে কথা বললে এরা নিজেরাই কেউ তাদেরকে ‘উপড়ে ফেলে দিবে’ – এমন রিস্ক নিচ্ছেন তারা।

    আর এটাই এক শাহরিয়ার কবীর আর ঐ বই লেখক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) ছাড়া ওখানে আর যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা কেউই  – হাসিনা চীনা-ঘনিষ্ট হয়েছেন বা আরো হতে পারেন – এনিয়ে কোন অভিযোগ করে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। বরং সকলেই ভারসাম্য রেখে কথা বলেছেন। সারকথায় হাসিনাকে চটাতে চাচ্ছেন না -চটে যাক এমন কথা কেউ বলছেন না – যার সোজা মানে তারা সবার আগে হাসিনাকেই ছুয়ে থাকতে চান, আনুগত্য ঠিক রাখতে চান – এটা পরিস্কার রেখেছেন!!!

    ওখানে আর যারা বক্তৃতা দিয়েছেন তারা হলেন, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার ইত্যাদি কেউই ভারসাম্য না রেখে কথা বলেন নাই।  যেমন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার। তিনি বলেন, চীন নিজের শক্তিতে উত্থান করেছে। চীনকে আমরা উপেক্ষা করতে পারবো না, তাই তাদের জানতে হবে। চীন যে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে- এতে সংঘাত অনিবার্য। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এই সংঘাত এড়াতে সচেষ্ট হতে হবে।

    এখন সবশেষে একটা কথা মনে করিয়ে দিব। কথিত হাসিনা-চীন আশ্বাস সেটা যদি সত্যিও ধরে নেই, তবুও এই সহায়তা পাওয়া তো শর্তযুক্ত। সে শর্ত বা বাস্তবতা বা যদির কথাটা হল,  যে হাসিনা সরকার চীনের সহায়তা পাবার পুর্বশর্ত  পুরণে নিজেকে কোনমতে করা একটা নির্বাচন দেখিয়ে নিজেকে বিজয়ী করতে পারতে হবে আগে। তবেই না এসব জল্পনা-কল্পনা!  কাজেই মোদির ভারত বা শাহরিয়ারের দালালির ঠিকাদারিতে  কি বললে এটা নিয়ে আমাদেরও এতে মনোযোগী হবার মত কিছুই নাই।  তবে এই লেখায় যা করা হল, তা হল, শাহরিয়ার গং যে মোদির ঝাপসা বয়ান টার উপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সেটাই খুলে দেখিয়ে দেয়া!! এতটুকুই!

    একটা কথা লিখতে চেয়েছিলাম বাদ পড়ে গেছে। আগামি এক বছরের মধ্যে এটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি-তে কেউ না, কোন ফ্যাক্টর না। এটা ২০০৭ সালের আগে বাংলাদেশের কাছে যেমন ভারত ছিল, এটা সেই ভারত হয়ে যাবে। এর মূল কারণ, এখনো আমেরিকা ঘোষণা না দিয়ে যেটা করে যাচ্ছে তা হল – চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিতে ভেট-উপহার হিশাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। বাইডেনের আমেরিকা সেই অবস্থানের ফাইনাল বদল বা সমাপ্তি টেনে দিলেও সেটা তিনি এখনও পাবলিক ঘোষণা দিয়ে করেন নাই।  অন্য আরেকটা ফ্যাক্টস হল, হাসিনা এখনও ক্ষমতায়। একারণে, মোদি  মিথ্যা ভাব ধরার সুযোগ নিতে পারছেন যেন ভারত এখনও আমেরিকার দেয়া খবরদারিটাই ব্যবহার করছে; সেটা তার যেন অটুট আছে। অথবা মোদির ভারত যা বাংলাদেশে করে মাতবরি দেখায় তা আমেরিকা অনুমোদিত অথবা মোদির ভারত চাইলেই সে আমেরিকার কাছে হাসিনার পক্ষ হয়ে সুপারিশ করতে পারে ইত্যাদি। অথচ  এসবই ভুয়া ভিত্তিহীন। আমেরিকা যা কিছু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে  ২০০৭ সালে ভারতকে দিয়েছিল  সেসবই প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু হাসিনা এখনও ক্ষমতায় আছে বলে মোদি এই মিথ্যা ভাব ও অভিনয়টা এখনও করে যেতে পারছে। একারণেই অগ্নি রায়েরা মিথ্যা কথা বলে করে খেয়ে যেতে পারছে।

    আগামি এক বছরের মধ্যে এই জিনিষটাই এই মিথ্যা ভাব ধরা – এটাই উন্মুক্ত হয়ে যাবে যে বাংলাদেশের উপরে ভারত কেউ না। আর আমেরিকাও এমন কোন কর্তৃত্ব বাংলাদেশের উপর খাটাতে ভারতকে দেয় নাই; ফিরিয়ে নিয়েছে। এসবই স্পষ্ট উদাম হয়ে যাবে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠান শেষ ফলাফলও প্রকাশ হয়ে যায় – এর পর থেকে।  ভারত কেউ না হয়ে যাবে। বাংলাদেশের উপর প্রভাব থাকবে কেবল আমেরিকা ও চীনের। একা ভারত, সে না আমেরিকা না চীনের ঘনিষ্ট থাকবে বা হবে। তবে ভারতের উপর আমেরিকান চাপ বাড়ার সম্ভাবনা (একেবারে বাংলাদেশের মত না হলেও ভারতের উপর আমেরিকার সাব-অর্ডিনেট হওয়ার চাপ বাড়বে) আর সে পরিস্থিতিতে ভারত হয়ত চীনের কোলে উঠতে চাইতে পারে।   ঘটনা যে দিকে গিয়েই থিতু হোক না কেন ভারত বাংলাদেশ কেউ না হয়ে যাবে ক্রমশ!! এই সম্ভাবনা এখন আমরা ক্রমশ উন্মুক্ত হতে দেখছি!

     

     

    আপডেটেডঃ   ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩;  রাত ০২ঃ ১৯ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com